Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — ইউসুফ 12:78 – আর-রাদ 13:35

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. ইউসুফ 12:78
  2. ইউসুফ 12:79
  3. ইউসুফ 12:80
  4. ইউসুফ 12:81
  5. ইউসুফ 12:82
  6. ইউসুফ 12:83
  7. ইউসুফ 12:84
  8. ইউসুফ 12:85
  9. ইউসুফ 12:86
  10. ইউসুফ 12:87
  11. ইউসুফ 12:88
  12. ইউসুফ 12:89
  13. ইউসুফ 12:90
  14. ইউসুফ 12:91
  15. ইউসুফ 12:92
  16. ইউসুফ 12:93
  17. ইউসুফ 12:94
  18. ইউসুফ 12:95
  19. ইউসুফ 12:96
  20. ইউসুফ 12:97
  21. ইউসুফ 12:98
  22. ইউসুফ 12:99
  23. ইউসুফ 12:100
  24. ইউসুফ 12:101
  25. ইউসুফ 12:102
  26. ইউসুফ 12:103
  27. ইউসুফ 12:104
  28. ইউসুফ 12:105
  29. ইউসুফ 12:106
  30. ইউসুফ 12:107
  31. ইউসুফ 12:108
  32. ইউসুফ 12:109
  33. ইউসুফ 12:110
  34. ইউসুফ 12:111
  35. আর-রাদ 13:1
  36. আর-রাদ 13:2
  37. আর-রাদ 13:3
  38. আর-রাদ 13:4
  39. আর-রাদ 13:5
  40. আর-রাদ 13:6
  41. আর-রাদ 13:7
  42. আর-রাদ 13:8
  43. আর-রাদ 13:9
  44. আর-রাদ 13:10
  45. আর-রাদ 13:11
  46. আর-রাদ 13:12
  47. আর-রাদ 13:13
  48. আর-রাদ 13:14
  49. আর-রাদ 13:15
  50. আর-রাদ 13:16
  51. আর-রাদ 13:17
  52. আর-রাদ 13:18
  53. আর-রাদ 13:19
  54. আর-রাদ 13:20
  55. আর-রাদ 13:21
  56. আর-রাদ 13:22
  57. আর-রাদ 13:23
  58. আর-রাদ 13:24
  59. আর-রাদ 13:25
  60. আর-রাদ 13:26
  61. আর-রাদ 13:27
  62. আর-রাদ 13:28
  63. আর-রাদ 13:29
  64. আর-রাদ 13:30
  65. আর-রাদ 13:31
  66. আর-রাদ 13:32
  67. আর-রাদ 13:33
  68. আর-রাদ 13:34
  69. আর-রাদ 13:35

ইউসুফ 12:78

৭৮-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর যখন বিনইয়ামীনের মালপত্র হতে শাহী পানপাত্র বের হলো তখন ভাইদের ফায়সালা অনুসারে তাঁকে শাহী বন্দীরূপে গণ্য করা হলো। তারা মিসরের আযীযকে (হযরত ইউসুফকে (আঃ)) সুপারিশ করে এবং করুণা আকর্ষণ করে বললেনঃ “দেখুন! আমার এ ভাইটি আমাদের পিতার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। তিনি এখন অত্যন্ত দুর্বল ও বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। এর এক সহোদর ভাই ইতিপূর্বে হারিয়ে গেছে, যার কারণে তিনি পূর্ব হতেই শোকার্ত রয়েছেন। এখন এই খবর শুনলেই আমরা আশঙ্কা করছি যে, তিনি শোকে দুঃখে অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়বেন। এমনকি তিনি প্রাণেই বাঁচেন কিনা সন্দেহ আছে। সুতরাং মেহেরবাণী করে আমাদের একজনকে তার স্থলে রেখে দিন এবং তাকে ছেড়ে দিন। আপনি একজন মহানুভব ব্যক্তি। কাজেই দয়া করে আমাদের এই আবেদন মঞ্জুর করুন।” হযরত ইউসুফ (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “কি করে আমার দ্বারা এটা সম্ভব হতে পারে? এটা তো বড়ই অন্যায় ও অত্যাচারমূলক কাজ যে, পাপ করবে একজন আর ধরা হবে অন্যকে! চুরি করবে একজন, আর বন্দী হবে অন্যজন। চোরকেই বন্দী করা হবে, বাদশাহকে নয়। নিস্পাপ ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া এবং পাপীকে ছেড়ে দেয়া প্রকাশ্যভাবে অবিচার ও অন্যায়।

ইউসুফ 12:79

৭৮-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর যখন বিনইয়ামীনের মালপত্র হতে শাহী পানপাত্র বের হলো তখন ভাইদের ফায়সালা অনুসারে তাঁকে শাহী বন্দীরূপে গণ্য করা হলো। তারা মিসরের আযীযকে (হযরত ইউসুফকে (আঃ)) সুপারিশ করে এবং করুণা আকর্ষণ করে বললেনঃ “দেখুন! আমার এ ভাইটি আমাদের পিতার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। তিনি এখন অত্যন্ত দুর্বল ও বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। এর এক সহোদর ভাই ইতিপূর্বে হারিয়ে গেছে, যার কারণে তিনি পূর্ব হতেই শোকার্ত রয়েছেন। এখন এই খবর শুনলেই আমরা আশঙ্কা করছি যে, তিনি শোকে দুঃখে অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়বেন। এমনকি তিনি প্রাণেই বাঁচেন কিনা সন্দেহ আছে। সুতরাং মেহেরবাণী করে আমাদের একজনকে তার স্থলে রেখে দিন এবং তাকে ছেড়ে দিন। আপনি একজন মহানুভব ব্যক্তি। কাজেই দয়া করে আমাদের এই আবেদন মঞ্জুর করুন।” হযরত ইউসুফ (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “কি করে আমার দ্বারা এটা সম্ভব হতে পারে? এটা তো বড়ই অন্যায় ও অত্যাচারমূলক কাজ যে, পাপ করবে একজন আর ধরা হবে অন্যকে! চুরি করবে একজন, আর বন্দী হবে অন্যজন। চোরকেই বন্দী করা হবে, বাদশাহকে নয়। নিস্পাপ ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া এবং পাপীকে ছেড়ে দেয়া প্রকাশ্যভাবে অবিচার ও অন্যায়।

ইউসুফ 12:80

৮০-৮২ নং আয়াতের তাফসীর হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ যখন তাঁদের ভাই বিনইয়ামীনের মুক্তি লাভের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলন তখন তারা অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন যে, বিনইয়ামীনকে অবশ্যই তাঁরা তাঁদের পিতার নিকট পৌঁছিয়ে দিবেন এই অঙ্গীকার তারা তাঁর সাথে করেছিলেন। কিন্তু এখন দেখছেন যে, কোন ক্রমেই তাঁকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। তিনি অপরাধী সাব্যস্ত হয়ে গেছেন এবং তাদেরই ফায়সালা অনুযায়ী তিনি শাহী বন্দী হিসেবে প্রমাণিত হয়ে গেছেন। সুতরাং এখন কি করা যায়? তাঁরা পিতার কাছে মুখ দেখাবেন কি করে? তাঁরা পরামর্শ করতে লাগলেন। বড় ভাই নিজের মত প্রকাশ করে বললেনঃ তোমাদের তো জানা আছে যে, আমরা আমাদের পিতার কাছে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করেছি। সুতরাং এ অবস্থায় আমরা পিতার কাছে মুখ দেখাতে পারবো না। আবার আমরা আমাদের ভাই বিনইয়ামীনকেও শাহী বন্ধন হতে কোন ক্রমে মুক্ত করতেও পারছি না। এখন পূর্বের ঘটনাটিই আমাদেরকে লজ্জিত করছে। তা হচ্ছে, বিনইয়ামীনের সহোদর ভাই ইউসুফের (আঃ) সাথে আমাদের দুর্ব্যবহার। কাজেই আমি এখানেই থেকে যাচ্ছি, যে পর্যন্ত না পিতা আমার অপরাধ ক্ষমা করে আমাকে বাড়ীতে যাওয়ার অনুমতি দেন অথবা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে কোন ফায়সালা এসে যায়, যাতে হয় আমি কোন রকমে ভাইকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবো, না হয় আল্লাহ অন্য কোন উপায় করে দেবেন।” কথিত আছে যে, তাঁর নাম ছিল রাওভীর অথবা ইয়াহুদা। ইনি ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি তাঁর ভাই ইউসুফকে (আঃ) নিহত হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন। যখন তার অন্যান্য ভাইয়েরা তাঁকে হত্যা করার পরামর্শ করেছিলেন। তখন তিনি ভাইদেরকে পরামর্শ দিলেনঃ “তোমরা পিতার কাছে যাও এবং তাঁকে প্রকৃত ব্যাপারে অবহিত কর। তাঁকে বলবেঃ ‘আমাদের ভাই বিনইয়ামীন যে চুরি করবে এটা কি আমাদের জানা ছিল? চুরির মাল তার কাছে বিদ্যমান রয়েছে। আমাদেরকে চুরির শাস্তি কি জিজ্ঞেস করা হলে আমরা শরীয়তে ইবরাহীমী অনুযায়ী ফায়সালা দিয়েছি। আমাদেরকে যদি আপনার বিশ্বাস না হয় তবে মিসরবাসীকে জিজ্ঞেস করুন। অথবা যে যাত্রীদের সাথে আমরা এসেছি তাদেরকে প্রকৃত ব্যাপার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করুন। আমরা সত্য কথাই বলছি। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেই আপনি জানতে পারবেন যে, আমরা মোটেই মিথ্যা কথা। বলছি না। আমরা আমাদের ভাই বিনইয়ামীনকে রক্ষণাবেক্ষণ করার ব্যাপারে তিল পরিমাণও ক্রটি করি নাই।”

ইউসুফ 12:81

৮০-৮২ নং আয়াতের তাফসীর হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ যখন তাঁদের ভাই বিনইয়ামীনের মুক্তি লাভের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলন তখন তারা অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন যে, বিনইয়ামীনকে অবশ্যই তাঁরা তাঁদের পিতার নিকট পৌঁছিয়ে দিবেন এই অঙ্গীকার তারা তাঁর সাথে করেছিলেন। কিন্তু এখন দেখছেন যে, কোন ক্রমেই তাঁকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। তিনি অপরাধী সাব্যস্ত হয়ে গেছেন এবং তাদেরই ফায়সালা অনুযায়ী তিনি শাহী বন্দী হিসেবে প্রমাণিত হয়ে গেছেন। সুতরাং এখন কি করা যায়? তাঁরা পিতার কাছে মুখ দেখাবেন কি করে? তাঁরা পরামর্শ করতে লাগলেন। বড় ভাই নিজের মত প্রকাশ করে বললেনঃ তোমাদের তো জানা আছে যে, আমরা আমাদের পিতার কাছে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করেছি। সুতরাং এ অবস্থায় আমরা পিতার কাছে মুখ দেখাতে পারবো না। আবার আমরা আমাদের ভাই বিনইয়ামীনকেও শাহী বন্ধন হতে কোন ক্রমে মুক্ত করতেও পারছি না। এখন পূর্বের ঘটনাটিই আমাদেরকে লজ্জিত করছে। তা হচ্ছে, বিনইয়ামীনের সহোদর ভাই ইউসুফের (আঃ) সাথে আমাদের দুর্ব্যবহার। কাজেই আমি এখানেই থেকে যাচ্ছি, যে পর্যন্ত না পিতা আমার অপরাধ ক্ষমা করে আমাকে বাড়ীতে যাওয়ার অনুমতি দেন অথবা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে কোন ফায়সালা এসে যায়, যাতে হয় আমি কোন রকমে ভাইকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবো, না হয় আল্লাহ অন্য কোন উপায় করে দেবেন।” কথিত আছে যে, তাঁর নাম ছিল রাওভীর অথবা ইয়াহুদা। ইনি ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি তাঁর ভাই ইউসুফকে (আঃ) নিহত হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন। যখন তার অন্যান্য ভাইয়েরা তাঁকে হত্যা করার পরামর্শ করেছিলেন। তখন তিনি ভাইদেরকে পরামর্শ দিলেনঃ “তোমরা পিতার কাছে যাও এবং তাঁকে প্রকৃত ব্যাপারে অবহিত কর। তাঁকে বলবেঃ ‘আমাদের ভাই বিনইয়ামীন যে চুরি করবে এটা কি আমাদের জানা ছিল? চুরির মাল তার কাছে বিদ্যমান রয়েছে। আমাদেরকে চুরির শাস্তি কি জিজ্ঞেস করা হলে আমরা শরীয়তে ইবরাহীমী অনুযায়ী ফায়সালা দিয়েছি। আমাদেরকে যদি আপনার বিশ্বাস না হয় তবে মিসরবাসীকে জিজ্ঞেস করুন। অথবা যে যাত্রীদের সাথে আমরা এসেছি তাদেরকে প্রকৃত ব্যাপার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করুন। আমরা সত্য কথাই বলছি। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেই আপনি জানতে পারবেন যে, আমরা মোটেই মিথ্যা কথা। বলছি না। আমরা আমাদের ভাই বিনইয়ামীনকে রক্ষণাবেক্ষণ করার ব্যাপারে তিল পরিমাণও ক্রটি করি নাই।”

ইউসুফ 12:82

৮০-৮২ নং আয়াতের তাফসীর হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ যখন তাঁদের ভাই বিনইয়ামীনের মুক্তি লাভের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলন তখন তারা অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন যে, বিনইয়ামীনকে অবশ্যই তাঁরা তাঁদের পিতার নিকট পৌঁছিয়ে দিবেন এই অঙ্গীকার তারা তাঁর সাথে করেছিলেন। কিন্তু এখন দেখছেন যে, কোন ক্রমেই তাঁকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। তিনি অপরাধী সাব্যস্ত হয়ে গেছেন এবং তাদেরই ফায়সালা অনুযায়ী তিনি শাহী বন্দী হিসেবে প্রমাণিত হয়ে গেছেন। সুতরাং এখন কি করা যায়? তাঁরা পিতার কাছে মুখ দেখাবেন কি করে? তাঁরা পরামর্শ করতে লাগলেন। বড় ভাই নিজের মত প্রকাশ করে বললেনঃ তোমাদের তো জানা আছে যে, আমরা আমাদের পিতার কাছে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করেছি। সুতরাং এ অবস্থায় আমরা পিতার কাছে মুখ দেখাতে পারবো না। আবার আমরা আমাদের ভাই বিনইয়ামীনকেও শাহী বন্ধন হতে কোন ক্রমে মুক্ত করতেও পারছি না। এখন পূর্বের ঘটনাটিই আমাদেরকে লজ্জিত করছে। তা হচ্ছে, বিনইয়ামীনের সহোদর ভাই ইউসুফের (আঃ) সাথে আমাদের দুর্ব্যবহার। কাজেই আমি এখানেই থেকে যাচ্ছি, যে পর্যন্ত না পিতা আমার অপরাধ ক্ষমা করে আমাকে বাড়ীতে যাওয়ার অনুমতি দেন অথবা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে কোন ফায়সালা এসে যায়, যাতে হয় আমি কোন রকমে ভাইকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবো, না হয় আল্লাহ অন্য কোন উপায় করে দেবেন।” কথিত আছে যে, তাঁর নাম ছিল রাওভীর অথবা ইয়াহুদা। ইনি ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি তাঁর ভাই ইউসুফকে (আঃ) নিহত হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন। যখন তার অন্যান্য ভাইয়েরা তাঁকে হত্যা করার পরামর্শ করেছিলেন। তখন তিনি ভাইদেরকে পরামর্শ দিলেনঃ “তোমরা পিতার কাছে যাও এবং তাঁকে প্রকৃত ব্যাপারে অবহিত কর। তাঁকে বলবেঃ ‘আমাদের ভাই বিনইয়ামীন যে চুরি করবে এটা কি আমাদের জানা ছিল? চুরির মাল তার কাছে বিদ্যমান রয়েছে। আমাদেরকে চুরির শাস্তি কি জিজ্ঞেস করা হলে আমরা শরীয়তে ইবরাহীমী অনুযায়ী ফায়সালা দিয়েছি। আমাদেরকে যদি আপনার বিশ্বাস না হয় তবে মিসরবাসীকে জিজ্ঞেস করুন। অথবা যে যাত্রীদের সাথে আমরা এসেছি তাদেরকে প্রকৃত ব্যাপার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করুন। আমরা সত্য কথাই বলছি। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেই আপনি জানতে পারবেন যে, আমরা মোটেই মিথ্যা কথা। বলছি না। আমরা আমাদের ভাই বিনইয়ামীনকে রক্ষণাবেক্ষণ করার ব্যাপারে তিল পরিমাণও ক্রটি করি নাই।”

ইউসুফ 12:83

৮৩-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর ছেলেদের মুখে এ খবর শুনে হযরত ইয়াকুব (আঃ) ঐ কথাই বললেন যা তিনি ইতিপূর্বে বলেছিলেন যখন তাঁর ছেলেরা ইউসুফের (আঃ) জামায় মিথ্যা রক্ত মাখিয়ে তার সামনে হাজির করেছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “এখন ধৈর্য ধারণই উত্তম।” তিনি বুঝে নেন যে, এবারও তাঁর ছেলেরা বানানো কথা বলছে। ছেলেদেরকে এ কথা বলার পর তিনি নিজের আশা প্রকাশ করেন, যে আশা তিনি মহান আল্লাহর কাছে করছিলেন। তিনি বলেন যে, খুব সম্ভব অতি সত্ত্বরই আল্লাহ তাআ’লা তার তিন ছেলেকেই তার সাথে সাক্ষাৎ করাবেন। অর্থাৎ ইউসুফকে (আঃ) বিনইয়ামীনকে এবং বড় ছেলে রাওভীলকে, যিনি মিসরে এই উদ্দেশ্যে রয়ে গেছেন যে, সুযোগ পেলে তিনি গুপ্তভাবে বিনইয়ামীনকে নিয়ে পালিয়ে আসবেন অথবা মহান আল্লাহ স্বয়ং কোন উপায় করে দেবেন।তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। তিনি আমার অবস্থা সম্যক অবগত। তাঁর সমস্ত কাজ হিকমতে পরিপূর্ণ। এখন তাঁর নতুন দুঃখ ও শোক পুরাতন শোককেও জাগিয়ে তুললো। হযরত ইউসুফের (আঃ) বিরহ বিচ্ছেদে তিনি একেবারে ভেঙ্গে পড়লেন। হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, দুঃখ ও বিপদের সময় শুধুমাত্র উম্মতে মুহাম্মদিয়াকেই (সঃ) (আরবি) (নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী) (২: ৫৬) বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী উম্মতবর্গ তাদের নবীগণসহ এই নিয়ামত থেকে বঞ্চিত ছিলেন। দেখা যাচ্ছে যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) এই অবস্থায় (আরবি) এই কথা বলেছিলেন। শোকে, দুঃখে হযরত ইয়াকুবের (আঃ) চোখ দু’টি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি ছিলেন অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিস্ট। অর্থাৎ তিনি মাখলুকের কারো কাছে কোন অভিযোগ করতেন না। সদা সর্বদা তিনি অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনা ভারাক্রান্ত অবস্থায় থাকতেন। হযরত আহ্‌নাফ ইবনু কায়েস (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত দাউদ (আঃ) আল্লাহ তাআ’লার নিকট আরয করেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! বানী ইসরাঈল আপনার কাছে হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ) ও হযরত ইয়াকুবের (আঃ) মাধ্যমে প্রার্থনা করে থাকে। আমাকে তাদের জন্যে চতুর্থ ব্যক্তি করে দিন।” তখন আল্লাহ তাআ’লা তাঁকে ওয়াহীর দ্বারা জানিয়ে দেনঃ “হে দাউদ (আঃ)! নিশ্চয় ইবরাহীমকে (আঃ) আমার কারণে আগুণে নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং ঐ সময় সে ধৈর্য ধারণ করেছিল। তুমি এখনো ঐ রূপ পরীক্ষায় পতিত হও নাই। ইসহাক (আঃ) নিজেকে আল্লাহর পথে কুরবানী করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্মত হয়েছিল। তোমার উপর কিন্তু এখনো এই পরীক্ষা আসে নাই। আর ইয়াকুব (আঃ) হতে তার কলিজার টুকরাকে পৃথক করে দেয়া হয়েছিল। ঐ সময় সে সবর করেছিল। তুমি এখনো ঐ ভাবে পরীক্ষিত হও নাই।” (এ হাদীসটি তাফসীরে ইবনে হাতিমে রয়েছে। এ রিওয়াইয়াতটি মুরসাল। এতে নাকারাত ও রয়েছে। এতে বর্ণিত হয়েছে যে, “যাবীহুল্লাহ” হচ্ছেন হযরত ইসহাক (আঃ); অথচ সঠিক কথা এই যে, “যাবীহুল্লাহ” হচ্ছেন হযরত ইসমাঈল (আঃ) এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক অবগত। খুব সম্ভব আহনাফ ইবনু কায়েস (রঃ) এই রিওয়াইয়াতটি বনী ইসরাইল হতে গ্রহণ করেছেন। যেমন কা'ব, অহাব প্রভৃতি হতে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধকারী)বর্ণিত আছে যে, মিসরে বিনইয়ামীনের বন্দীত্বের অবস্থায় হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইউসুফের কাছে (আঃ) পত্র লিখেছিলেন, যাতে তিনি তাঁর করুণা আকর্ষণ করে বলেছিলেনঃ “আমরা বিপদগ্রস্ত লোক। আমার দাদা হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আমার পিতা হযরত ইসহাক (আঃ) কে কুরবানী দ্বারা পরীক্ষা করা হয়েছিল স্বয়ং আমি ইউসুফের (আঃ) বিচ্ছেদের দ্বারা পরীক্ষিত হয়েছি।” (এটাও বনী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াত। সনদ দ্বারা এটা সাব্যস্ত নয়)হযরত ইয়াকুবের (আঃ) পূত্রগণ পিতার এই অবস্থা দেখে তাঁকে সান্ত্বনার সুরে বলেনঃ “আব্বাজান! ইউসুফের (আঃ) জন্যে এতো চিন্তা করবেন না। নইলে এই চিন্তা আপনাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমি তো তোমাদেরকে কিছুই বলছি না। আমি আমার মহান প্রতিপালকের কাছে আমার দুঃখ প্রকাশ করছি। তাঁর কাছে আমি অনেক কিছু আশা করি। তিনি কল্যাণদাতা। ইউসুফের (আঃ) স্বপ্নের কথা আমি ভুলি নাই। ঐ স্বপ্নের তাৎপর্য অবশ্যই একদিন প্রকাশিত হবে।”বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত ইয়াকুব (আঃ) কে তার এক অন্তরঙ্গ বন্ধু জিজ্ঞেস করেনঃ “কিভাবে আপনার চক্ষু নষ্ট হয়ে গেল এবং কিসে আপনার পিঠকে বাঁকা করে দিলো?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ইউসুফের (আঃ) জন্যে কেঁদে কেঁদে আমি চক্ষু নষ্ট করে ফেলেছি এবং বিনইয়ামীনের দুঃখ ও বেদনা আমার পিঠ বাঁকা করে দিয়েছে।” ঐ সময়েই হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ আপনাকে সালাম জানিয়ে বলেছেনঃ “অন্যের কাছে আমার অভিযোগ করতে তুমি লজ্জা কর না?” হযরত ইয়াকুব (আঃ) তৎক্ষণাৎ বলেনঃ “আমি আমার অসহনীয় বেদনা, আমার দুঃখ শুধু আল্লাহর নিকট নিবেদন করছি।” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন তাকে বলেনঃ “আপনার অভিযোগ সম্পর্কে আল্লাহ তাআ’লা পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (এটাও তাফসীরে ইবনু হাতিমে হযরত আনাস ইবনু মা’লিক (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। তবে এটাও গারীব হাদীস এবং এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)

ইউসুফ 12:84

৮৩-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর ছেলেদের মুখে এ খবর শুনে হযরত ইয়াকুব (আঃ) ঐ কথাই বললেন যা তিনি ইতিপূর্বে বলেছিলেন যখন তাঁর ছেলেরা ইউসুফের (আঃ) জামায় মিথ্যা রক্ত মাখিয়ে তার সামনে হাজির করেছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “এখন ধৈর্য ধারণই উত্তম।” তিনি বুঝে নেন যে, এবারও তাঁর ছেলেরা বানানো কথা বলছে। ছেলেদেরকে এ কথা বলার পর তিনি নিজের আশা প্রকাশ করেন, যে আশা তিনি মহান আল্লাহর কাছে করছিলেন। তিনি বলেন যে, খুব সম্ভব অতি সত্ত্বরই আল্লাহ তাআ’লা তার তিন ছেলেকেই তার সাথে সাক্ষাৎ করাবেন। অর্থাৎ ইউসুফকে (আঃ) বিনইয়ামীনকে এবং বড় ছেলে রাওভীলকে, যিনি মিসরে এই উদ্দেশ্যে রয়ে গেছেন যে, সুযোগ পেলে তিনি গুপ্তভাবে বিনইয়ামীনকে নিয়ে পালিয়ে আসবেন অথবা মহান আল্লাহ স্বয়ং কোন উপায় করে দেবেন।তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। তিনি আমার অবস্থা সম্যক অবগত। তাঁর সমস্ত কাজ হিকমতে পরিপূর্ণ। এখন তাঁর নতুন দুঃখ ও শোক পুরাতন শোককেও জাগিয়ে তুললো। হযরত ইউসুফের (আঃ) বিরহ বিচ্ছেদে তিনি একেবারে ভেঙ্গে পড়লেন। হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, দুঃখ ও বিপদের সময় শুধুমাত্র উম্মতে মুহাম্মদিয়াকেই (সঃ) (আরবি) (নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী) (২: ৫৬) বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী উম্মতবর্গ তাদের নবীগণসহ এই নিয়ামত থেকে বঞ্চিত ছিলেন। দেখা যাচ্ছে যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) এই অবস্থায় (আরবি) এই কথা বলেছিলেন। শোকে, দুঃখে হযরত ইয়াকুবের (আঃ) চোখ দু’টি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি ছিলেন অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিস্ট। অর্থাৎ তিনি মাখলুকের কারো কাছে কোন অভিযোগ করতেন না। সদা সর্বদা তিনি অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনা ভারাক্রান্ত অবস্থায় থাকতেন। হযরত আহ্‌নাফ ইবনু কায়েস (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত দাউদ (আঃ) আল্লাহ তাআ’লার নিকট আরয করেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! বানী ইসরাঈল আপনার কাছে হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ) ও হযরত ইয়াকুবের (আঃ) মাধ্যমে প্রার্থনা করে থাকে। আমাকে তাদের জন্যে চতুর্থ ব্যক্তি করে দিন।” তখন আল্লাহ তাআ’লা তাঁকে ওয়াহীর দ্বারা জানিয়ে দেনঃ “হে দাউদ (আঃ)! নিশ্চয় ইবরাহীমকে (আঃ) আমার কারণে আগুণে নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং ঐ সময় সে ধৈর্য ধারণ করেছিল। তুমি এখনো ঐ রূপ পরীক্ষায় পতিত হও নাই। ইসহাক (আঃ) নিজেকে আল্লাহর পথে কুরবানী করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্মত হয়েছিল। তোমার উপর কিন্তু এখনো এই পরীক্ষা আসে নাই। আর ইয়াকুব (আঃ) হতে তার কলিজার টুকরাকে পৃথক করে দেয়া হয়েছিল। ঐ সময় সে সবর করেছিল। তুমি এখনো ঐ ভাবে পরীক্ষিত হও নাই।” (এ হাদীসটি তাফসীরে ইবনে হাতিমে রয়েছে। এ রিওয়াইয়াতটি মুরসাল। এতে নাকারাত ও রয়েছে। এতে বর্ণিত হয়েছে যে, “যাবীহুল্লাহ” হচ্ছেন হযরত ইসহাক (আঃ); অথচ সঠিক কথা এই যে, “যাবীহুল্লাহ” হচ্ছেন হযরত ইসমাঈল (আঃ) এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক অবগত। খুব সম্ভব আহনাফ ইবনু কায়েস (রঃ) এই রিওয়াইয়াতটি বনী ইসরাইল হতে গ্রহণ করেছেন। যেমন কা'ব, অহাব প্রভৃতি হতে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধকারী)বর্ণিত আছে যে, মিসরে বিনইয়ামীনের বন্দীত্বের অবস্থায় হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইউসুফের কাছে (আঃ) পত্র লিখেছিলেন, যাতে তিনি তাঁর করুণা আকর্ষণ করে বলেছিলেনঃ “আমরা বিপদগ্রস্ত লোক। আমার দাদা হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আমার পিতা হযরত ইসহাক (আঃ) কে কুরবানী দ্বারা পরীক্ষা করা হয়েছিল স্বয়ং আমি ইউসুফের (আঃ) বিচ্ছেদের দ্বারা পরীক্ষিত হয়েছি।” (এটাও বনী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াত। সনদ দ্বারা এটা সাব্যস্ত নয়)হযরত ইয়াকুবের (আঃ) পূত্রগণ পিতার এই অবস্থা দেখে তাঁকে সান্ত্বনার সুরে বলেনঃ “আব্বাজান! ইউসুফের (আঃ) জন্যে এতো চিন্তা করবেন না। নইলে এই চিন্তা আপনাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমি তো তোমাদেরকে কিছুই বলছি না। আমি আমার মহান প্রতিপালকের কাছে আমার দুঃখ প্রকাশ করছি। তাঁর কাছে আমি অনেক কিছু আশা করি। তিনি কল্যাণদাতা। ইউসুফের (আঃ) স্বপ্নের কথা আমি ভুলি নাই। ঐ স্বপ্নের তাৎপর্য অবশ্যই একদিন প্রকাশিত হবে।”বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত ইয়াকুব (আঃ) কে তার এক অন্তরঙ্গ বন্ধু জিজ্ঞেস করেনঃ “কিভাবে আপনার চক্ষু নষ্ট হয়ে গেল এবং কিসে আপনার পিঠকে বাঁকা করে দিলো?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ইউসুফের (আঃ) জন্যে কেঁদে কেঁদে আমি চক্ষু নষ্ট করে ফেলেছি এবং বিনইয়ামীনের দুঃখ ও বেদনা আমার পিঠ বাঁকা করে দিয়েছে।” ঐ সময়েই হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ আপনাকে সালাম জানিয়ে বলেছেনঃ “অন্যের কাছে আমার অভিযোগ করতে তুমি লজ্জা কর না?” হযরত ইয়াকুব (আঃ) তৎক্ষণাৎ বলেনঃ “আমি আমার অসহনীয় বেদনা, আমার দুঃখ শুধু আল্লাহর নিকট নিবেদন করছি।” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন তাকে বলেনঃ “আপনার অভিযোগ সম্পর্কে আল্লাহ তাআ’লা পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (এটাও তাফসীরে ইবনু হাতিমে হযরত আনাস ইবনু মা’লিক (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। তবে এটাও গারীব হাদীস এবং এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)

ইউসুফ 12:85

৮৩-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর ছেলেদের মুখে এ খবর শুনে হযরত ইয়াকুব (আঃ) ঐ কথাই বললেন যা তিনি ইতিপূর্বে বলেছিলেন যখন তাঁর ছেলেরা ইউসুফের (আঃ) জামায় মিথ্যা রক্ত মাখিয়ে তার সামনে হাজির করেছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “এখন ধৈর্য ধারণই উত্তম।” তিনি বুঝে নেন যে, এবারও তাঁর ছেলেরা বানানো কথা বলছে। ছেলেদেরকে এ কথা বলার পর তিনি নিজের আশা প্রকাশ করেন, যে আশা তিনি মহান আল্লাহর কাছে করছিলেন। তিনি বলেন যে, খুব সম্ভব অতি সত্ত্বরই আল্লাহ তাআ’লা তার তিন ছেলেকেই তার সাথে সাক্ষাৎ করাবেন। অর্থাৎ ইউসুফকে (আঃ) বিনইয়ামীনকে এবং বড় ছেলে রাওভীলকে, যিনি মিসরে এই উদ্দেশ্যে রয়ে গেছেন যে, সুযোগ পেলে তিনি গুপ্তভাবে বিনইয়ামীনকে নিয়ে পালিয়ে আসবেন অথবা মহান আল্লাহ স্বয়ং কোন উপায় করে দেবেন।তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। তিনি আমার অবস্থা সম্যক অবগত। তাঁর সমস্ত কাজ হিকমতে পরিপূর্ণ। এখন তাঁর নতুন দুঃখ ও শোক পুরাতন শোককেও জাগিয়ে তুললো। হযরত ইউসুফের (আঃ) বিরহ বিচ্ছেদে তিনি একেবারে ভেঙ্গে পড়লেন। হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, দুঃখ ও বিপদের সময় শুধুমাত্র উম্মতে মুহাম্মদিয়াকেই (সঃ) (আরবি) (নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী) (২: ৫৬) বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী উম্মতবর্গ তাদের নবীগণসহ এই নিয়ামত থেকে বঞ্চিত ছিলেন। দেখা যাচ্ছে যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) এই অবস্থায় (আরবি) এই কথা বলেছিলেন। শোকে, দুঃখে হযরত ইয়াকুবের (আঃ) চোখ দু’টি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি ছিলেন অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিস্ট। অর্থাৎ তিনি মাখলুকের কারো কাছে কোন অভিযোগ করতেন না। সদা সর্বদা তিনি অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনা ভারাক্রান্ত অবস্থায় থাকতেন। হযরত আহ্‌নাফ ইবনু কায়েস (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত দাউদ (আঃ) আল্লাহ তাআ’লার নিকট আরয করেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! বানী ইসরাঈল আপনার কাছে হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ) ও হযরত ইয়াকুবের (আঃ) মাধ্যমে প্রার্থনা করে থাকে। আমাকে তাদের জন্যে চতুর্থ ব্যক্তি করে দিন।” তখন আল্লাহ তাআ’লা তাঁকে ওয়াহীর দ্বারা জানিয়ে দেনঃ “হে দাউদ (আঃ)! নিশ্চয় ইবরাহীমকে (আঃ) আমার কারণে আগুণে নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং ঐ সময় সে ধৈর্য ধারণ করেছিল। তুমি এখনো ঐ রূপ পরীক্ষায় পতিত হও নাই। ইসহাক (আঃ) নিজেকে আল্লাহর পথে কুরবানী করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্মত হয়েছিল। তোমার উপর কিন্তু এখনো এই পরীক্ষা আসে নাই। আর ইয়াকুব (আঃ) হতে তার কলিজার টুকরাকে পৃথক করে দেয়া হয়েছিল। ঐ সময় সে সবর করেছিল। তুমি এখনো ঐ ভাবে পরীক্ষিত হও নাই।” (এ হাদীসটি তাফসীরে ইবনে হাতিমে রয়েছে। এ রিওয়াইয়াতটি মুরসাল। এতে নাকারাত ও রয়েছে। এতে বর্ণিত হয়েছে যে, “যাবীহুল্লাহ” হচ্ছেন হযরত ইসহাক (আঃ); অথচ সঠিক কথা এই যে, “যাবীহুল্লাহ” হচ্ছেন হযরত ইসমাঈল (আঃ) এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক অবগত। খুব সম্ভব আহনাফ ইবনু কায়েস (রঃ) এই রিওয়াইয়াতটি বনী ইসরাইল হতে গ্রহণ করেছেন। যেমন কা'ব, অহাব প্রভৃতি হতে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধকারী)বর্ণিত আছে যে, মিসরে বিনইয়ামীনের বন্দীত্বের অবস্থায় হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইউসুফের কাছে (আঃ) পত্র লিখেছিলেন, যাতে তিনি তাঁর করুণা আকর্ষণ করে বলেছিলেনঃ “আমরা বিপদগ্রস্ত লোক। আমার দাদা হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আমার পিতা হযরত ইসহাক (আঃ) কে কুরবানী দ্বারা পরীক্ষা করা হয়েছিল স্বয়ং আমি ইউসুফের (আঃ) বিচ্ছেদের দ্বারা পরীক্ষিত হয়েছি।” (এটাও বনী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াত। সনদ দ্বারা এটা সাব্যস্ত নয়)হযরত ইয়াকুবের (আঃ) পূত্রগণ পিতার এই অবস্থা দেখে তাঁকে সান্ত্বনার সুরে বলেনঃ “আব্বাজান! ইউসুফের (আঃ) জন্যে এতো চিন্তা করবেন না। নইলে এই চিন্তা আপনাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমি তো তোমাদেরকে কিছুই বলছি না। আমি আমার মহান প্রতিপালকের কাছে আমার দুঃখ প্রকাশ করছি। তাঁর কাছে আমি অনেক কিছু আশা করি। তিনি কল্যাণদাতা। ইউসুফের (আঃ) স্বপ্নের কথা আমি ভুলি নাই। ঐ স্বপ্নের তাৎপর্য অবশ্যই একদিন প্রকাশিত হবে।”বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত ইয়াকুব (আঃ) কে তার এক অন্তরঙ্গ বন্ধু জিজ্ঞেস করেনঃ “কিভাবে আপনার চক্ষু নষ্ট হয়ে গেল এবং কিসে আপনার পিঠকে বাঁকা করে দিলো?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ইউসুফের (আঃ) জন্যে কেঁদে কেঁদে আমি চক্ষু নষ্ট করে ফেলেছি এবং বিনইয়ামীনের দুঃখ ও বেদনা আমার পিঠ বাঁকা করে দিয়েছে।” ঐ সময়েই হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ আপনাকে সালাম জানিয়ে বলেছেনঃ “অন্যের কাছে আমার অভিযোগ করতে তুমি লজ্জা কর না?” হযরত ইয়াকুব (আঃ) তৎক্ষণাৎ বলেনঃ “আমি আমার অসহনীয় বেদনা, আমার দুঃখ শুধু আল্লাহর নিকট নিবেদন করছি।” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন তাকে বলেনঃ “আপনার অভিযোগ সম্পর্কে আল্লাহ তাআ’লা পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (এটাও তাফসীরে ইবনু হাতিমে হযরত আনাস ইবনু মা’লিক (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। তবে এটাও গারীব হাদীস এবং এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)

ইউসুফ 12:86

৮৩-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর ছেলেদের মুখে এ খবর শুনে হযরত ইয়াকুব (আঃ) ঐ কথাই বললেন যা তিনি ইতিপূর্বে বলেছিলেন যখন তাঁর ছেলেরা ইউসুফের (আঃ) জামায় মিথ্যা রক্ত মাখিয়ে তার সামনে হাজির করেছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “এখন ধৈর্য ধারণই উত্তম।” তিনি বুঝে নেন যে, এবারও তাঁর ছেলেরা বানানো কথা বলছে। ছেলেদেরকে এ কথা বলার পর তিনি নিজের আশা প্রকাশ করেন, যে আশা তিনি মহান আল্লাহর কাছে করছিলেন। তিনি বলেন যে, খুব সম্ভব অতি সত্ত্বরই আল্লাহ তাআ’লা তার তিন ছেলেকেই তার সাথে সাক্ষাৎ করাবেন। অর্থাৎ ইউসুফকে (আঃ) বিনইয়ামীনকে এবং বড় ছেলে রাওভীলকে, যিনি মিসরে এই উদ্দেশ্যে রয়ে গেছেন যে, সুযোগ পেলে তিনি গুপ্তভাবে বিনইয়ামীনকে নিয়ে পালিয়ে আসবেন অথবা মহান আল্লাহ স্বয়ং কোন উপায় করে দেবেন।তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। তিনি আমার অবস্থা সম্যক অবগত। তাঁর সমস্ত কাজ হিকমতে পরিপূর্ণ। এখন তাঁর নতুন দুঃখ ও শোক পুরাতন শোককেও জাগিয়ে তুললো। হযরত ইউসুফের (আঃ) বিরহ বিচ্ছেদে তিনি একেবারে ভেঙ্গে পড়লেন। হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, দুঃখ ও বিপদের সময় শুধুমাত্র উম্মতে মুহাম্মদিয়াকেই (সঃ) (আরবি) (নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী) (২: ৫৬) বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী উম্মতবর্গ তাদের নবীগণসহ এই নিয়ামত থেকে বঞ্চিত ছিলেন। দেখা যাচ্ছে যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) এই অবস্থায় (আরবি) এই কথা বলেছিলেন। শোকে, দুঃখে হযরত ইয়াকুবের (আঃ) চোখ দু’টি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি ছিলেন অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিস্ট। অর্থাৎ তিনি মাখলুকের কারো কাছে কোন অভিযোগ করতেন না। সদা সর্বদা তিনি অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনা ভারাক্রান্ত অবস্থায় থাকতেন। হযরত আহ্‌নাফ ইবনু কায়েস (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত দাউদ (আঃ) আল্লাহ তাআ’লার নিকট আরয করেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! বানী ইসরাঈল আপনার কাছে হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ) ও হযরত ইয়াকুবের (আঃ) মাধ্যমে প্রার্থনা করে থাকে। আমাকে তাদের জন্যে চতুর্থ ব্যক্তি করে দিন।” তখন আল্লাহ তাআ’লা তাঁকে ওয়াহীর দ্বারা জানিয়ে দেনঃ “হে দাউদ (আঃ)! নিশ্চয় ইবরাহীমকে (আঃ) আমার কারণে আগুণে নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং ঐ সময় সে ধৈর্য ধারণ করেছিল। তুমি এখনো ঐ রূপ পরীক্ষায় পতিত হও নাই। ইসহাক (আঃ) নিজেকে আল্লাহর পথে কুরবানী করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্মত হয়েছিল। তোমার উপর কিন্তু এখনো এই পরীক্ষা আসে নাই। আর ইয়াকুব (আঃ) হতে তার কলিজার টুকরাকে পৃথক করে দেয়া হয়েছিল। ঐ সময় সে সবর করেছিল। তুমি এখনো ঐ ভাবে পরীক্ষিত হও নাই।” (এ হাদীসটি তাফসীরে ইবনে হাতিমে রয়েছে। এ রিওয়াইয়াতটি মুরসাল। এতে নাকারাত ও রয়েছে। এতে বর্ণিত হয়েছে যে, “যাবীহুল্লাহ” হচ্ছেন হযরত ইসহাক (আঃ); অথচ সঠিক কথা এই যে, “যাবীহুল্লাহ” হচ্ছেন হযরত ইসমাঈল (আঃ) এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক অবগত। খুব সম্ভব আহনাফ ইবনু কায়েস (রঃ) এই রিওয়াইয়াতটি বনী ইসরাইল হতে গ্রহণ করেছেন। যেমন কা'ব, অহাব প্রভৃতি হতে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধকারী)বর্ণিত আছে যে, মিসরে বিনইয়ামীনের বন্দীত্বের অবস্থায় হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইউসুফের কাছে (আঃ) পত্র লিখেছিলেন, যাতে তিনি তাঁর করুণা আকর্ষণ করে বলেছিলেনঃ “আমরা বিপদগ্রস্ত লোক। আমার দাদা হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আমার পিতা হযরত ইসহাক (আঃ) কে কুরবানী দ্বারা পরীক্ষা করা হয়েছিল স্বয়ং আমি ইউসুফের (আঃ) বিচ্ছেদের দ্বারা পরীক্ষিত হয়েছি।” (এটাও বনী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াত। সনদ দ্বারা এটা সাব্যস্ত নয়)হযরত ইয়াকুবের (আঃ) পূত্রগণ পিতার এই অবস্থা দেখে তাঁকে সান্ত্বনার সুরে বলেনঃ “আব্বাজান! ইউসুফের (আঃ) জন্যে এতো চিন্তা করবেন না। নইলে এই চিন্তা আপনাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমি তো তোমাদেরকে কিছুই বলছি না। আমি আমার মহান প্রতিপালকের কাছে আমার দুঃখ প্রকাশ করছি। তাঁর কাছে আমি অনেক কিছু আশা করি। তিনি কল্যাণদাতা। ইউসুফের (আঃ) স্বপ্নের কথা আমি ভুলি নাই। ঐ স্বপ্নের তাৎপর্য অবশ্যই একদিন প্রকাশিত হবে।”বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত ইয়াকুব (আঃ) কে তার এক অন্তরঙ্গ বন্ধু জিজ্ঞেস করেনঃ “কিভাবে আপনার চক্ষু নষ্ট হয়ে গেল এবং কিসে আপনার পিঠকে বাঁকা করে দিলো?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ইউসুফের (আঃ) জন্যে কেঁদে কেঁদে আমি চক্ষু নষ্ট করে ফেলেছি এবং বিনইয়ামীনের দুঃখ ও বেদনা আমার পিঠ বাঁকা করে দিয়েছে।” ঐ সময়েই হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ আপনাকে সালাম জানিয়ে বলেছেনঃ “অন্যের কাছে আমার অভিযোগ করতে তুমি লজ্জা কর না?” হযরত ইয়াকুব (আঃ) তৎক্ষণাৎ বলেনঃ “আমি আমার অসহনীয় বেদনা, আমার দুঃখ শুধু আল্লাহর নিকট নিবেদন করছি।” হযরত জিবরাঈল (আঃ) তখন তাকে বলেনঃ “আপনার অভিযোগ সম্পর্কে আল্লাহ তাআ’লা পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (এটাও তাফসীরে ইবনু হাতিমে হযরত আনাস ইবনু মা’লিক (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। তবে এটাও গারীব হাদীস এবং এতে অস্বীকৃতিও রয়েছে)

ইউসুফ 12:87

৮৭-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর হযরত ইয়াকুব (আঃ) স্বীয় পুত্রদেরকে আদেশ করছেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎসগণ! তোমরা এদিক ওদিক গমন কর এবং ইউসুফ (আঃ)ও বিনইয়ামীনের খোঁজ কর।” আরবী ভাষায় (আরবি) শব্দটি ভাল অনুসন্ধান করার ব্যাপারে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর মন্দ অনুসন্ধানের ব্যাপারে ব্যবহৃত হয় (আরবি) শব্দটি। এর সাথে সাথেই তিনি পুত্রদেরকে বলেন: “আল্লাহর সত্ত্বা থেকে নিরাশ হয়ে যেয়ো না। তাঁর করুণা ও রহমত থেকে কাফিররা ছাড়া আর কেউই নিরাশ হয় না। তোমরা তাদের অনুসন্ধান বন্ধ করে দিয়ো না। আল্লাহর নিকট তোমরা ভাল আশা কর। তোমরা নিজেদের চেষ্টা চালিয়ে যাও।”পিতার উপদেশ ক্রমে তাঁরা যাত্রা শুরু করে মিসরে পৌঁছে গেলেন। হযরত ইউসুফের (আঃ) সামনে হাজির হয়ে তাঁরা নিজেদের দুরাবস্থার কথা প্রকাশ করলেন। তারা বললেনঃ “দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে আমরা ধ্বংসের মুখোমুখি হয়ে গেছি। আমাদের কাছে এমন কিছুই নেই যার দ্বারা আমরা খাদ্য ক্রয় করতে পারি। আমাদের কাছে খারাপ, মেকী, ত্রুটিযুক্ত এবং মূল্য হতে পারে না, এরূপ সামান্য কিছু রয়েছে। এগুলো নিয়েই আমরা আপনার কাছে এসেছি। যদিও এগুলো খাদ্যের বিনিময় হতে পারে না, তথাপি আমরা কামনা করছি যে, আপনি আমাদেরকে ওগুলোই প্রদান করবেন: যেগুলো সঠিক ও পূর্ণ মূল্যের বিনিময়ে দেয়া হয়ে থাকে। আমরা আশা রাখছি যে, আপনি আমাদের বোঝা পূর্ণ করবেন এবং আমাদের বস্তা ভর্তি করে দেবেন।” হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) কিরআতে (আরবি) এর স্থলে (আরবি) রয়েছে। অর্থাৎ আপনি আমাদের উট খাদ্য দ্বারা বোঝাই করে দিন।অথবা ভাবার্থ হচ্ছে : এই খাদ্য আমাদেরকে আমাদের এই মালের বিনিময়ে নয়, বরং দান হিসেবে প্রদান করুন! হযরত সুফইয়ান ইবনু উয়াইনাকে (রাঃ) প্রশ্ন করা হয়ঃ “আমাদের নবীর (সঃ) পূর্বেও কি কোন নবীর উপর সাদকা হারাম ছিল?” উত্তরে তিনি এই আয়াতটিই পাঠ করে দলীল হিসাবে বলেনঃ “না, ইতিপূর্বে অন্য কোন নবীর উপর সাদকা হারাম হয় নাই।”হযরত মুজাহিদকে (রঃ) প্রশ্ন করা হয়ঃ “কোন ব্যক্তি তার প্রার্থনায় হে আল্লাহ! আমার উপর সাদকা করুন, একথা বলা কি মাকরূহ?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ। কেননা, ‘সাদকা’ সেই করে থাকে যে সাওয়াব চায়।”

ইউসুফ 12:88

৮৭-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর হযরত ইয়াকুব (আঃ) স্বীয় পুত্রদেরকে আদেশ করছেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎসগণ! তোমরা এদিক ওদিক গমন কর এবং ইউসুফ (আঃ)ও বিনইয়ামীনের খোঁজ কর।” আরবী ভাষায় (আরবি) শব্দটি ভাল অনুসন্ধান করার ব্যাপারে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর মন্দ অনুসন্ধানের ব্যাপারে ব্যবহৃত হয় (আরবি) শব্দটি। এর সাথে সাথেই তিনি পুত্রদেরকে বলেন: “আল্লাহর সত্ত্বা থেকে নিরাশ হয়ে যেয়ো না। তাঁর করুণা ও রহমত থেকে কাফিররা ছাড়া আর কেউই নিরাশ হয় না। তোমরা তাদের অনুসন্ধান বন্ধ করে দিয়ো না। আল্লাহর নিকট তোমরা ভাল আশা কর। তোমরা নিজেদের চেষ্টা চালিয়ে যাও।”পিতার উপদেশ ক্রমে তাঁরা যাত্রা শুরু করে মিসরে পৌঁছে গেলেন। হযরত ইউসুফের (আঃ) সামনে হাজির হয়ে তাঁরা নিজেদের দুরাবস্থার কথা প্রকাশ করলেন। তারা বললেনঃ “দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে আমরা ধ্বংসের মুখোমুখি হয়ে গেছি। আমাদের কাছে এমন কিছুই নেই যার দ্বারা আমরা খাদ্য ক্রয় করতে পারি। আমাদের কাছে খারাপ, মেকী, ত্রুটিযুক্ত এবং মূল্য হতে পারে না, এরূপ সামান্য কিছু রয়েছে। এগুলো নিয়েই আমরা আপনার কাছে এসেছি। যদিও এগুলো খাদ্যের বিনিময় হতে পারে না, তথাপি আমরা কামনা করছি যে, আপনি আমাদেরকে ওগুলোই প্রদান করবেন: যেগুলো সঠিক ও পূর্ণ মূল্যের বিনিময়ে দেয়া হয়ে থাকে। আমরা আশা রাখছি যে, আপনি আমাদের বোঝা পূর্ণ করবেন এবং আমাদের বস্তা ভর্তি করে দেবেন।” হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) কিরআতে (আরবি) এর স্থলে (আরবি) রয়েছে। অর্থাৎ আপনি আমাদের উট খাদ্য দ্বারা বোঝাই করে দিন।অথবা ভাবার্থ হচ্ছে : এই খাদ্য আমাদেরকে আমাদের এই মালের বিনিময়ে নয়, বরং দান হিসেবে প্রদান করুন! হযরত সুফইয়ান ইবনু উয়াইনাকে (রাঃ) প্রশ্ন করা হয়ঃ “আমাদের নবীর (সঃ) পূর্বেও কি কোন নবীর উপর সাদকা হারাম ছিল?” উত্তরে তিনি এই আয়াতটিই পাঠ করে দলীল হিসাবে বলেনঃ “না, ইতিপূর্বে অন্য কোন নবীর উপর সাদকা হারাম হয় নাই।”হযরত মুজাহিদকে (রঃ) প্রশ্ন করা হয়ঃ “কোন ব্যক্তি তার প্রার্থনায় হে আল্লাহ! আমার উপর সাদকা করুন, একথা বলা কি মাকরূহ?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ। কেননা, ‘সাদকা’ সেই করে থাকে যে সাওয়াব চায়।”

ইউসুফ 12:89

৮৯-৯২ নং আয়াতের তাফসীর হযরত ইউসুফের (আঃ) ভাইয়েরা যখন তাঁর কাছে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত ও দারিদ্রের অবস্থায় পৌঁছেন এবং তাঁর কাছে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশা, পিতা ও পরিবারবর্গের বিপদ-আপদের বর্ণনা দেন তখন তাঁর অন্তর বিগলিত হয়ে যায় এবং আবেগে অভিভূত হয়ে পড়েন। বর্ণিত আছে যে, সেই সময় তিনি স্বীয় মাথার তাজ নামিয়ে ফেলেন এবং ভাইদেরকে বলেনঃ “আপনারা ইউসুফের (আঃ) সাথে এবং তার ভাই বিনইয়ামীনের সাথে যে ব্যবহার করেছিলেন তা আপনাদের স্মরণ আছে কি, যখন আপনারা অজ্ঞ ছিলেন? এ জন্যেই পূর্ববর্তী কোন কোন গুরুজন বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লার প্রত্যেক পাপী বান্দাই অজ্ঞ ও মুখ। অতঃপর তিনি (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। (১৬: ১১৯)। বাহ্যতঃ এটা জানা যাচ্ছে যে, প্রথম দু’দফার সাক্ষাতের সময় নিজের পরিচয় দানের নির্দেশ আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ হতে হযরত ইউসুফের (আঃ) প্রতি ছিল না। তৃতীয় বারে সাক্ষাতের সময় তাঁকে নিজের পরিচয় দানের নির্দেশ দেয়া হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সবচেয়ে ভাল জানেন। যখন কষ্ট বেড়ে গেল এবং কাঠিণ্য বৃদ্ধি পেলো তখন আল্লাহ তাআ’লা কাঠিণ্য ও সংকীর্ণতা দূর করে দিলেন এবং প্রশস্ততা আনয়ন করলেন। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে। অবশ্য কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।” (৯৪: ৫-৬) হযরত ইউসুফের (আঃ) প্রশ্নে তাঁর ভ্রাতাগণ বিস্ময়ে চমকে উঠেন। এর একটা কারণ এই ছিল যে, মুকুট নামিয়ে দেয়ার ফলে তার কপালের নিদর্শন তাঁরা দেখে নেন। ঐ সময় তাঁরা তাঁকে প্রশ্ন করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তা হলে তুমিই কি ইউসুফ?” (১২:৯০) ইবনু মুহাইসিন (রঃ) (আরবি) পড়েছেন। প্রথমটিই প্রসিদ্ধ কিরআত। কেননা (আরবি) বা প্রশ্ন (আরবি) এর উপর ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ এতে তাঁরা বিস্মিত হন যে, তারা তাঁর কাছে দু’বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে যাতায়াত করছেন, অথচ তাঁকে তাঁরা চিনতে পারেন নাই।, আর তিনি কিন্তু তাদেরকে চিনেছেন ও নিজেকে গোপন করেছেন! এজন্যেই তারা প্রশ্নের সুরে বলেনঃ “তুমি কি ইউসুফ?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ, আমিই ইউসুফ (আঃ) এবং এটা (বিনইয়ামীন) আমার (সহোদর) ভাই। আল্লাহ তাআ’লা আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, দীর্ঘ দিনের বিচ্ছেদের পর আমাদেরকে তিনি মিলিত করেছেন। আল্লাহ্ভীতি ও ধৈর্যশীলতা বিফলে যায় না।”এখন হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নেন। তাঁরা তাঁকে বলেনঃ “বাস্তবিকই দৈহিক সৌন্দর্য ও নৈতিক চরিত্র উভয় দিক দিয়েই তুমি আমাদের চেয়ে উত্তম। রাজত্ব ও ধন-মালের দিক দিয়েও আল্লাহ তোমাকে আমাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন।” অনুরূপভাবে কারো কারো মতে নুবওয়াতের দিক দিয়েও তিনি ভাইদের উপর প্রাধান্য লাভ করেছিলেন। কেননা, তিনি নবী ছিলেন এবং তাঁর ভ্রাতাগণ নবী ছিলেন না। এই স্বীকারোক্তির পর তাঁরা তাঁদের ভুলও স্বীকার করেন। তৎক্ষণাৎ হযরত ইউসুফ (আঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আজকের পরে আমি আপনাদের এই ভুলের কথা মনেও করবো না। এ কারণে আমি আপনাদেরকে শাসন গর্জন করতে চাইনে। আমি আপনাদের উপর কোন অভিযোগও করছি না। আপনাদের উপর আমি রাগান্বিত নই। বরং আমার প্রার্থনা এই যে, আল্লাহ তাআ’লাও আপনাদেরকে ক্ষমা করুন! তিনি সর্বাপেক্ষা বড় দয়ালু।” তার ভ্রাতাগণ ওজর পেশ করলেন এবং তিনি তা কবুল করলেন। অর্থাৎ তিনি তাদেরকে বললেনঃ “আপনারা যা করেছেন, আল্লাহ তার উপর পর্দা করে দিন! তিনি হচ্ছেন পরম করুণাময়।”

ইউসুফ 12:90

৮৯-৯২ নং আয়াতের তাফসীর হযরত ইউসুফের (আঃ) ভাইয়েরা যখন তাঁর কাছে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত ও দারিদ্রের অবস্থায় পৌঁছেন এবং তাঁর কাছে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশা, পিতা ও পরিবারবর্গের বিপদ-আপদের বর্ণনা দেন তখন তাঁর অন্তর বিগলিত হয়ে যায় এবং আবেগে অভিভূত হয়ে পড়েন। বর্ণিত আছে যে, সেই সময় তিনি স্বীয় মাথার তাজ নামিয়ে ফেলেন এবং ভাইদেরকে বলেনঃ “আপনারা ইউসুফের (আঃ) সাথে এবং তার ভাই বিনইয়ামীনের সাথে যে ব্যবহার করেছিলেন তা আপনাদের স্মরণ আছে কি, যখন আপনারা অজ্ঞ ছিলেন? এ জন্যেই পূর্ববর্তী কোন কোন গুরুজন বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লার প্রত্যেক পাপী বান্দাই অজ্ঞ ও মুখ। অতঃপর তিনি (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। (১৬: ১১৯)। বাহ্যতঃ এটা জানা যাচ্ছে যে, প্রথম দু’দফার সাক্ষাতের সময় নিজের পরিচয় দানের নির্দেশ আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ হতে হযরত ইউসুফের (আঃ) প্রতি ছিল না। তৃতীয় বারে সাক্ষাতের সময় তাঁকে নিজের পরিচয় দানের নির্দেশ দেয়া হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সবচেয়ে ভাল জানেন। যখন কষ্ট বেড়ে গেল এবং কাঠিণ্য বৃদ্ধি পেলো তখন আল্লাহ তাআ’লা কাঠিণ্য ও সংকীর্ণতা দূর করে দিলেন এবং প্রশস্ততা আনয়ন করলেন। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে। অবশ্য কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।” (৯৪: ৫-৬) হযরত ইউসুফের (আঃ) প্রশ্নে তাঁর ভ্রাতাগণ বিস্ময়ে চমকে উঠেন। এর একটা কারণ এই ছিল যে, মুকুট নামিয়ে দেয়ার ফলে তার কপালের নিদর্শন তাঁরা দেখে নেন। ঐ সময় তাঁরা তাঁকে প্রশ্ন করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তা হলে তুমিই কি ইউসুফ?” (১২:৯০) ইবনু মুহাইসিন (রঃ) (আরবি) পড়েছেন। প্রথমটিই প্রসিদ্ধ কিরআত। কেননা (আরবি) বা প্রশ্ন (আরবি) এর উপর ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ এতে তাঁরা বিস্মিত হন যে, তারা তাঁর কাছে দু’বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে যাতায়াত করছেন, অথচ তাঁকে তাঁরা চিনতে পারেন নাই।, আর তিনি কিন্তু তাদেরকে চিনেছেন ও নিজেকে গোপন করেছেন! এজন্যেই তারা প্রশ্নের সুরে বলেনঃ “তুমি কি ইউসুফ?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ, আমিই ইউসুফ (আঃ) এবং এটা (বিনইয়ামীন) আমার (সহোদর) ভাই। আল্লাহ তাআ’লা আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, দীর্ঘ দিনের বিচ্ছেদের পর আমাদেরকে তিনি মিলিত করেছেন। আল্লাহ্ভীতি ও ধৈর্যশীলতা বিফলে যায় না।”এখন হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নেন। তাঁরা তাঁকে বলেনঃ “বাস্তবিকই দৈহিক সৌন্দর্য ও নৈতিক চরিত্র উভয় দিক দিয়েই তুমি আমাদের চেয়ে উত্তম। রাজত্ব ও ধন-মালের দিক দিয়েও আল্লাহ তোমাকে আমাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন।” অনুরূপভাবে কারো কারো মতে নুবওয়াতের দিক দিয়েও তিনি ভাইদের উপর প্রাধান্য লাভ করেছিলেন। কেননা, তিনি নবী ছিলেন এবং তাঁর ভ্রাতাগণ নবী ছিলেন না। এই স্বীকারোক্তির পর তাঁরা তাঁদের ভুলও স্বীকার করেন। তৎক্ষণাৎ হযরত ইউসুফ (আঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আজকের পরে আমি আপনাদের এই ভুলের কথা মনেও করবো না। এ কারণে আমি আপনাদেরকে শাসন গর্জন করতে চাইনে। আমি আপনাদের উপর কোন অভিযোগও করছি না। আপনাদের উপর আমি রাগান্বিত নই। বরং আমার প্রার্থনা এই যে, আল্লাহ তাআ’লাও আপনাদেরকে ক্ষমা করুন! তিনি সর্বাপেক্ষা বড় দয়ালু।” তার ভ্রাতাগণ ওজর পেশ করলেন এবং তিনি তা কবুল করলেন। অর্থাৎ তিনি তাদেরকে বললেনঃ “আপনারা যা করেছেন, আল্লাহ তার উপর পর্দা করে দিন! তিনি হচ্ছেন পরম করুণাময়।”

ইউসুফ 12:91

৮৯-৯২ নং আয়াতের তাফসীর হযরত ইউসুফের (আঃ) ভাইয়েরা যখন তাঁর কাছে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত ও দারিদ্রের অবস্থায় পৌঁছেন এবং তাঁর কাছে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশা, পিতা ও পরিবারবর্গের বিপদ-আপদের বর্ণনা দেন তখন তাঁর অন্তর বিগলিত হয়ে যায় এবং আবেগে অভিভূত হয়ে পড়েন। বর্ণিত আছে যে, সেই সময় তিনি স্বীয় মাথার তাজ নামিয়ে ফেলেন এবং ভাইদেরকে বলেনঃ “আপনারা ইউসুফের (আঃ) সাথে এবং তার ভাই বিনইয়ামীনের সাথে যে ব্যবহার করেছিলেন তা আপনাদের স্মরণ আছে কি, যখন আপনারা অজ্ঞ ছিলেন? এ জন্যেই পূর্ববর্তী কোন কোন গুরুজন বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লার প্রত্যেক পাপী বান্দাই অজ্ঞ ও মুখ। অতঃপর তিনি (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। (১৬: ১১৯)। বাহ্যতঃ এটা জানা যাচ্ছে যে, প্রথম দু’দফার সাক্ষাতের সময় নিজের পরিচয় দানের নির্দেশ আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ হতে হযরত ইউসুফের (আঃ) প্রতি ছিল না। তৃতীয় বারে সাক্ষাতের সময় তাঁকে নিজের পরিচয় দানের নির্দেশ দেয়া হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সবচেয়ে ভাল জানেন। যখন কষ্ট বেড়ে গেল এবং কাঠিণ্য বৃদ্ধি পেলো তখন আল্লাহ তাআ’লা কাঠিণ্য ও সংকীর্ণতা দূর করে দিলেন এবং প্রশস্ততা আনয়ন করলেন। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে। অবশ্য কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।” (৯৪: ৫-৬) হযরত ইউসুফের (আঃ) প্রশ্নে তাঁর ভ্রাতাগণ বিস্ময়ে চমকে উঠেন। এর একটা কারণ এই ছিল যে, মুকুট নামিয়ে দেয়ার ফলে তার কপালের নিদর্শন তাঁরা দেখে নেন। ঐ সময় তাঁরা তাঁকে প্রশ্ন করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তা হলে তুমিই কি ইউসুফ?” (১২:৯০) ইবনু মুহাইসিন (রঃ) (আরবি) পড়েছেন। প্রথমটিই প্রসিদ্ধ কিরআত। কেননা (আরবি) বা প্রশ্ন (আরবি) এর উপর ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ এতে তাঁরা বিস্মিত হন যে, তারা তাঁর কাছে দু’বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে যাতায়াত করছেন, অথচ তাঁকে তাঁরা চিনতে পারেন নাই।, আর তিনি কিন্তু তাদেরকে চিনেছেন ও নিজেকে গোপন করেছেন! এজন্যেই তারা প্রশ্নের সুরে বলেনঃ “তুমি কি ইউসুফ?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ, আমিই ইউসুফ (আঃ) এবং এটা (বিনইয়ামীন) আমার (সহোদর) ভাই। আল্লাহ তাআ’লা আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, দীর্ঘ দিনের বিচ্ছেদের পর আমাদেরকে তিনি মিলিত করেছেন। আল্লাহ্ভীতি ও ধৈর্যশীলতা বিফলে যায় না।”এখন হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নেন। তাঁরা তাঁকে বলেনঃ “বাস্তবিকই দৈহিক সৌন্দর্য ও নৈতিক চরিত্র উভয় দিক দিয়েই তুমি আমাদের চেয়ে উত্তম। রাজত্ব ও ধন-মালের দিক দিয়েও আল্লাহ তোমাকে আমাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন।” অনুরূপভাবে কারো কারো মতে নুবওয়াতের দিক দিয়েও তিনি ভাইদের উপর প্রাধান্য লাভ করেছিলেন। কেননা, তিনি নবী ছিলেন এবং তাঁর ভ্রাতাগণ নবী ছিলেন না। এই স্বীকারোক্তির পর তাঁরা তাঁদের ভুলও স্বীকার করেন। তৎক্ষণাৎ হযরত ইউসুফ (আঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আজকের পরে আমি আপনাদের এই ভুলের কথা মনেও করবো না। এ কারণে আমি আপনাদেরকে শাসন গর্জন করতে চাইনে। আমি আপনাদের উপর কোন অভিযোগও করছি না। আপনাদের উপর আমি রাগান্বিত নই। বরং আমার প্রার্থনা এই যে, আল্লাহ তাআ’লাও আপনাদেরকে ক্ষমা করুন! তিনি সর্বাপেক্ষা বড় দয়ালু।” তার ভ্রাতাগণ ওজর পেশ করলেন এবং তিনি তা কবুল করলেন। অর্থাৎ তিনি তাদেরকে বললেনঃ “আপনারা যা করেছেন, আল্লাহ তার উপর পর্দা করে দিন! তিনি হচ্ছেন পরম করুণাময়।”

ইউসুফ 12:92

৮৯-৯২ নং আয়াতের তাফসীর হযরত ইউসুফের (আঃ) ভাইয়েরা যখন তাঁর কাছে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত ও দারিদ্রের অবস্থায় পৌঁছেন এবং তাঁর কাছে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশা, পিতা ও পরিবারবর্গের বিপদ-আপদের বর্ণনা দেন তখন তাঁর অন্তর বিগলিত হয়ে যায় এবং আবেগে অভিভূত হয়ে পড়েন। বর্ণিত আছে যে, সেই সময় তিনি স্বীয় মাথার তাজ নামিয়ে ফেলেন এবং ভাইদেরকে বলেনঃ “আপনারা ইউসুফের (আঃ) সাথে এবং তার ভাই বিনইয়ামীনের সাথে যে ব্যবহার করেছিলেন তা আপনাদের স্মরণ আছে কি, যখন আপনারা অজ্ঞ ছিলেন? এ জন্যেই পূর্ববর্তী কোন কোন গুরুজন বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লার প্রত্যেক পাপী বান্দাই অজ্ঞ ও মুখ। অতঃপর তিনি (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। (১৬: ১১৯)। বাহ্যতঃ এটা জানা যাচ্ছে যে, প্রথম দু’দফার সাক্ষাতের সময় নিজের পরিচয় দানের নির্দেশ আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ হতে হযরত ইউসুফের (আঃ) প্রতি ছিল না। তৃতীয় বারে সাক্ষাতের সময় তাঁকে নিজের পরিচয় দানের নির্দেশ দেয়া হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সবচেয়ে ভাল জানেন। যখন কষ্ট বেড়ে গেল এবং কাঠিণ্য বৃদ্ধি পেলো তখন আল্লাহ তাআ’লা কাঠিণ্য ও সংকীর্ণতা দূর করে দিলেন এবং প্রশস্ততা আনয়ন করলেন। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে। অবশ্য কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।” (৯৪: ৫-৬) হযরত ইউসুফের (আঃ) প্রশ্নে তাঁর ভ্রাতাগণ বিস্ময়ে চমকে উঠেন। এর একটা কারণ এই ছিল যে, মুকুট নামিয়ে দেয়ার ফলে তার কপালের নিদর্শন তাঁরা দেখে নেন। ঐ সময় তাঁরা তাঁকে প্রশ্ন করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তা হলে তুমিই কি ইউসুফ?” (১২:৯০) ইবনু মুহাইসিন (রঃ) (আরবি) পড়েছেন। প্রথমটিই প্রসিদ্ধ কিরআত। কেননা (আরবি) বা প্রশ্ন (আরবি) এর উপর ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ এতে তাঁরা বিস্মিত হন যে, তারা তাঁর কাছে দু’বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে যাতায়াত করছেন, অথচ তাঁকে তাঁরা চিনতে পারেন নাই।, আর তিনি কিন্তু তাদেরকে চিনেছেন ও নিজেকে গোপন করেছেন! এজন্যেই তারা প্রশ্নের সুরে বলেনঃ “তুমি কি ইউসুফ?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ, আমিই ইউসুফ (আঃ) এবং এটা (বিনইয়ামীন) আমার (সহোদর) ভাই। আল্লাহ তাআ’লা আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, দীর্ঘ দিনের বিচ্ছেদের পর আমাদেরকে তিনি মিলিত করেছেন। আল্লাহ্ভীতি ও ধৈর্যশীলতা বিফলে যায় না।”এখন হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নেন। তাঁরা তাঁকে বলেনঃ “বাস্তবিকই দৈহিক সৌন্দর্য ও নৈতিক চরিত্র উভয় দিক দিয়েই তুমি আমাদের চেয়ে উত্তম। রাজত্ব ও ধন-মালের দিক দিয়েও আল্লাহ তোমাকে আমাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন।” অনুরূপভাবে কারো কারো মতে নুবওয়াতের দিক দিয়েও তিনি ভাইদের উপর প্রাধান্য লাভ করেছিলেন। কেননা, তিনি নবী ছিলেন এবং তাঁর ভ্রাতাগণ নবী ছিলেন না। এই স্বীকারোক্তির পর তাঁরা তাঁদের ভুলও স্বীকার করেন। তৎক্ষণাৎ হযরত ইউসুফ (আঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আজকের পরে আমি আপনাদের এই ভুলের কথা মনেও করবো না। এ কারণে আমি আপনাদেরকে শাসন গর্জন করতে চাইনে। আমি আপনাদের উপর কোন অভিযোগও করছি না। আপনাদের উপর আমি রাগান্বিত নই। বরং আমার প্রার্থনা এই যে, আল্লাহ তাআ’লাও আপনাদেরকে ক্ষমা করুন! তিনি সর্বাপেক্ষা বড় দয়ালু।” তার ভ্রাতাগণ ওজর পেশ করলেন এবং তিনি তা কবুল করলেন। অর্থাৎ তিনি তাদেরকে বললেনঃ “আপনারা যা করেছেন, আল্লাহ তার উপর পর্দা করে দিন! তিনি হচ্ছেন পরম করুণাময়।”

ইউসুফ 12:93

৯৩-৯৫ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহর নবী হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইউসুফের (আঃ) শোকে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, তাই হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর ভাইদেরকে বললেনঃ “আমার এই জামাটি নিয়ে আমাদের পিতার কাছে গমন করুন এবং এটা তার মুখের উপর রেখে দেবেন, ইনশা আল্লাহ তিনি তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাবেন। অতঃপর আপনারা তাঁকে এবং আপনাদের পরিবারের সকলকেই আমার নিকট নিয়ে আসবেন।” এদিকে এই যাত্রীদল মিসর থেকে যাত্রা শুরু করেছেন, আর ও দিকে আল্লাহ তাআ’লা হযরত ইয়াকুবের (আঃ) কাছে হযরত ইউসুফের (আঃ) সুগন্ধি পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তখন তিনি তাঁর কাছে অবস্থিত সন্তানদের বললেনঃ “আমার কাছে তো আমার প্রিয় পুত্র ইউসুফের (আঃ) সুগন্ধ আসছে। কিন্তু তোমরা তো আমাকে জ্ঞান শূন্য অতি বৃদ্ধ বলে আমার কথার প্রতি কোনই গুরুত্ব দেবে না।” ঐ সময় যাত্রীদল কিনআন থেকে ৮ (আট) দিনের পথের দূরত্বে ছিল। সেখান থেকেই আল্লাহর হুকুমে বাতাস হযরত ইয়াকুবকে (আঃ) হযরত ইউসুফের (আঃ) জামাটির সুগন্ধি পৌঁছিয়ে দিয়েছিল। ঐ সময় হযরত ইউসুফের (আঃ) হারিয়ে যাওয়ার সময় কাল ৮০ (আশি) বছরে পৌঁছেছিল এবং যাত্রীদল তার নিকট থেকে ৮০ (আশি) ‘ফারসাখ’ দূরে ছিল। কিন্তু পিতার পার্শ্বে অবস্থানকারী ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ পিতাকে বললো: “আপনি ইউসুফের (আঃ) প্রেমের কারণে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে রয়েছেন। সে কোন সময় আপনার মন হতে দূর হয় না এবং কোন সময় আপনি সান্ত্বনাও লাভ করতে পারছেন না।” হযরত ইয়াকুবের (আঃ) কাছে এই ভাষাটি বাস্তবিকই অত্যন্ত কঠোর ছিল। কোন যোগ্য সন্তানের পক্ষে এটা শোভনীয় নয় যে, নিজের পিতার নামে এরূপ ভাষা প্রয়োগ করে এবং উম্মতের জন্যেও এটা শোভা পায় না যে, তারা তাদের নবীকে (সঃ) এরূপ কথা বলে! সুদ্দী (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন একথাই বলেছেন।

ইউসুফ 12:94

৯৩-৯৫ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহর নবী হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইউসুফের (আঃ) শোকে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, তাই হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর ভাইদেরকে বললেনঃ “আমার এই জামাটি নিয়ে আমাদের পিতার কাছে গমন করুন এবং এটা তার মুখের উপর রেখে দেবেন, ইনশা আল্লাহ তিনি তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাবেন। অতঃপর আপনারা তাঁকে এবং আপনাদের পরিবারের সকলকেই আমার নিকট নিয়ে আসবেন।” এদিকে এই যাত্রীদল মিসর থেকে যাত্রা শুরু করেছেন, আর ও দিকে আল্লাহ তাআ’লা হযরত ইয়াকুবের (আঃ) কাছে হযরত ইউসুফের (আঃ) সুগন্ধি পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তখন তিনি তাঁর কাছে অবস্থিত সন্তানদের বললেনঃ “আমার কাছে তো আমার প্রিয় পুত্র ইউসুফের (আঃ) সুগন্ধ আসছে। কিন্তু তোমরা তো আমাকে জ্ঞান শূন্য অতি বৃদ্ধ বলে আমার কথার প্রতি কোনই গুরুত্ব দেবে না।” ঐ সময় যাত্রীদল কিনআন থেকে ৮ (আট) দিনের পথের দূরত্বে ছিল। সেখান থেকেই আল্লাহর হুকুমে বাতাস হযরত ইয়াকুবকে (আঃ) হযরত ইউসুফের (আঃ) জামাটির সুগন্ধি পৌঁছিয়ে দিয়েছিল। ঐ সময় হযরত ইউসুফের (আঃ) হারিয়ে যাওয়ার সময় কাল ৮০ (আশি) বছরে পৌঁছেছিল এবং যাত্রীদল তার নিকট থেকে ৮০ (আশি) ‘ফারসাখ’ দূরে ছিল। কিন্তু পিতার পার্শ্বে অবস্থানকারী ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ পিতাকে বললো: “আপনি ইউসুফের (আঃ) প্রেমের কারণে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে রয়েছেন। সে কোন সময় আপনার মন হতে দূর হয় না এবং কোন সময় আপনি সান্ত্বনাও লাভ করতে পারছেন না।” হযরত ইয়াকুবের (আঃ) কাছে এই ভাষাটি বাস্তবিকই অত্যন্ত কঠোর ছিল। কোন যোগ্য সন্তানের পক্ষে এটা শোভনীয় নয় যে, নিজের পিতার নামে এরূপ ভাষা প্রয়োগ করে এবং উম্মতের জন্যেও এটা শোভা পায় না যে, তারা তাদের নবীকে (সঃ) এরূপ কথা বলে! সুদ্দী (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন একথাই বলেছেন।

ইউসুফ 12:95

৯৩-৯৫ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহর নবী হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইউসুফের (আঃ) শোকে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, তাই হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর ভাইদেরকে বললেনঃ “আমার এই জামাটি নিয়ে আমাদের পিতার কাছে গমন করুন এবং এটা তার মুখের উপর রেখে দেবেন, ইনশা আল্লাহ তিনি তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাবেন। অতঃপর আপনারা তাঁকে এবং আপনাদের পরিবারের সকলকেই আমার নিকট নিয়ে আসবেন।” এদিকে এই যাত্রীদল মিসর থেকে যাত্রা শুরু করেছেন, আর ও দিকে আল্লাহ তাআ’লা হযরত ইয়াকুবের (আঃ) কাছে হযরত ইউসুফের (আঃ) সুগন্ধি পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তখন তিনি তাঁর কাছে অবস্থিত সন্তানদের বললেনঃ “আমার কাছে তো আমার প্রিয় পুত্র ইউসুফের (আঃ) সুগন্ধ আসছে। কিন্তু তোমরা তো আমাকে জ্ঞান শূন্য অতি বৃদ্ধ বলে আমার কথার প্রতি কোনই গুরুত্ব দেবে না।” ঐ সময় যাত্রীদল কিনআন থেকে ৮ (আট) দিনের পথের দূরত্বে ছিল। সেখান থেকেই আল্লাহর হুকুমে বাতাস হযরত ইয়াকুবকে (আঃ) হযরত ইউসুফের (আঃ) জামাটির সুগন্ধি পৌঁছিয়ে দিয়েছিল। ঐ সময় হযরত ইউসুফের (আঃ) হারিয়ে যাওয়ার সময় কাল ৮০ (আশি) বছরে পৌঁছেছিল এবং যাত্রীদল তার নিকট থেকে ৮০ (আশি) ‘ফারসাখ’ দূরে ছিল। কিন্তু পিতার পার্শ্বে অবস্থানকারী ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ পিতাকে বললো: “আপনি ইউসুফের (আঃ) প্রেমের কারণে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে রয়েছেন। সে কোন সময় আপনার মন হতে দূর হয় না এবং কোন সময় আপনি সান্ত্বনাও লাভ করতে পারছেন না।” হযরত ইয়াকুবের (আঃ) কাছে এই ভাষাটি বাস্তবিকই অত্যন্ত কঠোর ছিল। কোন যোগ্য সন্তানের পক্ষে এটা শোভনীয় নয় যে, নিজের পিতার নামে এরূপ ভাষা প্রয়োগ করে এবং উম্মতের জন্যেও এটা শোভা পায় না যে, তারা তাদের নবীকে (সঃ) এরূপ কথা বলে! সুদ্দী (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন একথাই বলেছেন।

ইউসুফ 12:96

৯৬-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, জামাটি এনেছিলেন হযরত ইয়াকুবের (আঃ) বড় ছেলে ইয়াহূদা। কেননা, তিনিই পূর্বে হযরত ইউসুফের (আঃ) জামায় মিথ্যা রক্ত মাখিয়ে পিতার কাছে হাযির করে ছিলেন এবং পিতাকে বলেছিলেন যে, এটা হচ্ছে হযরত ইউসুফের (আঃ) দেহের রক্তভরা জামা। এখন এরই বদলা হিসেবে তিনিই হযরত ইউসুফের (আঃ) এই জামাটি আনলেন যেন মন্দের বিনিময়ে ভাল সম্পাদিত হয়। যেন কু-খবরের বিনিময়ে সুখবর হয়ে যায়। জামাটি এনেই পিতার চেহারার উপর ফেলে দেন। সাথে সাথেই হযরত ইয়াকুবের (আঃ) চক্ষু খুলে যায়। তখন তিনি পুত্রদের সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখো! আমি তো সদা-সর্বদা তোমাদেরকে বলে আসছি যে, মহান আল্লাহর নিকট হতে আমি এমন কতকগুলি বিষয় অবগত আছি, যা তোমরা অবগত নও। আমি তোমাদেরকে বলেছি যে, আল্লাহ তাআ’লা অবশ্যই ইউসুফ (আঃ) কে আমার সাথে সাক্ষাত করাবেন। এই তো অল্প দিন পূর্বের আলোচনায় আমি তোমাদেরকে বলেছিলাম যে, আমি ইউসুফের (আঃ) ঘ্রাণ পাচ্ছি।” পিতার এ সব কথা শুনে পুত্রেরা লজ্জিত হয়ে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেন এবং পিতাকে নিজেদের জন্যে আল্লাহ তাআ’লার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলেন। উত্তরে পিতা বলেনঃ “আমি তোমাদের এই আবেদন প্রত্যাখ্যান করছি না এবং আমি আমার প্রতিপালকের নিকট এই আশাও রাখি যে, তিনি তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। কেননা, তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়। তিনি তাওবাকারীর তাওবা কবুল করে থাকেন। আমি প্রাতঃকালে তোমাদের জন্যে তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো।”হযরত মুহারিব ইবনু দাসার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) একদা মসজিদে আগমন করেন এবং এ কথাটি বলতে শুনেন: “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আহ্‌বান করেছেন, আমি আপনার আহ্‌বানে সাড়া দিয়েছি। আপনি আমাকে আদেশ করেছেন, আমি আপনার আদেশ মান্য করেছি। এটা প্রাতঃকাল। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন।” হযরত উমার (রাঃ) কান লাগিয়ে শুনলেন এবং বুঝলেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের (রাঃ) বাড়ী হতে এ শব্দ আসছে। তিনি এ ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “এটা হচ্ছে ঐ সময় যার জন্যে হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর ছেলেদেরকে বলেছিলেনঃ “অল্পক্ষণ পরেই আমি তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো”। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হাদীস শরীফে রয়েছে যে, ওটা ছিল জুমআ’র রাত্রি। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, অল্পক্ষণ পরেই আমি তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো’ এর দ্বারা হযরত ইয়াকুবের উদ্দেশ্য ছিল জুমআ’র রাত্রি। (এ হাদীসটিও ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। এর মারফূ’ হওয়ার ব্যাপারেও সমালোচনা হয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন)

ইউসুফ 12:97

৯৬-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, জামাটি এনেছিলেন হযরত ইয়াকুবের (আঃ) বড় ছেলে ইয়াহূদা। কেননা, তিনিই পূর্বে হযরত ইউসুফের (আঃ) জামায় মিথ্যা রক্ত মাখিয়ে পিতার কাছে হাযির করে ছিলেন এবং পিতাকে বলেছিলেন যে, এটা হচ্ছে হযরত ইউসুফের (আঃ) দেহের রক্তভরা জামা। এখন এরই বদলা হিসেবে তিনিই হযরত ইউসুফের (আঃ) এই জামাটি আনলেন যেন মন্দের বিনিময়ে ভাল সম্পাদিত হয়। যেন কু-খবরের বিনিময়ে সুখবর হয়ে যায়। জামাটি এনেই পিতার চেহারার উপর ফেলে দেন। সাথে সাথেই হযরত ইয়াকুবের (আঃ) চক্ষু খুলে যায়। তখন তিনি পুত্রদের সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখো! আমি তো সদা-সর্বদা তোমাদেরকে বলে আসছি যে, মহান আল্লাহর নিকট হতে আমি এমন কতকগুলি বিষয় অবগত আছি, যা তোমরা অবগত নও। আমি তোমাদেরকে বলেছি যে, আল্লাহ তাআ’লা অবশ্যই ইউসুফ (আঃ) কে আমার সাথে সাক্ষাত করাবেন। এই তো অল্প দিন পূর্বের আলোচনায় আমি তোমাদেরকে বলেছিলাম যে, আমি ইউসুফের (আঃ) ঘ্রাণ পাচ্ছি।” পিতার এ সব কথা শুনে পুত্রেরা লজ্জিত হয়ে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেন এবং পিতাকে নিজেদের জন্যে আল্লাহ তাআ’লার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলেন। উত্তরে পিতা বলেনঃ “আমি তোমাদের এই আবেদন প্রত্যাখ্যান করছি না এবং আমি আমার প্রতিপালকের নিকট এই আশাও রাখি যে, তিনি তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। কেননা, তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়। তিনি তাওবাকারীর তাওবা কবুল করে থাকেন। আমি প্রাতঃকালে তোমাদের জন্যে তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো।”হযরত মুহারিব ইবনু দাসার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) একদা মসজিদে আগমন করেন এবং এ কথাটি বলতে শুনেন: “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আহ্‌বান করেছেন, আমি আপনার আহ্‌বানে সাড়া দিয়েছি। আপনি আমাকে আদেশ করেছেন, আমি আপনার আদেশ মান্য করেছি। এটা প্রাতঃকাল। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন।” হযরত উমার (রাঃ) কান লাগিয়ে শুনলেন এবং বুঝলেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের (রাঃ) বাড়ী হতে এ শব্দ আসছে। তিনি এ ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “এটা হচ্ছে ঐ সময় যার জন্যে হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর ছেলেদেরকে বলেছিলেনঃ “অল্পক্ষণ পরেই আমি তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো”। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হাদীস শরীফে রয়েছে যে, ওটা ছিল জুমআ’র রাত্রি। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, অল্পক্ষণ পরেই আমি তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো’ এর দ্বারা হযরত ইয়াকুবের উদ্দেশ্য ছিল জুমআ’র রাত্রি। (এ হাদীসটিও ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। এর মারফূ’ হওয়ার ব্যাপারেও সমালোচনা হয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন)

ইউসুফ 12:98

৯৬-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, জামাটি এনেছিলেন হযরত ইয়াকুবের (আঃ) বড় ছেলে ইয়াহূদা। কেননা, তিনিই পূর্বে হযরত ইউসুফের (আঃ) জামায় মিথ্যা রক্ত মাখিয়ে পিতার কাছে হাযির করে ছিলেন এবং পিতাকে বলেছিলেন যে, এটা হচ্ছে হযরত ইউসুফের (আঃ) দেহের রক্তভরা জামা। এখন এরই বদলা হিসেবে তিনিই হযরত ইউসুফের (আঃ) এই জামাটি আনলেন যেন মন্দের বিনিময়ে ভাল সম্পাদিত হয়। যেন কু-খবরের বিনিময়ে সুখবর হয়ে যায়। জামাটি এনেই পিতার চেহারার উপর ফেলে দেন। সাথে সাথেই হযরত ইয়াকুবের (আঃ) চক্ষু খুলে যায়। তখন তিনি পুত্রদের সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখো! আমি তো সদা-সর্বদা তোমাদেরকে বলে আসছি যে, মহান আল্লাহর নিকট হতে আমি এমন কতকগুলি বিষয় অবগত আছি, যা তোমরা অবগত নও। আমি তোমাদেরকে বলেছি যে, আল্লাহ তাআ’লা অবশ্যই ইউসুফ (আঃ) কে আমার সাথে সাক্ষাত করাবেন। এই তো অল্প দিন পূর্বের আলোচনায় আমি তোমাদেরকে বলেছিলাম যে, আমি ইউসুফের (আঃ) ঘ্রাণ পাচ্ছি।” পিতার এ সব কথা শুনে পুত্রেরা লজ্জিত হয়ে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেন এবং পিতাকে নিজেদের জন্যে আল্লাহ তাআ’লার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলেন। উত্তরে পিতা বলেনঃ “আমি তোমাদের এই আবেদন প্রত্যাখ্যান করছি না এবং আমি আমার প্রতিপালকের নিকট এই আশাও রাখি যে, তিনি তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। কেননা, তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়। তিনি তাওবাকারীর তাওবা কবুল করে থাকেন। আমি প্রাতঃকালে তোমাদের জন্যে তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো।”হযরত মুহারিব ইবনু দাসার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) একদা মসজিদে আগমন করেন এবং এ কথাটি বলতে শুনেন: “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আহ্‌বান করেছেন, আমি আপনার আহ্‌বানে সাড়া দিয়েছি। আপনি আমাকে আদেশ করেছেন, আমি আপনার আদেশ মান্য করেছি। এটা প্রাতঃকাল। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন।” হযরত উমার (রাঃ) কান লাগিয়ে শুনলেন এবং বুঝলেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের (রাঃ) বাড়ী হতে এ শব্দ আসছে। তিনি এ ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “এটা হচ্ছে ঐ সময় যার জন্যে হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর ছেলেদেরকে বলেছিলেনঃ “অল্পক্ষণ পরেই আমি তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো”। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হাদীস শরীফে রয়েছে যে, ওটা ছিল জুমআ’র রাত্রি। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, অল্পক্ষণ পরেই আমি তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো’ এর দ্বারা হযরত ইয়াকুবের উদ্দেশ্য ছিল জুমআ’র রাত্রি। (এ হাদীসটিও ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। এর মারফূ’ হওয়ার ব্যাপারেও সমালোচনা হয়েছে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন)

ইউসুফ 12:99

৯৯-১০০ নং আয়াতের তাফসীর হযরত ইউসুফ (আঃ) ভাইদেরকে নিজের পরিচয় দানের পর বলেছিলেনঃ “আমাদের পিতা এবং আপনাদের পরিবারের সমস্ত লোককে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। আল্লাহ তাআ’লা এখানে ঐ সংবাদই দিচ্ছেন। হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ তাই করলেন। ঐ মহান যাত্রী দলটি কিনআ’ন থেকে মিসরের পথে যাত্রা শুরু করলেন। যখন তারা মিসরের নিকটবর্তী স্থানে পৌঁছলেন, তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) স্বীয় পিতা হযরত ইয়াকুবের (আঃ) অভ্যর্থনার জন্যে গমন করলেন এবং বাদশাহর নির্দেশক্রমে শহরের সমস্ত আমীর ও সভাসদও গেলেন। এও বর্ণিত আছে যে, স্বয়ং বাদশাহও অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে গমন করেছিলেন এবং শহরের বাইরে এসেছিলেন।(আরবি) এই উক্তির ব্যাপারে কোন কোন মুফাসসিরের বক্তব্য এই যে, এখানে রচনায় আগা-পিছা রয়েছে। অর্থাৎ হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁদেরকে বললেনঃ “আপনারা মিসরে প্রবেশ করুন, ইনশাআল্লাহ এখানে নির্ভয় ও নিরাপদে থাকবেন।” এখন শহরে প্রবেশ করার পর তিনি পিতা মাতাকে নিজের কাছে স্থান দেন এবং তাদেরকে উচ্চাসনে বসান। কিন্তু ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) এটা খন্ডন করেছেন এবং বলেছেন যে, এতে সুদ্দীর (রঃ) উক্তিটিই সঠিক। তাঁর উক্তি এই যে, যখন প্রথমে সাক্ষাৎ হলো তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দেন এবং যখন শহরে প্রবেশ করেন তখন বলেনঃ “এখন শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে এখানে চলে আসুন।” কিন্তু এখানে আর একটি কথা থেকে যাচ্ছে। তা এই যে, (আরবি) এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে বাড়ীতে স্থান দেয়া। যেমন রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনি তাঁর ভাইকে তাঁর বাড়ীতে স্থান দিলেন।” আর হাদীসেও (আরবি) এইরূপ রয়েছে।সুতরাং পিতা মাতার আগমনের পর হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁদেরকে নিজের কাছে স্থান দেয়ার পর তাঁদেরকে বলেনঃ আপনারা নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন। এখানে দুর্ভিক্ষ প্রভৃতি বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত অবস্থায় সুখে শান্তিতে বসবাস করুন। আমাদের এরূপ ভাবার্থ বর্ণনা না করার কোনই কারণ নেই।প্রসিদ্ধ উক্তি রয়েছে যে, দুর্ভিক্ষের যে কয়েক বছর অবশিষ্ট ছিল তা হযরত ইয়াকুবের (আঃ) আগমনের ফলে দূর হয়ে যায়। যেমন মক্কাবাসীদের দুর্ভিক্ষের বাকী বছরগুলি রাসূলুল্লাহর (সঃ) প্রার্থনার কারণে দূর হয়ে গিয়েছিল, যখন আবু সুফিয়ান (রাঃ) তাঁর কাছে দুর্ভিক্ষের অভিযোগ করেন এবং কেঁদে কেঁদে তাঁর কাছে দুআ’র সুপারিশ করেন। আবদুর রহমান (রঃ) বলেন যে, হযরত ইউসুফের (আঃ) মাতা পূর্বেই ইন্তেকাল করেছিলেন এবং তাঁর পিতার সাথে ছিলেন তাঁর খালা। কিন্তু ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) এবং ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইসহাকের (রঃ) উক্তি এই যে, ঐ সময় স্বয়ং তাঁর মাতাই জীবিত ছিলেন। এই উক্তিটি সঠিকও বটে। তাঁর মৃত্যুর উপর কোন বিশুদ্ধ দলীল নেই। আর কুরআন কারীমের প্রকাশ্য শব্দগুলি এটাই প্রমাণ করছে যে, ঐ সময় তাঁর মাতা জীবিত ছিলেন।হযরত ইউসুফ (আঃ) স্বীয় পিতা-মাতাকে রাজ সিংহাসনে বসিয়ে দেন। সেই সময় তাঁর পিতা-মাতা এবং এগারোটি ভাই সবাই তাঁর সামনে সিজদায় পড়ে যান। তখন তিনি পিতাকে সম্বোধন করে বলেনঃ “আব্বাজান! দেখুন, এতো দিনে আমার পূর্বের সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রকাশিত হলো। এই হচ্ছে এগারোটি তারকা এবং এই হচ্ছে সূর্য ও চন্দ্র যা আমার সামনে সিজদায় পতিত রয়েছে। তাদের শরীয়তে এটা বৈধ ছিল যে, বড়দেরকে তারা সালামের সাথে সিজদা করতেন। এমন কি হযরত আদম (আঃ) থেকে নিয়ে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত সমস্ত নবীর উম্মতদের জন্যে এটা জায়েয ছিল। কিন্তু মিল্লাতে মুহাম্মদিয়াতে (সঃ) আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআ’লা নিজের পবিত্র সত্ত্বা ছাড়া অন্য কারো জন্যে সিজদাকে বৈধ করেন নাই। বরং তিনি ওটা একমাত্র নিজের জন্যেই নির্দিষ্ট করেছেন। হযরত কাতাদা’ (রঃ) প্রভৃতি গুরুজনের উক্তির সারমর্ম এটাই।হাদীস শরীফে রয়েছে যে, হযরত মুআ’য (রাঃ) সিরিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেখেন যে, সিরিয়াবাসী তাদের বড়দেরকে সিজদা করে থাকে। তিনি ফিরে এসে রাসূলুল্লাহকে (সা) সিজদা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে মুআ’য (রাঃ)! এটা কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি সিরিয়াবাসীদেরকে দেখেছি যে, তারা তাদের বড় ও সম্মানিত লোকদেরকে সিজদা করে থাকে। তা হলে আপনি তো সর্বাপেক্ষা এর বড় হকদার।” একথায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যদি আমি কাউকেও কারো জন্যে সিজদার হুকুম দিতাম তবে স্ত্রীলোককে হুকুম করতাম যে, সে যেন তার স্বামীকে সিজদা করে। কারণ এই যে, তার বড় হক রয়েছে।” অন্য এক হাদীসে রয়েছে যে, হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) তাঁর ইসলাম গ্রহণের শুরুতে রাসূলুল্লাহকে (সঃ) পথে দেখে সিজদা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে সালমান (রাঃ)! আমাকে সিজদা করো না। সিজদা ঐ আল্লাহকে কর যিনি চিরঞ্জীব যিনি কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না।”মোট কথা, যেহেতু তাদের শরীয়তে মানুষকে সিজদা করা জায়েয ছিল, তাই তারা হযরত ইউসুফকে (আঃ) সিজদা করেছিলেন। তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেনঃ “দেখুন আব্বা! আমার স্বপ্নের তাৎপর্য প্রকাশিত হয়েছে। আমার প্রতিপালক এটাকে সত্যরূপে দেখিয়েছেন। এর ফল প্রকাশ হয়ে পড়েছে।”অন্য আয়াতে কিয়ামতের দিনের জন্যেও এই শব্দই ব্যবহৃত হয়েছে। সেখানে (আরবি) বলা হয়েছে। এরপর হযরত ইউসুফ (আঃ) বললেনঃ “এটাও আমার উপর আল্লাহর একটা ইহসান যে, তিনি আমার স্বপ্নকে সত্যরূপে দেখায়েছেন। যা আমি শুয়ে শুয়ে দেখেছিলাম, আল্লাহরই সমস্ত প্রশংসা যে, সেটাই তিনি আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখায়েছেন। আমার উপর তাঁর আরো অনুগ্রহ এই যে, তিনি আমাকে জেলখানা হতে মুক্তি দান করেছেন এবং আপনাদের সকলকে মরুভূমি হতে সরিয়ে এখানে আনয়ন করেছেন এবং আমার সাথে সাক্ষাৎ করায়েছেন।” হযরত ইয়াকুব (আঃ) জন্তু লালন-পালন করতেন বলে সাধারণতঃ তাঁকে মরুভূমি অঞ্চলেই বসবাস করতে হতো।ফিলিস্তিনও সিরিয়ার জঙ্গলে অবস্থিত। অধিকাংশ সময় তাঁরা তাঁবু খাটিয়ে বাস করতেন। বলা হয়েছে যে, তাঁরা হাসমীর নিম্নদেশে আওলাজ নামক স্থানে বসবাস করতেন এবং সেখানে পশু পালন করতেন। উট, বকরী ইত্যাদি তাঁদের সাথে থাকতো।অতঃপর হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেনঃ “আমার উপর আল্লাহ পাকের এটা কম বড় অনুগ্রহ নয় যে, শয়তান আমার ও আমার ভ্রাতাদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও তিনি আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে আনয়ন করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা করেন তা-ই নিপুণতার সাথে করে থাকেন। তিনি ঐ কাজের যথাযোগ্য উপকরণের ব্যবস্থা করে দেন। আর ওটাকে তিনি অতি সহজ করে দেন। বান্দার কিসে কল্যান রয়েছে তা তিনি খুব ভাল রূপেই জানেন। নিজের কাজে, কথায়, ফায়সালায় ও উদ্দেশ্যে তিনি অতি নিপুন।”সুলাইমানের (রঃ) উক্তি এই যে, স্বপ্ন দেখা ও ওর তাৎপর্য প্রকাশিত হওয়ার মধ্যে চল্লিশ বছরের ব্যবধান ছিল। আব্দুল্লাহ ইবনু শাদ্দাদ (রঃ) বলেন যে, স্বপ্নের তাৎপর্য প্রকাশিত হতে এর চেয়ে বেশী সময় লাগে না। এটাই হচ্ছে সময়ের শেষ সীমা। হযরত হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ৮০ বছর পরে পিতা পুত্রের মিলন ঘটে। এটা চিন্তার বিষয়, সেই সময় যমীনে হযরত ইয়াকুব (আঃ) অপেক্ষা আল্লাহ তাআ’লার বড় প্রিয় পাত্র আর কেউ ছিলেন না। তথাপি তাকে এতো দীর্ঘ দিন ধরে পুত্র ইউসুফকে (আঃ) ছেড়ে থাকতে হলো। সব সময় তাঁর চক্ষু দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে থাকতো। আর অন্তরে দুঃখ ও বেদনার তরঙ্গ উঠতো। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই বিচ্ছেদের সময়কাল ছিল ৮৩ (তিরাশি) বছর। মুবারক ইন ফুযালা’ (রঃ) হাসান (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন হযরত ইউসুফকে (আঃ) কূপে নিক্ষেপ করা হয়েছিল তখন তাঁর বয়স ছিল ১৭ (সতেরো বছর)। আর তিনি পিতার নিকট হারিয়ে থাকেন ৮০ (আশি) বছর। তারপরে তিনি ২৩ (তেইশ) বছর জীবিত থাকেন। ১২০ (এক শ’ বিশ) বছর বয়সে তিনি মৃত্যু মুখে পতিত হন। হযরত কাতাদা’’র (রঃ) উক্তি অনুসারে ৩৫ (পঁয়ত্রিশ) বছর প্ররে পিতা পুত্রের মিলন হয়। মুহাম্মদ ইবন ইসহাক (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) পিতার নিকট হতে ১৮ (আঠারো) বছর পর্যন্ত হারিয়ে থাকেন। আহলে কিতাবের ধারণায় তিনি চল্লিশ বছর পর্যন্ত পিতার নিকট হতে অনুপস্থিত ছিলেন। তারপর মিসরে পিতার সাথে মিলিত হন এবং এরপর ১৭ (সতের) বছর জীবিত থাকেন।হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, বানু ইসরাঈল যখন মিসরে পৌঁছেন তখন তাঁদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৩ (তেষট্টি) জন। (নুসখায়ে মাক্কিয়াতে তিনশ’ ষাটজন রয়েছে) আর যখন তারা মিসর হতে বের হন তখন তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ছ’লক্ষ সত্তর হাজার। আবু ইসহাক (রঃ) মাসরূক (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন তারা মিসরে প্রবেশ করেন তখন তাঁদের সংখ্যা ছিল তিনশ’ নব্বই জন। এঁদের মধ্যে ছিলেন পুরুষ ও নারী। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাদিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। আব্দুল্লাহ ইবনু শাদ্দাদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন এই লোকগুলি মিসরে আগমন করেন তখন তাদের মোট সংখ্যা ছিল ৮৬ (ছিয়াশি) জন। তাদের মধ্যে ছিলেন পুরুষ, নারী, বালক ও বৃদ্ধ। আর যখন বের হন তখন তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ছ’লক্ষেরও বেশি।

ইউসুফ 12:100

৯৯-১০০ নং আয়াতের তাফসীর হযরত ইউসুফ (আঃ) ভাইদেরকে নিজের পরিচয় দানের পর বলেছিলেনঃ “আমাদের পিতা এবং আপনাদের পরিবারের সমস্ত লোককে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। আল্লাহ তাআ’লা এখানে ঐ সংবাদই দিচ্ছেন। হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ তাই করলেন। ঐ মহান যাত্রী দলটি কিনআ’ন থেকে মিসরের পথে যাত্রা শুরু করলেন। যখন তারা মিসরের নিকটবর্তী স্থানে পৌঁছলেন, তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) স্বীয় পিতা হযরত ইয়াকুবের (আঃ) অভ্যর্থনার জন্যে গমন করলেন এবং বাদশাহর নির্দেশক্রমে শহরের সমস্ত আমীর ও সভাসদও গেলেন। এও বর্ণিত আছে যে, স্বয়ং বাদশাহও অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে গমন করেছিলেন এবং শহরের বাইরে এসেছিলেন।(আরবি) এই উক্তির ব্যাপারে কোন কোন মুফাসসিরের বক্তব্য এই যে, এখানে রচনায় আগা-পিছা রয়েছে। অর্থাৎ হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁদেরকে বললেনঃ “আপনারা মিসরে প্রবেশ করুন, ইনশাআল্লাহ এখানে নির্ভয় ও নিরাপদে থাকবেন।” এখন শহরে প্রবেশ করার পর তিনি পিতা মাতাকে নিজের কাছে স্থান দেন এবং তাদেরকে উচ্চাসনে বসান। কিন্তু ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) এটা খন্ডন করেছেন এবং বলেছেন যে, এতে সুদ্দীর (রঃ) উক্তিটিই সঠিক। তাঁর উক্তি এই যে, যখন প্রথমে সাক্ষাৎ হলো তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দেন এবং যখন শহরে প্রবেশ করেন তখন বলেনঃ “এখন শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে এখানে চলে আসুন।” কিন্তু এখানে আর একটি কথা থেকে যাচ্ছে। তা এই যে, (আরবি) এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে বাড়ীতে স্থান দেয়া। যেমন রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনি তাঁর ভাইকে তাঁর বাড়ীতে স্থান দিলেন।” আর হাদীসেও (আরবি) এইরূপ রয়েছে।সুতরাং পিতা মাতার আগমনের পর হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁদেরকে নিজের কাছে স্থান দেয়ার পর তাঁদেরকে বলেনঃ আপনারা নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন। এখানে দুর্ভিক্ষ প্রভৃতি বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত অবস্থায় সুখে শান্তিতে বসবাস করুন। আমাদের এরূপ ভাবার্থ বর্ণনা না করার কোনই কারণ নেই।প্রসিদ্ধ উক্তি রয়েছে যে, দুর্ভিক্ষের যে কয়েক বছর অবশিষ্ট ছিল তা হযরত ইয়াকুবের (আঃ) আগমনের ফলে দূর হয়ে যায়। যেমন মক্কাবাসীদের দুর্ভিক্ষের বাকী বছরগুলি রাসূলুল্লাহর (সঃ) প্রার্থনার কারণে দূর হয়ে গিয়েছিল, যখন আবু সুফিয়ান (রাঃ) তাঁর কাছে দুর্ভিক্ষের অভিযোগ করেন এবং কেঁদে কেঁদে তাঁর কাছে দুআ’র সুপারিশ করেন। আবদুর রহমান (রঃ) বলেন যে, হযরত ইউসুফের (আঃ) মাতা পূর্বেই ইন্তেকাল করেছিলেন এবং তাঁর পিতার সাথে ছিলেন তাঁর খালা। কিন্তু ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) এবং ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইসহাকের (রঃ) উক্তি এই যে, ঐ সময় স্বয়ং তাঁর মাতাই জীবিত ছিলেন। এই উক্তিটি সঠিকও বটে। তাঁর মৃত্যুর উপর কোন বিশুদ্ধ দলীল নেই। আর কুরআন কারীমের প্রকাশ্য শব্দগুলি এটাই প্রমাণ করছে যে, ঐ সময় তাঁর মাতা জীবিত ছিলেন।হযরত ইউসুফ (আঃ) স্বীয় পিতা-মাতাকে রাজ সিংহাসনে বসিয়ে দেন। সেই সময় তাঁর পিতা-মাতা এবং এগারোটি ভাই সবাই তাঁর সামনে সিজদায় পড়ে যান। তখন তিনি পিতাকে সম্বোধন করে বলেনঃ “আব্বাজান! দেখুন, এতো দিনে আমার পূর্বের সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রকাশিত হলো। এই হচ্ছে এগারোটি তারকা এবং এই হচ্ছে সূর্য ও চন্দ্র যা আমার সামনে সিজদায় পতিত রয়েছে। তাদের শরীয়তে এটা বৈধ ছিল যে, বড়দেরকে তারা সালামের সাথে সিজদা করতেন। এমন কি হযরত আদম (আঃ) থেকে নিয়ে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত সমস্ত নবীর উম্মতদের জন্যে এটা জায়েয ছিল। কিন্তু মিল্লাতে মুহাম্মদিয়াতে (সঃ) আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআ’লা নিজের পবিত্র সত্ত্বা ছাড়া অন্য কারো জন্যে সিজদাকে বৈধ করেন নাই। বরং তিনি ওটা একমাত্র নিজের জন্যেই নির্দিষ্ট করেছেন। হযরত কাতাদা’ (রঃ) প্রভৃতি গুরুজনের উক্তির সারমর্ম এটাই।হাদীস শরীফে রয়েছে যে, হযরত মুআ’য (রাঃ) সিরিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেখেন যে, সিরিয়াবাসী তাদের বড়দেরকে সিজদা করে থাকে। তিনি ফিরে এসে রাসূলুল্লাহকে (সা) সিজদা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে মুআ’য (রাঃ)! এটা কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি সিরিয়াবাসীদেরকে দেখেছি যে, তারা তাদের বড় ও সম্মানিত লোকদেরকে সিজদা করে থাকে। তা হলে আপনি তো সর্বাপেক্ষা এর বড় হকদার।” একথায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যদি আমি কাউকেও কারো জন্যে সিজদার হুকুম দিতাম তবে স্ত্রীলোককে হুকুম করতাম যে, সে যেন তার স্বামীকে সিজদা করে। কারণ এই যে, তার বড় হক রয়েছে।” অন্য এক হাদীসে রয়েছে যে, হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) তাঁর ইসলাম গ্রহণের শুরুতে রাসূলুল্লাহকে (সঃ) পথে দেখে সিজদা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে সালমান (রাঃ)! আমাকে সিজদা করো না। সিজদা ঐ আল্লাহকে কর যিনি চিরঞ্জীব যিনি কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না।”মোট কথা, যেহেতু তাদের শরীয়তে মানুষকে সিজদা করা জায়েয ছিল, তাই তারা হযরত ইউসুফকে (আঃ) সিজদা করেছিলেন। তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেনঃ “দেখুন আব্বা! আমার স্বপ্নের তাৎপর্য প্রকাশিত হয়েছে। আমার প্রতিপালক এটাকে সত্যরূপে দেখিয়েছেন। এর ফল প্রকাশ হয়ে পড়েছে।”অন্য আয়াতে কিয়ামতের দিনের জন্যেও এই শব্দই ব্যবহৃত হয়েছে। সেখানে (আরবি) বলা হয়েছে। এরপর হযরত ইউসুফ (আঃ) বললেনঃ “এটাও আমার উপর আল্লাহর একটা ইহসান যে, তিনি আমার স্বপ্নকে সত্যরূপে দেখায়েছেন। যা আমি শুয়ে শুয়ে দেখেছিলাম, আল্লাহরই সমস্ত প্রশংসা যে, সেটাই তিনি আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখায়েছেন। আমার উপর তাঁর আরো অনুগ্রহ এই যে, তিনি আমাকে জেলখানা হতে মুক্তি দান করেছেন এবং আপনাদের সকলকে মরুভূমি হতে সরিয়ে এখানে আনয়ন করেছেন এবং আমার সাথে সাক্ষাৎ করায়েছেন।” হযরত ইয়াকুব (আঃ) জন্তু লালন-পালন করতেন বলে সাধারণতঃ তাঁকে মরুভূমি অঞ্চলেই বসবাস করতে হতো।ফিলিস্তিনও সিরিয়ার জঙ্গলে অবস্থিত। অধিকাংশ সময় তাঁরা তাঁবু খাটিয়ে বাস করতেন। বলা হয়েছে যে, তাঁরা হাসমীর নিম্নদেশে আওলাজ নামক স্থানে বসবাস করতেন এবং সেখানে পশু পালন করতেন। উট, বকরী ইত্যাদি তাঁদের সাথে থাকতো।অতঃপর হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেনঃ “আমার উপর আল্লাহ পাকের এটা কম বড় অনুগ্রহ নয় যে, শয়তান আমার ও আমার ভ্রাতাদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও তিনি আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে আনয়ন করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা করেন তা-ই নিপুণতার সাথে করে থাকেন। তিনি ঐ কাজের যথাযোগ্য উপকরণের ব্যবস্থা করে দেন। আর ওটাকে তিনি অতি সহজ করে দেন। বান্দার কিসে কল্যান রয়েছে তা তিনি খুব ভাল রূপেই জানেন। নিজের কাজে, কথায়, ফায়সালায় ও উদ্দেশ্যে তিনি অতি নিপুন।”সুলাইমানের (রঃ) উক্তি এই যে, স্বপ্ন দেখা ও ওর তাৎপর্য প্রকাশিত হওয়ার মধ্যে চল্লিশ বছরের ব্যবধান ছিল। আব্দুল্লাহ ইবনু শাদ্দাদ (রঃ) বলেন যে, স্বপ্নের তাৎপর্য প্রকাশিত হতে এর চেয়ে বেশী সময় লাগে না। এটাই হচ্ছে সময়ের শেষ সীমা। হযরত হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ৮০ বছর পরে পিতা পুত্রের মিলন ঘটে। এটা চিন্তার বিষয়, সেই সময় যমীনে হযরত ইয়াকুব (আঃ) অপেক্ষা আল্লাহ তাআ’লার বড় প্রিয় পাত্র আর কেউ ছিলেন না। তথাপি তাকে এতো দীর্ঘ দিন ধরে পুত্র ইউসুফকে (আঃ) ছেড়ে থাকতে হলো। সব সময় তাঁর চক্ষু দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে থাকতো। আর অন্তরে দুঃখ ও বেদনার তরঙ্গ উঠতো। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই বিচ্ছেদের সময়কাল ছিল ৮৩ (তিরাশি) বছর। মুবারক ইন ফুযালা’ (রঃ) হাসান (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন হযরত ইউসুফকে (আঃ) কূপে নিক্ষেপ করা হয়েছিল তখন তাঁর বয়স ছিল ১৭ (সতেরো বছর)। আর তিনি পিতার নিকট হারিয়ে থাকেন ৮০ (আশি) বছর। তারপরে তিনি ২৩ (তেইশ) বছর জীবিত থাকেন। ১২০ (এক শ’ বিশ) বছর বয়সে তিনি মৃত্যু মুখে পতিত হন। হযরত কাতাদা’’র (রঃ) উক্তি অনুসারে ৩৫ (পঁয়ত্রিশ) বছর প্ররে পিতা পুত্রের মিলন হয়। মুহাম্মদ ইবন ইসহাক (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) পিতার নিকট হতে ১৮ (আঠারো) বছর পর্যন্ত হারিয়ে থাকেন। আহলে কিতাবের ধারণায় তিনি চল্লিশ বছর পর্যন্ত পিতার নিকট হতে অনুপস্থিত ছিলেন। তারপর মিসরে পিতার সাথে মিলিত হন এবং এরপর ১৭ (সতের) বছর জীবিত থাকেন।হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, বানু ইসরাঈল যখন মিসরে পৌঁছেন তখন তাঁদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৩ (তেষট্টি) জন। (নুসখায়ে মাক্কিয়াতে তিনশ’ ষাটজন রয়েছে) আর যখন তারা মিসর হতে বের হন তখন তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ছ’লক্ষ সত্তর হাজার। আবু ইসহাক (রঃ) মাসরূক (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন তারা মিসরে প্রবেশ করেন তখন তাঁদের সংখ্যা ছিল তিনশ’ নব্বই জন। এঁদের মধ্যে ছিলেন পুরুষ ও নারী। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাদিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। আব্দুল্লাহ ইবনু শাদ্দাদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন এই লোকগুলি মিসরে আগমন করেন তখন তাদের মোট সংখ্যা ছিল ৮৬ (ছিয়াশি) জন। তাদের মধ্যে ছিলেন পুরুষ, নারী, বালক ও বৃদ্ধ। আর যখন বের হন তখন তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ছ’লক্ষেরও বেশি।

ইউসুফ 12:101

এটা হচ্ছে সত্যবাদী হযরত ইউসুফের (আঃ) তাঁর প্রতিপালক মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট প্রার্থনা। তিনি নুবওয়াত লাভ করেছেন, তাঁকে রাজত্ব দান করা হয়েছে, বিপদ-আপদ থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছেন, পিতা-মাতা এবং ভ্রাতাদের সাথে মিলন ঘটেছে, তাই এখন তিনি আল্লাহ পাকের নিকট প্রার্থনা করছেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! পার্থিব নিয়ামতগুলি যেমন আপনি আমার উপর পরিপূর্ণ করেছেন, অনুরূপভাবে আখেরাতেও এই নিয়ামতগুলি আমাকে পরিপূর্ণভাবে প্রদান করুন। যখন আমার মৃত্যু আসবে তখন যেন তা ইসলাম ও আপনার আনুগত্যের উপরই আসে। আমাকে যেন সৎ লোকদের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। অন্যান্য নবী ও রাসূলদের সাথে যেন আমার সাক্ষাৎ ঘটে।”খুব সম্ভব হযরত ইউসুফের (আঃ) এই প্রার্থনা ছিল তাঁর মৃত্যুর সময়। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর মৃত্যুর সময় নিজের অঙ্গুলী উত্তোলন করেন এবং প্রার্থনা করেন : (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ্! মহান বন্ধুর সাথে আমার সাক্ষাত করিয়ে দিন!” তিনবার তিনি এই প্রার্থনাই করেন। আবার এটাও হতে পারে যে, তিনি যখনই মারা যাবেন তখনই যেন ইসলামের উপর মারা যান এবং নবীদের সাথে মিলিত হন, এই ছিল তাঁর প্রার্থনার উদ্দেশ্য। এ নয় যে, তখনই তিনি মৃত্যুর জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন। এর দৃষ্টান্ত ঠিক এইরূপই যে, যেমন কেউ কাউকেও দুআ’ দিয়ে বলেঃ “আল্লাহ ইসলামের উপর তোমার মৃত্যু দিন।” তখন উদ্দেশ্য এটা থাকে না যে, তখনই আল্লাহ তার মৃত্যু ঘটিয়ে দিন। কিংবা যেমন আমরা প্রার্থনায় বলে থাকিঃ “হে আল্লাহ! আপনার দ্বীনের উপরই যেন আমাদের মৃত্যু হয়।” অথবা আমরা প্রার্থনায় বলিঃ “হে আল্লাহ! ইসলামের উপর আমাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দিন এবং সৎ লোকদের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ করিয়ে দিন। আর যদি তার উদ্দেশ্য এটাই থেকে থাকে যে, প্রকৃত পক্ষে তৎক্ষণাৎ তিনি মৃত্যুর জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন তবে সম্ভবতঃ তাদের শরীয়তে ওটা জায়েয ছিল। যেমন কাতাদা’’র (রঃ) উক্তি রয়েছে যে, যখন হযরত ইউসুফের (আঃ) সমস্ত কাজ সমাপ্ত হয়ে গেল, চক্ষু ঠাণ্ডা হলো এবং রাজত্ব, সম্পদ, মান-সম্মান, বংশ, পরিবার ইত্যাদি সব কিছু মিলে গেল তখন তার সৎকর্মশীলদের সাথে মিলিত হওয়ার আগ্রহ হলো। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলতেন যে, হযরত ইউসুফের (আঃ) পূর্বে কোন নবী কখনো মৃত্যু কামনা করেন নাই। অনুরূপভাবে ইবনু জারীর (রঃ) এবং সুন্দী (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) প্রথম নবী যিনি মৃত্যুর জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন।আর এটা সম্ভব যে, তিনিই প্রথম ইসলামের উপর মৃত্যু বরণের প্রার্থনা জানিয়েছিলেন যেমন (আরবি) (৭১:২৮) এই দুআ’ সর্বপ্রথম হযরত নূহই (আঃ) করেছিলেন। এসব সত্ত্বেও যদি এটাই বলা হয় যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) মৃত্যুর জন্যেই প্রার্থনা করেছিলেন তবে আমরা বলবো যে, হয়তো তাঁদের শরীয়তে এটা জায়েয। আমাদের শরীয়তে কিন্তু এটা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যেন তার প্রতি আপতিত কষ্ট ও বিপদের কারণে মৃত্যু কামনা না করে। যদি একান্তই মৃত্যু কামনা করতেই হয় তবে যেন বলেঃ “হে আল্লাহ! আমাকে জীবিত রাখুন যতদিন আমার জীবিত থাকা মঙ্গলজনক হয় এবং আমাকে মৃত্যু দান করুন যদি আমার জন্যে মৃত্যুই কল্যাণকর হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু হাম্বল (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের এই হাদীসেই রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যেন তার উপর আপতিত বিপদ-আপদের কারণে কখনো মৃত্যু কামনা না করে। যদি সে সৎ হয় তবে তার জীবন তার পূণ্য বৃদ্ধি করবে। আর যদি সে দুষ্ট হয় তবে তার জীবনে হয়তো কোন সময় তাওবা করার তাওফীক লাভ হবে। বরং সে যেন বলেঃ হে আল্লাহ! যতদিন আমার জীবিত থাকা কল্যাণকর হয় ততদিন আমাকে জীবিত রাখুন। আর যদি মৃত্যুই আমার জন্যে কল্যাণকর হয় তবে আমাকে মৃত্যু দান করুন।” হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “(একদা) আমরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট বসেছিলাম। তিনি আমাদের উপদেশ দান করেন এবং আমাদেরকে অন্তর গলিয়ে দেন। ঐ সময় আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ক্রন্দনকারী ছিলেন হযরত সা’দ ইবনু আবি অক্কাস (রাঃ)। কাঁদতে কাঁদতেই তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসেঃ যদি আমি মরে যেতাম (তবে কতই না ভাল হতো)!' এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে সা’দ (রাঃ)! আমার সামনে তুমি মৃত্যু কামনা করছো?” তিন বার তিনি এ কথাই বলেন। অতঃপর বলেনঃ “হে সা’দ (রাঃ)! তোমাকে যদি বেহেশতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়ে থাকে তবে তোমার বয়স যত বেশি হবে, পুন্য তত বৃদ্ধি পাবে। আর এটাই হবে তোমার জন্যে উত্তম।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যেন বিপদ আপতিত হওয়ার কারণে কখনো মৃত্যু কামনা না করে এবং তার জন্যে প্রর্থনা না করে তা এসে যাওয়ার পূর্বে। হ্যাঁ, তবে যদি তার নিজের আমলের উপর ভরসা থাকে তবে ওটা স্বতন্ত্র কথা। জেনে রেখোঁরেখো যে, যখন তোমাদের কেউ মারা যায় তখন তার আমল শেষ হয়ে যায়। মু'মিনের আমল তার পূণ্যই বাড়িয়ে থাকে।” জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এই হুকুম হচ্ছে পার্থিব বিপদের ব্যাপারে এবং যা তার ব্যক্তিগত সম্পর্কযুক্ত হয়। কিন্তু যদি ধর্মীয় ফিৎনা হয় এবং দ্বীনী বিপদ হয় তবে মৃত্যুর জন্যে প্রার্থনা করা জায়েয। যেমন ফিরআউনের জাদুকরগণ ঐ সময় প্রার্থনা করেছিলেন যখন ফিরআউন তাদেরকে হত্যা করার হুমকি দিয়েছিল। ঐ সময় তারা প্রার্থনা করেছিলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! (আমাদের উপর ধৈর্য ঢেলে দিন এবং মুসলমান রূপে) আমাদেরকে মৃত্যু দান করুন। অনুরূপভাবে হযরত মরিয়ম (আঃ) কে যখন প্রসব বেদনা এক খেজুর বৃক্ষ তলে আশ্রয়ে বাধ্য করেছিল তখন তিনি বলেছিলেনঃ “হায়! এর পূর্বেই আমি যদি মরে যেতাম এবং লোকের স্মৃতি হতে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হতাম।” এ কথা তিনি ঐ সময় বলেছিলেন যখন জনগণ তাঁকে ব্যাভিচারের অপবাদ দিচ্ছিল।কেননা, তাঁর স্বামী ছিল না, অথচ তিনি গর্ভধারণ করেছিলেন। যখন তার সন্তান ভূমিষ্টি হয় এবং তিনি সন্তানকে নিয়ে তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হন তখন তারা বলেঃ “হে মরিয়ম (আঃ)! তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছে। হে হারুণ-ভগ্নী! তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিল না এবং তোমার মাতাও ছিল না ব্যভিচারিণী।” কিন্তু তিনি যে এ পাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এটা প্রমাণ করবার জন্যে আল্লাহ আআ’লা শিশু ঈসার (আঃ) মুখ দিয়ে বের করলেনঃ “আমি তো আল্লাহর বান্দা! তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। একটি হাদীসে একটি দীর্ঘ দুআ’’র বর্ণনা রয়েছে, যাতে এই বাক্যটিও রয়েছেঃ “যখন কোন কওমকে ফিৎনার মধ্যে নিক্ষেপ করার ইচ্ছা করবেন তখন আমাকে ঐ ফিৎনার মধ্যে জড়িত করার পূর্বেই উঠিয়ে নেন।” হযরত মাহমুদ ইবনু ওয়ালীদ (রঃ) হতে মারফূ’ রূপে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “বণী আদম নিজের পক্ষে দু’টি জিনিষকে খারাপ মনে করে থাকে। (১) মানুষ মৃত্যুকে খারাপ মনে করে। কিন্তু মৃত্যু মু’মিনের জন্যে ফিৎনা হতে উত্তম। (২) মালের স্বল্পতাকে মানুষ খারাপ মনে করে। অথচ মালের স্বল্পতা (কিয়ামতের দিনের) হিসাবকে কমিয়ে দেবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) মোট কথা দ্বীনী ফিৎনার সময় মৃত্যু কামনা করা জায়েয।হযরত আলী (রাঃ) তাঁর খিলাফতের শেষ যুগে যখন দেখেন যে, জনগণের দুষ্টামী ও দুর্ব্যবহার কোন ক্রমেই কমছে না এবং কোন উপায়েই তাদেরকে একত্রিত করা সম্ভব হচ্ছে না, তখন তিনি প্রার্থনা করেনঃ “হে আল্লাহ! আমাকে আপনার নিকট উঠিয়ে নিন। আমি জনগণের উপর অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি এবং তারাও আমার উপর অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।”ইমাম বুখারীও (রঃ) যখন অত্যাধিক ফিৎনার মধ্যে পড়ে গেলেন এবং দ্বীনকে রক্ষা করা তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়লো, আর খুরাসানের আমীরের সাথে তাঁর বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হলো তখন তিনি জনাব বারী তাআ’লার কাছে প্রার্থনা করলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার নিকট উঠিয়ে নিন।”হাদীসে রয়েছে যে, ফিৎনার যুগে মানুষ কবরকে দেখে বলবেঃ “হায় যদি আমি এই জায়গায় থাকতাম। কেননা, ফিৎনা-ফাসাদ, বালা-মুসিবত এবং কাঠিন্য প্রত্যেক ফিৎনা পীড়িতকে ফিৎনায় নিক্ষেপ করবে।বর্ণিত আছে যে, হযরত ইয়াকুবের (আঃ) যে পুত্রগণ খুব বেশী অপরাধ করেছিলেন তাদের জন্যে যখন তিনি মহান আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন তখন আল্লাহ তাআ’লা তা কবুল করে নেন এবং তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। (এটা তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে) হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, যখন হযরত ইয়াকুবের (আঃ) বংশের সবাই মিসরে একত্রিত হন তখন হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ পরস্পর বলাবলি করেনঃ “আমরা আমাদের পিতাকে যে জ্বালাতন করেছি তা তো স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়ে রয়েছে এবং ভাই ইউসুফের (আঃ) প্রতি যে অন্যায় আচরণ করেছি তাওতো প্রকাশমান। এখন যদিও এই দু’মহান ব্যক্তি আমাদেরকে কিছুই বললেন না বরং ক্ষমা করে দিলেন, তবুও আল্লাহর কাছে আমাদের অবস্থা কি হবে তা বাস্তবিকই চিন্তার বিষয়।” শেষ পর্যন্ত তারা একটা সিদ্ধান্তে উপণীত হয়ে বললেনঃ “চল আমরা আমাদের পিতার কাছে যাই এবং তাঁর সাথে এ ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করি।” সুতরাং সবাই মিলে পিতার কাছে আসলেন। ঐ সময় হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর নিকট বসেছিলেন। তারা সবাই একই সাথে বললেন : “জনাব, আজ আমরা আপনার কাছে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্যে এসেছি যে, এরূপ কাজের জন্যে ইতিপূর্বে আর কখনো আসি নাই। হে পিত! এবং হে ভ্রাতঃ আমরা এই সময় এমন বিপদে জড়িত হয়ে পড়েছি এবং আমাদের অন্তর এমনভাবে কাঁপছে যে, আজকের পূর্বে আমাদের অবস্থা এইরূপ কখনো হয় নাই।” মোট কথা, তাঁরা এমন বিনয় প্রকাশ করলেন যে, তাদের দু’জনের (পিতা ও পুত্রের) মন নরম হয়ে গেল। এটা প্রকাশ্য কথা যে, নবীদের অন্তর সমস্ত মাখলুকের তুলনায় বেশি দয়ার্দ্র ও কোমল হয়ে থাকে। তারা জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা কি বলতে চাও এবং তোমাদের উপর কি বিপদ পতিত হয়েছে?” সবাই সমস্বরে বলে উঠলেনঃ “আব্বা! আপনাকে কি পরিমাণ কষ্ট আমরা দিয়েছি তা আপনার জানা আছে এবং ভাই ইউসুফের (আঃ) উপর কত যে অত্যাচার করেছি তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তারা দুজনই বললেনঃ “হ্যাঁ আমাদের তা জানা আছে। তারা জিজ্ঞেস করলেনঃ “এটা কি সত্য যে, আপনারা আমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছেন?” তারা উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ, সম্পূর্ণ ঠিক। আমরা অন্তর থেকে তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি।” তখন তারা বললেনঃ “আব্বা! আপনাদের ক্ষমা করা বৃথা হবে যদি না আল্লাহ ক্ষমা করেন।” তখন পিতা জিজ্ঞেস করলেনঃ “আচ্ছা, তা হলে তোমরা আমার কাছে চাচ্ছ কি?” তারা জবাবে বললেনঃ আমরা আপনার নিকট এটাই চাচ্ছি যে, আপনি আমাদের জন্যে আল্লাহ তাআ’লার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, এমনকি ওয়াহী দ্বারা আপনি জানতে পারেন যে, আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তা হলেই আমরা মনে তৃপ্তি লাভ করতে পারি। অন্যথায় আমরা তো দুনিয়া ও আখেরাত সবই হারালাম।” তৎক্ষণাৎ হযরত ইয়াকুব (আঃ) দাড়িয়ে গেলেন এবং কিবলা মুখী হলেন। হযরত ইউসুফ (আঃ) তার পেছনে দাঁড়ালেন। অত্যন্ত বিনীতভাবে কেঁদে কেঁদে আল্লাহ তাআ’লার নিকট প্রার্থনা করতে শুরু করলেন। হযরত ইয়াকুব (আঃ) দুআ’ করছিলেন এবং হযরত ইউসুফ (আঃ) আমীন বলছিলেন। বিশ বছর পর্যন্ত দুআ’ কবুল হয় নাই। অবশেষে যখন ভ্রাতাদের শরীরের রক্ত আল্লাহ তাআ’লার ভয়ে শুকিয়ে যেতে লাগলো তখন ওয়াহী আসলো এবং তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়ার সুসংবাদ দেয়া হলো। এমনকি হযরত ইয়াকুবকে (আঃ) এ কথাও বলা হলো যে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানদেরকে নুবওয়াত দান করা হবে এটা আল্লাহর ওয়াদা। (এটা হযরত আনাসের (রাঃ) উক্তি। এর সনদে দু’জন বর্ণনাকারী দুর্বল রয়েছেন। তাঁরা হলেন ইয়াযীদ রিকাশী ও সা’লিহ মুররী)হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর মৃত্যুর সময় হযরত ইউসুফকে (আঃ) অসিয়ত করে যান যেন তাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসহাকের (আঃ) জায়গায় সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর ইন্তেকালের পর হযরত ইউসুফ (আঃ) তা পূর্ণ করেন এবং সিরিয়ায় তাঁকে পিতা ও পিতামহের পার্শ্বে দাফন করা হয়। তাঁদের সবারই উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।

ইউসুফ 12:102

১০২-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা হযরত ইউসুফের (আঃ) সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর, কি ভাবে ভ্রাতাগণ তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করে, কিভাবে তার জীবন নাশের চেষ্টা করে, আল্লাহ তাআ’লা এর পর তাঁকে কিভাবে রক্ষা করেন এবং কি ভাবে তাকে উন্নতির উচ্চতর শিখরে আরোহণ করিয়ে দেন, স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ “এটা এবং এ ধরণের আরো বহু অদৃশ্যের ঘটনা আমার পক্ষ থেকে তোমার কাছে বর্ণনা করা হয়ে থাকে; যাতে মানুষ তার থেকে উপদেশ গ্রহণ করে এবং তোমার বিরুদ্ধবাদীদেরও চক্ষু খুলে যায়। আর যাতে তাদের উপর আমার দলীল প্রমাণ কায়েম হয়ে যায়। যখন ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল এবং কূপে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছিল, তখন তুমি সেখানে উপস্থিত ছিলে না। আমি তোমাকে ওয়াহীর মাধ্যমে জানালাম বলেই তুমি জানতে পারলে।” যেমন হযরত মরিয়মের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “এটা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ যা আমি তোমাকে ঐশী বাণী দ্বারা অবহিত করছি। মরিয়মের (আঃ) তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাদের মধ্যে কে গ্রহণ করবে এর জন্য যখন তারা তাদের কলমগুলি নিক্ষেপ করছিল তুমি তখন তাদের নিকট ছিলে না এবং তারা যখন বাদানুবাদ করছিল তখনও তুমি তাদের কাছে ছিলে না।” হযরত মুসার (আঃ) ঘটনা প্রসঙ্গেও মহান আল্লাহ বলেনঃ “ (হে নবী সঃ!) ‘জানেবে গারবিয়্যে’ যখন আমি মুসাকে (আঃ) আমার কথা বুঝাচ্ছিলাম তখন তুমি সেখানে বিদ্যমান ছিলে না।” আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “মাদইয়ানবাসীর কার্যাবলীও তোমার কাছে গোপন ছিল (শেষ পর্যন্ত)।” আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেনঃ ‘মালায়ে আ’লার পারস্পরিক আলোচনার সময়ও তুমি তথায় বিদ্যমান ছিলে না। এই সব আমার পক্ষ হতে ওয়াহীর মাধ্যমে তোমাকে জানানো হয়েছে। এ হচ্ছে তোমার রিসালাত ও নুবওয়াতের স্পষ্ট দলীল যে, অতীত ঘটনাবলী। তুমি জনগণের সামনে এমনভাবে খুলে খুলে বর্ণনা করছো যে, যেন তুমি ওগুলো স্বচক্ষে দেখেছো এবং তোমার সামনেই সেগুলো সংঘটিত হয়েছে। আবার এই ঘটনাগুলি উপদেশ, শিক্ষা এবং হিকমতে পরিপূর্ণ, যার মাধ্যমে মানুষের দ্বীন ও দুনিয়া সুন্দর হতে পারে। এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ ঈমান থেকে অজ্ঞ থাকছে। তুমি হাজার চাইলেও এরা ঈমান আনবে না।” এর জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ (হে নবী (সঃ)! তুমি যদি ভূ-পৃষ্ঠের অধিকাংশ লোকের কথা মত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলবে।” প্রত্যেক ঘটনার সাথে সাথে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেনঃ “যদিও এতে বড় রকমের নিদর্শন রয়েছে তথাপি অধিকাংশ লোক ঈমান আনে না।” (৬: ১১৬)আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ তুমি তো তাদের কাছে কোন বিনিময় বা পারিশ্রমিক দাবী করছে না। তুমি যে মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করছে এবং এ জন্যে বহু চেষ্টা ও পরিশ্রম করছো এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার তোমার কাম্য নয়। তোমার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। এটা সারা বিশ্বজগতের জন্যে উপদেশ ছাড়া কিছু নয়। এর মাধ্যমে দুনিয়াবাসী উপদেশ লাভ করবে, সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং পরকালে কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পাবে।

ইউসুফ 12:103

১০২-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা হযরত ইউসুফের (আঃ) সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর, কি ভাবে ভ্রাতাগণ তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করে, কিভাবে তার জীবন নাশের চেষ্টা করে, আল্লাহ তাআ’লা এর পর তাঁকে কিভাবে রক্ষা করেন এবং কি ভাবে তাকে উন্নতির উচ্চতর শিখরে আরোহণ করিয়ে দেন, স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ “এটা এবং এ ধরণের আরো বহু অদৃশ্যের ঘটনা আমার পক্ষ থেকে তোমার কাছে বর্ণনা করা হয়ে থাকে; যাতে মানুষ তার থেকে উপদেশ গ্রহণ করে এবং তোমার বিরুদ্ধবাদীদেরও চক্ষু খুলে যায়। আর যাতে তাদের উপর আমার দলীল প্রমাণ কায়েম হয়ে যায়। যখন ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল এবং কূপে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছিল, তখন তুমি সেখানে উপস্থিত ছিলে না। আমি তোমাকে ওয়াহীর মাধ্যমে জানালাম বলেই তুমি জানতে পারলে।” যেমন হযরত মরিয়মের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “এটা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ যা আমি তোমাকে ঐশী বাণী দ্বারা অবহিত করছি। মরিয়মের (আঃ) তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাদের মধ্যে কে গ্রহণ করবে এর জন্য যখন তারা তাদের কলমগুলি নিক্ষেপ করছিল তুমি তখন তাদের নিকট ছিলে না এবং তারা যখন বাদানুবাদ করছিল তখনও তুমি তাদের কাছে ছিলে না।” হযরত মুসার (আঃ) ঘটনা প্রসঙ্গেও মহান আল্লাহ বলেনঃ “ (হে নবী সঃ!) ‘জানেবে গারবিয়্যে’ যখন আমি মুসাকে (আঃ) আমার কথা বুঝাচ্ছিলাম তখন তুমি সেখানে বিদ্যমান ছিলে না।” আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “মাদইয়ানবাসীর কার্যাবলীও তোমার কাছে গোপন ছিল (শেষ পর্যন্ত)।” আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেনঃ ‘মালায়ে আ’লার পারস্পরিক আলোচনার সময়ও তুমি তথায় বিদ্যমান ছিলে না। এই সব আমার পক্ষ হতে ওয়াহীর মাধ্যমে তোমাকে জানানো হয়েছে। এ হচ্ছে তোমার রিসালাত ও নুবওয়াতের স্পষ্ট দলীল যে, অতীত ঘটনাবলী। তুমি জনগণের সামনে এমনভাবে খুলে খুলে বর্ণনা করছো যে, যেন তুমি ওগুলো স্বচক্ষে দেখেছো এবং তোমার সামনেই সেগুলো সংঘটিত হয়েছে। আবার এই ঘটনাগুলি উপদেশ, শিক্ষা এবং হিকমতে পরিপূর্ণ, যার মাধ্যমে মানুষের দ্বীন ও দুনিয়া সুন্দর হতে পারে। এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ ঈমান থেকে অজ্ঞ থাকছে। তুমি হাজার চাইলেও এরা ঈমান আনবে না।” এর জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ (হে নবী (সঃ)! তুমি যদি ভূ-পৃষ্ঠের অধিকাংশ লোকের কথা মত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলবে।” প্রত্যেক ঘটনার সাথে সাথে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেনঃ “যদিও এতে বড় রকমের নিদর্শন রয়েছে তথাপি অধিকাংশ লোক ঈমান আনে না।” (৬: ১১৬)আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ তুমি তো তাদের কাছে কোন বিনিময় বা পারিশ্রমিক দাবী করছে না। তুমি যে মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করছে এবং এ জন্যে বহু চেষ্টা ও পরিশ্রম করছো এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার তোমার কাম্য নয়। তোমার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। এটা সারা বিশ্বজগতের জন্যে উপদেশ ছাড়া কিছু নয়। এর মাধ্যমে দুনিয়াবাসী উপদেশ লাভ করবে, সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং পরকালে কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পাবে।

ইউসুফ 12:104

১০২-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা হযরত ইউসুফের (আঃ) সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর, কি ভাবে ভ্রাতাগণ তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করে, কিভাবে তার জীবন নাশের চেষ্টা করে, আল্লাহ তাআ’লা এর পর তাঁকে কিভাবে রক্ষা করেন এবং কি ভাবে তাকে উন্নতির উচ্চতর শিখরে আরোহণ করিয়ে দেন, স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ “এটা এবং এ ধরণের আরো বহু অদৃশ্যের ঘটনা আমার পক্ষ থেকে তোমার কাছে বর্ণনা করা হয়ে থাকে; যাতে মানুষ তার থেকে উপদেশ গ্রহণ করে এবং তোমার বিরুদ্ধবাদীদেরও চক্ষু খুলে যায়। আর যাতে তাদের উপর আমার দলীল প্রমাণ কায়েম হয়ে যায়। যখন ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল এবং কূপে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছিল, তখন তুমি সেখানে উপস্থিত ছিলে না। আমি তোমাকে ওয়াহীর মাধ্যমে জানালাম বলেই তুমি জানতে পারলে।” যেমন হযরত মরিয়মের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “এটা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ যা আমি তোমাকে ঐশী বাণী দ্বারা অবহিত করছি। মরিয়মের (আঃ) তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাদের মধ্যে কে গ্রহণ করবে এর জন্য যখন তারা তাদের কলমগুলি নিক্ষেপ করছিল তুমি তখন তাদের নিকট ছিলে না এবং তারা যখন বাদানুবাদ করছিল তখনও তুমি তাদের কাছে ছিলে না।” হযরত মুসার (আঃ) ঘটনা প্রসঙ্গেও মহান আল্লাহ বলেনঃ “ (হে নবী সঃ!) ‘জানেবে গারবিয়্যে’ যখন আমি মুসাকে (আঃ) আমার কথা বুঝাচ্ছিলাম তখন তুমি সেখানে বিদ্যমান ছিলে না।” আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “মাদইয়ানবাসীর কার্যাবলীও তোমার কাছে গোপন ছিল (শেষ পর্যন্ত)।” আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেনঃ ‘মালায়ে আ’লার পারস্পরিক আলোচনার সময়ও তুমি তথায় বিদ্যমান ছিলে না। এই সব আমার পক্ষ হতে ওয়াহীর মাধ্যমে তোমাকে জানানো হয়েছে। এ হচ্ছে তোমার রিসালাত ও নুবওয়াতের স্পষ্ট দলীল যে, অতীত ঘটনাবলী। তুমি জনগণের সামনে এমনভাবে খুলে খুলে বর্ণনা করছো যে, যেন তুমি ওগুলো স্বচক্ষে দেখেছো এবং তোমার সামনেই সেগুলো সংঘটিত হয়েছে। আবার এই ঘটনাগুলি উপদেশ, শিক্ষা এবং হিকমতে পরিপূর্ণ, যার মাধ্যমে মানুষের দ্বীন ও দুনিয়া সুন্দর হতে পারে। এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ ঈমান থেকে অজ্ঞ থাকছে। তুমি হাজার চাইলেও এরা ঈমান আনবে না।” এর জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ (হে নবী (সঃ)! তুমি যদি ভূ-পৃষ্ঠের অধিকাংশ লোকের কথা মত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলবে।” প্রত্যেক ঘটনার সাথে সাথে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেনঃ “যদিও এতে বড় রকমের নিদর্শন রয়েছে তথাপি অধিকাংশ লোক ঈমান আনে না।” (৬: ১১৬)আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ তুমি তো তাদের কাছে কোন বিনিময় বা পারিশ্রমিক দাবী করছে না। তুমি যে মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করছে এবং এ জন্যে বহু চেষ্টা ও পরিশ্রম করছো এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার তোমার কাম্য নয়। তোমার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। এটা সারা বিশ্বজগতের জন্যে উপদেশ ছাড়া কিছু নয়। এর মাধ্যমে দুনিয়াবাসী উপদেশ লাভ করবে, সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং পরকালে কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পাবে।

ইউসুফ 12:105

১০৫-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা সংবাদ দিচ্ছেন যে, ক্ষমতাবান আল্লাহর বহু নিদর্শন, তাঁর একত্বের সাক্ষ্য প্রমাণ রাতদিন মানুষের সামনে রয়েছে। তবুও অধিকাংশ লোক অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে এগুলো থেকে উদাসীন ও অমনোযোগী রয়েছে। এই এতবড় ও প্রশস্ত আকাশ, এই বিস্তৃত যমীন, এই উজ্জ্বল নক্ষত্র-রাজি, এই আবর্তনশীল সূর্য ও চন্দ্র, এই গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত, শস্য-ক্ষেত্র, তরঙ্গ পূর্ণ সমুদ্র, প্রবাহিত বাতাস, বিভিন্ন প্রকারের ফল ফলাদি এবং নানা প্রকারের খাদ্য দ্রব্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর এই অসংখ্য নিদর্শনাবলী কি জ্ঞানী ব্যক্তির কোন কাজে আসে না যে, এগুলি দ্বারা সে তাঁকে চিনতে পারে, যিনি এক, অমুখাপেক্ষী, অংশীবিহীন, ক্ষমতাবান, চিরঞ্জীব এবং চিরবিদ্যমান? এগুলো দেখে কি-সে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না? তাদের অধিকাংশের মাথা এমনভাবে বিগড়ে গেছে যে, তাদের আল্লাহর উপর বিশ্বাস আছে, অথচ তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করছে। তারা আসমান ও যমীনের, পাহাড়-পর্বতের এবং দানব ও মানবের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আল্লাহকেই মানে, অথচ তাঁর সাথে অন্যদেরকেও শরীক করে ফেলে। এই মুশরিকরা হজ্জ করতে আসে এবং ইহরাম বেঁধে ‘লাব্বায়েক' উচ্চারণ করতে করতে বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনার কোন শরীক নেই, শরীক যারা আছে তাদেরও মালিক আপনি। তাদের অধিকার ভুক্ত সবকিছুরও মালিক আপনি।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, যখন মুশরিকরা বলতো: “হে আল্লাহ! আমরা হাজির আছি, আপনার কোন অংশীদার নেই, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যথেষ্ট হয়েছে। এর চেয়ে বেশী আর কিছু বলো না।” আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন : (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় শিরক চরম যুলুম।” (৩১: ১৩) প্রকৃতপক্ষে এটা বড়ই অত্যাচার যে, আল্লাহর সাথে আরো কারো ইবাদত করা হবে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় পাপ কোনটি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তা এই যে, তুমি আল্লাহর জন্যে শরীক স্থাপন করবে, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতের মধ্যে মুনাফিকরাও এসে পড়ে। তাদের আমলে একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা থাকে না। বরং তাদের মধ্যে রিয়াকারী ও লোক দেখানো ভাব থাকে। রিয়াকারীও শির্‌কের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন কারীম ঘোষণা করেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে তারা নিজেরাই প্রতারিত হয়। তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অত্যন্ত অলসভাবে দাঁড়ায়, তাদের উদ্দেশ্য হয় শুধু লোক দেখানো। তারা আল্লাহর যিকর খুব কমই করে।” (৪: ১৪২) এটাও স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, কতকগুলি শির্‌ক খুবই হালকা ও গোপনীয় হয়। স্বয়ং শির্‌ককারীও ওটা বুঝতে পারে না। হযরত হুযাইফা (রাঃ) একজন রুগ্ন ব্যক্তির নিকট গমন করেন। তার হাতে একটা সূতা বাঁধা ছিল। তিনি ওটা দেখে ছিঁড়ে ফেলেন এবং বলেনঃ “মু'মিন হয়েও শিরক করছো?” অর্থাৎ তিনি এ আয়াতটিই পাঠ করেন। হাদীস শরীফে আছে যে, যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর কসম খেলো সে মুশরিয্‌ক হয়ে গেল। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমযী (রঃ) হযরত ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। এবং তিনি এটাকে হাসান বলেছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঝাড়-ফুঁক, সূতা, এবং মিথ্যা তাবীজ শির্‌ক।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন বর্ণনা করেছেন) তিনি আরো বলেছেনঃ “বান্দার নির্ভরশীলতার কারণে আল্লাহ তাআ’লা তার সমস্ত বিপদ আপদ দূর করে থাকেন।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের স্ত্রী হযরত যায়নাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “ (আমার স্বামী) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন বাইরে থেকে বাড়ীতে প্রবেশ করতেন তখন তিনি গলা খাকড়াতেন এবং থুথু ফেলতেন। যাতে বাড়ীর লোকেরা তাঁর আগমনের ইঙ্গিত পেতে পারে এবং তিনি যেন তাদেরকে এমন অবস্থায় না দেখেন যা তিনি অপছন্দ করেন। একদা এই ভাবে তিনি বাড়ীতে প্রবেশের আভাষ দেন, ঐ সময় আমার কাছে একজন বুড়ী বিদ্যমান ছিল, যে আমার রোগের কারণে আমাকে ঝাড়-ফুক দিতে এসেছিল। আমি তাঁর গলা খাঁকড়ানোর শব্দ শুনেই বুড়িটিকে চৌকির নীচে লুকিয়ে দেই। তিনি আমার কাছে এসে চৌকির উপর বসে পড়েন এবং আমার গলায় সূতা দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি?” আমি উত্তরে বলিঃ এতে আমি ঝাড়-ফুক করিয়ে নিয়ে গলায় বেঁধেছি। আমার একথা শুনে তিনি ওটা ধরে ছিঁড়ে ফেলেন এবং বলেনঃ “আবদুল্লাহর (রাঃ) ঘর শিরক থেকে অমুখাপেক্ষী। স্বয়ং আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছি যে, ঝাড়-ফুক, তাবীয এবং ডোরা-সুতা বাধা শিরক।” আমি বললামঃ “আপনি এটা কিরূপে বলছেন? একবার আমার চক্ষু খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমি অমুক ইয়াহূদীর কাছে যেতাম। সে আমার চোখে ঝাড়-ফুক করতো। তখন আমার চক্ষু ভাল হয়ে যেতো।” আমার এ কথা শুনে তিনি বললেনঃ “শয়তান তোমার চোখে গুতো মারতো এবং ঝাড়-ফুঁকের কারণে সে থেমে যেতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা শিখিয়েছেন তা যদি তুমি বলতে তবে ওটাই তোমার জন্যে যথেষ্ট হতো। তা হচ্ছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মানুষের প্রতিপালক! আপনি কষ্ট দূর করে দিন, আপনি আরোগ্য দান করুন, আপনিই আরোগ্য দানকারী, আপনার আরোগ্য ছাড়া কোন আরোগ্য নেই, এমন আরোগ্য দান করুন যাতে কোন রোগ অবশিষ্ট না থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)ঈসা ইবনু আবদির রহমান (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একবার আবদুল্লাহ ইবনু হাকীম (রাঃ) রুগ্ন ছিলেন, আমরা তাঁকে দেখতে গেলাম। তাঁকে বলা হলো: “যদি আপনি কোন ডোরা-সূতা বাঁধতেন তবে ভাল হতো।” এ কথা শুনে তিনি বলেন, “আমি ডোরা-সূতা বাঁধবো? অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি যে জিনিষ লটকাবে তাকে তারই দিকে সমর্পণ করা হবে। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে। এ হাদিস ইমাম নাসায়ীও হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত করেছে) হযরত উকবা ইবনু আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তাবীয লটকালো সে শিরক করলো।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, যে ব্যক্তি তাবীয লটকায় আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করেন না এবং যে ব্যক্তি ওটা লটকায় আল্লাহ যেন ওটাকে লটকানো অবস্থাতেই রেখে দেন।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “আমি শরীকদের শিরক হতে অমুখাপেক্ষী। আমি ওর কোন পরওয়া করি না। যে ব্যক্তি এমন কাজ করলো যে, তাতে আমার শরীক স্থাপন করলো, আমি তাকে ও তার শিরককে পরিত্যাগ করি।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ ইবনু আবি ফুযালা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছিঃ “যখন আল্লাহ তাআ’লা সমস্ত প্রথম ও শেষের লোকদেরকে একত্রিত করবেন এমন এক দিনে, যেই দিনের ব্যাপারে কোনই সন্দেহ নেই, তখন একজন আহবানকারী আহবান করবেনঃ যে ব্যক্তি কোন কাজে শিরক করবে, যে কাজ সে আল্লাহর জন্যে করেছে, সে যেন গায়রুল্লাহর কাছেই প্রতিদান চায়। নিশ্চয় আল্লাহ শরীকদের শিরক থেকে বেপরোয়া।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মাহমূদ ইবনু ওয়ালীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের উপর আমার যে জন্যে সবচেয়ে ভয়, তা হচ্ছে ছোট শিরক।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ছোট শির্ক কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “রিয়াকারী (লোক দেখানো কাজ)। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআ’লা লোকদেরকে কর্মের প্রতিদান প্রদান করবেন। ঐ সময় তিনি ঐ রিয়াকারদেরকে বলবেনঃ “হে রিয়াকারগণ! তোমরা যাদেরকে দেখানোর জন্যে আমল করতে তাদের কাছেই আজ প্রতিদান চাও। দেখা যাক তারা তা দিতে পারে কি না।” (ইমাম আহমদ (রঃ) এই হাদীসটিও বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন কাজের অশুভ লক্ষণ দেখে তা থেকে ফিরে আসলো সে মুশরিক হয়ে গেল।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর কাফফারা কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এর কাফফারা এই যে, সে বলবেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনার মঙ্গল ছাড়া কোন মঙ্গল নেই এবং আপনার দেয়া অমঙ্গল ছাড়া কোন অমঙ্গলই নেই। (অর্থাৎ মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয়েরই কারণ একমাত্র আপনিই। দুটোই আপনার পক্ষ থেকে এসে থাকে) আর আপনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই।”বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আবু মুসা আশআ’রী (রাঃ) স্বীয় ভাষণে বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা শিরক থেকে বেঁচে থাকো। এটা পীপিলিকার গতির চেয়েও বেশি গোপনীয়।” তার একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু হারব (রাঃ) এবং হযরত কায়েস ইবনু মাযারিব (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “আপনি এর প্রমাণ পেশ করবেন, না আমরা হযরত উমারের (রাঃ) কাছে গিয়ে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবো?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “এর প্রমাণ আমি দিচ্ছি। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে ভাষণে বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা এই শিরক হতে বেঁচে থাকো! এটাতো পিঁপড়ার গতির চেয়েও বেশী গোপনীয় ও সূক্ষ্ণ।” তখন কেউ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) এটা পিঁপড়ার গতির চেয়েও সূক্ষ্ণ, তা হলে এর থেকে বাঁচবার উপায় কি?” তিনি জবাবে বলেনঃ “তোমরা বলোঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এমন কিছুকে আপনার সাথে শরীক স্থাপন করা হতে যা আমরা জানি এবং আমরা আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এমন কিছু হতে, যা আমরা জানি না”। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বানু কাইল গোত্রের একটি লোক হতে বর্ণনা করেছেন)একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই বর্ণনা ছিল হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! শিরক তো হচ্ছে এটাই যে, আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও ডাকা হয়।” এই হাদীসে দুআ’'র শব্দগুলি নিম্নরূপ রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি এ থেকে যে, আমি আপনার সাথে শরীক স্থাপন করবো অথচ আমি জানি (যে, এটা শিরক) এবং আমি আপনার নিকট এমন কিছু হতে ক্ষমা প্রার্থনা করছি যা আমি জানিনা।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আবি ইয়ালায় রয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) আরজ করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন একটি দুআ’ শিখিয়ে দিন যা আমি সকাল ও সন্ধ্যা এবং বিছানায় শয়নের সময় পাঠ করবো।” তিনি বলেনঃ “তুমি এ দু’আটি বলবেঃ (আরবি)অর্থাৎঃ“হে আল্লাহ! হে আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা, দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, প্রত্যেক জিনিষের প্রতিপালক ও অধিকর্তা! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। আমি আমার নফসের অনিষ্ঠ হতে, শয়তানের অনিষ্ট হতে এবং তার শিরক হতে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনাকরেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) উক্ত দুআ’’টি শিখিয়ে দেন এবং এর শেষে রয়েছে: (আরবি)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ “তবে কি তারা আল্লাহর সর্বগ্রাসী শাস্তি হতে অথবা তাদের অজ্ঞাতসারে কিয়ামতের আকস্মিক উপস্থিতি হতে নির্ভয় হয়ে গেছে? যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “প্রতারণা ও দুষ্কার্যকারীরা কি এ বিষয় থেকে নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আল্লাহ তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিবেন অথবা এমন স্থান হতে শান্তি আনয়ন করবেন যে, তারা বুঝতেই পারবে না? অথবা তাদের চলাফেরা অবস্থাতেই তিনি তাদেরকে পাকড়াও করবেন? তারা তাঁকে অপারগকারী নয়।” আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “গ্রামবাসী এ থেকে কি নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে যে, তাদের কাছে তাদের শয়ন ও ঘুমন্ত অবস্থায় আমার শাস্তি চলে আসবে? গ্রামবাসী কি এ থেকে নিরাপদ হয়ে গেছে যে, তাদের কাছে দিনের পূর্বভাগে তাদের খেলা ধূলায় মত্ত থাকা অবস্থায় আমার শাস্তি এসে পড়বে? তারা কি আল্লাহর মকর থেকে নির্ভয় ও নিরাপদ হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কওম ছাড়া কেউই আল্লাহর মকর থেকে নির্ভয় ও নিরাপদ থাকেনা।”

ইউসুফ 12:106

১০৫-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা সংবাদ দিচ্ছেন যে, ক্ষমতাবান আল্লাহর বহু নিদর্শন, তাঁর একত্বের সাক্ষ্য প্রমাণ রাতদিন মানুষের সামনে রয়েছে। তবুও অধিকাংশ লোক অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে এগুলো থেকে উদাসীন ও অমনোযোগী রয়েছে। এই এতবড় ও প্রশস্ত আকাশ, এই বিস্তৃত যমীন, এই উজ্জ্বল নক্ষত্র-রাজি, এই আবর্তনশীল সূর্য ও চন্দ্র, এই গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত, শস্য-ক্ষেত্র, তরঙ্গ পূর্ণ সমুদ্র, প্রবাহিত বাতাস, বিভিন্ন প্রকারের ফল ফলাদি এবং নানা প্রকারের খাদ্য দ্রব্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর এই অসংখ্য নিদর্শনাবলী কি জ্ঞানী ব্যক্তির কোন কাজে আসে না যে, এগুলি দ্বারা সে তাঁকে চিনতে পারে, যিনি এক, অমুখাপেক্ষী, অংশীবিহীন, ক্ষমতাবান, চিরঞ্জীব এবং চিরবিদ্যমান? এগুলো দেখে কি-সে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না? তাদের অধিকাংশের মাথা এমনভাবে বিগড়ে গেছে যে, তাদের আল্লাহর উপর বিশ্বাস আছে, অথচ তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করছে। তারা আসমান ও যমীনের, পাহাড়-পর্বতের এবং দানব ও মানবের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আল্লাহকেই মানে, অথচ তাঁর সাথে অন্যদেরকেও শরীক করে ফেলে। এই মুশরিকরা হজ্জ করতে আসে এবং ইহরাম বেঁধে ‘লাব্বায়েক' উচ্চারণ করতে করতে বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনার কোন শরীক নেই, শরীক যারা আছে তাদেরও মালিক আপনি। তাদের অধিকার ভুক্ত সবকিছুরও মালিক আপনি।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, যখন মুশরিকরা বলতো: “হে আল্লাহ! আমরা হাজির আছি, আপনার কোন অংশীদার নেই, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যথেষ্ট হয়েছে। এর চেয়ে বেশী আর কিছু বলো না।” আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন : (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় শিরক চরম যুলুম।” (৩১: ১৩) প্রকৃতপক্ষে এটা বড়ই অত্যাচার যে, আল্লাহর সাথে আরো কারো ইবাদত করা হবে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় পাপ কোনটি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তা এই যে, তুমি আল্লাহর জন্যে শরীক স্থাপন করবে, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতের মধ্যে মুনাফিকরাও এসে পড়ে। তাদের আমলে একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা থাকে না। বরং তাদের মধ্যে রিয়াকারী ও লোক দেখানো ভাব থাকে। রিয়াকারীও শির্‌কের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন কারীম ঘোষণা করেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে তারা নিজেরাই প্রতারিত হয়। তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অত্যন্ত অলসভাবে দাঁড়ায়, তাদের উদ্দেশ্য হয় শুধু লোক দেখানো। তারা আল্লাহর যিকর খুব কমই করে।” (৪: ১৪২) এটাও স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, কতকগুলি শির্‌ক খুবই হালকা ও গোপনীয় হয়। স্বয়ং শির্‌ককারীও ওটা বুঝতে পারে না। হযরত হুযাইফা (রাঃ) একজন রুগ্ন ব্যক্তির নিকট গমন করেন। তার হাতে একটা সূতা বাঁধা ছিল। তিনি ওটা দেখে ছিঁড়ে ফেলেন এবং বলেনঃ “মু'মিন হয়েও শিরক করছো?” অর্থাৎ তিনি এ আয়াতটিই পাঠ করেন। হাদীস শরীফে আছে যে, যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর কসম খেলো সে মুশরিয্‌ক হয়ে গেল। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমযী (রঃ) হযরত ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। এবং তিনি এটাকে হাসান বলেছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঝাড়-ফুঁক, সূতা, এবং মিথ্যা তাবীজ শির্‌ক।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন বর্ণনা করেছেন) তিনি আরো বলেছেনঃ “বান্দার নির্ভরশীলতার কারণে আল্লাহ তাআ’লা তার সমস্ত বিপদ আপদ দূর করে থাকেন।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের স্ত্রী হযরত যায়নাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “ (আমার স্বামী) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন বাইরে থেকে বাড়ীতে প্রবেশ করতেন তখন তিনি গলা খাকড়াতেন এবং থুথু ফেলতেন। যাতে বাড়ীর লোকেরা তাঁর আগমনের ইঙ্গিত পেতে পারে এবং তিনি যেন তাদেরকে এমন অবস্থায় না দেখেন যা তিনি অপছন্দ করেন। একদা এই ভাবে তিনি বাড়ীতে প্রবেশের আভাষ দেন, ঐ সময় আমার কাছে একজন বুড়ী বিদ্যমান ছিল, যে আমার রোগের কারণে আমাকে ঝাড়-ফুক দিতে এসেছিল। আমি তাঁর গলা খাঁকড়ানোর শব্দ শুনেই বুড়িটিকে চৌকির নীচে লুকিয়ে দেই। তিনি আমার কাছে এসে চৌকির উপর বসে পড়েন এবং আমার গলায় সূতা দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি?” আমি উত্তরে বলিঃ এতে আমি ঝাড়-ফুক করিয়ে নিয়ে গলায় বেঁধেছি। আমার একথা শুনে তিনি ওটা ধরে ছিঁড়ে ফেলেন এবং বলেনঃ “আবদুল্লাহর (রাঃ) ঘর শিরক থেকে অমুখাপেক্ষী। স্বয়ং আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছি যে, ঝাড়-ফুক, তাবীয এবং ডোরা-সুতা বাধা শিরক।” আমি বললামঃ “আপনি এটা কিরূপে বলছেন? একবার আমার চক্ষু খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমি অমুক ইয়াহূদীর কাছে যেতাম। সে আমার চোখে ঝাড়-ফুক করতো। তখন আমার চক্ষু ভাল হয়ে যেতো।” আমার এ কথা শুনে তিনি বললেনঃ “শয়তান তোমার চোখে গুতো মারতো এবং ঝাড়-ফুঁকের কারণে সে থেমে যেতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা শিখিয়েছেন তা যদি তুমি বলতে তবে ওটাই তোমার জন্যে যথেষ্ট হতো। তা হচ্ছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মানুষের প্রতিপালক! আপনি কষ্ট দূর করে দিন, আপনি আরোগ্য দান করুন, আপনিই আরোগ্য দানকারী, আপনার আরোগ্য ছাড়া কোন আরোগ্য নেই, এমন আরোগ্য দান করুন যাতে কোন রোগ অবশিষ্ট না থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)ঈসা ইবনু আবদির রহমান (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একবার আবদুল্লাহ ইবনু হাকীম (রাঃ) রুগ্ন ছিলেন, আমরা তাঁকে দেখতে গেলাম। তাঁকে বলা হলো: “যদি আপনি কোন ডোরা-সূতা বাঁধতেন তবে ভাল হতো।” এ কথা শুনে তিনি বলেন, “আমি ডোরা-সূতা বাঁধবো? অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি যে জিনিষ লটকাবে তাকে তারই দিকে সমর্পণ করা হবে। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে। এ হাদিস ইমাম নাসায়ীও হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত করেছে) হযরত উকবা ইবনু আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তাবীয লটকালো সে শিরক করলো।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, যে ব্যক্তি তাবীয লটকায় আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করেন না এবং যে ব্যক্তি ওটা লটকায় আল্লাহ যেন ওটাকে লটকানো অবস্থাতেই রেখে দেন।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “আমি শরীকদের শিরক হতে অমুখাপেক্ষী। আমি ওর কোন পরওয়া করি না। যে ব্যক্তি এমন কাজ করলো যে, তাতে আমার শরীক স্থাপন করলো, আমি তাকে ও তার শিরককে পরিত্যাগ করি।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ ইবনু আবি ফুযালা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছিঃ “যখন আল্লাহ তাআ’লা সমস্ত প্রথম ও শেষের লোকদেরকে একত্রিত করবেন এমন এক দিনে, যেই দিনের ব্যাপারে কোনই সন্দেহ নেই, তখন একজন আহবানকারী আহবান করবেনঃ যে ব্যক্তি কোন কাজে শিরক করবে, যে কাজ সে আল্লাহর জন্যে করেছে, সে যেন গায়রুল্লাহর কাছেই প্রতিদান চায়। নিশ্চয় আল্লাহ শরীকদের শিরক থেকে বেপরোয়া।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মাহমূদ ইবনু ওয়ালীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের উপর আমার যে জন্যে সবচেয়ে ভয়, তা হচ্ছে ছোট শিরক।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ছোট শির্ক কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “রিয়াকারী (লোক দেখানো কাজ)। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআ’লা লোকদেরকে কর্মের প্রতিদান প্রদান করবেন। ঐ সময় তিনি ঐ রিয়াকারদেরকে বলবেনঃ “হে রিয়াকারগণ! তোমরা যাদেরকে দেখানোর জন্যে আমল করতে তাদের কাছেই আজ প্রতিদান চাও। দেখা যাক তারা তা দিতে পারে কি না।” (ইমাম আহমদ (রঃ) এই হাদীসটিও বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন কাজের অশুভ লক্ষণ দেখে তা থেকে ফিরে আসলো সে মুশরিক হয়ে গেল।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর কাফফারা কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এর কাফফারা এই যে, সে বলবেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনার মঙ্গল ছাড়া কোন মঙ্গল নেই এবং আপনার দেয়া অমঙ্গল ছাড়া কোন অমঙ্গলই নেই। (অর্থাৎ মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয়েরই কারণ একমাত্র আপনিই। দুটোই আপনার পক্ষ থেকে এসে থাকে) আর আপনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই।”বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আবু মুসা আশআ’রী (রাঃ) স্বীয় ভাষণে বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা শিরক থেকে বেঁচে থাকো। এটা পীপিলিকার গতির চেয়েও বেশি গোপনীয়।” তার একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু হারব (রাঃ) এবং হযরত কায়েস ইবনু মাযারিব (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “আপনি এর প্রমাণ পেশ করবেন, না আমরা হযরত উমারের (রাঃ) কাছে গিয়ে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবো?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “এর প্রমাণ আমি দিচ্ছি। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে ভাষণে বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা এই শিরক হতে বেঁচে থাকো! এটাতো পিঁপড়ার গতির চেয়েও বেশী গোপনীয় ও সূক্ষ্ণ।” তখন কেউ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) এটা পিঁপড়ার গতির চেয়েও সূক্ষ্ণ, তা হলে এর থেকে বাঁচবার উপায় কি?” তিনি জবাবে বলেনঃ “তোমরা বলোঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এমন কিছুকে আপনার সাথে শরীক স্থাপন করা হতে যা আমরা জানি এবং আমরা আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এমন কিছু হতে, যা আমরা জানি না”। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বানু কাইল গোত্রের একটি লোক হতে বর্ণনা করেছেন)একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই বর্ণনা ছিল হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! শিরক তো হচ্ছে এটাই যে, আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও ডাকা হয়।” এই হাদীসে দুআ’'র শব্দগুলি নিম্নরূপ রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি এ থেকে যে, আমি আপনার সাথে শরীক স্থাপন করবো অথচ আমি জানি (যে, এটা শিরক) এবং আমি আপনার নিকট এমন কিছু হতে ক্ষমা প্রার্থনা করছি যা আমি জানিনা।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আবি ইয়ালায় রয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) আরজ করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন একটি দুআ’ শিখিয়ে দিন যা আমি সকাল ও সন্ধ্যা এবং বিছানায় শয়নের সময় পাঠ করবো।” তিনি বলেনঃ “তুমি এ দু’আটি বলবেঃ (আরবি)অর্থাৎঃ“হে আল্লাহ! হে আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা, দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, প্রত্যেক জিনিষের প্রতিপালক ও অধিকর্তা! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। আমি আমার নফসের অনিষ্ঠ হতে, শয়তানের অনিষ্ট হতে এবং তার শিরক হতে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনাকরেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) উক্ত দুআ’’টি শিখিয়ে দেন এবং এর শেষে রয়েছে: (আরবি)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ “তবে কি তারা আল্লাহর সর্বগ্রাসী শাস্তি হতে অথবা তাদের অজ্ঞাতসারে কিয়ামতের আকস্মিক উপস্থিতি হতে নির্ভয় হয়ে গেছে? যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “প্রতারণা ও দুষ্কার্যকারীরা কি এ বিষয় থেকে নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আল্লাহ তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিবেন অথবা এমন স্থান হতে শান্তি আনয়ন করবেন যে, তারা বুঝতেই পারবে না? অথবা তাদের চলাফেরা অবস্থাতেই তিনি তাদেরকে পাকড়াও করবেন? তারা তাঁকে অপারগকারী নয়।” আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “গ্রামবাসী এ থেকে কি নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে যে, তাদের কাছে তাদের শয়ন ও ঘুমন্ত অবস্থায় আমার শাস্তি চলে আসবে? গ্রামবাসী কি এ থেকে নিরাপদ হয়ে গেছে যে, তাদের কাছে দিনের পূর্বভাগে তাদের খেলা ধূলায় মত্ত থাকা অবস্থায় আমার শাস্তি এসে পড়বে? তারা কি আল্লাহর মকর থেকে নির্ভয় ও নিরাপদ হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কওম ছাড়া কেউই আল্লাহর মকর থেকে নির্ভয় ও নিরাপদ থাকেনা।”

ইউসুফ 12:107

১০৫-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা সংবাদ দিচ্ছেন যে, ক্ষমতাবান আল্লাহর বহু নিদর্শন, তাঁর একত্বের সাক্ষ্য প্রমাণ রাতদিন মানুষের সামনে রয়েছে। তবুও অধিকাংশ লোক অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে এগুলো থেকে উদাসীন ও অমনোযোগী রয়েছে। এই এতবড় ও প্রশস্ত আকাশ, এই বিস্তৃত যমীন, এই উজ্জ্বল নক্ষত্র-রাজি, এই আবর্তনশীল সূর্য ও চন্দ্র, এই গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত, শস্য-ক্ষেত্র, তরঙ্গ পূর্ণ সমুদ্র, প্রবাহিত বাতাস, বিভিন্ন প্রকারের ফল ফলাদি এবং নানা প্রকারের খাদ্য দ্রব্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর এই অসংখ্য নিদর্শনাবলী কি জ্ঞানী ব্যক্তির কোন কাজে আসে না যে, এগুলি দ্বারা সে তাঁকে চিনতে পারে, যিনি এক, অমুখাপেক্ষী, অংশীবিহীন, ক্ষমতাবান, চিরঞ্জীব এবং চিরবিদ্যমান? এগুলো দেখে কি-সে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না? তাদের অধিকাংশের মাথা এমনভাবে বিগড়ে গেছে যে, তাদের আল্লাহর উপর বিশ্বাস আছে, অথচ তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করছে। তারা আসমান ও যমীনের, পাহাড়-পর্বতের এবং দানব ও মানবের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আল্লাহকেই মানে, অথচ তাঁর সাথে অন্যদেরকেও শরীক করে ফেলে। এই মুশরিকরা হজ্জ করতে আসে এবং ইহরাম বেঁধে ‘লাব্বায়েক' উচ্চারণ করতে করতে বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনার কোন শরীক নেই, শরীক যারা আছে তাদেরও মালিক আপনি। তাদের অধিকার ভুক্ত সবকিছুরও মালিক আপনি।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, যখন মুশরিকরা বলতো: “হে আল্লাহ! আমরা হাজির আছি, আপনার কোন অংশীদার নেই, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যথেষ্ট হয়েছে। এর চেয়ে বেশী আর কিছু বলো না।” আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন : (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় শিরক চরম যুলুম।” (৩১: ১৩) প্রকৃতপক্ষে এটা বড়ই অত্যাচার যে, আল্লাহর সাথে আরো কারো ইবাদত করা হবে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় পাপ কোনটি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তা এই যে, তুমি আল্লাহর জন্যে শরীক স্থাপন করবে, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতের মধ্যে মুনাফিকরাও এসে পড়ে। তাদের আমলে একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা থাকে না। বরং তাদের মধ্যে রিয়াকারী ও লোক দেখানো ভাব থাকে। রিয়াকারীও শির্‌কের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন কারীম ঘোষণা করেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে তারা নিজেরাই প্রতারিত হয়। তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অত্যন্ত অলসভাবে দাঁড়ায়, তাদের উদ্দেশ্য হয় শুধু লোক দেখানো। তারা আল্লাহর যিকর খুব কমই করে।” (৪: ১৪২) এটাও স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, কতকগুলি শির্‌ক খুবই হালকা ও গোপনীয় হয়। স্বয়ং শির্‌ককারীও ওটা বুঝতে পারে না। হযরত হুযাইফা (রাঃ) একজন রুগ্ন ব্যক্তির নিকট গমন করেন। তার হাতে একটা সূতা বাঁধা ছিল। তিনি ওটা দেখে ছিঁড়ে ফেলেন এবং বলেনঃ “মু'মিন হয়েও শিরক করছো?” অর্থাৎ তিনি এ আয়াতটিই পাঠ করেন। হাদীস শরীফে আছে যে, যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর কসম খেলো সে মুশরিয্‌ক হয়ে গেল। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমযী (রঃ) হযরত ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। এবং তিনি এটাকে হাসান বলেছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঝাড়-ফুঁক, সূতা, এবং মিথ্যা তাবীজ শির্‌ক।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন বর্ণনা করেছেন) তিনি আরো বলেছেনঃ “বান্দার নির্ভরশীলতার কারণে আল্লাহ তাআ’লা তার সমস্ত বিপদ আপদ দূর করে থাকেন।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের স্ত্রী হযরত যায়নাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “ (আমার স্বামী) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন বাইরে থেকে বাড়ীতে প্রবেশ করতেন তখন তিনি গলা খাকড়াতেন এবং থুথু ফেলতেন। যাতে বাড়ীর লোকেরা তাঁর আগমনের ইঙ্গিত পেতে পারে এবং তিনি যেন তাদেরকে এমন অবস্থায় না দেখেন যা তিনি অপছন্দ করেন। একদা এই ভাবে তিনি বাড়ীতে প্রবেশের আভাষ দেন, ঐ সময় আমার কাছে একজন বুড়ী বিদ্যমান ছিল, যে আমার রোগের কারণে আমাকে ঝাড়-ফুক দিতে এসেছিল। আমি তাঁর গলা খাঁকড়ানোর শব্দ শুনেই বুড়িটিকে চৌকির নীচে লুকিয়ে দেই। তিনি আমার কাছে এসে চৌকির উপর বসে পড়েন এবং আমার গলায় সূতা দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি?” আমি উত্তরে বলিঃ এতে আমি ঝাড়-ফুক করিয়ে নিয়ে গলায় বেঁধেছি। আমার একথা শুনে তিনি ওটা ধরে ছিঁড়ে ফেলেন এবং বলেনঃ “আবদুল্লাহর (রাঃ) ঘর শিরক থেকে অমুখাপেক্ষী। স্বয়ং আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছি যে, ঝাড়-ফুক, তাবীয এবং ডোরা-সুতা বাধা শিরক।” আমি বললামঃ “আপনি এটা কিরূপে বলছেন? একবার আমার চক্ষু খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমি অমুক ইয়াহূদীর কাছে যেতাম। সে আমার চোখে ঝাড়-ফুক করতো। তখন আমার চক্ষু ভাল হয়ে যেতো।” আমার এ কথা শুনে তিনি বললেনঃ “শয়তান তোমার চোখে গুতো মারতো এবং ঝাড়-ফুঁকের কারণে সে থেমে যেতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা শিখিয়েছেন তা যদি তুমি বলতে তবে ওটাই তোমার জন্যে যথেষ্ট হতো। তা হচ্ছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মানুষের প্রতিপালক! আপনি কষ্ট দূর করে দিন, আপনি আরোগ্য দান করুন, আপনিই আরোগ্য দানকারী, আপনার আরোগ্য ছাড়া কোন আরোগ্য নেই, এমন আরোগ্য দান করুন যাতে কোন রোগ অবশিষ্ট না থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)ঈসা ইবনু আবদির রহমান (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একবার আবদুল্লাহ ইবনু হাকীম (রাঃ) রুগ্ন ছিলেন, আমরা তাঁকে দেখতে গেলাম। তাঁকে বলা হলো: “যদি আপনি কোন ডোরা-সূতা বাঁধতেন তবে ভাল হতো।” এ কথা শুনে তিনি বলেন, “আমি ডোরা-সূতা বাঁধবো? অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি যে জিনিষ লটকাবে তাকে তারই দিকে সমর্পণ করা হবে। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে। এ হাদিস ইমাম নাসায়ীও হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত করেছে) হযরত উকবা ইবনু আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তাবীয লটকালো সে শিরক করলো।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, যে ব্যক্তি তাবীয লটকায় আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করেন না এবং যে ব্যক্তি ওটা লটকায় আল্লাহ যেন ওটাকে লটকানো অবস্থাতেই রেখে দেন।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “আমি শরীকদের শিরক হতে অমুখাপেক্ষী। আমি ওর কোন পরওয়া করি না। যে ব্যক্তি এমন কাজ করলো যে, তাতে আমার শরীক স্থাপন করলো, আমি তাকে ও তার শিরককে পরিত্যাগ করি।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ ইবনু আবি ফুযালা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছিঃ “যখন আল্লাহ তাআ’লা সমস্ত প্রথম ও শেষের লোকদেরকে একত্রিত করবেন এমন এক দিনে, যেই দিনের ব্যাপারে কোনই সন্দেহ নেই, তখন একজন আহবানকারী আহবান করবেনঃ যে ব্যক্তি কোন কাজে শিরক করবে, যে কাজ সে আল্লাহর জন্যে করেছে, সে যেন গায়রুল্লাহর কাছেই প্রতিদান চায়। নিশ্চয় আল্লাহ শরীকদের শিরক থেকে বেপরোয়া।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মাহমূদ ইবনু ওয়ালীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের উপর আমার যে জন্যে সবচেয়ে ভয়, তা হচ্ছে ছোট শিরক।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ছোট শির্ক কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “রিয়াকারী (লোক দেখানো কাজ)। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআ’লা লোকদেরকে কর্মের প্রতিদান প্রদান করবেন। ঐ সময় তিনি ঐ রিয়াকারদেরকে বলবেনঃ “হে রিয়াকারগণ! তোমরা যাদেরকে দেখানোর জন্যে আমল করতে তাদের কাছেই আজ প্রতিদান চাও। দেখা যাক তারা তা দিতে পারে কি না।” (ইমাম আহমদ (রঃ) এই হাদীসটিও বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন কাজের অশুভ লক্ষণ দেখে তা থেকে ফিরে আসলো সে মুশরিক হয়ে গেল।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর কাফফারা কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এর কাফফারা এই যে, সে বলবেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনার মঙ্গল ছাড়া কোন মঙ্গল নেই এবং আপনার দেয়া অমঙ্গল ছাড়া কোন অমঙ্গলই নেই। (অর্থাৎ মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয়েরই কারণ একমাত্র আপনিই। দুটোই আপনার পক্ষ থেকে এসে থাকে) আর আপনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই।”বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আবু মুসা আশআ’রী (রাঃ) স্বীয় ভাষণে বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা শিরক থেকে বেঁচে থাকো। এটা পীপিলিকার গতির চেয়েও বেশি গোপনীয়।” তার একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু হারব (রাঃ) এবং হযরত কায়েস ইবনু মাযারিব (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “আপনি এর প্রমাণ পেশ করবেন, না আমরা হযরত উমারের (রাঃ) কাছে গিয়ে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবো?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “এর প্রমাণ আমি দিচ্ছি। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে ভাষণে বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা এই শিরক হতে বেঁচে থাকো! এটাতো পিঁপড়ার গতির চেয়েও বেশী গোপনীয় ও সূক্ষ্ণ।” তখন কেউ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) এটা পিঁপড়ার গতির চেয়েও সূক্ষ্ণ, তা হলে এর থেকে বাঁচবার উপায় কি?” তিনি জবাবে বলেনঃ “তোমরা বলোঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এমন কিছুকে আপনার সাথে শরীক স্থাপন করা হতে যা আমরা জানি এবং আমরা আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এমন কিছু হতে, যা আমরা জানি না”। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বানু কাইল গোত্রের একটি লোক হতে বর্ণনা করেছেন)একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই বর্ণনা ছিল হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! শিরক তো হচ্ছে এটাই যে, আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও ডাকা হয়।” এই হাদীসে দুআ’'র শব্দগুলি নিম্নরূপ রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি এ থেকে যে, আমি আপনার সাথে শরীক স্থাপন করবো অথচ আমি জানি (যে, এটা শিরক) এবং আমি আপনার নিকট এমন কিছু হতে ক্ষমা প্রার্থনা করছি যা আমি জানিনা।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আবি ইয়ালায় রয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) আরজ করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন একটি দুআ’ শিখিয়ে দিন যা আমি সকাল ও সন্ধ্যা এবং বিছানায় শয়নের সময় পাঠ করবো।” তিনি বলেনঃ “তুমি এ দু’আটি বলবেঃ (আরবি)অর্থাৎঃ“হে আল্লাহ! হে আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা, দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, প্রত্যেক জিনিষের প্রতিপালক ও অধিকর্তা! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। আমি আমার নফসের অনিষ্ঠ হতে, শয়তানের অনিষ্ট হতে এবং তার শিরক হতে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনাকরেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) উক্ত দুআ’’টি শিখিয়ে দেন এবং এর শেষে রয়েছে: (আরবি)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ “তবে কি তারা আল্লাহর সর্বগ্রাসী শাস্তি হতে অথবা তাদের অজ্ঞাতসারে কিয়ামতের আকস্মিক উপস্থিতি হতে নির্ভয় হয়ে গেছে? যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “প্রতারণা ও দুষ্কার্যকারীরা কি এ বিষয় থেকে নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আল্লাহ তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিবেন অথবা এমন স্থান হতে শান্তি আনয়ন করবেন যে, তারা বুঝতেই পারবে না? অথবা তাদের চলাফেরা অবস্থাতেই তিনি তাদেরকে পাকড়াও করবেন? তারা তাঁকে অপারগকারী নয়।” আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “গ্রামবাসী এ থেকে কি নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে যে, তাদের কাছে তাদের শয়ন ও ঘুমন্ত অবস্থায় আমার শাস্তি চলে আসবে? গ্রামবাসী কি এ থেকে নিরাপদ হয়ে গেছে যে, তাদের কাছে দিনের পূর্বভাগে তাদের খেলা ধূলায় মত্ত থাকা অবস্থায় আমার শাস্তি এসে পড়বে? তারা কি আল্লাহর মকর থেকে নির্ভয় ও নিরাপদ হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কওম ছাড়া কেউই আল্লাহর মকর থেকে নির্ভয় ও নিরাপদ থাকেনা।”

ইউসুফ 12:108

সমস্ত দানব ও মানবের প্রতি প্রেরিত রাসূলকে (সঃ) আল্লাহ তাআ’লা নির্দেশ দিচ্ছেনঃ জনগণকে তুমি খবর দিয়ে দাওঃ আমার নীতি, আমার পন্থা এবং আমার সুন্নাত এই যে, আমি সাধারণভাবে আল্লাহর একত্ববাদ প্রচার করবো। পরিপূর্ণ বিশ্বাস, দলীল প্রমাণ এবং বিচক্ষণতার সাথে আমি সকলকে ঐ দিকে আহবান করছি। আমার যতগুলি অনুসারী রয়েছে তারাও সবাই ঐ দিকেই আহবান করছে। তারা সবাই মিলে শরীয়ত সম্মত ও জ্ঞান সম্মত দলীল প্রমাণের মাধ্যমে ঐ দিকে ডাক দিচ্ছে। আমরা আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করি। আমরা তারই মর্যাদা, পবিত্রতা এবং গুণগান বর্ণনা করে থাকি। আমরা তাকে শরীক, তুলনীয়, সমকক্ষ, উযীর, পরামর্শদাতা এবং সর্বপ্রকারের দুর্বলতা ও ক্রটি থেকে পবিত্র বলে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি যে, তার কোন সন্তান নেই, স্ত্রী নেই এবং কোন সমকক্ষ নেই। তিনি এসব জঘন্য বিষয় থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। আসমান ও যমীন এবং এতোদুভয়ের সমস্ত মাখলুক তার প্রশংসা ও গুণ কীর্তন করে থাকে। কিন্তু মানুষ এ গুলি বুঝতে পারে না। আল্লাহ অত্যন্ত সহনশীল ও ক্ষমাশীল।

ইউসুফ 12:109

আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি রাসূল ও নবী হিসেবে দুনিয়ায় পুরুষ লোককেই পাঠিয়েছেন। স্ত্রীলোকদেরকে নয়। জমহুর আলেমদের উক্তি এটাই যে, নুবওয়াত কখনো নারীদেরকে দান করা হয় নাই। এই আয়াতের ধরণেও এটাই প্রমাণিত হয়। কিন্তু কোন কোন আলেমের উক্তি এই যে, হযরত ইবরাহীমের (আঃ) স্ত্রী হযরত সারা (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) মাতা এবং হযরত ঈসার (আঃ) মাতা মারইয়ামও (আঃ) নবী ছিলেন। ফেরেশতাগণ হযরত সারা (আঃ) কে তার পুত্র হযরত ইসহাক (আঃ) এবং পৌত্র হযরত ইয়াকুবের (আঃ) সুসংবাদ দিয়েছিলেন। হযরত মূসার (আঃ) মাতার নিকট তাঁকে দুধ পান করাবার ওয়াহী করা হয়। হযরত মারইয়ামকে (আঃ) ফেরেশতাগণ তাঁর পুত্র হযরত ঈসার (আঃ) সুসংবাদ দিয়েছিলেন। ফেরেশতাগণ তাকে বলেছিলেনঃ “হে মারইয়াম (আঃ)! আল্লাহ তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বের নারীদের মধ্যে তোমাকে মনোনীত করেছেন। হে মারইয়াম (আঃ) তোমার প্রতিপালকের অনুগত হও ও সিজদা কর, এবং যারা রুকু করে তাদের সাথে রুকু’ কর।” এর উত্তর এই যে, কুরআন কারীমে যেটুকু বর্ণনা রয়েছে তা আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে স্বীকার করে নিচ্ছি। কিন্তু এর দ্বারা তাদের নুবওয়াত প্রমাণিত হয় না। শুধু এইটুকু ফরমান বা এইটুকু শুভ সংবাদ অথবা এইটুকু হুকুম কারো নুবওয়াতের জন্যে দলীল নয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সবারই মাযহাব এটাই যে, নারীদের মধ্যে কেউই নবী হন নাই। হ্যাঁ তবে তাঁদের মধ্যে সিদ্দিকা বা সত্যবাদিণী রয়েছেন। যেমন সর্বাপেক্ষা সম্ভ্রান্ত বংশীয়া ও মর্যাদা সম্পন্না স্ত্রীলোক মারইয়াম (আঃ) সম্পর্কে কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার (হযরত ঈসার (আঃ) মা হচ্ছে সিদ্দীকা বা চরম সত্যবাদিনী।” সুতরাং যদি তিনি নবী হতেন তবে এই জায়গায় তাকে এটাই বলা হতো।আয়াতটির ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, যমীনে বসবাসকারী মানুষই নবী হয়ে থাকেন, এটা নয় যে, আকাশ হতে কোন ফেরেশতা অবতীর্ণ হন। যেমন এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যে রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছিলাম তারা অবশ্যই খাদ্য খেতো এবং বাজারে চলাফেরা করতো।” (২৫: ২০) তারা এইরূপ দেহ বিশিষ্ট ছিলেন না যে, খাদ্য গ্রহণ থেকে পবিত্র থাকবেন। তারা এমনও ছিলেন না যে, মৃত্যু তাদেরকে পেয়ে বসবে না। তারা বাজারেও চলাফেরা করতেন। আল্লাহ তাদের সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছেন। তিনি তাঁদের সাথে যাদেরকে ইচ্ছা মুক্তি দিয়েছেন এবং সীমালংঘনকারী লোকদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এক আয়াতে আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ (হে নবী (সঃ)! তুমি বলঃ আমি তো প্রথম রাসূল নই।” (৪৬: ৯) এ কথা জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এখানে ‘গ্রামবাসী’ দ্বারা শহরবাসী উদ্দেশ্য। কেননা, গ্রামবাসী বড়ই বক্র স্বভাব ও দুশ্চরিত্র হয়ে থাকে। এটা সর্বজন বিদিত যে, শহরবাসী হয় কোমল অন্তর ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী। অনুরূপভাবে জনপদ হতে দূরে তাঁবুতে বসবাসকারী বেদুঈনরাও অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের হয়ে থাকে। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মরুবাসী বেদুঈনরা কুফরী ও নিফাকে খুবই কঠিন।” (৯: ৯৭) কাতাদা’'ও (রঃ) এই ভাবার্থ বর্ণনা করেছেন। কেননা, শহরের লোকদের মধ্যে বিদ্যা ও ধৈর্য বেশি থাকে।একটি হাদীসে এসেছে যে, এক মরুবাসী বেদুঈন রাসূলুল্লাহর (সঃ) সমিনে কিছু হাদিয়া পেশ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ওর বিনিময় প্রদান করেন। সে কিন্তু ওটাকে খুবই কম মনে করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে আরো দেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে খুশী করেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আমি ইচ্ছা করছি যে, আমি কুরায়েশ, আনসারী, সাকাথী এবং দাওসী গোত্রের লোক ছাড়া আর কারো উপঢৌকন গ্রহণ করবো না।”হযরত আ’মাশ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে মুমিনমু’মিন লোকদের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের দেয়া কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণ করে সে ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম যে লোকদের সাথে মেলামেশা করে না এবং তাদের দেয়া কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণও করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তাআ’লার উক্তিঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী এই লোকগুলি কি ভূপৃষ্ঠে ভ্রমণ করে নাই, অতঃপর তাদের পুর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছিল তা কি দেখে নাই?’ (৪০: ৪৮২) অর্থাৎ তাদের পূর্ববর্তী যে সব উম্মত তাদের রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল তাদের পরিণাম ফল কি হয়েছিল! আল্লাহ কিভাবে তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন! এই কাফিরদের জন্যে অনুরূপ শাস্তি রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে নাই যে, তাদের অন্তরগুলি তার ফলে বোধশক্তি সম্পন্ন হতো?” (২২: ৪৬) এরূপ করলে তারা দেখতে পেতো যে, তাদের ন্যায় কাফির ও গুনাহগারদের পরিণতি কি হয়েছিল! আল্লাহ তাআ’লা কাফিরদের ধ্বংস করে দিয়েছিলেন এবং মুমিনমু’মিনদেরকে মুক্তি দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাআ’লার নীতি তাঁর মাখলুকের সাথে এইরূপই বটে। এই জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্যে পরকালই উত্তম। অর্থাৎ যেমন দুনিয়ায় আমি মু'মিনদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকি, অনুরূপভাবে আখেরাতেও তাদেরকে আমার শাস্তি হতে রক্ষা করবো এবং পরকালের মুক্তি তাদের জন্যে দুনিয়ার মুক্তি হতে উত্তম হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি অবশ্যই আমার রাসূলদেরকে এবং মু'মিনদেরকে পার্থিব জগতে সাহায্য করবো এবং যে দিন সাক্ষীগণ দাঁড়িয়ে যাবে। সেইদিন অত্যাচারীদের ওজর কোনই উপকারে আসবে না। তাদের উপর অভিসম্পাত বর্ষিত হবে এবং তাদের জন্যে নিকৃষ্ট ঘর হবে।” (৪০: ৫১-৫২) এখানে (আরবি) বা ঘরের সম্বন্ধ আখেরাতের দিকে লাগানো হয়েছে। যেমন (আরবি) এবং (আরবি) বলা হয়ে থাকে। আরব কবিদের কবিতাতেও এইরূপ (আরবি) বা সম্বন্ধ অনেক রয়েছে।

ইউসুফ 12:110

আল্লাহ তাআ’লা বর্ণনা করছেন যে, সংকীর্ণ অবস্থায় রাসূলদের উপর তার সাহায্য অবতীর্ণ হয়। যখন আল্লাহর নবীদেরকে চতুর্দিক থেকে পরিবেষ্টন করে ফেলা হয় তখন তাদের উপর আল্লাহর সাহায্য এসে পড়ে (আরবি) এবং (আরবি) এই দু’টি কিরআত রয়েছে। হযরত আয়েশার (রাঃ) কিরআত '(আরবি)' অক্ষরে তাশদীদ দিয়ে রয়েছে। হযরত উরওয়া ইবনু যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত আয়েশাকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “এই শব্দটি” (আরবি) না (আরবি)? হযরত আয়েশা (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ (আরবি) পড়তে হবে।” তিনি পুনরায় বলেনঃ “তা হলে তো এর অর্থ দাঁড়ায়ঃ রাসূলগণ ধারণা করেন যে, তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে। তবে এই ধারণা করার অর্থ কি হতে পারে? এটা তো নিশ্চিত কথা যে, তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হচ্ছিল।” উত্তরে হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “অবশ্যই এটা নিশ্চিত কথা যে, কাফিরদের পক্ষ থেকে তাঁদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু এমন সময়ও এসে গেল যে, ঈমানদার উম্মতগণও সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়ে গেল এবং সাহায্য আসতে এতো বিলম্ব হলো যে, স্বাভাবিকভাবে রাসূলগণও মনে করতে লাগলেন যে, তাঁদের মুমিনমু’মিন দলগুলিও হয়তো তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআ’লার সাহায্য এসে পড়লো এবং তাঁরা বিজয় লাভ করলেন। তুমি একটু চিন্তা করে দেখ তো যে, (আরবি) কি করে ঠিক হতে পারে? রাসূলদের মনে কি কখনো এ ধারণা জাগতে পারে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে মিথ্যা কথা বলা হয়েছে? আমরা এর থেকে আল্লাহ তাআ’লার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) এটাকে (আরবি) পড়তেন এবং এর দলীল হিসেবে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “(পরিস্থিতি এইরূপ দাঁড়ালো যে,) শেষ পর্যন্ত রাসূল ও তার সঙ্গীয় মুমিনমু’মিনরা বলে উঠলো: কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে? (তখন আল্লাহ তাআ’লা বললেনঃ) জেনে রেখোঁরেখো যে, আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী।” (২৪: ২১৬) হযরত আয়েশা (রাঃ) এটাকে কঠোরভাবে অস্বীকার করতেন এবং বলতেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে যতগুলি অঙ্গীকার করেছিলেন, তার দৃঢ় প্রত্যয় ও বিশ্বাস ছিল ঐ সবগুলিই নিশ্চিত রূপে পরিপূর্ণ হবে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার অন্তরে এরূপ ধারণা জাগ্রত হয় নাই যে, না জানি হয়তো আল্লাহ তাআ’লার কোন ওয়াদা ভুল প্রমাণিত হবে বা হয়তো পূর্ণ হবে না। হ্যাঁ, তবে নবীদের উপর বিপদ-আপদ আসতে থেকেছে এবং শেষ পর্যন্ত তারা আশঙ্কা করে বসেছেন যে, না জানি হয়তো তাঁদের অনুসারীরাও তাদের উপর বদ-ধারণা করে তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে বসবে।” ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক কাসিম ইবনু মুহাম্মদের (রঃ) কাছে এসে তাঁকে বলেঃ “মুহাম্মদ ইবনু কা'ব কারাযী (রঃ) (আরবি) পড়ে থাকেন।” তখন তিনি লোকটিকে বলেনঃ “তাঁকে তুমি বলবেঃ আমি (কাসিম ইবনু মুহাম্মদ) রাসূলুল্লাহর (সঃ) সহধর্মিনী হযরত আয়েশাকে (রাঃ) (আরবি) পড়তে শুনেছি। অর্থাৎ তাঁদের অনুসারীরা তাঁদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।” (এটা ইবনু আবি হা’তিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)সুতরাং একটি কিরআত আছে তাশদীদের সঙ্গে এবং একটি কিরআত আছে তাফীফের সঙ্গে (অর্থাৎ "(আরবি)" অক্ষরের নীচে শুধু যের, উপরে তাব্দীদ নয়)। তাশদীদ বিহীন অবস্থায় যে তাফসীর হযরত ইবনু আব্বাস। (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে তা তো উপরে উল্লেখিত হয়েছে। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি এই আয়াতটিকে এভাবেই পড়তেন অর্থাৎ (আরবি) পড়তেন। আর তিনি এটা এভাবে পাঠ করে বলেনঃ “কারণ এটাই যা তুমি অপছন্দ কর।” এই রিওয়াইয়াতটি ঐ রিওয়াইয়াতের বিপরীত যা এই দুই মহান ব্যক্তি হতে অন্যেরা রিওয়াইয়াত করেছেন। তাতে রয়েছে যে, হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ যখন রাসুলগণ তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকদের আনুগত্য হতে নিরাশ হয়ে যান এবং তাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা মনে করে নেয় যে, নবীরা তাদেরকে মিথ্যা কথা বলেছেন, তখনই আল্লাহর সাহায্য এসে পড়ে এবং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা নাজাত দেন। এইরূপ তাফসীর অন্যদের থেকেও বর্ণিত আছে। আবু হামযা’ আল জাযারী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন কুরাইশী যুবক হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইরকে (রাঃ) বলেনঃ “জনাব! (আরবি) শব্দটিকে কিভাবে পড়তে হবে? এই শব্দটির কারণে হয়তো আমি এই আয়াতটির পাঠ ছেড়েই দেবো।” তখন তিনি যুবকটিকে বলেনঃ “তা হলে শুন! এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ যখন নবীরা তাঁদের কওমের আনুগত্য থেকে নিরাশ হয়ে যান এবং কওম বুঝে নেয় যে, নবীরা তাদেরকে মিথ্যা কথা বলেছেন (তখনই আল্লাহর সাহায্য এসে যায়)।” এ কথা শুনে যহহাক ইবনু মাযাহিম (রাঃ) খুবই খুশী হন এবং বলেনঃ “এইরূপ উত্তর আমি কোন জ্ঞানী ব্যক্তির মুখে ইতিপূর্বে শুনি নাই। যদি আমি এখান হতে ইয়ামনে গিয়েও এরূপ উত্তর শুনতাম তবে ওটাকেও আমি খুবই সহজ মনে করতাম।” (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন) মুসলিম ইবনু ইয়াসারও (রাঃ) তাঁর এই জবাব শুনে খুশী হয়ে তার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেন। আর তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা আপনার চিন্তা ও উদ্বেগ এমনিভাবে দূর করে দিন যেমনি ভাবে আপনি আমাদের উদ্বেগ ও চিন্তা দূর করলেন।” আরো বহু মুফাসিরও এই ভাবার্থই বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) তো "(আরবি)" অক্ষরে যবর দিয়ে (আরবি) পড়েছেন। কতক মুফাসসির (আরবি) ক্রিয়াপদের কর্তা বলেছেন মুমিনমু’মিনদেরকে আর কেউ কেউ কাফিরদেরকে কর্তা বলেছেন। অর্থাৎ কাফিররা অথবা কোন কোন মু'মিন এই ধারণা করেছিলেন যে, রাসূলগণ। সাহায্যের যে ওয়াদা দিয়েছিলেন তাতে তারা মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়েছেন।হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলগণ নিরাশ হয়ে যান অর্থাৎ তাদের কওমের ঈমান হতে নিরাশ হয়ে যান এবং আল্লাহর সাহায্য আসতে বিলম্ব দেখে তাঁদের কওম ধারণা করতে লাগে যে, তাদেরকে মিথ্যা ওয়াদা দেয়া হয়েছিল। সুতরাং এই দু’টি রিওয়াইয়াত এই দু’জন মহান সাহাবী হতে বর্ণিত আছে। আর হযরত আয়েশা (রঃ) স্পষ্টভাবে এটা অস্বীকার করেন। ইমাম ইবনু জারীরও (রঃ) হযরত আয়েশার (রাঃ) পক্ষেই মত দিয়েছেন এবং অন্যান্য উক্তিগুলি খণ্ডন করেছেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।

ইউসুফ 12:111

আল্লাহ তাআ’লা বলেন যে, নবীদের ঘটনাবলী, মুসলমানদের মুক্তি এবং কাফিরদের ধ্বংসের কাহিনীর মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্যে বড়ই শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। কুরআন কারীম বানানো কথার কিতাব নয়। এটা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব সমূহের সত্যতার দলীল। ঐ সব গ্রন্থে আল্লাহ তাআ’লার যে সব সঠিক ও সত্য কথা রয়েছে সেগুলির স্বীকারোক্তি করে। আর যেগুলির পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে দেয়া হয়েছে সেগুলি ছাঁটাই করে দেয়। ঐ গুলির যে সব কথা বাকী রাখার যোগ্য সেগুলি বাকী রাখার এবং যেগুলি রহিত হয়ে গেছে সেগুলি রহিত হয়ে যাওয়ার বর্ণনা কুরআন কারীম দিয়ে থাকে। পবিত্র কুরআন প্রত্যেক হালাল, হারাম, পছন্দনীয় এবং অপছন্দনীয় বিষয়ের স্পষ্ট ও খোলাখুলি বর্ণনা দিয়ে থাকে। আনুগত্য, অবশ্য করণীয়, মুস্তাহাব, মাকরূহ ইত্যাদির বর্ণনা দেয়। সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত খবর কুরআন পাক প্রদান করে থাকে। মহা মহিমান্বিত আল্লাহর গুণাবলী বর্ণনা করে এবং বান্দারা তাদের সষ্টিকর্তার ব্যাপারে যে ভুলত্রুটি করে থাকে তার সংশোধন করে। সৃষ্টজীব আল্লাহর কোন গুণ বা বিশেষণ তার সৃষ্টির মধ্যে আনয়ন করবে এর থেকে পবিত্র কুরআন বাধা দিয়ে থাকে। সুতরাং এই কুরআন মুমিনমু’মিনদের জন্যে হিদায়াত ও রহমত। এর মাধ্যমে তাদের অন্তর বিভ্রান্তি থেকে হিদায়াত, মিথ্যা হতে সত্য এবং অকল্যাণ হতে কল্যাণের পথ পেয়ে থাকে। আর তারা বান্দার প্রতিপালকের কাছে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করে থাকে। আমাদেরও প্রার্থনা এই যে, আল্লাহ তাআ’লা যেন আমাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে এই রূপ মুমিনমু’মিনদের সাথেই রাখেন এবং কিয়ামতের দিন যখন কতকগুলি চেহারা উজ্জ্বল হবে, আর কতকগুলি চেহারা হবে কালিমাযুক্ত, তখন যেন আমাদেরকে উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত করেন। আমীন!

আর-রাদ 13:1

সূরার শুরুতে যে (আরবি) এসে থাকে সেগুলির পূর্ণ ব্যাখ্যা সুরায়ে বাকারার তাফসীরের শুরুতে লিখিত হয়েছে এবং সেখানে এ কথাও বলা হয়েছে যে, যে সূরাগুলির প্রথমে এই অক্ষরগুলি এসেছে সেখানে সাধারণভাবে এই বর্ণনাই হয়েছে যে, কুরআন আল্লাহর কালাম। এতে সন্দেহ ও সংশয়ের লেশ মাত্র নেই। এগুলি হচ্ছে কিতাব অর্থাৎ কুরআনের আয়াতসমূহ।এই নীতি অনুসারে এখানেও এই অক্ষরগুলির পরে আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ এগুলি হলো কিতাব অর্থাৎ কুরআনের আয়াতসমূহ। কেউ কেউ বলেছেন যে, কিতাব দ্বারা তাওরাত ও ইঞ্জিলকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু এটা সঠিক কথা নয়। এরপর এর উপরই সংযোগ স্থাপন করে এই কিতাবের অন্যান্য বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে যে, এটা সম্পূর্ণরূপে সত্য এবং আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ হতে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) উপর এটা অবতীর্ণ করা হয়েছে।(আরবি) হচ্ছে (আরবি) বা বিধেয়। এর (আরবি) বা উদ্দেশ্য পূর্বে বর্ণিত হয়েছে অর্থাৎ (আরবি) এই অংশটুকু। কিন্তু ইমাম ইবনু জারীরের (রঃ) পছন্দনীয় উক্তি এটাই যে, (আরবি) অক্ষরটি (আরবি) (অতিরিক্ত) অথবা (আরবি) (সংযোগ স্থাপনকারী) এবং এখানে (আরবি) এর সংযোগ (আরবি) এর উপর হয়েছে, যেমন আমরা ইতিপূর্বে বর্ণনা করেছি। ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) তাঁর উক্তির সমর্থনে কোন এক কবির কবিতাংশকে প্রমাণ হিসেবে আনয়ন করেছেন। কবিতাংশটি নিম্নরূপঃ (আরবি)অর্থাৎ কওমের বাদশাহ, ইবনুল হাম্মামও জনতার মধ্যে কুতাইবার সিংহের নিকট। এখানে কওমের বাদশাহ, ইবনুল হাম্মাম এবং কুতাইবার সিংহ একই ব্যক্তি। সুতরাং এখানে (আরবি) টি অতিরিক্ত বা (আরবি) এর উপর (আরবি) এর (আরবি) বা সংযোগ হয়েছে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা সত্য হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ লোক এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে না। অর্থাৎ এর সত্যতা স্পষ্ট ও সমুজ্জল। কিন্তু মানুষের অবাধ্যতা, হঠকারিতা এবং একগুঁয়েমী তাদেরকে ঈমানের দিকে মুখ করতে দেয় না।

আর-রাদ 13:2

আল্লাহ তাআ’লা নিজের ক্ষমতার পূর্ণতা এবং সাম্রাজ্যের বিরাটত্বের খবর দিচ্ছেন যে, তিনি বিনা স্তম্ভে আকাশকে উর্ধে স্থাপন করেছেন। আকাশকে তিনি যমীন হতে কতই না উঁচুতে রেখেছেন! শুধু নিজের আদেশে ওটাকে তিনি প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন যার শেষ সীমারেখার খবর কেউ রাখে না। দুনিয়ার আকাশ সারা যমীন এবং ওর চার পাশে পানি, বাতাস ইত্যাদি যা কিছু রয়েছে সবকিছুকেই পরিবেষ্টন করে রয়েছে। সব দিক থেকেই আসমান যমীন হতে সমানভাবে উঁচু রয়েছে। যমীন হতে আসমানের দুরত্ব হচ্ছে পাঁচ শ’ বছরের পথ। সবদিকেই ওটা এতোটা উঁচু। ওর পুরু ও ঘনত্বও পাঁচ শ' বছরের ব্যবধানে আছে। আবার দ্বিতীয় আকাশ এই দুনিয়ার আকাশকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। প্রথম আকাশ হতে দ্বিতীয় আকাশের ব্যবধানও পাঁচ শ' বছরের পথ। অনুরূপভাবে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম আকাশও একে অপর হতে পাঁচ শ’ বছরের পথের দূরত্বে অবস্থিত। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ এমন যিনি সাতটি আসমান সৃষ্টি করেছেন এবং অনুরূপ সংখ্যক যমীনও রয়েছে।” (৬৫: ১২)। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, সাতটি আকাশ এবং ওগুলির মাঝে যা কিছু রয়েছে সেগুলি কুরসীর তুলনায় এইরূপ যেইরূপ কোন প্রশস্ত ও বিরাট ময়দানে কোন একটা বৃত্ত। আর কুরসী আর্‌শের তুলনায় তদ্রুপ। আর্‌শের পরিমাপ মহা মহিমান্বিত আল্লাহ ছাড়া আর কারো জানা নেই। পূর্ববর্তী কোন কোন গুরুজনের বর্ণনা রয়েছে যে, আর্‌শ হতে যমীনের দূরত্ব পঞ্চাশ হাজার বছরের পথ।কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, আকাশের স্তম্ভ রয়েছে বটে, কিন্তু তা দেখা যায় না। কিন্তু আইয়াস ইবনু মুআ’বিয়া (রঃ) বলেন, আসমান যমীনের উপর গম্বুজের ন্যায় রয়েছে। অর্থাৎ তাতে কোন স্তম্ভ নেই। এই উক্তিটিই কুরআন কারীমের বাকরীতিরও যোগ্য বটে। এবং (আরবি) (২২: ৪ ৬৫) এই আয়াত দ্বারাও এটাই প্রতীয়মান হয়। সুতরাং (আরবি) এই কথা দ্বারা আকাশে স্তম্ভ না থাকার প্রতিই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আসমান বিনা স্তম্ভে এই পরিমাণ উঁচুতে রয়েছে এবং তোমরা তা স্বচক্ষে অবলোকন করছে। এটা হচ্ছে মহামহিমান্বিত আল্লাহর ব্যাপক ক্ষমতারই একটি নিদর্শন। উমাইয়া ইবনু সালাতের নিম্নের কবিতায় রয়েছে, যার কবিতা সম্পর্কে হাদীসে আছে, “তার কবিতা ঈমান এনেছে এবং তার অন্তর কুফরী করছে” আবার একথা ও বলা হয়েছে যে, এগুলি হচ্ছে হযরত যায়েদ ইবনু আমর ইবনু নুফাইলের (রাঃ) কবিতা। কবিতাগুলি নিম্নরূপঃ (আরবি)অর্থাৎ “আপনি সেই আল্লাহ যিনি স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহে স্বীয় নবী মূসাকে (আঃ) হারুণ (আঃ) সহ রাসূল করে ফিরাউনের নিকট পাঠিয়েছিলেন। আপনি তাদেরকে বলেছিলেনঃ “তোমরা যাও এবং অবাধ্য ফিরাউনকে আল্লাহর দিকে আহবান করো এবং তাকে বললাঃ তুমি কি এই উঁচু আকাশকে বিনা স্তম্ভে নির্মাণ করেছো? তাতে সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি কি তুমিই সৃষ্টি করেছো? আর মাটি হতে ফসল উৎপাদনকারী এবং গাছে ফল সৃষ্টিকারী কি তুমি? ব্যাপক ক্ষমতাবান আল্লাহ তাআ’লার এই বিরাট বিরাট নিদর্শনাবলী কি গভীরভাবে চিন্তাকারী মানুষের জন্যে তার অস্তিত্বের দলীল নয়?” ‘অতঃপর আল্লাহ আর্‌শের উপর সমাসীন হলেন’ এর তাফসীর সুরায়ে আরাফে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি যেভাবে আছেন সে ভাবেই থাকবেন। অবস্থা, তুলনা, সাদৃশ্য ইত্যাদি থেকে আল্লাহর সত্ত্বা পবিত্র ও বহু উর্ধ্বে। সূর্য ও চন্দ্র তাঁরই নির্দেশক্রমে আবর্তিত হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময় অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত এরূপ ভাবেই আবর্তিত হতে থাকবে। যেমন-আল্লাহ পাকের উক্তিঃ ‘প্রত্যেকে নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত আবর্তন করে।’ বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ এ দু'টো এদের শেষ সময় পর্যন্ত অর্থাৎ কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকবে। যেমন আল্লাহ তাআ’লা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সূর্য ভ্রমণ করে ওর নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে।” (৩৬: ৩৮) বলা হয়েছে যে, নির্দিষ্ট গন্তব্য দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আর্‌শের নীচে যা যমীনের নিম্নদেশের সাথে অন্য দিক থেকে মিলিত আছে। এটা এবং সমস্ত তারকা এখান পর্যন্ত পৌঁছে আর্‌শ থেকে আরো দূরে হয়ে যায়। কেননা, সঠিক কথা, যার উপর বহু দলীল প্রমাণ রয়েছে তা এই যে, ওটা গম্বুজ। পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত অবশিষ্ট আসমানের মতো ওটা পরিবেষ্টনকারী। কেননা ওর পায়া আছে এবং ওকে বহনকারী রয়েছেন। ঘূর্ণায়মান আকাশের ব্যাপারে এটা কল্পনায় আসতে পারে না। যে কেউই চিন্তা গবেষণা করবে সেই এটাকে সত্য বলে মেনে নেবে। কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান যাদের রয়েছে তাঁরা এই ফলাফলেই পৌঁছবেন। আল্লাহ তাআ’লার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা।এখানে শুধুমাত্র সূর্য ও চন্দ্রের উল্লেখ করার কারণ এই যে, চলমান ৭ (সাতটি) গ্রহের মধ্যে এ দুটোই বড় ও উজ্জ্বল। সুতরাং এ দুটোই যখন নিয়মাধীন তখন অন্যগুলো তো নিয়মাধীন হওয়া স্বাভাবিক। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘তোমরা সূর্য ও চন্দ্রকে সিজদা করো না। এর দ্বারা মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তোমরা অন্যান্য নক্ষত্রগুলোকেও সিজদা করো না। অন্য জায়গায় বিস্তারিত ভাবেও রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি তাঁর হুকুমের বাধ্য। সৃষ্টি ও হুকুম তাঁরই, তিনিই কল্যাণময় এবং তিনিই বিশ্বপ্রতিপালক।” (৭ :৫৪)। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “তিনি নিদর্শন সমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাস করতে পার।' অর্থাৎ মানুষ যেন এ সব নির্দশন দেখে নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করতে পারে যে, আল্লাহ তাআ’লা তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়ার পর পুনরায় জীবিত করবেন এবং তাঁর কাছে তাদেরকে একত্রিত করা হবে।

আর-রাদ 13:3

৩-৪ নং আয়াতের তাফসীর উর্ধ্বজগতের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআ’লা এখানে নিম্ন জগতের বর্ণনা দিয়েছেন। যমীনকে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বিস্তৃত করে আল্লাহ তাআ’লাই এটাকে বিছিয়ে দিয়েছেন। এতে দৃঢ় পাহাড় তিনিই স্থাপন করেছেন। এতে নদ-নদী ও প্রস্রবণ তিনিই প্রবাহিত করেছেন। এর ফলে বিভিন্ন আকারের বিভিন্ন রং এর এবং বিভিন্ন স্বাদের ফল মূলের বৃক্ষাদি সিঞ্চিত হয়ে থাকে। জোড়ায় জোড়ায় ফলমূল তিনিই সৃষ্টি করেছেন। ওগুলির মধ্যে কোনটি মিষ্টি এবং কোনটি টক। দিবস ও রজনী পর্যায়ক্রমে আসা যাওয়া করছে। একটির আগমন ঘটছে এবং অপরটির প্রস্থান হচ্ছে। এইসব ব্যবস্থাপনা সেই ব্যাপক ক্ষমতাবান আল্লাহর দ্বারাই হচ্ছে। আল্লাহ তাআ’লার এইসব নিদর্শন, নিপুণতা এবং প্রমাণাদির উপর যে ব্যক্তি চিন্তাপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে সে অবশ্যই সুপথ প্রাপ্ত হবে। যমীনের খণ্ডগুলি মিলিতভাবে রয়েছে। মহান আল্লাহর শক্তি দেখে বিস্মিত হতে হয় যে, পৃথিবীর এক খণ্ডে প্রচুর ফসল উৎপাদিত হয়, আবার আর একখণ্ডে কিছুই জন্মে না। কোন জায়গার মাটি লাল, কোন জায়গার মাটি সাদা, কোন মাটি কালো, কোনটি কংকরময়, কোনটা নরম, কোনটা শক্ত, কোনটা মিষ্টি, কোনটা তিক্ত, কোনটা বালুকাময় এবং কোনটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মোট কথা, এটাও সৃষ্টিকর্তার মহা শক্তির নিদর্শন, যা বলে দিচ্ছে যে, কার্য্য সম্পাদনকারী, স্বেচ্ছাচারী এবং সারা বিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি হচ্ছেন সেই একক, অদ্বিতীয় এবং অংশীবিহীন আল্লাহ। তিনিই হচ্ছেন সবকিছুরই সৃষ্টিকর্তা। তিনি ছাড়া অন্য কেউ মা'বুদ নেই এবং কোন প্রতিপালকও নেই।(আরবি) শব্দদ্বয়কে যদি (আরবি) শব্দের উপর বা সংযোগ ধরা হয় তবে পেশ দিয়ে পড়তে হবে। আর যদি (আরবি) শব্দের উপর সংযোগ ধরা হয় তবে (আরবি) ধরে যের দিয়ে পড়তে হবে। ইমামদের দল দু’ভাবেই পড়েছেন। (আরবি) বলা হয় ঐ গাছকে যার কয়েকটি গুঁড়ি ও শাখা হয়। যেমন ডালিম ডুমুর, এবং কোন কোন খেজুর গাছ। (আরবি) বলা হয় ঐ গাছকে যা এইরূপ হয় না বরং যার একটি মাত্র গুঁড়ি থাকে। এর থেকেই চাচাকে (আরবি) বলা হয়। হাদীসেও এটা এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমারকে (রাঃ) বলেনঃ “তোমার কি জানা নেই যে, চাচা পিতার মতই।”হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একটি মূল অর্থাৎ একটি গুঁড়ির মধ্যে কয়েকটি শাখা বিশিষ্ট খেজুরের গাছ থাকে, আবার একটি গুঁড়িতে একটিই থাকে। এটাই হচ্ছে (আরবি) ও (আরবি)। অন্যান্য গুরুজনদেরও এটাই উক্তি। সবগুলির জন্যে একই পানি। অর্থাৎ বর্ষার পানি। অথচ স্বাদের দিক দিয়ে এবং ছোট ও বড় হওয়ার দিক থেকে ফলের মধ্যে বড়ই পার্থক্য রয়েছে। কোনটা মিষ্টি ও কোনটা টক। জামে তিরমিযীর হাদীসেও এই ব্যাখ্যা রয়েছে। মোট কথা, বিভিন্ন দিক দিয়ে পার্থক্য আছে। যেমন প্রকারে পার্থক্য, রকমে পার্থক্য, রং এ পার্থক্য, গন্ধে পার্থক্য, স্বাদে পার্থক্য, পাতায় পার্থক্য এবং তরুতাজায় পার্থক্য। কোনটা অতি মিষ্টি এবং কোনটা অতি তিক্ত। কোনটি খুবই সুস্বাদু, আবার কোনটি অত্যন্ত বিস্বাদ। রং-এও পার্থক্য রয়েছে। কোনটা লাল, কোনটা সাদা এবং কোনটা কালো। অনুরূপভাবে সতেজতার দিক দিয়েও পার্থক্য রয়েছে। অথচ খাদ্য হিসেবে সবই এক। ব্যাপক ক্ষমতাবান আল্লাহ তাআ’লার এগুলি অলৌকিক শক্তি। সুতরাং বোধশক্তি সম্পন্ন লোকের জন্যে এগুলি শিক্ষণীয় বিষয়। এগুলি স্বেচ্ছাচারী আল্লাহ তাআ’লার মহাশক্তির পরিচয় বহন করে এবং এটাই ঘোষণা করে যে, তিনি যা চান তাই হয়। জ্ঞানীদের জন্যে এই নিদর্শনগুলিই যথেষ্ট।

আর-রাদ 13:4

৩-৪ নং আয়াতের তাফসীর উর্ধ্বজগতের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআ’লা এখানে নিম্ন জগতের বর্ণনা দিয়েছেন। যমীনকে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বিস্তৃত করে আল্লাহ তাআ’লাই এটাকে বিছিয়ে দিয়েছেন। এতে দৃঢ় পাহাড় তিনিই স্থাপন করেছেন। এতে নদ-নদী ও প্রস্রবণ তিনিই প্রবাহিত করেছেন। এর ফলে বিভিন্ন আকারের বিভিন্ন রং এর এবং বিভিন্ন স্বাদের ফল মূলের বৃক্ষাদি সিঞ্চিত হয়ে থাকে। জোড়ায় জোড়ায় ফলমূল তিনিই সৃষ্টি করেছেন। ওগুলির মধ্যে কোনটি মিষ্টি এবং কোনটি টক। দিবস ও রজনী পর্যায়ক্রমে আসা যাওয়া করছে। একটির আগমন ঘটছে এবং অপরটির প্রস্থান হচ্ছে। এইসব ব্যবস্থাপনা সেই ব্যাপক ক্ষমতাবান আল্লাহর দ্বারাই হচ্ছে। আল্লাহ তাআ’লার এইসব নিদর্শন, নিপুণতা এবং প্রমাণাদির উপর যে ব্যক্তি চিন্তাপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে সে অবশ্যই সুপথ প্রাপ্ত হবে। যমীনের খণ্ডগুলি মিলিতভাবে রয়েছে। মহান আল্লাহর শক্তি দেখে বিস্মিত হতে হয় যে, পৃথিবীর এক খণ্ডে প্রচুর ফসল উৎপাদিত হয়, আবার আর একখণ্ডে কিছুই জন্মে না। কোন জায়গার মাটি লাল, কোন জায়গার মাটি সাদা, কোন মাটি কালো, কোনটি কংকরময়, কোনটা নরম, কোনটা শক্ত, কোনটা মিষ্টি, কোনটা তিক্ত, কোনটা বালুকাময় এবং কোনটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মোট কথা, এটাও সৃষ্টিকর্তার মহা শক্তির নিদর্শন, যা বলে দিচ্ছে যে, কার্য্য সম্পাদনকারী, স্বেচ্ছাচারী এবং সারা বিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি হচ্ছেন সেই একক, অদ্বিতীয় এবং অংশীবিহীন আল্লাহ। তিনিই হচ্ছেন সবকিছুরই সৃষ্টিকর্তা। তিনি ছাড়া অন্য কেউ মা'বুদ নেই এবং কোন প্রতিপালকও নেই।(আরবি) শব্দদ্বয়কে যদি (আরবি) শব্দের উপর বা সংযোগ ধরা হয় তবে পেশ দিয়ে পড়তে হবে। আর যদি (আরবি) শব্দের উপর সংযোগ ধরা হয় তবে (আরবি) ধরে যের দিয়ে পড়তে হবে। ইমামদের দল দু’ভাবেই পড়েছেন। (আরবি) বলা হয় ঐ গাছকে যার কয়েকটি গুঁড়ি ও শাখা হয়। যেমন ডালিম ডুমুর, এবং কোন কোন খেজুর গাছ। (আরবি) বলা হয় ঐ গাছকে যা এইরূপ হয় না বরং যার একটি মাত্র গুঁড়ি থাকে। এর থেকেই চাচাকে (আরবি) বলা হয়। হাদীসেও এটা এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমারকে (রাঃ) বলেনঃ “তোমার কি জানা নেই যে, চাচা পিতার মতই।”হযরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একটি মূল অর্থাৎ একটি গুঁড়ির মধ্যে কয়েকটি শাখা বিশিষ্ট খেজুরের গাছ থাকে, আবার একটি গুঁড়িতে একটিই থাকে। এটাই হচ্ছে (আরবি) ও (আরবি)। অন্যান্য গুরুজনদেরও এটাই উক্তি। সবগুলির জন্যে একই পানি। অর্থাৎ বর্ষার পানি। অথচ স্বাদের দিক দিয়ে এবং ছোট ও বড় হওয়ার দিক থেকে ফলের মধ্যে বড়ই পার্থক্য রয়েছে। কোনটা মিষ্টি ও কোনটা টক। জামে তিরমিযীর হাদীসেও এই ব্যাখ্যা রয়েছে। মোট কথা, বিভিন্ন দিক দিয়ে পার্থক্য আছে। যেমন প্রকারে পার্থক্য, রকমে পার্থক্য, রং এ পার্থক্য, গন্ধে পার্থক্য, স্বাদে পার্থক্য, পাতায় পার্থক্য এবং তরুতাজায় পার্থক্য। কোনটা অতি মিষ্টি এবং কোনটা অতি তিক্ত। কোনটি খুবই সুস্বাদু, আবার কোনটি অত্যন্ত বিস্বাদ। রং-এও পার্থক্য রয়েছে। কোনটা লাল, কোনটা সাদা এবং কোনটা কালো। অনুরূপভাবে সতেজতার দিক দিয়েও পার্থক্য রয়েছে। অথচ খাদ্য হিসেবে সবই এক। ব্যাপক ক্ষমতাবান আল্লাহ তাআ’লার এগুলি অলৌকিক শক্তি। সুতরাং বোধশক্তি সম্পন্ন লোকের জন্যে এগুলি শিক্ষণীয় বিষয়। এগুলি স্বেচ্ছাচারী আল্লাহ তাআ’লার মহাশক্তির পরিচয় বহন করে এবং এটাই ঘোষণা করে যে, তিনি যা চান তাই হয়। জ্ঞানীদের জন্যে এই নিদর্শনগুলিই যথেষ্ট।

আর-রাদ 13:5

আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় রাসূল মুহাম্মদকে (সঃ) বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! এই কাফিররা যে তোমাকে মিথ্যাবাদী বলছে ও অবিশ্বাস করছে এতে তোমার বিস্মিত হবার কিছু নেই। এদের স্বভাব ও আচরণ এইরূপই যে, তারা এতো এতো নিদর্শন দেখছে, আল্লাহর বিরাট ক্ষমতার প্রমাণ তারা প্রত্যক্ষ করছে এবং এটা স্বীকারও করছে যে, সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ, এতদসত্বেও তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করে বসছে। তারা স্বচক্ষে দেখছে যে, দুনিয়ায় যা কিছু ঘটছে আল্লাহর হুকুমেই ঘটছে, তথাপি তারা ঈমান আনছে না। প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তিই এটা জানতে সক্ষম যে, যমীন ও আসমানের সৃষ্টি মানুষের সৃষ্টি অপেক্ষা বহুগুণে গুরুত্বপূর্ণ এবং দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা প্রথমবার সৃষ্টি করা অপেক্ষা অনেক সহজ। যেমন আল্লাহ তাআ’লা এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা কি দেখে নাই যে, সেই আল্লাহ যিনি আকাশসমুহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন অথচ তিনি ক্লান্ত হননি, তিনি কি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম নন? হ্যাঁ নিশ্চয়ই তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান।” (৪৬: ৩৩) তাই আল্লাহ তাআ’লা বর্ণনা করছেন যে, এরা কাফির। কিয়ামতের দিন তাদের গ্রীবাদেশে শৃঙ্খল থাকবে। তারা নরকবাসী। তারা নরকে চিরকাল অবস্থান করবে।

আর-রাদ 13:6

আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় রাসূলকে (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতকে অস্বীকারকারীরা তোমাকে বলছেঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি যদি তোমার কথায় সত্যবাদী হও তবে আমাদের উপর আল্লাহর শান্তি আনয়ন করছে না কেন? যেমন আল্লাহ তাআ’লা তাদের সম্পর্কে খবর দিয়েছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা বলেঃ হে সেই ব্যক্তি, যে দাবী করছো যে, তোমার উপর আল্লাহর যিকর অবতীর্ণ করা হয়, নিশ্চয় তুমি তো পাগল। যদি তুমি সত্যবাদীও হও তবে তুমি আমাদের কাছে আযাবের ফেরেশতাকে আনছো না কেন? (এর উত্তরে তাদেরকে বলা হয়) ফেরেশতাদেরকে আমি সত্য ও ফায়সালার সাথেই অবতীর্ণ করে থাকি, যখন তারা এসেই পড়বে তখন তাদেরকে (তাওবা’ করার ও ঈমান আনয়নের) বিন্দুমাত্র অবকাশ দেয়া হবে না।” (১৫: ৬-৮) আল্লাহ তাআ’লা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) (২৯:৫৩) (দু’আয়াত পর্যন্ত)। আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এক ব্যক্তি চাইলো সংঘটিত হোক শাস্তি যা অবধারিত।” (৭০ :১) অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা ঈমান আনয়ন করে না তারা ওটাকে (শাস্তিকে) তাড়াতাড়ি চাচ্ছে, আর যারা ঈমান এনেছে তারা এটাকে ভয় করছে এবং ওটাকে সত্য বলে জানছে।” (৪২ :১৮) আরো এক জায়গায় বলেছেনঃ “তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের শাস্তি ও হিসেবের ব্যবস্থা তাড়াতাড়ি করুন।” আর এক স্থানে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা বলতো: হে আল্লাহ! যদি এটা আপনার পক্ষ থেকে সত্য হয় তবে আমাদের উপর আকাশ হতে পাথর বর্ষণ করুন অথবা অন্য কোন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নাযিল করুন।” (৮:৩২) ভাবার্থ এই যে, কুফরী ও অস্বীকারের কারণে আল্লাহর শান্তি নেমে আসা অসম্ভব মনে করে এতে তারা নির্ভয় হয়ে যায় যে, শাস্তি নেমে আসার তারা আকাঙ্খ করে বসে। এখানে বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাদের পূর্ববর্তী এইরূপ লোকদের দৃষ্টান্ত তাদের সামনে রয়েছে। তারা আল্লাহর অবাধ্য হয়েছিল বলে তাদেরকে তাঁর আযাবের দ্বারা পাকড়াও করা হয়। এটা আল্লাহ তাআ’লার দয়া ও সহিষ্ণুতা যে, তিনি পাপকার্য করতে দেখেন অথচ সাথে সাথে পাকড়াও করেন না। নতূবা ভূ-পৃষ্ঠে কাউকেও তিনি চলতে ফিরতে দিতেন না। দিনরাত তিনি পাপ করতে দেখছেন এবং ক্ষমা করে দিচ্ছেন। কিন্তু তাঁর আযাবও বড় বিপজ্জনক, অত্যন্ত কঠিন এবং বড়ই যন্ত্রণাদায়ক। আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে তুমি বলে দাও তোমাদের প্রতিপালক বড়ই করুণাময়, আর তার শাস্তি পাপাচারী কওম হতে ফিরানো হয় না।” (৬: ১৪৭) আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক তাড়াতাড়ি হিসাব গ্রহণকারী এবং নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু”। (৬: ১৬৫) আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমার বান্দাদেরকে খবর দিয়ে দাও যে, নিশ্চয় আমি ক্ষমাশীল, দয়ালু আর নিশ্চয় আমার শাস্তি হচ্ছে বড়ই যন্ত্রণাদায়ক।” (১৫: ৪৯-৫০) এ ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যাতে একই সাথে আশা প্রদান ও ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে।হযরত সাঈদ ইবনু মুসাইয়াব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, যখন (আরবি) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি আল্লাহ তাআ’লা বান্দাকে ক্ষমা না করতেন তবে কেউই জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করতে পারতো না এবং যদি তিনি ধমক ও শাস্তি প্রদান না করতেন তবে বান্দা অত্যাচার ও সীমালংঘনের কাজে লিপ্ত হয়ে পড়তো।” (এ হাদীসটি ইবনু আবি হা’তিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান ইবনু উসমান আবু হাসান রামাদী (মক্কী নুসখাতে যিয়াদী রয়েছে) স্বপ্নে মহামহিমান্বিত আল্লাহর দর্শন লাভ করেন। তিনি দেখেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তাআ’লার সামনে দাঁড়িয়ে তার একজন উম্মতের জন্যে সুপারিশ করছেন। তখন আল্লাহ তাআ’লা তাকে বলেনঃ “তোমাদের জন্যে কি সুরায়ে রাদ এর (আরবি) এ আয়াতটি যথেষ্ট নয়?” হযরত আবু হাসান (রাঃ) বলেনঃ “এরপর আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি।” (এটা হা-ফিজ ইবনু আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আর-রাদ 13:7

মুশরিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআ’লা বলছেনঃ তারা অবাধ্যতা ও একগুঁয়েমী ভাব নিয়ে বলেঃ পূর্ববর্তী নবীগণ যেমনভাবে মু'জিযা নিয়ে এসেছিলেন তেমনিভাবে এই নবী অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কোন মু’জিযা নিয়ে আগমন করেন নাই কেন? যেমন সাফা পাহাড়কে সোনা বানিয়ে দেয়া, আরবের পাহাড়কে ওখান থেকে সরিয়ে ফেলা, আরব ভূমি সবুজ শ্যামল করে তোলা, এখানে নদী প্রবাহিত করা ইত্যাদি। তাদের এ কথার উত্তরে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ মু’জিযা’ প্রেরণ করা হতে আমাকে এ জিনিসই বিরত রেখেছে যে, পুর্ববর্তীরা তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল।” মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি মুশরিকদের এসব কথায় মোটেই দুঃখিত ও চিন্তিত হয়ো না। তোমার দায়িত্ব শুধু পৌঁছিয়ে দেয়া। তুমি হিদায়াতকারী নও। তারা না মানলে তোমাকে পাকড়াও করা হবে না। হিদায়াত করার হাত আল্লাহ তাআ’লার। এ কাজ তোমার ক্ষমতার বাইরে। প্রত্যেক কওমের জন্যেই পথ প্রদর্শক ও আহবানকারী রয়েছে।’ অথবা ভাবার্থ হবেঃ ‘হিদায়াতকারী আমি এবং ভয় প্রদর্শনকারী তুমি।' অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে ভয় প্রদর্শনকারী অতিবাহিত হয়েছেন।” (৩৫:২৪) এখানে (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে নবী। সুতরাং প্রত্যেক দলের মধ্যেই পথ প্রদর্শক থাকেন। তাঁর ইলম ও আমল দ্বারা অন্যান্যেরা পথ পেয়ে থাকে। এই উম্মতের পথ প্রদর্শক হচ্ছেন হয়রত মুহাম্মদ (সঃ)। একটি অত্যন্ত অস্বীকৃত রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় বক্ষে হাত রেখে বলেনঃ “ভয় প্রদর্শনকারী আমি এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের একজন হাদী বা পথ প্রদর্শক রয়েছে।” ঐ সময় তিনি হযরত আলীর (রাঃ) স্কন্ধের দিকে ইঙ্গিত করে বলেনঃ “হে আলী (রাঃ)! তুমি হাদী। আমার পরে তোমার দ্বারা মানুষ হিদায়াত প্রাপ্ত হবে।” (এ হাদীসটি আবু জাফর ইবনু জারীর (রাঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং এতে ভীষণ অস্বীকৃতি রয়েছে)হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এখানে ‘হাদী’ দ্বারা কুরায়েশের একজন লোককে বুঝানো হয়েছে। হযরত জুনাইদ (রাঃ) বলেন যে, লোকটি হচ্ছেন স্বয়ং হযরত আলী (রাঃ)। ইবনু জারীর (রঃ) হযরত আলীর (রাঃ) হাদী হওয়ার কথা বর্ণনা করেছেন। (কিন্তু এতেও কঠিন নাকারাত বা অস্বীকৃতি রয়েছে)

আর-রাদ 13:8

৮-৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, কোন জিনিসই তাঁর অগোচরে নেই। সমস্ত মাদীরা, স্ত্রী লিঙ্গ জন্তুই হোক অথবা মানুষই হোক, ওদের পেটের বা গর্ভের বাচ্চা সম্পর্কে জ্ঞান বা অবগতি আল্লাহ তাআ’লার রয়েছে। পেটে কি আছে তা তিনি ভালরূপেই জানেন। অর্থাৎ পুংলিঙ্গ কি স্ত্রী লিঙ্গ, ভাল কি মন্দ, বেশী বয়স পাবে কি কম বয়স পাবে এ সব খবর তিনি রাখেন। যেমন ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনি ভালরূপেই জানেন যখন তিনি তোমাদেরকে যমীন হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যখন তোমাদের মাতাদের পেটে লুকায়িত থাকো (শেষ পর্যন্ত)।” (৫৩: ৩২) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের পেটে সৃষ্টি করেন, এক সৃষ্টির পরে আর এক সৃষ্টি, তিন অন্ধকারের মধ্যে (শেষ পর্যন্ত)।” (৩৯: ৬) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান হতে। অতঃপর আমি ওকে শুক্র বিন্দু রূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে। পরে আমি শুক্র বিন্দুকে পরিণত করি রক্ত পিন্ডে, অতঃপর রক্ত পিন্ডকে পরিণত করি মাংস পিন্ডে এবং মাংস পিন্ডকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে, অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দিই গোশত দ্বারা, অবশেষে ওকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্ঠি রূপে; অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান।” (২৩:১২-১৪) হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত জমা হতে থাকে। অতঃপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত ওটা জমাট রক্তের আকারে থাকে। তারপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত ওটা মাংস পিন্ড রূপে থাকে। এরপর আল্লাহ তাআ’লা একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন, যাকে চারটি কথা লিখে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ওগুলি হচ্ছেঃ তার রিয্‌ক, তার বয়স, এবং তার ভাল ও মন্দ হওয়া।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য হাদীসে আছে যে, ঐ সময় ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! সে নর হবে, না নারী হবে? হতভাগ্য হবে, না সৌভাগ্যবান। হবে? তার জীবিকা কি হবে? তার বয়স কত হবে?” আল্লাহ তাআ’লা তখন বলে দেন এবং তিনি লিখে নেন। হযরত ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অদৃশ্যের পাঁচটি চাবী রয়েছে যা আল্লাহ ছাড়া কেউই জানে না। (১) আগামীকল্যের খবর আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ অবগত নয়। (২) জরায়ুতে যা কিছু কমে তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। (৩) বৃষ্টি কখন হবে তার অবগতিও শুধুমাত্র আল্লাহরই আছে। (৪) কে কোথায় মারা যাবে এ খবরও আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এবং (৫) কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে এ খবরও একমাত্র আল্লাহই রাখেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ‘জরায়ুতে যা কিছু কমে’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে গর্ভ পড়ে যাওয়া। আর ‘জরায়ুতে যা কিছু বাড়ে’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ কিভাবে তা পূর্ণ হয় এ খবরও আল্লাহ তাআ’লাই রাখেন। দেখা যায় যে, কোন কোন নারী গর্ভ ধারণ করে থাকে পূর্ণ দশ মাস। আবার কেউ ধারণ করেন ন'মাস। কারো গর্ভ বাড়ে এবং কারো কমে। ন'মাস থেকে কমে যাওয়া এবং নমাস থেকে বেড়ে যাওয়া আল্লাহ তাআ’লার অবগতিতে রয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) বলেনঃ “আমি দু’বছর মায়ের পেটে থেকেছি। আমি যখন ভূমিষ্ঠ হই তখন আমার সামনে দু’টি দাঁত বেরিয়ে পড়েছিল।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, গর্ভধারণের শেষ সময়কাল হচ্ছে দু’বছর। কমে যাওয়া দ্বারা কারো কারো মতে উদ্দেশ্য হচ্ছে গর্ভধারণের সময়কালের মধ্যে রক্ত আসা। আর বেড়ে যাওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে গর্ভধারণের সময়কাল ন'মাসের বেশী হওয়া। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ন’মাসের পূর্বে যদি স্ত্রীলোক রক্ত দেখে তবে গর্ভ ন'মাস ছাড়িয়ে যায় হায়েযের সময়কালের মত। রক্ত ঝরলে শিশু ভাল হয় এবং রক্ত না ঝরলে শিশু পূর্ণ ও বড় হয়। হযরত মাকহুল (রঃ) বলেনঃ “মায়ের পেটে শিশু সম্পূর্ণরূপে শান্তি ও আরামে থাকে। তার কোনই কষ্ট হয় না। তার মায়ের হায়েযের রক্ত তার খাদ্য হয়ে থাকে। তা অতি সহজে তার কাছে পৌঁছে থাকে। এ কারণেই গর্ভ ধারণের সময়কালে মায়ের হায়েয বা ঋতু হয় না। যখন সন্তান ভূমিষ্টি হয় তখন মাটিতে পড়া মাত্রই চীৎকার করে ওঠে। ঐ অপরিচিত জায়গায় সে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। যখন তার নাভি কেটে দেয়া হয় তখন তার খাদ্য আল্লাহ তাআ’লা তার মায়ের বক্ষে পৌঁছিয়ে দেন। তখনও বিনা সন্ধানে, বিনা চাওয়ায়, বিনা কষ্টে এবং বিনা চিন্তায় সে খাদ্য পেয়ে থাকে। তারপর কিছুটা বড় হলে সে নিজের হাতে পানাহার করতে শুরু করে। কিন্তু বালেগ হওয়া মাত্রই জীবিকার জন্যে সে হা-হুতাশ করতে থাকে। মরে যাওয়া এবং নিহত হওয়া পর্যন্ত রুযী লাভের সম্ভাবনা থাকলে তখনও তাতে সে কোন দ্বিধাবোধ করে না। আফসোস। হে বনি আদম (আঃ)! তোমাকে দেখে বিস্মিত হতে হয়! যিনি তোমাকে তোমার মায়ের পেটে আহার্য দিলেন, যিনি তোমাকে তোমার মায়ের কোলে আহার্য দিলেন, যিনি তোমাকে তোমার বয়োঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত খেতে দিলেন, এখন তুমি বয়োঃপ্রাপ্ত ও বুদ্ধিমান হয়ে (তাকে ভুলে গেলে এবং) বলতে শুরু করলেঃ হায়! কোথা থেকে খেতে পাবো? আমার মরণ হোক বা আমি নিহত হই।” অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন (আরবি) (এবং তাঁর বিধানে প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে)। এ সম্পর্কে কাতাদা’ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাঁর বিধানে প্রত্যেকেরই অয়ু, রিযক ইত্যাদি নির্ধারিত রয়েছে।সহীহ হাদীসে আছে যে, নবীর (সঃ) এক কন্যা তাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে খবর দেন যে, তাঁর এক ছেলে মৃত্যু শিয়রে দণ্ডায়মান। সুতরাং তিনি তাঁর উপস্থিতি কামনা করেন। এ খবর শুনে নবী (সঃ) তাঁর মেয়ের কাছে সংবাদ পাঠানঃ “আল্লাহ যা গ্রহণ করেন তা তাঁরই। তাঁর কাছে প্রত্যেক বস্তুরই একটা নির্দিষ্ট সময় রয়েছে।” (অতঃপর তিনি জনগণকে বলেনঃ) “তোমরা তাকে নির্দেশ দাও যে, সে যেন ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা রাখে।”আল্লাহ তাআ’লা ঐ সব কিছুই জানেন যা তাঁর বান্দাদের থেকে গোপনীয় রয়েছে এবং যা তাদের কাছে প্রকাশমান আছে। তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নেই। তিনি সর্বাপেক্ষা বড়। তিনি সবচেয়ে উচ্চ। সবকিছুই তাঁর অবগতিতে রয়েছে। সমস্ত মাখলুক তার কাছে বিনীত ও অবনত। এটা ইচ্ছায়ই হোক বা বাধ্য হয়েই হোক।

আর-রাদ 13:9

৮-৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, কোন জিনিসই তাঁর অগোচরে নেই। সমস্ত মাদীরা, স্ত্রী লিঙ্গ জন্তুই হোক অথবা মানুষই হোক, ওদের পেটের বা গর্ভের বাচ্চা সম্পর্কে জ্ঞান বা অবগতি আল্লাহ তাআ’লার রয়েছে। পেটে কি আছে তা তিনি ভালরূপেই জানেন। অর্থাৎ পুংলিঙ্গ কি স্ত্রী লিঙ্গ, ভাল কি মন্দ, বেশী বয়স পাবে কি কম বয়স পাবে এ সব খবর তিনি রাখেন। যেমন ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনি ভালরূপেই জানেন যখন তিনি তোমাদেরকে যমীন হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যখন তোমাদের মাতাদের পেটে লুকায়িত থাকো (শেষ পর্যন্ত)।” (৫৩: ৩২) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের পেটে সৃষ্টি করেন, এক সৃষ্টির পরে আর এক সৃষ্টি, তিন অন্ধকারের মধ্যে (শেষ পর্যন্ত)।” (৩৯: ৬) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান হতে। অতঃপর আমি ওকে শুক্র বিন্দু রূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে। পরে আমি শুক্র বিন্দুকে পরিণত করি রক্ত পিন্ডে, অতঃপর রক্ত পিন্ডকে পরিণত করি মাংস পিন্ডে এবং মাংস পিন্ডকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে, অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দিই গোশত দ্বারা, অবশেষে ওকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্ঠি রূপে; অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান।” (২৩:১২-১৪) হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত জমা হতে থাকে। অতঃপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত ওটা জমাট রক্তের আকারে থাকে। তারপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত ওটা মাংস পিন্ড রূপে থাকে। এরপর আল্লাহ তাআ’লা একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন, যাকে চারটি কথা লিখে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ওগুলি হচ্ছেঃ তার রিয্‌ক, তার বয়স, এবং তার ভাল ও মন্দ হওয়া।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য হাদীসে আছে যে, ঐ সময় ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! সে নর হবে, না নারী হবে? হতভাগ্য হবে, না সৌভাগ্যবান। হবে? তার জীবিকা কি হবে? তার বয়স কত হবে?” আল্লাহ তাআ’লা তখন বলে দেন এবং তিনি লিখে নেন। হযরত ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অদৃশ্যের পাঁচটি চাবী রয়েছে যা আল্লাহ ছাড়া কেউই জানে না। (১) আগামীকল্যের খবর আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ অবগত নয়। (২) জরায়ুতে যা কিছু কমে তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। (৩) বৃষ্টি কখন হবে তার অবগতিও শুধুমাত্র আল্লাহরই আছে। (৪) কে কোথায় মারা যাবে এ খবরও আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এবং (৫) কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে এ খবরও একমাত্র আল্লাহই রাখেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ‘জরায়ুতে যা কিছু কমে’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে গর্ভ পড়ে যাওয়া। আর ‘জরায়ুতে যা কিছু বাড়ে’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ কিভাবে তা পূর্ণ হয় এ খবরও আল্লাহ তাআ’লাই রাখেন। দেখা যায় যে, কোন কোন নারী গর্ভ ধারণ করে থাকে পূর্ণ দশ মাস। আবার কেউ ধারণ করেন ন'মাস। কারো গর্ভ বাড়ে এবং কারো কমে। ন'মাস থেকে কমে যাওয়া এবং নমাস থেকে বেড়ে যাওয়া আল্লাহ তাআ’লার অবগতিতে রয়েছে। হযরত যহহাক (রঃ) বলেনঃ “আমি দু’বছর মায়ের পেটে থেকেছি। আমি যখন ভূমিষ্ঠ হই তখন আমার সামনে দু’টি দাঁত বেরিয়ে পড়েছিল।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, গর্ভধারণের শেষ সময়কাল হচ্ছে দু’বছর। কমে যাওয়া দ্বারা কারো কারো মতে উদ্দেশ্য হচ্ছে গর্ভধারণের সময়কালের মধ্যে রক্ত আসা। আর বেড়ে যাওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে গর্ভধারণের সময়কাল ন'মাসের বেশী হওয়া। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ন’মাসের পূর্বে যদি স্ত্রীলোক রক্ত দেখে তবে গর্ভ ন'মাস ছাড়িয়ে যায় হায়েযের সময়কালের মত। রক্ত ঝরলে শিশু ভাল হয় এবং রক্ত না ঝরলে শিশু পূর্ণ ও বড় হয়। হযরত মাকহুল (রঃ) বলেনঃ “মায়ের পেটে শিশু সম্পূর্ণরূপে শান্তি ও আরামে থাকে। তার কোনই কষ্ট হয় না। তার মায়ের হায়েযের রক্ত তার খাদ্য হয়ে থাকে। তা অতি সহজে তার কাছে পৌঁছে থাকে। এ কারণেই গর্ভ ধারণের সময়কালে মায়ের হায়েয বা ঋতু হয় না। যখন সন্তান ভূমিষ্টি হয় তখন মাটিতে পড়া মাত্রই চীৎকার করে ওঠে। ঐ অপরিচিত জায়গায় সে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। যখন তার নাভি কেটে দেয়া হয় তখন তার খাদ্য আল্লাহ তাআ’লা তার মায়ের বক্ষে পৌঁছিয়ে দেন। তখনও বিনা সন্ধানে, বিনা চাওয়ায়, বিনা কষ্টে এবং বিনা চিন্তায় সে খাদ্য পেয়ে থাকে। তারপর কিছুটা বড় হলে সে নিজের হাতে পানাহার করতে শুরু করে। কিন্তু বালেগ হওয়া মাত্রই জীবিকার জন্যে সে হা-হুতাশ করতে থাকে। মরে যাওয়া এবং নিহত হওয়া পর্যন্ত রুযী লাভের সম্ভাবনা থাকলে তখনও তাতে সে কোন দ্বিধাবোধ করে না। আফসোস। হে বনি আদম (আঃ)! তোমাকে দেখে বিস্মিত হতে হয়! যিনি তোমাকে তোমার মায়ের পেটে আহার্য দিলেন, যিনি তোমাকে তোমার মায়ের কোলে আহার্য দিলেন, যিনি তোমাকে তোমার বয়োঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত খেতে দিলেন, এখন তুমি বয়োঃপ্রাপ্ত ও বুদ্ধিমান হয়ে (তাকে ভুলে গেলে এবং) বলতে শুরু করলেঃ হায়! কোথা থেকে খেতে পাবো? আমার মরণ হোক বা আমি নিহত হই।” অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন (আরবি) (এবং তাঁর বিধানে প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে)। এ সম্পর্কে কাতাদা’ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাঁর বিধানে প্রত্যেকেরই অয়ু, রিযক ইত্যাদি নির্ধারিত রয়েছে।সহীহ হাদীসে আছে যে, নবীর (সঃ) এক কন্যা তাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে খবর দেন যে, তাঁর এক ছেলে মৃত্যু শিয়রে দণ্ডায়মান। সুতরাং তিনি তাঁর উপস্থিতি কামনা করেন। এ খবর শুনে নবী (সঃ) তাঁর মেয়ের কাছে সংবাদ পাঠানঃ “আল্লাহ যা গ্রহণ করেন তা তাঁরই। তাঁর কাছে প্রত্যেক বস্তুরই একটা নির্দিষ্ট সময় রয়েছে।” (অতঃপর তিনি জনগণকে বলেনঃ) “তোমরা তাকে নির্দেশ দাও যে, সে যেন ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা রাখে।”আল্লাহ তাআ’লা ঐ সব কিছুই জানেন যা তাঁর বান্দাদের থেকে গোপনীয় রয়েছে এবং যা তাদের কাছে প্রকাশমান আছে। তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নেই। তিনি সর্বাপেক্ষা বড়। তিনি সবচেয়ে উচ্চ। সবকিছুই তাঁর অবগতিতে রয়েছে। সমস্ত মাখলুক তার কাছে বিনীত ও অবনত। এটা ইচ্ছায়ই হোক বা বাধ্য হয়েই হোক।

আর-রাদ 13:10

১০-১১ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর জ্ঞান সমস্ত মাখলুককে ঘিরে রয়েছে। কোন জিনিসই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নেই। তিনি নিম্ন ও উচ্চ শব্দ শুনতে পান। তিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব কিছুই জানেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি যদি কথাকে প্রকাশ কর তবে জেনে রেখোঁরেখো যে, তিনি (ওটা তো জানতে পারেনই, এমন কি) অতি গোপনীয় কথাও জানেন।” (২০: ৭)আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যা কিছু গোপন কর এবং যা কিছু প্রকাশ কর তিনি তা জানেন।” (২৭: ২৫)হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “ঐ আল্লাহ পবিত্র যাঁর শ্রবণ সমস্ত শব্দকে ঘিরে রয়েছে। আল্লাহর শপথ! নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী একজন মহিলা রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট আগমন করে তাঁর সাথে এমন আস্তে আস্তে কথা বলে যে, আমি পার্শ্বেই অথচ ভালরূপে তার কথা আমার কর্ণগোচর হয় নাই। ঐ সময় আল্লাহ তাআ’লা নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ (হে রাসূল (সঃ)!) আল্লাহ শুনেছেন সেই নারীর কথা, যে তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকটও ফরিয়াদ করছে; আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শুনেন, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা” (৫৮: ১)যে ব্যক্তি তার ঘরের কোণায় রাত্রির অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে সে এবং যে ব্যক্তি দিনের বেলায় প্রকাশ্যভাবে জনবহুল পথে চলাচল করে, অল্লাহর অবগতিতে এরা দু’জন সমান। যেমন তিনি (আরবি) এই আয়াতে বলেছেন। (১১: ৫) মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি যে কোন কর্মে রত হও এবং তুমি তৎসম্পর্কে কুরআন হতে যা আবৃত্তি কর এবং তোমরা যে কোন কার্য কর, আমি তোমাদের পরিদর্শক, যখন তোমরা তাতে প্রবৃত্ত হও; আকাশ মণ্ডলী ও পৃথিবীর অনু পরিমাণও তোমার প্রতিপালকের অগোচর নয় এবং ওটা অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর অথবা বৃহত্তর কিছুই নেই সুষ্পষ্ট কিতাবে নেই।” (১০: ৬১)আল্লাহ তাআ’লার উক্তি : (আরবি) অর্থাৎ “মানুষের জন্যে তার সামনে ও পেছনে একের পর এক প্রহরী থাকে; ওরা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে।” অর্থাৎ মানুষের রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে তাদের চতুর্দিকে ফেরেশতাদেরকে মোতায়েন করে রাখা হয়েছে। তারা মানুষকে কষ্ট ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে থাকেন। যেমন তাদের কার্যাবলী পরিদর্শন করার জন্যে ফেরেশতাদের অন্য দল রয়েছে। যারা পর্যায়ক্রমে একের পর এক আসা যাওয়া করে থাকেন। রাত্রিকালের জন্যে পৃথক ফেরেশতা আছেন এবং দিবা ভাগের জন্যেও পৃথক ফেরেশতা রয়েছেন। যেমন মানুষের ডানে ও বামে দু’জন ফেরেশতা মানুষের আমল লিখবার জন্যে নিযুক্ত রয়েছেন। ডান দিকের ফেরেশতা পূণ্য লিখেন এবং বাম দিকের ফেরেশতা পাপ লিখেন। অনুরূপভাবে তার সামনে ও পেছনে দু’জন ফেরেশতা রয়েছেন যারা তার রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন। সুতরাং প্রত্যেক মানুষ চারজন ফেরেশতার মধ্যে অবস্থান করে। দু’জন আমল লেখক ডানে ও বামে এবং দু’জন রক্ষণাবেক্ষণকারী সামনে ও পেছনে। তারপর রাত্রির পৃথক ও দিবসের পৃথক। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “তোমাদের কাছে ফেরেশতারা পালাক্রমে আগমন করে থাকেন দিবসে ও রজনীতে। ফজর ও আসরের নামাযে উভয় দলের মিলন ঘটে। রাত্রে অবস্থানকারী ফেরেশতাগণ রাত্রি শেষে আকাশে উঠে যান। বান্দাদের অবস্থা অবগত হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআ’লা তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা আমার বান্দাদেরকে কি অবস্থায় ছেড়ে এসেছো?” তারা উত্তরে বলেনঃ “আমরা তাদের কাছে আগমনের সময় নামাযের অবস্থায় তাদেরকে পেয়েছি এবং বিদায়ের সময়ও তাদেরকে নামাযের অবস্থায় ছেড়ে এসেছি।”অন্য হাদীসে এসেছেঃ “তোমাদের সাথে তাঁরা রয়েছেন যাঁরা তোমাদের পায়খানা ও সহবাসের সময় ছাড়া কোন অবস্থাতেই তোমাদের থেকে পৃথক হন না। সুতরাং তোমাদের উচিত তাদের থেকে লজ্জা করা ও তাদেরকে সম্মান করা।”হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লা যখন বান্দার কোন ক্ষতি সাধনের ইচ্ছা করেন তখন রক্ষক ফেরেশতা তা হতে দেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দার সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত ফেরেশতা থাকেন যিনি তাকে ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থায় দানব, মানব, বিষধর প্রাণী এবং সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে থাকেন।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে পার্থিব বাদশাহ ও আমীরদের আলোচনা যারা প্রহরাধীনে অবস্থান করে থাকেন। যহ্‌হাক (রঃ) বলেন যে, সম্রাট বা শাহান্শাহ আল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণে থাকেন আল্লাহর আমর হতে এবং তারা হচ্ছে আলুশ শিরক ও আহলুয যাহির। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।সম্ভবতঃ এই উক্তির উদ্দেশ্য এই যে, বাদশাহ ও আমীরদেরকে যেমন সৈন্য প্রহরীরা পাহারা দিয়ে থাকে তেমনিভাবে আল্লাহ তাআ’লার বান্দাদেরকে পাহারা দিয়ে থাকেন তার পক্ষ থেকে নিযুক্ত ফেরেশতাগণ।তাফসীরে ইবনু জারীরে একটি দুর্বল রিওয়াইয়াতে এসেছে যে, একদা হযরত উসমান (রাঃ) রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট আগমন করেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বান্দার সাথে কতজন ফেরেশতা থাকেন?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “একজন ডান দিকে থাকেন, যিনি পূণ্য লিখেন এবং তিনি বামদিকে অবস্থানকারী পাপ লেখক ফেরেশতার উপর নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। যখন তুমি কোন পূণ্যের কাজ কর তখন ঐ পূণ্য লেখক ফেরেশতা একটির বিনিময়ে দশটি পূণ্য লিখে ফেলেন। পক্ষান্তরে যখন তুমি কোন পাপকার্য কর তখন বাম দিকের ফেরেশতা তা লিখবার জন্যে ডানদিকের ফেরেশতার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন। ডান দিকের ফেরেশতা তখন তাকে বলেনঃ “কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর, হয়তো সে ক্ষমা প্রার্থনা ও তওবা করবে।” তিন বার তিনি অনুমতি চান। তখন পর্যন্তই যদি সে তওবা না করে তখন ঐ পূণ্য লেখক ফেরেশতা পাপ লেখক ফেরেশতাকে বলেনঃ “এখন লিখে নাও। আল্লাহ তার থেকে আমাদেরকে আরাম দান করুন। সে কতই না নিকৃষ্ট সঙ্গী। সে আল্লাহ তাআ’লার প্রতি খেয়াল রাখে না এবং আমাদের থেকে লজ্জা করে না।” আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করবার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।” (৫০: ১৮) আর দু’জন ফেরেশতা তোমার সামনে ও পেছনে রয়েছেন। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “মানুষের সামনে ও পেছনে একের পর এক প্রহরী থাকে।” আর একজন ফেরেশতা তোমার মাথার চুল ধরে রয়েছেন। যখন তুমি আল্লাহর সামনে বিনয় ও নীচতা প্রকাশ কর তখন তিনি তোমার মর্যাদা উচ্চ করে দেন। আর যখন তুমি আল্লাহর সামনে অবাধ্যতা ও অহংকার প্রকাশ কর তখন তিনি তোমার মর্যাদা নিচু করে দেন এবং তোমাকে অপারগ ও অক্ষম করেন। দু’জন ফেরেশতা তোমার ওষ্ঠের উপর রয়েছেন। তুমি যে দরূদ আমার উপর পাঠ করে থাকো তিনি তা হিফাযত করেন। একজন ফেরেশতা তোমার মুখের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন, যেন সর্প ইত্যাদির ন্যায় কোন কিছু গলায় চলে না যায়। দু’জন ফেরেশতা তোমার চোখের উপর রয়েছেন। অতএব এই দশজন ফেরেশতা প্রত্যেক বনী আদমের সাথে রয়েছেন। দিনের ফেরেশতা আলাদা এবং রাতের ফেরেশতা আলাদা। এভাবে প্রত্যেক লোকের সাথে আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ হতে বিশজন ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছেন। আর এদিকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যে সারা দিন ইবলীস কর্মব্যস্ত থাকে এবং রাত্রে এ কাজে লেগে থাকে তার সন্তানেরা।” (এ হাদীসটি তাফসীরে ইবনে জারীরে কিনানা’ আল আদাভী (রঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এটা খুবই গারীব বা দুর্বল) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে ভারপ্রাপ্ত সঙ্গী হিসেবে রয়েছে একজন জ্বিন ও একজন ফেরেশতা।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ, আমার সাথেও রয়েছে। তবে আল্লাহ আমাকে তার উপর সাহায্য করেছেন। সে আমাকে ভাল ছাড়া কিছুই হুকুম করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম একাকী এটা তাখরীজ করেছেন) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবি) (তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে) কোন কোন কিরআতে (আরবি) এর স্থলে (আরবি) রয়েছে। হযরত কা’ব (রঃ) বলেন যে, বনী আদমের জন্যে যদি প্রত্যেক নরম ও শক্ত খুলে যায় তবে অবশ্যই প্রতিটি জিনিস সে নিজেই দেখতে পাবে। আর যদি আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ থেকে এই রক্ষক ফেরেশতাগুলি নিযুক্ত না থাকেন যারা পানাহার ও লজ্জাস্থানের হিফাযত করে থাকেন তবে আল্লাহর শপথ! তোমাদেরকে অবশ্যই ছিনিয়ে নেয়া হবে। আবু উমামা (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক মানুষের সাথে রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতা রয়েছেন যারা ভাগ্যে লিখিত ছাড়া অন্যান্য সমস্ত বিপদ-আপদ তার থেকে দূর করে থাকে। আবু মাজায (রঃ) বলেন যে, মুরাদ গোত্রের একটি লোক হযরত আলীর (রাঃ) নিকট আগমন করে তাঁকে নামাযে মশগুল দেখতে পান। অতঃপর তাঁকে তিনি বলেনঃ “মুরাদ গোত্রের লোক আপনাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সুতরাং আপনি প্রহরী নিযুক্ত করুন।” এ কথা শুনে হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে তার হিফাযতের জন্যে দু’জন ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছেন। তকদীরে লিপিবদ্ধ ছাড়া কোন বিপদাপদ তারা তাঁর প্রতি আপতিত হতে দেন না। জেনে রেখোঁরেখো যে, ‘আজল’ একটা মযবুত দুর্গ ও উত্তম ঢাল স্বরূপ।” কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তারা আল্লাহর নির্দেশক্রমে তাকে তাঁর আমর থেকে হিফাযত করে থাকে। যেমন হাদীস শরীফে এসেছেঃ জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা যে ঝাড় ফুঁক করে থাকি তা কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তকদীরের পরিবর্তন ঘটাতে পারে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ওটা স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত।” ইবরাহীম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বনী ইসরাঈলের কোন এক নবীর কাছে আল্লাহ তাআ’লা ওয়াহী করেনঃ “তোমার কওমকে বলে দাওঃ যে গ্রামবাসী বা যে গৃহবাসী আল্লাহর আনুগত্য করতে করতে তাঁর অবাধ্য হতে শুরু করে, আল্লাহ তাদের আরামের জিনিস গুলিকে তাদের থেকে দূর করে দিয়ে ঐ জিনিসগুলি তাদের কাছে আনয়ন করেন যেগুলি তাদের কষ্টের ও দুঃখের কারণ হয়।” (এটা ইবনু আবি হা’তিম (রঃ) স্বীয় তাফসীরে বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনু আবি শায়বার (রঃ) “সিফাতুল আর্‌শ' নামক গ্রন্থে এই রিওয়াইয়াতটি মার’ রূপেও এসেছে)আল্লাহ তাআ’লার উক্তিঃ (আরবি) (নিশ্চয় আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে) এই আয়াত দ্বারা এ কথার সত্যতা স্বীকৃত হয়।উমাইর ইবনু আবদিল মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা কূফার (মসজিদের) মিম্বরের উপর হতে হযরত আলী (রাঃ) আমাদের মধ্যে ভাষণ দেন। তাতে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে নীরবতা অবলম্বন করলে তিনি কথা বলতে শুরু করতেন। আর আমি কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি তার উত্তর দিতেন। এক দিন তিনি আমাকে বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “আমার ইযযত ও জালাল এবং আমার আর্‌শের উচ্চতার শপথ! যে গ্রামবাসী বা যে গৃহবাসী আমার নাফরমানীতে জড়িয়ে পড়ার পর তা পরিত্যাগ করতঃ আমার আনুগত্যের কাজে লেগে পড়ে, আমি তখন আমার শাস্তি ও কষ্ট তাদের থেকে সরিয়ে নিয়ে আমার রহমত ও সুখ তাদের উপর অবতীর্ণ করে থাকি।” (এ হাদীসটি গারীব- এর সনদে একজন বর্ণনাকারী অপরিচিত)

আর-রাদ 13:11

১০-১১ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর জ্ঞান সমস্ত মাখলুককে ঘিরে রয়েছে। কোন জিনিসই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নেই। তিনি নিম্ন ও উচ্চ শব্দ শুনতে পান। তিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব কিছুই জানেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি যদি কথাকে প্রকাশ কর তবে জেনে রেখোঁরেখো যে, তিনি (ওটা তো জানতে পারেনই, এমন কি) অতি গোপনীয় কথাও জানেন।” (২০: ৭)আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যা কিছু গোপন কর এবং যা কিছু প্রকাশ কর তিনি তা জানেন।” (২৭: ২৫)হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “ঐ আল্লাহ পবিত্র যাঁর শ্রবণ সমস্ত শব্দকে ঘিরে রয়েছে। আল্লাহর শপথ! নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী একজন মহিলা রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট আগমন করে তাঁর সাথে এমন আস্তে আস্তে কথা বলে যে, আমি পার্শ্বেই অথচ ভালরূপে তার কথা আমার কর্ণগোচর হয় নাই। ঐ সময় আল্লাহ তাআ’লা নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ (হে রাসূল (সঃ)!) আল্লাহ শুনেছেন সেই নারীর কথা, যে তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকটও ফরিয়াদ করছে; আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শুনেন, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা” (৫৮: ১)যে ব্যক্তি তার ঘরের কোণায় রাত্রির অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে সে এবং যে ব্যক্তি দিনের বেলায় প্রকাশ্যভাবে জনবহুল পথে চলাচল করে, অল্লাহর অবগতিতে এরা দু’জন সমান। যেমন তিনি (আরবি) এই আয়াতে বলেছেন। (১১: ৫) মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি যে কোন কর্মে রত হও এবং তুমি তৎসম্পর্কে কুরআন হতে যা আবৃত্তি কর এবং তোমরা যে কোন কার্য কর, আমি তোমাদের পরিদর্শক, যখন তোমরা তাতে প্রবৃত্ত হও; আকাশ মণ্ডলী ও পৃথিবীর অনু পরিমাণও তোমার প্রতিপালকের অগোচর নয় এবং ওটা অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর অথবা বৃহত্তর কিছুই নেই সুষ্পষ্ট কিতাবে নেই।” (১০: ৬১)আল্লাহ তাআ’লার উক্তি : (আরবি) অর্থাৎ “মানুষের জন্যে তার সামনে ও পেছনে একের পর এক প্রহরী থাকে; ওরা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে।” অর্থাৎ মানুষের রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে তাদের চতুর্দিকে ফেরেশতাদেরকে মোতায়েন করে রাখা হয়েছে। তারা মানুষকে কষ্ট ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে থাকেন। যেমন তাদের কার্যাবলী পরিদর্শন করার জন্যে ফেরেশতাদের অন্য দল রয়েছে। যারা পর্যায়ক্রমে একের পর এক আসা যাওয়া করে থাকেন। রাত্রিকালের জন্যে পৃথক ফেরেশতা আছেন এবং দিবা ভাগের জন্যেও পৃথক ফেরেশতা রয়েছেন। যেমন মানুষের ডানে ও বামে দু’জন ফেরেশতা মানুষের আমল লিখবার জন্যে নিযুক্ত রয়েছেন। ডান দিকের ফেরেশতা পূণ্য লিখেন এবং বাম দিকের ফেরেশতা পাপ লিখেন। অনুরূপভাবে তার সামনে ও পেছনে দু’জন ফেরেশতা রয়েছেন যারা তার রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন। সুতরাং প্রত্যেক মানুষ চারজন ফেরেশতার মধ্যে অবস্থান করে। দু’জন আমল লেখক ডানে ও বামে এবং দু’জন রক্ষণাবেক্ষণকারী সামনে ও পেছনে। তারপর রাত্রির পৃথক ও দিবসের পৃথক। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “তোমাদের কাছে ফেরেশতারা পালাক্রমে আগমন করে থাকেন দিবসে ও রজনীতে। ফজর ও আসরের নামাযে উভয় দলের মিলন ঘটে। রাত্রে অবস্থানকারী ফেরেশতাগণ রাত্রি শেষে আকাশে উঠে যান। বান্দাদের অবস্থা অবগত হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআ’লা তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা আমার বান্দাদেরকে কি অবস্থায় ছেড়ে এসেছো?” তারা উত্তরে বলেনঃ “আমরা তাদের কাছে আগমনের সময় নামাযের অবস্থায় তাদেরকে পেয়েছি এবং বিদায়ের সময়ও তাদেরকে নামাযের অবস্থায় ছেড়ে এসেছি।”অন্য হাদীসে এসেছেঃ “তোমাদের সাথে তাঁরা রয়েছেন যাঁরা তোমাদের পায়খানা ও সহবাসের সময় ছাড়া কোন অবস্থাতেই তোমাদের থেকে পৃথক হন না। সুতরাং তোমাদের উচিত তাদের থেকে লজ্জা করা ও তাদেরকে সম্মান করা।”হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লা যখন বান্দার কোন ক্ষতি সাধনের ইচ্ছা করেন তখন রক্ষক ফেরেশতা তা হতে দেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দার সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত ফেরেশতা থাকেন যিনি তাকে ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থায় দানব, মানব, বিষধর প্রাণী এবং সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে থাকেন।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে পার্থিব বাদশাহ ও আমীরদের আলোচনা যারা প্রহরাধীনে অবস্থান করে থাকেন। যহ্‌হাক (রঃ) বলেন যে, সম্রাট বা শাহান্শাহ আল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণে থাকেন আল্লাহর আমর হতে এবং তারা হচ্ছে আলুশ শিরক ও আহলুয যাহির। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।সম্ভবতঃ এই উক্তির উদ্দেশ্য এই যে, বাদশাহ ও আমীরদেরকে যেমন সৈন্য প্রহরীরা পাহারা দিয়ে থাকে তেমনিভাবে আল্লাহ তাআ’লার বান্দাদেরকে পাহারা দিয়ে থাকেন তার পক্ষ থেকে নিযুক্ত ফেরেশতাগণ।তাফসীরে ইবনু জারীরে একটি দুর্বল রিওয়াইয়াতে এসেছে যে, একদা হযরত উসমান (রাঃ) রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট আগমন করেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বান্দার সাথে কতজন ফেরেশতা থাকেন?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “একজন ডান দিকে থাকেন, যিনি পূণ্য লিখেন এবং তিনি বামদিকে অবস্থানকারী পাপ লেখক ফেরেশতার উপর নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। যখন তুমি কোন পূণ্যের কাজ কর তখন ঐ পূণ্য লেখক ফেরেশতা একটির বিনিময়ে দশটি পূণ্য লিখে ফেলেন। পক্ষান্তরে যখন তুমি কোন পাপকার্য কর তখন বাম দিকের ফেরেশতা তা লিখবার জন্যে ডানদিকের ফেরেশতার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন। ডান দিকের ফেরেশতা তখন তাকে বলেনঃ “কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর, হয়তো সে ক্ষমা প্রার্থনা ও তওবা করবে।” তিন বার তিনি অনুমতি চান। তখন পর্যন্তই যদি সে তওবা না করে তখন ঐ পূণ্য লেখক ফেরেশতা পাপ লেখক ফেরেশতাকে বলেনঃ “এখন লিখে নাও। আল্লাহ তার থেকে আমাদেরকে আরাম দান করুন। সে কতই না নিকৃষ্ট সঙ্গী। সে আল্লাহ তাআ’লার প্রতি খেয়াল রাখে না এবং আমাদের থেকে লজ্জা করে না।” আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করবার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।” (৫০: ১৮) আর দু’জন ফেরেশতা তোমার সামনে ও পেছনে রয়েছেন। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “মানুষের সামনে ও পেছনে একের পর এক প্রহরী থাকে।” আর একজন ফেরেশতা তোমার মাথার চুল ধরে রয়েছেন। যখন তুমি আল্লাহর সামনে বিনয় ও নীচতা প্রকাশ কর তখন তিনি তোমার মর্যাদা উচ্চ করে দেন। আর যখন তুমি আল্লাহর সামনে অবাধ্যতা ও অহংকার প্রকাশ কর তখন তিনি তোমার মর্যাদা নিচু করে দেন এবং তোমাকে অপারগ ও অক্ষম করেন। দু’জন ফেরেশতা তোমার ওষ্ঠের উপর রয়েছেন। তুমি যে দরূদ আমার উপর পাঠ করে থাকো তিনি তা হিফাযত করেন। একজন ফেরেশতা তোমার মুখের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন, যেন সর্প ইত্যাদির ন্যায় কোন কিছু গলায় চলে না যায়। দু’জন ফেরেশতা তোমার চোখের উপর রয়েছেন। অতএব এই দশজন ফেরেশতা প্রত্যেক বনী আদমের সাথে রয়েছেন। দিনের ফেরেশতা আলাদা এবং রাতের ফেরেশতা আলাদা। এভাবে প্রত্যেক লোকের সাথে আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ হতে বিশজন ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছেন। আর এদিকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যে সারা দিন ইবলীস কর্মব্যস্ত থাকে এবং রাত্রে এ কাজে লেগে থাকে তার সন্তানেরা।” (এ হাদীসটি তাফসীরে ইবনে জারীরে কিনানা’ আল আদাভী (রঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এটা খুবই গারীব বা দুর্বল) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সাথে ভারপ্রাপ্ত সঙ্গী হিসেবে রয়েছে একজন জ্বিন ও একজন ফেরেশতা।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার সাথেও কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ, আমার সাথেও রয়েছে। তবে আল্লাহ আমাকে তার উপর সাহায্য করেছেন। সে আমাকে ভাল ছাড়া কিছুই হুকুম করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম একাকী এটা তাখরীজ করেছেন) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবি) (তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে) কোন কোন কিরআতে (আরবি) এর স্থলে (আরবি) রয়েছে। হযরত কা’ব (রঃ) বলেন যে, বনী আদমের জন্যে যদি প্রত্যেক নরম ও শক্ত খুলে যায় তবে অবশ্যই প্রতিটি জিনিস সে নিজেই দেখতে পাবে। আর যদি আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ থেকে এই রক্ষক ফেরেশতাগুলি নিযুক্ত না থাকেন যারা পানাহার ও লজ্জাস্থানের হিফাযত করে থাকেন তবে আল্লাহর শপথ! তোমাদেরকে অবশ্যই ছিনিয়ে নেয়া হবে। আবু উমামা (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক মানুষের সাথে রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতা রয়েছেন যারা ভাগ্যে লিখিত ছাড়া অন্যান্য সমস্ত বিপদ-আপদ তার থেকে দূর করে থাকে। আবু মাজায (রঃ) বলেন যে, মুরাদ গোত্রের একটি লোক হযরত আলীর (রাঃ) নিকট আগমন করে তাঁকে নামাযে মশগুল দেখতে পান। অতঃপর তাঁকে তিনি বলেনঃ “মুরাদ গোত্রের লোক আপনাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সুতরাং আপনি প্রহরী নিযুক্ত করুন।” এ কথা শুনে হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে তার হিফাযতের জন্যে দু’জন ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছেন। তকদীরে লিপিবদ্ধ ছাড়া কোন বিপদাপদ তারা তাঁর প্রতি আপতিত হতে দেন না। জেনে রেখোঁরেখো যে, ‘আজল’ একটা মযবুত দুর্গ ও উত্তম ঢাল স্বরূপ।” কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তারা আল্লাহর নির্দেশক্রমে তাকে তাঁর আমর থেকে হিফাযত করে থাকে। যেমন হাদীস শরীফে এসেছেঃ জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা যে ঝাড় ফুঁক করে থাকি তা কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তকদীরের পরিবর্তন ঘটাতে পারে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ওটা স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত।” ইবরাহীম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বনী ইসরাঈলের কোন এক নবীর কাছে আল্লাহ তাআ’লা ওয়াহী করেনঃ “তোমার কওমকে বলে দাওঃ যে গ্রামবাসী বা যে গৃহবাসী আল্লাহর আনুগত্য করতে করতে তাঁর অবাধ্য হতে শুরু করে, আল্লাহ তাদের আরামের জিনিস গুলিকে তাদের থেকে দূর করে দিয়ে ঐ জিনিসগুলি তাদের কাছে আনয়ন করেন যেগুলি তাদের কষ্টের ও দুঃখের কারণ হয়।” (এটা ইবনু আবি হা’তিম (রঃ) স্বীয় তাফসীরে বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনু আবি শায়বার (রঃ) “সিফাতুল আর্‌শ' নামক গ্রন্থে এই রিওয়াইয়াতটি মার’ রূপেও এসেছে)আল্লাহ তাআ’লার উক্তিঃ (আরবি) (নিশ্চয় আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে) এই আয়াত দ্বারা এ কথার সত্যতা স্বীকৃত হয়।উমাইর ইবনু আবদিল মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা কূফার (মসজিদের) মিম্বরের উপর হতে হযরত আলী (রাঃ) আমাদের মধ্যে ভাষণ দেন। তাতে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে নীরবতা অবলম্বন করলে তিনি কথা বলতে শুরু করতেন। আর আমি কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি তার উত্তর দিতেন। এক দিন তিনি আমাকে বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “আমার ইযযত ও জালাল এবং আমার আর্‌শের উচ্চতার শপথ! যে গ্রামবাসী বা যে গৃহবাসী আমার নাফরমানীতে জড়িয়ে পড়ার পর তা পরিত্যাগ করতঃ আমার আনুগত্যের কাজে লেগে পড়ে, আমি তখন আমার শাস্তি ও কষ্ট তাদের থেকে সরিয়ে নিয়ে আমার রহমত ও সুখ তাদের উপর অবতীর্ণ করে থাকি।” (এ হাদীসটি গারীব- এর সনদে একজন বর্ণনাকারী অপরিচিত)

আর-রাদ 13:12

১২-১৩ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, বিদ্যুৎও তারই নির্দেশাধীন। একটি লোক হযরত ইবনু আব্বাসকে (রাঃ) বিদ্যুৎ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে তাকে বলেনঃ “বিদ্যুৎ হচ্ছে পানি।” পথিক ওটা দেখে কষ্ট ও বিপদের ভয়ে বিচলিত হয়ে পড়ে। আর বাড়ীতে অবস্থানকারী ব্যক্তি বরকত ও উপকার লাভের আশায় জীবিকার আধিক্যের লোভ করে। ওটাই ঘন মেঘ সৃষ্টি করে থাকে যা পানির ভারে যমীনের নিকটবর্তী হয়ে যায়। ওটা পানিতে বোঝা স্বরূপ হয়ে যায়। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ বজ্রও তাঁর প্রশংসা মহিমা ও পবিত্রতা বর্ণনা করে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “প্রত্যেক জিনিসই আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করে থাকে।” বানু গিফার গোত্রের একজন শায়েখ নবীকে (সঃ) বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা মেঘ সৃষ্টি করেন যা উত্তমরূপে কথা বলে ও হাস্য করে। (এটা ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে কিতাবুল আদাবে রিওয়াইয়াত করেছেন এবং ইমাম হাকিম (রঃ) স্বীয় মুসতাদরাক’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)সম্ভবতঃ কথা বলা দ্বারা গর্জন করা এবং হাস্য করা দ্বারা বিদ্যুৎ চমকানো উদ্দেশ্য। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। সা'দ ইবনু ইবরাহীম (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লা মেঘ প্রেরণ করেন এবং ওটা অপেক্ষা উত্তম কথক ও উত্তম হাস্যকারী আর কিছুই নেই। ওর হাসি হচ্ছে বিদ্যুৎ এবং কথা হচ্ছে বজ্র। মুহাম্মদ ইবনু মুসলিম (রঃ) বলেন “আমরা খবর পেয়েছি যে, বিদ্যুৎ হচ্ছে একজন ফেরেশতা যার চারটি মুখ রয়েছে। একটি মানুষের মত, একটি বলদের মত, একটি গাধার মত এবং একটি সিংহের মত। সে যখন লেজ নাড়ে তখন বিদ্যুৎ চমকে ওঠে।”সা’লিম (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন বজ্র ধ্বনি শুনতেন তখন তিনি নিম্নের দু'আটি পাঠ করতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনার গযব দ্বারা নিপাত করবেন না এবং আপনার আযাব দ্বারা আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। এবং এর পূর্বেই আমাদেরকে নিরাপত্তা দান করুন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে নিম্নের দু'আটি রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি ঐ সত্ত্বার পবিত্রতা বর্ণনা করছি যাঁর প্রশংসা পবিত্রতা বর্ণনা করে থাকে বজ্ৰ।” হযরত আলী (রাঃ) বজ্ৰ ধ্বণি শুনে পাঠ করতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তারই পবিত্রতা বর্ণনা করছি যার তুমি পবিত্রতা বর্ণনা করলে।” ইবনু আবি যাকারিয়া (রাঃ) বলেন যে, বজ্র ধ্বনি শুনে যে ব্যক্তি (আরবি) পাঠ করে তার উপর বিদ্যুৎ পতিত হয় না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রাঃ) বজ্র ধ্বনি শুনে কথাবার্তা বন্ধ করে দিতেন এবং পাঠ করতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি ঐ আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি; বজ্রনির্ঘোষ ও ফেরেশতাগণ সভয়ে যাঁর প্রশংসা মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করে থাকে।” আর তিনি বলতেন যে, এই শব্দে দুনিয়াবাসীর জন্যে বড় সন্ত্রাসের ব্যাপার রয়েছে। (এটা ইমাম মা’লিক (রঃ) তার মুআত্তা এবং ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবুল আদাবে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মহা মহিমান্বিত প্রতিপালক বলেনঃ ‘যদি আমার বান্দারা পূর্ণমাত্রায় আমার আনুগত্য করতো তবে আমি অবশ্যই তাদের উপর রাত্রিকালে বৃষ্টি বর্ষণ করতাম এবং দিনের বেলায় তাদের উপর সূর্য প্রকাশমান রাখতাম, আর বজ্রের ধ্বনি পর্যন্ত তাদেরকে শুনাতাম না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বজ্র ধ্বনি শুনে তোমরা আল্লাহর যিকর করবে। কেননা, আল্লাহর কসম! আল্লাহর যিকরকারীর উপর বস্ত্র পতিত হয় না। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)“তিনি বজ্রপাত করেন এবং যাকে ইচ্ছা ওটা দ্বারা আঘাত করেন।” এ জন্যেই শেষ যুগে খুব বেশি বিজলী পতিত হবে। যেমন হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সময় খুব বেশি বিজলী পড়বে। এমনকি কোন লোক তাদের কওমের কাছে এসে জিজ্ঞেস করবেঃ “সকালে কার উপর বিজলী পড়েছে?” তারা উত্তরে বলবেঃ “অমুকের উপর অমুকের উপর, এবং অমুকের উপর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এই আয়াতের শানে নুযূলে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে একবার আরবের এক অহংকারী সরদারকে ডেকে আনার জন্যে প্রেরণ করেন। লোকটি তখন তার নিকট গমন করে এবং তাকে বলেঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। সে একথা শুনে লোকটিকে বলেঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে? এবং আল্লাহ কে? তিনি কি সোনার, না রূপার, না তামার (তৈরী)?” দূতটি তখন রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে ফিরে আসলো এবং বললো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো আপনাকে পূর্বেই বলেছিলাম যে, সে একজন অহংকারী লোক! সে আমাকে এরূপ, এরূপ বলেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে বললেনঃ “তুমি তার কাছে দ্বিতীয়বার যাও।” সে গেল এবং সে তাকে ঐ কথাই বললো। সুতরাং সে এবারও রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট ফিরে আসলো এবং বললো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো আপনাকে খবর দিয়েছিলাম যে, সে এর থেকে বেপরোয়া”। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে বললেনঃ “তুমি তার কাছে আবার ফিরে যাও এবং ডেকে আন।” সুতরাং সে তৃতীয়বার তার কাছে ফিরে গেল। এবারও লোকটি পয়গাম শুনে ঐ উত্তরই দিতে শুরু করলো। এমন সময় এক খন্ড মেঘ তার মাথার উপর এসে গেল। বজ্ৰ ধ্বনি হলো এবং তার উপর বিজলী পড়ে গেল। ফলে তার মাথার খুলী (মাথার উপরিভাগ উড়ে) গেল। ঐ সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা আল মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একজন ইয়াহূদী রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে এসে বলেঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ) ! আমাকে আপনার প্রতিপালক সম্পর্কে খবর দিন! তিনি কিসের তৈরী? তিনি কি তামার তৈরী, না মুক্তার তৈরী, না ইয়াকূতের তৈরী?” তার প্রশ্ন তখনও পূর্ণ হয়নি অকস্মাৎ আকাশ থেকে বিদ্যুৎ পতিত হলো এবং সে ধ্বংস হয়ে গেল। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো।কাতাদা’ (রঃ) বলেনঃ বর্ণিত আছে যে, একটি লোক কুরআন কারীমকে। মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং রাসূলুল্লাহর (সঃ) নুবওয়াতকে অস্বীকার করে। ঐ সময়ই আকাশ থেকে বিদ্যুৎ পতিত হয় এবং সে ধ্বংস হয়ে যায়। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।এই আয়াতের শানে নুযূলে আ’মির ইবনু তুফাইল ও আরবাদ ইবনু রাবী’আ’র কাহিনীও বর্ণিত হয়েছে। এ লোক দু’টি আরবের নেতৃস্থানীয় লোকদের অন্তর্ভূক্ত ছিল। তারা মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট হাযির হয় এবং বলেঃ “আমরা এই শর্তে আপনাকে নবী হিসেবে মেনে নিতে পারি যে, আপনি আমাদেরকে আপনার কাজের (নুবওয়াতের) অর্ধেক শরীক করবেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সুতরাং তারা নিরাশ হয়ে যায়। তখন অভিশপ্ত আমির বলেঃ “আল্লাহর কসম! আমি সারা আরবকে সৈন্য দ্বারা ভর্তি করে দেবো।” তার একথার উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তাআ’লা তোমাকে এ সময় দিবেন না।” অতঃপর তারা দু’জন মদীনায় অবস্থান করতে থাকলো, উদ্দেশ্য এই যে, সুযোগ পেলেই রাসূলুল্লাহকে (সঃ) হত্যা করে ফেলবে। ঘটনাক্রমে একদিন তারা সুযোগ পেয়ে গেল। একজন সামনে থেকে তার সাথে কথাবার্তা বলতে লাগলো। অন্য জন তরবারী নিয়ে পেছনে এসে গেল। কিন্তু সেই প্রকৃত রক্ষক তাঁকে তাদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন। তখন তারা এখান থেকে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে চলে গেল। তারা হিংসার আগুনে জ্বলে পুড়ে মরতে লাগলো। আরববাসীকে তারা তার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে শুরু করলো। ঐ অবস্থাতেই আরবদের উপর আকাশ থেকে বিদ্যুৎ পড়ে তাকে দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় করে দিলো। আর আমির প্লেগরোগে আক্রান্ত হলো এবং তাতেই সে মারা গেল। এই ধরনের লোকদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআ’লা (আরবি) (অর্থাৎ তিনি বজ্রপাত করেন এবং যাকে ইচ্ছা ওটা দ্বারা আঘাত করেন; তথাপি তারা আল্লাহর সম্বন্ধে বিতন্ডা করে) এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরবাদের ভাই লাবীদ ইবনু রাবী’আ' নিম্নের পংক্তিতে শোকগাথা গেয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আরবাদের ব্যাপারে আমি মৃত্যুকে ভয় করছি, তবে আমি তার ব্যাপারে সিমাক ও আসাদ তারকা দ্বয়ের কুলক্ষণকে ভয় করি না। যুদ্ধের দিনের বাহাদুর ঘোড় সওয়ারের ব্যাপারে বজ্র ও বিদ্যুই আমাকে ব্যথিত করেছে।”অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, আ’মির বলেছিলঃ “যদি আমি মুসলমান হই তবে কি পাবো?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তুমি মুসলমান হলে অন্যান্য মুসলমানদের যে অবস্থা হয়েছে তোমারও সেই অবস্থাই হবে।" সে তখন বলেঃ “তা হলে আমি মুসলমান হবে না। যদি আমি আপনার পরে এই আমরের (নুবওয়াতের) অধিকারী হই তবেই আমি এই দ্বীন (ইসলাম) কবুল করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “এটা তোমার জন্যেও হতে পারে না এবং তোমার কওমের জন্যেও হতে পারে না। হ্যাঁ, তবে তুমি ইসলাম কবুল করলে আমার অশ্বারোহী বাহিনী তোমাকে সাহায্য করবে।” একথা শুনে সে বলেঃ “আমার এর প্রয়োজন নেই। এখনও নজদের অশ্বারোহী বাহিনী আমার আশ্রয় স্থল হিসেবে রয়েছে। আমাকে আপনি যদি কাঁচা পাকার মালিক করে দেন তবে আমি ইসলাম কবুল করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “না (তা হবে না)।” সুতরাং তারা দু’জন তাঁর নিকট হতে চলে গেল। আ’মির বলতে লাগলো: “আল্লাহর কসম! আমি মদীনার চতুর্দিক সেনাবাহিনী দ্বারা অবরোধ করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা তোমার এইচ্ছা পূর্ণ হতে দেবেন না।” এখন তারা দুজনে পরামর্শ করলো যে, তাদের একজন রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কথাবার্তা বলতে থাকবে এবং অপরজন এই সুযোগে তাঁকে তরবারী দ্বারা হত্যা করে ফেলবে। তারপর তাদের সাথে যুদ্ধ করবে আর কে খুব বেশী হলে এটাই হবে যে, তাদেরকে রক্তপণ দিতে হবে। এই পরামর্শের পর আবার তারা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে আগমন করে। আমি তাঁকে বলেঃ আপনি এখানে একটু আসুন। আপনার সাথে আমি কিছু আলাপ করতে চাই।” তার একথা শুনে তিনি তার কাছে উঠে আসলেন এবং তার সাথে চললেন। এক প্রাচীরের পাদদেশে সে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কথা বলতে শুরু করে। তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার কথা শুনতে থাকেন। সুযোগ পেয়ে আরবাদ তরবারীর উপর হাত রাখে। ওটাকে কোষ হতে বের করার ইচ্ছা করে। কিন্তু আল্লাহ তাআ’লা তার হাত অবশ করে দেন। কোন ক্রমেই সে কোষ হতে তরবারী বের করতে পারলো না। যখন বেশ দেরী হয়ে গেল এবং পিছন দিকে ফিরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ অবস্থা দেখতে পেলেন তখন তিনি সেখান থেকে সরে আসলেন। অতঃপর তারা দু'জন মদীনা হতে প্রস্থান করে এবং ‘হাররা রা’কিম’ স্থানে পৌঁছে থেমে যায়। কিন্তু হযরত সা’দ ইবনু মুআ’য (রাঃ) এবং হযরত উসাইদ ইবনু হুযাইর (রাঃ) সেখানে পৌঁছেন এবং তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দেন। তারা সেখান হতে বের হয়ে ‘রকম’ নামক স্থানে পৌছা মাত্রই আরবাদের উপর আকাশ থেকে বিজলী পড়ে যায় এবং সেখানেই তার জীবন লীলা শেষ হয়ে যায়। আ’মির সেখান থেকে পলায়ণ করে। ‘খুৱায়েম' নামক স্থানে পৌছা মাত্রই সে প্লেগের ফেঁড়ায় আক্রান্ত হয়। বানু সালুল গোত্রের এক মহিলার ঘরে সে রাত্রি যাপন করে। কখনো কখনো সে তার ঘাড়ের ফোঁড়া স্পর্শ করতো এবং সবিস্ময়ে বলতো: “এটা তো সেই ফোড়া যা উটের হয়ে থাকে! হায় আফসোস! আমি সালুল গোত্রের এক মহিলার ঘরে মারা যাবো! যদি আমি নিজ বাড়ীতে থাকতাম তবে কতই না ভাল হতো।” শেষ পর্যন্ত সে সেখানে থাকতে পারলো না। তার ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সে সেখান থেকে বিদায় নিলো। কিন্তু পথেই সে ধ্বংস হয়ে গেলো। তাদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআ’লা(আরবি) (১৩: ৮-১১) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। এতে হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) হিফাযত করার বর্ণনাও রয়েছে এবং আরবাদের উপর বিজলী পতিত হওয়ার বর্ণনাও রয়েছে।এরপর আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ তারা আল্লাহর ব্যাপারে বাক বিতন্ডা করে। তারা তার মর্যাদা ও একত্ববাদকে স্বীকার করে না। অথচ আল্লাহ তাআ’লা তার বিরোধী ও অস্বীকারকারীদের কঠিন ও অসহনীয় শাস্তি প্রদানকারী। সুতরাং এই আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতই। (আরবি) অর্থাৎ “তারা চরমভাবে চক্রান্ত করলো এবং আমিও উত্তম কৌশল করলাম, অথচ তারা উপলব্ধি করতে পারলো না। সুতরাং তুমি লক্ষ্য কর, তাদের চক্রান্তের ফল কি দাঁড়ালো! আমি তাদেরকে এবং তাদের সমস্ত কওমকে ধ্বংস করে দিলাম।” (২৭: ৫০) (আরবি) এর ভাবার্থ হযরত আলীর (রাঃ) মতেঃ “তিনি কঠিনভাবে পাকড়াওকারী।” আর হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তিনি ভীষণ শক্তিশালী।

আর-রাদ 13:13

১২-১৩ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, বিদ্যুৎও তারই নির্দেশাধীন। একটি লোক হযরত ইবনু আব্বাসকে (রাঃ) বিদ্যুৎ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে তাকে বলেনঃ “বিদ্যুৎ হচ্ছে পানি।” পথিক ওটা দেখে কষ্ট ও বিপদের ভয়ে বিচলিত হয়ে পড়ে। আর বাড়ীতে অবস্থানকারী ব্যক্তি বরকত ও উপকার লাভের আশায় জীবিকার আধিক্যের লোভ করে। ওটাই ঘন মেঘ সৃষ্টি করে থাকে যা পানির ভারে যমীনের নিকটবর্তী হয়ে যায়। ওটা পানিতে বোঝা স্বরূপ হয়ে যায়। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ বজ্রও তাঁর প্রশংসা মহিমা ও পবিত্রতা বর্ণনা করে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “প্রত্যেক জিনিসই আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করে থাকে।” বানু গিফার গোত্রের একজন শায়েখ নবীকে (সঃ) বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা মেঘ সৃষ্টি করেন যা উত্তমরূপে কথা বলে ও হাস্য করে। (এটা ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে কিতাবুল আদাবে রিওয়াইয়াত করেছেন এবং ইমাম হাকিম (রঃ) স্বীয় মুসতাদরাক’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)সম্ভবতঃ কথা বলা দ্বারা গর্জন করা এবং হাস্য করা দ্বারা বিদ্যুৎ চমকানো উদ্দেশ্য। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। সা'দ ইবনু ইবরাহীম (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লা মেঘ প্রেরণ করেন এবং ওটা অপেক্ষা উত্তম কথক ও উত্তম হাস্যকারী আর কিছুই নেই। ওর হাসি হচ্ছে বিদ্যুৎ এবং কথা হচ্ছে বজ্র। মুহাম্মদ ইবনু মুসলিম (রঃ) বলেন “আমরা খবর পেয়েছি যে, বিদ্যুৎ হচ্ছে একজন ফেরেশতা যার চারটি মুখ রয়েছে। একটি মানুষের মত, একটি বলদের মত, একটি গাধার মত এবং একটি সিংহের মত। সে যখন লেজ নাড়ে তখন বিদ্যুৎ চমকে ওঠে।”সা’লিম (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন বজ্র ধ্বনি শুনতেন তখন তিনি নিম্নের দু'আটি পাঠ করতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনার গযব দ্বারা নিপাত করবেন না এবং আপনার আযাব দ্বারা আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। এবং এর পূর্বেই আমাদেরকে নিরাপত্তা দান করুন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে নিম্নের দু'আটি রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি ঐ সত্ত্বার পবিত্রতা বর্ণনা করছি যাঁর প্রশংসা পবিত্রতা বর্ণনা করে থাকে বজ্ৰ।” হযরত আলী (রাঃ) বজ্ৰ ধ্বণি শুনে পাঠ করতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তারই পবিত্রতা বর্ণনা করছি যার তুমি পবিত্রতা বর্ণনা করলে।” ইবনু আবি যাকারিয়া (রাঃ) বলেন যে, বজ্র ধ্বনি শুনে যে ব্যক্তি (আরবি) পাঠ করে তার উপর বিদ্যুৎ পতিত হয় না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রাঃ) বজ্র ধ্বনি শুনে কথাবার্তা বন্ধ করে দিতেন এবং পাঠ করতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি ঐ আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি; বজ্রনির্ঘোষ ও ফেরেশতাগণ সভয়ে যাঁর প্রশংসা মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করে থাকে।” আর তিনি বলতেন যে, এই শব্দে দুনিয়াবাসীর জন্যে বড় সন্ত্রাসের ব্যাপার রয়েছে। (এটা ইমাম মা’লিক (রঃ) তার মুআত্তা এবং ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবুল আদাবে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মহা মহিমান্বিত প্রতিপালক বলেনঃ ‘যদি আমার বান্দারা পূর্ণমাত্রায় আমার আনুগত্য করতো তবে আমি অবশ্যই তাদের উপর রাত্রিকালে বৃষ্টি বর্ষণ করতাম এবং দিনের বেলায় তাদের উপর সূর্য প্রকাশমান রাখতাম, আর বজ্রের ধ্বনি পর্যন্ত তাদেরকে শুনাতাম না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বজ্র ধ্বনি শুনে তোমরা আল্লাহর যিকর করবে। কেননা, আল্লাহর কসম! আল্লাহর যিকরকারীর উপর বস্ত্র পতিত হয় না। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)“তিনি বজ্রপাত করেন এবং যাকে ইচ্ছা ওটা দ্বারা আঘাত করেন।” এ জন্যেই শেষ যুগে খুব বেশি বিজলী পতিত হবে। যেমন হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সময় খুব বেশি বিজলী পড়বে। এমনকি কোন লোক তাদের কওমের কাছে এসে জিজ্ঞেস করবেঃ “সকালে কার উপর বিজলী পড়েছে?” তারা উত্তরে বলবেঃ “অমুকের উপর অমুকের উপর, এবং অমুকের উপর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এই আয়াতের শানে নুযূলে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে একবার আরবের এক অহংকারী সরদারকে ডেকে আনার জন্যে প্রেরণ করেন। লোকটি তখন তার নিকট গমন করে এবং তাকে বলেঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। সে একথা শুনে লোকটিকে বলেঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে? এবং আল্লাহ কে? তিনি কি সোনার, না রূপার, না তামার (তৈরী)?” দূতটি তখন রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে ফিরে আসলো এবং বললো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো আপনাকে পূর্বেই বলেছিলাম যে, সে একজন অহংকারী লোক! সে আমাকে এরূপ, এরূপ বলেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে বললেনঃ “তুমি তার কাছে দ্বিতীয়বার যাও।” সে গেল এবং সে তাকে ঐ কথাই বললো। সুতরাং সে এবারও রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট ফিরে আসলো এবং বললো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো আপনাকে খবর দিয়েছিলাম যে, সে এর থেকে বেপরোয়া”। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে বললেনঃ “তুমি তার কাছে আবার ফিরে যাও এবং ডেকে আন।” সুতরাং সে তৃতীয়বার তার কাছে ফিরে গেল। এবারও লোকটি পয়গাম শুনে ঐ উত্তরই দিতে শুরু করলো। এমন সময় এক খন্ড মেঘ তার মাথার উপর এসে গেল। বজ্ৰ ধ্বনি হলো এবং তার উপর বিজলী পড়ে গেল। ফলে তার মাথার খুলী (মাথার উপরিভাগ উড়ে) গেল। ঐ সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা আল মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একজন ইয়াহূদী রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে এসে বলেঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ) ! আমাকে আপনার প্রতিপালক সম্পর্কে খবর দিন! তিনি কিসের তৈরী? তিনি কি তামার তৈরী, না মুক্তার তৈরী, না ইয়াকূতের তৈরী?” তার প্রশ্ন তখনও পূর্ণ হয়নি অকস্মাৎ আকাশ থেকে বিদ্যুৎ পতিত হলো এবং সে ধ্বংস হয়ে গেল। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো।কাতাদা’ (রঃ) বলেনঃ বর্ণিত আছে যে, একটি লোক কুরআন কারীমকে। মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং রাসূলুল্লাহর (সঃ) নুবওয়াতকে অস্বীকার করে। ঐ সময়ই আকাশ থেকে বিদ্যুৎ পতিত হয় এবং সে ধ্বংস হয়ে যায়। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।এই আয়াতের শানে নুযূলে আ’মির ইবনু তুফাইল ও আরবাদ ইবনু রাবী’আ’র কাহিনীও বর্ণিত হয়েছে। এ লোক দু’টি আরবের নেতৃস্থানীয় লোকদের অন্তর্ভূক্ত ছিল। তারা মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট হাযির হয় এবং বলেঃ “আমরা এই শর্তে আপনাকে নবী হিসেবে মেনে নিতে পারি যে, আপনি আমাদেরকে আপনার কাজের (নুবওয়াতের) অর্ধেক শরীক করবেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সুতরাং তারা নিরাশ হয়ে যায়। তখন অভিশপ্ত আমির বলেঃ “আল্লাহর কসম! আমি সারা আরবকে সৈন্য দ্বারা ভর্তি করে দেবো।” তার একথার উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তাআ’লা তোমাকে এ সময় দিবেন না।” অতঃপর তারা দু’জন মদীনায় অবস্থান করতে থাকলো, উদ্দেশ্য এই যে, সুযোগ পেলেই রাসূলুল্লাহকে (সঃ) হত্যা করে ফেলবে। ঘটনাক্রমে একদিন তারা সুযোগ পেয়ে গেল। একজন সামনে থেকে তার সাথে কথাবার্তা বলতে লাগলো। অন্য জন তরবারী নিয়ে পেছনে এসে গেল। কিন্তু সেই প্রকৃত রক্ষক তাঁকে তাদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন। তখন তারা এখান থেকে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে চলে গেল। তারা হিংসার আগুনে জ্বলে পুড়ে মরতে লাগলো। আরববাসীকে তারা তার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে শুরু করলো। ঐ অবস্থাতেই আরবদের উপর আকাশ থেকে বিদ্যুৎ পড়ে তাকে দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় করে দিলো। আর আমির প্লেগরোগে আক্রান্ত হলো এবং তাতেই সে মারা গেল। এই ধরনের লোকদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআ’লা (আরবি) (অর্থাৎ তিনি বজ্রপাত করেন এবং যাকে ইচ্ছা ওটা দ্বারা আঘাত করেন; তথাপি তারা আল্লাহর সম্বন্ধে বিতন্ডা করে) এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরবাদের ভাই লাবীদ ইবনু রাবী’আ' নিম্নের পংক্তিতে শোকগাথা গেয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আরবাদের ব্যাপারে আমি মৃত্যুকে ভয় করছি, তবে আমি তার ব্যাপারে সিমাক ও আসাদ তারকা দ্বয়ের কুলক্ষণকে ভয় করি না। যুদ্ধের দিনের বাহাদুর ঘোড় সওয়ারের ব্যাপারে বজ্র ও বিদ্যুই আমাকে ব্যথিত করেছে।”অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, আ’মির বলেছিলঃ “যদি আমি মুসলমান হই তবে কি পাবো?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তুমি মুসলমান হলে অন্যান্য মুসলমানদের যে অবস্থা হয়েছে তোমারও সেই অবস্থাই হবে।" সে তখন বলেঃ “তা হলে আমি মুসলমান হবে না। যদি আমি আপনার পরে এই আমরের (নুবওয়াতের) অধিকারী হই তবেই আমি এই দ্বীন (ইসলাম) কবুল করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “এটা তোমার জন্যেও হতে পারে না এবং তোমার কওমের জন্যেও হতে পারে না। হ্যাঁ, তবে তুমি ইসলাম কবুল করলে আমার অশ্বারোহী বাহিনী তোমাকে সাহায্য করবে।” একথা শুনে সে বলেঃ “আমার এর প্রয়োজন নেই। এখনও নজদের অশ্বারোহী বাহিনী আমার আশ্রয় স্থল হিসেবে রয়েছে। আমাকে আপনি যদি কাঁচা পাকার মালিক করে দেন তবে আমি ইসলাম কবুল করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “না (তা হবে না)।” সুতরাং তারা দু’জন তাঁর নিকট হতে চলে গেল। আ’মির বলতে লাগলো: “আল্লাহর কসম! আমি মদীনার চতুর্দিক সেনাবাহিনী দ্বারা অবরোধ করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা তোমার এইচ্ছা পূর্ণ হতে দেবেন না।” এখন তারা দুজনে পরামর্শ করলো যে, তাদের একজন রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কথাবার্তা বলতে থাকবে এবং অপরজন এই সুযোগে তাঁকে তরবারী দ্বারা হত্যা করে ফেলবে। তারপর তাদের সাথে যুদ্ধ করবে আর কে খুব বেশী হলে এটাই হবে যে, তাদেরকে রক্তপণ দিতে হবে। এই পরামর্শের পর আবার তারা রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে আগমন করে। আমি তাঁকে বলেঃ আপনি এখানে একটু আসুন। আপনার সাথে আমি কিছু আলাপ করতে চাই।” তার একথা শুনে তিনি তার কাছে উঠে আসলেন এবং তার সাথে চললেন। এক প্রাচীরের পাদদেশে সে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কথা বলতে শুরু করে। তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার কথা শুনতে থাকেন। সুযোগ পেয়ে আরবাদ তরবারীর উপর হাত রাখে। ওটাকে কোষ হতে বের করার ইচ্ছা করে। কিন্তু আল্লাহ তাআ’লা তার হাত অবশ করে দেন। কোন ক্রমেই সে কোষ হতে তরবারী বের করতে পারলো না। যখন বেশ দেরী হয়ে গেল এবং পিছন দিকে ফিরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ অবস্থা দেখতে পেলেন তখন তিনি সেখান থেকে সরে আসলেন। অতঃপর তারা দু'জন মদীনা হতে প্রস্থান করে এবং ‘হাররা রা’কিম’ স্থানে পৌঁছে থেমে যায়। কিন্তু হযরত সা’দ ইবনু মুআ’য (রাঃ) এবং হযরত উসাইদ ইবনু হুযাইর (রাঃ) সেখানে পৌঁছেন এবং তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দেন। তারা সেখান হতে বের হয়ে ‘রকম’ নামক স্থানে পৌছা মাত্রই আরবাদের উপর আকাশ থেকে বিজলী পড়ে যায় এবং সেখানেই তার জীবন লীলা শেষ হয়ে যায়। আ’মির সেখান থেকে পলায়ণ করে। ‘খুৱায়েম' নামক স্থানে পৌছা মাত্রই সে প্লেগের ফেঁড়ায় আক্রান্ত হয়। বানু সালুল গোত্রের এক মহিলার ঘরে সে রাত্রি যাপন করে। কখনো কখনো সে তার ঘাড়ের ফোঁড়া স্পর্শ করতো এবং সবিস্ময়ে বলতো: “এটা তো সেই ফোড়া যা উটের হয়ে থাকে! হায় আফসোস! আমি সালুল গোত্রের এক মহিলার ঘরে মারা যাবো! যদি আমি নিজ বাড়ীতে থাকতাম তবে কতই না ভাল হতো।” শেষ পর্যন্ত সে সেখানে থাকতে পারলো না। তার ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সে সেখান থেকে বিদায় নিলো। কিন্তু পথেই সে ধ্বংস হয়ে গেলো। তাদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআ’লা(আরবি) (১৩: ৮-১১) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। এতে হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) হিফাযত করার বর্ণনাও রয়েছে এবং আরবাদের উপর বিজলী পতিত হওয়ার বর্ণনাও রয়েছে।এরপর আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ তারা আল্লাহর ব্যাপারে বাক বিতন্ডা করে। তারা তার মর্যাদা ও একত্ববাদকে স্বীকার করে না। অথচ আল্লাহ তাআ’লা তার বিরোধী ও অস্বীকারকারীদের কঠিন ও অসহনীয় শাস্তি প্রদানকারী। সুতরাং এই আয়াতটি নিম্নের আয়াতটির মতই। (আরবি) অর্থাৎ “তারা চরমভাবে চক্রান্ত করলো এবং আমিও উত্তম কৌশল করলাম, অথচ তারা উপলব্ধি করতে পারলো না। সুতরাং তুমি লক্ষ্য কর, তাদের চক্রান্তের ফল কি দাঁড়ালো! আমি তাদেরকে এবং তাদের সমস্ত কওমকে ধ্বংস করে দিলাম।” (২৭: ৫০) (আরবি) এর ভাবার্থ হযরত আলীর (রাঃ) মতেঃ “তিনি কঠিনভাবে পাকড়াওকারী।” আর হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তিনি ভীষণ শক্তিশালী।

আর-রাদ 13:14

হযরত আলী ইবনু আবি তা’লিব (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহর জন্যে সত্য আহবান। এর দ্বারা একত্ববাদকে বুঝানো হয়েছে। মুহাম্মদ ইবনু মুনকাদির (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা (আরবি) উদ্দেশ্য। এরপর মুশরিক ও কাফিরদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যেমন কোন লোক পানির দিকে হস্ত প্রসারিত করে থাকে এই উদ্দেশ্যে যে, পানি নিজে নিজেই তার মুখে পেঁছৈ যাবে। কিন্তু এরূপ কখনো হতে পারে না। অনুরূপভাবে এই মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে আহ্‌বান করছে এবং তাদের কাছে আশা রাখছে, তাদের আশা তারা পূর্ণ করতে পারবে না। আবার ভাবার্থ এও হতে পারে যে, যেমন কেউ যদি তার হস্তের মুষ্ঠিতে পানি আটকে রাখে তবে ঐ পানি তার মুষ্ঠির মধ্যে আটকে থাকবে না। সুতরাং (আরবি) এর অর্থ (আরবি) হবে। যেমন কোন কবি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় আমি ও তোমরা এবং তোমাদের প্রতি ভালবাসা স্থাপন হস্ত মুষ্ঠিতে পানি আটককারীর মতো, তার অঙ্গুলিগুলি তাকে পানি পান করায় না।” অন্য একজন বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমার মধ্যে ও তার মধ্যে যে প্রেম-প্রীতি ছিল তা হয়ে গেল হাতে পানি আটককারীর মত।” সুতরাং যেমন মুষ্ঠিতে পানি বন্ধকারী এবং যেমন পানির দিকে হস্ত প্রসারিতকারী পানি থেকে বঞ্চিত থাকে, তেমনই এই মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে আহবান করছে বটে, কিন্তু তারা বঞ্চিতই থাকবে। তারা দুনিয়া ও আখেরাতের কোনই উপকার লাভ করতে পারবে না। সুতরাং তাদেরকে আহ্‌বান করা সম্পূর্ণ অর্থহীন।

আর-রাদ 13:15

আল্লাহ তাআ’লা তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও সাম্রাজ্যের বিরাটত্বের সংবাদ দিচ্ছেন যে, সমস্ত কিছু তাঁর সামনে বিনয়াবনত। তাঁর সামনে সবাই বিনয় ও নীচতা প্রকাশ করে। মু’মিনরা খুশী মনে এবং কাফিররা বাধ্য হয়ে তাঁর সামনে সিজদায় পতিত হয়। তাদের ছায়াগুলি সকাল সন্ধ্যায় তার সামনে ঝুঁকে পড়ে।(আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহুবচন। এর অর্থ হচ্ছে দিনের শেষ ভাগ। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা কি দেখে নাই যে, আল্লাহর সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর ছায়া ডানে, বামে ঝুঁকে পড়ে তাঁকে সিজদা করে এবং নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করে?” (১৬: ৪৮)।

আর-রাদ 13:16

আল্লাহ তাআ’লা ঘোষণা দিচ্ছেন যে, তিনি ছাড়া কেউ উপাস্য নেই। এই মুশরিকরাও এর স্বীকারুক্তিকারী যে, যমীন ও আসমানের প্রতিপালক ও পরিচালক আল্লাহ তাআ’লাই বটে। এতদসত্ত্বেও তারা তাঁকে ছেড়ে অন্যান্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করছে এবং তাদের উপাসনায় লেগে পড়েছে। অথচ তারা সবাই আল্লাহ তাআ’লার অক্ষম বান্দা। তারা এতো অক্ষম যে, নিজেদেরই লাভ ও ক্ষতির মালিক তারা নয়। সুতরাং এই মুশরিকরা এবং আল্লাহর উপাসক বান্দা এক সমান হতে পারে না। এরা তো অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে। আর আল্লাহর এই খাঁটি বান্দারা রয়েছে আলোর মধ্যে। যতটা পার্থক্য রয়েছে অন্ধ ও চক্ষুষ্মনের মধ্যে এবং অন্ধকার ও আলোর মধ্যে, ততটা পার্থক্য রয়েছে এই দু'দলের মধ্যে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “এই মুশরিকদের নির্ধারিত শরীকরা কি তাদের কাছে কোন জিনিসের সৃষ্টিকর্তা? যার ফলে তাদের কাছে কঠিন হয়ে গেছে যে, কোনটার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ, আর কোনটার সৃষ্টিকর্তা তাদের এই উপাস্যেরা? অথচ এইরূপতো মোটেই নয়। আল্লাহর সাথে সাদৃশ্যযুক্ত, তার সমকক্ষ এবং তাঁর মত কেউই নেই। তিনি উযীর, শরীক, সন্তানাদি এবং স্ত্রী থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। এসব থেকে তাঁর সত্ত্বা বহু উর্ধ্বে। এটা তো মুশরিকদের চরম নির্বুদ্ধিতা যে, তারা তাদের ছোট উপাস্যদেরকে আল্লাহ তাআ’লার সৃষ্ট দাস মনে করা সত্ত্বেও তাদের উপাসনা করতে রয়েছে। (হজ্জের সময়) ‘লাব্বায়েক’ শব্দ উচ্চারণ করতে করতে বলেঃ “হে আল্লাহ! আমরা হাযির আছি। আপনার কোন অংশীদার নেই, কিন্তু শুধুমাত্র ঐ অংশীদার যারা স্বয়ং আপনারই অধিকারীত্বে রয়েছে। আর যে জিনিসের তারা মালিক সে জিনিসেরও প্রকৃত অধিকারী আপনিই।” কুরআন কারীমের অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমরা শুধু মাত্র এ জন্যেই তাদের ইবাদত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করাবে।” (৩৯: ৩) তাদের এই বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করে ইরশাদ হচ্ছেঃ “তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে কেউই তার কাছে মুখ খুলতে পারবে না। আকাশের ফেরেশতা মন্ডলীও তাঁর অনুমতি ছাড়া কারো জন্যে কোন সুপারিশ করতে পারবে না।”কুরআন পাকের এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকট বান্দারূপে উপস্থিত হবে না। তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে গণনা করেছেন এবং কিয়ামতের দিন ওদের সকলেই তাঁর নিকট একাকী অবস্থায় আসবে। (১৯: ৯৩-৯৫) সুতরাং আল্লাহ তাআ’লার বান্দা ও গোলাম হওয়ার দিক দিয়ে সবাই যখন সমান, তখন একে অপরের ইবাদত করা চরম নির্বুদ্ধিতা ও স্পষ্ট অন্যায় হবে না তো কি হবে? আল্লাহ তাআ’লা দুনিয়ার শুরু থেকেই রাসূলদের ক্রম পরম্পরা জারী রেখেছেন। সবাই মানুষকে প্রথম শিক্ষা এই দিয়েছেন যে, আল্লাহর এক এবং ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া কেউই উপাসনার যোগ্য নয়। কিন্তু মানুষ তাদেরকে অবিশ্বাস করেছে এবং তাঁদের বিরোধিতায় লেগে পড়েছে। ফলে তাদের উপর শাস্তির কথা বাস্তবায়িত হয়েছে। এটা কিন্তু আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ হতে যুলুম নয়। তিনি কারো প্রতি যুলুম করেন না।

আর-রাদ 13:17

এখানে সত্য ও মিথ্যা, আসল ও নকল, আসলের স্থায়ীত্ব এবং নকলের অস্থায়ীত্বের দু’টি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছেঃ আল্লাহ তাআ’লা মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। ঝরণা, নদী, নালা ইত্যাদির মাধ্যমে পানি প্রবাহিত হয়। কোনটায় কম এবং কোনটায় বেশি। কোনটা ছোট এবং কোনটা বড়। এটা দৃষ্টান্ত হচ্ছে অন্তরসমূহের ও ওগুলির তারতম্যের। কোনটা আসমানী জ্ঞান বেশী রাখে এবং কোনটা কম রাখে। পানির স্রোতের মুখে ফেনা উখিত হয়। এটা হচ্ছে একটি দৃষ্টান্ত। দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত হচ্ছে, সোনা, রূপা, লৌহ এবং তামার। এগুলিকে আগুনে তাপ দেয়া হয়। এগুলিতে তাপ দিয়ে স্বর্ণ ও রৌপ্য দ্বারা অলংকার তৈরী করা হয় এবং লোহা ও তামা দ্বারা বরতন, ভাঁড় ইত্যাদি তৈরী করা হয়। আগুনে তাপ দেয়ার সময় এগুলিতেও ফেনা জাতীয় জিনিস উথিত হয়। যেমন এ দু’টি জিনিসের ফেনা দূর হয়ে যায়, তেমনিভাবে বাতিল, যা কখনো কখনো হকের উপর ছেয়ে যায়, অবশেষে তা ছাটাঁই হয়ে যায় এবং হক পৃথকভাবে থেকে যায়। যেমন, পানি থেকে ফেনা দূর হয়ে গেলে তা পরিষ্কার হয়ে থেকে যায় এবং স্বর্ণ ও রৌপ্যকে যেমন আগুনে তাপ দিয়ে তার থেকে খুট বা জালকে পৃথক করে দেয়া হয়, তখন সোনা, রূপা, পানি ইত্যাদি দ্বারা দুনিয়াবাসী উপকার লাভ করে থাকে এবং ওগুলির উপর যে খুট ও ফেনা এসেছিল তার কোন নাম নিশানাও আর বাকী থাকে না। আল্লাহ তাআ’লা মানুষকে বুঝবার জন্যে কতই না পরিষ্কার ও স্পষ্ট দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। যেন মানুষ চিন্তা করে ও অনুধাবন করতে পারে। যেমন তিনি বলেনঃ “এই সব দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্যে বর্ণনা করে থাকি। কিন্তু জ্ঞানীগণ ছাড়া কেউই তা অনুধাবন করে না।”পূর্ববর্তী কোন গুরুজন যখন কোন দৃষ্টান্ত বুঝতে অসমর্থ হতেন তখন তারা কাঁদতে শুরু করতেন। কেননা, তা বুঝতে না পারা শুধুমাত্র জ্ঞানশূন্য লোকদের জন্যেই শোভা পায়।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রথম দৃষ্টান্তে ঐ লোকদের বর্ণনা রয়েছে যাদের অন্তর বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর জ্ঞান বহনকারী। কতকগুলি অন্তর এমনও আছে যেগুলিতে সন্দেহ বাকী থেকে যায়। সুতরাং সন্দেহের সাথে আমল নিরর্থক। পূর্ণ বিশ্বাসই পুরোপুরিভাবে উপকার পৌঁছিয়ে থাকে।(আরবি) শব্দ দ্বারা সন্দেহকে বুঝানো হয়েছে, যা নিরর্থক ও বাজে জিনিষ। বিশ্বাসই ফলদায়ক জিনিষ। এটা চিরস্থায়ী হয়। যেমন অলংকারকে আগুনে তাপ দিলে খুট বা নকল জিনিষ পুড়ে যায় এবং খাঁটি জিনিষ বাকী থেকে যায়, তেমনই আল্লাহ তাআ’লার কাছে বিশ্বাস গ্রহণীয় এবং সন্দেহ প্রত্যাখাত। সুতরাং যেমনভাবে পানি থেকে যায় এবং তা পান ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হয় এবং যেমনভাবে খাঁটি সোনা, রূপা ইত্যাদি থেকে যায় এবং অলংকার ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হয় এবং যেমনভাবে তামা, লোহা ইত্যাদি থেকে যায় এবং তার থেকে বিভিন্ন আসবাবপত্র নির্মিত হয়, তেমনিভাবে ভাল ও খাঁটি আমলও আমলকারীকে উপকার পৌঁছিয়ে থাকে এবং তা চিরস্থায়ী থাকে। হিদায়াত ও হকের উপর যে আমল করে সেই লাভবান হয়। যেমন আগুনে তাপ দেয়া ছাড়া লোহা দ্বারা ছুরি, তরবারী ইত্যাদি তৈরি করা যায় না অনুরূপভাবে মিথ্যা, সন্দেহ এবং লোক দেখানোযুক্ত আমল মহান আল্লাহর কাছে ফলদায়ক হতে পারে না। কিয়ামতের দিন বাতিল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং হকের উপর আমলকারী লাভবান হবে। সূরায়ে বাকারার প্রারম্ভে মহামহিমান্বিত আল্লাহ মুনাফিকদের দু’টি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। একটি পানির এবং একটি আগুনের। সূরায়ে নূরে কাফিরদের দু’টি দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। একটি মরিচীকার এবং আর একটি সমূদ্রের তলদেশের অন্ধকারের। গ্রীষ্মকালে দূর থেকে মরুভূমির বালুকারাশিকে তরঙ্গায়িত সমূদ্রের পানি বলে মনে হয়। এ জন্যেই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এসেছেঃ “কিয়ামতের দিন ইয়াহুদীদেরকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তোমরা কি চাও?” উত্তরে তারা বলবেঃ “আমরা অত্যন্ত পিপাসার্ত হয়ে পড়েছি। সুতরাং আমরা পানি চাই।” তখন তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা ফিরে যাচ্ছ না কেন?” এ কথা শুনে তারা জাহান্নামের দিকে ফিরে যাবে এবং দুনিয়ায় যেমন দূর থেকে মরুভূমির বালুকারাশিকে পানি বলে মনে হয় তদ্রুপ তারা সেখানে দেখতে পাবে (এবং পানি মনে করে দৌড়িয়ে যাবে, কিন্তু গিয়ে দেখবে যে, ওগুলো পানি নয়, বরং বালু। তখন তারা নিরাশ হয়ে ফিরে আসবে)।” দ্বিতীয় দৃষ্টান্তে আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘অথবা গভীর সমুদ্র তলের অন্ধকার সদৃশ।” (২৪: ৪০) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু মুসা আশআ’রী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে হিদায়াত ও জ্ঞানসহ আল্লাহ তাআ’লা আমাকে পাঠিয়েছেন তার দৃষ্টান্ত ঐ বৃষ্টির ন্যায় যা যমীনের উপর বর্ষিত হয়েছে। যমীনের এক অংশ পানি গ্রহন করে নিয়েছে, ফলে তাতে প্রচুর পরিমাণে তৃণলতা ও উদ্ভিদ জন্মেছে। দ্বিতীয় প্রকারের যমীন হচ্ছে শোষণ যোগ্য, যা পানি আটকিয়ে রাখে। এর দ্বারা আল্লাহ তাআ’লা জনগণের উপকার সাধন করেন। তারা ঐ পানি নিজেরা পান করে, জীবজন্তুকে পান করায় এবং জমিতে সেচন করে ফসল ফলায়। তৃতীয় প্রকার হচ্ছে কংকরময় ভূমি। না তাতে পানি জমে থাকে, না কোন ফসল উৎপন্ন হয়। এটা হচ্ছে ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করেছে এবং আমাকে পাঠানোর মাধ্যমে আল্লাহ তার উপকার সাধন করেছেন। সে নিজে ইলম শিক্ষা করেছে এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছে। আর এটা হচ্ছে ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে এ জন্যে মাথাও ঘামায়নি এবং যে হিদায়াতসহ আল্লাহ আমাকে প্রেরণ করেছেন তা কবুলও করেনি। সুতরাং সে হচ্ছে ঐ কংকরময় ভূমির ন্যায়।”হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে আগুন জ্বালালো। আগুন যখন ওর আশেপাশের জায়গাগুলিকে আলোকিত করলো তখন পতঙ্গগুলি ঐ আগুনে পড়তে শুরু করলো এবং এভাবে তাদের জীবন শেষ হতে লাগলো। লোকটি বারবার ওগুলিকে আগুনে পড়া হতে বাধা দিতে থাকলো, কিন্তু এতদসত্ত্বেও ওগুলি আগুনে পড়তেই থাকলো। ঠিক এরূপই দৃষ্টান্ত আমার ও তোমাদের। আমি তোমাদের কোমর ধরে তোমাদেরকে বাধা দিচ্ছি এবং বলছি যে, আগুণ থেকে দূরে সরে যাও। কিন্তু তোমরা আমার কথা মানছেনা। বরং আমার নিকট থেকে ছুটে গিয়ে আগুনেই ঝাপ দিচ্ছ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এই দু’জনও তাদের সহীহ' গ্রন্থে এটা তাখরীজ করেছেন। এভাবে হাদীসেও আগুন ও পানি এ দু’টির দৃষ্টান্ত এসে গেল)

আর-রাদ 13:18

আল্লাহ তাআ’লা পূণ্যবান ও পাপিষ্ঠদের পরিণামের খবর দিচ্ছেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে (সঃ) মান্যকারী, তাঁদের আদেশ ও নিষেধ অনুযায়ী আমলকারী, অতীত খবরগুলির প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী উত্তম প্রতিদান প্রাপ্ত হবে। যেমন আল্লাহ তাআ’লা যুলকারনাইন সম্পর্কে খবর দেন যে, তিনি বলেছেনঃ “যুলুমকারীকে আমরা সত্ত্বরই শাস্তি প্রদান করবো, অতঃপর তাকে তার প্রতিপালকের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং তিনি তাকে জঘন্য শাস্তি প্রদান করবেন। আর যে ভাল কাজ করবে, তার জন্যে রয়েছে উত্তম প্রতিদান এবং আমরাও তার সাথে নম্রভাবে কথা বলবো।” আল্লাহ তাআ’লা অন্য জায়গায় বলেনঃ “যারা ভাল কাজ করেছে তাদের জন্যে উত্তম বিনিময় রয়েছে এবং অতিরিক্তও রয়েছে।” আর এক স্থানে মহান আল্লাহ বলেনঃ “যারা আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয় না অর্থাৎ তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে না, তারা কিয়ামতের দিন এমন শাস্তি দেখবে যে, যদি তাদের কাছে পৃথিবীপূর্ণ সোনা থাকে তাহলে তারা তাদের মুক্তিপণ হিসেবে তা দিতেও প্রস্তুত থাকবে, এমন কি যদি আরো ঐ পরিমাণ হয় তবুও, কিন্তু কিয়ামতের দিন না মুক্তিপণের ব্যবস্থা থাকবে, না বিনিময় গ্রহণ করা হবে। সেদিন তাদের পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিচার করা হবে। একটা ছাল বা বাকল এবং একটা শস্যেরও হিসাব নেয়া হবে। এ জন্যেই আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “জাহান্নাম হবে তাদের আবাস এবং ওটা কতই না নিকৃষ্ট আশ্রয় স্থল!”

আর-রাদ 13:19

আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় নবীকে (সঃ) বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা যে ব্যক্তি সরাসরি সত্য বলে জানে বা বিশ্বাস করে, তাতে তার কোন সংশয় ও সন্দেহ থাকে না, সে একটিকে আর একটির সত্যতা প্রতিপাদনকারী ও আনুকূল্যকারী মনে করে, সব খবরকেই সত্য বলে বিশ্বাস করে, তোমার সত্যবাদিতার কথা অকপটে স্বীকার করে, আর দ্বিতীয় আর একটি ব্যক্তি, অন্তর্চক্ষু অন্ধ, মঙ্গল বুঝেই না এবং বুঝলেও মানে না ও বিশ্বাস করে না, এ দু’জন কি কখনও সমান হতে পারে? কখনো না। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।” এই ঘোষনা এখানেও দেয়া হয়েছে যে, এ দু'জন সমান নয়। কথা এই যে, বুদ্ধিমান ও বিবেকশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।

আর-রাদ 13:20

২০-২৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা ঐ মহান ব্যক্তিদের প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দিচ্ছেন এবং তাঁদের ভাল পরিণামের খবর দিচ্ছেন যারা আখেরাতে বেহেশতের মালিক হবেন এবং দুনিয়াতেও যাদের পরিণাম হবে অতি উত্তম। তাঁরা মুনাফিকদের মত নন যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করে। এটা মুনাফিকদেরই স্বভাব যে, তারা কোন ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করবে, ঝগড়ায় কটু বাক্য প্রয়োগ করবে, কথা মিথ্যা বলবে এবং আমানতে খিয়ানত করবে। আর ঐ উত্তম গুণের অধিকারী মুমিনমু’মিনদের স্বভাব এই যে, তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন, তাদের সাথে সদাচরণ করেন, অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র লোকদেরকে দান করেন এবং সকলের সাথে সদয় ব্যবহার করেন। তারা আল্লাহর নির্দেশ ক্রমেই এগুলো করে থাকেন।আল্লাহ তাআ’লার উক্তিঃ ‘তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে’ অর্থাৎ তারা সৎ কাজ করেন আল্লাহর নির্দেশ মনে করে এবং অসৎ কার্য পরিত্যাগ করেন আল্লাহর নির্দেশ মনে করেই। তাঁরা আখেরাতের কঠোর হিসাবকে ভয় করেন। এ জন্যেই তারা মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকেন, সৎ কার্যের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন, মধ্যম পথকে তারা কোন সময়ই পরিত্যাগ করেন না। সর্বাবস্থায়ই আল্লাহ তাআ’লার প্রতি লক্ষ্য রাখেন। হারাম কাজ এবং আল্লাহর নাফরমানীর দিকে প্রবৃত্তি তাদেরকে আকর্ষণ করলেও তারা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং আখেরাতের সওয়াবের কথা স্মরণ করে এবং আল্লাহ তাআ’লার সন্তুষ্টি কামনা করে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকেন। তারা নামাযের পূর্ণরূপে হিফাযত করেন। রুকু ও সিজদার সময় শরীয়ত অনুযায়ী বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে থাকেন। আল্লাহ যাদেরকে দান করতে বলেছেন তাদেরকে তারা আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ থেকে দান করে থাকেন। দরিদ্র, অভাবী ও মিসকীন নিজেদের মধ্যকার হোক বা দূর সম্পৰ্কীয় হোক, তাদের বরকত থেকে তারা বঞ্চিত হন না। গোপনে ও প্রকাশ্যে, সময়ে-অসময়ে তারা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকেন। তারা মন্দকে ভাল দ্বারা এবং শক্রতাকে বন্ধুত্ব দ্বারা দূরীভূত করে থাকেন। কেউ তাঁদের সাথে অসদাচরণ করলে তারা তার সাথে সদাচরণ করেন। তাঁদের সামনে কেউ মস্তক উত্তোলন করলে তারা মস্তক অবনত করেন। তাঁরা অন্যদের যুলুম সহ্য করে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করেন। কুরআন কারীমের শিক্ষা হচ্ছেঃ “মন্দকে ভাল দ্বারা দূরীভূত কর, তাহলে তোমার মধ্যে ও তার মধ্যে যে শত্রুতা ছিল তা দূর হয়ে গিয়ে এমন হবে যে, সে যেন তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। ধৈর্যশীল ও সৌভাগ্যবান ব্যক্তিই এই মর্যাদা লাভ করে থাকে।” এই রূপ লোকদের জন্যেই উত্তম পরিণাম রয়েছে।সেই উত্তম পরিণাম এবং উত্তম ঘর হচ্ছে জান্নাত, যা অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতের একটি প্রাসাদের নাম ‘আদন’। তাতে মিনার ও কক্ষ রয়েছে। তাতে রয়েছে পাঁচ হাজার দরজা। প্রত্যেক দরজার উপর পাঁচ হাজার ফেরেশতা রয়েছেন। ঐ প্রাসাদটি নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের জন্যে নির্দিষ্ট। যহাক (রঃ) বলেন যে, এটা জান্নাতের শহর। এতে থাকবেন নবীগণ, শহীদগণ এবং হিদায়াতের ইমামগণ। তাদের আশে পাশে অন্যান্য লোকেরা থাকবেন। ওর চতুর্দিকে অন্যান্য বেহেশত রয়েছে। ওখানে তারা তাঁদের প্রিয়জনকেও তাদের সাথে দেখতে পাবেন। তাদের সাথে থাকবেন তাঁদের মুমিনমু’মিন পিতা, পিতামহ, পুত্র, পৌত্র, স্ত্রী ইত্যাদি আত্মীয় স্বজন। তারা সুখে শান্তিতে অবস্থান করবেন এবং তাঁদের চক্ষুগুলি ঠাণ্ডা হবে। এমন কি তাদের মধ্যে কারো কারো আমল যদি তাকে ঐ উচ্চ মর্যাদায় পৌছাবার যোগ্যতা নাও রাখে, তবুও আল্লাহ তাআ’লা তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন এবং ঐ উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দেবেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে” এবং তাদের সন্তানরা ঈমানের মাধ্যমে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সাথে তাদের সন্তানদেরকে মিলিত করবো।” (৫২: ২১)।তাঁদেরকে মুবারকবাদ ও সালাম জ্ঞাপনের জন্যে সদাসর্বদা প্রত্যেকটি দরজা দিয়ে ফেরেশতাগণ যাতায়াত করবেন। এটাও আল্লাহ তাআ’লার একটি নিয়ামত। এর ফলে তাঁরা সব সময় খুশী থাকবেন এবং সুসংবাদ শুনবেন। এটা ফেরেশতাদের সৌভাগ্যের কারণ যে, তাঁরা শান্তির ঘরে নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সংস্পর্শে থাকতে পাবেন। এতে তারা নিজেদের জীবনকে ধন্য মনে করবেন।হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম কে জান্নাতে যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আল্লাহও সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম জান্নাতে যাবে দরিদ্র মুহাজিরগণ, যারা দুনিয়ার ভোগ বিলাস হতে দূরে ছিল, কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতো। যাদের মনের বাসনা মনেই রয়ে গিয়েছিল এমতাবস্থায় তারা মৃত্যুবরণ করেছিল। রহমতের ফেরেশতাদেরকে বলা হবেঃ “যাও, তাদেরকে মুবারকবাদ দাও।” ফেরেশতাগণ বলবেনঃ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার আকাশের অধিবাসী উত্তম মাখলুক। আপনি কি আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমরা গিয়ে তাদেরকে সালাম করবো এবং মুবারকবাদ জানাবো?” উত্তরে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ “এরা হচ্ছে আমার সেই বান্দা যারা শুধু আমারই ইবাদত করতো, আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করে নাই, পার্থিব সুখ-সম্ভোগ হতে বঞ্চিত ছিল এবং কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করেছিল। তাদের কোন মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় নাই। এতত্সত্ত্বেও তারা ধৈর্য ধারণ করেছে ও কৃতজ্ঞ থেকেছে।” তখন ফেরেশতারা তাড়াতাড়ি অতি আগ্রহের সাথে তাদের দিকে দৌড় দিবেন। এদিক ওদিকের প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেন এবং সালাম করে তাদেরকে মুবারকবাদ জানাবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম যে সব লোক বেহেশতে প্রবেশ করবে তারা হচ্ছে দরিদ্র মুহাজিররা। তারা কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্যে পতিত ছিল। যখনই তাদেরকে যে হুকুম করা হয়েছে তখনই তারা তা পালন করেছে। বাদশাহদের কাছে তাদের প্রয়োজন হতো। কিন্তু মৃত্যু পর্যন্ত তাদের প্রয়োজন পুরা হয় নাই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআ’লা জান্নাতকে সামনে আসতে বলবেন। জান্নাত তখন সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়ে আল্লাহ তাআ’লার সামনে হাজির হবে। ঐ সময় আল্লাহ তাআ’লা ঘোষণা করবেনঃ “আমার যে সব বান্দা আমার পথে জিহাদ করতো, আমার পথে যাদেরকে কষ্ট দেয়া হতো তারা আজ কোথায়? তোমরা এসো, বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাও।” ঐ সময় ফেরেশতারা আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে যাবেন এবং আরয করবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এরা কারা যাদেরকে আপনি আমাদের উপরও ফযীলত দান করলেন?” মহামহিমান্বিত আল্লাহ উত্তরে বলবেনঃ “এরা আমার ঐ বান্দা যারা আমার পথে জিহাদ করেছে এবং আমার পথে কষ্ট সহ্য করেছে।” ফেরেশতারা তখন তড়িৎ গতিতে এদিকে ওদিকের দরজা দিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে যাবেন, তাদেরকে সালাম করবেন এবং মুবারকবাদ জানিয়ে বলবেনঃ “আপনারা আপনাদের ধৈর্য ধারনের কতই না উত্তম বিনিময় লাভ করেছেন।” আবু উমামা (রাঃ) বলেনঃ “মু'মিন বেহেশতের মধ্যে নিজের আসনের উপর আরামে অত্যন্ত শান শওকতের সাথে হেলান দিয়ে বসে থাকবে। সেবক দল সারি সারি ভাবে এদিকে ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকবে। যে দরজার খাদেমের কাছে ফেরেশতা অনুমতি চাইবেন, তিনি তাঁর পার্শ্ববর্তী খাদেমকে বলবেন। তিনি আবার অন্যকে বলবেন এবং তিনি আবার অপরকে বলবেন। শেষ পর্যন্ত মুমিনমু’মিনকে জিজ্ঞেস করা হবে। মুমিনমু’মিন আসার অনুমতি দেবে। এইভাবে একে অপরের কাছে পয়গাম পৌছাবে এবং সর্বশেষ খাদেম ফেরেশতাকে অনুমতি দেবে ও দরজা খুলে দেবে। ফেরেশতা তখন প্রবেশ করে সালাম করতঃ চলে যাবেন।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক বছরের মাথায় শহীদদের কবরের কাছে আসতেন এবং বলতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছে বলে তোমাদের প্রতি শান্তি, কতই উত্তম এই পরিণাম।” এইরূপই হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উসমান (রাঃ) করতেন।

আর-রাদ 13:21

২০-২৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা ঐ মহান ব্যক্তিদের প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দিচ্ছেন এবং তাঁদের ভাল পরিণামের খবর দিচ্ছেন যারা আখেরাতে বেহেশতের মালিক হবেন এবং দুনিয়াতেও যাদের পরিণাম হবে অতি উত্তম। তাঁরা মুনাফিকদের মত নন যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করে। এটা মুনাফিকদেরই স্বভাব যে, তারা কোন ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করবে, ঝগড়ায় কটু বাক্য প্রয়োগ করবে, কথা মিথ্যা বলবে এবং আমানতে খিয়ানত করবে। আর ঐ উত্তম গুণের অধিকারী মুমিনমু’মিনদের স্বভাব এই যে, তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন, তাদের সাথে সদাচরণ করেন, অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র লোকদেরকে দান করেন এবং সকলের সাথে সদয় ব্যবহার করেন। তারা আল্লাহর নির্দেশ ক্রমেই এগুলো করে থাকেন।আল্লাহ তাআ’লার উক্তিঃ ‘তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে’ অর্থাৎ তারা সৎ কাজ করেন আল্লাহর নির্দেশ মনে করে এবং অসৎ কার্য পরিত্যাগ করেন আল্লাহর নির্দেশ মনে করেই। তাঁরা আখেরাতের কঠোর হিসাবকে ভয় করেন। এ জন্যেই তারা মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকেন, সৎ কার্যের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন, মধ্যম পথকে তারা কোন সময়ই পরিত্যাগ করেন না। সর্বাবস্থায়ই আল্লাহ তাআ’লার প্রতি লক্ষ্য রাখেন। হারাম কাজ এবং আল্লাহর নাফরমানীর দিকে প্রবৃত্তি তাদেরকে আকর্ষণ করলেও তারা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং আখেরাতের সওয়াবের কথা স্মরণ করে এবং আল্লাহ তাআ’লার সন্তুষ্টি কামনা করে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকেন। তারা নামাযের পূর্ণরূপে হিফাযত করেন। রুকু ও সিজদার সময় শরীয়ত অনুযায়ী বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে থাকেন। আল্লাহ যাদেরকে দান করতে বলেছেন তাদেরকে তারা আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ থেকে দান করে থাকেন। দরিদ্র, অভাবী ও মিসকীন নিজেদের মধ্যকার হোক বা দূর সম্পৰ্কীয় হোক, তাদের বরকত থেকে তারা বঞ্চিত হন না। গোপনে ও প্রকাশ্যে, সময়ে-অসময়ে তারা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকেন। তারা মন্দকে ভাল দ্বারা এবং শক্রতাকে বন্ধুত্ব দ্বারা দূরীভূত করে থাকেন। কেউ তাঁদের সাথে অসদাচরণ করলে তারা তার সাথে সদাচরণ করেন। তাঁদের সামনে কেউ মস্তক উত্তোলন করলে তারা মস্তক অবনত করেন। তাঁরা অন্যদের যুলুম সহ্য করে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করেন। কুরআন কারীমের শিক্ষা হচ্ছেঃ “মন্দকে ভাল দ্বারা দূরীভূত কর, তাহলে তোমার মধ্যে ও তার মধ্যে যে শত্রুতা ছিল তা দূর হয়ে গিয়ে এমন হবে যে, সে যেন তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। ধৈর্যশীল ও সৌভাগ্যবান ব্যক্তিই এই মর্যাদা লাভ করে থাকে।” এই রূপ লোকদের জন্যেই উত্তম পরিণাম রয়েছে।সেই উত্তম পরিণাম এবং উত্তম ঘর হচ্ছে জান্নাত, যা অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতের একটি প্রাসাদের নাম ‘আদন’। তাতে মিনার ও কক্ষ রয়েছে। তাতে রয়েছে পাঁচ হাজার দরজা। প্রত্যেক দরজার উপর পাঁচ হাজার ফেরেশতা রয়েছেন। ঐ প্রাসাদটি নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের জন্যে নির্দিষ্ট। যহাক (রঃ) বলেন যে, এটা জান্নাতের শহর। এতে থাকবেন নবীগণ, শহীদগণ এবং হিদায়াতের ইমামগণ। তাদের আশে পাশে অন্যান্য লোকেরা থাকবেন। ওর চতুর্দিকে অন্যান্য বেহেশত রয়েছে। ওখানে তারা তাঁদের প্রিয়জনকেও তাদের সাথে দেখতে পাবেন। তাদের সাথে থাকবেন তাঁদের মুমিনমু’মিন পিতা, পিতামহ, পুত্র, পৌত্র, স্ত্রী ইত্যাদি আত্মীয় স্বজন। তারা সুখে শান্তিতে অবস্থান করবেন এবং তাঁদের চক্ষুগুলি ঠাণ্ডা হবে। এমন কি তাদের মধ্যে কারো কারো আমল যদি তাকে ঐ উচ্চ মর্যাদায় পৌছাবার যোগ্যতা নাও রাখে, তবুও আল্লাহ তাআ’লা তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন এবং ঐ উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দেবেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে” এবং তাদের সন্তানরা ঈমানের মাধ্যমে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সাথে তাদের সন্তানদেরকে মিলিত করবো।” (৫২: ২১)।তাঁদেরকে মুবারকবাদ ও সালাম জ্ঞাপনের জন্যে সদাসর্বদা প্রত্যেকটি দরজা দিয়ে ফেরেশতাগণ যাতায়াত করবেন। এটাও আল্লাহ তাআ’লার একটি নিয়ামত। এর ফলে তাঁরা সব সময় খুশী থাকবেন এবং সুসংবাদ শুনবেন। এটা ফেরেশতাদের সৌভাগ্যের কারণ যে, তাঁরা শান্তির ঘরে নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সংস্পর্শে থাকতে পাবেন। এতে তারা নিজেদের জীবনকে ধন্য মনে করবেন।হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম কে জান্নাতে যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আল্লাহও সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম জান্নাতে যাবে দরিদ্র মুহাজিরগণ, যারা দুনিয়ার ভোগ বিলাস হতে দূরে ছিল, কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতো। যাদের মনের বাসনা মনেই রয়ে গিয়েছিল এমতাবস্থায় তারা মৃত্যুবরণ করেছিল। রহমতের ফেরেশতাদেরকে বলা হবেঃ “যাও, তাদেরকে মুবারকবাদ দাও।” ফেরেশতাগণ বলবেনঃ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার আকাশের অধিবাসী উত্তম মাখলুক। আপনি কি আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমরা গিয়ে তাদেরকে সালাম করবো এবং মুবারকবাদ জানাবো?” উত্তরে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ “এরা হচ্ছে আমার সেই বান্দা যারা শুধু আমারই ইবাদত করতো, আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করে নাই, পার্থিব সুখ-সম্ভোগ হতে বঞ্চিত ছিল এবং কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করেছিল। তাদের কোন মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় নাই। এতত্সত্ত্বেও তারা ধৈর্য ধারণ করেছে ও কৃতজ্ঞ থেকেছে।” তখন ফেরেশতারা তাড়াতাড়ি অতি আগ্রহের সাথে তাদের দিকে দৌড় দিবেন। এদিক ওদিকের প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেন এবং সালাম করে তাদেরকে মুবারকবাদ জানাবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম যে সব লোক বেহেশতে প্রবেশ করবে তারা হচ্ছে দরিদ্র মুহাজিররা। তারা কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্যে পতিত ছিল। যখনই তাদেরকে যে হুকুম করা হয়েছে তখনই তারা তা পালন করেছে। বাদশাহদের কাছে তাদের প্রয়োজন হতো। কিন্তু মৃত্যু পর্যন্ত তাদের প্রয়োজন পুরা হয় নাই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআ’লা জান্নাতকে সামনে আসতে বলবেন। জান্নাত তখন সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়ে আল্লাহ তাআ’লার সামনে হাজির হবে। ঐ সময় আল্লাহ তাআ’লা ঘোষণা করবেনঃ “আমার যে সব বান্দা আমার পথে জিহাদ করতো, আমার পথে যাদেরকে কষ্ট দেয়া হতো তারা আজ কোথায়? তোমরা এসো, বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাও।” ঐ সময় ফেরেশতারা আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে যাবেন এবং আরয করবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এরা কারা যাদেরকে আপনি আমাদের উপরও ফযীলত দান করলেন?” মহামহিমান্বিত আল্লাহ উত্তরে বলবেনঃ “এরা আমার ঐ বান্দা যারা আমার পথে জিহাদ করেছে এবং আমার পথে কষ্ট সহ্য করেছে।” ফেরেশতারা তখন তড়িৎ গতিতে এদিকে ওদিকের দরজা দিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে যাবেন, তাদেরকে সালাম করবেন এবং মুবারকবাদ জানিয়ে বলবেনঃ “আপনারা আপনাদের ধৈর্য ধারনের কতই না উত্তম বিনিময় লাভ করেছেন।” আবু উমামা (রাঃ) বলেনঃ “মু'মিন বেহেশতের মধ্যে নিজের আসনের উপর আরামে অত্যন্ত শান শওকতের সাথে হেলান দিয়ে বসে থাকবে। সেবক দল সারি সারি ভাবে এদিকে ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকবে। যে দরজার খাদেমের কাছে ফেরেশতা অনুমতি চাইবেন, তিনি তাঁর পার্শ্ববর্তী খাদেমকে বলবেন। তিনি আবার অন্যকে বলবেন এবং তিনি আবার অপরকে বলবেন। শেষ পর্যন্ত মুমিনমু’মিনকে জিজ্ঞেস করা হবে। মুমিনমু’মিন আসার অনুমতি দেবে। এইভাবে একে অপরের কাছে পয়গাম পৌছাবে এবং সর্বশেষ খাদেম ফেরেশতাকে অনুমতি দেবে ও দরজা খুলে দেবে। ফেরেশতা তখন প্রবেশ করে সালাম করতঃ চলে যাবেন।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক বছরের মাথায় শহীদদের কবরের কাছে আসতেন এবং বলতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছে বলে তোমাদের প্রতি শান্তি, কতই উত্তম এই পরিণাম।” এইরূপই হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উসমান (রাঃ) করতেন।

আর-রাদ 13:22

২০-২৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা ঐ মহান ব্যক্তিদের প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দিচ্ছেন এবং তাঁদের ভাল পরিণামের খবর দিচ্ছেন যারা আখেরাতে বেহেশতের মালিক হবেন এবং দুনিয়াতেও যাদের পরিণাম হবে অতি উত্তম। তাঁরা মুনাফিকদের মত নন যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করে। এটা মুনাফিকদেরই স্বভাব যে, তারা কোন ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করবে, ঝগড়ায় কটু বাক্য প্রয়োগ করবে, কথা মিথ্যা বলবে এবং আমানতে খিয়ানত করবে। আর ঐ উত্তম গুণের অধিকারী মুমিনমু’মিনদের স্বভাব এই যে, তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন, তাদের সাথে সদাচরণ করেন, অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র লোকদেরকে দান করেন এবং সকলের সাথে সদয় ব্যবহার করেন। তারা আল্লাহর নির্দেশ ক্রমেই এগুলো করে থাকেন।আল্লাহ তাআ’লার উক্তিঃ ‘তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে’ অর্থাৎ তারা সৎ কাজ করেন আল্লাহর নির্দেশ মনে করে এবং অসৎ কার্য পরিত্যাগ করেন আল্লাহর নির্দেশ মনে করেই। তাঁরা আখেরাতের কঠোর হিসাবকে ভয় করেন। এ জন্যেই তারা মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকেন, সৎ কার্যের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন, মধ্যম পথকে তারা কোন সময়ই পরিত্যাগ করেন না। সর্বাবস্থায়ই আল্লাহ তাআ’লার প্রতি লক্ষ্য রাখেন। হারাম কাজ এবং আল্লাহর নাফরমানীর দিকে প্রবৃত্তি তাদেরকে আকর্ষণ করলেও তারা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং আখেরাতের সওয়াবের কথা স্মরণ করে এবং আল্লাহ তাআ’লার সন্তুষ্টি কামনা করে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকেন। তারা নামাযের পূর্ণরূপে হিফাযত করেন। রুকু ও সিজদার সময় শরীয়ত অনুযায়ী বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে থাকেন। আল্লাহ যাদেরকে দান করতে বলেছেন তাদেরকে তারা আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ থেকে দান করে থাকেন। দরিদ্র, অভাবী ও মিসকীন নিজেদের মধ্যকার হোক বা দূর সম্পৰ্কীয় হোক, তাদের বরকত থেকে তারা বঞ্চিত হন না। গোপনে ও প্রকাশ্যে, সময়ে-অসময়ে তারা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকেন। তারা মন্দকে ভাল দ্বারা এবং শক্রতাকে বন্ধুত্ব দ্বারা দূরীভূত করে থাকেন। কেউ তাঁদের সাথে অসদাচরণ করলে তারা তার সাথে সদাচরণ করেন। তাঁদের সামনে কেউ মস্তক উত্তোলন করলে তারা মস্তক অবনত করেন। তাঁরা অন্যদের যুলুম সহ্য করে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করেন। কুরআন কারীমের শিক্ষা হচ্ছেঃ “মন্দকে ভাল দ্বারা দূরীভূত কর, তাহলে তোমার মধ্যে ও তার মধ্যে যে শত্রুতা ছিল তা দূর হয়ে গিয়ে এমন হবে যে, সে যেন তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। ধৈর্যশীল ও সৌভাগ্যবান ব্যক্তিই এই মর্যাদা লাভ করে থাকে।” এই রূপ লোকদের জন্যেই উত্তম পরিণাম রয়েছে।সেই উত্তম পরিণাম এবং উত্তম ঘর হচ্ছে জান্নাত, যা অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতের একটি প্রাসাদের নাম ‘আদন’। তাতে মিনার ও কক্ষ রয়েছে। তাতে রয়েছে পাঁচ হাজার দরজা। প্রত্যেক দরজার উপর পাঁচ হাজার ফেরেশতা রয়েছেন। ঐ প্রাসাদটি নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের জন্যে নির্দিষ্ট। যহাক (রঃ) বলেন যে, এটা জান্নাতের শহর। এতে থাকবেন নবীগণ, শহীদগণ এবং হিদায়াতের ইমামগণ। তাদের আশে পাশে অন্যান্য লোকেরা থাকবেন। ওর চতুর্দিকে অন্যান্য বেহেশত রয়েছে। ওখানে তারা তাঁদের প্রিয়জনকেও তাদের সাথে দেখতে পাবেন। তাদের সাথে থাকবেন তাঁদের মুমিনমু’মিন পিতা, পিতামহ, পুত্র, পৌত্র, স্ত্রী ইত্যাদি আত্মীয় স্বজন। তারা সুখে শান্তিতে অবস্থান করবেন এবং তাঁদের চক্ষুগুলি ঠাণ্ডা হবে। এমন কি তাদের মধ্যে কারো কারো আমল যদি তাকে ঐ উচ্চ মর্যাদায় পৌছাবার যোগ্যতা নাও রাখে, তবুও আল্লাহ তাআ’লা তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন এবং ঐ উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দেবেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে” এবং তাদের সন্তানরা ঈমানের মাধ্যমে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সাথে তাদের সন্তানদেরকে মিলিত করবো।” (৫২: ২১)।তাঁদেরকে মুবারকবাদ ও সালাম জ্ঞাপনের জন্যে সদাসর্বদা প্রত্যেকটি দরজা দিয়ে ফেরেশতাগণ যাতায়াত করবেন। এটাও আল্লাহ তাআ’লার একটি নিয়ামত। এর ফলে তাঁরা সব সময় খুশী থাকবেন এবং সুসংবাদ শুনবেন। এটা ফেরেশতাদের সৌভাগ্যের কারণ যে, তাঁরা শান্তির ঘরে নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সংস্পর্শে থাকতে পাবেন। এতে তারা নিজেদের জীবনকে ধন্য মনে করবেন।হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম কে জান্নাতে যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আল্লাহও সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম জান্নাতে যাবে দরিদ্র মুহাজিরগণ, যারা দুনিয়ার ভোগ বিলাস হতে দূরে ছিল, কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতো। যাদের মনের বাসনা মনেই রয়ে গিয়েছিল এমতাবস্থায় তারা মৃত্যুবরণ করেছিল। রহমতের ফেরেশতাদেরকে বলা হবেঃ “যাও, তাদেরকে মুবারকবাদ দাও।” ফেরেশতাগণ বলবেনঃ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার আকাশের অধিবাসী উত্তম মাখলুক। আপনি কি আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমরা গিয়ে তাদেরকে সালাম করবো এবং মুবারকবাদ জানাবো?” উত্তরে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ “এরা হচ্ছে আমার সেই বান্দা যারা শুধু আমারই ইবাদত করতো, আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করে নাই, পার্থিব সুখ-সম্ভোগ হতে বঞ্চিত ছিল এবং কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করেছিল। তাদের কোন মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় নাই। এতত্সত্ত্বেও তারা ধৈর্য ধারণ করেছে ও কৃতজ্ঞ থেকেছে।” তখন ফেরেশতারা তাড়াতাড়ি অতি আগ্রহের সাথে তাদের দিকে দৌড় দিবেন। এদিক ওদিকের প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেন এবং সালাম করে তাদেরকে মুবারকবাদ জানাবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম যে সব লোক বেহেশতে প্রবেশ করবে তারা হচ্ছে দরিদ্র মুহাজিররা। তারা কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্যে পতিত ছিল। যখনই তাদেরকে যে হুকুম করা হয়েছে তখনই তারা তা পালন করেছে। বাদশাহদের কাছে তাদের প্রয়োজন হতো। কিন্তু মৃত্যু পর্যন্ত তাদের প্রয়োজন পুরা হয় নাই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআ’লা জান্নাতকে সামনে আসতে বলবেন। জান্নাত তখন সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়ে আল্লাহ তাআ’লার সামনে হাজির হবে। ঐ সময় আল্লাহ তাআ’লা ঘোষণা করবেনঃ “আমার যে সব বান্দা আমার পথে জিহাদ করতো, আমার পথে যাদেরকে কষ্ট দেয়া হতো তারা আজ কোথায়? তোমরা এসো, বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাও।” ঐ সময় ফেরেশতারা আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে যাবেন এবং আরয করবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এরা কারা যাদেরকে আপনি আমাদের উপরও ফযীলত দান করলেন?” মহামহিমান্বিত আল্লাহ উত্তরে বলবেনঃ “এরা আমার ঐ বান্দা যারা আমার পথে জিহাদ করেছে এবং আমার পথে কষ্ট সহ্য করেছে।” ফেরেশতারা তখন তড়িৎ গতিতে এদিকে ওদিকের দরজা দিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে যাবেন, তাদেরকে সালাম করবেন এবং মুবারকবাদ জানিয়ে বলবেনঃ “আপনারা আপনাদের ধৈর্য ধারনের কতই না উত্তম বিনিময় লাভ করেছেন।” আবু উমামা (রাঃ) বলেনঃ “মু'মিন বেহেশতের মধ্যে নিজের আসনের উপর আরামে অত্যন্ত শান শওকতের সাথে হেলান দিয়ে বসে থাকবে। সেবক দল সারি সারি ভাবে এদিকে ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকবে। যে দরজার খাদেমের কাছে ফেরেশতা অনুমতি চাইবেন, তিনি তাঁর পার্শ্ববর্তী খাদেমকে বলবেন। তিনি আবার অন্যকে বলবেন এবং তিনি আবার অপরকে বলবেন। শেষ পর্যন্ত মুমিনমু’মিনকে জিজ্ঞেস করা হবে। মুমিনমু’মিন আসার অনুমতি দেবে। এইভাবে একে অপরের কাছে পয়গাম পৌছাবে এবং সর্বশেষ খাদেম ফেরেশতাকে অনুমতি দেবে ও দরজা খুলে দেবে। ফেরেশতা তখন প্রবেশ করে সালাম করতঃ চলে যাবেন।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক বছরের মাথায় শহীদদের কবরের কাছে আসতেন এবং বলতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছে বলে তোমাদের প্রতি শান্তি, কতই উত্তম এই পরিণাম।” এইরূপই হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উসমান (রাঃ) করতেন।

আর-রাদ 13:23

২০-২৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা ঐ মহান ব্যক্তিদের প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দিচ্ছেন এবং তাঁদের ভাল পরিণামের খবর দিচ্ছেন যারা আখেরাতে বেহেশতের মালিক হবেন এবং দুনিয়াতেও যাদের পরিণাম হবে অতি উত্তম। তাঁরা মুনাফিকদের মত নন যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করে। এটা মুনাফিকদেরই স্বভাব যে, তারা কোন ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করবে, ঝগড়ায় কটু বাক্য প্রয়োগ করবে, কথা মিথ্যা বলবে এবং আমানতে খিয়ানত করবে। আর ঐ উত্তম গুণের অধিকারী মুমিনমু’মিনদের স্বভাব এই যে, তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন, তাদের সাথে সদাচরণ করেন, অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র লোকদেরকে দান করেন এবং সকলের সাথে সদয় ব্যবহার করেন। তারা আল্লাহর নির্দেশ ক্রমেই এগুলো করে থাকেন।আল্লাহ তাআ’লার উক্তিঃ ‘তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে’ অর্থাৎ তারা সৎ কাজ করেন আল্লাহর নির্দেশ মনে করে এবং অসৎ কার্য পরিত্যাগ করেন আল্লাহর নির্দেশ মনে করেই। তাঁরা আখেরাতের কঠোর হিসাবকে ভয় করেন। এ জন্যেই তারা মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকেন, সৎ কার্যের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন, মধ্যম পথকে তারা কোন সময়ই পরিত্যাগ করেন না। সর্বাবস্থায়ই আল্লাহ তাআ’লার প্রতি লক্ষ্য রাখেন। হারাম কাজ এবং আল্লাহর নাফরমানীর দিকে প্রবৃত্তি তাদেরকে আকর্ষণ করলেও তারা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং আখেরাতের সওয়াবের কথা স্মরণ করে এবং আল্লাহ তাআ’লার সন্তুষ্টি কামনা করে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকেন। তারা নামাযের পূর্ণরূপে হিফাযত করেন। রুকু ও সিজদার সময় শরীয়ত অনুযায়ী বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে থাকেন। আল্লাহ যাদেরকে দান করতে বলেছেন তাদেরকে তারা আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ থেকে দান করে থাকেন। দরিদ্র, অভাবী ও মিসকীন নিজেদের মধ্যকার হোক বা দূর সম্পৰ্কীয় হোক, তাদের বরকত থেকে তারা বঞ্চিত হন না। গোপনে ও প্রকাশ্যে, সময়ে-অসময়ে তারা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকেন। তারা মন্দকে ভাল দ্বারা এবং শক্রতাকে বন্ধুত্ব দ্বারা দূরীভূত করে থাকেন। কেউ তাঁদের সাথে অসদাচরণ করলে তারা তার সাথে সদাচরণ করেন। তাঁদের সামনে কেউ মস্তক উত্তোলন করলে তারা মস্তক অবনত করেন। তাঁরা অন্যদের যুলুম সহ্য করে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করেন। কুরআন কারীমের শিক্ষা হচ্ছেঃ “মন্দকে ভাল দ্বারা দূরীভূত কর, তাহলে তোমার মধ্যে ও তার মধ্যে যে শত্রুতা ছিল তা দূর হয়ে গিয়ে এমন হবে যে, সে যেন তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। ধৈর্যশীল ও সৌভাগ্যবান ব্যক্তিই এই মর্যাদা লাভ করে থাকে।” এই রূপ লোকদের জন্যেই উত্তম পরিণাম রয়েছে।সেই উত্তম পরিণাম এবং উত্তম ঘর হচ্ছে জান্নাত, যা অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতের একটি প্রাসাদের নাম ‘আদন’। তাতে মিনার ও কক্ষ রয়েছে। তাতে রয়েছে পাঁচ হাজার দরজা। প্রত্যেক দরজার উপর পাঁচ হাজার ফেরেশতা রয়েছেন। ঐ প্রাসাদটি নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের জন্যে নির্দিষ্ট। যহাক (রঃ) বলেন যে, এটা জান্নাতের শহর। এতে থাকবেন নবীগণ, শহীদগণ এবং হিদায়াতের ইমামগণ। তাদের আশে পাশে অন্যান্য লোকেরা থাকবেন। ওর চতুর্দিকে অন্যান্য বেহেশত রয়েছে। ওখানে তারা তাঁদের প্রিয়জনকেও তাদের সাথে দেখতে পাবেন। তাদের সাথে থাকবেন তাঁদের মুমিনমু’মিন পিতা, পিতামহ, পুত্র, পৌত্র, স্ত্রী ইত্যাদি আত্মীয় স্বজন। তারা সুখে শান্তিতে অবস্থান করবেন এবং তাঁদের চক্ষুগুলি ঠাণ্ডা হবে। এমন কি তাদের মধ্যে কারো কারো আমল যদি তাকে ঐ উচ্চ মর্যাদায় পৌছাবার যোগ্যতা নাও রাখে, তবুও আল্লাহ তাআ’লা তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন এবং ঐ উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দেবেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে” এবং তাদের সন্তানরা ঈমানের মাধ্যমে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সাথে তাদের সন্তানদেরকে মিলিত করবো।” (৫২: ২১)।তাঁদেরকে মুবারকবাদ ও সালাম জ্ঞাপনের জন্যে সদাসর্বদা প্রত্যেকটি দরজা দিয়ে ফেরেশতাগণ যাতায়াত করবেন। এটাও আল্লাহ তাআ’লার একটি নিয়ামত। এর ফলে তাঁরা সব সময় খুশী থাকবেন এবং সুসংবাদ শুনবেন। এটা ফেরেশতাদের সৌভাগ্যের কারণ যে, তাঁরা শান্তির ঘরে নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সংস্পর্শে থাকতে পাবেন। এতে তারা নিজেদের জীবনকে ধন্য মনে করবেন।হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম কে জান্নাতে যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আল্লাহও সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম জান্নাতে যাবে দরিদ্র মুহাজিরগণ, যারা দুনিয়ার ভোগ বিলাস হতে দূরে ছিল, কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতো। যাদের মনের বাসনা মনেই রয়ে গিয়েছিল এমতাবস্থায় তারা মৃত্যুবরণ করেছিল। রহমতের ফেরেশতাদেরকে বলা হবেঃ “যাও, তাদেরকে মুবারকবাদ দাও।” ফেরেশতাগণ বলবেনঃ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার আকাশের অধিবাসী উত্তম মাখলুক। আপনি কি আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমরা গিয়ে তাদেরকে সালাম করবো এবং মুবারকবাদ জানাবো?” উত্তরে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ “এরা হচ্ছে আমার সেই বান্দা যারা শুধু আমারই ইবাদত করতো, আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করে নাই, পার্থিব সুখ-সম্ভোগ হতে বঞ্চিত ছিল এবং কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করেছিল। তাদের কোন মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় নাই। এতত্সত্ত্বেও তারা ধৈর্য ধারণ করেছে ও কৃতজ্ঞ থেকেছে।” তখন ফেরেশতারা তাড়াতাড়ি অতি আগ্রহের সাথে তাদের দিকে দৌড় দিবেন। এদিক ওদিকের প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেন এবং সালাম করে তাদেরকে মুবারকবাদ জানাবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম যে সব লোক বেহেশতে প্রবেশ করবে তারা হচ্ছে দরিদ্র মুহাজিররা। তারা কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্যে পতিত ছিল। যখনই তাদেরকে যে হুকুম করা হয়েছে তখনই তারা তা পালন করেছে। বাদশাহদের কাছে তাদের প্রয়োজন হতো। কিন্তু মৃত্যু পর্যন্ত তাদের প্রয়োজন পুরা হয় নাই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআ’লা জান্নাতকে সামনে আসতে বলবেন। জান্নাত তখন সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়ে আল্লাহ তাআ’লার সামনে হাজির হবে। ঐ সময় আল্লাহ তাআ’লা ঘোষণা করবেনঃ “আমার যে সব বান্দা আমার পথে জিহাদ করতো, আমার পথে যাদেরকে কষ্ট দেয়া হতো তারা আজ কোথায়? তোমরা এসো, বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাও।” ঐ সময় ফেরেশতারা আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে যাবেন এবং আরয করবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এরা কারা যাদেরকে আপনি আমাদের উপরও ফযীলত দান করলেন?” মহামহিমান্বিত আল্লাহ উত্তরে বলবেনঃ “এরা আমার ঐ বান্দা যারা আমার পথে জিহাদ করেছে এবং আমার পথে কষ্ট সহ্য করেছে।” ফেরেশতারা তখন তড়িৎ গতিতে এদিকে ওদিকের দরজা দিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে যাবেন, তাদেরকে সালাম করবেন এবং মুবারকবাদ জানিয়ে বলবেনঃ “আপনারা আপনাদের ধৈর্য ধারনের কতই না উত্তম বিনিময় লাভ করেছেন।” আবু উমামা (রাঃ) বলেনঃ “মু'মিন বেহেশতের মধ্যে নিজের আসনের উপর আরামে অত্যন্ত শান শওকতের সাথে হেলান দিয়ে বসে থাকবে। সেবক দল সারি সারি ভাবে এদিকে ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকবে। যে দরজার খাদেমের কাছে ফেরেশতা অনুমতি চাইবেন, তিনি তাঁর পার্শ্ববর্তী খাদেমকে বলবেন। তিনি আবার অন্যকে বলবেন এবং তিনি আবার অপরকে বলবেন। শেষ পর্যন্ত মুমিনমু’মিনকে জিজ্ঞেস করা হবে। মুমিনমু’মিন আসার অনুমতি দেবে। এইভাবে একে অপরের কাছে পয়গাম পৌছাবে এবং সর্বশেষ খাদেম ফেরেশতাকে অনুমতি দেবে ও দরজা খুলে দেবে। ফেরেশতা তখন প্রবেশ করে সালাম করতঃ চলে যাবেন।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক বছরের মাথায় শহীদদের কবরের কাছে আসতেন এবং বলতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছে বলে তোমাদের প্রতি শান্তি, কতই উত্তম এই পরিণাম।” এইরূপই হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উসমান (রাঃ) করতেন।

আর-রাদ 13:24

২০-২৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা ঐ মহান ব্যক্তিদের প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দিচ্ছেন এবং তাঁদের ভাল পরিণামের খবর দিচ্ছেন যারা আখেরাতে বেহেশতের মালিক হবেন এবং দুনিয়াতেও যাদের পরিণাম হবে অতি উত্তম। তাঁরা মুনাফিকদের মত নন যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করে। এটা মুনাফিকদেরই স্বভাব যে, তারা কোন ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করবে, ঝগড়ায় কটু বাক্য প্রয়োগ করবে, কথা মিথ্যা বলবে এবং আমানতে খিয়ানত করবে। আর ঐ উত্তম গুণের অধিকারী মুমিনমু’মিনদের স্বভাব এই যে, তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন, তাদের সাথে সদাচরণ করেন, অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র লোকদেরকে দান করেন এবং সকলের সাথে সদয় ব্যবহার করেন। তারা আল্লাহর নির্দেশ ক্রমেই এগুলো করে থাকেন।আল্লাহ তাআ’লার উক্তিঃ ‘তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে’ অর্থাৎ তারা সৎ কাজ করেন আল্লাহর নির্দেশ মনে করে এবং অসৎ কার্য পরিত্যাগ করেন আল্লাহর নির্দেশ মনে করেই। তাঁরা আখেরাতের কঠোর হিসাবকে ভয় করেন। এ জন্যেই তারা মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকেন, সৎ কার্যের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন, মধ্যম পথকে তারা কোন সময়ই পরিত্যাগ করেন না। সর্বাবস্থায়ই আল্লাহ তাআ’লার প্রতি লক্ষ্য রাখেন। হারাম কাজ এবং আল্লাহর নাফরমানীর দিকে প্রবৃত্তি তাদেরকে আকর্ষণ করলেও তারা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং আখেরাতের সওয়াবের কথা স্মরণ করে এবং আল্লাহ তাআ’লার সন্তুষ্টি কামনা করে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকেন। তারা নামাযের পূর্ণরূপে হিফাযত করেন। রুকু ও সিজদার সময় শরীয়ত অনুযায়ী বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে থাকেন। আল্লাহ যাদেরকে দান করতে বলেছেন তাদেরকে তারা আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ থেকে দান করে থাকেন। দরিদ্র, অভাবী ও মিসকীন নিজেদের মধ্যকার হোক বা দূর সম্পৰ্কীয় হোক, তাদের বরকত থেকে তারা বঞ্চিত হন না। গোপনে ও প্রকাশ্যে, সময়ে-অসময়ে তারা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকেন। তারা মন্দকে ভাল দ্বারা এবং শক্রতাকে বন্ধুত্ব দ্বারা দূরীভূত করে থাকেন। কেউ তাঁদের সাথে অসদাচরণ করলে তারা তার সাথে সদাচরণ করেন। তাঁদের সামনে কেউ মস্তক উত্তোলন করলে তারা মস্তক অবনত করেন। তাঁরা অন্যদের যুলুম সহ্য করে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করেন। কুরআন কারীমের শিক্ষা হচ্ছেঃ “মন্দকে ভাল দ্বারা দূরীভূত কর, তাহলে তোমার মধ্যে ও তার মধ্যে যে শত্রুতা ছিল তা দূর হয়ে গিয়ে এমন হবে যে, সে যেন তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। ধৈর্যশীল ও সৌভাগ্যবান ব্যক্তিই এই মর্যাদা লাভ করে থাকে।” এই রূপ লোকদের জন্যেই উত্তম পরিণাম রয়েছে।সেই উত্তম পরিণাম এবং উত্তম ঘর হচ্ছে জান্নাত, যা অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতের একটি প্রাসাদের নাম ‘আদন’। তাতে মিনার ও কক্ষ রয়েছে। তাতে রয়েছে পাঁচ হাজার দরজা। প্রত্যেক দরজার উপর পাঁচ হাজার ফেরেশতা রয়েছেন। ঐ প্রাসাদটি নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের জন্যে নির্দিষ্ট। যহাক (রঃ) বলেন যে, এটা জান্নাতের শহর। এতে থাকবেন নবীগণ, শহীদগণ এবং হিদায়াতের ইমামগণ। তাদের আশে পাশে অন্যান্য লোকেরা থাকবেন। ওর চতুর্দিকে অন্যান্য বেহেশত রয়েছে। ওখানে তারা তাঁদের প্রিয়জনকেও তাদের সাথে দেখতে পাবেন। তাদের সাথে থাকবেন তাঁদের মুমিনমু’মিন পিতা, পিতামহ, পুত্র, পৌত্র, স্ত্রী ইত্যাদি আত্মীয় স্বজন। তারা সুখে শান্তিতে অবস্থান করবেন এবং তাঁদের চক্ষুগুলি ঠাণ্ডা হবে। এমন কি তাদের মধ্যে কারো কারো আমল যদি তাকে ঐ উচ্চ মর্যাদায় পৌছাবার যোগ্যতা নাও রাখে, তবুও আল্লাহ তাআ’লা তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন এবং ঐ উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দেবেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে” এবং তাদের সন্তানরা ঈমানের মাধ্যমে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সাথে তাদের সন্তানদেরকে মিলিত করবো।” (৫২: ২১)।তাঁদেরকে মুবারকবাদ ও সালাম জ্ঞাপনের জন্যে সদাসর্বদা প্রত্যেকটি দরজা দিয়ে ফেরেশতাগণ যাতায়াত করবেন। এটাও আল্লাহ তাআ’লার একটি নিয়ামত। এর ফলে তাঁরা সব সময় খুশী থাকবেন এবং সুসংবাদ শুনবেন। এটা ফেরেশতাদের সৌভাগ্যের কারণ যে, তাঁরা শান্তির ঘরে নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সংস্পর্শে থাকতে পাবেন। এতে তারা নিজেদের জীবনকে ধন্য মনে করবেন।হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম কে জান্নাতে যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আল্লাহও সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম জান্নাতে যাবে দরিদ্র মুহাজিরগণ, যারা দুনিয়ার ভোগ বিলাস হতে দূরে ছিল, কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতো। যাদের মনের বাসনা মনেই রয়ে গিয়েছিল এমতাবস্থায় তারা মৃত্যুবরণ করেছিল। রহমতের ফেরেশতাদেরকে বলা হবেঃ “যাও, তাদেরকে মুবারকবাদ দাও।” ফেরেশতাগণ বলবেনঃ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার আকাশের অধিবাসী উত্তম মাখলুক। আপনি কি আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমরা গিয়ে তাদেরকে সালাম করবো এবং মুবারকবাদ জানাবো?” উত্তরে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ “এরা হচ্ছে আমার সেই বান্দা যারা শুধু আমারই ইবাদত করতো, আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করে নাই, পার্থিব সুখ-সম্ভোগ হতে বঞ্চিত ছিল এবং কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করেছিল। তাদের কোন মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় নাই। এতত্সত্ত্বেও তারা ধৈর্য ধারণ করেছে ও কৃতজ্ঞ থেকেছে।” তখন ফেরেশতারা তাড়াতাড়ি অতি আগ্রহের সাথে তাদের দিকে দৌড় দিবেন। এদিক ওদিকের প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেন এবং সালাম করে তাদেরকে মুবারকবাদ জানাবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম যে সব লোক বেহেশতে প্রবেশ করবে তারা হচ্ছে দরিদ্র মুহাজিররা। তারা কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্যে পতিত ছিল। যখনই তাদেরকে যে হুকুম করা হয়েছে তখনই তারা তা পালন করেছে। বাদশাহদের কাছে তাদের প্রয়োজন হতো। কিন্তু মৃত্যু পর্যন্ত তাদের প্রয়োজন পুরা হয় নাই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআ’লা জান্নাতকে সামনে আসতে বলবেন। জান্নাত তখন সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়ে আল্লাহ তাআ’লার সামনে হাজির হবে। ঐ সময় আল্লাহ তাআ’লা ঘোষণা করবেনঃ “আমার যে সব বান্দা আমার পথে জিহাদ করতো, আমার পথে যাদেরকে কষ্ট দেয়া হতো তারা আজ কোথায়? তোমরা এসো, বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাও।” ঐ সময় ফেরেশতারা আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে যাবেন এবং আরয করবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এরা কারা যাদেরকে আপনি আমাদের উপরও ফযীলত দান করলেন?” মহামহিমান্বিত আল্লাহ উত্তরে বলবেনঃ “এরা আমার ঐ বান্দা যারা আমার পথে জিহাদ করেছে এবং আমার পথে কষ্ট সহ্য করেছে।” ফেরেশতারা তখন তড়িৎ গতিতে এদিকে ওদিকের দরজা দিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে যাবেন, তাদেরকে সালাম করবেন এবং মুবারকবাদ জানিয়ে বলবেনঃ “আপনারা আপনাদের ধৈর্য ধারনের কতই না উত্তম বিনিময় লাভ করেছেন।” আবু উমামা (রাঃ) বলেনঃ “মু'মিন বেহেশতের মধ্যে নিজের আসনের উপর আরামে অত্যন্ত শান শওকতের সাথে হেলান দিয়ে বসে থাকবে। সেবক দল সারি সারি ভাবে এদিকে ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকবে। যে দরজার খাদেমের কাছে ফেরেশতা অনুমতি চাইবেন, তিনি তাঁর পার্শ্ববর্তী খাদেমকে বলবেন। তিনি আবার অন্যকে বলবেন এবং তিনি আবার অপরকে বলবেন। শেষ পর্যন্ত মুমিনমু’মিনকে জিজ্ঞেস করা হবে। মুমিনমু’মিন আসার অনুমতি দেবে। এইভাবে একে অপরের কাছে পয়গাম পৌছাবে এবং সর্বশেষ খাদেম ফেরেশতাকে অনুমতি দেবে ও দরজা খুলে দেবে। ফেরেশতা তখন প্রবেশ করে সালাম করতঃ চলে যাবেন।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক বছরের মাথায় শহীদদের কবরের কাছে আসতেন এবং বলতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছে বলে তোমাদের প্রতি শান্তি, কতই উত্তম এই পরিণাম।” এইরূপই হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উসমান (রাঃ) করতেন।

আর-রাদ 13:25

মুমিনমু’মিনদের গুণাবলী উপরে বর্ণনা করার পর এখানে ঐ হতভাগ্যদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে, যারা মুমিনমু’মিনদের বিপরীত স্বভাব বিশিষ্ট। তারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদার প্রতি না কোন ভ্রুক্ষেপ করতো, না তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখতো, না আল্লাহ তাআ’লার আদেশ নিষেধের প্রতি কোন খেয়াল রাখতো। এরা হচ্ছে অভিশপ্ত দল এবং এদের পরিণাম বড়ই মন্দ। যেমন হাদীসে এসেছেঃ “মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি। যখন তারা কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন কোন ওয়াদা করে তখন খেলাফ করে এবং যখন তাদের কাছে কোন আমানত রাখা হয় তখন তারা খেয়ানত করে।” আর একটি রিওয়াইয়াতে আছেঃ “যখন কোন চুক্তি করে তখন তা ভঙ্গ করে, যখন ঝগড়া করে তখন কটু ও অশ্লীল বাক্য প্রয়োগ করে।” এই শ্রেণীর লোক আল্লাহ তাআ’লার করুণা লাভ করবে না। এবং এদের পরিণাম হবে খুবই মন্দ। এরা হচ্ছে জাহান্নামী দল।(আরবি) এই আয়াতের ব্যাপারে আবুল আ’লিয়া (রঃ) বলেন যে, মুনাফিকদের মধ্যে ছ'টি অভ্যাস প্রকাশ পায় যখন তারা বিজয়ী হয়। অভ্যাসগুলি হচ্ছেঃ মিথ্যা কথা বলা,ওয়াদা খেলাফ করা, আমানতের খিয়ানত করা, আল্লাহর সাথে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করা, আল্লাহ তাআ’লা যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আদেশ করেছেন তা অক্ষুন্ন না রাখা এবং ভূ-পৃষ্ঠে বিশৃংখলা ও অশান্তি ছড়িয়ে দেয়া। আর যখন তারা বিজিত হয় তখন তাদের তিনটি স্বভাব প্রকাশ পায়ঃ যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে খেলাফ করে এবং আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।

আর-রাদ 13:26

এখানে আল্লাহ তাআ’লা বর্ণনা করেছেন যে, যার জীবিকায় তিনি প্রশস্ত করার ইচ্ছা করেন তা তিনি করতে পারেন। আবার যার জীবিকা সংকীর্ণ করার ইচ্ছা করেন সেটাতেও তিনি সক্ষম। এই সব কিছু হিকমত ও ইনসাফের সাথেই হচ্ছে। কাফিররা দুনিয়াকেই আশ্রয় স্থল মনে করে নিয়েছে। তাই তারা আখেরাত থেকে রয়েছে সম্পূর্ণ উদাসীন। তারা মনে করে নিয়েছে যে, এখানকার সুখ স্বাচ্ছন্দ্যই আসল ও ভাল। অথচ প্রকৃত পক্ষে এখানে তাদেরকে অবকাশ দেয়া হয়েছে মাত্র এবং ধীরে ধীরে তাদেরকে পাকড়াও করারই সূচনা হচ্ছে। কিন্তু তাদের কোন অনুভূতিই নেই। মু'মিনরা যে আখেরাত লাভ করবে তার তুলনায় এই দুনিয়া উল্লেখ যোগ্যই নয়। এটা খুবই অস্থায়ী ও নগণ্য জিনিষ। পক্ষান্তরে আখেরাত চিরস্থায়ী ও উত্তম জিনিষ। কিন্তু সাধারণতঃ মানুষ আখেরাতের উপর দুনিয়াকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। বানু ফাহর গোত্রের লোক মুসতাওরিদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আখেরাতের তুলনায় দুনিয়াটা ঠিক এই রূপ যেমন তোমাদের কেউ এই অঙ্গুলীটি সমুদ্রের পানিতে ডুবিয়ে দেয়, অতঃপর ঐ অঙ্গুলীতে কতটুকু পানি উঠেছে তা তো সে দেখতেই পায়।” ঐ সময় তিনি তাঁর শাহাদত অঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করেছিলেন। (অর্থাৎ তার অঙ্গুলীর পানিটুকু সমুদ্রের পানির তুলনায় যেমন, দুনিয়াও আখেরাতের তুলনায় তেমন)। (ইমাম মুসলিম (রঃ এ হাদীসটি স্বীয় ‘সহীহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, একদা পথে একটি ছোট কান বিশিষ্ট মৃত ছাগলের বাচ্চাকে পড়ে থাকতে দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মন্তব্য করেনঃ “এই বকরীর বাচ্চাটি যাদের ছিল তাদের কাছে এর মূল্য যেমন, আল্লাহ তাআ’লার কাছে এই দুনিয়াটার মূল্য এর চেয়েও বেশি নগণ্য।”

আর-রাদ 13:27

২৭-২৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা মুশরিকদের উক্তি সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, তারা বলেঃ পূর্ববর্তী নবীদের মত এই নবী (হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আমাদের কথা মত কোন মুজিযা উপস্থাপন করেন না কেন? এ সম্পর্কে পূর্ণ আলোচনা ইতিপূর্বে কয়েকবার হয়ে গেছে যে, আল্লাহর এ ক্ষমতা তো আছেই, কিন্তু এর পরেও যদি এরা ঈমান না আনে তবে তারা একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।হাদীসে এসেছেঃ মক্কার লোকেরা যখন হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) বললো যে, যদি তিনি সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করতে পারেন, মক্কা ভূমিতে নদী প্রবাহিত করতে পারেন এবং পাহাড়ী যমীনকে চাষযোগ্য জমিতে পরিবর্তিত করতে পারেন তবে তারা ঈমান আনবে। তখন আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় নবীর (সঃ) কাছে ওয়াহী পাঠালেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমি তাদেরকে এগুলো প্রদান করবো, কিন্তু এরপরেও যদি তারা ঈমান না আনে তবে আমি তাদেরকে এমন শাস্তি প্রদান করবো যা ইতিপূর্বে কারো উপর প্রদান করি নাই। যদি তুমি চাও তবে এটাই করি, নচেৎ তুমি তাদের জন্যে তাওবা ও রহমতের দরজা খোলা রাখতে পার।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয় পন্থাটি পছন্দ করলেন।এটা সত্য কথাই যে, পথ প্রদর্শন করা ও পথ ভ্রষ্ট করা আল্লাহ তাআ’লারই কাজ। ওটা কোন মু'জিযা দেখার উপর নির্ভরশীল নয়। বেঈমানদের জন্যে মু’জিযা দেখানো ও ভয় প্রদর্শন করা অর্থহীন। যার উপর শাস্তির কথা বাস্তবায়িত হয়ে গেছে, সে সমস্ত নিদর্শন দেখালেও ঈমান আনবেনা। তবে শাস্তি দেখে নেয়ার পর তো পুরোপুরি ঈমানদার হয়ে যাবে, কিন্তু তখনকার ঈমান আনয়ন নিষ্ফল হবে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি আমি তাদের উপর ফেরেশতা অবতীর্ণ করতাম এবং তাদের সাথে মৃতেরা কথা বলতে, আর তাদের কাছে আমি সমস্ত গুপ্ত জিনিস প্রকাশ করে দিতাম তবুও তারা ঈমান আনতো না, তবে আল্লাহ যাকে চান সেটা অন্য কথা, কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ।” এ জন্যেই আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওঃ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং তাদেরকেই সুপথ প্রদর্শন করেন যারা তাঁর অভিমুখী। যাদের অন্তরে ঈমান জমজমাট হয়ে গেছে, যাদের অন্তর আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তারা তাঁর যিকর দ্বারা প্রশান্তি লাভ করে থাকে, তারা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যায়। বাস্তবিকই আল্লাহর যিকর মনের প্রশান্তির কারণই বটে। এটা ঈমানদার ও সৎ লোকদের জন্যে খুশী ও চক্ষু ঠাণ্ডা হওয়ার কারণ। তাদের পরিণাম ভাল। তারা মুবারকবাদ পাওয়ার যোগ্য। সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (আরবি) হাবশী ভাষায় জান্নাতের ভূমিকে বলে। আর সাঈদ ইবনু মাসজু’ (রঃ) বলেন যে, হিন্দী ভাষায় (আরবি) হচ্ছে একটি জান্নাতের নাম। অনুরূপভাবে সুদ্দী (রঃ) ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (আরবি) হচ্ছে জান্নাত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লা যখন জান্নাত সৃষ্টি করেন এবং তার থেকে ফারেগ হন তখন তিনি (আরবি) এই কথাটি বলেন।শাহ্র ইবনু হাউশির (রঃ) বলেন যে, জান্নাতের মধ্যে একটি গাছের নামও তূবা। সমস্ত জান্নাতে এর শাখা গুলি ছড়িয়ে রয়েছে। প্রত্যেক ঘরে এর শাখা বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তাআ’লা এটাকে নিজের হাতে রোপণ করেছেন। মুক্তার দানা দিয়ে তিনি ওটা জন্মিয়েছেন এবং আল্লাহর হুকুমেই ওটা বর্ধিত হয়েছে এবং ছড়িয়ে পড়েছে। ওরই মূল হতে জান্নাতী মধু, সূরা, পানি এবং দুধের নহর প্রবাহিত হয়। (এটা ইবন্য জারীর (রঃ) স্বীয় তাফসীর বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে মারফূ’ রূপে বর্ণিত আছে যে, জান্নাতে তূবা বা নামক একটি বৃক্ষ রয়েছে যা একশ’ বছরের পথের দুরত্ব ব্যাপী ছড়িয়ে আছে। এরই গুচ্ছ হতে জান্নাতীদের পোষাক বের হয়ে থাকে।হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলেঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে আপনাকে দেখেছে এবং আপনার উপর ঈমান এনেছে তাকে মুবারকবাদ।” তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, তাকে মুবারকবাদ তো বটেই, তবে দ্বিগুণ মুবারকবাদ ঐ ব্যক্তিকে যে আমাকে দেখে নাই, অথচ আমার উপর ঈমান এনেছে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)একটি লোক জিজ্ঞেস করলো: “তূবা কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তূবা হচ্ছে একটি জান্নাতী গাছ যা একশ’ বছরের পথ পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে। জান্নাতীদের পোষাক ওরই শাখা থেকে বের হয়ে থাকে।” হযরত সাহল ইবনু সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতের মধ্যে এমন একটি গাছ রয়েছে যে, সওয়ার একশ’ বছর পর্যন্ত ওর ছায়ায় চলতে থাকবে তবুও তা শেষ হবে না।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, চলার গতিও দ্রুত এবং সওয়ারীও দ্রুতগামী। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতে (আরবি) (এবং সম্প্রসারিত ছায়া) এই আয়াতের তাফসীরেও এটাই রয়েছে। অন্য হাদীসে আছে সত্তর বছর বা একশ’ বছর।ঐ গাছটির নাম হচ্ছে ‘শাজারাতুল খুলদ’ (চিরস্থায়ী গাছ)। সিদরাতুল মুনতাহার আলোচনায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ওর একটি শাখার ছায়ায় একজন সওয়ার একশ’ বছর পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং শত শত আরোহী ওর একটি শাখার নীচে অবস্থান করতে পারে। তাতে সোনার ফড়িং রয়েছে। ওর ফলগুলি বড় বড় মটকা বা মৃৎ পাত্রের সমান।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবু উমামা আল বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের যে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে তাকেই ‘তূবা’ বা বৃক্ষের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে এবং তার জন্যে ওর শাখাগুলি খুলে দেয়া হবে। সে তখন ওগুলির যেটা ইচ্ছা সেটাই গ্রহণ করবে। ইচ্ছা করলে সাদাটা নিবে, ইচ্ছা করলে নিবে লালটা, ইচ্ছা করলে হলদেটা নিবে এবং ইচ্ছা হলে কালোটা নিবে। ওগুলি হবে অত্যন্ত সুন্দর, নরম ও উত্তম।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা তৃবা গাছকে হুকুম করবেনঃ “আমার বান্দাদের জন্যে তুমি উত্তম জিনিসগুলি ফেলতে থাকো”। তখন তা হতে ঘোড়া ও উট বর্ষিত হতে শুরু করবে। ওগুলি সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিত থাকবে, জ্বিন, লাগাম কষা থাকবে ইত্যাদি।ইবনু জারীর (রঃ) এখানে অহাব ইবনু মুনাব্বাহ (রঃ) প্রমুখাৎ একটি অতি বিস্ময়কর ও অদ্ভূদ ‘আসর' এনেছেন। অহাব ইবনু মুনাববাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, জান্নাতে তূবা বা নামক একটি গাছ রয়েছে যার ছায়ায় আরোহী একশ’ বছর পর্যন্ত চলতে থাকবে, তবুও তা শেষ হবে না। তার সতেজতা ও শ্যামলতা উন্মুক্ত বাগানের ন্যায়। ওর পাতাগুলি অতি চমৎকার। ওর শাখা গুলি আম্বর, ওর কঙ্করগুলি ইয়াকূত, ওর মাটি কপূর, ওর কাদা মিশক। ওর মূল হতে মদ্যের, দুধের এবং মধুর নহর প্রবাহিত হচ্ছে। ওর নীচে জান্নাতীদের মজলিস অনুষ্ঠিত হবে। জান্নাতীরা ওর নীচে উপবিষ্ট থাকবে এমতাবস্থায় ফেরেশতাগণ তাদের কাছে উষ্ট্রীর পাল নিয়ে আগমন করবেন। উষ্ট্ৰীসমূহের যিঞ্জীরগুলি সোনা দ্বারা নির্মিত হবে। ওগুলির চেহারা প্রদীপের ন্যায় উজ্জ্বল হবে। ওদের ললাম রেশমের মত নরম হবে। ওদের উপর ইয়াকূতের মত গদি থাকবে যাতে সোনা জড়ানো থাকবে। ওর উপর রেশমের ঝুল থাকবে। ফেরেশতাগন ঐ উষ্ট্রীগুলি ঐ জান্নাতী লোকদের সামনে পেশ করবেন এবং বলবেনঃ “এই সওয়ারীগুলি আপনার কাছে পাঠানো হয়েছে এবং মহামহিমান্বিত আল্লাহ আপনাদেরকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তারা তখন ঐ উষ্ট্ৰীগুলির উপর সওয়ার হয়ে যাবে। উষ্ট্রীগুলির চলন গতি হবে পক্ষীর ন্যায় দ্রুত। জান্নাতীরা একে অপরের সাথে মিলিতভাবে চলবে এবং পরস্পর কথা বলতে বলতে যাবে। এক উন্ত্রীর কানের সাথে অপর উন্ত্রীর কান মিলিত হবে না। উষ্ট্ৰীগুলি পূর্ণ আনুগত্যের সাথে চলবে। পথে যে গাছ পড়বে তা আপনা আপনি সরে যাবে, যেন কেউ তার সাথী থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে। এই ভাবে তারা পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাবে। আল্লাহ তাআ’লা নিজের চেহারার উপর হতে পর্দা সরিয়ে ফেলবেন। তারা (জান্নাতীরা) তাদের প্রতিপালকের চেহারার প্রতি দৃষ্টিপাত করে বলবেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি শান্তি, আপনার থেকেই শান্তি এবং মহিমা ও মর্যাদা আপনারই প্রাপ্য। তাদের এই কথার উত্তরে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি শান্তি, আমার থেকেই শান্তি এবং আমার করুণা ও প্রেম তোমাদের প্রাপ্য হয়ে গেছে। আমার ঐ বান্দাদেরকে মুবারকবাদ, যারা আমাকে না দেখেই ভয় করেছে এবং আমার নির্দেশ মেনে চলেছে।” জান্নাতীরা তখন বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার যথাযোগ্য ইবাদত করতে পারিনি এবং পুরোপুরিভাবে আপনাকে মর্যাদা দিতে পারিনি। সুতরাং আমাদেরকে আপনার সামনে সিজদা করার অনুমতি দিন।” আল্লাহ তাআ’লা তাদের একথার জবাবে বলবেনঃ “এটা পরিশ্রমের জায়গা নয় এবং ইবাদতেরও জায়গা নয়। এটা তো শুধু সুখ শান্তি ও ভোগ বিলাসের জায়গা। ইবাদতের কষ্ট শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু মজা উপভোগ ও আমোদ প্রমোদের দিন এসেছে। যা ইচ্ছা চাও, পাবে। তোমাদের যে-ই যা চাইবে তাকে আমি তাই প্রদান করবো।” সুতরাং তারা চাইবে। যে সবচেয়ে কম চাইবে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি দুনিয়ায় যা সৃষ্টি করেছিলেন, যাতে আপনার বান্দা হায় হায় করেছিল, আমি চাই যে, দুনিয়ার সৃষ্টির শুরু হতে শেষ পর্যন্ত দুনিয়ায় আপনি যত কিছু সৃষ্টি করেছিলেন আমাকে তা সবই প্রদান করুন। আল্লাহ তাআ’লা তখন বলবেনঃ তুমি কিছুই চাও নাই। নিজের মর্যাদার তুলনায় তুমি খুবই কম চেয়েছ। আমার দানের কোন কমি আছে কি? আচ্ছা, তুমি যা চাইলে তাই দিচ্ছি।” তারপর তিনি ফেরেশতাদেরকে বলবেনঃ “আমার বান্দাদের মনে যে জিনিষের কোন দিন কোন আকাখাও জাগেনি এবং তারা কখনো কল্পনাও করেনি, তাদেরকে তাই প্রদান কর।” তখন তাদেরকে তা দেয়া হবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের আকাঙ্খা পূর্ণ হয়ে যাবে। তারা সেখানে যা পাবে তা হচ্ছেঃ দ্রুতগামী ঘোড়া, প্রতি চার জনের জন্যে মণিমাণিক্যের আসন, প্রতি আসনের উপর সোনার একটা ডেরা এবং প্রতিটি ডেরায় জান্নাতী বিছানা। বিছানায় বড় বড় চক্ষু বিশিষ্টা দুটো করে হূর থাকবে। প্রত্যেক হুর জান্নাতী পোষাক পরিধান করে থাকবে। তাতে জান্নাতের সমস্ত রং থাকবে এবং সমস্ত সুগন্ধি থাকবে। ঐ ডেরা বা তাঁবুর বাহির থেকে তাদের চেহারা এতো উজ্জ্বল দেখাবে যে, যেন তারা বাইরেই বসে আছে। তাদের পায়ের গোছার ভিতরের মজ্জা বাহির হতে দেখতে পাওয়া যাবে। মনে হবে যেন লাল মাণিক্যের ডোরা পরিয়ে দেয়া হয়েছে, তা উপর থেকে দেখা যাবে। প্রত্যেকে একে অপরের উপর নিজের মর্যাদা এইরূপ মনে করবে যেই রূপ সূর্যের মর্যাদা থাকে পাথরের উপর। জান্নাতীরা তাদের কাছে যাবে এবং তাদের সাথে প্রেমালাপে লিপ্ত হয়ে পড়বে। তারা দুজন তাকে দেখে বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! আমরা কল্পনাও করি নাই যে, তিনি আমাদেরকে আপনার মত স্বামী দান করবেন। এরপর আল্লাহ তাআ’লার নির্দেশক্রমে ঐরূপ সারিবদ্ধভাবে সওয়ারীর উপর সওয়ার হয়ে তারা ফিরে যাবে এবং নিজ নিজ মনযিলে পৌঁছে যাবে। সুবহানাল্লাহ! পরম দয়ালু, দাতা আল্লাহ তাআ’লা তাদের জন্যে কতইনা নিয়ামত মওজুদ করে রেখেছেন।সেখানে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যে উঁচু উঁচু অট্টালিকা থাকবে, ওগুলি নির্মিত হবে খাঁটি মণি মুক্তা দ্বারা। দরজাগুলি হবে সোনার তৈরী। ওর মধ্যেকার আসনগুলি হবে মণিমাণিক্য দ্বারা নির্মিত, বিছানাগুলি হবে নরম ও মোটা রেশমের তৈরী। ওর মিম্বরগুলি হবে নূরের তৈরী যার ঔজ্জ্বল্য সূর্যের ঔজ্জ্বল্যকেও হার মানাবে। তাদের প্রাসাদ থাকবে ইল্লীনের উপর। তা নির্মিত হবে মণিমাণিক্য দ্বারা তা এতো উজ্জ্বল হবে যে, ওর ঔজ্জ্বল্যে চক্ষু ঝলসে যাবে। কিন্তু আল্লাহর করুণার কারণে চোখের জন্যে তা সহনীয় হয়ে যাবে। যে প্রাসাদগুলি লাল ইয়াকূতের হবে সেগুলিতে সবুজ রেশমী বিছানা বিছানো থাকবে। আর যেগুলি হলদে ইয়াকূতের হবে ওগুলির বিছানা হবে লাল মখমল, যাতে পান্না ও সোনা জড়ানো থাকবে। ওর আসনগুলির পায়া হবে মণিমুক্তার। ওর উপর মুক্তারই ছাদ হবে। ওর শিখর হবে প্রবালের। তাদের সেখানে পৌছার পূর্বেই আল্লাহর প্রদত্ত উপঢৌকন তথায় পৌঁছে যাবে। সাদা ইয়াকূতী ঘোড়া সেবকদের নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, যাদের সামনে রৌপ্য বসানো থাকবে। তাদের আসনের উপর উচ্চমানের নরম ও মোটা রেশমের গদি বিছানো থাকবে। তারা এই সব ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে আড়ম্বরের সাথে বেহেশতের দিকে রওয়ানা হবে এবং গিয়ে দেখবে যে, তাদের ঘরের পার্শ্বে আলোকময় মিম্বরগুলির উপর ফেরেশতাগণ তাদেরকে অভ্যর্থনার জন্যে বসে রয়েছেন। তাঁরা তাদেরকে আঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা করবেন এবং মুবারকবাদ জানাবেন। আর তাদের সাথে করমর্দন করবেন। তারপর তারা নিজেদের ঘরে প্রবেশ করবে এবং সেখানে আল্লাহর নিয়ামতরাশি বিদ্যমান পাবে। নিজেদের প্রাসাদের পার্শ্বে তারা সুদৃশ্য দু’টি জান্নাত দেখতে পাবে এবং ও দু’টি ফলে ফুলে ভরপুর থাকবে। ঐ দু'টি জান্নাতে দু’টি নহর পূর্ণ গতিতে প্রবাহিত হবে। সেখানে সর্ব প্রকারের সুস্বাদু ফল থাকবে এবং তাঁবুতে পবিত্ৰাত্মা সুদৃশ্য পর্দানশীন হুর থাকবে। যখন এই জান্নাতীরা সেখানে পৌঁছে সুখে শান্তিতে অবস্থান করবে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাদেরকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “হে আমার প্রিয় বান্দাগণ! তোমরা আমার ওয়াদা সত্যরূপে পেয়েছ কি? তোমরা আমার পক্ষ থেকে পুরস্কৃত হয়ে খুশী হয়েছ কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! হাঁ, আমরা খুশী হয়েছি। আমাদের খুশীর কোন ইয়ত্তা নেই। আপনিও আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।” আল্লাহ তাআ’লা তখন বলবেনঃ “যদি আমার সন্তুষ্টি না থাকতো তবে আমি আমার এই মেহমান খানায় তোমাদেরকে কি করে প্রবেশ করিয়েছি? কি করে আমি তোমাদেরকে আমার দর্শন দান করেছি। আমার ফেরেশতারা তোমাদের সাথে করমর্দন করেছে কেন? তোমরা সন্তুষ্ট থাকো। সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস কর। আমি তোমাদেরকে মুবারকবাদ জানাই। তোমরা আরাম আয়েশ, সুখ শান্তি ও ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থাকো। আমার নিয়ামতরাজি কমে যাওয়া ও শেষ হওয়ার নয়।” তখন তারা বলবেঃ “একমাত্র আল্লাহ তাআ’লাই প্রশংসার যোগ্য, তিনি আমাদের দুঃখ ও চিন্তা দূর করে দিয়েছেন এবং আমাদেরকে এমন জায়গায় পৌঁছিয়েছেন যেখানে আমাদের দুঃখ ও কষ্ট বলতে কিছুই নেই। এটা তারই অনুগ্রহ। তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়ালু। (এ আর টি বড়ই বিস্ময়কর এবং খুবই গরীবও বটে। তবে এর কিছু শাহেদও বিদ্যমান রয়েছে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের আসটি বর্ণিত হলো)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি সর্বশেষে জান্নাতে যাবে তাকে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ “আমার কাছে চাও।” সে চাইতে থাকবে এবং আল্লাহ তাআ’লা দিতে থাকবেন। শেষ পর্যন্ত তার প্রার্থনা পূর্ণ হয়ে যাবে এবং তার কোন চাহিদাই আর বাকী থাকবে না। তখন আল্লাহ নিজেই তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেনঃ “এটা চাও, ওটা চাও।” সে তখন চাইবে ও পাবে। তখন আল্লাহ তাআ’লা তাকে বলবেনঃ “এ সব কিছু আমি তোমাকে দিয়েছি এবং এই পরিমাণই আরো দশবার দিয়েছি।”হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মানুষ এবং জ্বিন সবাই যদি একটি ময়দানে দাঁড়িয়ে যায় এবং আমার কাছে প্রার্থনা করে ও চায়, আর আমি প্রত্যেকেরই সমস্ত চাহিদা পূরণ করে দিই, তবে আমার সাম্রাজ্যের ততটুকুই কমবে যতটুকু সমুদ্রের পানি কমে যখন তাতে সুঁই ডুবিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয়। (অর্থাৎ সমুদ্রের পানিতে পুঁই ডুবিয়ে উঠিয়ে নিলে তার অগ্রভাগে যেটুকু পানি উঠে, তাতে সমুদ্রের যেটুকু পানি কমে, আল্লাহ তাআ’লার ধনভান্ডারের ততটুকুই কমে অর্থাৎ কিছুই কমে না)।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে দীর্ঘভাবে বর্ণিত হয়েছে)খা’লিদ ইবনু মা’দান (রঃ) বলেনঃ জান্নাতের একটি গাছের নাম তূবা। তাতে স্তন রয়েছে, যা থেকে জান্নাতীদের শিশুরা দুধ পান করে থাকে। যে গর্ভবতী নারীর পেটের সন্তান অপূর্ণ অবস্থায় পড়ে গিয়েছে সেই সন্তান কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত জান্নাতের নহরে অবস্থান করে। অতঃপর তাকে চল্লিশ বছর বয়স্ক করে উঠানো হবে এবং সে পিতা মাতার সাথে বেহেশতে থাকবে। (এটা ইবনু আবি হা’তিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)

আর-রাদ 13:28

২৭-২৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা মুশরিকদের উক্তি সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, তারা বলেঃ পূর্ববর্তী নবীদের মত এই নবী (হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আমাদের কথা মত কোন মুজিযা উপস্থাপন করেন না কেন? এ সম্পর্কে পূর্ণ আলোচনা ইতিপূর্বে কয়েকবার হয়ে গেছে যে, আল্লাহর এ ক্ষমতা তো আছেই, কিন্তু এর পরেও যদি এরা ঈমান না আনে তবে তারা একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।হাদীসে এসেছেঃ মক্কার লোকেরা যখন হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) বললো যে, যদি তিনি সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করতে পারেন, মক্কা ভূমিতে নদী প্রবাহিত করতে পারেন এবং পাহাড়ী যমীনকে চাষযোগ্য জমিতে পরিবর্তিত করতে পারেন তবে তারা ঈমান আনবে। তখন আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় নবীর (সঃ) কাছে ওয়াহী পাঠালেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমি তাদেরকে এগুলো প্রদান করবো, কিন্তু এরপরেও যদি তারা ঈমান না আনে তবে আমি তাদেরকে এমন শাস্তি প্রদান করবো যা ইতিপূর্বে কারো উপর প্রদান করি নাই। যদি তুমি চাও তবে এটাই করি, নচেৎ তুমি তাদের জন্যে তাওবা ও রহমতের দরজা খোলা রাখতে পার।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয় পন্থাটি পছন্দ করলেন।এটা সত্য কথাই যে, পথ প্রদর্শন করা ও পথ ভ্রষ্ট করা আল্লাহ তাআ’লারই কাজ। ওটা কোন মু'জিযা দেখার উপর নির্ভরশীল নয়। বেঈমানদের জন্যে মু’জিযা দেখানো ও ভয় প্রদর্শন করা অর্থহীন। যার উপর শাস্তির কথা বাস্তবায়িত হয়ে গেছে, সে সমস্ত নিদর্শন দেখালেও ঈমান আনবেনা। তবে শাস্তি দেখে নেয়ার পর তো পুরোপুরি ঈমানদার হয়ে যাবে, কিন্তু তখনকার ঈমান আনয়ন নিষ্ফল হবে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি আমি তাদের উপর ফেরেশতা অবতীর্ণ করতাম এবং তাদের সাথে মৃতেরা কথা বলতে, আর তাদের কাছে আমি সমস্ত গুপ্ত জিনিস প্রকাশ করে দিতাম তবুও তারা ঈমান আনতো না, তবে আল্লাহ যাকে চান সেটা অন্য কথা, কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ।” এ জন্যেই আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওঃ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং তাদেরকেই সুপথ প্রদর্শন করেন যারা তাঁর অভিমুখী। যাদের অন্তরে ঈমান জমজমাট হয়ে গেছে, যাদের অন্তর আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তারা তাঁর যিকর দ্বারা প্রশান্তি লাভ করে থাকে, তারা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যায়। বাস্তবিকই আল্লাহর যিকর মনের প্রশান্তির কারণই বটে। এটা ঈমানদার ও সৎ লোকদের জন্যে খুশী ও চক্ষু ঠাণ্ডা হওয়ার কারণ। তাদের পরিণাম ভাল। তারা মুবারকবাদ পাওয়ার যোগ্য। সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (আরবি) হাবশী ভাষায় জান্নাতের ভূমিকে বলে। আর সাঈদ ইবনু মাসজু’ (রঃ) বলেন যে, হিন্দী ভাষায় (আরবি) হচ্ছে একটি জান্নাতের নাম। অনুরূপভাবে সুদ্দী (রঃ) ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (আরবি) হচ্ছে জান্নাত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লা যখন জান্নাত সৃষ্টি করেন এবং তার থেকে ফারেগ হন তখন তিনি (আরবি) এই কথাটি বলেন।শাহ্র ইবনু হাউশির (রঃ) বলেন যে, জান্নাতের মধ্যে একটি গাছের নামও তূবা। সমস্ত জান্নাতে এর শাখা গুলি ছড়িয়ে রয়েছে। প্রত্যেক ঘরে এর শাখা বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তাআ’লা এটাকে নিজের হাতে রোপণ করেছেন। মুক্তার দানা দিয়ে তিনি ওটা জন্মিয়েছেন এবং আল্লাহর হুকুমেই ওটা বর্ধিত হয়েছে এবং ছড়িয়ে পড়েছে। ওরই মূল হতে জান্নাতী মধু, সূরা, পানি এবং দুধের নহর প্রবাহিত হয়। (এটা ইবন্য জারীর (রঃ) স্বীয় তাফসীর বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে মারফূ’ রূপে বর্ণিত আছে যে, জান্নাতে তূবা বা নামক একটি বৃক্ষ রয়েছে যা একশ’ বছরের পথের দুরত্ব ব্যাপী ছড়িয়ে আছে। এরই গুচ্ছ হতে জান্নাতীদের পোষাক বের হয়ে থাকে।হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলেঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে আপনাকে দেখেছে এবং আপনার উপর ঈমান এনেছে তাকে মুবারকবাদ।” তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, তাকে মুবারকবাদ তো বটেই, তবে দ্বিগুণ মুবারকবাদ ঐ ব্যক্তিকে যে আমাকে দেখে নাই, অথচ আমার উপর ঈমান এনেছে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)একটি লোক জিজ্ঞেস করলো: “তূবা কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তূবা হচ্ছে একটি জান্নাতী গাছ যা একশ’ বছরের পথ পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে। জান্নাতীদের পোষাক ওরই শাখা থেকে বের হয়ে থাকে।” হযরত সাহল ইবনু সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতের মধ্যে এমন একটি গাছ রয়েছে যে, সওয়ার একশ’ বছর পর্যন্ত ওর ছায়ায় চলতে থাকবে তবুও তা শেষ হবে না।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, চলার গতিও দ্রুত এবং সওয়ারীও দ্রুতগামী। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতে (আরবি) (এবং সম্প্রসারিত ছায়া) এই আয়াতের তাফসীরেও এটাই রয়েছে। অন্য হাদীসে আছে সত্তর বছর বা একশ’ বছর।ঐ গাছটির নাম হচ্ছে ‘শাজারাতুল খুলদ’ (চিরস্থায়ী গাছ)। সিদরাতুল মুনতাহার আলোচনায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ওর একটি শাখার ছায়ায় একজন সওয়ার একশ’ বছর পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং শত শত আরোহী ওর একটি শাখার নীচে অবস্থান করতে পারে। তাতে সোনার ফড়িং রয়েছে। ওর ফলগুলি বড় বড় মটকা বা মৃৎ পাত্রের সমান।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবু উমামা আল বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের যে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে তাকেই ‘তূবা’ বা বৃক্ষের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে এবং তার জন্যে ওর শাখাগুলি খুলে দেয়া হবে। সে তখন ওগুলির যেটা ইচ্ছা সেটাই গ্রহণ করবে। ইচ্ছা করলে সাদাটা নিবে, ইচ্ছা করলে নিবে লালটা, ইচ্ছা করলে হলদেটা নিবে এবং ইচ্ছা হলে কালোটা নিবে। ওগুলি হবে অত্যন্ত সুন্দর, নরম ও উত্তম।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা তৃবা গাছকে হুকুম করবেনঃ “আমার বান্দাদের জন্যে তুমি উত্তম জিনিসগুলি ফেলতে থাকো”। তখন তা হতে ঘোড়া ও উট বর্ষিত হতে শুরু করবে। ওগুলি সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিত থাকবে, জ্বিন, লাগাম কষা থাকবে ইত্যাদি।ইবনু জারীর (রঃ) এখানে অহাব ইবনু মুনাব্বাহ (রঃ) প্রমুখাৎ একটি অতি বিস্ময়কর ও অদ্ভূদ ‘আসর' এনেছেন। অহাব ইবনু মুনাববাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, জান্নাতে তূবা বা নামক একটি গাছ রয়েছে যার ছায়ায় আরোহী একশ’ বছর পর্যন্ত চলতে থাকবে, তবুও তা শেষ হবে না। তার সতেজতা ও শ্যামলতা উন্মুক্ত বাগানের ন্যায়। ওর পাতাগুলি অতি চমৎকার। ওর শাখা গুলি আম্বর, ওর কঙ্করগুলি ইয়াকূত, ওর মাটি কপূর, ওর কাদা মিশক। ওর মূল হতে মদ্যের, দুধের এবং মধুর নহর প্রবাহিত হচ্ছে। ওর নীচে জান্নাতীদের মজলিস অনুষ্ঠিত হবে। জান্নাতীরা ওর নীচে উপবিষ্ট থাকবে এমতাবস্থায় ফেরেশতাগণ তাদের কাছে উষ্ট্রীর পাল নিয়ে আগমন করবেন। উষ্ট্ৰীসমূহের যিঞ্জীরগুলি সোনা দ্বারা নির্মিত হবে। ওগুলির চেহারা প্রদীপের ন্যায় উজ্জ্বল হবে। ওদের ললাম রেশমের মত নরম হবে। ওদের উপর ইয়াকূতের মত গদি থাকবে যাতে সোনা জড়ানো থাকবে। ওর উপর রেশমের ঝুল থাকবে। ফেরেশতাগন ঐ উষ্ট্রীগুলি ঐ জান্নাতী লোকদের সামনে পেশ করবেন এবং বলবেনঃ “এই সওয়ারীগুলি আপনার কাছে পাঠানো হয়েছে এবং মহামহিমান্বিত আল্লাহ আপনাদেরকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তারা তখন ঐ উষ্ট্ৰীগুলির উপর সওয়ার হয়ে যাবে। উষ্ট্রীগুলির চলন গতি হবে পক্ষীর ন্যায় দ্রুত। জান্নাতীরা একে অপরের সাথে মিলিতভাবে চলবে এবং পরস্পর কথা বলতে বলতে যাবে। এক উন্ত্রীর কানের সাথে অপর উন্ত্রীর কান মিলিত হবে না। উষ্ট্ৰীগুলি পূর্ণ আনুগত্যের সাথে চলবে। পথে যে গাছ পড়বে তা আপনা আপনি সরে যাবে, যেন কেউ তার সাথী থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে। এই ভাবে তারা পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাবে। আল্লাহ তাআ’লা নিজের চেহারার উপর হতে পর্দা সরিয়ে ফেলবেন। তারা (জান্নাতীরা) তাদের প্রতিপালকের চেহারার প্রতি দৃষ্টিপাত করে বলবেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি শান্তি, আপনার থেকেই শান্তি এবং মহিমা ও মর্যাদা আপনারই প্রাপ্য। তাদের এই কথার উত্তরে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি শান্তি, আমার থেকেই শান্তি এবং আমার করুণা ও প্রেম তোমাদের প্রাপ্য হয়ে গেছে। আমার ঐ বান্দাদেরকে মুবারকবাদ, যারা আমাকে না দেখেই ভয় করেছে এবং আমার নির্দেশ মেনে চলেছে।” জান্নাতীরা তখন বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার যথাযোগ্য ইবাদত করতে পারিনি এবং পুরোপুরিভাবে আপনাকে মর্যাদা দিতে পারিনি। সুতরাং আমাদেরকে আপনার সামনে সিজদা করার অনুমতি দিন।” আল্লাহ তাআ’লা তাদের একথার জবাবে বলবেনঃ “এটা পরিশ্রমের জায়গা নয় এবং ইবাদতেরও জায়গা নয়। এটা তো শুধু সুখ শান্তি ও ভোগ বিলাসের জায়গা। ইবাদতের কষ্ট শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু মজা উপভোগ ও আমোদ প্রমোদের দিন এসেছে। যা ইচ্ছা চাও, পাবে। তোমাদের যে-ই যা চাইবে তাকে আমি তাই প্রদান করবো।” সুতরাং তারা চাইবে। যে সবচেয়ে কম চাইবে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি দুনিয়ায় যা সৃষ্টি করেছিলেন, যাতে আপনার বান্দা হায় হায় করেছিল, আমি চাই যে, দুনিয়ার সৃষ্টির শুরু হতে শেষ পর্যন্ত দুনিয়ায় আপনি যত কিছু সৃষ্টি করেছিলেন আমাকে তা সবই প্রদান করুন। আল্লাহ তাআ’লা তখন বলবেনঃ তুমি কিছুই চাও নাই। নিজের মর্যাদার তুলনায় তুমি খুবই কম চেয়েছ। আমার দানের কোন কমি আছে কি? আচ্ছা, তুমি যা চাইলে তাই দিচ্ছি।” তারপর তিনি ফেরেশতাদেরকে বলবেনঃ “আমার বান্দাদের মনে যে জিনিষের কোন দিন কোন আকাখাও জাগেনি এবং তারা কখনো কল্পনাও করেনি, তাদেরকে তাই প্রদান কর।” তখন তাদেরকে তা দেয়া হবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের আকাঙ্খা পূর্ণ হয়ে যাবে। তারা সেখানে যা পাবে তা হচ্ছেঃ দ্রুতগামী ঘোড়া, প্রতি চার জনের জন্যে মণিমাণিক্যের আসন, প্রতি আসনের উপর সোনার একটা ডেরা এবং প্রতিটি ডেরায় জান্নাতী বিছানা। বিছানায় বড় বড় চক্ষু বিশিষ্টা দুটো করে হূর থাকবে। প্রত্যেক হুর জান্নাতী পোষাক পরিধান করে থাকবে। তাতে জান্নাতের সমস্ত রং থাকবে এবং সমস্ত সুগন্ধি থাকবে। ঐ ডেরা বা তাঁবুর বাহির থেকে তাদের চেহারা এতো উজ্জ্বল দেখাবে যে, যেন তারা বাইরেই বসে আছে। তাদের পায়ের গোছার ভিতরের মজ্জা বাহির হতে দেখতে পাওয়া যাবে। মনে হবে যেন লাল মাণিক্যের ডোরা পরিয়ে দেয়া হয়েছে, তা উপর থেকে দেখা যাবে। প্রত্যেকে একে অপরের উপর নিজের মর্যাদা এইরূপ মনে করবে যেই রূপ সূর্যের মর্যাদা থাকে পাথরের উপর। জান্নাতীরা তাদের কাছে যাবে এবং তাদের সাথে প্রেমালাপে লিপ্ত হয়ে পড়বে। তারা দুজন তাকে দেখে বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! আমরা কল্পনাও করি নাই যে, তিনি আমাদেরকে আপনার মত স্বামী দান করবেন। এরপর আল্লাহ তাআ’লার নির্দেশক্রমে ঐরূপ সারিবদ্ধভাবে সওয়ারীর উপর সওয়ার হয়ে তারা ফিরে যাবে এবং নিজ নিজ মনযিলে পৌঁছে যাবে। সুবহানাল্লাহ! পরম দয়ালু, দাতা আল্লাহ তাআ’লা তাদের জন্যে কতইনা নিয়ামত মওজুদ করে রেখেছেন।সেখানে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যে উঁচু উঁচু অট্টালিকা থাকবে, ওগুলি নির্মিত হবে খাঁটি মণি মুক্তা দ্বারা। দরজাগুলি হবে সোনার তৈরী। ওর মধ্যেকার আসনগুলি হবে মণিমাণিক্য দ্বারা নির্মিত, বিছানাগুলি হবে নরম ও মোটা রেশমের তৈরী। ওর মিম্বরগুলি হবে নূরের তৈরী যার ঔজ্জ্বল্য সূর্যের ঔজ্জ্বল্যকেও হার মানাবে। তাদের প্রাসাদ থাকবে ইল্লীনের উপর। তা নির্মিত হবে মণিমাণিক্য দ্বারা তা এতো উজ্জ্বল হবে যে, ওর ঔজ্জ্বল্যে চক্ষু ঝলসে যাবে। কিন্তু আল্লাহর করুণার কারণে চোখের জন্যে তা সহনীয় হয়ে যাবে। যে প্রাসাদগুলি লাল ইয়াকূতের হবে সেগুলিতে সবুজ রেশমী বিছানা বিছানো থাকবে। আর যেগুলি হলদে ইয়াকূতের হবে ওগুলির বিছানা হবে লাল মখমল, যাতে পান্না ও সোনা জড়ানো থাকবে। ওর আসনগুলির পায়া হবে মণিমুক্তার। ওর উপর মুক্তারই ছাদ হবে। ওর শিখর হবে প্রবালের। তাদের সেখানে পৌছার পূর্বেই আল্লাহর প্রদত্ত উপঢৌকন তথায় পৌঁছে যাবে। সাদা ইয়াকূতী ঘোড়া সেবকদের নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, যাদের সামনে রৌপ্য বসানো থাকবে। তাদের আসনের উপর উচ্চমানের নরম ও মোটা রেশমের গদি বিছানো থাকবে। তারা এই সব ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে আড়ম্বরের সাথে বেহেশতের দিকে রওয়ানা হবে এবং গিয়ে দেখবে যে, তাদের ঘরের পার্শ্বে আলোকময় মিম্বরগুলির উপর ফেরেশতাগণ তাদেরকে অভ্যর্থনার জন্যে বসে রয়েছেন। তাঁরা তাদেরকে আঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা করবেন এবং মুবারকবাদ জানাবেন। আর তাদের সাথে করমর্দন করবেন। তারপর তারা নিজেদের ঘরে প্রবেশ করবে এবং সেখানে আল্লাহর নিয়ামতরাশি বিদ্যমান পাবে। নিজেদের প্রাসাদের পার্শ্বে তারা সুদৃশ্য দু’টি জান্নাত দেখতে পাবে এবং ও দু’টি ফলে ফুলে ভরপুর থাকবে। ঐ দু'টি জান্নাতে দু’টি নহর পূর্ণ গতিতে প্রবাহিত হবে। সেখানে সর্ব প্রকারের সুস্বাদু ফল থাকবে এবং তাঁবুতে পবিত্ৰাত্মা সুদৃশ্য পর্দানশীন হুর থাকবে। যখন এই জান্নাতীরা সেখানে পৌঁছে সুখে শান্তিতে অবস্থান করবে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাদেরকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “হে আমার প্রিয় বান্দাগণ! তোমরা আমার ওয়াদা সত্যরূপে পেয়েছ কি? তোমরা আমার পক্ষ থেকে পুরস্কৃত হয়ে খুশী হয়েছ কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! হাঁ, আমরা খুশী হয়েছি। আমাদের খুশীর কোন ইয়ত্তা নেই। আপনিও আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।” আল্লাহ তাআ’লা তখন বলবেনঃ “যদি আমার সন্তুষ্টি না থাকতো তবে আমি আমার এই মেহমান খানায় তোমাদেরকে কি করে প্রবেশ করিয়েছি? কি করে আমি তোমাদেরকে আমার দর্শন দান করেছি। আমার ফেরেশতারা তোমাদের সাথে করমর্দন করেছে কেন? তোমরা সন্তুষ্ট থাকো। সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস কর। আমি তোমাদেরকে মুবারকবাদ জানাই। তোমরা আরাম আয়েশ, সুখ শান্তি ও ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থাকো। আমার নিয়ামতরাজি কমে যাওয়া ও শেষ হওয়ার নয়।” তখন তারা বলবেঃ “একমাত্র আল্লাহ তাআ’লাই প্রশংসার যোগ্য, তিনি আমাদের দুঃখ ও চিন্তা দূর করে দিয়েছেন এবং আমাদেরকে এমন জায়গায় পৌঁছিয়েছেন যেখানে আমাদের দুঃখ ও কষ্ট বলতে কিছুই নেই। এটা তারই অনুগ্রহ। তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়ালু। (এ আর টি বড়ই বিস্ময়কর এবং খুবই গরীবও বটে। তবে এর কিছু শাহেদও বিদ্যমান রয়েছে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের আসটি বর্ণিত হলো)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি সর্বশেষে জান্নাতে যাবে তাকে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ “আমার কাছে চাও।” সে চাইতে থাকবে এবং আল্লাহ তাআ’লা দিতে থাকবেন। শেষ পর্যন্ত তার প্রার্থনা পূর্ণ হয়ে যাবে এবং তার কোন চাহিদাই আর বাকী থাকবে না। তখন আল্লাহ নিজেই তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেনঃ “এটা চাও, ওটা চাও।” সে তখন চাইবে ও পাবে। তখন আল্লাহ তাআ’লা তাকে বলবেনঃ “এ সব কিছু আমি তোমাকে দিয়েছি এবং এই পরিমাণই আরো দশবার দিয়েছি।”হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মানুষ এবং জ্বিন সবাই যদি একটি ময়দানে দাঁড়িয়ে যায় এবং আমার কাছে প্রার্থনা করে ও চায়, আর আমি প্রত্যেকেরই সমস্ত চাহিদা পূরণ করে দিই, তবে আমার সাম্রাজ্যের ততটুকুই কমবে যতটুকু সমুদ্রের পানি কমে যখন তাতে সুঁই ডুবিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয়। (অর্থাৎ সমুদ্রের পানিতে পুঁই ডুবিয়ে উঠিয়ে নিলে তার অগ্রভাগে যেটুকু পানি উঠে, তাতে সমুদ্রের যেটুকু পানি কমে, আল্লাহ তাআ’লার ধনভান্ডারের ততটুকুই কমে অর্থাৎ কিছুই কমে না)।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে দীর্ঘভাবে বর্ণিত হয়েছে)খা’লিদ ইবনু মা’দান (রঃ) বলেনঃ জান্নাতের একটি গাছের নাম তূবা। তাতে স্তন রয়েছে, যা থেকে জান্নাতীদের শিশুরা দুধ পান করে থাকে। যে গর্ভবতী নারীর পেটের সন্তান অপূর্ণ অবস্থায় পড়ে গিয়েছে সেই সন্তান কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত জান্নাতের নহরে অবস্থান করে। অতঃপর তাকে চল্লিশ বছর বয়স্ক করে উঠানো হবে এবং সে পিতা মাতার সাথে বেহেশতে থাকবে। (এটা ইবনু আবি হা’তিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)

আর-রাদ 13:29

২৭-২৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা মুশরিকদের উক্তি সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, তারা বলেঃ পূর্ববর্তী নবীদের মত এই নবী (হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আমাদের কথা মত কোন মুজিযা উপস্থাপন করেন না কেন? এ সম্পর্কে পূর্ণ আলোচনা ইতিপূর্বে কয়েকবার হয়ে গেছে যে, আল্লাহর এ ক্ষমতা তো আছেই, কিন্তু এর পরেও যদি এরা ঈমান না আনে তবে তারা একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।হাদীসে এসেছেঃ মক্কার লোকেরা যখন হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) বললো যে, যদি তিনি সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করতে পারেন, মক্কা ভূমিতে নদী প্রবাহিত করতে পারেন এবং পাহাড়ী যমীনকে চাষযোগ্য জমিতে পরিবর্তিত করতে পারেন তবে তারা ঈমান আনবে। তখন আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় নবীর (সঃ) কাছে ওয়াহী পাঠালেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমি তাদেরকে এগুলো প্রদান করবো, কিন্তু এরপরেও যদি তারা ঈমান না আনে তবে আমি তাদেরকে এমন শাস্তি প্রদান করবো যা ইতিপূর্বে কারো উপর প্রদান করি নাই। যদি তুমি চাও তবে এটাই করি, নচেৎ তুমি তাদের জন্যে তাওবা ও রহমতের দরজা খোলা রাখতে পার।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয় পন্থাটি পছন্দ করলেন।এটা সত্য কথাই যে, পথ প্রদর্শন করা ও পথ ভ্রষ্ট করা আল্লাহ তাআ’লারই কাজ। ওটা কোন মু'জিযা দেখার উপর নির্ভরশীল নয়। বেঈমানদের জন্যে মু’জিযা দেখানো ও ভয় প্রদর্শন করা অর্থহীন। যার উপর শাস্তির কথা বাস্তবায়িত হয়ে গেছে, সে সমস্ত নিদর্শন দেখালেও ঈমান আনবেনা। তবে শাস্তি দেখে নেয়ার পর তো পুরোপুরি ঈমানদার হয়ে যাবে, কিন্তু তখনকার ঈমান আনয়ন নিষ্ফল হবে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি আমি তাদের উপর ফেরেশতা অবতীর্ণ করতাম এবং তাদের সাথে মৃতেরা কথা বলতে, আর তাদের কাছে আমি সমস্ত গুপ্ত জিনিস প্রকাশ করে দিতাম তবুও তারা ঈমান আনতো না, তবে আল্লাহ যাকে চান সেটা অন্য কথা, কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ।” এ জন্যেই আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওঃ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং তাদেরকেই সুপথ প্রদর্শন করেন যারা তাঁর অভিমুখী। যাদের অন্তরে ঈমান জমজমাট হয়ে গেছে, যাদের অন্তর আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তারা তাঁর যিকর দ্বারা প্রশান্তি লাভ করে থাকে, তারা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যায়। বাস্তবিকই আল্লাহর যিকর মনের প্রশান্তির কারণই বটে। এটা ঈমানদার ও সৎ লোকদের জন্যে খুশী ও চক্ষু ঠাণ্ডা হওয়ার কারণ। তাদের পরিণাম ভাল। তারা মুবারকবাদ পাওয়ার যোগ্য। সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (আরবি) হাবশী ভাষায় জান্নাতের ভূমিকে বলে। আর সাঈদ ইবনু মাসজু’ (রঃ) বলেন যে, হিন্দী ভাষায় (আরবি) হচ্ছে একটি জান্নাতের নাম। অনুরূপভাবে সুদ্দী (রঃ) ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (আরবি) হচ্ছে জান্নাত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লা যখন জান্নাত সৃষ্টি করেন এবং তার থেকে ফারেগ হন তখন তিনি (আরবি) এই কথাটি বলেন।শাহ্র ইবনু হাউশির (রঃ) বলেন যে, জান্নাতের মধ্যে একটি গাছের নামও তূবা। সমস্ত জান্নাতে এর শাখা গুলি ছড়িয়ে রয়েছে। প্রত্যেক ঘরে এর শাখা বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তাআ’লা এটাকে নিজের হাতে রোপণ করেছেন। মুক্তার দানা দিয়ে তিনি ওটা জন্মিয়েছেন এবং আল্লাহর হুকুমেই ওটা বর্ধিত হয়েছে এবং ছড়িয়ে পড়েছে। ওরই মূল হতে জান্নাতী মধু, সূরা, পানি এবং দুধের নহর প্রবাহিত হয়। (এটা ইবন্য জারীর (রঃ) স্বীয় তাফসীর বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে মারফূ’ রূপে বর্ণিত আছে যে, জান্নাতে তূবা বা নামক একটি বৃক্ষ রয়েছে যা একশ’ বছরের পথের দুরত্ব ব্যাপী ছড়িয়ে আছে। এরই গুচ্ছ হতে জান্নাতীদের পোষাক বের হয়ে থাকে।হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলেঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে আপনাকে দেখেছে এবং আপনার উপর ঈমান এনেছে তাকে মুবারকবাদ।” তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, তাকে মুবারকবাদ তো বটেই, তবে দ্বিগুণ মুবারকবাদ ঐ ব্যক্তিকে যে আমাকে দেখে নাই, অথচ আমার উপর ঈমান এনেছে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)একটি লোক জিজ্ঞেস করলো: “তূবা কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তূবা হচ্ছে একটি জান্নাতী গাছ যা একশ’ বছরের পথ পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে। জান্নাতীদের পোষাক ওরই শাখা থেকে বের হয়ে থাকে।” হযরত সাহল ইবনু সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতের মধ্যে এমন একটি গাছ রয়েছে যে, সওয়ার একশ’ বছর পর্যন্ত ওর ছায়ায় চলতে থাকবে তবুও তা শেষ হবে না।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, চলার গতিও দ্রুত এবং সওয়ারীও দ্রুতগামী। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতে (আরবি) (এবং সম্প্রসারিত ছায়া) এই আয়াতের তাফসীরেও এটাই রয়েছে। অন্য হাদীসে আছে সত্তর বছর বা একশ’ বছর।ঐ গাছটির নাম হচ্ছে ‘শাজারাতুল খুলদ’ (চিরস্থায়ী গাছ)। সিদরাতুল মুনতাহার আলোচনায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ওর একটি শাখার ছায়ায় একজন সওয়ার একশ’ বছর পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং শত শত আরোহী ওর একটি শাখার নীচে অবস্থান করতে পারে। তাতে সোনার ফড়িং রয়েছে। ওর ফলগুলি বড় বড় মটকা বা মৃৎ পাত্রের সমান।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবু উমামা আল বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের যে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে তাকেই ‘তূবা’ বা বৃক্ষের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে এবং তার জন্যে ওর শাখাগুলি খুলে দেয়া হবে। সে তখন ওগুলির যেটা ইচ্ছা সেটাই গ্রহণ করবে। ইচ্ছা করলে সাদাটা নিবে, ইচ্ছা করলে নিবে লালটা, ইচ্ছা করলে হলদেটা নিবে এবং ইচ্ছা হলে কালোটা নিবে। ওগুলি হবে অত্যন্ত সুন্দর, নরম ও উত্তম।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা তৃবা গাছকে হুকুম করবেনঃ “আমার বান্দাদের জন্যে তুমি উত্তম জিনিসগুলি ফেলতে থাকো”। তখন তা হতে ঘোড়া ও উট বর্ষিত হতে শুরু করবে। ওগুলি সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিত থাকবে, জ্বিন, লাগাম কষা থাকবে ইত্যাদি।ইবনু জারীর (রঃ) এখানে অহাব ইবনু মুনাব্বাহ (রঃ) প্রমুখাৎ একটি অতি বিস্ময়কর ও অদ্ভূদ ‘আসর' এনেছেন। অহাব ইবনু মুনাববাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, জান্নাতে তূবা বা নামক একটি গাছ রয়েছে যার ছায়ায় আরোহী একশ’ বছর পর্যন্ত চলতে থাকবে, তবুও তা শেষ হবে না। তার সতেজতা ও শ্যামলতা উন্মুক্ত বাগানের ন্যায়। ওর পাতাগুলি অতি চমৎকার। ওর শাখা গুলি আম্বর, ওর কঙ্করগুলি ইয়াকূত, ওর মাটি কপূর, ওর কাদা মিশক। ওর মূল হতে মদ্যের, দুধের এবং মধুর নহর প্রবাহিত হচ্ছে। ওর নীচে জান্নাতীদের মজলিস অনুষ্ঠিত হবে। জান্নাতীরা ওর নীচে উপবিষ্ট থাকবে এমতাবস্থায় ফেরেশতাগণ তাদের কাছে উষ্ট্রীর পাল নিয়ে আগমন করবেন। উষ্ট্ৰীসমূহের যিঞ্জীরগুলি সোনা দ্বারা নির্মিত হবে। ওগুলির চেহারা প্রদীপের ন্যায় উজ্জ্বল হবে। ওদের ললাম রেশমের মত নরম হবে। ওদের উপর ইয়াকূতের মত গদি থাকবে যাতে সোনা জড়ানো থাকবে। ওর উপর রেশমের ঝুল থাকবে। ফেরেশতাগন ঐ উষ্ট্রীগুলি ঐ জান্নাতী লোকদের সামনে পেশ করবেন এবং বলবেনঃ “এই সওয়ারীগুলি আপনার কাছে পাঠানো হয়েছে এবং মহামহিমান্বিত আল্লাহ আপনাদেরকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তারা তখন ঐ উষ্ট্ৰীগুলির উপর সওয়ার হয়ে যাবে। উষ্ট্রীগুলির চলন গতি হবে পক্ষীর ন্যায় দ্রুত। জান্নাতীরা একে অপরের সাথে মিলিতভাবে চলবে এবং পরস্পর কথা বলতে বলতে যাবে। এক উন্ত্রীর কানের সাথে অপর উন্ত্রীর কান মিলিত হবে না। উষ্ট্ৰীগুলি পূর্ণ আনুগত্যের সাথে চলবে। পথে যে গাছ পড়বে তা আপনা আপনি সরে যাবে, যেন কেউ তার সাথী থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে। এই ভাবে তারা পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাবে। আল্লাহ তাআ’লা নিজের চেহারার উপর হতে পর্দা সরিয়ে ফেলবেন। তারা (জান্নাতীরা) তাদের প্রতিপালকের চেহারার প্রতি দৃষ্টিপাত করে বলবেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি শান্তি, আপনার থেকেই শান্তি এবং মহিমা ও মর্যাদা আপনারই প্রাপ্য। তাদের এই কথার উত্তরে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি শান্তি, আমার থেকেই শান্তি এবং আমার করুণা ও প্রেম তোমাদের প্রাপ্য হয়ে গেছে। আমার ঐ বান্দাদেরকে মুবারকবাদ, যারা আমাকে না দেখেই ভয় করেছে এবং আমার নির্দেশ মেনে চলেছে।” জান্নাতীরা তখন বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার যথাযোগ্য ইবাদত করতে পারিনি এবং পুরোপুরিভাবে আপনাকে মর্যাদা দিতে পারিনি। সুতরাং আমাদেরকে আপনার সামনে সিজদা করার অনুমতি দিন।” আল্লাহ তাআ’লা তাদের একথার জবাবে বলবেনঃ “এটা পরিশ্রমের জায়গা নয় এবং ইবাদতেরও জায়গা নয়। এটা তো শুধু সুখ শান্তি ও ভোগ বিলাসের জায়গা। ইবাদতের কষ্ট শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু মজা উপভোগ ও আমোদ প্রমোদের দিন এসেছে। যা ইচ্ছা চাও, পাবে। তোমাদের যে-ই যা চাইবে তাকে আমি তাই প্রদান করবো।” সুতরাং তারা চাইবে। যে সবচেয়ে কম চাইবে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি দুনিয়ায় যা সৃষ্টি করেছিলেন, যাতে আপনার বান্দা হায় হায় করেছিল, আমি চাই যে, দুনিয়ার সৃষ্টির শুরু হতে শেষ পর্যন্ত দুনিয়ায় আপনি যত কিছু সৃষ্টি করেছিলেন আমাকে তা সবই প্রদান করুন। আল্লাহ তাআ’লা তখন বলবেনঃ তুমি কিছুই চাও নাই। নিজের মর্যাদার তুলনায় তুমি খুবই কম চেয়েছ। আমার দানের কোন কমি আছে কি? আচ্ছা, তুমি যা চাইলে তাই দিচ্ছি।” তারপর তিনি ফেরেশতাদেরকে বলবেনঃ “আমার বান্দাদের মনে যে জিনিষের কোন দিন কোন আকাখাও জাগেনি এবং তারা কখনো কল্পনাও করেনি, তাদেরকে তাই প্রদান কর।” তখন তাদেরকে তা দেয়া হবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের আকাঙ্খা পূর্ণ হয়ে যাবে। তারা সেখানে যা পাবে তা হচ্ছেঃ দ্রুতগামী ঘোড়া, প্রতি চার জনের জন্যে মণিমাণিক্যের আসন, প্রতি আসনের উপর সোনার একটা ডেরা এবং প্রতিটি ডেরায় জান্নাতী বিছানা। বিছানায় বড় বড় চক্ষু বিশিষ্টা দুটো করে হূর থাকবে। প্রত্যেক হুর জান্নাতী পোষাক পরিধান করে থাকবে। তাতে জান্নাতের সমস্ত রং থাকবে এবং সমস্ত সুগন্ধি থাকবে। ঐ ডেরা বা তাঁবুর বাহির থেকে তাদের চেহারা এতো উজ্জ্বল দেখাবে যে, যেন তারা বাইরেই বসে আছে। তাদের পায়ের গোছার ভিতরের মজ্জা বাহির হতে দেখতে পাওয়া যাবে। মনে হবে যেন লাল মাণিক্যের ডোরা পরিয়ে দেয়া হয়েছে, তা উপর থেকে দেখা যাবে। প্রত্যেকে একে অপরের উপর নিজের মর্যাদা এইরূপ মনে করবে যেই রূপ সূর্যের মর্যাদা থাকে পাথরের উপর। জান্নাতীরা তাদের কাছে যাবে এবং তাদের সাথে প্রেমালাপে লিপ্ত হয়ে পড়বে। তারা দুজন তাকে দেখে বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! আমরা কল্পনাও করি নাই যে, তিনি আমাদেরকে আপনার মত স্বামী দান করবেন। এরপর আল্লাহ তাআ’লার নির্দেশক্রমে ঐরূপ সারিবদ্ধভাবে সওয়ারীর উপর সওয়ার হয়ে তারা ফিরে যাবে এবং নিজ নিজ মনযিলে পৌঁছে যাবে। সুবহানাল্লাহ! পরম দয়ালু, দাতা আল্লাহ তাআ’লা তাদের জন্যে কতইনা নিয়ামত মওজুদ করে রেখেছেন।সেখানে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যে উঁচু উঁচু অট্টালিকা থাকবে, ওগুলি নির্মিত হবে খাঁটি মণি মুক্তা দ্বারা। দরজাগুলি হবে সোনার তৈরী। ওর মধ্যেকার আসনগুলি হবে মণিমাণিক্য দ্বারা নির্মিত, বিছানাগুলি হবে নরম ও মোটা রেশমের তৈরী। ওর মিম্বরগুলি হবে নূরের তৈরী যার ঔজ্জ্বল্য সূর্যের ঔজ্জ্বল্যকেও হার মানাবে। তাদের প্রাসাদ থাকবে ইল্লীনের উপর। তা নির্মিত হবে মণিমাণিক্য দ্বারা তা এতো উজ্জ্বল হবে যে, ওর ঔজ্জ্বল্যে চক্ষু ঝলসে যাবে। কিন্তু আল্লাহর করুণার কারণে চোখের জন্যে তা সহনীয় হয়ে যাবে। যে প্রাসাদগুলি লাল ইয়াকূতের হবে সেগুলিতে সবুজ রেশমী বিছানা বিছানো থাকবে। আর যেগুলি হলদে ইয়াকূতের হবে ওগুলির বিছানা হবে লাল মখমল, যাতে পান্না ও সোনা জড়ানো থাকবে। ওর আসনগুলির পায়া হবে মণিমুক্তার। ওর উপর মুক্তারই ছাদ হবে। ওর শিখর হবে প্রবালের। তাদের সেখানে পৌছার পূর্বেই আল্লাহর প্রদত্ত উপঢৌকন তথায় পৌঁছে যাবে। সাদা ইয়াকূতী ঘোড়া সেবকদের নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, যাদের সামনে রৌপ্য বসানো থাকবে। তাদের আসনের উপর উচ্চমানের নরম ও মোটা রেশমের গদি বিছানো থাকবে। তারা এই সব ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে আড়ম্বরের সাথে বেহেশতের দিকে রওয়ানা হবে এবং গিয়ে দেখবে যে, তাদের ঘরের পার্শ্বে আলোকময় মিম্বরগুলির উপর ফেরেশতাগণ তাদেরকে অভ্যর্থনার জন্যে বসে রয়েছেন। তাঁরা তাদেরকে আঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা করবেন এবং মুবারকবাদ জানাবেন। আর তাদের সাথে করমর্দন করবেন। তারপর তারা নিজেদের ঘরে প্রবেশ করবে এবং সেখানে আল্লাহর নিয়ামতরাশি বিদ্যমান পাবে। নিজেদের প্রাসাদের পার্শ্বে তারা সুদৃশ্য দু’টি জান্নাত দেখতে পাবে এবং ও দু’টি ফলে ফুলে ভরপুর থাকবে। ঐ দু'টি জান্নাতে দু’টি নহর পূর্ণ গতিতে প্রবাহিত হবে। সেখানে সর্ব প্রকারের সুস্বাদু ফল থাকবে এবং তাঁবুতে পবিত্ৰাত্মা সুদৃশ্য পর্দানশীন হুর থাকবে। যখন এই জান্নাতীরা সেখানে পৌঁছে সুখে শান্তিতে অবস্থান করবে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাদেরকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “হে আমার প্রিয় বান্দাগণ! তোমরা আমার ওয়াদা সত্যরূপে পেয়েছ কি? তোমরা আমার পক্ষ থেকে পুরস্কৃত হয়ে খুশী হয়েছ কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! হাঁ, আমরা খুশী হয়েছি। আমাদের খুশীর কোন ইয়ত্তা নেই। আপনিও আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।” আল্লাহ তাআ’লা তখন বলবেনঃ “যদি আমার সন্তুষ্টি না থাকতো তবে আমি আমার এই মেহমান খানায় তোমাদেরকে কি করে প্রবেশ করিয়েছি? কি করে আমি তোমাদেরকে আমার দর্শন দান করেছি। আমার ফেরেশতারা তোমাদের সাথে করমর্দন করেছে কেন? তোমরা সন্তুষ্ট থাকো। সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস কর। আমি তোমাদেরকে মুবারকবাদ জানাই। তোমরা আরাম আয়েশ, সুখ শান্তি ও ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থাকো। আমার নিয়ামতরাজি কমে যাওয়া ও শেষ হওয়ার নয়।” তখন তারা বলবেঃ “একমাত্র আল্লাহ তাআ’লাই প্রশংসার যোগ্য, তিনি আমাদের দুঃখ ও চিন্তা দূর করে দিয়েছেন এবং আমাদেরকে এমন জায়গায় পৌঁছিয়েছেন যেখানে আমাদের দুঃখ ও কষ্ট বলতে কিছুই নেই। এটা তারই অনুগ্রহ। তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়ালু। (এ আর টি বড়ই বিস্ময়কর এবং খুবই গরীবও বটে। তবে এর কিছু শাহেদও বিদ্যমান রয়েছে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের আসটি বর্ণিত হলো)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি সর্বশেষে জান্নাতে যাবে তাকে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ “আমার কাছে চাও।” সে চাইতে থাকবে এবং আল্লাহ তাআ’লা দিতে থাকবেন। শেষ পর্যন্ত তার প্রার্থনা পূর্ণ হয়ে যাবে এবং তার কোন চাহিদাই আর বাকী থাকবে না। তখন আল্লাহ নিজেই তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেনঃ “এটা চাও, ওটা চাও।” সে তখন চাইবে ও পাবে। তখন আল্লাহ তাআ’লা তাকে বলবেনঃ “এ সব কিছু আমি তোমাকে দিয়েছি এবং এই পরিমাণই আরো দশবার দিয়েছি।”হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মানুষ এবং জ্বিন সবাই যদি একটি ময়দানে দাঁড়িয়ে যায় এবং আমার কাছে প্রার্থনা করে ও চায়, আর আমি প্রত্যেকেরই সমস্ত চাহিদা পূরণ করে দিই, তবে আমার সাম্রাজ্যের ততটুকুই কমবে যতটুকু সমুদ্রের পানি কমে যখন তাতে সুঁই ডুবিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয়। (অর্থাৎ সমুদ্রের পানিতে পুঁই ডুবিয়ে উঠিয়ে নিলে তার অগ্রভাগে যেটুকু পানি উঠে, তাতে সমুদ্রের যেটুকু পানি কমে, আল্লাহ তাআ’লার ধনভান্ডারের ততটুকুই কমে অর্থাৎ কিছুই কমে না)।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে দীর্ঘভাবে বর্ণিত হয়েছে)খা’লিদ ইবনু মা’দান (রঃ) বলেনঃ জান্নাতের একটি গাছের নাম তূবা। তাতে স্তন রয়েছে, যা থেকে জান্নাতীদের শিশুরা দুধ পান করে থাকে। যে গর্ভবতী নারীর পেটের সন্তান অপূর্ণ অবস্থায় পড়ে গিয়েছে সেই সন্তান কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত জান্নাতের নহরে অবস্থান করে। অতঃপর তাকে চল্লিশ বছর বয়স্ক করে উঠানো হবে এবং সে পিতা মাতার সাথে বেহেশতে থাকবে। (এটা ইবনু আবি হা’তিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)

আর-রাদ 13:30

আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ হে মুহাম্মদ! যেমন আমি তোমাকে এই উম্মতের নিকট পাঠিয়েছি যে, তুমি তাদেরকে আমার কালাম পাঠ করে শুনাবে, তেমনই তোমার পূর্বে অন্যান্য রাসূলদেরকেও আমি পূর্ববর্তী উম্মতদের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। তারাও নিজ নিজ উম্মতের কাছে আমার পয়গাম পেীছিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তারা তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। অনুরূপভাবে তোমাকেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। সুতরাং তোমার মন খারাপ করা উচিত নয়। হাঁ, তবে এই মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের উচিত তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণামের প্রতি লক্ষ্য করা যে, কিভাবে আল্লাহ তাদেরকে তছনছ করে দিয়েছিলেন! আর তোমাকে অবিশ্বাস করা তো আমার কাছে তাদেরকে অবিশ্বাস করা অপেক্ষা বেশী অপছন্দনীয়। এখন তাদের উপর কিরূপ শাস্তি বর্ষিত হয় তা তারা দেখতেই পাবে। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি) (১৬: ৬৩) এবং আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ (হে নবী, সঃ)! তোমার পূর্বে রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছিল, অতঃপর তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা ও কষ্ট দেয়ার উপর, শেষ পর্যন্ত তাদের কাছে আমার সাহায্য এসে গিয়েছিল, আর (জেনে রেখোঁরেখো যে, আল্লাহর কথার কোন পরিবর্তন নেই এবং অবশ্যই তোমার কাছে রাসূলের খবর এসে গেছে।” (৬: ৩৪) ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাদের এটা লক্ষ্য করা উচিত যে, কিভাবে আল্লাহ তাআ’লা তাঁর অনুগত লোকদেরকে সাহায্য করেছিলেন এবং কি ভাবে তাদেরকে জয়যুক্ত করেছিলেন। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার কওমের প্রতি লক্ষ্য কর যে, তারা রহমানকে (দয়াময় আল্লাহকে) অস্বীকার করছে। তারা আল্লাহর এই বিশেষণ ও নামকে মানছেই না। হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্র লিখবার সময় মুশরিকরা বাধা দিয়ে বলেঃ “আমরা (আরবি) লিখতে দিবো না। রহমান এবং রাহীম কি তা আমরা জানি না।” পূর্ণ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বিদ্যমান রয়েছে। কুরআন কারীমে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা আল্লাহ বলে তাঁকে ডাকো অথবা রহমান বলে ডাকো, তিনি সমস্ত উত্তম নামের অধিকারী।” (১৭: ১১০)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয় আল্লাহ তাআ’লার কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম হচ্ছে আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা যে দয়াময় আল্লাহকে অস্বীকার করছো তিনিই আমার প্রতিপালক। তিনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। তাঁরই উপর আমি নির্ভর করি। আমার প্রত্যাবর্তন তাঁরই দিকে। তিনি ছাড়া অন্য কেউ এর হকদার নয়।

আর-রাদ 13:31

এখানে আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় পবিত্র গ্রন্থ কুরআনের প্রশংসা করছেন যে, যদি পূর্ববর্তী আসমানী গ্রন্থসমূহের কোনটার সাথে পাহাড় স্বীয় স্থান থেকে সরে গিয়ে থাকতো, যমীন বিদীর্ণ হয়ে থাকতো এবং মৃত কথা বলে থাকতো, তবে এই কুরআনই তো এ কাজের বেশী যোগ্য ছিল। কেননা, এটা পূর্ববর্তী সমস্ত আসমানী কিতাবের উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। এতে তো এই মু’জিযা রয়েছে যে, সমস্ত দানব ও মানব মিলিত হয়েও এর সূরার মত একটি সূরাও রচনা করতে পারে নাই। তথাপি মুশরিকরা এই কুরআনকেও অস্বীকার করছে। তা হলে সব দায়িত্ব আল্লাহ তাআ’লার উপরই অর্পন করে দাও। তিনি সবকিছুরই ম’লিক। সবই তাঁর ইখতিয়ারভুক্ত। তিনি যা চান তা হয় এবং যা চান না তা হয় না। তিনি যাকে সুপথ প্রদর্শন করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না, আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না। এটা স্মরনযোগ্য বিষয় যে, পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবগুলির উপরও কুরআনের প্রয়োগ হয়ে থাকে। কেননা, এটা সবটা থেকেই মুশতাক বা নির্গত। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত দাউদের (আঃ) উপর কুরআনকে এতো সহজ করে দেয়া হয়েছিল যে, তাঁর নির্দেশক্রমে সওয়ারী কষা হতো এবং ওটা প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার পূর্বেই তিনি কুরআন খতম করে ফেলতেন। তিনি স্ব হস্তের উপার্জন ছাড়া কিছুই খেতেন না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) একাকী তাখরীজ করেছেন)সুতরাং এখানে কুরআন দ্বারা যাবুরকে বুঝানো হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ তবে কি মুমিনমু’মিনদের এখনও এ বিশ্বাস হয়নি যে, সমস্ত মানুষ ঈমান আনবে না? তাদের কি এ বিশ্বাসও হয়নি যে, আল্লাহ তাআ’লার ইচ্ছা হলে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ ঈমান আনয়ন করতো। তারা আল্লাহ তাআ’লার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারে কি? এই কুরআনের পরে আর কোন মু’জিযার প্রয়োজন আছে কি? এর চেয়ে উত্তম, এর চেয়ে স্পষ্ট, এর চেয়ে পরিষ্কার এবং এর চেয়ে বেশি মনকে আকর্ষণকারী আর কোন কালাম হবে? এটা এমনই এক গ্রন্থ যে, যদি এটা বড় বড় পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ হতো তবে সেগুলি আল্লাহর ভয়ে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেতো। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবীকে এইরূপ জিনিস দেয়া হয়েছে যে, লোকেরা ওর উপর ঈমান এনেছে। আমার এই রূপ জিনিস হচ্ছে সেই ওয়াহী যা আল্লাহ তাআ’লা আমার প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং আমি আশা রাখি যে, সমস্ত নবী অপেক্ষা আমার অনুগামী বেশি হবে।” ভাবার্থ এই যে, সমস্ত নবীর মু'জিযা তাঁদের বিদায়ের সাথে সাথেই বিদায় হয়ে গেছে। কিন্তু তার মু'জিযা তত দিন শেষ হবে না যতদিন দুনিয়া থাকবে। না এর বিষ্ময়কর বিষয়গুলি শেষ হবে, অধিক পঠনের কারণে এটা (কুরআন কারীম) পুরানো হবে, না এর থেকে আলেমদের চাহিদা মিটে যাবে বা তাদের পেট পূর্ণ হয়ে যাবে। নিশ্চয় এটা মীমাংসাকারী বাণী এবং এটা নিরর্থক নয়। যে অবাধ্য একে পরিত্যাগ করবে, আল্লাহ তাআ’লা তাকে ধ্বংস করবেন। যে এটা ছাড়া অন্য কিছুতে হিদায়াত অনুসন্ধান করবে, আল্লাহ তাআ’লা তাকে পথভ্রষ্ট করবেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কাফিররা রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলেঃ “যদি আপনি পাহাড়কে এখান থেকে সরিয়ে দেন এবং এখানকার ভূমিকে ফসল উৎপাদনের যোগ্য করে দিতে পারেন, অথবা যেমনভাবে হযরত সুলাইমান (আঃ) বাতাস দ্বারা তার কওমের জন্যে মাটি কাটতেন তেমনিভাবে যদি আপনি আমাদের জন্যে মাটি কাটতে পারেন, অথবা যদি আপনি আমাদের জন্যে মৃতকে জীবিত করেন যেমন হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমের জন্যে করতেন (তবে আমরা ঈমান আনবো)।” তখন আল্লাহ তাআ’লা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। কাতাদা’ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ যদি কোন কুরআনের সাথে এসব বিষয় প্রকাশ পেতো তবে তোমাদের কুরআনের সাথেও পেতো। সব কিছুই তাঁর অধিকারে রয়েছে। কিন্তু তিনি এরূপ করেন না। কারণ তার উদ্দেশ্য হচ্ছে তোমাদেরকে পরীক্ষা করা যে, তোমরা নিজেদের ইচ্ছায় ঈমান আন কি আন না।আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “তবে কি ঈমানদারদের প্রত্যয় হয় নাই যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিশ্চয় সকলকেই সৎপথে পরিচালিত করতে পারতেন? অন্য জায়গায় (আরবি) এর (আরবি) স্থলে ও রয়েছে। মু'মিনরা ঐ কাফিরদের হিদায়াত থেকে নিরাশ হয়ে গিয়েছিল। হাঁ, তবে আল্লাহ তাআ’লার ইখতিয়ারের ব্যাপারে কারো কিছু বলার নাই। ইচ্ছা করলে তিনি সকলকেই সুপথ প্রদর্শন করতে পারেন। এটা কাফিররা বরাবর লক্ষ্য করে। এসেছে যে, তাদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কারণে আল্লাহ তাআ’লা বরাবরই তাদের উপর শাস্তি আপতিত করতে থেকেছেন বা তাদের আশে পাশেই বিপর্যয় আপতিত করতেই থেকেছেন। তবুও তারা কেন উপদেশ গ্রহণ করছে না? যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ অবশ্যই আমি তোমাদের চতুষ্পর্শ্বের বহু গ্রামবাসীকে তাদের দুষ্কর্মের কারণে ধ্বংস করে দিয়েছি এবং আমার বিভিন্ন প্রকারের নিদর্শনাবলী প্রকাশ করেছি যে, হয়তো তারা দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকবে।” (৪৬: ২৭) আর এক জায়গায় আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা কি দেখে নাই যে, আমি যমীনকে কমিয়ে দিয়ে আসছি, তবুও কি এখনও তারা নিজেদেরকেই বিজয়ী মনে করবে?” (২১: ৪৪)(আরবি) এর (আরবি) বা কর্তা হচ্ছে শব্দটি। এটাই প্রকাশমান এবং বাকরীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ কাফিরদের কর্মফলের কারণে তাদের কাছে পৌঁছে যাবে ক্ষুদ্র ইসলামী সেনাবাহিনী অথবা তুমি (মুহাম্মদ সঃ) নিজেই তাদের শহরের নিটকবর্তী স্থানে অবতরণ করবে যতক্ষণ না আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এসে পড়ে। এর দ্বারা মক্কা বিজয়কে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আসমানী শাস্তি এবং আশে পাশে অবতরণ করা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) তাঁর সেনাবাহিনীসহ তাদের সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে যাওয়া এবং তাদের সাথে জিহাদ করা। মুজাহিদ (রঃ), কাতাদা’ (রঃ), ইকরামা (রঃ) প্রভৃতি গুরুজনও একথাই বলেছেন। তাঁদের সবারই উক্তি এটাই যে, এখানে আল্লাহর ওয়াদা দ্বারা মক্কা বিজয়কেই বুঝানো হয়েছে। কিন্তু হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে কিয়ামতের দিন। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি হচ্ছে স্বীয় রাসূলদেরকে সাহায্য করা। এর ব্যতিক্রম হবার নয়। তাঁরা এবং তাঁদের অনুসারীরা অবশ্য অবশ্যই উর্ধে থাকবেন। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ তাঁর রাসূলদের সাথে কৃত ওয়াদার খেলাফ করবেন তা তুমি ধারণা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, দণ্ডদাতা।” (১৪:৪৭)

আর-রাদ 13:32

আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় রাসূলকে (সঃ) সান্ত্বনা দিয়ে বলছেনঃ তোমার কওম যে তোমাকে অবিশ্বাস ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে এতে তুমি মোটেই দুঃখ ও চিন্তা করো না। তোমার পূর্ববর্তী রাসূলদেরকেও ঠাট্টা বিদ্রুপ করা হয়েছিল। আমি ঐ কাফিরদেরকেও কিছুকাল ঢিল দিয়েছিলাম। শেষে তাদেরকে আমি মারাত্মকভাবে পাকড়াও করেছিলাম। আমার শাস্তির ধরণ কেমন ছিল তা তোমার জানা আছে কি? আর তাদের পরিণাম কিরূপ হয়েছিল সে সম্পর্কেও তুমি জ্ঞাত আছ কি? যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “বহু গ্রামবাসীকে আমি তাদের জুলুম সত্ত্বেও ঢিল দিয়েছিলাম, কিন্তু শেষে তাদের দুষ্কর্মের প্রতিফল হিসেবে তাদেরকে আমি আমার শাস্তির শিকারে পরিণত করেছিলাম।” সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “নিশ্চয় আল্লাহ অত্যাচারীকে অবকাশ দিয়ে থাকেন, অতঃপর যখন তাকে পাকড়াও করেন তখন সেই যালিম একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) (১১ :১০২) এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।

আর-রাদ 13:33

আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ আল্লাহ তাআ’লা প্রত্যেক মানুষের আমলের রক্ষক। প্রত্যেকের আমল সম্পর্কে তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। প্রত্যেক নফসের উপর তিনি প্রহরী। প্রত্যেক অমলকারীর ভাল ও মন্দ আমল তিনি সম্যক অবগত। কোন জিনিসই তার থেকে গোপনীয় নয়। তাঁর অজান্তে কোন কাজই হয় না। প্রত্যেক অবস্থা তাঁর অবগতিতে রয়েছে। প্রত্যেক আমলের উপর তিনি বিদ্যমান রয়েছেন। প্রতিটি পাতা ঝরে পড়ারও খবর তিনি রাখেন। প্রত্যেক প্রাণীর আহারের দায়িত্ব আল্লাহ তাআ’লার উপর রয়েছে। প্রত্যেকের ঠিকানা তিনি জানেন। সমস্ত কিছু তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত বিষয়ই তিনি জানেন। তোমরা যেখানেই থাক না কেন সেখানেই আল্লাহ তাআ’লা তোমাদের সাথে রয়েছেন। তিনি তোমাদের আমলগুলি দেখতে আছেন। এই সব গুণের অধিকারী আল্লাহ কি তোমাদের এইসব মিথ্যা উপাস্যের মত? যারা শুনেও না, দেখেও না? না তারা কোন জিনিসের মালিক, না অন্য কারো লাভ ও ক্ষতির তাদের কোন ইখতিয়ার রয়েছে। এই প্রশ্নের জবাবকে উহ্য রাখা হয়েছে। কেননা, কালামের ইঙ্গিত এখানে বিদ্যমান রয়েছে এবং তা হচ্ছে (আরবি) আল্লাহ তাআ’লার এই উক্তিটি। অর্থাৎ “তারা আল্লাহর সাথে অন্যদেরকে শরীক বানিয়ে নিয়েছে এবং তাদের ইবাদত করতে শুরু করেছে। তোমরা তাদের নাম তো বল এবং তাদের অবস্থা তো বর্ণনা কর, যাতে দুনিয়া জেনে নেয় যে, তাদের কোন অস্তিত্বই নেই। তোমরা কি যমীনের ঐ জিনিসগুলোর খবর আল্লাহকে দিচ্ছ যা তিনি জানেন না? অর্থাৎ যাদের কোন অস্তিত্বই নেই? কেননা, যদি ওগুলির কোন অস্তিত্ব থাকতো তবে সেগুলি আল্লাহ তাআ’লার অবগতির বাইরে থাকতো না। কেননা, তাঁর কাছে কোন গোপন হতে গোপনতম জিনিষও প্রকৃত পক্ষে গোপন নেই। তোমরা শুধু একটা আজগুবী কথা বানিয়ে নিয়েছে এবং আবোল তাবোল বকছো। তোমরা নিজেরাই তাদের নামগুলি বানিয়ে নিয়েছে। তোমরাই তাদেরকে লাভ ও ক্ষতির মালিক বলে ঘোষণা করছে এবং তাদের উপাসনা শুরু করে দিয়েছে। এগুলি সবই তোমাদের মনগড়া। তোমাদের হাতে কোন খোদায়ী দলিলও নেই এবং অন্য কোন দলিলও নেই। এগুলি তোমরা শুধু ধারণা ও প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়েই করছে। আল্লাহর পক্ষ হতে হিদায়াত নাযিল হয়েছে। কাফিরদের চক্রান্ত ও ছলনা তাদের কাছে শোভনীয় প্রতীয়মান হচ্ছে। তারা তাদের কুফরী ও শিরকের উপর গর্ববোধ করছে। দিনরাত তারা তাতেই মগ্ন রয়েছে। আর অন্যদেরকেও তারা ঐ দিকেই আহবান করছে। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “শয়তানরা তাদের সামনে তাদের দুষ্কার্যকে শোভনীয় করে তুলেছে। তাদেরকে আল্লাহর পথ ও হিদায়াতের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এক কিরআতে (আরবি) ও রয়েছে। অর্থাৎ তারা ওটাকে ভাল মনে করে অন্যদেরকে ওর ফাঁদে ফেলতে শুরু করেছে এবং রাসূলদের (সঃ) পথ। হতে জনগণকে ফিরিয়ে রাখছে।আল্লাহ পাক বলেনঃ “আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেন তার কোন পথ প্রদর্শক নেই।” যেমন আল্লাহ তাআ’লা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ)! আল্লাহ যাকে ফিৎনায় ফেলার ইচ্ছা করেন, তুমি তার জন্যে আল্লাহর কাছে কখনো কোন কিছুরই অধিকার রাখবে না।” (৫: ৪১) অন্য স্থানে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদিও তুমি তাদের হিদায়াত প্রাপ্তির জন্যে লালায়িত, কিন্তু নিশ্চয় আল্লাহ পথভ্রষ্টদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না এবং তাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী নেই।” (১৬: ৩৭)

আর-রাদ 13:34

৩৪-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা কাফিরদের শাস্তি এবং সৎলোকদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি কাফিরদের কুফরী ও শিরকের বর্ণনা দেয়ার পর তাদের শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা মুমিনমু’মিনদের হাতে নিহত ও ধ্বংস হবে। এর সাথে সাথেই তারা আখেরাতের কঠিন শাস্তিতে গ্রেফতার হবে, যা তাদের দুনিয়ার শাস্তি অপেক্ষা বহুগুণে কঠিন। পরস্পর লা'নতকারী স্বামী স্ত্রীকে যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “নিশ্চয় দুনিয়ার শাস্তি আখেরাতের শাস্তির তুলনায় খুবই সহজ।” ওটা ঐরূপ যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এখানকার অর্থাৎ দুনিয়ার শাস্তি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু পরকালের শাস্তি চিরস্থায়ী এবং তথাকার আগুনের তেজ এখানকার আগুন অপেক্ষা সত্তর গুণ বেশী এবং তথাকার পাকড়াও ও বন্ধন এতো শক্ত যা কল্পনা করা যায় না। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সেই দিন তাঁর শাস্তির শাস্তি কেউ দিতে পারবে না। এবং বন্ধনের মত বন্ধন কেউ করতে পারবে না।” (৮৯: ২৫-২৬) আল্লাহ তাআ’লা আর এক জায়গায় বলেছেনঃ “যারা কিয়ামতকে অস্বীকার করে তাদের জন্যে আমি প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত অগ্নি। দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে ওর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীৎকার। আর যখন তাদেরকে শৃংখলিত অবস্থায় নিক্ষেপ করা হবে তখন তারা তথায় ধ্বংস কামনা করবে। তাদেরকে বলা হবেঃ আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো। তাদেরকে জিজ্ঞেস করঃ এটাই শ্রেয়, না স্থায়ী জান্নাত, যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে মুত্তাকীদেরকে? এটাই তো তাদের পুরস্কার ও প্রত্যাবর্তন স্থল।” এরপর পূণ্যবান লোকদের পরিণামের বর্ণনা দেয়া হচ্ছেঃ যাদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে তার একটি গুণ তো এই যে, তার চারদিকে নদী প্রবাহিত হচ্ছে। তারা যেখান থেকে ইচ্ছা পানি নিয়ে যাবে। সেই পানি নষ্ট হবে না। আবার সেখানে দুধের নহর রয়েছে। দুধও এমন যে, যার স্বাদ কখনো নষ্ট হবে না। সেখানে সূরার নহরও রয়েছে। এতে শুধু সুস্বাদই রয়েছে। এটা কখনো বিস্বাদ হবেনা এবং এতে কখনো নেশাও ধরবে না। তথায় স্বচ্ছ মধুর নহরও রয়েছে এবং সেখানে সর্বপ্রকারের ফলমূল রয়েছে। এবং এর সাথে সাথে রয়েছে প্রতিপালকের করুণা এবং তার ক্ষমা। তথাকার ফল চিরস্থায়ী সেখানকার খাদ্য ও পানীয় কখনো শেষ হবার নয়।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কসূফের (সূর্যগ্রহণের) নামায পড়ছিলেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আপনাকে দেখলাম যে, আপনি যেন কোন জিনিষ পাবার ইচ্ছা করেছিলেন। তারপর আমরা দেখলাম যে, আপনি পশ্চাদপদে পিছনে সরতে লাগলেন, এর কারণ কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ, আমি জান্নাত দেখেছিলাম এবং একটা (ফলের) গুচ্ছ ভেঙ্গে নেয়ার ইচ্ছা করেছিলাম। যদি আমি তা নিতাম তবে যতদিন এ দুনিয়া থাকতো ততদিন তা থাকতো এবং তোমরা তা খেতে থাকতে।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা যুহরের নামাযে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে ছিলাম। হঠাৎ তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন, তখন আমরাও এগিয়ে গেলাম। অতঃপর আমরা দেখলাম যে, তিনি যেন কোন জিনিষ নেয়ার ইচ্ছা করলেন। আবার তিনি পিছনে সরে আসলেন। নামায শেষে হযরত উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আজ আমরা আপনাকে এমন একটা কাজ করতে দেখলাম যা ইতিপূর্বে কখনো দেখি নাই (এর কারণ কি?)।” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ, আমার সামনে জান্নাতকে পেশ করা হয়েছিল, যা ছিল তরুতাজা ও সুগন্ধময়। আমি ওর মধ্য থেকে একগুচ্ছ আঙ্গুর ভেঙ্গে নেয়ার ইচ্ছা করেছিলাম। কিন্তু আমার ও ওর মধ্যে আড় করে দেয়া হয়। যদি আমি ওটা ভেঙ্গে আনতাম তবে দুনিয়া থাকা পর্যন্ত সারা দুনিয়াবাসী ওটা খেতো, অথচ ওটা কিছুই কমতো না।” (এ হাদীসটি হা’ফিয আবু ইয়া’লা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উৎবা' ইবনু আবদিস সালামী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন বেদুইন নবীকে (সঃ) জিজ্ঞেস করেঃ “জান্নাতে আঙ্গুর থাকবে কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হ্যাঁ।” সে পুনরায় জিজ্ঞেস করেঃ “ওর গুচ্ছ কত বড় হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “এতো বড় যে, যদি কোন কালো কাক এক মাস ধরে ওর উপর দিয়ে উড়তে থাকে তবুও ওটা অতিক্রম করতে পারবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতবাসী যখন কোন ফল ভাঙ্গবে তখন আর একটি ফল ঐ স্থানে এসে লেগে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জা’বির ইবনু আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতবাসী খুব খাবে এবং পান করবে, কিন্তু তাদের থুথু আসবে না, নাকে শ্লেষ্ম আসবে না এবং প্রস্রাব ও পায়খানার প্রয়োজন হবে না। তাদের শরীর দিয়ে মিশক আম্বরের মত সুগন্ধময় ঘর্ম বের হবে এবং তাতেই খাদ্য হজম হয়ে যাবে। আর যেমন ভাবে শ্বাস প্রশ্বাস চলে, তেমনি ভাবে নফসের উপর তসবীহ পাঠ ও আল্লাহ তাআ’লার পবিত্রতা বর্ণনার ইলহাম করা হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত যায়েদ ইবনু আরকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আহলে কিতাবের একজন লোক রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে এসে বলেঃ “হে আবুল কা’সিম (সঃ)! আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, জান্নাতবাসী খাবে ও পান করবে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ, যার হাতে মুহাম্মদের (সঃ) প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এখানকার একশ’ জন লোকের পানাহার ও সহবাসের শক্তি সেখানকার একজন লোককে দেয়া হবে।” সে তখন বলেঃ “নিশ্চয় যে খাবে ও পান করবে তার তো পায়খানা ও প্রস্রাবের প্রয়োজন অবশ্যই হবে, অথচ জান্নাতে তো আবর্জনা ও মালিন্য থাকতে পারে না?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “না, বরং ঘর্মের মাধ্যমে সমস্ত হজম হয়ে যাবে এবং ঐ ঘর্মের সুগন্ধ মিশক আম্বরের মত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জান্নাতে যে পাখীর দিকে তুমি (ওর গোশত খাবার ইচ্ছার) দৃষ্টিপাত করবে তৎক্ষণাৎ ওটা ভাজা হয়ে তোমার সামনে চলে আসবে।” কোন কোন রিওয়াইয়াতে আছে যে, আবার ঐ পাখী আল্লাহর হুকুমে অনুরূপভাবে জীবিত হয়ে উঠে যাবে।'আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “ (জান্নাতে রয়েছে) প্রচুর ফলমূল, যা শেষ হবে না ও নিষিদ্ধও হবে না।” আর এক জায়গায় আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “সন্নিহিত বৃক্ষ ছায়া তাদের উপর থাকবে এবং ওর ফলমূল সম্পূর্ণরূপে তাদের আয়ত্তাধীন করা হবে।” অন্য এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “যারা ঈমান আনয়ন করে ও ভাল কাজ করে তাদেরকে দাখিল করবো এমন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, সেখানে তাদের জন্যে পবিত্র সঙ্গী থাকবে এবং তাদেরকে আমি চির স্নিগ্ধ ছায়ায় দাখিল করবো।” ইতিপূর্বে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে যে, জান্নাতের একটি গাছের ছায়াতলে দ্রুতগামী সওয়ারীর আরোহী এক শ' বছর পর্যন্ত চলতে থাকবে তথাপি ওর ছায়া শেষ হবে না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) (এবং সম্প্রসারিত ছায়া) (৫৬: ৩০) কুরআন কারীমের এই অংশটুকু পাঠ করেন।কুরাআন কারীমে জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা এক সাথে এসেছে যাতে মানুষের মধ্যে জান্নাতের আগ্রহ ও জাহান্নামের ভয় জন্মে। এখানেও আল্লাহ তাআ’লা জান্নাত ও তথাকার কতকগুলি নিয়মতের বর্ণনা দেয়ার পর বলেছেন যে, এটা পরিণাম হচ্ছে খোদাভীরু লোকদের। পক্ষান্তরে কাফিরদের পরিণাম হচ্ছে জাহান্নাম। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়, জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।”দামেস্কের খুৎবা পাঠক হযরত বিলাল ইবনু সা'দ (রঃ) জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দারা! তোমাদের কোন আমল কবুল হওয়া এবং কোন পাপ মোচন হয়ে যাওয়ার কোন সনদ তোমাদের কারো কাছে এসেছে কি? তোমরা কি ধারণা করেছে যে, তোমাদেরকে অযথা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তোমরা আল্লাহ তাআ’লার আয়ত্তের মধ্যে আসবে না ? আল্লাহর শপথ! তাঁর আনুগত্যের প্রতিদান যদি দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হতো তবে তোমরা সবাই পুণ্য কাজের উপর একত্রিত হয়ে পড়তে। তোমরা কি দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে গেলে? তোমরা কি ওরই পিছনে পড়ে থাকবে? তোমাদের কি জান্নাত লাভের আগ্রহ হয় না, যার ফল এবং ছায়া চিরস্থায়ী?” (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আর-রাদ 13:35

৩৪-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা কাফিরদের শাস্তি এবং সৎলোকদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি কাফিরদের কুফরী ও শিরকের বর্ণনা দেয়ার পর তাদের শাস্তির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা মুমিনমু’মিনদের হাতে নিহত ও ধ্বংস হবে। এর সাথে সাথেই তারা আখেরাতের কঠিন শাস্তিতে গ্রেফতার হবে, যা তাদের দুনিয়ার শাস্তি অপেক্ষা বহুগুণে কঠিন। পরস্পর লা'নতকারী স্বামী স্ত্রীকে যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “নিশ্চয় দুনিয়ার শাস্তি আখেরাতের শাস্তির তুলনায় খুবই সহজ।” ওটা ঐরূপ যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এখানকার অর্থাৎ দুনিয়ার শাস্তি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু পরকালের শাস্তি চিরস্থায়ী এবং তথাকার আগুনের তেজ এখানকার আগুন অপেক্ষা সত্তর গুণ বেশী এবং তথাকার পাকড়াও ও বন্ধন এতো শক্ত যা কল্পনা করা যায় না। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সেই দিন তাঁর শাস্তির শাস্তি কেউ দিতে পারবে না। এবং বন্ধনের মত বন্ধন কেউ করতে পারবে না।” (৮৯: ২৫-২৬) আল্লাহ তাআ’লা আর এক জায়গায় বলেছেনঃ “যারা কিয়ামতকে অস্বীকার করে তাদের জন্যে আমি প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত অগ্নি। দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে ওর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীৎকার। আর যখন তাদেরকে শৃংখলিত অবস্থায় নিক্ষেপ করা হবে তখন তারা তথায় ধ্বংস কামনা করবে। তাদেরকে বলা হবেঃ আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো। তাদেরকে জিজ্ঞেস করঃ এটাই শ্রেয়, না স্থায়ী জান্নাত, যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে মুত্তাকীদেরকে? এটাই তো তাদের পুরস্কার ও প্রত্যাবর্তন স্থল।” এরপর পূণ্যবান লোকদের পরিণামের বর্ণনা দেয়া হচ্ছেঃ যাদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে তার একটি গুণ তো এই যে, তার চারদিকে নদী প্রবাহিত হচ্ছে। তারা যেখান থেকে ইচ্ছা পানি নিয়ে যাবে। সেই পানি নষ্ট হবে না। আবার সেখানে দুধের নহর রয়েছে। দুধও এমন যে, যার স্বাদ কখনো নষ্ট হবে না। সেখানে সূরার নহরও রয়েছে। এতে শুধু সুস্বাদই রয়েছে। এটা কখনো বিস্বাদ হবেনা এবং এতে কখনো নেশাও ধরবে না। তথায় স্বচ্ছ মধুর নহরও রয়েছে এবং সেখানে সর্বপ্রকারের ফলমূল রয়েছে। এবং এর সাথে সাথে রয়েছে প্রতিপালকের করুণা এবং তার ক্ষমা। তথাকার ফল চিরস্থায়ী সেখানকার খাদ্য ও পানীয় কখনো শেষ হবার নয়।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কসূফের (সূর্যগ্রহণের) নামায পড়ছিলেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আপনাকে দেখলাম যে, আপনি যেন কোন জিনিষ পাবার ইচ্ছা করেছিলেন। তারপর আমরা দেখলাম যে, আপনি পশ্চাদপদে পিছনে সরতে লাগলেন, এর কারণ কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ, আমি জান্নাত দেখেছিলাম এবং একটা (ফলের) গুচ্ছ ভেঙ্গে নেয়ার ইচ্ছা করেছিলাম। যদি আমি তা নিতাম তবে যতদিন এ দুনিয়া থাকতো ততদিন তা থাকতো এবং তোমরা তা খেতে থাকতে।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা যুহরের নামাযে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে ছিলাম। হঠাৎ তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন, তখন আমরাও এগিয়ে গেলাম। অতঃপর আমরা দেখলাম যে, তিনি যেন কোন জিনিষ নেয়ার ইচ্ছা করলেন। আবার তিনি পিছনে সরে আসলেন। নামায শেষে হযরত উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আজ আমরা আপনাকে এমন একটা কাজ করতে দেখলাম যা ইতিপূর্বে কখনো দেখি নাই (এর কারণ কি?)।” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ, আমার সামনে জান্নাতকে পেশ করা হয়েছিল, যা ছিল তরুতাজা ও সুগন্ধময়। আমি ওর মধ্য থেকে একগুচ্ছ আঙ্গুর ভেঙ্গে নেয়ার ইচ্ছা করেছিলাম। কিন্তু আমার ও ওর মধ্যে আড় করে দেয়া হয়। যদি আমি ওটা ভেঙ্গে আনতাম তবে দুনিয়া থাকা পর্যন্ত সারা দুনিয়াবাসী ওটা খেতো, অথচ ওটা কিছুই কমতো না।” (এ হাদীসটি হা’ফিয আবু ইয়া’লা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উৎবা' ইবনু আবদিস সালামী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন বেদুইন নবীকে (সঃ) জিজ্ঞেস করেঃ “জান্নাতে আঙ্গুর থাকবে কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হ্যাঁ।” সে পুনরায় জিজ্ঞেস করেঃ “ওর গুচ্ছ কত বড় হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “এতো বড় যে, যদি কোন কালো কাক এক মাস ধরে ওর উপর দিয়ে উড়তে থাকে তবুও ওটা অতিক্রম করতে পারবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতবাসী যখন কোন ফল ভাঙ্গবে তখন আর একটি ফল ঐ স্থানে এসে লেগে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জা’বির ইবনু আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতবাসী খুব খাবে এবং পান করবে, কিন্তু তাদের থুথু আসবে না, নাকে শ্লেষ্ম আসবে না এবং প্রস্রাব ও পায়খানার প্রয়োজন হবে না। তাদের শরীর দিয়ে মিশক আম্বরের মত সুগন্ধময় ঘর্ম বের হবে এবং তাতেই খাদ্য হজম হয়ে যাবে। আর যেমন ভাবে শ্বাস প্রশ্বাস চলে, তেমনি ভাবে নফসের উপর তসবীহ পাঠ ও আল্লাহ তাআ’লার পবিত্রতা বর্ণনার ইলহাম করা হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত যায়েদ ইবনু আরকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আহলে কিতাবের একজন লোক রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে এসে বলেঃ “হে আবুল কা’সিম (সঃ)! আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, জান্নাতবাসী খাবে ও পান করবে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ, যার হাতে মুহাম্মদের (সঃ) প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এখানকার একশ’ জন লোকের পানাহার ও সহবাসের শক্তি সেখানকার একজন লোককে দেয়া হবে।” সে তখন বলেঃ “নিশ্চয় যে খাবে ও পান করবে তার তো পায়খানা ও প্রস্রাবের প্রয়োজন অবশ্যই হবে, অথচ জান্নাতে তো আবর্জনা ও মালিন্য থাকতে পারে না?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “না, বরং ঘর্মের মাধ্যমে সমস্ত হজম হয়ে যাবে এবং ঐ ঘর্মের সুগন্ধ মিশক আম্বরের মত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জান্নাতে যে পাখীর দিকে তুমি (ওর গোশত খাবার ইচ্ছার) দৃষ্টিপাত করবে তৎক্ষণাৎ ওটা ভাজা হয়ে তোমার সামনে চলে আসবে।” কোন কোন রিওয়াইয়াতে আছে যে, আবার ঐ পাখী আল্লাহর হুকুমে অনুরূপভাবে জীবিত হয়ে উঠে যাবে।'আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “ (জান্নাতে রয়েছে) প্রচুর ফলমূল, যা শেষ হবে না ও নিষিদ্ধও হবে না।” আর এক জায়গায় আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “সন্নিহিত বৃক্ষ ছায়া তাদের উপর থাকবে এবং ওর ফলমূল সম্পূর্ণরূপে তাদের আয়ত্তাধীন করা হবে।” অন্য এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “যারা ঈমান আনয়ন করে ও ভাল কাজ করে তাদেরকে দাখিল করবো এমন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, সেখানে তাদের জন্যে পবিত্র সঙ্গী থাকবে এবং তাদেরকে আমি চির স্নিগ্ধ ছায়ায় দাখিল করবো।” ইতিপূর্বে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে যে, জান্নাতের একটি গাছের ছায়াতলে দ্রুতগামী সওয়ারীর আরোহী এক শ' বছর পর্যন্ত চলতে থাকবে তথাপি ওর ছায়া শেষ হবে না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) (এবং সম্প্রসারিত ছায়া) (৫৬: ৩০) কুরআন কারীমের এই অংশটুকু পাঠ করেন।কুরাআন কারীমে জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা এক সাথে এসেছে যাতে মানুষের মধ্যে জান্নাতের আগ্রহ ও জাহান্নামের ভয় জন্মে। এখানেও আল্লাহ তাআ’লা জান্নাত ও তথাকার কতকগুলি নিয়মতের বর্ণনা দেয়ার পর বলেছেন যে, এটা পরিণাম হচ্ছে খোদাভীরু লোকদের। পক্ষান্তরে কাফিরদের পরিণাম হচ্ছে জাহান্নাম। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়, জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।”দামেস্কের খুৎবা পাঠক হযরত বিলাল ইবনু সা'দ (রঃ) জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দারা! তোমাদের কোন আমল কবুল হওয়া এবং কোন পাপ মোচন হয়ে যাওয়ার কোন সনদ তোমাদের কারো কাছে এসেছে কি? তোমরা কি ধারণা করেছে যে, তোমাদেরকে অযথা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তোমরা আল্লাহ তাআ’লার আয়ত্তের মধ্যে আসবে না ? আল্লাহর শপথ! তাঁর আনুগত্যের প্রতিদান যদি দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হতো তবে তোমরা সবাই পুণ্য কাজের উপর একত্রিত হয়ে পড়তে। তোমরা কি দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে গেলে? তোমরা কি ওরই পিছনে পড়ে থাকবে? তোমাদের কি জান্নাত লাভের আগ্রহ হয় না, যার ফল এবং ছায়া চিরস্থায়ী?” (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)