Tafseer ibn Kathir — মারইয়াম 19:1 – মারইয়াম 19:62
Contents
- মারইয়াম 19:1
- মারইয়াম 19:2
- মারইয়াম 19:3
- মারইয়াম 19:4
- মারইয়াম 19:5
- মারইয়াম 19:6
- মারইয়াম 19:7
- মারইয়াম 19:8
- মারইয়াম 19:9
- মারইয়াম 19:10
- মারইয়াম 19:11
- মারইয়াম 19:12
- মারইয়াম 19:13
- মারইয়াম 19:14
- মারইয়াম 19:15
- মারইয়াম 19:16
- মারইয়াম 19:17
- মারইয়াম 19:18
- মারইয়াম 19:19
- মারইয়াম 19:20
- মারইয়াম 19:21
- মারইয়াম 19:22
- মারইয়াম 19:23
- মারইয়াম 19:24
- মারইয়াম 19:25
- মারইয়াম 19:26
- মারইয়াম 19:27
- মারইয়াম 19:28
- মারইয়াম 19:29
- মারইয়াম 19:30
- মারইয়াম 19:31
- মারইয়াম 19:32
- মারইয়াম 19:33
- মারইয়াম 19:34
- মারইয়াম 19:35
- মারইয়াম 19:36
- মারইয়াম 19:37
- মারইয়াম 19:38
- মারইয়াম 19:39
- মারইয়াম 19:40
- মারইয়াম 19:41
- মারইয়াম 19:42
- মারইয়াম 19:43
- মারইয়াম 19:44
- মারইয়াম 19:45
- মারইয়াম 19:46
- মারইয়াম 19:47
- মারইয়াম 19:48
- মারইয়াম 19:49
- মারইয়াম 19:50
- মারইয়াম 19:51
- মারইয়াম 19:52
- মারইয়াম 19:53
- মারইয়াম 19:54
- মারইয়াম 19:55
- মারইয়াম 19:56
- মারইয়াম 19:57
- মারইয়াম 19:58
- মারইয়াম 19:59
- মারইয়াম 19:60
- মারইয়াম 19:61
- মারইয়াম 19:62
মারইয়াম 19:1
এই সূরার প্রারম্ভিক আয়াতগুলি হযরত জাফর ইবুন আবি তালিব (রাঃ) আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশী ও তার সভাসদ বর্গের সামনে পাঠ করেছিলেন। (এটা ‘মুসনাদে আহমাদ ও 'সীরাতে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক’ গ্রন্থে উল্লিখিত আছে) ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর: এই সূরার প্রারম্ভে যে পাঁচটি অক্ষর রয়েছে এ গুলিকে ‘হুরূফে মুকাত্তাআহ’ বলা হয়। সূরায়ে বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভে আমরা এগুলি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছি। আল্লাহ তাআলার বান্দা ও নবী যাকারিয়ার (আঃ) প্রতি তাঁর যে দয়া ও অনুগ্রহ নাযিল হয় তারই বর্ণনা এখানে দেয়া হচ্ছে। (আরবী) শব্দটি এক কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দটির উভয় কিরআতই মশহুর বা প্রসিদ্ধ। তিনি বাণী ইসরাঈলের এক অতি খ্যাতি সম্পন্ন নবী ছিলেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, তিনি ছুতার ছিলেন এবং এ কাজ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি স্বীয় প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করতেন। কিন্তু তাঁর এই প্রার্থনা ছিল লোকদের কাছে স্বাভাবিক এবং তাদের মনে খেয়াল জাগতে পারে যে, বুড়ো বয়সে তাঁর সন্তান লাভের চাহিদা হয়েছে, তাই তিনি নিভৃতে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন। তাঁর নিভৃতে ও নির্জনে প্রার্থনা করার আর একটি কারণ এই যে, নির্জনে ও নিভৃতে প্রার্থনা আল্লাহ তাআলার নিকট খুবই প্রিয়। এ প্রার্থনা তাড়াতাড়ি কবুল হয়ে থাকে। খোদাভীরু অন্তরকে আল্লাহ তাআলা খুব ভালরূপই জানেন। ধীরে ধীরে ও চুপি চুপি কথা বললেও তিনি পূর্ণরূপে শুনতে পান। পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, তিনি রাত্রে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন যখন তার পরিবার পরিজন ও সঙ্গী সাথীরা ঘুমিয়ে থাকতেন। অতঃপর তিনি চুপি চুপি বলতেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! হে আমার পালন কর্তা!' তখন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তোমার সামনে হাজির আছি, তোমার সামনে আমি বিদ্যমান রয়েছি, তোমার সম্মুখে আমি উপস্থিত রয়েছি। হযরত যাকারিয়া (আঃ) প্রার্থনায় বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার মাথার চুল পেকে সাদা হয়েছে। এর দ্বারা তিনি দুর্বলতা ও বার্ধক্যকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক! আমার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিন সমস্ত শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। ভিতরের ও বাইরের দুর্বলতা আমাকে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে।তিনি আরো বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার কাছে প্রার্থনা করে আমি তো কখনো ব্যর্থ মনোরথ হই নাই এবং আপনার দরবার হতে কখনো শূন্য হস্তে ফিরে যাই নাই। বরং যখনই যা কিছু চেয়েছি তাই আপনি আমাকে দান করেছেন।"কাসাঈ (রঃ) শব্দটিকে (আরবী) পড়েছেন অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে সাকিন বা জযম দিয়ে পড়েছেন। এর দ্বারা কে বুঝানো হয়েছে। (ফারায়েযের পরিভাষায় আল্লাহর কিতাবে যাদের অংশ নির্ধারিত রয়েছে ঐ সব ওয়ারিসকে আসহাবে ফুরূষ বলা হয়। এই অসহাবে ফুরূযকে অংশ দেয়ার পর অবশিষ্ট অংশ যে ওয়ারিছরা পেয়ে থাকে তাদেরকে আসাবা বলা হয়)বর্ণিত আছে যে, হযরত উছমনি (রাঃ) (আরবী) কে (আরবী) পড়েছেন। অর্থাৎ আমার পরে আমার নিজস্ব লোক খুবই কম থাকবে। প্রথম কিরআতে অর্থ হবে “আমার সন্তানাদি নেই বলে আমার আত্মীয় স্বজন যারা রয়েছে তাদের ব্যাপারে আমি আশংকা করছি যে, না জানি আমার পরে তারা আমার মীরাছের সাথে অন্যায় আচরণ করবে। সুতরাং হে আল্লাহ! আপনি আমাকে সন্তান দান করুন, যে আমার পরে আমার নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করবে।" এটা মনে করা কখনো উচিত নয় যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) মাল-ধন এদিক ওদিক হয়ে যাওয়ার আশংকা ছিল। কেননা, নবীগণ (আঃ) এর থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাঁরা যে এই উদ্দেশ্যে সন্তান লাভের প্রার্থনা জানাবেন যে, সন্তান না থাকলে তার মীরাছ বা উত্তরাধিকার দূরের আত্মীয়দের মধ্যে চলে যাবে, এটা হতে তাদের মর্যাদা বহু উর্ধ্বে। দ্বিতীয়তঃ এটাও প্রকাশমান যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) সারাজীবন ধরে ছুতারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, এমতাবস্থায় তাঁর কাছে কি এমন সম্পদ থাকতে পারে যার জন্য তিনি এতো ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বেন যে, ঐ সম্পদ তার হাত ছাড়া হয়ে যাবে? নবীগণ তো এমনিতেই সারা দুনিয়া হতে, অধিক মাল হতে বহু দূরে সরে থাকেন। দুনিয়ার প্রতি তাদের তো কোন আকর্ষণই থাকে না। তৃতীয় কারণ এটাও যে, কয়েকটি সনদে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীদের দল ওয়ারিছ বানাই না। আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই সবই সাদকারূপে পরিগণিত হয়।" জামে তিরমিযীতেও সহীহ সনদে এ হাদীস রয়েছে। সুতরাং এটা প্রমাণিত হলো যে, হযরত যাকারিয়া যে আল্লাহ তাআলার নিকট পুত্রের জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন যে, তিনি তার ওয়ারিছ হবেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য নবুওয়াতের ওয়ারিছ, মাল-ধনের ওয়ারিছ নয়। এ জন্যে তিনি বলেছিলেনঃ “সে আমার ওয়ারিছ হবে ও আলে ইয়াকুবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।"যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুলাইমান (আঃ) দাউদের (আঃ) ওয়ারিছ হলেন। (২৭:১৬) অর্থাৎ নবুওয়াতের ওয়ারিছ হলেন, ধন-মালের ওয়ারিছ নয়। অন্যথায় মালে তো অন্য ছেলেরাও ওয়ারিছ হয়। কাজেই মালে বিশেষত্ব বুঝায় না। চতুর্থ কারণ এটাও যে, ছেলে ওয়ারিছ হওয়া তো সাধারণ কথা। এটা সবারই মধ্যে এবং সমস্ত মাযহাবে আছে। সুতরাং এটার কোন প্রয়োজন ছিল না যে, হযরত যাকারিয়া (রাঃ) নিজের প্রার্থনার এই কারণ বর্ণনা করবেন। এর দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঐ উত্তরাধিকার একটা বিশেষ উত্তরাধিকার ছিল এবং সেটাও হলো নবুওয়াতের উত্তরাধিকার। যেমন হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমরা যা ছেড়ে যাই তা সাকারূপে পরিগণিত।" মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইলমের উত্তরাধিকার। হযরত যাকারিয়া (আঃ) হযরত ইয়াকূবের (আঃ) সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবু সালেহ (রঃ) বলেন যে, উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তিনিও তার বড়দের মত নবী হবেন। হাসান (রঃ) বলেন যে, নুবওয়াত ও ইলমের ওয়ারিছ হবেন। সুদ্দীর (রঃ) উক্তি এই যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উদ্দেশ্য ছিলঃ আমার ঐ সন্তান আমার ও আলে ইয়াকূবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।মুসনাদে আবদির রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উপর দয়া করুন! তার মালের ওয়ারিছের কি প্রয়োজন ছিল? আল্লাহ লুতের (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি সুদৃঢ় দুর্গের আকাংখা করে ছিলেন। তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার ভাই যাকারিয়ার (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি প্রার্থনা করেছিলেনঃ "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনার নিকট হতে একজন ওয়ালী দান করুন, যে আমার ও আলে ইয়াকুবের ওয়ারিছ হবে।" (কিন্তু এই সব হাদীসই মুরসাল। সাহাবী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেন নাই, তাবেয়ী বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এগুলো বিশুদ্ধ হাদীস সমূহের সমকক্ষতা লাভ করতে রাখে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) তিনি আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ! তাকে পছন্দনীয় গোলাম বানিয়ে দিন এবং এমন দ্বীনদার ও দিয়ানতদার বানিয়ে দিন যে, যেন আপনার মুহাব্বাত ছাড়াও সমস্ত সৃষ্টজীব তাকে মুহাব্বাত করে। সবাই যেন তার ধর্ম ও চরিত্রকে পছন্দনীয় ও প্রেম প্রীতির দৃষ্টিতে দেখে।”
মারইয়াম 19:2
এই সূরার প্রারম্ভিক আয়াতগুলি হযরত জাফর ইবুন আবি তালিব (রাঃ) আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশী ও তার সভাসদ বর্গের সামনে পাঠ করেছিলেন। (এটা ‘মুসনাদে আহমাদ ও 'সীরাতে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক’ গ্রন্থে উল্লিখিত আছে) ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর: এই সূরার প্রারম্ভে যে পাঁচটি অক্ষর রয়েছে এ গুলিকে ‘হুরূফে মুকাত্তাআহ’ বলা হয়। সূরায়ে বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভে আমরা এগুলি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছি। আল্লাহ তাআলার বান্দা ও নবী যাকারিয়ার (আঃ) প্রতি তাঁর যে দয়া ও অনুগ্রহ নাযিল হয় তারই বর্ণনা এখানে দেয়া হচ্ছে। (আরবী) শব্দটি এক কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দটির উভয় কিরআতই মশহুর বা প্রসিদ্ধ। তিনি বাণী ইসরাঈলের এক অতি খ্যাতি সম্পন্ন নবী ছিলেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, তিনি ছুতার ছিলেন এবং এ কাজ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি স্বীয় প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করতেন। কিন্তু তাঁর এই প্রার্থনা ছিল লোকদের কাছে স্বাভাবিক এবং তাদের মনে খেয়াল জাগতে পারে যে, বুড়ো বয়সে তাঁর সন্তান লাভের চাহিদা হয়েছে, তাই তিনি নিভৃতে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন। তাঁর নিভৃতে ও নির্জনে প্রার্থনা করার আর একটি কারণ এই যে, নির্জনে ও নিভৃতে প্রার্থনা আল্লাহ তাআলার নিকট খুবই প্রিয়। এ প্রার্থনা তাড়াতাড়ি কবুল হয়ে থাকে। খোদাভীরু অন্তরকে আল্লাহ তাআলা খুব ভালরূপই জানেন। ধীরে ধীরে ও চুপি চুপি কথা বললেও তিনি পূর্ণরূপে শুনতে পান। পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, তিনি রাত্রে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন যখন তার পরিবার পরিজন ও সঙ্গী সাথীরা ঘুমিয়ে থাকতেন। অতঃপর তিনি চুপি চুপি বলতেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! হে আমার পালন কর্তা!' তখন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তোমার সামনে হাজির আছি, তোমার সামনে আমি বিদ্যমান রয়েছি, তোমার সম্মুখে আমি উপস্থিত রয়েছি। হযরত যাকারিয়া (আঃ) প্রার্থনায় বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার মাথার চুল পেকে সাদা হয়েছে। এর দ্বারা তিনি দুর্বলতা ও বার্ধক্যকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক! আমার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিন সমস্ত শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। ভিতরের ও বাইরের দুর্বলতা আমাকে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে।তিনি আরো বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার কাছে প্রার্থনা করে আমি তো কখনো ব্যর্থ মনোরথ হই নাই এবং আপনার দরবার হতে কখনো শূন্য হস্তে ফিরে যাই নাই। বরং যখনই যা কিছু চেয়েছি তাই আপনি আমাকে দান করেছেন।"কাসাঈ (রঃ) শব্দটিকে (আরবী) পড়েছেন অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে সাকিন বা জযম দিয়ে পড়েছেন। এর দ্বারা কে বুঝানো হয়েছে। (ফারায়েযের পরিভাষায় আল্লাহর কিতাবে যাদের অংশ নির্ধারিত রয়েছে ঐ সব ওয়ারিসকে আসহাবে ফুরূষ বলা হয়। এই অসহাবে ফুরূযকে অংশ দেয়ার পর অবশিষ্ট অংশ যে ওয়ারিছরা পেয়ে থাকে তাদেরকে আসাবা বলা হয়)বর্ণিত আছে যে, হযরত উছমনি (রাঃ) (আরবী) কে (আরবী) পড়েছেন। অর্থাৎ আমার পরে আমার নিজস্ব লোক খুবই কম থাকবে। প্রথম কিরআতে অর্থ হবে “আমার সন্তানাদি নেই বলে আমার আত্মীয় স্বজন যারা রয়েছে তাদের ব্যাপারে আমি আশংকা করছি যে, না জানি আমার পরে তারা আমার মীরাছের সাথে অন্যায় আচরণ করবে। সুতরাং হে আল্লাহ! আপনি আমাকে সন্তান দান করুন, যে আমার পরে আমার নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করবে।" এটা মনে করা কখনো উচিত নয় যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) মাল-ধন এদিক ওদিক হয়ে যাওয়ার আশংকা ছিল। কেননা, নবীগণ (আঃ) এর থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাঁরা যে এই উদ্দেশ্যে সন্তান লাভের প্রার্থনা জানাবেন যে, সন্তান না থাকলে তার মীরাছ বা উত্তরাধিকার দূরের আত্মীয়দের মধ্যে চলে যাবে, এটা হতে তাদের মর্যাদা বহু উর্ধ্বে। দ্বিতীয়তঃ এটাও প্রকাশমান যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) সারাজীবন ধরে ছুতারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, এমতাবস্থায় তাঁর কাছে কি এমন সম্পদ থাকতে পারে যার জন্য তিনি এতো ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বেন যে, ঐ সম্পদ তার হাত ছাড়া হয়ে যাবে? নবীগণ তো এমনিতেই সারা দুনিয়া হতে, অধিক মাল হতে বহু দূরে সরে থাকেন। দুনিয়ার প্রতি তাদের তো কোন আকর্ষণই থাকে না। তৃতীয় কারণ এটাও যে, কয়েকটি সনদে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীদের দল ওয়ারিছ বানাই না। আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই সবই সাদকারূপে পরিগণিত হয়।" জামে তিরমিযীতেও সহীহ সনদে এ হাদীস রয়েছে। সুতরাং এটা প্রমাণিত হলো যে, হযরত যাকারিয়া যে আল্লাহ তাআলার নিকট পুত্রের জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন যে, তিনি তার ওয়ারিছ হবেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য নবুওয়াতের ওয়ারিছ, মাল-ধনের ওয়ারিছ নয়। এ জন্যে তিনি বলেছিলেনঃ “সে আমার ওয়ারিছ হবে ও আলে ইয়াকুবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।"যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুলাইমান (আঃ) দাউদের (আঃ) ওয়ারিছ হলেন। (২৭:১৬) অর্থাৎ নবুওয়াতের ওয়ারিছ হলেন, ধন-মালের ওয়ারিছ নয়। অন্যথায় মালে তো অন্য ছেলেরাও ওয়ারিছ হয়। কাজেই মালে বিশেষত্ব বুঝায় না। চতুর্থ কারণ এটাও যে, ছেলে ওয়ারিছ হওয়া তো সাধারণ কথা। এটা সবারই মধ্যে এবং সমস্ত মাযহাবে আছে। সুতরাং এটার কোন প্রয়োজন ছিল না যে, হযরত যাকারিয়া (রাঃ) নিজের প্রার্থনার এই কারণ বর্ণনা করবেন। এর দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঐ উত্তরাধিকার একটা বিশেষ উত্তরাধিকার ছিল এবং সেটাও হলো নবুওয়াতের উত্তরাধিকার। যেমন হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমরা যা ছেড়ে যাই তা সাকারূপে পরিগণিত।" মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইলমের উত্তরাধিকার। হযরত যাকারিয়া (আঃ) হযরত ইয়াকূবের (আঃ) সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবু সালেহ (রঃ) বলেন যে, উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তিনিও তার বড়দের মত নবী হবেন। হাসান (রঃ) বলেন যে, নুবওয়াত ও ইলমের ওয়ারিছ হবেন। সুদ্দীর (রঃ) উক্তি এই যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উদ্দেশ্য ছিলঃ আমার ঐ সন্তান আমার ও আলে ইয়াকূবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।মুসনাদে আবদির রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উপর দয়া করুন! তার মালের ওয়ারিছের কি প্রয়োজন ছিল? আল্লাহ লুতের (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি সুদৃঢ় দুর্গের আকাংখা করে ছিলেন। তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার ভাই যাকারিয়ার (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি প্রার্থনা করেছিলেনঃ "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনার নিকট হতে একজন ওয়ালী দান করুন, যে আমার ও আলে ইয়াকুবের ওয়ারিছ হবে।" (কিন্তু এই সব হাদীসই মুরসাল। সাহাবী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেন নাই, তাবেয়ী বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এগুলো বিশুদ্ধ হাদীস সমূহের সমকক্ষতা লাভ করতে রাখে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) তিনি আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ! তাকে পছন্দনীয় গোলাম বানিয়ে দিন এবং এমন দ্বীনদার ও দিয়ানতদার বানিয়ে দিন যে, যেন আপনার মুহাব্বাত ছাড়াও সমস্ত সৃষ্টজীব তাকে মুহাব্বাত করে। সবাই যেন তার ধর্ম ও চরিত্রকে পছন্দনীয় ও প্রেম প্রীতির দৃষ্টিতে দেখে।”
মারইয়াম 19:3
এই সূরার প্রারম্ভিক আয়াতগুলি হযরত জাফর ইবুন আবি তালিব (রাঃ) আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশী ও তার সভাসদ বর্গের সামনে পাঠ করেছিলেন। (এটা ‘মুসনাদে আহমাদ ও 'সীরাতে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক’ গ্রন্থে উল্লিখিত আছে) ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর: এই সূরার প্রারম্ভে যে পাঁচটি অক্ষর রয়েছে এ গুলিকে ‘হুরূফে মুকাত্তাআহ’ বলা হয়। সূরায়ে বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভে আমরা এগুলি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছি। আল্লাহ তাআলার বান্দা ও নবী যাকারিয়ার (আঃ) প্রতি তাঁর যে দয়া ও অনুগ্রহ নাযিল হয় তারই বর্ণনা এখানে দেয়া হচ্ছে। (আরবী) শব্দটি এক কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দটির উভয় কিরআতই মশহুর বা প্রসিদ্ধ। তিনি বাণী ইসরাঈলের এক অতি খ্যাতি সম্পন্ন নবী ছিলেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, তিনি ছুতার ছিলেন এবং এ কাজ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি স্বীয় প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করতেন। কিন্তু তাঁর এই প্রার্থনা ছিল লোকদের কাছে স্বাভাবিক এবং তাদের মনে খেয়াল জাগতে পারে যে, বুড়ো বয়সে তাঁর সন্তান লাভের চাহিদা হয়েছে, তাই তিনি নিভৃতে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন। তাঁর নিভৃতে ও নির্জনে প্রার্থনা করার আর একটি কারণ এই যে, নির্জনে ও নিভৃতে প্রার্থনা আল্লাহ তাআলার নিকট খুবই প্রিয়। এ প্রার্থনা তাড়াতাড়ি কবুল হয়ে থাকে। খোদাভীরু অন্তরকে আল্লাহ তাআলা খুব ভালরূপই জানেন। ধীরে ধীরে ও চুপি চুপি কথা বললেও তিনি পূর্ণরূপে শুনতে পান। পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, তিনি রাত্রে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন যখন তার পরিবার পরিজন ও সঙ্গী সাথীরা ঘুমিয়ে থাকতেন। অতঃপর তিনি চুপি চুপি বলতেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! হে আমার পালন কর্তা!' তখন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তোমার সামনে হাজির আছি, তোমার সামনে আমি বিদ্যমান রয়েছি, তোমার সম্মুখে আমি উপস্থিত রয়েছি। হযরত যাকারিয়া (আঃ) প্রার্থনায় বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার মাথার চুল পেকে সাদা হয়েছে। এর দ্বারা তিনি দুর্বলতা ও বার্ধক্যকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক! আমার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিন সমস্ত শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। ভিতরের ও বাইরের দুর্বলতা আমাকে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে।তিনি আরো বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার কাছে প্রার্থনা করে আমি তো কখনো ব্যর্থ মনোরথ হই নাই এবং আপনার দরবার হতে কখনো শূন্য হস্তে ফিরে যাই নাই। বরং যখনই যা কিছু চেয়েছি তাই আপনি আমাকে দান করেছেন।"কাসাঈ (রঃ) শব্দটিকে (আরবী) পড়েছেন অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে সাকিন বা জযম দিয়ে পড়েছেন। এর দ্বারা কে বুঝানো হয়েছে। (ফারায়েযের পরিভাষায় আল্লাহর কিতাবে যাদের অংশ নির্ধারিত রয়েছে ঐ সব ওয়ারিসকে আসহাবে ফুরূষ বলা হয়। এই অসহাবে ফুরূযকে অংশ দেয়ার পর অবশিষ্ট অংশ যে ওয়ারিছরা পেয়ে থাকে তাদেরকে আসাবা বলা হয়)বর্ণিত আছে যে, হযরত উছমনি (রাঃ) (আরবী) কে (আরবী) পড়েছেন। অর্থাৎ আমার পরে আমার নিজস্ব লোক খুবই কম থাকবে। প্রথম কিরআতে অর্থ হবে “আমার সন্তানাদি নেই বলে আমার আত্মীয় স্বজন যারা রয়েছে তাদের ব্যাপারে আমি আশংকা করছি যে, না জানি আমার পরে তারা আমার মীরাছের সাথে অন্যায় আচরণ করবে। সুতরাং হে আল্লাহ! আপনি আমাকে সন্তান দান করুন, যে আমার পরে আমার নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করবে।" এটা মনে করা কখনো উচিত নয় যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) মাল-ধন এদিক ওদিক হয়ে যাওয়ার আশংকা ছিল। কেননা, নবীগণ (আঃ) এর থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাঁরা যে এই উদ্দেশ্যে সন্তান লাভের প্রার্থনা জানাবেন যে, সন্তান না থাকলে তার মীরাছ বা উত্তরাধিকার দূরের আত্মীয়দের মধ্যে চলে যাবে, এটা হতে তাদের মর্যাদা বহু উর্ধ্বে। দ্বিতীয়তঃ এটাও প্রকাশমান যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) সারাজীবন ধরে ছুতারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, এমতাবস্থায় তাঁর কাছে কি এমন সম্পদ থাকতে পারে যার জন্য তিনি এতো ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বেন যে, ঐ সম্পদ তার হাত ছাড়া হয়ে যাবে? নবীগণ তো এমনিতেই সারা দুনিয়া হতে, অধিক মাল হতে বহু দূরে সরে থাকেন। দুনিয়ার প্রতি তাদের তো কোন আকর্ষণই থাকে না। তৃতীয় কারণ এটাও যে, কয়েকটি সনদে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীদের দল ওয়ারিছ বানাই না। আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই সবই সাদকারূপে পরিগণিত হয়।" জামে তিরমিযীতেও সহীহ সনদে এ হাদীস রয়েছে। সুতরাং এটা প্রমাণিত হলো যে, হযরত যাকারিয়া যে আল্লাহ তাআলার নিকট পুত্রের জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন যে, তিনি তার ওয়ারিছ হবেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য নবুওয়াতের ওয়ারিছ, মাল-ধনের ওয়ারিছ নয়। এ জন্যে তিনি বলেছিলেনঃ “সে আমার ওয়ারিছ হবে ও আলে ইয়াকুবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।"যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুলাইমান (আঃ) দাউদের (আঃ) ওয়ারিছ হলেন। (২৭:১৬) অর্থাৎ নবুওয়াতের ওয়ারিছ হলেন, ধন-মালের ওয়ারিছ নয়। অন্যথায় মালে তো অন্য ছেলেরাও ওয়ারিছ হয়। কাজেই মালে বিশেষত্ব বুঝায় না। চতুর্থ কারণ এটাও যে, ছেলে ওয়ারিছ হওয়া তো সাধারণ কথা। এটা সবারই মধ্যে এবং সমস্ত মাযহাবে আছে। সুতরাং এটার কোন প্রয়োজন ছিল না যে, হযরত যাকারিয়া (রাঃ) নিজের প্রার্থনার এই কারণ বর্ণনা করবেন। এর দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঐ উত্তরাধিকার একটা বিশেষ উত্তরাধিকার ছিল এবং সেটাও হলো নবুওয়াতের উত্তরাধিকার। যেমন হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমরা যা ছেড়ে যাই তা সাকারূপে পরিগণিত।" মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইলমের উত্তরাধিকার। হযরত যাকারিয়া (আঃ) হযরত ইয়াকূবের (আঃ) সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবু সালেহ (রঃ) বলেন যে, উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তিনিও তার বড়দের মত নবী হবেন। হাসান (রঃ) বলেন যে, নুবওয়াত ও ইলমের ওয়ারিছ হবেন। সুদ্দীর (রঃ) উক্তি এই যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উদ্দেশ্য ছিলঃ আমার ঐ সন্তান আমার ও আলে ইয়াকূবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।মুসনাদে আবদির রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উপর দয়া করুন! তার মালের ওয়ারিছের কি প্রয়োজন ছিল? আল্লাহ লুতের (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি সুদৃঢ় দুর্গের আকাংখা করে ছিলেন। তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার ভাই যাকারিয়ার (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি প্রার্থনা করেছিলেনঃ "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনার নিকট হতে একজন ওয়ালী দান করুন, যে আমার ও আলে ইয়াকুবের ওয়ারিছ হবে।" (কিন্তু এই সব হাদীসই মুরসাল। সাহাবী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেন নাই, তাবেয়ী বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এগুলো বিশুদ্ধ হাদীস সমূহের সমকক্ষতা লাভ করতে রাখে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) তিনি আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ! তাকে পছন্দনীয় গোলাম বানিয়ে দিন এবং এমন দ্বীনদার ও দিয়ানতদার বানিয়ে দিন যে, যেন আপনার মুহাব্বাত ছাড়াও সমস্ত সৃষ্টজীব তাকে মুহাব্বাত করে। সবাই যেন তার ধর্ম ও চরিত্রকে পছন্দনীয় ও প্রেম প্রীতির দৃষ্টিতে দেখে।”
মারইয়াম 19:4
এই সূরার প্রারম্ভিক আয়াতগুলি হযরত জাফর ইবুন আবি তালিব (রাঃ) আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশী ও তার সভাসদ বর্গের সামনে পাঠ করেছিলেন। (এটা ‘মুসনাদে আহমাদ ও 'সীরাতে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক’ গ্রন্থে উল্লিখিত আছে) ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর: এই সূরার প্রারম্ভে যে পাঁচটি অক্ষর রয়েছে এ গুলিকে ‘হুরূফে মুকাত্তাআহ’ বলা হয়। সূরায়ে বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভে আমরা এগুলি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছি। আল্লাহ তাআলার বান্দা ও নবী যাকারিয়ার (আঃ) প্রতি তাঁর যে দয়া ও অনুগ্রহ নাযিল হয় তারই বর্ণনা এখানে দেয়া হচ্ছে। (আরবী) শব্দটি এক কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দটির উভয় কিরআতই মশহুর বা প্রসিদ্ধ। তিনি বাণী ইসরাঈলের এক অতি খ্যাতি সম্পন্ন নবী ছিলেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, তিনি ছুতার ছিলেন এবং এ কাজ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি স্বীয় প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করতেন। কিন্তু তাঁর এই প্রার্থনা ছিল লোকদের কাছে স্বাভাবিক এবং তাদের মনে খেয়াল জাগতে পারে যে, বুড়ো বয়সে তাঁর সন্তান লাভের চাহিদা হয়েছে, তাই তিনি নিভৃতে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন। তাঁর নিভৃতে ও নির্জনে প্রার্থনা করার আর একটি কারণ এই যে, নির্জনে ও নিভৃতে প্রার্থনা আল্লাহ তাআলার নিকট খুবই প্রিয়। এ প্রার্থনা তাড়াতাড়ি কবুল হয়ে থাকে। খোদাভীরু অন্তরকে আল্লাহ তাআলা খুব ভালরূপই জানেন। ধীরে ধীরে ও চুপি চুপি কথা বললেও তিনি পূর্ণরূপে শুনতে পান। পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, তিনি রাত্রে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন যখন তার পরিবার পরিজন ও সঙ্গী সাথীরা ঘুমিয়ে থাকতেন। অতঃপর তিনি চুপি চুপি বলতেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! হে আমার পালন কর্তা!' তখন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তোমার সামনে হাজির আছি, তোমার সামনে আমি বিদ্যমান রয়েছি, তোমার সম্মুখে আমি উপস্থিত রয়েছি। হযরত যাকারিয়া (আঃ) প্রার্থনায় বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার মাথার চুল পেকে সাদা হয়েছে। এর দ্বারা তিনি দুর্বলতা ও বার্ধক্যকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক! আমার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিন সমস্ত শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। ভিতরের ও বাইরের দুর্বলতা আমাকে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে।তিনি আরো বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার কাছে প্রার্থনা করে আমি তো কখনো ব্যর্থ মনোরথ হই নাই এবং আপনার দরবার হতে কখনো শূন্য হস্তে ফিরে যাই নাই। বরং যখনই যা কিছু চেয়েছি তাই আপনি আমাকে দান করেছেন।"কাসাঈ (রঃ) শব্দটিকে (আরবী) পড়েছেন অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে সাকিন বা জযম দিয়ে পড়েছেন। এর দ্বারা কে বুঝানো হয়েছে। (ফারায়েযের পরিভাষায় আল্লাহর কিতাবে যাদের অংশ নির্ধারিত রয়েছে ঐ সব ওয়ারিসকে আসহাবে ফুরূষ বলা হয়। এই অসহাবে ফুরূযকে অংশ দেয়ার পর অবশিষ্ট অংশ যে ওয়ারিছরা পেয়ে থাকে তাদেরকে আসাবা বলা হয়)বর্ণিত আছে যে, হযরত উছমনি (রাঃ) (আরবী) কে (আরবী) পড়েছেন। অর্থাৎ আমার পরে আমার নিজস্ব লোক খুবই কম থাকবে। প্রথম কিরআতে অর্থ হবে “আমার সন্তানাদি নেই বলে আমার আত্মীয় স্বজন যারা রয়েছে তাদের ব্যাপারে আমি আশংকা করছি যে, না জানি আমার পরে তারা আমার মীরাছের সাথে অন্যায় আচরণ করবে। সুতরাং হে আল্লাহ! আপনি আমাকে সন্তান দান করুন, যে আমার পরে আমার নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করবে।" এটা মনে করা কখনো উচিত নয় যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) মাল-ধন এদিক ওদিক হয়ে যাওয়ার আশংকা ছিল। কেননা, নবীগণ (আঃ) এর থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাঁরা যে এই উদ্দেশ্যে সন্তান লাভের প্রার্থনা জানাবেন যে, সন্তান না থাকলে তার মীরাছ বা উত্তরাধিকার দূরের আত্মীয়দের মধ্যে চলে যাবে, এটা হতে তাদের মর্যাদা বহু উর্ধ্বে। দ্বিতীয়তঃ এটাও প্রকাশমান যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) সারাজীবন ধরে ছুতারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, এমতাবস্থায় তাঁর কাছে কি এমন সম্পদ থাকতে পারে যার জন্য তিনি এতো ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বেন যে, ঐ সম্পদ তার হাত ছাড়া হয়ে যাবে? নবীগণ তো এমনিতেই সারা দুনিয়া হতে, অধিক মাল হতে বহু দূরে সরে থাকেন। দুনিয়ার প্রতি তাদের তো কোন আকর্ষণই থাকে না। তৃতীয় কারণ এটাও যে, কয়েকটি সনদে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীদের দল ওয়ারিছ বানাই না। আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই সবই সাদকারূপে পরিগণিত হয়।" জামে তিরমিযীতেও সহীহ সনদে এ হাদীস রয়েছে। সুতরাং এটা প্রমাণিত হলো যে, হযরত যাকারিয়া যে আল্লাহ তাআলার নিকট পুত্রের জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন যে, তিনি তার ওয়ারিছ হবেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য নবুওয়াতের ওয়ারিছ, মাল-ধনের ওয়ারিছ নয়। এ জন্যে তিনি বলেছিলেনঃ “সে আমার ওয়ারিছ হবে ও আলে ইয়াকুবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।"যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুলাইমান (আঃ) দাউদের (আঃ) ওয়ারিছ হলেন। (২৭:১৬) অর্থাৎ নবুওয়াতের ওয়ারিছ হলেন, ধন-মালের ওয়ারিছ নয়। অন্যথায় মালে তো অন্য ছেলেরাও ওয়ারিছ হয়। কাজেই মালে বিশেষত্ব বুঝায় না। চতুর্থ কারণ এটাও যে, ছেলে ওয়ারিছ হওয়া তো সাধারণ কথা। এটা সবারই মধ্যে এবং সমস্ত মাযহাবে আছে। সুতরাং এটার কোন প্রয়োজন ছিল না যে, হযরত যাকারিয়া (রাঃ) নিজের প্রার্থনার এই কারণ বর্ণনা করবেন। এর দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঐ উত্তরাধিকার একটা বিশেষ উত্তরাধিকার ছিল এবং সেটাও হলো নবুওয়াতের উত্তরাধিকার। যেমন হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমরা যা ছেড়ে যাই তা সাকারূপে পরিগণিত।" মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইলমের উত্তরাধিকার। হযরত যাকারিয়া (আঃ) হযরত ইয়াকূবের (আঃ) সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবু সালেহ (রঃ) বলেন যে, উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তিনিও তার বড়দের মত নবী হবেন। হাসান (রঃ) বলেন যে, নুবওয়াত ও ইলমের ওয়ারিছ হবেন। সুদ্দীর (রঃ) উক্তি এই যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উদ্দেশ্য ছিলঃ আমার ঐ সন্তান আমার ও আলে ইয়াকূবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।মুসনাদে আবদির রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উপর দয়া করুন! তার মালের ওয়ারিছের কি প্রয়োজন ছিল? আল্লাহ লুতের (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি সুদৃঢ় দুর্গের আকাংখা করে ছিলেন। তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার ভাই যাকারিয়ার (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি প্রার্থনা করেছিলেনঃ "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনার নিকট হতে একজন ওয়ালী দান করুন, যে আমার ও আলে ইয়াকুবের ওয়ারিছ হবে।" (কিন্তু এই সব হাদীসই মুরসাল। সাহাবী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেন নাই, তাবেয়ী বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এগুলো বিশুদ্ধ হাদীস সমূহের সমকক্ষতা লাভ করতে রাখে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) তিনি আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ! তাকে পছন্দনীয় গোলাম বানিয়ে দিন এবং এমন দ্বীনদার ও দিয়ানতদার বানিয়ে দিন যে, যেন আপনার মুহাব্বাত ছাড়াও সমস্ত সৃষ্টজীব তাকে মুহাব্বাত করে। সবাই যেন তার ধর্ম ও চরিত্রকে পছন্দনীয় ও প্রেম প্রীতির দৃষ্টিতে দেখে।”
মারইয়াম 19:5
এই সূরার প্রারম্ভিক আয়াতগুলি হযরত জাফর ইবুন আবি তালিব (রাঃ) আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশী ও তার সভাসদ বর্গের সামনে পাঠ করেছিলেন। (এটা ‘মুসনাদে আহমাদ ও 'সীরাতে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক’ গ্রন্থে উল্লিখিত আছে) ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর: এই সূরার প্রারম্ভে যে পাঁচটি অক্ষর রয়েছে এ গুলিকে ‘হুরূফে মুকাত্তাআহ’ বলা হয়। সূরায়ে বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভে আমরা এগুলি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছি। আল্লাহ তাআলার বান্দা ও নবী যাকারিয়ার (আঃ) প্রতি তাঁর যে দয়া ও অনুগ্রহ নাযিল হয় তারই বর্ণনা এখানে দেয়া হচ্ছে। (আরবী) শব্দটি এক কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দটির উভয় কিরআতই মশহুর বা প্রসিদ্ধ। তিনি বাণী ইসরাঈলের এক অতি খ্যাতি সম্পন্ন নবী ছিলেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, তিনি ছুতার ছিলেন এবং এ কাজ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি স্বীয় প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করতেন। কিন্তু তাঁর এই প্রার্থনা ছিল লোকদের কাছে স্বাভাবিক এবং তাদের মনে খেয়াল জাগতে পারে যে, বুড়ো বয়সে তাঁর সন্তান লাভের চাহিদা হয়েছে, তাই তিনি নিভৃতে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন। তাঁর নিভৃতে ও নির্জনে প্রার্থনা করার আর একটি কারণ এই যে, নির্জনে ও নিভৃতে প্রার্থনা আল্লাহ তাআলার নিকট খুবই প্রিয়। এ প্রার্থনা তাড়াতাড়ি কবুল হয়ে থাকে। খোদাভীরু অন্তরকে আল্লাহ তাআলা খুব ভালরূপই জানেন। ধীরে ধীরে ও চুপি চুপি কথা বললেও তিনি পূর্ণরূপে শুনতে পান। পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, তিনি রাত্রে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন যখন তার পরিবার পরিজন ও সঙ্গী সাথীরা ঘুমিয়ে থাকতেন। অতঃপর তিনি চুপি চুপি বলতেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! হে আমার পালন কর্তা!' তখন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তোমার সামনে হাজির আছি, তোমার সামনে আমি বিদ্যমান রয়েছি, তোমার সম্মুখে আমি উপস্থিত রয়েছি। হযরত যাকারিয়া (আঃ) প্রার্থনায় বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার মাথার চুল পেকে সাদা হয়েছে। এর দ্বারা তিনি দুর্বলতা ও বার্ধক্যকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক! আমার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিন সমস্ত শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। ভিতরের ও বাইরের দুর্বলতা আমাকে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে।তিনি আরো বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার কাছে প্রার্থনা করে আমি তো কখনো ব্যর্থ মনোরথ হই নাই এবং আপনার দরবার হতে কখনো শূন্য হস্তে ফিরে যাই নাই। বরং যখনই যা কিছু চেয়েছি তাই আপনি আমাকে দান করেছেন।"কাসাঈ (রঃ) শব্দটিকে (আরবী) পড়েছেন অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে সাকিন বা জযম দিয়ে পড়েছেন। এর দ্বারা কে বুঝানো হয়েছে। (ফারায়েযের পরিভাষায় আল্লাহর কিতাবে যাদের অংশ নির্ধারিত রয়েছে ঐ সব ওয়ারিসকে আসহাবে ফুরূষ বলা হয়। এই অসহাবে ফুরূযকে অংশ দেয়ার পর অবশিষ্ট অংশ যে ওয়ারিছরা পেয়ে থাকে তাদেরকে আসাবা বলা হয়)বর্ণিত আছে যে, হযরত উছমনি (রাঃ) (আরবী) কে (আরবী) পড়েছেন। অর্থাৎ আমার পরে আমার নিজস্ব লোক খুবই কম থাকবে। প্রথম কিরআতে অর্থ হবে “আমার সন্তানাদি নেই বলে আমার আত্মীয় স্বজন যারা রয়েছে তাদের ব্যাপারে আমি আশংকা করছি যে, না জানি আমার পরে তারা আমার মীরাছের সাথে অন্যায় আচরণ করবে। সুতরাং হে আল্লাহ! আপনি আমাকে সন্তান দান করুন, যে আমার পরে আমার নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করবে।" এটা মনে করা কখনো উচিত নয় যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) মাল-ধন এদিক ওদিক হয়ে যাওয়ার আশংকা ছিল। কেননা, নবীগণ (আঃ) এর থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাঁরা যে এই উদ্দেশ্যে সন্তান লাভের প্রার্থনা জানাবেন যে, সন্তান না থাকলে তার মীরাছ বা উত্তরাধিকার দূরের আত্মীয়দের মধ্যে চলে যাবে, এটা হতে তাদের মর্যাদা বহু উর্ধ্বে। দ্বিতীয়তঃ এটাও প্রকাশমান যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) সারাজীবন ধরে ছুতারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, এমতাবস্থায় তাঁর কাছে কি এমন সম্পদ থাকতে পারে যার জন্য তিনি এতো ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বেন যে, ঐ সম্পদ তার হাত ছাড়া হয়ে যাবে? নবীগণ তো এমনিতেই সারা দুনিয়া হতে, অধিক মাল হতে বহু দূরে সরে থাকেন। দুনিয়ার প্রতি তাদের তো কোন আকর্ষণই থাকে না। তৃতীয় কারণ এটাও যে, কয়েকটি সনদে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীদের দল ওয়ারিছ বানাই না। আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই সবই সাদকারূপে পরিগণিত হয়।" জামে তিরমিযীতেও সহীহ সনদে এ হাদীস রয়েছে। সুতরাং এটা প্রমাণিত হলো যে, হযরত যাকারিয়া যে আল্লাহ তাআলার নিকট পুত্রের জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন যে, তিনি তার ওয়ারিছ হবেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য নবুওয়াতের ওয়ারিছ, মাল-ধনের ওয়ারিছ নয়। এ জন্যে তিনি বলেছিলেনঃ “সে আমার ওয়ারিছ হবে ও আলে ইয়াকুবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।"যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুলাইমান (আঃ) দাউদের (আঃ) ওয়ারিছ হলেন। (২৭:১৬) অর্থাৎ নবুওয়াতের ওয়ারিছ হলেন, ধন-মালের ওয়ারিছ নয়। অন্যথায় মালে তো অন্য ছেলেরাও ওয়ারিছ হয়। কাজেই মালে বিশেষত্ব বুঝায় না। চতুর্থ কারণ এটাও যে, ছেলে ওয়ারিছ হওয়া তো সাধারণ কথা। এটা সবারই মধ্যে এবং সমস্ত মাযহাবে আছে। সুতরাং এটার কোন প্রয়োজন ছিল না যে, হযরত যাকারিয়া (রাঃ) নিজের প্রার্থনার এই কারণ বর্ণনা করবেন। এর দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঐ উত্তরাধিকার একটা বিশেষ উত্তরাধিকার ছিল এবং সেটাও হলো নবুওয়াতের উত্তরাধিকার। যেমন হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমরা যা ছেড়ে যাই তা সাকারূপে পরিগণিত।" মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইলমের উত্তরাধিকার। হযরত যাকারিয়া (আঃ) হযরত ইয়াকূবের (আঃ) সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবু সালেহ (রঃ) বলেন যে, উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তিনিও তার বড়দের মত নবী হবেন। হাসান (রঃ) বলেন যে, নুবওয়াত ও ইলমের ওয়ারিছ হবেন। সুদ্দীর (রঃ) উক্তি এই যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উদ্দেশ্য ছিলঃ আমার ঐ সন্তান আমার ও আলে ইয়াকূবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।মুসনাদে আবদির রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উপর দয়া করুন! তার মালের ওয়ারিছের কি প্রয়োজন ছিল? আল্লাহ লুতের (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি সুদৃঢ় দুর্গের আকাংখা করে ছিলেন। তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার ভাই যাকারিয়ার (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি প্রার্থনা করেছিলেনঃ "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনার নিকট হতে একজন ওয়ালী দান করুন, যে আমার ও আলে ইয়াকুবের ওয়ারিছ হবে।" (কিন্তু এই সব হাদীসই মুরসাল। সাহাবী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেন নাই, তাবেয়ী বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এগুলো বিশুদ্ধ হাদীস সমূহের সমকক্ষতা লাভ করতে রাখে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) তিনি আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ! তাকে পছন্দনীয় গোলাম বানিয়ে দিন এবং এমন দ্বীনদার ও দিয়ানতদার বানিয়ে দিন যে, যেন আপনার মুহাব্বাত ছাড়াও সমস্ত সৃষ্টজীব তাকে মুহাব্বাত করে। সবাই যেন তার ধর্ম ও চরিত্রকে পছন্দনীয় ও প্রেম প্রীতির দৃষ্টিতে দেখে।”
মারইয়াম 19:6
এই সূরার প্রারম্ভিক আয়াতগুলি হযরত জাফর ইবুন আবি তালিব (রাঃ) আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশী ও তার সভাসদ বর্গের সামনে পাঠ করেছিলেন। (এটা ‘মুসনাদে আহমাদ ও 'সীরাতে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক’ গ্রন্থে উল্লিখিত আছে) ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর: এই সূরার প্রারম্ভে যে পাঁচটি অক্ষর রয়েছে এ গুলিকে ‘হুরূফে মুকাত্তাআহ’ বলা হয়। সূরায়ে বাকারার তাফসীরের প্রারম্ভে আমরা এগুলি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছি। আল্লাহ তাআলার বান্দা ও নবী যাকারিয়ার (আঃ) প্রতি তাঁর যে দয়া ও অনুগ্রহ নাযিল হয় তারই বর্ণনা এখানে দেয়া হচ্ছে। (আরবী) শব্দটি এক কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দটির উভয় কিরআতই মশহুর বা প্রসিদ্ধ। তিনি বাণী ইসরাঈলের এক অতি খ্যাতি সম্পন্ন নবী ছিলেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, তিনি ছুতার ছিলেন এবং এ কাজ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি স্বীয় প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করতেন। কিন্তু তাঁর এই প্রার্থনা ছিল লোকদের কাছে স্বাভাবিক এবং তাদের মনে খেয়াল জাগতে পারে যে, বুড়ো বয়সে তাঁর সন্তান লাভের চাহিদা হয়েছে, তাই তিনি নিভৃতে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন। তাঁর নিভৃতে ও নির্জনে প্রার্থনা করার আর একটি কারণ এই যে, নির্জনে ও নিভৃতে প্রার্থনা আল্লাহ তাআলার নিকট খুবই প্রিয়। এ প্রার্থনা তাড়াতাড়ি কবুল হয়ে থাকে। খোদাভীরু অন্তরকে আল্লাহ তাআলা খুব ভালরূপই জানেন। ধীরে ধীরে ও চুপি চুপি কথা বললেও তিনি পূর্ণরূপে শুনতে পান। পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, তিনি রাত্রে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন যখন তার পরিবার পরিজন ও সঙ্গী সাথীরা ঘুমিয়ে থাকতেন। অতঃপর তিনি চুপি চুপি বলতেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! হে আমার পালন কর্তা!' তখন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি তোমার সামনে হাজির আছি, তোমার সামনে আমি বিদ্যমান রয়েছি, তোমার সম্মুখে আমি উপস্থিত রয়েছি। হযরত যাকারিয়া (আঃ) প্রার্থনায় বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার মাথার চুল পেকে সাদা হয়েছে। এর দ্বারা তিনি দুর্বলতা ও বার্ধক্যকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক! আমার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিন সমস্ত শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। ভিতরের ও বাইরের দুর্বলতা আমাকে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে।তিনি আরো বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার কাছে প্রার্থনা করে আমি তো কখনো ব্যর্থ মনোরথ হই নাই এবং আপনার দরবার হতে কখনো শূন্য হস্তে ফিরে যাই নাই। বরং যখনই যা কিছু চেয়েছি তাই আপনি আমাকে দান করেছেন।"কাসাঈ (রঃ) শব্দটিকে (আরবী) পড়েছেন অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে সাকিন বা জযম দিয়ে পড়েছেন। এর দ্বারা কে বুঝানো হয়েছে। (ফারায়েযের পরিভাষায় আল্লাহর কিতাবে যাদের অংশ নির্ধারিত রয়েছে ঐ সব ওয়ারিসকে আসহাবে ফুরূষ বলা হয়। এই অসহাবে ফুরূযকে অংশ দেয়ার পর অবশিষ্ট অংশ যে ওয়ারিছরা পেয়ে থাকে তাদেরকে আসাবা বলা হয়)বর্ণিত আছে যে, হযরত উছমনি (রাঃ) (আরবী) কে (আরবী) পড়েছেন। অর্থাৎ আমার পরে আমার নিজস্ব লোক খুবই কম থাকবে। প্রথম কিরআতে অর্থ হবে “আমার সন্তানাদি নেই বলে আমার আত্মীয় স্বজন যারা রয়েছে তাদের ব্যাপারে আমি আশংকা করছি যে, না জানি আমার পরে তারা আমার মীরাছের সাথে অন্যায় আচরণ করবে। সুতরাং হে আল্লাহ! আপনি আমাকে সন্তান দান করুন, যে আমার পরে আমার নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করবে।" এটা মনে করা কখনো উচিত নয় যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) মাল-ধন এদিক ওদিক হয়ে যাওয়ার আশংকা ছিল। কেননা, নবীগণ (আঃ) এর থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তাঁরা যে এই উদ্দেশ্যে সন্তান লাভের প্রার্থনা জানাবেন যে, সন্তান না থাকলে তার মীরাছ বা উত্তরাধিকার দূরের আত্মীয়দের মধ্যে চলে যাবে, এটা হতে তাদের মর্যাদা বহু উর্ধ্বে। দ্বিতীয়তঃ এটাও প্রকাশমান যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) সারাজীবন ধরে ছুতারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, এমতাবস্থায় তাঁর কাছে কি এমন সম্পদ থাকতে পারে যার জন্য তিনি এতো ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বেন যে, ঐ সম্পদ তার হাত ছাড়া হয়ে যাবে? নবীগণ তো এমনিতেই সারা দুনিয়া হতে, অধিক মাল হতে বহু দূরে সরে থাকেন। দুনিয়ার প্রতি তাদের তো কোন আকর্ষণই থাকে না। তৃতীয় কারণ এটাও যে, কয়েকটি সনদে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীদের দল ওয়ারিছ বানাই না। আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই সবই সাদকারূপে পরিগণিত হয়।" জামে তিরমিযীতেও সহীহ সনদে এ হাদীস রয়েছে। সুতরাং এটা প্রমাণিত হলো যে, হযরত যাকারিয়া যে আল্লাহ তাআলার নিকট পুত্রের জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন যে, তিনি তার ওয়ারিছ হবেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য নবুওয়াতের ওয়ারিছ, মাল-ধনের ওয়ারিছ নয়। এ জন্যে তিনি বলেছিলেনঃ “সে আমার ওয়ারিছ হবে ও আলে ইয়াকুবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।"যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুলাইমান (আঃ) দাউদের (আঃ) ওয়ারিছ হলেন। (২৭:১৬) অর্থাৎ নবুওয়াতের ওয়ারিছ হলেন, ধন-মালের ওয়ারিছ নয়। অন্যথায় মালে তো অন্য ছেলেরাও ওয়ারিছ হয়। কাজেই মালে বিশেষত্ব বুঝায় না। চতুর্থ কারণ এটাও যে, ছেলে ওয়ারিছ হওয়া তো সাধারণ কথা। এটা সবারই মধ্যে এবং সমস্ত মাযহাবে আছে। সুতরাং এটার কোন প্রয়োজন ছিল না যে, হযরত যাকারিয়া (রাঃ) নিজের প্রার্থনার এই কারণ বর্ণনা করবেন। এর দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঐ উত্তরাধিকার একটা বিশেষ উত্তরাধিকার ছিল এবং সেটাও হলো নবুওয়াতের উত্তরাধিকার। যেমন হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমরা যা ছেড়ে যাই তা সাকারূপে পরিগণিত।" মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইলমের উত্তরাধিকার। হযরত যাকারিয়া (আঃ) হযরত ইয়াকূবের (আঃ) সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবু সালেহ (রঃ) বলেন যে, উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তিনিও তার বড়দের মত নবী হবেন। হাসান (রঃ) বলেন যে, নুবওয়াত ও ইলমের ওয়ারিছ হবেন। সুদ্দীর (রঃ) উক্তি এই যে, হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উদ্দেশ্য ছিলঃ আমার ঐ সন্তান আমার ও আলে ইয়াকূবের (আঃ) ওয়ারিছ হবে।মুসনাদে আবদির রাষ্যকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত যাকারিয়ার (আঃ) উপর দয়া করুন! তার মালের ওয়ারিছের কি প্রয়োজন ছিল? আল্লাহ লুতের (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি সুদৃঢ় দুর্গের আকাংখা করে ছিলেন। তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার ভাই যাকারিয়ার (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি প্রার্থনা করেছিলেনঃ "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনার নিকট হতে একজন ওয়ালী দান করুন, যে আমার ও আলে ইয়াকুবের ওয়ারিছ হবে।" (কিন্তু এই সব হাদীসই মুরসাল। সাহাবী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেন নাই, তাবেয়ী বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এগুলো বিশুদ্ধ হাদীস সমূহের সমকক্ষতা লাভ করতে রাখে। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) তিনি আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ! তাকে পছন্দনীয় গোলাম বানিয়ে দিন এবং এমন দ্বীনদার ও দিয়ানতদার বানিয়ে দিন যে, যেন আপনার মুহাব্বাত ছাড়াও সমস্ত সৃষ্টজীব তাকে মুহাব্বাত করে। সবাই যেন তার ধর্ম ও চরিত্রকে পছন্দনীয় ও প্রেম প্রীতির দৃষ্টিতে দেখে।”
মারইয়াম 19:7
হযরত যাকারিয়ার (আঃ) প্রার্থনা কবুল হয় এবং তাকে বলা হয়ঃ তুমি একটি সন্তানের সুসংবাদ শুনে নাও, যার নাম হবে ইয়াহইয়া (আঃ)। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তখন যাকারিয়া (আঃ) প্রার্থনা করলো স্বীয় প্রভূর নিকট, বললোঃ হে আমার প্রতিপালক! দান করুন আমাকে আপনার নিকট হতে কোন উত্তম সন্তান; নিশ্চয় আপনি খুব প্রার্থনা শ্রবণকারী। অতঃপর তাকে ফেরেশতারা ডেকে বললোঃ যখন সে মেহরাবে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছিলঃ আল্লাহ আপনাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন ইয়াহইয়ার (আঃ)। তার অবস্থা এই হবে যে, তিনি সমর্থনকারী হবেন কালেমাতুল্লাহর (নবুওয়াতে ঈসা (আঃ) এবং সরদার হবেন ও স্বীয় প্রবৃত্তিকে খুব দমনকারী হবেন, আর নবীও হবেন এবং উচ্চ স্তরের সুসভ্যও হবেন।" (৩:৩৮-৩৯)এখানে মহান আল্লাহ বলেন যে, তার পূর্বে এই নামের কোন মানুষ ছিল। এটাও বলা হয়েছে যে, তার সাথে সাদৃশ্যযুক্ত কেউ হবে না।' (আরবী) শব্দের এই অর্থই এই আয়াতেও রয়েছে। এ অর্থও বর্ণনা করা হয়েছে যে, এর পূর্বে কোন বন্ধ্যা স্ত্রী লোকের এইরূপ সন্তান হয় নাই। হযরত যাকারিয়ার কোন সন্তান জন্ম গ্রহণ করে নাই এবং তার স্ত্রীও পূর্ব হতেই সন্তানহীনা ছিলেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত সারা (আঃ) এই দু’জনও সন্তানের সুসংবাদ পেয়ে অত্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তারা সন্তানহীনা ও বন্ধ্যা ছিলেন বলেই যে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন তা নয়। বরং তাদের বিস্ময় প্রকাশের কারণ ছিল তাদের ঐ চরম বার্ধক্যের অবস্থায় সন্তান লাভ। হযরত যাকারিয়ার (আঃ) ঐ পূর্ণ বার্ধক্য অবস্থা পর্যন্ত কোন সন্তানই জন্মগ্রহণ করে নাই এবং তাঁর স্ত্রী তো প্রথম থেকেই বন্ধ্যা ছিলেন। কিন্তু হযরত ইবরাহীম খলীলের (আঃ) অবস্থা তো ছিল এর বিপরীত। কারণ, তখন থেকে তেরো বছর পূর্বে তো তাঁর পুত্র। হযরত ইসমাঈল (আঃ) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কাজেই বন্ধ্যা হওয়ার কারণে তিনি বিস্মিত হন নাই। বরং অত্যন্ত বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের (ইসহাকের (আঃ) সুসংবাদ শুনেই তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী সারাও (রাঃ) ঐ সুসংবাদ শুনে আশ্চর্যান্বিতা হয়েছিলেন এবং বলেছিলেনঃ “এই চরম বার্ধক্যের অবস্থায় আমার সন্তান হবে এটা কেমন কথা? আর আমার স্বামীও তো সীমাহীন বুদ্ধ! এটাতো চরম বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে। তাঁর এ কথা শুনে ফেরেশতারা বলেছিলেনঃ “আপনি কি আল্লাহর কাজে বিস্ময় প্রকাশ করছেন? (হে) এই পরিবারের লোকেরা! আপনাদের প্রতি তো আল্লাহর বিশেষ রহমত ও তাঁর বিবিধ বরকতসমূহ (নাযিল হয়ে আসছে) নিশ্চয় তিনি প্রশংসার যোগ্য, মহামহিমান্বিত।”
মারইয়াম 19:8
৮-৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যাকারিয়া (আঃ) তাঁর প্রার্থনা কবুল হওয়ার ও নিজের সন্তান হওয়ার সুসংবাদ শুনে আনন্দ ও বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করেন যে, বাহ্যতঃ তো এটা অসম্ব বলেই মনে হচ্ছে। কেননা স্বামী স্ত্রী উভয়ের দিক থেকেই শুধু নৈরাশ্যই বিরাজ করছে। স্ত্রী বন্ধ্যা, এই পর্যন্ত তার ছেলে মেয়েই হয়নি। আর তিনি শেষ পর্যায়ের বৃদ্ধ। তার অস্থি গুলিও তো মজ্জাহীন হয়ে গেছে। তিনি একেবারে শুষ্ক ডালের মত হয়ে গেছেন এবং তাঁর স্ত্রীও তো থুড়থুড়ে বুড়ী। কাজেই এমতাবস্থায় তাদের সন্তান হওয়া কি করে সম্ব? তাই, তিনি আনন্দিত ও বিস্মিত হয়েই বিশ্ব প্রতিপালকের কাছে এর অবস্থা জানতে চান। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “সমস্ত সুন্নাত আমার জানা আছে। কিন্তু আমি জানি না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুহরে ও আসরে পড়তেন কিনা এবং এটাও জানি না যে, তিনি (আরবী) বলার পর (আরবী) বলতেন কি (আরবী) বলতেন। (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ফেরেশতারা উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ তাআলা তো এটা ওয়াদাই করেছেন যে, এই অবস্থাতেই এই স্ত্রী হতেই তিনি আপনাকে ছেলে দান করবেন। তার কাছে এ কাজ মোটেই কঠিন নয়। এর চেয়ে বেশী বিস্ময়কর এবং এর চেয়ে বড় শক্তির কাজ তো তোমরা স্বয়ং দেখেছে এবং সেটা হচ্ছে। তোমাদের নিজেদেরই অস্তিত্ব, যা কিছুই ছিল না, আল্লাহ তাআলাই বানিয়েছেন। সুতরাং যিনি তোমাদের সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তিনি কি তোমাদেরকে সন্তান দানে সক্ষম নন? যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিঃসন্দেহে মানুষের উপর কালের মধ্যে এমন একটি সময় অতীত হয়েছে, যখন সে কোন উল্লেখযোগ্য বস্তুই ছিল না।" (৭৬:১)
মারইয়াম 19:9
৮-৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যাকারিয়া (আঃ) তাঁর প্রার্থনা কবুল হওয়ার ও নিজের সন্তান হওয়ার সুসংবাদ শুনে আনন্দ ও বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করেন যে, বাহ্যতঃ তো এটা অসম্ব বলেই মনে হচ্ছে। কেননা স্বামী স্ত্রী উভয়ের দিক থেকেই শুধু নৈরাশ্যই বিরাজ করছে। স্ত্রী বন্ধ্যা, এই পর্যন্ত তার ছেলে মেয়েই হয়নি। আর তিনি শেষ পর্যায়ের বৃদ্ধ। তার অস্থি গুলিও তো মজ্জাহীন হয়ে গেছে। তিনি একেবারে শুষ্ক ডালের মত হয়ে গেছেন এবং তাঁর স্ত্রীও তো থুড়থুড়ে বুড়ী। কাজেই এমতাবস্থায় তাদের সন্তান হওয়া কি করে সম্ব? তাই, তিনি আনন্দিত ও বিস্মিত হয়েই বিশ্ব প্রতিপালকের কাছে এর অবস্থা জানতে চান। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “সমস্ত সুন্নাত আমার জানা আছে। কিন্তু আমি জানি না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুহরে ও আসরে পড়তেন কিনা এবং এটাও জানি না যে, তিনি (আরবী) বলার পর (আরবী) বলতেন কি (আরবী) বলতেন। (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ফেরেশতারা উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ তাআলা তো এটা ওয়াদাই করেছেন যে, এই অবস্থাতেই এই স্ত্রী হতেই তিনি আপনাকে ছেলে দান করবেন। তার কাছে এ কাজ মোটেই কঠিন নয়। এর চেয়ে বেশী বিস্ময়কর এবং এর চেয়ে বড় শক্তির কাজ তো তোমরা স্বয়ং দেখেছে এবং সেটা হচ্ছে। তোমাদের নিজেদেরই অস্তিত্ব, যা কিছুই ছিল না, আল্লাহ তাআলাই বানিয়েছেন। সুতরাং যিনি তোমাদের সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তিনি কি তোমাদেরকে সন্তান দানে সক্ষম নন? যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিঃসন্দেহে মানুষের উপর কালের মধ্যে এমন একটি সময় অতীত হয়েছে, যখন সে কোন উল্লেখযোগ্য বস্তুই ছিল না।" (৭৬:১)
মারইয়াম 19:10
১০-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আরো বেশী মনের প্রশান্তি ও অন্তরের সান্ত্বনার জন্যে হযরত যাকারিয়া (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেনঃ “হে আল্লাহ! এর কোন একটি নিদর্শন প্রকাশ করুন। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) মৃতকে পুনরুজ্জীবিত করণ দর্শনের আকাংখা এ জন্যেই প্রকাশ করেছিলেন। হযরত যাকারিয়ার (আঃ) প্রার্থনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা তাকে বলেনঃ “তুমি মূক বা বোবা হবে না এবং রোগাক্রান্ত হবে না, কিন্তু তুমি লোকদের সাথে কথা বলতে পারবে না এবং ঐ সময় তোমার মুখ দিয়ে কথা সরবে না। তিন দিন ও তিন রাত এ অবস্থাই থাকবে। এটাই হলো নিদর্শন। হলোও তাই। তিনি মুখে তাসবীহ পাঠ, ক্ষমতা প্রার্থনা ও প্রশংসা কীর্তন সবই করতে পারতেন। কিন্তু লোকদের সাথে কথা বলতে পারতেন না। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে যে, (আরবী) এর অর্থ হলো ক্রমাগত। অর্থাৎ ক্রমাগত তিন দিন ও তিন রাত যুবান পার্থিব কথা হতে বিরত থাকবে। প্রথম উক্তিটিও তার থেকেই বর্ণিত আছে এবং জমহূরের তাফসীরও এটাই। আর এটাই সঠিকও বটে। যেমন সূরায়ে আলে ইমরানে এর বর্ণনা গত হয়েছে যে, নিদর্শন চাওয়ায় আল্লাহ তাআলা বলেছিলেনঃ “তোমার লক্ষ্যণ এটাই যে, তুমি মানুষের সাথে কথা বলতে সমর্থ হবে না তিন দিন পর্যন্ত ইশারা ছাড়া; আর তুমি প্রচুর পরিমাণে যিকর করবে, আর তাসবীহ পাঠ করবে অপরাহেও।” সুতরাং ঐ তিন দিন ও তিন রাত তিনি লোকদের সাথে কথা বলতে পারতেন না। ইশারা ইঙ্গিতে শুধু নিজেরা মনের কথা বুঝিয়ে দিতেন। কিন্তু এটা নয় যে, তিনি মূক হয়ে গিয়েছিলেন। এখন তিনি তাঁর যে কক্ষে গিয়ে নির্জনে সন্তানের জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন, সেখান থেকে বের হয়ে আসেন এবং আল্লাহ তাআলা তাকে যে নিয়ামত দান করেছিলেন এবং যে যিকর ও তাসবীহ্ পাঠের তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল ঐ হুকুম তার কওমের উপরও হয়। কিন্তু তিনি কথা বলতে পারতেন না বলে ইশারায় তাদেরকে বুঝিয়ে দেন অথবা মাটিতে লিখে বুঝিয়ে দেন।
মারইয়াম 19:11
১০-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আরো বেশী মনের প্রশান্তি ও অন্তরের সান্ত্বনার জন্যে হযরত যাকারিয়া (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেনঃ “হে আল্লাহ! এর কোন একটি নিদর্শন প্রকাশ করুন। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) মৃতকে পুনরুজ্জীবিত করণ দর্শনের আকাংখা এ জন্যেই প্রকাশ করেছিলেন। হযরত যাকারিয়ার (আঃ) প্রার্থনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা তাকে বলেনঃ “তুমি মূক বা বোবা হবে না এবং রোগাক্রান্ত হবে না, কিন্তু তুমি লোকদের সাথে কথা বলতে পারবে না এবং ঐ সময় তোমার মুখ দিয়ে কথা সরবে না। তিন দিন ও তিন রাত এ অবস্থাই থাকবে। এটাই হলো নিদর্শন। হলোও তাই। তিনি মুখে তাসবীহ পাঠ, ক্ষমতা প্রার্থনা ও প্রশংসা কীর্তন সবই করতে পারতেন। কিন্তু লোকদের সাথে কথা বলতে পারতেন না। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে যে, (আরবী) এর অর্থ হলো ক্রমাগত। অর্থাৎ ক্রমাগত তিন দিন ও তিন রাত যুবান পার্থিব কথা হতে বিরত থাকবে। প্রথম উক্তিটিও তার থেকেই বর্ণিত আছে এবং জমহূরের তাফসীরও এটাই। আর এটাই সঠিকও বটে। যেমন সূরায়ে আলে ইমরানে এর বর্ণনা গত হয়েছে যে, নিদর্শন চাওয়ায় আল্লাহ তাআলা বলেছিলেনঃ “তোমার লক্ষ্যণ এটাই যে, তুমি মানুষের সাথে কথা বলতে সমর্থ হবে না তিন দিন পর্যন্ত ইশারা ছাড়া; আর তুমি প্রচুর পরিমাণে যিকর করবে, আর তাসবীহ পাঠ করবে অপরাহেও।” সুতরাং ঐ তিন দিন ও তিন রাত তিনি লোকদের সাথে কথা বলতে পারতেন না। ইশারা ইঙ্গিতে শুধু নিজেরা মনের কথা বুঝিয়ে দিতেন। কিন্তু এটা নয় যে, তিনি মূক হয়ে গিয়েছিলেন। এখন তিনি তাঁর যে কক্ষে গিয়ে নির্জনে সন্তানের জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন, সেখান থেকে বের হয়ে আসেন এবং আল্লাহ তাআলা তাকে যে নিয়ামত দান করেছিলেন এবং যে যিকর ও তাসবীহ্ পাঠের তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল ঐ হুকুম তার কওমের উপরও হয়। কিন্তু তিনি কথা বলতে পারতেন না বলে ইশারায় তাদেরকে বুঝিয়ে দেন অথবা মাটিতে লিখে বুঝিয়ে দেন।
মারইয়াম 19:12
১২-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলার শুভ সংবাদ অনুযায়ী হযরত যাকারিয়ার (আঃ) ঔরষে হযরত ইয়াহইয়া জন্ম গ্রহণ করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাওরাত শিক্ষা দেন যা তার উপর পাঠ করা হতো এবং যার হুকুম সমূহ সৎলোকেরা ও নবীগণ অন্যদের নিকট প্রচার করতেন। ঐ সময় তিনি ছোট বালক ছিলেন। এ জন্যেই মহান আল্লাহ তাঁর ঐ অসাধারণ নিয়ামতেরও বর্ণনা দিয়েছেন যে, তিনি হযরত যাকারিয়াকে (আঃ) সন্তানও দান করেন এবং তাঁকে বাল্যাব স্থাতেই আসমানী কিতাবের আলেমও বানিয়ে দেন। আর তাকে নির্দেশ দেনঃ “কিতাবকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করো ও তা শিখে নাও।" আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ “সাথে সাথে আমি তাকে ঐ অল্প বয়সেই বোধসম্পন্ন জ্ঞান, শক্তি, দৃঢ়তা, বুদ্ধিমত্তা এবং সহনশীলতা দান করেছিলাম।” শৈশবেই তিনি সৎ কাজের প্রতি ঝুঁকে পড়েন এবং চেষ্টা ও আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর ইবাদত ও জনসেবার কাজে লেগে পড়েন। শিশুরা তাকে তাদের সাথে খেলতে ডাকতো। কিন্তু তিনি উত্তরে বলতেনঃ “আমাদেরকে খেলা করার জন্যে সৃষ্টি করা হয় নাই। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হযরত যাকারিয়ার (আঃ) জন্যে হযরত ইয়াহইয়ার (আঃ) অস্তিত্ব ছিল আমার করুণার প্রতীক, যার উপর আমি ছাড়া আর কেউই সক্ষম নয়। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! (আরবী) এর ভাবার্থ কি তা আমার জানা নেই। অভিধানে এটা প্রেম,প্রীতি, করুণা ইত্যাদি অর্থে এসে থাকে। বাহ্যতঃ ভাবার্থ এটাই জানা যাচ্ছে তাকে প্রেম, প্রীতি, স্নেহ এবং পবিত্রতা দান করেছিলাম।"হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামে একটি লোক এক হাজার বছর পর্যন্ত (আরবী) ও (আরবী) বলে ডাকতে থাকবে। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে) হযরত ইয়াহ্ইয়া (আঃ) সর্বপ্রকারের ময়লা হতে, পাপ। হতে এবং নাফরমানী হতে তিনি মুক্ত ছিলেন। তাঁর জীবনের একমাত্র কাজ ছিল সৎ কার্যাবলী সম্পাদন। তিনি পাপকার্য ও আল্লাহর অবাধ্যাচরণ হতে বহু দূরে ছিলেন। সাথে সাথে তিনি পিতা-মাতার অনুগত ছিলেন এবং তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করতেন। কখনো কোন কাজে তিনি পিতা-মাতার অবাধ্য হন নাই। কখনো তিনি তাঁদের কোন কথার বিরোধিতা করেন নাই। তারা যে কাজ করতে নিষেধ করতেন তা তিনি কখনো করতেন না। তাঁর মধ্যে কোন ঔদ্ধত্যপনা ও হঠকারিতা ছিল না। এই উত্তম গুণাবলী ও প্রশংসনীয় স্বভাবের কারণে তিনটি অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁকে শান্তি ও নিরাপত্তা দান করেছিলেন। অর্থাৎ জন্মের দিন, মৃত্যুর দিন এবং হাশরের দিন। এই তিনটি জায়গাই অতি ভয়াবহ ও অজানা। মায়ের পেট থেকে বের হওয়া মাত্রই একটি নতুন দুনিয়া দেখা যায় যা আজকের দুনিয়া হতে বিরাট ও সম্পূর্ণ পৃথকরূপে পরিলক্ষিত হয়। মৃত্যুর দিন ঐ মাখলুকের সাথে সম্বন্ধ হয়ে যায়। যাদের সাথে পার্থিব জীবনে কোনই সম্বন্ধ ছিল না। তাদেরকে কখনো দেখেও নাই। এইভাবে হাশরের দিন নিজেকে একটা বিরাট জন সমাবেশে দেখে মানুষ অত্যন্ত হতভম্ব ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে। কেননা, ওটাও একটা নতুন পরিবেশ। এই তিন ভয়াবহ সময়ে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করবেন।একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন সমস্ত লোক কিছু না কিছু গুনাহ নিয়ে যাবে, একমাত্র হযরত ইয়াহইয়া ছাড়া। হযরত কাতাদা’ (রাঃ) বলেন যে, হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) গুনাহ্ করা তো দূরের কথা, গুনা হর কখনো কোন ইচ্ছাও করেন নি। (এটা মারফু’রূপে এবং দুই সনদেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু দুটো সনদই দুর্বল। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) পরস্পর সাক্ষাৎ হলে হযরত ঈসা (আঃ) হযরত ইয়াহইয়াকে (আঃ) বলেনঃ “আপনি আমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থণা করুন! আপনি আমার চেয়ে উত্তম।" উত্তরে হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) বলেনঃ “আপনিই আমার চেয়ে উত্তম।” তখন হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “আমি তো নিজেই নিজের উপর সালাম বলেছি, আর আপনার উপর স্বয়ং আল্লাহ সালাম বলেছেন।” এখন এই দুই নবীর (আঃ) ফযীলত প্রকাশ হয়ে পড়লো।
মারইয়াম 19:13
১২-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলার শুভ সংবাদ অনুযায়ী হযরত যাকারিয়ার (আঃ) ঔরষে হযরত ইয়াহইয়া জন্ম গ্রহণ করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাওরাত শিক্ষা দেন যা তার উপর পাঠ করা হতো এবং যার হুকুম সমূহ সৎলোকেরা ও নবীগণ অন্যদের নিকট প্রচার করতেন। ঐ সময় তিনি ছোট বালক ছিলেন। এ জন্যেই মহান আল্লাহ তাঁর ঐ অসাধারণ নিয়ামতেরও বর্ণনা দিয়েছেন যে, তিনি হযরত যাকারিয়াকে (আঃ) সন্তানও দান করেন এবং তাঁকে বাল্যাব স্থাতেই আসমানী কিতাবের আলেমও বানিয়ে দেন। আর তাকে নির্দেশ দেনঃ “কিতাবকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করো ও তা শিখে নাও।" আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ “সাথে সাথে আমি তাকে ঐ অল্প বয়সেই বোধসম্পন্ন জ্ঞান, শক্তি, দৃঢ়তা, বুদ্ধিমত্তা এবং সহনশীলতা দান করেছিলাম।” শৈশবেই তিনি সৎ কাজের প্রতি ঝুঁকে পড়েন এবং চেষ্টা ও আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর ইবাদত ও জনসেবার কাজে লেগে পড়েন। শিশুরা তাকে তাদের সাথে খেলতে ডাকতো। কিন্তু তিনি উত্তরে বলতেনঃ “আমাদেরকে খেলা করার জন্যে সৃষ্টি করা হয় নাই। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হযরত যাকারিয়ার (আঃ) জন্যে হযরত ইয়াহইয়ার (আঃ) অস্তিত্ব ছিল আমার করুণার প্রতীক, যার উপর আমি ছাড়া আর কেউই সক্ষম নয়। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! (আরবী) এর ভাবার্থ কি তা আমার জানা নেই। অভিধানে এটা প্রেম,প্রীতি, করুণা ইত্যাদি অর্থে এসে থাকে। বাহ্যতঃ ভাবার্থ এটাই জানা যাচ্ছে তাকে প্রেম, প্রীতি, স্নেহ এবং পবিত্রতা দান করেছিলাম।"হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামে একটি লোক এক হাজার বছর পর্যন্ত (আরবী) ও (আরবী) বলে ডাকতে থাকবে। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে) হযরত ইয়াহ্ইয়া (আঃ) সর্বপ্রকারের ময়লা হতে, পাপ। হতে এবং নাফরমানী হতে তিনি মুক্ত ছিলেন। তাঁর জীবনের একমাত্র কাজ ছিল সৎ কার্যাবলী সম্পাদন। তিনি পাপকার্য ও আল্লাহর অবাধ্যাচরণ হতে বহু দূরে ছিলেন। সাথে সাথে তিনি পিতা-মাতার অনুগত ছিলেন এবং তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করতেন। কখনো কোন কাজে তিনি পিতা-মাতার অবাধ্য হন নাই। কখনো তিনি তাঁদের কোন কথার বিরোধিতা করেন নাই। তারা যে কাজ করতে নিষেধ করতেন তা তিনি কখনো করতেন না। তাঁর মধ্যে কোন ঔদ্ধত্যপনা ও হঠকারিতা ছিল না। এই উত্তম গুণাবলী ও প্রশংসনীয় স্বভাবের কারণে তিনটি অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁকে শান্তি ও নিরাপত্তা দান করেছিলেন। অর্থাৎ জন্মের দিন, মৃত্যুর দিন এবং হাশরের দিন। এই তিনটি জায়গাই অতি ভয়াবহ ও অজানা। মায়ের পেট থেকে বের হওয়া মাত্রই একটি নতুন দুনিয়া দেখা যায় যা আজকের দুনিয়া হতে বিরাট ও সম্পূর্ণ পৃথকরূপে পরিলক্ষিত হয়। মৃত্যুর দিন ঐ মাখলুকের সাথে সম্বন্ধ হয়ে যায়। যাদের সাথে পার্থিব জীবনে কোনই সম্বন্ধ ছিল না। তাদেরকে কখনো দেখেও নাই। এইভাবে হাশরের দিন নিজেকে একটা বিরাট জন সমাবেশে দেখে মানুষ অত্যন্ত হতভম্ব ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে। কেননা, ওটাও একটা নতুন পরিবেশ। এই তিন ভয়াবহ সময়ে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করবেন।একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন সমস্ত লোক কিছু না কিছু গুনাহ নিয়ে যাবে, একমাত্র হযরত ইয়াহইয়া ছাড়া। হযরত কাতাদা’ (রাঃ) বলেন যে, হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) গুনাহ্ করা তো দূরের কথা, গুনা হর কখনো কোন ইচ্ছাও করেন নি। (এটা মারফু’রূপে এবং দুই সনদেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু দুটো সনদই দুর্বল। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) পরস্পর সাক্ষাৎ হলে হযরত ঈসা (আঃ) হযরত ইয়াহইয়াকে (আঃ) বলেনঃ “আপনি আমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থণা করুন! আপনি আমার চেয়ে উত্তম।" উত্তরে হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) বলেনঃ “আপনিই আমার চেয়ে উত্তম।” তখন হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “আমি তো নিজেই নিজের উপর সালাম বলেছি, আর আপনার উপর স্বয়ং আল্লাহ সালাম বলেছেন।” এখন এই দুই নবীর (আঃ) ফযীলত প্রকাশ হয়ে পড়লো।
মারইয়াম 19:14
১২-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলার শুভ সংবাদ অনুযায়ী হযরত যাকারিয়ার (আঃ) ঔরষে হযরত ইয়াহইয়া জন্ম গ্রহণ করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাওরাত শিক্ষা দেন যা তার উপর পাঠ করা হতো এবং যার হুকুম সমূহ সৎলোকেরা ও নবীগণ অন্যদের নিকট প্রচার করতেন। ঐ সময় তিনি ছোট বালক ছিলেন। এ জন্যেই মহান আল্লাহ তাঁর ঐ অসাধারণ নিয়ামতেরও বর্ণনা দিয়েছেন যে, তিনি হযরত যাকারিয়াকে (আঃ) সন্তানও দান করেন এবং তাঁকে বাল্যাব স্থাতেই আসমানী কিতাবের আলেমও বানিয়ে দেন। আর তাকে নির্দেশ দেনঃ “কিতাবকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করো ও তা শিখে নাও।" আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ “সাথে সাথে আমি তাকে ঐ অল্প বয়সেই বোধসম্পন্ন জ্ঞান, শক্তি, দৃঢ়তা, বুদ্ধিমত্তা এবং সহনশীলতা দান করেছিলাম।” শৈশবেই তিনি সৎ কাজের প্রতি ঝুঁকে পড়েন এবং চেষ্টা ও আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর ইবাদত ও জনসেবার কাজে লেগে পড়েন। শিশুরা তাকে তাদের সাথে খেলতে ডাকতো। কিন্তু তিনি উত্তরে বলতেনঃ “আমাদেরকে খেলা করার জন্যে সৃষ্টি করা হয় নাই। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হযরত যাকারিয়ার (আঃ) জন্যে হযরত ইয়াহইয়ার (আঃ) অস্তিত্ব ছিল আমার করুণার প্রতীক, যার উপর আমি ছাড়া আর কেউই সক্ষম নয়। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! (আরবী) এর ভাবার্থ কি তা আমার জানা নেই। অভিধানে এটা প্রেম,প্রীতি, করুণা ইত্যাদি অর্থে এসে থাকে। বাহ্যতঃ ভাবার্থ এটাই জানা যাচ্ছে তাকে প্রেম, প্রীতি, স্নেহ এবং পবিত্রতা দান করেছিলাম।"হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামে একটি লোক এক হাজার বছর পর্যন্ত (আরবী) ও (আরবী) বলে ডাকতে থাকবে। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে) হযরত ইয়াহ্ইয়া (আঃ) সর্বপ্রকারের ময়লা হতে, পাপ। হতে এবং নাফরমানী হতে তিনি মুক্ত ছিলেন। তাঁর জীবনের একমাত্র কাজ ছিল সৎ কার্যাবলী সম্পাদন। তিনি পাপকার্য ও আল্লাহর অবাধ্যাচরণ হতে বহু দূরে ছিলেন। সাথে সাথে তিনি পিতা-মাতার অনুগত ছিলেন এবং তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করতেন। কখনো কোন কাজে তিনি পিতা-মাতার অবাধ্য হন নাই। কখনো তিনি তাঁদের কোন কথার বিরোধিতা করেন নাই। তারা যে কাজ করতে নিষেধ করতেন তা তিনি কখনো করতেন না। তাঁর মধ্যে কোন ঔদ্ধত্যপনা ও হঠকারিতা ছিল না। এই উত্তম গুণাবলী ও প্রশংসনীয় স্বভাবের কারণে তিনটি অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁকে শান্তি ও নিরাপত্তা দান করেছিলেন। অর্থাৎ জন্মের দিন, মৃত্যুর দিন এবং হাশরের দিন। এই তিনটি জায়গাই অতি ভয়াবহ ও অজানা। মায়ের পেট থেকে বের হওয়া মাত্রই একটি নতুন দুনিয়া দেখা যায় যা আজকের দুনিয়া হতে বিরাট ও সম্পূর্ণ পৃথকরূপে পরিলক্ষিত হয়। মৃত্যুর দিন ঐ মাখলুকের সাথে সম্বন্ধ হয়ে যায়। যাদের সাথে পার্থিব জীবনে কোনই সম্বন্ধ ছিল না। তাদেরকে কখনো দেখেও নাই। এইভাবে হাশরের দিন নিজেকে একটা বিরাট জন সমাবেশে দেখে মানুষ অত্যন্ত হতভম্ব ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে। কেননা, ওটাও একটা নতুন পরিবেশ। এই তিন ভয়াবহ সময়ে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করবেন।একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন সমস্ত লোক কিছু না কিছু গুনাহ নিয়ে যাবে, একমাত্র হযরত ইয়াহইয়া ছাড়া। হযরত কাতাদা’ (রাঃ) বলেন যে, হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) গুনাহ্ করা তো দূরের কথা, গুনা হর কখনো কোন ইচ্ছাও করেন নি। (এটা মারফু’রূপে এবং দুই সনদেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু দুটো সনদই দুর্বল। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) পরস্পর সাক্ষাৎ হলে হযরত ঈসা (আঃ) হযরত ইয়াহইয়াকে (আঃ) বলেনঃ “আপনি আমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থণা করুন! আপনি আমার চেয়ে উত্তম।" উত্তরে হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) বলেনঃ “আপনিই আমার চেয়ে উত্তম।” তখন হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “আমি তো নিজেই নিজের উপর সালাম বলেছি, আর আপনার উপর স্বয়ং আল্লাহ সালাম বলেছেন।” এখন এই দুই নবীর (আঃ) ফযীলত প্রকাশ হয়ে পড়লো।
মারইয়াম 19:15
১২-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলার শুভ সংবাদ অনুযায়ী হযরত যাকারিয়ার (আঃ) ঔরষে হযরত ইয়াহইয়া জন্ম গ্রহণ করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাওরাত শিক্ষা দেন যা তার উপর পাঠ করা হতো এবং যার হুকুম সমূহ সৎলোকেরা ও নবীগণ অন্যদের নিকট প্রচার করতেন। ঐ সময় তিনি ছোট বালক ছিলেন। এ জন্যেই মহান আল্লাহ তাঁর ঐ অসাধারণ নিয়ামতেরও বর্ণনা দিয়েছেন যে, তিনি হযরত যাকারিয়াকে (আঃ) সন্তানও দান করেন এবং তাঁকে বাল্যাব স্থাতেই আসমানী কিতাবের আলেমও বানিয়ে দেন। আর তাকে নির্দেশ দেনঃ “কিতাবকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করো ও তা শিখে নাও।" আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ “সাথে সাথে আমি তাকে ঐ অল্প বয়সেই বোধসম্পন্ন জ্ঞান, শক্তি, দৃঢ়তা, বুদ্ধিমত্তা এবং সহনশীলতা দান করেছিলাম।” শৈশবেই তিনি সৎ কাজের প্রতি ঝুঁকে পড়েন এবং চেষ্টা ও আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর ইবাদত ও জনসেবার কাজে লেগে পড়েন। শিশুরা তাকে তাদের সাথে খেলতে ডাকতো। কিন্তু তিনি উত্তরে বলতেনঃ “আমাদেরকে খেলা করার জন্যে সৃষ্টি করা হয় নাই। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হযরত যাকারিয়ার (আঃ) জন্যে হযরত ইয়াহইয়ার (আঃ) অস্তিত্ব ছিল আমার করুণার প্রতীক, যার উপর আমি ছাড়া আর কেউই সক্ষম নয়। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! (আরবী) এর ভাবার্থ কি তা আমার জানা নেই। অভিধানে এটা প্রেম,প্রীতি, করুণা ইত্যাদি অর্থে এসে থাকে। বাহ্যতঃ ভাবার্থ এটাই জানা যাচ্ছে তাকে প্রেম, প্রীতি, স্নেহ এবং পবিত্রতা দান করেছিলাম।"হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামে একটি লোক এক হাজার বছর পর্যন্ত (আরবী) ও (আরবী) বলে ডাকতে থাকবে। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে) হযরত ইয়াহ্ইয়া (আঃ) সর্বপ্রকারের ময়লা হতে, পাপ। হতে এবং নাফরমানী হতে তিনি মুক্ত ছিলেন। তাঁর জীবনের একমাত্র কাজ ছিল সৎ কার্যাবলী সম্পাদন। তিনি পাপকার্য ও আল্লাহর অবাধ্যাচরণ হতে বহু দূরে ছিলেন। সাথে সাথে তিনি পিতা-মাতার অনুগত ছিলেন এবং তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করতেন। কখনো কোন কাজে তিনি পিতা-মাতার অবাধ্য হন নাই। কখনো তিনি তাঁদের কোন কথার বিরোধিতা করেন নাই। তারা যে কাজ করতে নিষেধ করতেন তা তিনি কখনো করতেন না। তাঁর মধ্যে কোন ঔদ্ধত্যপনা ও হঠকারিতা ছিল না। এই উত্তম গুণাবলী ও প্রশংসনীয় স্বভাবের কারণে তিনটি অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁকে শান্তি ও নিরাপত্তা দান করেছিলেন। অর্থাৎ জন্মের দিন, মৃত্যুর দিন এবং হাশরের দিন। এই তিনটি জায়গাই অতি ভয়াবহ ও অজানা। মায়ের পেট থেকে বের হওয়া মাত্রই একটি নতুন দুনিয়া দেখা যায় যা আজকের দুনিয়া হতে বিরাট ও সম্পূর্ণ পৃথকরূপে পরিলক্ষিত হয়। মৃত্যুর দিন ঐ মাখলুকের সাথে সম্বন্ধ হয়ে যায়। যাদের সাথে পার্থিব জীবনে কোনই সম্বন্ধ ছিল না। তাদেরকে কখনো দেখেও নাই। এইভাবে হাশরের দিন নিজেকে একটা বিরাট জন সমাবেশে দেখে মানুষ অত্যন্ত হতভম্ব ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে। কেননা, ওটাও একটা নতুন পরিবেশ। এই তিন ভয়াবহ সময়ে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করবেন।একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন সমস্ত লোক কিছু না কিছু গুনাহ নিয়ে যাবে, একমাত্র হযরত ইয়াহইয়া ছাড়া। হযরত কাতাদা’ (রাঃ) বলেন যে, হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) গুনাহ্ করা তো দূরের কথা, গুনা হর কখনো কোন ইচ্ছাও করেন নি। (এটা মারফু’রূপে এবং দুই সনদেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু দুটো সনদই দুর্বল। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) পরস্পর সাক্ষাৎ হলে হযরত ঈসা (আঃ) হযরত ইয়াহইয়াকে (আঃ) বলেনঃ “আপনি আমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থণা করুন! আপনি আমার চেয়ে উত্তম।" উত্তরে হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) বলেনঃ “আপনিই আমার চেয়ে উত্তম।” তখন হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “আমি তো নিজেই নিজের উপর সালাম বলেছি, আর আপনার উপর স্বয়ং আল্লাহ সালাম বলেছেন।” এখন এই দুই নবীর (আঃ) ফযীলত প্রকাশ হয়ে পড়লো।
মারইয়াম 19:16
১৬-২১ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বে হযরত যাকারিয়ার (আঃ) ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছিল এবং এই বর্ণনা দেয়া হয়েছিল যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) পূর্ণ বার্ধক্যে উপনীত হওয়া পর্যন্ত সন্তানহীন ছিলেন। তার স্ত্রীর মধ্যে সন্তান লাভের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা নিজের ক্ষমতাবলে তাদেরকে সন্তান দান করেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও খোদাভীরু। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর এর চেয়েও বড় ক্ষমতার নিদর্শন পেশ করছেন। এখানে তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি ছিলেন চির কুমারী। কোন পুরুষ তাকে কখনো স্পর্শ করে নাই। এভাবে বিনা পুরুষেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতাবলে তাঁকে সন্তান দান করেন। তার গর্ভে হযরত ঈসার (আঃ) জন্ম হয়, যিনি আল্লাহর মনোনীত নবী এবং তার রূহ ও কালেমা ছিলেন। এই দু'টি ঘটনায় পূর্ণভাবে পারস্পরিক সম্বন্ধ রয়েছে বলে এখানে এবং সূরায়ে আল ইমরান ও সূরায়ে আম্বিয়াতেও এ দুটি ঘটনাকে মিলিতভাবে বর্ণনা করেছেন, যাতে বান্দা আল্লাহ তাআলার অতুলনীয় ক্ষমতা এবং ব্যাপক প্রতিপত্তি পর্যবেক্ষণ করে।হযরত মারইয়াম (আঃ) হযরত ইমরানের কন্যা ছিলেন। তিনি ছিলেন হযরত দাউদের (আঃ) বংশধর। এই পরিবারটি বানী ইসরাঈলের মধ্যে পবিত্র পরিবার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। সুরায়ে আল-ইমরানে তার জন্মের বিস্তারিত বিবরণ গত হয়েছে। ঐ যুগের প্রথা অনুযায়ী হযরত মারইয়ামের (আঃ) মাতা তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে কুদৃসের খিদমতের জন্যে পার্থিব কাজ কর্ম হতে আযাদ করে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর এই নর কবুল করেছিলেন। 'উত্তমরূপে তিনিহযরত মারইয়ামকে (আঃ) বড় করে তুলেছিলেন। তিনি আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী, দুনিয়ার প্রতি ঔদাসীন্য এবং সংযমী শীলতায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তার ইবাদত, আধ্যাত্মিক সাধনা ও তাকওয়ার কথা সর্বসাধারণের মুখে আলোচিত হতে থাকে। তাঁর লালন পালনের দায়িত্বভার তাঁর খালু হযরত যাকারিয়া (আঃ) গ্রহণ করেছিলেন। ঐ সময় তিনি ছিলেন বাণী ইসরাঈলের নবী। সমস্ত বাণী ইসরাঈল তাদের ধর্মীয় কাজে তাঁরই অনুসারী ছিল। হযরত যাকারিয়ার (আঃ) কাছে হযরত মারইয়ামের (আঃ) বহু অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেয়ে ছিল। বিশেষ করে যখনই তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ইবাদত খানায় প্রবেশ করতেন, তখন তিনি তার কাছে নতুন ধরণের অমওসূমী ফল দেখতে পেতেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করতেনঃ “হে মারইয়াম! এই ফল কোথা হতে আসলো?" উত্তরে তিনি বলতেনঃ “এগুলি আল্লাহ তাআলার নিকট হতে এসেছে। তিনি এমন ক্ষমতাবান যে, যাকে ইচ্ছা করেন বে হিসেবে রিক দান করে থাকেন।অতঃপর আল্লাহ তাআ'লা হযরত মারইয়ামের (আঃ) গর্ভে হযরত ঈসাকে (আঃ) সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, যিনি পঁচিজন স্থির প্রতিজ্ঞ নবীদের একজন ছিলেন। হযরত মারইয়াম (আঃ) মসজিদে কুদসের পূর্ব দিকে গমন করেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হায়েয বা মাসিক ঋতুর কারণেই তিনি ঐ দিকে গিয়েছিলেন। অন্যদের মতে তিনি অন্য কোন কারণে গিয়েছিলেন। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে কিতাবের উপর বায়তুল্লাহ মুখী হওয়া ও হজ্ব করা ফরয করা হয়েছিল। কিন্তু হযরত মারইয়াম (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস হতে পুর্ব দিকে গমন করেছিলেন বলে তারা পূর্ব মুখী হয়েই নামায পড়তে শুরু করে দেয়। হযরত ঈসার (আঃ) জন্মস্থানকে তারা নিজেরাই কিবলা বানিয়ে নেয়। বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) যে জায়গায় গিয়েছিলেন সেটা ছিল ঐ জনদপ হতে দূরে এক নির্জন স্থান। কথিত আছে যে, সেখানে তার শস্যক্ষেত্র ছিল এবং তাতে তিনি পানি দিতে গিয়েছিলেন। একথাও বলা হয়েছে যে, সেখানে তিনি একটি কক্ষ বানিয়ে নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি জনগণ হতে পৃথক হয়ে নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। যখন হযরত মারইয়াম (আঃ) জনগণ হতে পৃথক হয়ে দূরে চলে যান এবং তাদের মধ্যে ও তার মধ্যে আড়াল হয়ে যায় তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে ফেরেশতা হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) প্রেরণ করেন। তিনি পূর্ণ মানবাকৃতিতে তার সামনে প্রকাশিত হন। এখানে ‘রূহ দ্বারা এই মর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতাকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন কুরআন কারীমের (আরবী) এই আয়াতে রয়েছে। হযরত উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ) বলেন যে, রোযে আযলে যখন হযরত আদমের (আঃ) সমস্ত সন্তানের রূহসমূহের নিকট হতে তার প্রতিপালক হওয়ার স্বীকারোক্তি নিয়েছিলেন ঐ রূহগুলির মধ্যে হযরত ঈসার (আঃ) রহও ছিল। ঐ রূহকেই মানবাকৃতিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত মারইয়ামের (আঃ) নিকট পাঠানো হয়। ঐ রূহই তার সাথে কথা বলেন এবং তার দেহের মধ্যে প্রবেশ করেন। (কিন্তু এই উক্তিটি অস্বাভাবিক হওয়া ছাড়াও সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার্য। খুব সম্ভব এটা বাণী ইসরাঈলেরই উক্তি হবে)হযরত মারইয়াম (আঃ) ঐ জনশূন্য স্থানে একজন অপরিচিত লোক দেখে মনে করেন যে, হয়তো কোন দুষ্ট প্রকৃতির লোক হবে। তাকে তিনি আল্লাহর ভয় দেখিয়ে বলেনঃ “আপনি খোদাভীরু লোক হলে তাকে ভয় করুন। আমি তারই কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।” তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য দেখেই হযরত মারইয়াম (আঃ) বুঝে ফেলেছিলেন যে, তিনি ভাল লোকই হবেন এবং তিনি জানতেন যে, ভাল লোকের জন্যে আল্লাহর ভয়ই যথেষ্ট। ফেরেশতা হযরত মারইয়ামের (আঃ) ভয় ভীতি দূর করে দেয়ার জন্যে পরিষ্কার ভাবে বলেনঃ “আপনি অন্য কোন ধারণা করবেন না, আমি আল্লাহ তাআলার প্রেরিত ফেরেশতা।” বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলার নাম শুনেই হযরত জিবরাঈল (আঃ) কেঁপে উঠেন এবং নিজের প্রকৃতরূপ ধারণ করেন। আর বলে দেনঃ “ আমি আল্লাহর একজন দূত রূপে প্রেরিত হয়েছি। তিনি আমাকে এজন্যেই প্রেরণ করেছেন যে, তিনি আপনাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তান দান করবেন।”(আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) রয়েছে। প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত কারী আবু উমার ইবনু আলার কিরআত এটাই। দুটো কিরআতেরই মতলব পরিষ্কার। হযরত জিবরাঈলের (আঃ) এ কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) আরো বেশী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! আমরি সন্তান হওয়া কি করে সম্ব? আমার তো বিয়েই হয় নাই এবং কখনো কোন খারাপ খেয়াল আমার মনে জাগে নাই। আমার দেহ কখনো কোন পুরুষ লোক স্পর্শ করে নাই এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই। সুতরাং আমার সন্তান হওয়া কেমন কথা।"(আরবী) শব্দ দ্বারা ব্যভিচারিণীকে বুঝানো হয়েছে। হাদীসেও এই শব্দটি এই অর্থেই এসেছে। যেমন বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ব্যভিচারিণীর খরচা হারাম।হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর এই বিস্ময় দূর করার জন্যে বলেনঃ “এটা সত্য বটে, তবে স্বামী ছাড়া বা অন্য কোন উপকরণ ও উপাদান ছাড়াও আল্লাহ তাআলা সন্তান দানে সক্ষম। তিনি যা চান তাই হয়। তিনি এই সন্তান ও এই ঘটনাকে মানুষের জন্যে একটা নিদর্শন বানাতে চান। এটা আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন হবে যে, তিনি সর্ব প্রকারের সষ্টির উপরই সক্ষম। হযরত আদমকে (আঃ) তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। হাওয়াকে (আঃ) তিনি সৃষ্টি করেছেন নারী ছাড়াই-শুধু পুরুষের মাধ্যমে। বাকী সমস্ত মানুষকে তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। শুধু হযরত ঈসা (আঃ) এই নিয়মের ব্যতিক্রম। তিনি পুরুষ ছাড়াই শুধু নারীর মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছেন। সুতরাং মানব সৃষ্টির এই চারটি নিয়ম হতে পারে এবং সবটাই মহান আল্লাহ পুরো করে দেখিয়েছেন। এভাবে তিনি নিজের ব্যাপক ও পূর্ণক্ষমতা ও বিরাটত্বের দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। এটা বাস্তব কথা যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই এবং কোন প্রতিপালকও নেই। এই শিশু আল্লাহর রহমতরূপে পরিগণিত হবেন। তিনি তাঁর নবী হবেন। তিনি মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহবান করবেন।" অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “যখন ফেরেশতাগণ বললোঃ হে মারইয়াম (আঃ)! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন একটি কালেমার যা আল্লাহর পক্ষ হতে হবে; তার নাম হবে মাসীহ্ ঈসা ইবনু মারইয়াম; সম্মানিত হবে ইহলোকে এবং পরলোকে, আর সান্নিধ্য প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। মানুষের সাথে কথা বলবে দোলনার মধ্যে এবং প্রাপ্ত বয়সে এবং সসভ্য লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ তিনি বাল্যাবস্থায় ও বৃদ্ধ বয়সে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহবান করবেন।হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “ঈসা (আঃ) আমার পেটে থাকা অবস্থায় যখন আমি নির্জনে থাকতাম তখন সে আমার সাথে কথা বলতো। আর যখন আমি লোকদের সাথে থাকতাম তখন সে তাসবীহ ও তাকবীর পাঠ করতো।" (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ঘোষিত হচ্ছেঃ এটাতো এক স্থিরকৃত ব্যাপার। খুব সম্ভব যে, এটাও হযরত জিবরাঈলেরই (আঃ) উক্তি। আবার এও হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলার এই ফরমান রাসূলুল্লাহর (সঃ) মাধ্যমে ঘোষিত হয়েছে। আর এর দ্বারা রূহ ফুকে দেয়াই উদ্দেশ্য। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “ইমরানের কন্যা মারইয়াম (আঃ), যে তার গুপ্তাঙ্গকে পবিত্র রেখেছিল এবং আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুকে ছিলাম।” সুতরাং এই বাক্যের ভাবার্থ হচ্ছেঃ এটা তো হয়েই যাবে। আল্লাহ তাআলা এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
মারইয়াম 19:17
১৬-২১ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বে হযরত যাকারিয়ার (আঃ) ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছিল এবং এই বর্ণনা দেয়া হয়েছিল যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) পূর্ণ বার্ধক্যে উপনীত হওয়া পর্যন্ত সন্তানহীন ছিলেন। তার স্ত্রীর মধ্যে সন্তান লাভের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা নিজের ক্ষমতাবলে তাদেরকে সন্তান দান করেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও খোদাভীরু। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর এর চেয়েও বড় ক্ষমতার নিদর্শন পেশ করছেন। এখানে তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি ছিলেন চির কুমারী। কোন পুরুষ তাকে কখনো স্পর্শ করে নাই। এভাবে বিনা পুরুষেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতাবলে তাঁকে সন্তান দান করেন। তার গর্ভে হযরত ঈসার (আঃ) জন্ম হয়, যিনি আল্লাহর মনোনীত নবী এবং তার রূহ ও কালেমা ছিলেন। এই দু'টি ঘটনায় পূর্ণভাবে পারস্পরিক সম্বন্ধ রয়েছে বলে এখানে এবং সূরায়ে আল ইমরান ও সূরায়ে আম্বিয়াতেও এ দুটি ঘটনাকে মিলিতভাবে বর্ণনা করেছেন, যাতে বান্দা আল্লাহ তাআলার অতুলনীয় ক্ষমতা এবং ব্যাপক প্রতিপত্তি পর্যবেক্ষণ করে।হযরত মারইয়াম (আঃ) হযরত ইমরানের কন্যা ছিলেন। তিনি ছিলেন হযরত দাউদের (আঃ) বংশধর। এই পরিবারটি বানী ইসরাঈলের মধ্যে পবিত্র পরিবার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। সুরায়ে আল-ইমরানে তার জন্মের বিস্তারিত বিবরণ গত হয়েছে। ঐ যুগের প্রথা অনুযায়ী হযরত মারইয়ামের (আঃ) মাতা তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে কুদৃসের খিদমতের জন্যে পার্থিব কাজ কর্ম হতে আযাদ করে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর এই নর কবুল করেছিলেন। 'উত্তমরূপে তিনিহযরত মারইয়ামকে (আঃ) বড় করে তুলেছিলেন। তিনি আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী, দুনিয়ার প্রতি ঔদাসীন্য এবং সংযমী শীলতায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তার ইবাদত, আধ্যাত্মিক সাধনা ও তাকওয়ার কথা সর্বসাধারণের মুখে আলোচিত হতে থাকে। তাঁর লালন পালনের দায়িত্বভার তাঁর খালু হযরত যাকারিয়া (আঃ) গ্রহণ করেছিলেন। ঐ সময় তিনি ছিলেন বাণী ইসরাঈলের নবী। সমস্ত বাণী ইসরাঈল তাদের ধর্মীয় কাজে তাঁরই অনুসারী ছিল। হযরত যাকারিয়ার (আঃ) কাছে হযরত মারইয়ামের (আঃ) বহু অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেয়ে ছিল। বিশেষ করে যখনই তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ইবাদত খানায় প্রবেশ করতেন, তখন তিনি তার কাছে নতুন ধরণের অমওসূমী ফল দেখতে পেতেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করতেনঃ “হে মারইয়াম! এই ফল কোথা হতে আসলো?" উত্তরে তিনি বলতেনঃ “এগুলি আল্লাহ তাআলার নিকট হতে এসেছে। তিনি এমন ক্ষমতাবান যে, যাকে ইচ্ছা করেন বে হিসেবে রিক দান করে থাকেন।অতঃপর আল্লাহ তাআ'লা হযরত মারইয়ামের (আঃ) গর্ভে হযরত ঈসাকে (আঃ) সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, যিনি পঁচিজন স্থির প্রতিজ্ঞ নবীদের একজন ছিলেন। হযরত মারইয়াম (আঃ) মসজিদে কুদসের পূর্ব দিকে গমন করেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হায়েয বা মাসিক ঋতুর কারণেই তিনি ঐ দিকে গিয়েছিলেন। অন্যদের মতে তিনি অন্য কোন কারণে গিয়েছিলেন। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে কিতাবের উপর বায়তুল্লাহ মুখী হওয়া ও হজ্ব করা ফরয করা হয়েছিল। কিন্তু হযরত মারইয়াম (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস হতে পুর্ব দিকে গমন করেছিলেন বলে তারা পূর্ব মুখী হয়েই নামায পড়তে শুরু করে দেয়। হযরত ঈসার (আঃ) জন্মস্থানকে তারা নিজেরাই কিবলা বানিয়ে নেয়। বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) যে জায়গায় গিয়েছিলেন সেটা ছিল ঐ জনদপ হতে দূরে এক নির্জন স্থান। কথিত আছে যে, সেখানে তার শস্যক্ষেত্র ছিল এবং তাতে তিনি পানি দিতে গিয়েছিলেন। একথাও বলা হয়েছে যে, সেখানে তিনি একটি কক্ষ বানিয়ে নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি জনগণ হতে পৃথক হয়ে নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। যখন হযরত মারইয়াম (আঃ) জনগণ হতে পৃথক হয়ে দূরে চলে যান এবং তাদের মধ্যে ও তার মধ্যে আড়াল হয়ে যায় তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে ফেরেশতা হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) প্রেরণ করেন। তিনি পূর্ণ মানবাকৃতিতে তার সামনে প্রকাশিত হন। এখানে ‘রূহ দ্বারা এই মর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতাকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন কুরআন কারীমের (আরবী) এই আয়াতে রয়েছে। হযরত উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ) বলেন যে, রোযে আযলে যখন হযরত আদমের (আঃ) সমস্ত সন্তানের রূহসমূহের নিকট হতে তার প্রতিপালক হওয়ার স্বীকারোক্তি নিয়েছিলেন ঐ রূহগুলির মধ্যে হযরত ঈসার (আঃ) রহও ছিল। ঐ রূহকেই মানবাকৃতিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত মারইয়ামের (আঃ) নিকট পাঠানো হয়। ঐ রূহই তার সাথে কথা বলেন এবং তার দেহের মধ্যে প্রবেশ করেন। (কিন্তু এই উক্তিটি অস্বাভাবিক হওয়া ছাড়াও সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার্য। খুব সম্ভব এটা বাণী ইসরাঈলেরই উক্তি হবে)হযরত মারইয়াম (আঃ) ঐ জনশূন্য স্থানে একজন অপরিচিত লোক দেখে মনে করেন যে, হয়তো কোন দুষ্ট প্রকৃতির লোক হবে। তাকে তিনি আল্লাহর ভয় দেখিয়ে বলেনঃ “আপনি খোদাভীরু লোক হলে তাকে ভয় করুন। আমি তারই কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।” তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য দেখেই হযরত মারইয়াম (আঃ) বুঝে ফেলেছিলেন যে, তিনি ভাল লোকই হবেন এবং তিনি জানতেন যে, ভাল লোকের জন্যে আল্লাহর ভয়ই যথেষ্ট। ফেরেশতা হযরত মারইয়ামের (আঃ) ভয় ভীতি দূর করে দেয়ার জন্যে পরিষ্কার ভাবে বলেনঃ “আপনি অন্য কোন ধারণা করবেন না, আমি আল্লাহ তাআলার প্রেরিত ফেরেশতা।” বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলার নাম শুনেই হযরত জিবরাঈল (আঃ) কেঁপে উঠেন এবং নিজের প্রকৃতরূপ ধারণ করেন। আর বলে দেনঃ “ আমি আল্লাহর একজন দূত রূপে প্রেরিত হয়েছি। তিনি আমাকে এজন্যেই প্রেরণ করেছেন যে, তিনি আপনাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তান দান করবেন।”(আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) রয়েছে। প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত কারী আবু উমার ইবনু আলার কিরআত এটাই। দুটো কিরআতেরই মতলব পরিষ্কার। হযরত জিবরাঈলের (আঃ) এ কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) আরো বেশী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! আমরি সন্তান হওয়া কি করে সম্ব? আমার তো বিয়েই হয় নাই এবং কখনো কোন খারাপ খেয়াল আমার মনে জাগে নাই। আমার দেহ কখনো কোন পুরুষ লোক স্পর্শ করে নাই এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই। সুতরাং আমার সন্তান হওয়া কেমন কথা।"(আরবী) শব্দ দ্বারা ব্যভিচারিণীকে বুঝানো হয়েছে। হাদীসেও এই শব্দটি এই অর্থেই এসেছে। যেমন বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ব্যভিচারিণীর খরচা হারাম।হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর এই বিস্ময় দূর করার জন্যে বলেনঃ “এটা সত্য বটে, তবে স্বামী ছাড়া বা অন্য কোন উপকরণ ও উপাদান ছাড়াও আল্লাহ তাআলা সন্তান দানে সক্ষম। তিনি যা চান তাই হয়। তিনি এই সন্তান ও এই ঘটনাকে মানুষের জন্যে একটা নিদর্শন বানাতে চান। এটা আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন হবে যে, তিনি সর্ব প্রকারের সষ্টির উপরই সক্ষম। হযরত আদমকে (আঃ) তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। হাওয়াকে (আঃ) তিনি সৃষ্টি করেছেন নারী ছাড়াই-শুধু পুরুষের মাধ্যমে। বাকী সমস্ত মানুষকে তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। শুধু হযরত ঈসা (আঃ) এই নিয়মের ব্যতিক্রম। তিনি পুরুষ ছাড়াই শুধু নারীর মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছেন। সুতরাং মানব সৃষ্টির এই চারটি নিয়ম হতে পারে এবং সবটাই মহান আল্লাহ পুরো করে দেখিয়েছেন। এভাবে তিনি নিজের ব্যাপক ও পূর্ণক্ষমতা ও বিরাটত্বের দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। এটা বাস্তব কথা যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই এবং কোন প্রতিপালকও নেই। এই শিশু আল্লাহর রহমতরূপে পরিগণিত হবেন। তিনি তাঁর নবী হবেন। তিনি মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহবান করবেন।" অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “যখন ফেরেশতাগণ বললোঃ হে মারইয়াম (আঃ)! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন একটি কালেমার যা আল্লাহর পক্ষ হতে হবে; তার নাম হবে মাসীহ্ ঈসা ইবনু মারইয়াম; সম্মানিত হবে ইহলোকে এবং পরলোকে, আর সান্নিধ্য প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। মানুষের সাথে কথা বলবে দোলনার মধ্যে এবং প্রাপ্ত বয়সে এবং সসভ্য লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ তিনি বাল্যাবস্থায় ও বৃদ্ধ বয়সে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহবান করবেন।হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “ঈসা (আঃ) আমার পেটে থাকা অবস্থায় যখন আমি নির্জনে থাকতাম তখন সে আমার সাথে কথা বলতো। আর যখন আমি লোকদের সাথে থাকতাম তখন সে তাসবীহ ও তাকবীর পাঠ করতো।" (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ঘোষিত হচ্ছেঃ এটাতো এক স্থিরকৃত ব্যাপার। খুব সম্ভব যে, এটাও হযরত জিবরাঈলেরই (আঃ) উক্তি। আবার এও হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলার এই ফরমান রাসূলুল্লাহর (সঃ) মাধ্যমে ঘোষিত হয়েছে। আর এর দ্বারা রূহ ফুকে দেয়াই উদ্দেশ্য। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “ইমরানের কন্যা মারইয়াম (আঃ), যে তার গুপ্তাঙ্গকে পবিত্র রেখেছিল এবং আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুকে ছিলাম।” সুতরাং এই বাক্যের ভাবার্থ হচ্ছেঃ এটা তো হয়েই যাবে। আল্লাহ তাআলা এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
মারইয়াম 19:18
১৬-২১ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বে হযরত যাকারিয়ার (আঃ) ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছিল এবং এই বর্ণনা দেয়া হয়েছিল যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) পূর্ণ বার্ধক্যে উপনীত হওয়া পর্যন্ত সন্তানহীন ছিলেন। তার স্ত্রীর মধ্যে সন্তান লাভের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা নিজের ক্ষমতাবলে তাদেরকে সন্তান দান করেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও খোদাভীরু। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর এর চেয়েও বড় ক্ষমতার নিদর্শন পেশ করছেন। এখানে তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি ছিলেন চির কুমারী। কোন পুরুষ তাকে কখনো স্পর্শ করে নাই। এভাবে বিনা পুরুষেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতাবলে তাঁকে সন্তান দান করেন। তার গর্ভে হযরত ঈসার (আঃ) জন্ম হয়, যিনি আল্লাহর মনোনীত নবী এবং তার রূহ ও কালেমা ছিলেন। এই দু'টি ঘটনায় পূর্ণভাবে পারস্পরিক সম্বন্ধ রয়েছে বলে এখানে এবং সূরায়ে আল ইমরান ও সূরায়ে আম্বিয়াতেও এ দুটি ঘটনাকে মিলিতভাবে বর্ণনা করেছেন, যাতে বান্দা আল্লাহ তাআলার অতুলনীয় ক্ষমতা এবং ব্যাপক প্রতিপত্তি পর্যবেক্ষণ করে।হযরত মারইয়াম (আঃ) হযরত ইমরানের কন্যা ছিলেন। তিনি ছিলেন হযরত দাউদের (আঃ) বংশধর। এই পরিবারটি বানী ইসরাঈলের মধ্যে পবিত্র পরিবার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। সুরায়ে আল-ইমরানে তার জন্মের বিস্তারিত বিবরণ গত হয়েছে। ঐ যুগের প্রথা অনুযায়ী হযরত মারইয়ামের (আঃ) মাতা তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে কুদৃসের খিদমতের জন্যে পার্থিব কাজ কর্ম হতে আযাদ করে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর এই নর কবুল করেছিলেন। 'উত্তমরূপে তিনিহযরত মারইয়ামকে (আঃ) বড় করে তুলেছিলেন। তিনি আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী, দুনিয়ার প্রতি ঔদাসীন্য এবং সংযমী শীলতায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তার ইবাদত, আধ্যাত্মিক সাধনা ও তাকওয়ার কথা সর্বসাধারণের মুখে আলোচিত হতে থাকে। তাঁর লালন পালনের দায়িত্বভার তাঁর খালু হযরত যাকারিয়া (আঃ) গ্রহণ করেছিলেন। ঐ সময় তিনি ছিলেন বাণী ইসরাঈলের নবী। সমস্ত বাণী ইসরাঈল তাদের ধর্মীয় কাজে তাঁরই অনুসারী ছিল। হযরত যাকারিয়ার (আঃ) কাছে হযরত মারইয়ামের (আঃ) বহু অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেয়ে ছিল। বিশেষ করে যখনই তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ইবাদত খানায় প্রবেশ করতেন, তখন তিনি তার কাছে নতুন ধরণের অমওসূমী ফল দেখতে পেতেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করতেনঃ “হে মারইয়াম! এই ফল কোথা হতে আসলো?" উত্তরে তিনি বলতেনঃ “এগুলি আল্লাহ তাআলার নিকট হতে এসেছে। তিনি এমন ক্ষমতাবান যে, যাকে ইচ্ছা করেন বে হিসেবে রিক দান করে থাকেন।অতঃপর আল্লাহ তাআ'লা হযরত মারইয়ামের (আঃ) গর্ভে হযরত ঈসাকে (আঃ) সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, যিনি পঁচিজন স্থির প্রতিজ্ঞ নবীদের একজন ছিলেন। হযরত মারইয়াম (আঃ) মসজিদে কুদসের পূর্ব দিকে গমন করেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হায়েয বা মাসিক ঋতুর কারণেই তিনি ঐ দিকে গিয়েছিলেন। অন্যদের মতে তিনি অন্য কোন কারণে গিয়েছিলেন। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে কিতাবের উপর বায়তুল্লাহ মুখী হওয়া ও হজ্ব করা ফরয করা হয়েছিল। কিন্তু হযরত মারইয়াম (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস হতে পুর্ব দিকে গমন করেছিলেন বলে তারা পূর্ব মুখী হয়েই নামায পড়তে শুরু করে দেয়। হযরত ঈসার (আঃ) জন্মস্থানকে তারা নিজেরাই কিবলা বানিয়ে নেয়। বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) যে জায়গায় গিয়েছিলেন সেটা ছিল ঐ জনদপ হতে দূরে এক নির্জন স্থান। কথিত আছে যে, সেখানে তার শস্যক্ষেত্র ছিল এবং তাতে তিনি পানি দিতে গিয়েছিলেন। একথাও বলা হয়েছে যে, সেখানে তিনি একটি কক্ষ বানিয়ে নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি জনগণ হতে পৃথক হয়ে নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। যখন হযরত মারইয়াম (আঃ) জনগণ হতে পৃথক হয়ে দূরে চলে যান এবং তাদের মধ্যে ও তার মধ্যে আড়াল হয়ে যায় তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে ফেরেশতা হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) প্রেরণ করেন। তিনি পূর্ণ মানবাকৃতিতে তার সামনে প্রকাশিত হন। এখানে ‘রূহ দ্বারা এই মর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতাকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন কুরআন কারীমের (আরবী) এই আয়াতে রয়েছে। হযরত উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ) বলেন যে, রোযে আযলে যখন হযরত আদমের (আঃ) সমস্ত সন্তানের রূহসমূহের নিকট হতে তার প্রতিপালক হওয়ার স্বীকারোক্তি নিয়েছিলেন ঐ রূহগুলির মধ্যে হযরত ঈসার (আঃ) রহও ছিল। ঐ রূহকেই মানবাকৃতিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত মারইয়ামের (আঃ) নিকট পাঠানো হয়। ঐ রূহই তার সাথে কথা বলেন এবং তার দেহের মধ্যে প্রবেশ করেন। (কিন্তু এই উক্তিটি অস্বাভাবিক হওয়া ছাড়াও সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার্য। খুব সম্ভব এটা বাণী ইসরাঈলেরই উক্তি হবে)হযরত মারইয়াম (আঃ) ঐ জনশূন্য স্থানে একজন অপরিচিত লোক দেখে মনে করেন যে, হয়তো কোন দুষ্ট প্রকৃতির লোক হবে। তাকে তিনি আল্লাহর ভয় দেখিয়ে বলেনঃ “আপনি খোদাভীরু লোক হলে তাকে ভয় করুন। আমি তারই কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।” তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য দেখেই হযরত মারইয়াম (আঃ) বুঝে ফেলেছিলেন যে, তিনি ভাল লোকই হবেন এবং তিনি জানতেন যে, ভাল লোকের জন্যে আল্লাহর ভয়ই যথেষ্ট। ফেরেশতা হযরত মারইয়ামের (আঃ) ভয় ভীতি দূর করে দেয়ার জন্যে পরিষ্কার ভাবে বলেনঃ “আপনি অন্য কোন ধারণা করবেন না, আমি আল্লাহ তাআলার প্রেরিত ফেরেশতা।” বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলার নাম শুনেই হযরত জিবরাঈল (আঃ) কেঁপে উঠেন এবং নিজের প্রকৃতরূপ ধারণ করেন। আর বলে দেনঃ “ আমি আল্লাহর একজন দূত রূপে প্রেরিত হয়েছি। তিনি আমাকে এজন্যেই প্রেরণ করেছেন যে, তিনি আপনাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তান দান করবেন।”(আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) রয়েছে। প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত কারী আবু উমার ইবনু আলার কিরআত এটাই। দুটো কিরআতেরই মতলব পরিষ্কার। হযরত জিবরাঈলের (আঃ) এ কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) আরো বেশী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! আমরি সন্তান হওয়া কি করে সম্ব? আমার তো বিয়েই হয় নাই এবং কখনো কোন খারাপ খেয়াল আমার মনে জাগে নাই। আমার দেহ কখনো কোন পুরুষ লোক স্পর্শ করে নাই এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই। সুতরাং আমার সন্তান হওয়া কেমন কথা।"(আরবী) শব্দ দ্বারা ব্যভিচারিণীকে বুঝানো হয়েছে। হাদীসেও এই শব্দটি এই অর্থেই এসেছে। যেমন বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ব্যভিচারিণীর খরচা হারাম।হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর এই বিস্ময় দূর করার জন্যে বলেনঃ “এটা সত্য বটে, তবে স্বামী ছাড়া বা অন্য কোন উপকরণ ও উপাদান ছাড়াও আল্লাহ তাআলা সন্তান দানে সক্ষম। তিনি যা চান তাই হয়। তিনি এই সন্তান ও এই ঘটনাকে মানুষের জন্যে একটা নিদর্শন বানাতে চান। এটা আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন হবে যে, তিনি সর্ব প্রকারের সষ্টির উপরই সক্ষম। হযরত আদমকে (আঃ) তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। হাওয়াকে (আঃ) তিনি সৃষ্টি করেছেন নারী ছাড়াই-শুধু পুরুষের মাধ্যমে। বাকী সমস্ত মানুষকে তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। শুধু হযরত ঈসা (আঃ) এই নিয়মের ব্যতিক্রম। তিনি পুরুষ ছাড়াই শুধু নারীর মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছেন। সুতরাং মানব সৃষ্টির এই চারটি নিয়ম হতে পারে এবং সবটাই মহান আল্লাহ পুরো করে দেখিয়েছেন। এভাবে তিনি নিজের ব্যাপক ও পূর্ণক্ষমতা ও বিরাটত্বের দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। এটা বাস্তব কথা যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই এবং কোন প্রতিপালকও নেই। এই শিশু আল্লাহর রহমতরূপে পরিগণিত হবেন। তিনি তাঁর নবী হবেন। তিনি মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহবান করবেন।" অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “যখন ফেরেশতাগণ বললোঃ হে মারইয়াম (আঃ)! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন একটি কালেমার যা আল্লাহর পক্ষ হতে হবে; তার নাম হবে মাসীহ্ ঈসা ইবনু মারইয়াম; সম্মানিত হবে ইহলোকে এবং পরলোকে, আর সান্নিধ্য প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। মানুষের সাথে কথা বলবে দোলনার মধ্যে এবং প্রাপ্ত বয়সে এবং সসভ্য লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ তিনি বাল্যাবস্থায় ও বৃদ্ধ বয়সে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহবান করবেন।হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “ঈসা (আঃ) আমার পেটে থাকা অবস্থায় যখন আমি নির্জনে থাকতাম তখন সে আমার সাথে কথা বলতো। আর যখন আমি লোকদের সাথে থাকতাম তখন সে তাসবীহ ও তাকবীর পাঠ করতো।" (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ঘোষিত হচ্ছেঃ এটাতো এক স্থিরকৃত ব্যাপার। খুব সম্ভব যে, এটাও হযরত জিবরাঈলেরই (আঃ) উক্তি। আবার এও হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলার এই ফরমান রাসূলুল্লাহর (সঃ) মাধ্যমে ঘোষিত হয়েছে। আর এর দ্বারা রূহ ফুকে দেয়াই উদ্দেশ্য। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “ইমরানের কন্যা মারইয়াম (আঃ), যে তার গুপ্তাঙ্গকে পবিত্র রেখেছিল এবং আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুকে ছিলাম।” সুতরাং এই বাক্যের ভাবার্থ হচ্ছেঃ এটা তো হয়েই যাবে। আল্লাহ তাআলা এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
মারইয়াম 19:19
১৬-২১ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বে হযরত যাকারিয়ার (আঃ) ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছিল এবং এই বর্ণনা দেয়া হয়েছিল যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) পূর্ণ বার্ধক্যে উপনীত হওয়া পর্যন্ত সন্তানহীন ছিলেন। তার স্ত্রীর মধ্যে সন্তান লাভের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা নিজের ক্ষমতাবলে তাদেরকে সন্তান দান করেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও খোদাভীরু। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর এর চেয়েও বড় ক্ষমতার নিদর্শন পেশ করছেন। এখানে তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি ছিলেন চির কুমারী। কোন পুরুষ তাকে কখনো স্পর্শ করে নাই। এভাবে বিনা পুরুষেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতাবলে তাঁকে সন্তান দান করেন। তার গর্ভে হযরত ঈসার (আঃ) জন্ম হয়, যিনি আল্লাহর মনোনীত নবী এবং তার রূহ ও কালেমা ছিলেন। এই দু'টি ঘটনায় পূর্ণভাবে পারস্পরিক সম্বন্ধ রয়েছে বলে এখানে এবং সূরায়ে আল ইমরান ও সূরায়ে আম্বিয়াতেও এ দুটি ঘটনাকে মিলিতভাবে বর্ণনা করেছেন, যাতে বান্দা আল্লাহ তাআলার অতুলনীয় ক্ষমতা এবং ব্যাপক প্রতিপত্তি পর্যবেক্ষণ করে।হযরত মারইয়াম (আঃ) হযরত ইমরানের কন্যা ছিলেন। তিনি ছিলেন হযরত দাউদের (আঃ) বংশধর। এই পরিবারটি বানী ইসরাঈলের মধ্যে পবিত্র পরিবার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। সুরায়ে আল-ইমরানে তার জন্মের বিস্তারিত বিবরণ গত হয়েছে। ঐ যুগের প্রথা অনুযায়ী হযরত মারইয়ামের (আঃ) মাতা তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে কুদৃসের খিদমতের জন্যে পার্থিব কাজ কর্ম হতে আযাদ করে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর এই নর কবুল করেছিলেন। 'উত্তমরূপে তিনিহযরত মারইয়ামকে (আঃ) বড় করে তুলেছিলেন। তিনি আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী, দুনিয়ার প্রতি ঔদাসীন্য এবং সংযমী শীলতায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তার ইবাদত, আধ্যাত্মিক সাধনা ও তাকওয়ার কথা সর্বসাধারণের মুখে আলোচিত হতে থাকে। তাঁর লালন পালনের দায়িত্বভার তাঁর খালু হযরত যাকারিয়া (আঃ) গ্রহণ করেছিলেন। ঐ সময় তিনি ছিলেন বাণী ইসরাঈলের নবী। সমস্ত বাণী ইসরাঈল তাদের ধর্মীয় কাজে তাঁরই অনুসারী ছিল। হযরত যাকারিয়ার (আঃ) কাছে হযরত মারইয়ামের (আঃ) বহু অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেয়ে ছিল। বিশেষ করে যখনই তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ইবাদত খানায় প্রবেশ করতেন, তখন তিনি তার কাছে নতুন ধরণের অমওসূমী ফল দেখতে পেতেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করতেনঃ “হে মারইয়াম! এই ফল কোথা হতে আসলো?" উত্তরে তিনি বলতেনঃ “এগুলি আল্লাহ তাআলার নিকট হতে এসেছে। তিনি এমন ক্ষমতাবান যে, যাকে ইচ্ছা করেন বে হিসেবে রিক দান করে থাকেন।অতঃপর আল্লাহ তাআ'লা হযরত মারইয়ামের (আঃ) গর্ভে হযরত ঈসাকে (আঃ) সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, যিনি পঁচিজন স্থির প্রতিজ্ঞ নবীদের একজন ছিলেন। হযরত মারইয়াম (আঃ) মসজিদে কুদসের পূর্ব দিকে গমন করেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হায়েয বা মাসিক ঋতুর কারণেই তিনি ঐ দিকে গিয়েছিলেন। অন্যদের মতে তিনি অন্য কোন কারণে গিয়েছিলেন। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে কিতাবের উপর বায়তুল্লাহ মুখী হওয়া ও হজ্ব করা ফরয করা হয়েছিল। কিন্তু হযরত মারইয়াম (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস হতে পুর্ব দিকে গমন করেছিলেন বলে তারা পূর্ব মুখী হয়েই নামায পড়তে শুরু করে দেয়। হযরত ঈসার (আঃ) জন্মস্থানকে তারা নিজেরাই কিবলা বানিয়ে নেয়। বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) যে জায়গায় গিয়েছিলেন সেটা ছিল ঐ জনদপ হতে দূরে এক নির্জন স্থান। কথিত আছে যে, সেখানে তার শস্যক্ষেত্র ছিল এবং তাতে তিনি পানি দিতে গিয়েছিলেন। একথাও বলা হয়েছে যে, সেখানে তিনি একটি কক্ষ বানিয়ে নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি জনগণ হতে পৃথক হয়ে নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। যখন হযরত মারইয়াম (আঃ) জনগণ হতে পৃথক হয়ে দূরে চলে যান এবং তাদের মধ্যে ও তার মধ্যে আড়াল হয়ে যায় তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে ফেরেশতা হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) প্রেরণ করেন। তিনি পূর্ণ মানবাকৃতিতে তার সামনে প্রকাশিত হন। এখানে ‘রূহ দ্বারা এই মর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতাকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন কুরআন কারীমের (আরবী) এই আয়াতে রয়েছে। হযরত উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ) বলেন যে, রোযে আযলে যখন হযরত আদমের (আঃ) সমস্ত সন্তানের রূহসমূহের নিকট হতে তার প্রতিপালক হওয়ার স্বীকারোক্তি নিয়েছিলেন ঐ রূহগুলির মধ্যে হযরত ঈসার (আঃ) রহও ছিল। ঐ রূহকেই মানবাকৃতিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত মারইয়ামের (আঃ) নিকট পাঠানো হয়। ঐ রূহই তার সাথে কথা বলেন এবং তার দেহের মধ্যে প্রবেশ করেন। (কিন্তু এই উক্তিটি অস্বাভাবিক হওয়া ছাড়াও সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার্য। খুব সম্ভব এটা বাণী ইসরাঈলেরই উক্তি হবে)হযরত মারইয়াম (আঃ) ঐ জনশূন্য স্থানে একজন অপরিচিত লোক দেখে মনে করেন যে, হয়তো কোন দুষ্ট প্রকৃতির লোক হবে। তাকে তিনি আল্লাহর ভয় দেখিয়ে বলেনঃ “আপনি খোদাভীরু লোক হলে তাকে ভয় করুন। আমি তারই কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।” তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য দেখেই হযরত মারইয়াম (আঃ) বুঝে ফেলেছিলেন যে, তিনি ভাল লোকই হবেন এবং তিনি জানতেন যে, ভাল লোকের জন্যে আল্লাহর ভয়ই যথেষ্ট। ফেরেশতা হযরত মারইয়ামের (আঃ) ভয় ভীতি দূর করে দেয়ার জন্যে পরিষ্কার ভাবে বলেনঃ “আপনি অন্য কোন ধারণা করবেন না, আমি আল্লাহ তাআলার প্রেরিত ফেরেশতা।” বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলার নাম শুনেই হযরত জিবরাঈল (আঃ) কেঁপে উঠেন এবং নিজের প্রকৃতরূপ ধারণ করেন। আর বলে দেনঃ “ আমি আল্লাহর একজন দূত রূপে প্রেরিত হয়েছি। তিনি আমাকে এজন্যেই প্রেরণ করেছেন যে, তিনি আপনাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তান দান করবেন।”(আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) রয়েছে। প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত কারী আবু উমার ইবনু আলার কিরআত এটাই। দুটো কিরআতেরই মতলব পরিষ্কার। হযরত জিবরাঈলের (আঃ) এ কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) আরো বেশী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! আমরি সন্তান হওয়া কি করে সম্ব? আমার তো বিয়েই হয় নাই এবং কখনো কোন খারাপ খেয়াল আমার মনে জাগে নাই। আমার দেহ কখনো কোন পুরুষ লোক স্পর্শ করে নাই এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই। সুতরাং আমার সন্তান হওয়া কেমন কথা।"(আরবী) শব্দ দ্বারা ব্যভিচারিণীকে বুঝানো হয়েছে। হাদীসেও এই শব্দটি এই অর্থেই এসেছে। যেমন বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ব্যভিচারিণীর খরচা হারাম।হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর এই বিস্ময় দূর করার জন্যে বলেনঃ “এটা সত্য বটে, তবে স্বামী ছাড়া বা অন্য কোন উপকরণ ও উপাদান ছাড়াও আল্লাহ তাআলা সন্তান দানে সক্ষম। তিনি যা চান তাই হয়। তিনি এই সন্তান ও এই ঘটনাকে মানুষের জন্যে একটা নিদর্শন বানাতে চান। এটা আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন হবে যে, তিনি সর্ব প্রকারের সষ্টির উপরই সক্ষম। হযরত আদমকে (আঃ) তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। হাওয়াকে (আঃ) তিনি সৃষ্টি করেছেন নারী ছাড়াই-শুধু পুরুষের মাধ্যমে। বাকী সমস্ত মানুষকে তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। শুধু হযরত ঈসা (আঃ) এই নিয়মের ব্যতিক্রম। তিনি পুরুষ ছাড়াই শুধু নারীর মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছেন। সুতরাং মানব সৃষ্টির এই চারটি নিয়ম হতে পারে এবং সবটাই মহান আল্লাহ পুরো করে দেখিয়েছেন। এভাবে তিনি নিজের ব্যাপক ও পূর্ণক্ষমতা ও বিরাটত্বের দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। এটা বাস্তব কথা যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই এবং কোন প্রতিপালকও নেই। এই শিশু আল্লাহর রহমতরূপে পরিগণিত হবেন। তিনি তাঁর নবী হবেন। তিনি মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহবান করবেন।" অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “যখন ফেরেশতাগণ বললোঃ হে মারইয়াম (আঃ)! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন একটি কালেমার যা আল্লাহর পক্ষ হতে হবে; তার নাম হবে মাসীহ্ ঈসা ইবনু মারইয়াম; সম্মানিত হবে ইহলোকে এবং পরলোকে, আর সান্নিধ্য প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। মানুষের সাথে কথা বলবে দোলনার মধ্যে এবং প্রাপ্ত বয়সে এবং সসভ্য লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ তিনি বাল্যাবস্থায় ও বৃদ্ধ বয়সে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহবান করবেন।হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “ঈসা (আঃ) আমার পেটে থাকা অবস্থায় যখন আমি নির্জনে থাকতাম তখন সে আমার সাথে কথা বলতো। আর যখন আমি লোকদের সাথে থাকতাম তখন সে তাসবীহ ও তাকবীর পাঠ করতো।" (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ঘোষিত হচ্ছেঃ এটাতো এক স্থিরকৃত ব্যাপার। খুব সম্ভব যে, এটাও হযরত জিবরাঈলেরই (আঃ) উক্তি। আবার এও হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলার এই ফরমান রাসূলুল্লাহর (সঃ) মাধ্যমে ঘোষিত হয়েছে। আর এর দ্বারা রূহ ফুকে দেয়াই উদ্দেশ্য। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “ইমরানের কন্যা মারইয়াম (আঃ), যে তার গুপ্তাঙ্গকে পবিত্র রেখেছিল এবং আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুকে ছিলাম।” সুতরাং এই বাক্যের ভাবার্থ হচ্ছেঃ এটা তো হয়েই যাবে। আল্লাহ তাআলা এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
মারইয়াম 19:20
১৬-২১ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বে হযরত যাকারিয়ার (আঃ) ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছিল এবং এই বর্ণনা দেয়া হয়েছিল যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) পূর্ণ বার্ধক্যে উপনীত হওয়া পর্যন্ত সন্তানহীন ছিলেন। তার স্ত্রীর মধ্যে সন্তান লাভের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা নিজের ক্ষমতাবলে তাদেরকে সন্তান দান করেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও খোদাভীরু। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর এর চেয়েও বড় ক্ষমতার নিদর্শন পেশ করছেন। এখানে তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি ছিলেন চির কুমারী। কোন পুরুষ তাকে কখনো স্পর্শ করে নাই। এভাবে বিনা পুরুষেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতাবলে তাঁকে সন্তান দান করেন। তার গর্ভে হযরত ঈসার (আঃ) জন্ম হয়, যিনি আল্লাহর মনোনীত নবী এবং তার রূহ ও কালেমা ছিলেন। এই দু'টি ঘটনায় পূর্ণভাবে পারস্পরিক সম্বন্ধ রয়েছে বলে এখানে এবং সূরায়ে আল ইমরান ও সূরায়ে আম্বিয়াতেও এ দুটি ঘটনাকে মিলিতভাবে বর্ণনা করেছেন, যাতে বান্দা আল্লাহ তাআলার অতুলনীয় ক্ষমতা এবং ব্যাপক প্রতিপত্তি পর্যবেক্ষণ করে।হযরত মারইয়াম (আঃ) হযরত ইমরানের কন্যা ছিলেন। তিনি ছিলেন হযরত দাউদের (আঃ) বংশধর। এই পরিবারটি বানী ইসরাঈলের মধ্যে পবিত্র পরিবার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। সুরায়ে আল-ইমরানে তার জন্মের বিস্তারিত বিবরণ গত হয়েছে। ঐ যুগের প্রথা অনুযায়ী হযরত মারইয়ামের (আঃ) মাতা তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে কুদৃসের খিদমতের জন্যে পার্থিব কাজ কর্ম হতে আযাদ করে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর এই নর কবুল করেছিলেন। 'উত্তমরূপে তিনিহযরত মারইয়ামকে (আঃ) বড় করে তুলেছিলেন। তিনি আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী, দুনিয়ার প্রতি ঔদাসীন্য এবং সংযমী শীলতায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তার ইবাদত, আধ্যাত্মিক সাধনা ও তাকওয়ার কথা সর্বসাধারণের মুখে আলোচিত হতে থাকে। তাঁর লালন পালনের দায়িত্বভার তাঁর খালু হযরত যাকারিয়া (আঃ) গ্রহণ করেছিলেন। ঐ সময় তিনি ছিলেন বাণী ইসরাঈলের নবী। সমস্ত বাণী ইসরাঈল তাদের ধর্মীয় কাজে তাঁরই অনুসারী ছিল। হযরত যাকারিয়ার (আঃ) কাছে হযরত মারইয়ামের (আঃ) বহু অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেয়ে ছিল। বিশেষ করে যখনই তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ইবাদত খানায় প্রবেশ করতেন, তখন তিনি তার কাছে নতুন ধরণের অমওসূমী ফল দেখতে পেতেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করতেনঃ “হে মারইয়াম! এই ফল কোথা হতে আসলো?" উত্তরে তিনি বলতেনঃ “এগুলি আল্লাহ তাআলার নিকট হতে এসেছে। তিনি এমন ক্ষমতাবান যে, যাকে ইচ্ছা করেন বে হিসেবে রিক দান করে থাকেন।অতঃপর আল্লাহ তাআ'লা হযরত মারইয়ামের (আঃ) গর্ভে হযরত ঈসাকে (আঃ) সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, যিনি পঁচিজন স্থির প্রতিজ্ঞ নবীদের একজন ছিলেন। হযরত মারইয়াম (আঃ) মসজিদে কুদসের পূর্ব দিকে গমন করেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হায়েয বা মাসিক ঋতুর কারণেই তিনি ঐ দিকে গিয়েছিলেন। অন্যদের মতে তিনি অন্য কোন কারণে গিয়েছিলেন। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে কিতাবের উপর বায়তুল্লাহ মুখী হওয়া ও হজ্ব করা ফরয করা হয়েছিল। কিন্তু হযরত মারইয়াম (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস হতে পুর্ব দিকে গমন করেছিলেন বলে তারা পূর্ব মুখী হয়েই নামায পড়তে শুরু করে দেয়। হযরত ঈসার (আঃ) জন্মস্থানকে তারা নিজেরাই কিবলা বানিয়ে নেয়। বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) যে জায়গায় গিয়েছিলেন সেটা ছিল ঐ জনদপ হতে দূরে এক নির্জন স্থান। কথিত আছে যে, সেখানে তার শস্যক্ষেত্র ছিল এবং তাতে তিনি পানি দিতে গিয়েছিলেন। একথাও বলা হয়েছে যে, সেখানে তিনি একটি কক্ষ বানিয়ে নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি জনগণ হতে পৃথক হয়ে নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। যখন হযরত মারইয়াম (আঃ) জনগণ হতে পৃথক হয়ে দূরে চলে যান এবং তাদের মধ্যে ও তার মধ্যে আড়াল হয়ে যায় তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে ফেরেশতা হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) প্রেরণ করেন। তিনি পূর্ণ মানবাকৃতিতে তার সামনে প্রকাশিত হন। এখানে ‘রূহ দ্বারা এই মর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতাকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন কুরআন কারীমের (আরবী) এই আয়াতে রয়েছে। হযরত উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ) বলেন যে, রোযে আযলে যখন হযরত আদমের (আঃ) সমস্ত সন্তানের রূহসমূহের নিকট হতে তার প্রতিপালক হওয়ার স্বীকারোক্তি নিয়েছিলেন ঐ রূহগুলির মধ্যে হযরত ঈসার (আঃ) রহও ছিল। ঐ রূহকেই মানবাকৃতিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত মারইয়ামের (আঃ) নিকট পাঠানো হয়। ঐ রূহই তার সাথে কথা বলেন এবং তার দেহের মধ্যে প্রবেশ করেন। (কিন্তু এই উক্তিটি অস্বাভাবিক হওয়া ছাড়াও সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার্য। খুব সম্ভব এটা বাণী ইসরাঈলেরই উক্তি হবে)হযরত মারইয়াম (আঃ) ঐ জনশূন্য স্থানে একজন অপরিচিত লোক দেখে মনে করেন যে, হয়তো কোন দুষ্ট প্রকৃতির লোক হবে। তাকে তিনি আল্লাহর ভয় দেখিয়ে বলেনঃ “আপনি খোদাভীরু লোক হলে তাকে ভয় করুন। আমি তারই কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।” তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য দেখেই হযরত মারইয়াম (আঃ) বুঝে ফেলেছিলেন যে, তিনি ভাল লোকই হবেন এবং তিনি জানতেন যে, ভাল লোকের জন্যে আল্লাহর ভয়ই যথেষ্ট। ফেরেশতা হযরত মারইয়ামের (আঃ) ভয় ভীতি দূর করে দেয়ার জন্যে পরিষ্কার ভাবে বলেনঃ “আপনি অন্য কোন ধারণা করবেন না, আমি আল্লাহ তাআলার প্রেরিত ফেরেশতা।” বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলার নাম শুনেই হযরত জিবরাঈল (আঃ) কেঁপে উঠেন এবং নিজের প্রকৃতরূপ ধারণ করেন। আর বলে দেনঃ “ আমি আল্লাহর একজন দূত রূপে প্রেরিত হয়েছি। তিনি আমাকে এজন্যেই প্রেরণ করেছেন যে, তিনি আপনাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তান দান করবেন।”(আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) রয়েছে। প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত কারী আবু উমার ইবনু আলার কিরআত এটাই। দুটো কিরআতেরই মতলব পরিষ্কার। হযরত জিবরাঈলের (আঃ) এ কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) আরো বেশী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! আমরি সন্তান হওয়া কি করে সম্ব? আমার তো বিয়েই হয় নাই এবং কখনো কোন খারাপ খেয়াল আমার মনে জাগে নাই। আমার দেহ কখনো কোন পুরুষ লোক স্পর্শ করে নাই এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই। সুতরাং আমার সন্তান হওয়া কেমন কথা।"(আরবী) শব্দ দ্বারা ব্যভিচারিণীকে বুঝানো হয়েছে। হাদীসেও এই শব্দটি এই অর্থেই এসেছে। যেমন বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ব্যভিচারিণীর খরচা হারাম।হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর এই বিস্ময় দূর করার জন্যে বলেনঃ “এটা সত্য বটে, তবে স্বামী ছাড়া বা অন্য কোন উপকরণ ও উপাদান ছাড়াও আল্লাহ তাআলা সন্তান দানে সক্ষম। তিনি যা চান তাই হয়। তিনি এই সন্তান ও এই ঘটনাকে মানুষের জন্যে একটা নিদর্শন বানাতে চান। এটা আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন হবে যে, তিনি সর্ব প্রকারের সষ্টির উপরই সক্ষম। হযরত আদমকে (আঃ) তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। হাওয়াকে (আঃ) তিনি সৃষ্টি করেছেন নারী ছাড়াই-শুধু পুরুষের মাধ্যমে। বাকী সমস্ত মানুষকে তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। শুধু হযরত ঈসা (আঃ) এই নিয়মের ব্যতিক্রম। তিনি পুরুষ ছাড়াই শুধু নারীর মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছেন। সুতরাং মানব সৃষ্টির এই চারটি নিয়ম হতে পারে এবং সবটাই মহান আল্লাহ পুরো করে দেখিয়েছেন। এভাবে তিনি নিজের ব্যাপক ও পূর্ণক্ষমতা ও বিরাটত্বের দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। এটা বাস্তব কথা যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই এবং কোন প্রতিপালকও নেই। এই শিশু আল্লাহর রহমতরূপে পরিগণিত হবেন। তিনি তাঁর নবী হবেন। তিনি মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহবান করবেন।" অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “যখন ফেরেশতাগণ বললোঃ হে মারইয়াম (আঃ)! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন একটি কালেমার যা আল্লাহর পক্ষ হতে হবে; তার নাম হবে মাসীহ্ ঈসা ইবনু মারইয়াম; সম্মানিত হবে ইহলোকে এবং পরলোকে, আর সান্নিধ্য প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। মানুষের সাথে কথা বলবে দোলনার মধ্যে এবং প্রাপ্ত বয়সে এবং সসভ্য লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ তিনি বাল্যাবস্থায় ও বৃদ্ধ বয়সে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহবান করবেন।হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “ঈসা (আঃ) আমার পেটে থাকা অবস্থায় যখন আমি নির্জনে থাকতাম তখন সে আমার সাথে কথা বলতো। আর যখন আমি লোকদের সাথে থাকতাম তখন সে তাসবীহ ও তাকবীর পাঠ করতো।" (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ঘোষিত হচ্ছেঃ এটাতো এক স্থিরকৃত ব্যাপার। খুব সম্ভব যে, এটাও হযরত জিবরাঈলেরই (আঃ) উক্তি। আবার এও হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলার এই ফরমান রাসূলুল্লাহর (সঃ) মাধ্যমে ঘোষিত হয়েছে। আর এর দ্বারা রূহ ফুকে দেয়াই উদ্দেশ্য। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “ইমরানের কন্যা মারইয়াম (আঃ), যে তার গুপ্তাঙ্গকে পবিত্র রেখেছিল এবং আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুকে ছিলাম।” সুতরাং এই বাক্যের ভাবার্থ হচ্ছেঃ এটা তো হয়েই যাবে। আল্লাহ তাআলা এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
মারইয়াম 19:21
১৬-২১ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বে হযরত যাকারিয়ার (আঃ) ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছিল এবং এই বর্ণনা দেয়া হয়েছিল যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) পূর্ণ বার্ধক্যে উপনীত হওয়া পর্যন্ত সন্তানহীন ছিলেন। তার স্ত্রীর মধ্যে সন্তান লাভের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা নিজের ক্ষমতাবলে তাদেরকে সন্তান দান করেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও খোদাভীরু। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর এর চেয়েও বড় ক্ষমতার নিদর্শন পেশ করছেন। এখানে তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি ছিলেন চির কুমারী। কোন পুরুষ তাকে কখনো স্পর্শ করে নাই। এভাবে বিনা পুরুষেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতাবলে তাঁকে সন্তান দান করেন। তার গর্ভে হযরত ঈসার (আঃ) জন্ম হয়, যিনি আল্লাহর মনোনীত নবী এবং তার রূহ ও কালেমা ছিলেন। এই দু'টি ঘটনায় পূর্ণভাবে পারস্পরিক সম্বন্ধ রয়েছে বলে এখানে এবং সূরায়ে আল ইমরান ও সূরায়ে আম্বিয়াতেও এ দুটি ঘটনাকে মিলিতভাবে বর্ণনা করেছেন, যাতে বান্দা আল্লাহ তাআলার অতুলনীয় ক্ষমতা এবং ব্যাপক প্রতিপত্তি পর্যবেক্ষণ করে।হযরত মারইয়াম (আঃ) হযরত ইমরানের কন্যা ছিলেন। তিনি ছিলেন হযরত দাউদের (আঃ) বংশধর। এই পরিবারটি বানী ইসরাঈলের মধ্যে পবিত্র পরিবার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। সুরায়ে আল-ইমরানে তার জন্মের বিস্তারিত বিবরণ গত হয়েছে। ঐ যুগের প্রথা অনুযায়ী হযরত মারইয়ামের (আঃ) মাতা তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে কুদৃসের খিদমতের জন্যে পার্থিব কাজ কর্ম হতে আযাদ করে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর এই নর কবুল করেছিলেন। 'উত্তমরূপে তিনিহযরত মারইয়ামকে (আঃ) বড় করে তুলেছিলেন। তিনি আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী, দুনিয়ার প্রতি ঔদাসীন্য এবং সংযমী শীলতায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তার ইবাদত, আধ্যাত্মিক সাধনা ও তাকওয়ার কথা সর্বসাধারণের মুখে আলোচিত হতে থাকে। তাঁর লালন পালনের দায়িত্বভার তাঁর খালু হযরত যাকারিয়া (আঃ) গ্রহণ করেছিলেন। ঐ সময় তিনি ছিলেন বাণী ইসরাঈলের নবী। সমস্ত বাণী ইসরাঈল তাদের ধর্মীয় কাজে তাঁরই অনুসারী ছিল। হযরত যাকারিয়ার (আঃ) কাছে হযরত মারইয়ামের (আঃ) বহু অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেয়ে ছিল। বিশেষ করে যখনই তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ইবাদত খানায় প্রবেশ করতেন, তখন তিনি তার কাছে নতুন ধরণের অমওসূমী ফল দেখতে পেতেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করতেনঃ “হে মারইয়াম! এই ফল কোথা হতে আসলো?" উত্তরে তিনি বলতেনঃ “এগুলি আল্লাহ তাআলার নিকট হতে এসেছে। তিনি এমন ক্ষমতাবান যে, যাকে ইচ্ছা করেন বে হিসেবে রিক দান করে থাকেন।অতঃপর আল্লাহ তাআ'লা হযরত মারইয়ামের (আঃ) গর্ভে হযরত ঈসাকে (আঃ) সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, যিনি পঁচিজন স্থির প্রতিজ্ঞ নবীদের একজন ছিলেন। হযরত মারইয়াম (আঃ) মসজিদে কুদসের পূর্ব দিকে গমন করেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হায়েয বা মাসিক ঋতুর কারণেই তিনি ঐ দিকে গিয়েছিলেন। অন্যদের মতে তিনি অন্য কোন কারণে গিয়েছিলেন। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে কিতাবের উপর বায়তুল্লাহ মুখী হওয়া ও হজ্ব করা ফরয করা হয়েছিল। কিন্তু হযরত মারইয়াম (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস হতে পুর্ব দিকে গমন করেছিলেন বলে তারা পূর্ব মুখী হয়েই নামায পড়তে শুরু করে দেয়। হযরত ঈসার (আঃ) জন্মস্থানকে তারা নিজেরাই কিবলা বানিয়ে নেয়। বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) যে জায়গায় গিয়েছিলেন সেটা ছিল ঐ জনদপ হতে দূরে এক নির্জন স্থান। কথিত আছে যে, সেখানে তার শস্যক্ষেত্র ছিল এবং তাতে তিনি পানি দিতে গিয়েছিলেন। একথাও বলা হয়েছে যে, সেখানে তিনি একটি কক্ষ বানিয়ে নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি জনগণ হতে পৃথক হয়ে নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। যখন হযরত মারইয়াম (আঃ) জনগণ হতে পৃথক হয়ে দূরে চলে যান এবং তাদের মধ্যে ও তার মধ্যে আড়াল হয়ে যায় তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে ফেরেশতা হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) প্রেরণ করেন। তিনি পূর্ণ মানবাকৃতিতে তার সামনে প্রকাশিত হন। এখানে ‘রূহ দ্বারা এই মর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতাকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন কুরআন কারীমের (আরবী) এই আয়াতে রয়েছে। হযরত উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ) বলেন যে, রোযে আযলে যখন হযরত আদমের (আঃ) সমস্ত সন্তানের রূহসমূহের নিকট হতে তার প্রতিপালক হওয়ার স্বীকারোক্তি নিয়েছিলেন ঐ রূহগুলির মধ্যে হযরত ঈসার (আঃ) রহও ছিল। ঐ রূহকেই মানবাকৃতিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত মারইয়ামের (আঃ) নিকট পাঠানো হয়। ঐ রূহই তার সাথে কথা বলেন এবং তার দেহের মধ্যে প্রবেশ করেন। (কিন্তু এই উক্তিটি অস্বাভাবিক হওয়া ছাড়াও সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার্য। খুব সম্ভব এটা বাণী ইসরাঈলেরই উক্তি হবে)হযরত মারইয়াম (আঃ) ঐ জনশূন্য স্থানে একজন অপরিচিত লোক দেখে মনে করেন যে, হয়তো কোন দুষ্ট প্রকৃতির লোক হবে। তাকে তিনি আল্লাহর ভয় দেখিয়ে বলেনঃ “আপনি খোদাভীরু লোক হলে তাকে ভয় করুন। আমি তারই কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।” তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য দেখেই হযরত মারইয়াম (আঃ) বুঝে ফেলেছিলেন যে, তিনি ভাল লোকই হবেন এবং তিনি জানতেন যে, ভাল লোকের জন্যে আল্লাহর ভয়ই যথেষ্ট। ফেরেশতা হযরত মারইয়ামের (আঃ) ভয় ভীতি দূর করে দেয়ার জন্যে পরিষ্কার ভাবে বলেনঃ “আপনি অন্য কোন ধারণা করবেন না, আমি আল্লাহ তাআলার প্রেরিত ফেরেশতা।” বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলার নাম শুনেই হযরত জিবরাঈল (আঃ) কেঁপে উঠেন এবং নিজের প্রকৃতরূপ ধারণ করেন। আর বলে দেনঃ “ আমি আল্লাহর একজন দূত রূপে প্রেরিত হয়েছি। তিনি আমাকে এজন্যেই প্রেরণ করেছেন যে, তিনি আপনাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তান দান করবেন।”(আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) রয়েছে। প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত কারী আবু উমার ইবনু আলার কিরআত এটাই। দুটো কিরআতেরই মতলব পরিষ্কার। হযরত জিবরাঈলের (আঃ) এ কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) আরো বেশী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! আমরি সন্তান হওয়া কি করে সম্ব? আমার তো বিয়েই হয় নাই এবং কখনো কোন খারাপ খেয়াল আমার মনে জাগে নাই। আমার দেহ কখনো কোন পুরুষ লোক স্পর্শ করে নাই এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই। সুতরাং আমার সন্তান হওয়া কেমন কথা।"(আরবী) শব্দ দ্বারা ব্যভিচারিণীকে বুঝানো হয়েছে। হাদীসেও এই শব্দটি এই অর্থেই এসেছে। যেমন বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ব্যভিচারিণীর খরচা হারাম।হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর এই বিস্ময় দূর করার জন্যে বলেনঃ “এটা সত্য বটে, তবে স্বামী ছাড়া বা অন্য কোন উপকরণ ও উপাদান ছাড়াও আল্লাহ তাআলা সন্তান দানে সক্ষম। তিনি যা চান তাই হয়। তিনি এই সন্তান ও এই ঘটনাকে মানুষের জন্যে একটা নিদর্শন বানাতে চান। এটা আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন হবে যে, তিনি সর্ব প্রকারের সষ্টির উপরই সক্ষম। হযরত আদমকে (আঃ) তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। হাওয়াকে (আঃ) তিনি সৃষ্টি করেছেন নারী ছাড়াই-শুধু পুরুষের মাধ্যমে। বাকী সমস্ত মানুষকে তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। শুধু হযরত ঈসা (আঃ) এই নিয়মের ব্যতিক্রম। তিনি পুরুষ ছাড়াই শুধু নারীর মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছেন। সুতরাং মানব সৃষ্টির এই চারটি নিয়ম হতে পারে এবং সবটাই মহান আল্লাহ পুরো করে দেখিয়েছেন। এভাবে তিনি নিজের ব্যাপক ও পূর্ণক্ষমতা ও বিরাটত্বের দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। এটা বাস্তব কথা যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই এবং কোন প্রতিপালকও নেই। এই শিশু আল্লাহর রহমতরূপে পরিগণিত হবেন। তিনি তাঁর নবী হবেন। তিনি মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহবান করবেন।" অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “যখন ফেরেশতাগণ বললোঃ হে মারইয়াম (আঃ)! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন একটি কালেমার যা আল্লাহর পক্ষ হতে হবে; তার নাম হবে মাসীহ্ ঈসা ইবনু মারইয়াম; সম্মানিত হবে ইহলোকে এবং পরলোকে, আর সান্নিধ্য প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। মানুষের সাথে কথা বলবে দোলনার মধ্যে এবং প্রাপ্ত বয়সে এবং সসভ্য লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ তিনি বাল্যাবস্থায় ও বৃদ্ধ বয়সে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহবান করবেন।হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “ঈসা (আঃ) আমার পেটে থাকা অবস্থায় যখন আমি নির্জনে থাকতাম তখন সে আমার সাথে কথা বলতো। আর যখন আমি লোকদের সাথে থাকতাম তখন সে তাসবীহ ও তাকবীর পাঠ করতো।" (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ঘোষিত হচ্ছেঃ এটাতো এক স্থিরকৃত ব্যাপার। খুব সম্ভব যে, এটাও হযরত জিবরাঈলেরই (আঃ) উক্তি। আবার এও হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলার এই ফরমান রাসূলুল্লাহর (সঃ) মাধ্যমে ঘোষিত হয়েছে। আর এর দ্বারা রূহ ফুকে দেয়াই উদ্দেশ্য। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “ইমরানের কন্যা মারইয়াম (আঃ), যে তার গুপ্তাঙ্গকে পবিত্র রেখেছিল এবং আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুকে ছিলাম।” সুতরাং এই বাক্যের ভাবার্থ হচ্ছেঃ এটা তো হয়েই যাবে। আল্লাহ তাআলা এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
মারইয়াম 19:22
২২-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: বর্ণিত আছে যে, যখন হযরত মারইয়াম (আঃ) আল্লাহর নির্দেশ শুনে নেন এবং তাঁর সামনে নত হয়ে পড়েন তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) তার জামার কলারের মধ্যে দিয়ে ফুৎকার দেন, যার ফলে আল্লাহর হুকুমে তিনি গর্ভবতী হয়ে যান। এরপর তিনি কঠিনভাবে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন এবং জনগণকে তিনি কি জবাব দিবেন একথা ভেবে তিনি কেঁপে ওঠেন। তার ধারণা হলো যে, তিনি নিজেকে লক্ষবার দোষমুক্ত বললেও তাঁর ঐ অস্বাভাবিক কথা বিশ্বাস করবে কে? এভাবে ভয়ে ভয়েই তিনি কালাতিপাত করতে থাকেন। কারো কাছেই তিনি ঐ ঘটনা প্রকাশ করেন নাই। হাঁ, তবে একদা তিনি তার খালা হযরত যাকারিয়ার (আঃ) স্ত্রীর নিকট আগমন করেন। তাঁর খালা তখন তাঁর কাঁধে কাঁধ মিলানোর পর বলেন, “হে আমার বোনের মেয়ে আল্লাহর অসীম ক্ষমতাবলে ও তোমার খালুর প্রার্থনার বরকতে এই বৃদ্ধ বয়সেও আমি গর্ভবতী হয়ে গেছি।” তখন হযরত মারইয়াম (আঃ) তাকে বললেনঃ “খালাজান! আমার সাথে এরূপ এরূপ ঘটনা ঘটেছে এবং আমিও নিজেকে গর্ভবতী দেখছি।” তিনি ছিলেন নবী পরিবারের মহিলা, কাজেই তিনি আল্লাহর ক্ষমতার উপর এবং মারইয়ামের (আঃ) সত্যবাদিতার উপর ঈমান আনয়ন করেন। এখন থেকে অবস্থা এই দাড়ালো যে, যখনই তাঁরা দু’জন একত্রে মিলিত হতেন তখন খালা অনুভব করতেন যে, তার পেটের সন্তান যেন তার ভাগিনেয়ীর পেটের সন্তানের সামনে ঝুঁকে পড়ছে ও তাকে সম্মান করছে। তাদের মাযহাবে এটা জায়েযও ছিল। এ কারণেই হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ ও তাঁর পিতা মাতা তাকে সিজদা করেছিলেন এবং আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে হযরত আদমের (আঃ) সামনে সিজদাবনত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের শরীয়তে এইরূপ সম্মান প্রদর্শন আল্লাহ তাআলার জন্যেই বিশিষ্ট হয়ে গেছে। অন্যকারো সামনে সিজদাবনত হওয়া আমাদের শরীয়তে হারাম। কেননা, এইরূপ সম্মান প্রদর্শন আল্লাহর মাহাত্ম্যের বিপরীত। এটা একমাত্র তার জন্যেই শোভা পায়।ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) পরস্পর খালাতো ভাই ছিলেন। তাঁরা দুজন একই সময়ে নিজ নিজ মায়ের গর্ভে ছিলেন। হযরত ইয়াহ্ইয়ার (আঃ) মাতা প্রায়ই হযরত মারইয়ামকে (আঃ) বলতেনঃ “আমার এরূপ মনে হচ্ছে যে, আমার পেটের সন্তান যেন তোমার পেটের সন্তানের সামনে সিজদা করছে। এর দ্বারা হযরত ঈসার (আঃ) উচ্চ মর্যাদার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। কেননা, আল্লাহ তাআলার হুকুমে তিনি মৃতকে জীবিত করতেন এবং জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে ভাল করতেন। জমহুরের উক্তি তো এটাই যে, তিনি নয় মাস পর্যন্ত মাতার গর্ভে ছিলেন। ইকরামা (রঃ) বলেন, আট মাস পর্যন্ত ছিলেন। তিনি বলেন যে, এজন্যেই আট মাস পর্যন্ত থাকা সন্তান প্রায়ই বাঁচে না। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) গর্ভবতী হওয়ার সাথে সাথেই হযরত ঈসা (আঃ) জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এটা গারীব উক্তি। সম্ভৱতঃ আয়াতের বাহ্যিক শব্দ দেখেই তিনি এটা ধারণা করেছেন। কেননা, গর্ভ পৃথক হওয়া এবং প্রসব বেদনা শুরু হওয়ার বর্ণনা (আরবী) অক্ষরের সাথে রয়েছে। আর (আরবী) অক্ষরটি (আরবী) (পিছনে পিছনে আসা বা পরপরই আসা) এর জন্যে এসে থাকে। কিন্তু এই যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) বিষয় অনুপাতে হয়ে থাকে। অর্থাৎ “আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান হতে। অতঃপর আমি ওকে শুক্রবিন্দুরূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে। পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি জমাট রক্তে; অতঃপর জমাট রক্তকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে।" এখানেও দুই জায়গায় রয়েছে এবং এটাও এর জন্যেই বটে। কিন্তু হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, এই দুই অবস্থায় চল্লিশ দিনের ব্যবধান থাকে। কুরআন কারীমের এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখ নাই যে, আল্লাহ আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, অতঃপর যমীন সবুজ-শ্যামল হয়ে ওঠে?" (২২:৬৩) এটা স্পষ্টভাবে প্রকাশমান যে, বৃষ্টি বর্ষণের বহু দিন পরে মাঠ সবুজ শ্যামল হয়ে থাকে। অথচ (আরবী) এখানেও রয়েছে। সুতরাং বুঝা গেল যে, (আরবী) প্রত্যেক জিনিসের জন্যে ওর অনুপাতেই হয়ে থাকে।সোজা কথা এটাই যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) অন্যান্য স্ত্রী লোকদের মতই গর্ভধারণের পূর্ণ সময় অতিবাহিত করেন এবং ঐ সময় তিনি মসজিদেই কাটিয়ে দেন। মসজিদে আরো একজন খাদেম ছিলেন। তাঁর নাম ছিল ইউসুফ নাজ্জার। তিনি হযরত মারইয়ামকে (আঃ) ঐ অবস্থায় দেখে তার প্রতি কিছুটা সন্ধিহান হয়ে পড়েন। কিন্তু তার সংসার বিমুখতা খোদাভীরুতা, ইবাদত বন্দেগী এবং সত্যবাদিতার প্রতি খেয়াল করে তার ঐ সন্দেহ দূরীভূত হয়। কিন্তু যত যত দিন অতিবাহিত হয়, তার গর্ভ প্রকাশিত হতে থাকে। কাজেই আর তিনি নীরব থাকতে পারলেন না। একদিন আদবের সাথে তাঁকে বললেনঃ “হে মারইয়াম (আঃ)! আপনাকে আমি একটি কথা জিজ্ঞেস করছি অসন্তুষ্ট হবেন না। আচ্ছা বলুন তো, বিনা বীজে গাছ হয়? বিনা দানায় কি ফসল হয়? বিনা বাপে কি সন্তান হয়? হযরত মারইয়াম (আঃ) তাঁর উদ্দেশ্য বুঝে ফেললেন। তাই, তিনি উত্তরে বললেনঃ “এই সবকিছুই সম্ভ। সর্বপ্রথম যে গাছটি আল্লাহ সৃষ্টি করেন তা বিনা বীজেই ছিল। সর্বপ্রথম যে ফসল আল্লাহ উৎপন্ন করেন তা বিনা দানাতেই ছিল। আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম হযরত আদমকে (আঃ) সৃষ্টি করেন এবং তাঁর বাপ ছিল না। এমনকি মাও ছিল না। তার এ জবাবে ঐ লোকটি সব কিছু বুঝে নিলেন এবং আল্লাহর শক্তিকে অস্বীকার করতে পারলো না। হযরত মারইয়াম (আঃ) যখন দেখলেন যে, তাঁর কওমের লোকেরা তাঁর উপর অপবাদ দিতে শুরু করেছে, তখন তাদেরকে ছেড়ে তিনি বহু দূরে চলে। যান। ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক (রঃ) বলেন যে, যখন গর্ভের অবস্থা প্রকাশ হয়ে পড়ে, তখন তার কওম তাকে নানা কথা বলে। তারা হযরত ইউসুফ নাজ্জারের (রঃ) মত সৎলোকের উপর এই অপবাদ দেয়। তখন তিনি তাদের নিকট থেকে সরে পড়েন। না কেউ তাঁকে দেখতে পায় এবং না তিনি কাউকেও দেখতে পান। প্রসব বেদনা উঠে গেলে হযরত মারইয়াম (আঃ) একটি খেজুর গাছের নীচে বসে পড়েন। কথিত আছে যে, এই নির্জন স্থানটি ছিল বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকের কক্ষটি। এটাও একটি উক্তি আছে যে, যখন তিনি সিরিয়া ও মিসরের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছেন, তখন তার প্রসব বেদনা শুরু হয়। আর একটি উক্তি আছে যে, তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস হতে। আট মাইল দূরে গিয়েছিলেন। ঐ বস্তীটির নাম ছিল বাইতে লাহাম। পর্বে মিরাজের ঘটনায় একটি হাদীস গত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, হযরত ঈসার (আঃ) জন্ম গ্রহণের স্থানও ছিল বাইতে লাহাম। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রসিদ্ধ উক্তিও এটাই এবং খৃস্টানরা তো এর উপর একমত। আর উপরোক্ত হাদীস দ্বারাও এটাই প্রমাণিত হয় যদি ও হাদীসটি বিশুদ্ধ হয়।ঐ সময় হযরত মারইয়াম (আঃ) মৃত্যু কামনা করতে লাগলেন। কেননা, দ্বীনের ফিৎনার সময় এ কামনাও জায়েয। তিনি জানতেন যে, কেউই তাকে সত্যবাদিনী বলবে না এবং তাঁর বর্ণিত ঘটনাকে সবাই মনগড়া মনে করবে। দুনিয়া তঁাকে হতবুদ্ধি করে ফেলবে। ইবাদত ও স্থিরতায় বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে। সবাই তার দুর্নাম করবে। জনগণের মধ্যে খারাপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে। তাই, তিনি বলতে লাগলেনঃ “হায়! এর পূর্বে যদি আমি মরে যেতাম। এবং যদি আমাকে সৃষ্টি করাই না হতো! হায়! যদি আমি লোকের স্মৃতি হতে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হতাম!” লজ্জা শরম তাকে এমনভাবে পরিবেষ্টন করে ফেললো। যে, তিনি ঐ কষ্টের উপর মৃত্যুকেই প্রাধান্য দিলেন এবং কামনা করলেন যে, যদি তিনি জনগণের স্মৃতি হতে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে পড়তেন। তবে কতই না ভাল হতো! না কেউ তাকে স্মরণ করতো, না কেউ খোজ খবর নিতো, না তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করতো। হাদীস সমূহে মৃত্যু কামনা।করতে নিষেধ করা হয়েছে। আমরা ঐ রিওয়াইয়াতগুলিকে (আরবী) এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করে দিয়েছি।
মারইয়াম 19:23
২২-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: বর্ণিত আছে যে, যখন হযরত মারইয়াম (আঃ) আল্লাহর নির্দেশ শুনে নেন এবং তাঁর সামনে নত হয়ে পড়েন তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) তার জামার কলারের মধ্যে দিয়ে ফুৎকার দেন, যার ফলে আল্লাহর হুকুমে তিনি গর্ভবতী হয়ে যান। এরপর তিনি কঠিনভাবে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন এবং জনগণকে তিনি কি জবাব দিবেন একথা ভেবে তিনি কেঁপে ওঠেন। তার ধারণা হলো যে, তিনি নিজেকে লক্ষবার দোষমুক্ত বললেও তাঁর ঐ অস্বাভাবিক কথা বিশ্বাস করবে কে? এভাবে ভয়ে ভয়েই তিনি কালাতিপাত করতে থাকেন। কারো কাছেই তিনি ঐ ঘটনা প্রকাশ করেন নাই। হাঁ, তবে একদা তিনি তার খালা হযরত যাকারিয়ার (আঃ) স্ত্রীর নিকট আগমন করেন। তাঁর খালা তখন তাঁর কাঁধে কাঁধ মিলানোর পর বলেন, “হে আমার বোনের মেয়ে আল্লাহর অসীম ক্ষমতাবলে ও তোমার খালুর প্রার্থনার বরকতে এই বৃদ্ধ বয়সেও আমি গর্ভবতী হয়ে গেছি।” তখন হযরত মারইয়াম (আঃ) তাকে বললেনঃ “খালাজান! আমার সাথে এরূপ এরূপ ঘটনা ঘটেছে এবং আমিও নিজেকে গর্ভবতী দেখছি।” তিনি ছিলেন নবী পরিবারের মহিলা, কাজেই তিনি আল্লাহর ক্ষমতার উপর এবং মারইয়ামের (আঃ) সত্যবাদিতার উপর ঈমান আনয়ন করেন। এখন থেকে অবস্থা এই দাড়ালো যে, যখনই তাঁরা দু’জন একত্রে মিলিত হতেন তখন খালা অনুভব করতেন যে, তার পেটের সন্তান যেন তার ভাগিনেয়ীর পেটের সন্তানের সামনে ঝুঁকে পড়ছে ও তাকে সম্মান করছে। তাদের মাযহাবে এটা জায়েযও ছিল। এ কারণেই হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ ও তাঁর পিতা মাতা তাকে সিজদা করেছিলেন এবং আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে হযরত আদমের (আঃ) সামনে সিজদাবনত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের শরীয়তে এইরূপ সম্মান প্রদর্শন আল্লাহ তাআলার জন্যেই বিশিষ্ট হয়ে গেছে। অন্যকারো সামনে সিজদাবনত হওয়া আমাদের শরীয়তে হারাম। কেননা, এইরূপ সম্মান প্রদর্শন আল্লাহর মাহাত্ম্যের বিপরীত। এটা একমাত্র তার জন্যেই শোভা পায়।ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) পরস্পর খালাতো ভাই ছিলেন। তাঁরা দুজন একই সময়ে নিজ নিজ মায়ের গর্ভে ছিলেন। হযরত ইয়াহ্ইয়ার (আঃ) মাতা প্রায়ই হযরত মারইয়ামকে (আঃ) বলতেনঃ “আমার এরূপ মনে হচ্ছে যে, আমার পেটের সন্তান যেন তোমার পেটের সন্তানের সামনে সিজদা করছে। এর দ্বারা হযরত ঈসার (আঃ) উচ্চ মর্যাদার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। কেননা, আল্লাহ তাআলার হুকুমে তিনি মৃতকে জীবিত করতেন এবং জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে ভাল করতেন। জমহুরের উক্তি তো এটাই যে, তিনি নয় মাস পর্যন্ত মাতার গর্ভে ছিলেন। ইকরামা (রঃ) বলেন, আট মাস পর্যন্ত ছিলেন। তিনি বলেন যে, এজন্যেই আট মাস পর্যন্ত থাকা সন্তান প্রায়ই বাঁচে না। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) গর্ভবতী হওয়ার সাথে সাথেই হযরত ঈসা (আঃ) জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এটা গারীব উক্তি। সম্ভৱতঃ আয়াতের বাহ্যিক শব্দ দেখেই তিনি এটা ধারণা করেছেন। কেননা, গর্ভ পৃথক হওয়া এবং প্রসব বেদনা শুরু হওয়ার বর্ণনা (আরবী) অক্ষরের সাথে রয়েছে। আর (আরবী) অক্ষরটি (আরবী) (পিছনে পিছনে আসা বা পরপরই আসা) এর জন্যে এসে থাকে। কিন্তু এই যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) বিষয় অনুপাতে হয়ে থাকে। অর্থাৎ “আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান হতে। অতঃপর আমি ওকে শুক্রবিন্দুরূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে। পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি জমাট রক্তে; অতঃপর জমাট রক্তকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে।" এখানেও দুই জায়গায় রয়েছে এবং এটাও এর জন্যেই বটে। কিন্তু হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, এই দুই অবস্থায় চল্লিশ দিনের ব্যবধান থাকে। কুরআন কারীমের এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখ নাই যে, আল্লাহ আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, অতঃপর যমীন সবুজ-শ্যামল হয়ে ওঠে?" (২২:৬৩) এটা স্পষ্টভাবে প্রকাশমান যে, বৃষ্টি বর্ষণের বহু দিন পরে মাঠ সবুজ শ্যামল হয়ে থাকে। অথচ (আরবী) এখানেও রয়েছে। সুতরাং বুঝা গেল যে, (আরবী) প্রত্যেক জিনিসের জন্যে ওর অনুপাতেই হয়ে থাকে।সোজা কথা এটাই যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) অন্যান্য স্ত্রী লোকদের মতই গর্ভধারণের পূর্ণ সময় অতিবাহিত করেন এবং ঐ সময় তিনি মসজিদেই কাটিয়ে দেন। মসজিদে আরো একজন খাদেম ছিলেন। তাঁর নাম ছিল ইউসুফ নাজ্জার। তিনি হযরত মারইয়ামকে (আঃ) ঐ অবস্থায় দেখে তার প্রতি কিছুটা সন্ধিহান হয়ে পড়েন। কিন্তু তার সংসার বিমুখতা খোদাভীরুতা, ইবাদত বন্দেগী এবং সত্যবাদিতার প্রতি খেয়াল করে তার ঐ সন্দেহ দূরীভূত হয়। কিন্তু যত যত দিন অতিবাহিত হয়, তার গর্ভ প্রকাশিত হতে থাকে। কাজেই আর তিনি নীরব থাকতে পারলেন না। একদিন আদবের সাথে তাঁকে বললেনঃ “হে মারইয়াম (আঃ)! আপনাকে আমি একটি কথা জিজ্ঞেস করছি অসন্তুষ্ট হবেন না। আচ্ছা বলুন তো, বিনা বীজে গাছ হয়? বিনা দানায় কি ফসল হয়? বিনা বাপে কি সন্তান হয়? হযরত মারইয়াম (আঃ) তাঁর উদ্দেশ্য বুঝে ফেললেন। তাই, তিনি উত্তরে বললেনঃ “এই সবকিছুই সম্ভ। সর্বপ্রথম যে গাছটি আল্লাহ সৃষ্টি করেন তা বিনা বীজেই ছিল। সর্বপ্রথম যে ফসল আল্লাহ উৎপন্ন করেন তা বিনা দানাতেই ছিল। আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম হযরত আদমকে (আঃ) সৃষ্টি করেন এবং তাঁর বাপ ছিল না। এমনকি মাও ছিল না। তার এ জবাবে ঐ লোকটি সব কিছু বুঝে নিলেন এবং আল্লাহর শক্তিকে অস্বীকার করতে পারলো না। হযরত মারইয়াম (আঃ) যখন দেখলেন যে, তাঁর কওমের লোকেরা তাঁর উপর অপবাদ দিতে শুরু করেছে, তখন তাদেরকে ছেড়ে তিনি বহু দূরে চলে। যান। ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক (রঃ) বলেন যে, যখন গর্ভের অবস্থা প্রকাশ হয়ে পড়ে, তখন তার কওম তাকে নানা কথা বলে। তারা হযরত ইউসুফ নাজ্জারের (রঃ) মত সৎলোকের উপর এই অপবাদ দেয়। তখন তিনি তাদের নিকট থেকে সরে পড়েন। না কেউ তাঁকে দেখতে পায় এবং না তিনি কাউকেও দেখতে পান। প্রসব বেদনা উঠে গেলে হযরত মারইয়াম (আঃ) একটি খেজুর গাছের নীচে বসে পড়েন। কথিত আছে যে, এই নির্জন স্থানটি ছিল বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকের কক্ষটি। এটাও একটি উক্তি আছে যে, যখন তিনি সিরিয়া ও মিসরের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছেন, তখন তার প্রসব বেদনা শুরু হয়। আর একটি উক্তি আছে যে, তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস হতে। আট মাইল দূরে গিয়েছিলেন। ঐ বস্তীটির নাম ছিল বাইতে লাহাম। পর্বে মিরাজের ঘটনায় একটি হাদীস গত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, হযরত ঈসার (আঃ) জন্ম গ্রহণের স্থানও ছিল বাইতে লাহাম। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রসিদ্ধ উক্তিও এটাই এবং খৃস্টানরা তো এর উপর একমত। আর উপরোক্ত হাদীস দ্বারাও এটাই প্রমাণিত হয় যদি ও হাদীসটি বিশুদ্ধ হয়।ঐ সময় হযরত মারইয়াম (আঃ) মৃত্যু কামনা করতে লাগলেন। কেননা, দ্বীনের ফিৎনার সময় এ কামনাও জায়েয। তিনি জানতেন যে, কেউই তাকে সত্যবাদিনী বলবে না এবং তাঁর বর্ণিত ঘটনাকে সবাই মনগড়া মনে করবে। দুনিয়া তঁাকে হতবুদ্ধি করে ফেলবে। ইবাদত ও স্থিরতায় বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে। সবাই তার দুর্নাম করবে। জনগণের মধ্যে খারাপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে। তাই, তিনি বলতে লাগলেনঃ “হায়! এর পূর্বে যদি আমি মরে যেতাম। এবং যদি আমাকে সৃষ্টি করাই না হতো! হায়! যদি আমি লোকের স্মৃতি হতে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হতাম!” লজ্জা শরম তাকে এমনভাবে পরিবেষ্টন করে ফেললো। যে, তিনি ঐ কষ্টের উপর মৃত্যুকেই প্রাধান্য দিলেন এবং কামনা করলেন যে, যদি তিনি জনগণের স্মৃতি হতে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে পড়তেন। তবে কতই না ভাল হতো! না কেউ তাকে স্মরণ করতো, না কেউ খোজ খবর নিতো, না তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করতো। হাদীস সমূহে মৃত্যু কামনা।করতে নিষেধ করা হয়েছে। আমরা ঐ রিওয়াইয়াতগুলিকে (আরবী) এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করে দিয়েছি।
মারইয়াম 19:24
২৪-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) এর দ্বিতীয় কিরআত (আরবী) ও রয়েছে। এই সম্বোধনকারী ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ)। হযরত ঈসার (আঃ) প্রথম কাজ তো ওটাই ছিল, যা তিনি তার মাতাকে দোষমুক্ত করা ও পবিত্রতা প্রকাশের ব্যাপারে জনগণের সামনে করেছিলেন। ঐ উপত্যকার নীচের পার্শ্বদেশ হতে হযরত মারইয়াম (আঃ) ঐ চিন্তা ও উদ্বেগের অবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে এইভাবে সান্ত্বনা দান করেছিলেন। এই উক্তিও রয়েছে যে, এই সান্ত্বনামূলক কথা হযরত ঈসাই (আঃ) বলেছিলেন। শব্দ আসেঃ দুঃখ করো না ও চিন্তিত হয়ো না। দেখো, তোমার পায়ের নীচে নির্মল, স্বচ্ছ মিষ্টপানির ঝরণা তোমার প্রতিপালক প্রবাহিত করে দিয়েছেন। তুমি এই পানি পান করে নাও। একটি উক্তি এটাও আছে যে, ঐ ঝর্ণনা বা প্রস্রবণ দ্বারা স্বয়ং হযরত ঈসাকেই (আঃ) বুঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। যেহেতু এই পানির বর্ণনার পরেই খাবারের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছেঃ যাও, খেজুরের এই গাছটিকে নাড়া দাও। এর থেকে টাটকা ও পুষ্ট খেজুর ঝরে পড়বে। কথিত আছে যে, ঐ খেজুরের গাছটি শুকিয়ে গিয়েছিল। আবার এ উক্তিও আছে যে, ওটা ফল দানকারীই ছিল। বাহ্যতঃ জানা যাচ্ছে যে, ঐ সময় ঐ গাছটি খেজুর শূন্য ছিল। কিন্তু হযরত মারইয়াম (আঃ) ওটা নাড়া দেয়া মাত্রই মহান আল্লাহর কুদরতে তার থেকে খেজুর ঝরে পড়তে থাকে। তার কাছে খাদ্য ও পানীয় সবকিছুই মওজুদ হয়ে গেল। আর তাকে পানাহারের অনুমতি দেয়া হলো। বলা হলোঃ ‘খাও, পান কর ও চক্ষু জুড়িয়ে নাও।হযরত আমরা ইবনু মায়মূন (রাঃ) বলেছেন যে, নিফাস বিশিষ্টা (নতুন সন্তান প্রসবকারিণী) মহিলাদের জন্যে টাটকা খেজুর ও শুষ্ক খেজুর অপেক্ষা উত্তম খাদ্য আর কিছুই নেই। হযরত আলী ইবনু আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা খেজুর বৃক্ষের সম্মান করো। কেননা, এটাকে ঐ মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে যা দ্বারা হযরত আদম (আঃ) সৃষ্টি হয়েছিলেন। এটা ছাড়া অন্য কোন গাছ নর ও মাদী মিলিত হয়ে ফলে না। স্ত্রী লোকদেরকে তাদের সন্তান প্রসবের সময় টাটকা খেজুর খেতে দেবে। না পেলে শুষ্ক খেজুরই যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলার নিকট অন্য কোন গাছ এর চেয়ে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন নয়। এ কারণেই এর নীচে হযরত মারইয়াম (আঃ) অবতারিতা হন।” (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা সম্পূর্ণরূপে মুনকার বা অস্বীকার্য) (আরবী) এর অন্য কিরআত (আরবী) ও (আরবী) রয়েছে। সব কিরআতের ভাবার্থ একই।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ তুমি কারো সাথে কথা বলো না, শুধু ইশারা ইঙ্গিতে তাদেরকে বুঝিয়ে দাও যে, তুমি রোযা রেখেছে। কিংবা উদ্দেশ্য এই যে, তাদের রোযায় কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল অথবা ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমি কথা বলা থেকেই রোযা রেখেছি। অর্থাৎ আমাকে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। হারেসা (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) নিকট অবস্থান করছিলাম। এমন সময় দু’জন লোক তার নিকট আগমন করে। তাদের একজন সালাম করলো কিন্তু অন্যজন সালাম করলো না। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সালাম না করার কারণ কি?” তার সঙ্গীরা উত্তরে বললোঃ “আজ কারো সাথে কথা না বলার সে কসম খেয়েছে। তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি লোকদের সাথে কথা বলো ও তাদেরকে সালাম দাও। এটা তো ছিল। শুধু হযরত মারইয়ামের (আঃ) জন্য। কেননা, আল্লাহ তাআলা তাঁর সত্যবাদিতা ও মাহাত্ম প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। এজন্যে তার পক্ষে ওটা ওযর ছিল।” (এটা ইসহাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুর রহমান ইবনু যায়েদ (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর মাতাকে বলেনঃ “আপনি বিচলিত হবেন না।" তখন তার মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ কিরূপে আমি বিচলিত না হই? আমার স্বামী নেই এবং আমি কারো অধিকারীভুক্ত বাদী বা দাসীও নই। দুনিয়াবাসী বলবে যে, এ সন্তান কিরূপে হলো? আমি তাদের সামনে কি জবাব দেবো? তাদের সামনে আমি কি ওর পেশ করবো? হায়! যদি আমি ইতিপূর্বেই মরে যেতাম! যদি আমি লোকের স্মৃতি হতে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম!" ঐ সময় হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “আম্মাজান! কারো সামনে কিছু বলার আপনার কোন প্রয়োজন নেই। যা কিছু বলার আমিই বলবো। আমিই আপনার জন্যে যথেষ্ট। মানুষের মধ্যে কাউকেও যদি আপনি দেখেন, তবে বলবেনঃ ‘আমি দয়াময়ের উদ্দেশ্যে মৌনতাবলম্বনের মানত করেছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোন মানুষের সাথে বাক্যালাপ করবো না।” তিনি বলেন যে, এগুলি সবই হযরত ঈসার (আঃ) তাঁর মাতার উদ্দেশ্যে উক্তি। অহাবও (রঃ) এরূপই বলেছেন। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মারইয়াম 19:25
২৪-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) এর দ্বিতীয় কিরআত (আরবী) ও রয়েছে। এই সম্বোধনকারী ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ)। হযরত ঈসার (আঃ) প্রথম কাজ তো ওটাই ছিল, যা তিনি তার মাতাকে দোষমুক্ত করা ও পবিত্রতা প্রকাশের ব্যাপারে জনগণের সামনে করেছিলেন। ঐ উপত্যকার নীচের পার্শ্বদেশ হতে হযরত মারইয়াম (আঃ) ঐ চিন্তা ও উদ্বেগের অবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে এইভাবে সান্ত্বনা দান করেছিলেন। এই উক্তিও রয়েছে যে, এই সান্ত্বনামূলক কথা হযরত ঈসাই (আঃ) বলেছিলেন। শব্দ আসেঃ দুঃখ করো না ও চিন্তিত হয়ো না। দেখো, তোমার পায়ের নীচে নির্মল, স্বচ্ছ মিষ্টপানির ঝরণা তোমার প্রতিপালক প্রবাহিত করে দিয়েছেন। তুমি এই পানি পান করে নাও। একটি উক্তি এটাও আছে যে, ঐ ঝর্ণনা বা প্রস্রবণ দ্বারা স্বয়ং হযরত ঈসাকেই (আঃ) বুঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। যেহেতু এই পানির বর্ণনার পরেই খাবারের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছেঃ যাও, খেজুরের এই গাছটিকে নাড়া দাও। এর থেকে টাটকা ও পুষ্ট খেজুর ঝরে পড়বে। কথিত আছে যে, ঐ খেজুরের গাছটি শুকিয়ে গিয়েছিল। আবার এ উক্তিও আছে যে, ওটা ফল দানকারীই ছিল। বাহ্যতঃ জানা যাচ্ছে যে, ঐ সময় ঐ গাছটি খেজুর শূন্য ছিল। কিন্তু হযরত মারইয়াম (আঃ) ওটা নাড়া দেয়া মাত্রই মহান আল্লাহর কুদরতে তার থেকে খেজুর ঝরে পড়তে থাকে। তার কাছে খাদ্য ও পানীয় সবকিছুই মওজুদ হয়ে গেল। আর তাকে পানাহারের অনুমতি দেয়া হলো। বলা হলোঃ ‘খাও, পান কর ও চক্ষু জুড়িয়ে নাও।হযরত আমরা ইবনু মায়মূন (রাঃ) বলেছেন যে, নিফাস বিশিষ্টা (নতুন সন্তান প্রসবকারিণী) মহিলাদের জন্যে টাটকা খেজুর ও শুষ্ক খেজুর অপেক্ষা উত্তম খাদ্য আর কিছুই নেই। হযরত আলী ইবনু আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা খেজুর বৃক্ষের সম্মান করো। কেননা, এটাকে ঐ মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে যা দ্বারা হযরত আদম (আঃ) সৃষ্টি হয়েছিলেন। এটা ছাড়া অন্য কোন গাছ নর ও মাদী মিলিত হয়ে ফলে না। স্ত্রী লোকদেরকে তাদের সন্তান প্রসবের সময় টাটকা খেজুর খেতে দেবে। না পেলে শুষ্ক খেজুরই যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলার নিকট অন্য কোন গাছ এর চেয়ে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন নয়। এ কারণেই এর নীচে হযরত মারইয়াম (আঃ) অবতারিতা হন।” (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা সম্পূর্ণরূপে মুনকার বা অস্বীকার্য) (আরবী) এর অন্য কিরআত (আরবী) ও (আরবী) রয়েছে। সব কিরআতের ভাবার্থ একই।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ তুমি কারো সাথে কথা বলো না, শুধু ইশারা ইঙ্গিতে তাদেরকে বুঝিয়ে দাও যে, তুমি রোযা রেখেছে। কিংবা উদ্দেশ্য এই যে, তাদের রোযায় কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল অথবা ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমি কথা বলা থেকেই রোযা রেখেছি। অর্থাৎ আমাকে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। হারেসা (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) নিকট অবস্থান করছিলাম। এমন সময় দু’জন লোক তার নিকট আগমন করে। তাদের একজন সালাম করলো কিন্তু অন্যজন সালাম করলো না। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সালাম না করার কারণ কি?” তার সঙ্গীরা উত্তরে বললোঃ “আজ কারো সাথে কথা না বলার সে কসম খেয়েছে। তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি লোকদের সাথে কথা বলো ও তাদেরকে সালাম দাও। এটা তো ছিল। শুধু হযরত মারইয়ামের (আঃ) জন্য। কেননা, আল্লাহ তাআলা তাঁর সত্যবাদিতা ও মাহাত্ম প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। এজন্যে তার পক্ষে ওটা ওযর ছিল।” (এটা ইসহাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুর রহমান ইবনু যায়েদ (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর মাতাকে বলেনঃ “আপনি বিচলিত হবেন না।" তখন তার মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ কিরূপে আমি বিচলিত না হই? আমার স্বামী নেই এবং আমি কারো অধিকারীভুক্ত বাদী বা দাসীও নই। দুনিয়াবাসী বলবে যে, এ সন্তান কিরূপে হলো? আমি তাদের সামনে কি জবাব দেবো? তাদের সামনে আমি কি ওর পেশ করবো? হায়! যদি আমি ইতিপূর্বেই মরে যেতাম! যদি আমি লোকের স্মৃতি হতে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম!" ঐ সময় হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “আম্মাজান! কারো সামনে কিছু বলার আপনার কোন প্রয়োজন নেই। যা কিছু বলার আমিই বলবো। আমিই আপনার জন্যে যথেষ্ট। মানুষের মধ্যে কাউকেও যদি আপনি দেখেন, তবে বলবেনঃ ‘আমি দয়াময়ের উদ্দেশ্যে মৌনতাবলম্বনের মানত করেছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোন মানুষের সাথে বাক্যালাপ করবো না।” তিনি বলেন যে, এগুলি সবই হযরত ঈসার (আঃ) তাঁর মাতার উদ্দেশ্যে উক্তি। অহাবও (রঃ) এরূপই বলেছেন। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মারইয়াম 19:26
২৪-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) এর দ্বিতীয় কিরআত (আরবী) ও রয়েছে। এই সম্বোধনকারী ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ)। হযরত ঈসার (আঃ) প্রথম কাজ তো ওটাই ছিল, যা তিনি তার মাতাকে দোষমুক্ত করা ও পবিত্রতা প্রকাশের ব্যাপারে জনগণের সামনে করেছিলেন। ঐ উপত্যকার নীচের পার্শ্বদেশ হতে হযরত মারইয়াম (আঃ) ঐ চিন্তা ও উদ্বেগের অবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে এইভাবে সান্ত্বনা দান করেছিলেন। এই উক্তিও রয়েছে যে, এই সান্ত্বনামূলক কথা হযরত ঈসাই (আঃ) বলেছিলেন। শব্দ আসেঃ দুঃখ করো না ও চিন্তিত হয়ো না। দেখো, তোমার পায়ের নীচে নির্মল, স্বচ্ছ মিষ্টপানির ঝরণা তোমার প্রতিপালক প্রবাহিত করে দিয়েছেন। তুমি এই পানি পান করে নাও। একটি উক্তি এটাও আছে যে, ঐ ঝর্ণনা বা প্রস্রবণ দ্বারা স্বয়ং হযরত ঈসাকেই (আঃ) বুঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। যেহেতু এই পানির বর্ণনার পরেই খাবারের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছেঃ যাও, খেজুরের এই গাছটিকে নাড়া দাও। এর থেকে টাটকা ও পুষ্ট খেজুর ঝরে পড়বে। কথিত আছে যে, ঐ খেজুরের গাছটি শুকিয়ে গিয়েছিল। আবার এ উক্তিও আছে যে, ওটা ফল দানকারীই ছিল। বাহ্যতঃ জানা যাচ্ছে যে, ঐ সময় ঐ গাছটি খেজুর শূন্য ছিল। কিন্তু হযরত মারইয়াম (আঃ) ওটা নাড়া দেয়া মাত্রই মহান আল্লাহর কুদরতে তার থেকে খেজুর ঝরে পড়তে থাকে। তার কাছে খাদ্য ও পানীয় সবকিছুই মওজুদ হয়ে গেল। আর তাকে পানাহারের অনুমতি দেয়া হলো। বলা হলোঃ ‘খাও, পান কর ও চক্ষু জুড়িয়ে নাও।হযরত আমরা ইবনু মায়মূন (রাঃ) বলেছেন যে, নিফাস বিশিষ্টা (নতুন সন্তান প্রসবকারিণী) মহিলাদের জন্যে টাটকা খেজুর ও শুষ্ক খেজুর অপেক্ষা উত্তম খাদ্য আর কিছুই নেই। হযরত আলী ইবনু আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা খেজুর বৃক্ষের সম্মান করো। কেননা, এটাকে ঐ মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে যা দ্বারা হযরত আদম (আঃ) সৃষ্টি হয়েছিলেন। এটা ছাড়া অন্য কোন গাছ নর ও মাদী মিলিত হয়ে ফলে না। স্ত্রী লোকদেরকে তাদের সন্তান প্রসবের সময় টাটকা খেজুর খেতে দেবে। না পেলে শুষ্ক খেজুরই যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলার নিকট অন্য কোন গাছ এর চেয়ে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন নয়। এ কারণেই এর নীচে হযরত মারইয়াম (আঃ) অবতারিতা হন।” (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা সম্পূর্ণরূপে মুনকার বা অস্বীকার্য) (আরবী) এর অন্য কিরআত (আরবী) ও (আরবী) রয়েছে। সব কিরআতের ভাবার্থ একই।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ তুমি কারো সাথে কথা বলো না, শুধু ইশারা ইঙ্গিতে তাদেরকে বুঝিয়ে দাও যে, তুমি রোযা রেখেছে। কিংবা উদ্দেশ্য এই যে, তাদের রোযায় কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল অথবা ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমি কথা বলা থেকেই রোযা রেখেছি। অর্থাৎ আমাকে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। হারেসা (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) নিকট অবস্থান করছিলাম। এমন সময় দু’জন লোক তার নিকট আগমন করে। তাদের একজন সালাম করলো কিন্তু অন্যজন সালাম করলো না। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সালাম না করার কারণ কি?” তার সঙ্গীরা উত্তরে বললোঃ “আজ কারো সাথে কথা না বলার সে কসম খেয়েছে। তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি লোকদের সাথে কথা বলো ও তাদেরকে সালাম দাও। এটা তো ছিল। শুধু হযরত মারইয়ামের (আঃ) জন্য। কেননা, আল্লাহ তাআলা তাঁর সত্যবাদিতা ও মাহাত্ম প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। এজন্যে তার পক্ষে ওটা ওযর ছিল।” (এটা ইসহাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুর রহমান ইবনু যায়েদ (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর মাতাকে বলেনঃ “আপনি বিচলিত হবেন না।" তখন তার মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ কিরূপে আমি বিচলিত না হই? আমার স্বামী নেই এবং আমি কারো অধিকারীভুক্ত বাদী বা দাসীও নই। দুনিয়াবাসী বলবে যে, এ সন্তান কিরূপে হলো? আমি তাদের সামনে কি জবাব দেবো? তাদের সামনে আমি কি ওর পেশ করবো? হায়! যদি আমি ইতিপূর্বেই মরে যেতাম! যদি আমি লোকের স্মৃতি হতে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম!" ঐ সময় হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “আম্মাজান! কারো সামনে কিছু বলার আপনার কোন প্রয়োজন নেই। যা কিছু বলার আমিই বলবো। আমিই আপনার জন্যে যথেষ্ট। মানুষের মধ্যে কাউকেও যদি আপনি দেখেন, তবে বলবেনঃ ‘আমি দয়াময়ের উদ্দেশ্যে মৌনতাবলম্বনের মানত করেছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোন মানুষের সাথে বাক্যালাপ করবো না।” তিনি বলেন যে, এগুলি সবই হযরত ঈসার (আঃ) তাঁর মাতার উদ্দেশ্যে উক্তি। অহাবও (রঃ) এরূপই বলেছেন। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মারইয়াম 19:27
২৭-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তাআলার এই হুকুমও মেনে নেন এবং নিজের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে জনগণের নিকট হাজির হন। তাঁকে ঐ অবস্থায় দেখা মাত্রই প্রত্যেকে সঁতে আঙ্গুল কাটে এবং সবারই মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়েঃ “মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো বড়ই মন্দ কাজ করেছো!” নাউফ বাকারী (রঃ) বলেন যে, লোকেরা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) খোজে বের হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলার কি মাহাত্ম যে, তারা কোথাও তাকে খুঁজে পায় নাই। পথে একজন রাখালের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হলে তারা তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “এরূপ এরূপ ধরণের কোন স্ত্রী লোককে এই জঙ্গলের কোন জায়গায় দেখেছো কি?” উত্তরে সে বলেঃ “না তো। তবে রাত্রে আমি এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখেছি। আমার এই সব গরু এই উপত্যকার দিকে সিজদায় পড়ে গিয়েছিল। ইতিপূর্বে আমি কখনো এরূপ দেখি নাই। আমি স্বচক্ষে ঐদিকে এক নূর (জ্যোতি) দেখেছি।” লোকগুলি ঐ নিশানা ধরে চলতে শুরু করে। এমতাবস্থায় তারা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) দেখতে পায় যে, তিনি সন্তানকে কোলে করে এগিয়ে আসছেন। লোকগুলিকে দেখে সেখানেই তিনি সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে পড়েন। তারা সবাই তাকে ঘিরে ফেলে এবং বলতে থাকেঃ “হে মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছে। তারা তাকে হারূণের ভগ্নী বলে সম্বোধন করার কারণ এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) বংশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অথবা হয়তো তাঁর পরিবারের মধ্যে হারূণ নামক একজন সৎ লোক ছিলেন এবং তিনি ইবাদত বন্দেগী ও আধ্যাত্মিক সাধনায় তাকেই অনুসরণ করছিলেন। এজন্যেই তাকে হারূণের ভগ্নী বলা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হারূণ নামক একজন দুষ্ট লোক ছিল। এজন্যে লোকেরা উপহাস করে তাকে হারূণের বোন বলেছিল। এসব উক্তি হতে সবচেয়ে বেশী গারীব উক্তি হলো এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) ও হযরত মূসার (আঃ) সহদরা ভগ্নী ছিলেন, যাকে হযরত মূসার (আঃ) মাতা হযরত মূসাকে বাক্সে ভরে সমুদ্রে নিক্ষেপ করার সময় বলেছিলেনঃ “তুমি এই বাক্সের পিছনে পিছনে সমুদ্রের ধার দিয়ে এমনভাবে চলবে যে, কেউ যেন বুঝতেই না পারে। কিন্তু এই উক্তিটি একেবারে ভুল ও ভিত্তিহীন। কেননা, কুরআন কারীম দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, হযরত ঈসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলের শেষ নবী ছিলেন। তার পরে শুধু খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ) নবী হন। আর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমিই হযরত ঈসা ইবনু মারইয়ামের (আঃ) সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী কেননা, আমার ও তার মাঝে অন্য কোন নবীর আবির্ভাব হয় নাই।" (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)সুতরাং যদি মুহাম্মদ ইবনু কা'ব কারাযীর (রঃ) উক্তি সঠিক হয় যে, হযরত ঈসার (আঃ) মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, তবে এটা মানতে হবে যে, তিনি হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমানের (আঃ) পূর্বে বিদ্যমান ছিলেন। কেননা, কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) পরে এসেছেন। আয়াত গুলি হলোঃ (আরবী) (২:২৪৬)।এই আয়াতগুলিতে হযরত দাউদের (আঃ) ঘটনা এবং তাঁর জাতকে হত্যা করার বর্ণনা রয়েছে। আর এতে এই শব্দ বিদ্যমান রয়েছে যে, এটা হযরত মূসার (আঃ) পরের ঘটনা। তিনি যে ভুল বুঝেছেন তার কারণ এই যে, তাওরাতে আছেঃ যখন হযরত মূসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলসহ সমুদ্র অতিক্রম করেন এবং ফিরাউন তার কওমসহ পানিতে নিমজ্জিত হয়, তখন মারইয়াম বিনতে ইমরান, যিনি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, অন্যান্য স্ত্রীলোকসহ দ (এক প্রকার বাদ্য যন্ত্র) বাজিয়ে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতঃ তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাওরাতের এই ইবারত থেকেই কারাযী (রঃ) মনে করে নিয়েছেন যে, ঐ মারইয়ামই হযরত ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন। অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল। হতে পারে যে, হযরত মূসার (আঃ) বোনের নামও মারইয়াম ছিল কিন্তু ঐ মারইয়াম যে ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন এর কোন প্রমাণ নেই, বরং এটা অস। হতে পারে যে, দুজনের একই নাম। একজনের নামে অন্যের নাম রাখা হয়ে থাকে। বাণী ইসরাঈলের তো এটা অভ্যাসই ছিল যে, তারা তাদের নবী ও ওয়ালীদের নামে নিজেদের নাম রাখতো। হযরত মুগীরা ইবনু শু'বা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে নাজরানে প্রেরণ করেন। সেখানে আমাকে খৃস্টানরা জিজ্ঞেস করেঃ “তোমরা (আরবী) পড়ে থাকো। অথচ হযরত মূসা (আঃ) তে। হযরত ঈসার (আঃ) বহু পূর্বে অতীত হয়েছেন?” ঐ সময় আমি তাদের এই প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারলাম না। মদীনায় ফিরে এসে আমি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সামনে ওটা বর্ণনা করলাম। তিনি বলেনঃ “তুমি তো তাদেরকে ঐ সময়েই এ উত্তর দিতে পারতে যে, ঐ লোকেরা তাদের পূর্ববর্তী নবী ও সৎ লোকদের নামে তাদের সন্তানদের নাম বরাবরই রেখে আসতো।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে। সহীহ মুসলিমেও এটা রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন।)বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত কা'ব (রাঃ) বলেছিলেনঃ “এই হারূণ হযরত মূসার (আঃ) ভাই হারূণ (আঃ) নন।" উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত কাবের (রাঃ) একথা অস্বীকার করেন। তখন হযরত কা'ব (রাঃ) তাকে বলেনঃ “যদি আপনি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হতে কিছু শুনে থাকেন, তবে আমি তা মানতে সম্মত আছি। অন্যথায় ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে তো তাদের মাঝে ছয় শ বছরের ব্যবধান রয়েছে। তাঁর একথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ) নীরব হয়ে যান। (এই ইতিহাসের ব্যাপারে কিছু চিন্তা বিবেচনার অবকাশ রয়েছে)হযতর কাতাদা (রঃ) বলেন যে, হযরত মারইয়ামের (আঃ) পরিবার ও বংশের লোক উপরের স্তর হতেই সৎ ও দ্বীনদার ছিলেন এবং এই দ্বীনদারী যেন বরাবরই উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছিল। কতকগুলি লোক এরূপই। হয়ে থাকেন। আবার কতক পরিবার ও বংশ এর বিপরীতও হয় যে, উপরের স্তর থেকে নীচের স্তর পর্যন্ত সবাই খারাপ হয়। এই হারূণ বড়ই বুযুর্গ লোক ছিলেন। এই কারণেই বাণী ইসরাঈলের মধ্যে হারূণ নাম রাখার সাধারণভাবে প্রচলন হয়ে যায়। এমন কি বর্ণিত আছে যে, যেই দিন এই হারূণের জানাযা বের হয় সেই দিন তার জানাযায় ঐ হারূণ নামেরই চল্লিশ হাজার লোক শরীক হয়েছিল।হযরত মারইয়ামের (আঃ) কওম তাকে তিরস্কারের সুরে বলেঃ “কি করে তুমি এরূপ অসৎ কাজ করলে? তুমি তো ভাল ঘরের মেয়ে! তোমার পিতামাতা উভয়েই ভাল ছিলেন। তোমার পরিবারের সমস্ত লোকই পবিত্র। এতদসত্ত্বেও কি করে তুমি একাজ করতে পারলে?” কওমের এই ভৎসনা মূলক কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) নির্দেশ অনুযায়ী তার শিশু সন্তানের দিকে ইশারা করেন। তারা তার মর্যাদা স্বীকার করে নাই বলে তাকে অন্যায়ভাবে অনেক কিছু বললো। তারা বললোঃ “তুমি কি আমাদেরকে পাগল পেয়েছে। যে, আমরা তোমার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবো? সে আমাদেরকে কি বলবে?” ইতিমধ্যেই হযরত ঈসা (আঃ) মায়ের কোল থেকেই বলে উঠলেনঃ “হে লোক সকল! আমি আল্লাহর একজন দাস।" হযরত ঈসার (আঃ) প্রথম উক্তি ছিল এটাই। তিনি মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করলেন এবং নিজের দাসত্বের কথা ঘোষণা করলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার ‘যাত বা সত্তাকে সন্তান জন্মদান হতে পবিত্র বলে ঘোষণা দিলেন, এমনকি তা সাব্যস্ত করে দিলেন। কেননা, সন্তান দাস হয় না। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আল্লাহ আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। এতে তিনি তাঁর মাতার দোষমুক্তির বর্ণনা দিয়েছেন এবং দলীলও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ “আমাকে আল্লাহ তাআলা নবী করেছেন এবং কিতাব দান করেছেন।"বর্ণিত আছে যে, যখন ঐ লোকগুলি হযরত মারইয়াম (আঃ) কে তিরস্কার করছিল ঐ সময় হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর দুধ পান করছিলেন। তাদের ঐ তিরস্কার বাণী শুনে তিনি স্তন থেকে মুখ টেনে নেন এবং বাম পার্শ্বে ফিরে তাদের দিকে মুখ করে এই উত্তর দেন। কথিত আছে যে, এই উক্তির সময় তার অঙ্গলী উখিত ছিল এবং হাত কাধ পর্যন্ত উঁচু ছিল। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, আমাকে কিতাব দিয়েছেন তার এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাকে কিতাব দেয়ার ইচ্ছা করেছেন। এটা পূর্ণ হবেই। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, জন্ম গ্রহণের সময়েই হযরত ঈসার (আঃ) সব কিছু মুখস্থ ছিল এবং তাকে সব কিছু শিখিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল। (কিন্তু এই উক্তিটির সনদ ঠিক নয়) হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “যেখানেই আমি থাকি না কেন, তিনি (আল্লাহ) আমাকে আশিস ভজিন করেছেন। আমি মানুষকে কল্যাণের কথা শিক্ষা দেবে এবং তারা আমার দ্বারা উপকৃত হবে।"বানূ মাখযুম গোত্রের গোলাম অহাব ইবনু অরূদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আলেম তার চেয়ে বড় একজন আলেমের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন! বলুন তো, আমার কোন আমল আমি ঘোষণা বা প্রচার করতে পারি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ। কেননা, এটাই হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন যা সহ তিনি তাঁর নবীদেরকে তার বান্দাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন। সমস্ত ধর্মশাস্ত্রবিদ এ বিষয়ে একমত যে, হযরত ঈসার (আঃ) এই সাধারণ বরকত দ্বারা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধকেই বুঝানো হয়েছে। তিনি যেখানেই আসতেন, যেতেন, উঠতেন ও বসতেন সেখানেই তার একাজ তিনি চালু রাখতেন। আল্লাহর কথা মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে তিনি কখনো কার্পণ্য করতেন না। হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যতদিন আমি জীবিত থাকবে, ততদিন যেন নামায পড়ি ও যাকাত প্রদান করি। আমাদের নবীকেও (সঃ) এই নির্দেশই দেয়া হয়েছিল। তার ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যু পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো।” (১৫:৯৯) সুতরাং হযরত ঈসাও (আঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ দুটি কাজ আমার উপর ফরয করে দিয়েছেন। এর দ্বারা তকদীর সাব্যস্ত হয় এবং যারা তকদীরকে অস্বীকার করে তাদের দাবী খণ্ডন করা হয়ে যায়।অতঃপর তিনি বলেনঃ আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সাথে সাথে আমাকে এ হুকুমও দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন আমার মাতার প্রতি অনুগত থাকি। কুরআন কারীমে এ দুটি বর্ণনা প্রায়ই একই সাথে দেয়া হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।” (১৭:২৩) অন্য এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো আমার ও তোমার পিতা-মাতার।” (৩১:১৪)তিনি বলেনঃ তিনি (আল্লাহ) আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেন নাই। আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন উদ্ধত করেন নাই যে, আমি তার ইবাদত এবং আমার মাতার আনুগত্যের ব্যাপারে অহংকার করি এবং হতভাগ্য হয়ে যাই। সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) ও (আরবী) হলো ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় কাউকেও হত্যা করে ফেলে। পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষী বলেছেন যে, পিতা-মাতার অবাধ্য সেই হয়, যে উদ্ধত ও হতভাগ্য হয়। দুশ্চরিত্র সেই হয়, যে গর্ব ও অহংকার করে। বর্ণিত আছে যে, একটি স্ত্রী লোক হযরত ঈসার (আঃ) মু'জিযাগুলি দেখে তাঁকে বলেঃ “ঐ পেট কতই না বরকতময়, যে পেট আপনাকে বহন করেছে এবং ঐ সন্তান কতইনা কল্যাণময়, যে আপনাকে দুধ পান করিয়েছে। তার একথার জবাবে হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “ঐ ব্যক্তির জন্যে সুসংবাদ, যে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, অতঃপর ওর অনুসরণ করে এবং উদ্ধত ও হতভাগ্য হয় না।”এরপর হযরত ঈসা (আঃ) বলেন, আমার প্রতি ছিল শান্তি যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি ও শান্তি থাকবে যে দিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হবে। এর দ্বারাও হযরত ঈসার (আঃ) দাসত্ব এবং সমস্ত মাখলুকের মত তিনিও যে আল্লাহর এক মাখলুক, এটা প্রমাণিত হচ্ছে। সমস্ত মানুষ যেমন অস্তিত্বহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছে, অনুরূপ ভাবে তিনিও অস্তুিতহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছেন। অতঃপর তিনি মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন জীবিত অবস্থায় পুনরুতিও হবেন। তবে এই তিনটি অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জন্যে এটা সহজ হয়ে যাবে। তার মধ্যে কোন উদ্বেগ ও ভয়-ভীতি থাকবে না; বরং তিনি পূর্ণভাবে শান্তি লাভ করবেন। তার উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:28
২৭-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তাআলার এই হুকুমও মেনে নেন এবং নিজের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে জনগণের নিকট হাজির হন। তাঁকে ঐ অবস্থায় দেখা মাত্রই প্রত্যেকে সঁতে আঙ্গুল কাটে এবং সবারই মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়েঃ “মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো বড়ই মন্দ কাজ করেছো!” নাউফ বাকারী (রঃ) বলেন যে, লোকেরা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) খোজে বের হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলার কি মাহাত্ম যে, তারা কোথাও তাকে খুঁজে পায় নাই। পথে একজন রাখালের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হলে তারা তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “এরূপ এরূপ ধরণের কোন স্ত্রী লোককে এই জঙ্গলের কোন জায়গায় দেখেছো কি?” উত্তরে সে বলেঃ “না তো। তবে রাত্রে আমি এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখেছি। আমার এই সব গরু এই উপত্যকার দিকে সিজদায় পড়ে গিয়েছিল। ইতিপূর্বে আমি কখনো এরূপ দেখি নাই। আমি স্বচক্ষে ঐদিকে এক নূর (জ্যোতি) দেখেছি।” লোকগুলি ঐ নিশানা ধরে চলতে শুরু করে। এমতাবস্থায় তারা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) দেখতে পায় যে, তিনি সন্তানকে কোলে করে এগিয়ে আসছেন। লোকগুলিকে দেখে সেখানেই তিনি সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে পড়েন। তারা সবাই তাকে ঘিরে ফেলে এবং বলতে থাকেঃ “হে মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছে। তারা তাকে হারূণের ভগ্নী বলে সম্বোধন করার কারণ এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) বংশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অথবা হয়তো তাঁর পরিবারের মধ্যে হারূণ নামক একজন সৎ লোক ছিলেন এবং তিনি ইবাদত বন্দেগী ও আধ্যাত্মিক সাধনায় তাকেই অনুসরণ করছিলেন। এজন্যেই তাকে হারূণের ভগ্নী বলা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হারূণ নামক একজন দুষ্ট লোক ছিল। এজন্যে লোকেরা উপহাস করে তাকে হারূণের বোন বলেছিল। এসব উক্তি হতে সবচেয়ে বেশী গারীব উক্তি হলো এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) ও হযরত মূসার (আঃ) সহদরা ভগ্নী ছিলেন, যাকে হযরত মূসার (আঃ) মাতা হযরত মূসাকে বাক্সে ভরে সমুদ্রে নিক্ষেপ করার সময় বলেছিলেনঃ “তুমি এই বাক্সের পিছনে পিছনে সমুদ্রের ধার দিয়ে এমনভাবে চলবে যে, কেউ যেন বুঝতেই না পারে। কিন্তু এই উক্তিটি একেবারে ভুল ও ভিত্তিহীন। কেননা, কুরআন কারীম দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, হযরত ঈসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলের শেষ নবী ছিলেন। তার পরে শুধু খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ) নবী হন। আর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমিই হযরত ঈসা ইবনু মারইয়ামের (আঃ) সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী কেননা, আমার ও তার মাঝে অন্য কোন নবীর আবির্ভাব হয় নাই।" (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)সুতরাং যদি মুহাম্মদ ইবনু কা'ব কারাযীর (রঃ) উক্তি সঠিক হয় যে, হযরত ঈসার (আঃ) মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, তবে এটা মানতে হবে যে, তিনি হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমানের (আঃ) পূর্বে বিদ্যমান ছিলেন। কেননা, কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) পরে এসেছেন। আয়াত গুলি হলোঃ (আরবী) (২:২৪৬)।এই আয়াতগুলিতে হযরত দাউদের (আঃ) ঘটনা এবং তাঁর জাতকে হত্যা করার বর্ণনা রয়েছে। আর এতে এই শব্দ বিদ্যমান রয়েছে যে, এটা হযরত মূসার (আঃ) পরের ঘটনা। তিনি যে ভুল বুঝেছেন তার কারণ এই যে, তাওরাতে আছেঃ যখন হযরত মূসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলসহ সমুদ্র অতিক্রম করেন এবং ফিরাউন তার কওমসহ পানিতে নিমজ্জিত হয়, তখন মারইয়াম বিনতে ইমরান, যিনি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, অন্যান্য স্ত্রীলোকসহ দ (এক প্রকার বাদ্য যন্ত্র) বাজিয়ে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতঃ তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাওরাতের এই ইবারত থেকেই কারাযী (রঃ) মনে করে নিয়েছেন যে, ঐ মারইয়ামই হযরত ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন। অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল। হতে পারে যে, হযরত মূসার (আঃ) বোনের নামও মারইয়াম ছিল কিন্তু ঐ মারইয়াম যে ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন এর কোন প্রমাণ নেই, বরং এটা অস। হতে পারে যে, দুজনের একই নাম। একজনের নামে অন্যের নাম রাখা হয়ে থাকে। বাণী ইসরাঈলের তো এটা অভ্যাসই ছিল যে, তারা তাদের নবী ও ওয়ালীদের নামে নিজেদের নাম রাখতো। হযরত মুগীরা ইবনু শু'বা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে নাজরানে প্রেরণ করেন। সেখানে আমাকে খৃস্টানরা জিজ্ঞেস করেঃ “তোমরা (আরবী) পড়ে থাকো। অথচ হযরত মূসা (আঃ) তে। হযরত ঈসার (আঃ) বহু পূর্বে অতীত হয়েছেন?” ঐ সময় আমি তাদের এই প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারলাম না। মদীনায় ফিরে এসে আমি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সামনে ওটা বর্ণনা করলাম। তিনি বলেনঃ “তুমি তো তাদেরকে ঐ সময়েই এ উত্তর দিতে পারতে যে, ঐ লোকেরা তাদের পূর্ববর্তী নবী ও সৎ লোকদের নামে তাদের সন্তানদের নাম বরাবরই রেখে আসতো।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে। সহীহ মুসলিমেও এটা রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন।)বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত কা'ব (রাঃ) বলেছিলেনঃ “এই হারূণ হযরত মূসার (আঃ) ভাই হারূণ (আঃ) নন।" উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত কাবের (রাঃ) একথা অস্বীকার করেন। তখন হযরত কা'ব (রাঃ) তাকে বলেনঃ “যদি আপনি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হতে কিছু শুনে থাকেন, তবে আমি তা মানতে সম্মত আছি। অন্যথায় ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে তো তাদের মাঝে ছয় শ বছরের ব্যবধান রয়েছে। তাঁর একথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ) নীরব হয়ে যান। (এই ইতিহাসের ব্যাপারে কিছু চিন্তা বিবেচনার অবকাশ রয়েছে)হযতর কাতাদা (রঃ) বলেন যে, হযরত মারইয়ামের (আঃ) পরিবার ও বংশের লোক উপরের স্তর হতেই সৎ ও দ্বীনদার ছিলেন এবং এই দ্বীনদারী যেন বরাবরই উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছিল। কতকগুলি লোক এরূপই। হয়ে থাকেন। আবার কতক পরিবার ও বংশ এর বিপরীতও হয় যে, উপরের স্তর থেকে নীচের স্তর পর্যন্ত সবাই খারাপ হয়। এই হারূণ বড়ই বুযুর্গ লোক ছিলেন। এই কারণেই বাণী ইসরাঈলের মধ্যে হারূণ নাম রাখার সাধারণভাবে প্রচলন হয়ে যায়। এমন কি বর্ণিত আছে যে, যেই দিন এই হারূণের জানাযা বের হয় সেই দিন তার জানাযায় ঐ হারূণ নামেরই চল্লিশ হাজার লোক শরীক হয়েছিল।হযরত মারইয়ামের (আঃ) কওম তাকে তিরস্কারের সুরে বলেঃ “কি করে তুমি এরূপ অসৎ কাজ করলে? তুমি তো ভাল ঘরের মেয়ে! তোমার পিতামাতা উভয়েই ভাল ছিলেন। তোমার পরিবারের সমস্ত লোকই পবিত্র। এতদসত্ত্বেও কি করে তুমি একাজ করতে পারলে?” কওমের এই ভৎসনা মূলক কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) নির্দেশ অনুযায়ী তার শিশু সন্তানের দিকে ইশারা করেন। তারা তার মর্যাদা স্বীকার করে নাই বলে তাকে অন্যায়ভাবে অনেক কিছু বললো। তারা বললোঃ “তুমি কি আমাদেরকে পাগল পেয়েছে। যে, আমরা তোমার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবো? সে আমাদেরকে কি বলবে?” ইতিমধ্যেই হযরত ঈসা (আঃ) মায়ের কোল থেকেই বলে উঠলেনঃ “হে লোক সকল! আমি আল্লাহর একজন দাস।" হযরত ঈসার (আঃ) প্রথম উক্তি ছিল এটাই। তিনি মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করলেন এবং নিজের দাসত্বের কথা ঘোষণা করলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার ‘যাত বা সত্তাকে সন্তান জন্মদান হতে পবিত্র বলে ঘোষণা দিলেন, এমনকি তা সাব্যস্ত করে দিলেন। কেননা, সন্তান দাস হয় না। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আল্লাহ আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। এতে তিনি তাঁর মাতার দোষমুক্তির বর্ণনা দিয়েছেন এবং দলীলও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ “আমাকে আল্লাহ তাআলা নবী করেছেন এবং কিতাব দান করেছেন।"বর্ণিত আছে যে, যখন ঐ লোকগুলি হযরত মারইয়াম (আঃ) কে তিরস্কার করছিল ঐ সময় হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর দুধ পান করছিলেন। তাদের ঐ তিরস্কার বাণী শুনে তিনি স্তন থেকে মুখ টেনে নেন এবং বাম পার্শ্বে ফিরে তাদের দিকে মুখ করে এই উত্তর দেন। কথিত আছে যে, এই উক্তির সময় তার অঙ্গলী উখিত ছিল এবং হাত কাধ পর্যন্ত উঁচু ছিল। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, আমাকে কিতাব দিয়েছেন তার এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাকে কিতাব দেয়ার ইচ্ছা করেছেন। এটা পূর্ণ হবেই। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, জন্ম গ্রহণের সময়েই হযরত ঈসার (আঃ) সব কিছু মুখস্থ ছিল এবং তাকে সব কিছু শিখিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল। (কিন্তু এই উক্তিটির সনদ ঠিক নয়) হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “যেখানেই আমি থাকি না কেন, তিনি (আল্লাহ) আমাকে আশিস ভজিন করেছেন। আমি মানুষকে কল্যাণের কথা শিক্ষা দেবে এবং তারা আমার দ্বারা উপকৃত হবে।"বানূ মাখযুম গোত্রের গোলাম অহাব ইবনু অরূদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আলেম তার চেয়ে বড় একজন আলেমের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন! বলুন তো, আমার কোন আমল আমি ঘোষণা বা প্রচার করতে পারি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ। কেননা, এটাই হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন যা সহ তিনি তাঁর নবীদেরকে তার বান্দাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন। সমস্ত ধর্মশাস্ত্রবিদ এ বিষয়ে একমত যে, হযরত ঈসার (আঃ) এই সাধারণ বরকত দ্বারা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধকেই বুঝানো হয়েছে। তিনি যেখানেই আসতেন, যেতেন, উঠতেন ও বসতেন সেখানেই তার একাজ তিনি চালু রাখতেন। আল্লাহর কথা মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে তিনি কখনো কার্পণ্য করতেন না। হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যতদিন আমি জীবিত থাকবে, ততদিন যেন নামায পড়ি ও যাকাত প্রদান করি। আমাদের নবীকেও (সঃ) এই নির্দেশই দেয়া হয়েছিল। তার ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যু পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো।” (১৫:৯৯) সুতরাং হযরত ঈসাও (আঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ দুটি কাজ আমার উপর ফরয করে দিয়েছেন। এর দ্বারা তকদীর সাব্যস্ত হয় এবং যারা তকদীরকে অস্বীকার করে তাদের দাবী খণ্ডন করা হয়ে যায়।অতঃপর তিনি বলেনঃ আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সাথে সাথে আমাকে এ হুকুমও দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন আমার মাতার প্রতি অনুগত থাকি। কুরআন কারীমে এ দুটি বর্ণনা প্রায়ই একই সাথে দেয়া হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।” (১৭:২৩) অন্য এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো আমার ও তোমার পিতা-মাতার।” (৩১:১৪)তিনি বলেনঃ তিনি (আল্লাহ) আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেন নাই। আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন উদ্ধত করেন নাই যে, আমি তার ইবাদত এবং আমার মাতার আনুগত্যের ব্যাপারে অহংকার করি এবং হতভাগ্য হয়ে যাই। সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) ও (আরবী) হলো ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় কাউকেও হত্যা করে ফেলে। পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষী বলেছেন যে, পিতা-মাতার অবাধ্য সেই হয়, যে উদ্ধত ও হতভাগ্য হয়। দুশ্চরিত্র সেই হয়, যে গর্ব ও অহংকার করে। বর্ণিত আছে যে, একটি স্ত্রী লোক হযরত ঈসার (আঃ) মু'জিযাগুলি দেখে তাঁকে বলেঃ “ঐ পেট কতই না বরকতময়, যে পেট আপনাকে বহন করেছে এবং ঐ সন্তান কতইনা কল্যাণময়, যে আপনাকে দুধ পান করিয়েছে। তার একথার জবাবে হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “ঐ ব্যক্তির জন্যে সুসংবাদ, যে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, অতঃপর ওর অনুসরণ করে এবং উদ্ধত ও হতভাগ্য হয় না।”এরপর হযরত ঈসা (আঃ) বলেন, আমার প্রতি ছিল শান্তি যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি ও শান্তি থাকবে যে দিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হবে। এর দ্বারাও হযরত ঈসার (আঃ) দাসত্ব এবং সমস্ত মাখলুকের মত তিনিও যে আল্লাহর এক মাখলুক, এটা প্রমাণিত হচ্ছে। সমস্ত মানুষ যেমন অস্তিত্বহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছে, অনুরূপ ভাবে তিনিও অস্তুিতহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছেন। অতঃপর তিনি মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন জীবিত অবস্থায় পুনরুতিও হবেন। তবে এই তিনটি অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জন্যে এটা সহজ হয়ে যাবে। তার মধ্যে কোন উদ্বেগ ও ভয়-ভীতি থাকবে না; বরং তিনি পূর্ণভাবে শান্তি লাভ করবেন। তার উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:29
২৭-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তাআলার এই হুকুমও মেনে নেন এবং নিজের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে জনগণের নিকট হাজির হন। তাঁকে ঐ অবস্থায় দেখা মাত্রই প্রত্যেকে সঁতে আঙ্গুল কাটে এবং সবারই মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়েঃ “মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো বড়ই মন্দ কাজ করেছো!” নাউফ বাকারী (রঃ) বলেন যে, লোকেরা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) খোজে বের হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলার কি মাহাত্ম যে, তারা কোথাও তাকে খুঁজে পায় নাই। পথে একজন রাখালের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হলে তারা তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “এরূপ এরূপ ধরণের কোন স্ত্রী লোককে এই জঙ্গলের কোন জায়গায় দেখেছো কি?” উত্তরে সে বলেঃ “না তো। তবে রাত্রে আমি এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখেছি। আমার এই সব গরু এই উপত্যকার দিকে সিজদায় পড়ে গিয়েছিল। ইতিপূর্বে আমি কখনো এরূপ দেখি নাই। আমি স্বচক্ষে ঐদিকে এক নূর (জ্যোতি) দেখেছি।” লোকগুলি ঐ নিশানা ধরে চলতে শুরু করে। এমতাবস্থায় তারা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) দেখতে পায় যে, তিনি সন্তানকে কোলে করে এগিয়ে আসছেন। লোকগুলিকে দেখে সেখানেই তিনি সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে পড়েন। তারা সবাই তাকে ঘিরে ফেলে এবং বলতে থাকেঃ “হে মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছে। তারা তাকে হারূণের ভগ্নী বলে সম্বোধন করার কারণ এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) বংশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অথবা হয়তো তাঁর পরিবারের মধ্যে হারূণ নামক একজন সৎ লোক ছিলেন এবং তিনি ইবাদত বন্দেগী ও আধ্যাত্মিক সাধনায় তাকেই অনুসরণ করছিলেন। এজন্যেই তাকে হারূণের ভগ্নী বলা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হারূণ নামক একজন দুষ্ট লোক ছিল। এজন্যে লোকেরা উপহাস করে তাকে হারূণের বোন বলেছিল। এসব উক্তি হতে সবচেয়ে বেশী গারীব উক্তি হলো এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) ও হযরত মূসার (আঃ) সহদরা ভগ্নী ছিলেন, যাকে হযরত মূসার (আঃ) মাতা হযরত মূসাকে বাক্সে ভরে সমুদ্রে নিক্ষেপ করার সময় বলেছিলেনঃ “তুমি এই বাক্সের পিছনে পিছনে সমুদ্রের ধার দিয়ে এমনভাবে চলবে যে, কেউ যেন বুঝতেই না পারে। কিন্তু এই উক্তিটি একেবারে ভুল ও ভিত্তিহীন। কেননা, কুরআন কারীম দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, হযরত ঈসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলের শেষ নবী ছিলেন। তার পরে শুধু খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ) নবী হন। আর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমিই হযরত ঈসা ইবনু মারইয়ামের (আঃ) সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী কেননা, আমার ও তার মাঝে অন্য কোন নবীর আবির্ভাব হয় নাই।" (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)সুতরাং যদি মুহাম্মদ ইবনু কা'ব কারাযীর (রঃ) উক্তি সঠিক হয় যে, হযরত ঈসার (আঃ) মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, তবে এটা মানতে হবে যে, তিনি হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমানের (আঃ) পূর্বে বিদ্যমান ছিলেন। কেননা, কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) পরে এসেছেন। আয়াত গুলি হলোঃ (আরবী) (২:২৪৬)।এই আয়াতগুলিতে হযরত দাউদের (আঃ) ঘটনা এবং তাঁর জাতকে হত্যা করার বর্ণনা রয়েছে। আর এতে এই শব্দ বিদ্যমান রয়েছে যে, এটা হযরত মূসার (আঃ) পরের ঘটনা। তিনি যে ভুল বুঝেছেন তার কারণ এই যে, তাওরাতে আছেঃ যখন হযরত মূসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলসহ সমুদ্র অতিক্রম করেন এবং ফিরাউন তার কওমসহ পানিতে নিমজ্জিত হয়, তখন মারইয়াম বিনতে ইমরান, যিনি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, অন্যান্য স্ত্রীলোকসহ দ (এক প্রকার বাদ্য যন্ত্র) বাজিয়ে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতঃ তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাওরাতের এই ইবারত থেকেই কারাযী (রঃ) মনে করে নিয়েছেন যে, ঐ মারইয়ামই হযরত ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন। অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল। হতে পারে যে, হযরত মূসার (আঃ) বোনের নামও মারইয়াম ছিল কিন্তু ঐ মারইয়াম যে ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন এর কোন প্রমাণ নেই, বরং এটা অস। হতে পারে যে, দুজনের একই নাম। একজনের নামে অন্যের নাম রাখা হয়ে থাকে। বাণী ইসরাঈলের তো এটা অভ্যাসই ছিল যে, তারা তাদের নবী ও ওয়ালীদের নামে নিজেদের নাম রাখতো। হযরত মুগীরা ইবনু শু'বা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে নাজরানে প্রেরণ করেন। সেখানে আমাকে খৃস্টানরা জিজ্ঞেস করেঃ “তোমরা (আরবী) পড়ে থাকো। অথচ হযরত মূসা (আঃ) তে। হযরত ঈসার (আঃ) বহু পূর্বে অতীত হয়েছেন?” ঐ সময় আমি তাদের এই প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারলাম না। মদীনায় ফিরে এসে আমি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সামনে ওটা বর্ণনা করলাম। তিনি বলেনঃ “তুমি তো তাদেরকে ঐ সময়েই এ উত্তর দিতে পারতে যে, ঐ লোকেরা তাদের পূর্ববর্তী নবী ও সৎ লোকদের নামে তাদের সন্তানদের নাম বরাবরই রেখে আসতো।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে। সহীহ মুসলিমেও এটা রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন।)বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত কা'ব (রাঃ) বলেছিলেনঃ “এই হারূণ হযরত মূসার (আঃ) ভাই হারূণ (আঃ) নন।" উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত কাবের (রাঃ) একথা অস্বীকার করেন। তখন হযরত কা'ব (রাঃ) তাকে বলেনঃ “যদি আপনি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হতে কিছু শুনে থাকেন, তবে আমি তা মানতে সম্মত আছি। অন্যথায় ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে তো তাদের মাঝে ছয় শ বছরের ব্যবধান রয়েছে। তাঁর একথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ) নীরব হয়ে যান। (এই ইতিহাসের ব্যাপারে কিছু চিন্তা বিবেচনার অবকাশ রয়েছে)হযতর কাতাদা (রঃ) বলেন যে, হযরত মারইয়ামের (আঃ) পরিবার ও বংশের লোক উপরের স্তর হতেই সৎ ও দ্বীনদার ছিলেন এবং এই দ্বীনদারী যেন বরাবরই উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছিল। কতকগুলি লোক এরূপই। হয়ে থাকেন। আবার কতক পরিবার ও বংশ এর বিপরীতও হয় যে, উপরের স্তর থেকে নীচের স্তর পর্যন্ত সবাই খারাপ হয়। এই হারূণ বড়ই বুযুর্গ লোক ছিলেন। এই কারণেই বাণী ইসরাঈলের মধ্যে হারূণ নাম রাখার সাধারণভাবে প্রচলন হয়ে যায়। এমন কি বর্ণিত আছে যে, যেই দিন এই হারূণের জানাযা বের হয় সেই দিন তার জানাযায় ঐ হারূণ নামেরই চল্লিশ হাজার লোক শরীক হয়েছিল।হযরত মারইয়ামের (আঃ) কওম তাকে তিরস্কারের সুরে বলেঃ “কি করে তুমি এরূপ অসৎ কাজ করলে? তুমি তো ভাল ঘরের মেয়ে! তোমার পিতামাতা উভয়েই ভাল ছিলেন। তোমার পরিবারের সমস্ত লোকই পবিত্র। এতদসত্ত্বেও কি করে তুমি একাজ করতে পারলে?” কওমের এই ভৎসনা মূলক কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) নির্দেশ অনুযায়ী তার শিশু সন্তানের দিকে ইশারা করেন। তারা তার মর্যাদা স্বীকার করে নাই বলে তাকে অন্যায়ভাবে অনেক কিছু বললো। তারা বললোঃ “তুমি কি আমাদেরকে পাগল পেয়েছে। যে, আমরা তোমার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবো? সে আমাদেরকে কি বলবে?” ইতিমধ্যেই হযরত ঈসা (আঃ) মায়ের কোল থেকেই বলে উঠলেনঃ “হে লোক সকল! আমি আল্লাহর একজন দাস।" হযরত ঈসার (আঃ) প্রথম উক্তি ছিল এটাই। তিনি মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করলেন এবং নিজের দাসত্বের কথা ঘোষণা করলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার ‘যাত বা সত্তাকে সন্তান জন্মদান হতে পবিত্র বলে ঘোষণা দিলেন, এমনকি তা সাব্যস্ত করে দিলেন। কেননা, সন্তান দাস হয় না। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আল্লাহ আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। এতে তিনি তাঁর মাতার দোষমুক্তির বর্ণনা দিয়েছেন এবং দলীলও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ “আমাকে আল্লাহ তাআলা নবী করেছেন এবং কিতাব দান করেছেন।"বর্ণিত আছে যে, যখন ঐ লোকগুলি হযরত মারইয়াম (আঃ) কে তিরস্কার করছিল ঐ সময় হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর দুধ পান করছিলেন। তাদের ঐ তিরস্কার বাণী শুনে তিনি স্তন থেকে মুখ টেনে নেন এবং বাম পার্শ্বে ফিরে তাদের দিকে মুখ করে এই উত্তর দেন। কথিত আছে যে, এই উক্তির সময় তার অঙ্গলী উখিত ছিল এবং হাত কাধ পর্যন্ত উঁচু ছিল। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, আমাকে কিতাব দিয়েছেন তার এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাকে কিতাব দেয়ার ইচ্ছা করেছেন। এটা পূর্ণ হবেই। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, জন্ম গ্রহণের সময়েই হযরত ঈসার (আঃ) সব কিছু মুখস্থ ছিল এবং তাকে সব কিছু শিখিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল। (কিন্তু এই উক্তিটির সনদ ঠিক নয়) হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “যেখানেই আমি থাকি না কেন, তিনি (আল্লাহ) আমাকে আশিস ভজিন করেছেন। আমি মানুষকে কল্যাণের কথা শিক্ষা দেবে এবং তারা আমার দ্বারা উপকৃত হবে।"বানূ মাখযুম গোত্রের গোলাম অহাব ইবনু অরূদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আলেম তার চেয়ে বড় একজন আলেমের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন! বলুন তো, আমার কোন আমল আমি ঘোষণা বা প্রচার করতে পারি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ। কেননা, এটাই হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন যা সহ তিনি তাঁর নবীদেরকে তার বান্দাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন। সমস্ত ধর্মশাস্ত্রবিদ এ বিষয়ে একমত যে, হযরত ঈসার (আঃ) এই সাধারণ বরকত দ্বারা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধকেই বুঝানো হয়েছে। তিনি যেখানেই আসতেন, যেতেন, উঠতেন ও বসতেন সেখানেই তার একাজ তিনি চালু রাখতেন। আল্লাহর কথা মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে তিনি কখনো কার্পণ্য করতেন না। হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যতদিন আমি জীবিত থাকবে, ততদিন যেন নামায পড়ি ও যাকাত প্রদান করি। আমাদের নবীকেও (সঃ) এই নির্দেশই দেয়া হয়েছিল। তার ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যু পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো।” (১৫:৯৯) সুতরাং হযরত ঈসাও (আঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ দুটি কাজ আমার উপর ফরয করে দিয়েছেন। এর দ্বারা তকদীর সাব্যস্ত হয় এবং যারা তকদীরকে অস্বীকার করে তাদের দাবী খণ্ডন করা হয়ে যায়।অতঃপর তিনি বলেনঃ আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সাথে সাথে আমাকে এ হুকুমও দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন আমার মাতার প্রতি অনুগত থাকি। কুরআন কারীমে এ দুটি বর্ণনা প্রায়ই একই সাথে দেয়া হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।” (১৭:২৩) অন্য এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো আমার ও তোমার পিতা-মাতার।” (৩১:১৪)তিনি বলেনঃ তিনি (আল্লাহ) আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেন নাই। আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন উদ্ধত করেন নাই যে, আমি তার ইবাদত এবং আমার মাতার আনুগত্যের ব্যাপারে অহংকার করি এবং হতভাগ্য হয়ে যাই। সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) ও (আরবী) হলো ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় কাউকেও হত্যা করে ফেলে। পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষী বলেছেন যে, পিতা-মাতার অবাধ্য সেই হয়, যে উদ্ধত ও হতভাগ্য হয়। দুশ্চরিত্র সেই হয়, যে গর্ব ও অহংকার করে। বর্ণিত আছে যে, একটি স্ত্রী লোক হযরত ঈসার (আঃ) মু'জিযাগুলি দেখে তাঁকে বলেঃ “ঐ পেট কতই না বরকতময়, যে পেট আপনাকে বহন করেছে এবং ঐ সন্তান কতইনা কল্যাণময়, যে আপনাকে দুধ পান করিয়েছে। তার একথার জবাবে হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “ঐ ব্যক্তির জন্যে সুসংবাদ, যে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, অতঃপর ওর অনুসরণ করে এবং উদ্ধত ও হতভাগ্য হয় না।”এরপর হযরত ঈসা (আঃ) বলেন, আমার প্রতি ছিল শান্তি যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি ও শান্তি থাকবে যে দিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হবে। এর দ্বারাও হযরত ঈসার (আঃ) দাসত্ব এবং সমস্ত মাখলুকের মত তিনিও যে আল্লাহর এক মাখলুক, এটা প্রমাণিত হচ্ছে। সমস্ত মানুষ যেমন অস্তিত্বহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছে, অনুরূপ ভাবে তিনিও অস্তুিতহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছেন। অতঃপর তিনি মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন জীবিত অবস্থায় পুনরুতিও হবেন। তবে এই তিনটি অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জন্যে এটা সহজ হয়ে যাবে। তার মধ্যে কোন উদ্বেগ ও ভয়-ভীতি থাকবে না; বরং তিনি পূর্ণভাবে শান্তি লাভ করবেন। তার উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:30
২৭-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তাআলার এই হুকুমও মেনে নেন এবং নিজের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে জনগণের নিকট হাজির হন। তাঁকে ঐ অবস্থায় দেখা মাত্রই প্রত্যেকে সঁতে আঙ্গুল কাটে এবং সবারই মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়েঃ “মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো বড়ই মন্দ কাজ করেছো!” নাউফ বাকারী (রঃ) বলেন যে, লোকেরা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) খোজে বের হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলার কি মাহাত্ম যে, তারা কোথাও তাকে খুঁজে পায় নাই। পথে একজন রাখালের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হলে তারা তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “এরূপ এরূপ ধরণের কোন স্ত্রী লোককে এই জঙ্গলের কোন জায়গায় দেখেছো কি?” উত্তরে সে বলেঃ “না তো। তবে রাত্রে আমি এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখেছি। আমার এই সব গরু এই উপত্যকার দিকে সিজদায় পড়ে গিয়েছিল। ইতিপূর্বে আমি কখনো এরূপ দেখি নাই। আমি স্বচক্ষে ঐদিকে এক নূর (জ্যোতি) দেখেছি।” লোকগুলি ঐ নিশানা ধরে চলতে শুরু করে। এমতাবস্থায় তারা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) দেখতে পায় যে, তিনি সন্তানকে কোলে করে এগিয়ে আসছেন। লোকগুলিকে দেখে সেখানেই তিনি সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে পড়েন। তারা সবাই তাকে ঘিরে ফেলে এবং বলতে থাকেঃ “হে মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছে। তারা তাকে হারূণের ভগ্নী বলে সম্বোধন করার কারণ এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) বংশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অথবা হয়তো তাঁর পরিবারের মধ্যে হারূণ নামক একজন সৎ লোক ছিলেন এবং তিনি ইবাদত বন্দেগী ও আধ্যাত্মিক সাধনায় তাকেই অনুসরণ করছিলেন। এজন্যেই তাকে হারূণের ভগ্নী বলা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হারূণ নামক একজন দুষ্ট লোক ছিল। এজন্যে লোকেরা উপহাস করে তাকে হারূণের বোন বলেছিল। এসব উক্তি হতে সবচেয়ে বেশী গারীব উক্তি হলো এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) ও হযরত মূসার (আঃ) সহদরা ভগ্নী ছিলেন, যাকে হযরত মূসার (আঃ) মাতা হযরত মূসাকে বাক্সে ভরে সমুদ্রে নিক্ষেপ করার সময় বলেছিলেনঃ “তুমি এই বাক্সের পিছনে পিছনে সমুদ্রের ধার দিয়ে এমনভাবে চলবে যে, কেউ যেন বুঝতেই না পারে। কিন্তু এই উক্তিটি একেবারে ভুল ও ভিত্তিহীন। কেননা, কুরআন কারীম দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, হযরত ঈসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলের শেষ নবী ছিলেন। তার পরে শুধু খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ) নবী হন। আর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমিই হযরত ঈসা ইবনু মারইয়ামের (আঃ) সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী কেননা, আমার ও তার মাঝে অন্য কোন নবীর আবির্ভাব হয় নাই।" (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)সুতরাং যদি মুহাম্মদ ইবনু কা'ব কারাযীর (রঃ) উক্তি সঠিক হয় যে, হযরত ঈসার (আঃ) মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, তবে এটা মানতে হবে যে, তিনি হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমানের (আঃ) পূর্বে বিদ্যমান ছিলেন। কেননা, কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) পরে এসেছেন। আয়াত গুলি হলোঃ (আরবী) (২:২৪৬)।এই আয়াতগুলিতে হযরত দাউদের (আঃ) ঘটনা এবং তাঁর জাতকে হত্যা করার বর্ণনা রয়েছে। আর এতে এই শব্দ বিদ্যমান রয়েছে যে, এটা হযরত মূসার (আঃ) পরের ঘটনা। তিনি যে ভুল বুঝেছেন তার কারণ এই যে, তাওরাতে আছেঃ যখন হযরত মূসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলসহ সমুদ্র অতিক্রম করেন এবং ফিরাউন তার কওমসহ পানিতে নিমজ্জিত হয়, তখন মারইয়াম বিনতে ইমরান, যিনি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, অন্যান্য স্ত্রীলোকসহ দ (এক প্রকার বাদ্য যন্ত্র) বাজিয়ে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতঃ তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাওরাতের এই ইবারত থেকেই কারাযী (রঃ) মনে করে নিয়েছেন যে, ঐ মারইয়ামই হযরত ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন। অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল। হতে পারে যে, হযরত মূসার (আঃ) বোনের নামও মারইয়াম ছিল কিন্তু ঐ মারইয়াম যে ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন এর কোন প্রমাণ নেই, বরং এটা অস। হতে পারে যে, দুজনের একই নাম। একজনের নামে অন্যের নাম রাখা হয়ে থাকে। বাণী ইসরাঈলের তো এটা অভ্যাসই ছিল যে, তারা তাদের নবী ও ওয়ালীদের নামে নিজেদের নাম রাখতো। হযরত মুগীরা ইবনু শু'বা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে নাজরানে প্রেরণ করেন। সেখানে আমাকে খৃস্টানরা জিজ্ঞেস করেঃ “তোমরা (আরবী) পড়ে থাকো। অথচ হযরত মূসা (আঃ) তে। হযরত ঈসার (আঃ) বহু পূর্বে অতীত হয়েছেন?” ঐ সময় আমি তাদের এই প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারলাম না। মদীনায় ফিরে এসে আমি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সামনে ওটা বর্ণনা করলাম। তিনি বলেনঃ “তুমি তো তাদেরকে ঐ সময়েই এ উত্তর দিতে পারতে যে, ঐ লোকেরা তাদের পূর্ববর্তী নবী ও সৎ লোকদের নামে তাদের সন্তানদের নাম বরাবরই রেখে আসতো।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে। সহীহ মুসলিমেও এটা রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন।)বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত কা'ব (রাঃ) বলেছিলেনঃ “এই হারূণ হযরত মূসার (আঃ) ভাই হারূণ (আঃ) নন।" উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত কাবের (রাঃ) একথা অস্বীকার করেন। তখন হযরত কা'ব (রাঃ) তাকে বলেনঃ “যদি আপনি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হতে কিছু শুনে থাকেন, তবে আমি তা মানতে সম্মত আছি। অন্যথায় ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে তো তাদের মাঝে ছয় শ বছরের ব্যবধান রয়েছে। তাঁর একথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ) নীরব হয়ে যান। (এই ইতিহাসের ব্যাপারে কিছু চিন্তা বিবেচনার অবকাশ রয়েছে)হযতর কাতাদা (রঃ) বলেন যে, হযরত মারইয়ামের (আঃ) পরিবার ও বংশের লোক উপরের স্তর হতেই সৎ ও দ্বীনদার ছিলেন এবং এই দ্বীনদারী যেন বরাবরই উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছিল। কতকগুলি লোক এরূপই। হয়ে থাকেন। আবার কতক পরিবার ও বংশ এর বিপরীতও হয় যে, উপরের স্তর থেকে নীচের স্তর পর্যন্ত সবাই খারাপ হয়। এই হারূণ বড়ই বুযুর্গ লোক ছিলেন। এই কারণেই বাণী ইসরাঈলের মধ্যে হারূণ নাম রাখার সাধারণভাবে প্রচলন হয়ে যায়। এমন কি বর্ণিত আছে যে, যেই দিন এই হারূণের জানাযা বের হয় সেই দিন তার জানাযায় ঐ হারূণ নামেরই চল্লিশ হাজার লোক শরীক হয়েছিল।হযরত মারইয়ামের (আঃ) কওম তাকে তিরস্কারের সুরে বলেঃ “কি করে তুমি এরূপ অসৎ কাজ করলে? তুমি তো ভাল ঘরের মেয়ে! তোমার পিতামাতা উভয়েই ভাল ছিলেন। তোমার পরিবারের সমস্ত লোকই পবিত্র। এতদসত্ত্বেও কি করে তুমি একাজ করতে পারলে?” কওমের এই ভৎসনা মূলক কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) নির্দেশ অনুযায়ী তার শিশু সন্তানের দিকে ইশারা করেন। তারা তার মর্যাদা স্বীকার করে নাই বলে তাকে অন্যায়ভাবে অনেক কিছু বললো। তারা বললোঃ “তুমি কি আমাদেরকে পাগল পেয়েছে। যে, আমরা তোমার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবো? সে আমাদেরকে কি বলবে?” ইতিমধ্যেই হযরত ঈসা (আঃ) মায়ের কোল থেকেই বলে উঠলেনঃ “হে লোক সকল! আমি আল্লাহর একজন দাস।" হযরত ঈসার (আঃ) প্রথম উক্তি ছিল এটাই। তিনি মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করলেন এবং নিজের দাসত্বের কথা ঘোষণা করলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার ‘যাত বা সত্তাকে সন্তান জন্মদান হতে পবিত্র বলে ঘোষণা দিলেন, এমনকি তা সাব্যস্ত করে দিলেন। কেননা, সন্তান দাস হয় না। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আল্লাহ আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। এতে তিনি তাঁর মাতার দোষমুক্তির বর্ণনা দিয়েছেন এবং দলীলও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ “আমাকে আল্লাহ তাআলা নবী করেছেন এবং কিতাব দান করেছেন।"বর্ণিত আছে যে, যখন ঐ লোকগুলি হযরত মারইয়াম (আঃ) কে তিরস্কার করছিল ঐ সময় হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর দুধ পান করছিলেন। তাদের ঐ তিরস্কার বাণী শুনে তিনি স্তন থেকে মুখ টেনে নেন এবং বাম পার্শ্বে ফিরে তাদের দিকে মুখ করে এই উত্তর দেন। কথিত আছে যে, এই উক্তির সময় তার অঙ্গলী উখিত ছিল এবং হাত কাধ পর্যন্ত উঁচু ছিল। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, আমাকে কিতাব দিয়েছেন তার এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাকে কিতাব দেয়ার ইচ্ছা করেছেন। এটা পূর্ণ হবেই। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, জন্ম গ্রহণের সময়েই হযরত ঈসার (আঃ) সব কিছু মুখস্থ ছিল এবং তাকে সব কিছু শিখিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল। (কিন্তু এই উক্তিটির সনদ ঠিক নয়) হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “যেখানেই আমি থাকি না কেন, তিনি (আল্লাহ) আমাকে আশিস ভজিন করেছেন। আমি মানুষকে কল্যাণের কথা শিক্ষা দেবে এবং তারা আমার দ্বারা উপকৃত হবে।"বানূ মাখযুম গোত্রের গোলাম অহাব ইবনু অরূদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আলেম তার চেয়ে বড় একজন আলেমের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন! বলুন তো, আমার কোন আমল আমি ঘোষণা বা প্রচার করতে পারি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ। কেননা, এটাই হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন যা সহ তিনি তাঁর নবীদেরকে তার বান্দাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন। সমস্ত ধর্মশাস্ত্রবিদ এ বিষয়ে একমত যে, হযরত ঈসার (আঃ) এই সাধারণ বরকত দ্বারা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধকেই বুঝানো হয়েছে। তিনি যেখানেই আসতেন, যেতেন, উঠতেন ও বসতেন সেখানেই তার একাজ তিনি চালু রাখতেন। আল্লাহর কথা মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে তিনি কখনো কার্পণ্য করতেন না। হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যতদিন আমি জীবিত থাকবে, ততদিন যেন নামায পড়ি ও যাকাত প্রদান করি। আমাদের নবীকেও (সঃ) এই নির্দেশই দেয়া হয়েছিল। তার ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যু পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো।” (১৫:৯৯) সুতরাং হযরত ঈসাও (আঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ দুটি কাজ আমার উপর ফরয করে দিয়েছেন। এর দ্বারা তকদীর সাব্যস্ত হয় এবং যারা তকদীরকে অস্বীকার করে তাদের দাবী খণ্ডন করা হয়ে যায়।অতঃপর তিনি বলেনঃ আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সাথে সাথে আমাকে এ হুকুমও দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন আমার মাতার প্রতি অনুগত থাকি। কুরআন কারীমে এ দুটি বর্ণনা প্রায়ই একই সাথে দেয়া হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।” (১৭:২৩) অন্য এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো আমার ও তোমার পিতা-মাতার।” (৩১:১৪)তিনি বলেনঃ তিনি (আল্লাহ) আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেন নাই। আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন উদ্ধত করেন নাই যে, আমি তার ইবাদত এবং আমার মাতার আনুগত্যের ব্যাপারে অহংকার করি এবং হতভাগ্য হয়ে যাই। সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) ও (আরবী) হলো ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় কাউকেও হত্যা করে ফেলে। পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষী বলেছেন যে, পিতা-মাতার অবাধ্য সেই হয়, যে উদ্ধত ও হতভাগ্য হয়। দুশ্চরিত্র সেই হয়, যে গর্ব ও অহংকার করে। বর্ণিত আছে যে, একটি স্ত্রী লোক হযরত ঈসার (আঃ) মু'জিযাগুলি দেখে তাঁকে বলেঃ “ঐ পেট কতই না বরকতময়, যে পেট আপনাকে বহন করেছে এবং ঐ সন্তান কতইনা কল্যাণময়, যে আপনাকে দুধ পান করিয়েছে। তার একথার জবাবে হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “ঐ ব্যক্তির জন্যে সুসংবাদ, যে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, অতঃপর ওর অনুসরণ করে এবং উদ্ধত ও হতভাগ্য হয় না।”এরপর হযরত ঈসা (আঃ) বলেন, আমার প্রতি ছিল শান্তি যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি ও শান্তি থাকবে যে দিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হবে। এর দ্বারাও হযরত ঈসার (আঃ) দাসত্ব এবং সমস্ত মাখলুকের মত তিনিও যে আল্লাহর এক মাখলুক, এটা প্রমাণিত হচ্ছে। সমস্ত মানুষ যেমন অস্তিত্বহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছে, অনুরূপ ভাবে তিনিও অস্তুিতহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছেন। অতঃপর তিনি মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন জীবিত অবস্থায় পুনরুতিও হবেন। তবে এই তিনটি অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জন্যে এটা সহজ হয়ে যাবে। তার মধ্যে কোন উদ্বেগ ও ভয়-ভীতি থাকবে না; বরং তিনি পূর্ণভাবে শান্তি লাভ করবেন। তার উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:31
২৭-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তাআলার এই হুকুমও মেনে নেন এবং নিজের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে জনগণের নিকট হাজির হন। তাঁকে ঐ অবস্থায় দেখা মাত্রই প্রত্যেকে সঁতে আঙ্গুল কাটে এবং সবারই মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়েঃ “মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো বড়ই মন্দ কাজ করেছো!” নাউফ বাকারী (রঃ) বলেন যে, লোকেরা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) খোজে বের হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলার কি মাহাত্ম যে, তারা কোথাও তাকে খুঁজে পায় নাই। পথে একজন রাখালের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হলে তারা তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “এরূপ এরূপ ধরণের কোন স্ত্রী লোককে এই জঙ্গলের কোন জায়গায় দেখেছো কি?” উত্তরে সে বলেঃ “না তো। তবে রাত্রে আমি এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখেছি। আমার এই সব গরু এই উপত্যকার দিকে সিজদায় পড়ে গিয়েছিল। ইতিপূর্বে আমি কখনো এরূপ দেখি নাই। আমি স্বচক্ষে ঐদিকে এক নূর (জ্যোতি) দেখেছি।” লোকগুলি ঐ নিশানা ধরে চলতে শুরু করে। এমতাবস্থায় তারা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) দেখতে পায় যে, তিনি সন্তানকে কোলে করে এগিয়ে আসছেন। লোকগুলিকে দেখে সেখানেই তিনি সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে পড়েন। তারা সবাই তাকে ঘিরে ফেলে এবং বলতে থাকেঃ “হে মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছে। তারা তাকে হারূণের ভগ্নী বলে সম্বোধন করার কারণ এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) বংশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অথবা হয়তো তাঁর পরিবারের মধ্যে হারূণ নামক একজন সৎ লোক ছিলেন এবং তিনি ইবাদত বন্দেগী ও আধ্যাত্মিক সাধনায় তাকেই অনুসরণ করছিলেন। এজন্যেই তাকে হারূণের ভগ্নী বলা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হারূণ নামক একজন দুষ্ট লোক ছিল। এজন্যে লোকেরা উপহাস করে তাকে হারূণের বোন বলেছিল। এসব উক্তি হতে সবচেয়ে বেশী গারীব উক্তি হলো এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) ও হযরত মূসার (আঃ) সহদরা ভগ্নী ছিলেন, যাকে হযরত মূসার (আঃ) মাতা হযরত মূসাকে বাক্সে ভরে সমুদ্রে নিক্ষেপ করার সময় বলেছিলেনঃ “তুমি এই বাক্সের পিছনে পিছনে সমুদ্রের ধার দিয়ে এমনভাবে চলবে যে, কেউ যেন বুঝতেই না পারে। কিন্তু এই উক্তিটি একেবারে ভুল ও ভিত্তিহীন। কেননা, কুরআন কারীম দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, হযরত ঈসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলের শেষ নবী ছিলেন। তার পরে শুধু খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ) নবী হন। আর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমিই হযরত ঈসা ইবনু মারইয়ামের (আঃ) সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী কেননা, আমার ও তার মাঝে অন্য কোন নবীর আবির্ভাব হয় নাই।" (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)সুতরাং যদি মুহাম্মদ ইবনু কা'ব কারাযীর (রঃ) উক্তি সঠিক হয় যে, হযরত ঈসার (আঃ) মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, তবে এটা মানতে হবে যে, তিনি হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমানের (আঃ) পূর্বে বিদ্যমান ছিলেন। কেননা, কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) পরে এসেছেন। আয়াত গুলি হলোঃ (আরবী) (২:২৪৬)।এই আয়াতগুলিতে হযরত দাউদের (আঃ) ঘটনা এবং তাঁর জাতকে হত্যা করার বর্ণনা রয়েছে। আর এতে এই শব্দ বিদ্যমান রয়েছে যে, এটা হযরত মূসার (আঃ) পরের ঘটনা। তিনি যে ভুল বুঝেছেন তার কারণ এই যে, তাওরাতে আছেঃ যখন হযরত মূসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলসহ সমুদ্র অতিক্রম করেন এবং ফিরাউন তার কওমসহ পানিতে নিমজ্জিত হয়, তখন মারইয়াম বিনতে ইমরান, যিনি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, অন্যান্য স্ত্রীলোকসহ দ (এক প্রকার বাদ্য যন্ত্র) বাজিয়ে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতঃ তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাওরাতের এই ইবারত থেকেই কারাযী (রঃ) মনে করে নিয়েছেন যে, ঐ মারইয়ামই হযরত ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন। অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল। হতে পারে যে, হযরত মূসার (আঃ) বোনের নামও মারইয়াম ছিল কিন্তু ঐ মারইয়াম যে ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন এর কোন প্রমাণ নেই, বরং এটা অস। হতে পারে যে, দুজনের একই নাম। একজনের নামে অন্যের নাম রাখা হয়ে থাকে। বাণী ইসরাঈলের তো এটা অভ্যাসই ছিল যে, তারা তাদের নবী ও ওয়ালীদের নামে নিজেদের নাম রাখতো। হযরত মুগীরা ইবনু শু'বা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে নাজরানে প্রেরণ করেন। সেখানে আমাকে খৃস্টানরা জিজ্ঞেস করেঃ “তোমরা (আরবী) পড়ে থাকো। অথচ হযরত মূসা (আঃ) তে। হযরত ঈসার (আঃ) বহু পূর্বে অতীত হয়েছেন?” ঐ সময় আমি তাদের এই প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারলাম না। মদীনায় ফিরে এসে আমি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সামনে ওটা বর্ণনা করলাম। তিনি বলেনঃ “তুমি তো তাদেরকে ঐ সময়েই এ উত্তর দিতে পারতে যে, ঐ লোকেরা তাদের পূর্ববর্তী নবী ও সৎ লোকদের নামে তাদের সন্তানদের নাম বরাবরই রেখে আসতো।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে। সহীহ মুসলিমেও এটা রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন।)বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত কা'ব (রাঃ) বলেছিলেনঃ “এই হারূণ হযরত মূসার (আঃ) ভাই হারূণ (আঃ) নন।" উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত কাবের (রাঃ) একথা অস্বীকার করেন। তখন হযরত কা'ব (রাঃ) তাকে বলেনঃ “যদি আপনি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হতে কিছু শুনে থাকেন, তবে আমি তা মানতে সম্মত আছি। অন্যথায় ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে তো তাদের মাঝে ছয় শ বছরের ব্যবধান রয়েছে। তাঁর একথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ) নীরব হয়ে যান। (এই ইতিহাসের ব্যাপারে কিছু চিন্তা বিবেচনার অবকাশ রয়েছে)হযতর কাতাদা (রঃ) বলেন যে, হযরত মারইয়ামের (আঃ) পরিবার ও বংশের লোক উপরের স্তর হতেই সৎ ও দ্বীনদার ছিলেন এবং এই দ্বীনদারী যেন বরাবরই উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছিল। কতকগুলি লোক এরূপই। হয়ে থাকেন। আবার কতক পরিবার ও বংশ এর বিপরীতও হয় যে, উপরের স্তর থেকে নীচের স্তর পর্যন্ত সবাই খারাপ হয়। এই হারূণ বড়ই বুযুর্গ লোক ছিলেন। এই কারণেই বাণী ইসরাঈলের মধ্যে হারূণ নাম রাখার সাধারণভাবে প্রচলন হয়ে যায়। এমন কি বর্ণিত আছে যে, যেই দিন এই হারূণের জানাযা বের হয় সেই দিন তার জানাযায় ঐ হারূণ নামেরই চল্লিশ হাজার লোক শরীক হয়েছিল।হযরত মারইয়ামের (আঃ) কওম তাকে তিরস্কারের সুরে বলেঃ “কি করে তুমি এরূপ অসৎ কাজ করলে? তুমি তো ভাল ঘরের মেয়ে! তোমার পিতামাতা উভয়েই ভাল ছিলেন। তোমার পরিবারের সমস্ত লোকই পবিত্র। এতদসত্ত্বেও কি করে তুমি একাজ করতে পারলে?” কওমের এই ভৎসনা মূলক কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) নির্দেশ অনুযায়ী তার শিশু সন্তানের দিকে ইশারা করেন। তারা তার মর্যাদা স্বীকার করে নাই বলে তাকে অন্যায়ভাবে অনেক কিছু বললো। তারা বললোঃ “তুমি কি আমাদেরকে পাগল পেয়েছে। যে, আমরা তোমার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবো? সে আমাদেরকে কি বলবে?” ইতিমধ্যেই হযরত ঈসা (আঃ) মায়ের কোল থেকেই বলে উঠলেনঃ “হে লোক সকল! আমি আল্লাহর একজন দাস।" হযরত ঈসার (আঃ) প্রথম উক্তি ছিল এটাই। তিনি মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করলেন এবং নিজের দাসত্বের কথা ঘোষণা করলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার ‘যাত বা সত্তাকে সন্তান জন্মদান হতে পবিত্র বলে ঘোষণা দিলেন, এমনকি তা সাব্যস্ত করে দিলেন। কেননা, সন্তান দাস হয় না। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আল্লাহ আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। এতে তিনি তাঁর মাতার দোষমুক্তির বর্ণনা দিয়েছেন এবং দলীলও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ “আমাকে আল্লাহ তাআলা নবী করেছেন এবং কিতাব দান করেছেন।"বর্ণিত আছে যে, যখন ঐ লোকগুলি হযরত মারইয়াম (আঃ) কে তিরস্কার করছিল ঐ সময় হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর দুধ পান করছিলেন। তাদের ঐ তিরস্কার বাণী শুনে তিনি স্তন থেকে মুখ টেনে নেন এবং বাম পার্শ্বে ফিরে তাদের দিকে মুখ করে এই উত্তর দেন। কথিত আছে যে, এই উক্তির সময় তার অঙ্গলী উখিত ছিল এবং হাত কাধ পর্যন্ত উঁচু ছিল। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, আমাকে কিতাব দিয়েছেন তার এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাকে কিতাব দেয়ার ইচ্ছা করেছেন। এটা পূর্ণ হবেই। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, জন্ম গ্রহণের সময়েই হযরত ঈসার (আঃ) সব কিছু মুখস্থ ছিল এবং তাকে সব কিছু শিখিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল। (কিন্তু এই উক্তিটির সনদ ঠিক নয়) হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “যেখানেই আমি থাকি না কেন, তিনি (আল্লাহ) আমাকে আশিস ভজিন করেছেন। আমি মানুষকে কল্যাণের কথা শিক্ষা দেবে এবং তারা আমার দ্বারা উপকৃত হবে।"বানূ মাখযুম গোত্রের গোলাম অহাব ইবনু অরূদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আলেম তার চেয়ে বড় একজন আলেমের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন! বলুন তো, আমার কোন আমল আমি ঘোষণা বা প্রচার করতে পারি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ। কেননা, এটাই হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন যা সহ তিনি তাঁর নবীদেরকে তার বান্দাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন। সমস্ত ধর্মশাস্ত্রবিদ এ বিষয়ে একমত যে, হযরত ঈসার (আঃ) এই সাধারণ বরকত দ্বারা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধকেই বুঝানো হয়েছে। তিনি যেখানেই আসতেন, যেতেন, উঠতেন ও বসতেন সেখানেই তার একাজ তিনি চালু রাখতেন। আল্লাহর কথা মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে তিনি কখনো কার্পণ্য করতেন না। হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যতদিন আমি জীবিত থাকবে, ততদিন যেন নামায পড়ি ও যাকাত প্রদান করি। আমাদের নবীকেও (সঃ) এই নির্দেশই দেয়া হয়েছিল। তার ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যু পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো।” (১৫:৯৯) সুতরাং হযরত ঈসাও (আঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ দুটি কাজ আমার উপর ফরয করে দিয়েছেন। এর দ্বারা তকদীর সাব্যস্ত হয় এবং যারা তকদীরকে অস্বীকার করে তাদের দাবী খণ্ডন করা হয়ে যায়।অতঃপর তিনি বলেনঃ আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সাথে সাথে আমাকে এ হুকুমও দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন আমার মাতার প্রতি অনুগত থাকি। কুরআন কারীমে এ দুটি বর্ণনা প্রায়ই একই সাথে দেয়া হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।” (১৭:২৩) অন্য এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো আমার ও তোমার পিতা-মাতার।” (৩১:১৪)তিনি বলেনঃ তিনি (আল্লাহ) আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেন নাই। আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন উদ্ধত করেন নাই যে, আমি তার ইবাদত এবং আমার মাতার আনুগত্যের ব্যাপারে অহংকার করি এবং হতভাগ্য হয়ে যাই। সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) ও (আরবী) হলো ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় কাউকেও হত্যা করে ফেলে। পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষী বলেছেন যে, পিতা-মাতার অবাধ্য সেই হয়, যে উদ্ধত ও হতভাগ্য হয়। দুশ্চরিত্র সেই হয়, যে গর্ব ও অহংকার করে। বর্ণিত আছে যে, একটি স্ত্রী লোক হযরত ঈসার (আঃ) মু'জিযাগুলি দেখে তাঁকে বলেঃ “ঐ পেট কতই না বরকতময়, যে পেট আপনাকে বহন করেছে এবং ঐ সন্তান কতইনা কল্যাণময়, যে আপনাকে দুধ পান করিয়েছে। তার একথার জবাবে হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “ঐ ব্যক্তির জন্যে সুসংবাদ, যে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, অতঃপর ওর অনুসরণ করে এবং উদ্ধত ও হতভাগ্য হয় না।”এরপর হযরত ঈসা (আঃ) বলেন, আমার প্রতি ছিল শান্তি যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি ও শান্তি থাকবে যে দিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হবে। এর দ্বারাও হযরত ঈসার (আঃ) দাসত্ব এবং সমস্ত মাখলুকের মত তিনিও যে আল্লাহর এক মাখলুক, এটা প্রমাণিত হচ্ছে। সমস্ত মানুষ যেমন অস্তিত্বহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছে, অনুরূপ ভাবে তিনিও অস্তুিতহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছেন। অতঃপর তিনি মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন জীবিত অবস্থায় পুনরুতিও হবেন। তবে এই তিনটি অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জন্যে এটা সহজ হয়ে যাবে। তার মধ্যে কোন উদ্বেগ ও ভয়-ভীতি থাকবে না; বরং তিনি পূর্ণভাবে শান্তি লাভ করবেন। তার উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:32
২৭-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তাআলার এই হুকুমও মেনে নেন এবং নিজের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে জনগণের নিকট হাজির হন। তাঁকে ঐ অবস্থায় দেখা মাত্রই প্রত্যেকে সঁতে আঙ্গুল কাটে এবং সবারই মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়েঃ “মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো বড়ই মন্দ কাজ করেছো!” নাউফ বাকারী (রঃ) বলেন যে, লোকেরা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) খোজে বের হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলার কি মাহাত্ম যে, তারা কোথাও তাকে খুঁজে পায় নাই। পথে একজন রাখালের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হলে তারা তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “এরূপ এরূপ ধরণের কোন স্ত্রী লোককে এই জঙ্গলের কোন জায়গায় দেখেছো কি?” উত্তরে সে বলেঃ “না তো। তবে রাত্রে আমি এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখেছি। আমার এই সব গরু এই উপত্যকার দিকে সিজদায় পড়ে গিয়েছিল। ইতিপূর্বে আমি কখনো এরূপ দেখি নাই। আমি স্বচক্ষে ঐদিকে এক নূর (জ্যোতি) দেখেছি।” লোকগুলি ঐ নিশানা ধরে চলতে শুরু করে। এমতাবস্থায় তারা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) দেখতে পায় যে, তিনি সন্তানকে কোলে করে এগিয়ে আসছেন। লোকগুলিকে দেখে সেখানেই তিনি সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে পড়েন। তারা সবাই তাকে ঘিরে ফেলে এবং বলতে থাকেঃ “হে মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছে। তারা তাকে হারূণের ভগ্নী বলে সম্বোধন করার কারণ এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) বংশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অথবা হয়তো তাঁর পরিবারের মধ্যে হারূণ নামক একজন সৎ লোক ছিলেন এবং তিনি ইবাদত বন্দেগী ও আধ্যাত্মিক সাধনায় তাকেই অনুসরণ করছিলেন। এজন্যেই তাকে হারূণের ভগ্নী বলা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হারূণ নামক একজন দুষ্ট লোক ছিল। এজন্যে লোকেরা উপহাস করে তাকে হারূণের বোন বলেছিল। এসব উক্তি হতে সবচেয়ে বেশী গারীব উক্তি হলো এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) ও হযরত মূসার (আঃ) সহদরা ভগ্নী ছিলেন, যাকে হযরত মূসার (আঃ) মাতা হযরত মূসাকে বাক্সে ভরে সমুদ্রে নিক্ষেপ করার সময় বলেছিলেনঃ “তুমি এই বাক্সের পিছনে পিছনে সমুদ্রের ধার দিয়ে এমনভাবে চলবে যে, কেউ যেন বুঝতেই না পারে। কিন্তু এই উক্তিটি একেবারে ভুল ও ভিত্তিহীন। কেননা, কুরআন কারীম দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, হযরত ঈসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলের শেষ নবী ছিলেন। তার পরে শুধু খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ) নবী হন। আর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমিই হযরত ঈসা ইবনু মারইয়ামের (আঃ) সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী কেননা, আমার ও তার মাঝে অন্য কোন নবীর আবির্ভাব হয় নাই।" (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)সুতরাং যদি মুহাম্মদ ইবনু কা'ব কারাযীর (রঃ) উক্তি সঠিক হয় যে, হযরত ঈসার (আঃ) মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, তবে এটা মানতে হবে যে, তিনি হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমানের (আঃ) পূর্বে বিদ্যমান ছিলেন। কেননা, কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) পরে এসেছেন। আয়াত গুলি হলোঃ (আরবী) (২:২৪৬)।এই আয়াতগুলিতে হযরত দাউদের (আঃ) ঘটনা এবং তাঁর জাতকে হত্যা করার বর্ণনা রয়েছে। আর এতে এই শব্দ বিদ্যমান রয়েছে যে, এটা হযরত মূসার (আঃ) পরের ঘটনা। তিনি যে ভুল বুঝেছেন তার কারণ এই যে, তাওরাতে আছেঃ যখন হযরত মূসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলসহ সমুদ্র অতিক্রম করেন এবং ফিরাউন তার কওমসহ পানিতে নিমজ্জিত হয়, তখন মারইয়াম বিনতে ইমরান, যিনি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, অন্যান্য স্ত্রীলোকসহ দ (এক প্রকার বাদ্য যন্ত্র) বাজিয়ে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতঃ তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাওরাতের এই ইবারত থেকেই কারাযী (রঃ) মনে করে নিয়েছেন যে, ঐ মারইয়ামই হযরত ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন। অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল। হতে পারে যে, হযরত মূসার (আঃ) বোনের নামও মারইয়াম ছিল কিন্তু ঐ মারইয়াম যে ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন এর কোন প্রমাণ নেই, বরং এটা অস। হতে পারে যে, দুজনের একই নাম। একজনের নামে অন্যের নাম রাখা হয়ে থাকে। বাণী ইসরাঈলের তো এটা অভ্যাসই ছিল যে, তারা তাদের নবী ও ওয়ালীদের নামে নিজেদের নাম রাখতো। হযরত মুগীরা ইবনু শু'বা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে নাজরানে প্রেরণ করেন। সেখানে আমাকে খৃস্টানরা জিজ্ঞেস করেঃ “তোমরা (আরবী) পড়ে থাকো। অথচ হযরত মূসা (আঃ) তে। হযরত ঈসার (আঃ) বহু পূর্বে অতীত হয়েছেন?” ঐ সময় আমি তাদের এই প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারলাম না। মদীনায় ফিরে এসে আমি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সামনে ওটা বর্ণনা করলাম। তিনি বলেনঃ “তুমি তো তাদেরকে ঐ সময়েই এ উত্তর দিতে পারতে যে, ঐ লোকেরা তাদের পূর্ববর্তী নবী ও সৎ লোকদের নামে তাদের সন্তানদের নাম বরাবরই রেখে আসতো।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে। সহীহ মুসলিমেও এটা রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন।)বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত কা'ব (রাঃ) বলেছিলেনঃ “এই হারূণ হযরত মূসার (আঃ) ভাই হারূণ (আঃ) নন।" উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত কাবের (রাঃ) একথা অস্বীকার করেন। তখন হযরত কা'ব (রাঃ) তাকে বলেনঃ “যদি আপনি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হতে কিছু শুনে থাকেন, তবে আমি তা মানতে সম্মত আছি। অন্যথায় ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে তো তাদের মাঝে ছয় শ বছরের ব্যবধান রয়েছে। তাঁর একথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ) নীরব হয়ে যান। (এই ইতিহাসের ব্যাপারে কিছু চিন্তা বিবেচনার অবকাশ রয়েছে)হযতর কাতাদা (রঃ) বলেন যে, হযরত মারইয়ামের (আঃ) পরিবার ও বংশের লোক উপরের স্তর হতেই সৎ ও দ্বীনদার ছিলেন এবং এই দ্বীনদারী যেন বরাবরই উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছিল। কতকগুলি লোক এরূপই। হয়ে থাকেন। আবার কতক পরিবার ও বংশ এর বিপরীতও হয় যে, উপরের স্তর থেকে নীচের স্তর পর্যন্ত সবাই খারাপ হয়। এই হারূণ বড়ই বুযুর্গ লোক ছিলেন। এই কারণেই বাণী ইসরাঈলের মধ্যে হারূণ নাম রাখার সাধারণভাবে প্রচলন হয়ে যায়। এমন কি বর্ণিত আছে যে, যেই দিন এই হারূণের জানাযা বের হয় সেই দিন তার জানাযায় ঐ হারূণ নামেরই চল্লিশ হাজার লোক শরীক হয়েছিল।হযরত মারইয়ামের (আঃ) কওম তাকে তিরস্কারের সুরে বলেঃ “কি করে তুমি এরূপ অসৎ কাজ করলে? তুমি তো ভাল ঘরের মেয়ে! তোমার পিতামাতা উভয়েই ভাল ছিলেন। তোমার পরিবারের সমস্ত লোকই পবিত্র। এতদসত্ত্বেও কি করে তুমি একাজ করতে পারলে?” কওমের এই ভৎসনা মূলক কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) নির্দেশ অনুযায়ী তার শিশু সন্তানের দিকে ইশারা করেন। তারা তার মর্যাদা স্বীকার করে নাই বলে তাকে অন্যায়ভাবে অনেক কিছু বললো। তারা বললোঃ “তুমি কি আমাদেরকে পাগল পেয়েছে। যে, আমরা তোমার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবো? সে আমাদেরকে কি বলবে?” ইতিমধ্যেই হযরত ঈসা (আঃ) মায়ের কোল থেকেই বলে উঠলেনঃ “হে লোক সকল! আমি আল্লাহর একজন দাস।" হযরত ঈসার (আঃ) প্রথম উক্তি ছিল এটাই। তিনি মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করলেন এবং নিজের দাসত্বের কথা ঘোষণা করলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার ‘যাত বা সত্তাকে সন্তান জন্মদান হতে পবিত্র বলে ঘোষণা দিলেন, এমনকি তা সাব্যস্ত করে দিলেন। কেননা, সন্তান দাস হয় না। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আল্লাহ আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। এতে তিনি তাঁর মাতার দোষমুক্তির বর্ণনা দিয়েছেন এবং দলীলও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ “আমাকে আল্লাহ তাআলা নবী করেছেন এবং কিতাব দান করেছেন।"বর্ণিত আছে যে, যখন ঐ লোকগুলি হযরত মারইয়াম (আঃ) কে তিরস্কার করছিল ঐ সময় হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর দুধ পান করছিলেন। তাদের ঐ তিরস্কার বাণী শুনে তিনি স্তন থেকে মুখ টেনে নেন এবং বাম পার্শ্বে ফিরে তাদের দিকে মুখ করে এই উত্তর দেন। কথিত আছে যে, এই উক্তির সময় তার অঙ্গলী উখিত ছিল এবং হাত কাধ পর্যন্ত উঁচু ছিল। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, আমাকে কিতাব দিয়েছেন তার এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাকে কিতাব দেয়ার ইচ্ছা করেছেন। এটা পূর্ণ হবেই। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, জন্ম গ্রহণের সময়েই হযরত ঈসার (আঃ) সব কিছু মুখস্থ ছিল এবং তাকে সব কিছু শিখিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল। (কিন্তু এই উক্তিটির সনদ ঠিক নয়) হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “যেখানেই আমি থাকি না কেন, তিনি (আল্লাহ) আমাকে আশিস ভজিন করেছেন। আমি মানুষকে কল্যাণের কথা শিক্ষা দেবে এবং তারা আমার দ্বারা উপকৃত হবে।"বানূ মাখযুম গোত্রের গোলাম অহাব ইবনু অরূদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আলেম তার চেয়ে বড় একজন আলেমের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন! বলুন তো, আমার কোন আমল আমি ঘোষণা বা প্রচার করতে পারি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ। কেননা, এটাই হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন যা সহ তিনি তাঁর নবীদেরকে তার বান্দাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন। সমস্ত ধর্মশাস্ত্রবিদ এ বিষয়ে একমত যে, হযরত ঈসার (আঃ) এই সাধারণ বরকত দ্বারা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধকেই বুঝানো হয়েছে। তিনি যেখানেই আসতেন, যেতেন, উঠতেন ও বসতেন সেখানেই তার একাজ তিনি চালু রাখতেন। আল্লাহর কথা মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে তিনি কখনো কার্পণ্য করতেন না। হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যতদিন আমি জীবিত থাকবে, ততদিন যেন নামায পড়ি ও যাকাত প্রদান করি। আমাদের নবীকেও (সঃ) এই নির্দেশই দেয়া হয়েছিল। তার ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যু পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো।” (১৫:৯৯) সুতরাং হযরত ঈসাও (আঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ দুটি কাজ আমার উপর ফরয করে দিয়েছেন। এর দ্বারা তকদীর সাব্যস্ত হয় এবং যারা তকদীরকে অস্বীকার করে তাদের দাবী খণ্ডন করা হয়ে যায়।অতঃপর তিনি বলেনঃ আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সাথে সাথে আমাকে এ হুকুমও দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন আমার মাতার প্রতি অনুগত থাকি। কুরআন কারীমে এ দুটি বর্ণনা প্রায়ই একই সাথে দেয়া হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।” (১৭:২৩) অন্য এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো আমার ও তোমার পিতা-মাতার।” (৩১:১৪)তিনি বলেনঃ তিনি (আল্লাহ) আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেন নাই। আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন উদ্ধত করেন নাই যে, আমি তার ইবাদত এবং আমার মাতার আনুগত্যের ব্যাপারে অহংকার করি এবং হতভাগ্য হয়ে যাই। সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) ও (আরবী) হলো ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় কাউকেও হত্যা করে ফেলে। পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষী বলেছেন যে, পিতা-মাতার অবাধ্য সেই হয়, যে উদ্ধত ও হতভাগ্য হয়। দুশ্চরিত্র সেই হয়, যে গর্ব ও অহংকার করে। বর্ণিত আছে যে, একটি স্ত্রী লোক হযরত ঈসার (আঃ) মু'জিযাগুলি দেখে তাঁকে বলেঃ “ঐ পেট কতই না বরকতময়, যে পেট আপনাকে বহন করেছে এবং ঐ সন্তান কতইনা কল্যাণময়, যে আপনাকে দুধ পান করিয়েছে। তার একথার জবাবে হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “ঐ ব্যক্তির জন্যে সুসংবাদ, যে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, অতঃপর ওর অনুসরণ করে এবং উদ্ধত ও হতভাগ্য হয় না।”এরপর হযরত ঈসা (আঃ) বলেন, আমার প্রতি ছিল শান্তি যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি ও শান্তি থাকবে যে দিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হবে। এর দ্বারাও হযরত ঈসার (আঃ) দাসত্ব এবং সমস্ত মাখলুকের মত তিনিও যে আল্লাহর এক মাখলুক, এটা প্রমাণিত হচ্ছে। সমস্ত মানুষ যেমন অস্তিত্বহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছে, অনুরূপ ভাবে তিনিও অস্তুিতহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছেন। অতঃপর তিনি মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন জীবিত অবস্থায় পুনরুতিও হবেন। তবে এই তিনটি অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জন্যে এটা সহজ হয়ে যাবে। তার মধ্যে কোন উদ্বেগ ও ভয়-ভীতি থাকবে না; বরং তিনি পূর্ণভাবে শান্তি লাভ করবেন। তার উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:33
২৭-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তাআলার এই হুকুমও মেনে নেন এবং নিজের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে জনগণের নিকট হাজির হন। তাঁকে ঐ অবস্থায় দেখা মাত্রই প্রত্যেকে সঁতে আঙ্গুল কাটে এবং সবারই মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়েঃ “মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো বড়ই মন্দ কাজ করেছো!” নাউফ বাকারী (রঃ) বলেন যে, লোকেরা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) খোজে বের হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলার কি মাহাত্ম যে, তারা কোথাও তাকে খুঁজে পায় নাই। পথে একজন রাখালের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হলে তারা তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “এরূপ এরূপ ধরণের কোন স্ত্রী লোককে এই জঙ্গলের কোন জায়গায় দেখেছো কি?” উত্তরে সে বলেঃ “না তো। তবে রাত্রে আমি এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখেছি। আমার এই সব গরু এই উপত্যকার দিকে সিজদায় পড়ে গিয়েছিল। ইতিপূর্বে আমি কখনো এরূপ দেখি নাই। আমি স্বচক্ষে ঐদিকে এক নূর (জ্যোতি) দেখেছি।” লোকগুলি ঐ নিশানা ধরে চলতে শুরু করে। এমতাবস্থায় তারা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) দেখতে পায় যে, তিনি সন্তানকে কোলে করে এগিয়ে আসছেন। লোকগুলিকে দেখে সেখানেই তিনি সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে পড়েন। তারা সবাই তাকে ঘিরে ফেলে এবং বলতে থাকেঃ “হে মারইয়াম (আঃ)! তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছে। তারা তাকে হারূণের ভগ্নী বলে সম্বোধন করার কারণ এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) বংশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অথবা হয়তো তাঁর পরিবারের মধ্যে হারূণ নামক একজন সৎ লোক ছিলেন এবং তিনি ইবাদত বন্দেগী ও আধ্যাত্মিক সাধনায় তাকেই অনুসরণ করছিলেন। এজন্যেই তাকে হারূণের ভগ্নী বলা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হারূণ নামক একজন দুষ্ট লোক ছিল। এজন্যে লোকেরা উপহাস করে তাকে হারূণের বোন বলেছিল। এসব উক্তি হতে সবচেয়ে বেশী গারীব উক্তি হলো এই যে, তিনি হযরত হারূণের (আঃ) ও হযরত মূসার (আঃ) সহদরা ভগ্নী ছিলেন, যাকে হযরত মূসার (আঃ) মাতা হযরত মূসাকে বাক্সে ভরে সমুদ্রে নিক্ষেপ করার সময় বলেছিলেনঃ “তুমি এই বাক্সের পিছনে পিছনে সমুদ্রের ধার দিয়ে এমনভাবে চলবে যে, কেউ যেন বুঝতেই না পারে। কিন্তু এই উক্তিটি একেবারে ভুল ও ভিত্তিহীন। কেননা, কুরআন কারীম দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, হযরত ঈসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলের শেষ নবী ছিলেন। তার পরে শুধু খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ) নবী হন। আর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আমিই হযরত ঈসা ইবনু মারইয়ামের (আঃ) সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী কেননা, আমার ও তার মাঝে অন্য কোন নবীর আবির্ভাব হয় নাই।" (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)সুতরাং যদি মুহাম্মদ ইবনু কা'ব কারাযীর (রঃ) উক্তি সঠিক হয় যে, হযরত ঈসার (আঃ) মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, তবে এটা মানতে হবে যে, তিনি হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমানের (আঃ) পূর্বে বিদ্যমান ছিলেন। কেননা, কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) পরে এসেছেন। আয়াত গুলি হলোঃ (আরবী) (২:২৪৬)।এই আয়াতগুলিতে হযরত দাউদের (আঃ) ঘটনা এবং তাঁর জাতকে হত্যা করার বর্ণনা রয়েছে। আর এতে এই শব্দ বিদ্যমান রয়েছে যে, এটা হযরত মূসার (আঃ) পরের ঘটনা। তিনি যে ভুল বুঝেছেন তার কারণ এই যে, তাওরাতে আছেঃ যখন হযরত মূসা (আঃ) বাণী ইসরাঈলসহ সমুদ্র অতিক্রম করেন এবং ফিরাউন তার কওমসহ পানিতে নিমজ্জিত হয়, তখন মারইয়াম বিনতে ইমরান, যিনি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূণের (আঃ) ভগ্নী ছিলেন, অন্যান্য স্ত্রীলোকসহ দ (এক প্রকার বাদ্য যন্ত্র) বাজিয়ে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতঃ তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাওরাতের এই ইবারত থেকেই কারাযী (রঃ) মনে করে নিয়েছেন যে, ঐ মারইয়ামই হযরত ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন। অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল। হতে পারে যে, হযরত মূসার (আঃ) বোনের নামও মারইয়াম ছিল কিন্তু ঐ মারইয়াম যে ঈসার (আঃ) মাতা ছিলেন এর কোন প্রমাণ নেই, বরং এটা অস। হতে পারে যে, দুজনের একই নাম। একজনের নামে অন্যের নাম রাখা হয়ে থাকে। বাণী ইসরাঈলের তো এটা অভ্যাসই ছিল যে, তারা তাদের নবী ও ওয়ালীদের নামে নিজেদের নাম রাখতো। হযরত মুগীরা ইবনু শু'বা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে নাজরানে প্রেরণ করেন। সেখানে আমাকে খৃস্টানরা জিজ্ঞেস করেঃ “তোমরা (আরবী) পড়ে থাকো। অথচ হযরত মূসা (আঃ) তে। হযরত ঈসার (আঃ) বহু পূর্বে অতীত হয়েছেন?” ঐ সময় আমি তাদের এই প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারলাম না। মদীনায় ফিরে এসে আমি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সামনে ওটা বর্ণনা করলাম। তিনি বলেনঃ “তুমি তো তাদেরকে ঐ সময়েই এ উত্তর দিতে পারতে যে, ঐ লোকেরা তাদের পূর্ববর্তী নবী ও সৎ লোকদের নামে তাদের সন্তানদের নাম বরাবরই রেখে আসতো।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে। সহীহ মুসলিমেও এটা রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন।)বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত কা'ব (রাঃ) বলেছিলেনঃ “এই হারূণ হযরত মূসার (আঃ) ভাই হারূণ (আঃ) নন।" উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত কাবের (রাঃ) একথা অস্বীকার করেন। তখন হযরত কা'ব (রাঃ) তাকে বলেনঃ “যদি আপনি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হতে কিছু শুনে থাকেন, তবে আমি তা মানতে সম্মত আছি। অন্যথায় ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে তো তাদের মাঝে ছয় শ বছরের ব্যবধান রয়েছে। তাঁর একথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ) নীরব হয়ে যান। (এই ইতিহাসের ব্যাপারে কিছু চিন্তা বিবেচনার অবকাশ রয়েছে)হযতর কাতাদা (রঃ) বলেন যে, হযরত মারইয়ামের (আঃ) পরিবার ও বংশের লোক উপরের স্তর হতেই সৎ ও দ্বীনদার ছিলেন এবং এই দ্বীনদারী যেন বরাবরই উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছিল। কতকগুলি লোক এরূপই। হয়ে থাকেন। আবার কতক পরিবার ও বংশ এর বিপরীতও হয় যে, উপরের স্তর থেকে নীচের স্তর পর্যন্ত সবাই খারাপ হয়। এই হারূণ বড়ই বুযুর্গ লোক ছিলেন। এই কারণেই বাণী ইসরাঈলের মধ্যে হারূণ নাম রাখার সাধারণভাবে প্রচলন হয়ে যায়। এমন কি বর্ণিত আছে যে, যেই দিন এই হারূণের জানাযা বের হয় সেই দিন তার জানাযায় ঐ হারূণ নামেরই চল্লিশ হাজার লোক শরীক হয়েছিল।হযরত মারইয়ামের (আঃ) কওম তাকে তিরস্কারের সুরে বলেঃ “কি করে তুমি এরূপ অসৎ কাজ করলে? তুমি তো ভাল ঘরের মেয়ে! তোমার পিতামাতা উভয়েই ভাল ছিলেন। তোমার পরিবারের সমস্ত লোকই পবিত্র। এতদসত্ত্বেও কি করে তুমি একাজ করতে পারলে?” কওমের এই ভৎসনা মূলক কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) নির্দেশ অনুযায়ী তার শিশু সন্তানের দিকে ইশারা করেন। তারা তার মর্যাদা স্বীকার করে নাই বলে তাকে অন্যায়ভাবে অনেক কিছু বললো। তারা বললোঃ “তুমি কি আমাদেরকে পাগল পেয়েছে। যে, আমরা তোমার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবো? সে আমাদেরকে কি বলবে?” ইতিমধ্যেই হযরত ঈসা (আঃ) মায়ের কোল থেকেই বলে উঠলেনঃ “হে লোক সকল! আমি আল্লাহর একজন দাস।" হযরত ঈসার (আঃ) প্রথম উক্তি ছিল এটাই। তিনি মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করলেন এবং নিজের দাসত্বের কথা ঘোষণা করলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার ‘যাত বা সত্তাকে সন্তান জন্মদান হতে পবিত্র বলে ঘোষণা দিলেন, এমনকি তা সাব্যস্ত করে দিলেন। কেননা, সন্তান দাস হয় না। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আল্লাহ আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। এতে তিনি তাঁর মাতার দোষমুক্তির বর্ণনা দিয়েছেন এবং দলীলও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ “আমাকে আল্লাহ তাআলা নবী করেছেন এবং কিতাব দান করেছেন।"বর্ণিত আছে যে, যখন ঐ লোকগুলি হযরত মারইয়াম (আঃ) কে তিরস্কার করছিল ঐ সময় হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর দুধ পান করছিলেন। তাদের ঐ তিরস্কার বাণী শুনে তিনি স্তন থেকে মুখ টেনে নেন এবং বাম পার্শ্বে ফিরে তাদের দিকে মুখ করে এই উত্তর দেন। কথিত আছে যে, এই উক্তির সময় তার অঙ্গলী উখিত ছিল এবং হাত কাধ পর্যন্ত উঁচু ছিল। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, আমাকে কিতাব দিয়েছেন তার এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাকে কিতাব দেয়ার ইচ্ছা করেছেন। এটা পূর্ণ হবেই। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, জন্ম গ্রহণের সময়েই হযরত ঈসার (আঃ) সব কিছু মুখস্থ ছিল এবং তাকে সব কিছু শিখিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল। (কিন্তু এই উক্তিটির সনদ ঠিক নয়) হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “যেখানেই আমি থাকি না কেন, তিনি (আল্লাহ) আমাকে আশিস ভজিন করেছেন। আমি মানুষকে কল্যাণের কথা শিক্ষা দেবে এবং তারা আমার দ্বারা উপকৃত হবে।"বানূ মাখযুম গোত্রের গোলাম অহাব ইবনু অরূদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আলেম তার চেয়ে বড় একজন আলেমের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন! বলুন তো, আমার কোন আমল আমি ঘোষণা বা প্রচার করতে পারি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ। কেননা, এটাই হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন যা সহ তিনি তাঁর নবীদেরকে তার বান্দাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন। সমস্ত ধর্মশাস্ত্রবিদ এ বিষয়ে একমত যে, হযরত ঈসার (আঃ) এই সাধারণ বরকত দ্বারা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধকেই বুঝানো হয়েছে। তিনি যেখানেই আসতেন, যেতেন, উঠতেন ও বসতেন সেখানেই তার একাজ তিনি চালু রাখতেন। আল্লাহর কথা মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে তিনি কখনো কার্পণ্য করতেন না। হযরত ঈসা (আঃ) আরো বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যতদিন আমি জীবিত থাকবে, ততদিন যেন নামায পড়ি ও যাকাত প্রদান করি। আমাদের নবীকেও (সঃ) এই নির্দেশই দেয়া হয়েছিল। তার ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যু পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো।” (১৫:৯৯) সুতরাং হযরত ঈসাও (আঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ দুটি কাজ আমার উপর ফরয করে দিয়েছেন। এর দ্বারা তকদীর সাব্যস্ত হয় এবং যারা তকদীরকে অস্বীকার করে তাদের দাবী খণ্ডন করা হয়ে যায়।অতঃপর তিনি বলেনঃ আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সাথে সাথে আমাকে এ হুকুমও দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন আমার মাতার প্রতি অনুগত থাকি। কুরআন কারীমে এ দুটি বর্ণনা প্রায়ই একই সাথে দেয়া হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।” (১৭:২৩) অন্য এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো আমার ও তোমার পিতা-মাতার।” (৩১:১৪)তিনি বলেনঃ তিনি (আল্লাহ) আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেন নাই। আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন উদ্ধত করেন নাই যে, আমি তার ইবাদত এবং আমার মাতার আনুগত্যের ব্যাপারে অহংকার করি এবং হতভাগ্য হয়ে যাই। সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) ও (আরবী) হলো ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় কাউকেও হত্যা করে ফেলে। পূর্ব যুগীয় কোন কোন মনীষী বলেছেন যে, পিতা-মাতার অবাধ্য সেই হয়, যে উদ্ধত ও হতভাগ্য হয়। দুশ্চরিত্র সেই হয়, যে গর্ব ও অহংকার করে। বর্ণিত আছে যে, একটি স্ত্রী লোক হযরত ঈসার (আঃ) মু'জিযাগুলি দেখে তাঁকে বলেঃ “ঐ পেট কতই না বরকতময়, যে পেট আপনাকে বহন করেছে এবং ঐ সন্তান কতইনা কল্যাণময়, যে আপনাকে দুধ পান করিয়েছে। তার একথার জবাবে হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “ঐ ব্যক্তির জন্যে সুসংবাদ, যে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, অতঃপর ওর অনুসরণ করে এবং উদ্ধত ও হতভাগ্য হয় না।”এরপর হযরত ঈসা (আঃ) বলেন, আমার প্রতি ছিল শান্তি যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি ও শান্তি থাকবে যে দিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হবে। এর দ্বারাও হযরত ঈসার (আঃ) দাসত্ব এবং সমস্ত মাখলুকের মত তিনিও যে আল্লাহর এক মাখলুক, এটা প্রমাণিত হচ্ছে। সমস্ত মানুষ যেমন অস্তিত্বহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছে, অনুরূপ ভাবে তিনিও অস্তুিতহীনতা হতে অস্তিত্বে এসেছেন। অতঃপর তিনি মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন জীবিত অবস্থায় পুনরুতিও হবেন। তবে এই তিনটি অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জন্যে এটা সহজ হয়ে যাবে। তার মধ্যে কোন উদ্বেগ ও ভয়-ভীতি থাকবে না; বরং তিনি পূর্ণভাবে শান্তি লাভ করবেন। তার উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:34
৩৪-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ মুস্তফাকে (সঃ) বলছেনঃ হযরত ঈসার (আঃ) ঘটনার ব্যাপারে যে লোকদের মতানৈক্য ছিল, ওর মধ্যে যা সঠিক, তা আমি বর্ণনা করলাম। (আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) ও রয়েছে। হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দের (আরবী) 'কে (আরবী) বা পেশ দিয়ে পড়াই বেশী প্রকাশমান। আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তিটিই এর প্রমাণ। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে সত্য, সুতরাং তুমি সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৬০) হযরত ঈসা (আঃ) যে আল্লাহর নবী ও বান্দা ছিলেন এ কথা বলার পর আল্লাহ তাআলা নিজের সত্তার পবিত্রতা বর্ণনা করছেন। তার মাহাত্মের এটা সম্পূর্ণ বিপরীত যে, তার সন্তান হবে। অজ্ঞ ও যালিম লোকেরা যে এই গুজব রটিয়ে ফিরছে তার থেকে মহান আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং তিনি এর থেকে দূরে রয়েছেন। তিনি যে কাজের ইচ্ছা করেন, সে জন্যে তার কোন উপকরণের প্রয়োজন হয় না। তিনি শুধু মাত্র বলেনঃ ‘হও’ আর তেমনই তা হয়ে যায়। একদিকে হুকুম এবং অন্যদিকে জিনিস মওজুদ। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই ঈসার (আঃ) আশ্চর্য অবস্থা আল্লাহর নিকট আদমের (আঃ) আশ্চর্য অবস্থার ন্যায়, তাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করলেন, তৎপর তা (রকালবীকে বললেনঃ (সজীব) হয়ে যাও, তখনই তা (সজীব) হয়ে গেলো এই বাস্তব ঘটনা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে; সুতরাং তুমি সংশয়ীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।”হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে বললেনঃ আল্লাহই আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং তোমরা তারই ইবাদত করো, এটাই সরল পথ! এটাই আমি আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে নিয়ে এসেছি। যারা এর অনুসরণ করবে তারা সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং যারা এর বিপরীত করবে তারা পথভ্রষ্ট হবে।হযরত ঈসা (আঃ) নিজের সম্পর্কে এইরূপ বর্ণনার পরেও আহলে কিতাবের দলগুলি নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করলো। ইয়াহূদীরা বললো যে, (নাউযুবিল্লাহ) তিনি জারজ সন্তান। তাদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক যে, তারা তার একজন উত্তম রাসূলের উপর জঘন্য অপবাদ দিয়েছে। তারা বলেছে যে, তার এই কথা বলা ইত্যাদি সবই জাদু। অনুরূপভাবে খৃস্টানরাও বিভ্রান্ত হয়ে বলতে শুরু করেছে যে, তিনি তো স্বয়ং আল্লাহ এবং এই কথা আল্লাহরই কথা। অন্যেরা বলেছে যে, তিনি আল্লাহর পুত্র। আরো অন্যেরা বলেছে যে, তিনি তিন মা'বুদের মধ্যে এক মাবদ। তবে একটি দল প্রকৃত ঘটনা মুতাবেক বলেছে যে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল। এটাই হচ্ছে সঠিক উক্তি। হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে মুসলমানদের আকীদা এটাই। আর মু'মিনদেরকে আল্লাহ তাআলা এই শিক্ষাই দিয়েছেন। বর্ণিত আছে যে, বাণী ইসরাঈলের এক সম্মেলন হয়। তারা চারটি দল। ছাঁটাই করে এবং প্রত্যেক কওম নিজ নিজ আলেমকে পেশ করে। এটা হযরত ঈসার (আঃ) আকাশে উঠে যাওয়ার পরের ঘটনা। এখন চারটি দলের চারজন আলেমের মধ্যে হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে মতানৈক্য হয়। একজন বলে যে, তিনি নিজেই আল্লাহ ছিলেন। তিনি যত দিন ইচ্ছা দুনিয়ায় অবস্থান করেছেন। যাকে ইচ্ছা জীবিত রেখেছেন এবং যাকে ইচ্ছা মেরে ফেলেছেন।তার পর তিনি আকাশে উঠে গেছেন। এই দলটিকে ইয়াকুবিয়্যাত বলা হয়। বাকী তিনটি দলের তিনজন আলেম ঐ আলেমকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে। তখন ঐ তিন জনের দুজন তৃতীয়জনকে বলেঃ “তোমার ধারণা ও মতামত কি?” সে বললোঃ “তিনি আল্লাহর পুত্র ছিলেন। এই দলটির নাম নাসতুরিয়্যাহ। অবশিষ্ট দুজন ঐ তৃতীয় জনকে বললোঃ “তুমিও ভুল বললে।" অবশিষ্ট দু’জনের একজন অপরজনকে বললোঃ “তুমি তোমার মতামত পেশ কর।” সে বললোঃ “আমার তো আকীদা এই যে, তিনি তিন মাবুদের এক মাবুদ। এক মা’দ আল্লাহ, দ্বিতীয় মাবুদ এই ঈসা (আঃ) এবং তৃতীয় মা'বুদ তাঁর মাতা মারইয়াম (আঃ)।" এই দলটির নাম ইসরাঈলিয়্যাহ। আর দলটিই ছিল খৃস্টানদের বাদশাহ। তাদের সবার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক। চুতর্থ জন বললোঃ “তোমরা সবাই মিথ্যাবাদী। হযরত ঈসা (আঃ) ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল। তিনি ছিলেন আল্লাহর কালেমা এবং তারই নিকট হতে প্রেরিত আল্লাহর রূহ।” এই দলটি মুসলমান। আর এরাই ছিল সঠিক পথের অনুসারী। তাদের মধ্যে যার অনুসারী যে দল ছিল সেই দল তার উক্তির উপরই চলে গেলো এবং তারা পরস্পর যুদ্ধ বিগ্রহ শুরু করে। দিলো। সর্বযুগে মুসলমানদের সংখ্যা কম থাকে বলে ঐ সব দল মুসলমানদের উপর বিজয় লাভ করলো। আল্লাহ তাআলার উক্তির তাৎপর্য এটাই যে, তারা এমন লোকদেরকে হত্যা করতো মানুষের মধ্যে যারা ন্যায়ের আদেশ করতো।ঐতিহাসিকদের বর্ণনা এই যে, বাদশাহ কুতুনতীন তিনবার খৃস্টানদের একত্রিত করে। শেষ বারের সম্মেলনে তাদের দু' হাজার এক শ’ সর জন আলেম একত্রিত ছিল। কিন্তু তারা সবাই হযরত ঈসার (আঃ) ব্যাপারে বিভিন্ন মতাবলম্বী ছিল। এক শ' জন এক কথা বললে সত্তর জন অন্য কথা বলে। পঞ্চাশ জন আরো অন্য কিছু বলে। ষাট জনের আকীদা অন্য। প্রত্যেকের মত একে অপরের বিপরীত ছিল। সবচেয়ে বড় দলটির লোক সংখ্যা ছিল তিনশ ষাট। বাদশাহ এই দলের লোক সংখ্যা বেশী দেখে এই দলভুক্ত হয়ে যায়। রাজ্যের মঙ্গল এতেই ছিল। সুতরাং তার রাজনীতি তাকে এই দলের প্রতিই মনোযোগী করলো। সে অন্যান্য সমস্ত দলকে বের করে দিলো। আর এদের জন্যে সে ‘আমানাতে কুবরা এর প্রথা আবিষ্কার করলো। প্রকৃত পক্ষে এটাই হচ্ছে জঘন্যতম খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা। এখন ঐ আলেমদের দ্বারা সে শরীয়তের মাসআলার কিতাবগুলি লিখিয়ে নিলো। আর রাজ্যের বহু রীতি-নীতি এবং শহরের জরুরী বিষয়গুলি শরীয়তরূপে তার মধ্যে দাখিল করে দিলো। সে অনেক কিছু নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করলো। এভাবে প্রকৃত দ্বীনে মাসীহর রূপ পরিবর্তন করে একটা সংমিশ্রিত দ্বীন তৈরী করলো। আর জনগণের মধ্যে ওটা আইন রূপে চালু করে দিলো। তখন থেকে দ্বীনে মাসীহ বলতে এটাকেই বুঝায়। ওটার উপর যখন সে সকলকে সম্মত করে ফেললো, তখন চতুর্দিকে গীর্জা ও ইবাদতখানা নির্মাণ করা এবং ওগুলিতে আ'লেমদেরকে বসিয়ে দিয়ে তাদের মাধ্যমে ঐ নব সৃষ্ট মাসীহিয়্যাতকে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টায় উঠে পড়ে লেগে গেল। সিরিয়ায়, জাযীরায় এবং রোমে প্রায় বারো হাজার এইরূপ ঘর তার যুগে নির্মিত হয়। যে জায়গায় শূল তৈরী করা হয়েছিল সেখানে তারা মাতা হায়লানা একটা গম্বুজ তৈরী করিয়ে নিয়েছিল। নিয়মিতভাবে ওর পূজা শুরু হয়ে যায় এবং সবাই বিশ্বাস করে নেয় যে, হযরত ঈসাকে (আঃ) শূলে চড়ানো হয়েছে। অথচ তাদের এ উক্তিটি সম্পূর্ণ ভুল। আল্লাহ তাআলা তাকে নিজের পক্ষ থেকে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। এটাই হলো খৃস্ট ধর্মের সংক্ষিপ্ত নমুনা।যারা আল্লাহ তাআলার উপর মিথ্যা আরোপ করে এবং সন্তান ও শরীক স্থাপন করে তারা দুনিয়ায় হয়তো অবকাশ লাভ করবে, কিন্তু ঐ ভীষণ ভয়াবহ দিনে চতুর্দিক থেকে তাদের উপর ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা শুরু হয়ে যাবে এবং তারা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা স্বীয় অবাধ্য বান্দাদেরকে তাড়াতাড়ি শাস্তি দেন না বটে, কিন্তু তাদেরকে একেবারে ছেড়েও দেন না।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা যালিমকে অবকাশ দেন, কিন্তু যখন তাকে পাকড়াও করেন, তখন তার কোন আশ্রয় স্থল বাকী থাকে না।" একথা বলার পর তিনি কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন।(আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও করার পন্থা এরূপই যে, যখন কোন অত্যাচারী গ্রামবাসীকে পাকড়াও করেন ,তখন নিশ্চিত জানবে যে, তার পাকড়াও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক।" (১১:১০২)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অপছন্দনীয় কথা শুনে আল্লাহ অপেক্ষা অধিক ধৈর্যশীল আর কেউই নেই। মানুষ তার সন্তান স্থাপন করে, তথাপি তিনি তাদেরকে রিযক দিতেই রয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে রেখেছেন। আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অনেক গ্রামবাসীকে, তারা অত্যাচারী হওয়া সত্ত্বেও আমি অবকাশ দিয়েছি, তারপরে তাদেরকে পাকড়াও করেছি, শেষে তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে।" (২২:৪৮) অন্য জায়গায় তিনি বলেছেনঃ “অত্যাচারী লোকেরা যেন তাদের আমলের ব্যাপারে আল্লাহকে উদাসীন ও অমনোযোগী মনে না করে। তাদেরকে তিনি অবকাশ দিচ্ছেন ঐ দিনের জন্যে, যেই দিন চক্ষু উপরের দিকে উঠে যাবে।” ঐ কথা তিনি এখানেও বলছেনঃ এই কাফিরদের এক মহা দিবসের আগমনে ভীষণ দুর্দশা রয়েছে।হযরত উবাদা ইবনু সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ এক, তার কোন অংশীদার নেই এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল, আর ঈসা (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল এবং তাঁর কালেমা যা তিনি মারইয়ামের (আঃ) প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তিনি তাঁর রূহ; আরো সাক্ষ্য দেয় যে, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, তার আমল যা-ই হোক না কেন আল্লাহ তাকে বেহেশতে প্রবিষ্ট করবেন। (এ হাদীসটি বিশুদ্ধ। এর বিশুদ্ধ তার ব্যাপারে সবাই একমত)
মারইয়াম 19:35
৩৪-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ মুস্তফাকে (সঃ) বলছেনঃ হযরত ঈসার (আঃ) ঘটনার ব্যাপারে যে লোকদের মতানৈক্য ছিল, ওর মধ্যে যা সঠিক, তা আমি বর্ণনা করলাম। (আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) ও রয়েছে। হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দের (আরবী) 'কে (আরবী) বা পেশ দিয়ে পড়াই বেশী প্রকাশমান। আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তিটিই এর প্রমাণ। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে সত্য, সুতরাং তুমি সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৬০) হযরত ঈসা (আঃ) যে আল্লাহর নবী ও বান্দা ছিলেন এ কথা বলার পর আল্লাহ তাআলা নিজের সত্তার পবিত্রতা বর্ণনা করছেন। তার মাহাত্মের এটা সম্পূর্ণ বিপরীত যে, তার সন্তান হবে। অজ্ঞ ও যালিম লোকেরা যে এই গুজব রটিয়ে ফিরছে তার থেকে মহান আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং তিনি এর থেকে দূরে রয়েছেন। তিনি যে কাজের ইচ্ছা করেন, সে জন্যে তার কোন উপকরণের প্রয়োজন হয় না। তিনি শুধু মাত্র বলেনঃ ‘হও’ আর তেমনই তা হয়ে যায়। একদিকে হুকুম এবং অন্যদিকে জিনিস মওজুদ। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই ঈসার (আঃ) আশ্চর্য অবস্থা আল্লাহর নিকট আদমের (আঃ) আশ্চর্য অবস্থার ন্যায়, তাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করলেন, তৎপর তা (রকালবীকে বললেনঃ (সজীব) হয়ে যাও, তখনই তা (সজীব) হয়ে গেলো এই বাস্তব ঘটনা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে; সুতরাং তুমি সংশয়ীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।”হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে বললেনঃ আল্লাহই আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং তোমরা তারই ইবাদত করো, এটাই সরল পথ! এটাই আমি আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে নিয়ে এসেছি। যারা এর অনুসরণ করবে তারা সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং যারা এর বিপরীত করবে তারা পথভ্রষ্ট হবে।হযরত ঈসা (আঃ) নিজের সম্পর্কে এইরূপ বর্ণনার পরেও আহলে কিতাবের দলগুলি নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করলো। ইয়াহূদীরা বললো যে, (নাউযুবিল্লাহ) তিনি জারজ সন্তান। তাদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক যে, তারা তার একজন উত্তম রাসূলের উপর জঘন্য অপবাদ দিয়েছে। তারা বলেছে যে, তার এই কথা বলা ইত্যাদি সবই জাদু। অনুরূপভাবে খৃস্টানরাও বিভ্রান্ত হয়ে বলতে শুরু করেছে যে, তিনি তো স্বয়ং আল্লাহ এবং এই কথা আল্লাহরই কথা। অন্যেরা বলেছে যে, তিনি আল্লাহর পুত্র। আরো অন্যেরা বলেছে যে, তিনি তিন মা'বুদের মধ্যে এক মাবদ। তবে একটি দল প্রকৃত ঘটনা মুতাবেক বলেছে যে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল। এটাই হচ্ছে সঠিক উক্তি। হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে মুসলমানদের আকীদা এটাই। আর মু'মিনদেরকে আল্লাহ তাআলা এই শিক্ষাই দিয়েছেন। বর্ণিত আছে যে, বাণী ইসরাঈলের এক সম্মেলন হয়। তারা চারটি দল। ছাঁটাই করে এবং প্রত্যেক কওম নিজ নিজ আলেমকে পেশ করে। এটা হযরত ঈসার (আঃ) আকাশে উঠে যাওয়ার পরের ঘটনা। এখন চারটি দলের চারজন আলেমের মধ্যে হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে মতানৈক্য হয়। একজন বলে যে, তিনি নিজেই আল্লাহ ছিলেন। তিনি যত দিন ইচ্ছা দুনিয়ায় অবস্থান করেছেন। যাকে ইচ্ছা জীবিত রেখেছেন এবং যাকে ইচ্ছা মেরে ফেলেছেন।তার পর তিনি আকাশে উঠে গেছেন। এই দলটিকে ইয়াকুবিয়্যাত বলা হয়। বাকী তিনটি দলের তিনজন আলেম ঐ আলেমকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে। তখন ঐ তিন জনের দুজন তৃতীয়জনকে বলেঃ “তোমার ধারণা ও মতামত কি?” সে বললোঃ “তিনি আল্লাহর পুত্র ছিলেন। এই দলটির নাম নাসতুরিয়্যাহ। অবশিষ্ট দুজন ঐ তৃতীয় জনকে বললোঃ “তুমিও ভুল বললে।" অবশিষ্ট দু’জনের একজন অপরজনকে বললোঃ “তুমি তোমার মতামত পেশ কর।” সে বললোঃ “আমার তো আকীদা এই যে, তিনি তিন মাবুদের এক মাবুদ। এক মা’দ আল্লাহ, দ্বিতীয় মাবুদ এই ঈসা (আঃ) এবং তৃতীয় মা'বুদ তাঁর মাতা মারইয়াম (আঃ)।" এই দলটির নাম ইসরাঈলিয়্যাহ। আর দলটিই ছিল খৃস্টানদের বাদশাহ। তাদের সবার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক। চুতর্থ জন বললোঃ “তোমরা সবাই মিথ্যাবাদী। হযরত ঈসা (আঃ) ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল। তিনি ছিলেন আল্লাহর কালেমা এবং তারই নিকট হতে প্রেরিত আল্লাহর রূহ।” এই দলটি মুসলমান। আর এরাই ছিল সঠিক পথের অনুসারী। তাদের মধ্যে যার অনুসারী যে দল ছিল সেই দল তার উক্তির উপরই চলে গেলো এবং তারা পরস্পর যুদ্ধ বিগ্রহ শুরু করে। দিলো। সর্বযুগে মুসলমানদের সংখ্যা কম থাকে বলে ঐ সব দল মুসলমানদের উপর বিজয় লাভ করলো। আল্লাহ তাআলার উক্তির তাৎপর্য এটাই যে, তারা এমন লোকদেরকে হত্যা করতো মানুষের মধ্যে যারা ন্যায়ের আদেশ করতো।ঐতিহাসিকদের বর্ণনা এই যে, বাদশাহ কুতুনতীন তিনবার খৃস্টানদের একত্রিত করে। শেষ বারের সম্মেলনে তাদের দু' হাজার এক শ’ সর জন আলেম একত্রিত ছিল। কিন্তু তারা সবাই হযরত ঈসার (আঃ) ব্যাপারে বিভিন্ন মতাবলম্বী ছিল। এক শ' জন এক কথা বললে সত্তর জন অন্য কথা বলে। পঞ্চাশ জন আরো অন্য কিছু বলে। ষাট জনের আকীদা অন্য। প্রত্যেকের মত একে অপরের বিপরীত ছিল। সবচেয়ে বড় দলটির লোক সংখ্যা ছিল তিনশ ষাট। বাদশাহ এই দলের লোক সংখ্যা বেশী দেখে এই দলভুক্ত হয়ে যায়। রাজ্যের মঙ্গল এতেই ছিল। সুতরাং তার রাজনীতি তাকে এই দলের প্রতিই মনোযোগী করলো। সে অন্যান্য সমস্ত দলকে বের করে দিলো। আর এদের জন্যে সে ‘আমানাতে কুবরা এর প্রথা আবিষ্কার করলো। প্রকৃত পক্ষে এটাই হচ্ছে জঘন্যতম খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা। এখন ঐ আলেমদের দ্বারা সে শরীয়তের মাসআলার কিতাবগুলি লিখিয়ে নিলো। আর রাজ্যের বহু রীতি-নীতি এবং শহরের জরুরী বিষয়গুলি শরীয়তরূপে তার মধ্যে দাখিল করে দিলো। সে অনেক কিছু নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করলো। এভাবে প্রকৃত দ্বীনে মাসীহর রূপ পরিবর্তন করে একটা সংমিশ্রিত দ্বীন তৈরী করলো। আর জনগণের মধ্যে ওটা আইন রূপে চালু করে দিলো। তখন থেকে দ্বীনে মাসীহ বলতে এটাকেই বুঝায়। ওটার উপর যখন সে সকলকে সম্মত করে ফেললো, তখন চতুর্দিকে গীর্জা ও ইবাদতখানা নির্মাণ করা এবং ওগুলিতে আ'লেমদেরকে বসিয়ে দিয়ে তাদের মাধ্যমে ঐ নব সৃষ্ট মাসীহিয়্যাতকে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টায় উঠে পড়ে লেগে গেল। সিরিয়ায়, জাযীরায় এবং রোমে প্রায় বারো হাজার এইরূপ ঘর তার যুগে নির্মিত হয়। যে জায়গায় শূল তৈরী করা হয়েছিল সেখানে তারা মাতা হায়লানা একটা গম্বুজ তৈরী করিয়ে নিয়েছিল। নিয়মিতভাবে ওর পূজা শুরু হয়ে যায় এবং সবাই বিশ্বাস করে নেয় যে, হযরত ঈসাকে (আঃ) শূলে চড়ানো হয়েছে। অথচ তাদের এ উক্তিটি সম্পূর্ণ ভুল। আল্লাহ তাআলা তাকে নিজের পক্ষ থেকে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। এটাই হলো খৃস্ট ধর্মের সংক্ষিপ্ত নমুনা।যারা আল্লাহ তাআলার উপর মিথ্যা আরোপ করে এবং সন্তান ও শরীক স্থাপন করে তারা দুনিয়ায় হয়তো অবকাশ লাভ করবে, কিন্তু ঐ ভীষণ ভয়াবহ দিনে চতুর্দিক থেকে তাদের উপর ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা শুরু হয়ে যাবে এবং তারা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা স্বীয় অবাধ্য বান্দাদেরকে তাড়াতাড়ি শাস্তি দেন না বটে, কিন্তু তাদেরকে একেবারে ছেড়েও দেন না।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা যালিমকে অবকাশ দেন, কিন্তু যখন তাকে পাকড়াও করেন, তখন তার কোন আশ্রয় স্থল বাকী থাকে না।" একথা বলার পর তিনি কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন।(আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও করার পন্থা এরূপই যে, যখন কোন অত্যাচারী গ্রামবাসীকে পাকড়াও করেন ,তখন নিশ্চিত জানবে যে, তার পাকড়াও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক।" (১১:১০২)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অপছন্দনীয় কথা শুনে আল্লাহ অপেক্ষা অধিক ধৈর্যশীল আর কেউই নেই। মানুষ তার সন্তান স্থাপন করে, তথাপি তিনি তাদেরকে রিযক দিতেই রয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে রেখেছেন। আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অনেক গ্রামবাসীকে, তারা অত্যাচারী হওয়া সত্ত্বেও আমি অবকাশ দিয়েছি, তারপরে তাদেরকে পাকড়াও করেছি, শেষে তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে।" (২২:৪৮) অন্য জায়গায় তিনি বলেছেনঃ “অত্যাচারী লোকেরা যেন তাদের আমলের ব্যাপারে আল্লাহকে উদাসীন ও অমনোযোগী মনে না করে। তাদেরকে তিনি অবকাশ দিচ্ছেন ঐ দিনের জন্যে, যেই দিন চক্ষু উপরের দিকে উঠে যাবে।” ঐ কথা তিনি এখানেও বলছেনঃ এই কাফিরদের এক মহা দিবসের আগমনে ভীষণ দুর্দশা রয়েছে।হযরত উবাদা ইবনু সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ এক, তার কোন অংশীদার নেই এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল, আর ঈসা (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল এবং তাঁর কালেমা যা তিনি মারইয়ামের (আঃ) প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তিনি তাঁর রূহ; আরো সাক্ষ্য দেয় যে, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, তার আমল যা-ই হোক না কেন আল্লাহ তাকে বেহেশতে প্রবিষ্ট করবেন। (এ হাদীসটি বিশুদ্ধ। এর বিশুদ্ধ তার ব্যাপারে সবাই একমত)
মারইয়াম 19:36
৩৪-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ মুস্তফাকে (সঃ) বলছেনঃ হযরত ঈসার (আঃ) ঘটনার ব্যাপারে যে লোকদের মতানৈক্য ছিল, ওর মধ্যে যা সঠিক, তা আমি বর্ণনা করলাম। (আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) ও রয়েছে। হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দের (আরবী) 'কে (আরবী) বা পেশ দিয়ে পড়াই বেশী প্রকাশমান। আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তিটিই এর প্রমাণ। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে সত্য, সুতরাং তুমি সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৬০) হযরত ঈসা (আঃ) যে আল্লাহর নবী ও বান্দা ছিলেন এ কথা বলার পর আল্লাহ তাআলা নিজের সত্তার পবিত্রতা বর্ণনা করছেন। তার মাহাত্মের এটা সম্পূর্ণ বিপরীত যে, তার সন্তান হবে। অজ্ঞ ও যালিম লোকেরা যে এই গুজব রটিয়ে ফিরছে তার থেকে মহান আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং তিনি এর থেকে দূরে রয়েছেন। তিনি যে কাজের ইচ্ছা করেন, সে জন্যে তার কোন উপকরণের প্রয়োজন হয় না। তিনি শুধু মাত্র বলেনঃ ‘হও’ আর তেমনই তা হয়ে যায়। একদিকে হুকুম এবং অন্যদিকে জিনিস মওজুদ। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই ঈসার (আঃ) আশ্চর্য অবস্থা আল্লাহর নিকট আদমের (আঃ) আশ্চর্য অবস্থার ন্যায়, তাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করলেন, তৎপর তা (রকালবীকে বললেনঃ (সজীব) হয়ে যাও, তখনই তা (সজীব) হয়ে গেলো এই বাস্তব ঘটনা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে; সুতরাং তুমি সংশয়ীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।”হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে বললেনঃ আল্লাহই আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং তোমরা তারই ইবাদত করো, এটাই সরল পথ! এটাই আমি আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে নিয়ে এসেছি। যারা এর অনুসরণ করবে তারা সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং যারা এর বিপরীত করবে তারা পথভ্রষ্ট হবে।হযরত ঈসা (আঃ) নিজের সম্পর্কে এইরূপ বর্ণনার পরেও আহলে কিতাবের দলগুলি নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করলো। ইয়াহূদীরা বললো যে, (নাউযুবিল্লাহ) তিনি জারজ সন্তান। তাদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক যে, তারা তার একজন উত্তম রাসূলের উপর জঘন্য অপবাদ দিয়েছে। তারা বলেছে যে, তার এই কথা বলা ইত্যাদি সবই জাদু। অনুরূপভাবে খৃস্টানরাও বিভ্রান্ত হয়ে বলতে শুরু করেছে যে, তিনি তো স্বয়ং আল্লাহ এবং এই কথা আল্লাহরই কথা। অন্যেরা বলেছে যে, তিনি আল্লাহর পুত্র। আরো অন্যেরা বলেছে যে, তিনি তিন মা'বুদের মধ্যে এক মাবদ। তবে একটি দল প্রকৃত ঘটনা মুতাবেক বলেছে যে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল। এটাই হচ্ছে সঠিক উক্তি। হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে মুসলমানদের আকীদা এটাই। আর মু'মিনদেরকে আল্লাহ তাআলা এই শিক্ষাই দিয়েছেন। বর্ণিত আছে যে, বাণী ইসরাঈলের এক সম্মেলন হয়। তারা চারটি দল। ছাঁটাই করে এবং প্রত্যেক কওম নিজ নিজ আলেমকে পেশ করে। এটা হযরত ঈসার (আঃ) আকাশে উঠে যাওয়ার পরের ঘটনা। এখন চারটি দলের চারজন আলেমের মধ্যে হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে মতানৈক্য হয়। একজন বলে যে, তিনি নিজেই আল্লাহ ছিলেন। তিনি যত দিন ইচ্ছা দুনিয়ায় অবস্থান করেছেন। যাকে ইচ্ছা জীবিত রেখেছেন এবং যাকে ইচ্ছা মেরে ফেলেছেন।তার পর তিনি আকাশে উঠে গেছেন। এই দলটিকে ইয়াকুবিয়্যাত বলা হয়। বাকী তিনটি দলের তিনজন আলেম ঐ আলেমকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে। তখন ঐ তিন জনের দুজন তৃতীয়জনকে বলেঃ “তোমার ধারণা ও মতামত কি?” সে বললোঃ “তিনি আল্লাহর পুত্র ছিলেন। এই দলটির নাম নাসতুরিয়্যাহ। অবশিষ্ট দুজন ঐ তৃতীয় জনকে বললোঃ “তুমিও ভুল বললে।" অবশিষ্ট দু’জনের একজন অপরজনকে বললোঃ “তুমি তোমার মতামত পেশ কর।” সে বললোঃ “আমার তো আকীদা এই যে, তিনি তিন মাবুদের এক মাবুদ। এক মা’দ আল্লাহ, দ্বিতীয় মাবুদ এই ঈসা (আঃ) এবং তৃতীয় মা'বুদ তাঁর মাতা মারইয়াম (আঃ)।" এই দলটির নাম ইসরাঈলিয়্যাহ। আর দলটিই ছিল খৃস্টানদের বাদশাহ। তাদের সবার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক। চুতর্থ জন বললোঃ “তোমরা সবাই মিথ্যাবাদী। হযরত ঈসা (আঃ) ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল। তিনি ছিলেন আল্লাহর কালেমা এবং তারই নিকট হতে প্রেরিত আল্লাহর রূহ।” এই দলটি মুসলমান। আর এরাই ছিল সঠিক পথের অনুসারী। তাদের মধ্যে যার অনুসারী যে দল ছিল সেই দল তার উক্তির উপরই চলে গেলো এবং তারা পরস্পর যুদ্ধ বিগ্রহ শুরু করে। দিলো। সর্বযুগে মুসলমানদের সংখ্যা কম থাকে বলে ঐ সব দল মুসলমানদের উপর বিজয় লাভ করলো। আল্লাহ তাআলার উক্তির তাৎপর্য এটাই যে, তারা এমন লোকদেরকে হত্যা করতো মানুষের মধ্যে যারা ন্যায়ের আদেশ করতো।ঐতিহাসিকদের বর্ণনা এই যে, বাদশাহ কুতুনতীন তিনবার খৃস্টানদের একত্রিত করে। শেষ বারের সম্মেলনে তাদের দু' হাজার এক শ’ সর জন আলেম একত্রিত ছিল। কিন্তু তারা সবাই হযরত ঈসার (আঃ) ব্যাপারে বিভিন্ন মতাবলম্বী ছিল। এক শ' জন এক কথা বললে সত্তর জন অন্য কথা বলে। পঞ্চাশ জন আরো অন্য কিছু বলে। ষাট জনের আকীদা অন্য। প্রত্যেকের মত একে অপরের বিপরীত ছিল। সবচেয়ে বড় দলটির লোক সংখ্যা ছিল তিনশ ষাট। বাদশাহ এই দলের লোক সংখ্যা বেশী দেখে এই দলভুক্ত হয়ে যায়। রাজ্যের মঙ্গল এতেই ছিল। সুতরাং তার রাজনীতি তাকে এই দলের প্রতিই মনোযোগী করলো। সে অন্যান্য সমস্ত দলকে বের করে দিলো। আর এদের জন্যে সে ‘আমানাতে কুবরা এর প্রথা আবিষ্কার করলো। প্রকৃত পক্ষে এটাই হচ্ছে জঘন্যতম খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা। এখন ঐ আলেমদের দ্বারা সে শরীয়তের মাসআলার কিতাবগুলি লিখিয়ে নিলো। আর রাজ্যের বহু রীতি-নীতি এবং শহরের জরুরী বিষয়গুলি শরীয়তরূপে তার মধ্যে দাখিল করে দিলো। সে অনেক কিছু নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করলো। এভাবে প্রকৃত দ্বীনে মাসীহর রূপ পরিবর্তন করে একটা সংমিশ্রিত দ্বীন তৈরী করলো। আর জনগণের মধ্যে ওটা আইন রূপে চালু করে দিলো। তখন থেকে দ্বীনে মাসীহ বলতে এটাকেই বুঝায়। ওটার উপর যখন সে সকলকে সম্মত করে ফেললো, তখন চতুর্দিকে গীর্জা ও ইবাদতখানা নির্মাণ করা এবং ওগুলিতে আ'লেমদেরকে বসিয়ে দিয়ে তাদের মাধ্যমে ঐ নব সৃষ্ট মাসীহিয়্যাতকে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টায় উঠে পড়ে লেগে গেল। সিরিয়ায়, জাযীরায় এবং রোমে প্রায় বারো হাজার এইরূপ ঘর তার যুগে নির্মিত হয়। যে জায়গায় শূল তৈরী করা হয়েছিল সেখানে তারা মাতা হায়লানা একটা গম্বুজ তৈরী করিয়ে নিয়েছিল। নিয়মিতভাবে ওর পূজা শুরু হয়ে যায় এবং সবাই বিশ্বাস করে নেয় যে, হযরত ঈসাকে (আঃ) শূলে চড়ানো হয়েছে। অথচ তাদের এ উক্তিটি সম্পূর্ণ ভুল। আল্লাহ তাআলা তাকে নিজের পক্ষ থেকে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। এটাই হলো খৃস্ট ধর্মের সংক্ষিপ্ত নমুনা।যারা আল্লাহ তাআলার উপর মিথ্যা আরোপ করে এবং সন্তান ও শরীক স্থাপন করে তারা দুনিয়ায় হয়তো অবকাশ লাভ করবে, কিন্তু ঐ ভীষণ ভয়াবহ দিনে চতুর্দিক থেকে তাদের উপর ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা শুরু হয়ে যাবে এবং তারা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা স্বীয় অবাধ্য বান্দাদেরকে তাড়াতাড়ি শাস্তি দেন না বটে, কিন্তু তাদেরকে একেবারে ছেড়েও দেন না।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা যালিমকে অবকাশ দেন, কিন্তু যখন তাকে পাকড়াও করেন, তখন তার কোন আশ্রয় স্থল বাকী থাকে না।" একথা বলার পর তিনি কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন।(আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও করার পন্থা এরূপই যে, যখন কোন অত্যাচারী গ্রামবাসীকে পাকড়াও করেন ,তখন নিশ্চিত জানবে যে, তার পাকড়াও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক।" (১১:১০২)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অপছন্দনীয় কথা শুনে আল্লাহ অপেক্ষা অধিক ধৈর্যশীল আর কেউই নেই। মানুষ তার সন্তান স্থাপন করে, তথাপি তিনি তাদেরকে রিযক দিতেই রয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে রেখেছেন। আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অনেক গ্রামবাসীকে, তারা অত্যাচারী হওয়া সত্ত্বেও আমি অবকাশ দিয়েছি, তারপরে তাদেরকে পাকড়াও করেছি, শেষে তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে।" (২২:৪৮) অন্য জায়গায় তিনি বলেছেনঃ “অত্যাচারী লোকেরা যেন তাদের আমলের ব্যাপারে আল্লাহকে উদাসীন ও অমনোযোগী মনে না করে। তাদেরকে তিনি অবকাশ দিচ্ছেন ঐ দিনের জন্যে, যেই দিন চক্ষু উপরের দিকে উঠে যাবে।” ঐ কথা তিনি এখানেও বলছেনঃ এই কাফিরদের এক মহা দিবসের আগমনে ভীষণ দুর্দশা রয়েছে।হযরত উবাদা ইবনু সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ এক, তার কোন অংশীদার নেই এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল, আর ঈসা (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল এবং তাঁর কালেমা যা তিনি মারইয়ামের (আঃ) প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তিনি তাঁর রূহ; আরো সাক্ষ্য দেয় যে, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, তার আমল যা-ই হোক না কেন আল্লাহ তাকে বেহেশতে প্রবিষ্ট করবেন। (এ হাদীসটি বিশুদ্ধ। এর বিশুদ্ধ তার ব্যাপারে সবাই একমত)
মারইয়াম 19:37
৩৪-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ মুস্তফাকে (সঃ) বলছেনঃ হযরত ঈসার (আঃ) ঘটনার ব্যাপারে যে লোকদের মতানৈক্য ছিল, ওর মধ্যে যা সঠিক, তা আমি বর্ণনা করলাম। (আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) ও রয়েছে। হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) কিরআতে (আরবী) রয়েছে। (আরবী) শব্দের (আরবী) 'কে (আরবী) বা পেশ দিয়ে পড়াই বেশী প্রকাশমান। আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তিটিই এর প্রমাণ। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে সত্য, সুতরাং তুমি সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৬০) হযরত ঈসা (আঃ) যে আল্লাহর নবী ও বান্দা ছিলেন এ কথা বলার পর আল্লাহ তাআলা নিজের সত্তার পবিত্রতা বর্ণনা করছেন। তার মাহাত্মের এটা সম্পূর্ণ বিপরীত যে, তার সন্তান হবে। অজ্ঞ ও যালিম লোকেরা যে এই গুজব রটিয়ে ফিরছে তার থেকে মহান আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং তিনি এর থেকে দূরে রয়েছেন। তিনি যে কাজের ইচ্ছা করেন, সে জন্যে তার কোন উপকরণের প্রয়োজন হয় না। তিনি শুধু মাত্র বলেনঃ ‘হও’ আর তেমনই তা হয়ে যায়। একদিকে হুকুম এবং অন্যদিকে জিনিস মওজুদ। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই ঈসার (আঃ) আশ্চর্য অবস্থা আল্লাহর নিকট আদমের (আঃ) আশ্চর্য অবস্থার ন্যায়, তাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করলেন, তৎপর তা (রকালবীকে বললেনঃ (সজীব) হয়ে যাও, তখনই তা (সজীব) হয়ে গেলো এই বাস্তব ঘটনা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে; সুতরাং তুমি সংশয়ীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।”হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে বললেনঃ আল্লাহই আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং তোমরা তারই ইবাদত করো, এটাই সরল পথ! এটাই আমি আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে নিয়ে এসেছি। যারা এর অনুসরণ করবে তারা সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং যারা এর বিপরীত করবে তারা পথভ্রষ্ট হবে।হযরত ঈসা (আঃ) নিজের সম্পর্কে এইরূপ বর্ণনার পরেও আহলে কিতাবের দলগুলি নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করলো। ইয়াহূদীরা বললো যে, (নাউযুবিল্লাহ) তিনি জারজ সন্তান। তাদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক যে, তারা তার একজন উত্তম রাসূলের উপর জঘন্য অপবাদ দিয়েছে। তারা বলেছে যে, তার এই কথা বলা ইত্যাদি সবই জাদু। অনুরূপভাবে খৃস্টানরাও বিভ্রান্ত হয়ে বলতে শুরু করেছে যে, তিনি তো স্বয়ং আল্লাহ এবং এই কথা আল্লাহরই কথা। অন্যেরা বলেছে যে, তিনি আল্লাহর পুত্র। আরো অন্যেরা বলেছে যে, তিনি তিন মা'বুদের মধ্যে এক মাবদ। তবে একটি দল প্রকৃত ঘটনা মুতাবেক বলেছে যে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল। এটাই হচ্ছে সঠিক উক্তি। হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে মুসলমানদের আকীদা এটাই। আর মু'মিনদেরকে আল্লাহ তাআলা এই শিক্ষাই দিয়েছেন। বর্ণিত আছে যে, বাণী ইসরাঈলের এক সম্মেলন হয়। তারা চারটি দল। ছাঁটাই করে এবং প্রত্যেক কওম নিজ নিজ আলেমকে পেশ করে। এটা হযরত ঈসার (আঃ) আকাশে উঠে যাওয়ার পরের ঘটনা। এখন চারটি দলের চারজন আলেমের মধ্যে হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে মতানৈক্য হয়। একজন বলে যে, তিনি নিজেই আল্লাহ ছিলেন। তিনি যত দিন ইচ্ছা দুনিয়ায় অবস্থান করেছেন। যাকে ইচ্ছা জীবিত রেখেছেন এবং যাকে ইচ্ছা মেরে ফেলেছেন।তার পর তিনি আকাশে উঠে গেছেন। এই দলটিকে ইয়াকুবিয়্যাত বলা হয়। বাকী তিনটি দলের তিনজন আলেম ঐ আলেমকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে। তখন ঐ তিন জনের দুজন তৃতীয়জনকে বলেঃ “তোমার ধারণা ও মতামত কি?” সে বললোঃ “তিনি আল্লাহর পুত্র ছিলেন। এই দলটির নাম নাসতুরিয়্যাহ। অবশিষ্ট দুজন ঐ তৃতীয় জনকে বললোঃ “তুমিও ভুল বললে।" অবশিষ্ট দু’জনের একজন অপরজনকে বললোঃ “তুমি তোমার মতামত পেশ কর।” সে বললোঃ “আমার তো আকীদা এই যে, তিনি তিন মাবুদের এক মাবুদ। এক মা’দ আল্লাহ, দ্বিতীয় মাবুদ এই ঈসা (আঃ) এবং তৃতীয় মা'বুদ তাঁর মাতা মারইয়াম (আঃ)।" এই দলটির নাম ইসরাঈলিয়্যাহ। আর দলটিই ছিল খৃস্টানদের বাদশাহ। তাদের সবার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক। চুতর্থ জন বললোঃ “তোমরা সবাই মিথ্যাবাদী। হযরত ঈসা (আঃ) ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল। তিনি ছিলেন আল্লাহর কালেমা এবং তারই নিকট হতে প্রেরিত আল্লাহর রূহ।” এই দলটি মুসলমান। আর এরাই ছিল সঠিক পথের অনুসারী। তাদের মধ্যে যার অনুসারী যে দল ছিল সেই দল তার উক্তির উপরই চলে গেলো এবং তারা পরস্পর যুদ্ধ বিগ্রহ শুরু করে। দিলো। সর্বযুগে মুসলমানদের সংখ্যা কম থাকে বলে ঐ সব দল মুসলমানদের উপর বিজয় লাভ করলো। আল্লাহ তাআলার উক্তির তাৎপর্য এটাই যে, তারা এমন লোকদেরকে হত্যা করতো মানুষের মধ্যে যারা ন্যায়ের আদেশ করতো।ঐতিহাসিকদের বর্ণনা এই যে, বাদশাহ কুতুনতীন তিনবার খৃস্টানদের একত্রিত করে। শেষ বারের সম্মেলনে তাদের দু' হাজার এক শ’ সর জন আলেম একত্রিত ছিল। কিন্তু তারা সবাই হযরত ঈসার (আঃ) ব্যাপারে বিভিন্ন মতাবলম্বী ছিল। এক শ' জন এক কথা বললে সত্তর জন অন্য কথা বলে। পঞ্চাশ জন আরো অন্য কিছু বলে। ষাট জনের আকীদা অন্য। প্রত্যেকের মত একে অপরের বিপরীত ছিল। সবচেয়ে বড় দলটির লোক সংখ্যা ছিল তিনশ ষাট। বাদশাহ এই দলের লোক সংখ্যা বেশী দেখে এই দলভুক্ত হয়ে যায়। রাজ্যের মঙ্গল এতেই ছিল। সুতরাং তার রাজনীতি তাকে এই দলের প্রতিই মনোযোগী করলো। সে অন্যান্য সমস্ত দলকে বের করে দিলো। আর এদের জন্যে সে ‘আমানাতে কুবরা এর প্রথা আবিষ্কার করলো। প্রকৃত পক্ষে এটাই হচ্ছে জঘন্যতম খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা। এখন ঐ আলেমদের দ্বারা সে শরীয়তের মাসআলার কিতাবগুলি লিখিয়ে নিলো। আর রাজ্যের বহু রীতি-নীতি এবং শহরের জরুরী বিষয়গুলি শরীয়তরূপে তার মধ্যে দাখিল করে দিলো। সে অনেক কিছু নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করলো। এভাবে প্রকৃত দ্বীনে মাসীহর রূপ পরিবর্তন করে একটা সংমিশ্রিত দ্বীন তৈরী করলো। আর জনগণের মধ্যে ওটা আইন রূপে চালু করে দিলো। তখন থেকে দ্বীনে মাসীহ বলতে এটাকেই বুঝায়। ওটার উপর যখন সে সকলকে সম্মত করে ফেললো, তখন চতুর্দিকে গীর্জা ও ইবাদতখানা নির্মাণ করা এবং ওগুলিতে আ'লেমদেরকে বসিয়ে দিয়ে তাদের মাধ্যমে ঐ নব সৃষ্ট মাসীহিয়্যাতকে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টায় উঠে পড়ে লেগে গেল। সিরিয়ায়, জাযীরায় এবং রোমে প্রায় বারো হাজার এইরূপ ঘর তার যুগে নির্মিত হয়। যে জায়গায় শূল তৈরী করা হয়েছিল সেখানে তারা মাতা হায়লানা একটা গম্বুজ তৈরী করিয়ে নিয়েছিল। নিয়মিতভাবে ওর পূজা শুরু হয়ে যায় এবং সবাই বিশ্বাস করে নেয় যে, হযরত ঈসাকে (আঃ) শূলে চড়ানো হয়েছে। অথচ তাদের এ উক্তিটি সম্পূর্ণ ভুল। আল্লাহ তাআলা তাকে নিজের পক্ষ থেকে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। এটাই হলো খৃস্ট ধর্মের সংক্ষিপ্ত নমুনা।যারা আল্লাহ তাআলার উপর মিথ্যা আরোপ করে এবং সন্তান ও শরীক স্থাপন করে তারা দুনিয়ায় হয়তো অবকাশ লাভ করবে, কিন্তু ঐ ভীষণ ভয়াবহ দিনে চতুর্দিক থেকে তাদের উপর ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা শুরু হয়ে যাবে এবং তারা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা স্বীয় অবাধ্য বান্দাদেরকে তাড়াতাড়ি শাস্তি দেন না বটে, কিন্তু তাদেরকে একেবারে ছেড়েও দেন না।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা যালিমকে অবকাশ দেন, কিন্তু যখন তাকে পাকড়াও করেন, তখন তার কোন আশ্রয় স্থল বাকী থাকে না।" একথা বলার পর তিনি কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন।(আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও করার পন্থা এরূপই যে, যখন কোন অত্যাচারী গ্রামবাসীকে পাকড়াও করেন ,তখন নিশ্চিত জানবে যে, তার পাকড়াও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক।" (১১:১০২)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অপছন্দনীয় কথা শুনে আল্লাহ অপেক্ষা অধিক ধৈর্যশীল আর কেউই নেই। মানুষ তার সন্তান স্থাপন করে, তথাপি তিনি তাদেরকে রিযক দিতেই রয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে রেখেছেন। আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অনেক গ্রামবাসীকে, তারা অত্যাচারী হওয়া সত্ত্বেও আমি অবকাশ দিয়েছি, তারপরে তাদেরকে পাকড়াও করেছি, শেষে তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে।" (২২:৪৮) অন্য জায়গায় তিনি বলেছেনঃ “অত্যাচারী লোকেরা যেন তাদের আমলের ব্যাপারে আল্লাহকে উদাসীন ও অমনোযোগী মনে না করে। তাদেরকে তিনি অবকাশ দিচ্ছেন ঐ দিনের জন্যে, যেই দিন চক্ষু উপরের দিকে উঠে যাবে।” ঐ কথা তিনি এখানেও বলছেনঃ এই কাফিরদের এক মহা দিবসের আগমনে ভীষণ দুর্দশা রয়েছে।হযরত উবাদা ইবনু সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ এক, তার কোন অংশীদার নেই এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল, আর ঈসা (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল এবং তাঁর কালেমা যা তিনি মারইয়ামের (আঃ) প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তিনি তাঁর রূহ; আরো সাক্ষ্য দেয় যে, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, তার আমল যা-ই হোক না কেন আল্লাহ তাকে বেহেশতে প্রবিষ্ট করবেন। (এ হাদীসটি বিশুদ্ধ। এর বিশুদ্ধ তার ব্যাপারে সবাই একমত)
মারইয়াম 19:38
৩৮-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: কিয়ামতের দিন কাফিরদের অবস্থা কিরূপ হবে সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, আজ দুনিয়ায় কাফিররা তাদের চক্ষু বন্ধ করে রেখেছে এবং কানে সোলা দিয়েছে, (চোখেও দেখে না এবং শুনেও শুনে না), কিন্তু কিয়ামতের দিন তাদের চক্ষুগুলি খুবই উজ্জ্বল হয়ে যাবে এবং কানও উত্তমরূপে খুলে যাবে। যেমন আল্লাহ বলেনঃঅর্থাৎ “যদি তুমি দেখো, তবে এক বিস্ময়কর অবস্থা দেখবে যখন এই অপরাধীরা স্বীয় প্রতিপালকের সামনে মস্তক অবনত করে থাকবে (এবং বলবে) হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা দেখলাম ও শুনলাম।” (৩২:১২) সুতরাং সেই দিন দেখা ও শোনা কোনই কাজে আসবে না এবং দুঃখ ও আফসোস করেও কোন লাভ হবে না। যদি তারা দুনিয়ায় চক্ষু ও কর্ণ দ্বারা কাজ নিয়ে আল্লাহর দ্বীনকে মেনে নিতো আজ আর দুঃখ ও আফসোস করতে হতো না। সেই দিন চক্ষু ও কর্ণ খুলে যাবে, অথচ আজ তারা অন্ধ ও বধির সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ তুমি মানুষকে ঐ দুঃখ ও আফসোস করার দিন থেকে সাবধান করে দাও। যখন সমস্ত কাজের ফায়সালা হয়ে যাবে, জান্নাতীদেরকে জান্নাত এবং জা হান্নামীদেরকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেয়া হবে, সেই দুঃখ ও আফসোস করার দিন হতে তারা আজি উদাসীন রয়েছে, এমনকি এটাকে তারা বিশ্বাসই করছে না। তুমি তাদেরকে সেই দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে চলে যাওয়ার পর মৃত্যুকে একটি ভেড়ার আকারে আনয়ন করা হবে এবং জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে খাড়া করে দেয়া হবে। অতঃপর জান্নাতীদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে “একে চেনো কি?” উত্তরে তারা বলবেঃ “হাঁ, এটা মৃত্যু।” তারপর জাহান্নামীদেরকেও এই একই প্রশ্ন করা হবে। তারাও ঐ একই উত্তর দেবে। তারপর আল্লাহর নির্দেশক্রমে মৃত্যুকে যবাহ করে দেয়া হবে। এরপর ঘোষণা করা হবেঃ “হে জান্নাতবাসী! তোমাদের জন্যে চিরস্থায়ী জীবন হয়ে গেলো, মৃত্যু আর হবে না। আর হে জাহান্নামবাসী! তোমাদের জন্যেও চিরস্থায়ী জীবন হয়ে গেলো, মরণ আর হবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। অতঃপর তিনি ইশারা করে বলেনঃ “দুনিয়াবাসী গাফলাতে দুনিয়ায় রয়েছে (দুনিয়ায় বাস করে পরকালকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে রয়েছে)।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) একটি ঘটনা দীর্ঘভাবে বর্ণনা করার পর বলেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তি তার জাহান্নাম ও জান্নাতের ঘর দেখতে থাকবে। ঐদিন হবে দুঃখ ও আফসোস করার দিন। জাহান্নামী তার জান্নাতী ঘরটি দেখতে থাকবে এবং তাকে বলা হবেঃ “যদি তুমি ভাল আমল করতে তবে এই ঘরটি লাভ করতে।” তখন সে দুঃখ ও আফসোস করবে। পক্ষান্তরে জান্নাতীদেরকে তাদের জাহান্নামের ঘরটি দেখানো হবে এবং বলা হবেঃ “যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ না হতো তবে তোমরা এই ঘরে যেতে।” অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, মৃত্যুকে যবাহ করার পর যখন চিরস্থায়ী বাসের ঘোষণা দেয়া হবে তখন তারা এতো বেশী খুশী হবে যে, আল্লাহ না বাচালে খুশীর আধিক্য হেতু তারা মরেই যেতো। আর জাহান্নামবাসীরা ভীষণ দুঃখিত হয়ে যেতো। সুতরাং এ আয়াতের ভাবার্থ এটাই। এটা হবে আফসোসের সময় এবং কাজের পরিসমাপ্তিরও সময়। তাই কিয়ামতের সময় এবং কাজের পরিসমাপ্তিরও সময়। তাই, কিয়ামতের নাম সমূহের মধ্যে একটি নাম হচ্ছে (আরবী) বা আফসোসের দিন। যেমন অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী আমি। সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও ব্যবস্থাপক আমি ছাড়া আর কেউই নয়। আমি ছাড়া কোন কিছুর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার দাবীদার কেউই হতে পারে না। আমার সত্ত্বা যুলুম থেকে পবিত্র।ইসলামের বাদশাহ আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনু আবদিল আযীয (রাঃ) কূফায় আবদুল হামীদ ইবনু আবদির রহমানকে পত্র লিখেন। তাতে তিনি লিখেনঃ “হামদ ও সানার পর, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টজীবকে সৃষ্টি করার সময়েই তাদের উপর মৃত্যু লিখে দিয়েছেন। সবকেই তার কাছেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তিনি তার এই নাযিলকৃত সত্য কিতাবের মধ্যে লিখে দিয়েছেন। যে, কিতাবকে নিজের ইলম দ্বারা মাহফুয বা রক্ষিত রেখেছেন এবং ফেরেশতাদের দ্বারা যে কিতাবকে তিনি রক্ষণাবেক্ষণ করছেন (তাতে লিখে দিয়েছেন যে, পৃথিবী ও ওর উপর যারা আছে তাদের চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী তিনিই এবং তারা তারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।”
মারইয়াম 19:39
৩৮-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: কিয়ামতের দিন কাফিরদের অবস্থা কিরূপ হবে সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, আজ দুনিয়ায় কাফিররা তাদের চক্ষু বন্ধ করে রেখেছে এবং কানে সোলা দিয়েছে, (চোখেও দেখে না এবং শুনেও শুনে না), কিন্তু কিয়ামতের দিন তাদের চক্ষুগুলি খুবই উজ্জ্বল হয়ে যাবে এবং কানও উত্তমরূপে খুলে যাবে। যেমন আল্লাহ বলেনঃঅর্থাৎ “যদি তুমি দেখো, তবে এক বিস্ময়কর অবস্থা দেখবে যখন এই অপরাধীরা স্বীয় প্রতিপালকের সামনে মস্তক অবনত করে থাকবে (এবং বলবে) হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা দেখলাম ও শুনলাম।” (৩২:১২) সুতরাং সেই দিন দেখা ও শোনা কোনই কাজে আসবে না এবং দুঃখ ও আফসোস করেও কোন লাভ হবে না। যদি তারা দুনিয়ায় চক্ষু ও কর্ণ দ্বারা কাজ নিয়ে আল্লাহর দ্বীনকে মেনে নিতো আজ আর দুঃখ ও আফসোস করতে হতো না। সেই দিন চক্ষু ও কর্ণ খুলে যাবে, অথচ আজ তারা অন্ধ ও বধির সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ তুমি মানুষকে ঐ দুঃখ ও আফসোস করার দিন থেকে সাবধান করে দাও। যখন সমস্ত কাজের ফায়সালা হয়ে যাবে, জান্নাতীদেরকে জান্নাত এবং জা হান্নামীদেরকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেয়া হবে, সেই দুঃখ ও আফসোস করার দিন হতে তারা আজি উদাসীন রয়েছে, এমনকি এটাকে তারা বিশ্বাসই করছে না। তুমি তাদেরকে সেই দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে চলে যাওয়ার পর মৃত্যুকে একটি ভেড়ার আকারে আনয়ন করা হবে এবং জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে খাড়া করে দেয়া হবে। অতঃপর জান্নাতীদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে “একে চেনো কি?” উত্তরে তারা বলবেঃ “হাঁ, এটা মৃত্যু।” তারপর জাহান্নামীদেরকেও এই একই প্রশ্ন করা হবে। তারাও ঐ একই উত্তর দেবে। তারপর আল্লাহর নির্দেশক্রমে মৃত্যুকে যবাহ করে দেয়া হবে। এরপর ঘোষণা করা হবেঃ “হে জান্নাতবাসী! তোমাদের জন্যে চিরস্থায়ী জীবন হয়ে গেলো, মৃত্যু আর হবে না। আর হে জাহান্নামবাসী! তোমাদের জন্যেও চিরস্থায়ী জীবন হয়ে গেলো, মরণ আর হবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। অতঃপর তিনি ইশারা করে বলেনঃ “দুনিয়াবাসী গাফলাতে দুনিয়ায় রয়েছে (দুনিয়ায় বাস করে পরকালকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে রয়েছে)।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) একটি ঘটনা দীর্ঘভাবে বর্ণনা করার পর বলেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তি তার জাহান্নাম ও জান্নাতের ঘর দেখতে থাকবে। ঐদিন হবে দুঃখ ও আফসোস করার দিন। জাহান্নামী তার জান্নাতী ঘরটি দেখতে থাকবে এবং তাকে বলা হবেঃ “যদি তুমি ভাল আমল করতে তবে এই ঘরটি লাভ করতে।” তখন সে দুঃখ ও আফসোস করবে। পক্ষান্তরে জান্নাতীদেরকে তাদের জাহান্নামের ঘরটি দেখানো হবে এবং বলা হবেঃ “যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ না হতো তবে তোমরা এই ঘরে যেতে।” অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, মৃত্যুকে যবাহ করার পর যখন চিরস্থায়ী বাসের ঘোষণা দেয়া হবে তখন তারা এতো বেশী খুশী হবে যে, আল্লাহ না বাচালে খুশীর আধিক্য হেতু তারা মরেই যেতো। আর জাহান্নামবাসীরা ভীষণ দুঃখিত হয়ে যেতো। সুতরাং এ আয়াতের ভাবার্থ এটাই। এটা হবে আফসোসের সময় এবং কাজের পরিসমাপ্তিরও সময়। তাই কিয়ামতের সময় এবং কাজের পরিসমাপ্তিরও সময়। তাই, কিয়ামতের নাম সমূহের মধ্যে একটি নাম হচ্ছে (আরবী) বা আফসোসের দিন। যেমন অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী আমি। সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও ব্যবস্থাপক আমি ছাড়া আর কেউই নয়। আমি ছাড়া কোন কিছুর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার দাবীদার কেউই হতে পারে না। আমার সত্ত্বা যুলুম থেকে পবিত্র।ইসলামের বাদশাহ আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনু আবদিল আযীয (রাঃ) কূফায় আবদুল হামীদ ইবনু আবদির রহমানকে পত্র লিখেন। তাতে তিনি লিখেনঃ “হামদ ও সানার পর, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টজীবকে সৃষ্টি করার সময়েই তাদের উপর মৃত্যু লিখে দিয়েছেন। সবকেই তার কাছেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তিনি তার এই নাযিলকৃত সত্য কিতাবের মধ্যে লিখে দিয়েছেন। যে, কিতাবকে নিজের ইলম দ্বারা মাহফুয বা রক্ষিত রেখেছেন এবং ফেরেশতাদের দ্বারা যে কিতাবকে তিনি রক্ষণাবেক্ষণ করছেন (তাতে লিখে দিয়েছেন যে, পৃথিবী ও ওর উপর যারা আছে তাদের চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী তিনিই এবং তারা তারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।”
মারইয়াম 19:40
৩৮-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: কিয়ামতের দিন কাফিরদের অবস্থা কিরূপ হবে সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, আজ দুনিয়ায় কাফিররা তাদের চক্ষু বন্ধ করে রেখেছে এবং কানে সোলা দিয়েছে, (চোখেও দেখে না এবং শুনেও শুনে না), কিন্তু কিয়ামতের দিন তাদের চক্ষুগুলি খুবই উজ্জ্বল হয়ে যাবে এবং কানও উত্তমরূপে খুলে যাবে। যেমন আল্লাহ বলেনঃঅর্থাৎ “যদি তুমি দেখো, তবে এক বিস্ময়কর অবস্থা দেখবে যখন এই অপরাধীরা স্বীয় প্রতিপালকের সামনে মস্তক অবনত করে থাকবে (এবং বলবে) হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা দেখলাম ও শুনলাম।” (৩২:১২) সুতরাং সেই দিন দেখা ও শোনা কোনই কাজে আসবে না এবং দুঃখ ও আফসোস করেও কোন লাভ হবে না। যদি তারা দুনিয়ায় চক্ষু ও কর্ণ দ্বারা কাজ নিয়ে আল্লাহর দ্বীনকে মেনে নিতো আজ আর দুঃখ ও আফসোস করতে হতো না। সেই দিন চক্ষু ও কর্ণ খুলে যাবে, অথচ আজ তারা অন্ধ ও বধির সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ তুমি মানুষকে ঐ দুঃখ ও আফসোস করার দিন থেকে সাবধান করে দাও। যখন সমস্ত কাজের ফায়সালা হয়ে যাবে, জান্নাতীদেরকে জান্নাত এবং জা হান্নামীদেরকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেয়া হবে, সেই দুঃখ ও আফসোস করার দিন হতে তারা আজি উদাসীন রয়েছে, এমনকি এটাকে তারা বিশ্বাসই করছে না। তুমি তাদেরকে সেই দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে চলে যাওয়ার পর মৃত্যুকে একটি ভেড়ার আকারে আনয়ন করা হবে এবং জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে খাড়া করে দেয়া হবে। অতঃপর জান্নাতীদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে “একে চেনো কি?” উত্তরে তারা বলবেঃ “হাঁ, এটা মৃত্যু।” তারপর জাহান্নামীদেরকেও এই একই প্রশ্ন করা হবে। তারাও ঐ একই উত্তর দেবে। তারপর আল্লাহর নির্দেশক্রমে মৃত্যুকে যবাহ করে দেয়া হবে। এরপর ঘোষণা করা হবেঃ “হে জান্নাতবাসী! তোমাদের জন্যে চিরস্থায়ী জীবন হয়ে গেলো, মৃত্যু আর হবে না। আর হে জাহান্নামবাসী! তোমাদের জন্যেও চিরস্থায়ী জীবন হয়ে গেলো, মরণ আর হবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। অতঃপর তিনি ইশারা করে বলেনঃ “দুনিয়াবাসী গাফলাতে দুনিয়ায় রয়েছে (দুনিয়ায় বাস করে পরকালকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে রয়েছে)।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) একটি ঘটনা দীর্ঘভাবে বর্ণনা করার পর বলেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তি তার জাহান্নাম ও জান্নাতের ঘর দেখতে থাকবে। ঐদিন হবে দুঃখ ও আফসোস করার দিন। জাহান্নামী তার জান্নাতী ঘরটি দেখতে থাকবে এবং তাকে বলা হবেঃ “যদি তুমি ভাল আমল করতে তবে এই ঘরটি লাভ করতে।” তখন সে দুঃখ ও আফসোস করবে। পক্ষান্তরে জান্নাতীদেরকে তাদের জাহান্নামের ঘরটি দেখানো হবে এবং বলা হবেঃ “যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ না হতো তবে তোমরা এই ঘরে যেতে।” অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, মৃত্যুকে যবাহ করার পর যখন চিরস্থায়ী বাসের ঘোষণা দেয়া হবে তখন তারা এতো বেশী খুশী হবে যে, আল্লাহ না বাচালে খুশীর আধিক্য হেতু তারা মরেই যেতো। আর জাহান্নামবাসীরা ভীষণ দুঃখিত হয়ে যেতো। সুতরাং এ আয়াতের ভাবার্থ এটাই। এটা হবে আফসোসের সময় এবং কাজের পরিসমাপ্তিরও সময়। তাই কিয়ামতের সময় এবং কাজের পরিসমাপ্তিরও সময়। তাই, কিয়ামতের নাম সমূহের মধ্যে একটি নাম হচ্ছে (আরবী) বা আফসোসের দিন। যেমন অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী আমি। সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও ব্যবস্থাপক আমি ছাড়া আর কেউই নয়। আমি ছাড়া কোন কিছুর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার দাবীদার কেউই হতে পারে না। আমার সত্ত্বা যুলুম থেকে পবিত্র।ইসলামের বাদশাহ আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনু আবদিল আযীয (রাঃ) কূফায় আবদুল হামীদ ইবনু আবদির রহমানকে পত্র লিখেন। তাতে তিনি লিখেনঃ “হামদ ও সানার পর, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টজীবকে সৃষ্টি করার সময়েই তাদের উপর মৃত্যু লিখে দিয়েছেন। সবকেই তার কাছেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তিনি তার এই নাযিলকৃত সত্য কিতাবের মধ্যে লিখে দিয়েছেন। যে, কিতাবকে নিজের ইলম দ্বারা মাহফুয বা রক্ষিত রেখেছেন এবং ফেরেশতাদের দ্বারা যে কিতাবকে তিনি রক্ষণাবেক্ষণ করছেন (তাতে লিখে দিয়েছেন যে, পৃথিবী ও ওর উপর যারা আছে তাদের চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী তিনিই এবং তারা তারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।”
মারইয়াম 19:41
৪১-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: মক্কার মুশরিকরা যারা মূর্তিপুজক ছিল এবং নিজেদেরকে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) অনুসারী মনে করতো তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন এবং স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের সামনে স্বয়ং হযরত ইবরাহীম খলীলের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা কর। এ সত্য নবী নিজের পিতাকেও পরওয়া করেন নাই। তার সামনে তিনি সত্যকে খুলে দিয়েছিলেন এবং তাকে মূর্তিপূজা হতে বিরত থাকতে বলেছিলেন। তাকে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছিলেনঃ “যে মূর্তি তোমার কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে তার পূজা কর কেন?তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তোমার পুত্র। কিন্তু আমার মধ্যে আল্লাহর দেয়া যে জ্ঞান রয়েছে তা তোমাদের মধ্যে নেই। তুমি আমার অনুসরণ করো। আমি তোমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করছি এবং আমি তোমাকে অকল্যাণের পথ হতে সরিয়ে কল্যাণের পথে পৌঁছিয়ে দেবো। হে আমার পিতা! মূর্তি পূজা দ্বারা তো শয়তানেরই অনুসরণ করা হয়। সে ঐ পথে পরিচালিত করে এবং এতে সে খুশী হয়। যেমন সূরায়ে ইয়াসীনে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমাদেরকে সতর্ক করে দিই নাই হে অদিম সন্তানগণ (এবং হে জ্বিনগণ)! তোমরা শয়তানের পূজা করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু!" (৩৬:৬০) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা স্ত্রীলোকদেরকে ডেকে থাকে এবং আল্লাহকে পরিত্যাগ করে, প্রকৃত পক্ষে তারা উদ্ধত শয়তানকেই ডেকে থাকে।" (৪:১১৭)হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে আরো বলেনঃ শয়তান আল্লাহ তাআলার অবাধ্য ও বিরোধী। তার আনুগত্য স্বীকার করার ব্যাপারে সে অহংকারী। এ কারণেই সে মহান আল্লাহর দরবার হতে বিতাড়িত হয়েছে। যদি তুমিও এই শয়তানের আনুগত্য কর, তবে সে তোমাকেও তার অবস্থায় পৌঁছিয়ে দেবে। হে আমার পিতা! তেমাির এই শিরুক ও অবাধ্যতার কারণে আমি আশংকা করছি যে, হয়তো তোমার উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়বে এবং তুমি শয়তানের বন্ধু ও সঙ্গী হয়ে যাবে। আর এর ফলে তোমার উপর থেকে আল্লাহর সাহায্য সহানুভূতি দূর হয়ে যাবে। দেখো, শয়তানের কোনই ক্ষমতা নেই। তার আনুগত্য করলে তুমি অতি জঘন্য স্থানে পৌঁছে যাবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা নিশ্চিত ও শপথ যুক্ত কথা যে, তোমার পূর্ববর্তী উম্মতদের নিকট ও আমি রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু শয়তান তাদের খারাপ কাজগুলিকে তাদের কাছে শোভনীয় ও সুন্দররূপে দেখিয়েছিল এবং সেই আজ তাদের সঙ্গী ও বন্ধু হয়ে যায় (কিন্তু সুফল কিছুই হলো না), তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (১৬:৬৩)
মারইয়াম 19:42
৪১-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: মক্কার মুশরিকরা যারা মূর্তিপুজক ছিল এবং নিজেদেরকে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) অনুসারী মনে করতো তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন এবং স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের সামনে স্বয়ং হযরত ইবরাহীম খলীলের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা কর। এ সত্য নবী নিজের পিতাকেও পরওয়া করেন নাই। তার সামনে তিনি সত্যকে খুলে দিয়েছিলেন এবং তাকে মূর্তিপূজা হতে বিরত থাকতে বলেছিলেন। তাকে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছিলেনঃ “যে মূর্তি তোমার কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে তার পূজা কর কেন?তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তোমার পুত্র। কিন্তু আমার মধ্যে আল্লাহর দেয়া যে জ্ঞান রয়েছে তা তোমাদের মধ্যে নেই। তুমি আমার অনুসরণ করো। আমি তোমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করছি এবং আমি তোমাকে অকল্যাণের পথ হতে সরিয়ে কল্যাণের পথে পৌঁছিয়ে দেবো। হে আমার পিতা! মূর্তি পূজা দ্বারা তো শয়তানেরই অনুসরণ করা হয়। সে ঐ পথে পরিচালিত করে এবং এতে সে খুশী হয়। যেমন সূরায়ে ইয়াসীনে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমাদেরকে সতর্ক করে দিই নাই হে অদিম সন্তানগণ (এবং হে জ্বিনগণ)! তোমরা শয়তানের পূজা করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু!" (৩৬:৬০) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা স্ত্রীলোকদেরকে ডেকে থাকে এবং আল্লাহকে পরিত্যাগ করে, প্রকৃত পক্ষে তারা উদ্ধত শয়তানকেই ডেকে থাকে।" (৪:১১৭)হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে আরো বলেনঃ শয়তান আল্লাহ তাআলার অবাধ্য ও বিরোধী। তার আনুগত্য স্বীকার করার ব্যাপারে সে অহংকারী। এ কারণেই সে মহান আল্লাহর দরবার হতে বিতাড়িত হয়েছে। যদি তুমিও এই শয়তানের আনুগত্য কর, তবে সে তোমাকেও তার অবস্থায় পৌঁছিয়ে দেবে। হে আমার পিতা! তেমাির এই শিরুক ও অবাধ্যতার কারণে আমি আশংকা করছি যে, হয়তো তোমার উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়বে এবং তুমি শয়তানের বন্ধু ও সঙ্গী হয়ে যাবে। আর এর ফলে তোমার উপর থেকে আল্লাহর সাহায্য সহানুভূতি দূর হয়ে যাবে। দেখো, শয়তানের কোনই ক্ষমতা নেই। তার আনুগত্য করলে তুমি অতি জঘন্য স্থানে পৌঁছে যাবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা নিশ্চিত ও শপথ যুক্ত কথা যে, তোমার পূর্ববর্তী উম্মতদের নিকট ও আমি রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু শয়তান তাদের খারাপ কাজগুলিকে তাদের কাছে শোভনীয় ও সুন্দররূপে দেখিয়েছিল এবং সেই আজ তাদের সঙ্গী ও বন্ধু হয়ে যায় (কিন্তু সুফল কিছুই হলো না), তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (১৬:৬৩)
মারইয়াম 19:43
৪১-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: মক্কার মুশরিকরা যারা মূর্তিপুজক ছিল এবং নিজেদেরকে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) অনুসারী মনে করতো তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন এবং স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের সামনে স্বয়ং হযরত ইবরাহীম খলীলের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা কর। এ সত্য নবী নিজের পিতাকেও পরওয়া করেন নাই। তার সামনে তিনি সত্যকে খুলে দিয়েছিলেন এবং তাকে মূর্তিপূজা হতে বিরত থাকতে বলেছিলেন। তাকে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছিলেনঃ “যে মূর্তি তোমার কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে তার পূজা কর কেন?তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তোমার পুত্র। কিন্তু আমার মধ্যে আল্লাহর দেয়া যে জ্ঞান রয়েছে তা তোমাদের মধ্যে নেই। তুমি আমার অনুসরণ করো। আমি তোমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করছি এবং আমি তোমাকে অকল্যাণের পথ হতে সরিয়ে কল্যাণের পথে পৌঁছিয়ে দেবো। হে আমার পিতা! মূর্তি পূজা দ্বারা তো শয়তানেরই অনুসরণ করা হয়। সে ঐ পথে পরিচালিত করে এবং এতে সে খুশী হয়। যেমন সূরায়ে ইয়াসীনে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমাদেরকে সতর্ক করে দিই নাই হে অদিম সন্তানগণ (এবং হে জ্বিনগণ)! তোমরা শয়তানের পূজা করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু!" (৩৬:৬০) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা স্ত্রীলোকদেরকে ডেকে থাকে এবং আল্লাহকে পরিত্যাগ করে, প্রকৃত পক্ষে তারা উদ্ধত শয়তানকেই ডেকে থাকে।" (৪:১১৭)হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে আরো বলেনঃ শয়তান আল্লাহ তাআলার অবাধ্য ও বিরোধী। তার আনুগত্য স্বীকার করার ব্যাপারে সে অহংকারী। এ কারণেই সে মহান আল্লাহর দরবার হতে বিতাড়িত হয়েছে। যদি তুমিও এই শয়তানের আনুগত্য কর, তবে সে তোমাকেও তার অবস্থায় পৌঁছিয়ে দেবে। হে আমার পিতা! তেমাির এই শিরুক ও অবাধ্যতার কারণে আমি আশংকা করছি যে, হয়তো তোমার উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়বে এবং তুমি শয়তানের বন্ধু ও সঙ্গী হয়ে যাবে। আর এর ফলে তোমার উপর থেকে আল্লাহর সাহায্য সহানুভূতি দূর হয়ে যাবে। দেখো, শয়তানের কোনই ক্ষমতা নেই। তার আনুগত্য করলে তুমি অতি জঘন্য স্থানে পৌঁছে যাবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা নিশ্চিত ও শপথ যুক্ত কথা যে, তোমার পূর্ববর্তী উম্মতদের নিকট ও আমি রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু শয়তান তাদের খারাপ কাজগুলিকে তাদের কাছে শোভনীয় ও সুন্দররূপে দেখিয়েছিল এবং সেই আজ তাদের সঙ্গী ও বন্ধু হয়ে যায় (কিন্তু সুফল কিছুই হলো না), তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (১৬:৬৩)
মারইয়াম 19:44
৪১-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: মক্কার মুশরিকরা যারা মূর্তিপুজক ছিল এবং নিজেদেরকে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) অনুসারী মনে করতো তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন এবং স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের সামনে স্বয়ং হযরত ইবরাহীম খলীলের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা কর। এ সত্য নবী নিজের পিতাকেও পরওয়া করেন নাই। তার সামনে তিনি সত্যকে খুলে দিয়েছিলেন এবং তাকে মূর্তিপূজা হতে বিরত থাকতে বলেছিলেন। তাকে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছিলেনঃ “যে মূর্তি তোমার কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে তার পূজা কর কেন?তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তোমার পুত্র। কিন্তু আমার মধ্যে আল্লাহর দেয়া যে জ্ঞান রয়েছে তা তোমাদের মধ্যে নেই। তুমি আমার অনুসরণ করো। আমি তোমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করছি এবং আমি তোমাকে অকল্যাণের পথ হতে সরিয়ে কল্যাণের পথে পৌঁছিয়ে দেবো। হে আমার পিতা! মূর্তি পূজা দ্বারা তো শয়তানেরই অনুসরণ করা হয়। সে ঐ পথে পরিচালিত করে এবং এতে সে খুশী হয়। যেমন সূরায়ে ইয়াসীনে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমাদেরকে সতর্ক করে দিই নাই হে অদিম সন্তানগণ (এবং হে জ্বিনগণ)! তোমরা শয়তানের পূজা করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু!" (৩৬:৬০) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা স্ত্রীলোকদেরকে ডেকে থাকে এবং আল্লাহকে পরিত্যাগ করে, প্রকৃত পক্ষে তারা উদ্ধত শয়তানকেই ডেকে থাকে।" (৪:১১৭)হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে আরো বলেনঃ শয়তান আল্লাহ তাআলার অবাধ্য ও বিরোধী। তার আনুগত্য স্বীকার করার ব্যাপারে সে অহংকারী। এ কারণেই সে মহান আল্লাহর দরবার হতে বিতাড়িত হয়েছে। যদি তুমিও এই শয়তানের আনুগত্য কর, তবে সে তোমাকেও তার অবস্থায় পৌঁছিয়ে দেবে। হে আমার পিতা! তেমাির এই শিরুক ও অবাধ্যতার কারণে আমি আশংকা করছি যে, হয়তো তোমার উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়বে এবং তুমি শয়তানের বন্ধু ও সঙ্গী হয়ে যাবে। আর এর ফলে তোমার উপর থেকে আল্লাহর সাহায্য সহানুভূতি দূর হয়ে যাবে। দেখো, শয়তানের কোনই ক্ষমতা নেই। তার আনুগত্য করলে তুমি অতি জঘন্য স্থানে পৌঁছে যাবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা নিশ্চিত ও শপথ যুক্ত কথা যে, তোমার পূর্ববর্তী উম্মতদের নিকট ও আমি রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু শয়তান তাদের খারাপ কাজগুলিকে তাদের কাছে শোভনীয় ও সুন্দররূপে দেখিয়েছিল এবং সেই আজ তাদের সঙ্গী ও বন্ধু হয়ে যায় (কিন্তু সুফল কিছুই হলো না), তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (১৬:৬৩)
মারইয়াম 19:45
৪১-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: মক্কার মুশরিকরা যারা মূর্তিপুজক ছিল এবং নিজেদেরকে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) অনুসারী মনে করতো তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন এবং স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের সামনে স্বয়ং হযরত ইবরাহীম খলীলের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা কর। এ সত্য নবী নিজের পিতাকেও পরওয়া করেন নাই। তার সামনে তিনি সত্যকে খুলে দিয়েছিলেন এবং তাকে মূর্তিপূজা হতে বিরত থাকতে বলেছিলেন। তাকে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছিলেনঃ “যে মূর্তি তোমার কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে তার পূজা কর কেন?তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তোমার পুত্র। কিন্তু আমার মধ্যে আল্লাহর দেয়া যে জ্ঞান রয়েছে তা তোমাদের মধ্যে নেই। তুমি আমার অনুসরণ করো। আমি তোমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করছি এবং আমি তোমাকে অকল্যাণের পথ হতে সরিয়ে কল্যাণের পথে পৌঁছিয়ে দেবো। হে আমার পিতা! মূর্তি পূজা দ্বারা তো শয়তানেরই অনুসরণ করা হয়। সে ঐ পথে পরিচালিত করে এবং এতে সে খুশী হয়। যেমন সূরায়ে ইয়াসীনে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমাদেরকে সতর্ক করে দিই নাই হে অদিম সন্তানগণ (এবং হে জ্বিনগণ)! তোমরা শয়তানের পূজা করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু!" (৩৬:৬০) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা স্ত্রীলোকদেরকে ডেকে থাকে এবং আল্লাহকে পরিত্যাগ করে, প্রকৃত পক্ষে তারা উদ্ধত শয়তানকেই ডেকে থাকে।" (৪:১১৭)হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে আরো বলেনঃ শয়তান আল্লাহ তাআলার অবাধ্য ও বিরোধী। তার আনুগত্য স্বীকার করার ব্যাপারে সে অহংকারী। এ কারণেই সে মহান আল্লাহর দরবার হতে বিতাড়িত হয়েছে। যদি তুমিও এই শয়তানের আনুগত্য কর, তবে সে তোমাকেও তার অবস্থায় পৌঁছিয়ে দেবে। হে আমার পিতা! তেমাির এই শিরুক ও অবাধ্যতার কারণে আমি আশংকা করছি যে, হয়তো তোমার উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়বে এবং তুমি শয়তানের বন্ধু ও সঙ্গী হয়ে যাবে। আর এর ফলে তোমার উপর থেকে আল্লাহর সাহায্য সহানুভূতি দূর হয়ে যাবে। দেখো, শয়তানের কোনই ক্ষমতা নেই। তার আনুগত্য করলে তুমি অতি জঘন্য স্থানে পৌঁছে যাবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা নিশ্চিত ও শপথ যুক্ত কথা যে, তোমার পূর্ববর্তী উম্মতদের নিকট ও আমি রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু শয়তান তাদের খারাপ কাজগুলিকে তাদের কাছে শোভনীয় ও সুন্দররূপে দেখিয়েছিল এবং সেই আজ তাদের সঙ্গী ও বন্ধু হয়ে যায় (কিন্তু সুফল কিছুই হলো না), তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (১৬:৬৩)
মারইয়াম 19:46
৪৬-৪৮ নং আয়াতের তাফসীর: হ্যরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে আল্লাহর পথে আহবান করলে এবং মূর্তি পূজা পরিত্যাগ করতে বললে সে তাকে যে উত্তর দিয়েছিল এখানে আল্লাহ তাআলা তারই খবর দিচ্ছেন। সে হযরত ইবরাহীমকে (আঃ) বললোঃ “তুমি কি আমার মা’দদের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং তাদের উপাসনা করতে অস্বীকার করছো? তুমি কি তাদেরকে খারাপ বলছে, দোষ দিচ্ছ এবং গালাগালি করছো? জেনে রেখো যে, তুমি যদি এ কাজ থেকে বিরত না হও, তবে আমি তোমাকে প্রস্তুরাঘাতে হত্যা করে ফেলবো। তুমি আমাকে কষ্ট দিয়ো না এবং আমাকে কিছুই বলো না। এটাই উত্তম যে, তুমি আমার নিকট থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করো। নচেৎ আমি তোমাকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবো। উত্তরে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি খুশী হও যে, আমি তোমাকে কোন কষ্ট দিবো না। কেননা, তুমি আমার পিতা। বরং আমি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করবো যে, তিনি যেন তোমাকে ভাল হওয়ার তাওফীক দেন এবং তোমার গুনাহ মাফ করেন। মুমিনদের নীতি এটাই যে, তারা অজ্ঞদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা জবাব দেয় প্রশান্তভাবে।” (২৫:৬৩) আর এক জায়গায় আছেঃ “যখন তারা বাজে কথা শুনে, তখন তারা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলেঃ আমাদের কাজ আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কাজ তোমাদের জন্যে। তোমাদের উপর সালাম এবং আমরা অজ্ঞদের মুখোমুখী হতে চাইনে (অর্থাৎ তাদের সাথে ঝগড়া করতে চাইনে)।”অতঃপর হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “আমার প্রতিপালক আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল। এটা তারই অনুগ্রহ যে, তিনি আমাকে ঈমান, ইখলাস এবং হিদায়াত দান করেছেন। আমি আশা রাখি যে, তিনি আমার প্রার্থনা কবুল করবেন। পিতার সাথে তাঁর এ ওয়াদা অনুযায়ী তিনি তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। সিরিয়ায় হিজরত করার পরেও, মসজিদে হারাম নির্মাণ করার পরেও এবং তাঁর সন্তান জন্মগ্রহণ করার পরেও তিনি প্রার্থনা করতেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সমস্ত মুমিনকে হিসাব কায়েম হওয়ার দিন ক্ষমা করে দিবেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর নিকট ওয়াহী আসেঃ “মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করো না।” তাঁকে অনুসরণ করে ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানরাও তাঁদের মুশরিক আত্মীয় স্বজনের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। অতঃপর নিম্নের আয়াত নাযিল হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে ইবরাহীমের (আঃ) মধ্যে ও তাঁর সঙ্গীয় লোকদের মধ্যে; যখন তারা তাদের কওমকে বলেছিলঃ ক তোমাদের থেকে ও আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদত করছে তাদের থেকে মুক্ত.........., ইবরাহীমের (আঃ) ঐ কথাটি ছাড়া যা সে তার পিতাকে বলেছিলঃ আমি সত্বরই তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো এবং আমি তোমার জন্যে আল্লাহর নিকট কোন কিছুরই মালিক নই।” (৬০:৪) অর্থাৎ হে মুসলমানরা! নিঃসন্দেহে ইবরাহীম (আঃ) তোমাদের অনুসরণ যোগ্য। কিন্তু তিনি যে তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন বলে ওয়াদা করেছিলেন এ ব্যাপারে তিনি তোমাদের অনুসরণ যোগ্য নন। অন্য এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘নবী (সঃ) ও মু'মিনদের জন্যে উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে।" (৯:১১৩) এরপরে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “ইব্রাহীমের (আঃ) তার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা শুধু ঐ ওয়াদার কারণেই যে ওয়াদা সে তার সাথে করেছিল। কিন্তু যখন তার কাছে এটা প্রকাশিত হয়ে গেল যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তার থেকে বিরত থাকলো, নিশ্চয় ইবরাহীম (আঃ) (আল্লাহর দিকে) প্রত্যাবর্তনকারী এবং সহনশীল।"এরপর হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ আমি তোমাদের দিক হতে এবং তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত কর তাদের দিক হতে পৃথক হচ্ছি, আমি শুধু আমার প্রতিপালককে আহবান করি। তার ইবাদতে অন্য কাউকেও আমি শরীক করি না। আমি শুধু তার কাছেই প্রার্থনা জানাই। আমি আশা রাখি যে, আমার প্রতিপালককে আহবান করে আমি ব্যর্থকাম হবে না, বরং সফলকাম হবো। তিনি অবশ্যই আমার আহবানে সাড়া দিবেন। ঘটনাও এটাই বটে। এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) এর অর্থে এসেছে। কেননা, হযরত মুহাম্মদের (সঃ) পরে তিনিই নব্বীদের সরদার বা নেতা। তাদের সবারই উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:47
৪৬-৪৮ নং আয়াতের তাফসীর: হ্যরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে আল্লাহর পথে আহবান করলে এবং মূর্তি পূজা পরিত্যাগ করতে বললে সে তাকে যে উত্তর দিয়েছিল এখানে আল্লাহ তাআলা তারই খবর দিচ্ছেন। সে হযরত ইবরাহীমকে (আঃ) বললোঃ “তুমি কি আমার মা’দদের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং তাদের উপাসনা করতে অস্বীকার করছো? তুমি কি তাদেরকে খারাপ বলছে, দোষ দিচ্ছ এবং গালাগালি করছো? জেনে রেখো যে, তুমি যদি এ কাজ থেকে বিরত না হও, তবে আমি তোমাকে প্রস্তুরাঘাতে হত্যা করে ফেলবো। তুমি আমাকে কষ্ট দিয়ো না এবং আমাকে কিছুই বলো না। এটাই উত্তম যে, তুমি আমার নিকট থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করো। নচেৎ আমি তোমাকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবো। উত্তরে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি খুশী হও যে, আমি তোমাকে কোন কষ্ট দিবো না। কেননা, তুমি আমার পিতা। বরং আমি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করবো যে, তিনি যেন তোমাকে ভাল হওয়ার তাওফীক দেন এবং তোমার গুনাহ মাফ করেন। মুমিনদের নীতি এটাই যে, তারা অজ্ঞদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা জবাব দেয় প্রশান্তভাবে।” (২৫:৬৩) আর এক জায়গায় আছেঃ “যখন তারা বাজে কথা শুনে, তখন তারা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলেঃ আমাদের কাজ আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কাজ তোমাদের জন্যে। তোমাদের উপর সালাম এবং আমরা অজ্ঞদের মুখোমুখী হতে চাইনে (অর্থাৎ তাদের সাথে ঝগড়া করতে চাইনে)।”অতঃপর হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “আমার প্রতিপালক আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল। এটা তারই অনুগ্রহ যে, তিনি আমাকে ঈমান, ইখলাস এবং হিদায়াত দান করেছেন। আমি আশা রাখি যে, তিনি আমার প্রার্থনা কবুল করবেন। পিতার সাথে তাঁর এ ওয়াদা অনুযায়ী তিনি তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। সিরিয়ায় হিজরত করার পরেও, মসজিদে হারাম নির্মাণ করার পরেও এবং তাঁর সন্তান জন্মগ্রহণ করার পরেও তিনি প্রার্থনা করতেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সমস্ত মুমিনকে হিসাব কায়েম হওয়ার দিন ক্ষমা করে দিবেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর নিকট ওয়াহী আসেঃ “মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করো না।” তাঁকে অনুসরণ করে ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানরাও তাঁদের মুশরিক আত্মীয় স্বজনের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। অতঃপর নিম্নের আয়াত নাযিল হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে ইবরাহীমের (আঃ) মধ্যে ও তাঁর সঙ্গীয় লোকদের মধ্যে; যখন তারা তাদের কওমকে বলেছিলঃ ক তোমাদের থেকে ও আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদত করছে তাদের থেকে মুক্ত.........., ইবরাহীমের (আঃ) ঐ কথাটি ছাড়া যা সে তার পিতাকে বলেছিলঃ আমি সত্বরই তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো এবং আমি তোমার জন্যে আল্লাহর নিকট কোন কিছুরই মালিক নই।” (৬০:৪) অর্থাৎ হে মুসলমানরা! নিঃসন্দেহে ইবরাহীম (আঃ) তোমাদের অনুসরণ যোগ্য। কিন্তু তিনি যে তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন বলে ওয়াদা করেছিলেন এ ব্যাপারে তিনি তোমাদের অনুসরণ যোগ্য নন। অন্য এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘নবী (সঃ) ও মু'মিনদের জন্যে উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে।" (৯:১১৩) এরপরে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “ইব্রাহীমের (আঃ) তার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা শুধু ঐ ওয়াদার কারণেই যে ওয়াদা সে তার সাথে করেছিল। কিন্তু যখন তার কাছে এটা প্রকাশিত হয়ে গেল যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তার থেকে বিরত থাকলো, নিশ্চয় ইবরাহীম (আঃ) (আল্লাহর দিকে) প্রত্যাবর্তনকারী এবং সহনশীল।"এরপর হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ আমি তোমাদের দিক হতে এবং তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত কর তাদের দিক হতে পৃথক হচ্ছি, আমি শুধু আমার প্রতিপালককে আহবান করি। তার ইবাদতে অন্য কাউকেও আমি শরীক করি না। আমি শুধু তার কাছেই প্রার্থনা জানাই। আমি আশা রাখি যে, আমার প্রতিপালককে আহবান করে আমি ব্যর্থকাম হবে না, বরং সফলকাম হবো। তিনি অবশ্যই আমার আহবানে সাড়া দিবেন। ঘটনাও এটাই বটে। এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) এর অর্থে এসেছে। কেননা, হযরত মুহাম্মদের (সঃ) পরে তিনিই নব্বীদের সরদার বা নেতা। তাদের সবারই উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:48
৪৬-৪৮ নং আয়াতের তাফসীর: হ্যরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে আল্লাহর পথে আহবান করলে এবং মূর্তি পূজা পরিত্যাগ করতে বললে সে তাকে যে উত্তর দিয়েছিল এখানে আল্লাহ তাআলা তারই খবর দিচ্ছেন। সে হযরত ইবরাহীমকে (আঃ) বললোঃ “তুমি কি আমার মা’দদের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং তাদের উপাসনা করতে অস্বীকার করছো? তুমি কি তাদেরকে খারাপ বলছে, দোষ দিচ্ছ এবং গালাগালি করছো? জেনে রেখো যে, তুমি যদি এ কাজ থেকে বিরত না হও, তবে আমি তোমাকে প্রস্তুরাঘাতে হত্যা করে ফেলবো। তুমি আমাকে কষ্ট দিয়ো না এবং আমাকে কিছুই বলো না। এটাই উত্তম যে, তুমি আমার নিকট থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করো। নচেৎ আমি তোমাকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবো। উত্তরে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি খুশী হও যে, আমি তোমাকে কোন কষ্ট দিবো না। কেননা, তুমি আমার পিতা। বরং আমি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করবো যে, তিনি যেন তোমাকে ভাল হওয়ার তাওফীক দেন এবং তোমার গুনাহ মাফ করেন। মুমিনদের নীতি এটাই যে, তারা অজ্ঞদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা জবাব দেয় প্রশান্তভাবে।” (২৫:৬৩) আর এক জায়গায় আছেঃ “যখন তারা বাজে কথা শুনে, তখন তারা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলেঃ আমাদের কাজ আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কাজ তোমাদের জন্যে। তোমাদের উপর সালাম এবং আমরা অজ্ঞদের মুখোমুখী হতে চাইনে (অর্থাৎ তাদের সাথে ঝগড়া করতে চাইনে)।”অতঃপর হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “আমার প্রতিপালক আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল। এটা তারই অনুগ্রহ যে, তিনি আমাকে ঈমান, ইখলাস এবং হিদায়াত দান করেছেন। আমি আশা রাখি যে, তিনি আমার প্রার্থনা কবুল করবেন। পিতার সাথে তাঁর এ ওয়াদা অনুযায়ী তিনি তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। সিরিয়ায় হিজরত করার পরেও, মসজিদে হারাম নির্মাণ করার পরেও এবং তাঁর সন্তান জন্মগ্রহণ করার পরেও তিনি প্রার্থনা করতেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সমস্ত মুমিনকে হিসাব কায়েম হওয়ার দিন ক্ষমা করে দিবেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর নিকট ওয়াহী আসেঃ “মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করো না।” তাঁকে অনুসরণ করে ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানরাও তাঁদের মুশরিক আত্মীয় স্বজনের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। অতঃপর নিম্নের আয়াত নাযিল হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে ইবরাহীমের (আঃ) মধ্যে ও তাঁর সঙ্গীয় লোকদের মধ্যে; যখন তারা তাদের কওমকে বলেছিলঃ ক তোমাদের থেকে ও আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদত করছে তাদের থেকে মুক্ত.........., ইবরাহীমের (আঃ) ঐ কথাটি ছাড়া যা সে তার পিতাকে বলেছিলঃ আমি সত্বরই তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো এবং আমি তোমার জন্যে আল্লাহর নিকট কোন কিছুরই মালিক নই।” (৬০:৪) অর্থাৎ হে মুসলমানরা! নিঃসন্দেহে ইবরাহীম (আঃ) তোমাদের অনুসরণ যোগ্য। কিন্তু তিনি যে তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন বলে ওয়াদা করেছিলেন এ ব্যাপারে তিনি তোমাদের অনুসরণ যোগ্য নন। অন্য এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘নবী (সঃ) ও মু'মিনদের জন্যে উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে।" (৯:১১৩) এরপরে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “ইব্রাহীমের (আঃ) তার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা শুধু ঐ ওয়াদার কারণেই যে ওয়াদা সে তার সাথে করেছিল। কিন্তু যখন তার কাছে এটা প্রকাশিত হয়ে গেল যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তার থেকে বিরত থাকলো, নিশ্চয় ইবরাহীম (আঃ) (আল্লাহর দিকে) প্রত্যাবর্তনকারী এবং সহনশীল।"এরপর হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ আমি তোমাদের দিক হতে এবং তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত কর তাদের দিক হতে পৃথক হচ্ছি, আমি শুধু আমার প্রতিপালককে আহবান করি। তার ইবাদতে অন্য কাউকেও আমি শরীক করি না। আমি শুধু তার কাছেই প্রার্থনা জানাই। আমি আশা রাখি যে, আমার প্রতিপালককে আহবান করে আমি ব্যর্থকাম হবে না, বরং সফলকাম হবো। তিনি অবশ্যই আমার আহবানে সাড়া দিবেন। ঘটনাও এটাই বটে। এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) এর অর্থে এসেছে। কেননা, হযরত মুহাম্মদের (সঃ) পরে তিনিই নব্বীদের সরদার বা নেতা। তাদের সবারই উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:49
৪৯-৫০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলছেন যে, হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) পিতামতা, আত্মীয় স্বজন, দেশ ও গোত্রকে আল্লাহর দ্বীনের উপর উৎসর্গ করেছিলেন। এই সব থেকে তিনি পৃথক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি নিজেকে তাদের থেকে মুক্ত ও পৃথক বলে ঘোষণা করেন। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে দান করেন ইসহাককে (আঃ) এবং ইসহাককে (আঃ) দান করেন ইয়াকূবকে (আঃ)। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি ইয়াকূবকে (আঃ) অতিরিক্ত রূপে দান করেন।” (২১৪ ৭২) আর একটি আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ইসহাকের (আঃ) পিছনে ইয়াকূবকে (আঃ) দান করেন।” (১১:৭১) সুতরাং হযরত ইসহাক (আঃ) ছিলেন হযরত ইয়াকুবের (আঃ) পিতা। যেমন সূরায়ে বাকারায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি হাজির ছিলে যখন ইয়াকূবের (আঃ) মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়। তখন সে তার পুত্রদেরকে বলেঃ আমার পরে তোমরা কার ইবাদত করবে? উত্তরে তারা বলেঃ আমরা ইবাদত করবো আপনার মাবুদের এবং আপনার পিতৃ পুরুষ ইবরাহীম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ) এবং ইসহাকের (আঃ) মাবুদের।” (২:১৩৩) সুতরাং এখানে ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমি তার বংশক্রম চালু রেখেছি। তাকে আমি পুত্র দান করেছি এবং পুত্রকে পুত্র দান করেছি এবং এভাবে তার চক্ষু ঠাণ্ডা রেখেছি। এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, হযরত ইয়াকুবের (আঃ) পর তাঁর পুত্র হযরত ইউসুফ (আঃ) নবী হন। এখানে তার কথা উল্লেখ করা হয় নাই। কেননা, হযরত ইউসুফের (আঃ) নুবওয়াতের সময় হযরত ইবরাহীম (আঃ) জীবিত ছিলেন না। এই দুজন অর্থাৎ হযরত ইসহাক (আঃ) ও হযরত ইয়াকুবের (আঃ) নুবওয়াত তার জীবদ্দশায় তাঁর সামনেই ছিল। এই জন্যেই এই অনুগ্রহের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহকে (সঃ) প্রশ্ন করা হয়েছিলঃ “সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি কে? উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ “আল্লাহর নবী ইউসুফ (আঃ), তার পিতা আল্লাহর নবী ইয়াকূব (আঃ), তার পিতা আল্লাহর নবী ইসহাক (আঃ) এবং তাঁর পিতা আল্লাহর নবী ও খলীল ইবরাহীম (আঃ)।” অন্য শব্দে রয়েছেঃ “কারীম ইবনু কারীম, ইবনু কারীম, ইবনু কারীম ইউসুফ ইবনু ইয়াকূব, ইবনু ইসহাক, ইবনু ইবরাহীম। (সবারই উপর শান্তি বর্ষিত হোক)।”মহান আল্লাহ বলেনঃ তাদেরকে আমি দান করলাম আমার অনুগ্রহ এবং তাদেরকে দিলাম সমুচ্চ খ্যাতি। সারা দুনিয়াবাসী আজ তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাঁদের সবারই উপর আল্লাহর দুরূদও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:50
৪৯-৫০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলছেন যে, হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) পিতামতা, আত্মীয় স্বজন, দেশ ও গোত্রকে আল্লাহর দ্বীনের উপর উৎসর্গ করেছিলেন। এই সব থেকে তিনি পৃথক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি নিজেকে তাদের থেকে মুক্ত ও পৃথক বলে ঘোষণা করেন। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে দান করেন ইসহাককে (আঃ) এবং ইসহাককে (আঃ) দান করেন ইয়াকূবকে (আঃ)। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি ইয়াকূবকে (আঃ) অতিরিক্ত রূপে দান করেন।” (২১৪ ৭২) আর একটি আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ইসহাকের (আঃ) পিছনে ইয়াকূবকে (আঃ) দান করেন।” (১১:৭১) সুতরাং হযরত ইসহাক (আঃ) ছিলেন হযরত ইয়াকুবের (আঃ) পিতা। যেমন সূরায়ে বাকারায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি হাজির ছিলে যখন ইয়াকূবের (আঃ) মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়। তখন সে তার পুত্রদেরকে বলেঃ আমার পরে তোমরা কার ইবাদত করবে? উত্তরে তারা বলেঃ আমরা ইবাদত করবো আপনার মাবুদের এবং আপনার পিতৃ পুরুষ ইবরাহীম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ) এবং ইসহাকের (আঃ) মাবুদের।” (২:১৩৩) সুতরাং এখানে ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমি তার বংশক্রম চালু রেখেছি। তাকে আমি পুত্র দান করেছি এবং পুত্রকে পুত্র দান করেছি এবং এভাবে তার চক্ষু ঠাণ্ডা রেখেছি। এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, হযরত ইয়াকুবের (আঃ) পর তাঁর পুত্র হযরত ইউসুফ (আঃ) নবী হন। এখানে তার কথা উল্লেখ করা হয় নাই। কেননা, হযরত ইউসুফের (আঃ) নুবওয়াতের সময় হযরত ইবরাহীম (আঃ) জীবিত ছিলেন না। এই দুজন অর্থাৎ হযরত ইসহাক (আঃ) ও হযরত ইয়াকুবের (আঃ) নুবওয়াত তার জীবদ্দশায় তাঁর সামনেই ছিল। এই জন্যেই এই অনুগ্রহের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহকে (সঃ) প্রশ্ন করা হয়েছিলঃ “সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি কে? উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ “আল্লাহর নবী ইউসুফ (আঃ), তার পিতা আল্লাহর নবী ইয়াকূব (আঃ), তার পিতা আল্লাহর নবী ইসহাক (আঃ) এবং তাঁর পিতা আল্লাহর নবী ও খলীল ইবরাহীম (আঃ)।” অন্য শব্দে রয়েছেঃ “কারীম ইবনু কারীম, ইবনু কারীম, ইবনু কারীম ইউসুফ ইবনু ইয়াকূব, ইবনু ইসহাক, ইবনু ইবরাহীম। (সবারই উপর শান্তি বর্ষিত হোক)।”মহান আল্লাহ বলেনঃ তাদেরকে আমি দান করলাম আমার অনুগ্রহ এবং তাদেরকে দিলাম সমুচ্চ খ্যাতি। সারা দুনিয়াবাসী আজ তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাঁদের সবারই উপর আল্লাহর দুরূদও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:51
৫১-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: স্বীয় খলীলের (আঃ) বর্ণনার পর আল্লাহর স্বীয় কালীমের (অর্থাৎ মূসা কালীমুল্লাহর (আঃ) বর্ণনা শুরু করলেন।(আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) ও রয়েছে। অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ)। আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর ইবাদতকারী ছিলেন। বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসাকে (আঃ) তাঁর অনুসারী হাওয়ারীরা প্রশ্ন করেছিলঃ “(হে রূহুল্লাহ (আঃ)! বলুন তো, ‘মুখলিস' ব্যক্তি কে?" উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ “যে শুধু মাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে আমল করে। লোকে তার প্রশংসা করুক এটা তার উদ্দেশ্য থাকে না।" অন্য কিরআত (আরবী) রয়েছে। অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার মনোনীত ও নির্বাচিত বান্দা ছিলেন। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাকে লোকদের উপর মনোনীত করেছি।”(৭:১৪৪) হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার নবী ও রাসূল ছিলেন। পাঁচজন বড় মর্যাদাসম্পন্ন ও স্থির প্রতিজ্ঞ রাসূলদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। অর্থাৎ নূহ (আঃ), ইবরাহীম (আঃ), মূসা (আঃ), ঈসা (আঃ) এবং মুহাম্মদ (সঃ)। তাদের উপর এবং অন্যান্য সমস্ত ব্বীর উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তাকে আমি আহবান করেছিলাম তুর পর্বতের দক্ষিণ দিক হতে এবং আমি গূঢ়তত্ত্ব আলোচনারত অবস্থায় তাকে নিকটবর্তী করেছিলাম। এটা ঐ সময়ের ঘটনা, যখন তিনি আগুনের সন্ধানে বের হয়ে তূর পাহাড়ের দিকে আগুন দেখতে পান এবং সেই দিকে অগ্রসর হন। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি গুরুজন বলেনঃ তিনি এতো নিকটবর্তী হন যে, কলমের শব্দ শুনতে পান। এর দ্বারা তাওরাত লিখার কলমকে বুঝানো হয়েছে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তিনি আকাশে যান এবং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার সাথে কথা বলেন। বর্ণিত আছে যে, তার সাথে আল্লাহ তাআলার যে সব কথোপকথন হয়েছিল তার মধ্যে এটাও ছিলঃ “হে মূসা (আঃ)! যখন আমি তোমার অন্তরকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ও তোমার যবানকে আমার স্মরণকারী বানিয়ে দেবো, আর তোমাকে এমন স্ত্রী দান করবো যে পুণ্যের কাজে তোমার সহায়িকা হয়, তখন তুমি জানবে যে, তোমাকে আমি কোন কল্যাণই দান করতে ছাড়ি নাই। আর যাকে একটি জিনিস দান করি না, সে যেন মনে করে নেয় যে, তাকে আমি কোন কল্যাণই দান করি নাই। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি মূসার (আঃ) উপর আর একটি অনুগ্রহ এই করেছিলাম যে, তার ভাই হারূণকে (আঃ) নবী করে তার সাহায্যার্থে তার সঙ্গী করেছিলাম। এটা সে আকাংখাও করেছিল ও প্রার্থনা জানিয়েছিল। যেমন মহান আল্লাহ তাঁর প্রার্থনার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার ভ্রাতা হারূণ (আঃ) আমা অপেক্ষা বাগ্মী; অতএব, তাকে আমার সাহায্যকারীরূপে প্রেরণ করুন!” (২৮:৩৪) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মূসা (আঃ)! তোমার প্রার্থনা কবূল করা হলো।" (২০:৩৬) তার দু’আর শব্দ (আরবী) (২৬:১৩) এরূপও রয়েছে। অর্থাৎ “হারূণকেও (আঃ) রাসল বানিয়ে দিন।" বর্ণিত আছে যে, এর চেয়ে বড় প্রার্থনা এবং এরচেয়ে বড় সুপারিশ দুনিয়ায় কেউই কারো জন্যে করে নাই। হযরত হারূণ (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) চেয়ে বড় ছিলেন। তাঁদের উভয়ের উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:52
৫১-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: স্বীয় খলীলের (আঃ) বর্ণনার পর আল্লাহর স্বীয় কালীমের (অর্থাৎ মূসা কালীমুল্লাহর (আঃ) বর্ণনা শুরু করলেন।(আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) ও রয়েছে। অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ)। আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর ইবাদতকারী ছিলেন। বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসাকে (আঃ) তাঁর অনুসারী হাওয়ারীরা প্রশ্ন করেছিলঃ “(হে রূহুল্লাহ (আঃ)! বলুন তো, ‘মুখলিস' ব্যক্তি কে?" উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ “যে শুধু মাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে আমল করে। লোকে তার প্রশংসা করুক এটা তার উদ্দেশ্য থাকে না।" অন্য কিরআত (আরবী) রয়েছে। অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার মনোনীত ও নির্বাচিত বান্দা ছিলেন। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাকে লোকদের উপর মনোনীত করেছি।”(৭:১৪৪) হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার নবী ও রাসূল ছিলেন। পাঁচজন বড় মর্যাদাসম্পন্ন ও স্থির প্রতিজ্ঞ রাসূলদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। অর্থাৎ নূহ (আঃ), ইবরাহীম (আঃ), মূসা (আঃ), ঈসা (আঃ) এবং মুহাম্মদ (সঃ)। তাদের উপর এবং অন্যান্য সমস্ত ব্বীর উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তাকে আমি আহবান করেছিলাম তুর পর্বতের দক্ষিণ দিক হতে এবং আমি গূঢ়তত্ত্ব আলোচনারত অবস্থায় তাকে নিকটবর্তী করেছিলাম। এটা ঐ সময়ের ঘটনা, যখন তিনি আগুনের সন্ধানে বের হয়ে তূর পাহাড়ের দিকে আগুন দেখতে পান এবং সেই দিকে অগ্রসর হন। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি গুরুজন বলেনঃ তিনি এতো নিকটবর্তী হন যে, কলমের শব্দ শুনতে পান। এর দ্বারা তাওরাত লিখার কলমকে বুঝানো হয়েছে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তিনি আকাশে যান এবং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার সাথে কথা বলেন। বর্ণিত আছে যে, তার সাথে আল্লাহ তাআলার যে সব কথোপকথন হয়েছিল তার মধ্যে এটাও ছিলঃ “হে মূসা (আঃ)! যখন আমি তোমার অন্তরকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ও তোমার যবানকে আমার স্মরণকারী বানিয়ে দেবো, আর তোমাকে এমন স্ত্রী দান করবো যে পুণ্যের কাজে তোমার সহায়িকা হয়, তখন তুমি জানবে যে, তোমাকে আমি কোন কল্যাণই দান করতে ছাড়ি নাই। আর যাকে একটি জিনিস দান করি না, সে যেন মনে করে নেয় যে, তাকে আমি কোন কল্যাণই দান করি নাই। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি মূসার (আঃ) উপর আর একটি অনুগ্রহ এই করেছিলাম যে, তার ভাই হারূণকে (আঃ) নবী করে তার সাহায্যার্থে তার সঙ্গী করেছিলাম। এটা সে আকাংখাও করেছিল ও প্রার্থনা জানিয়েছিল। যেমন মহান আল্লাহ তাঁর প্রার্থনার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার ভ্রাতা হারূণ (আঃ) আমা অপেক্ষা বাগ্মী; অতএব, তাকে আমার সাহায্যকারীরূপে প্রেরণ করুন!” (২৮:৩৪) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মূসা (আঃ)! তোমার প্রার্থনা কবূল করা হলো।" (২০:৩৬) তার দু’আর শব্দ (আরবী) (২৬:১৩) এরূপও রয়েছে। অর্থাৎ “হারূণকেও (আঃ) রাসল বানিয়ে দিন।" বর্ণিত আছে যে, এর চেয়ে বড় প্রার্থনা এবং এরচেয়ে বড় সুপারিশ দুনিয়ায় কেউই কারো জন্যে করে নাই। হযরত হারূণ (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) চেয়ে বড় ছিলেন। তাঁদের উভয়ের উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:53
৫১-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: স্বীয় খলীলের (আঃ) বর্ণনার পর আল্লাহর স্বীয় কালীমের (অর্থাৎ মূসা কালীমুল্লাহর (আঃ) বর্ণনা শুরু করলেন।(আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) ও রয়েছে। অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ)। আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর ইবাদতকারী ছিলেন। বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসাকে (আঃ) তাঁর অনুসারী হাওয়ারীরা প্রশ্ন করেছিলঃ “(হে রূহুল্লাহ (আঃ)! বলুন তো, ‘মুখলিস' ব্যক্তি কে?" উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ “যে শুধু মাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে আমল করে। লোকে তার প্রশংসা করুক এটা তার উদ্দেশ্য থাকে না।" অন্য কিরআত (আরবী) রয়েছে। অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার মনোনীত ও নির্বাচিত বান্দা ছিলেন। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাকে লোকদের উপর মনোনীত করেছি।”(৭:১৪৪) হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার নবী ও রাসূল ছিলেন। পাঁচজন বড় মর্যাদাসম্পন্ন ও স্থির প্রতিজ্ঞ রাসূলদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। অর্থাৎ নূহ (আঃ), ইবরাহীম (আঃ), মূসা (আঃ), ঈসা (আঃ) এবং মুহাম্মদ (সঃ)। তাদের উপর এবং অন্যান্য সমস্ত ব্বীর উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তাকে আমি আহবান করেছিলাম তুর পর্বতের দক্ষিণ দিক হতে এবং আমি গূঢ়তত্ত্ব আলোচনারত অবস্থায় তাকে নিকটবর্তী করেছিলাম। এটা ঐ সময়ের ঘটনা, যখন তিনি আগুনের সন্ধানে বের হয়ে তূর পাহাড়ের দিকে আগুন দেখতে পান এবং সেই দিকে অগ্রসর হন। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি গুরুজন বলেনঃ তিনি এতো নিকটবর্তী হন যে, কলমের শব্দ শুনতে পান। এর দ্বারা তাওরাত লিখার কলমকে বুঝানো হয়েছে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তিনি আকাশে যান এবং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার সাথে কথা বলেন। বর্ণিত আছে যে, তার সাথে আল্লাহ তাআলার যে সব কথোপকথন হয়েছিল তার মধ্যে এটাও ছিলঃ “হে মূসা (আঃ)! যখন আমি তোমার অন্তরকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ও তোমার যবানকে আমার স্মরণকারী বানিয়ে দেবো, আর তোমাকে এমন স্ত্রী দান করবো যে পুণ্যের কাজে তোমার সহায়িকা হয়, তখন তুমি জানবে যে, তোমাকে আমি কোন কল্যাণই দান করতে ছাড়ি নাই। আর যাকে একটি জিনিস দান করি না, সে যেন মনে করে নেয় যে, তাকে আমি কোন কল্যাণই দান করি নাই। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি মূসার (আঃ) উপর আর একটি অনুগ্রহ এই করেছিলাম যে, তার ভাই হারূণকে (আঃ) নবী করে তার সাহায্যার্থে তার সঙ্গী করেছিলাম। এটা সে আকাংখাও করেছিল ও প্রার্থনা জানিয়েছিল। যেমন মহান আল্লাহ তাঁর প্রার্থনার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার ভ্রাতা হারূণ (আঃ) আমা অপেক্ষা বাগ্মী; অতএব, তাকে আমার সাহায্যকারীরূপে প্রেরণ করুন!” (২৮:৩৪) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মূসা (আঃ)! তোমার প্রার্থনা কবূল করা হলো।" (২০:৩৬) তার দু’আর শব্দ (আরবী) (২৬:১৩) এরূপও রয়েছে। অর্থাৎ “হারূণকেও (আঃ) রাসল বানিয়ে দিন।" বর্ণিত আছে যে, এর চেয়ে বড় প্রার্থনা এবং এরচেয়ে বড় সুপারিশ দুনিয়ায় কেউই কারো জন্যে করে নাই। হযরত হারূণ (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) চেয়ে বড় ছিলেন। তাঁদের উভয়ের উপর আল্লাহর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
মারইয়াম 19:54
৫৪-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীমের (আঃ) প্রশংসামূলক বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি সারা হিজাযের পিতা। তিনি যে নযর বা মানত মানতেন এবং যে ইবাদত করার ইচ্ছা করতেন তা তিনি পুরো করতেন। প্রত্যেক হক তিনি আদায় করতেন। একটি লোককে তিনি একদা ওয়াদা দিয়ে বলেনঃ “আমি তোমার সাথে অমুক জায়গায় সাক্ষাৎ করবো। তুমি সেখানে পৌঁছবে।” ওয়াদা মুতাবেক হযরত ইসমাঈল (আঃ) সেখানে হাজির হন। কিন্তু ঐ লোকটি আসে নাই। তার অপেক্ষায় তিনি সেখানে অবস্থান করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত পূর্ণ একদিন ও একরাত অতিবাহিত হয়ে যায়। পরে লোকটির ঐ কথা স্মরণ হলে সে সেখানে এসে দেখে যে, তিনি তার জন্যে অপেক্ষা করতে রয়েছেন। সে জিজ্ঞেস করেঃ “আপনি কি কাল থেকেই। এখানে অবস্থান করছেন? উত্তরে তিনি বলেনঃ “যখন ওয়াদা ছিল তখন অবস্থান না করে কি পারি?" লোকটি তখন ওর পেশ করে বলেঃ “জনাব ক্ষমা করবেন, আমি একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম।” সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, তার অপেক্ষায় সেখানে তার পূর্ণ একটি বছর কেটে যায়। ইবনু শূযিব (রঃ) বলেন যে, সেখানে তিনি বাসস্থান বানিয়ে নিয়ে ছিলেন। আবুল হামসা' (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “নুবওয়াতের পূর্বে আমি রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কিছু বাণিজ্যিক লেন দেন করেছিলাম। আমি চলে যাই এবং তাঁকে বলে যাইঃ আপনি এখানেই অবস্থান করুন, আমি এখনই ফিরে আসছি। তারপর আমি সম্পূর্ণরূপে বেখেয়াল হয়ে যাই। এরপর ঐদিন কেটে যায় এবং ঐ রাতও কেটে যায়। তৃতীয় দিনে আমার ঐকথা স্মরণ হলো। আমি গিয়ে দেখি যে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। তিনি আমাকে দেখে শুধু এইটুকু বলেনঃ “তুমি আমাকে কষ্টে ফেলে দিয়েছে। আমি তিন দিন থেকে এখানেই তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি।" (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) তাঁর সুনান গ্রন্থে এবং আবু বকর মুহাম্মদ ইবনু জাফর খারায়েতী (রঃ) তার মাকারিমূল আখলাক’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এটাও বলা হয়েছে যে, এটা তাঁর ঐ ওয়াদার বর্ণনা যা তিনি তাঁর যবাহর সময় তাঁর পিতার সাথে করেছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “আব্বা! আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।” সত্যিই তিনি তার ঐ ওয়াদা পুরো করেছিলেন এবং ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে কাজ করেছিলেন। ওয়াদা পুরো করা একটা ভাল কাজ এবং ওয়াদার খেলাফ করা অত্যন্ত খারাপ কাজ। কুরআন কারীমে ঘোষিত হচ্ছেঃ “হে মু'মিনগণ! এইরূপ কথা কেন বলছো যা (নিজেরা) কর না? আল্লাহর নিকট এটা অত্যন্ত অসন্তুষ্টির কারণ যে, এইরূপ কথা বলা যা (নিজেরা) কর না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে। এসব আচরণ হতে মু'মিন মুক্ত ও পবিত্র হয়ে থাকে। ওয়াদার এই সত্যতাই হযরত ইসমাঈলের (আঃ) মধ্যে ছিল এবং এই পবিত্র বিশেষণ হযরত মুহাম্মদ মুস্তফার (সঃ) মধ্যেও ছিল। কারো সাথে তিনি কখনো ওয়াদা খেলাফ করেননি। একদা তিনি আবুল আস ইবনু রাবীর (রাঃ)। প্রশংসা করতে গিয়ে বলেনঃ “সে আমার সাথে যে কথা বলেছে সত্য বলেছে এবং আমার সাথে যে ওয়াদা করেছে তা পূর্ণ করেছে।" হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাঃ) খিলাফতে নববীর (সঃ) উপর কদম রেখেই ঘোষণা করেনঃ “নবী (সঃ) কারো সাথে কোন ওয়াদা করে থাকলে আমি পুরো করার জন্যে প্রস্তুত আছি। আর রাসূলুল্লাহর (সঃ) উপর কারো কোন ঋণ থাকলে আমি তা আদায় করার জন্যে মওজুদ আছি।" তখন হযরত জাবির ইবনু আবদিল্লাহ (রাঃ) আর্য করেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, বাহরাইন হতে মাল আসলে তিনি আমাকে তিন লপ ভরে মাল দিবেন।” হযরত সিদ্দীকে আকবরের (রাঃ) নিকট বাাইন হতে যখন মাল আসলো তখন হযরত জাবিরকে ডেকে পাঠিয়ে বলেনঃ “হাতের দু’তালু ভরে মাল উঠিয়ে নাও।” এভাবে উঠিয়ে নিলে দেখা যায় যে, পাচশ দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) উঠিয়ে এসেছে। তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে বলেনঃ “তিন লপের পনের শ’ দিরহাম নিয়ে নাও।”অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) রাসূল ও নবী ছিলেন। অথচ হযরত ইসহাকের (আঃ) শুধু নবী হওয়ার কথা বলেছেন। এর দ্বারা ভাই-এর উপর হযরত ইসমাঈলের (আঃ) ফযীলত প্রমাণিত হচ্ছে। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইবরাহীমের (আঃ) সন্তানদের মধ্যে আল্লাহ তাআলা হযরত ইসমাঈলকে (আঃ) পছন্দ করেছেন। তারপর তার আরো প্রশংসা করা হচ্ছে যে, তিনি আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের উপর ধৈর্যশীল ছিলেন এবং নিজের পরিবারের লোকদেরকেও এই হুকুমই দিতে থাকতেন। এই হুকুমই আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকেও (সঃ) দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের হুকুম করতে থাকো এবং নিজেও ওর উপর দৃঢ়তার সাথে কাজ কারো। (২০:১৩২)অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিজনদেরকে সেই অগ্নি হতে রক্ষা করো যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে কঠোর স্বভাব, শক্তিশালী ফেরেশতারা (নিয়োজিত রয়েছে, তারা কোন বিষয়ে আল্লাহর নাফরমানী করে না, যা তাদেরকে আদেশ করেন, আর তাদেরকে যা আদেশ করা হয় তারা (তৎক্ষণাৎ) তা পালন করে। (৬৬:৬) সুতরাং মু'মিনদেরকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন নিজেদের পরিবারবর্গকে ও আত্মীয় স্বজনকে ভাল কাজের আদেশ করে ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। তারা যেন তাদেরকে শিক্ষাহীনভাবে ছেড়ে না দেয়, অন্যথায় তারা জাহান্নামের গ্রাস হয়ে যাবে অর্থাৎ জাহান্নাম তাদেরকে গ্রাস করে ফেলবে।হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তির উপর আল্লাহ করুণা বর্ষণ করুন, যে রাত্রে (ঘুম থেকে জেগে) ওঠে এবং (তাহাজ্জুদের) নামায পড়ে। অতঃপর তার স্ত্রীকে জাগিয়ে তোলে এবং সে উঠতে অস্বীকার করলে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহ ঐ স্ত্রী লোকের উপর দয়া করুন, যে রাত্রে (ঘুম হতে জেগে) ওঠে এবং (তাহাজ্জুদের) নামায পড়ে। অতঃপর তার স্বামীকে জাগ্রত করে এবং সে উঠতে অস্বীকার করলে তার চেহারায় পানি ছিটিয়ে দেয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম ইবনু মাজাহ (রঃ) তাখরীজ করেছেন)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) ও হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, “যখন মানুষ রাত্রে ঘুম হতে জেগে ওঠে এবং তার স্ত্রীকেও জাগ্রত করে, অতঃপর তারা দু'রাকাআত নামায পড়ে নেয়, তখন আল্লাহর যিক্রকারী ও যিকরকারিণী পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে তাদের নাম লিখে নেয়া হয়।" (এহাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম নাসায়ী (রঃ) ও ইমাম ইবনু মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মারইয়াম 19:55
৫৪-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীমের (আঃ) প্রশংসামূলক বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি সারা হিজাযের পিতা। তিনি যে নযর বা মানত মানতেন এবং যে ইবাদত করার ইচ্ছা করতেন তা তিনি পুরো করতেন। প্রত্যেক হক তিনি আদায় করতেন। একটি লোককে তিনি একদা ওয়াদা দিয়ে বলেনঃ “আমি তোমার সাথে অমুক জায়গায় সাক্ষাৎ করবো। তুমি সেখানে পৌঁছবে।” ওয়াদা মুতাবেক হযরত ইসমাঈল (আঃ) সেখানে হাজির হন। কিন্তু ঐ লোকটি আসে নাই। তার অপেক্ষায় তিনি সেখানে অবস্থান করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত পূর্ণ একদিন ও একরাত অতিবাহিত হয়ে যায়। পরে লোকটির ঐ কথা স্মরণ হলে সে সেখানে এসে দেখে যে, তিনি তার জন্যে অপেক্ষা করতে রয়েছেন। সে জিজ্ঞেস করেঃ “আপনি কি কাল থেকেই। এখানে অবস্থান করছেন? উত্তরে তিনি বলেনঃ “যখন ওয়াদা ছিল তখন অবস্থান না করে কি পারি?" লোকটি তখন ওর পেশ করে বলেঃ “জনাব ক্ষমা করবেন, আমি একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম।” সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, তার অপেক্ষায় সেখানে তার পূর্ণ একটি বছর কেটে যায়। ইবনু শূযিব (রঃ) বলেন যে, সেখানে তিনি বাসস্থান বানিয়ে নিয়ে ছিলেন। আবুল হামসা' (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “নুবওয়াতের পূর্বে আমি রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কিছু বাণিজ্যিক লেন দেন করেছিলাম। আমি চলে যাই এবং তাঁকে বলে যাইঃ আপনি এখানেই অবস্থান করুন, আমি এখনই ফিরে আসছি। তারপর আমি সম্পূর্ণরূপে বেখেয়াল হয়ে যাই। এরপর ঐদিন কেটে যায় এবং ঐ রাতও কেটে যায়। তৃতীয় দিনে আমার ঐকথা স্মরণ হলো। আমি গিয়ে দেখি যে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। তিনি আমাকে দেখে শুধু এইটুকু বলেনঃ “তুমি আমাকে কষ্টে ফেলে দিয়েছে। আমি তিন দিন থেকে এখানেই তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি।" (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) তাঁর সুনান গ্রন্থে এবং আবু বকর মুহাম্মদ ইবনু জাফর খারায়েতী (রঃ) তার মাকারিমূল আখলাক’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এটাও বলা হয়েছে যে, এটা তাঁর ঐ ওয়াদার বর্ণনা যা তিনি তাঁর যবাহর সময় তাঁর পিতার সাথে করেছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ “আব্বা! আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।” সত্যিই তিনি তার ঐ ওয়াদা পুরো করেছিলেন এবং ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে কাজ করেছিলেন। ওয়াদা পুরো করা একটা ভাল কাজ এবং ওয়াদার খেলাফ করা অত্যন্ত খারাপ কাজ। কুরআন কারীমে ঘোষিত হচ্ছেঃ “হে মু'মিনগণ! এইরূপ কথা কেন বলছো যা (নিজেরা) কর না? আল্লাহর নিকট এটা অত্যন্ত অসন্তুষ্টির কারণ যে, এইরূপ কথা বলা যা (নিজেরা) কর না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে। এসব আচরণ হতে মু'মিন মুক্ত ও পবিত্র হয়ে থাকে। ওয়াদার এই সত্যতাই হযরত ইসমাঈলের (আঃ) মধ্যে ছিল এবং এই পবিত্র বিশেষণ হযরত মুহাম্মদ মুস্তফার (সঃ) মধ্যেও ছিল। কারো সাথে তিনি কখনো ওয়াদা খেলাফ করেননি। একদা তিনি আবুল আস ইবনু রাবীর (রাঃ)। প্রশংসা করতে গিয়ে বলেনঃ “সে আমার সাথে যে কথা বলেছে সত্য বলেছে এবং আমার সাথে যে ওয়াদা করেছে তা পূর্ণ করেছে।" হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাঃ) খিলাফতে নববীর (সঃ) উপর কদম রেখেই ঘোষণা করেনঃ “নবী (সঃ) কারো সাথে কোন ওয়াদা করে থাকলে আমি পুরো করার জন্যে প্রস্তুত আছি। আর রাসূলুল্লাহর (সঃ) উপর কারো কোন ঋণ থাকলে আমি তা আদায় করার জন্যে মওজুদ আছি।" তখন হযরত জাবির ইবনু আবদিল্লাহ (রাঃ) আর্য করেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, বাহরাইন হতে মাল আসলে তিনি আমাকে তিন লপ ভরে মাল দিবেন।” হযরত সিদ্দীকে আকবরের (রাঃ) নিকট বাাইন হতে যখন মাল আসলো তখন হযরত জাবিরকে ডেকে পাঠিয়ে বলেনঃ “হাতের দু’তালু ভরে মাল উঠিয়ে নাও।” এভাবে উঠিয়ে নিলে দেখা যায় যে, পাচশ দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) উঠিয়ে এসেছে। তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে বলেনঃ “তিন লপের পনের শ’ দিরহাম নিয়ে নাও।”অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) রাসূল ও নবী ছিলেন। অথচ হযরত ইসহাকের (আঃ) শুধু নবী হওয়ার কথা বলেছেন। এর দ্বারা ভাই-এর উপর হযরত ইসমাঈলের (আঃ) ফযীলত প্রমাণিত হচ্ছে। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইবরাহীমের (আঃ) সন্তানদের মধ্যে আল্লাহ তাআলা হযরত ইসমাঈলকে (আঃ) পছন্দ করেছেন। তারপর তার আরো প্রশংসা করা হচ্ছে যে, তিনি আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের উপর ধৈর্যশীল ছিলেন এবং নিজের পরিবারের লোকদেরকেও এই হুকুমই দিতে থাকতেন। এই হুকুমই আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকেও (সঃ) দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের হুকুম করতে থাকো এবং নিজেও ওর উপর দৃঢ়তার সাথে কাজ কারো। (২০:১৩২)অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিজনদেরকে সেই অগ্নি হতে রক্ষা করো যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে কঠোর স্বভাব, শক্তিশালী ফেরেশতারা (নিয়োজিত রয়েছে, তারা কোন বিষয়ে আল্লাহর নাফরমানী করে না, যা তাদেরকে আদেশ করেন, আর তাদেরকে যা আদেশ করা হয় তারা (তৎক্ষণাৎ) তা পালন করে। (৬৬:৬) সুতরাং মু'মিনদেরকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন নিজেদের পরিবারবর্গকে ও আত্মীয় স্বজনকে ভাল কাজের আদেশ করে ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। তারা যেন তাদেরকে শিক্ষাহীনভাবে ছেড়ে না দেয়, অন্যথায় তারা জাহান্নামের গ্রাস হয়ে যাবে অর্থাৎ জাহান্নাম তাদেরকে গ্রাস করে ফেলবে।হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তির উপর আল্লাহ করুণা বর্ষণ করুন, যে রাত্রে (ঘুম থেকে জেগে) ওঠে এবং (তাহাজ্জুদের) নামায পড়ে। অতঃপর তার স্ত্রীকে জাগিয়ে তোলে এবং সে উঠতে অস্বীকার করলে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহ ঐ স্ত্রী লোকের উপর দয়া করুন, যে রাত্রে (ঘুম হতে জেগে) ওঠে এবং (তাহাজ্জুদের) নামায পড়ে। অতঃপর তার স্বামীকে জাগ্রত করে এবং সে উঠতে অস্বীকার করলে তার চেহারায় পানি ছিটিয়ে দেয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম ইবনু মাজাহ (রঃ) তাখরীজ করেছেন)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) ও হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, “যখন মানুষ রাত্রে ঘুম হতে জেগে ওঠে এবং তার স্ত্রীকেও জাগ্রত করে, অতঃপর তারা দু'রাকাআত নামায পড়ে নেয়, তখন আল্লাহর যিক্রকারী ও যিকরকারিণী পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে তাদের নাম লিখে নেয়া হয়।" (এহাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম নাসায়ী (রঃ) ও ইমাম ইবনু মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মারইয়াম 19:56
৫৬-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইদরীসের (আঃ) বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি সত্য নবী ছিলেন এবং আল্লাহর বিশিষ্ট বান্দা ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছিলেন। হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্বেই বর্ণনা করা হয়েছে যে, (মি’রাজে গিয়ে) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইদরীসকে (আঃ) চতুর্থ আকাশে দেখতে পান।এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) এক অতি বিস্ময় কর হাদীস আনয়ন করেছেন। তা এই যে, হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হযরত কা’বকে (রাঃ) (আরবী) এই আয়াতটির ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “হযরত ইদরীসকে (আঃ) আল্লাহ তাআলা ওয়াহী করেনঃ “সমস্ত বাণী আদমের আমলের সমান তোমার একার আমল আমি দৈনিক উঠিয়ে থাকি। সুতরাং আমি পছন্দ করি যে, তোমার আমল বেড়ে যাক।” অতঃপর তাঁর কাছে বন্ধু ফেরেশতা আগমন করলে তিনি তার কাছে বর্ণনা করেনঃ “আমার কাছে এরূপ ওয়াহী এসেছে। সুতরাং আপনি মালাকুল মাউতকে বলে দিন যে, তিনি যেন আমার জান কবয বিলম্বে করেন, যাতে আমার নেক আমল বৃদ্ধি পায়।” ঐ ফেরেশতা তখন তাকে নিজের পালকের উপর বসিয়ে নিয়ে আকাশে উঠে যান। চতুর্থ আকাশে পৌঁছে মালাকুল মাউতের সাথে সাক্ষাৎ হয়। ঐ ফেরেশতা মালাকুল মাউতকে হযরত ইদরীসের (আঃ) ব্যাপারে সুপারিশ করেন। মৃত্যুর ফেরেশতা তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “উনি কোথায় আছেন?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “এই যে, আমার পালকের উপর বসে রয়েছেন। মালাকুল মাউত বা মৃত্যুর ফেরেশতা তখন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! আমাকে এখনই হুকুম করা হলো যে, আমি যেন হযরত ইদরীসের (আঃ) রূহ চতুর্থ আকাশে কব্য করি। আমি চিন্তা করছিলাম যে, যিনি যমীনে রয়েছেন তাঁর রূহ আমি চতুর্থ আকাশে কি করে কবয করতে পারি।” সুতরাং তৎক্ষণাৎ তিনি হযরত ইদরীসের (আঃ) জান কবয করে নেন। (হযরত কাবের (রাঃ) এ বর্ণনাটি ইসরাঈলী রিওয়াইয়াত। এর কতক গুলি খবর স্বীকার্য নয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)এই রিওয়াইয়াতই অন্য সনদে রয়েছে। তাতে এও আছে যে, হযরত ইদরীস (আঃ) ঐ ফেরেশতার মাধ্যমে মালাকুল মাউতকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমার বয়সের আর কতদিন বাকী আছে?" আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তার এই প্রশ্নের জবাবে মালাকুল মাউত বলেছিলেনঃ “আমি দেখছি যে, শুধু চক্ষুর একটা পলক ফেলার সময় বাকী আছে।” ফেরেশতা তার পরের নীচে তাকিয়ে দেখেন যে, হযরত ইদরীসের (আঃ) প্রাণবায়ু বহির্গত হয়ে গেছে।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হযরত ইদরীস (আঃ) দরজি ছিলেন। সূচের প্রতিটি ফেঁড়ের সময় তিনি সুবহানাল্লাহ পাঠ করতেন। সন্ধ্যার সময় তাঁর সমান কারো নেক আমল আকাশে উঠে নাই। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, হযরত ইদরীসকে (আঃ) আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। তিনি মৃত্যুবরণ করেন নাই। বরং হযরত ঈসার (আঃ) মতই তাকে জীবিতই উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। আওফীর (রঃ) রিওয়াইয়াতের মাধ্যমে হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাকে ষষ্ঠ আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। আর সেখানেই তিনি মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছেন। হাসান (রাঃ) প্রভৃতি গুরুজন বলেন যে, (আরবী) দ্বারা জান্নাতকে বুঝানো হয়েছে।
মারইয়াম 19:57
৫৬-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইদরীসের (আঃ) বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি সত্য নবী ছিলেন এবং আল্লাহর বিশিষ্ট বান্দা ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছিলেন। হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্বেই বর্ণনা করা হয়েছে যে, (মি’রাজে গিয়ে) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইদরীসকে (আঃ) চতুর্থ আকাশে দেখতে পান।এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) এক অতি বিস্ময় কর হাদীস আনয়ন করেছেন। তা এই যে, হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হযরত কা’বকে (রাঃ) (আরবী) এই আয়াতটির ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “হযরত ইদরীসকে (আঃ) আল্লাহ তাআলা ওয়াহী করেনঃ “সমস্ত বাণী আদমের আমলের সমান তোমার একার আমল আমি দৈনিক উঠিয়ে থাকি। সুতরাং আমি পছন্দ করি যে, তোমার আমল বেড়ে যাক।” অতঃপর তাঁর কাছে বন্ধু ফেরেশতা আগমন করলে তিনি তার কাছে বর্ণনা করেনঃ “আমার কাছে এরূপ ওয়াহী এসেছে। সুতরাং আপনি মালাকুল মাউতকে বলে দিন যে, তিনি যেন আমার জান কবয বিলম্বে করেন, যাতে আমার নেক আমল বৃদ্ধি পায়।” ঐ ফেরেশতা তখন তাকে নিজের পালকের উপর বসিয়ে নিয়ে আকাশে উঠে যান। চতুর্থ আকাশে পৌঁছে মালাকুল মাউতের সাথে সাক্ষাৎ হয়। ঐ ফেরেশতা মালাকুল মাউতকে হযরত ইদরীসের (আঃ) ব্যাপারে সুপারিশ করেন। মৃত্যুর ফেরেশতা তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “উনি কোথায় আছেন?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “এই যে, আমার পালকের উপর বসে রয়েছেন। মালাকুল মাউত বা মৃত্যুর ফেরেশতা তখন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! আমাকে এখনই হুকুম করা হলো যে, আমি যেন হযরত ইদরীসের (আঃ) রূহ চতুর্থ আকাশে কব্য করি। আমি চিন্তা করছিলাম যে, যিনি যমীনে রয়েছেন তাঁর রূহ আমি চতুর্থ আকাশে কি করে কবয করতে পারি।” সুতরাং তৎক্ষণাৎ তিনি হযরত ইদরীসের (আঃ) জান কবয করে নেন। (হযরত কাবের (রাঃ) এ বর্ণনাটি ইসরাঈলী রিওয়াইয়াত। এর কতক গুলি খবর স্বীকার্য নয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)এই রিওয়াইয়াতই অন্য সনদে রয়েছে। তাতে এও আছে যে, হযরত ইদরীস (আঃ) ঐ ফেরেশতার মাধ্যমে মালাকুল মাউতকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমার বয়সের আর কতদিন বাকী আছে?" আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তার এই প্রশ্নের জবাবে মালাকুল মাউত বলেছিলেনঃ “আমি দেখছি যে, শুধু চক্ষুর একটা পলক ফেলার সময় বাকী আছে।” ফেরেশতা তার পরের নীচে তাকিয়ে দেখেন যে, হযরত ইদরীসের (আঃ) প্রাণবায়ু বহির্গত হয়ে গেছে।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হযরত ইদরীস (আঃ) দরজি ছিলেন। সূচের প্রতিটি ফেঁড়ের সময় তিনি সুবহানাল্লাহ পাঠ করতেন। সন্ধ্যার সময় তাঁর সমান কারো নেক আমল আকাশে উঠে নাই। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, হযরত ইদরীসকে (আঃ) আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। তিনি মৃত্যুবরণ করেন নাই। বরং হযরত ঈসার (আঃ) মতই তাকে জীবিতই উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। আওফীর (রঃ) রিওয়াইয়াতের মাধ্যমে হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাকে ষষ্ঠ আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। আর সেখানেই তিনি মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছেন। হাসান (রাঃ) প্রভৃতি গুরুজন বলেন যে, (আরবী) দ্বারা জান্নাতকে বুঝানো হয়েছে।
মারইয়াম 19:58
আল্লাহ তাআলা বলেন যে, এঁরাই হচ্ছেন নবীদের দল অর্থাৎ যাদের বর্ণনা এই সূরায় রয়েছে, কিংবা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে অথবা পরে বর্ণনা আসবে। তারা আল্লাহ তাআলার ইনআম প্রাপ্ত। সুতরাং এখানে ব্যক্তি বর্ণনা হতে জাতি বর্ণনার দিকে ফিরে যাওয়া হয়েছে।এরা হলেন হযরত আদমের (আঃ) সন্তানের অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ হযরত ইদরীসের (আঃ), বংশোদ্ভূত এবং তাদের বংশোদ্ভূত যাদেরকে হযরত নূহের (আঃ) সাথে নৌকায় আরোহণ করানো হয়েছিল। এর দ্বারা হযরত ইবরাহীমকে (আঃ) বুঝানো হয়েছে। আর হযরত ইবরাহীমের (আঃ) বংশধর দ্বারা হযরত ইসহাক (আঃ) হযরত ইয়াকূব (আঃ) ও হযরত ইসমাঈলকে (আঃ) বুঝানো হয়েছে। হযরত ইসরাঈলের (আঃ) বংশধর দ্বারা বুঝানো হয়েছে। হযরত মূসা (আঃ), হযরত হারূণ (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ), হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) এবং হযরত ঈসাকে (আঃ)। হযরত সুদ্দী (রঃ) ও হযরত ইবনু জারীরের (রঃ) এটাই উক্তি। এজন্যেই তাদের বংশের কথা পৃথকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যদিও সবাই হযরত আদমের (আঃ) বংশধর। কিন্তু তাদের মধ্যে কতক এমনও রয়েছেন যারা ঐ মনীষীদের বংশোদ্ভূত নন। যারা হযরত নূহের (আঃ) সাথী ছিলেন। কেননা, হযরত ইদরীস (আঃ) তো হযরত নূহের (আঃ) দাদা ছিলেন। আমি বলিঃ বাহ্যতঃ এটাই সঠিক যে, হযরত ইদরীস (আঃ) হযরত নূহ (আঃ) ছাড়া অন্যের বংশোদ্ভূত। তবে কতকগুলি লোকের ধারণা এই যে, হযরত ইদরীস (আঃ) বাণী ইসরাঈলী নবী ছিলেন। তারা বলেন যে, মিরাজের হাদীসে হযরত ইদরীসের (আঃ) সাথে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাক্ষাতের সময় তাকে উত্তম নবী ও উত্তম ভাই বলে অভ্যর্থনা জানানো বর্ণিত আছে। তিনি উত্তম সন্তান বলেন নাই, যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত আদম (আঃ) বলেছিলেন। বর্ণিত আছে যে, হযরত ইদরীস (আঃ) হযরত নূহের (আঃ) পূর্ববর্তী নবী ছিলেন। তিনি স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ “তোমরা লা ইলাহা ইল্লাহ’ এর উক্তিকারী ও এর উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী হয়ে যাও। তারপর যা ইচ্ছা তাই কর।” কিন্তু তাঁরা। তার কথা অমান্য করে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধ্বংস করে দেন। আমরা এই আয়াতটিকে নবীদের শ্রেণীভুক্ত আয়াত বলেছি। এর দলীল হচ্ছে সূরায়ে আনআমের ঐ আয়াতগুলি যেগুলিতে হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ), হযরত ইয়াকূব (আঃ), হযরত নূহ (আঃ), হযরত দাউদ (আঃ), হযরত সুলাইমান (আঃ), হযরত আইয়ূব (আঃ), হযরত মূসা (আঃ), হযরত হারূণ (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ), হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ), হযরত ইলইয়সি (আঃ), হযরত ইসমাঈল (আঃ), হযরত ইয়াসাআ (আঃ) এবং হযরত ইউনুস (আঃ) প্রভৃতি নবীদের বর্ণনা রয়েছে এবং তাঁদের প্রশংসা করার পর বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এরা তারাই যাদেরকে আল্লাহ তাআলা হিদায়াত দান করেছিলেন। সুতরাং (হে নবী (সাঃ) তুমি তাদের হিদায়াতের অনুসরণ করো।” (৬:৯০) আল্লাহ তাআলা একথাও বলেছেনঃ “নবীদের মধ্যে কারো কারো ঘটনা আমি বর্ণনা করে দিয়েছি এবং কারো কারো ঘটনা তোমার কাছে বর্ণনা করি নাই।” সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, হযরত মুজাহিদ (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাসকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “সূরায়ে সাদ’ এ কি সিজদা আছে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হাঁ তারপর তিনি এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করে বলেনঃ “তোমাদের নবীকে (সঃ) তাদের অনুসরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” হযরত দাউদ (আঃ) অনুসৃত নবীদের একজন ছিলেন।ঘোষণা করা হচ্ছেঃ যখন ঐ নবীদের (আঃ) সামনে আল্লাহর কিতাবের আয়াতসমূহ পাঠ করা হতো, তখন তারা ওর দলীল প্রমাণাদি শুনে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতঃ কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় পড়ে যেতেন। এ জন্যেই এই আয়াতে সিজদার হুকুমের ব্যাপারে আলেমগণ একমত, যাতে ঐ নবীদের অনুসরণ করা হয়। আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) সূরায়ে মারইয়াম পাঠ করেন। যখন তিনি এই আয়াতে পৌঁছেন, তখন সিজদা করেন। অতঃপর বলেনঃ ‘সিজদা তো করলাম, কিন্তু ঐ কান্না কোথা হতে আনবো?” (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) ও ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মারইয়াম 19:59
৫৯-৬০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ সৎলোকদের বিশেষ করে নবীদের (আঃ) বর্ণনা করলেন, যারা আল্লাহর হুদূদের রক্ষণাবেক্ষণকারী, সত্ত্বার্যের নমুনা স্বরূপ এবং মন্দকাজ থেকে দূরে অবস্থানকারী ছিলেন। এখন তিনি মন্দলোকদের বর্ণনা দিচ্ছেন, যারা ঐ ভাল লোকদের পরে এমনই হয়ে যায় যে, তারা নামায থেকেও বেপরোয়া হয়ে যায়। নামাযের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ফরজকেও যখন তারা ভুলে বসে, তখন তো এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, অন্যান্য ফরজগুলিকে কি পরোয়া তারা করতে পারে? কেননা নামায তো হচ্ছে দ্বীনের ভিত্তি এবং সমস্ত আমল হতে এটা উত্তম ও মর্যাদা সম্পন্ন। ঐ লোকগুলি তাদের কুপ্রবৃত্তির পিছনে লেগে পড়ে। পার্থিব জীবনেই তারা সন্তুষ্ট হয়ে যায়। কিয়ামতের দিন তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।নামাযকে নষ্ট করা দ্বারা উদ্দেশ্য হয়তো বা নামাযকে সম্পূর্ণরূপেই ছেড়ে দেয়। এ জন্যেই ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় ও পর যুগীয় অনেক গুরুজনের মাযহাব এটাই যে, নামায পরিত্যাগকারী কাফির। ইমাম শাফিয়ীরও (রঃ) একটি উক্তি এটাই। কেননা, হাদীসে রয়েছে যে, বান্দা ও কুফরীর (শিরকের) মধ্যে প্রভেদকারী হচ্ছে নামায। অন্য হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে প্রভেদকারী হলো নামায। সুতরাং যে ব্যক্তি নামায ছেড়ে দিলো সে কাফির হয়ে গেল। এই মাসআলা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার জায়গা এটা নয়। অথবা নামাযকে ছেড়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে সঠিকভাবে নামাযের সময়ের পাবন্দী না করা।হযরত ইবনু মাসউদকে (আঃ) জিজ্ঞেস করা হয়ঃ কুরআনকারীমে নামাযের বর্ণনা খুবই বেশী রয়েছে। কোথাও রয়েছে নামাযের প্রতি অবহেলা প্রদর্শনকারীদের শাস্তির বর্ণনা, কোথাও রয়েছে নামাযে চিরকালীনব্যাপী লেগে থাকার নির্দেশ এবং কোথাও আছে নামাযে যত্নবান থাকার হুকুম (এর কারণ কি?) উত্তরে তিনি বলেনঃ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে নামাযের সময়ের ব্যাপারে অবহেলা না করা এবং সময়ের পাবন্দী করা।" জনগণ বললোঃ “আমরা মনে করতাম যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নামাযকে ছেড়ে দেয়া ও ছেড়ে না দেয়া।” হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) তখন বললেনঃ “নামায ছেড়ে দেয়া তো কুফরী।" হযরত মারূক (রঃ) বলেন যে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের প্রতি যত্নবান লোকেরা উদাসীনদের তালিকাভুক্ত নয়।খলীফাতুল মুসলেমীন আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনু আবদিল আযীয (রঃ) এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এর দ্বারা উদ্দেশ্য সরাসরি নামাযকে ছেড়ে দেয়া নয়, বরং নামাযের সময়কে নষ্ট করে দেয়া উদ্দেশ্য। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে এই সব অসৎ লোকের আবিভাব ঘটবে। এই লোকগুলি চতুষ্পদ জন্তুর মত লম্ফ ঝম্ফ করতে থাকবে। আতা ইবনু আবি রবাহ্ও একথাই বলেন যে, শেষ যামানায় এ সব লোকের আবির্ভাব হবে। তারা চতুষ্পদ জন্তু ও গাধার মত রাস্তাতেই লাফাতে থাকবে এবং যে আল্লাহ আকাশে রয়েছেন তাকে মোটেই ভয় করবে। তারা লোকদেরকে দেখে কোন লজ্জা শরমও করবে না।মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই অপদার্থ পরবর্তী লোকেরা ষাট বছর পরে আসবে যারা নামাযকে নষ্ট করে দিবে এবং কুপ্রবৃত্তির পিছনে লেগে পড়বে। তারা কিয়ামতের দিন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতঃপর এদের পরে ঐ সব অযোগ্য লোক আসবে যারা কুরআন কারীমের পাঠ করবে বটে, কিন্তু তা তাদের কণ্ঠ থেকে নীচে নামবে না।কুরআনের পাঠক তিন প্রকারের রয়েছে। তারা হচ্ছে মু'মিন, মুনাফিক ও পাপাচার।" এই হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ওয়ালীদকে (রাঃ) তাঁর শিষ্য এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “মুমিন তো ওর সত্যতা স্বীকার করবে, মুনাফিক ওর উপর বিশ্বাস রাখবে না, আর পাপাচার এর দ্বারা নিজের পেট পূর্ণ করবে।”মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে একটি গারীব হাদীসে রয়েছে যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) যখন আসহাবে সুফফার নিকট কিছু সাদকী পাঠাতেন, তখন তিনি বলতেনঃ “কোন বারবারী পুরুষ ও বারবারিয়া স্ত্রী লোককে যেন এর থেকে কিছু না দেয়া হয়। কেননা, রাসূলুল্লাহকে (সঃ) আমি বলতে শুনেছিঃ “এরাই হচ্ছে ঐ পরবর্তী অপদার্থ লোক যাদের বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে। মুহাম্মদ ইবনু কা'ব কারাযী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পশ্চিমের ঐ বাদশাহকে বুঝানো হয়েছে, যে চরম দুষ্ট বাদশাহ। হযরত কা'ব আহবার (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি মুনাফিকদের বিশেষণ কুরআনকারীমে পেয়ে থাকি। তা এই যে, তারা নেশাপানকারী, নামায পরিত্যাগকারী, দাবা ও চৌসির (ক্রীড়া বিশেষ) খেলোয়াড়, এশার নামাযের সময় শয়নকারী, পানাহারের ব্যাপারে বাড়াবাড়িকারী এবং জামাআত পরিত্যাগকারী।" হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মসজিদগুলি তাদের থেকে শূন্য দেখা যায় এবং তারা অত্যন্ত শান শওকতের সাথে চলাফেরা করে। আবুল আশহাব আতারদী (রঃ) বলেন যে, হযরত দাউদের (আঃ) উপর ওয়াহী আসেঃ “তোমার সঙ্গীদেরকে সতর্ক করে দাও যে, তারা যেন কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ হতে বিরত থাকে। যার অন্তর কুপ্রবৃত্তির অনুসরণে পূর্ণ থাকে তাদের জ্ঞান ও বিবেকের উপর পর্দা পড়ে যায়। যখন কোন বান্দা প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে অন্ধ হয়ে যায়, তখন তাকে আমি সবচেয়ে হালকা শাস্তি এই দেই যে, তাকে আমার আনুগত্য হতে বঞ্চিত রাখি। হযরত উবা ইবনু আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি উম্মতের ব্যাপারে দুটি জিনিসকে ভয় করি। এক এই যে, তারা মিথ্যা কৃত্রিমতা ও প্রবৃত্তির পিছনে পড়ে যাবে এবং নামাযকে ছেড়ে দিবে। দ্বিতীয় এই যে, মুনাফিকরা দুনিয়াকে দেখাবার জন্যে কুরআনের উপর আমলকারী হয়ে খাটি মুমিনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)(আরবী) শব্দের অর্থ হলো ক্ষতি ও অকল্যাণ। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) হলো জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম য অত্যন্ত গভীর। এতে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। ওটা রক্ত ও পুঁজে পরিপূর্ণ রয়েছে।লুকমান ইবনু আমির (রঃ) বলেনঃ “আমি হযরত আবু উমামা সাদী ইবনু আজলানের (রাঃ) নিকট গমন করি। আমি তাকে অনুরোধ জানিয়ে বলিঃ আপনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে যে হাদীস শ্রবণ করেছেন তা আমাকে শুনিয়ে দিন।" তিনি তখন বলেনঃ আচ্ছা তা হলে শুনো রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন দশ ওজনের একটি পাথর যদি জাহান্নামের ধার থেকে তাতে নিক্ষেপ করা হয় তবে পঞ্চাশ বছর ধরে পড়তে থাকলেও তা জাহান্নামের তলদেশে পৌঁছতে পারবে না। ওটা (আরবী) ও (আরবী) এর মধ্যে পৌঁছবে। (আরবী) ও (আরবী) হলো জাহান্নামের দুটি কূপ, যেখানে জাহান্নামীদের রক্ত পুঁজ জমা হয়। (আরবী) এর বর্ণনা (আরবী) এর মধ্যে রয়েছে। আর (আরবী) এর বর্ণনা আছে (আরবী) এই আয়াতের মধ্যে। (এটা ইমাম আবু জাফর ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করা মুনকার বা অস্বিকার্য। সনদের দিক দিয়েও এ হাদীসটি গারীব)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ কিন্তু তারা নয় যারা তাওবা করেছে। অর্থাৎ নামাযে অবহেলা এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ পরিত্যাগ করেছে, আল্লাহ তাআলা তাদের তাওবা কবুল করবেন, তাদের পরিণাম ভাল করবেন এবং তাদেরকে জাহান্নাম হতে বের করে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিবেন। তাওবার মাধ্যমে পর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। হাদীসে আছে যে, তাওবাকারী এমন হয়ে যায় যে, যেন সে নিস্পাপ। এই লোকগুলি যে সৎকর্ম করে তার প্রতিদান ও বিনিময় তারা অবশ্যই প্রাপ্ত হবে। কোন একটি পুণ্যের প্রতিদান কম হবে না। তাওবার পূর্ববর্তী পাপের জন্যে পাকড়াও করা হবে না। এটাই হচ্ছে ঐ দয়াময়ের দয়া ও সহনশীলের সহনশীলতা যে, তাওবা করার পর তিনি পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিচ্ছেন। সূরায়ে ফুরকানে গুনাহ সমূহের বর্ণনা দেয়ার পর ওর শাস্তির বর্ণনা দিয়েছেন, অতঃপর ব্যতিক্রম দেখিয়ে বলেনঃ “আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।”
মারইয়াম 19:60
৫৯-৬০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ সৎলোকদের বিশেষ করে নবীদের (আঃ) বর্ণনা করলেন, যারা আল্লাহর হুদূদের রক্ষণাবেক্ষণকারী, সত্ত্বার্যের নমুনা স্বরূপ এবং মন্দকাজ থেকে দূরে অবস্থানকারী ছিলেন। এখন তিনি মন্দলোকদের বর্ণনা দিচ্ছেন, যারা ঐ ভাল লোকদের পরে এমনই হয়ে যায় যে, তারা নামায থেকেও বেপরোয়া হয়ে যায়। নামাযের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ফরজকেও যখন তারা ভুলে বসে, তখন তো এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, অন্যান্য ফরজগুলিকে কি পরোয়া তারা করতে পারে? কেননা নামায তো হচ্ছে দ্বীনের ভিত্তি এবং সমস্ত আমল হতে এটা উত্তম ও মর্যাদা সম্পন্ন। ঐ লোকগুলি তাদের কুপ্রবৃত্তির পিছনে লেগে পড়ে। পার্থিব জীবনেই তারা সন্তুষ্ট হয়ে যায়। কিয়ামতের দিন তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।নামাযকে নষ্ট করা দ্বারা উদ্দেশ্য হয়তো বা নামাযকে সম্পূর্ণরূপেই ছেড়ে দেয়। এ জন্যেই ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় ও পর যুগীয় অনেক গুরুজনের মাযহাব এটাই যে, নামায পরিত্যাগকারী কাফির। ইমাম শাফিয়ীরও (রঃ) একটি উক্তি এটাই। কেননা, হাদীসে রয়েছে যে, বান্দা ও কুফরীর (শিরকের) মধ্যে প্রভেদকারী হচ্ছে নামায। অন্য হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে প্রভেদকারী হলো নামায। সুতরাং যে ব্যক্তি নামায ছেড়ে দিলো সে কাফির হয়ে গেল। এই মাসআলা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার জায়গা এটা নয়। অথবা নামাযকে ছেড়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে সঠিকভাবে নামাযের সময়ের পাবন্দী না করা।হযরত ইবনু মাসউদকে (আঃ) জিজ্ঞেস করা হয়ঃ কুরআনকারীমে নামাযের বর্ণনা খুবই বেশী রয়েছে। কোথাও রয়েছে নামাযের প্রতি অবহেলা প্রদর্শনকারীদের শাস্তির বর্ণনা, কোথাও রয়েছে নামাযে চিরকালীনব্যাপী লেগে থাকার নির্দেশ এবং কোথাও আছে নামাযে যত্নবান থাকার হুকুম (এর কারণ কি?) উত্তরে তিনি বলেনঃ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে নামাযের সময়ের ব্যাপারে অবহেলা না করা এবং সময়ের পাবন্দী করা।" জনগণ বললোঃ “আমরা মনে করতাম যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নামাযকে ছেড়ে দেয়া ও ছেড়ে না দেয়া।” হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) তখন বললেনঃ “নামায ছেড়ে দেয়া তো কুফরী।" হযরত মারূক (রঃ) বলেন যে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের প্রতি যত্নবান লোকেরা উদাসীনদের তালিকাভুক্ত নয়।খলীফাতুল মুসলেমীন আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনু আবদিল আযীয (রঃ) এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এর দ্বারা উদ্দেশ্য সরাসরি নামাযকে ছেড়ে দেয়া নয়, বরং নামাযের সময়কে নষ্ট করে দেয়া উদ্দেশ্য। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে এই সব অসৎ লোকের আবিভাব ঘটবে। এই লোকগুলি চতুষ্পদ জন্তুর মত লম্ফ ঝম্ফ করতে থাকবে। আতা ইবনু আবি রবাহ্ও একথাই বলেন যে, শেষ যামানায় এ সব লোকের আবির্ভাব হবে। তারা চতুষ্পদ জন্তু ও গাধার মত রাস্তাতেই লাফাতে থাকবে এবং যে আল্লাহ আকাশে রয়েছেন তাকে মোটেই ভয় করবে। তারা লোকদেরকে দেখে কোন লজ্জা শরমও করবে না।মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই অপদার্থ পরবর্তী লোকেরা ষাট বছর পরে আসবে যারা নামাযকে নষ্ট করে দিবে এবং কুপ্রবৃত্তির পিছনে লেগে পড়বে। তারা কিয়ামতের দিন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতঃপর এদের পরে ঐ সব অযোগ্য লোক আসবে যারা কুরআন কারীমের পাঠ করবে বটে, কিন্তু তা তাদের কণ্ঠ থেকে নীচে নামবে না।কুরআনের পাঠক তিন প্রকারের রয়েছে। তারা হচ্ছে মু'মিন, মুনাফিক ও পাপাচার।" এই হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত ওয়ালীদকে (রাঃ) তাঁর শিষ্য এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “মুমিন তো ওর সত্যতা স্বীকার করবে, মুনাফিক ওর উপর বিশ্বাস রাখবে না, আর পাপাচার এর দ্বারা নিজের পেট পূর্ণ করবে।”মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে একটি গারীব হাদীসে রয়েছে যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) যখন আসহাবে সুফফার নিকট কিছু সাদকী পাঠাতেন, তখন তিনি বলতেনঃ “কোন বারবারী পুরুষ ও বারবারিয়া স্ত্রী লোককে যেন এর থেকে কিছু না দেয়া হয়। কেননা, রাসূলুল্লাহকে (সঃ) আমি বলতে শুনেছিঃ “এরাই হচ্ছে ঐ পরবর্তী অপদার্থ লোক যাদের বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে। মুহাম্মদ ইবনু কা'ব কারাযী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পশ্চিমের ঐ বাদশাহকে বুঝানো হয়েছে, যে চরম দুষ্ট বাদশাহ। হযরত কা'ব আহবার (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি মুনাফিকদের বিশেষণ কুরআনকারীমে পেয়ে থাকি। তা এই যে, তারা নেশাপানকারী, নামায পরিত্যাগকারী, দাবা ও চৌসির (ক্রীড়া বিশেষ) খেলোয়াড়, এশার নামাযের সময় শয়নকারী, পানাহারের ব্যাপারে বাড়াবাড়িকারী এবং জামাআত পরিত্যাগকারী।" হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মসজিদগুলি তাদের থেকে শূন্য দেখা যায় এবং তারা অত্যন্ত শান শওকতের সাথে চলাফেরা করে। আবুল আশহাব আতারদী (রঃ) বলেন যে, হযরত দাউদের (আঃ) উপর ওয়াহী আসেঃ “তোমার সঙ্গীদেরকে সতর্ক করে দাও যে, তারা যেন কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ হতে বিরত থাকে। যার অন্তর কুপ্রবৃত্তির অনুসরণে পূর্ণ থাকে তাদের জ্ঞান ও বিবেকের উপর পর্দা পড়ে যায়। যখন কোন বান্দা প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে অন্ধ হয়ে যায়, তখন তাকে আমি সবচেয়ে হালকা শাস্তি এই দেই যে, তাকে আমার আনুগত্য হতে বঞ্চিত রাখি। হযরত উবা ইবনু আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি উম্মতের ব্যাপারে দুটি জিনিসকে ভয় করি। এক এই যে, তারা মিথ্যা কৃত্রিমতা ও প্রবৃত্তির পিছনে পড়ে যাবে এবং নামাযকে ছেড়ে দিবে। দ্বিতীয় এই যে, মুনাফিকরা দুনিয়াকে দেখাবার জন্যে কুরআনের উপর আমলকারী হয়ে খাটি মুমিনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)(আরবী) শব্দের অর্থ হলো ক্ষতি ও অকল্যাণ। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) হলো জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম য অত্যন্ত গভীর। এতে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। ওটা রক্ত ও পুঁজে পরিপূর্ণ রয়েছে।লুকমান ইবনু আমির (রঃ) বলেনঃ “আমি হযরত আবু উমামা সাদী ইবনু আজলানের (রাঃ) নিকট গমন করি। আমি তাকে অনুরোধ জানিয়ে বলিঃ আপনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) কাছে যে হাদীস শ্রবণ করেছেন তা আমাকে শুনিয়ে দিন।" তিনি তখন বলেনঃ আচ্ছা তা হলে শুনো রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন দশ ওজনের একটি পাথর যদি জাহান্নামের ধার থেকে তাতে নিক্ষেপ করা হয় তবে পঞ্চাশ বছর ধরে পড়তে থাকলেও তা জাহান্নামের তলদেশে পৌঁছতে পারবে না। ওটা (আরবী) ও (আরবী) এর মধ্যে পৌঁছবে। (আরবী) ও (আরবী) হলো জাহান্নামের দুটি কূপ, যেখানে জাহান্নামীদের রক্ত পুঁজ জমা হয়। (আরবী) এর বর্ণনা (আরবী) এর মধ্যে রয়েছে। আর (আরবী) এর বর্ণনা আছে (আরবী) এই আয়াতের মধ্যে। (এটা ইমাম আবু জাফর ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করা মুনকার বা অস্বিকার্য। সনদের দিক দিয়েও এ হাদীসটি গারীব)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ কিন্তু তারা নয় যারা তাওবা করেছে। অর্থাৎ নামাযে অবহেলা এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ পরিত্যাগ করেছে, আল্লাহ তাআলা তাদের তাওবা কবুল করবেন, তাদের পরিণাম ভাল করবেন এবং তাদেরকে জাহান্নাম হতে বের করে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিবেন। তাওবার মাধ্যমে পর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। হাদীসে আছে যে, তাওবাকারী এমন হয়ে যায় যে, যেন সে নিস্পাপ। এই লোকগুলি যে সৎকর্ম করে তার প্রতিদান ও বিনিময় তারা অবশ্যই প্রাপ্ত হবে। কোন একটি পুণ্যের প্রতিদান কম হবে না। তাওবার পূর্ববর্তী পাপের জন্যে পাকড়াও করা হবে না। এটাই হচ্ছে ঐ দয়াময়ের দয়া ও সহনশীলের সহনশীলতা যে, তাওবা করার পর তিনি পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিচ্ছেন। সূরায়ে ফুরকানে গুনাহ সমূহের বর্ণনা দেয়ার পর ওর শাস্তির বর্ণনা দিয়েছেন, অতঃপর ব্যতিক্রম দেখিয়ে বলেনঃ “আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।”
মারইয়াম 19:61
৬১-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: গুনাহ হতে তাওবা কারীরা যে জান্নাতে প্রবেশ করবে তা হবে চিরস্থায়ী যার ভবিষ্যতের ওয়াদা তাদের প্রতিপালক তাদের সাথে করেছেন। ঐ জান্নাতকে তারা দেখে নাই। তবুও তারা ওর উপর ঈমান এনেছে ও ওটাকে বিশ্বাস করেছে। সত্য কথা এটাই যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য ও অটল। জান্নাত লাভ বাস্তব কথা। এই জান্নাত সামনে এসেই যাবে। আল্লাহ তাআলা ওয়াদা খেলাফও করবেন না এবং ওয়াদার পরিবর্তনও করবেন না। এই লোকদেরকে তথায় অবশ্যই পৌঁছানো হবে। (আরবী) এর অর্থ (আরবী) ও এসে থাকে। ভাবার্থ এটাওঃ আমরা যেখানেই যাই ওটা আমাদের কাছে এসেই পড়ে। যেমন বলা হয়ঃ আমার উপর পঞ্চাশ বছর এসেছে অথব্য আমি পঞ্চাশ বছরে পৌঁছেছি। দুটো বাক্যের অর্থ একই হয়ে থাকে। ঐ জান্নাতীদের কানে কোন বাজে কথা, অপছন্দনীয় কথা আসবে এটা অসম্ব। তাদের কানে শুধু শান্তির বাণীই পৌঁছবে। চতুর্দিক থেকে বিশেষ করে ফেরেশতাদের পবিত্র মুখ থেকে শান্তিপূর্ণ কথাই বের হবে এবং তা তাদের কানে গুঞ্জরিত হবে। যেমন সূরায়ে ওয়াকেআ’তে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেথায় তারা শুনবে না কোন অসার অথবা পাপ বাক্য ‘সালাম’ আর ‘সালাম’ বাণী ব্যতীত।” (৫৬:২৫-২৬) এখানে এটা (আরবী) হয়েছে। সকাল ও সন্ধ্যায় উত্তম ও সুস্বাদু আহার্য বিনা কষ্টে ও পরিশ্রমে তাদের কাছে আসতে থাকবে। এটা মনে করা ঠিক হবে না যে, জান্নাতে দিন ও রাত হবে, বরং ঐ আলো বা জ্যোতি দেখে সময় চিনে নেবে যা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত রয়েছে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রথম যে দলটি জান্নাতে যাবে তাদের মুখমণ্ডল চৌদ্দ তারিখের চাদের মত উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময় হবে। সেখানে তাদের মুখে থুথুও আসবে না এবং নাকে শ্লেষ্মও আসবে না। তাদের পায়খানা ও প্রস্রাবের প্রয়োজন হবে না। তাদের পানপাত্র ও আসবাবপত্র গুলি হবে স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত। তাদের দেহের ঘর্ম হবে মিশক আম্বারের মত সুগন্ধময়। প্রত্যেক জান্নাতীর এমন দুটি স্ত্রী থাকবে যাদের পরিচ্ছন্ন পায়ের গোছা হতে হাড়ের মজ্জা বাইরে থেকে দেখা যাবে, ঐ বেহেশতীদের একে অপরের প্রতি কোন শত্রুতা থাকবে না, সবাই যেন একই হৃদয়ের লোক। তাদের মধ্যে কোন মতানৈক্য থাকবে না। সকাল সন্ধ্যায় তারা আল্লাহর তাসবীহ পাঠে রত থাকবে।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শহীদ লোকেরা ঐ সময় জান্নাতের একটি নহরের ধারে জান্নাতের দরজার পার্শ্বে রক্তিম বর্ণের খিলান করা ছাদের নীচে অবস্থান করবে। তাদের কাছে সকাল সন্ধ্যায় আহার্য পৌঁছানো হবে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)তথাকার সকাল ও সন্ধ্যার কথা দুনিয়ার হিসেবে বলা হয়েছে। আসলে সেখানে রাত্রি হবেই না। বরং সদা আলো ও জ্যোতিই বিরাজ করবে। পর্দা পড়ে যাওয়া ও দরজা বন্ধ হওয়ার দ্বারা জান্নাতীরা সন্ধ্যা বুঝতে পারবে এবং অনুরূপভাবে সরে যাওয়া ও দরজা খুলে যাওয়া দ্বারা তারা সকাল জানতে পারবে। দর বন্ধ হওয়া ও খুলে যাওয়া জান্নাতীদের ইঙ্গিত ও নির্দেশক্রমেই। হবে। এই দরজগুলিও এতো পরিষ্কার ও ঝকঝকে হবে যে, বাইরের জিনিসগুলি ভিতর থেকে দেখা যাবে। দুনিয়ায় দিন রাত্রি ভোগ করা তাদের অভ্যাস ছিল বলে যে সময় তারা চাবে তাই পাবে। আরবের লোকেরা সকাল ও সন্ধ্যায় খাদ্য খেতে অভ্যস্ত ছিল বলেই জান্নাতীদের খাদ্য খাওয়ার ব্যাপারে সকাল ও সন্ধ্যার কথা বলা হয়েছে মাত্র। প্রকৃতপক্ষে তারা যা চাবে এবং যখন চাবে বক্ষ্যমান পেয়ে যাবে। যেমন একটি গারীব ও অস্বীকার্য হাদীসে রয়েছে যে, সকাল সন্ধ্যায় ঠিকানা নয়, বরং রিযক তো অসংখ্য এবং তা সব সময় বিদ্যমান থাকবে। আল্লাহর বন্ধুদের পার্শ্বে ঐ সময় এমন সব হ্র আগমন করবে যাদের মধ্যে নিম্নমানের হৃরেরা শুধুমাত্র যাফরান দ্বারা সৃষ্ট হবে। এই সব নিয়ামত বিশিষ্ট জান্নাতগুলি ঐ সব লোক পাবে যারা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে আল্লাহর বাধ্য ও অনুগত, ক্রোধসম্বরণকারী এবং লোকদেরকে ক্ষমাকারী। যাদের গুণাবলী (আরবী) এর শুরুতে বর্ণিত। হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছেঃ তারাই ফিরদাউসের অধিকারী হবে যাতে তারা স্থায়ী হবে।
মারইয়াম 19:62
৬১-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: গুনাহ হতে তাওবা কারীরা যে জান্নাতে প্রবেশ করবে তা হবে চিরস্থায়ী যার ভবিষ্যতের ওয়াদা তাদের প্রতিপালক তাদের সাথে করেছেন। ঐ জান্নাতকে তারা দেখে নাই। তবুও তারা ওর উপর ঈমান এনেছে ও ওটাকে বিশ্বাস করেছে। সত্য কথা এটাই যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য ও অটল। জান্নাত লাভ বাস্তব কথা। এই জান্নাত সামনে এসেই যাবে। আল্লাহ তাআলা ওয়াদা খেলাফও করবেন না এবং ওয়াদার পরিবর্তনও করবেন না। এই লোকদেরকে তথায় অবশ্যই পৌঁছানো হবে। (আরবী) এর অর্থ (আরবী) ও এসে থাকে। ভাবার্থ এটাওঃ আমরা যেখানেই যাই ওটা আমাদের কাছে এসেই পড়ে। যেমন বলা হয়ঃ আমার উপর পঞ্চাশ বছর এসেছে অথব্য আমি পঞ্চাশ বছরে পৌঁছেছি। দুটো বাক্যের অর্থ একই হয়ে থাকে। ঐ জান্নাতীদের কানে কোন বাজে কথা, অপছন্দনীয় কথা আসবে এটা অসম্ব। তাদের কানে শুধু শান্তির বাণীই পৌঁছবে। চতুর্দিক থেকে বিশেষ করে ফেরেশতাদের পবিত্র মুখ থেকে শান্তিপূর্ণ কথাই বের হবে এবং তা তাদের কানে গুঞ্জরিত হবে। যেমন সূরায়ে ওয়াকেআ’তে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেথায় তারা শুনবে না কোন অসার অথবা পাপ বাক্য ‘সালাম’ আর ‘সালাম’ বাণী ব্যতীত।” (৫৬:২৫-২৬) এখানে এটা (আরবী) হয়েছে। সকাল ও সন্ধ্যায় উত্তম ও সুস্বাদু আহার্য বিনা কষ্টে ও পরিশ্রমে তাদের কাছে আসতে থাকবে। এটা মনে করা ঠিক হবে না যে, জান্নাতে দিন ও রাত হবে, বরং ঐ আলো বা জ্যোতি দেখে সময় চিনে নেবে যা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত রয়েছে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রথম যে দলটি জান্নাতে যাবে তাদের মুখমণ্ডল চৌদ্দ তারিখের চাদের মত উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময় হবে। সেখানে তাদের মুখে থুথুও আসবে না এবং নাকে শ্লেষ্মও আসবে না। তাদের পায়খানা ও প্রস্রাবের প্রয়োজন হবে না। তাদের পানপাত্র ও আসবাবপত্র গুলি হবে স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত। তাদের দেহের ঘর্ম হবে মিশক আম্বারের মত সুগন্ধময়। প্রত্যেক জান্নাতীর এমন দুটি স্ত্রী থাকবে যাদের পরিচ্ছন্ন পায়ের গোছা হতে হাড়ের মজ্জা বাইরে থেকে দেখা যাবে, ঐ বেহেশতীদের একে অপরের প্রতি কোন শত্রুতা থাকবে না, সবাই যেন একই হৃদয়ের লোক। তাদের মধ্যে কোন মতানৈক্য থাকবে না। সকাল সন্ধ্যায় তারা আল্লাহর তাসবীহ পাঠে রত থাকবে।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শহীদ লোকেরা ঐ সময় জান্নাতের একটি নহরের ধারে জান্নাতের দরজার পার্শ্বে রক্তিম বর্ণের খিলান করা ছাদের নীচে অবস্থান করবে। তাদের কাছে সকাল সন্ধ্যায় আহার্য পৌঁছানো হবে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)তথাকার সকাল ও সন্ধ্যার কথা দুনিয়ার হিসেবে বলা হয়েছে। আসলে সেখানে রাত্রি হবেই না। বরং সদা আলো ও জ্যোতিই বিরাজ করবে। পর্দা পড়ে যাওয়া ও দরজা বন্ধ হওয়ার দ্বারা জান্নাতীরা সন্ধ্যা বুঝতে পারবে এবং অনুরূপভাবে সরে যাওয়া ও দরজা খুলে যাওয়া দ্বারা তারা সকাল জানতে পারবে। দর বন্ধ হওয়া ও খুলে যাওয়া জান্নাতীদের ইঙ্গিত ও নির্দেশক্রমেই। হবে। এই দরজগুলিও এতো পরিষ্কার ও ঝকঝকে হবে যে, বাইরের জিনিসগুলি ভিতর থেকে দেখা যাবে। দুনিয়ায় দিন রাত্রি ভোগ করা তাদের অভ্যাস ছিল বলে যে সময় তারা চাবে তাই পাবে। আরবের লোকেরা সকাল ও সন্ধ্যায় খাদ্য খেতে অভ্যস্ত ছিল বলেই জান্নাতীদের খাদ্য খাওয়ার ব্যাপারে সকাল ও সন্ধ্যার কথা বলা হয়েছে মাত্র। প্রকৃতপক্ষে তারা যা চাবে এবং যখন চাবে বক্ষ্যমান পেয়ে যাবে। যেমন একটি গারীব ও অস্বীকার্য হাদীসে রয়েছে যে, সকাল সন্ধ্যায় ঠিকানা নয়, বরং রিযক তো অসংখ্য এবং তা সব সময় বিদ্যমান থাকবে। আল্লাহর বন্ধুদের পার্শ্বে ঐ সময় এমন সব হ্র আগমন করবে যাদের মধ্যে নিম্নমানের হৃরেরা শুধুমাত্র যাফরান দ্বারা সৃষ্ট হবে। এই সব নিয়ামত বিশিষ্ট জান্নাতগুলি ঐ সব লোক পাবে যারা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে আল্লাহর বাধ্য ও অনুগত, ক্রোধসম্বরণকারী এবং লোকদেরকে ক্ষমাকারী। যাদের গুণাবলী (আরবী) এর শুরুতে বর্ণিত। হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছেঃ তারাই ফিরদাউসের অধিকারী হবে যাতে তারা স্থায়ী হবে।