Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-আম্বিয়া 21:79 – আল-আম্বিয়া 21:112

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-আম্বিয়া 21:79
  2. আল-আম্বিয়া 21:80
  3. আল-আম্বিয়া 21:81
  4. আল-আম্বিয়া 21:82
  5. আল-আম্বিয়া 21:83
  6. আল-আম্বিয়া 21:84
  7. আল-আম্বিয়া 21:85
  8. আল-আম্বিয়া 21:86
  9. আল-আম্বিয়া 21:87
  10. আল-আম্বিয়া 21:88
  11. আল-আম্বিয়া 21:89
  12. আল-আম্বিয়া 21:90
  13. আল-আম্বিয়া 21:91
  14. আল-আম্বিয়া 21:92
  15. আল-আম্বিয়া 21:93
  16. আল-আম্বিয়া 21:94
  17. আল-আম্বিয়া 21:95
  18. আল-আম্বিয়া 21:96
  19. আল-আম্বিয়া 21:97
  20. আল-আম্বিয়া 21:98
  21. আল-আম্বিয়া 21:99
  22. আল-আম্বিয়া 21:100
  23. আল-আম্বিয়া 21:101
  24. আল-আম্বিয়া 21:102
  25. আল-আম্বিয়া 21:103
  26. আল-আম্বিয়া 21:104
  27. আল-আম্বিয়া 21:105
  28. আল-আম্বিয়া 21:106
  29. আল-আম্বিয়া 21:107
  30. আল-আম্বিয়া 21:108
  31. আল-আম্বিয়া 21:109
  32. আল-আম্বিয়া 21:110
  33. আল-আম্বিয়া 21:111
  34. আল-আম্বিয়া 21:112

আল-আম্বিয়া 21:79

৭৮-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, ওটা ছিল আঙ্গুরের ক্ষেত্র বা বাগান। ঐ সময় আঙ্গুর গাছের গুচ্ছ বের হয়েছিল। (আরবী) শব্দের অর্থ হলো রাত্রিকালে পশুর চারণ ভূমিতে চরতে থাকা। দিবাভাগে চরাকে আরবী ভাষায় (আরবী) বলা হয়। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, ঐ বাগানটিকে বকরীগুলি নষ্ট করে দেয়। হযরত দাউদ (আঃ) ফায়সালা দেন যে, বাগানের ক্ষতি পুরণ স্বরূপ বকরীগুলি বাগানের মালিক পেয়ে যাবে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এই ফায়সালা শুনে আরয করেনঃ “ হে আল্লাহর নবী (আঃ)! এটা ছাড়া অন্য একটা ফায়সালা করা যেতে পারে তো?” হযরত দাউদ (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “ওটা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “প্রথমতঃ বকরীগুলি বাগানের মালিকের হাতে সমর্পণ করা হোক। সে ওগুলি দ্বারা ফায়েদা উঠাতে থাকবে। আর বাগান বকরীর মালিককে দেয়া হোক। সে আঙ্গুরের চারার খিদমত করতে থাকবে। অতঃপর যখন আঙ্গুরের গাছ গুলি ঠিক ঠাক হয়ে যাবে এবং পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে তখন বাগানের মালিককে বাগান ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং বাগানের মালিকও বকরীগুলি বকরীর মালিককে ফিরিয়ে দেবে।” এই আয়াতের ভাবার্থ এটাইঃ ‘আমি এই ঝগড়ার সঠিক ফায়সালা সুলাইমানকে (আঃ) বুঝিয়ে দিয়েছিলাম।”হযরত ইবনু আব্বাস (রা) বলেন যে, হযরত দাউদ (আঃ) যখন বকরীগুলি বাগানের মালিককে দিয়ে দেয়ার ফায়সালা করেন তখন বকরীর মালিকরা বেরিয়ে আসে। তাদের সাথে কুকুর ছিল। হযরত সুলাইমান (আঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের ফায়সালা কি হলো?” তারা তাদের ফায়সালার খবর দিলে তিনি বললেনঃ “আমি সেখানে হাযির থাকলে এই ফায়সালা দেয়া হতো না, বরং অন্য ফায়সালা হতো। তার এ কথা হযরত (আরবী) দাউদের (আঃ) কানে পৌঁছলে তিনি হযরত সুলাইমানকে (আঃ) ডেকে পাঠান এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! তুমি কি ফায়সালা করতে?” তখন তিনি তাঁর উপরিউক্ত ফায়সালার কথা শুনিয়ে দেন।হযরত মাসরূক (রাঃ) বলেন যে, ঐ বকরীগুলি আঙ্গুর গাছের গুচ্ছ ও পাতা সব খেয়ে ফেলেছিল। তখন হযরত সুলাইমান (আঃ) হযরত দাউদের (আঃ) বিপরীত ফায়সালা দেন যে, ঐ লোকদের বকরীগুলি বাগানের মালিকদের দিয়ে দেয়া হোক এবং ছাগলওয়ালাদেরকে বাগান সমর্পন করা হোক। যত দিন পর্যন্ত বাগান পূর্ব অবস্থায় ফিরে না আসবে ততদিন পর্যন্ত বকরী, বাচ্চা, দুধ এবং অন্যান্য সমস্ত উপকার বাগানের মালিকরা ভোগ করবে। অতঃপর প্রত্যেককে নিজনিজ জিনিস ফিরিয়ে দেয়া হবে।কাযী শুরাইহ্ এর (রাঃ) কাছেও এইরূপ একটি বিচার আসলে তিনি এই ফায়সালা করেন যে, দিনের বেলায় বকরী কোন ক্ষতি করলে ওর কোন ক্ষতিপূরণ করতে হবে না। আর যদি রাত্রি বেলায় ক্ষতি করে তবে বকরীওয়ালাদেরকে যামিন হতে হবে। অতঃপর তিনি এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।হযরত সা'দ ইবনু মাহীসাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত বারা ইবনু আযিবের (রাঃ) উন্থী একটি বাগানে প্রবেশ করে এবং বড়ই ক্ষতি করে ফেলে। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফায়সালা করেন যে, দিনের বেলায় বাগানওয়ালাদের দায়িত্ব হলো বাগানের হিফাযত করা। আর যদি পশু রাত্রিকালে বাগানের ক্ষতি করে তবে পুশুর মালিকদেরকেই ওর যামিন হতে। হবে (অর্থাৎ ক্ষতি পূরণ করতে হবে)। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) ইমাম আবু দাউদ (রাঃ) এবং ইমাম ইবনু মাজাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন) এই হাদীসে ইল্লাত সমূহ বের করা হয়েছে। আমরা কিতাবুল আহকামে আল্লাহর ফলে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছি।বর্ণিত আছে যে, হযরত আইয়াম ইবনু মুআবিয়াকে কাযী পদে নিয়োগ করার জন্যে যখন তাঁর কাছে আবেদন জানানো হয় তখন তিনি হযরত হাসান্দ্রে (রাঃ) কাছে এসে কেঁদে ফেলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আবু সাঈদ (রাঃ)! আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমার কাছে এই রিওয়াইয়াত পৌঁছেছে যে, কাযী যদি ইজতিহাদ করার পরেও ভুল করে তবে সে জাহান্নামী হবে। আর যে কুপ্রবৃত্তির প্রতি ঝুঁকে পড়ে সেও জাহান্নামী। কিন্তু যে ইজতিহাদ করার পর সঠিকতায় পৌঁছে যায় সে জান্নাতে যাবে।" তার এ কথা শুনে হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেনঃ “শুনুন, আল্লাহ তাআলা হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমানের (আঃ) ফায়সালার কথা বর্ণনা করেছেন। আর এটা প্রকাশমান যে, নবীরা (আঃ) ন্যায় বিচারক হয়ে থাকেন এবং তাঁদের কথা দ্বারা এই লোকদের কথা খণ্ডন করা যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা হযরত সুলাইমানের (আঃ) প্রশংসা করেছেন বটে, কিন্তু হযরত দাউদকে (আঃ) তিনি নিন্দা করেননি। জেনে রাখুন যে, আল্লাহ তাআলা বিচারকদের নিকট তিনটি কথার অঙ্গীকার নিয়েছেন। প্রথম অঙ্গীকার এই যে, তাঁরা যেন পার্থিব লোভের বশবর্তী হয়ে শরীয়তের আহকাম পরিবর্তন না করেন। দ্বিতীয় অঙ্গীকার এই যে, তারা যেন অন্তরের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির পিছনে না পড়েন বা প্রবৃত্তির অনুসরণ না করেন। তৃতীয় অঙ্গীকার এই যে, তারা যেন আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকেও ভয় না করেন। তারপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দাউদ (আঃ)! আমি তোমাকে যমীনের খলীফা বা প্রতিনিধি বানিয়েছি, সুতরাং তুমি লোকদের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা কর এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, অন্যথায় ওটা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিভ্রান্ত করে ফেলবে।” (৩৮:২৬) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানুষকে ভয় করো না, বরং আমাকেই ভয় কর।” (৫:৪৪) অন্য একস্থানে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা সামান্য বা নগণ্য মূল্যের বিনিময়ে আমার আয়াতসমূহ। বিক্রি করো না।” (৫:৪৪) আমি বলি যে, নবীরা যে নিস্পাপ এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাদেরকে যে সাহায্য করা হয়ে থাকে এ বিষয়ে পূর্বযুগীয় ও পরযুগীয় গুরুজনদের মধ্যে কোন মতানৈক্য নেই। তাদের ছাড়া অন্যদের ব্যাপারে কথা এই যে, হযরত আম্র ইনবুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “বিচারক যখন ইজতিহাদ ও চেষ্টা করার পর সঠিকতায় পৌঁছে যায় তখন সে দুটো প্রতিদান লাভ করে। আর ইজতিহাদের পর যদি তার ভূল হয়ে যায় তবে তার জন্যে রয়েছে একটি প্রতিদান।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রাঃ) স্বীয় সহীহ্ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এহাদীসটি পরিষ্কারভাবে বলে দিচ্ছে যে, পুর্ণভাবে চেষ্টা চালানোর পরেও যদি বিচারক ভুল করে দেয় তবে সে জাহান্নামী হবে বলে যে ধারণা ও সন্দেহ হযরত আইয়াস (রাঃ) করেছেন তা ঠিক নয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সুনানের একটি হাদীসে রয়েছে যে, বিচারক তিন প্রকার। এক প্রকারের বিচারক জান্নাতী ও দু'প্রকারের বিচারক জাহান্নামী। যে সত্য ও ন্যায় জানে এবং তদনুযায়ী ফায়সালা করে সে জান্নাতী। যে না জেনে ফায়সালা করে সে জাহান্নামী এবং যে সত্য জেনে শুনে ওর বিপরীত ফায়সালা করে সেও জাহান্নামী। কুরআন কারীমে বর্ণিত এই ঘটনার কাছাকাছিই আর একটি ঘটনা মুসনাদে আহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “দু'টি মহিলা ছিল, যাদের সাথে তাদের দুটি পুত্র সন্তান ছিল, (তারা ছিল দুগ্ধ পোষ্য শিশু)। একজনের শিশুকে বাঘে ধরে নিয়ে যায়। এখন মহিলা দুটির প্রত্যেকেই একে অপরকে বলেঃ “বাঘে তোমার শিশুকে ধরে নিয়ে গেছে এবং যেটা আছে আমারই।” অবশেষে তারা হযরত দাউদের (আঃ) নিকট এই মুকাদ্দামা পেশ করে। তখন তিনি ফায়সালা দেন যে, শিশুটি বড় স্ত্রী লোকটির প্রাপ্য। অতঃপর তারা দুজন বেরিয়ে আসে। পথে হযরত সুলাইমান (আঃ) ছিলেন। তিনি তাদেরকে ডাকলেন এবং (লোকদেরকে) বললেন “ছুরী নিয়ে এসো। আমি এই শিশুটিকে কেটে দুটুকরা করে দেবো এবং অর্ধেক করে দু’জনকে প্রদান করবো।” এতে বড় স্ত্রী লোকটি চুপ থাকলো। কিন্তু ছোট স্ত্রী লোকটি বললোঃ “আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন! শিশুটিকে কাটবেন ন। এটা বড় স্ত্রী লোকটিরই। সুতরাং তাকেই দিয়ে দিন।" হযরত সুলাইমান (আঃ) প্রকৃত ব্যাপার বুঝে নেন এবং শিশুটিকে ঐ ছোট স্ত্রী লোকটিকে দিয়ে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নাসায়ী (রাঃ) এর উপর একটি অনুচ্ছেদ বেঁধেছেন যে, বিচারক যদি নিজের ফায়সালা অন্তরে গোপন রেখে প্রকৃত রহস্য জানবার উদ্দেশ্যে ওর বিপরীত কিছু বলেন তবে তা জায়েয হবে)এ ধরনেরই একটি ঘটনা হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, বানী ইসরাঈলের যুগে একটি সুন্দরী নারী ছিল, যার প্রেমে চারজন নেতৃস্থানীয় লোক আসক্ত হয়ে পড়ে এবং তার সাথে ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়ার ইচ্ছা করে। কিন্তু ঐ নারী তা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করে। তখন তারা তার প্রতি চরম দুঃখিত ও রাগান্বিত হয় এবং চারজন একমত হয়ে হযরত দাউদের (আঃ) বিচারালয়ে উপস্থিত হয় ও সাক্ষ্য প্রদান করে যে, সে তার কুকুরের দ্বারা নিজের কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করে। চার জনের সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে হযরত দাউদ (আঃ) মহিলাটিকে রজম (পাথর নিক্ষেপে হত্যা করার নিদের্শ দেন। ঐ দিনই সন্ধ্যায় হযরত সুলাইমান (আঃ) নিজের সমবয়সী ছেলেদের নিয়ে বসেন। তিনি বিচারক হন এবং চার জন ছেলে ঐ লোকগুলির মত তার কাছে ঐ মুকাদ্দামা পেশ করে এবং একটি স্ত্রীলোকের সম্বন্ধে ঐ কথাই বলে। হযরত সুলাইমান (আঃ) ঐ চারজনকে পৃথক পৃথক করে দেয়ার নিদের্শ দেন। তার পর একজনকে তিনি তাঁর কাছে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “ঐ কুকুরটির রং কেমন ছিল?” সে উত্তরে বলেঃ “কালো”। এরপর দ্বিতীয় জনকে পৃথক ভাবে ডেকে ঐ প্রশ্নই করেন। সে জবাব দেয়ঃ “সাদা।” তিনি তৎক্ষণাৎ ফায়সালা দেন যে, স্ত্রী লোকটির উপর এটা অপবাদ ছাড়া কিছুই নয় এবং এই চারজনকে হত্যা করে দেওয়া হোক।” হযরত দাউদের (আঃ) নিকটও এই ঘটনাটি পেশ করা হলো। তিনি তখনই ঐ চারজন নেতৃ স্থানীয় লোককে ডেকে পাঠান এবং ঐ রূপেই পৃথক পৃথক ভাবে তাদেরকে কুকুরটির রং সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয়। তারা এক একজন এক এক কথা বলে এবং গড় বড় করে দেয়। হযরত দাউদের (আঃ) কাছে তারা মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়ে যায়। সুতরাং তিনি তাদেরকে হত্যা করে দেয়ার নিদের্শ দেন। (এটা হাফিয আবুল কাসিম ইবনু আসাকির (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি বিহঙ্গকুলের জন্যে নিয়ম করে দিয়েছিলাম যে, তারা যেন হযরত দাউদের (আঃ) সাথে আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। হযরত দাউদকে (আঃ) এমন মিষ্ট কণ্ঠস্বর দান করা হয়েছিল যে, যখন তিনি মিষ্টি সুরে ও আন্তরিকতার সাথে যরূর পাঠ করতেন। তখন পক্ষীকূল উড়ন বাদ দিয়ে থেমে যেতো এবং তার সুরে সুরে মিলিয়ে আল্লাহর তাসবীহ পাঠে লেগে পড়তো। অনুরূপভাবে পাহাড় পর্বতও তাসবীহ পাঠ করতো। বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) কুরআন কারীম পাঠ করছিলেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেখান দিয়ে গমন করছিলেন। তার মিষ্টি সূরে কুরআন পাঠ শুনে তিনি দাড়িয়ে যান এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে শুনতে থাকেন। তারপর তিনি বলেনঃ “একে তো আ'লে দাউদের (আঃ) মত মিষ্টি সুর দান করা হয়েছে। হযরত আবু মূসা (রাঃ) এটা জানতে পেরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমি যদি জানতাম যে, আপনি আমার কুরআন পাঠ শুনতে ছিলেন। তবে আমি আরো উত্তম রূপে পাঠ করতাম।”হযরত আবু উছমান নাহদী (রাঃ) বলেনঃ “ আমি কোন উত্তম বাজনার মধ্যে ঐ মজা পাই নাই যা হযরত আবূ মূসার (রাঃ) কণ্ঠস্বরে পেতাম।” সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার উত্তম কণ্ঠ স্বরকে হযরত দাউদের (আঃ) উত্তম ও মিষ্ট কণ্ঠস্বরের একটি অংশ বলেছেন। তাহলে স্বয়ং হযরত দাউদের কণ্ঠস্বর কত মধুর ছিল তা সহজেই অনুমেয়।আল্লাহ তাআলা তাঁর আর একটি অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেনঃ “আমি দাউদকে (আঃ) তোমাদের জন্যে বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে ওটা তোমাদেরকে তোমাদের যুদ্ধে রক্ষা করে। তার যুগের পূর্বে হল্কা বিহীন বর্ম নির্মিত হতো। হলকা বিশিষ্ট বর্ম তিনিই তৈরী করেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) “তার জন্যে আমি লৌহকে নমনীয় করেছিলাম। (হে দাউদ (আঃ)! উদ্দেশ্য এই যে, যাতে তুমি পূর্ণ মাপের বর্ম তৈরী করতে এবং বুননে পরিমাণ রক্ষা করতে পার।" (৩৪:১০-১১) এই বর্ম যুদ্ধের মাঠে কাজে লাগতো। সুতরাং এটা ছিল এমনই নিয়ামত যার কারণে মানুষের উচিত মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। তাই তিনি বলেনঃ তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে না?"এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি সুলাইমানের (আঃ) বশীভূত করেছিলাম উদ্দাম বায়ুকে, ওটা তার আদেশক্রমে প্রবাহিত হতো সেই দেশের দিকে যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি। অর্থাৎ ঐ বায়ু তাকে সিরিয়ায় পৌঁছিয়ে দিতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত হযরত সুলাইমান (আঃ) তার লোক-লশকর, সাজ-সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্রসহ তার সিংহাসনে বসে যেতেন। অতঃপর বায়ু তাঁকে তাঁর গন্তব্য স্থানে ক্ষণিকের মধ্যে পৌছিয়ে দিতো। সিংহাসনের উপর হতে পাখী পালক দ্বারা তাকে ছায়া করতো। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তার অধীন করে দিলাম বায়ুকে, যা তার আদেশে সে যেখানেই ইচ্ছা করতো সেথায় মৃদুমন্দ গতিতে প্রবাহিত হতো।" (৩৮:৩৬) মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(আমি সুলাইমানের (আঃ) অধীন করেছিলাম বায়ুকে) যা প্রভাতে এক মাসের পথ অতিক্রম করতো এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ অতিক্রম করতো।” (৩৪:১২) হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, ছয় লক্ষ চেয়ার রাখাহতো। তার পাশে বসতো মু'মিন মানুষ এবং তাদের পিছনে বসতো মু'মিন জ্বিন। তারপর তাঁর নির্দেশক্রমে পক্ষীকুল সবারই উপর ছায়া করতো। অতঃপর তার আদেশ অনুযায়ী বায়ু তাঁকে নিয়ে চলতে শুরু করতো। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন) তার উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উবাইদিল্লাহ ইবনু উমাইর (রাঃ) বলেন যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) বাতাসকে হুকুম করতেন তখন ওটা স্থূপাকারে জমা হয়ে যেতো, যেন ওটা পাহাড়। তারপর তিনি তাঁর ফরাশ আনার নিদের্শ দিতেন। তখন উচু জায়গায় রেখে দেয়া হতো। অতঃপর তিনি তাঁর ডানা ওয়ালা ঘোড়া আনার হুকুম করতেন।এরপর তিনি ঐ ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে স্বীয় ফরাশে উঠে বসতেন। অতঃপর তাঁর নির্দেশক্রমে বায়ূ তাকে উপরে উঠিয়ে নিয়ে যেতো। ঐ সময় তিনি মাথা নীচু করে থাকতেন। ডানে বামে মোটেই তাকাতেন না। এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হতো বিনয় ও আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। কেননা, নিজের নীচতার জ্ঞান তাঁর ছিল। অতঃপর বায়ুকে তিনি যেখানে নামাবার হুকুম করতেন সেখানেই নামিয়ে দিতো।অনুরূপভাবে অবাধ্য শয়তানদেরকেও আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত করে দিয়েছিলেন। তার জন্যে ডুবুরী কাজ করতো। তারা সমুদ্রে ডুব দিয়ে ওর তলদেশ হতে মণি মুক্তা বের করে আনতো। আরো বহু কাজ তারা করতো।যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং শয়তানদেরকে (আমি তার বাধ্য করেছিলাম), যারা সবাই ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী।” (৩৮:৩৭) এরা ছাড়া অন্যান্য শয়তানরাও তার অনুগত ছিল, যাদেরকে শিকলে আবদ্ধ রাখা হতো।মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতাম। কোন শয়তানই তার কোন ক্ষতি করতে পারতো না। বরং সবাই ছিল তার অনুগত ও অধীনস্থ। কেউই তাঁর কাছে ঘেঁষতে পারতো না। তাদের উপর তাঁরই শাসন চলতো। যাকে ইচ্ছা তিনি বন্দী করতেন এবং যাকে ইচ্ছা ছেড়ে দিতেন। তাদের কথাই বলেনঃ ‘অন্যান্য জ্বিন ছিল যারা শৃংখলে আবদ্ধ থাকতো।'

আল-আম্বিয়া 21:80

৭৮-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, ওটা ছিল আঙ্গুরের ক্ষেত্র বা বাগান। ঐ সময় আঙ্গুর গাছের গুচ্ছ বের হয়েছিল। (আরবী) শব্দের অর্থ হলো রাত্রিকালে পশুর চারণ ভূমিতে চরতে থাকা। দিবাভাগে চরাকে আরবী ভাষায় (আরবী) বলা হয়। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, ঐ বাগানটিকে বকরীগুলি নষ্ট করে দেয়। হযরত দাউদ (আঃ) ফায়সালা দেন যে, বাগানের ক্ষতি পুরণ স্বরূপ বকরীগুলি বাগানের মালিক পেয়ে যাবে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এই ফায়সালা শুনে আরয করেনঃ “ হে আল্লাহর নবী (আঃ)! এটা ছাড়া অন্য একটা ফায়সালা করা যেতে পারে তো?” হযরত দাউদ (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “ওটা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “প্রথমতঃ বকরীগুলি বাগানের মালিকের হাতে সমর্পণ করা হোক। সে ওগুলি দ্বারা ফায়েদা উঠাতে থাকবে। আর বাগান বকরীর মালিককে দেয়া হোক। সে আঙ্গুরের চারার খিদমত করতে থাকবে। অতঃপর যখন আঙ্গুরের গাছ গুলি ঠিক ঠাক হয়ে যাবে এবং পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে তখন বাগানের মালিককে বাগান ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং বাগানের মালিকও বকরীগুলি বকরীর মালিককে ফিরিয়ে দেবে।” এই আয়াতের ভাবার্থ এটাইঃ ‘আমি এই ঝগড়ার সঠিক ফায়সালা সুলাইমানকে (আঃ) বুঝিয়ে দিয়েছিলাম।”হযরত ইবনু আব্বাস (রা) বলেন যে, হযরত দাউদ (আঃ) যখন বকরীগুলি বাগানের মালিককে দিয়ে দেয়ার ফায়সালা করেন তখন বকরীর মালিকরা বেরিয়ে আসে। তাদের সাথে কুকুর ছিল। হযরত সুলাইমান (আঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের ফায়সালা কি হলো?” তারা তাদের ফায়সালার খবর দিলে তিনি বললেনঃ “আমি সেখানে হাযির থাকলে এই ফায়সালা দেয়া হতো না, বরং অন্য ফায়সালা হতো। তার এ কথা হযরত (আরবী) দাউদের (আঃ) কানে পৌঁছলে তিনি হযরত সুলাইমানকে (আঃ) ডেকে পাঠান এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! তুমি কি ফায়সালা করতে?” তখন তিনি তাঁর উপরিউক্ত ফায়সালার কথা শুনিয়ে দেন।হযরত মাসরূক (রাঃ) বলেন যে, ঐ বকরীগুলি আঙ্গুর গাছের গুচ্ছ ও পাতা সব খেয়ে ফেলেছিল। তখন হযরত সুলাইমান (আঃ) হযরত দাউদের (আঃ) বিপরীত ফায়সালা দেন যে, ঐ লোকদের বকরীগুলি বাগানের মালিকদের দিয়ে দেয়া হোক এবং ছাগলওয়ালাদেরকে বাগান সমর্পন করা হোক। যত দিন পর্যন্ত বাগান পূর্ব অবস্থায় ফিরে না আসবে ততদিন পর্যন্ত বকরী, বাচ্চা, দুধ এবং অন্যান্য সমস্ত উপকার বাগানের মালিকরা ভোগ করবে। অতঃপর প্রত্যেককে নিজনিজ জিনিস ফিরিয়ে দেয়া হবে।কাযী শুরাইহ্ এর (রাঃ) কাছেও এইরূপ একটি বিচার আসলে তিনি এই ফায়সালা করেন যে, দিনের বেলায় বকরী কোন ক্ষতি করলে ওর কোন ক্ষতিপূরণ করতে হবে না। আর যদি রাত্রি বেলায় ক্ষতি করে তবে বকরীওয়ালাদেরকে যামিন হতে হবে। অতঃপর তিনি এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।হযরত সা'দ ইবনু মাহীসাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত বারা ইবনু আযিবের (রাঃ) উন্থী একটি বাগানে প্রবেশ করে এবং বড়ই ক্ষতি করে ফেলে। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফায়সালা করেন যে, দিনের বেলায় বাগানওয়ালাদের দায়িত্ব হলো বাগানের হিফাযত করা। আর যদি পশু রাত্রিকালে বাগানের ক্ষতি করে তবে পুশুর মালিকদেরকেই ওর যামিন হতে। হবে (অর্থাৎ ক্ষতি পূরণ করতে হবে)। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) ইমাম আবু দাউদ (রাঃ) এবং ইমাম ইবনু মাজাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন) এই হাদীসে ইল্লাত সমূহ বের করা হয়েছে। আমরা কিতাবুল আহকামে আল্লাহর ফলে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছি।বর্ণিত আছে যে, হযরত আইয়াম ইবনু মুআবিয়াকে কাযী পদে নিয়োগ করার জন্যে যখন তাঁর কাছে আবেদন জানানো হয় তখন তিনি হযরত হাসান্দ্রে (রাঃ) কাছে এসে কেঁদে ফেলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আবু সাঈদ (রাঃ)! আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমার কাছে এই রিওয়াইয়াত পৌঁছেছে যে, কাযী যদি ইজতিহাদ করার পরেও ভুল করে তবে সে জাহান্নামী হবে। আর যে কুপ্রবৃত্তির প্রতি ঝুঁকে পড়ে সেও জাহান্নামী। কিন্তু যে ইজতিহাদ করার পর সঠিকতায় পৌঁছে যায় সে জান্নাতে যাবে।" তার এ কথা শুনে হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেনঃ “শুনুন, আল্লাহ তাআলা হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমানের (আঃ) ফায়সালার কথা বর্ণনা করেছেন। আর এটা প্রকাশমান যে, নবীরা (আঃ) ন্যায় বিচারক হয়ে থাকেন এবং তাঁদের কথা দ্বারা এই লোকদের কথা খণ্ডন করা যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা হযরত সুলাইমানের (আঃ) প্রশংসা করেছেন বটে, কিন্তু হযরত দাউদকে (আঃ) তিনি নিন্দা করেননি। জেনে রাখুন যে, আল্লাহ তাআলা বিচারকদের নিকট তিনটি কথার অঙ্গীকার নিয়েছেন। প্রথম অঙ্গীকার এই যে, তাঁরা যেন পার্থিব লোভের বশবর্তী হয়ে শরীয়তের আহকাম পরিবর্তন না করেন। দ্বিতীয় অঙ্গীকার এই যে, তারা যেন অন্তরের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির পিছনে না পড়েন বা প্রবৃত্তির অনুসরণ না করেন। তৃতীয় অঙ্গীকার এই যে, তারা যেন আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকেও ভয় না করেন। তারপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দাউদ (আঃ)! আমি তোমাকে যমীনের খলীফা বা প্রতিনিধি বানিয়েছি, সুতরাং তুমি লোকদের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা কর এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, অন্যথায় ওটা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিভ্রান্ত করে ফেলবে।” (৩৮:২৬) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানুষকে ভয় করো না, বরং আমাকেই ভয় কর।” (৫:৪৪) অন্য একস্থানে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা সামান্য বা নগণ্য মূল্যের বিনিময়ে আমার আয়াতসমূহ। বিক্রি করো না।” (৫:৪৪) আমি বলি যে, নবীরা যে নিস্পাপ এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাদেরকে যে সাহায্য করা হয়ে থাকে এ বিষয়ে পূর্বযুগীয় ও পরযুগীয় গুরুজনদের মধ্যে কোন মতানৈক্য নেই। তাদের ছাড়া অন্যদের ব্যাপারে কথা এই যে, হযরত আম্র ইনবুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “বিচারক যখন ইজতিহাদ ও চেষ্টা করার পর সঠিকতায় পৌঁছে যায় তখন সে দুটো প্রতিদান লাভ করে। আর ইজতিহাদের পর যদি তার ভূল হয়ে যায় তবে তার জন্যে রয়েছে একটি প্রতিদান।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রাঃ) স্বীয় সহীহ্ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এহাদীসটি পরিষ্কারভাবে বলে দিচ্ছে যে, পুর্ণভাবে চেষ্টা চালানোর পরেও যদি বিচারক ভুল করে দেয় তবে সে জাহান্নামী হবে বলে যে ধারণা ও সন্দেহ হযরত আইয়াস (রাঃ) করেছেন তা ঠিক নয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সুনানের একটি হাদীসে রয়েছে যে, বিচারক তিন প্রকার। এক প্রকারের বিচারক জান্নাতী ও দু'প্রকারের বিচারক জাহান্নামী। যে সত্য ও ন্যায় জানে এবং তদনুযায়ী ফায়সালা করে সে জান্নাতী। যে না জেনে ফায়সালা করে সে জাহান্নামী এবং যে সত্য জেনে শুনে ওর বিপরীত ফায়সালা করে সেও জাহান্নামী। কুরআন কারীমে বর্ণিত এই ঘটনার কাছাকাছিই আর একটি ঘটনা মুসনাদে আহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “দু'টি মহিলা ছিল, যাদের সাথে তাদের দুটি পুত্র সন্তান ছিল, (তারা ছিল দুগ্ধ পোষ্য শিশু)। একজনের শিশুকে বাঘে ধরে নিয়ে যায়। এখন মহিলা দুটির প্রত্যেকেই একে অপরকে বলেঃ “বাঘে তোমার শিশুকে ধরে নিয়ে গেছে এবং যেটা আছে আমারই।” অবশেষে তারা হযরত দাউদের (আঃ) নিকট এই মুকাদ্দামা পেশ করে। তখন তিনি ফায়সালা দেন যে, শিশুটি বড় স্ত্রী লোকটির প্রাপ্য। অতঃপর তারা দুজন বেরিয়ে আসে। পথে হযরত সুলাইমান (আঃ) ছিলেন। তিনি তাদেরকে ডাকলেন এবং (লোকদেরকে) বললেন “ছুরী নিয়ে এসো। আমি এই শিশুটিকে কেটে দুটুকরা করে দেবো এবং অর্ধেক করে দু’জনকে প্রদান করবো।” এতে বড় স্ত্রী লোকটি চুপ থাকলো। কিন্তু ছোট স্ত্রী লোকটি বললোঃ “আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন! শিশুটিকে কাটবেন ন। এটা বড় স্ত্রী লোকটিরই। সুতরাং তাকেই দিয়ে দিন।" হযরত সুলাইমান (আঃ) প্রকৃত ব্যাপার বুঝে নেন এবং শিশুটিকে ঐ ছোট স্ত্রী লোকটিকে দিয়ে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নাসায়ী (রাঃ) এর উপর একটি অনুচ্ছেদ বেঁধেছেন যে, বিচারক যদি নিজের ফায়সালা অন্তরে গোপন রেখে প্রকৃত রহস্য জানবার উদ্দেশ্যে ওর বিপরীত কিছু বলেন তবে তা জায়েয হবে)এ ধরনেরই একটি ঘটনা হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, বানী ইসরাঈলের যুগে একটি সুন্দরী নারী ছিল, যার প্রেমে চারজন নেতৃস্থানীয় লোক আসক্ত হয়ে পড়ে এবং তার সাথে ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়ার ইচ্ছা করে। কিন্তু ঐ নারী তা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করে। তখন তারা তার প্রতি চরম দুঃখিত ও রাগান্বিত হয় এবং চারজন একমত হয়ে হযরত দাউদের (আঃ) বিচারালয়ে উপস্থিত হয় ও সাক্ষ্য প্রদান করে যে, সে তার কুকুরের দ্বারা নিজের কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করে। চার জনের সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে হযরত দাউদ (আঃ) মহিলাটিকে রজম (পাথর নিক্ষেপে হত্যা করার নিদের্শ দেন। ঐ দিনই সন্ধ্যায় হযরত সুলাইমান (আঃ) নিজের সমবয়সী ছেলেদের নিয়ে বসেন। তিনি বিচারক হন এবং চার জন ছেলে ঐ লোকগুলির মত তার কাছে ঐ মুকাদ্দামা পেশ করে এবং একটি স্ত্রীলোকের সম্বন্ধে ঐ কথাই বলে। হযরত সুলাইমান (আঃ) ঐ চারজনকে পৃথক পৃথক করে দেয়ার নিদের্শ দেন। তার পর একজনকে তিনি তাঁর কাছে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “ঐ কুকুরটির রং কেমন ছিল?” সে উত্তরে বলেঃ “কালো”। এরপর দ্বিতীয় জনকে পৃথক ভাবে ডেকে ঐ প্রশ্নই করেন। সে জবাব দেয়ঃ “সাদা।” তিনি তৎক্ষণাৎ ফায়সালা দেন যে, স্ত্রী লোকটির উপর এটা অপবাদ ছাড়া কিছুই নয় এবং এই চারজনকে হত্যা করে দেওয়া হোক।” হযরত দাউদের (আঃ) নিকটও এই ঘটনাটি পেশ করা হলো। তিনি তখনই ঐ চারজন নেতৃ স্থানীয় লোককে ডেকে পাঠান এবং ঐ রূপেই পৃথক পৃথক ভাবে তাদেরকে কুকুরটির রং সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয়। তারা এক একজন এক এক কথা বলে এবং গড় বড় করে দেয়। হযরত দাউদের (আঃ) কাছে তারা মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়ে যায়। সুতরাং তিনি তাদেরকে হত্যা করে দেয়ার নিদের্শ দেন। (এটা হাফিয আবুল কাসিম ইবনু আসাকির (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি বিহঙ্গকুলের জন্যে নিয়ম করে দিয়েছিলাম যে, তারা যেন হযরত দাউদের (আঃ) সাথে আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। হযরত দাউদকে (আঃ) এমন মিষ্ট কণ্ঠস্বর দান করা হয়েছিল যে, যখন তিনি মিষ্টি সুরে ও আন্তরিকতার সাথে যরূর পাঠ করতেন। তখন পক্ষীকূল উড়ন বাদ দিয়ে থেমে যেতো এবং তার সুরে সুরে মিলিয়ে আল্লাহর তাসবীহ পাঠে লেগে পড়তো। অনুরূপভাবে পাহাড় পর্বতও তাসবীহ পাঠ করতো। বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) কুরআন কারীম পাঠ করছিলেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেখান দিয়ে গমন করছিলেন। তার মিষ্টি সূরে কুরআন পাঠ শুনে তিনি দাড়িয়ে যান এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে শুনতে থাকেন। তারপর তিনি বলেনঃ “একে তো আ'লে দাউদের (আঃ) মত মিষ্টি সুর দান করা হয়েছে। হযরত আবু মূসা (রাঃ) এটা জানতে পেরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমি যদি জানতাম যে, আপনি আমার কুরআন পাঠ শুনতে ছিলেন। তবে আমি আরো উত্তম রূপে পাঠ করতাম।”হযরত আবু উছমান নাহদী (রাঃ) বলেনঃ “ আমি কোন উত্তম বাজনার মধ্যে ঐ মজা পাই নাই যা হযরত আবূ মূসার (রাঃ) কণ্ঠস্বরে পেতাম।” সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার উত্তম কণ্ঠ স্বরকে হযরত দাউদের (আঃ) উত্তম ও মিষ্ট কণ্ঠস্বরের একটি অংশ বলেছেন। তাহলে স্বয়ং হযরত দাউদের কণ্ঠস্বর কত মধুর ছিল তা সহজেই অনুমেয়।আল্লাহ তাআলা তাঁর আর একটি অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেনঃ “আমি দাউদকে (আঃ) তোমাদের জন্যে বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে ওটা তোমাদেরকে তোমাদের যুদ্ধে রক্ষা করে। তার যুগের পূর্বে হল্কা বিহীন বর্ম নির্মিত হতো। হলকা বিশিষ্ট বর্ম তিনিই তৈরী করেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) “তার জন্যে আমি লৌহকে নমনীয় করেছিলাম। (হে দাউদ (আঃ)! উদ্দেশ্য এই যে, যাতে তুমি পূর্ণ মাপের বর্ম তৈরী করতে এবং বুননে পরিমাণ রক্ষা করতে পার।" (৩৪:১০-১১) এই বর্ম যুদ্ধের মাঠে কাজে লাগতো। সুতরাং এটা ছিল এমনই নিয়ামত যার কারণে মানুষের উচিত মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। তাই তিনি বলেনঃ তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে না?"এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি সুলাইমানের (আঃ) বশীভূত করেছিলাম উদ্দাম বায়ুকে, ওটা তার আদেশক্রমে প্রবাহিত হতো সেই দেশের দিকে যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি। অর্থাৎ ঐ বায়ু তাকে সিরিয়ায় পৌঁছিয়ে দিতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত হযরত সুলাইমান (আঃ) তার লোক-লশকর, সাজ-সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্রসহ তার সিংহাসনে বসে যেতেন। অতঃপর বায়ু তাঁকে তাঁর গন্তব্য স্থানে ক্ষণিকের মধ্যে পৌছিয়ে দিতো। সিংহাসনের উপর হতে পাখী পালক দ্বারা তাকে ছায়া করতো। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তার অধীন করে দিলাম বায়ুকে, যা তার আদেশে সে যেখানেই ইচ্ছা করতো সেথায় মৃদুমন্দ গতিতে প্রবাহিত হতো।" (৩৮:৩৬) মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(আমি সুলাইমানের (আঃ) অধীন করেছিলাম বায়ুকে) যা প্রভাতে এক মাসের পথ অতিক্রম করতো এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ অতিক্রম করতো।” (৩৪:১২) হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, ছয় লক্ষ চেয়ার রাখাহতো। তার পাশে বসতো মু'মিন মানুষ এবং তাদের পিছনে বসতো মু'মিন জ্বিন। তারপর তাঁর নির্দেশক্রমে পক্ষীকুল সবারই উপর ছায়া করতো। অতঃপর তার আদেশ অনুযায়ী বায়ু তাঁকে নিয়ে চলতে শুরু করতো। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন) তার উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উবাইদিল্লাহ ইবনু উমাইর (রাঃ) বলেন যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) বাতাসকে হুকুম করতেন তখন ওটা স্থূপাকারে জমা হয়ে যেতো, যেন ওটা পাহাড়। তারপর তিনি তাঁর ফরাশ আনার নিদের্শ দিতেন। তখন উচু জায়গায় রেখে দেয়া হতো। অতঃপর তিনি তাঁর ডানা ওয়ালা ঘোড়া আনার হুকুম করতেন।এরপর তিনি ঐ ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে স্বীয় ফরাশে উঠে বসতেন। অতঃপর তাঁর নির্দেশক্রমে বায়ূ তাকে উপরে উঠিয়ে নিয়ে যেতো। ঐ সময় তিনি মাথা নীচু করে থাকতেন। ডানে বামে মোটেই তাকাতেন না। এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হতো বিনয় ও আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। কেননা, নিজের নীচতার জ্ঞান তাঁর ছিল। অতঃপর বায়ুকে তিনি যেখানে নামাবার হুকুম করতেন সেখানেই নামিয়ে দিতো।অনুরূপভাবে অবাধ্য শয়তানদেরকেও আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত করে দিয়েছিলেন। তার জন্যে ডুবুরী কাজ করতো। তারা সমুদ্রে ডুব দিয়ে ওর তলদেশ হতে মণি মুক্তা বের করে আনতো। আরো বহু কাজ তারা করতো।যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং শয়তানদেরকে (আমি তার বাধ্য করেছিলাম), যারা সবাই ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী।” (৩৮:৩৭) এরা ছাড়া অন্যান্য শয়তানরাও তার অনুগত ছিল, যাদেরকে শিকলে আবদ্ধ রাখা হতো।মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতাম। কোন শয়তানই তার কোন ক্ষতি করতে পারতো না। বরং সবাই ছিল তার অনুগত ও অধীনস্থ। কেউই তাঁর কাছে ঘেঁষতে পারতো না। তাদের উপর তাঁরই শাসন চলতো। যাকে ইচ্ছা তিনি বন্দী করতেন এবং যাকে ইচ্ছা ছেড়ে দিতেন। তাদের কথাই বলেনঃ ‘অন্যান্য জ্বিন ছিল যারা শৃংখলে আবদ্ধ থাকতো।'

আল-আম্বিয়া 21:81

৭৮-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, ওটা ছিল আঙ্গুরের ক্ষেত্র বা বাগান। ঐ সময় আঙ্গুর গাছের গুচ্ছ বের হয়েছিল। (আরবী) শব্দের অর্থ হলো রাত্রিকালে পশুর চারণ ভূমিতে চরতে থাকা। দিবাভাগে চরাকে আরবী ভাষায় (আরবী) বলা হয়। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, ঐ বাগানটিকে বকরীগুলি নষ্ট করে দেয়। হযরত দাউদ (আঃ) ফায়সালা দেন যে, বাগানের ক্ষতি পুরণ স্বরূপ বকরীগুলি বাগানের মালিক পেয়ে যাবে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এই ফায়সালা শুনে আরয করেনঃ “ হে আল্লাহর নবী (আঃ)! এটা ছাড়া অন্য একটা ফায়সালা করা যেতে পারে তো?” হযরত দাউদ (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “ওটা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “প্রথমতঃ বকরীগুলি বাগানের মালিকের হাতে সমর্পণ করা হোক। সে ওগুলি দ্বারা ফায়েদা উঠাতে থাকবে। আর বাগান বকরীর মালিককে দেয়া হোক। সে আঙ্গুরের চারার খিদমত করতে থাকবে। অতঃপর যখন আঙ্গুরের গাছ গুলি ঠিক ঠাক হয়ে যাবে এবং পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে তখন বাগানের মালিককে বাগান ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং বাগানের মালিকও বকরীগুলি বকরীর মালিককে ফিরিয়ে দেবে।” এই আয়াতের ভাবার্থ এটাইঃ ‘আমি এই ঝগড়ার সঠিক ফায়সালা সুলাইমানকে (আঃ) বুঝিয়ে দিয়েছিলাম।”হযরত ইবনু আব্বাস (রা) বলেন যে, হযরত দাউদ (আঃ) যখন বকরীগুলি বাগানের মালিককে দিয়ে দেয়ার ফায়সালা করেন তখন বকরীর মালিকরা বেরিয়ে আসে। তাদের সাথে কুকুর ছিল। হযরত সুলাইমান (আঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের ফায়সালা কি হলো?” তারা তাদের ফায়সালার খবর দিলে তিনি বললেনঃ “আমি সেখানে হাযির থাকলে এই ফায়সালা দেয়া হতো না, বরং অন্য ফায়সালা হতো। তার এ কথা হযরত (আরবী) দাউদের (আঃ) কানে পৌঁছলে তিনি হযরত সুলাইমানকে (আঃ) ডেকে পাঠান এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! তুমি কি ফায়সালা করতে?” তখন তিনি তাঁর উপরিউক্ত ফায়সালার কথা শুনিয়ে দেন।হযরত মাসরূক (রাঃ) বলেন যে, ঐ বকরীগুলি আঙ্গুর গাছের গুচ্ছ ও পাতা সব খেয়ে ফেলেছিল। তখন হযরত সুলাইমান (আঃ) হযরত দাউদের (আঃ) বিপরীত ফায়সালা দেন যে, ঐ লোকদের বকরীগুলি বাগানের মালিকদের দিয়ে দেয়া হোক এবং ছাগলওয়ালাদেরকে বাগান সমর্পন করা হোক। যত দিন পর্যন্ত বাগান পূর্ব অবস্থায় ফিরে না আসবে ততদিন পর্যন্ত বকরী, বাচ্চা, দুধ এবং অন্যান্য সমস্ত উপকার বাগানের মালিকরা ভোগ করবে। অতঃপর প্রত্যেককে নিজনিজ জিনিস ফিরিয়ে দেয়া হবে।কাযী শুরাইহ্ এর (রাঃ) কাছেও এইরূপ একটি বিচার আসলে তিনি এই ফায়সালা করেন যে, দিনের বেলায় বকরী কোন ক্ষতি করলে ওর কোন ক্ষতিপূরণ করতে হবে না। আর যদি রাত্রি বেলায় ক্ষতি করে তবে বকরীওয়ালাদেরকে যামিন হতে হবে। অতঃপর তিনি এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।হযরত সা'দ ইবনু মাহীসাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত বারা ইবনু আযিবের (রাঃ) উন্থী একটি বাগানে প্রবেশ করে এবং বড়ই ক্ষতি করে ফেলে। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফায়সালা করেন যে, দিনের বেলায় বাগানওয়ালাদের দায়িত্ব হলো বাগানের হিফাযত করা। আর যদি পশু রাত্রিকালে বাগানের ক্ষতি করে তবে পুশুর মালিকদেরকেই ওর যামিন হতে। হবে (অর্থাৎ ক্ষতি পূরণ করতে হবে)। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) ইমাম আবু দাউদ (রাঃ) এবং ইমাম ইবনু মাজাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন) এই হাদীসে ইল্লাত সমূহ বের করা হয়েছে। আমরা কিতাবুল আহকামে আল্লাহর ফলে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছি।বর্ণিত আছে যে, হযরত আইয়াম ইবনু মুআবিয়াকে কাযী পদে নিয়োগ করার জন্যে যখন তাঁর কাছে আবেদন জানানো হয় তখন তিনি হযরত হাসান্দ্রে (রাঃ) কাছে এসে কেঁদে ফেলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আবু সাঈদ (রাঃ)! আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমার কাছে এই রিওয়াইয়াত পৌঁছেছে যে, কাযী যদি ইজতিহাদ করার পরেও ভুল করে তবে সে জাহান্নামী হবে। আর যে কুপ্রবৃত্তির প্রতি ঝুঁকে পড়ে সেও জাহান্নামী। কিন্তু যে ইজতিহাদ করার পর সঠিকতায় পৌঁছে যায় সে জান্নাতে যাবে।" তার এ কথা শুনে হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেনঃ “শুনুন, আল্লাহ তাআলা হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমানের (আঃ) ফায়সালার কথা বর্ণনা করেছেন। আর এটা প্রকাশমান যে, নবীরা (আঃ) ন্যায় বিচারক হয়ে থাকেন এবং তাঁদের কথা দ্বারা এই লোকদের কথা খণ্ডন করা যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা হযরত সুলাইমানের (আঃ) প্রশংসা করেছেন বটে, কিন্তু হযরত দাউদকে (আঃ) তিনি নিন্দা করেননি। জেনে রাখুন যে, আল্লাহ তাআলা বিচারকদের নিকট তিনটি কথার অঙ্গীকার নিয়েছেন। প্রথম অঙ্গীকার এই যে, তাঁরা যেন পার্থিব লোভের বশবর্তী হয়ে শরীয়তের আহকাম পরিবর্তন না করেন। দ্বিতীয় অঙ্গীকার এই যে, তারা যেন অন্তরের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির পিছনে না পড়েন বা প্রবৃত্তির অনুসরণ না করেন। তৃতীয় অঙ্গীকার এই যে, তারা যেন আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকেও ভয় না করেন। তারপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দাউদ (আঃ)! আমি তোমাকে যমীনের খলীফা বা প্রতিনিধি বানিয়েছি, সুতরাং তুমি লোকদের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা কর এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, অন্যথায় ওটা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিভ্রান্ত করে ফেলবে।” (৩৮:২৬) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানুষকে ভয় করো না, বরং আমাকেই ভয় কর।” (৫:৪৪) অন্য একস্থানে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা সামান্য বা নগণ্য মূল্যের বিনিময়ে আমার আয়াতসমূহ। বিক্রি করো না।” (৫:৪৪) আমি বলি যে, নবীরা যে নিস্পাপ এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাদেরকে যে সাহায্য করা হয়ে থাকে এ বিষয়ে পূর্বযুগীয় ও পরযুগীয় গুরুজনদের মধ্যে কোন মতানৈক্য নেই। তাদের ছাড়া অন্যদের ব্যাপারে কথা এই যে, হযরত আম্র ইনবুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “বিচারক যখন ইজতিহাদ ও চেষ্টা করার পর সঠিকতায় পৌঁছে যায় তখন সে দুটো প্রতিদান লাভ করে। আর ইজতিহাদের পর যদি তার ভূল হয়ে যায় তবে তার জন্যে রয়েছে একটি প্রতিদান।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রাঃ) স্বীয় সহীহ্ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এহাদীসটি পরিষ্কারভাবে বলে দিচ্ছে যে, পুর্ণভাবে চেষ্টা চালানোর পরেও যদি বিচারক ভুল করে দেয় তবে সে জাহান্নামী হবে বলে যে ধারণা ও সন্দেহ হযরত আইয়াস (রাঃ) করেছেন তা ঠিক নয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সুনানের একটি হাদীসে রয়েছে যে, বিচারক তিন প্রকার। এক প্রকারের বিচারক জান্নাতী ও দু'প্রকারের বিচারক জাহান্নামী। যে সত্য ও ন্যায় জানে এবং তদনুযায়ী ফায়সালা করে সে জান্নাতী। যে না জেনে ফায়সালা করে সে জাহান্নামী এবং যে সত্য জেনে শুনে ওর বিপরীত ফায়সালা করে সেও জাহান্নামী। কুরআন কারীমে বর্ণিত এই ঘটনার কাছাকাছিই আর একটি ঘটনা মুসনাদে আহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “দু'টি মহিলা ছিল, যাদের সাথে তাদের দুটি পুত্র সন্তান ছিল, (তারা ছিল দুগ্ধ পোষ্য শিশু)। একজনের শিশুকে বাঘে ধরে নিয়ে যায়। এখন মহিলা দুটির প্রত্যেকেই একে অপরকে বলেঃ “বাঘে তোমার শিশুকে ধরে নিয়ে গেছে এবং যেটা আছে আমারই।” অবশেষে তারা হযরত দাউদের (আঃ) নিকট এই মুকাদ্দামা পেশ করে। তখন তিনি ফায়সালা দেন যে, শিশুটি বড় স্ত্রী লোকটির প্রাপ্য। অতঃপর তারা দুজন বেরিয়ে আসে। পথে হযরত সুলাইমান (আঃ) ছিলেন। তিনি তাদেরকে ডাকলেন এবং (লোকদেরকে) বললেন “ছুরী নিয়ে এসো। আমি এই শিশুটিকে কেটে দুটুকরা করে দেবো এবং অর্ধেক করে দু’জনকে প্রদান করবো।” এতে বড় স্ত্রী লোকটি চুপ থাকলো। কিন্তু ছোট স্ত্রী লোকটি বললোঃ “আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন! শিশুটিকে কাটবেন ন। এটা বড় স্ত্রী লোকটিরই। সুতরাং তাকেই দিয়ে দিন।" হযরত সুলাইমান (আঃ) প্রকৃত ব্যাপার বুঝে নেন এবং শিশুটিকে ঐ ছোট স্ত্রী লোকটিকে দিয়ে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নাসায়ী (রাঃ) এর উপর একটি অনুচ্ছেদ বেঁধেছেন যে, বিচারক যদি নিজের ফায়সালা অন্তরে গোপন রেখে প্রকৃত রহস্য জানবার উদ্দেশ্যে ওর বিপরীত কিছু বলেন তবে তা জায়েয হবে)এ ধরনেরই একটি ঘটনা হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, বানী ইসরাঈলের যুগে একটি সুন্দরী নারী ছিল, যার প্রেমে চারজন নেতৃস্থানীয় লোক আসক্ত হয়ে পড়ে এবং তার সাথে ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়ার ইচ্ছা করে। কিন্তু ঐ নারী তা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করে। তখন তারা তার প্রতি চরম দুঃখিত ও রাগান্বিত হয় এবং চারজন একমত হয়ে হযরত দাউদের (আঃ) বিচারালয়ে উপস্থিত হয় ও সাক্ষ্য প্রদান করে যে, সে তার কুকুরের দ্বারা নিজের কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করে। চার জনের সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে হযরত দাউদ (আঃ) মহিলাটিকে রজম (পাথর নিক্ষেপে হত্যা করার নিদের্শ দেন। ঐ দিনই সন্ধ্যায় হযরত সুলাইমান (আঃ) নিজের সমবয়সী ছেলেদের নিয়ে বসেন। তিনি বিচারক হন এবং চার জন ছেলে ঐ লোকগুলির মত তার কাছে ঐ মুকাদ্দামা পেশ করে এবং একটি স্ত্রীলোকের সম্বন্ধে ঐ কথাই বলে। হযরত সুলাইমান (আঃ) ঐ চারজনকে পৃথক পৃথক করে দেয়ার নিদের্শ দেন। তার পর একজনকে তিনি তাঁর কাছে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “ঐ কুকুরটির রং কেমন ছিল?” সে উত্তরে বলেঃ “কালো”। এরপর দ্বিতীয় জনকে পৃথক ভাবে ডেকে ঐ প্রশ্নই করেন। সে জবাব দেয়ঃ “সাদা।” তিনি তৎক্ষণাৎ ফায়সালা দেন যে, স্ত্রী লোকটির উপর এটা অপবাদ ছাড়া কিছুই নয় এবং এই চারজনকে হত্যা করে দেওয়া হোক।” হযরত দাউদের (আঃ) নিকটও এই ঘটনাটি পেশ করা হলো। তিনি তখনই ঐ চারজন নেতৃ স্থানীয় লোককে ডেকে পাঠান এবং ঐ রূপেই পৃথক পৃথক ভাবে তাদেরকে কুকুরটির রং সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয়। তারা এক একজন এক এক কথা বলে এবং গড় বড় করে দেয়। হযরত দাউদের (আঃ) কাছে তারা মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়ে যায়। সুতরাং তিনি তাদেরকে হত্যা করে দেয়ার নিদের্শ দেন। (এটা হাফিয আবুল কাসিম ইবনু আসাকির (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি বিহঙ্গকুলের জন্যে নিয়ম করে দিয়েছিলাম যে, তারা যেন হযরত দাউদের (আঃ) সাথে আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। হযরত দাউদকে (আঃ) এমন মিষ্ট কণ্ঠস্বর দান করা হয়েছিল যে, যখন তিনি মিষ্টি সুরে ও আন্তরিকতার সাথে যরূর পাঠ করতেন। তখন পক্ষীকূল উড়ন বাদ দিয়ে থেমে যেতো এবং তার সুরে সুরে মিলিয়ে আল্লাহর তাসবীহ পাঠে লেগে পড়তো। অনুরূপভাবে পাহাড় পর্বতও তাসবীহ পাঠ করতো। বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) কুরআন কারীম পাঠ করছিলেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেখান দিয়ে গমন করছিলেন। তার মিষ্টি সূরে কুরআন পাঠ শুনে তিনি দাড়িয়ে যান এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে শুনতে থাকেন। তারপর তিনি বলেনঃ “একে তো আ'লে দাউদের (আঃ) মত মিষ্টি সুর দান করা হয়েছে। হযরত আবু মূসা (রাঃ) এটা জানতে পেরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমি যদি জানতাম যে, আপনি আমার কুরআন পাঠ শুনতে ছিলেন। তবে আমি আরো উত্তম রূপে পাঠ করতাম।”হযরত আবু উছমান নাহদী (রাঃ) বলেনঃ “ আমি কোন উত্তম বাজনার মধ্যে ঐ মজা পাই নাই যা হযরত আবূ মূসার (রাঃ) কণ্ঠস্বরে পেতাম।” সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার উত্তম কণ্ঠ স্বরকে হযরত দাউদের (আঃ) উত্তম ও মিষ্ট কণ্ঠস্বরের একটি অংশ বলেছেন। তাহলে স্বয়ং হযরত দাউদের কণ্ঠস্বর কত মধুর ছিল তা সহজেই অনুমেয়।আল্লাহ তাআলা তাঁর আর একটি অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেনঃ “আমি দাউদকে (আঃ) তোমাদের জন্যে বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে ওটা তোমাদেরকে তোমাদের যুদ্ধে রক্ষা করে। তার যুগের পূর্বে হল্কা বিহীন বর্ম নির্মিত হতো। হলকা বিশিষ্ট বর্ম তিনিই তৈরী করেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) “তার জন্যে আমি লৌহকে নমনীয় করেছিলাম। (হে দাউদ (আঃ)! উদ্দেশ্য এই যে, যাতে তুমি পূর্ণ মাপের বর্ম তৈরী করতে এবং বুননে পরিমাণ রক্ষা করতে পার।" (৩৪:১০-১১) এই বর্ম যুদ্ধের মাঠে কাজে লাগতো। সুতরাং এটা ছিল এমনই নিয়ামত যার কারণে মানুষের উচিত মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। তাই তিনি বলেনঃ তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে না?"এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি সুলাইমানের (আঃ) বশীভূত করেছিলাম উদ্দাম বায়ুকে, ওটা তার আদেশক্রমে প্রবাহিত হতো সেই দেশের দিকে যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি। অর্থাৎ ঐ বায়ু তাকে সিরিয়ায় পৌঁছিয়ে দিতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত হযরত সুলাইমান (আঃ) তার লোক-লশকর, সাজ-সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্রসহ তার সিংহাসনে বসে যেতেন। অতঃপর বায়ু তাঁকে তাঁর গন্তব্য স্থানে ক্ষণিকের মধ্যে পৌছিয়ে দিতো। সিংহাসনের উপর হতে পাখী পালক দ্বারা তাকে ছায়া করতো। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তার অধীন করে দিলাম বায়ুকে, যা তার আদেশে সে যেখানেই ইচ্ছা করতো সেথায় মৃদুমন্দ গতিতে প্রবাহিত হতো।" (৩৮:৩৬) মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(আমি সুলাইমানের (আঃ) অধীন করেছিলাম বায়ুকে) যা প্রভাতে এক মাসের পথ অতিক্রম করতো এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ অতিক্রম করতো।” (৩৪:১২) হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, ছয় লক্ষ চেয়ার রাখাহতো। তার পাশে বসতো মু'মিন মানুষ এবং তাদের পিছনে বসতো মু'মিন জ্বিন। তারপর তাঁর নির্দেশক্রমে পক্ষীকুল সবারই উপর ছায়া করতো। অতঃপর তার আদেশ অনুযায়ী বায়ু তাঁকে নিয়ে চলতে শুরু করতো। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন) তার উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উবাইদিল্লাহ ইবনু উমাইর (রাঃ) বলেন যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) বাতাসকে হুকুম করতেন তখন ওটা স্থূপাকারে জমা হয়ে যেতো, যেন ওটা পাহাড়। তারপর তিনি তাঁর ফরাশ আনার নিদের্শ দিতেন। তখন উচু জায়গায় রেখে দেয়া হতো। অতঃপর তিনি তাঁর ডানা ওয়ালা ঘোড়া আনার হুকুম করতেন।এরপর তিনি ঐ ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে স্বীয় ফরাশে উঠে বসতেন। অতঃপর তাঁর নির্দেশক্রমে বায়ূ তাকে উপরে উঠিয়ে নিয়ে যেতো। ঐ সময় তিনি মাথা নীচু করে থাকতেন। ডানে বামে মোটেই তাকাতেন না। এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হতো বিনয় ও আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। কেননা, নিজের নীচতার জ্ঞান তাঁর ছিল। অতঃপর বায়ুকে তিনি যেখানে নামাবার হুকুম করতেন সেখানেই নামিয়ে দিতো।অনুরূপভাবে অবাধ্য শয়তানদেরকেও আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত করে দিয়েছিলেন। তার জন্যে ডুবুরী কাজ করতো। তারা সমুদ্রে ডুব দিয়ে ওর তলদেশ হতে মণি মুক্তা বের করে আনতো। আরো বহু কাজ তারা করতো।যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং শয়তানদেরকে (আমি তার বাধ্য করেছিলাম), যারা সবাই ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী।” (৩৮:৩৭) এরা ছাড়া অন্যান্য শয়তানরাও তার অনুগত ছিল, যাদেরকে শিকলে আবদ্ধ রাখা হতো।মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতাম। কোন শয়তানই তার কোন ক্ষতি করতে পারতো না। বরং সবাই ছিল তার অনুগত ও অধীনস্থ। কেউই তাঁর কাছে ঘেঁষতে পারতো না। তাদের উপর তাঁরই শাসন চলতো। যাকে ইচ্ছা তিনি বন্দী করতেন এবং যাকে ইচ্ছা ছেড়ে দিতেন। তাদের কথাই বলেনঃ ‘অন্যান্য জ্বিন ছিল যারা শৃংখলে আবদ্ধ থাকতো।'

আল-আম্বিয়া 21:82

৭৮-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, ওটা ছিল আঙ্গুরের ক্ষেত্র বা বাগান। ঐ সময় আঙ্গুর গাছের গুচ্ছ বের হয়েছিল। (আরবী) শব্দের অর্থ হলো রাত্রিকালে পশুর চারণ ভূমিতে চরতে থাকা। দিবাভাগে চরাকে আরবী ভাষায় (আরবী) বলা হয়। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, ঐ বাগানটিকে বকরীগুলি নষ্ট করে দেয়। হযরত দাউদ (আঃ) ফায়সালা দেন যে, বাগানের ক্ষতি পুরণ স্বরূপ বকরীগুলি বাগানের মালিক পেয়ে যাবে। হযরত সুলাইমান (আঃ) এই ফায়সালা শুনে আরয করেনঃ “ হে আল্লাহর নবী (আঃ)! এটা ছাড়া অন্য একটা ফায়সালা করা যেতে পারে তো?” হযরত দাউদ (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “ওটা কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “প্রথমতঃ বকরীগুলি বাগানের মালিকের হাতে সমর্পণ করা হোক। সে ওগুলি দ্বারা ফায়েদা উঠাতে থাকবে। আর বাগান বকরীর মালিককে দেয়া হোক। সে আঙ্গুরের চারার খিদমত করতে থাকবে। অতঃপর যখন আঙ্গুরের গাছ গুলি ঠিক ঠাক হয়ে যাবে এবং পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে তখন বাগানের মালিককে বাগান ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং বাগানের মালিকও বকরীগুলি বকরীর মালিককে ফিরিয়ে দেবে।” এই আয়াতের ভাবার্থ এটাইঃ ‘আমি এই ঝগড়ার সঠিক ফায়সালা সুলাইমানকে (আঃ) বুঝিয়ে দিয়েছিলাম।”হযরত ইবনু আব্বাস (রা) বলেন যে, হযরত দাউদ (আঃ) যখন বকরীগুলি বাগানের মালিককে দিয়ে দেয়ার ফায়সালা করেন তখন বকরীর মালিকরা বেরিয়ে আসে। তাদের সাথে কুকুর ছিল। হযরত সুলাইমান (আঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের ফায়সালা কি হলো?” তারা তাদের ফায়সালার খবর দিলে তিনি বললেনঃ “আমি সেখানে হাযির থাকলে এই ফায়সালা দেয়া হতো না, বরং অন্য ফায়সালা হতো। তার এ কথা হযরত (আরবী) দাউদের (আঃ) কানে পৌঁছলে তিনি হযরত সুলাইমানকে (আঃ) ডেকে পাঠান এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! তুমি কি ফায়সালা করতে?” তখন তিনি তাঁর উপরিউক্ত ফায়সালার কথা শুনিয়ে দেন।হযরত মাসরূক (রাঃ) বলেন যে, ঐ বকরীগুলি আঙ্গুর গাছের গুচ্ছ ও পাতা সব খেয়ে ফেলেছিল। তখন হযরত সুলাইমান (আঃ) হযরত দাউদের (আঃ) বিপরীত ফায়সালা দেন যে, ঐ লোকদের বকরীগুলি বাগানের মালিকদের দিয়ে দেয়া হোক এবং ছাগলওয়ালাদেরকে বাগান সমর্পন করা হোক। যত দিন পর্যন্ত বাগান পূর্ব অবস্থায় ফিরে না আসবে ততদিন পর্যন্ত বকরী, বাচ্চা, দুধ এবং অন্যান্য সমস্ত উপকার বাগানের মালিকরা ভোগ করবে। অতঃপর প্রত্যেককে নিজনিজ জিনিস ফিরিয়ে দেয়া হবে।কাযী শুরাইহ্ এর (রাঃ) কাছেও এইরূপ একটি বিচার আসলে তিনি এই ফায়সালা করেন যে, দিনের বেলায় বকরী কোন ক্ষতি করলে ওর কোন ক্ষতিপূরণ করতে হবে না। আর যদি রাত্রি বেলায় ক্ষতি করে তবে বকরীওয়ালাদেরকে যামিন হতে হবে। অতঃপর তিনি এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।হযরত সা'দ ইবনু মাহীসাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত বারা ইবনু আযিবের (রাঃ) উন্থী একটি বাগানে প্রবেশ করে এবং বড়ই ক্ষতি করে ফেলে। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফায়সালা করেন যে, দিনের বেলায় বাগানওয়ালাদের দায়িত্ব হলো বাগানের হিফাযত করা। আর যদি পশু রাত্রিকালে বাগানের ক্ষতি করে তবে পুশুর মালিকদেরকেই ওর যামিন হতে। হবে (অর্থাৎ ক্ষতি পূরণ করতে হবে)। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) ইমাম আবু দাউদ (রাঃ) এবং ইমাম ইবনু মাজাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন) এই হাদীসে ইল্লাত সমূহ বের করা হয়েছে। আমরা কিতাবুল আহকামে আল্লাহর ফলে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছি।বর্ণিত আছে যে, হযরত আইয়াম ইবনু মুআবিয়াকে কাযী পদে নিয়োগ করার জন্যে যখন তাঁর কাছে আবেদন জানানো হয় তখন তিনি হযরত হাসান্দ্রে (রাঃ) কাছে এসে কেঁদে ফেলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আবু সাঈদ (রাঃ)! আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমার কাছে এই রিওয়াইয়াত পৌঁছেছে যে, কাযী যদি ইজতিহাদ করার পরেও ভুল করে তবে সে জাহান্নামী হবে। আর যে কুপ্রবৃত্তির প্রতি ঝুঁকে পড়ে সেও জাহান্নামী। কিন্তু যে ইজতিহাদ করার পর সঠিকতায় পৌঁছে যায় সে জান্নাতে যাবে।" তার এ কথা শুনে হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেনঃ “শুনুন, আল্লাহ তাআলা হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমানের (আঃ) ফায়সালার কথা বর্ণনা করেছেন। আর এটা প্রকাশমান যে, নবীরা (আঃ) ন্যায় বিচারক হয়ে থাকেন এবং তাঁদের কথা দ্বারা এই লোকদের কথা খণ্ডন করা যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা হযরত সুলাইমানের (আঃ) প্রশংসা করেছেন বটে, কিন্তু হযরত দাউদকে (আঃ) তিনি নিন্দা করেননি। জেনে রাখুন যে, আল্লাহ তাআলা বিচারকদের নিকট তিনটি কথার অঙ্গীকার নিয়েছেন। প্রথম অঙ্গীকার এই যে, তাঁরা যেন পার্থিব লোভের বশবর্তী হয়ে শরীয়তের আহকাম পরিবর্তন না করেন। দ্বিতীয় অঙ্গীকার এই যে, তারা যেন অন্তরের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির পিছনে না পড়েন বা প্রবৃত্তির অনুসরণ না করেন। তৃতীয় অঙ্গীকার এই যে, তারা যেন আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকেও ভয় না করেন। তারপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দাউদ (আঃ)! আমি তোমাকে যমীনের খলীফা বা প্রতিনিধি বানিয়েছি, সুতরাং তুমি লোকদের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা কর এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, অন্যথায় ওটা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিভ্রান্ত করে ফেলবে।” (৩৮:২৬) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানুষকে ভয় করো না, বরং আমাকেই ভয় কর।” (৫:৪৪) অন্য একস্থানে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা সামান্য বা নগণ্য মূল্যের বিনিময়ে আমার আয়াতসমূহ। বিক্রি করো না।” (৫:৪৪) আমি বলি যে, নবীরা যে নিস্পাপ এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাদেরকে যে সাহায্য করা হয়ে থাকে এ বিষয়ে পূর্বযুগীয় ও পরযুগীয় গুরুজনদের মধ্যে কোন মতানৈক্য নেই। তাদের ছাড়া অন্যদের ব্যাপারে কথা এই যে, হযরত আম্র ইনবুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “বিচারক যখন ইজতিহাদ ও চেষ্টা করার পর সঠিকতায় পৌঁছে যায় তখন সে দুটো প্রতিদান লাভ করে। আর ইজতিহাদের পর যদি তার ভূল হয়ে যায় তবে তার জন্যে রয়েছে একটি প্রতিদান।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রাঃ) স্বীয় সহীহ্ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এহাদীসটি পরিষ্কারভাবে বলে দিচ্ছে যে, পুর্ণভাবে চেষ্টা চালানোর পরেও যদি বিচারক ভুল করে দেয় তবে সে জাহান্নামী হবে বলে যে ধারণা ও সন্দেহ হযরত আইয়াস (রাঃ) করেছেন তা ঠিক নয়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সুনানের একটি হাদীসে রয়েছে যে, বিচারক তিন প্রকার। এক প্রকারের বিচারক জান্নাতী ও দু'প্রকারের বিচারক জাহান্নামী। যে সত্য ও ন্যায় জানে এবং তদনুযায়ী ফায়সালা করে সে জান্নাতী। যে না জেনে ফায়সালা করে সে জাহান্নামী এবং যে সত্য জেনে শুনে ওর বিপরীত ফায়সালা করে সেও জাহান্নামী। কুরআন কারীমে বর্ণিত এই ঘটনার কাছাকাছিই আর একটি ঘটনা মুসনাদে আহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “দু'টি মহিলা ছিল, যাদের সাথে তাদের দুটি পুত্র সন্তান ছিল, (তারা ছিল দুগ্ধ পোষ্য শিশু)। একজনের শিশুকে বাঘে ধরে নিয়ে যায়। এখন মহিলা দুটির প্রত্যেকেই একে অপরকে বলেঃ “বাঘে তোমার শিশুকে ধরে নিয়ে গেছে এবং যেটা আছে আমারই।” অবশেষে তারা হযরত দাউদের (আঃ) নিকট এই মুকাদ্দামা পেশ করে। তখন তিনি ফায়সালা দেন যে, শিশুটি বড় স্ত্রী লোকটির প্রাপ্য। অতঃপর তারা দুজন বেরিয়ে আসে। পথে হযরত সুলাইমান (আঃ) ছিলেন। তিনি তাদেরকে ডাকলেন এবং (লোকদেরকে) বললেন “ছুরী নিয়ে এসো। আমি এই শিশুটিকে কেটে দুটুকরা করে দেবো এবং অর্ধেক করে দু’জনকে প্রদান করবো।” এতে বড় স্ত্রী লোকটি চুপ থাকলো। কিন্তু ছোট স্ত্রী লোকটি বললোঃ “আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন! শিশুটিকে কাটবেন ন। এটা বড় স্ত্রী লোকটিরই। সুতরাং তাকেই দিয়ে দিন।" হযরত সুলাইমান (আঃ) প্রকৃত ব্যাপার বুঝে নেন এবং শিশুটিকে ঐ ছোট স্ত্রী লোকটিকে দিয়ে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নাসায়ী (রাঃ) এর উপর একটি অনুচ্ছেদ বেঁধেছেন যে, বিচারক যদি নিজের ফায়সালা অন্তরে গোপন রেখে প্রকৃত রহস্য জানবার উদ্দেশ্যে ওর বিপরীত কিছু বলেন তবে তা জায়েয হবে)এ ধরনেরই একটি ঘটনা হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, বানী ইসরাঈলের যুগে একটি সুন্দরী নারী ছিল, যার প্রেমে চারজন নেতৃস্থানীয় লোক আসক্ত হয়ে পড়ে এবং তার সাথে ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়ার ইচ্ছা করে। কিন্তু ঐ নারী তা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করে। তখন তারা তার প্রতি চরম দুঃখিত ও রাগান্বিত হয় এবং চারজন একমত হয়ে হযরত দাউদের (আঃ) বিচারালয়ে উপস্থিত হয় ও সাক্ষ্য প্রদান করে যে, সে তার কুকুরের দ্বারা নিজের কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করে। চার জনের সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে হযরত দাউদ (আঃ) মহিলাটিকে রজম (পাথর নিক্ষেপে হত্যা করার নিদের্শ দেন। ঐ দিনই সন্ধ্যায় হযরত সুলাইমান (আঃ) নিজের সমবয়সী ছেলেদের নিয়ে বসেন। তিনি বিচারক হন এবং চার জন ছেলে ঐ লোকগুলির মত তার কাছে ঐ মুকাদ্দামা পেশ করে এবং একটি স্ত্রীলোকের সম্বন্ধে ঐ কথাই বলে। হযরত সুলাইমান (আঃ) ঐ চারজনকে পৃথক পৃথক করে দেয়ার নিদের্শ দেন। তার পর একজনকে তিনি তাঁর কাছে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “ঐ কুকুরটির রং কেমন ছিল?” সে উত্তরে বলেঃ “কালো”। এরপর দ্বিতীয় জনকে পৃথক ভাবে ডেকে ঐ প্রশ্নই করেন। সে জবাব দেয়ঃ “সাদা।” তিনি তৎক্ষণাৎ ফায়সালা দেন যে, স্ত্রী লোকটির উপর এটা অপবাদ ছাড়া কিছুই নয় এবং এই চারজনকে হত্যা করে দেওয়া হোক।” হযরত দাউদের (আঃ) নিকটও এই ঘটনাটি পেশ করা হলো। তিনি তখনই ঐ চারজন নেতৃ স্থানীয় লোককে ডেকে পাঠান এবং ঐ রূপেই পৃথক পৃথক ভাবে তাদেরকে কুকুরটির রং সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয়। তারা এক একজন এক এক কথা বলে এবং গড় বড় করে দেয়। হযরত দাউদের (আঃ) কাছে তারা মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়ে যায়। সুতরাং তিনি তাদেরকে হত্যা করে দেয়ার নিদের্শ দেন। (এটা হাফিয আবুল কাসিম ইবনু আসাকির (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি বিহঙ্গকুলের জন্যে নিয়ম করে দিয়েছিলাম যে, তারা যেন হযরত দাউদের (আঃ) সাথে আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। হযরত দাউদকে (আঃ) এমন মিষ্ট কণ্ঠস্বর দান করা হয়েছিল যে, যখন তিনি মিষ্টি সুরে ও আন্তরিকতার সাথে যরূর পাঠ করতেন। তখন পক্ষীকূল উড়ন বাদ দিয়ে থেমে যেতো এবং তার সুরে সুরে মিলিয়ে আল্লাহর তাসবীহ পাঠে লেগে পড়তো। অনুরূপভাবে পাহাড় পর্বতও তাসবীহ পাঠ করতো। বর্ণিত আছে যে, একদা রাত্রে হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) কুরআন কারীম পাঠ করছিলেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেখান দিয়ে গমন করছিলেন। তার মিষ্টি সূরে কুরআন পাঠ শুনে তিনি দাড়িয়ে যান এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে শুনতে থাকেন। তারপর তিনি বলেনঃ “একে তো আ'লে দাউদের (আঃ) মত মিষ্টি সুর দান করা হয়েছে। হযরত আবু মূসা (রাঃ) এটা জানতে পেরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমি যদি জানতাম যে, আপনি আমার কুরআন পাঠ শুনতে ছিলেন। তবে আমি আরো উত্তম রূপে পাঠ করতাম।”হযরত আবু উছমান নাহদী (রাঃ) বলেনঃ “ আমি কোন উত্তম বাজনার মধ্যে ঐ মজা পাই নাই যা হযরত আবূ মূসার (রাঃ) কণ্ঠস্বরে পেতাম।” সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার উত্তম কণ্ঠ স্বরকে হযরত দাউদের (আঃ) উত্তম ও মিষ্ট কণ্ঠস্বরের একটি অংশ বলেছেন। তাহলে স্বয়ং হযরত দাউদের কণ্ঠস্বর কত মধুর ছিল তা সহজেই অনুমেয়।আল্লাহ তাআলা তাঁর আর একটি অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেনঃ “আমি দাউদকে (আঃ) তোমাদের জন্যে বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে ওটা তোমাদেরকে তোমাদের যুদ্ধে রক্ষা করে। তার যুগের পূর্বে হল্কা বিহীন বর্ম নির্মিত হতো। হলকা বিশিষ্ট বর্ম তিনিই তৈরী করেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) “তার জন্যে আমি লৌহকে নমনীয় করেছিলাম। (হে দাউদ (আঃ)! উদ্দেশ্য এই যে, যাতে তুমি পূর্ণ মাপের বর্ম তৈরী করতে এবং বুননে পরিমাণ রক্ষা করতে পার।" (৩৪:১০-১১) এই বর্ম যুদ্ধের মাঠে কাজে লাগতো। সুতরাং এটা ছিল এমনই নিয়ামত যার কারণে মানুষের উচিত মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। তাই তিনি বলেনঃ তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে না?"এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি সুলাইমানের (আঃ) বশীভূত করেছিলাম উদ্দাম বায়ুকে, ওটা তার আদেশক্রমে প্রবাহিত হতো সেই দেশের দিকে যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি। অর্থাৎ ঐ বায়ু তাকে সিরিয়ায় পৌঁছিয়ে দিতো। মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত হযরত সুলাইমান (আঃ) তার লোক-লশকর, সাজ-সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্রসহ তার সিংহাসনে বসে যেতেন। অতঃপর বায়ু তাঁকে তাঁর গন্তব্য স্থানে ক্ষণিকের মধ্যে পৌছিয়ে দিতো। সিংহাসনের উপর হতে পাখী পালক দ্বারা তাকে ছায়া করতো। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তার অধীন করে দিলাম বায়ুকে, যা তার আদেশে সে যেখানেই ইচ্ছা করতো সেথায় মৃদুমন্দ গতিতে প্রবাহিত হতো।" (৩৮:৩৬) মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(আমি সুলাইমানের (আঃ) অধীন করেছিলাম বায়ুকে) যা প্রভাতে এক মাসের পথ অতিক্রম করতো এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ অতিক্রম করতো।” (৩৪:১২) হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, ছয় লক্ষ চেয়ার রাখাহতো। তার পাশে বসতো মু'মিন মানুষ এবং তাদের পিছনে বসতো মু'মিন জ্বিন। তারপর তাঁর নির্দেশক্রমে পক্ষীকুল সবারই উপর ছায়া করতো। অতঃপর তার আদেশ অনুযায়ী বায়ু তাঁকে নিয়ে চলতে শুরু করতো। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন) তার উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উবাইদিল্লাহ ইবনু উমাইর (রাঃ) বলেন যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) বাতাসকে হুকুম করতেন তখন ওটা স্থূপাকারে জমা হয়ে যেতো, যেন ওটা পাহাড়। তারপর তিনি তাঁর ফরাশ আনার নিদের্শ দিতেন। তখন উচু জায়গায় রেখে দেয়া হতো। অতঃপর তিনি তাঁর ডানা ওয়ালা ঘোড়া আনার হুকুম করতেন।এরপর তিনি ঐ ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে স্বীয় ফরাশে উঠে বসতেন। অতঃপর তাঁর নির্দেশক্রমে বায়ূ তাকে উপরে উঠিয়ে নিয়ে যেতো। ঐ সময় তিনি মাথা নীচু করে থাকতেন। ডানে বামে মোটেই তাকাতেন না। এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হতো বিনয় ও আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। কেননা, নিজের নীচতার জ্ঞান তাঁর ছিল। অতঃপর বায়ুকে তিনি যেখানে নামাবার হুকুম করতেন সেখানেই নামিয়ে দিতো।অনুরূপভাবে অবাধ্য শয়তানদেরকেও আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত করে দিয়েছিলেন। তার জন্যে ডুবুরী কাজ করতো। তারা সমুদ্রে ডুব দিয়ে ওর তলদেশ হতে মণি মুক্তা বের করে আনতো। আরো বহু কাজ তারা করতো।যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং শয়তানদেরকে (আমি তার বাধ্য করেছিলাম), যারা সবাই ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী।” (৩৮:৩৭) এরা ছাড়া অন্যান্য শয়তানরাও তার অনুগত ছিল, যাদেরকে শিকলে আবদ্ধ রাখা হতো।মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতাম। কোন শয়তানই তার কোন ক্ষতি করতে পারতো না। বরং সবাই ছিল তার অনুগত ও অধীনস্থ। কেউই তাঁর কাছে ঘেঁষতে পারতো না। তাদের উপর তাঁরই শাসন চলতো। যাকে ইচ্ছা তিনি বন্দী করতেন এবং যাকে ইচ্ছা ছেড়ে দিতেন। তাদের কথাই বলেনঃ ‘অন্যান্য জ্বিন ছিল যারা শৃংখলে আবদ্ধ থাকতো।'

আল-আম্বিয়া 21:83

৮৩-৮৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআ'লা হযরত আইয়ুবের (আঃ) কষ্ট ও বিপদাপদের বর্ণনা দিচ্ছেন। আর তা ছিল আর্থিক, দৈহিক এবং সন্তানগত। তার বহু প্রকারের জীবজন্তু, ক্ষেত খামার বাগ-বাগিচা ইত্যাদি ছিল। তার আল্লাহ প্রদত্ত সন্তান সন্ততিসমূহ দাস-দাসী, ধন সম্পদ ইত্যাদি সবকিছুই বিদ্যমান ছিল। অতঃপর তার উপর আল্লাহ তাআলার পরীক্ষা আসে এবং সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যায়। এমনকি তাঁর দেহেও কুষ্ঠরোগ প্রকাশ পায়। শুধুমাত্র অন্তর ও যুবান ছাড়া তার দেহের কোন অংশই এই রোগ হতে রক্ষা পায় নাই। শেষ পর্যন্ত আশে পাশের লোকদের কাছে তিনি ঘৃণার পাত্র হয়ে যান। বাধ্য হয়ে তাঁকে শহরের এক জনমানবহীন প্রান্তে অবস্থান করতে হয়। তার একটি মাত্র স্ত্রী ছাড়া সবাই তাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। এই বিপদের সময় তার থেকে সবাই সরে পড়ে। এই একটি মাত্র স্ত্রী সদা তাঁর সেবার কাজে লেগে থাকতেন। সাথে সাথে মজুরী খেটে খেটে তার পানাহারেরও ব্যবস্থা করতেন। নবী (সাঃ) বলেছেনঃ “ সবচয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় নবীদের উপর। তারপর সৎলোকদের উপর এরপর তাদের চেয়ে কম মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের উপর এবং এরপরে আরো নিম্নমানের লোকদের উপর আল্লাহর পরীক্ষা এসে থাকে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, প্রত্যেকের পরীক্ষা তার দ্বীনের পরিমাণ হিসেবে হয়ে থাকে। যদি কেউ দ্বীনের ব্যাপারে দৃঢ় হয় তবে তার পরীক্ষাও কঠিন হয়। হযরত আইয়ুব (আঃ) বড়ই ধৈর্যশীল ছিলেন এমনকি তার ধৈর্যশীলতার কথা সর্বসাধারণের মুখে মুখে রয়েছে।হযরত ইয়াযীদ ইবনু মাইসারা (রাঃ) বলেন যে, যখন হযরত আইয়ুবের (আঃ) পরীক্ষা শুরু হয় তখন তাঁর সন্তান সন্ততি মারা যায়, ধন- সম্পদ ধ্বংস হয় এবং তিনি সম্পূর্ণরূপে রিক্ত হস্ত হয়ে পড়েন। এতে তিনি আরো বেশী আল্লাহর যিকরে লিপ্ত থাকেন। তিনি বলতে থাকেনঃ “হে সকল পলিনকারীদের পালনকর্তা! আমাকে আপনি বহু ধন মাল ও সন্তান সন্ততি দান করেছিলেন। ঐ সময় আমি ঐগুলিতে সদা লিপ্ত থাকতাম। অতঃপর আপনি ঐগুলি আমার থেকে নিয়ে নেয়ার ফলে আমার অন্তর ঐ সবের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়েছে। এখন আমার অন্তরের মধ্যে ও আপনার মধ্যে কোনই প্রতিবন্ধকতা নেই। যদি আমার শত্রু ইবলীস আমার প্রতি আপনার এই মেহেরবানীর কথা জানতে পারতো তবে সে আমার প্রতি হিংসায় ফেটে পড়তো।” ইবলীস তার এই কথায় এবং তাঁর ঐ সময়ের ঐ প্রশংসায় জ্বলে পুড়ে মরে। তিনি নিম্নরূপ প্রার্থনাও করেনঃ “হে আমর প্রতিপালক! আপনি আমাকে ধন সম্পদ, সন্তান সন্ততি এবং পরিবার পরিজনের অধিকারী করেছিলেন। আপনি খুব ভাল জানেন যে, ঐ সময় আমি কখনো অহংকার করি নাই এবং কারো প্রতি জুলুম ও অবিচারও করি নাই। হে আল্লাহ! এটা আপনার অজানা নেই যে, আমার। জন্যে নরম বিছানা প্রস্তুত থাকতো। কিন্তু আমি তা পরিত্যাগ করে আপনার ইবাদতে রাত্রি কাটিয়ে দিতাম এবং আমার নসকে ধমকের সুরে বলতামঃ তুমি নরম বিছানাতে আরাম করার জন্যে সৃষ্ট হও নাই। হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমি সুখ শান্তি ও আরাম আয়েশ বিসর্জন দিতাম।" (এটা মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে) এই আয়াতের তাফসীরে ইবনু জারীর (রাঃ) ও ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) একটি খুব দীর্ঘ কাহিনী বর্ণনা করেছেন, যা পর যুগীয় বহু মুফাসৃসিরও রিওয়াইয়াত করেছেন। কিন্তু তাতে অস্বাভাবিকতা রয়েছে এবং ওটা খুবই দীর্ঘ হওয়ার কারণে আমরা ছেড়ে দিয়েছি।দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই বিপদে জড়িত ছিলেন। হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত কাতাদা (রাঃ) বলেন যে, তিনি সাত বছর ও কয়েক মাস এই কষ্ট ভোগ করেছিলেন। বানী ইসরাঈলের আবর্জনা ফেলার জায়গায় তাঁকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তার দেহ পোকা হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর মহান আল্লাহ তার প্রতি দয়াপরবশ হন এবং তাঁকে সমস্ত বিপদ ও কষ্ট হতে মুক্তি দান করেন। আর তাকে তিনি পুরস্কৃত করেন ও তার উত্তম প্রশংসা করেন। অহবি ইবনু মুনাব্বাহ্ (রাঃ) বলেন যে, তিনি পুর্ণ তিন বছর এই কষ্টের মধ্যে পতিত ছিলেন। তাঁর দেহের সমস্ত মাংস খসে পড়েছিল। শুধু অস্থি ও চর্ম অবশিষ্ট ছিল। তিনি ছাই এর উপর পড়ে থাকতেন। তাঁর কাছে শুধু তার একজন স্ত্রী ছিলেন। দীর্ঘযুগ এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর একদা তিনি তাঁর স্বামীকে বলেনঃ “হে আল্লাহর নবী (আঃ)! আপনি মহান আল্লাহর নিকট কেন প্রার্থনা করেন না যাতে তিনি আমাদেরকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “দেখো, আল্লাহ তাআলা আমাকে সত্তর বছর সুস্থ শরীরে রেখেছিলেন। সুতরাং তিনি যদি আমাকে সত্তর বছর এই অবস্থায় রাখেন এবং আমি ধৈর্য ধারণ করি আল্লাহর জন্যে তবে এটা তো আল্লাহর জন্যে খুবই অল্প (সময়)।" একথা শুনে তাঁর স্ত্রী কেঁপে ওঠেন। তিনি তাঁর স্বামীর জন্যে শহরে বেরিয়ে যেতেন এবং এর ওর বাড়ীতে কাজকাম করে যা পেতেন তাই এনে স্বামীকে খাওয়াতেন। ফিলিস্তিনবাসী দু’জন লোক হযরত আইয়ুবের (আঃ) ভাই ও অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। তাদের কাছে শয়তান গিয়ে বলেঃ “তোমাদের ভাই আইয়ূব (আঃ) ভীষণ বিপদ গ্রস্ত ও কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তোমরা গিয়ে তার খবরা খবর নাও এবং তোমাদের এখান থেকে কিছু মদ সঙ্গে নিয়ে যাও। ওটা তাঁকে পান করালেই তিনি আরোগ্য লাভ করবেন। তার কথা মত তারা দু'জন হযরত আইয়ুবের (আঃ) নিকট আগমন করে এবং তার অবস্থা দেখা মাত্রই তঁাদের চক্ষু অশ্রু সিক্ত হয়ে ওঠে। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কে?” তারা নিজেদের পরিচয় দান করে। তিনি খুবই খুশী হন এবং তাদেরকে মুবারকবাদ জানান। তারা বলেঃ “হে আইয়ূব (আঃ)! সম্বতঃ আপনি ভিতরে কিছু গোপন রাখতেন এবং বাইরেও বিপরীত প্রকাশ করতেন। এজন্যেই আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষায় ফেলেছেন।”তাদের কথা শুনে হযরত আইয়ূব (আঃ) দৃষ্টি আকাশের দিকে উঠিয়ে বলেনঃ “আমি কি গোপন রাখতাম ওর বিপরীত কি প্রকাশ করতাম তা তিনি (আল্লাহ) জানেন। তিনি বরং আমাকে এই বিপদে জড়িয়ে ফেলেছেন এই উদ্দেশ্যে যে, আমি ধৈর্য ধারণ করি কি অধৈর্য হয়ে পড়ি তা তিনি দেখতে চান।অতঃপর তারা দু'জন বলেঃ “আমরা আপনার জন্যে ওষুধ এনেছি, আপনি তা পান করে নিন। এতে আপনি আরোগ্য লাভ করবেন। ওটা হলো মদ, যা অমিরা আমাদের ওখান থেকে আনয়ন করেছি।” তাদের একথা শোনা মাত্রই তিনি কঠিন রাগান্বিত হন এবং বলেনঃ “কলুষিত শয়তান তোমাদেরকে আমার নিকট আনয়ন করেছে। তোমাদের সাথে কথা বলা এবং তোমাদের খাদ্য ও পানীয় আমার জন্যে হারাম।" তখন তারা দু'জন তার নিকট থেকে চলে যায়। একদিনের ঘটনা, তাঁর স্ত্রী এক বাড়ীতে রুটি পাকিয়ে দিচ্ছিলেন। তাদের একটি শিশু ঘুমিয়ে পড়েছিল। তখন বাড়ীর মালিক ঐ শিশুর অংশের ছোট রুটি তাকে দিয়ে দেয়। তিনি রুটিটি নিয়ে হযরত আইয়ুবের (আঃ) কিট আসেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এরুটি তুমি কোথা হতে আনলেঃ উত্তরে তিনি ঘটনাটি বর্ণনা করেন। এ ঘটনা শুনে তিনি তার স্ত্রীকে বলেনঃ “তুমি এখনই রুটি নিয়ে ফিরে যাও। খুব সম্ভ শিশুটি এখন জেগে উঠেছে এবং এই ছোট রুটিটির জন্যে জি ধরেছে এবং কেঁদে কেঁদে সারা বাড়ীকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে। বাধ্য হয়ে তার স্ত্রী রুটি ফিরিয়ে নিয়ে চললেন। ঐ বাড়ীর বারান্দায় একটি ছাগল বাধা ছিল। ছাগলটি তাকে জোরে এক টক্কর মারে। ফলে তাঁর মখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে যায়ঃ “দেখো, হযরত আইয়র (আঃ) কত বড় ভুল ধারণা করে বসেছেন?" অতঃপর তিনি উপরে উঠে গিয়ে দেখেন যে, সত্যি সত্যিই শিশুটি রুটির জন্য কান্না জুড়ে দিয়েছে এবং বাড়ীর লোকদেরকে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলেছে। এদেখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত আইয়ুবের (আঃ) উপর দয়া করুন!” অতঃপর তিনি রুটিটি তাদেরকে দিয়ে দেন এবং ফিরে আসেন। পথে শয়তান ডাক্তারের রূপ ধরে তার সাথে সাক্ষাৎ করে এবং বলেঃ “তোমার স্বামী অত্যন্ত কষ্ট পাচ্ছেন। দীর্ঘ দিন ধরে কঠিন রোগে ভুগছেন। তুমি তাকে বুঝিয়ে বল যে, তিনি যেন অমুক গোত্রের প্রতিমার নামে একটি মাছি মারেন। এটা করলেই তিনি আরোগ্য লাভ করবেন।" হযরত আইয়ুবের (আঃ) নিকট পৌঁছে তিনি তাঁকে এই কথা বলেন। তিনি তখন তাকে বলেনঃ “তোমার উপর কলুষিত শয়তানের যাদু লেগে গেছে। সুস্থ হলে আমি তোমাকে একশ চাবুক মারবো।” একদা তাঁর স্ত্রী অভ্যাসমত জীবিকার অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। বাড়ী বাড়ী যান কিন্তু কাজ কাম পেলেন না। কাজেই তিনি নিরাশ হয়ে পড়েন। সন্ধ্যায় ঘনিয়ে আসলে হযরত আইয়ুবের (আঃ) ক্ষুধার চিন্তায় তিনি ব্যাকুল হয়ে পড়েন। সুতরাং তিনি নিরুপায় হয়ে তার চুলের এক খোপা কেটে নিয়ে এক সম্ভ্রান্ত লোকের কন্যার নিকট বিক্রী করেন। মেয়েটি পানাহারের অনেক কিছু জিনিস তাকে প্রদান করে। তা নিয়ে তিনি হযরত আইয়ুবের (আঃ) নিকট পৌঁছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি এতগুলো ভাল ভাল খাদ্য পেলে কোথায়?" তাঁর স্ত্রী উত্তরে বলেঃ “এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির বাড়ীতে কাজ করে দিয়ে ওর বিনিময়ে এগুলো পেয়েছি।" হযরত আইয়ুব (আঃ) তখন তা খেয়ে নেন। ঘটনাক্রমে দ্বিতীয় দিনও এরূপই ঘটে। সেদিনও তিনি তাঁর চুলের অপর খোপাটি কেটে নিয়ে বিক্রী করে দেন এবং ওর বিনিময়ে প্রাপ্ত খাদ্য নিয়ে স্বামীর নিকট হাযির হন। আজকেও ঐ খাদ্যই দেখে হযরত আইয়ূব (আঃ) তার স্ত্রীকে বলেনঃ “আল্লার কসম! আজকে আমি কিছুতেই এ খাদ্য খাবো না যে পর্যন্ত না তুমি আমাকে খবর দেবে যে, তুমি এ খাদ্য কিরূপে পেলে?" তখন তিনি তাঁর মাথা হতে ওড়না সরিয়ে দেন। ফলে হযরত আইয়ুব (আঃ) দেখতে পান যে, তাঁর মাথার চুল সবই কর্তিত হয়েছে। এ দেখে তিনি অত্যন্ত হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। ঐ সময় তিনি মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমি দুঃখ কষ্টে পড়েছি, আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু!" (২১৪ ৮৩) হযরত নাওফ (রাঃ) বলেন যে, যে শয়তান হযরত আইয়ুবের (আঃ) পিছনে লেগেছিল তার নাম ছিল মাবসূত।হযরত আইয়ুবকে (আঃ) তার স্ত্রী প্রায়ই বলতেনঃ “আপনি রোগ মুক্তির জন্যে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করুন।” কিন্তু তিনি প্রার্থনা করতেন না। একদা বানী ইসরাঈলের কতকগুলি লোক তার পার্শ্ব দিয়ে গমন করে। তাকে দেখে তারা মন্তব্য করেঃ “এ লোকটি অবশ্যই কোন পাপের কারণে এই কষ্টে পতিত হয়েছেন। ঐ সময় হঠাৎ তার মুখ দিয়ে এই প্রার্থনা বেরিয়ে পড়ে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উবায়েদ ইবনু উমাইর (রাঃ) বলেন যে, হযরত আইয়ুবের (আঃ) দুটি ভাই ছিল। একদিন তারা তাকে দেখতে আসে। কিন্তু তার শরীরের দুর্গন্ধের কারণে তারা তাঁর নিকটে যেতে পারে নাই। দূরে দাড়িয়ে বলাবলি করেঃ “যদি এর মধ্যে সততা থাকতো তবে সে এই কঠিন বিপদে পতিত হতো না।" তাদের একথায় হযরত আইয়ুবের (আঃ) এতো দুঃখ হয় যে, এরপূর্বে কোন কিছুতেই তিনি এতো দুঃখ পান নাই। ঐসময় তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! যদি আপনার জানা থাকে যে, এমন কোন রাত্রি অতিবাহিত হয় নাই যে রাত্রিতে আমার জানা মতে কেউ ক্ষুর্ধাত অবস্থায় থেকেছে এবং আমি পেট পুরে খাদ্য খেয়েছি। হে আল্লাহ! যদি আমি আমার একথায় আপনার নিকট সত্যবাদী হই তবে আপনি আমাকে সত্যায়িত করুন। তৎক্ষণাৎ আকাশ হতে তাকে সত্যায়িত করা হয় এবং ঐ দুজন তা শুনতে পায়। আবার তিনি বলেন, “হে আল্লাহ! কখনও এমন ঘটে নাই যে, আমার কাছে অতিরিক্ত কাপড় থেকেছে এবং কোন উলঙ্গ ব্যক্তিকে আমি তা প্রদান করি নাই। যদি আমি এতে সত্যবাদী হই তবে আপনি আমাকে আকাশ হতে সত্যায়িত করুন।এবারেও তাদেরকে শুনিয়েই তাঁকে সত্যায়িত করা হয়। পুনরায় তিনি নিম্নরূপ প্রার্থনা করতে করতে সিজদায় পড়ে যানঃ “হে আল্লাহ! আমি ঐ পর্যন্ত সিজদা হতে মাথা উঠাবো না যে পর্যন্ত না আপনি আমার উপর আপতিত সমস্ত বিপদ দূর করবেন।" তঁর এই প্রার্থনা কবুল হয়ে যায় এবং তিনি সিজদা হতে মাথা উঠানোর পূর্বেই তার সমস্ত বিপদ ও রোগ দূর হয়ে যায়।হযরত আনাস ইবনু মালিকা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “হযরত আইয়ূব (আঃ) আঠারো বছর পর্যন্ত ঐ রোগে পরিবেষ্টিত থাকেন। তাঁর নিকটের ও দূরের সব আত্মীয় স্বজন তাঁর থেকে সরে পড়ে। শুধুমাত্র তার দুই বিশিষ্ট ভাই তার কাছে সকাল সন্ধ্যায় আসতো। তাদের একজন অপরজনকে বলেঃ “জেনে রেখো যে, অবশ্যই আইয়ূব (আঃ) এমন পাপ করেছেন, যে পাপ সারা বিশ্বে কেউ করে নাই। তার একথা শুনে তার সঙ্গী তাকে বলে, তুমি এটা কি করে বললে?” সে উত্তরে বলেঃ “তাই যদি না হবে তবে সুদীর্ঘ আঠারো বছর গত হয়ে গেল তুবও আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাঁর রোগ হতে তাকে আরোগ্য দান করছেন না কেন?" অতঃপর সন্ধ্যায় যখন তারা দু'জন তার কাছে আসলো তখন ঐ লোকটি আর ধৈর্য ধরতে পারলো না। বরং তাঁর কাছে ঐ লোকটির কথা বর্ণনা করে দিলো। তখন হযরত আইয়ূব (আঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি যা বলছে তা আমি জানি না। তবে মহামহিমান্বিত আল্লাহ জানেন যে, রাস্তায় চলার সময় যখন আমি দু’জন লোককে ঝগড়া করতে দেখতাম এবং তাদের কাউকেও আল্লাহর নামে শপথ করতে শুনতাম তখন আমি এই কাজটি অবশ্যই করতাম যে, বাড়ী গিয়ে তার কসমের কাফফারা আমি নিজের পক্ষ থেকে আদায় করে দিতাম। তা আমি এই আশংকায় করতাম যে, সে হয় তো অন্যায়ভাবে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে থাকবে। (এ হাদীসটি ইবনু হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আইয়ুব (আঃ) এই রোগে এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীর হাত ধরে প্রস্রাব ও পায়খানার জন্যে যেতেন। একদা তাঁর (প্রস্রাব বা পায়খানার) প্রয়োজন হয়। তিনি স্বীয় স্ত্রীকে ডাক দেন। কিন্তু তার আসতে বিলম্ব হয়। ফলে তাঁর অত্যন্ত কষ্ট হয়। তৎক্ষণাৎ আকাশ থেকে শব্দ আসেঃ “তুমি তোমার পা দ্বারা ভূমিতে আঘাত কর, এই তো গোসলের সুশীতল পানি আর পানীয়। তুমি এই পানি পান কর এবং তাতে গোসলও কর। (এ হাদীসটি মার’ হওয়া খুবই গরীব)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তখনই আল্লাহ তাআলা জান্নাত হতে তাঁর জন্যে হুল্লা (পোষাক বিশেষ) পাঠিয়ে দেন। ওটা পরিধান করে তিনি এক প্রান্তে একাকী বসে পড়েন। যখন তার স্ত্রী আগমন করেন তখন তিনি তাকে চিনতে না পেরে তাকেই জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এখানে একজন রুগ্ন, দুর্বল ও শক্তিহীন ব্যক্তি ছিলেন। তার কি হলো তা আপনি বলতে পারেন কি? তাঁকে বাঘে খেয়ে ফেলে নাইতো? অথবা কুকুরে নিয়ে যায় নাই তো?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “না, না। ঐ রুগ্ন ব্যক্তি আইয়ুব (আঃ) আমিই তো।" আপনি আমার সাথে রসিকতা করছেন কেন?” তিনি বলেনঃ “না, না। আমিই আইয়ূব (আঃ)। আল্লাহ আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। তিনি আমাকে আমার প্রকৃত রূপ ও ঔজ্জ্বল্যও ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মাল ধনও তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তাঁর সন্তানদেরকে এবং তাদের সাথে অপরাপর সম্পদগুলিও তিনি ফিরিয়ে পান। ওয়াহীর মাধ্যমে তাকে এ সুসংবাদও দেয়া হয়েছিল ও বলা হয়েছিলঃ “তুমি তোমার সহচর ও পরিবার পরিজনদের পক্ষ হতে কুরবানী এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। কেননা, তারা তোমার ব্যাপারে আমার নাফরমানী করেছিল।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা যখন হযরত আইয়ূবকে (আঃ) আরোগ্য দান করেন তখন তিনি তার উপর সোনার ফড়িং সমূহ বর্ষণ করেন। হযরত আইয়ুব (আঃ) তখনও গুলি হাতে ধরে ধরে কাপড়ে জমা করতে শুরু করেন। ঐ সময় তাকে বলা হয়ঃ “হে আইয়ুব (আঃ)! এখনও তুমি পরিতৃপ্ত হওনি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার রহমত হতে কে পরিতৃপ্ত হতে পারে। (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) কান করেছেন। এর মৃণা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাকে তার পরিবার পরিজন ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) তে বলেন যে, ঐ লোকদেরকেই ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল। কারো কারো ধারণামতে তার স্ত্রীর নাম ছিল রহমত। এই উক্তি যদি এই আয়াত দ্বারা বুঝা হয়ে থাকে তবে তো এটা বহু দূরের বিষয়। আর যদি আহলে কিতাব হতে নেয়া হয়ে থাকে তবে এটা সত্য বা মিথ্যা কোনটাই বলা যাবে না। ইবনু আসাকির (রাঃ) তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে হযরত আইয়ুবের (আঃ) স্ত্রীর নাম বলেছেনঃ লাইয়া। তিনি হলেন লাইয়া বিতে মীশা’ ইবনু ইউসুফ ইবনু ইয়াকূব ইবনু ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (আঃ)। একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত লাইয়া ছিলেন হযরত ইয়াকুবের (আঃ) কন্যা এবং হযরত আইয়ুবের (আঃ) স্ত্রী। তিনি হযরত আইয়ুবের (আঃ) সাথে সানিয়া নামক স্থানে ছিলেন।হযরত মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, তাকে বলা হয়ঃ “হে আইয়ূব (আঃ)! তোমার আহ্ল (পরিবার পরিজন) সব জান্নাতী। তুমি যদি চাও তবে তাদের সবাইকে দুনিয়ায় এনে দিই, আর যদি চাও তবে তাদেরকে তোমার জন্যে জান্নাতেই রেখে দিই এবং প্রতিদান হিসেবে দুনিয়ায় তোমার তাদের অনুরূপ প্রদান করি।” তিনি বললেনঃ ‘না, বরং তাদেরকে জান্নাতেই রেখে দিন। তখন তাদেরকে জান্নাতেই রেখে দেয়া হয় এবং দুনিয়ায় তাঁকে তাদের অনুরূপ প্রতিদান দেয়া হয়।মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা ছিল আমার বিশেষ রহমত এবং ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ। এসব কিছু এজন্যেই হলো যে, বিপদে পতিত ব্যক্তিরা যেন হযরত আইয়ুবের (আঃ) নিকট হতে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং ধৈর্য হারা হয়ে যেন অকৃতজ্ঞ না হয়ে যায়। আর লোকেরা তাদেরকে খারাপ বান্দা বলে ধারনা না করে। হযরত আইয়ূব (আঃ) ছিলেন ধৈর্যের পর্বত স্বরূপ এবং স্থিরতার নুমনা ছিলেন। আল্লাহর তাকদীরের লিখন ও তাঁর পরীক্ষার উপর মানুষের ধৈর্য ধারণ করা উচিত। এতে যে তাঁর কি হিকমত বা রহস্য নিহিত রয়েছে তা মানুষের জানা নেই।

আল-আম্বিয়া 21:84

৮৩-৮৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআ'লা হযরত আইয়ুবের (আঃ) কষ্ট ও বিপদাপদের বর্ণনা দিচ্ছেন। আর তা ছিল আর্থিক, দৈহিক এবং সন্তানগত। তার বহু প্রকারের জীবজন্তু, ক্ষেত খামার বাগ-বাগিচা ইত্যাদি ছিল। তার আল্লাহ প্রদত্ত সন্তান সন্ততিসমূহ দাস-দাসী, ধন সম্পদ ইত্যাদি সবকিছুই বিদ্যমান ছিল। অতঃপর তার উপর আল্লাহ তাআলার পরীক্ষা আসে এবং সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যায়। এমনকি তাঁর দেহেও কুষ্ঠরোগ প্রকাশ পায়। শুধুমাত্র অন্তর ও যুবান ছাড়া তার দেহের কোন অংশই এই রোগ হতে রক্ষা পায় নাই। শেষ পর্যন্ত আশে পাশের লোকদের কাছে তিনি ঘৃণার পাত্র হয়ে যান। বাধ্য হয়ে তাঁকে শহরের এক জনমানবহীন প্রান্তে অবস্থান করতে হয়। তার একটি মাত্র স্ত্রী ছাড়া সবাই তাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। এই বিপদের সময় তার থেকে সবাই সরে পড়ে। এই একটি মাত্র স্ত্রী সদা তাঁর সেবার কাজে লেগে থাকতেন। সাথে সাথে মজুরী খেটে খেটে তার পানাহারেরও ব্যবস্থা করতেন। নবী (সাঃ) বলেছেনঃ “ সবচয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় নবীদের উপর। তারপর সৎলোকদের উপর এরপর তাদের চেয়ে কম মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের উপর এবং এরপরে আরো নিম্নমানের লোকদের উপর আল্লাহর পরীক্ষা এসে থাকে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, প্রত্যেকের পরীক্ষা তার দ্বীনের পরিমাণ হিসেবে হয়ে থাকে। যদি কেউ দ্বীনের ব্যাপারে দৃঢ় হয় তবে তার পরীক্ষাও কঠিন হয়। হযরত আইয়ুব (আঃ) বড়ই ধৈর্যশীল ছিলেন এমনকি তার ধৈর্যশীলতার কথা সর্বসাধারণের মুখে মুখে রয়েছে।হযরত ইয়াযীদ ইবনু মাইসারা (রাঃ) বলেন যে, যখন হযরত আইয়ুবের (আঃ) পরীক্ষা শুরু হয় তখন তাঁর সন্তান সন্ততি মারা যায়, ধন- সম্পদ ধ্বংস হয় এবং তিনি সম্পূর্ণরূপে রিক্ত হস্ত হয়ে পড়েন। এতে তিনি আরো বেশী আল্লাহর যিকরে লিপ্ত থাকেন। তিনি বলতে থাকেনঃ “হে সকল পলিনকারীদের পালনকর্তা! আমাকে আপনি বহু ধন মাল ও সন্তান সন্ততি দান করেছিলেন। ঐ সময় আমি ঐগুলিতে সদা লিপ্ত থাকতাম। অতঃপর আপনি ঐগুলি আমার থেকে নিয়ে নেয়ার ফলে আমার অন্তর ঐ সবের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়েছে। এখন আমার অন্তরের মধ্যে ও আপনার মধ্যে কোনই প্রতিবন্ধকতা নেই। যদি আমার শত্রু ইবলীস আমার প্রতি আপনার এই মেহেরবানীর কথা জানতে পারতো তবে সে আমার প্রতি হিংসায় ফেটে পড়তো।” ইবলীস তার এই কথায় এবং তাঁর ঐ সময়ের ঐ প্রশংসায় জ্বলে পুড়ে মরে। তিনি নিম্নরূপ প্রার্থনাও করেনঃ “হে আমর প্রতিপালক! আপনি আমাকে ধন সম্পদ, সন্তান সন্ততি এবং পরিবার পরিজনের অধিকারী করেছিলেন। আপনি খুব ভাল জানেন যে, ঐ সময় আমি কখনো অহংকার করি নাই এবং কারো প্রতি জুলুম ও অবিচারও করি নাই। হে আল্লাহ! এটা আপনার অজানা নেই যে, আমার। জন্যে নরম বিছানা প্রস্তুত থাকতো। কিন্তু আমি তা পরিত্যাগ করে আপনার ইবাদতে রাত্রি কাটিয়ে দিতাম এবং আমার নসকে ধমকের সুরে বলতামঃ তুমি নরম বিছানাতে আরাম করার জন্যে সৃষ্ট হও নাই। হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমি সুখ শান্তি ও আরাম আয়েশ বিসর্জন দিতাম।" (এটা মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে) এই আয়াতের তাফসীরে ইবনু জারীর (রাঃ) ও ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) একটি খুব দীর্ঘ কাহিনী বর্ণনা করেছেন, যা পর যুগীয় বহু মুফাসৃসিরও রিওয়াইয়াত করেছেন। কিন্তু তাতে অস্বাভাবিকতা রয়েছে এবং ওটা খুবই দীর্ঘ হওয়ার কারণে আমরা ছেড়ে দিয়েছি।দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই বিপদে জড়িত ছিলেন। হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত কাতাদা (রাঃ) বলেন যে, তিনি সাত বছর ও কয়েক মাস এই কষ্ট ভোগ করেছিলেন। বানী ইসরাঈলের আবর্জনা ফেলার জায়গায় তাঁকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তার দেহ পোকা হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর মহান আল্লাহ তার প্রতি দয়াপরবশ হন এবং তাঁকে সমস্ত বিপদ ও কষ্ট হতে মুক্তি দান করেন। আর তাকে তিনি পুরস্কৃত করেন ও তার উত্তম প্রশংসা করেন। অহবি ইবনু মুনাব্বাহ্ (রাঃ) বলেন যে, তিনি পুর্ণ তিন বছর এই কষ্টের মধ্যে পতিত ছিলেন। তাঁর দেহের সমস্ত মাংস খসে পড়েছিল। শুধু অস্থি ও চর্ম অবশিষ্ট ছিল। তিনি ছাই এর উপর পড়ে থাকতেন। তাঁর কাছে শুধু তার একজন স্ত্রী ছিলেন। দীর্ঘযুগ এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর একদা তিনি তাঁর স্বামীকে বলেনঃ “হে আল্লাহর নবী (আঃ)! আপনি মহান আল্লাহর নিকট কেন প্রার্থনা করেন না যাতে তিনি আমাদেরকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “দেখো, আল্লাহ তাআলা আমাকে সত্তর বছর সুস্থ শরীরে রেখেছিলেন। সুতরাং তিনি যদি আমাকে সত্তর বছর এই অবস্থায় রাখেন এবং আমি ধৈর্য ধারণ করি আল্লাহর জন্যে তবে এটা তো আল্লাহর জন্যে খুবই অল্প (সময়)।" একথা শুনে তাঁর স্ত্রী কেঁপে ওঠেন। তিনি তাঁর স্বামীর জন্যে শহরে বেরিয়ে যেতেন এবং এর ওর বাড়ীতে কাজকাম করে যা পেতেন তাই এনে স্বামীকে খাওয়াতেন। ফিলিস্তিনবাসী দু’জন লোক হযরত আইয়ুবের (আঃ) ভাই ও অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। তাদের কাছে শয়তান গিয়ে বলেঃ “তোমাদের ভাই আইয়ূব (আঃ) ভীষণ বিপদ গ্রস্ত ও কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তোমরা গিয়ে তার খবরা খবর নাও এবং তোমাদের এখান থেকে কিছু মদ সঙ্গে নিয়ে যাও। ওটা তাঁকে পান করালেই তিনি আরোগ্য লাভ করবেন। তার কথা মত তারা দু'জন হযরত আইয়ুবের (আঃ) নিকট আগমন করে এবং তার অবস্থা দেখা মাত্রই তঁাদের চক্ষু অশ্রু সিক্ত হয়ে ওঠে। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কে?” তারা নিজেদের পরিচয় দান করে। তিনি খুবই খুশী হন এবং তাদেরকে মুবারকবাদ জানান। তারা বলেঃ “হে আইয়ূব (আঃ)! সম্বতঃ আপনি ভিতরে কিছু গোপন রাখতেন এবং বাইরেও বিপরীত প্রকাশ করতেন। এজন্যেই আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষায় ফেলেছেন।”তাদের কথা শুনে হযরত আইয়ূব (আঃ) দৃষ্টি আকাশের দিকে উঠিয়ে বলেনঃ “আমি কি গোপন রাখতাম ওর বিপরীত কি প্রকাশ করতাম তা তিনি (আল্লাহ) জানেন। তিনি বরং আমাকে এই বিপদে জড়িয়ে ফেলেছেন এই উদ্দেশ্যে যে, আমি ধৈর্য ধারণ করি কি অধৈর্য হয়ে পড়ি তা তিনি দেখতে চান।অতঃপর তারা দু'জন বলেঃ “আমরা আপনার জন্যে ওষুধ এনেছি, আপনি তা পান করে নিন। এতে আপনি আরোগ্য লাভ করবেন। ওটা হলো মদ, যা অমিরা আমাদের ওখান থেকে আনয়ন করেছি।” তাদের একথা শোনা মাত্রই তিনি কঠিন রাগান্বিত হন এবং বলেনঃ “কলুষিত শয়তান তোমাদেরকে আমার নিকট আনয়ন করেছে। তোমাদের সাথে কথা বলা এবং তোমাদের খাদ্য ও পানীয় আমার জন্যে হারাম।" তখন তারা দু'জন তার নিকট থেকে চলে যায়। একদিনের ঘটনা, তাঁর স্ত্রী এক বাড়ীতে রুটি পাকিয়ে দিচ্ছিলেন। তাদের একটি শিশু ঘুমিয়ে পড়েছিল। তখন বাড়ীর মালিক ঐ শিশুর অংশের ছোট রুটি তাকে দিয়ে দেয়। তিনি রুটিটি নিয়ে হযরত আইয়ুবের (আঃ) কিট আসেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এরুটি তুমি কোথা হতে আনলেঃ উত্তরে তিনি ঘটনাটি বর্ণনা করেন। এ ঘটনা শুনে তিনি তার স্ত্রীকে বলেনঃ “তুমি এখনই রুটি নিয়ে ফিরে যাও। খুব সম্ভ শিশুটি এখন জেগে উঠেছে এবং এই ছোট রুটিটির জন্যে জি ধরেছে এবং কেঁদে কেঁদে সারা বাড়ীকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে। বাধ্য হয়ে তার স্ত্রী রুটি ফিরিয়ে নিয়ে চললেন। ঐ বাড়ীর বারান্দায় একটি ছাগল বাধা ছিল। ছাগলটি তাকে জোরে এক টক্কর মারে। ফলে তাঁর মখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে যায়ঃ “দেখো, হযরত আইয়র (আঃ) কত বড় ভুল ধারণা করে বসেছেন?" অতঃপর তিনি উপরে উঠে গিয়ে দেখেন যে, সত্যি সত্যিই শিশুটি রুটির জন্য কান্না জুড়ে দিয়েছে এবং বাড়ীর লোকদেরকে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলেছে। এদেখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত আইয়ুবের (আঃ) উপর দয়া করুন!” অতঃপর তিনি রুটিটি তাদেরকে দিয়ে দেন এবং ফিরে আসেন। পথে শয়তান ডাক্তারের রূপ ধরে তার সাথে সাক্ষাৎ করে এবং বলেঃ “তোমার স্বামী অত্যন্ত কষ্ট পাচ্ছেন। দীর্ঘ দিন ধরে কঠিন রোগে ভুগছেন। তুমি তাকে বুঝিয়ে বল যে, তিনি যেন অমুক গোত্রের প্রতিমার নামে একটি মাছি মারেন। এটা করলেই তিনি আরোগ্য লাভ করবেন।" হযরত আইয়ুবের (আঃ) নিকট পৌঁছে তিনি তাঁকে এই কথা বলেন। তিনি তখন তাকে বলেনঃ “তোমার উপর কলুষিত শয়তানের যাদু লেগে গেছে। সুস্থ হলে আমি তোমাকে একশ চাবুক মারবো।” একদা তাঁর স্ত্রী অভ্যাসমত জীবিকার অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। বাড়ী বাড়ী যান কিন্তু কাজ কাম পেলেন না। কাজেই তিনি নিরাশ হয়ে পড়েন। সন্ধ্যায় ঘনিয়ে আসলে হযরত আইয়ুবের (আঃ) ক্ষুধার চিন্তায় তিনি ব্যাকুল হয়ে পড়েন। সুতরাং তিনি নিরুপায় হয়ে তার চুলের এক খোপা কেটে নিয়ে এক সম্ভ্রান্ত লোকের কন্যার নিকট বিক্রী করেন। মেয়েটি পানাহারের অনেক কিছু জিনিস তাকে প্রদান করে। তা নিয়ে তিনি হযরত আইয়ুবের (আঃ) নিকট পৌঁছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি এতগুলো ভাল ভাল খাদ্য পেলে কোথায়?" তাঁর স্ত্রী উত্তরে বলেঃ “এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির বাড়ীতে কাজ করে দিয়ে ওর বিনিময়ে এগুলো পেয়েছি।" হযরত আইয়ুব (আঃ) তখন তা খেয়ে নেন। ঘটনাক্রমে দ্বিতীয় দিনও এরূপই ঘটে। সেদিনও তিনি তাঁর চুলের অপর খোপাটি কেটে নিয়ে বিক্রী করে দেন এবং ওর বিনিময়ে প্রাপ্ত খাদ্য নিয়ে স্বামীর নিকট হাযির হন। আজকেও ঐ খাদ্যই দেখে হযরত আইয়ূব (আঃ) তার স্ত্রীকে বলেনঃ “আল্লার কসম! আজকে আমি কিছুতেই এ খাদ্য খাবো না যে পর্যন্ত না তুমি আমাকে খবর দেবে যে, তুমি এ খাদ্য কিরূপে পেলে?" তখন তিনি তাঁর মাথা হতে ওড়না সরিয়ে দেন। ফলে হযরত আইয়ুব (আঃ) দেখতে পান যে, তাঁর মাথার চুল সবই কর্তিত হয়েছে। এ দেখে তিনি অত্যন্ত হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। ঐ সময় তিনি মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমি দুঃখ কষ্টে পড়েছি, আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু!" (২১৪ ৮৩) হযরত নাওফ (রাঃ) বলেন যে, যে শয়তান হযরত আইয়ুবের (আঃ) পিছনে লেগেছিল তার নাম ছিল মাবসূত।হযরত আইয়ুবকে (আঃ) তার স্ত্রী প্রায়ই বলতেনঃ “আপনি রোগ মুক্তির জন্যে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করুন।” কিন্তু তিনি প্রার্থনা করতেন না। একদা বানী ইসরাঈলের কতকগুলি লোক তার পার্শ্ব দিয়ে গমন করে। তাকে দেখে তারা মন্তব্য করেঃ “এ লোকটি অবশ্যই কোন পাপের কারণে এই কষ্টে পতিত হয়েছেন। ঐ সময় হঠাৎ তার মুখ দিয়ে এই প্রার্থনা বেরিয়ে পড়ে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উবায়েদ ইবনু উমাইর (রাঃ) বলেন যে, হযরত আইয়ুবের (আঃ) দুটি ভাই ছিল। একদিন তারা তাকে দেখতে আসে। কিন্তু তার শরীরের দুর্গন্ধের কারণে তারা তাঁর নিকটে যেতে পারে নাই। দূরে দাড়িয়ে বলাবলি করেঃ “যদি এর মধ্যে সততা থাকতো তবে সে এই কঠিন বিপদে পতিত হতো না।" তাদের একথায় হযরত আইয়ুবের (আঃ) এতো দুঃখ হয় যে, এরপূর্বে কোন কিছুতেই তিনি এতো দুঃখ পান নাই। ঐসময় তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! যদি আপনার জানা থাকে যে, এমন কোন রাত্রি অতিবাহিত হয় নাই যে রাত্রিতে আমার জানা মতে কেউ ক্ষুর্ধাত অবস্থায় থেকেছে এবং আমি পেট পুরে খাদ্য খেয়েছি। হে আল্লাহ! যদি আমি আমার একথায় আপনার নিকট সত্যবাদী হই তবে আপনি আমাকে সত্যায়িত করুন। তৎক্ষণাৎ আকাশ হতে তাকে সত্যায়িত করা হয় এবং ঐ দুজন তা শুনতে পায়। আবার তিনি বলেন, “হে আল্লাহ! কখনও এমন ঘটে নাই যে, আমার কাছে অতিরিক্ত কাপড় থেকেছে এবং কোন উলঙ্গ ব্যক্তিকে আমি তা প্রদান করি নাই। যদি আমি এতে সত্যবাদী হই তবে আপনি আমাকে আকাশ হতে সত্যায়িত করুন।এবারেও তাদেরকে শুনিয়েই তাঁকে সত্যায়িত করা হয়। পুনরায় তিনি নিম্নরূপ প্রার্থনা করতে করতে সিজদায় পড়ে যানঃ “হে আল্লাহ! আমি ঐ পর্যন্ত সিজদা হতে মাথা উঠাবো না যে পর্যন্ত না আপনি আমার উপর আপতিত সমস্ত বিপদ দূর করবেন।" তঁর এই প্রার্থনা কবুল হয়ে যায় এবং তিনি সিজদা হতে মাথা উঠানোর পূর্বেই তার সমস্ত বিপদ ও রোগ দূর হয়ে যায়।হযরত আনাস ইবনু মালিকা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “হযরত আইয়ূব (আঃ) আঠারো বছর পর্যন্ত ঐ রোগে পরিবেষ্টিত থাকেন। তাঁর নিকটের ও দূরের সব আত্মীয় স্বজন তাঁর থেকে সরে পড়ে। শুধুমাত্র তার দুই বিশিষ্ট ভাই তার কাছে সকাল সন্ধ্যায় আসতো। তাদের একজন অপরজনকে বলেঃ “জেনে রেখো যে, অবশ্যই আইয়ূব (আঃ) এমন পাপ করেছেন, যে পাপ সারা বিশ্বে কেউ করে নাই। তার একথা শুনে তার সঙ্গী তাকে বলে, তুমি এটা কি করে বললে?” সে উত্তরে বলেঃ “তাই যদি না হবে তবে সুদীর্ঘ আঠারো বছর গত হয়ে গেল তুবও আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাঁর রোগ হতে তাকে আরোগ্য দান করছেন না কেন?" অতঃপর সন্ধ্যায় যখন তারা দু'জন তার কাছে আসলো তখন ঐ লোকটি আর ধৈর্য ধরতে পারলো না। বরং তাঁর কাছে ঐ লোকটির কথা বর্ণনা করে দিলো। তখন হযরত আইয়ূব (আঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি যা বলছে তা আমি জানি না। তবে মহামহিমান্বিত আল্লাহ জানেন যে, রাস্তায় চলার সময় যখন আমি দু’জন লোককে ঝগড়া করতে দেখতাম এবং তাদের কাউকেও আল্লাহর নামে শপথ করতে শুনতাম তখন আমি এই কাজটি অবশ্যই করতাম যে, বাড়ী গিয়ে তার কসমের কাফফারা আমি নিজের পক্ষ থেকে আদায় করে দিতাম। তা আমি এই আশংকায় করতাম যে, সে হয় তো অন্যায়ভাবে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে থাকবে। (এ হাদীসটি ইবনু হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আইয়ুব (আঃ) এই রোগে এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীর হাত ধরে প্রস্রাব ও পায়খানার জন্যে যেতেন। একদা তাঁর (প্রস্রাব বা পায়খানার) প্রয়োজন হয়। তিনি স্বীয় স্ত্রীকে ডাক দেন। কিন্তু তার আসতে বিলম্ব হয়। ফলে তাঁর অত্যন্ত কষ্ট হয়। তৎক্ষণাৎ আকাশ থেকে শব্দ আসেঃ “তুমি তোমার পা দ্বারা ভূমিতে আঘাত কর, এই তো গোসলের সুশীতল পানি আর পানীয়। তুমি এই পানি পান কর এবং তাতে গোসলও কর। (এ হাদীসটি মার’ হওয়া খুবই গরীব)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তখনই আল্লাহ তাআলা জান্নাত হতে তাঁর জন্যে হুল্লা (পোষাক বিশেষ) পাঠিয়ে দেন। ওটা পরিধান করে তিনি এক প্রান্তে একাকী বসে পড়েন। যখন তার স্ত্রী আগমন করেন তখন তিনি তাকে চিনতে না পেরে তাকেই জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এখানে একজন রুগ্ন, দুর্বল ও শক্তিহীন ব্যক্তি ছিলেন। তার কি হলো তা আপনি বলতে পারেন কি? তাঁকে বাঘে খেয়ে ফেলে নাইতো? অথবা কুকুরে নিয়ে যায় নাই তো?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “না, না। ঐ রুগ্ন ব্যক্তি আইয়ুব (আঃ) আমিই তো।" আপনি আমার সাথে রসিকতা করছেন কেন?” তিনি বলেনঃ “না, না। আমিই আইয়ূব (আঃ)। আল্লাহ আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। তিনি আমাকে আমার প্রকৃত রূপ ও ঔজ্জ্বল্যও ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মাল ধনও তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তাঁর সন্তানদেরকে এবং তাদের সাথে অপরাপর সম্পদগুলিও তিনি ফিরিয়ে পান। ওয়াহীর মাধ্যমে তাকে এ সুসংবাদও দেয়া হয়েছিল ও বলা হয়েছিলঃ “তুমি তোমার সহচর ও পরিবার পরিজনদের পক্ষ হতে কুরবানী এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। কেননা, তারা তোমার ব্যাপারে আমার নাফরমানী করেছিল।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা যখন হযরত আইয়ূবকে (আঃ) আরোগ্য দান করেন তখন তিনি তার উপর সোনার ফড়িং সমূহ বর্ষণ করেন। হযরত আইয়ুব (আঃ) তখনও গুলি হাতে ধরে ধরে কাপড়ে জমা করতে শুরু করেন। ঐ সময় তাকে বলা হয়ঃ “হে আইয়ুব (আঃ)! এখনও তুমি পরিতৃপ্ত হওনি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার রহমত হতে কে পরিতৃপ্ত হতে পারে। (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) কান করেছেন। এর মৃণা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাকে তার পরিবার পরিজন ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) তে বলেন যে, ঐ লোকদেরকেই ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল। কারো কারো ধারণামতে তার স্ত্রীর নাম ছিল রহমত। এই উক্তি যদি এই আয়াত দ্বারা বুঝা হয়ে থাকে তবে তো এটা বহু দূরের বিষয়। আর যদি আহলে কিতাব হতে নেয়া হয়ে থাকে তবে এটা সত্য বা মিথ্যা কোনটাই বলা যাবে না। ইবনু আসাকির (রাঃ) তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে হযরত আইয়ুবের (আঃ) স্ত্রীর নাম বলেছেনঃ লাইয়া। তিনি হলেন লাইয়া বিতে মীশা’ ইবনু ইউসুফ ইবনু ইয়াকূব ইবনু ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (আঃ)। একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত লাইয়া ছিলেন হযরত ইয়াকুবের (আঃ) কন্যা এবং হযরত আইয়ুবের (আঃ) স্ত্রী। তিনি হযরত আইয়ুবের (আঃ) সাথে সানিয়া নামক স্থানে ছিলেন।হযরত মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, তাকে বলা হয়ঃ “হে আইয়ূব (আঃ)! তোমার আহ্ল (পরিবার পরিজন) সব জান্নাতী। তুমি যদি চাও তবে তাদের সবাইকে দুনিয়ায় এনে দিই, আর যদি চাও তবে তাদেরকে তোমার জন্যে জান্নাতেই রেখে দিই এবং প্রতিদান হিসেবে দুনিয়ায় তোমার তাদের অনুরূপ প্রদান করি।” তিনি বললেনঃ ‘না, বরং তাদেরকে জান্নাতেই রেখে দিন। তখন তাদেরকে জান্নাতেই রেখে দেয়া হয় এবং দুনিয়ায় তাঁকে তাদের অনুরূপ প্রতিদান দেয়া হয়।মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা ছিল আমার বিশেষ রহমত এবং ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ। এসব কিছু এজন্যেই হলো যে, বিপদে পতিত ব্যক্তিরা যেন হযরত আইয়ুবের (আঃ) নিকট হতে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং ধৈর্য হারা হয়ে যেন অকৃতজ্ঞ না হয়ে যায়। আর লোকেরা তাদেরকে খারাপ বান্দা বলে ধারনা না করে। হযরত আইয়ূব (আঃ) ছিলেন ধৈর্যের পর্বত স্বরূপ এবং স্থিরতার নুমনা ছিলেন। আল্লাহর তাকদীরের লিখন ও তাঁর পরীক্ষার উপর মানুষের ধৈর্য ধারণ করা উচিত। এতে যে তাঁর কি হিকমত বা রহস্য নিহিত রয়েছে তা মানুষের জানা নেই।

আল-আম্বিয়া 21:85

৮৫-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইসমাঈল (আঃ) ছিলেন হযরত ইবরাহীম খলীলের (আঃ) পুত্র। সূরায়ে মারইয়ামে তাঁর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইদরীসের (আঃ) বর্ণনা গত হয়েছে। যুল কিফলকে বাহ্যতঃ নবীরূপেই জানা যাচ্ছে। কেন না, নবীদের বর্ণনায় তার নাম এসেছে। কিন্তু লোকেরা বলেছেন যে, তিনি নবী ছিলেন না, বরং একজন সৎ লোক ছিলেন। তিনি তাঁর যুগের বাদশাহ ও ন্যায় বিচারক। ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেন। নাই। সুতরাং এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, তিনি একজন সৎ ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তার যুগের নবীদের চুক্তি ও অঙ্গীকার করেছিলেন এবং ওর উপর প্রতিষ্ঠি ত ছিলেন। কওমের মধ্যে তিনি ন্যায় বিচার করতেন। বর্ণিত আছে যে, যখন হযরত ইয়াসাআ' (আঃ) খুবই বৃদ্ধ হয়ে যান তখন তিনি নিজের জীবদ্দশাতেই তার একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করার ইচ্ছা করেন। তিনি তার আমল দেখতে চান। সূতরাং তিনি জনগণকে একত্রিত করেন এবং বলেনঃ “তিনটি প্রস্তাব যে ব্যক্তি সমর্থণ করবে তাকে আমি খিলাফত বা প্রতিনিধিত্ব প্রদান করবো। প্রস্তাব তিনটি এই যে, সে সারাদিন রোযা রাখবে, সারা রাত দাড়িয়ে ইবাদত করবে এবং কখনো রাগান্বিত হবে না।' তার একথা শুনে একটি লোক ছাড়া আর কেউই পঁড়ালো না। যে লোকটি দাঁড়ালো তাঁকে মানুষ হাল্কা মর্যাদার লোক মনে করতো। তিনি দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ “অর্থাৎ তুমি দিনে রোযা রাখবে, রাত্রে তাহাদের নামায পড়বে এবং কারো উপর রাগ করবে নাঃ" লোকটি উত্তর করলেনঃ “হ” হযরত ইয়াসা'আ বললেনঃ “আচ্ছা, আজকে তোমরা চলে যাও, কালকে আবার একত্রিত। হও।” পরদিনও তিনি মজলিসে সাধারণভাবে প্রশ্ন করলেন। কিন্তু ঐ লোকটি ছাড়া আর কেউই দাঁড়ালো না। সুতরাং তিনি তাকেই খলীফা বা প্রতিনিধি নির্বাচন করলেন। এখন শয়তান ছোট ছোট শয়তানদেরকে এই সম্রান্ত ব্যক্তিকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে পাঠাতে শুরু করলো। কিন্তু তারা তাকে কোন ক্রমেই বিভ্রান্ত করতে পারলো না। তখন ইবলীস নিজেই চললো। ঐ বুযুর্গ লোকটি দুপুরে বিশ্রামের জন্যে সবে মাত্র শুয়েছেন এমন সময় ইবলীস শয়তান তার দরজার কড়া নাড়তে শুরু করে। লোকটি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কে?” ইবলীস বলতে শুরু করলোঃ “আমি একজন অত্যাচারিত ব্যক্তি। আমার কওমের একটি লোক আমার উপর জুলুম করেছে। সে আমার সাথে এটা করেছে, ওটা করেছে। এভাবে সে দীর্ঘ বর্ণনা দিতে থাকে। সে তার বর্ণনা শেষ করতেই চায় না। তাঁর ঘুমাবার সময়টুকু তার সাথেই কেটে যায়। হযরত যুলকিফল (অর্থাৎ ঐ সম্রান্ত লোকটি) দিন রাত্রির মধ্যে শুধু এই সময়টুকুতে সামান্য কিছুক্ষণের জন্য ঘুমাতেন। তিনি তাকে বললেনঃ “তুমি সন্ধ্যায় এসো, তোমার প্রতি ন্যায় বিচার করা হবে। অতঃপর সন্ধ্যায় তিনি বিচার করতে বসলেন তখন চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করে ইবলীসকে খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কোন দিকেই তাকে দেখা গেল না। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই বাইরে গিয়ে তাকে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কোথায়ও তাকে পেলেন না। পর দিন সকালেও সে এলো না। আবার যেমনই তিনি দুপুরে সামান্য বিশ্রামের জন্যে শুয়েছেন তখনই সে দরজায় করাঘাত করতে শুরু করেছে। তিনি দরজা খুলে দেন এবং তাকে বলেনঃ “আমি তো তোমাকে সন্ধ্যায় ডেকে ছিলাম এবং তোমার জন্য অপেক্ষমান ছিলাম, তখন তুমি আস নাই কেন?" সে উত্তরে বলেঃ “ জনাব! কি আর বলবো? আমি আপনার কাছে আসার ইচ্ছা করেছি এমন সময় আমার হক নষ্টকারী লোকটি আমাকে অনুরোধ করে বলেঃ “তুমি যেয়ো না, আমি তোমার প্রাপ্য তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি।”কাজেই আমি এলাম না। কিন্তু এখন আবার সে অস্বীকার করেছে।” এভাবে আজকেও বহু লম্বা চওড়া বর্ণনা শুরু করে দেয়। সুতরাং আজও তার ঘুম নষ্ট হয়ে যায়। এবারও তিনি তাকে সন্ধ্যায় আসতে বলেন। সন্ধ্যায় আবার তিনি তার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু সে আসলো না তৃতীয় দিন তিনি একজন দ্বাররক্ষী নিযুক্ত করে তাকে বলে দিলেনঃ “দেখো, আজ যেন কেউই আমার দরজায় করাঘাত না করে। উপুর্যপরি কয়েকদিন কাহিল হয়ে পড়েছি। একথা বলে তিনি সবে মাত্র শুয়েছেন এমন সময় আবার ঐ বিতাড়িত শয়তান এসে পড়ে। দ্বাররক্ষী তাকে বাধা দেয়। কিন্তু সে এক তাকের মধ্য দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে এবং ভিতর থেকে দরজায় করাঘাত করতে শুরু করে দেয়। তিনি তখন উঠে দ্বার রক্ষীকে বলেনঃ “আমি তোমাকে বলে দেয়ার পরেও কেন তুমি একে দরজায় আসতে দিলে?" দ্বার রক্ষী উত্তরে বললোঃ কেউ তো যায় নাই?” এবার তিনি ভালরূপে দেখে শুনে। বুঝতে পারলেন যে, দরজা তো বন্ধই রয়েছে, আবার ভিতরে লোক প্রবেশ করলো কিরূপে? কাজেই এটা শয়তান ছাড়া কেউই নয়। ঐ সময় শয়তান তাকে সম্বোধন করে বললোঃ “হে আল্লাহর ওয়ালী! আমি আপনার নিকট পরাজিত হয়েছি। না আপনি রাত্রির ইবাদত পরিত্যাগ করেছেন, না এরূপ পরিস্থিতিতে আপনার দ্বার রক্ষী ভৃত্যের উপর রাগান্বিত হয়েছেন।” তখন আল্লাহ তাআলা তার নাম রাখলেন যুলকিফল। কেননা, যে বিষয়ের তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন তা বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছেন। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতেও কিছু তাফসীরের পর এই ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে একজন কাযী (বিচারক) ছিলেন। যিনি তাঁর মৃত্যুর সময় বলেছিলেনঃ “আমার পরে আমার এ পদের দায়িত্ব কে গ্রহণ করবে?” উত্তরে এই লোকটি (যুলকি) বলেছিলেনঃ “আমি গ্রহণ করবো।” তখন তার নাম যুলকিফল হয়ে যায়। এতে আছে যে, তাঁর ঘুমাবার সময় হলে প্রহরীরা শয়তানকে আসতে বাধা দেয় সে এতো গোলমান শুরু করে দেয় যে, তিনি জেগে ওঠেন। দ্বিতীয় দিন ও তৃতীয় দিনও এরূপই করে। তখন তিনি তার সাথে যেতে উদ্যত হয়ে বলেনঃ “আমি তোমার সাথে গিয়ে তোমার হক আদায় করে দিচ্ছি।” কিন্তু রাস্তায় গিয়ে সে তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।হযরত আশআরী (রাঃ) মিম্বরের উপর ভাষণ দেয়া অবস্থায় বলেনঃ “যুকিফুল নবী ছিলেন না। তিনি ছিলেন বানী ইসরাঈলের মধ্যে একজন সৎ লোক, যিনি প্রত্যহ একশ (রাকাত নামায পড়তেন। তিনি এই ইবাদতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে তাঁকে যুলকিফল বলা হয়েছে। একটি মুনকাতা (যে হাদীসের সনদের মধ্য হতে মাঝে মাঝে রাবী বা বর্ণনাকারী ছুটে গেছেন। ঐ হাদীসকে মুনকাতা হাদীস বলে) হাদীসে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। মুসনাদে আহমাদে একটি গারীব বা দুর্বল হাদীস বর্ণিত আছে। যাতে কিল এর একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাকে যুলকিফুল বলা হয়। নাই। সম্ভবতঃ তিনি এই ফুলকিফুল নন। বরং অন্য কোন লোক হবেন। হাদীসের ঘটনাটি এই যে, কিক্ল নামক একজন লোক ছিল, যে কোন পাপকার্য হতেই বিরত থাকতো না। একদা সে একটি স্ত্রীলোককে ষাটটি দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) দিয়ে ব্যভিচারের জন্যে উৎসাহিত করে। যখন সে নিজের কামনা চরিতার্থ করার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যায় তখন ঐ স্ত্রীলোকটি ক্রন্দন করতে ও কাপতে শুরু করে দেয়। সে তখন তাকে বলেঃ “আমি তোমার প্রতি কোন বল প্রয়োগ তো করি নাই তথাপি তোমার ক্রন্দনের ও কম্পনের কারণ কি? স্ত্রীলোকটি উত্তরে বলেঃ "আজ পর্যন্ত আমি আল্লাহ তাআলার কোন নাফরমানী করি নাই। কিন্তু আজ আমার অভাব ও দারিদ্র আমাকে এ কুকাজে বাধ্য করছে। (তাই, আমি আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করছি ও কম্পিত হচ্ছি)!" তার একথা শুনে কি তাকে বলেঃ “তুমি মাত্র একটি পাপ কার্যের কারণে এতো উদ্বেগ প্রকাশ করছো! অথচ এর পূর্বে তো তুমি এরূপ কোন কাজ কর নাই। তৎক্ষণাৎ সে তাকে ছেড়ে দেয় এবং তার থেকে পৃথক হয়ে যায়। অতঃপর তাকে বলেঃ “যাও, এই দীনারগুলি আমি তোমাকে দান করে দিলাম। আল্লাহর শপথ! আজ হতে আর কোন দিন আমি আল্লাহ তাআলার কোন নাফরমানী করবে না। আল্লাহর কি মহিমা যে, ঐ রাত্রেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। মানুষ সকালে এসে দেখে যে, তার দরজার উপর কুদরতী হরূফে লিখিত রয়েছেঃ “আল্লাহ কিকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।”

আল-আম্বিয়া 21:86

৮৫-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইসমাঈল (আঃ) ছিলেন হযরত ইবরাহীম খলীলের (আঃ) পুত্র। সূরায়ে মারইয়ামে তাঁর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইদরীসের (আঃ) বর্ণনা গত হয়েছে। যুল কিফলকে বাহ্যতঃ নবীরূপেই জানা যাচ্ছে। কেন না, নবীদের বর্ণনায় তার নাম এসেছে। কিন্তু লোকেরা বলেছেন যে, তিনি নবী ছিলেন না, বরং একজন সৎ লোক ছিলেন। তিনি তাঁর যুগের বাদশাহ ও ন্যায় বিচারক। ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেন। নাই। সুতরাং এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, তিনি একজন সৎ ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তার যুগের নবীদের চুক্তি ও অঙ্গীকার করেছিলেন এবং ওর উপর প্রতিষ্ঠি ত ছিলেন। কওমের মধ্যে তিনি ন্যায় বিচার করতেন। বর্ণিত আছে যে, যখন হযরত ইয়াসাআ' (আঃ) খুবই বৃদ্ধ হয়ে যান তখন তিনি নিজের জীবদ্দশাতেই তার একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করার ইচ্ছা করেন। তিনি তার আমল দেখতে চান। সূতরাং তিনি জনগণকে একত্রিত করেন এবং বলেনঃ “তিনটি প্রস্তাব যে ব্যক্তি সমর্থণ করবে তাকে আমি খিলাফত বা প্রতিনিধিত্ব প্রদান করবো। প্রস্তাব তিনটি এই যে, সে সারাদিন রোযা রাখবে, সারা রাত দাড়িয়ে ইবাদত করবে এবং কখনো রাগান্বিত হবে না।' তার একথা শুনে একটি লোক ছাড়া আর কেউই পঁড়ালো না। যে লোকটি দাঁড়ালো তাঁকে মানুষ হাল্কা মর্যাদার লোক মনে করতো। তিনি দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ “অর্থাৎ তুমি দিনে রোযা রাখবে, রাত্রে তাহাদের নামায পড়বে এবং কারো উপর রাগ করবে নাঃ" লোকটি উত্তর করলেনঃ “হ” হযরত ইয়াসা'আ বললেনঃ “আচ্ছা, আজকে তোমরা চলে যাও, কালকে আবার একত্রিত। হও।” পরদিনও তিনি মজলিসে সাধারণভাবে প্রশ্ন করলেন। কিন্তু ঐ লোকটি ছাড়া আর কেউই দাঁড়ালো না। সুতরাং তিনি তাকেই খলীফা বা প্রতিনিধি নির্বাচন করলেন। এখন শয়তান ছোট ছোট শয়তানদেরকে এই সম্রান্ত ব্যক্তিকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে পাঠাতে শুরু করলো। কিন্তু তারা তাকে কোন ক্রমেই বিভ্রান্ত করতে পারলো না। তখন ইবলীস নিজেই চললো। ঐ বুযুর্গ লোকটি দুপুরে বিশ্রামের জন্যে সবে মাত্র শুয়েছেন এমন সময় ইবলীস শয়তান তার দরজার কড়া নাড়তে শুরু করে। লোকটি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কে?” ইবলীস বলতে শুরু করলোঃ “আমি একজন অত্যাচারিত ব্যক্তি। আমার কওমের একটি লোক আমার উপর জুলুম করেছে। সে আমার সাথে এটা করেছে, ওটা করেছে। এভাবে সে দীর্ঘ বর্ণনা দিতে থাকে। সে তার বর্ণনা শেষ করতেই চায় না। তাঁর ঘুমাবার সময়টুকু তার সাথেই কেটে যায়। হযরত যুলকিফল (অর্থাৎ ঐ সম্রান্ত লোকটি) দিন রাত্রির মধ্যে শুধু এই সময়টুকুতে সামান্য কিছুক্ষণের জন্য ঘুমাতেন। তিনি তাকে বললেনঃ “তুমি সন্ধ্যায় এসো, তোমার প্রতি ন্যায় বিচার করা হবে। অতঃপর সন্ধ্যায় তিনি বিচার করতে বসলেন তখন চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করে ইবলীসকে খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কোন দিকেই তাকে দেখা গেল না। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই বাইরে গিয়ে তাকে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কোথায়ও তাকে পেলেন না। পর দিন সকালেও সে এলো না। আবার যেমনই তিনি দুপুরে সামান্য বিশ্রামের জন্যে শুয়েছেন তখনই সে দরজায় করাঘাত করতে শুরু করেছে। তিনি দরজা খুলে দেন এবং তাকে বলেনঃ “আমি তো তোমাকে সন্ধ্যায় ডেকে ছিলাম এবং তোমার জন্য অপেক্ষমান ছিলাম, তখন তুমি আস নাই কেন?" সে উত্তরে বলেঃ “ জনাব! কি আর বলবো? আমি আপনার কাছে আসার ইচ্ছা করেছি এমন সময় আমার হক নষ্টকারী লোকটি আমাকে অনুরোধ করে বলেঃ “তুমি যেয়ো না, আমি তোমার প্রাপ্য তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি।”কাজেই আমি এলাম না। কিন্তু এখন আবার সে অস্বীকার করেছে।” এভাবে আজকেও বহু লম্বা চওড়া বর্ণনা শুরু করে দেয়। সুতরাং আজও তার ঘুম নষ্ট হয়ে যায়। এবারও তিনি তাকে সন্ধ্যায় আসতে বলেন। সন্ধ্যায় আবার তিনি তার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু সে আসলো না তৃতীয় দিন তিনি একজন দ্বাররক্ষী নিযুক্ত করে তাকে বলে দিলেনঃ “দেখো, আজ যেন কেউই আমার দরজায় করাঘাত না করে। উপুর্যপরি কয়েকদিন কাহিল হয়ে পড়েছি। একথা বলে তিনি সবে মাত্র শুয়েছেন এমন সময় আবার ঐ বিতাড়িত শয়তান এসে পড়ে। দ্বাররক্ষী তাকে বাধা দেয়। কিন্তু সে এক তাকের মধ্য দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে এবং ভিতর থেকে দরজায় করাঘাত করতে শুরু করে দেয়। তিনি তখন উঠে দ্বার রক্ষীকে বলেনঃ “আমি তোমাকে বলে দেয়ার পরেও কেন তুমি একে দরজায় আসতে দিলে?" দ্বার রক্ষী উত্তরে বললোঃ কেউ তো যায় নাই?” এবার তিনি ভালরূপে দেখে শুনে। বুঝতে পারলেন যে, দরজা তো বন্ধই রয়েছে, আবার ভিতরে লোক প্রবেশ করলো কিরূপে? কাজেই এটা শয়তান ছাড়া কেউই নয়। ঐ সময় শয়তান তাকে সম্বোধন করে বললোঃ “হে আল্লাহর ওয়ালী! আমি আপনার নিকট পরাজিত হয়েছি। না আপনি রাত্রির ইবাদত পরিত্যাগ করেছেন, না এরূপ পরিস্থিতিতে আপনার দ্বার রক্ষী ভৃত্যের উপর রাগান্বিত হয়েছেন।” তখন আল্লাহ তাআলা তার নাম রাখলেন যুলকিফল। কেননা, যে বিষয়ের তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন তা বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছেন। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতেও কিছু তাফসীরের পর এই ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে একজন কাযী (বিচারক) ছিলেন। যিনি তাঁর মৃত্যুর সময় বলেছিলেনঃ “আমার পরে আমার এ পদের দায়িত্ব কে গ্রহণ করবে?” উত্তরে এই লোকটি (যুলকি) বলেছিলেনঃ “আমি গ্রহণ করবো।” তখন তার নাম যুলকিফল হয়ে যায়। এতে আছে যে, তাঁর ঘুমাবার সময় হলে প্রহরীরা শয়তানকে আসতে বাধা দেয় সে এতো গোলমান শুরু করে দেয় যে, তিনি জেগে ওঠেন। দ্বিতীয় দিন ও তৃতীয় দিনও এরূপই করে। তখন তিনি তার সাথে যেতে উদ্যত হয়ে বলেনঃ “আমি তোমার সাথে গিয়ে তোমার হক আদায় করে দিচ্ছি।” কিন্তু রাস্তায় গিয়ে সে তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।হযরত আশআরী (রাঃ) মিম্বরের উপর ভাষণ দেয়া অবস্থায় বলেনঃ “যুকিফুল নবী ছিলেন না। তিনি ছিলেন বানী ইসরাঈলের মধ্যে একজন সৎ লোক, যিনি প্রত্যহ একশ (রাকাত নামায পড়তেন। তিনি এই ইবাদতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে তাঁকে যুলকিফল বলা হয়েছে। একটি মুনকাতা (যে হাদীসের সনদের মধ্য হতে মাঝে মাঝে রাবী বা বর্ণনাকারী ছুটে গেছেন। ঐ হাদীসকে মুনকাতা হাদীস বলে) হাদীসে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। মুসনাদে আহমাদে একটি গারীব বা দুর্বল হাদীস বর্ণিত আছে। যাতে কিল এর একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাকে যুলকিফুল বলা হয়। নাই। সম্ভবতঃ তিনি এই ফুলকিফুল নন। বরং অন্য কোন লোক হবেন। হাদীসের ঘটনাটি এই যে, কিক্ল নামক একজন লোক ছিল, যে কোন পাপকার্য হতেই বিরত থাকতো না। একদা সে একটি স্ত্রীলোককে ষাটটি দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) দিয়ে ব্যভিচারের জন্যে উৎসাহিত করে। যখন সে নিজের কামনা চরিতার্থ করার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যায় তখন ঐ স্ত্রীলোকটি ক্রন্দন করতে ও কাপতে শুরু করে দেয়। সে তখন তাকে বলেঃ “আমি তোমার প্রতি কোন বল প্রয়োগ তো করি নাই তথাপি তোমার ক্রন্দনের ও কম্পনের কারণ কি? স্ত্রীলোকটি উত্তরে বলেঃ "আজ পর্যন্ত আমি আল্লাহ তাআলার কোন নাফরমানী করি নাই। কিন্তু আজ আমার অভাব ও দারিদ্র আমাকে এ কুকাজে বাধ্য করছে। (তাই, আমি আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করছি ও কম্পিত হচ্ছি)!" তার একথা শুনে কি তাকে বলেঃ “তুমি মাত্র একটি পাপ কার্যের কারণে এতো উদ্বেগ প্রকাশ করছো! অথচ এর পূর্বে তো তুমি এরূপ কোন কাজ কর নাই। তৎক্ষণাৎ সে তাকে ছেড়ে দেয় এবং তার থেকে পৃথক হয়ে যায়। অতঃপর তাকে বলেঃ “যাও, এই দীনারগুলি আমি তোমাকে দান করে দিলাম। আল্লাহর শপথ! আজ হতে আর কোন দিন আমি আল্লাহ তাআলার কোন নাফরমানী করবে না। আল্লাহর কি মহিমা যে, ঐ রাত্রেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। মানুষ সকালে এসে দেখে যে, তার দরজার উপর কুদরতী হরূফে লিখিত রয়েছেঃ “আল্লাহ কিকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।”

আল-আম্বিয়া 21:87

৮৭-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর: এই ঘটনাটি এখানেও বর্ণিত হয়েছে এবং সূরায়ে ‘সাফাত ও সূরায়ে ‘নূন'-এও বর্ণিত হয়েছে। ইনি হলেন নবী হযরত ইউনুস ইবনু মাত্তা (আঃ)। তাকে আল্লাহ তাআলা মূসিল অঞ্চলের নীনওয়া নামক গ্রামে নবীরূপে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি ঐ গ্রামবাসীদেরকে আল্লার পথে আহবান করেন; কিন্তু তারা ঈমান আনলো না। তখন তিনি তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে সেখান থেকে চলে যান এবং তাদেরকে বলে যান যে, তাদের উপর তিন দিনের মধ্যে আল্লাহর শাস্তি এসে পড়বে। তার কথায় তাদের বিশ্বাস হয়ে যায় এবং তারা জেনে নেয় যে, নবীর (আঃ) কথা মিথ্যা হয় না। তাই, তারা তাদের শিশুদেরকে ও গৃহপালিত পশুগুলিকে নিয়ে ময়দানের দিকে বেরিয়ে পড়লো। শিশুদেরকে তারা মাতাদের থেকে পৃথক করে দিলো। অতঃপর তারা কাদতে কাঁদতে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করতে লাগলো। একদিকে তাদের কান্নার রোল, আর অপরদিকে জীব জন্তুগুলোর ভয়ানক চীৎকার। এর ফলে আল্লাহর রহমত উথলিয়ে ওঠে। সুতরাং তিনি তাদের উপর হতে শাস্তি উঠিয়ে নেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তবে ইউনুসের (আঃ) সম্প্রদায় ব্যতীত কোন জনপদবাসী কেন এমন হলো না যারা ঈমান আনতো এবং তাদের ঈমান তাদের উপকারে আসতো? যখন তারা ঈমান আনলো তখন আমি তাদেরকে পার্থিব জীবনে হীনতাজনক শাস্তি হতে মুক্ত করলাম এবং কিছু কালের জন্যে জীবনোপভোগ করতে দিলাম।" (১০:৯৮)হযরত ইউনুস (আঃ) এখান হতে চলে গিয়ে একটি নৌকায় আরোহণ করেন। নৌকা কিছুদূর এগিয়ে গেলে তুফানের লক্ষণ প্রকাশ পায়। শেষ পর্যন্ত নৌকাটি ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়। নৌকার আরোহীদের মধ্যে পরামর্শক্রমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, নৌকার ভার হাল্কা করার জন্যে কোন একজন লোককে সমদ্রে নিক্ষেপ করা হোক। সুতরাং নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করা হলে দেখা গেল যে, হযরত ইউনুসেরই (আঃ) নাম বের হয়েছে। কিন্তু কেউই তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করা পছন্দ করলো না। দ্বিতীয়বার গুটিকা নিক্ষেপ করা হলো। এবারও তার নামই উঠলো। তৃতীয়বার পুনরায় গুটিকা ফেলা হলে এবারও তাঁর নামই দেখা দিল। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে লটারীতে যোগদান করলো এবং পরাভূত হলো।" (৩৭:১৪১) তখন হযরত ইউনুস (আঃ) নিজেই দাড়িয়ে গেলেন এবং কাপড় খুলে ফেলে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়লেন। তখন হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) উক্তি অনুসারে আল্লাহ তাআলা ‘বাহরে আখ্যার’ (সবুজ সাগর) হতে একটি বিরাট মাছ পাঠিয়ে দিলেন। মাছটি পানি ফেড়ে ফেড়ে আসলো এবং হযরত ইউনুসকে (আঃ) গিলে ফেললো। কিন্তু মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে মাছটি তার মাংসও খেলো না, অস্থিও ভেঙ্গে ফেললো না। এবং কোন ক্ষতিও করলো না। মাছটির তিনি খাদ্য ছিলেন না, বরং ওর পেট ছিল তার জন্যে কয়েদখানা স্বরূপ। আরবী ভাষায় মাছকে নূন বলা হয়। হযরত ইউনুসের (আঃ) ক্রোধ ছিল তাঁর কওমের উপর। তার ধারণা ছিল যে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি সংকীর্ণতা আনয়ন করবেন না। এখানে হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত যহাক (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন (আরবী) এর অর্থ এটাই করেছেন। ইমাম ইবনু জারীরও (রাঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। দলীল হিসেবে আল্লাহ তাআলার নিম্নেন উক্তিটি পেশ করা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যার জীবনোপকরণ সংকীর্ণ বা সীমিত সে আল্লাহ যা দান করেছেন তা হতে ব্যয় করবে; আল্লাহ যাকে যে সামর্থ দিয়েছেন তদপেক্ষা গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না; আল্লাহ কষ্টের পর দিবেন স্বস্তি।" (৬৫:৭) হযরত আতিয়্যাহ আওফী এটার অর্থ করেছেনঃ “আমি তার উপর নির্ধারণ করবো না। আরববাসীরা (আরবী) ও (আরবী) এর একই অর্থ করে থাকে। কোন কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ যুগ আর প্রত্যাবর্তনকারী নয় যা অতীত হয়েছে। আপনি কল্যাণময়, আপনি যা নির্ধারণ করেন সেই কাজ সংঘটিত হয়ে থাকে।” আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর সব পানি মিলিত হলো এক পরিকল্পনা অনুসারে।” (৫৪:১২) ঐ অন্ধকারের মধ্যে প্রবেশ করে হযরত ইউনুস (আঃ) মহান আল্লাহকে ডাকতে শুরু করেন। সেখানে সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার, মাছের পেটের অন্ধকার এবং রাত্রির অন্ধকার এই তিন অন্ধকার একত্রিত হয়েছিল। তিনি সমুদ্রের তলদেশের কংকর গুলির তাসবীহ পাঠ শুনে নিজেও তাসবীহ পাঠ করতে শুরু করেন। তিনি মাছের পেটে গিয়ে প্রথমতঃ মনে করে ছিলেন যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তারপর তিনি পা নাড়িয়ে দেখেন এবং তা নড়ে ওঠে। সুতরাং মাছের পেটের মধ্যেই তিনি সিজদায় পড়ে যান এবং বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি এমন এক জায়গাকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছি। যে, সতঃ কেউই এই জায়গাকে ইতিপূর্বে সিজদার জায়গা বানায় নাই।হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, হযরত ইউনুস (আঃ) চল্লিশ দিন মাছের পেটে ছিলেন। তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা যখন হযরত ইউনুসকে (আঃ) বন্দী করার ইচ্ছা করেন তখন তিনি মাছকে নির্দেশ দেনঃ “তুমি তাকে গিলে নাও, কিন্তু তার মাংস ভক্ষণ করো না এবং অস্থিও ভেঙ্গে ফেলো না।" যখন তিনি সমুদ্রের তলদেশে পৌঁছেন তখন সেখানে তাসবীহ পাঠ শুনে তিনি হতবাক হয়ে যান। ওয়াহীর মাধ্যমে তাকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, এটা হলো সমুদ্রের জন্তু গুলির তাসবীহ পাঠ। তখন তিনিও আল্লাহর তাসবীহ পাঠ শুরু করে দেন। তার তাসবীহ পাঠ শুনে ফেরেশতারা বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এটা খুবই দুরের শব্দ এবং খুবই দুর্বল অওয়ায, কার আওয়ায এটা? আমরা তে বুঝতে পারলাম না। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে উত্তরে বললেনঃ “এটা আমার বান্দা ইউনুসের (আঃ) শব্দ। সে আমার নাফরমানী করেছে বলে আমি তাকে মাছের পেটে বন্দী করেছি।"ফেরেশতারা তখন বললেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! তার নেক আমলগুলি তো দিনরাত্রির সব সময় আকাশে উঠতেই থাকতো ।?" উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হা।” তখন তারা তার জন্যে সুপারিশ করেন। আল্লাহ তাদের সুপারিশ ককূল করেন। তিনি মাছকে নিদের্শ দেন যে, সে যেন তাঁকে সমুদ্রের তীরে উগলিয়ে দেয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর আমি তাকে নিক্ষেপ করলাম এক তৃণহীন প্রান্তরে এবং সে ছিল রুগ্ন।” (৩৭:১৪৫) উপরে বর্ণিত রিওয়াইয়াতটির ঐ একটি মাত্র সনদ।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন- (আরবী) এই কালেমাটির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেন তখন এই কালেমাটি আরূশের চারদিকে ঘুরতে থাকে। তখন ফেরেশতারা বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এটা তো খুবই দূরের শব্দ। কিন্তু কান এ শব্দের সাথে পরিচিত। এটা অত্যন্ত দুর্বল ও ক্ষীণ শব্দ!" আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কার শব্দ তা কি তোমরা জান না?” উত্তরে তারা বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! না তো! কে তিনি?” আল্লাহ তাআলা তখন বলেনঃ “এটা হলো আমার বান্দা ইউনুসের (আঃ) শব্দ। ফেরেশতারা তখন বলেনঃ “তা হলে তিনি তো সেই ইউনস (আঃ} যার ককূলকৃত পবিত্র আমল প্রত্যেক দিন আপনার নিকট উঠে আসতো এবং যার প্রার্থনা আপনি ককূল করতেন! হে আমাদের প্রতিপালক! তিনি যখন সুখের সময় ভাল আমল করতেন তখন এই বিপদের সময় আপনি তার প্রতি দয়া করুন!” তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলা মাছকে হুকুম করলেন যে, সে যেন কোন কষ্ট না দিয়েই তাকে সমুদ্রের তীরে নিক্ষেপ করে। (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে উদ্ধার করলাম দুশ্চিন্তা হতে। আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি। সে বিপদে পরিবেষ্টিত হয়ে যখন আমাকে আহবান করলো, আমি তখন তার আহবানে সাড়া দিলাম এবং ঐ বিপদ থেকে তাকে মুক্তি দান করলাম।বিশেষ করে যারা বিপদ আপদের সময় এই দুআয়ে ইউনুস (আঃ) পাঠ করে তাদেরকে আল্লাহ তাআলা ঐ সব বিপদ আপদ থেকে উদ্ধার করে থাকেন। এ ব্যাপারে সাইয়্যেদুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদের (সঃ) পক্ষ হতে খুবই উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। হযরত সা’দ ইবনু আবি অক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি মসজিদে হযরত উছমান ইবনু আফানের (রাঃ) নিকট গমন করি। আমি তাকে সালাম করি। তিনি আমাকে পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখেন, কিন্তু আমার সালামের জবাব দিলেন না। আমি তখন আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনু খাত্তাবের (রাঃ) নিকট গিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করি। তিনি হযরত উছমানকে ডেকে পাঠান এবং তাঁকে বলেনঃ “আপনি আপনার এই মুসলমান ভাই-এর সালামের জবাব দেন নাই কেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি এরূপ করি নাই (অর্থাৎ তিনি আমার কাছে আসেন নাই এবং সালামও দেন নাই।" আমি। বললামঃ হাঁ (অর্থাৎ আমি এসেছি ও সালাম দিয়েছি)। শেষ পর্যন্ত তিনি শপথ করলেন এবং আমিও শপথ করলাম। তারপর কি মনে করে তিনি বললেনঃ “আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তার কাছে তাওবা করছি। অবশ্যই ইতিপূর্বে আমার কাছে এসেছিলেন। কিন্তু ঐ সময় আমি মনে মনে ঐকথা বলছিলাম যা আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হতে শুনেছিলাম। আল্লাহর শপথ! যখন আমার ঐ কথা মনে হয়ে যায় তখন শুধু আমার চোখের উপরই পর্দা পড়ে না, বরং আমার অন্তরের উপরও পর্দা পড়ে যায়। আমি তখন বললামঃ আমি আপনাকে ঐ খবর দিচ্ছি। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের সামনে প্রথম দুআ’র বর্ণনা দিতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় এক বেদুঈন এসে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) কথার মোড় নিজের দিকে ফিরিয়ে নেন। এভাবে অনেক্ষণ কেটে যায়। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান থেকে উঠে পড়েন এবং নিজের বাড়ীর দিকে চলতে শুরু করেন। আমিও তার পিছনে পিছনে চলতে থাকি। যখন তিনি বাড়ীর কাছাকাছি হয়ে যান তখন আমি আশংকা করি যে, তিনি হয়তো বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করবেন, আর আমি এখানেই রয়ে যাবো। সুতরাং আমি জোরে জোরে পা ফেলে চলতে লাগলাম। আমার জুতার শব্দ শুনে তিনি আমার দিকে ফিরে তাকান এবং বলেনঃ “আরে, তুমি আবু ইসহাক?” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাঁ, আমিই বটে। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “খবর কি?” আমি জবাব দিলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি প্রথম দুআ’র বর্ণনা দিতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় ঐ বেদুঈন এসে পড়েছিল এবং আপনার কথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তিনি আমার একথা শুনে বললেনঃ “হাঁ, হাঁ।” ওটা ছিল যুন নূনের (আঃ) দুআ যা তিনি মাছের পেটের মধ্যে থাকা অবস্থায় করেছিলেন। অর্থাৎ (আরবী) এই দুআ’টি। জেনে রেখো যে, যে কোন মুসলমান যে কোন ব্যাপারে যখনই তার প্রতিপালকের কাছে এই দুআ’টি করবে, তিনি তা ককূল করবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে কেউই হযরত ইউনুসের (আঃ) এই দুআ’র মাধ্যমে দুআ করবে, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তার দুআ কবূল করবেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াতেই এরপরেই রয়েছেঃ “এভাবেই আমি মু'মিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি।”হযরত সা'দ ইবনু আবি অক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ তাআলার ঐ নামটি যার মাধ্যমে তাঁকে ডাকলে তিনি সেই ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন এবং কিছু চাইলে প্রদান করে থাকেন তা হলো হযরত ইউনুস ইবনু মাত্তার (আঃ) দুআটি।” হযরত সাদ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কি হযরত ইউনুসের (আঃ) জন্যে বিশিষ্ট ছিল, না সমস্ত মুসলমানের জন্যেই সাধারণ?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তুমি কি কুরআন কারীমে পড় নাই যে, তাতে রয়েছেঃ “আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম ও তাকে দুশ্চিন্তা হতে উদ্ধার করে ছিলাম এবং এভাবেই আম মু'মিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি।” সুতরাং যে কেউই এই দুআ করবে আল্লাহ তা কবূল করার ওয়াদা করেছেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাসীর ইবনু মা’বাদ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি। হযরত হাসান বসরীকে (রঃ) জিজ্ঞেস করলামঃ হে আবু সাঈদ (রঃ)! আল্লাহ তাআলার যে ইসমে আযমের মাধ্যমে তার কাছে দুআ করলে তিনি তা ককূল করে থাকেন এবং কিছু চাইলে তা প্রদান করে থাকেন ওটা কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি কি কুরআন কারীমের মধ্যে উল্লিখিত আল্লাহ তাআলার এই ফরমনি পাঠ কর নাই?” অতঃপর তিনি (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “হে আমার ভাতিজা! এটাই হলো আল্লাহ তাআলার ঐ ইসমে আযম যে, যখন এর মাধ্যমে তাঁর নিকট দুআ করা হয়। তখন তিনি তা কবুল করে থাকেন এবং যা চাওয়া হয় তা তিনি দিয়ে থাকেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-আম্বিয়া 21:88

৮৭-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর: এই ঘটনাটি এখানেও বর্ণিত হয়েছে এবং সূরায়ে ‘সাফাত ও সূরায়ে ‘নূন'-এও বর্ণিত হয়েছে। ইনি হলেন নবী হযরত ইউনুস ইবনু মাত্তা (আঃ)। তাকে আল্লাহ তাআলা মূসিল অঞ্চলের নীনওয়া নামক গ্রামে নবীরূপে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি ঐ গ্রামবাসীদেরকে আল্লার পথে আহবান করেন; কিন্তু তারা ঈমান আনলো না। তখন তিনি তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে সেখান থেকে চলে যান এবং তাদেরকে বলে যান যে, তাদের উপর তিন দিনের মধ্যে আল্লাহর শাস্তি এসে পড়বে। তার কথায় তাদের বিশ্বাস হয়ে যায় এবং তারা জেনে নেয় যে, নবীর (আঃ) কথা মিথ্যা হয় না। তাই, তারা তাদের শিশুদেরকে ও গৃহপালিত পশুগুলিকে নিয়ে ময়দানের দিকে বেরিয়ে পড়লো। শিশুদেরকে তারা মাতাদের থেকে পৃথক করে দিলো। অতঃপর তারা কাদতে কাঁদতে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করতে লাগলো। একদিকে তাদের কান্নার রোল, আর অপরদিকে জীব জন্তুগুলোর ভয়ানক চীৎকার। এর ফলে আল্লাহর রহমত উথলিয়ে ওঠে। সুতরাং তিনি তাদের উপর হতে শাস্তি উঠিয়ে নেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তবে ইউনুসের (আঃ) সম্প্রদায় ব্যতীত কোন জনপদবাসী কেন এমন হলো না যারা ঈমান আনতো এবং তাদের ঈমান তাদের উপকারে আসতো? যখন তারা ঈমান আনলো তখন আমি তাদেরকে পার্থিব জীবনে হীনতাজনক শাস্তি হতে মুক্ত করলাম এবং কিছু কালের জন্যে জীবনোপভোগ করতে দিলাম।" (১০:৯৮)হযরত ইউনুস (আঃ) এখান হতে চলে গিয়ে একটি নৌকায় আরোহণ করেন। নৌকা কিছুদূর এগিয়ে গেলে তুফানের লক্ষণ প্রকাশ পায়। শেষ পর্যন্ত নৌকাটি ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়। নৌকার আরোহীদের মধ্যে পরামর্শক্রমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, নৌকার ভার হাল্কা করার জন্যে কোন একজন লোককে সমদ্রে নিক্ষেপ করা হোক। সুতরাং নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করা হলে দেখা গেল যে, হযরত ইউনুসেরই (আঃ) নাম বের হয়েছে। কিন্তু কেউই তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করা পছন্দ করলো না। দ্বিতীয়বার গুটিকা নিক্ষেপ করা হলো। এবারও তার নামই উঠলো। তৃতীয়বার পুনরায় গুটিকা ফেলা হলে এবারও তাঁর নামই দেখা দিল। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে লটারীতে যোগদান করলো এবং পরাভূত হলো।" (৩৭:১৪১) তখন হযরত ইউনুস (আঃ) নিজেই দাড়িয়ে গেলেন এবং কাপড় খুলে ফেলে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়লেন। তখন হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) উক্তি অনুসারে আল্লাহ তাআলা ‘বাহরে আখ্যার’ (সবুজ সাগর) হতে একটি বিরাট মাছ পাঠিয়ে দিলেন। মাছটি পানি ফেড়ে ফেড়ে আসলো এবং হযরত ইউনুসকে (আঃ) গিলে ফেললো। কিন্তু মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে মাছটি তার মাংসও খেলো না, অস্থিও ভেঙ্গে ফেললো না। এবং কোন ক্ষতিও করলো না। মাছটির তিনি খাদ্য ছিলেন না, বরং ওর পেট ছিল তার জন্যে কয়েদখানা স্বরূপ। আরবী ভাষায় মাছকে নূন বলা হয়। হযরত ইউনুসের (আঃ) ক্রোধ ছিল তাঁর কওমের উপর। তার ধারণা ছিল যে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি সংকীর্ণতা আনয়ন করবেন না। এখানে হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত যহাক (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন (আরবী) এর অর্থ এটাই করেছেন। ইমাম ইবনু জারীরও (রাঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। দলীল হিসেবে আল্লাহ তাআলার নিম্নেন উক্তিটি পেশ করা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যার জীবনোপকরণ সংকীর্ণ বা সীমিত সে আল্লাহ যা দান করেছেন তা হতে ব্যয় করবে; আল্লাহ যাকে যে সামর্থ দিয়েছেন তদপেক্ষা গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না; আল্লাহ কষ্টের পর দিবেন স্বস্তি।" (৬৫:৭) হযরত আতিয়্যাহ আওফী এটার অর্থ করেছেনঃ “আমি তার উপর নির্ধারণ করবো না। আরববাসীরা (আরবী) ও (আরবী) এর একই অর্থ করে থাকে। কোন কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ যুগ আর প্রত্যাবর্তনকারী নয় যা অতীত হয়েছে। আপনি কল্যাণময়, আপনি যা নির্ধারণ করেন সেই কাজ সংঘটিত হয়ে থাকে।” আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর সব পানি মিলিত হলো এক পরিকল্পনা অনুসারে।” (৫৪:১২) ঐ অন্ধকারের মধ্যে প্রবেশ করে হযরত ইউনুস (আঃ) মহান আল্লাহকে ডাকতে শুরু করেন। সেখানে সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার, মাছের পেটের অন্ধকার এবং রাত্রির অন্ধকার এই তিন অন্ধকার একত্রিত হয়েছিল। তিনি সমুদ্রের তলদেশের কংকর গুলির তাসবীহ পাঠ শুনে নিজেও তাসবীহ পাঠ করতে শুরু করেন। তিনি মাছের পেটে গিয়ে প্রথমতঃ মনে করে ছিলেন যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তারপর তিনি পা নাড়িয়ে দেখেন এবং তা নড়ে ওঠে। সুতরাং মাছের পেটের মধ্যেই তিনি সিজদায় পড়ে যান এবং বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি এমন এক জায়গাকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছি। যে, সতঃ কেউই এই জায়গাকে ইতিপূর্বে সিজদার জায়গা বানায় নাই।হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, হযরত ইউনুস (আঃ) চল্লিশ দিন মাছের পেটে ছিলেন। তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা যখন হযরত ইউনুসকে (আঃ) বন্দী করার ইচ্ছা করেন তখন তিনি মাছকে নির্দেশ দেনঃ “তুমি তাকে গিলে নাও, কিন্তু তার মাংস ভক্ষণ করো না এবং অস্থিও ভেঙ্গে ফেলো না।" যখন তিনি সমুদ্রের তলদেশে পৌঁছেন তখন সেখানে তাসবীহ পাঠ শুনে তিনি হতবাক হয়ে যান। ওয়াহীর মাধ্যমে তাকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, এটা হলো সমুদ্রের জন্তু গুলির তাসবীহ পাঠ। তখন তিনিও আল্লাহর তাসবীহ পাঠ শুরু করে দেন। তার তাসবীহ পাঠ শুনে ফেরেশতারা বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এটা খুবই দুরের শব্দ এবং খুবই দুর্বল অওয়ায, কার আওয়ায এটা? আমরা তে বুঝতে পারলাম না। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে উত্তরে বললেনঃ “এটা আমার বান্দা ইউনুসের (আঃ) শব্দ। সে আমার নাফরমানী করেছে বলে আমি তাকে মাছের পেটে বন্দী করেছি।"ফেরেশতারা তখন বললেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! তার নেক আমলগুলি তো দিনরাত্রির সব সময় আকাশে উঠতেই থাকতো ।?" উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হা।” তখন তারা তার জন্যে সুপারিশ করেন। আল্লাহ তাদের সুপারিশ ককূল করেন। তিনি মাছকে নিদের্শ দেন যে, সে যেন তাঁকে সমুদ্রের তীরে উগলিয়ে দেয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর আমি তাকে নিক্ষেপ করলাম এক তৃণহীন প্রান্তরে এবং সে ছিল রুগ্ন।” (৩৭:১৪৫) উপরে বর্ণিত রিওয়াইয়াতটির ঐ একটি মাত্র সনদ।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন- (আরবী) এই কালেমাটির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেন তখন এই কালেমাটি আরূশের চারদিকে ঘুরতে থাকে। তখন ফেরেশতারা বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এটা তো খুবই দূরের শব্দ। কিন্তু কান এ শব্দের সাথে পরিচিত। এটা অত্যন্ত দুর্বল ও ক্ষীণ শব্দ!" আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কার শব্দ তা কি তোমরা জান না?” উত্তরে তারা বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! না তো! কে তিনি?” আল্লাহ তাআলা তখন বলেনঃ “এটা হলো আমার বান্দা ইউনুসের (আঃ) শব্দ। ফেরেশতারা তখন বলেনঃ “তা হলে তিনি তো সেই ইউনস (আঃ} যার ককূলকৃত পবিত্র আমল প্রত্যেক দিন আপনার নিকট উঠে আসতো এবং যার প্রার্থনা আপনি ককূল করতেন! হে আমাদের প্রতিপালক! তিনি যখন সুখের সময় ভাল আমল করতেন তখন এই বিপদের সময় আপনি তার প্রতি দয়া করুন!” তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলা মাছকে হুকুম করলেন যে, সে যেন কোন কষ্ট না দিয়েই তাকে সমুদ্রের তীরে নিক্ষেপ করে। (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে উদ্ধার করলাম দুশ্চিন্তা হতে। আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি। সে বিপদে পরিবেষ্টিত হয়ে যখন আমাকে আহবান করলো, আমি তখন তার আহবানে সাড়া দিলাম এবং ঐ বিপদ থেকে তাকে মুক্তি দান করলাম।বিশেষ করে যারা বিপদ আপদের সময় এই দুআয়ে ইউনুস (আঃ) পাঠ করে তাদেরকে আল্লাহ তাআলা ঐ সব বিপদ আপদ থেকে উদ্ধার করে থাকেন। এ ব্যাপারে সাইয়্যেদুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদের (সঃ) পক্ষ হতে খুবই উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। হযরত সা’দ ইবনু আবি অক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি মসজিদে হযরত উছমান ইবনু আফানের (রাঃ) নিকট গমন করি। আমি তাকে সালাম করি। তিনি আমাকে পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখেন, কিন্তু আমার সালামের জবাব দিলেন না। আমি তখন আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনু খাত্তাবের (রাঃ) নিকট গিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করি। তিনি হযরত উছমানকে ডেকে পাঠান এবং তাঁকে বলেনঃ “আপনি আপনার এই মুসলমান ভাই-এর সালামের জবাব দেন নাই কেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি এরূপ করি নাই (অর্থাৎ তিনি আমার কাছে আসেন নাই এবং সালামও দেন নাই।" আমি। বললামঃ হাঁ (অর্থাৎ আমি এসেছি ও সালাম দিয়েছি)। শেষ পর্যন্ত তিনি শপথ করলেন এবং আমিও শপথ করলাম। তারপর কি মনে করে তিনি বললেনঃ “আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তার কাছে তাওবা করছি। অবশ্যই ইতিপূর্বে আমার কাছে এসেছিলেন। কিন্তু ঐ সময় আমি মনে মনে ঐকথা বলছিলাম যা আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হতে শুনেছিলাম। আল্লাহর শপথ! যখন আমার ঐ কথা মনে হয়ে যায় তখন শুধু আমার চোখের উপরই পর্দা পড়ে না, বরং আমার অন্তরের উপরও পর্দা পড়ে যায়। আমি তখন বললামঃ আমি আপনাকে ঐ খবর দিচ্ছি। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের সামনে প্রথম দুআ’র বর্ণনা দিতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় এক বেদুঈন এসে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) কথার মোড় নিজের দিকে ফিরিয়ে নেন। এভাবে অনেক্ষণ কেটে যায়। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান থেকে উঠে পড়েন এবং নিজের বাড়ীর দিকে চলতে শুরু করেন। আমিও তার পিছনে পিছনে চলতে থাকি। যখন তিনি বাড়ীর কাছাকাছি হয়ে যান তখন আমি আশংকা করি যে, তিনি হয়তো বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করবেন, আর আমি এখানেই রয়ে যাবো। সুতরাং আমি জোরে জোরে পা ফেলে চলতে লাগলাম। আমার জুতার শব্দ শুনে তিনি আমার দিকে ফিরে তাকান এবং বলেনঃ “আরে, তুমি আবু ইসহাক?” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাঁ, আমিই বটে। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “খবর কি?” আমি জবাব দিলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি প্রথম দুআ’র বর্ণনা দিতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় ঐ বেদুঈন এসে পড়েছিল এবং আপনার কথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তিনি আমার একথা শুনে বললেনঃ “হাঁ, হাঁ।” ওটা ছিল যুন নূনের (আঃ) দুআ যা তিনি মাছের পেটের মধ্যে থাকা অবস্থায় করেছিলেন। অর্থাৎ (আরবী) এই দুআ’টি। জেনে রেখো যে, যে কোন মুসলমান যে কোন ব্যাপারে যখনই তার প্রতিপালকের কাছে এই দুআ’টি করবে, তিনি তা ককূল করবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে কেউই হযরত ইউনুসের (আঃ) এই দুআ’র মাধ্যমে দুআ করবে, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তার দুআ কবূল করবেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে) হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াতেই এরপরেই রয়েছেঃ “এভাবেই আমি মু'মিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি।”হযরত সা'দ ইবনু আবি অক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহ তাআলার ঐ নামটি যার মাধ্যমে তাঁকে ডাকলে তিনি সেই ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন এবং কিছু চাইলে প্রদান করে থাকেন তা হলো হযরত ইউনুস ইবনু মাত্তার (আঃ) দুআটি।” হযরত সাদ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কি হযরত ইউনুসের (আঃ) জন্যে বিশিষ্ট ছিল, না সমস্ত মুসলমানের জন্যেই সাধারণ?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তুমি কি কুরআন কারীমে পড় নাই যে, তাতে রয়েছেঃ “আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম ও তাকে দুশ্চিন্তা হতে উদ্ধার করে ছিলাম এবং এভাবেই আম মু'মিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি।” সুতরাং যে কেউই এই দুআ করবে আল্লাহ তা কবূল করার ওয়াদা করেছেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাসীর ইবনু মা’বাদ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি। হযরত হাসান বসরীকে (রঃ) জিজ্ঞেস করলামঃ হে আবু সাঈদ (রঃ)! আল্লাহ তাআলার যে ইসমে আযমের মাধ্যমে তার কাছে দুআ করলে তিনি তা ককূল করে থাকেন এবং কিছু চাইলে তা প্রদান করে থাকেন ওটা কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি কি কুরআন কারীমের মধ্যে উল্লিখিত আল্লাহ তাআলার এই ফরমনি পাঠ কর নাই?” অতঃপর তিনি (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “হে আমার ভাতিজা! এটাই হলো আল্লাহ তাআলার ঐ ইসমে আযম যে, যখন এর মাধ্যমে তাঁর নিকট দুআ করা হয়। তখন তিনি তা কবুল করে থাকেন এবং যা চাওয়া হয় তা তিনি দিয়ে থাকেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-আম্বিয়া 21:89

৮৯-৯০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দা হযরত যাকারিয়্যার (আঃ) খবর দিচ্ছেন যে, তিনি প্রার্থনা করেছিলেনঃ “আমাকে একটি সন্তান দান করুন, যে আমার পরে নবী হবে।” সূরায়ে মারইয়াম ও সূরায়ে আল-ইমরানে এই ঘটনা বিস্তারিত ভাবে বর্ণিত হয়েছে। তিনি এই দুআ’ নির্জনে করেছিলেন। ‘আমাকে একা ছেড়ে দিয়েন না, এই উক্তির তাৎপর্য হচ্ছেঃ আমাকে সন্তানহীন করবেন না। দুআ ও চাওয়ার জন্যে তিনি আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রার্থনা কবূল করেন এবং তার যে স্ত্রী বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন তাকে তিনি সন্তানের যোগ্যা করে তোলেন। হযরত ইবন আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, তিনি বন্ধ্যা ছিলেন, অতঃপর তিনি সন্তান প্রসব করেন। আবদুর রহমান ইবনু মাহদী (রঃ) তালহা ইবনু আমর (রঃ) হতে, তিনি আতা (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর লম্বা চওড়া কথা বন্ধ করে দেয়া হয়। আবার অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তার চরিত্রে কিছু ত্রুটি ছিল তা সংশোধন করে দেয়া হয়। কিন্তু প্রথম অর্থটিই কুরআনের ভাষার বেশী নিকটবর্তী।মহান আল্লাহ বলেনঃ তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করতো। তারা আমাকে ডাকতো আশা ও ভীতির সাথে এবং তারা ছিল আমার নিকট বিনীত। বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) একদা তাঁর এক ভাষণে বলেনঃ “হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে আল্লাহকে ভয় করতে থাকা, পূর্ণভাবে তাঁর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করা, লোভ ও ভয়ের সাথে প্রার্থনা করা এবং প্রার্থনায় বিনয় প্রকাশ করার উপদেশ দিচ্ছি। দেখো, আল্লাহ তাআলা হযরত যাকারিয়্যার (আঃ) পরিবারের লোকদের এই ফযীলতই বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তিনি- (আরবী) এই আয়াতাংশ টুকু পাঠ করেন।

আল-আম্বিয়া 21:90

৮৯-৯০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দা হযরত যাকারিয়্যার (আঃ) খবর দিচ্ছেন যে, তিনি প্রার্থনা করেছিলেনঃ “আমাকে একটি সন্তান দান করুন, যে আমার পরে নবী হবে।” সূরায়ে মারইয়াম ও সূরায়ে আল-ইমরানে এই ঘটনা বিস্তারিত ভাবে বর্ণিত হয়েছে। তিনি এই দুআ’ নির্জনে করেছিলেন। ‘আমাকে একা ছেড়ে দিয়েন না, এই উক্তির তাৎপর্য হচ্ছেঃ আমাকে সন্তানহীন করবেন না। দুআ ও চাওয়ার জন্যে তিনি আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রার্থনা কবূল করেন এবং তার যে স্ত্রী বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন তাকে তিনি সন্তানের যোগ্যা করে তোলেন। হযরত ইবন আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, তিনি বন্ধ্যা ছিলেন, অতঃপর তিনি সন্তান প্রসব করেন। আবদুর রহমান ইবনু মাহদী (রঃ) তালহা ইবনু আমর (রঃ) হতে, তিনি আতা (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর লম্বা চওড়া কথা বন্ধ করে দেয়া হয়। আবার অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তার চরিত্রে কিছু ত্রুটি ছিল তা সংশোধন করে দেয়া হয়। কিন্তু প্রথম অর্থটিই কুরআনের ভাষার বেশী নিকটবর্তী।মহান আল্লাহ বলেনঃ তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করতো। তারা আমাকে ডাকতো আশা ও ভীতির সাথে এবং তারা ছিল আমার নিকট বিনীত। বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) একদা তাঁর এক ভাষণে বলেনঃ “হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে আল্লাহকে ভয় করতে থাকা, পূর্ণভাবে তাঁর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করা, লোভ ও ভয়ের সাথে প্রার্থনা করা এবং প্রার্থনায় বিনয় প্রকাশ করার উপদেশ দিচ্ছি। দেখো, আল্লাহ তাআলা হযরত যাকারিয়্যার (আঃ) পরিবারের লোকদের এই ফযীলতই বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তিনি- (আরবী) এই আয়াতাংশ টুকু পাঠ করেন।

আল-আম্বিয়া 21:91

এভাবেই আল্লাহ তাআলা হযরত মারইয়াম (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করেছেন। কুরআন কারীমে প্রায়ই হযরত যাকারিয়া (আঃ) ও হযরত ইয়াহইয়ার (আঃ) ঘটনার সাথে সাথেই হযরত মারইয়াম (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। কেননা, তাঁদের মধ্যে পুরোপুরি সম্পর্ক ও সম্বন্ধ রয়েছে। হযরত যাকারিয়্যা (আঃ) পূর্ণ বার্ধক্যে পদার্পণ করেছিলেন এবং তার স্ত্রীও ছিলেন বন্ধ্যা। আর তিনিও বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন, এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সন্তান দান করেছিলেন। মহান আল্লাহ নিজের এই ক্ষমতা প্রদর্শনের পর স্বামী ছাড়াই শুধু স্ত্রী লোককে সন্তান দান করে তিনি নিজের আর এক ব্যাপক ক্ষমতা প্রকাশ করেছেন। সরায়ে আল-ইমরান ও সুরায়ে মারইয়ামেও এই শ্রেণী বিন্যাসই রয়েছে।‘যে নিজ সতীত্বকে রক্ষা করেছিল এই উক্তি দ্বারা হযরত মারইয়ামকে (আঃ) বুঝানো হয়েছে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ সূরায়ে তাহরীমে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(আরো দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন) ইমরান-তনয়া মারইয়ামের (আঃ) যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল, ফলে আমি তার মধ্যে রূহ ফুকে দিয়েছিলাম।” (৬৬:১২) আল্লাহ বলেনঃ আমি তাকে ও তার পুত্রকে করেছিলাম বিশ্ববাসীর জন্যে এক নিদর্শন। যাতে বিশ্ববাসী আল্লাহ তাআলার সর্বপ্রকারের ক্ষমতা, সৃষ্টি কৌশলের ব্যাপক অধিকার ও স্বাধীনতা সম্পর্কে অবহিত হতে পারে। হযরত ঈসা (আঃ) ছিলেন আল্লাহর কুদরতের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। তিনি নিদর্শন ছিলেন দানব ও মানব উভয় জাতির জন্যেই।

আল-আম্বিয়া 21:92

৯২-৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রাঃ), হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনু যায়েদ ইবনু আসলাম (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) এর অর্থ হচ্ছে। তোমাদের দ্বীন হলো একই দ্বীন। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতে যা হতে বিরত থাকতে হবে এবং যা করতে হবে তাই বর্ণনা করা হয়েছে। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের (আরবী) এবং (আরবী) ওর। আর (আরবী) শব্দ দুটি (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ যে শরীয়তের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা তোমাদের সবারই শরীয়ত, যার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর একত্ববাদ। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) (হে রাসুলগণ! তোমরা উৎকৃষ্ট জিনিস ভক্ষণ কর) (আমি তোমাদের প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা আমাকে ভয় কর) ... পর্যন্ত। (২৩:৫১-৫২)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীদের দল পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই (আমাদের সবারই পিতা একই), আমাদের সবারই একই দ্বীন)” তা হলো। এক শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদত করা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেকের জন্যে আমি পথ ও পন্থা করে দিয়েছি।" (৫:৪৮) অতঃপর লোকেরা মতানৈক্য সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ তাদের বীদের (আঃ) উপর ঈমান এনেছে এবং কেউ কেউ ঈমান আনয়ন করে নাই।মহান আল্লাহ বলেনঃ কিয়ামতের দিন সকলকেই আমারই নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। প্রত্যেককেই নিজ নিজ কতকর্মের প্রতিদান দেয়াহবে। ভাল লোকদেরকে দেয়া হবে ভাল প্রতিদান। মন্দ লোকদেরকে দেয়া হবে মন্দ প্রতিদান।সুতরাং কেউ যদি মু'মিন হয়ে সৎকর্ম করে তবে তার কর্ম প্রচেষ্টা অগ্রাহ্য হবে না এবং আল্লাহ তাআলা তা লিখে রাখেন। যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সকর্মশীলদের বিনিময় আমি নষ্ট করি না।” (১৮:৩০) আল্লাহ তাআ'লা অনুপরিমাণ যুলুম করাও সমীচীন মনে করেন না। তিনি স্বীয় বান্দাদের সমস্ত আমল লিখে রাখেন। একটিও ছুটে যায় না।

আল-আম্বিয়া 21:93

৯২-৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রাঃ), হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনু যায়েদ ইবনু আসলাম (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) এর অর্থ হচ্ছে। তোমাদের দ্বীন হলো একই দ্বীন। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতে যা হতে বিরত থাকতে হবে এবং যা করতে হবে তাই বর্ণনা করা হয়েছে। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের (আরবী) এবং (আরবী) ওর। আর (আরবী) শব্দ দুটি (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ যে শরীয়তের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা তোমাদের সবারই শরীয়ত, যার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর একত্ববাদ। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) (হে রাসুলগণ! তোমরা উৎকৃষ্ট জিনিস ভক্ষণ কর) (আমি তোমাদের প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা আমাকে ভয় কর) ... পর্যন্ত। (২৩:৫১-৫২)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীদের দল পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই (আমাদের সবারই পিতা একই), আমাদের সবারই একই দ্বীন)” তা হলো। এক শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদত করা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেকের জন্যে আমি পথ ও পন্থা করে দিয়েছি।" (৫:৪৮) অতঃপর লোকেরা মতানৈক্য সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ তাদের বীদের (আঃ) উপর ঈমান এনেছে এবং কেউ কেউ ঈমান আনয়ন করে নাই।মহান আল্লাহ বলেনঃ কিয়ামতের দিন সকলকেই আমারই নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। প্রত্যেককেই নিজ নিজ কতকর্মের প্রতিদান দেয়াহবে। ভাল লোকদেরকে দেয়া হবে ভাল প্রতিদান। মন্দ লোকদেরকে দেয়া হবে মন্দ প্রতিদান।সুতরাং কেউ যদি মু'মিন হয়ে সৎকর্ম করে তবে তার কর্ম প্রচেষ্টা অগ্রাহ্য হবে না এবং আল্লাহ তাআলা তা লিখে রাখেন। যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সকর্মশীলদের বিনিময় আমি নষ্ট করি না।” (১৮:৩০) আল্লাহ তাআ'লা অনুপরিমাণ যুলুম করাও সমীচীন মনে করেন না। তিনি স্বীয় বান্দাদের সমস্ত আমল লিখে রাখেন। একটিও ছুটে যায় না।

আল-আম্বিয়া 21:94

৯২-৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রাঃ), হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনু যায়েদ ইবনু আসলাম (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) এর অর্থ হচ্ছে। তোমাদের দ্বীন হলো একই দ্বীন। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতে যা হতে বিরত থাকতে হবে এবং যা করতে হবে তাই বর্ণনা করা হয়েছে। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের (আরবী) এবং (আরবী) ওর। আর (আরবী) শব্দ দুটি (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ যে শরীয়তের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা তোমাদের সবারই শরীয়ত, যার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর একত্ববাদ। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) (হে রাসুলগণ! তোমরা উৎকৃষ্ট জিনিস ভক্ষণ কর) (আমি তোমাদের প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা আমাকে ভয় কর) ... পর্যন্ত। (২৩:৫১-৫২)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীদের দল পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই (আমাদের সবারই পিতা একই), আমাদের সবারই একই দ্বীন)” তা হলো। এক শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদত করা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেকের জন্যে আমি পথ ও পন্থা করে দিয়েছি।" (৫:৪৮) অতঃপর লোকেরা মতানৈক্য সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ তাদের বীদের (আঃ) উপর ঈমান এনেছে এবং কেউ কেউ ঈমান আনয়ন করে নাই।মহান আল্লাহ বলেনঃ কিয়ামতের দিন সকলকেই আমারই নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। প্রত্যেককেই নিজ নিজ কতকর্মের প্রতিদান দেয়াহবে। ভাল লোকদেরকে দেয়া হবে ভাল প্রতিদান। মন্দ লোকদেরকে দেয়া হবে মন্দ প্রতিদান।সুতরাং কেউ যদি মু'মিন হয়ে সৎকর্ম করে তবে তার কর্ম প্রচেষ্টা অগ্রাহ্য হবে না এবং আল্লাহ তাআলা তা লিখে রাখেন। যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সকর্মশীলদের বিনিময় আমি নষ্ট করি না।” (১৮:৩০) আল্লাহ তাআ'লা অনুপরিমাণ যুলুম করাও সমীচীন মনে করেন না। তিনি স্বীয় বান্দাদের সমস্ত আমল লিখে রাখেন। একটিও ছুটে যায় না।

আল-আম্বিয়া 21:95

৯৫-৯৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেন যে, ধ্বংস প্রাপ্ত লোকদের পুনরায় দুনিয়ায় প্রত্যাবর্তন অসম্ভ। ভাবার্থ এও হতে পারে যে, তাদের তাওবা গৃহীত হবে না কিন্তু প্রথম উক্তিটিই উত্তম। ইয়াজুজ ও মাজুজ হযরত আদমেরই (আঃ) বংশোদ্ভূত। এমনকি তারা হযরত নূহের (আঃ) পুত্র ইয়াফাসের সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত। তুর্কীরা তাদেরই বংশধর। এরাও তাদেরই একটা দল। এদেরকে যুলকারনাইনের নির্মিত প্রাচীরের বাইরে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি প্রাচীরটি নির্মাণ করে বলেছিলেনঃ “এটা আমার প্রতিপালকের রহমত। আল্লাহর ওয়াদাকৃত সময়ে তা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আমার প্রতিপালকের ওয়াদা সত্য।”কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সময় ইয়াজুজ মাজুজ সেখান থেকে বেরিয়ে আসবে এবং ভূ-পৃষ্ঠে বিশৃংখলা সৃষ্টি করবে। প্রত্যেক উঁচু জায়গাকে আরবী ভাষায় (আরবী) বলা হয়। বর্ণিত আছে যে, তাদের বের হওয়ার সময় তাদের এই অবস্থাই হবে। এই খবরকে শ্রোতাদের সামনে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, যেন তারা স্বচক্ষে দেখতে রয়েছে। আর বাস্তবিকই আল্লাহ তাআলা অপেক্ষা অধিক সত্য খবরদাতা আর কে হতে পারে? তিনি তো দৃশ্য ও অদৃশ্য সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। যা হয়ে গেছে ও যা হবে তা তিনি সম্যক অবগত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) ছেলেদেরকে লাফাতে, খেলতে, দৌড়তে এবং একে অপরের উপর চড়তে দেখে বলেনঃ “এভাবেই ইয়াজুজ মাজুজ আসবে।” বহু হাদীসে তাদের বের হওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথম হাদীসঃ হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছেনঃ “ইয়াজুজ ও মাজুজকে যখন খুলে দেয়া হবে এবং তারা লোকদের কাছে পৌঁছবে, যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তারা প্রত্যেক উচ্চ ভূমি হতে ছুটে আসবে।” তখন তারা জনগণের মধ্যে ছেয়ে যাবে এবং মুসলমানরা তাদের শহর ও দুর্গের মধ্যে কুঁচকে পড়বে। আর তারা তাদের পশুগুলিকে ওর মধ্যে নিয়ে যাবে। তারা ভূ-পৃষ্ঠের পানি পান করতে থাকবে। ইয়াজুজ মাজুজ যে নদীর পার্শ্ব দিয়ে গমন করবে, ওর পানি তারা সমস্ত পান করে ফেলবে। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে ধূলো উড়তে থাকবে। তাদের অন্য দল যখন সেখানে পৌঁছবে তখন তারা পরস্পর বলাবলি করবে: “সতঃ কোন যুগে এখানে পানি ছিল।" যখন তারা দেখবে যে, এখন ভুপৃষ্ঠে আর কেউই অবশিষ্ট নেই। আর বাস্তবিকই যে সব মুসলমান নিজেদের শহরে ও দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করবে তারা ছাড়া যমীনের উপর আর কেউই বাকী থাকবে না, তখন তারা বলবেঃ পৃথিবীর অধিবাসীদেরকে তো আমরা শেষ করে ফেলেছি, সুতরাং এখন আকাশবাসীদের খবর নেয়া যাক।" অতঃপর তাদের একজন দুষ্ট ব্যক্তি তার বর্শাটি আকাশের দিকে নিক্ষেপ করবে। তখন মহান আল্লাহর হুকুমে ওটা রক্ত মাখানো অবস্থায় তাদের কাছে ফিরে আসবে। এটাও হবে একটা কুদরতী পরীক্ষা। এরপ তাদের ঘাড়ে গুটি বের হবে এবং এই মহামারীতে তারা সবাই একই সাথে মৃত্যু বরণ করবে। তাদের একজনও অবশিষ্ট থাকবে না। তাদের সমস্ত শোর গোলের সমাপ্তি ঘটবে। মুসলমানরা বলবেঃ “এমন কেউ আছে কি, যে আমাদের মুসলমানদের স্বার্থে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাইরে গিয়ে শত্রুদের অবস্থা দেখে আসতে পারে?" তখন এক ব্যক্তি এজন্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে এবং নিজেকে নিহত মনে করে আল্লাহর পথে মুসলমানদের খিদমতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে। তখন সে দেখতে পাবে যে শত্রুদের মৃতদেহের স্কুপ পড়ে রয়েছে। সবাই ধ্বংসের কবলে পতিত হয়েছে। তখন উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বলবেঃ “হে মুসলিম বৃন্দ! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর এবং খুশী হয়ে যাও। আল্লাহ তাআলা তোমাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। তাদের মৃতদেহের ঢেরি পড়ে রয়েছে। তার একথা শুনে মুসলমাল্লা বেরিয়ে আসবে এবং তাদের গৃহপালিত পশুগুলিকেও সাথে আনবে। তাদের পশুগুলির খাদ্য মৃতদেহগুলির মাংস ছাড়া আর কিছু থাকবে না। ওগুলি খেয়ে তারা খুব মোটা তাজী হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন) দ্বিতীয় হাদীসঃ হযরত নাওয়াস ইবনু সামআন আল কিলাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা সকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাজ্জালের বর্ণনা দেন এবং এই বর্ণনা তিনি এমনভাবে দেন যে, সে খেজুর গাছের আড়ালে রয়েছে। বলে আমাদের ধারণা হয়। আর মনে হয় যে, সে যেন বের হতে চাচ্ছে। তিনি বলেনঃ “আমি তোমাদের ব্যাপারে দাজ্জালের চেয়ে অন্য কিছুর বেশী ভয় করি। আমি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় যদি সে বের হয়। তবে তোমাদের মাঝে আমি তার প্রতিবন্ধক হয়ে যাবো। আর আমি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকবো না এমন অবস্থায় যদি সে বের হয় তবে আমি তোমাদের নিরাপত্তার জন্যে তোমাদেরকে আল্লাহর হাতে সমর্পণ করছি। সে হবে এলোমেলো চুল বিশিষ্ট এবং কানা ও উপরের দিকে উখিত চক্ষু বিশিষ্ট যুবক। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী স্থান হতে বের হবে। ডান দিকে ও বাম দিকে সে ঘুরতে থাকবে। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা অটল ও স্থির থাকবে।” আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কত দিন অবস্থান করবে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “চল্লিশ দিন। একটি দিন এক বছরের সমান, একটি দিন একমাসের সমান, একটি দিন হবে এক সপ্তাহের সমান এবং অবশিষ্ট দিন হবে সাধারণ দিনের মত।" আমরা আবার প্রশ্ন করলামঃ যে দিনটি এক বছরের সমান হবে তাতে এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়লেই কি যথেষ্ট হবে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “না, বরং অনুমান করে তোমাদেরকে সময় মত নামায আদায় করতে হবে। আমরা পুনরায় জিজ্ঞেস করলামঃ তার চলন গতি কেমন হবে? তিনি জবাব দিলেনঃ “যেমন বায়ু মেঘকে এদিক ওদিক তাড়িয়ে নিয়ে যায় তেমনই সে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে। এক গোত্রের কাছে যাবে এবং তাদেরকে নিজের দিকে আহ্বান করবে। তারা তার কথা মেনে নেবে। সে আকাশকে নির্দেশ দেবে যে, ও যেন তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করে। যমীনকে তাদের জন্যে ফসল উৎপাদন করার হুকুম করবে। তাদের পশুগুলি পেটপূর্ণ অবস্থায় মোটা তাজা হয়ে ফিরে আসবে। অতঃপর সে অন্য গোত্রের নিকট গিয়ে তাদেরকে নিজের দিকে আহ্বান করবে, কিন্তু তারা অস্বীকার করবে। সে সেখান থেকে চলে আসবে। তখন তাদের সমস্ত মালধন তার পিছনে চলে আসবে এবং তারা হয়ে যাবে সম্পূর্ণ শূন্য হস্ত। সে অনাবাদী জঙ্গলে যাবে এবং যমীনকে বলবেঃ “তোমার গুপ্তধন উঠিয়ে দাও | যমীন তখন তা উপরে উঠিয়ে ফেলবে। তখন সমস্ত ধন ভাণ্ডার তার পিছনে এমনভাবে চলে যাবে যেমন ভাবে মৌমাছিগুলি তাদের নেতাদের পিছনে চলে থাকে। সে এও দেখাবে যে, একজন লোককে তরবারী দ্বারা দু'টুকরা করে দেবে এবং ও দুটিকে এদিকে ওদিকে বহু দূরে নিক্ষেপ করবে। তারপর তার নাম ধরে ডাক দেবে এবং তৎক্ষণাৎ সে জীবিত হয়ে তার কাছে চলে আসবে। সে ঐ অবস্থাতেই থাকবে এমতাবস্থায় মহামহিমান্বিত আল্লাহ হযরত মসীহকে (আঃ) অবতীর্ণ করবেন। তিনি দামেস্কের পূর্ব দিকে সাদা মিনারের পার্শ্বে অবতরণ করবেন। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় ফেরেশতাদের ডানার উপর রাখবেন। তিনি দাজ্জালের পশ্চাদ্ধাবন করবেন এবং পূর্ব দরজা ‘লুদ-এর কাছে তাকে পেয়ে তাকে হত্যা করে ফেলবেন। তারপর হযরত ঈসার (আঃ) কাছে আল্লাহর ওয়াহী আসবেঃ “আমি আমার এমন বান্দাদেরকে পাঠাচ্ছি যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার ক্ষমতা তোমার নেই। সুতরাং তুমি আমার বান্দাদেরকে তুরের কাছে একত্রিত কর।” অতঃপর আল্লাহ তাআলা ইয়াজুজ মাজুজকে পাঠাবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা প্রত্যেক উঁচু স্থান হতে ছুটে আসবে।” তাদের কাজে অতিষ্ঠ হয়ে হযরত ঈসা (আঃ) ও তার সঙ্গীরা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। তখন তিনি গুটির রোগ পাঠাবেন যা তাদের গ্রীবায় বের হবে তখন তারা সবাই এক সাথে মৃত্যু বরণ করবে। অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ) তার মু'মিন সঙ্গীগণ সহ এসে দেখবেন যে, সমস্ত যমীনে তাদের মৃতদেহের ঢেরী হয়ে গেছে। আর তাদের দুর্গন্ধে থাকা যায় না। হযরত ঈসা (আঃ) তখন আবার দুআ করবেন। ফলে আল্লাহ তাআলা উটের গর্দানের ন্যায় পাখি পাঠিয়ে দিবেন যারা ঐ মৃতদেহগুলি উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে কোথায় যে ফেলে দেবে তা তিনিই জানেন। তারপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত অনবরত যমীনে বৃষ্টি বর্ষিত হয়ে থাকবে। ফলে যমীন ধুয়ে মুছে হাতের তালুর ন্যায় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। অতঃপর মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে বরকত উৎপাদন করবে। ঐদিন একটি দলের লোক একটি ডালিম খেয়েই পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে এবং ওর বাকলের ছায়া তলে আশ্রয় লাভ করবে। একটি উষ্টীর দুগ্ধ একটি দলের লোকদের জন্যে, একটি গাভীর দুগ্ধ একটি গোত্রের জন্যে এবং একটি বকরীর দুগ্ধ একটি বাড়ীর পরিবারের জন্যে যথেষ্ট হবে। তারপর এক পবিত্র বায়ু প্রবাহিত হবে যা মুসলমানদের বগলের নীচ দিয়ে বের হবে এবং তাদের রূহ্ কব হয়ে যাবে। তখন যমীনে শুধু দুষ্ট লোকেরাই অবশিষ্ট থাকবে, যারা গাধার মত লাফাতে থাকবে। তাদের উপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন) তৃতীয় হাদীসঃ হযরত হারমালা (রাঃ) তার খালা হতে বর্ণনা করেছেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভাষণ দিচ্ছিলেন। ঐ সময় তার আঙ্গুলে বৃশ্চিকে দংশন করেছিল বলে তিনি ঐ আঙ্গুলে পট্টি বেঁধে ছিলেন। ভাষণে তিনি বলেনঃ “তোমরা বলছো যে, এখন দুশমন নেই। কিন্তু তোমরা দুশমনদের সাথে যুদ্ধ করতেই থাকবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা ইয়াজুজ মাজুজকে পাঠাবেন। তারা হবে চওড়া চেহারা ও ছোট চোখ বিশিষ্ট। তাদের চেহারা হবে প্রশস্ত ঢালের মত।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমদে বর্নিত হয়েছে) চতুর্থ হাদীসঃ এই রিওয়াইয়াতটি সূরায়ে আ'রাফের তাফসীরের শেষ ভাগে বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মিরাজের রাত্রে হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) মধ্যে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময়ের ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “এ সম্পর্কে। আমার কোন জ্ঞান বা অবগতি নেই। অনুরূপভাবে হযরত মূসা (আঃ) তার অজানার কথা প্রকাশ করেন। তখন হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “কিয়ামত যে কোন্ সময় সংঘটিত হবে এটা আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। তবে আমার প্রতিপালক আমাকে এটুকু জানিয়ে দিয়েছেন যে, দাজ্জাল বের হবে। আমার সাথে দুটো ডাল থাকবে। আমাকে দেখা মাত্রই সে শীশার মত গলতে শুরু করবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করে ফেলবেন, যখন সে আমাকে দেখবে। এমনকি পাথর ও বৃক্ষও বলে উঠবেঃ “হে মুসলমান! এই যে, কাফির আমার ছায়ার নীচে রয়েছে, তুমি এসে তাকে হত্যা কর।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করে দিবেন এবং জনগণ তাদের শহরে ও দেশে ফিরে যাবে। ঐ সময় ইয়াজুজ মাজুজ বের হবে যারা প্রত্যেক উঁচু স্থান হতে ছুটে আসবে এবং যা পাবে ধ্বংস করবে। যত পানি পাবে সব পান করে ফেলবে। জনগণ আবার অতিষ্ঠ হয়ে নিজেদের বাস ভূমিতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। তারা অভিযোগ করবে, তখন আমি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করবো। ফলে তিনি তাদেরকে ধ্বংস করে দিবেন। সারা ভূ পৃষ্ঠে তাদের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে। তারপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং পানির নালাগুলি তাদের গলিত মৃত দেহগুলি টেনে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে ফেলে দিবে। আমার প্রতিপালক আমাকে একথা বলে দিয়েছেন। যখন এসব কিছু প্রকাশিত হয়ে পড়বে তখন কিয়ামত সংঘটিত হওয়া ঠিক তেমনই যেমন পূর্ণ গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হওয়া। ঐ সময় তার পরিবারে লোকদের এই চিন্তা থাকে যে, হয়তো সকালে সে সন্তান প্রসব করবে বা সন্ধ্যায় করবে অথবা রাত্রে করবে।” (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম ইবনু মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কুরআন কারীমের (আরবী) এই আয়াতটি এটাকে সত্যায়িত করছে। এই ব্যাপারে বহু হাদীস রয়েছে। হযরত কা'ব (রাঃ) বলেন যে, ইয়াজুজ মাজুজের বের হবার সময় তারা প্রাচীর খনন করবে। এমন কি তাদের কোদালের শব্দ আশে পাশের লোকেরা শুনতে পাবে। খনন করতে করতে রাত্রি হয়ে যাবে। তখন তাদের একজন। বলবেঃ “সকালে এসে আমরা এটাকে ভেঙ্গে ফেলবো।” কিন্তু আল্লাহ তাআলা ওটাকে পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে দিবেন। সকালে এসে তারা দেখতে পাবে যে, ওটাকে আল্লাহ তাআলা পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। আবার তারা খনন করতে শুরু করবে এবং এই একই অবস্থা ঘটতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত যখন তাদের বের হওয়া আল্লাহ তাআলা মঞ্জুর করবেন তখন তাদের এক ব্যক্তির মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাবেঃ “আগামী কাল ইনশা আল্লাহ আমরা এটাকে ভেঙ্গেফেলবো।” সুতরাং পরদিন এসে তারা দেখতে পাবে যে গতকাল তারা ওটাকে যে অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছিল ঐ অবস্থাতেই রয়েছে। তখন তারা ওটাকে খনন করে ভেঙ্গে ফেলবে। তাদের প্রথম দলটি বাহীরার পার্শ্ব দিয়ে বের হবে এবং সমস্ত পানি পান করে ফেলবে। দ্বিতীয় দলটি এসে শুধু কাদা চাটবে। আর তৃতীয় দলটি এসে বলবেঃ “সম্ভবতঃ কোন সময় এখানে পানি ছিল। জনগণ তাদেরকে দেখে পালিয়ে গিয়ে এদিকে ওদিকে লুকিয়ে যাবে। যখন তারা যমীনে কাউকেও দেখতে পাবে না তখন আকাশের দিকে তাদের তীর ছুঁড়বে। তখন ঐ তীরটি রক্ত মাখানো অবস্থায় তাদের কাছে ফিরে আসবে। তারা তখন গর্ব করে বলবেঃ “আমরা পৃথিবীবাসী ও আকাশবাসীদের উপর বিজয়ী হয়েছি।” ঐ সময় হযরত ঈসা ইবনু মারইয়াম (আঃ) তাদের উপর বদ দুআ করে বলবেনঃ “হে আল্লাহ! তাদের সাথে মুকাবিলা করার শক্তি আমাদের নেই। অরি যমীনে চলা ফেরা করাও আমাদের প্রয়োজন। সুতরাং যেভাবেই হোক আপনি আমাদেরকে তাদের কবল থেকে মুক্তি দান করুন।" তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মহামারীতে আক্রান্ত করবেন। তাদের দেহে গুটি বের হবে এবং তাতেই তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। তারপর এক প্রকারের পাখী এসে তাদেরকে চঞ্চুতে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। তারপর মহান আল্লাহ নাহরে হায়াত জারি করে দিবেন, যা যমীন ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেবে। যমীন নিজের বরকত বের করবে। একটি ডালিম একটি বাড়ীর পরিবারবর্গের জন্যে যথেষ্ট হবে। এক ব্যক্তি এসে ঘোষণা করবেঃ ‘যুসসুইয়াকতীন’ বেরিয়ে পড়েছে। হযরত ঈসা (আঃ) সাতশ' আটশ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করবেন। তারা পথেই থাকবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলার হুকুমে ইয়ামনের দিক হতে এক পবিত্র বায়ু প্রবাহিত হবে, যার ফলে সমস্ত মুমিনের রূহ্ কব হয়ে যাবে। তখন যমীনে শুধু দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরাই রয়ে যাবে। তারা হবে চতুষ্পদ জন্তুর মত। তাদের উপর দিয়ে কিয়ামত সংঘটিত হবে। ঐ সময় কিয়ামত এতো নিকটবর্তী হবে যেমন পূর্ণ গর্ভবতী ঘোটকী, যার বাচ্চা প্রসবের সময়কাল অতি নিকটবর্তী, যার আশে পাশে ওর মনিব ঘোরা ফেরা করে এই চিন্তায় যে, কখন বা বাচ্চা হয়ে যায়। হযরত কা'ব (রাঃ) একথা বলার পর বলেনঃ “ এখন যে ব্যক্তি আমার এই উক্তি ও এই ইলমের পরেও অন্য কিছু বলে সে বানিয়ে কথা বলে।" হযরত কাবের (রাঃ) বর্ণিত এই ঘটনাটি উত্তম ঘটনাই বটে। কেননা, সহীহ্ হাদীস সমূহে এও রয়েছে যে, ঐ যুগে হযরত ঈসা (আঃ) বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্জও করবেন।মুসনাদে আহমাদে এ হাদীসটি মার’রূপে বর্ণিত আছে যে, তিনি ইয়াজুজ-মাজুজের বের হবার পরে অবশ্যই বায়তুল্লাহর হজ্জ করবেন। এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতেও রয়েছে।যখন এই ভয়াবহ অবস্থা, এই ভূ-কম্পন এবং এই বালা-মসীবত এসে পড়বে তখন কিয়ামত অতি নিকটবর্তী এসে পড়বে। এ অবস্থা দেখে কাফিররা বলবেঃ “এটা বড়ই কঠিন দিন। তাদের চক্ষুগুলি স্থির হয়ে যাবে এবং বলতে শুরু করবেঃ “হায়, দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো ছিলাম এ বিষয়ে উদাসীন। আমরা নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছি। সত্যি, আমরা সীমালংঘনকারীই ছিলাম। এভাবে তারা নিজের পাপের কথা অকপটে স্বীকার করবে এবং লজ্জিত হবে। কিন্তু তখন সবই বৃথা।

আল-আম্বিয়া 21:96

৯৫-৯৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেন যে, ধ্বংস প্রাপ্ত লোকদের পুনরায় দুনিয়ায় প্রত্যাবর্তন অসম্ভ। ভাবার্থ এও হতে পারে যে, তাদের তাওবা গৃহীত হবে না কিন্তু প্রথম উক্তিটিই উত্তম। ইয়াজুজ ও মাজুজ হযরত আদমেরই (আঃ) বংশোদ্ভূত। এমনকি তারা হযরত নূহের (আঃ) পুত্র ইয়াফাসের সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত। তুর্কীরা তাদেরই বংশধর। এরাও তাদেরই একটা দল। এদেরকে যুলকারনাইনের নির্মিত প্রাচীরের বাইরে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি প্রাচীরটি নির্মাণ করে বলেছিলেনঃ “এটা আমার প্রতিপালকের রহমত। আল্লাহর ওয়াদাকৃত সময়ে তা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আমার প্রতিপালকের ওয়াদা সত্য।”কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সময় ইয়াজুজ মাজুজ সেখান থেকে বেরিয়ে আসবে এবং ভূ-পৃষ্ঠে বিশৃংখলা সৃষ্টি করবে। প্রত্যেক উঁচু জায়গাকে আরবী ভাষায় (আরবী) বলা হয়। বর্ণিত আছে যে, তাদের বের হওয়ার সময় তাদের এই অবস্থাই হবে। এই খবরকে শ্রোতাদের সামনে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, যেন তারা স্বচক্ষে দেখতে রয়েছে। আর বাস্তবিকই আল্লাহ তাআলা অপেক্ষা অধিক সত্য খবরদাতা আর কে হতে পারে? তিনি তো দৃশ্য ও অদৃশ্য সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। যা হয়ে গেছে ও যা হবে তা তিনি সম্যক অবগত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) ছেলেদেরকে লাফাতে, খেলতে, দৌড়তে এবং একে অপরের উপর চড়তে দেখে বলেনঃ “এভাবেই ইয়াজুজ মাজুজ আসবে।” বহু হাদীসে তাদের বের হওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথম হাদীসঃ হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছেনঃ “ইয়াজুজ ও মাজুজকে যখন খুলে দেয়া হবে এবং তারা লোকদের কাছে পৌঁছবে, যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তারা প্রত্যেক উচ্চ ভূমি হতে ছুটে আসবে।” তখন তারা জনগণের মধ্যে ছেয়ে যাবে এবং মুসলমানরা তাদের শহর ও দুর্গের মধ্যে কুঁচকে পড়বে। আর তারা তাদের পশুগুলিকে ওর মধ্যে নিয়ে যাবে। তারা ভূ-পৃষ্ঠের পানি পান করতে থাকবে। ইয়াজুজ মাজুজ যে নদীর পার্শ্ব দিয়ে গমন করবে, ওর পানি তারা সমস্ত পান করে ফেলবে। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে ধূলো উড়তে থাকবে। তাদের অন্য দল যখন সেখানে পৌঁছবে তখন তারা পরস্পর বলাবলি করবে: “সতঃ কোন যুগে এখানে পানি ছিল।" যখন তারা দেখবে যে, এখন ভুপৃষ্ঠে আর কেউই অবশিষ্ট নেই। আর বাস্তবিকই যে সব মুসলমান নিজেদের শহরে ও দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করবে তারা ছাড়া যমীনের উপর আর কেউই বাকী থাকবে না, তখন তারা বলবেঃ পৃথিবীর অধিবাসীদেরকে তো আমরা শেষ করে ফেলেছি, সুতরাং এখন আকাশবাসীদের খবর নেয়া যাক।" অতঃপর তাদের একজন দুষ্ট ব্যক্তি তার বর্শাটি আকাশের দিকে নিক্ষেপ করবে। তখন মহান আল্লাহর হুকুমে ওটা রক্ত মাখানো অবস্থায় তাদের কাছে ফিরে আসবে। এটাও হবে একটা কুদরতী পরীক্ষা। এরপ তাদের ঘাড়ে গুটি বের হবে এবং এই মহামারীতে তারা সবাই একই সাথে মৃত্যু বরণ করবে। তাদের একজনও অবশিষ্ট থাকবে না। তাদের সমস্ত শোর গোলের সমাপ্তি ঘটবে। মুসলমানরা বলবেঃ “এমন কেউ আছে কি, যে আমাদের মুসলমানদের স্বার্থে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাইরে গিয়ে শত্রুদের অবস্থা দেখে আসতে পারে?" তখন এক ব্যক্তি এজন্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে এবং নিজেকে নিহত মনে করে আল্লাহর পথে মুসলমানদের খিদমতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে। তখন সে দেখতে পাবে যে শত্রুদের মৃতদেহের স্কুপ পড়ে রয়েছে। সবাই ধ্বংসের কবলে পতিত হয়েছে। তখন উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বলবেঃ “হে মুসলিম বৃন্দ! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর এবং খুশী হয়ে যাও। আল্লাহ তাআলা তোমাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। তাদের মৃতদেহের ঢেরি পড়ে রয়েছে। তার একথা শুনে মুসলমাল্লা বেরিয়ে আসবে এবং তাদের গৃহপালিত পশুগুলিকেও সাথে আনবে। তাদের পশুগুলির খাদ্য মৃতদেহগুলির মাংস ছাড়া আর কিছু থাকবে না। ওগুলি খেয়ে তারা খুব মোটা তাজী হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন) দ্বিতীয় হাদীসঃ হযরত নাওয়াস ইবনু সামআন আল কিলাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা সকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাজ্জালের বর্ণনা দেন এবং এই বর্ণনা তিনি এমনভাবে দেন যে, সে খেজুর গাছের আড়ালে রয়েছে। বলে আমাদের ধারণা হয়। আর মনে হয় যে, সে যেন বের হতে চাচ্ছে। তিনি বলেনঃ “আমি তোমাদের ব্যাপারে দাজ্জালের চেয়ে অন্য কিছুর বেশী ভয় করি। আমি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় যদি সে বের হয়। তবে তোমাদের মাঝে আমি তার প্রতিবন্ধক হয়ে যাবো। আর আমি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকবো না এমন অবস্থায় যদি সে বের হয় তবে আমি তোমাদের নিরাপত্তার জন্যে তোমাদেরকে আল্লাহর হাতে সমর্পণ করছি। সে হবে এলোমেলো চুল বিশিষ্ট এবং কানা ও উপরের দিকে উখিত চক্ষু বিশিষ্ট যুবক। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী স্থান হতে বের হবে। ডান দিকে ও বাম দিকে সে ঘুরতে থাকবে। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা অটল ও স্থির থাকবে।” আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কত দিন অবস্থান করবে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “চল্লিশ দিন। একটি দিন এক বছরের সমান, একটি দিন একমাসের সমান, একটি দিন হবে এক সপ্তাহের সমান এবং অবশিষ্ট দিন হবে সাধারণ দিনের মত।" আমরা আবার প্রশ্ন করলামঃ যে দিনটি এক বছরের সমান হবে তাতে এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়লেই কি যথেষ্ট হবে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “না, বরং অনুমান করে তোমাদেরকে সময় মত নামায আদায় করতে হবে। আমরা পুনরায় জিজ্ঞেস করলামঃ তার চলন গতি কেমন হবে? তিনি জবাব দিলেনঃ “যেমন বায়ু মেঘকে এদিক ওদিক তাড়িয়ে নিয়ে যায় তেমনই সে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে। এক গোত্রের কাছে যাবে এবং তাদেরকে নিজের দিকে আহ্বান করবে। তারা তার কথা মেনে নেবে। সে আকাশকে নির্দেশ দেবে যে, ও যেন তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করে। যমীনকে তাদের জন্যে ফসল উৎপাদন করার হুকুম করবে। তাদের পশুগুলি পেটপূর্ণ অবস্থায় মোটা তাজা হয়ে ফিরে আসবে। অতঃপর সে অন্য গোত্রের নিকট গিয়ে তাদেরকে নিজের দিকে আহ্বান করবে, কিন্তু তারা অস্বীকার করবে। সে সেখান থেকে চলে আসবে। তখন তাদের সমস্ত মালধন তার পিছনে চলে আসবে এবং তারা হয়ে যাবে সম্পূর্ণ শূন্য হস্ত। সে অনাবাদী জঙ্গলে যাবে এবং যমীনকে বলবেঃ “তোমার গুপ্তধন উঠিয়ে দাও | যমীন তখন তা উপরে উঠিয়ে ফেলবে। তখন সমস্ত ধন ভাণ্ডার তার পিছনে এমনভাবে চলে যাবে যেমন ভাবে মৌমাছিগুলি তাদের নেতাদের পিছনে চলে থাকে। সে এও দেখাবে যে, একজন লোককে তরবারী দ্বারা দু'টুকরা করে দেবে এবং ও দুটিকে এদিকে ওদিকে বহু দূরে নিক্ষেপ করবে। তারপর তার নাম ধরে ডাক দেবে এবং তৎক্ষণাৎ সে জীবিত হয়ে তার কাছে চলে আসবে। সে ঐ অবস্থাতেই থাকবে এমতাবস্থায় মহামহিমান্বিত আল্লাহ হযরত মসীহকে (আঃ) অবতীর্ণ করবেন। তিনি দামেস্কের পূর্ব দিকে সাদা মিনারের পার্শ্বে অবতরণ করবেন। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় ফেরেশতাদের ডানার উপর রাখবেন। তিনি দাজ্জালের পশ্চাদ্ধাবন করবেন এবং পূর্ব দরজা ‘লুদ-এর কাছে তাকে পেয়ে তাকে হত্যা করে ফেলবেন। তারপর হযরত ঈসার (আঃ) কাছে আল্লাহর ওয়াহী আসবেঃ “আমি আমার এমন বান্দাদেরকে পাঠাচ্ছি যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার ক্ষমতা তোমার নেই। সুতরাং তুমি আমার বান্দাদেরকে তুরের কাছে একত্রিত কর।” অতঃপর আল্লাহ তাআলা ইয়াজুজ মাজুজকে পাঠাবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা প্রত্যেক উঁচু স্থান হতে ছুটে আসবে।” তাদের কাজে অতিষ্ঠ হয়ে হযরত ঈসা (আঃ) ও তার সঙ্গীরা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। তখন তিনি গুটির রোগ পাঠাবেন যা তাদের গ্রীবায় বের হবে তখন তারা সবাই এক সাথে মৃত্যু বরণ করবে। অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ) তার মু'মিন সঙ্গীগণ সহ এসে দেখবেন যে, সমস্ত যমীনে তাদের মৃতদেহের ঢেরী হয়ে গেছে। আর তাদের দুর্গন্ধে থাকা যায় না। হযরত ঈসা (আঃ) তখন আবার দুআ করবেন। ফলে আল্লাহ তাআলা উটের গর্দানের ন্যায় পাখি পাঠিয়ে দিবেন যারা ঐ মৃতদেহগুলি উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে কোথায় যে ফেলে দেবে তা তিনিই জানেন। তারপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত অনবরত যমীনে বৃষ্টি বর্ষিত হয়ে থাকবে। ফলে যমীন ধুয়ে মুছে হাতের তালুর ন্যায় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। অতঃপর মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে বরকত উৎপাদন করবে। ঐদিন একটি দলের লোক একটি ডালিম খেয়েই পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে এবং ওর বাকলের ছায়া তলে আশ্রয় লাভ করবে। একটি উষ্টীর দুগ্ধ একটি দলের লোকদের জন্যে, একটি গাভীর দুগ্ধ একটি গোত্রের জন্যে এবং একটি বকরীর দুগ্ধ একটি বাড়ীর পরিবারের জন্যে যথেষ্ট হবে। তারপর এক পবিত্র বায়ু প্রবাহিত হবে যা মুসলমানদের বগলের নীচ দিয়ে বের হবে এবং তাদের রূহ্ কব হয়ে যাবে। তখন যমীনে শুধু দুষ্ট লোকেরাই অবশিষ্ট থাকবে, যারা গাধার মত লাফাতে থাকবে। তাদের উপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন) তৃতীয় হাদীসঃ হযরত হারমালা (রাঃ) তার খালা হতে বর্ণনা করেছেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভাষণ দিচ্ছিলেন। ঐ সময় তার আঙ্গুলে বৃশ্চিকে দংশন করেছিল বলে তিনি ঐ আঙ্গুলে পট্টি বেঁধে ছিলেন। ভাষণে তিনি বলেনঃ “তোমরা বলছো যে, এখন দুশমন নেই। কিন্তু তোমরা দুশমনদের সাথে যুদ্ধ করতেই থাকবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা ইয়াজুজ মাজুজকে পাঠাবেন। তারা হবে চওড়া চেহারা ও ছোট চোখ বিশিষ্ট। তাদের চেহারা হবে প্রশস্ত ঢালের মত।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমদে বর্নিত হয়েছে) চতুর্থ হাদীসঃ এই রিওয়াইয়াতটি সূরায়ে আ'রাফের তাফসীরের শেষ ভাগে বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মিরাজের রাত্রে হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) মধ্যে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময়ের ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “এ সম্পর্কে। আমার কোন জ্ঞান বা অবগতি নেই। অনুরূপভাবে হযরত মূসা (আঃ) তার অজানার কথা প্রকাশ করেন। তখন হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “কিয়ামত যে কোন্ সময় সংঘটিত হবে এটা আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। তবে আমার প্রতিপালক আমাকে এটুকু জানিয়ে দিয়েছেন যে, দাজ্জাল বের হবে। আমার সাথে দুটো ডাল থাকবে। আমাকে দেখা মাত্রই সে শীশার মত গলতে শুরু করবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করে ফেলবেন, যখন সে আমাকে দেখবে। এমনকি পাথর ও বৃক্ষও বলে উঠবেঃ “হে মুসলমান! এই যে, কাফির আমার ছায়ার নীচে রয়েছে, তুমি এসে তাকে হত্যা কর।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করে দিবেন এবং জনগণ তাদের শহরে ও দেশে ফিরে যাবে। ঐ সময় ইয়াজুজ মাজুজ বের হবে যারা প্রত্যেক উঁচু স্থান হতে ছুটে আসবে এবং যা পাবে ধ্বংস করবে। যত পানি পাবে সব পান করে ফেলবে। জনগণ আবার অতিষ্ঠ হয়ে নিজেদের বাস ভূমিতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। তারা অভিযোগ করবে, তখন আমি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করবো। ফলে তিনি তাদেরকে ধ্বংস করে দিবেন। সারা ভূ পৃষ্ঠে তাদের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে। তারপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং পানির নালাগুলি তাদের গলিত মৃত দেহগুলি টেনে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে ফেলে দিবে। আমার প্রতিপালক আমাকে একথা বলে দিয়েছেন। যখন এসব কিছু প্রকাশিত হয়ে পড়বে তখন কিয়ামত সংঘটিত হওয়া ঠিক তেমনই যেমন পূর্ণ গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হওয়া। ঐ সময় তার পরিবারে লোকদের এই চিন্তা থাকে যে, হয়তো সকালে সে সন্তান প্রসব করবে বা সন্ধ্যায় করবে অথবা রাত্রে করবে।” (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম ইবনু মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কুরআন কারীমের (আরবী) এই আয়াতটি এটাকে সত্যায়িত করছে। এই ব্যাপারে বহু হাদীস রয়েছে। হযরত কা'ব (রাঃ) বলেন যে, ইয়াজুজ মাজুজের বের হবার সময় তারা প্রাচীর খনন করবে। এমন কি তাদের কোদালের শব্দ আশে পাশের লোকেরা শুনতে পাবে। খনন করতে করতে রাত্রি হয়ে যাবে। তখন তাদের একজন। বলবেঃ “সকালে এসে আমরা এটাকে ভেঙ্গে ফেলবো।” কিন্তু আল্লাহ তাআলা ওটাকে পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে দিবেন। সকালে এসে তারা দেখতে পাবে যে, ওটাকে আল্লাহ তাআলা পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। আবার তারা খনন করতে শুরু করবে এবং এই একই অবস্থা ঘটতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত যখন তাদের বের হওয়া আল্লাহ তাআলা মঞ্জুর করবেন তখন তাদের এক ব্যক্তির মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাবেঃ “আগামী কাল ইনশা আল্লাহ আমরা এটাকে ভেঙ্গেফেলবো।” সুতরাং পরদিন এসে তারা দেখতে পাবে যে গতকাল তারা ওটাকে যে অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছিল ঐ অবস্থাতেই রয়েছে। তখন তারা ওটাকে খনন করে ভেঙ্গে ফেলবে। তাদের প্রথম দলটি বাহীরার পার্শ্ব দিয়ে বের হবে এবং সমস্ত পানি পান করে ফেলবে। দ্বিতীয় দলটি এসে শুধু কাদা চাটবে। আর তৃতীয় দলটি এসে বলবেঃ “সম্ভবতঃ কোন সময় এখানে পানি ছিল। জনগণ তাদেরকে দেখে পালিয়ে গিয়ে এদিকে ওদিকে লুকিয়ে যাবে। যখন তারা যমীনে কাউকেও দেখতে পাবে না তখন আকাশের দিকে তাদের তীর ছুঁড়বে। তখন ঐ তীরটি রক্ত মাখানো অবস্থায় তাদের কাছে ফিরে আসবে। তারা তখন গর্ব করে বলবেঃ “আমরা পৃথিবীবাসী ও আকাশবাসীদের উপর বিজয়ী হয়েছি।” ঐ সময় হযরত ঈসা ইবনু মারইয়াম (আঃ) তাদের উপর বদ দুআ করে বলবেনঃ “হে আল্লাহ! তাদের সাথে মুকাবিলা করার শক্তি আমাদের নেই। অরি যমীনে চলা ফেরা করাও আমাদের প্রয়োজন। সুতরাং যেভাবেই হোক আপনি আমাদেরকে তাদের কবল থেকে মুক্তি দান করুন।" তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মহামারীতে আক্রান্ত করবেন। তাদের দেহে গুটি বের হবে এবং তাতেই তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। তারপর এক প্রকারের পাখী এসে তাদেরকে চঞ্চুতে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। তারপর মহান আল্লাহ নাহরে হায়াত জারি করে দিবেন, যা যমীন ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেবে। যমীন নিজের বরকত বের করবে। একটি ডালিম একটি বাড়ীর পরিবারবর্গের জন্যে যথেষ্ট হবে। এক ব্যক্তি এসে ঘোষণা করবেঃ ‘যুসসুইয়াকতীন’ বেরিয়ে পড়েছে। হযরত ঈসা (আঃ) সাতশ' আটশ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করবেন। তারা পথেই থাকবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলার হুকুমে ইয়ামনের দিক হতে এক পবিত্র বায়ু প্রবাহিত হবে, যার ফলে সমস্ত মুমিনের রূহ্ কব হয়ে যাবে। তখন যমীনে শুধু দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরাই রয়ে যাবে। তারা হবে চতুষ্পদ জন্তুর মত। তাদের উপর দিয়ে কিয়ামত সংঘটিত হবে। ঐ সময় কিয়ামত এতো নিকটবর্তী হবে যেমন পূর্ণ গর্ভবতী ঘোটকী, যার বাচ্চা প্রসবের সময়কাল অতি নিকটবর্তী, যার আশে পাশে ওর মনিব ঘোরা ফেরা করে এই চিন্তায় যে, কখন বা বাচ্চা হয়ে যায়। হযরত কা'ব (রাঃ) একথা বলার পর বলেনঃ “ এখন যে ব্যক্তি আমার এই উক্তি ও এই ইলমের পরেও অন্য কিছু বলে সে বানিয়ে কথা বলে।" হযরত কাবের (রাঃ) বর্ণিত এই ঘটনাটি উত্তম ঘটনাই বটে। কেননা, সহীহ্ হাদীস সমূহে এও রয়েছে যে, ঐ যুগে হযরত ঈসা (আঃ) বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্জও করবেন।মুসনাদে আহমাদে এ হাদীসটি মার’রূপে বর্ণিত আছে যে, তিনি ইয়াজুজ-মাজুজের বের হবার পরে অবশ্যই বায়তুল্লাহর হজ্জ করবেন। এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতেও রয়েছে।যখন এই ভয়াবহ অবস্থা, এই ভূ-কম্পন এবং এই বালা-মসীবত এসে পড়বে তখন কিয়ামত অতি নিকটবর্তী এসে পড়বে। এ অবস্থা দেখে কাফিররা বলবেঃ “এটা বড়ই কঠিন দিন। তাদের চক্ষুগুলি স্থির হয়ে যাবে এবং বলতে শুরু করবেঃ “হায়, দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো ছিলাম এ বিষয়ে উদাসীন। আমরা নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছি। সত্যি, আমরা সীমালংঘনকারীই ছিলাম। এভাবে তারা নিজের পাপের কথা অকপটে স্বীকার করবে এবং লজ্জিত হবে। কিন্তু তখন সবই বৃথা।

আল-আম্বিয়া 21:97

৯৫-৯৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেন যে, ধ্বংস প্রাপ্ত লোকদের পুনরায় দুনিয়ায় প্রত্যাবর্তন অসম্ভ। ভাবার্থ এও হতে পারে যে, তাদের তাওবা গৃহীত হবে না কিন্তু প্রথম উক্তিটিই উত্তম। ইয়াজুজ ও মাজুজ হযরত আদমেরই (আঃ) বংশোদ্ভূত। এমনকি তারা হযরত নূহের (আঃ) পুত্র ইয়াফাসের সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত। তুর্কীরা তাদেরই বংশধর। এরাও তাদেরই একটা দল। এদেরকে যুলকারনাইনের নির্মিত প্রাচীরের বাইরে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি প্রাচীরটি নির্মাণ করে বলেছিলেনঃ “এটা আমার প্রতিপালকের রহমত। আল্লাহর ওয়াদাকৃত সময়ে তা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আমার প্রতিপালকের ওয়াদা সত্য।”কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সময় ইয়াজুজ মাজুজ সেখান থেকে বেরিয়ে আসবে এবং ভূ-পৃষ্ঠে বিশৃংখলা সৃষ্টি করবে। প্রত্যেক উঁচু জায়গাকে আরবী ভাষায় (আরবী) বলা হয়। বর্ণিত আছে যে, তাদের বের হওয়ার সময় তাদের এই অবস্থাই হবে। এই খবরকে শ্রোতাদের সামনে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, যেন তারা স্বচক্ষে দেখতে রয়েছে। আর বাস্তবিকই আল্লাহ তাআলা অপেক্ষা অধিক সত্য খবরদাতা আর কে হতে পারে? তিনি তো দৃশ্য ও অদৃশ্য সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। যা হয়ে গেছে ও যা হবে তা তিনি সম্যক অবগত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) ছেলেদেরকে লাফাতে, খেলতে, দৌড়তে এবং একে অপরের উপর চড়তে দেখে বলেনঃ “এভাবেই ইয়াজুজ মাজুজ আসবে।” বহু হাদীসে তাদের বের হওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথম হাদীসঃ হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছেনঃ “ইয়াজুজ ও মাজুজকে যখন খুলে দেয়া হবে এবং তারা লোকদের কাছে পৌঁছবে, যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তারা প্রত্যেক উচ্চ ভূমি হতে ছুটে আসবে।” তখন তারা জনগণের মধ্যে ছেয়ে যাবে এবং মুসলমানরা তাদের শহর ও দুর্গের মধ্যে কুঁচকে পড়বে। আর তারা তাদের পশুগুলিকে ওর মধ্যে নিয়ে যাবে। তারা ভূ-পৃষ্ঠের পানি পান করতে থাকবে। ইয়াজুজ মাজুজ যে নদীর পার্শ্ব দিয়ে গমন করবে, ওর পানি তারা সমস্ত পান করে ফেলবে। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে ধূলো উড়তে থাকবে। তাদের অন্য দল যখন সেখানে পৌঁছবে তখন তারা পরস্পর বলাবলি করবে: “সতঃ কোন যুগে এখানে পানি ছিল।" যখন তারা দেখবে যে, এখন ভুপৃষ্ঠে আর কেউই অবশিষ্ট নেই। আর বাস্তবিকই যে সব মুসলমান নিজেদের শহরে ও দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করবে তারা ছাড়া যমীনের উপর আর কেউই বাকী থাকবে না, তখন তারা বলবেঃ পৃথিবীর অধিবাসীদেরকে তো আমরা শেষ করে ফেলেছি, সুতরাং এখন আকাশবাসীদের খবর নেয়া যাক।" অতঃপর তাদের একজন দুষ্ট ব্যক্তি তার বর্শাটি আকাশের দিকে নিক্ষেপ করবে। তখন মহান আল্লাহর হুকুমে ওটা রক্ত মাখানো অবস্থায় তাদের কাছে ফিরে আসবে। এটাও হবে একটা কুদরতী পরীক্ষা। এরপ তাদের ঘাড়ে গুটি বের হবে এবং এই মহামারীতে তারা সবাই একই সাথে মৃত্যু বরণ করবে। তাদের একজনও অবশিষ্ট থাকবে না। তাদের সমস্ত শোর গোলের সমাপ্তি ঘটবে। মুসলমানরা বলবেঃ “এমন কেউ আছে কি, যে আমাদের মুসলমানদের স্বার্থে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাইরে গিয়ে শত্রুদের অবস্থা দেখে আসতে পারে?" তখন এক ব্যক্তি এজন্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে এবং নিজেকে নিহত মনে করে আল্লাহর পথে মুসলমানদের খিদমতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে। তখন সে দেখতে পাবে যে শত্রুদের মৃতদেহের স্কুপ পড়ে রয়েছে। সবাই ধ্বংসের কবলে পতিত হয়েছে। তখন উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বলবেঃ “হে মুসলিম বৃন্দ! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর এবং খুশী হয়ে যাও। আল্লাহ তাআলা তোমাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। তাদের মৃতদেহের ঢেরি পড়ে রয়েছে। তার একথা শুনে মুসলমাল্লা বেরিয়ে আসবে এবং তাদের গৃহপালিত পশুগুলিকেও সাথে আনবে। তাদের পশুগুলির খাদ্য মৃতদেহগুলির মাংস ছাড়া আর কিছু থাকবে না। ওগুলি খেয়ে তারা খুব মোটা তাজী হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন) দ্বিতীয় হাদীসঃ হযরত নাওয়াস ইবনু সামআন আল কিলাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা সকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাজ্জালের বর্ণনা দেন এবং এই বর্ণনা তিনি এমনভাবে দেন যে, সে খেজুর গাছের আড়ালে রয়েছে। বলে আমাদের ধারণা হয়। আর মনে হয় যে, সে যেন বের হতে চাচ্ছে। তিনি বলেনঃ “আমি তোমাদের ব্যাপারে দাজ্জালের চেয়ে অন্য কিছুর বেশী ভয় করি। আমি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় যদি সে বের হয়। তবে তোমাদের মাঝে আমি তার প্রতিবন্ধক হয়ে যাবো। আর আমি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকবো না এমন অবস্থায় যদি সে বের হয় তবে আমি তোমাদের নিরাপত্তার জন্যে তোমাদেরকে আল্লাহর হাতে সমর্পণ করছি। সে হবে এলোমেলো চুল বিশিষ্ট এবং কানা ও উপরের দিকে উখিত চক্ষু বিশিষ্ট যুবক। সে সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী স্থান হতে বের হবে। ডান দিকে ও বাম দিকে সে ঘুরতে থাকবে। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা অটল ও স্থির থাকবে।” আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কত দিন অবস্থান করবে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “চল্লিশ দিন। একটি দিন এক বছরের সমান, একটি দিন একমাসের সমান, একটি দিন হবে এক সপ্তাহের সমান এবং অবশিষ্ট দিন হবে সাধারণ দিনের মত।" আমরা আবার প্রশ্ন করলামঃ যে দিনটি এক বছরের সমান হবে তাতে এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়লেই কি যথেষ্ট হবে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “না, বরং অনুমান করে তোমাদেরকে সময় মত নামায আদায় করতে হবে। আমরা পুনরায় জিজ্ঞেস করলামঃ তার চলন গতি কেমন হবে? তিনি জবাব দিলেনঃ “যেমন বায়ু মেঘকে এদিক ওদিক তাড়িয়ে নিয়ে যায় তেমনই সে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে। এক গোত্রের কাছে যাবে এবং তাদেরকে নিজের দিকে আহ্বান করবে। তারা তার কথা মেনে নেবে। সে আকাশকে নির্দেশ দেবে যে, ও যেন তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করে। যমীনকে তাদের জন্যে ফসল উৎপাদন করার হুকুম করবে। তাদের পশুগুলি পেটপূর্ণ অবস্থায় মোটা তাজা হয়ে ফিরে আসবে। অতঃপর সে অন্য গোত্রের নিকট গিয়ে তাদেরকে নিজের দিকে আহ্বান করবে, কিন্তু তারা অস্বীকার করবে। সে সেখান থেকে চলে আসবে। তখন তাদের সমস্ত মালধন তার পিছনে চলে আসবে এবং তারা হয়ে যাবে সম্পূর্ণ শূন্য হস্ত। সে অনাবাদী জঙ্গলে যাবে এবং যমীনকে বলবেঃ “তোমার গুপ্তধন উঠিয়ে দাও | যমীন তখন তা উপরে উঠিয়ে ফেলবে। তখন সমস্ত ধন ভাণ্ডার তার পিছনে এমনভাবে চলে যাবে যেমন ভাবে মৌমাছিগুলি তাদের নেতাদের পিছনে চলে থাকে। সে এও দেখাবে যে, একজন লোককে তরবারী দ্বারা দু'টুকরা করে দেবে এবং ও দুটিকে এদিকে ওদিকে বহু দূরে নিক্ষেপ করবে। তারপর তার নাম ধরে ডাক দেবে এবং তৎক্ষণাৎ সে জীবিত হয়ে তার কাছে চলে আসবে। সে ঐ অবস্থাতেই থাকবে এমতাবস্থায় মহামহিমান্বিত আল্লাহ হযরত মসীহকে (আঃ) অবতীর্ণ করবেন। তিনি দামেস্কের পূর্ব দিকে সাদা মিনারের পার্শ্বে অবতরণ করবেন। তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় ফেরেশতাদের ডানার উপর রাখবেন। তিনি দাজ্জালের পশ্চাদ্ধাবন করবেন এবং পূর্ব দরজা ‘লুদ-এর কাছে তাকে পেয়ে তাকে হত্যা করে ফেলবেন। তারপর হযরত ঈসার (আঃ) কাছে আল্লাহর ওয়াহী আসবেঃ “আমি আমার এমন বান্দাদেরকে পাঠাচ্ছি যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার ক্ষমতা তোমার নেই। সুতরাং তুমি আমার বান্দাদেরকে তুরের কাছে একত্রিত কর।” অতঃপর আল্লাহ তাআলা ইয়াজুজ মাজুজকে পাঠাবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা প্রত্যেক উঁচু স্থান হতে ছুটে আসবে।” তাদের কাজে অতিষ্ঠ হয়ে হযরত ঈসা (আঃ) ও তার সঙ্গীরা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। তখন তিনি গুটির রোগ পাঠাবেন যা তাদের গ্রীবায় বের হবে তখন তারা সবাই এক সাথে মৃত্যু বরণ করবে। অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ) তার মু'মিন সঙ্গীগণ সহ এসে দেখবেন যে, সমস্ত যমীনে তাদের মৃতদেহের ঢেরী হয়ে গেছে। আর তাদের দুর্গন্ধে থাকা যায় না। হযরত ঈসা (আঃ) তখন আবার দুআ করবেন। ফলে আল্লাহ তাআলা উটের গর্দানের ন্যায় পাখি পাঠিয়ে দিবেন যারা ঐ মৃতদেহগুলি উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে কোথায় যে ফেলে দেবে তা তিনিই জানেন। তারপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত অনবরত যমীনে বৃষ্টি বর্ষিত হয়ে থাকবে। ফলে যমীন ধুয়ে মুছে হাতের তালুর ন্যায় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। অতঃপর মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে বরকত উৎপাদন করবে। ঐদিন একটি দলের লোক একটি ডালিম খেয়েই পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে এবং ওর বাকলের ছায়া তলে আশ্রয় লাভ করবে। একটি উষ্টীর দুগ্ধ একটি দলের লোকদের জন্যে, একটি গাভীর দুগ্ধ একটি গোত্রের জন্যে এবং একটি বকরীর দুগ্ধ একটি বাড়ীর পরিবারের জন্যে যথেষ্ট হবে। তারপর এক পবিত্র বায়ু প্রবাহিত হবে যা মুসলমানদের বগলের নীচ দিয়ে বের হবে এবং তাদের রূহ্ কব হয়ে যাবে। তখন যমীনে শুধু দুষ্ট লোকেরাই অবশিষ্ট থাকবে, যারা গাধার মত লাফাতে থাকবে। তাদের উপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন) তৃতীয় হাদীসঃ হযরত হারমালা (রাঃ) তার খালা হতে বর্ণনা করেছেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভাষণ দিচ্ছিলেন। ঐ সময় তার আঙ্গুলে বৃশ্চিকে দংশন করেছিল বলে তিনি ঐ আঙ্গুলে পট্টি বেঁধে ছিলেন। ভাষণে তিনি বলেনঃ “তোমরা বলছো যে, এখন দুশমন নেই। কিন্তু তোমরা দুশমনদের সাথে যুদ্ধ করতেই থাকবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা ইয়াজুজ মাজুজকে পাঠাবেন। তারা হবে চওড়া চেহারা ও ছোট চোখ বিশিষ্ট। তাদের চেহারা হবে প্রশস্ত ঢালের মত।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমদে বর্নিত হয়েছে) চতুর্থ হাদীসঃ এই রিওয়াইয়াতটি সূরায়ে আ'রাফের তাফসীরের শেষ ভাগে বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মিরাজের রাত্রে হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) মধ্যে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময়ের ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “এ সম্পর্কে। আমার কোন জ্ঞান বা অবগতি নেই। অনুরূপভাবে হযরত মূসা (আঃ) তার অজানার কথা প্রকাশ করেন। তখন হযরত ঈসা (আঃ) বলেনঃ “কিয়ামত যে কোন্ সময় সংঘটিত হবে এটা আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। তবে আমার প্রতিপালক আমাকে এটুকু জানিয়ে দিয়েছেন যে, দাজ্জাল বের হবে। আমার সাথে দুটো ডাল থাকবে। আমাকে দেখা মাত্রই সে শীশার মত গলতে শুরু করবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করে ফেলবেন, যখন সে আমাকে দেখবে। এমনকি পাথর ও বৃক্ষও বলে উঠবেঃ “হে মুসলমান! এই যে, কাফির আমার ছায়ার নীচে রয়েছে, তুমি এসে তাকে হত্যা কর।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করে দিবেন এবং জনগণ তাদের শহরে ও দেশে ফিরে যাবে। ঐ সময় ইয়াজুজ মাজুজ বের হবে যারা প্রত্যেক উঁচু স্থান হতে ছুটে আসবে এবং যা পাবে ধ্বংস করবে। যত পানি পাবে সব পান করে ফেলবে। জনগণ আবার অতিষ্ঠ হয়ে নিজেদের বাস ভূমিতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। তারা অভিযোগ করবে, তখন আমি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করবো। ফলে তিনি তাদেরকে ধ্বংস করে দিবেন। সারা ভূ পৃষ্ঠে তাদের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে। তারপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং পানির নালাগুলি তাদের গলিত মৃত দেহগুলি টেনে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে ফেলে দিবে। আমার প্রতিপালক আমাকে একথা বলে দিয়েছেন। যখন এসব কিছু প্রকাশিত হয়ে পড়বে তখন কিয়ামত সংঘটিত হওয়া ঠিক তেমনই যেমন পূর্ণ গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হওয়া। ঐ সময় তার পরিবারে লোকদের এই চিন্তা থাকে যে, হয়তো সকালে সে সন্তান প্রসব করবে বা সন্ধ্যায় করবে অথবা রাত্রে করবে।” (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম ইবনু মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কুরআন কারীমের (আরবী) এই আয়াতটি এটাকে সত্যায়িত করছে। এই ব্যাপারে বহু হাদীস রয়েছে। হযরত কা'ব (রাঃ) বলেন যে, ইয়াজুজ মাজুজের বের হবার সময় তারা প্রাচীর খনন করবে। এমন কি তাদের কোদালের শব্দ আশে পাশের লোকেরা শুনতে পাবে। খনন করতে করতে রাত্রি হয়ে যাবে। তখন তাদের একজন। বলবেঃ “সকালে এসে আমরা এটাকে ভেঙ্গে ফেলবো।” কিন্তু আল্লাহ তাআলা ওটাকে পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে দিবেন। সকালে এসে তারা দেখতে পাবে যে, ওটাকে আল্লাহ তাআলা পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। আবার তারা খনন করতে শুরু করবে এবং এই একই অবস্থা ঘটতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত যখন তাদের বের হওয়া আল্লাহ তাআলা মঞ্জুর করবেন তখন তাদের এক ব্যক্তির মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাবেঃ “আগামী কাল ইনশা আল্লাহ আমরা এটাকে ভেঙ্গেফেলবো।” সুতরাং পরদিন এসে তারা দেখতে পাবে যে গতকাল তারা ওটাকে যে অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছিল ঐ অবস্থাতেই রয়েছে। তখন তারা ওটাকে খনন করে ভেঙ্গে ফেলবে। তাদের প্রথম দলটি বাহীরার পার্শ্ব দিয়ে বের হবে এবং সমস্ত পানি পান করে ফেলবে। দ্বিতীয় দলটি এসে শুধু কাদা চাটবে। আর তৃতীয় দলটি এসে বলবেঃ “সম্ভবতঃ কোন সময় এখানে পানি ছিল। জনগণ তাদেরকে দেখে পালিয়ে গিয়ে এদিকে ওদিকে লুকিয়ে যাবে। যখন তারা যমীনে কাউকেও দেখতে পাবে না তখন আকাশের দিকে তাদের তীর ছুঁড়বে। তখন ঐ তীরটি রক্ত মাখানো অবস্থায় তাদের কাছে ফিরে আসবে। তারা তখন গর্ব করে বলবেঃ “আমরা পৃথিবীবাসী ও আকাশবাসীদের উপর বিজয়ী হয়েছি।” ঐ সময় হযরত ঈসা ইবনু মারইয়াম (আঃ) তাদের উপর বদ দুআ করে বলবেনঃ “হে আল্লাহ! তাদের সাথে মুকাবিলা করার শক্তি আমাদের নেই। অরি যমীনে চলা ফেরা করাও আমাদের প্রয়োজন। সুতরাং যেভাবেই হোক আপনি আমাদেরকে তাদের কবল থেকে মুক্তি দান করুন।" তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মহামারীতে আক্রান্ত করবেন। তাদের দেহে গুটি বের হবে এবং তাতেই তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। তারপর এক প্রকারের পাখী এসে তাদেরকে চঞ্চুতে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। তারপর মহান আল্লাহ নাহরে হায়াত জারি করে দিবেন, যা যমীন ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেবে। যমীন নিজের বরকত বের করবে। একটি ডালিম একটি বাড়ীর পরিবারবর্গের জন্যে যথেষ্ট হবে। এক ব্যক্তি এসে ঘোষণা করবেঃ ‘যুসসুইয়াকতীন’ বেরিয়ে পড়েছে। হযরত ঈসা (আঃ) সাতশ' আটশ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করবেন। তারা পথেই থাকবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলার হুকুমে ইয়ামনের দিক হতে এক পবিত্র বায়ু প্রবাহিত হবে, যার ফলে সমস্ত মুমিনের রূহ্ কব হয়ে যাবে। তখন যমীনে শুধু দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরাই রয়ে যাবে। তারা হবে চতুষ্পদ জন্তুর মত। তাদের উপর দিয়ে কিয়ামত সংঘটিত হবে। ঐ সময় কিয়ামত এতো নিকটবর্তী হবে যেমন পূর্ণ গর্ভবতী ঘোটকী, যার বাচ্চা প্রসবের সময়কাল অতি নিকটবর্তী, যার আশে পাশে ওর মনিব ঘোরা ফেরা করে এই চিন্তায় যে, কখন বা বাচ্চা হয়ে যায়। হযরত কা'ব (রাঃ) একথা বলার পর বলেনঃ “ এখন যে ব্যক্তি আমার এই উক্তি ও এই ইলমের পরেও অন্য কিছু বলে সে বানিয়ে কথা বলে।" হযরত কাবের (রাঃ) বর্ণিত এই ঘটনাটি উত্তম ঘটনাই বটে। কেননা, সহীহ্ হাদীস সমূহে এও রয়েছে যে, ঐ যুগে হযরত ঈসা (আঃ) বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্জও করবেন।মুসনাদে আহমাদে এ হাদীসটি মার’রূপে বর্ণিত আছে যে, তিনি ইয়াজুজ-মাজুজের বের হবার পরে অবশ্যই বায়তুল্লাহর হজ্জ করবেন। এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতেও রয়েছে।যখন এই ভয়াবহ অবস্থা, এই ভূ-কম্পন এবং এই বালা-মসীবত এসে পড়বে তখন কিয়ামত অতি নিকটবর্তী এসে পড়বে। এ অবস্থা দেখে কাফিররা বলবেঃ “এটা বড়ই কঠিন দিন। তাদের চক্ষুগুলি স্থির হয়ে যাবে এবং বলতে শুরু করবেঃ “হায়, দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো ছিলাম এ বিষয়ে উদাসীন। আমরা নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছি। সত্যি, আমরা সীমালংঘনকারীই ছিলাম। এভাবে তারা নিজের পাপের কথা অকপটে স্বীকার করবে এবং লজ্জিত হবে। কিন্তু তখন সবই বৃথা।

আল-আম্বিয়া 21:98

৯৮-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মক্কাবাসী কুরায়েশ মুশরিকদেরকে সম্বোধন করে বলছেনঃ তোমরা ও তোমাদের উপাস্য মূর্তিগুলি জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওর ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” হাবশী ভাষায় (আরবী) শব্দকে (আরবী) বলা হয়, যার অর্থ হলো ইন্ধন বা খড়ি। এমনকি একটি কিরআতে বা পঠনে (আরবী) এর স্থলে (আরবী) রয়েছে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর সেগুলি তো 'জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে। তারা যদি মা'রূদ হতো তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করতো না। তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে। সেথায় থাকবে তাদের আর্তনাদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ সেথায় তাদের জন্যে থাকবে আর্তনাদ ও চীৎকার।" সেথায় তারা (এই আর্তনাদ ও চীৎকার ছাড়া) কিছুই শুনতে পাবে না। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন শুধু মুশরিকরাই জাহান্নামে রয়ে যাবে তখন তাদের আগুনের বাসে বন্দী করে দেয়া হবে। তাতে থাকবে আগুনের পেরেক। ওর মধ্যে অবস্থান করে প্রত্যেকেই মনে করবে যে, জাহান্নামে সে ছাড়া আর কেউ নেই।" অতঃপর তিনি- (আরবী) এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনু জারীরও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)(আরবী) দ্বারা করুণা ও সৌভাগ্য বুঝানো হয়েছে। জাহান্নামীদের এবং তাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোক ও তাদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ যাদের জন্যে আমার নিকট হতে পূর্ব হতে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে ঐ জাহান্নাম হতে দূরে রাখা হবে। তাদের সৎ আমলের কারণে সৌভাগ্য তাদের অভ্যর্থনার জন্যে পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে উত্তম প্রতিদান রয়েছে এবং অতিরিক্ত প্রতিদানও বটে।" (১০:২৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “উত্তম কাজের জন্যে উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কি হতে পারে? (৫৫:৬০) তাদের দুনিয়ার আমল ছিল ভাল, তাই তারা আখেরাতে পুরস্কার ও উত্তম বিনিময় লাভ করলো। আর শাস্তি থেকে রক্ষা পেলো ও আল্লাহর করুণা প্রাপ্ত হলো। তাদেরকে জাহান্নাম হতে এতো দূরে রাখা হবে যে,তারা ওর ক্ষীণতর শব্দও শুনবে না এবং জাহান্নামীদেরকে জ্বলতে পুড়তেও দেখতে পাবে না। পুলসিরাতের উপর দুখীদেরকে বিষাক্ত সাপে দংশন করবে এবং ওটা হিসৃহিস্ শব্দ করবে। জান্নাতীরা এই শব্দও শুনতে পাবে না। তাদেরকে কষ্ট ও বিপদ আপদ থেকে দূরে রাখা হবে শুধু এটাই নয়, বরং সেখানে তারা তাদের মন যা চায় চিরকাল ভোগ করবে। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) (আরবী) (যাদের জন্য আমার নিকট হতে পূর্ব থেকে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে তা হতে (জাহান্নাম হতে) দূরে রাখা হবে) এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “আমি, ওমর (রাঃ), উছমান (রাঃ) এই লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত।” অথবা তিনি হযরত সা’দের (রাঃ) নাম নিয়েছিলেন। এমন সময় নামাযের জন্যে তাকবীর দেয়া হয় এবং তিনি। (আরবী) এ উক্তিটি পাঠরত অবস্থায় স্বীয় চাদরখানা টানতে টানতে দাড়িয়ে যান। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত উছমান (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই লোকগুলিই আল্লাহর বন্ধু। বিদ্যুত অপেক্ষাও দ্রুত গতিতে তারা পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে কাফিররা হাঁটুর ভরে পড়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা ঐ বুযর্গ ব্যক্তিদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহ ভক্ত ছিলেন এবং মুশরিকদের প্রতি ছিলেন অসন্তুষ্ট। কিন্তু তাদের পরবর্তী লোকেরা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের পূজা শুরু করে দিয়েছিল। যেমন হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ), ফেরেশতা মণ্ডলী, সূর্য, চন্দ্র, হযরত মারইয়াম (আঃ) ইত্যাদি। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী নবীর (সঃ) নিকট আগমন করে এবং বলতে শুরু করেঃ “আপনি ধারণা করছেন যে, আল্লাহ তাআলা (আরবী) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেছেন। যদি এটা সত্য হয় তবে কি সূর্য, চন্দ্র, ফেরেশতা মণ্ডলী, হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি সবাই আমাদের মূর্তিগুলির সাথে জাহান্নামে চলে যাবে?” তার এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তাআলা (আরবী) (৪৩:৫৭-৫৮) এই আয়াত দুটি অবতীর্ণ করেন। এরপর তিনি (আরবী) এই আয়াত নাযিল করেন। (এটা আবুবকর ইবনু মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ননা করেছেন)একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ালীদ ইবনু মুগীরার সাথে মসজিদে বসে ছিলেন। এমন সময় নায়র ইবনু হারিছ তথায় আগমন করে। ঐ সময় মসজিদে আরো বহু কুরায়েশও বিদ্যমান ছিল। নাহ্র ইবনু হারিছ। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কথা বলছিল। কিন্তু সে নিরুত্তর হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলি পাঠ করেন। যখন তিনি ঐ মজলিস হতে উঠে চলে যান তখন আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী আগমন করে। লোকেরা তাকে বলেঃ আজ নাফর ইবনু হারিস রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে আলাপ-আলোচনা করেছে কিন্ত শেষে একেবারে নিরুত্তর হয়ে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাদের সম্পর্কে একথা বলে উঠে গেছেন যে, আমরা এবং আমাদের এই উপাস্য দেবতারা সবাই জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হয়ে যাবো।” তাদের এই কথা শুনে আবদুল্লাহ ইবন যাবআ’রী বলেঃ “আমি থাকলে তাঁকে উত্তর দিতাম যে, আমরা ফেরেশতাদের পূজা করে থাকি, ইয়াহুদীরা উযায়েরের (আঃ) পূজা করে এবং খৃস্টানরা ঈসার (আঃ) পূজা করে। তাহলে এরা সবাই জাহান্নামে যাবেন। তার এই উত্তর সবারই খুব পছন্দ হয়। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সামনে এটা বর্ণনা করা হলে তিনি বলেনঃ “যে নিজের ইবাদত করিয়েছে সে ইবাদতকারীদের সাথে জাহান্নামে যাবে। কিন্তু এই বুযুর্গ ব্যক্তিরা নিজেদের ইবাদত করান নাই। আসলে তো এই লোকগুলি তাঁদের নয়, বরং শয়তানদের পূজা করছে। শয়তানই তাদেরকে তাদের ইবাদতের পন্থা হিসেবে বাতলিয়ে দিয়েছে। তাঁর জবাবের সাথে সাথেই আল্লাহ তাআলা জবাব হিসাবে পরবর্তী আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ করেন। সুতরাং অজ্ঞ লোকেরা যে সব সৎ লোকের উপাসনা করতো তাঁরা পৃথক হয়ে গেলেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মধ্যে যে বলেঃ তিনি (আল্লাহ) ছাড়া আমিই মাবুদ, তার প্রতিফল জাহান্নাম এবং এই ভাবেই আমি অত্যাচারীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি।” হযরত ঈসার (আঃ) ব্যাপারে তাদের তর্ক-বিতর্কের কারণে আল্লাহ তাআলা নিম্নের আয়াতগুলি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন মারইয়াম তনয়ের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমাদের সম্প্রদায় শোর গোল শুরু করে দেয়। তারা বলেঃ আমাদের দেবতাগুলি শ্রেষ্ঠ, না ঈসা (আঃ)? এরা তো বাক বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। বস্তুত এরা তো এক বিতণ্ডাকারী সম্প্রদায়। সে তো ছিলে আমারই এক বান্দা, যার উপর আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতরে নিদর্শন; সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকে অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।” (৪৩:৫৭-৬১)ইবনু যাবআ’রী বড়ই ভুল করেছিল। কেননা, এই আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে মক্কাবাসী কাফিরদেরকে এবং উক্তি করা হয়েছে তাদের প্রতিমা ও পাথরগুলি সম্পর্কে যেগুলির তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদত করতো। এ উক্তি হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি পবিত্র ও একত্ববাদী লোকদের সম্পর্কে নয়। তাঁরা তো গায়রুল্লাহর ইবাদত হতে মানুষকে বিরত রাখতেন!ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে যে (আরবী) শব্দটি রয়েছে তা আরবে নির্জীব ও বিবেকহীনদের জন্যে এসে থাকে। এই ইবনু যাবআ’রী এর পরে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। সে প্রসিদ্ধ কবিদের একজন ছিল। প্রথমতঃ সে মুসলমান হওয়ার পর সে বড়ই ক্ষমাপ্রার্থী হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ মহা-ভীতি তাদেরকে বিষাদষ্টি করবে না। অর্থাৎ মৃত্যুর ভয়, শিঙ্গার ফুৎকারের আতংক, জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশের সময়ের ভীতি বিহবলতা এবং জান্নাতী ও জাহান্নামীদের মাঝে মৃত্যুকে যবাহ্ করে দেয়ার আতংক ইত্যাদি কিছুই তাদের থাকবে না। তারা চিন্তা ও দুঃখ হতে বহু দূরে থাকবে। তারা হবে পুরোপুরি ভাবে উৎফুল্ল ও আনন্দিত। অসন্তুষ্টির চিহ্নমাত্র তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হবে না। ফেরেশতা মণ্ডলী তাদেরকে অভ্যর্থনা করে বলবেঃ এই তোমাদের সেই দিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল।

আল-আম্বিয়া 21:99

৯৮-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মক্কাবাসী কুরায়েশ মুশরিকদেরকে সম্বোধন করে বলছেনঃ তোমরা ও তোমাদের উপাস্য মূর্তিগুলি জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওর ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” হাবশী ভাষায় (আরবী) শব্দকে (আরবী) বলা হয়, যার অর্থ হলো ইন্ধন বা খড়ি। এমনকি একটি কিরআতে বা পঠনে (আরবী) এর স্থলে (আরবী) রয়েছে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর সেগুলি তো 'জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে। তারা যদি মা'রূদ হতো তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করতো না। তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে। সেথায় থাকবে তাদের আর্তনাদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ সেথায় তাদের জন্যে থাকবে আর্তনাদ ও চীৎকার।" সেথায় তারা (এই আর্তনাদ ও চীৎকার ছাড়া) কিছুই শুনতে পাবে না। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন শুধু মুশরিকরাই জাহান্নামে রয়ে যাবে তখন তাদের আগুনের বাসে বন্দী করে দেয়া হবে। তাতে থাকবে আগুনের পেরেক। ওর মধ্যে অবস্থান করে প্রত্যেকেই মনে করবে যে, জাহান্নামে সে ছাড়া আর কেউ নেই।" অতঃপর তিনি- (আরবী) এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনু জারীরও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)(আরবী) দ্বারা করুণা ও সৌভাগ্য বুঝানো হয়েছে। জাহান্নামীদের এবং তাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোক ও তাদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ যাদের জন্যে আমার নিকট হতে পূর্ব হতে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে ঐ জাহান্নাম হতে দূরে রাখা হবে। তাদের সৎ আমলের কারণে সৌভাগ্য তাদের অভ্যর্থনার জন্যে পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে উত্তম প্রতিদান রয়েছে এবং অতিরিক্ত প্রতিদানও বটে।" (১০:২৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “উত্তম কাজের জন্যে উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কি হতে পারে? (৫৫:৬০) তাদের দুনিয়ার আমল ছিল ভাল, তাই তারা আখেরাতে পুরস্কার ও উত্তম বিনিময় লাভ করলো। আর শাস্তি থেকে রক্ষা পেলো ও আল্লাহর করুণা প্রাপ্ত হলো। তাদেরকে জাহান্নাম হতে এতো দূরে রাখা হবে যে,তারা ওর ক্ষীণতর শব্দও শুনবে না এবং জাহান্নামীদেরকে জ্বলতে পুড়তেও দেখতে পাবে না। পুলসিরাতের উপর দুখীদেরকে বিষাক্ত সাপে দংশন করবে এবং ওটা হিসৃহিস্ শব্দ করবে। জান্নাতীরা এই শব্দও শুনতে পাবে না। তাদেরকে কষ্ট ও বিপদ আপদ থেকে দূরে রাখা হবে শুধু এটাই নয়, বরং সেখানে তারা তাদের মন যা চায় চিরকাল ভোগ করবে। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) (আরবী) (যাদের জন্য আমার নিকট হতে পূর্ব থেকে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে তা হতে (জাহান্নাম হতে) দূরে রাখা হবে) এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “আমি, ওমর (রাঃ), উছমান (রাঃ) এই লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত।” অথবা তিনি হযরত সা’দের (রাঃ) নাম নিয়েছিলেন। এমন সময় নামাযের জন্যে তাকবীর দেয়া হয় এবং তিনি। (আরবী) এ উক্তিটি পাঠরত অবস্থায় স্বীয় চাদরখানা টানতে টানতে দাড়িয়ে যান। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত উছমান (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই লোকগুলিই আল্লাহর বন্ধু। বিদ্যুত অপেক্ষাও দ্রুত গতিতে তারা পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে কাফিররা হাঁটুর ভরে পড়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা ঐ বুযর্গ ব্যক্তিদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহ ভক্ত ছিলেন এবং মুশরিকদের প্রতি ছিলেন অসন্তুষ্ট। কিন্তু তাদের পরবর্তী লোকেরা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের পূজা শুরু করে দিয়েছিল। যেমন হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ), ফেরেশতা মণ্ডলী, সূর্য, চন্দ্র, হযরত মারইয়াম (আঃ) ইত্যাদি। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী নবীর (সঃ) নিকট আগমন করে এবং বলতে শুরু করেঃ “আপনি ধারণা করছেন যে, আল্লাহ তাআলা (আরবী) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেছেন। যদি এটা সত্য হয় তবে কি সূর্য, চন্দ্র, ফেরেশতা মণ্ডলী, হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি সবাই আমাদের মূর্তিগুলির সাথে জাহান্নামে চলে যাবে?” তার এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তাআলা (আরবী) (৪৩:৫৭-৫৮) এই আয়াত দুটি অবতীর্ণ করেন। এরপর তিনি (আরবী) এই আয়াত নাযিল করেন। (এটা আবুবকর ইবনু মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ননা করেছেন)একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ালীদ ইবনু মুগীরার সাথে মসজিদে বসে ছিলেন। এমন সময় নায়র ইবনু হারিছ তথায় আগমন করে। ঐ সময় মসজিদে আরো বহু কুরায়েশও বিদ্যমান ছিল। নাহ্র ইবনু হারিছ। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কথা বলছিল। কিন্তু সে নিরুত্তর হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলি পাঠ করেন। যখন তিনি ঐ মজলিস হতে উঠে চলে যান তখন আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী আগমন করে। লোকেরা তাকে বলেঃ আজ নাফর ইবনু হারিস রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে আলাপ-আলোচনা করেছে কিন্ত শেষে একেবারে নিরুত্তর হয়ে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাদের সম্পর্কে একথা বলে উঠে গেছেন যে, আমরা এবং আমাদের এই উপাস্য দেবতারা সবাই জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হয়ে যাবো।” তাদের এই কথা শুনে আবদুল্লাহ ইবন যাবআ’রী বলেঃ “আমি থাকলে তাঁকে উত্তর দিতাম যে, আমরা ফেরেশতাদের পূজা করে থাকি, ইয়াহুদীরা উযায়েরের (আঃ) পূজা করে এবং খৃস্টানরা ঈসার (আঃ) পূজা করে। তাহলে এরা সবাই জাহান্নামে যাবেন। তার এই উত্তর সবারই খুব পছন্দ হয়। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সামনে এটা বর্ণনা করা হলে তিনি বলেনঃ “যে নিজের ইবাদত করিয়েছে সে ইবাদতকারীদের সাথে জাহান্নামে যাবে। কিন্তু এই বুযুর্গ ব্যক্তিরা নিজেদের ইবাদত করান নাই। আসলে তো এই লোকগুলি তাঁদের নয়, বরং শয়তানদের পূজা করছে। শয়তানই তাদেরকে তাদের ইবাদতের পন্থা হিসেবে বাতলিয়ে দিয়েছে। তাঁর জবাবের সাথে সাথেই আল্লাহ তাআলা জবাব হিসাবে পরবর্তী আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ করেন। সুতরাং অজ্ঞ লোকেরা যে সব সৎ লোকের উপাসনা করতো তাঁরা পৃথক হয়ে গেলেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মধ্যে যে বলেঃ তিনি (আল্লাহ) ছাড়া আমিই মাবুদ, তার প্রতিফল জাহান্নাম এবং এই ভাবেই আমি অত্যাচারীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি।” হযরত ঈসার (আঃ) ব্যাপারে তাদের তর্ক-বিতর্কের কারণে আল্লাহ তাআলা নিম্নের আয়াতগুলি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন মারইয়াম তনয়ের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমাদের সম্প্রদায় শোর গোল শুরু করে দেয়। তারা বলেঃ আমাদের দেবতাগুলি শ্রেষ্ঠ, না ঈসা (আঃ)? এরা তো বাক বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। বস্তুত এরা তো এক বিতণ্ডাকারী সম্প্রদায়। সে তো ছিলে আমারই এক বান্দা, যার উপর আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতরে নিদর্শন; সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকে অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।” (৪৩:৫৭-৬১)ইবনু যাবআ’রী বড়ই ভুল করেছিল। কেননা, এই আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে মক্কাবাসী কাফিরদেরকে এবং উক্তি করা হয়েছে তাদের প্রতিমা ও পাথরগুলি সম্পর্কে যেগুলির তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদত করতো। এ উক্তি হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি পবিত্র ও একত্ববাদী লোকদের সম্পর্কে নয়। তাঁরা তো গায়রুল্লাহর ইবাদত হতে মানুষকে বিরত রাখতেন!ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে যে (আরবী) শব্দটি রয়েছে তা আরবে নির্জীব ও বিবেকহীনদের জন্যে এসে থাকে। এই ইবনু যাবআ’রী এর পরে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। সে প্রসিদ্ধ কবিদের একজন ছিল। প্রথমতঃ সে মুসলমান হওয়ার পর সে বড়ই ক্ষমাপ্রার্থী হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ মহা-ভীতি তাদেরকে বিষাদষ্টি করবে না। অর্থাৎ মৃত্যুর ভয়, শিঙ্গার ফুৎকারের আতংক, জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশের সময়ের ভীতি বিহবলতা এবং জান্নাতী ও জাহান্নামীদের মাঝে মৃত্যুকে যবাহ্ করে দেয়ার আতংক ইত্যাদি কিছুই তাদের থাকবে না। তারা চিন্তা ও দুঃখ হতে বহু দূরে থাকবে। তারা হবে পুরোপুরি ভাবে উৎফুল্ল ও আনন্দিত। অসন্তুষ্টির চিহ্নমাত্র তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হবে না। ফেরেশতা মণ্ডলী তাদেরকে অভ্যর্থনা করে বলবেঃ এই তোমাদের সেই দিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল।

আল-আম্বিয়া 21:100

৯৮-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মক্কাবাসী কুরায়েশ মুশরিকদেরকে সম্বোধন করে বলছেনঃ তোমরা ও তোমাদের উপাস্য মূর্তিগুলি জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওর ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” হাবশী ভাষায় (আরবী) শব্দকে (আরবী) বলা হয়, যার অর্থ হলো ইন্ধন বা খড়ি। এমনকি একটি কিরআতে বা পঠনে (আরবী) এর স্থলে (আরবী) রয়েছে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর সেগুলি তো 'জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে। তারা যদি মা'রূদ হতো তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করতো না। তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে। সেথায় থাকবে তাদের আর্তনাদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ সেথায় তাদের জন্যে থাকবে আর্তনাদ ও চীৎকার।" সেথায় তারা (এই আর্তনাদ ও চীৎকার ছাড়া) কিছুই শুনতে পাবে না। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন শুধু মুশরিকরাই জাহান্নামে রয়ে যাবে তখন তাদের আগুনের বাসে বন্দী করে দেয়া হবে। তাতে থাকবে আগুনের পেরেক। ওর মধ্যে অবস্থান করে প্রত্যেকেই মনে করবে যে, জাহান্নামে সে ছাড়া আর কেউ নেই।" অতঃপর তিনি- (আরবী) এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনু জারীরও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)(আরবী) দ্বারা করুণা ও সৌভাগ্য বুঝানো হয়েছে। জাহান্নামীদের এবং তাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোক ও তাদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ যাদের জন্যে আমার নিকট হতে পূর্ব হতে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে ঐ জাহান্নাম হতে দূরে রাখা হবে। তাদের সৎ আমলের কারণে সৌভাগ্য তাদের অভ্যর্থনার জন্যে পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে উত্তম প্রতিদান রয়েছে এবং অতিরিক্ত প্রতিদানও বটে।" (১০:২৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “উত্তম কাজের জন্যে উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কি হতে পারে? (৫৫:৬০) তাদের দুনিয়ার আমল ছিল ভাল, তাই তারা আখেরাতে পুরস্কার ও উত্তম বিনিময় লাভ করলো। আর শাস্তি থেকে রক্ষা পেলো ও আল্লাহর করুণা প্রাপ্ত হলো। তাদেরকে জাহান্নাম হতে এতো দূরে রাখা হবে যে,তারা ওর ক্ষীণতর শব্দও শুনবে না এবং জাহান্নামীদেরকে জ্বলতে পুড়তেও দেখতে পাবে না। পুলসিরাতের উপর দুখীদেরকে বিষাক্ত সাপে দংশন করবে এবং ওটা হিসৃহিস্ শব্দ করবে। জান্নাতীরা এই শব্দও শুনতে পাবে না। তাদেরকে কষ্ট ও বিপদ আপদ থেকে দূরে রাখা হবে শুধু এটাই নয়, বরং সেখানে তারা তাদের মন যা চায় চিরকাল ভোগ করবে। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) (আরবী) (যাদের জন্য আমার নিকট হতে পূর্ব থেকে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে তা হতে (জাহান্নাম হতে) দূরে রাখা হবে) এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “আমি, ওমর (রাঃ), উছমান (রাঃ) এই লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত।” অথবা তিনি হযরত সা’দের (রাঃ) নাম নিয়েছিলেন। এমন সময় নামাযের জন্যে তাকবীর দেয়া হয় এবং তিনি। (আরবী) এ উক্তিটি পাঠরত অবস্থায় স্বীয় চাদরখানা টানতে টানতে দাড়িয়ে যান। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত উছমান (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই লোকগুলিই আল্লাহর বন্ধু। বিদ্যুত অপেক্ষাও দ্রুত গতিতে তারা পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে কাফিররা হাঁটুর ভরে পড়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা ঐ বুযর্গ ব্যক্তিদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহ ভক্ত ছিলেন এবং মুশরিকদের প্রতি ছিলেন অসন্তুষ্ট। কিন্তু তাদের পরবর্তী লোকেরা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের পূজা শুরু করে দিয়েছিল। যেমন হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ), ফেরেশতা মণ্ডলী, সূর্য, চন্দ্র, হযরত মারইয়াম (আঃ) ইত্যাদি। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী নবীর (সঃ) নিকট আগমন করে এবং বলতে শুরু করেঃ “আপনি ধারণা করছেন যে, আল্লাহ তাআলা (আরবী) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেছেন। যদি এটা সত্য হয় তবে কি সূর্য, চন্দ্র, ফেরেশতা মণ্ডলী, হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি সবাই আমাদের মূর্তিগুলির সাথে জাহান্নামে চলে যাবে?” তার এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তাআলা (আরবী) (৪৩:৫৭-৫৮) এই আয়াত দুটি অবতীর্ণ করেন। এরপর তিনি (আরবী) এই আয়াত নাযিল করেন। (এটা আবুবকর ইবনু মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ননা করেছেন)একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ালীদ ইবনু মুগীরার সাথে মসজিদে বসে ছিলেন। এমন সময় নায়র ইবনু হারিছ তথায় আগমন করে। ঐ সময় মসজিদে আরো বহু কুরায়েশও বিদ্যমান ছিল। নাহ্র ইবনু হারিছ। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কথা বলছিল। কিন্তু সে নিরুত্তর হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলি পাঠ করেন। যখন তিনি ঐ মজলিস হতে উঠে চলে যান তখন আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী আগমন করে। লোকেরা তাকে বলেঃ আজ নাফর ইবনু হারিস রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে আলাপ-আলোচনা করেছে কিন্ত শেষে একেবারে নিরুত্তর হয়ে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাদের সম্পর্কে একথা বলে উঠে গেছেন যে, আমরা এবং আমাদের এই উপাস্য দেবতারা সবাই জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হয়ে যাবো।” তাদের এই কথা শুনে আবদুল্লাহ ইবন যাবআ’রী বলেঃ “আমি থাকলে তাঁকে উত্তর দিতাম যে, আমরা ফেরেশতাদের পূজা করে থাকি, ইয়াহুদীরা উযায়েরের (আঃ) পূজা করে এবং খৃস্টানরা ঈসার (আঃ) পূজা করে। তাহলে এরা সবাই জাহান্নামে যাবেন। তার এই উত্তর সবারই খুব পছন্দ হয়। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সামনে এটা বর্ণনা করা হলে তিনি বলেনঃ “যে নিজের ইবাদত করিয়েছে সে ইবাদতকারীদের সাথে জাহান্নামে যাবে। কিন্তু এই বুযুর্গ ব্যক্তিরা নিজেদের ইবাদত করান নাই। আসলে তো এই লোকগুলি তাঁদের নয়, বরং শয়তানদের পূজা করছে। শয়তানই তাদেরকে তাদের ইবাদতের পন্থা হিসেবে বাতলিয়ে দিয়েছে। তাঁর জবাবের সাথে সাথেই আল্লাহ তাআলা জবাব হিসাবে পরবর্তী আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ করেন। সুতরাং অজ্ঞ লোকেরা যে সব সৎ লোকের উপাসনা করতো তাঁরা পৃথক হয়ে গেলেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মধ্যে যে বলেঃ তিনি (আল্লাহ) ছাড়া আমিই মাবুদ, তার প্রতিফল জাহান্নাম এবং এই ভাবেই আমি অত্যাচারীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি।” হযরত ঈসার (আঃ) ব্যাপারে তাদের তর্ক-বিতর্কের কারণে আল্লাহ তাআলা নিম্নের আয়াতগুলি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন মারইয়াম তনয়ের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমাদের সম্প্রদায় শোর গোল শুরু করে দেয়। তারা বলেঃ আমাদের দেবতাগুলি শ্রেষ্ঠ, না ঈসা (আঃ)? এরা তো বাক বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। বস্তুত এরা তো এক বিতণ্ডাকারী সম্প্রদায়। সে তো ছিলে আমারই এক বান্দা, যার উপর আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতরে নিদর্শন; সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকে অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।” (৪৩:৫৭-৬১)ইবনু যাবআ’রী বড়ই ভুল করেছিল। কেননা, এই আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে মক্কাবাসী কাফিরদেরকে এবং উক্তি করা হয়েছে তাদের প্রতিমা ও পাথরগুলি সম্পর্কে যেগুলির তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদত করতো। এ উক্তি হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি পবিত্র ও একত্ববাদী লোকদের সম্পর্কে নয়। তাঁরা তো গায়রুল্লাহর ইবাদত হতে মানুষকে বিরত রাখতেন!ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে যে (আরবী) শব্দটি রয়েছে তা আরবে নির্জীব ও বিবেকহীনদের জন্যে এসে থাকে। এই ইবনু যাবআ’রী এর পরে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। সে প্রসিদ্ধ কবিদের একজন ছিল। প্রথমতঃ সে মুসলমান হওয়ার পর সে বড়ই ক্ষমাপ্রার্থী হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ মহা-ভীতি তাদেরকে বিষাদষ্টি করবে না। অর্থাৎ মৃত্যুর ভয়, শিঙ্গার ফুৎকারের আতংক, জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশের সময়ের ভীতি বিহবলতা এবং জান্নাতী ও জাহান্নামীদের মাঝে মৃত্যুকে যবাহ্ করে দেয়ার আতংক ইত্যাদি কিছুই তাদের থাকবে না। তারা চিন্তা ও দুঃখ হতে বহু দূরে থাকবে। তারা হবে পুরোপুরি ভাবে উৎফুল্ল ও আনন্দিত। অসন্তুষ্টির চিহ্নমাত্র তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হবে না। ফেরেশতা মণ্ডলী তাদেরকে অভ্যর্থনা করে বলবেঃ এই তোমাদের সেই দিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল।

আল-আম্বিয়া 21:101

৯৮-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মক্কাবাসী কুরায়েশ মুশরিকদেরকে সম্বোধন করে বলছেনঃ তোমরা ও তোমাদের উপাস্য মূর্তিগুলি জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওর ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” হাবশী ভাষায় (আরবী) শব্দকে (আরবী) বলা হয়, যার অর্থ হলো ইন্ধন বা খড়ি। এমনকি একটি কিরআতে বা পঠনে (আরবী) এর স্থলে (আরবী) রয়েছে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর সেগুলি তো 'জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে। তারা যদি মা'রূদ হতো তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করতো না। তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে। সেথায় থাকবে তাদের আর্তনাদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ সেথায় তাদের জন্যে থাকবে আর্তনাদ ও চীৎকার।" সেথায় তারা (এই আর্তনাদ ও চীৎকার ছাড়া) কিছুই শুনতে পাবে না। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন শুধু মুশরিকরাই জাহান্নামে রয়ে যাবে তখন তাদের আগুনের বাসে বন্দী করে দেয়া হবে। তাতে থাকবে আগুনের পেরেক। ওর মধ্যে অবস্থান করে প্রত্যেকেই মনে করবে যে, জাহান্নামে সে ছাড়া আর কেউ নেই।" অতঃপর তিনি- (আরবী) এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনু জারীরও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)(আরবী) দ্বারা করুণা ও সৌভাগ্য বুঝানো হয়েছে। জাহান্নামীদের এবং তাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোক ও তাদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ যাদের জন্যে আমার নিকট হতে পূর্ব হতে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে ঐ জাহান্নাম হতে দূরে রাখা হবে। তাদের সৎ আমলের কারণে সৌভাগ্য তাদের অভ্যর্থনার জন্যে পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে উত্তম প্রতিদান রয়েছে এবং অতিরিক্ত প্রতিদানও বটে।" (১০:২৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “উত্তম কাজের জন্যে উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কি হতে পারে? (৫৫:৬০) তাদের দুনিয়ার আমল ছিল ভাল, তাই তারা আখেরাতে পুরস্কার ও উত্তম বিনিময় লাভ করলো। আর শাস্তি থেকে রক্ষা পেলো ও আল্লাহর করুণা প্রাপ্ত হলো। তাদেরকে জাহান্নাম হতে এতো দূরে রাখা হবে যে,তারা ওর ক্ষীণতর শব্দও শুনবে না এবং জাহান্নামীদেরকে জ্বলতে পুড়তেও দেখতে পাবে না। পুলসিরাতের উপর দুখীদেরকে বিষাক্ত সাপে দংশন করবে এবং ওটা হিসৃহিস্ শব্দ করবে। জান্নাতীরা এই শব্দও শুনতে পাবে না। তাদেরকে কষ্ট ও বিপদ আপদ থেকে দূরে রাখা হবে শুধু এটাই নয়, বরং সেখানে তারা তাদের মন যা চায় চিরকাল ভোগ করবে। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) (আরবী) (যাদের জন্য আমার নিকট হতে পূর্ব থেকে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে তা হতে (জাহান্নাম হতে) দূরে রাখা হবে) এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “আমি, ওমর (রাঃ), উছমান (রাঃ) এই লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত।” অথবা তিনি হযরত সা’দের (রাঃ) নাম নিয়েছিলেন। এমন সময় নামাযের জন্যে তাকবীর দেয়া হয় এবং তিনি। (আরবী) এ উক্তিটি পাঠরত অবস্থায় স্বীয় চাদরখানা টানতে টানতে দাড়িয়ে যান। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত উছমান (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই লোকগুলিই আল্লাহর বন্ধু। বিদ্যুত অপেক্ষাও দ্রুত গতিতে তারা পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে কাফিররা হাঁটুর ভরে পড়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা ঐ বুযর্গ ব্যক্তিদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহ ভক্ত ছিলেন এবং মুশরিকদের প্রতি ছিলেন অসন্তুষ্ট। কিন্তু তাদের পরবর্তী লোকেরা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের পূজা শুরু করে দিয়েছিল। যেমন হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ), ফেরেশতা মণ্ডলী, সূর্য, চন্দ্র, হযরত মারইয়াম (আঃ) ইত্যাদি। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী নবীর (সঃ) নিকট আগমন করে এবং বলতে শুরু করেঃ “আপনি ধারণা করছেন যে, আল্লাহ তাআলা (আরবী) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেছেন। যদি এটা সত্য হয় তবে কি সূর্য, চন্দ্র, ফেরেশতা মণ্ডলী, হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি সবাই আমাদের মূর্তিগুলির সাথে জাহান্নামে চলে যাবে?” তার এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তাআলা (আরবী) (৪৩:৫৭-৫৮) এই আয়াত দুটি অবতীর্ণ করেন। এরপর তিনি (আরবী) এই আয়াত নাযিল করেন। (এটা আবুবকর ইবনু মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ননা করেছেন)একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ালীদ ইবনু মুগীরার সাথে মসজিদে বসে ছিলেন। এমন সময় নায়র ইবনু হারিছ তথায় আগমন করে। ঐ সময় মসজিদে আরো বহু কুরায়েশও বিদ্যমান ছিল। নাহ্র ইবনু হারিছ। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কথা বলছিল। কিন্তু সে নিরুত্তর হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলি পাঠ করেন। যখন তিনি ঐ মজলিস হতে উঠে চলে যান তখন আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী আগমন করে। লোকেরা তাকে বলেঃ আজ নাফর ইবনু হারিস রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে আলাপ-আলোচনা করেছে কিন্ত শেষে একেবারে নিরুত্তর হয়ে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাদের সম্পর্কে একথা বলে উঠে গেছেন যে, আমরা এবং আমাদের এই উপাস্য দেবতারা সবাই জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হয়ে যাবো।” তাদের এই কথা শুনে আবদুল্লাহ ইবন যাবআ’রী বলেঃ “আমি থাকলে তাঁকে উত্তর দিতাম যে, আমরা ফেরেশতাদের পূজা করে থাকি, ইয়াহুদীরা উযায়েরের (আঃ) পূজা করে এবং খৃস্টানরা ঈসার (আঃ) পূজা করে। তাহলে এরা সবাই জাহান্নামে যাবেন। তার এই উত্তর সবারই খুব পছন্দ হয়। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সামনে এটা বর্ণনা করা হলে তিনি বলেনঃ “যে নিজের ইবাদত করিয়েছে সে ইবাদতকারীদের সাথে জাহান্নামে যাবে। কিন্তু এই বুযুর্গ ব্যক্তিরা নিজেদের ইবাদত করান নাই। আসলে তো এই লোকগুলি তাঁদের নয়, বরং শয়তানদের পূজা করছে। শয়তানই তাদেরকে তাদের ইবাদতের পন্থা হিসেবে বাতলিয়ে দিয়েছে। তাঁর জবাবের সাথে সাথেই আল্লাহ তাআলা জবাব হিসাবে পরবর্তী আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ করেন। সুতরাং অজ্ঞ লোকেরা যে সব সৎ লোকের উপাসনা করতো তাঁরা পৃথক হয়ে গেলেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মধ্যে যে বলেঃ তিনি (আল্লাহ) ছাড়া আমিই মাবুদ, তার প্রতিফল জাহান্নাম এবং এই ভাবেই আমি অত্যাচারীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি।” হযরত ঈসার (আঃ) ব্যাপারে তাদের তর্ক-বিতর্কের কারণে আল্লাহ তাআলা নিম্নের আয়াতগুলি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন মারইয়াম তনয়ের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমাদের সম্প্রদায় শোর গোল শুরু করে দেয়। তারা বলেঃ আমাদের দেবতাগুলি শ্রেষ্ঠ, না ঈসা (আঃ)? এরা তো বাক বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। বস্তুত এরা তো এক বিতণ্ডাকারী সম্প্রদায়। সে তো ছিলে আমারই এক বান্দা, যার উপর আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতরে নিদর্শন; সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকে অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।” (৪৩:৫৭-৬১)ইবনু যাবআ’রী বড়ই ভুল করেছিল। কেননা, এই আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে মক্কাবাসী কাফিরদেরকে এবং উক্তি করা হয়েছে তাদের প্রতিমা ও পাথরগুলি সম্পর্কে যেগুলির তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদত করতো। এ উক্তি হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি পবিত্র ও একত্ববাদী লোকদের সম্পর্কে নয়। তাঁরা তো গায়রুল্লাহর ইবাদত হতে মানুষকে বিরত রাখতেন!ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে যে (আরবী) শব্দটি রয়েছে তা আরবে নির্জীব ও বিবেকহীনদের জন্যে এসে থাকে। এই ইবনু যাবআ’রী এর পরে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। সে প্রসিদ্ধ কবিদের একজন ছিল। প্রথমতঃ সে মুসলমান হওয়ার পর সে বড়ই ক্ষমাপ্রার্থী হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ মহা-ভীতি তাদেরকে বিষাদষ্টি করবে না। অর্থাৎ মৃত্যুর ভয়, শিঙ্গার ফুৎকারের আতংক, জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশের সময়ের ভীতি বিহবলতা এবং জান্নাতী ও জাহান্নামীদের মাঝে মৃত্যুকে যবাহ্ করে দেয়ার আতংক ইত্যাদি কিছুই তাদের থাকবে না। তারা চিন্তা ও দুঃখ হতে বহু দূরে থাকবে। তারা হবে পুরোপুরি ভাবে উৎফুল্ল ও আনন্দিত। অসন্তুষ্টির চিহ্নমাত্র তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হবে না। ফেরেশতা মণ্ডলী তাদেরকে অভ্যর্থনা করে বলবেঃ এই তোমাদের সেই দিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল।

আল-আম্বিয়া 21:102

৯৮-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মক্কাবাসী কুরায়েশ মুশরিকদেরকে সম্বোধন করে বলছেনঃ তোমরা ও তোমাদের উপাস্য মূর্তিগুলি জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওর ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” হাবশী ভাষায় (আরবী) শব্দকে (আরবী) বলা হয়, যার অর্থ হলো ইন্ধন বা খড়ি। এমনকি একটি কিরআতে বা পঠনে (আরবী) এর স্থলে (আরবী) রয়েছে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর সেগুলি তো 'জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে। তারা যদি মা'রূদ হতো তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করতো না। তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে। সেথায় থাকবে তাদের আর্তনাদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ সেথায় তাদের জন্যে থাকবে আর্তনাদ ও চীৎকার।" সেথায় তারা (এই আর্তনাদ ও চীৎকার ছাড়া) কিছুই শুনতে পাবে না। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন শুধু মুশরিকরাই জাহান্নামে রয়ে যাবে তখন তাদের আগুনের বাসে বন্দী করে দেয়া হবে। তাতে থাকবে আগুনের পেরেক। ওর মধ্যে অবস্থান করে প্রত্যেকেই মনে করবে যে, জাহান্নামে সে ছাড়া আর কেউ নেই।" অতঃপর তিনি- (আরবী) এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনু জারীরও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)(আরবী) দ্বারা করুণা ও সৌভাগ্য বুঝানো হয়েছে। জাহান্নামীদের এবং তাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোক ও তাদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ যাদের জন্যে আমার নিকট হতে পূর্ব হতে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে ঐ জাহান্নাম হতে দূরে রাখা হবে। তাদের সৎ আমলের কারণে সৌভাগ্য তাদের অভ্যর্থনার জন্যে পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে উত্তম প্রতিদান রয়েছে এবং অতিরিক্ত প্রতিদানও বটে।" (১০:২৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “উত্তম কাজের জন্যে উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কি হতে পারে? (৫৫:৬০) তাদের দুনিয়ার আমল ছিল ভাল, তাই তারা আখেরাতে পুরস্কার ও উত্তম বিনিময় লাভ করলো। আর শাস্তি থেকে রক্ষা পেলো ও আল্লাহর করুণা প্রাপ্ত হলো। তাদেরকে জাহান্নাম হতে এতো দূরে রাখা হবে যে,তারা ওর ক্ষীণতর শব্দও শুনবে না এবং জাহান্নামীদেরকে জ্বলতে পুড়তেও দেখতে পাবে না। পুলসিরাতের উপর দুখীদেরকে বিষাক্ত সাপে দংশন করবে এবং ওটা হিসৃহিস্ শব্দ করবে। জান্নাতীরা এই শব্দও শুনতে পাবে না। তাদেরকে কষ্ট ও বিপদ আপদ থেকে দূরে রাখা হবে শুধু এটাই নয়, বরং সেখানে তারা তাদের মন যা চায় চিরকাল ভোগ করবে। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) (আরবী) (যাদের জন্য আমার নিকট হতে পূর্ব থেকে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে তা হতে (জাহান্নাম হতে) দূরে রাখা হবে) এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “আমি, ওমর (রাঃ), উছমান (রাঃ) এই লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত।” অথবা তিনি হযরত সা’দের (রাঃ) নাম নিয়েছিলেন। এমন সময় নামাযের জন্যে তাকবীর দেয়া হয় এবং তিনি। (আরবী) এ উক্তিটি পাঠরত অবস্থায় স্বীয় চাদরখানা টানতে টানতে দাড়িয়ে যান। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত উছমান (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই লোকগুলিই আল্লাহর বন্ধু। বিদ্যুত অপেক্ষাও দ্রুত গতিতে তারা পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে কাফিররা হাঁটুর ভরে পড়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা ঐ বুযর্গ ব্যক্তিদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহ ভক্ত ছিলেন এবং মুশরিকদের প্রতি ছিলেন অসন্তুষ্ট। কিন্তু তাদের পরবর্তী লোকেরা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের পূজা শুরু করে দিয়েছিল। যেমন হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ), ফেরেশতা মণ্ডলী, সূর্য, চন্দ্র, হযরত মারইয়াম (আঃ) ইত্যাদি। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী নবীর (সঃ) নিকট আগমন করে এবং বলতে শুরু করেঃ “আপনি ধারণা করছেন যে, আল্লাহ তাআলা (আরবী) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেছেন। যদি এটা সত্য হয় তবে কি সূর্য, চন্দ্র, ফেরেশতা মণ্ডলী, হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি সবাই আমাদের মূর্তিগুলির সাথে জাহান্নামে চলে যাবে?” তার এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তাআলা (আরবী) (৪৩:৫৭-৫৮) এই আয়াত দুটি অবতীর্ণ করেন। এরপর তিনি (আরবী) এই আয়াত নাযিল করেন। (এটা আবুবকর ইবনু মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ননা করেছেন)একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ালীদ ইবনু মুগীরার সাথে মসজিদে বসে ছিলেন। এমন সময় নায়র ইবনু হারিছ তথায় আগমন করে। ঐ সময় মসজিদে আরো বহু কুরায়েশও বিদ্যমান ছিল। নাহ্র ইবনু হারিছ। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কথা বলছিল। কিন্তু সে নিরুত্তর হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলি পাঠ করেন। যখন তিনি ঐ মজলিস হতে উঠে চলে যান তখন আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী আগমন করে। লোকেরা তাকে বলেঃ আজ নাফর ইবনু হারিস রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে আলাপ-আলোচনা করেছে কিন্ত শেষে একেবারে নিরুত্তর হয়ে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাদের সম্পর্কে একথা বলে উঠে গেছেন যে, আমরা এবং আমাদের এই উপাস্য দেবতারা সবাই জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হয়ে যাবো।” তাদের এই কথা শুনে আবদুল্লাহ ইবন যাবআ’রী বলেঃ “আমি থাকলে তাঁকে উত্তর দিতাম যে, আমরা ফেরেশতাদের পূজা করে থাকি, ইয়াহুদীরা উযায়েরের (আঃ) পূজা করে এবং খৃস্টানরা ঈসার (আঃ) পূজা করে। তাহলে এরা সবাই জাহান্নামে যাবেন। তার এই উত্তর সবারই খুব পছন্দ হয়। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সামনে এটা বর্ণনা করা হলে তিনি বলেনঃ “যে নিজের ইবাদত করিয়েছে সে ইবাদতকারীদের সাথে জাহান্নামে যাবে। কিন্তু এই বুযুর্গ ব্যক্তিরা নিজেদের ইবাদত করান নাই। আসলে তো এই লোকগুলি তাঁদের নয়, বরং শয়তানদের পূজা করছে। শয়তানই তাদেরকে তাদের ইবাদতের পন্থা হিসেবে বাতলিয়ে দিয়েছে। তাঁর জবাবের সাথে সাথেই আল্লাহ তাআলা জবাব হিসাবে পরবর্তী আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ করেন। সুতরাং অজ্ঞ লোকেরা যে সব সৎ লোকের উপাসনা করতো তাঁরা পৃথক হয়ে গেলেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মধ্যে যে বলেঃ তিনি (আল্লাহ) ছাড়া আমিই মাবুদ, তার প্রতিফল জাহান্নাম এবং এই ভাবেই আমি অত্যাচারীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি।” হযরত ঈসার (আঃ) ব্যাপারে তাদের তর্ক-বিতর্কের কারণে আল্লাহ তাআলা নিম্নের আয়াতগুলি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন মারইয়াম তনয়ের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমাদের সম্প্রদায় শোর গোল শুরু করে দেয়। তারা বলেঃ আমাদের দেবতাগুলি শ্রেষ্ঠ, না ঈসা (আঃ)? এরা তো বাক বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। বস্তুত এরা তো এক বিতণ্ডাকারী সম্প্রদায়। সে তো ছিলে আমারই এক বান্দা, যার উপর আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতরে নিদর্শন; সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকে অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।” (৪৩:৫৭-৬১)ইবনু যাবআ’রী বড়ই ভুল করেছিল। কেননা, এই আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে মক্কাবাসী কাফিরদেরকে এবং উক্তি করা হয়েছে তাদের প্রতিমা ও পাথরগুলি সম্পর্কে যেগুলির তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদত করতো। এ উক্তি হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি পবিত্র ও একত্ববাদী লোকদের সম্পর্কে নয়। তাঁরা তো গায়রুল্লাহর ইবাদত হতে মানুষকে বিরত রাখতেন!ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে যে (আরবী) শব্দটি রয়েছে তা আরবে নির্জীব ও বিবেকহীনদের জন্যে এসে থাকে। এই ইবনু যাবআ’রী এর পরে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। সে প্রসিদ্ধ কবিদের একজন ছিল। প্রথমতঃ সে মুসলমান হওয়ার পর সে বড়ই ক্ষমাপ্রার্থী হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ মহা-ভীতি তাদেরকে বিষাদষ্টি করবে না। অর্থাৎ মৃত্যুর ভয়, শিঙ্গার ফুৎকারের আতংক, জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশের সময়ের ভীতি বিহবলতা এবং জান্নাতী ও জাহান্নামীদের মাঝে মৃত্যুকে যবাহ্ করে দেয়ার আতংক ইত্যাদি কিছুই তাদের থাকবে না। তারা চিন্তা ও দুঃখ হতে বহু দূরে থাকবে। তারা হবে পুরোপুরি ভাবে উৎফুল্ল ও আনন্দিত। অসন্তুষ্টির চিহ্নমাত্র তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হবে না। ফেরেশতা মণ্ডলী তাদেরকে অভ্যর্থনা করে বলবেঃ এই তোমাদের সেই দিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল।

আল-আম্বিয়া 21:103

৯৮-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মক্কাবাসী কুরায়েশ মুশরিকদেরকে সম্বোধন করে বলছেনঃ তোমরা ও তোমাদের উপাস্য মূর্তিগুলি জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওর ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” হাবশী ভাষায় (আরবী) শব্দকে (আরবী) বলা হয়, যার অর্থ হলো ইন্ধন বা খড়ি। এমনকি একটি কিরআতে বা পঠনে (আরবী) এর স্থলে (আরবী) রয়েছে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর সেগুলি তো 'জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে। তারা যদি মা'রূদ হতো তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করতো না। তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে। সেথায় থাকবে তাদের আর্তনাদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ সেথায় তাদের জন্যে থাকবে আর্তনাদ ও চীৎকার।" সেথায় তারা (এই আর্তনাদ ও চীৎকার ছাড়া) কিছুই শুনতে পাবে না। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন শুধু মুশরিকরাই জাহান্নামে রয়ে যাবে তখন তাদের আগুনের বাসে বন্দী করে দেয়া হবে। তাতে থাকবে আগুনের পেরেক। ওর মধ্যে অবস্থান করে প্রত্যেকেই মনে করবে যে, জাহান্নামে সে ছাড়া আর কেউ নেই।" অতঃপর তিনি- (আরবী) এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনু জারীরও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)(আরবী) দ্বারা করুণা ও সৌভাগ্য বুঝানো হয়েছে। জাহান্নামীদের এবং তাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোক ও তাদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ যাদের জন্যে আমার নিকট হতে পূর্ব হতে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে ঐ জাহান্নাম হতে দূরে রাখা হবে। তাদের সৎ আমলের কারণে সৌভাগ্য তাদের অভ্যর্থনার জন্যে পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে উত্তম প্রতিদান রয়েছে এবং অতিরিক্ত প্রতিদানও বটে।" (১০:২৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “উত্তম কাজের জন্যে উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কি হতে পারে? (৫৫:৬০) তাদের দুনিয়ার আমল ছিল ভাল, তাই তারা আখেরাতে পুরস্কার ও উত্তম বিনিময় লাভ করলো। আর শাস্তি থেকে রক্ষা পেলো ও আল্লাহর করুণা প্রাপ্ত হলো। তাদেরকে জাহান্নাম হতে এতো দূরে রাখা হবে যে,তারা ওর ক্ষীণতর শব্দও শুনবে না এবং জাহান্নামীদেরকে জ্বলতে পুড়তেও দেখতে পাবে না। পুলসিরাতের উপর দুখীদেরকে বিষাক্ত সাপে দংশন করবে এবং ওটা হিসৃহিস্ শব্দ করবে। জান্নাতীরা এই শব্দও শুনতে পাবে না। তাদেরকে কষ্ট ও বিপদ আপদ থেকে দূরে রাখা হবে শুধু এটাই নয়, বরং সেখানে তারা তাদের মন যা চায় চিরকাল ভোগ করবে। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) (আরবী) (যাদের জন্য আমার নিকট হতে পূর্ব থেকে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে তা হতে (জাহান্নাম হতে) দূরে রাখা হবে) এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “আমি, ওমর (রাঃ), উছমান (রাঃ) এই লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত।” অথবা তিনি হযরত সা’দের (রাঃ) নাম নিয়েছিলেন। এমন সময় নামাযের জন্যে তাকবীর দেয়া হয় এবং তিনি। (আরবী) এ উক্তিটি পাঠরত অবস্থায় স্বীয় চাদরখানা টানতে টানতে দাড়িয়ে যান। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত উছমান (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই লোকগুলিই আল্লাহর বন্ধু। বিদ্যুত অপেক্ষাও দ্রুত গতিতে তারা পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে কাফিররা হাঁটুর ভরে পড়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা ঐ বুযর্গ ব্যক্তিদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহ ভক্ত ছিলেন এবং মুশরিকদের প্রতি ছিলেন অসন্তুষ্ট। কিন্তু তাদের পরবর্তী লোকেরা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের পূজা শুরু করে দিয়েছিল। যেমন হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ), ফেরেশতা মণ্ডলী, সূর্য, চন্দ্র, হযরত মারইয়াম (আঃ) ইত্যাদি। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী নবীর (সঃ) নিকট আগমন করে এবং বলতে শুরু করেঃ “আপনি ধারণা করছেন যে, আল্লাহ তাআলা (আরবী) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেছেন। যদি এটা সত্য হয় তবে কি সূর্য, চন্দ্র, ফেরেশতা মণ্ডলী, হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি সবাই আমাদের মূর্তিগুলির সাথে জাহান্নামে চলে যাবে?” তার এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তাআলা (আরবী) (৪৩:৫৭-৫৮) এই আয়াত দুটি অবতীর্ণ করেন। এরপর তিনি (আরবী) এই আয়াত নাযিল করেন। (এটা আবুবকর ইবনু মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ননা করেছেন)একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ালীদ ইবনু মুগীরার সাথে মসজিদে বসে ছিলেন। এমন সময় নায়র ইবনু হারিছ তথায় আগমন করে। ঐ সময় মসজিদে আরো বহু কুরায়েশও বিদ্যমান ছিল। নাহ্র ইবনু হারিছ। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কথা বলছিল। কিন্তু সে নিরুত্তর হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলি পাঠ করেন। যখন তিনি ঐ মজলিস হতে উঠে চলে যান তখন আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী আগমন করে। লোকেরা তাকে বলেঃ আজ নাফর ইবনু হারিস রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে আলাপ-আলোচনা করেছে কিন্ত শেষে একেবারে নিরুত্তর হয়ে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাদের সম্পর্কে একথা বলে উঠে গেছেন যে, আমরা এবং আমাদের এই উপাস্য দেবতারা সবাই জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হয়ে যাবো।” তাদের এই কথা শুনে আবদুল্লাহ ইবন যাবআ’রী বলেঃ “আমি থাকলে তাঁকে উত্তর দিতাম যে, আমরা ফেরেশতাদের পূজা করে থাকি, ইয়াহুদীরা উযায়েরের (আঃ) পূজা করে এবং খৃস্টানরা ঈসার (আঃ) পূজা করে। তাহলে এরা সবাই জাহান্নামে যাবেন। তার এই উত্তর সবারই খুব পছন্দ হয়। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সামনে এটা বর্ণনা করা হলে তিনি বলেনঃ “যে নিজের ইবাদত করিয়েছে সে ইবাদতকারীদের সাথে জাহান্নামে যাবে। কিন্তু এই বুযুর্গ ব্যক্তিরা নিজেদের ইবাদত করান নাই। আসলে তো এই লোকগুলি তাঁদের নয়, বরং শয়তানদের পূজা করছে। শয়তানই তাদেরকে তাদের ইবাদতের পন্থা হিসেবে বাতলিয়ে দিয়েছে। তাঁর জবাবের সাথে সাথেই আল্লাহ তাআলা জবাব হিসাবে পরবর্তী আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ করেন। সুতরাং অজ্ঞ লোকেরা যে সব সৎ লোকের উপাসনা করতো তাঁরা পৃথক হয়ে গেলেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মধ্যে যে বলেঃ তিনি (আল্লাহ) ছাড়া আমিই মাবুদ, তার প্রতিফল জাহান্নাম এবং এই ভাবেই আমি অত্যাচারীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি।” হযরত ঈসার (আঃ) ব্যাপারে তাদের তর্ক-বিতর্কের কারণে আল্লাহ তাআলা নিম্নের আয়াতগুলি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন মারইয়াম তনয়ের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমাদের সম্প্রদায় শোর গোল শুরু করে দেয়। তারা বলেঃ আমাদের দেবতাগুলি শ্রেষ্ঠ, না ঈসা (আঃ)? এরা তো বাক বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। বস্তুত এরা তো এক বিতণ্ডাকারী সম্প্রদায়। সে তো ছিলে আমারই এক বান্দা, যার উপর আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতরে নিদর্শন; সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকে অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।” (৪৩:৫৭-৬১)ইবনু যাবআ’রী বড়ই ভুল করেছিল। কেননা, এই আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে মক্কাবাসী কাফিরদেরকে এবং উক্তি করা হয়েছে তাদের প্রতিমা ও পাথরগুলি সম্পর্কে যেগুলির তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদত করতো। এ উক্তি হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি পবিত্র ও একত্ববাদী লোকদের সম্পর্কে নয়। তাঁরা তো গায়রুল্লাহর ইবাদত হতে মানুষকে বিরত রাখতেন!ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে যে (আরবী) শব্দটি রয়েছে তা আরবে নির্জীব ও বিবেকহীনদের জন্যে এসে থাকে। এই ইবনু যাবআ’রী এর পরে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। সে প্রসিদ্ধ কবিদের একজন ছিল। প্রথমতঃ সে মুসলমান হওয়ার পর সে বড়ই ক্ষমাপ্রার্থী হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ মহা-ভীতি তাদেরকে বিষাদষ্টি করবে না। অর্থাৎ মৃত্যুর ভয়, শিঙ্গার ফুৎকারের আতংক, জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশের সময়ের ভীতি বিহবলতা এবং জান্নাতী ও জাহান্নামীদের মাঝে মৃত্যুকে যবাহ্ করে দেয়ার আতংক ইত্যাদি কিছুই তাদের থাকবে না। তারা চিন্তা ও দুঃখ হতে বহু দূরে থাকবে। তারা হবে পুরোপুরি ভাবে উৎফুল্ল ও আনন্দিত। অসন্তুষ্টির চিহ্নমাত্র তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হবে না। ফেরেশতা মণ্ডলী তাদেরকে অভ্যর্থনা করে বলবেঃ এই তোমাদের সেই দিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল।

আল-আম্বিয়া 21:104

আল্লাহ তাআলা বলেন যে, এটা কিয়ামতের দিন হবে। তিনি বলেনঃ আমি আকাশকে গুটিয়ে নেবো। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা আল্লাহর সেইরূপ মর্যাদা দেয় নাই যেইরূপ তার মর্যাদা দেয়া উচিত ছিল, অথচ কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন তার মুষ্টির মধ্যে থাকবে এবং আকাশ সমূহ তার দক্ষিণ হস্তে গুটানো থাকবে, তিনি মহিমান্বিত এবং তারা যাকে শরীক করে তিনি তার উর্ধ্বে।" (৩৯:৬৭)।হযরত ইবনু ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সমস্ত যমীনকে স্বীয় মুষ্টির মধ্যে গ্রহণ করবে এবং আকাশসমূহ তার ডান হাতে হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআ’লী সপ্ত আকাশ ও ওগুলির মধ্যস্থিত সমস্ত মাখলুক এবং সপ্ত যমীন ও ওগুলির মধ্যস্থিত সবকিছু স্বীয় দক্ষিণ হস্তে গুটিয়ে নিবেন, ওগুলি তাঁর হাতে শরিষার দানার মত থাকবে।” (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য কিতাব। বলা হয়েছে যে, এখানে (আরবী) দ্বারা ঐ ফেরেশতাকে বুঝানো হয়েছে যার নিকট দিয়ে কারো ইসতিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা উপরে ওঠার সময় তিনি বলেনঃ “এটাকে জ্যোতিরূপে লিপিবদ্ধ কর।" এই ফেরেশতা আমল নামার কাজের উপর নিযুক্ত রয়েছেন। যখন মানুষ মারা যায় তখন তিনি তার কিতাব (আমলনামা) অন্যান্য কিতাবগুলির সাথে গুটিয়ে নিয়ে কিয়ামতের দিনের জন্যে রেখে দেন। একথাও বলা হয়েছে যে, এই নাম হচ্ছে ঐ সাহাবীর যিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) ওয়াহী লেখক ছিলেন। কিন্তু এই রিওয়াইয়াতটি প্রমাণিত নয়। হাদীসের অধিকাংশ হাফি এটাকে মাওযূ' বা বানোনা কথা বলেছেন। বিশেষ করে আমাদের উসতাদ আল হাফিযুল কাবীর আবুল হাজ্জাজ মুযী (রঃ) এটাকে মাওযূ বলেছেন। আমি এই হাদীসকে একটি পৃথক কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছি। ইমাম আবু জাফর ইবনু জারীরও (রঃ) এই হাদীসের উপর খুবই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং বহুভাবে এটাকে খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেছেন যে, সিজুল নামের কোন সাহাবীই নেই। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সমস্ত ওয়াহী লেখকের নাম সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত হয়ে রয়েছে। তাদের কারো নামই সিজ্বল নেই। বাস্তবিকই ইমাম সাহেব খুব সঠিক কথাই বলেছেন। এ হাদীসটি অস্বীকৃত হওয়ার এটা একটি বড় কারণ। এমন কি এটাও স্মরণ রাখার বিষয় যে, যিনি এই সা হাবীর নাম উল্লেখ করেছেন তিনি এই হাদীসের উপর ভিত্তি করেই তা করেছেন। যখন এই হাদীসই প্রমাণিত নয় তখন উল্লিখিত নামও সম্পূর্ণরূপে ভুল প্রমাণিত হলো। সঠিক কথা এটাই যে, (আরবী) দ্বারা সাহীফা’কেই বুঝানো হয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসিরেরও এটাই উক্তি। এর আভিধানিক অর্থও এটাই। সুতরাং অর্থ হলো সেই দিন আমি আকাশকে গুটিয়ে ফেলবো, যেভাবে গুটানো হয় লিখিত দফতর। (আরবী) এখানে (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন (আরবী) এখানেও (আরবী) এসেছে (আরবী) অর্থে। অভিধানে এর আরো বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেইভাবে পুনরায় সৃষ্টি করবো। প্রথমে সৃষ্টি করার উপর আমি যখন সক্ষ ছিলাম তখন দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আমি আরো বেশী সক্ষম। এটা আমার প্রতিশ্রুতি। আর প্রতিশ্রুতি পালন আমার কর্তব্য। আমি এটা পালন করবই। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের সামনে ভাষণ দিতে দাড়িয়ে যান। ভাষণে তিনি বলেনঃ “তোমাদেরকে আল্লাহ তাআলার সামনে উলঙ্গ পায়ে ও উলঙ্গ দেহে এবং খনা বিহীন অবস্থায় একত্রিত করা হবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ “যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য, আমি তা পালন করবই।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন) সমস্ত কিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং পুনরায় সৃষ্টি করা হবে।

আল-আম্বিয়া 21:105

১০৫-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর সবান্দাদেরকের যেমন আখেরাতে ভাগ্যবান করে থাকেন তেমনই দুনিয়াতেও তাদেরকে রাজ্য ও ধনমাল দান করেন। এটা আল্লাহর নিশ্চিত ওয়াদা এবং সত্য ফায়সালা। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয় যমীন আল্লাহর অধিকারভুক্ত। তিনি তাঁর বান্দাদের যাকে চান ওর ওয়ারিস বানিয়ে দেন, আর উত্তম পরিণাম তো খোদাভীরুদের জন্যেই।” (৭:১২৮) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে ও মু'মিনদেরকে পার্থিব জীবনেও সাহায্য করবো এবং যেই দিন সাক্ষীরা দণ্ডায়মান হবে সেই দিনও (অর্থাৎ আখেরাতেও) সাহায্য করবো।” (৪০:৫১) অন্যত্র বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেছে তাদের সঙ্গে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাদেরকে ভূ-পৃষ্ঠে বিজয়ী ও শক্তিমান করবেন যেমন বিজয়ী ও শক্তিমান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে আর তিনি তাদের জন্যে তাদের দ্বীনকে সদঢ় করবেন যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেন ও যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন।” (২৪:৫৫)আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, এটা শারইয়্যাহ ও কাদরিয়্যাহ কিতাব সমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং এটা অবশ্য অবশ্যই হবে। তাই, তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি উপদেশের পর কিতাবে লিখে দিয়েছি।'হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, 'যাকূর' দ্বারা তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ‘যাবুর দ্বারা বুঝানো হয়েছে কিতাবকে। কেউ কেউ বলেন যে, যাবুর হলো ঐ কিতাবের নাম যা হযরত দাউদের (আঃ) উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। এখানে ‘যি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাওরাত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, “যি দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, যি হলো ওটাই যা আকাশে রয়েছে। অর্থাৎ যা আল্লাহর নিকট বিদ্যমান উম্মুল কিতাব, যা সর্বপ্রথম কিতাব। অর্থাৎ লাওহে মাহ। এটাও বর্ণিত আছে যে, যাবুর' হলো ঐ আসমানী কিতাবসমূহ যে গুলি নবীদের (আঃ) উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। আর যি হলো প্রথম কিতাব অর্থাৎ লাওহে মাহফুয।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা তাওরাত ও যাবুরে এবং আসমান ও যমীন সৃষ্ট হওয়ার পূর্বে তার সাবেক জ্ঞানে খবর দিয়েছেন যে, হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) উম্মত যমীনের বাদশাহ হয়ে যাবে এবং সৎকর্মশীল হয়ে বেহেশতে প্রবেশ করবে। একথাও বলা হয়েছে যে, যমীন দ্বারা এখানে জান্নাতের যমীন বুঝানো হয়েছে। হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেনঃ “সৎকর্মশীল লোক আমরাই।” সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুমিন লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ শেষ নবী হযরত মুহাম্মদের (সঃ) উপর অবতারিত পূর্ণ উপদেশ বাণী রয়েছে ঐ সম্প্রদায়ের জন্যে যারা ইবাদত করে। যারা আমাকে মেনে চলে এবং আমার নামে নিজেদের প্রবৃত্তিকে দমন করে।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে বিশ্ব জগতের প্রতি শুধু রহমত বা করুণী রূপেই প্রেরণ করেছি। সুতরাং যারা এই রহমতের কারণে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে তারা হবে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম। পক্ষান্তরে, যারা অকৃতজ্ঞ হবে তারা উভয় জগতে হবে ধ্বংস প্রাপ্ত। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী (সঃ)! তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য কর না যারা আল্লাহর অনুগ্রহের বদলে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং তারা তাদের সম্প্রদায়কে নামিয়ে আনে ধ্বংসের ক্ষেত্র জাহান্নামে যার মধ্যে তারা প্রবেশ করবে, কত নিকৃষ্ট এই আবাস স্থল!” (১৪:২৮-২৯) কুরআন কারীমের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওঃ মু'মিনদের জন্যে এটা (কুরআন) পথ-নির্দেশ ও ব্যাধির প্রতিকার। কিন্তু যারা অবিশ্বাসী তাদের কর্ণে রয়েছে। বধিরতা এবং কুরআন হবে তাদের জন্যে অন্ধত্ব। তারা এমন যে, যেন তাদেরকে আহ্বান করা হয় বহু দূর হতে!" (৪১:৪৪)।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলা হয়ঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি মুশরিকদের উপর বদ দুআ করুন!” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি লানতকারীরূপে প্রেরিত হই নাই, বরং রহমত রূপে প্রেরিত হয়েছি।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছে) অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তো শুধু রহমত ও হিদায়াত।" অন্য রিওয়াইয়াতে এর সাথে এটাও রয়েছেঃ “আমাকে এক কওমের উত্থান ও অন্য কওমের পতনের সাথে প্রেরণ করা হয়েছে।” বর্ণিত আছে যে, আবৃ জাল একদা বলেঃ “হে কুরায়েশের দল! মুহাম্মদ (সঃ) ইয়াসরিবে (মদীনায়) চলে গেছে এবং পরিভ্রমণকারী প্রহরী সে এদিকে ওদিকে তোমাদের অনুসন্ধানে পাঠিয়ে দিয়েছে। দেখো, তোমরা সদা সতর্ক থাকো। সে ক্ষুধার্ত সিংহের ন্যায় ওৎ পেতে রয়েছে। কেননা, তোমরা তাকে দেশ হতে বিতাড়িত করেছে। আল্লাহর শপথ! তার যাদু অতুলনীয়। আমি যখনই তাকে বা তার যে কোন সঙ্গীকে দেখি তখনই তার সাথে শয়তানি আমার দৃষ্টি গোচর হয়। তোমরা তো জান যে, (মদীনার) আউস ও খাযরাজ গোত্র আমাদের শত্রু। আমাদের এই শত্রুকে ঐ শত্রুরা আশ্রয় দিয়েছে। তার এই কথার জবাবে মুতইম ইবনু আ’দী তাকে বলেনঃ “হে আবুল হাকাম! আল্লাহর কসম! তোমাদের যে ভাইটিকে তোমরা দেশ থেকে বিতাড়িত করেছো তাঁর চেয়ে তো অধিক সত্যবাদী ও প্রতিশ্রুতি পালনকারী আর কাউকেও আমি দেখি নাই! যখন তোমরা এই ভাল লোকটির সাথে দুর্ব্যবহার করেছে তখন তাকে ছেড়ে দাও। তোমাদের এখন উচিত তার থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকা।” তখন আবু সুফিয়ান ইবনু হারিস বললোঃ “না, না। বরং তার উপর কঠোরতা অবলম্বন করা উচিত। জেনে রেখো যে, যদি তার পক্ষের লোকেরা তোমাদের উপর জয়যুক্ত হয় তবে তোমাদের কোথাও ঠাঁই মিলবে না। তোমাদের আত্মীয় স্বজনই তোমাদেরকে আশ্রয় দেবে না। সুতরাং তোমাদের উচিত মদীনাবাসীদের উপর এই চাপ সৃষ্টি করা যে, তারা যেন মুহাম্মদকে (সঃ) পরিত্যাগ করে, যাতে সে একাকী হয়ে যায়। যদি তারা এটা অস্বীকার করে তবে তাদের উপর আক্রমণ চালাতে হবে। যদি তোমরা এতে সম্মত হও তবে আমি মদীনার প্রান্তে প্রান্তে সৈন্য মোতায়েন করে দেবো এবং তাদেরকে সমুচিত শিক্ষা প্রদান করবো।" যখন রাসূলুল্লাহর (সঃ) কানে এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! আমি তাদেরকে হত্যা ও ধ্বংস করবো এবং কতকগুলিকে বন্দী করার পর অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেবো। আমি হলাম রহমত স্বরূপ। আমাকে দুনিয়া হতে উঠিয়ে নিবেন না, যে পর্যন্ত না তিনি তার দ্বীনকে সারা দুনিয়ার উপর বিজয়ী না করবেন। আমার পাঁচটি নাম রয়েছে। সেগুলি হলোঃ মুহাম্মদ (সঃ), আহমাদ (সঃ), মাহী, কেননা আমার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা কুফরীকে নিশ্চিহ্ন করবেন। আমার চতুর্থ নাম হাশির। কেননা, আমার পায়ের উপর লোকদেরকে একত্রিত করা হবে। আর আমার পঞ্চম নাম হলো আকিব।" (এ হাদীসটি আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আহমাদ ইবনু সালিহ বলেন: “আমি আশা করি হাদীসটি বিশুদ্ধ)বর্ণিত আছে যে, হযরত হুযাইফা (রাঃ) মাদায়েনে অবস্থান করছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি এমন কিছু আলোচনা করতেন যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন। একদা হযরত হুযাইফা (রাঃ) সালমান ফারসীর (রাঃ) নিকট আগমন করেন। তখন হযরত সালমান (রাঃ) বলেনঃ হে হুযাইফা (রাঃ)! একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলেছিলেনঃ “ক্রোধের সময় যদি আমি কাউকেও ভাল মন্দ কিছু বলে দিই বা লানত করি তবে জেনে রেখো যে, আমিও তোমাদের মতই একজন মানুষ। তোমাদের মত আমারও রাগ হয়। হাঁ, তবে যেহেতু আমি সারা বিশ্বের জন্যে রহমত স্বরূপ, সেহেতু আমার প্রার্থনা এই যে, আল্লাহ যেন আমার এই শব্দগুলিকেও মানুষের জন্যে করুণার কারণ বানিয়ে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এখন বাকী থাকলো এই কথা যে, কাফিরদের জন্যে কি করে তিনি রহমত হতে পারেন? এই উত্তরে বলা যেতে পারেঃ হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে এই আয়াতেরই তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, মু'মিনদের জন্যে তো তিনি দুনিয়া ও আখেরাতে রহমত স্বরূপ ছিলেন। কিন্তু যারা মুমিন নয় তাদের জন্যে তিনি দুনিয়াতেই রহমত স্বরূপ ছিলেন। তারা তাঁরই র হমতের বদৌলতে যমীনে ধ্বসে যাওয়া হতে, আকাশ হতে পাথর বর্ষণ হতে রক্ষা পেয়ে যায়। পূর্ববর্তী অবাধ্য উম্মতদের উপর এই শাস্তি এসেছিল। (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-আম্বিয়া 21:106

১০৫-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর সবান্দাদেরকের যেমন আখেরাতে ভাগ্যবান করে থাকেন তেমনই দুনিয়াতেও তাদেরকে রাজ্য ও ধনমাল দান করেন। এটা আল্লাহর নিশ্চিত ওয়াদা এবং সত্য ফায়সালা। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয় যমীন আল্লাহর অধিকারভুক্ত। তিনি তাঁর বান্দাদের যাকে চান ওর ওয়ারিস বানিয়ে দেন, আর উত্তম পরিণাম তো খোদাভীরুদের জন্যেই।” (৭:১২৮) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে ও মু'মিনদেরকে পার্থিব জীবনেও সাহায্য করবো এবং যেই দিন সাক্ষীরা দণ্ডায়মান হবে সেই দিনও (অর্থাৎ আখেরাতেও) সাহায্য করবো।” (৪০:৫১) অন্যত্র বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেছে তাদের সঙ্গে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাদেরকে ভূ-পৃষ্ঠে বিজয়ী ও শক্তিমান করবেন যেমন বিজয়ী ও শক্তিমান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে আর তিনি তাদের জন্যে তাদের দ্বীনকে সদঢ় করবেন যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেন ও যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন।” (২৪:৫৫)আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, এটা শারইয়্যাহ ও কাদরিয়্যাহ কিতাব সমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং এটা অবশ্য অবশ্যই হবে। তাই, তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি উপদেশের পর কিতাবে লিখে দিয়েছি।'হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, 'যাকূর' দ্বারা তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ‘যাবুর দ্বারা বুঝানো হয়েছে কিতাবকে। কেউ কেউ বলেন যে, যাবুর হলো ঐ কিতাবের নাম যা হযরত দাউদের (আঃ) উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। এখানে ‘যি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাওরাত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, “যি দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, যি হলো ওটাই যা আকাশে রয়েছে। অর্থাৎ যা আল্লাহর নিকট বিদ্যমান উম্মুল কিতাব, যা সর্বপ্রথম কিতাব। অর্থাৎ লাওহে মাহ। এটাও বর্ণিত আছে যে, যাবুর' হলো ঐ আসমানী কিতাবসমূহ যে গুলি নবীদের (আঃ) উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। আর যি হলো প্রথম কিতাব অর্থাৎ লাওহে মাহফুয।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা তাওরাত ও যাবুরে এবং আসমান ও যমীন সৃষ্ট হওয়ার পূর্বে তার সাবেক জ্ঞানে খবর দিয়েছেন যে, হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) উম্মত যমীনের বাদশাহ হয়ে যাবে এবং সৎকর্মশীল হয়ে বেহেশতে প্রবেশ করবে। একথাও বলা হয়েছে যে, যমীন দ্বারা এখানে জান্নাতের যমীন বুঝানো হয়েছে। হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেনঃ “সৎকর্মশীল লোক আমরাই।” সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুমিন লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ শেষ নবী হযরত মুহাম্মদের (সঃ) উপর অবতারিত পূর্ণ উপদেশ বাণী রয়েছে ঐ সম্প্রদায়ের জন্যে যারা ইবাদত করে। যারা আমাকে মেনে চলে এবং আমার নামে নিজেদের প্রবৃত্তিকে দমন করে।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে বিশ্ব জগতের প্রতি শুধু রহমত বা করুণী রূপেই প্রেরণ করেছি। সুতরাং যারা এই রহমতের কারণে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে তারা হবে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম। পক্ষান্তরে, যারা অকৃতজ্ঞ হবে তারা উভয় জগতে হবে ধ্বংস প্রাপ্ত। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী (সঃ)! তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য কর না যারা আল্লাহর অনুগ্রহের বদলে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং তারা তাদের সম্প্রদায়কে নামিয়ে আনে ধ্বংসের ক্ষেত্র জাহান্নামে যার মধ্যে তারা প্রবেশ করবে, কত নিকৃষ্ট এই আবাস স্থল!” (১৪:২৮-২৯) কুরআন কারীমের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওঃ মু'মিনদের জন্যে এটা (কুরআন) পথ-নির্দেশ ও ব্যাধির প্রতিকার। কিন্তু যারা অবিশ্বাসী তাদের কর্ণে রয়েছে। বধিরতা এবং কুরআন হবে তাদের জন্যে অন্ধত্ব। তারা এমন যে, যেন তাদেরকে আহ্বান করা হয় বহু দূর হতে!" (৪১:৪৪)।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলা হয়ঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি মুশরিকদের উপর বদ দুআ করুন!” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি লানতকারীরূপে প্রেরিত হই নাই, বরং রহমত রূপে প্রেরিত হয়েছি।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছে) অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তো শুধু রহমত ও হিদায়াত।" অন্য রিওয়াইয়াতে এর সাথে এটাও রয়েছেঃ “আমাকে এক কওমের উত্থান ও অন্য কওমের পতনের সাথে প্রেরণ করা হয়েছে।” বর্ণিত আছে যে, আবৃ জাল একদা বলেঃ “হে কুরায়েশের দল! মুহাম্মদ (সঃ) ইয়াসরিবে (মদীনায়) চলে গেছে এবং পরিভ্রমণকারী প্রহরী সে এদিকে ওদিকে তোমাদের অনুসন্ধানে পাঠিয়ে দিয়েছে। দেখো, তোমরা সদা সতর্ক থাকো। সে ক্ষুধার্ত সিংহের ন্যায় ওৎ পেতে রয়েছে। কেননা, তোমরা তাকে দেশ হতে বিতাড়িত করেছে। আল্লাহর শপথ! তার যাদু অতুলনীয়। আমি যখনই তাকে বা তার যে কোন সঙ্গীকে দেখি তখনই তার সাথে শয়তানি আমার দৃষ্টি গোচর হয়। তোমরা তো জান যে, (মদীনার) আউস ও খাযরাজ গোত্র আমাদের শত্রু। আমাদের এই শত্রুকে ঐ শত্রুরা আশ্রয় দিয়েছে। তার এই কথার জবাবে মুতইম ইবনু আ’দী তাকে বলেনঃ “হে আবুল হাকাম! আল্লাহর কসম! তোমাদের যে ভাইটিকে তোমরা দেশ থেকে বিতাড়িত করেছো তাঁর চেয়ে তো অধিক সত্যবাদী ও প্রতিশ্রুতি পালনকারী আর কাউকেও আমি দেখি নাই! যখন তোমরা এই ভাল লোকটির সাথে দুর্ব্যবহার করেছে তখন তাকে ছেড়ে দাও। তোমাদের এখন উচিত তার থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকা।” তখন আবু সুফিয়ান ইবনু হারিস বললোঃ “না, না। বরং তার উপর কঠোরতা অবলম্বন করা উচিত। জেনে রেখো যে, যদি তার পক্ষের লোকেরা তোমাদের উপর জয়যুক্ত হয় তবে তোমাদের কোথাও ঠাঁই মিলবে না। তোমাদের আত্মীয় স্বজনই তোমাদেরকে আশ্রয় দেবে না। সুতরাং তোমাদের উচিত মদীনাবাসীদের উপর এই চাপ সৃষ্টি করা যে, তারা যেন মুহাম্মদকে (সঃ) পরিত্যাগ করে, যাতে সে একাকী হয়ে যায়। যদি তারা এটা অস্বীকার করে তবে তাদের উপর আক্রমণ চালাতে হবে। যদি তোমরা এতে সম্মত হও তবে আমি মদীনার প্রান্তে প্রান্তে সৈন্য মোতায়েন করে দেবো এবং তাদেরকে সমুচিত শিক্ষা প্রদান করবো।" যখন রাসূলুল্লাহর (সঃ) কানে এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! আমি তাদেরকে হত্যা ও ধ্বংস করবো এবং কতকগুলিকে বন্দী করার পর অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেবো। আমি হলাম রহমত স্বরূপ। আমাকে দুনিয়া হতে উঠিয়ে নিবেন না, যে পর্যন্ত না তিনি তার দ্বীনকে সারা দুনিয়ার উপর বিজয়ী না করবেন। আমার পাঁচটি নাম রয়েছে। সেগুলি হলোঃ মুহাম্মদ (সঃ), আহমাদ (সঃ), মাহী, কেননা আমার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা কুফরীকে নিশ্চিহ্ন করবেন। আমার চতুর্থ নাম হাশির। কেননা, আমার পায়ের উপর লোকদেরকে একত্রিত করা হবে। আর আমার পঞ্চম নাম হলো আকিব।" (এ হাদীসটি আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আহমাদ ইবনু সালিহ বলেন: “আমি আশা করি হাদীসটি বিশুদ্ধ)বর্ণিত আছে যে, হযরত হুযাইফা (রাঃ) মাদায়েনে অবস্থান করছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি এমন কিছু আলোচনা করতেন যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন। একদা হযরত হুযাইফা (রাঃ) সালমান ফারসীর (রাঃ) নিকট আগমন করেন। তখন হযরত সালমান (রাঃ) বলেনঃ হে হুযাইফা (রাঃ)! একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলেছিলেনঃ “ক্রোধের সময় যদি আমি কাউকেও ভাল মন্দ কিছু বলে দিই বা লানত করি তবে জেনে রেখো যে, আমিও তোমাদের মতই একজন মানুষ। তোমাদের মত আমারও রাগ হয়। হাঁ, তবে যেহেতু আমি সারা বিশ্বের জন্যে রহমত স্বরূপ, সেহেতু আমার প্রার্থনা এই যে, আল্লাহ যেন আমার এই শব্দগুলিকেও মানুষের জন্যে করুণার কারণ বানিয়ে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এখন বাকী থাকলো এই কথা যে, কাফিরদের জন্যে কি করে তিনি রহমত হতে পারেন? এই উত্তরে বলা যেতে পারেঃ হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে এই আয়াতেরই তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, মু'মিনদের জন্যে তো তিনি দুনিয়া ও আখেরাতে রহমত স্বরূপ ছিলেন। কিন্তু যারা মুমিন নয় তাদের জন্যে তিনি দুনিয়াতেই রহমত স্বরূপ ছিলেন। তারা তাঁরই র হমতের বদৌলতে যমীনে ধ্বসে যাওয়া হতে, আকাশ হতে পাথর বর্ষণ হতে রক্ষা পেয়ে যায়। পূর্ববর্তী অবাধ্য উম্মতদের উপর এই শাস্তি এসেছিল। (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-আম্বিয়া 21:107

১০৫-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর সবান্দাদেরকের যেমন আখেরাতে ভাগ্যবান করে থাকেন তেমনই দুনিয়াতেও তাদেরকে রাজ্য ও ধনমাল দান করেন। এটা আল্লাহর নিশ্চিত ওয়াদা এবং সত্য ফায়সালা। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয় যমীন আল্লাহর অধিকারভুক্ত। তিনি তাঁর বান্দাদের যাকে চান ওর ওয়ারিস বানিয়ে দেন, আর উত্তম পরিণাম তো খোদাভীরুদের জন্যেই।” (৭:১২৮) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে ও মু'মিনদেরকে পার্থিব জীবনেও সাহায্য করবো এবং যেই দিন সাক্ষীরা দণ্ডায়মান হবে সেই দিনও (অর্থাৎ আখেরাতেও) সাহায্য করবো।” (৪০:৫১) অন্যত্র বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেছে তাদের সঙ্গে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাদেরকে ভূ-পৃষ্ঠে বিজয়ী ও শক্তিমান করবেন যেমন বিজয়ী ও শক্তিমান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে আর তিনি তাদের জন্যে তাদের দ্বীনকে সদঢ় করবেন যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেন ও যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন।” (২৪:৫৫)আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, এটা শারইয়্যাহ ও কাদরিয়্যাহ কিতাব সমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং এটা অবশ্য অবশ্যই হবে। তাই, তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি উপদেশের পর কিতাবে লিখে দিয়েছি।'হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, 'যাকূর' দ্বারা তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ‘যাবুর দ্বারা বুঝানো হয়েছে কিতাবকে। কেউ কেউ বলেন যে, যাবুর হলো ঐ কিতাবের নাম যা হযরত দাউদের (আঃ) উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। এখানে ‘যি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাওরাত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, “যি দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে। হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) বলেন যে, যি হলো ওটাই যা আকাশে রয়েছে। অর্থাৎ যা আল্লাহর নিকট বিদ্যমান উম্মুল কিতাব, যা সর্বপ্রথম কিতাব। অর্থাৎ লাওহে মাহ। এটাও বর্ণিত আছে যে, যাবুর' হলো ঐ আসমানী কিতাবসমূহ যে গুলি নবীদের (আঃ) উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। আর যি হলো প্রথম কিতাব অর্থাৎ লাওহে মাহফুয।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা তাওরাত ও যাবুরে এবং আসমান ও যমীন সৃষ্ট হওয়ার পূর্বে তার সাবেক জ্ঞানে খবর দিয়েছেন যে, হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) উম্মত যমীনের বাদশাহ হয়ে যাবে এবং সৎকর্মশীল হয়ে বেহেশতে প্রবেশ করবে। একথাও বলা হয়েছে যে, যমীন দ্বারা এখানে জান্নাতের যমীন বুঝানো হয়েছে। হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেনঃ “সৎকর্মশীল লোক আমরাই।” সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুমিন লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ শেষ নবী হযরত মুহাম্মদের (সঃ) উপর অবতারিত পূর্ণ উপদেশ বাণী রয়েছে ঐ সম্প্রদায়ের জন্যে যারা ইবাদত করে। যারা আমাকে মেনে চলে এবং আমার নামে নিজেদের প্রবৃত্তিকে দমন করে।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে বিশ্ব জগতের প্রতি শুধু রহমত বা করুণী রূপেই প্রেরণ করেছি। সুতরাং যারা এই রহমতের কারণে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে তারা হবে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম। পক্ষান্তরে, যারা অকৃতজ্ঞ হবে তারা উভয় জগতে হবে ধ্বংস প্রাপ্ত। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী (সঃ)! তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য কর না যারা আল্লাহর অনুগ্রহের বদলে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং তারা তাদের সম্প্রদায়কে নামিয়ে আনে ধ্বংসের ক্ষেত্র জাহান্নামে যার মধ্যে তারা প্রবেশ করবে, কত নিকৃষ্ট এই আবাস স্থল!” (১৪:২৮-২৯) কুরআন কারীমের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওঃ মু'মিনদের জন্যে এটা (কুরআন) পথ-নির্দেশ ও ব্যাধির প্রতিকার। কিন্তু যারা অবিশ্বাসী তাদের কর্ণে রয়েছে। বধিরতা এবং কুরআন হবে তাদের জন্যে অন্ধত্ব। তারা এমন যে, যেন তাদেরকে আহ্বান করা হয় বহু দূর হতে!" (৪১:৪৪)।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলা হয়ঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি মুশরিকদের উপর বদ দুআ করুন!” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি লানতকারীরূপে প্রেরিত হই নাই, বরং রহমত রূপে প্রেরিত হয়েছি।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছে) অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তো শুধু রহমত ও হিদায়াত।" অন্য রিওয়াইয়াতে এর সাথে এটাও রয়েছেঃ “আমাকে এক কওমের উত্থান ও অন্য কওমের পতনের সাথে প্রেরণ করা হয়েছে।” বর্ণিত আছে যে, আবৃ জাল একদা বলেঃ “হে কুরায়েশের দল! মুহাম্মদ (সঃ) ইয়াসরিবে (মদীনায়) চলে গেছে এবং পরিভ্রমণকারী প্রহরী সে এদিকে ওদিকে তোমাদের অনুসন্ধানে পাঠিয়ে দিয়েছে। দেখো, তোমরা সদা সতর্ক থাকো। সে ক্ষুধার্ত সিংহের ন্যায় ওৎ পেতে রয়েছে। কেননা, তোমরা তাকে দেশ হতে বিতাড়িত করেছে। আল্লাহর শপথ! তার যাদু অতুলনীয়। আমি যখনই তাকে বা তার যে কোন সঙ্গীকে দেখি তখনই তার সাথে শয়তানি আমার দৃষ্টি গোচর হয়। তোমরা তো জান যে, (মদীনার) আউস ও খাযরাজ গোত্র আমাদের শত্রু। আমাদের এই শত্রুকে ঐ শত্রুরা আশ্রয় দিয়েছে। তার এই কথার জবাবে মুতইম ইবনু আ’দী তাকে বলেনঃ “হে আবুল হাকাম! আল্লাহর কসম! তোমাদের যে ভাইটিকে তোমরা দেশ থেকে বিতাড়িত করেছো তাঁর চেয়ে তো অধিক সত্যবাদী ও প্রতিশ্রুতি পালনকারী আর কাউকেও আমি দেখি নাই! যখন তোমরা এই ভাল লোকটির সাথে দুর্ব্যবহার করেছে তখন তাকে ছেড়ে দাও। তোমাদের এখন উচিত তার থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকা।” তখন আবু সুফিয়ান ইবনু হারিস বললোঃ “না, না। বরং তার উপর কঠোরতা অবলম্বন করা উচিত। জেনে রেখো যে, যদি তার পক্ষের লোকেরা তোমাদের উপর জয়যুক্ত হয় তবে তোমাদের কোথাও ঠাঁই মিলবে না। তোমাদের আত্মীয় স্বজনই তোমাদেরকে আশ্রয় দেবে না। সুতরাং তোমাদের উচিত মদীনাবাসীদের উপর এই চাপ সৃষ্টি করা যে, তারা যেন মুহাম্মদকে (সঃ) পরিত্যাগ করে, যাতে সে একাকী হয়ে যায়। যদি তারা এটা অস্বীকার করে তবে তাদের উপর আক্রমণ চালাতে হবে। যদি তোমরা এতে সম্মত হও তবে আমি মদীনার প্রান্তে প্রান্তে সৈন্য মোতায়েন করে দেবো এবং তাদেরকে সমুচিত শিক্ষা প্রদান করবো।" যখন রাসূলুল্লাহর (সঃ) কানে এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! আমি তাদেরকে হত্যা ও ধ্বংস করবো এবং কতকগুলিকে বন্দী করার পর অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেবো। আমি হলাম রহমত স্বরূপ। আমাকে দুনিয়া হতে উঠিয়ে নিবেন না, যে পর্যন্ত না তিনি তার দ্বীনকে সারা দুনিয়ার উপর বিজয়ী না করবেন। আমার পাঁচটি নাম রয়েছে। সেগুলি হলোঃ মুহাম্মদ (সঃ), আহমাদ (সঃ), মাহী, কেননা আমার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা কুফরীকে নিশ্চিহ্ন করবেন। আমার চতুর্থ নাম হাশির। কেননা, আমার পায়ের উপর লোকদেরকে একত্রিত করা হবে। আর আমার পঞ্চম নাম হলো আকিব।" (এ হাদীসটি আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আহমাদ ইবনু সালিহ বলেন: “আমি আশা করি হাদীসটি বিশুদ্ধ)বর্ণিত আছে যে, হযরত হুযাইফা (রাঃ) মাদায়েনে অবস্থান করছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি এমন কিছু আলোচনা করতেন যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন। একদা হযরত হুযাইফা (রাঃ) সালমান ফারসীর (রাঃ) নিকট আগমন করেন। তখন হযরত সালমান (রাঃ) বলেনঃ হে হুযাইফা (রাঃ)! একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ভাষণে বলেছিলেনঃ “ক্রোধের সময় যদি আমি কাউকেও ভাল মন্দ কিছু বলে দিই বা লানত করি তবে জেনে রেখো যে, আমিও তোমাদের মতই একজন মানুষ। তোমাদের মত আমারও রাগ হয়। হাঁ, তবে যেহেতু আমি সারা বিশ্বের জন্যে রহমত স্বরূপ, সেহেতু আমার প্রার্থনা এই যে, আল্লাহ যেন আমার এই শব্দগুলিকেও মানুষের জন্যে করুণার কারণ বানিয়ে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এখন বাকী থাকলো এই কথা যে, কাফিরদের জন্যে কি করে তিনি রহমত হতে পারেন? এই উত্তরে বলা যেতে পারেঃ হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে এই আয়াতেরই তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, মু'মিনদের জন্যে তো তিনি দুনিয়া ও আখেরাতে রহমত স্বরূপ ছিলেন। কিন্তু যারা মুমিন নয় তাদের জন্যে তিনি দুনিয়াতেই রহমত স্বরূপ ছিলেন। তারা তাঁরই র হমতের বদৌলতে যমীনে ধ্বসে যাওয়া হতে, আকাশ হতে পাথর বর্ষণ হতে রক্ষা পেয়ে যায়। পূর্ববর্তী অবাধ্য উম্মতদের উপর এই শাস্তি এসেছিল। (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-আম্বিয়া 21:108

১০৮-১১২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূলকে (সঃ) নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তুমি মুশরিকদেরকে বলে দাওঃ আমার কাছে এই ওয়াহী করা হচ্ছে যে, সত্য ও প্রকৃত মাবুদ শুধু আল্লাহ তাআলাই। তোমরা সবাই এটা মেনে নাও। যদি তোমরা আমার কথা না মানে তবে আমরা ও তোমরা পৃথক। তোমরা আমাদের শত্রু এবং আমরা তোমাদের শত্রু। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে বলে দাও আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে, আমি যে আমল করি তা হতে তোমরা মুক্ত এবং তোমরা যে আমল কর তা হতে আমি মুক্ত।" (১০:৪১) আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যদি কোন কওমের বিশ্বাসঘাতকতা ও চুক্তি ভঙ্গের আশংকা কর তবে তৎক্ষণাৎ তাদেরকে চুক্তি ভঙ্গের খবর দিয়ে দাও।" (৮:৫৮)। অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা এখানেও বলেনঃ যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বলে দাওঃ তোমাদের আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তোমরা নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, তোমাদের সঙ্গে যে ওয়াদা করা হচ্ছে। তা অবশ্য অবশ্যই পূর্ণ হবে, তা এখনই হোক অথবা বিলম্বেই হোক। আল্লাহ তাআলা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত। তোমরা যা কিছু প্রকাশ কর এবং যা কিছু গোপন রাখো আল্লাহ তা সবই জানেন। বান্দাদের সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় সংবাদ তার নিকট প্রকাশমান। ছোট, বড়, প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য সবই তিনি জানতে পারেন। খুব সঙ্ঘ ওয়াদা পূরণে বিলম্ব করার মধ্যেও তোমাদের জন্যে একটা পরীক্ষা রয়েছে এবং কিছু কালের জন্যে তোমরা জীবনোপভোগ করবে।রাসূলদেরকে (আঃ) যে দুআ শিক্ষা দেয়া হয়েছিল তা হলো : হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মধ্যে ও আমাদের কওমের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করুন এবং উত্তম ফায়সালাকারী একমাত্র আপনিই। রাসূলুল্লাহকেও (সঃ) এই প্রকারেরই দুআ'র নির্দেশ দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কোন যুদ্ধে গিয়েই দুআ করতেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আপনি ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করে দিন। আমরা আমাদের দয়াময় আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। হে কাফির ও মুশরিকদের দল! তোমরা যা কিছু মিথ্যা আরোপ করছে সে বিষয়ে আমাদের একমাত্র সহায়স্থল তিনিই। তিনিই আমাদের সাহায্যকারী।

আল-আম্বিয়া 21:109

১০৮-১১২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূলকে (সঃ) নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তুমি মুশরিকদেরকে বলে দাওঃ আমার কাছে এই ওয়াহী করা হচ্ছে যে, সত্য ও প্রকৃত মাবুদ শুধু আল্লাহ তাআলাই। তোমরা সবাই এটা মেনে নাও। যদি তোমরা আমার কথা না মানে তবে আমরা ও তোমরা পৃথক। তোমরা আমাদের শত্রু এবং আমরা তোমাদের শত্রু। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে বলে দাও আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে, আমি যে আমল করি তা হতে তোমরা মুক্ত এবং তোমরা যে আমল কর তা হতে আমি মুক্ত।" (১০:৪১) আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যদি কোন কওমের বিশ্বাসঘাতকতা ও চুক্তি ভঙ্গের আশংকা কর তবে তৎক্ষণাৎ তাদেরকে চুক্তি ভঙ্গের খবর দিয়ে দাও।" (৮:৫৮)। অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা এখানেও বলেনঃ যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বলে দাওঃ তোমাদের আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তোমরা নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, তোমাদের সঙ্গে যে ওয়াদা করা হচ্ছে। তা অবশ্য অবশ্যই পূর্ণ হবে, তা এখনই হোক অথবা বিলম্বেই হোক। আল্লাহ তাআলা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত। তোমরা যা কিছু প্রকাশ কর এবং যা কিছু গোপন রাখো আল্লাহ তা সবই জানেন। বান্দাদের সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় সংবাদ তার নিকট প্রকাশমান। ছোট, বড়, প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য সবই তিনি জানতে পারেন। খুব সঙ্ঘ ওয়াদা পূরণে বিলম্ব করার মধ্যেও তোমাদের জন্যে একটা পরীক্ষা রয়েছে এবং কিছু কালের জন্যে তোমরা জীবনোপভোগ করবে।রাসূলদেরকে (আঃ) যে দুআ শিক্ষা দেয়া হয়েছিল তা হলো : হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মধ্যে ও আমাদের কওমের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করুন এবং উত্তম ফায়সালাকারী একমাত্র আপনিই। রাসূলুল্লাহকেও (সঃ) এই প্রকারেরই দুআ'র নির্দেশ দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কোন যুদ্ধে গিয়েই দুআ করতেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আপনি ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করে দিন। আমরা আমাদের দয়াময় আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। হে কাফির ও মুশরিকদের দল! তোমরা যা কিছু মিথ্যা আরোপ করছে সে বিষয়ে আমাদের একমাত্র সহায়স্থল তিনিই। তিনিই আমাদের সাহায্যকারী।

আল-আম্বিয়া 21:110

১০৮-১১২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূলকে (সঃ) নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তুমি মুশরিকদেরকে বলে দাওঃ আমার কাছে এই ওয়াহী করা হচ্ছে যে, সত্য ও প্রকৃত মাবুদ শুধু আল্লাহ তাআলাই। তোমরা সবাই এটা মেনে নাও। যদি তোমরা আমার কথা না মানে তবে আমরা ও তোমরা পৃথক। তোমরা আমাদের শত্রু এবং আমরা তোমাদের শত্রু। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে বলে দাও আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে, আমি যে আমল করি তা হতে তোমরা মুক্ত এবং তোমরা যে আমল কর তা হতে আমি মুক্ত।" (১০:৪১) আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যদি কোন কওমের বিশ্বাসঘাতকতা ও চুক্তি ভঙ্গের আশংকা কর তবে তৎক্ষণাৎ তাদেরকে চুক্তি ভঙ্গের খবর দিয়ে দাও।" (৮:৫৮)। অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা এখানেও বলেনঃ যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বলে দাওঃ তোমাদের আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তোমরা নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, তোমাদের সঙ্গে যে ওয়াদা করা হচ্ছে। তা অবশ্য অবশ্যই পূর্ণ হবে, তা এখনই হোক অথবা বিলম্বেই হোক। আল্লাহ তাআলা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত। তোমরা যা কিছু প্রকাশ কর এবং যা কিছু গোপন রাখো আল্লাহ তা সবই জানেন। বান্দাদের সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় সংবাদ তার নিকট প্রকাশমান। ছোট, বড়, প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য সবই তিনি জানতে পারেন। খুব সঙ্ঘ ওয়াদা পূরণে বিলম্ব করার মধ্যেও তোমাদের জন্যে একটা পরীক্ষা রয়েছে এবং কিছু কালের জন্যে তোমরা জীবনোপভোগ করবে।রাসূলদেরকে (আঃ) যে দুআ শিক্ষা দেয়া হয়েছিল তা হলো : হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মধ্যে ও আমাদের কওমের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করুন এবং উত্তম ফায়সালাকারী একমাত্র আপনিই। রাসূলুল্লাহকেও (সঃ) এই প্রকারেরই দুআ'র নির্দেশ দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কোন যুদ্ধে গিয়েই দুআ করতেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আপনি ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করে দিন। আমরা আমাদের দয়াময় আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। হে কাফির ও মুশরিকদের দল! তোমরা যা কিছু মিথ্যা আরোপ করছে সে বিষয়ে আমাদের একমাত্র সহায়স্থল তিনিই। তিনিই আমাদের সাহায্যকারী।

আল-আম্বিয়া 21:111

১০৮-১১২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূলকে (সঃ) নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তুমি মুশরিকদেরকে বলে দাওঃ আমার কাছে এই ওয়াহী করা হচ্ছে যে, সত্য ও প্রকৃত মাবুদ শুধু আল্লাহ তাআলাই। তোমরা সবাই এটা মেনে নাও। যদি তোমরা আমার কথা না মানে তবে আমরা ও তোমরা পৃথক। তোমরা আমাদের শত্রু এবং আমরা তোমাদের শত্রু। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে বলে দাও আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে, আমি যে আমল করি তা হতে তোমরা মুক্ত এবং তোমরা যে আমল কর তা হতে আমি মুক্ত।" (১০:৪১) আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যদি কোন কওমের বিশ্বাসঘাতকতা ও চুক্তি ভঙ্গের আশংকা কর তবে তৎক্ষণাৎ তাদেরকে চুক্তি ভঙ্গের খবর দিয়ে দাও।" (৮:৫৮)। অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা এখানেও বলেনঃ যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বলে দাওঃ তোমাদের আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তোমরা নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, তোমাদের সঙ্গে যে ওয়াদা করা হচ্ছে। তা অবশ্য অবশ্যই পূর্ণ হবে, তা এখনই হোক অথবা বিলম্বেই হোক। আল্লাহ তাআলা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত। তোমরা যা কিছু প্রকাশ কর এবং যা কিছু গোপন রাখো আল্লাহ তা সবই জানেন। বান্দাদের সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় সংবাদ তার নিকট প্রকাশমান। ছোট, বড়, প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য সবই তিনি জানতে পারেন। খুব সঙ্ঘ ওয়াদা পূরণে বিলম্ব করার মধ্যেও তোমাদের জন্যে একটা পরীক্ষা রয়েছে এবং কিছু কালের জন্যে তোমরা জীবনোপভোগ করবে।রাসূলদেরকে (আঃ) যে দুআ শিক্ষা দেয়া হয়েছিল তা হলো : হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মধ্যে ও আমাদের কওমের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করুন এবং উত্তম ফায়সালাকারী একমাত্র আপনিই। রাসূলুল্লাহকেও (সঃ) এই প্রকারেরই দুআ'র নির্দেশ দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কোন যুদ্ধে গিয়েই দুআ করতেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আপনি ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করে দিন। আমরা আমাদের দয়াময় আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। হে কাফির ও মুশরিকদের দল! তোমরা যা কিছু মিথ্যা আরোপ করছে সে বিষয়ে আমাদের একমাত্র সহায়স্থল তিনিই। তিনিই আমাদের সাহায্যকারী।

আল-আম্বিয়া 21:112

১০৮-১১২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূলকে (সঃ) নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তুমি মুশরিকদেরকে বলে দাওঃ আমার কাছে এই ওয়াহী করা হচ্ছে যে, সত্য ও প্রকৃত মাবুদ শুধু আল্লাহ তাআলাই। তোমরা সবাই এটা মেনে নাও। যদি তোমরা আমার কথা না মানে তবে আমরা ও তোমরা পৃথক। তোমরা আমাদের শত্রু এবং আমরা তোমাদের শত্রু। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে বলে দাও আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে, আমি যে আমল করি তা হতে তোমরা মুক্ত এবং তোমরা যে আমল কর তা হতে আমি মুক্ত।" (১০:৪১) আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যদি কোন কওমের বিশ্বাসঘাতকতা ও চুক্তি ভঙ্গের আশংকা কর তবে তৎক্ষণাৎ তাদেরকে চুক্তি ভঙ্গের খবর দিয়ে দাও।" (৮:৫৮)। অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা এখানেও বলেনঃ যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বলে দাওঃ তোমাদের আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তোমরা নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, তোমাদের সঙ্গে যে ওয়াদা করা হচ্ছে। তা অবশ্য অবশ্যই পূর্ণ হবে, তা এখনই হোক অথবা বিলম্বেই হোক। আল্লাহ তাআলা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত। তোমরা যা কিছু প্রকাশ কর এবং যা কিছু গোপন রাখো আল্লাহ তা সবই জানেন। বান্দাদের সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় সংবাদ তার নিকট প্রকাশমান। ছোট, বড়, প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য সবই তিনি জানতে পারেন। খুব সঙ্ঘ ওয়াদা পূরণে বিলম্ব করার মধ্যেও তোমাদের জন্যে একটা পরীক্ষা রয়েছে এবং কিছু কালের জন্যে তোমরা জীবনোপভোগ করবে।রাসূলদেরকে (আঃ) যে দুআ শিক্ষা দেয়া হয়েছিল তা হলো : হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মধ্যে ও আমাদের কওমের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করুন এবং উত্তম ফায়সালাকারী একমাত্র আপনিই। রাসূলুল্লাহকেও (সঃ) এই প্রকারেরই দুআ'র নির্দেশ দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কোন যুদ্ধে গিয়েই দুআ করতেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আপনি ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করে দিন। আমরা আমাদের দয়াময় আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। হে কাফির ও মুশরিকদের দল! তোমরা যা কিছু মিথ্যা আরোপ করছে সে বিষয়ে আমাদের একমাত্র সহায়স্থল তিনিই। তিনিই আমাদের সাহায্যকারী।