Tafseer ibn Kathir — আল-হাজ্জ 22:74 – আল-মুমিনুন 23:58
Contents
- আল-হাজ্জ 22:74
- আল-হাজ্জ 22:75
- আল-হাজ্জ 22:76
- আল-হাজ্জ 22:77
- আল-হাজ্জ 22:78
- আল-মুমিনুন 23:1
- আল-মুমিনুন 23:2
- আল-মুমিনুন 23:3
- আল-মুমিনুন 23:4
- আল-মুমিনুন 23:5
- আল-মুমিনুন 23:6
- আল-মুমিনুন 23:7
- আল-মুমিনুন 23:8
- আল-মুমিনুন 23:9
- আল-মুমিনুন 23:10
- আল-মুমিনুন 23:11
- আল-মুমিনুন 23:12
- আল-মুমিনুন 23:13
- আল-মুমিনুন 23:14
- আল-মুমিনুন 23:15
- আল-মুমিনুন 23:16
- আল-মুমিনুন 23:17
- আল-মুমিনুন 23:18
- আল-মুমিনুন 23:19
- আল-মুমিনুন 23:20
- আল-মুমিনুন 23:21
- আল-মুমিনুন 23:22
- আল-মুমিনুন 23:23
- আল-মুমিনুন 23:24
- আল-মুমিনুন 23:25
- আল-মুমিনুন 23:26
- আল-মুমিনুন 23:27
- আল-মুমিনুন 23:28
- আল-মুমিনুন 23:29
- আল-মুমিনুন 23:30
- আল-মুমিনুন 23:31
- আল-মুমিনুন 23:32
- আল-মুমিনুন 23:33
- আল-মুমিনুন 23:34
- আল-মুমিনুন 23:35
- আল-মুমিনুন 23:36
- আল-মুমিনুন 23:37
- আল-মুমিনুন 23:38
- আল-মুমিনুন 23:39
- আল-মুমিনুন 23:40
- আল-মুমিনুন 23:41
- আল-মুমিনুন 23:42
- আল-মুমিনুন 23:43
- আল-মুমিনুন 23:44
- আল-মুমিনুন 23:45
- আল-মুমিনুন 23:46
- আল-মুমিনুন 23:47
- আল-মুমিনুন 23:48
- আল-মুমিনুন 23:49
- আল-মুমিনুন 23:50
- আল-মুমিনুন 23:51
- আল-মুমিনুন 23:52
- আল-মুমিনুন 23:53
- আল-মুমিনুন 23:54
- আল-মুমিনুন 23:55
- আল-মুমিনুন 23:56
- আল-মুমিনুন 23:57
- আল-মুমিনুন 23:58
আল-হাজ্জ 22:74
৭৩-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ এখানে, মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া যে মূর্তি ও দেবতাগুলির পূজ্য উপাসনা করছে ওগুলির দুর্বলতা ও অক্ষমতা এবং ওগুলির পূজারী ঐ মুশরিকদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি মানুষকে সম্বোধন করে বলছেনঃ হে মানব মণ্ডলী! এই অজ্ঞ ও নির্বোধরা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করছে, প্রতিপালকের সাথে এরা যে শিরুক করছে তার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে, তা তোমরা খুব মনোযোগের সাথে শ্রবণ কর। এই উপাস্য দেবতাগুলি সবাই একত্রিত হয়ে যদি একটি ক্ষুদ্র মাছিও সৃষ্টি করার ইচ্ছা করে তবে তারা সম্পূর্ণ রূপে অপারগ হয়ে যাবে। ঐ মাছি সৃষ্টি করার ক্ষমতা তাদের কখনই হবে না। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) মার’রূপে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তার চেয়ে বড় অত্যাচারী আর কে আছে, যে আমার সৃষ্টি করার মত কিছু সৃষ্টি করতে চায়? প্রকৃতই যদি কারো এ ক্ষমতা। থেকে থাকে তবে একটা অনু বা একটা মাছি অথবা একটা দানা সৃষ্টি করুক তো?" (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, যে নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক জালিম আরকে আছে যে, আমার সৃষ্টি করার মত কিছু করতে যায়? তাহলে তারা একটা যব সৃষ্টি করুক তো?" (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ এই বাতিল মা’বৃদগুলির আরো অক্ষমতা দেখে, তারা একটি মাছিরও মুকাবিলা করতে পারে না। তাদেরকে প্রদত্ত কোন জিনিস যদি মাছি ছিনিয়ে নিয়ে যায় তবে তারা এতই শক্তি হীন যে, ঐ মাছির নিকট হতে ঐ জিনিস ফিরিয়ে নিতে পারে না! মাছির ন্যায় তুচ্ছ, নগণ্য এবং অতি দুর্বল সৃষ্ট জীবের নিকট থেকেও যারা নিজেদের হক ফিরিয়ে নিতে পারে না, তাদের চেয়েও বেশী দুর্বল, শক্তিহীন ও অক্ষম আর কেউ হতে পারে কি? হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা মূর্তি এবং (আরবী) দ্বারা মাছিকে বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনু জারীর ও (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। আর বাহ্যিক শব্দ দ্বারাও এটাই প্রকাশমান। দ্বিতীয় ভাবার্থ এট্য বর্ণনা করা হয়েছে যে, দ্বারা (আরবী) উপাসক এবং (আরবী) দ্বারা উপাস্যদেরকে বুঝানো হয়েছে।আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ তারা আল্লাহর যথোচিত মর্যাদা উপলব্ধি করে। তারা এটা উপলব্ধি করলে এতো বড় শক্তিমান আল্লাহর সাথে এই নগণ্য ও তুচ্ছ মাখলুককে তারা শরীক করতো না, যাদের মাছি তাড়াবারও শক্তি নেই, যেমন মুশরিকদের মূর্তিগুলি। মহান আল্লাহ স্বীয় শক্তিতে অতুলনীয়। সমস্ত কিছু তিনি বিনা নমুনায় সৃষ্টি করেছেন। কারো কাছে তিনি সাহায্যও নেন নি। এবং কারো পরামর্শও গ্রহণ করেন নি। অতঃপর সবকিছুকে ধ্বংস করে তিনি এর চেয়েও বেশী সহজে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম। তার পাকড়াও খুব কঠিন। তিনি প্রথমে সৃষ্টিকারী, পরে আবার সৃষ্টিকারী, রিযকদাতা ও অসীম ক্ষমতার অধিকারী। সব কিছুই তার সামনে নত। কেউই তার ইচ্ছা পরিবর্তন করতে পারে না, কেউই তার আদেশ লংঘন করতে পারে না। এমন কেউ নেই যে, তার শ্রেষ্ঠত্ব ও ক্ষমতার মুকাবিলা করে। তিনি একক ও মহাপরাক্রমশালী।
আল-হাজ্জ 22:75
৭৫-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি নিজের নির্ধারিত তকদীর জারি করা এবং নির্ধারিত শরীয়ত স্বীয় রাসূল (সঃ) পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্যে যে ফেরেশতাকে চান নির্দিষ্ট করে নেন। অনুরূপভাবে তিনি লোকদের মধ্য হতে যাকে চান নবুওয়াতের পোষাক পরিয়ে দেন। তিনি বান্দাদের সমস্ত কথা শুনে থাকেন। এক একজন বান্দা তার আমলসহ তার দৃষ্টির মধ্যে রয়েছে। নবুওয়াত প্রাপ্তির যোগ্য পাত্র কে তা তিনি খুব ভালই জানেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “রিসালাত লাভের যোগ্য পাত্র কে তা আল্লাহ খুব ভাল জানেন।” রাসূলদেরসামনেরও পিছনের খবর আল্লাহ রাখেন। তাঁদের কাছে তিনি কি পৌঁছালেন এবং তারা কি পৌছিয়ে দিলেন এ সব কিছু তার কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত।অর্থাৎ তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না, তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত। সেই ক্ষেত্রে আল্লাহ রাসূলের অগ্রে ও পশ্চাতে প্রহরী নিয়েজিত করেন, রাসূলগণ তাদের প্রতিপালকের বাণী পৌছিয়ে দিয়েছেন কি না তা জানবার জন্যে; রাসূলদের নিকট যা আছে তা তার জ্ঞান গোচর এবং তিনি সমস্ত কিছুর বিস্তারিত হিসাব রাখেন।" (৭২:২৬-২৮)।সুতরাং মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূলদের রক্ষক। যা তাদের বলা হয় তার তিনি হিফাজতকারী। তিনি তাদের সাহায্যকারী। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে রাসূল (সঃ) তোমার নিকট তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা কিছু অবতীর্ণ করা হয় তা তুমি (মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দাও, আর তা যদি না কর তবে তুমি তাঁর রিসালাত পৌছিয়ে দিলে না, এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ্ তোমাকে মানুষ (এর অনিষ্ট) হতে রক্ষা করবেন।" (৫:৬৭)
আল-হাজ্জ 22:76
৭৫-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি নিজের নির্ধারিত তকদীর জারি করা এবং নির্ধারিত শরীয়ত স্বীয় রাসূল (সঃ) পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্যে যে ফেরেশতাকে চান নির্দিষ্ট করে নেন। অনুরূপভাবে তিনি লোকদের মধ্য হতে যাকে চান নবুওয়াতের পোষাক পরিয়ে দেন। তিনি বান্দাদের সমস্ত কথা শুনে থাকেন। এক একজন বান্দা তার আমলসহ তার দৃষ্টির মধ্যে রয়েছে। নবুওয়াত প্রাপ্তির যোগ্য পাত্র কে তা তিনি খুব ভালই জানেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “রিসালাত লাভের যোগ্য পাত্র কে তা আল্লাহ খুব ভাল জানেন।” রাসূলদেরসামনেরও পিছনের খবর আল্লাহ রাখেন। তাঁদের কাছে তিনি কি পৌঁছালেন এবং তারা কি পৌছিয়ে দিলেন এ সব কিছু তার কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত।অর্থাৎ তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না, তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত। সেই ক্ষেত্রে আল্লাহ রাসূলের অগ্রে ও পশ্চাতে প্রহরী নিয়েজিত করেন, রাসূলগণ তাদের প্রতিপালকের বাণী পৌছিয়ে দিয়েছেন কি না তা জানবার জন্যে; রাসূলদের নিকট যা আছে তা তার জ্ঞান গোচর এবং তিনি সমস্ত কিছুর বিস্তারিত হিসাব রাখেন।" (৭২:২৬-২৮)।সুতরাং মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূলদের রক্ষক। যা তাদের বলা হয় তার তিনি হিফাজতকারী। তিনি তাদের সাহায্যকারী। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে রাসূল (সঃ) তোমার নিকট তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা কিছু অবতীর্ণ করা হয় তা তুমি (মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দাও, আর তা যদি না কর তবে তুমি তাঁর রিসালাত পৌছিয়ে দিলে না, এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ্ তোমাকে মানুষ (এর অনিষ্ট) হতে রক্ষা করবেন।" (৫:৬৭)
আল-হাজ্জ 22:77
৭৭-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: এই দ্বিতীয় সিজদাটির ব্যাপারে দু’টি উক্তি রয়েছে। প্রথম সিজুদার জায়গায় আমরা ঐ হাদীসটি বর্ণনা করেছি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সূরায়ে ‘হাজ্জ’কে দুটি সিজদার মাধ্যমে ফযীলত দান করা হয়েছে। যারা এ দুটো সিজদা করে না তারা যেন এই আয়াতটি না পড়ে।”আল্লাহ তাআলা রুকু সিজদা, ইবাদত ও সৎকর্মের হুকুম করার পর বলছেনঃ তোমরা তোমাদের জান, মাল ও কথা দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ কর এবং যেভাবে জিহাদ করা উচিত সেভাবেই কর। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিত।” তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। অন্যান্য উম্মত বর্গের উপর তিনি তোমাদেরকে মর্যাদা দান করেছেন। পূর্ণ রাসূল (সঃ) ও পূর্ণ শরীয়ত দানের মাধ্যমে তোমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। তোমাদেরকে তিনি সহজ এবং উত্তম দ্বীন প্রদান করেছেন। এমন আহকাম তোমাদের উপর রাখেন নাই যা পালন করা তোমাদের পক্ষে কঠিন। এমন বোঝা তিনি তোমাদের উপর চাপিয়ে দেন নাই বহন করা তোমাদের সাধ্যাতিত।‘আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল এ দুটি সাক্ষ্য দানের পর ইসলামের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রুকন হচ্ছে নামায। বাড়ীতে অবস্থানকালে চার রাকআত বিশিষ্ট ফরয নামায চার রাকআতই পড়তে হয়। আর সফরে থাকাকালে চার রাকআতের স্থলে দু'রাকআত পড়ার নির্দেশ রয়েছে। ভয়ের নামায তো হাদীস অনুযায়ী মাত্র এক রাকআত পড়ার হুকুম আছে। ওটাও আবার পায়ে হেঁটে বা সওয়ারীর উপর এবং কিবলামুখী হয়ে হোক কিংবা কিবলার দিকে মুখ না হোক। সফরের নফল নামাযেরও অনুরূপ হুকুম আছে যে, সওয়ারীর মুখ যেদিকেই থাক না কেন নামায হয়ে যাবে। রুগ্ন ব্যক্তি বসে নামায পড়তে পারে এবং বসে না পারলে শুয়েও পড়তে পারে। অন্যান্য ফরয ও ওয়াজিব গুলোকেও মহান আল্লাহ সহজ সাধ্য করেছেন। এজন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “আমি একনিষ্ঠ ও খুবই সহজ দ্বীন নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হযরত মুআয (রাঃ) এবং হযরত আবু মূসাকে (রাঃ) ইয়ামানের আমীর নিযুক্ত করে পাঠান তখন তাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেনঃ “তোমরা (জনগণকে) সুসংবাদ দেবে, তাদের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করবে না এবং এমন কাজের হুকুম করবে যা পালন করা তাদের পক্ষে সহজ সাধ্য হয়, কঠিন না হয়। এই বিষয় সম্পৰ্কীয় বহু হাদীস রয়েছে। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতের নিম্নরূপ তাফসীরই করেছেনঃ “তোমাদের দ্বীনে কোন সংকীর্ণতা কঠোরতা নেই।” ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এর (আরবী) উপর (আরবী) বা যবর দেয়া হয়েছে (আরবী) হিসেবে। এটা যেন (আরবী) এইরূপ ছিল। আবার (আরবী) কে উহ্য মেনে নিয়ে (আরবী) কে ওর (আরবী) হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। এই অবস্থায় এটা (আরবী) এই আয়াতের মত হয়ে যাবে।মহান আল্লাহর উক্তিঃ তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম। অর্থাৎ আল্লাহ তাআ'লা হযরত ইবরাহীমেরও (আঃ) পূর্বে মুসলিম নামকরণ করেন। কেননা, তার প্রার্থনা ছিলঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে (দু’জন অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) এবং আমাদের সন্তানদের মধ্য হতে একটি দলকে ‘মুসলিম বানিয়ে দিন। কিন্তু ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন এই উক্তিটি সঠিক বলে বিবেচিত হচ্ছে না। যে, পূর্বে দ্বারা হযরত ইবরাহীমের (আঃ) পূর্বে বুঝানো হয়েছে। কেননা এটা প্রকাশমান যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) এই উম্মতের নাম এই কুরআনে ‘মুসলিম রাখেন নাই। তাহলে পূর্বে দ্বারা অর্থ হবেঃ পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে, যিকরে এবং এই পবিত্র শেষ কিতাবে।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি গুরুজনেরও উক্তি এটাই। আর এটা সঠিকও বটে। কেননা ইতিপূর্বে এই উম্মতের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। এবং তাদের দ্বীন সহজ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অতঃপর এই দ্বীনের প্রতি আরো বেশী অকির্ষণ সৃষ্টি করার জন্যে বলা হচ্ছেঃ এটা হলো ঐ দ্বীন যা হযরত ইবরাহীম (আঃ) আনয়ন করেছিলেন।এরপর এই উম্মতের বুযুর্গীর জন্যে এবং তাদেরকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের বর্ণনা আমার পূর্ববর্তী কিতাব সমূহেও ছিল। যুগ যুগ ধরে নবীদের (আঃ) আসমানী কিতাবসমূহে তোমাদের আলোচনা হতে থেকেছে। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের পাঠকরা তোমাদের সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। সুতরাং এই কুরআনের পূর্বে এবং এই কুরআনেও তোমাদের নাম ‘মুসলিম'। আর এই নামকরণ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ।হযরত হারিস আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অজ্ঞতার দাবী এখনও করে (অর্থাৎ বাপ-দাদার উপর এবং বংশের উপর গর্ব প্রকাশ করে; আর অন্যান্য মুসলমানদেরকে ইতর ও তুচ্ছ জ্ঞান করে) সে জাহান্নামের ইন্ধন।” তখন একটি লোক জিজ্ঞেস করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদিও সে রোযা রাখে ও নামায পড়ে (তবুও কি) ?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “হা ,হাঁ'। যদিও সে রোযাদার হয় এবং নামাযীও হয় (তবুও সে জাহান্নামের ইন্ধন হবে)।” সুতরাং আল্লাহ তাআলা তোমাদের যে নাম রেখেছেন সেই নামেই ডাকো। তা হলো ‘মুসলেমীন', ‘মুমিনীন' এবং ইবাদুল্লাহ'।" (ইমাম নাসাঈ (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে এ হাদীসটি আনয়ন করেছেন) সূরায়ে বাকারার। এই আয়াতের তাফসীরে আমরা এই হাদীসটিকে পূর্ণ রূপে বর্ণনা করেছি। মহান আল্লাহর উক্তিঃ আমি তোমাদেরকে ন্যায়পরায়ণ এবং উত্তম উম্মত এ জন্যেই বানিয়েছি এবং এজন্যেই আমি তোমাদের সুখ্যাতি অন্যান্য সমস্ত উম্মতের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছি যাতে তোমরা কিয়ামতের দিন মানব জাতির জন্যে সাক্ষীস্বরূপ হও। পূর্ববর্তী সমস্ত উম্মত উম্মতে মুহাম্মদীর (সঃ) শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা স্বীকার করবে। এই উম্মত সমস্ত উম্মতের উপর নেতৃত্ব লাভ করেছে। এই জন্যেই এই উম্মতের সাক্ষ্য অন্যান্য উম্মত বর্গের উপর ধর্তব্য হবে। তাদের সাক্ষ্য হবে এটাই যে, পূর্ববর্তী উম্মত বর্গের কাছে তাদের নব্বীরা (আঃ) আল্লাহর পয়গাম পৌছিয়ে দিয়েছিলেন। আর এই উম্মতের উপর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাক্ষ্য প্রদান করবেন যে, তিনি তাদের কাছে আল্লাহর দ্বীন পৌছিয়ে দিয়েছেন এবং রিসালাতের দায়িত্ব তিনি পূর্ণভাবে পালন করেছেন। এই ব্যাপারে যতগুলি হাদীস রয়েছে এবং যত কিছু তাফসীর আছে সবই আমরা সূরায়ে বাকারার সপ্তদশ রুকুর (আরবী) (২:১৪৩) এই আয়াতের তাফসীরে লিখে এসেছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। সেখানে আমরা হযরত নূহ (আঃ) এবং তাঁর উম্মতের ঘটনাও বর্ণনা করেছি।আল্লাহ তাআলার উক্তি সুতরাং তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে অবলম্বন কর। অর্থাৎ এত বড় নিয়ামতের অধিকারী যিনি তোমাদেরকে করেছেন তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা তোমাদের একান্ত কর্তব্য। এর পন্থা এই যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর যা কিছু ফরয করেছেন তা অতি আগ্রহের সাথে খুশী মনে তোমরা পালন কর। বিশেষ করে নামায ও যাকাতের প্রতি পূর্ণ মনোযোগী হবে। আল্লাহ তাআলা যা কিছু ওয়াজিব করেছেন তা আন্তরিক মুহাব্বতের সাথে পালন কর। যা কিছু তিনি হারাম করেছেন তার কাছেও যেয়ো না। সুতরাং নামায, যা নির্ভেজাল আল্লাহরই জন্যে এবং যাকাত, যার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত ছাড়াও তার সৃষ্টজীবের প্রতিও ইহসান করা হয়, ধনী লোকেরা তাদের মালের একটা অংশ সন্তুষ্ট চিত্তে দরিদ্রদেরকে দান করে, এতে তাদের কাজ চলে, মনে তৃপ্তি আসে। এতেও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সহজ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অংশও কম এবং বছরে মাত্র একবার।যাকাতের সমস্ত নিয়ম কানুন সূরায়ে তাওবা’র (আরবী) (৯:৬০) এই আয়াতের তাফসীরে আমরা বর্ণনা করে দিয়েছি। আল্লাহ তাবারাকা ওয়াতাআলা বলেনঃ আল্লাহকে অবলম্বন কর। তাঁর উপর পূর্ণ ভরসা রাখো। তোমাদের সমস্ত কাজে তার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা কর। সব সময় তাঁর উপরই নির্ভর কর। তারই সাহায্য সহায়তা ও পৃষ্ঠ পোষকতার প্রতি দৃষ্টি রাখো।মহামহিমান্বিত আল্লাহর উক্তিঃ তিনিই তোমাদের অভিভাবক। তিনিই তোমাদের রক্ষক। তিনিই তোমাদের সহায়ক। তোমাদেরকে তোমাদের শত্রুদের উপর বিজয় দানকারী তিনিই। তিনিই সর্বোত্তম অভিভাবক। তিনি যার অভিভাবক হন, তার আর কোন অভিভাবকের প্রয়োজন নেই। সর্বোত্তম সাহায্যকারী তিনিই। দুনিয়ার সবাই যদি শত্রু হয়ে যায় তাতেও কোন যায় আসে না। সবারই উপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী।মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে হযরত ওয়াহীব ইবনু অরূদ (রাঃ) হতে। বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে ইবনু আদম! তোমার ক্রোধের সময় তুমি আমাকে স্মরণ করো, তা হলে আমিও আমার ক্রোধের সময় তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। আর যাদের উপর আমার শাস্তি অবতীর্ণ হবে তাদের মধ্য থেকে আমি তোমাকে রক্ষা করবো। ধ্বংস প্রাপ্তদের সাথে আমি তোমাকে ধ্বংস করবো না। হে আদম সন্তান! যখন তোমার উপর যুলুম করা হয় তখন তুমি ধৈর্য ধারণ কর, আমার প্রতি দৃষ্টিপাত কর এবং আমার সাহায্যের উপর ভরসা রাখো ও আমার সাহায্যের উপর সন্তুষ্ট থাকো। জেনে রেখো যে, তুমি তোমার নিজেকে সাহায্য করবে এর চেয়ে আমিই তোমাকে সাহায্য করবে এটাই উত্তম।” এ সব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
আল-হাজ্জ 22:78
৭৭-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: এই দ্বিতীয় সিজদাটির ব্যাপারে দু’টি উক্তি রয়েছে। প্রথম সিজুদার জায়গায় আমরা ঐ হাদীসটি বর্ণনা করেছি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সূরায়ে ‘হাজ্জ’কে দুটি সিজদার মাধ্যমে ফযীলত দান করা হয়েছে। যারা এ দুটো সিজদা করে না তারা যেন এই আয়াতটি না পড়ে।”আল্লাহ তাআলা রুকু সিজদা, ইবাদত ও সৎকর্মের হুকুম করার পর বলছেনঃ তোমরা তোমাদের জান, মাল ও কথা দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ কর এবং যেভাবে জিহাদ করা উচিত সেভাবেই কর। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিত।” তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। অন্যান্য উম্মত বর্গের উপর তিনি তোমাদেরকে মর্যাদা দান করেছেন। পূর্ণ রাসূল (সঃ) ও পূর্ণ শরীয়ত দানের মাধ্যমে তোমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। তোমাদেরকে তিনি সহজ এবং উত্তম দ্বীন প্রদান করেছেন। এমন আহকাম তোমাদের উপর রাখেন নাই যা পালন করা তোমাদের পক্ষে কঠিন। এমন বোঝা তিনি তোমাদের উপর চাপিয়ে দেন নাই বহন করা তোমাদের সাধ্যাতিত।‘আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল এ দুটি সাক্ষ্য দানের পর ইসলামের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রুকন হচ্ছে নামায। বাড়ীতে অবস্থানকালে চার রাকআত বিশিষ্ট ফরয নামায চার রাকআতই পড়তে হয়। আর সফরে থাকাকালে চার রাকআতের স্থলে দু'রাকআত পড়ার নির্দেশ রয়েছে। ভয়ের নামায তো হাদীস অনুযায়ী মাত্র এক রাকআত পড়ার হুকুম আছে। ওটাও আবার পায়ে হেঁটে বা সওয়ারীর উপর এবং কিবলামুখী হয়ে হোক কিংবা কিবলার দিকে মুখ না হোক। সফরের নফল নামাযেরও অনুরূপ হুকুম আছে যে, সওয়ারীর মুখ যেদিকেই থাক না কেন নামায হয়ে যাবে। রুগ্ন ব্যক্তি বসে নামায পড়তে পারে এবং বসে না পারলে শুয়েও পড়তে পারে। অন্যান্য ফরয ও ওয়াজিব গুলোকেও মহান আল্লাহ সহজ সাধ্য করেছেন। এজন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “আমি একনিষ্ঠ ও খুবই সহজ দ্বীন নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হযরত মুআয (রাঃ) এবং হযরত আবু মূসাকে (রাঃ) ইয়ামানের আমীর নিযুক্ত করে পাঠান তখন তাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেনঃ “তোমরা (জনগণকে) সুসংবাদ দেবে, তাদের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করবে না এবং এমন কাজের হুকুম করবে যা পালন করা তাদের পক্ষে সহজ সাধ্য হয়, কঠিন না হয়। এই বিষয় সম্পৰ্কীয় বহু হাদীস রয়েছে। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতের নিম্নরূপ তাফসীরই করেছেনঃ “তোমাদের দ্বীনে কোন সংকীর্ণতা কঠোরতা নেই।” ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এর (আরবী) উপর (আরবী) বা যবর দেয়া হয়েছে (আরবী) হিসেবে। এটা যেন (আরবী) এইরূপ ছিল। আবার (আরবী) কে উহ্য মেনে নিয়ে (আরবী) কে ওর (আরবী) হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। এই অবস্থায় এটা (আরবী) এই আয়াতের মত হয়ে যাবে।মহান আল্লাহর উক্তিঃ তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম। অর্থাৎ আল্লাহ তাআ'লা হযরত ইবরাহীমেরও (আঃ) পূর্বে মুসলিম নামকরণ করেন। কেননা, তার প্রার্থনা ছিলঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে (দু’জন অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) এবং আমাদের সন্তানদের মধ্য হতে একটি দলকে ‘মুসলিম বানিয়ে দিন। কিন্তু ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন এই উক্তিটি সঠিক বলে বিবেচিত হচ্ছে না। যে, পূর্বে দ্বারা হযরত ইবরাহীমের (আঃ) পূর্বে বুঝানো হয়েছে। কেননা এটা প্রকাশমান যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) এই উম্মতের নাম এই কুরআনে ‘মুসলিম রাখেন নাই। তাহলে পূর্বে দ্বারা অর্থ হবেঃ পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে, যিকরে এবং এই পবিত্র শেষ কিতাবে।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি গুরুজনেরও উক্তি এটাই। আর এটা সঠিকও বটে। কেননা ইতিপূর্বে এই উম্মতের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। এবং তাদের দ্বীন সহজ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অতঃপর এই দ্বীনের প্রতি আরো বেশী অকির্ষণ সৃষ্টি করার জন্যে বলা হচ্ছেঃ এটা হলো ঐ দ্বীন যা হযরত ইবরাহীম (আঃ) আনয়ন করেছিলেন।এরপর এই উম্মতের বুযুর্গীর জন্যে এবং তাদেরকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের বর্ণনা আমার পূর্ববর্তী কিতাব সমূহেও ছিল। যুগ যুগ ধরে নবীদের (আঃ) আসমানী কিতাবসমূহে তোমাদের আলোচনা হতে থেকেছে। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের পাঠকরা তোমাদের সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। সুতরাং এই কুরআনের পূর্বে এবং এই কুরআনেও তোমাদের নাম ‘মুসলিম'। আর এই নামকরণ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ।হযরত হারিস আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি অজ্ঞতার দাবী এখনও করে (অর্থাৎ বাপ-দাদার উপর এবং বংশের উপর গর্ব প্রকাশ করে; আর অন্যান্য মুসলমানদেরকে ইতর ও তুচ্ছ জ্ঞান করে) সে জাহান্নামের ইন্ধন।” তখন একটি লোক জিজ্ঞেস করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদিও সে রোযা রাখে ও নামায পড়ে (তবুও কি) ?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “হা ,হাঁ'। যদিও সে রোযাদার হয় এবং নামাযীও হয় (তবুও সে জাহান্নামের ইন্ধন হবে)।” সুতরাং আল্লাহ তাআলা তোমাদের যে নাম রেখেছেন সেই নামেই ডাকো। তা হলো ‘মুসলেমীন', ‘মুমিনীন' এবং ইবাদুল্লাহ'।" (ইমাম নাসাঈ (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে এ হাদীসটি আনয়ন করেছেন) সূরায়ে বাকারার। এই আয়াতের তাফসীরে আমরা এই হাদীসটিকে পূর্ণ রূপে বর্ণনা করেছি। মহান আল্লাহর উক্তিঃ আমি তোমাদেরকে ন্যায়পরায়ণ এবং উত্তম উম্মত এ জন্যেই বানিয়েছি এবং এজন্যেই আমি তোমাদের সুখ্যাতি অন্যান্য সমস্ত উম্মতের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছি যাতে তোমরা কিয়ামতের দিন মানব জাতির জন্যে সাক্ষীস্বরূপ হও। পূর্ববর্তী সমস্ত উম্মত উম্মতে মুহাম্মদীর (সঃ) শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা স্বীকার করবে। এই উম্মত সমস্ত উম্মতের উপর নেতৃত্ব লাভ করেছে। এই জন্যেই এই উম্মতের সাক্ষ্য অন্যান্য উম্মত বর্গের উপর ধর্তব্য হবে। তাদের সাক্ষ্য হবে এটাই যে, পূর্ববর্তী উম্মত বর্গের কাছে তাদের নব্বীরা (আঃ) আল্লাহর পয়গাম পৌছিয়ে দিয়েছিলেন। আর এই উম্মতের উপর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাক্ষ্য প্রদান করবেন যে, তিনি তাদের কাছে আল্লাহর দ্বীন পৌছিয়ে দিয়েছেন এবং রিসালাতের দায়িত্ব তিনি পূর্ণভাবে পালন করেছেন। এই ব্যাপারে যতগুলি হাদীস রয়েছে এবং যত কিছু তাফসীর আছে সবই আমরা সূরায়ে বাকারার সপ্তদশ রুকুর (আরবী) (২:১৪৩) এই আয়াতের তাফসীরে লিখে এসেছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। সেখানে আমরা হযরত নূহ (আঃ) এবং তাঁর উম্মতের ঘটনাও বর্ণনা করেছি।আল্লাহ তাআলার উক্তি সুতরাং তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে অবলম্বন কর। অর্থাৎ এত বড় নিয়ামতের অধিকারী যিনি তোমাদেরকে করেছেন তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা তোমাদের একান্ত কর্তব্য। এর পন্থা এই যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর যা কিছু ফরয করেছেন তা অতি আগ্রহের সাথে খুশী মনে তোমরা পালন কর। বিশেষ করে নামায ও যাকাতের প্রতি পূর্ণ মনোযোগী হবে। আল্লাহ তাআলা যা কিছু ওয়াজিব করেছেন তা আন্তরিক মুহাব্বতের সাথে পালন কর। যা কিছু তিনি হারাম করেছেন তার কাছেও যেয়ো না। সুতরাং নামায, যা নির্ভেজাল আল্লাহরই জন্যে এবং যাকাত, যার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত ছাড়াও তার সৃষ্টজীবের প্রতিও ইহসান করা হয়, ধনী লোকেরা তাদের মালের একটা অংশ সন্তুষ্ট চিত্তে দরিদ্রদেরকে দান করে, এতে তাদের কাজ চলে, মনে তৃপ্তি আসে। এতেও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সহজ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অংশও কম এবং বছরে মাত্র একবার।যাকাতের সমস্ত নিয়ম কানুন সূরায়ে তাওবা’র (আরবী) (৯:৬০) এই আয়াতের তাফসীরে আমরা বর্ণনা করে দিয়েছি। আল্লাহ তাবারাকা ওয়াতাআলা বলেনঃ আল্লাহকে অবলম্বন কর। তাঁর উপর পূর্ণ ভরসা রাখো। তোমাদের সমস্ত কাজে তার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা কর। সব সময় তাঁর উপরই নির্ভর কর। তারই সাহায্য সহায়তা ও পৃষ্ঠ পোষকতার প্রতি দৃষ্টি রাখো।মহামহিমান্বিত আল্লাহর উক্তিঃ তিনিই তোমাদের অভিভাবক। তিনিই তোমাদের রক্ষক। তিনিই তোমাদের সহায়ক। তোমাদেরকে তোমাদের শত্রুদের উপর বিজয় দানকারী তিনিই। তিনিই সর্বোত্তম অভিভাবক। তিনি যার অভিভাবক হন, তার আর কোন অভিভাবকের প্রয়োজন নেই। সর্বোত্তম সাহায্যকারী তিনিই। দুনিয়ার সবাই যদি শত্রু হয়ে যায় তাতেও কোন যায় আসে না। সবারই উপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী।মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে হযরত ওয়াহীব ইবনু অরূদ (রাঃ) হতে। বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে ইবনু আদম! তোমার ক্রোধের সময় তুমি আমাকে স্মরণ করো, তা হলে আমিও আমার ক্রোধের সময় তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। আর যাদের উপর আমার শাস্তি অবতীর্ণ হবে তাদের মধ্য থেকে আমি তোমাকে রক্ষা করবো। ধ্বংস প্রাপ্তদের সাথে আমি তোমাকে ধ্বংস করবো না। হে আদম সন্তান! যখন তোমার উপর যুলুম করা হয় তখন তুমি ধৈর্য ধারণ কর, আমার প্রতি দৃষ্টিপাত কর এবং আমার সাহায্যের উপর ভরসা রাখো ও আমার সাহায্যের উপর সন্তুষ্ট থাকো। জেনে রেখো যে, তুমি তোমার নিজেকে সাহায্য করবে এর চেয়ে আমিই তোমাকে সাহায্য করবে এটাই উত্তম।” এ সব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
আল-মুমিনুন 23:1
১-১১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তাঁর মুখের কাছে মৌমাছির গুন্গুন্ শব্দের মত শব্দ শোনা যেতো। একদা তার উপর এ অবস্থাই ঘটে। অল্পক্ষণ পরে যখন অহী অবতীর্ণ হওয়ার কাজ শেষ হয় তখন তিনি কিবলামুখী হয়ে স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করতঃ নিম্নের দু'আটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে বেশী করে দিন, কম করবেন না। আমাদেরকে সম্মানিত করুন, লাঞ্ছিত করবেন না। আমাদেরকে প্রদান করুন, বঞ্চিত করবেন না। অন্যদের উপর আমাদেরকে পছন্দ করে নিন, আমাদের উপর অন্যদেরকে পছন্দ করবেন না। আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। তারপর তিনি (আরবী) হতে দশটি আয়াত পর্যন্ত পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে মুনকার বলেছেন। কেননা এর বর্ণনাকারী শুধু ইউনুস ইবনে সুলায়েম রয়েছেন, যিনি মুহাদ্দিসদের নিকট পরিচিত নন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে বাবনুস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেনঃ “কুরআনই ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র এরূপই ছিল।” (এটা নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কা'ব আল আহবার (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন এবং ওর মধ্যে (গাছপালা ইত্যাদি) স্বহস্তে রোপণ করেন তখন ওগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে ওকে বলেনঃ “কিছু কথা বলো”। ঐ জান্নাতে আদন তখন (আরবী)-এই আয়াতগুলো পাঠ করে। যেগুলো আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে অবতীর্ণ করেন।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করেন যার এক ইট সোনার ও এক ইট রূপার তৈরী। তাতে তিনি গাছ রোপণ করেন। অতঃপর তিনি জান্নাতকে বলেনঃ “কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তাতে ফেরেশতারা প্রবেশ করে বলেনঃ “বাঃ! বাঃ! এটা তো বাদশাহদের জায়গা।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওর গারা ছিল মৃগনাভির। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাতে এমন এমন জিনিস রয়েছে যা কোন চক্ষু দেখেনি এবং কোন অন্তর কল্পনা করেনি।আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, জান্নাত যখন এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ কখনো প্রবেশ করতে পারে না।” (এ হাদীসটি তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন যার একটি ইট সাদা মুক্তার, একটি ইট লাল পদ্মরাগের এবং একটি ইট সবুজ পান্নার। আর ওর গারা (গাঁথুনির চুন-সুরকি) মৃগনাভির এবং ওর ঘাস হলো যাফরান। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “তুমি কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তখন আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ প্রবেশ করতে পারবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতাংশটুকু পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত তারাই সফলকাম।” (৫৯:৯) (এ হাদীসটি আবূ বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) (অবশ্যই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে), অর্থাৎ তারা ভাগ্যবান হয়েছে এবং পরিত্রাণ পেয়ে গেছে। এই মুমিনদের বিশেষণ এই যে, তারা নামাযের অবস্থায় অত্যন্ত বিনয়ী হয়। মন তাদের আল্লাহর দিকেই থাকে। তাদের দৃষ্টি থাকে নীচের দিকে এবং বাহুদ্বয় থাকে ঝুঁকানো অবস্থায়। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও সাহাবীগণ (রাঃ) তাদের দৃষ্টিগুলো নামাযের অবস্থায় আকাশের দিকে উঠিয়ে রাখতেন। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁদের দৃষ্টি নীচের দিকে হয়ে যায়। সিজদার স্থান হতে তারা নিজেদের দৃষ্টি সরাতেন। যদি কারো অভ্যাস এর বিপরীত হয়ে গিয়ে থাকে তবে তার উচিত তার দৃষ্টি নীচের দিকে করে নেয়া। একটি হাদীসে রয়েছে যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহও (সঃ) এরূপ করতেন। (এ হাদীসটি মুরসাল)সুতরাং এই বিনয় ও নম্রতা ঐ ব্যক্তিই লাভ করতে পারে যার অন্তঃকরণ খাঁটি ও বিশুদ্ধ হয়, নামাযে পুরোপুরিভাবে মনোযোগ থাকে এবং সমস্ত কাজ অপেক্ষা নামাযে বেশী মন বসে। যেমন হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমার কাছে সুগন্ধি ও স্ত্রীলোক খুবই পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু ঠাণ্ডাকারী হলো নামায।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে বেলাল (রাঃ)! নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দান কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী (রাঃ) নামাযের সময় স্বীয় দাসীকে বলেনঃ “অযুর পানি নিয়ে এসো, যাতে আমি নামায পড়ে শান্তি লাভ করতে পারি।” তিনি দেখলেন যে, উপস্থিত জনগণ তাঁর একথা অপছন্দ করেছে, তাই তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “হে বেলাল (রাঃ)! ওঠো, নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দাও।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। অর্থাৎ মুমিনরা বাতিল, শিরক, পাপ এবং বাজে ও নিরর্থক কথা হতে দূরে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যখন তারা অসার ক্রিয়া-কলাপের সম্মুখীন হয় তখন স্বীয় মর্যাদার সাথে তা পরিহার করে চলে।” (২৫:৭২) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যারা যাকাত দানে সক্রিয়। অর্থাৎ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ এই যে, তারা তাদের মালের যাকাত আদায় করে থাকে। অধিকাংশ তাফসীরকার এটাই অর্থ করেছেন। কিন্তু এতে একটি প্রশ্ন ওঠে যে, এটা তো মক্কী আয়াত, অথচ যাকাত তো ফরয হয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। সুতরাং মক্কী আয়াতে যাকাতের বর্ণনা কেমন? এর উত্তর এই যে, যাকাত মক্কাতেই ফরয হয়েছিল, তবে ওর নিসাবের পরিমাণ কত ইত্যাদি সমস্ত হুকুম মদীনায় নির্ধারিত হয়েছিল। যেমন দেখা যায় যে, সূরায়ে আনআমও তো মক্কী সূরা, অথচ ওর মধ্যেও যাকাতের এই হুকুমই বিদ্যমান রয়েছে। ঘোষিত হয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিনই ওর যাকাত আদায় কর।” (৬:১৪১) আবার অর্থ এও হতে পারেঃ নফসকে তারা শিরক এবং কুফরীর ময়লা আবর্জনা থেকে পবিত্র করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।” (৯১: ৯-১০) নিম্নের আয়াতেও একটি উক্তি এই রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্যে যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে না।” (৪১: ৬-৭) আবার এও হতে পারে যে, নফসেরও যাকাত, মালেরও যাকাত। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। অতঃপর মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। অর্থাৎ যারা ব্যভিচার, লাওয়াতাত ইত্যাদি দুষ্কর্ম হতে বেঁচে থাকে। তবে যে স্ত্রীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে বৈধ করেছেন এবং জিহাদে যেসব দাসী লাভ করা হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তাদের জন্যে হালাল করেছেন, তাদের সাথে মিলনে কোন দোষ নেই।এরপর ঘোষণা করা হচ্ছেঃ যারা এদেরকে ছাড়া অন্যদেরকে কামনা করে তারা হবে সীমালংঘনকারী।হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন স্ত্রীলোক তার গোলামকে গ্রহণ করে (অর্থাৎ গোলামের সাথে সহবাস করে) এবং দলীল হিসেবে এই পেশ করে। হযরত উমার (রাঃ) এটা জানতে পেরে সাহাবীদের (রাঃ) সামনে এটা পেশ করেন। সাহাবীগণ বলেনঃ “সে এ আয়াতের অর্থ ভুল বুঝেছে।” তখন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) গোলামটিকে প্রহার করেন এবং তার মাথা মুণ্ডন করেন। আর ঐ স্ত্রীলোকটিকে তিনি বলেনঃ “এরপরে তুমি প্রত্যেক মুসলমানের উপর হারাম।” (‘আসার’টি মুনাকাতা’ এবং গারীব বা দুর্বলও বটে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা সূরায়ে মায়েদার তাফসীরের শুরুতে আনয়ন করেছেন। কিন্তু এখানে আনয়ন করাই উচিত ছিল। ঐ স্ত্রীলোকটিকে সাধারণ মুসলমানদের উপর হারাম করার কারণ হলো তার ইচ্ছার বিপরীত তার সাথে মুআমালা করা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এবং তাঁর অনুসরণকারীরা এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, স্বীয় হস্ত দ্বারা স্বীয় বিশেষ পানি (শুক্র বা বীর্য বের করা হারাম। কেননা, এটাও উক্ত দু’টি হালাল পন্থার বাইরের ব্যবস্থা। সুতরাং হস্তমৈথুনকারী ব্যক্তি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।ইমাম হাসান ইবনে আরাফা (রঃ) তাঁর বিখ্যাত জুযএ একটি হাদীস আনয়ন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাত প্রকারের লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাদেরকে (পাপ হতে)। পবিত্র করবেন না, আমলকারীদের সাথে তাদেরকে একত্রিত করবেন না এবং সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তাদের জাহান্নামে প্রবিষ্ট করবেন, তবে যদি তারা তাওবা করে তবে সেটা অন্য কথা।তারা হলো স্বীয় হস্তের মাধ্যমে বিবাহকারী অর্থাৎ হস্তমৈথুনকারী, সমমৈথুনকারী, সমমৈথুনকৃত, মদ্যপানকারী, পিতামাতাকে প্রহারকারী, যার ফলে পিতামাতা চীৎকার শুরু করে দেয়, প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা, যার ফলে সে তার উপর লা'নত করে এবং প্রতিবেশিনীর সাথে ব্যভিচারকারী।” (এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুমিনদের আরো গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। তারা আমানতে খিয়ানত করে না; বরং আমানত আদায়ের ব্যাপারে তারা অগ্রগামী হয়। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এর বিপরীত স্বভাব হলো মুনাফিকের। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।মহান আল্লাহ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করছেন যে, তারা তাদের নামাযে যত্নবান থাকে। অর্থাৎ তারা নামাযের সময়ের হিফাযত করে।হ্যরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট কোন আমল সর্বাপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “নামাযকে সময়মত আদায় করা।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোন আমল? তিনি জবাব দিলেনঃ “পিতা-মাতার খিদমত করা।” আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, তারপর কোনটি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সময় দ্বারা রুকু, সিজদা ইত্যাদির হিফাযত উদ্দেশ্য। দেখা যায় যে, প্রথমে একবার নামাযের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং শেষেও আবার বর্ণিত হলো। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত সবচেয়ে বেশী। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“তোমরা সোজা সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আর তোমরা কখনো (আল্লাহর নিয়ামতরাশি) গণনা করে শেষ করতে পারবে না এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হলো নামায। আর অযুর হিফাযত শুধু মুমিনই করতে পারে।”মুমিনদের এই প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই হবে অধিকারী, অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করলে ফিরদাউসের জন্যে প্রার্থনা করো। ওটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ও মধ্যস্থলে অবস্থিত জান্নাত। সেখান হতেই জান্নাতের সমস্ত নহর প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং ওরই উপর রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেরই দু’টি মনযিল রয়েছে। একটি মনযিল জান্নাতে এবং একটি মনযিল জাহান্নামে। যদি কেউ মারা যায় ও জাহান্নামে প্রবেশ করে তবে তার (জান্নাতের) মনযিলের উত্তরাধিকারী হয় আহলে জান্নাত। তারাই হবে উত্তরাধিকারী’ আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি দ্বারা তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দারই দু’টি বাসস্থান রয়েছে, একটি জান্নাতে ও একটি জাহান্নামে। মুমিন তার জান্নাতের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জাহান্নামের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। পক্ষান্তরে কাফিররা জাহান্নামের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জান্নাতের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।মমিনদেরকে কাফিরদের মনযিলগুলোর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। কেননা, ঐ কাফিরদেরকে এক ও শরীকবিহীন আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তারা তাঁর ইবাদত পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং তাদের জন্যে যেসব পুরস্কার ছিল সেগুলো তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর ইবাদতকারী মুমিনদেরকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এজন্যেই তাদেরকে ওয়ারিস বলা হয়েছে। হযরত আবূ মূসা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক পাহাড় পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আসবে। তখন তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদের গুনাহগুলো ইয়াহুদী ও নাসারার উপর চাপিয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুসলমানের নিকট একজন ইয়াহুদী ও একজন খৃষ্টানকে হাযির করবেন। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “এরা হলো তোমার জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পাওয়ার মুক্তিপণ ।” এ হাদীসটি শ্রবণ করার পর (হাদীসটির বর্ণনাকারী) আবূ বুরদাহ (রাঃ)-কে আল্লাহর নামে শপথ করতে বলেন। তখন আবু বুরদাহ (রাঃ) তিনবার শপথ করে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করেন। এই ধরনের আয়াত আরো রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী আমি আমার এমন বান্দাদেরকে করে থাকি, যারা আমাকে ভয় করে।” (১৯:৬৩) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী তোমাদেরকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময় হিসেবে।” (৪৩:৭২) হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, রোমকদের ভাষায় বাগানকে ফিরদাউস বলা হয়। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেন যে, ফিরদাউস ঐ বাগানকে বলা হয় যাতে আঙ্গুর (এর গাছ) থাকে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
আল-মুমিনুন 23:2
১-১১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তাঁর মুখের কাছে মৌমাছির গুন্গুন্ শব্দের মত শব্দ শোনা যেতো। একদা তার উপর এ অবস্থাই ঘটে। অল্পক্ষণ পরে যখন অহী অবতীর্ণ হওয়ার কাজ শেষ হয় তখন তিনি কিবলামুখী হয়ে স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করতঃ নিম্নের দু'আটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে বেশী করে দিন, কম করবেন না। আমাদেরকে সম্মানিত করুন, লাঞ্ছিত করবেন না। আমাদেরকে প্রদান করুন, বঞ্চিত করবেন না। অন্যদের উপর আমাদেরকে পছন্দ করে নিন, আমাদের উপর অন্যদেরকে পছন্দ করবেন না। আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। তারপর তিনি (আরবী) হতে দশটি আয়াত পর্যন্ত পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে মুনকার বলেছেন। কেননা এর বর্ণনাকারী শুধু ইউনুস ইবনে সুলায়েম রয়েছেন, যিনি মুহাদ্দিসদের নিকট পরিচিত নন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে বাবনুস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেনঃ “কুরআনই ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র এরূপই ছিল।” (এটা নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কা'ব আল আহবার (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন এবং ওর মধ্যে (গাছপালা ইত্যাদি) স্বহস্তে রোপণ করেন তখন ওগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে ওকে বলেনঃ “কিছু কথা বলো”। ঐ জান্নাতে আদন তখন (আরবী)-এই আয়াতগুলো পাঠ করে। যেগুলো আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে অবতীর্ণ করেন।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করেন যার এক ইট সোনার ও এক ইট রূপার তৈরী। তাতে তিনি গাছ রোপণ করেন। অতঃপর তিনি জান্নাতকে বলেনঃ “কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তাতে ফেরেশতারা প্রবেশ করে বলেনঃ “বাঃ! বাঃ! এটা তো বাদশাহদের জায়গা।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওর গারা ছিল মৃগনাভির। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাতে এমন এমন জিনিস রয়েছে যা কোন চক্ষু দেখেনি এবং কোন অন্তর কল্পনা করেনি।আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, জান্নাত যখন এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ কখনো প্রবেশ করতে পারে না।” (এ হাদীসটি তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন যার একটি ইট সাদা মুক্তার, একটি ইট লাল পদ্মরাগের এবং একটি ইট সবুজ পান্নার। আর ওর গারা (গাঁথুনির চুন-সুরকি) মৃগনাভির এবং ওর ঘাস হলো যাফরান। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “তুমি কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তখন আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ প্রবেশ করতে পারবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতাংশটুকু পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত তারাই সফলকাম।” (৫৯:৯) (এ হাদীসটি আবূ বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) (অবশ্যই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে), অর্থাৎ তারা ভাগ্যবান হয়েছে এবং পরিত্রাণ পেয়ে গেছে। এই মুমিনদের বিশেষণ এই যে, তারা নামাযের অবস্থায় অত্যন্ত বিনয়ী হয়। মন তাদের আল্লাহর দিকেই থাকে। তাদের দৃষ্টি থাকে নীচের দিকে এবং বাহুদ্বয় থাকে ঝুঁকানো অবস্থায়। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও সাহাবীগণ (রাঃ) তাদের দৃষ্টিগুলো নামাযের অবস্থায় আকাশের দিকে উঠিয়ে রাখতেন। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁদের দৃষ্টি নীচের দিকে হয়ে যায়। সিজদার স্থান হতে তারা নিজেদের দৃষ্টি সরাতেন। যদি কারো অভ্যাস এর বিপরীত হয়ে গিয়ে থাকে তবে তার উচিত তার দৃষ্টি নীচের দিকে করে নেয়া। একটি হাদীসে রয়েছে যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহও (সঃ) এরূপ করতেন। (এ হাদীসটি মুরসাল)সুতরাং এই বিনয় ও নম্রতা ঐ ব্যক্তিই লাভ করতে পারে যার অন্তঃকরণ খাঁটি ও বিশুদ্ধ হয়, নামাযে পুরোপুরিভাবে মনোযোগ থাকে এবং সমস্ত কাজ অপেক্ষা নামাযে বেশী মন বসে। যেমন হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমার কাছে সুগন্ধি ও স্ত্রীলোক খুবই পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু ঠাণ্ডাকারী হলো নামায।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে বেলাল (রাঃ)! নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দান কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী (রাঃ) নামাযের সময় স্বীয় দাসীকে বলেনঃ “অযুর পানি নিয়ে এসো, যাতে আমি নামায পড়ে শান্তি লাভ করতে পারি।” তিনি দেখলেন যে, উপস্থিত জনগণ তাঁর একথা অপছন্দ করেছে, তাই তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “হে বেলাল (রাঃ)! ওঠো, নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দাও।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। অর্থাৎ মুমিনরা বাতিল, শিরক, পাপ এবং বাজে ও নিরর্থক কথা হতে দূরে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যখন তারা অসার ক্রিয়া-কলাপের সম্মুখীন হয় তখন স্বীয় মর্যাদার সাথে তা পরিহার করে চলে।” (২৫:৭২) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যারা যাকাত দানে সক্রিয়। অর্থাৎ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ এই যে, তারা তাদের মালের যাকাত আদায় করে থাকে। অধিকাংশ তাফসীরকার এটাই অর্থ করেছেন। কিন্তু এতে একটি প্রশ্ন ওঠে যে, এটা তো মক্কী আয়াত, অথচ যাকাত তো ফরয হয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। সুতরাং মক্কী আয়াতে যাকাতের বর্ণনা কেমন? এর উত্তর এই যে, যাকাত মক্কাতেই ফরয হয়েছিল, তবে ওর নিসাবের পরিমাণ কত ইত্যাদি সমস্ত হুকুম মদীনায় নির্ধারিত হয়েছিল। যেমন দেখা যায় যে, সূরায়ে আনআমও তো মক্কী সূরা, অথচ ওর মধ্যেও যাকাতের এই হুকুমই বিদ্যমান রয়েছে। ঘোষিত হয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিনই ওর যাকাত আদায় কর।” (৬:১৪১) আবার অর্থ এও হতে পারেঃ নফসকে তারা শিরক এবং কুফরীর ময়লা আবর্জনা থেকে পবিত্র করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।” (৯১: ৯-১০) নিম্নের আয়াতেও একটি উক্তি এই রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্যে যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে না।” (৪১: ৬-৭) আবার এও হতে পারে যে, নফসেরও যাকাত, মালেরও যাকাত। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। অতঃপর মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। অর্থাৎ যারা ব্যভিচার, লাওয়াতাত ইত্যাদি দুষ্কর্ম হতে বেঁচে থাকে। তবে যে স্ত্রীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে বৈধ করেছেন এবং জিহাদে যেসব দাসী লাভ করা হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তাদের জন্যে হালাল করেছেন, তাদের সাথে মিলনে কোন দোষ নেই।এরপর ঘোষণা করা হচ্ছেঃ যারা এদেরকে ছাড়া অন্যদেরকে কামনা করে তারা হবে সীমালংঘনকারী।হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন স্ত্রীলোক তার গোলামকে গ্রহণ করে (অর্থাৎ গোলামের সাথে সহবাস করে) এবং দলীল হিসেবে এই পেশ করে। হযরত উমার (রাঃ) এটা জানতে পেরে সাহাবীদের (রাঃ) সামনে এটা পেশ করেন। সাহাবীগণ বলেনঃ “সে এ আয়াতের অর্থ ভুল বুঝেছে।” তখন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) গোলামটিকে প্রহার করেন এবং তার মাথা মুণ্ডন করেন। আর ঐ স্ত্রীলোকটিকে তিনি বলেনঃ “এরপরে তুমি প্রত্যেক মুসলমানের উপর হারাম।” (‘আসার’টি মুনাকাতা’ এবং গারীব বা দুর্বলও বটে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা সূরায়ে মায়েদার তাফসীরের শুরুতে আনয়ন করেছেন। কিন্তু এখানে আনয়ন করাই উচিত ছিল। ঐ স্ত্রীলোকটিকে সাধারণ মুসলমানদের উপর হারাম করার কারণ হলো তার ইচ্ছার বিপরীত তার সাথে মুআমালা করা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এবং তাঁর অনুসরণকারীরা এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, স্বীয় হস্ত দ্বারা স্বীয় বিশেষ পানি (শুক্র বা বীর্য বের করা হারাম। কেননা, এটাও উক্ত দু’টি হালাল পন্থার বাইরের ব্যবস্থা। সুতরাং হস্তমৈথুনকারী ব্যক্তি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।ইমাম হাসান ইবনে আরাফা (রঃ) তাঁর বিখ্যাত জুযএ একটি হাদীস আনয়ন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাত প্রকারের লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাদেরকে (পাপ হতে)। পবিত্র করবেন না, আমলকারীদের সাথে তাদেরকে একত্রিত করবেন না এবং সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তাদের জাহান্নামে প্রবিষ্ট করবেন, তবে যদি তারা তাওবা করে তবে সেটা অন্য কথা।তারা হলো স্বীয় হস্তের মাধ্যমে বিবাহকারী অর্থাৎ হস্তমৈথুনকারী, সমমৈথুনকারী, সমমৈথুনকৃত, মদ্যপানকারী, পিতামাতাকে প্রহারকারী, যার ফলে পিতামাতা চীৎকার শুরু করে দেয়, প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা, যার ফলে সে তার উপর লা'নত করে এবং প্রতিবেশিনীর সাথে ব্যভিচারকারী।” (এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুমিনদের আরো গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। তারা আমানতে খিয়ানত করে না; বরং আমানত আদায়ের ব্যাপারে তারা অগ্রগামী হয়। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এর বিপরীত স্বভাব হলো মুনাফিকের। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।মহান আল্লাহ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করছেন যে, তারা তাদের নামাযে যত্নবান থাকে। অর্থাৎ তারা নামাযের সময়ের হিফাযত করে।হ্যরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট কোন আমল সর্বাপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “নামাযকে সময়মত আদায় করা।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোন আমল? তিনি জবাব দিলেনঃ “পিতা-মাতার খিদমত করা।” আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, তারপর কোনটি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সময় দ্বারা রুকু, সিজদা ইত্যাদির হিফাযত উদ্দেশ্য। দেখা যায় যে, প্রথমে একবার নামাযের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং শেষেও আবার বর্ণিত হলো। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত সবচেয়ে বেশী। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“তোমরা সোজা সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আর তোমরা কখনো (আল্লাহর নিয়ামতরাশি) গণনা করে শেষ করতে পারবে না এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হলো নামায। আর অযুর হিফাযত শুধু মুমিনই করতে পারে।”মুমিনদের এই প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই হবে অধিকারী, অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করলে ফিরদাউসের জন্যে প্রার্থনা করো। ওটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ও মধ্যস্থলে অবস্থিত জান্নাত। সেখান হতেই জান্নাতের সমস্ত নহর প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং ওরই উপর রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেরই দু’টি মনযিল রয়েছে। একটি মনযিল জান্নাতে এবং একটি মনযিল জাহান্নামে। যদি কেউ মারা যায় ও জাহান্নামে প্রবেশ করে তবে তার (জান্নাতের) মনযিলের উত্তরাধিকারী হয় আহলে জান্নাত। তারাই হবে উত্তরাধিকারী’ আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি দ্বারা তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দারই দু’টি বাসস্থান রয়েছে, একটি জান্নাতে ও একটি জাহান্নামে। মুমিন তার জান্নাতের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জাহান্নামের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। পক্ষান্তরে কাফিররা জাহান্নামের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জান্নাতের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।মমিনদেরকে কাফিরদের মনযিলগুলোর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। কেননা, ঐ কাফিরদেরকে এক ও শরীকবিহীন আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তারা তাঁর ইবাদত পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং তাদের জন্যে যেসব পুরস্কার ছিল সেগুলো তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর ইবাদতকারী মুমিনদেরকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এজন্যেই তাদেরকে ওয়ারিস বলা হয়েছে। হযরত আবূ মূসা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক পাহাড় পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আসবে। তখন তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদের গুনাহগুলো ইয়াহুদী ও নাসারার উপর চাপিয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুসলমানের নিকট একজন ইয়াহুদী ও একজন খৃষ্টানকে হাযির করবেন। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “এরা হলো তোমার জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পাওয়ার মুক্তিপণ ।” এ হাদীসটি শ্রবণ করার পর (হাদীসটির বর্ণনাকারী) আবূ বুরদাহ (রাঃ)-কে আল্লাহর নামে শপথ করতে বলেন। তখন আবু বুরদাহ (রাঃ) তিনবার শপথ করে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করেন। এই ধরনের আয়াত আরো রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী আমি আমার এমন বান্দাদেরকে করে থাকি, যারা আমাকে ভয় করে।” (১৯:৬৩) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী তোমাদেরকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময় হিসেবে।” (৪৩:৭২) হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, রোমকদের ভাষায় বাগানকে ফিরদাউস বলা হয়। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেন যে, ফিরদাউস ঐ বাগানকে বলা হয় যাতে আঙ্গুর (এর গাছ) থাকে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
আল-মুমিনুন 23:3
১-১১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তাঁর মুখের কাছে মৌমাছির গুন্গুন্ শব্দের মত শব্দ শোনা যেতো। একদা তার উপর এ অবস্থাই ঘটে। অল্পক্ষণ পরে যখন অহী অবতীর্ণ হওয়ার কাজ শেষ হয় তখন তিনি কিবলামুখী হয়ে স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করতঃ নিম্নের দু'আটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে বেশী করে দিন, কম করবেন না। আমাদেরকে সম্মানিত করুন, লাঞ্ছিত করবেন না। আমাদেরকে প্রদান করুন, বঞ্চিত করবেন না। অন্যদের উপর আমাদেরকে পছন্দ করে নিন, আমাদের উপর অন্যদেরকে পছন্দ করবেন না। আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। তারপর তিনি (আরবী) হতে দশটি আয়াত পর্যন্ত পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে মুনকার বলেছেন। কেননা এর বর্ণনাকারী শুধু ইউনুস ইবনে সুলায়েম রয়েছেন, যিনি মুহাদ্দিসদের নিকট পরিচিত নন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে বাবনুস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেনঃ “কুরআনই ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র এরূপই ছিল।” (এটা নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কা'ব আল আহবার (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন এবং ওর মধ্যে (গাছপালা ইত্যাদি) স্বহস্তে রোপণ করেন তখন ওগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে ওকে বলেনঃ “কিছু কথা বলো”। ঐ জান্নাতে আদন তখন (আরবী)-এই আয়াতগুলো পাঠ করে। যেগুলো আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে অবতীর্ণ করেন।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করেন যার এক ইট সোনার ও এক ইট রূপার তৈরী। তাতে তিনি গাছ রোপণ করেন। অতঃপর তিনি জান্নাতকে বলেনঃ “কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তাতে ফেরেশতারা প্রবেশ করে বলেনঃ “বাঃ! বাঃ! এটা তো বাদশাহদের জায়গা।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওর গারা ছিল মৃগনাভির। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাতে এমন এমন জিনিস রয়েছে যা কোন চক্ষু দেখেনি এবং কোন অন্তর কল্পনা করেনি।আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, জান্নাত যখন এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ কখনো প্রবেশ করতে পারে না।” (এ হাদীসটি তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন যার একটি ইট সাদা মুক্তার, একটি ইট লাল পদ্মরাগের এবং একটি ইট সবুজ পান্নার। আর ওর গারা (গাঁথুনির চুন-সুরকি) মৃগনাভির এবং ওর ঘাস হলো যাফরান। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “তুমি কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তখন আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ প্রবেশ করতে পারবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতাংশটুকু পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত তারাই সফলকাম।” (৫৯:৯) (এ হাদীসটি আবূ বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) (অবশ্যই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে), অর্থাৎ তারা ভাগ্যবান হয়েছে এবং পরিত্রাণ পেয়ে গেছে। এই মুমিনদের বিশেষণ এই যে, তারা নামাযের অবস্থায় অত্যন্ত বিনয়ী হয়। মন তাদের আল্লাহর দিকেই থাকে। তাদের দৃষ্টি থাকে নীচের দিকে এবং বাহুদ্বয় থাকে ঝুঁকানো অবস্থায়। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও সাহাবীগণ (রাঃ) তাদের দৃষ্টিগুলো নামাযের অবস্থায় আকাশের দিকে উঠিয়ে রাখতেন। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁদের দৃষ্টি নীচের দিকে হয়ে যায়। সিজদার স্থান হতে তারা নিজেদের দৃষ্টি সরাতেন। যদি কারো অভ্যাস এর বিপরীত হয়ে গিয়ে থাকে তবে তার উচিত তার দৃষ্টি নীচের দিকে করে নেয়া। একটি হাদীসে রয়েছে যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহও (সঃ) এরূপ করতেন। (এ হাদীসটি মুরসাল)সুতরাং এই বিনয় ও নম্রতা ঐ ব্যক্তিই লাভ করতে পারে যার অন্তঃকরণ খাঁটি ও বিশুদ্ধ হয়, নামাযে পুরোপুরিভাবে মনোযোগ থাকে এবং সমস্ত কাজ অপেক্ষা নামাযে বেশী মন বসে। যেমন হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমার কাছে সুগন্ধি ও স্ত্রীলোক খুবই পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু ঠাণ্ডাকারী হলো নামায।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে বেলাল (রাঃ)! নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দান কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী (রাঃ) নামাযের সময় স্বীয় দাসীকে বলেনঃ “অযুর পানি নিয়ে এসো, যাতে আমি নামায পড়ে শান্তি লাভ করতে পারি।” তিনি দেখলেন যে, উপস্থিত জনগণ তাঁর একথা অপছন্দ করেছে, তাই তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “হে বেলাল (রাঃ)! ওঠো, নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দাও।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। অর্থাৎ মুমিনরা বাতিল, শিরক, পাপ এবং বাজে ও নিরর্থক কথা হতে দূরে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যখন তারা অসার ক্রিয়া-কলাপের সম্মুখীন হয় তখন স্বীয় মর্যাদার সাথে তা পরিহার করে চলে।” (২৫:৭২) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যারা যাকাত দানে সক্রিয়। অর্থাৎ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ এই যে, তারা তাদের মালের যাকাত আদায় করে থাকে। অধিকাংশ তাফসীরকার এটাই অর্থ করেছেন। কিন্তু এতে একটি প্রশ্ন ওঠে যে, এটা তো মক্কী আয়াত, অথচ যাকাত তো ফরয হয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। সুতরাং মক্কী আয়াতে যাকাতের বর্ণনা কেমন? এর উত্তর এই যে, যাকাত মক্কাতেই ফরয হয়েছিল, তবে ওর নিসাবের পরিমাণ কত ইত্যাদি সমস্ত হুকুম মদীনায় নির্ধারিত হয়েছিল। যেমন দেখা যায় যে, সূরায়ে আনআমও তো মক্কী সূরা, অথচ ওর মধ্যেও যাকাতের এই হুকুমই বিদ্যমান রয়েছে। ঘোষিত হয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিনই ওর যাকাত আদায় কর।” (৬:১৪১) আবার অর্থ এও হতে পারেঃ নফসকে তারা শিরক এবং কুফরীর ময়লা আবর্জনা থেকে পবিত্র করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।” (৯১: ৯-১০) নিম্নের আয়াতেও একটি উক্তি এই রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্যে যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে না।” (৪১: ৬-৭) আবার এও হতে পারে যে, নফসেরও যাকাত, মালেরও যাকাত। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। অতঃপর মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। অর্থাৎ যারা ব্যভিচার, লাওয়াতাত ইত্যাদি দুষ্কর্ম হতে বেঁচে থাকে। তবে যে স্ত্রীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে বৈধ করেছেন এবং জিহাদে যেসব দাসী লাভ করা হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তাদের জন্যে হালাল করেছেন, তাদের সাথে মিলনে কোন দোষ নেই।এরপর ঘোষণা করা হচ্ছেঃ যারা এদেরকে ছাড়া অন্যদেরকে কামনা করে তারা হবে সীমালংঘনকারী।হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন স্ত্রীলোক তার গোলামকে গ্রহণ করে (অর্থাৎ গোলামের সাথে সহবাস করে) এবং দলীল হিসেবে এই পেশ করে। হযরত উমার (রাঃ) এটা জানতে পেরে সাহাবীদের (রাঃ) সামনে এটা পেশ করেন। সাহাবীগণ বলেনঃ “সে এ আয়াতের অর্থ ভুল বুঝেছে।” তখন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) গোলামটিকে প্রহার করেন এবং তার মাথা মুণ্ডন করেন। আর ঐ স্ত্রীলোকটিকে তিনি বলেনঃ “এরপরে তুমি প্রত্যেক মুসলমানের উপর হারাম।” (‘আসার’টি মুনাকাতা’ এবং গারীব বা দুর্বলও বটে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা সূরায়ে মায়েদার তাফসীরের শুরুতে আনয়ন করেছেন। কিন্তু এখানে আনয়ন করাই উচিত ছিল। ঐ স্ত্রীলোকটিকে সাধারণ মুসলমানদের উপর হারাম করার কারণ হলো তার ইচ্ছার বিপরীত তার সাথে মুআমালা করা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এবং তাঁর অনুসরণকারীরা এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, স্বীয় হস্ত দ্বারা স্বীয় বিশেষ পানি (শুক্র বা বীর্য বের করা হারাম। কেননা, এটাও উক্ত দু’টি হালাল পন্থার বাইরের ব্যবস্থা। সুতরাং হস্তমৈথুনকারী ব্যক্তি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।ইমাম হাসান ইবনে আরাফা (রঃ) তাঁর বিখ্যাত জুযএ একটি হাদীস আনয়ন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাত প্রকারের লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাদেরকে (পাপ হতে)। পবিত্র করবেন না, আমলকারীদের সাথে তাদেরকে একত্রিত করবেন না এবং সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তাদের জাহান্নামে প্রবিষ্ট করবেন, তবে যদি তারা তাওবা করে তবে সেটা অন্য কথা।তারা হলো স্বীয় হস্তের মাধ্যমে বিবাহকারী অর্থাৎ হস্তমৈথুনকারী, সমমৈথুনকারী, সমমৈথুনকৃত, মদ্যপানকারী, পিতামাতাকে প্রহারকারী, যার ফলে পিতামাতা চীৎকার শুরু করে দেয়, প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা, যার ফলে সে তার উপর লা'নত করে এবং প্রতিবেশিনীর সাথে ব্যভিচারকারী।” (এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুমিনদের আরো গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। তারা আমানতে খিয়ানত করে না; বরং আমানত আদায়ের ব্যাপারে তারা অগ্রগামী হয়। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এর বিপরীত স্বভাব হলো মুনাফিকের। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।মহান আল্লাহ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করছেন যে, তারা তাদের নামাযে যত্নবান থাকে। অর্থাৎ তারা নামাযের সময়ের হিফাযত করে।হ্যরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট কোন আমল সর্বাপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “নামাযকে সময়মত আদায় করা।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোন আমল? তিনি জবাব দিলেনঃ “পিতা-মাতার খিদমত করা।” আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, তারপর কোনটি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সময় দ্বারা রুকু, সিজদা ইত্যাদির হিফাযত উদ্দেশ্য। দেখা যায় যে, প্রথমে একবার নামাযের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং শেষেও আবার বর্ণিত হলো। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত সবচেয়ে বেশী। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“তোমরা সোজা সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আর তোমরা কখনো (আল্লাহর নিয়ামতরাশি) গণনা করে শেষ করতে পারবে না এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হলো নামায। আর অযুর হিফাযত শুধু মুমিনই করতে পারে।”মুমিনদের এই প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই হবে অধিকারী, অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করলে ফিরদাউসের জন্যে প্রার্থনা করো। ওটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ও মধ্যস্থলে অবস্থিত জান্নাত। সেখান হতেই জান্নাতের সমস্ত নহর প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং ওরই উপর রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেরই দু’টি মনযিল রয়েছে। একটি মনযিল জান্নাতে এবং একটি মনযিল জাহান্নামে। যদি কেউ মারা যায় ও জাহান্নামে প্রবেশ করে তবে তার (জান্নাতের) মনযিলের উত্তরাধিকারী হয় আহলে জান্নাত। তারাই হবে উত্তরাধিকারী’ আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি দ্বারা তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দারই দু’টি বাসস্থান রয়েছে, একটি জান্নাতে ও একটি জাহান্নামে। মুমিন তার জান্নাতের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জাহান্নামের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। পক্ষান্তরে কাফিররা জাহান্নামের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জান্নাতের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।মমিনদেরকে কাফিরদের মনযিলগুলোর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। কেননা, ঐ কাফিরদেরকে এক ও শরীকবিহীন আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তারা তাঁর ইবাদত পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং তাদের জন্যে যেসব পুরস্কার ছিল সেগুলো তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর ইবাদতকারী মুমিনদেরকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এজন্যেই তাদেরকে ওয়ারিস বলা হয়েছে। হযরত আবূ মূসা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক পাহাড় পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আসবে। তখন তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদের গুনাহগুলো ইয়াহুদী ও নাসারার উপর চাপিয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুসলমানের নিকট একজন ইয়াহুদী ও একজন খৃষ্টানকে হাযির করবেন। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “এরা হলো তোমার জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পাওয়ার মুক্তিপণ ।” এ হাদীসটি শ্রবণ করার পর (হাদীসটির বর্ণনাকারী) আবূ বুরদাহ (রাঃ)-কে আল্লাহর নামে শপথ করতে বলেন। তখন আবু বুরদাহ (রাঃ) তিনবার শপথ করে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করেন। এই ধরনের আয়াত আরো রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী আমি আমার এমন বান্দাদেরকে করে থাকি, যারা আমাকে ভয় করে।” (১৯:৬৩) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী তোমাদেরকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময় হিসেবে।” (৪৩:৭২) হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, রোমকদের ভাষায় বাগানকে ফিরদাউস বলা হয়। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেন যে, ফিরদাউস ঐ বাগানকে বলা হয় যাতে আঙ্গুর (এর গাছ) থাকে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
আল-মুমিনুন 23:4
১-১১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তাঁর মুখের কাছে মৌমাছির গুন্গুন্ শব্দের মত শব্দ শোনা যেতো। একদা তার উপর এ অবস্থাই ঘটে। অল্পক্ষণ পরে যখন অহী অবতীর্ণ হওয়ার কাজ শেষ হয় তখন তিনি কিবলামুখী হয়ে স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করতঃ নিম্নের দু'আটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে বেশী করে দিন, কম করবেন না। আমাদেরকে সম্মানিত করুন, লাঞ্ছিত করবেন না। আমাদেরকে প্রদান করুন, বঞ্চিত করবেন না। অন্যদের উপর আমাদেরকে পছন্দ করে নিন, আমাদের উপর অন্যদেরকে পছন্দ করবেন না। আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। তারপর তিনি (আরবী) হতে দশটি আয়াত পর্যন্ত পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে মুনকার বলেছেন। কেননা এর বর্ণনাকারী শুধু ইউনুস ইবনে সুলায়েম রয়েছেন, যিনি মুহাদ্দিসদের নিকট পরিচিত নন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে বাবনুস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেনঃ “কুরআনই ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র এরূপই ছিল।” (এটা নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কা'ব আল আহবার (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন এবং ওর মধ্যে (গাছপালা ইত্যাদি) স্বহস্তে রোপণ করেন তখন ওগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে ওকে বলেনঃ “কিছু কথা বলো”। ঐ জান্নাতে আদন তখন (আরবী)-এই আয়াতগুলো পাঠ করে। যেগুলো আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে অবতীর্ণ করেন।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করেন যার এক ইট সোনার ও এক ইট রূপার তৈরী। তাতে তিনি গাছ রোপণ করেন। অতঃপর তিনি জান্নাতকে বলেনঃ “কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তাতে ফেরেশতারা প্রবেশ করে বলেনঃ “বাঃ! বাঃ! এটা তো বাদশাহদের জায়গা।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওর গারা ছিল মৃগনাভির। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাতে এমন এমন জিনিস রয়েছে যা কোন চক্ষু দেখেনি এবং কোন অন্তর কল্পনা করেনি।আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, জান্নাত যখন এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ কখনো প্রবেশ করতে পারে না।” (এ হাদীসটি তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন যার একটি ইট সাদা মুক্তার, একটি ইট লাল পদ্মরাগের এবং একটি ইট সবুজ পান্নার। আর ওর গারা (গাঁথুনির চুন-সুরকি) মৃগনাভির এবং ওর ঘাস হলো যাফরান। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “তুমি কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তখন আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ প্রবেশ করতে পারবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতাংশটুকু পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত তারাই সফলকাম।” (৫৯:৯) (এ হাদীসটি আবূ বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) (অবশ্যই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে), অর্থাৎ তারা ভাগ্যবান হয়েছে এবং পরিত্রাণ পেয়ে গেছে। এই মুমিনদের বিশেষণ এই যে, তারা নামাযের অবস্থায় অত্যন্ত বিনয়ী হয়। মন তাদের আল্লাহর দিকেই থাকে। তাদের দৃষ্টি থাকে নীচের দিকে এবং বাহুদ্বয় থাকে ঝুঁকানো অবস্থায়। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও সাহাবীগণ (রাঃ) তাদের দৃষ্টিগুলো নামাযের অবস্থায় আকাশের দিকে উঠিয়ে রাখতেন। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁদের দৃষ্টি নীচের দিকে হয়ে যায়। সিজদার স্থান হতে তারা নিজেদের দৃষ্টি সরাতেন। যদি কারো অভ্যাস এর বিপরীত হয়ে গিয়ে থাকে তবে তার উচিত তার দৃষ্টি নীচের দিকে করে নেয়া। একটি হাদীসে রয়েছে যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহও (সঃ) এরূপ করতেন। (এ হাদীসটি মুরসাল)সুতরাং এই বিনয় ও নম্রতা ঐ ব্যক্তিই লাভ করতে পারে যার অন্তঃকরণ খাঁটি ও বিশুদ্ধ হয়, নামাযে পুরোপুরিভাবে মনোযোগ থাকে এবং সমস্ত কাজ অপেক্ষা নামাযে বেশী মন বসে। যেমন হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমার কাছে সুগন্ধি ও স্ত্রীলোক খুবই পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু ঠাণ্ডাকারী হলো নামায।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে বেলাল (রাঃ)! নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দান কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী (রাঃ) নামাযের সময় স্বীয় দাসীকে বলেনঃ “অযুর পানি নিয়ে এসো, যাতে আমি নামায পড়ে শান্তি লাভ করতে পারি।” তিনি দেখলেন যে, উপস্থিত জনগণ তাঁর একথা অপছন্দ করেছে, তাই তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “হে বেলাল (রাঃ)! ওঠো, নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দাও।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। অর্থাৎ মুমিনরা বাতিল, শিরক, পাপ এবং বাজে ও নিরর্থক কথা হতে দূরে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যখন তারা অসার ক্রিয়া-কলাপের সম্মুখীন হয় তখন স্বীয় মর্যাদার সাথে তা পরিহার করে চলে।” (২৫:৭২) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যারা যাকাত দানে সক্রিয়। অর্থাৎ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ এই যে, তারা তাদের মালের যাকাত আদায় করে থাকে। অধিকাংশ তাফসীরকার এটাই অর্থ করেছেন। কিন্তু এতে একটি প্রশ্ন ওঠে যে, এটা তো মক্কী আয়াত, অথচ যাকাত তো ফরয হয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। সুতরাং মক্কী আয়াতে যাকাতের বর্ণনা কেমন? এর উত্তর এই যে, যাকাত মক্কাতেই ফরয হয়েছিল, তবে ওর নিসাবের পরিমাণ কত ইত্যাদি সমস্ত হুকুম মদীনায় নির্ধারিত হয়েছিল। যেমন দেখা যায় যে, সূরায়ে আনআমও তো মক্কী সূরা, অথচ ওর মধ্যেও যাকাতের এই হুকুমই বিদ্যমান রয়েছে। ঘোষিত হয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিনই ওর যাকাত আদায় কর।” (৬:১৪১) আবার অর্থ এও হতে পারেঃ নফসকে তারা শিরক এবং কুফরীর ময়লা আবর্জনা থেকে পবিত্র করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।” (৯১: ৯-১০) নিম্নের আয়াতেও একটি উক্তি এই রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্যে যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে না।” (৪১: ৬-৭) আবার এও হতে পারে যে, নফসেরও যাকাত, মালেরও যাকাত। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। অতঃপর মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। অর্থাৎ যারা ব্যভিচার, লাওয়াতাত ইত্যাদি দুষ্কর্ম হতে বেঁচে থাকে। তবে যে স্ত্রীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে বৈধ করেছেন এবং জিহাদে যেসব দাসী লাভ করা হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তাদের জন্যে হালাল করেছেন, তাদের সাথে মিলনে কোন দোষ নেই।এরপর ঘোষণা করা হচ্ছেঃ যারা এদেরকে ছাড়া অন্যদেরকে কামনা করে তারা হবে সীমালংঘনকারী।হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন স্ত্রীলোক তার গোলামকে গ্রহণ করে (অর্থাৎ গোলামের সাথে সহবাস করে) এবং দলীল হিসেবে এই পেশ করে। হযরত উমার (রাঃ) এটা জানতে পেরে সাহাবীদের (রাঃ) সামনে এটা পেশ করেন। সাহাবীগণ বলেনঃ “সে এ আয়াতের অর্থ ভুল বুঝেছে।” তখন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) গোলামটিকে প্রহার করেন এবং তার মাথা মুণ্ডন করেন। আর ঐ স্ত্রীলোকটিকে তিনি বলেনঃ “এরপরে তুমি প্রত্যেক মুসলমানের উপর হারাম।” (‘আসার’টি মুনাকাতা’ এবং গারীব বা দুর্বলও বটে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা সূরায়ে মায়েদার তাফসীরের শুরুতে আনয়ন করেছেন। কিন্তু এখানে আনয়ন করাই উচিত ছিল। ঐ স্ত্রীলোকটিকে সাধারণ মুসলমানদের উপর হারাম করার কারণ হলো তার ইচ্ছার বিপরীত তার সাথে মুআমালা করা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এবং তাঁর অনুসরণকারীরা এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, স্বীয় হস্ত দ্বারা স্বীয় বিশেষ পানি (শুক্র বা বীর্য বের করা হারাম। কেননা, এটাও উক্ত দু’টি হালাল পন্থার বাইরের ব্যবস্থা। সুতরাং হস্তমৈথুনকারী ব্যক্তি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।ইমাম হাসান ইবনে আরাফা (রঃ) তাঁর বিখ্যাত জুযএ একটি হাদীস আনয়ন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাত প্রকারের লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাদেরকে (পাপ হতে)। পবিত্র করবেন না, আমলকারীদের সাথে তাদেরকে একত্রিত করবেন না এবং সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তাদের জাহান্নামে প্রবিষ্ট করবেন, তবে যদি তারা তাওবা করে তবে সেটা অন্য কথা।তারা হলো স্বীয় হস্তের মাধ্যমে বিবাহকারী অর্থাৎ হস্তমৈথুনকারী, সমমৈথুনকারী, সমমৈথুনকৃত, মদ্যপানকারী, পিতামাতাকে প্রহারকারী, যার ফলে পিতামাতা চীৎকার শুরু করে দেয়, প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা, যার ফলে সে তার উপর লা'নত করে এবং প্রতিবেশিনীর সাথে ব্যভিচারকারী।” (এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুমিনদের আরো গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। তারা আমানতে খিয়ানত করে না; বরং আমানত আদায়ের ব্যাপারে তারা অগ্রগামী হয়। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এর বিপরীত স্বভাব হলো মুনাফিকের। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।মহান আল্লাহ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করছেন যে, তারা তাদের নামাযে যত্নবান থাকে। অর্থাৎ তারা নামাযের সময়ের হিফাযত করে।হ্যরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট কোন আমল সর্বাপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “নামাযকে সময়মত আদায় করা।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোন আমল? তিনি জবাব দিলেনঃ “পিতা-মাতার খিদমত করা।” আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, তারপর কোনটি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সময় দ্বারা রুকু, সিজদা ইত্যাদির হিফাযত উদ্দেশ্য। দেখা যায় যে, প্রথমে একবার নামাযের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং শেষেও আবার বর্ণিত হলো। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত সবচেয়ে বেশী। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“তোমরা সোজা সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আর তোমরা কখনো (আল্লাহর নিয়ামতরাশি) গণনা করে শেষ করতে পারবে না এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হলো নামায। আর অযুর হিফাযত শুধু মুমিনই করতে পারে।”মুমিনদের এই প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই হবে অধিকারী, অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করলে ফিরদাউসের জন্যে প্রার্থনা করো। ওটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ও মধ্যস্থলে অবস্থিত জান্নাত। সেখান হতেই জান্নাতের সমস্ত নহর প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং ওরই উপর রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেরই দু’টি মনযিল রয়েছে। একটি মনযিল জান্নাতে এবং একটি মনযিল জাহান্নামে। যদি কেউ মারা যায় ও জাহান্নামে প্রবেশ করে তবে তার (জান্নাতের) মনযিলের উত্তরাধিকারী হয় আহলে জান্নাত। তারাই হবে উত্তরাধিকারী’ আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি দ্বারা তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দারই দু’টি বাসস্থান রয়েছে, একটি জান্নাতে ও একটি জাহান্নামে। মুমিন তার জান্নাতের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জাহান্নামের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। পক্ষান্তরে কাফিররা জাহান্নামের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জান্নাতের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।মমিনদেরকে কাফিরদের মনযিলগুলোর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। কেননা, ঐ কাফিরদেরকে এক ও শরীকবিহীন আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তারা তাঁর ইবাদত পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং তাদের জন্যে যেসব পুরস্কার ছিল সেগুলো তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর ইবাদতকারী মুমিনদেরকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এজন্যেই তাদেরকে ওয়ারিস বলা হয়েছে। হযরত আবূ মূসা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক পাহাড় পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আসবে। তখন তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদের গুনাহগুলো ইয়াহুদী ও নাসারার উপর চাপিয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুসলমানের নিকট একজন ইয়াহুদী ও একজন খৃষ্টানকে হাযির করবেন। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “এরা হলো তোমার জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পাওয়ার মুক্তিপণ ।” এ হাদীসটি শ্রবণ করার পর (হাদীসটির বর্ণনাকারী) আবূ বুরদাহ (রাঃ)-কে আল্লাহর নামে শপথ করতে বলেন। তখন আবু বুরদাহ (রাঃ) তিনবার শপথ করে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করেন। এই ধরনের আয়াত আরো রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী আমি আমার এমন বান্দাদেরকে করে থাকি, যারা আমাকে ভয় করে।” (১৯:৬৩) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী তোমাদেরকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময় হিসেবে।” (৪৩:৭২) হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, রোমকদের ভাষায় বাগানকে ফিরদাউস বলা হয়। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেন যে, ফিরদাউস ঐ বাগানকে বলা হয় যাতে আঙ্গুর (এর গাছ) থাকে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
আল-মুমিনুন 23:5
১-১১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তাঁর মুখের কাছে মৌমাছির গুন্গুন্ শব্দের মত শব্দ শোনা যেতো। একদা তার উপর এ অবস্থাই ঘটে। অল্পক্ষণ পরে যখন অহী অবতীর্ণ হওয়ার কাজ শেষ হয় তখন তিনি কিবলামুখী হয়ে স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করতঃ নিম্নের দু'আটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে বেশী করে দিন, কম করবেন না। আমাদেরকে সম্মানিত করুন, লাঞ্ছিত করবেন না। আমাদেরকে প্রদান করুন, বঞ্চিত করবেন না। অন্যদের উপর আমাদেরকে পছন্দ করে নিন, আমাদের উপর অন্যদেরকে পছন্দ করবেন না। আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। তারপর তিনি (আরবী) হতে দশটি আয়াত পর্যন্ত পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে মুনকার বলেছেন। কেননা এর বর্ণনাকারী শুধু ইউনুস ইবনে সুলায়েম রয়েছেন, যিনি মুহাদ্দিসদের নিকট পরিচিত নন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে বাবনুস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেনঃ “কুরআনই ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র এরূপই ছিল।” (এটা নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কা'ব আল আহবার (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন এবং ওর মধ্যে (গাছপালা ইত্যাদি) স্বহস্তে রোপণ করেন তখন ওগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে ওকে বলেনঃ “কিছু কথা বলো”। ঐ জান্নাতে আদন তখন (আরবী)-এই আয়াতগুলো পাঠ করে। যেগুলো আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে অবতীর্ণ করেন।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করেন যার এক ইট সোনার ও এক ইট রূপার তৈরী। তাতে তিনি গাছ রোপণ করেন। অতঃপর তিনি জান্নাতকে বলেনঃ “কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তাতে ফেরেশতারা প্রবেশ করে বলেনঃ “বাঃ! বাঃ! এটা তো বাদশাহদের জায়গা।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওর গারা ছিল মৃগনাভির। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাতে এমন এমন জিনিস রয়েছে যা কোন চক্ষু দেখেনি এবং কোন অন্তর কল্পনা করেনি।আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, জান্নাত যখন এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ কখনো প্রবেশ করতে পারে না।” (এ হাদীসটি তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন যার একটি ইট সাদা মুক্তার, একটি ইট লাল পদ্মরাগের এবং একটি ইট সবুজ পান্নার। আর ওর গারা (গাঁথুনির চুন-সুরকি) মৃগনাভির এবং ওর ঘাস হলো যাফরান। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “তুমি কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তখন আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ প্রবেশ করতে পারবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতাংশটুকু পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত তারাই সফলকাম।” (৫৯:৯) (এ হাদীসটি আবূ বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) (অবশ্যই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে), অর্থাৎ তারা ভাগ্যবান হয়েছে এবং পরিত্রাণ পেয়ে গেছে। এই মুমিনদের বিশেষণ এই যে, তারা নামাযের অবস্থায় অত্যন্ত বিনয়ী হয়। মন তাদের আল্লাহর দিকেই থাকে। তাদের দৃষ্টি থাকে নীচের দিকে এবং বাহুদ্বয় থাকে ঝুঁকানো অবস্থায়। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও সাহাবীগণ (রাঃ) তাদের দৃষ্টিগুলো নামাযের অবস্থায় আকাশের দিকে উঠিয়ে রাখতেন। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁদের দৃষ্টি নীচের দিকে হয়ে যায়। সিজদার স্থান হতে তারা নিজেদের দৃষ্টি সরাতেন। যদি কারো অভ্যাস এর বিপরীত হয়ে গিয়ে থাকে তবে তার উচিত তার দৃষ্টি নীচের দিকে করে নেয়া। একটি হাদীসে রয়েছে যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহও (সঃ) এরূপ করতেন। (এ হাদীসটি মুরসাল)সুতরাং এই বিনয় ও নম্রতা ঐ ব্যক্তিই লাভ করতে পারে যার অন্তঃকরণ খাঁটি ও বিশুদ্ধ হয়, নামাযে পুরোপুরিভাবে মনোযোগ থাকে এবং সমস্ত কাজ অপেক্ষা নামাযে বেশী মন বসে। যেমন হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমার কাছে সুগন্ধি ও স্ত্রীলোক খুবই পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু ঠাণ্ডাকারী হলো নামায।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে বেলাল (রাঃ)! নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দান কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী (রাঃ) নামাযের সময় স্বীয় দাসীকে বলেনঃ “অযুর পানি নিয়ে এসো, যাতে আমি নামায পড়ে শান্তি লাভ করতে পারি।” তিনি দেখলেন যে, উপস্থিত জনগণ তাঁর একথা অপছন্দ করেছে, তাই তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “হে বেলাল (রাঃ)! ওঠো, নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দাও।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। অর্থাৎ মুমিনরা বাতিল, শিরক, পাপ এবং বাজে ও নিরর্থক কথা হতে দূরে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যখন তারা অসার ক্রিয়া-কলাপের সম্মুখীন হয় তখন স্বীয় মর্যাদার সাথে তা পরিহার করে চলে।” (২৫:৭২) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যারা যাকাত দানে সক্রিয়। অর্থাৎ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ এই যে, তারা তাদের মালের যাকাত আদায় করে থাকে। অধিকাংশ তাফসীরকার এটাই অর্থ করেছেন। কিন্তু এতে একটি প্রশ্ন ওঠে যে, এটা তো মক্কী আয়াত, অথচ যাকাত তো ফরয হয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। সুতরাং মক্কী আয়াতে যাকাতের বর্ণনা কেমন? এর উত্তর এই যে, যাকাত মক্কাতেই ফরয হয়েছিল, তবে ওর নিসাবের পরিমাণ কত ইত্যাদি সমস্ত হুকুম মদীনায় নির্ধারিত হয়েছিল। যেমন দেখা যায় যে, সূরায়ে আনআমও তো মক্কী সূরা, অথচ ওর মধ্যেও যাকাতের এই হুকুমই বিদ্যমান রয়েছে। ঘোষিত হয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিনই ওর যাকাত আদায় কর।” (৬:১৪১) আবার অর্থ এও হতে পারেঃ নফসকে তারা শিরক এবং কুফরীর ময়লা আবর্জনা থেকে পবিত্র করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।” (৯১: ৯-১০) নিম্নের আয়াতেও একটি উক্তি এই রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্যে যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে না।” (৪১: ৬-৭) আবার এও হতে পারে যে, নফসেরও যাকাত, মালেরও যাকাত। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। অতঃপর মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। অর্থাৎ যারা ব্যভিচার, লাওয়াতাত ইত্যাদি দুষ্কর্ম হতে বেঁচে থাকে। তবে যে স্ত্রীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে বৈধ করেছেন এবং জিহাদে যেসব দাসী লাভ করা হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তাদের জন্যে হালাল করেছেন, তাদের সাথে মিলনে কোন দোষ নেই।এরপর ঘোষণা করা হচ্ছেঃ যারা এদেরকে ছাড়া অন্যদেরকে কামনা করে তারা হবে সীমালংঘনকারী।হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন স্ত্রীলোক তার গোলামকে গ্রহণ করে (অর্থাৎ গোলামের সাথে সহবাস করে) এবং দলীল হিসেবে এই পেশ করে। হযরত উমার (রাঃ) এটা জানতে পেরে সাহাবীদের (রাঃ) সামনে এটা পেশ করেন। সাহাবীগণ বলেনঃ “সে এ আয়াতের অর্থ ভুল বুঝেছে।” তখন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) গোলামটিকে প্রহার করেন এবং তার মাথা মুণ্ডন করেন। আর ঐ স্ত্রীলোকটিকে তিনি বলেনঃ “এরপরে তুমি প্রত্যেক মুসলমানের উপর হারাম।” (‘আসার’টি মুনাকাতা’ এবং গারীব বা দুর্বলও বটে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা সূরায়ে মায়েদার তাফসীরের শুরুতে আনয়ন করেছেন। কিন্তু এখানে আনয়ন করাই উচিত ছিল। ঐ স্ত্রীলোকটিকে সাধারণ মুসলমানদের উপর হারাম করার কারণ হলো তার ইচ্ছার বিপরীত তার সাথে মুআমালা করা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এবং তাঁর অনুসরণকারীরা এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, স্বীয় হস্ত দ্বারা স্বীয় বিশেষ পানি (শুক্র বা বীর্য বের করা হারাম। কেননা, এটাও উক্ত দু’টি হালাল পন্থার বাইরের ব্যবস্থা। সুতরাং হস্তমৈথুনকারী ব্যক্তি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।ইমাম হাসান ইবনে আরাফা (রঃ) তাঁর বিখ্যাত জুযএ একটি হাদীস আনয়ন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাত প্রকারের লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাদেরকে (পাপ হতে)। পবিত্র করবেন না, আমলকারীদের সাথে তাদেরকে একত্রিত করবেন না এবং সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তাদের জাহান্নামে প্রবিষ্ট করবেন, তবে যদি তারা তাওবা করে তবে সেটা অন্য কথা।তারা হলো স্বীয় হস্তের মাধ্যমে বিবাহকারী অর্থাৎ হস্তমৈথুনকারী, সমমৈথুনকারী, সমমৈথুনকৃত, মদ্যপানকারী, পিতামাতাকে প্রহারকারী, যার ফলে পিতামাতা চীৎকার শুরু করে দেয়, প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা, যার ফলে সে তার উপর লা'নত করে এবং প্রতিবেশিনীর সাথে ব্যভিচারকারী।” (এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুমিনদের আরো গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। তারা আমানতে খিয়ানত করে না; বরং আমানত আদায়ের ব্যাপারে তারা অগ্রগামী হয়। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এর বিপরীত স্বভাব হলো মুনাফিকের। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।মহান আল্লাহ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করছেন যে, তারা তাদের নামাযে যত্নবান থাকে। অর্থাৎ তারা নামাযের সময়ের হিফাযত করে।হ্যরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট কোন আমল সর্বাপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “নামাযকে সময়মত আদায় করা।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোন আমল? তিনি জবাব দিলেনঃ “পিতা-মাতার খিদমত করা।” আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, তারপর কোনটি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সময় দ্বারা রুকু, সিজদা ইত্যাদির হিফাযত উদ্দেশ্য। দেখা যায় যে, প্রথমে একবার নামাযের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং শেষেও আবার বর্ণিত হলো। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত সবচেয়ে বেশী। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“তোমরা সোজা সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আর তোমরা কখনো (আল্লাহর নিয়ামতরাশি) গণনা করে শেষ করতে পারবে না এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হলো নামায। আর অযুর হিফাযত শুধু মুমিনই করতে পারে।”মুমিনদের এই প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই হবে অধিকারী, অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করলে ফিরদাউসের জন্যে প্রার্থনা করো। ওটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ও মধ্যস্থলে অবস্থিত জান্নাত। সেখান হতেই জান্নাতের সমস্ত নহর প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং ওরই উপর রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেরই দু’টি মনযিল রয়েছে। একটি মনযিল জান্নাতে এবং একটি মনযিল জাহান্নামে। যদি কেউ মারা যায় ও জাহান্নামে প্রবেশ করে তবে তার (জান্নাতের) মনযিলের উত্তরাধিকারী হয় আহলে জান্নাত। তারাই হবে উত্তরাধিকারী’ আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি দ্বারা তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দারই দু’টি বাসস্থান রয়েছে, একটি জান্নাতে ও একটি জাহান্নামে। মুমিন তার জান্নাতের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জাহান্নামের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। পক্ষান্তরে কাফিররা জাহান্নামের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জান্নাতের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।মমিনদেরকে কাফিরদের মনযিলগুলোর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। কেননা, ঐ কাফিরদেরকে এক ও শরীকবিহীন আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তারা তাঁর ইবাদত পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং তাদের জন্যে যেসব পুরস্কার ছিল সেগুলো তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর ইবাদতকারী মুমিনদেরকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এজন্যেই তাদেরকে ওয়ারিস বলা হয়েছে। হযরত আবূ মূসা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক পাহাড় পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আসবে। তখন তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদের গুনাহগুলো ইয়াহুদী ও নাসারার উপর চাপিয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুসলমানের নিকট একজন ইয়াহুদী ও একজন খৃষ্টানকে হাযির করবেন। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “এরা হলো তোমার জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পাওয়ার মুক্তিপণ ।” এ হাদীসটি শ্রবণ করার পর (হাদীসটির বর্ণনাকারী) আবূ বুরদাহ (রাঃ)-কে আল্লাহর নামে শপথ করতে বলেন। তখন আবু বুরদাহ (রাঃ) তিনবার শপথ করে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করেন। এই ধরনের আয়াত আরো রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী আমি আমার এমন বান্দাদেরকে করে থাকি, যারা আমাকে ভয় করে।” (১৯:৬৩) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী তোমাদেরকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময় হিসেবে।” (৪৩:৭২) হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, রোমকদের ভাষায় বাগানকে ফিরদাউস বলা হয়। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেন যে, ফিরদাউস ঐ বাগানকে বলা হয় যাতে আঙ্গুর (এর গাছ) থাকে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
আল-মুমিনুন 23:6
১-১১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তাঁর মুখের কাছে মৌমাছির গুন্গুন্ শব্দের মত শব্দ শোনা যেতো। একদা তার উপর এ অবস্থাই ঘটে। অল্পক্ষণ পরে যখন অহী অবতীর্ণ হওয়ার কাজ শেষ হয় তখন তিনি কিবলামুখী হয়ে স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করতঃ নিম্নের দু'আটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে বেশী করে দিন, কম করবেন না। আমাদেরকে সম্মানিত করুন, লাঞ্ছিত করবেন না। আমাদেরকে প্রদান করুন, বঞ্চিত করবেন না। অন্যদের উপর আমাদেরকে পছন্দ করে নিন, আমাদের উপর অন্যদেরকে পছন্দ করবেন না। আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। তারপর তিনি (আরবী) হতে দশটি আয়াত পর্যন্ত পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে মুনকার বলেছেন। কেননা এর বর্ণনাকারী শুধু ইউনুস ইবনে সুলায়েম রয়েছেন, যিনি মুহাদ্দিসদের নিকট পরিচিত নন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে বাবনুস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেনঃ “কুরআনই ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র এরূপই ছিল।” (এটা নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কা'ব আল আহবার (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন এবং ওর মধ্যে (গাছপালা ইত্যাদি) স্বহস্তে রোপণ করেন তখন ওগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে ওকে বলেনঃ “কিছু কথা বলো”। ঐ জান্নাতে আদন তখন (আরবী)-এই আয়াতগুলো পাঠ করে। যেগুলো আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে অবতীর্ণ করেন।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করেন যার এক ইট সোনার ও এক ইট রূপার তৈরী। তাতে তিনি গাছ রোপণ করেন। অতঃপর তিনি জান্নাতকে বলেনঃ “কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তাতে ফেরেশতারা প্রবেশ করে বলেনঃ “বাঃ! বাঃ! এটা তো বাদশাহদের জায়গা।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওর গারা ছিল মৃগনাভির। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাতে এমন এমন জিনিস রয়েছে যা কোন চক্ষু দেখেনি এবং কোন অন্তর কল্পনা করেনি।আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, জান্নাত যখন এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ কখনো প্রবেশ করতে পারে না।” (এ হাদীসটি তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন যার একটি ইট সাদা মুক্তার, একটি ইট লাল পদ্মরাগের এবং একটি ইট সবুজ পান্নার। আর ওর গারা (গাঁথুনির চুন-সুরকি) মৃগনাভির এবং ওর ঘাস হলো যাফরান। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “তুমি কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তখন আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ প্রবেশ করতে পারবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতাংশটুকু পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত তারাই সফলকাম।” (৫৯:৯) (এ হাদীসটি আবূ বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) (অবশ্যই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে), অর্থাৎ তারা ভাগ্যবান হয়েছে এবং পরিত্রাণ পেয়ে গেছে। এই মুমিনদের বিশেষণ এই যে, তারা নামাযের অবস্থায় অত্যন্ত বিনয়ী হয়। মন তাদের আল্লাহর দিকেই থাকে। তাদের দৃষ্টি থাকে নীচের দিকে এবং বাহুদ্বয় থাকে ঝুঁকানো অবস্থায়। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও সাহাবীগণ (রাঃ) তাদের দৃষ্টিগুলো নামাযের অবস্থায় আকাশের দিকে উঠিয়ে রাখতেন। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁদের দৃষ্টি নীচের দিকে হয়ে যায়। সিজদার স্থান হতে তারা নিজেদের দৃষ্টি সরাতেন। যদি কারো অভ্যাস এর বিপরীত হয়ে গিয়ে থাকে তবে তার উচিত তার দৃষ্টি নীচের দিকে করে নেয়া। একটি হাদীসে রয়েছে যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহও (সঃ) এরূপ করতেন। (এ হাদীসটি মুরসাল)সুতরাং এই বিনয় ও নম্রতা ঐ ব্যক্তিই লাভ করতে পারে যার অন্তঃকরণ খাঁটি ও বিশুদ্ধ হয়, নামাযে পুরোপুরিভাবে মনোযোগ থাকে এবং সমস্ত কাজ অপেক্ষা নামাযে বেশী মন বসে। যেমন হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমার কাছে সুগন্ধি ও স্ত্রীলোক খুবই পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু ঠাণ্ডাকারী হলো নামায।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে বেলাল (রাঃ)! নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দান কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী (রাঃ) নামাযের সময় স্বীয় দাসীকে বলেনঃ “অযুর পানি নিয়ে এসো, যাতে আমি নামায পড়ে শান্তি লাভ করতে পারি।” তিনি দেখলেন যে, উপস্থিত জনগণ তাঁর একথা অপছন্দ করেছে, তাই তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “হে বেলাল (রাঃ)! ওঠো, নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দাও।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। অর্থাৎ মুমিনরা বাতিল, শিরক, পাপ এবং বাজে ও নিরর্থক কথা হতে দূরে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যখন তারা অসার ক্রিয়া-কলাপের সম্মুখীন হয় তখন স্বীয় মর্যাদার সাথে তা পরিহার করে চলে।” (২৫:৭২) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যারা যাকাত দানে সক্রিয়। অর্থাৎ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ এই যে, তারা তাদের মালের যাকাত আদায় করে থাকে। অধিকাংশ তাফসীরকার এটাই অর্থ করেছেন। কিন্তু এতে একটি প্রশ্ন ওঠে যে, এটা তো মক্কী আয়াত, অথচ যাকাত তো ফরয হয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। সুতরাং মক্কী আয়াতে যাকাতের বর্ণনা কেমন? এর উত্তর এই যে, যাকাত মক্কাতেই ফরয হয়েছিল, তবে ওর নিসাবের পরিমাণ কত ইত্যাদি সমস্ত হুকুম মদীনায় নির্ধারিত হয়েছিল। যেমন দেখা যায় যে, সূরায়ে আনআমও তো মক্কী সূরা, অথচ ওর মধ্যেও যাকাতের এই হুকুমই বিদ্যমান রয়েছে। ঘোষিত হয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিনই ওর যাকাত আদায় কর।” (৬:১৪১) আবার অর্থ এও হতে পারেঃ নফসকে তারা শিরক এবং কুফরীর ময়লা আবর্জনা থেকে পবিত্র করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।” (৯১: ৯-১০) নিম্নের আয়াতেও একটি উক্তি এই রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্যে যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে না।” (৪১: ৬-৭) আবার এও হতে পারে যে, নফসেরও যাকাত, মালেরও যাকাত। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। অতঃপর মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। অর্থাৎ যারা ব্যভিচার, লাওয়াতাত ইত্যাদি দুষ্কর্ম হতে বেঁচে থাকে। তবে যে স্ত্রীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে বৈধ করেছেন এবং জিহাদে যেসব দাসী লাভ করা হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তাদের জন্যে হালাল করেছেন, তাদের সাথে মিলনে কোন দোষ নেই।এরপর ঘোষণা করা হচ্ছেঃ যারা এদেরকে ছাড়া অন্যদেরকে কামনা করে তারা হবে সীমালংঘনকারী।হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন স্ত্রীলোক তার গোলামকে গ্রহণ করে (অর্থাৎ গোলামের সাথে সহবাস করে) এবং দলীল হিসেবে এই পেশ করে। হযরত উমার (রাঃ) এটা জানতে পেরে সাহাবীদের (রাঃ) সামনে এটা পেশ করেন। সাহাবীগণ বলেনঃ “সে এ আয়াতের অর্থ ভুল বুঝেছে।” তখন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) গোলামটিকে প্রহার করেন এবং তার মাথা মুণ্ডন করেন। আর ঐ স্ত্রীলোকটিকে তিনি বলেনঃ “এরপরে তুমি প্রত্যেক মুসলমানের উপর হারাম।” (‘আসার’টি মুনাকাতা’ এবং গারীব বা দুর্বলও বটে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা সূরায়ে মায়েদার তাফসীরের শুরুতে আনয়ন করেছেন। কিন্তু এখানে আনয়ন করাই উচিত ছিল। ঐ স্ত্রীলোকটিকে সাধারণ মুসলমানদের উপর হারাম করার কারণ হলো তার ইচ্ছার বিপরীত তার সাথে মুআমালা করা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এবং তাঁর অনুসরণকারীরা এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, স্বীয় হস্ত দ্বারা স্বীয় বিশেষ পানি (শুক্র বা বীর্য বের করা হারাম। কেননা, এটাও উক্ত দু’টি হালাল পন্থার বাইরের ব্যবস্থা। সুতরাং হস্তমৈথুনকারী ব্যক্তি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।ইমাম হাসান ইবনে আরাফা (রঃ) তাঁর বিখ্যাত জুযএ একটি হাদীস আনয়ন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাত প্রকারের লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাদেরকে (পাপ হতে)। পবিত্র করবেন না, আমলকারীদের সাথে তাদেরকে একত্রিত করবেন না এবং সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তাদের জাহান্নামে প্রবিষ্ট করবেন, তবে যদি তারা তাওবা করে তবে সেটা অন্য কথা।তারা হলো স্বীয় হস্তের মাধ্যমে বিবাহকারী অর্থাৎ হস্তমৈথুনকারী, সমমৈথুনকারী, সমমৈথুনকৃত, মদ্যপানকারী, পিতামাতাকে প্রহারকারী, যার ফলে পিতামাতা চীৎকার শুরু করে দেয়, প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা, যার ফলে সে তার উপর লা'নত করে এবং প্রতিবেশিনীর সাথে ব্যভিচারকারী।” (এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুমিনদের আরো গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। তারা আমানতে খিয়ানত করে না; বরং আমানত আদায়ের ব্যাপারে তারা অগ্রগামী হয়। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এর বিপরীত স্বভাব হলো মুনাফিকের। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।মহান আল্লাহ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করছেন যে, তারা তাদের নামাযে যত্নবান থাকে। অর্থাৎ তারা নামাযের সময়ের হিফাযত করে।হ্যরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট কোন আমল সর্বাপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “নামাযকে সময়মত আদায় করা।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোন আমল? তিনি জবাব দিলেনঃ “পিতা-মাতার খিদমত করা।” আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, তারপর কোনটি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সময় দ্বারা রুকু, সিজদা ইত্যাদির হিফাযত উদ্দেশ্য। দেখা যায় যে, প্রথমে একবার নামাযের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং শেষেও আবার বর্ণিত হলো। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত সবচেয়ে বেশী। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“তোমরা সোজা সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আর তোমরা কখনো (আল্লাহর নিয়ামতরাশি) গণনা করে শেষ করতে পারবে না এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হলো নামায। আর অযুর হিফাযত শুধু মুমিনই করতে পারে।”মুমিনদের এই প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই হবে অধিকারী, অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করলে ফিরদাউসের জন্যে প্রার্থনা করো। ওটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ও মধ্যস্থলে অবস্থিত জান্নাত। সেখান হতেই জান্নাতের সমস্ত নহর প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং ওরই উপর রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেরই দু’টি মনযিল রয়েছে। একটি মনযিল জান্নাতে এবং একটি মনযিল জাহান্নামে। যদি কেউ মারা যায় ও জাহান্নামে প্রবেশ করে তবে তার (জান্নাতের) মনযিলের উত্তরাধিকারী হয় আহলে জান্নাত। তারাই হবে উত্তরাধিকারী’ আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি দ্বারা তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দারই দু’টি বাসস্থান রয়েছে, একটি জান্নাতে ও একটি জাহান্নামে। মুমিন তার জান্নাতের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জাহান্নামের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। পক্ষান্তরে কাফিররা জাহান্নামের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জান্নাতের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।মমিনদেরকে কাফিরদের মনযিলগুলোর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। কেননা, ঐ কাফিরদেরকে এক ও শরীকবিহীন আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তারা তাঁর ইবাদত পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং তাদের জন্যে যেসব পুরস্কার ছিল সেগুলো তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর ইবাদতকারী মুমিনদেরকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এজন্যেই তাদেরকে ওয়ারিস বলা হয়েছে। হযরত আবূ মূসা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক পাহাড় পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আসবে। তখন তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদের গুনাহগুলো ইয়াহুদী ও নাসারার উপর চাপিয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুসলমানের নিকট একজন ইয়াহুদী ও একজন খৃষ্টানকে হাযির করবেন। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “এরা হলো তোমার জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পাওয়ার মুক্তিপণ ।” এ হাদীসটি শ্রবণ করার পর (হাদীসটির বর্ণনাকারী) আবূ বুরদাহ (রাঃ)-কে আল্লাহর নামে শপথ করতে বলেন। তখন আবু বুরদাহ (রাঃ) তিনবার শপথ করে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করেন। এই ধরনের আয়াত আরো রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী আমি আমার এমন বান্দাদেরকে করে থাকি, যারা আমাকে ভয় করে।” (১৯:৬৩) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী তোমাদেরকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময় হিসেবে।” (৪৩:৭২) হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, রোমকদের ভাষায় বাগানকে ফিরদাউস বলা হয়। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেন যে, ফিরদাউস ঐ বাগানকে বলা হয় যাতে আঙ্গুর (এর গাছ) থাকে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
আল-মুমিনুন 23:7
১-১১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তাঁর মুখের কাছে মৌমাছির গুন্গুন্ শব্দের মত শব্দ শোনা যেতো। একদা তার উপর এ অবস্থাই ঘটে। অল্পক্ষণ পরে যখন অহী অবতীর্ণ হওয়ার কাজ শেষ হয় তখন তিনি কিবলামুখী হয়ে স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করতঃ নিম্নের দু'আটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে বেশী করে দিন, কম করবেন না। আমাদেরকে সম্মানিত করুন, লাঞ্ছিত করবেন না। আমাদেরকে প্রদান করুন, বঞ্চিত করবেন না। অন্যদের উপর আমাদেরকে পছন্দ করে নিন, আমাদের উপর অন্যদেরকে পছন্দ করবেন না। আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। তারপর তিনি (আরবী) হতে দশটি আয়াত পর্যন্ত পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে মুনকার বলেছেন। কেননা এর বর্ণনাকারী শুধু ইউনুস ইবনে সুলায়েম রয়েছেন, যিনি মুহাদ্দিসদের নিকট পরিচিত নন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে বাবনুস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেনঃ “কুরআনই ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র এরূপই ছিল।” (এটা নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কা'ব আল আহবার (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন এবং ওর মধ্যে (গাছপালা ইত্যাদি) স্বহস্তে রোপণ করেন তখন ওগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে ওকে বলেনঃ “কিছু কথা বলো”। ঐ জান্নাতে আদন তখন (আরবী)-এই আয়াতগুলো পাঠ করে। যেগুলো আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে অবতীর্ণ করেন।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করেন যার এক ইট সোনার ও এক ইট রূপার তৈরী। তাতে তিনি গাছ রোপণ করেন। অতঃপর তিনি জান্নাতকে বলেনঃ “কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তাতে ফেরেশতারা প্রবেশ করে বলেনঃ “বাঃ! বাঃ! এটা তো বাদশাহদের জায়গা।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওর গারা ছিল মৃগনাভির। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাতে এমন এমন জিনিস রয়েছে যা কোন চক্ষু দেখেনি এবং কোন অন্তর কল্পনা করেনি।আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, জান্নাত যখন এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ কখনো প্রবেশ করতে পারে না।” (এ হাদীসটি তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন যার একটি ইট সাদা মুক্তার, একটি ইট লাল পদ্মরাগের এবং একটি ইট সবুজ পান্নার। আর ওর গারা (গাঁথুনির চুন-সুরকি) মৃগনাভির এবং ওর ঘাস হলো যাফরান। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “তুমি কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তখন আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ প্রবেশ করতে পারবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতাংশটুকু পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত তারাই সফলকাম।” (৫৯:৯) (এ হাদীসটি আবূ বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) (অবশ্যই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে), অর্থাৎ তারা ভাগ্যবান হয়েছে এবং পরিত্রাণ পেয়ে গেছে। এই মুমিনদের বিশেষণ এই যে, তারা নামাযের অবস্থায় অত্যন্ত বিনয়ী হয়। মন তাদের আল্লাহর দিকেই থাকে। তাদের দৃষ্টি থাকে নীচের দিকে এবং বাহুদ্বয় থাকে ঝুঁকানো অবস্থায়। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও সাহাবীগণ (রাঃ) তাদের দৃষ্টিগুলো নামাযের অবস্থায় আকাশের দিকে উঠিয়ে রাখতেন। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁদের দৃষ্টি নীচের দিকে হয়ে যায়। সিজদার স্থান হতে তারা নিজেদের দৃষ্টি সরাতেন। যদি কারো অভ্যাস এর বিপরীত হয়ে গিয়ে থাকে তবে তার উচিত তার দৃষ্টি নীচের দিকে করে নেয়া। একটি হাদীসে রয়েছে যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহও (সঃ) এরূপ করতেন। (এ হাদীসটি মুরসাল)সুতরাং এই বিনয় ও নম্রতা ঐ ব্যক্তিই লাভ করতে পারে যার অন্তঃকরণ খাঁটি ও বিশুদ্ধ হয়, নামাযে পুরোপুরিভাবে মনোযোগ থাকে এবং সমস্ত কাজ অপেক্ষা নামাযে বেশী মন বসে। যেমন হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমার কাছে সুগন্ধি ও স্ত্রীলোক খুবই পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু ঠাণ্ডাকারী হলো নামায।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে বেলাল (রাঃ)! নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দান কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী (রাঃ) নামাযের সময় স্বীয় দাসীকে বলেনঃ “অযুর পানি নিয়ে এসো, যাতে আমি নামায পড়ে শান্তি লাভ করতে পারি।” তিনি দেখলেন যে, উপস্থিত জনগণ তাঁর একথা অপছন্দ করেছে, তাই তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “হে বেলাল (রাঃ)! ওঠো, নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দাও।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। অর্থাৎ মুমিনরা বাতিল, শিরক, পাপ এবং বাজে ও নিরর্থক কথা হতে দূরে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যখন তারা অসার ক্রিয়া-কলাপের সম্মুখীন হয় তখন স্বীয় মর্যাদার সাথে তা পরিহার করে চলে।” (২৫:৭২) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যারা যাকাত দানে সক্রিয়। অর্থাৎ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ এই যে, তারা তাদের মালের যাকাত আদায় করে থাকে। অধিকাংশ তাফসীরকার এটাই অর্থ করেছেন। কিন্তু এতে একটি প্রশ্ন ওঠে যে, এটা তো মক্কী আয়াত, অথচ যাকাত তো ফরয হয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। সুতরাং মক্কী আয়াতে যাকাতের বর্ণনা কেমন? এর উত্তর এই যে, যাকাত মক্কাতেই ফরয হয়েছিল, তবে ওর নিসাবের পরিমাণ কত ইত্যাদি সমস্ত হুকুম মদীনায় নির্ধারিত হয়েছিল। যেমন দেখা যায় যে, সূরায়ে আনআমও তো মক্কী সূরা, অথচ ওর মধ্যেও যাকাতের এই হুকুমই বিদ্যমান রয়েছে। ঘোষিত হয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিনই ওর যাকাত আদায় কর।” (৬:১৪১) আবার অর্থ এও হতে পারেঃ নফসকে তারা শিরক এবং কুফরীর ময়লা আবর্জনা থেকে পবিত্র করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।” (৯১: ৯-১০) নিম্নের আয়াতেও একটি উক্তি এই রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্যে যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে না।” (৪১: ৬-৭) আবার এও হতে পারে যে, নফসেরও যাকাত, মালেরও যাকাত। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। অতঃপর মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। অর্থাৎ যারা ব্যভিচার, লাওয়াতাত ইত্যাদি দুষ্কর্ম হতে বেঁচে থাকে। তবে যে স্ত্রীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে বৈধ করেছেন এবং জিহাদে যেসব দাসী লাভ করা হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তাদের জন্যে হালাল করেছেন, তাদের সাথে মিলনে কোন দোষ নেই।এরপর ঘোষণা করা হচ্ছেঃ যারা এদেরকে ছাড়া অন্যদেরকে কামনা করে তারা হবে সীমালংঘনকারী।হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন স্ত্রীলোক তার গোলামকে গ্রহণ করে (অর্থাৎ গোলামের সাথে সহবাস করে) এবং দলীল হিসেবে এই পেশ করে। হযরত উমার (রাঃ) এটা জানতে পেরে সাহাবীদের (রাঃ) সামনে এটা পেশ করেন। সাহাবীগণ বলেনঃ “সে এ আয়াতের অর্থ ভুল বুঝেছে।” তখন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) গোলামটিকে প্রহার করেন এবং তার মাথা মুণ্ডন করেন। আর ঐ স্ত্রীলোকটিকে তিনি বলেনঃ “এরপরে তুমি প্রত্যেক মুসলমানের উপর হারাম।” (‘আসার’টি মুনাকাতা’ এবং গারীব বা দুর্বলও বটে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা সূরায়ে মায়েদার তাফসীরের শুরুতে আনয়ন করেছেন। কিন্তু এখানে আনয়ন করাই উচিত ছিল। ঐ স্ত্রীলোকটিকে সাধারণ মুসলমানদের উপর হারাম করার কারণ হলো তার ইচ্ছার বিপরীত তার সাথে মুআমালা করা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এবং তাঁর অনুসরণকারীরা এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, স্বীয় হস্ত দ্বারা স্বীয় বিশেষ পানি (শুক্র বা বীর্য বের করা হারাম। কেননা, এটাও উক্ত দু’টি হালাল পন্থার বাইরের ব্যবস্থা। সুতরাং হস্তমৈথুনকারী ব্যক্তি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।ইমাম হাসান ইবনে আরাফা (রঃ) তাঁর বিখ্যাত জুযএ একটি হাদীস আনয়ন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাত প্রকারের লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাদেরকে (পাপ হতে)। পবিত্র করবেন না, আমলকারীদের সাথে তাদেরকে একত্রিত করবেন না এবং সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তাদের জাহান্নামে প্রবিষ্ট করবেন, তবে যদি তারা তাওবা করে তবে সেটা অন্য কথা।তারা হলো স্বীয় হস্তের মাধ্যমে বিবাহকারী অর্থাৎ হস্তমৈথুনকারী, সমমৈথুনকারী, সমমৈথুনকৃত, মদ্যপানকারী, পিতামাতাকে প্রহারকারী, যার ফলে পিতামাতা চীৎকার শুরু করে দেয়, প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা, যার ফলে সে তার উপর লা'নত করে এবং প্রতিবেশিনীর সাথে ব্যভিচারকারী।” (এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুমিনদের আরো গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। তারা আমানতে খিয়ানত করে না; বরং আমানত আদায়ের ব্যাপারে তারা অগ্রগামী হয়। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এর বিপরীত স্বভাব হলো মুনাফিকের। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।মহান আল্লাহ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করছেন যে, তারা তাদের নামাযে যত্নবান থাকে। অর্থাৎ তারা নামাযের সময়ের হিফাযত করে।হ্যরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট কোন আমল সর্বাপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “নামাযকে সময়মত আদায় করা।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোন আমল? তিনি জবাব দিলেনঃ “পিতা-মাতার খিদমত করা।” আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, তারপর কোনটি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সময় দ্বারা রুকু, সিজদা ইত্যাদির হিফাযত উদ্দেশ্য। দেখা যায় যে, প্রথমে একবার নামাযের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং শেষেও আবার বর্ণিত হলো। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত সবচেয়ে বেশী। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“তোমরা সোজা সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আর তোমরা কখনো (আল্লাহর নিয়ামতরাশি) গণনা করে শেষ করতে পারবে না এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হলো নামায। আর অযুর হিফাযত শুধু মুমিনই করতে পারে।”মুমিনদের এই প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই হবে অধিকারী, অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করলে ফিরদাউসের জন্যে প্রার্থনা করো। ওটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ও মধ্যস্থলে অবস্থিত জান্নাত। সেখান হতেই জান্নাতের সমস্ত নহর প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং ওরই উপর রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেরই দু’টি মনযিল রয়েছে। একটি মনযিল জান্নাতে এবং একটি মনযিল জাহান্নামে। যদি কেউ মারা যায় ও জাহান্নামে প্রবেশ করে তবে তার (জান্নাতের) মনযিলের উত্তরাধিকারী হয় আহলে জান্নাত। তারাই হবে উত্তরাধিকারী’ আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি দ্বারা তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দারই দু’টি বাসস্থান রয়েছে, একটি জান্নাতে ও একটি জাহান্নামে। মুমিন তার জান্নাতের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জাহান্নামের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। পক্ষান্তরে কাফিররা জাহান্নামের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জান্নাতের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।মমিনদেরকে কাফিরদের মনযিলগুলোর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। কেননা, ঐ কাফিরদেরকে এক ও শরীকবিহীন আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তারা তাঁর ইবাদত পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং তাদের জন্যে যেসব পুরস্কার ছিল সেগুলো তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর ইবাদতকারী মুমিনদেরকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এজন্যেই তাদেরকে ওয়ারিস বলা হয়েছে। হযরত আবূ মূসা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক পাহাড় পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আসবে। তখন তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদের গুনাহগুলো ইয়াহুদী ও নাসারার উপর চাপিয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুসলমানের নিকট একজন ইয়াহুদী ও একজন খৃষ্টানকে হাযির করবেন। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “এরা হলো তোমার জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পাওয়ার মুক্তিপণ ।” এ হাদীসটি শ্রবণ করার পর (হাদীসটির বর্ণনাকারী) আবূ বুরদাহ (রাঃ)-কে আল্লাহর নামে শপথ করতে বলেন। তখন আবু বুরদাহ (রাঃ) তিনবার শপথ করে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করেন। এই ধরনের আয়াত আরো রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী আমি আমার এমন বান্দাদেরকে করে থাকি, যারা আমাকে ভয় করে।” (১৯:৬৩) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী তোমাদেরকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময় হিসেবে।” (৪৩:৭২) হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, রোমকদের ভাষায় বাগানকে ফিরদাউস বলা হয়। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেন যে, ফিরদাউস ঐ বাগানকে বলা হয় যাতে আঙ্গুর (এর গাছ) থাকে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
আল-মুমিনুন 23:8
১-১১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তাঁর মুখের কাছে মৌমাছির গুন্গুন্ শব্দের মত শব্দ শোনা যেতো। একদা তার উপর এ অবস্থাই ঘটে। অল্পক্ষণ পরে যখন অহী অবতীর্ণ হওয়ার কাজ শেষ হয় তখন তিনি কিবলামুখী হয়ে স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করতঃ নিম্নের দু'আটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে বেশী করে দিন, কম করবেন না। আমাদেরকে সম্মানিত করুন, লাঞ্ছিত করবেন না। আমাদেরকে প্রদান করুন, বঞ্চিত করবেন না। অন্যদের উপর আমাদেরকে পছন্দ করে নিন, আমাদের উপর অন্যদেরকে পছন্দ করবেন না। আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। তারপর তিনি (আরবী) হতে দশটি আয়াত পর্যন্ত পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে মুনকার বলেছেন। কেননা এর বর্ণনাকারী শুধু ইউনুস ইবনে সুলায়েম রয়েছেন, যিনি মুহাদ্দিসদের নিকট পরিচিত নন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে বাবনুস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেনঃ “কুরআনই ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র এরূপই ছিল।” (এটা নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কা'ব আল আহবার (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন এবং ওর মধ্যে (গাছপালা ইত্যাদি) স্বহস্তে রোপণ করেন তখন ওগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে ওকে বলেনঃ “কিছু কথা বলো”। ঐ জান্নাতে আদন তখন (আরবী)-এই আয়াতগুলো পাঠ করে। যেগুলো আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে অবতীর্ণ করেন।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করেন যার এক ইট সোনার ও এক ইট রূপার তৈরী। তাতে তিনি গাছ রোপণ করেন। অতঃপর তিনি জান্নাতকে বলেনঃ “কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তাতে ফেরেশতারা প্রবেশ করে বলেনঃ “বাঃ! বাঃ! এটা তো বাদশাহদের জায়গা।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওর গারা ছিল মৃগনাভির। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাতে এমন এমন জিনিস রয়েছে যা কোন চক্ষু দেখেনি এবং কোন অন্তর কল্পনা করেনি।আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, জান্নাত যখন এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ কখনো প্রবেশ করতে পারে না।” (এ হাদীসটি তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন যার একটি ইট সাদা মুক্তার, একটি ইট লাল পদ্মরাগের এবং একটি ইট সবুজ পান্নার। আর ওর গারা (গাঁথুনির চুন-সুরকি) মৃগনাভির এবং ওর ঘাস হলো যাফরান। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “তুমি কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তখন আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ প্রবেশ করতে পারবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতাংশটুকু পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত তারাই সফলকাম।” (৫৯:৯) (এ হাদীসটি আবূ বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) (অবশ্যই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে), অর্থাৎ তারা ভাগ্যবান হয়েছে এবং পরিত্রাণ পেয়ে গেছে। এই মুমিনদের বিশেষণ এই যে, তারা নামাযের অবস্থায় অত্যন্ত বিনয়ী হয়। মন তাদের আল্লাহর দিকেই থাকে। তাদের দৃষ্টি থাকে নীচের দিকে এবং বাহুদ্বয় থাকে ঝুঁকানো অবস্থায়। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও সাহাবীগণ (রাঃ) তাদের দৃষ্টিগুলো নামাযের অবস্থায় আকাশের দিকে উঠিয়ে রাখতেন। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁদের দৃষ্টি নীচের দিকে হয়ে যায়। সিজদার স্থান হতে তারা নিজেদের দৃষ্টি সরাতেন। যদি কারো অভ্যাস এর বিপরীত হয়ে গিয়ে থাকে তবে তার উচিত তার দৃষ্টি নীচের দিকে করে নেয়া। একটি হাদীসে রয়েছে যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহও (সঃ) এরূপ করতেন। (এ হাদীসটি মুরসাল)সুতরাং এই বিনয় ও নম্রতা ঐ ব্যক্তিই লাভ করতে পারে যার অন্তঃকরণ খাঁটি ও বিশুদ্ধ হয়, নামাযে পুরোপুরিভাবে মনোযোগ থাকে এবং সমস্ত কাজ অপেক্ষা নামাযে বেশী মন বসে। যেমন হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমার কাছে সুগন্ধি ও স্ত্রীলোক খুবই পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু ঠাণ্ডাকারী হলো নামায।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে বেলাল (রাঃ)! নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দান কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী (রাঃ) নামাযের সময় স্বীয় দাসীকে বলেনঃ “অযুর পানি নিয়ে এসো, যাতে আমি নামায পড়ে শান্তি লাভ করতে পারি।” তিনি দেখলেন যে, উপস্থিত জনগণ তাঁর একথা অপছন্দ করেছে, তাই তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “হে বেলাল (রাঃ)! ওঠো, নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দাও।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। অর্থাৎ মুমিনরা বাতিল, শিরক, পাপ এবং বাজে ও নিরর্থক কথা হতে দূরে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যখন তারা অসার ক্রিয়া-কলাপের সম্মুখীন হয় তখন স্বীয় মর্যাদার সাথে তা পরিহার করে চলে।” (২৫:৭২) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যারা যাকাত দানে সক্রিয়। অর্থাৎ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ এই যে, তারা তাদের মালের যাকাত আদায় করে থাকে। অধিকাংশ তাফসীরকার এটাই অর্থ করেছেন। কিন্তু এতে একটি প্রশ্ন ওঠে যে, এটা তো মক্কী আয়াত, অথচ যাকাত তো ফরয হয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। সুতরাং মক্কী আয়াতে যাকাতের বর্ণনা কেমন? এর উত্তর এই যে, যাকাত মক্কাতেই ফরয হয়েছিল, তবে ওর নিসাবের পরিমাণ কত ইত্যাদি সমস্ত হুকুম মদীনায় নির্ধারিত হয়েছিল। যেমন দেখা যায় যে, সূরায়ে আনআমও তো মক্কী সূরা, অথচ ওর মধ্যেও যাকাতের এই হুকুমই বিদ্যমান রয়েছে। ঘোষিত হয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিনই ওর যাকাত আদায় কর।” (৬:১৪১) আবার অর্থ এও হতে পারেঃ নফসকে তারা শিরক এবং কুফরীর ময়লা আবর্জনা থেকে পবিত্র করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।” (৯১: ৯-১০) নিম্নের আয়াতেও একটি উক্তি এই রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্যে যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে না।” (৪১: ৬-৭) আবার এও হতে পারে যে, নফসেরও যাকাত, মালেরও যাকাত। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। অতঃপর মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। অর্থাৎ যারা ব্যভিচার, লাওয়াতাত ইত্যাদি দুষ্কর্ম হতে বেঁচে থাকে। তবে যে স্ত্রীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে বৈধ করেছেন এবং জিহাদে যেসব দাসী লাভ করা হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তাদের জন্যে হালাল করেছেন, তাদের সাথে মিলনে কোন দোষ নেই।এরপর ঘোষণা করা হচ্ছেঃ যারা এদেরকে ছাড়া অন্যদেরকে কামনা করে তারা হবে সীমালংঘনকারী।হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন স্ত্রীলোক তার গোলামকে গ্রহণ করে (অর্থাৎ গোলামের সাথে সহবাস করে) এবং দলীল হিসেবে এই পেশ করে। হযরত উমার (রাঃ) এটা জানতে পেরে সাহাবীদের (রাঃ) সামনে এটা পেশ করেন। সাহাবীগণ বলেনঃ “সে এ আয়াতের অর্থ ভুল বুঝেছে।” তখন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) গোলামটিকে প্রহার করেন এবং তার মাথা মুণ্ডন করেন। আর ঐ স্ত্রীলোকটিকে তিনি বলেনঃ “এরপরে তুমি প্রত্যেক মুসলমানের উপর হারাম।” (‘আসার’টি মুনাকাতা’ এবং গারীব বা দুর্বলও বটে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা সূরায়ে মায়েদার তাফসীরের শুরুতে আনয়ন করেছেন। কিন্তু এখানে আনয়ন করাই উচিত ছিল। ঐ স্ত্রীলোকটিকে সাধারণ মুসলমানদের উপর হারাম করার কারণ হলো তার ইচ্ছার বিপরীত তার সাথে মুআমালা করা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এবং তাঁর অনুসরণকারীরা এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, স্বীয় হস্ত দ্বারা স্বীয় বিশেষ পানি (শুক্র বা বীর্য বের করা হারাম। কেননা, এটাও উক্ত দু’টি হালাল পন্থার বাইরের ব্যবস্থা। সুতরাং হস্তমৈথুনকারী ব্যক্তি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।ইমাম হাসান ইবনে আরাফা (রঃ) তাঁর বিখ্যাত জুযএ একটি হাদীস আনয়ন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাত প্রকারের লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাদেরকে (পাপ হতে)। পবিত্র করবেন না, আমলকারীদের সাথে তাদেরকে একত্রিত করবেন না এবং সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তাদের জাহান্নামে প্রবিষ্ট করবেন, তবে যদি তারা তাওবা করে তবে সেটা অন্য কথা।তারা হলো স্বীয় হস্তের মাধ্যমে বিবাহকারী অর্থাৎ হস্তমৈথুনকারী, সমমৈথুনকারী, সমমৈথুনকৃত, মদ্যপানকারী, পিতামাতাকে প্রহারকারী, যার ফলে পিতামাতা চীৎকার শুরু করে দেয়, প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা, যার ফলে সে তার উপর লা'নত করে এবং প্রতিবেশিনীর সাথে ব্যভিচারকারী।” (এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুমিনদের আরো গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। তারা আমানতে খিয়ানত করে না; বরং আমানত আদায়ের ব্যাপারে তারা অগ্রগামী হয়। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এর বিপরীত স্বভাব হলো মুনাফিকের। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।মহান আল্লাহ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করছেন যে, তারা তাদের নামাযে যত্নবান থাকে। অর্থাৎ তারা নামাযের সময়ের হিফাযত করে।হ্যরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট কোন আমল সর্বাপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “নামাযকে সময়মত আদায় করা।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোন আমল? তিনি জবাব দিলেনঃ “পিতা-মাতার খিদমত করা।” আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, তারপর কোনটি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সময় দ্বারা রুকু, সিজদা ইত্যাদির হিফাযত উদ্দেশ্য। দেখা যায় যে, প্রথমে একবার নামাযের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং শেষেও আবার বর্ণিত হলো। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত সবচেয়ে বেশী। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“তোমরা সোজা সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আর তোমরা কখনো (আল্লাহর নিয়ামতরাশি) গণনা করে শেষ করতে পারবে না এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হলো নামায। আর অযুর হিফাযত শুধু মুমিনই করতে পারে।”মুমিনদের এই প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই হবে অধিকারী, অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করলে ফিরদাউসের জন্যে প্রার্থনা করো। ওটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ও মধ্যস্থলে অবস্থিত জান্নাত। সেখান হতেই জান্নাতের সমস্ত নহর প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং ওরই উপর রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেরই দু’টি মনযিল রয়েছে। একটি মনযিল জান্নাতে এবং একটি মনযিল জাহান্নামে। যদি কেউ মারা যায় ও জাহান্নামে প্রবেশ করে তবে তার (জান্নাতের) মনযিলের উত্তরাধিকারী হয় আহলে জান্নাত। তারাই হবে উত্তরাধিকারী’ আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি দ্বারা তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দারই দু’টি বাসস্থান রয়েছে, একটি জান্নাতে ও একটি জাহান্নামে। মুমিন তার জান্নাতের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জাহান্নামের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। পক্ষান্তরে কাফিররা জাহান্নামের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জান্নাতের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।মমিনদেরকে কাফিরদের মনযিলগুলোর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। কেননা, ঐ কাফিরদেরকে এক ও শরীকবিহীন আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তারা তাঁর ইবাদত পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং তাদের জন্যে যেসব পুরস্কার ছিল সেগুলো তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর ইবাদতকারী মুমিনদেরকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এজন্যেই তাদেরকে ওয়ারিস বলা হয়েছে। হযরত আবূ মূসা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক পাহাড় পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আসবে। তখন তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদের গুনাহগুলো ইয়াহুদী ও নাসারার উপর চাপিয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুসলমানের নিকট একজন ইয়াহুদী ও একজন খৃষ্টানকে হাযির করবেন। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “এরা হলো তোমার জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পাওয়ার মুক্তিপণ ।” এ হাদীসটি শ্রবণ করার পর (হাদীসটির বর্ণনাকারী) আবূ বুরদাহ (রাঃ)-কে আল্লাহর নামে শপথ করতে বলেন। তখন আবু বুরদাহ (রাঃ) তিনবার শপথ করে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করেন। এই ধরনের আয়াত আরো রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী আমি আমার এমন বান্দাদেরকে করে থাকি, যারা আমাকে ভয় করে।” (১৯:৬৩) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী তোমাদেরকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময় হিসেবে।” (৪৩:৭২) হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, রোমকদের ভাষায় বাগানকে ফিরদাউস বলা হয়। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেন যে, ফিরদাউস ঐ বাগানকে বলা হয় যাতে আঙ্গুর (এর গাছ) থাকে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
আল-মুমিনুন 23:9
১-১১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তাঁর মুখের কাছে মৌমাছির গুন্গুন্ শব্দের মত শব্দ শোনা যেতো। একদা তার উপর এ অবস্থাই ঘটে। অল্পক্ষণ পরে যখন অহী অবতীর্ণ হওয়ার কাজ শেষ হয় তখন তিনি কিবলামুখী হয়ে স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করতঃ নিম্নের দু'আটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে বেশী করে দিন, কম করবেন না। আমাদেরকে সম্মানিত করুন, লাঞ্ছিত করবেন না। আমাদেরকে প্রদান করুন, বঞ্চিত করবেন না। অন্যদের উপর আমাদেরকে পছন্দ করে নিন, আমাদের উপর অন্যদেরকে পছন্দ করবেন না। আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। তারপর তিনি (আরবী) হতে দশটি আয়াত পর্যন্ত পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে মুনকার বলেছেন। কেননা এর বর্ণনাকারী শুধু ইউনুস ইবনে সুলায়েম রয়েছেন, যিনি মুহাদ্দিসদের নিকট পরিচিত নন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে বাবনুস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেনঃ “কুরআনই ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র এরূপই ছিল।” (এটা নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কা'ব আল আহবার (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন এবং ওর মধ্যে (গাছপালা ইত্যাদি) স্বহস্তে রোপণ করেন তখন ওগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে ওকে বলেনঃ “কিছু কথা বলো”। ঐ জান্নাতে আদন তখন (আরবী)-এই আয়াতগুলো পাঠ করে। যেগুলো আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে অবতীর্ণ করেন।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করেন যার এক ইট সোনার ও এক ইট রূপার তৈরী। তাতে তিনি গাছ রোপণ করেন। অতঃপর তিনি জান্নাতকে বলেনঃ “কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তাতে ফেরেশতারা প্রবেশ করে বলেনঃ “বাঃ! বাঃ! এটা তো বাদশাহদের জায়গা।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওর গারা ছিল মৃগনাভির। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাতে এমন এমন জিনিস রয়েছে যা কোন চক্ষু দেখেনি এবং কোন অন্তর কল্পনা করেনি।আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, জান্নাত যখন এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ কখনো প্রবেশ করতে পারে না।” (এ হাদীসটি তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন যার একটি ইট সাদা মুক্তার, একটি ইট লাল পদ্মরাগের এবং একটি ইট সবুজ পান্নার। আর ওর গারা (গাঁথুনির চুন-সুরকি) মৃগনাভির এবং ওর ঘাস হলো যাফরান। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “তুমি কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তখন আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ প্রবেশ করতে পারবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতাংশটুকু পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত তারাই সফলকাম।” (৫৯:৯) (এ হাদীসটি আবূ বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) (অবশ্যই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে), অর্থাৎ তারা ভাগ্যবান হয়েছে এবং পরিত্রাণ পেয়ে গেছে। এই মুমিনদের বিশেষণ এই যে, তারা নামাযের অবস্থায় অত্যন্ত বিনয়ী হয়। মন তাদের আল্লাহর দিকেই থাকে। তাদের দৃষ্টি থাকে নীচের দিকে এবং বাহুদ্বয় থাকে ঝুঁকানো অবস্থায়। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও সাহাবীগণ (রাঃ) তাদের দৃষ্টিগুলো নামাযের অবস্থায় আকাশের দিকে উঠিয়ে রাখতেন। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁদের দৃষ্টি নীচের দিকে হয়ে যায়। সিজদার স্থান হতে তারা নিজেদের দৃষ্টি সরাতেন। যদি কারো অভ্যাস এর বিপরীত হয়ে গিয়ে থাকে তবে তার উচিত তার দৃষ্টি নীচের দিকে করে নেয়া। একটি হাদীসে রয়েছে যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহও (সঃ) এরূপ করতেন। (এ হাদীসটি মুরসাল)সুতরাং এই বিনয় ও নম্রতা ঐ ব্যক্তিই লাভ করতে পারে যার অন্তঃকরণ খাঁটি ও বিশুদ্ধ হয়, নামাযে পুরোপুরিভাবে মনোযোগ থাকে এবং সমস্ত কাজ অপেক্ষা নামাযে বেশী মন বসে। যেমন হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমার কাছে সুগন্ধি ও স্ত্রীলোক খুবই পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু ঠাণ্ডাকারী হলো নামায।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে বেলাল (রাঃ)! নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দান কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী (রাঃ) নামাযের সময় স্বীয় দাসীকে বলেনঃ “অযুর পানি নিয়ে এসো, যাতে আমি নামায পড়ে শান্তি লাভ করতে পারি।” তিনি দেখলেন যে, উপস্থিত জনগণ তাঁর একথা অপছন্দ করেছে, তাই তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “হে বেলাল (রাঃ)! ওঠো, নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দাও।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। অর্থাৎ মুমিনরা বাতিল, শিরক, পাপ এবং বাজে ও নিরর্থক কথা হতে দূরে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যখন তারা অসার ক্রিয়া-কলাপের সম্মুখীন হয় তখন স্বীয় মর্যাদার সাথে তা পরিহার করে চলে।” (২৫:৭২) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যারা যাকাত দানে সক্রিয়। অর্থাৎ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ এই যে, তারা তাদের মালের যাকাত আদায় করে থাকে। অধিকাংশ তাফসীরকার এটাই অর্থ করেছেন। কিন্তু এতে একটি প্রশ্ন ওঠে যে, এটা তো মক্কী আয়াত, অথচ যাকাত তো ফরয হয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। সুতরাং মক্কী আয়াতে যাকাতের বর্ণনা কেমন? এর উত্তর এই যে, যাকাত মক্কাতেই ফরয হয়েছিল, তবে ওর নিসাবের পরিমাণ কত ইত্যাদি সমস্ত হুকুম মদীনায় নির্ধারিত হয়েছিল। যেমন দেখা যায় যে, সূরায়ে আনআমও তো মক্কী সূরা, অথচ ওর মধ্যেও যাকাতের এই হুকুমই বিদ্যমান রয়েছে। ঘোষিত হয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিনই ওর যাকাত আদায় কর।” (৬:১৪১) আবার অর্থ এও হতে পারেঃ নফসকে তারা শিরক এবং কুফরীর ময়লা আবর্জনা থেকে পবিত্র করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।” (৯১: ৯-১০) নিম্নের আয়াতেও একটি উক্তি এই রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্যে যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে না।” (৪১: ৬-৭) আবার এও হতে পারে যে, নফসেরও যাকাত, মালেরও যাকাত। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। অতঃপর মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। অর্থাৎ যারা ব্যভিচার, লাওয়াতাত ইত্যাদি দুষ্কর্ম হতে বেঁচে থাকে। তবে যে স্ত্রীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে বৈধ করেছেন এবং জিহাদে যেসব দাসী লাভ করা হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তাদের জন্যে হালাল করেছেন, তাদের সাথে মিলনে কোন দোষ নেই।এরপর ঘোষণা করা হচ্ছেঃ যারা এদেরকে ছাড়া অন্যদেরকে কামনা করে তারা হবে সীমালংঘনকারী।হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন স্ত্রীলোক তার গোলামকে গ্রহণ করে (অর্থাৎ গোলামের সাথে সহবাস করে) এবং দলীল হিসেবে এই পেশ করে। হযরত উমার (রাঃ) এটা জানতে পেরে সাহাবীদের (রাঃ) সামনে এটা পেশ করেন। সাহাবীগণ বলেনঃ “সে এ আয়াতের অর্থ ভুল বুঝেছে।” তখন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) গোলামটিকে প্রহার করেন এবং তার মাথা মুণ্ডন করেন। আর ঐ স্ত্রীলোকটিকে তিনি বলেনঃ “এরপরে তুমি প্রত্যেক মুসলমানের উপর হারাম।” (‘আসার’টি মুনাকাতা’ এবং গারীব বা দুর্বলও বটে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা সূরায়ে মায়েদার তাফসীরের শুরুতে আনয়ন করেছেন। কিন্তু এখানে আনয়ন করাই উচিত ছিল। ঐ স্ত্রীলোকটিকে সাধারণ মুসলমানদের উপর হারাম করার কারণ হলো তার ইচ্ছার বিপরীত তার সাথে মুআমালা করা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এবং তাঁর অনুসরণকারীরা এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, স্বীয় হস্ত দ্বারা স্বীয় বিশেষ পানি (শুক্র বা বীর্য বের করা হারাম। কেননা, এটাও উক্ত দু’টি হালাল পন্থার বাইরের ব্যবস্থা। সুতরাং হস্তমৈথুনকারী ব্যক্তি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।ইমাম হাসান ইবনে আরাফা (রঃ) তাঁর বিখ্যাত জুযএ একটি হাদীস আনয়ন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাত প্রকারের লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাদেরকে (পাপ হতে)। পবিত্র করবেন না, আমলকারীদের সাথে তাদেরকে একত্রিত করবেন না এবং সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তাদের জাহান্নামে প্রবিষ্ট করবেন, তবে যদি তারা তাওবা করে তবে সেটা অন্য কথা।তারা হলো স্বীয় হস্তের মাধ্যমে বিবাহকারী অর্থাৎ হস্তমৈথুনকারী, সমমৈথুনকারী, সমমৈথুনকৃত, মদ্যপানকারী, পিতামাতাকে প্রহারকারী, যার ফলে পিতামাতা চীৎকার শুরু করে দেয়, প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা, যার ফলে সে তার উপর লা'নত করে এবং প্রতিবেশিনীর সাথে ব্যভিচারকারী।” (এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুমিনদের আরো গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। তারা আমানতে খিয়ানত করে না; বরং আমানত আদায়ের ব্যাপারে তারা অগ্রগামী হয়। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এর বিপরীত স্বভাব হলো মুনাফিকের। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।মহান আল্লাহ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করছেন যে, তারা তাদের নামাযে যত্নবান থাকে। অর্থাৎ তারা নামাযের সময়ের হিফাযত করে।হ্যরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট কোন আমল সর্বাপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “নামাযকে সময়মত আদায় করা।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোন আমল? তিনি জবাব দিলেনঃ “পিতা-মাতার খিদমত করা।” আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, তারপর কোনটি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সময় দ্বারা রুকু, সিজদা ইত্যাদির হিফাযত উদ্দেশ্য। দেখা যায় যে, প্রথমে একবার নামাযের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং শেষেও আবার বর্ণিত হলো। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত সবচেয়ে বেশী। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“তোমরা সোজা সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আর তোমরা কখনো (আল্লাহর নিয়ামতরাশি) গণনা করে শেষ করতে পারবে না এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হলো নামায। আর অযুর হিফাযত শুধু মুমিনই করতে পারে।”মুমিনদের এই প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই হবে অধিকারী, অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করলে ফিরদাউসের জন্যে প্রার্থনা করো। ওটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ও মধ্যস্থলে অবস্থিত জান্নাত। সেখান হতেই জান্নাতের সমস্ত নহর প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং ওরই উপর রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেরই দু’টি মনযিল রয়েছে। একটি মনযিল জান্নাতে এবং একটি মনযিল জাহান্নামে। যদি কেউ মারা যায় ও জাহান্নামে প্রবেশ করে তবে তার (জান্নাতের) মনযিলের উত্তরাধিকারী হয় আহলে জান্নাত। তারাই হবে উত্তরাধিকারী’ আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি দ্বারা তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দারই দু’টি বাসস্থান রয়েছে, একটি জান্নাতে ও একটি জাহান্নামে। মুমিন তার জান্নাতের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জাহান্নামের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। পক্ষান্তরে কাফিররা জাহান্নামের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জান্নাতের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।মমিনদেরকে কাফিরদের মনযিলগুলোর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। কেননা, ঐ কাফিরদেরকে এক ও শরীকবিহীন আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তারা তাঁর ইবাদত পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং তাদের জন্যে যেসব পুরস্কার ছিল সেগুলো তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর ইবাদতকারী মুমিনদেরকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এজন্যেই তাদেরকে ওয়ারিস বলা হয়েছে। হযরত আবূ মূসা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক পাহাড় পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আসবে। তখন তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদের গুনাহগুলো ইয়াহুদী ও নাসারার উপর চাপিয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুসলমানের নিকট একজন ইয়াহুদী ও একজন খৃষ্টানকে হাযির করবেন। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “এরা হলো তোমার জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পাওয়ার মুক্তিপণ ।” এ হাদীসটি শ্রবণ করার পর (হাদীসটির বর্ণনাকারী) আবূ বুরদাহ (রাঃ)-কে আল্লাহর নামে শপথ করতে বলেন। তখন আবু বুরদাহ (রাঃ) তিনবার শপথ করে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করেন। এই ধরনের আয়াত আরো রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী আমি আমার এমন বান্দাদেরকে করে থাকি, যারা আমাকে ভয় করে।” (১৯:৬৩) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী তোমাদেরকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময় হিসেবে।” (৪৩:৭২) হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, রোমকদের ভাষায় বাগানকে ফিরদাউস বলা হয়। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেন যে, ফিরদাউস ঐ বাগানকে বলা হয় যাতে আঙ্গুর (এর গাছ) থাকে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
আল-মুমিনুন 23:10
১-১১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তাঁর মুখের কাছে মৌমাছির গুন্গুন্ শব্দের মত শব্দ শোনা যেতো। একদা তার উপর এ অবস্থাই ঘটে। অল্পক্ষণ পরে যখন অহী অবতীর্ণ হওয়ার কাজ শেষ হয় তখন তিনি কিবলামুখী হয়ে স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করতঃ নিম্নের দু'আটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে বেশী করে দিন, কম করবেন না। আমাদেরকে সম্মানিত করুন, লাঞ্ছিত করবেন না। আমাদেরকে প্রদান করুন, বঞ্চিত করবেন না। অন্যদের উপর আমাদেরকে পছন্দ করে নিন, আমাদের উপর অন্যদেরকে পছন্দ করবেন না। আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। তারপর তিনি (আরবী) হতে দশটি আয়াত পর্যন্ত পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে মুনকার বলেছেন। কেননা এর বর্ণনাকারী শুধু ইউনুস ইবনে সুলায়েম রয়েছেন, যিনি মুহাদ্দিসদের নিকট পরিচিত নন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে বাবনুস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেনঃ “কুরআনই ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র এরূপই ছিল।” (এটা নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কা'ব আল আহবার (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন এবং ওর মধ্যে (গাছপালা ইত্যাদি) স্বহস্তে রোপণ করেন তখন ওগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে ওকে বলেনঃ “কিছু কথা বলো”। ঐ জান্নাতে আদন তখন (আরবী)-এই আয়াতগুলো পাঠ করে। যেগুলো আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে অবতীর্ণ করেন।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করেন যার এক ইট সোনার ও এক ইট রূপার তৈরী। তাতে তিনি গাছ রোপণ করেন। অতঃপর তিনি জান্নাতকে বলেনঃ “কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তাতে ফেরেশতারা প্রবেশ করে বলেনঃ “বাঃ! বাঃ! এটা তো বাদশাহদের জায়গা।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওর গারা ছিল মৃগনাভির। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাতে এমন এমন জিনিস রয়েছে যা কোন চক্ষু দেখেনি এবং কোন অন্তর কল্পনা করেনি।আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, জান্নাত যখন এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ কখনো প্রবেশ করতে পারে না।” (এ হাদীসটি তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন যার একটি ইট সাদা মুক্তার, একটি ইট লাল পদ্মরাগের এবং একটি ইট সবুজ পান্নার। আর ওর গারা (গাঁথুনির চুন-সুরকি) মৃগনাভির এবং ওর ঘাস হলো যাফরান। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “তুমি কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তখন আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ প্রবেশ করতে পারবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতাংশটুকু পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত তারাই সফলকাম।” (৫৯:৯) (এ হাদীসটি আবূ বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) (অবশ্যই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে), অর্থাৎ তারা ভাগ্যবান হয়েছে এবং পরিত্রাণ পেয়ে গেছে। এই মুমিনদের বিশেষণ এই যে, তারা নামাযের অবস্থায় অত্যন্ত বিনয়ী হয়। মন তাদের আল্লাহর দিকেই থাকে। তাদের দৃষ্টি থাকে নীচের দিকে এবং বাহুদ্বয় থাকে ঝুঁকানো অবস্থায়। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও সাহাবীগণ (রাঃ) তাদের দৃষ্টিগুলো নামাযের অবস্থায় আকাশের দিকে উঠিয়ে রাখতেন। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁদের দৃষ্টি নীচের দিকে হয়ে যায়। সিজদার স্থান হতে তারা নিজেদের দৃষ্টি সরাতেন। যদি কারো অভ্যাস এর বিপরীত হয়ে গিয়ে থাকে তবে তার উচিত তার দৃষ্টি নীচের দিকে করে নেয়া। একটি হাদীসে রয়েছে যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহও (সঃ) এরূপ করতেন। (এ হাদীসটি মুরসাল)সুতরাং এই বিনয় ও নম্রতা ঐ ব্যক্তিই লাভ করতে পারে যার অন্তঃকরণ খাঁটি ও বিশুদ্ধ হয়, নামাযে পুরোপুরিভাবে মনোযোগ থাকে এবং সমস্ত কাজ অপেক্ষা নামাযে বেশী মন বসে। যেমন হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমার কাছে সুগন্ধি ও স্ত্রীলোক খুবই পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু ঠাণ্ডাকারী হলো নামায।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে বেলাল (রাঃ)! নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দান কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী (রাঃ) নামাযের সময় স্বীয় দাসীকে বলেনঃ “অযুর পানি নিয়ে এসো, যাতে আমি নামায পড়ে শান্তি লাভ করতে পারি।” তিনি দেখলেন যে, উপস্থিত জনগণ তাঁর একথা অপছন্দ করেছে, তাই তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “হে বেলাল (রাঃ)! ওঠো, নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দাও।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। অর্থাৎ মুমিনরা বাতিল, শিরক, পাপ এবং বাজে ও নিরর্থক কথা হতে দূরে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যখন তারা অসার ক্রিয়া-কলাপের সম্মুখীন হয় তখন স্বীয় মর্যাদার সাথে তা পরিহার করে চলে।” (২৫:৭২) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যারা যাকাত দানে সক্রিয়। অর্থাৎ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ এই যে, তারা তাদের মালের যাকাত আদায় করে থাকে। অধিকাংশ তাফসীরকার এটাই অর্থ করেছেন। কিন্তু এতে একটি প্রশ্ন ওঠে যে, এটা তো মক্কী আয়াত, অথচ যাকাত তো ফরয হয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। সুতরাং মক্কী আয়াতে যাকাতের বর্ণনা কেমন? এর উত্তর এই যে, যাকাত মক্কাতেই ফরয হয়েছিল, তবে ওর নিসাবের পরিমাণ কত ইত্যাদি সমস্ত হুকুম মদীনায় নির্ধারিত হয়েছিল। যেমন দেখা যায় যে, সূরায়ে আনআমও তো মক্কী সূরা, অথচ ওর মধ্যেও যাকাতের এই হুকুমই বিদ্যমান রয়েছে। ঘোষিত হয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিনই ওর যাকাত আদায় কর।” (৬:১৪১) আবার অর্থ এও হতে পারেঃ নফসকে তারা শিরক এবং কুফরীর ময়লা আবর্জনা থেকে পবিত্র করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।” (৯১: ৯-১০) নিম্নের আয়াতেও একটি উক্তি এই রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্যে যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে না।” (৪১: ৬-৭) আবার এও হতে পারে যে, নফসেরও যাকাত, মালেরও যাকাত। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। অতঃপর মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। অর্থাৎ যারা ব্যভিচার, লাওয়াতাত ইত্যাদি দুষ্কর্ম হতে বেঁচে থাকে। তবে যে স্ত্রীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে বৈধ করেছেন এবং জিহাদে যেসব দাসী লাভ করা হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তাদের জন্যে হালাল করেছেন, তাদের সাথে মিলনে কোন দোষ নেই।এরপর ঘোষণা করা হচ্ছেঃ যারা এদেরকে ছাড়া অন্যদেরকে কামনা করে তারা হবে সীমালংঘনকারী।হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন স্ত্রীলোক তার গোলামকে গ্রহণ করে (অর্থাৎ গোলামের সাথে সহবাস করে) এবং দলীল হিসেবে এই পেশ করে। হযরত উমার (রাঃ) এটা জানতে পেরে সাহাবীদের (রাঃ) সামনে এটা পেশ করেন। সাহাবীগণ বলেনঃ “সে এ আয়াতের অর্থ ভুল বুঝেছে।” তখন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) গোলামটিকে প্রহার করেন এবং তার মাথা মুণ্ডন করেন। আর ঐ স্ত্রীলোকটিকে তিনি বলেনঃ “এরপরে তুমি প্রত্যেক মুসলমানের উপর হারাম।” (‘আসার’টি মুনাকাতা’ এবং গারীব বা দুর্বলও বটে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা সূরায়ে মায়েদার তাফসীরের শুরুতে আনয়ন করেছেন। কিন্তু এখানে আনয়ন করাই উচিত ছিল। ঐ স্ত্রীলোকটিকে সাধারণ মুসলমানদের উপর হারাম করার কারণ হলো তার ইচ্ছার বিপরীত তার সাথে মুআমালা করা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এবং তাঁর অনুসরণকারীরা এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, স্বীয় হস্ত দ্বারা স্বীয় বিশেষ পানি (শুক্র বা বীর্য বের করা হারাম। কেননা, এটাও উক্ত দু’টি হালাল পন্থার বাইরের ব্যবস্থা। সুতরাং হস্তমৈথুনকারী ব্যক্তি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।ইমাম হাসান ইবনে আরাফা (রঃ) তাঁর বিখ্যাত জুযএ একটি হাদীস আনয়ন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাত প্রকারের লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাদেরকে (পাপ হতে)। পবিত্র করবেন না, আমলকারীদের সাথে তাদেরকে একত্রিত করবেন না এবং সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তাদের জাহান্নামে প্রবিষ্ট করবেন, তবে যদি তারা তাওবা করে তবে সেটা অন্য কথা।তারা হলো স্বীয় হস্তের মাধ্যমে বিবাহকারী অর্থাৎ হস্তমৈথুনকারী, সমমৈথুনকারী, সমমৈথুনকৃত, মদ্যপানকারী, পিতামাতাকে প্রহারকারী, যার ফলে পিতামাতা চীৎকার শুরু করে দেয়, প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা, যার ফলে সে তার উপর লা'নত করে এবং প্রতিবেশিনীর সাথে ব্যভিচারকারী।” (এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুমিনদের আরো গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। তারা আমানতে খিয়ানত করে না; বরং আমানত আদায়ের ব্যাপারে তারা অগ্রগামী হয়। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এর বিপরীত স্বভাব হলো মুনাফিকের। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।মহান আল্লাহ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করছেন যে, তারা তাদের নামাযে যত্নবান থাকে। অর্থাৎ তারা নামাযের সময়ের হিফাযত করে।হ্যরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট কোন আমল সর্বাপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “নামাযকে সময়মত আদায় করা।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোন আমল? তিনি জবাব দিলেনঃ “পিতা-মাতার খিদমত করা।” আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, তারপর কোনটি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সময় দ্বারা রুকু, সিজদা ইত্যাদির হিফাযত উদ্দেশ্য। দেখা যায় যে, প্রথমে একবার নামাযের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং শেষেও আবার বর্ণিত হলো। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত সবচেয়ে বেশী। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“তোমরা সোজা সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আর তোমরা কখনো (আল্লাহর নিয়ামতরাশি) গণনা করে শেষ করতে পারবে না এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হলো নামায। আর অযুর হিফাযত শুধু মুমিনই করতে পারে।”মুমিনদের এই প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই হবে অধিকারী, অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করলে ফিরদাউসের জন্যে প্রার্থনা করো। ওটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ও মধ্যস্থলে অবস্থিত জান্নাত। সেখান হতেই জান্নাতের সমস্ত নহর প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং ওরই উপর রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেরই দু’টি মনযিল রয়েছে। একটি মনযিল জান্নাতে এবং একটি মনযিল জাহান্নামে। যদি কেউ মারা যায় ও জাহান্নামে প্রবেশ করে তবে তার (জান্নাতের) মনযিলের উত্তরাধিকারী হয় আহলে জান্নাত। তারাই হবে উত্তরাধিকারী’ আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি দ্বারা তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দারই দু’টি বাসস্থান রয়েছে, একটি জান্নাতে ও একটি জাহান্নামে। মুমিন তার জান্নাতের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জাহান্নামের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। পক্ষান্তরে কাফিররা জাহান্নামের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জান্নাতের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।মমিনদেরকে কাফিরদের মনযিলগুলোর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। কেননা, ঐ কাফিরদেরকে এক ও শরীকবিহীন আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তারা তাঁর ইবাদত পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং তাদের জন্যে যেসব পুরস্কার ছিল সেগুলো তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর ইবাদতকারী মুমিনদেরকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এজন্যেই তাদেরকে ওয়ারিস বলা হয়েছে। হযরত আবূ মূসা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক পাহাড় পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আসবে। তখন তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদের গুনাহগুলো ইয়াহুদী ও নাসারার উপর চাপিয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুসলমানের নিকট একজন ইয়াহুদী ও একজন খৃষ্টানকে হাযির করবেন। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “এরা হলো তোমার জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পাওয়ার মুক্তিপণ ।” এ হাদীসটি শ্রবণ করার পর (হাদীসটির বর্ণনাকারী) আবূ বুরদাহ (রাঃ)-কে আল্লাহর নামে শপথ করতে বলেন। তখন আবু বুরদাহ (রাঃ) তিনবার শপথ করে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করেন। এই ধরনের আয়াত আরো রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী আমি আমার এমন বান্দাদেরকে করে থাকি, যারা আমাকে ভয় করে।” (১৯:৬৩) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী তোমাদেরকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময় হিসেবে।” (৪৩:৭২) হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, রোমকদের ভাষায় বাগানকে ফিরদাউস বলা হয়। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেন যে, ফিরদাউস ঐ বাগানকে বলা হয় যাতে আঙ্গুর (এর গাছ) থাকে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
আল-মুমিনুন 23:11
১-১১ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তাঁর মুখের কাছে মৌমাছির গুন্গুন্ শব্দের মত শব্দ শোনা যেতো। একদা তার উপর এ অবস্থাই ঘটে। অল্পক্ষণ পরে যখন অহী অবতীর্ণ হওয়ার কাজ শেষ হয় তখন তিনি কিবলামুখী হয়ে স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করতঃ নিম্নের দু'আটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে বেশী করে দিন, কম করবেন না। আমাদেরকে সম্মানিত করুন, লাঞ্ছিত করবেন না। আমাদেরকে প্রদান করুন, বঞ্চিত করবেন না। অন্যদের উপর আমাদেরকে পছন্দ করে নিন, আমাদের উপর অন্যদেরকে পছন্দ করবেন না। আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করুন। তারপর তিনি (আরবী) হতে দশটি আয়াত পর্যন্ত পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে মুনকার বলেছেন। কেননা এর বর্ণনাকারী শুধু ইউনুস ইবনে সুলায়েম রয়েছেন, যিনি মুহাদ্দিসদের নিকট পরিচিত নন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে বাবনুস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেনঃ “কুরআনই ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র এরূপই ছিল।” (এটা নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কা'ব আল আহবার (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন এবং ওর মধ্যে (গাছপালা ইত্যাদি) স্বহস্তে রোপণ করেন তখন ওগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে ওকে বলেনঃ “কিছু কথা বলো”। ঐ জান্নাতে আদন তখন (আরবী)-এই আয়াতগুলো পাঠ করে। যেগুলো আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে অবতীর্ণ করেন।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করেন যার এক ইট সোনার ও এক ইট রূপার তৈরী। তাতে তিনি গাছ রোপণ করেন। অতঃপর তিনি জান্নাতকে বলেনঃ “কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তাতে ফেরেশতারা প্রবেশ করে বলেনঃ “বাঃ! বাঃ! এটা তো বাদশাহদের জায়গা।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওর গারা ছিল মৃগনাভির। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাতে এমন এমন জিনিস রয়েছে যা কোন চক্ষু দেখেনি এবং কোন অন্তর কল্পনা করেনি।আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, জান্নাত যখন এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ কখনো প্রবেশ করতে পারে না।” (এ হাদীসটি তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদন সৃষ্টি করেন যার একটি ইট সাদা মুক্তার, একটি ইট লাল পদ্মরাগের এবং একটি ইট সবুজ পান্নার। আর ওর গারা (গাঁথুনির চুন-সুরকি) মৃগনাভির এবং ওর ঘাস হলো যাফরান। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “তুমি কথা বলো।” জান্নাত তখন (আরবী) বলে। তখন আল্লাহ তা'আলা ওকে বলেনঃ “আমার বুযর্গী ও মর্যাদার শপথ! তোমার মধ্যে কৃপণ প্রবেশ করতে পারবে না।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতাংশটুকু পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত তারাই সফলকাম।” (৫৯:৯) (এ হাদীসটি আবূ বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) (অবশ্যই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে), অর্থাৎ তারা ভাগ্যবান হয়েছে এবং পরিত্রাণ পেয়ে গেছে। এই মুমিনদের বিশেষণ এই যে, তারা নামাযের অবস্থায় অত্যন্ত বিনয়ী হয়। মন তাদের আল্লাহর দিকেই থাকে। তাদের দৃষ্টি থাকে নীচের দিকে এবং বাহুদ্বয় থাকে ঝুঁকানো অবস্থায়। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও সাহাবীগণ (রাঃ) তাদের দৃষ্টিগুলো নামাযের অবস্থায় আকাশের দিকে উঠিয়ে রাখতেন। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁদের দৃষ্টি নীচের দিকে হয়ে যায়। সিজদার স্থান হতে তারা নিজেদের দৃষ্টি সরাতেন। যদি কারো অভ্যাস এর বিপরীত হয়ে গিয়ে থাকে তবে তার উচিত তার দৃষ্টি নীচের দিকে করে নেয়া। একটি হাদীসে রয়েছে যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহও (সঃ) এরূপ করতেন। (এ হাদীসটি মুরসাল)সুতরাং এই বিনয় ও নম্রতা ঐ ব্যক্তিই লাভ করতে পারে যার অন্তঃকরণ খাঁটি ও বিশুদ্ধ হয়, নামাযে পুরোপুরিভাবে মনোযোগ থাকে এবং সমস্ত কাজ অপেক্ষা নামাযে বেশী মন বসে। যেমন হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমার কাছে সুগন্ধি ও স্ত্রীলোক খুবই পছন্দনীয় এবং আমার চক্ষু ঠাণ্ডাকারী হলো নামায।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে বেলাল (রাঃ)! নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দান কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী (রাঃ) নামাযের সময় স্বীয় দাসীকে বলেনঃ “অযুর পানি নিয়ে এসো, যাতে আমি নামায পড়ে শান্তি লাভ করতে পারি।” তিনি দেখলেন যে, উপস্থিত জনগণ তাঁর একথা অপছন্দ করেছে, তাই তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “হে বেলাল (রাঃ)! ওঠো, নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে শান্তি দাও।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। অর্থাৎ মুমিনরা বাতিল, শিরক, পাপ এবং বাজে ও নিরর্থক কথা হতে দূরে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যখন তারা অসার ক্রিয়া-কলাপের সম্মুখীন হয় তখন স্বীয় মর্যাদার সাথে তা পরিহার করে চলে।” (২৫:৭২) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যারা যাকাত দানে সক্রিয়। অর্থাৎ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ এই যে, তারা তাদের মালের যাকাত আদায় করে থাকে। অধিকাংশ তাফসীরকার এটাই অর্থ করেছেন। কিন্তু এতে একটি প্রশ্ন ওঠে যে, এটা তো মক্কী আয়াত, অথচ যাকাত তো ফরয হয় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। সুতরাং মক্কী আয়াতে যাকাতের বর্ণনা কেমন? এর উত্তর এই যে, যাকাত মক্কাতেই ফরয হয়েছিল, তবে ওর নিসাবের পরিমাণ কত ইত্যাদি সমস্ত হুকুম মদীনায় নির্ধারিত হয়েছিল। যেমন দেখা যায় যে, সূরায়ে আনআমও তো মক্কী সূরা, অথচ ওর মধ্যেও যাকাতের এই হুকুমই বিদ্যমান রয়েছে। ঘোষিত হয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিনই ওর যাকাত আদায় কর।” (৬:১৪১) আবার অর্থ এও হতে পারেঃ নফসকে তারা শিরক এবং কুফরীর ময়লা আবর্জনা থেকে পবিত্র করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।” (৯১: ৯-১০) নিম্নের আয়াতেও একটি উক্তি এই রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্যে যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে না।” (৪১: ৬-৭) আবার এও হতে পারে যে, নফসেরও যাকাত, মালেরও যাকাত। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। অতঃপর মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। অর্থাৎ যারা ব্যভিচার, লাওয়াতাত ইত্যাদি দুষ্কর্ম হতে বেঁচে থাকে। তবে যে স্ত্রীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে বৈধ করেছেন এবং জিহাদে যেসব দাসী লাভ করা হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তাদের জন্যে হালাল করেছেন, তাদের সাথে মিলনে কোন দোষ নেই।এরপর ঘোষণা করা হচ্ছেঃ যারা এদেরকে ছাড়া অন্যদেরকে কামনা করে তারা হবে সীমালংঘনকারী।হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন স্ত্রীলোক তার গোলামকে গ্রহণ করে (অর্থাৎ গোলামের সাথে সহবাস করে) এবং দলীল হিসেবে এই পেশ করে। হযরত উমার (রাঃ) এটা জানতে পেরে সাহাবীদের (রাঃ) সামনে এটা পেশ করেন। সাহাবীগণ বলেনঃ “সে এ আয়াতের অর্থ ভুল বুঝেছে।” তখন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) গোলামটিকে প্রহার করেন এবং তার মাথা মুণ্ডন করেন। আর ঐ স্ত্রীলোকটিকে তিনি বলেনঃ “এরপরে তুমি প্রত্যেক মুসলমানের উপর হারাম।” (‘আসার’টি মুনাকাতা’ এবং গারীব বা দুর্বলও বটে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা সূরায়ে মায়েদার তাফসীরের শুরুতে আনয়ন করেছেন। কিন্তু এখানে আনয়ন করাই উচিত ছিল। ঐ স্ত্রীলোকটিকে সাধারণ মুসলমানদের উপর হারাম করার কারণ হলো তার ইচ্ছার বিপরীত তার সাথে মুআমালা করা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ইমাম শাফিয়ী (রঃ) এবং তাঁর অনুসরণকারীরা এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, স্বীয় হস্ত দ্বারা স্বীয় বিশেষ পানি (শুক্র বা বীর্য বের করা হারাম। কেননা, এটাও উক্ত দু’টি হালাল পন্থার বাইরের ব্যবস্থা। সুতরাং হস্তমৈথুনকারী ব্যক্তি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।ইমাম হাসান ইবনে আরাফা (রঃ) তাঁর বিখ্যাত জুযএ একটি হাদীস আনয়ন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাত প্রকারের লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাদেরকে (পাপ হতে)। পবিত্র করবেন না, আমলকারীদের সাথে তাদেরকে একত্রিত করবেন না এবং সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তাদের জাহান্নামে প্রবিষ্ট করবেন, তবে যদি তারা তাওবা করে তবে সেটা অন্য কথা।তারা হলো স্বীয় হস্তের মাধ্যমে বিবাহকারী অর্থাৎ হস্তমৈথুনকারী, সমমৈথুনকারী, সমমৈথুনকৃত, মদ্যপানকারী, পিতামাতাকে প্রহারকারী, যার ফলে পিতামাতা চীৎকার শুরু করে দেয়, প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা, যার ফলে সে তার উপর লা'নত করে এবং প্রতিবেশিনীর সাথে ব্যভিচারকারী।” (এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)মুমিনদের আরো গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। তারা আমানতে খিয়ানত করে না; বরং আমানত আদায়ের ব্যাপারে তারা অগ্রগামী হয়। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এর বিপরীত স্বভাব হলো মুনাফিকের। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।মহান আল্লাহ মুমিনদের আর একটি বিশেষণ বর্ণনা করছেন যে, তারা তাদের নামাযে যত্নবান থাকে। অর্থাৎ তারা নামাযের সময়ের হিফাযত করে।হ্যরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট কোন আমল সর্বাপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “নামাযকে সময়মত আদায় করা।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোন আমল? তিনি জবাব দিলেনঃ “পিতা-মাতার খিদমত করা।” আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, তারপর কোনটি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সময় দ্বারা রুকু, সিজদা ইত্যাদির হিফাযত উদ্দেশ্য। দেখা যায় যে, প্রথমে একবার নামাযের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং শেষেও আবার বর্ণিত হলো। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত সবচেয়ে বেশী। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ“তোমরা সোজা সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আর তোমরা কখনো (আল্লাহর নিয়ামতরাশি) গণনা করে শেষ করতে পারবে না এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল হলো নামায। আর অযুর হিফাযত শুধু মুমিনই করতে পারে।”মুমিনদের এই প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই হবে অধিকারী, অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করলে ফিরদাউসের জন্যে প্রার্থনা করো। ওটা হচ্ছে সর্বোচ্চ ও মধ্যস্থলে অবস্থিত জান্নাত। সেখান হতেই জান্নাতের সমস্ত নহর প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং ওরই উপর রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকেরই দু’টি মনযিল রয়েছে। একটি মনযিল জান্নাতে এবং একটি মনযিল জাহান্নামে। যদি কেউ মারা যায় ও জাহান্নামে প্রবেশ করে তবে তার (জান্নাতের) মনযিলের উত্তরাধিকারী হয় আহলে জান্নাত। তারাই হবে উত্তরাধিকারী’ আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি দ্বারা তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বান্দারই দু’টি বাসস্থান রয়েছে, একটি জান্নাতে ও একটি জাহান্নামে। মুমিন তার জান্নাতের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জাহান্নামের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। পক্ষান্তরে কাফিররা জাহান্নামের ঘরটিকে সজ্জিত করে এবং জান্নাতের ঘরটিকে ভেঙ্গে ফেলে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।মমিনদেরকে কাফিরদের মনযিলগুলোর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। কেননা, ঐ কাফিরদেরকে এক ও শরীকবিহীন আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তারা তাঁর ইবাদত পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং তাদের জন্যে যেসব পুরস্কার ছিল সেগুলো তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আল্লাহর ইবাদতকারী মুমিনদেরকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এজন্যেই তাদেরকে ওয়ারিস বলা হয়েছে। হযরত আবূ মূসা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক পাহাড় পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আসবে। তখন তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদের গুনাহগুলো ইয়াহুদী ও নাসারার উপর চাপিয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুসলমানের নিকট একজন ইয়াহুদী ও একজন খৃষ্টানকে হাযির করবেন। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “এরা হলো তোমার জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ পাওয়ার মুক্তিপণ ।” এ হাদীসটি শ্রবণ করার পর (হাদীসটির বর্ণনাকারী) আবূ বুরদাহ (রাঃ)-কে আল্লাহর নামে শপথ করতে বলেন। তখন আবু বুরদাহ (রাঃ) তিনবার শপথ করে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করেন। এই ধরনের আয়াত আরো রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী আমি আমার এমন বান্দাদেরকে করে থাকি, যারা আমাকে ভয় করে।” (১৯:৬৩) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা হলো ঐ জান্নাত যার অধিকারী তোমাদেরকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে তোমাদের কৃতকর্মের বিনিময় হিসেবে।” (৪৩:৭২) হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, রোমকদের ভাষায় বাগানকে ফিরদাউস বলা হয়। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেন যে, ফিরদাউস ঐ বাগানকে বলা হয় যাতে আঙ্গুর (এর গাছ) থাকে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
আল-মুমিনুন 23:12
১২-১৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রাথমিক সৃষ্টির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি হযরত আদিম (আঃ)-কে মাটির দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যা কাদা ও বেজে ওঠে এমন মাটির আকারে ছিল। অতঃপর হযরত আদম (আঃ)-এর শুক্র হতে তার সন্তানদেরকে সৃষ্টি করা হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটাও একটি নিদর্শন যে, তিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমরা এখন মানুষরূপে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছো।” (৩০:২০)হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে এক মুষ্টি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যা তিনি সমস্ত যমীন হতে গ্রহণ করেছিলেন। এ হিসেবেই হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানদের রূপ ও রঙ বিভিন্ন রকম হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ হয়েছে লাল, কেউ সাদা, কেউ কালো এবং কেউ হয়েছে অন্য রঙ-এর। তাদের মধ্যে অশ্লীলও রয়েছে, পবিত্রও রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)(আরবী) এর মধ্যে (আরবী) সর্বনামটি (আরবী) (মানবজাতি)-এর দিকে ফিরেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি কর্দম হতে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তার বংশ উৎপন্ন করেছেন তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস হতে।” (৩২:৭-৮) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি (শুক্র) হতে সৃষ্টি করিনি, অতঃপর স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে?" (৭৭:২০-২১) সুতরাং মানুষের জন্যে একটা নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তার মাতার গর্ভাশয়ই বাসস্থান হয়ে থাকে। সেখানে সে এক অবস্থা হতে অন্য অবস্থার দিকে এবং এক আকার হতে অন্য আকারের দিকে পরিবর্তিত হতে থাকে। তারপর শুক্র, যা তীব্রবেগে বহির্গত হয় এমন পানি, যা পুরুষের পৃষ্ঠদেশ হতে ও নারীর বক্ষদেশ হতে বহির্গত হয়, রূপ পরিবর্তন করে লাল রঙ-এর পিণ্ডে রূপান্তরিত হয়। এরপর ওটা গোশ্তপিণ্ডের রূপে পরিবর্তিত হয়। তখন তাতে কোন আকার বা কোন রেখা থাকে না। তারপর তাতে অস্থি তৈরী করেন এবং মাথা, হাত, পা, হাড়, শিরা, পাছা ইত্যাদি বানিয়ে দেন। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষের সারা দেহ গলে পচে যায়, শুধু মেরুদণ্ডের (পাছার) হাড়টি অবশিষ্ট থাকে। ওর থেকেই তাকে (পুনরায়) সৃষ্টি করা হবে এবং পুনর্গঠন করা হবে।”মহান আল্লাহ বলেন, অতঃপর অস্থি-পঞ্জরকে আমি গোশ্ত দ্বারা ঢেকে দিই, যেন তা গুপ্ত ও দৃঢ় থাকে। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাতে রূহ ফুকে দেন, যাতে সে নড়া চড়া করা ও চলাফেলা করার যোগ্য হয়ে ওঠে। ঐ সময় সে জীবন্ত মানবরূপ ধারণ করে। সে দেখার, শুনার, বুঝার, নড়ার এবং স্থির থাকার শক্তি প্রাপ্ত হয়। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান! হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেন যে, যখন শুক্রের উপর চার মাস অতিবাহিত হয় তখন আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দেন যিনি তিন তিনটি অন্ধকারের মধ্যে রুহ ফুঁকে দেন। অবশেষে ওকে গড়ে তুলি এক সৃফিলে আল্লাহ পাকের এই উক্তির অর্থ এটাই। অর্থাৎ দ্বিতীয় এর এই সৃষ্টি রা রুহ ফুঁকে দেয়াকেই বুঝানো হয়েছে। সুতরাং মায়ের পেটের মধ্যে এক অবস্থা হতে দ্বিতীয় অবস্থায় এবং দ্বিতীয় হতে তৃতীয় অবস্থায় রূপান্তরিত হওয়ার পর একেবারে অবুঝ ও জ্ঞান শূন্য নিলে সে জাহণ করে। তারপর সে ধীরে ধীরে বড় হতে হতে যৌবনে গান করে। তারপর হয় পৌঢ় এবং এর পর বার্ধক্যে পৌঁছে যায়। পরিশেষে সে সম্পূর্ণরূপে বৃদ্ধ হয়ে পড়ে। মোটকথা রূহ ফুঁকে দেয়া হয় এবং পরে এসব বৃত্তির সাধিত হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন ধিৰি সত্যবাদী ও সত্যায়িতঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি (এর মাধ্যম শুক্র) তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত জমা থাকে। তারপর ওটা চল্লিশ দিন পর্যন্ত রক্তপিণ্ডের আকারে থাকে। এর চল্লিশ দিন পর্যন্ত গোশ্তপিণ্ডের রূপ ধারণ করে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা একজন ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দেন, যিনি তাতে ফুঁকে দেন এবং আল্লাহর নির্দেশক্রমে চারটি বিষয় লিখে নেন। তাহলো তার বিষক, আয়ুষ্কাল, আমল এবং সে হতভাগ্য হবে কি সৌভাগ্যবান হবে। যিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই তাঁর শপথ! এক ব্যক্তি জান্নাতবাসীর আমল করতে থাকে, এমনকি সে জান্নাত হতে শুধুমাত্র এক হাত দূরে রয়ে যায়। এমতাবস্থায় তার তকদীরের লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়ে যায়, ফলে সে শেষ অবস্থায় জাহান্নামবাসীর আমল করতে শুরু করে এবং ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং সে জাহান্নামী হয়ে যায়। অনুরূপভাবে অন্য একটি লোক খারাপ কাজ করতে করতে জাহান্নাম হতে মাত্র এক হাত দূরে রয়ে যায়। কিন্তু তকদীরের লিখন অগ্রগামী হয় এবং শেষ জীবনে সে জান্নাতবাসীর আমল করতে শুরু করে দেয়। সুতরাং সে জান্নাতবাসী হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, শুক্র বা বীর্য যখন গর্ভাশয়ে পতিত হয় তখন ওটা প্রত্যেক চুল ও নখের স্থানে পৌছে যায়। অতঃপর চল্লিশ দিন পরে ওটা জমাট রক্তের আকার ধারণ করে। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের (রাঃ) সাথে কথাবার্তা বলছিলেন, এমন সময় একজন ইয়াহুদী আগমন করে। তখন কুরায়েশ কাফিররা তাকে বলেঃ “হে ইয়াহুদী! এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) নবুওয়াতের দাবী করছেন। সে তখন বলেঃ “আচ্ছা, আমি তাকে এমন এক প্রশ্ন করাবো যার উত্তর নবী ছাড়া আর কেউ দিতে পারে না।” অতঃপর সে নবী (সঃ)-এর মজলিসে এসে বসে পড়ে। সে প্রশ্ন করেঃ “আচ্ছা বলুন তো, মানুষের জন্ম কি জিনিস থেকে হয়?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “পুরুষ ও স্ত্রীর মিলিত শুক্রের মাধ্যমে। পুরুষের শুক্র মোটা ও গাঢ় হয় এবং তার থেকে অস্থি ও পাছা বা নিতম্ব গঠিত হয়। আর স্ত্রীর শুক্র হয় তরল ও পাতলা। তার থেকে গঠিত হয় গোশ্ত ও রক্ত। তাঁর এই জবাব শুনে ইয়াহূদী বলেঃ “আপনি সত্য বলেছেন। পূর্ববর্তী নবীদেরও (আঃ) উক্তি এটাই ছিল।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত হুযাইফা ইবনে উসাইদ আল গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেন, গর্ভাশয়ে শুক্রের যখন চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয় তখন একজন ফেরেশতা আগমন করেন এবং আল্লাহ তা'আলাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ ভাল হবে, না মন্দ হবে? নর হবে না নারী হবে?” উত্তরে যা বলা হয় তাই তিনি লিখে নেন এবং তার আমল, বয়স, বিপদ-আপদ, রিযক ইত্যাদি সবকিছু লিখে ফেলেন। তারপর ঐ খাতাপত্র জড়িয়ে নেয়া হয় এবং তাতে কমবেশী করার কোন অবকাশ থাকে না। (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিমও (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা গর্ভাশয়ে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন যিনি আরয করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! এখন শুক্র। হে আল্লাহ! এখন রক্তপিণ্ড। হে আমার প্রতিপালক! এখন গোশ্তপিণ্ড।” যখন আল্লাহ তা'আলা ওকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন তখন ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহ! নর হবে, না নারী হবে? দুর্ভাগা হবে, না ভাগ্যবান হবে? এর রিযক কি হবে এবং আয়ুষ্কাল কত হবে?” তখন আল্লাহ তা'আলা উত্তর দেন এবং তিনি তার মায়ের পেটেই সবকিছু লিখে নেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)এসব কথা এবং নিজের পূর্ণ ও ব্যাপক ক্ষমতার বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ বলেনঃ অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান! হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “আমি চারটি বিষয়ে আমার প্রতিপালকের আনুকূল্য করেছি। যখন তিনি (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার মুখ হতে বেরিয়ে যায় (আরবী) অর্থাৎ “সর্বোত্তম সৃষ্টিকর্তা কতই না মহান! আমার প্রতিপালক পরে এটাই আবার অবতীর্ণ করেন।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমির শা’বী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত আনসারী (রাঃ)-কে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো লিখাতে ছিলেন তখন হযরত মুআয (রাঃ) হঠাৎ করে (আরবী)-এই অংশটুকু বলে ফেলেন। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে ওঠেন। তাঁকে হাসতে দেখে হযরত মুআয (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার হাসার কারণ কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমার এই কথার দ্বারাই এই আয়াতকে সমাপ্ত করা হয়েছে।” (এই হাদীসের সনদে জাবির জুফী নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন যিনি খুবই দুর্বল। আর এ বিওয়াইয়াতটি সম্পূর্ণরূপে মুনকার বা অনস্বীকার্য। অহী লেখক হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) মদীনায় ছিলেন, মক্কায় নয়। হযরত মুআয (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও মদীনার ঘটনা। অথচ এই আয়াত অবতীর্ণ হয় মক্কায়। সুতরাং উল্লিখিত রিওয়াইয়াত নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ এই প্রথম সৃষ্টির পর তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমরা পুনরুত্থিত হবে। তারপর তোমাদের হিসাব নিকাশ হবে এবং ভাল ও মন্দ কর্মের প্রতিদান প্রাপ্ত হবে।
আল-মুমিনুন 23:13
১২-১৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রাথমিক সৃষ্টির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি হযরত আদিম (আঃ)-কে মাটির দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যা কাদা ও বেজে ওঠে এমন মাটির আকারে ছিল। অতঃপর হযরত আদম (আঃ)-এর শুক্র হতে তার সন্তানদেরকে সৃষ্টি করা হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটাও একটি নিদর্শন যে, তিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমরা এখন মানুষরূপে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছো।” (৩০:২০)হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে এক মুষ্টি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যা তিনি সমস্ত যমীন হতে গ্রহণ করেছিলেন। এ হিসেবেই হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানদের রূপ ও রঙ বিভিন্ন রকম হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ হয়েছে লাল, কেউ সাদা, কেউ কালো এবং কেউ হয়েছে অন্য রঙ-এর। তাদের মধ্যে অশ্লীলও রয়েছে, পবিত্রও রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)(আরবী) এর মধ্যে (আরবী) সর্বনামটি (আরবী) (মানবজাতি)-এর দিকে ফিরেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি কর্দম হতে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তার বংশ উৎপন্ন করেছেন তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস হতে।” (৩২:৭-৮) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি (শুক্র) হতে সৃষ্টি করিনি, অতঃপর স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে?" (৭৭:২০-২১) সুতরাং মানুষের জন্যে একটা নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তার মাতার গর্ভাশয়ই বাসস্থান হয়ে থাকে। সেখানে সে এক অবস্থা হতে অন্য অবস্থার দিকে এবং এক আকার হতে অন্য আকারের দিকে পরিবর্তিত হতে থাকে। তারপর শুক্র, যা তীব্রবেগে বহির্গত হয় এমন পানি, যা পুরুষের পৃষ্ঠদেশ হতে ও নারীর বক্ষদেশ হতে বহির্গত হয়, রূপ পরিবর্তন করে লাল রঙ-এর পিণ্ডে রূপান্তরিত হয়। এরপর ওটা গোশ্তপিণ্ডের রূপে পরিবর্তিত হয়। তখন তাতে কোন আকার বা কোন রেখা থাকে না। তারপর তাতে অস্থি তৈরী করেন এবং মাথা, হাত, পা, হাড়, শিরা, পাছা ইত্যাদি বানিয়ে দেন। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষের সারা দেহ গলে পচে যায়, শুধু মেরুদণ্ডের (পাছার) হাড়টি অবশিষ্ট থাকে। ওর থেকেই তাকে (পুনরায়) সৃষ্টি করা হবে এবং পুনর্গঠন করা হবে।”মহান আল্লাহ বলেন, অতঃপর অস্থি-পঞ্জরকে আমি গোশ্ত দ্বারা ঢেকে দিই, যেন তা গুপ্ত ও দৃঢ় থাকে। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাতে রূহ ফুকে দেন, যাতে সে নড়া চড়া করা ও চলাফেলা করার যোগ্য হয়ে ওঠে। ঐ সময় সে জীবন্ত মানবরূপ ধারণ করে। সে দেখার, শুনার, বুঝার, নড়ার এবং স্থির থাকার শক্তি প্রাপ্ত হয়। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান! হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেন যে, যখন শুক্রের উপর চার মাস অতিবাহিত হয় তখন আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দেন যিনি তিন তিনটি অন্ধকারের মধ্যে রুহ ফুঁকে দেন। অবশেষে ওকে গড়ে তুলি এক সৃফিলে আল্লাহ পাকের এই উক্তির অর্থ এটাই। অর্থাৎ দ্বিতীয় এর এই সৃষ্টি রা রুহ ফুঁকে দেয়াকেই বুঝানো হয়েছে। সুতরাং মায়ের পেটের মধ্যে এক অবস্থা হতে দ্বিতীয় অবস্থায় এবং দ্বিতীয় হতে তৃতীয় অবস্থায় রূপান্তরিত হওয়ার পর একেবারে অবুঝ ও জ্ঞান শূন্য নিলে সে জাহণ করে। তারপর সে ধীরে ধীরে বড় হতে হতে যৌবনে গান করে। তারপর হয় পৌঢ় এবং এর পর বার্ধক্যে পৌঁছে যায়। পরিশেষে সে সম্পূর্ণরূপে বৃদ্ধ হয়ে পড়ে। মোটকথা রূহ ফুঁকে দেয়া হয় এবং পরে এসব বৃত্তির সাধিত হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন ধিৰি সত্যবাদী ও সত্যায়িতঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি (এর মাধ্যম শুক্র) তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত জমা থাকে। তারপর ওটা চল্লিশ দিন পর্যন্ত রক্তপিণ্ডের আকারে থাকে। এর চল্লিশ দিন পর্যন্ত গোশ্তপিণ্ডের রূপ ধারণ করে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা একজন ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দেন, যিনি তাতে ফুঁকে দেন এবং আল্লাহর নির্দেশক্রমে চারটি বিষয় লিখে নেন। তাহলো তার বিষক, আয়ুষ্কাল, আমল এবং সে হতভাগ্য হবে কি সৌভাগ্যবান হবে। যিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই তাঁর শপথ! এক ব্যক্তি জান্নাতবাসীর আমল করতে থাকে, এমনকি সে জান্নাত হতে শুধুমাত্র এক হাত দূরে রয়ে যায়। এমতাবস্থায় তার তকদীরের লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়ে যায়, ফলে সে শেষ অবস্থায় জাহান্নামবাসীর আমল করতে শুরু করে এবং ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং সে জাহান্নামী হয়ে যায়। অনুরূপভাবে অন্য একটি লোক খারাপ কাজ করতে করতে জাহান্নাম হতে মাত্র এক হাত দূরে রয়ে যায়। কিন্তু তকদীরের লিখন অগ্রগামী হয় এবং শেষ জীবনে সে জান্নাতবাসীর আমল করতে শুরু করে দেয়। সুতরাং সে জান্নাতবাসী হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, শুক্র বা বীর্য যখন গর্ভাশয়ে পতিত হয় তখন ওটা প্রত্যেক চুল ও নখের স্থানে পৌছে যায়। অতঃপর চল্লিশ দিন পরে ওটা জমাট রক্তের আকার ধারণ করে। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের (রাঃ) সাথে কথাবার্তা বলছিলেন, এমন সময় একজন ইয়াহুদী আগমন করে। তখন কুরায়েশ কাফিররা তাকে বলেঃ “হে ইয়াহুদী! এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) নবুওয়াতের দাবী করছেন। সে তখন বলেঃ “আচ্ছা, আমি তাকে এমন এক প্রশ্ন করাবো যার উত্তর নবী ছাড়া আর কেউ দিতে পারে না।” অতঃপর সে নবী (সঃ)-এর মজলিসে এসে বসে পড়ে। সে প্রশ্ন করেঃ “আচ্ছা বলুন তো, মানুষের জন্ম কি জিনিস থেকে হয়?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “পুরুষ ও স্ত্রীর মিলিত শুক্রের মাধ্যমে। পুরুষের শুক্র মোটা ও গাঢ় হয় এবং তার থেকে অস্থি ও পাছা বা নিতম্ব গঠিত হয়। আর স্ত্রীর শুক্র হয় তরল ও পাতলা। তার থেকে গঠিত হয় গোশ্ত ও রক্ত। তাঁর এই জবাব শুনে ইয়াহূদী বলেঃ “আপনি সত্য বলেছেন। পূর্ববর্তী নবীদেরও (আঃ) উক্তি এটাই ছিল।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত হুযাইফা ইবনে উসাইদ আল গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেন, গর্ভাশয়ে শুক্রের যখন চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয় তখন একজন ফেরেশতা আগমন করেন এবং আল্লাহ তা'আলাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ ভাল হবে, না মন্দ হবে? নর হবে না নারী হবে?” উত্তরে যা বলা হয় তাই তিনি লিখে নেন এবং তার আমল, বয়স, বিপদ-আপদ, রিযক ইত্যাদি সবকিছু লিখে ফেলেন। তারপর ঐ খাতাপত্র জড়িয়ে নেয়া হয় এবং তাতে কমবেশী করার কোন অবকাশ থাকে না। (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিমও (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা গর্ভাশয়ে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন যিনি আরয করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! এখন শুক্র। হে আল্লাহ! এখন রক্তপিণ্ড। হে আমার প্রতিপালক! এখন গোশ্তপিণ্ড।” যখন আল্লাহ তা'আলা ওকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন তখন ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহ! নর হবে, না নারী হবে? দুর্ভাগা হবে, না ভাগ্যবান হবে? এর রিযক কি হবে এবং আয়ুষ্কাল কত হবে?” তখন আল্লাহ তা'আলা উত্তর দেন এবং তিনি তার মায়ের পেটেই সবকিছু লিখে নেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)এসব কথা এবং নিজের পূর্ণ ও ব্যাপক ক্ষমতার বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ বলেনঃ অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান! হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “আমি চারটি বিষয়ে আমার প্রতিপালকের আনুকূল্য করেছি। যখন তিনি (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার মুখ হতে বেরিয়ে যায় (আরবী) অর্থাৎ “সর্বোত্তম সৃষ্টিকর্তা কতই না মহান! আমার প্রতিপালক পরে এটাই আবার অবতীর্ণ করেন।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমির শা’বী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত আনসারী (রাঃ)-কে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো লিখাতে ছিলেন তখন হযরত মুআয (রাঃ) হঠাৎ করে (আরবী)-এই অংশটুকু বলে ফেলেন। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে ওঠেন। তাঁকে হাসতে দেখে হযরত মুআয (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার হাসার কারণ কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমার এই কথার দ্বারাই এই আয়াতকে সমাপ্ত করা হয়েছে।” (এই হাদীসের সনদে জাবির জুফী নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন যিনি খুবই দুর্বল। আর এ বিওয়াইয়াতটি সম্পূর্ণরূপে মুনকার বা অনস্বীকার্য। অহী লেখক হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) মদীনায় ছিলেন, মক্কায় নয়। হযরত মুআয (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও মদীনার ঘটনা। অথচ এই আয়াত অবতীর্ণ হয় মক্কায়। সুতরাং উল্লিখিত রিওয়াইয়াত নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ এই প্রথম সৃষ্টির পর তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমরা পুনরুত্থিত হবে। তারপর তোমাদের হিসাব নিকাশ হবে এবং ভাল ও মন্দ কর্মের প্রতিদান প্রাপ্ত হবে।
আল-মুমিনুন 23:14
১২-১৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রাথমিক সৃষ্টির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি হযরত আদিম (আঃ)-কে মাটির দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যা কাদা ও বেজে ওঠে এমন মাটির আকারে ছিল। অতঃপর হযরত আদম (আঃ)-এর শুক্র হতে তার সন্তানদেরকে সৃষ্টি করা হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটাও একটি নিদর্শন যে, তিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমরা এখন মানুষরূপে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছো।” (৩০:২০)হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে এক মুষ্টি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যা তিনি সমস্ত যমীন হতে গ্রহণ করেছিলেন। এ হিসেবেই হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানদের রূপ ও রঙ বিভিন্ন রকম হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ হয়েছে লাল, কেউ সাদা, কেউ কালো এবং কেউ হয়েছে অন্য রঙ-এর। তাদের মধ্যে অশ্লীলও রয়েছে, পবিত্রও রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)(আরবী) এর মধ্যে (আরবী) সর্বনামটি (আরবী) (মানবজাতি)-এর দিকে ফিরেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি কর্দম হতে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তার বংশ উৎপন্ন করেছেন তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস হতে।” (৩২:৭-৮) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি (শুক্র) হতে সৃষ্টি করিনি, অতঃপর স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে?" (৭৭:২০-২১) সুতরাং মানুষের জন্যে একটা নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তার মাতার গর্ভাশয়ই বাসস্থান হয়ে থাকে। সেখানে সে এক অবস্থা হতে অন্য অবস্থার দিকে এবং এক আকার হতে অন্য আকারের দিকে পরিবর্তিত হতে থাকে। তারপর শুক্র, যা তীব্রবেগে বহির্গত হয় এমন পানি, যা পুরুষের পৃষ্ঠদেশ হতে ও নারীর বক্ষদেশ হতে বহির্গত হয়, রূপ পরিবর্তন করে লাল রঙ-এর পিণ্ডে রূপান্তরিত হয়। এরপর ওটা গোশ্তপিণ্ডের রূপে পরিবর্তিত হয়। তখন তাতে কোন আকার বা কোন রেখা থাকে না। তারপর তাতে অস্থি তৈরী করেন এবং মাথা, হাত, পা, হাড়, শিরা, পাছা ইত্যাদি বানিয়ে দেন। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষের সারা দেহ গলে পচে যায়, শুধু মেরুদণ্ডের (পাছার) হাড়টি অবশিষ্ট থাকে। ওর থেকেই তাকে (পুনরায়) সৃষ্টি করা হবে এবং পুনর্গঠন করা হবে।”মহান আল্লাহ বলেন, অতঃপর অস্থি-পঞ্জরকে আমি গোশ্ত দ্বারা ঢেকে দিই, যেন তা গুপ্ত ও দৃঢ় থাকে। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাতে রূহ ফুকে দেন, যাতে সে নড়া চড়া করা ও চলাফেলা করার যোগ্য হয়ে ওঠে। ঐ সময় সে জীবন্ত মানবরূপ ধারণ করে। সে দেখার, শুনার, বুঝার, নড়ার এবং স্থির থাকার শক্তি প্রাপ্ত হয়। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান! হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেন যে, যখন শুক্রের উপর চার মাস অতিবাহিত হয় তখন আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দেন যিনি তিন তিনটি অন্ধকারের মধ্যে রুহ ফুঁকে দেন। অবশেষে ওকে গড়ে তুলি এক সৃফিলে আল্লাহ পাকের এই উক্তির অর্থ এটাই। অর্থাৎ দ্বিতীয় এর এই সৃষ্টি রা রুহ ফুঁকে দেয়াকেই বুঝানো হয়েছে। সুতরাং মায়ের পেটের মধ্যে এক অবস্থা হতে দ্বিতীয় অবস্থায় এবং দ্বিতীয় হতে তৃতীয় অবস্থায় রূপান্তরিত হওয়ার পর একেবারে অবুঝ ও জ্ঞান শূন্য নিলে সে জাহণ করে। তারপর সে ধীরে ধীরে বড় হতে হতে যৌবনে গান করে। তারপর হয় পৌঢ় এবং এর পর বার্ধক্যে পৌঁছে যায়। পরিশেষে সে সম্পূর্ণরূপে বৃদ্ধ হয়ে পড়ে। মোটকথা রূহ ফুঁকে দেয়া হয় এবং পরে এসব বৃত্তির সাধিত হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন ধিৰি সত্যবাদী ও সত্যায়িতঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি (এর মাধ্যম শুক্র) তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত জমা থাকে। তারপর ওটা চল্লিশ দিন পর্যন্ত রক্তপিণ্ডের আকারে থাকে। এর চল্লিশ দিন পর্যন্ত গোশ্তপিণ্ডের রূপ ধারণ করে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা একজন ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দেন, যিনি তাতে ফুঁকে দেন এবং আল্লাহর নির্দেশক্রমে চারটি বিষয় লিখে নেন। তাহলো তার বিষক, আয়ুষ্কাল, আমল এবং সে হতভাগ্য হবে কি সৌভাগ্যবান হবে। যিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই তাঁর শপথ! এক ব্যক্তি জান্নাতবাসীর আমল করতে থাকে, এমনকি সে জান্নাত হতে শুধুমাত্র এক হাত দূরে রয়ে যায়। এমতাবস্থায় তার তকদীরের লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়ে যায়, ফলে সে শেষ অবস্থায় জাহান্নামবাসীর আমল করতে শুরু করে এবং ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং সে জাহান্নামী হয়ে যায়। অনুরূপভাবে অন্য একটি লোক খারাপ কাজ করতে করতে জাহান্নাম হতে মাত্র এক হাত দূরে রয়ে যায়। কিন্তু তকদীরের লিখন অগ্রগামী হয় এবং শেষ জীবনে সে জান্নাতবাসীর আমল করতে শুরু করে দেয়। সুতরাং সে জান্নাতবাসী হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, শুক্র বা বীর্য যখন গর্ভাশয়ে পতিত হয় তখন ওটা প্রত্যেক চুল ও নখের স্থানে পৌছে যায়। অতঃপর চল্লিশ দিন পরে ওটা জমাট রক্তের আকার ধারণ করে। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের (রাঃ) সাথে কথাবার্তা বলছিলেন, এমন সময় একজন ইয়াহুদী আগমন করে। তখন কুরায়েশ কাফিররা তাকে বলেঃ “হে ইয়াহুদী! এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) নবুওয়াতের দাবী করছেন। সে তখন বলেঃ “আচ্ছা, আমি তাকে এমন এক প্রশ্ন করাবো যার উত্তর নবী ছাড়া আর কেউ দিতে পারে না।” অতঃপর সে নবী (সঃ)-এর মজলিসে এসে বসে পড়ে। সে প্রশ্ন করেঃ “আচ্ছা বলুন তো, মানুষের জন্ম কি জিনিস থেকে হয়?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “পুরুষ ও স্ত্রীর মিলিত শুক্রের মাধ্যমে। পুরুষের শুক্র মোটা ও গাঢ় হয় এবং তার থেকে অস্থি ও পাছা বা নিতম্ব গঠিত হয়। আর স্ত্রীর শুক্র হয় তরল ও পাতলা। তার থেকে গঠিত হয় গোশ্ত ও রক্ত। তাঁর এই জবাব শুনে ইয়াহূদী বলেঃ “আপনি সত্য বলেছেন। পূর্ববর্তী নবীদেরও (আঃ) উক্তি এটাই ছিল।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত হুযাইফা ইবনে উসাইদ আল গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেন, গর্ভাশয়ে শুক্রের যখন চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয় তখন একজন ফেরেশতা আগমন করেন এবং আল্লাহ তা'আলাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ ভাল হবে, না মন্দ হবে? নর হবে না নারী হবে?” উত্তরে যা বলা হয় তাই তিনি লিখে নেন এবং তার আমল, বয়স, বিপদ-আপদ, রিযক ইত্যাদি সবকিছু লিখে ফেলেন। তারপর ঐ খাতাপত্র জড়িয়ে নেয়া হয় এবং তাতে কমবেশী করার কোন অবকাশ থাকে না। (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিমও (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা গর্ভাশয়ে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন যিনি আরয করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! এখন শুক্র। হে আল্লাহ! এখন রক্তপিণ্ড। হে আমার প্রতিপালক! এখন গোশ্তপিণ্ড।” যখন আল্লাহ তা'আলা ওকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন তখন ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহ! নর হবে, না নারী হবে? দুর্ভাগা হবে, না ভাগ্যবান হবে? এর রিযক কি হবে এবং আয়ুষ্কাল কত হবে?” তখন আল্লাহ তা'আলা উত্তর দেন এবং তিনি তার মায়ের পেটেই সবকিছু লিখে নেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)এসব কথা এবং নিজের পূর্ণ ও ব্যাপক ক্ষমতার বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ বলেনঃ অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান! হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “আমি চারটি বিষয়ে আমার প্রতিপালকের আনুকূল্য করেছি। যখন তিনি (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার মুখ হতে বেরিয়ে যায় (আরবী) অর্থাৎ “সর্বোত্তম সৃষ্টিকর্তা কতই না মহান! আমার প্রতিপালক পরে এটাই আবার অবতীর্ণ করেন।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমির শা’বী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত আনসারী (রাঃ)-কে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো লিখাতে ছিলেন তখন হযরত মুআয (রাঃ) হঠাৎ করে (আরবী)-এই অংশটুকু বলে ফেলেন। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে ওঠেন। তাঁকে হাসতে দেখে হযরত মুআয (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার হাসার কারণ কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমার এই কথার দ্বারাই এই আয়াতকে সমাপ্ত করা হয়েছে।” (এই হাদীসের সনদে জাবির জুফী নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন যিনি খুবই দুর্বল। আর এ বিওয়াইয়াতটি সম্পূর্ণরূপে মুনকার বা অনস্বীকার্য। অহী লেখক হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) মদীনায় ছিলেন, মক্কায় নয়। হযরত মুআয (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও মদীনার ঘটনা। অথচ এই আয়াত অবতীর্ণ হয় মক্কায়। সুতরাং উল্লিখিত রিওয়াইয়াত নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ এই প্রথম সৃষ্টির পর তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমরা পুনরুত্থিত হবে। তারপর তোমাদের হিসাব নিকাশ হবে এবং ভাল ও মন্দ কর্মের প্রতিদান প্রাপ্ত হবে।
আল-মুমিনুন 23:15
১২-১৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রাথমিক সৃষ্টির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি হযরত আদিম (আঃ)-কে মাটির দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যা কাদা ও বেজে ওঠে এমন মাটির আকারে ছিল। অতঃপর হযরত আদম (আঃ)-এর শুক্র হতে তার সন্তানদেরকে সৃষ্টি করা হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটাও একটি নিদর্শন যে, তিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমরা এখন মানুষরূপে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছো।” (৩০:২০)হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে এক মুষ্টি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যা তিনি সমস্ত যমীন হতে গ্রহণ করেছিলেন। এ হিসেবেই হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানদের রূপ ও রঙ বিভিন্ন রকম হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ হয়েছে লাল, কেউ সাদা, কেউ কালো এবং কেউ হয়েছে অন্য রঙ-এর। তাদের মধ্যে অশ্লীলও রয়েছে, পবিত্রও রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)(আরবী) এর মধ্যে (আরবী) সর্বনামটি (আরবী) (মানবজাতি)-এর দিকে ফিরেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি কর্দম হতে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তার বংশ উৎপন্ন করেছেন তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস হতে।” (৩২:৭-৮) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি (শুক্র) হতে সৃষ্টি করিনি, অতঃপর স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে?" (৭৭:২০-২১) সুতরাং মানুষের জন্যে একটা নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তার মাতার গর্ভাশয়ই বাসস্থান হয়ে থাকে। সেখানে সে এক অবস্থা হতে অন্য অবস্থার দিকে এবং এক আকার হতে অন্য আকারের দিকে পরিবর্তিত হতে থাকে। তারপর শুক্র, যা তীব্রবেগে বহির্গত হয় এমন পানি, যা পুরুষের পৃষ্ঠদেশ হতে ও নারীর বক্ষদেশ হতে বহির্গত হয়, রূপ পরিবর্তন করে লাল রঙ-এর পিণ্ডে রূপান্তরিত হয়। এরপর ওটা গোশ্তপিণ্ডের রূপে পরিবর্তিত হয়। তখন তাতে কোন আকার বা কোন রেখা থাকে না। তারপর তাতে অস্থি তৈরী করেন এবং মাথা, হাত, পা, হাড়, শিরা, পাছা ইত্যাদি বানিয়ে দেন। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষের সারা দেহ গলে পচে যায়, শুধু মেরুদণ্ডের (পাছার) হাড়টি অবশিষ্ট থাকে। ওর থেকেই তাকে (পুনরায়) সৃষ্টি করা হবে এবং পুনর্গঠন করা হবে।”মহান আল্লাহ বলেন, অতঃপর অস্থি-পঞ্জরকে আমি গোশ্ত দ্বারা ঢেকে দিই, যেন তা গুপ্ত ও দৃঢ় থাকে। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাতে রূহ ফুকে দেন, যাতে সে নড়া চড়া করা ও চলাফেলা করার যোগ্য হয়ে ওঠে। ঐ সময় সে জীবন্ত মানবরূপ ধারণ করে। সে দেখার, শুনার, বুঝার, নড়ার এবং স্থির থাকার শক্তি প্রাপ্ত হয়। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান! হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেন যে, যখন শুক্রের উপর চার মাস অতিবাহিত হয় তখন আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দেন যিনি তিন তিনটি অন্ধকারের মধ্যে রুহ ফুঁকে দেন। অবশেষে ওকে গড়ে তুলি এক সৃফিলে আল্লাহ পাকের এই উক্তির অর্থ এটাই। অর্থাৎ দ্বিতীয় এর এই সৃষ্টি রা রুহ ফুঁকে দেয়াকেই বুঝানো হয়েছে। সুতরাং মায়ের পেটের মধ্যে এক অবস্থা হতে দ্বিতীয় অবস্থায় এবং দ্বিতীয় হতে তৃতীয় অবস্থায় রূপান্তরিত হওয়ার পর একেবারে অবুঝ ও জ্ঞান শূন্য নিলে সে জাহণ করে। তারপর সে ধীরে ধীরে বড় হতে হতে যৌবনে গান করে। তারপর হয় পৌঢ় এবং এর পর বার্ধক্যে পৌঁছে যায়। পরিশেষে সে সম্পূর্ণরূপে বৃদ্ধ হয়ে পড়ে। মোটকথা রূহ ফুঁকে দেয়া হয় এবং পরে এসব বৃত্তির সাধিত হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন ধিৰি সত্যবাদী ও সত্যায়িতঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি (এর মাধ্যম শুক্র) তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত জমা থাকে। তারপর ওটা চল্লিশ দিন পর্যন্ত রক্তপিণ্ডের আকারে থাকে। এর চল্লিশ দিন পর্যন্ত গোশ্তপিণ্ডের রূপ ধারণ করে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা একজন ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দেন, যিনি তাতে ফুঁকে দেন এবং আল্লাহর নির্দেশক্রমে চারটি বিষয় লিখে নেন। তাহলো তার বিষক, আয়ুষ্কাল, আমল এবং সে হতভাগ্য হবে কি সৌভাগ্যবান হবে। যিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই তাঁর শপথ! এক ব্যক্তি জান্নাতবাসীর আমল করতে থাকে, এমনকি সে জান্নাত হতে শুধুমাত্র এক হাত দূরে রয়ে যায়। এমতাবস্থায় তার তকদীরের লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়ে যায়, ফলে সে শেষ অবস্থায় জাহান্নামবাসীর আমল করতে শুরু করে এবং ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং সে জাহান্নামী হয়ে যায়। অনুরূপভাবে অন্য একটি লোক খারাপ কাজ করতে করতে জাহান্নাম হতে মাত্র এক হাত দূরে রয়ে যায়। কিন্তু তকদীরের লিখন অগ্রগামী হয় এবং শেষ জীবনে সে জান্নাতবাসীর আমল করতে শুরু করে দেয়। সুতরাং সে জান্নাতবাসী হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, শুক্র বা বীর্য যখন গর্ভাশয়ে পতিত হয় তখন ওটা প্রত্যেক চুল ও নখের স্থানে পৌছে যায়। অতঃপর চল্লিশ দিন পরে ওটা জমাট রক্তের আকার ধারণ করে। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের (রাঃ) সাথে কথাবার্তা বলছিলেন, এমন সময় একজন ইয়াহুদী আগমন করে। তখন কুরায়েশ কাফিররা তাকে বলেঃ “হে ইয়াহুদী! এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) নবুওয়াতের দাবী করছেন। সে তখন বলেঃ “আচ্ছা, আমি তাকে এমন এক প্রশ্ন করাবো যার উত্তর নবী ছাড়া আর কেউ দিতে পারে না।” অতঃপর সে নবী (সঃ)-এর মজলিসে এসে বসে পড়ে। সে প্রশ্ন করেঃ “আচ্ছা বলুন তো, মানুষের জন্ম কি জিনিস থেকে হয়?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “পুরুষ ও স্ত্রীর মিলিত শুক্রের মাধ্যমে। পুরুষের শুক্র মোটা ও গাঢ় হয় এবং তার থেকে অস্থি ও পাছা বা নিতম্ব গঠিত হয়। আর স্ত্রীর শুক্র হয় তরল ও পাতলা। তার থেকে গঠিত হয় গোশ্ত ও রক্ত। তাঁর এই জবাব শুনে ইয়াহূদী বলেঃ “আপনি সত্য বলেছেন। পূর্ববর্তী নবীদেরও (আঃ) উক্তি এটাই ছিল।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত হুযাইফা ইবনে উসাইদ আল গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেন, গর্ভাশয়ে শুক্রের যখন চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয় তখন একজন ফেরেশতা আগমন করেন এবং আল্লাহ তা'আলাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ ভাল হবে, না মন্দ হবে? নর হবে না নারী হবে?” উত্তরে যা বলা হয় তাই তিনি লিখে নেন এবং তার আমল, বয়স, বিপদ-আপদ, রিযক ইত্যাদি সবকিছু লিখে ফেলেন। তারপর ঐ খাতাপত্র জড়িয়ে নেয়া হয় এবং তাতে কমবেশী করার কোন অবকাশ থাকে না। (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিমও (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা গর্ভাশয়ে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন যিনি আরয করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! এখন শুক্র। হে আল্লাহ! এখন রক্তপিণ্ড। হে আমার প্রতিপালক! এখন গোশ্তপিণ্ড।” যখন আল্লাহ তা'আলা ওকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন তখন ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহ! নর হবে, না নারী হবে? দুর্ভাগা হবে, না ভাগ্যবান হবে? এর রিযক কি হবে এবং আয়ুষ্কাল কত হবে?” তখন আল্লাহ তা'আলা উত্তর দেন এবং তিনি তার মায়ের পেটেই সবকিছু লিখে নেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)এসব কথা এবং নিজের পূর্ণ ও ব্যাপক ক্ষমতার বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ বলেনঃ অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান! হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “আমি চারটি বিষয়ে আমার প্রতিপালকের আনুকূল্য করেছি। যখন তিনি (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার মুখ হতে বেরিয়ে যায় (আরবী) অর্থাৎ “সর্বোত্তম সৃষ্টিকর্তা কতই না মহান! আমার প্রতিপালক পরে এটাই আবার অবতীর্ণ করেন।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমির শা’বী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত আনসারী (রাঃ)-কে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো লিখাতে ছিলেন তখন হযরত মুআয (রাঃ) হঠাৎ করে (আরবী)-এই অংশটুকু বলে ফেলেন। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে ওঠেন। তাঁকে হাসতে দেখে হযরত মুআয (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার হাসার কারণ কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমার এই কথার দ্বারাই এই আয়াতকে সমাপ্ত করা হয়েছে।” (এই হাদীসের সনদে জাবির জুফী নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন যিনি খুবই দুর্বল। আর এ বিওয়াইয়াতটি সম্পূর্ণরূপে মুনকার বা অনস্বীকার্য। অহী লেখক হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) মদীনায় ছিলেন, মক্কায় নয়। হযরত মুআয (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও মদীনার ঘটনা। অথচ এই আয়াত অবতীর্ণ হয় মক্কায়। সুতরাং উল্লিখিত রিওয়াইয়াত নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ এই প্রথম সৃষ্টির পর তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমরা পুনরুত্থিত হবে। তারপর তোমাদের হিসাব নিকাশ হবে এবং ভাল ও মন্দ কর্মের প্রতিদান প্রাপ্ত হবে।
আল-মুমিনুন 23:16
১২-১৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রাথমিক সৃষ্টির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি হযরত আদিম (আঃ)-কে মাটির দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যা কাদা ও বেজে ওঠে এমন মাটির আকারে ছিল। অতঃপর হযরত আদম (আঃ)-এর শুক্র হতে তার সন্তানদেরকে সৃষ্টি করা হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটাও একটি নিদর্শন যে, তিনি তোমাদেরকে মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমরা এখন মানুষরূপে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছো।” (৩০:২০)হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে এক মুষ্টি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যা তিনি সমস্ত যমীন হতে গ্রহণ করেছিলেন। এ হিসেবেই হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানদের রূপ ও রঙ বিভিন্ন রকম হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ হয়েছে লাল, কেউ সাদা, কেউ কালো এবং কেউ হয়েছে অন্য রঙ-এর। তাদের মধ্যে অশ্লীলও রয়েছে, পবিত্রও রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)(আরবী) এর মধ্যে (আরবী) সর্বনামটি (আরবী) (মানবজাতি)-এর দিকে ফিরেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি কর্দম হতে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তার বংশ উৎপন্ন করেছেন তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস হতে।” (৩২:৭-৮) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি (শুক্র) হতে সৃষ্টি করিনি, অতঃপর স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে?" (৭৭:২০-২১) সুতরাং মানুষের জন্যে একটা নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তার মাতার গর্ভাশয়ই বাসস্থান হয়ে থাকে। সেখানে সে এক অবস্থা হতে অন্য অবস্থার দিকে এবং এক আকার হতে অন্য আকারের দিকে পরিবর্তিত হতে থাকে। তারপর শুক্র, যা তীব্রবেগে বহির্গত হয় এমন পানি, যা পুরুষের পৃষ্ঠদেশ হতে ও নারীর বক্ষদেশ হতে বহির্গত হয়, রূপ পরিবর্তন করে লাল রঙ-এর পিণ্ডে রূপান্তরিত হয়। এরপর ওটা গোশ্তপিণ্ডের রূপে পরিবর্তিত হয়। তখন তাতে কোন আকার বা কোন রেখা থাকে না। তারপর তাতে অস্থি তৈরী করেন এবং মাথা, হাত, পা, হাড়, শিরা, পাছা ইত্যাদি বানিয়ে দেন। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষের সারা দেহ গলে পচে যায়, শুধু মেরুদণ্ডের (পাছার) হাড়টি অবশিষ্ট থাকে। ওর থেকেই তাকে (পুনরায়) সৃষ্টি করা হবে এবং পুনর্গঠন করা হবে।”মহান আল্লাহ বলেন, অতঃপর অস্থি-পঞ্জরকে আমি গোশ্ত দ্বারা ঢেকে দিই, যেন তা গুপ্ত ও দৃঢ় থাকে। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাতে রূহ ফুকে দেন, যাতে সে নড়া চড়া করা ও চলাফেলা করার যোগ্য হয়ে ওঠে। ঐ সময় সে জীবন্ত মানবরূপ ধারণ করে। সে দেখার, শুনার, বুঝার, নড়ার এবং স্থির থাকার শক্তি প্রাপ্ত হয়। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান! হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেন যে, যখন শুক্রের উপর চার মাস অতিবাহিত হয় তখন আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দেন যিনি তিন তিনটি অন্ধকারের মধ্যে রুহ ফুঁকে দেন। অবশেষে ওকে গড়ে তুলি এক সৃফিলে আল্লাহ পাকের এই উক্তির অর্থ এটাই। অর্থাৎ দ্বিতীয় এর এই সৃষ্টি রা রুহ ফুঁকে দেয়াকেই বুঝানো হয়েছে। সুতরাং মায়ের পেটের মধ্যে এক অবস্থা হতে দ্বিতীয় অবস্থায় এবং দ্বিতীয় হতে তৃতীয় অবস্থায় রূপান্তরিত হওয়ার পর একেবারে অবুঝ ও জ্ঞান শূন্য নিলে সে জাহণ করে। তারপর সে ধীরে ধীরে বড় হতে হতে যৌবনে গান করে। তারপর হয় পৌঢ় এবং এর পর বার্ধক্যে পৌঁছে যায়। পরিশেষে সে সম্পূর্ণরূপে বৃদ্ধ হয়ে পড়ে। মোটকথা রূহ ফুঁকে দেয়া হয় এবং পরে এসব বৃত্তির সাধিত হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন ধিৰি সত্যবাদী ও সত্যায়িতঃ “তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি (এর মাধ্যম শুক্র) তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত জমা থাকে। তারপর ওটা চল্লিশ দিন পর্যন্ত রক্তপিণ্ডের আকারে থাকে। এর চল্লিশ দিন পর্যন্ত গোশ্তপিণ্ডের রূপ ধারণ করে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা একজন ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দেন, যিনি তাতে ফুঁকে দেন এবং আল্লাহর নির্দেশক্রমে চারটি বিষয় লিখে নেন। তাহলো তার বিষক, আয়ুষ্কাল, আমল এবং সে হতভাগ্য হবে কি সৌভাগ্যবান হবে। যিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই তাঁর শপথ! এক ব্যক্তি জান্নাতবাসীর আমল করতে থাকে, এমনকি সে জান্নাত হতে শুধুমাত্র এক হাত দূরে রয়ে যায়। এমতাবস্থায় তার তকদীরের লিখন তার উপর জয়যুক্ত হয়ে যায়, ফলে সে শেষ অবস্থায় জাহান্নামবাসীর আমল করতে শুরু করে এবং ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং সে জাহান্নামী হয়ে যায়। অনুরূপভাবে অন্য একটি লোক খারাপ কাজ করতে করতে জাহান্নাম হতে মাত্র এক হাত দূরে রয়ে যায়। কিন্তু তকদীরের লিখন অগ্রগামী হয় এবং শেষ জীবনে সে জান্নাতবাসীর আমল করতে শুরু করে দেয়। সুতরাং সে জান্নাতবাসী হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, শুক্র বা বীর্য যখন গর্ভাশয়ে পতিত হয় তখন ওটা প্রত্যেক চুল ও নখের স্থানে পৌছে যায়। অতঃপর চল্লিশ দিন পরে ওটা জমাট রক্তের আকার ধারণ করে। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের (রাঃ) সাথে কথাবার্তা বলছিলেন, এমন সময় একজন ইয়াহুদী আগমন করে। তখন কুরায়েশ কাফিররা তাকে বলেঃ “হে ইয়াহুদী! এই লোকটি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) নবুওয়াতের দাবী করছেন। সে তখন বলেঃ “আচ্ছা, আমি তাকে এমন এক প্রশ্ন করাবো যার উত্তর নবী ছাড়া আর কেউ দিতে পারে না।” অতঃপর সে নবী (সঃ)-এর মজলিসে এসে বসে পড়ে। সে প্রশ্ন করেঃ “আচ্ছা বলুন তো, মানুষের জন্ম কি জিনিস থেকে হয়?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “পুরুষ ও স্ত্রীর মিলিত শুক্রের মাধ্যমে। পুরুষের শুক্র মোটা ও গাঢ় হয় এবং তার থেকে অস্থি ও পাছা বা নিতম্ব গঠিত হয়। আর স্ত্রীর শুক্র হয় তরল ও পাতলা। তার থেকে গঠিত হয় গোশ্ত ও রক্ত। তাঁর এই জবাব শুনে ইয়াহূদী বলেঃ “আপনি সত্য বলেছেন। পূর্ববর্তী নবীদেরও (আঃ) উক্তি এটাই ছিল।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত হুযাইফা ইবনে উসাইদ আল গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেন, গর্ভাশয়ে শুক্রের যখন চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয় তখন একজন ফেরেশতা আগমন করেন এবং আল্লাহ তা'আলাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ ভাল হবে, না মন্দ হবে? নর হবে না নারী হবে?” উত্তরে যা বলা হয় তাই তিনি লিখে নেন এবং তার আমল, বয়স, বিপদ-আপদ, রিযক ইত্যাদি সবকিছু লিখে ফেলেন। তারপর ঐ খাতাপত্র জড়িয়ে নেয়া হয় এবং তাতে কমবেশী করার কোন অবকাশ থাকে না। (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিমও (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা গর্ভাশয়ে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন যিনি আরয করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! এখন শুক্র। হে আল্লাহ! এখন রক্তপিণ্ড। হে আমার প্রতিপালক! এখন গোশ্তপিণ্ড।” যখন আল্লাহ তা'আলা ওকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন তখন ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহ! নর হবে, না নারী হবে? দুর্ভাগা হবে, না ভাগ্যবান হবে? এর রিযক কি হবে এবং আয়ুষ্কাল কত হবে?” তখন আল্লাহ তা'আলা উত্তর দেন এবং তিনি তার মায়ের পেটেই সবকিছু লিখে নেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে তাখরীজ করেছেন)এসব কথা এবং নিজের পূর্ণ ও ব্যাপক ক্ষমতার বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ বলেনঃ অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান! হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “আমি চারটি বিষয়ে আমার প্রতিপালকের আনুকূল্য করেছি। যখন তিনি (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার মুখ হতে বেরিয়ে যায় (আরবী) অর্থাৎ “সর্বোত্তম সৃষ্টিকর্তা কতই না মহান! আমার প্রতিপালক পরে এটাই আবার অবতীর্ণ করেন।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমির শা’বী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত আনসারী (রাঃ)-কে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো লিখাতে ছিলেন তখন হযরত মুআয (রাঃ) হঠাৎ করে (আরবী)-এই অংশটুকু বলে ফেলেন। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে ওঠেন। তাঁকে হাসতে দেখে হযরত মুআয (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার হাসার কারণ কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমার এই কথার দ্বারাই এই আয়াতকে সমাপ্ত করা হয়েছে।” (এই হাদীসের সনদে জাবির জুফী নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন যিনি খুবই দুর্বল। আর এ বিওয়াইয়াতটি সম্পূর্ণরূপে মুনকার বা অনস্বীকার্য। অহী লেখক হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) মদীনায় ছিলেন, মক্কায় নয়। হযরত মুআয (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও মদীনার ঘটনা। অথচ এই আয়াত অবতীর্ণ হয় মক্কায়। সুতরাং উল্লিখিত রিওয়াইয়াত নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ এই প্রথম সৃষ্টির পর তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমরা পুনরুত্থিত হবে। তারপর তোমাদের হিসাব নিকাশ হবে এবং ভাল ও মন্দ কর্মের প্রতিদান প্রাপ্ত হবে।
আল-মুমিনুন 23:17
মানব সৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আকাশসমূহের সৃষ্টির বর্ণনা দিচ্ছেন। মানব সৃষ্টির তুলনায় আকাশসমূহের সৃষ্টি বহুগুণে বেশী শিল্প চাতুর্যের পরিচায়ক। সূরায়ে আলিফ-লাম-মীম সাজদাহতেও এরই বর্ণনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জুমআর দিন ফজরের নামাযের প্রথম রাকআতে এই সূরাটি পাঠ করতেন। সেখানে প্রথমে আসমান ও যমীনের সষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তারপর মানব সৃষ্টির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এরপর পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে।এখানে মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তো তোমাদের উর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সপ্তস্তর। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সপ্ত আকাশ ও যমীন এবং এতোদুভয়ের মধ্যে যত কিছু রয়েছে সবই তার মহিমা কীর্তন করে।” (১৭:৪৪) অন্য এক স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি দেখেনি যে, কিভাবে আল্লাহ সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন?” (৭১:১৫) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সপ্ত আকাশ এবং পৃথিবীও ওগুলোর মতই, ওগুলোর মধ্যে নেমে আসে তাঁর নির্দেশ; ফলে তোমরা বুঝতে পার যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান এবং জ্ঞানে আল্লাহ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।” (৬৫: ১২)আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নই। অর্থাৎ তিনি জানেন যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা কিছু তা হতে বের হয় এবং আকাশ হতে যা কিছু নামে ও আকাশে যা কিছু উথিত হয়। তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সাথে আছেন; তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেন। আকাশের উচ্চ হতে উচ্চতম স্থানে অবস্থিত জিনিস, যমীনের গোপনীয় জিনিস, পর্বতের শৃঙ্গ, সমুদ্রের তলদেশ ইত্যাদি সবকিছুই তাঁর সামনে প্রকাশমান। পাহাড়-পর্বত-টিলা, মরুভূমি, সমুদ্র, ময়দান ইত্যাদি সবকিছুরই খবর তিনি রাখেন। গাছের এমন কোন পাতা ঝরে পড়ে না যা তাঁর জানা থাকে না, যমীনের অন্ধকারে এমন বীজ নেই যা তাঁর অজানা রয়েছে এবং এমন কোন আর্দ্র ও শুষ্ক জিনিস নেই যা প্রকাশ্য কিতাবে বিদ্যমান নেই।
আল-মুমিনুন 23:18
১৮-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলার তো অসংখ্য নিয়ামত রয়েছে, কিন্তু এখানে তিনি তাঁর কতকগুলো বড় বড় নিয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেন যে, তিনি প্রয়োজন অনুপাতে আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন। তিনি এতো বেশী বৃষ্টি বর্ষণ করেন না যে, তার ফলে যমীন খারাপ হয়ে যায় এবং শস্য পচে সড়ে নষ্ট হয়ে যায়। আবার এতো কমও নয় যে, ফল, শস্য ইত্যাদি জন্মেই না। বরং এমন পরিমিতভাবে তিনি বৃষ্টি দিয়ে থাকেন যে, এর ফলে শস্যক্ষেত্র সবুজ-শ্যামল থাকে এবং ফলের বাগান তরুতাজা হয়। পুকুর-পুষ্করিণী, নদ-নদী এবং খাল-বিল পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। ফলে নিজেদের পান করা এবং গবাদি পশুগুলোকে পান করানোর কোন অসুবিধা হয় না। যেখানে পানির বেশী প্রয়োজন সেখানে বেশী পানি বর্ষিত হয় এবং যেখানে কম প্রয়োজন সেখানে কম। আর যেখানকার ভূমি এর যোগ্যতাই রাখে না সেখানে পানি মোটেই বর্ষিত হয় না। কিন্তু নদী-নালার সাহায্যে সেখানে পানি পৌছিয়ে দেয়া হয় এবং এভাবে সেখানকার ভূমিকে পরিতৃপ্ত করা হয়। যেমন মিসর অঞ্চলের মাটি, যা নীল নদীর পানিতে পরিতৃপ্ত হয়ে সদা সবুজ-শ্যামল ও সতেজ থাকে। ঐ পানির সাথে লাল মাটি আকর্ষণ করা হয়, যা হাবশা বা আবিসিনিয়া অঞ্চলে থাকে। সেখানকার বৃষ্টির সাথে থাকার মাটি বয়ে চলে আসে যা জমিতে এসে থেকে যায় এবং এর ফলে জমি চাষের উপযোগী হয়ে ওঠে। আসলে কিন্তু তথাকার মাটি লবণাক্ত এবং চাষের মোটেই উপযোগী নয়। আল্লাহ তা'আলার কি মহিমা! সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞাতা, ক্ষমাশীল ও দয়ালু আল্লাহর কি ক্ষমতা ও নিপুণতা যে, তিনি পানিকে জমিতে স্থির রাখেন এবং জমিকে ঐ পানি শোষণ করার ক্ষমতা দান করেন, যাতে ওটা ওর মধ্যেই বীজকে পানি পৌছিয়ে দিতে পারে।এরপর তিনি বলেনঃ আমি ঐ পানিকে অপসারিত করতেও সক্ষম অর্থাৎ আমি ইচ্ছা করলে পানি বর্ষণ নাও করতে পারি। আমি ইচ্ছা করলে ঐ পানি কংকরময় ভূমিতে এবং পাহাড়ে ও জঙ্গলে বর্ষাতে পারি। আমি যদি চাই তবে পানিকে তিক্ত ও লবণাক্ত করতে পারি। ফলে তা তোমরা নিজেরাও পান করতে পারবে না, তোমাদের গবাদি পশুকেও পান করাতে পারবে না এবং ঐ পানি দ্বারা ফসল উৎপাদন করতেও সক্ষম হবে না। আর তোমরা ঐ পানিতে গোসলও করতে পারবে না। আমি ইচ্ছা করলে মাটিতে ঐ শক্তি দিবো না যার সাহায্যে সে পানি শোষণ করতে পারে। বরং ঐ পানি মাটির উপরেই ভেসে বেড়াবে। এটাও আমার অধিকারে আছে যে, আমি এ পানি এমন দূর-দূরান্তের বিলে বর্ষিয়ে দিবো যে, তা তোমাদের কোনই কাজে আসবে না, তোমাদের কোনই উপকার হবে না। এটা আমার এক বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহ যে, মেঘ হতে আমি সুমিষ্ট, উত্তম, হালকা ও সুস্বাদু পানি বর্ষণ করে থাকি। অতঃপর ওটা জমিতে পৌছিয়ে দিই। ফলে জমিতে ফসল হয় এবং বাগানে পানি বর্ষণের ফলে বাগানের গাছ-পালাগুলো সতেজ হয়। তোমরা নিজেরা এই পানি পান কর, জীব-জন্তুকে পান করাও এবং এই পানিতে গোসল করে দেহ-মন পবিত্র করে থাকো। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেন। জমি শস্য-শ্যামল হয়ে ওঠে। ফলের বাগান সবুজশ্যামল আকার ধারণ করে। বাগান তখন সুন্দর ও সুদৃশ্য হয় এবং সাথে সাথে খুব উপকারী হয়। মহান আল্লাহ আরববাসীর পছন্দনীয় ফল খেজুর ও আঙ্গুর জন্মিয়ে থাকেন। অনুরূপভাবে প্রত্যেক দেশবাসীর জন্যেই তিনি বিভিন্ন প্রকারের ফলের ব্যবস্থা করে দেন। পুরোপুরিভাবে এগুলোর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ক্ষমতা কারো নেই। বহু ফল আল্লাহ মানুষকে দান করেছেন। যেগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করার সাথে সাথে তারা ওগুলোর স্বাদও গ্রহণ করে থাকে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ যায়তুন গাছের বর্ণনা দিচ্ছেন। ভূরে সীনা হলো ঐ পাহাড় যার উপর আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেছিলেন এবং ওর আশে পাশের পাহাড়গুলো। দূর ঐ পাহাড়কে বলে যাতে গাছপালা থাকে এবং থাকে সদা সবুজ-শ্যামল। এরূপ না হলে ওকে ‘জাবাল’ বলবে, তূর বলবে না। সুতরাং ভূরে সীনায় যে যায়তুন গাছ জন্মে তার থেকে তেল বের হয় এবং ওটা ভোজনকারীদের জন্যে তরকারীর কাজ দেয়। যেমন হযরত মালিক ইবনে রাবীআ সায়েদী আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যায়তুনের তেল খাও এবং (শরীরে) লাগাও, কেননা এটা কল্যাণময় গাছ হতে বের হয়ে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একবার একজন লোক আশুরা দিবসে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর বাড়ীতে অতিথি হন। তিনি তখন তাকে উটের মাথা (এর গোশ্ত) ও যায়তুনের তেল খেতে দেন। অতঃপর তিনি লোকটিকে বলেনঃ “এটা হচ্ছে ঐ বরকতময় গাছের তেল যার বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)-এর কাছে দিয়েছেন।” (এটা আবুল কাসেম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ চতুষ্পদ জন্তুর বর্ণনা দিচ্ছেন এবং ঐগুলোর দ্বারা মানুষ যে উপকার লাভ করে থাকে ঐসব নিয়ামতের কথা উল্লেখ করছেন। তিনি বলেনঃ তোমরা ওগুলোর দুধ পান করে থাকো, গোশ্ত ভক্ষণ কর এবং লোমে বা পশম দ্বারা পোষাক তৈরী করে থাকো। আর তোমরা ওগুলোর উপর ওয়ার হও, ওগুলোর উপর তোমাদের আসবাবপত্র চাপিয়ে দিয়ে দূর-দূরান্তে পৌঁছিয়ে থাকো। যদি এগুলো না থাকতো তবে তোমাদের এসব জিনিসপত্র অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া খুবই কষ্টকর হতো। সত্যি মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর খুবই দয়ালু ও অনুগ্রহশীল। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং ওগুলো তোমাদের ভার বহন করে নিয়ে যায় দূর দেশে যেখানে প্রাণান্ত ক্লেশ ব্যতীত তোমরা পৌছতে পারবে না; তোমাদের প্রতিপালক অবশ্যই দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” (১৬:৭) অন্যত্র বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা কি লক্ষ্য করে না যে, নিজ হাতে সৃষ্ট বস্তুগুলোর মধ্য হতে তাদের জন্য আমি সৃষ্টি করেছি চতুষ্পদ জন্তু এবং তারাই এগুলোর অধিকারী? আর আমি এগুলোকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছি; এগুলোর কতক তাদের বাহন এবং ওদের কতক তারা আহার করে। তাদের জন্যে এগুলোতে আছে বহু উপকার আর আছে পানীয় বস্তু; তবুও কি তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না?” (৩৬:৭১-৭৩)
আল-মুমিনুন 23:19
১৮-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলার তো অসংখ্য নিয়ামত রয়েছে, কিন্তু এখানে তিনি তাঁর কতকগুলো বড় বড় নিয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেন যে, তিনি প্রয়োজন অনুপাতে আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন। তিনি এতো বেশী বৃষ্টি বর্ষণ করেন না যে, তার ফলে যমীন খারাপ হয়ে যায় এবং শস্য পচে সড়ে নষ্ট হয়ে যায়। আবার এতো কমও নয় যে, ফল, শস্য ইত্যাদি জন্মেই না। বরং এমন পরিমিতভাবে তিনি বৃষ্টি দিয়ে থাকেন যে, এর ফলে শস্যক্ষেত্র সবুজ-শ্যামল থাকে এবং ফলের বাগান তরুতাজা হয়। পুকুর-পুষ্করিণী, নদ-নদী এবং খাল-বিল পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। ফলে নিজেদের পান করা এবং গবাদি পশুগুলোকে পান করানোর কোন অসুবিধা হয় না। যেখানে পানির বেশী প্রয়োজন সেখানে বেশী পানি বর্ষিত হয় এবং যেখানে কম প্রয়োজন সেখানে কম। আর যেখানকার ভূমি এর যোগ্যতাই রাখে না সেখানে পানি মোটেই বর্ষিত হয় না। কিন্তু নদী-নালার সাহায্যে সেখানে পানি পৌছিয়ে দেয়া হয় এবং এভাবে সেখানকার ভূমিকে পরিতৃপ্ত করা হয়। যেমন মিসর অঞ্চলের মাটি, যা নীল নদীর পানিতে পরিতৃপ্ত হয়ে সদা সবুজ-শ্যামল ও সতেজ থাকে। ঐ পানির সাথে লাল মাটি আকর্ষণ করা হয়, যা হাবশা বা আবিসিনিয়া অঞ্চলে থাকে। সেখানকার বৃষ্টির সাথে থাকার মাটি বয়ে চলে আসে যা জমিতে এসে থেকে যায় এবং এর ফলে জমি চাষের উপযোগী হয়ে ওঠে। আসলে কিন্তু তথাকার মাটি লবণাক্ত এবং চাষের মোটেই উপযোগী নয়। আল্লাহ তা'আলার কি মহিমা! সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞাতা, ক্ষমাশীল ও দয়ালু আল্লাহর কি ক্ষমতা ও নিপুণতা যে, তিনি পানিকে জমিতে স্থির রাখেন এবং জমিকে ঐ পানি শোষণ করার ক্ষমতা দান করেন, যাতে ওটা ওর মধ্যেই বীজকে পানি পৌছিয়ে দিতে পারে।এরপর তিনি বলেনঃ আমি ঐ পানিকে অপসারিত করতেও সক্ষম অর্থাৎ আমি ইচ্ছা করলে পানি বর্ষণ নাও করতে পারি। আমি ইচ্ছা করলে ঐ পানি কংকরময় ভূমিতে এবং পাহাড়ে ও জঙ্গলে বর্ষাতে পারি। আমি যদি চাই তবে পানিকে তিক্ত ও লবণাক্ত করতে পারি। ফলে তা তোমরা নিজেরাও পান করতে পারবে না, তোমাদের গবাদি পশুকেও পান করাতে পারবে না এবং ঐ পানি দ্বারা ফসল উৎপাদন করতেও সক্ষম হবে না। আর তোমরা ঐ পানিতে গোসলও করতে পারবে না। আমি ইচ্ছা করলে মাটিতে ঐ শক্তি দিবো না যার সাহায্যে সে পানি শোষণ করতে পারে। বরং ঐ পানি মাটির উপরেই ভেসে বেড়াবে। এটাও আমার অধিকারে আছে যে, আমি এ পানি এমন দূর-দূরান্তের বিলে বর্ষিয়ে দিবো যে, তা তোমাদের কোনই কাজে আসবে না, তোমাদের কোনই উপকার হবে না। এটা আমার এক বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহ যে, মেঘ হতে আমি সুমিষ্ট, উত্তম, হালকা ও সুস্বাদু পানি বর্ষণ করে থাকি। অতঃপর ওটা জমিতে পৌছিয়ে দিই। ফলে জমিতে ফসল হয় এবং বাগানে পানি বর্ষণের ফলে বাগানের গাছ-পালাগুলো সতেজ হয়। তোমরা নিজেরা এই পানি পান কর, জীব-জন্তুকে পান করাও এবং এই পানিতে গোসল করে দেহ-মন পবিত্র করে থাকো। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেন। জমি শস্য-শ্যামল হয়ে ওঠে। ফলের বাগান সবুজশ্যামল আকার ধারণ করে। বাগান তখন সুন্দর ও সুদৃশ্য হয় এবং সাথে সাথে খুব উপকারী হয়। মহান আল্লাহ আরববাসীর পছন্দনীয় ফল খেজুর ও আঙ্গুর জন্মিয়ে থাকেন। অনুরূপভাবে প্রত্যেক দেশবাসীর জন্যেই তিনি বিভিন্ন প্রকারের ফলের ব্যবস্থা করে দেন। পুরোপুরিভাবে এগুলোর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ক্ষমতা কারো নেই। বহু ফল আল্লাহ মানুষকে দান করেছেন। যেগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করার সাথে সাথে তারা ওগুলোর স্বাদও গ্রহণ করে থাকে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ যায়তুন গাছের বর্ণনা দিচ্ছেন। ভূরে সীনা হলো ঐ পাহাড় যার উপর আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেছিলেন এবং ওর আশে পাশের পাহাড়গুলো। দূর ঐ পাহাড়কে বলে যাতে গাছপালা থাকে এবং থাকে সদা সবুজ-শ্যামল। এরূপ না হলে ওকে ‘জাবাল’ বলবে, তূর বলবে না। সুতরাং ভূরে সীনায় যে যায়তুন গাছ জন্মে তার থেকে তেল বের হয় এবং ওটা ভোজনকারীদের জন্যে তরকারীর কাজ দেয়। যেমন হযরত মালিক ইবনে রাবীআ সায়েদী আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যায়তুনের তেল খাও এবং (শরীরে) লাগাও, কেননা এটা কল্যাণময় গাছ হতে বের হয়ে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একবার একজন লোক আশুরা দিবসে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর বাড়ীতে অতিথি হন। তিনি তখন তাকে উটের মাথা (এর গোশ্ত) ও যায়তুনের তেল খেতে দেন। অতঃপর তিনি লোকটিকে বলেনঃ “এটা হচ্ছে ঐ বরকতময় গাছের তেল যার বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)-এর কাছে দিয়েছেন।” (এটা আবুল কাসেম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ চতুষ্পদ জন্তুর বর্ণনা দিচ্ছেন এবং ঐগুলোর দ্বারা মানুষ যে উপকার লাভ করে থাকে ঐসব নিয়ামতের কথা উল্লেখ করছেন। তিনি বলেনঃ তোমরা ওগুলোর দুধ পান করে থাকো, গোশ্ত ভক্ষণ কর এবং লোমে বা পশম দ্বারা পোষাক তৈরী করে থাকো। আর তোমরা ওগুলোর উপর ওয়ার হও, ওগুলোর উপর তোমাদের আসবাবপত্র চাপিয়ে দিয়ে দূর-দূরান্তে পৌঁছিয়ে থাকো। যদি এগুলো না থাকতো তবে তোমাদের এসব জিনিসপত্র অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া খুবই কষ্টকর হতো। সত্যি মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর খুবই দয়ালু ও অনুগ্রহশীল। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং ওগুলো তোমাদের ভার বহন করে নিয়ে যায় দূর দেশে যেখানে প্রাণান্ত ক্লেশ ব্যতীত তোমরা পৌছতে পারবে না; তোমাদের প্রতিপালক অবশ্যই দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” (১৬:৭) অন্যত্র বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা কি লক্ষ্য করে না যে, নিজ হাতে সৃষ্ট বস্তুগুলোর মধ্য হতে তাদের জন্য আমি সৃষ্টি করেছি চতুষ্পদ জন্তু এবং তারাই এগুলোর অধিকারী? আর আমি এগুলোকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছি; এগুলোর কতক তাদের বাহন এবং ওদের কতক তারা আহার করে। তাদের জন্যে এগুলোতে আছে বহু উপকার আর আছে পানীয় বস্তু; তবুও কি তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না?” (৩৬:৭১-৭৩)
আল-মুমিনুন 23:20
১৮-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলার তো অসংখ্য নিয়ামত রয়েছে, কিন্তু এখানে তিনি তাঁর কতকগুলো বড় বড় নিয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেন যে, তিনি প্রয়োজন অনুপাতে আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন। তিনি এতো বেশী বৃষ্টি বর্ষণ করেন না যে, তার ফলে যমীন খারাপ হয়ে যায় এবং শস্য পচে সড়ে নষ্ট হয়ে যায়। আবার এতো কমও নয় যে, ফল, শস্য ইত্যাদি জন্মেই না। বরং এমন পরিমিতভাবে তিনি বৃষ্টি দিয়ে থাকেন যে, এর ফলে শস্যক্ষেত্র সবুজ-শ্যামল থাকে এবং ফলের বাগান তরুতাজা হয়। পুকুর-পুষ্করিণী, নদ-নদী এবং খাল-বিল পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। ফলে নিজেদের পান করা এবং গবাদি পশুগুলোকে পান করানোর কোন অসুবিধা হয় না। যেখানে পানির বেশী প্রয়োজন সেখানে বেশী পানি বর্ষিত হয় এবং যেখানে কম প্রয়োজন সেখানে কম। আর যেখানকার ভূমি এর যোগ্যতাই রাখে না সেখানে পানি মোটেই বর্ষিত হয় না। কিন্তু নদী-নালার সাহায্যে সেখানে পানি পৌছিয়ে দেয়া হয় এবং এভাবে সেখানকার ভূমিকে পরিতৃপ্ত করা হয়। যেমন মিসর অঞ্চলের মাটি, যা নীল নদীর পানিতে পরিতৃপ্ত হয়ে সদা সবুজ-শ্যামল ও সতেজ থাকে। ঐ পানির সাথে লাল মাটি আকর্ষণ করা হয়, যা হাবশা বা আবিসিনিয়া অঞ্চলে থাকে। সেখানকার বৃষ্টির সাথে থাকার মাটি বয়ে চলে আসে যা জমিতে এসে থেকে যায় এবং এর ফলে জমি চাষের উপযোগী হয়ে ওঠে। আসলে কিন্তু তথাকার মাটি লবণাক্ত এবং চাষের মোটেই উপযোগী নয়। আল্লাহ তা'আলার কি মহিমা! সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞাতা, ক্ষমাশীল ও দয়ালু আল্লাহর কি ক্ষমতা ও নিপুণতা যে, তিনি পানিকে জমিতে স্থির রাখেন এবং জমিকে ঐ পানি শোষণ করার ক্ষমতা দান করেন, যাতে ওটা ওর মধ্যেই বীজকে পানি পৌছিয়ে দিতে পারে।এরপর তিনি বলেনঃ আমি ঐ পানিকে অপসারিত করতেও সক্ষম অর্থাৎ আমি ইচ্ছা করলে পানি বর্ষণ নাও করতে পারি। আমি ইচ্ছা করলে ঐ পানি কংকরময় ভূমিতে এবং পাহাড়ে ও জঙ্গলে বর্ষাতে পারি। আমি যদি চাই তবে পানিকে তিক্ত ও লবণাক্ত করতে পারি। ফলে তা তোমরা নিজেরাও পান করতে পারবে না, তোমাদের গবাদি পশুকেও পান করাতে পারবে না এবং ঐ পানি দ্বারা ফসল উৎপাদন করতেও সক্ষম হবে না। আর তোমরা ঐ পানিতে গোসলও করতে পারবে না। আমি ইচ্ছা করলে মাটিতে ঐ শক্তি দিবো না যার সাহায্যে সে পানি শোষণ করতে পারে। বরং ঐ পানি মাটির উপরেই ভেসে বেড়াবে। এটাও আমার অধিকারে আছে যে, আমি এ পানি এমন দূর-দূরান্তের বিলে বর্ষিয়ে দিবো যে, তা তোমাদের কোনই কাজে আসবে না, তোমাদের কোনই উপকার হবে না। এটা আমার এক বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহ যে, মেঘ হতে আমি সুমিষ্ট, উত্তম, হালকা ও সুস্বাদু পানি বর্ষণ করে থাকি। অতঃপর ওটা জমিতে পৌছিয়ে দিই। ফলে জমিতে ফসল হয় এবং বাগানে পানি বর্ষণের ফলে বাগানের গাছ-পালাগুলো সতেজ হয়। তোমরা নিজেরা এই পানি পান কর, জীব-জন্তুকে পান করাও এবং এই পানিতে গোসল করে দেহ-মন পবিত্র করে থাকো। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেন। জমি শস্য-শ্যামল হয়ে ওঠে। ফলের বাগান সবুজশ্যামল আকার ধারণ করে। বাগান তখন সুন্দর ও সুদৃশ্য হয় এবং সাথে সাথে খুব উপকারী হয়। মহান আল্লাহ আরববাসীর পছন্দনীয় ফল খেজুর ও আঙ্গুর জন্মিয়ে থাকেন। অনুরূপভাবে প্রত্যেক দেশবাসীর জন্যেই তিনি বিভিন্ন প্রকারের ফলের ব্যবস্থা করে দেন। পুরোপুরিভাবে এগুলোর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ক্ষমতা কারো নেই। বহু ফল আল্লাহ মানুষকে দান করেছেন। যেগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করার সাথে সাথে তারা ওগুলোর স্বাদও গ্রহণ করে থাকে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ যায়তুন গাছের বর্ণনা দিচ্ছেন। ভূরে সীনা হলো ঐ পাহাড় যার উপর আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেছিলেন এবং ওর আশে পাশের পাহাড়গুলো। দূর ঐ পাহাড়কে বলে যাতে গাছপালা থাকে এবং থাকে সদা সবুজ-শ্যামল। এরূপ না হলে ওকে ‘জাবাল’ বলবে, তূর বলবে না। সুতরাং ভূরে সীনায় যে যায়তুন গাছ জন্মে তার থেকে তেল বের হয় এবং ওটা ভোজনকারীদের জন্যে তরকারীর কাজ দেয়। যেমন হযরত মালিক ইবনে রাবীআ সায়েদী আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যায়তুনের তেল খাও এবং (শরীরে) লাগাও, কেননা এটা কল্যাণময় গাছ হতে বের হয়ে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একবার একজন লোক আশুরা দিবসে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর বাড়ীতে অতিথি হন। তিনি তখন তাকে উটের মাথা (এর গোশ্ত) ও যায়তুনের তেল খেতে দেন। অতঃপর তিনি লোকটিকে বলেনঃ “এটা হচ্ছে ঐ বরকতময় গাছের তেল যার বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)-এর কাছে দিয়েছেন।” (এটা আবুল কাসেম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ চতুষ্পদ জন্তুর বর্ণনা দিচ্ছেন এবং ঐগুলোর দ্বারা মানুষ যে উপকার লাভ করে থাকে ঐসব নিয়ামতের কথা উল্লেখ করছেন। তিনি বলেনঃ তোমরা ওগুলোর দুধ পান করে থাকো, গোশ্ত ভক্ষণ কর এবং লোমে বা পশম দ্বারা পোষাক তৈরী করে থাকো। আর তোমরা ওগুলোর উপর ওয়ার হও, ওগুলোর উপর তোমাদের আসবাবপত্র চাপিয়ে দিয়ে দূর-দূরান্তে পৌঁছিয়ে থাকো। যদি এগুলো না থাকতো তবে তোমাদের এসব জিনিসপত্র অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া খুবই কষ্টকর হতো। সত্যি মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর খুবই দয়ালু ও অনুগ্রহশীল। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং ওগুলো তোমাদের ভার বহন করে নিয়ে যায় দূর দেশে যেখানে প্রাণান্ত ক্লেশ ব্যতীত তোমরা পৌছতে পারবে না; তোমাদের প্রতিপালক অবশ্যই দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” (১৬:৭) অন্যত্র বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা কি লক্ষ্য করে না যে, নিজ হাতে সৃষ্ট বস্তুগুলোর মধ্য হতে তাদের জন্য আমি সৃষ্টি করেছি চতুষ্পদ জন্তু এবং তারাই এগুলোর অধিকারী? আর আমি এগুলোকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছি; এগুলোর কতক তাদের বাহন এবং ওদের কতক তারা আহার করে। তাদের জন্যে এগুলোতে আছে বহু উপকার আর আছে পানীয় বস্তু; তবুও কি তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না?” (৩৬:৭১-৭৩)
আল-মুমিনুন 23:21
১৮-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলার তো অসংখ্য নিয়ামত রয়েছে, কিন্তু এখানে তিনি তাঁর কতকগুলো বড় বড় নিয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেন যে, তিনি প্রয়োজন অনুপাতে আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন। তিনি এতো বেশী বৃষ্টি বর্ষণ করেন না যে, তার ফলে যমীন খারাপ হয়ে যায় এবং শস্য পচে সড়ে নষ্ট হয়ে যায়। আবার এতো কমও নয় যে, ফল, শস্য ইত্যাদি জন্মেই না। বরং এমন পরিমিতভাবে তিনি বৃষ্টি দিয়ে থাকেন যে, এর ফলে শস্যক্ষেত্র সবুজ-শ্যামল থাকে এবং ফলের বাগান তরুতাজা হয়। পুকুর-পুষ্করিণী, নদ-নদী এবং খাল-বিল পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। ফলে নিজেদের পান করা এবং গবাদি পশুগুলোকে পান করানোর কোন অসুবিধা হয় না। যেখানে পানির বেশী প্রয়োজন সেখানে বেশী পানি বর্ষিত হয় এবং যেখানে কম প্রয়োজন সেখানে কম। আর যেখানকার ভূমি এর যোগ্যতাই রাখে না সেখানে পানি মোটেই বর্ষিত হয় না। কিন্তু নদী-নালার সাহায্যে সেখানে পানি পৌছিয়ে দেয়া হয় এবং এভাবে সেখানকার ভূমিকে পরিতৃপ্ত করা হয়। যেমন মিসর অঞ্চলের মাটি, যা নীল নদীর পানিতে পরিতৃপ্ত হয়ে সদা সবুজ-শ্যামল ও সতেজ থাকে। ঐ পানির সাথে লাল মাটি আকর্ষণ করা হয়, যা হাবশা বা আবিসিনিয়া অঞ্চলে থাকে। সেখানকার বৃষ্টির সাথে থাকার মাটি বয়ে চলে আসে যা জমিতে এসে থেকে যায় এবং এর ফলে জমি চাষের উপযোগী হয়ে ওঠে। আসলে কিন্তু তথাকার মাটি লবণাক্ত এবং চাষের মোটেই উপযোগী নয়। আল্লাহ তা'আলার কি মহিমা! সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞাতা, ক্ষমাশীল ও দয়ালু আল্লাহর কি ক্ষমতা ও নিপুণতা যে, তিনি পানিকে জমিতে স্থির রাখেন এবং জমিকে ঐ পানি শোষণ করার ক্ষমতা দান করেন, যাতে ওটা ওর মধ্যেই বীজকে পানি পৌছিয়ে দিতে পারে।এরপর তিনি বলেনঃ আমি ঐ পানিকে অপসারিত করতেও সক্ষম অর্থাৎ আমি ইচ্ছা করলে পানি বর্ষণ নাও করতে পারি। আমি ইচ্ছা করলে ঐ পানি কংকরময় ভূমিতে এবং পাহাড়ে ও জঙ্গলে বর্ষাতে পারি। আমি যদি চাই তবে পানিকে তিক্ত ও লবণাক্ত করতে পারি। ফলে তা তোমরা নিজেরাও পান করতে পারবে না, তোমাদের গবাদি পশুকেও পান করাতে পারবে না এবং ঐ পানি দ্বারা ফসল উৎপাদন করতেও সক্ষম হবে না। আর তোমরা ঐ পানিতে গোসলও করতে পারবে না। আমি ইচ্ছা করলে মাটিতে ঐ শক্তি দিবো না যার সাহায্যে সে পানি শোষণ করতে পারে। বরং ঐ পানি মাটির উপরেই ভেসে বেড়াবে। এটাও আমার অধিকারে আছে যে, আমি এ পানি এমন দূর-দূরান্তের বিলে বর্ষিয়ে দিবো যে, তা তোমাদের কোনই কাজে আসবে না, তোমাদের কোনই উপকার হবে না। এটা আমার এক বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহ যে, মেঘ হতে আমি সুমিষ্ট, উত্তম, হালকা ও সুস্বাদু পানি বর্ষণ করে থাকি। অতঃপর ওটা জমিতে পৌছিয়ে দিই। ফলে জমিতে ফসল হয় এবং বাগানে পানি বর্ষণের ফলে বাগানের গাছ-পালাগুলো সতেজ হয়। তোমরা নিজেরা এই পানি পান কর, জীব-জন্তুকে পান করাও এবং এই পানিতে গোসল করে দেহ-মন পবিত্র করে থাকো। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেন। জমি শস্য-শ্যামল হয়ে ওঠে। ফলের বাগান সবুজশ্যামল আকার ধারণ করে। বাগান তখন সুন্দর ও সুদৃশ্য হয় এবং সাথে সাথে খুব উপকারী হয়। মহান আল্লাহ আরববাসীর পছন্দনীয় ফল খেজুর ও আঙ্গুর জন্মিয়ে থাকেন। অনুরূপভাবে প্রত্যেক দেশবাসীর জন্যেই তিনি বিভিন্ন প্রকারের ফলের ব্যবস্থা করে দেন। পুরোপুরিভাবে এগুলোর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ক্ষমতা কারো নেই। বহু ফল আল্লাহ মানুষকে দান করেছেন। যেগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করার সাথে সাথে তারা ওগুলোর স্বাদও গ্রহণ করে থাকে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ যায়তুন গাছের বর্ণনা দিচ্ছেন। ভূরে সীনা হলো ঐ পাহাড় যার উপর আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেছিলেন এবং ওর আশে পাশের পাহাড়গুলো। দূর ঐ পাহাড়কে বলে যাতে গাছপালা থাকে এবং থাকে সদা সবুজ-শ্যামল। এরূপ না হলে ওকে ‘জাবাল’ বলবে, তূর বলবে না। সুতরাং ভূরে সীনায় যে যায়তুন গাছ জন্মে তার থেকে তেল বের হয় এবং ওটা ভোজনকারীদের জন্যে তরকারীর কাজ দেয়। যেমন হযরত মালিক ইবনে রাবীআ সায়েদী আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যায়তুনের তেল খাও এবং (শরীরে) লাগাও, কেননা এটা কল্যাণময় গাছ হতে বের হয়ে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একবার একজন লোক আশুরা দিবসে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর বাড়ীতে অতিথি হন। তিনি তখন তাকে উটের মাথা (এর গোশ্ত) ও যায়তুনের তেল খেতে দেন। অতঃপর তিনি লোকটিকে বলেনঃ “এটা হচ্ছে ঐ বরকতময় গাছের তেল যার বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)-এর কাছে দিয়েছেন।” (এটা আবুল কাসেম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ চতুষ্পদ জন্তুর বর্ণনা দিচ্ছেন এবং ঐগুলোর দ্বারা মানুষ যে উপকার লাভ করে থাকে ঐসব নিয়ামতের কথা উল্লেখ করছেন। তিনি বলেনঃ তোমরা ওগুলোর দুধ পান করে থাকো, গোশ্ত ভক্ষণ কর এবং লোমে বা পশম দ্বারা পোষাক তৈরী করে থাকো। আর তোমরা ওগুলোর উপর ওয়ার হও, ওগুলোর উপর তোমাদের আসবাবপত্র চাপিয়ে দিয়ে দূর-দূরান্তে পৌঁছিয়ে থাকো। যদি এগুলো না থাকতো তবে তোমাদের এসব জিনিসপত্র অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া খুবই কষ্টকর হতো। সত্যি মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর খুবই দয়ালু ও অনুগ্রহশীল। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং ওগুলো তোমাদের ভার বহন করে নিয়ে যায় দূর দেশে যেখানে প্রাণান্ত ক্লেশ ব্যতীত তোমরা পৌছতে পারবে না; তোমাদের প্রতিপালক অবশ্যই দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” (১৬:৭) অন্যত্র বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা কি লক্ষ্য করে না যে, নিজ হাতে সৃষ্ট বস্তুগুলোর মধ্য হতে তাদের জন্য আমি সৃষ্টি করেছি চতুষ্পদ জন্তু এবং তারাই এগুলোর অধিকারী? আর আমি এগুলোকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছি; এগুলোর কতক তাদের বাহন এবং ওদের কতক তারা আহার করে। তাদের জন্যে এগুলোতে আছে বহু উপকার আর আছে পানীয় বস্তু; তবুও কি তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না?” (৩৬:৭১-৭৩)
আল-মুমিনুন 23:22
১৮-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলার তো অসংখ্য নিয়ামত রয়েছে, কিন্তু এখানে তিনি তাঁর কতকগুলো বড় বড় নিয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেন যে, তিনি প্রয়োজন অনুপাতে আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন। তিনি এতো বেশী বৃষ্টি বর্ষণ করেন না যে, তার ফলে যমীন খারাপ হয়ে যায় এবং শস্য পচে সড়ে নষ্ট হয়ে যায়। আবার এতো কমও নয় যে, ফল, শস্য ইত্যাদি জন্মেই না। বরং এমন পরিমিতভাবে তিনি বৃষ্টি দিয়ে থাকেন যে, এর ফলে শস্যক্ষেত্র সবুজ-শ্যামল থাকে এবং ফলের বাগান তরুতাজা হয়। পুকুর-পুষ্করিণী, নদ-নদী এবং খাল-বিল পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। ফলে নিজেদের পান করা এবং গবাদি পশুগুলোকে পান করানোর কোন অসুবিধা হয় না। যেখানে পানির বেশী প্রয়োজন সেখানে বেশী পানি বর্ষিত হয় এবং যেখানে কম প্রয়োজন সেখানে কম। আর যেখানকার ভূমি এর যোগ্যতাই রাখে না সেখানে পানি মোটেই বর্ষিত হয় না। কিন্তু নদী-নালার সাহায্যে সেখানে পানি পৌছিয়ে দেয়া হয় এবং এভাবে সেখানকার ভূমিকে পরিতৃপ্ত করা হয়। যেমন মিসর অঞ্চলের মাটি, যা নীল নদীর পানিতে পরিতৃপ্ত হয়ে সদা সবুজ-শ্যামল ও সতেজ থাকে। ঐ পানির সাথে লাল মাটি আকর্ষণ করা হয়, যা হাবশা বা আবিসিনিয়া অঞ্চলে থাকে। সেখানকার বৃষ্টির সাথে থাকার মাটি বয়ে চলে আসে যা জমিতে এসে থেকে যায় এবং এর ফলে জমি চাষের উপযোগী হয়ে ওঠে। আসলে কিন্তু তথাকার মাটি লবণাক্ত এবং চাষের মোটেই উপযোগী নয়। আল্লাহ তা'আলার কি মহিমা! সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞাতা, ক্ষমাশীল ও দয়ালু আল্লাহর কি ক্ষমতা ও নিপুণতা যে, তিনি পানিকে জমিতে স্থির রাখেন এবং জমিকে ঐ পানি শোষণ করার ক্ষমতা দান করেন, যাতে ওটা ওর মধ্যেই বীজকে পানি পৌছিয়ে দিতে পারে।এরপর তিনি বলেনঃ আমি ঐ পানিকে অপসারিত করতেও সক্ষম অর্থাৎ আমি ইচ্ছা করলে পানি বর্ষণ নাও করতে পারি। আমি ইচ্ছা করলে ঐ পানি কংকরময় ভূমিতে এবং পাহাড়ে ও জঙ্গলে বর্ষাতে পারি। আমি যদি চাই তবে পানিকে তিক্ত ও লবণাক্ত করতে পারি। ফলে তা তোমরা নিজেরাও পান করতে পারবে না, তোমাদের গবাদি পশুকেও পান করাতে পারবে না এবং ঐ পানি দ্বারা ফসল উৎপাদন করতেও সক্ষম হবে না। আর তোমরা ঐ পানিতে গোসলও করতে পারবে না। আমি ইচ্ছা করলে মাটিতে ঐ শক্তি দিবো না যার সাহায্যে সে পানি শোষণ করতে পারে। বরং ঐ পানি মাটির উপরেই ভেসে বেড়াবে। এটাও আমার অধিকারে আছে যে, আমি এ পানি এমন দূর-দূরান্তের বিলে বর্ষিয়ে দিবো যে, তা তোমাদের কোনই কাজে আসবে না, তোমাদের কোনই উপকার হবে না। এটা আমার এক বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহ যে, মেঘ হতে আমি সুমিষ্ট, উত্তম, হালকা ও সুস্বাদু পানি বর্ষণ করে থাকি। অতঃপর ওটা জমিতে পৌছিয়ে দিই। ফলে জমিতে ফসল হয় এবং বাগানে পানি বর্ষণের ফলে বাগানের গাছ-পালাগুলো সতেজ হয়। তোমরা নিজেরা এই পানি পান কর, জীব-জন্তুকে পান করাও এবং এই পানিতে গোসল করে দেহ-মন পবিত্র করে থাকো। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেন। জমি শস্য-শ্যামল হয়ে ওঠে। ফলের বাগান সবুজশ্যামল আকার ধারণ করে। বাগান তখন সুন্দর ও সুদৃশ্য হয় এবং সাথে সাথে খুব উপকারী হয়। মহান আল্লাহ আরববাসীর পছন্দনীয় ফল খেজুর ও আঙ্গুর জন্মিয়ে থাকেন। অনুরূপভাবে প্রত্যেক দেশবাসীর জন্যেই তিনি বিভিন্ন প্রকারের ফলের ব্যবস্থা করে দেন। পুরোপুরিভাবে এগুলোর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ক্ষমতা কারো নেই। বহু ফল আল্লাহ মানুষকে দান করেছেন। যেগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করার সাথে সাথে তারা ওগুলোর স্বাদও গ্রহণ করে থাকে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ যায়তুন গাছের বর্ণনা দিচ্ছেন। ভূরে সীনা হলো ঐ পাহাড় যার উপর আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে কথা বলেছিলেন এবং ওর আশে পাশের পাহাড়গুলো। দূর ঐ পাহাড়কে বলে যাতে গাছপালা থাকে এবং থাকে সদা সবুজ-শ্যামল। এরূপ না হলে ওকে ‘জাবাল’ বলবে, তূর বলবে না। সুতরাং ভূরে সীনায় যে যায়তুন গাছ জন্মে তার থেকে তেল বের হয় এবং ওটা ভোজনকারীদের জন্যে তরকারীর কাজ দেয়। যেমন হযরত মালিক ইবনে রাবীআ সায়েদী আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যায়তুনের তেল খাও এবং (শরীরে) লাগাও, কেননা এটা কল্যাণময় গাছ হতে বের হয়ে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একবার একজন লোক আশুরা দিবসে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর বাড়ীতে অতিথি হন। তিনি তখন তাকে উটের মাথা (এর গোশ্ত) ও যায়তুনের তেল খেতে দেন। অতঃপর তিনি লোকটিকে বলেনঃ “এটা হচ্ছে ঐ বরকতময় গাছের তেল যার বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)-এর কাছে দিয়েছেন।” (এটা আবুল কাসেম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ চতুষ্পদ জন্তুর বর্ণনা দিচ্ছেন এবং ঐগুলোর দ্বারা মানুষ যে উপকার লাভ করে থাকে ঐসব নিয়ামতের কথা উল্লেখ করছেন। তিনি বলেনঃ তোমরা ওগুলোর দুধ পান করে থাকো, গোশ্ত ভক্ষণ কর এবং লোমে বা পশম দ্বারা পোষাক তৈরী করে থাকো। আর তোমরা ওগুলোর উপর ওয়ার হও, ওগুলোর উপর তোমাদের আসবাবপত্র চাপিয়ে দিয়ে দূর-দূরান্তে পৌঁছিয়ে থাকো। যদি এগুলো না থাকতো তবে তোমাদের এসব জিনিসপত্র অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া খুবই কষ্টকর হতো। সত্যি মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর খুবই দয়ালু ও অনুগ্রহশীল। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং ওগুলো তোমাদের ভার বহন করে নিয়ে যায় দূর দেশে যেখানে প্রাণান্ত ক্লেশ ব্যতীত তোমরা পৌছতে পারবে না; তোমাদের প্রতিপালক অবশ্যই দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” (১৬:৭) অন্যত্র বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা কি লক্ষ্য করে না যে, নিজ হাতে সৃষ্ট বস্তুগুলোর মধ্য হতে তাদের জন্য আমি সৃষ্টি করেছি চতুষ্পদ জন্তু এবং তারাই এগুলোর অধিকারী? আর আমি এগুলোকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছি; এগুলোর কতক তাদের বাহন এবং ওদের কতক তারা আহার করে। তাদের জন্যে এগুলোতে আছে বহু উপকার আর আছে পানীয় বস্তু; তবুও কি তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না?” (৩৬:৭১-৭৩)
আল-মুমিনুন 23:23
২৩-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-কে তিনি সুসংবাদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে তাঁর কওমের নিকট প্রেরণ করেন। তিনি তাদের কাছে আল্লাহর পয়গাম নিয়ে গিয়ে বলেনঃ তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের হকদার নয়। তোমরা তাকে ছেড়ে যে অন্যদের উপাসনা করছো এতে কি তোমাদের ভয় হচ্ছে না? তাঁর একথা শুনে তাঁর কওমের নেতৃস্থানীয় লোকেরা বললোঃ হে জনগণ! এই লোকটি তো আমাদের মতই একজন মানুষ। নবুওয়াতের দাবী করে সে তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে চায়। তার উদ্দেশ্য হলো নেতৃত্ব লাভ করা। মানুষের কাছে অহী আসা কি সম্ভব? আল্লাহ তা'আলার নবী পাঠাবার ইচ্ছা থাকলে তিনি কোন আসমানী ফেরেশতাকে পাঠাতেন? এরূপ কথা আমরা কেন, আমাদের পূর্বপুরুষরাও শুনেনি যে, আল্লাহ তা'আলা কোন মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন। হে নূহ (আঃ)! তুমি একজন পাগল ছাড়া কিছুই নও। পাগল না হলে তুমি কখনো এরূপ দাবী করতে না এবং আত্মগর্বী হতে না। সুতরাং হে জনমণ্ডলী! তোমরা এর সম্পর্কে কিছুকাল অপেক্ষা কর (সে অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে।
আল-মুমিনুন 23:24
২৩-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-কে তিনি সুসংবাদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে তাঁর কওমের নিকট প্রেরণ করেন। তিনি তাদের কাছে আল্লাহর পয়গাম নিয়ে গিয়ে বলেনঃ তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের হকদার নয়। তোমরা তাকে ছেড়ে যে অন্যদের উপাসনা করছো এতে কি তোমাদের ভয় হচ্ছে না? তাঁর একথা শুনে তাঁর কওমের নেতৃস্থানীয় লোকেরা বললোঃ হে জনগণ! এই লোকটি তো আমাদের মতই একজন মানুষ। নবুওয়াতের দাবী করে সে তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে চায়। তার উদ্দেশ্য হলো নেতৃত্ব লাভ করা। মানুষের কাছে অহী আসা কি সম্ভব? আল্লাহ তা'আলার নবী পাঠাবার ইচ্ছা থাকলে তিনি কোন আসমানী ফেরেশতাকে পাঠাতেন? এরূপ কথা আমরা কেন, আমাদের পূর্বপুরুষরাও শুনেনি যে, আল্লাহ তা'আলা কোন মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন। হে নূহ (আঃ)! তুমি একজন পাগল ছাড়া কিছুই নও। পাগল না হলে তুমি কখনো এরূপ দাবী করতে না এবং আত্মগর্বী হতে না। সুতরাং হে জনমণ্ডলী! তোমরা এর সম্পর্কে কিছুকাল অপেক্ষা কর (সে অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে।
আল-মুমিনুন 23:25
২৩-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-কে তিনি সুসংবাদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে তাঁর কওমের নিকট প্রেরণ করেন। তিনি তাদের কাছে আল্লাহর পয়গাম নিয়ে গিয়ে বলেনঃ তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের হকদার নয়। তোমরা তাকে ছেড়ে যে অন্যদের উপাসনা করছো এতে কি তোমাদের ভয় হচ্ছে না? তাঁর একথা শুনে তাঁর কওমের নেতৃস্থানীয় লোকেরা বললোঃ হে জনগণ! এই লোকটি তো আমাদের মতই একজন মানুষ। নবুওয়াতের দাবী করে সে তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে চায়। তার উদ্দেশ্য হলো নেতৃত্ব লাভ করা। মানুষের কাছে অহী আসা কি সম্ভব? আল্লাহ তা'আলার নবী পাঠাবার ইচ্ছা থাকলে তিনি কোন আসমানী ফেরেশতাকে পাঠাতেন? এরূপ কথা আমরা কেন, আমাদের পূর্বপুরুষরাও শুনেনি যে, আল্লাহ তা'আলা কোন মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন। হে নূহ (আঃ)! তুমি একজন পাগল ছাড়া কিছুই নও। পাগল না হলে তুমি কখনো এরূপ দাবী করতে না এবং আত্মগর্বী হতে না। সুতরাং হে জনমণ্ডলী! তোমরা এর সম্পর্কে কিছুকাল অপেক্ষা কর (সে অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে।
আল-মুমিনুন 23:26
আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ) যখন তাঁর কওমের হিদায়াত প্রাপ্তি হতে নিরাশ হয়ে গেলেন তখন তিনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন! যারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলছে তাদের উপর আমাকে জয়যুক্ত করুন! যেমন অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিলঃ আমি তো অসহায়, অতএব, তুমি প্রতিবিধান কর।” (৫৪:১০) তৎক্ষণাৎ মহান আল্লাহ তাঁর কাছে অহী করলেনঃ তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার অহী অনুযায়ী নৌযান নির্মাণ কর এবং তাতে প্রত্যেক জীবের এক এক জোড়া উঠিয়ে নাও এবং তোমার পরিবার-পরিজনকেও উঠিয়ে নাও তাদেরকে ছাড়া যাদের বিরুদ্ধে পূর্বেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। তাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বলো না, তারা তো নিমজ্জিত হয়ে যাবে। তারা হলো তাঁর কওমের কাফির লোকেরা এবং তাঁর স্ত্রী ও তাঁর পুত্র। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জনেন। এর পূর্ণ ঘটনা সূরায়ে হূদের তাফসীরে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহ বলেন, যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা নৌযানে আসন গ্রহণ করবে তখন বলবেঃ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদেরকে উদ্ধার করেছেন যালিম সম্প্রদায় হতে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যিনি তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেন এমন নৌযান ও চতুষ্পদ জন্তু যাতে তোমরা আরোহণ কর। যাতে তোমরা ওদের পৃষ্ঠে স্থির হয়ে বসতে পার, তারপর তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তোমরা ওর উপর স্থির হয়ে বস; এবং বলঃ পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এগুলোকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যদিও আমরা সমর্থ ছিলাম না এগুলোকে বশীভূত করতে। আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিকট অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করাবো।” (৪৩:১২-১৪) হযরত নূহ (আঃ) এ কথাই বলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে বললোঃ এতে আরোহণ কর, আল্লাহর নামে এর গতি ও স্থিতি, আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (১১:৪১) সুতরাং নৌকা চলতে শুরু করার সময়ও তিনি আল্লাহকে স্মরণ করেন এবং যখন ওটা থামবার উপক্রম হয় তখনও তিনি আল্লাহকে স্মরণ করেন। তিনি প্রার্থনা করেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করান যা হবে কল্যাণকর; আর আপনিই শ্রেষ্ঠ অবতারণকারী। এতে অর্থাৎ মুমিনদের মুক্তি ও কাফিরদের ধ্বংসের মধ্যে নবীদের সত্যতার নিদর্শন রয়েছে এবং এই আলামত রয়েছে যে, আল্লাহ যা চান তাই করে থাকেন। তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। তিনি সবকিছু অবগত আছেন।নিশ্চয়ই তিনি রাসূলদেরকে পাঠিয়ে স্বীয় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন।
আল-মুমিনুন 23:27
আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ) যখন তাঁর কওমের হিদায়াত প্রাপ্তি হতে নিরাশ হয়ে গেলেন তখন তিনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন! যারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলছে তাদের উপর আমাকে জয়যুক্ত করুন! যেমন অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিলঃ আমি তো অসহায়, অতএব, তুমি প্রতিবিধান কর।” (৫৪:১০) তৎক্ষণাৎ মহান আল্লাহ তাঁর কাছে অহী করলেনঃ তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার অহী অনুযায়ী নৌযান নির্মাণ কর এবং তাতে প্রত্যেক জীবের এক এক জোড়া উঠিয়ে নাও এবং তোমার পরিবার-পরিজনকেও উঠিয়ে নাও তাদেরকে ছাড়া যাদের বিরুদ্ধে পূর্বেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। তাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বলো না, তারা তো নিমজ্জিত হয়ে যাবে। তারা হলো তাঁর কওমের কাফির লোকেরা এবং তাঁর স্ত্রী ও তাঁর পুত্র। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জনেন। এর পূর্ণ ঘটনা সূরায়ে হূদের তাফসীরে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহ বলেন, যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা নৌযানে আসন গ্রহণ করবে তখন বলবেঃ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদেরকে উদ্ধার করেছেন যালিম সম্প্রদায় হতে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যিনি তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেন এমন নৌযান ও চতুষ্পদ জন্তু যাতে তোমরা আরোহণ কর। যাতে তোমরা ওদের পৃষ্ঠে স্থির হয়ে বসতে পার, তারপর তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তোমরা ওর উপর স্থির হয়ে বস; এবং বলঃ পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এগুলোকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যদিও আমরা সমর্থ ছিলাম না এগুলোকে বশীভূত করতে। আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিকট অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করাবো।” (৪৩:১২-১৪) হযরত নূহ (আঃ) এ কথাই বলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে বললোঃ এতে আরোহণ কর, আল্লাহর নামে এর গতি ও স্থিতি, আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (১১:৪১) সুতরাং নৌকা চলতে শুরু করার সময়ও তিনি আল্লাহকে স্মরণ করেন এবং যখন ওটা থামবার উপক্রম হয় তখনও তিনি আল্লাহকে স্মরণ করেন। তিনি প্রার্থনা করেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করান যা হবে কল্যাণকর; আর আপনিই শ্রেষ্ঠ অবতারণকারী। এতে অর্থাৎ মুমিনদের মুক্তি ও কাফিরদের ধ্বংসের মধ্যে নবীদের সত্যতার নিদর্শন রয়েছে এবং এই আলামত রয়েছে যে, আল্লাহ যা চান তাই করে থাকেন। তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। তিনি সবকিছু অবগত আছেন।নিশ্চয়ই তিনি রাসূলদেরকে পাঠিয়ে স্বীয় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন।
আল-মুমিনুন 23:28
আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ) যখন তাঁর কওমের হিদায়াত প্রাপ্তি হতে নিরাশ হয়ে গেলেন তখন তিনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন! যারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলছে তাদের উপর আমাকে জয়যুক্ত করুন! যেমন অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিলঃ আমি তো অসহায়, অতএব, তুমি প্রতিবিধান কর।” (৫৪:১০) তৎক্ষণাৎ মহান আল্লাহ তাঁর কাছে অহী করলেনঃ তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার অহী অনুযায়ী নৌযান নির্মাণ কর এবং তাতে প্রত্যেক জীবের এক এক জোড়া উঠিয়ে নাও এবং তোমার পরিবার-পরিজনকেও উঠিয়ে নাও তাদেরকে ছাড়া যাদের বিরুদ্ধে পূর্বেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। তাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বলো না, তারা তো নিমজ্জিত হয়ে যাবে। তারা হলো তাঁর কওমের কাফির লোকেরা এবং তাঁর স্ত্রী ও তাঁর পুত্র। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জনেন। এর পূর্ণ ঘটনা সূরায়ে হূদের তাফসীরে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহ বলেন, যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা নৌযানে আসন গ্রহণ করবে তখন বলবেঃ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদেরকে উদ্ধার করেছেন যালিম সম্প্রদায় হতে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যিনি তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেন এমন নৌযান ও চতুষ্পদ জন্তু যাতে তোমরা আরোহণ কর। যাতে তোমরা ওদের পৃষ্ঠে স্থির হয়ে বসতে পার, তারপর তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তোমরা ওর উপর স্থির হয়ে বস; এবং বলঃ পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এগুলোকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যদিও আমরা সমর্থ ছিলাম না এগুলোকে বশীভূত করতে। আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিকট অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করাবো।” (৪৩:১২-১৪) হযরত নূহ (আঃ) এ কথাই বলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে বললোঃ এতে আরোহণ কর, আল্লাহর নামে এর গতি ও স্থিতি, আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (১১:৪১) সুতরাং নৌকা চলতে শুরু করার সময়ও তিনি আল্লাহকে স্মরণ করেন এবং যখন ওটা থামবার উপক্রম হয় তখনও তিনি আল্লাহকে স্মরণ করেন। তিনি প্রার্থনা করেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করান যা হবে কল্যাণকর; আর আপনিই শ্রেষ্ঠ অবতারণকারী। এতে অর্থাৎ মুমিনদের মুক্তি ও কাফিরদের ধ্বংসের মধ্যে নবীদের সত্যতার নিদর্শন রয়েছে এবং এই আলামত রয়েছে যে, আল্লাহ যা চান তাই করে থাকেন। তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। তিনি সবকিছু অবগত আছেন।নিশ্চয়ই তিনি রাসূলদেরকে পাঠিয়ে স্বীয় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন।
আল-মুমিনুন 23:29
আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ) যখন তাঁর কওমের হিদায়াত প্রাপ্তি হতে নিরাশ হয়ে গেলেন তখন তিনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন! যারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলছে তাদের উপর আমাকে জয়যুক্ত করুন! যেমন অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিলঃ আমি তো অসহায়, অতএব, তুমি প্রতিবিধান কর।” (৫৪:১০) তৎক্ষণাৎ মহান আল্লাহ তাঁর কাছে অহী করলেনঃ তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার অহী অনুযায়ী নৌযান নির্মাণ কর এবং তাতে প্রত্যেক জীবের এক এক জোড়া উঠিয়ে নাও এবং তোমার পরিবার-পরিজনকেও উঠিয়ে নাও তাদেরকে ছাড়া যাদের বিরুদ্ধে পূর্বেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। তাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বলো না, তারা তো নিমজ্জিত হয়ে যাবে। তারা হলো তাঁর কওমের কাফির লোকেরা এবং তাঁর স্ত্রী ও তাঁর পুত্র। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জনেন। এর পূর্ণ ঘটনা সূরায়ে হূদের তাফসীরে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহ বলেন, যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা নৌযানে আসন গ্রহণ করবে তখন বলবেঃ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদেরকে উদ্ধার করেছেন যালিম সম্প্রদায় হতে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যিনি তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেন এমন নৌযান ও চতুষ্পদ জন্তু যাতে তোমরা আরোহণ কর। যাতে তোমরা ওদের পৃষ্ঠে স্থির হয়ে বসতে পার, তারপর তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তোমরা ওর উপর স্থির হয়ে বস; এবং বলঃ পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এগুলোকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যদিও আমরা সমর্থ ছিলাম না এগুলোকে বশীভূত করতে। আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিকট অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করাবো।” (৪৩:১২-১৪) হযরত নূহ (আঃ) এ কথাই বলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে বললোঃ এতে আরোহণ কর, আল্লাহর নামে এর গতি ও স্থিতি, আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (১১:৪১) সুতরাং নৌকা চলতে শুরু করার সময়ও তিনি আল্লাহকে স্মরণ করেন এবং যখন ওটা থামবার উপক্রম হয় তখনও তিনি আল্লাহকে স্মরণ করেন। তিনি প্রার্থনা করেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করান যা হবে কল্যাণকর; আর আপনিই শ্রেষ্ঠ অবতারণকারী। এতে অর্থাৎ মুমিনদের মুক্তি ও কাফিরদের ধ্বংসের মধ্যে নবীদের সত্যতার নিদর্শন রয়েছে এবং এই আলামত রয়েছে যে, আল্লাহ যা চান তাই করে থাকেন। তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। তিনি সবকিছু অবগত আছেন।নিশ্চয়ই তিনি রাসূলদেরকে পাঠিয়ে স্বীয় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন।
আল-মুমিনুন 23:30
আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ) যখন তাঁর কওমের হিদায়াত প্রাপ্তি হতে নিরাশ হয়ে গেলেন তখন তিনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন! যারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলছে তাদের উপর আমাকে জয়যুক্ত করুন! যেমন অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিলঃ আমি তো অসহায়, অতএব, তুমি প্রতিবিধান কর।” (৫৪:১০) তৎক্ষণাৎ মহান আল্লাহ তাঁর কাছে অহী করলেনঃ তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার অহী অনুযায়ী নৌযান নির্মাণ কর এবং তাতে প্রত্যেক জীবের এক এক জোড়া উঠিয়ে নাও এবং তোমার পরিবার-পরিজনকেও উঠিয়ে নাও তাদেরকে ছাড়া যাদের বিরুদ্ধে পূর্বেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। তাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বলো না, তারা তো নিমজ্জিত হয়ে যাবে। তারা হলো তাঁর কওমের কাফির লোকেরা এবং তাঁর স্ত্রী ও তাঁর পুত্র। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জনেন। এর পূর্ণ ঘটনা সূরায়ে হূদের তাফসীরে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহ বলেন, যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা নৌযানে আসন গ্রহণ করবে তখন বলবেঃ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদেরকে উদ্ধার করেছেন যালিম সম্প্রদায় হতে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যিনি তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেন এমন নৌযান ও চতুষ্পদ জন্তু যাতে তোমরা আরোহণ কর। যাতে তোমরা ওদের পৃষ্ঠে স্থির হয়ে বসতে পার, তারপর তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তোমরা ওর উপর স্থির হয়ে বস; এবং বলঃ পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এগুলোকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যদিও আমরা সমর্থ ছিলাম না এগুলোকে বশীভূত করতে। আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিকট অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করাবো।” (৪৩:১২-১৪) হযরত নূহ (আঃ) এ কথাই বলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে বললোঃ এতে আরোহণ কর, আল্লাহর নামে এর গতি ও স্থিতি, আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (১১:৪১) সুতরাং নৌকা চলতে শুরু করার সময়ও তিনি আল্লাহকে স্মরণ করেন এবং যখন ওটা থামবার উপক্রম হয় তখনও তিনি আল্লাহকে স্মরণ করেন। তিনি প্রার্থনা করেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করান যা হবে কল্যাণকর; আর আপনিই শ্রেষ্ঠ অবতারণকারী। এতে অর্থাৎ মুমিনদের মুক্তি ও কাফিরদের ধ্বংসের মধ্যে নবীদের সত্যতার নিদর্শন রয়েছে এবং এই আলামত রয়েছে যে, আল্লাহ যা চান তাই করে থাকেন। তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। তিনি সবকিছু অবগত আছেন।নিশ্চয়ই তিনি রাসূলদেরকে পাঠিয়ে স্বীয় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে থাকেন।
আল-মুমিনুন 23:31
৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর পরেও বহু উম্মতের আগমন ঘটে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সামূদ সম্প্রদায়কে। তাদের উপর বিকট শব্দের শাস্তি এসেছিল। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। তাদের কাছেও রাসূল এসেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, বিরোধিতা করে এবং তার আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ শুধুমাত্র এটাই যে, তিনি মানুষ। তারা কিয়ামতকেও অস্বীকার করে। শারীরিক পুনরুত্থানকে তারা অবিশ্বাস করে এবং বলেঃ “ওটা অসম্ভব ব্যাপার। এই লোকটি নিজেই এটা বানিয়ে বলছে। আমরা এসব বাজে কথা বিশ্বাস করতে পারি না।” নবী (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন। কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে।” অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়ায তাদেরকে আঘাত করলো এবং তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ্য করে দেয়া হলো। সুতরাং যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এই শাস্তির যোগ্যই ছিল। প্রচণ্ড ঝটিকার সাথে সাথে ফেরেশতার বিকট ও ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে টুকরা টুকরা করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলো। ভূষির মত তারা উড়ে গেল। রয়ে গেল শুধু তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম।” (৪৩:৭৬) সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা ও তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত।
আল-মুমিনুন 23:32
৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর পরেও বহু উম্মতের আগমন ঘটে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সামূদ সম্প্রদায়কে। তাদের উপর বিকট শব্দের শাস্তি এসেছিল। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। তাদের কাছেও রাসূল এসেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, বিরোধিতা করে এবং তার আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ শুধুমাত্র এটাই যে, তিনি মানুষ। তারা কিয়ামতকেও অস্বীকার করে। শারীরিক পুনরুত্থানকে তারা অবিশ্বাস করে এবং বলেঃ “ওটা অসম্ভব ব্যাপার। এই লোকটি নিজেই এটা বানিয়ে বলছে। আমরা এসব বাজে কথা বিশ্বাস করতে পারি না।” নবী (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন। কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে।” অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়ায তাদেরকে আঘাত করলো এবং তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ্য করে দেয়া হলো। সুতরাং যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এই শাস্তির যোগ্যই ছিল। প্রচণ্ড ঝটিকার সাথে সাথে ফেরেশতার বিকট ও ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে টুকরা টুকরা করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলো। ভূষির মত তারা উড়ে গেল। রয়ে গেল শুধু তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম।” (৪৩:৭৬) সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা ও তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত।
আল-মুমিনুন 23:33
৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর পরেও বহু উম্মতের আগমন ঘটে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সামূদ সম্প্রদায়কে। তাদের উপর বিকট শব্দের শাস্তি এসেছিল। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। তাদের কাছেও রাসূল এসেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, বিরোধিতা করে এবং তার আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ শুধুমাত্র এটাই যে, তিনি মানুষ। তারা কিয়ামতকেও অস্বীকার করে। শারীরিক পুনরুত্থানকে তারা অবিশ্বাস করে এবং বলেঃ “ওটা অসম্ভব ব্যাপার। এই লোকটি নিজেই এটা বানিয়ে বলছে। আমরা এসব বাজে কথা বিশ্বাস করতে পারি না।” নবী (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন। কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে।” অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়ায তাদেরকে আঘাত করলো এবং তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ্য করে দেয়া হলো। সুতরাং যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এই শাস্তির যোগ্যই ছিল। প্রচণ্ড ঝটিকার সাথে সাথে ফেরেশতার বিকট ও ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে টুকরা টুকরা করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলো। ভূষির মত তারা উড়ে গেল। রয়ে গেল শুধু তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম।” (৪৩:৭৬) সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা ও তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত।
আল-মুমিনুন 23:34
৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর পরেও বহু উম্মতের আগমন ঘটে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সামূদ সম্প্রদায়কে। তাদের উপর বিকট শব্দের শাস্তি এসেছিল। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। তাদের কাছেও রাসূল এসেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, বিরোধিতা করে এবং তার আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ শুধুমাত্র এটাই যে, তিনি মানুষ। তারা কিয়ামতকেও অস্বীকার করে। শারীরিক পুনরুত্থানকে তারা অবিশ্বাস করে এবং বলেঃ “ওটা অসম্ভব ব্যাপার। এই লোকটি নিজেই এটা বানিয়ে বলছে। আমরা এসব বাজে কথা বিশ্বাস করতে পারি না।” নবী (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন। কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে।” অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়ায তাদেরকে আঘাত করলো এবং তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ্য করে দেয়া হলো। সুতরাং যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এই শাস্তির যোগ্যই ছিল। প্রচণ্ড ঝটিকার সাথে সাথে ফেরেশতার বিকট ও ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে টুকরা টুকরা করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলো। ভূষির মত তারা উড়ে গেল। রয়ে গেল শুধু তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম।” (৪৩:৭৬) সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা ও তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত।
আল-মুমিনুন 23:35
৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর পরেও বহু উম্মতের আগমন ঘটে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সামূদ সম্প্রদায়কে। তাদের উপর বিকট শব্দের শাস্তি এসেছিল। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। তাদের কাছেও রাসূল এসেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, বিরোধিতা করে এবং তার আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ শুধুমাত্র এটাই যে, তিনি মানুষ। তারা কিয়ামতকেও অস্বীকার করে। শারীরিক পুনরুত্থানকে তারা অবিশ্বাস করে এবং বলেঃ “ওটা অসম্ভব ব্যাপার। এই লোকটি নিজেই এটা বানিয়ে বলছে। আমরা এসব বাজে কথা বিশ্বাস করতে পারি না।” নবী (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন। কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে।” অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়ায তাদেরকে আঘাত করলো এবং তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ্য করে দেয়া হলো। সুতরাং যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এই শাস্তির যোগ্যই ছিল। প্রচণ্ড ঝটিকার সাথে সাথে ফেরেশতার বিকট ও ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে টুকরা টুকরা করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলো। ভূষির মত তারা উড়ে গেল। রয়ে গেল শুধু তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম।” (৪৩:৭৬) সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা ও তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত।
আল-মুমিনুন 23:36
৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর পরেও বহু উম্মতের আগমন ঘটে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সামূদ সম্প্রদায়কে। তাদের উপর বিকট শব্দের শাস্তি এসেছিল। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। তাদের কাছেও রাসূল এসেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, বিরোধিতা করে এবং তার আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ শুধুমাত্র এটাই যে, তিনি মানুষ। তারা কিয়ামতকেও অস্বীকার করে। শারীরিক পুনরুত্থানকে তারা অবিশ্বাস করে এবং বলেঃ “ওটা অসম্ভব ব্যাপার। এই লোকটি নিজেই এটা বানিয়ে বলছে। আমরা এসব বাজে কথা বিশ্বাস করতে পারি না।” নবী (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন। কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে।” অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়ায তাদেরকে আঘাত করলো এবং তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ্য করে দেয়া হলো। সুতরাং যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এই শাস্তির যোগ্যই ছিল। প্রচণ্ড ঝটিকার সাথে সাথে ফেরেশতার বিকট ও ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে টুকরা টুকরা করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলো। ভূষির মত তারা উড়ে গেল। রয়ে গেল শুধু তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম।” (৪৩:৭৬) সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা ও তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত।
আল-মুমিনুন 23:37
৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর পরেও বহু উম্মতের আগমন ঘটে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সামূদ সম্প্রদায়কে। তাদের উপর বিকট শব্দের শাস্তি এসেছিল। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। তাদের কাছেও রাসূল এসেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, বিরোধিতা করে এবং তার আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ শুধুমাত্র এটাই যে, তিনি মানুষ। তারা কিয়ামতকেও অস্বীকার করে। শারীরিক পুনরুত্থানকে তারা অবিশ্বাস করে এবং বলেঃ “ওটা অসম্ভব ব্যাপার। এই লোকটি নিজেই এটা বানিয়ে বলছে। আমরা এসব বাজে কথা বিশ্বাস করতে পারি না।” নবী (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন। কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে।” অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়ায তাদেরকে আঘাত করলো এবং তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ্য করে দেয়া হলো। সুতরাং যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এই শাস্তির যোগ্যই ছিল। প্রচণ্ড ঝটিকার সাথে সাথে ফেরেশতার বিকট ও ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে টুকরা টুকরা করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলো। ভূষির মত তারা উড়ে গেল। রয়ে গেল শুধু তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম।” (৪৩:৭৬) সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা ও তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত।
আল-মুমিনুন 23:38
৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর পরেও বহু উম্মতের আগমন ঘটে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সামূদ সম্প্রদায়কে। তাদের উপর বিকট শব্দের শাস্তি এসেছিল। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। তাদের কাছেও রাসূল এসেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, বিরোধিতা করে এবং তার আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ শুধুমাত্র এটাই যে, তিনি মানুষ। তারা কিয়ামতকেও অস্বীকার করে। শারীরিক পুনরুত্থানকে তারা অবিশ্বাস করে এবং বলেঃ “ওটা অসম্ভব ব্যাপার। এই লোকটি নিজেই এটা বানিয়ে বলছে। আমরা এসব বাজে কথা বিশ্বাস করতে পারি না।” নবী (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন। কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে।” অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়ায তাদেরকে আঘাত করলো এবং তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ্য করে দেয়া হলো। সুতরাং যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এই শাস্তির যোগ্যই ছিল। প্রচণ্ড ঝটিকার সাথে সাথে ফেরেশতার বিকট ও ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে টুকরা টুকরা করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলো। ভূষির মত তারা উড়ে গেল। রয়ে গেল শুধু তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম।” (৪৩:৭৬) সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা ও তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত।
আল-মুমিনুন 23:39
৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর পরেও বহু উম্মতের আগমন ঘটে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সামূদ সম্প্রদায়কে। তাদের উপর বিকট শব্দের শাস্তি এসেছিল। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। তাদের কাছেও রাসূল এসেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, বিরোধিতা করে এবং তার আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ শুধুমাত্র এটাই যে, তিনি মানুষ। তারা কিয়ামতকেও অস্বীকার করে। শারীরিক পুনরুত্থানকে তারা অবিশ্বাস করে এবং বলেঃ “ওটা অসম্ভব ব্যাপার। এই লোকটি নিজেই এটা বানিয়ে বলছে। আমরা এসব বাজে কথা বিশ্বাস করতে পারি না।” নবী (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন। কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে।” অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়ায তাদেরকে আঘাত করলো এবং তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ্য করে দেয়া হলো। সুতরাং যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এই শাস্তির যোগ্যই ছিল। প্রচণ্ড ঝটিকার সাথে সাথে ফেরেশতার বিকট ও ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে টুকরা টুকরা করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলো। ভূষির মত তারা উড়ে গেল। রয়ে গেল শুধু তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম।” (৪৩:৭৬) সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা ও তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত।
আল-মুমিনুন 23:40
৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর পরেও বহু উম্মতের আগমন ঘটে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সামূদ সম্প্রদায়কে। তাদের উপর বিকট শব্দের শাস্তি এসেছিল। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। তাদের কাছেও রাসূল এসেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, বিরোধিতা করে এবং তার আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ শুধুমাত্র এটাই যে, তিনি মানুষ। তারা কিয়ামতকেও অস্বীকার করে। শারীরিক পুনরুত্থানকে তারা অবিশ্বাস করে এবং বলেঃ “ওটা অসম্ভব ব্যাপার। এই লোকটি নিজেই এটা বানিয়ে বলছে। আমরা এসব বাজে কথা বিশ্বাস করতে পারি না।” নবী (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন। কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে।” অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়ায তাদেরকে আঘাত করলো এবং তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ্য করে দেয়া হলো। সুতরাং যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এই শাস্তির যোগ্যই ছিল। প্রচণ্ড ঝটিকার সাথে সাথে ফেরেশতার বিকট ও ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে টুকরা টুকরা করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলো। ভূষির মত তারা উড়ে গেল। রয়ে গেল শুধু তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম।” (৪৩:৭৬) সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা ও তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত।
আল-মুমিনুন 23:41
৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর পরেও বহু উম্মতের আগমন ঘটে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সামূদ সম্প্রদায়কে। তাদের উপর বিকট শব্দের শাস্তি এসেছিল। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। তাদের কাছেও রাসূল এসেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, বিরোধিতা করে এবং তার আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ শুধুমাত্র এটাই যে, তিনি মানুষ। তারা কিয়ামতকেও অস্বীকার করে। শারীরিক পুনরুত্থানকে তারা অবিশ্বাস করে এবং বলেঃ “ওটা অসম্ভব ব্যাপার। এই লোকটি নিজেই এটা বানিয়ে বলছে। আমরা এসব বাজে কথা বিশ্বাস করতে পারি না।” নবী (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন। কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে।” অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়ায তাদেরকে আঘাত করলো এবং তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ্য করে দেয়া হলো। সুতরাং যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এই শাস্তির যোগ্যই ছিল। প্রচণ্ড ঝটিকার সাথে সাথে ফেরেশতার বিকট ও ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে টুকরা টুকরা করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলো। ভূষির মত তারা উড়ে গেল। রয়ে গেল শুধু তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম।” (৪৩:৭৬) সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা ও তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত।
আল-মুমিনুন 23:42
৪২-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তাদের পরে বহু জাতির আগমন ঘটেছিল। যাদেরকে আমিই সৃষ্টি করেছিলাম। আমি তাদের জন্যে যে কাল নির্ধারণ করেছিলাম তা পূর্ণ হয়েছিল। তা ত্বরান্বিত হয়নি এবং বিলম্বিতও হয়নি। আমি একের পর এক রাসূল পাঠিয়েছি। প্রত্যেক জাতির কাছে রাসূল এসেছেন। তিনি তাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তারা তাদেরকে বলেছেনঃ তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং তার ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সঠিক পথে এসে যায় এবং কারো কারো উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হয়। অধিকাংশ জাতিই তাদের নবীকে অস্বীকার করে। যেমন সূরায়ে ইয়াসীনে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “পরিতাপ বান্দাদের জন্যে! তাদের নিকট যখনই কোন রাসূল এসেছে তখনই তারা তাকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছে।”(৩৬:৩০)আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি তাদের একের পর এককে ধ্বংস করে দিয়েছি। যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘নূহ (আঃ)-এর পরেও আমি বহু জনপদকে ধ্বংস করেছি। (১৭:১৭)মহান আল্লাহর উক্তিঃ আমি তাদেরকে কাহিনীর বিষয় করেছি। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুতরাং আমি তাদেরকে কাহিনীর বিষয় করেছি এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে টুকরা টুকরা করে ফেলেছি।” (৩৪:১৯)
আল-মুমিনুন 23:43
৪২-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তাদের পরে বহু জাতির আগমন ঘটেছিল। যাদেরকে আমিই সৃষ্টি করেছিলাম। আমি তাদের জন্যে যে কাল নির্ধারণ করেছিলাম তা পূর্ণ হয়েছিল। তা ত্বরান্বিত হয়নি এবং বিলম্বিতও হয়নি। আমি একের পর এক রাসূল পাঠিয়েছি। প্রত্যেক জাতির কাছে রাসূল এসেছেন। তিনি তাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তারা তাদেরকে বলেছেনঃ তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং তার ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সঠিক পথে এসে যায় এবং কারো কারো উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হয়। অধিকাংশ জাতিই তাদের নবীকে অস্বীকার করে। যেমন সূরায়ে ইয়াসীনে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “পরিতাপ বান্দাদের জন্যে! তাদের নিকট যখনই কোন রাসূল এসেছে তখনই তারা তাকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছে।”(৩৬:৩০)আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি তাদের একের পর এককে ধ্বংস করে দিয়েছি। যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘নূহ (আঃ)-এর পরেও আমি বহু জনপদকে ধ্বংস করেছি। (১৭:১৭)মহান আল্লাহর উক্তিঃ আমি তাদেরকে কাহিনীর বিষয় করেছি। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুতরাং আমি তাদেরকে কাহিনীর বিষয় করেছি এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে টুকরা টুকরা করে ফেলেছি।” (৩৪:১৯)
আল-মুমিনুন 23:44
৪২-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তাদের পরে বহু জাতির আগমন ঘটেছিল। যাদেরকে আমিই সৃষ্টি করেছিলাম। আমি তাদের জন্যে যে কাল নির্ধারণ করেছিলাম তা পূর্ণ হয়েছিল। তা ত্বরান্বিত হয়নি এবং বিলম্বিতও হয়নি। আমি একের পর এক রাসূল পাঠিয়েছি। প্রত্যেক জাতির কাছে রাসূল এসেছেন। তিনি তাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তারা তাদেরকে বলেছেনঃ তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং তার ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সঠিক পথে এসে যায় এবং কারো কারো উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হয়। অধিকাংশ জাতিই তাদের নবীকে অস্বীকার করে। যেমন সূরায়ে ইয়াসীনে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “পরিতাপ বান্দাদের জন্যে! তাদের নিকট যখনই কোন রাসূল এসেছে তখনই তারা তাকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছে।”(৩৬:৩০)আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি তাদের একের পর এককে ধ্বংস করে দিয়েছি। যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘নূহ (আঃ)-এর পরেও আমি বহু জনপদকে ধ্বংস করেছি। (১৭:১৭)মহান আল্লাহর উক্তিঃ আমি তাদেরকে কাহিনীর বিষয় করেছি। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুতরাং আমি তাদেরকে কাহিনীর বিষয় করেছি এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে টুকরা টুকরা করে ফেলেছি।” (৩৪:১৯)
আল-মুমিনুন 23:45
৪৫-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর ভাই হারুন (আঃ)-কে নিদর্শন ও সুস্পষ্ট প্রমাণসহ ফিরাউন ও তার পারিষদবর্গের নিকট প্রেরন করেন। কিন্তু তারা তাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের মতই তাদেরকে সি করে এবং তাঁদের বিরুদ্ধাচরণে উঠে পড়ে লেগে যায়। তারা তাদেরকে বলেঃ তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ। সুতরাং আমরা তোমাদের নবুওয়াতকে বিশ্বাস করতে পারি না। তাদের অন্তর তাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের মতই শক্ত হয়ে যায়। অবশেষে একদিনেই আল্লাহ তা'আলা তাদের সবকেই সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন।এরপর লোকদেরকে হিদায়াত করার জন্যে হযরত মূসা (আঃ)-কে তাওরাত প্রদান করা হয়। আবার মুমিনদের হাতে কাফিররা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হয়। ফিরাউন ও তার কওম কিবতীদের পরে এরূপভাবে সাধারণ আযাবে কোন উম্মত সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়নি। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তো পূর্ববর্তী বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করবার পর মূসা (আঃ)-কে দিয়েছিলাম কিতাব, মানব জাতির জন্যে জ্ঞান-বর্তিকা, পথ-নির্দেশ ও দয়া স্বরূপ, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” (২৮:৪৩)
আল-মুমিনুন 23:46
৪৫-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর ভাই হারুন (আঃ)-কে নিদর্শন ও সুস্পষ্ট প্রমাণসহ ফিরাউন ও তার পারিষদবর্গের নিকট প্রেরন করেন। কিন্তু তারা তাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের মতই তাদেরকে সি করে এবং তাঁদের বিরুদ্ধাচরণে উঠে পড়ে লেগে যায়। তারা তাদেরকে বলেঃ তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ। সুতরাং আমরা তোমাদের নবুওয়াতকে বিশ্বাস করতে পারি না। তাদের অন্তর তাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের মতই শক্ত হয়ে যায়। অবশেষে একদিনেই আল্লাহ তা'আলা তাদের সবকেই সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন।এরপর লোকদেরকে হিদায়াত করার জন্যে হযরত মূসা (আঃ)-কে তাওরাত প্রদান করা হয়। আবার মুমিনদের হাতে কাফিররা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হয়। ফিরাউন ও তার কওম কিবতীদের পরে এরূপভাবে সাধারণ আযাবে কোন উম্মত সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়নি। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তো পূর্ববর্তী বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করবার পর মূসা (আঃ)-কে দিয়েছিলাম কিতাব, মানব জাতির জন্যে জ্ঞান-বর্তিকা, পথ-নির্দেশ ও দয়া স্বরূপ, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” (২৮:৪৩)
আল-মুমিনুন 23:47
৪৫-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর ভাই হারুন (আঃ)-কে নিদর্শন ও সুস্পষ্ট প্রমাণসহ ফিরাউন ও তার পারিষদবর্গের নিকট প্রেরন করেন। কিন্তু তারা তাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের মতই তাদেরকে সি করে এবং তাঁদের বিরুদ্ধাচরণে উঠে পড়ে লেগে যায়। তারা তাদেরকে বলেঃ তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ। সুতরাং আমরা তোমাদের নবুওয়াতকে বিশ্বাস করতে পারি না। তাদের অন্তর তাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের মতই শক্ত হয়ে যায়। অবশেষে একদিনেই আল্লাহ তা'আলা তাদের সবকেই সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন।এরপর লোকদেরকে হিদায়াত করার জন্যে হযরত মূসা (আঃ)-কে তাওরাত প্রদান করা হয়। আবার মুমিনদের হাতে কাফিররা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হয়। ফিরাউন ও তার কওম কিবতীদের পরে এরূপভাবে সাধারণ আযাবে কোন উম্মত সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়নি। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তো পূর্ববর্তী বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করবার পর মূসা (আঃ)-কে দিয়েছিলাম কিতাব, মানব জাতির জন্যে জ্ঞান-বর্তিকা, পথ-নির্দেশ ও দয়া স্বরূপ, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” (২৮:৪৩)
আল-মুমিনুন 23:48
৪৫-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর ভাই হারুন (আঃ)-কে নিদর্শন ও সুস্পষ্ট প্রমাণসহ ফিরাউন ও তার পারিষদবর্গের নিকট প্রেরন করেন। কিন্তু তারা তাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের মতই তাদেরকে সি করে এবং তাঁদের বিরুদ্ধাচরণে উঠে পড়ে লেগে যায়। তারা তাদেরকে বলেঃ তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ। সুতরাং আমরা তোমাদের নবুওয়াতকে বিশ্বাস করতে পারি না। তাদের অন্তর তাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের মতই শক্ত হয়ে যায়। অবশেষে একদিনেই আল্লাহ তা'আলা তাদের সবকেই সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন।এরপর লোকদেরকে হিদায়াত করার জন্যে হযরত মূসা (আঃ)-কে তাওরাত প্রদান করা হয়। আবার মুমিনদের হাতে কাফিররা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হয়। ফিরাউন ও তার কওম কিবতীদের পরে এরূপভাবে সাধারণ আযাবে কোন উম্মত সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়নি। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তো পূর্ববর্তী বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করবার পর মূসা (আঃ)-কে দিয়েছিলাম কিতাব, মানব জাতির জন্যে জ্ঞান-বর্তিকা, পথ-নির্দেশ ও দয়া স্বরূপ, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” (২৮:৪৩)
আল-মুমিনুন 23:49
৪৫-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর ভাই হারুন (আঃ)-কে নিদর্শন ও সুস্পষ্ট প্রমাণসহ ফিরাউন ও তার পারিষদবর্গের নিকট প্রেরন করেন। কিন্তু তারা তাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের মতই তাদেরকে সি করে এবং তাঁদের বিরুদ্ধাচরণে উঠে পড়ে লেগে যায়। তারা তাদেরকে বলেঃ তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ। সুতরাং আমরা তোমাদের নবুওয়াতকে বিশ্বাস করতে পারি না। তাদের অন্তর তাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের মতই শক্ত হয়ে যায়। অবশেষে একদিনেই আল্লাহ তা'আলা তাদের সবকেই সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন।এরপর লোকদেরকে হিদায়াত করার জন্যে হযরত মূসা (আঃ)-কে তাওরাত প্রদান করা হয়। আবার মুমিনদের হাতে কাফিররা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হয়। ফিরাউন ও তার কওম কিবতীদের পরে এরূপভাবে সাধারণ আযাবে কোন উম্মত সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়নি। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তো পূর্ববর্তী বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করবার পর মূসা (আঃ)-কে দিয়েছিলাম কিতাব, মানব জাতির জন্যে জ্ঞান-বর্তিকা, পথ-নির্দেশ ও দয়া স্বরূপ, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” (২৮:৪৩)
আল-মুমিনুন 23:50
আল্লাহ তাআলা খরব দিচ্ছেন যে, তিনি হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-কে তাঁর পূর্ণ ও ব্যাপক ক্ষমতা প্রকাশের এক বড় নিদর্শন বানিয়েছেন। হযরত আদম (আঃ)-কে তিনি নর ও নারীর মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। হযরত হাওয়া (আঃ)-কে স্ত্রী ছাড়া শুধু পুরুষের মাধ্যমে তিনি সৃষ্টি করেছেন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে তিনি সৃষ্টি করেছেন পুরুষ লোকে ছাড়া শুধু স্ত্রীলোকের মাধ্যমে। আর অবশিষ্ট সমস্ত লোককে তিনি নর ও নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন।(আরবী) বলা হয় ঐ উঁচু ভূমিকে যা সবুজ-শ্যামল ও কৃষি কার্যের উপযোগী। এরূপ তৃণলতা ও পানি বিশিষ্ট তরুতাজা এবং সবুজ-শ্যামল স্থানে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দা ও নবী হযরত ঈসা (আঃ) এবং তাঁর মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে আশ্রয় দান করেছিলেন। সেখানে পানি প্রবাহিত হতো। ওটা ছিল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এক মসৃণ ও সমতলভূমি। কোন কোন গুরুজনের মতে ওটা ছিল মিসরের ভূখণ্ড। আবার কারো কারো মতে ওটা ছিল দামেস্ক অথবা ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড। (আরবী) বালুকাময় ভূমিকেও বলা হয়। যেমন হযরত মুররাতল বাহযী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেন, যা তিনি একজন সাহাবী (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ “রাবওয়াতে তোমার ইন্তেকাল হবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস) ঐ সাহাবী (রাঃ) বালুকাময় ভূমিতেই মৃত্যুবরণ করেন। এসব উক্তির মধ্যে সবচেয়ে বেশী বিশ্বাসযোগ্য উক্তি হলো এই যে, এর দ্বারা নহরকে বুঝানো হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক তোমার পাদদেশে এক নহর সৃষ্টি করেছেন।” (১৯:২৪) সুতরাং এটা হলো বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি স্থান। তাহলে এ আয়াতটি যেন ঐ আয়াতেরই তাফসীর। আর কুরআনের তাফসীর প্রথমতঃ কুরআন দ্বারা, তারপর হাদীস দ্বারা এবং এরপর আসার দ্বারা করা উচিত।
আল-মুমিনুন 23:51
৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর সমস্ত নবী (আঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেন হালাল খাদ্য ভক্ষণ করেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেন। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, হালাল খাদ্য সৎ কার্যের সহায়ক। নবীগণ (আঃ) সর্বপ্রকারের মঙ্গল সঞ্চয় করেছেন। কথা, কাজ, পথ-প্রদর্শন, উপদেশ ইত্যাদি সবকিছুই জমা করেছেন। এখানে আল্লাহ পাক রং, স্বাদ ইত্যাদি বর্ণনা করেননি, বরং শুধুমাত্র হালাল খাদ্য খেতে বলেছেন। আবূ মাইসারা আমর ইবনে শুরাহবীল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তার মাতার বয়ন করার পারিশ্রমিক হতে খেতেন। সহীহ হাদীসে আছে যে, এমন কোন নবী ছিলেন না যিনি ছাগল চরাননি। সাহাবীগণ তখন জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনিও কি (ছাগল চরিয়েছেন)?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হ্যা, আমিও কয়েকটি কীরাতের (কীরাত হলো এক আউন্সের চব্বিশভাগের একভাগ পরিমাণ ওজন) বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম।” আর একটি সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) স্বহস্তের উপার্জন হতে ভক্ষণ করতেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয় রোযা হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর রোযা। আর আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় কিয়াম (রাত্রিকালে ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকা) হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর কিয়াম। তিনি অর্ধেক রাত্রি ঘুমাতেন, এক তৃতীয়াংশ রাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন এবং এক ষষ্ঠাংশ শুয়ে থাকতেন। একদিন তিনি রোযা রাখতেন ও একদিন রোযা ছেড়ে দিতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি কখনো পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতেন না। শাদ্দাদ ইবনে আউসের কন্যা হযরত উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (একদা) দিনের প্রথম ভাগে কঠিন গরমের সময় আমি এক পেয়ালা দুধ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে প্রেরণ করি এই উদ্দেশ্যে যে, তিনি এটা দ্বারা রোযার ইফতার করবেন। তিনি আমার প্রেরিত দূতকে এই বলে ফিরিয়ে পাঠালেনঃ “এ দুধ যদি তোমার নিজের বকরীর হতো তবে আমি তা পান করতাম। আমি তখন বলে পাঠালামঃ আমি এ দুধ নিজের মাল দ্বারা ক্রয় করেছি। তখন তিনি তা পান করলেন। পরের দিন শাদ্দাদের কন্যা উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দিনের দীর্ঘ সময়ের অত্যন্ত গরমের মধ্যে আমি আপনার নিকট দুধ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমার দূতকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন (এর কারণ কি?)!" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা, আমি এরূপ করতেই আদিষ্ট হয়েছি। নবীরা শুধু হালাল খাদ্যই ভক্ষণ করে থাকেন এবং ভাল কাজই সম্পাদন করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র। পবিত্র ছাড়া তিনি কিছুই কবুল করেন না। মুমিনদেরকে তিনি তিনি ঐ হুকুমই দিয়েছেন যে হুকুম তিনি রাসূলদেরকে (আঃ) দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র খাদ্য ভক্ষণ কর ও সৎ কার্য সম্পাদনা কর এবং জেনে রেখো যে, তোমরা যা কিছু আমল করছে আমি তা দেখতে রয়েছি” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা শৰি ৰাদ্য ভক্ষণ কর যা আমি তোমাদেরকে জীবিকারূপে দান করেছি।" অতঃপর তিনি এমন একটি লোকের বর্ণনা দেন যে দীর্ঘ সফর করে, যার চুল থাকে এলো মেলো এবং চেহারা থাকে ধূলো বালিতে আচ্ছন্ন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক!' কিন্তু তার দুআ কবুল করা হবে এটা অসম্ভব (কেননা, সে হারাম পন্থায় উপার্জন করে ও হারাম খাদ্য ভক্ষণ করে)। (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম, জামেউত তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ ‘তোমাদের এই যে জাতি এটা তো একই জাতি। অর্থাৎ হে নবীগণ (আঃ)! তোমাদের এই দ্বীন একই দ্বীন, এই মিল্লাত একই মিল্লাত। আর তাহলো শরীক বিহীন এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেয়া। এ জন্যেই এর পরে বলেছেনঃ “আমিই তোমাদের প্রতিপালক! সুতরাং আমাকে ভয় কর।’ সূরায়ে আম্বিয়ায় এর ব্যাখ্যা গত হয়েছে। (আরবী) এর উপর (আরবী) বা অবস্থা বোধক-এর কারণে যবর দেয়া হয়েছে। যে উম্মতদের নিকট নবীদেরকে (আঃ) পাঠানো হয়েছিল তারা তাদের নিজেদের মধ্যে তাদের দ্বীনকে শতধা বিভক্ত করে ফেলেছিল এবং এতেই তারা সন্তুষ্ট ছিল। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যেক দলই তাদের নিকট যা আছে তা নিয়েই আনন্দিত। সুতরাং তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হচ্ছেঃ কিছুকালের জন্যে তাদেরকে তাদের বিভ্রান্তির মধ্যে থাকতে দাও। অবশেষে তাদের ধ্বংসের সময় এসে পড়বে। তাদেরকে পানাহার ও হাসি খুশীতে মগ্ন থাকতে দাও। সত্বরই তারা তাদের কৃতকর্মের ফল জানতে পারবে।মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে যে মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি দান করেছি তা তাদের মঙ্গলের জন্যে? আমি তাদের উপর সন্তুষ্ট বলেই কি তাদেরকে এ সবকিছু দিয়েছি? কখনই না। তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ অমলক। তারা প্রতারণার মধ্যে পড়ে গেছে। তারা মনে করছে যে, দুনিয়ায় যেমন তারা সুখে-শান্তিতে রয়েছে, অনুরূপভাবে আখিরাতেও তারা সুখ-শান্তি লাভ করবে। তাদেরকে সেখানে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেয়া হবে না। এটা তাদের সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। তাদেরকে কিছুদিনের জন্যে অবকাশ দেয়া হচ্ছে মাত্র। কিন্তু তারা বুঝে না। প্রকৃত ব্যাপার তারা অনুধাবন করতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব তাদেরকে (কাফিরদেরকে) অবকাশ দাও; তাদেরকে অবকাশ দাও কিছুকালের জন্যে।” (৮৬:১৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে; আল্লাহ এর দ্বারা তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান।” (৯:৫৫) অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ ১) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি হয়।” (৩:১৭৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত। অর্থাৎ “আমাকে ছেড়ে দাও এবং তাকে যাকে আমি সৃষ্টি করেছি অসাধারণ করে। আমি তাকে দিয়েছি বিপুল ধন-সম্পদ এবং নিত্য সঙ্গী পুত্রগণ। আর তাকে দিয়েছি স্বচ্ছন্দ জীবনের প্রচুর উপকরণ। এরপরেও সে কামনা করে যে, আমি তাকে আরো অধিক দিই। না, তা হবে না, সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী।” (৭:১১-১৬) অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মাল ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নৈকট্য লাভ করাতে পারবে না, আমার নৈকট্য লাভকারী তো তারাই হবে যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে।” (৩৪:৩৭) এই বিষয়ের আরো বহু আয়াত রয়েছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে কওমকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করা হয়েছে তারা প্রতারিত হয়েছে। ধন-মাল ও সন্তানাদি দ্বারা মানুষের গুণ ও মহত্ত্ব প্রকাশ পায় না, বরং তাদের কষ্টিপাথর হলো ঈমান ও সৎ আমল। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের মধ্যে তোমাদের চরিত্রকে বন্টন করে দিয়েছেন যেমনভাবে তোমদের মধ্যে বন্টন করেছেন তোমাদের জীবিকাকে। যাকে তিনি ভালবাসেন তাকেও দুনিয়া দান করেন এবং যাকে ভালবাসেন না তাকেও দুনিয়া (-এর সুখ-ভাগে) দান করে থাকেন। আর দ্বীন শুধু তাকেই তিনি দান করেন যাকে ভালবাসেন। সুতরাং যাকে আল্লাহ তা'আলা দ্বীন দান করেন, জানবে যে, তাকে তিনি ভালবাসেন। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! বান্দা মুসলিম হয় না যে পর্যন্ত না তার হৃদয় ও জিহ্বা মুসলিম হয়। আর বান্দা মুমিন হয় না যে পর্যন্ত না তার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ হয়।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার অনিষ্ট কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “প্রতারণা, যুলুম ইত্যাদি। জেনে রেখো যে, যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে মাল উপার্জন করে, অতঃপর তা থেকে খরচ করে, তার খরচে বরকত দেয়া হয় না এবং সে যে দান করে সেই দান গৃহীত হয় না। সে যা কিছু ছেড়ে যাবে তা হবে তার জন্যে জাহান্নামের খাদ্যসম্ভার। আল্লাহ তাআলা মন্দকে মন্দ দ্বারা মুছে ফেলেন না। বরং তিনি মন্দকে মিটিয়ে থাকেন ভাল দ্বারা। কলুষতা কলুষতাকে দূর করে না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-মুমিনুন 23:52
৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর সমস্ত নবী (আঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেন হালাল খাদ্য ভক্ষণ করেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেন। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, হালাল খাদ্য সৎ কার্যের সহায়ক। নবীগণ (আঃ) সর্বপ্রকারের মঙ্গল সঞ্চয় করেছেন। কথা, কাজ, পথ-প্রদর্শন, উপদেশ ইত্যাদি সবকিছুই জমা করেছেন। এখানে আল্লাহ পাক রং, স্বাদ ইত্যাদি বর্ণনা করেননি, বরং শুধুমাত্র হালাল খাদ্য খেতে বলেছেন। আবূ মাইসারা আমর ইবনে শুরাহবীল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তার মাতার বয়ন করার পারিশ্রমিক হতে খেতেন। সহীহ হাদীসে আছে যে, এমন কোন নবী ছিলেন না যিনি ছাগল চরাননি। সাহাবীগণ তখন জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনিও কি (ছাগল চরিয়েছেন)?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হ্যা, আমিও কয়েকটি কীরাতের (কীরাত হলো এক আউন্সের চব্বিশভাগের একভাগ পরিমাণ ওজন) বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম।” আর একটি সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) স্বহস্তের উপার্জন হতে ভক্ষণ করতেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয় রোযা হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর রোযা। আর আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় কিয়াম (রাত্রিকালে ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকা) হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর কিয়াম। তিনি অর্ধেক রাত্রি ঘুমাতেন, এক তৃতীয়াংশ রাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন এবং এক ষষ্ঠাংশ শুয়ে থাকতেন। একদিন তিনি রোযা রাখতেন ও একদিন রোযা ছেড়ে দিতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি কখনো পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতেন না। শাদ্দাদ ইবনে আউসের কন্যা হযরত উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (একদা) দিনের প্রথম ভাগে কঠিন গরমের সময় আমি এক পেয়ালা দুধ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে প্রেরণ করি এই উদ্দেশ্যে যে, তিনি এটা দ্বারা রোযার ইফতার করবেন। তিনি আমার প্রেরিত দূতকে এই বলে ফিরিয়ে পাঠালেনঃ “এ দুধ যদি তোমার নিজের বকরীর হতো তবে আমি তা পান করতাম। আমি তখন বলে পাঠালামঃ আমি এ দুধ নিজের মাল দ্বারা ক্রয় করেছি। তখন তিনি তা পান করলেন। পরের দিন শাদ্দাদের কন্যা উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দিনের দীর্ঘ সময়ের অত্যন্ত গরমের মধ্যে আমি আপনার নিকট দুধ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমার দূতকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন (এর কারণ কি?)!" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা, আমি এরূপ করতেই আদিষ্ট হয়েছি। নবীরা শুধু হালাল খাদ্যই ভক্ষণ করে থাকেন এবং ভাল কাজই সম্পাদন করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র। পবিত্র ছাড়া তিনি কিছুই কবুল করেন না। মুমিনদেরকে তিনি তিনি ঐ হুকুমই দিয়েছেন যে হুকুম তিনি রাসূলদেরকে (আঃ) দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র খাদ্য ভক্ষণ কর ও সৎ কার্য সম্পাদনা কর এবং জেনে রেখো যে, তোমরা যা কিছু আমল করছে আমি তা দেখতে রয়েছি” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা শৰি ৰাদ্য ভক্ষণ কর যা আমি তোমাদেরকে জীবিকারূপে দান করেছি।" অতঃপর তিনি এমন একটি লোকের বর্ণনা দেন যে দীর্ঘ সফর করে, যার চুল থাকে এলো মেলো এবং চেহারা থাকে ধূলো বালিতে আচ্ছন্ন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক!' কিন্তু তার দুআ কবুল করা হবে এটা অসম্ভব (কেননা, সে হারাম পন্থায় উপার্জন করে ও হারাম খাদ্য ভক্ষণ করে)। (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম, জামেউত তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ ‘তোমাদের এই যে জাতি এটা তো একই জাতি। অর্থাৎ হে নবীগণ (আঃ)! তোমাদের এই দ্বীন একই দ্বীন, এই মিল্লাত একই মিল্লাত। আর তাহলো শরীক বিহীন এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেয়া। এ জন্যেই এর পরে বলেছেনঃ “আমিই তোমাদের প্রতিপালক! সুতরাং আমাকে ভয় কর।’ সূরায়ে আম্বিয়ায় এর ব্যাখ্যা গত হয়েছে। (আরবী) এর উপর (আরবী) বা অবস্থা বোধক-এর কারণে যবর দেয়া হয়েছে। যে উম্মতদের নিকট নবীদেরকে (আঃ) পাঠানো হয়েছিল তারা তাদের নিজেদের মধ্যে তাদের দ্বীনকে শতধা বিভক্ত করে ফেলেছিল এবং এতেই তারা সন্তুষ্ট ছিল। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যেক দলই তাদের নিকট যা আছে তা নিয়েই আনন্দিত। সুতরাং তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হচ্ছেঃ কিছুকালের জন্যে তাদেরকে তাদের বিভ্রান্তির মধ্যে থাকতে দাও। অবশেষে তাদের ধ্বংসের সময় এসে পড়বে। তাদেরকে পানাহার ও হাসি খুশীতে মগ্ন থাকতে দাও। সত্বরই তারা তাদের কৃতকর্মের ফল জানতে পারবে।মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে যে মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি দান করেছি তা তাদের মঙ্গলের জন্যে? আমি তাদের উপর সন্তুষ্ট বলেই কি তাদেরকে এ সবকিছু দিয়েছি? কখনই না। তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ অমলক। তারা প্রতারণার মধ্যে পড়ে গেছে। তারা মনে করছে যে, দুনিয়ায় যেমন তারা সুখে-শান্তিতে রয়েছে, অনুরূপভাবে আখিরাতেও তারা সুখ-শান্তি লাভ করবে। তাদেরকে সেখানে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেয়া হবে না। এটা তাদের সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। তাদেরকে কিছুদিনের জন্যে অবকাশ দেয়া হচ্ছে মাত্র। কিন্তু তারা বুঝে না। প্রকৃত ব্যাপার তারা অনুধাবন করতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব তাদেরকে (কাফিরদেরকে) অবকাশ দাও; তাদেরকে অবকাশ দাও কিছুকালের জন্যে।” (৮৬:১৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে; আল্লাহ এর দ্বারা তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান।” (৯:৫৫) অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ ১) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি হয়।” (৩:১৭৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত। অর্থাৎ “আমাকে ছেড়ে দাও এবং তাকে যাকে আমি সৃষ্টি করেছি অসাধারণ করে। আমি তাকে দিয়েছি বিপুল ধন-সম্পদ এবং নিত্য সঙ্গী পুত্রগণ। আর তাকে দিয়েছি স্বচ্ছন্দ জীবনের প্রচুর উপকরণ। এরপরেও সে কামনা করে যে, আমি তাকে আরো অধিক দিই। না, তা হবে না, সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী।” (৭:১১-১৬) অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মাল ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নৈকট্য লাভ করাতে পারবে না, আমার নৈকট্য লাভকারী তো তারাই হবে যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে।” (৩৪:৩৭) এই বিষয়ের আরো বহু আয়াত রয়েছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে কওমকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করা হয়েছে তারা প্রতারিত হয়েছে। ধন-মাল ও সন্তানাদি দ্বারা মানুষের গুণ ও মহত্ত্ব প্রকাশ পায় না, বরং তাদের কষ্টিপাথর হলো ঈমান ও সৎ আমল। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের মধ্যে তোমাদের চরিত্রকে বন্টন করে দিয়েছেন যেমনভাবে তোমদের মধ্যে বন্টন করেছেন তোমাদের জীবিকাকে। যাকে তিনি ভালবাসেন তাকেও দুনিয়া দান করেন এবং যাকে ভালবাসেন না তাকেও দুনিয়া (-এর সুখ-ভাগে) দান করে থাকেন। আর দ্বীন শুধু তাকেই তিনি দান করেন যাকে ভালবাসেন। সুতরাং যাকে আল্লাহ তা'আলা দ্বীন দান করেন, জানবে যে, তাকে তিনি ভালবাসেন। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! বান্দা মুসলিম হয় না যে পর্যন্ত না তার হৃদয় ও জিহ্বা মুসলিম হয়। আর বান্দা মুমিন হয় না যে পর্যন্ত না তার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ হয়।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার অনিষ্ট কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “প্রতারণা, যুলুম ইত্যাদি। জেনে রেখো যে, যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে মাল উপার্জন করে, অতঃপর তা থেকে খরচ করে, তার খরচে বরকত দেয়া হয় না এবং সে যে দান করে সেই দান গৃহীত হয় না। সে যা কিছু ছেড়ে যাবে তা হবে তার জন্যে জাহান্নামের খাদ্যসম্ভার। আল্লাহ তাআলা মন্দকে মন্দ দ্বারা মুছে ফেলেন না। বরং তিনি মন্দকে মিটিয়ে থাকেন ভাল দ্বারা। কলুষতা কলুষতাকে দূর করে না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-মুমিনুন 23:53
৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর সমস্ত নবী (আঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেন হালাল খাদ্য ভক্ষণ করেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেন। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, হালাল খাদ্য সৎ কার্যের সহায়ক। নবীগণ (আঃ) সর্বপ্রকারের মঙ্গল সঞ্চয় করেছেন। কথা, কাজ, পথ-প্রদর্শন, উপদেশ ইত্যাদি সবকিছুই জমা করেছেন। এখানে আল্লাহ পাক রং, স্বাদ ইত্যাদি বর্ণনা করেননি, বরং শুধুমাত্র হালাল খাদ্য খেতে বলেছেন। আবূ মাইসারা আমর ইবনে শুরাহবীল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তার মাতার বয়ন করার পারিশ্রমিক হতে খেতেন। সহীহ হাদীসে আছে যে, এমন কোন নবী ছিলেন না যিনি ছাগল চরাননি। সাহাবীগণ তখন জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনিও কি (ছাগল চরিয়েছেন)?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হ্যা, আমিও কয়েকটি কীরাতের (কীরাত হলো এক আউন্সের চব্বিশভাগের একভাগ পরিমাণ ওজন) বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম।” আর একটি সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) স্বহস্তের উপার্জন হতে ভক্ষণ করতেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয় রোযা হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর রোযা। আর আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় কিয়াম (রাত্রিকালে ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকা) হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর কিয়াম। তিনি অর্ধেক রাত্রি ঘুমাতেন, এক তৃতীয়াংশ রাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন এবং এক ষষ্ঠাংশ শুয়ে থাকতেন। একদিন তিনি রোযা রাখতেন ও একদিন রোযা ছেড়ে দিতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি কখনো পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতেন না। শাদ্দাদ ইবনে আউসের কন্যা হযরত উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (একদা) দিনের প্রথম ভাগে কঠিন গরমের সময় আমি এক পেয়ালা দুধ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে প্রেরণ করি এই উদ্দেশ্যে যে, তিনি এটা দ্বারা রোযার ইফতার করবেন। তিনি আমার প্রেরিত দূতকে এই বলে ফিরিয়ে পাঠালেনঃ “এ দুধ যদি তোমার নিজের বকরীর হতো তবে আমি তা পান করতাম। আমি তখন বলে পাঠালামঃ আমি এ দুধ নিজের মাল দ্বারা ক্রয় করেছি। তখন তিনি তা পান করলেন। পরের দিন শাদ্দাদের কন্যা উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দিনের দীর্ঘ সময়ের অত্যন্ত গরমের মধ্যে আমি আপনার নিকট দুধ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমার দূতকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন (এর কারণ কি?)!" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা, আমি এরূপ করতেই আদিষ্ট হয়েছি। নবীরা শুধু হালাল খাদ্যই ভক্ষণ করে থাকেন এবং ভাল কাজই সম্পাদন করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র। পবিত্র ছাড়া তিনি কিছুই কবুল করেন না। মুমিনদেরকে তিনি তিনি ঐ হুকুমই দিয়েছেন যে হুকুম তিনি রাসূলদেরকে (আঃ) দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র খাদ্য ভক্ষণ কর ও সৎ কার্য সম্পাদনা কর এবং জেনে রেখো যে, তোমরা যা কিছু আমল করছে আমি তা দেখতে রয়েছি” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা শৰি ৰাদ্য ভক্ষণ কর যা আমি তোমাদেরকে জীবিকারূপে দান করেছি।" অতঃপর তিনি এমন একটি লোকের বর্ণনা দেন যে দীর্ঘ সফর করে, যার চুল থাকে এলো মেলো এবং চেহারা থাকে ধূলো বালিতে আচ্ছন্ন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক!' কিন্তু তার দুআ কবুল করা হবে এটা অসম্ভব (কেননা, সে হারাম পন্থায় উপার্জন করে ও হারাম খাদ্য ভক্ষণ করে)। (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম, জামেউত তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ ‘তোমাদের এই যে জাতি এটা তো একই জাতি। অর্থাৎ হে নবীগণ (আঃ)! তোমাদের এই দ্বীন একই দ্বীন, এই মিল্লাত একই মিল্লাত। আর তাহলো শরীক বিহীন এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেয়া। এ জন্যেই এর পরে বলেছেনঃ “আমিই তোমাদের প্রতিপালক! সুতরাং আমাকে ভয় কর।’ সূরায়ে আম্বিয়ায় এর ব্যাখ্যা গত হয়েছে। (আরবী) এর উপর (আরবী) বা অবস্থা বোধক-এর কারণে যবর দেয়া হয়েছে। যে উম্মতদের নিকট নবীদেরকে (আঃ) পাঠানো হয়েছিল তারা তাদের নিজেদের মধ্যে তাদের দ্বীনকে শতধা বিভক্ত করে ফেলেছিল এবং এতেই তারা সন্তুষ্ট ছিল। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যেক দলই তাদের নিকট যা আছে তা নিয়েই আনন্দিত। সুতরাং তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হচ্ছেঃ কিছুকালের জন্যে তাদেরকে তাদের বিভ্রান্তির মধ্যে থাকতে দাও। অবশেষে তাদের ধ্বংসের সময় এসে পড়বে। তাদেরকে পানাহার ও হাসি খুশীতে মগ্ন থাকতে দাও। সত্বরই তারা তাদের কৃতকর্মের ফল জানতে পারবে।মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে যে মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি দান করেছি তা তাদের মঙ্গলের জন্যে? আমি তাদের উপর সন্তুষ্ট বলেই কি তাদেরকে এ সবকিছু দিয়েছি? কখনই না। তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ অমলক। তারা প্রতারণার মধ্যে পড়ে গেছে। তারা মনে করছে যে, দুনিয়ায় যেমন তারা সুখে-শান্তিতে রয়েছে, অনুরূপভাবে আখিরাতেও তারা সুখ-শান্তি লাভ করবে। তাদেরকে সেখানে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেয়া হবে না। এটা তাদের সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। তাদেরকে কিছুদিনের জন্যে অবকাশ দেয়া হচ্ছে মাত্র। কিন্তু তারা বুঝে না। প্রকৃত ব্যাপার তারা অনুধাবন করতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব তাদেরকে (কাফিরদেরকে) অবকাশ দাও; তাদেরকে অবকাশ দাও কিছুকালের জন্যে।” (৮৬:১৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে; আল্লাহ এর দ্বারা তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান।” (৯:৫৫) অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ ১) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি হয়।” (৩:১৭৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত। অর্থাৎ “আমাকে ছেড়ে দাও এবং তাকে যাকে আমি সৃষ্টি করেছি অসাধারণ করে। আমি তাকে দিয়েছি বিপুল ধন-সম্পদ এবং নিত্য সঙ্গী পুত্রগণ। আর তাকে দিয়েছি স্বচ্ছন্দ জীবনের প্রচুর উপকরণ। এরপরেও সে কামনা করে যে, আমি তাকে আরো অধিক দিই। না, তা হবে না, সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী।” (৭:১১-১৬) অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মাল ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নৈকট্য লাভ করাতে পারবে না, আমার নৈকট্য লাভকারী তো তারাই হবে যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে।” (৩৪:৩৭) এই বিষয়ের আরো বহু আয়াত রয়েছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে কওমকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করা হয়েছে তারা প্রতারিত হয়েছে। ধন-মাল ও সন্তানাদি দ্বারা মানুষের গুণ ও মহত্ত্ব প্রকাশ পায় না, বরং তাদের কষ্টিপাথর হলো ঈমান ও সৎ আমল। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের মধ্যে তোমাদের চরিত্রকে বন্টন করে দিয়েছেন যেমনভাবে তোমদের মধ্যে বন্টন করেছেন তোমাদের জীবিকাকে। যাকে তিনি ভালবাসেন তাকেও দুনিয়া দান করেন এবং যাকে ভালবাসেন না তাকেও দুনিয়া (-এর সুখ-ভাগে) দান করে থাকেন। আর দ্বীন শুধু তাকেই তিনি দান করেন যাকে ভালবাসেন। সুতরাং যাকে আল্লাহ তা'আলা দ্বীন দান করেন, জানবে যে, তাকে তিনি ভালবাসেন। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! বান্দা মুসলিম হয় না যে পর্যন্ত না তার হৃদয় ও জিহ্বা মুসলিম হয়। আর বান্দা মুমিন হয় না যে পর্যন্ত না তার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ হয়।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার অনিষ্ট কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “প্রতারণা, যুলুম ইত্যাদি। জেনে রেখো যে, যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে মাল উপার্জন করে, অতঃপর তা থেকে খরচ করে, তার খরচে বরকত দেয়া হয় না এবং সে যে দান করে সেই দান গৃহীত হয় না। সে যা কিছু ছেড়ে যাবে তা হবে তার জন্যে জাহান্নামের খাদ্যসম্ভার। আল্লাহ তাআলা মন্দকে মন্দ দ্বারা মুছে ফেলেন না। বরং তিনি মন্দকে মিটিয়ে থাকেন ভাল দ্বারা। কলুষতা কলুষতাকে দূর করে না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-মুমিনুন 23:54
৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর সমস্ত নবী (আঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেন হালাল খাদ্য ভক্ষণ করেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেন। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, হালাল খাদ্য সৎ কার্যের সহায়ক। নবীগণ (আঃ) সর্বপ্রকারের মঙ্গল সঞ্চয় করেছেন। কথা, কাজ, পথ-প্রদর্শন, উপদেশ ইত্যাদি সবকিছুই জমা করেছেন। এখানে আল্লাহ পাক রং, স্বাদ ইত্যাদি বর্ণনা করেননি, বরং শুধুমাত্র হালাল খাদ্য খেতে বলেছেন। আবূ মাইসারা আমর ইবনে শুরাহবীল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তার মাতার বয়ন করার পারিশ্রমিক হতে খেতেন। সহীহ হাদীসে আছে যে, এমন কোন নবী ছিলেন না যিনি ছাগল চরাননি। সাহাবীগণ তখন জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনিও কি (ছাগল চরিয়েছেন)?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হ্যা, আমিও কয়েকটি কীরাতের (কীরাত হলো এক আউন্সের চব্বিশভাগের একভাগ পরিমাণ ওজন) বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম।” আর একটি সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) স্বহস্তের উপার্জন হতে ভক্ষণ করতেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয় রোযা হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর রোযা। আর আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় কিয়াম (রাত্রিকালে ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকা) হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর কিয়াম। তিনি অর্ধেক রাত্রি ঘুমাতেন, এক তৃতীয়াংশ রাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন এবং এক ষষ্ঠাংশ শুয়ে থাকতেন। একদিন তিনি রোযা রাখতেন ও একদিন রোযা ছেড়ে দিতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি কখনো পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতেন না। শাদ্দাদ ইবনে আউসের কন্যা হযরত উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (একদা) দিনের প্রথম ভাগে কঠিন গরমের সময় আমি এক পেয়ালা দুধ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে প্রেরণ করি এই উদ্দেশ্যে যে, তিনি এটা দ্বারা রোযার ইফতার করবেন। তিনি আমার প্রেরিত দূতকে এই বলে ফিরিয়ে পাঠালেনঃ “এ দুধ যদি তোমার নিজের বকরীর হতো তবে আমি তা পান করতাম। আমি তখন বলে পাঠালামঃ আমি এ দুধ নিজের মাল দ্বারা ক্রয় করেছি। তখন তিনি তা পান করলেন। পরের দিন শাদ্দাদের কন্যা উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দিনের দীর্ঘ সময়ের অত্যন্ত গরমের মধ্যে আমি আপনার নিকট দুধ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমার দূতকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন (এর কারণ কি?)!" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা, আমি এরূপ করতেই আদিষ্ট হয়েছি। নবীরা শুধু হালাল খাদ্যই ভক্ষণ করে থাকেন এবং ভাল কাজই সম্পাদন করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র। পবিত্র ছাড়া তিনি কিছুই কবুল করেন না। মুমিনদেরকে তিনি তিনি ঐ হুকুমই দিয়েছেন যে হুকুম তিনি রাসূলদেরকে (আঃ) দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র খাদ্য ভক্ষণ কর ও সৎ কার্য সম্পাদনা কর এবং জেনে রেখো যে, তোমরা যা কিছু আমল করছে আমি তা দেখতে রয়েছি” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা শৰি ৰাদ্য ভক্ষণ কর যা আমি তোমাদেরকে জীবিকারূপে দান করেছি।" অতঃপর তিনি এমন একটি লোকের বর্ণনা দেন যে দীর্ঘ সফর করে, যার চুল থাকে এলো মেলো এবং চেহারা থাকে ধূলো বালিতে আচ্ছন্ন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক!' কিন্তু তার দুআ কবুল করা হবে এটা অসম্ভব (কেননা, সে হারাম পন্থায় উপার্জন করে ও হারাম খাদ্য ভক্ষণ করে)। (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম, জামেউত তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ ‘তোমাদের এই যে জাতি এটা তো একই জাতি। অর্থাৎ হে নবীগণ (আঃ)! তোমাদের এই দ্বীন একই দ্বীন, এই মিল্লাত একই মিল্লাত। আর তাহলো শরীক বিহীন এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেয়া। এ জন্যেই এর পরে বলেছেনঃ “আমিই তোমাদের প্রতিপালক! সুতরাং আমাকে ভয় কর।’ সূরায়ে আম্বিয়ায় এর ব্যাখ্যা গত হয়েছে। (আরবী) এর উপর (আরবী) বা অবস্থা বোধক-এর কারণে যবর দেয়া হয়েছে। যে উম্মতদের নিকট নবীদেরকে (আঃ) পাঠানো হয়েছিল তারা তাদের নিজেদের মধ্যে তাদের দ্বীনকে শতধা বিভক্ত করে ফেলেছিল এবং এতেই তারা সন্তুষ্ট ছিল। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যেক দলই তাদের নিকট যা আছে তা নিয়েই আনন্দিত। সুতরাং তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হচ্ছেঃ কিছুকালের জন্যে তাদেরকে তাদের বিভ্রান্তির মধ্যে থাকতে দাও। অবশেষে তাদের ধ্বংসের সময় এসে পড়বে। তাদেরকে পানাহার ও হাসি খুশীতে মগ্ন থাকতে দাও। সত্বরই তারা তাদের কৃতকর্মের ফল জানতে পারবে।মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে যে মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি দান করেছি তা তাদের মঙ্গলের জন্যে? আমি তাদের উপর সন্তুষ্ট বলেই কি তাদেরকে এ সবকিছু দিয়েছি? কখনই না। তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ অমলক। তারা প্রতারণার মধ্যে পড়ে গেছে। তারা মনে করছে যে, দুনিয়ায় যেমন তারা সুখে-শান্তিতে রয়েছে, অনুরূপভাবে আখিরাতেও তারা সুখ-শান্তি লাভ করবে। তাদেরকে সেখানে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেয়া হবে না। এটা তাদের সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। তাদেরকে কিছুদিনের জন্যে অবকাশ দেয়া হচ্ছে মাত্র। কিন্তু তারা বুঝে না। প্রকৃত ব্যাপার তারা অনুধাবন করতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব তাদেরকে (কাফিরদেরকে) অবকাশ দাও; তাদেরকে অবকাশ দাও কিছুকালের জন্যে।” (৮৬:১৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে; আল্লাহ এর দ্বারা তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান।” (৯:৫৫) অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ ১) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি হয়।” (৩:১৭৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত। অর্থাৎ “আমাকে ছেড়ে দাও এবং তাকে যাকে আমি সৃষ্টি করেছি অসাধারণ করে। আমি তাকে দিয়েছি বিপুল ধন-সম্পদ এবং নিত্য সঙ্গী পুত্রগণ। আর তাকে দিয়েছি স্বচ্ছন্দ জীবনের প্রচুর উপকরণ। এরপরেও সে কামনা করে যে, আমি তাকে আরো অধিক দিই। না, তা হবে না, সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী।” (৭:১১-১৬) অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মাল ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নৈকট্য লাভ করাতে পারবে না, আমার নৈকট্য লাভকারী তো তারাই হবে যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে।” (৩৪:৩৭) এই বিষয়ের আরো বহু আয়াত রয়েছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে কওমকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করা হয়েছে তারা প্রতারিত হয়েছে। ধন-মাল ও সন্তানাদি দ্বারা মানুষের গুণ ও মহত্ত্ব প্রকাশ পায় না, বরং তাদের কষ্টিপাথর হলো ঈমান ও সৎ আমল। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের মধ্যে তোমাদের চরিত্রকে বন্টন করে দিয়েছেন যেমনভাবে তোমদের মধ্যে বন্টন করেছেন তোমাদের জীবিকাকে। যাকে তিনি ভালবাসেন তাকেও দুনিয়া দান করেন এবং যাকে ভালবাসেন না তাকেও দুনিয়া (-এর সুখ-ভাগে) দান করে থাকেন। আর দ্বীন শুধু তাকেই তিনি দান করেন যাকে ভালবাসেন। সুতরাং যাকে আল্লাহ তা'আলা দ্বীন দান করেন, জানবে যে, তাকে তিনি ভালবাসেন। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! বান্দা মুসলিম হয় না যে পর্যন্ত না তার হৃদয় ও জিহ্বা মুসলিম হয়। আর বান্দা মুমিন হয় না যে পর্যন্ত না তার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ হয়।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার অনিষ্ট কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “প্রতারণা, যুলুম ইত্যাদি। জেনে রেখো যে, যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে মাল উপার্জন করে, অতঃপর তা থেকে খরচ করে, তার খরচে বরকত দেয়া হয় না এবং সে যে দান করে সেই দান গৃহীত হয় না। সে যা কিছু ছেড়ে যাবে তা হবে তার জন্যে জাহান্নামের খাদ্যসম্ভার। আল্লাহ তাআলা মন্দকে মন্দ দ্বারা মুছে ফেলেন না। বরং তিনি মন্দকে মিটিয়ে থাকেন ভাল দ্বারা। কলুষতা কলুষতাকে দূর করে না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-মুমিনুন 23:55
৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর সমস্ত নবী (আঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেন হালাল খাদ্য ভক্ষণ করেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেন। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, হালাল খাদ্য সৎ কার্যের সহায়ক। নবীগণ (আঃ) সর্বপ্রকারের মঙ্গল সঞ্চয় করেছেন। কথা, কাজ, পথ-প্রদর্শন, উপদেশ ইত্যাদি সবকিছুই জমা করেছেন। এখানে আল্লাহ পাক রং, স্বাদ ইত্যাদি বর্ণনা করেননি, বরং শুধুমাত্র হালাল খাদ্য খেতে বলেছেন। আবূ মাইসারা আমর ইবনে শুরাহবীল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তার মাতার বয়ন করার পারিশ্রমিক হতে খেতেন। সহীহ হাদীসে আছে যে, এমন কোন নবী ছিলেন না যিনি ছাগল চরাননি। সাহাবীগণ তখন জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনিও কি (ছাগল চরিয়েছেন)?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হ্যা, আমিও কয়েকটি কীরাতের (কীরাত হলো এক আউন্সের চব্বিশভাগের একভাগ পরিমাণ ওজন) বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম।” আর একটি সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) স্বহস্তের উপার্জন হতে ভক্ষণ করতেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয় রোযা হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর রোযা। আর আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় কিয়াম (রাত্রিকালে ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকা) হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর কিয়াম। তিনি অর্ধেক রাত্রি ঘুমাতেন, এক তৃতীয়াংশ রাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন এবং এক ষষ্ঠাংশ শুয়ে থাকতেন। একদিন তিনি রোযা রাখতেন ও একদিন রোযা ছেড়ে দিতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি কখনো পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতেন না। শাদ্দাদ ইবনে আউসের কন্যা হযরত উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (একদা) দিনের প্রথম ভাগে কঠিন গরমের সময় আমি এক পেয়ালা দুধ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে প্রেরণ করি এই উদ্দেশ্যে যে, তিনি এটা দ্বারা রোযার ইফতার করবেন। তিনি আমার প্রেরিত দূতকে এই বলে ফিরিয়ে পাঠালেনঃ “এ দুধ যদি তোমার নিজের বকরীর হতো তবে আমি তা পান করতাম। আমি তখন বলে পাঠালামঃ আমি এ দুধ নিজের মাল দ্বারা ক্রয় করেছি। তখন তিনি তা পান করলেন। পরের দিন শাদ্দাদের কন্যা উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দিনের দীর্ঘ সময়ের অত্যন্ত গরমের মধ্যে আমি আপনার নিকট দুধ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমার দূতকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন (এর কারণ কি?)!" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা, আমি এরূপ করতেই আদিষ্ট হয়েছি। নবীরা শুধু হালাল খাদ্যই ভক্ষণ করে থাকেন এবং ভাল কাজই সম্পাদন করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র। পবিত্র ছাড়া তিনি কিছুই কবুল করেন না। মুমিনদেরকে তিনি তিনি ঐ হুকুমই দিয়েছেন যে হুকুম তিনি রাসূলদেরকে (আঃ) দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র খাদ্য ভক্ষণ কর ও সৎ কার্য সম্পাদনা কর এবং জেনে রেখো যে, তোমরা যা কিছু আমল করছে আমি তা দেখতে রয়েছি” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা শৰি ৰাদ্য ভক্ষণ কর যা আমি তোমাদেরকে জীবিকারূপে দান করেছি।" অতঃপর তিনি এমন একটি লোকের বর্ণনা দেন যে দীর্ঘ সফর করে, যার চুল থাকে এলো মেলো এবং চেহারা থাকে ধূলো বালিতে আচ্ছন্ন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক!' কিন্তু তার দুআ কবুল করা হবে এটা অসম্ভব (কেননা, সে হারাম পন্থায় উপার্জন করে ও হারাম খাদ্য ভক্ষণ করে)। (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম, জামেউত তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ ‘তোমাদের এই যে জাতি এটা তো একই জাতি। অর্থাৎ হে নবীগণ (আঃ)! তোমাদের এই দ্বীন একই দ্বীন, এই মিল্লাত একই মিল্লাত। আর তাহলো শরীক বিহীন এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেয়া। এ জন্যেই এর পরে বলেছেনঃ “আমিই তোমাদের প্রতিপালক! সুতরাং আমাকে ভয় কর।’ সূরায়ে আম্বিয়ায় এর ব্যাখ্যা গত হয়েছে। (আরবী) এর উপর (আরবী) বা অবস্থা বোধক-এর কারণে যবর দেয়া হয়েছে। যে উম্মতদের নিকট নবীদেরকে (আঃ) পাঠানো হয়েছিল তারা তাদের নিজেদের মধ্যে তাদের দ্বীনকে শতধা বিভক্ত করে ফেলেছিল এবং এতেই তারা সন্তুষ্ট ছিল। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যেক দলই তাদের নিকট যা আছে তা নিয়েই আনন্দিত। সুতরাং তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হচ্ছেঃ কিছুকালের জন্যে তাদেরকে তাদের বিভ্রান্তির মধ্যে থাকতে দাও। অবশেষে তাদের ধ্বংসের সময় এসে পড়বে। তাদেরকে পানাহার ও হাসি খুশীতে মগ্ন থাকতে দাও। সত্বরই তারা তাদের কৃতকর্মের ফল জানতে পারবে।মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে যে মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি দান করেছি তা তাদের মঙ্গলের জন্যে? আমি তাদের উপর সন্তুষ্ট বলেই কি তাদেরকে এ সবকিছু দিয়েছি? কখনই না। তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ অমলক। তারা প্রতারণার মধ্যে পড়ে গেছে। তারা মনে করছে যে, দুনিয়ায় যেমন তারা সুখে-শান্তিতে রয়েছে, অনুরূপভাবে আখিরাতেও তারা সুখ-শান্তি লাভ করবে। তাদেরকে সেখানে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেয়া হবে না। এটা তাদের সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। তাদেরকে কিছুদিনের জন্যে অবকাশ দেয়া হচ্ছে মাত্র। কিন্তু তারা বুঝে না। প্রকৃত ব্যাপার তারা অনুধাবন করতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব তাদেরকে (কাফিরদেরকে) অবকাশ দাও; তাদেরকে অবকাশ দাও কিছুকালের জন্যে।” (৮৬:১৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে; আল্লাহ এর দ্বারা তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান।” (৯:৫৫) অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ ১) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি হয়।” (৩:১৭৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত। অর্থাৎ “আমাকে ছেড়ে দাও এবং তাকে যাকে আমি সৃষ্টি করেছি অসাধারণ করে। আমি তাকে দিয়েছি বিপুল ধন-সম্পদ এবং নিত্য সঙ্গী পুত্রগণ। আর তাকে দিয়েছি স্বচ্ছন্দ জীবনের প্রচুর উপকরণ। এরপরেও সে কামনা করে যে, আমি তাকে আরো অধিক দিই। না, তা হবে না, সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী।” (৭:১১-১৬) অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মাল ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নৈকট্য লাভ করাতে পারবে না, আমার নৈকট্য লাভকারী তো তারাই হবে যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে।” (৩৪:৩৭) এই বিষয়ের আরো বহু আয়াত রয়েছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে কওমকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করা হয়েছে তারা প্রতারিত হয়েছে। ধন-মাল ও সন্তানাদি দ্বারা মানুষের গুণ ও মহত্ত্ব প্রকাশ পায় না, বরং তাদের কষ্টিপাথর হলো ঈমান ও সৎ আমল। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের মধ্যে তোমাদের চরিত্রকে বন্টন করে দিয়েছেন যেমনভাবে তোমদের মধ্যে বন্টন করেছেন তোমাদের জীবিকাকে। যাকে তিনি ভালবাসেন তাকেও দুনিয়া দান করেন এবং যাকে ভালবাসেন না তাকেও দুনিয়া (-এর সুখ-ভাগে) দান করে থাকেন। আর দ্বীন শুধু তাকেই তিনি দান করেন যাকে ভালবাসেন। সুতরাং যাকে আল্লাহ তা'আলা দ্বীন দান করেন, জানবে যে, তাকে তিনি ভালবাসেন। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! বান্দা মুসলিম হয় না যে পর্যন্ত না তার হৃদয় ও জিহ্বা মুসলিম হয়। আর বান্দা মুমিন হয় না যে পর্যন্ত না তার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ হয়।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার অনিষ্ট কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “প্রতারণা, যুলুম ইত্যাদি। জেনে রেখো যে, যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে মাল উপার্জন করে, অতঃপর তা থেকে খরচ করে, তার খরচে বরকত দেয়া হয় না এবং সে যে দান করে সেই দান গৃহীত হয় না। সে যা কিছু ছেড়ে যাবে তা হবে তার জন্যে জাহান্নামের খাদ্যসম্ভার। আল্লাহ তাআলা মন্দকে মন্দ দ্বারা মুছে ফেলেন না। বরং তিনি মন্দকে মিটিয়ে থাকেন ভাল দ্বারা। কলুষতা কলুষতাকে দূর করে না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-মুমিনুন 23:56
৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর সমস্ত নবী (আঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেন হালাল খাদ্য ভক্ষণ করেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেন। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, হালাল খাদ্য সৎ কার্যের সহায়ক। নবীগণ (আঃ) সর্বপ্রকারের মঙ্গল সঞ্চয় করেছেন। কথা, কাজ, পথ-প্রদর্শন, উপদেশ ইত্যাদি সবকিছুই জমা করেছেন। এখানে আল্লাহ পাক রং, স্বাদ ইত্যাদি বর্ণনা করেননি, বরং শুধুমাত্র হালাল খাদ্য খেতে বলেছেন। আবূ মাইসারা আমর ইবনে শুরাহবীল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তার মাতার বয়ন করার পারিশ্রমিক হতে খেতেন। সহীহ হাদীসে আছে যে, এমন কোন নবী ছিলেন না যিনি ছাগল চরাননি। সাহাবীগণ তখন জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনিও কি (ছাগল চরিয়েছেন)?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হ্যা, আমিও কয়েকটি কীরাতের (কীরাত হলো এক আউন্সের চব্বিশভাগের একভাগ পরিমাণ ওজন) বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম।” আর একটি সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) স্বহস্তের উপার্জন হতে ভক্ষণ করতেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয় রোযা হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর রোযা। আর আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় কিয়াম (রাত্রিকালে ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকা) হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর কিয়াম। তিনি অর্ধেক রাত্রি ঘুমাতেন, এক তৃতীয়াংশ রাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন এবং এক ষষ্ঠাংশ শুয়ে থাকতেন। একদিন তিনি রোযা রাখতেন ও একদিন রোযা ছেড়ে দিতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি কখনো পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতেন না। শাদ্দাদ ইবনে আউসের কন্যা হযরত উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (একদা) দিনের প্রথম ভাগে কঠিন গরমের সময় আমি এক পেয়ালা দুধ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে প্রেরণ করি এই উদ্দেশ্যে যে, তিনি এটা দ্বারা রোযার ইফতার করবেন। তিনি আমার প্রেরিত দূতকে এই বলে ফিরিয়ে পাঠালেনঃ “এ দুধ যদি তোমার নিজের বকরীর হতো তবে আমি তা পান করতাম। আমি তখন বলে পাঠালামঃ আমি এ দুধ নিজের মাল দ্বারা ক্রয় করেছি। তখন তিনি তা পান করলেন। পরের দিন শাদ্দাদের কন্যা উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দিনের দীর্ঘ সময়ের অত্যন্ত গরমের মধ্যে আমি আপনার নিকট দুধ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমার দূতকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন (এর কারণ কি?)!" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা, আমি এরূপ করতেই আদিষ্ট হয়েছি। নবীরা শুধু হালাল খাদ্যই ভক্ষণ করে থাকেন এবং ভাল কাজই সম্পাদন করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র। পবিত্র ছাড়া তিনি কিছুই কবুল করেন না। মুমিনদেরকে তিনি তিনি ঐ হুকুমই দিয়েছেন যে হুকুম তিনি রাসূলদেরকে (আঃ) দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র খাদ্য ভক্ষণ কর ও সৎ কার্য সম্পাদনা কর এবং জেনে রেখো যে, তোমরা যা কিছু আমল করছে আমি তা দেখতে রয়েছি” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা শৰি ৰাদ্য ভক্ষণ কর যা আমি তোমাদেরকে জীবিকারূপে দান করেছি।" অতঃপর তিনি এমন একটি লোকের বর্ণনা দেন যে দীর্ঘ সফর করে, যার চুল থাকে এলো মেলো এবং চেহারা থাকে ধূলো বালিতে আচ্ছন্ন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক!' কিন্তু তার দুআ কবুল করা হবে এটা অসম্ভব (কেননা, সে হারাম পন্থায় উপার্জন করে ও হারাম খাদ্য ভক্ষণ করে)। (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম, জামেউত তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ ‘তোমাদের এই যে জাতি এটা তো একই জাতি। অর্থাৎ হে নবীগণ (আঃ)! তোমাদের এই দ্বীন একই দ্বীন, এই মিল্লাত একই মিল্লাত। আর তাহলো শরীক বিহীন এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেয়া। এ জন্যেই এর পরে বলেছেনঃ “আমিই তোমাদের প্রতিপালক! সুতরাং আমাকে ভয় কর।’ সূরায়ে আম্বিয়ায় এর ব্যাখ্যা গত হয়েছে। (আরবী) এর উপর (আরবী) বা অবস্থা বোধক-এর কারণে যবর দেয়া হয়েছে। যে উম্মতদের নিকট নবীদেরকে (আঃ) পাঠানো হয়েছিল তারা তাদের নিজেদের মধ্যে তাদের দ্বীনকে শতধা বিভক্ত করে ফেলেছিল এবং এতেই তারা সন্তুষ্ট ছিল। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যেক দলই তাদের নিকট যা আছে তা নিয়েই আনন্দিত। সুতরাং তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হচ্ছেঃ কিছুকালের জন্যে তাদেরকে তাদের বিভ্রান্তির মধ্যে থাকতে দাও। অবশেষে তাদের ধ্বংসের সময় এসে পড়বে। তাদেরকে পানাহার ও হাসি খুশীতে মগ্ন থাকতে দাও। সত্বরই তারা তাদের কৃতকর্মের ফল জানতে পারবে।মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে যে মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি দান করেছি তা তাদের মঙ্গলের জন্যে? আমি তাদের উপর সন্তুষ্ট বলেই কি তাদেরকে এ সবকিছু দিয়েছি? কখনই না। তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ অমলক। তারা প্রতারণার মধ্যে পড়ে গেছে। তারা মনে করছে যে, দুনিয়ায় যেমন তারা সুখে-শান্তিতে রয়েছে, অনুরূপভাবে আখিরাতেও তারা সুখ-শান্তি লাভ করবে। তাদেরকে সেখানে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেয়া হবে না। এটা তাদের সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। তাদেরকে কিছুদিনের জন্যে অবকাশ দেয়া হচ্ছে মাত্র। কিন্তু তারা বুঝে না। প্রকৃত ব্যাপার তারা অনুধাবন করতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব তাদেরকে (কাফিরদেরকে) অবকাশ দাও; তাদেরকে অবকাশ দাও কিছুকালের জন্যে।” (৮৬:১৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে; আল্লাহ এর দ্বারা তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান।” (৯:৫৫) অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ ১) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি হয়।” (৩:১৭৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত। অর্থাৎ “আমাকে ছেড়ে দাও এবং তাকে যাকে আমি সৃষ্টি করেছি অসাধারণ করে। আমি তাকে দিয়েছি বিপুল ধন-সম্পদ এবং নিত্য সঙ্গী পুত্রগণ। আর তাকে দিয়েছি স্বচ্ছন্দ জীবনের প্রচুর উপকরণ। এরপরেও সে কামনা করে যে, আমি তাকে আরো অধিক দিই। না, তা হবে না, সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী।” (৭:১১-১৬) অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মাল ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নৈকট্য লাভ করাতে পারবে না, আমার নৈকট্য লাভকারী তো তারাই হবে যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে।” (৩৪:৩৭) এই বিষয়ের আরো বহু আয়াত রয়েছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে কওমকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করা হয়েছে তারা প্রতারিত হয়েছে। ধন-মাল ও সন্তানাদি দ্বারা মানুষের গুণ ও মহত্ত্ব প্রকাশ পায় না, বরং তাদের কষ্টিপাথর হলো ঈমান ও সৎ আমল। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের মধ্যে তোমাদের চরিত্রকে বন্টন করে দিয়েছেন যেমনভাবে তোমদের মধ্যে বন্টন করেছেন তোমাদের জীবিকাকে। যাকে তিনি ভালবাসেন তাকেও দুনিয়া দান করেন এবং যাকে ভালবাসেন না তাকেও দুনিয়া (-এর সুখ-ভাগে) দান করে থাকেন। আর দ্বীন শুধু তাকেই তিনি দান করেন যাকে ভালবাসেন। সুতরাং যাকে আল্লাহ তা'আলা দ্বীন দান করেন, জানবে যে, তাকে তিনি ভালবাসেন। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! বান্দা মুসলিম হয় না যে পর্যন্ত না তার হৃদয় ও জিহ্বা মুসলিম হয়। আর বান্দা মুমিন হয় না যে পর্যন্ত না তার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ হয়।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার অনিষ্ট কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “প্রতারণা, যুলুম ইত্যাদি। জেনে রেখো যে, যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে মাল উপার্জন করে, অতঃপর তা থেকে খরচ করে, তার খরচে বরকত দেয়া হয় না এবং সে যে দান করে সেই দান গৃহীত হয় না। সে যা কিছু ছেড়ে যাবে তা হবে তার জন্যে জাহান্নামের খাদ্যসম্ভার। আল্লাহ তাআলা মন্দকে মন্দ দ্বারা মুছে ফেলেন না। বরং তিনি মন্দকে মিটিয়ে থাকেন ভাল দ্বারা। কলুষতা কলুষতাকে দূর করে না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-মুমিনুন 23:57
৫৭-৬১ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ বলেন যে, ইহসান ও ঈমানের সাথে সাথে সৎ কাজ করা এবং এরপরেও আল্লাহর ভয়ে প্রকম্পিত হওয়া মুমিনের বিশেষণ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মুমিন ভাল কাজ করে এবং সাথে সাথে আল্লাহকে ভয় করতে থাকে। পক্ষান্তরে মুনাফিক খারাপ কাজ করে, আবার আল্লাহ থেকে নির্ভয় থাকে।ঘোষিত হচ্ছেঃ তারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলীতে ঈমান আনে। যেমন মহান আল্লাহ হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে তার প্রতিপালকের কালেমা ও কিতাবসমূহর্কে সত্য বলে জেনেছিল।” (৬৬: ১২) অর্থাৎ তিনি আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা, ইচ্ছা ও শরীয়তের উপর পূর্ণ আস্থা রাখতেন। তাঁর আদিষ্ট প্রতিটি কাজকে তিনি ভালবাসতেন। আর তাঁর নিষেধকৃত প্রতিটি কাজকে তিনি অপছন্দ করতেন।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ তারা তাদের প্রতিপালকের সাথে শরীক করে না বরং তাকে এক বলে বিশ্বাস করে। তারা স্বীকার করে যে, আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে অভাবমুক্ত। তাঁর স্ত্রী ও সন্তান নেই। তিনি অতুলনীয়। তাঁর সমকক্ষ কেউই নেই। তাঁর নামে তারা দান-খয়রাত করে থাকে। কিন্তু তা ককূল হবে কি না এ ভয় তাদের অন্তরে থাকে। তাই আল্লাহর পথে খরচ করার সময় তারা ভীত-কম্পিত হয়। হযরত সাঈদ ইবনে অহাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যারা যা দান করার তা দান করে ভীত-কম্পিত হৃদয়ে’-এর দ্বারা কি ঐ লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা চুরি করে, ব্যভিচার করে এবং মদ্যপান করে, অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহকে ভয় করে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)-এর কন্যা! হে সিদ্দীক (রাঃ)-এর কন্যা। না, তারা নয়; বরং যারা নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং দান-খয়রাত করে, অথচ আল্লাহকে ভয় করে তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। জামেউত তিরমিযী ও মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। তাতে আছেঃ “হে সিদ্দীক (রাঃ)-এর কন্যা! না, তারা নয়, বরং যারা নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং দান-খয়রাত করে অথচ ওগুলো কবুল হয় কি-না এজন্যে সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ‘তারাই দ্রুত সম্পাদন করে কল্যাণকর কাজ এবং তারা তাতে অগ্রগামী হয়। (আরবী) অন্য কিরাতে (আরবী) রয়েছে। অর্থাৎ তারা যা করার তা করে থাকে, কিন্তু তাদের অন্তর থাকে ভীত-সন্ত্রস্ত।বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু আসিম (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট প্রবেশ করেন। তখন তিনি তাকে মারহাবা বলে সাদর সম্ভাষণ জানান এবং বলেনঃ “তুমি মাঝে মাঝে আমাকে দর্শন দান কর না কেন?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “আপনি হয়তো বিরক্তিবোধ করবেন এ জন্যেই আসি না। আজকে একটি আয়াতের শব্দগুলোর বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যেই আগমন করেছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিভাবে এটা পড়তেন তা আমি জানতে চাই।” হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “ওটা কোন আয়াত?" তিনি জবাবে বললেনঃ “আয়াতটি হলোঃ (আরবী)উনি এভাবে পাঠ করতেন, না (আরবী) এভাবে পাঠ করতেন?” হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “এ দুটোর মধ্যে কোনটি তোমার নিকট অধিক পছন্দনীয়?” তিনি উত্তরে বললেনঃ (আরবী) এরূপভাবে পঠিত হয়ে থাকলে আমি যেন সারা দুনিয়াই পেয়ে যাবো, এমনকি এর চেয়েও বেশী আমি আনন্দিত হবো।” তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ তুমি শুনে খুশী হও যে, আল্লাহর শপথ! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে। এই আয়াতটি এভাবেই পড়তে শুনেছি। (এটা মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। এর একজন বর্ণনাকারী হলেন ইসমাঈল ইবনে মুসলিম। তিনি দুর্বল। বর্তমানে কুরআনে যেরূপ আছে এটাই প্রসিদ্ধ সাতটি কিরআত ও জমহূরের কিরাত। অর্থের দিক দিয়েও এটাই বেশী প্রকাশমান। কেননা, তাদেরকে অগ্রগামী বলা হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় কিরআতটি নিলে তারা অগ্রগামী থাকেন না। বরং মধ্যম হালকা হয়ে যান। এসব ব্যাপারে আল্লাহই বেশী ভাল জানেন)
আল-মুমিনুন 23:58
৫৭-৬১ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ বলেন যে, ইহসান ও ঈমানের সাথে সাথে সৎ কাজ করা এবং এরপরেও আল্লাহর ভয়ে প্রকম্পিত হওয়া মুমিনের বিশেষণ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মুমিন ভাল কাজ করে এবং সাথে সাথে আল্লাহকে ভয় করতে থাকে। পক্ষান্তরে মুনাফিক খারাপ কাজ করে, আবার আল্লাহ থেকে নির্ভয় থাকে।ঘোষিত হচ্ছেঃ তারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলীতে ঈমান আনে। যেমন মহান আল্লাহ হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে তার প্রতিপালকের কালেমা ও কিতাবসমূহর্কে সত্য বলে জেনেছিল।” (৬৬: ১২) অর্থাৎ তিনি আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা, ইচ্ছা ও শরীয়তের উপর পূর্ণ আস্থা রাখতেন। তাঁর আদিষ্ট প্রতিটি কাজকে তিনি ভালবাসতেন। আর তাঁর নিষেধকৃত প্রতিটি কাজকে তিনি অপছন্দ করতেন।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ তারা তাদের প্রতিপালকের সাথে শরীক করে না বরং তাকে এক বলে বিশ্বাস করে। তারা স্বীকার করে যে, আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে অভাবমুক্ত। তাঁর স্ত্রী ও সন্তান নেই। তিনি অতুলনীয়। তাঁর সমকক্ষ কেউই নেই। তাঁর নামে তারা দান-খয়রাত করে থাকে। কিন্তু তা ককূল হবে কি না এ ভয় তাদের অন্তরে থাকে। তাই আল্লাহর পথে খরচ করার সময় তারা ভীত-কম্পিত হয়। হযরত সাঈদ ইবনে অহাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যারা যা দান করার তা দান করে ভীত-কম্পিত হৃদয়ে’-এর দ্বারা কি ঐ লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা চুরি করে, ব্যভিচার করে এবং মদ্যপান করে, অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহকে ভয় করে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)-এর কন্যা! হে সিদ্দীক (রাঃ)-এর কন্যা। না, তারা নয়; বরং যারা নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং দান-খয়রাত করে, অথচ আল্লাহকে ভয় করে তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। জামেউত তিরমিযী ও মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। তাতে আছেঃ “হে সিদ্দীক (রাঃ)-এর কন্যা! না, তারা নয়, বরং যারা নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং দান-খয়রাত করে অথচ ওগুলো কবুল হয় কি-না এজন্যে সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ‘তারাই দ্রুত সম্পাদন করে কল্যাণকর কাজ এবং তারা তাতে অগ্রগামী হয়। (আরবী) অন্য কিরাতে (আরবী) রয়েছে। অর্থাৎ তারা যা করার তা করে থাকে, কিন্তু তাদের অন্তর থাকে ভীত-সন্ত্রস্ত।বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু আসিম (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট প্রবেশ করেন। তখন তিনি তাকে মারহাবা বলে সাদর সম্ভাষণ জানান এবং বলেনঃ “তুমি মাঝে মাঝে আমাকে দর্শন দান কর না কেন?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “আপনি হয়তো বিরক্তিবোধ করবেন এ জন্যেই আসি না। আজকে একটি আয়াতের শব্দগুলোর বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যেই আগমন করেছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিভাবে এটা পড়তেন তা আমি জানতে চাই।” হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “ওটা কোন আয়াত?" তিনি জবাবে বললেনঃ “আয়াতটি হলোঃ (আরবী)উনি এভাবে পাঠ করতেন, না (আরবী) এভাবে পাঠ করতেন?” হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “এ দুটোর মধ্যে কোনটি তোমার নিকট অধিক পছন্দনীয়?” তিনি উত্তরে বললেনঃ (আরবী) এরূপভাবে পঠিত হয়ে থাকলে আমি যেন সারা দুনিয়াই পেয়ে যাবো, এমনকি এর চেয়েও বেশী আমি আনন্দিত হবো।” তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ তুমি শুনে খুশী হও যে, আল্লাহর শপথ! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে। এই আয়াতটি এভাবেই পড়তে শুনেছি। (এটা মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। এর একজন বর্ণনাকারী হলেন ইসমাঈল ইবনে মুসলিম। তিনি দুর্বল। বর্তমানে কুরআনে যেরূপ আছে এটাই প্রসিদ্ধ সাতটি কিরআত ও জমহূরের কিরাত। অর্থের দিক দিয়েও এটাই বেশী প্রকাশমান। কেননা, তাদেরকে অগ্রগামী বলা হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় কিরআতটি নিলে তারা অগ্রগামী থাকেন না। বরং মধ্যম হালকা হয়ে যান। এসব ব্যাপারে আল্লাহই বেশী ভাল জানেন)