Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আন-নূর 24:38 – আল-ফুরকান 25:28

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আন-নূর 24:38
  2. আন-নূর 24:39
  3. আন-নূর 24:40
  4. আন-নূর 24:41
  5. আন-নূর 24:42
  6. আন-নূর 24:43
  7. আন-নূর 24:44
  8. আন-নূর 24:45
  9. আন-নূর 24:46
  10. আন-নূর 24:47
  11. আন-নূর 24:48
  12. আন-নূর 24:49
  13. আন-নূর 24:50
  14. আন-নূর 24:51
  15. আন-নূর 24:52
  16. আন-নূর 24:53
  17. আন-নূর 24:54
  18. আন-নূর 24:55
  19. আন-নূর 24:56
  20. আন-নূর 24:57
  21. আন-নূর 24:58
  22. আন-নূর 24:59
  23. আন-নূর 24:60
  24. আন-নূর 24:61
  25. আন-নূর 24:62
  26. আন-নূর 24:63
  27. আন-নূর 24:64
  28. আল-ফুরকান 25:1
  29. আল-ফুরকান 25:2
  30. আল-ফুরকান 25:3
  31. আল-ফুরকান 25:4
  32. আল-ফুরকান 25:5
  33. আল-ফুরকান 25:6
  34. আল-ফুরকান 25:7
  35. আল-ফুরকান 25:8
  36. আল-ফুরকান 25:9
  37. আল-ফুরকান 25:10
  38. আল-ফুরকান 25:11
  39. আল-ফুরকান 25:12
  40. আল-ফুরকান 25:13
  41. আল-ফুরকান 25:14
  42. আল-ফুরকান 25:15
  43. আল-ফুরকান 25:16
  44. আল-ফুরকান 25:17
  45. আল-ফুরকান 25:18
  46. আল-ফুরকান 25:19
  47. আল-ফুরকান 25:20
  48. আল-ফুরকান 25:21
  49. আল-ফুরকান 25:22
  50. আল-ফুরকান 25:23
  51. আল-ফুরকান 25:24
  52. আল-ফুরকান 25:25
  53. আল-ফুরকান 25:26
  54. আল-ফুরকান 25:27
  55. আল-ফুরকান 25:28

আন-নূর 24:38

৩৬-৩৮ নং আয়াতের তাফসীরমুমিনের অন্তরের এবং ওর মধ্যে যে হিদায়াত ও ইলম রয়েছে ওর দৃষ্টান্ত উপরের আয়াতে ঐ উজ্জ্বল প্রদীপের সাথে দেয়া হয়েছে যা স্বচ্ছ কাচের মধ্যে রয়েছে এবং পরিষ্কার যয়নের উজ্জ্বল তেল দ্বারা জ্বলতে থাকে। এ জন্যে এখানে ওর স্থানের বর্ণনা মহান আল্লাহ দিচ্ছেন যে, ওটা আবার রয়েছে ঐসব গৃহে অর্থাৎ মসজিদে, যা সবচেয়ে উত্তম জায়গা এবং আল্লাহর প্রিয় স্থান। যেখানে তাঁর ইবাদত করা হয় এবং তার একত্ববাদের বর্ণনা দেয়া হয়। যার রক্ষণাবেক্ষণ করা, পাক-সাফ রাখা এবং অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখার নির্দেশ আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হলো সেখানে অশ্লীল ও বাজে কাজ না করা। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ মসজিদগুলো যেগুলো নির্মাণ করা, আবাদ করা ও পবিত্র রাখার হুকুম দেয়া হয়েছে। হযরত কা'ব (রঃ) বলতেনঃ তাওরাতে লিখিত আছে- যমীনে আমার ঘর হলো মসজিদসমূহ। যে কেউ অযু করে আমার ঘরে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসবে আমি তার সম্মান করবো।যে কেউ কারো বাড়ীতে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে, তার কর্তব্য হলো তার সম্মান করা। এটা তাফসীরে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত আছে। মসজিদ নির্মাণ করা, ওর আদব ও সম্মান করা এবং ওকে সুগন্ধময় ও পাক-সাফ রাখার ব্যাপারে বহু হাদীস এসেছে, যেগুলোকে আমি একটি পৃথক কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। এখানেও অল্প বিস্তর আনয়ন করছি। আল্লাহ আমাদেরকে সাহায্য করুন! আমাদের তার উপরই ভরসা।আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাতে ওর মত ঘর নির্মাণ করবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন)হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি একটি মসজিদ নির্মাণ করে যাতে আল্লাহর নাম যিকর করা হয়, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন।" (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মহল্লায় মসজিদ নির্মাণ করার এবং ওটাকে পাক-পবিত্র ও সুগন্ধময় করে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) ছাড়া অন্যান্য আহলুস সুনান বর্ণনা করেছেন)হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা লোকদের জন্যে মসজিদ নির্মাণ কর যেখানেই জায়গা পাও। কিন্তু লাল ও হলদে রঙ থেকে বেঁচে থাকো, যাতে মানুষ ফিৎনায় না পড়ে।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কওমের আমল কখনো খারাপ হয় না যে পর্যন্ত না তারা তাদের মসজিদগুলোকে রঙিন, নকশা বিশিষ্ট ও চাকচিক্যময় করে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করছেন। কিন্তু এর সনদ দুর্বল)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মসজিদগুলোকে উচ্চ ও পাকা করে নির্মাণ করতে আমি আদিষ্ট হইনি।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের মসজিদগুলোকে সুন্দর চাকচিক্যময় ও নকশা বিশিষ্ট বানাবে যেমন ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা বানিয়েছিল (অর্থাৎ তাদের অনুকরণ করা ঠিক নয়)।" হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত না লোকেরা মসজিদগুলোর ব্যাপারে পুরুস্পর একে অপরের উপর ফখর ও গর্ব প্রকাশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) ছাড়া অন্যান্য আহলে সুনান বর্ণনা করেছেন)হযরত বুরাইদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক তার হারানো উট খুঁজতে মসজিদে এসে বলে- “আমার একটি লাল বর্ণের হারানো উটের কেউ কোন খোঁজ-খবর দিতে পারে কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “তুমি যেন তা না পাও। মসজিদকে যে কাজের জন্যে নির্মাণ করা হয়েছে ওটা ঐ কাজেই ব্যবহৃত হবে (তোমার উট খোঁজ করার জায়গা হিসেবে নয়)। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে শুআইব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করতে এবং কবিতা পাঠ করতে নিষেধ করেছেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং আহলে সুনান বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা কাউকে দেখবে যে, সে মসজিদে বেচা-কেনা করছে তখন তোমরা বলবে, আল্লাহ তোমাকে তোমার ব্যবসায়ে লাভবান না করুন! আর যখন তোমরা কাউকে দেখবে যে, সে তার হারানো জন্তু মসজিদে খোজ করছে তখন তোমরা বলবে- আল্লাহ যেন তোমাকে তোমার হারানো জন্তু ফিরিয়ে না দেন!” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: “কতকগুলো অভ্যাস বা কাজ রয়েছে সেগুলো মসজিদের পক্ষে সমীচীন নয়। যেমন, মসজিদকে রাস্তা বানানো চলবে না, সেখানে অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে আসা চলবে, সেখানে তীর, কামান ব্যবহার করা চলবে না, কাচা গোশত সেখানে আনা যাবে না, সেখানে হদ মারা যাবে না, গল্প-গুজব ও কাহিনী বলা সেখানে চলবে এবং ওটাকে বাজার বানানো যাবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) প্রমুখ মনীষী বর্ণনা করেছেন)হযরত ওয়ায়েলা ইবনে আসফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা মসজিদগুলো হতে তোমাদের নাবালক ছেলেদেরকে, পাগলদেরকে, বেচা-কেনাকে, ঝগড়া-বিবাদকে, উচ্চ স্বরে কথা বলাকে, হদ জারী করাকে এবং তরবারী উন্মুক্ত করাকে দূরে রাখবে। মসজিদের দরগুলোর উপর তোমরা অযু ইত্যাদির স্থান বানিয়ে নিবে এবং জুমআর দিনে ওগুলোকে সুগন্ধময় করে রাখবে।” (এটাও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটির সনদে দুর্বলতা রয়েছে)কোন কোন আলেম কঠিন প্রয়োজন ছাড়া মসজিদকে যাতায়াতের স্থান বানানো মাকরূহ বলেছেন। একটি আসারে আছে যে, ফেরেশতামণ্ডলী ঐ লোককে দেখে বিস্মিত হন যে ঐ মসজিদের মধ্য দিয়ে গমন করে যেখানে সে নামায পড়ে না। অস্ত্র-শস্ত্র ও তীর-বল্লম নিয়ে মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ এই যে, সেখানে বহু লোক একত্রিত হয়। কাজেই কারো গায়ে লেগে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এজন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নির্দেশ দিয়েছেন যে, কেউ যদি তীর-বল্লম নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করে তবে যেন তীরের ফলাটি নিজের হাতে রাখে যাতে কাউকেও কোন কষ্ট না পৌছে। আর কাঁচা গোশত নিয়ে মসজিদে আগমন নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ এই যে, ওর থেকে ফোঁটা ফোঁটা করে রক্ত পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই ঋতুবতী নারীরও মসজিদে আগমন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মসজিদে হদ লাগানো ও কেসাস নেয়া নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ এই যে, হয়তো সে মসজিদকে ময়লা বা বিষ্ঠা দ্বারা অপবিত্র করে দেবে। মসজিদকে বাজারে পরিণত করতে নিষেধ করার কারণ এই যে, বাজার হলো ক্রয়-বিক্রয়ের স্থান আর মসজিদে এ দু'টো কাজ করা নিষিদ্ধ। কেননা, মসজিদ হলো আল্লাহর যিকর করা ও নামায আদায় করার জায়গা। যেমন একজন বেদুঈন মসজিদের এক প্রান্তে প্রস্রাব করে দিলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “মসজিদ এ কাজের জন্যে নির্মাণ করা হয়নি, বরং মসজিদ হলো আল্লাহর যিকর ও নামায পড়ার জায়গা।” অতঃপর তিনি তার প্রস্রাবের উপর বড় এক বালতি পানি বইয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। অন্য হাদীসে রয়েছেঃ “তোমরা নাবালক ছেলেদেরকে মসজিদ হতে দূরে রাখবে। কেননা, খেল-তামাশাই তাদের কাজ। অথচ মসজিদে এটা মোটেই উচিত নয়।” হযরত উমার ফারুক (রাঃ) যখন কোন ছোট ছেলেকে মসজিদে খেলতে দেখতেন তখন তিনি তাকে চাবুক মারতেন এবং এশার নামাযের পরে কাউকেও মসজিদে থাকতে দিতেন না।পাগলদেরকেও মসজিদে আসতে দিতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা, তাদের শ্রন থাকে না। কাজেই তারা মানুষের হাসি-তামাসার পাত্র হয়। আর মসজিদে জমা করা উচিত নয়। তাছাড়া তাদের দ্বারা মসজিদ অপবিত্র হয়ে যাওয়ারও আম রয়েছে।মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করতেও নিষেধ করা হয়েছে। কেননা এ দুটো আল্লাহর যিকুরের কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। মসজিদে ঝগড়া করতে নিষেধ করার কারণ এই যে, তাতে শব্দ উচ্চ হয় এবং ঝগড়াকারীদের মুখ দিয়ে এমন কথাও বেরিয়ে যায় যা মসজিদের আদবের পরিপন্থী। অধিকাংশ আলেমের উক্তি এই যে, মসজিদে বিচার সালিস করা চলবে না। এ জন্যেই এই বাক্যর পরে মসজিদে উচ্চ স্বরে কথা বলা হতে নিষেধ করা হয়েছে। হযরত সাইব ইবনে কান্দী (রঃ) বলেন, আমি একদা মসজিদে দাঁড়িয়েছিলাম এমন সময় হঠাৎ কে আমায় কংকর নিক্ষেপ করে। আমি ফিরে দেখি যে, তিনি হযরত উমার (রাঃ)। তিনি আমাকে বলেনঃ “যাও, ঐ দু'টি লোককে আমার নিকট ধরে নিয়ে এসো।” আমি ঐ দু’জনকে তাঁর কাছে ধরে আনলে তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কে?” অথবা প্রশ্ন করেনঃ “তোমরা কোথাকার লোক?” তারা উত্তরে বলেঃ “আমরা তায়েফের অধিবাসী।” তিনি তখন বলেনঃ “তোমরা যদি এখানকার অধিবাসী হতে তবে আমি তোমাদেরকে শাস্তি দিতাম। তোমরা মসজিদে নববীতে (সঃ) উচ্চ স্বরে কথা বলছো?” (এটা সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) মসজিদে (নববীতে সঃ) উচ্চ স্বরে একটি লোককে কথা বলতে শুনে বলেনঃ “তুমি কোথায় রয়েছ তা জান কি?” (এটা সুনানে নাসাঈতে হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে)রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদের দরযার উপর অযু ও পবিত্রতা লাভের স্থান বানানোর নির্দেশ দিয়েছেন। মসজিদে নববী (সঃ)-এর নিকটেই পানির কূপ ছিল। লোকেরা সেখান থেকে পানি উঠিয়ে নিয়ে পান করতেন, অযু করতেন এবং পবিত্রতা হাসিল করতেন। আর জুমআর দিন মসজিদকে সুগন্ধময় বানাবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেননা, ঐ দিন বহু লোক মসজিদে একত্রিত হন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) প্রত্যেক জুমআর দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মসজিদকে সুগন্ধময় করতেন। (এটা হাফিয আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ হাসান। এতে কোন দোষ নেই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মানুষ যে নামায একায় বাড়ীতে পড়ে অথবা দোকানে পড়ে ঐ নামাযের উপর জামাআতের নামাযের সওয়াব পঁচিশগুণ বেশী দেয়া হয়। এটা এই কারণে যে, যখন সে ভালরূপে অযু করে শুধু নামাযের উদ্দেশ্যে বের হয় তখন তার উঠানো প্রতিটি পদক্ষেপে একটা মরতবা বৃদ্ধি পায় এবং একটা গুনাহ মাফ হয়। তারপর নামায শেষে যতক্ষণ সে তার নামাযের জায়গায় বসে থাকে ততক্ষণ ফেরেশতারা তার উপর দু'আ পাঠাতে থাকেন। তারা বলেনঃ “হে আল্লাহ! তার উপর আপনি করুণা অবতীর্ণ করুণ! হে আল্লাহ! তার উপর আপনি দয়া করুন!” আর যতক্ষণ সে নামাযের অপেক্ষায় বসে থাকে ততক্ষণ সে নামাযের সওয়াব পেতে থাকে। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মসজিদের প্রতিবেশীর নামায মসজিদে ছাড়া (শুদ্ধ) হয় না।” (এ হাসীদটি ইমাম দারকুতনী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেছেনঃ “অন্ধকারে মসজিদে গমনকারীদেরকে শুভ সংবাদ শুনিয়ে দাও যে, কিয়ামতের দিন তারা পূর্ণ আলো প্রাপ্ত হবে।” (এ হাদীসটি সুনানে বর্ণিত হয়েছে)মসজিদে প্রবেশকারীর জন্যে এটা মুসতাহাব যে, সে যেন মসজিদে প্রবেশের সময় প্রথমে ডান পা রাখে এবং এই দু'আ পাঠ করে যা হাদীসে এসেছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মসজিদে প্রবেশ করতেন তখন বলতেনঃ(আরবি) অর্থাৎ “মহান, সম্মানিত চেহারার অধিকারী এবং প্রাচীন সাম্রাজ্যের অধিপতি আল্লাহর নিকট আমি বিতাড়িত শয়তান হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” তিনি বলেন, যখন কেউ এটা বলে তখন শয়তান বলে- “সে সারা দিনের তরে আমার অনিষ্ট থেকে রক্ষা পেয়ে গেল।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে) হযরত আবু হুমাইদ (রাঃ) অথবা হ্যরত উসাইদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করবে তখন যেন সে বলে (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমার জন্যে আপনি আপনার রহমতের দরযা খুলে দিন! আর যখন মসজিদ হতে বের হবে তখন যেন বলে (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমার জন্যে আপনার অনুগ্রহের দরযা খুলে দিন।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করবে তখন সে যেন নবী (সঃ) (আরবি)-এর উপর সালাম দেয় এবং যেন বলে এবং যখন বের হবে তখন যেন বলে(আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমাকে বিতাড়িত শয়তান হতে রক্ষা করুন!” (ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আর ইবনে কুযাইমা (রঃ) ও ইবনে হিব্বান (রঃ) এটা তাদের সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মসজিদে প্রবেশ করতেন তখন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর দরূদ ও সালাম বলতেন, তারপর বলতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমার পাপরাশি ক্ষমা করে দিন এবং আমার জন্যে আপনার রহমতের দরযা খুলে দিন!” আর যখন বের হতেন তখন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর দরূদ ও সালাম বলতেন, অতঃপর বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আমার গুনাহগুলো মাফ করুন এবং আমার জন্যে আপনার অনুগ্রহের দ্য উন্মুক্ত করে দিন!” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি হাসান এবং এর ইসনাদ মুত্তাসিল নয়। কেননা, হযরত হুসাইনের কন্যা ছোট ফাতিমা (রাঃ) বড় ফাতিমা (রাঃ)-কে পাননি)মোটকথা, এ ধরনের বহু হাদীস এই আয়াত সম্পর্কে রয়েছে এবং ঐগুলো মসজিদের নির্দেশাবলীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ “তোমরা মসজিদে নিজেদের মুখমণ্ডল সোজা রাখো এবং আন্তরিকতার সাথে শুধু আল্লাহ তা'আলাকেই ডাকতে থাকো।” আর একটি আয়াতে রয়েছেঃ “নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্যে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মসজিদে তাঁর নাম স্মরণ করতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ সেখানে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে। তিনি আরো নির্দেশ দিয়েছেন মসজিদে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরআন কারীমের যেখানেই ‘তাসবীহ’ শব্দ রয়েছে সেখানেই ওর দ্বারা নামাযকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে ফজর ও আসরের নামায। প্রথম প্রথম এই দুই ওয়াক্ত নামাযই ফরয হয়েছিল। সুতরাং এখানে এই দুই ওয়াক্ত নামাযকেই স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। এক কিরআতে (আরবি) রয়েছে। অর্থাৎ (আরবি) অক্ষরের উপর (আরবি) বা যবর আছে। এই পঠনে (আরবি)-এর উপর (আরবি) করা হয়েছে এবং (আরবি) দ্বারা অন্য বাক্য শুরু করা হয়েছে। এটা যেন উহ্য কর্তার জন্যে মুফাসসির। তাহলে যেন বলা হয়েছেঃ সেখানে কে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? জবাবে যেন বলা হয়েছেঃ এইরূপ লোকেরা পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে থাকে। (আরবি) পড়া হলে (আরবি) বা কর্তা হবে। তাহলে (আরবি) হওয়া উচিত (আরবি)-এর বর্ণনার পর।(আরবি) বলার দ্বারা তাদের ভাল উদ্দেশ্য, সৎ নিয়ত এবং বড় কাজের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এরা আল্লাহর ঘরের আবাদকারী, তাঁর ইবাদতের স্থান তাদের দ্বারা সৌন্দর্য মণ্ডিত হয় এবং তারা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। যেমন এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ “মুমিনদের মধ্যে কতকগুলো লোক এমন রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে ওয়াদাকৃত কথাকে সত্য করে দেখিয়েছে (শেষ পর্যন্ত)।” (৩৩:২৩)হাঁ, তবে স্ত্রীলোকদের জন্যে মসজিদে নামায পড়া অপেক্ষা বাড়ীতে নামায পড়াই উত্তম। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “স্ত্রীলোকদের সর্বোত্তম মসজিদ হলো তাদের ঘরের কোণা।” (হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সুওয়ায়েদ আনসারী (রাঃ) বলেন যে, তাঁর ফুফু উম্মে হুমায়েদ (রাঃ) আবূ হুমায়েদ সায়েদ (রাঃ)-এর স্ত্রী নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার সাথে নামায পড়তে ভালবাসি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি জানি যে, তুমি আমার সাথে নামায পড়তে ভালবাস। কিন্তু জেনে রেখো যে, তোমার নামায তোমার হুজরায় (ক্ষুদ্র কক্ষে) পড়া অপেক্ষা তোমার ঘরে পড়া উত্তম। তোমার বাড়ীতে নামায পড়া অপেক্ষা তোমার হুজরায় নামায পড়া উত্তম। তোমার মহল্লার মসজিদে নামায পড়ার চেয়ে তোমার বাড়ীতে নামায পড়া উত্তম এবং আমার এই মসজিদে নামায পড়ার চেয়ে তোমার মহল্লার মসজিদে নামায পড়াই উত্তম।” বর্ণনাকারী বলেনঃ তখন তাঁর নির্দেশক্রমে তাঁর ঘরের একেবারে শেষ প্রান্তে একটি নামাযের জায়গা বানিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহর শপথ! মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ওখানেই নামায পড়তে থাকেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)অবশ্যই মসজিদে পুরুষ লোকদের সাথে স্ত্রীলোকদেরও নামায পড়া জায়েয যদি তারা তাদের সৌন্দর্য পুরুষদের উপর প্রকাশ না করে এবং সুগন্ধি মেখে বের হয়। যেমন সহীহ্ হাদীসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর বান্দীদেরকে তাঁর মসজিদে আসতে বাধা দিয়োনা বা নিষেধ করো না।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, স্ত্রীলোকদের জন্যে তাদের ঘরই উত্তম। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ ও সুনানে আবি দাউদে বর্ণিত আছে) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তারা যেন সুগন্ধি ব্যবহার করে বের না হয়।হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর স্ত্রী হযরত যয়নব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যদি মসজিদে হাযির হতে ইচ্ছা করে তবে সে যেন খোশবু বা সুগন্ধি স্পর্শ না করে।” (সহীহ মুসলিমে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “মুমিনা নারীরা ফজরের নামাযে হাযির হতো। অতঃপর তারা নিজেদেরকে চাদরে জড়িয়ে ফিরে আসতে এবং কিছুটা অন্ধকার থাকতো বলে তাদেরকে চিনতে পারা যেতো না।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এ হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতেই বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “স্ত্রীলোকেরা এই যে নতুন নতুন বিষয় উদ্ভাবন করেছে এটা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) জানতেন তবে অবশ্যই তিনি তাদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করতেন, যেমন বানী ইসরাঈলের নারীদেরকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ সেই সব লোক, যাদেরকে ব্যবসা বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে ভুলিয়ে রাখে না। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে।” (৬৩৯) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! জুমআর দিনে যখন নামাযের জন্যে আহ্বান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর।” (৬২:৯) ভাবার্থ এই যে, সৎ লোকদেরকে দুনিয়া ও দুনিয়ার ভোগ-বিলাস আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন রাখতে পারে না। তাদের আখিরাত ও আখিরাতের নিয়ামতের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে এবং তারা ওটাকে অবিনশ্বর মনে করে। আর দুনিয়ার সবকিছুকে তারা অস্থায়ী ও ধ্বংসশীল বলে বিশ্বাস করে থাকে। এ জন্যেই তারা দুনিয়া ছেড়ে আখিরাতের দিকে মনোযোগ দেয়। তারা আল্লাহর আনুগত্যকে, তার মহব্বতকে এবং তাঁর হুকুমকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) একদা ব্যবসায়িক লোকদেরকে আযান শুনে তাদের কাজ কারবার ছেড়ে দিয়ে মসজিদের দিকে যেতে দেখে এ আয়াতটিই। তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “এ লোকগুলো ওদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে)হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বলেনঃ “আমি ব্যবসা-বাণিজ্য করবো। যদি প্রত্যহ আমি তিনশ’ স্বর্ণমুদ্রা লাভ করি তবুও নামাযের সময় হলেই আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে নামাযের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাবো। ব্যবসা যে হারাম এটা ভাবার্থ কখনো নয়। বরং ভাবার্থ এটাই যে, আমাদের মধ্যে এই বিশেষণ থাকতে হবে যা এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।”বর্ণিত আছে যে, হযরত সালিম ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) একদা নামাযের জন্যে যাচ্ছিলেন, তখন দেখতে পান যে, মদীনার ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ পদ্রব্যকে কাপড় দ্বারা ঢেকে দিয়ে নামাযের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছেন। তখন তিনি (আরবি)-এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “এই লোকদেরই প্রশংসা এই আয়াতে করা হয়েছে।”মাতারুল অরাক (রঃ) বলেন যে, তাঁরা বেচাকেনা করতেন, নিক্তি হয়তো তাদের হাতে থাকতো এমতাবস্থায় আযান তাদের কানে আসলে তারা নিক্তি ফেলে দিয়ে নামাযের উদ্দেশ্যে ধাবিত হতেন। জামাআতের সাথে নামায পড়ার প্রতি তাদের খুবই আসক্তি ছিল। তারা নামাযের সময়, রুকন এবং আদবের ফিহাযতসহ নামাযের পাবন্দ ছিলেন। এটা এ কারণে যে, তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ছিল এবং কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এ ব্যাপারে তাদের পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। ঐ দিনের ভয়াবহ অবস্থা সম্পর্কে তারা ছিলেন পূর্ণ ওয়াকিফহাল যে, সেই দিন তাদের অন্তর ও দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। তাই তো তারা থাকতেন সদা উদ্বিগ্ন ও সন্ত্রস্ত। অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আহার্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে আহার্য দান করে এবং বলে- শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি, আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। আমরা আশঙ্কা করি আমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে এক ভীতিপ্রদ ভয়ঙ্কর দিনের। পরিণামে আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করবেন সেই দিনের অনিষ্ট হতে এবং তাদেরকে দিবেন উৎফুল্লতা ও আনন্দ। আর তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কার স্বরূপ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র।”এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যাতে তারা যে কর্ম করে তজ্জন্যে আল্লাহ তাদেরকে উত্তম পুরস্কার দেন এবং নিজ অনুগ্রহে তাদের প্রাপ্যের অধিক দেন। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ অণুপরিমাণ যুলুম করেন না।” (৪: ৪০) অন্য এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “যে ব্যক্তি কোন ভাল কাজ করে তার জন্যে ওর দশগুণ পুণ্য রয়েছে। অন্য এক স্থানে তিনি বলেনঃ “কে এমন আছে যে আল্লাহকে করযে হাসানা দিতে পারে?” আরো বলেনঃ “তিনি যার জন্যে ইচ্ছা করেন (পুণ্য) বৃদ্ধি করে থাকেন।” এখানে মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন অপরিমিত জীবিকা দান করেন। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কাছে দুধ আনয়ন করা হয়। তিনি তার মজলিসের সব লোককেই তা পান করাবার ইচ্ছা করেন। কিন্তু সবাই রোযার অবস্থায় ছিলেন বলে পুনরায় দুধের পাত্রটি তার কাছেই ফিরিয়ে আনা হয়। তখন তিনি তা পান করেন, যেহেতু তিনি রোযা অবস্থায় ছিলেন না। অতঃপর তিনি (আরবি)-এই আয়াতটি পাঠ করেন।” (এটা ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ ইবনে সাকান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন যখন প্রথম ও শেষ সবকেই একত্রিত করা হবে তখন আল্লাহ তাআলা একজন ঘোষণাকারীকে ঘোষণা করতে বলবেন, ফলে ঘোষণাকারী খুবই উচ্চ স্বরে ঘোষণা করবেন যা হাশরের একত্রিত লোকদের সবাই শুনতে পাবে। ঘোষণায় বলা হবে- আজ সবাই জানতে পারবে যে, আল্লাহ তা'আলার কাছে সবচেয়ে সম্মানিত কে? অতঃপর বলবেনঃ যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য আল্লাহর স্মরণ হতে ভুলিয়ে রাখতে পারতো তারা যেন দাঁড়িয়ে যায়। তখন তারা দাড়িয়ে যাবে এবং সংখ্যায় খুবই অল্প। হবে। তারপর সমস্ত মাখলুকের হিসাব গ্রহণ করা হবে।” হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) (৩৫:৩০) (তিনি তাদেরকে পূর্ণভাবে তাদের প্রতিদান প্রদান করবেন এবং প্রাপ্যের অধিক দিবেন)-এর ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদের প্রতিদান এই যে, আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন। আর তাদের প্রাপ্যের অধিক দিবেন, এর ভাবার্থ এই যে, যারা তাদের প্রতি ইহসান করেছিল এবং তারা শাফাআতের হকদারও বটে, তাদের জন্যে শাফাআত করার অধিকার এরা লাভ করবে। (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আন-নূর 24:39

৩৯-৪০ নং আয়াতের তাফসীরআরো দু'প্রকার কাফিরের এ দু’টি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন সূরায়ে বাকারার শুরুতে দু'শ্রেণীর দু’টি উপমা বর্ণনা করা হয়েছে, একটি আগুনের উপমা এবং একটি পানির উপমা। আর যেমন সূরায়ে রা’দে মানুষের অন্তরে স্থান ধারণকারী ইলম ও হিদায়াতের এরূপই আগুন ও পানির দুটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে। ঐ দু’টি সূরায় ঐ আয়াতগুলোর পূর্ণ তাফসীর গত হয়েছে। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। প্রথমটি হচ্ছে ঐ কাফিরদের দৃষ্টান্ত যারা অন্যদেরকেও কুফরীর দিকে আহ্বান করে থাকে এবং মনে করে যে, তারা হিদায়াতের উপরই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। কিন্তু ওটা শুধু তাদের কল্পনা মাত্র। তাদের দৃষ্টান্ত তো হলো এরূপ যেমন কোন পিপাসার্ত লোক মরুভূমিতে দূর থেকে চকচকে বালু দেখতে পায় এবং ওকে পানির তরঙ্গ মনে করে বসে।(আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহুবচন, যেমন শব্দটির বহুবচন হলো (আরবি) এবং (আরবি) শব্দের বহুবচন (আরবি) ও এসে থাকে, যেমন (আরবি) শব্দের বহুবচন (আরবি) ও আসে। (আরবি) শব্দের অর্থ হলো জনশূন্য প্রশস্ত ও বিস্তীর্ণ মরুভূমি। এরূপ মরুভূমিতেই মরীচিকা দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। দুপুরের সময় এরূপই মনে হয় যে, পানির প্রশস্ত সমুদ্র তরঙ্গায়িত হচ্ছে। মরুভূমির উপর দিয়ে চলতে চলতে যখন কোন লোক পিপাসায় কাতর হয়ে ছটফট করে এবং ওষ্ঠাগত প্রাণ হয়ে যায়, আর উড্রান্তের মত পানির খোঁজে ফিরতে থাকে, তখন সে ওটাকে পানি মনে করে সেখানে পৌছে যায়। কিন্তু গিয়ে দেখে যে, সেখানে এক ফোটা পানিরও কোন নাম-নিশানা নেই। দ্রুপ এই কাফিররাও মনে করে নিয়েছে যে, তারা খুব ভাল কাজই করছে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তারা দেখতে পাবে যে, তাদের কাছে একটা পুণ্যও নেই। হয়তো তাদের পুণ্য তাদের বদ নিয়তের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে অথবা শরীয়ত মোতাবেক না হওয়ার কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। মোটকথা, সেখানে পৌছবার পূর্বেই তারা জাহান্নামীদের তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে। সুতরাং সেখানে তারা হয়ে গেছে সম্পূর্ণ শূন্য হস্ত। হিসাব গ্রহণের সময় স্বয়ং মহিমান্বিত ও প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ সেখানে বিদ্যমান। তিনি এক এক করে প্রত্যেকটি আমলের হিসাব গ্রহণ করছেন এবং ঐ কাফিরদের একটি আমলও পুণ্যের যোগ্যরূপে পাওয়া যাচ্ছেনা।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের দিন ইয়াহূদীদেরকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “দুনিয়ায় তোমরা কার উপাসনা করতে?” উত্তরে তারা বলবেঃ “আমরা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করতাম।” তখন তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা মিথ্যা কথা বলছো, আল্লাহর কোন পুত্র নেই। তারপর তাদেরকে প্রশ্ন করা হবেঃ “আচ্ছা, এখন তোমরা কি চাও?” তারা জবাবে বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা খুবই পিপাসার্ত। সুতরাং আমাদেরকে পানি পান করিয়ে দিন!” তখন তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা কি দেখতে পাচ্ছ না (ঐ যে পানি দেখা যায়, সেখানে যাও কেন)?” অতঃপর দূর থেকে তারা জাহান্নামকে তেমনই দেখবে যেমন দুনিয়ায় মরীচিকা দেখা যায়। সুতরাং তারা পানি মনে করে ওদিকে দৌড় দেবে এবং সেখানে পৌছলেই তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। এটা দৃষ্টান্ত হলো অনুসৃত লোকদের। এখন দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে অনুসরণকারী লোকদের, যারা মোটেই জ্ঞান রাখতো না। তারা পূর্ব বর্ণিত কাফিরদের অন্ধ অনুকরণ করতো। যাদের উপমা দেয়া হয়েছে গভীর সমুদ্রতলের অন্ধকারের সাথে, যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ, যার ঊর্ধ্বে মেঘপুঞ্জ, অন্ধকারপুঞ্জ স্তরের উপর স্তর, এমনকি সে হাত বের করলে তা আদৌ দেখতে পাবে না। এই অবস্থা ঐ অনুসরণকারী কাফিরদের হবে যারা নেতৃস্থানীয় কাফিরদেরকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে থাকে। যাদের তারা অনুসরণ করে তাদেরকেও তারা সঠিকভাবে চিনে না। তারা ন্যায়ের উপর আছে কি অন্যায়ের উপর আছে সেটাও তারা জানে না। তারা তাদের পিছনে চলতে রয়েছে, কিন্তু তারা তাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এ খবর তারা রাখে না। উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়ে থাকে যে, কোন একজন অজ্ঞ লোককে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “তু কোখায় যাচ্ছ?” উত্তরে সে বলেঃ “আমি এই লোকটির সাথে যাচ্ছি।” আবার তাকে প্রশ্ন করা হয়ঃ “এ লোকটি কোথায় যাচ্ছে?” জবাবে সে বলেঃ “তা তো আমি জানি না।” যেমন সমুদ্র তরঙ্গায়িত হচ্ছে তেমনই এই কাফিরের কানে এবং চোখের উপর পর্দা পড়ে রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ তাদের অন্তরের উপর ও কানের উপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন (শেষ পর্যন্ত)।” অন্য আয়াতে রয়েছে-(আরবি)অর্থাৎ “তুমি কি ঐ ব্যক্তিকে দেখনি যে তার প্রবৃত্তিকে তার মা'বুদ বানিয়ে নিয়েছে, আর আল্লাহ তাকে জ্ঞানের উপর পথভ্রষ্ট করেছেন এবং তার কানের উপর ও অন্তরের উপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন ও তার চোখের উপর পর্দা ফেলে দিয়েছেন?।” (৪৫: ২৩) হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেছেন যে, এই ধরনের লোক পাঁচটি অন্ধকারের মধ্যে থাকে। তার কথা, কাজ, যাওয়া, আসা এবং পরিণাম অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ যাকে জ্যোতি দান করেন। তার জন্যে কোন জ্যোতিই নেই। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা যাকে হিদায়াতের জ্যোতি দান না করেন সে হিদায়াত শূন্য থাকে এবং অজ্ঞতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে ধ্বংসের মধ্যে পতিত হয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন হিদায়াতকারী নেই।” (৭: ১৮৬) এটা ওরই মুকাবিলায় বলা হয়েছে যা মুমিনদের উপমার বর্ণনায় বলা হয়েছিল যে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করেন তাঁর জ্যোতির দিকে। আমরা মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি যে, তিনি যেন আমাদের অন্তরে নূর সৃষ্টি করেন এবং আমাদের ডানে এবং বামেও যেন নূর বা জ্যোতি দান করেন। তিনি যেন আমাদের জ্যোতি বাড়িয়ে দেন এবং ওটাকে খুবই বড় ও বেশী করেন।

আন-নূর 24:40

৩৯-৪০ নং আয়াতের তাফসীরআরো দু'প্রকার কাফিরের এ দু’টি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন সূরায়ে বাকারার শুরুতে দু'শ্রেণীর দু’টি উপমা বর্ণনা করা হয়েছে, একটি আগুনের উপমা এবং একটি পানির উপমা। আর যেমন সূরায়ে রা’দে মানুষের অন্তরে স্থান ধারণকারী ইলম ও হিদায়াতের এরূপই আগুন ও পানির দুটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে। ঐ দু’টি সূরায় ঐ আয়াতগুলোর পূর্ণ তাফসীর গত হয়েছে। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। প্রথমটি হচ্ছে ঐ কাফিরদের দৃষ্টান্ত যারা অন্যদেরকেও কুফরীর দিকে আহ্বান করে থাকে এবং মনে করে যে, তারা হিদায়াতের উপরই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। কিন্তু ওটা শুধু তাদের কল্পনা মাত্র। তাদের দৃষ্টান্ত তো হলো এরূপ যেমন কোন পিপাসার্ত লোক মরুভূমিতে দূর থেকে চকচকে বালু দেখতে পায় এবং ওকে পানির তরঙ্গ মনে করে বসে।(আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহুবচন, যেমন শব্দটির বহুবচন হলো (আরবি) এবং (আরবি) শব্দের বহুবচন (আরবি) ও এসে থাকে, যেমন (আরবি) শব্দের বহুবচন (আরবি) ও আসে। (আরবি) শব্দের অর্থ হলো জনশূন্য প্রশস্ত ও বিস্তীর্ণ মরুভূমি। এরূপ মরুভূমিতেই মরীচিকা দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। দুপুরের সময় এরূপই মনে হয় যে, পানির প্রশস্ত সমুদ্র তরঙ্গায়িত হচ্ছে। মরুভূমির উপর দিয়ে চলতে চলতে যখন কোন লোক পিপাসায় কাতর হয়ে ছটফট করে এবং ওষ্ঠাগত প্রাণ হয়ে যায়, আর উড্রান্তের মত পানির খোঁজে ফিরতে থাকে, তখন সে ওটাকে পানি মনে করে সেখানে পৌছে যায়। কিন্তু গিয়ে দেখে যে, সেখানে এক ফোটা পানিরও কোন নাম-নিশানা নেই। দ্রুপ এই কাফিররাও মনে করে নিয়েছে যে, তারা খুব ভাল কাজই করছে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তারা দেখতে পাবে যে, তাদের কাছে একটা পুণ্যও নেই। হয়তো তাদের পুণ্য তাদের বদ নিয়তের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে অথবা শরীয়ত মোতাবেক না হওয়ার কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। মোটকথা, সেখানে পৌছবার পূর্বেই তারা জাহান্নামীদের তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে। সুতরাং সেখানে তারা হয়ে গেছে সম্পূর্ণ শূন্য হস্ত। হিসাব গ্রহণের সময় স্বয়ং মহিমান্বিত ও প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ সেখানে বিদ্যমান। তিনি এক এক করে প্রত্যেকটি আমলের হিসাব গ্রহণ করছেন এবং ঐ কাফিরদের একটি আমলও পুণ্যের যোগ্যরূপে পাওয়া যাচ্ছেনা।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের দিন ইয়াহূদীদেরকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “দুনিয়ায় তোমরা কার উপাসনা করতে?” উত্তরে তারা বলবেঃ “আমরা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করতাম।” তখন তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা মিথ্যা কথা বলছো, আল্লাহর কোন পুত্র নেই। তারপর তাদেরকে প্রশ্ন করা হবেঃ “আচ্ছা, এখন তোমরা কি চাও?” তারা জবাবে বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা খুবই পিপাসার্ত। সুতরাং আমাদেরকে পানি পান করিয়ে দিন!” তখন তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা কি দেখতে পাচ্ছ না (ঐ যে পানি দেখা যায়, সেখানে যাও কেন)?” অতঃপর দূর থেকে তারা জাহান্নামকে তেমনই দেখবে যেমন দুনিয়ায় মরীচিকা দেখা যায়। সুতরাং তারা পানি মনে করে ওদিকে দৌড় দেবে এবং সেখানে পৌছলেই তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। এটা দৃষ্টান্ত হলো অনুসৃত লোকদের। এখন দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে অনুসরণকারী লোকদের, যারা মোটেই জ্ঞান রাখতো না। তারা পূর্ব বর্ণিত কাফিরদের অন্ধ অনুকরণ করতো। যাদের উপমা দেয়া হয়েছে গভীর সমুদ্রতলের অন্ধকারের সাথে, যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ, যার ঊর্ধ্বে মেঘপুঞ্জ, অন্ধকারপুঞ্জ স্তরের উপর স্তর, এমনকি সে হাত বের করলে তা আদৌ দেখতে পাবে না। এই অবস্থা ঐ অনুসরণকারী কাফিরদের হবে যারা নেতৃস্থানীয় কাফিরদেরকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে থাকে। যাদের তারা অনুসরণ করে তাদেরকেও তারা সঠিকভাবে চিনে না। তারা ন্যায়ের উপর আছে কি অন্যায়ের উপর আছে সেটাও তারা জানে না। তারা তাদের পিছনে চলতে রয়েছে, কিন্তু তারা তাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এ খবর তারা রাখে না। উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়ে থাকে যে, কোন একজন অজ্ঞ লোককে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “তু কোখায় যাচ্ছ?” উত্তরে সে বলেঃ “আমি এই লোকটির সাথে যাচ্ছি।” আবার তাকে প্রশ্ন করা হয়ঃ “এ লোকটি কোথায় যাচ্ছে?” জবাবে সে বলেঃ “তা তো আমি জানি না।” যেমন সমুদ্র তরঙ্গায়িত হচ্ছে তেমনই এই কাফিরের কানে এবং চোখের উপর পর্দা পড়ে রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ তাদের অন্তরের উপর ও কানের উপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন (শেষ পর্যন্ত)।” অন্য আয়াতে রয়েছে-(আরবি)অর্থাৎ “তুমি কি ঐ ব্যক্তিকে দেখনি যে তার প্রবৃত্তিকে তার মা'বুদ বানিয়ে নিয়েছে, আর আল্লাহ তাকে জ্ঞানের উপর পথভ্রষ্ট করেছেন এবং তার কানের উপর ও অন্তরের উপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন ও তার চোখের উপর পর্দা ফেলে দিয়েছেন?।” (৪৫: ২৩) হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেছেন যে, এই ধরনের লোক পাঁচটি অন্ধকারের মধ্যে থাকে। তার কথা, কাজ, যাওয়া, আসা এবং পরিণাম অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ যাকে জ্যোতি দান করেন। তার জন্যে কোন জ্যোতিই নেই। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা যাকে হিদায়াতের জ্যোতি দান না করেন সে হিদায়াত শূন্য থাকে এবং অজ্ঞতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে ধ্বংসের মধ্যে পতিত হয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন হিদায়াতকারী নেই।” (৭: ১৮৬) এটা ওরই মুকাবিলায় বলা হয়েছে যা মুমিনদের উপমার বর্ণনায় বলা হয়েছিল যে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করেন তাঁর জ্যোতির দিকে। আমরা মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি যে, তিনি যেন আমাদের অন্তরে নূর সৃষ্টি করেন এবং আমাদের ডানে এবং বামেও যেন নূর বা জ্যোতি দান করেন। তিনি যেন আমাদের জ্যোতি বাড়িয়ে দেন এবং ওটাকে খুবই বড় ও বেশী করেন।

আন-নূর 24:41

৪১-৪২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে। অর্থাৎ মানুষ, জ্বিন, ফেরেশতা এমনকি অজৈব বস্তুও আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণায় লিপ্ত রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “সপ্ত আকাশ ও যমীন এবং এগুলোর মধ্যে যত কিছু রয়েছে সবাই তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে থাকে। (শেষ পর্যন্ত)।” উড্ডীয়মান পক্ষীকুলও আল্লাহ তা'আলার মহিমা ঘোষণা করে থাকে। এ সবগুলোর জন্যে যথাযোগ্য তাসবীহ তিনি এগুলোকে শিখিয়ে দিয়েছেন এবং নিজের ইবাদতের বিভিন্ন পন্থাও তিনি তাদেরকে শিখিয়ে রেখেছেন। তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত। কোন কিছুই তার কাছে গোপন নেই। তিনি শাসনকর্তা, ব্যবস্থাপক, একচ্ছত্র মালিক, প্রকৃত উপাস্য এবং আসমান ও যমীনের বাদশাহ একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া কেউই ইবাদতের যোগ্য নয়। তাঁর হুকুম কেউ টলাতে পারে না। কিয়ামতের দিন সবাইকে তাঁরই সামনে হাযির হতে হবে। তিনি যা চাইবেন তাঁর সৃষ্টজীবের মধ্যে হুকুম জারী করে দিবেন। মন্দ লোকে মন্দ বিনিময় পাবে এবং ভাল লোক ভাল বিনিময় লাভ করবে। সৃষ্টিকর্তা ও অধিপতি তিনিই। তিনিই দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত হাকেম। তাঁরই সত্তা প্রশংসা ও গুণকীর্তনের যোগ্য।

আন-নূর 24:42

৪১-৪২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে। অর্থাৎ মানুষ, জ্বিন, ফেরেশতা এমনকি অজৈব বস্তুও আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণায় লিপ্ত রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “সপ্ত আকাশ ও যমীন এবং এগুলোর মধ্যে যত কিছু রয়েছে সবাই তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে থাকে। (শেষ পর্যন্ত)।” উড্ডীয়মান পক্ষীকুলও আল্লাহ তা'আলার মহিমা ঘোষণা করে থাকে। এ সবগুলোর জন্যে যথাযোগ্য তাসবীহ তিনি এগুলোকে শিখিয়ে দিয়েছেন এবং নিজের ইবাদতের বিভিন্ন পন্থাও তিনি তাদেরকে শিখিয়ে রেখেছেন। তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত। কোন কিছুই তার কাছে গোপন নেই। তিনি শাসনকর্তা, ব্যবস্থাপক, একচ্ছত্র মালিক, প্রকৃত উপাস্য এবং আসমান ও যমীনের বাদশাহ একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া কেউই ইবাদতের যোগ্য নয়। তাঁর হুকুম কেউ টলাতে পারে না। কিয়ামতের দিন সবাইকে তাঁরই সামনে হাযির হতে হবে। তিনি যা চাইবেন তাঁর সৃষ্টজীবের মধ্যে হুকুম জারী করে দিবেন। মন্দ লোকে মন্দ বিনিময় পাবে এবং ভাল লোক ভাল বিনিময় লাভ করবে। সৃষ্টিকর্তা ও অধিপতি তিনিই। তিনিই দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত হাকেম। তাঁরই সত্তা প্রশংসা ও গুণকীর্তনের যোগ্য।

আন-নূর 24:43

৪৩-৪৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন যে, তিনি মেঘমালাকে সঞ্চালিত করেন। এই মেঘমালা তাঁর শক্তিবলে প্রথম প্রথম পাতলা ধোয়ার আকারে উঠে। তারপর ওগুলো পরস্পর মিলিত হয়ে মোটা ও ঘন হয়ে যায় এবং একে অপরের উপর জমে যায়। তারপর ওগুলোর মধ্য হতে বৃষ্টি ধারা নির্গত হয়। বায়ু প্রবাহিত হয়, যমীনকে তিনি যোগ্য করে তুলেন। এরপর পুনরায় মেঘকে উঠিয়ে নেন এবং আবার মিলিত করেন। পুনরায় ঐ মেঘমালা পানিতে পূর্ণ হয়ে যায় এবং বর্ষিতে শুরু করে। আকাশস্থিত শিলাপ হতে তিনি শিলা বর্ষণ করেন।এই বাক্যে প্রথম (আরবি) টি (আরবি) -এর জন্যে, দ্বিতীয়টি (আরবি)-এর জন্যে এবং তৃতীয়টি (আরবি) -এর বর্ণনার জন্যে। এটা এই তাফসীরের উপর ভিত্তি করে যে, আয়াতের অর্থ করা হবেঃ শিলার পাহাড় আকাশে রয়েছে। আর যাদের মতে এখানে (আরবি) বা পাহাড়’ শব্দটি রূপক অর্থে ‘মেঘ’ রূপে ব্যবহৃত, তাঁদের নিকট দ্বিতীয়(আরবি) টিও (আরবি) -এর জন্যে এসেছে। কিন্তু ওটা প্রথম হতে বদল হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী ।পরবর্তী বাক্যের ভাবার্থ হচ্ছেঃ বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি আল্লাহ তা'আলা যেখানে বর্ষাবার ইচ্ছা করেন সেখানেই তা তাঁর রহমতে বর্ষে থাকে এবং তিনি যেখানে চান না সেখানে বর্ষে না। অথবা ভাবার্থ এই যে, এই শিলা দ্বারা যার ক্ষেত্র ও বাগানকে তিনি নষ্ট করার ইচ্ছা করেন নষ্ট করে দেন এবং যার উপর তিনি মেহেরবানী করেন তার ক্ষেত্র ও বাগানকে তিনি বাঁচিয়ে নেন।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বিদ্যুতের চমক ও শক্তির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, ওটা দৃষ্টিশক্তি প্রায় কেড়ে নেয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনিই দিবস ও রজনীর পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকেন। যখন তিনি ইচ্ছা করেন দিন ছোট কবেন ও রাত্রি বড় করেন এবং ইচ্ছা করলে পিন বড় করেন ও রাত্রি হোট করেন। এই সমুদয় নিদর্শনের মধ্যে অন্তদৃষ্টি সম্পন্ন লোকদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। এগুলো মহাক্ষমতাবান আল্লাহর ক্ষমতা প্রকাশ করছে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেন (আরবি)অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবস ও রজনীর পরিবর্তনে নিদর্শনাবলী রয়েছে বোধশক্তি সম্পন্ন লোকের জন্যে।” (৩:১৯০)

আন-নূর 24:44

৪৩-৪৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন যে, তিনি মেঘমালাকে সঞ্চালিত করেন। এই মেঘমালা তাঁর শক্তিবলে প্রথম প্রথম পাতলা ধোয়ার আকারে উঠে। তারপর ওগুলো পরস্পর মিলিত হয়ে মোটা ও ঘন হয়ে যায় এবং একে অপরের উপর জমে যায়। তারপর ওগুলোর মধ্য হতে বৃষ্টি ধারা নির্গত হয়। বায়ু প্রবাহিত হয়, যমীনকে তিনি যোগ্য করে তুলেন। এরপর পুনরায় মেঘকে উঠিয়ে নেন এবং আবার মিলিত করেন। পুনরায় ঐ মেঘমালা পানিতে পূর্ণ হয়ে যায় এবং বর্ষিতে শুরু করে। আকাশস্থিত শিলাপ হতে তিনি শিলা বর্ষণ করেন।এই বাক্যে প্রথম (আরবি) টি (আরবি) -এর জন্যে, দ্বিতীয়টি (আরবি)-এর জন্যে এবং তৃতীয়টি (আরবি) -এর বর্ণনার জন্যে। এটা এই তাফসীরের উপর ভিত্তি করে যে, আয়াতের অর্থ করা হবেঃ শিলার পাহাড় আকাশে রয়েছে। আর যাদের মতে এখানে (আরবি) বা পাহাড়’ শব্দটি রূপক অর্থে ‘মেঘ’ রূপে ব্যবহৃত, তাঁদের নিকট দ্বিতীয়(আরবি) টিও (আরবি) -এর জন্যে এসেছে। কিন্তু ওটা প্রথম হতে বদল হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী ।পরবর্তী বাক্যের ভাবার্থ হচ্ছেঃ বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি আল্লাহ তা'আলা যেখানে বর্ষাবার ইচ্ছা করেন সেখানেই তা তাঁর রহমতে বর্ষে থাকে এবং তিনি যেখানে চান না সেখানে বর্ষে না। অথবা ভাবার্থ এই যে, এই শিলা দ্বারা যার ক্ষেত্র ও বাগানকে তিনি নষ্ট করার ইচ্ছা করেন নষ্ট করে দেন এবং যার উপর তিনি মেহেরবানী করেন তার ক্ষেত্র ও বাগানকে তিনি বাঁচিয়ে নেন।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বিদ্যুতের চমক ও শক্তির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, ওটা দৃষ্টিশক্তি প্রায় কেড়ে নেয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তিনিই দিবস ও রজনীর পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকেন। যখন তিনি ইচ্ছা করেন দিন ছোট কবেন ও রাত্রি বড় করেন এবং ইচ্ছা করলে পিন বড় করেন ও রাত্রি হোট করেন। এই সমুদয় নিদর্শনের মধ্যে অন্তদৃষ্টি সম্পন্ন লোকদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। এগুলো মহাক্ষমতাবান আল্লাহর ক্ষমতা প্রকাশ করছে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেন (আরবি)অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবস ও রজনীর পরিবর্তনে নিদর্শনাবলী রয়েছে বোধশক্তি সম্পন্ন লোকের জন্যে।” (৩:১৯০)

আন-নূর 24:45

আল্লাহ তাআলা স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতা ও আধিপত্যের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি একই পানি দ্বারা নানা প্রকারের মাখলূক বা সৃষ্টজীব সৃষ্টি করেছেন। সাপ প্রভৃতি প্রাণীকে দেখা যায় যে, ওগুলো পেটের ভরে চলে। মানুষ ও পাখী দুই পায়ে চলে এবং জন্তুগুলো চলে চার পায়ে। তিনি বড়ই ক্ষমতাবান। তিনি যা চান তা হয় এবং যা চান না তা কখনো হয় না।

আন-নূর 24:46

এই নৈপুণ্যপূর্ণ আহকাম ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্তসমূহ এই কুরআন কারীমে আল্লাহ তা'আলাই বর্ণনা করেছেন। তিনি জ্ঞানীদেরকে বুঝবার তাওফীক দিয়েছেন। মহান আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন সরল সঠিক পথ-প্রদর্শন করেন।

আন-নূর 24:47

৪৭-৫২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আল মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন, তারা মুখে তো ঈমান ও আনুগত্যের কথা স্বীকার করছে বটে, কিন্তু তাদের অন্তর এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোন মিল নেই। কারণ তারা ঈমানদার নয়। হাদীসে আছে যে, যাকে বাদশাহর সামনে হাযির হওয়ার জন্যে আহ্বান করা হয়। এবং সে ঐ আহ্বানে সাড়া দেয় না সে যালিম। সে অন্যায়ের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) হযরত সামুরা প্রমুখ বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদেরকে আহ্বান করা হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দিকে তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবার জন্যে, অর্থাৎ যখন তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহবান করা হয় এবং কুরআন ও হাদীস মানতে বলা হয় তখন তারা গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এটা আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উজির মতঃ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত।অর্থাৎ “তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা দাবী করে যে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস করে, অথচ তারা তাগূতের কাছে বিচার প্রার্থী হতে চায়, যদিও ওটা প্রত্যাখ্যান করার জন্যে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়? তাদেরকে যখন বলা হয়ঃ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে এবং রাসূল (সঃ)-এর দিকে এসো, তখন মুনাফিকদেরকে তুমি তোমার নিকট হতে মুখ একেবারে ফিরিয়ে নিতে দেখবে।” (৪:৬০-৬১) ঘোষিত হচ্ছেঃ যদি তাদের প্রাপ্য থাকে তাহলে তারা বিনীতভাবে রাসূল (সঃ)-এর নিকট ছুটে আসে। অর্থাৎ তারা যদি শরীয়তের ফায়সালায় নিজেদের লাভ দেখতে পায় তবে আনন্দে আটখানা হয়ে রাসূল (সঃ)-এর নিকট ছুটে আসে। আর যদি জানতে পারে যে, শরয়ী ফায়সালা তাদের মনের চাহিদার উল্টো, পার্থিব স্বার্থের পরিপন্থী, তবে তারা সত্যের দিকে ফিরেও তাকায় না। সুতরাং এইরূপ লোকে পাকা কাফির। কেননা, তাদের মধ্যে তিন অবস্থার যে কোন একটি অবশ্যই রয়েছে। হয়তো তাদের অন্তরে বে-ঈমানী বদ্ধমূল হয়ে গেছে, কিংবা হয়তো তারা আল্লাহর দ্বীনের সত্যতায় সন্দিহান রয়েছে, অথবা হয়তো তারা এই ভয় করে যে, না জানি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) তাদের হক নষ্ট করেন এবং তাদের প্রতি যুলুম করেন। এই তিনটাই কুফরীর অবস্থা। আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রত্যেককেই জানেন। তাদের অন্তরে যা রয়েছে তা তার কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। প্রকৃতপক্ষে এই লোকগুলোই পাপী ও অত্যাচারী। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে এরূপ কাফিরের সংখ্যা অনেক ছিল যারা বাহ্যিকভাবে মুসলমান ছিল। যখন তারা দেখতো যে, কুরআন ও হাদীসমূলে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হবে তখন তারা নবী (সঃ)-এর খিদমতে তাদের মুকদ্দমা পেশ করতো। আর যখন দেখতো যে, তাদের প্রতিপক্ষের অনুকূলে রায় যাবে তখন নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হতে প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করতো। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি দুই ব্যক্তির মধ্যে কোন বিবাদ হয় এবং তাদেরকে ইসলামী হুকুম অনুযায়ী ফায়সালার দিকে আহ্বান করা হয়, আর তারা তা অস্বীকার করে তবে তারা যালিম এবং তারা অন্যায়ের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি গারীব ও মুরসাল)এরপর সঠিক ও খাঁটি মুমিনের বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাত ছাড়া অন্য কিছুকেই দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না। তারা তো কুরআন ও হাদীস শোনা মাত্রই এবং এগুলোর ডাক কানে আসা মাত্রই পরিষ্কারভাবে বলে থাকেঃ আমরা শুনলাম ও মানলাম। এরা উদ্দেশ্যে সফলকাম ও মুক্তিপ্রাপ্ত লোক।হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ), যিনি ছিলেন একজন বদরী সাহাবী এবং আনসারদের মধ্যে একজন নেতৃস্থানীয় লোক, মৃত্যুর সময় স্বীয় ভাতুপুত্র জানাদাহ ইবনে আবি উমাইয়া (রাঃ)-কে বলেনঃ “তোমার উপর কি কর্তব্য এবং তোমার কি উপকারী তাকি আমি তোমাকে বলে দেবো না? তিনি জবাবে বললেনঃ “হ্যা বলুন।” তখন তিনি বললেনঃ “তোমার কর্তব্য হলো (ধর্মীয় উপদেশ) শ্রবণ করা ও মান্য করা কঠিন অবস্থায়ও এবং সহজ অবস্থায়ও, আনন্দের সময়ও এবং দুঃখের সময়ও, আর ঐ সময়েও যখন তোমার হক অন্যকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। তোমার জিহ্বাকে তুমি ন্যায় ও সত্যবাদিতার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখবে। যোগ্য শাসনকর্তার নিকট থেকে শাসনকার্য ছিনিয়ে নিবে না। তবে সে। যদি প্রকাশ্যভাবে অবাধ্যতার হুকুম করে তবে তা কখনো মানবে না। সে যদি আল্লাহর কিতাবের বিপরীত কিছু বলে তবে তা কখনো স্বীকার করবে না। সদা-সর্বদা আল্লাহর কিতাবের অনুসরণ করবে।” হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া ইসলাম নেই। আর সমস্ত মঙ্গল নিহিত রয়েছে জামাআতের মধ্যে এবং আল্লাহ, তদীয় রাসূল (সঃ), মুসলমানদের খলীফা এবং সাধারণ মুসলমানদের মঙ্গল কামনার মধ্যে।হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন যে, ইসলামের দৃঢ় রঙ্গু হলো আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেয়া, নামায প্রতিষ্ঠিত করা, যাকাত প্রদান করা এবং মুসলমানদের বাদশাহদের আনুগত্য স্বীকার করা।আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ)-এর এবং মুসলমান বাদশাহদের আনুগত্যের ব্যাপারে যেসব হাদীস ও আসার এসেছে সেগুলোর সংখ্যা এতো বেশী যে, সকলো এখানে বর্ণনা করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুগত হবে, তারা যা করতে আদেশ করেছেন তা পালন কবে, যা করতে নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকবে, যে পাপকার্য করে ফেলেছে তার জন্যে সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে এবং আগামীতে ঐ সব পাপকার্য হতে বিরত থাকবে সে সমুদয় কল্যাণ জমাকার এবং সমস্ত অকল্যাণ হতে পৰিত্ৰাণ প্রাপ্ত। দুনিয়া ও আখিরাতে সে মুক্তিপ্রাপ্ত ও সফলকাম।

আন-নূর 24:48

৪৭-৫২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আল মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন, তারা মুখে তো ঈমান ও আনুগত্যের কথা স্বীকার করছে বটে, কিন্তু তাদের অন্তর এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোন মিল নেই। কারণ তারা ঈমানদার নয়। হাদীসে আছে যে, যাকে বাদশাহর সামনে হাযির হওয়ার জন্যে আহ্বান করা হয়। এবং সে ঐ আহ্বানে সাড়া দেয় না সে যালিম। সে অন্যায়ের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) হযরত সামুরা প্রমুখ বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদেরকে আহ্বান করা হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দিকে তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবার জন্যে, অর্থাৎ যখন তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহবান করা হয় এবং কুরআন ও হাদীস মানতে বলা হয় তখন তারা গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এটা আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উজির মতঃ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত।অর্থাৎ “তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা দাবী করে যে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস করে, অথচ তারা তাগূতের কাছে বিচার প্রার্থী হতে চায়, যদিও ওটা প্রত্যাখ্যান করার জন্যে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়? তাদেরকে যখন বলা হয়ঃ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে এবং রাসূল (সঃ)-এর দিকে এসো, তখন মুনাফিকদেরকে তুমি তোমার নিকট হতে মুখ একেবারে ফিরিয়ে নিতে দেখবে।” (৪:৬০-৬১) ঘোষিত হচ্ছেঃ যদি তাদের প্রাপ্য থাকে তাহলে তারা বিনীতভাবে রাসূল (সঃ)-এর নিকট ছুটে আসে। অর্থাৎ তারা যদি শরীয়তের ফায়সালায় নিজেদের লাভ দেখতে পায় তবে আনন্দে আটখানা হয়ে রাসূল (সঃ)-এর নিকট ছুটে আসে। আর যদি জানতে পারে যে, শরয়ী ফায়সালা তাদের মনের চাহিদার উল্টো, পার্থিব স্বার্থের পরিপন্থী, তবে তারা সত্যের দিকে ফিরেও তাকায় না। সুতরাং এইরূপ লোকে পাকা কাফির। কেননা, তাদের মধ্যে তিন অবস্থার যে কোন একটি অবশ্যই রয়েছে। হয়তো তাদের অন্তরে বে-ঈমানী বদ্ধমূল হয়ে গেছে, কিংবা হয়তো তারা আল্লাহর দ্বীনের সত্যতায় সন্দিহান রয়েছে, অথবা হয়তো তারা এই ভয় করে যে, না জানি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) তাদের হক নষ্ট করেন এবং তাদের প্রতি যুলুম করেন। এই তিনটাই কুফরীর অবস্থা। আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রত্যেককেই জানেন। তাদের অন্তরে যা রয়েছে তা তার কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। প্রকৃতপক্ষে এই লোকগুলোই পাপী ও অত্যাচারী। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে এরূপ কাফিরের সংখ্যা অনেক ছিল যারা বাহ্যিকভাবে মুসলমান ছিল। যখন তারা দেখতো যে, কুরআন ও হাদীসমূলে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হবে তখন তারা নবী (সঃ)-এর খিদমতে তাদের মুকদ্দমা পেশ করতো। আর যখন দেখতো যে, তাদের প্রতিপক্ষের অনুকূলে রায় যাবে তখন নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হতে প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করতো। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি দুই ব্যক্তির মধ্যে কোন বিবাদ হয় এবং তাদেরকে ইসলামী হুকুম অনুযায়ী ফায়সালার দিকে আহ্বান করা হয়, আর তারা তা অস্বীকার করে তবে তারা যালিম এবং তারা অন্যায়ের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি গারীব ও মুরসাল)এরপর সঠিক ও খাঁটি মুমিনের বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাত ছাড়া অন্য কিছুকেই দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না। তারা তো কুরআন ও হাদীস শোনা মাত্রই এবং এগুলোর ডাক কানে আসা মাত্রই পরিষ্কারভাবে বলে থাকেঃ আমরা শুনলাম ও মানলাম। এরা উদ্দেশ্যে সফলকাম ও মুক্তিপ্রাপ্ত লোক।হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ), যিনি ছিলেন একজন বদরী সাহাবী এবং আনসারদের মধ্যে একজন নেতৃস্থানীয় লোক, মৃত্যুর সময় স্বীয় ভাতুপুত্র জানাদাহ ইবনে আবি উমাইয়া (রাঃ)-কে বলেনঃ “তোমার উপর কি কর্তব্য এবং তোমার কি উপকারী তাকি আমি তোমাকে বলে দেবো না? তিনি জবাবে বললেনঃ “হ্যা বলুন।” তখন তিনি বললেনঃ “তোমার কর্তব্য হলো (ধর্মীয় উপদেশ) শ্রবণ করা ও মান্য করা কঠিন অবস্থায়ও এবং সহজ অবস্থায়ও, আনন্দের সময়ও এবং দুঃখের সময়ও, আর ঐ সময়েও যখন তোমার হক অন্যকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। তোমার জিহ্বাকে তুমি ন্যায় ও সত্যবাদিতার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখবে। যোগ্য শাসনকর্তার নিকট থেকে শাসনকার্য ছিনিয়ে নিবে না। তবে সে। যদি প্রকাশ্যভাবে অবাধ্যতার হুকুম করে তবে তা কখনো মানবে না। সে যদি আল্লাহর কিতাবের বিপরীত কিছু বলে তবে তা কখনো স্বীকার করবে না। সদা-সর্বদা আল্লাহর কিতাবের অনুসরণ করবে।” হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া ইসলাম নেই। আর সমস্ত মঙ্গল নিহিত রয়েছে জামাআতের মধ্যে এবং আল্লাহ, তদীয় রাসূল (সঃ), মুসলমানদের খলীফা এবং সাধারণ মুসলমানদের মঙ্গল কামনার মধ্যে।হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন যে, ইসলামের দৃঢ় রঙ্গু হলো আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেয়া, নামায প্রতিষ্ঠিত করা, যাকাত প্রদান করা এবং মুসলমানদের বাদশাহদের আনুগত্য স্বীকার করা।আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ)-এর এবং মুসলমান বাদশাহদের আনুগত্যের ব্যাপারে যেসব হাদীস ও আসার এসেছে সেগুলোর সংখ্যা এতো বেশী যে, সকলো এখানে বর্ণনা করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুগত হবে, তারা যা করতে আদেশ করেছেন তা পালন কবে, যা করতে নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকবে, যে পাপকার্য করে ফেলেছে তার জন্যে সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে এবং আগামীতে ঐ সব পাপকার্য হতে বিরত থাকবে সে সমুদয় কল্যাণ জমাকার এবং সমস্ত অকল্যাণ হতে পৰিত্ৰাণ প্রাপ্ত। দুনিয়া ও আখিরাতে সে মুক্তিপ্রাপ্ত ও সফলকাম।

আন-নূর 24:49

৪৭-৫২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আল মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন, তারা মুখে তো ঈমান ও আনুগত্যের কথা স্বীকার করছে বটে, কিন্তু তাদের অন্তর এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোন মিল নেই। কারণ তারা ঈমানদার নয়। হাদীসে আছে যে, যাকে বাদশাহর সামনে হাযির হওয়ার জন্যে আহ্বান করা হয়। এবং সে ঐ আহ্বানে সাড়া দেয় না সে যালিম। সে অন্যায়ের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) হযরত সামুরা প্রমুখ বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদেরকে আহ্বান করা হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দিকে তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবার জন্যে, অর্থাৎ যখন তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহবান করা হয় এবং কুরআন ও হাদীস মানতে বলা হয় তখন তারা গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এটা আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উজির মতঃ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত।অর্থাৎ “তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা দাবী করে যে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস করে, অথচ তারা তাগূতের কাছে বিচার প্রার্থী হতে চায়, যদিও ওটা প্রত্যাখ্যান করার জন্যে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়? তাদেরকে যখন বলা হয়ঃ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে এবং রাসূল (সঃ)-এর দিকে এসো, তখন মুনাফিকদেরকে তুমি তোমার নিকট হতে মুখ একেবারে ফিরিয়ে নিতে দেখবে।” (৪:৬০-৬১) ঘোষিত হচ্ছেঃ যদি তাদের প্রাপ্য থাকে তাহলে তারা বিনীতভাবে রাসূল (সঃ)-এর নিকট ছুটে আসে। অর্থাৎ তারা যদি শরীয়তের ফায়সালায় নিজেদের লাভ দেখতে পায় তবে আনন্দে আটখানা হয়ে রাসূল (সঃ)-এর নিকট ছুটে আসে। আর যদি জানতে পারে যে, শরয়ী ফায়সালা তাদের মনের চাহিদার উল্টো, পার্থিব স্বার্থের পরিপন্থী, তবে তারা সত্যের দিকে ফিরেও তাকায় না। সুতরাং এইরূপ লোকে পাকা কাফির। কেননা, তাদের মধ্যে তিন অবস্থার যে কোন একটি অবশ্যই রয়েছে। হয়তো তাদের অন্তরে বে-ঈমানী বদ্ধমূল হয়ে গেছে, কিংবা হয়তো তারা আল্লাহর দ্বীনের সত্যতায় সন্দিহান রয়েছে, অথবা হয়তো তারা এই ভয় করে যে, না জানি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) তাদের হক নষ্ট করেন এবং তাদের প্রতি যুলুম করেন। এই তিনটাই কুফরীর অবস্থা। আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রত্যেককেই জানেন। তাদের অন্তরে যা রয়েছে তা তার কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। প্রকৃতপক্ষে এই লোকগুলোই পাপী ও অত্যাচারী। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে এরূপ কাফিরের সংখ্যা অনেক ছিল যারা বাহ্যিকভাবে মুসলমান ছিল। যখন তারা দেখতো যে, কুরআন ও হাদীসমূলে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হবে তখন তারা নবী (সঃ)-এর খিদমতে তাদের মুকদ্দমা পেশ করতো। আর যখন দেখতো যে, তাদের প্রতিপক্ষের অনুকূলে রায় যাবে তখন নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হতে প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করতো। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি দুই ব্যক্তির মধ্যে কোন বিবাদ হয় এবং তাদেরকে ইসলামী হুকুম অনুযায়ী ফায়সালার দিকে আহ্বান করা হয়, আর তারা তা অস্বীকার করে তবে তারা যালিম এবং তারা অন্যায়ের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি গারীব ও মুরসাল)এরপর সঠিক ও খাঁটি মুমিনের বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাত ছাড়া অন্য কিছুকেই দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না। তারা তো কুরআন ও হাদীস শোনা মাত্রই এবং এগুলোর ডাক কানে আসা মাত্রই পরিষ্কারভাবে বলে থাকেঃ আমরা শুনলাম ও মানলাম। এরা উদ্দেশ্যে সফলকাম ও মুক্তিপ্রাপ্ত লোক।হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ), যিনি ছিলেন একজন বদরী সাহাবী এবং আনসারদের মধ্যে একজন নেতৃস্থানীয় লোক, মৃত্যুর সময় স্বীয় ভাতুপুত্র জানাদাহ ইবনে আবি উমাইয়া (রাঃ)-কে বলেনঃ “তোমার উপর কি কর্তব্য এবং তোমার কি উপকারী তাকি আমি তোমাকে বলে দেবো না? তিনি জবাবে বললেনঃ “হ্যা বলুন।” তখন তিনি বললেনঃ “তোমার কর্তব্য হলো (ধর্মীয় উপদেশ) শ্রবণ করা ও মান্য করা কঠিন অবস্থায়ও এবং সহজ অবস্থায়ও, আনন্দের সময়ও এবং দুঃখের সময়ও, আর ঐ সময়েও যখন তোমার হক অন্যকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। তোমার জিহ্বাকে তুমি ন্যায় ও সত্যবাদিতার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখবে। যোগ্য শাসনকর্তার নিকট থেকে শাসনকার্য ছিনিয়ে নিবে না। তবে সে। যদি প্রকাশ্যভাবে অবাধ্যতার হুকুম করে তবে তা কখনো মানবে না। সে যদি আল্লাহর কিতাবের বিপরীত কিছু বলে তবে তা কখনো স্বীকার করবে না। সদা-সর্বদা আল্লাহর কিতাবের অনুসরণ করবে।” হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া ইসলাম নেই। আর সমস্ত মঙ্গল নিহিত রয়েছে জামাআতের মধ্যে এবং আল্লাহ, তদীয় রাসূল (সঃ), মুসলমানদের খলীফা এবং সাধারণ মুসলমানদের মঙ্গল কামনার মধ্যে।হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন যে, ইসলামের দৃঢ় রঙ্গু হলো আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেয়া, নামায প্রতিষ্ঠিত করা, যাকাত প্রদান করা এবং মুসলমানদের বাদশাহদের আনুগত্য স্বীকার করা।আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ)-এর এবং মুসলমান বাদশাহদের আনুগত্যের ব্যাপারে যেসব হাদীস ও আসার এসেছে সেগুলোর সংখ্যা এতো বেশী যে, সকলো এখানে বর্ণনা করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুগত হবে, তারা যা করতে আদেশ করেছেন তা পালন কবে, যা করতে নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকবে, যে পাপকার্য করে ফেলেছে তার জন্যে সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে এবং আগামীতে ঐ সব পাপকার্য হতে বিরত থাকবে সে সমুদয় কল্যাণ জমাকার এবং সমস্ত অকল্যাণ হতে পৰিত্ৰাণ প্রাপ্ত। দুনিয়া ও আখিরাতে সে মুক্তিপ্রাপ্ত ও সফলকাম।

আন-নূর 24:50

৪৭-৫২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আল মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন, তারা মুখে তো ঈমান ও আনুগত্যের কথা স্বীকার করছে বটে, কিন্তু তাদের অন্তর এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোন মিল নেই। কারণ তারা ঈমানদার নয়। হাদীসে আছে যে, যাকে বাদশাহর সামনে হাযির হওয়ার জন্যে আহ্বান করা হয়। এবং সে ঐ আহ্বানে সাড়া দেয় না সে যালিম। সে অন্যায়ের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) হযরত সামুরা প্রমুখ বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদেরকে আহ্বান করা হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দিকে তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবার জন্যে, অর্থাৎ যখন তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহবান করা হয় এবং কুরআন ও হাদীস মানতে বলা হয় তখন তারা গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এটা আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উজির মতঃ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত।অর্থাৎ “তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা দাবী করে যে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস করে, অথচ তারা তাগূতের কাছে বিচার প্রার্থী হতে চায়, যদিও ওটা প্রত্যাখ্যান করার জন্যে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়? তাদেরকে যখন বলা হয়ঃ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে এবং রাসূল (সঃ)-এর দিকে এসো, তখন মুনাফিকদেরকে তুমি তোমার নিকট হতে মুখ একেবারে ফিরিয়ে নিতে দেখবে।” (৪:৬০-৬১) ঘোষিত হচ্ছেঃ যদি তাদের প্রাপ্য থাকে তাহলে তারা বিনীতভাবে রাসূল (সঃ)-এর নিকট ছুটে আসে। অর্থাৎ তারা যদি শরীয়তের ফায়সালায় নিজেদের লাভ দেখতে পায় তবে আনন্দে আটখানা হয়ে রাসূল (সঃ)-এর নিকট ছুটে আসে। আর যদি জানতে পারে যে, শরয়ী ফায়সালা তাদের মনের চাহিদার উল্টো, পার্থিব স্বার্থের পরিপন্থী, তবে তারা সত্যের দিকে ফিরেও তাকায় না। সুতরাং এইরূপ লোকে পাকা কাফির। কেননা, তাদের মধ্যে তিন অবস্থার যে কোন একটি অবশ্যই রয়েছে। হয়তো তাদের অন্তরে বে-ঈমানী বদ্ধমূল হয়ে গেছে, কিংবা হয়তো তারা আল্লাহর দ্বীনের সত্যতায় সন্দিহান রয়েছে, অথবা হয়তো তারা এই ভয় করে যে, না জানি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) তাদের হক নষ্ট করেন এবং তাদের প্রতি যুলুম করেন। এই তিনটাই কুফরীর অবস্থা। আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রত্যেককেই জানেন। তাদের অন্তরে যা রয়েছে তা তার কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। প্রকৃতপক্ষে এই লোকগুলোই পাপী ও অত্যাচারী। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে এরূপ কাফিরের সংখ্যা অনেক ছিল যারা বাহ্যিকভাবে মুসলমান ছিল। যখন তারা দেখতো যে, কুরআন ও হাদীসমূলে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হবে তখন তারা নবী (সঃ)-এর খিদমতে তাদের মুকদ্দমা পেশ করতো। আর যখন দেখতো যে, তাদের প্রতিপক্ষের অনুকূলে রায় যাবে তখন নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হতে প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করতো। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি দুই ব্যক্তির মধ্যে কোন বিবাদ হয় এবং তাদেরকে ইসলামী হুকুম অনুযায়ী ফায়সালার দিকে আহ্বান করা হয়, আর তারা তা অস্বীকার করে তবে তারা যালিম এবং তারা অন্যায়ের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি গারীব ও মুরসাল)এরপর সঠিক ও খাঁটি মুমিনের বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাত ছাড়া অন্য কিছুকেই দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না। তারা তো কুরআন ও হাদীস শোনা মাত্রই এবং এগুলোর ডাক কানে আসা মাত্রই পরিষ্কারভাবে বলে থাকেঃ আমরা শুনলাম ও মানলাম। এরা উদ্দেশ্যে সফলকাম ও মুক্তিপ্রাপ্ত লোক।হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ), যিনি ছিলেন একজন বদরী সাহাবী এবং আনসারদের মধ্যে একজন নেতৃস্থানীয় লোক, মৃত্যুর সময় স্বীয় ভাতুপুত্র জানাদাহ ইবনে আবি উমাইয়া (রাঃ)-কে বলেনঃ “তোমার উপর কি কর্তব্য এবং তোমার কি উপকারী তাকি আমি তোমাকে বলে দেবো না? তিনি জবাবে বললেনঃ “হ্যা বলুন।” তখন তিনি বললেনঃ “তোমার কর্তব্য হলো (ধর্মীয় উপদেশ) শ্রবণ করা ও মান্য করা কঠিন অবস্থায়ও এবং সহজ অবস্থায়ও, আনন্দের সময়ও এবং দুঃখের সময়ও, আর ঐ সময়েও যখন তোমার হক অন্যকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। তোমার জিহ্বাকে তুমি ন্যায় ও সত্যবাদিতার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখবে। যোগ্য শাসনকর্তার নিকট থেকে শাসনকার্য ছিনিয়ে নিবে না। তবে সে। যদি প্রকাশ্যভাবে অবাধ্যতার হুকুম করে তবে তা কখনো মানবে না। সে যদি আল্লাহর কিতাবের বিপরীত কিছু বলে তবে তা কখনো স্বীকার করবে না। সদা-সর্বদা আল্লাহর কিতাবের অনুসরণ করবে।” হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া ইসলাম নেই। আর সমস্ত মঙ্গল নিহিত রয়েছে জামাআতের মধ্যে এবং আল্লাহ, তদীয় রাসূল (সঃ), মুসলমানদের খলীফা এবং সাধারণ মুসলমানদের মঙ্গল কামনার মধ্যে।হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন যে, ইসলামের দৃঢ় রঙ্গু হলো আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেয়া, নামায প্রতিষ্ঠিত করা, যাকাত প্রদান করা এবং মুসলমানদের বাদশাহদের আনুগত্য স্বীকার করা।আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ)-এর এবং মুসলমান বাদশাহদের আনুগত্যের ব্যাপারে যেসব হাদীস ও আসার এসেছে সেগুলোর সংখ্যা এতো বেশী যে, সকলো এখানে বর্ণনা করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুগত হবে, তারা যা করতে আদেশ করেছেন তা পালন কবে, যা করতে নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকবে, যে পাপকার্য করে ফেলেছে তার জন্যে সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে এবং আগামীতে ঐ সব পাপকার্য হতে বিরত থাকবে সে সমুদয় কল্যাণ জমাকার এবং সমস্ত অকল্যাণ হতে পৰিত্ৰাণ প্রাপ্ত। দুনিয়া ও আখিরাতে সে মুক্তিপ্রাপ্ত ও সফলকাম।

আন-নূর 24:51

৪৭-৫২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আল মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন, তারা মুখে তো ঈমান ও আনুগত্যের কথা স্বীকার করছে বটে, কিন্তু তাদের অন্তর এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোন মিল নেই। কারণ তারা ঈমানদার নয়। হাদীসে আছে যে, যাকে বাদশাহর সামনে হাযির হওয়ার জন্যে আহ্বান করা হয়। এবং সে ঐ আহ্বানে সাড়া দেয় না সে যালিম। সে অন্যায়ের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) হযরত সামুরা প্রমুখ বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদেরকে আহ্বান করা হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দিকে তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবার জন্যে, অর্থাৎ যখন তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহবান করা হয় এবং কুরআন ও হাদীস মানতে বলা হয় তখন তারা গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এটা আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উজির মতঃ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত।অর্থাৎ “তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা দাবী করে যে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস করে, অথচ তারা তাগূতের কাছে বিচার প্রার্থী হতে চায়, যদিও ওটা প্রত্যাখ্যান করার জন্যে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়? তাদেরকে যখন বলা হয়ঃ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে এবং রাসূল (সঃ)-এর দিকে এসো, তখন মুনাফিকদেরকে তুমি তোমার নিকট হতে মুখ একেবারে ফিরিয়ে নিতে দেখবে।” (৪:৬০-৬১) ঘোষিত হচ্ছেঃ যদি তাদের প্রাপ্য থাকে তাহলে তারা বিনীতভাবে রাসূল (সঃ)-এর নিকট ছুটে আসে। অর্থাৎ তারা যদি শরীয়তের ফায়সালায় নিজেদের লাভ দেখতে পায় তবে আনন্দে আটখানা হয়ে রাসূল (সঃ)-এর নিকট ছুটে আসে। আর যদি জানতে পারে যে, শরয়ী ফায়সালা তাদের মনের চাহিদার উল্টো, পার্থিব স্বার্থের পরিপন্থী, তবে তারা সত্যের দিকে ফিরেও তাকায় না। সুতরাং এইরূপ লোকে পাকা কাফির। কেননা, তাদের মধ্যে তিন অবস্থার যে কোন একটি অবশ্যই রয়েছে। হয়তো তাদের অন্তরে বে-ঈমানী বদ্ধমূল হয়ে গেছে, কিংবা হয়তো তারা আল্লাহর দ্বীনের সত্যতায় সন্দিহান রয়েছে, অথবা হয়তো তারা এই ভয় করে যে, না জানি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) তাদের হক নষ্ট করেন এবং তাদের প্রতি যুলুম করেন। এই তিনটাই কুফরীর অবস্থা। আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রত্যেককেই জানেন। তাদের অন্তরে যা রয়েছে তা তার কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। প্রকৃতপক্ষে এই লোকগুলোই পাপী ও অত্যাচারী। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে এরূপ কাফিরের সংখ্যা অনেক ছিল যারা বাহ্যিকভাবে মুসলমান ছিল। যখন তারা দেখতো যে, কুরআন ও হাদীসমূলে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হবে তখন তারা নবী (সঃ)-এর খিদমতে তাদের মুকদ্দমা পেশ করতো। আর যখন দেখতো যে, তাদের প্রতিপক্ষের অনুকূলে রায় যাবে তখন নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হতে প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করতো। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি দুই ব্যক্তির মধ্যে কোন বিবাদ হয় এবং তাদেরকে ইসলামী হুকুম অনুযায়ী ফায়সালার দিকে আহ্বান করা হয়, আর তারা তা অস্বীকার করে তবে তারা যালিম এবং তারা অন্যায়ের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি গারীব ও মুরসাল)এরপর সঠিক ও খাঁটি মুমিনের বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাত ছাড়া অন্য কিছুকেই দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না। তারা তো কুরআন ও হাদীস শোনা মাত্রই এবং এগুলোর ডাক কানে আসা মাত্রই পরিষ্কারভাবে বলে থাকেঃ আমরা শুনলাম ও মানলাম। এরা উদ্দেশ্যে সফলকাম ও মুক্তিপ্রাপ্ত লোক।হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ), যিনি ছিলেন একজন বদরী সাহাবী এবং আনসারদের মধ্যে একজন নেতৃস্থানীয় লোক, মৃত্যুর সময় স্বীয় ভাতুপুত্র জানাদাহ ইবনে আবি উমাইয়া (রাঃ)-কে বলেনঃ “তোমার উপর কি কর্তব্য এবং তোমার কি উপকারী তাকি আমি তোমাকে বলে দেবো না? তিনি জবাবে বললেনঃ “হ্যা বলুন।” তখন তিনি বললেনঃ “তোমার কর্তব্য হলো (ধর্মীয় উপদেশ) শ্রবণ করা ও মান্য করা কঠিন অবস্থায়ও এবং সহজ অবস্থায়ও, আনন্দের সময়ও এবং দুঃখের সময়ও, আর ঐ সময়েও যখন তোমার হক অন্যকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। তোমার জিহ্বাকে তুমি ন্যায় ও সত্যবাদিতার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখবে। যোগ্য শাসনকর্তার নিকট থেকে শাসনকার্য ছিনিয়ে নিবে না। তবে সে। যদি প্রকাশ্যভাবে অবাধ্যতার হুকুম করে তবে তা কখনো মানবে না। সে যদি আল্লাহর কিতাবের বিপরীত কিছু বলে তবে তা কখনো স্বীকার করবে না। সদা-সর্বদা আল্লাহর কিতাবের অনুসরণ করবে।” হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া ইসলাম নেই। আর সমস্ত মঙ্গল নিহিত রয়েছে জামাআতের মধ্যে এবং আল্লাহ, তদীয় রাসূল (সঃ), মুসলমানদের খলীফা এবং সাধারণ মুসলমানদের মঙ্গল কামনার মধ্যে।হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন যে, ইসলামের দৃঢ় রঙ্গু হলো আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেয়া, নামায প্রতিষ্ঠিত করা, যাকাত প্রদান করা এবং মুসলমানদের বাদশাহদের আনুগত্য স্বীকার করা।আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ)-এর এবং মুসলমান বাদশাহদের আনুগত্যের ব্যাপারে যেসব হাদীস ও আসার এসেছে সেগুলোর সংখ্যা এতো বেশী যে, সকলো এখানে বর্ণনা করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুগত হবে, তারা যা করতে আদেশ করেছেন তা পালন কবে, যা করতে নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকবে, যে পাপকার্য করে ফেলেছে তার জন্যে সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে এবং আগামীতে ঐ সব পাপকার্য হতে বিরত থাকবে সে সমুদয় কল্যাণ জমাকার এবং সমস্ত অকল্যাণ হতে পৰিত্ৰাণ প্রাপ্ত। দুনিয়া ও আখিরাতে সে মুক্তিপ্রাপ্ত ও সফলকাম।

আন-নূর 24:52

৪৭-৫২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আল মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন, তারা মুখে তো ঈমান ও আনুগত্যের কথা স্বীকার করছে বটে, কিন্তু তাদের অন্তর এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোন মিল নেই। কারণ তারা ঈমানদার নয়। হাদীসে আছে যে, যাকে বাদশাহর সামনে হাযির হওয়ার জন্যে আহ্বান করা হয়। এবং সে ঐ আহ্বানে সাড়া দেয় না সে যালিম। সে অন্যায়ের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) হযরত সামুরা প্রমুখ বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদেরকে আহ্বান করা হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দিকে তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবার জন্যে, অর্থাৎ যখন তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহবান করা হয় এবং কুরআন ও হাদীস মানতে বলা হয় তখন তারা গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এটা আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উজির মতঃ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত।অর্থাৎ “তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা দাবী করে যে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস করে, অথচ তারা তাগূতের কাছে বিচার প্রার্থী হতে চায়, যদিও ওটা প্রত্যাখ্যান করার জন্যে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়? তাদেরকে যখন বলা হয়ঃ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে এবং রাসূল (সঃ)-এর দিকে এসো, তখন মুনাফিকদেরকে তুমি তোমার নিকট হতে মুখ একেবারে ফিরিয়ে নিতে দেখবে।” (৪:৬০-৬১) ঘোষিত হচ্ছেঃ যদি তাদের প্রাপ্য থাকে তাহলে তারা বিনীতভাবে রাসূল (সঃ)-এর নিকট ছুটে আসে। অর্থাৎ তারা যদি শরীয়তের ফায়সালায় নিজেদের লাভ দেখতে পায় তবে আনন্দে আটখানা হয়ে রাসূল (সঃ)-এর নিকট ছুটে আসে। আর যদি জানতে পারে যে, শরয়ী ফায়সালা তাদের মনের চাহিদার উল্টো, পার্থিব স্বার্থের পরিপন্থী, তবে তারা সত্যের দিকে ফিরেও তাকায় না। সুতরাং এইরূপ লোকে পাকা কাফির। কেননা, তাদের মধ্যে তিন অবস্থার যে কোন একটি অবশ্যই রয়েছে। হয়তো তাদের অন্তরে বে-ঈমানী বদ্ধমূল হয়ে গেছে, কিংবা হয়তো তারা আল্লাহর দ্বীনের সত্যতায় সন্দিহান রয়েছে, অথবা হয়তো তারা এই ভয় করে যে, না জানি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) তাদের হক নষ্ট করেন এবং তাদের প্রতি যুলুম করেন। এই তিনটাই কুফরীর অবস্থা। আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রত্যেককেই জানেন। তাদের অন্তরে যা রয়েছে তা তার কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। প্রকৃতপক্ষে এই লোকগুলোই পাপী ও অত্যাচারী। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে এরূপ কাফিরের সংখ্যা অনেক ছিল যারা বাহ্যিকভাবে মুসলমান ছিল। যখন তারা দেখতো যে, কুরআন ও হাদীসমূলে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হবে তখন তারা নবী (সঃ)-এর খিদমতে তাদের মুকদ্দমা পেশ করতো। আর যখন দেখতো যে, তাদের প্রতিপক্ষের অনুকূলে রায় যাবে তখন নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হতে প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করতো। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি দুই ব্যক্তির মধ্যে কোন বিবাদ হয় এবং তাদেরকে ইসলামী হুকুম অনুযায়ী ফায়সালার দিকে আহ্বান করা হয়, আর তারা তা অস্বীকার করে তবে তারা যালিম এবং তারা অন্যায়ের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি গারীব ও মুরসাল)এরপর সঠিক ও খাঁটি মুমিনের বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাত ছাড়া অন্য কিছুকেই দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না। তারা তো কুরআন ও হাদীস শোনা মাত্রই এবং এগুলোর ডাক কানে আসা মাত্রই পরিষ্কারভাবে বলে থাকেঃ আমরা শুনলাম ও মানলাম। এরা উদ্দেশ্যে সফলকাম ও মুক্তিপ্রাপ্ত লোক।হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ), যিনি ছিলেন একজন বদরী সাহাবী এবং আনসারদের মধ্যে একজন নেতৃস্থানীয় লোক, মৃত্যুর সময় স্বীয় ভাতুপুত্র জানাদাহ ইবনে আবি উমাইয়া (রাঃ)-কে বলেনঃ “তোমার উপর কি কর্তব্য এবং তোমার কি উপকারী তাকি আমি তোমাকে বলে দেবো না? তিনি জবাবে বললেনঃ “হ্যা বলুন।” তখন তিনি বললেনঃ “তোমার কর্তব্য হলো (ধর্মীয় উপদেশ) শ্রবণ করা ও মান্য করা কঠিন অবস্থায়ও এবং সহজ অবস্থায়ও, আনন্দের সময়ও এবং দুঃখের সময়ও, আর ঐ সময়েও যখন তোমার হক অন্যকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। তোমার জিহ্বাকে তুমি ন্যায় ও সত্যবাদিতার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখবে। যোগ্য শাসনকর্তার নিকট থেকে শাসনকার্য ছিনিয়ে নিবে না। তবে সে। যদি প্রকাশ্যভাবে অবাধ্যতার হুকুম করে তবে তা কখনো মানবে না। সে যদি আল্লাহর কিতাবের বিপরীত কিছু বলে তবে তা কখনো স্বীকার করবে না। সদা-সর্বদা আল্লাহর কিতাবের অনুসরণ করবে।” হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া ইসলাম নেই। আর সমস্ত মঙ্গল নিহিত রয়েছে জামাআতের মধ্যে এবং আল্লাহ, তদীয় রাসূল (সঃ), মুসলমানদের খলীফা এবং সাধারণ মুসলমানদের মঙ্গল কামনার মধ্যে।হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন যে, ইসলামের দৃঢ় রঙ্গু হলো আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেয়া, নামায প্রতিষ্ঠিত করা, যাকাত প্রদান করা এবং মুসলমানদের বাদশাহদের আনুগত্য স্বীকার করা।আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ)-এর এবং মুসলমান বাদশাহদের আনুগত্যের ব্যাপারে যেসব হাদীস ও আসার এসেছে সেগুলোর সংখ্যা এতো বেশী যে, সকলো এখানে বর্ণনা করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুগত হবে, তারা যা করতে আদেশ করেছেন তা পালন কবে, যা করতে নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকবে, যে পাপকার্য করে ফেলেছে তার জন্যে সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে এবং আগামীতে ঐ সব পাপকার্য হতে বিরত থাকবে সে সমুদয় কল্যাণ জমাকার এবং সমস্ত অকল্যাণ হতে পৰিত্ৰাণ প্রাপ্ত। দুনিয়া ও আখিরাতে সে মুক্তিপ্রাপ্ত ও সফলকাম।

আন-নূর 24:53

৫৩-৫৪ নং আয়াতের তাফসীরএখানে আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে নিজেদের ঈমানদারী ও শুভাকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করতো এবং শপথ করে করে বলতো যে, তারা জিহাদে গমনের জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে। কিন্তু হুকুমের অপেক্ষায় রয়েছে। হুকুম হওয়া মাত্রই ঘরবাড়ী ও ছেলে মেয়ে ছেড়ে জিহাদের মাঠে পৌছে যাবে। আল্লাহ তাদেরকে লক্ষ্য করে বলেনঃ “তোমরা শপথ করো না। তোমাদের আনুগত্যের মূলতত্ত্ব আমার জানা আছে। তোমাদের অন্তরে এক কথা, মুখে এক কথা। সুতরাং তোমাদের শপথের হাকীকত আমার অজানা নয়। তোমাদের মুখ যতটা মুমিন তোমাদের অন্তর ততটা কাফির। তোমাদের এই শপথগুলো শুধু মুসলমানদের সহানুভূতি লাভ করার জন্যে। হে মুমিনগণ! এই মুনাফিকরা তাদের শপথকে ঢাল বানিয়ে রেখেছে। তারা যে শুধু তোমাদের সামনে কসম করছে তা নয়, বরং কাফিরদের সামনেও তারা তাদের পক্ষ অবলম্বনের ও তাদের সাহায্য সহযোগিতার কসম খেয়ে থাকে। কিন্তু তারা এতো ভীরু ও কাপুরুষ যে, তাদের সাথেও তারা থাকতে পারে না।এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ “হে মুনাফিকরা! তোমাদের জ্ঞানসম্মত ও পছন্দনীয় আনুগত্যের নীতি অবলম্বন করা উচিত ছিল, এভাবে শপথ করা মোটেই শোভনীয় নয়। তোমাদের সামনে মুসলমানরা বিদ্যমান রয়েছে। তাদেরকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ যে, তারা না শপথ করছে, না বেড়ে বেড়ে কথা বলছে, বরং কাজের সময় তারা সবারই আগে বেরিয়ে পড়ছে। বেশী কথা না বলে কাজই তারা বেশী করছে। তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত। তোমাদের কোন কাজই তাঁর কাছে গোপন নেই। প্রত্যেক অবাধ্য ও অনুগত তার কাছে প্রকাশমান। প্রত্যেকের ভিতরের খবর তিনি তেমনই জানেন যেমন জানেন বাইরের খবর। তোমরা বাইরে যা কিছুই প্রকাশ কর না কেন, তিনি তোমাদের অন্তরের লুক্কায়িত খবরও পূর্ণমাত্রায় রাখেন।মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য কর। অর্থাৎ তোমরা কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে জেনে রেখো যে, তোমাদের এই অপরাধের শাস্তি নবী (সঃ)-এর উপর পতিত হবে না। তার কাজ তো শুধু আল্লাহর পয়গাম মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়া। তোমাদের উপর অর্পিত দায়িতের জন্যে তোমরাই দায়ী। আর তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব হচ্ছে রাসূল (সঃ)-এর কথা মেনে নেয়া এবং এর উপর আমল করা ইত্যাদি। হিদায়াত শুধু রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যেই রয়েছে। কেননা, সরল সঠিক পথের দিকে আহ্বানকারী তিনিই। এই সরল সোজা পথ ঐ আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে যার রাজত্ব সমস্ত যমীন ও আসমানব্যাপী। রাসূল (সঃ)-এর দায়িত্ব শুধু পৌঁছিয়ে দেয়া। সবারই হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব মহামহিমান্বিত আল্লাহর। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতএব তুমি উপদেশ দাও; তুমি তো একজন উপদেশদাতা। তুমি তাদের কর্ম নিয়ন্ত্রক নও।” (৮৮: ২১-২২)।অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের নবীদের মধ্যে হযরত শাইয়া (আঃ) নামক একজন নবীর নিকট অহী করেনঃ “তুমি বানী ইসরাঈলের সমাবেশে দাঁড়িয়ে যাও। আমি তোমার মুখ দিয়ে যা বের করার বের করবো।” আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশক্রমেই হযরত শাইয়া (আঃ) দাঁড়িয়ে যান। তখন আল্লাহর হুকুমে তার মুখ দিয়ে নিম্ন লিখিত ভাষণ বের হয়ঃ“হে আকাশ! শুন, এবং হে যমীন! চুপ থাকো। আল্লাহ তা'আলা একটা শান বা মাহাত্ম্য পূর্ণ করতে এবং একটা বিষয়ের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার ইচ্ছা করেন। ওটা তিনি পূর্ণ করবেন। তিনি চান যে, জঙ্গলকে বাসযোগ্য করবেন, জনহীন মরুপ্রান্তরকে করবেন জনবসতিপূর্ণ, বালুকায়ময় মরুভূমিকে করবেন শ্যামল-সবুজ, দরিদ্রদেরকে করবেন সম্পদশালী এবং রাখালদেরকে তিনি বাদশাহ বানিয়ে দেবেন। তিনি অশিক্ষিতদের মধ্য হতে একজন নিরক্ষর লোককে নবী করে পাঠাবেন, যিনি চরিত্রহীন হবেন না এবং কর্কশ ভাষীও হবেন না। তিনি বাজারে হট্টগোল ও গোলমাল করবেন না। তিনি এতো বিনয়ী ও নম্র হবেন যে, তাঁর বস্ত্রের অঞ্চলের বাতাসে ঐ প্রদীপ নির্বাপিত হবে না যার পার্শ্ব দিয়ে তিনি গমন করবেন। তিনি যদি শুষ্ক বাঁশের উপর পা রেখেও চলেন তবুও ঐ বাঁশের চড়চড়ি শব্দ কারো কানে পৌঁছবে না। আমি তাকে সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে পাঠাবো। তার মুখের ভাষা হবে মধুর ও পবিত্র। তাঁর আবির্ভাবের ফলে অন্ধ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে এবং বধির ফিরে পাবে শ্রবণশক্তি। তার বরকতে মোহরযুক্ত অন্তর খুলে যাবে। সমস্ত ভাল কাজ দ্বারা আমি তাকে শোভনীয় করবো। তাঁকে আমি সর্বদিক দিয়ে মধুর ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী করবো। সাকীনা বা চিত্ত প্রশান্তি হবে তাঁর পোশাক। পুণ্য হবে তাঁর রীতি-নীতি এবং তাঁর অন্তর হবে আল্লাহভীতিতে পরিপূর্ণ। তার কথা হবে জ্ঞানপূর্ণ এবং সত্যবাদিতা ও প্রতিজ্ঞা-পালন হবে তার স্বভাব। তার অভ্যাস ও প্রকৃতি হবে মার্জনা ও ক্ষমা এবং মঙ্গল কামনা। হক ও সত্য হবে তার শরীয়ত এবং আদল ও ইনসাফ হবে তার চরিত্র। হিদায়াত হবে তাঁর ইমাম এবং ইসলাম হবে তার মিল্লাত। তার নাম হবে আহমাদ (সঃ)। তাঁর কারণে আমি পথভ্রষ্টতার পরে হিদায়াত ছড়িয়ে দিবো। অজ্ঞতার পরে জ্ঞান বিকশিত হবে। তার কারণে অবনতির পরে উন্নতি হবে। তার মাধ্যমে অজানা জানার সাথে পরিবর্তিত হবে। স্বল্পতা আধিক্যে পরিবর্তিত হয়ে যাবে। তারই কারণে আমি দারিদ্রকে পরিবর্তিত করবো ঐশ্বর্যে। যারা পরস্পর পৃথক পৃথক রয়েছে, তার মাধ্যমে আমি তাদেরকে পরস্পর মিলিত করবো। তার মাধ্যমে আমি পরস্পরের মধ্যে প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করবো। তাদের পরস্পরের মতানৈক্যের পর তার মাধ্যমে আমি তাদেরকে মতৈক্য পৌছিয়ে দিবো। তাঁর মাধ্যমে আমি পৃথক পৃথক হৃদয়কে এক হৃদয়ে পরিণত করবো। অর্থাৎ তারা পরস্পর শত্রুতা ভুলে গিয়ে একে অপরের বন্ধুতে পরিণত হয়ে যাবে, মনে হবে যেন একই হৃদয়। আল্লাহর অসংখ্য বান্দা ধ্বংস হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। তার উম্মতকে আমি সমস্ত উম্মতের উপর মর্যাদা দান করবো, যারা জনগণের জন্যে উপকারী হবে। তারা ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখবে। তারা হবে একত্ববাদী খাঁটি মুমিন। আল্লাহ তাআলার যতগুলো রাসূল আল্লাহ তা'আলার নিকট থেকে যত কিছু এনেছেন, এই শেষ নবী (সঃ) তাদের সকলকেই স্বীকার করবেন, কাউকেও অস্বীকার করবেন না।

আন-নূর 24:54

৫৩-৫৪ নং আয়াতের তাফসীরএখানে আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে নিজেদের ঈমানদারী ও শুভাকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করতো এবং শপথ করে করে বলতো যে, তারা জিহাদে গমনের জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে। কিন্তু হুকুমের অপেক্ষায় রয়েছে। হুকুম হওয়া মাত্রই ঘরবাড়ী ও ছেলে মেয়ে ছেড়ে জিহাদের মাঠে পৌছে যাবে। আল্লাহ তাদেরকে লক্ষ্য করে বলেনঃ “তোমরা শপথ করো না। তোমাদের আনুগত্যের মূলতত্ত্ব আমার জানা আছে। তোমাদের অন্তরে এক কথা, মুখে এক কথা। সুতরাং তোমাদের শপথের হাকীকত আমার অজানা নয়। তোমাদের মুখ যতটা মুমিন তোমাদের অন্তর ততটা কাফির। তোমাদের এই শপথগুলো শুধু মুসলমানদের সহানুভূতি লাভ করার জন্যে। হে মুমিনগণ! এই মুনাফিকরা তাদের শপথকে ঢাল বানিয়ে রেখেছে। তারা যে শুধু তোমাদের সামনে কসম করছে তা নয়, বরং কাফিরদের সামনেও তারা তাদের পক্ষ অবলম্বনের ও তাদের সাহায্য সহযোগিতার কসম খেয়ে থাকে। কিন্তু তারা এতো ভীরু ও কাপুরুষ যে, তাদের সাথেও তারা থাকতে পারে না।এর ভাবার্থ এও হতে পারেঃ “হে মুনাফিকরা! তোমাদের জ্ঞানসম্মত ও পছন্দনীয় আনুগত্যের নীতি অবলম্বন করা উচিত ছিল, এভাবে শপথ করা মোটেই শোভনীয় নয়। তোমাদের সামনে মুসলমানরা বিদ্যমান রয়েছে। তাদেরকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ যে, তারা না শপথ করছে, না বেড়ে বেড়ে কথা বলছে, বরং কাজের সময় তারা সবারই আগে বেরিয়ে পড়ছে। বেশী কথা না বলে কাজই তারা বেশী করছে। তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত। তোমাদের কোন কাজই তাঁর কাছে গোপন নেই। প্রত্যেক অবাধ্য ও অনুগত তার কাছে প্রকাশমান। প্রত্যেকের ভিতরের খবর তিনি তেমনই জানেন যেমন জানেন বাইরের খবর। তোমরা বাইরে যা কিছুই প্রকাশ কর না কেন, তিনি তোমাদের অন্তরের লুক্কায়িত খবরও পূর্ণমাত্রায় রাখেন।মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য কর। অর্থাৎ তোমরা কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে জেনে রেখো যে, তোমাদের এই অপরাধের শাস্তি নবী (সঃ)-এর উপর পতিত হবে না। তার কাজ তো শুধু আল্লাহর পয়গাম মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়া। তোমাদের উপর অর্পিত দায়িতের জন্যে তোমরাই দায়ী। আর তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব হচ্ছে রাসূল (সঃ)-এর কথা মেনে নেয়া এবং এর উপর আমল করা ইত্যাদি। হিদায়াত শুধু রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যেই রয়েছে। কেননা, সরল সঠিক পথের দিকে আহ্বানকারী তিনিই। এই সরল সোজা পথ ঐ আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে যার রাজত্ব সমস্ত যমীন ও আসমানব্যাপী। রাসূল (সঃ)-এর দায়িত্ব শুধু পৌঁছিয়ে দেয়া। সবারই হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব মহামহিমান্বিত আল্লাহর। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতএব তুমি উপদেশ দাও; তুমি তো একজন উপদেশদাতা। তুমি তাদের কর্ম নিয়ন্ত্রক নও।” (৮৮: ২১-২২)।অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের নবীদের মধ্যে হযরত শাইয়া (আঃ) নামক একজন নবীর নিকট অহী করেনঃ “তুমি বানী ইসরাঈলের সমাবেশে দাঁড়িয়ে যাও। আমি তোমার মুখ দিয়ে যা বের করার বের করবো।” আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশক্রমেই হযরত শাইয়া (আঃ) দাঁড়িয়ে যান। তখন আল্লাহর হুকুমে তার মুখ দিয়ে নিম্ন লিখিত ভাষণ বের হয়ঃ“হে আকাশ! শুন, এবং হে যমীন! চুপ থাকো। আল্লাহ তা'আলা একটা শান বা মাহাত্ম্য পূর্ণ করতে এবং একটা বিষয়ের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার ইচ্ছা করেন। ওটা তিনি পূর্ণ করবেন। তিনি চান যে, জঙ্গলকে বাসযোগ্য করবেন, জনহীন মরুপ্রান্তরকে করবেন জনবসতিপূর্ণ, বালুকায়ময় মরুভূমিকে করবেন শ্যামল-সবুজ, দরিদ্রদেরকে করবেন সম্পদশালী এবং রাখালদেরকে তিনি বাদশাহ বানিয়ে দেবেন। তিনি অশিক্ষিতদের মধ্য হতে একজন নিরক্ষর লোককে নবী করে পাঠাবেন, যিনি চরিত্রহীন হবেন না এবং কর্কশ ভাষীও হবেন না। তিনি বাজারে হট্টগোল ও গোলমাল করবেন না। তিনি এতো বিনয়ী ও নম্র হবেন যে, তাঁর বস্ত্রের অঞ্চলের বাতাসে ঐ প্রদীপ নির্বাপিত হবে না যার পার্শ্ব দিয়ে তিনি গমন করবেন। তিনি যদি শুষ্ক বাঁশের উপর পা রেখেও চলেন তবুও ঐ বাঁশের চড়চড়ি শব্দ কারো কানে পৌঁছবে না। আমি তাকে সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে পাঠাবো। তার মুখের ভাষা হবে মধুর ও পবিত্র। তাঁর আবির্ভাবের ফলে অন্ধ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে এবং বধির ফিরে পাবে শ্রবণশক্তি। তার বরকতে মোহরযুক্ত অন্তর খুলে যাবে। সমস্ত ভাল কাজ দ্বারা আমি তাকে শোভনীয় করবো। তাঁকে আমি সর্বদিক দিয়ে মধুর ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী করবো। সাকীনা বা চিত্ত প্রশান্তি হবে তাঁর পোশাক। পুণ্য হবে তাঁর রীতি-নীতি এবং তাঁর অন্তর হবে আল্লাহভীতিতে পরিপূর্ণ। তার কথা হবে জ্ঞানপূর্ণ এবং সত্যবাদিতা ও প্রতিজ্ঞা-পালন হবে তার স্বভাব। তার অভ্যাস ও প্রকৃতি হবে মার্জনা ও ক্ষমা এবং মঙ্গল কামনা। হক ও সত্য হবে তার শরীয়ত এবং আদল ও ইনসাফ হবে তার চরিত্র। হিদায়াত হবে তাঁর ইমাম এবং ইসলাম হবে তার মিল্লাত। তার নাম হবে আহমাদ (সঃ)। তাঁর কারণে আমি পথভ্রষ্টতার পরে হিদায়াত ছড়িয়ে দিবো। অজ্ঞতার পরে জ্ঞান বিকশিত হবে। তার কারণে অবনতির পরে উন্নতি হবে। তার মাধ্যমে অজানা জানার সাথে পরিবর্তিত হবে। স্বল্পতা আধিক্যে পরিবর্তিত হয়ে যাবে। তারই কারণে আমি দারিদ্রকে পরিবর্তিত করবো ঐশ্বর্যে। যারা পরস্পর পৃথক পৃথক রয়েছে, তার মাধ্যমে আমি তাদেরকে পরস্পর মিলিত করবো। তার মাধ্যমে আমি পরস্পরের মধ্যে প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করবো। তাদের পরস্পরের মতানৈক্যের পর তার মাধ্যমে আমি তাদেরকে মতৈক্য পৌছিয়ে দিবো। তাঁর মাধ্যমে আমি পৃথক পৃথক হৃদয়কে এক হৃদয়ে পরিণত করবো। অর্থাৎ তারা পরস্পর শত্রুতা ভুলে গিয়ে একে অপরের বন্ধুতে পরিণত হয়ে যাবে, মনে হবে যেন একই হৃদয়। আল্লাহর অসংখ্য বান্দা ধ্বংস হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। তার উম্মতকে আমি সমস্ত উম্মতের উপর মর্যাদা দান করবো, যারা জনগণের জন্যে উপকারী হবে। তারা ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখবে। তারা হবে একত্ববাদী খাঁটি মুমিন। আল্লাহ তাআলার যতগুলো রাসূল আল্লাহ তা'আলার নিকট থেকে যত কিছু এনেছেন, এই শেষ নবী (সঃ) তাদের সকলকেই স্বীকার করবেন, কাউকেও অস্বীকার করবেন না।

আন-নূর 24:55

আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর সাথে ওয়াদা করছেন যে, তিনি তাঁর উম্মতকে যমীনের মালিক বানিয়ে দিবেন, তাদেরকে তিনি লোকদের নেতা করবেন এবং দেশ তাদের দ্বারা জনবসতিপূর্ণ হবে। আল্লাহর বান্দারা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে। আজ জনগণ লোকদের থেকে ভীত-সন্ত্রস্ত রয়েছে, কাল তারা পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করবে। হুকুমত তাদের হবে এবং তারাই হবে সাম্রাজ্যের মালিক। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, হয়েছেও তাই। মক্কা, খায়বার, বাহরাইন, আরব উপদ্বীপ এবং ইয়ামন তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগেই বিজিত হয়েছিল। হিজরের মাজুসীরা জিযিয়া কর দিতে স্বীকৃত হয়ে মুসলমানদের অধীনতা স্বীকার করে নেয়। সিরিয়ার কোন কোন অংশেরও এই অবস্থাই হয়। রোমক সম্রাট কায়সার উপহার উপঢৌকন পাঠিয়ে দেন। মিসরের গভর্নরও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপঢৌকন পাঠায়। ইসকানদারিয়ার বাদশাহ মাকুকাস এবং আম্মানের বাদশাহরাও এটাই করেন এবং এইভাবে নিজেদের আনুগত্য প্রমাণ করেন। হাবশের বাদশাহ নাজ্জাসী (রঃ) তো মুসলমানই হয়ে যান যিনি আসহামার পরে হাবশের বাদশাহ হয়েছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ইন্তেকাল করেন এবং হযরত আবু বকর (রাঃ) খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তখন তিনি হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে এক সেনাবাহিনী পারস্য অভিমুখে প্রেরণ করেন। সেখানে তিনি ক্রমান্বয়ে বিজয় লাভ করতে থাকেন এবং কুফরীর গাছগুলোকে কেটে ফেলে চতুর্দিকে ইসলামের চারা রোপণ করেন। হযরত আবু উবাদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ) প্রমুখ সেনাবাহিনীর অধীনে ইসলামের বীর সৈনিকদেরকে সিরিয়ার রাজ্যগুলোর দিকে প্রেরণ করেন এবং তাঁরা সেখানে মুহাম্মাদ (সঃ) পতাকা উত্তোলন করেন এবং ক্রুশ চিহ্নযুক্ত পতাকাগুলোকে উল্টোমুখে নিক্ষেপ করেন। হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একদল সেনাবাহিনী মিসরের দিকে প্রেরিত হয়। বসরা, দামে, আম্মান প্রভৃতি রাজ্য বিজয়ের পর হযরত আবু বকর (রাঃ) মৃত্যুর ডাকে সাড়া দেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি মহান। আল্লাহর ইঙ্গিতক্রমে হযরত উমার (রাঃ)-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান। এটা সত্য কথা যে, আকাশের নীচে কোন নবীর পরে হযরত উমার (রাঃ)-এর যুগের মত যুগ আর আসেনি। তার স্বভাবগত শক্তি, তাঁর পুণ্য, তার চরিত্র, তাঁর ন্যায়পরায়ণতা এবং তার আল্লাহভীতির দৃষ্টান্ত দুনিয়ায় তার পরে অনুসন্ধান করা বৃথা কালক্ষেপণ ছাড়া কিছুই নয়। সমগ্র সিরিয়া ও মিসর এবং পারস্যের অধিকাংশ অঞ্চল তার খিলাফতের আমলে বিজিত হয়। পারস্য সম্রাট কিসরার সাম্রাজ্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। স্বয়ং সম্রাটের মাথা লুকাবার কোন জায়গা থাকে। তাকে লাঞ্ছিত অবস্থায় পালিয়ে বেড়াতে হয়। রোমক সম্রাট কায়সারকেও সাম্রাজ্যচ্যুত করা হয়। সিরিয়া সাম্রাজ্য তার হাত ছাড়া হয়ে যায় এবং কনস্টান্টিনোপলে পালিয়ে গিয়ে তাকে আত্মগোপন করতে হয়। এই সাম্রাজ্যগুলোর বহু বছরের সঞ্চিত ধন-সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়। আল্লাহর এই সৎ ও মধুর চরিত্রের অধিকারী বান্দাদের মধ্যে এগুলো বন্টন করা হয়। এইভাবে মহান আল্লাহ তাঁর ঐ ওয়াদা পূর্ণ করেন যা তিনি তার প্রিয় বন্ধু হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথে করেছিলেন।অতঃপর হযরত উসমান (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগ আসে এবং পূর্ব হতে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত আল্লাহর দ্বীন ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহর সেনাবাহিনী একদিকে পূর্ব দিকের শেষ প্রান্ত এবং অপরদিকে পশ্চিম দিকের শেষ প্রান্তে পৌঁছে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। ইসলামী মুজাহিদদের উন্মুক্ত তরবারী আল্লাহর তাওহীদকে দুনিয়ার প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছিয়ে দেন। স্পেন, কিবরাস এমন কি সুদূর চীন পর্যন্ত হযরত উমার (রাঃ)-এর যুগে বিজিত হয়। পারস্য সম্রাট কিসরা নিহত হয়। তার সাম্রাজ্যের নাম ও নিশানা নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়। অগ্নি উপাসকদের হাজার হাজার বছরের উপাসনালয় নির্বাপিত হয় এবং প্রত্যেকটি উঁচু টিলা হতে আল্লাহু আকবার ধ্বনি গুঞ্জরিত হয়। অপরদিকে মাদায়েন, ইরাক, খখারাসান, আহওয়ায ইত্যাদি সাম্রাজ্য জয় করা হয়। তুর্কীদের সাথে বিশাল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অবশেষে তাদের বড় বাদশাহ খাকান মাটির সাথে মিশে যায়। সে চরমভাবে লাঞ্ছিত ও পর্যদস্ত হয় এবং যমীনের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত হতে হযরত উসমান (রাঃ)-এর দরবারে খাজনা পৌছতে থাকে। সত্য কথা তো এটাই যে, মুসলিম বীর পুরুষদের এই জীবন মরণ সংগ্রামের মূলে ছিল হযরত উসমান (রাঃ)-এর তিলাওয়াতে কুরআনের বরকত। কুরআন কারীমের প্রতি তাঁর যে আসক্তি ও অনুরাগ ছিল তা বর্ণনাতীত। কুরআনকে একত্রিতকরণ ও মুখস্থকরণ এবং প্রচার ও প্রসারকরণে তিনি যে খিদমত আঞ্জাম দেন তার তুলনা মিলে না। তাঁর যুগের থতি লক্ষ্য করলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণীটি মানসপটে ভেসে ওঠে। তিনি বলেছিলেনঃ “আমার জন্যে যমীনকে এক জায়গায় একত্রিত ও জড় করা য়, এমনকি আমি পূর্ব দিক ও পশ্চিম দিক দেখে নিই। আমার উম্মতের সাম্রাজ্য ইন পর্যন্ত পৌঁছে যাবে যেখান পর্যন্ত আমাকে দেখানো হয়েছিল। এখন আৰা দেখতে পাই যে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) আমাদের সাথে যে ভদ করেছিলেন তা সত্যে পরিণত হয়েছে। সুতরাং আমরা আল্লাহর প্রতি এবং তৰ ৰাসূল (সঃ)-এর প্রতি ঈমানের প্রার্থনা করছি এবং যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তিনি সন্তুষ্ট হন সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার আমরা তাঁর কাছে তাওফীক চাচ্ছি। হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “মুসলমানদের কাজ উত্তমরূপে চালু থাকবে, শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে বারো জন খলীফা হবে।” অতঃপর তিনি একটি বাক্য আস্তে বলেন যা আমার কর্ণগোচর হয়নি। আমি ওটা আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কথাটি আস্তে বলেছিলেন তাহলোঃ “এদের সবাই কুরায়েশী হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথাটি ঐদিনের সন্ধ্যায় বলেছিলেন যেই দিন হযরত মায়েয ইবনে মালিক (রাঃ)-কে রজম বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা হয়েছিল। সুতরাং জানা গেল যে, এই বারোজন খলীফা অবশ্যই হবেন। কিন্তু এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, এই বারো জন খলীফা তারা নয় যাদেরকে শিয়া সম্প্রদায় ধারণা করছে। কেননা শিয়াদের ইমামদের মধ্যে এমন বহু ইমামও রয়েছে যারা খিলাফত ও সালতানাতের কোন অংশ সারা জীবনেও লাভ করেনি। এই বারো জন খলীফা সবাই হবেন কুরায়েশ বংশের। তাঁরা হবেন ন্যায়ের সাথে ফায়সালাকারী। তাঁদের সুসংবাদ পূর্ববর্তী কিতাবসমূহেও রয়েছে। এটা শর্ত নয় যে, এই বারো জন খলীফা পর্যায়ক্রমে ও ক্রমিকভাবে হবেন। বরং হতে পারে যে, তারা বিভিন্ন যুগে হবেন। চার জন খলীফা তো ক্রমিকভাবেই হয়েছেন। যেমন হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ)। তাঁদের পর ক্রম কেটে গেছে। পরে এরূপ খলীফা গত হয়েছেন এবং পরবর্তীতেও কোন কোন খলীফার আগমন ঘটতে পারে। সঠিক যুগের অবগতি একমাত্র মহান আল্লাহরই রয়েছে। তবে এটা নিশ্চিত কথা যে, ইমাম মেহেদীও এই বারো জনের একজন হবেন যার নাম ও কুনিয়াত হবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নাম ও কুনিয়াত মুতাবেক। তিনি সমগ্র ভূ-পৃষ্ঠকে আদল ও ইনসাফ দ্বারা পূর্ণ করে দিবেন, যখন সারা দুনিয়া অন্যায় ও অত্যাচারে ছেয়ে যাবে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুক্ত দাস হযরত সাফীনা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার (ইন্তেকালের) পরে ত্রিশ বছর পর্যন্ত খিলাফত থাকবে, তারপর দন্তকর্তিত রাজ্য হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবুল আলিয়া (রঃ) আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, (ইসলামের আবির্ভাবের পর) রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সহচরবর্গ দশ বছরের মত মক্কায় অবস্থান করেন। ঐ সময় তারা দুনিয়াবাসীকে আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর ইবাদতের দিকে আহ্বান করতে থাকেন। কিন্তু ঐ যুগটি ছিল গোপনীয়তা, ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার যুগ। তখন পর্যন্ত জিহাদের হুকুম নাযিল হয়নি। মুসলমানরা ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল। এরপর হিজরতের হুকুম হয় এবং তাঁরা মদীনায় হিজরত করেন। অতঃপর জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হয়। চতুর্দিকে শত্রু পরিবেষ্টিত ছিল। মুসলমানরা ছিলেন ভীত-সন্ত্রস্ত। কোন সময়ই বিপদ শূন্য ছিল না। সকাল সন্ধ্যায় সাহাবীগণ (রাঃ) অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত থাকতেন। একজন সাহাবী একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের জীবনের একটা মুহূর্তও কি শান্তিতে কাটবে না? হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ক্ষণেকের জন্যেও কি আমরা অস্ত্র-শস্ত্র রেখে দিয়ে তৃপ্তি ও স্বস্তির শ্বাস গ্রহণ করতে পারবো না?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যন্ত শান্তভাবে উত্তর দেনঃ “আরো কিছুদিন ধৈর্যধারণ কর। অতঃপর এমন শান্তি এবং নিরাপত্তা বিরাজ করবে যে, মানুষ ভরা মজলিসে আরামে ও নিশ্চিন্তে বসে থাকবে, একজনের কাছে কেন, কারো কাছেই কোন অস্ত্র থাকবে।" ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।অতঃপর আল্লাহর নবী (সঃ) আরব উপদ্বীপের উপর বিজয় লাভ করেন। আরবে কোন কাফির থাকলো না। সুতরাং মুসলমানদের অন্তর ভয়শূন্য হয়ে গেল। আর সদা-সর্বদা অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত থাকার কোন প্রয়োজন থাকলো না। ভারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকালের পরেও তিনজন খলীফার যুগ পর্যন্ত সর্বত্র ঐ শান্তি ও নিরাপত্তাই বিরাজ করে। অর্থাৎ হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ) এবং হযরত উসমান (রাঃ)-এর যুগ পর্যন্ত। এরপর মুসলমানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। কাজেই আবার তাদের মধ্যে ভয় এসে পড়ে এবং প্রহরী, চৌকিদার, দারোগা ইত্যাতি নিযুক্ত করতে হয়। মুসলমানরা যখন নিজেদের অবস্থা নিজেরাই পরিবর্তন করে তখন তাদের অবস্থা পবির্তিত হয়ে যায়।পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন হতে বর্ণিত আছে যে, তারা হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের সত্যতার ব্যাপারে এই আয়াতটিকে পেশ করেছেন।হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) বলেনঃ “যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন আমরা অত্যন্ত ভয় ও দুর্ভাবনার অবস্থায় ছিলাম। যেমন আল্লাহ তা'আলা (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা স্মরণ কর, যখন তোমরা ছিলে খুবই অল্প এবং ভূ-পৃষ্ঠে তোমাদেরকে দুর্বল মনে করা হতো।” (৮:২৬) অর্থাৎ পদে পদে তোমরা ভীত ও শংকিত থাকতে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের সংখ্যা বাড়িয়ে দেন এবং তোমাদেরকে শক্তিশালী করেন। আর তিনি তোমাদেরকে নিরাপত্তা দান করেন।মহান আল্লাহ বলেনঃ যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে। যেমন হযরত মূসা (আঃ) তাঁর কওমকে বলেছিলেন (আরবি) অর্থাৎ “এটা খুবই নিকটে যে, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করবেন এবং যমীনে তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন।” (৭:১২৯) অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি চাই যে, ভূ-পৃষ্ঠে যাদেরকে দুর্বল জ্ঞান করা হতো তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবো।” (২৮: ৫) এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তিনি অবশ্যই তাদের জন্যে সুদৃঢ় করবেন তাদের দ্বীনকে যা তিনি তাদের জন্যে মনোনীত করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে তাদেরকে অবশ্যই নিরাপত্তা দান করবেন। হযরত আদী ইবনে হাতিম (রাঃ) যখন প্রতিনিধি হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কি হীরা নামক দেশ দেখেছো?” উত্তরে হযরত আদী ইবনে হাতিম (রাঃ) বলেনঃ “জ্বী না, আমি হীরা দেখিনি, তবে নাম শুনেছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! আল্লাহ তা'আলা আমার এই দ্বীনকে পূর্ণরূপে ছড়িয়ে দিবেন। তখন এমনভাবে শান্তি ও নিরাপত্তা এসে যাবে যে, হীরা হতে একজন মহিলা উন্ত্রীর উপর সওয়ার হয়ে একাই বেরিয়ে পড়বে এবং বায়তুল্লাহ শরীফে পৌঁছে তাওয়াফ কার্য সম্পন্ন করতঃ ফিরে আসবে। সে না কাউকেও ভয় করবে এবং না কারো আশ্রয়ে থাকবে। জেনে রেখো যে, ইরানের বাদশাহ কিসরা ইবনে হরমুযের কোষাগার বিজিত হবে।” হযরত আদী (রাঃ) বিস্ময়ের সুরে বলেনঃ “ইরানের বাদশাহ কিসরা ইবনে হরমুযের কোষাগার মুসলমানরা জয় করবেন!” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, কিসরা ইবনে হরমুযের কোষাগারই বটে। ধন-সম্পদ এতো বৃদ্ধি পাবে যে, তা গ্রহণকারী কেউ থাকবে না।” হযরত আদী (রাঃ) বলেনঃ “দেখুন, বাস্তবিকই স্ত্রীলোকেরা হীরা হতে কারো আশ্রয় ছাড়াই যাতায়াত করছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হতে আমি স্বচক্ষে দেখলাম। দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণীও আমার চোখের সামনে পুরো হয়েছে। কিসরার ধনভাণ্ডার জয়কারীদের মধ্যে স্বয়ং আমিও বিদ্যমান ছিলাম। তৃতীয় ভবিষ্যদ্বাণীটিও নিঃসন্দেহে পূর্ণ হবে। কেননা, এটাও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এরই ভবিষ্যদ্বাণী ।” হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই উম্মতকে ভূ-পৃষ্ঠে উন্নতি, উচ্চ মর্যাদা, দ্বীনের প্রসার ও সাহায্যের সুসংবাদ দিয়ে দাও। তবে যে ব্যক্তি দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে আখিরাতের কাজ করবে তার জানা উচিত যে, পরকালে তার জন্যে কোনই অংশ নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা আমার ইবাদত করবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি উটের উপরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে বসেছিলাম। আমার ও তার মাঝে জিনের (উটের গদীর) শেষ কাষ্ঠখণ্ড ছাড়া কিছুই ছিল না (অর্থাৎ আমি নবী (সঃ)-এর খুবই সংলগ্ন ছিলাম)। তখন তিনি বললেনঃ “হে মুআয (রাঃ)!” আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লাব্বায়েক ওয়া সাদায়েক! অতঃপর আল্লাহর রাসূল (সঃ) সামনে কিছুক্ষণ অগ্রসর হলেন। আবার তিনি বললেনঃ “হে মুআয (রাঃ)!” আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লাব্বায়েক ওয়া সাদায়েক! আবার তিনি কিছুক্ষণ সামনে চললেন। পুনরায় তিনি বললেনঃ “হে মুআয (রাঃ)!" আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লাব্বায়েক ওয়া সাদায়েক! তিনি (এবার) বললেনঃ “বান্দার উপর আল্লাহর হক কি তা কি তুমি জান?" আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ) অধিকতর ভাল জানেন ও জ্ঞাত আছেন। তিনি বললেনঃ “বান্দার উপর আল্লাহর হক এই যে, তারা একবার তারই ইবাদত করবে এবং তার সাথে এতটুকুও শরীক করবে না।” অতঃ তিনি কিছুক্ষণ সামনে গেলেন এবং আবার বললেনঃ “হে মুআয! (৯)!” আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লাব্বায়েক ওয়া সাদায়েক! তিনি বললেনঃ “আল্লাহর উপর বান্দার হক কি তা তুমি জান কি?” আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) সবচেয়ে ভাল জ্ঞাত আছেন। তিনি বললেনঃ “আল্লাহর উপর বান্দার হক হচ্ছে এই যে, তিনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাদের সহীহ গ্রন্থে এটা তাখরীজ করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আর যারা অকৃতজ্ঞ হবে তারা তো সত্যত্যাগী অর্থাৎ এর পরেও যারা আমার আনুগত্য পরিত্যাগ করবে সে আমার হুকুম অমান্য করলো এবং এটা খুবই কঠিন ও বড় পাপ।আল্লাহর মাহাত্ম্য এই যে, যেই যুগে ইসলামের শক্তি বেশী থেকেছে সেই যুগে তিনি সাহায্যও বেশী করেছেন। সাহাবীগণ ঈমানে অগ্রগামী ছিলেন, কাজেই তঁারা বিজয় লাভের ব্যাপারেও সবারই অগ্রে থেকেছেন। যেমন ঈমানে দুর্বলতা দেখা দেয় তেমন পার্থিব অবস্থা, রাজত্ব এবং শান-শওকতও নীচে নেমে গেছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে একটি দল সদা সত্যের উপর থাকবে এবং তারা থাকবে সদা জয়যুক্ত। তাদের বিরোধীরা তাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। কিয়ামত পর্যন্ত এই অবস্থাই থাকবে। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ওয়াদা এসে যাবে। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, শেষ পর্যন্ত এই দলটিই সর্বশেষে দাজ্জালের সাথে যুদ্ধ করবে। আর একটি হাদীসে আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর অবতরণ পর্যন্ত এই লোকগুলো কাফিরদের উপর জয়যুক্ত থাকবে। এই সব রিওয়াইয়াত বিশুদ্ধ এবং সবগুলোরই ভাবার্থ একই।

আন-নূর 24:56

৫৬-৫৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় ঈমানদার বান্দাদেরকে শুধু তাঁরই ইবাদত করার নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বলছেনঃ তাঁরই জন্যে তোমরা নামায সুপ্রতিষ্ঠিত কর এবং সাথে সাথে তাঁর বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ কর ও তাদের সাথে সৎ ব্যবহার কর। দুর্বল, দরিদ্র এবং মিসকীনদের খবরাখবর নিতে থাকো। মালের মধ্য হতে আল্লাহর হক অর্থাৎ যাকাত বের কর এবং প্রতিটি কাজে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করতে থাকো। তিনি যে কাজের নির্দেশ দেন তা পালন কর এবং যা করতে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাকো। জেনে রেখো যে, আল্লাহর রহমত লাভের এটাই একমাত্র পন্থা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “ওরাই তারা যাদের উপর আল্লাহ সত্বরই করুণা বর্ষণ করবেন।” (৯:৭১)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ধারণা করো না যে, তোমাকে অবিশ্বাসকারীরা আমার উপর জয়যুক্ত হবে বা এদিক-ওদিক পালিয়ে গিয়ে আমার কঠিন শাস্তি হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। আমি তাদের প্রকৃত বাসস্থান জাহান্নামে ঠিক করে রেখেছি যা বাসের পক্ষে অত্যন্ত জঘন্য স্থান।

আন-নূর 24:57

৫৬-৫৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় ঈমানদার বান্দাদেরকে শুধু তাঁরই ইবাদত করার নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বলছেনঃ তাঁরই জন্যে তোমরা নামায সুপ্রতিষ্ঠিত কর এবং সাথে সাথে তাঁর বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ কর ও তাদের সাথে সৎ ব্যবহার কর। দুর্বল, দরিদ্র এবং মিসকীনদের খবরাখবর নিতে থাকো। মালের মধ্য হতে আল্লাহর হক অর্থাৎ যাকাত বের কর এবং প্রতিটি কাজে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করতে থাকো। তিনি যে কাজের নির্দেশ দেন তা পালন কর এবং যা করতে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাকো। জেনে রেখো যে, আল্লাহর রহমত লাভের এটাই একমাত্র পন্থা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “ওরাই তারা যাদের উপর আল্লাহ সত্বরই করুণা বর্ষণ করবেন।” (৯:৭১)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ধারণা করো না যে, তোমাকে অবিশ্বাসকারীরা আমার উপর জয়যুক্ত হবে বা এদিক-ওদিক পালিয়ে গিয়ে আমার কঠিন শাস্তি হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। আমি তাদের প্রকৃত বাসস্থান জাহান্নামে ঠিক করে রেখেছি যা বাসের পক্ষে অত্যন্ত জঘন্য স্থান।

আন-নূর 24:58

৫৮-৬০ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতে নিকটাত্মীয়দেরকেও নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারাও যেন অনুমতি নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করে। ইতিপূর্বে এই সূরার প্রথম দিকের আয়াতে যে হুকুম ছিল তা ছিল পর পুরুষ ও অনাত্মীয়ের জন্যে। এখানে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিন সময়ে গোলামদেরকে এমনকি নাবালক বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেদেরকেও অনুমতি নিতে হবে। ঐ তিন সময় হলোঃ ফজরের নামাযের পূর্বে। কেননা, এটা হলো ঘুমানোর সময়। দ্বিতীয় হলো দুপুরের সময়, যখন মানুষ সাধারণতঃ কিছুটা বিশ্রামের জন্যে কাপড় ছেড়ে বিছানায় শুয়ে থাকে। আর তৃতীয় হলো এশার নামাযের সময়। কেননা, ওটাই হচ্ছে শিশুদেরকে নিয়ে শয়নের সময়। সুতরাং এই তিন সময় যেন গোলাম ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেরাও অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ না করে। তবে এই তিন সময় ছাড়া অন্যান্য সময়ে তাদের ঘরে প্রবেশের জন্যে অনুমতির প্রয়োজন নেই। কেননা, তাদের ঘরে যাতায়াত জরুরী। তারা বারবার আসে ও যায়। সুতরাং প্রত্যেকবার অনুমতি প্রার্থনা করা তাদের জন্যে এবং বাড়ীর লোকদের জন্যেও বড়ই অসুবিধাজনক ব্যাপার। এ জন্যেই নবী (সঃ) বলেছেনঃ “বিড়াল অপবিত্র নয়। ওটা তো তোমাদের বাড়ীতে তোমাদের আশে পাশে সদা ঘোরাফেরা করেই থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং আহলুস সুনান বর্ণনা করেছেন) হুকুম তো এটাই, কিন্তু এর উপর আমল খুব কমই হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তিনটি আয়াতের উপর আমল মানুষ প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। একটি এই আয়াতটি। দ্বিতীয় হলো সূরায়ে নিসার (আরবি) (৪: ৮) এই আয়াতটি এবং তৃতীয়টি হলো সূরায়ে হুজুরাতের (আরবি) (৪৯: ১৩) এই আয়াতটি। শয়তান লোকদের উপর ছেয়ে গেছে এবং সে তাদেরকে এই আয়াতগুলোর উপর আমল করা হতে উদাসীন রেখেছে, যেন তাদের এ আয়াতগুলোৱ উপর ঈমান নেই। আমি তো আমার দাসটিকেও নির্দেশ দিয়েছি যে, সে যেন এই তিন সময়ে বিনা অনুমতিতে কখনো না আসে।” প্রথম আয়াতটিতে দাস-দাসী ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেদেরকেও অনুমতি গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় আয়াতটিতে ওয়ারিসদের মধ্যে মাল বন্টনের সময় আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও মিকসীন এসে গেলে তাদেকেও কিছু দেয়া ও তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করার হুকুম করা হয়েছে। আর তৃতীয় আয়াতে বংশ ও আভিজাত্যের উপর গর্ব না করা, বরং আল্লাহভীরু লোককেই সম্মান প্রাপ্তির যোগ্য মনে কর বর্ণনা রয়েছে।মূসা ইবনে আবি আয়েশা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি শাবী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন (আরবি) -এই আয়াতটি কি মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না, রহিত হয়নি।” তখন পুনরায় তিনি প্রশ্ন করেনঃ “জনগণ এর প্রতি আমল ছেড়ে দিয়েছে যে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “(এই আয়াতের প্রতি আমল করার জন্যে) আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত।”হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দু’জন লোক কুরআন কারীমে বর্ণিত তিন সময়ে অনুমতি প্রার্থনা সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “এই আয়াতের উপর আমল ছেড়ে দেয়ার একটি বড় কারণ হলো লোকদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ও প্রশস্ততা। পূর্বে জনগণের আর্থিক অবস্থা এমন ভাল ছিল না যে, তারা ঘরের দরযার উপর পর্দা লটকাবে বা কয়েকটি কক্ষ বিশিষ্ট একটি বড় ঘর নির্মাণ করবে। বরং তাদের একটিমাত্র ঘর থাকতো এবং অনেক সময় দাস-দাসীরা তাদের অজ্ঞাতে ঘরে প্রবেশ করতো। ঐ সময় স্বামী স্ত্রী হয়তো ঘরে একত্রে থাকতো, ফলে তারা খুবই লজ্জিত হতো এবং বাড়ীর লোকেরাও এতে কঠিনভাবে অস্বস্তিবোধ করতো। অতঃপর যখন আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে আর্থিক স্বচ্ছলতা দান করলেন এবং তারা পৃথক পৃথক কক্ষ বানিয়ে নিলো ও দরযার উপর পর্দা লটকিয়ে দিলো তখন তারা রক্ষিত হয়ে গেল। আর এর ফলে যে যৌক্তিকতায় অনুমতি প্রার্থনার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তা পূর্ণ হয়ে গেল। তাই জনগণ এই হুকুমের পাবন্দী ছেড়ে দিলো এবং তারা এর প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করতে শুরু করলো।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এই তিনটি এমন সময় যখন মানুষ কিছুটা অবসর পায় এবং বাড়ীতেই অবস্থান করে। আল্লাহ জানেন তারা তখন কি অবস্থায় থাকে। এজন্যেই দাস-দাসীদেরও অনুমতি প্রার্থনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেননা, সাধারণতঃ ঐ সময়েই মানুষ স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে থাকে, যেন গোসল করে পাক-পবিত্র হয়ে বের হতে পারে এবং নামাযে শরীক হতে পারে। | মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী এবং তার স্ত্রী আসমা বিনতে মুরসিদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে কিছু খাদ্য তৈরী করেন। লোকেরা বিনা অনুমতিতে ঘরে প্রবেশ করতে শুরু করে। তখন হযরত আসমা (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটাতো খুবই জঘন্য প্রথা যে, স্বামী স্ত্রী একই কাপড়ে রয়েছে এমতাবস্থায় তাদের গোলাম ঘরে প্রবেশ করে।" ঐ সময় (আরবি)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।এই আয়াত যে মানসূখ বা রহিত নয়, শেষের শব্দগুলো তার ইঙ্গিত বহন করছে। ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “এইভাবে আল্লাহ তোমাদের নিকট তাঁর নির্দেশ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” হ্যাঁ, তবে যখন ছেলেরা প্রাপ্ত বয়সে পৌঁছে যাবে তখন তাদেরকে এই তিন সময় ছাড়া অন্য সময়েও অনুমতি নিতে হবে। যে তিন সময়ের কথা মহান আল্লাহ বর্ণনা করেছেন এই তিন সময়ে ছোট ছেলেকেও তার পিতা-মাতার কাছে যাওয়ার সময় অনুমতি প্রার্থনা করতে হবে। কিন্তু প্রাপ্ত বয়সে পৌঁছার পর সব সময়েই অনুমতি চাইতে হবে যেমন অন্যান্য বড় মানুষ অনুমতি চেয়ে থাকে, তারা নিজস্ব লোকই হোক অথবা অপর লোকই হোক।ঘোষিত হচ্ছেঃ বৃদ্ধা নারী, যারা বিবাহের আশা রাখে না, অর্থাৎ তারা এমন বয়সে পৌছে গেছে যে, পুরুষদের প্রতি তাদের কোনই আকর্ষণ নেই, তাদের জন্যে অপরাধ নেই, যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে তাদের বহির্বাস খুলে রাখে। অর্থাৎ অন্যান্য নারীদের মত তাদের পর্দার দরকার নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটি (আরবি) (২৪:৩১) এই আয়াতটি হতে স্বতন্ত্র। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এরূপ বৃদ্ধা নারীর জন্যে বুরকা এবং চাদর নামিয়ে দিয়ে শুধু দো-পাট্টা এবং জামা ও পায়জামা পরে থাকার অনুমতি রয়েছে। তার কিরআতও(আরবি) এরূপই বটে। এর দ্বারা দোপাট্টার উপরের চাদরকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং বুড়ী স্ত্রীলোকেরা যখন মোটা, চওড়া দোপাট্টা পরে থাকবে তখন ওর উপরে অন্য চাদর রাখা জরুরী নয়। কিন্তু এর দ্বারাও যেন সৌন্দর্য প্রকাশ উদ্দেশ্য না হয়।শ্রীলোকেরা হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে এই ধরনের প্রশ্ন করলে তিনি তাদেরকে বলেনঃ তোমাদের জন্যে সাজ-সজ্জা অবশ্যই বৈধ, কিন্তু এটা যেন অর পুরুষদের চক্ষু ঠাণ্ডা করার জন্যে না হয়।”হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর স্ত্রী খুবই বৃদ্ধা হয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় তিনি তার গোলামের দ্বারা তার মাথায় মেহেদী লাগিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁকে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি এমন বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি যে, আমার পুরুষদের প্রতি কোন আকর্ষণই নেই।”শেষে মহান আল্লাহ বলেনঃ (চাদর না নেয়া তো এরূপ বুড়ী স্ত্রীলোকদের জন্যে জায়েয বটে, কিন্তু এটা হতে তাদের বিরত থাকাই (অর্থাৎ বুরকা ও চাদর ব্যবহার করাই) তাদের জন্যে উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

আন-নূর 24:59

৫৮-৬০ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতে নিকটাত্মীয়দেরকেও নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারাও যেন অনুমতি নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করে। ইতিপূর্বে এই সূরার প্রথম দিকের আয়াতে যে হুকুম ছিল তা ছিল পর পুরুষ ও অনাত্মীয়ের জন্যে। এখানে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিন সময়ে গোলামদেরকে এমনকি নাবালক বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেদেরকেও অনুমতি নিতে হবে। ঐ তিন সময় হলোঃ ফজরের নামাযের পূর্বে। কেননা, এটা হলো ঘুমানোর সময়। দ্বিতীয় হলো দুপুরের সময়, যখন মানুষ সাধারণতঃ কিছুটা বিশ্রামের জন্যে কাপড় ছেড়ে বিছানায় শুয়ে থাকে। আর তৃতীয় হলো এশার নামাযের সময়। কেননা, ওটাই হচ্ছে শিশুদেরকে নিয়ে শয়নের সময়। সুতরাং এই তিন সময় যেন গোলাম ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেরাও অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ না করে। তবে এই তিন সময় ছাড়া অন্যান্য সময়ে তাদের ঘরে প্রবেশের জন্যে অনুমতির প্রয়োজন নেই। কেননা, তাদের ঘরে যাতায়াত জরুরী। তারা বারবার আসে ও যায়। সুতরাং প্রত্যেকবার অনুমতি প্রার্থনা করা তাদের জন্যে এবং বাড়ীর লোকদের জন্যেও বড়ই অসুবিধাজনক ব্যাপার। এ জন্যেই নবী (সঃ) বলেছেনঃ “বিড়াল অপবিত্র নয়। ওটা তো তোমাদের বাড়ীতে তোমাদের আশে পাশে সদা ঘোরাফেরা করেই থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং আহলুস সুনান বর্ণনা করেছেন) হুকুম তো এটাই, কিন্তু এর উপর আমল খুব কমই হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তিনটি আয়াতের উপর আমল মানুষ প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। একটি এই আয়াতটি। দ্বিতীয় হলো সূরায়ে নিসার (আরবি) (৪: ৮) এই আয়াতটি এবং তৃতীয়টি হলো সূরায়ে হুজুরাতের (আরবি) (৪৯: ১৩) এই আয়াতটি। শয়তান লোকদের উপর ছেয়ে গেছে এবং সে তাদেরকে এই আয়াতগুলোর উপর আমল করা হতে উদাসীন রেখেছে, যেন তাদের এ আয়াতগুলোৱ উপর ঈমান নেই। আমি তো আমার দাসটিকেও নির্দেশ দিয়েছি যে, সে যেন এই তিন সময়ে বিনা অনুমতিতে কখনো না আসে।” প্রথম আয়াতটিতে দাস-দাসী ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেদেরকেও অনুমতি গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় আয়াতটিতে ওয়ারিসদের মধ্যে মাল বন্টনের সময় আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও মিকসীন এসে গেলে তাদেকেও কিছু দেয়া ও তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করার হুকুম করা হয়েছে। আর তৃতীয় আয়াতে বংশ ও আভিজাত্যের উপর গর্ব না করা, বরং আল্লাহভীরু লোককেই সম্মান প্রাপ্তির যোগ্য মনে কর বর্ণনা রয়েছে।মূসা ইবনে আবি আয়েশা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি শাবী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন (আরবি) -এই আয়াতটি কি মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না, রহিত হয়নি।” তখন পুনরায় তিনি প্রশ্ন করেনঃ “জনগণ এর প্রতি আমল ছেড়ে দিয়েছে যে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “(এই আয়াতের প্রতি আমল করার জন্যে) আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত।”হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দু’জন লোক কুরআন কারীমে বর্ণিত তিন সময়ে অনুমতি প্রার্থনা সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “এই আয়াতের উপর আমল ছেড়ে দেয়ার একটি বড় কারণ হলো লোকদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ও প্রশস্ততা। পূর্বে জনগণের আর্থিক অবস্থা এমন ভাল ছিল না যে, তারা ঘরের দরযার উপর পর্দা লটকাবে বা কয়েকটি কক্ষ বিশিষ্ট একটি বড় ঘর নির্মাণ করবে। বরং তাদের একটিমাত্র ঘর থাকতো এবং অনেক সময় দাস-দাসীরা তাদের অজ্ঞাতে ঘরে প্রবেশ করতো। ঐ সময় স্বামী স্ত্রী হয়তো ঘরে একত্রে থাকতো, ফলে তারা খুবই লজ্জিত হতো এবং বাড়ীর লোকেরাও এতে কঠিনভাবে অস্বস্তিবোধ করতো। অতঃপর যখন আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে আর্থিক স্বচ্ছলতা দান করলেন এবং তারা পৃথক পৃথক কক্ষ বানিয়ে নিলো ও দরযার উপর পর্দা লটকিয়ে দিলো তখন তারা রক্ষিত হয়ে গেল। আর এর ফলে যে যৌক্তিকতায় অনুমতি প্রার্থনার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তা পূর্ণ হয়ে গেল। তাই জনগণ এই হুকুমের পাবন্দী ছেড়ে দিলো এবং তারা এর প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করতে শুরু করলো।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এই তিনটি এমন সময় যখন মানুষ কিছুটা অবসর পায় এবং বাড়ীতেই অবস্থান করে। আল্লাহ জানেন তারা তখন কি অবস্থায় থাকে। এজন্যেই দাস-দাসীদেরও অনুমতি প্রার্থনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেননা, সাধারণতঃ ঐ সময়েই মানুষ স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে থাকে, যেন গোসল করে পাক-পবিত্র হয়ে বের হতে পারে এবং নামাযে শরীক হতে পারে। | মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী এবং তার স্ত্রী আসমা বিনতে মুরসিদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে কিছু খাদ্য তৈরী করেন। লোকেরা বিনা অনুমতিতে ঘরে প্রবেশ করতে শুরু করে। তখন হযরত আসমা (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটাতো খুবই জঘন্য প্রথা যে, স্বামী স্ত্রী একই কাপড়ে রয়েছে এমতাবস্থায় তাদের গোলাম ঘরে প্রবেশ করে।" ঐ সময় (আরবি)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।এই আয়াত যে মানসূখ বা রহিত নয়, শেষের শব্দগুলো তার ইঙ্গিত বহন করছে। ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “এইভাবে আল্লাহ তোমাদের নিকট তাঁর নির্দেশ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” হ্যাঁ, তবে যখন ছেলেরা প্রাপ্ত বয়সে পৌঁছে যাবে তখন তাদেরকে এই তিন সময় ছাড়া অন্য সময়েও অনুমতি নিতে হবে। যে তিন সময়ের কথা মহান আল্লাহ বর্ণনা করেছেন এই তিন সময়ে ছোট ছেলেকেও তার পিতা-মাতার কাছে যাওয়ার সময় অনুমতি প্রার্থনা করতে হবে। কিন্তু প্রাপ্ত বয়সে পৌঁছার পর সব সময়েই অনুমতি চাইতে হবে যেমন অন্যান্য বড় মানুষ অনুমতি চেয়ে থাকে, তারা নিজস্ব লোকই হোক অথবা অপর লোকই হোক।ঘোষিত হচ্ছেঃ বৃদ্ধা নারী, যারা বিবাহের আশা রাখে না, অর্থাৎ তারা এমন বয়সে পৌছে গেছে যে, পুরুষদের প্রতি তাদের কোনই আকর্ষণ নেই, তাদের জন্যে অপরাধ নেই, যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে তাদের বহির্বাস খুলে রাখে। অর্থাৎ অন্যান্য নারীদের মত তাদের পর্দার দরকার নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটি (আরবি) (২৪:৩১) এই আয়াতটি হতে স্বতন্ত্র। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এরূপ বৃদ্ধা নারীর জন্যে বুরকা এবং চাদর নামিয়ে দিয়ে শুধু দো-পাট্টা এবং জামা ও পায়জামা পরে থাকার অনুমতি রয়েছে। তার কিরআতও(আরবি) এরূপই বটে। এর দ্বারা দোপাট্টার উপরের চাদরকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং বুড়ী স্ত্রীলোকেরা যখন মোটা, চওড়া দোপাট্টা পরে থাকবে তখন ওর উপরে অন্য চাদর রাখা জরুরী নয়। কিন্তু এর দ্বারাও যেন সৌন্দর্য প্রকাশ উদ্দেশ্য না হয়।শ্রীলোকেরা হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে এই ধরনের প্রশ্ন করলে তিনি তাদেরকে বলেনঃ তোমাদের জন্যে সাজ-সজ্জা অবশ্যই বৈধ, কিন্তু এটা যেন অর পুরুষদের চক্ষু ঠাণ্ডা করার জন্যে না হয়।”হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর স্ত্রী খুবই বৃদ্ধা হয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় তিনি তার গোলামের দ্বারা তার মাথায় মেহেদী লাগিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁকে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি এমন বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি যে, আমার পুরুষদের প্রতি কোন আকর্ষণই নেই।”শেষে মহান আল্লাহ বলেনঃ (চাদর না নেয়া তো এরূপ বুড়ী স্ত্রীলোকদের জন্যে জায়েয বটে, কিন্তু এটা হতে তাদের বিরত থাকাই (অর্থাৎ বুরকা ও চাদর ব্যবহার করাই) তাদের জন্যে উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

আন-নূর 24:60

৫৮-৬০ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতে নিকটাত্মীয়দেরকেও নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারাও যেন অনুমতি নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করে। ইতিপূর্বে এই সূরার প্রথম দিকের আয়াতে যে হুকুম ছিল তা ছিল পর পুরুষ ও অনাত্মীয়ের জন্যে। এখানে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিন সময়ে গোলামদেরকে এমনকি নাবালক বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেদেরকেও অনুমতি নিতে হবে। ঐ তিন সময় হলোঃ ফজরের নামাযের পূর্বে। কেননা, এটা হলো ঘুমানোর সময়। দ্বিতীয় হলো দুপুরের সময়, যখন মানুষ সাধারণতঃ কিছুটা বিশ্রামের জন্যে কাপড় ছেড়ে বিছানায় শুয়ে থাকে। আর তৃতীয় হলো এশার নামাযের সময়। কেননা, ওটাই হচ্ছে শিশুদেরকে নিয়ে শয়নের সময়। সুতরাং এই তিন সময় যেন গোলাম ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেরাও অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ না করে। তবে এই তিন সময় ছাড়া অন্যান্য সময়ে তাদের ঘরে প্রবেশের জন্যে অনুমতির প্রয়োজন নেই। কেননা, তাদের ঘরে যাতায়াত জরুরী। তারা বারবার আসে ও যায়। সুতরাং প্রত্যেকবার অনুমতি প্রার্থনা করা তাদের জন্যে এবং বাড়ীর লোকদের জন্যেও বড়ই অসুবিধাজনক ব্যাপার। এ জন্যেই নবী (সঃ) বলেছেনঃ “বিড়াল অপবিত্র নয়। ওটা তো তোমাদের বাড়ীতে তোমাদের আশে পাশে সদা ঘোরাফেরা করেই থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং আহলুস সুনান বর্ণনা করেছেন) হুকুম তো এটাই, কিন্তু এর উপর আমল খুব কমই হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তিনটি আয়াতের উপর আমল মানুষ প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। একটি এই আয়াতটি। দ্বিতীয় হলো সূরায়ে নিসার (আরবি) (৪: ৮) এই আয়াতটি এবং তৃতীয়টি হলো সূরায়ে হুজুরাতের (আরবি) (৪৯: ১৩) এই আয়াতটি। শয়তান লোকদের উপর ছেয়ে গেছে এবং সে তাদেরকে এই আয়াতগুলোর উপর আমল করা হতে উদাসীন রেখেছে, যেন তাদের এ আয়াতগুলোৱ উপর ঈমান নেই। আমি তো আমার দাসটিকেও নির্দেশ দিয়েছি যে, সে যেন এই তিন সময়ে বিনা অনুমতিতে কখনো না আসে।” প্রথম আয়াতটিতে দাস-দাসী ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেদেরকেও অনুমতি গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় আয়াতটিতে ওয়ারিসদের মধ্যে মাল বন্টনের সময় আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও মিকসীন এসে গেলে তাদেকেও কিছু দেয়া ও তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করার হুকুম করা হয়েছে। আর তৃতীয় আয়াতে বংশ ও আভিজাত্যের উপর গর্ব না করা, বরং আল্লাহভীরু লোককেই সম্মান প্রাপ্তির যোগ্য মনে কর বর্ণনা রয়েছে।মূসা ইবনে আবি আয়েশা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি শাবী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন (আরবি) -এই আয়াতটি কি মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না, রহিত হয়নি।” তখন পুনরায় তিনি প্রশ্ন করেনঃ “জনগণ এর প্রতি আমল ছেড়ে দিয়েছে যে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “(এই আয়াতের প্রতি আমল করার জন্যে) আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত।”হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দু’জন লোক কুরআন কারীমে বর্ণিত তিন সময়ে অনুমতি প্রার্থনা সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “এই আয়াতের উপর আমল ছেড়ে দেয়ার একটি বড় কারণ হলো লোকদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ও প্রশস্ততা। পূর্বে জনগণের আর্থিক অবস্থা এমন ভাল ছিল না যে, তারা ঘরের দরযার উপর পর্দা লটকাবে বা কয়েকটি কক্ষ বিশিষ্ট একটি বড় ঘর নির্মাণ করবে। বরং তাদের একটিমাত্র ঘর থাকতো এবং অনেক সময় দাস-দাসীরা তাদের অজ্ঞাতে ঘরে প্রবেশ করতো। ঐ সময় স্বামী স্ত্রী হয়তো ঘরে একত্রে থাকতো, ফলে তারা খুবই লজ্জিত হতো এবং বাড়ীর লোকেরাও এতে কঠিনভাবে অস্বস্তিবোধ করতো। অতঃপর যখন আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে আর্থিক স্বচ্ছলতা দান করলেন এবং তারা পৃথক পৃথক কক্ষ বানিয়ে নিলো ও দরযার উপর পর্দা লটকিয়ে দিলো তখন তারা রক্ষিত হয়ে গেল। আর এর ফলে যে যৌক্তিকতায় অনুমতি প্রার্থনার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তা পূর্ণ হয়ে গেল। তাই জনগণ এই হুকুমের পাবন্দী ছেড়ে দিলো এবং তারা এর প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করতে শুরু করলো।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এই তিনটি এমন সময় যখন মানুষ কিছুটা অবসর পায় এবং বাড়ীতেই অবস্থান করে। আল্লাহ জানেন তারা তখন কি অবস্থায় থাকে। এজন্যেই দাস-দাসীদেরও অনুমতি প্রার্থনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেননা, সাধারণতঃ ঐ সময়েই মানুষ স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে থাকে, যেন গোসল করে পাক-পবিত্র হয়ে বের হতে পারে এবং নামাযে শরীক হতে পারে। | মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী এবং তার স্ত্রী আসমা বিনতে মুরসিদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে কিছু খাদ্য তৈরী করেন। লোকেরা বিনা অনুমতিতে ঘরে প্রবেশ করতে শুরু করে। তখন হযরত আসমা (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটাতো খুবই জঘন্য প্রথা যে, স্বামী স্ত্রী একই কাপড়ে রয়েছে এমতাবস্থায় তাদের গোলাম ঘরে প্রবেশ করে।" ঐ সময় (আরবি)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।এই আয়াত যে মানসূখ বা রহিত নয়, শেষের শব্দগুলো তার ইঙ্গিত বহন করছে। ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “এইভাবে আল্লাহ তোমাদের নিকট তাঁর নির্দেশ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” হ্যাঁ, তবে যখন ছেলেরা প্রাপ্ত বয়সে পৌঁছে যাবে তখন তাদেরকে এই তিন সময় ছাড়া অন্য সময়েও অনুমতি নিতে হবে। যে তিন সময়ের কথা মহান আল্লাহ বর্ণনা করেছেন এই তিন সময়ে ছোট ছেলেকেও তার পিতা-মাতার কাছে যাওয়ার সময় অনুমতি প্রার্থনা করতে হবে। কিন্তু প্রাপ্ত বয়সে পৌঁছার পর সব সময়েই অনুমতি চাইতে হবে যেমন অন্যান্য বড় মানুষ অনুমতি চেয়ে থাকে, তারা নিজস্ব লোকই হোক অথবা অপর লোকই হোক।ঘোষিত হচ্ছেঃ বৃদ্ধা নারী, যারা বিবাহের আশা রাখে না, অর্থাৎ তারা এমন বয়সে পৌছে গেছে যে, পুরুষদের প্রতি তাদের কোনই আকর্ষণ নেই, তাদের জন্যে অপরাধ নেই, যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে তাদের বহির্বাস খুলে রাখে। অর্থাৎ অন্যান্য নারীদের মত তাদের পর্দার দরকার নেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটি (আরবি) (২৪:৩১) এই আয়াতটি হতে স্বতন্ত্র। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এরূপ বৃদ্ধা নারীর জন্যে বুরকা এবং চাদর নামিয়ে দিয়ে শুধু দো-পাট্টা এবং জামা ও পায়জামা পরে থাকার অনুমতি রয়েছে। তার কিরআতও(আরবি) এরূপই বটে। এর দ্বারা দোপাট্টার উপরের চাদরকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং বুড়ী স্ত্রীলোকেরা যখন মোটা, চওড়া দোপাট্টা পরে থাকবে তখন ওর উপরে অন্য চাদর রাখা জরুরী নয়। কিন্তু এর দ্বারাও যেন সৌন্দর্য প্রকাশ উদ্দেশ্য না হয়।শ্রীলোকেরা হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে এই ধরনের প্রশ্ন করলে তিনি তাদেরকে বলেনঃ তোমাদের জন্যে সাজ-সজ্জা অবশ্যই বৈধ, কিন্তু এটা যেন অর পুরুষদের চক্ষু ঠাণ্ডা করার জন্যে না হয়।”হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর স্ত্রী খুবই বৃদ্ধা হয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় তিনি তার গোলামের দ্বারা তার মাথায় মেহেদী লাগিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁকে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি এমন বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি যে, আমার পুরুষদের প্রতি কোন আকর্ষণই নেই।”শেষে মহান আল্লাহ বলেনঃ (চাদর না নেয়া তো এরূপ বুড়ী স্ত্রীলোকদের জন্যে জায়েয বটে, কিন্তু এটা হতে তাদের বিরত থাকাই (অর্থাৎ বুরকা ও চাদর ব্যবহার করাই) তাদের জন্যে উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

আন-নূর 24:61

এই আয়াতে যে দোষ না হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে সে সম্পর্কে হযরত আতা (রঃ) প্রমুখ গুরুজনতো বলেন যে, এর দ্বারা অন্ধ ও খোঁড়াদের জিহাদে যোগদান না করা বুঝানো হয়েছে। যেমন সূরায়ে আল-ফাতহুতে রয়েছে। সুতরাং এ ধরনের লোক যদি জিহাদে গমন না করে তবে তাদের শরীয়ত সম্মত ওজর থাকার কারণে তাদের কোন অপরাধ হবে না। সূরায়ে বারাআতে রয়েছেঃ “যারা দুর্বল, যারা পীড়িত এবং যারা অর্থ সাহায্যে অসমর্থ, তাদের কোন অপরাধ নেই, যদি আল্লাহ ও রাসূল (সঃ)-এর প্রতি তাদের অবিমিশ্র অনুরাগ থাকে। যারা সৎকর্মপরায়ণ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন হেতু নেই; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তাদেরও কোন অপরাধ নেই যারা তোমার নিকট বাহনের জনে আসলে তুমি বলেছিলেঃ তোমাদের জন্যে কোন বাহন আমি পাচ্ছি না, তারা অর্থ ব্যয়ে অসামর্থ্য জনিত দুঃখে অশ্রু বিগলিত নেত্রে ফিরে গেল।” তাহলে এই আয়াতে তাদের জন্যে অনুমতি রইলো যে, তাদের কোন অপরাধ নেই।কতকগুলো লোক ঘৃণা করে তাদের সাথে খেতে বসতো না। শরীয়ত এসব অজ্ঞতাপূর্ণ অভ্যাস উঠিয়ে দেয়। হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ এইরূপ লোকদেরকে নিজেদের পিতা, ভ্রাতা, ভগ্নী প্রভৃতি নিকটতম আত্মীয়দের নিকট পৌঁছিয়ে দিতো, যেন তারা সেখানে আহার করে। এ লোকগুলো এটাকে দূষণীয় মনে করতো যে, তাদেরকে অপরের বাড়ী নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, মানুষ যখন তার ভ্রাতা, ভগ্নী প্রভৃতির বাড়ী যেতো এবং স্ত্রীলোকেরা কোন খাদ্য তার সামনে হাযির করতো তখন সে তা খেতো না এই মনে করে যে, সেখানে বাড়ীর মালিক তো নেই। তখন আল্লাহ তা'আলা ঐ খাদ্য খেয়ে নেয়ার অনুমতি দেন। এটা যে বলা হয়েছে যে, তোমাদের নিজেদের জন্যেও কোন দোষ নেই, এটা তো প্রকাশমানই ছিল, কিন্তু এর উপর অন্যগুলোর সংযোগ স্থাপনের জন্যে এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং এর পরবর্তী বর্ণনা এই হুকুমের ব্যাপারে সমান। পুত্রদের বাড়ীর হুকুমও এটাই, যদিও শব্দে এর বর্ণনা দেয়া হয়নি। কিন্তু আনুষঙ্গিকভাবে এটাও এসে যাচ্ছে। এমনকি এই আয়াত দ্বারাই দলীল গ্রহণ করে কেউ কেউ বলেছেন যে, পুত্রের মাল পিতার মালেরই স্থলবর্তী। মুসনাদ ও সুনান গ্রন্থে কয়েকটি সনদে হাদীস এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তুমি ও তোমার মাল তোমার পিতার (-ই মালিকানাধীন)।” আর যাদের নাম এসেছে তাদের দ্বারা দলীল গ্রহণ করে কেউ কেউ বলেছেন যে, নিকটতম আত্মীয়দের একের খাওয়া পরা অপরের উপর ওয়াজিব। যেমন ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর প্রসিদ্ধ উক্তি এটাই।আল্লাহ পাকের যার চাবী তোমাদের মালিকানায় রয়েছে’ -এই উক্তি দ্বারা গোলাম ও প্রহরীকে বুঝানো হয়েছে যে, তারা তাদের মনিবের মাল হতে প্রয়োজন হিসেবে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী খেতে পারে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন জিহাদে গমন করতেন তখন প্রত্যেকেরই মনের বাসনা এটা হতো যে, সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে যদি যেতে পেতো! যাওয়ার সময় তারা নিজেদের বিশিষ্ট বন্ধুদেরকে চাবি দিয়ে যেতো এবং তাদেরকে বলে যেতো: “প্রয়োজনবোধে তোমরা আমাদের মাল থেকে খেতে পারবে। আমরা তোমাদেরকে অনুমতি দিলাম। কিন্তু এরপরেও এরা নিজেদেরকে আমানতদার মনে করে এবং এই মনে করে যে, তারা হয়তো ভোলা মনে অনুমতি দেয়নি। পানাহারের কোন জিনিসকে তারা স্পর্শই করতো না। তখন এই হুকুম নাযিল হয়।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা তোমাদের বন্ধুদের গৃহেও খেতে পার, যখন তোমরা জানবে যে, তারা এটা খারাপ মনে করবে না এবং তাদের কাছে এটা কঠিনও ঠেকবে না। কাতাদা (রঃ) বলেনঃ “যখন তুমি তোমার বন্ধুর বাড়ীতে যাবে তখন তার অনুমতি ছাড়াই তুমি তার খাদ্য হতে খেতে পারবে।”অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা একত্রে আহার কর অথবা পৃথক পৃথকভাবে আহার কর তাতে তোমাদের জন্যে কোন অপরাধ নেই।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন (আরবি) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা অন্যের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।” (৪: ২৯) এই আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন সাহাবীগণ (রাঃ) পরস্পর বলাবলি করেনঃ “পানাহারের জিনিসগুলোও তো মাল, সুতরাং এটাও আমাদের জন্যে হালাল নয় যে, আমরা একে অপরের সাথে আহার করি। কাজেই তারা ওটা থেকেও বিরত হন। ঐ সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।অনুরূপভাবে পৃথক পৃথকভাবে পানাহারকেও তারা খারাপ মনে করতেন। কেউ সঙ্গী না হওয়া পর্যন্ত তারা খেতেন না। এজন্যে আল্লাহ পাক এই হুকুমের মধ্যে দুটোরই অনুমতি দিলেন, অর্থাৎ অন্যদের সাথে খেতেও এবং পৃথক পৃথকভাবে খেতেও। বানু কিনানা গোত্রের লোক বিশেষভাবে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। তারা ক্ষুধার্ত থাকতো, তথাপি সঙ্গে কাউকেও না পাওয়া পর্যন্ত খেতো না। সওয়ারীর উপর সওয়ার হয়ে তারা সাথে আহারকারী সঙ্গীর খোঁজে বেরিয়ে পড়তো। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা একাকী খাওয়ার অনুমতি দান সম্পর্কীয় আয়াত অবতীর্ণ করে অজ্ঞতাযুগের ঐ কঠিন প্রথাকে দূর করে দেন।এ আয়াতে যদিও একাকী খাওয়ার অনুমতি রয়েছে, কিন্তু এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, লোকদের সাথে মিলিত হয়ে খাওয়া নিঃসন্দেহে উত্তম। আর এতে বেশী বরকতও রয়েছে।ওয়াহশী ইবনে হারব (রাঃ) তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন যে, একটি লোকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি খাই, কিন্তু পরিতৃপ্ত হই না (এর কারণ কি?)।” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “ সম্ভবতঃ তুমি পৃথকভাবে একাকী খেয়ে থাকো। তোমরা খাদ্যের উপর একত্রিত হও এবং আল্লাহর নাম নিয়ে খেতে শুরু কর, তোমাদের খাদ্যে বরকত দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা সবাই একত্রিতভাবে খাও, পৃথক পৃথকভাবে খেয়ো না। কেননা, বরকত জামাআতের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর শিক্ষা দেয়া হচ্ছেঃ যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে তখন তোমরা তোমাদের স্বজনদের প্রতি অভিবাদন স্বরূপ সালাম করবে। হযরত জাবির (রাঃ) বলেনঃ “যখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ তা'আলার শেখানো বরকতময় উত্তম সালাম বলবে। আমি তো পরীক্ষা করে দেখেছি যে, এটা সরাসরি বরকতই বটে।” ইবনে তাউস (রঃ) বলেনঃ “তোমাদের যে কেউ বাড়ীতে প্রবেশ করবে সে যেন বাড়ীর লোকদেরকে সালাম দেয়।” হযরত আতা (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “এটা কি ওয়াজিব?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “কেউ যে এটাকে ওয়াজিব বলেছেন তা আমার জানা নেই। তবে আমি এটা খুবই পছন্দ করি যে, যখনই তোমরা বাড়ীতে প্রবেশ করবে তখন সালাম দিয়ে প্রবেশ করবে। আমি তো এটা কখনো ছাড়িনি। তবে কোন সময় ভুলে গিয়ে থাকি। সেটা অন্য কথা।” মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ “যখন মসজিদে যাবে তখন বলবেঃ (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর উপর শান্তি বর্ষিত হোক।' যখন নিজের বাড়ীতে প্রবেশ করবে তখন নিজের ছেলে মেয়েদেরকে সালাম দিবে এবং যখন এমন কোন বাড়ীতে যাবে যেখানে কেউই নেই তখন বলবেঃ(আরবি) অর্থাৎ আমাদের উপর ও আল্লাহর সৎ বান্দাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক।' এটাই হুকুম দেয়া হচ্ছে। এইরূপ সময়ে তোমাদের সালামের জবাব আল্লাহর ফেরেশতারা দিয়ে থাকেন।"হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, নবী (সঃ) আমাকে পাঁচটি অভ্যাসের অসিয়ত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ “হে আনাস (রাঃ)! তুমি পূর্ণভাবে অযু কর, তোমার বয়স বৃদ্ধি পাবে। আমার উম্মতের যার সাথেই তোমার সাক্ষাৎ হবে তাকেই সালাম দেবে, এর ফলে তোমার পুণ্য বেড়ে যাবে। যখন তুমি তোমার বাড়ীতে প্রবেশ করবে তখন তোমার পরিবারের লোককে সালাম দেবে, তাহলে তোমার বাড়ীর কল্যাণ বৃদ্ধি পাবে। চাশতের নামায পড়তে থাকবে, তোমাদের পূর্ববর্তী দ্বীনদার লোকদের এই নীতিই ছিল। হে আনাস (রাঃ)! ছোটদেরকে স্নেহ করবে এবং বড়দেরকে সম্মান করবে, তাহলে কিয়ামতের দিন তুমি আমার বন্ধুদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা আল্লাহর নিকট হতে কল্যাণ ও পবিত্র। অর্থাৎ এটা হলো দু'আয়ে খায়ের যা আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এটা কল্যাণময় ও পবিত্র।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি তাশাহ্হুদ তো আল্লাহর কিতাব হতেই গ্রহণ করেছি। আমি আল্লাহকে বলতে শুনেছিঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে তখন তোমরা তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম করবে অভিবাদন স্বরূপ যা আল্লাহর নিকট হতে কল্যাণময় ও পবিত্র।” সুতরাং নামাযের তাশাহহুদ হলোঃ (আরবি)অর্থাৎ কল্যাণময় অভিবাদন ও পবিত্র সালাত আল্লাহর জন্যে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। (হে নবী সঃ)! আপনার উপর শান্তি এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। আমাদের উপর এবং আল্লাহর সৎ বান্দাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তারপর নামাযী ব্যক্তি নিজের জন্যে দু'আ করবে, অতঃপর সালাম ফিরাবে।” (এটা মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আবার সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেই মারফু’রূপে যা বর্ণিত আছে তা এর বিপরীত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী)অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এইভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্যে তাঁর নির্দেশ বিশদভাবে বিবৃত করেন যাতে তোমরা বুঝতে পার এবং জ্ঞান লাভ কর।

আন-নূর 24:62

এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে আরো একটি আদব বা ভদ্রতা শিক্ষা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ যেমন তোমরা আগমনের সময় অনুমতি নিয়ে আগমন করে থাকো, অনুরূপভাবে প্রস্থানের সময়ও আমার নবী (সঃ)-এর কাছে অনুমতি নিয়ে প্রস্থান করো। বিশেষ করে যখন কোন সমাবেশ হবে এবং কোন জরুরী বিষয়ের উপর আলোচনা চলবে। যেমন জুমআর নামায, ঈদের নামায, কোন জামাআত এবং পরামর্শ সভা ইত্যাদি। এরূপ স্থলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অনুমতি না নেয়া পর্যন্ত তোমরা কখনো এদিক-ওদিক যাবে না। পূর্ণ মুমিনের এটাও একটা নিদর্শন।এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তারা তাদের কোন কাজে বাইরে যাবার জন্যে তোমার কাছে অনুমতি চাইলে তাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছা তুমি অনুমতি দেবে এবং তাদের জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনাও করবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যখন কোন মজলিসে যাবে তখন সে যেন মজলিসের লোকদেরকে সালাম করে। আর যখন সেখান হতে চলে আসার ইচ্ছা করবে তখনো যেন সালাম দিয়ে আসে। মর্যাদার দিক দিয়ে দ্বিতীয় বারের সালাম প্রথমবারের সালামের চেয়ে কোন অংশেই কম নয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আৰু দাউদ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান হাদীস বলেছেন)

আন-নূর 24:63

হযরত যহহাক (রঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ‘হে মুহাম্মাদ (সঃ)!' এবং 'হে আবুল কাসেম (সঃ)!' বলে আহ্বান করতো, যেমন তারা একে অপরকে ডেকে থাকে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এই বেআদবী হতে নিষেধ করে দেন। তাদেরকে তিনি বলেনঃ তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নাম ধরে ডাকো না। বরং হে আল্লাহর নবী (সঃ)!’ বা ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)!' এই বলে ডাকবে। তাহলে তাঁর বুযর্গী, মর্যাদা ও অদিবের প্রতি লক্ষ্য রাখা হবে। নিম্নলিখিত আয়াতগুলোও এই আয়াতের মতই। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ!” রাইনা (হে নির্বোধ) বলো না, এবং ‘উনযুর না’ (আমাদের প্রতি লক্ষ্য করুন!) বলো, আর শুনে রেখো, কাফিরদের জন্যে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।” (২: ১০৪) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা নবী (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চ স্বরে কথা বল তার সাথে সেইরূপ উচ্চ স্বরে কথা বলো না, কারণ এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে।যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্যে পরিশোধিত করেছেন; তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহা পুরস্কার।যারা ঘরের পিছন হতে তোমাকে উচ্চ স্বরে ডাকে, তাদের অধিকাংশই নির্বোধ। তুমি বের হয়ে তাদের নিকট আসা পর্যন্ত যদি তারা ধৈর্যধারণ করতো তবে তাই তাদের জন্যে উত্তম হতো; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম, দয়ালু।” (৪৯;২-৫)সুতরাং এসব দ্বারা মুমিনদেরকে দ্রতা শিখানো হয়েছে যে, তাঁকে কিভাবে সম্বোধন করতে হবে, কিভাবে তার সাথে কথাবার্তা বলতে হবে, কিভাবে তার সাথে আলাপ-আলোচনা করতে হবে ইত্যাদি। এমনকি পূর্বে তো তার সাথে আলাপ-আলোচনা করার সময় সাদকা করার হুকুম ছিল। এই আয়াতের একটি ভাবার্থততা এই হলো। দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ রাসূল (সঃ)-এর দু'আকে তোমরা তোমাদের পরস্পরের দু'আর মত মনে করো না। তার দু'আতো কবুল হবেই। সুতরাং সাবধান! তোমরা আমার নবী (সঃ)-কে কষ্ট দিয়ো না। অন্যথায় তোমাদের বিরুদ্ধে কোন বদদু'আ যদি তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে তবে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে।এর পূর্ববর্তী বাক্যের তাফসীরে মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) বলেন যে, জুমআর দিন খুৎবায় বসে থাকা মুনাফিকদের কাছে খুবই ভারী বোধ হতো। আর মসজিদে এসে যাওয়া এবং খুৎবা শুরু হয়ে যাবার পর কেউ নবী (সঃ)-এর অনুমতি ছাড়া বাইরে যেতে পারতো না। কারো বাইরে যাওয়ার একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়লে সে নবী (সঃ)-এর কাছে অনুমতি চাইতো এবং তিনি তাকে অনুমতি দিতেন। কেননা, খুত্বার সময় কথা বললে জুমআ বাতিল হয়ে যায়। তখন এই মুনাফিক আড়ে আড়েই দৃষ্টি বাঁচিয়ে সটকে পড়তো। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, জামাআতে যখন এই মুনাফিক থাকতো তখন একে অপরের আড়ালে হয়ে পালিয়ে যেতো। আল্লাহর নবী (সঃ) হতে এবং তার কিতাব হতে সরে যেতো। জামাআতের সারি হতে বেরিয়ে গিয়ে ইসলামের বিরোধিতায় উঠে পড়ে লেগে যেতো।যে ব্যক্তি রাসূল (সঃ)-এর আদেশের, তাঁর সুন্নাতের, তাঁর হুকুমের, তার নীতির এবং তাঁর শরীয়তের বিরুদ্ধাচরণ করবে সে শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। মানুষের কথা ও কাজকে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাত ও হাদীসের সাথে মিলানো উচিত। যদি তা তাঁর সুন্নাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তবে তো তা ভাল। আর যদি সুন্নাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় তবে তা অবশ্যই অগ্রাহ্য।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি এমন কাজ করে যার উপর আমার আদেশ নেই তা অগ্রাহ্য।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে) প্রকাশ্যে বা গোপনে যে কেউই শরীয়তে মুহাম্মাদীর (সঃ) বিপরীত করে, তার অন্তরে কুফরী, নিফাক, বিদাআত ও মন্দের বীজ বপন করে দেয়া হয়। তাকে কঠিন শাস্তি দেয়া হয়, হয়তো দুনিয়াতেই হত্যা, বন্দী, হদ ইত্যাদির মাধ্যমে অথবা পরকালের পারলৌকিক শাস্তি দ্বারা।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আমি এবং মানুষের দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির ন্যায়, যে আগুন জ্বালালো। আর আগুন যখন তার চারপাশ আলোকিত করলো, পতঙ্গ ও যেসব প্রাণী আগুনে ঝাঁপ দেয় সেগুলো ঝাঁপ দিতে লাগলো। তখন সেই ব্যক্তি সেগুলোকে (আগুন থেকে ফিরাবার চেষ্টা করলো, তা সত্ত্বেও সেগুলো আগুনে পুড়ে মরে। সুতরাং এটাই আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত। আমিও তোমাদের কোমর ধরে আগুন থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করি, কিন্তু তোমরা তাতে পতিত হও। (হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম ফুসলিমও (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)

আন-নূর 24:64

আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, যমীন ও আসমানের মালিক, অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা এবং বান্দাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় কার্যাবলীর জান্তা একমাত্র আল্লাহ। (আরবি)-এর (আরবি) শব্দটি তাহকীক বা নিশ্চয়তা বুঝাবার জন্যে এসেছে। যেমন এর পূর্ববর্তী আয়াতে রয়েছে(আরবি)জায়গায় আছেঃ (আরবি) (৩৩:১৮) আর এক আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি) (৫৮: ১) অন্য একটি আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি) (৬:৩৩) আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি) (২:১৪৪) ইত্যাদি। এই সমুদয় স্থানে এসেছে বা ক্রিয়ার বা নিশ্চয়তা বুঝাবার জন্যে। যেমন মুআযযিন বলে থাকেন (আরবি) এখানেও (আরবি)শব্দটি নিশ্চয়তা বুঝাবার জন্যেই এসেছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা যাতে ব্যাপৃত রয়েছে তিনি তা জানেন। তোমরা যে অবস্থাতেই থাকে না কেন এবং যে আমল ও বিশ্বাসের উপর থাকে না কেন সবই তাঁর কাছে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। আসমান ও যমীনের অণু পরিমাণ জিনিসও তাঁর কাছে গোপন নেই। তোমাদের আমল ও অবস্থা সম্পর্কে তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম বস্তুও তার কাছে প্রকাশমান। ছোট বড় সমস্ত জিনিস স্পষ্ট কিতাবে রক্ষিত রয়েছে। বান্দাদের ভাল-মন্দ সমস্ত কাজ তিনি পূর্ণভাবে পরিজ্ঞাত রয়েছেন। তোমরা কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকো অথবা গোপনে গোপনে কিছু করো না কেন, আল্লাহর কাছে কিছুই গোপন থাকবে না। প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবই তাঁর কাছে সমান। চুপি চুপি কথা এবং উচ্চ স্বরের কথা সবই তাঁর কানে পৌঁছে যায়। সমস্ত প্রাণীর রিযকদাতা তিনিই। প্রত্যেক প্রাণীর প্রত্যেক অবস্থার খবর তিনিই রাখেন। প্রথম থেকেই সব কিছু লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ রয়েছে। অদৃশ্যের চাবি তাঁরই হাতে আছে, যা তিনি ছাড়া আর কেউই জানে না। জলে ও স্থলে অবস্থানরত সব কিছুর খবর একমাত্র তিনিই রাখেন। গাছের একটি পাতা ঝরে পড়লে সেটাও তাঁর অজানা থাকে না। যমীনের অন্ধকারের মধ্যে কোন দানা নেই এবং শুষ্ক ও সিক্ত এমন কোন জিনিস নেই যা স্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই। এই বিষয়ের বহু আয়াত এবং হাদীস রয়েছে। যখন সৃষ্টজীব আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে, ঐ সময় তাদের সামনে ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম পুণ্য ও পাপ পেশ করা হবে। তারা তাদের পূর্বের ও পরের সমস্ত আমল দেখতে পাবে। আমলনামা তারা ভীত ও কম্পিতভাবে দেখবে এবং ওর মধ্যে তাদের সারা জীবনের কার্যাবলী দেখতে পেয়ে অত্যন্ত বিস্ময়ের সুরে বলবেঃ “এটা কেমন কিতাব যে, এতে বড় তত বড়ই এমনকি ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম কোন কিছুও বাদ পড়েনি!” যে যা করেছে তার সবই সেখানে বিদ্যমান পাবে। যেমন মহামহিমান্বিত ও প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কি অগ্রে পাঠিয়েছে এবং কি পশ্চাতে রেখে গিয়েছে।” (৭৫: ১৩) আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আর হাযির করা হবে আমলনামা এবং তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে আতংকগ্রস্ত এবং তারা বলবেঃ হায়! দুর্ভাগ্য আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! এটা ছোট বড় কিছুই বাদ দেয় না; রবং ওটা সমস্ত হিসাব রেখেছে। তারা তাদের কৃতকর্ম সামনে হাযির পাবে; তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করেন না।” (১৮:৪৯)এজন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ যেদিন তারা তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে সেদিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিবেন তারা যা করতো। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।

আল-ফুরকান 25:1

১-২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা স্বীয় রহমত বা করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যাতে তার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব জনগণের উপর প্রকাশিত হয়। তাঁর এই করুণা এই যে, তিনি তার পবিত্র কালাম কুরআন কারীমকে স্বীয় বান্দা হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছেন।সূরায়ে কাহাফের শুরুতেও আল্লাহ তা'আলা স্বীয় প্রশংসা এই বিশেষণ দ্বারাই বর্ণনা করেছেন। এখানে তিনি নিজের সত্তাকে কল্যাণময় বলে বর্ণনা করেছেন।এখানে মহান আল্লাহ (আরবিক্রিয়া ব্যবহার করেছেন। এর দ্বারা বার বার বেশী বেশী করে অবতীর্ণ হওয়া প্রমাণিত হয়। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যে কিতাব তিনি অবতীর্ণ করেছেন তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর এবং যে কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে ইতিপূর্বে।” (৪: ১৩৬) সুতরাং পূর্ববর্তী কিতাবগুলোকে (আরবি) এবং এই শেষ কিতাবকে (কুরআনকে) (আরবি) দ্বারা বর্ণনা করেছেন। এটা এ কারণেই যে, পূর্ববর্তী কিতাবগুলো এক সাথেই অবতীর্ণ হয়েছিল। আর কুরআন কারীম প্রয়োজন অনুপাতে অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হতে থাকে। কখনো কয়েকটি আয়াত, কখনো কয়েকটি সূরা এবং কখনো কিছু আহকাম অবতীর্ণ হতে থাকে। এতে বড় এক নিপুণতা এই ছিল যে, লোকের উপর ওর প্রতি আমল কঠিন ও কষ্টকর না হয়। তারা যেন ওগুলো ভালভাবে মনে রাখতে পারে। আর মেনে নেয়ার জন্যে যেন তাদের অন্তর খুলে যায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা এই সূরার মধ্যেই বলেনঃ “কাফিররা বলে- সমগ্র কুরআন তার নিকট একবারে অবতীর্ণ হলো না কেন? এভাবেই অবতীর্ণ করেছি তোমার হৃদয়কে ওটা দ্বারা মযবুত করবার জন্যে এবং ক্রমে ক্রমে স্পষ্টভাবে আবৃত্তি। করেছি। তারা তোমার নিকট এমন কোন সমস্যা উপস্থিত করেনি যার সঠিক সমাধান ও সুন্দর ব্যাখ্যা আমি তোমাকে দান করিনি।” এখানে এই আয়াতে এর নাম ফুরকান রাখার কারণ এই যে, এটা সত্য ও মিথ্যা এবং হিদায়াত ও গুমরাহীর মধ্যে পার্থক্যকারী। এর দ্বারা ভাল ও মন্দ এবং হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য নিরূপিত হয়।কুরআন কারীমের এই পবিত্র বিশেষণ বর্ণনা করার পর যার উপর কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে তাঁর পবিত্র গুণাবলীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, তিনি বিশিষ্টভাবে তাঁরই ইবাদতে লেগে থাকেন। তিনি আল্লাহর বিশিষ্ট বান্দা। এটাই হলো সবচেয়ে বড় গুণ। এজন্যেই বড় বড় নিয়ামতের বর্ণনার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই বিশেষণেরই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেমন মিরাজ সম্পৰ্কীয় ঘটনায় তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পবিত্র ও মহিমময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়েছিলেন।” (১৭: ১) অন্য জায়গায় দু'আর স্থলে বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং যখন আল্লাহর বান্দা (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) ইবাদতের জন্যে দাড়িয়ে যায়।” (৭২: ১৯) এই বিশেষণই কুরআন কারীমের অবতরণ এবং নবী (সঃ)-এর নিকট বুযর্গ ফেরেশতার আগমনের মর্যাদার বর্ণনার সময় বর্ণিত হয়েছে।এরপর ঘোষিত হচ্ছেঃ এই পবিত্র গ্রন্থ মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছেন যাতে তিনি বিশ্বজগতের জন্যে সতর্ককারী হতে পারেন। এটা এমন একটি কিতাব যা সরাসরি হিকমত ও হিদায়াতে পূর্ণ। এই কিতাব বিশ্লেষিত মর্যাদা সম্পন্ন, স্পষ্টভাবে বর্ণিত ও সুদৃঢ়। বাতিল এর আশে পাশেও আসতে পারে না। এটা বিজ্ঞানময় ও প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা দুনিয়ায় এর প্রচার চালিয়ে যান। তিনি প্রত্যেক লাল ও সাদাকে এবং দূরের ও কাছের লোকেদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন করেন। যারাই আকাশের নীচে ও পৃথিবীর উপরে রয়েছে তাদের সবারই তিনি রাসূল। যেমন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি সমস্ত লাল ও সাদা মানুষের নিকট রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি।” তিনি আরো বলেনঃ “আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যেগুলো আমার পূর্বে কোন নবীকে দেয়া হয়নি। ওগুলোর মধ্যে একটি এই যে, আমার পূর্ববর্তী এক একজন নবী নিজ নিজ কওমের নিকট প্রেরিত হতেন। কিন্তু আমি সারা দুনিয়ার জন্যে প্রেরিত হয়েছি। স্বয়ং কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ(আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সবারই নিকট আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি।” (৭: ১৫৮) অর্থাৎ আমাকে রাসূলরূপে প্রেরণকারী এবং আমার উপর পবিত্র কিতাব অবতীর্ণকারী হলেন ঐ আল্লাহ যিনি আসমান ও যমীনের একক মালিক। তিনি যখন কোন কাজের ইচ্ছা করেন তখন শুধু বলেন- হও, আর তখনই তা হয়ে যায়। তিনিই মারেন, তিনিই জীবিত রাখেন। তাঁর কোন সন্তান নেই, কোন অংশীদার নেই। সবকিছুই তাঁরই সৃষ্ট। সবাই তাঁরই অধীনে লালিত পালিত। সবারই সৃষ্টিকর্তা, অধিকর্তা, রূযীদাতা, মা'বুদ এবং প্রতিপালক তিনিই। তিনিই প্রত্যেককে পরিমিত করেছেন যথাযথ অনুপাতে।

আল-ফুরকান 25:2

১-২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা স্বীয় রহমত বা করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যাতে তার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব জনগণের উপর প্রকাশিত হয়। তাঁর এই করুণা এই যে, তিনি তার পবিত্র কালাম কুরআন কারীমকে স্বীয় বান্দা হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছেন।সূরায়ে কাহাফের শুরুতেও আল্লাহ তা'আলা স্বীয় প্রশংসা এই বিশেষণ দ্বারাই বর্ণনা করেছেন। এখানে তিনি নিজের সত্তাকে কল্যাণময় বলে বর্ণনা করেছেন।এখানে মহান আল্লাহ (আরবিক্রিয়া ব্যবহার করেছেন। এর দ্বারা বার বার বেশী বেশী করে অবতীর্ণ হওয়া প্রমাণিত হয়। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যে কিতাব তিনি অবতীর্ণ করেছেন তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর এবং যে কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে ইতিপূর্বে।” (৪: ১৩৬) সুতরাং পূর্ববর্তী কিতাবগুলোকে (আরবি) এবং এই শেষ কিতাবকে (কুরআনকে) (আরবি) দ্বারা বর্ণনা করেছেন। এটা এ কারণেই যে, পূর্ববর্তী কিতাবগুলো এক সাথেই অবতীর্ণ হয়েছিল। আর কুরআন কারীম প্রয়োজন অনুপাতে অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হতে থাকে। কখনো কয়েকটি আয়াত, কখনো কয়েকটি সূরা এবং কখনো কিছু আহকাম অবতীর্ণ হতে থাকে। এতে বড় এক নিপুণতা এই ছিল যে, লোকের উপর ওর প্রতি আমল কঠিন ও কষ্টকর না হয়। তারা যেন ওগুলো ভালভাবে মনে রাখতে পারে। আর মেনে নেয়ার জন্যে যেন তাদের অন্তর খুলে যায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা এই সূরার মধ্যেই বলেনঃ “কাফিররা বলে- সমগ্র কুরআন তার নিকট একবারে অবতীর্ণ হলো না কেন? এভাবেই অবতীর্ণ করেছি তোমার হৃদয়কে ওটা দ্বারা মযবুত করবার জন্যে এবং ক্রমে ক্রমে স্পষ্টভাবে আবৃত্তি। করেছি। তারা তোমার নিকট এমন কোন সমস্যা উপস্থিত করেনি যার সঠিক সমাধান ও সুন্দর ব্যাখ্যা আমি তোমাকে দান করিনি।” এখানে এই আয়াতে এর নাম ফুরকান রাখার কারণ এই যে, এটা সত্য ও মিথ্যা এবং হিদায়াত ও গুমরাহীর মধ্যে পার্থক্যকারী। এর দ্বারা ভাল ও মন্দ এবং হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য নিরূপিত হয়।কুরআন কারীমের এই পবিত্র বিশেষণ বর্ণনা করার পর যার উপর কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে তাঁর পবিত্র গুণাবলীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, তিনি বিশিষ্টভাবে তাঁরই ইবাদতে লেগে থাকেন। তিনি আল্লাহর বিশিষ্ট বান্দা। এটাই হলো সবচেয়ে বড় গুণ। এজন্যেই বড় বড় নিয়ামতের বর্ণনার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই বিশেষণেরই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেমন মিরাজ সম্পৰ্কীয় ঘটনায় তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “পবিত্র ও মহিমময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়েছিলেন।” (১৭: ১) অন্য জায়গায় দু'আর স্থলে বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং যখন আল্লাহর বান্দা (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) ইবাদতের জন্যে দাড়িয়ে যায়।” (৭২: ১৯) এই বিশেষণই কুরআন কারীমের অবতরণ এবং নবী (সঃ)-এর নিকট বুযর্গ ফেরেশতার আগমনের মর্যাদার বর্ণনার সময় বর্ণিত হয়েছে।এরপর ঘোষিত হচ্ছেঃ এই পবিত্র গ্রন্থ মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছেন যাতে তিনি বিশ্বজগতের জন্যে সতর্ককারী হতে পারেন। এটা এমন একটি কিতাব যা সরাসরি হিকমত ও হিদায়াতে পূর্ণ। এই কিতাব বিশ্লেষিত মর্যাদা সম্পন্ন, স্পষ্টভাবে বর্ণিত ও সুদৃঢ়। বাতিল এর আশে পাশেও আসতে পারে না। এটা বিজ্ঞানময় ও প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা দুনিয়ায় এর প্রচার চালিয়ে যান। তিনি প্রত্যেক লাল ও সাদাকে এবং দূরের ও কাছের লোকেদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন করেন। যারাই আকাশের নীচে ও পৃথিবীর উপরে রয়েছে তাদের সবারই তিনি রাসূল। যেমন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি সমস্ত লাল ও সাদা মানুষের নিকট রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি।” তিনি আরো বলেনঃ “আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যেগুলো আমার পূর্বে কোন নবীকে দেয়া হয়নি। ওগুলোর মধ্যে একটি এই যে, আমার পূর্ববর্তী এক একজন নবী নিজ নিজ কওমের নিকট প্রেরিত হতেন। কিন্তু আমি সারা দুনিয়ার জন্যে প্রেরিত হয়েছি। স্বয়ং কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ(আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সবারই নিকট আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি।” (৭: ১৫৮) অর্থাৎ আমাকে রাসূলরূপে প্রেরণকারী এবং আমার উপর পবিত্র কিতাব অবতীর্ণকারী হলেন ঐ আল্লাহ যিনি আসমান ও যমীনের একক মালিক। তিনি যখন কোন কাজের ইচ্ছা করেন তখন শুধু বলেন- হও, আর তখনই তা হয়ে যায়। তিনিই মারেন, তিনিই জীবিত রাখেন। তাঁর কোন সন্তান নেই, কোন অংশীদার নেই। সবকিছুই তাঁরই সৃষ্ট। সবাই তাঁরই অধীনে লালিত পালিত। সবারই সৃষ্টিকর্তা, অধিকর্তা, রূযীদাতা, মা'বুদ এবং প্রতিপালক তিনিই। তিনিই প্রত্যেককে পরিমিত করেছেন যথাযথ অনুপাতে।

আল-ফুরকান 25:3

এখানে মুশরিকদের অজ্ঞতার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা সৃষ্টিকর্তা, অধিকর্তা, ক্ষমতাবান এবং স্বেচ্ছাচারী বাদশাহ মহান আল্লাহকে ছেড়ে তাদের ইবাদত করছে যারা একটা মশাও সৃষ্টি করতে পারে না। বরং তারা নিজেরাও আল্লাহর সৃষ্ট। তারা নিজেদেরও লাভ এবং ক্ষতির অধিকার রাখে না, অপরের লাভ ক্ষতি করা তো দূরের কথা। তারা নিজেদের জীবন মৃত্যুর মালিক নয় এবং পুনরায় জীবন লাভেরও ক্ষমতা রাখে না। তাহলে যারা তাদের উপাসনা করছে তাদের এগুলোর মালিক তারা কি করে হতে পারে? প্রকৃত কথা এটাই যে, এই সমুদয় কাজের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনিই জীবিত রাখেন এবং তিনিই মারেন। তিনিই কিয়ামতের দিন সমস্ত মাখলুককে নতুনভাবে সৃষ্টি করবেন। এ কাজ তাঁর কাছে মোটেই কঠিন নয়। একজনকে সৃষ্টি করা ও সকলকে সৃষ্টি করা, একজনকে মৃত্যুর পরে জীবিত করা এবং সকলকে জীবিত করা তাঁর কাছে সমান। চোখের পলকে তার হুকুম পূর্ণ হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওটা একটি মাত্র প্রচণ্ড শব্দ, এর সাথে সাথেই সমস্ত মৃত মাখলুক জীবিত হয়ে তাঁর সামনে এক বিরাট ময়দানে দাঁড়িয়ে যাবে।” (৭৯:১৩-১৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এটা তো শুধু এক বিকট আওয়াজ, আর তখনই তারা প্রত্যক্ষ করবে।” (৩৭: ১৯) আল্লাহ তা'আলা আরো এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এটা তো হবে শুধু এক মহানাদ; তখনই তাদের সকলকে উপস্থিত করা হবে আমার সম্মুখে।" (৩৬:৫৩) সুতরাং তিনিই আল্লাহ যিনি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি ছাড়া কোন প্রতিপালক নেই। আমরা তার ছাড়া আর কারো ইবাদত কামনা করি না। কারণ তিনি যা চান তা হয় এবং যা চান না তা হয় না। তিনি এমনই যে, তাঁর কোন সন্তান নেই, পিতা নেই, সমকক্ষ নেই, স্থলাভিষিক্ত নেই, উযীর নেই এবং তুলনা নেই। বরং তিনি একক ও অদ্বিতীয়। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, সবাই তার মুখাপেক্ষী, তিনি কাউকেও জন্ম দেননি এক তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি, এবং তার সমতুল্য কেউই নেই।

আল-ফুরকান 25:4

৪-৬ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে মুশরিকদের একটি অজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন যা তার সত্তা সম্পর্কে ছিল। এখানে তিনি তাদের অন্য একটি অজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছেন যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্তার সাথে সম্পর্কযুক্ত। তারা নবী (সঃ)-কে বলে- তুমি এই কুরআনকে অন্যদের সাহায্যবলে নিজেই বানিয়ে নিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এটা তাদের অত্যাচার ও মিথ্যামূলক কথা যা তারা নিজেরাও জানে। কিন্তু তাদের জানা কথারও বিপরীত কথা তারা বলছে।কখনো কখনো তারা গলা উঁচু করে বলে যে, পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের কাহিনীগুলো তিনি লিখিয়ে নিয়েছেন এবং ঐগুলোই সকাল সন্ধ্যায় তাঁর মজলিসে পঠিত হয়। তাদের এটাও এমন একটা মিথ্যা কথা যে, এটা মিথ্যা হওয়ার ব্যাপারে কারো কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। কেননা, শুধু মক্কাবাসী নয়, বরং দুনিয়া জানে যে, আমাদের নবী (সঃ) নিরক্ষর ছিলেন। না তিনি লিখতে জানতেন পড়তে জানতেন। নবুওয়াতের পূর্বের চল্লিশ বছরের জীবন তিনি মক্কাবাসীদের মধ্যেই কাটিয়েছেন। তাঁর এ জীবন তাদের মধ্যে এমনভাবে কেটেছে যে, তার এ দীর্ঘ জীবনের মধ্যে এমন একটি ঘটনা ঘটেনি যার ফলে তাঁর প্রতি কোন প্রকার দোষারোপ করা যেতে পারে। মক্কাবাসী তাঁর এক একটি গুণের উপর পাগল ছিল। তাঁর মধুর চরিত্র এবং উত্তম ব্যবহারে তারা এমনভাবে মুগ্ধ ছিল যে, তাকে তারা মুহাম্মদ আমীন (সঃ) বলে অত্যন্ত স্নেহের সুরে আহ্বান করতো। কোন এমন অন্তর ছিল যাতে তিনি বাসা বাঁধেননি? কোন এমন চক্ষু ছিল যাতে তার মর্যাদা প্রকাশিত হয়নি? কোন এমন সমাবেশ ছিল যেখানে তাঁর সম্পর্কে উত্তম আলোচনা হয়নি? কোন এমন লোক ছিল যে তাঁর বুযর্গী, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্থতা ও সততার উক্তিকারী ছিল না? অতঃপর তাকেই যখন মহান আল্লাহ উচ্চতম সম্মানে সম্মানিত করলেন, আসমানী অহীর তাঁকে আমীন বানানো হলো, তখন শুধু বাপ-দাদার রীতি-নীতি ও কু-প্রথা উঠে যেতে দেখে ঐ নির্বোধের দল তাঁর শক্ত হয়ে দাঁড়ায়, তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা শুরু করে দেয় এবং তার প্রতি নানারূপ মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে। তাঁর সম্পর্কে তারা নানারূপ মন্তব্য করে। কেউ তাকে কবি বলে, কেউ বলে যাদুকর এবং কেউ বলে পাগল। কি করে তারা তাদের বাপ-দাদাদের অজ্ঞতাপূর্ণ রীতি-নীতি ও কু-প্রথা ঠিক রাখতে পারে এই চিন্তাতেই তারা সদা নিমগ্ন থাকে। তারা এ চিন্তাও করতে থাকে যে, কোনক্রমেই যেন তাদের মিথ্যা ও বাজে উপাস্যদের পতাকা উল্টোমুখে পতিত হয় এবং অজ্ঞতার অন্ধকারে পরিপূর্ণ দুনিয়া আল্লাহর জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় হয়। এখন তাদেরকে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে জবাব দেয়া হচ্ছেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- এই কুরআন তো তিনিই অবতীর্ণ করেছেন যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমুদয় রহস্য অবগত আছেন। যার থেকে এক অণু-পরিমাণ জিনিসও লুক্কায়িত নয়। এতে অতীতের যেসব ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। তার সবই সত্য। ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটবার বর্ণনা দেয়া হয়েছে সেগুলোও সত্য। যা কিছু হবে সবই আল্লাহর কাছে সমান। তিনি অদৃশ্যকে ঐ ভাবেই জানেন যেমন তিনি জানেন দৃশ্যকে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেন যে, তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তাঁর এ কথা বলার কারণ হলো যাতে মানুষ তার থেকে নিরাশ না হয়ে যায়। তারা যেন এ আশা করতে পারে যে, তারা যত কিছু অন্যায় ও দুস্কার্য করুক না কেন, পরে যদি তারা শুদ্ধ অন্তঃকরণে সমস্ত পাপ হতে তাওবা করতঃ তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে তবে তিনি তাদের পূর্বের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দিবেন। এরূপ আশা পেয়ে হয়তো তারা তাদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হবে এবং মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টির সন্ধানী হবে।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা কতই না মহান ও দয়ালু যে, যারা তার চরম অবাধ্য ও শত্রু, যারা তার প্রিয় রাসূল (সঃ)-কে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কষ্ট দিচ্ছে, তাদেরকেও তিনি নিজের সাধারণ করুণার দিকে আহ্বান করছেন! যারা তাকে মন্দ বলছে, তাঁর রাসূল (সঃ)-কে খারাপ বলছে তাদেরকেও তিনি ক্ষমা করে দেয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন এবং তাদের সামনে ইসলাম ও হিদায়াত পেশ করছেন! নিজের উত্তম কথাগুলো তাদেরকে বুঝাতে রয়েছেন! যেমন অন্য আয়াতে তিনি ত্রিত্ববাদী খৃষ্টানদের ত্রিত্ববাদিতার বর্ণনা দেয়ার পর তাদের শাস্তির কথা উল্লেখ করতঃ বলেন (আরবি)অর্থাৎ “তারা কি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতঃ তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে না? আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (৫: ৭৪) তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাসী নর-নারীদের বিপদাপন্ন করেছে এবং পরে তাওবা করেনি তাদের জন্যে আছে জাহান্নামের শাস্তি, আছে দহন যন্ত্রণা।” (৮৫: ১০)।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর এই দয়া ও দানের প্রতি লক্ষ্য করুন যে, যারা তাঁর বন্ধুদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে তাদেরকে তিনি তাওবা ও রহমতের দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন। (এটা কত বড় দয়া ও সহনশীলতার পরিচায়ক)!”

আল-ফুরকান 25:5

৪-৬ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে মুশরিকদের একটি অজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন যা তার সত্তা সম্পর্কে ছিল। এখানে তিনি তাদের অন্য একটি অজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছেন যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্তার সাথে সম্পর্কযুক্ত। তারা নবী (সঃ)-কে বলে- তুমি এই কুরআনকে অন্যদের সাহায্যবলে নিজেই বানিয়ে নিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এটা তাদের অত্যাচার ও মিথ্যামূলক কথা যা তারা নিজেরাও জানে। কিন্তু তাদের জানা কথারও বিপরীত কথা তারা বলছে।কখনো কখনো তারা গলা উঁচু করে বলে যে, পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের কাহিনীগুলো তিনি লিখিয়ে নিয়েছেন এবং ঐগুলোই সকাল সন্ধ্যায় তাঁর মজলিসে পঠিত হয়। তাদের এটাও এমন একটা মিথ্যা কথা যে, এটা মিথ্যা হওয়ার ব্যাপারে কারো কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। কেননা, শুধু মক্কাবাসী নয়, বরং দুনিয়া জানে যে, আমাদের নবী (সঃ) নিরক্ষর ছিলেন। না তিনি লিখতে জানতেন পড়তে জানতেন। নবুওয়াতের পূর্বের চল্লিশ বছরের জীবন তিনি মক্কাবাসীদের মধ্যেই কাটিয়েছেন। তাঁর এ জীবন তাদের মধ্যে এমনভাবে কেটেছে যে, তার এ দীর্ঘ জীবনের মধ্যে এমন একটি ঘটনা ঘটেনি যার ফলে তাঁর প্রতি কোন প্রকার দোষারোপ করা যেতে পারে। মক্কাবাসী তাঁর এক একটি গুণের উপর পাগল ছিল। তাঁর মধুর চরিত্র এবং উত্তম ব্যবহারে তারা এমনভাবে মুগ্ধ ছিল যে, তাকে তারা মুহাম্মদ আমীন (সঃ) বলে অত্যন্ত স্নেহের সুরে আহ্বান করতো। কোন এমন অন্তর ছিল যাতে তিনি বাসা বাঁধেননি? কোন এমন চক্ষু ছিল যাতে তার মর্যাদা প্রকাশিত হয়নি? কোন এমন সমাবেশ ছিল যেখানে তাঁর সম্পর্কে উত্তম আলোচনা হয়নি? কোন এমন লোক ছিল যে তাঁর বুযর্গী, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্থতা ও সততার উক্তিকারী ছিল না? অতঃপর তাকেই যখন মহান আল্লাহ উচ্চতম সম্মানে সম্মানিত করলেন, আসমানী অহীর তাঁকে আমীন বানানো হলো, তখন শুধু বাপ-দাদার রীতি-নীতি ও কু-প্রথা উঠে যেতে দেখে ঐ নির্বোধের দল তাঁর শক্ত হয়ে দাঁড়ায়, তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা শুরু করে দেয় এবং তার প্রতি নানারূপ মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে। তাঁর সম্পর্কে তারা নানারূপ মন্তব্য করে। কেউ তাকে কবি বলে, কেউ বলে যাদুকর এবং কেউ বলে পাগল। কি করে তারা তাদের বাপ-দাদাদের অজ্ঞতাপূর্ণ রীতি-নীতি ও কু-প্রথা ঠিক রাখতে পারে এই চিন্তাতেই তারা সদা নিমগ্ন থাকে। তারা এ চিন্তাও করতে থাকে যে, কোনক্রমেই যেন তাদের মিথ্যা ও বাজে উপাস্যদের পতাকা উল্টোমুখে পতিত হয় এবং অজ্ঞতার অন্ধকারে পরিপূর্ণ দুনিয়া আল্লাহর জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় হয়। এখন তাদেরকে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে জবাব দেয়া হচ্ছেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- এই কুরআন তো তিনিই অবতীর্ণ করেছেন যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমুদয় রহস্য অবগত আছেন। যার থেকে এক অণু-পরিমাণ জিনিসও লুক্কায়িত নয়। এতে অতীতের যেসব ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। তার সবই সত্য। ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটবার বর্ণনা দেয়া হয়েছে সেগুলোও সত্য। যা কিছু হবে সবই আল্লাহর কাছে সমান। তিনি অদৃশ্যকে ঐ ভাবেই জানেন যেমন তিনি জানেন দৃশ্যকে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেন যে, তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তাঁর এ কথা বলার কারণ হলো যাতে মানুষ তার থেকে নিরাশ না হয়ে যায়। তারা যেন এ আশা করতে পারে যে, তারা যত কিছু অন্যায় ও দুস্কার্য করুক না কেন, পরে যদি তারা শুদ্ধ অন্তঃকরণে সমস্ত পাপ হতে তাওবা করতঃ তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে তবে তিনি তাদের পূর্বের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দিবেন। এরূপ আশা পেয়ে হয়তো তারা তাদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হবে এবং মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টির সন্ধানী হবে।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা কতই না মহান ও দয়ালু যে, যারা তার চরম অবাধ্য ও শত্রু, যারা তার প্রিয় রাসূল (সঃ)-কে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কষ্ট দিচ্ছে, তাদেরকেও তিনি নিজের সাধারণ করুণার দিকে আহ্বান করছেন! যারা তাকে মন্দ বলছে, তাঁর রাসূল (সঃ)-কে খারাপ বলছে তাদেরকেও তিনি ক্ষমা করে দেয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন এবং তাদের সামনে ইসলাম ও হিদায়াত পেশ করছেন! নিজের উত্তম কথাগুলো তাদেরকে বুঝাতে রয়েছেন! যেমন অন্য আয়াতে তিনি ত্রিত্ববাদী খৃষ্টানদের ত্রিত্ববাদিতার বর্ণনা দেয়ার পর তাদের শাস্তির কথা উল্লেখ করতঃ বলেন (আরবি)অর্থাৎ “তারা কি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতঃ তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে না? আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (৫: ৭৪) তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাসী নর-নারীদের বিপদাপন্ন করেছে এবং পরে তাওবা করেনি তাদের জন্যে আছে জাহান্নামের শাস্তি, আছে দহন যন্ত্রণা।” (৮৫: ১০)।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর এই দয়া ও দানের প্রতি লক্ষ্য করুন যে, যারা তাঁর বন্ধুদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে তাদেরকে তিনি তাওবা ও রহমতের দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন। (এটা কত বড় দয়া ও সহনশীলতার পরিচায়ক)!”

আল-ফুরকান 25:6

৪-৬ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে মুশরিকদের একটি অজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন যা তার সত্তা সম্পর্কে ছিল। এখানে তিনি তাদের অন্য একটি অজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছেন যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্তার সাথে সম্পর্কযুক্ত। তারা নবী (সঃ)-কে বলে- তুমি এই কুরআনকে অন্যদের সাহায্যবলে নিজেই বানিয়ে নিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এটা তাদের অত্যাচার ও মিথ্যামূলক কথা যা তারা নিজেরাও জানে। কিন্তু তাদের জানা কথারও বিপরীত কথা তারা বলছে।কখনো কখনো তারা গলা উঁচু করে বলে যে, পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের কাহিনীগুলো তিনি লিখিয়ে নিয়েছেন এবং ঐগুলোই সকাল সন্ধ্যায় তাঁর মজলিসে পঠিত হয়। তাদের এটাও এমন একটা মিথ্যা কথা যে, এটা মিথ্যা হওয়ার ব্যাপারে কারো কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। কেননা, শুধু মক্কাবাসী নয়, বরং দুনিয়া জানে যে, আমাদের নবী (সঃ) নিরক্ষর ছিলেন। না তিনি লিখতে জানতেন পড়তে জানতেন। নবুওয়াতের পূর্বের চল্লিশ বছরের জীবন তিনি মক্কাবাসীদের মধ্যেই কাটিয়েছেন। তাঁর এ জীবন তাদের মধ্যে এমনভাবে কেটেছে যে, তার এ দীর্ঘ জীবনের মধ্যে এমন একটি ঘটনা ঘটেনি যার ফলে তাঁর প্রতি কোন প্রকার দোষারোপ করা যেতে পারে। মক্কাবাসী তাঁর এক একটি গুণের উপর পাগল ছিল। তাঁর মধুর চরিত্র এবং উত্তম ব্যবহারে তারা এমনভাবে মুগ্ধ ছিল যে, তাকে তারা মুহাম্মদ আমীন (সঃ) বলে অত্যন্ত স্নেহের সুরে আহ্বান করতো। কোন এমন অন্তর ছিল যাতে তিনি বাসা বাঁধেননি? কোন এমন চক্ষু ছিল যাতে তার মর্যাদা প্রকাশিত হয়নি? কোন এমন সমাবেশ ছিল যেখানে তাঁর সম্পর্কে উত্তম আলোচনা হয়নি? কোন এমন লোক ছিল যে তাঁর বুযর্গী, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্থতা ও সততার উক্তিকারী ছিল না? অতঃপর তাকেই যখন মহান আল্লাহ উচ্চতম সম্মানে সম্মানিত করলেন, আসমানী অহীর তাঁকে আমীন বানানো হলো, তখন শুধু বাপ-দাদার রীতি-নীতি ও কু-প্রথা উঠে যেতে দেখে ঐ নির্বোধের দল তাঁর শক্ত হয়ে দাঁড়ায়, তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা শুরু করে দেয় এবং তার প্রতি নানারূপ মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে। তাঁর সম্পর্কে তারা নানারূপ মন্তব্য করে। কেউ তাকে কবি বলে, কেউ বলে যাদুকর এবং কেউ বলে পাগল। কি করে তারা তাদের বাপ-দাদাদের অজ্ঞতাপূর্ণ রীতি-নীতি ও কু-প্রথা ঠিক রাখতে পারে এই চিন্তাতেই তারা সদা নিমগ্ন থাকে। তারা এ চিন্তাও করতে থাকে যে, কোনক্রমেই যেন তাদের মিথ্যা ও বাজে উপাস্যদের পতাকা উল্টোমুখে পতিত হয় এবং অজ্ঞতার অন্ধকারে পরিপূর্ণ দুনিয়া আল্লাহর জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় হয়। এখন তাদেরকে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে জবাব দেয়া হচ্ছেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- এই কুরআন তো তিনিই অবতীর্ণ করেছেন যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমুদয় রহস্য অবগত আছেন। যার থেকে এক অণু-পরিমাণ জিনিসও লুক্কায়িত নয়। এতে অতীতের যেসব ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। তার সবই সত্য। ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটবার বর্ণনা দেয়া হয়েছে সেগুলোও সত্য। যা কিছু হবে সবই আল্লাহর কাছে সমান। তিনি অদৃশ্যকে ঐ ভাবেই জানেন যেমন তিনি জানেন দৃশ্যকে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেন যে, তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তাঁর এ কথা বলার কারণ হলো যাতে মানুষ তার থেকে নিরাশ না হয়ে যায়। তারা যেন এ আশা করতে পারে যে, তারা যত কিছু অন্যায় ও দুস্কার্য করুক না কেন, পরে যদি তারা শুদ্ধ অন্তঃকরণে সমস্ত পাপ হতে তাওবা করতঃ তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে তবে তিনি তাদের পূর্বের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দিবেন। এরূপ আশা পেয়ে হয়তো তারা তাদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হবে এবং মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টির সন্ধানী হবে।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা কতই না মহান ও দয়ালু যে, যারা তার চরম অবাধ্য ও শত্রু, যারা তার প্রিয় রাসূল (সঃ)-কে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কষ্ট দিচ্ছে, তাদেরকেও তিনি নিজের সাধারণ করুণার দিকে আহ্বান করছেন! যারা তাকে মন্দ বলছে, তাঁর রাসূল (সঃ)-কে খারাপ বলছে তাদেরকেও তিনি ক্ষমা করে দেয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন এবং তাদের সামনে ইসলাম ও হিদায়াত পেশ করছেন! নিজের উত্তম কথাগুলো তাদেরকে বুঝাতে রয়েছেন! যেমন অন্য আয়াতে তিনি ত্রিত্ববাদী খৃষ্টানদের ত্রিত্ববাদিতার বর্ণনা দেয়ার পর তাদের শাস্তির কথা উল্লেখ করতঃ বলেন (আরবি)অর্থাৎ “তারা কি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতঃ তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে না? আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (৫: ৭৪) তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাসী নর-নারীদের বিপদাপন্ন করেছে এবং পরে তাওবা করেনি তাদের জন্যে আছে জাহান্নামের শাস্তি, আছে দহন যন্ত্রণা।” (৮৫: ১০)।হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর এই দয়া ও দানের প্রতি লক্ষ্য করুন যে, যারা তাঁর বন্ধুদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে তাদেরকে তিনি তাওবা ও রহমতের দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন। (এটা কত বড় দয়া ও সহনশীলতার পরিচায়ক)!”

আল-ফুরকান 25:7

৭-১৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা কাফিরদের আরো বোকামির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের অস্বীকার করার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলে তিনি পানাহারের মুখাপেক্ষী কেন? কেনই বা তিনি ব্যবসা ও লেনদেনের জন্যে বাজারে গমনাগমন করেন? তার সাথে কোন ফেরেশতাকে কেন অবতীর্ণ করা হয়নি? তাহলে তিনি তাঁকে সত্যায়িত করতেন, জনগণকে তার দ্বীনের দিকে আহ্বান করতেন এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে সতর্ক করতেন? ফিরাউনও একথাই বলেছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “তার উপর সোনার কংকন কেন নিক্ষেপ করা হয়নি কিংবা তার সাহায্যের জন্যে আকাশ থেকে কেন ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি?” (৪৩:৫৩)সমস্ত কাফিরের অন্তর একই বলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগের কাফিররাও বলেছিল- তাকে ধন-ভাণ্ডার দেয়া হয় না কেন অথবা তার একটি বাগান নেই। কেন যা হতে সে আহার সংগ্রহ করতে পারে? নিশ্চয়ই এ সবকিছু প্রদান করা আল্লাহর কাছে খুবই সহজ। কিন্তু সাথে সাথে এগুলো না দেয়ার মধ্যে নিপুণতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে।এই যালিমরা মুসলমানদেরকেও বিভ্রান্ত করতো। তারা তাদেরকে বলতো: ‘তোমরা এমন একজন লোকের অনুসরণ করছো যার উপর কেউ যাদু করেছে। তারা কতই না ভিত্তিহীন কথা বলছে! কোন একটি কথার উপর তারা স্থির থাকতে পারছে না। তারা কথাকে এদিক-ওদিক নিয়ে যাচ্ছে। কখনো বলছে যে, কেউ তার উপর যাদু করেছে, কখনো তাকে যাদুকর বলছে, কখনো বলছে যে, তিনি একজন কবি, কখনো বলছে যে, তার উপর জ্বিনের আসর হয়েছে, কখনো তাকে মিথ্যাবাদী বলছে, আবার কখনো বলছে যে, তিনি একজন পাগল। অথচ তাদের এসবই বাজে ও ভিত্তিহীন কথা। আর তারা যে ভুল কথা বলছে এটা এর দ্বারাও প্রকাশমান যে, স্বয়ং তাদের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী কথা রয়েছে। কোন একটি কথার উপর মুশরিকদের আস্থা নেই। তারা একবার একটি কথা বানিয়ে বলছে, তারপর ওটাকে ছেড়ে দিয়ে আর একটি কথা বানাচ্ছে এবং আবার ওটাকেও ছাড়ছে। একটি কথার উপর তারা অটল থাকতে পারছে না। সঠিক ও সত্য তো এটাই হয় যে, এ ব্যাপারে কোন দ্বন্দ্ব ও বিরোধ থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কত মহান তিনি যিনি ইচ্ছা করলে তোমাকে দিতে পারেন এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বস্তু উদ্যানসমূহ যার নিম্নদেশে নদী-নালা প্রবাহিত এবং দিতে পারেন প্রাসাদসমূহ।পাথর দ্বারা নির্মিত ঘরকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলে থাকে, তা বড়ই হোক বা ছোটই হোক।আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলা হয়েছিলঃ “তুমি যদি চাও তবে যমীনের ধন-ভাণ্ডার এবং এর চাবী আমি তোমাকে দিয়ে দিই। আর তোমাকে দুনিয়ার এত বড় মালিক করে দিই যে, এত বড় মালিকানা আমি তোমার পূর্বে কোন নবীকে দিইনি এবং তোমার পরে আর কাউকেও প্রদান করবো না। সাথে সাথে তোমার পারলৌকিক সমস্ত নিয়ামত ঠিকমতই থাকবে।” কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “সব কিছু আমার জন্যে আখিরাতেই জমা করা হোক (দুনিয়ায় আমার এগুলোর দরকার নেই)।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হাবীব ইবনে আবি সাবিত (রঃ) হতে এবং তিনি খাইসুমা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ এরা এসব যা কিছু বলছে তা শুধু গর্ব, অবাধ্যতা, জিদ ও হঠকারিতার বশবর্তী হয়েই বলছে। এ নয় যে, তারা যা কিছু বলছে তা হয়ে গেলে তারা মুসলমান হয়ে যাবে। বরং এরপরেও তারা কোন কৌশল বের করবে। তাদের অন্তরে তো এটা বদ্ধমূল রয়েছে যে, কিয়ামত সংঘটিত হবেই না। আর এরূপ লোকদের জন্যেই আমি জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি। এটা তাদের সহ্যের বাইরে। দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীকার। জাহান্নাম ঐ দুষ্ট লোকদেরকে দেখে ক্রোধে দাঁতে আঙ্গুন কাটবে এবং ভীষণ গর্জন ও চীৎকার করবে যে, কখন সে ঐ কাফিরদেরকে গ্রাস করবে। আর কখন সে ঐ যালিমদের নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ওর মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা জাহান্নামের শব্দ শুনবে, আর তা হবে উদ্বেলিত। ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে।” (৬৭:৭-৮),নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার নাম দিয়ে এমন কথা বলে যা আমি বলিনি, যে ব্যক্তি নিজের পিতা-মাতাকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে নিজের পিতা-মাতা বলে, যে গোলাম নিজের মনিবকে বাদ দিয়ে অন্যকে নিজের মনিব বলে পরিচয় দেয় তারা যেন জাহান্নামের দুই চক্ষুর মাঝে নিজেদের বাসস্থান ঠিক করে নেয়।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জাহান্নামেরও কি দুই চক্ষু রয়েছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তুমি কি আল্লাহর কালামের নিম্নের আয়াতটি শুননি?” (আরবি)অর্থাৎ “যখন ওটা (জাহান্নাম) তাদেরকে দূর স্থান হতে দেখবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু ওয়ায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সাথে বের হই। আমাদের সাথে হযরত রাবী ইবনে খাইমও (রাঃ) ছিলেন। পথে একটি কামারের দোকান দেখা যায়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) সেখানে দাড়িয়ে যান। সেখানে লোহাকে আগুনে গরম করা হচ্ছিল তাই তিনি দেখতে ছিলেন। হযরত রাবী (রাঃ)-এর অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেল। আল্লাহর শাস্তির ছবি তার চোখের সামনে প্রকাশিত হলো। তাঁর অবস্থা এমনই হলো যে, যেন তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবেন। এরপর হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ফুরাতের তীরে গেলেন। সেখানে তিনি একটি চুল্লী দেখলেন যার মধ্যে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হচ্ছিল। হঠাৎ তার মুখ দিয়ে (আরবি) (অর্থাৎ দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীৎকার)। এটা শশানামাত্রই হযরত রাবী (রাঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। খাটের উপর উঠিয়ে নিয়ে তাঁকে তাঁর বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দেয়া হয়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তার পার্শ্বে বসে থাকেন এবং তাঁকে দেখা শোনা করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর আর জ্ঞান ফিরেনি।” (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নামীকে যখন জাহান্নামের দিকে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম ভীষণ চীৎকার করবে এবং ক্রোধে এমনভাবে ফেটে পড়বে যে হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, কোন কোন লোককে যখন জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম জড়সড় ও সংকুচিত হয়ে যাবে। তখন রহমান (দয়ালু আল্লাহ) জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমার কি হলো?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ তো দুআয় আপনার নিকট জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতো এবং আজও সে আশ্রয় প্রার্থনা করতে রয়েছে।” একথা শুনে তার প্রতি আল্লাহর দয়া হবে এবং তিনি নির্দেশ দিবেনঃ “তাকে ছেড়ে দাও।” আরও কতক লোককে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার সম্পর্কে তো এরূপ ধারণা আমাদের ছিল না।” আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের কিরূপ ধারণা ছিল?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমাদের ধারণা এটাই ছিল যে, আপনার রহমত আমাদেরকে ঢেকে নেবে, আপনার করুণা আমাদের অবস্থার অনুকূলে হবে এবং আপনার প্রশস্ত রহমত আমাদেরকে স্বীয় আঁচলে জড়িয়ে ফেলবে।” আল্লাহ তা'আলা তাদের আশাও পুরো করবেন এবং (ফেরেশতাদেরকে) নির্দেশ দিবেনঃ “আমার এই বান্দাদেরকেও ছেড়ে দাও।”আরো কিছু লোককে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসা হবে। তাদেরকে দেখা মাত্রই জাহান্নাম ক্রোধে চীৎকার করতে করতে এগিয়ে আসবে এবং এমনভাবে ক্রোধে ফেটে পড়বে যে, হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা ভীষণভাবে আতংকিত হবে। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম যখন ক্রোধে থরথর করে কাঁপতে থাকবে এবং ভীষণ চীৎকার শুরু করে দেবে ও কঠিন উত্তেজিত হয়ে উঠবে তখন সমস্ত নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতা এবং মর্যাদা সম্পন্ন। নবীগণ কম্পিত হবেন। এমনকি হযরত ইবরাহীম খলীলও (আঃ) হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন এবং বলতে থাকবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আজ আমি আপনার কাছে শুধু নিজের প্রাণ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করছি। আর কিছুই চাচ্ছি না।” এই লোকদেরকে জাহান্নামের অত্যন্ত সংকীর্ণ স্থান দিয়ে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হবে যেমনভাবে বর্শাকে ছিদ্রে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অন্য রিওয়াইয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা এবং তার নিম্নরূপ কথা বলা বর্ণিত আছেঃ “যেমনভাবে পেরেককে দেয়ালে অতি কষ্টে গেড়ে দেয়া হয় তেমনিভাবে জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামের মধ্যে ঠুসিয়ে দেয়া হবে।” ঐ সময় তারা শৃংখলিত অবস্থায় থাকবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যু কামনা করবে। তাদেরকে তখন বলা হবে। আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম ইবলীসকে জাহান্নামের পোশাক পরানো হবে। সে ওটা তার কপালের উপর রাখবে এবং পিছন হতে তার সন্তানদেরকে টানতে টানতে নিয়ে চলবে, আর মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করতঃ ফিরতে থাকবে। তার সাথে সাথে তার সন্তানরাও হায়! হায়! করবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে। ঐ সময় তাদেরকে বলা হবে- “আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)(আরবি) শব্দের ভাবার্থ হলো মৃত্যু, ধ্বংস, ক্ষতি, দুর্ভাগ্য ইত্যাদি। যেমন হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ অর্থাঃ “হে ফিরাউন! আমি তো মনে করি যে, তুমি ধ্বংসপ্রাপ্তই হবে।” (১৭:১০২)

আল-ফুরকান 25:8

৭-১৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা কাফিরদের আরো বোকামির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের অস্বীকার করার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলে তিনি পানাহারের মুখাপেক্ষী কেন? কেনই বা তিনি ব্যবসা ও লেনদেনের জন্যে বাজারে গমনাগমন করেন? তার সাথে কোন ফেরেশতাকে কেন অবতীর্ণ করা হয়নি? তাহলে তিনি তাঁকে সত্যায়িত করতেন, জনগণকে তার দ্বীনের দিকে আহ্বান করতেন এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে সতর্ক করতেন? ফিরাউনও একথাই বলেছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “তার উপর সোনার কংকন কেন নিক্ষেপ করা হয়নি কিংবা তার সাহায্যের জন্যে আকাশ থেকে কেন ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি?” (৪৩:৫৩)সমস্ত কাফিরের অন্তর একই বলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগের কাফিররাও বলেছিল- তাকে ধন-ভাণ্ডার দেয়া হয় না কেন অথবা তার একটি বাগান নেই। কেন যা হতে সে আহার সংগ্রহ করতে পারে? নিশ্চয়ই এ সবকিছু প্রদান করা আল্লাহর কাছে খুবই সহজ। কিন্তু সাথে সাথে এগুলো না দেয়ার মধ্যে নিপুণতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে।এই যালিমরা মুসলমানদেরকেও বিভ্রান্ত করতো। তারা তাদেরকে বলতো: ‘তোমরা এমন একজন লোকের অনুসরণ করছো যার উপর কেউ যাদু করেছে। তারা কতই না ভিত্তিহীন কথা বলছে! কোন একটি কথার উপর তারা স্থির থাকতে পারছে না। তারা কথাকে এদিক-ওদিক নিয়ে যাচ্ছে। কখনো বলছে যে, কেউ তার উপর যাদু করেছে, কখনো তাকে যাদুকর বলছে, কখনো বলছে যে, তিনি একজন কবি, কখনো বলছে যে, তার উপর জ্বিনের আসর হয়েছে, কখনো তাকে মিথ্যাবাদী বলছে, আবার কখনো বলছে যে, তিনি একজন পাগল। অথচ তাদের এসবই বাজে ও ভিত্তিহীন কথা। আর তারা যে ভুল কথা বলছে এটা এর দ্বারাও প্রকাশমান যে, স্বয়ং তাদের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী কথা রয়েছে। কোন একটি কথার উপর মুশরিকদের আস্থা নেই। তারা একবার একটি কথা বানিয়ে বলছে, তারপর ওটাকে ছেড়ে দিয়ে আর একটি কথা বানাচ্ছে এবং আবার ওটাকেও ছাড়ছে। একটি কথার উপর তারা অটল থাকতে পারছে না। সঠিক ও সত্য তো এটাই হয় যে, এ ব্যাপারে কোন দ্বন্দ্ব ও বিরোধ থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কত মহান তিনি যিনি ইচ্ছা করলে তোমাকে দিতে পারেন এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বস্তু উদ্যানসমূহ যার নিম্নদেশে নদী-নালা প্রবাহিত এবং দিতে পারেন প্রাসাদসমূহ।পাথর দ্বারা নির্মিত ঘরকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলে থাকে, তা বড়ই হোক বা ছোটই হোক।আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলা হয়েছিলঃ “তুমি যদি চাও তবে যমীনের ধন-ভাণ্ডার এবং এর চাবী আমি তোমাকে দিয়ে দিই। আর তোমাকে দুনিয়ার এত বড় মালিক করে দিই যে, এত বড় মালিকানা আমি তোমার পূর্বে কোন নবীকে দিইনি এবং তোমার পরে আর কাউকেও প্রদান করবো না। সাথে সাথে তোমার পারলৌকিক সমস্ত নিয়ামত ঠিকমতই থাকবে।” কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “সব কিছু আমার জন্যে আখিরাতেই জমা করা হোক (দুনিয়ায় আমার এগুলোর দরকার নেই)।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হাবীব ইবনে আবি সাবিত (রঃ) হতে এবং তিনি খাইসুমা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ এরা এসব যা কিছু বলছে তা শুধু গর্ব, অবাধ্যতা, জিদ ও হঠকারিতার বশবর্তী হয়েই বলছে। এ নয় যে, তারা যা কিছু বলছে তা হয়ে গেলে তারা মুসলমান হয়ে যাবে। বরং এরপরেও তারা কোন কৌশল বের করবে। তাদের অন্তরে তো এটা বদ্ধমূল রয়েছে যে, কিয়ামত সংঘটিত হবেই না। আর এরূপ লোকদের জন্যেই আমি জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি। এটা তাদের সহ্যের বাইরে। দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীকার। জাহান্নাম ঐ দুষ্ট লোকদেরকে দেখে ক্রোধে দাঁতে আঙ্গুন কাটবে এবং ভীষণ গর্জন ও চীৎকার করবে যে, কখন সে ঐ কাফিরদেরকে গ্রাস করবে। আর কখন সে ঐ যালিমদের নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ওর মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা জাহান্নামের শব্দ শুনবে, আর তা হবে উদ্বেলিত। ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে।” (৬৭:৭-৮),নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার নাম দিয়ে এমন কথা বলে যা আমি বলিনি, যে ব্যক্তি নিজের পিতা-মাতাকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে নিজের পিতা-মাতা বলে, যে গোলাম নিজের মনিবকে বাদ দিয়ে অন্যকে নিজের মনিব বলে পরিচয় দেয় তারা যেন জাহান্নামের দুই চক্ষুর মাঝে নিজেদের বাসস্থান ঠিক করে নেয়।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জাহান্নামেরও কি দুই চক্ষু রয়েছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তুমি কি আল্লাহর কালামের নিম্নের আয়াতটি শুননি?” (আরবি)অর্থাৎ “যখন ওটা (জাহান্নাম) তাদেরকে দূর স্থান হতে দেখবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু ওয়ায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সাথে বের হই। আমাদের সাথে হযরত রাবী ইবনে খাইমও (রাঃ) ছিলেন। পথে একটি কামারের দোকান দেখা যায়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) সেখানে দাড়িয়ে যান। সেখানে লোহাকে আগুনে গরম করা হচ্ছিল তাই তিনি দেখতে ছিলেন। হযরত রাবী (রাঃ)-এর অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেল। আল্লাহর শাস্তির ছবি তার চোখের সামনে প্রকাশিত হলো। তাঁর অবস্থা এমনই হলো যে, যেন তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবেন। এরপর হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ফুরাতের তীরে গেলেন। সেখানে তিনি একটি চুল্লী দেখলেন যার মধ্যে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হচ্ছিল। হঠাৎ তার মুখ দিয়ে (আরবি) (অর্থাৎ দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীৎকার)। এটা শশানামাত্রই হযরত রাবী (রাঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। খাটের উপর উঠিয়ে নিয়ে তাঁকে তাঁর বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দেয়া হয়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তার পার্শ্বে বসে থাকেন এবং তাঁকে দেখা শোনা করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর আর জ্ঞান ফিরেনি।” (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নামীকে যখন জাহান্নামের দিকে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম ভীষণ চীৎকার করবে এবং ক্রোধে এমনভাবে ফেটে পড়বে যে হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, কোন কোন লোককে যখন জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম জড়সড় ও সংকুচিত হয়ে যাবে। তখন রহমান (দয়ালু আল্লাহ) জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমার কি হলো?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ তো দুআয় আপনার নিকট জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতো এবং আজও সে আশ্রয় প্রার্থনা করতে রয়েছে।” একথা শুনে তার প্রতি আল্লাহর দয়া হবে এবং তিনি নির্দেশ দিবেনঃ “তাকে ছেড়ে দাও।” আরও কতক লোককে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার সম্পর্কে তো এরূপ ধারণা আমাদের ছিল না।” আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের কিরূপ ধারণা ছিল?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমাদের ধারণা এটাই ছিল যে, আপনার রহমত আমাদেরকে ঢেকে নেবে, আপনার করুণা আমাদের অবস্থার অনুকূলে হবে এবং আপনার প্রশস্ত রহমত আমাদেরকে স্বীয় আঁচলে জড়িয়ে ফেলবে।” আল্লাহ তা'আলা তাদের আশাও পুরো করবেন এবং (ফেরেশতাদেরকে) নির্দেশ দিবেনঃ “আমার এই বান্দাদেরকেও ছেড়ে দাও।”আরো কিছু লোককে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসা হবে। তাদেরকে দেখা মাত্রই জাহান্নাম ক্রোধে চীৎকার করতে করতে এগিয়ে আসবে এবং এমনভাবে ক্রোধে ফেটে পড়বে যে, হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা ভীষণভাবে আতংকিত হবে। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম যখন ক্রোধে থরথর করে কাঁপতে থাকবে এবং ভীষণ চীৎকার শুরু করে দেবে ও কঠিন উত্তেজিত হয়ে উঠবে তখন সমস্ত নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতা এবং মর্যাদা সম্পন্ন। নবীগণ কম্পিত হবেন। এমনকি হযরত ইবরাহীম খলীলও (আঃ) হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন এবং বলতে থাকবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আজ আমি আপনার কাছে শুধু নিজের প্রাণ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করছি। আর কিছুই চাচ্ছি না।” এই লোকদেরকে জাহান্নামের অত্যন্ত সংকীর্ণ স্থান দিয়ে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হবে যেমনভাবে বর্শাকে ছিদ্রে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অন্য রিওয়াইয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা এবং তার নিম্নরূপ কথা বলা বর্ণিত আছেঃ “যেমনভাবে পেরেককে দেয়ালে অতি কষ্টে গেড়ে দেয়া হয় তেমনিভাবে জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামের মধ্যে ঠুসিয়ে দেয়া হবে।” ঐ সময় তারা শৃংখলিত অবস্থায় থাকবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যু কামনা করবে। তাদেরকে তখন বলা হবে। আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম ইবলীসকে জাহান্নামের পোশাক পরানো হবে। সে ওটা তার কপালের উপর রাখবে এবং পিছন হতে তার সন্তানদেরকে টানতে টানতে নিয়ে চলবে, আর মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করতঃ ফিরতে থাকবে। তার সাথে সাথে তার সন্তানরাও হায়! হায়! করবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে। ঐ সময় তাদেরকে বলা হবে- “আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)(আরবি) শব্দের ভাবার্থ হলো মৃত্যু, ধ্বংস, ক্ষতি, দুর্ভাগ্য ইত্যাদি। যেমন হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ অর্থাঃ “হে ফিরাউন! আমি তো মনে করি যে, তুমি ধ্বংসপ্রাপ্তই হবে।” (১৭:১০২)

আল-ফুরকান 25:9

৭-১৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা কাফিরদের আরো বোকামির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের অস্বীকার করার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলে তিনি পানাহারের মুখাপেক্ষী কেন? কেনই বা তিনি ব্যবসা ও লেনদেনের জন্যে বাজারে গমনাগমন করেন? তার সাথে কোন ফেরেশতাকে কেন অবতীর্ণ করা হয়নি? তাহলে তিনি তাঁকে সত্যায়িত করতেন, জনগণকে তার দ্বীনের দিকে আহ্বান করতেন এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে সতর্ক করতেন? ফিরাউনও একথাই বলেছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “তার উপর সোনার কংকন কেন নিক্ষেপ করা হয়নি কিংবা তার সাহায্যের জন্যে আকাশ থেকে কেন ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি?” (৪৩:৫৩)সমস্ত কাফিরের অন্তর একই বলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগের কাফিররাও বলেছিল- তাকে ধন-ভাণ্ডার দেয়া হয় না কেন অথবা তার একটি বাগান নেই। কেন যা হতে সে আহার সংগ্রহ করতে পারে? নিশ্চয়ই এ সবকিছু প্রদান করা আল্লাহর কাছে খুবই সহজ। কিন্তু সাথে সাথে এগুলো না দেয়ার মধ্যে নিপুণতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে।এই যালিমরা মুসলমানদেরকেও বিভ্রান্ত করতো। তারা তাদেরকে বলতো: ‘তোমরা এমন একজন লোকের অনুসরণ করছো যার উপর কেউ যাদু করেছে। তারা কতই না ভিত্তিহীন কথা বলছে! কোন একটি কথার উপর তারা স্থির থাকতে পারছে না। তারা কথাকে এদিক-ওদিক নিয়ে যাচ্ছে। কখনো বলছে যে, কেউ তার উপর যাদু করেছে, কখনো তাকে যাদুকর বলছে, কখনো বলছে যে, তিনি একজন কবি, কখনো বলছে যে, তার উপর জ্বিনের আসর হয়েছে, কখনো তাকে মিথ্যাবাদী বলছে, আবার কখনো বলছে যে, তিনি একজন পাগল। অথচ তাদের এসবই বাজে ও ভিত্তিহীন কথা। আর তারা যে ভুল কথা বলছে এটা এর দ্বারাও প্রকাশমান যে, স্বয়ং তাদের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী কথা রয়েছে। কোন একটি কথার উপর মুশরিকদের আস্থা নেই। তারা একবার একটি কথা বানিয়ে বলছে, তারপর ওটাকে ছেড়ে দিয়ে আর একটি কথা বানাচ্ছে এবং আবার ওটাকেও ছাড়ছে। একটি কথার উপর তারা অটল থাকতে পারছে না। সঠিক ও সত্য তো এটাই হয় যে, এ ব্যাপারে কোন দ্বন্দ্ব ও বিরোধ থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কত মহান তিনি যিনি ইচ্ছা করলে তোমাকে দিতে পারেন এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বস্তু উদ্যানসমূহ যার নিম্নদেশে নদী-নালা প্রবাহিত এবং দিতে পারেন প্রাসাদসমূহ।পাথর দ্বারা নির্মিত ঘরকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলে থাকে, তা বড়ই হোক বা ছোটই হোক।আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলা হয়েছিলঃ “তুমি যদি চাও তবে যমীনের ধন-ভাণ্ডার এবং এর চাবী আমি তোমাকে দিয়ে দিই। আর তোমাকে দুনিয়ার এত বড় মালিক করে দিই যে, এত বড় মালিকানা আমি তোমার পূর্বে কোন নবীকে দিইনি এবং তোমার পরে আর কাউকেও প্রদান করবো না। সাথে সাথে তোমার পারলৌকিক সমস্ত নিয়ামত ঠিকমতই থাকবে।” কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “সব কিছু আমার জন্যে আখিরাতেই জমা করা হোক (দুনিয়ায় আমার এগুলোর দরকার নেই)।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হাবীব ইবনে আবি সাবিত (রঃ) হতে এবং তিনি খাইসুমা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ এরা এসব যা কিছু বলছে তা শুধু গর্ব, অবাধ্যতা, জিদ ও হঠকারিতার বশবর্তী হয়েই বলছে। এ নয় যে, তারা যা কিছু বলছে তা হয়ে গেলে তারা মুসলমান হয়ে যাবে। বরং এরপরেও তারা কোন কৌশল বের করবে। তাদের অন্তরে তো এটা বদ্ধমূল রয়েছে যে, কিয়ামত সংঘটিত হবেই না। আর এরূপ লোকদের জন্যেই আমি জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি। এটা তাদের সহ্যের বাইরে। দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীকার। জাহান্নাম ঐ দুষ্ট লোকদেরকে দেখে ক্রোধে দাঁতে আঙ্গুন কাটবে এবং ভীষণ গর্জন ও চীৎকার করবে যে, কখন সে ঐ কাফিরদেরকে গ্রাস করবে। আর কখন সে ঐ যালিমদের নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ওর মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা জাহান্নামের শব্দ শুনবে, আর তা হবে উদ্বেলিত। ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে।” (৬৭:৭-৮),নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার নাম দিয়ে এমন কথা বলে যা আমি বলিনি, যে ব্যক্তি নিজের পিতা-মাতাকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে নিজের পিতা-মাতা বলে, যে গোলাম নিজের মনিবকে বাদ দিয়ে অন্যকে নিজের মনিব বলে পরিচয় দেয় তারা যেন জাহান্নামের দুই চক্ষুর মাঝে নিজেদের বাসস্থান ঠিক করে নেয়।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জাহান্নামেরও কি দুই চক্ষু রয়েছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তুমি কি আল্লাহর কালামের নিম্নের আয়াতটি শুননি?” (আরবি)অর্থাৎ “যখন ওটা (জাহান্নাম) তাদেরকে দূর স্থান হতে দেখবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু ওয়ায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সাথে বের হই। আমাদের সাথে হযরত রাবী ইবনে খাইমও (রাঃ) ছিলেন। পথে একটি কামারের দোকান দেখা যায়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) সেখানে দাড়িয়ে যান। সেখানে লোহাকে আগুনে গরম করা হচ্ছিল তাই তিনি দেখতে ছিলেন। হযরত রাবী (রাঃ)-এর অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেল। আল্লাহর শাস্তির ছবি তার চোখের সামনে প্রকাশিত হলো। তাঁর অবস্থা এমনই হলো যে, যেন তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবেন। এরপর হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ফুরাতের তীরে গেলেন। সেখানে তিনি একটি চুল্লী দেখলেন যার মধ্যে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হচ্ছিল। হঠাৎ তার মুখ দিয়ে (আরবি) (অর্থাৎ দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীৎকার)। এটা শশানামাত্রই হযরত রাবী (রাঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। খাটের উপর উঠিয়ে নিয়ে তাঁকে তাঁর বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দেয়া হয়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তার পার্শ্বে বসে থাকেন এবং তাঁকে দেখা শোনা করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর আর জ্ঞান ফিরেনি।” (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নামীকে যখন জাহান্নামের দিকে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম ভীষণ চীৎকার করবে এবং ক্রোধে এমনভাবে ফেটে পড়বে যে হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, কোন কোন লোককে যখন জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম জড়সড় ও সংকুচিত হয়ে যাবে। তখন রহমান (দয়ালু আল্লাহ) জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমার কি হলো?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ তো দুআয় আপনার নিকট জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতো এবং আজও সে আশ্রয় প্রার্থনা করতে রয়েছে।” একথা শুনে তার প্রতি আল্লাহর দয়া হবে এবং তিনি নির্দেশ দিবেনঃ “তাকে ছেড়ে দাও।” আরও কতক লোককে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার সম্পর্কে তো এরূপ ধারণা আমাদের ছিল না।” আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের কিরূপ ধারণা ছিল?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমাদের ধারণা এটাই ছিল যে, আপনার রহমত আমাদেরকে ঢেকে নেবে, আপনার করুণা আমাদের অবস্থার অনুকূলে হবে এবং আপনার প্রশস্ত রহমত আমাদেরকে স্বীয় আঁচলে জড়িয়ে ফেলবে।” আল্লাহ তা'আলা তাদের আশাও পুরো করবেন এবং (ফেরেশতাদেরকে) নির্দেশ দিবেনঃ “আমার এই বান্দাদেরকেও ছেড়ে দাও।”আরো কিছু লোককে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসা হবে। তাদেরকে দেখা মাত্রই জাহান্নাম ক্রোধে চীৎকার করতে করতে এগিয়ে আসবে এবং এমনভাবে ক্রোধে ফেটে পড়বে যে, হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা ভীষণভাবে আতংকিত হবে। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম যখন ক্রোধে থরথর করে কাঁপতে থাকবে এবং ভীষণ চীৎকার শুরু করে দেবে ও কঠিন উত্তেজিত হয়ে উঠবে তখন সমস্ত নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতা এবং মর্যাদা সম্পন্ন। নবীগণ কম্পিত হবেন। এমনকি হযরত ইবরাহীম খলীলও (আঃ) হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন এবং বলতে থাকবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আজ আমি আপনার কাছে শুধু নিজের প্রাণ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করছি। আর কিছুই চাচ্ছি না।” এই লোকদেরকে জাহান্নামের অত্যন্ত সংকীর্ণ স্থান দিয়ে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হবে যেমনভাবে বর্শাকে ছিদ্রে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অন্য রিওয়াইয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা এবং তার নিম্নরূপ কথা বলা বর্ণিত আছেঃ “যেমনভাবে পেরেককে দেয়ালে অতি কষ্টে গেড়ে দেয়া হয় তেমনিভাবে জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামের মধ্যে ঠুসিয়ে দেয়া হবে।” ঐ সময় তারা শৃংখলিত অবস্থায় থাকবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যু কামনা করবে। তাদেরকে তখন বলা হবে। আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম ইবলীসকে জাহান্নামের পোশাক পরানো হবে। সে ওটা তার কপালের উপর রাখবে এবং পিছন হতে তার সন্তানদেরকে টানতে টানতে নিয়ে চলবে, আর মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করতঃ ফিরতে থাকবে। তার সাথে সাথে তার সন্তানরাও হায়! হায়! করবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে। ঐ সময় তাদেরকে বলা হবে- “আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)(আরবি) শব্দের ভাবার্থ হলো মৃত্যু, ধ্বংস, ক্ষতি, দুর্ভাগ্য ইত্যাদি। যেমন হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ অর্থাঃ “হে ফিরাউন! আমি তো মনে করি যে, তুমি ধ্বংসপ্রাপ্তই হবে।” (১৭:১০২)

আল-ফুরকান 25:10

৭-১৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা কাফিরদের আরো বোকামির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের অস্বীকার করার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলে তিনি পানাহারের মুখাপেক্ষী কেন? কেনই বা তিনি ব্যবসা ও লেনদেনের জন্যে বাজারে গমনাগমন করেন? তার সাথে কোন ফেরেশতাকে কেন অবতীর্ণ করা হয়নি? তাহলে তিনি তাঁকে সত্যায়িত করতেন, জনগণকে তার দ্বীনের দিকে আহ্বান করতেন এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে সতর্ক করতেন? ফিরাউনও একথাই বলেছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “তার উপর সোনার কংকন কেন নিক্ষেপ করা হয়নি কিংবা তার সাহায্যের জন্যে আকাশ থেকে কেন ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি?” (৪৩:৫৩)সমস্ত কাফিরের অন্তর একই বলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগের কাফিররাও বলেছিল- তাকে ধন-ভাণ্ডার দেয়া হয় না কেন অথবা তার একটি বাগান নেই। কেন যা হতে সে আহার সংগ্রহ করতে পারে? নিশ্চয়ই এ সবকিছু প্রদান করা আল্লাহর কাছে খুবই সহজ। কিন্তু সাথে সাথে এগুলো না দেয়ার মধ্যে নিপুণতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে।এই যালিমরা মুসলমানদেরকেও বিভ্রান্ত করতো। তারা তাদেরকে বলতো: ‘তোমরা এমন একজন লোকের অনুসরণ করছো যার উপর কেউ যাদু করেছে। তারা কতই না ভিত্তিহীন কথা বলছে! কোন একটি কথার উপর তারা স্থির থাকতে পারছে না। তারা কথাকে এদিক-ওদিক নিয়ে যাচ্ছে। কখনো বলছে যে, কেউ তার উপর যাদু করেছে, কখনো তাকে যাদুকর বলছে, কখনো বলছে যে, তিনি একজন কবি, কখনো বলছে যে, তার উপর জ্বিনের আসর হয়েছে, কখনো তাকে মিথ্যাবাদী বলছে, আবার কখনো বলছে যে, তিনি একজন পাগল। অথচ তাদের এসবই বাজে ও ভিত্তিহীন কথা। আর তারা যে ভুল কথা বলছে এটা এর দ্বারাও প্রকাশমান যে, স্বয়ং তাদের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী কথা রয়েছে। কোন একটি কথার উপর মুশরিকদের আস্থা নেই। তারা একবার একটি কথা বানিয়ে বলছে, তারপর ওটাকে ছেড়ে দিয়ে আর একটি কথা বানাচ্ছে এবং আবার ওটাকেও ছাড়ছে। একটি কথার উপর তারা অটল থাকতে পারছে না। সঠিক ও সত্য তো এটাই হয় যে, এ ব্যাপারে কোন দ্বন্দ্ব ও বিরোধ থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কত মহান তিনি যিনি ইচ্ছা করলে তোমাকে দিতে পারেন এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বস্তু উদ্যানসমূহ যার নিম্নদেশে নদী-নালা প্রবাহিত এবং দিতে পারেন প্রাসাদসমূহ।পাথর দ্বারা নির্মিত ঘরকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলে থাকে, তা বড়ই হোক বা ছোটই হোক।আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলা হয়েছিলঃ “তুমি যদি চাও তবে যমীনের ধন-ভাণ্ডার এবং এর চাবী আমি তোমাকে দিয়ে দিই। আর তোমাকে দুনিয়ার এত বড় মালিক করে দিই যে, এত বড় মালিকানা আমি তোমার পূর্বে কোন নবীকে দিইনি এবং তোমার পরে আর কাউকেও প্রদান করবো না। সাথে সাথে তোমার পারলৌকিক সমস্ত নিয়ামত ঠিকমতই থাকবে।” কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “সব কিছু আমার জন্যে আখিরাতেই জমা করা হোক (দুনিয়ায় আমার এগুলোর দরকার নেই)।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হাবীব ইবনে আবি সাবিত (রঃ) হতে এবং তিনি খাইসুমা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ এরা এসব যা কিছু বলছে তা শুধু গর্ব, অবাধ্যতা, জিদ ও হঠকারিতার বশবর্তী হয়েই বলছে। এ নয় যে, তারা যা কিছু বলছে তা হয়ে গেলে তারা মুসলমান হয়ে যাবে। বরং এরপরেও তারা কোন কৌশল বের করবে। তাদের অন্তরে তো এটা বদ্ধমূল রয়েছে যে, কিয়ামত সংঘটিত হবেই না। আর এরূপ লোকদের জন্যেই আমি জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি। এটা তাদের সহ্যের বাইরে। দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীকার। জাহান্নাম ঐ দুষ্ট লোকদেরকে দেখে ক্রোধে দাঁতে আঙ্গুন কাটবে এবং ভীষণ গর্জন ও চীৎকার করবে যে, কখন সে ঐ কাফিরদেরকে গ্রাস করবে। আর কখন সে ঐ যালিমদের নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ওর মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা জাহান্নামের শব্দ শুনবে, আর তা হবে উদ্বেলিত। ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে।” (৬৭:৭-৮),নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার নাম দিয়ে এমন কথা বলে যা আমি বলিনি, যে ব্যক্তি নিজের পিতা-মাতাকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে নিজের পিতা-মাতা বলে, যে গোলাম নিজের মনিবকে বাদ দিয়ে অন্যকে নিজের মনিব বলে পরিচয় দেয় তারা যেন জাহান্নামের দুই চক্ষুর মাঝে নিজেদের বাসস্থান ঠিক করে নেয়।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জাহান্নামেরও কি দুই চক্ষু রয়েছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তুমি কি আল্লাহর কালামের নিম্নের আয়াতটি শুননি?” (আরবি)অর্থাৎ “যখন ওটা (জাহান্নাম) তাদেরকে দূর স্থান হতে দেখবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু ওয়ায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সাথে বের হই। আমাদের সাথে হযরত রাবী ইবনে খাইমও (রাঃ) ছিলেন। পথে একটি কামারের দোকান দেখা যায়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) সেখানে দাড়িয়ে যান। সেখানে লোহাকে আগুনে গরম করা হচ্ছিল তাই তিনি দেখতে ছিলেন। হযরত রাবী (রাঃ)-এর অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেল। আল্লাহর শাস্তির ছবি তার চোখের সামনে প্রকাশিত হলো। তাঁর অবস্থা এমনই হলো যে, যেন তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবেন। এরপর হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ফুরাতের তীরে গেলেন। সেখানে তিনি একটি চুল্লী দেখলেন যার মধ্যে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হচ্ছিল। হঠাৎ তার মুখ দিয়ে (আরবি) (অর্থাৎ দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীৎকার)। এটা শশানামাত্রই হযরত রাবী (রাঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। খাটের উপর উঠিয়ে নিয়ে তাঁকে তাঁর বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দেয়া হয়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তার পার্শ্বে বসে থাকেন এবং তাঁকে দেখা শোনা করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর আর জ্ঞান ফিরেনি।” (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নামীকে যখন জাহান্নামের দিকে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম ভীষণ চীৎকার করবে এবং ক্রোধে এমনভাবে ফেটে পড়বে যে হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, কোন কোন লোককে যখন জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম জড়সড় ও সংকুচিত হয়ে যাবে। তখন রহমান (দয়ালু আল্লাহ) জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমার কি হলো?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ তো দুআয় আপনার নিকট জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতো এবং আজও সে আশ্রয় প্রার্থনা করতে রয়েছে।” একথা শুনে তার প্রতি আল্লাহর দয়া হবে এবং তিনি নির্দেশ দিবেনঃ “তাকে ছেড়ে দাও।” আরও কতক লোককে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার সম্পর্কে তো এরূপ ধারণা আমাদের ছিল না।” আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের কিরূপ ধারণা ছিল?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমাদের ধারণা এটাই ছিল যে, আপনার রহমত আমাদেরকে ঢেকে নেবে, আপনার করুণা আমাদের অবস্থার অনুকূলে হবে এবং আপনার প্রশস্ত রহমত আমাদেরকে স্বীয় আঁচলে জড়িয়ে ফেলবে।” আল্লাহ তা'আলা তাদের আশাও পুরো করবেন এবং (ফেরেশতাদেরকে) নির্দেশ দিবেনঃ “আমার এই বান্দাদেরকেও ছেড়ে দাও।”আরো কিছু লোককে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসা হবে। তাদেরকে দেখা মাত্রই জাহান্নাম ক্রোধে চীৎকার করতে করতে এগিয়ে আসবে এবং এমনভাবে ক্রোধে ফেটে পড়বে যে, হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা ভীষণভাবে আতংকিত হবে। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম যখন ক্রোধে থরথর করে কাঁপতে থাকবে এবং ভীষণ চীৎকার শুরু করে দেবে ও কঠিন উত্তেজিত হয়ে উঠবে তখন সমস্ত নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতা এবং মর্যাদা সম্পন্ন। নবীগণ কম্পিত হবেন। এমনকি হযরত ইবরাহীম খলীলও (আঃ) হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন এবং বলতে থাকবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আজ আমি আপনার কাছে শুধু নিজের প্রাণ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করছি। আর কিছুই চাচ্ছি না।” এই লোকদেরকে জাহান্নামের অত্যন্ত সংকীর্ণ স্থান দিয়ে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হবে যেমনভাবে বর্শাকে ছিদ্রে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অন্য রিওয়াইয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা এবং তার নিম্নরূপ কথা বলা বর্ণিত আছেঃ “যেমনভাবে পেরেককে দেয়ালে অতি কষ্টে গেড়ে দেয়া হয় তেমনিভাবে জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামের মধ্যে ঠুসিয়ে দেয়া হবে।” ঐ সময় তারা শৃংখলিত অবস্থায় থাকবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যু কামনা করবে। তাদেরকে তখন বলা হবে। আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম ইবলীসকে জাহান্নামের পোশাক পরানো হবে। সে ওটা তার কপালের উপর রাখবে এবং পিছন হতে তার সন্তানদেরকে টানতে টানতে নিয়ে চলবে, আর মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করতঃ ফিরতে থাকবে। তার সাথে সাথে তার সন্তানরাও হায়! হায়! করবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে। ঐ সময় তাদেরকে বলা হবে- “আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)(আরবি) শব্দের ভাবার্থ হলো মৃত্যু, ধ্বংস, ক্ষতি, দুর্ভাগ্য ইত্যাদি। যেমন হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ অর্থাঃ “হে ফিরাউন! আমি তো মনে করি যে, তুমি ধ্বংসপ্রাপ্তই হবে।” (১৭:১০২)

আল-ফুরকান 25:11

৭-১৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা কাফিরদের আরো বোকামির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের অস্বীকার করার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলে তিনি পানাহারের মুখাপেক্ষী কেন? কেনই বা তিনি ব্যবসা ও লেনদেনের জন্যে বাজারে গমনাগমন করেন? তার সাথে কোন ফেরেশতাকে কেন অবতীর্ণ করা হয়নি? তাহলে তিনি তাঁকে সত্যায়িত করতেন, জনগণকে তার দ্বীনের দিকে আহ্বান করতেন এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে সতর্ক করতেন? ফিরাউনও একথাই বলেছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “তার উপর সোনার কংকন কেন নিক্ষেপ করা হয়নি কিংবা তার সাহায্যের জন্যে আকাশ থেকে কেন ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি?” (৪৩:৫৩)সমস্ত কাফিরের অন্তর একই বলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগের কাফিররাও বলেছিল- তাকে ধন-ভাণ্ডার দেয়া হয় না কেন অথবা তার একটি বাগান নেই। কেন যা হতে সে আহার সংগ্রহ করতে পারে? নিশ্চয়ই এ সবকিছু প্রদান করা আল্লাহর কাছে খুবই সহজ। কিন্তু সাথে সাথে এগুলো না দেয়ার মধ্যে নিপুণতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে।এই যালিমরা মুসলমানদেরকেও বিভ্রান্ত করতো। তারা তাদেরকে বলতো: ‘তোমরা এমন একজন লোকের অনুসরণ করছো যার উপর কেউ যাদু করেছে। তারা কতই না ভিত্তিহীন কথা বলছে! কোন একটি কথার উপর তারা স্থির থাকতে পারছে না। তারা কথাকে এদিক-ওদিক নিয়ে যাচ্ছে। কখনো বলছে যে, কেউ তার উপর যাদু করেছে, কখনো তাকে যাদুকর বলছে, কখনো বলছে যে, তিনি একজন কবি, কখনো বলছে যে, তার উপর জ্বিনের আসর হয়েছে, কখনো তাকে মিথ্যাবাদী বলছে, আবার কখনো বলছে যে, তিনি একজন পাগল। অথচ তাদের এসবই বাজে ও ভিত্তিহীন কথা। আর তারা যে ভুল কথা বলছে এটা এর দ্বারাও প্রকাশমান যে, স্বয়ং তাদের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী কথা রয়েছে। কোন একটি কথার উপর মুশরিকদের আস্থা নেই। তারা একবার একটি কথা বানিয়ে বলছে, তারপর ওটাকে ছেড়ে দিয়ে আর একটি কথা বানাচ্ছে এবং আবার ওটাকেও ছাড়ছে। একটি কথার উপর তারা অটল থাকতে পারছে না। সঠিক ও সত্য তো এটাই হয় যে, এ ব্যাপারে কোন দ্বন্দ্ব ও বিরোধ থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কত মহান তিনি যিনি ইচ্ছা করলে তোমাকে দিতে পারেন এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বস্তু উদ্যানসমূহ যার নিম্নদেশে নদী-নালা প্রবাহিত এবং দিতে পারেন প্রাসাদসমূহ।পাথর দ্বারা নির্মিত ঘরকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলে থাকে, তা বড়ই হোক বা ছোটই হোক।আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলা হয়েছিলঃ “তুমি যদি চাও তবে যমীনের ধন-ভাণ্ডার এবং এর চাবী আমি তোমাকে দিয়ে দিই। আর তোমাকে দুনিয়ার এত বড় মালিক করে দিই যে, এত বড় মালিকানা আমি তোমার পূর্বে কোন নবীকে দিইনি এবং তোমার পরে আর কাউকেও প্রদান করবো না। সাথে সাথে তোমার পারলৌকিক সমস্ত নিয়ামত ঠিকমতই থাকবে।” কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “সব কিছু আমার জন্যে আখিরাতেই জমা করা হোক (দুনিয়ায় আমার এগুলোর দরকার নেই)।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হাবীব ইবনে আবি সাবিত (রঃ) হতে এবং তিনি খাইসুমা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ এরা এসব যা কিছু বলছে তা শুধু গর্ব, অবাধ্যতা, জিদ ও হঠকারিতার বশবর্তী হয়েই বলছে। এ নয় যে, তারা যা কিছু বলছে তা হয়ে গেলে তারা মুসলমান হয়ে যাবে। বরং এরপরেও তারা কোন কৌশল বের করবে। তাদের অন্তরে তো এটা বদ্ধমূল রয়েছে যে, কিয়ামত সংঘটিত হবেই না। আর এরূপ লোকদের জন্যেই আমি জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি। এটা তাদের সহ্যের বাইরে। দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীকার। জাহান্নাম ঐ দুষ্ট লোকদেরকে দেখে ক্রোধে দাঁতে আঙ্গুন কাটবে এবং ভীষণ গর্জন ও চীৎকার করবে যে, কখন সে ঐ কাফিরদেরকে গ্রাস করবে। আর কখন সে ঐ যালিমদের নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ওর মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা জাহান্নামের শব্দ শুনবে, আর তা হবে উদ্বেলিত। ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে।” (৬৭:৭-৮),নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার নাম দিয়ে এমন কথা বলে যা আমি বলিনি, যে ব্যক্তি নিজের পিতা-মাতাকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে নিজের পিতা-মাতা বলে, যে গোলাম নিজের মনিবকে বাদ দিয়ে অন্যকে নিজের মনিব বলে পরিচয় দেয় তারা যেন জাহান্নামের দুই চক্ষুর মাঝে নিজেদের বাসস্থান ঠিক করে নেয়।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জাহান্নামেরও কি দুই চক্ষু রয়েছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তুমি কি আল্লাহর কালামের নিম্নের আয়াতটি শুননি?” (আরবি)অর্থাৎ “যখন ওটা (জাহান্নাম) তাদেরকে দূর স্থান হতে দেখবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু ওয়ায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সাথে বের হই। আমাদের সাথে হযরত রাবী ইবনে খাইমও (রাঃ) ছিলেন। পথে একটি কামারের দোকান দেখা যায়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) সেখানে দাড়িয়ে যান। সেখানে লোহাকে আগুনে গরম করা হচ্ছিল তাই তিনি দেখতে ছিলেন। হযরত রাবী (রাঃ)-এর অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেল। আল্লাহর শাস্তির ছবি তার চোখের সামনে প্রকাশিত হলো। তাঁর অবস্থা এমনই হলো যে, যেন তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবেন। এরপর হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ফুরাতের তীরে গেলেন। সেখানে তিনি একটি চুল্লী দেখলেন যার মধ্যে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হচ্ছিল। হঠাৎ তার মুখ দিয়ে (আরবি) (অর্থাৎ দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীৎকার)। এটা শশানামাত্রই হযরত রাবী (রাঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। খাটের উপর উঠিয়ে নিয়ে তাঁকে তাঁর বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দেয়া হয়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তার পার্শ্বে বসে থাকেন এবং তাঁকে দেখা শোনা করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর আর জ্ঞান ফিরেনি।” (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নামীকে যখন জাহান্নামের দিকে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম ভীষণ চীৎকার করবে এবং ক্রোধে এমনভাবে ফেটে পড়বে যে হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, কোন কোন লোককে যখন জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম জড়সড় ও সংকুচিত হয়ে যাবে। তখন রহমান (দয়ালু আল্লাহ) জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমার কি হলো?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ তো দুআয় আপনার নিকট জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতো এবং আজও সে আশ্রয় প্রার্থনা করতে রয়েছে।” একথা শুনে তার প্রতি আল্লাহর দয়া হবে এবং তিনি নির্দেশ দিবেনঃ “তাকে ছেড়ে দাও।” আরও কতক লোককে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার সম্পর্কে তো এরূপ ধারণা আমাদের ছিল না।” আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের কিরূপ ধারণা ছিল?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমাদের ধারণা এটাই ছিল যে, আপনার রহমত আমাদেরকে ঢেকে নেবে, আপনার করুণা আমাদের অবস্থার অনুকূলে হবে এবং আপনার প্রশস্ত রহমত আমাদেরকে স্বীয় আঁচলে জড়িয়ে ফেলবে।” আল্লাহ তা'আলা তাদের আশাও পুরো করবেন এবং (ফেরেশতাদেরকে) নির্দেশ দিবেনঃ “আমার এই বান্দাদেরকেও ছেড়ে দাও।”আরো কিছু লোককে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসা হবে। তাদেরকে দেখা মাত্রই জাহান্নাম ক্রোধে চীৎকার করতে করতে এগিয়ে আসবে এবং এমনভাবে ক্রোধে ফেটে পড়বে যে, হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা ভীষণভাবে আতংকিত হবে। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম যখন ক্রোধে থরথর করে কাঁপতে থাকবে এবং ভীষণ চীৎকার শুরু করে দেবে ও কঠিন উত্তেজিত হয়ে উঠবে তখন সমস্ত নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতা এবং মর্যাদা সম্পন্ন। নবীগণ কম্পিত হবেন। এমনকি হযরত ইবরাহীম খলীলও (আঃ) হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন এবং বলতে থাকবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আজ আমি আপনার কাছে শুধু নিজের প্রাণ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করছি। আর কিছুই চাচ্ছি না।” এই লোকদেরকে জাহান্নামের অত্যন্ত সংকীর্ণ স্থান দিয়ে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হবে যেমনভাবে বর্শাকে ছিদ্রে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অন্য রিওয়াইয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা এবং তার নিম্নরূপ কথা বলা বর্ণিত আছেঃ “যেমনভাবে পেরেককে দেয়ালে অতি কষ্টে গেড়ে দেয়া হয় তেমনিভাবে জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামের মধ্যে ঠুসিয়ে দেয়া হবে।” ঐ সময় তারা শৃংখলিত অবস্থায় থাকবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যু কামনা করবে। তাদেরকে তখন বলা হবে। আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম ইবলীসকে জাহান্নামের পোশাক পরানো হবে। সে ওটা তার কপালের উপর রাখবে এবং পিছন হতে তার সন্তানদেরকে টানতে টানতে নিয়ে চলবে, আর মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করতঃ ফিরতে থাকবে। তার সাথে সাথে তার সন্তানরাও হায়! হায়! করবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে। ঐ সময় তাদেরকে বলা হবে- “আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)(আরবি) শব্দের ভাবার্থ হলো মৃত্যু, ধ্বংস, ক্ষতি, দুর্ভাগ্য ইত্যাদি। যেমন হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ অর্থাঃ “হে ফিরাউন! আমি তো মনে করি যে, তুমি ধ্বংসপ্রাপ্তই হবে।” (১৭:১০২)

আল-ফুরকান 25:12

৭-১৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা কাফিরদের আরো বোকামির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের অস্বীকার করার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলে তিনি পানাহারের মুখাপেক্ষী কেন? কেনই বা তিনি ব্যবসা ও লেনদেনের জন্যে বাজারে গমনাগমন করেন? তার সাথে কোন ফেরেশতাকে কেন অবতীর্ণ করা হয়নি? তাহলে তিনি তাঁকে সত্যায়িত করতেন, জনগণকে তার দ্বীনের দিকে আহ্বান করতেন এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে সতর্ক করতেন? ফিরাউনও একথাই বলেছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “তার উপর সোনার কংকন কেন নিক্ষেপ করা হয়নি কিংবা তার সাহায্যের জন্যে আকাশ থেকে কেন ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি?” (৪৩:৫৩)সমস্ত কাফিরের অন্তর একই বলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগের কাফিররাও বলেছিল- তাকে ধন-ভাণ্ডার দেয়া হয় না কেন অথবা তার একটি বাগান নেই। কেন যা হতে সে আহার সংগ্রহ করতে পারে? নিশ্চয়ই এ সবকিছু প্রদান করা আল্লাহর কাছে খুবই সহজ। কিন্তু সাথে সাথে এগুলো না দেয়ার মধ্যে নিপুণতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে।এই যালিমরা মুসলমানদেরকেও বিভ্রান্ত করতো। তারা তাদেরকে বলতো: ‘তোমরা এমন একজন লোকের অনুসরণ করছো যার উপর কেউ যাদু করেছে। তারা কতই না ভিত্তিহীন কথা বলছে! কোন একটি কথার উপর তারা স্থির থাকতে পারছে না। তারা কথাকে এদিক-ওদিক নিয়ে যাচ্ছে। কখনো বলছে যে, কেউ তার উপর যাদু করেছে, কখনো তাকে যাদুকর বলছে, কখনো বলছে যে, তিনি একজন কবি, কখনো বলছে যে, তার উপর জ্বিনের আসর হয়েছে, কখনো তাকে মিথ্যাবাদী বলছে, আবার কখনো বলছে যে, তিনি একজন পাগল। অথচ তাদের এসবই বাজে ও ভিত্তিহীন কথা। আর তারা যে ভুল কথা বলছে এটা এর দ্বারাও প্রকাশমান যে, স্বয়ং তাদের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী কথা রয়েছে। কোন একটি কথার উপর মুশরিকদের আস্থা নেই। তারা একবার একটি কথা বানিয়ে বলছে, তারপর ওটাকে ছেড়ে দিয়ে আর একটি কথা বানাচ্ছে এবং আবার ওটাকেও ছাড়ছে। একটি কথার উপর তারা অটল থাকতে পারছে না। সঠিক ও সত্য তো এটাই হয় যে, এ ব্যাপারে কোন দ্বন্দ্ব ও বিরোধ থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কত মহান তিনি যিনি ইচ্ছা করলে তোমাকে দিতে পারেন এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বস্তু উদ্যানসমূহ যার নিম্নদেশে নদী-নালা প্রবাহিত এবং দিতে পারেন প্রাসাদসমূহ।পাথর দ্বারা নির্মিত ঘরকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলে থাকে, তা বড়ই হোক বা ছোটই হোক।আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলা হয়েছিলঃ “তুমি যদি চাও তবে যমীনের ধন-ভাণ্ডার এবং এর চাবী আমি তোমাকে দিয়ে দিই। আর তোমাকে দুনিয়ার এত বড় মালিক করে দিই যে, এত বড় মালিকানা আমি তোমার পূর্বে কোন নবীকে দিইনি এবং তোমার পরে আর কাউকেও প্রদান করবো না। সাথে সাথে তোমার পারলৌকিক সমস্ত নিয়ামত ঠিকমতই থাকবে।” কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “সব কিছু আমার জন্যে আখিরাতেই জমা করা হোক (দুনিয়ায় আমার এগুলোর দরকার নেই)।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হাবীব ইবনে আবি সাবিত (রঃ) হতে এবং তিনি খাইসুমা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ এরা এসব যা কিছু বলছে তা শুধু গর্ব, অবাধ্যতা, জিদ ও হঠকারিতার বশবর্তী হয়েই বলছে। এ নয় যে, তারা যা কিছু বলছে তা হয়ে গেলে তারা মুসলমান হয়ে যাবে। বরং এরপরেও তারা কোন কৌশল বের করবে। তাদের অন্তরে তো এটা বদ্ধমূল রয়েছে যে, কিয়ামত সংঘটিত হবেই না। আর এরূপ লোকদের জন্যেই আমি জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি। এটা তাদের সহ্যের বাইরে। দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীকার। জাহান্নাম ঐ দুষ্ট লোকদেরকে দেখে ক্রোধে দাঁতে আঙ্গুন কাটবে এবং ভীষণ গর্জন ও চীৎকার করবে যে, কখন সে ঐ কাফিরদেরকে গ্রাস করবে। আর কখন সে ঐ যালিমদের নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ওর মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা জাহান্নামের শব্দ শুনবে, আর তা হবে উদ্বেলিত। ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে।” (৬৭:৭-৮),নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার নাম দিয়ে এমন কথা বলে যা আমি বলিনি, যে ব্যক্তি নিজের পিতা-মাতাকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে নিজের পিতা-মাতা বলে, যে গোলাম নিজের মনিবকে বাদ দিয়ে অন্যকে নিজের মনিব বলে পরিচয় দেয় তারা যেন জাহান্নামের দুই চক্ষুর মাঝে নিজেদের বাসস্থান ঠিক করে নেয়।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জাহান্নামেরও কি দুই চক্ষু রয়েছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তুমি কি আল্লাহর কালামের নিম্নের আয়াতটি শুননি?” (আরবি)অর্থাৎ “যখন ওটা (জাহান্নাম) তাদেরকে দূর স্থান হতে দেখবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু ওয়ায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সাথে বের হই। আমাদের সাথে হযরত রাবী ইবনে খাইমও (রাঃ) ছিলেন। পথে একটি কামারের দোকান দেখা যায়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) সেখানে দাড়িয়ে যান। সেখানে লোহাকে আগুনে গরম করা হচ্ছিল তাই তিনি দেখতে ছিলেন। হযরত রাবী (রাঃ)-এর অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেল। আল্লাহর শাস্তির ছবি তার চোখের সামনে প্রকাশিত হলো। তাঁর অবস্থা এমনই হলো যে, যেন তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবেন। এরপর হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ফুরাতের তীরে গেলেন। সেখানে তিনি একটি চুল্লী দেখলেন যার মধ্যে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হচ্ছিল। হঠাৎ তার মুখ দিয়ে (আরবি) (অর্থাৎ দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীৎকার)। এটা শশানামাত্রই হযরত রাবী (রাঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। খাটের উপর উঠিয়ে নিয়ে তাঁকে তাঁর বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দেয়া হয়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তার পার্শ্বে বসে থাকেন এবং তাঁকে দেখা শোনা করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর আর জ্ঞান ফিরেনি।” (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নামীকে যখন জাহান্নামের দিকে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম ভীষণ চীৎকার করবে এবং ক্রোধে এমনভাবে ফেটে পড়বে যে হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, কোন কোন লোককে যখন জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম জড়সড় ও সংকুচিত হয়ে যাবে। তখন রহমান (দয়ালু আল্লাহ) জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমার কি হলো?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ তো দুআয় আপনার নিকট জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতো এবং আজও সে আশ্রয় প্রার্থনা করতে রয়েছে।” একথা শুনে তার প্রতি আল্লাহর দয়া হবে এবং তিনি নির্দেশ দিবেনঃ “তাকে ছেড়ে দাও।” আরও কতক লোককে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার সম্পর্কে তো এরূপ ধারণা আমাদের ছিল না।” আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের কিরূপ ধারণা ছিল?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমাদের ধারণা এটাই ছিল যে, আপনার রহমত আমাদেরকে ঢেকে নেবে, আপনার করুণা আমাদের অবস্থার অনুকূলে হবে এবং আপনার প্রশস্ত রহমত আমাদেরকে স্বীয় আঁচলে জড়িয়ে ফেলবে।” আল্লাহ তা'আলা তাদের আশাও পুরো করবেন এবং (ফেরেশতাদেরকে) নির্দেশ দিবেনঃ “আমার এই বান্দাদেরকেও ছেড়ে দাও।”আরো কিছু লোককে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসা হবে। তাদেরকে দেখা মাত্রই জাহান্নাম ক্রোধে চীৎকার করতে করতে এগিয়ে আসবে এবং এমনভাবে ক্রোধে ফেটে পড়বে যে, হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা ভীষণভাবে আতংকিত হবে। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম যখন ক্রোধে থরথর করে কাঁপতে থাকবে এবং ভীষণ চীৎকার শুরু করে দেবে ও কঠিন উত্তেজিত হয়ে উঠবে তখন সমস্ত নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতা এবং মর্যাদা সম্পন্ন। নবীগণ কম্পিত হবেন। এমনকি হযরত ইবরাহীম খলীলও (আঃ) হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন এবং বলতে থাকবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আজ আমি আপনার কাছে শুধু নিজের প্রাণ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করছি। আর কিছুই চাচ্ছি না।” এই লোকদেরকে জাহান্নামের অত্যন্ত সংকীর্ণ স্থান দিয়ে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হবে যেমনভাবে বর্শাকে ছিদ্রে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অন্য রিওয়াইয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা এবং তার নিম্নরূপ কথা বলা বর্ণিত আছেঃ “যেমনভাবে পেরেককে দেয়ালে অতি কষ্টে গেড়ে দেয়া হয় তেমনিভাবে জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামের মধ্যে ঠুসিয়ে দেয়া হবে।” ঐ সময় তারা শৃংখলিত অবস্থায় থাকবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যু কামনা করবে। তাদেরকে তখন বলা হবে। আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম ইবলীসকে জাহান্নামের পোশাক পরানো হবে। সে ওটা তার কপালের উপর রাখবে এবং পিছন হতে তার সন্তানদেরকে টানতে টানতে নিয়ে চলবে, আর মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করতঃ ফিরতে থাকবে। তার সাথে সাথে তার সন্তানরাও হায়! হায়! করবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে। ঐ সময় তাদেরকে বলা হবে- “আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)(আরবি) শব্দের ভাবার্থ হলো মৃত্যু, ধ্বংস, ক্ষতি, দুর্ভাগ্য ইত্যাদি। যেমন হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ অর্থাঃ “হে ফিরাউন! আমি তো মনে করি যে, তুমি ধ্বংসপ্রাপ্তই হবে।” (১৭:১০২)

আল-ফুরকান 25:13

৭-১৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা কাফিরদের আরো বোকামির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের অস্বীকার করার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলে তিনি পানাহারের মুখাপেক্ষী কেন? কেনই বা তিনি ব্যবসা ও লেনদেনের জন্যে বাজারে গমনাগমন করেন? তার সাথে কোন ফেরেশতাকে কেন অবতীর্ণ করা হয়নি? তাহলে তিনি তাঁকে সত্যায়িত করতেন, জনগণকে তার দ্বীনের দিকে আহ্বান করতেন এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে সতর্ক করতেন? ফিরাউনও একথাই বলেছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “তার উপর সোনার কংকন কেন নিক্ষেপ করা হয়নি কিংবা তার সাহায্যের জন্যে আকাশ থেকে কেন ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি?” (৪৩:৫৩)সমস্ত কাফিরের অন্তর একই বলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগের কাফিররাও বলেছিল- তাকে ধন-ভাণ্ডার দেয়া হয় না কেন অথবা তার একটি বাগান নেই। কেন যা হতে সে আহার সংগ্রহ করতে পারে? নিশ্চয়ই এ সবকিছু প্রদান করা আল্লাহর কাছে খুবই সহজ। কিন্তু সাথে সাথে এগুলো না দেয়ার মধ্যে নিপুণতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে।এই যালিমরা মুসলমানদেরকেও বিভ্রান্ত করতো। তারা তাদেরকে বলতো: ‘তোমরা এমন একজন লোকের অনুসরণ করছো যার উপর কেউ যাদু করেছে। তারা কতই না ভিত্তিহীন কথা বলছে! কোন একটি কথার উপর তারা স্থির থাকতে পারছে না। তারা কথাকে এদিক-ওদিক নিয়ে যাচ্ছে। কখনো বলছে যে, কেউ তার উপর যাদু করেছে, কখনো তাকে যাদুকর বলছে, কখনো বলছে যে, তিনি একজন কবি, কখনো বলছে যে, তার উপর জ্বিনের আসর হয়েছে, কখনো তাকে মিথ্যাবাদী বলছে, আবার কখনো বলছে যে, তিনি একজন পাগল। অথচ তাদের এসবই বাজে ও ভিত্তিহীন কথা। আর তারা যে ভুল কথা বলছে এটা এর দ্বারাও প্রকাশমান যে, স্বয়ং তাদের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী কথা রয়েছে। কোন একটি কথার উপর মুশরিকদের আস্থা নেই। তারা একবার একটি কথা বানিয়ে বলছে, তারপর ওটাকে ছেড়ে দিয়ে আর একটি কথা বানাচ্ছে এবং আবার ওটাকেও ছাড়ছে। একটি কথার উপর তারা অটল থাকতে পারছে না। সঠিক ও সত্য তো এটাই হয় যে, এ ব্যাপারে কোন দ্বন্দ্ব ও বিরোধ থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কত মহান তিনি যিনি ইচ্ছা করলে তোমাকে দিতে পারেন এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বস্তু উদ্যানসমূহ যার নিম্নদেশে নদী-নালা প্রবাহিত এবং দিতে পারেন প্রাসাদসমূহ।পাথর দ্বারা নির্মিত ঘরকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলে থাকে, তা বড়ই হোক বা ছোটই হোক।আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলা হয়েছিলঃ “তুমি যদি চাও তবে যমীনের ধন-ভাণ্ডার এবং এর চাবী আমি তোমাকে দিয়ে দিই। আর তোমাকে দুনিয়ার এত বড় মালিক করে দিই যে, এত বড় মালিকানা আমি তোমার পূর্বে কোন নবীকে দিইনি এবং তোমার পরে আর কাউকেও প্রদান করবো না। সাথে সাথে তোমার পারলৌকিক সমস্ত নিয়ামত ঠিকমতই থাকবে।” কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “সব কিছু আমার জন্যে আখিরাতেই জমা করা হোক (দুনিয়ায় আমার এগুলোর দরকার নেই)।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হাবীব ইবনে আবি সাবিত (রঃ) হতে এবং তিনি খাইসুমা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ এরা এসব যা কিছু বলছে তা শুধু গর্ব, অবাধ্যতা, জিদ ও হঠকারিতার বশবর্তী হয়েই বলছে। এ নয় যে, তারা যা কিছু বলছে তা হয়ে গেলে তারা মুসলমান হয়ে যাবে। বরং এরপরেও তারা কোন কৌশল বের করবে। তাদের অন্তরে তো এটা বদ্ধমূল রয়েছে যে, কিয়ামত সংঘটিত হবেই না। আর এরূপ লোকদের জন্যেই আমি জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি। এটা তাদের সহ্যের বাইরে। দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীকার। জাহান্নাম ঐ দুষ্ট লোকদেরকে দেখে ক্রোধে দাঁতে আঙ্গুন কাটবে এবং ভীষণ গর্জন ও চীৎকার করবে যে, কখন সে ঐ কাফিরদেরকে গ্রাস করবে। আর কখন সে ঐ যালিমদের নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ওর মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা জাহান্নামের শব্দ শুনবে, আর তা হবে উদ্বেলিত। ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে।” (৬৭:৭-৮),নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার নাম দিয়ে এমন কথা বলে যা আমি বলিনি, যে ব্যক্তি নিজের পিতা-মাতাকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে নিজের পিতা-মাতা বলে, যে গোলাম নিজের মনিবকে বাদ দিয়ে অন্যকে নিজের মনিব বলে পরিচয় দেয় তারা যেন জাহান্নামের দুই চক্ষুর মাঝে নিজেদের বাসস্থান ঠিক করে নেয়।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জাহান্নামেরও কি দুই চক্ষু রয়েছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তুমি কি আল্লাহর কালামের নিম্নের আয়াতটি শুননি?” (আরবি)অর্থাৎ “যখন ওটা (জাহান্নাম) তাদেরকে দূর স্থান হতে দেখবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু ওয়ায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সাথে বের হই। আমাদের সাথে হযরত রাবী ইবনে খাইমও (রাঃ) ছিলেন। পথে একটি কামারের দোকান দেখা যায়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) সেখানে দাড়িয়ে যান। সেখানে লোহাকে আগুনে গরম করা হচ্ছিল তাই তিনি দেখতে ছিলেন। হযরত রাবী (রাঃ)-এর অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেল। আল্লাহর শাস্তির ছবি তার চোখের সামনে প্রকাশিত হলো। তাঁর অবস্থা এমনই হলো যে, যেন তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবেন। এরপর হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ফুরাতের তীরে গেলেন। সেখানে তিনি একটি চুল্লী দেখলেন যার মধ্যে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হচ্ছিল। হঠাৎ তার মুখ দিয়ে (আরবি) (অর্থাৎ দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীৎকার)। এটা শশানামাত্রই হযরত রাবী (রাঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। খাটের উপর উঠিয়ে নিয়ে তাঁকে তাঁর বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দেয়া হয়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তার পার্শ্বে বসে থাকেন এবং তাঁকে দেখা শোনা করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর আর জ্ঞান ফিরেনি।” (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নামীকে যখন জাহান্নামের দিকে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম ভীষণ চীৎকার করবে এবং ক্রোধে এমনভাবে ফেটে পড়বে যে হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, কোন কোন লোককে যখন জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম জড়সড় ও সংকুচিত হয়ে যাবে। তখন রহমান (দয়ালু আল্লাহ) জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমার কি হলো?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ তো দুআয় আপনার নিকট জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতো এবং আজও সে আশ্রয় প্রার্থনা করতে রয়েছে।” একথা শুনে তার প্রতি আল্লাহর দয়া হবে এবং তিনি নির্দেশ দিবেনঃ “তাকে ছেড়ে দাও।” আরও কতক লোককে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার সম্পর্কে তো এরূপ ধারণা আমাদের ছিল না।” আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের কিরূপ ধারণা ছিল?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমাদের ধারণা এটাই ছিল যে, আপনার রহমত আমাদেরকে ঢেকে নেবে, আপনার করুণা আমাদের অবস্থার অনুকূলে হবে এবং আপনার প্রশস্ত রহমত আমাদেরকে স্বীয় আঁচলে জড়িয়ে ফেলবে।” আল্লাহ তা'আলা তাদের আশাও পুরো করবেন এবং (ফেরেশতাদেরকে) নির্দেশ দিবেনঃ “আমার এই বান্দাদেরকেও ছেড়ে দাও।”আরো কিছু লোককে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসা হবে। তাদেরকে দেখা মাত্রই জাহান্নাম ক্রোধে চীৎকার করতে করতে এগিয়ে আসবে এবং এমনভাবে ক্রোধে ফেটে পড়বে যে, হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা ভীষণভাবে আতংকিত হবে। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম যখন ক্রোধে থরথর করে কাঁপতে থাকবে এবং ভীষণ চীৎকার শুরু করে দেবে ও কঠিন উত্তেজিত হয়ে উঠবে তখন সমস্ত নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতা এবং মর্যাদা সম্পন্ন। নবীগণ কম্পিত হবেন। এমনকি হযরত ইবরাহীম খলীলও (আঃ) হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন এবং বলতে থাকবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আজ আমি আপনার কাছে শুধু নিজের প্রাণ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করছি। আর কিছুই চাচ্ছি না।” এই লোকদেরকে জাহান্নামের অত্যন্ত সংকীর্ণ স্থান দিয়ে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হবে যেমনভাবে বর্শাকে ছিদ্রে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অন্য রিওয়াইয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা এবং তার নিম্নরূপ কথা বলা বর্ণিত আছেঃ “যেমনভাবে পেরেককে দেয়ালে অতি কষ্টে গেড়ে দেয়া হয় তেমনিভাবে জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামের মধ্যে ঠুসিয়ে দেয়া হবে।” ঐ সময় তারা শৃংখলিত অবস্থায় থাকবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যু কামনা করবে। তাদেরকে তখন বলা হবে। আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম ইবলীসকে জাহান্নামের পোশাক পরানো হবে। সে ওটা তার কপালের উপর রাখবে এবং পিছন হতে তার সন্তানদেরকে টানতে টানতে নিয়ে চলবে, আর মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করতঃ ফিরতে থাকবে। তার সাথে সাথে তার সন্তানরাও হায়! হায়! করবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে। ঐ সময় তাদেরকে বলা হবে- “আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)(আরবি) শব্দের ভাবার্থ হলো মৃত্যু, ধ্বংস, ক্ষতি, দুর্ভাগ্য ইত্যাদি। যেমন হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ অর্থাঃ “হে ফিরাউন! আমি তো মনে করি যে, তুমি ধ্বংসপ্রাপ্তই হবে।” (১৭:১০২)

আল-ফুরকান 25:14

৭-১৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা কাফিরদের আরো বোকামির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের অস্বীকার করার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলে তিনি পানাহারের মুখাপেক্ষী কেন? কেনই বা তিনি ব্যবসা ও লেনদেনের জন্যে বাজারে গমনাগমন করেন? তার সাথে কোন ফেরেশতাকে কেন অবতীর্ণ করা হয়নি? তাহলে তিনি তাঁকে সত্যায়িত করতেন, জনগণকে তার দ্বীনের দিকে আহ্বান করতেন এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে সতর্ক করতেন? ফিরাউনও একথাই বলেছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “তার উপর সোনার কংকন কেন নিক্ষেপ করা হয়নি কিংবা তার সাহায্যের জন্যে আকাশ থেকে কেন ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয়নি?” (৪৩:৫৩)সমস্ত কাফিরের অন্তর একই বলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগের কাফিররাও বলেছিল- তাকে ধন-ভাণ্ডার দেয়া হয় না কেন অথবা তার একটি বাগান নেই। কেন যা হতে সে আহার সংগ্রহ করতে পারে? নিশ্চয়ই এ সবকিছু প্রদান করা আল্লাহর কাছে খুবই সহজ। কিন্তু সাথে সাথে এগুলো না দেয়ার মধ্যে নিপুণতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে।এই যালিমরা মুসলমানদেরকেও বিভ্রান্ত করতো। তারা তাদেরকে বলতো: ‘তোমরা এমন একজন লোকের অনুসরণ করছো যার উপর কেউ যাদু করেছে। তারা কতই না ভিত্তিহীন কথা বলছে! কোন একটি কথার উপর তারা স্থির থাকতে পারছে না। তারা কথাকে এদিক-ওদিক নিয়ে যাচ্ছে। কখনো বলছে যে, কেউ তার উপর যাদু করেছে, কখনো তাকে যাদুকর বলছে, কখনো বলছে যে, তিনি একজন কবি, কখনো বলছে যে, তার উপর জ্বিনের আসর হয়েছে, কখনো তাকে মিথ্যাবাদী বলছে, আবার কখনো বলছে যে, তিনি একজন পাগল। অথচ তাদের এসবই বাজে ও ভিত্তিহীন কথা। আর তারা যে ভুল কথা বলছে এটা এর দ্বারাও প্রকাশমান যে, স্বয়ং তাদের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী কথা রয়েছে। কোন একটি কথার উপর মুশরিকদের আস্থা নেই। তারা একবার একটি কথা বানিয়ে বলছে, তারপর ওটাকে ছেড়ে দিয়ে আর একটি কথা বানাচ্ছে এবং আবার ওটাকেও ছাড়ছে। একটি কথার উপর তারা অটল থাকতে পারছে না। সঠিক ও সত্য তো এটাই হয় যে, এ ব্যাপারে কোন দ্বন্দ্ব ও বিরোধ থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন যে, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কত মহান তিনি যিনি ইচ্ছা করলে তোমাকে দিতে পারেন এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বস্তু উদ্যানসমূহ যার নিম্নদেশে নদী-নালা প্রবাহিত এবং দিতে পারেন প্রাসাদসমূহ।পাথর দ্বারা নির্মিত ঘরকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলে থাকে, তা বড়ই হোক বা ছোটই হোক।আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলা হয়েছিলঃ “তুমি যদি চাও তবে যমীনের ধন-ভাণ্ডার এবং এর চাবী আমি তোমাকে দিয়ে দিই। আর তোমাকে দুনিয়ার এত বড় মালিক করে দিই যে, এত বড় মালিকানা আমি তোমার পূর্বে কোন নবীকে দিইনি এবং তোমার পরে আর কাউকেও প্রদান করবো না। সাথে সাথে তোমার পারলৌকিক সমস্ত নিয়ামত ঠিকমতই থাকবে।” কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “সব কিছু আমার জন্যে আখিরাতেই জমা করা হোক (দুনিয়ায় আমার এগুলোর দরকার নেই)।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হাবীব ইবনে আবি সাবিত (রঃ) হতে এবং তিনি খাইসুমা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ এরা এসব যা কিছু বলছে তা শুধু গর্ব, অবাধ্যতা, জিদ ও হঠকারিতার বশবর্তী হয়েই বলছে। এ নয় যে, তারা যা কিছু বলছে তা হয়ে গেলে তারা মুসলমান হয়ে যাবে। বরং এরপরেও তারা কোন কৌশল বের করবে। তাদের অন্তরে তো এটা বদ্ধমূল রয়েছে যে, কিয়ামত সংঘটিত হবেই না। আর এরূপ লোকদের জন্যেই আমি জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি। এটা তাদের সহ্যের বাইরে। দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীকার। জাহান্নাম ঐ দুষ্ট লোকদেরকে দেখে ক্রোধে দাঁতে আঙ্গুন কাটবে এবং ভীষণ গর্জন ও চীৎকার করবে যে, কখন সে ঐ কাফিরদেরকে গ্রাস করবে। আর কখন সে ঐ যালিমদের নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ওর মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা জাহান্নামের শব্দ শুনবে, আর তা হবে উদ্বেলিত। ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে।” (৬৭:৭-৮),নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার নাম দিয়ে এমন কথা বলে যা আমি বলিনি, যে ব্যক্তি নিজের পিতা-মাতাকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে নিজের পিতা-মাতা বলে, যে গোলাম নিজের মনিবকে বাদ দিয়ে অন্যকে নিজের মনিব বলে পরিচয় দেয় তারা যেন জাহান্নামের দুই চক্ষুর মাঝে নিজেদের বাসস্থান ঠিক করে নেয়।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জাহান্নামেরও কি দুই চক্ষু রয়েছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তুমি কি আল্লাহর কালামের নিম্নের আয়াতটি শুননি?” (আরবি)অর্থাৎ “যখন ওটা (জাহান্নাম) তাদেরকে দূর স্থান হতে দেখবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু ওয়ায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সাথে বের হই। আমাদের সাথে হযরত রাবী ইবনে খাইমও (রাঃ) ছিলেন। পথে একটি কামারের দোকান দেখা যায়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) সেখানে দাড়িয়ে যান। সেখানে লোহাকে আগুনে গরম করা হচ্ছিল তাই তিনি দেখতে ছিলেন। হযরত রাবী (রাঃ)-এর অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেল। আল্লাহর শাস্তির ছবি তার চোখের সামনে প্রকাশিত হলো। তাঁর অবস্থা এমনই হলো যে, যেন তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবেন। এরপর হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ফুরাতের তীরে গেলেন। সেখানে তিনি একটি চুল্লী দেখলেন যার মধ্যে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হচ্ছিল। হঠাৎ তার মুখ দিয়ে (আরবি) (অর্থাৎ দূর হতে অগ্নি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা শুনতে পাবে এর ক্রুদ্ধ গর্জন ও চীৎকার)। এটা শশানামাত্রই হযরত রাবী (রাঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। খাটের উপর উঠিয়ে নিয়ে তাঁকে তাঁর বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দেয়া হয়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তার পার্শ্বে বসে থাকেন এবং তাঁকে দেখা শোনা করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর আর জ্ঞান ফিরেনি।” (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নামীকে যখন জাহান্নামের দিকে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম ভীষণ চীৎকার করবে এবং ক্রোধে এমনভাবে ফেটে পড়বে যে হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, কোন কোন লোককে যখন জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নাম জড়সড় ও সংকুচিত হয়ে যাবে। তখন রহমান (দয়ালু আল্লাহ) জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমার কি হলো?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! এ তো দুআয় আপনার নিকট জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতো এবং আজও সে আশ্রয় প্রার্থনা করতে রয়েছে।” একথা শুনে তার প্রতি আল্লাহর দয়া হবে এবং তিনি নির্দেশ দিবেনঃ “তাকে ছেড়ে দাও।” আরও কতক লোককে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার সম্পর্কে তো এরূপ ধারণা আমাদের ছিল না।” আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমাদের কিরূপ ধারণা ছিল?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমাদের ধারণা এটাই ছিল যে, আপনার রহমত আমাদেরকে ঢেকে নেবে, আপনার করুণা আমাদের অবস্থার অনুকূলে হবে এবং আপনার প্রশস্ত রহমত আমাদেরকে স্বীয় আঁচলে জড়িয়ে ফেলবে।” আল্লাহ তা'আলা তাদের আশাও পুরো করবেন এবং (ফেরেশতাদেরকে) নির্দেশ দিবেনঃ “আমার এই বান্দাদেরকেও ছেড়ে দাও।”আরো কিছু লোককে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসা হবে। তাদেরকে দেখা মাত্রই জাহান্নাম ক্রোধে চীৎকার করতে করতে এগিয়ে আসবে এবং এমনভাবে ক্রোধে ফেটে পড়বে যে, হাশরের মাঠে উপস্থিত জনতা ভীষণভাবে আতংকিত হবে। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম যখন ক্রোধে থরথর করে কাঁপতে থাকবে এবং ভীষণ চীৎকার শুরু করে দেবে ও কঠিন উত্তেজিত হয়ে উঠবে তখন সমস্ত নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতা এবং মর্যাদা সম্পন্ন। নবীগণ কম্পিত হবেন। এমনকি হযরত ইবরাহীম খলীলও (আঃ) হাঁটুর ভরে পড়ে যাবেন এবং বলতে থাকবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আজ আমি আপনার কাছে শুধু নিজের প্রাণ রক্ষার জন্যে প্রার্থনা করছি। আর কিছুই চাচ্ছি না।” এই লোকদেরকে জাহান্নামের অত্যন্ত সংকীর্ণ স্থান দিয়ে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হবে যেমনভাবে বর্শাকে ছিদ্রে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অন্য রিওয়াইয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা এবং তার নিম্নরূপ কথা বলা বর্ণিত আছেঃ “যেমনভাবে পেরেককে দেয়ালে অতি কষ্টে গেড়ে দেয়া হয় তেমনিভাবে জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামের মধ্যে ঠুসিয়ে দেয়া হবে।” ঐ সময় তারা শৃংখলিত অবস্থায় থাকবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যু কামনা করবে। তাদেরকে তখন বলা হবে। আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম ইবলীসকে জাহান্নামের পোশাক পরানো হবে। সে ওটা তার কপালের উপর রাখবে এবং পিছন হতে তার সন্তানদেরকে টানতে টানতে নিয়ে চলবে, আর মৃত্যু ও ধ্বংস কামনা করতঃ ফিরতে থাকবে। তার সাথে সাথে তার সন্তানরাও হায়! হায়! করবে এবং ধ্বংস ও মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে। ঐ সময় তাদেরকে বলা হবে- “আজ তোমরা একবারের জন্যে ধ্বংস কামনা করো না, বরং বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাকো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)(আরবি) শব্দের ভাবার্থ হলো মৃত্যু, ধ্বংস, ক্ষতি, দুর্ভাগ্য ইত্যাদি। যেমন হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ অর্থাঃ “হে ফিরাউন! আমি তো মনে করি যে, তুমি ধ্বংসপ্রাপ্তই হবে।” (১৭:১০২)

আল-ফুরকান 25:15

১৫-১৬ নং আয়াতের তাফসীরপূর্ববর্তী আয়াতসমূহে ঐ দুষ্ট ও পাপীদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যাদেরকে অত্যন্ত লাঞ্ছিত অবস্থায় উল্টোমুখে জাহান্নামের দিকে টেনে আনা হবে এবং মাথার ভরে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করা হবে। ঐ সময় তারা শৃংখলিত থাকবে। তারা থাকবে অত্যন্ত সংকীর্ণ স্থানে, যেখান থেকে না তারা ছুটতে পারবে, নড়তে পারবে, না পালাতে পারবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি কাফির ও মুশরিকদেরকে জিজ্ঞেস কর- এটাই কি শ্রেয়, না স্থায়ী জান্নাত শ্রেয়, যার প্রতিশ্রুতি মুত্তাকীদেরকে দেয়া হয়েছে? অর্থাৎ দুনিয়ায় যারা পাপকর্ম হতে বেঁচে থেকেছে এবং আল্লাহর ভয় অন্তরে রেখেছে, আজ তারা ওর বিনিময়ে প্রকৃত বাসস্থানে পৌঁছে গেছে, অর্থাৎ জান্নাতে। সেখানে রয়েছে তাদের চাহিদামত নিয়ামতরাজি, চিরস্থায়ী ভোগ্যবস্তু এবং এমন আনন্দের জিনিস যা কখনো শেষ হবার নয়। তথায় আছে সুস্বাদু ও উপাদেয় খাদ্য, উত্তম বিছানাপত্র, ভাল ভাল যানবাহন, সুন্দর সুন্দর পোশাক, চমৎকার বাসস্থান, সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিতা সুলোচনা হুরগণ এবং আরাম ও শান্তিদায়ক দৃশ্য। এগুলো চোখে দেখা তো দূরের কথা, কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারে না। এগুলো কমে যাবার, খারাপ হওয়ার, ভেঙ্গে যাবার এবং শেষ হয়ে যাওয়ার কোনই আশংকা নেই। তার। সেখান হতে কখনো বহিষ্কৃত হবে না। তারা সেখানে চিরন্তন উত্তম জীবন, সীমাহীন রহমত এবং চিরস্থায়ী সম্পদ লাভ করবে। এ সবগুলো হলো প্রতিপালকের ইহসান ও ইনআম, যা তারা লাভ করেছে এবং যেগুলো তাদের প্রাপ্য ছিল। এটা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুতি যা তিনি নিজের দায়িত্বে গ্রহণ করেছেন। এটা পূর্ণ হবেই। এটা পূর্ণ না হওয়া অসম্ভব এবং এটা ভুল হওয়াও সম্ভব নয়। তাঁর কাছে তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্যে প্রার্থনা কর। তার কাছে জান্নাত চাও এবং তাঁকে তাঁর প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দাও। এটাও তাঁর অনুগ্রহ যে, ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার মুমিন বান্দাদের সাথে আপনি যে ওয়াদা করেছেন তা পূরণ করুন এবং তাদেরকে জান্নাতে আদনে প্রবেশ করিয়ে দিন।” আিমতের দিন মুমিন বান্দারা বলবেনঃ “হে বিশ্বপ্রতিপালক! আমরা আপনার কিতিকে সামনে রেখে আমল করেছিলাম। আজ আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি পূরণ করুন।”এখানে প্রথমে জাহান্নামীদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। অতঃপর প্রার্থনার পরে অতীদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সূরায়ে সফফাতে জান্নাতীদের সম্পর্কে আলোচনা করতঃ প্রার্থনার পরে জাহান্নামীদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সেখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেছেনঃ “আপ্যায়নের জন্যে এটাই শ্রেয়, না যাককূম বৃক্ষ? যালিমদের জন্যে আমি এটা সৃষ্টি করেছি পরীক্ষা স্বরূপ। এই বৃক্ষ উপাত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে। এর মোচা যেন শয়তানের মাথা। তারা এটা হতে ভক্ষণ করবে এবং উদর পূর্ণ করবে এটা দ্বারা। তদুপরি তাদের জন্যে থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ। আর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে। তারা তাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছিল বিপথগামী এবং তারা তাদের পদাংক অনুসরণে ধাবিত হয়েছিল।

আল-ফুরকান 25:16

১৫-১৬ নং আয়াতের তাফসীরপূর্ববর্তী আয়াতসমূহে ঐ দুষ্ট ও পাপীদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যাদেরকে অত্যন্ত লাঞ্ছিত অবস্থায় উল্টোমুখে জাহান্নামের দিকে টেনে আনা হবে এবং মাথার ভরে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করা হবে। ঐ সময় তারা শৃংখলিত থাকবে। তারা থাকবে অত্যন্ত সংকীর্ণ স্থানে, যেখান থেকে না তারা ছুটতে পারবে, নড়তে পারবে, না পালাতে পারবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি কাফির ও মুশরিকদেরকে জিজ্ঞেস কর- এটাই কি শ্রেয়, না স্থায়ী জান্নাত শ্রেয়, যার প্রতিশ্রুতি মুত্তাকীদেরকে দেয়া হয়েছে? অর্থাৎ দুনিয়ায় যারা পাপকর্ম হতে বেঁচে থেকেছে এবং আল্লাহর ভয় অন্তরে রেখেছে, আজ তারা ওর বিনিময়ে প্রকৃত বাসস্থানে পৌঁছে গেছে, অর্থাৎ জান্নাতে। সেখানে রয়েছে তাদের চাহিদামত নিয়ামতরাজি, চিরস্থায়ী ভোগ্যবস্তু এবং এমন আনন্দের জিনিস যা কখনো শেষ হবার নয়। তথায় আছে সুস্বাদু ও উপাদেয় খাদ্য, উত্তম বিছানাপত্র, ভাল ভাল যানবাহন, সুন্দর সুন্দর পোশাক, চমৎকার বাসস্থান, সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিতা সুলোচনা হুরগণ এবং আরাম ও শান্তিদায়ক দৃশ্য। এগুলো চোখে দেখা তো দূরের কথা, কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারে না। এগুলো কমে যাবার, খারাপ হওয়ার, ভেঙ্গে যাবার এবং শেষ হয়ে যাওয়ার কোনই আশংকা নেই। তার। সেখান হতে কখনো বহিষ্কৃত হবে না। তারা সেখানে চিরন্তন উত্তম জীবন, সীমাহীন রহমত এবং চিরস্থায়ী সম্পদ লাভ করবে। এ সবগুলো হলো প্রতিপালকের ইহসান ও ইনআম, যা তারা লাভ করেছে এবং যেগুলো তাদের প্রাপ্য ছিল। এটা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুতি যা তিনি নিজের দায়িত্বে গ্রহণ করেছেন। এটা পূর্ণ হবেই। এটা পূর্ণ না হওয়া অসম্ভব এবং এটা ভুল হওয়াও সম্ভব নয়। তাঁর কাছে তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্যে প্রার্থনা কর। তার কাছে জান্নাত চাও এবং তাঁকে তাঁর প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দাও। এটাও তাঁর অনুগ্রহ যে, ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার মুমিন বান্দাদের সাথে আপনি যে ওয়াদা করেছেন তা পূরণ করুন এবং তাদেরকে জান্নাতে আদনে প্রবেশ করিয়ে দিন।” আিমতের দিন মুমিন বান্দারা বলবেনঃ “হে বিশ্বপ্রতিপালক! আমরা আপনার কিতিকে সামনে রেখে আমল করেছিলাম। আজ আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি পূরণ করুন।”এখানে প্রথমে জাহান্নামীদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। অতঃপর প্রার্থনার পরে অতীদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সূরায়ে সফফাতে জান্নাতীদের সম্পর্কে আলোচনা করতঃ প্রার্থনার পরে জাহান্নামীদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সেখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেছেনঃ “আপ্যায়নের জন্যে এটাই শ্রেয়, না যাককূম বৃক্ষ? যালিমদের জন্যে আমি এটা সৃষ্টি করেছি পরীক্ষা স্বরূপ। এই বৃক্ষ উপাত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে। এর মোচা যেন শয়তানের মাথা। তারা এটা হতে ভক্ষণ করবে এবং উদর পূর্ণ করবে এটা দ্বারা। তদুপরি তাদের জন্যে থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ। আর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে। তারা তাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছিল বিপথগামী এবং তারা তাদের পদাংক অনুসরণে ধাবিত হয়েছিল।

আল-ফুরকান 25:17

১৭-১৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য যেসব মা’রূদের ইবাদত করতো, কিয়ামতের দিন তাদেরকে তাদের সামনে শাস্তি প্রদান ছাড়াও মৌখিকভাবেও তিরস্কার করা হবে, যাতে তারা লজ্জিত হয়। হযরত ঈসা (আঃ), হযরত উযায়ের (আঃ) এবং ফেরেশতামণ্ডলী, যাদের যাদের উপাসনা করা হতো তারা সবাই সেদিন বিদ্যমান থাকবেন এবং সমাবেশে ইবাদতকারীরাও হাযির থাকবে। ঐ সময় আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ঐ উপাস্যদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমরা কি আমার এই বান্দাদেরকে তোমাদের উপাসনা করতে বলেছিলে, না তারা নিজেদের ইচ্ছাতেই তোমাদের ইবাদত করতে শুরু করে দিয়েছিল?” হযরত ঈসা (আঃ)-কেও অনুরূপ প্রশ্ন করা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ যখন বলবেন, হে মারইয়াম তনয় ঈসা (আঃ)! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে- তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে মা'বূদ রূপে গ্রহণ কর? সে বলবেঃ আপনিই মহিমান্বিত! যা বলার আমার অধিকার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়। যদি আমি তা বলতাম তবে আপনি তা জানতেন। আমার অন্তরের কথা তো আপনি অবগত আছেন, কিন্তু আপনার অন্তরের কথা আমি অবগত নই; আপনি তো অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। আপনি আমাকে যে আদেশ করেছেন তা ব্যতীত তাদেরকে আমি কিছুই বলিনি। (শেষ পর্যন্ত)।”দ্রুপ এসব উপাস্য যাঁদের মুশরিকরা আল্লাহ ব্যতীত উপাসনা করতো এবং ভরা আল্লাহর খাঁটি বান্দা ও শিরকের প্রতি অসন্তুষ্ট, উত্তরে বলবেনঃ “কোন মাখলুকের, আমাদের ও তাদের জন্যে এটা শোভনীয় ছিল না যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা করে। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা কখনো তাদেরকে শিরকের শিক্ষা দিইনি। তারা নিজেদের ইচ্ছাতেই অন্যদের পূজা শুরু করে দিয়েছিল। আমরা তাদের থেকে এবং তাদের উপাসনা থেকে অসন্তুষ্ট। আমরা তাদের ঐ শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আমরা তো নিজেরাই আপনার উপাসনাকারী। সুতরাং আমাদের পক্ষে উপাস্যের পদে অধিষ্ঠিত হওয়া কী করে সম্ভব? আমরা তো মোটেই এর যোগ্যতা রাখতাম না। আপনার সত্তা এর থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র যে, কেউ আপনার অংশীদার হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেন (আরবি) অর্থাৎ “যেদিন তিনি তাদের সকলকে একত্রিত করবেন, অতঃপর ফেরেশতাদেরকে বলবেন- এরা কি তোমাদেরই উপাসনা করতো? তারা বলবেআমরা আপনার মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” (৩৪:৪০-৪১)(আরবি) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবি) ও রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের জন্যে এটা উপযুক্ত ছিল না যে, লোকেরা আমাদের উপাসনা করতে শুরু করে দেয় এবং আপনার ইবাদত পরিত্যাগ করে। কেননা, আমরা তো আপনার দ্বারের ভিখারী। দুই অবস্থাতেই ভাবার্থ কাছাকাছি একই।তাদের বিভ্রান্তির কারণ আমরা এটাই বুঝি যে, তারা বয়স পেয়েছিল, তারা পানাহারের বস্তু যথেষ্ট পরিমাণে লাভ করেছিল, কাজেই তারা ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। এমনকি রাসূলদের মাধ্যমে যে উপদেশাবলী তাদের নিকট পৌঁছেছিল সেগুলোও তারা ভুলে বসেছিল। তারা আপনার উপাসনা ও তাওহীদ হতে সরে পড়েছিল। তারা এসব হতে ছিল সম্পূর্ণরূপে উদাসীন। তাই তারা ধ্বংসের গর্তে নিক্ষিপ্ত হয় এবং তাদের সর্বনাশ ঘটে। (আরবি) শব্দ দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্তই বুঝানো হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ মুশরিকদেরকে বলবেনঃ এখন তোমাদের উপাস্যরা তো তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে। তোমরা তো তাদেরকে নিজের মনে করে এই বিশ্বাস রেখে তাদের উপাসনা শুরু করে দিয়েছিলে যে, তাদের মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে। কিন্তু আজ তো তারা তোমাদেরকে ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে, তোমাদের থেকে পৃথক হচ্ছে এবং তোমাদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তার চেয়ে বড় পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে যে আল্লাহ ব্যতীত এমন মা’রূদকে আহবান করে যে কিয়ামতের দিন তার আহ্বানে সাড়া দেবে না? আর তারা তাদের আহ্বান হতে উদাসীন থাকবে। যখন মানুষকে একত্রিত করা হবে। তখন তারা (উপাস্যরা) তাদের (উপাস্যদের) শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের উপাসনাকে পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করবে।” (৪৬: ৫-৬) সুতরাং কিয়ামতের দিন এই মুশরিকরা না নিজেদের থেকে আল্লাহর শাস্তি দূর করতে পারবে, না নিজেদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম হবে, না কাউকেও নিজেদের সাহাযাকারীরূপে প্রাপ্ত হবে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের মধ্যে যে সীমালংঘন করবে আমি তাকে মহাশাস্তি আস্বাদন করাবো।

আল-ফুরকান 25:18

১৭-১৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য যেসব মা’রূদের ইবাদত করতো, কিয়ামতের দিন তাদেরকে তাদের সামনে শাস্তি প্রদান ছাড়াও মৌখিকভাবেও তিরস্কার করা হবে, যাতে তারা লজ্জিত হয়। হযরত ঈসা (আঃ), হযরত উযায়ের (আঃ) এবং ফেরেশতামণ্ডলী, যাদের যাদের উপাসনা করা হতো তারা সবাই সেদিন বিদ্যমান থাকবেন এবং সমাবেশে ইবাদতকারীরাও হাযির থাকবে। ঐ সময় আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ঐ উপাস্যদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমরা কি আমার এই বান্দাদেরকে তোমাদের উপাসনা করতে বলেছিলে, না তারা নিজেদের ইচ্ছাতেই তোমাদের ইবাদত করতে শুরু করে দিয়েছিল?” হযরত ঈসা (আঃ)-কেও অনুরূপ প্রশ্ন করা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ যখন বলবেন, হে মারইয়াম তনয় ঈসা (আঃ)! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে- তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে মা'বূদ রূপে গ্রহণ কর? সে বলবেঃ আপনিই মহিমান্বিত! যা বলার আমার অধিকার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়। যদি আমি তা বলতাম তবে আপনি তা জানতেন। আমার অন্তরের কথা তো আপনি অবগত আছেন, কিন্তু আপনার অন্তরের কথা আমি অবগত নই; আপনি তো অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। আপনি আমাকে যে আদেশ করেছেন তা ব্যতীত তাদেরকে আমি কিছুই বলিনি। (শেষ পর্যন্ত)।”দ্রুপ এসব উপাস্য যাঁদের মুশরিকরা আল্লাহ ব্যতীত উপাসনা করতো এবং ভরা আল্লাহর খাঁটি বান্দা ও শিরকের প্রতি অসন্তুষ্ট, উত্তরে বলবেনঃ “কোন মাখলুকের, আমাদের ও তাদের জন্যে এটা শোভনীয় ছিল না যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা করে। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা কখনো তাদেরকে শিরকের শিক্ষা দিইনি। তারা নিজেদের ইচ্ছাতেই অন্যদের পূজা শুরু করে দিয়েছিল। আমরা তাদের থেকে এবং তাদের উপাসনা থেকে অসন্তুষ্ট। আমরা তাদের ঐ শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আমরা তো নিজেরাই আপনার উপাসনাকারী। সুতরাং আমাদের পক্ষে উপাস্যের পদে অধিষ্ঠিত হওয়া কী করে সম্ভব? আমরা তো মোটেই এর যোগ্যতা রাখতাম না। আপনার সত্তা এর থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র যে, কেউ আপনার অংশীদার হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেন (আরবি) অর্থাৎ “যেদিন তিনি তাদের সকলকে একত্রিত করবেন, অতঃপর ফেরেশতাদেরকে বলবেন- এরা কি তোমাদেরই উপাসনা করতো? তারা বলবেআমরা আপনার মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” (৩৪:৪০-৪১)(আরবি) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবি) ও রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের জন্যে এটা উপযুক্ত ছিল না যে, লোকেরা আমাদের উপাসনা করতে শুরু করে দেয় এবং আপনার ইবাদত পরিত্যাগ করে। কেননা, আমরা তো আপনার দ্বারের ভিখারী। দুই অবস্থাতেই ভাবার্থ কাছাকাছি একই।তাদের বিভ্রান্তির কারণ আমরা এটাই বুঝি যে, তারা বয়স পেয়েছিল, তারা পানাহারের বস্তু যথেষ্ট পরিমাণে লাভ করেছিল, কাজেই তারা ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। এমনকি রাসূলদের মাধ্যমে যে উপদেশাবলী তাদের নিকট পৌঁছেছিল সেগুলোও তারা ভুলে বসেছিল। তারা আপনার উপাসনা ও তাওহীদ হতে সরে পড়েছিল। তারা এসব হতে ছিল সম্পূর্ণরূপে উদাসীন। তাই তারা ধ্বংসের গর্তে নিক্ষিপ্ত হয় এবং তাদের সর্বনাশ ঘটে। (আরবি) শব্দ দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্তই বুঝানো হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ মুশরিকদেরকে বলবেনঃ এখন তোমাদের উপাস্যরা তো তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে। তোমরা তো তাদেরকে নিজের মনে করে এই বিশ্বাস রেখে তাদের উপাসনা শুরু করে দিয়েছিলে যে, তাদের মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে। কিন্তু আজ তো তারা তোমাদেরকে ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে, তোমাদের থেকে পৃথক হচ্ছে এবং তোমাদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তার চেয়ে বড় পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে যে আল্লাহ ব্যতীত এমন মা’রূদকে আহবান করে যে কিয়ামতের দিন তার আহ্বানে সাড়া দেবে না? আর তারা তাদের আহ্বান হতে উদাসীন থাকবে। যখন মানুষকে একত্রিত করা হবে। তখন তারা (উপাস্যরা) তাদের (উপাস্যদের) শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের উপাসনাকে পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করবে।” (৪৬: ৫-৬) সুতরাং কিয়ামতের দিন এই মুশরিকরা না নিজেদের থেকে আল্লাহর শাস্তি দূর করতে পারবে, না নিজেদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম হবে, না কাউকেও নিজেদের সাহাযাকারীরূপে প্রাপ্ত হবে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের মধ্যে যে সীমালংঘন করবে আমি তাকে মহাশাস্তি আস্বাদন করাবো।

আল-ফুরকান 25:19

১৭-১৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য যেসব মা’রূদের ইবাদত করতো, কিয়ামতের দিন তাদেরকে তাদের সামনে শাস্তি প্রদান ছাড়াও মৌখিকভাবেও তিরস্কার করা হবে, যাতে তারা লজ্জিত হয়। হযরত ঈসা (আঃ), হযরত উযায়ের (আঃ) এবং ফেরেশতামণ্ডলী, যাদের যাদের উপাসনা করা হতো তারা সবাই সেদিন বিদ্যমান থাকবেন এবং সমাবেশে ইবাদতকারীরাও হাযির থাকবে। ঐ সময় আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ঐ উপাস্যদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমরা কি আমার এই বান্দাদেরকে তোমাদের উপাসনা করতে বলেছিলে, না তারা নিজেদের ইচ্ছাতেই তোমাদের ইবাদত করতে শুরু করে দিয়েছিল?” হযরত ঈসা (আঃ)-কেও অনুরূপ প্রশ্ন করা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ যখন বলবেন, হে মারইয়াম তনয় ঈসা (আঃ)! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে- তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে মা'বূদ রূপে গ্রহণ কর? সে বলবেঃ আপনিই মহিমান্বিত! যা বলার আমার অধিকার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়। যদি আমি তা বলতাম তবে আপনি তা জানতেন। আমার অন্তরের কথা তো আপনি অবগত আছেন, কিন্তু আপনার অন্তরের কথা আমি অবগত নই; আপনি তো অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। আপনি আমাকে যে আদেশ করেছেন তা ব্যতীত তাদেরকে আমি কিছুই বলিনি। (শেষ পর্যন্ত)।”দ্রুপ এসব উপাস্য যাঁদের মুশরিকরা আল্লাহ ব্যতীত উপাসনা করতো এবং ভরা আল্লাহর খাঁটি বান্দা ও শিরকের প্রতি অসন্তুষ্ট, উত্তরে বলবেনঃ “কোন মাখলুকের, আমাদের ও তাদের জন্যে এটা শোভনীয় ছিল না যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা করে। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা কখনো তাদেরকে শিরকের শিক্ষা দিইনি। তারা নিজেদের ইচ্ছাতেই অন্যদের পূজা শুরু করে দিয়েছিল। আমরা তাদের থেকে এবং তাদের উপাসনা থেকে অসন্তুষ্ট। আমরা তাদের ঐ শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আমরা তো নিজেরাই আপনার উপাসনাকারী। সুতরাং আমাদের পক্ষে উপাস্যের পদে অধিষ্ঠিত হওয়া কী করে সম্ভব? আমরা তো মোটেই এর যোগ্যতা রাখতাম না। আপনার সত্তা এর থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র যে, কেউ আপনার অংশীদার হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেন (আরবি) অর্থাৎ “যেদিন তিনি তাদের সকলকে একত্রিত করবেন, অতঃপর ফেরেশতাদেরকে বলবেন- এরা কি তোমাদেরই উপাসনা করতো? তারা বলবেআমরা আপনার মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” (৩৪:৪০-৪১)(আরবি) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবি) ও রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের জন্যে এটা উপযুক্ত ছিল না যে, লোকেরা আমাদের উপাসনা করতে শুরু করে দেয় এবং আপনার ইবাদত পরিত্যাগ করে। কেননা, আমরা তো আপনার দ্বারের ভিখারী। দুই অবস্থাতেই ভাবার্থ কাছাকাছি একই।তাদের বিভ্রান্তির কারণ আমরা এটাই বুঝি যে, তারা বয়স পেয়েছিল, তারা পানাহারের বস্তু যথেষ্ট পরিমাণে লাভ করেছিল, কাজেই তারা ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। এমনকি রাসূলদের মাধ্যমে যে উপদেশাবলী তাদের নিকট পৌঁছেছিল সেগুলোও তারা ভুলে বসেছিল। তারা আপনার উপাসনা ও তাওহীদ হতে সরে পড়েছিল। তারা এসব হতে ছিল সম্পূর্ণরূপে উদাসীন। তাই তারা ধ্বংসের গর্তে নিক্ষিপ্ত হয় এবং তাদের সর্বনাশ ঘটে। (আরবি) শব্দ দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্তই বুঝানো হয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ মুশরিকদেরকে বলবেনঃ এখন তোমাদের উপাস্যরা তো তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে। তোমরা তো তাদেরকে নিজের মনে করে এই বিশ্বাস রেখে তাদের উপাসনা শুরু করে দিয়েছিলে যে, তাদের মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে। কিন্তু আজ তো তারা তোমাদেরকে ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে, তোমাদের থেকে পৃথক হচ্ছে এবং তোমাদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তার চেয়ে বড় পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে যে আল্লাহ ব্যতীত এমন মা’রূদকে আহবান করে যে কিয়ামতের দিন তার আহ্বানে সাড়া দেবে না? আর তারা তাদের আহ্বান হতে উদাসীন থাকবে। যখন মানুষকে একত্রিত করা হবে। তখন তারা (উপাস্যরা) তাদের (উপাস্যদের) শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের উপাসনাকে পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করবে।” (৪৬: ৫-৬) সুতরাং কিয়ামতের দিন এই মুশরিকরা না নিজেদের থেকে আল্লাহর শাস্তি দূর করতে পারবে, না নিজেদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম হবে, না কাউকেও নিজেদের সাহাযাকারীরূপে প্রাপ্ত হবে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের মধ্যে যে সীমালংঘন করবে আমি তাকে মহাশাস্তি আস্বাদন করাবো।

আল-ফুরকান 25:20

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ কাফিররা যে এ অভিযোগ উত্থাপন করে যে, নবী-রাসূলদের পানাহার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কি প্রয়োজন? তাদের একথার জবাবে মহান আল্লাহ বলেনঃ পূর্ববর্তী সব নবীই মনুষ্যজনিত প্রয়োজন রাখতেন। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জীবিকা উপার্জন ইত্যাদি সবকিছুই করতেন। এগুলো নবুওয়াতের পরিপন্থী নয়। হ্যাঁ তবে মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর বিশেষ সাহায্য দ্বারা তাঁদেরকে ঐ পবিত্র গুণাবলী, উত্তম চরিত্র, ভাল কথা, পছন্দনীয় কাজ, প্রকাশ্য দলীল এবং উন্নতমানের মুজিযা দান করেন যেগুলো দেখে প্রত্যেক জ্ঞানী ও চক্ষুষ্মন ব্যক্তি তাঁদের নবুওয়াত ও সত্যবাদিতাকে মেনে নিতে বাধ্য হয়। এ আয়াতের অনুরূপ আয়াত আরো রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যত নবী পাঠিয়েছিলাম তারা সবাই শহরবাসী মানুষই ছিল।” (১২:১০৯) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে এমন দেহ বিশিষ্ট বানাইনি যে, তারা খাদ্য খাবে না।” (২১:৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে মানুষ! আমি তোমাদের মধ্যে এককে অপরের জন্যে পরীক্ষা স্বরূপ করেছি যাতে অনুগত ও অবাধ্যের পার্থক্য প্রকাশিত হয় এবং ধৈর্যশীল ও অধৈর্যের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তোমার প্রতিপালক সবকিছুই দেখেন এবং সবকিছু জানেন। নবুওয়াত প্রাপ্তির যোগ্য কে তা তিনি ভালরূপেই জানেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “রিসালাত প্রাপ্তির যোগ্য ব্যক্তি কে তা আল্লাহই খুব ভাল জানেন।” (৬: ১২৪) হিদায়াতের হকদার কে সেটাও তাঁরই জানা আছে। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হলো বান্দাদের পরীক্ষা গ্রহণ করা। এই জন্যেই নবীদেরকে তিনি সাধারণ অবস্থায় রাখেন। অন্যথায় যদি তাদেরকে তিনি দুনিয়ার প্রাচুর্য দান করতেন তবে ধন-মালের লোভে বহু লোক তাঁর অনুগামী হয়ে যেতো, ফলে তখন সত্য ও মিথ্যা এবং খাঁটি ও নকল মিশ্রিত হয়ে যেতো।সহীহ মুসলিমে হযরত আইয়াম ইবনে হাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি স্বয়ং তোমাকে এবং তোমার কারণে অন্যান্য লোকদেরকে পরীক্ষাকারী।”মুসনাদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি চাইলে আল্লাহ তা'আলা আমার সাথে স্বর্ণ ও রৌপ্যের পর্বত চালাতেন।”সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ)-কে রাসূল ও বাদশাহ হওয়ার অথবা রাসূল ও বান্দা হওয়ার অধিকার দেয়া হয়েছিল। তখন তিনি রাসূল ও বান্দা হওয়াই পছন্দ করেন।

আল-ফুরকান 25:21

২১-২৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা কাফিরদের অবাধ্যতা, ঔদ্ধত্যপনা এবং হঠকারিতার সংবাদ দিচ্ছেন যে, তারা বলে- আমাদের নিকট ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় না কেন? অর্থাৎ রিসালাত দিয়ে ফেরেশতা কেন অবতীর্ণ করা হয় না যেমন নবীদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল? যেমন মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে তাদের কথার উদ্ধৃতি দিয়েছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা বলে- আমরা কখনো ঈমান আনবো না যে পর্যন্ত না আমাদেরকে দেয়া হবে যা দেয়া হয়েছিল রাসূলদেরকে।” (৬:১২৪) আর এ সম্ভাবনাও আছে যে, (আরবি) দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ আমরা ফেরেশতাদেরকে প্রত্যক্ষভাবে দেখতে চাই, তাহলে তারা আমাদেরকে সংবাদ দেবেন যে, মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল। যেমন তাদের উক্তিঃ (আরবি)অর্থাৎ “অথবা তুমি আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে উপস্থিত করবে।” (১৭:৯২) সূরায়ে সুবহানাল্লাযীতে এর তাফসীর গত হয়েছে।এ জন্যেই তারা বলেঃ অথবা আমরা আমাদের প্রতিপালককে প্রত্যক্ষ করি না কেন? আর এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা তাদের অন্তরে অহংকার পোষণ করে এবং তারা সীমালংঘন করেছে গুরুতররূপে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের নিকট ফেরেশতা প্রেরণ করলেও এবং মৃতেরা তাদের সাথে কথা বললেও এবং সকল বস্তুকে তাদের সামনে হাযির করলেও যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন তারা বিশ্বাস করবে না; কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ।” (৬: ১১১)।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে প্রত্যক্ষ করবে সেদিন অপরাধীদের জন্যে সুসংবাদ থাকবে না এবং তারা বলবেঃ রক্ষা কর, রক্ষা কর। অর্থাৎ যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাচ্ছে না সেদিনই তাদের জন্যে উত্তম। আর যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাবে সেদিন তাদের জন্যে সুসংবাদ থাকবে না। এটা বাস্তবে রূপলাভ করবে কিয়ামতের দিনে হাযিরীরসময়, যখন ফেরেশতামণ্ডলী তাদেরকে জাহান্নাম ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর ক্রোধের সুসংবাদ প্রদান করবেন। ঐ সময় ফেরেশতারা কাফিরকে তার প্রাণবায়ু বের হবার সময় বলবেনঃ “হে কলুষিত দেহের মধ্যে অবস্থিত কলুষিত আত্মা! তুমি বের হয়ে এসো! বের হয়ে এসো অত্যুষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানির দিকে এবং কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রছায়ার দিকে।” তখন ঐ আত্মা বের হতে অস্বীকার করবে এবং দেহের মধ্যে লুকাতে থাকবে। সুতরাং তারা ওকে প্রহার করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তুমি দেখতে, যখন ফেরেশতারা কাফিরদের মৃত্যু ঘটাবে তখন তারা তাদের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে প্রহার করবে।” (৮:৫০) তিনি আর এক আয়াতে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তুমি দেখতে যখন যালিমরা মৃত্যুর কাঠিন্যের মধ্যে থাকবে এবং ফেরেশতারা তাদের হাত বিস্তারকারী হবে।” (৬:৯৩) অর্থাৎ হাত বিস্তার করে তারা তাদেরকে মারতে থাকবেন। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতে কারীমায় বলেনঃ সেদিন অপরাধীদের জন্যে সুসংবাদ থাকবে না।এটা মুমিনদের অবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদেরকে সেই দিন ফেরেশতারা কল্যাণের ও আনন্দ লাভের সুসংবাদ দিবেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা বলে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলে- তোমরা ভীত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও।আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা তোমরা ফরমায়েশ কর। এটা হবে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (৪১:৩০-৩২)সহীহ হাদীসে হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতারা মুমিনের আত্মাকে বলেনঃ “পবিত্র দেহের মধ্যে অবস্থিত হে পবিত্র আত্মা! বেরিয়ে এসো। বেরিয়ে এসো আরাম, উত্তম জীবনোপকরণ ও এমন প্রতিপালকের দিকে যিনি রাগান্বিত নন।” সূরায়ে ইবরাহীমের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার ঐ উক্তির তাফসীরে বর্ণিত হাদীস গত হয়েছে, যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী তাদেরকে ইহজীবনে ও পরজীবনে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন এবং যারা যালিম আল্লাহ তাদেরকে বিভ্রান্তিতে রাখবেন, আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন।”(১৪:২৭) অন্যেরা বলেছেন যে, (আরবি) দ্বারা কিয়ামতের দিনকে বুঝানো হয়েছে। এটা মুজাহিদ (রঃ), যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ বলেছেন। তবে এ কথা এবং পূর্বের কথা পরস্পর বিরোধী নয়। কারণ এই দুই দিন অর্থাৎ মৃত্যুর দিন ও কিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফিরদের জন্যে তো জাজ্বল্যমান হবে। ফেরেশতারা মুমিনদেরকে করুণা ও সন্তুষ্টির সুসংবাদ দিবেন এবং কাফিরদেরকে সংবাদ দিবেন ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ততার। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে সেই দিন অপরাধীদের জন্যে কোন সুসংবাদ থাকবে না। আর সেই দিন তারা বলবেঃ রক্ষা কর, রক্ষা কর। অর্থাৎ ফেরেশতারা কাফিরদেরকে বলবেনঃ আজকে তোমাদের জন্যে মুক্তি ও পরিত্রাণ হারাম করে দেয়া হয়েছে। (আরবি) শব্দের মূল হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ নিষেধ করা বা বিরত রাখা। এর থেকেই বলা হয়। (আরবি) অর্থাৎ অমুকের উপর বিচারক নিষিদ্ধ করেছেন, যখন তিনি তার উপর খরচ নিষিদ্ধ করেন, হয়তো বা দারিদ্রের কারণে অথবা নির্বুদ্ধিতার কারণে বা বাল্যাবস্থার কারণে অথবা এ ধরনের অন্য কোন কারণে। আর এটা হতেই বায়তুল্লাহ শরীফের (কালো) পাথরের নাম (আরবি)রাখা হয়েছে। কেননা, ওর মধ্যে তাওয়াফ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ওর পিছন দিয়ে তাওয়াফ করার নির্দেশ রয়েছে। এই একই কারণে (জ্ঞান) (আরবি) -কে বলা হয়। কেননা, এই জ্ঞান জ্ঞানীকে এমন কিছু গ্রহণ করা হতে বিরত রাখে যা তার পক্ষে উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নয়।মোটকথা, (আরবি) -এর মধ্যে যে (আরবি) বা সর্বনাম রয়েছে ওটা (আরবি) (ফেরেশতাগণ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। এটা মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রঃ), যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ), আতিয়্যা আওফী (রঃ), আতা খুরাসানী (রঃ) এবং খাসীফ (রঃ)-এর উক্তি। ইবনে জারীর (রঃ) এটাকে পছন্দ করেছেন।(আরবি) এই উক্তি সম্পর্কে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, মুত্তাকীদেরকে যে জিনিসের সুসংবাদ দেয়া হবে সে জিনিসের সুসংবাদ কাফির ও অপরাধীদেরকে দেয়া হারাম করে দেয়া হবে, এর অর্থ এটাই। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ইবনে জুরায়েজ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ এটা হবে মুশরিকদের কথা। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) (যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে প্রত্যক্ষ করবে), অর্থাৎ তারা ফেরেশতাদের হতে আশ্রয় কামনা করবে। আরববাসীদের এটা নিয়ম ছিল যে, যখন তাদের কারো উপর কোন বিপদ আসতো বা তারা কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতো তখন তারা (আরবি) একথা বলতো। একথা বলার কারণ ও যৌক্তিকতা থাকলেও এটা বাকরীতি ও রচনাভঙ্গীর বিপরীত কথা। তা ছাড়া জমহুর উলামা এর বিপক্ষে দলীল এনেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের কৃতকর্মগুলো বিবেচনা করবো, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলি-কণায় পরিণত করবো। এটা কিয়ামতের দিন হবে, যখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের ভালমন্দ কার্যের হিসাব গ্রহণ করবেন। ঐ সময় তিনি খবর দিবেন যে, এই মুশরিকরা তাদের যে কৃতকর্মগুলোকে তাদের মুক্তির মাধ্যম মনে করেছিল সেগুলো সবই বিফলে গেছে। আজ ওগুলো তাদের কোনই উপকারে আসবে না। এটা এই কারণে যে, ওগুলো শরীয়তের শর্তকে হারিয়ে ফেলেছে। শর্ত ছিল যে, ওগুলোতে আন্তরিকতা থাকতে হবে এবং আল্লাহর শরীয়তের অনুগামী হতে হবে। সুতরাং যে আমলে আন্তরিকতা থাকবে না এবং আল্লাহর শরীয়ত অনুযায়ী যে আমল হবে না তা বাতিল ও বিফল হয়ে যাবে। কাফিরদের আমলে এ দু’টির কোনটাই নেই। কাজেই তা কবূল হওয়া সুদূর পরাহত। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেছেনঃ আমি তাদের কৃতকর্মগুলো বিবেচনা করবো, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলি-কণায় পরিণত করবো।হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে (আরবি) -এর অর্থ হলো সূর্যের কিরণ যা দেয়ালের ছিদ্রে প্রবেশ করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হযরত সুদ্দী (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতেও অনুরূপ উক্তি বর্ণিত আছে।হযরত উবায়েদ ইবনে ইয়ালা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো ঐ ভস্ম যাকে বাতাস প্রচণ্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়, ফলে তা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। মোটকথা, এসব হচ্ছে সতর্কতামূলক কথা যে, কাফির ও মুশরিকরা তাদের কৃত আমলগুলোকে নাজাতের মাধ্যম মনে করে নিয়েছে বটে, কিন্তু যখন ওগুলোকে মহাবিজ্ঞানময় ও ন্যায় বিচারক আল্লাহর সামনে পেশ করা হবে তখন তারা দেখবে যে, সবগুলোই বিফলে গেছে। ওগুলো তাদের কোনই উপকারে আসবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের উপমা এই যে, তাদের কর্মসমূহ ভস্ম সদৃশ যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচণ্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না। এটা তো ঘেরি বিভ্রান্তি।” (১৪:১৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! দানের কথা প্রচার করে এবং ক্লেশ দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে ঐ ব্যক্তির ন্যায় নিষ্ফল করো না যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্যে ব্যয় করে থাকে, এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না। তার উপমা একটি মসৃণ পাথর যার উপর কিছু মাটি থাকে, অতঃপর প্রবল বৃষ্টিপাত ওকে পরিষ্কার করে রেখে দেয়। যা তারা উপার্জন করেছে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারবে না।” (২:২৬৪) মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য এক আয়াতে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা কুফরী করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ, পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু সে ওর নিকট উপস্থিত হলে দেখবে ওটা কিছু নয়।” (২৪: ৩৯) এ আয়াতের তাফসীরে এ সম্পর্কে সবকিছু বর্ণনা গত হয়েছে। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহর জন্যেই।আল্লাহ পাক বলেনঃ সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।” (৫৯:২০) ওটা এই যে, জান্নাত বাসীরা উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে এবং শান্তি ও আরামদায়ক কক্ষে অবস্থান করবে। তারা থাকবে নিরাপদ স্থানে যা সুদৃশ্য ও মনোরম মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃঅর্থাৎ “সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে ওটা কতই না। উৎকৃষ্ট।” (২৫:৭৬) পক্ষান্তরে জাহান্নামবাসীরা অতি জঘন্য ও নিকৃষ্ট স্থানে অবস্থান করবে, হা-হুতাম করবে এবং বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি ও যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে ওটা কতই না নিকৃষ্ট!” (২৫:৬৬) অর্থাৎ তাদের অবতরণ স্থল দেখতে কতই না খারাপ এবং আশ্রয়স্থল হিসেবে ওটা কতই না জঘন্য! এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। অর্থাৎ তারা যে গ্রহণীয় আমল করেছে তার বিনিময়ে তারা যা পাওয়ার তা পেয়েছে এবং যে স্থানে অবস্থান করার সে স্থানে অবস্থান করেছে। কিন্তু জাহান্নামীদের অবস্থা এর বিপরীত। কারণ তাদের একটি আমলও এমন নেই যার মাধ্যমে তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা ভাগ্যবানদের অবস্থা দ্বারা হতভাগ্যের অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন যে, তাদের নিকট কোনই কল্যাণ নেই। হযরত যহহাক (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, ওটা এমন এক সময় যে সময়ে আল্লাহর ওলীরা সিংহাসনের উপর সুলোচনা হুরদের সাথে অবস্থান করবে। আর আল্লাহর শত্রুরা তাদের শয়তান সঙ্গীদের সাথে লাঞ্ছিত অবস্থায় বসবাস করবে।হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, দিনের অর্ধভাগে আল্লাহ তা'আলা হিসাব হতে ফারেগ হবেন। অতঃপর জান্নাতবাসীরা জান্নাতে বিশ্রাম গ্রহণ করবে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে বিশ্রাম নেবে।হযরত ইকরামা (রঃ) বলেনঃ ঐ সময় আমার জানা আছে যখন জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে তখন দুনিয়া দিবসের প্রথম অংশের উঁচুতে অবস্থান করবে (দিনের প্রথম ভাগে সূর্য অনেকটা উপরে উঠে ববে)। যেই সময় মানুষ দুপুরের বিশ্রামের সময় তাদের পরিবারের (স্ত্রীদের) কিট গমন করে থাকে। সুতরাং ঐ সময় জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে গমন কবে। পক্ষান্তরে জান্নাতবাসীদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে। কাজেই তাদের দরে বিশ্রামস্থল হবে জান্নাত। সেখানে তাদেরকে মাছের কলিজা আহার করানো হবে এবং তারা সবাই তাতে পরিতৃপ্ত হবে। এর উপর ভিত্তি করেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ অর্ধ দিন হবে না যে পর্যন্ত না এরা এবং ওরা বিশ্রামস্থল গ্রহণ করবে। অতঃপর তিনি পাঠ করেন (আরবি)-এ আয়াতটি এবং পরে পাঠ করেন। (আরবি)-এ আয়াতটি। “আর তাদের (জাহান্নামীদের) গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে।” (৩৭: ৬৮)(আরবি) এ আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে বলেন যে, এর দ্বারা জান্নাতের কক্ষসমূহ বুঝানো হয়েছে। যখন তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে একবার পেশ করা হবে তখন তাদের হিসাব খুবই সহজভাবে গ্রহণ করা হবে। যেমন মহান আল্লাহ এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাকে তার আমলনামা দক্ষিণ হস্তে দেয়া হবে তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেয়া হবে। আর সে তার স্বজনদের নিকট প্রফুল্ল চিত্তে ফিরে যাবে।” (৮৪: ৮-৯) কাতাদা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আশ্রয়স্থল ও অবতরণস্থল।সাফওয়ান ইবনে মুহরিম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের দিন এমন দু’জন লোককে আনয়ন করা হবে যাদের একজন দুনিয়ায় লাল-সাদাদের নিকট বাদশাহ রূপে ছিল। তার হিসাব গ্রহণ করা হবে। কিন্তু সে এমনই এক বান্দা যে, জীবনে কখনো সে একটি সৎ কাজও করেনি। সুতরাং তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হবে। আর অপর লোকটি এতো দরিদ্র ছিল যে, পরিধেয় বস্ত্রটি ছিল তার একমাত্র সম্বল। তার হিসাব গ্রহণ করা হলে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনি এমন কিছু দেননি যার হিসেব আমার কাছে নিবেন।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমার বান্দা সত্য কথা বলেছে। সুতরাং (হে আমার ফেরেশতামণ্ডলী)! তোমরা তাকে পাঠিয়ে দাও।” অতঃপর তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করার নির্দেশ দেয়া হবে। তারপর আল্লাহ যতদিন চাবেন তাদেরকে তাদের নিজ নিজ অবস্থায় ছেড়ে দিবেন। এরপর তিনি জাহান্নামবাসী লোকটিকে ডেকে পাঠাবেন। সে মহান আল্লাহর সামনে হাযির হলে দেখা যাবে যে, সে অত্যন্ত কালো কয়লার মত হয়ে গেছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তুমি কেমন বিশ্রামস্থল পেয়েছো?” উত্তরে সে বলবেঃ “আমার বিশ্রামস্থল অত্যন্ত জঘন্য।” তখন তাকে বলা হবেঃ “তুমি সেখানেই ফিরে যাও।” অতঃপর জান্নাতবাসী ঐ লোকটিকে ডাকা হবে। তার চেহারা হবে চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল। তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তোমার বাসস্থান তুমি কেমন পেয়েছো?” উত্তরে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি উত্তম বাসস্থান পেয়েছি। তাকে তখন বলা হবেঃ “তুমি (তোমার ঐ জায়গাতেই) ফিরে যাও।” (ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ আস্ সওয়াফ (রঃ)-এর নিকট খবর পৌঁছেছে যে, কিয়ামতের দিনটি মুমিনের নিকট খুবই ছোট অনুভূত হবে। এমনকি তাদের মনে হবে যে, ওটা আসর হতে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়। তারা জান্নাতের বাগানে ঘোরাফেরা করবে। আল্লাহ তাআলার উক্তির তাৎপর্য এটাই যে, সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। ২৫। যেদিন আকাশ মেঘপুঞ্জ সহ বিদীর্ণ হবে এবং ফেরেশতাদেরকে নামিয়ে দেয়া হবে।

আল-ফুরকান 25:22

২১-২৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা কাফিরদের অবাধ্যতা, ঔদ্ধত্যপনা এবং হঠকারিতার সংবাদ দিচ্ছেন যে, তারা বলে- আমাদের নিকট ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় না কেন? অর্থাৎ রিসালাত দিয়ে ফেরেশতা কেন অবতীর্ণ করা হয় না যেমন নবীদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল? যেমন মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে তাদের কথার উদ্ধৃতি দিয়েছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা বলে- আমরা কখনো ঈমান আনবো না যে পর্যন্ত না আমাদেরকে দেয়া হবে যা দেয়া হয়েছিল রাসূলদেরকে।” (৬:১২৪) আর এ সম্ভাবনাও আছে যে, (আরবি) দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ আমরা ফেরেশতাদেরকে প্রত্যক্ষভাবে দেখতে চাই, তাহলে তারা আমাদেরকে সংবাদ দেবেন যে, মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল। যেমন তাদের উক্তিঃ (আরবি)অর্থাৎ “অথবা তুমি আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে উপস্থিত করবে।” (১৭:৯২) সূরায়ে সুবহানাল্লাযীতে এর তাফসীর গত হয়েছে।এ জন্যেই তারা বলেঃ অথবা আমরা আমাদের প্রতিপালককে প্রত্যক্ষ করি না কেন? আর এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা তাদের অন্তরে অহংকার পোষণ করে এবং তারা সীমালংঘন করেছে গুরুতররূপে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের নিকট ফেরেশতা প্রেরণ করলেও এবং মৃতেরা তাদের সাথে কথা বললেও এবং সকল বস্তুকে তাদের সামনে হাযির করলেও যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন তারা বিশ্বাস করবে না; কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ।” (৬: ১১১)।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে প্রত্যক্ষ করবে সেদিন অপরাধীদের জন্যে সুসংবাদ থাকবে না এবং তারা বলবেঃ রক্ষা কর, রক্ষা কর। অর্থাৎ যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাচ্ছে না সেদিনই তাদের জন্যে উত্তম। আর যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাবে সেদিন তাদের জন্যে সুসংবাদ থাকবে না। এটা বাস্তবে রূপলাভ করবে কিয়ামতের দিনে হাযিরীরসময়, যখন ফেরেশতামণ্ডলী তাদেরকে জাহান্নাম ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর ক্রোধের সুসংবাদ প্রদান করবেন। ঐ সময় ফেরেশতারা কাফিরকে তার প্রাণবায়ু বের হবার সময় বলবেনঃ “হে কলুষিত দেহের মধ্যে অবস্থিত কলুষিত আত্মা! তুমি বের হয়ে এসো! বের হয়ে এসো অত্যুষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানির দিকে এবং কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রছায়ার দিকে।” তখন ঐ আত্মা বের হতে অস্বীকার করবে এবং দেহের মধ্যে লুকাতে থাকবে। সুতরাং তারা ওকে প্রহার করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তুমি দেখতে, যখন ফেরেশতারা কাফিরদের মৃত্যু ঘটাবে তখন তারা তাদের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে প্রহার করবে।” (৮:৫০) তিনি আর এক আয়াতে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তুমি দেখতে যখন যালিমরা মৃত্যুর কাঠিন্যের মধ্যে থাকবে এবং ফেরেশতারা তাদের হাত বিস্তারকারী হবে।” (৬:৯৩) অর্থাৎ হাত বিস্তার করে তারা তাদেরকে মারতে থাকবেন। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতে কারীমায় বলেনঃ সেদিন অপরাধীদের জন্যে সুসংবাদ থাকবে না।এটা মুমিনদের অবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদেরকে সেই দিন ফেরেশতারা কল্যাণের ও আনন্দ লাভের সুসংবাদ দিবেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা বলে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলে- তোমরা ভীত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও।আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা তোমরা ফরমায়েশ কর। এটা হবে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (৪১:৩০-৩২)সহীহ হাদীসে হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতারা মুমিনের আত্মাকে বলেনঃ “পবিত্র দেহের মধ্যে অবস্থিত হে পবিত্র আত্মা! বেরিয়ে এসো। বেরিয়ে এসো আরাম, উত্তম জীবনোপকরণ ও এমন প্রতিপালকের দিকে যিনি রাগান্বিত নন।” সূরায়ে ইবরাহীমের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার ঐ উক্তির তাফসীরে বর্ণিত হাদীস গত হয়েছে, যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী তাদেরকে ইহজীবনে ও পরজীবনে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন এবং যারা যালিম আল্লাহ তাদেরকে বিভ্রান্তিতে রাখবেন, আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন।”(১৪:২৭) অন্যেরা বলেছেন যে, (আরবি) দ্বারা কিয়ামতের দিনকে বুঝানো হয়েছে। এটা মুজাহিদ (রঃ), যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ বলেছেন। তবে এ কথা এবং পূর্বের কথা পরস্পর বিরোধী নয়। কারণ এই দুই দিন অর্থাৎ মৃত্যুর দিন ও কিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফিরদের জন্যে তো জাজ্বল্যমান হবে। ফেরেশতারা মুমিনদেরকে করুণা ও সন্তুষ্টির সুসংবাদ দিবেন এবং কাফিরদেরকে সংবাদ দিবেন ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ততার। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে সেই দিন অপরাধীদের জন্যে কোন সুসংবাদ থাকবে না। আর সেই দিন তারা বলবেঃ রক্ষা কর, রক্ষা কর। অর্থাৎ ফেরেশতারা কাফিরদেরকে বলবেনঃ আজকে তোমাদের জন্যে মুক্তি ও পরিত্রাণ হারাম করে দেয়া হয়েছে। (আরবি) শব্দের মূল হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ নিষেধ করা বা বিরত রাখা। এর থেকেই বলা হয়। (আরবি) অর্থাৎ অমুকের উপর বিচারক নিষিদ্ধ করেছেন, যখন তিনি তার উপর খরচ নিষিদ্ধ করেন, হয়তো বা দারিদ্রের কারণে অথবা নির্বুদ্ধিতার কারণে বা বাল্যাবস্থার কারণে অথবা এ ধরনের অন্য কোন কারণে। আর এটা হতেই বায়তুল্লাহ শরীফের (কালো) পাথরের নাম (আরবি)রাখা হয়েছে। কেননা, ওর মধ্যে তাওয়াফ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ওর পিছন দিয়ে তাওয়াফ করার নির্দেশ রয়েছে। এই একই কারণে (জ্ঞান) (আরবি) -কে বলা হয়। কেননা, এই জ্ঞান জ্ঞানীকে এমন কিছু গ্রহণ করা হতে বিরত রাখে যা তার পক্ষে উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নয়।মোটকথা, (আরবি) -এর মধ্যে যে (আরবি) বা সর্বনাম রয়েছে ওটা (আরবি) (ফেরেশতাগণ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। এটা মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রঃ), যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ), আতিয়্যা আওফী (রঃ), আতা খুরাসানী (রঃ) এবং খাসীফ (রঃ)-এর উক্তি। ইবনে জারীর (রঃ) এটাকে পছন্দ করেছেন।(আরবি) এই উক্তি সম্পর্কে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, মুত্তাকীদেরকে যে জিনিসের সুসংবাদ দেয়া হবে সে জিনিসের সুসংবাদ কাফির ও অপরাধীদেরকে দেয়া হারাম করে দেয়া হবে, এর অর্থ এটাই। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ইবনে জুরায়েজ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ এটা হবে মুশরিকদের কথা। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) (যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে প্রত্যক্ষ করবে), অর্থাৎ তারা ফেরেশতাদের হতে আশ্রয় কামনা করবে। আরববাসীদের এটা নিয়ম ছিল যে, যখন তাদের কারো উপর কোন বিপদ আসতো বা তারা কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতো তখন তারা (আরবি) একথা বলতো। একথা বলার কারণ ও যৌক্তিকতা থাকলেও এটা বাকরীতি ও রচনাভঙ্গীর বিপরীত কথা। তা ছাড়া জমহুর উলামা এর বিপক্ষে দলীল এনেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের কৃতকর্মগুলো বিবেচনা করবো, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলি-কণায় পরিণত করবো। এটা কিয়ামতের দিন হবে, যখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের ভালমন্দ কার্যের হিসাব গ্রহণ করবেন। ঐ সময় তিনি খবর দিবেন যে, এই মুশরিকরা তাদের যে কৃতকর্মগুলোকে তাদের মুক্তির মাধ্যম মনে করেছিল সেগুলো সবই বিফলে গেছে। আজ ওগুলো তাদের কোনই উপকারে আসবে না। এটা এই কারণে যে, ওগুলো শরীয়তের শর্তকে হারিয়ে ফেলেছে। শর্ত ছিল যে, ওগুলোতে আন্তরিকতা থাকতে হবে এবং আল্লাহর শরীয়তের অনুগামী হতে হবে। সুতরাং যে আমলে আন্তরিকতা থাকবে না এবং আল্লাহর শরীয়ত অনুযায়ী যে আমল হবে না তা বাতিল ও বিফল হয়ে যাবে। কাফিরদের আমলে এ দু’টির কোনটাই নেই। কাজেই তা কবূল হওয়া সুদূর পরাহত। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেছেনঃ আমি তাদের কৃতকর্মগুলো বিবেচনা করবো, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলি-কণায় পরিণত করবো।হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে (আরবি) -এর অর্থ হলো সূর্যের কিরণ যা দেয়ালের ছিদ্রে প্রবেশ করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হযরত সুদ্দী (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতেও অনুরূপ উক্তি বর্ণিত আছে।হযরত উবায়েদ ইবনে ইয়ালা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো ঐ ভস্ম যাকে বাতাস প্রচণ্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়, ফলে তা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। মোটকথা, এসব হচ্ছে সতর্কতামূলক কথা যে, কাফির ও মুশরিকরা তাদের কৃত আমলগুলোকে নাজাতের মাধ্যম মনে করে নিয়েছে বটে, কিন্তু যখন ওগুলোকে মহাবিজ্ঞানময় ও ন্যায় বিচারক আল্লাহর সামনে পেশ করা হবে তখন তারা দেখবে যে, সবগুলোই বিফলে গেছে। ওগুলো তাদের কোনই উপকারে আসবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের উপমা এই যে, তাদের কর্মসমূহ ভস্ম সদৃশ যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচণ্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না। এটা তো ঘেরি বিভ্রান্তি।” (১৪:১৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! দানের কথা প্রচার করে এবং ক্লেশ দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে ঐ ব্যক্তির ন্যায় নিষ্ফল করো না যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্যে ব্যয় করে থাকে, এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না। তার উপমা একটি মসৃণ পাথর যার উপর কিছু মাটি থাকে, অতঃপর প্রবল বৃষ্টিপাত ওকে পরিষ্কার করে রেখে দেয়। যা তারা উপার্জন করেছে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারবে না।” (২:২৬৪) মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য এক আয়াতে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা কুফরী করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ, পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু সে ওর নিকট উপস্থিত হলে দেখবে ওটা কিছু নয়।” (২৪: ৩৯) এ আয়াতের তাফসীরে এ সম্পর্কে সবকিছু বর্ণনা গত হয়েছে। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহর জন্যেই।আল্লাহ পাক বলেনঃ সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।” (৫৯:২০) ওটা এই যে, জান্নাত বাসীরা উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে এবং শান্তি ও আরামদায়ক কক্ষে অবস্থান করবে। তারা থাকবে নিরাপদ স্থানে যা সুদৃশ্য ও মনোরম মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃঅর্থাৎ “সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে ওটা কতই না। উৎকৃষ্ট।” (২৫:৭৬) পক্ষান্তরে জাহান্নামবাসীরা অতি জঘন্য ও নিকৃষ্ট স্থানে অবস্থান করবে, হা-হুতাম করবে এবং বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি ও যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে ওটা কতই না নিকৃষ্ট!” (২৫:৬৬) অর্থাৎ তাদের অবতরণ স্থল দেখতে কতই না খারাপ এবং আশ্রয়স্থল হিসেবে ওটা কতই না জঘন্য! এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। অর্থাৎ তারা যে গ্রহণীয় আমল করেছে তার বিনিময়ে তারা যা পাওয়ার তা পেয়েছে এবং যে স্থানে অবস্থান করার সে স্থানে অবস্থান করেছে। কিন্তু জাহান্নামীদের অবস্থা এর বিপরীত। কারণ তাদের একটি আমলও এমন নেই যার মাধ্যমে তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা ভাগ্যবানদের অবস্থা দ্বারা হতভাগ্যের অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন যে, তাদের নিকট কোনই কল্যাণ নেই। হযরত যহহাক (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, ওটা এমন এক সময় যে সময়ে আল্লাহর ওলীরা সিংহাসনের উপর সুলোচনা হুরদের সাথে অবস্থান করবে। আর আল্লাহর শত্রুরা তাদের শয়তান সঙ্গীদের সাথে লাঞ্ছিত অবস্থায় বসবাস করবে।হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, দিনের অর্ধভাগে আল্লাহ তা'আলা হিসাব হতে ফারেগ হবেন। অতঃপর জান্নাতবাসীরা জান্নাতে বিশ্রাম গ্রহণ করবে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে বিশ্রাম নেবে।হযরত ইকরামা (রঃ) বলেনঃ ঐ সময় আমার জানা আছে যখন জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে তখন দুনিয়া দিবসের প্রথম অংশের উঁচুতে অবস্থান করবে (দিনের প্রথম ভাগে সূর্য অনেকটা উপরে উঠে ববে)। যেই সময় মানুষ দুপুরের বিশ্রামের সময় তাদের পরিবারের (স্ত্রীদের) কিট গমন করে থাকে। সুতরাং ঐ সময় জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে গমন কবে। পক্ষান্তরে জান্নাতবাসীদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে। কাজেই তাদের দরে বিশ্রামস্থল হবে জান্নাত। সেখানে তাদেরকে মাছের কলিজা আহার করানো হবে এবং তারা সবাই তাতে পরিতৃপ্ত হবে। এর উপর ভিত্তি করেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ অর্ধ দিন হবে না যে পর্যন্ত না এরা এবং ওরা বিশ্রামস্থল গ্রহণ করবে। অতঃপর তিনি পাঠ করেন (আরবি)-এ আয়াতটি এবং পরে পাঠ করেন। (আরবি)-এ আয়াতটি। “আর তাদের (জাহান্নামীদের) গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে।” (৩৭: ৬৮)(আরবি) এ আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে বলেন যে, এর দ্বারা জান্নাতের কক্ষসমূহ বুঝানো হয়েছে। যখন তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে একবার পেশ করা হবে তখন তাদের হিসাব খুবই সহজভাবে গ্রহণ করা হবে। যেমন মহান আল্লাহ এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাকে তার আমলনামা দক্ষিণ হস্তে দেয়া হবে তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেয়া হবে। আর সে তার স্বজনদের নিকট প্রফুল্ল চিত্তে ফিরে যাবে।” (৮৪: ৮-৯) কাতাদা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আশ্রয়স্থল ও অবতরণস্থল।সাফওয়ান ইবনে মুহরিম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের দিন এমন দু’জন লোককে আনয়ন করা হবে যাদের একজন দুনিয়ায় লাল-সাদাদের নিকট বাদশাহ রূপে ছিল। তার হিসাব গ্রহণ করা হবে। কিন্তু সে এমনই এক বান্দা যে, জীবনে কখনো সে একটি সৎ কাজও করেনি। সুতরাং তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হবে। আর অপর লোকটি এতো দরিদ্র ছিল যে, পরিধেয় বস্ত্রটি ছিল তার একমাত্র সম্বল। তার হিসাব গ্রহণ করা হলে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনি এমন কিছু দেননি যার হিসেব আমার কাছে নিবেন।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমার বান্দা সত্য কথা বলেছে। সুতরাং (হে আমার ফেরেশতামণ্ডলী)! তোমরা তাকে পাঠিয়ে দাও।” অতঃপর তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করার নির্দেশ দেয়া হবে। তারপর আল্লাহ যতদিন চাবেন তাদেরকে তাদের নিজ নিজ অবস্থায় ছেড়ে দিবেন। এরপর তিনি জাহান্নামবাসী লোকটিকে ডেকে পাঠাবেন। সে মহান আল্লাহর সামনে হাযির হলে দেখা যাবে যে, সে অত্যন্ত কালো কয়লার মত হয়ে গেছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তুমি কেমন বিশ্রামস্থল পেয়েছো?” উত্তরে সে বলবেঃ “আমার বিশ্রামস্থল অত্যন্ত জঘন্য।” তখন তাকে বলা হবেঃ “তুমি সেখানেই ফিরে যাও।” অতঃপর জান্নাতবাসী ঐ লোকটিকে ডাকা হবে। তার চেহারা হবে চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল। তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তোমার বাসস্থান তুমি কেমন পেয়েছো?” উত্তরে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি উত্তম বাসস্থান পেয়েছি। তাকে তখন বলা হবেঃ “তুমি (তোমার ঐ জায়গাতেই) ফিরে যাও।” (ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ আস্ সওয়াফ (রঃ)-এর নিকট খবর পৌঁছেছে যে, কিয়ামতের দিনটি মুমিনের নিকট খুবই ছোট অনুভূত হবে। এমনকি তাদের মনে হবে যে, ওটা আসর হতে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়। তারা জান্নাতের বাগানে ঘোরাফেরা করবে। আল্লাহ তাআলার উক্তির তাৎপর্য এটাই যে, সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। ২৫। যেদিন আকাশ মেঘপুঞ্জ সহ বিদীর্ণ হবে এবং ফেরেশতাদেরকে নামিয়ে দেয়া হবে।

আল-ফুরকান 25:23

২১-২৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা কাফিরদের অবাধ্যতা, ঔদ্ধত্যপনা এবং হঠকারিতার সংবাদ দিচ্ছেন যে, তারা বলে- আমাদের নিকট ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় না কেন? অর্থাৎ রিসালাত দিয়ে ফেরেশতা কেন অবতীর্ণ করা হয় না যেমন নবীদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল? যেমন মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে তাদের কথার উদ্ধৃতি দিয়েছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা বলে- আমরা কখনো ঈমান আনবো না যে পর্যন্ত না আমাদেরকে দেয়া হবে যা দেয়া হয়েছিল রাসূলদেরকে।” (৬:১২৪) আর এ সম্ভাবনাও আছে যে, (আরবি) দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ আমরা ফেরেশতাদেরকে প্রত্যক্ষভাবে দেখতে চাই, তাহলে তারা আমাদেরকে সংবাদ দেবেন যে, মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল। যেমন তাদের উক্তিঃ (আরবি)অর্থাৎ “অথবা তুমি আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে উপস্থিত করবে।” (১৭:৯২) সূরায়ে সুবহানাল্লাযীতে এর তাফসীর গত হয়েছে।এ জন্যেই তারা বলেঃ অথবা আমরা আমাদের প্রতিপালককে প্রত্যক্ষ করি না কেন? আর এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা তাদের অন্তরে অহংকার পোষণ করে এবং তারা সীমালংঘন করেছে গুরুতররূপে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের নিকট ফেরেশতা প্রেরণ করলেও এবং মৃতেরা তাদের সাথে কথা বললেও এবং সকল বস্তুকে তাদের সামনে হাযির করলেও যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন তারা বিশ্বাস করবে না; কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ।” (৬: ১১১)।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে প্রত্যক্ষ করবে সেদিন অপরাধীদের জন্যে সুসংবাদ থাকবে না এবং তারা বলবেঃ রক্ষা কর, রক্ষা কর। অর্থাৎ যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাচ্ছে না সেদিনই তাদের জন্যে উত্তম। আর যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাবে সেদিন তাদের জন্যে সুসংবাদ থাকবে না। এটা বাস্তবে রূপলাভ করবে কিয়ামতের দিনে হাযিরীরসময়, যখন ফেরেশতামণ্ডলী তাদেরকে জাহান্নাম ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর ক্রোধের সুসংবাদ প্রদান করবেন। ঐ সময় ফেরেশতারা কাফিরকে তার প্রাণবায়ু বের হবার সময় বলবেনঃ “হে কলুষিত দেহের মধ্যে অবস্থিত কলুষিত আত্মা! তুমি বের হয়ে এসো! বের হয়ে এসো অত্যুষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানির দিকে এবং কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রছায়ার দিকে।” তখন ঐ আত্মা বের হতে অস্বীকার করবে এবং দেহের মধ্যে লুকাতে থাকবে। সুতরাং তারা ওকে প্রহার করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তুমি দেখতে, যখন ফেরেশতারা কাফিরদের মৃত্যু ঘটাবে তখন তারা তাদের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে প্রহার করবে।” (৮:৫০) তিনি আর এক আয়াতে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তুমি দেখতে যখন যালিমরা মৃত্যুর কাঠিন্যের মধ্যে থাকবে এবং ফেরেশতারা তাদের হাত বিস্তারকারী হবে।” (৬:৯৩) অর্থাৎ হাত বিস্তার করে তারা তাদেরকে মারতে থাকবেন। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতে কারীমায় বলেনঃ সেদিন অপরাধীদের জন্যে সুসংবাদ থাকবে না।এটা মুমিনদের অবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদেরকে সেই দিন ফেরেশতারা কল্যাণের ও আনন্দ লাভের সুসংবাদ দিবেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা বলে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলে- তোমরা ভীত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও।আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা তোমরা ফরমায়েশ কর। এটা হবে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (৪১:৩০-৩২)সহীহ হাদীসে হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতারা মুমিনের আত্মাকে বলেনঃ “পবিত্র দেহের মধ্যে অবস্থিত হে পবিত্র আত্মা! বেরিয়ে এসো। বেরিয়ে এসো আরাম, উত্তম জীবনোপকরণ ও এমন প্রতিপালকের দিকে যিনি রাগান্বিত নন।” সূরায়ে ইবরাহীমের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার ঐ উক্তির তাফসীরে বর্ণিত হাদীস গত হয়েছে, যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী তাদেরকে ইহজীবনে ও পরজীবনে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন এবং যারা যালিম আল্লাহ তাদেরকে বিভ্রান্তিতে রাখবেন, আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন।”(১৪:২৭) অন্যেরা বলেছেন যে, (আরবি) দ্বারা কিয়ামতের দিনকে বুঝানো হয়েছে। এটা মুজাহিদ (রঃ), যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ বলেছেন। তবে এ কথা এবং পূর্বের কথা পরস্পর বিরোধী নয়। কারণ এই দুই দিন অর্থাৎ মৃত্যুর দিন ও কিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফিরদের জন্যে তো জাজ্বল্যমান হবে। ফেরেশতারা মুমিনদেরকে করুণা ও সন্তুষ্টির সুসংবাদ দিবেন এবং কাফিরদেরকে সংবাদ দিবেন ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ততার। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে সেই দিন অপরাধীদের জন্যে কোন সুসংবাদ থাকবে না। আর সেই দিন তারা বলবেঃ রক্ষা কর, রক্ষা কর। অর্থাৎ ফেরেশতারা কাফিরদেরকে বলবেনঃ আজকে তোমাদের জন্যে মুক্তি ও পরিত্রাণ হারাম করে দেয়া হয়েছে। (আরবি) শব্দের মূল হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ নিষেধ করা বা বিরত রাখা। এর থেকেই বলা হয়। (আরবি) অর্থাৎ অমুকের উপর বিচারক নিষিদ্ধ করেছেন, যখন তিনি তার উপর খরচ নিষিদ্ধ করেন, হয়তো বা দারিদ্রের কারণে অথবা নির্বুদ্ধিতার কারণে বা বাল্যাবস্থার কারণে অথবা এ ধরনের অন্য কোন কারণে। আর এটা হতেই বায়তুল্লাহ শরীফের (কালো) পাথরের নাম (আরবি)রাখা হয়েছে। কেননা, ওর মধ্যে তাওয়াফ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ওর পিছন দিয়ে তাওয়াফ করার নির্দেশ রয়েছে। এই একই কারণে (জ্ঞান) (আরবি) -কে বলা হয়। কেননা, এই জ্ঞান জ্ঞানীকে এমন কিছু গ্রহণ করা হতে বিরত রাখে যা তার পক্ষে উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নয়।মোটকথা, (আরবি) -এর মধ্যে যে (আরবি) বা সর্বনাম রয়েছে ওটা (আরবি) (ফেরেশতাগণ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। এটা মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রঃ), যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ), আতিয়্যা আওফী (রঃ), আতা খুরাসানী (রঃ) এবং খাসীফ (রঃ)-এর উক্তি। ইবনে জারীর (রঃ) এটাকে পছন্দ করেছেন।(আরবি) এই উক্তি সম্পর্কে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, মুত্তাকীদেরকে যে জিনিসের সুসংবাদ দেয়া হবে সে জিনিসের সুসংবাদ কাফির ও অপরাধীদেরকে দেয়া হারাম করে দেয়া হবে, এর অর্থ এটাই। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ইবনে জুরায়েজ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ এটা হবে মুশরিকদের কথা। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) (যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে প্রত্যক্ষ করবে), অর্থাৎ তারা ফেরেশতাদের হতে আশ্রয় কামনা করবে। আরববাসীদের এটা নিয়ম ছিল যে, যখন তাদের কারো উপর কোন বিপদ আসতো বা তারা কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতো তখন তারা (আরবি) একথা বলতো। একথা বলার কারণ ও যৌক্তিকতা থাকলেও এটা বাকরীতি ও রচনাভঙ্গীর বিপরীত কথা। তা ছাড়া জমহুর উলামা এর বিপক্ষে দলীল এনেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের কৃতকর্মগুলো বিবেচনা করবো, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলি-কণায় পরিণত করবো। এটা কিয়ামতের দিন হবে, যখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের ভালমন্দ কার্যের হিসাব গ্রহণ করবেন। ঐ সময় তিনি খবর দিবেন যে, এই মুশরিকরা তাদের যে কৃতকর্মগুলোকে তাদের মুক্তির মাধ্যম মনে করেছিল সেগুলো সবই বিফলে গেছে। আজ ওগুলো তাদের কোনই উপকারে আসবে না। এটা এই কারণে যে, ওগুলো শরীয়তের শর্তকে হারিয়ে ফেলেছে। শর্ত ছিল যে, ওগুলোতে আন্তরিকতা থাকতে হবে এবং আল্লাহর শরীয়তের অনুগামী হতে হবে। সুতরাং যে আমলে আন্তরিকতা থাকবে না এবং আল্লাহর শরীয়ত অনুযায়ী যে আমল হবে না তা বাতিল ও বিফল হয়ে যাবে। কাফিরদের আমলে এ দু’টির কোনটাই নেই। কাজেই তা কবূল হওয়া সুদূর পরাহত। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেছেনঃ আমি তাদের কৃতকর্মগুলো বিবেচনা করবো, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলি-কণায় পরিণত করবো।হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে (আরবি) -এর অর্থ হলো সূর্যের কিরণ যা দেয়ালের ছিদ্রে প্রবেশ করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হযরত সুদ্দী (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতেও অনুরূপ উক্তি বর্ণিত আছে।হযরত উবায়েদ ইবনে ইয়ালা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো ঐ ভস্ম যাকে বাতাস প্রচণ্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়, ফলে তা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। মোটকথা, এসব হচ্ছে সতর্কতামূলক কথা যে, কাফির ও মুশরিকরা তাদের কৃত আমলগুলোকে নাজাতের মাধ্যম মনে করে নিয়েছে বটে, কিন্তু যখন ওগুলোকে মহাবিজ্ঞানময় ও ন্যায় বিচারক আল্লাহর সামনে পেশ করা হবে তখন তারা দেখবে যে, সবগুলোই বিফলে গেছে। ওগুলো তাদের কোনই উপকারে আসবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের উপমা এই যে, তাদের কর্মসমূহ ভস্ম সদৃশ যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচণ্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না। এটা তো ঘেরি বিভ্রান্তি।” (১৪:১৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! দানের কথা প্রচার করে এবং ক্লেশ দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে ঐ ব্যক্তির ন্যায় নিষ্ফল করো না যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্যে ব্যয় করে থাকে, এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না। তার উপমা একটি মসৃণ পাথর যার উপর কিছু মাটি থাকে, অতঃপর প্রবল বৃষ্টিপাত ওকে পরিষ্কার করে রেখে দেয়। যা তারা উপার্জন করেছে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারবে না।” (২:২৬৪) মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য এক আয়াতে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা কুফরী করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ, পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু সে ওর নিকট উপস্থিত হলে দেখবে ওটা কিছু নয়।” (২৪: ৩৯) এ আয়াতের তাফসীরে এ সম্পর্কে সবকিছু বর্ণনা গত হয়েছে। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহর জন্যেই।আল্লাহ পাক বলেনঃ সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।” (৫৯:২০) ওটা এই যে, জান্নাত বাসীরা উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে এবং শান্তি ও আরামদায়ক কক্ষে অবস্থান করবে। তারা থাকবে নিরাপদ স্থানে যা সুদৃশ্য ও মনোরম মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃঅর্থাৎ “সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে ওটা কতই না। উৎকৃষ্ট।” (২৫:৭৬) পক্ষান্তরে জাহান্নামবাসীরা অতি জঘন্য ও নিকৃষ্ট স্থানে অবস্থান করবে, হা-হুতাম করবে এবং বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি ও যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে ওটা কতই না নিকৃষ্ট!” (২৫:৬৬) অর্থাৎ তাদের অবতরণ স্থল দেখতে কতই না খারাপ এবং আশ্রয়স্থল হিসেবে ওটা কতই না জঘন্য! এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। অর্থাৎ তারা যে গ্রহণীয় আমল করেছে তার বিনিময়ে তারা যা পাওয়ার তা পেয়েছে এবং যে স্থানে অবস্থান করার সে স্থানে অবস্থান করেছে। কিন্তু জাহান্নামীদের অবস্থা এর বিপরীত। কারণ তাদের একটি আমলও এমন নেই যার মাধ্যমে তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা ভাগ্যবানদের অবস্থা দ্বারা হতভাগ্যের অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন যে, তাদের নিকট কোনই কল্যাণ নেই। হযরত যহহাক (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, ওটা এমন এক সময় যে সময়ে আল্লাহর ওলীরা সিংহাসনের উপর সুলোচনা হুরদের সাথে অবস্থান করবে। আর আল্লাহর শত্রুরা তাদের শয়তান সঙ্গীদের সাথে লাঞ্ছিত অবস্থায় বসবাস করবে।হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, দিনের অর্ধভাগে আল্লাহ তা'আলা হিসাব হতে ফারেগ হবেন। অতঃপর জান্নাতবাসীরা জান্নাতে বিশ্রাম গ্রহণ করবে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে বিশ্রাম নেবে।হযরত ইকরামা (রঃ) বলেনঃ ঐ সময় আমার জানা আছে যখন জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে তখন দুনিয়া দিবসের প্রথম অংশের উঁচুতে অবস্থান করবে (দিনের প্রথম ভাগে সূর্য অনেকটা উপরে উঠে ববে)। যেই সময় মানুষ দুপুরের বিশ্রামের সময় তাদের পরিবারের (স্ত্রীদের) কিট গমন করে থাকে। সুতরাং ঐ সময় জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে গমন কবে। পক্ষান্তরে জান্নাতবাসীদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে। কাজেই তাদের দরে বিশ্রামস্থল হবে জান্নাত। সেখানে তাদেরকে মাছের কলিজা আহার করানো হবে এবং তারা সবাই তাতে পরিতৃপ্ত হবে। এর উপর ভিত্তি করেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ অর্ধ দিন হবে না যে পর্যন্ত না এরা এবং ওরা বিশ্রামস্থল গ্রহণ করবে। অতঃপর তিনি পাঠ করেন (আরবি)-এ আয়াতটি এবং পরে পাঠ করেন। (আরবি)-এ আয়াতটি। “আর তাদের (জাহান্নামীদের) গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে।” (৩৭: ৬৮)(আরবি) এ আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে বলেন যে, এর দ্বারা জান্নাতের কক্ষসমূহ বুঝানো হয়েছে। যখন তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে একবার পেশ করা হবে তখন তাদের হিসাব খুবই সহজভাবে গ্রহণ করা হবে। যেমন মহান আল্লাহ এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাকে তার আমলনামা দক্ষিণ হস্তে দেয়া হবে তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেয়া হবে। আর সে তার স্বজনদের নিকট প্রফুল্ল চিত্তে ফিরে যাবে।” (৮৪: ৮-৯) কাতাদা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আশ্রয়স্থল ও অবতরণস্থল।সাফওয়ান ইবনে মুহরিম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের দিন এমন দু’জন লোককে আনয়ন করা হবে যাদের একজন দুনিয়ায় লাল-সাদাদের নিকট বাদশাহ রূপে ছিল। তার হিসাব গ্রহণ করা হবে। কিন্তু সে এমনই এক বান্দা যে, জীবনে কখনো সে একটি সৎ কাজও করেনি। সুতরাং তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হবে। আর অপর লোকটি এতো দরিদ্র ছিল যে, পরিধেয় বস্ত্রটি ছিল তার একমাত্র সম্বল। তার হিসাব গ্রহণ করা হলে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনি এমন কিছু দেননি যার হিসেব আমার কাছে নিবেন।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমার বান্দা সত্য কথা বলেছে। সুতরাং (হে আমার ফেরেশতামণ্ডলী)! তোমরা তাকে পাঠিয়ে দাও।” অতঃপর তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করার নির্দেশ দেয়া হবে। তারপর আল্লাহ যতদিন চাবেন তাদেরকে তাদের নিজ নিজ অবস্থায় ছেড়ে দিবেন। এরপর তিনি জাহান্নামবাসী লোকটিকে ডেকে পাঠাবেন। সে মহান আল্লাহর সামনে হাযির হলে দেখা যাবে যে, সে অত্যন্ত কালো কয়লার মত হয়ে গেছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তুমি কেমন বিশ্রামস্থল পেয়েছো?” উত্তরে সে বলবেঃ “আমার বিশ্রামস্থল অত্যন্ত জঘন্য।” তখন তাকে বলা হবেঃ “তুমি সেখানেই ফিরে যাও।” অতঃপর জান্নাতবাসী ঐ লোকটিকে ডাকা হবে। তার চেহারা হবে চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল। তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তোমার বাসস্থান তুমি কেমন পেয়েছো?” উত্তরে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি উত্তম বাসস্থান পেয়েছি। তাকে তখন বলা হবেঃ “তুমি (তোমার ঐ জায়গাতেই) ফিরে যাও।” (ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ আস্ সওয়াফ (রঃ)-এর নিকট খবর পৌঁছেছে যে, কিয়ামতের দিনটি মুমিনের নিকট খুবই ছোট অনুভূত হবে। এমনকি তাদের মনে হবে যে, ওটা আসর হতে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়। তারা জান্নাতের বাগানে ঘোরাফেরা করবে। আল্লাহ তাআলার উক্তির তাৎপর্য এটাই যে, সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। ২৫। যেদিন আকাশ মেঘপুঞ্জ সহ বিদীর্ণ হবে এবং ফেরেশতাদেরকে নামিয়ে দেয়া হবে।

আল-ফুরকান 25:24

২১-২৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা কাফিরদের অবাধ্যতা, ঔদ্ধত্যপনা এবং হঠকারিতার সংবাদ দিচ্ছেন যে, তারা বলে- আমাদের নিকট ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় না কেন? অর্থাৎ রিসালাত দিয়ে ফেরেশতা কেন অবতীর্ণ করা হয় না যেমন নবীদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল? যেমন মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে তাদের কথার উদ্ধৃতি দিয়েছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা বলে- আমরা কখনো ঈমান আনবো না যে পর্যন্ত না আমাদেরকে দেয়া হবে যা দেয়া হয়েছিল রাসূলদেরকে।” (৬:১২৪) আর এ সম্ভাবনাও আছে যে, (আরবি) দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ আমরা ফেরেশতাদেরকে প্রত্যক্ষভাবে দেখতে চাই, তাহলে তারা আমাদেরকে সংবাদ দেবেন যে, মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল। যেমন তাদের উক্তিঃ (আরবি)অর্থাৎ “অথবা তুমি আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে উপস্থিত করবে।” (১৭:৯২) সূরায়ে সুবহানাল্লাযীতে এর তাফসীর গত হয়েছে।এ জন্যেই তারা বলেঃ অথবা আমরা আমাদের প্রতিপালককে প্রত্যক্ষ করি না কেন? আর এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা তাদের অন্তরে অহংকার পোষণ করে এবং তারা সীমালংঘন করেছে গুরুতররূপে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের নিকট ফেরেশতা প্রেরণ করলেও এবং মৃতেরা তাদের সাথে কথা বললেও এবং সকল বস্তুকে তাদের সামনে হাযির করলেও যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন তারা বিশ্বাস করবে না; কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ।” (৬: ১১১)।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে প্রত্যক্ষ করবে সেদিন অপরাধীদের জন্যে সুসংবাদ থাকবে না এবং তারা বলবেঃ রক্ষা কর, রক্ষা কর। অর্থাৎ যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাচ্ছে না সেদিনই তাদের জন্যে উত্তম। আর যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাবে সেদিন তাদের জন্যে সুসংবাদ থাকবে না। এটা বাস্তবে রূপলাভ করবে কিয়ামতের দিনে হাযিরীরসময়, যখন ফেরেশতামণ্ডলী তাদেরকে জাহান্নাম ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর ক্রোধের সুসংবাদ প্রদান করবেন। ঐ সময় ফেরেশতারা কাফিরকে তার প্রাণবায়ু বের হবার সময় বলবেনঃ “হে কলুষিত দেহের মধ্যে অবস্থিত কলুষিত আত্মা! তুমি বের হয়ে এসো! বের হয়ে এসো অত্যুষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানির দিকে এবং কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রছায়ার দিকে।” তখন ঐ আত্মা বের হতে অস্বীকার করবে এবং দেহের মধ্যে লুকাতে থাকবে। সুতরাং তারা ওকে প্রহার করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তুমি দেখতে, যখন ফেরেশতারা কাফিরদের মৃত্যু ঘটাবে তখন তারা তাদের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে প্রহার করবে।” (৮:৫০) তিনি আর এক আয়াতে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তুমি দেখতে যখন যালিমরা মৃত্যুর কাঠিন্যের মধ্যে থাকবে এবং ফেরেশতারা তাদের হাত বিস্তারকারী হবে।” (৬:৯৩) অর্থাৎ হাত বিস্তার করে তারা তাদেরকে মারতে থাকবেন। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতে কারীমায় বলেনঃ সেদিন অপরাধীদের জন্যে সুসংবাদ থাকবে না।এটা মুমিনদের অবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদেরকে সেই দিন ফেরেশতারা কল্যাণের ও আনন্দ লাভের সুসংবাদ দিবেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা বলে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলে- তোমরা ভীত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও।আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা তোমরা ফরমায়েশ কর। এটা হবে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (৪১:৩০-৩২)সহীহ হাদীসে হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতারা মুমিনের আত্মাকে বলেনঃ “পবিত্র দেহের মধ্যে অবস্থিত হে পবিত্র আত্মা! বেরিয়ে এসো। বেরিয়ে এসো আরাম, উত্তম জীবনোপকরণ ও এমন প্রতিপালকের দিকে যিনি রাগান্বিত নন।” সূরায়ে ইবরাহীমের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার ঐ উক্তির তাফসীরে বর্ণিত হাদীস গত হয়েছে, যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী তাদেরকে ইহজীবনে ও পরজীবনে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন এবং যারা যালিম আল্লাহ তাদেরকে বিভ্রান্তিতে রাখবেন, আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন।”(১৪:২৭) অন্যেরা বলেছেন যে, (আরবি) দ্বারা কিয়ামতের দিনকে বুঝানো হয়েছে। এটা মুজাহিদ (রঃ), যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ বলেছেন। তবে এ কথা এবং পূর্বের কথা পরস্পর বিরোধী নয়। কারণ এই দুই দিন অর্থাৎ মৃত্যুর দিন ও কিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফিরদের জন্যে তো জাজ্বল্যমান হবে। ফেরেশতারা মুমিনদেরকে করুণা ও সন্তুষ্টির সুসংবাদ দিবেন এবং কাফিরদেরকে সংবাদ দিবেন ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ততার। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে সেই দিন অপরাধীদের জন্যে কোন সুসংবাদ থাকবে না। আর সেই দিন তারা বলবেঃ রক্ষা কর, রক্ষা কর। অর্থাৎ ফেরেশতারা কাফিরদেরকে বলবেনঃ আজকে তোমাদের জন্যে মুক্তি ও পরিত্রাণ হারাম করে দেয়া হয়েছে। (আরবি) শব্দের মূল হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ নিষেধ করা বা বিরত রাখা। এর থেকেই বলা হয়। (আরবি) অর্থাৎ অমুকের উপর বিচারক নিষিদ্ধ করেছেন, যখন তিনি তার উপর খরচ নিষিদ্ধ করেন, হয়তো বা দারিদ্রের কারণে অথবা নির্বুদ্ধিতার কারণে বা বাল্যাবস্থার কারণে অথবা এ ধরনের অন্য কোন কারণে। আর এটা হতেই বায়তুল্লাহ শরীফের (কালো) পাথরের নাম (আরবি)রাখা হয়েছে। কেননা, ওর মধ্যে তাওয়াফ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ওর পিছন দিয়ে তাওয়াফ করার নির্দেশ রয়েছে। এই একই কারণে (জ্ঞান) (আরবি) -কে বলা হয়। কেননা, এই জ্ঞান জ্ঞানীকে এমন কিছু গ্রহণ করা হতে বিরত রাখে যা তার পক্ষে উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নয়।মোটকথা, (আরবি) -এর মধ্যে যে (আরবি) বা সর্বনাম রয়েছে ওটা (আরবি) (ফেরেশতাগণ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। এটা মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রঃ), যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ), আতিয়্যা আওফী (রঃ), আতা খুরাসানী (রঃ) এবং খাসীফ (রঃ)-এর উক্তি। ইবনে জারীর (রঃ) এটাকে পছন্দ করেছেন।(আরবি) এই উক্তি সম্পর্কে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, মুত্তাকীদেরকে যে জিনিসের সুসংবাদ দেয়া হবে সে জিনিসের সুসংবাদ কাফির ও অপরাধীদেরকে দেয়া হারাম করে দেয়া হবে, এর অর্থ এটাই। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ইবনে জুরায়েজ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ এটা হবে মুশরিকদের কথা। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) (যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে প্রত্যক্ষ করবে), অর্থাৎ তারা ফেরেশতাদের হতে আশ্রয় কামনা করবে। আরববাসীদের এটা নিয়ম ছিল যে, যখন তাদের কারো উপর কোন বিপদ আসতো বা তারা কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতো তখন তারা (আরবি) একথা বলতো। একথা বলার কারণ ও যৌক্তিকতা থাকলেও এটা বাকরীতি ও রচনাভঙ্গীর বিপরীত কথা। তা ছাড়া জমহুর উলামা এর বিপক্ষে দলীল এনেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের কৃতকর্মগুলো বিবেচনা করবো, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলি-কণায় পরিণত করবো। এটা কিয়ামতের দিন হবে, যখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের ভালমন্দ কার্যের হিসাব গ্রহণ করবেন। ঐ সময় তিনি খবর দিবেন যে, এই মুশরিকরা তাদের যে কৃতকর্মগুলোকে তাদের মুক্তির মাধ্যম মনে করেছিল সেগুলো সবই বিফলে গেছে। আজ ওগুলো তাদের কোনই উপকারে আসবে না। এটা এই কারণে যে, ওগুলো শরীয়তের শর্তকে হারিয়ে ফেলেছে। শর্ত ছিল যে, ওগুলোতে আন্তরিকতা থাকতে হবে এবং আল্লাহর শরীয়তের অনুগামী হতে হবে। সুতরাং যে আমলে আন্তরিকতা থাকবে না এবং আল্লাহর শরীয়ত অনুযায়ী যে আমল হবে না তা বাতিল ও বিফল হয়ে যাবে। কাফিরদের আমলে এ দু’টির কোনটাই নেই। কাজেই তা কবূল হওয়া সুদূর পরাহত। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেছেনঃ আমি তাদের কৃতকর্মগুলো বিবেচনা করবো, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলি-কণায় পরিণত করবো।হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে (আরবি) -এর অর্থ হলো সূর্যের কিরণ যা দেয়ালের ছিদ্রে প্রবেশ করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হযরত সুদ্দী (রঃ), হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতেও অনুরূপ উক্তি বর্ণিত আছে।হযরত উবায়েদ ইবনে ইয়ালা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো ঐ ভস্ম যাকে বাতাস প্রচণ্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়, ফলে তা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। মোটকথা, এসব হচ্ছে সতর্কতামূলক কথা যে, কাফির ও মুশরিকরা তাদের কৃত আমলগুলোকে নাজাতের মাধ্যম মনে করে নিয়েছে বটে, কিন্তু যখন ওগুলোকে মহাবিজ্ঞানময় ও ন্যায় বিচারক আল্লাহর সামনে পেশ করা হবে তখন তারা দেখবে যে, সবগুলোই বিফলে গেছে। ওগুলো তাদের কোনই উপকারে আসবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের উপমা এই যে, তাদের কর্মসমূহ ভস্ম সদৃশ যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচণ্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না। এটা তো ঘেরি বিভ্রান্তি।” (১৪:১৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! দানের কথা প্রচার করে এবং ক্লেশ দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে ঐ ব্যক্তির ন্যায় নিষ্ফল করো না যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্যে ব্যয় করে থাকে, এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না। তার উপমা একটি মসৃণ পাথর যার উপর কিছু মাটি থাকে, অতঃপর প্রবল বৃষ্টিপাত ওকে পরিষ্কার করে রেখে দেয়। যা তারা উপার্জন করেছে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারবে না।” (২:২৬৪) মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য এক আয়াতে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা কুফরী করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ, পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু সে ওর নিকট উপস্থিত হলে দেখবে ওটা কিছু নয়।” (২৪: ৩৯) এ আয়াতের তাফসীরে এ সম্পর্কে সবকিছু বর্ণনা গত হয়েছে। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহর জন্যেই।আল্লাহ পাক বলেনঃ সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।” (৫৯:২০) ওটা এই যে, জান্নাত বাসীরা উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে এবং শান্তি ও আরামদায়ক কক্ষে অবস্থান করবে। তারা থাকবে নিরাপদ স্থানে যা সুদৃশ্য ও মনোরম মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃঅর্থাৎ “সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে ওটা কতই না। উৎকৃষ্ট।” (২৫:৭৬) পক্ষান্তরে জাহান্নামবাসীরা অতি জঘন্য ও নিকৃষ্ট স্থানে অবস্থান করবে, হা-হুতাম করবে এবং বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি ও যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে ওটা কতই না নিকৃষ্ট!” (২৫:৬৬) অর্থাৎ তাদের অবতরণ স্থল দেখতে কতই না খারাপ এবং আশ্রয়স্থল হিসেবে ওটা কতই না জঘন্য! এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। অর্থাৎ তারা যে গ্রহণীয় আমল করেছে তার বিনিময়ে তারা যা পাওয়ার তা পেয়েছে এবং যে স্থানে অবস্থান করার সে স্থানে অবস্থান করেছে। কিন্তু জাহান্নামীদের অবস্থা এর বিপরীত। কারণ তাদের একটি আমলও এমন নেই যার মাধ্যমে তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা ভাগ্যবানদের অবস্থা দ্বারা হতভাগ্যের অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন যে, তাদের নিকট কোনই কল্যাণ নেই। হযরত যহহাক (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, ওটা এমন এক সময় যে সময়ে আল্লাহর ওলীরা সিংহাসনের উপর সুলোচনা হুরদের সাথে অবস্থান করবে। আর আল্লাহর শত্রুরা তাদের শয়তান সঙ্গীদের সাথে লাঞ্ছিত অবস্থায় বসবাস করবে।হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, দিনের অর্ধভাগে আল্লাহ তা'আলা হিসাব হতে ফারেগ হবেন। অতঃপর জান্নাতবাসীরা জান্নাতে বিশ্রাম গ্রহণ করবে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে বিশ্রাম নেবে।হযরত ইকরামা (রঃ) বলেনঃ ঐ সময় আমার জানা আছে যখন জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে তখন দুনিয়া দিবসের প্রথম অংশের উঁচুতে অবস্থান করবে (দিনের প্রথম ভাগে সূর্য অনেকটা উপরে উঠে ববে)। যেই সময় মানুষ দুপুরের বিশ্রামের সময় তাদের পরিবারের (স্ত্রীদের) কিট গমন করে থাকে। সুতরাং ঐ সময় জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে গমন কবে। পক্ষান্তরে জান্নাতবাসীদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে। কাজেই তাদের দরে বিশ্রামস্থল হবে জান্নাত। সেখানে তাদেরকে মাছের কলিজা আহার করানো হবে এবং তারা সবাই তাতে পরিতৃপ্ত হবে। এর উপর ভিত্তি করেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ অর্ধ দিন হবে না যে পর্যন্ত না এরা এবং ওরা বিশ্রামস্থল গ্রহণ করবে। অতঃপর তিনি পাঠ করেন (আরবি)-এ আয়াতটি এবং পরে পাঠ করেন। (আরবি)-এ আয়াতটি। “আর তাদের (জাহান্নামীদের) গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে।” (৩৭: ৬৮)(আরবি) এ আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে বলেন যে, এর দ্বারা জান্নাতের কক্ষসমূহ বুঝানো হয়েছে। যখন তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে একবার পেশ করা হবে তখন তাদের হিসাব খুবই সহজভাবে গ্রহণ করা হবে। যেমন মহান আল্লাহ এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাকে তার আমলনামা দক্ষিণ হস্তে দেয়া হবে তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেয়া হবে। আর সে তার স্বজনদের নিকট প্রফুল্ল চিত্তে ফিরে যাবে।” (৮৪: ৮-৯) কাতাদা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আশ্রয়স্থল ও অবতরণস্থল।সাফওয়ান ইবনে মুহরিম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের দিন এমন দু’জন লোককে আনয়ন করা হবে যাদের একজন দুনিয়ায় লাল-সাদাদের নিকট বাদশাহ রূপে ছিল। তার হিসাব গ্রহণ করা হবে। কিন্তু সে এমনই এক বান্দা যে, জীবনে কখনো সে একটি সৎ কাজও করেনি। সুতরাং তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হবে। আর অপর লোকটি এতো দরিদ্র ছিল যে, পরিধেয় বস্ত্রটি ছিল তার একমাত্র সম্বল। তার হিসাব গ্রহণ করা হলে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আপনি এমন কিছু দেননি যার হিসেব আমার কাছে নিবেন।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমার বান্দা সত্য কথা বলেছে। সুতরাং (হে আমার ফেরেশতামণ্ডলী)! তোমরা তাকে পাঠিয়ে দাও।” অতঃপর তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করার নির্দেশ দেয়া হবে। তারপর আল্লাহ যতদিন চাবেন তাদেরকে তাদের নিজ নিজ অবস্থায় ছেড়ে দিবেন। এরপর তিনি জাহান্নামবাসী লোকটিকে ডেকে পাঠাবেন। সে মহান আল্লাহর সামনে হাযির হলে দেখা যাবে যে, সে অত্যন্ত কালো কয়লার মত হয়ে গেছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তুমি কেমন বিশ্রামস্থল পেয়েছো?” উত্তরে সে বলবেঃ “আমার বিশ্রামস্থল অত্যন্ত জঘন্য।” তখন তাকে বলা হবেঃ “তুমি সেখানেই ফিরে যাও।” অতঃপর জান্নাতবাসী ঐ লোকটিকে ডাকা হবে। তার চেহারা হবে চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল। তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তোমার বাসস্থান তুমি কেমন পেয়েছো?” উত্তরে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি উত্তম বাসস্থান পেয়েছি। তাকে তখন বলা হবেঃ “তুমি (তোমার ঐ জায়গাতেই) ফিরে যাও।” (ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ আস্ সওয়াফ (রঃ)-এর নিকট খবর পৌঁছেছে যে, কিয়ামতের দিনটি মুমিনের নিকট খুবই ছোট অনুভূত হবে। এমনকি তাদের মনে হবে যে, ওটা আসর হতে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়। তারা জান্নাতের বাগানে ঘোরাফেরা করবে। আল্লাহ তাআলার উক্তির তাৎপর্য এটাই যে, সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম। ২৫। যেদিন আকাশ মেঘপুঞ্জ সহ বিদীর্ণ হবে এবং ফেরেশতাদেরকে নামিয়ে দেয়া হবে।

আল-ফুরকান 25:25

২৫-২৯ নং আয়াতের তাফসীরকিয়ামতের দিন যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে এবং যেসব বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হবে, আল্লাহ তাআলা এখানে তারই সংবাদ দিচ্ছেন। এগুলোর মধ্য হতে কয়েকটি যেমনঃ আকাশ মেঘপুঞ্জসহ বিদীর্ণ হওয়া এবং ফেরেশতাদেরকে নামিয়ে দেয়া। সেই দিন ফেরেশতারা একত্রিত হওয়ার স্থানে সমস্ত সৃষ্টজীবকে পরিবেষ্টন করে ফেলবেন। অতঃপর মহা কল্যাণময় প্রতিপালক বিচার-ফায়সালার জন্যে আগমন করবেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ তাদের নিকট মেঘের ছায়ার মধ্যে আগমন করবেন তারা শুধু এরই অপেক্ষা করছে।” (২:২১০) আল্লাহ পাকের(আরবি)-এই উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা দানব, মানব, পশু-পাখী এবং সমস্ত সৃষ্টজীবকে একই মাটিতে একত্রিত করবেন। অতঃপর দুনিয়ার আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে এবং এই আকাশের অধিবাসীরা নীচে নেমে আসবে যাদের সংখ্যা দানব, মানব ও সমুদয় সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী হবে। সুতরাং তারা দানব, মানব এবং সমুদয় মাখলুককে পরিবেষ্টন করে ফেলবে। এরপর দ্বিতীয় আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং ওর অধিবাসীরা নীচে নেমে আসবে। তারা তাদের পূর্বে অবতণকারী ফেরেশতাদেরকে ও জ্বিন, মানুষ এবং সমস্ত মাখলুককে পরিবেষ্টন করবে। আর এই দ্বিতীয় আকাশের অধিবাসীদের সংখ্যা হবে দুনিয়ার আকাশের অধিবাসী এবং সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী। তারপর তৃতীয় আকাশ ফেটে যাবে এবং ওর অধিবাসীরা নীচে অবতরণ করবে। তারা সংখ্যায় দ্বিতীয় আকাশের অধিবাসী, দুনিয়ার আকাশের অধিবাসী এবং সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা অধিক হবে। তারা তাদের পূর্বে অবতারিত ফেরেশতাসমূহ, দানব, মানব এবং সমুদয় মাখলুককে পরিবেষ্টন করবে। অতঃপর অনুরূপভাবে প্রত্যেক আকাশই ফেটে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত সপ্তম আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং ওর অধিবাসীরা নীচে নেমে আসবে যাদের সংখ্যা ছয় আকাশের অধিবাসী, দানব, মানব এবং সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী হবে। তারা তাদের পূর্বে অবতারিত আকাশসমূহের অধিবাসী, জ্বিন, মানুষ এবং সমস্ত মাখলুককে পরিবেষ্টন করবে। আর আমাদের মহামহিমান্বিত প্রতিপালক মেঘমালার ছায়ায় অবতরণ করবেন। এবং তাঁর চতুর্দিকে তাঁর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাগণ থাকবেন যাদের সংখ্যা সপ্ত আকাশের অধিবাসী দানব, মানব ও সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী হবে। বর্শার ফলকের গিঁটের মত তাঁদের শিং থাকবে। তারা আরশের নীচে অবস্থান করবেন। তারা মহামহিমান্বিত আল্লাহর তাসবীহ-তাহলীল পাঠে এবং তাঁর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণায় লিপ্ত থাকবেন। তাদের পায়ের পাতা ও পায়ের গিটের মধ্যকার দূরত্ব হবে পাঁচশ’ বছরের পথ। পায়ের গিট ও হাঁটুর মধ্যকার দূরত্ব হবে পাঁচশ' বছরের পথ। হাঁটু হতে কোমর পর্যন্ত জায়গার দূরত্ব হবে পাচশ' বছরের পথ। কোমর থেকে নিয়ে বুকের উপরের অস্থি পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হবে পাঁচশ' বছরের পথ। বক্ষের উপরোস্থিত অস্থি হতে কানের লতি পর্যন্ত জায়গার দূরত্ব হবে পাঁচশ বছরের পথ। আর সেখান থেকে উপরের শেষাংশ পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হবে পাঁচশ' বছরের পথ। জাহান্নাম এর অনুভূতি স্থল।” (এভাবে এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইউসুফ ইবনে মাহরান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ এই আকাশ যখন বিদীর্ণ হয়ে যাবে তখন এটা হতে ফেরেশতারা অবতরণ করবেন যাদের সংখ্যা মানব ও দানব হতে বেশী হবে। ওটা হলো কিয়ামতের দিন, যেই দিন আসমানের অধিবাসী ও যমীনের অধিবাসীরা মিলিত হবে। তখন যমীনবাসীরা জিজ্ঞেস করবেঃ “আমাদের প্রতিপালক এসেছেন কি?” তারা উত্তরে বলবেনঃ “তিনি এখনো আসেননি, তবে আসবেন।” অতঃপর দ্বিতীয় আকাশ ফেটে যাবে। তারপর পর্যায়ক্রমে আকাশগুলো ফাটতে থাকবে। অবশেষে সপ্তম আকাশ ফেটে পড়বে। তখন ওর থেকে ফেরেশতারা নীচে অবতরণ করবেন যাদের সংখ্যা পূর্বে আকাশসমূহ হতে অবতারিত সমুদয় ফেরেশতা হতে এবং সমস্ত দানব ও মানব হতে বেশী হবে। তারপর নেতৃস্থানীয় ফেরেশতাগণ অবতরণ করবেন। অতঃপর আমাদের প্রতিপালক আটজন ফেরেশতা দ্বারা বহনকৃত আরশে চড়ে আসবেন। ঐ আটজন ফেরেশতার প্রত্যেকের পায়ের গিঁট হতে কাঁধ পর্যন্ত জায়গার দূরত্ব হবে পাঁচশ বছরের রাস্তা। ঐ ফেরেশতারা একে অপরের মুখের দিকে তাকাবেন না। বরং তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ মাথা নিজ নিজ হস্তদ্বয়ের মাঝে রেখে বলতে থাকবেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মহান ও পবিত্র বাদশাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। তাদের মাথার উপর তীরের ন্যায় কিছু থাকবে এবং ওর উপর আরশ থাকবে। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ বর্ণনাটি খুবই দুর্বল এবং এতে কঠিন অস্বীকৃতি রয়েছে। প্রসিদ্ধ সূরের (শিঙ্গার) হাদীসে প্রায় এরূপই বর্ণনা রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী)মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেদিন সংঘটিত হবে মহাপ্রলয়, এবং আকাশ বিদীর্ণ হয়ে বিশ্লিষ্ট হয়ে পড়বে। ফেরেশতারা আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে এবং সেই দিন আটজন ফেরেশতা তাদের প্রতিপালকের আরশকে ধারণ করবে তাদের ঊর্ধ্বে।” (৬৯:১৫-১৭)শাহর ইবনে হাউশিব (রঃ) বলেন যে, আটজন ফেরেশতা আরশ বহন করবেন। তাদের মধ্যে চারজন বলতে থাকবেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি। আপনার জানার পরেও আপনার সহনশীলতার জন্যে প্রশংসা আপনার।” আর তাদের অবশিষ্ট চারজন বলবেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার মহিমা ঘোষণা করছি। আপনার ক্ষমতার পরেও আপনার ক্ষমার কারণে প্রশংসা আপনারই জন্যে।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আবু বকর ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) বলেন যে, যমীনবাসী যখন আরশের দিকে তাকাবে তখন তাদের চক্ষু স্থির ও বিস্ফারিত হয়ে যাবে এবং প্রাণ হয়ে যাবে কণ্ঠাগত।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ ‘সেই দিন প্রকৃত কর্তৃত্ব হবে দয়াময়ের। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আজ কর্তৃত্ব কার? আল্লাহর জন্যে, যিনি এক, প্রবল পরাক্রান্ত।” (৪০: ১৬)সহীহ হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানসমূহকে ডান হাতে এবং যমীনসমূহকে বাম হাতে ধারণ পূর্বক বললেনঃ “আমি বাদশাহ এবং আমি মহাবিচারক। যমীনের বাদশাহরা কোথায়? কোথায় শক্তিশালীরা? অহংকারীরা কোথায়?” আর এক জায়গায় তার উক্তি রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “ঐ দিন কাফিরদের উপর কঠিন হবে।” (২৫: ২৬) কেননা, ওটা হবে ন্যায়বিচার ও ফায়সালার দিন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওটা সেই দিন হবে কঠিন দিন। কাফিরদের উপর তা সহজ নয়।” (৭৪: ৯-১০) সুতরাং এই দিন এটা হবে কাফিরদের অবস্থা। পক্ষান্তরে মুমিনদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “বড় ভয়-বিহ্বলতা তাদেরকে চিন্তান্বিত করবে না।” (২১:১০৩)। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ওটা এমন একদিন যা পার্থিব পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান' এই দিন কতই না দীর্ঘ হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! অবশ্যই ওটা মুমিনের উপর হালকা করা হবে। এমনকি ওটা তার উপর দুনিয়ার ফরয নামাযের চেয়েও হালকা হবে।” মহান আল্লাহর উক্তিঃ যালিম ব্যক্তি সেই দিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করবে। এই উক্তি দ্বারা আল্লাহ তা'আলা ঐ যালিমের অনুতাপের সংবাদ দিচ্ছেন যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং তিনি যে সুস্পষ্ট সত্য জিনিস আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে নিয় এসেছেন তা থেকে সরে পড়েছে, আর রাসূল (সঃ)-এর বাতলানো পথের বিপরীত পথে চলেছে। সুতরাং যেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেই দিন সে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হবে এবং শোকে ও দুঃখে স্বীয় হস্ত কামড়াতে থাকবে। কিন্তু ঐ সময় এতে কোনই উপকার সে লাভ করতে পারবে না। এ আয়াতটি উকবা ইবনে আবি মুঈত এবং অন্যান্য দুষ্ট শ্রেণীর লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও প্রত্যেক যালিমের ব্যাপারে এটা সাধারণ এবং সমানভাবে প্রযোজ্য। অতএব কিয়ামতের দিন প্রত্যেক যালিমই অত্যন্ত লজ্জিত হবে এবং স্বীয় হস্তদ্বয় কামড়াতে কামড়াতে বলবেঃ “হায়! আমি যদি রাসূল (সঃ)-এর সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায় দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!” অর্থাৎ যে তাকে হিদায়াতের পথ হতে সরিয়ে দিয়ে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে গিয়েছিল তার কথা মান্য করার কারণে সে এরূপ আক্ষেপ করবে। এটা উমাইয়া ইবনে খালফ অথবা তার ভাই উবাই ইবনে খালফ বা অন্যান্য সমস্ত যালিমের ব্যাপারেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ‘আমাকে তো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ অর্থাৎ কুরআন পৌঁছার পর। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘শয়তান তো মানুষের জন্যে মহাপ্রতারক।' অর্থাৎ সে প্রতারণা করে মানুষকে সত্য পথ থেকে সরিয়ে দিয়ে বিভ্রান্তি ও বাতিলের পথে নিয়ে যায়। আর সে তাকে ঐ দিকে আহ্বান করে।

আল-ফুরকান 25:26

২৫-২৯ নং আয়াতের তাফসীরকিয়ামতের দিন যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে এবং যেসব বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হবে, আল্লাহ তাআলা এখানে তারই সংবাদ দিচ্ছেন। এগুলোর মধ্য হতে কয়েকটি যেমনঃ আকাশ মেঘপুঞ্জসহ বিদীর্ণ হওয়া এবং ফেরেশতাদেরকে নামিয়ে দেয়া। সেই দিন ফেরেশতারা একত্রিত হওয়ার স্থানে সমস্ত সৃষ্টজীবকে পরিবেষ্টন করে ফেলবেন। অতঃপর মহা কল্যাণময় প্রতিপালক বিচার-ফায়সালার জন্যে আগমন করবেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ তাদের নিকট মেঘের ছায়ার মধ্যে আগমন করবেন তারা শুধু এরই অপেক্ষা করছে।” (২:২১০) আল্লাহ পাকের(আরবি)-এই উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা দানব, মানব, পশু-পাখী এবং সমস্ত সৃষ্টজীবকে একই মাটিতে একত্রিত করবেন। অতঃপর দুনিয়ার আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে এবং এই আকাশের অধিবাসীরা নীচে নেমে আসবে যাদের সংখ্যা দানব, মানব ও সমুদয় সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী হবে। সুতরাং তারা দানব, মানব এবং সমুদয় মাখলুককে পরিবেষ্টন করে ফেলবে। এরপর দ্বিতীয় আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং ওর অধিবাসীরা নীচে নেমে আসবে। তারা তাদের পূর্বে অবতণকারী ফেরেশতাদেরকে ও জ্বিন, মানুষ এবং সমস্ত মাখলুককে পরিবেষ্টন করবে। আর এই দ্বিতীয় আকাশের অধিবাসীদের সংখ্যা হবে দুনিয়ার আকাশের অধিবাসী এবং সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী। তারপর তৃতীয় আকাশ ফেটে যাবে এবং ওর অধিবাসীরা নীচে অবতরণ করবে। তারা সংখ্যায় দ্বিতীয় আকাশের অধিবাসী, দুনিয়ার আকাশের অধিবাসী এবং সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা অধিক হবে। তারা তাদের পূর্বে অবতারিত ফেরেশতাসমূহ, দানব, মানব এবং সমুদয় মাখলুককে পরিবেষ্টন করবে। অতঃপর অনুরূপভাবে প্রত্যেক আকাশই ফেটে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত সপ্তম আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং ওর অধিবাসীরা নীচে নেমে আসবে যাদের সংখ্যা ছয় আকাশের অধিবাসী, দানব, মানব এবং সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী হবে। তারা তাদের পূর্বে অবতারিত আকাশসমূহের অধিবাসী, জ্বিন, মানুষ এবং সমস্ত মাখলুককে পরিবেষ্টন করবে। আর আমাদের মহামহিমান্বিত প্রতিপালক মেঘমালার ছায়ায় অবতরণ করবেন। এবং তাঁর চতুর্দিকে তাঁর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাগণ থাকবেন যাদের সংখ্যা সপ্ত আকাশের অধিবাসী দানব, মানব ও সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী হবে। বর্শার ফলকের গিঁটের মত তাঁদের শিং থাকবে। তারা আরশের নীচে অবস্থান করবেন। তারা মহামহিমান্বিত আল্লাহর তাসবীহ-তাহলীল পাঠে এবং তাঁর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণায় লিপ্ত থাকবেন। তাদের পায়ের পাতা ও পায়ের গিটের মধ্যকার দূরত্ব হবে পাঁচশ’ বছরের পথ। পায়ের গিট ও হাঁটুর মধ্যকার দূরত্ব হবে পাঁচশ' বছরের পথ। হাঁটু হতে কোমর পর্যন্ত জায়গার দূরত্ব হবে পাচশ' বছরের পথ। কোমর থেকে নিয়ে বুকের উপরের অস্থি পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হবে পাঁচশ' বছরের পথ। বক্ষের উপরোস্থিত অস্থি হতে কানের লতি পর্যন্ত জায়গার দূরত্ব হবে পাঁচশ বছরের পথ। আর সেখান থেকে উপরের শেষাংশ পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হবে পাঁচশ' বছরের পথ। জাহান্নাম এর অনুভূতি স্থল।” (এভাবে এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইউসুফ ইবনে মাহরান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ এই আকাশ যখন বিদীর্ণ হয়ে যাবে তখন এটা হতে ফেরেশতারা অবতরণ করবেন যাদের সংখ্যা মানব ও দানব হতে বেশী হবে। ওটা হলো কিয়ামতের দিন, যেই দিন আসমানের অধিবাসী ও যমীনের অধিবাসীরা মিলিত হবে। তখন যমীনবাসীরা জিজ্ঞেস করবেঃ “আমাদের প্রতিপালক এসেছেন কি?” তারা উত্তরে বলবেনঃ “তিনি এখনো আসেননি, তবে আসবেন।” অতঃপর দ্বিতীয় আকাশ ফেটে যাবে। তারপর পর্যায়ক্রমে আকাশগুলো ফাটতে থাকবে। অবশেষে সপ্তম আকাশ ফেটে পড়বে। তখন ওর থেকে ফেরেশতারা নীচে অবতরণ করবেন যাদের সংখ্যা পূর্বে আকাশসমূহ হতে অবতারিত সমুদয় ফেরেশতা হতে এবং সমস্ত দানব ও মানব হতে বেশী হবে। তারপর নেতৃস্থানীয় ফেরেশতাগণ অবতরণ করবেন। অতঃপর আমাদের প্রতিপালক আটজন ফেরেশতা দ্বারা বহনকৃত আরশে চড়ে আসবেন। ঐ আটজন ফেরেশতার প্রত্যেকের পায়ের গিঁট হতে কাঁধ পর্যন্ত জায়গার দূরত্ব হবে পাঁচশ বছরের রাস্তা। ঐ ফেরেশতারা একে অপরের মুখের দিকে তাকাবেন না। বরং তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ মাথা নিজ নিজ হস্তদ্বয়ের মাঝে রেখে বলতে থাকবেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মহান ও পবিত্র বাদশাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। তাদের মাথার উপর তীরের ন্যায় কিছু থাকবে এবং ওর উপর আরশ থাকবে। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ বর্ণনাটি খুবই দুর্বল এবং এতে কঠিন অস্বীকৃতি রয়েছে। প্রসিদ্ধ সূরের (শিঙ্গার) হাদীসে প্রায় এরূপই বর্ণনা রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী)মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেদিন সংঘটিত হবে মহাপ্রলয়, এবং আকাশ বিদীর্ণ হয়ে বিশ্লিষ্ট হয়ে পড়বে। ফেরেশতারা আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে এবং সেই দিন আটজন ফেরেশতা তাদের প্রতিপালকের আরশকে ধারণ করবে তাদের ঊর্ধ্বে।” (৬৯:১৫-১৭)শাহর ইবনে হাউশিব (রঃ) বলেন যে, আটজন ফেরেশতা আরশ বহন করবেন। তাদের মধ্যে চারজন বলতে থাকবেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি। আপনার জানার পরেও আপনার সহনশীলতার জন্যে প্রশংসা আপনার।” আর তাদের অবশিষ্ট চারজন বলবেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার মহিমা ঘোষণা করছি। আপনার ক্ষমতার পরেও আপনার ক্ষমার কারণে প্রশংসা আপনারই জন্যে।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আবু বকর ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) বলেন যে, যমীনবাসী যখন আরশের দিকে তাকাবে তখন তাদের চক্ষু স্থির ও বিস্ফারিত হয়ে যাবে এবং প্রাণ হয়ে যাবে কণ্ঠাগত।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ ‘সেই দিন প্রকৃত কর্তৃত্ব হবে দয়াময়ের। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আজ কর্তৃত্ব কার? আল্লাহর জন্যে, যিনি এক, প্রবল পরাক্রান্ত।” (৪০: ১৬)সহীহ হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানসমূহকে ডান হাতে এবং যমীনসমূহকে বাম হাতে ধারণ পূর্বক বললেনঃ “আমি বাদশাহ এবং আমি মহাবিচারক। যমীনের বাদশাহরা কোথায়? কোথায় শক্তিশালীরা? অহংকারীরা কোথায়?” আর এক জায়গায় তার উক্তি রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “ঐ দিন কাফিরদের উপর কঠিন হবে।” (২৫: ২৬) কেননা, ওটা হবে ন্যায়বিচার ও ফায়সালার দিন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওটা সেই দিন হবে কঠিন দিন। কাফিরদের উপর তা সহজ নয়।” (৭৪: ৯-১০) সুতরাং এই দিন এটা হবে কাফিরদের অবস্থা। পক্ষান্তরে মুমিনদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “বড় ভয়-বিহ্বলতা তাদেরকে চিন্তান্বিত করবে না।” (২১:১০৩)। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ওটা এমন একদিন যা পার্থিব পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান' এই দিন কতই না দীর্ঘ হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! অবশ্যই ওটা মুমিনের উপর হালকা করা হবে। এমনকি ওটা তার উপর দুনিয়ার ফরয নামাযের চেয়েও হালকা হবে।” মহান আল্লাহর উক্তিঃ যালিম ব্যক্তি সেই দিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করবে। এই উক্তি দ্বারা আল্লাহ তা'আলা ঐ যালিমের অনুতাপের সংবাদ দিচ্ছেন যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং তিনি যে সুস্পষ্ট সত্য জিনিস আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে নিয় এসেছেন তা থেকে সরে পড়েছে, আর রাসূল (সঃ)-এর বাতলানো পথের বিপরীত পথে চলেছে। সুতরাং যেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেই দিন সে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হবে এবং শোকে ও দুঃখে স্বীয় হস্ত কামড়াতে থাকবে। কিন্তু ঐ সময় এতে কোনই উপকার সে লাভ করতে পারবে না। এ আয়াতটি উকবা ইবনে আবি মুঈত এবং অন্যান্য দুষ্ট শ্রেণীর লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও প্রত্যেক যালিমের ব্যাপারে এটা সাধারণ এবং সমানভাবে প্রযোজ্য। অতএব কিয়ামতের দিন প্রত্যেক যালিমই অত্যন্ত লজ্জিত হবে এবং স্বীয় হস্তদ্বয় কামড়াতে কামড়াতে বলবেঃ “হায়! আমি যদি রাসূল (সঃ)-এর সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায় দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!” অর্থাৎ যে তাকে হিদায়াতের পথ হতে সরিয়ে দিয়ে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে গিয়েছিল তার কথা মান্য করার কারণে সে এরূপ আক্ষেপ করবে। এটা উমাইয়া ইবনে খালফ অথবা তার ভাই উবাই ইবনে খালফ বা অন্যান্য সমস্ত যালিমের ব্যাপারেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ‘আমাকে তো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ অর্থাৎ কুরআন পৌঁছার পর। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘শয়তান তো মানুষের জন্যে মহাপ্রতারক।' অর্থাৎ সে প্রতারণা করে মানুষকে সত্য পথ থেকে সরিয়ে দিয়ে বিভ্রান্তি ও বাতিলের পথে নিয়ে যায়। আর সে তাকে ঐ দিকে আহ্বান করে।

আল-ফুরকান 25:27

২৫-২৯ নং আয়াতের তাফসীরকিয়ামতের দিন যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে এবং যেসব বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হবে, আল্লাহ তাআলা এখানে তারই সংবাদ দিচ্ছেন। এগুলোর মধ্য হতে কয়েকটি যেমনঃ আকাশ মেঘপুঞ্জসহ বিদীর্ণ হওয়া এবং ফেরেশতাদেরকে নামিয়ে দেয়া। সেই দিন ফেরেশতারা একত্রিত হওয়ার স্থানে সমস্ত সৃষ্টজীবকে পরিবেষ্টন করে ফেলবেন। অতঃপর মহা কল্যাণময় প্রতিপালক বিচার-ফায়সালার জন্যে আগমন করবেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ তাদের নিকট মেঘের ছায়ার মধ্যে আগমন করবেন তারা শুধু এরই অপেক্ষা করছে।” (২:২১০) আল্লাহ পাকের(আরবি)-এই উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা দানব, মানব, পশু-পাখী এবং সমস্ত সৃষ্টজীবকে একই মাটিতে একত্রিত করবেন। অতঃপর দুনিয়ার আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে এবং এই আকাশের অধিবাসীরা নীচে নেমে আসবে যাদের সংখ্যা দানব, মানব ও সমুদয় সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী হবে। সুতরাং তারা দানব, মানব এবং সমুদয় মাখলুককে পরিবেষ্টন করে ফেলবে। এরপর দ্বিতীয় আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং ওর অধিবাসীরা নীচে নেমে আসবে। তারা তাদের পূর্বে অবতণকারী ফেরেশতাদেরকে ও জ্বিন, মানুষ এবং সমস্ত মাখলুককে পরিবেষ্টন করবে। আর এই দ্বিতীয় আকাশের অধিবাসীদের সংখ্যা হবে দুনিয়ার আকাশের অধিবাসী এবং সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী। তারপর তৃতীয় আকাশ ফেটে যাবে এবং ওর অধিবাসীরা নীচে অবতরণ করবে। তারা সংখ্যায় দ্বিতীয় আকাশের অধিবাসী, দুনিয়ার আকাশের অধিবাসী এবং সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা অধিক হবে। তারা তাদের পূর্বে অবতারিত ফেরেশতাসমূহ, দানব, মানব এবং সমুদয় মাখলুককে পরিবেষ্টন করবে। অতঃপর অনুরূপভাবে প্রত্যেক আকাশই ফেটে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত সপ্তম আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং ওর অধিবাসীরা নীচে নেমে আসবে যাদের সংখ্যা ছয় আকাশের অধিবাসী, দানব, মানব এবং সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী হবে। তারা তাদের পূর্বে অবতারিত আকাশসমূহের অধিবাসী, জ্বিন, মানুষ এবং সমস্ত মাখলুককে পরিবেষ্টন করবে। আর আমাদের মহামহিমান্বিত প্রতিপালক মেঘমালার ছায়ায় অবতরণ করবেন। এবং তাঁর চতুর্দিকে তাঁর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাগণ থাকবেন যাদের সংখ্যা সপ্ত আকাশের অধিবাসী দানব, মানব ও সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী হবে। বর্শার ফলকের গিঁটের মত তাঁদের শিং থাকবে। তারা আরশের নীচে অবস্থান করবেন। তারা মহামহিমান্বিত আল্লাহর তাসবীহ-তাহলীল পাঠে এবং তাঁর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণায় লিপ্ত থাকবেন। তাদের পায়ের পাতা ও পায়ের গিটের মধ্যকার দূরত্ব হবে পাঁচশ’ বছরের পথ। পায়ের গিট ও হাঁটুর মধ্যকার দূরত্ব হবে পাঁচশ' বছরের পথ। হাঁটু হতে কোমর পর্যন্ত জায়গার দূরত্ব হবে পাচশ' বছরের পথ। কোমর থেকে নিয়ে বুকের উপরের অস্থি পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হবে পাঁচশ' বছরের পথ। বক্ষের উপরোস্থিত অস্থি হতে কানের লতি পর্যন্ত জায়গার দূরত্ব হবে পাঁচশ বছরের পথ। আর সেখান থেকে উপরের শেষাংশ পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হবে পাঁচশ' বছরের পথ। জাহান্নাম এর অনুভূতি স্থল।” (এভাবে এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইউসুফ ইবনে মাহরান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ এই আকাশ যখন বিদীর্ণ হয়ে যাবে তখন এটা হতে ফেরেশতারা অবতরণ করবেন যাদের সংখ্যা মানব ও দানব হতে বেশী হবে। ওটা হলো কিয়ামতের দিন, যেই দিন আসমানের অধিবাসী ও যমীনের অধিবাসীরা মিলিত হবে। তখন যমীনবাসীরা জিজ্ঞেস করবেঃ “আমাদের প্রতিপালক এসেছেন কি?” তারা উত্তরে বলবেনঃ “তিনি এখনো আসেননি, তবে আসবেন।” অতঃপর দ্বিতীয় আকাশ ফেটে যাবে। তারপর পর্যায়ক্রমে আকাশগুলো ফাটতে থাকবে। অবশেষে সপ্তম আকাশ ফেটে পড়বে। তখন ওর থেকে ফেরেশতারা নীচে অবতরণ করবেন যাদের সংখ্যা পূর্বে আকাশসমূহ হতে অবতারিত সমুদয় ফেরেশতা হতে এবং সমস্ত দানব ও মানব হতে বেশী হবে। তারপর নেতৃস্থানীয় ফেরেশতাগণ অবতরণ করবেন। অতঃপর আমাদের প্রতিপালক আটজন ফেরেশতা দ্বারা বহনকৃত আরশে চড়ে আসবেন। ঐ আটজন ফেরেশতার প্রত্যেকের পায়ের গিঁট হতে কাঁধ পর্যন্ত জায়গার দূরত্ব হবে পাঁচশ বছরের রাস্তা। ঐ ফেরেশতারা একে অপরের মুখের দিকে তাকাবেন না। বরং তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ মাথা নিজ নিজ হস্তদ্বয়ের মাঝে রেখে বলতে থাকবেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মহান ও পবিত্র বাদশাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। তাদের মাথার উপর তীরের ন্যায় কিছু থাকবে এবং ওর উপর আরশ থাকবে। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ বর্ণনাটি খুবই দুর্বল এবং এতে কঠিন অস্বীকৃতি রয়েছে। প্রসিদ্ধ সূরের (শিঙ্গার) হাদীসে প্রায় এরূপই বর্ণনা রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী)মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেদিন সংঘটিত হবে মহাপ্রলয়, এবং আকাশ বিদীর্ণ হয়ে বিশ্লিষ্ট হয়ে পড়বে। ফেরেশতারা আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে এবং সেই দিন আটজন ফেরেশতা তাদের প্রতিপালকের আরশকে ধারণ করবে তাদের ঊর্ধ্বে।” (৬৯:১৫-১৭)শাহর ইবনে হাউশিব (রঃ) বলেন যে, আটজন ফেরেশতা আরশ বহন করবেন। তাদের মধ্যে চারজন বলতে থাকবেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি। আপনার জানার পরেও আপনার সহনশীলতার জন্যে প্রশংসা আপনার।” আর তাদের অবশিষ্ট চারজন বলবেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার মহিমা ঘোষণা করছি। আপনার ক্ষমতার পরেও আপনার ক্ষমার কারণে প্রশংসা আপনারই জন্যে।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আবু বকর ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) বলেন যে, যমীনবাসী যখন আরশের দিকে তাকাবে তখন তাদের চক্ষু স্থির ও বিস্ফারিত হয়ে যাবে এবং প্রাণ হয়ে যাবে কণ্ঠাগত।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ ‘সেই দিন প্রকৃত কর্তৃত্ব হবে দয়াময়ের। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আজ কর্তৃত্ব কার? আল্লাহর জন্যে, যিনি এক, প্রবল পরাক্রান্ত।” (৪০: ১৬)সহীহ হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানসমূহকে ডান হাতে এবং যমীনসমূহকে বাম হাতে ধারণ পূর্বক বললেনঃ “আমি বাদশাহ এবং আমি মহাবিচারক। যমীনের বাদশাহরা কোথায়? কোথায় শক্তিশালীরা? অহংকারীরা কোথায়?” আর এক জায়গায় তার উক্তি রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “ঐ দিন কাফিরদের উপর কঠিন হবে।” (২৫: ২৬) কেননা, ওটা হবে ন্যায়বিচার ও ফায়সালার দিন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওটা সেই দিন হবে কঠিন দিন। কাফিরদের উপর তা সহজ নয়।” (৭৪: ৯-১০) সুতরাং এই দিন এটা হবে কাফিরদের অবস্থা। পক্ষান্তরে মুমিনদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “বড় ভয়-বিহ্বলতা তাদেরকে চিন্তান্বিত করবে না।” (২১:১০৩)। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ওটা এমন একদিন যা পার্থিব পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান' এই দিন কতই না দীর্ঘ হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! অবশ্যই ওটা মুমিনের উপর হালকা করা হবে। এমনকি ওটা তার উপর দুনিয়ার ফরয নামাযের চেয়েও হালকা হবে।” মহান আল্লাহর উক্তিঃ যালিম ব্যক্তি সেই দিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করবে। এই উক্তি দ্বারা আল্লাহ তা'আলা ঐ যালিমের অনুতাপের সংবাদ দিচ্ছেন যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং তিনি যে সুস্পষ্ট সত্য জিনিস আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে নিয় এসেছেন তা থেকে সরে পড়েছে, আর রাসূল (সঃ)-এর বাতলানো পথের বিপরীত পথে চলেছে। সুতরাং যেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেই দিন সে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হবে এবং শোকে ও দুঃখে স্বীয় হস্ত কামড়াতে থাকবে। কিন্তু ঐ সময় এতে কোনই উপকার সে লাভ করতে পারবে না। এ আয়াতটি উকবা ইবনে আবি মুঈত এবং অন্যান্য দুষ্ট শ্রেণীর লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও প্রত্যেক যালিমের ব্যাপারে এটা সাধারণ এবং সমানভাবে প্রযোজ্য। অতএব কিয়ামতের দিন প্রত্যেক যালিমই অত্যন্ত লজ্জিত হবে এবং স্বীয় হস্তদ্বয় কামড়াতে কামড়াতে বলবেঃ “হায়! আমি যদি রাসূল (সঃ)-এর সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায় দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!” অর্থাৎ যে তাকে হিদায়াতের পথ হতে সরিয়ে দিয়ে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে গিয়েছিল তার কথা মান্য করার কারণে সে এরূপ আক্ষেপ করবে। এটা উমাইয়া ইবনে খালফ অথবা তার ভাই উবাই ইবনে খালফ বা অন্যান্য সমস্ত যালিমের ব্যাপারেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ‘আমাকে তো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ অর্থাৎ কুরআন পৌঁছার পর। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘শয়তান তো মানুষের জন্যে মহাপ্রতারক।' অর্থাৎ সে প্রতারণা করে মানুষকে সত্য পথ থেকে সরিয়ে দিয়ে বিভ্রান্তি ও বাতিলের পথে নিয়ে যায়। আর সে তাকে ঐ দিকে আহ্বান করে।

আল-ফুরকান 25:28

২৫-২৯ নং আয়াতের তাফসীরকিয়ামতের দিন যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে এবং যেসব বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হবে, আল্লাহ তাআলা এখানে তারই সংবাদ দিচ্ছেন। এগুলোর মধ্য হতে কয়েকটি যেমনঃ আকাশ মেঘপুঞ্জসহ বিদীর্ণ হওয়া এবং ফেরেশতাদেরকে নামিয়ে দেয়া। সেই দিন ফেরেশতারা একত্রিত হওয়ার স্থানে সমস্ত সৃষ্টজীবকে পরিবেষ্টন করে ফেলবেন। অতঃপর মহা কল্যাণময় প্রতিপালক বিচার-ফায়সালার জন্যে আগমন করবেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ তাদের নিকট মেঘের ছায়ার মধ্যে আগমন করবেন তারা শুধু এরই অপেক্ষা করছে।” (২:২১০) আল্লাহ পাকের(আরবি)-এই উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা দানব, মানব, পশু-পাখী এবং সমস্ত সৃষ্টজীবকে একই মাটিতে একত্রিত করবেন। অতঃপর দুনিয়ার আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে এবং এই আকাশের অধিবাসীরা নীচে নেমে আসবে যাদের সংখ্যা দানব, মানব ও সমুদয় সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী হবে। সুতরাং তারা দানব, মানব এবং সমুদয় মাখলুককে পরিবেষ্টন করে ফেলবে। এরপর দ্বিতীয় আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং ওর অধিবাসীরা নীচে নেমে আসবে। তারা তাদের পূর্বে অবতণকারী ফেরেশতাদেরকে ও জ্বিন, মানুষ এবং সমস্ত মাখলুককে পরিবেষ্টন করবে। আর এই দ্বিতীয় আকাশের অধিবাসীদের সংখ্যা হবে দুনিয়ার আকাশের অধিবাসী এবং সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী। তারপর তৃতীয় আকাশ ফেটে যাবে এবং ওর অধিবাসীরা নীচে অবতরণ করবে। তারা সংখ্যায় দ্বিতীয় আকাশের অধিবাসী, দুনিয়ার আকাশের অধিবাসী এবং সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা অধিক হবে। তারা তাদের পূর্বে অবতারিত ফেরেশতাসমূহ, দানব, মানব এবং সমুদয় মাখলুককে পরিবেষ্টন করবে। অতঃপর অনুরূপভাবে প্রত্যেক আকাশই ফেটে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত সপ্তম আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং ওর অধিবাসীরা নীচে নেমে আসবে যাদের সংখ্যা ছয় আকাশের অধিবাসী, দানব, মানব এবং সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী হবে। তারা তাদের পূর্বে অবতারিত আকাশসমূহের অধিবাসী, জ্বিন, মানুষ এবং সমস্ত মাখলুককে পরিবেষ্টন করবে। আর আমাদের মহামহিমান্বিত প্রতিপালক মেঘমালার ছায়ায় অবতরণ করবেন। এবং তাঁর চতুর্দিকে তাঁর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাগণ থাকবেন যাদের সংখ্যা সপ্ত আকাশের অধিবাসী দানব, মানব ও সমস্ত সৃষ্টজীব অপেক্ষা বেশী হবে। বর্শার ফলকের গিঁটের মত তাঁদের শিং থাকবে। তারা আরশের নীচে অবস্থান করবেন। তারা মহামহিমান্বিত আল্লাহর তাসবীহ-তাহলীল পাঠে এবং তাঁর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণায় লিপ্ত থাকবেন। তাদের পায়ের পাতা ও পায়ের গিটের মধ্যকার দূরত্ব হবে পাঁচশ’ বছরের পথ। পায়ের গিট ও হাঁটুর মধ্যকার দূরত্ব হবে পাঁচশ' বছরের পথ। হাঁটু হতে কোমর পর্যন্ত জায়গার দূরত্ব হবে পাচশ' বছরের পথ। কোমর থেকে নিয়ে বুকের উপরের অস্থি পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হবে পাঁচশ' বছরের পথ। বক্ষের উপরোস্থিত অস্থি হতে কানের লতি পর্যন্ত জায়গার দূরত্ব হবে পাঁচশ বছরের পথ। আর সেখান থেকে উপরের শেষাংশ পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হবে পাঁচশ' বছরের পথ। জাহান্নাম এর অনুভূতি স্থল।” (এভাবে এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইউসুফ ইবনে মাহরান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ এই আকাশ যখন বিদীর্ণ হয়ে যাবে তখন এটা হতে ফেরেশতারা অবতরণ করবেন যাদের সংখ্যা মানব ও দানব হতে বেশী হবে। ওটা হলো কিয়ামতের দিন, যেই দিন আসমানের অধিবাসী ও যমীনের অধিবাসীরা মিলিত হবে। তখন যমীনবাসীরা জিজ্ঞেস করবেঃ “আমাদের প্রতিপালক এসেছেন কি?” তারা উত্তরে বলবেনঃ “তিনি এখনো আসেননি, তবে আসবেন।” অতঃপর দ্বিতীয় আকাশ ফেটে যাবে। তারপর পর্যায়ক্রমে আকাশগুলো ফাটতে থাকবে। অবশেষে সপ্তম আকাশ ফেটে পড়বে। তখন ওর থেকে ফেরেশতারা নীচে অবতরণ করবেন যাদের সংখ্যা পূর্বে আকাশসমূহ হতে অবতারিত সমুদয় ফেরেশতা হতে এবং সমস্ত দানব ও মানব হতে বেশী হবে। তারপর নেতৃস্থানীয় ফেরেশতাগণ অবতরণ করবেন। অতঃপর আমাদের প্রতিপালক আটজন ফেরেশতা দ্বারা বহনকৃত আরশে চড়ে আসবেন। ঐ আটজন ফেরেশতার প্রত্যেকের পায়ের গিঁট হতে কাঁধ পর্যন্ত জায়গার দূরত্ব হবে পাঁচশ বছরের রাস্তা। ঐ ফেরেশতারা একে অপরের মুখের দিকে তাকাবেন না। বরং তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ মাথা নিজ নিজ হস্তদ্বয়ের মাঝে রেখে বলতে থাকবেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মহান ও পবিত্র বাদশাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। তাদের মাথার উপর তীরের ন্যায় কিছু থাকবে এবং ওর উপর আরশ থাকবে। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ বর্ণনাটি খুবই দুর্বল এবং এতে কঠিন অস্বীকৃতি রয়েছে। প্রসিদ্ধ সূরের (শিঙ্গার) হাদীসে প্রায় এরূপই বর্ণনা রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী)মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেদিন সংঘটিত হবে মহাপ্রলয়, এবং আকাশ বিদীর্ণ হয়ে বিশ্লিষ্ট হয়ে পড়বে। ফেরেশতারা আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে এবং সেই দিন আটজন ফেরেশতা তাদের প্রতিপালকের আরশকে ধারণ করবে তাদের ঊর্ধ্বে।” (৬৯:১৫-১৭)শাহর ইবনে হাউশিব (রঃ) বলেন যে, আটজন ফেরেশতা আরশ বহন করবেন। তাদের মধ্যে চারজন বলতে থাকবেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি। আপনার জানার পরেও আপনার সহনশীলতার জন্যে প্রশংসা আপনার।” আর তাদের অবশিষ্ট চারজন বলবেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার মহিমা ঘোষণা করছি। আপনার ক্ষমতার পরেও আপনার ক্ষমার কারণে প্রশংসা আপনারই জন্যে।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আবু বকর ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) বলেন যে, যমীনবাসী যখন আরশের দিকে তাকাবে তখন তাদের চক্ষু স্থির ও বিস্ফারিত হয়ে যাবে এবং প্রাণ হয়ে যাবে কণ্ঠাগত।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ ‘সেই দিন প্রকৃত কর্তৃত্ব হবে দয়াময়ের। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আজ কর্তৃত্ব কার? আল্লাহর জন্যে, যিনি এক, প্রবল পরাক্রান্ত।” (৪০: ১৬)সহীহ হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানসমূহকে ডান হাতে এবং যমীনসমূহকে বাম হাতে ধারণ পূর্বক বললেনঃ “আমি বাদশাহ এবং আমি মহাবিচারক। যমীনের বাদশাহরা কোথায়? কোথায় শক্তিশালীরা? অহংকারীরা কোথায়?” আর এক জায়গায় তার উক্তি রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “ঐ দিন কাফিরদের উপর কঠিন হবে।” (২৫: ২৬) কেননা, ওটা হবে ন্যায়বিচার ও ফায়সালার দিন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওটা সেই দিন হবে কঠিন দিন। কাফিরদের উপর তা সহজ নয়।” (৭৪: ৯-১০) সুতরাং এই দিন এটা হবে কাফিরদের অবস্থা। পক্ষান্তরে মুমিনদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “বড় ভয়-বিহ্বলতা তাদেরকে চিন্তান্বিত করবে না।” (২১:১০৩)। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ওটা এমন একদিন যা পার্থিব পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান' এই দিন কতই না দীর্ঘ হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! অবশ্যই ওটা মুমিনের উপর হালকা করা হবে। এমনকি ওটা তার উপর দুনিয়ার ফরয নামাযের চেয়েও হালকা হবে।” মহান আল্লাহর উক্তিঃ যালিম ব্যক্তি সেই দিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করবে। এই উক্তি দ্বারা আল্লাহ তা'আলা ঐ যালিমের অনুতাপের সংবাদ দিচ্ছেন যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং তিনি যে সুস্পষ্ট সত্য জিনিস আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে নিয় এসেছেন তা থেকে সরে পড়েছে, আর রাসূল (সঃ)-এর বাতলানো পথের বিপরীত পথে চলেছে। সুতরাং যেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেই দিন সে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হবে এবং শোকে ও দুঃখে স্বীয় হস্ত কামড়াতে থাকবে। কিন্তু ঐ সময় এতে কোনই উপকার সে লাভ করতে পারবে না। এ আয়াতটি উকবা ইবনে আবি মুঈত এবং অন্যান্য দুষ্ট শ্রেণীর লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও প্রত্যেক যালিমের ব্যাপারে এটা সাধারণ এবং সমানভাবে প্রযোজ্য। অতএব কিয়ামতের দিন প্রত্যেক যালিমই অত্যন্ত লজ্জিত হবে এবং স্বীয় হস্তদ্বয় কামড়াতে কামড়াতে বলবেঃ “হায়! আমি যদি রাসূল (সঃ)-এর সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায় দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!” অর্থাৎ যে তাকে হিদায়াতের পথ হতে সরিয়ে দিয়ে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে গিয়েছিল তার কথা মান্য করার কারণে সে এরূপ আক্ষেপ করবে। এটা উমাইয়া ইবনে খালফ অথবা তার ভাই উবাই ইবনে খালফ বা অন্যান্য সমস্ত যালিমের ব্যাপারেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ‘আমাকে তো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ অর্থাৎ কুরআন পৌঁছার পর। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘শয়তান তো মানুষের জন্যে মহাপ্রতারক।' অর্থাৎ সে প্রতারণা করে মানুষকে সত্য পথ থেকে সরিয়ে দিয়ে বিভ্রান্তি ও বাতিলের পথে নিয়ে যায়। আর সে তাকে ঐ দিকে আহ্বান করে।