Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আশ-শুআরা 26:212 – আশ-শুআরা 26:227

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আশ-শুআরা 26:212
  2. আশ-শুআরা 26:213
  3. আশ-শুআরা 26:214
  4. আশ-শুআরা 26:215
  5. আশ-শুআরা 26:216
  6. আশ-শুআরা 26:217
  7. আশ-শুআরা 26:218
  8. আশ-শুআরা 26:219
  9. আশ-শুআরা 26:220
  10. আশ-শুআরা 26:221
  11. আশ-শুআরা 26:222
  12. আশ-শুআরা 26:223
  13. আশ-শুআরা 26:224
  14. আশ-শুআরা 26:225
  15. আশ-শুআরা 26:226
  16. আশ-শুআরা 26:227

আশ-শুআরা 26:212

২১০-২১২ নং আয়াতের তাফসীরমহান আল্লাহ বলেন যে, এটা এমন এক পবিত্র কিতাব যার আশে পাশে মিথ্যা আসতে পারে না। কিতাব (আল-কুরআন) মহাবিজ্ঞানময় ও প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত। এটাকে শক্তিশালী ফেরেশতা রূহুল আমীন (হযরত জিবরাঈল আঃ) আনয়ন করেছেন, শয়তান আনয়ন করেনি।অতঃপর শয়তান যে এটা আনয়ন করেনি তার তিনটি কারণ বর্ণনা করা হচ্ছে। যে, সে এর যোগ্যতাই রাখে না। তার কাজ হলো মাখলুককে পথভ্রষ্ট করা, সরল-সঠিক পথে আনয়ন করা নয়। ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ এই কিতাবের বৈশিষ্ট্য। অথচ শয়তান এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এই কিতাব হলো জ্যোতি ও হিদায়াত এবং এটা হলো দলীল। আর শয়তানরা এই তিনটিরই উল্টো। তারা অন্ধকার-প্রিয়। তারা ভ্রান্তপথ প্রদর্শক এবং অজ্ঞতার পাগল। সুতরাং এই কিতাব ও শয়তানদের মধ্যে আকাশ পাতালের পার্থক্য রয়েছে। কোথায় তারা এবং কোথায় এই কিতাব! দ্বিতীয় কারণ এই যে, সে তো এটা বহন করার যোগ্যতাই রাখে না এবং তার মধ্যে এ শক্তিই নেই। এটা এমনই সম্মানিত ও মর্যাদা সম্পন্ন বাণী যে, যদি এটা কোন বড় পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ হয় তবে ওকে ফাটিয়ে চৌচির করে ফেলবে। এরপর তৃতীয় কারণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এই কুরআন অবতীর্ণ করার সময় শয়তানদেরকে তো সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। তারা তো ওটা শুনতেই পায়নি। আকাশের চতুর্দিকে প্রহরী নিযুক্ত ছিল। শুনবার জন্যে যখনই তারা আকাশে উঠতে যাচ্ছিল তখনই তাদের প্রতি অগ্নি বর্ষিত হচ্ছিল। এর একটি অক্ষরও শুনবার ক্ষমতা তার ছিল না। এর ফলে আল্লাহর কালাম নিরাপদ ও সুরক্ষিত পন্থায় তাঁর নবী (সঃ)-এর নিকট পৌঁছে যায় এবং তার মাধ্যমে আল্লাহর মাখলুকের কাছে এটা পৌঁছে। এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তাদেরকে তো শ্রবণের সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে। যেমন তিনি স্বয়ং জ্বিনদের উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমরা চেয়েছিলাম আকাশের তথ্য সংগ্রহ করতে কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিণ্ড দ্বারা আকাশ পরিপূর্ণ। আর পূর্বে আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শুনবার জন্যে বসতাম কিন্তু এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে তার উপর নিক্ষেপের জন্যে প্রস্তুত জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ডের সম্মুখীন হয়। আমরা জানি না জগদ্বাসীর অমঙ্গলই অভিপ্রেত, না তাদের প্রতিপালক তাদের মঙ্গল চান।” (৭২: ৮-১০)

আশ-শুআরা 26:213

২১৩-২২০ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ তুমি শুধু আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। আর যে এরূপ করবে না অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে সে অবশ্যই শাস্তির যোগ্য হবে। তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিবে যে, ঈমান ছাড়া অন্য কিছুই মুক্তিদাতা নয়।এরপর তিনি নির্দেশ দিচ্ছেনঃ একত্ববাদী ও তোমার অনুসারী মুমিনদের প্রতি বিনয়ী হবে। আর যে কেউই আমার আদেশ ও নিষেধ অমান্য করবে সে যে-ই হোক না কেন তার সাথে কোনই সম্পর্ক রাখবে না এবং তার প্রতি স্বীয় অসন্তোষ প্রকাশ করবে।বিশেষ লোককে এই ভয় প্রদর্শন সাধারণ লোককে ভয় প্রদর্শন করার বিপরীত নয়। কেননা, এটা তার একটা অংশ। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে যাদের পিতৃপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি, যার ফলে তারা গাফিল।” (৩৬: ৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার মূল জনপদকে এবং ওর আশে পাশের লোকদেরকে।”(৭: ৪২) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এর দ্বারা তুমি সতর্ক কর তাদেরকে যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের নিকট একত্রিত করা হবে।” (৬: ৫১) আরো এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যাতে তুমি এর দ্বারা পরহেযগারদেরকে সুসংবাদ দিতে ও উদ্ধতদেরকে সতর্ক করতে পার।”(১৯:৯৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে আমি এর দ্বারা ভয় প্রদর্শন করতে পারি তোমাদেরকে এবং তাদেরকেও যাদের কাছে এটা পৌঁছে।” (৬: ১৯)সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এই উম্মতের মধ্যে যার কানে আমার খবর পৌঁছেছে, সে ইয়াহুদী হোক অথবা খৃষ্টানই হোক, অতঃপর আমার উপর সে ঈমান আনেনি, সে অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে বহু হাদীস এসেছে। আমরা এগুলো বর্ণনা করছিঃ প্রথম হাদীস ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে (আরবি) আকস্মিক কোন বিপদের সময় আরবের লোকেরা বিপদ সংকেত হিসেবে এরূপ শব্দ উচ্চারণকরতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই প্রচলিত প্রথারই অনুসরণ করেছিলেন। বলে উচ্চ স্বরে ডাক দেন। এ শব্দ শুনে লোকেরা তাঁর নিকট একত্রিত হয়ে যায়। যারা আসতে পারেনি তারা লোক পাটিয়ে দেয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! হে বানী ফাহর! হে বানী লুওয়াই! আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে, এই পাহাড়ের পিছনে তোমাদের শত্রু- সেনাবাহিনী রয়েছে এবং তারা ওঁৎ পেতে বসে আছে। সুযোগ পেলেই তোমাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। তবে তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে কি?" সবাই এক বাক্যে উত্তর দেয়ঃ “হ্যা, আমরা আপনার কথা সত্য বলেই বিশ্বাস করবো।" তিনি তখন বলেনঃ ‘তাহলে জেনে রেখো যে, সামনের কঠিন শাস্তি হতে আমি তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শনকারী।” তাঁর একথা শুনে আবু লাহাব বলে ওঠে-“তুমি ধ্বংস হও। এটা শুনাবার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে ডেকেছিলে?” তার কথার প্রতিবাদে সূরায়ে তাব্বাত ইয়াদা’ অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী(রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) দ্বিতীয় হাদীসঃহযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন (আরবি) অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! হে আবদুল মুত্তালিবের কন্যা সুফিয়া (রাঃ)! হে বানী আবদিল মুত্তালিব! জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে আমি তোমাদের জন্যে কোন (উপকারের) অধিকার রাখবো না। হ্যাঁ, তবে আমার কাছে যে মাল আছে তা হতে তোমরা যা চাইবে তা আমি তোমাদেরকে দেয়ার জন্যে প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)তৃতীয় হাদীসঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরায়েশদেরকে আহ্বান করেন। এবং এক এক করে ও সাধারণভাবে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে কুরায়েশের দল! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা কর। হে কাবের বংশধরগণ! তোমরা নিজেদের জীবনকে আগুন হতে বাঁচাও। হে হাশেমের সন্তানগণ! তোমরা নিজেদের প্রাণকে আল্লাহর আযাব হতে রক্ষা কর। হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানরা! তোমরা আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর। হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! নিজের জীবনকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচিয়ে নাও। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্যে কোন কিছুরই মালিক হতে পারবো না। তবে অবশ্যই আমার সাথে তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে যার পার্থিব সর্বপ্রকারের হক আদায় করতে আমি সদা প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ, ইমাম মুসলিম ও ইমম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতেও শব্দের কিছু পরিবর্তনের সাথে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ভাতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ফুফু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবং স্বীয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে বলেন, তোমরা দুজন নিজেদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে বাচিয়ে নাও এবং জেনে রেখো যে, (কিয়ামতের দিন) আমি আল্লাহর সামনে তোমাদের কোন কাজে লাগবো না। অতঃপর বলেনঃ “হে বানী কুসাই! হে বানী হাশিম! এবং হে আবদে মানাফ! (মনে রেখো যে) আমি হলাম সতর্ককারী, আর মৃত্যু হচ্ছে পরিবর্তন আনয়নকারী এবং কিয়ামত হলো ওয়াদার স্থান।” চতুর্থ হাদীসঃ হযরত কুবাইসা ইবনে মাখারিক (রাঃ) এবং হযরত যুহায়ের ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাঁরা দু'জন বলেন, যখন -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন যার চূড়ার উপর একটি পাথর ছিল। সেখান থেকে তিনি ডাক দিয়ে বলতে শুরু করেনঃ “হে বানী আবদে মানাফ! আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র। আমার ও তোমাদের উপমা ঐ লোকটির মত যে শত্রু দেখলো এবং দৌড়িয়ে নিজের লোকদেরকে সতর্ক করতে আসলো যাতে তারা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। দূর থেকেই সে চীকার করতে শুরু করে দিলো যাতে প্রথম থেকেই তারা সতর্ক হয়ে যেতে পারে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)পঞ্চম হাদীসঃ হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় আহলে বায়েতকে একত্রিত করেন। তাঁরা ছিলেন সংখ্যায় ত্রিশজন। তাঁদের পানাহার শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কে এমন আছে যে আমার কর্জ তার দায়িত্বে নিয়ে নেয় এবং আমার পরে আমার অঙ্গীকারসমূহ পূরণ করে, অতঃপর জান্নাতে আমার সাথী হতে পারে ও আমার আঙ্গুলের মধ্যে আমার খলীফা হতে পারে?” একটি লোক উত্তরে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো সমুদ্র (সদৃশ), সুতরাং কে আপনার সাথে দাড়াতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার তার উক্তির পুনরাবৃত্তি করেন, কিন্তু কেউই ওর জন্যে প্রস্তুত হলো না। তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এজন্যে আমিই প্রস্তুত আছি। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) এক সনদে এর চেয়েও বেশী বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু আবদিল মুত্তালিবের একটি বড় দলকে একত্রিত করেন যারা বড়ই পেটুক ছিল। তাদের এক একজন একটি বকরীর বাচ্চা ও একটি বড় পিয়ালাপূর্ণ দুধ পান করে ফেলতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের জন্যে শুধু তিন পোয়া পরিমাণ খাদ্য রান্না করিয়ে নেন। কিন্তু তাতে এতো বরকত দেয়া হয় যে, সবাই পেট পুরে পানাহার করে, অথচ না খাদ্য কিছু হ্রাস পায় এবং না পানীয় কিছু কমে যায়। এরপর নবী (সঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! আমি তোমাদের নিকট বিশিষ্টভাবে এবং সমস্ত মানুষের নিকট সাধারণভাবে নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি। এই সময় তোমরা আমার একটি মুজিয়াও দেখলে। এখন তোমাদের মধ্যে কে আছে যে, সে আমার হাতে আমার ভাই ও সাথী হওয়ার দীক্ষা গ্রহণ করে?” কিন্তু মজলিসের একটি লোকও দাঁড়ালো না। (হযরত আলী রাঃ বলেনঃ) আমি তখন দাঁড়িয়ে গেলাম আর মজলিসের মধ্যে আমি ছিলাম সবচেয়ে ছোট। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি বসে পড়।” তিনি তিনবার তাদেরকে ঐ কথা বলেন কিন্তু তিনবারই আমি ছাড়া আর কেউই দাঁড়ায়নি। তৃতীয়বারে তিনি আমার বায়আত গ্রহণ করেন।”ইমাম বায়হাকী (রঃ) দালাইলুন নবুওয়াত’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি আমার কওমের সামনে আমি এখনই এটা পেশ করি তবে তারা মানবে না এবং তারা এমন উত্তর দেবে যা আমার কাছে কঠিন ঠেকবে।” তাই তিনি নীরব হয়ে যান। ইতিমধ্যে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়েন এবং বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনাকে যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা পালনে যদি আপনি বিলম্ব করেন তবে আপনার প্রতিপালক আপনাকে শাস্তি প্রদান করবেন।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে আলী (রাঃ)! আমার প্রতিপালক আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন আমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করি। আমি মনে করলাম যে, আমি যদি তাড়াতাড়ি এ কাজে লেগে পড়ি তবে আমার কওম আমাকে মানবে না এবং আমাকে এমন উত্তর দেবে যাতে আমি মনে ব্যথা পাবো। তাই আমি নীরবতা অবলম্বন করি। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার কাছে এসে বলেনঃ “আপনি যদি আপনার প্রতিপালকের আদেশ পালনে বিলম্ব করেন তবে তিনি আপনাকে শাস্তি দিবেন।” সুতরাং হে আলী (রাঃ)! তুমি একটি বকরী যবাহ কর, তিন সের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত কর এবং এক বাটি দুধও সগ্রহ কর। অতঃপর বানী আবদিল মুত্তালিবকে একত্রিত কর। হযরত আলী (রাঃ) তাই করলেন এবং সবাইকে দাওয়াত দিলেন। তারা সংখ্যায় দু’এক কমবেশী চল্লিশ জন ছিল। তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচারাও ছিলেন। তাঁরা হলেন আবু তালিব, হযরত হামযা (রাঃ) এবং হযরত আব্বাস (রাঃ)। তার কাফির ও খবীস চাচা আবু লাহাবও ছিল। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তরকারী পেশ করলে তিনি তা হতে এক টুকরা নিয়ে কিছু খেলেন। অতঃপর তা হাঁড়িতে রেখে দিলেন। এরপর তিনি সকলকে বললেনঃ “তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে খেতে শুরু কর।” সবাই খেতে লাগলো এবং পেট পুরে খেলো। হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! হাঁড়িতে যা ছিল তাই থেকে গেল। গোশতে শুধু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অঙ্গুলীর দাগ ছিল, কিন্তু গোশত এতটুকু কমেনি। অথচ তাদের এক একজনই হাঁড়িতে রাখা সব গোশত খেয়ে নিতে পারতো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! তাদেরকে এখন দুধ পান করিয়ে দাও।” আমি তখন দুধের ঐ বাটিটি আনলাম এবং তাদেরকে পান করতে বললাম। তারা পালাক্রমে পান করে পরিতৃপ্ত হয়ে গেল। কিন্তু দুধ মোটেই কমলো না। অথচ তাদের এক একজনই ঐ বাটির সম্পূর্ণ দুধ পান করে নিতে পারতো। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কিছু বলতে চাচ্ছিলেন কিন্তু আবু লাহাব মজলিস হতে উঠে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “তোমাদের এ লোকটির এ সবকিছুই যাদু।” তার দেখাদেখি সবাই মজলিস হতে উঠে গেল এবং নিজ নিজ পথ ধরলো। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে উপদেশ দেয়ার সুযোগ পেলেন না।”পরের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় হযরত আলী (রাঃ)-কে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! অনুরূপভাবে আজকেও আবার তাদেরকে দাওয়াত কর। কেননা, গতকাল তারা আমাকে কথা বলার কোন সুযোগই দেয়নি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেন, সুতরাং আমি পুনরায় ঐ প্রকারের ব্যবস্থা করলাম। সবকে দাওয়াত দিয়ে আসলাম। ঐদিনও আবু লাহাব দাঁড়িয়ে গিয়ে পূর্বের ন্যায়ই কথা বললো এবং ঐভাবে মজলিসের লোক ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তৃতীয় দিন আবার আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে সবকিছুরই ব্যবস্থা করলাম। খাওয়া দাওয়ার পর ঐদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাড়াতাড়ি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আরবের কোন যুবক তার কওমের কাছে এমন উত্তম কিছু নিয়ে আসেনি যা আমি তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছি। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ আনয়ন করেছি।”অন্য রিওয়াইয়াতে এরপর এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এখন তোমরা বল তো তোমাদের মধ্যে কে আমার আনুকূল্য করতে পারে এবং কে আমার সহচর হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন তোমাদেরকে তার দিকে আহ্বান করি। সুতরাং কে আমাকে এ কাজে সহায়তা করতে পারে এই শর্তে যে, সে আমার ভাই হয়ে যাবে এবং সে এরূপ এরূপ মর্যাদা লাভ করবে?” তাঁর একথা শুনে কওমের সবাই নীরব থাকে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আলী (রাঃ) বলেন, যদিও আমি তাদের মধ্যে বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট, দুঃখময় চক্ষু বিশিষ্ট, মোটা পেট বিশিষ্ট এবং ভারী পদনালী বিশিষ্ট, তথাপি আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার আনুকূল্য করতে প্রস্তুত আছি। তিনি তখন আমার স্কন্ধে হাত রেখে বললেনঃ “এটা আমার ভাই এবং তার এরূপ এরূপ মর্যাদা রয়েছে। সুতরাং তোমরা তার কথা শুনো এবং তার আনুগত্য কর।” তাঁর এ কথা শুনে কওমের লোকেরা উঠে গেল এবং হেসে উঠলো ও আবু তালিবকে বললোঃ “তুমিই তোমার ছেলের কথা শুনো ও তার আনুগত্য করতে থাকো (আমাদের দ্বারা এ কাজ হবে না।” কিন্তু এ হাদীসটির বর্ণনাকারী আবদুল গাফফার ইবনে কাসিব ইবনে আবি মারইয়াম পরিত্যাজ্য এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে শিয়াও বটে, ইবনে মাদনী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, সে হাদীস নিজে বানিয়ে নিতো। হাদীসের অন্যান্য ইমামগণও তাকে দুর্বল বলেছেন।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই দাওয়াতে শুধুমাত্র বকরীর একটি পায়ের গোশত ছিল। এতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ভাষণ দিতে শুরু করলেন তখন তারা হঠাৎ করে বলে ফেললোঃ “এরূপ যাদু তো ইতিপূর্বে আমরা কখনো দেখিনি।” তখন তিনি নীরব হয়ে যান। তাঁর ভাষণ ছিলঃ “কে আছে, যে আমার ঋণ তার দায়িত্বে গ্রহণ করবে এবং আমার আহূলের মধ্যে খলীফা হয়ে যাবে?” হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “ঐ মজলিসে হযরত আব্বাসও (রঃ) বিদ্যমান ছিলেন। শুধু মাল-ধনের কার্পণ্যের কারণে তিনিও নীরব ছিলেন।অকে নীরব থাকতে দেখে আমিও নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বারও এ ই বললেন। এবারও চতুর্দিকে নীরবতা বিরাজ করে। এবার আমি আর নীরব থাকতে পারলাম না, বরং উপরোক্ত কথা বলে ফেললাম। ঐ সময় আমি বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট এবং ছিলাম ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন, বড় পেট ও ভারী পদনালী বিশিষ্ট।" ঐ রিওয়াইয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ফরমান রয়েছেঃ “কে আমার ঋণ তার দায়িত্বে নিচ্ছে এবং আমার পর কে আমার আহলের হিফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করছে?” এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমি আমার এই দ্বীনের প্রচার চারদিকে ছড়িয়ে দিবো এবং লোকদের আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করবো। ফলে সবাই আমার শত্রুতে পরিণত হয়ে যাবে এবং আমাকে হত্যা করে ফেলার চেষ্টা করবে।” এরূপ আশংকা তিনি করতে থাকেন। অবশেষে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ তোমাকে লোকদের অনিষ্ট হতে রক্ষা করবেন।” (৫: ৬৭) এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আশংকা দূর হয়ে যায়। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তিনি নিজের জন্যে প্রহরী নিযুক্ত রাখতেন। কিন্তু এটা অবতীর্ণ হওয়ার পর প্রহরী রাখাও তিনি বন্ধ করে দেন। বাস্তবিকই ঐ সময় বানু হাশেমের সবারই মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) অপেক্ষা বড় ঈমানদার ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সত্যায়নকারী আর কেউ ছিল না। এজন্যেই তিনিই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সাহচর্য দান করার স্বীকারোক্তি করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে জনগণকে সাধারণ দাওয়াত দেন এবং তাদেরকে খাঁটি তাওহীদের দিকে আহ্বান করেন এবং নিজের নবুওয়াতের ঘোষণা দেন।আবদুল ওয়াহিদ দেমাশকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা হযরত আবূ দারদা (রাঃ) মসজিদে বসে ওয়াজ করছিলেন এবং ফতওয়া দিচ্ছিলেন। মজলিস লোকে ভরপুর ছিল। সবারই দৃষ্টি তার চেহারার উপর ছিল এবং তারা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তার ওয়াজ শুনছিল। কিন্তু তার ছেলে এবং তার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত ছিল। কেউ একজন হযরত আবু দারদা (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়ে বলেনঃ “অন্যান্য সব লোকই তো আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে, কিন্তু আপনার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত রয়েছে, ব্যাপার কি?” তিনি উত্তরে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “দুনিয়া হতে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ থাকেন নবীরা এবং তাঁদের উপর সবচেয়ে বেশী কঠিন ও ভারী হয় তাঁদের পরিবারবর্গ ও আত্মীয় স্বজন। এব্যাপারেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।” এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহর উপর নির্ভর কর। তিনিই তোমার রক্ষক ও সাহায্যকারী। তিনিই তোমার শক্তি যোগাবেন এবং তোমার কথাকে সমুন্নত করবেন। তাঁর দৃষ্টি সব সময় তোমার উপর রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি তোমার প্রতিপালকের হুকুমের উপর ধৈর্য ধারণ কর, তুমি তো আমার চোখের সামনেই রয়েছো।” (৫২: ৪৮) ভাবার্থ এটাওঃ যখন তুমি নামাযের জন্যে দণ্ডায়মান হও তখন তুমি আমার চোখের সামনে থাকো। আমি তোমার রুকু ও সিজদা দেখে থাকি। তুমি দাঁড়িয়ে থাকো বা বসে থাকো অথবা যে অবস্থাতেই থাকো না কেন আমার চোখের সামনেই থাকো। অর্থাৎ তুমি একাকী নামায পড়লেও আমি দেখতে পাই এবং জামাআতে পড়লেও তুমি আমার সামনেই থাকো। ভাবার্থ এটাও যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যেভাবে তাঁর সামনের জিনিসগুলো দেখাতেন তেমনিভাবে তার পিছনের মুক্তাদীরাও তাঁর দৃষ্টির সামনে থাকতো। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “তোমরা তোমাদের নামাযের সারি সোজা করে নেবে। জেনে রেখো যে, আমি তোমাদেরকে আমার পিছন হতে দেখতে পাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ভাবার্থ এও করেছেনঃ “তার এক নবীর পিঠ হতে অন্য নবীর পিঠের দিকে স্থানান্তরিত হওয়াকে আমি বরাবরই দেখতে রয়েছি, শেষ পর্যন্ত তিনি নবী হিসেবে দুনিয়ায় এসেছেন।” মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তিনি স্বীয় বান্দাদের কথা খুবই শুনে থাকেন এবং তাদের কাজ কারবার সম্পর্কে তিনি পূর্ণ অবহিত। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি যে অবস্থায় থাকো, তুমি যে কুরআন পাঠ কর, তুমি যে আমল কর সেসব সম্পর্কে আমি পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (১০:৬১)

আশ-শুআরা 26:214

২১৩-২২০ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ তুমি শুধু আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। আর যে এরূপ করবে না অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে সে অবশ্যই শাস্তির যোগ্য হবে। তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিবে যে, ঈমান ছাড়া অন্য কিছুই মুক্তিদাতা নয়।এরপর তিনি নির্দেশ দিচ্ছেনঃ একত্ববাদী ও তোমার অনুসারী মুমিনদের প্রতি বিনয়ী হবে। আর যে কেউই আমার আদেশ ও নিষেধ অমান্য করবে সে যে-ই হোক না কেন তার সাথে কোনই সম্পর্ক রাখবে না এবং তার প্রতি স্বীয় অসন্তোষ প্রকাশ করবে।বিশেষ লোককে এই ভয় প্রদর্শন সাধারণ লোককে ভয় প্রদর্শন করার বিপরীত নয়। কেননা, এটা তার একটা অংশ। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে যাদের পিতৃপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি, যার ফলে তারা গাফিল।” (৩৬: ৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার মূল জনপদকে এবং ওর আশে পাশের লোকদেরকে।”(৭: ৪২) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এর দ্বারা তুমি সতর্ক কর তাদেরকে যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের নিকট একত্রিত করা হবে।” (৬: ৫১) আরো এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যাতে তুমি এর দ্বারা পরহেযগারদেরকে সুসংবাদ দিতে ও উদ্ধতদেরকে সতর্ক করতে পার।”(১৯:৯৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে আমি এর দ্বারা ভয় প্রদর্শন করতে পারি তোমাদেরকে এবং তাদেরকেও যাদের কাছে এটা পৌঁছে।” (৬: ১৯)সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এই উম্মতের মধ্যে যার কানে আমার খবর পৌঁছেছে, সে ইয়াহুদী হোক অথবা খৃষ্টানই হোক, অতঃপর আমার উপর সে ঈমান আনেনি, সে অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে বহু হাদীস এসেছে। আমরা এগুলো বর্ণনা করছিঃ প্রথম হাদীস ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে (আরবি) আকস্মিক কোন বিপদের সময় আরবের লোকেরা বিপদ সংকেত হিসেবে এরূপ শব্দ উচ্চারণকরতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই প্রচলিত প্রথারই অনুসরণ করেছিলেন। বলে উচ্চ স্বরে ডাক দেন। এ শব্দ শুনে লোকেরা তাঁর নিকট একত্রিত হয়ে যায়। যারা আসতে পারেনি তারা লোক পাটিয়ে দেয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! হে বানী ফাহর! হে বানী লুওয়াই! আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে, এই পাহাড়ের পিছনে তোমাদের শত্রু- সেনাবাহিনী রয়েছে এবং তারা ওঁৎ পেতে বসে আছে। সুযোগ পেলেই তোমাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। তবে তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে কি?" সবাই এক বাক্যে উত্তর দেয়ঃ “হ্যা, আমরা আপনার কথা সত্য বলেই বিশ্বাস করবো।" তিনি তখন বলেনঃ ‘তাহলে জেনে রেখো যে, সামনের কঠিন শাস্তি হতে আমি তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শনকারী।” তাঁর একথা শুনে আবু লাহাব বলে ওঠে-“তুমি ধ্বংস হও। এটা শুনাবার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে ডেকেছিলে?” তার কথার প্রতিবাদে সূরায়ে তাব্বাত ইয়াদা’ অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী(রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) দ্বিতীয় হাদীসঃহযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন (আরবি) অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! হে আবদুল মুত্তালিবের কন্যা সুফিয়া (রাঃ)! হে বানী আবদিল মুত্তালিব! জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে আমি তোমাদের জন্যে কোন (উপকারের) অধিকার রাখবো না। হ্যাঁ, তবে আমার কাছে যে মাল আছে তা হতে তোমরা যা চাইবে তা আমি তোমাদেরকে দেয়ার জন্যে প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)তৃতীয় হাদীসঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরায়েশদেরকে আহ্বান করেন। এবং এক এক করে ও সাধারণভাবে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে কুরায়েশের দল! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা কর। হে কাবের বংশধরগণ! তোমরা নিজেদের জীবনকে আগুন হতে বাঁচাও। হে হাশেমের সন্তানগণ! তোমরা নিজেদের প্রাণকে আল্লাহর আযাব হতে রক্ষা কর। হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানরা! তোমরা আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর। হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! নিজের জীবনকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচিয়ে নাও। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্যে কোন কিছুরই মালিক হতে পারবো না। তবে অবশ্যই আমার সাথে তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে যার পার্থিব সর্বপ্রকারের হক আদায় করতে আমি সদা প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ, ইমাম মুসলিম ও ইমম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতেও শব্দের কিছু পরিবর্তনের সাথে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ভাতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ফুফু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবং স্বীয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে বলেন, তোমরা দুজন নিজেদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে বাচিয়ে নাও এবং জেনে রেখো যে, (কিয়ামতের দিন) আমি আল্লাহর সামনে তোমাদের কোন কাজে লাগবো না। অতঃপর বলেনঃ “হে বানী কুসাই! হে বানী হাশিম! এবং হে আবদে মানাফ! (মনে রেখো যে) আমি হলাম সতর্ককারী, আর মৃত্যু হচ্ছে পরিবর্তন আনয়নকারী এবং কিয়ামত হলো ওয়াদার স্থান।” চতুর্থ হাদীসঃ হযরত কুবাইসা ইবনে মাখারিক (রাঃ) এবং হযরত যুহায়ের ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাঁরা দু'জন বলেন, যখন -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন যার চূড়ার উপর একটি পাথর ছিল। সেখান থেকে তিনি ডাক দিয়ে বলতে শুরু করেনঃ “হে বানী আবদে মানাফ! আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র। আমার ও তোমাদের উপমা ঐ লোকটির মত যে শত্রু দেখলো এবং দৌড়িয়ে নিজের লোকদেরকে সতর্ক করতে আসলো যাতে তারা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। দূর থেকেই সে চীকার করতে শুরু করে দিলো যাতে প্রথম থেকেই তারা সতর্ক হয়ে যেতে পারে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)পঞ্চম হাদীসঃ হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় আহলে বায়েতকে একত্রিত করেন। তাঁরা ছিলেন সংখ্যায় ত্রিশজন। তাঁদের পানাহার শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কে এমন আছে যে আমার কর্জ তার দায়িত্বে নিয়ে নেয় এবং আমার পরে আমার অঙ্গীকারসমূহ পূরণ করে, অতঃপর জান্নাতে আমার সাথী হতে পারে ও আমার আঙ্গুলের মধ্যে আমার খলীফা হতে পারে?” একটি লোক উত্তরে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো সমুদ্র (সদৃশ), সুতরাং কে আপনার সাথে দাড়াতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার তার উক্তির পুনরাবৃত্তি করেন, কিন্তু কেউই ওর জন্যে প্রস্তুত হলো না। তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এজন্যে আমিই প্রস্তুত আছি। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) এক সনদে এর চেয়েও বেশী বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু আবদিল মুত্তালিবের একটি বড় দলকে একত্রিত করেন যারা বড়ই পেটুক ছিল। তাদের এক একজন একটি বকরীর বাচ্চা ও একটি বড় পিয়ালাপূর্ণ দুধ পান করে ফেলতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের জন্যে শুধু তিন পোয়া পরিমাণ খাদ্য রান্না করিয়ে নেন। কিন্তু তাতে এতো বরকত দেয়া হয় যে, সবাই পেট পুরে পানাহার করে, অথচ না খাদ্য কিছু হ্রাস পায় এবং না পানীয় কিছু কমে যায়। এরপর নবী (সঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! আমি তোমাদের নিকট বিশিষ্টভাবে এবং সমস্ত মানুষের নিকট সাধারণভাবে নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি। এই সময় তোমরা আমার একটি মুজিয়াও দেখলে। এখন তোমাদের মধ্যে কে আছে যে, সে আমার হাতে আমার ভাই ও সাথী হওয়ার দীক্ষা গ্রহণ করে?” কিন্তু মজলিসের একটি লোকও দাঁড়ালো না। (হযরত আলী রাঃ বলেনঃ) আমি তখন দাঁড়িয়ে গেলাম আর মজলিসের মধ্যে আমি ছিলাম সবচেয়ে ছোট। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি বসে পড়।” তিনি তিনবার তাদেরকে ঐ কথা বলেন কিন্তু তিনবারই আমি ছাড়া আর কেউই দাঁড়ায়নি। তৃতীয়বারে তিনি আমার বায়আত গ্রহণ করেন।”ইমাম বায়হাকী (রঃ) দালাইলুন নবুওয়াত’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি আমার কওমের সামনে আমি এখনই এটা পেশ করি তবে তারা মানবে না এবং তারা এমন উত্তর দেবে যা আমার কাছে কঠিন ঠেকবে।” তাই তিনি নীরব হয়ে যান। ইতিমধ্যে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়েন এবং বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনাকে যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা পালনে যদি আপনি বিলম্ব করেন তবে আপনার প্রতিপালক আপনাকে শাস্তি প্রদান করবেন।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে আলী (রাঃ)! আমার প্রতিপালক আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন আমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করি। আমি মনে করলাম যে, আমি যদি তাড়াতাড়ি এ কাজে লেগে পড়ি তবে আমার কওম আমাকে মানবে না এবং আমাকে এমন উত্তর দেবে যাতে আমি মনে ব্যথা পাবো। তাই আমি নীরবতা অবলম্বন করি। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার কাছে এসে বলেনঃ “আপনি যদি আপনার প্রতিপালকের আদেশ পালনে বিলম্ব করেন তবে তিনি আপনাকে শাস্তি দিবেন।” সুতরাং হে আলী (রাঃ)! তুমি একটি বকরী যবাহ কর, তিন সের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত কর এবং এক বাটি দুধও সগ্রহ কর। অতঃপর বানী আবদিল মুত্তালিবকে একত্রিত কর। হযরত আলী (রাঃ) তাই করলেন এবং সবাইকে দাওয়াত দিলেন। তারা সংখ্যায় দু’এক কমবেশী চল্লিশ জন ছিল। তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচারাও ছিলেন। তাঁরা হলেন আবু তালিব, হযরত হামযা (রাঃ) এবং হযরত আব্বাস (রাঃ)। তার কাফির ও খবীস চাচা আবু লাহাবও ছিল। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তরকারী পেশ করলে তিনি তা হতে এক টুকরা নিয়ে কিছু খেলেন। অতঃপর তা হাঁড়িতে রেখে দিলেন। এরপর তিনি সকলকে বললেনঃ “তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে খেতে শুরু কর।” সবাই খেতে লাগলো এবং পেট পুরে খেলো। হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! হাঁড়িতে যা ছিল তাই থেকে গেল। গোশতে শুধু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অঙ্গুলীর দাগ ছিল, কিন্তু গোশত এতটুকু কমেনি। অথচ তাদের এক একজনই হাঁড়িতে রাখা সব গোশত খেয়ে নিতে পারতো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! তাদেরকে এখন দুধ পান করিয়ে দাও।” আমি তখন দুধের ঐ বাটিটি আনলাম এবং তাদেরকে পান করতে বললাম। তারা পালাক্রমে পান করে পরিতৃপ্ত হয়ে গেল। কিন্তু দুধ মোটেই কমলো না। অথচ তাদের এক একজনই ঐ বাটির সম্পূর্ণ দুধ পান করে নিতে পারতো। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কিছু বলতে চাচ্ছিলেন কিন্তু আবু লাহাব মজলিস হতে উঠে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “তোমাদের এ লোকটির এ সবকিছুই যাদু।” তার দেখাদেখি সবাই মজলিস হতে উঠে গেল এবং নিজ নিজ পথ ধরলো। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে উপদেশ দেয়ার সুযোগ পেলেন না।”পরের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় হযরত আলী (রাঃ)-কে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! অনুরূপভাবে আজকেও আবার তাদেরকে দাওয়াত কর। কেননা, গতকাল তারা আমাকে কথা বলার কোন সুযোগই দেয়নি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেন, সুতরাং আমি পুনরায় ঐ প্রকারের ব্যবস্থা করলাম। সবকে দাওয়াত দিয়ে আসলাম। ঐদিনও আবু লাহাব দাঁড়িয়ে গিয়ে পূর্বের ন্যায়ই কথা বললো এবং ঐভাবে মজলিসের লোক ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তৃতীয় দিন আবার আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে সবকিছুরই ব্যবস্থা করলাম। খাওয়া দাওয়ার পর ঐদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাড়াতাড়ি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আরবের কোন যুবক তার কওমের কাছে এমন উত্তম কিছু নিয়ে আসেনি যা আমি তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছি। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ আনয়ন করেছি।”অন্য রিওয়াইয়াতে এরপর এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এখন তোমরা বল তো তোমাদের মধ্যে কে আমার আনুকূল্য করতে পারে এবং কে আমার সহচর হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন তোমাদেরকে তার দিকে আহ্বান করি। সুতরাং কে আমাকে এ কাজে সহায়তা করতে পারে এই শর্তে যে, সে আমার ভাই হয়ে যাবে এবং সে এরূপ এরূপ মর্যাদা লাভ করবে?” তাঁর একথা শুনে কওমের সবাই নীরব থাকে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আলী (রাঃ) বলেন, যদিও আমি তাদের মধ্যে বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট, দুঃখময় চক্ষু বিশিষ্ট, মোটা পেট বিশিষ্ট এবং ভারী পদনালী বিশিষ্ট, তথাপি আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার আনুকূল্য করতে প্রস্তুত আছি। তিনি তখন আমার স্কন্ধে হাত রেখে বললেনঃ “এটা আমার ভাই এবং তার এরূপ এরূপ মর্যাদা রয়েছে। সুতরাং তোমরা তার কথা শুনো এবং তার আনুগত্য কর।” তাঁর এ কথা শুনে কওমের লোকেরা উঠে গেল এবং হেসে উঠলো ও আবু তালিবকে বললোঃ “তুমিই তোমার ছেলের কথা শুনো ও তার আনুগত্য করতে থাকো (আমাদের দ্বারা এ কাজ হবে না।” কিন্তু এ হাদীসটির বর্ণনাকারী আবদুল গাফফার ইবনে কাসিব ইবনে আবি মারইয়াম পরিত্যাজ্য এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে শিয়াও বটে, ইবনে মাদনী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, সে হাদীস নিজে বানিয়ে নিতো। হাদীসের অন্যান্য ইমামগণও তাকে দুর্বল বলেছেন।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই দাওয়াতে শুধুমাত্র বকরীর একটি পায়ের গোশত ছিল। এতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ভাষণ দিতে শুরু করলেন তখন তারা হঠাৎ করে বলে ফেললোঃ “এরূপ যাদু তো ইতিপূর্বে আমরা কখনো দেখিনি।” তখন তিনি নীরব হয়ে যান। তাঁর ভাষণ ছিলঃ “কে আছে, যে আমার ঋণ তার দায়িত্বে গ্রহণ করবে এবং আমার আহূলের মধ্যে খলীফা হয়ে যাবে?” হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “ঐ মজলিসে হযরত আব্বাসও (রঃ) বিদ্যমান ছিলেন। শুধু মাল-ধনের কার্পণ্যের কারণে তিনিও নীরব ছিলেন।অকে নীরব থাকতে দেখে আমিও নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বারও এ ই বললেন। এবারও চতুর্দিকে নীরবতা বিরাজ করে। এবার আমি আর নীরব থাকতে পারলাম না, বরং উপরোক্ত কথা বলে ফেললাম। ঐ সময় আমি বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট এবং ছিলাম ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন, বড় পেট ও ভারী পদনালী বিশিষ্ট।" ঐ রিওয়াইয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ফরমান রয়েছেঃ “কে আমার ঋণ তার দায়িত্বে নিচ্ছে এবং আমার পর কে আমার আহলের হিফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করছে?” এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমি আমার এই দ্বীনের প্রচার চারদিকে ছড়িয়ে দিবো এবং লোকদের আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করবো। ফলে সবাই আমার শত্রুতে পরিণত হয়ে যাবে এবং আমাকে হত্যা করে ফেলার চেষ্টা করবে।” এরূপ আশংকা তিনি করতে থাকেন। অবশেষে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ তোমাকে লোকদের অনিষ্ট হতে রক্ষা করবেন।” (৫: ৬৭) এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আশংকা দূর হয়ে যায়। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তিনি নিজের জন্যে প্রহরী নিযুক্ত রাখতেন। কিন্তু এটা অবতীর্ণ হওয়ার পর প্রহরী রাখাও তিনি বন্ধ করে দেন। বাস্তবিকই ঐ সময় বানু হাশেমের সবারই মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) অপেক্ষা বড় ঈমানদার ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সত্যায়নকারী আর কেউ ছিল না। এজন্যেই তিনিই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সাহচর্য দান করার স্বীকারোক্তি করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে জনগণকে সাধারণ দাওয়াত দেন এবং তাদেরকে খাঁটি তাওহীদের দিকে আহ্বান করেন এবং নিজের নবুওয়াতের ঘোষণা দেন।আবদুল ওয়াহিদ দেমাশকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা হযরত আবূ দারদা (রাঃ) মসজিদে বসে ওয়াজ করছিলেন এবং ফতওয়া দিচ্ছিলেন। মজলিস লোকে ভরপুর ছিল। সবারই দৃষ্টি তার চেহারার উপর ছিল এবং তারা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তার ওয়াজ শুনছিল। কিন্তু তার ছেলে এবং তার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত ছিল। কেউ একজন হযরত আবু দারদা (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়ে বলেনঃ “অন্যান্য সব লোকই তো আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে, কিন্তু আপনার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত রয়েছে, ব্যাপার কি?” তিনি উত্তরে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “দুনিয়া হতে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ থাকেন নবীরা এবং তাঁদের উপর সবচেয়ে বেশী কঠিন ও ভারী হয় তাঁদের পরিবারবর্গ ও আত্মীয় স্বজন। এব্যাপারেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।” এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহর উপর নির্ভর কর। তিনিই তোমার রক্ষক ও সাহায্যকারী। তিনিই তোমার শক্তি যোগাবেন এবং তোমার কথাকে সমুন্নত করবেন। তাঁর দৃষ্টি সব সময় তোমার উপর রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি তোমার প্রতিপালকের হুকুমের উপর ধৈর্য ধারণ কর, তুমি তো আমার চোখের সামনেই রয়েছো।” (৫২: ৪৮) ভাবার্থ এটাওঃ যখন তুমি নামাযের জন্যে দণ্ডায়মান হও তখন তুমি আমার চোখের সামনে থাকো। আমি তোমার রুকু ও সিজদা দেখে থাকি। তুমি দাঁড়িয়ে থাকো বা বসে থাকো অথবা যে অবস্থাতেই থাকো না কেন আমার চোখের সামনেই থাকো। অর্থাৎ তুমি একাকী নামায পড়লেও আমি দেখতে পাই এবং জামাআতে পড়লেও তুমি আমার সামনেই থাকো। ভাবার্থ এটাও যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যেভাবে তাঁর সামনের জিনিসগুলো দেখাতেন তেমনিভাবে তার পিছনের মুক্তাদীরাও তাঁর দৃষ্টির সামনে থাকতো। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “তোমরা তোমাদের নামাযের সারি সোজা করে নেবে। জেনে রেখো যে, আমি তোমাদেরকে আমার পিছন হতে দেখতে পাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ভাবার্থ এও করেছেনঃ “তার এক নবীর পিঠ হতে অন্য নবীর পিঠের দিকে স্থানান্তরিত হওয়াকে আমি বরাবরই দেখতে রয়েছি, শেষ পর্যন্ত তিনি নবী হিসেবে দুনিয়ায় এসেছেন।” মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তিনি স্বীয় বান্দাদের কথা খুবই শুনে থাকেন এবং তাদের কাজ কারবার সম্পর্কে তিনি পূর্ণ অবহিত। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি যে অবস্থায় থাকো, তুমি যে কুরআন পাঠ কর, তুমি যে আমল কর সেসব সম্পর্কে আমি পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (১০:৬১)

আশ-শুআরা 26:215

২১৩-২২০ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ তুমি শুধু আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। আর যে এরূপ করবে না অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে সে অবশ্যই শাস্তির যোগ্য হবে। তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিবে যে, ঈমান ছাড়া অন্য কিছুই মুক্তিদাতা নয়।এরপর তিনি নির্দেশ দিচ্ছেনঃ একত্ববাদী ও তোমার অনুসারী মুমিনদের প্রতি বিনয়ী হবে। আর যে কেউই আমার আদেশ ও নিষেধ অমান্য করবে সে যে-ই হোক না কেন তার সাথে কোনই সম্পর্ক রাখবে না এবং তার প্রতি স্বীয় অসন্তোষ প্রকাশ করবে।বিশেষ লোককে এই ভয় প্রদর্শন সাধারণ লোককে ভয় প্রদর্শন করার বিপরীত নয়। কেননা, এটা তার একটা অংশ। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে যাদের পিতৃপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি, যার ফলে তারা গাফিল।” (৩৬: ৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার মূল জনপদকে এবং ওর আশে পাশের লোকদেরকে।”(৭: ৪২) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এর দ্বারা তুমি সতর্ক কর তাদেরকে যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের নিকট একত্রিত করা হবে।” (৬: ৫১) আরো এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যাতে তুমি এর দ্বারা পরহেযগারদেরকে সুসংবাদ দিতে ও উদ্ধতদেরকে সতর্ক করতে পার।”(১৯:৯৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে আমি এর দ্বারা ভয় প্রদর্শন করতে পারি তোমাদেরকে এবং তাদেরকেও যাদের কাছে এটা পৌঁছে।” (৬: ১৯)সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এই উম্মতের মধ্যে যার কানে আমার খবর পৌঁছেছে, সে ইয়াহুদী হোক অথবা খৃষ্টানই হোক, অতঃপর আমার উপর সে ঈমান আনেনি, সে অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে বহু হাদীস এসেছে। আমরা এগুলো বর্ণনা করছিঃ প্রথম হাদীস ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে (আরবি) আকস্মিক কোন বিপদের সময় আরবের লোকেরা বিপদ সংকেত হিসেবে এরূপ শব্দ উচ্চারণকরতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই প্রচলিত প্রথারই অনুসরণ করেছিলেন। বলে উচ্চ স্বরে ডাক দেন। এ শব্দ শুনে লোকেরা তাঁর নিকট একত্রিত হয়ে যায়। যারা আসতে পারেনি তারা লোক পাটিয়ে দেয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! হে বানী ফাহর! হে বানী লুওয়াই! আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে, এই পাহাড়ের পিছনে তোমাদের শত্রু- সেনাবাহিনী রয়েছে এবং তারা ওঁৎ পেতে বসে আছে। সুযোগ পেলেই তোমাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। তবে তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে কি?" সবাই এক বাক্যে উত্তর দেয়ঃ “হ্যা, আমরা আপনার কথা সত্য বলেই বিশ্বাস করবো।" তিনি তখন বলেনঃ ‘তাহলে জেনে রেখো যে, সামনের কঠিন শাস্তি হতে আমি তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শনকারী।” তাঁর একথা শুনে আবু লাহাব বলে ওঠে-“তুমি ধ্বংস হও। এটা শুনাবার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে ডেকেছিলে?” তার কথার প্রতিবাদে সূরায়ে তাব্বাত ইয়াদা’ অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী(রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) দ্বিতীয় হাদীসঃহযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন (আরবি) অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! হে আবদুল মুত্তালিবের কন্যা সুফিয়া (রাঃ)! হে বানী আবদিল মুত্তালিব! জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে আমি তোমাদের জন্যে কোন (উপকারের) অধিকার রাখবো না। হ্যাঁ, তবে আমার কাছে যে মাল আছে তা হতে তোমরা যা চাইবে তা আমি তোমাদেরকে দেয়ার জন্যে প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)তৃতীয় হাদীসঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরায়েশদেরকে আহ্বান করেন। এবং এক এক করে ও সাধারণভাবে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে কুরায়েশের দল! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা কর। হে কাবের বংশধরগণ! তোমরা নিজেদের জীবনকে আগুন হতে বাঁচাও। হে হাশেমের সন্তানগণ! তোমরা নিজেদের প্রাণকে আল্লাহর আযাব হতে রক্ষা কর। হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানরা! তোমরা আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর। হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! নিজের জীবনকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচিয়ে নাও। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্যে কোন কিছুরই মালিক হতে পারবো না। তবে অবশ্যই আমার সাথে তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে যার পার্থিব সর্বপ্রকারের হক আদায় করতে আমি সদা প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ, ইমাম মুসলিম ও ইমম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতেও শব্দের কিছু পরিবর্তনের সাথে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ভাতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ফুফু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবং স্বীয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে বলেন, তোমরা দুজন নিজেদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে বাচিয়ে নাও এবং জেনে রেখো যে, (কিয়ামতের দিন) আমি আল্লাহর সামনে তোমাদের কোন কাজে লাগবো না। অতঃপর বলেনঃ “হে বানী কুসাই! হে বানী হাশিম! এবং হে আবদে মানাফ! (মনে রেখো যে) আমি হলাম সতর্ককারী, আর মৃত্যু হচ্ছে পরিবর্তন আনয়নকারী এবং কিয়ামত হলো ওয়াদার স্থান।” চতুর্থ হাদীসঃ হযরত কুবাইসা ইবনে মাখারিক (রাঃ) এবং হযরত যুহায়ের ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাঁরা দু'জন বলেন, যখন -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন যার চূড়ার উপর একটি পাথর ছিল। সেখান থেকে তিনি ডাক দিয়ে বলতে শুরু করেনঃ “হে বানী আবদে মানাফ! আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র। আমার ও তোমাদের উপমা ঐ লোকটির মত যে শত্রু দেখলো এবং দৌড়িয়ে নিজের লোকদেরকে সতর্ক করতে আসলো যাতে তারা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। দূর থেকেই সে চীকার করতে শুরু করে দিলো যাতে প্রথম থেকেই তারা সতর্ক হয়ে যেতে পারে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)পঞ্চম হাদীসঃ হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় আহলে বায়েতকে একত্রিত করেন। তাঁরা ছিলেন সংখ্যায় ত্রিশজন। তাঁদের পানাহার শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কে এমন আছে যে আমার কর্জ তার দায়িত্বে নিয়ে নেয় এবং আমার পরে আমার অঙ্গীকারসমূহ পূরণ করে, অতঃপর জান্নাতে আমার সাথী হতে পারে ও আমার আঙ্গুলের মধ্যে আমার খলীফা হতে পারে?” একটি লোক উত্তরে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো সমুদ্র (সদৃশ), সুতরাং কে আপনার সাথে দাড়াতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার তার উক্তির পুনরাবৃত্তি করেন, কিন্তু কেউই ওর জন্যে প্রস্তুত হলো না। তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এজন্যে আমিই প্রস্তুত আছি। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) এক সনদে এর চেয়েও বেশী বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু আবদিল মুত্তালিবের একটি বড় দলকে একত্রিত করেন যারা বড়ই পেটুক ছিল। তাদের এক একজন একটি বকরীর বাচ্চা ও একটি বড় পিয়ালাপূর্ণ দুধ পান করে ফেলতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের জন্যে শুধু তিন পোয়া পরিমাণ খাদ্য রান্না করিয়ে নেন। কিন্তু তাতে এতো বরকত দেয়া হয় যে, সবাই পেট পুরে পানাহার করে, অথচ না খাদ্য কিছু হ্রাস পায় এবং না পানীয় কিছু কমে যায়। এরপর নবী (সঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! আমি তোমাদের নিকট বিশিষ্টভাবে এবং সমস্ত মানুষের নিকট সাধারণভাবে নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি। এই সময় তোমরা আমার একটি মুজিয়াও দেখলে। এখন তোমাদের মধ্যে কে আছে যে, সে আমার হাতে আমার ভাই ও সাথী হওয়ার দীক্ষা গ্রহণ করে?” কিন্তু মজলিসের একটি লোকও দাঁড়ালো না। (হযরত আলী রাঃ বলেনঃ) আমি তখন দাঁড়িয়ে গেলাম আর মজলিসের মধ্যে আমি ছিলাম সবচেয়ে ছোট। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি বসে পড়।” তিনি তিনবার তাদেরকে ঐ কথা বলেন কিন্তু তিনবারই আমি ছাড়া আর কেউই দাঁড়ায়নি। তৃতীয়বারে তিনি আমার বায়আত গ্রহণ করেন।”ইমাম বায়হাকী (রঃ) দালাইলুন নবুওয়াত’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি আমার কওমের সামনে আমি এখনই এটা পেশ করি তবে তারা মানবে না এবং তারা এমন উত্তর দেবে যা আমার কাছে কঠিন ঠেকবে।” তাই তিনি নীরব হয়ে যান। ইতিমধ্যে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়েন এবং বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনাকে যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা পালনে যদি আপনি বিলম্ব করেন তবে আপনার প্রতিপালক আপনাকে শাস্তি প্রদান করবেন।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে আলী (রাঃ)! আমার প্রতিপালক আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন আমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করি। আমি মনে করলাম যে, আমি যদি তাড়াতাড়ি এ কাজে লেগে পড়ি তবে আমার কওম আমাকে মানবে না এবং আমাকে এমন উত্তর দেবে যাতে আমি মনে ব্যথা পাবো। তাই আমি নীরবতা অবলম্বন করি। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার কাছে এসে বলেনঃ “আপনি যদি আপনার প্রতিপালকের আদেশ পালনে বিলম্ব করেন তবে তিনি আপনাকে শাস্তি দিবেন।” সুতরাং হে আলী (রাঃ)! তুমি একটি বকরী যবাহ কর, তিন সের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত কর এবং এক বাটি দুধও সগ্রহ কর। অতঃপর বানী আবদিল মুত্তালিবকে একত্রিত কর। হযরত আলী (রাঃ) তাই করলেন এবং সবাইকে দাওয়াত দিলেন। তারা সংখ্যায় দু’এক কমবেশী চল্লিশ জন ছিল। তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচারাও ছিলেন। তাঁরা হলেন আবু তালিব, হযরত হামযা (রাঃ) এবং হযরত আব্বাস (রাঃ)। তার কাফির ও খবীস চাচা আবু লাহাবও ছিল। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তরকারী পেশ করলে তিনি তা হতে এক টুকরা নিয়ে কিছু খেলেন। অতঃপর তা হাঁড়িতে রেখে দিলেন। এরপর তিনি সকলকে বললেনঃ “তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে খেতে শুরু কর।” সবাই খেতে লাগলো এবং পেট পুরে খেলো। হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! হাঁড়িতে যা ছিল তাই থেকে গেল। গোশতে শুধু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অঙ্গুলীর দাগ ছিল, কিন্তু গোশত এতটুকু কমেনি। অথচ তাদের এক একজনই হাঁড়িতে রাখা সব গোশত খেয়ে নিতে পারতো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! তাদেরকে এখন দুধ পান করিয়ে দাও।” আমি তখন দুধের ঐ বাটিটি আনলাম এবং তাদেরকে পান করতে বললাম। তারা পালাক্রমে পান করে পরিতৃপ্ত হয়ে গেল। কিন্তু দুধ মোটেই কমলো না। অথচ তাদের এক একজনই ঐ বাটির সম্পূর্ণ দুধ পান করে নিতে পারতো। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কিছু বলতে চাচ্ছিলেন কিন্তু আবু লাহাব মজলিস হতে উঠে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “তোমাদের এ লোকটির এ সবকিছুই যাদু।” তার দেখাদেখি সবাই মজলিস হতে উঠে গেল এবং নিজ নিজ পথ ধরলো। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে উপদেশ দেয়ার সুযোগ পেলেন না।”পরের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় হযরত আলী (রাঃ)-কে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! অনুরূপভাবে আজকেও আবার তাদেরকে দাওয়াত কর। কেননা, গতকাল তারা আমাকে কথা বলার কোন সুযোগই দেয়নি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেন, সুতরাং আমি পুনরায় ঐ প্রকারের ব্যবস্থা করলাম। সবকে দাওয়াত দিয়ে আসলাম। ঐদিনও আবু লাহাব দাঁড়িয়ে গিয়ে পূর্বের ন্যায়ই কথা বললো এবং ঐভাবে মজলিসের লোক ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তৃতীয় দিন আবার আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে সবকিছুরই ব্যবস্থা করলাম। খাওয়া দাওয়ার পর ঐদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাড়াতাড়ি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আরবের কোন যুবক তার কওমের কাছে এমন উত্তম কিছু নিয়ে আসেনি যা আমি তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছি। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ আনয়ন করেছি।”অন্য রিওয়াইয়াতে এরপর এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এখন তোমরা বল তো তোমাদের মধ্যে কে আমার আনুকূল্য করতে পারে এবং কে আমার সহচর হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন তোমাদেরকে তার দিকে আহ্বান করি। সুতরাং কে আমাকে এ কাজে সহায়তা করতে পারে এই শর্তে যে, সে আমার ভাই হয়ে যাবে এবং সে এরূপ এরূপ মর্যাদা লাভ করবে?” তাঁর একথা শুনে কওমের সবাই নীরব থাকে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আলী (রাঃ) বলেন, যদিও আমি তাদের মধ্যে বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট, দুঃখময় চক্ষু বিশিষ্ট, মোটা পেট বিশিষ্ট এবং ভারী পদনালী বিশিষ্ট, তথাপি আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার আনুকূল্য করতে প্রস্তুত আছি। তিনি তখন আমার স্কন্ধে হাত রেখে বললেনঃ “এটা আমার ভাই এবং তার এরূপ এরূপ মর্যাদা রয়েছে। সুতরাং তোমরা তার কথা শুনো এবং তার আনুগত্য কর।” তাঁর এ কথা শুনে কওমের লোকেরা উঠে গেল এবং হেসে উঠলো ও আবু তালিবকে বললোঃ “তুমিই তোমার ছেলের কথা শুনো ও তার আনুগত্য করতে থাকো (আমাদের দ্বারা এ কাজ হবে না।” কিন্তু এ হাদীসটির বর্ণনাকারী আবদুল গাফফার ইবনে কাসিব ইবনে আবি মারইয়াম পরিত্যাজ্য এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে শিয়াও বটে, ইবনে মাদনী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, সে হাদীস নিজে বানিয়ে নিতো। হাদীসের অন্যান্য ইমামগণও তাকে দুর্বল বলেছেন।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই দাওয়াতে শুধুমাত্র বকরীর একটি পায়ের গোশত ছিল। এতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ভাষণ দিতে শুরু করলেন তখন তারা হঠাৎ করে বলে ফেললোঃ “এরূপ যাদু তো ইতিপূর্বে আমরা কখনো দেখিনি।” তখন তিনি নীরব হয়ে যান। তাঁর ভাষণ ছিলঃ “কে আছে, যে আমার ঋণ তার দায়িত্বে গ্রহণ করবে এবং আমার আহূলের মধ্যে খলীফা হয়ে যাবে?” হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “ঐ মজলিসে হযরত আব্বাসও (রঃ) বিদ্যমান ছিলেন। শুধু মাল-ধনের কার্পণ্যের কারণে তিনিও নীরব ছিলেন।অকে নীরব থাকতে দেখে আমিও নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বারও এ ই বললেন। এবারও চতুর্দিকে নীরবতা বিরাজ করে। এবার আমি আর নীরব থাকতে পারলাম না, বরং উপরোক্ত কথা বলে ফেললাম। ঐ সময় আমি বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট এবং ছিলাম ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন, বড় পেট ও ভারী পদনালী বিশিষ্ট।" ঐ রিওয়াইয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ফরমান রয়েছেঃ “কে আমার ঋণ তার দায়িত্বে নিচ্ছে এবং আমার পর কে আমার আহলের হিফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করছে?” এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমি আমার এই দ্বীনের প্রচার চারদিকে ছড়িয়ে দিবো এবং লোকদের আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করবো। ফলে সবাই আমার শত্রুতে পরিণত হয়ে যাবে এবং আমাকে হত্যা করে ফেলার চেষ্টা করবে।” এরূপ আশংকা তিনি করতে থাকেন। অবশেষে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ তোমাকে লোকদের অনিষ্ট হতে রক্ষা করবেন।” (৫: ৬৭) এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আশংকা দূর হয়ে যায়। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তিনি নিজের জন্যে প্রহরী নিযুক্ত রাখতেন। কিন্তু এটা অবতীর্ণ হওয়ার পর প্রহরী রাখাও তিনি বন্ধ করে দেন। বাস্তবিকই ঐ সময় বানু হাশেমের সবারই মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) অপেক্ষা বড় ঈমানদার ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সত্যায়নকারী আর কেউ ছিল না। এজন্যেই তিনিই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সাহচর্য দান করার স্বীকারোক্তি করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে জনগণকে সাধারণ দাওয়াত দেন এবং তাদেরকে খাঁটি তাওহীদের দিকে আহ্বান করেন এবং নিজের নবুওয়াতের ঘোষণা দেন।আবদুল ওয়াহিদ দেমাশকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা হযরত আবূ দারদা (রাঃ) মসজিদে বসে ওয়াজ করছিলেন এবং ফতওয়া দিচ্ছিলেন। মজলিস লোকে ভরপুর ছিল। সবারই দৃষ্টি তার চেহারার উপর ছিল এবং তারা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তার ওয়াজ শুনছিল। কিন্তু তার ছেলে এবং তার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত ছিল। কেউ একজন হযরত আবু দারদা (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়ে বলেনঃ “অন্যান্য সব লোকই তো আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে, কিন্তু আপনার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত রয়েছে, ব্যাপার কি?” তিনি উত্তরে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “দুনিয়া হতে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ থাকেন নবীরা এবং তাঁদের উপর সবচেয়ে বেশী কঠিন ও ভারী হয় তাঁদের পরিবারবর্গ ও আত্মীয় স্বজন। এব্যাপারেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।” এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহর উপর নির্ভর কর। তিনিই তোমার রক্ষক ও সাহায্যকারী। তিনিই তোমার শক্তি যোগাবেন এবং তোমার কথাকে সমুন্নত করবেন। তাঁর দৃষ্টি সব সময় তোমার উপর রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি তোমার প্রতিপালকের হুকুমের উপর ধৈর্য ধারণ কর, তুমি তো আমার চোখের সামনেই রয়েছো।” (৫২: ৪৮) ভাবার্থ এটাওঃ যখন তুমি নামাযের জন্যে দণ্ডায়মান হও তখন তুমি আমার চোখের সামনে থাকো। আমি তোমার রুকু ও সিজদা দেখে থাকি। তুমি দাঁড়িয়ে থাকো বা বসে থাকো অথবা যে অবস্থাতেই থাকো না কেন আমার চোখের সামনেই থাকো। অর্থাৎ তুমি একাকী নামায পড়লেও আমি দেখতে পাই এবং জামাআতে পড়লেও তুমি আমার সামনেই থাকো। ভাবার্থ এটাও যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যেভাবে তাঁর সামনের জিনিসগুলো দেখাতেন তেমনিভাবে তার পিছনের মুক্তাদীরাও তাঁর দৃষ্টির সামনে থাকতো। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “তোমরা তোমাদের নামাযের সারি সোজা করে নেবে। জেনে রেখো যে, আমি তোমাদেরকে আমার পিছন হতে দেখতে পাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ভাবার্থ এও করেছেনঃ “তার এক নবীর পিঠ হতে অন্য নবীর পিঠের দিকে স্থানান্তরিত হওয়াকে আমি বরাবরই দেখতে রয়েছি, শেষ পর্যন্ত তিনি নবী হিসেবে দুনিয়ায় এসেছেন।” মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তিনি স্বীয় বান্দাদের কথা খুবই শুনে থাকেন এবং তাদের কাজ কারবার সম্পর্কে তিনি পূর্ণ অবহিত। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি যে অবস্থায় থাকো, তুমি যে কুরআন পাঠ কর, তুমি যে আমল কর সেসব সম্পর্কে আমি পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (১০:৬১)

আশ-শুআরা 26:216

২১৩-২২০ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ তুমি শুধু আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। আর যে এরূপ করবে না অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে সে অবশ্যই শাস্তির যোগ্য হবে। তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিবে যে, ঈমান ছাড়া অন্য কিছুই মুক্তিদাতা নয়।এরপর তিনি নির্দেশ দিচ্ছেনঃ একত্ববাদী ও তোমার অনুসারী মুমিনদের প্রতি বিনয়ী হবে। আর যে কেউই আমার আদেশ ও নিষেধ অমান্য করবে সে যে-ই হোক না কেন তার সাথে কোনই সম্পর্ক রাখবে না এবং তার প্রতি স্বীয় অসন্তোষ প্রকাশ করবে।বিশেষ লোককে এই ভয় প্রদর্শন সাধারণ লোককে ভয় প্রদর্শন করার বিপরীত নয়। কেননা, এটা তার একটা অংশ। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে যাদের পিতৃপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি, যার ফলে তারা গাফিল।” (৩৬: ৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার মূল জনপদকে এবং ওর আশে পাশের লোকদেরকে।”(৭: ৪২) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এর দ্বারা তুমি সতর্ক কর তাদেরকে যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের নিকট একত্রিত করা হবে।” (৬: ৫১) আরো এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যাতে তুমি এর দ্বারা পরহেযগারদেরকে সুসংবাদ দিতে ও উদ্ধতদেরকে সতর্ক করতে পার।”(১৯:৯৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে আমি এর দ্বারা ভয় প্রদর্শন করতে পারি তোমাদেরকে এবং তাদেরকেও যাদের কাছে এটা পৌঁছে।” (৬: ১৯)সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এই উম্মতের মধ্যে যার কানে আমার খবর পৌঁছেছে, সে ইয়াহুদী হোক অথবা খৃষ্টানই হোক, অতঃপর আমার উপর সে ঈমান আনেনি, সে অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে বহু হাদীস এসেছে। আমরা এগুলো বর্ণনা করছিঃ প্রথম হাদীস ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে (আরবি) আকস্মিক কোন বিপদের সময় আরবের লোকেরা বিপদ সংকেত হিসেবে এরূপ শব্দ উচ্চারণকরতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই প্রচলিত প্রথারই অনুসরণ করেছিলেন। বলে উচ্চ স্বরে ডাক দেন। এ শব্দ শুনে লোকেরা তাঁর নিকট একত্রিত হয়ে যায়। যারা আসতে পারেনি তারা লোক পাটিয়ে দেয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! হে বানী ফাহর! হে বানী লুওয়াই! আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে, এই পাহাড়ের পিছনে তোমাদের শত্রু- সেনাবাহিনী রয়েছে এবং তারা ওঁৎ পেতে বসে আছে। সুযোগ পেলেই তোমাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। তবে তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে কি?" সবাই এক বাক্যে উত্তর দেয়ঃ “হ্যা, আমরা আপনার কথা সত্য বলেই বিশ্বাস করবো।" তিনি তখন বলেনঃ ‘তাহলে জেনে রেখো যে, সামনের কঠিন শাস্তি হতে আমি তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শনকারী।” তাঁর একথা শুনে আবু লাহাব বলে ওঠে-“তুমি ধ্বংস হও। এটা শুনাবার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে ডেকেছিলে?” তার কথার প্রতিবাদে সূরায়ে তাব্বাত ইয়াদা’ অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী(রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) দ্বিতীয় হাদীসঃহযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন (আরবি) অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! হে আবদুল মুত্তালিবের কন্যা সুফিয়া (রাঃ)! হে বানী আবদিল মুত্তালিব! জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে আমি তোমাদের জন্যে কোন (উপকারের) অধিকার রাখবো না। হ্যাঁ, তবে আমার কাছে যে মাল আছে তা হতে তোমরা যা চাইবে তা আমি তোমাদেরকে দেয়ার জন্যে প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)তৃতীয় হাদীসঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরায়েশদেরকে আহ্বান করেন। এবং এক এক করে ও সাধারণভাবে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে কুরায়েশের দল! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা কর। হে কাবের বংশধরগণ! তোমরা নিজেদের জীবনকে আগুন হতে বাঁচাও। হে হাশেমের সন্তানগণ! তোমরা নিজেদের প্রাণকে আল্লাহর আযাব হতে রক্ষা কর। হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানরা! তোমরা আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর। হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! নিজের জীবনকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচিয়ে নাও। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্যে কোন কিছুরই মালিক হতে পারবো না। তবে অবশ্যই আমার সাথে তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে যার পার্থিব সর্বপ্রকারের হক আদায় করতে আমি সদা প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ, ইমাম মুসলিম ও ইমম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতেও শব্দের কিছু পরিবর্তনের সাথে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ভাতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ফুফু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবং স্বীয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে বলেন, তোমরা দুজন নিজেদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে বাচিয়ে নাও এবং জেনে রেখো যে, (কিয়ামতের দিন) আমি আল্লাহর সামনে তোমাদের কোন কাজে লাগবো না। অতঃপর বলেনঃ “হে বানী কুসাই! হে বানী হাশিম! এবং হে আবদে মানাফ! (মনে রেখো যে) আমি হলাম সতর্ককারী, আর মৃত্যু হচ্ছে পরিবর্তন আনয়নকারী এবং কিয়ামত হলো ওয়াদার স্থান।” চতুর্থ হাদীসঃ হযরত কুবাইসা ইবনে মাখারিক (রাঃ) এবং হযরত যুহায়ের ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাঁরা দু'জন বলেন, যখন -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন যার চূড়ার উপর একটি পাথর ছিল। সেখান থেকে তিনি ডাক দিয়ে বলতে শুরু করেনঃ “হে বানী আবদে মানাফ! আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র। আমার ও তোমাদের উপমা ঐ লোকটির মত যে শত্রু দেখলো এবং দৌড়িয়ে নিজের লোকদেরকে সতর্ক করতে আসলো যাতে তারা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। দূর থেকেই সে চীকার করতে শুরু করে দিলো যাতে প্রথম থেকেই তারা সতর্ক হয়ে যেতে পারে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)পঞ্চম হাদীসঃ হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় আহলে বায়েতকে একত্রিত করেন। তাঁরা ছিলেন সংখ্যায় ত্রিশজন। তাঁদের পানাহার শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কে এমন আছে যে আমার কর্জ তার দায়িত্বে নিয়ে নেয় এবং আমার পরে আমার অঙ্গীকারসমূহ পূরণ করে, অতঃপর জান্নাতে আমার সাথী হতে পারে ও আমার আঙ্গুলের মধ্যে আমার খলীফা হতে পারে?” একটি লোক উত্তরে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো সমুদ্র (সদৃশ), সুতরাং কে আপনার সাথে দাড়াতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার তার উক্তির পুনরাবৃত্তি করেন, কিন্তু কেউই ওর জন্যে প্রস্তুত হলো না। তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এজন্যে আমিই প্রস্তুত আছি। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) এক সনদে এর চেয়েও বেশী বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু আবদিল মুত্তালিবের একটি বড় দলকে একত্রিত করেন যারা বড়ই পেটুক ছিল। তাদের এক একজন একটি বকরীর বাচ্চা ও একটি বড় পিয়ালাপূর্ণ দুধ পান করে ফেলতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের জন্যে শুধু তিন পোয়া পরিমাণ খাদ্য রান্না করিয়ে নেন। কিন্তু তাতে এতো বরকত দেয়া হয় যে, সবাই পেট পুরে পানাহার করে, অথচ না খাদ্য কিছু হ্রাস পায় এবং না পানীয় কিছু কমে যায়। এরপর নবী (সঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! আমি তোমাদের নিকট বিশিষ্টভাবে এবং সমস্ত মানুষের নিকট সাধারণভাবে নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি। এই সময় তোমরা আমার একটি মুজিয়াও দেখলে। এখন তোমাদের মধ্যে কে আছে যে, সে আমার হাতে আমার ভাই ও সাথী হওয়ার দীক্ষা গ্রহণ করে?” কিন্তু মজলিসের একটি লোকও দাঁড়ালো না। (হযরত আলী রাঃ বলেনঃ) আমি তখন দাঁড়িয়ে গেলাম আর মজলিসের মধ্যে আমি ছিলাম সবচেয়ে ছোট। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি বসে পড়।” তিনি তিনবার তাদেরকে ঐ কথা বলেন কিন্তু তিনবারই আমি ছাড়া আর কেউই দাঁড়ায়নি। তৃতীয়বারে তিনি আমার বায়আত গ্রহণ করেন।”ইমাম বায়হাকী (রঃ) দালাইলুন নবুওয়াত’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি আমার কওমের সামনে আমি এখনই এটা পেশ করি তবে তারা মানবে না এবং তারা এমন উত্তর দেবে যা আমার কাছে কঠিন ঠেকবে।” তাই তিনি নীরব হয়ে যান। ইতিমধ্যে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়েন এবং বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনাকে যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা পালনে যদি আপনি বিলম্ব করেন তবে আপনার প্রতিপালক আপনাকে শাস্তি প্রদান করবেন।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে আলী (রাঃ)! আমার প্রতিপালক আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন আমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করি। আমি মনে করলাম যে, আমি যদি তাড়াতাড়ি এ কাজে লেগে পড়ি তবে আমার কওম আমাকে মানবে না এবং আমাকে এমন উত্তর দেবে যাতে আমি মনে ব্যথা পাবো। তাই আমি নীরবতা অবলম্বন করি। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার কাছে এসে বলেনঃ “আপনি যদি আপনার প্রতিপালকের আদেশ পালনে বিলম্ব করেন তবে তিনি আপনাকে শাস্তি দিবেন।” সুতরাং হে আলী (রাঃ)! তুমি একটি বকরী যবাহ কর, তিন সের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত কর এবং এক বাটি দুধও সগ্রহ কর। অতঃপর বানী আবদিল মুত্তালিবকে একত্রিত কর। হযরত আলী (রাঃ) তাই করলেন এবং সবাইকে দাওয়াত দিলেন। তারা সংখ্যায় দু’এক কমবেশী চল্লিশ জন ছিল। তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচারাও ছিলেন। তাঁরা হলেন আবু তালিব, হযরত হামযা (রাঃ) এবং হযরত আব্বাস (রাঃ)। তার কাফির ও খবীস চাচা আবু লাহাবও ছিল। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তরকারী পেশ করলে তিনি তা হতে এক টুকরা নিয়ে কিছু খেলেন। অতঃপর তা হাঁড়িতে রেখে দিলেন। এরপর তিনি সকলকে বললেনঃ “তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে খেতে শুরু কর।” সবাই খেতে লাগলো এবং পেট পুরে খেলো। হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! হাঁড়িতে যা ছিল তাই থেকে গেল। গোশতে শুধু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অঙ্গুলীর দাগ ছিল, কিন্তু গোশত এতটুকু কমেনি। অথচ তাদের এক একজনই হাঁড়িতে রাখা সব গোশত খেয়ে নিতে পারতো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! তাদেরকে এখন দুধ পান করিয়ে দাও।” আমি তখন দুধের ঐ বাটিটি আনলাম এবং তাদেরকে পান করতে বললাম। তারা পালাক্রমে পান করে পরিতৃপ্ত হয়ে গেল। কিন্তু দুধ মোটেই কমলো না। অথচ তাদের এক একজনই ঐ বাটির সম্পূর্ণ দুধ পান করে নিতে পারতো। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কিছু বলতে চাচ্ছিলেন কিন্তু আবু লাহাব মজলিস হতে উঠে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “তোমাদের এ লোকটির এ সবকিছুই যাদু।” তার দেখাদেখি সবাই মজলিস হতে উঠে গেল এবং নিজ নিজ পথ ধরলো। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে উপদেশ দেয়ার সুযোগ পেলেন না।”পরের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় হযরত আলী (রাঃ)-কে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! অনুরূপভাবে আজকেও আবার তাদেরকে দাওয়াত কর। কেননা, গতকাল তারা আমাকে কথা বলার কোন সুযোগই দেয়নি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেন, সুতরাং আমি পুনরায় ঐ প্রকারের ব্যবস্থা করলাম। সবকে দাওয়াত দিয়ে আসলাম। ঐদিনও আবু লাহাব দাঁড়িয়ে গিয়ে পূর্বের ন্যায়ই কথা বললো এবং ঐভাবে মজলিসের লোক ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তৃতীয় দিন আবার আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে সবকিছুরই ব্যবস্থা করলাম। খাওয়া দাওয়ার পর ঐদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাড়াতাড়ি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আরবের কোন যুবক তার কওমের কাছে এমন উত্তম কিছু নিয়ে আসেনি যা আমি তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছি। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ আনয়ন করেছি।”অন্য রিওয়াইয়াতে এরপর এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এখন তোমরা বল তো তোমাদের মধ্যে কে আমার আনুকূল্য করতে পারে এবং কে আমার সহচর হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন তোমাদেরকে তার দিকে আহ্বান করি। সুতরাং কে আমাকে এ কাজে সহায়তা করতে পারে এই শর্তে যে, সে আমার ভাই হয়ে যাবে এবং সে এরূপ এরূপ মর্যাদা লাভ করবে?” তাঁর একথা শুনে কওমের সবাই নীরব থাকে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আলী (রাঃ) বলেন, যদিও আমি তাদের মধ্যে বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট, দুঃখময় চক্ষু বিশিষ্ট, মোটা পেট বিশিষ্ট এবং ভারী পদনালী বিশিষ্ট, তথাপি আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার আনুকূল্য করতে প্রস্তুত আছি। তিনি তখন আমার স্কন্ধে হাত রেখে বললেনঃ “এটা আমার ভাই এবং তার এরূপ এরূপ মর্যাদা রয়েছে। সুতরাং তোমরা তার কথা শুনো এবং তার আনুগত্য কর।” তাঁর এ কথা শুনে কওমের লোকেরা উঠে গেল এবং হেসে উঠলো ও আবু তালিবকে বললোঃ “তুমিই তোমার ছেলের কথা শুনো ও তার আনুগত্য করতে থাকো (আমাদের দ্বারা এ কাজ হবে না।” কিন্তু এ হাদীসটির বর্ণনাকারী আবদুল গাফফার ইবনে কাসিব ইবনে আবি মারইয়াম পরিত্যাজ্য এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে শিয়াও বটে, ইবনে মাদনী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, সে হাদীস নিজে বানিয়ে নিতো। হাদীসের অন্যান্য ইমামগণও তাকে দুর্বল বলেছেন।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই দাওয়াতে শুধুমাত্র বকরীর একটি পায়ের গোশত ছিল। এতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ভাষণ দিতে শুরু করলেন তখন তারা হঠাৎ করে বলে ফেললোঃ “এরূপ যাদু তো ইতিপূর্বে আমরা কখনো দেখিনি।” তখন তিনি নীরব হয়ে যান। তাঁর ভাষণ ছিলঃ “কে আছে, যে আমার ঋণ তার দায়িত্বে গ্রহণ করবে এবং আমার আহূলের মধ্যে খলীফা হয়ে যাবে?” হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “ঐ মজলিসে হযরত আব্বাসও (রঃ) বিদ্যমান ছিলেন। শুধু মাল-ধনের কার্পণ্যের কারণে তিনিও নীরব ছিলেন।অকে নীরব থাকতে দেখে আমিও নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বারও এ ই বললেন। এবারও চতুর্দিকে নীরবতা বিরাজ করে। এবার আমি আর নীরব থাকতে পারলাম না, বরং উপরোক্ত কথা বলে ফেললাম। ঐ সময় আমি বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট এবং ছিলাম ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন, বড় পেট ও ভারী পদনালী বিশিষ্ট।" ঐ রিওয়াইয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ফরমান রয়েছেঃ “কে আমার ঋণ তার দায়িত্বে নিচ্ছে এবং আমার পর কে আমার আহলের হিফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করছে?” এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমি আমার এই দ্বীনের প্রচার চারদিকে ছড়িয়ে দিবো এবং লোকদের আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করবো। ফলে সবাই আমার শত্রুতে পরিণত হয়ে যাবে এবং আমাকে হত্যা করে ফেলার চেষ্টা করবে।” এরূপ আশংকা তিনি করতে থাকেন। অবশেষে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ তোমাকে লোকদের অনিষ্ট হতে রক্ষা করবেন।” (৫: ৬৭) এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আশংকা দূর হয়ে যায়। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তিনি নিজের জন্যে প্রহরী নিযুক্ত রাখতেন। কিন্তু এটা অবতীর্ণ হওয়ার পর প্রহরী রাখাও তিনি বন্ধ করে দেন। বাস্তবিকই ঐ সময় বানু হাশেমের সবারই মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) অপেক্ষা বড় ঈমানদার ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সত্যায়নকারী আর কেউ ছিল না। এজন্যেই তিনিই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সাহচর্য দান করার স্বীকারোক্তি করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে জনগণকে সাধারণ দাওয়াত দেন এবং তাদেরকে খাঁটি তাওহীদের দিকে আহ্বান করেন এবং নিজের নবুওয়াতের ঘোষণা দেন।আবদুল ওয়াহিদ দেমাশকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা হযরত আবূ দারদা (রাঃ) মসজিদে বসে ওয়াজ করছিলেন এবং ফতওয়া দিচ্ছিলেন। মজলিস লোকে ভরপুর ছিল। সবারই দৃষ্টি তার চেহারার উপর ছিল এবং তারা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তার ওয়াজ শুনছিল। কিন্তু তার ছেলে এবং তার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত ছিল। কেউ একজন হযরত আবু দারদা (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়ে বলেনঃ “অন্যান্য সব লোকই তো আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে, কিন্তু আপনার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত রয়েছে, ব্যাপার কি?” তিনি উত্তরে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “দুনিয়া হতে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ থাকেন নবীরা এবং তাঁদের উপর সবচেয়ে বেশী কঠিন ও ভারী হয় তাঁদের পরিবারবর্গ ও আত্মীয় স্বজন। এব্যাপারেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।” এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহর উপর নির্ভর কর। তিনিই তোমার রক্ষক ও সাহায্যকারী। তিনিই তোমার শক্তি যোগাবেন এবং তোমার কথাকে সমুন্নত করবেন। তাঁর দৃষ্টি সব সময় তোমার উপর রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি তোমার প্রতিপালকের হুকুমের উপর ধৈর্য ধারণ কর, তুমি তো আমার চোখের সামনেই রয়েছো।” (৫২: ৪৮) ভাবার্থ এটাওঃ যখন তুমি নামাযের জন্যে দণ্ডায়মান হও তখন তুমি আমার চোখের সামনে থাকো। আমি তোমার রুকু ও সিজদা দেখে থাকি। তুমি দাঁড়িয়ে থাকো বা বসে থাকো অথবা যে অবস্থাতেই থাকো না কেন আমার চোখের সামনেই থাকো। অর্থাৎ তুমি একাকী নামায পড়লেও আমি দেখতে পাই এবং জামাআতে পড়লেও তুমি আমার সামনেই থাকো। ভাবার্থ এটাও যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যেভাবে তাঁর সামনের জিনিসগুলো দেখাতেন তেমনিভাবে তার পিছনের মুক্তাদীরাও তাঁর দৃষ্টির সামনে থাকতো। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “তোমরা তোমাদের নামাযের সারি সোজা করে নেবে। জেনে রেখো যে, আমি তোমাদেরকে আমার পিছন হতে দেখতে পাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ভাবার্থ এও করেছেনঃ “তার এক নবীর পিঠ হতে অন্য নবীর পিঠের দিকে স্থানান্তরিত হওয়াকে আমি বরাবরই দেখতে রয়েছি, শেষ পর্যন্ত তিনি নবী হিসেবে দুনিয়ায় এসেছেন।” মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তিনি স্বীয় বান্দাদের কথা খুবই শুনে থাকেন এবং তাদের কাজ কারবার সম্পর্কে তিনি পূর্ণ অবহিত। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি যে অবস্থায় থাকো, তুমি যে কুরআন পাঠ কর, তুমি যে আমল কর সেসব সম্পর্কে আমি পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (১০:৬১)

আশ-শুআরা 26:217

২১৩-২২০ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ তুমি শুধু আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। আর যে এরূপ করবে না অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে সে অবশ্যই শাস্তির যোগ্য হবে। তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিবে যে, ঈমান ছাড়া অন্য কিছুই মুক্তিদাতা নয়।এরপর তিনি নির্দেশ দিচ্ছেনঃ একত্ববাদী ও তোমার অনুসারী মুমিনদের প্রতি বিনয়ী হবে। আর যে কেউই আমার আদেশ ও নিষেধ অমান্য করবে সে যে-ই হোক না কেন তার সাথে কোনই সম্পর্ক রাখবে না এবং তার প্রতি স্বীয় অসন্তোষ প্রকাশ করবে।বিশেষ লোককে এই ভয় প্রদর্শন সাধারণ লোককে ভয় প্রদর্শন করার বিপরীত নয়। কেননা, এটা তার একটা অংশ। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে যাদের পিতৃপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি, যার ফলে তারা গাফিল।” (৩৬: ৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার মূল জনপদকে এবং ওর আশে পাশের লোকদেরকে।”(৭: ৪২) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এর দ্বারা তুমি সতর্ক কর তাদেরকে যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের নিকট একত্রিত করা হবে।” (৬: ৫১) আরো এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যাতে তুমি এর দ্বারা পরহেযগারদেরকে সুসংবাদ দিতে ও উদ্ধতদেরকে সতর্ক করতে পার।”(১৯:৯৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে আমি এর দ্বারা ভয় প্রদর্শন করতে পারি তোমাদেরকে এবং তাদেরকেও যাদের কাছে এটা পৌঁছে।” (৬: ১৯)সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এই উম্মতের মধ্যে যার কানে আমার খবর পৌঁছেছে, সে ইয়াহুদী হোক অথবা খৃষ্টানই হোক, অতঃপর আমার উপর সে ঈমান আনেনি, সে অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে বহু হাদীস এসেছে। আমরা এগুলো বর্ণনা করছিঃ প্রথম হাদীস ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে (আরবি) আকস্মিক কোন বিপদের সময় আরবের লোকেরা বিপদ সংকেত হিসেবে এরূপ শব্দ উচ্চারণকরতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই প্রচলিত প্রথারই অনুসরণ করেছিলেন। বলে উচ্চ স্বরে ডাক দেন। এ শব্দ শুনে লোকেরা তাঁর নিকট একত্রিত হয়ে যায়। যারা আসতে পারেনি তারা লোক পাটিয়ে দেয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! হে বানী ফাহর! হে বানী লুওয়াই! আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে, এই পাহাড়ের পিছনে তোমাদের শত্রু- সেনাবাহিনী রয়েছে এবং তারা ওঁৎ পেতে বসে আছে। সুযোগ পেলেই তোমাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। তবে তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে কি?" সবাই এক বাক্যে উত্তর দেয়ঃ “হ্যা, আমরা আপনার কথা সত্য বলেই বিশ্বাস করবো।" তিনি তখন বলেনঃ ‘তাহলে জেনে রেখো যে, সামনের কঠিন শাস্তি হতে আমি তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শনকারী।” তাঁর একথা শুনে আবু লাহাব বলে ওঠে-“তুমি ধ্বংস হও। এটা শুনাবার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে ডেকেছিলে?” তার কথার প্রতিবাদে সূরায়ে তাব্বাত ইয়াদা’ অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী(রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) দ্বিতীয় হাদীসঃহযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন (আরবি) অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! হে আবদুল মুত্তালিবের কন্যা সুফিয়া (রাঃ)! হে বানী আবদিল মুত্তালিব! জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে আমি তোমাদের জন্যে কোন (উপকারের) অধিকার রাখবো না। হ্যাঁ, তবে আমার কাছে যে মাল আছে তা হতে তোমরা যা চাইবে তা আমি তোমাদেরকে দেয়ার জন্যে প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)তৃতীয় হাদীসঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরায়েশদেরকে আহ্বান করেন। এবং এক এক করে ও সাধারণভাবে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে কুরায়েশের দল! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা কর। হে কাবের বংশধরগণ! তোমরা নিজেদের জীবনকে আগুন হতে বাঁচাও। হে হাশেমের সন্তানগণ! তোমরা নিজেদের প্রাণকে আল্লাহর আযাব হতে রক্ষা কর। হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানরা! তোমরা আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর। হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! নিজের জীবনকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচিয়ে নাও। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্যে কোন কিছুরই মালিক হতে পারবো না। তবে অবশ্যই আমার সাথে তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে যার পার্থিব সর্বপ্রকারের হক আদায় করতে আমি সদা প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ, ইমাম মুসলিম ও ইমম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতেও শব্দের কিছু পরিবর্তনের সাথে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ভাতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ফুফু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবং স্বীয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে বলেন, তোমরা দুজন নিজেদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে বাচিয়ে নাও এবং জেনে রেখো যে, (কিয়ামতের দিন) আমি আল্লাহর সামনে তোমাদের কোন কাজে লাগবো না। অতঃপর বলেনঃ “হে বানী কুসাই! হে বানী হাশিম! এবং হে আবদে মানাফ! (মনে রেখো যে) আমি হলাম সতর্ককারী, আর মৃত্যু হচ্ছে পরিবর্তন আনয়নকারী এবং কিয়ামত হলো ওয়াদার স্থান।” চতুর্থ হাদীসঃ হযরত কুবাইসা ইবনে মাখারিক (রাঃ) এবং হযরত যুহায়ের ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাঁরা দু'জন বলেন, যখন -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন যার চূড়ার উপর একটি পাথর ছিল। সেখান থেকে তিনি ডাক দিয়ে বলতে শুরু করেনঃ “হে বানী আবদে মানাফ! আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র। আমার ও তোমাদের উপমা ঐ লোকটির মত যে শত্রু দেখলো এবং দৌড়িয়ে নিজের লোকদেরকে সতর্ক করতে আসলো যাতে তারা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। দূর থেকেই সে চীকার করতে শুরু করে দিলো যাতে প্রথম থেকেই তারা সতর্ক হয়ে যেতে পারে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)পঞ্চম হাদীসঃ হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় আহলে বায়েতকে একত্রিত করেন। তাঁরা ছিলেন সংখ্যায় ত্রিশজন। তাঁদের পানাহার শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কে এমন আছে যে আমার কর্জ তার দায়িত্বে নিয়ে নেয় এবং আমার পরে আমার অঙ্গীকারসমূহ পূরণ করে, অতঃপর জান্নাতে আমার সাথী হতে পারে ও আমার আঙ্গুলের মধ্যে আমার খলীফা হতে পারে?” একটি লোক উত্তরে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো সমুদ্র (সদৃশ), সুতরাং কে আপনার সাথে দাড়াতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার তার উক্তির পুনরাবৃত্তি করেন, কিন্তু কেউই ওর জন্যে প্রস্তুত হলো না। তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এজন্যে আমিই প্রস্তুত আছি। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) এক সনদে এর চেয়েও বেশী বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু আবদিল মুত্তালিবের একটি বড় দলকে একত্রিত করেন যারা বড়ই পেটুক ছিল। তাদের এক একজন একটি বকরীর বাচ্চা ও একটি বড় পিয়ালাপূর্ণ দুধ পান করে ফেলতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের জন্যে শুধু তিন পোয়া পরিমাণ খাদ্য রান্না করিয়ে নেন। কিন্তু তাতে এতো বরকত দেয়া হয় যে, সবাই পেট পুরে পানাহার করে, অথচ না খাদ্য কিছু হ্রাস পায় এবং না পানীয় কিছু কমে যায়। এরপর নবী (সঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! আমি তোমাদের নিকট বিশিষ্টভাবে এবং সমস্ত মানুষের নিকট সাধারণভাবে নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি। এই সময় তোমরা আমার একটি মুজিয়াও দেখলে। এখন তোমাদের মধ্যে কে আছে যে, সে আমার হাতে আমার ভাই ও সাথী হওয়ার দীক্ষা গ্রহণ করে?” কিন্তু মজলিসের একটি লোকও দাঁড়ালো না। (হযরত আলী রাঃ বলেনঃ) আমি তখন দাঁড়িয়ে গেলাম আর মজলিসের মধ্যে আমি ছিলাম সবচেয়ে ছোট। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি বসে পড়।” তিনি তিনবার তাদেরকে ঐ কথা বলেন কিন্তু তিনবারই আমি ছাড়া আর কেউই দাঁড়ায়নি। তৃতীয়বারে তিনি আমার বায়আত গ্রহণ করেন।”ইমাম বায়হাকী (রঃ) দালাইলুন নবুওয়াত’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি আমার কওমের সামনে আমি এখনই এটা পেশ করি তবে তারা মানবে না এবং তারা এমন উত্তর দেবে যা আমার কাছে কঠিন ঠেকবে।” তাই তিনি নীরব হয়ে যান। ইতিমধ্যে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়েন এবং বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনাকে যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা পালনে যদি আপনি বিলম্ব করেন তবে আপনার প্রতিপালক আপনাকে শাস্তি প্রদান করবেন।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে আলী (রাঃ)! আমার প্রতিপালক আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন আমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করি। আমি মনে করলাম যে, আমি যদি তাড়াতাড়ি এ কাজে লেগে পড়ি তবে আমার কওম আমাকে মানবে না এবং আমাকে এমন উত্তর দেবে যাতে আমি মনে ব্যথা পাবো। তাই আমি নীরবতা অবলম্বন করি। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার কাছে এসে বলেনঃ “আপনি যদি আপনার প্রতিপালকের আদেশ পালনে বিলম্ব করেন তবে তিনি আপনাকে শাস্তি দিবেন।” সুতরাং হে আলী (রাঃ)! তুমি একটি বকরী যবাহ কর, তিন সের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত কর এবং এক বাটি দুধও সগ্রহ কর। অতঃপর বানী আবদিল মুত্তালিবকে একত্রিত কর। হযরত আলী (রাঃ) তাই করলেন এবং সবাইকে দাওয়াত দিলেন। তারা সংখ্যায় দু’এক কমবেশী চল্লিশ জন ছিল। তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচারাও ছিলেন। তাঁরা হলেন আবু তালিব, হযরত হামযা (রাঃ) এবং হযরত আব্বাস (রাঃ)। তার কাফির ও খবীস চাচা আবু লাহাবও ছিল। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তরকারী পেশ করলে তিনি তা হতে এক টুকরা নিয়ে কিছু খেলেন। অতঃপর তা হাঁড়িতে রেখে দিলেন। এরপর তিনি সকলকে বললেনঃ “তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে খেতে শুরু কর।” সবাই খেতে লাগলো এবং পেট পুরে খেলো। হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! হাঁড়িতে যা ছিল তাই থেকে গেল। গোশতে শুধু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অঙ্গুলীর দাগ ছিল, কিন্তু গোশত এতটুকু কমেনি। অথচ তাদের এক একজনই হাঁড়িতে রাখা সব গোশত খেয়ে নিতে পারতো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! তাদেরকে এখন দুধ পান করিয়ে দাও।” আমি তখন দুধের ঐ বাটিটি আনলাম এবং তাদেরকে পান করতে বললাম। তারা পালাক্রমে পান করে পরিতৃপ্ত হয়ে গেল। কিন্তু দুধ মোটেই কমলো না। অথচ তাদের এক একজনই ঐ বাটির সম্পূর্ণ দুধ পান করে নিতে পারতো। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কিছু বলতে চাচ্ছিলেন কিন্তু আবু লাহাব মজলিস হতে উঠে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “তোমাদের এ লোকটির এ সবকিছুই যাদু।” তার দেখাদেখি সবাই মজলিস হতে উঠে গেল এবং নিজ নিজ পথ ধরলো। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে উপদেশ দেয়ার সুযোগ পেলেন না।”পরের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় হযরত আলী (রাঃ)-কে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! অনুরূপভাবে আজকেও আবার তাদেরকে দাওয়াত কর। কেননা, গতকাল তারা আমাকে কথা বলার কোন সুযোগই দেয়নি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেন, সুতরাং আমি পুনরায় ঐ প্রকারের ব্যবস্থা করলাম। সবকে দাওয়াত দিয়ে আসলাম। ঐদিনও আবু লাহাব দাঁড়িয়ে গিয়ে পূর্বের ন্যায়ই কথা বললো এবং ঐভাবে মজলিসের লোক ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তৃতীয় দিন আবার আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে সবকিছুরই ব্যবস্থা করলাম। খাওয়া দাওয়ার পর ঐদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাড়াতাড়ি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আরবের কোন যুবক তার কওমের কাছে এমন উত্তম কিছু নিয়ে আসেনি যা আমি তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছি। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ আনয়ন করেছি।”অন্য রিওয়াইয়াতে এরপর এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এখন তোমরা বল তো তোমাদের মধ্যে কে আমার আনুকূল্য করতে পারে এবং কে আমার সহচর হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন তোমাদেরকে তার দিকে আহ্বান করি। সুতরাং কে আমাকে এ কাজে সহায়তা করতে পারে এই শর্তে যে, সে আমার ভাই হয়ে যাবে এবং সে এরূপ এরূপ মর্যাদা লাভ করবে?” তাঁর একথা শুনে কওমের সবাই নীরব থাকে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আলী (রাঃ) বলেন, যদিও আমি তাদের মধ্যে বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট, দুঃখময় চক্ষু বিশিষ্ট, মোটা পেট বিশিষ্ট এবং ভারী পদনালী বিশিষ্ট, তথাপি আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার আনুকূল্য করতে প্রস্তুত আছি। তিনি তখন আমার স্কন্ধে হাত রেখে বললেনঃ “এটা আমার ভাই এবং তার এরূপ এরূপ মর্যাদা রয়েছে। সুতরাং তোমরা তার কথা শুনো এবং তার আনুগত্য কর।” তাঁর এ কথা শুনে কওমের লোকেরা উঠে গেল এবং হেসে উঠলো ও আবু তালিবকে বললোঃ “তুমিই তোমার ছেলের কথা শুনো ও তার আনুগত্য করতে থাকো (আমাদের দ্বারা এ কাজ হবে না।” কিন্তু এ হাদীসটির বর্ণনাকারী আবদুল গাফফার ইবনে কাসিব ইবনে আবি মারইয়াম পরিত্যাজ্য এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে শিয়াও বটে, ইবনে মাদনী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, সে হাদীস নিজে বানিয়ে নিতো। হাদীসের অন্যান্য ইমামগণও তাকে দুর্বল বলেছেন।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই দাওয়াতে শুধুমাত্র বকরীর একটি পায়ের গোশত ছিল। এতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ভাষণ দিতে শুরু করলেন তখন তারা হঠাৎ করে বলে ফেললোঃ “এরূপ যাদু তো ইতিপূর্বে আমরা কখনো দেখিনি।” তখন তিনি নীরব হয়ে যান। তাঁর ভাষণ ছিলঃ “কে আছে, যে আমার ঋণ তার দায়িত্বে গ্রহণ করবে এবং আমার আহূলের মধ্যে খলীফা হয়ে যাবে?” হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “ঐ মজলিসে হযরত আব্বাসও (রঃ) বিদ্যমান ছিলেন। শুধু মাল-ধনের কার্পণ্যের কারণে তিনিও নীরব ছিলেন।অকে নীরব থাকতে দেখে আমিও নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বারও এ ই বললেন। এবারও চতুর্দিকে নীরবতা বিরাজ করে। এবার আমি আর নীরব থাকতে পারলাম না, বরং উপরোক্ত কথা বলে ফেললাম। ঐ সময় আমি বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট এবং ছিলাম ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন, বড় পেট ও ভারী পদনালী বিশিষ্ট।" ঐ রিওয়াইয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ফরমান রয়েছেঃ “কে আমার ঋণ তার দায়িত্বে নিচ্ছে এবং আমার পর কে আমার আহলের হিফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করছে?” এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমি আমার এই দ্বীনের প্রচার চারদিকে ছড়িয়ে দিবো এবং লোকদের আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করবো। ফলে সবাই আমার শত্রুতে পরিণত হয়ে যাবে এবং আমাকে হত্যা করে ফেলার চেষ্টা করবে।” এরূপ আশংকা তিনি করতে থাকেন। অবশেষে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ তোমাকে লোকদের অনিষ্ট হতে রক্ষা করবেন।” (৫: ৬৭) এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আশংকা দূর হয়ে যায়। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তিনি নিজের জন্যে প্রহরী নিযুক্ত রাখতেন। কিন্তু এটা অবতীর্ণ হওয়ার পর প্রহরী রাখাও তিনি বন্ধ করে দেন। বাস্তবিকই ঐ সময় বানু হাশেমের সবারই মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) অপেক্ষা বড় ঈমানদার ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সত্যায়নকারী আর কেউ ছিল না। এজন্যেই তিনিই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সাহচর্য দান করার স্বীকারোক্তি করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে জনগণকে সাধারণ দাওয়াত দেন এবং তাদেরকে খাঁটি তাওহীদের দিকে আহ্বান করেন এবং নিজের নবুওয়াতের ঘোষণা দেন।আবদুল ওয়াহিদ দেমাশকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা হযরত আবূ দারদা (রাঃ) মসজিদে বসে ওয়াজ করছিলেন এবং ফতওয়া দিচ্ছিলেন। মজলিস লোকে ভরপুর ছিল। সবারই দৃষ্টি তার চেহারার উপর ছিল এবং তারা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তার ওয়াজ শুনছিল। কিন্তু তার ছেলে এবং তার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত ছিল। কেউ একজন হযরত আবু দারদা (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়ে বলেনঃ “অন্যান্য সব লোকই তো আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে, কিন্তু আপনার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত রয়েছে, ব্যাপার কি?” তিনি উত্তরে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “দুনিয়া হতে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ থাকেন নবীরা এবং তাঁদের উপর সবচেয়ে বেশী কঠিন ও ভারী হয় তাঁদের পরিবারবর্গ ও আত্মীয় স্বজন। এব্যাপারেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।” এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহর উপর নির্ভর কর। তিনিই তোমার রক্ষক ও সাহায্যকারী। তিনিই তোমার শক্তি যোগাবেন এবং তোমার কথাকে সমুন্নত করবেন। তাঁর দৃষ্টি সব সময় তোমার উপর রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি তোমার প্রতিপালকের হুকুমের উপর ধৈর্য ধারণ কর, তুমি তো আমার চোখের সামনেই রয়েছো।” (৫২: ৪৮) ভাবার্থ এটাওঃ যখন তুমি নামাযের জন্যে দণ্ডায়মান হও তখন তুমি আমার চোখের সামনে থাকো। আমি তোমার রুকু ও সিজদা দেখে থাকি। তুমি দাঁড়িয়ে থাকো বা বসে থাকো অথবা যে অবস্থাতেই থাকো না কেন আমার চোখের সামনেই থাকো। অর্থাৎ তুমি একাকী নামায পড়লেও আমি দেখতে পাই এবং জামাআতে পড়লেও তুমি আমার সামনেই থাকো। ভাবার্থ এটাও যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যেভাবে তাঁর সামনের জিনিসগুলো দেখাতেন তেমনিভাবে তার পিছনের মুক্তাদীরাও তাঁর দৃষ্টির সামনে থাকতো। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “তোমরা তোমাদের নামাযের সারি সোজা করে নেবে। জেনে রেখো যে, আমি তোমাদেরকে আমার পিছন হতে দেখতে পাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ভাবার্থ এও করেছেনঃ “তার এক নবীর পিঠ হতে অন্য নবীর পিঠের দিকে স্থানান্তরিত হওয়াকে আমি বরাবরই দেখতে রয়েছি, শেষ পর্যন্ত তিনি নবী হিসেবে দুনিয়ায় এসেছেন।” মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তিনি স্বীয় বান্দাদের কথা খুবই শুনে থাকেন এবং তাদের কাজ কারবার সম্পর্কে তিনি পূর্ণ অবহিত। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি যে অবস্থায় থাকো, তুমি যে কুরআন পাঠ কর, তুমি যে আমল কর সেসব সম্পর্কে আমি পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (১০:৬১)

আশ-শুআরা 26:218

২১৩-২২০ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ তুমি শুধু আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। আর যে এরূপ করবে না অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে সে অবশ্যই শাস্তির যোগ্য হবে। তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিবে যে, ঈমান ছাড়া অন্য কিছুই মুক্তিদাতা নয়।এরপর তিনি নির্দেশ দিচ্ছেনঃ একত্ববাদী ও তোমার অনুসারী মুমিনদের প্রতি বিনয়ী হবে। আর যে কেউই আমার আদেশ ও নিষেধ অমান্য করবে সে যে-ই হোক না কেন তার সাথে কোনই সম্পর্ক রাখবে না এবং তার প্রতি স্বীয় অসন্তোষ প্রকাশ করবে।বিশেষ লোককে এই ভয় প্রদর্শন সাধারণ লোককে ভয় প্রদর্শন করার বিপরীত নয়। কেননা, এটা তার একটা অংশ। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে যাদের পিতৃপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি, যার ফলে তারা গাফিল।” (৩৬: ৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার মূল জনপদকে এবং ওর আশে পাশের লোকদেরকে।”(৭: ৪২) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এর দ্বারা তুমি সতর্ক কর তাদেরকে যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের নিকট একত্রিত করা হবে।” (৬: ৫১) আরো এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যাতে তুমি এর দ্বারা পরহেযগারদেরকে সুসংবাদ দিতে ও উদ্ধতদেরকে সতর্ক করতে পার।”(১৯:৯৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে আমি এর দ্বারা ভয় প্রদর্শন করতে পারি তোমাদেরকে এবং তাদেরকেও যাদের কাছে এটা পৌঁছে।” (৬: ১৯)সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এই উম্মতের মধ্যে যার কানে আমার খবর পৌঁছেছে, সে ইয়াহুদী হোক অথবা খৃষ্টানই হোক, অতঃপর আমার উপর সে ঈমান আনেনি, সে অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে বহু হাদীস এসেছে। আমরা এগুলো বর্ণনা করছিঃ প্রথম হাদীস ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে (আরবি) আকস্মিক কোন বিপদের সময় আরবের লোকেরা বিপদ সংকেত হিসেবে এরূপ শব্দ উচ্চারণকরতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই প্রচলিত প্রথারই অনুসরণ করেছিলেন। বলে উচ্চ স্বরে ডাক দেন। এ শব্দ শুনে লোকেরা তাঁর নিকট একত্রিত হয়ে যায়। যারা আসতে পারেনি তারা লোক পাটিয়ে দেয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! হে বানী ফাহর! হে বানী লুওয়াই! আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে, এই পাহাড়ের পিছনে তোমাদের শত্রু- সেনাবাহিনী রয়েছে এবং তারা ওঁৎ পেতে বসে আছে। সুযোগ পেলেই তোমাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। তবে তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে কি?" সবাই এক বাক্যে উত্তর দেয়ঃ “হ্যা, আমরা আপনার কথা সত্য বলেই বিশ্বাস করবো।" তিনি তখন বলেনঃ ‘তাহলে জেনে রেখো যে, সামনের কঠিন শাস্তি হতে আমি তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শনকারী।” তাঁর একথা শুনে আবু লাহাব বলে ওঠে-“তুমি ধ্বংস হও। এটা শুনাবার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে ডেকেছিলে?” তার কথার প্রতিবাদে সূরায়ে তাব্বাত ইয়াদা’ অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী(রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) দ্বিতীয় হাদীসঃহযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন (আরবি) অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! হে আবদুল মুত্তালিবের কন্যা সুফিয়া (রাঃ)! হে বানী আবদিল মুত্তালিব! জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে আমি তোমাদের জন্যে কোন (উপকারের) অধিকার রাখবো না। হ্যাঁ, তবে আমার কাছে যে মাল আছে তা হতে তোমরা যা চাইবে তা আমি তোমাদেরকে দেয়ার জন্যে প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)তৃতীয় হাদীসঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরায়েশদেরকে আহ্বান করেন। এবং এক এক করে ও সাধারণভাবে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে কুরায়েশের দল! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা কর। হে কাবের বংশধরগণ! তোমরা নিজেদের জীবনকে আগুন হতে বাঁচাও। হে হাশেমের সন্তানগণ! তোমরা নিজেদের প্রাণকে আল্লাহর আযাব হতে রক্ষা কর। হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানরা! তোমরা আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর। হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! নিজের জীবনকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচিয়ে নাও। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্যে কোন কিছুরই মালিক হতে পারবো না। তবে অবশ্যই আমার সাথে তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে যার পার্থিব সর্বপ্রকারের হক আদায় করতে আমি সদা প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ, ইমাম মুসলিম ও ইমম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতেও শব্দের কিছু পরিবর্তনের সাথে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ভাতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ফুফু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবং স্বীয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে বলেন, তোমরা দুজন নিজেদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে বাচিয়ে নাও এবং জেনে রেখো যে, (কিয়ামতের দিন) আমি আল্লাহর সামনে তোমাদের কোন কাজে লাগবো না। অতঃপর বলেনঃ “হে বানী কুসাই! হে বানী হাশিম! এবং হে আবদে মানাফ! (মনে রেখো যে) আমি হলাম সতর্ককারী, আর মৃত্যু হচ্ছে পরিবর্তন আনয়নকারী এবং কিয়ামত হলো ওয়াদার স্থান।” চতুর্থ হাদীসঃ হযরত কুবাইসা ইবনে মাখারিক (রাঃ) এবং হযরত যুহায়ের ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাঁরা দু'জন বলেন, যখন -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন যার চূড়ার উপর একটি পাথর ছিল। সেখান থেকে তিনি ডাক দিয়ে বলতে শুরু করেনঃ “হে বানী আবদে মানাফ! আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র। আমার ও তোমাদের উপমা ঐ লোকটির মত যে শত্রু দেখলো এবং দৌড়িয়ে নিজের লোকদেরকে সতর্ক করতে আসলো যাতে তারা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। দূর থেকেই সে চীকার করতে শুরু করে দিলো যাতে প্রথম থেকেই তারা সতর্ক হয়ে যেতে পারে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)পঞ্চম হাদীসঃ হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় আহলে বায়েতকে একত্রিত করেন। তাঁরা ছিলেন সংখ্যায় ত্রিশজন। তাঁদের পানাহার শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কে এমন আছে যে আমার কর্জ তার দায়িত্বে নিয়ে নেয় এবং আমার পরে আমার অঙ্গীকারসমূহ পূরণ করে, অতঃপর জান্নাতে আমার সাথী হতে পারে ও আমার আঙ্গুলের মধ্যে আমার খলীফা হতে পারে?” একটি লোক উত্তরে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো সমুদ্র (সদৃশ), সুতরাং কে আপনার সাথে দাড়াতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার তার উক্তির পুনরাবৃত্তি করেন, কিন্তু কেউই ওর জন্যে প্রস্তুত হলো না। তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এজন্যে আমিই প্রস্তুত আছি। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) এক সনদে এর চেয়েও বেশী বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু আবদিল মুত্তালিবের একটি বড় দলকে একত্রিত করেন যারা বড়ই পেটুক ছিল। তাদের এক একজন একটি বকরীর বাচ্চা ও একটি বড় পিয়ালাপূর্ণ দুধ পান করে ফেলতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের জন্যে শুধু তিন পোয়া পরিমাণ খাদ্য রান্না করিয়ে নেন। কিন্তু তাতে এতো বরকত দেয়া হয় যে, সবাই পেট পুরে পানাহার করে, অথচ না খাদ্য কিছু হ্রাস পায় এবং না পানীয় কিছু কমে যায়। এরপর নবী (সঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! আমি তোমাদের নিকট বিশিষ্টভাবে এবং সমস্ত মানুষের নিকট সাধারণভাবে নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি। এই সময় তোমরা আমার একটি মুজিয়াও দেখলে। এখন তোমাদের মধ্যে কে আছে যে, সে আমার হাতে আমার ভাই ও সাথী হওয়ার দীক্ষা গ্রহণ করে?” কিন্তু মজলিসের একটি লোকও দাঁড়ালো না। (হযরত আলী রাঃ বলেনঃ) আমি তখন দাঁড়িয়ে গেলাম আর মজলিসের মধ্যে আমি ছিলাম সবচেয়ে ছোট। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি বসে পড়।” তিনি তিনবার তাদেরকে ঐ কথা বলেন কিন্তু তিনবারই আমি ছাড়া আর কেউই দাঁড়ায়নি। তৃতীয়বারে তিনি আমার বায়আত গ্রহণ করেন।”ইমাম বায়হাকী (রঃ) দালাইলুন নবুওয়াত’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি আমার কওমের সামনে আমি এখনই এটা পেশ করি তবে তারা মানবে না এবং তারা এমন উত্তর দেবে যা আমার কাছে কঠিন ঠেকবে।” তাই তিনি নীরব হয়ে যান। ইতিমধ্যে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়েন এবং বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনাকে যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা পালনে যদি আপনি বিলম্ব করেন তবে আপনার প্রতিপালক আপনাকে শাস্তি প্রদান করবেন।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে আলী (রাঃ)! আমার প্রতিপালক আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন আমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করি। আমি মনে করলাম যে, আমি যদি তাড়াতাড়ি এ কাজে লেগে পড়ি তবে আমার কওম আমাকে মানবে না এবং আমাকে এমন উত্তর দেবে যাতে আমি মনে ব্যথা পাবো। তাই আমি নীরবতা অবলম্বন করি। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার কাছে এসে বলেনঃ “আপনি যদি আপনার প্রতিপালকের আদেশ পালনে বিলম্ব করেন তবে তিনি আপনাকে শাস্তি দিবেন।” সুতরাং হে আলী (রাঃ)! তুমি একটি বকরী যবাহ কর, তিন সের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত কর এবং এক বাটি দুধও সগ্রহ কর। অতঃপর বানী আবদিল মুত্তালিবকে একত্রিত কর। হযরত আলী (রাঃ) তাই করলেন এবং সবাইকে দাওয়াত দিলেন। তারা সংখ্যায় দু’এক কমবেশী চল্লিশ জন ছিল। তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচারাও ছিলেন। তাঁরা হলেন আবু তালিব, হযরত হামযা (রাঃ) এবং হযরত আব্বাস (রাঃ)। তার কাফির ও খবীস চাচা আবু লাহাবও ছিল। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তরকারী পেশ করলে তিনি তা হতে এক টুকরা নিয়ে কিছু খেলেন। অতঃপর তা হাঁড়িতে রেখে দিলেন। এরপর তিনি সকলকে বললেনঃ “তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে খেতে শুরু কর।” সবাই খেতে লাগলো এবং পেট পুরে খেলো। হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! হাঁড়িতে যা ছিল তাই থেকে গেল। গোশতে শুধু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অঙ্গুলীর দাগ ছিল, কিন্তু গোশত এতটুকু কমেনি। অথচ তাদের এক একজনই হাঁড়িতে রাখা সব গোশত খেয়ে নিতে পারতো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! তাদেরকে এখন দুধ পান করিয়ে দাও।” আমি তখন দুধের ঐ বাটিটি আনলাম এবং তাদেরকে পান করতে বললাম। তারা পালাক্রমে পান করে পরিতৃপ্ত হয়ে গেল। কিন্তু দুধ মোটেই কমলো না। অথচ তাদের এক একজনই ঐ বাটির সম্পূর্ণ দুধ পান করে নিতে পারতো। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কিছু বলতে চাচ্ছিলেন কিন্তু আবু লাহাব মজলিস হতে উঠে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “তোমাদের এ লোকটির এ সবকিছুই যাদু।” তার দেখাদেখি সবাই মজলিস হতে উঠে গেল এবং নিজ নিজ পথ ধরলো। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে উপদেশ দেয়ার সুযোগ পেলেন না।”পরের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় হযরত আলী (রাঃ)-কে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! অনুরূপভাবে আজকেও আবার তাদেরকে দাওয়াত কর। কেননা, গতকাল তারা আমাকে কথা বলার কোন সুযোগই দেয়নি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেন, সুতরাং আমি পুনরায় ঐ প্রকারের ব্যবস্থা করলাম। সবকে দাওয়াত দিয়ে আসলাম। ঐদিনও আবু লাহাব দাঁড়িয়ে গিয়ে পূর্বের ন্যায়ই কথা বললো এবং ঐভাবে মজলিসের লোক ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তৃতীয় দিন আবার আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে সবকিছুরই ব্যবস্থা করলাম। খাওয়া দাওয়ার পর ঐদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাড়াতাড়ি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আরবের কোন যুবক তার কওমের কাছে এমন উত্তম কিছু নিয়ে আসেনি যা আমি তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছি। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ আনয়ন করেছি।”অন্য রিওয়াইয়াতে এরপর এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এখন তোমরা বল তো তোমাদের মধ্যে কে আমার আনুকূল্য করতে পারে এবং কে আমার সহচর হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন তোমাদেরকে তার দিকে আহ্বান করি। সুতরাং কে আমাকে এ কাজে সহায়তা করতে পারে এই শর্তে যে, সে আমার ভাই হয়ে যাবে এবং সে এরূপ এরূপ মর্যাদা লাভ করবে?” তাঁর একথা শুনে কওমের সবাই নীরব থাকে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আলী (রাঃ) বলেন, যদিও আমি তাদের মধ্যে বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট, দুঃখময় চক্ষু বিশিষ্ট, মোটা পেট বিশিষ্ট এবং ভারী পদনালী বিশিষ্ট, তথাপি আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার আনুকূল্য করতে প্রস্তুত আছি। তিনি তখন আমার স্কন্ধে হাত রেখে বললেনঃ “এটা আমার ভাই এবং তার এরূপ এরূপ মর্যাদা রয়েছে। সুতরাং তোমরা তার কথা শুনো এবং তার আনুগত্য কর।” তাঁর এ কথা শুনে কওমের লোকেরা উঠে গেল এবং হেসে উঠলো ও আবু তালিবকে বললোঃ “তুমিই তোমার ছেলের কথা শুনো ও তার আনুগত্য করতে থাকো (আমাদের দ্বারা এ কাজ হবে না।” কিন্তু এ হাদীসটির বর্ণনাকারী আবদুল গাফফার ইবনে কাসিব ইবনে আবি মারইয়াম পরিত্যাজ্য এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে শিয়াও বটে, ইবনে মাদনী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, সে হাদীস নিজে বানিয়ে নিতো। হাদীসের অন্যান্য ইমামগণও তাকে দুর্বল বলেছেন।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই দাওয়াতে শুধুমাত্র বকরীর একটি পায়ের গোশত ছিল। এতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ভাষণ দিতে শুরু করলেন তখন তারা হঠাৎ করে বলে ফেললোঃ “এরূপ যাদু তো ইতিপূর্বে আমরা কখনো দেখিনি।” তখন তিনি নীরব হয়ে যান। তাঁর ভাষণ ছিলঃ “কে আছে, যে আমার ঋণ তার দায়িত্বে গ্রহণ করবে এবং আমার আহূলের মধ্যে খলীফা হয়ে যাবে?” হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “ঐ মজলিসে হযরত আব্বাসও (রঃ) বিদ্যমান ছিলেন। শুধু মাল-ধনের কার্পণ্যের কারণে তিনিও নীরব ছিলেন।অকে নীরব থাকতে দেখে আমিও নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বারও এ ই বললেন। এবারও চতুর্দিকে নীরবতা বিরাজ করে। এবার আমি আর নীরব থাকতে পারলাম না, বরং উপরোক্ত কথা বলে ফেললাম। ঐ সময় আমি বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট এবং ছিলাম ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন, বড় পেট ও ভারী পদনালী বিশিষ্ট।" ঐ রিওয়াইয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ফরমান রয়েছেঃ “কে আমার ঋণ তার দায়িত্বে নিচ্ছে এবং আমার পর কে আমার আহলের হিফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করছে?” এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমি আমার এই দ্বীনের প্রচার চারদিকে ছড়িয়ে দিবো এবং লোকদের আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করবো। ফলে সবাই আমার শত্রুতে পরিণত হয়ে যাবে এবং আমাকে হত্যা করে ফেলার চেষ্টা করবে।” এরূপ আশংকা তিনি করতে থাকেন। অবশেষে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ তোমাকে লোকদের অনিষ্ট হতে রক্ষা করবেন।” (৫: ৬৭) এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আশংকা দূর হয়ে যায়। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তিনি নিজের জন্যে প্রহরী নিযুক্ত রাখতেন। কিন্তু এটা অবতীর্ণ হওয়ার পর প্রহরী রাখাও তিনি বন্ধ করে দেন। বাস্তবিকই ঐ সময় বানু হাশেমের সবারই মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) অপেক্ষা বড় ঈমানদার ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সত্যায়নকারী আর কেউ ছিল না। এজন্যেই তিনিই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সাহচর্য দান করার স্বীকারোক্তি করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে জনগণকে সাধারণ দাওয়াত দেন এবং তাদেরকে খাঁটি তাওহীদের দিকে আহ্বান করেন এবং নিজের নবুওয়াতের ঘোষণা দেন।আবদুল ওয়াহিদ দেমাশকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা হযরত আবূ দারদা (রাঃ) মসজিদে বসে ওয়াজ করছিলেন এবং ফতওয়া দিচ্ছিলেন। মজলিস লোকে ভরপুর ছিল। সবারই দৃষ্টি তার চেহারার উপর ছিল এবং তারা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তার ওয়াজ শুনছিল। কিন্তু তার ছেলে এবং তার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত ছিল। কেউ একজন হযরত আবু দারদা (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়ে বলেনঃ “অন্যান্য সব লোকই তো আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে, কিন্তু আপনার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত রয়েছে, ব্যাপার কি?” তিনি উত্তরে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “দুনিয়া হতে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ থাকেন নবীরা এবং তাঁদের উপর সবচেয়ে বেশী কঠিন ও ভারী হয় তাঁদের পরিবারবর্গ ও আত্মীয় স্বজন। এব্যাপারেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।” এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহর উপর নির্ভর কর। তিনিই তোমার রক্ষক ও সাহায্যকারী। তিনিই তোমার শক্তি যোগাবেন এবং তোমার কথাকে সমুন্নত করবেন। তাঁর দৃষ্টি সব সময় তোমার উপর রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি তোমার প্রতিপালকের হুকুমের উপর ধৈর্য ধারণ কর, তুমি তো আমার চোখের সামনেই রয়েছো।” (৫২: ৪৮) ভাবার্থ এটাওঃ যখন তুমি নামাযের জন্যে দণ্ডায়মান হও তখন তুমি আমার চোখের সামনে থাকো। আমি তোমার রুকু ও সিজদা দেখে থাকি। তুমি দাঁড়িয়ে থাকো বা বসে থাকো অথবা যে অবস্থাতেই থাকো না কেন আমার চোখের সামনেই থাকো। অর্থাৎ তুমি একাকী নামায পড়লেও আমি দেখতে পাই এবং জামাআতে পড়লেও তুমি আমার সামনেই থাকো। ভাবার্থ এটাও যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যেভাবে তাঁর সামনের জিনিসগুলো দেখাতেন তেমনিভাবে তার পিছনের মুক্তাদীরাও তাঁর দৃষ্টির সামনে থাকতো। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “তোমরা তোমাদের নামাযের সারি সোজা করে নেবে। জেনে রেখো যে, আমি তোমাদেরকে আমার পিছন হতে দেখতে পাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ভাবার্থ এও করেছেনঃ “তার এক নবীর পিঠ হতে অন্য নবীর পিঠের দিকে স্থানান্তরিত হওয়াকে আমি বরাবরই দেখতে রয়েছি, শেষ পর্যন্ত তিনি নবী হিসেবে দুনিয়ায় এসেছেন।” মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তিনি স্বীয় বান্দাদের কথা খুবই শুনে থাকেন এবং তাদের কাজ কারবার সম্পর্কে তিনি পূর্ণ অবহিত। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি যে অবস্থায় থাকো, তুমি যে কুরআন পাঠ কর, তুমি যে আমল কর সেসব সম্পর্কে আমি পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (১০:৬১)

আশ-শুআরা 26:219

২১৩-২২০ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ তুমি শুধু আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। আর যে এরূপ করবে না অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে সে অবশ্যই শাস্তির যোগ্য হবে। তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিবে যে, ঈমান ছাড়া অন্য কিছুই মুক্তিদাতা নয়।এরপর তিনি নির্দেশ দিচ্ছেনঃ একত্ববাদী ও তোমার অনুসারী মুমিনদের প্রতি বিনয়ী হবে। আর যে কেউই আমার আদেশ ও নিষেধ অমান্য করবে সে যে-ই হোক না কেন তার সাথে কোনই সম্পর্ক রাখবে না এবং তার প্রতি স্বীয় অসন্তোষ প্রকাশ করবে।বিশেষ লোককে এই ভয় প্রদর্শন সাধারণ লোককে ভয় প্রদর্শন করার বিপরীত নয়। কেননা, এটা তার একটা অংশ। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে যাদের পিতৃপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি, যার ফলে তারা গাফিল।” (৩৬: ৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার মূল জনপদকে এবং ওর আশে পাশের লোকদেরকে।”(৭: ৪২) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এর দ্বারা তুমি সতর্ক কর তাদেরকে যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের নিকট একত্রিত করা হবে।” (৬: ৫১) আরো এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যাতে তুমি এর দ্বারা পরহেযগারদেরকে সুসংবাদ দিতে ও উদ্ধতদেরকে সতর্ক করতে পার।”(১৯:৯৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে আমি এর দ্বারা ভয় প্রদর্শন করতে পারি তোমাদেরকে এবং তাদেরকেও যাদের কাছে এটা পৌঁছে।” (৬: ১৯)সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এই উম্মতের মধ্যে যার কানে আমার খবর পৌঁছেছে, সে ইয়াহুদী হোক অথবা খৃষ্টানই হোক, অতঃপর আমার উপর সে ঈমান আনেনি, সে অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে বহু হাদীস এসেছে। আমরা এগুলো বর্ণনা করছিঃ প্রথম হাদীস ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে (আরবি) আকস্মিক কোন বিপদের সময় আরবের লোকেরা বিপদ সংকেত হিসেবে এরূপ শব্দ উচ্চারণকরতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই প্রচলিত প্রথারই অনুসরণ করেছিলেন। বলে উচ্চ স্বরে ডাক দেন। এ শব্দ শুনে লোকেরা তাঁর নিকট একত্রিত হয়ে যায়। যারা আসতে পারেনি তারা লোক পাটিয়ে দেয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! হে বানী ফাহর! হে বানী লুওয়াই! আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে, এই পাহাড়ের পিছনে তোমাদের শত্রু- সেনাবাহিনী রয়েছে এবং তারা ওঁৎ পেতে বসে আছে। সুযোগ পেলেই তোমাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। তবে তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে কি?" সবাই এক বাক্যে উত্তর দেয়ঃ “হ্যা, আমরা আপনার কথা সত্য বলেই বিশ্বাস করবো।" তিনি তখন বলেনঃ ‘তাহলে জেনে রেখো যে, সামনের কঠিন শাস্তি হতে আমি তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শনকারী।” তাঁর একথা শুনে আবু লাহাব বলে ওঠে-“তুমি ধ্বংস হও। এটা শুনাবার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে ডেকেছিলে?” তার কথার প্রতিবাদে সূরায়ে তাব্বাত ইয়াদা’ অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী(রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) দ্বিতীয় হাদীসঃহযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন (আরবি) অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! হে আবদুল মুত্তালিবের কন্যা সুফিয়া (রাঃ)! হে বানী আবদিল মুত্তালিব! জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে আমি তোমাদের জন্যে কোন (উপকারের) অধিকার রাখবো না। হ্যাঁ, তবে আমার কাছে যে মাল আছে তা হতে তোমরা যা চাইবে তা আমি তোমাদেরকে দেয়ার জন্যে প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)তৃতীয় হাদীসঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরায়েশদেরকে আহ্বান করেন। এবং এক এক করে ও সাধারণভাবে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে কুরায়েশের দল! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা কর। হে কাবের বংশধরগণ! তোমরা নিজেদের জীবনকে আগুন হতে বাঁচাও। হে হাশেমের সন্তানগণ! তোমরা নিজেদের প্রাণকে আল্লাহর আযাব হতে রক্ষা কর। হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানরা! তোমরা আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর। হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! নিজের জীবনকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচিয়ে নাও। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্যে কোন কিছুরই মালিক হতে পারবো না। তবে অবশ্যই আমার সাথে তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে যার পার্থিব সর্বপ্রকারের হক আদায় করতে আমি সদা প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ, ইমাম মুসলিম ও ইমম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতেও শব্দের কিছু পরিবর্তনের সাথে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ভাতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ফুফু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবং স্বীয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে বলেন, তোমরা দুজন নিজেদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে বাচিয়ে নাও এবং জেনে রেখো যে, (কিয়ামতের দিন) আমি আল্লাহর সামনে তোমাদের কোন কাজে লাগবো না। অতঃপর বলেনঃ “হে বানী কুসাই! হে বানী হাশিম! এবং হে আবদে মানাফ! (মনে রেখো যে) আমি হলাম সতর্ককারী, আর মৃত্যু হচ্ছে পরিবর্তন আনয়নকারী এবং কিয়ামত হলো ওয়াদার স্থান।” চতুর্থ হাদীসঃ হযরত কুবাইসা ইবনে মাখারিক (রাঃ) এবং হযরত যুহায়ের ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাঁরা দু'জন বলেন, যখন -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন যার চূড়ার উপর একটি পাথর ছিল। সেখান থেকে তিনি ডাক দিয়ে বলতে শুরু করেনঃ “হে বানী আবদে মানাফ! আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র। আমার ও তোমাদের উপমা ঐ লোকটির মত যে শত্রু দেখলো এবং দৌড়িয়ে নিজের লোকদেরকে সতর্ক করতে আসলো যাতে তারা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। দূর থেকেই সে চীকার করতে শুরু করে দিলো যাতে প্রথম থেকেই তারা সতর্ক হয়ে যেতে পারে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)পঞ্চম হাদীসঃ হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় আহলে বায়েতকে একত্রিত করেন। তাঁরা ছিলেন সংখ্যায় ত্রিশজন। তাঁদের পানাহার শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কে এমন আছে যে আমার কর্জ তার দায়িত্বে নিয়ে নেয় এবং আমার পরে আমার অঙ্গীকারসমূহ পূরণ করে, অতঃপর জান্নাতে আমার সাথী হতে পারে ও আমার আঙ্গুলের মধ্যে আমার খলীফা হতে পারে?” একটি লোক উত্তরে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো সমুদ্র (সদৃশ), সুতরাং কে আপনার সাথে দাড়াতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার তার উক্তির পুনরাবৃত্তি করেন, কিন্তু কেউই ওর জন্যে প্রস্তুত হলো না। তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এজন্যে আমিই প্রস্তুত আছি। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) এক সনদে এর চেয়েও বেশী বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু আবদিল মুত্তালিবের একটি বড় দলকে একত্রিত করেন যারা বড়ই পেটুক ছিল। তাদের এক একজন একটি বকরীর বাচ্চা ও একটি বড় পিয়ালাপূর্ণ দুধ পান করে ফেলতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের জন্যে শুধু তিন পোয়া পরিমাণ খাদ্য রান্না করিয়ে নেন। কিন্তু তাতে এতো বরকত দেয়া হয় যে, সবাই পেট পুরে পানাহার করে, অথচ না খাদ্য কিছু হ্রাস পায় এবং না পানীয় কিছু কমে যায়। এরপর নবী (সঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! আমি তোমাদের নিকট বিশিষ্টভাবে এবং সমস্ত মানুষের নিকট সাধারণভাবে নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি। এই সময় তোমরা আমার একটি মুজিয়াও দেখলে। এখন তোমাদের মধ্যে কে আছে যে, সে আমার হাতে আমার ভাই ও সাথী হওয়ার দীক্ষা গ্রহণ করে?” কিন্তু মজলিসের একটি লোকও দাঁড়ালো না। (হযরত আলী রাঃ বলেনঃ) আমি তখন দাঁড়িয়ে গেলাম আর মজলিসের মধ্যে আমি ছিলাম সবচেয়ে ছোট। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি বসে পড়।” তিনি তিনবার তাদেরকে ঐ কথা বলেন কিন্তু তিনবারই আমি ছাড়া আর কেউই দাঁড়ায়নি। তৃতীয়বারে তিনি আমার বায়আত গ্রহণ করেন।”ইমাম বায়হাকী (রঃ) দালাইলুন নবুওয়াত’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি আমার কওমের সামনে আমি এখনই এটা পেশ করি তবে তারা মানবে না এবং তারা এমন উত্তর দেবে যা আমার কাছে কঠিন ঠেকবে।” তাই তিনি নীরব হয়ে যান। ইতিমধ্যে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়েন এবং বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনাকে যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা পালনে যদি আপনি বিলম্ব করেন তবে আপনার প্রতিপালক আপনাকে শাস্তি প্রদান করবেন।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে আলী (রাঃ)! আমার প্রতিপালক আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন আমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করি। আমি মনে করলাম যে, আমি যদি তাড়াতাড়ি এ কাজে লেগে পড়ি তবে আমার কওম আমাকে মানবে না এবং আমাকে এমন উত্তর দেবে যাতে আমি মনে ব্যথা পাবো। তাই আমি নীরবতা অবলম্বন করি। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার কাছে এসে বলেনঃ “আপনি যদি আপনার প্রতিপালকের আদেশ পালনে বিলম্ব করেন তবে তিনি আপনাকে শাস্তি দিবেন।” সুতরাং হে আলী (রাঃ)! তুমি একটি বকরী যবাহ কর, তিন সের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত কর এবং এক বাটি দুধও সগ্রহ কর। অতঃপর বানী আবদিল মুত্তালিবকে একত্রিত কর। হযরত আলী (রাঃ) তাই করলেন এবং সবাইকে দাওয়াত দিলেন। তারা সংখ্যায় দু’এক কমবেশী চল্লিশ জন ছিল। তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচারাও ছিলেন। তাঁরা হলেন আবু তালিব, হযরত হামযা (রাঃ) এবং হযরত আব্বাস (রাঃ)। তার কাফির ও খবীস চাচা আবু লাহাবও ছিল। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তরকারী পেশ করলে তিনি তা হতে এক টুকরা নিয়ে কিছু খেলেন। অতঃপর তা হাঁড়িতে রেখে দিলেন। এরপর তিনি সকলকে বললেনঃ “তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে খেতে শুরু কর।” সবাই খেতে লাগলো এবং পেট পুরে খেলো। হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! হাঁড়িতে যা ছিল তাই থেকে গেল। গোশতে শুধু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অঙ্গুলীর দাগ ছিল, কিন্তু গোশত এতটুকু কমেনি। অথচ তাদের এক একজনই হাঁড়িতে রাখা সব গোশত খেয়ে নিতে পারতো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! তাদেরকে এখন দুধ পান করিয়ে দাও।” আমি তখন দুধের ঐ বাটিটি আনলাম এবং তাদেরকে পান করতে বললাম। তারা পালাক্রমে পান করে পরিতৃপ্ত হয়ে গেল। কিন্তু দুধ মোটেই কমলো না। অথচ তাদের এক একজনই ঐ বাটির সম্পূর্ণ দুধ পান করে নিতে পারতো। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কিছু বলতে চাচ্ছিলেন কিন্তু আবু লাহাব মজলিস হতে উঠে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “তোমাদের এ লোকটির এ সবকিছুই যাদু।” তার দেখাদেখি সবাই মজলিস হতে উঠে গেল এবং নিজ নিজ পথ ধরলো। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে উপদেশ দেয়ার সুযোগ পেলেন না।”পরের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় হযরত আলী (রাঃ)-কে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! অনুরূপভাবে আজকেও আবার তাদেরকে দাওয়াত কর। কেননা, গতকাল তারা আমাকে কথা বলার কোন সুযোগই দেয়নি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেন, সুতরাং আমি পুনরায় ঐ প্রকারের ব্যবস্থা করলাম। সবকে দাওয়াত দিয়ে আসলাম। ঐদিনও আবু লাহাব দাঁড়িয়ে গিয়ে পূর্বের ন্যায়ই কথা বললো এবং ঐভাবে মজলিসের লোক ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তৃতীয় দিন আবার আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে সবকিছুরই ব্যবস্থা করলাম। খাওয়া দাওয়ার পর ঐদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাড়াতাড়ি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আরবের কোন যুবক তার কওমের কাছে এমন উত্তম কিছু নিয়ে আসেনি যা আমি তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছি। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ আনয়ন করেছি।”অন্য রিওয়াইয়াতে এরপর এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এখন তোমরা বল তো তোমাদের মধ্যে কে আমার আনুকূল্য করতে পারে এবং কে আমার সহচর হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন তোমাদেরকে তার দিকে আহ্বান করি। সুতরাং কে আমাকে এ কাজে সহায়তা করতে পারে এই শর্তে যে, সে আমার ভাই হয়ে যাবে এবং সে এরূপ এরূপ মর্যাদা লাভ করবে?” তাঁর একথা শুনে কওমের সবাই নীরব থাকে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আলী (রাঃ) বলেন, যদিও আমি তাদের মধ্যে বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট, দুঃখময় চক্ষু বিশিষ্ট, মোটা পেট বিশিষ্ট এবং ভারী পদনালী বিশিষ্ট, তথাপি আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার আনুকূল্য করতে প্রস্তুত আছি। তিনি তখন আমার স্কন্ধে হাত রেখে বললেনঃ “এটা আমার ভাই এবং তার এরূপ এরূপ মর্যাদা রয়েছে। সুতরাং তোমরা তার কথা শুনো এবং তার আনুগত্য কর।” তাঁর এ কথা শুনে কওমের লোকেরা উঠে গেল এবং হেসে উঠলো ও আবু তালিবকে বললোঃ “তুমিই তোমার ছেলের কথা শুনো ও তার আনুগত্য করতে থাকো (আমাদের দ্বারা এ কাজ হবে না।” কিন্তু এ হাদীসটির বর্ণনাকারী আবদুল গাফফার ইবনে কাসিব ইবনে আবি মারইয়াম পরিত্যাজ্য এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে শিয়াও বটে, ইবনে মাদনী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, সে হাদীস নিজে বানিয়ে নিতো। হাদীসের অন্যান্য ইমামগণও তাকে দুর্বল বলেছেন।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই দাওয়াতে শুধুমাত্র বকরীর একটি পায়ের গোশত ছিল। এতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ভাষণ দিতে শুরু করলেন তখন তারা হঠাৎ করে বলে ফেললোঃ “এরূপ যাদু তো ইতিপূর্বে আমরা কখনো দেখিনি।” তখন তিনি নীরব হয়ে যান। তাঁর ভাষণ ছিলঃ “কে আছে, যে আমার ঋণ তার দায়িত্বে গ্রহণ করবে এবং আমার আহূলের মধ্যে খলীফা হয়ে যাবে?” হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “ঐ মজলিসে হযরত আব্বাসও (রঃ) বিদ্যমান ছিলেন। শুধু মাল-ধনের কার্পণ্যের কারণে তিনিও নীরব ছিলেন।অকে নীরব থাকতে দেখে আমিও নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বারও এ ই বললেন। এবারও চতুর্দিকে নীরবতা বিরাজ করে। এবার আমি আর নীরব থাকতে পারলাম না, বরং উপরোক্ত কথা বলে ফেললাম। ঐ সময় আমি বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট এবং ছিলাম ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন, বড় পেট ও ভারী পদনালী বিশিষ্ট।" ঐ রিওয়াইয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ফরমান রয়েছেঃ “কে আমার ঋণ তার দায়িত্বে নিচ্ছে এবং আমার পর কে আমার আহলের হিফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করছে?” এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমি আমার এই দ্বীনের প্রচার চারদিকে ছড়িয়ে দিবো এবং লোকদের আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করবো। ফলে সবাই আমার শত্রুতে পরিণত হয়ে যাবে এবং আমাকে হত্যা করে ফেলার চেষ্টা করবে।” এরূপ আশংকা তিনি করতে থাকেন। অবশেষে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ তোমাকে লোকদের অনিষ্ট হতে রক্ষা করবেন।” (৫: ৬৭) এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আশংকা দূর হয়ে যায়। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তিনি নিজের জন্যে প্রহরী নিযুক্ত রাখতেন। কিন্তু এটা অবতীর্ণ হওয়ার পর প্রহরী রাখাও তিনি বন্ধ করে দেন। বাস্তবিকই ঐ সময় বানু হাশেমের সবারই মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) অপেক্ষা বড় ঈমানদার ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সত্যায়নকারী আর কেউ ছিল না। এজন্যেই তিনিই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সাহচর্য দান করার স্বীকারোক্তি করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে জনগণকে সাধারণ দাওয়াত দেন এবং তাদেরকে খাঁটি তাওহীদের দিকে আহ্বান করেন এবং নিজের নবুওয়াতের ঘোষণা দেন।আবদুল ওয়াহিদ দেমাশকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা হযরত আবূ দারদা (রাঃ) মসজিদে বসে ওয়াজ করছিলেন এবং ফতওয়া দিচ্ছিলেন। মজলিস লোকে ভরপুর ছিল। সবারই দৃষ্টি তার চেহারার উপর ছিল এবং তারা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তার ওয়াজ শুনছিল। কিন্তু তার ছেলে এবং তার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত ছিল। কেউ একজন হযরত আবু দারদা (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়ে বলেনঃ “অন্যান্য সব লোকই তো আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে, কিন্তু আপনার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত রয়েছে, ব্যাপার কি?” তিনি উত্তরে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “দুনিয়া হতে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ থাকেন নবীরা এবং তাঁদের উপর সবচেয়ে বেশী কঠিন ও ভারী হয় তাঁদের পরিবারবর্গ ও আত্মীয় স্বজন। এব্যাপারেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।” এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহর উপর নির্ভর কর। তিনিই তোমার রক্ষক ও সাহায্যকারী। তিনিই তোমার শক্তি যোগাবেন এবং তোমার কথাকে সমুন্নত করবেন। তাঁর দৃষ্টি সব সময় তোমার উপর রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি তোমার প্রতিপালকের হুকুমের উপর ধৈর্য ধারণ কর, তুমি তো আমার চোখের সামনেই রয়েছো।” (৫২: ৪৮) ভাবার্থ এটাওঃ যখন তুমি নামাযের জন্যে দণ্ডায়মান হও তখন তুমি আমার চোখের সামনে থাকো। আমি তোমার রুকু ও সিজদা দেখে থাকি। তুমি দাঁড়িয়ে থাকো বা বসে থাকো অথবা যে অবস্থাতেই থাকো না কেন আমার চোখের সামনেই থাকো। অর্থাৎ তুমি একাকী নামায পড়লেও আমি দেখতে পাই এবং জামাআতে পড়লেও তুমি আমার সামনেই থাকো। ভাবার্থ এটাও যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যেভাবে তাঁর সামনের জিনিসগুলো দেখাতেন তেমনিভাবে তার পিছনের মুক্তাদীরাও তাঁর দৃষ্টির সামনে থাকতো। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “তোমরা তোমাদের নামাযের সারি সোজা করে নেবে। জেনে রেখো যে, আমি তোমাদেরকে আমার পিছন হতে দেখতে পাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ভাবার্থ এও করেছেনঃ “তার এক নবীর পিঠ হতে অন্য নবীর পিঠের দিকে স্থানান্তরিত হওয়াকে আমি বরাবরই দেখতে রয়েছি, শেষ পর্যন্ত তিনি নবী হিসেবে দুনিয়ায় এসেছেন।” মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তিনি স্বীয় বান্দাদের কথা খুবই শুনে থাকেন এবং তাদের কাজ কারবার সম্পর্কে তিনি পূর্ণ অবহিত। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি যে অবস্থায় থাকো, তুমি যে কুরআন পাঠ কর, তুমি যে আমল কর সেসব সম্পর্কে আমি পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (১০:৬১)

আশ-শুআরা 26:220

২১৩-২২০ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ তুমি শুধু আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। আর যে এরূপ করবে না অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে সে অবশ্যই শাস্তির যোগ্য হবে। তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিবে যে, ঈমান ছাড়া অন্য কিছুই মুক্তিদাতা নয়।এরপর তিনি নির্দেশ দিচ্ছেনঃ একত্ববাদী ও তোমার অনুসারী মুমিনদের প্রতি বিনয়ী হবে। আর যে কেউই আমার আদেশ ও নিষেধ অমান্য করবে সে যে-ই হোক না কেন তার সাথে কোনই সম্পর্ক রাখবে না এবং তার প্রতি স্বীয় অসন্তোষ প্রকাশ করবে।বিশেষ লোককে এই ভয় প্রদর্শন সাধারণ লোককে ভয় প্রদর্শন করার বিপরীত নয়। কেননা, এটা তার একটা অংশ। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে যাদের পিতৃপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি, যার ফলে তারা গাফিল।” (৩৬: ৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যাতে তুমি সতর্ক করতে পার মূল জনপদকে এবং ওর আশে পাশের লোকদেরকে।”(৭: ৪২) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এর দ্বারা তুমি সতর্ক কর তাদেরকে যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের নিকট একত্রিত করা হবে।” (৬: ৫১) আরো এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যাতে তুমি এর দ্বারা পরহেযগারদেরকে সুসংবাদ দিতে ও উদ্ধতদেরকে সতর্ক করতে পার।”(১৯:৯৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাতে আমি এর দ্বারা ভয় প্রদর্শন করতে পারি তোমাদেরকে এবং তাদেরকেও যাদের কাছে এটা পৌঁছে।” (৬: ১৯)সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এই উম্মতের মধ্যে যার কানে আমার খবর পৌঁছেছে, সে ইয়াহুদী হোক অথবা খৃষ্টানই হোক, অতঃপর আমার উপর সে ঈমান আনেনি, সে অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে বহু হাদীস এসেছে। আমরা এগুলো বর্ণনা করছিঃ প্রথম হাদীস ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে (আরবি) আকস্মিক কোন বিপদের সময় আরবের লোকেরা বিপদ সংকেত হিসেবে এরূপ শব্দ উচ্চারণকরতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই প্রচলিত প্রথারই অনুসরণ করেছিলেন। বলে উচ্চ স্বরে ডাক দেন। এ শব্দ শুনে লোকেরা তাঁর নিকট একত্রিত হয়ে যায়। যারা আসতে পারেনি তারা লোক পাটিয়ে দেয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! হে বানী ফাহর! হে বানী লুওয়াই! আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে, এই পাহাড়ের পিছনে তোমাদের শত্রু- সেনাবাহিনী রয়েছে এবং তারা ওঁৎ পেতে বসে আছে। সুযোগ পেলেই তোমাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। তবে তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে কি?" সবাই এক বাক্যে উত্তর দেয়ঃ “হ্যা, আমরা আপনার কথা সত্য বলেই বিশ্বাস করবো।" তিনি তখন বলেনঃ ‘তাহলে জেনে রেখো যে, সামনের কঠিন শাস্তি হতে আমি তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শনকারী।” তাঁর একথা শুনে আবু লাহাব বলে ওঠে-“তুমি ধ্বংস হও। এটা শুনাবার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে ডেকেছিলে?” তার কথার প্রতিবাদে সূরায়ে তাব্বাত ইয়াদা’ অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী(রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) দ্বিতীয় হাদীসঃহযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন (আরবি) অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! হে আবদুল মুত্তালিবের কন্যা সুফিয়া (রাঃ)! হে বানী আবদিল মুত্তালিব! জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে আমি তোমাদের জন্যে কোন (উপকারের) অধিকার রাখবো না। হ্যাঁ, তবে আমার কাছে যে মাল আছে তা হতে তোমরা যা চাইবে তা আমি তোমাদেরকে দেয়ার জন্যে প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)তৃতীয় হাদীসঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরায়েশদেরকে আহ্বান করেন। এবং এক এক করে ও সাধারণভাবে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে কুরায়েশের দল! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা কর। হে কাবের বংশধরগণ! তোমরা নিজেদের জীবনকে আগুন হতে বাঁচাও। হে হাশেমের সন্তানগণ! তোমরা নিজেদের প্রাণকে আল্লাহর আযাব হতে রক্ষা কর। হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানরা! তোমরা আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর। হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)! নিজের জীবনকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচিয়ে নাও। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্যে কোন কিছুরই মালিক হতে পারবো না। তবে অবশ্যই আমার সাথে তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে যার পার্থিব সর্বপ্রকারের হক আদায় করতে আমি সদা প্রস্তুত আছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ, ইমাম মুসলিম ও ইমম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারীতেও শব্দের কিছু পরিবর্তনের সাথে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ভাতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ফুফু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এবং স্বীয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে বলেন, তোমরা দুজন নিজেদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে বাচিয়ে নাও এবং জেনে রেখো যে, (কিয়ামতের দিন) আমি আল্লাহর সামনে তোমাদের কোন কাজে লাগবো না। অতঃপর বলেনঃ “হে বানী কুসাই! হে বানী হাশিম! এবং হে আবদে মানাফ! (মনে রেখো যে) আমি হলাম সতর্ককারী, আর মৃত্যু হচ্ছে পরিবর্তন আনয়নকারী এবং কিয়ামত হলো ওয়াদার স্থান।” চতুর্থ হাদীসঃ হযরত কুবাইসা ইবনে মাখারিক (রাঃ) এবং হযরত যুহায়ের ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাঁরা দু'জন বলেন, যখন -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন যার চূড়ার উপর একটি পাথর ছিল। সেখান থেকে তিনি ডাক দিয়ে বলতে শুরু করেনঃ “হে বানী আবদে মানাফ! আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র। আমার ও তোমাদের উপমা ঐ লোকটির মত যে শত্রু দেখলো এবং দৌড়িয়ে নিজের লোকদেরকে সতর্ক করতে আসলো যাতে তারা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। দূর থেকেই সে চীকার করতে শুরু করে দিলো যাতে প্রথম থেকেই তারা সতর্ক হয়ে যেতে পারে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)পঞ্চম হাদীসঃ হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় আহলে বায়েতকে একত্রিত করেন। তাঁরা ছিলেন সংখ্যায় ত্রিশজন। তাঁদের পানাহার শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কে এমন আছে যে আমার কর্জ তার দায়িত্বে নিয়ে নেয় এবং আমার পরে আমার অঙ্গীকারসমূহ পূরণ করে, অতঃপর জান্নাতে আমার সাথী হতে পারে ও আমার আঙ্গুলের মধ্যে আমার খলীফা হতে পারে?” একটি লোক উত্তরে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো সমুদ্র (সদৃশ), সুতরাং কে আপনার সাথে দাড়াতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার তার উক্তির পুনরাবৃত্তি করেন, কিন্তু কেউই ওর জন্যে প্রস্তুত হলো না। তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এজন্যে আমিই প্রস্তুত আছি। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) এক সনদে এর চেয়েও বেশী বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু আবদিল মুত্তালিবের একটি বড় দলকে একত্রিত করেন যারা বড়ই পেটুক ছিল। তাদের এক একজন একটি বকরীর বাচ্চা ও একটি বড় পিয়ালাপূর্ণ দুধ পান করে ফেলতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের জন্যে শুধু তিন পোয়া পরিমাণ খাদ্য রান্না করিয়ে নেন। কিন্তু তাতে এতো বরকত দেয়া হয় যে, সবাই পেট পুরে পানাহার করে, অথচ না খাদ্য কিছু হ্রাস পায় এবং না পানীয় কিছু কমে যায়। এরপর নবী (সঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে বানী আবদিল মুত্তালিব! আমি তোমাদের নিকট বিশিষ্টভাবে এবং সমস্ত মানুষের নিকট সাধারণভাবে নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি। এই সময় তোমরা আমার একটি মুজিয়াও দেখলে। এখন তোমাদের মধ্যে কে আছে যে, সে আমার হাতে আমার ভাই ও সাথী হওয়ার দীক্ষা গ্রহণ করে?” কিন্তু মজলিসের একটি লোকও দাঁড়ালো না। (হযরত আলী রাঃ বলেনঃ) আমি তখন দাঁড়িয়ে গেলাম আর মজলিসের মধ্যে আমি ছিলাম সবচেয়ে ছোট। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি বসে পড়।” তিনি তিনবার তাদেরকে ঐ কথা বলেন কিন্তু তিনবারই আমি ছাড়া আর কেউই দাঁড়ায়নি। তৃতীয়বারে তিনি আমার বায়আত গ্রহণ করেন।”ইমাম বায়হাকী (রঃ) দালাইলুন নবুওয়াত’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি আমার কওমের সামনে আমি এখনই এটা পেশ করি তবে তারা মানবে না এবং তারা এমন উত্তর দেবে যা আমার কাছে কঠিন ঠেকবে।” তাই তিনি নীরব হয়ে যান। ইতিমধ্যে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়েন এবং বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনাকে যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা পালনে যদি আপনি বিলম্ব করেন তবে আপনার প্রতিপালক আপনাকে শাস্তি প্রদান করবেন।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে আলী (রাঃ)! আমার প্রতিপালক আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন আমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করি। আমি মনে করলাম যে, আমি যদি তাড়াতাড়ি এ কাজে লেগে পড়ি তবে আমার কওম আমাকে মানবে না এবং আমাকে এমন উত্তর দেবে যাতে আমি মনে ব্যথা পাবো। তাই আমি নীরবতা অবলম্বন করি। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার কাছে এসে বলেনঃ “আপনি যদি আপনার প্রতিপালকের আদেশ পালনে বিলম্ব করেন তবে তিনি আপনাকে শাস্তি দিবেন।” সুতরাং হে আলী (রাঃ)! তুমি একটি বকরী যবাহ কর, তিন সের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত কর এবং এক বাটি দুধও সগ্রহ কর। অতঃপর বানী আবদিল মুত্তালিবকে একত্রিত কর। হযরত আলী (রাঃ) তাই করলেন এবং সবাইকে দাওয়াত দিলেন। তারা সংখ্যায় দু’এক কমবেশী চল্লিশ জন ছিল। তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচারাও ছিলেন। তাঁরা হলেন আবু তালিব, হযরত হামযা (রাঃ) এবং হযরত আব্বাস (রাঃ)। তার কাফির ও খবীস চাচা আবু লাহাবও ছিল। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তরকারী পেশ করলে তিনি তা হতে এক টুকরা নিয়ে কিছু খেলেন। অতঃপর তা হাঁড়িতে রেখে দিলেন। এরপর তিনি সকলকে বললেনঃ “তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে খেতে শুরু কর।” সবাই খেতে লাগলো এবং পেট পুরে খেলো। হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! হাঁড়িতে যা ছিল তাই থেকে গেল। গোশতে শুধু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অঙ্গুলীর দাগ ছিল, কিন্তু গোশত এতটুকু কমেনি। অথচ তাদের এক একজনই হাঁড়িতে রাখা সব গোশত খেয়ে নিতে পারতো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! তাদেরকে এখন দুধ পান করিয়ে দাও।” আমি তখন দুধের ঐ বাটিটি আনলাম এবং তাদেরকে পান করতে বললাম। তারা পালাক্রমে পান করে পরিতৃপ্ত হয়ে গেল। কিন্তু দুধ মোটেই কমলো না। অথচ তাদের এক একজনই ঐ বাটির সম্পূর্ণ দুধ পান করে নিতে পারতো। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কিছু বলতে চাচ্ছিলেন কিন্তু আবু লাহাব মজলিস হতে উঠে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “তোমাদের এ লোকটির এ সবকিছুই যাদু।” তার দেখাদেখি সবাই মজলিস হতে উঠে গেল এবং নিজ নিজ পথ ধরলো। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে উপদেশ দেয়ার সুযোগ পেলেন না।”পরের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় হযরত আলী (রাঃ)-কে বললেনঃ “হে আলী (রাঃ)! অনুরূপভাবে আজকেও আবার তাদেরকে দাওয়াত কর। কেননা, গতকাল তারা আমাকে কথা বলার কোন সুযোগই দেয়নি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেন, সুতরাং আমি পুনরায় ঐ প্রকারের ব্যবস্থা করলাম। সবকে দাওয়াত দিয়ে আসলাম। ঐদিনও আবু লাহাব দাঁড়িয়ে গিয়ে পূর্বের ন্যায়ই কথা বললো এবং ঐভাবে মজলিসের লোক ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তৃতীয় দিন আবার আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে সবকিছুরই ব্যবস্থা করলাম। খাওয়া দাওয়ার পর ঐদিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাড়াতাড়ি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আরবের কোন যুবক তার কওমের কাছে এমন উত্তম কিছু নিয়ে আসেনি যা আমি তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছি। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ আনয়ন করেছি।”অন্য রিওয়াইয়াতে এরপর এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এখন তোমরা বল তো তোমাদের মধ্যে কে আমার আনুকূল্য করতে পারে এবং কে আমার সহচর হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন তোমাদেরকে তার দিকে আহ্বান করি। সুতরাং কে আমাকে এ কাজে সহায়তা করতে পারে এই শর্তে যে, সে আমার ভাই হয়ে যাবে এবং সে এরূপ এরূপ মর্যাদা লাভ করবে?” তাঁর একথা শুনে কওমের সবাই নীরব থাকে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আলী (রাঃ) বলেন, যদিও আমি তাদের মধ্যে বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট, দুঃখময় চক্ষু বিশিষ্ট, মোটা পেট বিশিষ্ট এবং ভারী পদনালী বিশিষ্ট, তথাপি আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার আনুকূল্য করতে প্রস্তুত আছি। তিনি তখন আমার স্কন্ধে হাত রেখে বললেনঃ “এটা আমার ভাই এবং তার এরূপ এরূপ মর্যাদা রয়েছে। সুতরাং তোমরা তার কথা শুনো এবং তার আনুগত্য কর।” তাঁর এ কথা শুনে কওমের লোকেরা উঠে গেল এবং হেসে উঠলো ও আবু তালিবকে বললোঃ “তুমিই তোমার ছেলের কথা শুনো ও তার আনুগত্য করতে থাকো (আমাদের দ্বারা এ কাজ হবে না।” কিন্তু এ হাদীসটির বর্ণনাকারী আবদুল গাফফার ইবনে কাসিব ইবনে আবি মারইয়াম পরিত্যাজ্য এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে শিয়াও বটে, ইবনে মাদনী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, সে হাদীস নিজে বানিয়ে নিতো। হাদীসের অন্যান্য ইমামগণও তাকে দুর্বল বলেছেন।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই দাওয়াতে শুধুমাত্র বকরীর একটি পায়ের গোশত ছিল। এতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ভাষণ দিতে শুরু করলেন তখন তারা হঠাৎ করে বলে ফেললোঃ “এরূপ যাদু তো ইতিপূর্বে আমরা কখনো দেখিনি।” তখন তিনি নীরব হয়ে যান। তাঁর ভাষণ ছিলঃ “কে আছে, যে আমার ঋণ তার দায়িত্বে গ্রহণ করবে এবং আমার আহূলের মধ্যে খলীফা হয়ে যাবে?” হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “ঐ মজলিসে হযরত আব্বাসও (রঃ) বিদ্যমান ছিলেন। শুধু মাল-ধনের কার্পণ্যের কারণে তিনিও নীরব ছিলেন।অকে নীরব থাকতে দেখে আমিও নীরব থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বারও এ ই বললেন। এবারও চতুর্দিকে নীরবতা বিরাজ করে। এবার আমি আর নীরব থাকতে পারলাম না, বরং উপরোক্ত কথা বলে ফেললাম। ঐ সময় আমি বয়সে ছিলাম সবচেয়ে ছোট এবং ছিলাম ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন, বড় পেট ও ভারী পদনালী বিশিষ্ট।" ঐ রিওয়াইয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ফরমান রয়েছেঃ “কে আমার ঋণ তার দায়িত্বে নিচ্ছে এবং আমার পর কে আমার আহলের হিফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করছে?” এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমি আমার এই দ্বীনের প্রচার চারদিকে ছড়িয়ে দিবো এবং লোকদের আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করবো। ফলে সবাই আমার শত্রুতে পরিণত হয়ে যাবে এবং আমাকে হত্যা করে ফেলার চেষ্টা করবে।” এরূপ আশংকা তিনি করতে থাকেন। অবশেষে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ তোমাকে লোকদের অনিষ্ট হতে রক্ষা করবেন।” (৫: ৬৭) এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আশংকা দূর হয়ে যায়। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তিনি নিজের জন্যে প্রহরী নিযুক্ত রাখতেন। কিন্তু এটা অবতীর্ণ হওয়ার পর প্রহরী রাখাও তিনি বন্ধ করে দেন। বাস্তবিকই ঐ সময় বানু হাশেমের সবারই মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) অপেক্ষা বড় ঈমানদার ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সত্যায়নকারী আর কেউ ছিল না। এজন্যেই তিনিই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সাহচর্য দান করার স্বীকারোক্তি করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফা পর্বতের উপর উঠে জনগণকে সাধারণ দাওয়াত দেন এবং তাদেরকে খাঁটি তাওহীদের দিকে আহ্বান করেন এবং নিজের নবুওয়াতের ঘোষণা দেন।আবদুল ওয়াহিদ দেমাশকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একদা হযরত আবূ দারদা (রাঃ) মসজিদে বসে ওয়াজ করছিলেন এবং ফতওয়া দিচ্ছিলেন। মজলিস লোকে ভরপুর ছিল। সবারই দৃষ্টি তার চেহারার উপর ছিল এবং তারা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তার ওয়াজ শুনছিল। কিন্তু তার ছেলে এবং তার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত ছিল। কেউ একজন হযরত আবু দারদা (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়ে বলেনঃ “অন্যান্য সব লোকই তো আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে, কিন্তু আপনার বাড়ীর লোকেরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নিজেদের কথায় লিপ্ত রয়েছে, ব্যাপার কি?” তিনি উত্তরে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “দুনিয়া হতে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ থাকেন নবীরা এবং তাঁদের উপর সবচেয়ে বেশী কঠিন ও ভারী হয় তাঁদের পরিবারবর্গ ও আত্মীয় স্বজন। এব্যাপারেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।” এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহর উপর নির্ভর কর। তিনিই তোমার রক্ষক ও সাহায্যকারী। তিনিই তোমার শক্তি যোগাবেন এবং তোমার কথাকে সমুন্নত করবেন। তাঁর দৃষ্টি সব সময় তোমার উপর রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি তোমার প্রতিপালকের হুকুমের উপর ধৈর্য ধারণ কর, তুমি তো আমার চোখের সামনেই রয়েছো।” (৫২: ৪৮) ভাবার্থ এটাওঃ যখন তুমি নামাযের জন্যে দণ্ডায়মান হও তখন তুমি আমার চোখের সামনে থাকো। আমি তোমার রুকু ও সিজদা দেখে থাকি। তুমি দাঁড়িয়ে থাকো বা বসে থাকো অথবা যে অবস্থাতেই থাকো না কেন আমার চোখের সামনেই থাকো। অর্থাৎ তুমি একাকী নামায পড়লেও আমি দেখতে পাই এবং জামাআতে পড়লেও তুমি আমার সামনেই থাকো। ভাবার্থ এটাও যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যেভাবে তাঁর সামনের জিনিসগুলো দেখাতেন তেমনিভাবে তার পিছনের মুক্তাদীরাও তাঁর দৃষ্টির সামনে থাকতো। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “তোমরা তোমাদের নামাযের সারি সোজা করে নেবে। জেনে রেখো যে, আমি তোমাদেরকে আমার পিছন হতে দেখতে পাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ভাবার্থ এও করেছেনঃ “তার এক নবীর পিঠ হতে অন্য নবীর পিঠের দিকে স্থানান্তরিত হওয়াকে আমি বরাবরই দেখতে রয়েছি, শেষ পর্যন্ত তিনি নবী হিসেবে দুনিয়ায় এসেছেন।” মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তিনি স্বীয় বান্দাদের কথা খুবই শুনে থাকেন এবং তাদের কাজ কারবার সম্পর্কে তিনি পূর্ণ অবহিত। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি যে অবস্থায় থাকো, তুমি যে কুরআন পাঠ কর, তুমি যে আমল কর সেসব সম্পর্কে আমি পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (১০:৬১)

আশ-শুআরা 26:221

২২১-২২৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, মুশরিকরা বলতো: রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কুরআন নিয়ে আগমন করেছেন তা সত্য নয়। তিনি এটা স্বয়ং রচনা করেছেন। অথবা তার কাছে জ্বিনদের নেতা এসে থাকে যে তাঁকে শিখিয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে এই আপত্তিকর কথা হতে পবিত্র করছেন এবং প্রমাণ করছেন যে, তিনি যে কুরআন আনয়ন করেছেন তা আল্লাহর কালাম এবং তাঁর নিকট হতেই এটা অবতারিত। সম্মানিত, বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আঃ) এটা আনয়ন করেছেন। এটা কোন শয়তান বা জ্বিন আনয়ন করেনি। শয়তানরা তো কুরআনের শিক্ষা হতে সম্পূর্ণ বিমুখ। তাদের শিক্ষা তো কুরআন কারীমের শিক্ষার একেবারে বিপরীত। সুতরাং কি করে তারা কুরআনের ন্যায় পবিত্র ও সুপথ প্রদর্শনকারী কালাম আনয়ন করতঃ মানুষকে সুপথ প্রদর্শন করতে পারে? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। কেননা, তারা নিজেরাও চরম মিথ্যাবাদী ও পাপী। তারা চুরি করে আকাশে যে এক আধটি কথা শুনে নেয়, ওর সাথে বহু কিছু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ যাদুকররা তখন ওর সাথে নিজেদের পক্ষ হতে আরো বহু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে লোকদের মধ্যে প্রচার করে। এখন শয়তান লুকিয়ে যে সত্য কথাটি আকাশে শুনেছিল ওটা সত্যরূপেই প্রকাশিত হয়, কিন্তু লোকেরা ঐ একটি সত্য কথার উপর ভিত্তি করে যাদুকরের আরো শত শত মিথ্যা কথাকেও সত্য বলে বিশ্বাস করে থাকে। এভাবে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একদা জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যাদুকর ও ভবিষ্যদ্বক্তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “তারা কিছুই নয়।” জনগণ বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা এমনও কথা বলে যা সত্য হয়ে থাকে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, এটা ঐ কথা যা জ্বিনেরা-চুরি করে আকাশ হতে শুনে আসে এবং তা ঐ ভবিষ্যদ্বক্তার কানে পৌঁছিয়ে থাকে। অতঃপর ঐ ভবিষ্যদ্বক্তা নিজের পক্ষ হতে শতটি মিথ্যা কথা ওর সাথে মিলিয়ে বলে দেয়।” হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা আকাশে কোন কাজের ফায়সালা করেন তখন ফেরেশতারা আদবের সাথে নিজেদের পালক ঝুঁকিয়ে দেন। কোন কংকরময় ভূমিতে জিঞ্জীর বাজানো হলে যেরূপ শব্দ হয় ঐরূপ শব্দ ঐ সময় আসতে থাকে। যখন ঐ বিহ্বলতা বিদূরিত হয় তখন ফেরেশতারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন (কি হুকুম করেছেন)?” উত্তরে বলা হয়ঃ “তিনি সত্য বলেছেন (সঠিক হুকুম করেছেন)। তিনি সমুন্নত ও মহান।” কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার ঐ হুকুম চুরি করে শ্রবণকারী কোন জ্বিনের কানে পৌঁছে যায় যারা এভাবে একের উপর এক হয়ে ঐ পর্যন্ত পৌঁছে থাকে। হাদীস বর্ণনাকারী হযরত সুফিয়ান (রঃ) স্বীয় হাতের অঙ্গুলীগুলো বিছিয়ে দিয়ে ওর উপর অপর হাত ঐভাবেই রেখে ওগুলোকে মিলিত করে বলেনঃ “এইভাবে।” এখন উপরের জন নীচের জনকে, সে তার নীচের জনকে ঐ কথা বলে দেয়। শেষ পর্যন্ত সর্ব নীচের জন ঐ কথা ভবিষ্যদ্বক্তা বা যাদুকরের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। কখনো কখনো এমনও হয় যে, ঐ কথা পৌঁছাবার পূর্বেই অগ্নিশিখা পৌঁছে যায়, সুতরাং শয়তান ঐ কথা পৌঁছাতে পারে না। আবার কখনো কখনো অগ্নিশিখা পৌঁছার পূর্বেই শয়তান ঐ কথা পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ কথার সাথে যাদুকর নিজের পক্ষ হতে শত শত মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে প্রচার করে দেয়। ঐ একটি কথা সত্যরূপে প্রকাশিত হওয়ায় জনগণ সবগুলোকেই সত্য মনে করে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এই সমুদয় হাদীসের বর্ণনা (আরবি) (৩৪: ২৩) এই আয়াতের তাফসীরে আসবে ইনশাআল্লাহ।সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে এও আছে যে, ফেরেশতারা আসমানী বিষয়ক কথাবার্তা মেঘের উপর বলে থাকেন যা শয়তান শুনে নিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। আর ঐ যাদুকর একটি সত্যের সাথে শতটি মিথ্যা মিলিয়ে দেয়। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (কাফির) কবিদের অনুসরণ বিভ্রান্ত লোকেরাই করে থাকে। আরব কবিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে, কারো নিন্দায় তারা কিছু বলতো। জনগণের একটি দল তাদের সাথে হয়ে যেতো এবং তাদের নিকট হতে ঐ নিন্দাসূচক কবিতা নিয়ে আসতো।একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের একটি দলকে সাথে নিয়ে আ’রজের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে একজন কবির সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয় যে কবিতা পাঠ করতে করতে চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তাকে ধর অথবা তাকে কবিতা পাঠ হতে বিরত রাখো। কারো রক্ত পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি কি দেখো না যে, তারা উড্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? প্রত্যেক বাজে বিষয়ের মধ্যে তারা ঢুকে পড়ে। কারো প্রশংসা করতে গিয়ে তারা তাকে একেবারে আকাশে উঠিয়ে দেয়। মিথ্যা প্রশংসা করে তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে। তারা হয় কথার সওদাগর, কিন্তু কাজে অলস। তারা নিজেরা যা করে না তা বলে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে দু’টি লোক একে অপরকে নিন্দা করে। তাদের একজন ছিল আনসারী এবং অপরজন ছিল অন্য গোত্রের লোক। তখন দুই গোত্রেরই বড় বড় লোকেরা তাদের সাথে যোগ দেয়। তাই এই আয়াতে এটাই রয়েছে যে, বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদেরকে অনুসরণ করে থাকে। তারা ঐ কথা বলে থাকে যা তারা নিজেরা করে না। এজন্যেই আলেমগণ এ ব্যাপারে মতভেদ করেছেন যে, যদি কোন কবি নিজের কবিতার মধ্যে এমন কোন পাপের কথা স্বীকার করে নেয় যার উপর শরীয়তের হদ ওয়াজিব হয়, তবে তার উপর হদ জারী করা যাবে কি যাবে না? আলেমরা দুই দিকেই গিয়েছেন। আসলে তারা ফখর ও গর্ব করে এ ধরনের কথা বলে থাকে। তারা বলেঃ “আমি এই করেছি, ঐ করেছি, অথচ আসলে তারা কিছুই করেনি এবং করতেও পারে না। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) ও মুহাম্মাদ ইবনে সা'দ (রঃ) তাবাকাতে এবং যুবায়ের ইবনে বিকার (রঃ) কিতাবুল ফুকাহাতে বর্ণনা করেছেন যে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাঁর খিলাফতের আমলে হযরত নুমান ইবনে আদী ইবনে ফুলা (রাঃ)-কে বসরার মাইসান শহরের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি একজন কবি ছিলেন। তিনি কবিতায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সুন্দরী মহিলারা কি এ খবর পায়নি যে, তাদের প্রেমিক মাইসানে অবস্থান করছে? যেখানে সদা-সর্বদা শীশার গ্লাসে মদ্যচক্র চলছে? আর গ্রামের তরুণীরা নাচ-গানে মত্ত রয়েছে। হ্যাঁ, যদি আমার কোন বন্ধু দ্বারা এটা সম্ভব হয় তবে এর চেয়ে বড় ও পূর্ণ মদ্যের গ্লাস আমাকে পান করাতে পারে। কিন্তু ছোট গ্লাস আমার নিকট খুবই অপছন্দনীয়। আল্লাহ করুন যেন আমীরুল মুমিনীনের কাছে এ খবর না পেীছে। অন্যথায় তিনি এতে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন এবং আমাকে শাস্তি দিবেন।” ঘটনাক্রমে সত্যিই এ কবিতাগুলো আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট পৌছে যায় এবং সাথে সাথেই তিনি লোক পাঠিয়ে তাঁকে পদচ্যুত করেন এবং তিনি একটি চিঠিও পাঠান। ঐ চিঠিতে তিনি লিখেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। হা-মীম। এই কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিকট হতে, যিনি পাপ ক্ষমা করেন, তওবা কবুল করেন, যিনি শাস্তি দানে কঠোর, শক্তিশালী। তিনি ছাড়া কোন মা'বূদ নেই। প্রত্যাবর্তন তাঁরই নিকট। অতঃপর আমার কাছে তোমার (কবিতার) কথা পৌঁছেছে। আল্লাহর কসম! অবশ্যই ওটা আমাকে অসন্তুষ্ট করেছে। তাই আমি তোমাকে পদচ্যুত করলাম।" এ চিঠি পাঠ মাত্রই হযরত নু'মান (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে যান এবং অত্যন্ত দ্রতার সাথে আরয করেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনো মদ্যপানও করিনি, নাচও দেখিনি এবং গান বাজনাও করিনি। এটা তো শুধু কবিতাসূচক আবেগ-উচ্ছ্বাস ছিল।” তাঁর একথা শুনে আমীরুল মুমিনীন বলেনঃ “আমারও ধারণা এটাই ছিল। কিন্তু আমি তো এটা সহ্য করতে পারি না যে, এরূপ অশ্লীলভাষী কবিকে কোন পদে রেখে দিই।” তাহলে বুঝা গেল যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর মতেও কবি যদি তার কবিতার মাধ্যমে এমন কোন অপরাধের কথা ঘোষণা করে যা হদের যোগ্য, তবুও তাকে হদ মারা যাবে না। কেননা, সে বলে বটে, কিন্তু করে না। তবে নিঃসন্দেহে সে তিরস্কার ও নিন্দার যোগ্য। হাদীসে আছে যে, রক্ত, পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম। ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবিও নন, যাদুকরও নন, ভবিষ্যদ্বক্তাও নন এবং মিথ্যা আরোপকারীও নন। তাঁর বাহ্যিক অবস্থাই তাঁর এসব দোষ হতে মুক্ত হওয়ার বড় সাক্ষী। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি রাসূল (সঃ)-কে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয় নয়, এটাতো শুধু এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন।” (৩৬:৬৯) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “এটা কোন কবির রচনা নয়, তোমরা অল্পই বিশ্বাস কর। এটা কোন গণকের কথাও নয়, তোমরা অল্পই অনুধাবন কর। এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ।” (৬৯: ৪১-৪৩) অনুরূপভাবে এখানে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আর নিশ্চয়ই এটা (আল-কুরআন) জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। জিবরাঈল (আঃ) এটা নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার। অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।” (২৬:১৯২-১৯৫) এ সূরারই আর একটি জায়গায় বলেছেনঃ “শয়তানরা ওটাসহ অবতীর্ণ হয়নি। তারা এ কাজের যোগ্য নয় এবং তারা এর সামর্থ্যও রাখে না। তাদেরকে তো শ্রবণের সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে। এর আরো কিছু পরে বলেছেনঃ “তোমাদেরকে কি আমি জানিয়ে দেবো কার কাছে শয়তানরা অবতীর্ণ হয়? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। তারা কান পেতে থাকে এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। আর কবিদেরকে অনুসরণ করে তারা যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখো না তারা। উল্লান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং যা করে না তা বলে।” এরপরে যা রয়েছে তার শানে নুযূল এই যে, এর পূর্ববর্তী আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় (যাতে কবিদেরকে নিন্দে করা হয়েছে), তখন নবী (সঃ)-এর দরবারের কবিরা যেমন হযরত হাস্সান ইবনে সাবিত (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) এবং হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো কবিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। আমরাও তো কুবি (সুতরাং আমরাও তো তাহলে নিন্দনীয়?)।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই পরবর্তী আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “ঈমান আনয়নকারী ও সৎকর্মশীল তোমরাই এবং আল্লাহকে বার বার স্মরণকারীও তোমরাই। তোমরাই অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণকারী। সুতরাং তোমরা এদের হতে স্বতন্ত্র।”অন্য একটি রিওয়াইয়াতে হযরত কা'ব (রাঃ)-এর নাম নেই। একটি রিওয়াইয়াতে শুধু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-এর কথা আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও তো কবি?” তারই একথার পরিপ্রেক্ষিতে (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কথা বর্ণিত আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এটা মক্কী সূরা। আর আনসার কবিরা মক্কায় ছিলেন না। তারা সবাই ছিলেন মদীনায়। কাজেই তাদের ব্যাপারে এ সূরা অবতীর্ণ হওয়া অসম্ভবই বটে। যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে ওগুলো মুরসাল। সুতরাং এগুলোর উপর ভরসা করা যায় না। তবে এ আয়াতটি যে স্বাতন্ত্রের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে তাতে সন্দেহের লেশ মাত্র নেই। আর এই স্বাতন্ত্র শুধু এই আনসার কবিদের ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যে কোন কবি তার অজ্ঞতার যুগে যদি ইসলাম ও মুসলমানদের বিপক্ষে কবিতা লিখে থাকে, অতঃপর মুসলমান হয়ে গিয়ে তাওবা করে থাকে এবং পূর্বের দুষ্কর্মের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বার বার আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে তবে তারাও নিন্দনীয় কবিদের হতে স্বতন্ত্র হবে। কেননা, সৎ কার্যাবলী দুষ্কর্মগুলোকে মিটিয়ে দেয়। তাহলে সে যখন কবিতার মাধ্যমে মুসলমানদের দুর্নাম করেছিল এবং আল্লাহর দ্বীনকে মন্দ বলেছিল তখন ওটা নিঃসন্দেহে মন্দ কাজই ছিল। কিন্তু পরে যখন সে মুসলমানদের ও ইসলামের প্রশংসা করলো তখন ঐ দুষ্কর্ম সকর্মে পরিবর্তিত হয়ে গেল। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যাবআরী (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুর্নাম করেছিলেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর বড়ই প্রশংসা করেছিলেন এবং পূর্বে যে তিনি তাঁর দুর্নাম করেছিলেন, কবিতার মাধ্যমে ওর ওজর পেশ করতে গিয়ে বলেন যে, ঐ সময় তিনি শয়তানের খপ্পরে পড়েছিলেন। অনুরূপভাবে হযরত আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচাতো ভাই হওয়া সত্ত্বেও তার একজন বড় শত্রু ছিলেন এবং কবিতার মাধ্যমে তাঁর খুবই দুর্নাম করতেন। কিন্তু যখন তিনি মুসলমান হলেন তখন এমন পাকা মুসলমান হলেন যে, সারা দুনিয়ায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) অপেক্ষা বড় প্রিয়জন তাঁর কাছে আর কেউই ছিল না। প্রায়ই তিনি তাঁর প্রশংসা করতেন এবং তার সাথে অত্যন্ত ভালবাসা রাখতেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারব যখন মুসলমান হন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে আপনি তিনটি জিনিস দান করুন। প্রথম এই যে, আমার পুত্র মুআবিয়া (রাঃ)-কে আপনার লেখক (অর্থাৎ অহী লেখক) বানিয়ে নিন। দ্বিতীয় এই যে, আমার সাথে এক দল সৈন্য প্রেরণ করুন যাতে আমি কাফিরদের সাথে লড়তে পারি যেমন আমি মুসলমানদের সাথে লড়তাম।” তাঁর এই দু’টি আবেদনই রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবুল করে নেন। তৃতীয় আর একটি আবেদন তিনি করেন এবং সেটাও গৃহীত হয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) সুতরাং এই লোকদেরকে পূর্ববর্তী আয়াতের হুকুম হতে এই পরবর্তী আয়াত দ্বারা পৃথক করা হয়েছে। আল্লাহর অধিক স্মরণ তাঁরা তাঁদের কবিতার মাধ্যমেই করুন অথবা অন্য কোন প্রকারে করুন, নিশ্চিতরূপে তা তাদের পূর্ববর্তী পাপসমূহের কাফফারা হয়ে যাবে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে অর্থাৎ কবিতার মাধ্যমে তারা কাফিরদের নিন্দামূলক কবিতার জবাব দিয়ে থাকেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ “তুমি কাফিরদের নিন্দা করে কবিতা রচনা কর, হযরত জিবরাঈল (আঃ) তোমার সাথে রয়েছেন।”হযরত কাব ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন তিনি কুরআন পাকে কবিদের নিন্দা শুনেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আর্য করেনঃ “আল্লাহ তা'আলা (কবিদের সম্পর্কে) যা নাযিল করার তা তো নাযিল করেছেন (তাহলে আমিও কি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত?)।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “ (না, না, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও। জেনে রেখো যে,) মুমিন তরবারী ও জিহ্বা দ্বারা জিহাদ করে থাকে। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদের কবিতাগুলো তো তাদেরকে (কাফিরদেরকে) মুজাহিদের তীরের ন্যায় ছিদ্র করে দিয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অত্যাচারীদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা তারা শীঘ্রই জানতে পারবে। সেই দিন তাদের ওজর আপত্তি কোন কাজে আসবে না। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যুলুম হতে বেঁচে থাকো। কারণ কিয়ামতের দিন যুলুম অন্ধকারের কারণ হবে।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ পাকের (আরবি) উক্তিটি আম বা সাধারণ, কবি হোক বা অন্য কেউ হোক, সবাই এর অন্তর্ভুক্ত।হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন খৃষ্টানের জানাযা যেতে দেখে এ আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন। তিনি যখন এ আয়াতটি পাঠ করতেন তখন এতো কাঁদতেন যে, তাঁর হেঁচকী বন্ধ হয়ে যেতো।হযরত ফুযালা ইবনে উবায়েদ (রঃ) যখন রোমে আগমন করেন তখন একটি লোক নামায পড়ছিলেন। যখন লোকটি (আরবি) আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, এর দ্বারা বায়তুল্লাহর ধ্বংসকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা মক্কাবাসী উদ্দেশ্য। আবার এটাও বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুশরিকরা উদ্দেশ্য। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আয়াতটি হলো সাধারণ। সুতরাং এটা সব যালিমকেই অন্তর্ভুক্তকারী।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর মৃত্যুর সময় মাত্র দু'টি লাইনে তাঁর অসিয়ত লিখে যান। তা ছিল নিম্নরূপঃবিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। এটা আবু বকর ইবনে আবি কাহাফা (রাঃ)-এর অসিয়ত। এটা ঐ সময়ের অসিয়ত, যখন তিনি দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছেন। যে সময় কাফিরও মুমিন হয়ে যায়, পাপীও তাওবা করে এবং মিথ্যাবাদীকেও সত্যবাদী মনে করা হয়। আমি উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে তোমাদের উপর আমার খলীফা নিযুক্ত করে যাচ্ছি। সে যদি ইনসাফ করে তবে খুব ভাল কথা এবং তার সম্পর্কে আমার ধারণা এটাই আছে। আর যদি সে যুলুম করে এবং কোন পরিবর্তন আনয়ন করে তবে জেনে রেখো যে, আমি ভবিষ্যদ্রষ্টা নই। অত্যাচারীরা তাদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা সত্বরই জানতে পারবে।”

আশ-শুআরা 26:222

২২১-২২৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, মুশরিকরা বলতো: রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কুরআন নিয়ে আগমন করেছেন তা সত্য নয়। তিনি এটা স্বয়ং রচনা করেছেন। অথবা তার কাছে জ্বিনদের নেতা এসে থাকে যে তাঁকে শিখিয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে এই আপত্তিকর কথা হতে পবিত্র করছেন এবং প্রমাণ করছেন যে, তিনি যে কুরআন আনয়ন করেছেন তা আল্লাহর কালাম এবং তাঁর নিকট হতেই এটা অবতারিত। সম্মানিত, বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আঃ) এটা আনয়ন করেছেন। এটা কোন শয়তান বা জ্বিন আনয়ন করেনি। শয়তানরা তো কুরআনের শিক্ষা হতে সম্পূর্ণ বিমুখ। তাদের শিক্ষা তো কুরআন কারীমের শিক্ষার একেবারে বিপরীত। সুতরাং কি করে তারা কুরআনের ন্যায় পবিত্র ও সুপথ প্রদর্শনকারী কালাম আনয়ন করতঃ মানুষকে সুপথ প্রদর্শন করতে পারে? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। কেননা, তারা নিজেরাও চরম মিথ্যাবাদী ও পাপী। তারা চুরি করে আকাশে যে এক আধটি কথা শুনে নেয়, ওর সাথে বহু কিছু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ যাদুকররা তখন ওর সাথে নিজেদের পক্ষ হতে আরো বহু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে লোকদের মধ্যে প্রচার করে। এখন শয়তান লুকিয়ে যে সত্য কথাটি আকাশে শুনেছিল ওটা সত্যরূপেই প্রকাশিত হয়, কিন্তু লোকেরা ঐ একটি সত্য কথার উপর ভিত্তি করে যাদুকরের আরো শত শত মিথ্যা কথাকেও সত্য বলে বিশ্বাস করে থাকে। এভাবে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একদা জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যাদুকর ও ভবিষ্যদ্বক্তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “তারা কিছুই নয়।” জনগণ বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা এমনও কথা বলে যা সত্য হয়ে থাকে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, এটা ঐ কথা যা জ্বিনেরা-চুরি করে আকাশ হতে শুনে আসে এবং তা ঐ ভবিষ্যদ্বক্তার কানে পৌঁছিয়ে থাকে। অতঃপর ঐ ভবিষ্যদ্বক্তা নিজের পক্ষ হতে শতটি মিথ্যা কথা ওর সাথে মিলিয়ে বলে দেয়।” হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা আকাশে কোন কাজের ফায়সালা করেন তখন ফেরেশতারা আদবের সাথে নিজেদের পালক ঝুঁকিয়ে দেন। কোন কংকরময় ভূমিতে জিঞ্জীর বাজানো হলে যেরূপ শব্দ হয় ঐরূপ শব্দ ঐ সময় আসতে থাকে। যখন ঐ বিহ্বলতা বিদূরিত হয় তখন ফেরেশতারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন (কি হুকুম করেছেন)?” উত্তরে বলা হয়ঃ “তিনি সত্য বলেছেন (সঠিক হুকুম করেছেন)। তিনি সমুন্নত ও মহান।” কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার ঐ হুকুম চুরি করে শ্রবণকারী কোন জ্বিনের কানে পৌঁছে যায় যারা এভাবে একের উপর এক হয়ে ঐ পর্যন্ত পৌঁছে থাকে। হাদীস বর্ণনাকারী হযরত সুফিয়ান (রঃ) স্বীয় হাতের অঙ্গুলীগুলো বিছিয়ে দিয়ে ওর উপর অপর হাত ঐভাবেই রেখে ওগুলোকে মিলিত করে বলেনঃ “এইভাবে।” এখন উপরের জন নীচের জনকে, সে তার নীচের জনকে ঐ কথা বলে দেয়। শেষ পর্যন্ত সর্ব নীচের জন ঐ কথা ভবিষ্যদ্বক্তা বা যাদুকরের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। কখনো কখনো এমনও হয় যে, ঐ কথা পৌঁছাবার পূর্বেই অগ্নিশিখা পৌঁছে যায়, সুতরাং শয়তান ঐ কথা পৌঁছাতে পারে না। আবার কখনো কখনো অগ্নিশিখা পৌঁছার পূর্বেই শয়তান ঐ কথা পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ কথার সাথে যাদুকর নিজের পক্ষ হতে শত শত মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে প্রচার করে দেয়। ঐ একটি কথা সত্যরূপে প্রকাশিত হওয়ায় জনগণ সবগুলোকেই সত্য মনে করে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এই সমুদয় হাদীসের বর্ণনা (আরবি) (৩৪: ২৩) এই আয়াতের তাফসীরে আসবে ইনশাআল্লাহ।সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে এও আছে যে, ফেরেশতারা আসমানী বিষয়ক কথাবার্তা মেঘের উপর বলে থাকেন যা শয়তান শুনে নিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। আর ঐ যাদুকর একটি সত্যের সাথে শতটি মিথ্যা মিলিয়ে দেয়। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (কাফির) কবিদের অনুসরণ বিভ্রান্ত লোকেরাই করে থাকে। আরব কবিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে, কারো নিন্দায় তারা কিছু বলতো। জনগণের একটি দল তাদের সাথে হয়ে যেতো এবং তাদের নিকট হতে ঐ নিন্দাসূচক কবিতা নিয়ে আসতো।একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের একটি দলকে সাথে নিয়ে আ’রজের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে একজন কবির সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয় যে কবিতা পাঠ করতে করতে চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তাকে ধর অথবা তাকে কবিতা পাঠ হতে বিরত রাখো। কারো রক্ত পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি কি দেখো না যে, তারা উড্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? প্রত্যেক বাজে বিষয়ের মধ্যে তারা ঢুকে পড়ে। কারো প্রশংসা করতে গিয়ে তারা তাকে একেবারে আকাশে উঠিয়ে দেয়। মিথ্যা প্রশংসা করে তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে। তারা হয় কথার সওদাগর, কিন্তু কাজে অলস। তারা নিজেরা যা করে না তা বলে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে দু’টি লোক একে অপরকে নিন্দা করে। তাদের একজন ছিল আনসারী এবং অপরজন ছিল অন্য গোত্রের লোক। তখন দুই গোত্রেরই বড় বড় লোকেরা তাদের সাথে যোগ দেয়। তাই এই আয়াতে এটাই রয়েছে যে, বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদেরকে অনুসরণ করে থাকে। তারা ঐ কথা বলে থাকে যা তারা নিজেরা করে না। এজন্যেই আলেমগণ এ ব্যাপারে মতভেদ করেছেন যে, যদি কোন কবি নিজের কবিতার মধ্যে এমন কোন পাপের কথা স্বীকার করে নেয় যার উপর শরীয়তের হদ ওয়াজিব হয়, তবে তার উপর হদ জারী করা যাবে কি যাবে না? আলেমরা দুই দিকেই গিয়েছেন। আসলে তারা ফখর ও গর্ব করে এ ধরনের কথা বলে থাকে। তারা বলেঃ “আমি এই করেছি, ঐ করেছি, অথচ আসলে তারা কিছুই করেনি এবং করতেও পারে না। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) ও মুহাম্মাদ ইবনে সা'দ (রঃ) তাবাকাতে এবং যুবায়ের ইবনে বিকার (রঃ) কিতাবুল ফুকাহাতে বর্ণনা করেছেন যে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাঁর খিলাফতের আমলে হযরত নুমান ইবনে আদী ইবনে ফুলা (রাঃ)-কে বসরার মাইসান শহরের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি একজন কবি ছিলেন। তিনি কবিতায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সুন্দরী মহিলারা কি এ খবর পায়নি যে, তাদের প্রেমিক মাইসানে অবস্থান করছে? যেখানে সদা-সর্বদা শীশার গ্লাসে মদ্যচক্র চলছে? আর গ্রামের তরুণীরা নাচ-গানে মত্ত রয়েছে। হ্যাঁ, যদি আমার কোন বন্ধু দ্বারা এটা সম্ভব হয় তবে এর চেয়ে বড় ও পূর্ণ মদ্যের গ্লাস আমাকে পান করাতে পারে। কিন্তু ছোট গ্লাস আমার নিকট খুবই অপছন্দনীয়। আল্লাহ করুন যেন আমীরুল মুমিনীনের কাছে এ খবর না পেীছে। অন্যথায় তিনি এতে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন এবং আমাকে শাস্তি দিবেন।” ঘটনাক্রমে সত্যিই এ কবিতাগুলো আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট পৌছে যায় এবং সাথে সাথেই তিনি লোক পাঠিয়ে তাঁকে পদচ্যুত করেন এবং তিনি একটি চিঠিও পাঠান। ঐ চিঠিতে তিনি লিখেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। হা-মীম। এই কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিকট হতে, যিনি পাপ ক্ষমা করেন, তওবা কবুল করেন, যিনি শাস্তি দানে কঠোর, শক্তিশালী। তিনি ছাড়া কোন মা'বূদ নেই। প্রত্যাবর্তন তাঁরই নিকট। অতঃপর আমার কাছে তোমার (কবিতার) কথা পৌঁছেছে। আল্লাহর কসম! অবশ্যই ওটা আমাকে অসন্তুষ্ট করেছে। তাই আমি তোমাকে পদচ্যুত করলাম।" এ চিঠি পাঠ মাত্রই হযরত নু'মান (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে যান এবং অত্যন্ত দ্রতার সাথে আরয করেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনো মদ্যপানও করিনি, নাচও দেখিনি এবং গান বাজনাও করিনি। এটা তো শুধু কবিতাসূচক আবেগ-উচ্ছ্বাস ছিল।” তাঁর একথা শুনে আমীরুল মুমিনীন বলেনঃ “আমারও ধারণা এটাই ছিল। কিন্তু আমি তো এটা সহ্য করতে পারি না যে, এরূপ অশ্লীলভাষী কবিকে কোন পদে রেখে দিই।” তাহলে বুঝা গেল যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর মতেও কবি যদি তার কবিতার মাধ্যমে এমন কোন অপরাধের কথা ঘোষণা করে যা হদের যোগ্য, তবুও তাকে হদ মারা যাবে না। কেননা, সে বলে বটে, কিন্তু করে না। তবে নিঃসন্দেহে সে তিরস্কার ও নিন্দার যোগ্য। হাদীসে আছে যে, রক্ত, পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম। ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবিও নন, যাদুকরও নন, ভবিষ্যদ্বক্তাও নন এবং মিথ্যা আরোপকারীও নন। তাঁর বাহ্যিক অবস্থাই তাঁর এসব দোষ হতে মুক্ত হওয়ার বড় সাক্ষী। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি রাসূল (সঃ)-কে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয় নয়, এটাতো শুধু এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন।” (৩৬:৬৯) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “এটা কোন কবির রচনা নয়, তোমরা অল্পই বিশ্বাস কর। এটা কোন গণকের কথাও নয়, তোমরা অল্পই অনুধাবন কর। এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ।” (৬৯: ৪১-৪৩) অনুরূপভাবে এখানে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আর নিশ্চয়ই এটা (আল-কুরআন) জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। জিবরাঈল (আঃ) এটা নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার। অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।” (২৬:১৯২-১৯৫) এ সূরারই আর একটি জায়গায় বলেছেনঃ “শয়তানরা ওটাসহ অবতীর্ণ হয়নি। তারা এ কাজের যোগ্য নয় এবং তারা এর সামর্থ্যও রাখে না। তাদেরকে তো শ্রবণের সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে। এর আরো কিছু পরে বলেছেনঃ “তোমাদেরকে কি আমি জানিয়ে দেবো কার কাছে শয়তানরা অবতীর্ণ হয়? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। তারা কান পেতে থাকে এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। আর কবিদেরকে অনুসরণ করে তারা যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখো না তারা। উল্লান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং যা করে না তা বলে।” এরপরে যা রয়েছে তার শানে নুযূল এই যে, এর পূর্ববর্তী আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় (যাতে কবিদেরকে নিন্দে করা হয়েছে), তখন নবী (সঃ)-এর দরবারের কবিরা যেমন হযরত হাস্সান ইবনে সাবিত (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) এবং হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো কবিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। আমরাও তো কুবি (সুতরাং আমরাও তো তাহলে নিন্দনীয়?)।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই পরবর্তী আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “ঈমান আনয়নকারী ও সৎকর্মশীল তোমরাই এবং আল্লাহকে বার বার স্মরণকারীও তোমরাই। তোমরাই অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণকারী। সুতরাং তোমরা এদের হতে স্বতন্ত্র।”অন্য একটি রিওয়াইয়াতে হযরত কা'ব (রাঃ)-এর নাম নেই। একটি রিওয়াইয়াতে শুধু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-এর কথা আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও তো কবি?” তারই একথার পরিপ্রেক্ষিতে (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কথা বর্ণিত আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এটা মক্কী সূরা। আর আনসার কবিরা মক্কায় ছিলেন না। তারা সবাই ছিলেন মদীনায়। কাজেই তাদের ব্যাপারে এ সূরা অবতীর্ণ হওয়া অসম্ভবই বটে। যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে ওগুলো মুরসাল। সুতরাং এগুলোর উপর ভরসা করা যায় না। তবে এ আয়াতটি যে স্বাতন্ত্রের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে তাতে সন্দেহের লেশ মাত্র নেই। আর এই স্বাতন্ত্র শুধু এই আনসার কবিদের ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যে কোন কবি তার অজ্ঞতার যুগে যদি ইসলাম ও মুসলমানদের বিপক্ষে কবিতা লিখে থাকে, অতঃপর মুসলমান হয়ে গিয়ে তাওবা করে থাকে এবং পূর্বের দুষ্কর্মের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বার বার আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে তবে তারাও নিন্দনীয় কবিদের হতে স্বতন্ত্র হবে। কেননা, সৎ কার্যাবলী দুষ্কর্মগুলোকে মিটিয়ে দেয়। তাহলে সে যখন কবিতার মাধ্যমে মুসলমানদের দুর্নাম করেছিল এবং আল্লাহর দ্বীনকে মন্দ বলেছিল তখন ওটা নিঃসন্দেহে মন্দ কাজই ছিল। কিন্তু পরে যখন সে মুসলমানদের ও ইসলামের প্রশংসা করলো তখন ঐ দুষ্কর্ম সকর্মে পরিবর্তিত হয়ে গেল। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যাবআরী (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুর্নাম করেছিলেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর বড়ই প্রশংসা করেছিলেন এবং পূর্বে যে তিনি তাঁর দুর্নাম করেছিলেন, কবিতার মাধ্যমে ওর ওজর পেশ করতে গিয়ে বলেন যে, ঐ সময় তিনি শয়তানের খপ্পরে পড়েছিলেন। অনুরূপভাবে হযরত আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচাতো ভাই হওয়া সত্ত্বেও তার একজন বড় শত্রু ছিলেন এবং কবিতার মাধ্যমে তাঁর খুবই দুর্নাম করতেন। কিন্তু যখন তিনি মুসলমান হলেন তখন এমন পাকা মুসলমান হলেন যে, সারা দুনিয়ায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) অপেক্ষা বড় প্রিয়জন তাঁর কাছে আর কেউই ছিল না। প্রায়ই তিনি তাঁর প্রশংসা করতেন এবং তার সাথে অত্যন্ত ভালবাসা রাখতেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারব যখন মুসলমান হন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে আপনি তিনটি জিনিস দান করুন। প্রথম এই যে, আমার পুত্র মুআবিয়া (রাঃ)-কে আপনার লেখক (অর্থাৎ অহী লেখক) বানিয়ে নিন। দ্বিতীয় এই যে, আমার সাথে এক দল সৈন্য প্রেরণ করুন যাতে আমি কাফিরদের সাথে লড়তে পারি যেমন আমি মুসলমানদের সাথে লড়তাম।” তাঁর এই দু’টি আবেদনই রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবুল করে নেন। তৃতীয় আর একটি আবেদন তিনি করেন এবং সেটাও গৃহীত হয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) সুতরাং এই লোকদেরকে পূর্ববর্তী আয়াতের হুকুম হতে এই পরবর্তী আয়াত দ্বারা পৃথক করা হয়েছে। আল্লাহর অধিক স্মরণ তাঁরা তাঁদের কবিতার মাধ্যমেই করুন অথবা অন্য কোন প্রকারে করুন, নিশ্চিতরূপে তা তাদের পূর্ববর্তী পাপসমূহের কাফফারা হয়ে যাবে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে অর্থাৎ কবিতার মাধ্যমে তারা কাফিরদের নিন্দামূলক কবিতার জবাব দিয়ে থাকেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ “তুমি কাফিরদের নিন্দা করে কবিতা রচনা কর, হযরত জিবরাঈল (আঃ) তোমার সাথে রয়েছেন।”হযরত কাব ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন তিনি কুরআন পাকে কবিদের নিন্দা শুনেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আর্য করেনঃ “আল্লাহ তা'আলা (কবিদের সম্পর্কে) যা নাযিল করার তা তো নাযিল করেছেন (তাহলে আমিও কি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত?)।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “ (না, না, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও। জেনে রেখো যে,) মুমিন তরবারী ও জিহ্বা দ্বারা জিহাদ করে থাকে। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদের কবিতাগুলো তো তাদেরকে (কাফিরদেরকে) মুজাহিদের তীরের ন্যায় ছিদ্র করে দিয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অত্যাচারীদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা তারা শীঘ্রই জানতে পারবে। সেই দিন তাদের ওজর আপত্তি কোন কাজে আসবে না। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যুলুম হতে বেঁচে থাকো। কারণ কিয়ামতের দিন যুলুম অন্ধকারের কারণ হবে।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ পাকের (আরবি) উক্তিটি আম বা সাধারণ, কবি হোক বা অন্য কেউ হোক, সবাই এর অন্তর্ভুক্ত।হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন খৃষ্টানের জানাযা যেতে দেখে এ আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন। তিনি যখন এ আয়াতটি পাঠ করতেন তখন এতো কাঁদতেন যে, তাঁর হেঁচকী বন্ধ হয়ে যেতো।হযরত ফুযালা ইবনে উবায়েদ (রঃ) যখন রোমে আগমন করেন তখন একটি লোক নামায পড়ছিলেন। যখন লোকটি (আরবি) আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, এর দ্বারা বায়তুল্লাহর ধ্বংসকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা মক্কাবাসী উদ্দেশ্য। আবার এটাও বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুশরিকরা উদ্দেশ্য। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আয়াতটি হলো সাধারণ। সুতরাং এটা সব যালিমকেই অন্তর্ভুক্তকারী।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর মৃত্যুর সময় মাত্র দু'টি লাইনে তাঁর অসিয়ত লিখে যান। তা ছিল নিম্নরূপঃবিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। এটা আবু বকর ইবনে আবি কাহাফা (রাঃ)-এর অসিয়ত। এটা ঐ সময়ের অসিয়ত, যখন তিনি দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছেন। যে সময় কাফিরও মুমিন হয়ে যায়, পাপীও তাওবা করে এবং মিথ্যাবাদীকেও সত্যবাদী মনে করা হয়। আমি উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে তোমাদের উপর আমার খলীফা নিযুক্ত করে যাচ্ছি। সে যদি ইনসাফ করে তবে খুব ভাল কথা এবং তার সম্পর্কে আমার ধারণা এটাই আছে। আর যদি সে যুলুম করে এবং কোন পরিবর্তন আনয়ন করে তবে জেনে রেখো যে, আমি ভবিষ্যদ্রষ্টা নই। অত্যাচারীরা তাদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা সত্বরই জানতে পারবে।”

আশ-শুআরা 26:223

২২১-২২৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, মুশরিকরা বলতো: রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কুরআন নিয়ে আগমন করেছেন তা সত্য নয়। তিনি এটা স্বয়ং রচনা করেছেন। অথবা তার কাছে জ্বিনদের নেতা এসে থাকে যে তাঁকে শিখিয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে এই আপত্তিকর কথা হতে পবিত্র করছেন এবং প্রমাণ করছেন যে, তিনি যে কুরআন আনয়ন করেছেন তা আল্লাহর কালাম এবং তাঁর নিকট হতেই এটা অবতারিত। সম্মানিত, বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আঃ) এটা আনয়ন করেছেন। এটা কোন শয়তান বা জ্বিন আনয়ন করেনি। শয়তানরা তো কুরআনের শিক্ষা হতে সম্পূর্ণ বিমুখ। তাদের শিক্ষা তো কুরআন কারীমের শিক্ষার একেবারে বিপরীত। সুতরাং কি করে তারা কুরআনের ন্যায় পবিত্র ও সুপথ প্রদর্শনকারী কালাম আনয়ন করতঃ মানুষকে সুপথ প্রদর্শন করতে পারে? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। কেননা, তারা নিজেরাও চরম মিথ্যাবাদী ও পাপী। তারা চুরি করে আকাশে যে এক আধটি কথা শুনে নেয়, ওর সাথে বহু কিছু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ যাদুকররা তখন ওর সাথে নিজেদের পক্ষ হতে আরো বহু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে লোকদের মধ্যে প্রচার করে। এখন শয়তান লুকিয়ে যে সত্য কথাটি আকাশে শুনেছিল ওটা সত্যরূপেই প্রকাশিত হয়, কিন্তু লোকেরা ঐ একটি সত্য কথার উপর ভিত্তি করে যাদুকরের আরো শত শত মিথ্যা কথাকেও সত্য বলে বিশ্বাস করে থাকে। এভাবে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একদা জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যাদুকর ও ভবিষ্যদ্বক্তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “তারা কিছুই নয়।” জনগণ বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা এমনও কথা বলে যা সত্য হয়ে থাকে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, এটা ঐ কথা যা জ্বিনেরা-চুরি করে আকাশ হতে শুনে আসে এবং তা ঐ ভবিষ্যদ্বক্তার কানে পৌঁছিয়ে থাকে। অতঃপর ঐ ভবিষ্যদ্বক্তা নিজের পক্ষ হতে শতটি মিথ্যা কথা ওর সাথে মিলিয়ে বলে দেয়।” হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা আকাশে কোন কাজের ফায়সালা করেন তখন ফেরেশতারা আদবের সাথে নিজেদের পালক ঝুঁকিয়ে দেন। কোন কংকরময় ভূমিতে জিঞ্জীর বাজানো হলে যেরূপ শব্দ হয় ঐরূপ শব্দ ঐ সময় আসতে থাকে। যখন ঐ বিহ্বলতা বিদূরিত হয় তখন ফেরেশতারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন (কি হুকুম করেছেন)?” উত্তরে বলা হয়ঃ “তিনি সত্য বলেছেন (সঠিক হুকুম করেছেন)। তিনি সমুন্নত ও মহান।” কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার ঐ হুকুম চুরি করে শ্রবণকারী কোন জ্বিনের কানে পৌঁছে যায় যারা এভাবে একের উপর এক হয়ে ঐ পর্যন্ত পৌঁছে থাকে। হাদীস বর্ণনাকারী হযরত সুফিয়ান (রঃ) স্বীয় হাতের অঙ্গুলীগুলো বিছিয়ে দিয়ে ওর উপর অপর হাত ঐভাবেই রেখে ওগুলোকে মিলিত করে বলেনঃ “এইভাবে।” এখন উপরের জন নীচের জনকে, সে তার নীচের জনকে ঐ কথা বলে দেয়। শেষ পর্যন্ত সর্ব নীচের জন ঐ কথা ভবিষ্যদ্বক্তা বা যাদুকরের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। কখনো কখনো এমনও হয় যে, ঐ কথা পৌঁছাবার পূর্বেই অগ্নিশিখা পৌঁছে যায়, সুতরাং শয়তান ঐ কথা পৌঁছাতে পারে না। আবার কখনো কখনো অগ্নিশিখা পৌঁছার পূর্বেই শয়তান ঐ কথা পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ কথার সাথে যাদুকর নিজের পক্ষ হতে শত শত মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে প্রচার করে দেয়। ঐ একটি কথা সত্যরূপে প্রকাশিত হওয়ায় জনগণ সবগুলোকেই সত্য মনে করে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এই সমুদয় হাদীসের বর্ণনা (আরবি) (৩৪: ২৩) এই আয়াতের তাফসীরে আসবে ইনশাআল্লাহ।সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে এও আছে যে, ফেরেশতারা আসমানী বিষয়ক কথাবার্তা মেঘের উপর বলে থাকেন যা শয়তান শুনে নিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। আর ঐ যাদুকর একটি সত্যের সাথে শতটি মিথ্যা মিলিয়ে দেয়। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (কাফির) কবিদের অনুসরণ বিভ্রান্ত লোকেরাই করে থাকে। আরব কবিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে, কারো নিন্দায় তারা কিছু বলতো। জনগণের একটি দল তাদের সাথে হয়ে যেতো এবং তাদের নিকট হতে ঐ নিন্দাসূচক কবিতা নিয়ে আসতো।একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের একটি দলকে সাথে নিয়ে আ’রজের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে একজন কবির সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয় যে কবিতা পাঠ করতে করতে চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তাকে ধর অথবা তাকে কবিতা পাঠ হতে বিরত রাখো। কারো রক্ত পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি কি দেখো না যে, তারা উড্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? প্রত্যেক বাজে বিষয়ের মধ্যে তারা ঢুকে পড়ে। কারো প্রশংসা করতে গিয়ে তারা তাকে একেবারে আকাশে উঠিয়ে দেয়। মিথ্যা প্রশংসা করে তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে। তারা হয় কথার সওদাগর, কিন্তু কাজে অলস। তারা নিজেরা যা করে না তা বলে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে দু’টি লোক একে অপরকে নিন্দা করে। তাদের একজন ছিল আনসারী এবং অপরজন ছিল অন্য গোত্রের লোক। তখন দুই গোত্রেরই বড় বড় লোকেরা তাদের সাথে যোগ দেয়। তাই এই আয়াতে এটাই রয়েছে যে, বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদেরকে অনুসরণ করে থাকে। তারা ঐ কথা বলে থাকে যা তারা নিজেরা করে না। এজন্যেই আলেমগণ এ ব্যাপারে মতভেদ করেছেন যে, যদি কোন কবি নিজের কবিতার মধ্যে এমন কোন পাপের কথা স্বীকার করে নেয় যার উপর শরীয়তের হদ ওয়াজিব হয়, তবে তার উপর হদ জারী করা যাবে কি যাবে না? আলেমরা দুই দিকেই গিয়েছেন। আসলে তারা ফখর ও গর্ব করে এ ধরনের কথা বলে থাকে। তারা বলেঃ “আমি এই করেছি, ঐ করেছি, অথচ আসলে তারা কিছুই করেনি এবং করতেও পারে না। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) ও মুহাম্মাদ ইবনে সা'দ (রঃ) তাবাকাতে এবং যুবায়ের ইবনে বিকার (রঃ) কিতাবুল ফুকাহাতে বর্ণনা করেছেন যে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাঁর খিলাফতের আমলে হযরত নুমান ইবনে আদী ইবনে ফুলা (রাঃ)-কে বসরার মাইসান শহরের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি একজন কবি ছিলেন। তিনি কবিতায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সুন্দরী মহিলারা কি এ খবর পায়নি যে, তাদের প্রেমিক মাইসানে অবস্থান করছে? যেখানে সদা-সর্বদা শীশার গ্লাসে মদ্যচক্র চলছে? আর গ্রামের তরুণীরা নাচ-গানে মত্ত রয়েছে। হ্যাঁ, যদি আমার কোন বন্ধু দ্বারা এটা সম্ভব হয় তবে এর চেয়ে বড় ও পূর্ণ মদ্যের গ্লাস আমাকে পান করাতে পারে। কিন্তু ছোট গ্লাস আমার নিকট খুবই অপছন্দনীয়। আল্লাহ করুন যেন আমীরুল মুমিনীনের কাছে এ খবর না পেীছে। অন্যথায় তিনি এতে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন এবং আমাকে শাস্তি দিবেন।” ঘটনাক্রমে সত্যিই এ কবিতাগুলো আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট পৌছে যায় এবং সাথে সাথেই তিনি লোক পাঠিয়ে তাঁকে পদচ্যুত করেন এবং তিনি একটি চিঠিও পাঠান। ঐ চিঠিতে তিনি লিখেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। হা-মীম। এই কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিকট হতে, যিনি পাপ ক্ষমা করেন, তওবা কবুল করেন, যিনি শাস্তি দানে কঠোর, শক্তিশালী। তিনি ছাড়া কোন মা'বূদ নেই। প্রত্যাবর্তন তাঁরই নিকট। অতঃপর আমার কাছে তোমার (কবিতার) কথা পৌঁছেছে। আল্লাহর কসম! অবশ্যই ওটা আমাকে অসন্তুষ্ট করেছে। তাই আমি তোমাকে পদচ্যুত করলাম।" এ চিঠি পাঠ মাত্রই হযরত নু'মান (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে যান এবং অত্যন্ত দ্রতার সাথে আরয করেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনো মদ্যপানও করিনি, নাচও দেখিনি এবং গান বাজনাও করিনি। এটা তো শুধু কবিতাসূচক আবেগ-উচ্ছ্বাস ছিল।” তাঁর একথা শুনে আমীরুল মুমিনীন বলেনঃ “আমারও ধারণা এটাই ছিল। কিন্তু আমি তো এটা সহ্য করতে পারি না যে, এরূপ অশ্লীলভাষী কবিকে কোন পদে রেখে দিই।” তাহলে বুঝা গেল যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর মতেও কবি যদি তার কবিতার মাধ্যমে এমন কোন অপরাধের কথা ঘোষণা করে যা হদের যোগ্য, তবুও তাকে হদ মারা যাবে না। কেননা, সে বলে বটে, কিন্তু করে না। তবে নিঃসন্দেহে সে তিরস্কার ও নিন্দার যোগ্য। হাদীসে আছে যে, রক্ত, পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম। ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবিও নন, যাদুকরও নন, ভবিষ্যদ্বক্তাও নন এবং মিথ্যা আরোপকারীও নন। তাঁর বাহ্যিক অবস্থাই তাঁর এসব দোষ হতে মুক্ত হওয়ার বড় সাক্ষী। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি রাসূল (সঃ)-কে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয় নয়, এটাতো শুধু এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন।” (৩৬:৬৯) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “এটা কোন কবির রচনা নয়, তোমরা অল্পই বিশ্বাস কর। এটা কোন গণকের কথাও নয়, তোমরা অল্পই অনুধাবন কর। এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ।” (৬৯: ৪১-৪৩) অনুরূপভাবে এখানে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আর নিশ্চয়ই এটা (আল-কুরআন) জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। জিবরাঈল (আঃ) এটা নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার। অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।” (২৬:১৯২-১৯৫) এ সূরারই আর একটি জায়গায় বলেছেনঃ “শয়তানরা ওটাসহ অবতীর্ণ হয়নি। তারা এ কাজের যোগ্য নয় এবং তারা এর সামর্থ্যও রাখে না। তাদেরকে তো শ্রবণের সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে। এর আরো কিছু পরে বলেছেনঃ “তোমাদেরকে কি আমি জানিয়ে দেবো কার কাছে শয়তানরা অবতীর্ণ হয়? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। তারা কান পেতে থাকে এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। আর কবিদেরকে অনুসরণ করে তারা যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখো না তারা। উল্লান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং যা করে না তা বলে।” এরপরে যা রয়েছে তার শানে নুযূল এই যে, এর পূর্ববর্তী আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় (যাতে কবিদেরকে নিন্দে করা হয়েছে), তখন নবী (সঃ)-এর দরবারের কবিরা যেমন হযরত হাস্সান ইবনে সাবিত (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) এবং হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো কবিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। আমরাও তো কুবি (সুতরাং আমরাও তো তাহলে নিন্দনীয়?)।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই পরবর্তী আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “ঈমান আনয়নকারী ও সৎকর্মশীল তোমরাই এবং আল্লাহকে বার বার স্মরণকারীও তোমরাই। তোমরাই অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণকারী। সুতরাং তোমরা এদের হতে স্বতন্ত্র।”অন্য একটি রিওয়াইয়াতে হযরত কা'ব (রাঃ)-এর নাম নেই। একটি রিওয়াইয়াতে শুধু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-এর কথা আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও তো কবি?” তারই একথার পরিপ্রেক্ষিতে (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কথা বর্ণিত আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এটা মক্কী সূরা। আর আনসার কবিরা মক্কায় ছিলেন না। তারা সবাই ছিলেন মদীনায়। কাজেই তাদের ব্যাপারে এ সূরা অবতীর্ণ হওয়া অসম্ভবই বটে। যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে ওগুলো মুরসাল। সুতরাং এগুলোর উপর ভরসা করা যায় না। তবে এ আয়াতটি যে স্বাতন্ত্রের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে তাতে সন্দেহের লেশ মাত্র নেই। আর এই স্বাতন্ত্র শুধু এই আনসার কবিদের ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যে কোন কবি তার অজ্ঞতার যুগে যদি ইসলাম ও মুসলমানদের বিপক্ষে কবিতা লিখে থাকে, অতঃপর মুসলমান হয়ে গিয়ে তাওবা করে থাকে এবং পূর্বের দুষ্কর্মের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বার বার আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে তবে তারাও নিন্দনীয় কবিদের হতে স্বতন্ত্র হবে। কেননা, সৎ কার্যাবলী দুষ্কর্মগুলোকে মিটিয়ে দেয়। তাহলে সে যখন কবিতার মাধ্যমে মুসলমানদের দুর্নাম করেছিল এবং আল্লাহর দ্বীনকে মন্দ বলেছিল তখন ওটা নিঃসন্দেহে মন্দ কাজই ছিল। কিন্তু পরে যখন সে মুসলমানদের ও ইসলামের প্রশংসা করলো তখন ঐ দুষ্কর্ম সকর্মে পরিবর্তিত হয়ে গেল। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যাবআরী (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুর্নাম করেছিলেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর বড়ই প্রশংসা করেছিলেন এবং পূর্বে যে তিনি তাঁর দুর্নাম করেছিলেন, কবিতার মাধ্যমে ওর ওজর পেশ করতে গিয়ে বলেন যে, ঐ সময় তিনি শয়তানের খপ্পরে পড়েছিলেন। অনুরূপভাবে হযরত আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচাতো ভাই হওয়া সত্ত্বেও তার একজন বড় শত্রু ছিলেন এবং কবিতার মাধ্যমে তাঁর খুবই দুর্নাম করতেন। কিন্তু যখন তিনি মুসলমান হলেন তখন এমন পাকা মুসলমান হলেন যে, সারা দুনিয়ায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) অপেক্ষা বড় প্রিয়জন তাঁর কাছে আর কেউই ছিল না। প্রায়ই তিনি তাঁর প্রশংসা করতেন এবং তার সাথে অত্যন্ত ভালবাসা রাখতেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারব যখন মুসলমান হন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে আপনি তিনটি জিনিস দান করুন। প্রথম এই যে, আমার পুত্র মুআবিয়া (রাঃ)-কে আপনার লেখক (অর্থাৎ অহী লেখক) বানিয়ে নিন। দ্বিতীয় এই যে, আমার সাথে এক দল সৈন্য প্রেরণ করুন যাতে আমি কাফিরদের সাথে লড়তে পারি যেমন আমি মুসলমানদের সাথে লড়তাম।” তাঁর এই দু’টি আবেদনই রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবুল করে নেন। তৃতীয় আর একটি আবেদন তিনি করেন এবং সেটাও গৃহীত হয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) সুতরাং এই লোকদেরকে পূর্ববর্তী আয়াতের হুকুম হতে এই পরবর্তী আয়াত দ্বারা পৃথক করা হয়েছে। আল্লাহর অধিক স্মরণ তাঁরা তাঁদের কবিতার মাধ্যমেই করুন অথবা অন্য কোন প্রকারে করুন, নিশ্চিতরূপে তা তাদের পূর্ববর্তী পাপসমূহের কাফফারা হয়ে যাবে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে অর্থাৎ কবিতার মাধ্যমে তারা কাফিরদের নিন্দামূলক কবিতার জবাব দিয়ে থাকেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ “তুমি কাফিরদের নিন্দা করে কবিতা রচনা কর, হযরত জিবরাঈল (আঃ) তোমার সাথে রয়েছেন।”হযরত কাব ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন তিনি কুরআন পাকে কবিদের নিন্দা শুনেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আর্য করেনঃ “আল্লাহ তা'আলা (কবিদের সম্পর্কে) যা নাযিল করার তা তো নাযিল করেছেন (তাহলে আমিও কি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত?)।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “ (না, না, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও। জেনে রেখো যে,) মুমিন তরবারী ও জিহ্বা দ্বারা জিহাদ করে থাকে। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদের কবিতাগুলো তো তাদেরকে (কাফিরদেরকে) মুজাহিদের তীরের ন্যায় ছিদ্র করে দিয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অত্যাচারীদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা তারা শীঘ্রই জানতে পারবে। সেই দিন তাদের ওজর আপত্তি কোন কাজে আসবে না। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যুলুম হতে বেঁচে থাকো। কারণ কিয়ামতের দিন যুলুম অন্ধকারের কারণ হবে।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ পাকের (আরবি) উক্তিটি আম বা সাধারণ, কবি হোক বা অন্য কেউ হোক, সবাই এর অন্তর্ভুক্ত।হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন খৃষ্টানের জানাযা যেতে দেখে এ আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন। তিনি যখন এ আয়াতটি পাঠ করতেন তখন এতো কাঁদতেন যে, তাঁর হেঁচকী বন্ধ হয়ে যেতো।হযরত ফুযালা ইবনে উবায়েদ (রঃ) যখন রোমে আগমন করেন তখন একটি লোক নামায পড়ছিলেন। যখন লোকটি (আরবি) আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, এর দ্বারা বায়তুল্লাহর ধ্বংসকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা মক্কাবাসী উদ্দেশ্য। আবার এটাও বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুশরিকরা উদ্দেশ্য। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আয়াতটি হলো সাধারণ। সুতরাং এটা সব যালিমকেই অন্তর্ভুক্তকারী।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর মৃত্যুর সময় মাত্র দু'টি লাইনে তাঁর অসিয়ত লিখে যান। তা ছিল নিম্নরূপঃবিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। এটা আবু বকর ইবনে আবি কাহাফা (রাঃ)-এর অসিয়ত। এটা ঐ সময়ের অসিয়ত, যখন তিনি দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছেন। যে সময় কাফিরও মুমিন হয়ে যায়, পাপীও তাওবা করে এবং মিথ্যাবাদীকেও সত্যবাদী মনে করা হয়। আমি উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে তোমাদের উপর আমার খলীফা নিযুক্ত করে যাচ্ছি। সে যদি ইনসাফ করে তবে খুব ভাল কথা এবং তার সম্পর্কে আমার ধারণা এটাই আছে। আর যদি সে যুলুম করে এবং কোন পরিবর্তন আনয়ন করে তবে জেনে রেখো যে, আমি ভবিষ্যদ্রষ্টা নই। অত্যাচারীরা তাদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা সত্বরই জানতে পারবে।”

আশ-শুআরা 26:224

২২১-২২৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, মুশরিকরা বলতো: রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কুরআন নিয়ে আগমন করেছেন তা সত্য নয়। তিনি এটা স্বয়ং রচনা করেছেন। অথবা তার কাছে জ্বিনদের নেতা এসে থাকে যে তাঁকে শিখিয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে এই আপত্তিকর কথা হতে পবিত্র করছেন এবং প্রমাণ করছেন যে, তিনি যে কুরআন আনয়ন করেছেন তা আল্লাহর কালাম এবং তাঁর নিকট হতেই এটা অবতারিত। সম্মানিত, বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আঃ) এটা আনয়ন করেছেন। এটা কোন শয়তান বা জ্বিন আনয়ন করেনি। শয়তানরা তো কুরআনের শিক্ষা হতে সম্পূর্ণ বিমুখ। তাদের শিক্ষা তো কুরআন কারীমের শিক্ষার একেবারে বিপরীত। সুতরাং কি করে তারা কুরআনের ন্যায় পবিত্র ও সুপথ প্রদর্শনকারী কালাম আনয়ন করতঃ মানুষকে সুপথ প্রদর্শন করতে পারে? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। কেননা, তারা নিজেরাও চরম মিথ্যাবাদী ও পাপী। তারা চুরি করে আকাশে যে এক আধটি কথা শুনে নেয়, ওর সাথে বহু কিছু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ যাদুকররা তখন ওর সাথে নিজেদের পক্ষ হতে আরো বহু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে লোকদের মধ্যে প্রচার করে। এখন শয়তান লুকিয়ে যে সত্য কথাটি আকাশে শুনেছিল ওটা সত্যরূপেই প্রকাশিত হয়, কিন্তু লোকেরা ঐ একটি সত্য কথার উপর ভিত্তি করে যাদুকরের আরো শত শত মিথ্যা কথাকেও সত্য বলে বিশ্বাস করে থাকে। এভাবে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একদা জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যাদুকর ও ভবিষ্যদ্বক্তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “তারা কিছুই নয়।” জনগণ বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা এমনও কথা বলে যা সত্য হয়ে থাকে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, এটা ঐ কথা যা জ্বিনেরা-চুরি করে আকাশ হতে শুনে আসে এবং তা ঐ ভবিষ্যদ্বক্তার কানে পৌঁছিয়ে থাকে। অতঃপর ঐ ভবিষ্যদ্বক্তা নিজের পক্ষ হতে শতটি মিথ্যা কথা ওর সাথে মিলিয়ে বলে দেয়।” হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা আকাশে কোন কাজের ফায়সালা করেন তখন ফেরেশতারা আদবের সাথে নিজেদের পালক ঝুঁকিয়ে দেন। কোন কংকরময় ভূমিতে জিঞ্জীর বাজানো হলে যেরূপ শব্দ হয় ঐরূপ শব্দ ঐ সময় আসতে থাকে। যখন ঐ বিহ্বলতা বিদূরিত হয় তখন ফেরেশতারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন (কি হুকুম করেছেন)?” উত্তরে বলা হয়ঃ “তিনি সত্য বলেছেন (সঠিক হুকুম করেছেন)। তিনি সমুন্নত ও মহান।” কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার ঐ হুকুম চুরি করে শ্রবণকারী কোন জ্বিনের কানে পৌঁছে যায় যারা এভাবে একের উপর এক হয়ে ঐ পর্যন্ত পৌঁছে থাকে। হাদীস বর্ণনাকারী হযরত সুফিয়ান (রঃ) স্বীয় হাতের অঙ্গুলীগুলো বিছিয়ে দিয়ে ওর উপর অপর হাত ঐভাবেই রেখে ওগুলোকে মিলিত করে বলেনঃ “এইভাবে।” এখন উপরের জন নীচের জনকে, সে তার নীচের জনকে ঐ কথা বলে দেয়। শেষ পর্যন্ত সর্ব নীচের জন ঐ কথা ভবিষ্যদ্বক্তা বা যাদুকরের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। কখনো কখনো এমনও হয় যে, ঐ কথা পৌঁছাবার পূর্বেই অগ্নিশিখা পৌঁছে যায়, সুতরাং শয়তান ঐ কথা পৌঁছাতে পারে না। আবার কখনো কখনো অগ্নিশিখা পৌঁছার পূর্বেই শয়তান ঐ কথা পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ কথার সাথে যাদুকর নিজের পক্ষ হতে শত শত মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে প্রচার করে দেয়। ঐ একটি কথা সত্যরূপে প্রকাশিত হওয়ায় জনগণ সবগুলোকেই সত্য মনে করে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এই সমুদয় হাদীসের বর্ণনা (আরবি) (৩৪: ২৩) এই আয়াতের তাফসীরে আসবে ইনশাআল্লাহ।সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে এও আছে যে, ফেরেশতারা আসমানী বিষয়ক কথাবার্তা মেঘের উপর বলে থাকেন যা শয়তান শুনে নিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। আর ঐ যাদুকর একটি সত্যের সাথে শতটি মিথ্যা মিলিয়ে দেয়। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (কাফির) কবিদের অনুসরণ বিভ্রান্ত লোকেরাই করে থাকে। আরব কবিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে, কারো নিন্দায় তারা কিছু বলতো। জনগণের একটি দল তাদের সাথে হয়ে যেতো এবং তাদের নিকট হতে ঐ নিন্দাসূচক কবিতা নিয়ে আসতো।একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের একটি দলকে সাথে নিয়ে আ’রজের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে একজন কবির সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয় যে কবিতা পাঠ করতে করতে চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তাকে ধর অথবা তাকে কবিতা পাঠ হতে বিরত রাখো। কারো রক্ত পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি কি দেখো না যে, তারা উড্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? প্রত্যেক বাজে বিষয়ের মধ্যে তারা ঢুকে পড়ে। কারো প্রশংসা করতে গিয়ে তারা তাকে একেবারে আকাশে উঠিয়ে দেয়। মিথ্যা প্রশংসা করে তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে। তারা হয় কথার সওদাগর, কিন্তু কাজে অলস। তারা নিজেরা যা করে না তা বলে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে দু’টি লোক একে অপরকে নিন্দা করে। তাদের একজন ছিল আনসারী এবং অপরজন ছিল অন্য গোত্রের লোক। তখন দুই গোত্রেরই বড় বড় লোকেরা তাদের সাথে যোগ দেয়। তাই এই আয়াতে এটাই রয়েছে যে, বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদেরকে অনুসরণ করে থাকে। তারা ঐ কথা বলে থাকে যা তারা নিজেরা করে না। এজন্যেই আলেমগণ এ ব্যাপারে মতভেদ করেছেন যে, যদি কোন কবি নিজের কবিতার মধ্যে এমন কোন পাপের কথা স্বীকার করে নেয় যার উপর শরীয়তের হদ ওয়াজিব হয়, তবে তার উপর হদ জারী করা যাবে কি যাবে না? আলেমরা দুই দিকেই গিয়েছেন। আসলে তারা ফখর ও গর্ব করে এ ধরনের কথা বলে থাকে। তারা বলেঃ “আমি এই করেছি, ঐ করেছি, অথচ আসলে তারা কিছুই করেনি এবং করতেও পারে না। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) ও মুহাম্মাদ ইবনে সা'দ (রঃ) তাবাকাতে এবং যুবায়ের ইবনে বিকার (রঃ) কিতাবুল ফুকাহাতে বর্ণনা করেছেন যে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাঁর খিলাফতের আমলে হযরত নুমান ইবনে আদী ইবনে ফুলা (রাঃ)-কে বসরার মাইসান শহরের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি একজন কবি ছিলেন। তিনি কবিতায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সুন্দরী মহিলারা কি এ খবর পায়নি যে, তাদের প্রেমিক মাইসানে অবস্থান করছে? যেখানে সদা-সর্বদা শীশার গ্লাসে মদ্যচক্র চলছে? আর গ্রামের তরুণীরা নাচ-গানে মত্ত রয়েছে। হ্যাঁ, যদি আমার কোন বন্ধু দ্বারা এটা সম্ভব হয় তবে এর চেয়ে বড় ও পূর্ণ মদ্যের গ্লাস আমাকে পান করাতে পারে। কিন্তু ছোট গ্লাস আমার নিকট খুবই অপছন্দনীয়। আল্লাহ করুন যেন আমীরুল মুমিনীনের কাছে এ খবর না পেীছে। অন্যথায় তিনি এতে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন এবং আমাকে শাস্তি দিবেন।” ঘটনাক্রমে সত্যিই এ কবিতাগুলো আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট পৌছে যায় এবং সাথে সাথেই তিনি লোক পাঠিয়ে তাঁকে পদচ্যুত করেন এবং তিনি একটি চিঠিও পাঠান। ঐ চিঠিতে তিনি লিখেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। হা-মীম। এই কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিকট হতে, যিনি পাপ ক্ষমা করেন, তওবা কবুল করেন, যিনি শাস্তি দানে কঠোর, শক্তিশালী। তিনি ছাড়া কোন মা'বূদ নেই। প্রত্যাবর্তন তাঁরই নিকট। অতঃপর আমার কাছে তোমার (কবিতার) কথা পৌঁছেছে। আল্লাহর কসম! অবশ্যই ওটা আমাকে অসন্তুষ্ট করেছে। তাই আমি তোমাকে পদচ্যুত করলাম।" এ চিঠি পাঠ মাত্রই হযরত নু'মান (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে যান এবং অত্যন্ত দ্রতার সাথে আরয করেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনো মদ্যপানও করিনি, নাচও দেখিনি এবং গান বাজনাও করিনি। এটা তো শুধু কবিতাসূচক আবেগ-উচ্ছ্বাস ছিল।” তাঁর একথা শুনে আমীরুল মুমিনীন বলেনঃ “আমারও ধারণা এটাই ছিল। কিন্তু আমি তো এটা সহ্য করতে পারি না যে, এরূপ অশ্লীলভাষী কবিকে কোন পদে রেখে দিই।” তাহলে বুঝা গেল যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর মতেও কবি যদি তার কবিতার মাধ্যমে এমন কোন অপরাধের কথা ঘোষণা করে যা হদের যোগ্য, তবুও তাকে হদ মারা যাবে না। কেননা, সে বলে বটে, কিন্তু করে না। তবে নিঃসন্দেহে সে তিরস্কার ও নিন্দার যোগ্য। হাদীসে আছে যে, রক্ত, পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম। ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবিও নন, যাদুকরও নন, ভবিষ্যদ্বক্তাও নন এবং মিথ্যা আরোপকারীও নন। তাঁর বাহ্যিক অবস্থাই তাঁর এসব দোষ হতে মুক্ত হওয়ার বড় সাক্ষী। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি রাসূল (সঃ)-কে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয় নয়, এটাতো শুধু এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন।” (৩৬:৬৯) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “এটা কোন কবির রচনা নয়, তোমরা অল্পই বিশ্বাস কর। এটা কোন গণকের কথাও নয়, তোমরা অল্পই অনুধাবন কর। এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ।” (৬৯: ৪১-৪৩) অনুরূপভাবে এখানে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আর নিশ্চয়ই এটা (আল-কুরআন) জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। জিবরাঈল (আঃ) এটা নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার। অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।” (২৬:১৯২-১৯৫) এ সূরারই আর একটি জায়গায় বলেছেনঃ “শয়তানরা ওটাসহ অবতীর্ণ হয়নি। তারা এ কাজের যোগ্য নয় এবং তারা এর সামর্থ্যও রাখে না। তাদেরকে তো শ্রবণের সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে। এর আরো কিছু পরে বলেছেনঃ “তোমাদেরকে কি আমি জানিয়ে দেবো কার কাছে শয়তানরা অবতীর্ণ হয়? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। তারা কান পেতে থাকে এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। আর কবিদেরকে অনুসরণ করে তারা যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখো না তারা। উল্লান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং যা করে না তা বলে।” এরপরে যা রয়েছে তার শানে নুযূল এই যে, এর পূর্ববর্তী আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় (যাতে কবিদেরকে নিন্দে করা হয়েছে), তখন নবী (সঃ)-এর দরবারের কবিরা যেমন হযরত হাস্সান ইবনে সাবিত (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) এবং হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো কবিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। আমরাও তো কুবি (সুতরাং আমরাও তো তাহলে নিন্দনীয়?)।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই পরবর্তী আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “ঈমান আনয়নকারী ও সৎকর্মশীল তোমরাই এবং আল্লাহকে বার বার স্মরণকারীও তোমরাই। তোমরাই অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণকারী। সুতরাং তোমরা এদের হতে স্বতন্ত্র।”অন্য একটি রিওয়াইয়াতে হযরত কা'ব (রাঃ)-এর নাম নেই। একটি রিওয়াইয়াতে শুধু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-এর কথা আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও তো কবি?” তারই একথার পরিপ্রেক্ষিতে (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কথা বর্ণিত আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এটা মক্কী সূরা। আর আনসার কবিরা মক্কায় ছিলেন না। তারা সবাই ছিলেন মদীনায়। কাজেই তাদের ব্যাপারে এ সূরা অবতীর্ণ হওয়া অসম্ভবই বটে। যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে ওগুলো মুরসাল। সুতরাং এগুলোর উপর ভরসা করা যায় না। তবে এ আয়াতটি যে স্বাতন্ত্রের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে তাতে সন্দেহের লেশ মাত্র নেই। আর এই স্বাতন্ত্র শুধু এই আনসার কবিদের ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যে কোন কবি তার অজ্ঞতার যুগে যদি ইসলাম ও মুসলমানদের বিপক্ষে কবিতা লিখে থাকে, অতঃপর মুসলমান হয়ে গিয়ে তাওবা করে থাকে এবং পূর্বের দুষ্কর্মের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বার বার আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে তবে তারাও নিন্দনীয় কবিদের হতে স্বতন্ত্র হবে। কেননা, সৎ কার্যাবলী দুষ্কর্মগুলোকে মিটিয়ে দেয়। তাহলে সে যখন কবিতার মাধ্যমে মুসলমানদের দুর্নাম করেছিল এবং আল্লাহর দ্বীনকে মন্দ বলেছিল তখন ওটা নিঃসন্দেহে মন্দ কাজই ছিল। কিন্তু পরে যখন সে মুসলমানদের ও ইসলামের প্রশংসা করলো তখন ঐ দুষ্কর্ম সকর্মে পরিবর্তিত হয়ে গেল। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যাবআরী (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুর্নাম করেছিলেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর বড়ই প্রশংসা করেছিলেন এবং পূর্বে যে তিনি তাঁর দুর্নাম করেছিলেন, কবিতার মাধ্যমে ওর ওজর পেশ করতে গিয়ে বলেন যে, ঐ সময় তিনি শয়তানের খপ্পরে পড়েছিলেন। অনুরূপভাবে হযরত আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচাতো ভাই হওয়া সত্ত্বেও তার একজন বড় শত্রু ছিলেন এবং কবিতার মাধ্যমে তাঁর খুবই দুর্নাম করতেন। কিন্তু যখন তিনি মুসলমান হলেন তখন এমন পাকা মুসলমান হলেন যে, সারা দুনিয়ায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) অপেক্ষা বড় প্রিয়জন তাঁর কাছে আর কেউই ছিল না। প্রায়ই তিনি তাঁর প্রশংসা করতেন এবং তার সাথে অত্যন্ত ভালবাসা রাখতেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারব যখন মুসলমান হন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে আপনি তিনটি জিনিস দান করুন। প্রথম এই যে, আমার পুত্র মুআবিয়া (রাঃ)-কে আপনার লেখক (অর্থাৎ অহী লেখক) বানিয়ে নিন। দ্বিতীয় এই যে, আমার সাথে এক দল সৈন্য প্রেরণ করুন যাতে আমি কাফিরদের সাথে লড়তে পারি যেমন আমি মুসলমানদের সাথে লড়তাম।” তাঁর এই দু’টি আবেদনই রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবুল করে নেন। তৃতীয় আর একটি আবেদন তিনি করেন এবং সেটাও গৃহীত হয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) সুতরাং এই লোকদেরকে পূর্ববর্তী আয়াতের হুকুম হতে এই পরবর্তী আয়াত দ্বারা পৃথক করা হয়েছে। আল্লাহর অধিক স্মরণ তাঁরা তাঁদের কবিতার মাধ্যমেই করুন অথবা অন্য কোন প্রকারে করুন, নিশ্চিতরূপে তা তাদের পূর্ববর্তী পাপসমূহের কাফফারা হয়ে যাবে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে অর্থাৎ কবিতার মাধ্যমে তারা কাফিরদের নিন্দামূলক কবিতার জবাব দিয়ে থাকেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ “তুমি কাফিরদের নিন্দা করে কবিতা রচনা কর, হযরত জিবরাঈল (আঃ) তোমার সাথে রয়েছেন।”হযরত কাব ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন তিনি কুরআন পাকে কবিদের নিন্দা শুনেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আর্য করেনঃ “আল্লাহ তা'আলা (কবিদের সম্পর্কে) যা নাযিল করার তা তো নাযিল করেছেন (তাহলে আমিও কি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত?)।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “ (না, না, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও। জেনে রেখো যে,) মুমিন তরবারী ও জিহ্বা দ্বারা জিহাদ করে থাকে। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদের কবিতাগুলো তো তাদেরকে (কাফিরদেরকে) মুজাহিদের তীরের ন্যায় ছিদ্র করে দিয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অত্যাচারীদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা তারা শীঘ্রই জানতে পারবে। সেই দিন তাদের ওজর আপত্তি কোন কাজে আসবে না। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যুলুম হতে বেঁচে থাকো। কারণ কিয়ামতের দিন যুলুম অন্ধকারের কারণ হবে।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ পাকের (আরবি) উক্তিটি আম বা সাধারণ, কবি হোক বা অন্য কেউ হোক, সবাই এর অন্তর্ভুক্ত।হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন খৃষ্টানের জানাযা যেতে দেখে এ আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন। তিনি যখন এ আয়াতটি পাঠ করতেন তখন এতো কাঁদতেন যে, তাঁর হেঁচকী বন্ধ হয়ে যেতো।হযরত ফুযালা ইবনে উবায়েদ (রঃ) যখন রোমে আগমন করেন তখন একটি লোক নামায পড়ছিলেন। যখন লোকটি (আরবি) আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, এর দ্বারা বায়তুল্লাহর ধ্বংসকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা মক্কাবাসী উদ্দেশ্য। আবার এটাও বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুশরিকরা উদ্দেশ্য। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আয়াতটি হলো সাধারণ। সুতরাং এটা সব যালিমকেই অন্তর্ভুক্তকারী।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর মৃত্যুর সময় মাত্র দু'টি লাইনে তাঁর অসিয়ত লিখে যান। তা ছিল নিম্নরূপঃবিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। এটা আবু বকর ইবনে আবি কাহাফা (রাঃ)-এর অসিয়ত। এটা ঐ সময়ের অসিয়ত, যখন তিনি দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছেন। যে সময় কাফিরও মুমিন হয়ে যায়, পাপীও তাওবা করে এবং মিথ্যাবাদীকেও সত্যবাদী মনে করা হয়। আমি উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে তোমাদের উপর আমার খলীফা নিযুক্ত করে যাচ্ছি। সে যদি ইনসাফ করে তবে খুব ভাল কথা এবং তার সম্পর্কে আমার ধারণা এটাই আছে। আর যদি সে যুলুম করে এবং কোন পরিবর্তন আনয়ন করে তবে জেনে রেখো যে, আমি ভবিষ্যদ্রষ্টা নই। অত্যাচারীরা তাদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা সত্বরই জানতে পারবে।”

আশ-শুআরা 26:225

২২১-২২৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, মুশরিকরা বলতো: রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কুরআন নিয়ে আগমন করেছেন তা সত্য নয়। তিনি এটা স্বয়ং রচনা করেছেন। অথবা তার কাছে জ্বিনদের নেতা এসে থাকে যে তাঁকে শিখিয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে এই আপত্তিকর কথা হতে পবিত্র করছেন এবং প্রমাণ করছেন যে, তিনি যে কুরআন আনয়ন করেছেন তা আল্লাহর কালাম এবং তাঁর নিকট হতেই এটা অবতারিত। সম্মানিত, বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আঃ) এটা আনয়ন করেছেন। এটা কোন শয়তান বা জ্বিন আনয়ন করেনি। শয়তানরা তো কুরআনের শিক্ষা হতে সম্পূর্ণ বিমুখ। তাদের শিক্ষা তো কুরআন কারীমের শিক্ষার একেবারে বিপরীত। সুতরাং কি করে তারা কুরআনের ন্যায় পবিত্র ও সুপথ প্রদর্শনকারী কালাম আনয়ন করতঃ মানুষকে সুপথ প্রদর্শন করতে পারে? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। কেননা, তারা নিজেরাও চরম মিথ্যাবাদী ও পাপী। তারা চুরি করে আকাশে যে এক আধটি কথা শুনে নেয়, ওর সাথে বহু কিছু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ যাদুকররা তখন ওর সাথে নিজেদের পক্ষ হতে আরো বহু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে লোকদের মধ্যে প্রচার করে। এখন শয়তান লুকিয়ে যে সত্য কথাটি আকাশে শুনেছিল ওটা সত্যরূপেই প্রকাশিত হয়, কিন্তু লোকেরা ঐ একটি সত্য কথার উপর ভিত্তি করে যাদুকরের আরো শত শত মিথ্যা কথাকেও সত্য বলে বিশ্বাস করে থাকে। এভাবে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একদা জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যাদুকর ও ভবিষ্যদ্বক্তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “তারা কিছুই নয়।” জনগণ বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা এমনও কথা বলে যা সত্য হয়ে থাকে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, এটা ঐ কথা যা জ্বিনেরা-চুরি করে আকাশ হতে শুনে আসে এবং তা ঐ ভবিষ্যদ্বক্তার কানে পৌঁছিয়ে থাকে। অতঃপর ঐ ভবিষ্যদ্বক্তা নিজের পক্ষ হতে শতটি মিথ্যা কথা ওর সাথে মিলিয়ে বলে দেয়।” হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা আকাশে কোন কাজের ফায়সালা করেন তখন ফেরেশতারা আদবের সাথে নিজেদের পালক ঝুঁকিয়ে দেন। কোন কংকরময় ভূমিতে জিঞ্জীর বাজানো হলে যেরূপ শব্দ হয় ঐরূপ শব্দ ঐ সময় আসতে থাকে। যখন ঐ বিহ্বলতা বিদূরিত হয় তখন ফেরেশতারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন (কি হুকুম করেছেন)?” উত্তরে বলা হয়ঃ “তিনি সত্য বলেছেন (সঠিক হুকুম করেছেন)। তিনি সমুন্নত ও মহান।” কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার ঐ হুকুম চুরি করে শ্রবণকারী কোন জ্বিনের কানে পৌঁছে যায় যারা এভাবে একের উপর এক হয়ে ঐ পর্যন্ত পৌঁছে থাকে। হাদীস বর্ণনাকারী হযরত সুফিয়ান (রঃ) স্বীয় হাতের অঙ্গুলীগুলো বিছিয়ে দিয়ে ওর উপর অপর হাত ঐভাবেই রেখে ওগুলোকে মিলিত করে বলেনঃ “এইভাবে।” এখন উপরের জন নীচের জনকে, সে তার নীচের জনকে ঐ কথা বলে দেয়। শেষ পর্যন্ত সর্ব নীচের জন ঐ কথা ভবিষ্যদ্বক্তা বা যাদুকরের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। কখনো কখনো এমনও হয় যে, ঐ কথা পৌঁছাবার পূর্বেই অগ্নিশিখা পৌঁছে যায়, সুতরাং শয়তান ঐ কথা পৌঁছাতে পারে না। আবার কখনো কখনো অগ্নিশিখা পৌঁছার পূর্বেই শয়তান ঐ কথা পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ কথার সাথে যাদুকর নিজের পক্ষ হতে শত শত মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে প্রচার করে দেয়। ঐ একটি কথা সত্যরূপে প্রকাশিত হওয়ায় জনগণ সবগুলোকেই সত্য মনে করে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এই সমুদয় হাদীসের বর্ণনা (আরবি) (৩৪: ২৩) এই আয়াতের তাফসীরে আসবে ইনশাআল্লাহ।সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে এও আছে যে, ফেরেশতারা আসমানী বিষয়ক কথাবার্তা মেঘের উপর বলে থাকেন যা শয়তান শুনে নিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। আর ঐ যাদুকর একটি সত্যের সাথে শতটি মিথ্যা মিলিয়ে দেয়। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (কাফির) কবিদের অনুসরণ বিভ্রান্ত লোকেরাই করে থাকে। আরব কবিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে, কারো নিন্দায় তারা কিছু বলতো। জনগণের একটি দল তাদের সাথে হয়ে যেতো এবং তাদের নিকট হতে ঐ নিন্দাসূচক কবিতা নিয়ে আসতো।একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের একটি দলকে সাথে নিয়ে আ’রজের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে একজন কবির সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয় যে কবিতা পাঠ করতে করতে চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তাকে ধর অথবা তাকে কবিতা পাঠ হতে বিরত রাখো। কারো রক্ত পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি কি দেখো না যে, তারা উড্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? প্রত্যেক বাজে বিষয়ের মধ্যে তারা ঢুকে পড়ে। কারো প্রশংসা করতে গিয়ে তারা তাকে একেবারে আকাশে উঠিয়ে দেয়। মিথ্যা প্রশংসা করে তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে। তারা হয় কথার সওদাগর, কিন্তু কাজে অলস। তারা নিজেরা যা করে না তা বলে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে দু’টি লোক একে অপরকে নিন্দা করে। তাদের একজন ছিল আনসারী এবং অপরজন ছিল অন্য গোত্রের লোক। তখন দুই গোত্রেরই বড় বড় লোকেরা তাদের সাথে যোগ দেয়। তাই এই আয়াতে এটাই রয়েছে যে, বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদেরকে অনুসরণ করে থাকে। তারা ঐ কথা বলে থাকে যা তারা নিজেরা করে না। এজন্যেই আলেমগণ এ ব্যাপারে মতভেদ করেছেন যে, যদি কোন কবি নিজের কবিতার মধ্যে এমন কোন পাপের কথা স্বীকার করে নেয় যার উপর শরীয়তের হদ ওয়াজিব হয়, তবে তার উপর হদ জারী করা যাবে কি যাবে না? আলেমরা দুই দিকেই গিয়েছেন। আসলে তারা ফখর ও গর্ব করে এ ধরনের কথা বলে থাকে। তারা বলেঃ “আমি এই করেছি, ঐ করেছি, অথচ আসলে তারা কিছুই করেনি এবং করতেও পারে না। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) ও মুহাম্মাদ ইবনে সা'দ (রঃ) তাবাকাতে এবং যুবায়ের ইবনে বিকার (রঃ) কিতাবুল ফুকাহাতে বর্ণনা করেছেন যে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাঁর খিলাফতের আমলে হযরত নুমান ইবনে আদী ইবনে ফুলা (রাঃ)-কে বসরার মাইসান শহরের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি একজন কবি ছিলেন। তিনি কবিতায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সুন্দরী মহিলারা কি এ খবর পায়নি যে, তাদের প্রেমিক মাইসানে অবস্থান করছে? যেখানে সদা-সর্বদা শীশার গ্লাসে মদ্যচক্র চলছে? আর গ্রামের তরুণীরা নাচ-গানে মত্ত রয়েছে। হ্যাঁ, যদি আমার কোন বন্ধু দ্বারা এটা সম্ভব হয় তবে এর চেয়ে বড় ও পূর্ণ মদ্যের গ্লাস আমাকে পান করাতে পারে। কিন্তু ছোট গ্লাস আমার নিকট খুবই অপছন্দনীয়। আল্লাহ করুন যেন আমীরুল মুমিনীনের কাছে এ খবর না পেীছে। অন্যথায় তিনি এতে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন এবং আমাকে শাস্তি দিবেন।” ঘটনাক্রমে সত্যিই এ কবিতাগুলো আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট পৌছে যায় এবং সাথে সাথেই তিনি লোক পাঠিয়ে তাঁকে পদচ্যুত করেন এবং তিনি একটি চিঠিও পাঠান। ঐ চিঠিতে তিনি লিখেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। হা-মীম। এই কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিকট হতে, যিনি পাপ ক্ষমা করেন, তওবা কবুল করেন, যিনি শাস্তি দানে কঠোর, শক্তিশালী। তিনি ছাড়া কোন মা'বূদ নেই। প্রত্যাবর্তন তাঁরই নিকট। অতঃপর আমার কাছে তোমার (কবিতার) কথা পৌঁছেছে। আল্লাহর কসম! অবশ্যই ওটা আমাকে অসন্তুষ্ট করেছে। তাই আমি তোমাকে পদচ্যুত করলাম।" এ চিঠি পাঠ মাত্রই হযরত নু'মান (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে যান এবং অত্যন্ত দ্রতার সাথে আরয করেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনো মদ্যপানও করিনি, নাচও দেখিনি এবং গান বাজনাও করিনি। এটা তো শুধু কবিতাসূচক আবেগ-উচ্ছ্বাস ছিল।” তাঁর একথা শুনে আমীরুল মুমিনীন বলেনঃ “আমারও ধারণা এটাই ছিল। কিন্তু আমি তো এটা সহ্য করতে পারি না যে, এরূপ অশ্লীলভাষী কবিকে কোন পদে রেখে দিই।” তাহলে বুঝা গেল যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর মতেও কবি যদি তার কবিতার মাধ্যমে এমন কোন অপরাধের কথা ঘোষণা করে যা হদের যোগ্য, তবুও তাকে হদ মারা যাবে না। কেননা, সে বলে বটে, কিন্তু করে না। তবে নিঃসন্দেহে সে তিরস্কার ও নিন্দার যোগ্য। হাদীসে আছে যে, রক্ত, পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম। ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবিও নন, যাদুকরও নন, ভবিষ্যদ্বক্তাও নন এবং মিথ্যা আরোপকারীও নন। তাঁর বাহ্যিক অবস্থাই তাঁর এসব দোষ হতে মুক্ত হওয়ার বড় সাক্ষী। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি রাসূল (সঃ)-কে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয় নয়, এটাতো শুধু এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন।” (৩৬:৬৯) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “এটা কোন কবির রচনা নয়, তোমরা অল্পই বিশ্বাস কর। এটা কোন গণকের কথাও নয়, তোমরা অল্পই অনুধাবন কর। এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ।” (৬৯: ৪১-৪৩) অনুরূপভাবে এখানে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আর নিশ্চয়ই এটা (আল-কুরআন) জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। জিবরাঈল (আঃ) এটা নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার। অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।” (২৬:১৯২-১৯৫) এ সূরারই আর একটি জায়গায় বলেছেনঃ “শয়তানরা ওটাসহ অবতীর্ণ হয়নি। তারা এ কাজের যোগ্য নয় এবং তারা এর সামর্থ্যও রাখে না। তাদেরকে তো শ্রবণের সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে। এর আরো কিছু পরে বলেছেনঃ “তোমাদেরকে কি আমি জানিয়ে দেবো কার কাছে শয়তানরা অবতীর্ণ হয়? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। তারা কান পেতে থাকে এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। আর কবিদেরকে অনুসরণ করে তারা যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখো না তারা। উল্লান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং যা করে না তা বলে।” এরপরে যা রয়েছে তার শানে নুযূল এই যে, এর পূর্ববর্তী আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় (যাতে কবিদেরকে নিন্দে করা হয়েছে), তখন নবী (সঃ)-এর দরবারের কবিরা যেমন হযরত হাস্সান ইবনে সাবিত (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) এবং হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো কবিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। আমরাও তো কুবি (সুতরাং আমরাও তো তাহলে নিন্দনীয়?)।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই পরবর্তী আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “ঈমান আনয়নকারী ও সৎকর্মশীল তোমরাই এবং আল্লাহকে বার বার স্মরণকারীও তোমরাই। তোমরাই অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণকারী। সুতরাং তোমরা এদের হতে স্বতন্ত্র।”অন্য একটি রিওয়াইয়াতে হযরত কা'ব (রাঃ)-এর নাম নেই। একটি রিওয়াইয়াতে শুধু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-এর কথা আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও তো কবি?” তারই একথার পরিপ্রেক্ষিতে (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কথা বর্ণিত আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এটা মক্কী সূরা। আর আনসার কবিরা মক্কায় ছিলেন না। তারা সবাই ছিলেন মদীনায়। কাজেই তাদের ব্যাপারে এ সূরা অবতীর্ণ হওয়া অসম্ভবই বটে। যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে ওগুলো মুরসাল। সুতরাং এগুলোর উপর ভরসা করা যায় না। তবে এ আয়াতটি যে স্বাতন্ত্রের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে তাতে সন্দেহের লেশ মাত্র নেই। আর এই স্বাতন্ত্র শুধু এই আনসার কবিদের ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যে কোন কবি তার অজ্ঞতার যুগে যদি ইসলাম ও মুসলমানদের বিপক্ষে কবিতা লিখে থাকে, অতঃপর মুসলমান হয়ে গিয়ে তাওবা করে থাকে এবং পূর্বের দুষ্কর্মের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বার বার আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে তবে তারাও নিন্দনীয় কবিদের হতে স্বতন্ত্র হবে। কেননা, সৎ কার্যাবলী দুষ্কর্মগুলোকে মিটিয়ে দেয়। তাহলে সে যখন কবিতার মাধ্যমে মুসলমানদের দুর্নাম করেছিল এবং আল্লাহর দ্বীনকে মন্দ বলেছিল তখন ওটা নিঃসন্দেহে মন্দ কাজই ছিল। কিন্তু পরে যখন সে মুসলমানদের ও ইসলামের প্রশংসা করলো তখন ঐ দুষ্কর্ম সকর্মে পরিবর্তিত হয়ে গেল। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যাবআরী (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুর্নাম করেছিলেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর বড়ই প্রশংসা করেছিলেন এবং পূর্বে যে তিনি তাঁর দুর্নাম করেছিলেন, কবিতার মাধ্যমে ওর ওজর পেশ করতে গিয়ে বলেন যে, ঐ সময় তিনি শয়তানের খপ্পরে পড়েছিলেন। অনুরূপভাবে হযরত আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচাতো ভাই হওয়া সত্ত্বেও তার একজন বড় শত্রু ছিলেন এবং কবিতার মাধ্যমে তাঁর খুবই দুর্নাম করতেন। কিন্তু যখন তিনি মুসলমান হলেন তখন এমন পাকা মুসলমান হলেন যে, সারা দুনিয়ায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) অপেক্ষা বড় প্রিয়জন তাঁর কাছে আর কেউই ছিল না। প্রায়ই তিনি তাঁর প্রশংসা করতেন এবং তার সাথে অত্যন্ত ভালবাসা রাখতেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারব যখন মুসলমান হন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে আপনি তিনটি জিনিস দান করুন। প্রথম এই যে, আমার পুত্র মুআবিয়া (রাঃ)-কে আপনার লেখক (অর্থাৎ অহী লেখক) বানিয়ে নিন। দ্বিতীয় এই যে, আমার সাথে এক দল সৈন্য প্রেরণ করুন যাতে আমি কাফিরদের সাথে লড়তে পারি যেমন আমি মুসলমানদের সাথে লড়তাম।” তাঁর এই দু’টি আবেদনই রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবুল করে নেন। তৃতীয় আর একটি আবেদন তিনি করেন এবং সেটাও গৃহীত হয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) সুতরাং এই লোকদেরকে পূর্ববর্তী আয়াতের হুকুম হতে এই পরবর্তী আয়াত দ্বারা পৃথক করা হয়েছে। আল্লাহর অধিক স্মরণ তাঁরা তাঁদের কবিতার মাধ্যমেই করুন অথবা অন্য কোন প্রকারে করুন, নিশ্চিতরূপে তা তাদের পূর্ববর্তী পাপসমূহের কাফফারা হয়ে যাবে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে অর্থাৎ কবিতার মাধ্যমে তারা কাফিরদের নিন্দামূলক কবিতার জবাব দিয়ে থাকেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ “তুমি কাফিরদের নিন্দা করে কবিতা রচনা কর, হযরত জিবরাঈল (আঃ) তোমার সাথে রয়েছেন।”হযরত কাব ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন তিনি কুরআন পাকে কবিদের নিন্দা শুনেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আর্য করেনঃ “আল্লাহ তা'আলা (কবিদের সম্পর্কে) যা নাযিল করার তা তো নাযিল করেছেন (তাহলে আমিও কি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত?)।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “ (না, না, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও। জেনে রেখো যে,) মুমিন তরবারী ও জিহ্বা দ্বারা জিহাদ করে থাকে। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদের কবিতাগুলো তো তাদেরকে (কাফিরদেরকে) মুজাহিদের তীরের ন্যায় ছিদ্র করে দিয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অত্যাচারীদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা তারা শীঘ্রই জানতে পারবে। সেই দিন তাদের ওজর আপত্তি কোন কাজে আসবে না। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যুলুম হতে বেঁচে থাকো। কারণ কিয়ামতের দিন যুলুম অন্ধকারের কারণ হবে।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ পাকের (আরবি) উক্তিটি আম বা সাধারণ, কবি হোক বা অন্য কেউ হোক, সবাই এর অন্তর্ভুক্ত।হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন খৃষ্টানের জানাযা যেতে দেখে এ আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন। তিনি যখন এ আয়াতটি পাঠ করতেন তখন এতো কাঁদতেন যে, তাঁর হেঁচকী বন্ধ হয়ে যেতো।হযরত ফুযালা ইবনে উবায়েদ (রঃ) যখন রোমে আগমন করেন তখন একটি লোক নামায পড়ছিলেন। যখন লোকটি (আরবি) আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, এর দ্বারা বায়তুল্লাহর ধ্বংসকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা মক্কাবাসী উদ্দেশ্য। আবার এটাও বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুশরিকরা উদ্দেশ্য। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আয়াতটি হলো সাধারণ। সুতরাং এটা সব যালিমকেই অন্তর্ভুক্তকারী।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর মৃত্যুর সময় মাত্র দু'টি লাইনে তাঁর অসিয়ত লিখে যান। তা ছিল নিম্নরূপঃবিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। এটা আবু বকর ইবনে আবি কাহাফা (রাঃ)-এর অসিয়ত। এটা ঐ সময়ের অসিয়ত, যখন তিনি দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছেন। যে সময় কাফিরও মুমিন হয়ে যায়, পাপীও তাওবা করে এবং মিথ্যাবাদীকেও সত্যবাদী মনে করা হয়। আমি উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে তোমাদের উপর আমার খলীফা নিযুক্ত করে যাচ্ছি। সে যদি ইনসাফ করে তবে খুব ভাল কথা এবং তার সম্পর্কে আমার ধারণা এটাই আছে। আর যদি সে যুলুম করে এবং কোন পরিবর্তন আনয়ন করে তবে জেনে রেখো যে, আমি ভবিষ্যদ্রষ্টা নই। অত্যাচারীরা তাদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা সত্বরই জানতে পারবে।”

আশ-শুআরা 26:226

২২১-২২৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, মুশরিকরা বলতো: রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কুরআন নিয়ে আগমন করেছেন তা সত্য নয়। তিনি এটা স্বয়ং রচনা করেছেন। অথবা তার কাছে জ্বিনদের নেতা এসে থাকে যে তাঁকে শিখিয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে এই আপত্তিকর কথা হতে পবিত্র করছেন এবং প্রমাণ করছেন যে, তিনি যে কুরআন আনয়ন করেছেন তা আল্লাহর কালাম এবং তাঁর নিকট হতেই এটা অবতারিত। সম্মানিত, বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আঃ) এটা আনয়ন করেছেন। এটা কোন শয়তান বা জ্বিন আনয়ন করেনি। শয়তানরা তো কুরআনের শিক্ষা হতে সম্পূর্ণ বিমুখ। তাদের শিক্ষা তো কুরআন কারীমের শিক্ষার একেবারে বিপরীত। সুতরাং কি করে তারা কুরআনের ন্যায় পবিত্র ও সুপথ প্রদর্শনকারী কালাম আনয়ন করতঃ মানুষকে সুপথ প্রদর্শন করতে পারে? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। কেননা, তারা নিজেরাও চরম মিথ্যাবাদী ও পাপী। তারা চুরি করে আকাশে যে এক আধটি কথা শুনে নেয়, ওর সাথে বহু কিছু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ যাদুকররা তখন ওর সাথে নিজেদের পক্ষ হতে আরো বহু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে লোকদের মধ্যে প্রচার করে। এখন শয়তান লুকিয়ে যে সত্য কথাটি আকাশে শুনেছিল ওটা সত্যরূপেই প্রকাশিত হয়, কিন্তু লোকেরা ঐ একটি সত্য কথার উপর ভিত্তি করে যাদুকরের আরো শত শত মিথ্যা কথাকেও সত্য বলে বিশ্বাস করে থাকে। এভাবে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একদা জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যাদুকর ও ভবিষ্যদ্বক্তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “তারা কিছুই নয়।” জনগণ বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা এমনও কথা বলে যা সত্য হয়ে থাকে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, এটা ঐ কথা যা জ্বিনেরা-চুরি করে আকাশ হতে শুনে আসে এবং তা ঐ ভবিষ্যদ্বক্তার কানে পৌঁছিয়ে থাকে। অতঃপর ঐ ভবিষ্যদ্বক্তা নিজের পক্ষ হতে শতটি মিথ্যা কথা ওর সাথে মিলিয়ে বলে দেয়।” হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা আকাশে কোন কাজের ফায়সালা করেন তখন ফেরেশতারা আদবের সাথে নিজেদের পালক ঝুঁকিয়ে দেন। কোন কংকরময় ভূমিতে জিঞ্জীর বাজানো হলে যেরূপ শব্দ হয় ঐরূপ শব্দ ঐ সময় আসতে থাকে। যখন ঐ বিহ্বলতা বিদূরিত হয় তখন ফেরেশতারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন (কি হুকুম করেছেন)?” উত্তরে বলা হয়ঃ “তিনি সত্য বলেছেন (সঠিক হুকুম করেছেন)। তিনি সমুন্নত ও মহান।” কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার ঐ হুকুম চুরি করে শ্রবণকারী কোন জ্বিনের কানে পৌঁছে যায় যারা এভাবে একের উপর এক হয়ে ঐ পর্যন্ত পৌঁছে থাকে। হাদীস বর্ণনাকারী হযরত সুফিয়ান (রঃ) স্বীয় হাতের অঙ্গুলীগুলো বিছিয়ে দিয়ে ওর উপর অপর হাত ঐভাবেই রেখে ওগুলোকে মিলিত করে বলেনঃ “এইভাবে।” এখন উপরের জন নীচের জনকে, সে তার নীচের জনকে ঐ কথা বলে দেয়। শেষ পর্যন্ত সর্ব নীচের জন ঐ কথা ভবিষ্যদ্বক্তা বা যাদুকরের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। কখনো কখনো এমনও হয় যে, ঐ কথা পৌঁছাবার পূর্বেই অগ্নিশিখা পৌঁছে যায়, সুতরাং শয়তান ঐ কথা পৌঁছাতে পারে না। আবার কখনো কখনো অগ্নিশিখা পৌঁছার পূর্বেই শয়তান ঐ কথা পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ কথার সাথে যাদুকর নিজের পক্ষ হতে শত শত মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে প্রচার করে দেয়। ঐ একটি কথা সত্যরূপে প্রকাশিত হওয়ায় জনগণ সবগুলোকেই সত্য মনে করে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এই সমুদয় হাদীসের বর্ণনা (আরবি) (৩৪: ২৩) এই আয়াতের তাফসীরে আসবে ইনশাআল্লাহ।সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে এও আছে যে, ফেরেশতারা আসমানী বিষয়ক কথাবার্তা মেঘের উপর বলে থাকেন যা শয়তান শুনে নিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। আর ঐ যাদুকর একটি সত্যের সাথে শতটি মিথ্যা মিলিয়ে দেয়। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (কাফির) কবিদের অনুসরণ বিভ্রান্ত লোকেরাই করে থাকে। আরব কবিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে, কারো নিন্দায় তারা কিছু বলতো। জনগণের একটি দল তাদের সাথে হয়ে যেতো এবং তাদের নিকট হতে ঐ নিন্দাসূচক কবিতা নিয়ে আসতো।একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের একটি দলকে সাথে নিয়ে আ’রজের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে একজন কবির সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয় যে কবিতা পাঠ করতে করতে চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তাকে ধর অথবা তাকে কবিতা পাঠ হতে বিরত রাখো। কারো রক্ত পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি কি দেখো না যে, তারা উড্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? প্রত্যেক বাজে বিষয়ের মধ্যে তারা ঢুকে পড়ে। কারো প্রশংসা করতে গিয়ে তারা তাকে একেবারে আকাশে উঠিয়ে দেয়। মিথ্যা প্রশংসা করে তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে। তারা হয় কথার সওদাগর, কিন্তু কাজে অলস। তারা নিজেরা যা করে না তা বলে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে দু’টি লোক একে অপরকে নিন্দা করে। তাদের একজন ছিল আনসারী এবং অপরজন ছিল অন্য গোত্রের লোক। তখন দুই গোত্রেরই বড় বড় লোকেরা তাদের সাথে যোগ দেয়। তাই এই আয়াতে এটাই রয়েছে যে, বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদেরকে অনুসরণ করে থাকে। তারা ঐ কথা বলে থাকে যা তারা নিজেরা করে না। এজন্যেই আলেমগণ এ ব্যাপারে মতভেদ করেছেন যে, যদি কোন কবি নিজের কবিতার মধ্যে এমন কোন পাপের কথা স্বীকার করে নেয় যার উপর শরীয়তের হদ ওয়াজিব হয়, তবে তার উপর হদ জারী করা যাবে কি যাবে না? আলেমরা দুই দিকেই গিয়েছেন। আসলে তারা ফখর ও গর্ব করে এ ধরনের কথা বলে থাকে। তারা বলেঃ “আমি এই করেছি, ঐ করেছি, অথচ আসলে তারা কিছুই করেনি এবং করতেও পারে না। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) ও মুহাম্মাদ ইবনে সা'দ (রঃ) তাবাকাতে এবং যুবায়ের ইবনে বিকার (রঃ) কিতাবুল ফুকাহাতে বর্ণনা করেছেন যে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাঁর খিলাফতের আমলে হযরত নুমান ইবনে আদী ইবনে ফুলা (রাঃ)-কে বসরার মাইসান শহরের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি একজন কবি ছিলেন। তিনি কবিতায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সুন্দরী মহিলারা কি এ খবর পায়নি যে, তাদের প্রেমিক মাইসানে অবস্থান করছে? যেখানে সদা-সর্বদা শীশার গ্লাসে মদ্যচক্র চলছে? আর গ্রামের তরুণীরা নাচ-গানে মত্ত রয়েছে। হ্যাঁ, যদি আমার কোন বন্ধু দ্বারা এটা সম্ভব হয় তবে এর চেয়ে বড় ও পূর্ণ মদ্যের গ্লাস আমাকে পান করাতে পারে। কিন্তু ছোট গ্লাস আমার নিকট খুবই অপছন্দনীয়। আল্লাহ করুন যেন আমীরুল মুমিনীনের কাছে এ খবর না পেীছে। অন্যথায় তিনি এতে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন এবং আমাকে শাস্তি দিবেন।” ঘটনাক্রমে সত্যিই এ কবিতাগুলো আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট পৌছে যায় এবং সাথে সাথেই তিনি লোক পাঠিয়ে তাঁকে পদচ্যুত করেন এবং তিনি একটি চিঠিও পাঠান। ঐ চিঠিতে তিনি লিখেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। হা-মীম। এই কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিকট হতে, যিনি পাপ ক্ষমা করেন, তওবা কবুল করেন, যিনি শাস্তি দানে কঠোর, শক্তিশালী। তিনি ছাড়া কোন মা'বূদ নেই। প্রত্যাবর্তন তাঁরই নিকট। অতঃপর আমার কাছে তোমার (কবিতার) কথা পৌঁছেছে। আল্লাহর কসম! অবশ্যই ওটা আমাকে অসন্তুষ্ট করেছে। তাই আমি তোমাকে পদচ্যুত করলাম।" এ চিঠি পাঠ মাত্রই হযরত নু'মান (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে যান এবং অত্যন্ত দ্রতার সাথে আরয করেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনো মদ্যপানও করিনি, নাচও দেখিনি এবং গান বাজনাও করিনি। এটা তো শুধু কবিতাসূচক আবেগ-উচ্ছ্বাস ছিল।” তাঁর একথা শুনে আমীরুল মুমিনীন বলেনঃ “আমারও ধারণা এটাই ছিল। কিন্তু আমি তো এটা সহ্য করতে পারি না যে, এরূপ অশ্লীলভাষী কবিকে কোন পদে রেখে দিই।” তাহলে বুঝা গেল যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর মতেও কবি যদি তার কবিতার মাধ্যমে এমন কোন অপরাধের কথা ঘোষণা করে যা হদের যোগ্য, তবুও তাকে হদ মারা যাবে না। কেননা, সে বলে বটে, কিন্তু করে না। তবে নিঃসন্দেহে সে তিরস্কার ও নিন্দার যোগ্য। হাদীসে আছে যে, রক্ত, পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম। ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবিও নন, যাদুকরও নন, ভবিষ্যদ্বক্তাও নন এবং মিথ্যা আরোপকারীও নন। তাঁর বাহ্যিক অবস্থাই তাঁর এসব দোষ হতে মুক্ত হওয়ার বড় সাক্ষী। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি রাসূল (সঃ)-কে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয় নয়, এটাতো শুধু এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন।” (৩৬:৬৯) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “এটা কোন কবির রচনা নয়, তোমরা অল্পই বিশ্বাস কর। এটা কোন গণকের কথাও নয়, তোমরা অল্পই অনুধাবন কর। এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ।” (৬৯: ৪১-৪৩) অনুরূপভাবে এখানে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আর নিশ্চয়ই এটা (আল-কুরআন) জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। জিবরাঈল (আঃ) এটা নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার। অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।” (২৬:১৯২-১৯৫) এ সূরারই আর একটি জায়গায় বলেছেনঃ “শয়তানরা ওটাসহ অবতীর্ণ হয়নি। তারা এ কাজের যোগ্য নয় এবং তারা এর সামর্থ্যও রাখে না। তাদেরকে তো শ্রবণের সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে। এর আরো কিছু পরে বলেছেনঃ “তোমাদেরকে কি আমি জানিয়ে দেবো কার কাছে শয়তানরা অবতীর্ণ হয়? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। তারা কান পেতে থাকে এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। আর কবিদেরকে অনুসরণ করে তারা যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখো না তারা। উল্লান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং যা করে না তা বলে।” এরপরে যা রয়েছে তার শানে নুযূল এই যে, এর পূর্ববর্তী আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় (যাতে কবিদেরকে নিন্দে করা হয়েছে), তখন নবী (সঃ)-এর দরবারের কবিরা যেমন হযরত হাস্সান ইবনে সাবিত (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) এবং হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো কবিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। আমরাও তো কুবি (সুতরাং আমরাও তো তাহলে নিন্দনীয়?)।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই পরবর্তী আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “ঈমান আনয়নকারী ও সৎকর্মশীল তোমরাই এবং আল্লাহকে বার বার স্মরণকারীও তোমরাই। তোমরাই অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণকারী। সুতরাং তোমরা এদের হতে স্বতন্ত্র।”অন্য একটি রিওয়াইয়াতে হযরত কা'ব (রাঃ)-এর নাম নেই। একটি রিওয়াইয়াতে শুধু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-এর কথা আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও তো কবি?” তারই একথার পরিপ্রেক্ষিতে (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কথা বর্ণিত আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এটা মক্কী সূরা। আর আনসার কবিরা মক্কায় ছিলেন না। তারা সবাই ছিলেন মদীনায়। কাজেই তাদের ব্যাপারে এ সূরা অবতীর্ণ হওয়া অসম্ভবই বটে। যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে ওগুলো মুরসাল। সুতরাং এগুলোর উপর ভরসা করা যায় না। তবে এ আয়াতটি যে স্বাতন্ত্রের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে তাতে সন্দেহের লেশ মাত্র নেই। আর এই স্বাতন্ত্র শুধু এই আনসার কবিদের ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যে কোন কবি তার অজ্ঞতার যুগে যদি ইসলাম ও মুসলমানদের বিপক্ষে কবিতা লিখে থাকে, অতঃপর মুসলমান হয়ে গিয়ে তাওবা করে থাকে এবং পূর্বের দুষ্কর্মের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বার বার আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে তবে তারাও নিন্দনীয় কবিদের হতে স্বতন্ত্র হবে। কেননা, সৎ কার্যাবলী দুষ্কর্মগুলোকে মিটিয়ে দেয়। তাহলে সে যখন কবিতার মাধ্যমে মুসলমানদের দুর্নাম করেছিল এবং আল্লাহর দ্বীনকে মন্দ বলেছিল তখন ওটা নিঃসন্দেহে মন্দ কাজই ছিল। কিন্তু পরে যখন সে মুসলমানদের ও ইসলামের প্রশংসা করলো তখন ঐ দুষ্কর্ম সকর্মে পরিবর্তিত হয়ে গেল। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যাবআরী (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুর্নাম করেছিলেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর বড়ই প্রশংসা করেছিলেন এবং পূর্বে যে তিনি তাঁর দুর্নাম করেছিলেন, কবিতার মাধ্যমে ওর ওজর পেশ করতে গিয়ে বলেন যে, ঐ সময় তিনি শয়তানের খপ্পরে পড়েছিলেন। অনুরূপভাবে হযরত আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচাতো ভাই হওয়া সত্ত্বেও তার একজন বড় শত্রু ছিলেন এবং কবিতার মাধ্যমে তাঁর খুবই দুর্নাম করতেন। কিন্তু যখন তিনি মুসলমান হলেন তখন এমন পাকা মুসলমান হলেন যে, সারা দুনিয়ায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) অপেক্ষা বড় প্রিয়জন তাঁর কাছে আর কেউই ছিল না। প্রায়ই তিনি তাঁর প্রশংসা করতেন এবং তার সাথে অত্যন্ত ভালবাসা রাখতেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারব যখন মুসলমান হন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে আপনি তিনটি জিনিস দান করুন। প্রথম এই যে, আমার পুত্র মুআবিয়া (রাঃ)-কে আপনার লেখক (অর্থাৎ অহী লেখক) বানিয়ে নিন। দ্বিতীয় এই যে, আমার সাথে এক দল সৈন্য প্রেরণ করুন যাতে আমি কাফিরদের সাথে লড়তে পারি যেমন আমি মুসলমানদের সাথে লড়তাম।” তাঁর এই দু’টি আবেদনই রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবুল করে নেন। তৃতীয় আর একটি আবেদন তিনি করেন এবং সেটাও গৃহীত হয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) সুতরাং এই লোকদেরকে পূর্ববর্তী আয়াতের হুকুম হতে এই পরবর্তী আয়াত দ্বারা পৃথক করা হয়েছে। আল্লাহর অধিক স্মরণ তাঁরা তাঁদের কবিতার মাধ্যমেই করুন অথবা অন্য কোন প্রকারে করুন, নিশ্চিতরূপে তা তাদের পূর্ববর্তী পাপসমূহের কাফফারা হয়ে যাবে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে অর্থাৎ কবিতার মাধ্যমে তারা কাফিরদের নিন্দামূলক কবিতার জবাব দিয়ে থাকেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ “তুমি কাফিরদের নিন্দা করে কবিতা রচনা কর, হযরত জিবরাঈল (আঃ) তোমার সাথে রয়েছেন।”হযরত কাব ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন তিনি কুরআন পাকে কবিদের নিন্দা শুনেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আর্য করেনঃ “আল্লাহ তা'আলা (কবিদের সম্পর্কে) যা নাযিল করার তা তো নাযিল করেছেন (তাহলে আমিও কি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত?)।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “ (না, না, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও। জেনে রেখো যে,) মুমিন তরবারী ও জিহ্বা দ্বারা জিহাদ করে থাকে। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদের কবিতাগুলো তো তাদেরকে (কাফিরদেরকে) মুজাহিদের তীরের ন্যায় ছিদ্র করে দিয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অত্যাচারীদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা তারা শীঘ্রই জানতে পারবে। সেই দিন তাদের ওজর আপত্তি কোন কাজে আসবে না। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যুলুম হতে বেঁচে থাকো। কারণ কিয়ামতের দিন যুলুম অন্ধকারের কারণ হবে।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ পাকের (আরবি) উক্তিটি আম বা সাধারণ, কবি হোক বা অন্য কেউ হোক, সবাই এর অন্তর্ভুক্ত।হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন খৃষ্টানের জানাযা যেতে দেখে এ আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন। তিনি যখন এ আয়াতটি পাঠ করতেন তখন এতো কাঁদতেন যে, তাঁর হেঁচকী বন্ধ হয়ে যেতো।হযরত ফুযালা ইবনে উবায়েদ (রঃ) যখন রোমে আগমন করেন তখন একটি লোক নামায পড়ছিলেন। যখন লোকটি (আরবি) আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, এর দ্বারা বায়তুল্লাহর ধ্বংসকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা মক্কাবাসী উদ্দেশ্য। আবার এটাও বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুশরিকরা উদ্দেশ্য। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আয়াতটি হলো সাধারণ। সুতরাং এটা সব যালিমকেই অন্তর্ভুক্তকারী।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর মৃত্যুর সময় মাত্র দু'টি লাইনে তাঁর অসিয়ত লিখে যান। তা ছিল নিম্নরূপঃবিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। এটা আবু বকর ইবনে আবি কাহাফা (রাঃ)-এর অসিয়ত। এটা ঐ সময়ের অসিয়ত, যখন তিনি দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছেন। যে সময় কাফিরও মুমিন হয়ে যায়, পাপীও তাওবা করে এবং মিথ্যাবাদীকেও সত্যবাদী মনে করা হয়। আমি উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে তোমাদের উপর আমার খলীফা নিযুক্ত করে যাচ্ছি। সে যদি ইনসাফ করে তবে খুব ভাল কথা এবং তার সম্পর্কে আমার ধারণা এটাই আছে। আর যদি সে যুলুম করে এবং কোন পরিবর্তন আনয়ন করে তবে জেনে রেখো যে, আমি ভবিষ্যদ্রষ্টা নই। অত্যাচারীরা তাদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা সত্বরই জানতে পারবে।”

আশ-শুআরা 26:227

২২১-২২৭ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, মুশরিকরা বলতো: রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে কুরআন নিয়ে আগমন করেছেন তা সত্য নয়। তিনি এটা স্বয়ং রচনা করেছেন। অথবা তার কাছে জ্বিনদের নেতা এসে থাকে যে তাঁকে শিখিয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে এই আপত্তিকর কথা হতে পবিত্র করছেন এবং প্রমাণ করছেন যে, তিনি যে কুরআন আনয়ন করেছেন তা আল্লাহর কালাম এবং তাঁর নিকট হতেই এটা অবতারিত। সম্মানিত, বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আঃ) এটা আনয়ন করেছেন। এটা কোন শয়তান বা জ্বিন আনয়ন করেনি। শয়তানরা তো কুরআনের শিক্ষা হতে সম্পূর্ণ বিমুখ। তাদের শিক্ষা তো কুরআন কারীমের শিক্ষার একেবারে বিপরীত। সুতরাং কি করে তারা কুরআনের ন্যায় পবিত্র ও সুপথ প্রদর্শনকারী কালাম আনয়ন করতঃ মানুষকে সুপথ প্রদর্শন করতে পারে? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। কেননা, তারা নিজেরাও চরম মিথ্যাবাদী ও পাপী। তারা চুরি করে আকাশে যে এক আধটি কথা শুনে নেয়, ওর সাথে বহু কিছু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ যাদুকররা তখন ওর সাথে নিজেদের পক্ষ হতে আরো বহু মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে লোকদের মধ্যে প্রচার করে। এখন শয়তান লুকিয়ে যে সত্য কথাটি আকাশে শুনেছিল ওটা সত্যরূপেই প্রকাশিত হয়, কিন্তু লোকেরা ঐ একটি সত্য কথার উপর ভিত্তি করে যাদুকরের আরো শত শত মিথ্যা কথাকেও সত্য বলে বিশ্বাস করে থাকে। এভাবে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একদা জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যাদুকর ও ভবিষ্যদ্বক্তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “তারা কিছুই নয়।” জনগণ বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা এমনও কথা বলে যা সত্য হয়ে থাকে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, এটা ঐ কথা যা জ্বিনেরা-চুরি করে আকাশ হতে শুনে আসে এবং তা ঐ ভবিষ্যদ্বক্তার কানে পৌঁছিয়ে থাকে। অতঃপর ঐ ভবিষ্যদ্বক্তা নিজের পক্ষ হতে শতটি মিথ্যা কথা ওর সাথে মিলিয়ে বলে দেয়।” হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা আকাশে কোন কাজের ফায়সালা করেন তখন ফেরেশতারা আদবের সাথে নিজেদের পালক ঝুঁকিয়ে দেন। কোন কংকরময় ভূমিতে জিঞ্জীর বাজানো হলে যেরূপ শব্দ হয় ঐরূপ শব্দ ঐ সময় আসতে থাকে। যখন ঐ বিহ্বলতা বিদূরিত হয় তখন ফেরেশতারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন (কি হুকুম করেছেন)?” উত্তরে বলা হয়ঃ “তিনি সত্য বলেছেন (সঠিক হুকুম করেছেন)। তিনি সমুন্নত ও মহান।” কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার ঐ হুকুম চুরি করে শ্রবণকারী কোন জ্বিনের কানে পৌঁছে যায় যারা এভাবে একের উপর এক হয়ে ঐ পর্যন্ত পৌঁছে থাকে। হাদীস বর্ণনাকারী হযরত সুফিয়ান (রঃ) স্বীয় হাতের অঙ্গুলীগুলো বিছিয়ে দিয়ে ওর উপর অপর হাত ঐভাবেই রেখে ওগুলোকে মিলিত করে বলেনঃ “এইভাবে।” এখন উপরের জন নীচের জনকে, সে তার নীচের জনকে ঐ কথা বলে দেয়। শেষ পর্যন্ত সর্ব নীচের জন ঐ কথা ভবিষ্যদ্বক্তা বা যাদুকরের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। কখনো কখনো এমনও হয় যে, ঐ কথা পৌঁছাবার পূর্বেই অগ্নিশিখা পৌঁছে যায়, সুতরাং শয়তান ঐ কথা পৌঁছাতে পারে না। আবার কখনো কখনো অগ্নিশিখা পৌঁছার পূর্বেই শয়তান ঐ কথা পৌঁছিয়ে থাকে। ঐ কথার সাথে যাদুকর নিজের পক্ষ হতে শত শত মিথ্যা কথা মিলিয়ে দিয়ে প্রচার করে দেয়। ঐ একটি কথা সত্যরূপে প্রকাশিত হওয়ায় জনগণ সবগুলোকেই সত্য মনে করে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) এই সমুদয় হাদীসের বর্ণনা (আরবি) (৩৪: ২৩) এই আয়াতের তাফসীরে আসবে ইনশাআল্লাহ।সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে এও আছে যে, ফেরেশতারা আসমানী বিষয়ক কথাবার্তা মেঘের উপর বলে থাকেন যা শয়তান শুনে নিয়ে যাদুকরদের কানে পৌঁছিয়ে থাকে। আর ঐ যাদুকর একটি সত্যের সাথে শতটি মিথ্যা মিলিয়ে দেয়। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (কাফির) কবিদের অনুসরণ বিভ্রান্ত লোকেরাই করে থাকে। আরব কবিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে, কারো নিন্দায় তারা কিছু বলতো। জনগণের একটি দল তাদের সাথে হয়ে যেতো এবং তাদের নিকট হতে ঐ নিন্দাসূচক কবিতা নিয়ে আসতো।একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের একটি দলকে সাথে নিয়ে আ’রজের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে একজন কবির সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয় যে কবিতা পাঠ করতে করতে চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তাকে ধর অথবা তাকে কবিতা পাঠ হতে বিরত রাখো। কারো রক্ত পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি কি দেখো না যে, তারা উড্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? প্রত্যেক বাজে বিষয়ের মধ্যে তারা ঢুকে পড়ে। কারো প্রশংসা করতে গিয়ে তারা তাকে একেবারে আকাশে উঠিয়ে দেয়। মিথ্যা প্রশংসা করে তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে। তারা হয় কথার সওদাগর, কিন্তু কাজে অলস। তারা নিজেরা যা করে না তা বলে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে দু’টি লোক একে অপরকে নিন্দা করে। তাদের একজন ছিল আনসারী এবং অপরজন ছিল অন্য গোত্রের লোক। তখন দুই গোত্রেরই বড় বড় লোকেরা তাদের সাথে যোগ দেয়। তাই এই আয়াতে এটাই রয়েছে যে, বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদেরকে অনুসরণ করে থাকে। তারা ঐ কথা বলে থাকে যা তারা নিজেরা করে না। এজন্যেই আলেমগণ এ ব্যাপারে মতভেদ করেছেন যে, যদি কোন কবি নিজের কবিতার মধ্যে এমন কোন পাপের কথা স্বীকার করে নেয় যার উপর শরীয়তের হদ ওয়াজিব হয়, তবে তার উপর হদ জারী করা যাবে কি যাবে না? আলেমরা দুই দিকেই গিয়েছেন। আসলে তারা ফখর ও গর্ব করে এ ধরনের কথা বলে থাকে। তারা বলেঃ “আমি এই করেছি, ঐ করেছি, অথচ আসলে তারা কিছুই করেনি এবং করতেও পারে না। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) ও মুহাম্মাদ ইবনে সা'দ (রঃ) তাবাকাতে এবং যুবায়ের ইবনে বিকার (রঃ) কিতাবুল ফুকাহাতে বর্ণনা করেছেন যে, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাঁর খিলাফতের আমলে হযরত নুমান ইবনে আদী ইবনে ফুলা (রাঃ)-কে বসরার মাইসান শহরের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি একজন কবি ছিলেন। তিনি কবিতায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সুন্দরী মহিলারা কি এ খবর পায়নি যে, তাদের প্রেমিক মাইসানে অবস্থান করছে? যেখানে সদা-সর্বদা শীশার গ্লাসে মদ্যচক্র চলছে? আর গ্রামের তরুণীরা নাচ-গানে মত্ত রয়েছে। হ্যাঁ, যদি আমার কোন বন্ধু দ্বারা এটা সম্ভব হয় তবে এর চেয়ে বড় ও পূর্ণ মদ্যের গ্লাস আমাকে পান করাতে পারে। কিন্তু ছোট গ্লাস আমার নিকট খুবই অপছন্দনীয়। আল্লাহ করুন যেন আমীরুল মুমিনীনের কাছে এ খবর না পেীছে। অন্যথায় তিনি এতে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন এবং আমাকে শাস্তি দিবেন।” ঘটনাক্রমে সত্যিই এ কবিতাগুলো আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট পৌছে যায় এবং সাথে সাথেই তিনি লোক পাঠিয়ে তাঁকে পদচ্যুত করেন এবং তিনি একটি চিঠিও পাঠান। ঐ চিঠিতে তিনি লিখেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। হা-মীম। এই কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিকট হতে, যিনি পাপ ক্ষমা করেন, তওবা কবুল করেন, যিনি শাস্তি দানে কঠোর, শক্তিশালী। তিনি ছাড়া কোন মা'বূদ নেই। প্রত্যাবর্তন তাঁরই নিকট। অতঃপর আমার কাছে তোমার (কবিতার) কথা পৌঁছেছে। আল্লাহর কসম! অবশ্যই ওটা আমাকে অসন্তুষ্ট করেছে। তাই আমি তোমাকে পদচ্যুত করলাম।" এ চিঠি পাঠ মাত্রই হযরত নু'মান (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে যান এবং অত্যন্ত দ্রতার সাথে আরয করেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনো মদ্যপানও করিনি, নাচও দেখিনি এবং গান বাজনাও করিনি। এটা তো শুধু কবিতাসূচক আবেগ-উচ্ছ্বাস ছিল।” তাঁর একথা শুনে আমীরুল মুমিনীন বলেনঃ “আমারও ধারণা এটাই ছিল। কিন্তু আমি তো এটা সহ্য করতে পারি না যে, এরূপ অশ্লীলভাষী কবিকে কোন পদে রেখে দিই।” তাহলে বুঝা গেল যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর মতেও কবি যদি তার কবিতার মাধ্যমে এমন কোন অপরাধের কথা ঘোষণা করে যা হদের যোগ্য, তবুও তাকে হদ মারা যাবে না। কেননা, সে বলে বটে, কিন্তু করে না। তবে নিঃসন্দেহে সে তিরস্কার ও নিন্দার যোগ্য। হাদীসে আছে যে, রক্ত, পুঁজ দ্বারা পেট পূর্ণ করা কবিতা দ্বারা পেট পূর্ণ করা অপেক্ষা উত্তম। ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবিও নন, যাদুকরও নন, ভবিষ্যদ্বক্তাও নন এবং মিথ্যা আরোপকারীও নন। তাঁর বাহ্যিক অবস্থাই তাঁর এসব দোষ হতে মুক্ত হওয়ার বড় সাক্ষী। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি রাসূল (সঃ)-কে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয় নয়, এটাতো শুধু এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন।” (৩৬:৬৯) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “এটা কোন কবির রচনা নয়, তোমরা অল্পই বিশ্বাস কর। এটা কোন গণকের কথাও নয়, তোমরা অল্পই অনুধাবন কর। এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ।” (৬৯: ৪১-৪৩) অনুরূপভাবে এখানে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আর নিশ্চয়ই এটা (আল-কুরআন) জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। জিবরাঈল (আঃ) এটা নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার। অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।” (২৬:১৯২-১৯৫) এ সূরারই আর একটি জায়গায় বলেছেনঃ “শয়তানরা ওটাসহ অবতীর্ণ হয়নি। তারা এ কাজের যোগ্য নয় এবং তারা এর সামর্থ্যও রাখে না। তাদেরকে তো শ্রবণের সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে। এর আরো কিছু পরে বলেছেনঃ “তোমাদেরকে কি আমি জানিয়ে দেবো কার কাছে শয়তানরা অবতীর্ণ হয়? তারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। তারা কান পেতে থাকে এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। আর কবিদেরকে অনুসরণ করে তারা যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখো না তারা। উল্লান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং যা করে না তা বলে।” এরপরে যা রয়েছে তার শানে নুযূল এই যে, এর পূর্ববর্তী আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় (যাতে কবিদেরকে নিন্দে করা হয়েছে), তখন নবী (সঃ)-এর দরবারের কবিরা যেমন হযরত হাস্সান ইবনে সাবিত (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) এবং হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো কবিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। আমরাও তো কুবি (সুতরাং আমরাও তো তাহলে নিন্দনীয়?)।” তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই পরবর্তী আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “ঈমান আনয়নকারী ও সৎকর্মশীল তোমরাই এবং আল্লাহকে বার বার স্মরণকারীও তোমরাই। তোমরাই অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণকারী। সুতরাং তোমরা এদের হতে স্বতন্ত্র।”অন্য একটি রিওয়াইয়াতে হযরত কা'ব (রাঃ)-এর নাম নেই। একটি রিওয়াইয়াতে শুধু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)-এর কথা আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও তো কবি?” তারই একথার পরিপ্রেক্ষিতে (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কথা বর্ণিত আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এটা মক্কী সূরা। আর আনসার কবিরা মক্কায় ছিলেন না। তারা সবাই ছিলেন মদীনায়। কাজেই তাদের ব্যাপারে এ সূরা অবতীর্ণ হওয়া অসম্ভবই বটে। যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে ওগুলো মুরসাল। সুতরাং এগুলোর উপর ভরসা করা যায় না। তবে এ আয়াতটি যে স্বাতন্ত্রের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে তাতে সন্দেহের লেশ মাত্র নেই। আর এই স্বাতন্ত্র শুধু এই আনসার কবিদের ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যে কোন কবি তার অজ্ঞতার যুগে যদি ইসলাম ও মুসলমানদের বিপক্ষে কবিতা লিখে থাকে, অতঃপর মুসলমান হয়ে গিয়ে তাওবা করে থাকে এবং পূর্বের দুষ্কর্মের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বার বার আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে তবে তারাও নিন্দনীয় কবিদের হতে স্বতন্ত্র হবে। কেননা, সৎ কার্যাবলী দুষ্কর্মগুলোকে মিটিয়ে দেয়। তাহলে সে যখন কবিতার মাধ্যমে মুসলমানদের দুর্নাম করেছিল এবং আল্লাহর দ্বীনকে মন্দ বলেছিল তখন ওটা নিঃসন্দেহে মন্দ কাজই ছিল। কিন্তু পরে যখন সে মুসলমানদের ও ইসলামের প্রশংসা করলো তখন ঐ দুষ্কর্ম সকর্মে পরিবর্তিত হয়ে গেল। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যাবআরী (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুর্নাম করেছিলেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর বড়ই প্রশংসা করেছিলেন এবং পূর্বে যে তিনি তাঁর দুর্নাম করেছিলেন, কবিতার মাধ্যমে ওর ওজর পেশ করতে গিয়ে বলেন যে, ঐ সময় তিনি শয়তানের খপ্পরে পড়েছিলেন। অনুরূপভাবে হযরত আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচাতো ভাই হওয়া সত্ত্বেও তার একজন বড় শত্রু ছিলেন এবং কবিতার মাধ্যমে তাঁর খুবই দুর্নাম করতেন। কিন্তু যখন তিনি মুসলমান হলেন তখন এমন পাকা মুসলমান হলেন যে, সারা দুনিয়ায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) অপেক্ষা বড় প্রিয়জন তাঁর কাছে আর কেউই ছিল না। প্রায়ই তিনি তাঁর প্রশংসা করতেন এবং তার সাথে অত্যন্ত ভালবাসা রাখতেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারব যখন মুসলমান হন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে আপনি তিনটি জিনিস দান করুন। প্রথম এই যে, আমার পুত্র মুআবিয়া (রাঃ)-কে আপনার লেখক (অর্থাৎ অহী লেখক) বানিয়ে নিন। দ্বিতীয় এই যে, আমার সাথে এক দল সৈন্য প্রেরণ করুন যাতে আমি কাফিরদের সাথে লড়তে পারি যেমন আমি মুসলমানদের সাথে লড়তাম।” তাঁর এই দু’টি আবেদনই রাসূলুল্লাহ (সঃ) কবুল করে নেন। তৃতীয় আর একটি আবেদন তিনি করেন এবং সেটাও গৃহীত হয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) সুতরাং এই লোকদেরকে পূর্ববর্তী আয়াতের হুকুম হতে এই পরবর্তী আয়াত দ্বারা পৃথক করা হয়েছে। আল্লাহর অধিক স্মরণ তাঁরা তাঁদের কবিতার মাধ্যমেই করুন অথবা অন্য কোন প্রকারে করুন, নিশ্চিতরূপে তা তাদের পূর্ববর্তী পাপসমূহের কাফফারা হয়ে যাবে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে অর্থাৎ কবিতার মাধ্যমে তারা কাফিরদের নিন্দামূলক কবিতার জবাব দিয়ে থাকেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ “তুমি কাফিরদের নিন্দা করে কবিতা রচনা কর, হযরত জিবরাঈল (আঃ) তোমার সাথে রয়েছেন।”হযরত কাব ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন তিনি কুরআন পাকে কবিদের নিন্দা শুনেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আর্য করেনঃ “আল্লাহ তা'আলা (কবিদের সম্পর্কে) যা নাযিল করার তা তো নাযিল করেছেন (তাহলে আমিও কি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত?)।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “ (না, না, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও। জেনে রেখো যে,) মুমিন তরবারী ও জিহ্বা দ্বারা জিহাদ করে থাকে। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদের কবিতাগুলো তো তাদেরকে (কাফিরদেরকে) মুজাহিদের তীরের ন্যায় ছিদ্র করে দিয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অত্যাচারীদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা তারা শীঘ্রই জানতে পারবে। সেই দিন তাদের ওজর আপত্তি কোন কাজে আসবে না। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যুলুম হতে বেঁচে থাকো। কারণ কিয়ামতের দিন যুলুম অন্ধকারের কারণ হবে।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ পাকের (আরবি) উক্তিটি আম বা সাধারণ, কবি হোক বা অন্য কেউ হোক, সবাই এর অন্তর্ভুক্ত।হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন খৃষ্টানের জানাযা যেতে দেখে এ আয়াতটিই পাঠ করেছিলেন। তিনি যখন এ আয়াতটি পাঠ করতেন তখন এতো কাঁদতেন যে, তাঁর হেঁচকী বন্ধ হয়ে যেতো।হযরত ফুযালা ইবনে উবায়েদ (রঃ) যখন রোমে আগমন করেন তখন একটি লোক নামায পড়ছিলেন। যখন লোকটি (আরবি) আয়াতটি পাঠ করেন তখন তিনি বলেন যে, এর দ্বারা বায়তুল্লাহর ধ্বংসকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা মক্কাবাসী উদ্দেশ্য। আবার এটাও বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুশরিকরা উদ্দেশ্য। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আয়াতটি হলো সাধারণ। সুতরাং এটা সব যালিমকেই অন্তর্ভুক্তকারী।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর মৃত্যুর সময় মাত্র দু'টি লাইনে তাঁর অসিয়ত লিখে যান। তা ছিল নিম্নরূপঃবিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। এটা আবু বকর ইবনে আবি কাহাফা (রাঃ)-এর অসিয়ত। এটা ঐ সময়ের অসিয়ত, যখন তিনি দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছেন। যে সময় কাফিরও মুমিন হয়ে যায়, পাপীও তাওবা করে এবং মিথ্যাবাদীকেও সত্যবাদী মনে করা হয়। আমি উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে তোমাদের উপর আমার খলীফা নিযুক্ত করে যাচ্ছি। সে যদি ইনসাফ করে তবে খুব ভাল কথা এবং তার সম্পর্কে আমার ধারণা এটাই আছে। আর যদি সে যুলুম করে এবং কোন পরিবর্তন আনয়ন করে তবে জেনে রেখো যে, আমি ভবিষ্যদ্রষ্টা নই। অত্যাচারীরা তাদের গন্তব্যস্থল কোথায় তা সত্বরই জানতে পারবে।”