Tafseer ibn Kathir — আস-সাফফাত 37:56 – আস-সাফফাত 37:102
Contents
- আস-সাফফাত 37:56
- আস-সাফফাত 37:57
- আস-সাফফাত 37:58
- আস-সাফফাত 37:59
- আস-সাফফাত 37:60
- আস-সাফফাত 37:61
- আস-সাফফাত 37:62
- আস-সাফফাত 37:63
- আস-সাফফাত 37:64
- আস-সাফফাত 37:65
- আস-সাফফাত 37:66
- আস-সাফফাত 37:67
- আস-সাফফাত 37:68
- আস-সাফফাত 37:69
- আস-সাফফাত 37:70
- আস-সাফফাত 37:71
- আস-সাফফাত 37:72
- আস-সাফফাত 37:73
- আস-সাফফাত 37:74
- আস-সাফফাত 37:75
- আস-সাফফাত 37:76
- আস-সাফফাত 37:77
- আস-সাফফাত 37:78
- আস-সাফফাত 37:79
- আস-সাফফাত 37:80
- আস-সাফফাত 37:81
- আস-সাফফাত 37:82
- আস-সাফফাত 37:83
- আস-সাফফাত 37:84
- আস-সাফফাত 37:85
- আস-সাফফাত 37:86
- আস-সাফফাত 37:87
- আস-সাফফাত 37:88
- আস-সাফফাত 37:89
- আস-সাফফাত 37:90
- আস-সাফফাত 37:91
- আস-সাফফাত 37:92
- আস-সাফফাত 37:93
- আস-সাফফাত 37:94
- আস-সাফফাত 37:95
- আস-সাফফাত 37:96
- আস-সাফফাত 37:97
- আস-সাফফাত 37:98
- আস-সাফফাত 37:99
- আস-সাফফাত 37:100
- আস-সাফফাত 37:101
- আস-সাফফাত 37:102
আস-সাফফাত 37:56
৫০-৬১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, জান্নাতবাসীরা একে অপরের সামনা সামনি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। অর্থাৎ তারা দুনিয়ার মাঝে কে কেমন অবস্থায় ছিল এবং সেখানে তাদের দিনগুলো কিভাবে অতিবাহিত হয়েছিল সে সম্বন্ধে একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। চৌকির উপর পরস্পর তারা হেলান দিয়ে বসে থাকবে। শত শত সুদৃশ্য পরি-চেহারার সেবক তাদের হুকুমের অপেক্ষায় সদা প্রস্তুত থাকবে। ঐ জান্নাতীরা বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য ও পানীয় এবং রঙ বেরঙ-এর পোশাকের মধ্যে ডুবে থাকবে। তাদের মধ্যে সুরা পরিবেশিত হবে। এবং তারা এমন সব সুখের সামগ্রী লাভ করবে যা কোন কানও শুনেনি, চক্ষুও অবলোকন করেনি এবং হৃদয়ও কল্পনা করেনি। কথা প্রসঙ্গে তাদের একজন বলবেঃ দুনিয়ায় আমার এক বন্ধু ছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ শয়তান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সে এক মুশরিক ব্যক্তি। দুনিয়াতে মুমিনদের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল। এ দু’জন মনীষীর কথার মধ্যে বৈপরীত্য কিছুই নেই। কেননা, শয়তান জ্বিনদের মধ্য থেকেও হয়ে থাকে এবং সে অন্তরে সন্দেহের উদ্রেক করে। আর মানুষের মধ্যেও শয়তান থাকে, সেও গোপনে কথা বলে যা কান শ্রবণ করে। এই উভয় প্রকার মত একে অপরের পরিপূরক। এই উভয় প্রকারের শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি) আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে।”(১১৪:৪-৬) এ জন্যেই ঘোষিত হয়েছেঃ “তাদের কেউ বলেআমার ছিল (দুনিয়ায়) এক সঙ্গী। সে আমাকে বলতো ? তুমি কি এতে বিশ্বাসী যে, আমরা যখন মরে যাবো এবং আমরা মৃত্তিকা ও অস্থিতে পরিণত হবো তখনো কি আমাদেরকে প্রতিফল দেয়া হবে?” অর্থাৎ আমার ঐ বন্ধুটি আমাকে বলতোঃ তুমি কি কিয়ামত, হিসাব-নিকাশ ও প্রতিফল দিবসে বিশ্বাসী? এটা সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করতো। কেননা, সে তো অবিশ্বাস করতো। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, -এর অর্থ হলো হিসাব গ্রহণ করা। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল ফারাযী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো আমল অনুযায়ী প্রতিফল প্রদান করা। উভয় মতই ঠিক।মহান আল্লাহর বাণীঃ “তোমরা কি প্রত্যক্ষ করতে চাও?' মুমিন ব্যক্তি তার জান্নাতী বন্ধু ও সহচরকে পৃথিবীর ঐ বন্ধুর কথা বলবে। (আরবী) অর্থাৎ ‘অতঃপর সে ঝুঁকে দেখবে এবং তাকে দেখতে পাবে জাহান্নামের মধ্যস্থলে।' ইবনে আব্বাস (রাঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), খালীদুল আসরী (রঃ), কাতাদা (রঃ), সুদ্দী (রঃ), আতাউল খুরাসানী (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলো জাহান্নামের মধ্যস্থল। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সেই মুমিন ব্যক্তি তার বন্ধুটিকে মস্তক গলা অবস্থায় জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে। কা'ব (রঃ) বলেন যে, জান্নাতে জানালা রয়েছে। সুতরাং কেউ তার শত্রুদেরকে দেখতে ইচ্ছা করলে উঁকি দিলেই দেখতে পাবে। ফলে সে খুব বেশী বেশী আল্লাহ তা'আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। জান্নাতী ব্যক্তি তাকে দেখেই বলবেঃ তুমি আমার জন্যে এমন ফাঁদ পেতেছিলে যাতে আমাকে ধ্বংস করেই ছাড়তে। কিন্তু মহান আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি আমাকে তোমার খপ্পর থেকে রক্ষা করেছেন। যদি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ না হতো তবে আমি বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতাম। তোমার মত আমাকে জাহান্নামে জ্বলতে হতো। আল্লাহ আমাকে সুপথ প্রদর্শন করে একত্ববাদের দিকে ধাবিত করেছেন। “আমাদের তো মৃত্যু হবে না প্রথম মৃত্যুর পর এবং আমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে না।" এটা মুমিন বান্দাদের কথা, যাতে তাদের আনন্দ ও সাফল্যের সংবাদ রয়েছে। জান্নাতে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। সেখানে না আছে মৃত্যু, না আছে ভয় এবং না আছে শাস্তির কোন সম্ভাবনা। এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এটা তো মহা সাফল্য।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতীদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের আমলের বিনিময়ে খুব আনন্দের সাথে পানাহার করতে থাকো। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ এখানে ঐ কথারই ইঙ্গিত রয়েছে যে, জান্নাতীরা জান্নাতে কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তখন তারা জিজ্ঞেস করবেঃ “আমাদের আর মৃত্যু তো হবে না, তবে কখনো শাস্তি দেয়া হবে কি?” উত্তরে বলা হবেঃ “না।” হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “জেনে রেখো যে, প্রত্যেক নিয়ামত মৃত্যুর দ্বারা লয়প্রাপ্ত হয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “এরূপ সাফল্যের জন্যে সাধকদের উচিত সাধনা করা।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা জান্নাতীদের কথা। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা মহান আল্লাহর উক্তি। অর্থাৎ এরূপ রহমত ও নিয়ামত লাভ করার জন্যে মানুষের পূর্ণ আগ্রহের সাথে দুনিয়ায় কাজ করা উচিত যাতে পরকালে উক্ত নিয়ামত তারা লাভ করতে পারে। এই আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাহিনী রয়েছে যা নিম্নে বর্ণিত হলোঃবানী ইসরাঈলের দু’জন লোক যৌথভাবে ব্যবসা করতো। তাদের নিকট আট হাজার স্বর্ণমুদ্রা মজুদ ছিল। তাদের একজন ব্যবসায়ের কৌশল ভাল জানতো এবং অপরজন ব্যবসা তেমন বুঝতো না। তাই অভিজ্ঞ লোকটি তার সঙ্গীকে বললো যে, সে যেন তার অংশ নিয়ে পৃথক হয়ে যায়। সুতরাং উভয়ে ভিন্ন হয়ে গেল। অতঃপর ঐ অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী দেশের বাদশাহর মৃত্যুর পর তার। রাজপ্রাসাদ এক হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে ক্রয় করে নিলো এবং তার ঐ সঙ্গীটিকে ডেকে বললোঃ “দেখতো বন্ধু, আমি কেমন জিনিস ক্রয় করেছি?” সঙ্গীটি তার খুব প্রশংসা করলো। তারপর সে সেখান হতে বিদায় হয়ে গেল। অতঃপর সে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ সঙ্গী লোকটি এক হাজার স্বর্ণমুদ্রায় পার্থিব প্রাসাদ ক্রয় করেছে। আমি আপনার নিকট জানাতে একটি ঘরের আবেদন জানাচ্ছি। আমি এক হাজার স্বর্ণমুদা আপনার মিসকীন বান্দাদের মধ্যে দান করে দিচ্ছি।” অতঃপর সে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা সাদকা করে দিলো। কিছুকাল পর ঐ অভিজ্ঞ লোকটি এক হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) খরচ করে বিয়ে করলো। বিয়েতে সে তার ঐ পুরাতন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করে আনলো এবং বললোঃ “বন্ধু! আমি এক হাজার দীনার খরচ করে ঐ সুন্দরী মহিলাটিকে বিয়ে করে ঘরে আনলাম।” এবারও সে তার খুব। বাইরে এসে সে মহান আল্লাহর পথে এক হাজার দীনার দান করে দিলো এবং তার নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ বন্ধুটি এ পরিমানই টাকা খরচ করে এই দুনিয়ার একটি স্ত্রী লাভ করলো। আর আমি এর দ্বারা আপনার নিকট আয়ত লোচনা হুরী কামনা করছি।” আরো কিছুকাল পর ঐ দুনিয়াদার লোকটি এ লোকটিকে ডেকে নিয়ে বললোঃ “বন্ধু! আমি দুই হাজার দীনার খরচ করে দু'টি ফলের বাগান ক্রয় করেছি। দেখো তো কেমন হয়েছে?” এ লোকটি তার বাগান দুটি দেখে খুব প্রশংসা করলো এবং বাইরে এসে স্বীয় অভ্যাস মত আল্লাহ তা'আলার দরবারে আরয করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ বন্ধু দু’হাজার দীনারের বিনিময়ে দু’টি বাগান ক্রয় করেছে। আমি আপনার নিকট জান্নাতে দু’টি বাগানের জন্যে আবেদন করছি। আর এই দু’হাজার দীনার আমি আপনার নামে সাদকা করছি।” অতঃপর সে দু'হাজার দীনার সাদকা করে দিলো। তারপর যখন তাদের দু'জনের মৃত্যু হয়ে গেল তখন ঐ সাদকা প্রদানকারীকে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দেয়া হলো। সেখানে সে এক অতি পরমা সুন্দরী রমণী লাভ করলো এবং দু'টি সুন্দর বাগান প্রাপ্ত হলো। এ ছাড়া আরো এমন বহু নিয়ামত সে লাভ করলো যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। ঐ সময় তার পার্থিব ঐ সঙ্গীর কথা মনে পড়লো। ফেরেশতারা তাকে বললেনঃ “সে তো জাহান্নামে রয়েছে। তুমি ইচ্ছে করলে উঁকি মেরে তাকে দেখতে পার।” সে তখন উঁকি দিয়ে দেখলো যে, তার ঐ সঙ্গীটি জাহান্নামের আগুনে জ্বলছে। সে তখন তাকে সম্বোধন করে বললোঃ “তুমি তো আমাকেও প্রায় তোমার ফাঁদে ফেলে দিয়েছিলে। এটা আমার প্রতি আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ যে, তিনি আমাকে রক্ষা করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এটা তাশদীদ দিয়ে পড়াই অধিক সঙ্গত। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আবু হাফস (রঃ) ইসমাঈল সুদ্দী (রঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “এটা তোমাকে কে বলেছে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি এইমাত্র এটা পড়লাম। আমি আপনার নিকট হতে এটা জেনে নিতে চাই।” তখন তিনি বলেনঃ তবে শুননা ও স্মরণ রেখো। বানী ইসরাঈলের মধ্যে দুই জন অংশীদার ছিল। একজন ছিল মুমিন এবং অপরজন ছিল কাফির। তারা ছয় হাজার দীনার তিন হাজার করে ভাগ করে নিয়ে পৃথক হয়ে গেল। তারপর কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। একদা দু’জনের সাক্ষাৎ হলো। কাফির লোকটি মুমিন লোকটিকে বললোঃ “তোমার মাল-ধন তুমি কি করেছো? তা দিয়ে কোন কাজ করেছো, না ব্যবসায়ে লাগিয়েছো?” মুমিন লোকটি উত্তরে বললোঃ “আমি কিছুই করিনি। তুমি তোমার সম্পদ দিয়ে কি করেছো তাই বল।” কাফির লোকটি তখন বললোঃ “এক হাজার দীনার দিয়ে আমি জমি, খেজুরের বাগান ও নদী ক্রয় করেছি।” মুমিন লোকটি বললোঃ “সত্যিই কি তাই করেছো?” উত্তরে কাফির লোকটি বললোঃ “হ্যা, সত্যিই।” অতঃপর মুমিন লোকটি ফিরে আসলো। রাত্রি হলে সে আল্লাহর ইচ্ছা মত নামায পড়লো। নামায শেষে এক হাজার দীনার সামনে রেখে সে বললোঃ “হে আল্লাহ! ঐ কাফির এক হাজার দীনারের বিনিময়ে জমি, বাগান ও নহর ক্রয় করেছে। আগামীকাল তার মৃত্যু হলে সবই সে ছেড়ে যাবে। আমি এই এক হাজার দীনারের বিনিময়ে জান্নাতের জমি, বাগান ও নহর ক্রয় করতে চাই।" অতঃপর সকালে সে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। এরপর আরো কিছুকাল অতিবাহিত হলো। হঠাৎ একদিন উভয়ের সাক্ষাৎ হয়ে গেল। কাফির তার মুমিন সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার সম্পদ কি করেছো? কোন ব্যবসায়ে লাগিয়েছ কি?" মুমিন জবাবে বললো:“না। তবে তোমার সম্পদ তুমি কি করেছো তাই বল?” জিজ্ঞেস করলো মুমিন কাফিরকে। উত্তরে কাফির বললোঃ “হাজার দীনারের বিনিময়ে কিছু সঙ্গিনী ক্রয় করেছি। তারা আমার জন্যে সদা প্রস্তুত থাকে এবং আমার হুকুমের তাবেদারী করে।" মুমিন লোকটি তাকে বললোঃ “সত্যিই কি তুমি এ কাজ করেছো?” সে জবাব দিলো:“হ্যা, সত্যিই।" তারপর মুমিন লোকটি সেখান হতে চলে এসে রাত্রে আল্লাহর ইচ্ছা মত নামায আদায় করলো এবং নামায শেষে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা সামনে রেখে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করতে লাগলোঃ “হে আল্লাহ! আমার ঐ সাথীটি দুনিয়ার সঙ্গিনী ক্রয় করেছে। সে যদি মারা যায় তবে এ সবই রেখে যাবে অথবা তারা মারা গেলে একে তারা ছেড়ে যাবে। হে আল্লাহ! আমি এ দীনার দিয়ে জান্নাতের সঙ্গিনী ক্রয় করতে চাই।” অতঃপর সকালে সে ঐ এক হাজার দীনার দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। তারপর আরো কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। আবার একদিন উভয় বন্ধুর সাক্ষাৎ ঘটলো। তাদের মধ্যে আলাপ হতে লাগলো। মুমিন ব্যক্তির এক প্রশ্নের উত্তরে কাফির ব্যক্তি বললোঃ “আমার মনের যত বাসনা ছিল সবই প্রায় পূর্ণ হয়েছে। এখন শুধু একটি কাজ হাতে রয়েছে। তাহলো এই যে, একটি মহিলার স্বামী মারা গেছে। আমি তাকে এক হাজার দীনার উপঢৌকন রূপে পাঠিয়েছিলাম। সে ওর দ্বিগুণ দীনার নিয়ে আমার কাছে এসেছে।" মুমিন বললোঃ “তুমি তাহলে এ কাজ করেছো?” সে উত্তরে বললোঃ “হ্যা।” তারপর মুমিন লোকটি সেখান হতে ফিরে এলো এবং রাত্রে আল্লাহ যা চাইলেন সেই মত সে নামায আদায় করলো। এরপর সে অবশিষ্ট এক হাজার দীনার হাতে নিয়ে প্রার্থনা শুরু করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার ঐ কাফির সঙ্গীটি দুনিয়ার রমণীর মধ্যে একটি রমণীকে হাজার দীনারের বিনিমেয় বিয়ে করেছে। আগামীকাল এ খ্রীকে রেখে সে মারা যেতে পারে অথবা তার এ স্ত্রীটিও তাকে রেখে মৃত্যুবরণ করতে পারে। আমি এই দীনারের বিনিময়ে আপনার নিকট জান্নাতী আয়ত নয়না হুরীর প্রস্তাব রাখলাম।” অতঃপর সকালে সে ঐ দীনারগুলো মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। বলা বাহুল্য যে, মুমিন লোকটির নিকট আর কোন অর্থই অবশিষ্ট থাকলো না। এবার সে সূতার তৈরী সাধারণ জামা গায়ে দিয়ে একটি কম্বল হাতে নিয়ে এবং একটি কোদাল কাঁধে করে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লো। পথে এক ব্যক্তি তাকে দেখে বললোঃ “তুমি আমার গবাদি পশুর দেখা শুনা করবে এবং গোবর উঠাবে আর এর বিনিময়ে আমি তোমার পানাহারের ব্যবস্থা করবো। এতে তুমি সম্মত আছ কি?” মুমিন লোকটি এতে সম্মত হয়ে গেল এবং কাজ করতে শুরু করলো। ঐ মালিকটি ছিল অত্যন্ত নির্দয় ও কঠোর হৃদয়ের লোক। কোন পশুকে দুর্বল ও অসুস্থ দেখলে সে মনে করতো যে, ঐ সহিস তার পশুর খাদ্য চুরি করে। এই বদ ধারণার বশবর্তী হয়ে সে ঐ মুমিন লোকটিকে নির্মমভাবে প্রহার করতো। তার এরূপ অত্যাচারে সে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লো এবং তার ঐ কাফির সঙ্গীটিকে স্মরণ করলো যে, তারই ক্ষেত-খামারে সে কাজ করবে। এর বিনিময়ে হয়তো সে তাকে খেতে-পরতে দিবে এবং এটাই তার জন্যে যথেষ্ট। এই ভরসায় সে রওয়ানা হয়ে গেল। তার দরযার সামনে এসে বিরাট গগনচুম্বী প্রাসাদ দেখে তো তার চক্ষু স্থির। দেওড়ীতে পাহারাদার! তাদের নিকট সে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলো এবং বললোঃ “আমার নাম শুনলেই এ বাড়ীর মালিক খুশী হয়ে আমাকে প্রবেশের অনুমতি দিবে।” প্রহরীরা বললোঃ “তোমার কথা যদি সত্য হয় তবে এই এক কোণে চুপ করে পড়ে থাকো। সকাল হলে তার সামনে নিজেই গিয়ে পরিচয় দান করবে।” সে তাই করলো। এক পাশে গিয়ে কম্বলের অর্ধেকটি বিছিয়ে দিলো এবং বাকী অর্ধেক গায়ে দিয়ে রাত্রি কাটিয়ে দিলো।সকাল বেলা তার ঐ কাফির সঙ্গীটি ঘোড়ায় চড়ে প্রাতঃ ভ্রমণে বের হয়েছে এমন সময় মুমিন লোকটি তার সামনে হাযির হলো। তার এই দুরবস্থা দেখে সে অত্যন্ত বিস্মিত হলো এবং জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার এ অবস্থা কেন? টাকা পয়সা কি করেছো?” উত্তরে মুমিন ব্যক্তি বললোঃ “ওটা আর জিজ্ঞেস করো না ভাই। বরং আমাকে তোমার ক্ষেত-খামারের কাজে নিয়োগ কর। মজুরী কিছু লাগবে না, শুধু দু' বেলা খেতে দিলেই চলবে। আর যখন আমার পরনের এ বস্ত্রগুলো পুরোনো হয়ে যাবে তখন নতুন কাপড় কিনে দিবে আর কি?” সে উত্তরে বললোঃ “আরে, অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন, আমি বরং এর চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা তোমার জন্যে করে দিবো। এখন তুমি বল তোমার মাল-ধন কি করেছো? সে উত্তর দিলোঃ “একজনকে কর্জ দিয়েছি।” জিজ্ঞেস করলোঃ “কাকে কর্জ দিয়েছো?” উত্তর হলোঃ “এমন একজনকে কর্জ দিয়েছি যিনি তা অস্বীকার করবেন না এবং নষ্ট হতেও দিবেন না। তিনি আমার প্রতিপালক মহান আল্লাহ!” একথা শুনে কাফির লোকটি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললোঃ “তুমি তো দেখি বড় নির্বোধ! আমরা পচে গলে মাটিতে পরিণত হবো, অতঃপর পুনরুজ্জীবিত হবো ও প্রতিদান পাবো এতে তুমি বিশ্বাসী! তোমার যখন এমন বিশ্বাস তখন তুমি চলে যাও, তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।” এই বলে সে চলে গেল। মুমিন লোকটি সেখান থেকে বিদায় হলো এবং অতি কষ্টে জীবন যাপন করতে লাগলো। আর ঐ কাফির পরম সুখে দিন যাপন করতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত উভয়েই মৃত্যুমুখে পতিত হলো। তারপর মুমিন লোকটিকে জান্নাত দান করা হলো। সে বিরাট ময়দান, খুরমা-খেজুরের বাগান ও প্রবাহিত নদী দেখে অত্যন্ত বিস্ময়বোধ করলো এবং ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করলোঃ “এগুলো কার জন্যে?" তারা উত্তর দিলোঃ “এগুলো সবই তোমার ।" তারপর আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখলো যে, অসংখ্য দাস-দাসী অপেক্ষমান রয়েছে। জিজ্ঞেস করলোঃ “এগুলো কার জন্যে?” উত্তর হলোঃ “এগুলোও তোমারই জন্যে।" সে বললোঃ “সুবহানাল্লাহ! এটাতো আমার প্রতি আল্লাহর বড়ই মেহেরবানী।” আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখতে পেলো যে, ইয়াকুত পাথরের তৈরী এক মহল রয়েছে এবং ওর মধ্যে আনত নয়না ও আয়ত লোচনা হরীরা অবস্থান করছে। প্রশ্ন করে জানতে পারলো যে, এগুলো তারই জন্যে। এসব দেখে তো তার চক্ষু স্থির! অতঃপর তার ঐ কাফির সাথীর কথা তার মনে পড়লো। আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখাবেন যে, সে জাহান্নামে জ্বলতে রয়েছে। তাদের মধ্যে ঐ সব কথোপকথন হবে যার বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে। মুমিনের উপর দুনিয়ায় যে বিপদাপদ এসেছিল তা সে স্মরণ করবে। তখন মৃত্যু অপেক্ষা কঠিন বিপদ আর কিছুই তার কাছে অনুভূত হবে না।
আস-সাফফাত 37:57
৫০-৬১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, জান্নাতবাসীরা একে অপরের সামনা সামনি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। অর্থাৎ তারা দুনিয়ার মাঝে কে কেমন অবস্থায় ছিল এবং সেখানে তাদের দিনগুলো কিভাবে অতিবাহিত হয়েছিল সে সম্বন্ধে একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। চৌকির উপর পরস্পর তারা হেলান দিয়ে বসে থাকবে। শত শত সুদৃশ্য পরি-চেহারার সেবক তাদের হুকুমের অপেক্ষায় সদা প্রস্তুত থাকবে। ঐ জান্নাতীরা বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য ও পানীয় এবং রঙ বেরঙ-এর পোশাকের মধ্যে ডুবে থাকবে। তাদের মধ্যে সুরা পরিবেশিত হবে। এবং তারা এমন সব সুখের সামগ্রী লাভ করবে যা কোন কানও শুনেনি, চক্ষুও অবলোকন করেনি এবং হৃদয়ও কল্পনা করেনি। কথা প্রসঙ্গে তাদের একজন বলবেঃ দুনিয়ায় আমার এক বন্ধু ছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ শয়তান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সে এক মুশরিক ব্যক্তি। দুনিয়াতে মুমিনদের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল। এ দু’জন মনীষীর কথার মধ্যে বৈপরীত্য কিছুই নেই। কেননা, শয়তান জ্বিনদের মধ্য থেকেও হয়ে থাকে এবং সে অন্তরে সন্দেহের উদ্রেক করে। আর মানুষের মধ্যেও শয়তান থাকে, সেও গোপনে কথা বলে যা কান শ্রবণ করে। এই উভয় প্রকার মত একে অপরের পরিপূরক। এই উভয় প্রকারের শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি) আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে।”(১১৪:৪-৬) এ জন্যেই ঘোষিত হয়েছেঃ “তাদের কেউ বলেআমার ছিল (দুনিয়ায়) এক সঙ্গী। সে আমাকে বলতো ? তুমি কি এতে বিশ্বাসী যে, আমরা যখন মরে যাবো এবং আমরা মৃত্তিকা ও অস্থিতে পরিণত হবো তখনো কি আমাদেরকে প্রতিফল দেয়া হবে?” অর্থাৎ আমার ঐ বন্ধুটি আমাকে বলতোঃ তুমি কি কিয়ামত, হিসাব-নিকাশ ও প্রতিফল দিবসে বিশ্বাসী? এটা সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করতো। কেননা, সে তো অবিশ্বাস করতো। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, -এর অর্থ হলো হিসাব গ্রহণ করা। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল ফারাযী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো আমল অনুযায়ী প্রতিফল প্রদান করা। উভয় মতই ঠিক।মহান আল্লাহর বাণীঃ “তোমরা কি প্রত্যক্ষ করতে চাও?' মুমিন ব্যক্তি তার জান্নাতী বন্ধু ও সহচরকে পৃথিবীর ঐ বন্ধুর কথা বলবে। (আরবী) অর্থাৎ ‘অতঃপর সে ঝুঁকে দেখবে এবং তাকে দেখতে পাবে জাহান্নামের মধ্যস্থলে।' ইবনে আব্বাস (রাঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), খালীদুল আসরী (রঃ), কাতাদা (রঃ), সুদ্দী (রঃ), আতাউল খুরাসানী (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলো জাহান্নামের মধ্যস্থল। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সেই মুমিন ব্যক্তি তার বন্ধুটিকে মস্তক গলা অবস্থায় জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে। কা'ব (রঃ) বলেন যে, জান্নাতে জানালা রয়েছে। সুতরাং কেউ তার শত্রুদেরকে দেখতে ইচ্ছা করলে উঁকি দিলেই দেখতে পাবে। ফলে সে খুব বেশী বেশী আল্লাহ তা'আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। জান্নাতী ব্যক্তি তাকে দেখেই বলবেঃ তুমি আমার জন্যে এমন ফাঁদ পেতেছিলে যাতে আমাকে ধ্বংস করেই ছাড়তে। কিন্তু মহান আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি আমাকে তোমার খপ্পর থেকে রক্ষা করেছেন। যদি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ না হতো তবে আমি বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতাম। তোমার মত আমাকে জাহান্নামে জ্বলতে হতো। আল্লাহ আমাকে সুপথ প্রদর্শন করে একত্ববাদের দিকে ধাবিত করেছেন। “আমাদের তো মৃত্যু হবে না প্রথম মৃত্যুর পর এবং আমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে না।" এটা মুমিন বান্দাদের কথা, যাতে তাদের আনন্দ ও সাফল্যের সংবাদ রয়েছে। জান্নাতে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। সেখানে না আছে মৃত্যু, না আছে ভয় এবং না আছে শাস্তির কোন সম্ভাবনা। এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এটা তো মহা সাফল্য।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতীদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের আমলের বিনিময়ে খুব আনন্দের সাথে পানাহার করতে থাকো। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ এখানে ঐ কথারই ইঙ্গিত রয়েছে যে, জান্নাতীরা জান্নাতে কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তখন তারা জিজ্ঞেস করবেঃ “আমাদের আর মৃত্যু তো হবে না, তবে কখনো শাস্তি দেয়া হবে কি?” উত্তরে বলা হবেঃ “না।” হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “জেনে রেখো যে, প্রত্যেক নিয়ামত মৃত্যুর দ্বারা লয়প্রাপ্ত হয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “এরূপ সাফল্যের জন্যে সাধকদের উচিত সাধনা করা।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা জান্নাতীদের কথা। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা মহান আল্লাহর উক্তি। অর্থাৎ এরূপ রহমত ও নিয়ামত লাভ করার জন্যে মানুষের পূর্ণ আগ্রহের সাথে দুনিয়ায় কাজ করা উচিত যাতে পরকালে উক্ত নিয়ামত তারা লাভ করতে পারে। এই আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাহিনী রয়েছে যা নিম্নে বর্ণিত হলোঃবানী ইসরাঈলের দু’জন লোক যৌথভাবে ব্যবসা করতো। তাদের নিকট আট হাজার স্বর্ণমুদ্রা মজুদ ছিল। তাদের একজন ব্যবসায়ের কৌশল ভাল জানতো এবং অপরজন ব্যবসা তেমন বুঝতো না। তাই অভিজ্ঞ লোকটি তার সঙ্গীকে বললো যে, সে যেন তার অংশ নিয়ে পৃথক হয়ে যায়। সুতরাং উভয়ে ভিন্ন হয়ে গেল। অতঃপর ঐ অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী দেশের বাদশাহর মৃত্যুর পর তার। রাজপ্রাসাদ এক হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে ক্রয় করে নিলো এবং তার ঐ সঙ্গীটিকে ডেকে বললোঃ “দেখতো বন্ধু, আমি কেমন জিনিস ক্রয় করেছি?” সঙ্গীটি তার খুব প্রশংসা করলো। তারপর সে সেখান হতে বিদায় হয়ে গেল। অতঃপর সে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ সঙ্গী লোকটি এক হাজার স্বর্ণমুদ্রায় পার্থিব প্রাসাদ ক্রয় করেছে। আমি আপনার নিকট জানাতে একটি ঘরের আবেদন জানাচ্ছি। আমি এক হাজার স্বর্ণমুদা আপনার মিসকীন বান্দাদের মধ্যে দান করে দিচ্ছি।” অতঃপর সে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা সাদকা করে দিলো। কিছুকাল পর ঐ অভিজ্ঞ লোকটি এক হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) খরচ করে বিয়ে করলো। বিয়েতে সে তার ঐ পুরাতন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করে আনলো এবং বললোঃ “বন্ধু! আমি এক হাজার দীনার খরচ করে ঐ সুন্দরী মহিলাটিকে বিয়ে করে ঘরে আনলাম।” এবারও সে তার খুব। বাইরে এসে সে মহান আল্লাহর পথে এক হাজার দীনার দান করে দিলো এবং তার নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ বন্ধুটি এ পরিমানই টাকা খরচ করে এই দুনিয়ার একটি স্ত্রী লাভ করলো। আর আমি এর দ্বারা আপনার নিকট আয়ত লোচনা হুরী কামনা করছি।” আরো কিছুকাল পর ঐ দুনিয়াদার লোকটি এ লোকটিকে ডেকে নিয়ে বললোঃ “বন্ধু! আমি দুই হাজার দীনার খরচ করে দু'টি ফলের বাগান ক্রয় করেছি। দেখো তো কেমন হয়েছে?” এ লোকটি তার বাগান দুটি দেখে খুব প্রশংসা করলো এবং বাইরে এসে স্বীয় অভ্যাস মত আল্লাহ তা'আলার দরবারে আরয করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ বন্ধু দু’হাজার দীনারের বিনিময়ে দু’টি বাগান ক্রয় করেছে। আমি আপনার নিকট জান্নাতে দু’টি বাগানের জন্যে আবেদন করছি। আর এই দু’হাজার দীনার আমি আপনার নামে সাদকা করছি।” অতঃপর সে দু'হাজার দীনার সাদকা করে দিলো। তারপর যখন তাদের দু'জনের মৃত্যু হয়ে গেল তখন ঐ সাদকা প্রদানকারীকে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দেয়া হলো। সেখানে সে এক অতি পরমা সুন্দরী রমণী লাভ করলো এবং দু'টি সুন্দর বাগান প্রাপ্ত হলো। এ ছাড়া আরো এমন বহু নিয়ামত সে লাভ করলো যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। ঐ সময় তার পার্থিব ঐ সঙ্গীর কথা মনে পড়লো। ফেরেশতারা তাকে বললেনঃ “সে তো জাহান্নামে রয়েছে। তুমি ইচ্ছে করলে উঁকি মেরে তাকে দেখতে পার।” সে তখন উঁকি দিয়ে দেখলো যে, তার ঐ সঙ্গীটি জাহান্নামের আগুনে জ্বলছে। সে তখন তাকে সম্বোধন করে বললোঃ “তুমি তো আমাকেও প্রায় তোমার ফাঁদে ফেলে দিয়েছিলে। এটা আমার প্রতি আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ যে, তিনি আমাকে রক্ষা করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এটা তাশদীদ দিয়ে পড়াই অধিক সঙ্গত। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আবু হাফস (রঃ) ইসমাঈল সুদ্দী (রঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “এটা তোমাকে কে বলেছে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি এইমাত্র এটা পড়লাম। আমি আপনার নিকট হতে এটা জেনে নিতে চাই।” তখন তিনি বলেনঃ তবে শুননা ও স্মরণ রেখো। বানী ইসরাঈলের মধ্যে দুই জন অংশীদার ছিল। একজন ছিল মুমিন এবং অপরজন ছিল কাফির। তারা ছয় হাজার দীনার তিন হাজার করে ভাগ করে নিয়ে পৃথক হয়ে গেল। তারপর কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। একদা দু’জনের সাক্ষাৎ হলো। কাফির লোকটি মুমিন লোকটিকে বললোঃ “তোমার মাল-ধন তুমি কি করেছো? তা দিয়ে কোন কাজ করেছো, না ব্যবসায়ে লাগিয়েছো?” মুমিন লোকটি উত্তরে বললোঃ “আমি কিছুই করিনি। তুমি তোমার সম্পদ দিয়ে কি করেছো তাই বল।” কাফির লোকটি তখন বললোঃ “এক হাজার দীনার দিয়ে আমি জমি, খেজুরের বাগান ও নদী ক্রয় করেছি।” মুমিন লোকটি বললোঃ “সত্যিই কি তাই করেছো?” উত্তরে কাফির লোকটি বললোঃ “হ্যা, সত্যিই।” অতঃপর মুমিন লোকটি ফিরে আসলো। রাত্রি হলে সে আল্লাহর ইচ্ছা মত নামায পড়লো। নামায শেষে এক হাজার দীনার সামনে রেখে সে বললোঃ “হে আল্লাহ! ঐ কাফির এক হাজার দীনারের বিনিময়ে জমি, বাগান ও নহর ক্রয় করেছে। আগামীকাল তার মৃত্যু হলে সবই সে ছেড়ে যাবে। আমি এই এক হাজার দীনারের বিনিময়ে জান্নাতের জমি, বাগান ও নহর ক্রয় করতে চাই।" অতঃপর সকালে সে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। এরপর আরো কিছুকাল অতিবাহিত হলো। হঠাৎ একদিন উভয়ের সাক্ষাৎ হয়ে গেল। কাফির তার মুমিন সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার সম্পদ কি করেছো? কোন ব্যবসায়ে লাগিয়েছ কি?" মুমিন জবাবে বললো:“না। তবে তোমার সম্পদ তুমি কি করেছো তাই বল?” জিজ্ঞেস করলো মুমিন কাফিরকে। উত্তরে কাফির বললোঃ “হাজার দীনারের বিনিময়ে কিছু সঙ্গিনী ক্রয় করেছি। তারা আমার জন্যে সদা প্রস্তুত থাকে এবং আমার হুকুমের তাবেদারী করে।" মুমিন লোকটি তাকে বললোঃ “সত্যিই কি তুমি এ কাজ করেছো?” সে জবাব দিলো:“হ্যা, সত্যিই।" তারপর মুমিন লোকটি সেখান হতে চলে এসে রাত্রে আল্লাহর ইচ্ছা মত নামায আদায় করলো এবং নামায শেষে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা সামনে রেখে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করতে লাগলোঃ “হে আল্লাহ! আমার ঐ সাথীটি দুনিয়ার সঙ্গিনী ক্রয় করেছে। সে যদি মারা যায় তবে এ সবই রেখে যাবে অথবা তারা মারা গেলে একে তারা ছেড়ে যাবে। হে আল্লাহ! আমি এ দীনার দিয়ে জান্নাতের সঙ্গিনী ক্রয় করতে চাই।” অতঃপর সকালে সে ঐ এক হাজার দীনার দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। তারপর আরো কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। আবার একদিন উভয় বন্ধুর সাক্ষাৎ ঘটলো। তাদের মধ্যে আলাপ হতে লাগলো। মুমিন ব্যক্তির এক প্রশ্নের উত্তরে কাফির ব্যক্তি বললোঃ “আমার মনের যত বাসনা ছিল সবই প্রায় পূর্ণ হয়েছে। এখন শুধু একটি কাজ হাতে রয়েছে। তাহলো এই যে, একটি মহিলার স্বামী মারা গেছে। আমি তাকে এক হাজার দীনার উপঢৌকন রূপে পাঠিয়েছিলাম। সে ওর দ্বিগুণ দীনার নিয়ে আমার কাছে এসেছে।" মুমিন বললোঃ “তুমি তাহলে এ কাজ করেছো?” সে উত্তরে বললোঃ “হ্যা।” তারপর মুমিন লোকটি সেখান হতে ফিরে এলো এবং রাত্রে আল্লাহ যা চাইলেন সেই মত সে নামায আদায় করলো। এরপর সে অবশিষ্ট এক হাজার দীনার হাতে নিয়ে প্রার্থনা শুরু করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার ঐ কাফির সঙ্গীটি দুনিয়ার রমণীর মধ্যে একটি রমণীকে হাজার দীনারের বিনিমেয় বিয়ে করেছে। আগামীকাল এ খ্রীকে রেখে সে মারা যেতে পারে অথবা তার এ স্ত্রীটিও তাকে রেখে মৃত্যুবরণ করতে পারে। আমি এই দীনারের বিনিময়ে আপনার নিকট জান্নাতী আয়ত নয়না হুরীর প্রস্তাব রাখলাম।” অতঃপর সকালে সে ঐ দীনারগুলো মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। বলা বাহুল্য যে, মুমিন লোকটির নিকট আর কোন অর্থই অবশিষ্ট থাকলো না। এবার সে সূতার তৈরী সাধারণ জামা গায়ে দিয়ে একটি কম্বল হাতে নিয়ে এবং একটি কোদাল কাঁধে করে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লো। পথে এক ব্যক্তি তাকে দেখে বললোঃ “তুমি আমার গবাদি পশুর দেখা শুনা করবে এবং গোবর উঠাবে আর এর বিনিময়ে আমি তোমার পানাহারের ব্যবস্থা করবো। এতে তুমি সম্মত আছ কি?” মুমিন লোকটি এতে সম্মত হয়ে গেল এবং কাজ করতে শুরু করলো। ঐ মালিকটি ছিল অত্যন্ত নির্দয় ও কঠোর হৃদয়ের লোক। কোন পশুকে দুর্বল ও অসুস্থ দেখলে সে মনে করতো যে, ঐ সহিস তার পশুর খাদ্য চুরি করে। এই বদ ধারণার বশবর্তী হয়ে সে ঐ মুমিন লোকটিকে নির্মমভাবে প্রহার করতো। তার এরূপ অত্যাচারে সে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লো এবং তার ঐ কাফির সঙ্গীটিকে স্মরণ করলো যে, তারই ক্ষেত-খামারে সে কাজ করবে। এর বিনিময়ে হয়তো সে তাকে খেতে-পরতে দিবে এবং এটাই তার জন্যে যথেষ্ট। এই ভরসায় সে রওয়ানা হয়ে গেল। তার দরযার সামনে এসে বিরাট গগনচুম্বী প্রাসাদ দেখে তো তার চক্ষু স্থির। দেওড়ীতে পাহারাদার! তাদের নিকট সে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলো এবং বললোঃ “আমার নাম শুনলেই এ বাড়ীর মালিক খুশী হয়ে আমাকে প্রবেশের অনুমতি দিবে।” প্রহরীরা বললোঃ “তোমার কথা যদি সত্য হয় তবে এই এক কোণে চুপ করে পড়ে থাকো। সকাল হলে তার সামনে নিজেই গিয়ে পরিচয় দান করবে।” সে তাই করলো। এক পাশে গিয়ে কম্বলের অর্ধেকটি বিছিয়ে দিলো এবং বাকী অর্ধেক গায়ে দিয়ে রাত্রি কাটিয়ে দিলো।সকাল বেলা তার ঐ কাফির সঙ্গীটি ঘোড়ায় চড়ে প্রাতঃ ভ্রমণে বের হয়েছে এমন সময় মুমিন লোকটি তার সামনে হাযির হলো। তার এই দুরবস্থা দেখে সে অত্যন্ত বিস্মিত হলো এবং জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার এ অবস্থা কেন? টাকা পয়সা কি করেছো?” উত্তরে মুমিন ব্যক্তি বললোঃ “ওটা আর জিজ্ঞেস করো না ভাই। বরং আমাকে তোমার ক্ষেত-খামারের কাজে নিয়োগ কর। মজুরী কিছু লাগবে না, শুধু দু' বেলা খেতে দিলেই চলবে। আর যখন আমার পরনের এ বস্ত্রগুলো পুরোনো হয়ে যাবে তখন নতুন কাপড় কিনে দিবে আর কি?” সে উত্তরে বললোঃ “আরে, অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন, আমি বরং এর চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা তোমার জন্যে করে দিবো। এখন তুমি বল তোমার মাল-ধন কি করেছো? সে উত্তর দিলোঃ “একজনকে কর্জ দিয়েছি।” জিজ্ঞেস করলোঃ “কাকে কর্জ দিয়েছো?” উত্তর হলোঃ “এমন একজনকে কর্জ দিয়েছি যিনি তা অস্বীকার করবেন না এবং নষ্ট হতেও দিবেন না। তিনি আমার প্রতিপালক মহান আল্লাহ!” একথা শুনে কাফির লোকটি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললোঃ “তুমি তো দেখি বড় নির্বোধ! আমরা পচে গলে মাটিতে পরিণত হবো, অতঃপর পুনরুজ্জীবিত হবো ও প্রতিদান পাবো এতে তুমি বিশ্বাসী! তোমার যখন এমন বিশ্বাস তখন তুমি চলে যাও, তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।” এই বলে সে চলে গেল। মুমিন লোকটি সেখান থেকে বিদায় হলো এবং অতি কষ্টে জীবন যাপন করতে লাগলো। আর ঐ কাফির পরম সুখে দিন যাপন করতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত উভয়েই মৃত্যুমুখে পতিত হলো। তারপর মুমিন লোকটিকে জান্নাত দান করা হলো। সে বিরাট ময়দান, খুরমা-খেজুরের বাগান ও প্রবাহিত নদী দেখে অত্যন্ত বিস্ময়বোধ করলো এবং ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করলোঃ “এগুলো কার জন্যে?" তারা উত্তর দিলোঃ “এগুলো সবই তোমার ।" তারপর আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখলো যে, অসংখ্য দাস-দাসী অপেক্ষমান রয়েছে। জিজ্ঞেস করলোঃ “এগুলো কার জন্যে?” উত্তর হলোঃ “এগুলোও তোমারই জন্যে।" সে বললোঃ “সুবহানাল্লাহ! এটাতো আমার প্রতি আল্লাহর বড়ই মেহেরবানী।” আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখতে পেলো যে, ইয়াকুত পাথরের তৈরী এক মহল রয়েছে এবং ওর মধ্যে আনত নয়না ও আয়ত লোচনা হরীরা অবস্থান করছে। প্রশ্ন করে জানতে পারলো যে, এগুলো তারই জন্যে। এসব দেখে তো তার চক্ষু স্থির! অতঃপর তার ঐ কাফির সাথীর কথা তার মনে পড়লো। আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখাবেন যে, সে জাহান্নামে জ্বলতে রয়েছে। তাদের মধ্যে ঐ সব কথোপকথন হবে যার বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে। মুমিনের উপর দুনিয়ায় যে বিপদাপদ এসেছিল তা সে স্মরণ করবে। তখন মৃত্যু অপেক্ষা কঠিন বিপদ আর কিছুই তার কাছে অনুভূত হবে না।
আস-সাফফাত 37:58
৫০-৬১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, জান্নাতবাসীরা একে অপরের সামনা সামনি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। অর্থাৎ তারা দুনিয়ার মাঝে কে কেমন অবস্থায় ছিল এবং সেখানে তাদের দিনগুলো কিভাবে অতিবাহিত হয়েছিল সে সম্বন্ধে একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। চৌকির উপর পরস্পর তারা হেলান দিয়ে বসে থাকবে। শত শত সুদৃশ্য পরি-চেহারার সেবক তাদের হুকুমের অপেক্ষায় সদা প্রস্তুত থাকবে। ঐ জান্নাতীরা বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য ও পানীয় এবং রঙ বেরঙ-এর পোশাকের মধ্যে ডুবে থাকবে। তাদের মধ্যে সুরা পরিবেশিত হবে। এবং তারা এমন সব সুখের সামগ্রী লাভ করবে যা কোন কানও শুনেনি, চক্ষুও অবলোকন করেনি এবং হৃদয়ও কল্পনা করেনি। কথা প্রসঙ্গে তাদের একজন বলবেঃ দুনিয়ায় আমার এক বন্ধু ছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ শয়তান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সে এক মুশরিক ব্যক্তি। দুনিয়াতে মুমিনদের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল। এ দু’জন মনীষীর কথার মধ্যে বৈপরীত্য কিছুই নেই। কেননা, শয়তান জ্বিনদের মধ্য থেকেও হয়ে থাকে এবং সে অন্তরে সন্দেহের উদ্রেক করে। আর মানুষের মধ্যেও শয়তান থাকে, সেও গোপনে কথা বলে যা কান শ্রবণ করে। এই উভয় প্রকার মত একে অপরের পরিপূরক। এই উভয় প্রকারের শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি) আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে।”(১১৪:৪-৬) এ জন্যেই ঘোষিত হয়েছেঃ “তাদের কেউ বলেআমার ছিল (দুনিয়ায়) এক সঙ্গী। সে আমাকে বলতো ? তুমি কি এতে বিশ্বাসী যে, আমরা যখন মরে যাবো এবং আমরা মৃত্তিকা ও অস্থিতে পরিণত হবো তখনো কি আমাদেরকে প্রতিফল দেয়া হবে?” অর্থাৎ আমার ঐ বন্ধুটি আমাকে বলতোঃ তুমি কি কিয়ামত, হিসাব-নিকাশ ও প্রতিফল দিবসে বিশ্বাসী? এটা সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করতো। কেননা, সে তো অবিশ্বাস করতো। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, -এর অর্থ হলো হিসাব গ্রহণ করা। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল ফারাযী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো আমল অনুযায়ী প্রতিফল প্রদান করা। উভয় মতই ঠিক।মহান আল্লাহর বাণীঃ “তোমরা কি প্রত্যক্ষ করতে চাও?' মুমিন ব্যক্তি তার জান্নাতী বন্ধু ও সহচরকে পৃথিবীর ঐ বন্ধুর কথা বলবে। (আরবী) অর্থাৎ ‘অতঃপর সে ঝুঁকে দেখবে এবং তাকে দেখতে পাবে জাহান্নামের মধ্যস্থলে।' ইবনে আব্বাস (রাঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), খালীদুল আসরী (রঃ), কাতাদা (রঃ), সুদ্দী (রঃ), আতাউল খুরাসানী (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলো জাহান্নামের মধ্যস্থল। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সেই মুমিন ব্যক্তি তার বন্ধুটিকে মস্তক গলা অবস্থায় জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে। কা'ব (রঃ) বলেন যে, জান্নাতে জানালা রয়েছে। সুতরাং কেউ তার শত্রুদেরকে দেখতে ইচ্ছা করলে উঁকি দিলেই দেখতে পাবে। ফলে সে খুব বেশী বেশী আল্লাহ তা'আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। জান্নাতী ব্যক্তি তাকে দেখেই বলবেঃ তুমি আমার জন্যে এমন ফাঁদ পেতেছিলে যাতে আমাকে ধ্বংস করেই ছাড়তে। কিন্তু মহান আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি আমাকে তোমার খপ্পর থেকে রক্ষা করেছেন। যদি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ না হতো তবে আমি বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতাম। তোমার মত আমাকে জাহান্নামে জ্বলতে হতো। আল্লাহ আমাকে সুপথ প্রদর্শন করে একত্ববাদের দিকে ধাবিত করেছেন। “আমাদের তো মৃত্যু হবে না প্রথম মৃত্যুর পর এবং আমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে না।" এটা মুমিন বান্দাদের কথা, যাতে তাদের আনন্দ ও সাফল্যের সংবাদ রয়েছে। জান্নাতে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। সেখানে না আছে মৃত্যু, না আছে ভয় এবং না আছে শাস্তির কোন সম্ভাবনা। এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এটা তো মহা সাফল্য।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতীদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের আমলের বিনিময়ে খুব আনন্দের সাথে পানাহার করতে থাকো। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ এখানে ঐ কথারই ইঙ্গিত রয়েছে যে, জান্নাতীরা জান্নাতে কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তখন তারা জিজ্ঞেস করবেঃ “আমাদের আর মৃত্যু তো হবে না, তবে কখনো শাস্তি দেয়া হবে কি?” উত্তরে বলা হবেঃ “না।” হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “জেনে রেখো যে, প্রত্যেক নিয়ামত মৃত্যুর দ্বারা লয়প্রাপ্ত হয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “এরূপ সাফল্যের জন্যে সাধকদের উচিত সাধনা করা।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা জান্নাতীদের কথা। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা মহান আল্লাহর উক্তি। অর্থাৎ এরূপ রহমত ও নিয়ামত লাভ করার জন্যে মানুষের পূর্ণ আগ্রহের সাথে দুনিয়ায় কাজ করা উচিত যাতে পরকালে উক্ত নিয়ামত তারা লাভ করতে পারে। এই আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাহিনী রয়েছে যা নিম্নে বর্ণিত হলোঃবানী ইসরাঈলের দু’জন লোক যৌথভাবে ব্যবসা করতো। তাদের নিকট আট হাজার স্বর্ণমুদ্রা মজুদ ছিল। তাদের একজন ব্যবসায়ের কৌশল ভাল জানতো এবং অপরজন ব্যবসা তেমন বুঝতো না। তাই অভিজ্ঞ লোকটি তার সঙ্গীকে বললো যে, সে যেন তার অংশ নিয়ে পৃথক হয়ে যায়। সুতরাং উভয়ে ভিন্ন হয়ে গেল। অতঃপর ঐ অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী দেশের বাদশাহর মৃত্যুর পর তার। রাজপ্রাসাদ এক হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে ক্রয় করে নিলো এবং তার ঐ সঙ্গীটিকে ডেকে বললোঃ “দেখতো বন্ধু, আমি কেমন জিনিস ক্রয় করেছি?” সঙ্গীটি তার খুব প্রশংসা করলো। তারপর সে সেখান হতে বিদায় হয়ে গেল। অতঃপর সে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ সঙ্গী লোকটি এক হাজার স্বর্ণমুদ্রায় পার্থিব প্রাসাদ ক্রয় করেছে। আমি আপনার নিকট জানাতে একটি ঘরের আবেদন জানাচ্ছি। আমি এক হাজার স্বর্ণমুদা আপনার মিসকীন বান্দাদের মধ্যে দান করে দিচ্ছি।” অতঃপর সে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা সাদকা করে দিলো। কিছুকাল পর ঐ অভিজ্ঞ লোকটি এক হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) খরচ করে বিয়ে করলো। বিয়েতে সে তার ঐ পুরাতন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করে আনলো এবং বললোঃ “বন্ধু! আমি এক হাজার দীনার খরচ করে ঐ সুন্দরী মহিলাটিকে বিয়ে করে ঘরে আনলাম।” এবারও সে তার খুব। বাইরে এসে সে মহান আল্লাহর পথে এক হাজার দীনার দান করে দিলো এবং তার নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ বন্ধুটি এ পরিমানই টাকা খরচ করে এই দুনিয়ার একটি স্ত্রী লাভ করলো। আর আমি এর দ্বারা আপনার নিকট আয়ত লোচনা হুরী কামনা করছি।” আরো কিছুকাল পর ঐ দুনিয়াদার লোকটি এ লোকটিকে ডেকে নিয়ে বললোঃ “বন্ধু! আমি দুই হাজার দীনার খরচ করে দু'টি ফলের বাগান ক্রয় করেছি। দেখো তো কেমন হয়েছে?” এ লোকটি তার বাগান দুটি দেখে খুব প্রশংসা করলো এবং বাইরে এসে স্বীয় অভ্যাস মত আল্লাহ তা'আলার দরবারে আরয করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ বন্ধু দু’হাজার দীনারের বিনিময়ে দু’টি বাগান ক্রয় করেছে। আমি আপনার নিকট জান্নাতে দু’টি বাগানের জন্যে আবেদন করছি। আর এই দু’হাজার দীনার আমি আপনার নামে সাদকা করছি।” অতঃপর সে দু'হাজার দীনার সাদকা করে দিলো। তারপর যখন তাদের দু'জনের মৃত্যু হয়ে গেল তখন ঐ সাদকা প্রদানকারীকে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দেয়া হলো। সেখানে সে এক অতি পরমা সুন্দরী রমণী লাভ করলো এবং দু'টি সুন্দর বাগান প্রাপ্ত হলো। এ ছাড়া আরো এমন বহু নিয়ামত সে লাভ করলো যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। ঐ সময় তার পার্থিব ঐ সঙ্গীর কথা মনে পড়লো। ফেরেশতারা তাকে বললেনঃ “সে তো জাহান্নামে রয়েছে। তুমি ইচ্ছে করলে উঁকি মেরে তাকে দেখতে পার।” সে তখন উঁকি দিয়ে দেখলো যে, তার ঐ সঙ্গীটি জাহান্নামের আগুনে জ্বলছে। সে তখন তাকে সম্বোধন করে বললোঃ “তুমি তো আমাকেও প্রায় তোমার ফাঁদে ফেলে দিয়েছিলে। এটা আমার প্রতি আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ যে, তিনি আমাকে রক্ষা করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এটা তাশদীদ দিয়ে পড়াই অধিক সঙ্গত। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আবু হাফস (রঃ) ইসমাঈল সুদ্দী (রঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “এটা তোমাকে কে বলেছে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি এইমাত্র এটা পড়লাম। আমি আপনার নিকট হতে এটা জেনে নিতে চাই।” তখন তিনি বলেনঃ তবে শুননা ও স্মরণ রেখো। বানী ইসরাঈলের মধ্যে দুই জন অংশীদার ছিল। একজন ছিল মুমিন এবং অপরজন ছিল কাফির। তারা ছয় হাজার দীনার তিন হাজার করে ভাগ করে নিয়ে পৃথক হয়ে গেল। তারপর কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। একদা দু’জনের সাক্ষাৎ হলো। কাফির লোকটি মুমিন লোকটিকে বললোঃ “তোমার মাল-ধন তুমি কি করেছো? তা দিয়ে কোন কাজ করেছো, না ব্যবসায়ে লাগিয়েছো?” মুমিন লোকটি উত্তরে বললোঃ “আমি কিছুই করিনি। তুমি তোমার সম্পদ দিয়ে কি করেছো তাই বল।” কাফির লোকটি তখন বললোঃ “এক হাজার দীনার দিয়ে আমি জমি, খেজুরের বাগান ও নদী ক্রয় করেছি।” মুমিন লোকটি বললোঃ “সত্যিই কি তাই করেছো?” উত্তরে কাফির লোকটি বললোঃ “হ্যা, সত্যিই।” অতঃপর মুমিন লোকটি ফিরে আসলো। রাত্রি হলে সে আল্লাহর ইচ্ছা মত নামায পড়লো। নামায শেষে এক হাজার দীনার সামনে রেখে সে বললোঃ “হে আল্লাহ! ঐ কাফির এক হাজার দীনারের বিনিময়ে জমি, বাগান ও নহর ক্রয় করেছে। আগামীকাল তার মৃত্যু হলে সবই সে ছেড়ে যাবে। আমি এই এক হাজার দীনারের বিনিময়ে জান্নাতের জমি, বাগান ও নহর ক্রয় করতে চাই।" অতঃপর সকালে সে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। এরপর আরো কিছুকাল অতিবাহিত হলো। হঠাৎ একদিন উভয়ের সাক্ষাৎ হয়ে গেল। কাফির তার মুমিন সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার সম্পদ কি করেছো? কোন ব্যবসায়ে লাগিয়েছ কি?" মুমিন জবাবে বললো:“না। তবে তোমার সম্পদ তুমি কি করেছো তাই বল?” জিজ্ঞেস করলো মুমিন কাফিরকে। উত্তরে কাফির বললোঃ “হাজার দীনারের বিনিময়ে কিছু সঙ্গিনী ক্রয় করেছি। তারা আমার জন্যে সদা প্রস্তুত থাকে এবং আমার হুকুমের তাবেদারী করে।" মুমিন লোকটি তাকে বললোঃ “সত্যিই কি তুমি এ কাজ করেছো?” সে জবাব দিলো:“হ্যা, সত্যিই।" তারপর মুমিন লোকটি সেখান হতে চলে এসে রাত্রে আল্লাহর ইচ্ছা মত নামায আদায় করলো এবং নামায শেষে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা সামনে রেখে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করতে লাগলোঃ “হে আল্লাহ! আমার ঐ সাথীটি দুনিয়ার সঙ্গিনী ক্রয় করেছে। সে যদি মারা যায় তবে এ সবই রেখে যাবে অথবা তারা মারা গেলে একে তারা ছেড়ে যাবে। হে আল্লাহ! আমি এ দীনার দিয়ে জান্নাতের সঙ্গিনী ক্রয় করতে চাই।” অতঃপর সকালে সে ঐ এক হাজার দীনার দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। তারপর আরো কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। আবার একদিন উভয় বন্ধুর সাক্ষাৎ ঘটলো। তাদের মধ্যে আলাপ হতে লাগলো। মুমিন ব্যক্তির এক প্রশ্নের উত্তরে কাফির ব্যক্তি বললোঃ “আমার মনের যত বাসনা ছিল সবই প্রায় পূর্ণ হয়েছে। এখন শুধু একটি কাজ হাতে রয়েছে। তাহলো এই যে, একটি মহিলার স্বামী মারা গেছে। আমি তাকে এক হাজার দীনার উপঢৌকন রূপে পাঠিয়েছিলাম। সে ওর দ্বিগুণ দীনার নিয়ে আমার কাছে এসেছে।" মুমিন বললোঃ “তুমি তাহলে এ কাজ করেছো?” সে উত্তরে বললোঃ “হ্যা।” তারপর মুমিন লোকটি সেখান হতে ফিরে এলো এবং রাত্রে আল্লাহ যা চাইলেন সেই মত সে নামায আদায় করলো। এরপর সে অবশিষ্ট এক হাজার দীনার হাতে নিয়ে প্রার্থনা শুরু করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার ঐ কাফির সঙ্গীটি দুনিয়ার রমণীর মধ্যে একটি রমণীকে হাজার দীনারের বিনিমেয় বিয়ে করেছে। আগামীকাল এ খ্রীকে রেখে সে মারা যেতে পারে অথবা তার এ স্ত্রীটিও তাকে রেখে মৃত্যুবরণ করতে পারে। আমি এই দীনারের বিনিময়ে আপনার নিকট জান্নাতী আয়ত নয়না হুরীর প্রস্তাব রাখলাম।” অতঃপর সকালে সে ঐ দীনারগুলো মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। বলা বাহুল্য যে, মুমিন লোকটির নিকট আর কোন অর্থই অবশিষ্ট থাকলো না। এবার সে সূতার তৈরী সাধারণ জামা গায়ে দিয়ে একটি কম্বল হাতে নিয়ে এবং একটি কোদাল কাঁধে করে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লো। পথে এক ব্যক্তি তাকে দেখে বললোঃ “তুমি আমার গবাদি পশুর দেখা শুনা করবে এবং গোবর উঠাবে আর এর বিনিময়ে আমি তোমার পানাহারের ব্যবস্থা করবো। এতে তুমি সম্মত আছ কি?” মুমিন লোকটি এতে সম্মত হয়ে গেল এবং কাজ করতে শুরু করলো। ঐ মালিকটি ছিল অত্যন্ত নির্দয় ও কঠোর হৃদয়ের লোক। কোন পশুকে দুর্বল ও অসুস্থ দেখলে সে মনে করতো যে, ঐ সহিস তার পশুর খাদ্য চুরি করে। এই বদ ধারণার বশবর্তী হয়ে সে ঐ মুমিন লোকটিকে নির্মমভাবে প্রহার করতো। তার এরূপ অত্যাচারে সে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লো এবং তার ঐ কাফির সঙ্গীটিকে স্মরণ করলো যে, তারই ক্ষেত-খামারে সে কাজ করবে। এর বিনিময়ে হয়তো সে তাকে খেতে-পরতে দিবে এবং এটাই তার জন্যে যথেষ্ট। এই ভরসায় সে রওয়ানা হয়ে গেল। তার দরযার সামনে এসে বিরাট গগনচুম্বী প্রাসাদ দেখে তো তার চক্ষু স্থির। দেওড়ীতে পাহারাদার! তাদের নিকট সে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলো এবং বললোঃ “আমার নাম শুনলেই এ বাড়ীর মালিক খুশী হয়ে আমাকে প্রবেশের অনুমতি দিবে।” প্রহরীরা বললোঃ “তোমার কথা যদি সত্য হয় তবে এই এক কোণে চুপ করে পড়ে থাকো। সকাল হলে তার সামনে নিজেই গিয়ে পরিচয় দান করবে।” সে তাই করলো। এক পাশে গিয়ে কম্বলের অর্ধেকটি বিছিয়ে দিলো এবং বাকী অর্ধেক গায়ে দিয়ে রাত্রি কাটিয়ে দিলো।সকাল বেলা তার ঐ কাফির সঙ্গীটি ঘোড়ায় চড়ে প্রাতঃ ভ্রমণে বের হয়েছে এমন সময় মুমিন লোকটি তার সামনে হাযির হলো। তার এই দুরবস্থা দেখে সে অত্যন্ত বিস্মিত হলো এবং জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার এ অবস্থা কেন? টাকা পয়সা কি করেছো?” উত্তরে মুমিন ব্যক্তি বললোঃ “ওটা আর জিজ্ঞেস করো না ভাই। বরং আমাকে তোমার ক্ষেত-খামারের কাজে নিয়োগ কর। মজুরী কিছু লাগবে না, শুধু দু' বেলা খেতে দিলেই চলবে। আর যখন আমার পরনের এ বস্ত্রগুলো পুরোনো হয়ে যাবে তখন নতুন কাপড় কিনে দিবে আর কি?” সে উত্তরে বললোঃ “আরে, অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন, আমি বরং এর চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা তোমার জন্যে করে দিবো। এখন তুমি বল তোমার মাল-ধন কি করেছো? সে উত্তর দিলোঃ “একজনকে কর্জ দিয়েছি।” জিজ্ঞেস করলোঃ “কাকে কর্জ দিয়েছো?” উত্তর হলোঃ “এমন একজনকে কর্জ দিয়েছি যিনি তা অস্বীকার করবেন না এবং নষ্ট হতেও দিবেন না। তিনি আমার প্রতিপালক মহান আল্লাহ!” একথা শুনে কাফির লোকটি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললোঃ “তুমি তো দেখি বড় নির্বোধ! আমরা পচে গলে মাটিতে পরিণত হবো, অতঃপর পুনরুজ্জীবিত হবো ও প্রতিদান পাবো এতে তুমি বিশ্বাসী! তোমার যখন এমন বিশ্বাস তখন তুমি চলে যাও, তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।” এই বলে সে চলে গেল। মুমিন লোকটি সেখান থেকে বিদায় হলো এবং অতি কষ্টে জীবন যাপন করতে লাগলো। আর ঐ কাফির পরম সুখে দিন যাপন করতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত উভয়েই মৃত্যুমুখে পতিত হলো। তারপর মুমিন লোকটিকে জান্নাত দান করা হলো। সে বিরাট ময়দান, খুরমা-খেজুরের বাগান ও প্রবাহিত নদী দেখে অত্যন্ত বিস্ময়বোধ করলো এবং ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করলোঃ “এগুলো কার জন্যে?" তারা উত্তর দিলোঃ “এগুলো সবই তোমার ।" তারপর আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখলো যে, অসংখ্য দাস-দাসী অপেক্ষমান রয়েছে। জিজ্ঞেস করলোঃ “এগুলো কার জন্যে?” উত্তর হলোঃ “এগুলোও তোমারই জন্যে।" সে বললোঃ “সুবহানাল্লাহ! এটাতো আমার প্রতি আল্লাহর বড়ই মেহেরবানী।” আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখতে পেলো যে, ইয়াকুত পাথরের তৈরী এক মহল রয়েছে এবং ওর মধ্যে আনত নয়না ও আয়ত লোচনা হরীরা অবস্থান করছে। প্রশ্ন করে জানতে পারলো যে, এগুলো তারই জন্যে। এসব দেখে তো তার চক্ষু স্থির! অতঃপর তার ঐ কাফির সাথীর কথা তার মনে পড়লো। আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখাবেন যে, সে জাহান্নামে জ্বলতে রয়েছে। তাদের মধ্যে ঐ সব কথোপকথন হবে যার বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে। মুমিনের উপর দুনিয়ায় যে বিপদাপদ এসেছিল তা সে স্মরণ করবে। তখন মৃত্যু অপেক্ষা কঠিন বিপদ আর কিছুই তার কাছে অনুভূত হবে না।
আস-সাফফাত 37:59
৫০-৬১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, জান্নাতবাসীরা একে অপরের সামনা সামনি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। অর্থাৎ তারা দুনিয়ার মাঝে কে কেমন অবস্থায় ছিল এবং সেখানে তাদের দিনগুলো কিভাবে অতিবাহিত হয়েছিল সে সম্বন্ধে একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। চৌকির উপর পরস্পর তারা হেলান দিয়ে বসে থাকবে। শত শত সুদৃশ্য পরি-চেহারার সেবক তাদের হুকুমের অপেক্ষায় সদা প্রস্তুত থাকবে। ঐ জান্নাতীরা বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য ও পানীয় এবং রঙ বেরঙ-এর পোশাকের মধ্যে ডুবে থাকবে। তাদের মধ্যে সুরা পরিবেশিত হবে। এবং তারা এমন সব সুখের সামগ্রী লাভ করবে যা কোন কানও শুনেনি, চক্ষুও অবলোকন করেনি এবং হৃদয়ও কল্পনা করেনি। কথা প্রসঙ্গে তাদের একজন বলবেঃ দুনিয়ায় আমার এক বন্ধু ছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ শয়তান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সে এক মুশরিক ব্যক্তি। দুনিয়াতে মুমিনদের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল। এ দু’জন মনীষীর কথার মধ্যে বৈপরীত্য কিছুই নেই। কেননা, শয়তান জ্বিনদের মধ্য থেকেও হয়ে থাকে এবং সে অন্তরে সন্দেহের উদ্রেক করে। আর মানুষের মধ্যেও শয়তান থাকে, সেও গোপনে কথা বলে যা কান শ্রবণ করে। এই উভয় প্রকার মত একে অপরের পরিপূরক। এই উভয় প্রকারের শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি) আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে।”(১১৪:৪-৬) এ জন্যেই ঘোষিত হয়েছেঃ “তাদের কেউ বলেআমার ছিল (দুনিয়ায়) এক সঙ্গী। সে আমাকে বলতো ? তুমি কি এতে বিশ্বাসী যে, আমরা যখন মরে যাবো এবং আমরা মৃত্তিকা ও অস্থিতে পরিণত হবো তখনো কি আমাদেরকে প্রতিফল দেয়া হবে?” অর্থাৎ আমার ঐ বন্ধুটি আমাকে বলতোঃ তুমি কি কিয়ামত, হিসাব-নিকাশ ও প্রতিফল দিবসে বিশ্বাসী? এটা সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করতো। কেননা, সে তো অবিশ্বাস করতো। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, -এর অর্থ হলো হিসাব গ্রহণ করা। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল ফারাযী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো আমল অনুযায়ী প্রতিফল প্রদান করা। উভয় মতই ঠিক।মহান আল্লাহর বাণীঃ “তোমরা কি প্রত্যক্ষ করতে চাও?' মুমিন ব্যক্তি তার জান্নাতী বন্ধু ও সহচরকে পৃথিবীর ঐ বন্ধুর কথা বলবে। (আরবী) অর্থাৎ ‘অতঃপর সে ঝুঁকে দেখবে এবং তাকে দেখতে পাবে জাহান্নামের মধ্যস্থলে।' ইবনে আব্বাস (রাঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), খালীদুল আসরী (রঃ), কাতাদা (রঃ), সুদ্দী (রঃ), আতাউল খুরাসানী (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলো জাহান্নামের মধ্যস্থল। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সেই মুমিন ব্যক্তি তার বন্ধুটিকে মস্তক গলা অবস্থায় জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে। কা'ব (রঃ) বলেন যে, জান্নাতে জানালা রয়েছে। সুতরাং কেউ তার শত্রুদেরকে দেখতে ইচ্ছা করলে উঁকি দিলেই দেখতে পাবে। ফলে সে খুব বেশী বেশী আল্লাহ তা'আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। জান্নাতী ব্যক্তি তাকে দেখেই বলবেঃ তুমি আমার জন্যে এমন ফাঁদ পেতেছিলে যাতে আমাকে ধ্বংস করেই ছাড়তে। কিন্তু মহান আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি আমাকে তোমার খপ্পর থেকে রক্ষা করেছেন। যদি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ না হতো তবে আমি বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতাম। তোমার মত আমাকে জাহান্নামে জ্বলতে হতো। আল্লাহ আমাকে সুপথ প্রদর্শন করে একত্ববাদের দিকে ধাবিত করেছেন। “আমাদের তো মৃত্যু হবে না প্রথম মৃত্যুর পর এবং আমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে না।" এটা মুমিন বান্দাদের কথা, যাতে তাদের আনন্দ ও সাফল্যের সংবাদ রয়েছে। জান্নাতে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। সেখানে না আছে মৃত্যু, না আছে ভয় এবং না আছে শাস্তির কোন সম্ভাবনা। এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এটা তো মহা সাফল্য।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতীদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের আমলের বিনিময়ে খুব আনন্দের সাথে পানাহার করতে থাকো। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ এখানে ঐ কথারই ইঙ্গিত রয়েছে যে, জান্নাতীরা জান্নাতে কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তখন তারা জিজ্ঞেস করবেঃ “আমাদের আর মৃত্যু তো হবে না, তবে কখনো শাস্তি দেয়া হবে কি?” উত্তরে বলা হবেঃ “না।” হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “জেনে রেখো যে, প্রত্যেক নিয়ামত মৃত্যুর দ্বারা লয়প্রাপ্ত হয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “এরূপ সাফল্যের জন্যে সাধকদের উচিত সাধনা করা।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা জান্নাতীদের কথা। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা মহান আল্লাহর উক্তি। অর্থাৎ এরূপ রহমত ও নিয়ামত লাভ করার জন্যে মানুষের পূর্ণ আগ্রহের সাথে দুনিয়ায় কাজ করা উচিত যাতে পরকালে উক্ত নিয়ামত তারা লাভ করতে পারে। এই আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাহিনী রয়েছে যা নিম্নে বর্ণিত হলোঃবানী ইসরাঈলের দু’জন লোক যৌথভাবে ব্যবসা করতো। তাদের নিকট আট হাজার স্বর্ণমুদ্রা মজুদ ছিল। তাদের একজন ব্যবসায়ের কৌশল ভাল জানতো এবং অপরজন ব্যবসা তেমন বুঝতো না। তাই অভিজ্ঞ লোকটি তার সঙ্গীকে বললো যে, সে যেন তার অংশ নিয়ে পৃথক হয়ে যায়। সুতরাং উভয়ে ভিন্ন হয়ে গেল। অতঃপর ঐ অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী দেশের বাদশাহর মৃত্যুর পর তার। রাজপ্রাসাদ এক হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে ক্রয় করে নিলো এবং তার ঐ সঙ্গীটিকে ডেকে বললোঃ “দেখতো বন্ধু, আমি কেমন জিনিস ক্রয় করেছি?” সঙ্গীটি তার খুব প্রশংসা করলো। তারপর সে সেখান হতে বিদায় হয়ে গেল। অতঃপর সে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ সঙ্গী লোকটি এক হাজার স্বর্ণমুদ্রায় পার্থিব প্রাসাদ ক্রয় করেছে। আমি আপনার নিকট জানাতে একটি ঘরের আবেদন জানাচ্ছি। আমি এক হাজার স্বর্ণমুদা আপনার মিসকীন বান্দাদের মধ্যে দান করে দিচ্ছি।” অতঃপর সে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা সাদকা করে দিলো। কিছুকাল পর ঐ অভিজ্ঞ লোকটি এক হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) খরচ করে বিয়ে করলো। বিয়েতে সে তার ঐ পুরাতন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করে আনলো এবং বললোঃ “বন্ধু! আমি এক হাজার দীনার খরচ করে ঐ সুন্দরী মহিলাটিকে বিয়ে করে ঘরে আনলাম।” এবারও সে তার খুব। বাইরে এসে সে মহান আল্লাহর পথে এক হাজার দীনার দান করে দিলো এবং তার নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ বন্ধুটি এ পরিমানই টাকা খরচ করে এই দুনিয়ার একটি স্ত্রী লাভ করলো। আর আমি এর দ্বারা আপনার নিকট আয়ত লোচনা হুরী কামনা করছি।” আরো কিছুকাল পর ঐ দুনিয়াদার লোকটি এ লোকটিকে ডেকে নিয়ে বললোঃ “বন্ধু! আমি দুই হাজার দীনার খরচ করে দু'টি ফলের বাগান ক্রয় করেছি। দেখো তো কেমন হয়েছে?” এ লোকটি তার বাগান দুটি দেখে খুব প্রশংসা করলো এবং বাইরে এসে স্বীয় অভ্যাস মত আল্লাহ তা'আলার দরবারে আরয করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ বন্ধু দু’হাজার দীনারের বিনিময়ে দু’টি বাগান ক্রয় করেছে। আমি আপনার নিকট জান্নাতে দু’টি বাগানের জন্যে আবেদন করছি। আর এই দু’হাজার দীনার আমি আপনার নামে সাদকা করছি।” অতঃপর সে দু'হাজার দীনার সাদকা করে দিলো। তারপর যখন তাদের দু'জনের মৃত্যু হয়ে গেল তখন ঐ সাদকা প্রদানকারীকে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দেয়া হলো। সেখানে সে এক অতি পরমা সুন্দরী রমণী লাভ করলো এবং দু'টি সুন্দর বাগান প্রাপ্ত হলো। এ ছাড়া আরো এমন বহু নিয়ামত সে লাভ করলো যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। ঐ সময় তার পার্থিব ঐ সঙ্গীর কথা মনে পড়লো। ফেরেশতারা তাকে বললেনঃ “সে তো জাহান্নামে রয়েছে। তুমি ইচ্ছে করলে উঁকি মেরে তাকে দেখতে পার।” সে তখন উঁকি দিয়ে দেখলো যে, তার ঐ সঙ্গীটি জাহান্নামের আগুনে জ্বলছে। সে তখন তাকে সম্বোধন করে বললোঃ “তুমি তো আমাকেও প্রায় তোমার ফাঁদে ফেলে দিয়েছিলে। এটা আমার প্রতি আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ যে, তিনি আমাকে রক্ষা করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এটা তাশদীদ দিয়ে পড়াই অধিক সঙ্গত। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আবু হাফস (রঃ) ইসমাঈল সুদ্দী (রঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “এটা তোমাকে কে বলেছে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি এইমাত্র এটা পড়লাম। আমি আপনার নিকট হতে এটা জেনে নিতে চাই।” তখন তিনি বলেনঃ তবে শুননা ও স্মরণ রেখো। বানী ইসরাঈলের মধ্যে দুই জন অংশীদার ছিল। একজন ছিল মুমিন এবং অপরজন ছিল কাফির। তারা ছয় হাজার দীনার তিন হাজার করে ভাগ করে নিয়ে পৃথক হয়ে গেল। তারপর কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। একদা দু’জনের সাক্ষাৎ হলো। কাফির লোকটি মুমিন লোকটিকে বললোঃ “তোমার মাল-ধন তুমি কি করেছো? তা দিয়ে কোন কাজ করেছো, না ব্যবসায়ে লাগিয়েছো?” মুমিন লোকটি উত্তরে বললোঃ “আমি কিছুই করিনি। তুমি তোমার সম্পদ দিয়ে কি করেছো তাই বল।” কাফির লোকটি তখন বললোঃ “এক হাজার দীনার দিয়ে আমি জমি, খেজুরের বাগান ও নদী ক্রয় করেছি।” মুমিন লোকটি বললোঃ “সত্যিই কি তাই করেছো?” উত্তরে কাফির লোকটি বললোঃ “হ্যা, সত্যিই।” অতঃপর মুমিন লোকটি ফিরে আসলো। রাত্রি হলে সে আল্লাহর ইচ্ছা মত নামায পড়লো। নামায শেষে এক হাজার দীনার সামনে রেখে সে বললোঃ “হে আল্লাহ! ঐ কাফির এক হাজার দীনারের বিনিময়ে জমি, বাগান ও নহর ক্রয় করেছে। আগামীকাল তার মৃত্যু হলে সবই সে ছেড়ে যাবে। আমি এই এক হাজার দীনারের বিনিময়ে জান্নাতের জমি, বাগান ও নহর ক্রয় করতে চাই।" অতঃপর সকালে সে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। এরপর আরো কিছুকাল অতিবাহিত হলো। হঠাৎ একদিন উভয়ের সাক্ষাৎ হয়ে গেল। কাফির তার মুমিন সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার সম্পদ কি করেছো? কোন ব্যবসায়ে লাগিয়েছ কি?" মুমিন জবাবে বললো:“না। তবে তোমার সম্পদ তুমি কি করেছো তাই বল?” জিজ্ঞেস করলো মুমিন কাফিরকে। উত্তরে কাফির বললোঃ “হাজার দীনারের বিনিময়ে কিছু সঙ্গিনী ক্রয় করেছি। তারা আমার জন্যে সদা প্রস্তুত থাকে এবং আমার হুকুমের তাবেদারী করে।" মুমিন লোকটি তাকে বললোঃ “সত্যিই কি তুমি এ কাজ করেছো?” সে জবাব দিলো:“হ্যা, সত্যিই।" তারপর মুমিন লোকটি সেখান হতে চলে এসে রাত্রে আল্লাহর ইচ্ছা মত নামায আদায় করলো এবং নামায শেষে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা সামনে রেখে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করতে লাগলোঃ “হে আল্লাহ! আমার ঐ সাথীটি দুনিয়ার সঙ্গিনী ক্রয় করেছে। সে যদি মারা যায় তবে এ সবই রেখে যাবে অথবা তারা মারা গেলে একে তারা ছেড়ে যাবে। হে আল্লাহ! আমি এ দীনার দিয়ে জান্নাতের সঙ্গিনী ক্রয় করতে চাই।” অতঃপর সকালে সে ঐ এক হাজার দীনার দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। তারপর আরো কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। আবার একদিন উভয় বন্ধুর সাক্ষাৎ ঘটলো। তাদের মধ্যে আলাপ হতে লাগলো। মুমিন ব্যক্তির এক প্রশ্নের উত্তরে কাফির ব্যক্তি বললোঃ “আমার মনের যত বাসনা ছিল সবই প্রায় পূর্ণ হয়েছে। এখন শুধু একটি কাজ হাতে রয়েছে। তাহলো এই যে, একটি মহিলার স্বামী মারা গেছে। আমি তাকে এক হাজার দীনার উপঢৌকন রূপে পাঠিয়েছিলাম। সে ওর দ্বিগুণ দীনার নিয়ে আমার কাছে এসেছে।" মুমিন বললোঃ “তুমি তাহলে এ কাজ করেছো?” সে উত্তরে বললোঃ “হ্যা।” তারপর মুমিন লোকটি সেখান হতে ফিরে এলো এবং রাত্রে আল্লাহ যা চাইলেন সেই মত সে নামায আদায় করলো। এরপর সে অবশিষ্ট এক হাজার দীনার হাতে নিয়ে প্রার্থনা শুরু করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার ঐ কাফির সঙ্গীটি দুনিয়ার রমণীর মধ্যে একটি রমণীকে হাজার দীনারের বিনিমেয় বিয়ে করেছে। আগামীকাল এ খ্রীকে রেখে সে মারা যেতে পারে অথবা তার এ স্ত্রীটিও তাকে রেখে মৃত্যুবরণ করতে পারে। আমি এই দীনারের বিনিময়ে আপনার নিকট জান্নাতী আয়ত নয়না হুরীর প্রস্তাব রাখলাম।” অতঃপর সকালে সে ঐ দীনারগুলো মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। বলা বাহুল্য যে, মুমিন লোকটির নিকট আর কোন অর্থই অবশিষ্ট থাকলো না। এবার সে সূতার তৈরী সাধারণ জামা গায়ে দিয়ে একটি কম্বল হাতে নিয়ে এবং একটি কোদাল কাঁধে করে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লো। পথে এক ব্যক্তি তাকে দেখে বললোঃ “তুমি আমার গবাদি পশুর দেখা শুনা করবে এবং গোবর উঠাবে আর এর বিনিময়ে আমি তোমার পানাহারের ব্যবস্থা করবো। এতে তুমি সম্মত আছ কি?” মুমিন লোকটি এতে সম্মত হয়ে গেল এবং কাজ করতে শুরু করলো। ঐ মালিকটি ছিল অত্যন্ত নির্দয় ও কঠোর হৃদয়ের লোক। কোন পশুকে দুর্বল ও অসুস্থ দেখলে সে মনে করতো যে, ঐ সহিস তার পশুর খাদ্য চুরি করে। এই বদ ধারণার বশবর্তী হয়ে সে ঐ মুমিন লোকটিকে নির্মমভাবে প্রহার করতো। তার এরূপ অত্যাচারে সে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লো এবং তার ঐ কাফির সঙ্গীটিকে স্মরণ করলো যে, তারই ক্ষেত-খামারে সে কাজ করবে। এর বিনিময়ে হয়তো সে তাকে খেতে-পরতে দিবে এবং এটাই তার জন্যে যথেষ্ট। এই ভরসায় সে রওয়ানা হয়ে গেল। তার দরযার সামনে এসে বিরাট গগনচুম্বী প্রাসাদ দেখে তো তার চক্ষু স্থির। দেওড়ীতে পাহারাদার! তাদের নিকট সে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলো এবং বললোঃ “আমার নাম শুনলেই এ বাড়ীর মালিক খুশী হয়ে আমাকে প্রবেশের অনুমতি দিবে।” প্রহরীরা বললোঃ “তোমার কথা যদি সত্য হয় তবে এই এক কোণে চুপ করে পড়ে থাকো। সকাল হলে তার সামনে নিজেই গিয়ে পরিচয় দান করবে।” সে তাই করলো। এক পাশে গিয়ে কম্বলের অর্ধেকটি বিছিয়ে দিলো এবং বাকী অর্ধেক গায়ে দিয়ে রাত্রি কাটিয়ে দিলো।সকাল বেলা তার ঐ কাফির সঙ্গীটি ঘোড়ায় চড়ে প্রাতঃ ভ্রমণে বের হয়েছে এমন সময় মুমিন লোকটি তার সামনে হাযির হলো। তার এই দুরবস্থা দেখে সে অত্যন্ত বিস্মিত হলো এবং জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার এ অবস্থা কেন? টাকা পয়সা কি করেছো?” উত্তরে মুমিন ব্যক্তি বললোঃ “ওটা আর জিজ্ঞেস করো না ভাই। বরং আমাকে তোমার ক্ষেত-খামারের কাজে নিয়োগ কর। মজুরী কিছু লাগবে না, শুধু দু' বেলা খেতে দিলেই চলবে। আর যখন আমার পরনের এ বস্ত্রগুলো পুরোনো হয়ে যাবে তখন নতুন কাপড় কিনে দিবে আর কি?” সে উত্তরে বললোঃ “আরে, অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন, আমি বরং এর চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা তোমার জন্যে করে দিবো। এখন তুমি বল তোমার মাল-ধন কি করেছো? সে উত্তর দিলোঃ “একজনকে কর্জ দিয়েছি।” জিজ্ঞেস করলোঃ “কাকে কর্জ দিয়েছো?” উত্তর হলোঃ “এমন একজনকে কর্জ দিয়েছি যিনি তা অস্বীকার করবেন না এবং নষ্ট হতেও দিবেন না। তিনি আমার প্রতিপালক মহান আল্লাহ!” একথা শুনে কাফির লোকটি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললোঃ “তুমি তো দেখি বড় নির্বোধ! আমরা পচে গলে মাটিতে পরিণত হবো, অতঃপর পুনরুজ্জীবিত হবো ও প্রতিদান পাবো এতে তুমি বিশ্বাসী! তোমার যখন এমন বিশ্বাস তখন তুমি চলে যাও, তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।” এই বলে সে চলে গেল। মুমিন লোকটি সেখান থেকে বিদায় হলো এবং অতি কষ্টে জীবন যাপন করতে লাগলো। আর ঐ কাফির পরম সুখে দিন যাপন করতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত উভয়েই মৃত্যুমুখে পতিত হলো। তারপর মুমিন লোকটিকে জান্নাত দান করা হলো। সে বিরাট ময়দান, খুরমা-খেজুরের বাগান ও প্রবাহিত নদী দেখে অত্যন্ত বিস্ময়বোধ করলো এবং ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করলোঃ “এগুলো কার জন্যে?" তারা উত্তর দিলোঃ “এগুলো সবই তোমার ।" তারপর আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখলো যে, অসংখ্য দাস-দাসী অপেক্ষমান রয়েছে। জিজ্ঞেস করলোঃ “এগুলো কার জন্যে?” উত্তর হলোঃ “এগুলোও তোমারই জন্যে।" সে বললোঃ “সুবহানাল্লাহ! এটাতো আমার প্রতি আল্লাহর বড়ই মেহেরবানী।” আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখতে পেলো যে, ইয়াকুত পাথরের তৈরী এক মহল রয়েছে এবং ওর মধ্যে আনত নয়না ও আয়ত লোচনা হরীরা অবস্থান করছে। প্রশ্ন করে জানতে পারলো যে, এগুলো তারই জন্যে। এসব দেখে তো তার চক্ষু স্থির! অতঃপর তার ঐ কাফির সাথীর কথা তার মনে পড়লো। আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখাবেন যে, সে জাহান্নামে জ্বলতে রয়েছে। তাদের মধ্যে ঐ সব কথোপকথন হবে যার বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে। মুমিনের উপর দুনিয়ায় যে বিপদাপদ এসেছিল তা সে স্মরণ করবে। তখন মৃত্যু অপেক্ষা কঠিন বিপদ আর কিছুই তার কাছে অনুভূত হবে না।
আস-সাফফাত 37:60
৫০-৬১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, জান্নাতবাসীরা একে অপরের সামনা সামনি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। অর্থাৎ তারা দুনিয়ার মাঝে কে কেমন অবস্থায় ছিল এবং সেখানে তাদের দিনগুলো কিভাবে অতিবাহিত হয়েছিল সে সম্বন্ধে একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। চৌকির উপর পরস্পর তারা হেলান দিয়ে বসে থাকবে। শত শত সুদৃশ্য পরি-চেহারার সেবক তাদের হুকুমের অপেক্ষায় সদা প্রস্তুত থাকবে। ঐ জান্নাতীরা বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য ও পানীয় এবং রঙ বেরঙ-এর পোশাকের মধ্যে ডুবে থাকবে। তাদের মধ্যে সুরা পরিবেশিত হবে। এবং তারা এমন সব সুখের সামগ্রী লাভ করবে যা কোন কানও শুনেনি, চক্ষুও অবলোকন করেনি এবং হৃদয়ও কল্পনা করেনি। কথা প্রসঙ্গে তাদের একজন বলবেঃ দুনিয়ায় আমার এক বন্ধু ছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ শয়তান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সে এক মুশরিক ব্যক্তি। দুনিয়াতে মুমিনদের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল। এ দু’জন মনীষীর কথার মধ্যে বৈপরীত্য কিছুই নেই। কেননা, শয়তান জ্বিনদের মধ্য থেকেও হয়ে থাকে এবং সে অন্তরে সন্দেহের উদ্রেক করে। আর মানুষের মধ্যেও শয়তান থাকে, সেও গোপনে কথা বলে যা কান শ্রবণ করে। এই উভয় প্রকার মত একে অপরের পরিপূরক। এই উভয় প্রকারের শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি) আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে।”(১১৪:৪-৬) এ জন্যেই ঘোষিত হয়েছেঃ “তাদের কেউ বলেআমার ছিল (দুনিয়ায়) এক সঙ্গী। সে আমাকে বলতো ? তুমি কি এতে বিশ্বাসী যে, আমরা যখন মরে যাবো এবং আমরা মৃত্তিকা ও অস্থিতে পরিণত হবো তখনো কি আমাদেরকে প্রতিফল দেয়া হবে?” অর্থাৎ আমার ঐ বন্ধুটি আমাকে বলতোঃ তুমি কি কিয়ামত, হিসাব-নিকাশ ও প্রতিফল দিবসে বিশ্বাসী? এটা সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করতো। কেননা, সে তো অবিশ্বাস করতো। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, -এর অর্থ হলো হিসাব গ্রহণ করা। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল ফারাযী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো আমল অনুযায়ী প্রতিফল প্রদান করা। উভয় মতই ঠিক।মহান আল্লাহর বাণীঃ “তোমরা কি প্রত্যক্ষ করতে চাও?' মুমিন ব্যক্তি তার জান্নাতী বন্ধু ও সহচরকে পৃথিবীর ঐ বন্ধুর কথা বলবে। (আরবী) অর্থাৎ ‘অতঃপর সে ঝুঁকে দেখবে এবং তাকে দেখতে পাবে জাহান্নামের মধ্যস্থলে।' ইবনে আব্বাস (রাঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), খালীদুল আসরী (রঃ), কাতাদা (রঃ), সুদ্দী (রঃ), আতাউল খুরাসানী (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলো জাহান্নামের মধ্যস্থল। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সেই মুমিন ব্যক্তি তার বন্ধুটিকে মস্তক গলা অবস্থায় জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে। কা'ব (রঃ) বলেন যে, জান্নাতে জানালা রয়েছে। সুতরাং কেউ তার শত্রুদেরকে দেখতে ইচ্ছা করলে উঁকি দিলেই দেখতে পাবে। ফলে সে খুব বেশী বেশী আল্লাহ তা'আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। জান্নাতী ব্যক্তি তাকে দেখেই বলবেঃ তুমি আমার জন্যে এমন ফাঁদ পেতেছিলে যাতে আমাকে ধ্বংস করেই ছাড়তে। কিন্তু মহান আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি আমাকে তোমার খপ্পর থেকে রক্ষা করেছেন। যদি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ না হতো তবে আমি বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতাম। তোমার মত আমাকে জাহান্নামে জ্বলতে হতো। আল্লাহ আমাকে সুপথ প্রদর্শন করে একত্ববাদের দিকে ধাবিত করেছেন। “আমাদের তো মৃত্যু হবে না প্রথম মৃত্যুর পর এবং আমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে না।" এটা মুমিন বান্দাদের কথা, যাতে তাদের আনন্দ ও সাফল্যের সংবাদ রয়েছে। জান্নাতে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। সেখানে না আছে মৃত্যু, না আছে ভয় এবং না আছে শাস্তির কোন সম্ভাবনা। এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এটা তো মহা সাফল্য।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতীদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের আমলের বিনিময়ে খুব আনন্দের সাথে পানাহার করতে থাকো। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ এখানে ঐ কথারই ইঙ্গিত রয়েছে যে, জান্নাতীরা জান্নাতে কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তখন তারা জিজ্ঞেস করবেঃ “আমাদের আর মৃত্যু তো হবে না, তবে কখনো শাস্তি দেয়া হবে কি?” উত্তরে বলা হবেঃ “না।” হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “জেনে রেখো যে, প্রত্যেক নিয়ামত মৃত্যুর দ্বারা লয়প্রাপ্ত হয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “এরূপ সাফল্যের জন্যে সাধকদের উচিত সাধনা করা।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা জান্নাতীদের কথা। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা মহান আল্লাহর উক্তি। অর্থাৎ এরূপ রহমত ও নিয়ামত লাভ করার জন্যে মানুষের পূর্ণ আগ্রহের সাথে দুনিয়ায় কাজ করা উচিত যাতে পরকালে উক্ত নিয়ামত তারা লাভ করতে পারে। এই আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাহিনী রয়েছে যা নিম্নে বর্ণিত হলোঃবানী ইসরাঈলের দু’জন লোক যৌথভাবে ব্যবসা করতো। তাদের নিকট আট হাজার স্বর্ণমুদ্রা মজুদ ছিল। তাদের একজন ব্যবসায়ের কৌশল ভাল জানতো এবং অপরজন ব্যবসা তেমন বুঝতো না। তাই অভিজ্ঞ লোকটি তার সঙ্গীকে বললো যে, সে যেন তার অংশ নিয়ে পৃথক হয়ে যায়। সুতরাং উভয়ে ভিন্ন হয়ে গেল। অতঃপর ঐ অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী দেশের বাদশাহর মৃত্যুর পর তার। রাজপ্রাসাদ এক হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে ক্রয় করে নিলো এবং তার ঐ সঙ্গীটিকে ডেকে বললোঃ “দেখতো বন্ধু, আমি কেমন জিনিস ক্রয় করেছি?” সঙ্গীটি তার খুব প্রশংসা করলো। তারপর সে সেখান হতে বিদায় হয়ে গেল। অতঃপর সে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ সঙ্গী লোকটি এক হাজার স্বর্ণমুদ্রায় পার্থিব প্রাসাদ ক্রয় করেছে। আমি আপনার নিকট জানাতে একটি ঘরের আবেদন জানাচ্ছি। আমি এক হাজার স্বর্ণমুদা আপনার মিসকীন বান্দাদের মধ্যে দান করে দিচ্ছি।” অতঃপর সে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা সাদকা করে দিলো। কিছুকাল পর ঐ অভিজ্ঞ লোকটি এক হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) খরচ করে বিয়ে করলো। বিয়েতে সে তার ঐ পুরাতন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করে আনলো এবং বললোঃ “বন্ধু! আমি এক হাজার দীনার খরচ করে ঐ সুন্দরী মহিলাটিকে বিয়ে করে ঘরে আনলাম।” এবারও সে তার খুব। বাইরে এসে সে মহান আল্লাহর পথে এক হাজার দীনার দান করে দিলো এবং তার নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ বন্ধুটি এ পরিমানই টাকা খরচ করে এই দুনিয়ার একটি স্ত্রী লাভ করলো। আর আমি এর দ্বারা আপনার নিকট আয়ত লোচনা হুরী কামনা করছি।” আরো কিছুকাল পর ঐ দুনিয়াদার লোকটি এ লোকটিকে ডেকে নিয়ে বললোঃ “বন্ধু! আমি দুই হাজার দীনার খরচ করে দু'টি ফলের বাগান ক্রয় করেছি। দেখো তো কেমন হয়েছে?” এ লোকটি তার বাগান দুটি দেখে খুব প্রশংসা করলো এবং বাইরে এসে স্বীয় অভ্যাস মত আল্লাহ তা'আলার দরবারে আরয করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ বন্ধু দু’হাজার দীনারের বিনিময়ে দু’টি বাগান ক্রয় করেছে। আমি আপনার নিকট জান্নাতে দু’টি বাগানের জন্যে আবেদন করছি। আর এই দু’হাজার দীনার আমি আপনার নামে সাদকা করছি।” অতঃপর সে দু'হাজার দীনার সাদকা করে দিলো। তারপর যখন তাদের দু'জনের মৃত্যু হয়ে গেল তখন ঐ সাদকা প্রদানকারীকে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দেয়া হলো। সেখানে সে এক অতি পরমা সুন্দরী রমণী লাভ করলো এবং দু'টি সুন্দর বাগান প্রাপ্ত হলো। এ ছাড়া আরো এমন বহু নিয়ামত সে লাভ করলো যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। ঐ সময় তার পার্থিব ঐ সঙ্গীর কথা মনে পড়লো। ফেরেশতারা তাকে বললেনঃ “সে তো জাহান্নামে রয়েছে। তুমি ইচ্ছে করলে উঁকি মেরে তাকে দেখতে পার।” সে তখন উঁকি দিয়ে দেখলো যে, তার ঐ সঙ্গীটি জাহান্নামের আগুনে জ্বলছে। সে তখন তাকে সম্বোধন করে বললোঃ “তুমি তো আমাকেও প্রায় তোমার ফাঁদে ফেলে দিয়েছিলে। এটা আমার প্রতি আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ যে, তিনি আমাকে রক্ষা করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এটা তাশদীদ দিয়ে পড়াই অধিক সঙ্গত। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আবু হাফস (রঃ) ইসমাঈল সুদ্দী (রঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “এটা তোমাকে কে বলেছে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি এইমাত্র এটা পড়লাম। আমি আপনার নিকট হতে এটা জেনে নিতে চাই।” তখন তিনি বলেনঃ তবে শুননা ও স্মরণ রেখো। বানী ইসরাঈলের মধ্যে দুই জন অংশীদার ছিল। একজন ছিল মুমিন এবং অপরজন ছিল কাফির। তারা ছয় হাজার দীনার তিন হাজার করে ভাগ করে নিয়ে পৃথক হয়ে গেল। তারপর কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। একদা দু’জনের সাক্ষাৎ হলো। কাফির লোকটি মুমিন লোকটিকে বললোঃ “তোমার মাল-ধন তুমি কি করেছো? তা দিয়ে কোন কাজ করেছো, না ব্যবসায়ে লাগিয়েছো?” মুমিন লোকটি উত্তরে বললোঃ “আমি কিছুই করিনি। তুমি তোমার সম্পদ দিয়ে কি করেছো তাই বল।” কাফির লোকটি তখন বললোঃ “এক হাজার দীনার দিয়ে আমি জমি, খেজুরের বাগান ও নদী ক্রয় করেছি।” মুমিন লোকটি বললোঃ “সত্যিই কি তাই করেছো?” উত্তরে কাফির লোকটি বললোঃ “হ্যা, সত্যিই।” অতঃপর মুমিন লোকটি ফিরে আসলো। রাত্রি হলে সে আল্লাহর ইচ্ছা মত নামায পড়লো। নামায শেষে এক হাজার দীনার সামনে রেখে সে বললোঃ “হে আল্লাহ! ঐ কাফির এক হাজার দীনারের বিনিময়ে জমি, বাগান ও নহর ক্রয় করেছে। আগামীকাল তার মৃত্যু হলে সবই সে ছেড়ে যাবে। আমি এই এক হাজার দীনারের বিনিময়ে জান্নাতের জমি, বাগান ও নহর ক্রয় করতে চাই।" অতঃপর সকালে সে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। এরপর আরো কিছুকাল অতিবাহিত হলো। হঠাৎ একদিন উভয়ের সাক্ষাৎ হয়ে গেল। কাফির তার মুমিন সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার সম্পদ কি করেছো? কোন ব্যবসায়ে লাগিয়েছ কি?" মুমিন জবাবে বললো:“না। তবে তোমার সম্পদ তুমি কি করেছো তাই বল?” জিজ্ঞেস করলো মুমিন কাফিরকে। উত্তরে কাফির বললোঃ “হাজার দীনারের বিনিময়ে কিছু সঙ্গিনী ক্রয় করেছি। তারা আমার জন্যে সদা প্রস্তুত থাকে এবং আমার হুকুমের তাবেদারী করে।" মুমিন লোকটি তাকে বললোঃ “সত্যিই কি তুমি এ কাজ করেছো?” সে জবাব দিলো:“হ্যা, সত্যিই।" তারপর মুমিন লোকটি সেখান হতে চলে এসে রাত্রে আল্লাহর ইচ্ছা মত নামায আদায় করলো এবং নামায শেষে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা সামনে রেখে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করতে লাগলোঃ “হে আল্লাহ! আমার ঐ সাথীটি দুনিয়ার সঙ্গিনী ক্রয় করেছে। সে যদি মারা যায় তবে এ সবই রেখে যাবে অথবা তারা মারা গেলে একে তারা ছেড়ে যাবে। হে আল্লাহ! আমি এ দীনার দিয়ে জান্নাতের সঙ্গিনী ক্রয় করতে চাই।” অতঃপর সকালে সে ঐ এক হাজার দীনার দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। তারপর আরো কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। আবার একদিন উভয় বন্ধুর সাক্ষাৎ ঘটলো। তাদের মধ্যে আলাপ হতে লাগলো। মুমিন ব্যক্তির এক প্রশ্নের উত্তরে কাফির ব্যক্তি বললোঃ “আমার মনের যত বাসনা ছিল সবই প্রায় পূর্ণ হয়েছে। এখন শুধু একটি কাজ হাতে রয়েছে। তাহলো এই যে, একটি মহিলার স্বামী মারা গেছে। আমি তাকে এক হাজার দীনার উপঢৌকন রূপে পাঠিয়েছিলাম। সে ওর দ্বিগুণ দীনার নিয়ে আমার কাছে এসেছে।" মুমিন বললোঃ “তুমি তাহলে এ কাজ করেছো?” সে উত্তরে বললোঃ “হ্যা।” তারপর মুমিন লোকটি সেখান হতে ফিরে এলো এবং রাত্রে আল্লাহ যা চাইলেন সেই মত সে নামায আদায় করলো। এরপর সে অবশিষ্ট এক হাজার দীনার হাতে নিয়ে প্রার্থনা শুরু করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার ঐ কাফির সঙ্গীটি দুনিয়ার রমণীর মধ্যে একটি রমণীকে হাজার দীনারের বিনিমেয় বিয়ে করেছে। আগামীকাল এ খ্রীকে রেখে সে মারা যেতে পারে অথবা তার এ স্ত্রীটিও তাকে রেখে মৃত্যুবরণ করতে পারে। আমি এই দীনারের বিনিময়ে আপনার নিকট জান্নাতী আয়ত নয়না হুরীর প্রস্তাব রাখলাম।” অতঃপর সকালে সে ঐ দীনারগুলো মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। বলা বাহুল্য যে, মুমিন লোকটির নিকট আর কোন অর্থই অবশিষ্ট থাকলো না। এবার সে সূতার তৈরী সাধারণ জামা গায়ে দিয়ে একটি কম্বল হাতে নিয়ে এবং একটি কোদাল কাঁধে করে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লো। পথে এক ব্যক্তি তাকে দেখে বললোঃ “তুমি আমার গবাদি পশুর দেখা শুনা করবে এবং গোবর উঠাবে আর এর বিনিময়ে আমি তোমার পানাহারের ব্যবস্থা করবো। এতে তুমি সম্মত আছ কি?” মুমিন লোকটি এতে সম্মত হয়ে গেল এবং কাজ করতে শুরু করলো। ঐ মালিকটি ছিল অত্যন্ত নির্দয় ও কঠোর হৃদয়ের লোক। কোন পশুকে দুর্বল ও অসুস্থ দেখলে সে মনে করতো যে, ঐ সহিস তার পশুর খাদ্য চুরি করে। এই বদ ধারণার বশবর্তী হয়ে সে ঐ মুমিন লোকটিকে নির্মমভাবে প্রহার করতো। তার এরূপ অত্যাচারে সে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লো এবং তার ঐ কাফির সঙ্গীটিকে স্মরণ করলো যে, তারই ক্ষেত-খামারে সে কাজ করবে। এর বিনিময়ে হয়তো সে তাকে খেতে-পরতে দিবে এবং এটাই তার জন্যে যথেষ্ট। এই ভরসায় সে রওয়ানা হয়ে গেল। তার দরযার সামনে এসে বিরাট গগনচুম্বী প্রাসাদ দেখে তো তার চক্ষু স্থির। দেওড়ীতে পাহারাদার! তাদের নিকট সে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলো এবং বললোঃ “আমার নাম শুনলেই এ বাড়ীর মালিক খুশী হয়ে আমাকে প্রবেশের অনুমতি দিবে।” প্রহরীরা বললোঃ “তোমার কথা যদি সত্য হয় তবে এই এক কোণে চুপ করে পড়ে থাকো। সকাল হলে তার সামনে নিজেই গিয়ে পরিচয় দান করবে।” সে তাই করলো। এক পাশে গিয়ে কম্বলের অর্ধেকটি বিছিয়ে দিলো এবং বাকী অর্ধেক গায়ে দিয়ে রাত্রি কাটিয়ে দিলো।সকাল বেলা তার ঐ কাফির সঙ্গীটি ঘোড়ায় চড়ে প্রাতঃ ভ্রমণে বের হয়েছে এমন সময় মুমিন লোকটি তার সামনে হাযির হলো। তার এই দুরবস্থা দেখে সে অত্যন্ত বিস্মিত হলো এবং জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার এ অবস্থা কেন? টাকা পয়সা কি করেছো?” উত্তরে মুমিন ব্যক্তি বললোঃ “ওটা আর জিজ্ঞেস করো না ভাই। বরং আমাকে তোমার ক্ষেত-খামারের কাজে নিয়োগ কর। মজুরী কিছু লাগবে না, শুধু দু' বেলা খেতে দিলেই চলবে। আর যখন আমার পরনের এ বস্ত্রগুলো পুরোনো হয়ে যাবে তখন নতুন কাপড় কিনে দিবে আর কি?” সে উত্তরে বললোঃ “আরে, অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন, আমি বরং এর চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা তোমার জন্যে করে দিবো। এখন তুমি বল তোমার মাল-ধন কি করেছো? সে উত্তর দিলোঃ “একজনকে কর্জ দিয়েছি।” জিজ্ঞেস করলোঃ “কাকে কর্জ দিয়েছো?” উত্তর হলোঃ “এমন একজনকে কর্জ দিয়েছি যিনি তা অস্বীকার করবেন না এবং নষ্ট হতেও দিবেন না। তিনি আমার প্রতিপালক মহান আল্লাহ!” একথা শুনে কাফির লোকটি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললোঃ “তুমি তো দেখি বড় নির্বোধ! আমরা পচে গলে মাটিতে পরিণত হবো, অতঃপর পুনরুজ্জীবিত হবো ও প্রতিদান পাবো এতে তুমি বিশ্বাসী! তোমার যখন এমন বিশ্বাস তখন তুমি চলে যাও, তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।” এই বলে সে চলে গেল। মুমিন লোকটি সেখান থেকে বিদায় হলো এবং অতি কষ্টে জীবন যাপন করতে লাগলো। আর ঐ কাফির পরম সুখে দিন যাপন করতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত উভয়েই মৃত্যুমুখে পতিত হলো। তারপর মুমিন লোকটিকে জান্নাত দান করা হলো। সে বিরাট ময়দান, খুরমা-খেজুরের বাগান ও প্রবাহিত নদী দেখে অত্যন্ত বিস্ময়বোধ করলো এবং ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করলোঃ “এগুলো কার জন্যে?" তারা উত্তর দিলোঃ “এগুলো সবই তোমার ।" তারপর আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখলো যে, অসংখ্য দাস-দাসী অপেক্ষমান রয়েছে। জিজ্ঞেস করলোঃ “এগুলো কার জন্যে?” উত্তর হলোঃ “এগুলোও তোমারই জন্যে।" সে বললোঃ “সুবহানাল্লাহ! এটাতো আমার প্রতি আল্লাহর বড়ই মেহেরবানী।” আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখতে পেলো যে, ইয়াকুত পাথরের তৈরী এক মহল রয়েছে এবং ওর মধ্যে আনত নয়না ও আয়ত লোচনা হরীরা অবস্থান করছে। প্রশ্ন করে জানতে পারলো যে, এগুলো তারই জন্যে। এসব দেখে তো তার চক্ষু স্থির! অতঃপর তার ঐ কাফির সাথীর কথা তার মনে পড়লো। আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখাবেন যে, সে জাহান্নামে জ্বলতে রয়েছে। তাদের মধ্যে ঐ সব কথোপকথন হবে যার বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে। মুমিনের উপর দুনিয়ায় যে বিপদাপদ এসেছিল তা সে স্মরণ করবে। তখন মৃত্যু অপেক্ষা কঠিন বিপদ আর কিছুই তার কাছে অনুভূত হবে না।
আস-সাফফাত 37:61
৫০-৬১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, জান্নাতবাসীরা একে অপরের সামনা সামনি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। অর্থাৎ তারা দুনিয়ার মাঝে কে কেমন অবস্থায় ছিল এবং সেখানে তাদের দিনগুলো কিভাবে অতিবাহিত হয়েছিল সে সম্বন্ধে একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। চৌকির উপর পরস্পর তারা হেলান দিয়ে বসে থাকবে। শত শত সুদৃশ্য পরি-চেহারার সেবক তাদের হুকুমের অপেক্ষায় সদা প্রস্তুত থাকবে। ঐ জান্নাতীরা বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য ও পানীয় এবং রঙ বেরঙ-এর পোশাকের মধ্যে ডুবে থাকবে। তাদের মধ্যে সুরা পরিবেশিত হবে। এবং তারা এমন সব সুখের সামগ্রী লাভ করবে যা কোন কানও শুনেনি, চক্ষুও অবলোকন করেনি এবং হৃদয়ও কল্পনা করেনি। কথা প্রসঙ্গে তাদের একজন বলবেঃ দুনিয়ায় আমার এক বন্ধু ছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ শয়তান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সে এক মুশরিক ব্যক্তি। দুনিয়াতে মুমিনদের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল। এ দু’জন মনীষীর কথার মধ্যে বৈপরীত্য কিছুই নেই। কেননা, শয়তান জ্বিনদের মধ্য থেকেও হয়ে থাকে এবং সে অন্তরে সন্দেহের উদ্রেক করে। আর মানুষের মধ্যেও শয়তান থাকে, সেও গোপনে কথা বলে যা কান শ্রবণ করে। এই উভয় প্রকার মত একে অপরের পরিপূরক। এই উভয় প্রকারের শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি) আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জ্বিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে।”(১১৪:৪-৬) এ জন্যেই ঘোষিত হয়েছেঃ “তাদের কেউ বলেআমার ছিল (দুনিয়ায়) এক সঙ্গী। সে আমাকে বলতো ? তুমি কি এতে বিশ্বাসী যে, আমরা যখন মরে যাবো এবং আমরা মৃত্তিকা ও অস্থিতে পরিণত হবো তখনো কি আমাদেরকে প্রতিফল দেয়া হবে?” অর্থাৎ আমার ঐ বন্ধুটি আমাকে বলতোঃ তুমি কি কিয়ামত, হিসাব-নিকাশ ও প্রতিফল দিবসে বিশ্বাসী? এটা সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করতো। কেননা, সে তো অবিশ্বাস করতো। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, -এর অর্থ হলো হিসাব গ্রহণ করা। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল ফারাযী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো আমল অনুযায়ী প্রতিফল প্রদান করা। উভয় মতই ঠিক।মহান আল্লাহর বাণীঃ “তোমরা কি প্রত্যক্ষ করতে চাও?' মুমিন ব্যক্তি তার জান্নাতী বন্ধু ও সহচরকে পৃথিবীর ঐ বন্ধুর কথা বলবে। (আরবী) অর্থাৎ ‘অতঃপর সে ঝুঁকে দেখবে এবং তাকে দেখতে পাবে জাহান্নামের মধ্যস্থলে।' ইবনে আব্বাস (রাঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), খালীদুল আসরী (রঃ), কাতাদা (রঃ), সুদ্দী (রঃ), আতাউল খুরাসানী (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলো জাহান্নামের মধ্যস্থল। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সেই মুমিন ব্যক্তি তার বন্ধুটিকে মস্তক গলা অবস্থায় জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে। কা'ব (রঃ) বলেন যে, জান্নাতে জানালা রয়েছে। সুতরাং কেউ তার শত্রুদেরকে দেখতে ইচ্ছা করলে উঁকি দিলেই দেখতে পাবে। ফলে সে খুব বেশী বেশী আল্লাহ তা'আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। জান্নাতী ব্যক্তি তাকে দেখেই বলবেঃ তুমি আমার জন্যে এমন ফাঁদ পেতেছিলে যাতে আমাকে ধ্বংস করেই ছাড়তে। কিন্তু মহান আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি আমাকে তোমার খপ্পর থেকে রক্ষা করেছেন। যদি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ না হতো তবে আমি বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতাম। তোমার মত আমাকে জাহান্নামে জ্বলতে হতো। আল্লাহ আমাকে সুপথ প্রদর্শন করে একত্ববাদের দিকে ধাবিত করেছেন। “আমাদের তো মৃত্যু হবে না প্রথম মৃত্যুর পর এবং আমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে না।" এটা মুমিন বান্দাদের কথা, যাতে তাদের আনন্দ ও সাফল্যের সংবাদ রয়েছে। জান্নাতে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। সেখানে না আছে মৃত্যু, না আছে ভয় এবং না আছে শাস্তির কোন সম্ভাবনা। এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এটা তো মহা সাফল্য।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতীদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের আমলের বিনিময়ে খুব আনন্দের সাথে পানাহার করতে থাকো। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ এখানে ঐ কথারই ইঙ্গিত রয়েছে যে, জান্নাতীরা জান্নাতে কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তখন তারা জিজ্ঞেস করবেঃ “আমাদের আর মৃত্যু তো হবে না, তবে কখনো শাস্তি দেয়া হবে কি?” উত্তরে বলা হবেঃ “না।” হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “জেনে রেখো যে, প্রত্যেক নিয়ামত মৃত্যুর দ্বারা লয়প্রাপ্ত হয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “এরূপ সাফল্যের জন্যে সাধকদের উচিত সাধনা করা।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা জান্নাতীদের কথা। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা মহান আল্লাহর উক্তি। অর্থাৎ এরূপ রহমত ও নিয়ামত লাভ করার জন্যে মানুষের পূর্ণ আগ্রহের সাথে দুনিয়ায় কাজ করা উচিত যাতে পরকালে উক্ত নিয়ামত তারা লাভ করতে পারে। এই আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাহিনী রয়েছে যা নিম্নে বর্ণিত হলোঃবানী ইসরাঈলের দু’জন লোক যৌথভাবে ব্যবসা করতো। তাদের নিকট আট হাজার স্বর্ণমুদ্রা মজুদ ছিল। তাদের একজন ব্যবসায়ের কৌশল ভাল জানতো এবং অপরজন ব্যবসা তেমন বুঝতো না। তাই অভিজ্ঞ লোকটি তার সঙ্গীকে বললো যে, সে যেন তার অংশ নিয়ে পৃথক হয়ে যায়। সুতরাং উভয়ে ভিন্ন হয়ে গেল। অতঃপর ঐ অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী দেশের বাদশাহর মৃত্যুর পর তার। রাজপ্রাসাদ এক হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে ক্রয় করে নিলো এবং তার ঐ সঙ্গীটিকে ডেকে বললোঃ “দেখতো বন্ধু, আমি কেমন জিনিস ক্রয় করেছি?” সঙ্গীটি তার খুব প্রশংসা করলো। তারপর সে সেখান হতে বিদায় হয়ে গেল। অতঃপর সে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ সঙ্গী লোকটি এক হাজার স্বর্ণমুদ্রায় পার্থিব প্রাসাদ ক্রয় করেছে। আমি আপনার নিকট জানাতে একটি ঘরের আবেদন জানাচ্ছি। আমি এক হাজার স্বর্ণমুদা আপনার মিসকীন বান্দাদের মধ্যে দান করে দিচ্ছি।” অতঃপর সে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা সাদকা করে দিলো। কিছুকাল পর ঐ অভিজ্ঞ লোকটি এক হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) খরচ করে বিয়ে করলো। বিয়েতে সে তার ঐ পুরাতন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করে আনলো এবং বললোঃ “বন্ধু! আমি এক হাজার দীনার খরচ করে ঐ সুন্দরী মহিলাটিকে বিয়ে করে ঘরে আনলাম।” এবারও সে তার খুব। বাইরে এসে সে মহান আল্লাহর পথে এক হাজার দীনার দান করে দিলো এবং তার নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ বন্ধুটি এ পরিমানই টাকা খরচ করে এই দুনিয়ার একটি স্ত্রী লাভ করলো। আর আমি এর দ্বারা আপনার নিকট আয়ত লোচনা হুরী কামনা করছি।” আরো কিছুকাল পর ঐ দুনিয়াদার লোকটি এ লোকটিকে ডেকে নিয়ে বললোঃ “বন্ধু! আমি দুই হাজার দীনার খরচ করে দু'টি ফলের বাগান ক্রয় করেছি। দেখো তো কেমন হয়েছে?” এ লোকটি তার বাগান দুটি দেখে খুব প্রশংসা করলো এবং বাইরে এসে স্বীয় অভ্যাস মত আল্লাহ তা'আলার দরবারে আরয করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার এ বন্ধু দু’হাজার দীনারের বিনিময়ে দু’টি বাগান ক্রয় করেছে। আমি আপনার নিকট জান্নাতে দু’টি বাগানের জন্যে আবেদন করছি। আর এই দু’হাজার দীনার আমি আপনার নামে সাদকা করছি।” অতঃপর সে দু'হাজার দীনার সাদকা করে দিলো। তারপর যখন তাদের দু'জনের মৃত্যু হয়ে গেল তখন ঐ সাদকা প্রদানকারীকে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দেয়া হলো। সেখানে সে এক অতি পরমা সুন্দরী রমণী লাভ করলো এবং দু'টি সুন্দর বাগান প্রাপ্ত হলো। এ ছাড়া আরো এমন বহু নিয়ামত সে লাভ করলো যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। ঐ সময় তার পার্থিব ঐ সঙ্গীর কথা মনে পড়লো। ফেরেশতারা তাকে বললেনঃ “সে তো জাহান্নামে রয়েছে। তুমি ইচ্ছে করলে উঁকি মেরে তাকে দেখতে পার।” সে তখন উঁকি দিয়ে দেখলো যে, তার ঐ সঙ্গীটি জাহান্নামের আগুনে জ্বলছে। সে তখন তাকে সম্বোধন করে বললোঃ “তুমি তো আমাকেও প্রায় তোমার ফাঁদে ফেলে দিয়েছিলে। এটা আমার প্রতি আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ যে, তিনি আমাকে রক্ষা করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এটা তাশদীদ দিয়ে পড়াই অধিক সঙ্গত। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আবু হাফস (রঃ) ইসমাঈল সুদ্দী (রঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “এটা তোমাকে কে বলেছে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি এইমাত্র এটা পড়লাম। আমি আপনার নিকট হতে এটা জেনে নিতে চাই।” তখন তিনি বলেনঃ তবে শুননা ও স্মরণ রেখো। বানী ইসরাঈলের মধ্যে দুই জন অংশীদার ছিল। একজন ছিল মুমিন এবং অপরজন ছিল কাফির। তারা ছয় হাজার দীনার তিন হাজার করে ভাগ করে নিয়ে পৃথক হয়ে গেল। তারপর কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। একদা দু’জনের সাক্ষাৎ হলো। কাফির লোকটি মুমিন লোকটিকে বললোঃ “তোমার মাল-ধন তুমি কি করেছো? তা দিয়ে কোন কাজ করেছো, না ব্যবসায়ে লাগিয়েছো?” মুমিন লোকটি উত্তরে বললোঃ “আমি কিছুই করিনি। তুমি তোমার সম্পদ দিয়ে কি করেছো তাই বল।” কাফির লোকটি তখন বললোঃ “এক হাজার দীনার দিয়ে আমি জমি, খেজুরের বাগান ও নদী ক্রয় করেছি।” মুমিন লোকটি বললোঃ “সত্যিই কি তাই করেছো?” উত্তরে কাফির লোকটি বললোঃ “হ্যা, সত্যিই।” অতঃপর মুমিন লোকটি ফিরে আসলো। রাত্রি হলে সে আল্লাহর ইচ্ছা মত নামায পড়লো। নামায শেষে এক হাজার দীনার সামনে রেখে সে বললোঃ “হে আল্লাহ! ঐ কাফির এক হাজার দীনারের বিনিময়ে জমি, বাগান ও নহর ক্রয় করেছে। আগামীকাল তার মৃত্যু হলে সবই সে ছেড়ে যাবে। আমি এই এক হাজার দীনারের বিনিময়ে জান্নাতের জমি, বাগান ও নহর ক্রয় করতে চাই।" অতঃপর সকালে সে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। এরপর আরো কিছুকাল অতিবাহিত হলো। হঠাৎ একদিন উভয়ের সাক্ষাৎ হয়ে গেল। কাফির তার মুমিন সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার সম্পদ কি করেছো? কোন ব্যবসায়ে লাগিয়েছ কি?" মুমিন জবাবে বললো:“না। তবে তোমার সম্পদ তুমি কি করেছো তাই বল?” জিজ্ঞেস করলো মুমিন কাফিরকে। উত্তরে কাফির বললোঃ “হাজার দীনারের বিনিময়ে কিছু সঙ্গিনী ক্রয় করেছি। তারা আমার জন্যে সদা প্রস্তুত থাকে এবং আমার হুকুমের তাবেদারী করে।" মুমিন লোকটি তাকে বললোঃ “সত্যিই কি তুমি এ কাজ করেছো?” সে জবাব দিলো:“হ্যা, সত্যিই।" তারপর মুমিন লোকটি সেখান হতে চলে এসে রাত্রে আল্লাহর ইচ্ছা মত নামায আদায় করলো এবং নামায শেষে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা সামনে রেখে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করতে লাগলোঃ “হে আল্লাহ! আমার ঐ সাথীটি দুনিয়ার সঙ্গিনী ক্রয় করেছে। সে যদি মারা যায় তবে এ সবই রেখে যাবে অথবা তারা মারা গেলে একে তারা ছেড়ে যাবে। হে আল্লাহ! আমি এ দীনার দিয়ে জান্নাতের সঙ্গিনী ক্রয় করতে চাই।” অতঃপর সকালে সে ঐ এক হাজার দীনার দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। তারপর আরো কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। আবার একদিন উভয় বন্ধুর সাক্ষাৎ ঘটলো। তাদের মধ্যে আলাপ হতে লাগলো। মুমিন ব্যক্তির এক প্রশ্নের উত্তরে কাফির ব্যক্তি বললোঃ “আমার মনের যত বাসনা ছিল সবই প্রায় পূর্ণ হয়েছে। এখন শুধু একটি কাজ হাতে রয়েছে। তাহলো এই যে, একটি মহিলার স্বামী মারা গেছে। আমি তাকে এক হাজার দীনার উপঢৌকন রূপে পাঠিয়েছিলাম। সে ওর দ্বিগুণ দীনার নিয়ে আমার কাছে এসেছে।" মুমিন বললোঃ “তুমি তাহলে এ কাজ করেছো?” সে উত্তরে বললোঃ “হ্যা।” তারপর মুমিন লোকটি সেখান হতে ফিরে এলো এবং রাত্রে আল্লাহ যা চাইলেন সেই মত সে নামায আদায় করলো। এরপর সে অবশিষ্ট এক হাজার দীনার হাতে নিয়ে প্রার্থনা শুরু করলোঃ “হে আল্লাহ! আমার ঐ কাফির সঙ্গীটি দুনিয়ার রমণীর মধ্যে একটি রমণীকে হাজার দীনারের বিনিমেয় বিয়ে করেছে। আগামীকাল এ খ্রীকে রেখে সে মারা যেতে পারে অথবা তার এ স্ত্রীটিও তাকে রেখে মৃত্যুবরণ করতে পারে। আমি এই দীনারের বিনিময়ে আপনার নিকট জান্নাতী আয়ত নয়না হুরীর প্রস্তাব রাখলাম।” অতঃপর সকালে সে ঐ দীনারগুলো মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। বলা বাহুল্য যে, মুমিন লোকটির নিকট আর কোন অর্থই অবশিষ্ট থাকলো না। এবার সে সূতার তৈরী সাধারণ জামা গায়ে দিয়ে একটি কম্বল হাতে নিয়ে এবং একটি কোদাল কাঁধে করে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লো। পথে এক ব্যক্তি তাকে দেখে বললোঃ “তুমি আমার গবাদি পশুর দেখা শুনা করবে এবং গোবর উঠাবে আর এর বিনিময়ে আমি তোমার পানাহারের ব্যবস্থা করবো। এতে তুমি সম্মত আছ কি?” মুমিন লোকটি এতে সম্মত হয়ে গেল এবং কাজ করতে শুরু করলো। ঐ মালিকটি ছিল অত্যন্ত নির্দয় ও কঠোর হৃদয়ের লোক। কোন পশুকে দুর্বল ও অসুস্থ দেখলে সে মনে করতো যে, ঐ সহিস তার পশুর খাদ্য চুরি করে। এই বদ ধারণার বশবর্তী হয়ে সে ঐ মুমিন লোকটিকে নির্মমভাবে প্রহার করতো। তার এরূপ অত্যাচারে সে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লো এবং তার ঐ কাফির সঙ্গীটিকে স্মরণ করলো যে, তারই ক্ষেত-খামারে সে কাজ করবে। এর বিনিময়ে হয়তো সে তাকে খেতে-পরতে দিবে এবং এটাই তার জন্যে যথেষ্ট। এই ভরসায় সে রওয়ানা হয়ে গেল। তার দরযার সামনে এসে বিরাট গগনচুম্বী প্রাসাদ দেখে তো তার চক্ষু স্থির। দেওড়ীতে পাহারাদার! তাদের নিকট সে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলো এবং বললোঃ “আমার নাম শুনলেই এ বাড়ীর মালিক খুশী হয়ে আমাকে প্রবেশের অনুমতি দিবে।” প্রহরীরা বললোঃ “তোমার কথা যদি সত্য হয় তবে এই এক কোণে চুপ করে পড়ে থাকো। সকাল হলে তার সামনে নিজেই গিয়ে পরিচয় দান করবে।” সে তাই করলো। এক পাশে গিয়ে কম্বলের অর্ধেকটি বিছিয়ে দিলো এবং বাকী অর্ধেক গায়ে দিয়ে রাত্রি কাটিয়ে দিলো।সকাল বেলা তার ঐ কাফির সঙ্গীটি ঘোড়ায় চড়ে প্রাতঃ ভ্রমণে বের হয়েছে এমন সময় মুমিন লোকটি তার সামনে হাযির হলো। তার এই দুরবস্থা দেখে সে অত্যন্ত বিস্মিত হলো এবং জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার এ অবস্থা কেন? টাকা পয়সা কি করেছো?” উত্তরে মুমিন ব্যক্তি বললোঃ “ওটা আর জিজ্ঞেস করো না ভাই। বরং আমাকে তোমার ক্ষেত-খামারের কাজে নিয়োগ কর। মজুরী কিছু লাগবে না, শুধু দু' বেলা খেতে দিলেই চলবে। আর যখন আমার পরনের এ বস্ত্রগুলো পুরোনো হয়ে যাবে তখন নতুন কাপড় কিনে দিবে আর কি?” সে উত্তরে বললোঃ “আরে, অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন, আমি বরং এর চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা তোমার জন্যে করে দিবো। এখন তুমি বল তোমার মাল-ধন কি করেছো? সে উত্তর দিলোঃ “একজনকে কর্জ দিয়েছি।” জিজ্ঞেস করলোঃ “কাকে কর্জ দিয়েছো?” উত্তর হলোঃ “এমন একজনকে কর্জ দিয়েছি যিনি তা অস্বীকার করবেন না এবং নষ্ট হতেও দিবেন না। তিনি আমার প্রতিপালক মহান আল্লাহ!” একথা শুনে কাফির লোকটি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললোঃ “তুমি তো দেখি বড় নির্বোধ! আমরা পচে গলে মাটিতে পরিণত হবো, অতঃপর পুনরুজ্জীবিত হবো ও প্রতিদান পাবো এতে তুমি বিশ্বাসী! তোমার যখন এমন বিশ্বাস তখন তুমি চলে যাও, তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।” এই বলে সে চলে গেল। মুমিন লোকটি সেখান থেকে বিদায় হলো এবং অতি কষ্টে জীবন যাপন করতে লাগলো। আর ঐ কাফির পরম সুখে দিন যাপন করতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত উভয়েই মৃত্যুমুখে পতিত হলো। তারপর মুমিন লোকটিকে জান্নাত দান করা হলো। সে বিরাট ময়দান, খুরমা-খেজুরের বাগান ও প্রবাহিত নদী দেখে অত্যন্ত বিস্ময়বোধ করলো এবং ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করলোঃ “এগুলো কার জন্যে?" তারা উত্তর দিলোঃ “এগুলো সবই তোমার ।" তারপর আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখলো যে, অসংখ্য দাস-দাসী অপেক্ষমান রয়েছে। জিজ্ঞেস করলোঃ “এগুলো কার জন্যে?” উত্তর হলোঃ “এগুলোও তোমারই জন্যে।" সে বললোঃ “সুবহানাল্লাহ! এটাতো আমার প্রতি আল্লাহর বড়ই মেহেরবানী।” আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে দেখতে পেলো যে, ইয়াকুত পাথরের তৈরী এক মহল রয়েছে এবং ওর মধ্যে আনত নয়না ও আয়ত লোচনা হরীরা অবস্থান করছে। প্রশ্ন করে জানতে পারলো যে, এগুলো তারই জন্যে। এসব দেখে তো তার চক্ষু স্থির! অতঃপর তার ঐ কাফির সাথীর কথা তার মনে পড়লো। আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখাবেন যে, সে জাহান্নামে জ্বলতে রয়েছে। তাদের মধ্যে ঐ সব কথোপকথন হবে যার বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে। মুমিনের উপর দুনিয়ায় যে বিপদাপদ এসেছিল তা সে স্মরণ করবে। তখন মৃত্যু অপেক্ষা কঠিন বিপদ আর কিছুই তার কাছে অনুভূত হবে না।
আস-সাফফাত 37:62
৬২-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের বিভিন্ন নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ জান্নাতের এসব নিয়ামত উত্তম, না ‘যাককূম’ নামীয় বৃক্ষ? অর্থাৎ যা জাহান্নামে রয়েছে। এর অর্থ নিকৃষ্ট একটি গাছ হতে পারে যা জাহান্নামের সকল প্রকোষ্ঠে প্রসারিত। যেমন ‘বা' নামক একটি গাছ, যার শাখা জান্নাতের প্রতিটি কামরায় প্রবিষ্ট রয়েছে। এও হতে পার যে, ওটা যাকূম জাতীয় গাছ। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আবোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে।”(৫৬:৫১-৫২)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি এটা যালিমদের জন্যে সৃষ্টি করেছি পরীক্ষা স্বরূপ।' কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যাকূম গাছের উল্লেখ পথভ্রষ্টদের জন্যে ফিত্না হয়ে গেছে। তারা বলেঃ “আরে দেখো, দেখো। এ নবী বলে কি শুন! আগুনে নাকি গাছ হবে? আগুনতো গাছকে জ্বালিয়ে দেয়। সুতরাং এটা কোন ধরনের কথা?” তাদের একথা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই এ বৃক্ষ উদ্গত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে।' হ্যা, এই গাছ আগুন থেকেই জন্মে এবং আগুনই ওর খাদ্য। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল এ কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়তো এবং বলতোঃ “আমি তো মজা করে খেজুর ও মাখন বাবো এবং এরই নাম যাকূম। মোটকথা এটাও একটা পরীক্ষা। ভাল লোকেরা এতে ভয়ে আঁৎকে উঠে, আর মন্দ লোকেরা একে হেসে উড়িয়ে দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যে দৃশ্য তোমাকে দেখিয়েছি তা এবং কুরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও শুধু মানুষের জন্যে। আমি তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করি, কিন্তু এটা তাদের ঘোর অবাধ্যতাই বৃদ্ধি করে।”(১৭:৬০)আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ওর মোচা যেন শয়তানের মাথা।' এ কথা দ্বারা উক্ত গাছের কদর্যতা বর্ণনা করা হয়েছে। অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, শয়তানের মস্তক আকাশে প্রতিষ্ঠিত। এ গাছের মোচাকে শয়তানের মস্তকের সাথে তুলনা করার উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, যদিও কেউ কখনো শয়তানকে দেখেনি, তবুও তার নাম শুনামাত্রই তার জঘন্য রূপের ছবি মানুষের মানসপটে ভেসে ওঠে। উক্ত গাছেরও অবস্থা এইরূপ। এর ভিতর ও বাহির উভয়ই খারাপ। একথাও বলা হয়েছে যে, এটা এক প্রকার সর্প বিশেষ যার মস্তক অত্যন্ত ভয়ংকর। একটি উক্তি এও আছে যে, ওটা এক প্রকার উদ্ভিদ, যা অত্যন্ত জঘন্যভাবে বর্ধিত ও বিস্তৃত হয়ে থাকে। কিন্তু এ দুটি সম্ভাবনা সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা বর্ণনা করলাম। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা এটা হতে ভক্ষণ করবে এবং উদর পূর্ণ করবে এর দ্বারা। সেই দুর্গন্ধময় তীব্র তিক্ত তরু জোরপূর্বক তাদেরকে খাওয়ানো হবে। আর এটা তারা খেতেও বাধ্য হবে। এটাও এক প্রকারের শাস্তি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী [(আরবী) আরব দেশের এক প্রকার গুল্ম। এটা যখন সবুজ থাকে তখন একে (আরবী) (শিবরাক) বলা হয়। আর যখন শুকিয়ে যায় তখন একে (আরবী) (যারী) বলা হয়। এটা খুব বিষাক্ত এবং কোন জন্তুই এটা খায় না] ব্যতীত। যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তও করবে না।” (৮৮:৬-৭) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যদি যাকূম বৃক্ষের এক ফোঁটা রস দুনিয়ার সমুদ্রে পতিত হয় তবে সারা বিশ্ববাসীর সমস্ত খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে যার খাদ্য এটাই হবে তার কি অবস্থা হবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তদুপরি তাদের জন্যে থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ।' অথবা ভাবার্থ হচ্ছেঃ ঐ জাহান্নামী গাছকে জাহান্নামী পানির সাথে মিশিয়ে তাদেরকে পান করানো হবে। আর এই গরম পানি ওটাই হবে যা জাহান্নামীদের ক্ষতস্থান হতে রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি আকারে বের হয়ে আসবে এবং তাদের চক্ষু হতে ও গুপ্তাঙ্গ হতে বেরিয়ে আসবে। হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যখন এই পানি তাদের সামনে ধরা হবে তখন তা তাদের নিকট অপছন্দনীয় হবে। আর যখন তা তাদের চেহারার সামনে তুলে ধরা হবে তখন ওর তাপে তাদের চেহারা ঝলসে যাবে। আর যখন তারা ওটা পান করবে তখন তাদের নাড়িভূড়ী কেটে নিম্ন রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামীরা যখন ক্ষুধার কথা বলবে তখন তাদেরকে যাকূম খাওয়ানো হবে। ফলে তাদের মুখের চামড়া সম্পূর্ণ খসে পড়বে। এমনকি কোন পরিচিত ব্যক্তি সেই মুখের চামড়া দেখেই তাদেরকে চিনে নিবে। তারপর পিপাসায় ছটফট করে যখন পানি চাইবে তখন গলিত তামার ন্যায় গরম পানি তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে। ওটা চেহারার সামনে আসা মাত্রই চেহারার গোশত ঝলসিয়ে দিবে এবং সমস্ত গোশত খসে পড়বে। আর পেটে গিয়ে ওটা নাড়িভূড়ি বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে এবং উপর থেকে লোহার হাতুড়ী দ্বারা প্রহার করা হবে। ফলে দেহের এক একটি অংশ পৃথক। পৃথক হয়ে যাবে। তখন তারা মৃত্যু কামনা করতে থাকবে। প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে। সেখানে তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি হতে থাকবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।”(৫৫:৪৪) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! দুপুরের পূর্বেই জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে পৌঁছে যাবে। আর সেখানেই তারা দুপুরের বিশ্রাম করবে।” অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম।”(২৫-২৪) মোটকথা কায়লুলার (দুপুরের বিশ্রামের) সময় উভয় দল নিজ নিজ ঠিকানায় অবস্থান করবে। এই অর্থের জন্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর উপর (আরবী)-এর (আরবী)-এর জন্যে হবে। এটা ওরই প্রতিফল যে, তারা তাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছিল বিপথগামী এবং তারা তাদের পদাংক অনুসরণে ধাবিত হয়েছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, বাধ্য হয়ে এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, নির্বোধ হিসেবে তাদের পদাংক অনুসরণ করেছিল।
আস-সাফফাত 37:63
৬২-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের বিভিন্ন নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ জান্নাতের এসব নিয়ামত উত্তম, না ‘যাককূম’ নামীয় বৃক্ষ? অর্থাৎ যা জাহান্নামে রয়েছে। এর অর্থ নিকৃষ্ট একটি গাছ হতে পারে যা জাহান্নামের সকল প্রকোষ্ঠে প্রসারিত। যেমন ‘বা' নামক একটি গাছ, যার শাখা জান্নাতের প্রতিটি কামরায় প্রবিষ্ট রয়েছে। এও হতে পার যে, ওটা যাকূম জাতীয় গাছ। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আবোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে।”(৫৬:৫১-৫২)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি এটা যালিমদের জন্যে সৃষ্টি করেছি পরীক্ষা স্বরূপ।' কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যাকূম গাছের উল্লেখ পথভ্রষ্টদের জন্যে ফিত্না হয়ে গেছে। তারা বলেঃ “আরে দেখো, দেখো। এ নবী বলে কি শুন! আগুনে নাকি গাছ হবে? আগুনতো গাছকে জ্বালিয়ে দেয়। সুতরাং এটা কোন ধরনের কথা?” তাদের একথা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই এ বৃক্ষ উদ্গত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে।' হ্যা, এই গাছ আগুন থেকেই জন্মে এবং আগুনই ওর খাদ্য। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল এ কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়তো এবং বলতোঃ “আমি তো মজা করে খেজুর ও মাখন বাবো এবং এরই নাম যাকূম। মোটকথা এটাও একটা পরীক্ষা। ভাল লোকেরা এতে ভয়ে আঁৎকে উঠে, আর মন্দ লোকেরা একে হেসে উড়িয়ে দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যে দৃশ্য তোমাকে দেখিয়েছি তা এবং কুরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও শুধু মানুষের জন্যে। আমি তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করি, কিন্তু এটা তাদের ঘোর অবাধ্যতাই বৃদ্ধি করে।”(১৭:৬০)আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ওর মোচা যেন শয়তানের মাথা।' এ কথা দ্বারা উক্ত গাছের কদর্যতা বর্ণনা করা হয়েছে। অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, শয়তানের মস্তক আকাশে প্রতিষ্ঠিত। এ গাছের মোচাকে শয়তানের মস্তকের সাথে তুলনা করার উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, যদিও কেউ কখনো শয়তানকে দেখেনি, তবুও তার নাম শুনামাত্রই তার জঘন্য রূপের ছবি মানুষের মানসপটে ভেসে ওঠে। উক্ত গাছেরও অবস্থা এইরূপ। এর ভিতর ও বাহির উভয়ই খারাপ। একথাও বলা হয়েছে যে, এটা এক প্রকার সর্প বিশেষ যার মস্তক অত্যন্ত ভয়ংকর। একটি উক্তি এও আছে যে, ওটা এক প্রকার উদ্ভিদ, যা অত্যন্ত জঘন্যভাবে বর্ধিত ও বিস্তৃত হয়ে থাকে। কিন্তু এ দুটি সম্ভাবনা সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা বর্ণনা করলাম। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা এটা হতে ভক্ষণ করবে এবং উদর পূর্ণ করবে এর দ্বারা। সেই দুর্গন্ধময় তীব্র তিক্ত তরু জোরপূর্বক তাদেরকে খাওয়ানো হবে। আর এটা তারা খেতেও বাধ্য হবে। এটাও এক প্রকারের শাস্তি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী [(আরবী) আরব দেশের এক প্রকার গুল্ম। এটা যখন সবুজ থাকে তখন একে (আরবী) (শিবরাক) বলা হয়। আর যখন শুকিয়ে যায় তখন একে (আরবী) (যারী) বলা হয়। এটা খুব বিষাক্ত এবং কোন জন্তুই এটা খায় না] ব্যতীত। যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তও করবে না।” (৮৮:৬-৭) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যদি যাকূম বৃক্ষের এক ফোঁটা রস দুনিয়ার সমুদ্রে পতিত হয় তবে সারা বিশ্ববাসীর সমস্ত খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে যার খাদ্য এটাই হবে তার কি অবস্থা হবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তদুপরি তাদের জন্যে থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ।' অথবা ভাবার্থ হচ্ছেঃ ঐ জাহান্নামী গাছকে জাহান্নামী পানির সাথে মিশিয়ে তাদেরকে পান করানো হবে। আর এই গরম পানি ওটাই হবে যা জাহান্নামীদের ক্ষতস্থান হতে রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি আকারে বের হয়ে আসবে এবং তাদের চক্ষু হতে ও গুপ্তাঙ্গ হতে বেরিয়ে আসবে। হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যখন এই পানি তাদের সামনে ধরা হবে তখন তা তাদের নিকট অপছন্দনীয় হবে। আর যখন তা তাদের চেহারার সামনে তুলে ধরা হবে তখন ওর তাপে তাদের চেহারা ঝলসে যাবে। আর যখন তারা ওটা পান করবে তখন তাদের নাড়িভূড়ী কেটে নিম্ন রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামীরা যখন ক্ষুধার কথা বলবে তখন তাদেরকে যাকূম খাওয়ানো হবে। ফলে তাদের মুখের চামড়া সম্পূর্ণ খসে পড়বে। এমনকি কোন পরিচিত ব্যক্তি সেই মুখের চামড়া দেখেই তাদেরকে চিনে নিবে। তারপর পিপাসায় ছটফট করে যখন পানি চাইবে তখন গলিত তামার ন্যায় গরম পানি তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে। ওটা চেহারার সামনে আসা মাত্রই চেহারার গোশত ঝলসিয়ে দিবে এবং সমস্ত গোশত খসে পড়বে। আর পেটে গিয়ে ওটা নাড়িভূড়ি বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে এবং উপর থেকে লোহার হাতুড়ী দ্বারা প্রহার করা হবে। ফলে দেহের এক একটি অংশ পৃথক। পৃথক হয়ে যাবে। তখন তারা মৃত্যু কামনা করতে থাকবে। প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে। সেখানে তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি হতে থাকবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।”(৫৫:৪৪) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! দুপুরের পূর্বেই জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে পৌঁছে যাবে। আর সেখানেই তারা দুপুরের বিশ্রাম করবে।” অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম।”(২৫-২৪) মোটকথা কায়লুলার (দুপুরের বিশ্রামের) সময় উভয় দল নিজ নিজ ঠিকানায় অবস্থান করবে। এই অর্থের জন্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর উপর (আরবী)-এর (আরবী)-এর জন্যে হবে। এটা ওরই প্রতিফল যে, তারা তাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছিল বিপথগামী এবং তারা তাদের পদাংক অনুসরণে ধাবিত হয়েছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, বাধ্য হয়ে এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, নির্বোধ হিসেবে তাদের পদাংক অনুসরণ করেছিল।
আস-সাফফাত 37:64
৬২-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের বিভিন্ন নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ জান্নাতের এসব নিয়ামত উত্তম, না ‘যাককূম’ নামীয় বৃক্ষ? অর্থাৎ যা জাহান্নামে রয়েছে। এর অর্থ নিকৃষ্ট একটি গাছ হতে পারে যা জাহান্নামের সকল প্রকোষ্ঠে প্রসারিত। যেমন ‘বা' নামক একটি গাছ, যার শাখা জান্নাতের প্রতিটি কামরায় প্রবিষ্ট রয়েছে। এও হতে পার যে, ওটা যাকূম জাতীয় গাছ। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আবোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে।”(৫৬:৫১-৫২)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি এটা যালিমদের জন্যে সৃষ্টি করেছি পরীক্ষা স্বরূপ।' কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যাকূম গাছের উল্লেখ পথভ্রষ্টদের জন্যে ফিত্না হয়ে গেছে। তারা বলেঃ “আরে দেখো, দেখো। এ নবী বলে কি শুন! আগুনে নাকি গাছ হবে? আগুনতো গাছকে জ্বালিয়ে দেয়। সুতরাং এটা কোন ধরনের কথা?” তাদের একথা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই এ বৃক্ষ উদ্গত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে।' হ্যা, এই গাছ আগুন থেকেই জন্মে এবং আগুনই ওর খাদ্য। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল এ কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়তো এবং বলতোঃ “আমি তো মজা করে খেজুর ও মাখন বাবো এবং এরই নাম যাকূম। মোটকথা এটাও একটা পরীক্ষা। ভাল লোকেরা এতে ভয়ে আঁৎকে উঠে, আর মন্দ লোকেরা একে হেসে উড়িয়ে দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যে দৃশ্য তোমাকে দেখিয়েছি তা এবং কুরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও শুধু মানুষের জন্যে। আমি তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করি, কিন্তু এটা তাদের ঘোর অবাধ্যতাই বৃদ্ধি করে।”(১৭:৬০)আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ওর মোচা যেন শয়তানের মাথা।' এ কথা দ্বারা উক্ত গাছের কদর্যতা বর্ণনা করা হয়েছে। অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, শয়তানের মস্তক আকাশে প্রতিষ্ঠিত। এ গাছের মোচাকে শয়তানের মস্তকের সাথে তুলনা করার উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, যদিও কেউ কখনো শয়তানকে দেখেনি, তবুও তার নাম শুনামাত্রই তার জঘন্য রূপের ছবি মানুষের মানসপটে ভেসে ওঠে। উক্ত গাছেরও অবস্থা এইরূপ। এর ভিতর ও বাহির উভয়ই খারাপ। একথাও বলা হয়েছে যে, এটা এক প্রকার সর্প বিশেষ যার মস্তক অত্যন্ত ভয়ংকর। একটি উক্তি এও আছে যে, ওটা এক প্রকার উদ্ভিদ, যা অত্যন্ত জঘন্যভাবে বর্ধিত ও বিস্তৃত হয়ে থাকে। কিন্তু এ দুটি সম্ভাবনা সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা বর্ণনা করলাম। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা এটা হতে ভক্ষণ করবে এবং উদর পূর্ণ করবে এর দ্বারা। সেই দুর্গন্ধময় তীব্র তিক্ত তরু জোরপূর্বক তাদেরকে খাওয়ানো হবে। আর এটা তারা খেতেও বাধ্য হবে। এটাও এক প্রকারের শাস্তি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী [(আরবী) আরব দেশের এক প্রকার গুল্ম। এটা যখন সবুজ থাকে তখন একে (আরবী) (শিবরাক) বলা হয়। আর যখন শুকিয়ে যায় তখন একে (আরবী) (যারী) বলা হয়। এটা খুব বিষাক্ত এবং কোন জন্তুই এটা খায় না] ব্যতীত। যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তও করবে না।” (৮৮:৬-৭) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যদি যাকূম বৃক্ষের এক ফোঁটা রস দুনিয়ার সমুদ্রে পতিত হয় তবে সারা বিশ্ববাসীর সমস্ত খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে যার খাদ্য এটাই হবে তার কি অবস্থা হবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তদুপরি তাদের জন্যে থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ।' অথবা ভাবার্থ হচ্ছেঃ ঐ জাহান্নামী গাছকে জাহান্নামী পানির সাথে মিশিয়ে তাদেরকে পান করানো হবে। আর এই গরম পানি ওটাই হবে যা জাহান্নামীদের ক্ষতস্থান হতে রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি আকারে বের হয়ে আসবে এবং তাদের চক্ষু হতে ও গুপ্তাঙ্গ হতে বেরিয়ে আসবে। হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যখন এই পানি তাদের সামনে ধরা হবে তখন তা তাদের নিকট অপছন্দনীয় হবে। আর যখন তা তাদের চেহারার সামনে তুলে ধরা হবে তখন ওর তাপে তাদের চেহারা ঝলসে যাবে। আর যখন তারা ওটা পান করবে তখন তাদের নাড়িভূড়ী কেটে নিম্ন রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামীরা যখন ক্ষুধার কথা বলবে তখন তাদেরকে যাকূম খাওয়ানো হবে। ফলে তাদের মুখের চামড়া সম্পূর্ণ খসে পড়বে। এমনকি কোন পরিচিত ব্যক্তি সেই মুখের চামড়া দেখেই তাদেরকে চিনে নিবে। তারপর পিপাসায় ছটফট করে যখন পানি চাইবে তখন গলিত তামার ন্যায় গরম পানি তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে। ওটা চেহারার সামনে আসা মাত্রই চেহারার গোশত ঝলসিয়ে দিবে এবং সমস্ত গোশত খসে পড়বে। আর পেটে গিয়ে ওটা নাড়িভূড়ি বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে এবং উপর থেকে লোহার হাতুড়ী দ্বারা প্রহার করা হবে। ফলে দেহের এক একটি অংশ পৃথক। পৃথক হয়ে যাবে। তখন তারা মৃত্যু কামনা করতে থাকবে। প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে। সেখানে তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি হতে থাকবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।”(৫৫:৪৪) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! দুপুরের পূর্বেই জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে পৌঁছে যাবে। আর সেখানেই তারা দুপুরের বিশ্রাম করবে।” অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম।”(২৫-২৪) মোটকথা কায়লুলার (দুপুরের বিশ্রামের) সময় উভয় দল নিজ নিজ ঠিকানায় অবস্থান করবে। এই অর্থের জন্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর উপর (আরবী)-এর (আরবী)-এর জন্যে হবে। এটা ওরই প্রতিফল যে, তারা তাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছিল বিপথগামী এবং তারা তাদের পদাংক অনুসরণে ধাবিত হয়েছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, বাধ্য হয়ে এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, নির্বোধ হিসেবে তাদের পদাংক অনুসরণ করেছিল।
আস-সাফফাত 37:65
৬২-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের বিভিন্ন নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ জান্নাতের এসব নিয়ামত উত্তম, না ‘যাককূম’ নামীয় বৃক্ষ? অর্থাৎ যা জাহান্নামে রয়েছে। এর অর্থ নিকৃষ্ট একটি গাছ হতে পারে যা জাহান্নামের সকল প্রকোষ্ঠে প্রসারিত। যেমন ‘বা' নামক একটি গাছ, যার শাখা জান্নাতের প্রতিটি কামরায় প্রবিষ্ট রয়েছে। এও হতে পার যে, ওটা যাকূম জাতীয় গাছ। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আবোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে।”(৫৬:৫১-৫২)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি এটা যালিমদের জন্যে সৃষ্টি করেছি পরীক্ষা স্বরূপ।' কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যাকূম গাছের উল্লেখ পথভ্রষ্টদের জন্যে ফিত্না হয়ে গেছে। তারা বলেঃ “আরে দেখো, দেখো। এ নবী বলে কি শুন! আগুনে নাকি গাছ হবে? আগুনতো গাছকে জ্বালিয়ে দেয়। সুতরাং এটা কোন ধরনের কথা?” তাদের একথা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই এ বৃক্ষ উদ্গত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে।' হ্যা, এই গাছ আগুন থেকেই জন্মে এবং আগুনই ওর খাদ্য। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল এ কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়তো এবং বলতোঃ “আমি তো মজা করে খেজুর ও মাখন বাবো এবং এরই নাম যাকূম। মোটকথা এটাও একটা পরীক্ষা। ভাল লোকেরা এতে ভয়ে আঁৎকে উঠে, আর মন্দ লোকেরা একে হেসে উড়িয়ে দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যে দৃশ্য তোমাকে দেখিয়েছি তা এবং কুরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও শুধু মানুষের জন্যে। আমি তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করি, কিন্তু এটা তাদের ঘোর অবাধ্যতাই বৃদ্ধি করে।”(১৭:৬০)আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ওর মোচা যেন শয়তানের মাথা।' এ কথা দ্বারা উক্ত গাছের কদর্যতা বর্ণনা করা হয়েছে। অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, শয়তানের মস্তক আকাশে প্রতিষ্ঠিত। এ গাছের মোচাকে শয়তানের মস্তকের সাথে তুলনা করার উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, যদিও কেউ কখনো শয়তানকে দেখেনি, তবুও তার নাম শুনামাত্রই তার জঘন্য রূপের ছবি মানুষের মানসপটে ভেসে ওঠে। উক্ত গাছেরও অবস্থা এইরূপ। এর ভিতর ও বাহির উভয়ই খারাপ। একথাও বলা হয়েছে যে, এটা এক প্রকার সর্প বিশেষ যার মস্তক অত্যন্ত ভয়ংকর। একটি উক্তি এও আছে যে, ওটা এক প্রকার উদ্ভিদ, যা অত্যন্ত জঘন্যভাবে বর্ধিত ও বিস্তৃত হয়ে থাকে। কিন্তু এ দুটি সম্ভাবনা সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা বর্ণনা করলাম। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা এটা হতে ভক্ষণ করবে এবং উদর পূর্ণ করবে এর দ্বারা। সেই দুর্গন্ধময় তীব্র তিক্ত তরু জোরপূর্বক তাদেরকে খাওয়ানো হবে। আর এটা তারা খেতেও বাধ্য হবে। এটাও এক প্রকারের শাস্তি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী [(আরবী) আরব দেশের এক প্রকার গুল্ম। এটা যখন সবুজ থাকে তখন একে (আরবী) (শিবরাক) বলা হয়। আর যখন শুকিয়ে যায় তখন একে (আরবী) (যারী) বলা হয়। এটা খুব বিষাক্ত এবং কোন জন্তুই এটা খায় না] ব্যতীত। যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তও করবে না।” (৮৮:৬-৭) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যদি যাকূম বৃক্ষের এক ফোঁটা রস দুনিয়ার সমুদ্রে পতিত হয় তবে সারা বিশ্ববাসীর সমস্ত খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে যার খাদ্য এটাই হবে তার কি অবস্থা হবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তদুপরি তাদের জন্যে থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ।' অথবা ভাবার্থ হচ্ছেঃ ঐ জাহান্নামী গাছকে জাহান্নামী পানির সাথে মিশিয়ে তাদেরকে পান করানো হবে। আর এই গরম পানি ওটাই হবে যা জাহান্নামীদের ক্ষতস্থান হতে রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি আকারে বের হয়ে আসবে এবং তাদের চক্ষু হতে ও গুপ্তাঙ্গ হতে বেরিয়ে আসবে। হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যখন এই পানি তাদের সামনে ধরা হবে তখন তা তাদের নিকট অপছন্দনীয় হবে। আর যখন তা তাদের চেহারার সামনে তুলে ধরা হবে তখন ওর তাপে তাদের চেহারা ঝলসে যাবে। আর যখন তারা ওটা পান করবে তখন তাদের নাড়িভূড়ী কেটে নিম্ন রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামীরা যখন ক্ষুধার কথা বলবে তখন তাদেরকে যাকূম খাওয়ানো হবে। ফলে তাদের মুখের চামড়া সম্পূর্ণ খসে পড়বে। এমনকি কোন পরিচিত ব্যক্তি সেই মুখের চামড়া দেখেই তাদেরকে চিনে নিবে। তারপর পিপাসায় ছটফট করে যখন পানি চাইবে তখন গলিত তামার ন্যায় গরম পানি তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে। ওটা চেহারার সামনে আসা মাত্রই চেহারার গোশত ঝলসিয়ে দিবে এবং সমস্ত গোশত খসে পড়বে। আর পেটে গিয়ে ওটা নাড়িভূড়ি বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে এবং উপর থেকে লোহার হাতুড়ী দ্বারা প্রহার করা হবে। ফলে দেহের এক একটি অংশ পৃথক। পৃথক হয়ে যাবে। তখন তারা মৃত্যু কামনা করতে থাকবে। প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে। সেখানে তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি হতে থাকবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।”(৫৫:৪৪) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! দুপুরের পূর্বেই জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে পৌঁছে যাবে। আর সেখানেই তারা দুপুরের বিশ্রাম করবে।” অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম।”(২৫-২৪) মোটকথা কায়লুলার (দুপুরের বিশ্রামের) সময় উভয় দল নিজ নিজ ঠিকানায় অবস্থান করবে। এই অর্থের জন্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর উপর (আরবী)-এর (আরবী)-এর জন্যে হবে। এটা ওরই প্রতিফল যে, তারা তাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছিল বিপথগামী এবং তারা তাদের পদাংক অনুসরণে ধাবিত হয়েছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, বাধ্য হয়ে এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, নির্বোধ হিসেবে তাদের পদাংক অনুসরণ করেছিল।
আস-সাফফাত 37:66
৬২-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের বিভিন্ন নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ জান্নাতের এসব নিয়ামত উত্তম, না ‘যাককূম’ নামীয় বৃক্ষ? অর্থাৎ যা জাহান্নামে রয়েছে। এর অর্থ নিকৃষ্ট একটি গাছ হতে পারে যা জাহান্নামের সকল প্রকোষ্ঠে প্রসারিত। যেমন ‘বা' নামক একটি গাছ, যার শাখা জান্নাতের প্রতিটি কামরায় প্রবিষ্ট রয়েছে। এও হতে পার যে, ওটা যাকূম জাতীয় গাছ। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আবোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে।”(৫৬:৫১-৫২)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি এটা যালিমদের জন্যে সৃষ্টি করেছি পরীক্ষা স্বরূপ।' কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যাকূম গাছের উল্লেখ পথভ্রষ্টদের জন্যে ফিত্না হয়ে গেছে। তারা বলেঃ “আরে দেখো, দেখো। এ নবী বলে কি শুন! আগুনে নাকি গাছ হবে? আগুনতো গাছকে জ্বালিয়ে দেয়। সুতরাং এটা কোন ধরনের কথা?” তাদের একথা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই এ বৃক্ষ উদ্গত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে।' হ্যা, এই গাছ আগুন থেকেই জন্মে এবং আগুনই ওর খাদ্য। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল এ কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়তো এবং বলতোঃ “আমি তো মজা করে খেজুর ও মাখন বাবো এবং এরই নাম যাকূম। মোটকথা এটাও একটা পরীক্ষা। ভাল লোকেরা এতে ভয়ে আঁৎকে উঠে, আর মন্দ লোকেরা একে হেসে উড়িয়ে দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যে দৃশ্য তোমাকে দেখিয়েছি তা এবং কুরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও শুধু মানুষের জন্যে। আমি তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করি, কিন্তু এটা তাদের ঘোর অবাধ্যতাই বৃদ্ধি করে।”(১৭:৬০)আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ওর মোচা যেন শয়তানের মাথা।' এ কথা দ্বারা উক্ত গাছের কদর্যতা বর্ণনা করা হয়েছে। অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, শয়তানের মস্তক আকাশে প্রতিষ্ঠিত। এ গাছের মোচাকে শয়তানের মস্তকের সাথে তুলনা করার উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, যদিও কেউ কখনো শয়তানকে দেখেনি, তবুও তার নাম শুনামাত্রই তার জঘন্য রূপের ছবি মানুষের মানসপটে ভেসে ওঠে। উক্ত গাছেরও অবস্থা এইরূপ। এর ভিতর ও বাহির উভয়ই খারাপ। একথাও বলা হয়েছে যে, এটা এক প্রকার সর্প বিশেষ যার মস্তক অত্যন্ত ভয়ংকর। একটি উক্তি এও আছে যে, ওটা এক প্রকার উদ্ভিদ, যা অত্যন্ত জঘন্যভাবে বর্ধিত ও বিস্তৃত হয়ে থাকে। কিন্তু এ দুটি সম্ভাবনা সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা বর্ণনা করলাম। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা এটা হতে ভক্ষণ করবে এবং উদর পূর্ণ করবে এর দ্বারা। সেই দুর্গন্ধময় তীব্র তিক্ত তরু জোরপূর্বক তাদেরকে খাওয়ানো হবে। আর এটা তারা খেতেও বাধ্য হবে। এটাও এক প্রকারের শাস্তি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী [(আরবী) আরব দেশের এক প্রকার গুল্ম। এটা যখন সবুজ থাকে তখন একে (আরবী) (শিবরাক) বলা হয়। আর যখন শুকিয়ে যায় তখন একে (আরবী) (যারী) বলা হয়। এটা খুব বিষাক্ত এবং কোন জন্তুই এটা খায় না] ব্যতীত। যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তও করবে না।” (৮৮:৬-৭) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যদি যাকূম বৃক্ষের এক ফোঁটা রস দুনিয়ার সমুদ্রে পতিত হয় তবে সারা বিশ্ববাসীর সমস্ত খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে যার খাদ্য এটাই হবে তার কি অবস্থা হবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তদুপরি তাদের জন্যে থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ।' অথবা ভাবার্থ হচ্ছেঃ ঐ জাহান্নামী গাছকে জাহান্নামী পানির সাথে মিশিয়ে তাদেরকে পান করানো হবে। আর এই গরম পানি ওটাই হবে যা জাহান্নামীদের ক্ষতস্থান হতে রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি আকারে বের হয়ে আসবে এবং তাদের চক্ষু হতে ও গুপ্তাঙ্গ হতে বেরিয়ে আসবে। হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যখন এই পানি তাদের সামনে ধরা হবে তখন তা তাদের নিকট অপছন্দনীয় হবে। আর যখন তা তাদের চেহারার সামনে তুলে ধরা হবে তখন ওর তাপে তাদের চেহারা ঝলসে যাবে। আর যখন তারা ওটা পান করবে তখন তাদের নাড়িভূড়ী কেটে নিম্ন রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামীরা যখন ক্ষুধার কথা বলবে তখন তাদেরকে যাকূম খাওয়ানো হবে। ফলে তাদের মুখের চামড়া সম্পূর্ণ খসে পড়বে। এমনকি কোন পরিচিত ব্যক্তি সেই মুখের চামড়া দেখেই তাদেরকে চিনে নিবে। তারপর পিপাসায় ছটফট করে যখন পানি চাইবে তখন গলিত তামার ন্যায় গরম পানি তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে। ওটা চেহারার সামনে আসা মাত্রই চেহারার গোশত ঝলসিয়ে দিবে এবং সমস্ত গোশত খসে পড়বে। আর পেটে গিয়ে ওটা নাড়িভূড়ি বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে এবং উপর থেকে লোহার হাতুড়ী দ্বারা প্রহার করা হবে। ফলে দেহের এক একটি অংশ পৃথক। পৃথক হয়ে যাবে। তখন তারা মৃত্যু কামনা করতে থাকবে। প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে। সেখানে তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি হতে থাকবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।”(৫৫:৪৪) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! দুপুরের পূর্বেই জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে পৌঁছে যাবে। আর সেখানেই তারা দুপুরের বিশ্রাম করবে।” অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম।”(২৫-২৪) মোটকথা কায়লুলার (দুপুরের বিশ্রামের) সময় উভয় দল নিজ নিজ ঠিকানায় অবস্থান করবে। এই অর্থের জন্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর উপর (আরবী)-এর (আরবী)-এর জন্যে হবে। এটা ওরই প্রতিফল যে, তারা তাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছিল বিপথগামী এবং তারা তাদের পদাংক অনুসরণে ধাবিত হয়েছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, বাধ্য হয়ে এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, নির্বোধ হিসেবে তাদের পদাংক অনুসরণ করেছিল।
আস-সাফফাত 37:67
৬২-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের বিভিন্ন নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ জান্নাতের এসব নিয়ামত উত্তম, না ‘যাককূম’ নামীয় বৃক্ষ? অর্থাৎ যা জাহান্নামে রয়েছে। এর অর্থ নিকৃষ্ট একটি গাছ হতে পারে যা জাহান্নামের সকল প্রকোষ্ঠে প্রসারিত। যেমন ‘বা' নামক একটি গাছ, যার শাখা জান্নাতের প্রতিটি কামরায় প্রবিষ্ট রয়েছে। এও হতে পার যে, ওটা যাকূম জাতীয় গাছ। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আবোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে।”(৫৬:৫১-৫২)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি এটা যালিমদের জন্যে সৃষ্টি করেছি পরীক্ষা স্বরূপ।' কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যাকূম গাছের উল্লেখ পথভ্রষ্টদের জন্যে ফিত্না হয়ে গেছে। তারা বলেঃ “আরে দেখো, দেখো। এ নবী বলে কি শুন! আগুনে নাকি গাছ হবে? আগুনতো গাছকে জ্বালিয়ে দেয়। সুতরাং এটা কোন ধরনের কথা?” তাদের একথা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই এ বৃক্ষ উদ্গত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে।' হ্যা, এই গাছ আগুন থেকেই জন্মে এবং আগুনই ওর খাদ্য। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল এ কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়তো এবং বলতোঃ “আমি তো মজা করে খেজুর ও মাখন বাবো এবং এরই নাম যাকূম। মোটকথা এটাও একটা পরীক্ষা। ভাল লোকেরা এতে ভয়ে আঁৎকে উঠে, আর মন্দ লোকেরা একে হেসে উড়িয়ে দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যে দৃশ্য তোমাকে দেখিয়েছি তা এবং কুরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও শুধু মানুষের জন্যে। আমি তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করি, কিন্তু এটা তাদের ঘোর অবাধ্যতাই বৃদ্ধি করে।”(১৭:৬০)আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ওর মোচা যেন শয়তানের মাথা।' এ কথা দ্বারা উক্ত গাছের কদর্যতা বর্ণনা করা হয়েছে। অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, শয়তানের মস্তক আকাশে প্রতিষ্ঠিত। এ গাছের মোচাকে শয়তানের মস্তকের সাথে তুলনা করার উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, যদিও কেউ কখনো শয়তানকে দেখেনি, তবুও তার নাম শুনামাত্রই তার জঘন্য রূপের ছবি মানুষের মানসপটে ভেসে ওঠে। উক্ত গাছেরও অবস্থা এইরূপ। এর ভিতর ও বাহির উভয়ই খারাপ। একথাও বলা হয়েছে যে, এটা এক প্রকার সর্প বিশেষ যার মস্তক অত্যন্ত ভয়ংকর। একটি উক্তি এও আছে যে, ওটা এক প্রকার উদ্ভিদ, যা অত্যন্ত জঘন্যভাবে বর্ধিত ও বিস্তৃত হয়ে থাকে। কিন্তু এ দুটি সম্ভাবনা সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা বর্ণনা করলাম। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা এটা হতে ভক্ষণ করবে এবং উদর পূর্ণ করবে এর দ্বারা। সেই দুর্গন্ধময় তীব্র তিক্ত তরু জোরপূর্বক তাদেরকে খাওয়ানো হবে। আর এটা তারা খেতেও বাধ্য হবে। এটাও এক প্রকারের শাস্তি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী [(আরবী) আরব দেশের এক প্রকার গুল্ম। এটা যখন সবুজ থাকে তখন একে (আরবী) (শিবরাক) বলা হয়। আর যখন শুকিয়ে যায় তখন একে (আরবী) (যারী) বলা হয়। এটা খুব বিষাক্ত এবং কোন জন্তুই এটা খায় না] ব্যতীত। যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তও করবে না।” (৮৮:৬-৭) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যদি যাকূম বৃক্ষের এক ফোঁটা রস দুনিয়ার সমুদ্রে পতিত হয় তবে সারা বিশ্ববাসীর সমস্ত খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে যার খাদ্য এটাই হবে তার কি অবস্থা হবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তদুপরি তাদের জন্যে থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ।' অথবা ভাবার্থ হচ্ছেঃ ঐ জাহান্নামী গাছকে জাহান্নামী পানির সাথে মিশিয়ে তাদেরকে পান করানো হবে। আর এই গরম পানি ওটাই হবে যা জাহান্নামীদের ক্ষতস্থান হতে রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি আকারে বের হয়ে আসবে এবং তাদের চক্ষু হতে ও গুপ্তাঙ্গ হতে বেরিয়ে আসবে। হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যখন এই পানি তাদের সামনে ধরা হবে তখন তা তাদের নিকট অপছন্দনীয় হবে। আর যখন তা তাদের চেহারার সামনে তুলে ধরা হবে তখন ওর তাপে তাদের চেহারা ঝলসে যাবে। আর যখন তারা ওটা পান করবে তখন তাদের নাড়িভূড়ী কেটে নিম্ন রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামীরা যখন ক্ষুধার কথা বলবে তখন তাদেরকে যাকূম খাওয়ানো হবে। ফলে তাদের মুখের চামড়া সম্পূর্ণ খসে পড়বে। এমনকি কোন পরিচিত ব্যক্তি সেই মুখের চামড়া দেখেই তাদেরকে চিনে নিবে। তারপর পিপাসায় ছটফট করে যখন পানি চাইবে তখন গলিত তামার ন্যায় গরম পানি তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে। ওটা চেহারার সামনে আসা মাত্রই চেহারার গোশত ঝলসিয়ে দিবে এবং সমস্ত গোশত খসে পড়বে। আর পেটে গিয়ে ওটা নাড়িভূড়ি বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে এবং উপর থেকে লোহার হাতুড়ী দ্বারা প্রহার করা হবে। ফলে দেহের এক একটি অংশ পৃথক। পৃথক হয়ে যাবে। তখন তারা মৃত্যু কামনা করতে থাকবে। প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে। সেখানে তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি হতে থাকবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।”(৫৫:৪৪) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! দুপুরের পূর্বেই জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে পৌঁছে যাবে। আর সেখানেই তারা দুপুরের বিশ্রাম করবে।” অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম।”(২৫-২৪) মোটকথা কায়লুলার (দুপুরের বিশ্রামের) সময় উভয় দল নিজ নিজ ঠিকানায় অবস্থান করবে। এই অর্থের জন্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর উপর (আরবী)-এর (আরবী)-এর জন্যে হবে। এটা ওরই প্রতিফল যে, তারা তাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছিল বিপথগামী এবং তারা তাদের পদাংক অনুসরণে ধাবিত হয়েছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, বাধ্য হয়ে এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, নির্বোধ হিসেবে তাদের পদাংক অনুসরণ করেছিল।
আস-সাফফাত 37:68
৬২-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের বিভিন্ন নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ জান্নাতের এসব নিয়ামত উত্তম, না ‘যাককূম’ নামীয় বৃক্ষ? অর্থাৎ যা জাহান্নামে রয়েছে। এর অর্থ নিকৃষ্ট একটি গাছ হতে পারে যা জাহান্নামের সকল প্রকোষ্ঠে প্রসারিত। যেমন ‘বা' নামক একটি গাছ, যার শাখা জান্নাতের প্রতিটি কামরায় প্রবিষ্ট রয়েছে। এও হতে পার যে, ওটা যাকূম জাতীয় গাছ। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আবোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে।”(৫৬:৫১-৫২)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি এটা যালিমদের জন্যে সৃষ্টি করেছি পরীক্ষা স্বরূপ।' কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যাকূম গাছের উল্লেখ পথভ্রষ্টদের জন্যে ফিত্না হয়ে গেছে। তারা বলেঃ “আরে দেখো, দেখো। এ নবী বলে কি শুন! আগুনে নাকি গাছ হবে? আগুনতো গাছকে জ্বালিয়ে দেয়। সুতরাং এটা কোন ধরনের কথা?” তাদের একথা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই এ বৃক্ষ উদ্গত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে।' হ্যা, এই গাছ আগুন থেকেই জন্মে এবং আগুনই ওর খাদ্য। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল এ কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়তো এবং বলতোঃ “আমি তো মজা করে খেজুর ও মাখন বাবো এবং এরই নাম যাকূম। মোটকথা এটাও একটা পরীক্ষা। ভাল লোকেরা এতে ভয়ে আঁৎকে উঠে, আর মন্দ লোকেরা একে হেসে উড়িয়ে দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যে দৃশ্য তোমাকে দেখিয়েছি তা এবং কুরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও শুধু মানুষের জন্যে। আমি তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করি, কিন্তু এটা তাদের ঘোর অবাধ্যতাই বৃদ্ধি করে।”(১৭:৬০)আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ওর মোচা যেন শয়তানের মাথা।' এ কথা দ্বারা উক্ত গাছের কদর্যতা বর্ণনা করা হয়েছে। অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, শয়তানের মস্তক আকাশে প্রতিষ্ঠিত। এ গাছের মোচাকে শয়তানের মস্তকের সাথে তুলনা করার উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, যদিও কেউ কখনো শয়তানকে দেখেনি, তবুও তার নাম শুনামাত্রই তার জঘন্য রূপের ছবি মানুষের মানসপটে ভেসে ওঠে। উক্ত গাছেরও অবস্থা এইরূপ। এর ভিতর ও বাহির উভয়ই খারাপ। একথাও বলা হয়েছে যে, এটা এক প্রকার সর্প বিশেষ যার মস্তক অত্যন্ত ভয়ংকর। একটি উক্তি এও আছে যে, ওটা এক প্রকার উদ্ভিদ, যা অত্যন্ত জঘন্যভাবে বর্ধিত ও বিস্তৃত হয়ে থাকে। কিন্তু এ দুটি সম্ভাবনা সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা বর্ণনা করলাম। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা এটা হতে ভক্ষণ করবে এবং উদর পূর্ণ করবে এর দ্বারা। সেই দুর্গন্ধময় তীব্র তিক্ত তরু জোরপূর্বক তাদেরকে খাওয়ানো হবে। আর এটা তারা খেতেও বাধ্য হবে। এটাও এক প্রকারের শাস্তি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী [(আরবী) আরব দেশের এক প্রকার গুল্ম। এটা যখন সবুজ থাকে তখন একে (আরবী) (শিবরাক) বলা হয়। আর যখন শুকিয়ে যায় তখন একে (আরবী) (যারী) বলা হয়। এটা খুব বিষাক্ত এবং কোন জন্তুই এটা খায় না] ব্যতীত। যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তও করবে না।” (৮৮:৬-৭) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যদি যাকূম বৃক্ষের এক ফোঁটা রস দুনিয়ার সমুদ্রে পতিত হয় তবে সারা বিশ্ববাসীর সমস্ত খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে যার খাদ্য এটাই হবে তার কি অবস্থা হবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তদুপরি তাদের জন্যে থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ।' অথবা ভাবার্থ হচ্ছেঃ ঐ জাহান্নামী গাছকে জাহান্নামী পানির সাথে মিশিয়ে তাদেরকে পান করানো হবে। আর এই গরম পানি ওটাই হবে যা জাহান্নামীদের ক্ষতস্থান হতে রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি আকারে বের হয়ে আসবে এবং তাদের চক্ষু হতে ও গুপ্তাঙ্গ হতে বেরিয়ে আসবে। হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যখন এই পানি তাদের সামনে ধরা হবে তখন তা তাদের নিকট অপছন্দনীয় হবে। আর যখন তা তাদের চেহারার সামনে তুলে ধরা হবে তখন ওর তাপে তাদের চেহারা ঝলসে যাবে। আর যখন তারা ওটা পান করবে তখন তাদের নাড়িভূড়ী কেটে নিম্ন রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামীরা যখন ক্ষুধার কথা বলবে তখন তাদেরকে যাকূম খাওয়ানো হবে। ফলে তাদের মুখের চামড়া সম্পূর্ণ খসে পড়বে। এমনকি কোন পরিচিত ব্যক্তি সেই মুখের চামড়া দেখেই তাদেরকে চিনে নিবে। তারপর পিপাসায় ছটফট করে যখন পানি চাইবে তখন গলিত তামার ন্যায় গরম পানি তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে। ওটা চেহারার সামনে আসা মাত্রই চেহারার গোশত ঝলসিয়ে দিবে এবং সমস্ত গোশত খসে পড়বে। আর পেটে গিয়ে ওটা নাড়িভূড়ি বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে এবং উপর থেকে লোহার হাতুড়ী দ্বারা প্রহার করা হবে। ফলে দেহের এক একটি অংশ পৃথক। পৃথক হয়ে যাবে। তখন তারা মৃত্যু কামনা করতে থাকবে। প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে। সেখানে তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি হতে থাকবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।”(৫৫:৪৪) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! দুপুরের পূর্বেই জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে পৌঁছে যাবে। আর সেখানেই তারা দুপুরের বিশ্রাম করবে।” অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম।”(২৫-২৪) মোটকথা কায়লুলার (দুপুরের বিশ্রামের) সময় উভয় দল নিজ নিজ ঠিকানায় অবস্থান করবে। এই অর্থের জন্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর উপর (আরবী)-এর (আরবী)-এর জন্যে হবে। এটা ওরই প্রতিফল যে, তারা তাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছিল বিপথগামী এবং তারা তাদের পদাংক অনুসরণে ধাবিত হয়েছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, বাধ্য হয়ে এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, নির্বোধ হিসেবে তাদের পদাংক অনুসরণ করেছিল।
আস-সাফফাত 37:69
৬২-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের বিভিন্ন নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ জান্নাতের এসব নিয়ামত উত্তম, না ‘যাককূম’ নামীয় বৃক্ষ? অর্থাৎ যা জাহান্নামে রয়েছে। এর অর্থ নিকৃষ্ট একটি গাছ হতে পারে যা জাহান্নামের সকল প্রকোষ্ঠে প্রসারিত। যেমন ‘বা' নামক একটি গাছ, যার শাখা জান্নাতের প্রতিটি কামরায় প্রবিষ্ট রয়েছে। এও হতে পার যে, ওটা যাকূম জাতীয় গাছ। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আবোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে।”(৫৬:৫১-৫২)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি এটা যালিমদের জন্যে সৃষ্টি করেছি পরীক্ষা স্বরূপ।' কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যাকূম গাছের উল্লেখ পথভ্রষ্টদের জন্যে ফিত্না হয়ে গেছে। তারা বলেঃ “আরে দেখো, দেখো। এ নবী বলে কি শুন! আগুনে নাকি গাছ হবে? আগুনতো গাছকে জ্বালিয়ে দেয়। সুতরাং এটা কোন ধরনের কথা?” তাদের একথা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই এ বৃক্ষ উদ্গত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে।' হ্যা, এই গাছ আগুন থেকেই জন্মে এবং আগুনই ওর খাদ্য। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল এ কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়তো এবং বলতোঃ “আমি তো মজা করে খেজুর ও মাখন বাবো এবং এরই নাম যাকূম। মোটকথা এটাও একটা পরীক্ষা। ভাল লোকেরা এতে ভয়ে আঁৎকে উঠে, আর মন্দ লোকেরা একে হেসে উড়িয়ে দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যে দৃশ্য তোমাকে দেখিয়েছি তা এবং কুরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও শুধু মানুষের জন্যে। আমি তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করি, কিন্তু এটা তাদের ঘোর অবাধ্যতাই বৃদ্ধি করে।”(১৭:৬০)আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ওর মোচা যেন শয়তানের মাথা।' এ কথা দ্বারা উক্ত গাছের কদর্যতা বর্ণনা করা হয়েছে। অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, শয়তানের মস্তক আকাশে প্রতিষ্ঠিত। এ গাছের মোচাকে শয়তানের মস্তকের সাথে তুলনা করার উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, যদিও কেউ কখনো শয়তানকে দেখেনি, তবুও তার নাম শুনামাত্রই তার জঘন্য রূপের ছবি মানুষের মানসপটে ভেসে ওঠে। উক্ত গাছেরও অবস্থা এইরূপ। এর ভিতর ও বাহির উভয়ই খারাপ। একথাও বলা হয়েছে যে, এটা এক প্রকার সর্প বিশেষ যার মস্তক অত্যন্ত ভয়ংকর। একটি উক্তি এও আছে যে, ওটা এক প্রকার উদ্ভিদ, যা অত্যন্ত জঘন্যভাবে বর্ধিত ও বিস্তৃত হয়ে থাকে। কিন্তু এ দুটি সম্ভাবনা সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা বর্ণনা করলাম। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা এটা হতে ভক্ষণ করবে এবং উদর পূর্ণ করবে এর দ্বারা। সেই দুর্গন্ধময় তীব্র তিক্ত তরু জোরপূর্বক তাদেরকে খাওয়ানো হবে। আর এটা তারা খেতেও বাধ্য হবে। এটাও এক প্রকারের শাস্তি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী [(আরবী) আরব দেশের এক প্রকার গুল্ম। এটা যখন সবুজ থাকে তখন একে (আরবী) (শিবরাক) বলা হয়। আর যখন শুকিয়ে যায় তখন একে (আরবী) (যারী) বলা হয়। এটা খুব বিষাক্ত এবং কোন জন্তুই এটা খায় না] ব্যতীত। যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তও করবে না।” (৮৮:৬-৭) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যদি যাকূম বৃক্ষের এক ফোঁটা রস দুনিয়ার সমুদ্রে পতিত হয় তবে সারা বিশ্ববাসীর সমস্ত খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে যার খাদ্য এটাই হবে তার কি অবস্থা হবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তদুপরি তাদের জন্যে থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ।' অথবা ভাবার্থ হচ্ছেঃ ঐ জাহান্নামী গাছকে জাহান্নামী পানির সাথে মিশিয়ে তাদেরকে পান করানো হবে। আর এই গরম পানি ওটাই হবে যা জাহান্নামীদের ক্ষতস্থান হতে রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি আকারে বের হয়ে আসবে এবং তাদের চক্ষু হতে ও গুপ্তাঙ্গ হতে বেরিয়ে আসবে। হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যখন এই পানি তাদের সামনে ধরা হবে তখন তা তাদের নিকট অপছন্দনীয় হবে। আর যখন তা তাদের চেহারার সামনে তুলে ধরা হবে তখন ওর তাপে তাদের চেহারা ঝলসে যাবে। আর যখন তারা ওটা পান করবে তখন তাদের নাড়িভূড়ী কেটে নিম্ন রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামীরা যখন ক্ষুধার কথা বলবে তখন তাদেরকে যাকূম খাওয়ানো হবে। ফলে তাদের মুখের চামড়া সম্পূর্ণ খসে পড়বে। এমনকি কোন পরিচিত ব্যক্তি সেই মুখের চামড়া দেখেই তাদেরকে চিনে নিবে। তারপর পিপাসায় ছটফট করে যখন পানি চাইবে তখন গলিত তামার ন্যায় গরম পানি তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে। ওটা চেহারার সামনে আসা মাত্রই চেহারার গোশত ঝলসিয়ে দিবে এবং সমস্ত গোশত খসে পড়বে। আর পেটে গিয়ে ওটা নাড়িভূড়ি বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে এবং উপর থেকে লোহার হাতুড়ী দ্বারা প্রহার করা হবে। ফলে দেহের এক একটি অংশ পৃথক। পৃথক হয়ে যাবে। তখন তারা মৃত্যু কামনা করতে থাকবে। প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে। সেখানে তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি হতে থাকবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।”(৫৫:৪৪) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! দুপুরের পূর্বেই জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে পৌঁছে যাবে। আর সেখানেই তারা দুপুরের বিশ্রাম করবে।” অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম।”(২৫-২৪) মোটকথা কায়লুলার (দুপুরের বিশ্রামের) সময় উভয় দল নিজ নিজ ঠিকানায় অবস্থান করবে। এই অর্থের জন্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর উপর (আরবী)-এর (আরবী)-এর জন্যে হবে। এটা ওরই প্রতিফল যে, তারা তাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছিল বিপথগামী এবং তারা তাদের পদাংক অনুসরণে ধাবিত হয়েছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, বাধ্য হয়ে এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, নির্বোধ হিসেবে তাদের পদাংক অনুসরণ করেছিল।
আস-সাফফাত 37:70
৬২-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের বিভিন্ন নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ জান্নাতের এসব নিয়ামত উত্তম, না ‘যাককূম’ নামীয় বৃক্ষ? অর্থাৎ যা জাহান্নামে রয়েছে। এর অর্থ নিকৃষ্ট একটি গাছ হতে পারে যা জাহান্নামের সকল প্রকোষ্ঠে প্রসারিত। যেমন ‘বা' নামক একটি গাছ, যার শাখা জান্নাতের প্রতিটি কামরায় প্রবিষ্ট রয়েছে। এও হতে পার যে, ওটা যাকূম জাতীয় গাছ। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আবোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে।”(৫৬:৫১-৫২)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি এটা যালিমদের জন্যে সৃষ্টি করেছি পরীক্ষা স্বরূপ।' কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যাকূম গাছের উল্লেখ পথভ্রষ্টদের জন্যে ফিত্না হয়ে গেছে। তারা বলেঃ “আরে দেখো, দেখো। এ নবী বলে কি শুন! আগুনে নাকি গাছ হবে? আগুনতো গাছকে জ্বালিয়ে দেয়। সুতরাং এটা কোন ধরনের কথা?” তাদের একথা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই এ বৃক্ষ উদ্গত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে।' হ্যা, এই গাছ আগুন থেকেই জন্মে এবং আগুনই ওর খাদ্য। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, অভিশপ্ত আবু জেহেল এ কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়তো এবং বলতোঃ “আমি তো মজা করে খেজুর ও মাখন বাবো এবং এরই নাম যাকূম। মোটকথা এটাও একটা পরীক্ষা। ভাল লোকেরা এতে ভয়ে আঁৎকে উঠে, আর মন্দ লোকেরা একে হেসে উড়িয়ে দেয়। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যে দৃশ্য তোমাকে দেখিয়েছি তা এবং কুরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও শুধু মানুষের জন্যে। আমি তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করি, কিন্তু এটা তাদের ঘোর অবাধ্যতাই বৃদ্ধি করে।”(১৭:৬০)আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ওর মোচা যেন শয়তানের মাথা।' এ কথা দ্বারা উক্ত গাছের কদর্যতা বর্ণনা করা হয়েছে। অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, শয়তানের মস্তক আকাশে প্রতিষ্ঠিত। এ গাছের মোচাকে শয়তানের মস্তকের সাথে তুলনা করার উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, যদিও কেউ কখনো শয়তানকে দেখেনি, তবুও তার নাম শুনামাত্রই তার জঘন্য রূপের ছবি মানুষের মানসপটে ভেসে ওঠে। উক্ত গাছেরও অবস্থা এইরূপ। এর ভিতর ও বাহির উভয়ই খারাপ। একথাও বলা হয়েছে যে, এটা এক প্রকার সর্প বিশেষ যার মস্তক অত্যন্ত ভয়ংকর। একটি উক্তি এও আছে যে, ওটা এক প্রকার উদ্ভিদ, যা অত্যন্ত জঘন্যভাবে বর্ধিত ও বিস্তৃত হয়ে থাকে। কিন্তু এ দুটি সম্ভাবনা সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা বর্ণনা করলাম। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা এটা হতে ভক্ষণ করবে এবং উদর পূর্ণ করবে এর দ্বারা। সেই দুর্গন্ধময় তীব্র তিক্ত তরু জোরপূর্বক তাদেরকে খাওয়ানো হবে। আর এটা তারা খেতেও বাধ্য হবে। এটাও এক প্রকারের শাস্তি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের জন্যে খাদ্য থাকবে না যারী [(আরবী) আরব দেশের এক প্রকার গুল্ম। এটা যখন সবুজ থাকে তখন একে (আরবী) (শিবরাক) বলা হয়। আর যখন শুকিয়ে যায় তখন একে (আরবী) (যারী) বলা হয়। এটা খুব বিষাক্ত এবং কোন জন্তুই এটা খায় না] ব্যতীত। যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তও করবে না।” (৮৮:৬-৭) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যদি যাকূম বৃক্ষের এক ফোঁটা রস দুনিয়ার সমুদ্রে পতিত হয় তবে সারা বিশ্ববাসীর সমস্ত খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে যার খাদ্য এটাই হবে তার কি অবস্থা হবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তদুপরি তাদের জন্যে থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ।' অথবা ভাবার্থ হচ্ছেঃ ঐ জাহান্নামী গাছকে জাহান্নামী পানির সাথে মিশিয়ে তাদেরকে পান করানো হবে। আর এই গরম পানি ওটাই হবে যা জাহান্নামীদের ক্ষতস্থান হতে রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি আকারে বের হয়ে আসবে এবং তাদের চক্ষু হতে ও গুপ্তাঙ্গ হতে বেরিয়ে আসবে। হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যখন এই পানি তাদের সামনে ধরা হবে তখন তা তাদের নিকট অপছন্দনীয় হবে। আর যখন তা তাদের চেহারার সামনে তুলে ধরা হবে তখন ওর তাপে তাদের চেহারা ঝলসে যাবে। আর যখন তারা ওটা পান করবে তখন তাদের নাড়িভূড়ী কেটে নিম্ন রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামীরা যখন ক্ষুধার কথা বলবে তখন তাদেরকে যাকূম খাওয়ানো হবে। ফলে তাদের মুখের চামড়া সম্পূর্ণ খসে পড়বে। এমনকি কোন পরিচিত ব্যক্তি সেই মুখের চামড়া দেখেই তাদেরকে চিনে নিবে। তারপর পিপাসায় ছটফট করে যখন পানি চাইবে তখন গলিত তামার ন্যায় গরম পানি তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে। ওটা চেহারার সামনে আসা মাত্রই চেহারার গোশত ঝলসিয়ে দিবে এবং সমস্ত গোশত খসে পড়বে। আর পেটে গিয়ে ওটা নাড়িভূড়ি বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে এবং উপর থেকে লোহার হাতুড়ী দ্বারা প্রহার করা হবে। ফলে দেহের এক একটি অংশ পৃথক। পৃথক হয়ে যাবে। তখন তারা মৃত্যু কামনা করতে থাকবে। প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে। সেখানে তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি হতে থাকবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।”(৫৫:৪৪) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! দুপুরের পূর্বেই জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে পৌঁছে যাবে। আর সেখানেই তারা দুপুরের বিশ্রাম করবে।” অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন হবে জান্নাতবাসীদের বাসস্থান উৎকৃষ্ট এবং বিশ্রামস্থল মনোরম।”(২৫-২৪) মোটকথা কায়লুলার (দুপুরের বিশ্রামের) সময় উভয় দল নিজ নিজ ঠিকানায় অবস্থান করবে। এই অর্থের জন্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর উপর (আরবী)-এর (আরবী)-এর জন্যে হবে। এটা ওরই প্রতিফল যে, তারা তাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছিল বিপথগামী এবং তারা তাদের পদাংক অনুসরণে ধাবিত হয়েছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, বাধ্য হয়ে এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, নির্বোধ হিসেবে তাদের পদাংক অনুসরণ করেছিল।
আস-সাফফাত 37:71
৭১-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা পূর্বযুগের উম্মতদের সংবাদ প্রদান করছেন যে, তাদের অধিকাংশই ছিল পথহারা। তারা আল্লাহ তা'আলার অংশী স্থাপন করতো। তাদের নিকট আল্লাহর নবী এসে তাদেরকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, ভয় দেখিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, অংশী স্থাপন করা, কুফরী করা এবং নবীদেরকে (আঃ) মিথ্যা প্রতিপন্ন করা প্রভৃতি কাজে আল্লাহ চরম রাগান্বিত হন। এগুলো হতে বিরত না হলে তাদের উপর আল্লাহর গযব নেমে আসবে। এতদসত্ত্বেও তারা রাসূলদের বিরোধিতা করেছে ও তাঁদেরকে মিথ্যাবাদী জেনেছে। ফলে তাদের পরিণাম হয়েছে অত্যন্ত শোচনীয়। অবশ্য আল্লাহ তাঁর সৎকর্মশীল বান্দাদেরকে সাহায্য করেছেন এবং জয়যুক্ত করে সম্মানিত করেছেন।
আস-সাফফাত 37:72
৭১-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা পূর্বযুগের উম্মতদের সংবাদ প্রদান করছেন যে, তাদের অধিকাংশই ছিল পথহারা। তারা আল্লাহ তা'আলার অংশী স্থাপন করতো। তাদের নিকট আল্লাহর নবী এসে তাদেরকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, ভয় দেখিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, অংশী স্থাপন করা, কুফরী করা এবং নবীদেরকে (আঃ) মিথ্যা প্রতিপন্ন করা প্রভৃতি কাজে আল্লাহ চরম রাগান্বিত হন। এগুলো হতে বিরত না হলে তাদের উপর আল্লাহর গযব নেমে আসবে। এতদসত্ত্বেও তারা রাসূলদের বিরোধিতা করেছে ও তাঁদেরকে মিথ্যাবাদী জেনেছে। ফলে তাদের পরিণাম হয়েছে অত্যন্ত শোচনীয়। অবশ্য আল্লাহ তাঁর সৎকর্মশীল বান্দাদেরকে সাহায্য করেছেন এবং জয়যুক্ত করে সম্মানিত করেছেন।
আস-সাফফাত 37:73
৭১-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা পূর্বযুগের উম্মতদের সংবাদ প্রদান করছেন যে, তাদের অধিকাংশই ছিল পথহারা। তারা আল্লাহ তা'আলার অংশী স্থাপন করতো। তাদের নিকট আল্লাহর নবী এসে তাদেরকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, ভয় দেখিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, অংশী স্থাপন করা, কুফরী করা এবং নবীদেরকে (আঃ) মিথ্যা প্রতিপন্ন করা প্রভৃতি কাজে আল্লাহ চরম রাগান্বিত হন। এগুলো হতে বিরত না হলে তাদের উপর আল্লাহর গযব নেমে আসবে। এতদসত্ত্বেও তারা রাসূলদের বিরোধিতা করেছে ও তাঁদেরকে মিথ্যাবাদী জেনেছে। ফলে তাদের পরিণাম হয়েছে অত্যন্ত শোচনীয়। অবশ্য আল্লাহ তাঁর সৎকর্মশীল বান্দাদেরকে সাহায্য করেছেন এবং জয়যুক্ত করে সম্মানিত করেছেন।
আস-সাফফাত 37:74
৭১-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা পূর্বযুগের উম্মতদের সংবাদ প্রদান করছেন যে, তাদের অধিকাংশই ছিল পথহারা। তারা আল্লাহ তা'আলার অংশী স্থাপন করতো। তাদের নিকট আল্লাহর নবী এসে তাদেরকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, ভয় দেখিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, অংশী স্থাপন করা, কুফরী করা এবং নবীদেরকে (আঃ) মিথ্যা প্রতিপন্ন করা প্রভৃতি কাজে আল্লাহ চরম রাগান্বিত হন। এগুলো হতে বিরত না হলে তাদের উপর আল্লাহর গযব নেমে আসবে। এতদসত্ত্বেও তারা রাসূলদের বিরোধিতা করেছে ও তাঁদেরকে মিথ্যাবাদী জেনেছে। ফলে তাদের পরিণাম হয়েছে অত্যন্ত শোচনীয়। অবশ্য আল্লাহ তাঁর সৎকর্মশীল বান্দাদেরকে সাহায্য করেছেন এবং জয়যুক্ত করে সম্মানিত করেছেন।
আস-সাফফাত 37:75
৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে পূর্বযুগের মানুষের পথভ্রষ্টতার কথা সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছেন। হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সুদীর্ঘ নয় শত পঞ্চাশ বছর অবস্থান করেছিলেন। তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের লোককে সদা-সর্বদা উপদেশ দিতেন ও বুঝাতেন। এতদসত্ত্বেও তারা পথভ্রষ্টতার মধ্যেই ডুবে ছিল। শুধুমাত্র গুটিকতক লোক তার উপর ঈমান এনেছিল। জাতির যখন এহেন অবস্থা চলতে থাকলো এবং নবী (আঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করতে লাগলো তখন হযরত নূহ (আঃ) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানালেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি তো অসহায়, অতএব আপনি প্রতিবিধান করুন।” তখন আল্লাহর ক্রোধ তাদের উপর পতিত হলো। সমস্ত কাফির পানিতে ডুবে মরলো। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ নূহ (আঃ) আমাকে আহ্বান করেছিল, আর আমি কত উত্তম সাড়াদানকারী।' অর্থাৎ আমি তার আহ্বানে উত্তমরূপে সাড়া দিয়েছিলাম। তাকে ও তার পরিবার পরিজনকে বিপদ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলাম। আর তার বংশধরদেরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশ পরম্পরায়। কেননা, তারাই তো শুধু অবশিষ্ট ছিল। হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানরা ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট ছিল না। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সমগ্র মানব জাতি হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের থেকেই হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, সাম, হাম ও ইয়াফাসের সন্তানরা দুনিয়াতে বিস্তার লাভ করে ও অবশিষ্ট থাকে। ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন যে, সাম সমগ্র আরব জাতির পিতা, হাম সমগ্র হাবশের পিতা এবং ইয়াফাস সমগ্র রোমের পিতা। এই হাদীসে রোম দ্বারা প্রথম রোম অর্থাৎ ইউনানকে বুঝানো হয়েছে যা রোমী লায়তী ইবনে ইউনান ইবনে ইয়াফাস ইবনে নূহ (আঃ)-এর দিকে সমন্ধযুক্ত। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর এক পুত্র সামের সন্তান হলো আরব, ফারেস ও রোমীরা। ইয়াফাসের সস্তান হলো তুর্কী, সাকালিয়া এবং ইয়াজুজ ও মাজুজ। আর হামের সন্তান হচ্ছে কিবতী, সুদানী ও বার্বারীরা। হযরত নূহ (আঃ)-এর সততা এবং তাঁর উত্তম স্বরণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর পরবর্তী লোকদের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে। সমস্ত নবী (আঃ)-এর সত্যবাদিতার ফল এটাই হয় যে, জনগণ সদা-সর্বদা তাদের উপর সালাম পাঠিয়ে থাকেন এবং তাঁদের প্রশংসা করে থাকেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহ (আঃ)-এর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক!' এটা যেন পূর্ববর্তী বাক্যেরই ব্যাখ্যা। অর্থাৎ তার যিকর উত্তমরূপে অবশিষ্ট থাকার অর্থ এই যে, প্রত্যেক উম্মত তার উপর সালাম বর্ষণ করতে থাকবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমার নীতি এই যে, যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে আমার ইবাদত ও আনুগত্যে লেগে থাকে, তাকে এই ভাবেই আমি পুরস্কৃত করে থাকি। অর্থাৎ পরবর্তীদের মধ্যে তার উত্তম যিকর সদা-সর্বদার জন্যে বাকী রেখে থাকি।' আল্লাহ তা'আলার উক্তি:নূহ (আঃ) ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বিশ্বাসী ও তাওহীদের উপর অটল। তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের পরিণাম ভাল হয়েছিল এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে ধ্বংস ও নিমজ্জিত করে দেয়া হয়েছিল। চোখের পলক ফেলে এমনও একজন তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। এমনকি তাদের কোন চিহ্ন পর্যন্ত বাকী ছিল না। হ্যা, তবে তাদের কলংকময় কার্যকলাপ মানুষের মাঝে প্রাচীন ঘটনা হিসেবে আলোচিত হতে থাকলো।
আস-সাফফাত 37:76
৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে পূর্বযুগের মানুষের পথভ্রষ্টতার কথা সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছেন। হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সুদীর্ঘ নয় শত পঞ্চাশ বছর অবস্থান করেছিলেন। তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের লোককে সদা-সর্বদা উপদেশ দিতেন ও বুঝাতেন। এতদসত্ত্বেও তারা পথভ্রষ্টতার মধ্যেই ডুবে ছিল। শুধুমাত্র গুটিকতক লোক তার উপর ঈমান এনেছিল। জাতির যখন এহেন অবস্থা চলতে থাকলো এবং নবী (আঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করতে লাগলো তখন হযরত নূহ (আঃ) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানালেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি তো অসহায়, অতএব আপনি প্রতিবিধান করুন।” তখন আল্লাহর ক্রোধ তাদের উপর পতিত হলো। সমস্ত কাফির পানিতে ডুবে মরলো। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ নূহ (আঃ) আমাকে আহ্বান করেছিল, আর আমি কত উত্তম সাড়াদানকারী।' অর্থাৎ আমি তার আহ্বানে উত্তমরূপে সাড়া দিয়েছিলাম। তাকে ও তার পরিবার পরিজনকে বিপদ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলাম। আর তার বংশধরদেরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশ পরম্পরায়। কেননা, তারাই তো শুধু অবশিষ্ট ছিল। হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানরা ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট ছিল না। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সমগ্র মানব জাতি হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের থেকেই হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, সাম, হাম ও ইয়াফাসের সন্তানরা দুনিয়াতে বিস্তার লাভ করে ও অবশিষ্ট থাকে। ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন যে, সাম সমগ্র আরব জাতির পিতা, হাম সমগ্র হাবশের পিতা এবং ইয়াফাস সমগ্র রোমের পিতা। এই হাদীসে রোম দ্বারা প্রথম রোম অর্থাৎ ইউনানকে বুঝানো হয়েছে যা রোমী লায়তী ইবনে ইউনান ইবনে ইয়াফাস ইবনে নূহ (আঃ)-এর দিকে সমন্ধযুক্ত। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর এক পুত্র সামের সন্তান হলো আরব, ফারেস ও রোমীরা। ইয়াফাসের সস্তান হলো তুর্কী, সাকালিয়া এবং ইয়াজুজ ও মাজুজ। আর হামের সন্তান হচ্ছে কিবতী, সুদানী ও বার্বারীরা। হযরত নূহ (আঃ)-এর সততা এবং তাঁর উত্তম স্বরণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর পরবর্তী লোকদের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে। সমস্ত নবী (আঃ)-এর সত্যবাদিতার ফল এটাই হয় যে, জনগণ সদা-সর্বদা তাদের উপর সালাম পাঠিয়ে থাকেন এবং তাঁদের প্রশংসা করে থাকেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহ (আঃ)-এর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক!' এটা যেন পূর্ববর্তী বাক্যেরই ব্যাখ্যা। অর্থাৎ তার যিকর উত্তমরূপে অবশিষ্ট থাকার অর্থ এই যে, প্রত্যেক উম্মত তার উপর সালাম বর্ষণ করতে থাকবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমার নীতি এই যে, যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে আমার ইবাদত ও আনুগত্যে লেগে থাকে, তাকে এই ভাবেই আমি পুরস্কৃত করে থাকি। অর্থাৎ পরবর্তীদের মধ্যে তার উত্তম যিকর সদা-সর্বদার জন্যে বাকী রেখে থাকি।' আল্লাহ তা'আলার উক্তি:নূহ (আঃ) ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বিশ্বাসী ও তাওহীদের উপর অটল। তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের পরিণাম ভাল হয়েছিল এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে ধ্বংস ও নিমজ্জিত করে দেয়া হয়েছিল। চোখের পলক ফেলে এমনও একজন তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। এমনকি তাদের কোন চিহ্ন পর্যন্ত বাকী ছিল না। হ্যা, তবে তাদের কলংকময় কার্যকলাপ মানুষের মাঝে প্রাচীন ঘটনা হিসেবে আলোচিত হতে থাকলো।
আস-সাফফাত 37:77
৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে পূর্বযুগের মানুষের পথভ্রষ্টতার কথা সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছেন। হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সুদীর্ঘ নয় শত পঞ্চাশ বছর অবস্থান করেছিলেন। তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের লোককে সদা-সর্বদা উপদেশ দিতেন ও বুঝাতেন। এতদসত্ত্বেও তারা পথভ্রষ্টতার মধ্যেই ডুবে ছিল। শুধুমাত্র গুটিকতক লোক তার উপর ঈমান এনেছিল। জাতির যখন এহেন অবস্থা চলতে থাকলো এবং নবী (আঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করতে লাগলো তখন হযরত নূহ (আঃ) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানালেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি তো অসহায়, অতএব আপনি প্রতিবিধান করুন।” তখন আল্লাহর ক্রোধ তাদের উপর পতিত হলো। সমস্ত কাফির পানিতে ডুবে মরলো। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ নূহ (আঃ) আমাকে আহ্বান করেছিল, আর আমি কত উত্তম সাড়াদানকারী।' অর্থাৎ আমি তার আহ্বানে উত্তমরূপে সাড়া দিয়েছিলাম। তাকে ও তার পরিবার পরিজনকে বিপদ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলাম। আর তার বংশধরদেরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশ পরম্পরায়। কেননা, তারাই তো শুধু অবশিষ্ট ছিল। হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানরা ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট ছিল না। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সমগ্র মানব জাতি হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের থেকেই হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, সাম, হাম ও ইয়াফাসের সন্তানরা দুনিয়াতে বিস্তার লাভ করে ও অবশিষ্ট থাকে। ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন যে, সাম সমগ্র আরব জাতির পিতা, হাম সমগ্র হাবশের পিতা এবং ইয়াফাস সমগ্র রোমের পিতা। এই হাদীসে রোম দ্বারা প্রথম রোম অর্থাৎ ইউনানকে বুঝানো হয়েছে যা রোমী লায়তী ইবনে ইউনান ইবনে ইয়াফাস ইবনে নূহ (আঃ)-এর দিকে সমন্ধযুক্ত। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর এক পুত্র সামের সন্তান হলো আরব, ফারেস ও রোমীরা। ইয়াফাসের সস্তান হলো তুর্কী, সাকালিয়া এবং ইয়াজুজ ও মাজুজ। আর হামের সন্তান হচ্ছে কিবতী, সুদানী ও বার্বারীরা। হযরত নূহ (আঃ)-এর সততা এবং তাঁর উত্তম স্বরণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর পরবর্তী লোকদের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে। সমস্ত নবী (আঃ)-এর সত্যবাদিতার ফল এটাই হয় যে, জনগণ সদা-সর্বদা তাদের উপর সালাম পাঠিয়ে থাকেন এবং তাঁদের প্রশংসা করে থাকেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহ (আঃ)-এর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক!' এটা যেন পূর্ববর্তী বাক্যেরই ব্যাখ্যা। অর্থাৎ তার যিকর উত্তমরূপে অবশিষ্ট থাকার অর্থ এই যে, প্রত্যেক উম্মত তার উপর সালাম বর্ষণ করতে থাকবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমার নীতি এই যে, যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে আমার ইবাদত ও আনুগত্যে লেগে থাকে, তাকে এই ভাবেই আমি পুরস্কৃত করে থাকি। অর্থাৎ পরবর্তীদের মধ্যে তার উত্তম যিকর সদা-সর্বদার জন্যে বাকী রেখে থাকি।' আল্লাহ তা'আলার উক্তি:নূহ (আঃ) ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বিশ্বাসী ও তাওহীদের উপর অটল। তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের পরিণাম ভাল হয়েছিল এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে ধ্বংস ও নিমজ্জিত করে দেয়া হয়েছিল। চোখের পলক ফেলে এমনও একজন তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। এমনকি তাদের কোন চিহ্ন পর্যন্ত বাকী ছিল না। হ্যা, তবে তাদের কলংকময় কার্যকলাপ মানুষের মাঝে প্রাচীন ঘটনা হিসেবে আলোচিত হতে থাকলো।
আস-সাফফাত 37:78
৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে পূর্বযুগের মানুষের পথভ্রষ্টতার কথা সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছেন। হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সুদীর্ঘ নয় শত পঞ্চাশ বছর অবস্থান করেছিলেন। তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের লোককে সদা-সর্বদা উপদেশ দিতেন ও বুঝাতেন। এতদসত্ত্বেও তারা পথভ্রষ্টতার মধ্যেই ডুবে ছিল। শুধুমাত্র গুটিকতক লোক তার উপর ঈমান এনেছিল। জাতির যখন এহেন অবস্থা চলতে থাকলো এবং নবী (আঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করতে লাগলো তখন হযরত নূহ (আঃ) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানালেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি তো অসহায়, অতএব আপনি প্রতিবিধান করুন।” তখন আল্লাহর ক্রোধ তাদের উপর পতিত হলো। সমস্ত কাফির পানিতে ডুবে মরলো। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ নূহ (আঃ) আমাকে আহ্বান করেছিল, আর আমি কত উত্তম সাড়াদানকারী।' অর্থাৎ আমি তার আহ্বানে উত্তমরূপে সাড়া দিয়েছিলাম। তাকে ও তার পরিবার পরিজনকে বিপদ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলাম। আর তার বংশধরদেরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশ পরম্পরায়। কেননা, তারাই তো শুধু অবশিষ্ট ছিল। হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানরা ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট ছিল না। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সমগ্র মানব জাতি হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের থেকেই হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, সাম, হাম ও ইয়াফাসের সন্তানরা দুনিয়াতে বিস্তার লাভ করে ও অবশিষ্ট থাকে। ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন যে, সাম সমগ্র আরব জাতির পিতা, হাম সমগ্র হাবশের পিতা এবং ইয়াফাস সমগ্র রোমের পিতা। এই হাদীসে রোম দ্বারা প্রথম রোম অর্থাৎ ইউনানকে বুঝানো হয়েছে যা রোমী লায়তী ইবনে ইউনান ইবনে ইয়াফাস ইবনে নূহ (আঃ)-এর দিকে সমন্ধযুক্ত। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর এক পুত্র সামের সন্তান হলো আরব, ফারেস ও রোমীরা। ইয়াফাসের সস্তান হলো তুর্কী, সাকালিয়া এবং ইয়াজুজ ও মাজুজ। আর হামের সন্তান হচ্ছে কিবতী, সুদানী ও বার্বারীরা। হযরত নূহ (আঃ)-এর সততা এবং তাঁর উত্তম স্বরণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর পরবর্তী লোকদের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে। সমস্ত নবী (আঃ)-এর সত্যবাদিতার ফল এটাই হয় যে, জনগণ সদা-সর্বদা তাদের উপর সালাম পাঠিয়ে থাকেন এবং তাঁদের প্রশংসা করে থাকেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহ (আঃ)-এর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক!' এটা যেন পূর্ববর্তী বাক্যেরই ব্যাখ্যা। অর্থাৎ তার যিকর উত্তমরূপে অবশিষ্ট থাকার অর্থ এই যে, প্রত্যেক উম্মত তার উপর সালাম বর্ষণ করতে থাকবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমার নীতি এই যে, যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে আমার ইবাদত ও আনুগত্যে লেগে থাকে, তাকে এই ভাবেই আমি পুরস্কৃত করে থাকি। অর্থাৎ পরবর্তীদের মধ্যে তার উত্তম যিকর সদা-সর্বদার জন্যে বাকী রেখে থাকি।' আল্লাহ তা'আলার উক্তি:নূহ (আঃ) ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বিশ্বাসী ও তাওহীদের উপর অটল। তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের পরিণাম ভাল হয়েছিল এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে ধ্বংস ও নিমজ্জিত করে দেয়া হয়েছিল। চোখের পলক ফেলে এমনও একজন তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। এমনকি তাদের কোন চিহ্ন পর্যন্ত বাকী ছিল না। হ্যা, তবে তাদের কলংকময় কার্যকলাপ মানুষের মাঝে প্রাচীন ঘটনা হিসেবে আলোচিত হতে থাকলো।
আস-সাফফাত 37:79
৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে পূর্বযুগের মানুষের পথভ্রষ্টতার কথা সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছেন। হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সুদীর্ঘ নয় শত পঞ্চাশ বছর অবস্থান করেছিলেন। তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের লোককে সদা-সর্বদা উপদেশ দিতেন ও বুঝাতেন। এতদসত্ত্বেও তারা পথভ্রষ্টতার মধ্যেই ডুবে ছিল। শুধুমাত্র গুটিকতক লোক তার উপর ঈমান এনেছিল। জাতির যখন এহেন অবস্থা চলতে থাকলো এবং নবী (আঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করতে লাগলো তখন হযরত নূহ (আঃ) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানালেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি তো অসহায়, অতএব আপনি প্রতিবিধান করুন।” তখন আল্লাহর ক্রোধ তাদের উপর পতিত হলো। সমস্ত কাফির পানিতে ডুবে মরলো। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ নূহ (আঃ) আমাকে আহ্বান করেছিল, আর আমি কত উত্তম সাড়াদানকারী।' অর্থাৎ আমি তার আহ্বানে উত্তমরূপে সাড়া দিয়েছিলাম। তাকে ও তার পরিবার পরিজনকে বিপদ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলাম। আর তার বংশধরদেরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশ পরম্পরায়। কেননা, তারাই তো শুধু অবশিষ্ট ছিল। হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানরা ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট ছিল না। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সমগ্র মানব জাতি হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের থেকেই হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, সাম, হাম ও ইয়াফাসের সন্তানরা দুনিয়াতে বিস্তার লাভ করে ও অবশিষ্ট থাকে। ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন যে, সাম সমগ্র আরব জাতির পিতা, হাম সমগ্র হাবশের পিতা এবং ইয়াফাস সমগ্র রোমের পিতা। এই হাদীসে রোম দ্বারা প্রথম রোম অর্থাৎ ইউনানকে বুঝানো হয়েছে যা রোমী লায়তী ইবনে ইউনান ইবনে ইয়াফাস ইবনে নূহ (আঃ)-এর দিকে সমন্ধযুক্ত। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর এক পুত্র সামের সন্তান হলো আরব, ফারেস ও রোমীরা। ইয়াফাসের সস্তান হলো তুর্কী, সাকালিয়া এবং ইয়াজুজ ও মাজুজ। আর হামের সন্তান হচ্ছে কিবতী, সুদানী ও বার্বারীরা। হযরত নূহ (আঃ)-এর সততা এবং তাঁর উত্তম স্বরণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর পরবর্তী লোকদের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে। সমস্ত নবী (আঃ)-এর সত্যবাদিতার ফল এটাই হয় যে, জনগণ সদা-সর্বদা তাদের উপর সালাম পাঠিয়ে থাকেন এবং তাঁদের প্রশংসা করে থাকেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহ (আঃ)-এর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক!' এটা যেন পূর্ববর্তী বাক্যেরই ব্যাখ্যা। অর্থাৎ তার যিকর উত্তমরূপে অবশিষ্ট থাকার অর্থ এই যে, প্রত্যেক উম্মত তার উপর সালাম বর্ষণ করতে থাকবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমার নীতি এই যে, যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে আমার ইবাদত ও আনুগত্যে লেগে থাকে, তাকে এই ভাবেই আমি পুরস্কৃত করে থাকি। অর্থাৎ পরবর্তীদের মধ্যে তার উত্তম যিকর সদা-সর্বদার জন্যে বাকী রেখে থাকি।' আল্লাহ তা'আলার উক্তি:নূহ (আঃ) ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বিশ্বাসী ও তাওহীদের উপর অটল। তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের পরিণাম ভাল হয়েছিল এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে ধ্বংস ও নিমজ্জিত করে দেয়া হয়েছিল। চোখের পলক ফেলে এমনও একজন তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। এমনকি তাদের কোন চিহ্ন পর্যন্ত বাকী ছিল না। হ্যা, তবে তাদের কলংকময় কার্যকলাপ মানুষের মাঝে প্রাচীন ঘটনা হিসেবে আলোচিত হতে থাকলো।
আস-সাফফাত 37:80
৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে পূর্বযুগের মানুষের পথভ্রষ্টতার কথা সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছেন। হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সুদীর্ঘ নয় শত পঞ্চাশ বছর অবস্থান করেছিলেন। তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের লোককে সদা-সর্বদা উপদেশ দিতেন ও বুঝাতেন। এতদসত্ত্বেও তারা পথভ্রষ্টতার মধ্যেই ডুবে ছিল। শুধুমাত্র গুটিকতক লোক তার উপর ঈমান এনেছিল। জাতির যখন এহেন অবস্থা চলতে থাকলো এবং নবী (আঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করতে লাগলো তখন হযরত নূহ (আঃ) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানালেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি তো অসহায়, অতএব আপনি প্রতিবিধান করুন।” তখন আল্লাহর ক্রোধ তাদের উপর পতিত হলো। সমস্ত কাফির পানিতে ডুবে মরলো। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ নূহ (আঃ) আমাকে আহ্বান করেছিল, আর আমি কত উত্তম সাড়াদানকারী।' অর্থাৎ আমি তার আহ্বানে উত্তমরূপে সাড়া দিয়েছিলাম। তাকে ও তার পরিবার পরিজনকে বিপদ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলাম। আর তার বংশধরদেরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশ পরম্পরায়। কেননা, তারাই তো শুধু অবশিষ্ট ছিল। হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানরা ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট ছিল না। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সমগ্র মানব জাতি হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের থেকেই হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, সাম, হাম ও ইয়াফাসের সন্তানরা দুনিয়াতে বিস্তার লাভ করে ও অবশিষ্ট থাকে। ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন যে, সাম সমগ্র আরব জাতির পিতা, হাম সমগ্র হাবশের পিতা এবং ইয়াফাস সমগ্র রোমের পিতা। এই হাদীসে রোম দ্বারা প্রথম রোম অর্থাৎ ইউনানকে বুঝানো হয়েছে যা রোমী লায়তী ইবনে ইউনান ইবনে ইয়াফাস ইবনে নূহ (আঃ)-এর দিকে সমন্ধযুক্ত। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর এক পুত্র সামের সন্তান হলো আরব, ফারেস ও রোমীরা। ইয়াফাসের সস্তান হলো তুর্কী, সাকালিয়া এবং ইয়াজুজ ও মাজুজ। আর হামের সন্তান হচ্ছে কিবতী, সুদানী ও বার্বারীরা। হযরত নূহ (আঃ)-এর সততা এবং তাঁর উত্তম স্বরণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর পরবর্তী লোকদের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে। সমস্ত নবী (আঃ)-এর সত্যবাদিতার ফল এটাই হয় যে, জনগণ সদা-সর্বদা তাদের উপর সালাম পাঠিয়ে থাকেন এবং তাঁদের প্রশংসা করে থাকেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহ (আঃ)-এর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক!' এটা যেন পূর্ববর্তী বাক্যেরই ব্যাখ্যা। অর্থাৎ তার যিকর উত্তমরূপে অবশিষ্ট থাকার অর্থ এই যে, প্রত্যেক উম্মত তার উপর সালাম বর্ষণ করতে থাকবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমার নীতি এই যে, যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে আমার ইবাদত ও আনুগত্যে লেগে থাকে, তাকে এই ভাবেই আমি পুরস্কৃত করে থাকি। অর্থাৎ পরবর্তীদের মধ্যে তার উত্তম যিকর সদা-সর্বদার জন্যে বাকী রেখে থাকি।' আল্লাহ তা'আলার উক্তি:নূহ (আঃ) ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বিশ্বাসী ও তাওহীদের উপর অটল। তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের পরিণাম ভাল হয়েছিল এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে ধ্বংস ও নিমজ্জিত করে দেয়া হয়েছিল। চোখের পলক ফেলে এমনও একজন তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। এমনকি তাদের কোন চিহ্ন পর্যন্ত বাকী ছিল না। হ্যা, তবে তাদের কলংকময় কার্যকলাপ মানুষের মাঝে প্রাচীন ঘটনা হিসেবে আলোচিত হতে থাকলো।
আস-সাফফাত 37:81
৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে পূর্বযুগের মানুষের পথভ্রষ্টতার কথা সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছেন। হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সুদীর্ঘ নয় শত পঞ্চাশ বছর অবস্থান করেছিলেন। তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের লোককে সদা-সর্বদা উপদেশ দিতেন ও বুঝাতেন। এতদসত্ত্বেও তারা পথভ্রষ্টতার মধ্যেই ডুবে ছিল। শুধুমাত্র গুটিকতক লোক তার উপর ঈমান এনেছিল। জাতির যখন এহেন অবস্থা চলতে থাকলো এবং নবী (আঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করতে লাগলো তখন হযরত নূহ (আঃ) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানালেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি তো অসহায়, অতএব আপনি প্রতিবিধান করুন।” তখন আল্লাহর ক্রোধ তাদের উপর পতিত হলো। সমস্ত কাফির পানিতে ডুবে মরলো। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ নূহ (আঃ) আমাকে আহ্বান করেছিল, আর আমি কত উত্তম সাড়াদানকারী।' অর্থাৎ আমি তার আহ্বানে উত্তমরূপে সাড়া দিয়েছিলাম। তাকে ও তার পরিবার পরিজনকে বিপদ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলাম। আর তার বংশধরদেরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশ পরম্পরায়। কেননা, তারাই তো শুধু অবশিষ্ট ছিল। হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানরা ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট ছিল না। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সমগ্র মানব জাতি হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের থেকেই হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, সাম, হাম ও ইয়াফাসের সন্তানরা দুনিয়াতে বিস্তার লাভ করে ও অবশিষ্ট থাকে। ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন যে, সাম সমগ্র আরব জাতির পিতা, হাম সমগ্র হাবশের পিতা এবং ইয়াফাস সমগ্র রোমের পিতা। এই হাদীসে রোম দ্বারা প্রথম রোম অর্থাৎ ইউনানকে বুঝানো হয়েছে যা রোমী লায়তী ইবনে ইউনান ইবনে ইয়াফাস ইবনে নূহ (আঃ)-এর দিকে সমন্ধযুক্ত। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর এক পুত্র সামের সন্তান হলো আরব, ফারেস ও রোমীরা। ইয়াফাসের সস্তান হলো তুর্কী, সাকালিয়া এবং ইয়াজুজ ও মাজুজ। আর হামের সন্তান হচ্ছে কিবতী, সুদানী ও বার্বারীরা। হযরত নূহ (আঃ)-এর সততা এবং তাঁর উত্তম স্বরণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর পরবর্তী লোকদের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে। সমস্ত নবী (আঃ)-এর সত্যবাদিতার ফল এটাই হয় যে, জনগণ সদা-সর্বদা তাদের উপর সালাম পাঠিয়ে থাকেন এবং তাঁদের প্রশংসা করে থাকেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহ (আঃ)-এর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক!' এটা যেন পূর্ববর্তী বাক্যেরই ব্যাখ্যা। অর্থাৎ তার যিকর উত্তমরূপে অবশিষ্ট থাকার অর্থ এই যে, প্রত্যেক উম্মত তার উপর সালাম বর্ষণ করতে থাকবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমার নীতি এই যে, যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে আমার ইবাদত ও আনুগত্যে লেগে থাকে, তাকে এই ভাবেই আমি পুরস্কৃত করে থাকি। অর্থাৎ পরবর্তীদের মধ্যে তার উত্তম যিকর সদা-সর্বদার জন্যে বাকী রেখে থাকি।' আল্লাহ তা'আলার উক্তি:নূহ (আঃ) ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বিশ্বাসী ও তাওহীদের উপর অটল। তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের পরিণাম ভাল হয়েছিল এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে ধ্বংস ও নিমজ্জিত করে দেয়া হয়েছিল। চোখের পলক ফেলে এমনও একজন তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। এমনকি তাদের কোন চিহ্ন পর্যন্ত বাকী ছিল না। হ্যা, তবে তাদের কলংকময় কার্যকলাপ মানুষের মাঝে প্রাচীন ঘটনা হিসেবে আলোচিত হতে থাকলো।
আস-সাফফাত 37:82
৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে পূর্বযুগের মানুষের পথভ্রষ্টতার কথা সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছেন। হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সুদীর্ঘ নয় শত পঞ্চাশ বছর অবস্থান করেছিলেন। তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের লোককে সদা-সর্বদা উপদেশ দিতেন ও বুঝাতেন। এতদসত্ত্বেও তারা পথভ্রষ্টতার মধ্যেই ডুবে ছিল। শুধুমাত্র গুটিকতক লোক তার উপর ঈমান এনেছিল। জাতির যখন এহেন অবস্থা চলতে থাকলো এবং নবী (আঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করতে লাগলো তখন হযরত নূহ (আঃ) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানালেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি তো অসহায়, অতএব আপনি প্রতিবিধান করুন।” তখন আল্লাহর ক্রোধ তাদের উপর পতিত হলো। সমস্ত কাফির পানিতে ডুবে মরলো। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ নূহ (আঃ) আমাকে আহ্বান করেছিল, আর আমি কত উত্তম সাড়াদানকারী।' অর্থাৎ আমি তার আহ্বানে উত্তমরূপে সাড়া দিয়েছিলাম। তাকে ও তার পরিবার পরিজনকে বিপদ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলাম। আর তার বংশধরদেরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশ পরম্পরায়। কেননা, তারাই তো শুধু অবশিষ্ট ছিল। হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানরা ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট ছিল না। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সমগ্র মানব জাতি হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের থেকেই হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, সাম, হাম ও ইয়াফাসের সন্তানরা দুনিয়াতে বিস্তার লাভ করে ও অবশিষ্ট থাকে। ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন যে, সাম সমগ্র আরব জাতির পিতা, হাম সমগ্র হাবশের পিতা এবং ইয়াফাস সমগ্র রোমের পিতা। এই হাদীসে রোম দ্বারা প্রথম রোম অর্থাৎ ইউনানকে বুঝানো হয়েছে যা রোমী লায়তী ইবনে ইউনান ইবনে ইয়াফাস ইবনে নূহ (আঃ)-এর দিকে সমন্ধযুক্ত। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর এক পুত্র সামের সন্তান হলো আরব, ফারেস ও রোমীরা। ইয়াফাসের সস্তান হলো তুর্কী, সাকালিয়া এবং ইয়াজুজ ও মাজুজ। আর হামের সন্তান হচ্ছে কিবতী, সুদানী ও বার্বারীরা। হযরত নূহ (আঃ)-এর সততা এবং তাঁর উত্তম স্বরণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর পরবর্তী লোকদের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে। সমস্ত নবী (আঃ)-এর সত্যবাদিতার ফল এটাই হয় যে, জনগণ সদা-সর্বদা তাদের উপর সালাম পাঠিয়ে থাকেন এবং তাঁদের প্রশংসা করে থাকেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহ (আঃ)-এর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক!' এটা যেন পূর্ববর্তী বাক্যেরই ব্যাখ্যা। অর্থাৎ তার যিকর উত্তমরূপে অবশিষ্ট থাকার অর্থ এই যে, প্রত্যেক উম্মত তার উপর সালাম বর্ষণ করতে থাকবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমার নীতি এই যে, যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে আমার ইবাদত ও আনুগত্যে লেগে থাকে, তাকে এই ভাবেই আমি পুরস্কৃত করে থাকি। অর্থাৎ পরবর্তীদের মধ্যে তার উত্তম যিকর সদা-সর্বদার জন্যে বাকী রেখে থাকি।' আল্লাহ তা'আলার উক্তি:নূহ (আঃ) ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বিশ্বাসী ও তাওহীদের উপর অটল। তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের পরিণাম ভাল হয়েছিল এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে ধ্বংস ও নিমজ্জিত করে দেয়া হয়েছিল। চোখের পলক ফেলে এমনও একজন তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। এমনকি তাদের কোন চিহ্ন পর্যন্ত বাকী ছিল না। হ্যা, তবে তাদের কলংকময় কার্যকলাপ মানুষের মাঝে প্রাচীন ঘটনা হিসেবে আলোচিত হতে থাকলো।
আস-সাফফাত 37:83
৮৩-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত নূহ (আঃ)-এর ধর্মমতের উপরই ছিলেন। তিনি তাঁরই রীতি-নীতি ও চাল-চলনের উপর ছিলেন। তিনি তার প্রতিপালকের নিকট হাযির হয়েছিলেন বিশুদ্ধ চিত্তে। অর্থাৎ তিনি একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি আল্লাহকে সত্য বলে বিশ্বাস করতেন। কিয়ামত যে একদিন সংঘটিত হবে তা তিনি স্বীকার করতেন। মৃতকে যে পুনরুজ্জীবিত করা হবে সেটাও তিনি বিশ্বাস করতেন। শিরক ও কুফরীর তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি অপরকে তিরস্কারকারী ছিলেন না। মহান আল্লাহ বলেন, যখন সে তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে জিজ্ঞেস করেছিলঃ “তোমরা কিসের পূজা করছো?” অর্থাৎ তিনি মূর্তিপূজা ও অন্যান্য দেবদেবীর পূজার বিরোধিতা করলেন এবং সব কিছুকেই ঘৃণার চোখে দেখলেন। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা কি তাহলে আল্লাহর পরিবর্তে অসত্য উপাস্য কামনা করছো, অতঃপর বিশ্বপ্রতিপালকের সম্বন্ধে তোমরা কিরূপ ধারণা পোষণ করছো?” অর্থাৎ তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের উপাসনা পরিত্যাগ কর এবং নিজেদের মিথ্যা ও অলীক মা’ৰূদদের ইচ্ছার কথা ছেড়ে দাও। অন্যথায় জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন।
আস-সাফফাত 37:84
৮৩-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত নূহ (আঃ)-এর ধর্মমতের উপরই ছিলেন। তিনি তাঁরই রীতি-নীতি ও চাল-চলনের উপর ছিলেন। তিনি তার প্রতিপালকের নিকট হাযির হয়েছিলেন বিশুদ্ধ চিত্তে। অর্থাৎ তিনি একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি আল্লাহকে সত্য বলে বিশ্বাস করতেন। কিয়ামত যে একদিন সংঘটিত হবে তা তিনি স্বীকার করতেন। মৃতকে যে পুনরুজ্জীবিত করা হবে সেটাও তিনি বিশ্বাস করতেন। শিরক ও কুফরীর তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি অপরকে তিরস্কারকারী ছিলেন না। মহান আল্লাহ বলেন, যখন সে তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে জিজ্ঞেস করেছিলঃ “তোমরা কিসের পূজা করছো?” অর্থাৎ তিনি মূর্তিপূজা ও অন্যান্য দেবদেবীর পূজার বিরোধিতা করলেন এবং সব কিছুকেই ঘৃণার চোখে দেখলেন। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা কি তাহলে আল্লাহর পরিবর্তে অসত্য উপাস্য কামনা করছো, অতঃপর বিশ্বপ্রতিপালকের সম্বন্ধে তোমরা কিরূপ ধারণা পোষণ করছো?” অর্থাৎ তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের উপাসনা পরিত্যাগ কর এবং নিজেদের মিথ্যা ও অলীক মা’ৰূদদের ইচ্ছার কথা ছেড়ে দাও। অন্যথায় জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন।
আস-সাফফাত 37:85
৮৩-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত নূহ (আঃ)-এর ধর্মমতের উপরই ছিলেন। তিনি তাঁরই রীতি-নীতি ও চাল-চলনের উপর ছিলেন। তিনি তার প্রতিপালকের নিকট হাযির হয়েছিলেন বিশুদ্ধ চিত্তে। অর্থাৎ তিনি একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি আল্লাহকে সত্য বলে বিশ্বাস করতেন। কিয়ামত যে একদিন সংঘটিত হবে তা তিনি স্বীকার করতেন। মৃতকে যে পুনরুজ্জীবিত করা হবে সেটাও তিনি বিশ্বাস করতেন। শিরক ও কুফরীর তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি অপরকে তিরস্কারকারী ছিলেন না। মহান আল্লাহ বলেন, যখন সে তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে জিজ্ঞেস করেছিলঃ “তোমরা কিসের পূজা করছো?” অর্থাৎ তিনি মূর্তিপূজা ও অন্যান্য দেবদেবীর পূজার বিরোধিতা করলেন এবং সব কিছুকেই ঘৃণার চোখে দেখলেন। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা কি তাহলে আল্লাহর পরিবর্তে অসত্য উপাস্য কামনা করছো, অতঃপর বিশ্বপ্রতিপালকের সম্বন্ধে তোমরা কিরূপ ধারণা পোষণ করছো?” অর্থাৎ তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের উপাসনা পরিত্যাগ কর এবং নিজেদের মিথ্যা ও অলীক মা’ৰূদদের ইচ্ছার কথা ছেড়ে দাও। অন্যথায় জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন।
আস-সাফফাত 37:86
৮৩-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত নূহ (আঃ)-এর ধর্মমতের উপরই ছিলেন। তিনি তাঁরই রীতি-নীতি ও চাল-চলনের উপর ছিলেন। তিনি তার প্রতিপালকের নিকট হাযির হয়েছিলেন বিশুদ্ধ চিত্তে। অর্থাৎ তিনি একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি আল্লাহকে সত্য বলে বিশ্বাস করতেন। কিয়ামত যে একদিন সংঘটিত হবে তা তিনি স্বীকার করতেন। মৃতকে যে পুনরুজ্জীবিত করা হবে সেটাও তিনি বিশ্বাস করতেন। শিরক ও কুফরীর তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি অপরকে তিরস্কারকারী ছিলেন না। মহান আল্লাহ বলেন, যখন সে তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে জিজ্ঞেস করেছিলঃ “তোমরা কিসের পূজা করছো?” অর্থাৎ তিনি মূর্তিপূজা ও অন্যান্য দেবদেবীর পূজার বিরোধিতা করলেন এবং সব কিছুকেই ঘৃণার চোখে দেখলেন। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা কি তাহলে আল্লাহর পরিবর্তে অসত্য উপাস্য কামনা করছো, অতঃপর বিশ্বপ্রতিপালকের সম্বন্ধে তোমরা কিরূপ ধারণা পোষণ করছো?” অর্থাৎ তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের উপাসনা পরিত্যাগ কর এবং নিজেদের মিথ্যা ও অলীক মা’ৰূদদের ইচ্ছার কথা ছেড়ে দাও। অন্যথায় জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন।
আস-সাফফাত 37:87
৮৩-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত নূহ (আঃ)-এর ধর্মমতের উপরই ছিলেন। তিনি তাঁরই রীতি-নীতি ও চাল-চলনের উপর ছিলেন। তিনি তার প্রতিপালকের নিকট হাযির হয়েছিলেন বিশুদ্ধ চিত্তে। অর্থাৎ তিনি একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি আল্লাহকে সত্য বলে বিশ্বাস করতেন। কিয়ামত যে একদিন সংঘটিত হবে তা তিনি স্বীকার করতেন। মৃতকে যে পুনরুজ্জীবিত করা হবে সেটাও তিনি বিশ্বাস করতেন। শিরক ও কুফরীর তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি অপরকে তিরস্কারকারী ছিলেন না। মহান আল্লাহ বলেন, যখন সে তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে জিজ্ঞেস করেছিলঃ “তোমরা কিসের পূজা করছো?” অর্থাৎ তিনি মূর্তিপূজা ও অন্যান্য দেবদেবীর পূজার বিরোধিতা করলেন এবং সব কিছুকেই ঘৃণার চোখে দেখলেন। এজন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা কি তাহলে আল্লাহর পরিবর্তে অসত্য উপাস্য কামনা করছো, অতঃপর বিশ্বপ্রতিপালকের সম্বন্ধে তোমরা কিরূপ ধারণা পোষণ করছো?” অর্থাৎ তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের উপাসনা পরিত্যাগ কর এবং নিজেদের মিথ্যা ও অলীক মা’ৰূদদের ইচ্ছার কথা ছেড়ে দাও। অন্যথায় জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন।
আস-সাফফাত 37:88
৮৮-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে এই কথা এ জন্যেই বললেন যে, যখন তারা তাদের মেলায় বের হয়ে যাবে তখন তিনি যেন শহরে একাই থেকে যেতে পারেন এবং তাদের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করার সুযোগ পান। এই জন্যে তিনি এমন কথা বললেন যা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য ছিল। তারা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে অসুস্থ ভেবেছিল। তাই তাকে রেখেই তারা বের হয়েছিল। আর এরই মাঝে তিনি দ্বীনী খিদমত করেছিলেন। কাতাদাও (রঃ) বলেন যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তখন আরবীয়রা বলেঃ “তিনি নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।” অর্থ হচ্ছে এই যে, চিন্তিতভাবে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা এবং অনুধাবন করা যে, কিভাবে ওর প্রভাবমুক্ত হওয়া যাবে? হযরত ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা-ভাবনা করে বললেন যে, তিনি পীড়িত অর্থাৎ দুর্বল। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবরহীম (আঃ) তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে দু’বার আল্লাহর দ্বীনের জন্যে মিথ্যা বলেছিলেন। যথা (আরবী) (আমি অসুস্থ)। অপর স্থানে বলেছিলেনঃ (আরবী) (২১:৬৩) (বরং তাদের এই বড় প্রতিমাটি এ কাজ করেছে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ভেঙ্গেছে)। আর একবার তিনি স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে তার বোন বলেছিলেন। একথা স্মরণযোগ্য যে, এগুলোর একটিও আসল বা প্রকৃত মিথ্যা ছিল না। এখানে রূপক অর্থে মিথ্যা বলা হয়েছে। সুতরাং তাকে তিরস্কার করা চলবে না। কথার মাঝে কোন শরয়ী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এরূপ বাহানা করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐ তিনটি কথার মধ্যে একটিও এমন ছিল না যার কর্ম-কৌশলের সাথে আল্লাহর দ্বীনের কল্যাণ সাধন উদ্দেশ্য ছিল না।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান (রঃ) বলেন যে, “আমি অসুস্থ” এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছি।” আর ঐ লোকগুলো এরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে পালিয়ে যেতো। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর দ্বীন প্রচার এবং তাদের মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা প্রমাণের জন্যেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এটা একটি কর্মকৌশল ছিল যে, তিনি নক্ষত্র উদিত হতে দেখে বলেছিলেনঃ “আমি অসুস্থ।” এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি রোগাক্রান্ত হবো” অর্থাৎ একবার মৃত্যুর রোগ আসবেই। একটা উক্তি এও রয়েছে যে, তার এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমার হৃদয় তোমাদের দেব-দেবীর উপাসনা করাতে অসুস্থ।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় মেলাতে যাচ্ছিল তখন তাকেও তারা তাদের সাথে যেতে বাধ্য করছিল। তখন তিনি “আমি অসুস্থ” একথা বলে সরে পড়েন এবং একটি নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। যখন তারা সবাই মেলায় চলে যায় তখন তিনি অতি সন্তর্পণে তাদের দেবতাগুলোর নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ “তোমরা খাদ্য গ্রহণ করছো না কেন?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের মন্দিরে গিয়ে দেখেন যে, তারা তাদের দেবতাগুলোর সামনে যে নৈবেদ্য বা প্রসাদ রেখেছিল সেগুলো সবই পড়ে রয়েছে। তারা বরকতের আশায় যেসব উৎসর্গ রেখেছিল সেগুলো হতে তাদের দেবতাগুলো কিছুই খায়নি। মন্দিরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও কারুকার্য খচিত। দরযার নিকটেই এক প্রকাণ্ড মূর্তি ছিল। তার পাশে ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট মূর্তি। মন্দিরটি মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। তাদের সামনে নানা জাতের উপাদেয় খাদ্য রাখা ছিল। তাদের এ বিশ্বাস ছিল যে, খাদ্যগুলো বরকতময় হবে এবং তারা মেলা হতে ফিরে এসে ওগুলো ভক্ষণ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) মূর্তিগুলোর মুখ হতে তার কথার কোন জবাব না পেয়ে আবার বললেনঃ “তোমাদের হয়েছে কি, কথা বলছো না কেন?” অতঃপর তিনি তাদের নিকটবর্তী হয়ে ডান হাত দ্বারা তাদেরকে আঘাত করেন। কাতাদা (রঃ) ও জওহারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তখন মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন এবং ডান হাত দ্বারা আঘাত করতে শুরু করলেন। কেননা ঐগুলো ছিল খুব শক্ত। তিনি সবগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় মূর্তিটিকে তিনি বহাল রেখে দিলেন, ভেঙ্গে ফেললেন না। যাতে ওর উপরই মন্দ ধারণা জন্মে, যেমন সূরায়ে আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীরও বর্ণনা করা হয়েছে।মূর্তিপূজকরা মেলা হতে ফিরে এসে যখন তাদের মন্দিরে প্রবেশ করলো তখন দেখলো যে, মূর্তিগুলো ভাঙ্গা অবস্থায় বিশৃংখলভাবে পড়ে রয়েছে। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো মাথা এবং কারো কারো পূর্ণ দেহটিই নেই। তারা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি!মহান আল্লাহর উক্তিঃ “তখন ঐ লোকগুলো তার দিকে ছুটে আসলো।” অর্থাৎ বহু চিন্তা-ভাবনা করে, আলাপ আলোচনা করে তারা বুঝলো যে, হয় না হয় এটা ইবরাহীমেরই (আঃ) কাজ। তাই তারা দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল। এখানে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরায়ে আম্বিয়ায় এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের সকলকে এক সাথে পেয়ে তাবলীগ করার বড় সুযোগ লাভ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ কর তাদেরই কি তোমরা পূজা করে থাকো? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর সেগুলোকেও।” এই আয়াতে (আরবী) অক্ষরটি সম্ভবতঃ (আরবী) হিসেবে এসেছে এবং এও হতে পারে যে, এটা (আরবী)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথমটিই বেশী সুস্পষ্ট। হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ প্রত্যেক শিল্পী ও তার শিল্পকে সৃষ্টি করেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবু আফআলিল ইবাদ’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ এ আয়াতটি (আরবী) এরূপ পড়েছেন। যেহেতু এমন সুস্পষ্ট উক্তির উত্তর তাদের নিকট ছিল না সেই হেতু তারা নবী (আঃ)-এর শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগে গেল। তারা বললোঃ “তার জন্যে একটি ইমারত (চতুর্দিকে পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত যাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছিল) তৈরী কর, অতঃপর তাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর।” মহান আল্লাহ স্বীয় বন্ধুকে এই জ্বলন্ত অগ্নি হতে রক্ষা করেন। তাঁকেই তিনি বিজয় মাল্যে ভূষিত করেন ও সাহায্য দান করেন। আর তাদেরকে করেন অতিশয় হেয় ও অপমানিত। এর পূর্ণ বর্ণনা ও পুরোপুরি তাফসীর সূরায়ে আম্বিয়ায় গত হয়েছে। এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম।”
আস-সাফফাত 37:89
৮৮-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে এই কথা এ জন্যেই বললেন যে, যখন তারা তাদের মেলায় বের হয়ে যাবে তখন তিনি যেন শহরে একাই থেকে যেতে পারেন এবং তাদের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করার সুযোগ পান। এই জন্যে তিনি এমন কথা বললেন যা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য ছিল। তারা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে অসুস্থ ভেবেছিল। তাই তাকে রেখেই তারা বের হয়েছিল। আর এরই মাঝে তিনি দ্বীনী খিদমত করেছিলেন। কাতাদাও (রঃ) বলেন যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তখন আরবীয়রা বলেঃ “তিনি নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।” অর্থ হচ্ছে এই যে, চিন্তিতভাবে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা এবং অনুধাবন করা যে, কিভাবে ওর প্রভাবমুক্ত হওয়া যাবে? হযরত ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা-ভাবনা করে বললেন যে, তিনি পীড়িত অর্থাৎ দুর্বল। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবরহীম (আঃ) তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে দু’বার আল্লাহর দ্বীনের জন্যে মিথ্যা বলেছিলেন। যথা (আরবী) (আমি অসুস্থ)। অপর স্থানে বলেছিলেনঃ (আরবী) (২১:৬৩) (বরং তাদের এই বড় প্রতিমাটি এ কাজ করেছে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ভেঙ্গেছে)। আর একবার তিনি স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে তার বোন বলেছিলেন। একথা স্মরণযোগ্য যে, এগুলোর একটিও আসল বা প্রকৃত মিথ্যা ছিল না। এখানে রূপক অর্থে মিথ্যা বলা হয়েছে। সুতরাং তাকে তিরস্কার করা চলবে না। কথার মাঝে কোন শরয়ী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এরূপ বাহানা করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐ তিনটি কথার মধ্যে একটিও এমন ছিল না যার কর্ম-কৌশলের সাথে আল্লাহর দ্বীনের কল্যাণ সাধন উদ্দেশ্য ছিল না।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান (রঃ) বলেন যে, “আমি অসুস্থ” এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছি।” আর ঐ লোকগুলো এরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে পালিয়ে যেতো। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর দ্বীন প্রচার এবং তাদের মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা প্রমাণের জন্যেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এটা একটি কর্মকৌশল ছিল যে, তিনি নক্ষত্র উদিত হতে দেখে বলেছিলেনঃ “আমি অসুস্থ।” এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি রোগাক্রান্ত হবো” অর্থাৎ একবার মৃত্যুর রোগ আসবেই। একটা উক্তি এও রয়েছে যে, তার এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমার হৃদয় তোমাদের দেব-দেবীর উপাসনা করাতে অসুস্থ।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় মেলাতে যাচ্ছিল তখন তাকেও তারা তাদের সাথে যেতে বাধ্য করছিল। তখন তিনি “আমি অসুস্থ” একথা বলে সরে পড়েন এবং একটি নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। যখন তারা সবাই মেলায় চলে যায় তখন তিনি অতি সন্তর্পণে তাদের দেবতাগুলোর নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ “তোমরা খাদ্য গ্রহণ করছো না কেন?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের মন্দিরে গিয়ে দেখেন যে, তারা তাদের দেবতাগুলোর সামনে যে নৈবেদ্য বা প্রসাদ রেখেছিল সেগুলো সবই পড়ে রয়েছে। তারা বরকতের আশায় যেসব উৎসর্গ রেখেছিল সেগুলো হতে তাদের দেবতাগুলো কিছুই খায়নি। মন্দিরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও কারুকার্য খচিত। দরযার নিকটেই এক প্রকাণ্ড মূর্তি ছিল। তার পাশে ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট মূর্তি। মন্দিরটি মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। তাদের সামনে নানা জাতের উপাদেয় খাদ্য রাখা ছিল। তাদের এ বিশ্বাস ছিল যে, খাদ্যগুলো বরকতময় হবে এবং তারা মেলা হতে ফিরে এসে ওগুলো ভক্ষণ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) মূর্তিগুলোর মুখ হতে তার কথার কোন জবাব না পেয়ে আবার বললেনঃ “তোমাদের হয়েছে কি, কথা বলছো না কেন?” অতঃপর তিনি তাদের নিকটবর্তী হয়ে ডান হাত দ্বারা তাদেরকে আঘাত করেন। কাতাদা (রঃ) ও জওহারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তখন মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন এবং ডান হাত দ্বারা আঘাত করতে শুরু করলেন। কেননা ঐগুলো ছিল খুব শক্ত। তিনি সবগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় মূর্তিটিকে তিনি বহাল রেখে দিলেন, ভেঙ্গে ফেললেন না। যাতে ওর উপরই মন্দ ধারণা জন্মে, যেমন সূরায়ে আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীরও বর্ণনা করা হয়েছে।মূর্তিপূজকরা মেলা হতে ফিরে এসে যখন তাদের মন্দিরে প্রবেশ করলো তখন দেখলো যে, মূর্তিগুলো ভাঙ্গা অবস্থায় বিশৃংখলভাবে পড়ে রয়েছে। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো মাথা এবং কারো কারো পূর্ণ দেহটিই নেই। তারা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি!মহান আল্লাহর উক্তিঃ “তখন ঐ লোকগুলো তার দিকে ছুটে আসলো।” অর্থাৎ বহু চিন্তা-ভাবনা করে, আলাপ আলোচনা করে তারা বুঝলো যে, হয় না হয় এটা ইবরাহীমেরই (আঃ) কাজ। তাই তারা দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল। এখানে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরায়ে আম্বিয়ায় এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের সকলকে এক সাথে পেয়ে তাবলীগ করার বড় সুযোগ লাভ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ কর তাদেরই কি তোমরা পূজা করে থাকো? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর সেগুলোকেও।” এই আয়াতে (আরবী) অক্ষরটি সম্ভবতঃ (আরবী) হিসেবে এসেছে এবং এও হতে পারে যে, এটা (আরবী)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথমটিই বেশী সুস্পষ্ট। হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ প্রত্যেক শিল্পী ও তার শিল্পকে সৃষ্টি করেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবু আফআলিল ইবাদ’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ এ আয়াতটি (আরবী) এরূপ পড়েছেন। যেহেতু এমন সুস্পষ্ট উক্তির উত্তর তাদের নিকট ছিল না সেই হেতু তারা নবী (আঃ)-এর শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগে গেল। তারা বললোঃ “তার জন্যে একটি ইমারত (চতুর্দিকে পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত যাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছিল) তৈরী কর, অতঃপর তাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর।” মহান আল্লাহ স্বীয় বন্ধুকে এই জ্বলন্ত অগ্নি হতে রক্ষা করেন। তাঁকেই তিনি বিজয় মাল্যে ভূষিত করেন ও সাহায্য দান করেন। আর তাদেরকে করেন অতিশয় হেয় ও অপমানিত। এর পূর্ণ বর্ণনা ও পুরোপুরি তাফসীর সূরায়ে আম্বিয়ায় গত হয়েছে। এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম।”
আস-সাফফাত 37:90
৮৮-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে এই কথা এ জন্যেই বললেন যে, যখন তারা তাদের মেলায় বের হয়ে যাবে তখন তিনি যেন শহরে একাই থেকে যেতে পারেন এবং তাদের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করার সুযোগ পান। এই জন্যে তিনি এমন কথা বললেন যা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য ছিল। তারা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে অসুস্থ ভেবেছিল। তাই তাকে রেখেই তারা বের হয়েছিল। আর এরই মাঝে তিনি দ্বীনী খিদমত করেছিলেন। কাতাদাও (রঃ) বলেন যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তখন আরবীয়রা বলেঃ “তিনি নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।” অর্থ হচ্ছে এই যে, চিন্তিতভাবে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা এবং অনুধাবন করা যে, কিভাবে ওর প্রভাবমুক্ত হওয়া যাবে? হযরত ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা-ভাবনা করে বললেন যে, তিনি পীড়িত অর্থাৎ দুর্বল। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবরহীম (আঃ) তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে দু’বার আল্লাহর দ্বীনের জন্যে মিথ্যা বলেছিলেন। যথা (আরবী) (আমি অসুস্থ)। অপর স্থানে বলেছিলেনঃ (আরবী) (২১:৬৩) (বরং তাদের এই বড় প্রতিমাটি এ কাজ করেছে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ভেঙ্গেছে)। আর একবার তিনি স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে তার বোন বলেছিলেন। একথা স্মরণযোগ্য যে, এগুলোর একটিও আসল বা প্রকৃত মিথ্যা ছিল না। এখানে রূপক অর্থে মিথ্যা বলা হয়েছে। সুতরাং তাকে তিরস্কার করা চলবে না। কথার মাঝে কোন শরয়ী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এরূপ বাহানা করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐ তিনটি কথার মধ্যে একটিও এমন ছিল না যার কর্ম-কৌশলের সাথে আল্লাহর দ্বীনের কল্যাণ সাধন উদ্দেশ্য ছিল না।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান (রঃ) বলেন যে, “আমি অসুস্থ” এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছি।” আর ঐ লোকগুলো এরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে পালিয়ে যেতো। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর দ্বীন প্রচার এবং তাদের মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা প্রমাণের জন্যেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এটা একটি কর্মকৌশল ছিল যে, তিনি নক্ষত্র উদিত হতে দেখে বলেছিলেনঃ “আমি অসুস্থ।” এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি রোগাক্রান্ত হবো” অর্থাৎ একবার মৃত্যুর রোগ আসবেই। একটা উক্তি এও রয়েছে যে, তার এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমার হৃদয় তোমাদের দেব-দেবীর উপাসনা করাতে অসুস্থ।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় মেলাতে যাচ্ছিল তখন তাকেও তারা তাদের সাথে যেতে বাধ্য করছিল। তখন তিনি “আমি অসুস্থ” একথা বলে সরে পড়েন এবং একটি নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। যখন তারা সবাই মেলায় চলে যায় তখন তিনি অতি সন্তর্পণে তাদের দেবতাগুলোর নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ “তোমরা খাদ্য গ্রহণ করছো না কেন?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের মন্দিরে গিয়ে দেখেন যে, তারা তাদের দেবতাগুলোর সামনে যে নৈবেদ্য বা প্রসাদ রেখেছিল সেগুলো সবই পড়ে রয়েছে। তারা বরকতের আশায় যেসব উৎসর্গ রেখেছিল সেগুলো হতে তাদের দেবতাগুলো কিছুই খায়নি। মন্দিরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও কারুকার্য খচিত। দরযার নিকটেই এক প্রকাণ্ড মূর্তি ছিল। তার পাশে ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট মূর্তি। মন্দিরটি মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। তাদের সামনে নানা জাতের উপাদেয় খাদ্য রাখা ছিল। তাদের এ বিশ্বাস ছিল যে, খাদ্যগুলো বরকতময় হবে এবং তারা মেলা হতে ফিরে এসে ওগুলো ভক্ষণ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) মূর্তিগুলোর মুখ হতে তার কথার কোন জবাব না পেয়ে আবার বললেনঃ “তোমাদের হয়েছে কি, কথা বলছো না কেন?” অতঃপর তিনি তাদের নিকটবর্তী হয়ে ডান হাত দ্বারা তাদেরকে আঘাত করেন। কাতাদা (রঃ) ও জওহারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তখন মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন এবং ডান হাত দ্বারা আঘাত করতে শুরু করলেন। কেননা ঐগুলো ছিল খুব শক্ত। তিনি সবগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় মূর্তিটিকে তিনি বহাল রেখে দিলেন, ভেঙ্গে ফেললেন না। যাতে ওর উপরই মন্দ ধারণা জন্মে, যেমন সূরায়ে আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীরও বর্ণনা করা হয়েছে।মূর্তিপূজকরা মেলা হতে ফিরে এসে যখন তাদের মন্দিরে প্রবেশ করলো তখন দেখলো যে, মূর্তিগুলো ভাঙ্গা অবস্থায় বিশৃংখলভাবে পড়ে রয়েছে। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো মাথা এবং কারো কারো পূর্ণ দেহটিই নেই। তারা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি!মহান আল্লাহর উক্তিঃ “তখন ঐ লোকগুলো তার দিকে ছুটে আসলো।” অর্থাৎ বহু চিন্তা-ভাবনা করে, আলাপ আলোচনা করে তারা বুঝলো যে, হয় না হয় এটা ইবরাহীমেরই (আঃ) কাজ। তাই তারা দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল। এখানে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরায়ে আম্বিয়ায় এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের সকলকে এক সাথে পেয়ে তাবলীগ করার বড় সুযোগ লাভ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ কর তাদেরই কি তোমরা পূজা করে থাকো? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর সেগুলোকেও।” এই আয়াতে (আরবী) অক্ষরটি সম্ভবতঃ (আরবী) হিসেবে এসেছে এবং এও হতে পারে যে, এটা (আরবী)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথমটিই বেশী সুস্পষ্ট। হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ প্রত্যেক শিল্পী ও তার শিল্পকে সৃষ্টি করেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবু আফআলিল ইবাদ’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ এ আয়াতটি (আরবী) এরূপ পড়েছেন। যেহেতু এমন সুস্পষ্ট উক্তির উত্তর তাদের নিকট ছিল না সেই হেতু তারা নবী (আঃ)-এর শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগে গেল। তারা বললোঃ “তার জন্যে একটি ইমারত (চতুর্দিকে পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত যাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছিল) তৈরী কর, অতঃপর তাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর।” মহান আল্লাহ স্বীয় বন্ধুকে এই জ্বলন্ত অগ্নি হতে রক্ষা করেন। তাঁকেই তিনি বিজয় মাল্যে ভূষিত করেন ও সাহায্য দান করেন। আর তাদেরকে করেন অতিশয় হেয় ও অপমানিত। এর পূর্ণ বর্ণনা ও পুরোপুরি তাফসীর সূরায়ে আম্বিয়ায় গত হয়েছে। এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম।”
আস-সাফফাত 37:91
৮৮-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে এই কথা এ জন্যেই বললেন যে, যখন তারা তাদের মেলায় বের হয়ে যাবে তখন তিনি যেন শহরে একাই থেকে যেতে পারেন এবং তাদের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করার সুযোগ পান। এই জন্যে তিনি এমন কথা বললেন যা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য ছিল। তারা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে অসুস্থ ভেবেছিল। তাই তাকে রেখেই তারা বের হয়েছিল। আর এরই মাঝে তিনি দ্বীনী খিদমত করেছিলেন। কাতাদাও (রঃ) বলেন যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তখন আরবীয়রা বলেঃ “তিনি নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।” অর্থ হচ্ছে এই যে, চিন্তিতভাবে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা এবং অনুধাবন করা যে, কিভাবে ওর প্রভাবমুক্ত হওয়া যাবে? হযরত ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা-ভাবনা করে বললেন যে, তিনি পীড়িত অর্থাৎ দুর্বল। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবরহীম (আঃ) তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে দু’বার আল্লাহর দ্বীনের জন্যে মিথ্যা বলেছিলেন। যথা (আরবী) (আমি অসুস্থ)। অপর স্থানে বলেছিলেনঃ (আরবী) (২১:৬৩) (বরং তাদের এই বড় প্রতিমাটি এ কাজ করেছে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ভেঙ্গেছে)। আর একবার তিনি স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে তার বোন বলেছিলেন। একথা স্মরণযোগ্য যে, এগুলোর একটিও আসল বা প্রকৃত মিথ্যা ছিল না। এখানে রূপক অর্থে মিথ্যা বলা হয়েছে। সুতরাং তাকে তিরস্কার করা চলবে না। কথার মাঝে কোন শরয়ী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এরূপ বাহানা করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐ তিনটি কথার মধ্যে একটিও এমন ছিল না যার কর্ম-কৌশলের সাথে আল্লাহর দ্বীনের কল্যাণ সাধন উদ্দেশ্য ছিল না।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান (রঃ) বলেন যে, “আমি অসুস্থ” এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছি।” আর ঐ লোকগুলো এরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে পালিয়ে যেতো। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর দ্বীন প্রচার এবং তাদের মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা প্রমাণের জন্যেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এটা একটি কর্মকৌশল ছিল যে, তিনি নক্ষত্র উদিত হতে দেখে বলেছিলেনঃ “আমি অসুস্থ।” এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি রোগাক্রান্ত হবো” অর্থাৎ একবার মৃত্যুর রোগ আসবেই। একটা উক্তি এও রয়েছে যে, তার এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমার হৃদয় তোমাদের দেব-দেবীর উপাসনা করাতে অসুস্থ।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় মেলাতে যাচ্ছিল তখন তাকেও তারা তাদের সাথে যেতে বাধ্য করছিল। তখন তিনি “আমি অসুস্থ” একথা বলে সরে পড়েন এবং একটি নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। যখন তারা সবাই মেলায় চলে যায় তখন তিনি অতি সন্তর্পণে তাদের দেবতাগুলোর নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ “তোমরা খাদ্য গ্রহণ করছো না কেন?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের মন্দিরে গিয়ে দেখেন যে, তারা তাদের দেবতাগুলোর সামনে যে নৈবেদ্য বা প্রসাদ রেখেছিল সেগুলো সবই পড়ে রয়েছে। তারা বরকতের আশায় যেসব উৎসর্গ রেখেছিল সেগুলো হতে তাদের দেবতাগুলো কিছুই খায়নি। মন্দিরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও কারুকার্য খচিত। দরযার নিকটেই এক প্রকাণ্ড মূর্তি ছিল। তার পাশে ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট মূর্তি। মন্দিরটি মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। তাদের সামনে নানা জাতের উপাদেয় খাদ্য রাখা ছিল। তাদের এ বিশ্বাস ছিল যে, খাদ্যগুলো বরকতময় হবে এবং তারা মেলা হতে ফিরে এসে ওগুলো ভক্ষণ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) মূর্তিগুলোর মুখ হতে তার কথার কোন জবাব না পেয়ে আবার বললেনঃ “তোমাদের হয়েছে কি, কথা বলছো না কেন?” অতঃপর তিনি তাদের নিকটবর্তী হয়ে ডান হাত দ্বারা তাদেরকে আঘাত করেন। কাতাদা (রঃ) ও জওহারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তখন মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন এবং ডান হাত দ্বারা আঘাত করতে শুরু করলেন। কেননা ঐগুলো ছিল খুব শক্ত। তিনি সবগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় মূর্তিটিকে তিনি বহাল রেখে দিলেন, ভেঙ্গে ফেললেন না। যাতে ওর উপরই মন্দ ধারণা জন্মে, যেমন সূরায়ে আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীরও বর্ণনা করা হয়েছে।মূর্তিপূজকরা মেলা হতে ফিরে এসে যখন তাদের মন্দিরে প্রবেশ করলো তখন দেখলো যে, মূর্তিগুলো ভাঙ্গা অবস্থায় বিশৃংখলভাবে পড়ে রয়েছে। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো মাথা এবং কারো কারো পূর্ণ দেহটিই নেই। তারা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি!মহান আল্লাহর উক্তিঃ “তখন ঐ লোকগুলো তার দিকে ছুটে আসলো।” অর্থাৎ বহু চিন্তা-ভাবনা করে, আলাপ আলোচনা করে তারা বুঝলো যে, হয় না হয় এটা ইবরাহীমেরই (আঃ) কাজ। তাই তারা দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল। এখানে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরায়ে আম্বিয়ায় এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের সকলকে এক সাথে পেয়ে তাবলীগ করার বড় সুযোগ লাভ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ কর তাদেরই কি তোমরা পূজা করে থাকো? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর সেগুলোকেও।” এই আয়াতে (আরবী) অক্ষরটি সম্ভবতঃ (আরবী) হিসেবে এসেছে এবং এও হতে পারে যে, এটা (আরবী)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথমটিই বেশী সুস্পষ্ট। হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ প্রত্যেক শিল্পী ও তার শিল্পকে সৃষ্টি করেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবু আফআলিল ইবাদ’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ এ আয়াতটি (আরবী) এরূপ পড়েছেন। যেহেতু এমন সুস্পষ্ট উক্তির উত্তর তাদের নিকট ছিল না সেই হেতু তারা নবী (আঃ)-এর শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগে গেল। তারা বললোঃ “তার জন্যে একটি ইমারত (চতুর্দিকে পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত যাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছিল) তৈরী কর, অতঃপর তাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর।” মহান আল্লাহ স্বীয় বন্ধুকে এই জ্বলন্ত অগ্নি হতে রক্ষা করেন। তাঁকেই তিনি বিজয় মাল্যে ভূষিত করেন ও সাহায্য দান করেন। আর তাদেরকে করেন অতিশয় হেয় ও অপমানিত। এর পূর্ণ বর্ণনা ও পুরোপুরি তাফসীর সূরায়ে আম্বিয়ায় গত হয়েছে। এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম।”
আস-সাফফাত 37:92
৮৮-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে এই কথা এ জন্যেই বললেন যে, যখন তারা তাদের মেলায় বের হয়ে যাবে তখন তিনি যেন শহরে একাই থেকে যেতে পারেন এবং তাদের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করার সুযোগ পান। এই জন্যে তিনি এমন কথা বললেন যা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য ছিল। তারা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে অসুস্থ ভেবেছিল। তাই তাকে রেখেই তারা বের হয়েছিল। আর এরই মাঝে তিনি দ্বীনী খিদমত করেছিলেন। কাতাদাও (রঃ) বলেন যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তখন আরবীয়রা বলেঃ “তিনি নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।” অর্থ হচ্ছে এই যে, চিন্তিতভাবে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা এবং অনুধাবন করা যে, কিভাবে ওর প্রভাবমুক্ত হওয়া যাবে? হযরত ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা-ভাবনা করে বললেন যে, তিনি পীড়িত অর্থাৎ দুর্বল। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবরহীম (আঃ) তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে দু’বার আল্লাহর দ্বীনের জন্যে মিথ্যা বলেছিলেন। যথা (আরবী) (আমি অসুস্থ)। অপর স্থানে বলেছিলেনঃ (আরবী) (২১:৬৩) (বরং তাদের এই বড় প্রতিমাটি এ কাজ করেছে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ভেঙ্গেছে)। আর একবার তিনি স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে তার বোন বলেছিলেন। একথা স্মরণযোগ্য যে, এগুলোর একটিও আসল বা প্রকৃত মিথ্যা ছিল না। এখানে রূপক অর্থে মিথ্যা বলা হয়েছে। সুতরাং তাকে তিরস্কার করা চলবে না। কথার মাঝে কোন শরয়ী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এরূপ বাহানা করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐ তিনটি কথার মধ্যে একটিও এমন ছিল না যার কর্ম-কৌশলের সাথে আল্লাহর দ্বীনের কল্যাণ সাধন উদ্দেশ্য ছিল না।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান (রঃ) বলেন যে, “আমি অসুস্থ” এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছি।” আর ঐ লোকগুলো এরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে পালিয়ে যেতো। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর দ্বীন প্রচার এবং তাদের মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা প্রমাণের জন্যেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এটা একটি কর্মকৌশল ছিল যে, তিনি নক্ষত্র উদিত হতে দেখে বলেছিলেনঃ “আমি অসুস্থ।” এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি রোগাক্রান্ত হবো” অর্থাৎ একবার মৃত্যুর রোগ আসবেই। একটা উক্তি এও রয়েছে যে, তার এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমার হৃদয় তোমাদের দেব-দেবীর উপাসনা করাতে অসুস্থ।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় মেলাতে যাচ্ছিল তখন তাকেও তারা তাদের সাথে যেতে বাধ্য করছিল। তখন তিনি “আমি অসুস্থ” একথা বলে সরে পড়েন এবং একটি নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। যখন তারা সবাই মেলায় চলে যায় তখন তিনি অতি সন্তর্পণে তাদের দেবতাগুলোর নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ “তোমরা খাদ্য গ্রহণ করছো না কেন?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের মন্দিরে গিয়ে দেখেন যে, তারা তাদের দেবতাগুলোর সামনে যে নৈবেদ্য বা প্রসাদ রেখেছিল সেগুলো সবই পড়ে রয়েছে। তারা বরকতের আশায় যেসব উৎসর্গ রেখেছিল সেগুলো হতে তাদের দেবতাগুলো কিছুই খায়নি। মন্দিরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও কারুকার্য খচিত। দরযার নিকটেই এক প্রকাণ্ড মূর্তি ছিল। তার পাশে ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট মূর্তি। মন্দিরটি মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। তাদের সামনে নানা জাতের উপাদেয় খাদ্য রাখা ছিল। তাদের এ বিশ্বাস ছিল যে, খাদ্যগুলো বরকতময় হবে এবং তারা মেলা হতে ফিরে এসে ওগুলো ভক্ষণ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) মূর্তিগুলোর মুখ হতে তার কথার কোন জবাব না পেয়ে আবার বললেনঃ “তোমাদের হয়েছে কি, কথা বলছো না কেন?” অতঃপর তিনি তাদের নিকটবর্তী হয়ে ডান হাত দ্বারা তাদেরকে আঘাত করেন। কাতাদা (রঃ) ও জওহারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তখন মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন এবং ডান হাত দ্বারা আঘাত করতে শুরু করলেন। কেননা ঐগুলো ছিল খুব শক্ত। তিনি সবগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় মূর্তিটিকে তিনি বহাল রেখে দিলেন, ভেঙ্গে ফেললেন না। যাতে ওর উপরই মন্দ ধারণা জন্মে, যেমন সূরায়ে আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীরও বর্ণনা করা হয়েছে।মূর্তিপূজকরা মেলা হতে ফিরে এসে যখন তাদের মন্দিরে প্রবেশ করলো তখন দেখলো যে, মূর্তিগুলো ভাঙ্গা অবস্থায় বিশৃংখলভাবে পড়ে রয়েছে। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো মাথা এবং কারো কারো পূর্ণ দেহটিই নেই। তারা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি!মহান আল্লাহর উক্তিঃ “তখন ঐ লোকগুলো তার দিকে ছুটে আসলো।” অর্থাৎ বহু চিন্তা-ভাবনা করে, আলাপ আলোচনা করে তারা বুঝলো যে, হয় না হয় এটা ইবরাহীমেরই (আঃ) কাজ। তাই তারা দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল। এখানে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরায়ে আম্বিয়ায় এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের সকলকে এক সাথে পেয়ে তাবলীগ করার বড় সুযোগ লাভ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ কর তাদেরই কি তোমরা পূজা করে থাকো? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর সেগুলোকেও।” এই আয়াতে (আরবী) অক্ষরটি সম্ভবতঃ (আরবী) হিসেবে এসেছে এবং এও হতে পারে যে, এটা (আরবী)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথমটিই বেশী সুস্পষ্ট। হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ প্রত্যেক শিল্পী ও তার শিল্পকে সৃষ্টি করেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবু আফআলিল ইবাদ’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ এ আয়াতটি (আরবী) এরূপ পড়েছেন। যেহেতু এমন সুস্পষ্ট উক্তির উত্তর তাদের নিকট ছিল না সেই হেতু তারা নবী (আঃ)-এর শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগে গেল। তারা বললোঃ “তার জন্যে একটি ইমারত (চতুর্দিকে পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত যাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছিল) তৈরী কর, অতঃপর তাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর।” মহান আল্লাহ স্বীয় বন্ধুকে এই জ্বলন্ত অগ্নি হতে রক্ষা করেন। তাঁকেই তিনি বিজয় মাল্যে ভূষিত করেন ও সাহায্য দান করেন। আর তাদেরকে করেন অতিশয় হেয় ও অপমানিত। এর পূর্ণ বর্ণনা ও পুরোপুরি তাফসীর সূরায়ে আম্বিয়ায় গত হয়েছে। এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম।”
আস-সাফফাত 37:93
৮৮-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে এই কথা এ জন্যেই বললেন যে, যখন তারা তাদের মেলায় বের হয়ে যাবে তখন তিনি যেন শহরে একাই থেকে যেতে পারেন এবং তাদের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করার সুযোগ পান। এই জন্যে তিনি এমন কথা বললেন যা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য ছিল। তারা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে অসুস্থ ভেবেছিল। তাই তাকে রেখেই তারা বের হয়েছিল। আর এরই মাঝে তিনি দ্বীনী খিদমত করেছিলেন। কাতাদাও (রঃ) বলেন যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তখন আরবীয়রা বলেঃ “তিনি নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।” অর্থ হচ্ছে এই যে, চিন্তিতভাবে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা এবং অনুধাবন করা যে, কিভাবে ওর প্রভাবমুক্ত হওয়া যাবে? হযরত ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা-ভাবনা করে বললেন যে, তিনি পীড়িত অর্থাৎ দুর্বল। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবরহীম (আঃ) তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে দু’বার আল্লাহর দ্বীনের জন্যে মিথ্যা বলেছিলেন। যথা (আরবী) (আমি অসুস্থ)। অপর স্থানে বলেছিলেনঃ (আরবী) (২১:৬৩) (বরং তাদের এই বড় প্রতিমাটি এ কাজ করেছে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ভেঙ্গেছে)। আর একবার তিনি স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে তার বোন বলেছিলেন। একথা স্মরণযোগ্য যে, এগুলোর একটিও আসল বা প্রকৃত মিথ্যা ছিল না। এখানে রূপক অর্থে মিথ্যা বলা হয়েছে। সুতরাং তাকে তিরস্কার করা চলবে না। কথার মাঝে কোন শরয়ী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এরূপ বাহানা করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐ তিনটি কথার মধ্যে একটিও এমন ছিল না যার কর্ম-কৌশলের সাথে আল্লাহর দ্বীনের কল্যাণ সাধন উদ্দেশ্য ছিল না।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান (রঃ) বলেন যে, “আমি অসুস্থ” এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছি।” আর ঐ লোকগুলো এরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে পালিয়ে যেতো। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর দ্বীন প্রচার এবং তাদের মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা প্রমাণের জন্যেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এটা একটি কর্মকৌশল ছিল যে, তিনি নক্ষত্র উদিত হতে দেখে বলেছিলেনঃ “আমি অসুস্থ।” এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি রোগাক্রান্ত হবো” অর্থাৎ একবার মৃত্যুর রোগ আসবেই। একটা উক্তি এও রয়েছে যে, তার এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমার হৃদয় তোমাদের দেব-দেবীর উপাসনা করাতে অসুস্থ।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় মেলাতে যাচ্ছিল তখন তাকেও তারা তাদের সাথে যেতে বাধ্য করছিল। তখন তিনি “আমি অসুস্থ” একথা বলে সরে পড়েন এবং একটি নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। যখন তারা সবাই মেলায় চলে যায় তখন তিনি অতি সন্তর্পণে তাদের দেবতাগুলোর নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ “তোমরা খাদ্য গ্রহণ করছো না কেন?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের মন্দিরে গিয়ে দেখেন যে, তারা তাদের দেবতাগুলোর সামনে যে নৈবেদ্য বা প্রসাদ রেখেছিল সেগুলো সবই পড়ে রয়েছে। তারা বরকতের আশায় যেসব উৎসর্গ রেখেছিল সেগুলো হতে তাদের দেবতাগুলো কিছুই খায়নি। মন্দিরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও কারুকার্য খচিত। দরযার নিকটেই এক প্রকাণ্ড মূর্তি ছিল। তার পাশে ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট মূর্তি। মন্দিরটি মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। তাদের সামনে নানা জাতের উপাদেয় খাদ্য রাখা ছিল। তাদের এ বিশ্বাস ছিল যে, খাদ্যগুলো বরকতময় হবে এবং তারা মেলা হতে ফিরে এসে ওগুলো ভক্ষণ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) মূর্তিগুলোর মুখ হতে তার কথার কোন জবাব না পেয়ে আবার বললেনঃ “তোমাদের হয়েছে কি, কথা বলছো না কেন?” অতঃপর তিনি তাদের নিকটবর্তী হয়ে ডান হাত দ্বারা তাদেরকে আঘাত করেন। কাতাদা (রঃ) ও জওহারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তখন মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন এবং ডান হাত দ্বারা আঘাত করতে শুরু করলেন। কেননা ঐগুলো ছিল খুব শক্ত। তিনি সবগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় মূর্তিটিকে তিনি বহাল রেখে দিলেন, ভেঙ্গে ফেললেন না। যাতে ওর উপরই মন্দ ধারণা জন্মে, যেমন সূরায়ে আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীরও বর্ণনা করা হয়েছে।মূর্তিপূজকরা মেলা হতে ফিরে এসে যখন তাদের মন্দিরে প্রবেশ করলো তখন দেখলো যে, মূর্তিগুলো ভাঙ্গা অবস্থায় বিশৃংখলভাবে পড়ে রয়েছে। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো মাথা এবং কারো কারো পূর্ণ দেহটিই নেই। তারা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি!মহান আল্লাহর উক্তিঃ “তখন ঐ লোকগুলো তার দিকে ছুটে আসলো।” অর্থাৎ বহু চিন্তা-ভাবনা করে, আলাপ আলোচনা করে তারা বুঝলো যে, হয় না হয় এটা ইবরাহীমেরই (আঃ) কাজ। তাই তারা দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল। এখানে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরায়ে আম্বিয়ায় এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের সকলকে এক সাথে পেয়ে তাবলীগ করার বড় সুযোগ লাভ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ কর তাদেরই কি তোমরা পূজা করে থাকো? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর সেগুলোকেও।” এই আয়াতে (আরবী) অক্ষরটি সম্ভবতঃ (আরবী) হিসেবে এসেছে এবং এও হতে পারে যে, এটা (আরবী)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথমটিই বেশী সুস্পষ্ট। হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ প্রত্যেক শিল্পী ও তার শিল্পকে সৃষ্টি করেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবু আফআলিল ইবাদ’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ এ আয়াতটি (আরবী) এরূপ পড়েছেন। যেহেতু এমন সুস্পষ্ট উক্তির উত্তর তাদের নিকট ছিল না সেই হেতু তারা নবী (আঃ)-এর শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগে গেল। তারা বললোঃ “তার জন্যে একটি ইমারত (চতুর্দিকে পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত যাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছিল) তৈরী কর, অতঃপর তাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর।” মহান আল্লাহ স্বীয় বন্ধুকে এই জ্বলন্ত অগ্নি হতে রক্ষা করেন। তাঁকেই তিনি বিজয় মাল্যে ভূষিত করেন ও সাহায্য দান করেন। আর তাদেরকে করেন অতিশয় হেয় ও অপমানিত। এর পূর্ণ বর্ণনা ও পুরোপুরি তাফসীর সূরায়ে আম্বিয়ায় গত হয়েছে। এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম।”
আস-সাফফাত 37:94
৮৮-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে এই কথা এ জন্যেই বললেন যে, যখন তারা তাদের মেলায় বের হয়ে যাবে তখন তিনি যেন শহরে একাই থেকে যেতে পারেন এবং তাদের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করার সুযোগ পান। এই জন্যে তিনি এমন কথা বললেন যা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য ছিল। তারা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে অসুস্থ ভেবেছিল। তাই তাকে রেখেই তারা বের হয়েছিল। আর এরই মাঝে তিনি দ্বীনী খিদমত করেছিলেন। কাতাদাও (রঃ) বলেন যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তখন আরবীয়রা বলেঃ “তিনি নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।” অর্থ হচ্ছে এই যে, চিন্তিতভাবে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা এবং অনুধাবন করা যে, কিভাবে ওর প্রভাবমুক্ত হওয়া যাবে? হযরত ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা-ভাবনা করে বললেন যে, তিনি পীড়িত অর্থাৎ দুর্বল। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবরহীম (আঃ) তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে দু’বার আল্লাহর দ্বীনের জন্যে মিথ্যা বলেছিলেন। যথা (আরবী) (আমি অসুস্থ)। অপর স্থানে বলেছিলেনঃ (আরবী) (২১:৬৩) (বরং তাদের এই বড় প্রতিমাটি এ কাজ করেছে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ভেঙ্গেছে)। আর একবার তিনি স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে তার বোন বলেছিলেন। একথা স্মরণযোগ্য যে, এগুলোর একটিও আসল বা প্রকৃত মিথ্যা ছিল না। এখানে রূপক অর্থে মিথ্যা বলা হয়েছে। সুতরাং তাকে তিরস্কার করা চলবে না। কথার মাঝে কোন শরয়ী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এরূপ বাহানা করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐ তিনটি কথার মধ্যে একটিও এমন ছিল না যার কর্ম-কৌশলের সাথে আল্লাহর দ্বীনের কল্যাণ সাধন উদ্দেশ্য ছিল না।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান (রঃ) বলেন যে, “আমি অসুস্থ” এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছি।” আর ঐ লোকগুলো এরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে পালিয়ে যেতো। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর দ্বীন প্রচার এবং তাদের মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা প্রমাণের জন্যেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এটা একটি কর্মকৌশল ছিল যে, তিনি নক্ষত্র উদিত হতে দেখে বলেছিলেনঃ “আমি অসুস্থ।” এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি রোগাক্রান্ত হবো” অর্থাৎ একবার মৃত্যুর রোগ আসবেই। একটা উক্তি এও রয়েছে যে, তার এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমার হৃদয় তোমাদের দেব-দেবীর উপাসনা করাতে অসুস্থ।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় মেলাতে যাচ্ছিল তখন তাকেও তারা তাদের সাথে যেতে বাধ্য করছিল। তখন তিনি “আমি অসুস্থ” একথা বলে সরে পড়েন এবং একটি নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। যখন তারা সবাই মেলায় চলে যায় তখন তিনি অতি সন্তর্পণে তাদের দেবতাগুলোর নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ “তোমরা খাদ্য গ্রহণ করছো না কেন?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের মন্দিরে গিয়ে দেখেন যে, তারা তাদের দেবতাগুলোর সামনে যে নৈবেদ্য বা প্রসাদ রেখেছিল সেগুলো সবই পড়ে রয়েছে। তারা বরকতের আশায় যেসব উৎসর্গ রেখেছিল সেগুলো হতে তাদের দেবতাগুলো কিছুই খায়নি। মন্দিরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও কারুকার্য খচিত। দরযার নিকটেই এক প্রকাণ্ড মূর্তি ছিল। তার পাশে ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট মূর্তি। মন্দিরটি মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। তাদের সামনে নানা জাতের উপাদেয় খাদ্য রাখা ছিল। তাদের এ বিশ্বাস ছিল যে, খাদ্যগুলো বরকতময় হবে এবং তারা মেলা হতে ফিরে এসে ওগুলো ভক্ষণ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) মূর্তিগুলোর মুখ হতে তার কথার কোন জবাব না পেয়ে আবার বললেনঃ “তোমাদের হয়েছে কি, কথা বলছো না কেন?” অতঃপর তিনি তাদের নিকটবর্তী হয়ে ডান হাত দ্বারা তাদেরকে আঘাত করেন। কাতাদা (রঃ) ও জওহারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তখন মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন এবং ডান হাত দ্বারা আঘাত করতে শুরু করলেন। কেননা ঐগুলো ছিল খুব শক্ত। তিনি সবগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় মূর্তিটিকে তিনি বহাল রেখে দিলেন, ভেঙ্গে ফেললেন না। যাতে ওর উপরই মন্দ ধারণা জন্মে, যেমন সূরায়ে আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীরও বর্ণনা করা হয়েছে।মূর্তিপূজকরা মেলা হতে ফিরে এসে যখন তাদের মন্দিরে প্রবেশ করলো তখন দেখলো যে, মূর্তিগুলো ভাঙ্গা অবস্থায় বিশৃংখলভাবে পড়ে রয়েছে। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো মাথা এবং কারো কারো পূর্ণ দেহটিই নেই। তারা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি!মহান আল্লাহর উক্তিঃ “তখন ঐ লোকগুলো তার দিকে ছুটে আসলো।” অর্থাৎ বহু চিন্তা-ভাবনা করে, আলাপ আলোচনা করে তারা বুঝলো যে, হয় না হয় এটা ইবরাহীমেরই (আঃ) কাজ। তাই তারা দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল। এখানে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরায়ে আম্বিয়ায় এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের সকলকে এক সাথে পেয়ে তাবলীগ করার বড় সুযোগ লাভ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ কর তাদেরই কি তোমরা পূজা করে থাকো? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর সেগুলোকেও।” এই আয়াতে (আরবী) অক্ষরটি সম্ভবতঃ (আরবী) হিসেবে এসেছে এবং এও হতে পারে যে, এটা (আরবী)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথমটিই বেশী সুস্পষ্ট। হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ প্রত্যেক শিল্পী ও তার শিল্পকে সৃষ্টি করেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবু আফআলিল ইবাদ’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ এ আয়াতটি (আরবী) এরূপ পড়েছেন। যেহেতু এমন সুস্পষ্ট উক্তির উত্তর তাদের নিকট ছিল না সেই হেতু তারা নবী (আঃ)-এর শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগে গেল। তারা বললোঃ “তার জন্যে একটি ইমারত (চতুর্দিকে পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত যাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছিল) তৈরী কর, অতঃপর তাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর।” মহান আল্লাহ স্বীয় বন্ধুকে এই জ্বলন্ত অগ্নি হতে রক্ষা করেন। তাঁকেই তিনি বিজয় মাল্যে ভূষিত করেন ও সাহায্য দান করেন। আর তাদেরকে করেন অতিশয় হেয় ও অপমানিত। এর পূর্ণ বর্ণনা ও পুরোপুরি তাফসীর সূরায়ে আম্বিয়ায় গত হয়েছে। এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম।”
আস-সাফফাত 37:95
৮৮-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে এই কথা এ জন্যেই বললেন যে, যখন তারা তাদের মেলায় বের হয়ে যাবে তখন তিনি যেন শহরে একাই থেকে যেতে পারেন এবং তাদের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করার সুযোগ পান। এই জন্যে তিনি এমন কথা বললেন যা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য ছিল। তারা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে অসুস্থ ভেবেছিল। তাই তাকে রেখেই তারা বের হয়েছিল। আর এরই মাঝে তিনি দ্বীনী খিদমত করেছিলেন। কাতাদাও (রঃ) বলেন যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তখন আরবীয়রা বলেঃ “তিনি নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।” অর্থ হচ্ছে এই যে, চিন্তিতভাবে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা এবং অনুধাবন করা যে, কিভাবে ওর প্রভাবমুক্ত হওয়া যাবে? হযরত ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা-ভাবনা করে বললেন যে, তিনি পীড়িত অর্থাৎ দুর্বল। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবরহীম (আঃ) তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে দু’বার আল্লাহর দ্বীনের জন্যে মিথ্যা বলেছিলেন। যথা (আরবী) (আমি অসুস্থ)। অপর স্থানে বলেছিলেনঃ (আরবী) (২১:৬৩) (বরং তাদের এই বড় প্রতিমাটি এ কাজ করেছে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ভেঙ্গেছে)। আর একবার তিনি স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে তার বোন বলেছিলেন। একথা স্মরণযোগ্য যে, এগুলোর একটিও আসল বা প্রকৃত মিথ্যা ছিল না। এখানে রূপক অর্থে মিথ্যা বলা হয়েছে। সুতরাং তাকে তিরস্কার করা চলবে না। কথার মাঝে কোন শরয়ী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এরূপ বাহানা করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐ তিনটি কথার মধ্যে একটিও এমন ছিল না যার কর্ম-কৌশলের সাথে আল্লাহর দ্বীনের কল্যাণ সাধন উদ্দেশ্য ছিল না।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান (রঃ) বলেন যে, “আমি অসুস্থ” এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছি।” আর ঐ লোকগুলো এরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে পালিয়ে যেতো। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর দ্বীন প্রচার এবং তাদের মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা প্রমাণের জন্যেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এটা একটি কর্মকৌশল ছিল যে, তিনি নক্ষত্র উদিত হতে দেখে বলেছিলেনঃ “আমি অসুস্থ।” এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি রোগাক্রান্ত হবো” অর্থাৎ একবার মৃত্যুর রোগ আসবেই। একটা উক্তি এও রয়েছে যে, তার এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমার হৃদয় তোমাদের দেব-দেবীর উপাসনা করাতে অসুস্থ।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় মেলাতে যাচ্ছিল তখন তাকেও তারা তাদের সাথে যেতে বাধ্য করছিল। তখন তিনি “আমি অসুস্থ” একথা বলে সরে পড়েন এবং একটি নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। যখন তারা সবাই মেলায় চলে যায় তখন তিনি অতি সন্তর্পণে তাদের দেবতাগুলোর নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ “তোমরা খাদ্য গ্রহণ করছো না কেন?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের মন্দিরে গিয়ে দেখেন যে, তারা তাদের দেবতাগুলোর সামনে যে নৈবেদ্য বা প্রসাদ রেখেছিল সেগুলো সবই পড়ে রয়েছে। তারা বরকতের আশায় যেসব উৎসর্গ রেখেছিল সেগুলো হতে তাদের দেবতাগুলো কিছুই খায়নি। মন্দিরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও কারুকার্য খচিত। দরযার নিকটেই এক প্রকাণ্ড মূর্তি ছিল। তার পাশে ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট মূর্তি। মন্দিরটি মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। তাদের সামনে নানা জাতের উপাদেয় খাদ্য রাখা ছিল। তাদের এ বিশ্বাস ছিল যে, খাদ্যগুলো বরকতময় হবে এবং তারা মেলা হতে ফিরে এসে ওগুলো ভক্ষণ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) মূর্তিগুলোর মুখ হতে তার কথার কোন জবাব না পেয়ে আবার বললেনঃ “তোমাদের হয়েছে কি, কথা বলছো না কেন?” অতঃপর তিনি তাদের নিকটবর্তী হয়ে ডান হাত দ্বারা তাদেরকে আঘাত করেন। কাতাদা (রঃ) ও জওহারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তখন মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন এবং ডান হাত দ্বারা আঘাত করতে শুরু করলেন। কেননা ঐগুলো ছিল খুব শক্ত। তিনি সবগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় মূর্তিটিকে তিনি বহাল রেখে দিলেন, ভেঙ্গে ফেললেন না। যাতে ওর উপরই মন্দ ধারণা জন্মে, যেমন সূরায়ে আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীরও বর্ণনা করা হয়েছে।মূর্তিপূজকরা মেলা হতে ফিরে এসে যখন তাদের মন্দিরে প্রবেশ করলো তখন দেখলো যে, মূর্তিগুলো ভাঙ্গা অবস্থায় বিশৃংখলভাবে পড়ে রয়েছে। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো মাথা এবং কারো কারো পূর্ণ দেহটিই নেই। তারা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি!মহান আল্লাহর উক্তিঃ “তখন ঐ লোকগুলো তার দিকে ছুটে আসলো।” অর্থাৎ বহু চিন্তা-ভাবনা করে, আলাপ আলোচনা করে তারা বুঝলো যে, হয় না হয় এটা ইবরাহীমেরই (আঃ) কাজ। তাই তারা দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল। এখানে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরায়ে আম্বিয়ায় এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের সকলকে এক সাথে পেয়ে তাবলীগ করার বড় সুযোগ লাভ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ কর তাদেরই কি তোমরা পূজা করে থাকো? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর সেগুলোকেও।” এই আয়াতে (আরবী) অক্ষরটি সম্ভবতঃ (আরবী) হিসেবে এসেছে এবং এও হতে পারে যে, এটা (আরবী)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথমটিই বেশী সুস্পষ্ট। হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ প্রত্যেক শিল্পী ও তার শিল্পকে সৃষ্টি করেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবু আফআলিল ইবাদ’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ এ আয়াতটি (আরবী) এরূপ পড়েছেন। যেহেতু এমন সুস্পষ্ট উক্তির উত্তর তাদের নিকট ছিল না সেই হেতু তারা নবী (আঃ)-এর শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগে গেল। তারা বললোঃ “তার জন্যে একটি ইমারত (চতুর্দিকে পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত যাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছিল) তৈরী কর, অতঃপর তাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর।” মহান আল্লাহ স্বীয় বন্ধুকে এই জ্বলন্ত অগ্নি হতে রক্ষা করেন। তাঁকেই তিনি বিজয় মাল্যে ভূষিত করেন ও সাহায্য দান করেন। আর তাদেরকে করেন অতিশয় হেয় ও অপমানিত। এর পূর্ণ বর্ণনা ও পুরোপুরি তাফসীর সূরায়ে আম্বিয়ায় গত হয়েছে। এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম।”
আস-সাফফাত 37:96
৮৮-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে এই কথা এ জন্যেই বললেন যে, যখন তারা তাদের মেলায় বের হয়ে যাবে তখন তিনি যেন শহরে একাই থেকে যেতে পারেন এবং তাদের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করার সুযোগ পান। এই জন্যে তিনি এমন কথা বললেন যা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য ছিল। তারা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে অসুস্থ ভেবেছিল। তাই তাকে রেখেই তারা বের হয়েছিল। আর এরই মাঝে তিনি দ্বীনী খিদমত করেছিলেন। কাতাদাও (রঃ) বলেন যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তখন আরবীয়রা বলেঃ “তিনি নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।” অর্থ হচ্ছে এই যে, চিন্তিতভাবে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা এবং অনুধাবন করা যে, কিভাবে ওর প্রভাবমুক্ত হওয়া যাবে? হযরত ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা-ভাবনা করে বললেন যে, তিনি পীড়িত অর্থাৎ দুর্বল। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবরহীম (আঃ) তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে দু’বার আল্লাহর দ্বীনের জন্যে মিথ্যা বলেছিলেন। যথা (আরবী) (আমি অসুস্থ)। অপর স্থানে বলেছিলেনঃ (আরবী) (২১:৬৩) (বরং তাদের এই বড় প্রতিমাটি এ কাজ করেছে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ভেঙ্গেছে)। আর একবার তিনি স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে তার বোন বলেছিলেন। একথা স্মরণযোগ্য যে, এগুলোর একটিও আসল বা প্রকৃত মিথ্যা ছিল না। এখানে রূপক অর্থে মিথ্যা বলা হয়েছে। সুতরাং তাকে তিরস্কার করা চলবে না। কথার মাঝে কোন শরয়ী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এরূপ বাহানা করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐ তিনটি কথার মধ্যে একটিও এমন ছিল না যার কর্ম-কৌশলের সাথে আল্লাহর দ্বীনের কল্যাণ সাধন উদ্দেশ্য ছিল না।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান (রঃ) বলেন যে, “আমি অসুস্থ” এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছি।” আর ঐ লোকগুলো এরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে পালিয়ে যেতো। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর দ্বীন প্রচার এবং তাদের মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা প্রমাণের জন্যেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এটা একটি কর্মকৌশল ছিল যে, তিনি নক্ষত্র উদিত হতে দেখে বলেছিলেনঃ “আমি অসুস্থ।” এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি রোগাক্রান্ত হবো” অর্থাৎ একবার মৃত্যুর রোগ আসবেই। একটা উক্তি এও রয়েছে যে, তার এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমার হৃদয় তোমাদের দেব-দেবীর উপাসনা করাতে অসুস্থ।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় মেলাতে যাচ্ছিল তখন তাকেও তারা তাদের সাথে যেতে বাধ্য করছিল। তখন তিনি “আমি অসুস্থ” একথা বলে সরে পড়েন এবং একটি নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। যখন তারা সবাই মেলায় চলে যায় তখন তিনি অতি সন্তর্পণে তাদের দেবতাগুলোর নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ “তোমরা খাদ্য গ্রহণ করছো না কেন?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের মন্দিরে গিয়ে দেখেন যে, তারা তাদের দেবতাগুলোর সামনে যে নৈবেদ্য বা প্রসাদ রেখেছিল সেগুলো সবই পড়ে রয়েছে। তারা বরকতের আশায় যেসব উৎসর্গ রেখেছিল সেগুলো হতে তাদের দেবতাগুলো কিছুই খায়নি। মন্দিরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও কারুকার্য খচিত। দরযার নিকটেই এক প্রকাণ্ড মূর্তি ছিল। তার পাশে ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট মূর্তি। মন্দিরটি মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। তাদের সামনে নানা জাতের উপাদেয় খাদ্য রাখা ছিল। তাদের এ বিশ্বাস ছিল যে, খাদ্যগুলো বরকতময় হবে এবং তারা মেলা হতে ফিরে এসে ওগুলো ভক্ষণ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) মূর্তিগুলোর মুখ হতে তার কথার কোন জবাব না পেয়ে আবার বললেনঃ “তোমাদের হয়েছে কি, কথা বলছো না কেন?” অতঃপর তিনি তাদের নিকটবর্তী হয়ে ডান হাত দ্বারা তাদেরকে আঘাত করেন। কাতাদা (রঃ) ও জওহারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তখন মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন এবং ডান হাত দ্বারা আঘাত করতে শুরু করলেন। কেননা ঐগুলো ছিল খুব শক্ত। তিনি সবগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় মূর্তিটিকে তিনি বহাল রেখে দিলেন, ভেঙ্গে ফেললেন না। যাতে ওর উপরই মন্দ ধারণা জন্মে, যেমন সূরায়ে আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীরও বর্ণনা করা হয়েছে।মূর্তিপূজকরা মেলা হতে ফিরে এসে যখন তাদের মন্দিরে প্রবেশ করলো তখন দেখলো যে, মূর্তিগুলো ভাঙ্গা অবস্থায় বিশৃংখলভাবে পড়ে রয়েছে। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো মাথা এবং কারো কারো পূর্ণ দেহটিই নেই। তারা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি!মহান আল্লাহর উক্তিঃ “তখন ঐ লোকগুলো তার দিকে ছুটে আসলো।” অর্থাৎ বহু চিন্তা-ভাবনা করে, আলাপ আলোচনা করে তারা বুঝলো যে, হয় না হয় এটা ইবরাহীমেরই (আঃ) কাজ। তাই তারা দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল। এখানে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরায়ে আম্বিয়ায় এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের সকলকে এক সাথে পেয়ে তাবলীগ করার বড় সুযোগ লাভ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ কর তাদেরই কি তোমরা পূজা করে থাকো? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর সেগুলোকেও।” এই আয়াতে (আরবী) অক্ষরটি সম্ভবতঃ (আরবী) হিসেবে এসেছে এবং এও হতে পারে যে, এটা (আরবী)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথমটিই বেশী সুস্পষ্ট। হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ প্রত্যেক শিল্পী ও তার শিল্পকে সৃষ্টি করেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবু আফআলিল ইবাদ’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ এ আয়াতটি (আরবী) এরূপ পড়েছেন। যেহেতু এমন সুস্পষ্ট উক্তির উত্তর তাদের নিকট ছিল না সেই হেতু তারা নবী (আঃ)-এর শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগে গেল। তারা বললোঃ “তার জন্যে একটি ইমারত (চতুর্দিকে পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত যাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছিল) তৈরী কর, অতঃপর তাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর।” মহান আল্লাহ স্বীয় বন্ধুকে এই জ্বলন্ত অগ্নি হতে রক্ষা করেন। তাঁকেই তিনি বিজয় মাল্যে ভূষিত করেন ও সাহায্য দান করেন। আর তাদেরকে করেন অতিশয় হেয় ও অপমানিত। এর পূর্ণ বর্ণনা ও পুরোপুরি তাফসীর সূরায়ে আম্বিয়ায় গত হয়েছে। এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম।”
আস-সাফফাত 37:97
৮৮-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে এই কথা এ জন্যেই বললেন যে, যখন তারা তাদের মেলায় বের হয়ে যাবে তখন তিনি যেন শহরে একাই থেকে যেতে পারেন এবং তাদের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করার সুযোগ পান। এই জন্যে তিনি এমন কথা বললেন যা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য ছিল। তারা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে অসুস্থ ভেবেছিল। তাই তাকে রেখেই তারা বের হয়েছিল। আর এরই মাঝে তিনি দ্বীনী খিদমত করেছিলেন। কাতাদাও (রঃ) বলেন যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তখন আরবীয়রা বলেঃ “তিনি নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।” অর্থ হচ্ছে এই যে, চিন্তিতভাবে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা এবং অনুধাবন করা যে, কিভাবে ওর প্রভাবমুক্ত হওয়া যাবে? হযরত ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা-ভাবনা করে বললেন যে, তিনি পীড়িত অর্থাৎ দুর্বল। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবরহীম (আঃ) তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে দু’বার আল্লাহর দ্বীনের জন্যে মিথ্যা বলেছিলেন। যথা (আরবী) (আমি অসুস্থ)। অপর স্থানে বলেছিলেনঃ (আরবী) (২১:৬৩) (বরং তাদের এই বড় প্রতিমাটি এ কাজ করেছে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ভেঙ্গেছে)। আর একবার তিনি স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে তার বোন বলেছিলেন। একথা স্মরণযোগ্য যে, এগুলোর একটিও আসল বা প্রকৃত মিথ্যা ছিল না। এখানে রূপক অর্থে মিথ্যা বলা হয়েছে। সুতরাং তাকে তিরস্কার করা চলবে না। কথার মাঝে কোন শরয়ী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এরূপ বাহানা করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐ তিনটি কথার মধ্যে একটিও এমন ছিল না যার কর্ম-কৌশলের সাথে আল্লাহর দ্বীনের কল্যাণ সাধন উদ্দেশ্য ছিল না।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান (রঃ) বলেন যে, “আমি অসুস্থ” এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছি।” আর ঐ লোকগুলো এরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে পালিয়ে যেতো। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর দ্বীন প্রচার এবং তাদের মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা প্রমাণের জন্যেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এটা একটি কর্মকৌশল ছিল যে, তিনি নক্ষত্র উদিত হতে দেখে বলেছিলেনঃ “আমি অসুস্থ।” এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি রোগাক্রান্ত হবো” অর্থাৎ একবার মৃত্যুর রোগ আসবেই। একটা উক্তি এও রয়েছে যে, তার এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমার হৃদয় তোমাদের দেব-দেবীর উপাসনা করাতে অসুস্থ।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় মেলাতে যাচ্ছিল তখন তাকেও তারা তাদের সাথে যেতে বাধ্য করছিল। তখন তিনি “আমি অসুস্থ” একথা বলে সরে পড়েন এবং একটি নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। যখন তারা সবাই মেলায় চলে যায় তখন তিনি অতি সন্তর্পণে তাদের দেবতাগুলোর নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ “তোমরা খাদ্য গ্রহণ করছো না কেন?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের মন্দিরে গিয়ে দেখেন যে, তারা তাদের দেবতাগুলোর সামনে যে নৈবেদ্য বা প্রসাদ রেখেছিল সেগুলো সবই পড়ে রয়েছে। তারা বরকতের আশায় যেসব উৎসর্গ রেখেছিল সেগুলো হতে তাদের দেবতাগুলো কিছুই খায়নি। মন্দিরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও কারুকার্য খচিত। দরযার নিকটেই এক প্রকাণ্ড মূর্তি ছিল। তার পাশে ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট মূর্তি। মন্দিরটি মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। তাদের সামনে নানা জাতের উপাদেয় খাদ্য রাখা ছিল। তাদের এ বিশ্বাস ছিল যে, খাদ্যগুলো বরকতময় হবে এবং তারা মেলা হতে ফিরে এসে ওগুলো ভক্ষণ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) মূর্তিগুলোর মুখ হতে তার কথার কোন জবাব না পেয়ে আবার বললেনঃ “তোমাদের হয়েছে কি, কথা বলছো না কেন?” অতঃপর তিনি তাদের নিকটবর্তী হয়ে ডান হাত দ্বারা তাদেরকে আঘাত করেন। কাতাদা (রঃ) ও জওহারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তখন মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন এবং ডান হাত দ্বারা আঘাত করতে শুরু করলেন। কেননা ঐগুলো ছিল খুব শক্ত। তিনি সবগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় মূর্তিটিকে তিনি বহাল রেখে দিলেন, ভেঙ্গে ফেললেন না। যাতে ওর উপরই মন্দ ধারণা জন্মে, যেমন সূরায়ে আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীরও বর্ণনা করা হয়েছে।মূর্তিপূজকরা মেলা হতে ফিরে এসে যখন তাদের মন্দিরে প্রবেশ করলো তখন দেখলো যে, মূর্তিগুলো ভাঙ্গা অবস্থায় বিশৃংখলভাবে পড়ে রয়েছে। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো মাথা এবং কারো কারো পূর্ণ দেহটিই নেই। তারা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি!মহান আল্লাহর উক্তিঃ “তখন ঐ লোকগুলো তার দিকে ছুটে আসলো।” অর্থাৎ বহু চিন্তা-ভাবনা করে, আলাপ আলোচনা করে তারা বুঝলো যে, হয় না হয় এটা ইবরাহীমেরই (আঃ) কাজ। তাই তারা দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল। এখানে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরায়ে আম্বিয়ায় এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের সকলকে এক সাথে পেয়ে তাবলীগ করার বড় সুযোগ লাভ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ কর তাদেরই কি তোমরা পূজা করে থাকো? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর সেগুলোকেও।” এই আয়াতে (আরবী) অক্ষরটি সম্ভবতঃ (আরবী) হিসেবে এসেছে এবং এও হতে পারে যে, এটা (আরবী)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথমটিই বেশী সুস্পষ্ট। হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ প্রত্যেক শিল্পী ও তার শিল্পকে সৃষ্টি করেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবু আফআলিল ইবাদ’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ এ আয়াতটি (আরবী) এরূপ পড়েছেন। যেহেতু এমন সুস্পষ্ট উক্তির উত্তর তাদের নিকট ছিল না সেই হেতু তারা নবী (আঃ)-এর শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগে গেল। তারা বললোঃ “তার জন্যে একটি ইমারত (চতুর্দিকে পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত যাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছিল) তৈরী কর, অতঃপর তাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর।” মহান আল্লাহ স্বীয় বন্ধুকে এই জ্বলন্ত অগ্নি হতে রক্ষা করেন। তাঁকেই তিনি বিজয় মাল্যে ভূষিত করেন ও সাহায্য দান করেন। আর তাদেরকে করেন অতিশয় হেয় ও অপমানিত। এর পূর্ণ বর্ণনা ও পুরোপুরি তাফসীর সূরায়ে আম্বিয়ায় গত হয়েছে। এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম।”
আস-সাফফাত 37:98
৮৮-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে এই কথা এ জন্যেই বললেন যে, যখন তারা তাদের মেলায় বের হয়ে যাবে তখন তিনি যেন শহরে একাই থেকে যেতে পারেন এবং তাদের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করার সুযোগ পান। এই জন্যে তিনি এমন কথা বললেন যা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য ছিল। তারা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে অসুস্থ ভেবেছিল। তাই তাকে রেখেই তারা বের হয়েছিল। আর এরই মাঝে তিনি দ্বীনী খিদমত করেছিলেন। কাতাদাও (রঃ) বলেন যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তখন আরবীয়রা বলেঃ “তিনি নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।” অর্থ হচ্ছে এই যে, চিন্তিতভাবে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা এবং অনুধাবন করা যে, কিভাবে ওর প্রভাবমুক্ত হওয়া যাবে? হযরত ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা-ভাবনা করে বললেন যে, তিনি পীড়িত অর্থাৎ দুর্বল। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবরহীম (আঃ) তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে দু’বার আল্লাহর দ্বীনের জন্যে মিথ্যা বলেছিলেন। যথা (আরবী) (আমি অসুস্থ)। অপর স্থানে বলেছিলেনঃ (আরবী) (২১:৬৩) (বরং তাদের এই বড় প্রতিমাটি এ কাজ করেছে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ভেঙ্গেছে)। আর একবার তিনি স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে তার বোন বলেছিলেন। একথা স্মরণযোগ্য যে, এগুলোর একটিও আসল বা প্রকৃত মিথ্যা ছিল না। এখানে রূপক অর্থে মিথ্যা বলা হয়েছে। সুতরাং তাকে তিরস্কার করা চলবে না। কথার মাঝে কোন শরয়ী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এরূপ বাহানা করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐ তিনটি কথার মধ্যে একটিও এমন ছিল না যার কর্ম-কৌশলের সাথে আল্লাহর দ্বীনের কল্যাণ সাধন উদ্দেশ্য ছিল না।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান (রঃ) বলেন যে, “আমি অসুস্থ” এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছি।” আর ঐ লোকগুলো এরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে পালিয়ে যেতো। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর দ্বীন প্রচার এবং তাদের মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা প্রমাণের জন্যেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এটা একটি কর্মকৌশল ছিল যে, তিনি নক্ষত্র উদিত হতে দেখে বলেছিলেনঃ “আমি অসুস্থ।” এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি রোগাক্রান্ত হবো” অর্থাৎ একবার মৃত্যুর রোগ আসবেই। একটা উক্তি এও রয়েছে যে, তার এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমার হৃদয় তোমাদের দেব-দেবীর উপাসনা করাতে অসুস্থ।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় মেলাতে যাচ্ছিল তখন তাকেও তারা তাদের সাথে যেতে বাধ্য করছিল। তখন তিনি “আমি অসুস্থ” একথা বলে সরে পড়েন এবং একটি নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। যখন তারা সবাই মেলায় চলে যায় তখন তিনি অতি সন্তর্পণে তাদের দেবতাগুলোর নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ “তোমরা খাদ্য গ্রহণ করছো না কেন?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের মন্দিরে গিয়ে দেখেন যে, তারা তাদের দেবতাগুলোর সামনে যে নৈবেদ্য বা প্রসাদ রেখেছিল সেগুলো সবই পড়ে রয়েছে। তারা বরকতের আশায় যেসব উৎসর্গ রেখেছিল সেগুলো হতে তাদের দেবতাগুলো কিছুই খায়নি। মন্দিরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও কারুকার্য খচিত। দরযার নিকটেই এক প্রকাণ্ড মূর্তি ছিল। তার পাশে ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট মূর্তি। মন্দিরটি মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। তাদের সামনে নানা জাতের উপাদেয় খাদ্য রাখা ছিল। তাদের এ বিশ্বাস ছিল যে, খাদ্যগুলো বরকতময় হবে এবং তারা মেলা হতে ফিরে এসে ওগুলো ভক্ষণ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) মূর্তিগুলোর মুখ হতে তার কথার কোন জবাব না পেয়ে আবার বললেনঃ “তোমাদের হয়েছে কি, কথা বলছো না কেন?” অতঃপর তিনি তাদের নিকটবর্তী হয়ে ডান হাত দ্বারা তাদেরকে আঘাত করেন। কাতাদা (রঃ) ও জওহারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তখন মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন এবং ডান হাত দ্বারা আঘাত করতে শুরু করলেন। কেননা ঐগুলো ছিল খুব শক্ত। তিনি সবগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় মূর্তিটিকে তিনি বহাল রেখে দিলেন, ভেঙ্গে ফেললেন না। যাতে ওর উপরই মন্দ ধারণা জন্মে, যেমন সূরায়ে আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীরও বর্ণনা করা হয়েছে।মূর্তিপূজকরা মেলা হতে ফিরে এসে যখন তাদের মন্দিরে প্রবেশ করলো তখন দেখলো যে, মূর্তিগুলো ভাঙ্গা অবস্থায় বিশৃংখলভাবে পড়ে রয়েছে। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো মাথা এবং কারো কারো পূর্ণ দেহটিই নেই। তারা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি!মহান আল্লাহর উক্তিঃ “তখন ঐ লোকগুলো তার দিকে ছুটে আসলো।” অর্থাৎ বহু চিন্তা-ভাবনা করে, আলাপ আলোচনা করে তারা বুঝলো যে, হয় না হয় এটা ইবরাহীমেরই (আঃ) কাজ। তাই তারা দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল। এখানে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরায়ে আম্বিয়ায় এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের সকলকে এক সাথে পেয়ে তাবলীগ করার বড় সুযোগ লাভ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ কর তাদেরই কি তোমরা পূজা করে থাকো? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর সেগুলোকেও।” এই আয়াতে (আরবী) অক্ষরটি সম্ভবতঃ (আরবী) হিসেবে এসেছে এবং এও হতে পারে যে, এটা (আরবী)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথমটিই বেশী সুস্পষ্ট। হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ প্রত্যেক শিল্পী ও তার শিল্পকে সৃষ্টি করেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবু আফআলিল ইবাদ’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ এ আয়াতটি (আরবী) এরূপ পড়েছেন। যেহেতু এমন সুস্পষ্ট উক্তির উত্তর তাদের নিকট ছিল না সেই হেতু তারা নবী (আঃ)-এর শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগে গেল। তারা বললোঃ “তার জন্যে একটি ইমারত (চতুর্দিকে পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত যাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছিল) তৈরী কর, অতঃপর তাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর।” মহান আল্লাহ স্বীয় বন্ধুকে এই জ্বলন্ত অগ্নি হতে রক্ষা করেন। তাঁকেই তিনি বিজয় মাল্যে ভূষিত করেন ও সাহায্য দান করেন। আর তাদেরকে করেন অতিশয় হেয় ও অপমানিত। এর পূর্ণ বর্ণনা ও পুরোপুরি তাফসীর সূরায়ে আম্বিয়ায় গত হয়েছে। এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম।”
আস-সাফফাত 37:99
৯৯-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ প্রদান করছেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়ের ঈমান আনয়ন হতে নিরাশ হয়ে গেলেন, কারণ তারা আল্লাহর ক্ষমতা প্রকাশক বহু নিদর্শন দেখার পরও ঈমান আনলো না, তখন তিনি সেখান থেকে হিজরত করে অন্যত্র চলে যেতে ইচ্ছা করে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে বললেনঃ “আমি আমার প্রতিপালকের দিকে চললাম। তিনি অবশ্যই আমাকে সৎপথে পরিচালিত করবেন। আর তিনি প্রার্থনা করলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন!” অর্থাৎ ঐ সন্তান যেন একত্ববাদে তাঁর সঙ্গী হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাকে এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।” ইনিই ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ), হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রথম সন্তান। বিশ্ব মুসলিম এর ঐকমত্যে তিনি হযরত ইসহাক (আঃ)-এর বড় ছিলেন। একথা আহলে কিতাবও মেনে থাকে। এমনকি তাদের কিতাবেও লিখিত আছে যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর জন্মের সময়। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বয়স ছিল ছিয়াশি বছর। আর হযরত ইসহাক (আঃ)-এর যখন জন্ম হয় তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বয়স নিরানব্বই বছরে পৌঁছেছিল। তাদেরই গ্রন্থে একথাও লিখিত রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে তার একমাত্র সন্তানকে কুরবানী করার হুকুম হয়েছিল। কিন্তু ইয়াহুদীরা হযরত ইসহাক (আঃ)-এর বংশধর এবং আরবরা হলো হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর, শুধু এই কারণেই তারা কুরবানীর মর্যাদা হযরত ইসমাঈল (আঃ) হতে সরিয়ে হযরত ইসহাক (আঃ)-কে প্রদান করেছে। আর অনর্থক ব্যাখ্যা করে আল্লাহর বাণীর পরিবর্তন সাধন করেছে। তারা একথাও বলেছেঃ “আমাদের কিতাবে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যার অর্থ একমাত্র সন্তান নয়, বরং এর অর্থ হলোঃ “যে তোমার নিকট বর্তমানে একাকী রয়েছে। এটা এজন্যেই যে, ঐ সময় হযরত ইসমাঈল (আঃ) মক্কায় তাঁর মায়ের কাছে ছিলেন এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট শুধুমাত্র হযরত ইসহাক (আঃ) ছিলেন।কিন্তু এটা সম্পূর্ণরূপে ভুল কথা। কেননা, ওকেই বলে যে একমাত্র সন্তান, যার আর কোন ভাই নেই। আর একথাও সত্য যে, যার একটি মাত্র সন্তান, আর তার পরে কোন সন্তান নেই তার প্রতি স্বাভাবিকভাবে মমতা বেশীই হয়ে থাকে। এজন্যে তাকে কুরবানী করার আদেশ দান পরীক্ষা করার একটি বিরাট হাতিয়ার। পূর্বযুগীয় কতক গুরুজন এমনকি কতক সাহাবীও (রাঃ) যে এ মত পোষণ করতেন যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ), এটা আমরা স্বীকার করি। কিন্তু এটা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাত সম্মত নয়। বরং এরূপ ধারণা করা যায় যে, তাঁরা বানী ইসরাঈলের কথাকে বিনা প্রমাণেই মেনে নিয়েছেন, এর পিছনে কোন যুক্তি তাঁরা অন্বেষণ করেননি। আমরা আল্লাহর কালাম দ্বারাই প্রমাণ করবো যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) ছিলেন যাবীহুল্লাহ। সুসংবাদে বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ সহনশীল সন্তান। অতঃপর কুরবানীর উল্লেখ রয়েছে। এসব বর্ণনা সমাপ্ত করার পর সৎ নবী হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ রয়েছে এবং তাঁর সম্পর্কে ফেরেশতারা (আরবী) বা বিজ্ঞ সন্তান বলেছেন। তারপর তার সুসংবাদের সাথে ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী) (১১:৭১) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশাতেই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবেন। আর এভাবেই তাঁর বংশ বৃদ্ধির সংবাদ প্রথমেই জানানো হয়। তাহলে তাঁকে যবেহ করার আদেশ কি প্রকারে সম্ভব হতে পারে? এটা আমরা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি। অবশ্য এখানে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে ধৈর্যশীল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং তা যবেহ করার কাজের সাথে অতি সামঞ্জস্যপূর্ণ।এখন হযরত ইসমাঈল (আঃ) বড় হলেন। এখন তিনি পিতার সাথে চলাফেরা করতে পারেন। ঐ সময় তিনি তাঁর মাতার সাথে ফারান নামক এলাকায় থাকতেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রায়ই সেখানে যাতায়াত করতেন। এ কথাও বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তথায় বুরাক নামক যানে যাওয়া আসা করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলৈনঃ এই বাক্যের অর্থ এও হতে পারে যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) ঐ সময় প্রায় যৌবনে পদার্পণ করেছিলেন এবং পিতার ন্যায় চলাফেরা করা ও কাজকর্ম করার যোগ্য হয়ে উঠেছিলেন। তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বপ্ন দেখেন যে, তিনি তাঁর প্রিয় সন্তানকে কুরবানী করছেন। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, নবীদের স্বপ্ন হলো অহী। অতঃপর তিনি। (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। একটি মার’ হাদীসেও এটা রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঘুমে নবীদের (আঃ) স্বপ্ন হলো অহী।” (এহানসটি মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে)আল্লাহর প্রিয় নবী হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানের পরীক্ষার জন্যে এবং এজন্যেও যে, হঠাৎ কুরবানীর কথা শুনে তিনি যেন হতবুদ্ধি না হয়ে পড়েন, নিজের মত ও সত্য স্বপ্ন তার সামনে প্রকাশ করলেন। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান উত্তর দিলেনঃ “পিতঃ! বিলম্ব করছেন কেন? একথা কি জিজ্ঞেস করতে হয়? যা করতে আদিষ্ট হয়েছেন তা সত্বর করে ফেলুন। ইনশাআল্লাহ আমি ধৈর্যধারণের মাধ্যমে আপনার বাসনা চরিতার্থ করবো।” তিনি যা বললেন তাই করে দেখালেন এবং তিনি প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী রূপে প্রমাণিত হলেন। এজন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “স্মরণ কর এই কিতাবে উল্লিখিত ইসমাঈল (আঃ)-এর কথা, সে ছিল প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী, এবং সে ছিল রাসূল, নবী। সে তার পরিজনবর্গকে নামায ও যাকাতের নির্দেশ দিতো এবং সে ছিল তার প্রতিপালকের সন্তোষজন।”(১৯:৫৪-৫৫)পিতা-পুত্র উভয়ে যখন একমত হলেন তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে মাটিতে কাত করে শায়িত করলেন বা অধোমুখে মাটিতে ফেলে দিলেন, যাতে যবেহ করার সময় প্রাণপ্রিয় সন্তানের মুখমণ্ডল দেখে মায়ার উদ্রেক না হয়। মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে একট বর্ণনা রয়েছে যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন শয়তান সামনে এসে হাযির হলো। কিন্তু তিনি শয়তানকে পিছনে ফেলে অগ্রসর হলেন। অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) সহ, জামরায়ে অকাবায় উপস্থিত হলেন। এখানেও শয়তান সামনে আসলে তার দিকে তিনি সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। তারপর তিনি জামরায়ে উসতার নিকট এসে পুনরায় শয়তানের দিকে সাতটি কংকর ছুঁড়লেন। অতঃপর সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে ছেলেকে মাটিতে শায়িত করলেন। ঐ সময় ছেলের গায়ে সাদা রঙ-এর চাদর ছিল। তিনি পিতাকে চাদরটি খুলে নিতে বললেন, যাতে ঐ চাদর দ্বারা তাঁর কাফনের কাজ হয়। এহেন অবস্থায় পিতা হয়ে পুত্রের দেহ অনাবৃত করা অতি বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে। এমন সময় শব্দ এলোঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তো স্বপ্নদেশ সত্যিই পালন করলে। তখন তিনি পিছনে ফিরে একটি দুম্বা দেখতে পেলেন, যার শিং ছিল বড় বড় এবং চক্ষুদ্বয় ছিল অতি সুন্দর।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এ জন্যেই আমরা কুরবানীর জন্যে এই প্রকারের দুম্বা মনোনীত করে থাকি।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর অপর এক বর্ণনায় হযরত ইসহাক (আঃ)-এর নাম উল্লিখিত রয়েছে। ফলে তাঁর বর্ণনায় দু’জনের নাম পাওয়া যায়। সুতরাং প্রথমটিই গ্রহণযোগ্য। ইনশাআল্লাহ এর প্রমাণ পেশ করা হবে।আল্লাহ তা'আলা কুরবানীর জন্যে একটি দুম্বা দান করলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা জান্নাতের দুম্বা ছিল। চল্লিশ বছর ধরে সেখানে পালিত হয়েছিল। এটা দেখে হযরত ইবরহীম (আঃ) পুত্রকে ছেড়ে দিয়ে সেই দিকে অগ্রসর হলেন। প্রথম জামরায় এসে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। শয়তান সেখান থেকে পালিয়ে জামরায়ে উসতায় আসলো। সেখানেও তিনি সাতটি কংকর হুঁড়লেন। আবার প্রথম জামরায় এসে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। সেখান হতে যবেহের স্থানে এসে দুষাটি কুরবানী করলেন। এটার মাথাসহ শিং কা’বার দেয়ালে লটকানো ছিল। পরে ওটা শুকিয়ে যায় এবং ইসলামের আবির্ভাব পর্যন্ত সেখানেই বিদ্যমান ছিল। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ও হযরত কা'ব (রাঃ) একত্রিত হন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) নবী (সঃ) হতে হাদীস বর্ণনা করছিলেন এবং হযরত কা'ব (রাঃ) আল্লাহর কিতাব হতে ঘটনা বর্ণনা করছিলেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবী (আঃ)-এর জন্যে একটি ককূলকৃত দুআ রয়েছে। আমার এই কবুলকৃত দু'আ আমি আমার উম্মতের শাফাআতের জন্যে গোপন রেখেছি যা কিয়ামতের দিন হবে।” হযরত কা'ব (রাঃ) তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি কি স্বয়ং এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছো?” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, আমি নিজেই শুনেছি।” তখন হযরত কা'ব (রাঃ) খুব খুশী হন এবং বলেনঃ “তোমার উপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গকৃত হোক অথবা নবী (সঃ)-এর উপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গকৃত হোক।” অতঃপর হযরত কা'ব (রাঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঘটনা শুনালেন। তিনি বর্ণনা করলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসহাক (আঃ)-কে যবেহ করার জন্যে প্রস্তুত হলেন তখন শয়তান (মনে মনে) বললোঃ “আমি যদি এ সময়ে এ কাজ থেকে তাঁকে টলাতে না পারি তবে আমাকে এ জন্যে সারা জীবন নিরাশ থাকতে হবে। প্রথমে সে হযরত সারার নিকট গেল এবং তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার স্বামী তোমার পুত্রকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা জান কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হয়তো নিজের কোন কাজের জন্যে। নিয়ে যাচ্ছেন।” সে বললোঃ “না, না, বরং তাকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছেন।” হযরত সারা বললেন:“তিনি নিজের পুত্রকে যবেহ করবেন এটা কি সম্ভব?” অভিশপ্ত শয়তান জবাব দিলোঃ “তোমার স্বামী বলেন কি জান? তাঁকে নাকি আল্লাহ এই নির্দেশ দিয়েছেন!” হযরত সারা তখন বললেনঃ “তাকে যদি আল্লাহ নির্দেশ দিয়ে থাকেন তবে তিনি ঠিকই করছেন। আল্লাহর হুকুম পালন করে তিনি ফিরে আসবেন।” সে এখানে ব্যর্থ হয়ে হযরত ইসহাক (আঃ)-এর নিকট গেল এবং তাকে বললোঃ “তোমাকে তোমার আব্বা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা জান কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হয়তো কোন কাজের জন্যে কোন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন।” শয়তান বললোঃ “না, বরং তোমাকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছেন।” হযরত ইসহাক (আঃ) বললেনঃ “এটা কি করে সম্ভব?” শয়তান। বললোঃ “তোমাকে যবেহ করতে নাকি আল্লাহ তাকে আদেশ করেছেন।” তখন হযরত ইসহাক (আঃ) বললেনঃ “আল্লাহর কসম! যদি সত্যি আল্লাহ আমাকে যবেহ করতে তাঁকে নির্দেশ দিয়ে থাকেন তবে তো তাড়াতাড়ি তার এ কাজ করা উচিত।”শয়তান এখানেও নিরাশ হয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট গিয়ে বললোঃ “ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “প্রয়োজনীয় কাজে যাচ্ছি।” শয়তান বললোঃ “না, তা নয়। বরং তাকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছে।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) বললেনঃ “তাকে আমি কেন যবেহ করবো?” শয়তান জবাব দিলোঃ “হয়তো আপনার প্রতিপালক আপনাকে এ কাজে আদেশ করেছেন। তিনি তখন বললেনঃ “আমার প্রতিপালক যদি আমাকে আদেশ করেই থাকেন তবে আমি তা করবোই।" ফলে শয়তান এখানেও নিরাশ হয়ে গেল। অপর এক বর্ণনায় বলা হয় যে, এই সব ঘটনার পর মহান আল্লাহ হযরত ইসহাক (আঃ)-কে বললেনঃ “তুমি আমার নিকট যে দু'আ করবে আমি তা ককূল করবো।” হযরত ইসহাক (আঃ) তখন দু'আ করলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! যারা আপনার সাথে কোন শরীক স্থাপন করবে না তাদেরকে আপনি জান্নাত দান করুন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বর্ণনা করেনঃ “দু'টি বিষয় আমার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। একটি হলো এই যে, আমার অর্ধেক উম্মতকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর দ্বিতীয় হলো এই যে, আমাকে শাফাআত করার অধিকার দেয়া হবে। অমি শাফাআত করাকেই প্রাধান্য দিলাম, এই আশায় যে, ওটা সাধারণ হবে। হ্যা, তবে একটি দু'আ ছিল যে, আমি ওটাই করতাম। কিন্তু আমার পূর্বেই আল্লাহর এক সৎ বান্দা তা করে ফেলেছেন। ঘটনা এই যে, যখন হযরত ইসহাক (আঃ) যবেহ-এর বিপদ হতে মুক্তি পেলেন তখন তাঁকে বলা হলোঃ “আমার নিকট চাও, যা চাইবে তাই আমি দিবো।” তখন হযরত ইসহাক (আঃ) বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! শয়তান ধোকা দেয়ার পূর্বেই আমি তা চাইবো। হে আল্লাহ! যে আপনার সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করবে তাকে আপনি জান্নাতে প্রবিষ্ট করুন!” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। এর সনদ গারীব ও মুনকার। আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম নামক এর একজন বর্ণনাকারী দুর্বল। আর আমার তো এই ভয়ও হয় যে, “যখন আল্লাহ হযরত ইসহাক (আঃ)-কে বললেন ... শেষ পর্যন্ত এ কথাগুলো তার নিজের কথা, যেগুলো তিনি হাদীসের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। যাবীহুল্লাহ তো ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ) এবং যবেহ-এর স্থান তো মিনা, যা মক্কায় অবস্থিত এবং হযরত ইসমাঈল (আঃ) মক্কাতেই ছিলেন, হযরত ইসহাক (আঃ) নন, তিনি তো ছিলেন সিরিয়ার কিন’আন শহরে)মহান আল্লাহ বলেনঃ “যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পুত্র (ইসমাঈল আঃ)-কে কাত করে শায়িত করলেন তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললামঃ হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তো স্বপ্নদেশ সত্যিই পালন করলে!” হযরত সুদ্দী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর গলায় ছুরি চালাতে শুরু করলেন তখন গলা তামা হয়ে গেল, ফলে ছুরি চললো না ও গলা কাটলো না। ঐ সময় (আরবী) এই শব্দ আসলো।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। অর্থাৎ তাদেরকে কঠিন বিপদ থেকে উদ্ধার করে থাকি। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার পরিত্রাণের উপায় বের করে দেন এবং তাকে এমনভাবে রিযক দান করে থাকেন যে, ওটা তার ধারণা বা কল্পনাও থাকে না। আল্লাহর উপর ভরসাকারীর জন্যে তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পুরো করেই থাকেন এবং প্রত্যেক জিনিসেরই তিনি পরিমাপ নির্ধারণ করে রেখেছেন।”(৬৫:২-৩)এই আয়াত দ্বারা আলেমগণ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কাজের উপর ক্ষমতা লাভের পূর্বেই হুকুম রহিত হয়ে যায়। অবশ্য মু'তাযিলা সম্প্রদায় এটা মানে না। দলীল গ্রহণের কারণ প্রকাশমান। কেননা, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তিনি যেন তার পুত্রকে কুরবানী করেন। অতঃপর যবেহ করার। পূর্বেই ফিদিয়ার মাধ্যমে এ হুকুম রহিত করে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল এটাই যে, তাকে ধৈর্য ও আদিষ্ট কাজ প্রতিপালনে সদা প্রস্তুত থাকার উপর বিনিময় প্রদান করা হবে। এজন্যেই ইরশাদ হয়েছেঃ “নিশ্চয়ই এটা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। একদিকে হুকুম এবং অপরদিকে তা প্রতিপালন। এজন্যেই মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রশংসায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ ইবরাহীম (আঃ), যে পালন করেছিল তার দায়িত্ব।”(৫৩:৩৭)হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, যে ফিদিয়া দান করা হয়েছিল তার রঙ ছিল সাদা, চক্ষু বড় এবং বড় শিং বিশিষ্ট উৎকৃষ্ট খাদ্যে প্রতিপালিত ভেড়া। যা সাবীর’ নামক স্থানে বাবুল বৃক্ষে বাঁধা ছিল। ওটা জান্নাতে চল্লিশ বছর ধরে ছিল। মিনাতে সাবীরের নিকট ওটাকে যবেহ করা হয়। এটা সেই ভেড়া যাকে হাবীল কুরবানী করেছিলেন। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, ঐ ভেড়াটির নাম ছিল জারীর। ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বলেন যে, ওটাকে মাকামে ইবরাহীমে যবেহ করা হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওটাকে মিনার নহরের স্থানে যবেহ করা হয়। বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নিজেকে কুরবানী করার মানত মানে এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে তাঁর কাছে ফতওয়া জিজ্ঞেস করে। তিনি তাকে একশটি উট কুরবানী করার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি বলতেনঃ “তাকে যদি আমি একটি মাত্র ভেড়া কুরবানী করতে বলতাম তাহলেও যথেষ্ট হতো। কেননা কুরআন কারীমে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইসমাঈল যাবীহুল্লাহ (আঃ)-এর ফিদিয়া ওটা দ্বারাই দেয়া হয়েছিল।”কেউ কেউ বলেন যে, ওটা পাহাড়ী ছাগল ছিল। কারো কারো মতে ওটা ছিল হরিণ।মুনসাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উসমান ইবনে তালহা (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “কা’বা ঘরে প্রবেশ করে আমি ভেড়ার শিং দেখেছি। কিন্তু ওটা তোমাকে ঢেকে রাখতে বলার কথা আমি ভুলে গেছি। যাও, ওটা ঢেকে দাও। কাবা ঘরে এমন কোন জিনিস থাকা ঠিক নয় যাতে নামাযীর নামাযে অসুবিধা সৃষ্টি হয়।” সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, ওটা কা'বা ঘরেই ছিল। পরবর্তীকালে কা'বা ঘরে আগুন লাগায় ওটা পুড়ে যায়। এর দ্বারাও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর কুরবানী হওয়ার প্রমাণ মিলে। কেননা, উক্ত শিং তখন থেকে নিয়ে ইসলামের আবির্ভাব পর্যন্ত কুরায়েশদের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে রক্ষিত ছিল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। অধ্যায়: প্রকৃত যাবীহ কে ছিলেন সে সম্পর্কে পূর্বযুগীয় গুরুজন হতে যেসব ‘আসার’ এসেছে সেগুলোর বর্ণনাঃ যারা দাবী করেন যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ), তাঁদের যুক্তি, যথাঃ হযরত আবু মায়সারা (রঃ) বলেন যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) মিসরের বাদশাহকে বলেনঃ “আপনি কি আমার সাথে খেতে চান? আমি হলাম ইউসুফ ইবনে ইয়াকূব ইবনে ইসহাক যাবীহুল্লাহ ইবনে ইবরাহীম খালীলুল্লাহ (আঃ)।”হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! মানুষরা মুখে মুখে হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ) এবং হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর মা’রূদের শপথ করে থাকে। এর কারণ কি?" উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “কারণ এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রত্যেকটি বিষয়ে আমাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। ইসহাক (আঃ) আমার পথে কুরবানী হওয়ার জন্যে নিজেকে আমার হাতে সমর্পণ করে। আর ইয়াকূব (আঃ)-কে আমি যতই বিপদাপদে নিপতিত করি, তার শুভ ধারণা ততই বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।”হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সামনে একদা এক ব্যক্তি তার পূর্বপুরুষের গৌরবের কথা বলাবলি করছিল। তিনি তাকে বললেনঃ “প্রকৃত গৌরবের অধিকারী হওয়ার যোগ্য হযরত ইউসুফ (আঃ)। কেননা, তিনি হচ্ছেন ইয়াকূব (আঃ) ইবনে ইসহাক যাবীহুল্লাহ (আঃ) ইবনে ইবরাহীম খালীলুল্লাহ (আঃ)-এর বংশধর।”ইকরামা (রঃ), ইবনে আব্বাস (রাঃ), আব্বাস (রাঃ), আলী (রাঃ), যায়েদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), শাবী (রঃ), উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ), যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ), আবদুল্লাহ ইবনে শাকীক (রঃ), কাসিম ইবনে আবি বুরযা (রঃ), মাকহুল (রঃ), উসমান ইবনে আবি হাযির (রঃ), সুদ্দী (রঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা (রঃ), আবূ হুয়েল (রঃ), ইবনে সাবিত (রঃ), কাবুল আহবার (রঃ) প্রমুখ গুরুজন এই মত পোষণ করেন যে, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসহাকই (আঃ) ছিলেন। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই মত গ্রহণ করেছেন। সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই আছে। তবে বাহ্যতঃ এটা জানা যায় যে, উক্ত মনীষীবৃন্দের উস্তাদ ছিলেন হযরত কা'বুল আহবার (রঃ)। তিনি হযরত উমার ফারূক (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি হযরত উমার (রাঃ)-কে প্রাচীন কিতাবগুলোর ঘটনা শুনাতেন। জনগণের মধ্যেও তিনি ঐ সব কথা বলতেন। তখন শুদ্ধ ও অশুদ্ধের পার্থক্য উঠে যায়। সঠিক কথা তো এই যে, এই জাতির জন্যে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের একটি কথারও প্রয়োজন নেই। ইমাম বাগাবী (রঃ) আরো কিছু সাহাবী ও তাবেয়ীর নাম সংযোজন করেছেন যাঁরা সবাই হযরত ইসহাক (আঃ)-কে যাবীহুল্লাহ বলতেন। একটি মারফু হাদীসেও এরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু হাদীসটি সহীহ হলে তো বিবাদের মীমাংসা হয়েই যেতো। আসলে হাদীসটি সহীহ নয়। কেননা, এর সনদে দুজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন। হাসান ইবনে দীনার পরিত্যক্ত এবং আলী ইবনে যায়েদ মুনকারুল হাদীস। আর সৰ্বাধিক সঠিক কথা এই যে, হাদীসটি মাওকুফ। কেননা, অন্য এক সনদে একথা হযরত আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে এবং এটাই বেশী সঠিক কথা। তবে সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।এখন ঐ সব ‘আসার’ বর্ণনা করা হচ্ছে যেগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)। আর এটাই অকাট্যরূপে সত্য।হযরত ইবনে আব্বাস বলেন যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)। ইয়াহূদীরা যে হযরত ইসহাক (আঃ)-কে যাবীহুল্লাহ বলেছে তা তারা ভুল বলেছে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), শা'বী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন মত প্রকাশ করেন যে, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল (আঃ) ছিলেন। হযরত শাবী (রঃ) বলেনঃ ‘যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ) এবং আমি কা'বা গৃহে ভেড়ার শিং দেখেছি।”মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে কুরবানী করার নির্দেশ দেন। উক্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছিলাম ইসহাক (আঃ)-এর, সে ছিল এক নবী, সৎকর্মশীলদের অন্যতম।” হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে পুত্র ইসহাক (আঃ)-এর জন্ম হওয়ার সুসংবাদ দেয়া হয়েছে এবং এর সাথে আরো বলা হয়েছে। যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্ম লাভ করবেন। সুতরাং হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর জন্মগ্রহণের পূর্বে তাঁকে কুরবানী করার হুকুম দেয়া কি করে সম্ভব? কেননা, এটা আল্লাহ তাআলার ওয়াদা যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর ঔরষে হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর জন্ম হবে। সুতরাং এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কেই কুরবানী দেয়ার হুকুম হয়েছিল, হযরত ইসহাক (আঃ)-কে নয়।হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ একথা আমি বহু লোককে বলতে শুনেছি। এ প্রসঙ্গে হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) বর্ণনা করেনঃ “এটা অতি পরিষ্কার প্রমাণ। আমিও জানতাম যে, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈলই (আঃ) ছিলেন। অতঃপর তিনি সিরিয়ার একজন ইয়াহূদী আলেমকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন যিনি মুসলমান হয়েছিলেন। উত্তরে ঐ আলেম বলেছিলেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! সত্য কথা এটাই যে, যাকে কুরবানী করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তিনি ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)। কিন্তু যেহেতু আরবরা ছিল তাঁর বংশধর, তাই এই মর্যাদা তাদের দিকেই, প্রত্যাবর্তিত হয়। এতে ইয়াহূদীরা হিংসায় জ্বলে ওঠে এবং হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নাম পরিবর্তন করে হযরত ইসহাক (আঃ)-এর নাম প্রবিষ্ট করে। এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। আমাদের ঈমান রয়েছে যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও হযরত ইসহাক (আঃ) উভয়েই ছিলেন সৎ, পবিত্র ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং আল্লাহর খাটি অনুগত বান্দা। কিতাবুয যুহদে বর্ণিত আছে যে, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-কে তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ্ (রঃ) এই মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “যাবীহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)।” হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), আবু তোফায়েল (রঃ), সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হাসান (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), শা’বী (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে আলী (রঃ), আবূ সালেহ (রঃ) প্রমুখ মনীষীবৃন্দ হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম বাগাবী (রঃ) আরো কিছু সাহাবী ও তাবেয়ীর নাম উল্লেখ করেছেন। এর স্বপক্ষে একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসও রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, সিরিয়ায় আমীর মু'আবিয়া (রাঃ)-এর সামনে যাবীহুল্লাহ কে ছিলেন এ প্রশ্ন উত্থাপিত হলে তিনি জবাবে বলেন, আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি এটা অবগত আছি। শুনুন, আমি একদা নবী (সঃ)-এর নিকটে ছিলাম এমন সময় একজন লোক এসে বলতে শুরু করলোঃ “হে আল্লাহর পথে উৎসর্গীকৃত দুই ব্যক্তির বংশের রাসূল (সঃ)! আমাকেও গানীমাতের মাল হতে কিছু প্রদান করুন!” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হাসলেন। হযরত মু'আবিয়া (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! ঐ যাবীহদ্বয় কারা?” তিনি জবাবে বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিতামহ আবদুল মুত্তালিব যখন যমযম কূপ খনন করেন তখন তিনি নযর মেনেছিলেন যে, যদি কাজটি সহজভাবে সমাপ্ত হয় তবে তিনি তাঁর একটি ছেলেকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করবেন। কাজটি সহজভাবে সমাপ্ত হলো। তখন কোন ছেলেকে কুরবানী করা যায় এটা নির্ণয় করার জন্যে তিনি লটারী করেন। লটারীতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিতা আবদুল্লাহর নাম উঠে। এ দেখে তাঁর নানারা এ কাজ করতে তাঁকে নিষেধ করলো এবং বললোঃ “তার বিনিময়ে একশটি উট কুরবানী করে দাও।” তিনি তাই করলেন। আর দ্বিতীয় যাবীহ হলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ), যা সর্বজন বিদিত।" তাফসীরে ইবনে জারীর ও মাগাযী উমুবীতে এ রিওয়াইয়াতটি বিদ্যমান রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত ইসহাক (আঃ) যাবীহুল্লাহ হওয়ার একটি দলীল এই পেশ করেছেন যে, যে (আরবী) বা সহনশীল ছেলের সুসংবাদের উল্লেখ রয়েছে তার দ্বারা হযরত ইসহাককেই (আঃ) বুঝানো হয়েছে। কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাকে এক জ্ঞানী ও বিজ্ঞ সন্তানের সুসংবাদ দিলো।”(৫১:২৮) আর হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর সুসংবাদের জবাব এই দিয়েছেন যে, তিনি তার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছে গিয়েছিলেন। আর সম্ভবতঃ হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর সাথেই আরো সন্তানও থেকে থাকবে। কা'বা ঘরে শিং থাকার ব্যাপারে বলেছেন। যে, ওটা কিনআন শহর হতে এনে এখানে রেখে দেয়া হয়েছে। কোন কোন লোক হযরত ইসহাক (আঃ)-এর কথা খোলাখুলিভাবেই বলেছেন। কিন্তু এসব কথা বাস্তবতা শূন্য। অবশ্য হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর যাবীহুল্লাহ হওয়ার ব্যাপারে মুহাম্মাদ ইবনে কাব কারাযীর (রঃ) প্রমাণ খুব স্পষ্ট ও সবল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রথমে যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর জন্ম লাভের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল এবং এরপর তাঁর ভাই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। সূরায়ে হৃদ ও সূরায়ে হিজরে এর বর্ণনা গত হয়েছে।(আরবী) শব্দটি হয়েছে, অর্থাৎ তিনি নবী হবেন সৎ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যাবীহ ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ) এবং এখানে নবুওয়াত হলো হযরত ইসহাক (আঃ)-এর সুসংবাদ। যেমন হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজ অনুগ্রহে তাকে দিলাম তার ভ্রাতা হারূন (আঃ)-কে নবীরূপে।"(১৯:৫৩) প্রকৃতপক্ষে হযরত হারূন (আঃ) হযরত মূসা (আঃ)-এর চেয়ে বড় ছিলেন। এখানে তাঁর নবুওয়াতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। সুতরাং এখানেও সুসংবাদ ঐ সময় দেয়া হয় যখন তিনি যবেহ-এর পরীক্ষায় ধৈর্যশীল প্রমাণিত হয়েছিলেন। এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, এ সুসংবাদ দুইবার প্রদান করা হয়েছে। প্রথমবার জন্মের পূর্বে এবং দ্বিতীয়বার নবুওয়াতের কিছু পূর্বে। এটা হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাকে বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাককেও (আঃ), তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক নিজেদের প্রতি স্পষ্ট অত্যাচারী। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “বলা হলো- হে নূহ (আঃ)! অবতরণ কর আমার দেয়া শান্তিসহ এবং তোমার প্রতি ও যেসব সম্প্রদায় তোমার সাথে আছে তাদের প্রতি কল্যাণসহ; অপর সম্প্রদায়সমূহকে জীবন উপভোগ করতে দিবো, পরে আমা হতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে স্পর্শ করবে।"(১১:৪৮)
আস-সাফফাত 37:100
৯৯-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ প্রদান করছেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়ের ঈমান আনয়ন হতে নিরাশ হয়ে গেলেন, কারণ তারা আল্লাহর ক্ষমতা প্রকাশক বহু নিদর্শন দেখার পরও ঈমান আনলো না, তখন তিনি সেখান থেকে হিজরত করে অন্যত্র চলে যেতে ইচ্ছা করে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে বললেনঃ “আমি আমার প্রতিপালকের দিকে চললাম। তিনি অবশ্যই আমাকে সৎপথে পরিচালিত করবেন। আর তিনি প্রার্থনা করলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন!” অর্থাৎ ঐ সন্তান যেন একত্ববাদে তাঁর সঙ্গী হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাকে এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।” ইনিই ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ), হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রথম সন্তান। বিশ্ব মুসলিম এর ঐকমত্যে তিনি হযরত ইসহাক (আঃ)-এর বড় ছিলেন। একথা আহলে কিতাবও মেনে থাকে। এমনকি তাদের কিতাবেও লিখিত আছে যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর জন্মের সময়। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বয়স ছিল ছিয়াশি বছর। আর হযরত ইসহাক (আঃ)-এর যখন জন্ম হয় তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বয়স নিরানব্বই বছরে পৌঁছেছিল। তাদেরই গ্রন্থে একথাও লিখিত রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে তার একমাত্র সন্তানকে কুরবানী করার হুকুম হয়েছিল। কিন্তু ইয়াহুদীরা হযরত ইসহাক (আঃ)-এর বংশধর এবং আরবরা হলো হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর, শুধু এই কারণেই তারা কুরবানীর মর্যাদা হযরত ইসমাঈল (আঃ) হতে সরিয়ে হযরত ইসহাক (আঃ)-কে প্রদান করেছে। আর অনর্থক ব্যাখ্যা করে আল্লাহর বাণীর পরিবর্তন সাধন করেছে। তারা একথাও বলেছেঃ “আমাদের কিতাবে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যার অর্থ একমাত্র সন্তান নয়, বরং এর অর্থ হলোঃ “যে তোমার নিকট বর্তমানে একাকী রয়েছে। এটা এজন্যেই যে, ঐ সময় হযরত ইসমাঈল (আঃ) মক্কায় তাঁর মায়ের কাছে ছিলেন এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট শুধুমাত্র হযরত ইসহাক (আঃ) ছিলেন।কিন্তু এটা সম্পূর্ণরূপে ভুল কথা। কেননা, ওকেই বলে যে একমাত্র সন্তান, যার আর কোন ভাই নেই। আর একথাও সত্য যে, যার একটি মাত্র সন্তান, আর তার পরে কোন সন্তান নেই তার প্রতি স্বাভাবিকভাবে মমতা বেশীই হয়ে থাকে। এজন্যে তাকে কুরবানী করার আদেশ দান পরীক্ষা করার একটি বিরাট হাতিয়ার। পূর্বযুগীয় কতক গুরুজন এমনকি কতক সাহাবীও (রাঃ) যে এ মত পোষণ করতেন যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ), এটা আমরা স্বীকার করি। কিন্তু এটা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাত সম্মত নয়। বরং এরূপ ধারণা করা যায় যে, তাঁরা বানী ইসরাঈলের কথাকে বিনা প্রমাণেই মেনে নিয়েছেন, এর পিছনে কোন যুক্তি তাঁরা অন্বেষণ করেননি। আমরা আল্লাহর কালাম দ্বারাই প্রমাণ করবো যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) ছিলেন যাবীহুল্লাহ। সুসংবাদে বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ সহনশীল সন্তান। অতঃপর কুরবানীর উল্লেখ রয়েছে। এসব বর্ণনা সমাপ্ত করার পর সৎ নবী হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ রয়েছে এবং তাঁর সম্পর্কে ফেরেশতারা (আরবী) বা বিজ্ঞ সন্তান বলেছেন। তারপর তার সুসংবাদের সাথে ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী) (১১:৭১) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশাতেই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবেন। আর এভাবেই তাঁর বংশ বৃদ্ধির সংবাদ প্রথমেই জানানো হয়। তাহলে তাঁকে যবেহ করার আদেশ কি প্রকারে সম্ভব হতে পারে? এটা আমরা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি। অবশ্য এখানে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে ধৈর্যশীল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং তা যবেহ করার কাজের সাথে অতি সামঞ্জস্যপূর্ণ।এখন হযরত ইসমাঈল (আঃ) বড় হলেন। এখন তিনি পিতার সাথে চলাফেরা করতে পারেন। ঐ সময় তিনি তাঁর মাতার সাথে ফারান নামক এলাকায় থাকতেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রায়ই সেখানে যাতায়াত করতেন। এ কথাও বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তথায় বুরাক নামক যানে যাওয়া আসা করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলৈনঃ এই বাক্যের অর্থ এও হতে পারে যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) ঐ সময় প্রায় যৌবনে পদার্পণ করেছিলেন এবং পিতার ন্যায় চলাফেরা করা ও কাজকর্ম করার যোগ্য হয়ে উঠেছিলেন। তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বপ্ন দেখেন যে, তিনি তাঁর প্রিয় সন্তানকে কুরবানী করছেন। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, নবীদের স্বপ্ন হলো অহী। অতঃপর তিনি। (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। একটি মার’ হাদীসেও এটা রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঘুমে নবীদের (আঃ) স্বপ্ন হলো অহী।” (এহানসটি মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে)আল্লাহর প্রিয় নবী হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানের পরীক্ষার জন্যে এবং এজন্যেও যে, হঠাৎ কুরবানীর কথা শুনে তিনি যেন হতবুদ্ধি না হয়ে পড়েন, নিজের মত ও সত্য স্বপ্ন তার সামনে প্রকাশ করলেন। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান উত্তর দিলেনঃ “পিতঃ! বিলম্ব করছেন কেন? একথা কি জিজ্ঞেস করতে হয়? যা করতে আদিষ্ট হয়েছেন তা সত্বর করে ফেলুন। ইনশাআল্লাহ আমি ধৈর্যধারণের মাধ্যমে আপনার বাসনা চরিতার্থ করবো।” তিনি যা বললেন তাই করে দেখালেন এবং তিনি প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী রূপে প্রমাণিত হলেন। এজন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “স্মরণ কর এই কিতাবে উল্লিখিত ইসমাঈল (আঃ)-এর কথা, সে ছিল প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী, এবং সে ছিল রাসূল, নবী। সে তার পরিজনবর্গকে নামায ও যাকাতের নির্দেশ দিতো এবং সে ছিল তার প্রতিপালকের সন্তোষজন।”(১৯:৫৪-৫৫)পিতা-পুত্র উভয়ে যখন একমত হলেন তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে মাটিতে কাত করে শায়িত করলেন বা অধোমুখে মাটিতে ফেলে দিলেন, যাতে যবেহ করার সময় প্রাণপ্রিয় সন্তানের মুখমণ্ডল দেখে মায়ার উদ্রেক না হয়। মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে একট বর্ণনা রয়েছে যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন শয়তান সামনে এসে হাযির হলো। কিন্তু তিনি শয়তানকে পিছনে ফেলে অগ্রসর হলেন। অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) সহ, জামরায়ে অকাবায় উপস্থিত হলেন। এখানেও শয়তান সামনে আসলে তার দিকে তিনি সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। তারপর তিনি জামরায়ে উসতার নিকট এসে পুনরায় শয়তানের দিকে সাতটি কংকর ছুঁড়লেন। অতঃপর সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে ছেলেকে মাটিতে শায়িত করলেন। ঐ সময় ছেলের গায়ে সাদা রঙ-এর চাদর ছিল। তিনি পিতাকে চাদরটি খুলে নিতে বললেন, যাতে ঐ চাদর দ্বারা তাঁর কাফনের কাজ হয়। এহেন অবস্থায় পিতা হয়ে পুত্রের দেহ অনাবৃত করা অতি বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে। এমন সময় শব্দ এলোঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তো স্বপ্নদেশ সত্যিই পালন করলে। তখন তিনি পিছনে ফিরে একটি দুম্বা দেখতে পেলেন, যার শিং ছিল বড় বড় এবং চক্ষুদ্বয় ছিল অতি সুন্দর।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এ জন্যেই আমরা কুরবানীর জন্যে এই প্রকারের দুম্বা মনোনীত করে থাকি।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর অপর এক বর্ণনায় হযরত ইসহাক (আঃ)-এর নাম উল্লিখিত রয়েছে। ফলে তাঁর বর্ণনায় দু’জনের নাম পাওয়া যায়। সুতরাং প্রথমটিই গ্রহণযোগ্য। ইনশাআল্লাহ এর প্রমাণ পেশ করা হবে।আল্লাহ তা'আলা কুরবানীর জন্যে একটি দুম্বা দান করলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা জান্নাতের দুম্বা ছিল। চল্লিশ বছর ধরে সেখানে পালিত হয়েছিল। এটা দেখে হযরত ইবরহীম (আঃ) পুত্রকে ছেড়ে দিয়ে সেই দিকে অগ্রসর হলেন। প্রথম জামরায় এসে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। শয়তান সেখান থেকে পালিয়ে জামরায়ে উসতায় আসলো। সেখানেও তিনি সাতটি কংকর হুঁড়লেন। আবার প্রথম জামরায় এসে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। সেখান হতে যবেহের স্থানে এসে দুষাটি কুরবানী করলেন। এটার মাথাসহ শিং কা’বার দেয়ালে লটকানো ছিল। পরে ওটা শুকিয়ে যায় এবং ইসলামের আবির্ভাব পর্যন্ত সেখানেই বিদ্যমান ছিল। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ও হযরত কা'ব (রাঃ) একত্রিত হন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) নবী (সঃ) হতে হাদীস বর্ণনা করছিলেন এবং হযরত কা'ব (রাঃ) আল্লাহর কিতাব হতে ঘটনা বর্ণনা করছিলেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবী (আঃ)-এর জন্যে একটি ককূলকৃত দুআ রয়েছে। আমার এই কবুলকৃত দু'আ আমি আমার উম্মতের শাফাআতের জন্যে গোপন রেখেছি যা কিয়ামতের দিন হবে।” হযরত কা'ব (রাঃ) তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি কি স্বয়ং এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছো?” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, আমি নিজেই শুনেছি।” তখন হযরত কা'ব (রাঃ) খুব খুশী হন এবং বলেনঃ “তোমার উপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গকৃত হোক অথবা নবী (সঃ)-এর উপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গকৃত হোক।” অতঃপর হযরত কা'ব (রাঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঘটনা শুনালেন। তিনি বর্ণনা করলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসহাক (আঃ)-কে যবেহ করার জন্যে প্রস্তুত হলেন তখন শয়তান (মনে মনে) বললোঃ “আমি যদি এ সময়ে এ কাজ থেকে তাঁকে টলাতে না পারি তবে আমাকে এ জন্যে সারা জীবন নিরাশ থাকতে হবে। প্রথমে সে হযরত সারার নিকট গেল এবং তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার স্বামী তোমার পুত্রকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা জান কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হয়তো নিজের কোন কাজের জন্যে। নিয়ে যাচ্ছেন।” সে বললোঃ “না, না, বরং তাকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছেন।” হযরত সারা বললেন:“তিনি নিজের পুত্রকে যবেহ করবেন এটা কি সম্ভব?” অভিশপ্ত শয়তান জবাব দিলোঃ “তোমার স্বামী বলেন কি জান? তাঁকে নাকি আল্লাহ এই নির্দেশ দিয়েছেন!” হযরত সারা তখন বললেনঃ “তাকে যদি আল্লাহ নির্দেশ দিয়ে থাকেন তবে তিনি ঠিকই করছেন। আল্লাহর হুকুম পালন করে তিনি ফিরে আসবেন।” সে এখানে ব্যর্থ হয়ে হযরত ইসহাক (আঃ)-এর নিকট গেল এবং তাকে বললোঃ “তোমাকে তোমার আব্বা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা জান কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হয়তো কোন কাজের জন্যে কোন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন।” শয়তান বললোঃ “না, বরং তোমাকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছেন।” হযরত ইসহাক (আঃ) বললেনঃ “এটা কি করে সম্ভব?” শয়তান। বললোঃ “তোমাকে যবেহ করতে নাকি আল্লাহ তাকে আদেশ করেছেন।” তখন হযরত ইসহাক (আঃ) বললেনঃ “আল্লাহর কসম! যদি সত্যি আল্লাহ আমাকে যবেহ করতে তাঁকে নির্দেশ দিয়ে থাকেন তবে তো তাড়াতাড়ি তার এ কাজ করা উচিত।”শয়তান এখানেও নিরাশ হয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট গিয়ে বললোঃ “ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “প্রয়োজনীয় কাজে যাচ্ছি।” শয়তান বললোঃ “না, তা নয়। বরং তাকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছে।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) বললেনঃ “তাকে আমি কেন যবেহ করবো?” শয়তান জবাব দিলোঃ “হয়তো আপনার প্রতিপালক আপনাকে এ কাজে আদেশ করেছেন। তিনি তখন বললেনঃ “আমার প্রতিপালক যদি আমাকে আদেশ করেই থাকেন তবে আমি তা করবোই।" ফলে শয়তান এখানেও নিরাশ হয়ে গেল। অপর এক বর্ণনায় বলা হয় যে, এই সব ঘটনার পর মহান আল্লাহ হযরত ইসহাক (আঃ)-কে বললেনঃ “তুমি আমার নিকট যে দু'আ করবে আমি তা ককূল করবো।” হযরত ইসহাক (আঃ) তখন দু'আ করলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! যারা আপনার সাথে কোন শরীক স্থাপন করবে না তাদেরকে আপনি জান্নাত দান করুন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বর্ণনা করেনঃ “দু'টি বিষয় আমার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। একটি হলো এই যে, আমার অর্ধেক উম্মতকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর দ্বিতীয় হলো এই যে, আমাকে শাফাআত করার অধিকার দেয়া হবে। অমি শাফাআত করাকেই প্রাধান্য দিলাম, এই আশায় যে, ওটা সাধারণ হবে। হ্যা, তবে একটি দু'আ ছিল যে, আমি ওটাই করতাম। কিন্তু আমার পূর্বেই আল্লাহর এক সৎ বান্দা তা করে ফেলেছেন। ঘটনা এই যে, যখন হযরত ইসহাক (আঃ) যবেহ-এর বিপদ হতে মুক্তি পেলেন তখন তাঁকে বলা হলোঃ “আমার নিকট চাও, যা চাইবে তাই আমি দিবো।” তখন হযরত ইসহাক (আঃ) বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! শয়তান ধোকা দেয়ার পূর্বেই আমি তা চাইবো। হে আল্লাহ! যে আপনার সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করবে তাকে আপনি জান্নাতে প্রবিষ্ট করুন!” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। এর সনদ গারীব ও মুনকার। আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম নামক এর একজন বর্ণনাকারী দুর্বল। আর আমার তো এই ভয়ও হয় যে, “যখন আল্লাহ হযরত ইসহাক (আঃ)-কে বললেন ... শেষ পর্যন্ত এ কথাগুলো তার নিজের কথা, যেগুলো তিনি হাদীসের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। যাবীহুল্লাহ তো ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ) এবং যবেহ-এর স্থান তো মিনা, যা মক্কায় অবস্থিত এবং হযরত ইসমাঈল (আঃ) মক্কাতেই ছিলেন, হযরত ইসহাক (আঃ) নন, তিনি তো ছিলেন সিরিয়ার কিন’আন শহরে)মহান আল্লাহ বলেনঃ “যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পুত্র (ইসমাঈল আঃ)-কে কাত করে শায়িত করলেন তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললামঃ হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তো স্বপ্নদেশ সত্যিই পালন করলে!” হযরত সুদ্দী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর গলায় ছুরি চালাতে শুরু করলেন তখন গলা তামা হয়ে গেল, ফলে ছুরি চললো না ও গলা কাটলো না। ঐ সময় (আরবী) এই শব্দ আসলো।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। অর্থাৎ তাদেরকে কঠিন বিপদ থেকে উদ্ধার করে থাকি। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার পরিত্রাণের উপায় বের করে দেন এবং তাকে এমনভাবে রিযক দান করে থাকেন যে, ওটা তার ধারণা বা কল্পনাও থাকে না। আল্লাহর উপর ভরসাকারীর জন্যে তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পুরো করেই থাকেন এবং প্রত্যেক জিনিসেরই তিনি পরিমাপ নির্ধারণ করে রেখেছেন।”(৬৫:২-৩)এই আয়াত দ্বারা আলেমগণ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কাজের উপর ক্ষমতা লাভের পূর্বেই হুকুম রহিত হয়ে যায়। অবশ্য মু'তাযিলা সম্প্রদায় এটা মানে না। দলীল গ্রহণের কারণ প্রকাশমান। কেননা, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তিনি যেন তার পুত্রকে কুরবানী করেন। অতঃপর যবেহ করার। পূর্বেই ফিদিয়ার মাধ্যমে এ হুকুম রহিত করে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল এটাই যে, তাকে ধৈর্য ও আদিষ্ট কাজ প্রতিপালনে সদা প্রস্তুত থাকার উপর বিনিময় প্রদান করা হবে। এজন্যেই ইরশাদ হয়েছেঃ “নিশ্চয়ই এটা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। একদিকে হুকুম এবং অপরদিকে তা প্রতিপালন। এজন্যেই মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রশংসায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ ইবরাহীম (আঃ), যে পালন করেছিল তার দায়িত্ব।”(৫৩:৩৭)হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, যে ফিদিয়া দান করা হয়েছিল তার রঙ ছিল সাদা, চক্ষু বড় এবং বড় শিং বিশিষ্ট উৎকৃষ্ট খাদ্যে প্রতিপালিত ভেড়া। যা সাবীর’ নামক স্থানে বাবুল বৃক্ষে বাঁধা ছিল। ওটা জান্নাতে চল্লিশ বছর ধরে ছিল। মিনাতে সাবীরের নিকট ওটাকে যবেহ করা হয়। এটা সেই ভেড়া যাকে হাবীল কুরবানী করেছিলেন। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, ঐ ভেড়াটির নাম ছিল জারীর। ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বলেন যে, ওটাকে মাকামে ইবরাহীমে যবেহ করা হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওটাকে মিনার নহরের স্থানে যবেহ করা হয়। বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নিজেকে কুরবানী করার মানত মানে এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে তাঁর কাছে ফতওয়া জিজ্ঞেস করে। তিনি তাকে একশটি উট কুরবানী করার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি বলতেনঃ “তাকে যদি আমি একটি মাত্র ভেড়া কুরবানী করতে বলতাম তাহলেও যথেষ্ট হতো। কেননা কুরআন কারীমে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইসমাঈল যাবীহুল্লাহ (আঃ)-এর ফিদিয়া ওটা দ্বারাই দেয়া হয়েছিল।”কেউ কেউ বলেন যে, ওটা পাহাড়ী ছাগল ছিল। কারো কারো মতে ওটা ছিল হরিণ।মুনসাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উসমান ইবনে তালহা (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “কা’বা ঘরে প্রবেশ করে আমি ভেড়ার শিং দেখেছি। কিন্তু ওটা তোমাকে ঢেকে রাখতে বলার কথা আমি ভুলে গেছি। যাও, ওটা ঢেকে দাও। কাবা ঘরে এমন কোন জিনিস থাকা ঠিক নয় যাতে নামাযীর নামাযে অসুবিধা সৃষ্টি হয়।” সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, ওটা কা'বা ঘরেই ছিল। পরবর্তীকালে কা'বা ঘরে আগুন লাগায় ওটা পুড়ে যায়। এর দ্বারাও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর কুরবানী হওয়ার প্রমাণ মিলে। কেননা, উক্ত শিং তখন থেকে নিয়ে ইসলামের আবির্ভাব পর্যন্ত কুরায়েশদের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে রক্ষিত ছিল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। অধ্যায়: প্রকৃত যাবীহ কে ছিলেন সে সম্পর্কে পূর্বযুগীয় গুরুজন হতে যেসব ‘আসার’ এসেছে সেগুলোর বর্ণনাঃ যারা দাবী করেন যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ), তাঁদের যুক্তি, যথাঃ হযরত আবু মায়সারা (রঃ) বলেন যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) মিসরের বাদশাহকে বলেনঃ “আপনি কি আমার সাথে খেতে চান? আমি হলাম ইউসুফ ইবনে ইয়াকূব ইবনে ইসহাক যাবীহুল্লাহ ইবনে ইবরাহীম খালীলুল্লাহ (আঃ)।”হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! মানুষরা মুখে মুখে হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ) এবং হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর মা’রূদের শপথ করে থাকে। এর কারণ কি?" উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “কারণ এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রত্যেকটি বিষয়ে আমাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। ইসহাক (আঃ) আমার পথে কুরবানী হওয়ার জন্যে নিজেকে আমার হাতে সমর্পণ করে। আর ইয়াকূব (আঃ)-কে আমি যতই বিপদাপদে নিপতিত করি, তার শুভ ধারণা ততই বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।”হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সামনে একদা এক ব্যক্তি তার পূর্বপুরুষের গৌরবের কথা বলাবলি করছিল। তিনি তাকে বললেনঃ “প্রকৃত গৌরবের অধিকারী হওয়ার যোগ্য হযরত ইউসুফ (আঃ)। কেননা, তিনি হচ্ছেন ইয়াকূব (আঃ) ইবনে ইসহাক যাবীহুল্লাহ (আঃ) ইবনে ইবরাহীম খালীলুল্লাহ (আঃ)-এর বংশধর।”ইকরামা (রঃ), ইবনে আব্বাস (রাঃ), আব্বাস (রাঃ), আলী (রাঃ), যায়েদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), শাবী (রঃ), উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ), যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ), আবদুল্লাহ ইবনে শাকীক (রঃ), কাসিম ইবনে আবি বুরযা (রঃ), মাকহুল (রঃ), উসমান ইবনে আবি হাযির (রঃ), সুদ্দী (রঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা (রঃ), আবূ হুয়েল (রঃ), ইবনে সাবিত (রঃ), কাবুল আহবার (রঃ) প্রমুখ গুরুজন এই মত পোষণ করেন যে, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসহাকই (আঃ) ছিলেন। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই মত গ্রহণ করেছেন। সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই আছে। তবে বাহ্যতঃ এটা জানা যায় যে, উক্ত মনীষীবৃন্দের উস্তাদ ছিলেন হযরত কা'বুল আহবার (রঃ)। তিনি হযরত উমার ফারূক (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি হযরত উমার (রাঃ)-কে প্রাচীন কিতাবগুলোর ঘটনা শুনাতেন। জনগণের মধ্যেও তিনি ঐ সব কথা বলতেন। তখন শুদ্ধ ও অশুদ্ধের পার্থক্য উঠে যায়। সঠিক কথা তো এই যে, এই জাতির জন্যে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের একটি কথারও প্রয়োজন নেই। ইমাম বাগাবী (রঃ) আরো কিছু সাহাবী ও তাবেয়ীর নাম সংযোজন করেছেন যাঁরা সবাই হযরত ইসহাক (আঃ)-কে যাবীহুল্লাহ বলতেন। একটি মারফু হাদীসেও এরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু হাদীসটি সহীহ হলে তো বিবাদের মীমাংসা হয়েই যেতো। আসলে হাদীসটি সহীহ নয়। কেননা, এর সনদে দুজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন। হাসান ইবনে দীনার পরিত্যক্ত এবং আলী ইবনে যায়েদ মুনকারুল হাদীস। আর সৰ্বাধিক সঠিক কথা এই যে, হাদীসটি মাওকুফ। কেননা, অন্য এক সনদে একথা হযরত আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে এবং এটাই বেশী সঠিক কথা। তবে সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।এখন ঐ সব ‘আসার’ বর্ণনা করা হচ্ছে যেগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)। আর এটাই অকাট্যরূপে সত্য।হযরত ইবনে আব্বাস বলেন যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)। ইয়াহূদীরা যে হযরত ইসহাক (আঃ)-কে যাবীহুল্লাহ বলেছে তা তারা ভুল বলেছে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), শা'বী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন মত প্রকাশ করেন যে, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল (আঃ) ছিলেন। হযরত শাবী (রঃ) বলেনঃ ‘যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ) এবং আমি কা'বা গৃহে ভেড়ার শিং দেখেছি।”মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে কুরবানী করার নির্দেশ দেন। উক্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছিলাম ইসহাক (আঃ)-এর, সে ছিল এক নবী, সৎকর্মশীলদের অন্যতম।” হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে পুত্র ইসহাক (আঃ)-এর জন্ম হওয়ার সুসংবাদ দেয়া হয়েছে এবং এর সাথে আরো বলা হয়েছে। যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্ম লাভ করবেন। সুতরাং হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর জন্মগ্রহণের পূর্বে তাঁকে কুরবানী করার হুকুম দেয়া কি করে সম্ভব? কেননা, এটা আল্লাহ তাআলার ওয়াদা যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর ঔরষে হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর জন্ম হবে। সুতরাং এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কেই কুরবানী দেয়ার হুকুম হয়েছিল, হযরত ইসহাক (আঃ)-কে নয়।হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ একথা আমি বহু লোককে বলতে শুনেছি। এ প্রসঙ্গে হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) বর্ণনা করেনঃ “এটা অতি পরিষ্কার প্রমাণ। আমিও জানতাম যে, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈলই (আঃ) ছিলেন। অতঃপর তিনি সিরিয়ার একজন ইয়াহূদী আলেমকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন যিনি মুসলমান হয়েছিলেন। উত্তরে ঐ আলেম বলেছিলেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! সত্য কথা এটাই যে, যাকে কুরবানী করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তিনি ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)। কিন্তু যেহেতু আরবরা ছিল তাঁর বংশধর, তাই এই মর্যাদা তাদের দিকেই, প্রত্যাবর্তিত হয়। এতে ইয়াহূদীরা হিংসায় জ্বলে ওঠে এবং হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নাম পরিবর্তন করে হযরত ইসহাক (আঃ)-এর নাম প্রবিষ্ট করে। এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। আমাদের ঈমান রয়েছে যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও হযরত ইসহাক (আঃ) উভয়েই ছিলেন সৎ, পবিত্র ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং আল্লাহর খাটি অনুগত বান্দা। কিতাবুয যুহদে বর্ণিত আছে যে, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-কে তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ্ (রঃ) এই মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “যাবীহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)।” হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), আবু তোফায়েল (রঃ), সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হাসান (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), শা’বী (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে আলী (রঃ), আবূ সালেহ (রঃ) প্রমুখ মনীষীবৃন্দ হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম বাগাবী (রঃ) আরো কিছু সাহাবী ও তাবেয়ীর নাম উল্লেখ করেছেন। এর স্বপক্ষে একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসও রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, সিরিয়ায় আমীর মু'আবিয়া (রাঃ)-এর সামনে যাবীহুল্লাহ কে ছিলেন এ প্রশ্ন উত্থাপিত হলে তিনি জবাবে বলেন, আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি এটা অবগত আছি। শুনুন, আমি একদা নবী (সঃ)-এর নিকটে ছিলাম এমন সময় একজন লোক এসে বলতে শুরু করলোঃ “হে আল্লাহর পথে উৎসর্গীকৃত দুই ব্যক্তির বংশের রাসূল (সঃ)! আমাকেও গানীমাতের মাল হতে কিছু প্রদান করুন!” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হাসলেন। হযরত মু'আবিয়া (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! ঐ যাবীহদ্বয় কারা?” তিনি জবাবে বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিতামহ আবদুল মুত্তালিব যখন যমযম কূপ খনন করেন তখন তিনি নযর মেনেছিলেন যে, যদি কাজটি সহজভাবে সমাপ্ত হয় তবে তিনি তাঁর একটি ছেলেকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করবেন। কাজটি সহজভাবে সমাপ্ত হলো। তখন কোন ছেলেকে কুরবানী করা যায় এটা নির্ণয় করার জন্যে তিনি লটারী করেন। লটারীতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিতা আবদুল্লাহর নাম উঠে। এ দেখে তাঁর নানারা এ কাজ করতে তাঁকে নিষেধ করলো এবং বললোঃ “তার বিনিময়ে একশটি উট কুরবানী করে দাও।” তিনি তাই করলেন। আর দ্বিতীয় যাবীহ হলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ), যা সর্বজন বিদিত।" তাফসীরে ইবনে জারীর ও মাগাযী উমুবীতে এ রিওয়াইয়াতটি বিদ্যমান রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত ইসহাক (আঃ) যাবীহুল্লাহ হওয়ার একটি দলীল এই পেশ করেছেন যে, যে (আরবী) বা সহনশীল ছেলের সুসংবাদের উল্লেখ রয়েছে তার দ্বারা হযরত ইসহাককেই (আঃ) বুঝানো হয়েছে। কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাকে এক জ্ঞানী ও বিজ্ঞ সন্তানের সুসংবাদ দিলো।”(৫১:২৮) আর হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর সুসংবাদের জবাব এই দিয়েছেন যে, তিনি তার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছে গিয়েছিলেন। আর সম্ভবতঃ হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর সাথেই আরো সন্তানও থেকে থাকবে। কা'বা ঘরে শিং থাকার ব্যাপারে বলেছেন। যে, ওটা কিনআন শহর হতে এনে এখানে রেখে দেয়া হয়েছে। কোন কোন লোক হযরত ইসহাক (আঃ)-এর কথা খোলাখুলিভাবেই বলেছেন। কিন্তু এসব কথা বাস্তবতা শূন্য। অবশ্য হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর যাবীহুল্লাহ হওয়ার ব্যাপারে মুহাম্মাদ ইবনে কাব কারাযীর (রঃ) প্রমাণ খুব স্পষ্ট ও সবল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রথমে যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর জন্ম লাভের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল এবং এরপর তাঁর ভাই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। সূরায়ে হৃদ ও সূরায়ে হিজরে এর বর্ণনা গত হয়েছে।(আরবী) শব্দটি হয়েছে, অর্থাৎ তিনি নবী হবেন সৎ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যাবীহ ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ) এবং এখানে নবুওয়াত হলো হযরত ইসহাক (আঃ)-এর সুসংবাদ। যেমন হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজ অনুগ্রহে তাকে দিলাম তার ভ্রাতা হারূন (আঃ)-কে নবীরূপে।"(১৯:৫৩) প্রকৃতপক্ষে হযরত হারূন (আঃ) হযরত মূসা (আঃ)-এর চেয়ে বড় ছিলেন। এখানে তাঁর নবুওয়াতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। সুতরাং এখানেও সুসংবাদ ঐ সময় দেয়া হয় যখন তিনি যবেহ-এর পরীক্ষায় ধৈর্যশীল প্রমাণিত হয়েছিলেন। এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, এ সুসংবাদ দুইবার প্রদান করা হয়েছে। প্রথমবার জন্মের পূর্বে এবং দ্বিতীয়বার নবুওয়াতের কিছু পূর্বে। এটা হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাকে বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাককেও (আঃ), তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক নিজেদের প্রতি স্পষ্ট অত্যাচারী। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “বলা হলো- হে নূহ (আঃ)! অবতরণ কর আমার দেয়া শান্তিসহ এবং তোমার প্রতি ও যেসব সম্প্রদায় তোমার সাথে আছে তাদের প্রতি কল্যাণসহ; অপর সম্প্রদায়সমূহকে জীবন উপভোগ করতে দিবো, পরে আমা হতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে স্পর্শ করবে।"(১১:৪৮)
আস-সাফফাত 37:101
৯৯-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ প্রদান করছেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়ের ঈমান আনয়ন হতে নিরাশ হয়ে গেলেন, কারণ তারা আল্লাহর ক্ষমতা প্রকাশক বহু নিদর্শন দেখার পরও ঈমান আনলো না, তখন তিনি সেখান থেকে হিজরত করে অন্যত্র চলে যেতে ইচ্ছা করে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে বললেনঃ “আমি আমার প্রতিপালকের দিকে চললাম। তিনি অবশ্যই আমাকে সৎপথে পরিচালিত করবেন। আর তিনি প্রার্থনা করলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন!” অর্থাৎ ঐ সন্তান যেন একত্ববাদে তাঁর সঙ্গী হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাকে এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।” ইনিই ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ), হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রথম সন্তান। বিশ্ব মুসলিম এর ঐকমত্যে তিনি হযরত ইসহাক (আঃ)-এর বড় ছিলেন। একথা আহলে কিতাবও মেনে থাকে। এমনকি তাদের কিতাবেও লিখিত আছে যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর জন্মের সময়। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বয়স ছিল ছিয়াশি বছর। আর হযরত ইসহাক (আঃ)-এর যখন জন্ম হয় তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বয়স নিরানব্বই বছরে পৌঁছেছিল। তাদেরই গ্রন্থে একথাও লিখিত রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে তার একমাত্র সন্তানকে কুরবানী করার হুকুম হয়েছিল। কিন্তু ইয়াহুদীরা হযরত ইসহাক (আঃ)-এর বংশধর এবং আরবরা হলো হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর, শুধু এই কারণেই তারা কুরবানীর মর্যাদা হযরত ইসমাঈল (আঃ) হতে সরিয়ে হযরত ইসহাক (আঃ)-কে প্রদান করেছে। আর অনর্থক ব্যাখ্যা করে আল্লাহর বাণীর পরিবর্তন সাধন করেছে। তারা একথাও বলেছেঃ “আমাদের কিতাবে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যার অর্থ একমাত্র সন্তান নয়, বরং এর অর্থ হলোঃ “যে তোমার নিকট বর্তমানে একাকী রয়েছে। এটা এজন্যেই যে, ঐ সময় হযরত ইসমাঈল (আঃ) মক্কায় তাঁর মায়ের কাছে ছিলেন এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট শুধুমাত্র হযরত ইসহাক (আঃ) ছিলেন।কিন্তু এটা সম্পূর্ণরূপে ভুল কথা। কেননা, ওকেই বলে যে একমাত্র সন্তান, যার আর কোন ভাই নেই। আর একথাও সত্য যে, যার একটি মাত্র সন্তান, আর তার পরে কোন সন্তান নেই তার প্রতি স্বাভাবিকভাবে মমতা বেশীই হয়ে থাকে। এজন্যে তাকে কুরবানী করার আদেশ দান পরীক্ষা করার একটি বিরাট হাতিয়ার। পূর্বযুগীয় কতক গুরুজন এমনকি কতক সাহাবীও (রাঃ) যে এ মত পোষণ করতেন যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ), এটা আমরা স্বীকার করি। কিন্তু এটা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাত সম্মত নয়। বরং এরূপ ধারণা করা যায় যে, তাঁরা বানী ইসরাঈলের কথাকে বিনা প্রমাণেই মেনে নিয়েছেন, এর পিছনে কোন যুক্তি তাঁরা অন্বেষণ করেননি। আমরা আল্লাহর কালাম দ্বারাই প্রমাণ করবো যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) ছিলেন যাবীহুল্লাহ। সুসংবাদে বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ সহনশীল সন্তান। অতঃপর কুরবানীর উল্লেখ রয়েছে। এসব বর্ণনা সমাপ্ত করার পর সৎ নবী হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ রয়েছে এবং তাঁর সম্পর্কে ফেরেশতারা (আরবী) বা বিজ্ঞ সন্তান বলেছেন। তারপর তার সুসংবাদের সাথে ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী) (১১:৭১) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশাতেই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবেন। আর এভাবেই তাঁর বংশ বৃদ্ধির সংবাদ প্রথমেই জানানো হয়। তাহলে তাঁকে যবেহ করার আদেশ কি প্রকারে সম্ভব হতে পারে? এটা আমরা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি। অবশ্য এখানে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে ধৈর্যশীল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং তা যবেহ করার কাজের সাথে অতি সামঞ্জস্যপূর্ণ।এখন হযরত ইসমাঈল (আঃ) বড় হলেন। এখন তিনি পিতার সাথে চলাফেরা করতে পারেন। ঐ সময় তিনি তাঁর মাতার সাথে ফারান নামক এলাকায় থাকতেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রায়ই সেখানে যাতায়াত করতেন। এ কথাও বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তথায় বুরাক নামক যানে যাওয়া আসা করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলৈনঃ এই বাক্যের অর্থ এও হতে পারে যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) ঐ সময় প্রায় যৌবনে পদার্পণ করেছিলেন এবং পিতার ন্যায় চলাফেরা করা ও কাজকর্ম করার যোগ্য হয়ে উঠেছিলেন। তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বপ্ন দেখেন যে, তিনি তাঁর প্রিয় সন্তানকে কুরবানী করছেন। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, নবীদের স্বপ্ন হলো অহী। অতঃপর তিনি। (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। একটি মার’ হাদীসেও এটা রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঘুমে নবীদের (আঃ) স্বপ্ন হলো অহী।” (এহানসটি মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে)আল্লাহর প্রিয় নবী হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানের পরীক্ষার জন্যে এবং এজন্যেও যে, হঠাৎ কুরবানীর কথা শুনে তিনি যেন হতবুদ্ধি না হয়ে পড়েন, নিজের মত ও সত্য স্বপ্ন তার সামনে প্রকাশ করলেন। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান উত্তর দিলেনঃ “পিতঃ! বিলম্ব করছেন কেন? একথা কি জিজ্ঞেস করতে হয়? যা করতে আদিষ্ট হয়েছেন তা সত্বর করে ফেলুন। ইনশাআল্লাহ আমি ধৈর্যধারণের মাধ্যমে আপনার বাসনা চরিতার্থ করবো।” তিনি যা বললেন তাই করে দেখালেন এবং তিনি প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী রূপে প্রমাণিত হলেন। এজন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “স্মরণ কর এই কিতাবে উল্লিখিত ইসমাঈল (আঃ)-এর কথা, সে ছিল প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী, এবং সে ছিল রাসূল, নবী। সে তার পরিজনবর্গকে নামায ও যাকাতের নির্দেশ দিতো এবং সে ছিল তার প্রতিপালকের সন্তোষজন।”(১৯:৫৪-৫৫)পিতা-পুত্র উভয়ে যখন একমত হলেন তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে মাটিতে কাত করে শায়িত করলেন বা অধোমুখে মাটিতে ফেলে দিলেন, যাতে যবেহ করার সময় প্রাণপ্রিয় সন্তানের মুখমণ্ডল দেখে মায়ার উদ্রেক না হয়। মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে একট বর্ণনা রয়েছে যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন শয়তান সামনে এসে হাযির হলো। কিন্তু তিনি শয়তানকে পিছনে ফেলে অগ্রসর হলেন। অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) সহ, জামরায়ে অকাবায় উপস্থিত হলেন। এখানেও শয়তান সামনে আসলে তার দিকে তিনি সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। তারপর তিনি জামরায়ে উসতার নিকট এসে পুনরায় শয়তানের দিকে সাতটি কংকর ছুঁড়লেন। অতঃপর সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে ছেলেকে মাটিতে শায়িত করলেন। ঐ সময় ছেলের গায়ে সাদা রঙ-এর চাদর ছিল। তিনি পিতাকে চাদরটি খুলে নিতে বললেন, যাতে ঐ চাদর দ্বারা তাঁর কাফনের কাজ হয়। এহেন অবস্থায় পিতা হয়ে পুত্রের দেহ অনাবৃত করা অতি বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে। এমন সময় শব্দ এলোঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তো স্বপ্নদেশ সত্যিই পালন করলে। তখন তিনি পিছনে ফিরে একটি দুম্বা দেখতে পেলেন, যার শিং ছিল বড় বড় এবং চক্ষুদ্বয় ছিল অতি সুন্দর।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এ জন্যেই আমরা কুরবানীর জন্যে এই প্রকারের দুম্বা মনোনীত করে থাকি।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর অপর এক বর্ণনায় হযরত ইসহাক (আঃ)-এর নাম উল্লিখিত রয়েছে। ফলে তাঁর বর্ণনায় দু’জনের নাম পাওয়া যায়। সুতরাং প্রথমটিই গ্রহণযোগ্য। ইনশাআল্লাহ এর প্রমাণ পেশ করা হবে।আল্লাহ তা'আলা কুরবানীর জন্যে একটি দুম্বা দান করলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা জান্নাতের দুম্বা ছিল। চল্লিশ বছর ধরে সেখানে পালিত হয়েছিল। এটা দেখে হযরত ইবরহীম (আঃ) পুত্রকে ছেড়ে দিয়ে সেই দিকে অগ্রসর হলেন। প্রথম জামরায় এসে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। শয়তান সেখান থেকে পালিয়ে জামরায়ে উসতায় আসলো। সেখানেও তিনি সাতটি কংকর হুঁড়লেন। আবার প্রথম জামরায় এসে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। সেখান হতে যবেহের স্থানে এসে দুষাটি কুরবানী করলেন। এটার মাথাসহ শিং কা’বার দেয়ালে লটকানো ছিল। পরে ওটা শুকিয়ে যায় এবং ইসলামের আবির্ভাব পর্যন্ত সেখানেই বিদ্যমান ছিল। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ও হযরত কা'ব (রাঃ) একত্রিত হন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) নবী (সঃ) হতে হাদীস বর্ণনা করছিলেন এবং হযরত কা'ব (রাঃ) আল্লাহর কিতাব হতে ঘটনা বর্ণনা করছিলেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবী (আঃ)-এর জন্যে একটি ককূলকৃত দুআ রয়েছে। আমার এই কবুলকৃত দু'আ আমি আমার উম্মতের শাফাআতের জন্যে গোপন রেখেছি যা কিয়ামতের দিন হবে।” হযরত কা'ব (রাঃ) তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি কি স্বয়ং এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছো?” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, আমি নিজেই শুনেছি।” তখন হযরত কা'ব (রাঃ) খুব খুশী হন এবং বলেনঃ “তোমার উপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গকৃত হোক অথবা নবী (সঃ)-এর উপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গকৃত হোক।” অতঃপর হযরত কা'ব (রাঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঘটনা শুনালেন। তিনি বর্ণনা করলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসহাক (আঃ)-কে যবেহ করার জন্যে প্রস্তুত হলেন তখন শয়তান (মনে মনে) বললোঃ “আমি যদি এ সময়ে এ কাজ থেকে তাঁকে টলাতে না পারি তবে আমাকে এ জন্যে সারা জীবন নিরাশ থাকতে হবে। প্রথমে সে হযরত সারার নিকট গেল এবং তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার স্বামী তোমার পুত্রকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা জান কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হয়তো নিজের কোন কাজের জন্যে। নিয়ে যাচ্ছেন।” সে বললোঃ “না, না, বরং তাকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছেন।” হযরত সারা বললেন:“তিনি নিজের পুত্রকে যবেহ করবেন এটা কি সম্ভব?” অভিশপ্ত শয়তান জবাব দিলোঃ “তোমার স্বামী বলেন কি জান? তাঁকে নাকি আল্লাহ এই নির্দেশ দিয়েছেন!” হযরত সারা তখন বললেনঃ “তাকে যদি আল্লাহ নির্দেশ দিয়ে থাকেন তবে তিনি ঠিকই করছেন। আল্লাহর হুকুম পালন করে তিনি ফিরে আসবেন।” সে এখানে ব্যর্থ হয়ে হযরত ইসহাক (আঃ)-এর নিকট গেল এবং তাকে বললোঃ “তোমাকে তোমার আব্বা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা জান কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হয়তো কোন কাজের জন্যে কোন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন।” শয়তান বললোঃ “না, বরং তোমাকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছেন।” হযরত ইসহাক (আঃ) বললেনঃ “এটা কি করে সম্ভব?” শয়তান। বললোঃ “তোমাকে যবেহ করতে নাকি আল্লাহ তাকে আদেশ করেছেন।” তখন হযরত ইসহাক (আঃ) বললেনঃ “আল্লাহর কসম! যদি সত্যি আল্লাহ আমাকে যবেহ করতে তাঁকে নির্দেশ দিয়ে থাকেন তবে তো তাড়াতাড়ি তার এ কাজ করা উচিত।”শয়তান এখানেও নিরাশ হয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট গিয়ে বললোঃ “ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “প্রয়োজনীয় কাজে যাচ্ছি।” শয়তান বললোঃ “না, তা নয়। বরং তাকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছে।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) বললেনঃ “তাকে আমি কেন যবেহ করবো?” শয়তান জবাব দিলোঃ “হয়তো আপনার প্রতিপালক আপনাকে এ কাজে আদেশ করেছেন। তিনি তখন বললেনঃ “আমার প্রতিপালক যদি আমাকে আদেশ করেই থাকেন তবে আমি তা করবোই।" ফলে শয়তান এখানেও নিরাশ হয়ে গেল। অপর এক বর্ণনায় বলা হয় যে, এই সব ঘটনার পর মহান আল্লাহ হযরত ইসহাক (আঃ)-কে বললেনঃ “তুমি আমার নিকট যে দু'আ করবে আমি তা ককূল করবো।” হযরত ইসহাক (আঃ) তখন দু'আ করলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! যারা আপনার সাথে কোন শরীক স্থাপন করবে না তাদেরকে আপনি জান্নাত দান করুন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বর্ণনা করেনঃ “দু'টি বিষয় আমার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। একটি হলো এই যে, আমার অর্ধেক উম্মতকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর দ্বিতীয় হলো এই যে, আমাকে শাফাআত করার অধিকার দেয়া হবে। অমি শাফাআত করাকেই প্রাধান্য দিলাম, এই আশায় যে, ওটা সাধারণ হবে। হ্যা, তবে একটি দু'আ ছিল যে, আমি ওটাই করতাম। কিন্তু আমার পূর্বেই আল্লাহর এক সৎ বান্দা তা করে ফেলেছেন। ঘটনা এই যে, যখন হযরত ইসহাক (আঃ) যবেহ-এর বিপদ হতে মুক্তি পেলেন তখন তাঁকে বলা হলোঃ “আমার নিকট চাও, যা চাইবে তাই আমি দিবো।” তখন হযরত ইসহাক (আঃ) বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! শয়তান ধোকা দেয়ার পূর্বেই আমি তা চাইবো। হে আল্লাহ! যে আপনার সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করবে তাকে আপনি জান্নাতে প্রবিষ্ট করুন!” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। এর সনদ গারীব ও মুনকার। আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম নামক এর একজন বর্ণনাকারী দুর্বল। আর আমার তো এই ভয়ও হয় যে, “যখন আল্লাহ হযরত ইসহাক (আঃ)-কে বললেন ... শেষ পর্যন্ত এ কথাগুলো তার নিজের কথা, যেগুলো তিনি হাদীসের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। যাবীহুল্লাহ তো ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ) এবং যবেহ-এর স্থান তো মিনা, যা মক্কায় অবস্থিত এবং হযরত ইসমাঈল (আঃ) মক্কাতেই ছিলেন, হযরত ইসহাক (আঃ) নন, তিনি তো ছিলেন সিরিয়ার কিন’আন শহরে)মহান আল্লাহ বলেনঃ “যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পুত্র (ইসমাঈল আঃ)-কে কাত করে শায়িত করলেন তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললামঃ হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তো স্বপ্নদেশ সত্যিই পালন করলে!” হযরত সুদ্দী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর গলায় ছুরি চালাতে শুরু করলেন তখন গলা তামা হয়ে গেল, ফলে ছুরি চললো না ও গলা কাটলো না। ঐ সময় (আরবী) এই শব্দ আসলো।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। অর্থাৎ তাদেরকে কঠিন বিপদ থেকে উদ্ধার করে থাকি। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার পরিত্রাণের উপায় বের করে দেন এবং তাকে এমনভাবে রিযক দান করে থাকেন যে, ওটা তার ধারণা বা কল্পনাও থাকে না। আল্লাহর উপর ভরসাকারীর জন্যে তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পুরো করেই থাকেন এবং প্রত্যেক জিনিসেরই তিনি পরিমাপ নির্ধারণ করে রেখেছেন।”(৬৫:২-৩)এই আয়াত দ্বারা আলেমগণ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কাজের উপর ক্ষমতা লাভের পূর্বেই হুকুম রহিত হয়ে যায়। অবশ্য মু'তাযিলা সম্প্রদায় এটা মানে না। দলীল গ্রহণের কারণ প্রকাশমান। কেননা, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তিনি যেন তার পুত্রকে কুরবানী করেন। অতঃপর যবেহ করার। পূর্বেই ফিদিয়ার মাধ্যমে এ হুকুম রহিত করে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল এটাই যে, তাকে ধৈর্য ও আদিষ্ট কাজ প্রতিপালনে সদা প্রস্তুত থাকার উপর বিনিময় প্রদান করা হবে। এজন্যেই ইরশাদ হয়েছেঃ “নিশ্চয়ই এটা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। একদিকে হুকুম এবং অপরদিকে তা প্রতিপালন। এজন্যেই মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রশংসায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ ইবরাহীম (আঃ), যে পালন করেছিল তার দায়িত্ব।”(৫৩:৩৭)হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, যে ফিদিয়া দান করা হয়েছিল তার রঙ ছিল সাদা, চক্ষু বড় এবং বড় শিং বিশিষ্ট উৎকৃষ্ট খাদ্যে প্রতিপালিত ভেড়া। যা সাবীর’ নামক স্থানে বাবুল বৃক্ষে বাঁধা ছিল। ওটা জান্নাতে চল্লিশ বছর ধরে ছিল। মিনাতে সাবীরের নিকট ওটাকে যবেহ করা হয়। এটা সেই ভেড়া যাকে হাবীল কুরবানী করেছিলেন। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, ঐ ভেড়াটির নাম ছিল জারীর। ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বলেন যে, ওটাকে মাকামে ইবরাহীমে যবেহ করা হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওটাকে মিনার নহরের স্থানে যবেহ করা হয়। বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নিজেকে কুরবানী করার মানত মানে এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে তাঁর কাছে ফতওয়া জিজ্ঞেস করে। তিনি তাকে একশটি উট কুরবানী করার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি বলতেনঃ “তাকে যদি আমি একটি মাত্র ভেড়া কুরবানী করতে বলতাম তাহলেও যথেষ্ট হতো। কেননা কুরআন কারীমে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইসমাঈল যাবীহুল্লাহ (আঃ)-এর ফিদিয়া ওটা দ্বারাই দেয়া হয়েছিল।”কেউ কেউ বলেন যে, ওটা পাহাড়ী ছাগল ছিল। কারো কারো মতে ওটা ছিল হরিণ।মুনসাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উসমান ইবনে তালহা (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “কা’বা ঘরে প্রবেশ করে আমি ভেড়ার শিং দেখেছি। কিন্তু ওটা তোমাকে ঢেকে রাখতে বলার কথা আমি ভুলে গেছি। যাও, ওটা ঢেকে দাও। কাবা ঘরে এমন কোন জিনিস থাকা ঠিক নয় যাতে নামাযীর নামাযে অসুবিধা সৃষ্টি হয়।” সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, ওটা কা'বা ঘরেই ছিল। পরবর্তীকালে কা'বা ঘরে আগুন লাগায় ওটা পুড়ে যায়। এর দ্বারাও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর কুরবানী হওয়ার প্রমাণ মিলে। কেননা, উক্ত শিং তখন থেকে নিয়ে ইসলামের আবির্ভাব পর্যন্ত কুরায়েশদের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে রক্ষিত ছিল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। অধ্যায়: প্রকৃত যাবীহ কে ছিলেন সে সম্পর্কে পূর্বযুগীয় গুরুজন হতে যেসব ‘আসার’ এসেছে সেগুলোর বর্ণনাঃ যারা দাবী করেন যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ), তাঁদের যুক্তি, যথাঃ হযরত আবু মায়সারা (রঃ) বলেন যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) মিসরের বাদশাহকে বলেনঃ “আপনি কি আমার সাথে খেতে চান? আমি হলাম ইউসুফ ইবনে ইয়াকূব ইবনে ইসহাক যাবীহুল্লাহ ইবনে ইবরাহীম খালীলুল্লাহ (আঃ)।”হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! মানুষরা মুখে মুখে হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ) এবং হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর মা’রূদের শপথ করে থাকে। এর কারণ কি?" উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “কারণ এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রত্যেকটি বিষয়ে আমাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। ইসহাক (আঃ) আমার পথে কুরবানী হওয়ার জন্যে নিজেকে আমার হাতে সমর্পণ করে। আর ইয়াকূব (আঃ)-কে আমি যতই বিপদাপদে নিপতিত করি, তার শুভ ধারণা ততই বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।”হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সামনে একদা এক ব্যক্তি তার পূর্বপুরুষের গৌরবের কথা বলাবলি করছিল। তিনি তাকে বললেনঃ “প্রকৃত গৌরবের অধিকারী হওয়ার যোগ্য হযরত ইউসুফ (আঃ)। কেননা, তিনি হচ্ছেন ইয়াকূব (আঃ) ইবনে ইসহাক যাবীহুল্লাহ (আঃ) ইবনে ইবরাহীম খালীলুল্লাহ (আঃ)-এর বংশধর।”ইকরামা (রঃ), ইবনে আব্বাস (রাঃ), আব্বাস (রাঃ), আলী (রাঃ), যায়েদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), শাবী (রঃ), উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ), যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ), আবদুল্লাহ ইবনে শাকীক (রঃ), কাসিম ইবনে আবি বুরযা (রঃ), মাকহুল (রঃ), উসমান ইবনে আবি হাযির (রঃ), সুদ্দী (রঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা (রঃ), আবূ হুয়েল (রঃ), ইবনে সাবিত (রঃ), কাবুল আহবার (রঃ) প্রমুখ গুরুজন এই মত পোষণ করেন যে, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসহাকই (আঃ) ছিলেন। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই মত গ্রহণ করেছেন। সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই আছে। তবে বাহ্যতঃ এটা জানা যায় যে, উক্ত মনীষীবৃন্দের উস্তাদ ছিলেন হযরত কা'বুল আহবার (রঃ)। তিনি হযরত উমার ফারূক (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি হযরত উমার (রাঃ)-কে প্রাচীন কিতাবগুলোর ঘটনা শুনাতেন। জনগণের মধ্যেও তিনি ঐ সব কথা বলতেন। তখন শুদ্ধ ও অশুদ্ধের পার্থক্য উঠে যায়। সঠিক কথা তো এই যে, এই জাতির জন্যে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের একটি কথারও প্রয়োজন নেই। ইমাম বাগাবী (রঃ) আরো কিছু সাহাবী ও তাবেয়ীর নাম সংযোজন করেছেন যাঁরা সবাই হযরত ইসহাক (আঃ)-কে যাবীহুল্লাহ বলতেন। একটি মারফু হাদীসেও এরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু হাদীসটি সহীহ হলে তো বিবাদের মীমাংসা হয়েই যেতো। আসলে হাদীসটি সহীহ নয়। কেননা, এর সনদে দুজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন। হাসান ইবনে দীনার পরিত্যক্ত এবং আলী ইবনে যায়েদ মুনকারুল হাদীস। আর সৰ্বাধিক সঠিক কথা এই যে, হাদীসটি মাওকুফ। কেননা, অন্য এক সনদে একথা হযরত আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে এবং এটাই বেশী সঠিক কথা। তবে সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।এখন ঐ সব ‘আসার’ বর্ণনা করা হচ্ছে যেগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)। আর এটাই অকাট্যরূপে সত্য।হযরত ইবনে আব্বাস বলেন যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)। ইয়াহূদীরা যে হযরত ইসহাক (আঃ)-কে যাবীহুল্লাহ বলেছে তা তারা ভুল বলেছে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), শা'বী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন মত প্রকাশ করেন যে, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল (আঃ) ছিলেন। হযরত শাবী (রঃ) বলেনঃ ‘যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ) এবং আমি কা'বা গৃহে ভেড়ার শিং দেখেছি।”মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে কুরবানী করার নির্দেশ দেন। উক্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছিলাম ইসহাক (আঃ)-এর, সে ছিল এক নবী, সৎকর্মশীলদের অন্যতম।” হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে পুত্র ইসহাক (আঃ)-এর জন্ম হওয়ার সুসংবাদ দেয়া হয়েছে এবং এর সাথে আরো বলা হয়েছে। যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্ম লাভ করবেন। সুতরাং হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর জন্মগ্রহণের পূর্বে তাঁকে কুরবানী করার হুকুম দেয়া কি করে সম্ভব? কেননা, এটা আল্লাহ তাআলার ওয়াদা যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর ঔরষে হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর জন্ম হবে। সুতরাং এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কেই কুরবানী দেয়ার হুকুম হয়েছিল, হযরত ইসহাক (আঃ)-কে নয়।হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ একথা আমি বহু লোককে বলতে শুনেছি। এ প্রসঙ্গে হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) বর্ণনা করেনঃ “এটা অতি পরিষ্কার প্রমাণ। আমিও জানতাম যে, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈলই (আঃ) ছিলেন। অতঃপর তিনি সিরিয়ার একজন ইয়াহূদী আলেমকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন যিনি মুসলমান হয়েছিলেন। উত্তরে ঐ আলেম বলেছিলেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! সত্য কথা এটাই যে, যাকে কুরবানী করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তিনি ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)। কিন্তু যেহেতু আরবরা ছিল তাঁর বংশধর, তাই এই মর্যাদা তাদের দিকেই, প্রত্যাবর্তিত হয়। এতে ইয়াহূদীরা হিংসায় জ্বলে ওঠে এবং হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নাম পরিবর্তন করে হযরত ইসহাক (আঃ)-এর নাম প্রবিষ্ট করে। এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। আমাদের ঈমান রয়েছে যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও হযরত ইসহাক (আঃ) উভয়েই ছিলেন সৎ, পবিত্র ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং আল্লাহর খাটি অনুগত বান্দা। কিতাবুয যুহদে বর্ণিত আছে যে, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-কে তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ্ (রঃ) এই মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “যাবীহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)।” হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), আবু তোফায়েল (রঃ), সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হাসান (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), শা’বী (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে আলী (রঃ), আবূ সালেহ (রঃ) প্রমুখ মনীষীবৃন্দ হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম বাগাবী (রঃ) আরো কিছু সাহাবী ও তাবেয়ীর নাম উল্লেখ করেছেন। এর স্বপক্ষে একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসও রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, সিরিয়ায় আমীর মু'আবিয়া (রাঃ)-এর সামনে যাবীহুল্লাহ কে ছিলেন এ প্রশ্ন উত্থাপিত হলে তিনি জবাবে বলেন, আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি এটা অবগত আছি। শুনুন, আমি একদা নবী (সঃ)-এর নিকটে ছিলাম এমন সময় একজন লোক এসে বলতে শুরু করলোঃ “হে আল্লাহর পথে উৎসর্গীকৃত দুই ব্যক্তির বংশের রাসূল (সঃ)! আমাকেও গানীমাতের মাল হতে কিছু প্রদান করুন!” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হাসলেন। হযরত মু'আবিয়া (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! ঐ যাবীহদ্বয় কারা?” তিনি জবাবে বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিতামহ আবদুল মুত্তালিব যখন যমযম কূপ খনন করেন তখন তিনি নযর মেনেছিলেন যে, যদি কাজটি সহজভাবে সমাপ্ত হয় তবে তিনি তাঁর একটি ছেলেকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করবেন। কাজটি সহজভাবে সমাপ্ত হলো। তখন কোন ছেলেকে কুরবানী করা যায় এটা নির্ণয় করার জন্যে তিনি লটারী করেন। লটারীতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিতা আবদুল্লাহর নাম উঠে। এ দেখে তাঁর নানারা এ কাজ করতে তাঁকে নিষেধ করলো এবং বললোঃ “তার বিনিময়ে একশটি উট কুরবানী করে দাও।” তিনি তাই করলেন। আর দ্বিতীয় যাবীহ হলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ), যা সর্বজন বিদিত।" তাফসীরে ইবনে জারীর ও মাগাযী উমুবীতে এ রিওয়াইয়াতটি বিদ্যমান রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত ইসহাক (আঃ) যাবীহুল্লাহ হওয়ার একটি দলীল এই পেশ করেছেন যে, যে (আরবী) বা সহনশীল ছেলের সুসংবাদের উল্লেখ রয়েছে তার দ্বারা হযরত ইসহাককেই (আঃ) বুঝানো হয়েছে। কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাকে এক জ্ঞানী ও বিজ্ঞ সন্তানের সুসংবাদ দিলো।”(৫১:২৮) আর হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর সুসংবাদের জবাব এই দিয়েছেন যে, তিনি তার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছে গিয়েছিলেন। আর সম্ভবতঃ হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর সাথেই আরো সন্তানও থেকে থাকবে। কা'বা ঘরে শিং থাকার ব্যাপারে বলেছেন। যে, ওটা কিনআন শহর হতে এনে এখানে রেখে দেয়া হয়েছে। কোন কোন লোক হযরত ইসহাক (আঃ)-এর কথা খোলাখুলিভাবেই বলেছেন। কিন্তু এসব কথা বাস্তবতা শূন্য। অবশ্য হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর যাবীহুল্লাহ হওয়ার ব্যাপারে মুহাম্মাদ ইবনে কাব কারাযীর (রঃ) প্রমাণ খুব স্পষ্ট ও সবল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রথমে যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর জন্ম লাভের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল এবং এরপর তাঁর ভাই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। সূরায়ে হৃদ ও সূরায়ে হিজরে এর বর্ণনা গত হয়েছে।(আরবী) শব্দটি হয়েছে, অর্থাৎ তিনি নবী হবেন সৎ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যাবীহ ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ) এবং এখানে নবুওয়াত হলো হযরত ইসহাক (আঃ)-এর সুসংবাদ। যেমন হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজ অনুগ্রহে তাকে দিলাম তার ভ্রাতা হারূন (আঃ)-কে নবীরূপে।"(১৯:৫৩) প্রকৃতপক্ষে হযরত হারূন (আঃ) হযরত মূসা (আঃ)-এর চেয়ে বড় ছিলেন। এখানে তাঁর নবুওয়াতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। সুতরাং এখানেও সুসংবাদ ঐ সময় দেয়া হয় যখন তিনি যবেহ-এর পরীক্ষায় ধৈর্যশীল প্রমাণিত হয়েছিলেন। এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, এ সুসংবাদ দুইবার প্রদান করা হয়েছে। প্রথমবার জন্মের পূর্বে এবং দ্বিতীয়বার নবুওয়াতের কিছু পূর্বে। এটা হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাকে বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাককেও (আঃ), তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক নিজেদের প্রতি স্পষ্ট অত্যাচারী। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “বলা হলো- হে নূহ (আঃ)! অবতরণ কর আমার দেয়া শান্তিসহ এবং তোমার প্রতি ও যেসব সম্প্রদায় তোমার সাথে আছে তাদের প্রতি কল্যাণসহ; অপর সম্প্রদায়সমূহকে জীবন উপভোগ করতে দিবো, পরে আমা হতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে স্পর্শ করবে।"(১১:৪৮)
আস-সাফফাত 37:102
৯৯-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সংবাদ প্রদান করছেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়ের ঈমান আনয়ন হতে নিরাশ হয়ে গেলেন, কারণ তারা আল্লাহর ক্ষমতা প্রকাশক বহু নিদর্শন দেখার পরও ঈমান আনলো না, তখন তিনি সেখান থেকে হিজরত করে অন্যত্র চলে যেতে ইচ্ছা করে প্রকাশ্যভাবে তাদেরকে বললেনঃ “আমি আমার প্রতিপালকের দিকে চললাম। তিনি অবশ্যই আমাকে সৎপথে পরিচালিত করবেন। আর তিনি প্রার্থনা করলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন!” অর্থাৎ ঐ সন্তান যেন একত্ববাদে তাঁর সঙ্গী হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাকে এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।” ইনিই ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ), হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রথম সন্তান। বিশ্ব মুসলিম এর ঐকমত্যে তিনি হযরত ইসহাক (আঃ)-এর বড় ছিলেন। একথা আহলে কিতাবও মেনে থাকে। এমনকি তাদের কিতাবেও লিখিত আছে যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর জন্মের সময়। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বয়স ছিল ছিয়াশি বছর। আর হযরত ইসহাক (আঃ)-এর যখন জন্ম হয় তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বয়স নিরানব্বই বছরে পৌঁছেছিল। তাদেরই গ্রন্থে একথাও লিখিত রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে তার একমাত্র সন্তানকে কুরবানী করার হুকুম হয়েছিল। কিন্তু ইয়াহুদীরা হযরত ইসহাক (আঃ)-এর বংশধর এবং আরবরা হলো হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধর, শুধু এই কারণেই তারা কুরবানীর মর্যাদা হযরত ইসমাঈল (আঃ) হতে সরিয়ে হযরত ইসহাক (আঃ)-কে প্রদান করেছে। আর অনর্থক ব্যাখ্যা করে আল্লাহর বাণীর পরিবর্তন সাধন করেছে। তারা একথাও বলেছেঃ “আমাদের কিতাবে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যার অর্থ একমাত্র সন্তান নয়, বরং এর অর্থ হলোঃ “যে তোমার নিকট বর্তমানে একাকী রয়েছে। এটা এজন্যেই যে, ঐ সময় হযরত ইসমাঈল (আঃ) মক্কায় তাঁর মায়ের কাছে ছিলেন এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট শুধুমাত্র হযরত ইসহাক (আঃ) ছিলেন।কিন্তু এটা সম্পূর্ণরূপে ভুল কথা। কেননা, ওকেই বলে যে একমাত্র সন্তান, যার আর কোন ভাই নেই। আর একথাও সত্য যে, যার একটি মাত্র সন্তান, আর তার পরে কোন সন্তান নেই তার প্রতি স্বাভাবিকভাবে মমতা বেশীই হয়ে থাকে। এজন্যে তাকে কুরবানী করার আদেশ দান পরীক্ষা করার একটি বিরাট হাতিয়ার। পূর্বযুগীয় কতক গুরুজন এমনকি কতক সাহাবীও (রাঃ) যে এ মত পোষণ করতেন যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ), এটা আমরা স্বীকার করি। কিন্তু এটা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাত সম্মত নয়। বরং এরূপ ধারণা করা যায় যে, তাঁরা বানী ইসরাঈলের কথাকে বিনা প্রমাণেই মেনে নিয়েছেন, এর পিছনে কোন যুক্তি তাঁরা অন্বেষণ করেননি। আমরা আল্লাহর কালাম দ্বারাই প্রমাণ করবো যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) ছিলেন যাবীহুল্লাহ। সুসংবাদে বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ সহনশীল সন্তান। অতঃপর কুরবানীর উল্লেখ রয়েছে। এসব বর্ণনা সমাপ্ত করার পর সৎ নবী হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ রয়েছে এবং তাঁর সম্পর্কে ফেরেশতারা (আরবী) বা বিজ্ঞ সন্তান বলেছেন। তারপর তার সুসংবাদের সাথে ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবী) (১১:৭১) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশাতেই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবেন। আর এভাবেই তাঁর বংশ বৃদ্ধির সংবাদ প্রথমেই জানানো হয়। তাহলে তাঁকে যবেহ করার আদেশ কি প্রকারে সম্ভব হতে পারে? এটা আমরা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি। অবশ্য এখানে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে ধৈর্যশীল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং তা যবেহ করার কাজের সাথে অতি সামঞ্জস্যপূর্ণ।এখন হযরত ইসমাঈল (আঃ) বড় হলেন। এখন তিনি পিতার সাথে চলাফেরা করতে পারেন। ঐ সময় তিনি তাঁর মাতার সাথে ফারান নামক এলাকায় থাকতেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রায়ই সেখানে যাতায়াত করতেন। এ কথাও বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তথায় বুরাক নামক যানে যাওয়া আসা করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলৈনঃ এই বাক্যের অর্থ এও হতে পারে যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) ঐ সময় প্রায় যৌবনে পদার্পণ করেছিলেন এবং পিতার ন্যায় চলাফেরা করা ও কাজকর্ম করার যোগ্য হয়ে উঠেছিলেন। তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বপ্ন দেখেন যে, তিনি তাঁর প্রিয় সন্তানকে কুরবানী করছেন। হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, নবীদের স্বপ্ন হলো অহী। অতঃপর তিনি। (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। একটি মার’ হাদীসেও এটা রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঘুমে নবীদের (আঃ) স্বপ্ন হলো অহী।” (এহানসটি মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে)আল্লাহর প্রিয় নবী হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানের পরীক্ষার জন্যে এবং এজন্যেও যে, হঠাৎ কুরবানীর কথা শুনে তিনি যেন হতবুদ্ধি না হয়ে পড়েন, নিজের মত ও সত্য স্বপ্ন তার সামনে প্রকাশ করলেন। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান উত্তর দিলেনঃ “পিতঃ! বিলম্ব করছেন কেন? একথা কি জিজ্ঞেস করতে হয়? যা করতে আদিষ্ট হয়েছেন তা সত্বর করে ফেলুন। ইনশাআল্লাহ আমি ধৈর্যধারণের মাধ্যমে আপনার বাসনা চরিতার্থ করবো।” তিনি যা বললেন তাই করে দেখালেন এবং তিনি প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী রূপে প্রমাণিত হলেন। এজন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “স্মরণ কর এই কিতাবে উল্লিখিত ইসমাঈল (আঃ)-এর কথা, সে ছিল প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী, এবং সে ছিল রাসূল, নবী। সে তার পরিজনবর্গকে নামায ও যাকাতের নির্দেশ দিতো এবং সে ছিল তার প্রতিপালকের সন্তোষজন।”(১৯:৫৪-৫৫)পিতা-পুত্র উভয়ে যখন একমত হলেন তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে মাটিতে কাত করে শায়িত করলেন বা অধোমুখে মাটিতে ফেলে দিলেন, যাতে যবেহ করার সময় প্রাণপ্রিয় সন্তানের মুখমণ্ডল দেখে মায়ার উদ্রেক না হয়। মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে একট বর্ণনা রয়েছে যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সন্তানকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন শয়তান সামনে এসে হাযির হলো। কিন্তু তিনি শয়তানকে পিছনে ফেলে অগ্রসর হলেন। অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) সহ, জামরায়ে অকাবায় উপস্থিত হলেন। এখানেও শয়তান সামনে আসলে তার দিকে তিনি সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। তারপর তিনি জামরায়ে উসতার নিকট এসে পুনরায় শয়তানের দিকে সাতটি কংকর ছুঁড়লেন। অতঃপর সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে ছেলেকে মাটিতে শায়িত করলেন। ঐ সময় ছেলের গায়ে সাদা রঙ-এর চাদর ছিল। তিনি পিতাকে চাদরটি খুলে নিতে বললেন, যাতে ঐ চাদর দ্বারা তাঁর কাফনের কাজ হয়। এহেন অবস্থায় পিতা হয়ে পুত্রের দেহ অনাবৃত করা অতি বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে। এমন সময় শব্দ এলোঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তো স্বপ্নদেশ সত্যিই পালন করলে। তখন তিনি পিছনে ফিরে একটি দুম্বা দেখতে পেলেন, যার শিং ছিল বড় বড় এবং চক্ষুদ্বয় ছিল অতি সুন্দর।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এ জন্যেই আমরা কুরবানীর জন্যে এই প্রকারের দুম্বা মনোনীত করে থাকি।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর অপর এক বর্ণনায় হযরত ইসহাক (আঃ)-এর নাম উল্লিখিত রয়েছে। ফলে তাঁর বর্ণনায় দু’জনের নাম পাওয়া যায়। সুতরাং প্রথমটিই গ্রহণযোগ্য। ইনশাআল্লাহ এর প্রমাণ পেশ করা হবে।আল্লাহ তা'আলা কুরবানীর জন্যে একটি দুম্বা দান করলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা জান্নাতের দুম্বা ছিল। চল্লিশ বছর ধরে সেখানে পালিত হয়েছিল। এটা দেখে হযরত ইবরহীম (আঃ) পুত্রকে ছেড়ে দিয়ে সেই দিকে অগ্রসর হলেন। প্রথম জামরায় এসে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। শয়তান সেখান থেকে পালিয়ে জামরায়ে উসতায় আসলো। সেখানেও তিনি সাতটি কংকর হুঁড়লেন। আবার প্রথম জামরায় এসে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। সেখান হতে যবেহের স্থানে এসে দুষাটি কুরবানী করলেন। এটার মাথাসহ শিং কা’বার দেয়ালে লটকানো ছিল। পরে ওটা শুকিয়ে যায় এবং ইসলামের আবির্ভাব পর্যন্ত সেখানেই বিদ্যমান ছিল। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ও হযরত কা'ব (রাঃ) একত্রিত হন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) নবী (সঃ) হতে হাদীস বর্ণনা করছিলেন এবং হযরত কা'ব (রাঃ) আল্লাহর কিতাব হতে ঘটনা বর্ণনা করছিলেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবী (আঃ)-এর জন্যে একটি ককূলকৃত দুআ রয়েছে। আমার এই কবুলকৃত দু'আ আমি আমার উম্মতের শাফাআতের জন্যে গোপন রেখেছি যা কিয়ামতের দিন হবে।” হযরত কা'ব (রাঃ) তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি কি স্বয়ং এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছো?” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, আমি নিজেই শুনেছি।” তখন হযরত কা'ব (রাঃ) খুব খুশী হন এবং বলেনঃ “তোমার উপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গকৃত হোক অথবা নবী (সঃ)-এর উপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গকৃত হোক।” অতঃপর হযরত কা'ব (রাঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঘটনা শুনালেন। তিনি বর্ণনা করলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসহাক (আঃ)-কে যবেহ করার জন্যে প্রস্তুত হলেন তখন শয়তান (মনে মনে) বললোঃ “আমি যদি এ সময়ে এ কাজ থেকে তাঁকে টলাতে না পারি তবে আমাকে এ জন্যে সারা জীবন নিরাশ থাকতে হবে। প্রথমে সে হযরত সারার নিকট গেল এবং তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “তোমার স্বামী তোমার পুত্রকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা জান কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হয়তো নিজের কোন কাজের জন্যে। নিয়ে যাচ্ছেন।” সে বললোঃ “না, না, বরং তাকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছেন।” হযরত সারা বললেন:“তিনি নিজের পুত্রকে যবেহ করবেন এটা কি সম্ভব?” অভিশপ্ত শয়তান জবাব দিলোঃ “তোমার স্বামী বলেন কি জান? তাঁকে নাকি আল্লাহ এই নির্দেশ দিয়েছেন!” হযরত সারা তখন বললেনঃ “তাকে যদি আল্লাহ নির্দেশ দিয়ে থাকেন তবে তিনি ঠিকই করছেন। আল্লাহর হুকুম পালন করে তিনি ফিরে আসবেন।” সে এখানে ব্যর্থ হয়ে হযরত ইসহাক (আঃ)-এর নিকট গেল এবং তাকে বললোঃ “তোমাকে তোমার আব্বা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা জান কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হয়তো কোন কাজের জন্যে কোন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন।” শয়তান বললোঃ “না, বরং তোমাকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছেন।” হযরত ইসহাক (আঃ) বললেনঃ “এটা কি করে সম্ভব?” শয়তান। বললোঃ “তোমাকে যবেহ করতে নাকি আল্লাহ তাকে আদেশ করেছেন।” তখন হযরত ইসহাক (আঃ) বললেনঃ “আল্লাহর কসম! যদি সত্যি আল্লাহ আমাকে যবেহ করতে তাঁকে নির্দেশ দিয়ে থাকেন তবে তো তাড়াতাড়ি তার এ কাজ করা উচিত।”শয়তান এখানেও নিরাশ হয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট গিয়ে বললোঃ “ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “প্রয়োজনীয় কাজে যাচ্ছি।” শয়তান বললোঃ “না, তা নয়। বরং তাকে যবেহ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছে।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) বললেনঃ “তাকে আমি কেন যবেহ করবো?” শয়তান জবাব দিলোঃ “হয়তো আপনার প্রতিপালক আপনাকে এ কাজে আদেশ করেছেন। তিনি তখন বললেনঃ “আমার প্রতিপালক যদি আমাকে আদেশ করেই থাকেন তবে আমি তা করবোই।" ফলে শয়তান এখানেও নিরাশ হয়ে গেল। অপর এক বর্ণনায় বলা হয় যে, এই সব ঘটনার পর মহান আল্লাহ হযরত ইসহাক (আঃ)-কে বললেনঃ “তুমি আমার নিকট যে দু'আ করবে আমি তা ককূল করবো।” হযরত ইসহাক (আঃ) তখন দু'আ করলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! যারা আপনার সাথে কোন শরীক স্থাপন করবে না তাদেরকে আপনি জান্নাত দান করুন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বর্ণনা করেনঃ “দু'টি বিষয় আমার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। একটি হলো এই যে, আমার অর্ধেক উম্মতকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর দ্বিতীয় হলো এই যে, আমাকে শাফাআত করার অধিকার দেয়া হবে। অমি শাফাআত করাকেই প্রাধান্য দিলাম, এই আশায় যে, ওটা সাধারণ হবে। হ্যা, তবে একটি দু'আ ছিল যে, আমি ওটাই করতাম। কিন্তু আমার পূর্বেই আল্লাহর এক সৎ বান্দা তা করে ফেলেছেন। ঘটনা এই যে, যখন হযরত ইসহাক (আঃ) যবেহ-এর বিপদ হতে মুক্তি পেলেন তখন তাঁকে বলা হলোঃ “আমার নিকট চাও, যা চাইবে তাই আমি দিবো।” তখন হযরত ইসহাক (আঃ) বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! শয়তান ধোকা দেয়ার পূর্বেই আমি তা চাইবো। হে আল্লাহ! যে আপনার সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করবে তাকে আপনি জান্নাতে প্রবিষ্ট করুন!” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। এর সনদ গারীব ও মুনকার। আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম নামক এর একজন বর্ণনাকারী দুর্বল। আর আমার তো এই ভয়ও হয় যে, “যখন আল্লাহ হযরত ইসহাক (আঃ)-কে বললেন ... শেষ পর্যন্ত এ কথাগুলো তার নিজের কথা, যেগুলো তিনি হাদীসের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। যাবীহুল্লাহ তো ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ) এবং যবেহ-এর স্থান তো মিনা, যা মক্কায় অবস্থিত এবং হযরত ইসমাঈল (আঃ) মক্কাতেই ছিলেন, হযরত ইসহাক (আঃ) নন, তিনি তো ছিলেন সিরিয়ার কিন’আন শহরে)মহান আল্লাহ বলেনঃ “যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পুত্র (ইসমাঈল আঃ)-কে কাত করে শায়িত করলেন তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললামঃ হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তো স্বপ্নদেশ সত্যিই পালন করলে!” হযরত সুদ্দী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর গলায় ছুরি চালাতে শুরু করলেন তখন গলা তামা হয়ে গেল, ফলে ছুরি চললো না ও গলা কাটলো না। ঐ সময় (আরবী) এই শব্দ আসলো।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। অর্থাৎ তাদেরকে কঠিন বিপদ থেকে উদ্ধার করে থাকি। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার পরিত্রাণের উপায় বের করে দেন এবং তাকে এমনভাবে রিযক দান করে থাকেন যে, ওটা তার ধারণা বা কল্পনাও থাকে না। আল্লাহর উপর ভরসাকারীর জন্যে তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পুরো করেই থাকেন এবং প্রত্যেক জিনিসেরই তিনি পরিমাপ নির্ধারণ করে রেখেছেন।”(৬৫:২-৩)এই আয়াত দ্বারা আলেমগণ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, কাজের উপর ক্ষমতা লাভের পূর্বেই হুকুম রহিত হয়ে যায়। অবশ্য মু'তাযিলা সম্প্রদায় এটা মানে না। দলীল গ্রহণের কারণ প্রকাশমান। কেননা, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তিনি যেন তার পুত্রকে কুরবানী করেন। অতঃপর যবেহ করার। পূর্বেই ফিদিয়ার মাধ্যমে এ হুকুম রহিত করে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল এটাই যে, তাকে ধৈর্য ও আদিষ্ট কাজ প্রতিপালনে সদা প্রস্তুত থাকার উপর বিনিময় প্রদান করা হবে। এজন্যেই ইরশাদ হয়েছেঃ “নিশ্চয়ই এটা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। একদিকে হুকুম এবং অপরদিকে তা প্রতিপালন। এজন্যেই মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রশংসায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ ইবরাহীম (আঃ), যে পালন করেছিল তার দায়িত্ব।”(৫৩:৩৭)হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, যে ফিদিয়া দান করা হয়েছিল তার রঙ ছিল সাদা, চক্ষু বড় এবং বড় শিং বিশিষ্ট উৎকৃষ্ট খাদ্যে প্রতিপালিত ভেড়া। যা সাবীর’ নামক স্থানে বাবুল বৃক্ষে বাঁধা ছিল। ওটা জান্নাতে চল্লিশ বছর ধরে ছিল। মিনাতে সাবীরের নিকট ওটাকে যবেহ করা হয়। এটা সেই ভেড়া যাকে হাবীল কুরবানী করেছিলেন। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, ঐ ভেড়াটির নাম ছিল জারীর। ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বলেন যে, ওটাকে মাকামে ইবরাহীমে যবেহ করা হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওটাকে মিনার নহরের স্থানে যবেহ করা হয়। বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নিজেকে কুরবানী করার মানত মানে এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে তাঁর কাছে ফতওয়া জিজ্ঞেস করে। তিনি তাকে একশটি উট কুরবানী করার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি বলতেনঃ “তাকে যদি আমি একটি মাত্র ভেড়া কুরবানী করতে বলতাম তাহলেও যথেষ্ট হতো। কেননা কুরআন কারীমে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইসমাঈল যাবীহুল্লাহ (আঃ)-এর ফিদিয়া ওটা দ্বারাই দেয়া হয়েছিল।”কেউ কেউ বলেন যে, ওটা পাহাড়ী ছাগল ছিল। কারো কারো মতে ওটা ছিল হরিণ।মুনসাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উসমান ইবনে তালহা (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “কা’বা ঘরে প্রবেশ করে আমি ভেড়ার শিং দেখেছি। কিন্তু ওটা তোমাকে ঢেকে রাখতে বলার কথা আমি ভুলে গেছি। যাও, ওটা ঢেকে দাও। কাবা ঘরে এমন কোন জিনিস থাকা ঠিক নয় যাতে নামাযীর নামাযে অসুবিধা সৃষ্টি হয়।” সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, ওটা কা'বা ঘরেই ছিল। পরবর্তীকালে কা'বা ঘরে আগুন লাগায় ওটা পুড়ে যায়। এর দ্বারাও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর কুরবানী হওয়ার প্রমাণ মিলে। কেননা, উক্ত শিং তখন থেকে নিয়ে ইসলামের আবির্ভাব পর্যন্ত কুরায়েশদের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে রক্ষিত ছিল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। অধ্যায়: প্রকৃত যাবীহ কে ছিলেন সে সম্পর্কে পূর্বযুগীয় গুরুজন হতে যেসব ‘আসার’ এসেছে সেগুলোর বর্ণনাঃ যারা দাবী করেন যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ), তাঁদের যুক্তি, যথাঃ হযরত আবু মায়সারা (রঃ) বলেন যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) মিসরের বাদশাহকে বলেনঃ “আপনি কি আমার সাথে খেতে চান? আমি হলাম ইউসুফ ইবনে ইয়াকূব ইবনে ইসহাক যাবীহুল্লাহ ইবনে ইবরাহীম খালীলুল্লাহ (আঃ)।”হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! মানুষরা মুখে মুখে হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ) এবং হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর মা’রূদের শপথ করে থাকে। এর কারণ কি?" উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “কারণ এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রত্যেকটি বিষয়ে আমাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। ইসহাক (আঃ) আমার পথে কুরবানী হওয়ার জন্যে নিজেকে আমার হাতে সমর্পণ করে। আর ইয়াকূব (আঃ)-কে আমি যতই বিপদাপদে নিপতিত করি, তার শুভ ধারণা ততই বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।”হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সামনে একদা এক ব্যক্তি তার পূর্বপুরুষের গৌরবের কথা বলাবলি করছিল। তিনি তাকে বললেনঃ “প্রকৃত গৌরবের অধিকারী হওয়ার যোগ্য হযরত ইউসুফ (আঃ)। কেননা, তিনি হচ্ছেন ইয়াকূব (আঃ) ইবনে ইসহাক যাবীহুল্লাহ (আঃ) ইবনে ইবরাহীম খালীলুল্লাহ (আঃ)-এর বংশধর।”ইকরামা (রঃ), ইবনে আব্বাস (রাঃ), আব্বাস (রাঃ), আলী (রাঃ), যায়েদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), শাবী (রঃ), উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ), যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ), আবদুল্লাহ ইবনে শাকীক (রঃ), কাসিম ইবনে আবি বুরযা (রঃ), মাকহুল (রঃ), উসমান ইবনে আবি হাযির (রঃ), সুদ্দী (রঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা (রঃ), আবূ হুয়েল (রঃ), ইবনে সাবিত (রঃ), কাবুল আহবার (রঃ) প্রমুখ গুরুজন এই মত পোষণ করেন যে, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসহাকই (আঃ) ছিলেন। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই মত গ্রহণ করেছেন। সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই আছে। তবে বাহ্যতঃ এটা জানা যায় যে, উক্ত মনীষীবৃন্দের উস্তাদ ছিলেন হযরত কা'বুল আহবার (রঃ)। তিনি হযরত উমার ফারূক (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি হযরত উমার (রাঃ)-কে প্রাচীন কিতাবগুলোর ঘটনা শুনাতেন। জনগণের মধ্যেও তিনি ঐ সব কথা বলতেন। তখন শুদ্ধ ও অশুদ্ধের পার্থক্য উঠে যায়। সঠিক কথা তো এই যে, এই জাতির জন্যে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের একটি কথারও প্রয়োজন নেই। ইমাম বাগাবী (রঃ) আরো কিছু সাহাবী ও তাবেয়ীর নাম সংযোজন করেছেন যাঁরা সবাই হযরত ইসহাক (আঃ)-কে যাবীহুল্লাহ বলতেন। একটি মারফু হাদীসেও এরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু হাদীসটি সহীহ হলে তো বিবাদের মীমাংসা হয়েই যেতো। আসলে হাদীসটি সহীহ নয়। কেননা, এর সনদে দুজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন। হাসান ইবনে দীনার পরিত্যক্ত এবং আলী ইবনে যায়েদ মুনকারুল হাদীস। আর সৰ্বাধিক সঠিক কথা এই যে, হাদীসটি মাওকুফ। কেননা, অন্য এক সনদে একথা হযরত আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে এবং এটাই বেশী সঠিক কথা। তবে সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।এখন ঐ সব ‘আসার’ বর্ণনা করা হচ্ছে যেগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)। আর এটাই অকাট্যরূপে সত্য।হযরত ইবনে আব্বাস বলেন যে, যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)। ইয়াহূদীরা যে হযরত ইসহাক (আঃ)-কে যাবীহুল্লাহ বলেছে তা তারা ভুল বলেছে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), শা'বী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন মত প্রকাশ করেন যে, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল (আঃ) ছিলেন। হযরত শাবী (রঃ) বলেনঃ ‘যাবীহুল্লাহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ) এবং আমি কা'বা গৃহে ভেড়ার শিং দেখেছি।”মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে কুরবানী করার নির্দেশ দেন। উক্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছিলাম ইসহাক (আঃ)-এর, সে ছিল এক নবী, সৎকর্মশীলদের অন্যতম।” হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে পুত্র ইসহাক (আঃ)-এর জন্ম হওয়ার সুসংবাদ দেয়া হয়েছে এবং এর সাথে আরো বলা হয়েছে। যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্ম লাভ করবেন। সুতরাং হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর জন্মগ্রহণের পূর্বে তাঁকে কুরবানী করার হুকুম দেয়া কি করে সম্ভব? কেননা, এটা আল্লাহ তাআলার ওয়াদা যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর ঔরষে হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর জন্ম হবে। সুতরাং এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কেই কুরবানী দেয়ার হুকুম হয়েছিল, হযরত ইসহাক (আঃ)-কে নয়।হযরত ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেনঃ একথা আমি বহু লোককে বলতে শুনেছি। এ প্রসঙ্গে হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) বর্ণনা করেনঃ “এটা অতি পরিষ্কার প্রমাণ। আমিও জানতাম যে, যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈলই (আঃ) ছিলেন। অতঃপর তিনি সিরিয়ার একজন ইয়াহূদী আলেমকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন যিনি মুসলমান হয়েছিলেন। উত্তরে ঐ আলেম বলেছিলেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! সত্য কথা এটাই যে, যাকে কুরবানী করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তিনি ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)। কিন্তু যেহেতু আরবরা ছিল তাঁর বংশধর, তাই এই মর্যাদা তাদের দিকেই, প্রত্যাবর্তিত হয়। এতে ইয়াহূদীরা হিংসায় জ্বলে ওঠে এবং হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নাম পরিবর্তন করে হযরত ইসহাক (আঃ)-এর নাম প্রবিষ্ট করে। এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। আমাদের ঈমান রয়েছে যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও হযরত ইসহাক (আঃ) উভয়েই ছিলেন সৎ, পবিত্র ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং আল্লাহর খাটি অনুগত বান্দা। কিতাবুয যুহদে বর্ণিত আছে যে, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ)-কে তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ্ (রঃ) এই মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “যাবীহ ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)।” হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), আবু তোফায়েল (রঃ), সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হাসান (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), শা’বী (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে আলী (রঃ), আবূ সালেহ (রঃ) প্রমুখ মনীষীবৃন্দ হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম বাগাবী (রঃ) আরো কিছু সাহাবী ও তাবেয়ীর নাম উল্লেখ করেছেন। এর স্বপক্ষে একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসও রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, সিরিয়ায় আমীর মু'আবিয়া (রাঃ)-এর সামনে যাবীহুল্লাহ কে ছিলেন এ প্রশ্ন উত্থাপিত হলে তিনি জবাবে বলেন, আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি এটা অবগত আছি। শুনুন, আমি একদা নবী (সঃ)-এর নিকটে ছিলাম এমন সময় একজন লোক এসে বলতে শুরু করলোঃ “হে আল্লাহর পথে উৎসর্গীকৃত দুই ব্যক্তির বংশের রাসূল (সঃ)! আমাকেও গানীমাতের মাল হতে কিছু প্রদান করুন!” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হাসলেন। হযরত মু'আবিয়া (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! ঐ যাবীহদ্বয় কারা?” তিনি জবাবে বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পিতামহ আবদুল মুত্তালিব যখন যমযম কূপ খনন করেন তখন তিনি নযর মেনেছিলেন যে, যদি কাজটি সহজভাবে সমাপ্ত হয় তবে তিনি তাঁর একটি ছেলেকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করবেন। কাজটি সহজভাবে সমাপ্ত হলো। তখন কোন ছেলেকে কুরবানী করা যায় এটা নির্ণয় করার জন্যে তিনি লটারী করেন। লটারীতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিতা আবদুল্লাহর নাম উঠে। এ দেখে তাঁর নানারা এ কাজ করতে তাঁকে নিষেধ করলো এবং বললোঃ “তার বিনিময়ে একশটি উট কুরবানী করে দাও।” তিনি তাই করলেন। আর দ্বিতীয় যাবীহ হলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ), যা সর্বজন বিদিত।" তাফসীরে ইবনে জারীর ও মাগাযী উমুবীতে এ রিওয়াইয়াতটি বিদ্যমান রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত ইসহাক (আঃ) যাবীহুল্লাহ হওয়ার একটি দলীল এই পেশ করেছেন যে, যে (আরবী) বা সহনশীল ছেলের সুসংবাদের উল্লেখ রয়েছে তার দ্বারা হযরত ইসহাককেই (আঃ) বুঝানো হয়েছে। কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাকে এক জ্ঞানী ও বিজ্ঞ সন্তানের সুসংবাদ দিলো।”(৫১:২৮) আর হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর সুসংবাদের জবাব এই দিয়েছেন যে, তিনি তার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছে গিয়েছিলেন। আর সম্ভবতঃ হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর সাথেই আরো সন্তানও থেকে থাকবে। কা'বা ঘরে শিং থাকার ব্যাপারে বলেছেন। যে, ওটা কিনআন শহর হতে এনে এখানে রেখে দেয়া হয়েছে। কোন কোন লোক হযরত ইসহাক (আঃ)-এর কথা খোলাখুলিভাবেই বলেছেন। কিন্তু এসব কথা বাস্তবতা শূন্য। অবশ্য হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর যাবীহুল্লাহ হওয়ার ব্যাপারে মুহাম্মাদ ইবনে কাব কারাযীর (রঃ) প্রমাণ খুব স্পষ্ট ও সবল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রথমে যাবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর জন্ম লাভের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল এবং এরপর তাঁর ভাই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। সূরায়ে হৃদ ও সূরায়ে হিজরে এর বর্ণনা গত হয়েছে।(আরবী) শব্দটি হয়েছে, অর্থাৎ তিনি নবী হবেন সৎ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যাবীহ ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ) এবং এখানে নবুওয়াত হলো হযরত ইসহাক (আঃ)-এর সুসংবাদ। যেমন হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজ অনুগ্রহে তাকে দিলাম তার ভ্রাতা হারূন (আঃ)-কে নবীরূপে।"(১৯:৫৩) প্রকৃতপক্ষে হযরত হারূন (আঃ) হযরত মূসা (আঃ)-এর চেয়ে বড় ছিলেন। এখানে তাঁর নবুওয়াতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। সুতরাং এখানেও সুসংবাদ ঐ সময় দেয়া হয় যখন তিনি যবেহ-এর পরীক্ষায় ধৈর্যশীল প্রমাণিত হয়েছিলেন। এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, এ সুসংবাদ দুইবার প্রদান করা হয়েছে। প্রথমবার জন্মের পূর্বে এবং দ্বিতীয়বার নবুওয়াতের কিছু পূর্বে। এটা হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাকে বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাককেও (আঃ), তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক নিজেদের প্রতি স্পষ্ট অত্যাচারী। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “বলা হলো- হে নূহ (আঃ)! অবতরণ কর আমার দেয়া শান্তিসহ এবং তোমার প্রতি ও যেসব সম্প্রদায় তোমার সাথে আছে তাদের প্রতি কল্যাণসহ; অপর সম্প্রদায়সমূহকে জীবন উপভোগ করতে দিবো, পরে আমা হতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে স্পর্শ করবে।"(১১:৪৮)