Tafseer ibn Kathir — আয-যুখরুফ 43:57 – আয-যুখরুফ 43:89
Contents
- আয-যুখরুফ 43:57
- আয-যুখরুফ 43:58
- আয-যুখরুফ 43:59
- আয-যুখরুফ 43:60
- আয-যুখরুফ 43:61
- আয-যুখরুফ 43:62
- আয-যুখরুফ 43:63
- আয-যুখরুফ 43:64
- আয-যুখরুফ 43:65
- আয-যুখরুফ 43:66
- আয-যুখরুফ 43:67
- আয-যুখরুফ 43:68
- আয-যুখরুফ 43:69
- আয-যুখরুফ 43:70
- আয-যুখরুফ 43:71
- আয-যুখরুফ 43:72
- আয-যুখরুফ 43:73
- আয-যুখরুফ 43:74
- আয-যুখরুফ 43:75
- আয-যুখরুফ 43:76
- আয-যুখরুফ 43:77
- আয-যুখরুফ 43:78
- আয-যুখরুফ 43:79
- আয-যুখরুফ 43:80
- আয-যুখরুফ 43:81
- আয-যুখরুফ 43:82
- আয-যুখরুফ 43:83
- আয-যুখরুফ 43:84
- আয-যুখরুফ 43:85
- আয-যুখরুফ 43:86
- আয-যুখরুফ 43:87
- আয-যুখরুফ 43:88
- আয-যুখরুফ 43:89
আয-যুখরুফ 43:57
৫৭-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ) এবং হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলোঃ “তারা হাসতে লাগলো।' অর্থাৎ এতে তারা বিস্ময়বোধ করলো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা হতবুদ্ধি হলো এবং হাসতে লাগলো। ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা মুখ ফিরিয়ে নিলো।' ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) তাঁর ‘সীরাত গ্রন্থে এর যে কারণ বর্ণনা করেছেন তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা প্রমুখ কুরায়েশদের নিকট আগমন করেন। সেখানে নযর ইবনে হারিসও এসে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলতে শুরু করে। সে যুক্তি-তর্কে টিকতে না পেরে লা-জবাব বা নিরুত্তর হয়ে যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা ও তোমাদের মা’বৃদরা জাহান্নামের ইন্ধন হবে।”(২১:৯৮) তারপর তিনি সেখান হতে চলে আসেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে আবদুল্লাহ ইবনে যাবআলী তামীমী আগমন করে। তখন ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা তাকে বলেঃ “নযর ইবনে হারিস তো আবদুল মুত্তালিবের সন্তানের (পৌত্রের) নিকট হেরে গেছে। শেষ পর্যন্ত সে তো আমাদেরকে ও আমাদের মা'বূদদেরকে জাহান্নামের ইন্ধন বলে দিয়ে চলে গেল।” সে তখন বললোঃ “আমি থাকলে সে নিজেই নিরুত্তর হয়ে যেতো। যাও, তোমরা গিয়ে তাকে প্রশ্ন করঃ আমরা এবং আমাদের সমস্ত মা’রূদ যখন জাহান্নামী তখন এটা অপরিহার্য যে, ফেরেশতারা, হযরত উযায়ের (আঃ) এবং ঈসা (আঃ)ও জাহান্নামী হবেন? কেননা, আমরা ফেরেশতাদের উপাসনা করে থাকি, ইয়াহূদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করে এবং খৃষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে?” তার একথা শুনে মজলিসের লোকেরা সবাই খুব খুশী হলো এবং বললো যে, এটাই সঠিক কথা। নবী (সঃ)-এর কানে যখন এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেনঃ “প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি, যে গায়রুল্লাহর ইবাদত করে এবং প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে খুশী মনে নিজেদের ইবাদত করিয়ে নেয়, এরূপ উপাসক ও উপাস্য উভয়েই জাহান্নামী। ফেরেশতারা এবং নবীরা (আঃ) না নিজেদের ইবাদত করার জন্যে কাউকেও নির্দেশ দিয়েছেন, না তারা তাতে সন্তুষ্ট। তাদের নামে আসলে এরা শয়তানের উপাসনা করে। সেই তাদেরকে শিরকের হুকুম দিয়ে থাকে। আর তারা তার সেই হুকুম পালন করে।” তখন .... (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ), হযরত উযায়ের (আঃ) এবং এঁদের ছাড়া অন্যান্য যেসব আলেম ও ধর্ম যাজকদের এরা উপাসনা করে, যারা নিজেরা আল্লাহর আনুগত্যের উপর কায়েম ছিলেন এবং শিরকের প্রতি অসন্তুষ্ট ও তা হতে বাধাদানকারী ছিলেন, তাঁদের মৃত্যুর পরে এই পথভ্রষ্ট অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে মা'বুদ বানিয়ে নেয়, তারা সম্পূর্ণরূপে নিরপরাধ ।আর ফেরেশতাদেরকে যে মুশরিকরা আল্লাহর কন্যা বিশ্বাস করে নিয়ে তাদের উপাসনা করতো তা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলে যে, দয়াময় (আল্লাহ) সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ তিনি। তা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র, বরং তারা (ফেরেশতারা) তো তার সম্মানিত বান্দা।”(২১:২৬) এর দ্বারা তাদের এই বাতিল আকীদাকে খণ্ডন করা হয়। আর হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন মরিয়ম (আঃ)-এর পুত্রের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমার সম্প্রদায় শশারগোল শুরু করে দেয়। এরপর মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “সে তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্যে দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।” অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাধ্যমে আমি যেসব মু’জিয়া দুনিয়াবাসীকে দেখিয়েছি, যেমন মৃতকে জীবিত করা, কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য দান করা ইত্যাদি, এগুলো কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দলীল হিসেবে যথেষ্ট। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকেই অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তাদের মা’ৰূদদের জাহান্নামী হওয়ার কথা শুনে তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ইবনে মরিয়ম (আঃ) সম্পর্কে আপনি কি বলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” তারা কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে বললো, “আল্লাহর শপথ! এ ব্যক্তি তো শুধু এটাই চায় যে, আমরা যেন তাকে প্রভু বানিয়ে নিই যেমন খৃষ্টানরা হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-কে প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল। তখন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “এরা তো শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একদা বলেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে যার তাফসীর কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি। আমি জানি না যে, সবাই কি এর তাফসীর জানে, না না জেনেও জানার চেষ্টা করে না?” তারপর তিনি মজলিসে অন্য কিছুর বর্ণনা দিতে থাকলেন, অবশেষে মজলিস শেষ হয়ে গেল এবং তিনি উঠে চলে গেলেন। তার সঙ্গীগণ তাঁকে আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ না করার জন্যে খুব আফসোস করতে লাগলেন। তখন ইবনে আকীল আনসারী (রাঃ)-এর মাওলা আবু ইয়াহইয়া (রঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, আগামী কাল সকালে তিনি আগমন করলে আমি তাকে আয়াতটির তাফসীর জিজ্ঞেস করবো।” পরদিন তিনি আগমন করলে হযরত আবু ইয়াহইয়া (রাঃ) পূর্ব দিনের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ঐ আয়াতটি কি?” উত্তরে তিনি বললেন, শুনো, কুরায়েশদেরকে একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেন:“কেউ এমন নেই, আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা যেতে পারে এবং তাতে কল্যাণ থাকতে পারে।” তখন কুরায়েশরা বললোঃ “খৃষ্টানরা কি হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে না? আপনি কি হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর নবী এবং তার মনোনীত বান্দা মনে করেন না? তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই একথা বলার অর্থ কি হতে পারে?” তখন ... (আরবী)-এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “যখন হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর বর্ণনা আসলো তখন এ লোকগুলো হাসতে শুরু করলো।” আর ঈসা (আঃ) কিয়ামতের নিদর্শন’ এর ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের পূর্বে বের হয়ে আসবেন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং এ রিওয়াইয়াতটি পরবর্তী বাক্যটি ছাড়া ইমাম ইবনে আবি হাতিমও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আমাদের দেবতাগুলো ভাল, না এই ব্যক্তি? তাদের এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাদের মা'বুদ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) হতে উত্তম।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ এরা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। অর্থাৎ তাদের এটা বিনা দলীল-প্রমাণে ঝগড়া। মিথ্যার উপরই তারা তর্ক-বিতর্ক করছে। তারা নিজেরাও জানে যে, তারা যেটা বলছে ভাবার্থ সেটা নয় এবং তাদের প্রতিবাদ ও আপত্তি নিরর্থক। কেননা, প্রথমতঃ আয়াতে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যা জ্ঞান-বিবেকহীনের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর দ্বিতীয়তঃ আয়াতে কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে যারা মূর্তি, প্রতিমা, পাথর ইত্যাদির পূজা করতো। তারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর পূজারী ছিল না। সুতরাং নবী (সঃ)-কে তারা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই এ কথা বলে। অর্থাৎ তারা যে কথা বলে সেটা যে বাকপটুত্ব শূন্য তা তারা নিজেরাও জানে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কওম হিদায়াতের উপর থাকার পর কখনো পথভ্রষ্ট হয় না যে পর্যন্ত না তাদের মধ্যে দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়ার রীতি চলে আসে।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে এ হাদীসেরই শুরুতে রয়েছেঃ “নবীর আগমনের পর কোন উম্মত পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তাদের পথভ্রষ্ট হওয়ার প্রথম কারণ হলো তকদীরকে অবিশ্বাস করা। আর নবীর আগমনের পর কোন কওম পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তখনই পথভ্রষ্ট হয়েছে যখন তাদের মধ্যে কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়ে পড়ার রীতি চালু হয়েছে।”হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাহাবীদের মধ্যে এমন সময় আগমন করেন যখন তারা কুরআন কারীমের আয়াতগুলো নিয়ে পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের উপর ভীষণ রাগান্বিত হন। অতঃপর তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা এভাবে আল্লাহর কিতাবের আয়াতগুলোর একটির সাথে অপরটির টক্কর লাগিয়ে দিয়ো না। জেনে রেখো যে, এই পারস্পরিক বাক-বিতণ্ডার অভ্যাসই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ ঈসা (আঃ) তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়ে বানী ইসরাঈলের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। যেন তারা জানতে পারে যে, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই করার তিনি ক্ষমতা রাখেন।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো।কিংবা এর অর্থ হচ্ছেঃ যেমনভাবে তোমরা একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছ তেমনিভাবে তাদেরকেও করে দিতাম। দুই অবস্থাতেই ভাবার্থ একই।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমাদের পরিবর্তে তাদের দ্বারা দুনিয়া আবাদ করতাম।মহান আল্লাহ বলেনঃ “ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।' এর ভাবার্থ ইবনে ইসহাক (রঃ) যা বর্ণনা করেছেন তা কিছুই নয়। আর এর চেয়েও বেশী দূরের কথা হচ্ছে ওটা যা কাতাদা (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেছেন। তা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে কুরআনের দিকে। এই দু'টি উক্তিই ভুল। বরং সঠিক কথা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর দিকে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের একটি নিদর্শন। কেননা, উপর হতে তারই আলোচনা চলে আসছে। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে নাযিল হওয়াকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার মৃত্যুর পূর্বে (হযরত ঈসা আঃ-এর মৃত্যুর পূর্বে) প্রত্যেক আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনবে। তারপর কিয়ামতের দিন সে তাদের উপর সাক্ষী হবে।”(৪:১৫৯)। এই ভাবার্থ পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় এই আয়াতেরই দ্বিতীয় পঠনে, যাতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সে (হযরত ঈসা আঃ) কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আলামত বা লক্ষণ।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা হলো কিয়ামতের লক্ষণ, অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে আগমন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত হয়েছে। আবুল আলিয়া (রঃ), আৰূ মালিক (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা (রঃ) যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতেও অনুরূপই বর্ণিত আছে।মুতাওয়াতির হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খবর দিয়েছেন যে, কিয়ামতের দিনের পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ ইমাম ও ইনসাফকারী হাকিম রূপে অবতীর্ণ হবেন। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না, বরং এটাকে নিশ্চিত রূপে বিশ্বাস কর এবং আমি তোমাদেরকে যে খবর দিচ্ছি তাতে তোমরা আমার অনুসরণ কর, এটাই সরল পথ। শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই আমার এই সরল সঠিক পথ হতে নিবৃত্ত না করে। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ হে আমার কওম! আমি তোমাদের নিকট এসেছি হিকমত অর্থাৎ নবুওয়াত নিয়ে এবং দ্বীনী বিষয়ে তোমরা যে মতভেদ করছো তা স্পষ্ট করে দিবার জন্যে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই বলেন। এই উক্তিটিই উত্তম ও পাকাপোক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ঐ লোকদের উক্তিকে খণ্ডন করেছেন যারা বলেন যে, (আরবী) (কতক) শব্দটি এখানে (আরবী) (সমস্ত) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে আরো বলেনঃ “সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমারই অনুসরণ কর। আল্লাহই তো আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। মনে রেখো যে, তোমরা সবাই এবং আমি নিজেও তার গোলাম এবং তাঁর মুখাপেক্ষী। আমরা তার দরবার ফকীর। সুতরাং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা আমাদের সবারই একান্ত কর্তব্য। তিনি এক ও অংশী বিহীন। এটাই হলো তাওহীদের পথ, এটাই সরল সঠিক পথ।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের কতিপয় দল মতানৈক্য সৃষ্টি করলো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। কেউ কেউ তো হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলেই স্বীকার করলো এবং এরাই ছিল সত্যপন্থী দল। আবার কেউ কেউ তাঁর সম্পর্কে দাবী করলো যে, তিনি আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। আর কেউ কেউ তাকেই আল্লাহ বললো (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা)। আল্লাহ তা'আলা তাদের দুই দাবী হতেই মুক্ত ও পবিত্র। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এ জন্যেই মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ দুর্ভোগ এই যালিমদের জন্যে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করা হবে।
আয-যুখরুফ 43:58
৫৭-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ) এবং হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলোঃ “তারা হাসতে লাগলো।' অর্থাৎ এতে তারা বিস্ময়বোধ করলো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা হতবুদ্ধি হলো এবং হাসতে লাগলো। ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা মুখ ফিরিয়ে নিলো।' ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) তাঁর ‘সীরাত গ্রন্থে এর যে কারণ বর্ণনা করেছেন তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা প্রমুখ কুরায়েশদের নিকট আগমন করেন। সেখানে নযর ইবনে হারিসও এসে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলতে শুরু করে। সে যুক্তি-তর্কে টিকতে না পেরে লা-জবাব বা নিরুত্তর হয়ে যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা ও তোমাদের মা’বৃদরা জাহান্নামের ইন্ধন হবে।”(২১:৯৮) তারপর তিনি সেখান হতে চলে আসেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে আবদুল্লাহ ইবনে যাবআলী তামীমী আগমন করে। তখন ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা তাকে বলেঃ “নযর ইবনে হারিস তো আবদুল মুত্তালিবের সন্তানের (পৌত্রের) নিকট হেরে গেছে। শেষ পর্যন্ত সে তো আমাদেরকে ও আমাদের মা'বূদদেরকে জাহান্নামের ইন্ধন বলে দিয়ে চলে গেল।” সে তখন বললোঃ “আমি থাকলে সে নিজেই নিরুত্তর হয়ে যেতো। যাও, তোমরা গিয়ে তাকে প্রশ্ন করঃ আমরা এবং আমাদের সমস্ত মা’রূদ যখন জাহান্নামী তখন এটা অপরিহার্য যে, ফেরেশতারা, হযরত উযায়ের (আঃ) এবং ঈসা (আঃ)ও জাহান্নামী হবেন? কেননা, আমরা ফেরেশতাদের উপাসনা করে থাকি, ইয়াহূদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করে এবং খৃষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে?” তার একথা শুনে মজলিসের লোকেরা সবাই খুব খুশী হলো এবং বললো যে, এটাই সঠিক কথা। নবী (সঃ)-এর কানে যখন এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেনঃ “প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি, যে গায়রুল্লাহর ইবাদত করে এবং প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে খুশী মনে নিজেদের ইবাদত করিয়ে নেয়, এরূপ উপাসক ও উপাস্য উভয়েই জাহান্নামী। ফেরেশতারা এবং নবীরা (আঃ) না নিজেদের ইবাদত করার জন্যে কাউকেও নির্দেশ দিয়েছেন, না তারা তাতে সন্তুষ্ট। তাদের নামে আসলে এরা শয়তানের উপাসনা করে। সেই তাদেরকে শিরকের হুকুম দিয়ে থাকে। আর তারা তার সেই হুকুম পালন করে।” তখন .... (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ), হযরত উযায়ের (আঃ) এবং এঁদের ছাড়া অন্যান্য যেসব আলেম ও ধর্ম যাজকদের এরা উপাসনা করে, যারা নিজেরা আল্লাহর আনুগত্যের উপর কায়েম ছিলেন এবং শিরকের প্রতি অসন্তুষ্ট ও তা হতে বাধাদানকারী ছিলেন, তাঁদের মৃত্যুর পরে এই পথভ্রষ্ট অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে মা'বুদ বানিয়ে নেয়, তারা সম্পূর্ণরূপে নিরপরাধ ।আর ফেরেশতাদেরকে যে মুশরিকরা আল্লাহর কন্যা বিশ্বাস করে নিয়ে তাদের উপাসনা করতো তা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলে যে, দয়াময় (আল্লাহ) সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ তিনি। তা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র, বরং তারা (ফেরেশতারা) তো তার সম্মানিত বান্দা।”(২১:২৬) এর দ্বারা তাদের এই বাতিল আকীদাকে খণ্ডন করা হয়। আর হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন মরিয়ম (আঃ)-এর পুত্রের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমার সম্প্রদায় শশারগোল শুরু করে দেয়। এরপর মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “সে তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্যে দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।” অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাধ্যমে আমি যেসব মু’জিয়া দুনিয়াবাসীকে দেখিয়েছি, যেমন মৃতকে জীবিত করা, কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য দান করা ইত্যাদি, এগুলো কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দলীল হিসেবে যথেষ্ট। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকেই অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তাদের মা’ৰূদদের জাহান্নামী হওয়ার কথা শুনে তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ইবনে মরিয়ম (আঃ) সম্পর্কে আপনি কি বলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” তারা কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে বললো, “আল্লাহর শপথ! এ ব্যক্তি তো শুধু এটাই চায় যে, আমরা যেন তাকে প্রভু বানিয়ে নিই যেমন খৃষ্টানরা হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-কে প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল। তখন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “এরা তো শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একদা বলেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে যার তাফসীর কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি। আমি জানি না যে, সবাই কি এর তাফসীর জানে, না না জেনেও জানার চেষ্টা করে না?” তারপর তিনি মজলিসে অন্য কিছুর বর্ণনা দিতে থাকলেন, অবশেষে মজলিস শেষ হয়ে গেল এবং তিনি উঠে চলে গেলেন। তার সঙ্গীগণ তাঁকে আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ না করার জন্যে খুব আফসোস করতে লাগলেন। তখন ইবনে আকীল আনসারী (রাঃ)-এর মাওলা আবু ইয়াহইয়া (রঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, আগামী কাল সকালে তিনি আগমন করলে আমি তাকে আয়াতটির তাফসীর জিজ্ঞেস করবো।” পরদিন তিনি আগমন করলে হযরত আবু ইয়াহইয়া (রাঃ) পূর্ব দিনের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ঐ আয়াতটি কি?” উত্তরে তিনি বললেন, শুনো, কুরায়েশদেরকে একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেন:“কেউ এমন নেই, আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা যেতে পারে এবং তাতে কল্যাণ থাকতে পারে।” তখন কুরায়েশরা বললোঃ “খৃষ্টানরা কি হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে না? আপনি কি হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর নবী এবং তার মনোনীত বান্দা মনে করেন না? তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই একথা বলার অর্থ কি হতে পারে?” তখন ... (আরবী)-এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “যখন হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর বর্ণনা আসলো তখন এ লোকগুলো হাসতে শুরু করলো।” আর ঈসা (আঃ) কিয়ামতের নিদর্শন’ এর ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের পূর্বে বের হয়ে আসবেন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং এ রিওয়াইয়াতটি পরবর্তী বাক্যটি ছাড়া ইমাম ইবনে আবি হাতিমও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আমাদের দেবতাগুলো ভাল, না এই ব্যক্তি? তাদের এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাদের মা'বুদ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) হতে উত্তম।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ এরা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। অর্থাৎ তাদের এটা বিনা দলীল-প্রমাণে ঝগড়া। মিথ্যার উপরই তারা তর্ক-বিতর্ক করছে। তারা নিজেরাও জানে যে, তারা যেটা বলছে ভাবার্থ সেটা নয় এবং তাদের প্রতিবাদ ও আপত্তি নিরর্থক। কেননা, প্রথমতঃ আয়াতে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যা জ্ঞান-বিবেকহীনের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর দ্বিতীয়তঃ আয়াতে কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে যারা মূর্তি, প্রতিমা, পাথর ইত্যাদির পূজা করতো। তারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর পূজারী ছিল না। সুতরাং নবী (সঃ)-কে তারা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই এ কথা বলে। অর্থাৎ তারা যে কথা বলে সেটা যে বাকপটুত্ব শূন্য তা তারা নিজেরাও জানে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কওম হিদায়াতের উপর থাকার পর কখনো পথভ্রষ্ট হয় না যে পর্যন্ত না তাদের মধ্যে দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়ার রীতি চলে আসে।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে এ হাদীসেরই শুরুতে রয়েছেঃ “নবীর আগমনের পর কোন উম্মত পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তাদের পথভ্রষ্ট হওয়ার প্রথম কারণ হলো তকদীরকে অবিশ্বাস করা। আর নবীর আগমনের পর কোন কওম পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তখনই পথভ্রষ্ট হয়েছে যখন তাদের মধ্যে কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়ে পড়ার রীতি চালু হয়েছে।”হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাহাবীদের মধ্যে এমন সময় আগমন করেন যখন তারা কুরআন কারীমের আয়াতগুলো নিয়ে পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের উপর ভীষণ রাগান্বিত হন। অতঃপর তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা এভাবে আল্লাহর কিতাবের আয়াতগুলোর একটির সাথে অপরটির টক্কর লাগিয়ে দিয়ো না। জেনে রেখো যে, এই পারস্পরিক বাক-বিতণ্ডার অভ্যাসই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ ঈসা (আঃ) তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়ে বানী ইসরাঈলের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। যেন তারা জানতে পারে যে, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই করার তিনি ক্ষমতা রাখেন।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো।কিংবা এর অর্থ হচ্ছেঃ যেমনভাবে তোমরা একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছ তেমনিভাবে তাদেরকেও করে দিতাম। দুই অবস্থাতেই ভাবার্থ একই।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমাদের পরিবর্তে তাদের দ্বারা দুনিয়া আবাদ করতাম।মহান আল্লাহ বলেনঃ “ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।' এর ভাবার্থ ইবনে ইসহাক (রঃ) যা বর্ণনা করেছেন তা কিছুই নয়। আর এর চেয়েও বেশী দূরের কথা হচ্ছে ওটা যা কাতাদা (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেছেন। তা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে কুরআনের দিকে। এই দু'টি উক্তিই ভুল। বরং সঠিক কথা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর দিকে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের একটি নিদর্শন। কেননা, উপর হতে তারই আলোচনা চলে আসছে। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে নাযিল হওয়াকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার মৃত্যুর পূর্বে (হযরত ঈসা আঃ-এর মৃত্যুর পূর্বে) প্রত্যেক আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনবে। তারপর কিয়ামতের দিন সে তাদের উপর সাক্ষী হবে।”(৪:১৫৯)। এই ভাবার্থ পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় এই আয়াতেরই দ্বিতীয় পঠনে, যাতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সে (হযরত ঈসা আঃ) কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আলামত বা লক্ষণ।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা হলো কিয়ামতের লক্ষণ, অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে আগমন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত হয়েছে। আবুল আলিয়া (রঃ), আৰূ মালিক (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা (রঃ) যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতেও অনুরূপই বর্ণিত আছে।মুতাওয়াতির হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খবর দিয়েছেন যে, কিয়ামতের দিনের পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ ইমাম ও ইনসাফকারী হাকিম রূপে অবতীর্ণ হবেন। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না, বরং এটাকে নিশ্চিত রূপে বিশ্বাস কর এবং আমি তোমাদেরকে যে খবর দিচ্ছি তাতে তোমরা আমার অনুসরণ কর, এটাই সরল পথ। শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই আমার এই সরল সঠিক পথ হতে নিবৃত্ত না করে। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ হে আমার কওম! আমি তোমাদের নিকট এসেছি হিকমত অর্থাৎ নবুওয়াত নিয়ে এবং দ্বীনী বিষয়ে তোমরা যে মতভেদ করছো তা স্পষ্ট করে দিবার জন্যে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই বলেন। এই উক্তিটিই উত্তম ও পাকাপোক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ঐ লোকদের উক্তিকে খণ্ডন করেছেন যারা বলেন যে, (আরবী) (কতক) শব্দটি এখানে (আরবী) (সমস্ত) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে আরো বলেনঃ “সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমারই অনুসরণ কর। আল্লাহই তো আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। মনে রেখো যে, তোমরা সবাই এবং আমি নিজেও তার গোলাম এবং তাঁর মুখাপেক্ষী। আমরা তার দরবার ফকীর। সুতরাং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা আমাদের সবারই একান্ত কর্তব্য। তিনি এক ও অংশী বিহীন। এটাই হলো তাওহীদের পথ, এটাই সরল সঠিক পথ।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের কতিপয় দল মতানৈক্য সৃষ্টি করলো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। কেউ কেউ তো হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলেই স্বীকার করলো এবং এরাই ছিল সত্যপন্থী দল। আবার কেউ কেউ তাঁর সম্পর্কে দাবী করলো যে, তিনি আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। আর কেউ কেউ তাকেই আল্লাহ বললো (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা)। আল্লাহ তা'আলা তাদের দুই দাবী হতেই মুক্ত ও পবিত্র। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এ জন্যেই মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ দুর্ভোগ এই যালিমদের জন্যে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করা হবে।
আয-যুখরুফ 43:59
৫৭-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ) এবং হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলোঃ “তারা হাসতে লাগলো।' অর্থাৎ এতে তারা বিস্ময়বোধ করলো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা হতবুদ্ধি হলো এবং হাসতে লাগলো। ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা মুখ ফিরিয়ে নিলো।' ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) তাঁর ‘সীরাত গ্রন্থে এর যে কারণ বর্ণনা করেছেন তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা প্রমুখ কুরায়েশদের নিকট আগমন করেন। সেখানে নযর ইবনে হারিসও এসে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলতে শুরু করে। সে যুক্তি-তর্কে টিকতে না পেরে লা-জবাব বা নিরুত্তর হয়ে যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা ও তোমাদের মা’বৃদরা জাহান্নামের ইন্ধন হবে।”(২১:৯৮) তারপর তিনি সেখান হতে চলে আসেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে আবদুল্লাহ ইবনে যাবআলী তামীমী আগমন করে। তখন ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা তাকে বলেঃ “নযর ইবনে হারিস তো আবদুল মুত্তালিবের সন্তানের (পৌত্রের) নিকট হেরে গেছে। শেষ পর্যন্ত সে তো আমাদেরকে ও আমাদের মা'বূদদেরকে জাহান্নামের ইন্ধন বলে দিয়ে চলে গেল।” সে তখন বললোঃ “আমি থাকলে সে নিজেই নিরুত্তর হয়ে যেতো। যাও, তোমরা গিয়ে তাকে প্রশ্ন করঃ আমরা এবং আমাদের সমস্ত মা’রূদ যখন জাহান্নামী তখন এটা অপরিহার্য যে, ফেরেশতারা, হযরত উযায়ের (আঃ) এবং ঈসা (আঃ)ও জাহান্নামী হবেন? কেননা, আমরা ফেরেশতাদের উপাসনা করে থাকি, ইয়াহূদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করে এবং খৃষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে?” তার একথা শুনে মজলিসের লোকেরা সবাই খুব খুশী হলো এবং বললো যে, এটাই সঠিক কথা। নবী (সঃ)-এর কানে যখন এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেনঃ “প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি, যে গায়রুল্লাহর ইবাদত করে এবং প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে খুশী মনে নিজেদের ইবাদত করিয়ে নেয়, এরূপ উপাসক ও উপাস্য উভয়েই জাহান্নামী। ফেরেশতারা এবং নবীরা (আঃ) না নিজেদের ইবাদত করার জন্যে কাউকেও নির্দেশ দিয়েছেন, না তারা তাতে সন্তুষ্ট। তাদের নামে আসলে এরা শয়তানের উপাসনা করে। সেই তাদেরকে শিরকের হুকুম দিয়ে থাকে। আর তারা তার সেই হুকুম পালন করে।” তখন .... (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ), হযরত উযায়ের (আঃ) এবং এঁদের ছাড়া অন্যান্য যেসব আলেম ও ধর্ম যাজকদের এরা উপাসনা করে, যারা নিজেরা আল্লাহর আনুগত্যের উপর কায়েম ছিলেন এবং শিরকের প্রতি অসন্তুষ্ট ও তা হতে বাধাদানকারী ছিলেন, তাঁদের মৃত্যুর পরে এই পথভ্রষ্ট অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে মা'বুদ বানিয়ে নেয়, তারা সম্পূর্ণরূপে নিরপরাধ ।আর ফেরেশতাদেরকে যে মুশরিকরা আল্লাহর কন্যা বিশ্বাস করে নিয়ে তাদের উপাসনা করতো তা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলে যে, দয়াময় (আল্লাহ) সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ তিনি। তা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র, বরং তারা (ফেরেশতারা) তো তার সম্মানিত বান্দা।”(২১:২৬) এর দ্বারা তাদের এই বাতিল আকীদাকে খণ্ডন করা হয়। আর হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন মরিয়ম (আঃ)-এর পুত্রের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমার সম্প্রদায় শশারগোল শুরু করে দেয়। এরপর মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “সে তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্যে দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।” অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাধ্যমে আমি যেসব মু’জিয়া দুনিয়াবাসীকে দেখিয়েছি, যেমন মৃতকে জীবিত করা, কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য দান করা ইত্যাদি, এগুলো কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দলীল হিসেবে যথেষ্ট। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকেই অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তাদের মা’ৰূদদের জাহান্নামী হওয়ার কথা শুনে তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ইবনে মরিয়ম (আঃ) সম্পর্কে আপনি কি বলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” তারা কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে বললো, “আল্লাহর শপথ! এ ব্যক্তি তো শুধু এটাই চায় যে, আমরা যেন তাকে প্রভু বানিয়ে নিই যেমন খৃষ্টানরা হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-কে প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল। তখন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “এরা তো শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একদা বলেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে যার তাফসীর কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি। আমি জানি না যে, সবাই কি এর তাফসীর জানে, না না জেনেও জানার চেষ্টা করে না?” তারপর তিনি মজলিসে অন্য কিছুর বর্ণনা দিতে থাকলেন, অবশেষে মজলিস শেষ হয়ে গেল এবং তিনি উঠে চলে গেলেন। তার সঙ্গীগণ তাঁকে আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ না করার জন্যে খুব আফসোস করতে লাগলেন। তখন ইবনে আকীল আনসারী (রাঃ)-এর মাওলা আবু ইয়াহইয়া (রঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, আগামী কাল সকালে তিনি আগমন করলে আমি তাকে আয়াতটির তাফসীর জিজ্ঞেস করবো।” পরদিন তিনি আগমন করলে হযরত আবু ইয়াহইয়া (রাঃ) পূর্ব দিনের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ঐ আয়াতটি কি?” উত্তরে তিনি বললেন, শুনো, কুরায়েশদেরকে একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেন:“কেউ এমন নেই, আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা যেতে পারে এবং তাতে কল্যাণ থাকতে পারে।” তখন কুরায়েশরা বললোঃ “খৃষ্টানরা কি হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে না? আপনি কি হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর নবী এবং তার মনোনীত বান্দা মনে করেন না? তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই একথা বলার অর্থ কি হতে পারে?” তখন ... (আরবী)-এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “যখন হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর বর্ণনা আসলো তখন এ লোকগুলো হাসতে শুরু করলো।” আর ঈসা (আঃ) কিয়ামতের নিদর্শন’ এর ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের পূর্বে বের হয়ে আসবেন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং এ রিওয়াইয়াতটি পরবর্তী বাক্যটি ছাড়া ইমাম ইবনে আবি হাতিমও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আমাদের দেবতাগুলো ভাল, না এই ব্যক্তি? তাদের এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাদের মা'বুদ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) হতে উত্তম।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ এরা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। অর্থাৎ তাদের এটা বিনা দলীল-প্রমাণে ঝগড়া। মিথ্যার উপরই তারা তর্ক-বিতর্ক করছে। তারা নিজেরাও জানে যে, তারা যেটা বলছে ভাবার্থ সেটা নয় এবং তাদের প্রতিবাদ ও আপত্তি নিরর্থক। কেননা, প্রথমতঃ আয়াতে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যা জ্ঞান-বিবেকহীনের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর দ্বিতীয়তঃ আয়াতে কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে যারা মূর্তি, প্রতিমা, পাথর ইত্যাদির পূজা করতো। তারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর পূজারী ছিল না। সুতরাং নবী (সঃ)-কে তারা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই এ কথা বলে। অর্থাৎ তারা যে কথা বলে সেটা যে বাকপটুত্ব শূন্য তা তারা নিজেরাও জানে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কওম হিদায়াতের উপর থাকার পর কখনো পথভ্রষ্ট হয় না যে পর্যন্ত না তাদের মধ্যে দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়ার রীতি চলে আসে।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে এ হাদীসেরই শুরুতে রয়েছেঃ “নবীর আগমনের পর কোন উম্মত পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তাদের পথভ্রষ্ট হওয়ার প্রথম কারণ হলো তকদীরকে অবিশ্বাস করা। আর নবীর আগমনের পর কোন কওম পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তখনই পথভ্রষ্ট হয়েছে যখন তাদের মধ্যে কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়ে পড়ার রীতি চালু হয়েছে।”হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাহাবীদের মধ্যে এমন সময় আগমন করেন যখন তারা কুরআন কারীমের আয়াতগুলো নিয়ে পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের উপর ভীষণ রাগান্বিত হন। অতঃপর তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা এভাবে আল্লাহর কিতাবের আয়াতগুলোর একটির সাথে অপরটির টক্কর লাগিয়ে দিয়ো না। জেনে রেখো যে, এই পারস্পরিক বাক-বিতণ্ডার অভ্যাসই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ ঈসা (আঃ) তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়ে বানী ইসরাঈলের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। যেন তারা জানতে পারে যে, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই করার তিনি ক্ষমতা রাখেন।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো।কিংবা এর অর্থ হচ্ছেঃ যেমনভাবে তোমরা একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছ তেমনিভাবে তাদেরকেও করে দিতাম। দুই অবস্থাতেই ভাবার্থ একই।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমাদের পরিবর্তে তাদের দ্বারা দুনিয়া আবাদ করতাম।মহান আল্লাহ বলেনঃ “ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।' এর ভাবার্থ ইবনে ইসহাক (রঃ) যা বর্ণনা করেছেন তা কিছুই নয়। আর এর চেয়েও বেশী দূরের কথা হচ্ছে ওটা যা কাতাদা (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেছেন। তা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে কুরআনের দিকে। এই দু'টি উক্তিই ভুল। বরং সঠিক কথা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর দিকে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের একটি নিদর্শন। কেননা, উপর হতে তারই আলোচনা চলে আসছে। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে নাযিল হওয়াকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার মৃত্যুর পূর্বে (হযরত ঈসা আঃ-এর মৃত্যুর পূর্বে) প্রত্যেক আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনবে। তারপর কিয়ামতের দিন সে তাদের উপর সাক্ষী হবে।”(৪:১৫৯)। এই ভাবার্থ পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় এই আয়াতেরই দ্বিতীয় পঠনে, যাতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সে (হযরত ঈসা আঃ) কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আলামত বা লক্ষণ।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা হলো কিয়ামতের লক্ষণ, অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে আগমন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত হয়েছে। আবুল আলিয়া (রঃ), আৰূ মালিক (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা (রঃ) যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতেও অনুরূপই বর্ণিত আছে।মুতাওয়াতির হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খবর দিয়েছেন যে, কিয়ামতের দিনের পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ ইমাম ও ইনসাফকারী হাকিম রূপে অবতীর্ণ হবেন। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না, বরং এটাকে নিশ্চিত রূপে বিশ্বাস কর এবং আমি তোমাদেরকে যে খবর দিচ্ছি তাতে তোমরা আমার অনুসরণ কর, এটাই সরল পথ। শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই আমার এই সরল সঠিক পথ হতে নিবৃত্ত না করে। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ হে আমার কওম! আমি তোমাদের নিকট এসেছি হিকমত অর্থাৎ নবুওয়াত নিয়ে এবং দ্বীনী বিষয়ে তোমরা যে মতভেদ করছো তা স্পষ্ট করে দিবার জন্যে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই বলেন। এই উক্তিটিই উত্তম ও পাকাপোক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ঐ লোকদের উক্তিকে খণ্ডন করেছেন যারা বলেন যে, (আরবী) (কতক) শব্দটি এখানে (আরবী) (সমস্ত) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে আরো বলেনঃ “সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমারই অনুসরণ কর। আল্লাহই তো আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। মনে রেখো যে, তোমরা সবাই এবং আমি নিজেও তার গোলাম এবং তাঁর মুখাপেক্ষী। আমরা তার দরবার ফকীর। সুতরাং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা আমাদের সবারই একান্ত কর্তব্য। তিনি এক ও অংশী বিহীন। এটাই হলো তাওহীদের পথ, এটাই সরল সঠিক পথ।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের কতিপয় দল মতানৈক্য সৃষ্টি করলো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। কেউ কেউ তো হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলেই স্বীকার করলো এবং এরাই ছিল সত্যপন্থী দল। আবার কেউ কেউ তাঁর সম্পর্কে দাবী করলো যে, তিনি আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। আর কেউ কেউ তাকেই আল্লাহ বললো (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা)। আল্লাহ তা'আলা তাদের দুই দাবী হতেই মুক্ত ও পবিত্র। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এ জন্যেই মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ দুর্ভোগ এই যালিমদের জন্যে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করা হবে।
আয-যুখরুফ 43:60
৫৭-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ) এবং হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলোঃ “তারা হাসতে লাগলো।' অর্থাৎ এতে তারা বিস্ময়বোধ করলো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা হতবুদ্ধি হলো এবং হাসতে লাগলো। ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা মুখ ফিরিয়ে নিলো।' ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) তাঁর ‘সীরাত গ্রন্থে এর যে কারণ বর্ণনা করেছেন তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা প্রমুখ কুরায়েশদের নিকট আগমন করেন। সেখানে নযর ইবনে হারিসও এসে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলতে শুরু করে। সে যুক্তি-তর্কে টিকতে না পেরে লা-জবাব বা নিরুত্তর হয়ে যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা ও তোমাদের মা’বৃদরা জাহান্নামের ইন্ধন হবে।”(২১:৯৮) তারপর তিনি সেখান হতে চলে আসেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে আবদুল্লাহ ইবনে যাবআলী তামীমী আগমন করে। তখন ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা তাকে বলেঃ “নযর ইবনে হারিস তো আবদুল মুত্তালিবের সন্তানের (পৌত্রের) নিকট হেরে গেছে। শেষ পর্যন্ত সে তো আমাদেরকে ও আমাদের মা'বূদদেরকে জাহান্নামের ইন্ধন বলে দিয়ে চলে গেল।” সে তখন বললোঃ “আমি থাকলে সে নিজেই নিরুত্তর হয়ে যেতো। যাও, তোমরা গিয়ে তাকে প্রশ্ন করঃ আমরা এবং আমাদের সমস্ত মা’রূদ যখন জাহান্নামী তখন এটা অপরিহার্য যে, ফেরেশতারা, হযরত উযায়ের (আঃ) এবং ঈসা (আঃ)ও জাহান্নামী হবেন? কেননা, আমরা ফেরেশতাদের উপাসনা করে থাকি, ইয়াহূদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করে এবং খৃষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে?” তার একথা শুনে মজলিসের লোকেরা সবাই খুব খুশী হলো এবং বললো যে, এটাই সঠিক কথা। নবী (সঃ)-এর কানে যখন এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেনঃ “প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি, যে গায়রুল্লাহর ইবাদত করে এবং প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে খুশী মনে নিজেদের ইবাদত করিয়ে নেয়, এরূপ উপাসক ও উপাস্য উভয়েই জাহান্নামী। ফেরেশতারা এবং নবীরা (আঃ) না নিজেদের ইবাদত করার জন্যে কাউকেও নির্দেশ দিয়েছেন, না তারা তাতে সন্তুষ্ট। তাদের নামে আসলে এরা শয়তানের উপাসনা করে। সেই তাদেরকে শিরকের হুকুম দিয়ে থাকে। আর তারা তার সেই হুকুম পালন করে।” তখন .... (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ), হযরত উযায়ের (আঃ) এবং এঁদের ছাড়া অন্যান্য যেসব আলেম ও ধর্ম যাজকদের এরা উপাসনা করে, যারা নিজেরা আল্লাহর আনুগত্যের উপর কায়েম ছিলেন এবং শিরকের প্রতি অসন্তুষ্ট ও তা হতে বাধাদানকারী ছিলেন, তাঁদের মৃত্যুর পরে এই পথভ্রষ্ট অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে মা'বুদ বানিয়ে নেয়, তারা সম্পূর্ণরূপে নিরপরাধ ।আর ফেরেশতাদেরকে যে মুশরিকরা আল্লাহর কন্যা বিশ্বাস করে নিয়ে তাদের উপাসনা করতো তা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলে যে, দয়াময় (আল্লাহ) সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ তিনি। তা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র, বরং তারা (ফেরেশতারা) তো তার সম্মানিত বান্দা।”(২১:২৬) এর দ্বারা তাদের এই বাতিল আকীদাকে খণ্ডন করা হয়। আর হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন মরিয়ম (আঃ)-এর পুত্রের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমার সম্প্রদায় শশারগোল শুরু করে দেয়। এরপর মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “সে তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্যে দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।” অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাধ্যমে আমি যেসব মু’জিয়া দুনিয়াবাসীকে দেখিয়েছি, যেমন মৃতকে জীবিত করা, কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য দান করা ইত্যাদি, এগুলো কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দলীল হিসেবে যথেষ্ট। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকেই অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তাদের মা’ৰূদদের জাহান্নামী হওয়ার কথা শুনে তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ইবনে মরিয়ম (আঃ) সম্পর্কে আপনি কি বলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” তারা কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে বললো, “আল্লাহর শপথ! এ ব্যক্তি তো শুধু এটাই চায় যে, আমরা যেন তাকে প্রভু বানিয়ে নিই যেমন খৃষ্টানরা হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-কে প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল। তখন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “এরা তো শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একদা বলেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে যার তাফসীর কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি। আমি জানি না যে, সবাই কি এর তাফসীর জানে, না না জেনেও জানার চেষ্টা করে না?” তারপর তিনি মজলিসে অন্য কিছুর বর্ণনা দিতে থাকলেন, অবশেষে মজলিস শেষ হয়ে গেল এবং তিনি উঠে চলে গেলেন। তার সঙ্গীগণ তাঁকে আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ না করার জন্যে খুব আফসোস করতে লাগলেন। তখন ইবনে আকীল আনসারী (রাঃ)-এর মাওলা আবু ইয়াহইয়া (রঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, আগামী কাল সকালে তিনি আগমন করলে আমি তাকে আয়াতটির তাফসীর জিজ্ঞেস করবো।” পরদিন তিনি আগমন করলে হযরত আবু ইয়াহইয়া (রাঃ) পূর্ব দিনের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ঐ আয়াতটি কি?” উত্তরে তিনি বললেন, শুনো, কুরায়েশদেরকে একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেন:“কেউ এমন নেই, আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা যেতে পারে এবং তাতে কল্যাণ থাকতে পারে।” তখন কুরায়েশরা বললোঃ “খৃষ্টানরা কি হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে না? আপনি কি হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর নবী এবং তার মনোনীত বান্দা মনে করেন না? তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই একথা বলার অর্থ কি হতে পারে?” তখন ... (আরবী)-এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “যখন হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর বর্ণনা আসলো তখন এ লোকগুলো হাসতে শুরু করলো।” আর ঈসা (আঃ) কিয়ামতের নিদর্শন’ এর ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের পূর্বে বের হয়ে আসবেন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং এ রিওয়াইয়াতটি পরবর্তী বাক্যটি ছাড়া ইমাম ইবনে আবি হাতিমও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আমাদের দেবতাগুলো ভাল, না এই ব্যক্তি? তাদের এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাদের মা'বুদ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) হতে উত্তম।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ এরা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। অর্থাৎ তাদের এটা বিনা দলীল-প্রমাণে ঝগড়া। মিথ্যার উপরই তারা তর্ক-বিতর্ক করছে। তারা নিজেরাও জানে যে, তারা যেটা বলছে ভাবার্থ সেটা নয় এবং তাদের প্রতিবাদ ও আপত্তি নিরর্থক। কেননা, প্রথমতঃ আয়াতে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যা জ্ঞান-বিবেকহীনের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর দ্বিতীয়তঃ আয়াতে কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে যারা মূর্তি, প্রতিমা, পাথর ইত্যাদির পূজা করতো। তারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর পূজারী ছিল না। সুতরাং নবী (সঃ)-কে তারা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই এ কথা বলে। অর্থাৎ তারা যে কথা বলে সেটা যে বাকপটুত্ব শূন্য তা তারা নিজেরাও জানে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কওম হিদায়াতের উপর থাকার পর কখনো পথভ্রষ্ট হয় না যে পর্যন্ত না তাদের মধ্যে দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়ার রীতি চলে আসে।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে এ হাদীসেরই শুরুতে রয়েছেঃ “নবীর আগমনের পর কোন উম্মত পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তাদের পথভ্রষ্ট হওয়ার প্রথম কারণ হলো তকদীরকে অবিশ্বাস করা। আর নবীর আগমনের পর কোন কওম পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তখনই পথভ্রষ্ট হয়েছে যখন তাদের মধ্যে কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়ে পড়ার রীতি চালু হয়েছে।”হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাহাবীদের মধ্যে এমন সময় আগমন করেন যখন তারা কুরআন কারীমের আয়াতগুলো নিয়ে পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের উপর ভীষণ রাগান্বিত হন। অতঃপর তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা এভাবে আল্লাহর কিতাবের আয়াতগুলোর একটির সাথে অপরটির টক্কর লাগিয়ে দিয়ো না। জেনে রেখো যে, এই পারস্পরিক বাক-বিতণ্ডার অভ্যাসই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ ঈসা (আঃ) তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়ে বানী ইসরাঈলের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। যেন তারা জানতে পারে যে, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই করার তিনি ক্ষমতা রাখেন।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো।কিংবা এর অর্থ হচ্ছেঃ যেমনভাবে তোমরা একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছ তেমনিভাবে তাদেরকেও করে দিতাম। দুই অবস্থাতেই ভাবার্থ একই।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমাদের পরিবর্তে তাদের দ্বারা দুনিয়া আবাদ করতাম।মহান আল্লাহ বলেনঃ “ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।' এর ভাবার্থ ইবনে ইসহাক (রঃ) যা বর্ণনা করেছেন তা কিছুই নয়। আর এর চেয়েও বেশী দূরের কথা হচ্ছে ওটা যা কাতাদা (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেছেন। তা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে কুরআনের দিকে। এই দু'টি উক্তিই ভুল। বরং সঠিক কথা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর দিকে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের একটি নিদর্শন। কেননা, উপর হতে তারই আলোচনা চলে আসছে। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে নাযিল হওয়াকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার মৃত্যুর পূর্বে (হযরত ঈসা আঃ-এর মৃত্যুর পূর্বে) প্রত্যেক আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনবে। তারপর কিয়ামতের দিন সে তাদের উপর সাক্ষী হবে।”(৪:১৫৯)। এই ভাবার্থ পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় এই আয়াতেরই দ্বিতীয় পঠনে, যাতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সে (হযরত ঈসা আঃ) কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আলামত বা লক্ষণ।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা হলো কিয়ামতের লক্ষণ, অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে আগমন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত হয়েছে। আবুল আলিয়া (রঃ), আৰূ মালিক (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা (রঃ) যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতেও অনুরূপই বর্ণিত আছে।মুতাওয়াতির হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খবর দিয়েছেন যে, কিয়ামতের দিনের পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ ইমাম ও ইনসাফকারী হাকিম রূপে অবতীর্ণ হবেন। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না, বরং এটাকে নিশ্চিত রূপে বিশ্বাস কর এবং আমি তোমাদেরকে যে খবর দিচ্ছি তাতে তোমরা আমার অনুসরণ কর, এটাই সরল পথ। শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই আমার এই সরল সঠিক পথ হতে নিবৃত্ত না করে। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ হে আমার কওম! আমি তোমাদের নিকট এসেছি হিকমত অর্থাৎ নবুওয়াত নিয়ে এবং দ্বীনী বিষয়ে তোমরা যে মতভেদ করছো তা স্পষ্ট করে দিবার জন্যে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই বলেন। এই উক্তিটিই উত্তম ও পাকাপোক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ঐ লোকদের উক্তিকে খণ্ডন করেছেন যারা বলেন যে, (আরবী) (কতক) শব্দটি এখানে (আরবী) (সমস্ত) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে আরো বলেনঃ “সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমারই অনুসরণ কর। আল্লাহই তো আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। মনে রেখো যে, তোমরা সবাই এবং আমি নিজেও তার গোলাম এবং তাঁর মুখাপেক্ষী। আমরা তার দরবার ফকীর। সুতরাং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা আমাদের সবারই একান্ত কর্তব্য। তিনি এক ও অংশী বিহীন। এটাই হলো তাওহীদের পথ, এটাই সরল সঠিক পথ।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের কতিপয় দল মতানৈক্য সৃষ্টি করলো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। কেউ কেউ তো হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলেই স্বীকার করলো এবং এরাই ছিল সত্যপন্থী দল। আবার কেউ কেউ তাঁর সম্পর্কে দাবী করলো যে, তিনি আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। আর কেউ কেউ তাকেই আল্লাহ বললো (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা)। আল্লাহ তা'আলা তাদের দুই দাবী হতেই মুক্ত ও পবিত্র। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এ জন্যেই মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ দুর্ভোগ এই যালিমদের জন্যে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করা হবে।
আয-যুখরুফ 43:61
৫৭-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ) এবং হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলোঃ “তারা হাসতে লাগলো।' অর্থাৎ এতে তারা বিস্ময়বোধ করলো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা হতবুদ্ধি হলো এবং হাসতে লাগলো। ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা মুখ ফিরিয়ে নিলো।' ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) তাঁর ‘সীরাত গ্রন্থে এর যে কারণ বর্ণনা করেছেন তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা প্রমুখ কুরায়েশদের নিকট আগমন করেন। সেখানে নযর ইবনে হারিসও এসে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলতে শুরু করে। সে যুক্তি-তর্কে টিকতে না পেরে লা-জবাব বা নিরুত্তর হয়ে যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা ও তোমাদের মা’বৃদরা জাহান্নামের ইন্ধন হবে।”(২১:৯৮) তারপর তিনি সেখান হতে চলে আসেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে আবদুল্লাহ ইবনে যাবআলী তামীমী আগমন করে। তখন ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা তাকে বলেঃ “নযর ইবনে হারিস তো আবদুল মুত্তালিবের সন্তানের (পৌত্রের) নিকট হেরে গেছে। শেষ পর্যন্ত সে তো আমাদেরকে ও আমাদের মা'বূদদেরকে জাহান্নামের ইন্ধন বলে দিয়ে চলে গেল।” সে তখন বললোঃ “আমি থাকলে সে নিজেই নিরুত্তর হয়ে যেতো। যাও, তোমরা গিয়ে তাকে প্রশ্ন করঃ আমরা এবং আমাদের সমস্ত মা’রূদ যখন জাহান্নামী তখন এটা অপরিহার্য যে, ফেরেশতারা, হযরত উযায়ের (আঃ) এবং ঈসা (আঃ)ও জাহান্নামী হবেন? কেননা, আমরা ফেরেশতাদের উপাসনা করে থাকি, ইয়াহূদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করে এবং খৃষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে?” তার একথা শুনে মজলিসের লোকেরা সবাই খুব খুশী হলো এবং বললো যে, এটাই সঠিক কথা। নবী (সঃ)-এর কানে যখন এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেনঃ “প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি, যে গায়রুল্লাহর ইবাদত করে এবং প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে খুশী মনে নিজেদের ইবাদত করিয়ে নেয়, এরূপ উপাসক ও উপাস্য উভয়েই জাহান্নামী। ফেরেশতারা এবং নবীরা (আঃ) না নিজেদের ইবাদত করার জন্যে কাউকেও নির্দেশ দিয়েছেন, না তারা তাতে সন্তুষ্ট। তাদের নামে আসলে এরা শয়তানের উপাসনা করে। সেই তাদেরকে শিরকের হুকুম দিয়ে থাকে। আর তারা তার সেই হুকুম পালন করে।” তখন .... (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ), হযরত উযায়ের (আঃ) এবং এঁদের ছাড়া অন্যান্য যেসব আলেম ও ধর্ম যাজকদের এরা উপাসনা করে, যারা নিজেরা আল্লাহর আনুগত্যের উপর কায়েম ছিলেন এবং শিরকের প্রতি অসন্তুষ্ট ও তা হতে বাধাদানকারী ছিলেন, তাঁদের মৃত্যুর পরে এই পথভ্রষ্ট অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে মা'বুদ বানিয়ে নেয়, তারা সম্পূর্ণরূপে নিরপরাধ ।আর ফেরেশতাদেরকে যে মুশরিকরা আল্লাহর কন্যা বিশ্বাস করে নিয়ে তাদের উপাসনা করতো তা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলে যে, দয়াময় (আল্লাহ) সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ তিনি। তা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র, বরং তারা (ফেরেশতারা) তো তার সম্মানিত বান্দা।”(২১:২৬) এর দ্বারা তাদের এই বাতিল আকীদাকে খণ্ডন করা হয়। আর হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন মরিয়ম (আঃ)-এর পুত্রের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমার সম্প্রদায় শশারগোল শুরু করে দেয়। এরপর মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “সে তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্যে দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।” অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাধ্যমে আমি যেসব মু’জিয়া দুনিয়াবাসীকে দেখিয়েছি, যেমন মৃতকে জীবিত করা, কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য দান করা ইত্যাদি, এগুলো কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দলীল হিসেবে যথেষ্ট। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকেই অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তাদের মা’ৰূদদের জাহান্নামী হওয়ার কথা শুনে তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ইবনে মরিয়ম (আঃ) সম্পর্কে আপনি কি বলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” তারা কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে বললো, “আল্লাহর শপথ! এ ব্যক্তি তো শুধু এটাই চায় যে, আমরা যেন তাকে প্রভু বানিয়ে নিই যেমন খৃষ্টানরা হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-কে প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল। তখন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “এরা তো শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একদা বলেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে যার তাফসীর কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি। আমি জানি না যে, সবাই কি এর তাফসীর জানে, না না জেনেও জানার চেষ্টা করে না?” তারপর তিনি মজলিসে অন্য কিছুর বর্ণনা দিতে থাকলেন, অবশেষে মজলিস শেষ হয়ে গেল এবং তিনি উঠে চলে গেলেন। তার সঙ্গীগণ তাঁকে আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ না করার জন্যে খুব আফসোস করতে লাগলেন। তখন ইবনে আকীল আনসারী (রাঃ)-এর মাওলা আবু ইয়াহইয়া (রঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, আগামী কাল সকালে তিনি আগমন করলে আমি তাকে আয়াতটির তাফসীর জিজ্ঞেস করবো।” পরদিন তিনি আগমন করলে হযরত আবু ইয়াহইয়া (রাঃ) পূর্ব দিনের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ঐ আয়াতটি কি?” উত্তরে তিনি বললেন, শুনো, কুরায়েশদেরকে একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেন:“কেউ এমন নেই, আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা যেতে পারে এবং তাতে কল্যাণ থাকতে পারে।” তখন কুরায়েশরা বললোঃ “খৃষ্টানরা কি হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে না? আপনি কি হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর নবী এবং তার মনোনীত বান্দা মনে করেন না? তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই একথা বলার অর্থ কি হতে পারে?” তখন ... (আরবী)-এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “যখন হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর বর্ণনা আসলো তখন এ লোকগুলো হাসতে শুরু করলো।” আর ঈসা (আঃ) কিয়ামতের নিদর্শন’ এর ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের পূর্বে বের হয়ে আসবেন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং এ রিওয়াইয়াতটি পরবর্তী বাক্যটি ছাড়া ইমাম ইবনে আবি হাতিমও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আমাদের দেবতাগুলো ভাল, না এই ব্যক্তি? তাদের এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাদের মা'বুদ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) হতে উত্তম।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ এরা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। অর্থাৎ তাদের এটা বিনা দলীল-প্রমাণে ঝগড়া। মিথ্যার উপরই তারা তর্ক-বিতর্ক করছে। তারা নিজেরাও জানে যে, তারা যেটা বলছে ভাবার্থ সেটা নয় এবং তাদের প্রতিবাদ ও আপত্তি নিরর্থক। কেননা, প্রথমতঃ আয়াতে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যা জ্ঞান-বিবেকহীনের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর দ্বিতীয়তঃ আয়াতে কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে যারা মূর্তি, প্রতিমা, পাথর ইত্যাদির পূজা করতো। তারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর পূজারী ছিল না। সুতরাং নবী (সঃ)-কে তারা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই এ কথা বলে। অর্থাৎ তারা যে কথা বলে সেটা যে বাকপটুত্ব শূন্য তা তারা নিজেরাও জানে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কওম হিদায়াতের উপর থাকার পর কখনো পথভ্রষ্ট হয় না যে পর্যন্ত না তাদের মধ্যে দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়ার রীতি চলে আসে।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে এ হাদীসেরই শুরুতে রয়েছেঃ “নবীর আগমনের পর কোন উম্মত পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তাদের পথভ্রষ্ট হওয়ার প্রথম কারণ হলো তকদীরকে অবিশ্বাস করা। আর নবীর আগমনের পর কোন কওম পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তখনই পথভ্রষ্ট হয়েছে যখন তাদের মধ্যে কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়ে পড়ার রীতি চালু হয়েছে।”হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাহাবীদের মধ্যে এমন সময় আগমন করেন যখন তারা কুরআন কারীমের আয়াতগুলো নিয়ে পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের উপর ভীষণ রাগান্বিত হন। অতঃপর তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা এভাবে আল্লাহর কিতাবের আয়াতগুলোর একটির সাথে অপরটির টক্কর লাগিয়ে দিয়ো না। জেনে রেখো যে, এই পারস্পরিক বাক-বিতণ্ডার অভ্যাসই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ ঈসা (আঃ) তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়ে বানী ইসরাঈলের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। যেন তারা জানতে পারে যে, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই করার তিনি ক্ষমতা রাখেন।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো।কিংবা এর অর্থ হচ্ছেঃ যেমনভাবে তোমরা একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছ তেমনিভাবে তাদেরকেও করে দিতাম। দুই অবস্থাতেই ভাবার্থ একই।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমাদের পরিবর্তে তাদের দ্বারা দুনিয়া আবাদ করতাম।মহান আল্লাহ বলেনঃ “ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।' এর ভাবার্থ ইবনে ইসহাক (রঃ) যা বর্ণনা করেছেন তা কিছুই নয়। আর এর চেয়েও বেশী দূরের কথা হচ্ছে ওটা যা কাতাদা (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেছেন। তা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে কুরআনের দিকে। এই দু'টি উক্তিই ভুল। বরং সঠিক কথা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর দিকে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের একটি নিদর্শন। কেননা, উপর হতে তারই আলোচনা চলে আসছে। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে নাযিল হওয়াকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার মৃত্যুর পূর্বে (হযরত ঈসা আঃ-এর মৃত্যুর পূর্বে) প্রত্যেক আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনবে। তারপর কিয়ামতের দিন সে তাদের উপর সাক্ষী হবে।”(৪:১৫৯)। এই ভাবার্থ পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় এই আয়াতেরই দ্বিতীয় পঠনে, যাতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সে (হযরত ঈসা আঃ) কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আলামত বা লক্ষণ।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা হলো কিয়ামতের লক্ষণ, অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে আগমন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত হয়েছে। আবুল আলিয়া (রঃ), আৰূ মালিক (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা (রঃ) যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতেও অনুরূপই বর্ণিত আছে।মুতাওয়াতির হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খবর দিয়েছেন যে, কিয়ামতের দিনের পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ ইমাম ও ইনসাফকারী হাকিম রূপে অবতীর্ণ হবেন। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না, বরং এটাকে নিশ্চিত রূপে বিশ্বাস কর এবং আমি তোমাদেরকে যে খবর দিচ্ছি তাতে তোমরা আমার অনুসরণ কর, এটাই সরল পথ। শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই আমার এই সরল সঠিক পথ হতে নিবৃত্ত না করে। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ হে আমার কওম! আমি তোমাদের নিকট এসেছি হিকমত অর্থাৎ নবুওয়াত নিয়ে এবং দ্বীনী বিষয়ে তোমরা যে মতভেদ করছো তা স্পষ্ট করে দিবার জন্যে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই বলেন। এই উক্তিটিই উত্তম ও পাকাপোক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ঐ লোকদের উক্তিকে খণ্ডন করেছেন যারা বলেন যে, (আরবী) (কতক) শব্দটি এখানে (আরবী) (সমস্ত) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে আরো বলেনঃ “সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমারই অনুসরণ কর। আল্লাহই তো আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। মনে রেখো যে, তোমরা সবাই এবং আমি নিজেও তার গোলাম এবং তাঁর মুখাপেক্ষী। আমরা তার দরবার ফকীর। সুতরাং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা আমাদের সবারই একান্ত কর্তব্য। তিনি এক ও অংশী বিহীন। এটাই হলো তাওহীদের পথ, এটাই সরল সঠিক পথ।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের কতিপয় দল মতানৈক্য সৃষ্টি করলো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। কেউ কেউ তো হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলেই স্বীকার করলো এবং এরাই ছিল সত্যপন্থী দল। আবার কেউ কেউ তাঁর সম্পর্কে দাবী করলো যে, তিনি আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। আর কেউ কেউ তাকেই আল্লাহ বললো (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা)। আল্লাহ তা'আলা তাদের দুই দাবী হতেই মুক্ত ও পবিত্র। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এ জন্যেই মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ দুর্ভোগ এই যালিমদের জন্যে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করা হবে।
আয-যুখরুফ 43:62
৫৭-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ) এবং হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলোঃ “তারা হাসতে লাগলো।' অর্থাৎ এতে তারা বিস্ময়বোধ করলো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা হতবুদ্ধি হলো এবং হাসতে লাগলো। ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা মুখ ফিরিয়ে নিলো।' ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) তাঁর ‘সীরাত গ্রন্থে এর যে কারণ বর্ণনা করেছেন তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা প্রমুখ কুরায়েশদের নিকট আগমন করেন। সেখানে নযর ইবনে হারিসও এসে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলতে শুরু করে। সে যুক্তি-তর্কে টিকতে না পেরে লা-জবাব বা নিরুত্তর হয়ে যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা ও তোমাদের মা’বৃদরা জাহান্নামের ইন্ধন হবে।”(২১:৯৮) তারপর তিনি সেখান হতে চলে আসেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে আবদুল্লাহ ইবনে যাবআলী তামীমী আগমন করে। তখন ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা তাকে বলেঃ “নযর ইবনে হারিস তো আবদুল মুত্তালিবের সন্তানের (পৌত্রের) নিকট হেরে গেছে। শেষ পর্যন্ত সে তো আমাদেরকে ও আমাদের মা'বূদদেরকে জাহান্নামের ইন্ধন বলে দিয়ে চলে গেল।” সে তখন বললোঃ “আমি থাকলে সে নিজেই নিরুত্তর হয়ে যেতো। যাও, তোমরা গিয়ে তাকে প্রশ্ন করঃ আমরা এবং আমাদের সমস্ত মা’রূদ যখন জাহান্নামী তখন এটা অপরিহার্য যে, ফেরেশতারা, হযরত উযায়ের (আঃ) এবং ঈসা (আঃ)ও জাহান্নামী হবেন? কেননা, আমরা ফেরেশতাদের উপাসনা করে থাকি, ইয়াহূদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করে এবং খৃষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে?” তার একথা শুনে মজলিসের লোকেরা সবাই খুব খুশী হলো এবং বললো যে, এটাই সঠিক কথা। নবী (সঃ)-এর কানে যখন এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেনঃ “প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি, যে গায়রুল্লাহর ইবাদত করে এবং প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে খুশী মনে নিজেদের ইবাদত করিয়ে নেয়, এরূপ উপাসক ও উপাস্য উভয়েই জাহান্নামী। ফেরেশতারা এবং নবীরা (আঃ) না নিজেদের ইবাদত করার জন্যে কাউকেও নির্দেশ দিয়েছেন, না তারা তাতে সন্তুষ্ট। তাদের নামে আসলে এরা শয়তানের উপাসনা করে। সেই তাদেরকে শিরকের হুকুম দিয়ে থাকে। আর তারা তার সেই হুকুম পালন করে।” তখন .... (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ), হযরত উযায়ের (আঃ) এবং এঁদের ছাড়া অন্যান্য যেসব আলেম ও ধর্ম যাজকদের এরা উপাসনা করে, যারা নিজেরা আল্লাহর আনুগত্যের উপর কায়েম ছিলেন এবং শিরকের প্রতি অসন্তুষ্ট ও তা হতে বাধাদানকারী ছিলেন, তাঁদের মৃত্যুর পরে এই পথভ্রষ্ট অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে মা'বুদ বানিয়ে নেয়, তারা সম্পূর্ণরূপে নিরপরাধ ।আর ফেরেশতাদেরকে যে মুশরিকরা আল্লাহর কন্যা বিশ্বাস করে নিয়ে তাদের উপাসনা করতো তা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলে যে, দয়াময় (আল্লাহ) সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ তিনি। তা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র, বরং তারা (ফেরেশতারা) তো তার সম্মানিত বান্দা।”(২১:২৬) এর দ্বারা তাদের এই বাতিল আকীদাকে খণ্ডন করা হয়। আর হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন মরিয়ম (আঃ)-এর পুত্রের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমার সম্প্রদায় শশারগোল শুরু করে দেয়। এরপর মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “সে তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্যে দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।” অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাধ্যমে আমি যেসব মু’জিয়া দুনিয়াবাসীকে দেখিয়েছি, যেমন মৃতকে জীবিত করা, কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য দান করা ইত্যাদি, এগুলো কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দলীল হিসেবে যথেষ্ট। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকেই অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তাদের মা’ৰূদদের জাহান্নামী হওয়ার কথা শুনে তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ইবনে মরিয়ম (আঃ) সম্পর্কে আপনি কি বলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” তারা কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে বললো, “আল্লাহর শপথ! এ ব্যক্তি তো শুধু এটাই চায় যে, আমরা যেন তাকে প্রভু বানিয়ে নিই যেমন খৃষ্টানরা হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-কে প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল। তখন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “এরা তো শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একদা বলেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে যার তাফসীর কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি। আমি জানি না যে, সবাই কি এর তাফসীর জানে, না না জেনেও জানার চেষ্টা করে না?” তারপর তিনি মজলিসে অন্য কিছুর বর্ণনা দিতে থাকলেন, অবশেষে মজলিস শেষ হয়ে গেল এবং তিনি উঠে চলে গেলেন। তার সঙ্গীগণ তাঁকে আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ না করার জন্যে খুব আফসোস করতে লাগলেন। তখন ইবনে আকীল আনসারী (রাঃ)-এর মাওলা আবু ইয়াহইয়া (রঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, আগামী কাল সকালে তিনি আগমন করলে আমি তাকে আয়াতটির তাফসীর জিজ্ঞেস করবো।” পরদিন তিনি আগমন করলে হযরত আবু ইয়াহইয়া (রাঃ) পূর্ব দিনের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ঐ আয়াতটি কি?” উত্তরে তিনি বললেন, শুনো, কুরায়েশদেরকে একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেন:“কেউ এমন নেই, আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা যেতে পারে এবং তাতে কল্যাণ থাকতে পারে।” তখন কুরায়েশরা বললোঃ “খৃষ্টানরা কি হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে না? আপনি কি হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর নবী এবং তার মনোনীত বান্দা মনে করেন না? তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই একথা বলার অর্থ কি হতে পারে?” তখন ... (আরবী)-এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “যখন হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর বর্ণনা আসলো তখন এ লোকগুলো হাসতে শুরু করলো।” আর ঈসা (আঃ) কিয়ামতের নিদর্শন’ এর ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের পূর্বে বের হয়ে আসবেন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং এ রিওয়াইয়াতটি পরবর্তী বাক্যটি ছাড়া ইমাম ইবনে আবি হাতিমও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আমাদের দেবতাগুলো ভাল, না এই ব্যক্তি? তাদের এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাদের মা'বুদ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) হতে উত্তম।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ এরা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। অর্থাৎ তাদের এটা বিনা দলীল-প্রমাণে ঝগড়া। মিথ্যার উপরই তারা তর্ক-বিতর্ক করছে। তারা নিজেরাও জানে যে, তারা যেটা বলছে ভাবার্থ সেটা নয় এবং তাদের প্রতিবাদ ও আপত্তি নিরর্থক। কেননা, প্রথমতঃ আয়াতে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যা জ্ঞান-বিবেকহীনের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর দ্বিতীয়তঃ আয়াতে কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে যারা মূর্তি, প্রতিমা, পাথর ইত্যাদির পূজা করতো। তারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর পূজারী ছিল না। সুতরাং নবী (সঃ)-কে তারা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই এ কথা বলে। অর্থাৎ তারা যে কথা বলে সেটা যে বাকপটুত্ব শূন্য তা তারা নিজেরাও জানে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কওম হিদায়াতের উপর থাকার পর কখনো পথভ্রষ্ট হয় না যে পর্যন্ত না তাদের মধ্যে দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়ার রীতি চলে আসে।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে এ হাদীসেরই শুরুতে রয়েছেঃ “নবীর আগমনের পর কোন উম্মত পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তাদের পথভ্রষ্ট হওয়ার প্রথম কারণ হলো তকদীরকে অবিশ্বাস করা। আর নবীর আগমনের পর কোন কওম পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তখনই পথভ্রষ্ট হয়েছে যখন তাদের মধ্যে কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়ে পড়ার রীতি চালু হয়েছে।”হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাহাবীদের মধ্যে এমন সময় আগমন করেন যখন তারা কুরআন কারীমের আয়াতগুলো নিয়ে পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের উপর ভীষণ রাগান্বিত হন। অতঃপর তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা এভাবে আল্লাহর কিতাবের আয়াতগুলোর একটির সাথে অপরটির টক্কর লাগিয়ে দিয়ো না। জেনে রেখো যে, এই পারস্পরিক বাক-বিতণ্ডার অভ্যাসই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ ঈসা (আঃ) তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়ে বানী ইসরাঈলের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। যেন তারা জানতে পারে যে, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই করার তিনি ক্ষমতা রাখেন।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো।কিংবা এর অর্থ হচ্ছেঃ যেমনভাবে তোমরা একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছ তেমনিভাবে তাদেরকেও করে দিতাম। দুই অবস্থাতেই ভাবার্থ একই।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমাদের পরিবর্তে তাদের দ্বারা দুনিয়া আবাদ করতাম।মহান আল্লাহ বলেনঃ “ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।' এর ভাবার্থ ইবনে ইসহাক (রঃ) যা বর্ণনা করেছেন তা কিছুই নয়। আর এর চেয়েও বেশী দূরের কথা হচ্ছে ওটা যা কাতাদা (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেছেন। তা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে কুরআনের দিকে। এই দু'টি উক্তিই ভুল। বরং সঠিক কথা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর দিকে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের একটি নিদর্শন। কেননা, উপর হতে তারই আলোচনা চলে আসছে। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে নাযিল হওয়াকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার মৃত্যুর পূর্বে (হযরত ঈসা আঃ-এর মৃত্যুর পূর্বে) প্রত্যেক আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনবে। তারপর কিয়ামতের দিন সে তাদের উপর সাক্ষী হবে।”(৪:১৫৯)। এই ভাবার্থ পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় এই আয়াতেরই দ্বিতীয় পঠনে, যাতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সে (হযরত ঈসা আঃ) কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আলামত বা লক্ষণ।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা হলো কিয়ামতের লক্ষণ, অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে আগমন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত হয়েছে। আবুল আলিয়া (রঃ), আৰূ মালিক (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা (রঃ) যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতেও অনুরূপই বর্ণিত আছে।মুতাওয়াতির হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খবর দিয়েছেন যে, কিয়ামতের দিনের পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ ইমাম ও ইনসাফকারী হাকিম রূপে অবতীর্ণ হবেন। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না, বরং এটাকে নিশ্চিত রূপে বিশ্বাস কর এবং আমি তোমাদেরকে যে খবর দিচ্ছি তাতে তোমরা আমার অনুসরণ কর, এটাই সরল পথ। শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই আমার এই সরল সঠিক পথ হতে নিবৃত্ত না করে। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ হে আমার কওম! আমি তোমাদের নিকট এসেছি হিকমত অর্থাৎ নবুওয়াত নিয়ে এবং দ্বীনী বিষয়ে তোমরা যে মতভেদ করছো তা স্পষ্ট করে দিবার জন্যে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই বলেন। এই উক্তিটিই উত্তম ও পাকাপোক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ঐ লোকদের উক্তিকে খণ্ডন করেছেন যারা বলেন যে, (আরবী) (কতক) শব্দটি এখানে (আরবী) (সমস্ত) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে আরো বলেনঃ “সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমারই অনুসরণ কর। আল্লাহই তো আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। মনে রেখো যে, তোমরা সবাই এবং আমি নিজেও তার গোলাম এবং তাঁর মুখাপেক্ষী। আমরা তার দরবার ফকীর। সুতরাং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা আমাদের সবারই একান্ত কর্তব্য। তিনি এক ও অংশী বিহীন। এটাই হলো তাওহীদের পথ, এটাই সরল সঠিক পথ।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের কতিপয় দল মতানৈক্য সৃষ্টি করলো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। কেউ কেউ তো হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলেই স্বীকার করলো এবং এরাই ছিল সত্যপন্থী দল। আবার কেউ কেউ তাঁর সম্পর্কে দাবী করলো যে, তিনি আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। আর কেউ কেউ তাকেই আল্লাহ বললো (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা)। আল্লাহ তা'আলা তাদের দুই দাবী হতেই মুক্ত ও পবিত্র। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এ জন্যেই মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ দুর্ভোগ এই যালিমদের জন্যে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করা হবে।
আয-যুখরুফ 43:63
৫৭-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ) এবং হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলোঃ “তারা হাসতে লাগলো।' অর্থাৎ এতে তারা বিস্ময়বোধ করলো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা হতবুদ্ধি হলো এবং হাসতে লাগলো। ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা মুখ ফিরিয়ে নিলো।' ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) তাঁর ‘সীরাত গ্রন্থে এর যে কারণ বর্ণনা করেছেন তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা প্রমুখ কুরায়েশদের নিকট আগমন করেন। সেখানে নযর ইবনে হারিসও এসে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলতে শুরু করে। সে যুক্তি-তর্কে টিকতে না পেরে লা-জবাব বা নিরুত্তর হয়ে যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা ও তোমাদের মা’বৃদরা জাহান্নামের ইন্ধন হবে।”(২১:৯৮) তারপর তিনি সেখান হতে চলে আসেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে আবদুল্লাহ ইবনে যাবআলী তামীমী আগমন করে। তখন ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা তাকে বলেঃ “নযর ইবনে হারিস তো আবদুল মুত্তালিবের সন্তানের (পৌত্রের) নিকট হেরে গেছে। শেষ পর্যন্ত সে তো আমাদেরকে ও আমাদের মা'বূদদেরকে জাহান্নামের ইন্ধন বলে দিয়ে চলে গেল।” সে তখন বললোঃ “আমি থাকলে সে নিজেই নিরুত্তর হয়ে যেতো। যাও, তোমরা গিয়ে তাকে প্রশ্ন করঃ আমরা এবং আমাদের সমস্ত মা’রূদ যখন জাহান্নামী তখন এটা অপরিহার্য যে, ফেরেশতারা, হযরত উযায়ের (আঃ) এবং ঈসা (আঃ)ও জাহান্নামী হবেন? কেননা, আমরা ফেরেশতাদের উপাসনা করে থাকি, ইয়াহূদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করে এবং খৃষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে?” তার একথা শুনে মজলিসের লোকেরা সবাই খুব খুশী হলো এবং বললো যে, এটাই সঠিক কথা। নবী (সঃ)-এর কানে যখন এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেনঃ “প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি, যে গায়রুল্লাহর ইবাদত করে এবং প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে খুশী মনে নিজেদের ইবাদত করিয়ে নেয়, এরূপ উপাসক ও উপাস্য উভয়েই জাহান্নামী। ফেরেশতারা এবং নবীরা (আঃ) না নিজেদের ইবাদত করার জন্যে কাউকেও নির্দেশ দিয়েছেন, না তারা তাতে সন্তুষ্ট। তাদের নামে আসলে এরা শয়তানের উপাসনা করে। সেই তাদেরকে শিরকের হুকুম দিয়ে থাকে। আর তারা তার সেই হুকুম পালন করে।” তখন .... (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ), হযরত উযায়ের (আঃ) এবং এঁদের ছাড়া অন্যান্য যেসব আলেম ও ধর্ম যাজকদের এরা উপাসনা করে, যারা নিজেরা আল্লাহর আনুগত্যের উপর কায়েম ছিলেন এবং শিরকের প্রতি অসন্তুষ্ট ও তা হতে বাধাদানকারী ছিলেন, তাঁদের মৃত্যুর পরে এই পথভ্রষ্ট অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে মা'বুদ বানিয়ে নেয়, তারা সম্পূর্ণরূপে নিরপরাধ ।আর ফেরেশতাদেরকে যে মুশরিকরা আল্লাহর কন্যা বিশ্বাস করে নিয়ে তাদের উপাসনা করতো তা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলে যে, দয়াময় (আল্লাহ) সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ তিনি। তা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র, বরং তারা (ফেরেশতারা) তো তার সম্মানিত বান্দা।”(২১:২৬) এর দ্বারা তাদের এই বাতিল আকীদাকে খণ্ডন করা হয়। আর হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন মরিয়ম (আঃ)-এর পুত্রের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমার সম্প্রদায় শশারগোল শুরু করে দেয়। এরপর মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “সে তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্যে দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।” অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাধ্যমে আমি যেসব মু’জিয়া দুনিয়াবাসীকে দেখিয়েছি, যেমন মৃতকে জীবিত করা, কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য দান করা ইত্যাদি, এগুলো কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দলীল হিসেবে যথেষ্ট। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকেই অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তাদের মা’ৰূদদের জাহান্নামী হওয়ার কথা শুনে তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ইবনে মরিয়ম (আঃ) সম্পর্কে আপনি কি বলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” তারা কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে বললো, “আল্লাহর শপথ! এ ব্যক্তি তো শুধু এটাই চায় যে, আমরা যেন তাকে প্রভু বানিয়ে নিই যেমন খৃষ্টানরা হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-কে প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল। তখন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “এরা তো শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একদা বলেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে যার তাফসীর কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি। আমি জানি না যে, সবাই কি এর তাফসীর জানে, না না জেনেও জানার চেষ্টা করে না?” তারপর তিনি মজলিসে অন্য কিছুর বর্ণনা দিতে থাকলেন, অবশেষে মজলিস শেষ হয়ে গেল এবং তিনি উঠে চলে গেলেন। তার সঙ্গীগণ তাঁকে আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ না করার জন্যে খুব আফসোস করতে লাগলেন। তখন ইবনে আকীল আনসারী (রাঃ)-এর মাওলা আবু ইয়াহইয়া (রঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, আগামী কাল সকালে তিনি আগমন করলে আমি তাকে আয়াতটির তাফসীর জিজ্ঞেস করবো।” পরদিন তিনি আগমন করলে হযরত আবু ইয়াহইয়া (রাঃ) পূর্ব দিনের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ঐ আয়াতটি কি?” উত্তরে তিনি বললেন, শুনো, কুরায়েশদেরকে একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেন:“কেউ এমন নেই, আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা যেতে পারে এবং তাতে কল্যাণ থাকতে পারে।” তখন কুরায়েশরা বললোঃ “খৃষ্টানরা কি হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে না? আপনি কি হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর নবী এবং তার মনোনীত বান্দা মনে করেন না? তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই একথা বলার অর্থ কি হতে পারে?” তখন ... (আরবী)-এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “যখন হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর বর্ণনা আসলো তখন এ লোকগুলো হাসতে শুরু করলো।” আর ঈসা (আঃ) কিয়ামতের নিদর্শন’ এর ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের পূর্বে বের হয়ে আসবেন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং এ রিওয়াইয়াতটি পরবর্তী বাক্যটি ছাড়া ইমাম ইবনে আবি হাতিমও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আমাদের দেবতাগুলো ভাল, না এই ব্যক্তি? তাদের এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাদের মা'বুদ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) হতে উত্তম।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ এরা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। অর্থাৎ তাদের এটা বিনা দলীল-প্রমাণে ঝগড়া। মিথ্যার উপরই তারা তর্ক-বিতর্ক করছে। তারা নিজেরাও জানে যে, তারা যেটা বলছে ভাবার্থ সেটা নয় এবং তাদের প্রতিবাদ ও আপত্তি নিরর্থক। কেননা, প্রথমতঃ আয়াতে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যা জ্ঞান-বিবেকহীনের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর দ্বিতীয়তঃ আয়াতে কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে যারা মূর্তি, প্রতিমা, পাথর ইত্যাদির পূজা করতো। তারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর পূজারী ছিল না। সুতরাং নবী (সঃ)-কে তারা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই এ কথা বলে। অর্থাৎ তারা যে কথা বলে সেটা যে বাকপটুত্ব শূন্য তা তারা নিজেরাও জানে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কওম হিদায়াতের উপর থাকার পর কখনো পথভ্রষ্ট হয় না যে পর্যন্ত না তাদের মধ্যে দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়ার রীতি চলে আসে।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে এ হাদীসেরই শুরুতে রয়েছেঃ “নবীর আগমনের পর কোন উম্মত পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তাদের পথভ্রষ্ট হওয়ার প্রথম কারণ হলো তকদীরকে অবিশ্বাস করা। আর নবীর আগমনের পর কোন কওম পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তখনই পথভ্রষ্ট হয়েছে যখন তাদের মধ্যে কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়ে পড়ার রীতি চালু হয়েছে।”হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাহাবীদের মধ্যে এমন সময় আগমন করেন যখন তারা কুরআন কারীমের আয়াতগুলো নিয়ে পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের উপর ভীষণ রাগান্বিত হন। অতঃপর তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা এভাবে আল্লাহর কিতাবের আয়াতগুলোর একটির সাথে অপরটির টক্কর লাগিয়ে দিয়ো না। জেনে রেখো যে, এই পারস্পরিক বাক-বিতণ্ডার অভ্যাসই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ ঈসা (আঃ) তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়ে বানী ইসরাঈলের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। যেন তারা জানতে পারে যে, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই করার তিনি ক্ষমতা রাখেন।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো।কিংবা এর অর্থ হচ্ছেঃ যেমনভাবে তোমরা একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছ তেমনিভাবে তাদেরকেও করে দিতাম। দুই অবস্থাতেই ভাবার্থ একই।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমাদের পরিবর্তে তাদের দ্বারা দুনিয়া আবাদ করতাম।মহান আল্লাহ বলেনঃ “ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।' এর ভাবার্থ ইবনে ইসহাক (রঃ) যা বর্ণনা করেছেন তা কিছুই নয়। আর এর চেয়েও বেশী দূরের কথা হচ্ছে ওটা যা কাতাদা (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেছেন। তা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে কুরআনের দিকে। এই দু'টি উক্তিই ভুল। বরং সঠিক কথা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর দিকে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের একটি নিদর্শন। কেননা, উপর হতে তারই আলোচনা চলে আসছে। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে নাযিল হওয়াকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার মৃত্যুর পূর্বে (হযরত ঈসা আঃ-এর মৃত্যুর পূর্বে) প্রত্যেক আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনবে। তারপর কিয়ামতের দিন সে তাদের উপর সাক্ষী হবে।”(৪:১৫৯)। এই ভাবার্থ পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় এই আয়াতেরই দ্বিতীয় পঠনে, যাতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সে (হযরত ঈসা আঃ) কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আলামত বা লক্ষণ।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা হলো কিয়ামতের লক্ষণ, অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে আগমন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত হয়েছে। আবুল আলিয়া (রঃ), আৰূ মালিক (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা (রঃ) যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতেও অনুরূপই বর্ণিত আছে।মুতাওয়াতির হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খবর দিয়েছেন যে, কিয়ামতের দিনের পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ ইমাম ও ইনসাফকারী হাকিম রূপে অবতীর্ণ হবেন। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না, বরং এটাকে নিশ্চিত রূপে বিশ্বাস কর এবং আমি তোমাদেরকে যে খবর দিচ্ছি তাতে তোমরা আমার অনুসরণ কর, এটাই সরল পথ। শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই আমার এই সরল সঠিক পথ হতে নিবৃত্ত না করে। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ হে আমার কওম! আমি তোমাদের নিকট এসেছি হিকমত অর্থাৎ নবুওয়াত নিয়ে এবং দ্বীনী বিষয়ে তোমরা যে মতভেদ করছো তা স্পষ্ট করে দিবার জন্যে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই বলেন। এই উক্তিটিই উত্তম ও পাকাপোক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ঐ লোকদের উক্তিকে খণ্ডন করেছেন যারা বলেন যে, (আরবী) (কতক) শব্দটি এখানে (আরবী) (সমস্ত) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে আরো বলেনঃ “সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমারই অনুসরণ কর। আল্লাহই তো আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। মনে রেখো যে, তোমরা সবাই এবং আমি নিজেও তার গোলাম এবং তাঁর মুখাপেক্ষী। আমরা তার দরবার ফকীর। সুতরাং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা আমাদের সবারই একান্ত কর্তব্য। তিনি এক ও অংশী বিহীন। এটাই হলো তাওহীদের পথ, এটাই সরল সঠিক পথ।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের কতিপয় দল মতানৈক্য সৃষ্টি করলো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। কেউ কেউ তো হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলেই স্বীকার করলো এবং এরাই ছিল সত্যপন্থী দল। আবার কেউ কেউ তাঁর সম্পর্কে দাবী করলো যে, তিনি আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। আর কেউ কেউ তাকেই আল্লাহ বললো (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা)। আল্লাহ তা'আলা তাদের দুই দাবী হতেই মুক্ত ও পবিত্র। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এ জন্যেই মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ দুর্ভোগ এই যালিমদের জন্যে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করা হবে।
আয-যুখরুফ 43:64
৫৭-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ) এবং হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলোঃ “তারা হাসতে লাগলো।' অর্থাৎ এতে তারা বিস্ময়বোধ করলো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা হতবুদ্ধি হলো এবং হাসতে লাগলো। ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা মুখ ফিরিয়ে নিলো।' ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) তাঁর ‘সীরাত গ্রন্থে এর যে কারণ বর্ণনা করেছেন তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা প্রমুখ কুরায়েশদের নিকট আগমন করেন। সেখানে নযর ইবনে হারিসও এসে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলতে শুরু করে। সে যুক্তি-তর্কে টিকতে না পেরে লা-জবাব বা নিরুত্তর হয়ে যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা ও তোমাদের মা’বৃদরা জাহান্নামের ইন্ধন হবে।”(২১:৯৮) তারপর তিনি সেখান হতে চলে আসেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে আবদুল্লাহ ইবনে যাবআলী তামীমী আগমন করে। তখন ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা তাকে বলেঃ “নযর ইবনে হারিস তো আবদুল মুত্তালিবের সন্তানের (পৌত্রের) নিকট হেরে গেছে। শেষ পর্যন্ত সে তো আমাদেরকে ও আমাদের মা'বূদদেরকে জাহান্নামের ইন্ধন বলে দিয়ে চলে গেল।” সে তখন বললোঃ “আমি থাকলে সে নিজেই নিরুত্তর হয়ে যেতো। যাও, তোমরা গিয়ে তাকে প্রশ্ন করঃ আমরা এবং আমাদের সমস্ত মা’রূদ যখন জাহান্নামী তখন এটা অপরিহার্য যে, ফেরেশতারা, হযরত উযায়ের (আঃ) এবং ঈসা (আঃ)ও জাহান্নামী হবেন? কেননা, আমরা ফেরেশতাদের উপাসনা করে থাকি, ইয়াহূদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করে এবং খৃষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে?” তার একথা শুনে মজলিসের লোকেরা সবাই খুব খুশী হলো এবং বললো যে, এটাই সঠিক কথা। নবী (সঃ)-এর কানে যখন এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেনঃ “প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি, যে গায়রুল্লাহর ইবাদত করে এবং প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে খুশী মনে নিজেদের ইবাদত করিয়ে নেয়, এরূপ উপাসক ও উপাস্য উভয়েই জাহান্নামী। ফেরেশতারা এবং নবীরা (আঃ) না নিজেদের ইবাদত করার জন্যে কাউকেও নির্দেশ দিয়েছেন, না তারা তাতে সন্তুষ্ট। তাদের নামে আসলে এরা শয়তানের উপাসনা করে। সেই তাদেরকে শিরকের হুকুম দিয়ে থাকে। আর তারা তার সেই হুকুম পালন করে।” তখন .... (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ), হযরত উযায়ের (আঃ) এবং এঁদের ছাড়া অন্যান্য যেসব আলেম ও ধর্ম যাজকদের এরা উপাসনা করে, যারা নিজেরা আল্লাহর আনুগত্যের উপর কায়েম ছিলেন এবং শিরকের প্রতি অসন্তুষ্ট ও তা হতে বাধাদানকারী ছিলেন, তাঁদের মৃত্যুর পরে এই পথভ্রষ্ট অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে মা'বুদ বানিয়ে নেয়, তারা সম্পূর্ণরূপে নিরপরাধ ।আর ফেরেশতাদেরকে যে মুশরিকরা আল্লাহর কন্যা বিশ্বাস করে নিয়ে তাদের উপাসনা করতো তা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলে যে, দয়াময় (আল্লাহ) সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ তিনি। তা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র, বরং তারা (ফেরেশতারা) তো তার সম্মানিত বান্দা।”(২১:২৬) এর দ্বারা তাদের এই বাতিল আকীদাকে খণ্ডন করা হয়। আর হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন মরিয়ম (আঃ)-এর পুত্রের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমার সম্প্রদায় শশারগোল শুরু করে দেয়। এরপর মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “সে তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্যে দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।” অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাধ্যমে আমি যেসব মু’জিয়া দুনিয়াবাসীকে দেখিয়েছি, যেমন মৃতকে জীবিত করা, কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য দান করা ইত্যাদি, এগুলো কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দলীল হিসেবে যথেষ্ট। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকেই অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তাদের মা’ৰূদদের জাহান্নামী হওয়ার কথা শুনে তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ইবনে মরিয়ম (আঃ) সম্পর্কে আপনি কি বলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” তারা কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে বললো, “আল্লাহর শপথ! এ ব্যক্তি তো শুধু এটাই চায় যে, আমরা যেন তাকে প্রভু বানিয়ে নিই যেমন খৃষ্টানরা হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-কে প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল। তখন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “এরা তো শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একদা বলেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে যার তাফসীর কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি। আমি জানি না যে, সবাই কি এর তাফসীর জানে, না না জেনেও জানার চেষ্টা করে না?” তারপর তিনি মজলিসে অন্য কিছুর বর্ণনা দিতে থাকলেন, অবশেষে মজলিস শেষ হয়ে গেল এবং তিনি উঠে চলে গেলেন। তার সঙ্গীগণ তাঁকে আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ না করার জন্যে খুব আফসোস করতে লাগলেন। তখন ইবনে আকীল আনসারী (রাঃ)-এর মাওলা আবু ইয়াহইয়া (রঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, আগামী কাল সকালে তিনি আগমন করলে আমি তাকে আয়াতটির তাফসীর জিজ্ঞেস করবো।” পরদিন তিনি আগমন করলে হযরত আবু ইয়াহইয়া (রাঃ) পূর্ব দিনের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ঐ আয়াতটি কি?” উত্তরে তিনি বললেন, শুনো, কুরায়েশদেরকে একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেন:“কেউ এমন নেই, আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা যেতে পারে এবং তাতে কল্যাণ থাকতে পারে।” তখন কুরায়েশরা বললোঃ “খৃষ্টানরা কি হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে না? আপনি কি হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর নবী এবং তার মনোনীত বান্দা মনে করেন না? তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই একথা বলার অর্থ কি হতে পারে?” তখন ... (আরবী)-এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “যখন হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর বর্ণনা আসলো তখন এ লোকগুলো হাসতে শুরু করলো।” আর ঈসা (আঃ) কিয়ামতের নিদর্শন’ এর ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের পূর্বে বের হয়ে আসবেন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং এ রিওয়াইয়াতটি পরবর্তী বাক্যটি ছাড়া ইমাম ইবনে আবি হাতিমও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আমাদের দেবতাগুলো ভাল, না এই ব্যক্তি? তাদের এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাদের মা'বুদ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) হতে উত্তম।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ এরা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। অর্থাৎ তাদের এটা বিনা দলীল-প্রমাণে ঝগড়া। মিথ্যার উপরই তারা তর্ক-বিতর্ক করছে। তারা নিজেরাও জানে যে, তারা যেটা বলছে ভাবার্থ সেটা নয় এবং তাদের প্রতিবাদ ও আপত্তি নিরর্থক। কেননা, প্রথমতঃ আয়াতে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যা জ্ঞান-বিবেকহীনের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর দ্বিতীয়তঃ আয়াতে কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে যারা মূর্তি, প্রতিমা, পাথর ইত্যাদির পূজা করতো। তারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর পূজারী ছিল না। সুতরাং নবী (সঃ)-কে তারা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই এ কথা বলে। অর্থাৎ তারা যে কথা বলে সেটা যে বাকপটুত্ব শূন্য তা তারা নিজেরাও জানে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কওম হিদায়াতের উপর থাকার পর কখনো পথভ্রষ্ট হয় না যে পর্যন্ত না তাদের মধ্যে দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়ার রীতি চলে আসে।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে এ হাদীসেরই শুরুতে রয়েছেঃ “নবীর আগমনের পর কোন উম্মত পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তাদের পথভ্রষ্ট হওয়ার প্রথম কারণ হলো তকদীরকে অবিশ্বাস করা। আর নবীর আগমনের পর কোন কওম পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তখনই পথভ্রষ্ট হয়েছে যখন তাদের মধ্যে কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়ে পড়ার রীতি চালু হয়েছে।”হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাহাবীদের মধ্যে এমন সময় আগমন করেন যখন তারা কুরআন কারীমের আয়াতগুলো নিয়ে পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের উপর ভীষণ রাগান্বিত হন। অতঃপর তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা এভাবে আল্লাহর কিতাবের আয়াতগুলোর একটির সাথে অপরটির টক্কর লাগিয়ে দিয়ো না। জেনে রেখো যে, এই পারস্পরিক বাক-বিতণ্ডার অভ্যাসই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ ঈসা (আঃ) তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়ে বানী ইসরাঈলের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। যেন তারা জানতে পারে যে, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই করার তিনি ক্ষমতা রাখেন।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো।কিংবা এর অর্থ হচ্ছেঃ যেমনভাবে তোমরা একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছ তেমনিভাবে তাদেরকেও করে দিতাম। দুই অবস্থাতেই ভাবার্থ একই।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমাদের পরিবর্তে তাদের দ্বারা দুনিয়া আবাদ করতাম।মহান আল্লাহ বলেনঃ “ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।' এর ভাবার্থ ইবনে ইসহাক (রঃ) যা বর্ণনা করেছেন তা কিছুই নয়। আর এর চেয়েও বেশী দূরের কথা হচ্ছে ওটা যা কাতাদা (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেছেন। তা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে কুরআনের দিকে। এই দু'টি উক্তিই ভুল। বরং সঠিক কথা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর দিকে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের একটি নিদর্শন। কেননা, উপর হতে তারই আলোচনা চলে আসছে। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে নাযিল হওয়াকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার মৃত্যুর পূর্বে (হযরত ঈসা আঃ-এর মৃত্যুর পূর্বে) প্রত্যেক আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনবে। তারপর কিয়ামতের দিন সে তাদের উপর সাক্ষী হবে।”(৪:১৫৯)। এই ভাবার্থ পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় এই আয়াতেরই দ্বিতীয় পঠনে, যাতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সে (হযরত ঈসা আঃ) কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আলামত বা লক্ষণ।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা হলো কিয়ামতের লক্ষণ, অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে আগমন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত হয়েছে। আবুল আলিয়া (রঃ), আৰূ মালিক (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা (রঃ) যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতেও অনুরূপই বর্ণিত আছে।মুতাওয়াতির হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খবর দিয়েছেন যে, কিয়ামতের দিনের পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ ইমাম ও ইনসাফকারী হাকিম রূপে অবতীর্ণ হবেন। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না, বরং এটাকে নিশ্চিত রূপে বিশ্বাস কর এবং আমি তোমাদেরকে যে খবর দিচ্ছি তাতে তোমরা আমার অনুসরণ কর, এটাই সরল পথ। শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই আমার এই সরল সঠিক পথ হতে নিবৃত্ত না করে। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ হে আমার কওম! আমি তোমাদের নিকট এসেছি হিকমত অর্থাৎ নবুওয়াত নিয়ে এবং দ্বীনী বিষয়ে তোমরা যে মতভেদ করছো তা স্পষ্ট করে দিবার জন্যে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই বলেন। এই উক্তিটিই উত্তম ও পাকাপোক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ঐ লোকদের উক্তিকে খণ্ডন করেছেন যারা বলেন যে, (আরবী) (কতক) শব্দটি এখানে (আরবী) (সমস্ত) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে আরো বলেনঃ “সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমারই অনুসরণ কর। আল্লাহই তো আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। মনে রেখো যে, তোমরা সবাই এবং আমি নিজেও তার গোলাম এবং তাঁর মুখাপেক্ষী। আমরা তার দরবার ফকীর। সুতরাং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা আমাদের সবারই একান্ত কর্তব্য। তিনি এক ও অংশী বিহীন। এটাই হলো তাওহীদের পথ, এটাই সরল সঠিক পথ।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের কতিপয় দল মতানৈক্য সৃষ্টি করলো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। কেউ কেউ তো হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলেই স্বীকার করলো এবং এরাই ছিল সত্যপন্থী দল। আবার কেউ কেউ তাঁর সম্পর্কে দাবী করলো যে, তিনি আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। আর কেউ কেউ তাকেই আল্লাহ বললো (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা)। আল্লাহ তা'আলা তাদের দুই দাবী হতেই মুক্ত ও পবিত্র। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এ জন্যেই মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ দুর্ভোগ এই যালিমদের জন্যে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করা হবে।
আয-যুখরুফ 43:65
৫৭-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ) এবং হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলোঃ “তারা হাসতে লাগলো।' অর্থাৎ এতে তারা বিস্ময়বোধ করলো। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা হতবুদ্ধি হলো এবং হাসতে লাগলো। ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “তারা মুখ ফিরিয়ে নিলো।' ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) তাঁর ‘সীরাত গ্রন্থে এর যে কারণ বর্ণনা করেছেন তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা প্রমুখ কুরায়েশদের নিকট আগমন করেন। সেখানে নযর ইবনে হারিসও এসে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলতে শুরু করে। সে যুক্তি-তর্কে টিকতে না পেরে লা-জবাব বা নিরুত্তর হয়ে যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা ও তোমাদের মা’বৃদরা জাহান্নামের ইন্ধন হবে।”(২১:৯৮) তারপর তিনি সেখান হতে চলে আসেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে আবদুল্লাহ ইবনে যাবআলী তামীমী আগমন করে। তখন ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা তাকে বলেঃ “নযর ইবনে হারিস তো আবদুল মুত্তালিবের সন্তানের (পৌত্রের) নিকট হেরে গেছে। শেষ পর্যন্ত সে তো আমাদেরকে ও আমাদের মা'বূদদেরকে জাহান্নামের ইন্ধন বলে দিয়ে চলে গেল।” সে তখন বললোঃ “আমি থাকলে সে নিজেই নিরুত্তর হয়ে যেতো। যাও, তোমরা গিয়ে তাকে প্রশ্ন করঃ আমরা এবং আমাদের সমস্ত মা’রূদ যখন জাহান্নামী তখন এটা অপরিহার্য যে, ফেরেশতারা, হযরত উযায়ের (আঃ) এবং ঈসা (আঃ)ও জাহান্নামী হবেন? কেননা, আমরা ফেরেশতাদের উপাসনা করে থাকি, ইয়াহূদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করে এবং খৃষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে?” তার একথা শুনে মজলিসের লোকেরা সবাই খুব খুশী হলো এবং বললো যে, এটাই সঠিক কথা। নবী (সঃ)-এর কানে যখন এ সংবাদ পৌঁছলো তখন তিনি বললেনঃ “প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি, যে গায়রুল্লাহর ইবাদত করে এবং প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে খুশী মনে নিজেদের ইবাদত করিয়ে নেয়, এরূপ উপাসক ও উপাস্য উভয়েই জাহান্নামী। ফেরেশতারা এবং নবীরা (আঃ) না নিজেদের ইবাদত করার জন্যে কাউকেও নির্দেশ দিয়েছেন, না তারা তাতে সন্তুষ্ট। তাদের নামে আসলে এরা শয়তানের উপাসনা করে। সেই তাদেরকে শিরকের হুকুম দিয়ে থাকে। আর তারা তার সেই হুকুম পালন করে।” তখন .... (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ), হযরত উযায়ের (আঃ) এবং এঁদের ছাড়া অন্যান্য যেসব আলেম ও ধর্ম যাজকদের এরা উপাসনা করে, যারা নিজেরা আল্লাহর আনুগত্যের উপর কায়েম ছিলেন এবং শিরকের প্রতি অসন্তুষ্ট ও তা হতে বাধাদানকারী ছিলেন, তাঁদের মৃত্যুর পরে এই পথভ্রষ্ট অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে মা'বুদ বানিয়ে নেয়, তারা সম্পূর্ণরূপে নিরপরাধ ।আর ফেরেশতাদেরকে যে মুশরিকরা আল্লাহর কন্যা বিশ্বাস করে নিয়ে তাদের উপাসনা করতো তা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলে যে, দয়াময় (আল্লাহ) সন্তান গ্রহণ করেছেন, অথচ তিনি। তা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র, বরং তারা (ফেরেশতারা) তো তার সম্মানিত বান্দা।”(২১:২৬) এর দ্বারা তাদের এই বাতিল আকীদাকে খণ্ডন করা হয়। আর হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন মরিয়ম (আঃ)-এর পুত্রের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমার সম্প্রদায় শশারগোল শুরু করে দেয়। এরপর মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “সে তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্যে দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।” অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাধ্যমে আমি যেসব মু’জিয়া দুনিয়াবাসীকে দেখিয়েছি, যেমন মৃতকে জীবিত করা, কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য দান করা ইত্যাদি, এগুলো কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দলীল হিসেবে যথেষ্ট। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকেই অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তাদের মা’ৰূদদের জাহান্নামী হওয়ার কথা শুনে তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ইবনে মরিয়ম (আঃ) সম্পর্কে আপনি কি বলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” তারা কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে বললো, “আল্লাহর শপথ! এ ব্যক্তি তো শুধু এটাই চায় যে, আমরা যেন তাকে প্রভু বানিয়ে নিই যেমন খৃষ্টানরা হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-কে প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল। তখন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “এরা তো শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একদা বলেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে যার তাফসীর কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি। আমি জানি না যে, সবাই কি এর তাফসীর জানে, না না জেনেও জানার চেষ্টা করে না?” তারপর তিনি মজলিসে অন্য কিছুর বর্ণনা দিতে থাকলেন, অবশেষে মজলিস শেষ হয়ে গেল এবং তিনি উঠে চলে গেলেন। তার সঙ্গীগণ তাঁকে আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ না করার জন্যে খুব আফসোস করতে লাগলেন। তখন ইবনে আকীল আনসারী (রাঃ)-এর মাওলা আবু ইয়াহইয়া (রঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, আগামী কাল সকালে তিনি আগমন করলে আমি তাকে আয়াতটির তাফসীর জিজ্ঞেস করবো।” পরদিন তিনি আগমন করলে হযরত আবু ইয়াহইয়া (রাঃ) পূর্ব দিনের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ঐ আয়াতটি কি?” উত্তরে তিনি বললেন, শুনো, কুরায়েশদেরকে একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেন:“কেউ এমন নেই, আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা যেতে পারে এবং তাতে কল্যাণ থাকতে পারে।” তখন কুরায়েশরা বললোঃ “খৃষ্টানরা কি হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করে না? আপনি কি হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর নবী এবং তার মনোনীত বান্দা মনে করেন না? তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই একথা বলার অর্থ কি হতে পারে?” তখন ... (আরবী)-এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “যখন হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর বর্ণনা আসলো তখন এ লোকগুলো হাসতে শুরু করলো।” আর ঈসা (আঃ) কিয়ামতের নিদর্শন’ এর ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের পূর্বে বের হয়ে আসবেন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং এ রিওয়াইয়াতটি পরবর্তী বাক্যটি ছাড়া ইমাম ইবনে আবি হাতিমও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আমাদের দেবতাগুলো ভাল, না এই ব্যক্তি? তাদের এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমাদের মা'বুদ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) হতে উত্তম।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ এরা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। অর্থাৎ তাদের এটা বিনা দলীল-প্রমাণে ঝগড়া। মিথ্যার উপরই তারা তর্ক-বিতর্ক করছে। তারা নিজেরাও জানে যে, তারা যেটা বলছে ভাবার্থ সেটা নয় এবং তাদের প্রতিবাদ ও আপত্তি নিরর্থক। কেননা, প্রথমতঃ আয়াতে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যা জ্ঞান-বিবেকহীনের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর দ্বিতীয়তঃ আয়াতে কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে যারা মূর্তি, প্রতিমা, পাথর ইত্যাদির পূজা করতো। তারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর পূজারী ছিল না। সুতরাং নবী (সঃ)-কে তারা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই এ কথা বলে। অর্থাৎ তারা যে কথা বলে সেটা যে বাকপটুত্ব শূন্য তা তারা নিজেরাও জানে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কওম হিদায়াতের উপর থাকার পর কখনো পথভ্রষ্ট হয় না যে পর্যন্ত না তাদের মধ্যে দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়ার রীতি চলে আসে।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে এ হাদীসেরই শুরুতে রয়েছেঃ “নবীর আগমনের পর কোন উম্মত পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তাদের পথভ্রষ্ট হওয়ার প্রথম কারণ হলো তকদীরকে অবিশ্বাস করা। আর নবীর আগমনের পর কোন কওম পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তখনই পথভ্রষ্ট হয়েছে যখন তাদের মধ্যে কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়ে পড়ার রীতি চালু হয়েছে।”হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সাহাবীদের মধ্যে এমন সময় আগমন করেন যখন তারা কুরআন কারীমের আয়াতগুলো নিয়ে পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের উপর ভীষণ রাগান্বিত হন। অতঃপর তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা এভাবে আল্লাহর কিতাবের আয়াতগুলোর একটির সাথে অপরটির টক্কর লাগিয়ে দিয়ো না। জেনে রেখো যে, এই পারস্পরিক বাক-বিতণ্ডার অভ্যাসই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ ঈসা (আঃ) তো ছিল আমারই এক বান্দা যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন বানিয়ে বানী ইসরাঈলের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। যেন তারা জানতে পারে যে, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই করার তিনি ক্ষমতা রাখেন।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো।কিংবা এর অর্থ হচ্ছেঃ যেমনভাবে তোমরা একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছ তেমনিভাবে তাদেরকেও করে দিতাম। দুই অবস্থাতেই ভাবার্থ একই।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমাদের পরিবর্তে তাদের দ্বারা দুনিয়া আবাদ করতাম।মহান আল্লাহ বলেনঃ “ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতের নিদর্শন।' এর ভাবার্থ ইবনে ইসহাক (রঃ) যা বর্ণনা করেছেন তা কিছুই নয়। আর এর চেয়েও বেশী দূরের কথা হচ্ছে ওটা যা কাতাদা (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেছেন। তা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে কুরআনের দিকে। এই দু'টি উক্তিই ভুল। বরং সঠিক কথা এই যে, (আরবী) সর্বনামটি ফিরেছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর দিকে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ) কিয়ামতের একটি নিদর্শন। কেননা, উপর হতে তারই আলোচনা চলে আসছে। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে নাযিল হওয়াকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার মৃত্যুর পূর্বে (হযরত ঈসা আঃ-এর মৃত্যুর পূর্বে) প্রত্যেক আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনবে। তারপর কিয়ামতের দিন সে তাদের উপর সাক্ষী হবে।”(৪:১৫৯)। এই ভাবার্থ পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় এই আয়াতেরই দ্বিতীয় পঠনে, যাতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সে (হযরত ঈসা আঃ) কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আলামত বা লক্ষণ।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা হলো কিয়ামতের লক্ষণ, অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আঃ)-এর কিয়ামতের পূর্বে আগমন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত হয়েছে। আবুল আলিয়া (রঃ), আৰূ মালিক (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রঃ), কাতাদা (রঃ) যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতেও অনুরূপই বর্ণিত আছে।মুতাওয়াতির হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খবর দিয়েছেন যে, কিয়ামতের দিনের পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ ইমাম ও ইনসাফকারী হাকিম রূপে অবতীর্ণ হবেন। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না, বরং এটাকে নিশ্চিত রূপে বিশ্বাস কর এবং আমি তোমাদেরকে যে খবর দিচ্ছি তাতে তোমরা আমার অনুসরণ কর, এটাই সরল পথ। শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই আমার এই সরল সঠিক পথ হতে নিবৃত্ত না করে। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ হে আমার কওম! আমি তোমাদের নিকট এসেছি হিকমত অর্থাৎ নবুওয়াত নিয়ে এবং দ্বীনী বিষয়ে তোমরা যে মতভেদ করছো তা স্পষ্ট করে দিবার জন্যে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই বলেন। এই উক্তিটিই উত্তম ও পাকাপোক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ঐ লোকদের উক্তিকে খণ্ডন করেছেন যারা বলেন যে, (আরবী) (কতক) শব্দটি এখানে (আরবী) (সমস্ত) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর কওমকে আরো বলেনঃ “সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমারই অনুসরণ কর। আল্লাহই তো আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। মনে রেখো যে, তোমরা সবাই এবং আমি নিজেও তার গোলাম এবং তাঁর মুখাপেক্ষী। আমরা তার দরবার ফকীর। সুতরাং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা আমাদের সবারই একান্ত কর্তব্য। তিনি এক ও অংশী বিহীন। এটাই হলো তাওহীদের পথ, এটাই সরল সঠিক পথ।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর তাদের কতিপয় দল মতানৈক্য সৃষ্টি করলো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। কেউ কেউ তো হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলেই স্বীকার করলো এবং এরাই ছিল সত্যপন্থী দল। আবার কেউ কেউ তাঁর সম্পর্কে দাবী করলো যে, তিনি আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। আর কেউ কেউ তাকেই আল্লাহ বললো (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা)। আল্লাহ তা'আলা তাদের দুই দাবী হতেই মুক্ত ও পবিত্র। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এ জন্যেই মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ দুর্ভোগ এই যালিমদের জন্যে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করা হবে।
আয-যুখরুফ 43:66
৬৬-৭৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দেখো, এই মুশরিকরা কিয়ামতের অপেক্ষা করছে, কিন্তু এতে কোন লাভ নেই, কেননা এটা তাদের অজ্ঞাতসারে আকস্মিকভাবে এসে পড়বে। কারণ এটা সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময় তো কারো জানা নেই। হঠাৎ করে যখন এটা এসে পড়বে তখন এরা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলেও কোন উপকার হবে না। এরা যদিও এই কিয়ামতকে অসম্ভব মনে করছে, কিন্তু এটা শুধু সম্ভবই নয়, বরং নিশ্চিত। ঐ সময় বা ঐ সময়ের পরের আমল কোন কাজে আসবে না। দুনিয়ায় যাদের বন্ধুত্ব গায়রুল্লাহর জন্যে রয়েছে ঐ দিন সেটা শত্রুতায় পরিবর্তিত হবে। হ্যা, তবে যে বন্ধুত্ব শুধু আল্লাহর জন্যে রয়েছে তা বাকী ও চিরস্থায়ী থাকবে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহ ছাড়া প্রতিমাগুলোর সাথে পার্থিব জীবনে যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে রেখেছে তা শুধু পার্থিব জীবন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে, অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমাদের একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করবে এবং তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম, আর তোমাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী হবে না।”(২৯:২৫)।হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ দুই জন মুমিন যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজনের মৃত্যু হয় এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে সে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয় তখন সে তার ঐ দুনিয়ার বন্ধুকে স্মরণ করে এবং বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার এবং আপনার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিতো। আমাকে সে ভাল কাজের আদেশ করতো এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখতো। আমাকে সে বিশ্বাস করাতো যে, একদিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। সুতরাং হে আল্লাহ! তাকে আপনি সত্য পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং শেষে তাকে ওটাই দেখিয়ে দিবেন যা আমাকে দেখিয়েছেন এবং তার উপর ঐরূপই সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন যেমন সন্তুষ্ট আমার উপর হয়েছেন।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি সন্তুষ্ট চিত্তে চলে যাও। আমি তার জন্যে যা কিছু প্রস্তুত রেখেছি তা যদি তুমি দেখতে তবে খুব হাসতে এবং মোটেই দুঃখিত হতে না।” অতঃপর যখন তার ঐ বন্ধু মারা যায় এবং দুই বন্ধুর রূহ মিলিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বর্ণনা দাও।” তখন একজন অপরজনকে বলেঃ “তুমি আমার খুব ভাল বন্ধু ছিলে ও অত্যন্ত সৎ সঙ্গী ছিলে এবং ছিলে অতি উত্তম দোস্ত। পক্ষান্তরে, দুইজন কাফির, যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজন মারা যায় এবং তাকে জাহান্নামের দুঃসংবাদ দেয়া। হয় তখন দুনিয়ার ঐ বন্ধুর কথা তার স্মরণ হয় এবং সে বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার ও আপনার নবী (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণের নির্দেশ দিতো। সে আমাকে মন্দ কাজে উৎসাহিত করতো এবং ভাল কাজ হতে বিরত রাখতো। আর আমার মনে সে এই বিশ্বাস জন্মাতো যে, আপনার সাথে সাক্ষাৎ হবে না। সুতরাং আপনি তাকে সুপথ প্রদর্শন করবেন না যাতে সেও যেন ওটাই দেখতে পায় যা আমাকে দেখানো হয়েছে এবং আপনি তার উপর ঐরূপই অসন্তুষ্ট থাকবেন যেরূপ আমার উপর অসন্তুষ্ট রয়েছেন।” তারপর যখন ঐ দ্বিতীয় বন্ধু মারা যায় এবং উভয়ের রূহ একত্রিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা একে অপরের গুণাগুণ বর্ণনা কর।” প্রত্যেকেই তখন অপরকে বলেঃ “তুমি আমার খুবই মন্দ ভাই ছিলে, ছিলে খারাপ সঙ্গী ও নিকৃষ্ট বন্ধু।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বন্ধুত্ব শত্রুতায় পরিবর্তিত হয়ে যাবে। তবে আল্লাহভীরুদের বন্ধুত্ব তা হবে না। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে দুই ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালবাসে, যাদের একজন রয়েছে পূর্ব দিকে এবং অপরজন রয়েছে পশ্চিম দিকে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের দুজনকেই একত্রিত করে প্রত্যেককেই বলবেনঃ “এ হলো ঐ ব্যক্তি যাকে তুমি আমারই জন্যে ভালবাসতে।” (এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইরশাদ হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন মুত্তাকীদেরকে বলা হবেঃ হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না। যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। এটা হলো তোমাদের . ঈমান ও ইসলামের প্রতিদান। অর্থাৎ ভিতরে বিশ্বাস ও পূর্ণ প্রত্যয়, আর বাইরে শরীয়তের উপর আমল। মু’তামার ইবনে সুলাইমান (রাঃ) স্বীয় পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন মানুষ নিজ নিজ কবর হতে উথিত হবে তখন সবাই অশান্তি ও সন্ত্রাসের মধ্যে থাকবে। তখন একজন ঘোষক (আল্লাহর বাণী) ঘোষণা করবেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং দুঃখিতও হবে না তোমরা।' এ ঘোষণা শুনে সবাই খুশী হয়ে যাবে, কারণ তারা এটাকে সাধারণ ঘোষণা মনে করবে (অর্থাৎ তারা মনে করবে যে এ ঘোষণা সবারই জন্যে)। এরপর আবার ঘোষণা করা হবেঃ ‘যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল। এ ঘোষণা শুনে খাটি ও পাকা মুসলমান ছাড়া অন্যান্য সবাই নিরাশ হয়ে যাবে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীরা সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর।' সূরায়ে রূমে-এর তাফসীর গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে। সেখানে সবকিছু রয়েছে অন্তর যা চায় এবং নয়ন যাতে তৃপ্ত হয়। সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে।(আরবী) এবং (আরবী) এই দুই কিরআতই রয়েছে। অর্থাৎ সেখানে তাদের জন্যে সুস্বাদু, সুগন্ধময় এবং সুন্দর রঙ এর খাবার রয়েছে যা মনে চায়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সর্বাপেক্ষা নিম্নশ্রেণীর জান্নাতী, যে সর্বশেষ জান্নাতে যাবে, তার দৃষ্টি শত বছরের পথের দূরত্ব পর্যন্ত যাবে, আর তত দূর পর্যন্ত সে শুধু নিজেরই ডেরা, . তাঁবু এবং স্বর্ণ ও পান্না নির্মিত প্রাসাদ দেখতে পাবে। ঐগুলো সবই বিভিন্ন প্রকারের ও রঙ বেরঙ এর আসবাবপত্রে ভরপুর থাকবে। সকাল-সন্ধ্যায় বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যে পরিপূর্ণ সত্তর হাজার করে রেকাবী ও পেয়ালা তার সামনে পেশ করা হবে। ঐগুলোর প্রত্যেকটি তার মনের চাহিদা মুতাবিক হবে। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার চাহিদা একই রকম থাকবে। যদি সে সারা দুনিয়ার লোককে যিয়াফত দেয় তবে তাদের সবারই জন্যে ঐ খাদ্যগুলো যথেষ্ট হবে। অথচ ওগুলোর কিছুই কমবে না।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জান্নাতের। বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর। শপথ! জান্নাতী খাবারের একটি গ্রাস উঠাবে এবং তার মনে খেয়াল জাগবে যে, অমুক প্রকারের খাদ্য হলে খুবই ভাল হতো! তখন ঐ গ্রাস তার মুখে ঐ জিনিসই হয়ে যাবে যার সে আকাঙ্ক্ষা করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর সাত তলা প্রাসাদ হবে। সে ষষ্ঠ তলায় অবস্থান করবে এবং সপ্তম তলাটি তার উপরে থাকবে। তার ত্রিশজন খাদেম থাকবে যারা সকাল-সন্ধ্যায় স্বর্ণ নির্মিত তিনশটি পাত্রে তার জন্যে খাদ্য পরিবেশন করবে। প্রত্যেকটিতে পৃথক পৃথক খাদ্য থাকবে এবং ওগুলো হবে খুবই সুন্দর ও সুস্বাদু। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার খাওয়ার চাহিদা একই রূপ থাকবে। অনুরূপভাবে তাকে তিন শ’টি সোনার পেয়ালা, পানপাত্র ও গ্লাসে পানীয় জিনিস দেয়া হবে। ওগুলোও পৃথক পৃথক জিনিস হবে। সে তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি সমস্ত জান্নাতীকে দাওয়াত দিতাম। সবাই যদি আমার এখানে খায় তবুও আমার খাদ্য মোটেই হ্রাস পাবে না।” আয়ত চক্ষু বিশিষ্ট হ্রদের মধ্য হতে তার বাহাত্তরটি স্ত্রী থাকবে এবং দুনিয়ার স্ত্রী পৃথকভাবে থাকবে। তাদের মধ্যে এক একজন এক এক মাইল জায়গার মধ্যে বসে থাকবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সাথে সাথে তাদেরকে বলা হবেঃ তোমাদের এই নিয়ামত চিরস্থায়ী থাকবে। আর তোমরাও হবে এখানে স্থায়ী। অর্থাৎ কখনো এখান হতে বের হবে না এবং এটা হতে স্থানান্তর কামনা করবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের উপর নিজের অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন:“এটাই জান্নাত, তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে, তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ।” অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে এটা দান করেছি আমার প্রশস্ত রহমতের গুণে। কেননা, কোন ব্যক্তিই আল্লাহর রহমত ছাড়া শুধু নিজের কর্মের বলে জান্নাতে যেতে পারে না। হ্যা, তবে অবশ্যই জান্নাতের শেণীভেদ যে হবে তা সৎ কার্যাবলীর পার্থক্যের কারণেই হবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামী তার জান্নাতের জায়গা জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে এবং দেখে দুঃখ ও আফসোস করে বলবে যে, যদি আল্লাহ তাকে হিদায়াত দান করতেন তবে সেও মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত হতো। আর প্রত্যেক জান্নাতী তার জাহান্নামের জায়গা জান্নাতের মধ্যে দেখতে পাবে এবং ওটা দেখে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পূর্বক বলবে:“আল্লাহ তা'আলা আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করলে আমি সুপথ লাভে সক্ষম হতাম না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেনঃ “প্রত্যেক লোকেরই একটি স্থান জান্নাতে রয়েছে এবং একটি স্থান জাহান্নামে রয়েছে। সুতরাং কাফির মুমিনের জাহান্নামের জায়গার ওয়ারিস হবে এবং মুমিন কাফিরের জান্নাতের জায়গার ওয়ারিস হবে। আল্লাহ তা'আলার ‘এটাই জান্নাত, যার অধিকারী তোমাদেরকে করা হয়েছে তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ এই উক্তির দ্বারা এটাকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)খাদ্য ও পানীয়ের বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ জান্নাতের ফলমূল ও তরিতরকারীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সেখানে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তারা সেগুলো হতে আহার করবে। মোটকথা, তারা ভরপুর নিয়ামতরাজিসহ মহান আল্লাহর পছন্দনীয় ঘরে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আয-যুখরুফ 43:67
৬৬-৭৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দেখো, এই মুশরিকরা কিয়ামতের অপেক্ষা করছে, কিন্তু এতে কোন লাভ নেই, কেননা এটা তাদের অজ্ঞাতসারে আকস্মিকভাবে এসে পড়বে। কারণ এটা সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময় তো কারো জানা নেই। হঠাৎ করে যখন এটা এসে পড়বে তখন এরা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলেও কোন উপকার হবে না। এরা যদিও এই কিয়ামতকে অসম্ভব মনে করছে, কিন্তু এটা শুধু সম্ভবই নয়, বরং নিশ্চিত। ঐ সময় বা ঐ সময়ের পরের আমল কোন কাজে আসবে না। দুনিয়ায় যাদের বন্ধুত্ব গায়রুল্লাহর জন্যে রয়েছে ঐ দিন সেটা শত্রুতায় পরিবর্তিত হবে। হ্যা, তবে যে বন্ধুত্ব শুধু আল্লাহর জন্যে রয়েছে তা বাকী ও চিরস্থায়ী থাকবে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহ ছাড়া প্রতিমাগুলোর সাথে পার্থিব জীবনে যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে রেখেছে তা শুধু পার্থিব জীবন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে, অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমাদের একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করবে এবং তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম, আর তোমাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী হবে না।”(২৯:২৫)।হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ দুই জন মুমিন যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজনের মৃত্যু হয় এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে সে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয় তখন সে তার ঐ দুনিয়ার বন্ধুকে স্মরণ করে এবং বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার এবং আপনার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিতো। আমাকে সে ভাল কাজের আদেশ করতো এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখতো। আমাকে সে বিশ্বাস করাতো যে, একদিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। সুতরাং হে আল্লাহ! তাকে আপনি সত্য পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং শেষে তাকে ওটাই দেখিয়ে দিবেন যা আমাকে দেখিয়েছেন এবং তার উপর ঐরূপই সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন যেমন সন্তুষ্ট আমার উপর হয়েছেন।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি সন্তুষ্ট চিত্তে চলে যাও। আমি তার জন্যে যা কিছু প্রস্তুত রেখেছি তা যদি তুমি দেখতে তবে খুব হাসতে এবং মোটেই দুঃখিত হতে না।” অতঃপর যখন তার ঐ বন্ধু মারা যায় এবং দুই বন্ধুর রূহ মিলিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বর্ণনা দাও।” তখন একজন অপরজনকে বলেঃ “তুমি আমার খুব ভাল বন্ধু ছিলে ও অত্যন্ত সৎ সঙ্গী ছিলে এবং ছিলে অতি উত্তম দোস্ত। পক্ষান্তরে, দুইজন কাফির, যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজন মারা যায় এবং তাকে জাহান্নামের দুঃসংবাদ দেয়া। হয় তখন দুনিয়ার ঐ বন্ধুর কথা তার স্মরণ হয় এবং সে বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার ও আপনার নবী (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণের নির্দেশ দিতো। সে আমাকে মন্দ কাজে উৎসাহিত করতো এবং ভাল কাজ হতে বিরত রাখতো। আর আমার মনে সে এই বিশ্বাস জন্মাতো যে, আপনার সাথে সাক্ষাৎ হবে না। সুতরাং আপনি তাকে সুপথ প্রদর্শন করবেন না যাতে সেও যেন ওটাই দেখতে পায় যা আমাকে দেখানো হয়েছে এবং আপনি তার উপর ঐরূপই অসন্তুষ্ট থাকবেন যেরূপ আমার উপর অসন্তুষ্ট রয়েছেন।” তারপর যখন ঐ দ্বিতীয় বন্ধু মারা যায় এবং উভয়ের রূহ একত্রিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা একে অপরের গুণাগুণ বর্ণনা কর।” প্রত্যেকেই তখন অপরকে বলেঃ “তুমি আমার খুবই মন্দ ভাই ছিলে, ছিলে খারাপ সঙ্গী ও নিকৃষ্ট বন্ধু।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বন্ধুত্ব শত্রুতায় পরিবর্তিত হয়ে যাবে। তবে আল্লাহভীরুদের বন্ধুত্ব তা হবে না। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে দুই ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালবাসে, যাদের একজন রয়েছে পূর্ব দিকে এবং অপরজন রয়েছে পশ্চিম দিকে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের দুজনকেই একত্রিত করে প্রত্যেককেই বলবেনঃ “এ হলো ঐ ব্যক্তি যাকে তুমি আমারই জন্যে ভালবাসতে।” (এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইরশাদ হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন মুত্তাকীদেরকে বলা হবেঃ হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না। যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। এটা হলো তোমাদের . ঈমান ও ইসলামের প্রতিদান। অর্থাৎ ভিতরে বিশ্বাস ও পূর্ণ প্রত্যয়, আর বাইরে শরীয়তের উপর আমল। মু’তামার ইবনে সুলাইমান (রাঃ) স্বীয় পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন মানুষ নিজ নিজ কবর হতে উথিত হবে তখন সবাই অশান্তি ও সন্ত্রাসের মধ্যে থাকবে। তখন একজন ঘোষক (আল্লাহর বাণী) ঘোষণা করবেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং দুঃখিতও হবে না তোমরা।' এ ঘোষণা শুনে সবাই খুশী হয়ে যাবে, কারণ তারা এটাকে সাধারণ ঘোষণা মনে করবে (অর্থাৎ তারা মনে করবে যে এ ঘোষণা সবারই জন্যে)। এরপর আবার ঘোষণা করা হবেঃ ‘যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল। এ ঘোষণা শুনে খাটি ও পাকা মুসলমান ছাড়া অন্যান্য সবাই নিরাশ হয়ে যাবে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীরা সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর।' সূরায়ে রূমে-এর তাফসীর গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে। সেখানে সবকিছু রয়েছে অন্তর যা চায় এবং নয়ন যাতে তৃপ্ত হয়। সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে।(আরবী) এবং (আরবী) এই দুই কিরআতই রয়েছে। অর্থাৎ সেখানে তাদের জন্যে সুস্বাদু, সুগন্ধময় এবং সুন্দর রঙ এর খাবার রয়েছে যা মনে চায়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সর্বাপেক্ষা নিম্নশ্রেণীর জান্নাতী, যে সর্বশেষ জান্নাতে যাবে, তার দৃষ্টি শত বছরের পথের দূরত্ব পর্যন্ত যাবে, আর তত দূর পর্যন্ত সে শুধু নিজেরই ডেরা, . তাঁবু এবং স্বর্ণ ও পান্না নির্মিত প্রাসাদ দেখতে পাবে। ঐগুলো সবই বিভিন্ন প্রকারের ও রঙ বেরঙ এর আসবাবপত্রে ভরপুর থাকবে। সকাল-সন্ধ্যায় বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যে পরিপূর্ণ সত্তর হাজার করে রেকাবী ও পেয়ালা তার সামনে পেশ করা হবে। ঐগুলোর প্রত্যেকটি তার মনের চাহিদা মুতাবিক হবে। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার চাহিদা একই রকম থাকবে। যদি সে সারা দুনিয়ার লোককে যিয়াফত দেয় তবে তাদের সবারই জন্যে ঐ খাদ্যগুলো যথেষ্ট হবে। অথচ ওগুলোর কিছুই কমবে না।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জান্নাতের। বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর। শপথ! জান্নাতী খাবারের একটি গ্রাস উঠাবে এবং তার মনে খেয়াল জাগবে যে, অমুক প্রকারের খাদ্য হলে খুবই ভাল হতো! তখন ঐ গ্রাস তার মুখে ঐ জিনিসই হয়ে যাবে যার সে আকাঙ্ক্ষা করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর সাত তলা প্রাসাদ হবে। সে ষষ্ঠ তলায় অবস্থান করবে এবং সপ্তম তলাটি তার উপরে থাকবে। তার ত্রিশজন খাদেম থাকবে যারা সকাল-সন্ধ্যায় স্বর্ণ নির্মিত তিনশটি পাত্রে তার জন্যে খাদ্য পরিবেশন করবে। প্রত্যেকটিতে পৃথক পৃথক খাদ্য থাকবে এবং ওগুলো হবে খুবই সুন্দর ও সুস্বাদু। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার খাওয়ার চাহিদা একই রূপ থাকবে। অনুরূপভাবে তাকে তিন শ’টি সোনার পেয়ালা, পানপাত্র ও গ্লাসে পানীয় জিনিস দেয়া হবে। ওগুলোও পৃথক পৃথক জিনিস হবে। সে তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি সমস্ত জান্নাতীকে দাওয়াত দিতাম। সবাই যদি আমার এখানে খায় তবুও আমার খাদ্য মোটেই হ্রাস পাবে না।” আয়ত চক্ষু বিশিষ্ট হ্রদের মধ্য হতে তার বাহাত্তরটি স্ত্রী থাকবে এবং দুনিয়ার স্ত্রী পৃথকভাবে থাকবে। তাদের মধ্যে এক একজন এক এক মাইল জায়গার মধ্যে বসে থাকবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সাথে সাথে তাদেরকে বলা হবেঃ তোমাদের এই নিয়ামত চিরস্থায়ী থাকবে। আর তোমরাও হবে এখানে স্থায়ী। অর্থাৎ কখনো এখান হতে বের হবে না এবং এটা হতে স্থানান্তর কামনা করবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের উপর নিজের অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন:“এটাই জান্নাত, তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে, তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ।” অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে এটা দান করেছি আমার প্রশস্ত রহমতের গুণে। কেননা, কোন ব্যক্তিই আল্লাহর রহমত ছাড়া শুধু নিজের কর্মের বলে জান্নাতে যেতে পারে না। হ্যা, তবে অবশ্যই জান্নাতের শেণীভেদ যে হবে তা সৎ কার্যাবলীর পার্থক্যের কারণেই হবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামী তার জান্নাতের জায়গা জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে এবং দেখে দুঃখ ও আফসোস করে বলবে যে, যদি আল্লাহ তাকে হিদায়াত দান করতেন তবে সেও মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত হতো। আর প্রত্যেক জান্নাতী তার জাহান্নামের জায়গা জান্নাতের মধ্যে দেখতে পাবে এবং ওটা দেখে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পূর্বক বলবে:“আল্লাহ তা'আলা আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করলে আমি সুপথ লাভে সক্ষম হতাম না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেনঃ “প্রত্যেক লোকেরই একটি স্থান জান্নাতে রয়েছে এবং একটি স্থান জাহান্নামে রয়েছে। সুতরাং কাফির মুমিনের জাহান্নামের জায়গার ওয়ারিস হবে এবং মুমিন কাফিরের জান্নাতের জায়গার ওয়ারিস হবে। আল্লাহ তা'আলার ‘এটাই জান্নাত, যার অধিকারী তোমাদেরকে করা হয়েছে তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ এই উক্তির দ্বারা এটাকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)খাদ্য ও পানীয়ের বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ জান্নাতের ফলমূল ও তরিতরকারীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সেখানে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তারা সেগুলো হতে আহার করবে। মোটকথা, তারা ভরপুর নিয়ামতরাজিসহ মহান আল্লাহর পছন্দনীয় ঘরে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আয-যুখরুফ 43:68
৬৬-৭৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দেখো, এই মুশরিকরা কিয়ামতের অপেক্ষা করছে, কিন্তু এতে কোন লাভ নেই, কেননা এটা তাদের অজ্ঞাতসারে আকস্মিকভাবে এসে পড়বে। কারণ এটা সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময় তো কারো জানা নেই। হঠাৎ করে যখন এটা এসে পড়বে তখন এরা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলেও কোন উপকার হবে না। এরা যদিও এই কিয়ামতকে অসম্ভব মনে করছে, কিন্তু এটা শুধু সম্ভবই নয়, বরং নিশ্চিত। ঐ সময় বা ঐ সময়ের পরের আমল কোন কাজে আসবে না। দুনিয়ায় যাদের বন্ধুত্ব গায়রুল্লাহর জন্যে রয়েছে ঐ দিন সেটা শত্রুতায় পরিবর্তিত হবে। হ্যা, তবে যে বন্ধুত্ব শুধু আল্লাহর জন্যে রয়েছে তা বাকী ও চিরস্থায়ী থাকবে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহ ছাড়া প্রতিমাগুলোর সাথে পার্থিব জীবনে যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে রেখেছে তা শুধু পার্থিব জীবন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে, অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমাদের একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করবে এবং তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম, আর তোমাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী হবে না।”(২৯:২৫)।হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ দুই জন মুমিন যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজনের মৃত্যু হয় এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে সে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয় তখন সে তার ঐ দুনিয়ার বন্ধুকে স্মরণ করে এবং বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার এবং আপনার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিতো। আমাকে সে ভাল কাজের আদেশ করতো এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখতো। আমাকে সে বিশ্বাস করাতো যে, একদিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। সুতরাং হে আল্লাহ! তাকে আপনি সত্য পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং শেষে তাকে ওটাই দেখিয়ে দিবেন যা আমাকে দেখিয়েছেন এবং তার উপর ঐরূপই সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন যেমন সন্তুষ্ট আমার উপর হয়েছেন।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি সন্তুষ্ট চিত্তে চলে যাও। আমি তার জন্যে যা কিছু প্রস্তুত রেখেছি তা যদি তুমি দেখতে তবে খুব হাসতে এবং মোটেই দুঃখিত হতে না।” অতঃপর যখন তার ঐ বন্ধু মারা যায় এবং দুই বন্ধুর রূহ মিলিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বর্ণনা দাও।” তখন একজন অপরজনকে বলেঃ “তুমি আমার খুব ভাল বন্ধু ছিলে ও অত্যন্ত সৎ সঙ্গী ছিলে এবং ছিলে অতি উত্তম দোস্ত। পক্ষান্তরে, দুইজন কাফির, যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজন মারা যায় এবং তাকে জাহান্নামের দুঃসংবাদ দেয়া। হয় তখন দুনিয়ার ঐ বন্ধুর কথা তার স্মরণ হয় এবং সে বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার ও আপনার নবী (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণের নির্দেশ দিতো। সে আমাকে মন্দ কাজে উৎসাহিত করতো এবং ভাল কাজ হতে বিরত রাখতো। আর আমার মনে সে এই বিশ্বাস জন্মাতো যে, আপনার সাথে সাক্ষাৎ হবে না। সুতরাং আপনি তাকে সুপথ প্রদর্শন করবেন না যাতে সেও যেন ওটাই দেখতে পায় যা আমাকে দেখানো হয়েছে এবং আপনি তার উপর ঐরূপই অসন্তুষ্ট থাকবেন যেরূপ আমার উপর অসন্তুষ্ট রয়েছেন।” তারপর যখন ঐ দ্বিতীয় বন্ধু মারা যায় এবং উভয়ের রূহ একত্রিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা একে অপরের গুণাগুণ বর্ণনা কর।” প্রত্যেকেই তখন অপরকে বলেঃ “তুমি আমার খুবই মন্দ ভাই ছিলে, ছিলে খারাপ সঙ্গী ও নিকৃষ্ট বন্ধু।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বন্ধুত্ব শত্রুতায় পরিবর্তিত হয়ে যাবে। তবে আল্লাহভীরুদের বন্ধুত্ব তা হবে না। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে দুই ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালবাসে, যাদের একজন রয়েছে পূর্ব দিকে এবং অপরজন রয়েছে পশ্চিম দিকে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের দুজনকেই একত্রিত করে প্রত্যেককেই বলবেনঃ “এ হলো ঐ ব্যক্তি যাকে তুমি আমারই জন্যে ভালবাসতে।” (এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইরশাদ হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন মুত্তাকীদেরকে বলা হবেঃ হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না। যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। এটা হলো তোমাদের . ঈমান ও ইসলামের প্রতিদান। অর্থাৎ ভিতরে বিশ্বাস ও পূর্ণ প্রত্যয়, আর বাইরে শরীয়তের উপর আমল। মু’তামার ইবনে সুলাইমান (রাঃ) স্বীয় পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন মানুষ নিজ নিজ কবর হতে উথিত হবে তখন সবাই অশান্তি ও সন্ত্রাসের মধ্যে থাকবে। তখন একজন ঘোষক (আল্লাহর বাণী) ঘোষণা করবেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং দুঃখিতও হবে না তোমরা।' এ ঘোষণা শুনে সবাই খুশী হয়ে যাবে, কারণ তারা এটাকে সাধারণ ঘোষণা মনে করবে (অর্থাৎ তারা মনে করবে যে এ ঘোষণা সবারই জন্যে)। এরপর আবার ঘোষণা করা হবেঃ ‘যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল। এ ঘোষণা শুনে খাটি ও পাকা মুসলমান ছাড়া অন্যান্য সবাই নিরাশ হয়ে যাবে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীরা সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর।' সূরায়ে রূমে-এর তাফসীর গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে। সেখানে সবকিছু রয়েছে অন্তর যা চায় এবং নয়ন যাতে তৃপ্ত হয়। সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে।(আরবী) এবং (আরবী) এই দুই কিরআতই রয়েছে। অর্থাৎ সেখানে তাদের জন্যে সুস্বাদু, সুগন্ধময় এবং সুন্দর রঙ এর খাবার রয়েছে যা মনে চায়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সর্বাপেক্ষা নিম্নশ্রেণীর জান্নাতী, যে সর্বশেষ জান্নাতে যাবে, তার দৃষ্টি শত বছরের পথের দূরত্ব পর্যন্ত যাবে, আর তত দূর পর্যন্ত সে শুধু নিজেরই ডেরা, . তাঁবু এবং স্বর্ণ ও পান্না নির্মিত প্রাসাদ দেখতে পাবে। ঐগুলো সবই বিভিন্ন প্রকারের ও রঙ বেরঙ এর আসবাবপত্রে ভরপুর থাকবে। সকাল-সন্ধ্যায় বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যে পরিপূর্ণ সত্তর হাজার করে রেকাবী ও পেয়ালা তার সামনে পেশ করা হবে। ঐগুলোর প্রত্যেকটি তার মনের চাহিদা মুতাবিক হবে। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার চাহিদা একই রকম থাকবে। যদি সে সারা দুনিয়ার লোককে যিয়াফত দেয় তবে তাদের সবারই জন্যে ঐ খাদ্যগুলো যথেষ্ট হবে। অথচ ওগুলোর কিছুই কমবে না।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জান্নাতের। বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর। শপথ! জান্নাতী খাবারের একটি গ্রাস উঠাবে এবং তার মনে খেয়াল জাগবে যে, অমুক প্রকারের খাদ্য হলে খুবই ভাল হতো! তখন ঐ গ্রাস তার মুখে ঐ জিনিসই হয়ে যাবে যার সে আকাঙ্ক্ষা করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর সাত তলা প্রাসাদ হবে। সে ষষ্ঠ তলায় অবস্থান করবে এবং সপ্তম তলাটি তার উপরে থাকবে। তার ত্রিশজন খাদেম থাকবে যারা সকাল-সন্ধ্যায় স্বর্ণ নির্মিত তিনশটি পাত্রে তার জন্যে খাদ্য পরিবেশন করবে। প্রত্যেকটিতে পৃথক পৃথক খাদ্য থাকবে এবং ওগুলো হবে খুবই সুন্দর ও সুস্বাদু। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার খাওয়ার চাহিদা একই রূপ থাকবে। অনুরূপভাবে তাকে তিন শ’টি সোনার পেয়ালা, পানপাত্র ও গ্লাসে পানীয় জিনিস দেয়া হবে। ওগুলোও পৃথক পৃথক জিনিস হবে। সে তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি সমস্ত জান্নাতীকে দাওয়াত দিতাম। সবাই যদি আমার এখানে খায় তবুও আমার খাদ্য মোটেই হ্রাস পাবে না।” আয়ত চক্ষু বিশিষ্ট হ্রদের মধ্য হতে তার বাহাত্তরটি স্ত্রী থাকবে এবং দুনিয়ার স্ত্রী পৃথকভাবে থাকবে। তাদের মধ্যে এক একজন এক এক মাইল জায়গার মধ্যে বসে থাকবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সাথে সাথে তাদেরকে বলা হবেঃ তোমাদের এই নিয়ামত চিরস্থায়ী থাকবে। আর তোমরাও হবে এখানে স্থায়ী। অর্থাৎ কখনো এখান হতে বের হবে না এবং এটা হতে স্থানান্তর কামনা করবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের উপর নিজের অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন:“এটাই জান্নাত, তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে, তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ।” অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে এটা দান করেছি আমার প্রশস্ত রহমতের গুণে। কেননা, কোন ব্যক্তিই আল্লাহর রহমত ছাড়া শুধু নিজের কর্মের বলে জান্নাতে যেতে পারে না। হ্যা, তবে অবশ্যই জান্নাতের শেণীভেদ যে হবে তা সৎ কার্যাবলীর পার্থক্যের কারণেই হবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামী তার জান্নাতের জায়গা জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে এবং দেখে দুঃখ ও আফসোস করে বলবে যে, যদি আল্লাহ তাকে হিদায়াত দান করতেন তবে সেও মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত হতো। আর প্রত্যেক জান্নাতী তার জাহান্নামের জায়গা জান্নাতের মধ্যে দেখতে পাবে এবং ওটা দেখে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পূর্বক বলবে:“আল্লাহ তা'আলা আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করলে আমি সুপথ লাভে সক্ষম হতাম না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেনঃ “প্রত্যেক লোকেরই একটি স্থান জান্নাতে রয়েছে এবং একটি স্থান জাহান্নামে রয়েছে। সুতরাং কাফির মুমিনের জাহান্নামের জায়গার ওয়ারিস হবে এবং মুমিন কাফিরের জান্নাতের জায়গার ওয়ারিস হবে। আল্লাহ তা'আলার ‘এটাই জান্নাত, যার অধিকারী তোমাদেরকে করা হয়েছে তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ এই উক্তির দ্বারা এটাকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)খাদ্য ও পানীয়ের বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ জান্নাতের ফলমূল ও তরিতরকারীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সেখানে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তারা সেগুলো হতে আহার করবে। মোটকথা, তারা ভরপুর নিয়ামতরাজিসহ মহান আল্লাহর পছন্দনীয় ঘরে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আয-যুখরুফ 43:69
৬৬-৭৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দেখো, এই মুশরিকরা কিয়ামতের অপেক্ষা করছে, কিন্তু এতে কোন লাভ নেই, কেননা এটা তাদের অজ্ঞাতসারে আকস্মিকভাবে এসে পড়বে। কারণ এটা সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময় তো কারো জানা নেই। হঠাৎ করে যখন এটা এসে পড়বে তখন এরা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলেও কোন উপকার হবে না। এরা যদিও এই কিয়ামতকে অসম্ভব মনে করছে, কিন্তু এটা শুধু সম্ভবই নয়, বরং নিশ্চিত। ঐ সময় বা ঐ সময়ের পরের আমল কোন কাজে আসবে না। দুনিয়ায় যাদের বন্ধুত্ব গায়রুল্লাহর জন্যে রয়েছে ঐ দিন সেটা শত্রুতায় পরিবর্তিত হবে। হ্যা, তবে যে বন্ধুত্ব শুধু আল্লাহর জন্যে রয়েছে তা বাকী ও চিরস্থায়ী থাকবে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহ ছাড়া প্রতিমাগুলোর সাথে পার্থিব জীবনে যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে রেখেছে তা শুধু পার্থিব জীবন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে, অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমাদের একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করবে এবং তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম, আর তোমাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী হবে না।”(২৯:২৫)।হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ দুই জন মুমিন যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজনের মৃত্যু হয় এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে সে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয় তখন সে তার ঐ দুনিয়ার বন্ধুকে স্মরণ করে এবং বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার এবং আপনার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিতো। আমাকে সে ভাল কাজের আদেশ করতো এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখতো। আমাকে সে বিশ্বাস করাতো যে, একদিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। সুতরাং হে আল্লাহ! তাকে আপনি সত্য পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং শেষে তাকে ওটাই দেখিয়ে দিবেন যা আমাকে দেখিয়েছেন এবং তার উপর ঐরূপই সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন যেমন সন্তুষ্ট আমার উপর হয়েছেন।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি সন্তুষ্ট চিত্তে চলে যাও। আমি তার জন্যে যা কিছু প্রস্তুত রেখেছি তা যদি তুমি দেখতে তবে খুব হাসতে এবং মোটেই দুঃখিত হতে না।” অতঃপর যখন তার ঐ বন্ধু মারা যায় এবং দুই বন্ধুর রূহ মিলিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বর্ণনা দাও।” তখন একজন অপরজনকে বলেঃ “তুমি আমার খুব ভাল বন্ধু ছিলে ও অত্যন্ত সৎ সঙ্গী ছিলে এবং ছিলে অতি উত্তম দোস্ত। পক্ষান্তরে, দুইজন কাফির, যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজন মারা যায় এবং তাকে জাহান্নামের দুঃসংবাদ দেয়া। হয় তখন দুনিয়ার ঐ বন্ধুর কথা তার স্মরণ হয় এবং সে বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার ও আপনার নবী (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণের নির্দেশ দিতো। সে আমাকে মন্দ কাজে উৎসাহিত করতো এবং ভাল কাজ হতে বিরত রাখতো। আর আমার মনে সে এই বিশ্বাস জন্মাতো যে, আপনার সাথে সাক্ষাৎ হবে না। সুতরাং আপনি তাকে সুপথ প্রদর্শন করবেন না যাতে সেও যেন ওটাই দেখতে পায় যা আমাকে দেখানো হয়েছে এবং আপনি তার উপর ঐরূপই অসন্তুষ্ট থাকবেন যেরূপ আমার উপর অসন্তুষ্ট রয়েছেন।” তারপর যখন ঐ দ্বিতীয় বন্ধু মারা যায় এবং উভয়ের রূহ একত্রিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা একে অপরের গুণাগুণ বর্ণনা কর।” প্রত্যেকেই তখন অপরকে বলেঃ “তুমি আমার খুবই মন্দ ভাই ছিলে, ছিলে খারাপ সঙ্গী ও নিকৃষ্ট বন্ধু।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বন্ধুত্ব শত্রুতায় পরিবর্তিত হয়ে যাবে। তবে আল্লাহভীরুদের বন্ধুত্ব তা হবে না। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে দুই ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালবাসে, যাদের একজন রয়েছে পূর্ব দিকে এবং অপরজন রয়েছে পশ্চিম দিকে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের দুজনকেই একত্রিত করে প্রত্যেককেই বলবেনঃ “এ হলো ঐ ব্যক্তি যাকে তুমি আমারই জন্যে ভালবাসতে।” (এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইরশাদ হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন মুত্তাকীদেরকে বলা হবেঃ হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না। যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। এটা হলো তোমাদের . ঈমান ও ইসলামের প্রতিদান। অর্থাৎ ভিতরে বিশ্বাস ও পূর্ণ প্রত্যয়, আর বাইরে শরীয়তের উপর আমল। মু’তামার ইবনে সুলাইমান (রাঃ) স্বীয় পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন মানুষ নিজ নিজ কবর হতে উথিত হবে তখন সবাই অশান্তি ও সন্ত্রাসের মধ্যে থাকবে। তখন একজন ঘোষক (আল্লাহর বাণী) ঘোষণা করবেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং দুঃখিতও হবে না তোমরা।' এ ঘোষণা শুনে সবাই খুশী হয়ে যাবে, কারণ তারা এটাকে সাধারণ ঘোষণা মনে করবে (অর্থাৎ তারা মনে করবে যে এ ঘোষণা সবারই জন্যে)। এরপর আবার ঘোষণা করা হবেঃ ‘যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল। এ ঘোষণা শুনে খাটি ও পাকা মুসলমান ছাড়া অন্যান্য সবাই নিরাশ হয়ে যাবে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীরা সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর।' সূরায়ে রূমে-এর তাফসীর গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে। সেখানে সবকিছু রয়েছে অন্তর যা চায় এবং নয়ন যাতে তৃপ্ত হয়। সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে।(আরবী) এবং (আরবী) এই দুই কিরআতই রয়েছে। অর্থাৎ সেখানে তাদের জন্যে সুস্বাদু, সুগন্ধময় এবং সুন্দর রঙ এর খাবার রয়েছে যা মনে চায়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সর্বাপেক্ষা নিম্নশ্রেণীর জান্নাতী, যে সর্বশেষ জান্নাতে যাবে, তার দৃষ্টি শত বছরের পথের দূরত্ব পর্যন্ত যাবে, আর তত দূর পর্যন্ত সে শুধু নিজেরই ডেরা, . তাঁবু এবং স্বর্ণ ও পান্না নির্মিত প্রাসাদ দেখতে পাবে। ঐগুলো সবই বিভিন্ন প্রকারের ও রঙ বেরঙ এর আসবাবপত্রে ভরপুর থাকবে। সকাল-সন্ধ্যায় বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যে পরিপূর্ণ সত্তর হাজার করে রেকাবী ও পেয়ালা তার সামনে পেশ করা হবে। ঐগুলোর প্রত্যেকটি তার মনের চাহিদা মুতাবিক হবে। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার চাহিদা একই রকম থাকবে। যদি সে সারা দুনিয়ার লোককে যিয়াফত দেয় তবে তাদের সবারই জন্যে ঐ খাদ্যগুলো যথেষ্ট হবে। অথচ ওগুলোর কিছুই কমবে না।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জান্নাতের। বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর। শপথ! জান্নাতী খাবারের একটি গ্রাস উঠাবে এবং তার মনে খেয়াল জাগবে যে, অমুক প্রকারের খাদ্য হলে খুবই ভাল হতো! তখন ঐ গ্রাস তার মুখে ঐ জিনিসই হয়ে যাবে যার সে আকাঙ্ক্ষা করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর সাত তলা প্রাসাদ হবে। সে ষষ্ঠ তলায় অবস্থান করবে এবং সপ্তম তলাটি তার উপরে থাকবে। তার ত্রিশজন খাদেম থাকবে যারা সকাল-সন্ধ্যায় স্বর্ণ নির্মিত তিনশটি পাত্রে তার জন্যে খাদ্য পরিবেশন করবে। প্রত্যেকটিতে পৃথক পৃথক খাদ্য থাকবে এবং ওগুলো হবে খুবই সুন্দর ও সুস্বাদু। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার খাওয়ার চাহিদা একই রূপ থাকবে। অনুরূপভাবে তাকে তিন শ’টি সোনার পেয়ালা, পানপাত্র ও গ্লাসে পানীয় জিনিস দেয়া হবে। ওগুলোও পৃথক পৃথক জিনিস হবে। সে তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি সমস্ত জান্নাতীকে দাওয়াত দিতাম। সবাই যদি আমার এখানে খায় তবুও আমার খাদ্য মোটেই হ্রাস পাবে না।” আয়ত চক্ষু বিশিষ্ট হ্রদের মধ্য হতে তার বাহাত্তরটি স্ত্রী থাকবে এবং দুনিয়ার স্ত্রী পৃথকভাবে থাকবে। তাদের মধ্যে এক একজন এক এক মাইল জায়গার মধ্যে বসে থাকবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সাথে সাথে তাদেরকে বলা হবেঃ তোমাদের এই নিয়ামত চিরস্থায়ী থাকবে। আর তোমরাও হবে এখানে স্থায়ী। অর্থাৎ কখনো এখান হতে বের হবে না এবং এটা হতে স্থানান্তর কামনা করবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের উপর নিজের অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন:“এটাই জান্নাত, তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে, তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ।” অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে এটা দান করেছি আমার প্রশস্ত রহমতের গুণে। কেননা, কোন ব্যক্তিই আল্লাহর রহমত ছাড়া শুধু নিজের কর্মের বলে জান্নাতে যেতে পারে না। হ্যা, তবে অবশ্যই জান্নাতের শেণীভেদ যে হবে তা সৎ কার্যাবলীর পার্থক্যের কারণেই হবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামী তার জান্নাতের জায়গা জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে এবং দেখে দুঃখ ও আফসোস করে বলবে যে, যদি আল্লাহ তাকে হিদায়াত দান করতেন তবে সেও মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত হতো। আর প্রত্যেক জান্নাতী তার জাহান্নামের জায়গা জান্নাতের মধ্যে দেখতে পাবে এবং ওটা দেখে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পূর্বক বলবে:“আল্লাহ তা'আলা আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করলে আমি সুপথ লাভে সক্ষম হতাম না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেনঃ “প্রত্যেক লোকেরই একটি স্থান জান্নাতে রয়েছে এবং একটি স্থান জাহান্নামে রয়েছে। সুতরাং কাফির মুমিনের জাহান্নামের জায়গার ওয়ারিস হবে এবং মুমিন কাফিরের জান্নাতের জায়গার ওয়ারিস হবে। আল্লাহ তা'আলার ‘এটাই জান্নাত, যার অধিকারী তোমাদেরকে করা হয়েছে তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ এই উক্তির দ্বারা এটাকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)খাদ্য ও পানীয়ের বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ জান্নাতের ফলমূল ও তরিতরকারীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সেখানে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তারা সেগুলো হতে আহার করবে। মোটকথা, তারা ভরপুর নিয়ামতরাজিসহ মহান আল্লাহর পছন্দনীয় ঘরে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আয-যুখরুফ 43:70
৬৬-৭৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দেখো, এই মুশরিকরা কিয়ামতের অপেক্ষা করছে, কিন্তু এতে কোন লাভ নেই, কেননা এটা তাদের অজ্ঞাতসারে আকস্মিকভাবে এসে পড়বে। কারণ এটা সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময় তো কারো জানা নেই। হঠাৎ করে যখন এটা এসে পড়বে তখন এরা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলেও কোন উপকার হবে না। এরা যদিও এই কিয়ামতকে অসম্ভব মনে করছে, কিন্তু এটা শুধু সম্ভবই নয়, বরং নিশ্চিত। ঐ সময় বা ঐ সময়ের পরের আমল কোন কাজে আসবে না। দুনিয়ায় যাদের বন্ধুত্ব গায়রুল্লাহর জন্যে রয়েছে ঐ দিন সেটা শত্রুতায় পরিবর্তিত হবে। হ্যা, তবে যে বন্ধুত্ব শুধু আল্লাহর জন্যে রয়েছে তা বাকী ও চিরস্থায়ী থাকবে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহ ছাড়া প্রতিমাগুলোর সাথে পার্থিব জীবনে যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে রেখেছে তা শুধু পার্থিব জীবন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে, অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমাদের একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করবে এবং তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম, আর তোমাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী হবে না।”(২৯:২৫)।হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ দুই জন মুমিন যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজনের মৃত্যু হয় এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে সে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয় তখন সে তার ঐ দুনিয়ার বন্ধুকে স্মরণ করে এবং বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার এবং আপনার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিতো। আমাকে সে ভাল কাজের আদেশ করতো এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখতো। আমাকে সে বিশ্বাস করাতো যে, একদিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। সুতরাং হে আল্লাহ! তাকে আপনি সত্য পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং শেষে তাকে ওটাই দেখিয়ে দিবেন যা আমাকে দেখিয়েছেন এবং তার উপর ঐরূপই সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন যেমন সন্তুষ্ট আমার উপর হয়েছেন।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি সন্তুষ্ট চিত্তে চলে যাও। আমি তার জন্যে যা কিছু প্রস্তুত রেখেছি তা যদি তুমি দেখতে তবে খুব হাসতে এবং মোটেই দুঃখিত হতে না।” অতঃপর যখন তার ঐ বন্ধু মারা যায় এবং দুই বন্ধুর রূহ মিলিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বর্ণনা দাও।” তখন একজন অপরজনকে বলেঃ “তুমি আমার খুব ভাল বন্ধু ছিলে ও অত্যন্ত সৎ সঙ্গী ছিলে এবং ছিলে অতি উত্তম দোস্ত। পক্ষান্তরে, দুইজন কাফির, যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজন মারা যায় এবং তাকে জাহান্নামের দুঃসংবাদ দেয়া। হয় তখন দুনিয়ার ঐ বন্ধুর কথা তার স্মরণ হয় এবং সে বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার ও আপনার নবী (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণের নির্দেশ দিতো। সে আমাকে মন্দ কাজে উৎসাহিত করতো এবং ভাল কাজ হতে বিরত রাখতো। আর আমার মনে সে এই বিশ্বাস জন্মাতো যে, আপনার সাথে সাক্ষাৎ হবে না। সুতরাং আপনি তাকে সুপথ প্রদর্শন করবেন না যাতে সেও যেন ওটাই দেখতে পায় যা আমাকে দেখানো হয়েছে এবং আপনি তার উপর ঐরূপই অসন্তুষ্ট থাকবেন যেরূপ আমার উপর অসন্তুষ্ট রয়েছেন।” তারপর যখন ঐ দ্বিতীয় বন্ধু মারা যায় এবং উভয়ের রূহ একত্রিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা একে অপরের গুণাগুণ বর্ণনা কর।” প্রত্যেকেই তখন অপরকে বলেঃ “তুমি আমার খুবই মন্দ ভাই ছিলে, ছিলে খারাপ সঙ্গী ও নিকৃষ্ট বন্ধু।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বন্ধুত্ব শত্রুতায় পরিবর্তিত হয়ে যাবে। তবে আল্লাহভীরুদের বন্ধুত্ব তা হবে না। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে দুই ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালবাসে, যাদের একজন রয়েছে পূর্ব দিকে এবং অপরজন রয়েছে পশ্চিম দিকে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের দুজনকেই একত্রিত করে প্রত্যেককেই বলবেনঃ “এ হলো ঐ ব্যক্তি যাকে তুমি আমারই জন্যে ভালবাসতে।” (এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইরশাদ হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন মুত্তাকীদেরকে বলা হবেঃ হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না। যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। এটা হলো তোমাদের . ঈমান ও ইসলামের প্রতিদান। অর্থাৎ ভিতরে বিশ্বাস ও পূর্ণ প্রত্যয়, আর বাইরে শরীয়তের উপর আমল। মু’তামার ইবনে সুলাইমান (রাঃ) স্বীয় পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন মানুষ নিজ নিজ কবর হতে উথিত হবে তখন সবাই অশান্তি ও সন্ত্রাসের মধ্যে থাকবে। তখন একজন ঘোষক (আল্লাহর বাণী) ঘোষণা করবেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং দুঃখিতও হবে না তোমরা।' এ ঘোষণা শুনে সবাই খুশী হয়ে যাবে, কারণ তারা এটাকে সাধারণ ঘোষণা মনে করবে (অর্থাৎ তারা মনে করবে যে এ ঘোষণা সবারই জন্যে)। এরপর আবার ঘোষণা করা হবেঃ ‘যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল। এ ঘোষণা শুনে খাটি ও পাকা মুসলমান ছাড়া অন্যান্য সবাই নিরাশ হয়ে যাবে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীরা সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর।' সূরায়ে রূমে-এর তাফসীর গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে। সেখানে সবকিছু রয়েছে অন্তর যা চায় এবং নয়ন যাতে তৃপ্ত হয়। সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে।(আরবী) এবং (আরবী) এই দুই কিরআতই রয়েছে। অর্থাৎ সেখানে তাদের জন্যে সুস্বাদু, সুগন্ধময় এবং সুন্দর রঙ এর খাবার রয়েছে যা মনে চায়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সর্বাপেক্ষা নিম্নশ্রেণীর জান্নাতী, যে সর্বশেষ জান্নাতে যাবে, তার দৃষ্টি শত বছরের পথের দূরত্ব পর্যন্ত যাবে, আর তত দূর পর্যন্ত সে শুধু নিজেরই ডেরা, . তাঁবু এবং স্বর্ণ ও পান্না নির্মিত প্রাসাদ দেখতে পাবে। ঐগুলো সবই বিভিন্ন প্রকারের ও রঙ বেরঙ এর আসবাবপত্রে ভরপুর থাকবে। সকাল-সন্ধ্যায় বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যে পরিপূর্ণ সত্তর হাজার করে রেকাবী ও পেয়ালা তার সামনে পেশ করা হবে। ঐগুলোর প্রত্যেকটি তার মনের চাহিদা মুতাবিক হবে। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার চাহিদা একই রকম থাকবে। যদি সে সারা দুনিয়ার লোককে যিয়াফত দেয় তবে তাদের সবারই জন্যে ঐ খাদ্যগুলো যথেষ্ট হবে। অথচ ওগুলোর কিছুই কমবে না।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জান্নাতের। বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর। শপথ! জান্নাতী খাবারের একটি গ্রাস উঠাবে এবং তার মনে খেয়াল জাগবে যে, অমুক প্রকারের খাদ্য হলে খুবই ভাল হতো! তখন ঐ গ্রাস তার মুখে ঐ জিনিসই হয়ে যাবে যার সে আকাঙ্ক্ষা করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর সাত তলা প্রাসাদ হবে। সে ষষ্ঠ তলায় অবস্থান করবে এবং সপ্তম তলাটি তার উপরে থাকবে। তার ত্রিশজন খাদেম থাকবে যারা সকাল-সন্ধ্যায় স্বর্ণ নির্মিত তিনশটি পাত্রে তার জন্যে খাদ্য পরিবেশন করবে। প্রত্যেকটিতে পৃথক পৃথক খাদ্য থাকবে এবং ওগুলো হবে খুবই সুন্দর ও সুস্বাদু। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার খাওয়ার চাহিদা একই রূপ থাকবে। অনুরূপভাবে তাকে তিন শ’টি সোনার পেয়ালা, পানপাত্র ও গ্লাসে পানীয় জিনিস দেয়া হবে। ওগুলোও পৃথক পৃথক জিনিস হবে। সে তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি সমস্ত জান্নাতীকে দাওয়াত দিতাম। সবাই যদি আমার এখানে খায় তবুও আমার খাদ্য মোটেই হ্রাস পাবে না।” আয়ত চক্ষু বিশিষ্ট হ্রদের মধ্য হতে তার বাহাত্তরটি স্ত্রী থাকবে এবং দুনিয়ার স্ত্রী পৃথকভাবে থাকবে। তাদের মধ্যে এক একজন এক এক মাইল জায়গার মধ্যে বসে থাকবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সাথে সাথে তাদেরকে বলা হবেঃ তোমাদের এই নিয়ামত চিরস্থায়ী থাকবে। আর তোমরাও হবে এখানে স্থায়ী। অর্থাৎ কখনো এখান হতে বের হবে না এবং এটা হতে স্থানান্তর কামনা করবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের উপর নিজের অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন:“এটাই জান্নাত, তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে, তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ।” অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে এটা দান করেছি আমার প্রশস্ত রহমতের গুণে। কেননা, কোন ব্যক্তিই আল্লাহর রহমত ছাড়া শুধু নিজের কর্মের বলে জান্নাতে যেতে পারে না। হ্যা, তবে অবশ্যই জান্নাতের শেণীভেদ যে হবে তা সৎ কার্যাবলীর পার্থক্যের কারণেই হবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামী তার জান্নাতের জায়গা জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে এবং দেখে দুঃখ ও আফসোস করে বলবে যে, যদি আল্লাহ তাকে হিদায়াত দান করতেন তবে সেও মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত হতো। আর প্রত্যেক জান্নাতী তার জাহান্নামের জায়গা জান্নাতের মধ্যে দেখতে পাবে এবং ওটা দেখে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পূর্বক বলবে:“আল্লাহ তা'আলা আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করলে আমি সুপথ লাভে সক্ষম হতাম না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেনঃ “প্রত্যেক লোকেরই একটি স্থান জান্নাতে রয়েছে এবং একটি স্থান জাহান্নামে রয়েছে। সুতরাং কাফির মুমিনের জাহান্নামের জায়গার ওয়ারিস হবে এবং মুমিন কাফিরের জান্নাতের জায়গার ওয়ারিস হবে। আল্লাহ তা'আলার ‘এটাই জান্নাত, যার অধিকারী তোমাদেরকে করা হয়েছে তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ এই উক্তির দ্বারা এটাকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)খাদ্য ও পানীয়ের বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ জান্নাতের ফলমূল ও তরিতরকারীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সেখানে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তারা সেগুলো হতে আহার করবে। মোটকথা, তারা ভরপুর নিয়ামতরাজিসহ মহান আল্লাহর পছন্দনীয় ঘরে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আয-যুখরুফ 43:71
৬৬-৭৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দেখো, এই মুশরিকরা কিয়ামতের অপেক্ষা করছে, কিন্তু এতে কোন লাভ নেই, কেননা এটা তাদের অজ্ঞাতসারে আকস্মিকভাবে এসে পড়বে। কারণ এটা সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময় তো কারো জানা নেই। হঠাৎ করে যখন এটা এসে পড়বে তখন এরা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলেও কোন উপকার হবে না। এরা যদিও এই কিয়ামতকে অসম্ভব মনে করছে, কিন্তু এটা শুধু সম্ভবই নয়, বরং নিশ্চিত। ঐ সময় বা ঐ সময়ের পরের আমল কোন কাজে আসবে না। দুনিয়ায় যাদের বন্ধুত্ব গায়রুল্লাহর জন্যে রয়েছে ঐ দিন সেটা শত্রুতায় পরিবর্তিত হবে। হ্যা, তবে যে বন্ধুত্ব শুধু আল্লাহর জন্যে রয়েছে তা বাকী ও চিরস্থায়ী থাকবে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহ ছাড়া প্রতিমাগুলোর সাথে পার্থিব জীবনে যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে রেখেছে তা শুধু পার্থিব জীবন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে, অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমাদের একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করবে এবং তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম, আর তোমাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী হবে না।”(২৯:২৫)।হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ দুই জন মুমিন যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজনের মৃত্যু হয় এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে সে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয় তখন সে তার ঐ দুনিয়ার বন্ধুকে স্মরণ করে এবং বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার এবং আপনার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিতো। আমাকে সে ভাল কাজের আদেশ করতো এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখতো। আমাকে সে বিশ্বাস করাতো যে, একদিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। সুতরাং হে আল্লাহ! তাকে আপনি সত্য পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং শেষে তাকে ওটাই দেখিয়ে দিবেন যা আমাকে দেখিয়েছেন এবং তার উপর ঐরূপই সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন যেমন সন্তুষ্ট আমার উপর হয়েছেন।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি সন্তুষ্ট চিত্তে চলে যাও। আমি তার জন্যে যা কিছু প্রস্তুত রেখেছি তা যদি তুমি দেখতে তবে খুব হাসতে এবং মোটেই দুঃখিত হতে না।” অতঃপর যখন তার ঐ বন্ধু মারা যায় এবং দুই বন্ধুর রূহ মিলিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বর্ণনা দাও।” তখন একজন অপরজনকে বলেঃ “তুমি আমার খুব ভাল বন্ধু ছিলে ও অত্যন্ত সৎ সঙ্গী ছিলে এবং ছিলে অতি উত্তম দোস্ত। পক্ষান্তরে, দুইজন কাফির, যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজন মারা যায় এবং তাকে জাহান্নামের দুঃসংবাদ দেয়া। হয় তখন দুনিয়ার ঐ বন্ধুর কথা তার স্মরণ হয় এবং সে বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার ও আপনার নবী (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণের নির্দেশ দিতো। সে আমাকে মন্দ কাজে উৎসাহিত করতো এবং ভাল কাজ হতে বিরত রাখতো। আর আমার মনে সে এই বিশ্বাস জন্মাতো যে, আপনার সাথে সাক্ষাৎ হবে না। সুতরাং আপনি তাকে সুপথ প্রদর্শন করবেন না যাতে সেও যেন ওটাই দেখতে পায় যা আমাকে দেখানো হয়েছে এবং আপনি তার উপর ঐরূপই অসন্তুষ্ট থাকবেন যেরূপ আমার উপর অসন্তুষ্ট রয়েছেন।” তারপর যখন ঐ দ্বিতীয় বন্ধু মারা যায় এবং উভয়ের রূহ একত্রিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা একে অপরের গুণাগুণ বর্ণনা কর।” প্রত্যেকেই তখন অপরকে বলেঃ “তুমি আমার খুবই মন্দ ভাই ছিলে, ছিলে খারাপ সঙ্গী ও নিকৃষ্ট বন্ধু।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বন্ধুত্ব শত্রুতায় পরিবর্তিত হয়ে যাবে। তবে আল্লাহভীরুদের বন্ধুত্ব তা হবে না। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে দুই ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালবাসে, যাদের একজন রয়েছে পূর্ব দিকে এবং অপরজন রয়েছে পশ্চিম দিকে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের দুজনকেই একত্রিত করে প্রত্যেককেই বলবেনঃ “এ হলো ঐ ব্যক্তি যাকে তুমি আমারই জন্যে ভালবাসতে।” (এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইরশাদ হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন মুত্তাকীদেরকে বলা হবেঃ হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না। যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। এটা হলো তোমাদের . ঈমান ও ইসলামের প্রতিদান। অর্থাৎ ভিতরে বিশ্বাস ও পূর্ণ প্রত্যয়, আর বাইরে শরীয়তের উপর আমল। মু’তামার ইবনে সুলাইমান (রাঃ) স্বীয় পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন মানুষ নিজ নিজ কবর হতে উথিত হবে তখন সবাই অশান্তি ও সন্ত্রাসের মধ্যে থাকবে। তখন একজন ঘোষক (আল্লাহর বাণী) ঘোষণা করবেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং দুঃখিতও হবে না তোমরা।' এ ঘোষণা শুনে সবাই খুশী হয়ে যাবে, কারণ তারা এটাকে সাধারণ ঘোষণা মনে করবে (অর্থাৎ তারা মনে করবে যে এ ঘোষণা সবারই জন্যে)। এরপর আবার ঘোষণা করা হবেঃ ‘যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল। এ ঘোষণা শুনে খাটি ও পাকা মুসলমান ছাড়া অন্যান্য সবাই নিরাশ হয়ে যাবে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীরা সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর।' সূরায়ে রূমে-এর তাফসীর গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে। সেখানে সবকিছু রয়েছে অন্তর যা চায় এবং নয়ন যাতে তৃপ্ত হয়। সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে।(আরবী) এবং (আরবী) এই দুই কিরআতই রয়েছে। অর্থাৎ সেখানে তাদের জন্যে সুস্বাদু, সুগন্ধময় এবং সুন্দর রঙ এর খাবার রয়েছে যা মনে চায়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সর্বাপেক্ষা নিম্নশ্রেণীর জান্নাতী, যে সর্বশেষ জান্নাতে যাবে, তার দৃষ্টি শত বছরের পথের দূরত্ব পর্যন্ত যাবে, আর তত দূর পর্যন্ত সে শুধু নিজেরই ডেরা, . তাঁবু এবং স্বর্ণ ও পান্না নির্মিত প্রাসাদ দেখতে পাবে। ঐগুলো সবই বিভিন্ন প্রকারের ও রঙ বেরঙ এর আসবাবপত্রে ভরপুর থাকবে। সকাল-সন্ধ্যায় বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যে পরিপূর্ণ সত্তর হাজার করে রেকাবী ও পেয়ালা তার সামনে পেশ করা হবে। ঐগুলোর প্রত্যেকটি তার মনের চাহিদা মুতাবিক হবে। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার চাহিদা একই রকম থাকবে। যদি সে সারা দুনিয়ার লোককে যিয়াফত দেয় তবে তাদের সবারই জন্যে ঐ খাদ্যগুলো যথেষ্ট হবে। অথচ ওগুলোর কিছুই কমবে না।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জান্নাতের। বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর। শপথ! জান্নাতী খাবারের একটি গ্রাস উঠাবে এবং তার মনে খেয়াল জাগবে যে, অমুক প্রকারের খাদ্য হলে খুবই ভাল হতো! তখন ঐ গ্রাস তার মুখে ঐ জিনিসই হয়ে যাবে যার সে আকাঙ্ক্ষা করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর সাত তলা প্রাসাদ হবে। সে ষষ্ঠ তলায় অবস্থান করবে এবং সপ্তম তলাটি তার উপরে থাকবে। তার ত্রিশজন খাদেম থাকবে যারা সকাল-সন্ধ্যায় স্বর্ণ নির্মিত তিনশটি পাত্রে তার জন্যে খাদ্য পরিবেশন করবে। প্রত্যেকটিতে পৃথক পৃথক খাদ্য থাকবে এবং ওগুলো হবে খুবই সুন্দর ও সুস্বাদু। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার খাওয়ার চাহিদা একই রূপ থাকবে। অনুরূপভাবে তাকে তিন শ’টি সোনার পেয়ালা, পানপাত্র ও গ্লাসে পানীয় জিনিস দেয়া হবে। ওগুলোও পৃথক পৃথক জিনিস হবে। সে তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি সমস্ত জান্নাতীকে দাওয়াত দিতাম। সবাই যদি আমার এখানে খায় তবুও আমার খাদ্য মোটেই হ্রাস পাবে না।” আয়ত চক্ষু বিশিষ্ট হ্রদের মধ্য হতে তার বাহাত্তরটি স্ত্রী থাকবে এবং দুনিয়ার স্ত্রী পৃথকভাবে থাকবে। তাদের মধ্যে এক একজন এক এক মাইল জায়গার মধ্যে বসে থাকবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সাথে সাথে তাদেরকে বলা হবেঃ তোমাদের এই নিয়ামত চিরস্থায়ী থাকবে। আর তোমরাও হবে এখানে স্থায়ী। অর্থাৎ কখনো এখান হতে বের হবে না এবং এটা হতে স্থানান্তর কামনা করবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের উপর নিজের অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন:“এটাই জান্নাত, তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে, তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ।” অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে এটা দান করেছি আমার প্রশস্ত রহমতের গুণে। কেননা, কোন ব্যক্তিই আল্লাহর রহমত ছাড়া শুধু নিজের কর্মের বলে জান্নাতে যেতে পারে না। হ্যা, তবে অবশ্যই জান্নাতের শেণীভেদ যে হবে তা সৎ কার্যাবলীর পার্থক্যের কারণেই হবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামী তার জান্নাতের জায়গা জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে এবং দেখে দুঃখ ও আফসোস করে বলবে যে, যদি আল্লাহ তাকে হিদায়াত দান করতেন তবে সেও মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত হতো। আর প্রত্যেক জান্নাতী তার জাহান্নামের জায়গা জান্নাতের মধ্যে দেখতে পাবে এবং ওটা দেখে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পূর্বক বলবে:“আল্লাহ তা'আলা আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করলে আমি সুপথ লাভে সক্ষম হতাম না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেনঃ “প্রত্যেক লোকেরই একটি স্থান জান্নাতে রয়েছে এবং একটি স্থান জাহান্নামে রয়েছে। সুতরাং কাফির মুমিনের জাহান্নামের জায়গার ওয়ারিস হবে এবং মুমিন কাফিরের জান্নাতের জায়গার ওয়ারিস হবে। আল্লাহ তা'আলার ‘এটাই জান্নাত, যার অধিকারী তোমাদেরকে করা হয়েছে তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ এই উক্তির দ্বারা এটাকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)খাদ্য ও পানীয়ের বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ জান্নাতের ফলমূল ও তরিতরকারীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সেখানে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তারা সেগুলো হতে আহার করবে। মোটকথা, তারা ভরপুর নিয়ামতরাজিসহ মহান আল্লাহর পছন্দনীয় ঘরে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আয-যুখরুফ 43:72
৬৬-৭৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দেখো, এই মুশরিকরা কিয়ামতের অপেক্ষা করছে, কিন্তু এতে কোন লাভ নেই, কেননা এটা তাদের অজ্ঞাতসারে আকস্মিকভাবে এসে পড়বে। কারণ এটা সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময় তো কারো জানা নেই। হঠাৎ করে যখন এটা এসে পড়বে তখন এরা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলেও কোন উপকার হবে না। এরা যদিও এই কিয়ামতকে অসম্ভব মনে করছে, কিন্তু এটা শুধু সম্ভবই নয়, বরং নিশ্চিত। ঐ সময় বা ঐ সময়ের পরের আমল কোন কাজে আসবে না। দুনিয়ায় যাদের বন্ধুত্ব গায়রুল্লাহর জন্যে রয়েছে ঐ দিন সেটা শত্রুতায় পরিবর্তিত হবে। হ্যা, তবে যে বন্ধুত্ব শুধু আল্লাহর জন্যে রয়েছে তা বাকী ও চিরস্থায়ী থাকবে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহ ছাড়া প্রতিমাগুলোর সাথে পার্থিব জীবনে যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে রেখেছে তা শুধু পার্থিব জীবন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে, অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমাদের একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করবে এবং তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম, আর তোমাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী হবে না।”(২৯:২৫)।হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ দুই জন মুমিন যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজনের মৃত্যু হয় এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে সে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয় তখন সে তার ঐ দুনিয়ার বন্ধুকে স্মরণ করে এবং বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার এবং আপনার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিতো। আমাকে সে ভাল কাজের আদেশ করতো এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখতো। আমাকে সে বিশ্বাস করাতো যে, একদিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। সুতরাং হে আল্লাহ! তাকে আপনি সত্য পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং শেষে তাকে ওটাই দেখিয়ে দিবেন যা আমাকে দেখিয়েছেন এবং তার উপর ঐরূপই সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন যেমন সন্তুষ্ট আমার উপর হয়েছেন।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি সন্তুষ্ট চিত্তে চলে যাও। আমি তার জন্যে যা কিছু প্রস্তুত রেখেছি তা যদি তুমি দেখতে তবে খুব হাসতে এবং মোটেই দুঃখিত হতে না।” অতঃপর যখন তার ঐ বন্ধু মারা যায় এবং দুই বন্ধুর রূহ মিলিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বর্ণনা দাও।” তখন একজন অপরজনকে বলেঃ “তুমি আমার খুব ভাল বন্ধু ছিলে ও অত্যন্ত সৎ সঙ্গী ছিলে এবং ছিলে অতি উত্তম দোস্ত। পক্ষান্তরে, দুইজন কাফির, যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজন মারা যায় এবং তাকে জাহান্নামের দুঃসংবাদ দেয়া। হয় তখন দুনিয়ার ঐ বন্ধুর কথা তার স্মরণ হয় এবং সে বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার ও আপনার নবী (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণের নির্দেশ দিতো। সে আমাকে মন্দ কাজে উৎসাহিত করতো এবং ভাল কাজ হতে বিরত রাখতো। আর আমার মনে সে এই বিশ্বাস জন্মাতো যে, আপনার সাথে সাক্ষাৎ হবে না। সুতরাং আপনি তাকে সুপথ প্রদর্শন করবেন না যাতে সেও যেন ওটাই দেখতে পায় যা আমাকে দেখানো হয়েছে এবং আপনি তার উপর ঐরূপই অসন্তুষ্ট থাকবেন যেরূপ আমার উপর অসন্তুষ্ট রয়েছেন।” তারপর যখন ঐ দ্বিতীয় বন্ধু মারা যায় এবং উভয়ের রূহ একত্রিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা একে অপরের গুণাগুণ বর্ণনা কর।” প্রত্যেকেই তখন অপরকে বলেঃ “তুমি আমার খুবই মন্দ ভাই ছিলে, ছিলে খারাপ সঙ্গী ও নিকৃষ্ট বন্ধু।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বন্ধুত্ব শত্রুতায় পরিবর্তিত হয়ে যাবে। তবে আল্লাহভীরুদের বন্ধুত্ব তা হবে না। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে দুই ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালবাসে, যাদের একজন রয়েছে পূর্ব দিকে এবং অপরজন রয়েছে পশ্চিম দিকে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের দুজনকেই একত্রিত করে প্রত্যেককেই বলবেনঃ “এ হলো ঐ ব্যক্তি যাকে তুমি আমারই জন্যে ভালবাসতে।” (এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইরশাদ হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন মুত্তাকীদেরকে বলা হবেঃ হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না। যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। এটা হলো তোমাদের . ঈমান ও ইসলামের প্রতিদান। অর্থাৎ ভিতরে বিশ্বাস ও পূর্ণ প্রত্যয়, আর বাইরে শরীয়তের উপর আমল। মু’তামার ইবনে সুলাইমান (রাঃ) স্বীয় পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন মানুষ নিজ নিজ কবর হতে উথিত হবে তখন সবাই অশান্তি ও সন্ত্রাসের মধ্যে থাকবে। তখন একজন ঘোষক (আল্লাহর বাণী) ঘোষণা করবেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং দুঃখিতও হবে না তোমরা।' এ ঘোষণা শুনে সবাই খুশী হয়ে যাবে, কারণ তারা এটাকে সাধারণ ঘোষণা মনে করবে (অর্থাৎ তারা মনে করবে যে এ ঘোষণা সবারই জন্যে)। এরপর আবার ঘোষণা করা হবেঃ ‘যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল। এ ঘোষণা শুনে খাটি ও পাকা মুসলমান ছাড়া অন্যান্য সবাই নিরাশ হয়ে যাবে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীরা সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর।' সূরায়ে রূমে-এর তাফসীর গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে। সেখানে সবকিছু রয়েছে অন্তর যা চায় এবং নয়ন যাতে তৃপ্ত হয়। সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে।(আরবী) এবং (আরবী) এই দুই কিরআতই রয়েছে। অর্থাৎ সেখানে তাদের জন্যে সুস্বাদু, সুগন্ধময় এবং সুন্দর রঙ এর খাবার রয়েছে যা মনে চায়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সর্বাপেক্ষা নিম্নশ্রেণীর জান্নাতী, যে সর্বশেষ জান্নাতে যাবে, তার দৃষ্টি শত বছরের পথের দূরত্ব পর্যন্ত যাবে, আর তত দূর পর্যন্ত সে শুধু নিজেরই ডেরা, . তাঁবু এবং স্বর্ণ ও পান্না নির্মিত প্রাসাদ দেখতে পাবে। ঐগুলো সবই বিভিন্ন প্রকারের ও রঙ বেরঙ এর আসবাবপত্রে ভরপুর থাকবে। সকাল-সন্ধ্যায় বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যে পরিপূর্ণ সত্তর হাজার করে রেকাবী ও পেয়ালা তার সামনে পেশ করা হবে। ঐগুলোর প্রত্যেকটি তার মনের চাহিদা মুতাবিক হবে। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার চাহিদা একই রকম থাকবে। যদি সে সারা দুনিয়ার লোককে যিয়াফত দেয় তবে তাদের সবারই জন্যে ঐ খাদ্যগুলো যথেষ্ট হবে। অথচ ওগুলোর কিছুই কমবে না।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জান্নাতের। বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর। শপথ! জান্নাতী খাবারের একটি গ্রাস উঠাবে এবং তার মনে খেয়াল জাগবে যে, অমুক প্রকারের খাদ্য হলে খুবই ভাল হতো! তখন ঐ গ্রাস তার মুখে ঐ জিনিসই হয়ে যাবে যার সে আকাঙ্ক্ষা করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর সাত তলা প্রাসাদ হবে। সে ষষ্ঠ তলায় অবস্থান করবে এবং সপ্তম তলাটি তার উপরে থাকবে। তার ত্রিশজন খাদেম থাকবে যারা সকাল-সন্ধ্যায় স্বর্ণ নির্মিত তিনশটি পাত্রে তার জন্যে খাদ্য পরিবেশন করবে। প্রত্যেকটিতে পৃথক পৃথক খাদ্য থাকবে এবং ওগুলো হবে খুবই সুন্দর ও সুস্বাদু। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার খাওয়ার চাহিদা একই রূপ থাকবে। অনুরূপভাবে তাকে তিন শ’টি সোনার পেয়ালা, পানপাত্র ও গ্লাসে পানীয় জিনিস দেয়া হবে। ওগুলোও পৃথক পৃথক জিনিস হবে। সে তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি সমস্ত জান্নাতীকে দাওয়াত দিতাম। সবাই যদি আমার এখানে খায় তবুও আমার খাদ্য মোটেই হ্রাস পাবে না।” আয়ত চক্ষু বিশিষ্ট হ্রদের মধ্য হতে তার বাহাত্তরটি স্ত্রী থাকবে এবং দুনিয়ার স্ত্রী পৃথকভাবে থাকবে। তাদের মধ্যে এক একজন এক এক মাইল জায়গার মধ্যে বসে থাকবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সাথে সাথে তাদেরকে বলা হবেঃ তোমাদের এই নিয়ামত চিরস্থায়ী থাকবে। আর তোমরাও হবে এখানে স্থায়ী। অর্থাৎ কখনো এখান হতে বের হবে না এবং এটা হতে স্থানান্তর কামনা করবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের উপর নিজের অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন:“এটাই জান্নাত, তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে, তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ।” অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে এটা দান করেছি আমার প্রশস্ত রহমতের গুণে। কেননা, কোন ব্যক্তিই আল্লাহর রহমত ছাড়া শুধু নিজের কর্মের বলে জান্নাতে যেতে পারে না। হ্যা, তবে অবশ্যই জান্নাতের শেণীভেদ যে হবে তা সৎ কার্যাবলীর পার্থক্যের কারণেই হবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামী তার জান্নাতের জায়গা জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে এবং দেখে দুঃখ ও আফসোস করে বলবে যে, যদি আল্লাহ তাকে হিদায়াত দান করতেন তবে সেও মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত হতো। আর প্রত্যেক জান্নাতী তার জাহান্নামের জায়গা জান্নাতের মধ্যে দেখতে পাবে এবং ওটা দেখে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পূর্বক বলবে:“আল্লাহ তা'আলা আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করলে আমি সুপথ লাভে সক্ষম হতাম না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেনঃ “প্রত্যেক লোকেরই একটি স্থান জান্নাতে রয়েছে এবং একটি স্থান জাহান্নামে রয়েছে। সুতরাং কাফির মুমিনের জাহান্নামের জায়গার ওয়ারিস হবে এবং মুমিন কাফিরের জান্নাতের জায়গার ওয়ারিস হবে। আল্লাহ তা'আলার ‘এটাই জান্নাত, যার অধিকারী তোমাদেরকে করা হয়েছে তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ এই উক্তির দ্বারা এটাকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)খাদ্য ও পানীয়ের বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ জান্নাতের ফলমূল ও তরিতরকারীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সেখানে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তারা সেগুলো হতে আহার করবে। মোটকথা, তারা ভরপুর নিয়ামতরাজিসহ মহান আল্লাহর পছন্দনীয় ঘরে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আয-যুখরুফ 43:73
৬৬-৭৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ দেখো, এই মুশরিকরা কিয়ামতের অপেক্ষা করছে, কিন্তু এতে কোন লাভ নেই, কেননা এটা তাদের অজ্ঞাতসারে আকস্মিকভাবে এসে পড়বে। কারণ এটা সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময় তো কারো জানা নেই। হঠাৎ করে যখন এটা এসে পড়বে তখন এরা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলেও কোন উপকার হবে না। এরা যদিও এই কিয়ামতকে অসম্ভব মনে করছে, কিন্তু এটা শুধু সম্ভবই নয়, বরং নিশ্চিত। ঐ সময় বা ঐ সময়ের পরের আমল কোন কাজে আসবে না। দুনিয়ায় যাদের বন্ধুত্ব গায়রুল্লাহর জন্যে রয়েছে ঐ দিন সেটা শত্রুতায় পরিবর্তিত হবে। হ্যা, তবে যে বন্ধুত্ব শুধু আল্লাহর জন্যে রয়েছে তা বাকী ও চিরস্থায়ী থাকবে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহ ছাড়া প্রতিমাগুলোর সাথে পার্থিব জীবনে যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে রেখেছে তা শুধু পার্থিব জীবন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে, অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমাদের একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করবে এবং তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম, আর তোমাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী হবে না।”(২৯:২৫)।হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ দুই জন মুমিন যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজনের মৃত্যু হয় এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে সে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয় তখন সে তার ঐ দুনিয়ার বন্ধুকে স্মরণ করে এবং বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার এবং আপনার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিতো। আমাকে সে ভাল কাজের আদেশ করতো এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখতো। আমাকে সে বিশ্বাস করাতো যে, একদিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। সুতরাং হে আল্লাহ! তাকে আপনি সত্য পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং শেষে তাকে ওটাই দেখিয়ে দিবেন যা আমাকে দেখিয়েছেন এবং তার উপর ঐরূপই সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন যেমন সন্তুষ্ট আমার উপর হয়েছেন।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি সন্তুষ্ট চিত্তে চলে যাও। আমি তার জন্যে যা কিছু প্রস্তুত রেখেছি তা যদি তুমি দেখতে তবে খুব হাসতে এবং মোটেই দুঃখিত হতে না।” অতঃপর যখন তার ঐ বন্ধু মারা যায় এবং দুই বন্ধুর রূহ মিলিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বর্ণনা দাও।” তখন একজন অপরজনকে বলেঃ “তুমি আমার খুব ভাল বন্ধু ছিলে ও অত্যন্ত সৎ সঙ্গী ছিলে এবং ছিলে অতি উত্তম দোস্ত। পক্ষান্তরে, দুইজন কাফির, যারা দুনিয়ায় পরস্পর বন্ধু হয়, যখন তাদের একজন মারা যায় এবং তাকে জাহান্নামের দুঃসংবাদ দেয়া। হয় তখন দুনিয়ার ঐ বন্ধুর কথা তার স্মরণ হয় এবং সে বলেঃ “হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমার বন্ধু ছিল। সে আমাকে আপনার ও আপনার নবী (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণের নির্দেশ দিতো। সে আমাকে মন্দ কাজে উৎসাহিত করতো এবং ভাল কাজ হতে বিরত রাখতো। আর আমার মনে সে এই বিশ্বাস জন্মাতো যে, আপনার সাথে সাক্ষাৎ হবে না। সুতরাং আপনি তাকে সুপথ প্রদর্শন করবেন না যাতে সেও যেন ওটাই দেখতে পায় যা আমাকে দেখানো হয়েছে এবং আপনি তার উপর ঐরূপই অসন্তুষ্ট থাকবেন যেরূপ আমার উপর অসন্তুষ্ট রয়েছেন।” তারপর যখন ঐ দ্বিতীয় বন্ধু মারা যায় এবং উভয়ের রূহ একত্রিত হয় তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ “তোমরা একে অপরের গুণাগুণ বর্ণনা কর।” প্রত্যেকেই তখন অপরকে বলেঃ “তুমি আমার খুবই মন্দ ভাই ছিলে, ছিলে খারাপ সঙ্গী ও নিকৃষ্ট বন্ধু।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বন্ধুত্ব শত্রুতায় পরিবর্তিত হয়ে যাবে। তবে আল্লাহভীরুদের বন্ধুত্ব তা হবে না। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে দুই ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালবাসে, যাদের একজন রয়েছে পূর্ব দিকে এবং অপরজন রয়েছে পশ্চিম দিকে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের দুজনকেই একত্রিত করে প্রত্যেককেই বলবেনঃ “এ হলো ঐ ব্যক্তি যাকে তুমি আমারই জন্যে ভালবাসতে।” (এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইরশাদ হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন মুত্তাকীদেরকে বলা হবেঃ হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না। যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। এটা হলো তোমাদের . ঈমান ও ইসলামের প্রতিদান। অর্থাৎ ভিতরে বিশ্বাস ও পূর্ণ প্রত্যয়, আর বাইরে শরীয়তের উপর আমল। মু’তামার ইবনে সুলাইমান (রাঃ) স্বীয় পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন মানুষ নিজ নিজ কবর হতে উথিত হবে তখন সবাই অশান্তি ও সন্ত্রাসের মধ্যে থাকবে। তখন একজন ঘোষক (আল্লাহর বাণী) ঘোষণা করবেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং দুঃখিতও হবে না তোমরা।' এ ঘোষণা শুনে সবাই খুশী হয়ে যাবে, কারণ তারা এটাকে সাধারণ ঘোষণা মনে করবে (অর্থাৎ তারা মনে করবে যে এ ঘোষণা সবারই জন্যে)। এরপর আবার ঘোষণা করা হবেঃ ‘যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল। এ ঘোষণা শুনে খাটি ও পাকা মুসলমান ছাড়া অন্যান্য সবাই নিরাশ হয়ে যাবে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীরা সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর।' সূরায়ে রূমে-এর তাফসীর গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে। সেখানে সবকিছু রয়েছে অন্তর যা চায় এবং নয়ন যাতে তৃপ্ত হয়। সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে।(আরবী) এবং (আরবী) এই দুই কিরআতই রয়েছে। অর্থাৎ সেখানে তাদের জন্যে সুস্বাদু, সুগন্ধময় এবং সুন্দর রঙ এর খাবার রয়েছে যা মনে চায়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘সর্বাপেক্ষা নিম্নশ্রেণীর জান্নাতী, যে সর্বশেষ জান্নাতে যাবে, তার দৃষ্টি শত বছরের পথের দূরত্ব পর্যন্ত যাবে, আর তত দূর পর্যন্ত সে শুধু নিজেরই ডেরা, . তাঁবু এবং স্বর্ণ ও পান্না নির্মিত প্রাসাদ দেখতে পাবে। ঐগুলো সবই বিভিন্ন প্রকারের ও রঙ বেরঙ এর আসবাবপত্রে ভরপুর থাকবে। সকাল-সন্ধ্যায় বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যে পরিপূর্ণ সত্তর হাজার করে রেকাবী ও পেয়ালা তার সামনে পেশ করা হবে। ঐগুলোর প্রত্যেকটি তার মনের চাহিদা মুতাবিক হবে। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার চাহিদা একই রকম থাকবে। যদি সে সারা দুনিয়ার লোককে যিয়াফত দেয় তবে তাদের সবারই জন্যে ঐ খাদ্যগুলো যথেষ্ট হবে। অথচ ওগুলোর কিছুই কমবে না।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জান্নাতের। বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর। শপথ! জান্নাতী খাবারের একটি গ্রাস উঠাবে এবং তার মনে খেয়াল জাগবে যে, অমুক প্রকারের খাদ্য হলে খুবই ভাল হতো! তখন ঐ গ্রাস তার মুখে ঐ জিনিসই হয়ে যাবে যার সে আকাঙ্ক্ষা করেছিল।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বনিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীর সাত তলা প্রাসাদ হবে। সে ষষ্ঠ তলায় অবস্থান করবে এবং সপ্তম তলাটি তার উপরে থাকবে। তার ত্রিশজন খাদেম থাকবে যারা সকাল-সন্ধ্যায় স্বর্ণ নির্মিত তিনশটি পাত্রে তার জন্যে খাদ্য পরিবেশন করবে। প্রত্যেকটিতে পৃথক পৃথক খাদ্য থাকবে এবং ওগুলো হবে খুবই সুন্দর ও সুস্বাদু। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তার খাওয়ার চাহিদা একই রূপ থাকবে। অনুরূপভাবে তাকে তিন শ’টি সোনার পেয়ালা, পানপাত্র ও গ্লাসে পানীয় জিনিস দেয়া হবে। ওগুলোও পৃথক পৃথক জিনিস হবে। সে তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি সমস্ত জান্নাতীকে দাওয়াত দিতাম। সবাই যদি আমার এখানে খায় তবুও আমার খাদ্য মোটেই হ্রাস পাবে না।” আয়ত চক্ষু বিশিষ্ট হ্রদের মধ্য হতে তার বাহাত্তরটি স্ত্রী থাকবে এবং দুনিয়ার স্ত্রী পৃথকভাবে থাকবে। তাদের মধ্যে এক একজন এক এক মাইল জায়গার মধ্যে বসে থাকবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সাথে সাথে তাদেরকে বলা হবেঃ তোমাদের এই নিয়ামত চিরস্থায়ী থাকবে। আর তোমরাও হবে এখানে স্থায়ী। অর্থাৎ কখনো এখান হতে বের হবে না এবং এটা হতে স্থানান্তর কামনা করবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের উপর নিজের অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন:“এটাই জান্নাত, তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে, তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ।” অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে এটা দান করেছি আমার প্রশস্ত রহমতের গুণে। কেননা, কোন ব্যক্তিই আল্লাহর রহমত ছাড়া শুধু নিজের কর্মের বলে জান্নাতে যেতে পারে না। হ্যা, তবে অবশ্যই জান্নাতের শেণীভেদ যে হবে তা সৎ কার্যাবলীর পার্থক্যের কারণেই হবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামী তার জান্নাতের জায়গা জাহান্নামের মধ্যে দেখতে পাবে এবং দেখে দুঃখ ও আফসোস করে বলবে যে, যদি আল্লাহ তাকে হিদায়াত দান করতেন তবে সেও মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত হতো। আর প্রত্যেক জান্নাতী তার জাহান্নামের জায়গা জান্নাতের মধ্যে দেখতে পাবে এবং ওটা দেখে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পূর্বক বলবে:“আল্লাহ তা'আলা আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করলে আমি সুপথ লাভে সক্ষম হতাম না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেনঃ “প্রত্যেক লোকেরই একটি স্থান জান্নাতে রয়েছে এবং একটি স্থান জাহান্নামে রয়েছে। সুতরাং কাফির মুমিনের জাহান্নামের জায়গার ওয়ারিস হবে এবং মুমিন কাফিরের জান্নাতের জায়গার ওয়ারিস হবে। আল্লাহ তা'আলার ‘এটাই জান্নাত, যার অধিকারী তোমাদেরকে করা হয়েছে তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ এই উক্তির দ্বারা এটাকেই বুঝানো হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)খাদ্য ও পানীয়ের বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ জান্নাতের ফলমূল ও তরিতরকারীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সেখানে জান্নাতীদের জন্যে রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তারা সেগুলো হতে আহার করবে। মোটকথা, তারা ভরপুর নিয়ামতরাজিসহ মহান আল্লাহর পছন্দনীয় ঘরে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আয-যুখরুফ 43:74
৭৪-৮০ নং আয়াতের তাফসীর: উপরে সৎ লোকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছিল এ জন্যে এখানে মন্দ ও অসৎ লোকদের অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, পাপীরা স্থায়ীভাবে জাহান্নামের আযাব। ভোগ করতে থাকবে। এক ঘন্টার জন্যেও তাদের ঐ শাস্তি হালকা করা হবে না। জাহান্নামে সে হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে থাকবে। সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে সে। নিরাশ হয়ে যাবে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম। দুষ্কর্যের মাধ্যমে তারা নিজেরাই নিজেদের উপর যুলুম করেছে। আমি রাসূল পাঠিয়েছিলাম, কিতাব নাযিল করেছিলাম এবং যুক্তি-প্রমাণ কায়েম করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের হঠকারিতা, অবাধ্যতা এবং সীমালংঘন হতে বিরত হয়নি। ফলে আমি তাদেরকে এর প্রতিফল প্রদান করেছি। এটা আমার তাদের প্রতি যুলুম নয়, আমি তো আমার বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুম করি না। জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিককে চীৎকার করে ডাক দিয়ে বলবেঃ ‘তোমার প্রতিপালক যেন আমাদেরকে নিঃশেষ করে দেন। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত ইয়ালা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মিম্বরের উপর এ আয়াতটি পড়তে শুনেন, অতঃপর তিনি বলেন যে, জাহান্নামীরা মৃত্যু কামনা করবে যাতে শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এটা ফায়সালা হয়ে গেছে যে, না তাদের মৃত্যু হবে এবং না তাদের শাস্তি হালকা করা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপর এ সিদ্ধান্ত নেই যে, তারা মৃত্যু বরণ করবে, আর তাদের হতে শাস্তি হালকা করা হবে না।” (৩৫:৩৬) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটা (উপদেশ) উপেক্ষা করবে যে নিতান্ত হতভাগা, যে মহা অগ্নিতে প্রবেশ করবে, অতঃপর সেখানে সে মরবেও না, বাঁচবেও না।” (৮৭:১১-১৩)।যখন জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিকের কাছে আবেদন করবে যে, আল্লাহ তাআলা যেন তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দেন, তখন মালিক উত্তরে বলবেঃ ‘তোমরা এখানে এভাবেই থাকবে, তোমাদের আর মৃত্যু হবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হলো এক হাজার বছর। অর্থাৎ তোমরা মরবেও না, মুক্তিও পাবে না এবং এখান হতে পালাতেও পারবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের দুস্কার্যের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যখন তিনি তাদের সামনে সত্যকে পেশ করেন অর্থাৎ তাদের সামনে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেন। তখন তারা তা মেনে নেয়া তো দূরের কথা, ওর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতঃ মুখ ফিরিয়ে নেয়। ওটা তাদের মনেই চায় না। তাই তারা হকপন্থীদেরকে ঘৃণার চোখে দেখে। তারা অসত্য ও অন্যায়ের দিকেই ঝুঁকে থাকে এবং অসৎপন্থীদের সাথেই তাদের খুব মিল মহব্বত। সুতরাং তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা আজ নিজেদেরকেই ভৎসনা কর এবং নিজেদের উপরই দুঃখ আফসোস কর। কিন্তু সেদিন তাদের আফসোসেও কোন উপকার হবে না।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “তারা জঘন্য চক্রান্তের ইচ্ছা করেছিল, তখন আমিও কৌশল করেছিলাম।' মুজাহিদ (রঃ) এটার এই তাফসীর করেছেন এবং এর স্বপক্ষে আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তিটি রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা চক্রান্ত করেছিল এবং আমিও এমন কৌশল করেছিলাম যে, তারা বুঝতেই পারে না।” (২৭:৫০) মুশরিকরা সত্যকে এড়িয়ে চলার জন্যে নানা প্রকারের কৌশল অবলম্বন করতো। আল্লাহ তাআলাও তখন তাদেরকে ধোকার মধ্যেই রেখে দেন এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি তাদের মাথার উপর এসে না পড়া পর্যন্ত তাদের চক্ষু খুললো না। এ জন্যেই এর পরেই প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণার খবর রাখি না? তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমি অবশ্যই তাদের সমস্ত গোপন বিষয় অবগত রয়েছি। আর আমার ফেরেশতারা তো তাদের নিকট থেকে সবকিছু লিপিবদ্ধ করে। অর্থাৎ আমি নিজেই তো তাদের সমস্ত গোপন বিষয়ের খবর রাখি, তদুপরি আমার নির্ধারিত ফেরেশতারা তাদের ছোট বড় সব আমলই লিপিবদ্ধ করে রাখছে।
আয-যুখরুফ 43:75
৭৪-৮০ নং আয়াতের তাফসীর: উপরে সৎ লোকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছিল এ জন্যে এখানে মন্দ ও অসৎ লোকদের অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, পাপীরা স্থায়ীভাবে জাহান্নামের আযাব। ভোগ করতে থাকবে। এক ঘন্টার জন্যেও তাদের ঐ শাস্তি হালকা করা হবে না। জাহান্নামে সে হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে থাকবে। সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে সে। নিরাশ হয়ে যাবে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম। দুষ্কর্যের মাধ্যমে তারা নিজেরাই নিজেদের উপর যুলুম করেছে। আমি রাসূল পাঠিয়েছিলাম, কিতাব নাযিল করেছিলাম এবং যুক্তি-প্রমাণ কায়েম করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের হঠকারিতা, অবাধ্যতা এবং সীমালংঘন হতে বিরত হয়নি। ফলে আমি তাদেরকে এর প্রতিফল প্রদান করেছি। এটা আমার তাদের প্রতি যুলুম নয়, আমি তো আমার বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুম করি না। জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিককে চীৎকার করে ডাক দিয়ে বলবেঃ ‘তোমার প্রতিপালক যেন আমাদেরকে নিঃশেষ করে দেন। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত ইয়ালা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মিম্বরের উপর এ আয়াতটি পড়তে শুনেন, অতঃপর তিনি বলেন যে, জাহান্নামীরা মৃত্যু কামনা করবে যাতে শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এটা ফায়সালা হয়ে গেছে যে, না তাদের মৃত্যু হবে এবং না তাদের শাস্তি হালকা করা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপর এ সিদ্ধান্ত নেই যে, তারা মৃত্যু বরণ করবে, আর তাদের হতে শাস্তি হালকা করা হবে না।” (৩৫:৩৬) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটা (উপদেশ) উপেক্ষা করবে যে নিতান্ত হতভাগা, যে মহা অগ্নিতে প্রবেশ করবে, অতঃপর সেখানে সে মরবেও না, বাঁচবেও না।” (৮৭:১১-১৩)।যখন জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিকের কাছে আবেদন করবে যে, আল্লাহ তাআলা যেন তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দেন, তখন মালিক উত্তরে বলবেঃ ‘তোমরা এখানে এভাবেই থাকবে, তোমাদের আর মৃত্যু হবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হলো এক হাজার বছর। অর্থাৎ তোমরা মরবেও না, মুক্তিও পাবে না এবং এখান হতে পালাতেও পারবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের দুস্কার্যের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যখন তিনি তাদের সামনে সত্যকে পেশ করেন অর্থাৎ তাদের সামনে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেন। তখন তারা তা মেনে নেয়া তো দূরের কথা, ওর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতঃ মুখ ফিরিয়ে নেয়। ওটা তাদের মনেই চায় না। তাই তারা হকপন্থীদেরকে ঘৃণার চোখে দেখে। তারা অসত্য ও অন্যায়ের দিকেই ঝুঁকে থাকে এবং অসৎপন্থীদের সাথেই তাদের খুব মিল মহব্বত। সুতরাং তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা আজ নিজেদেরকেই ভৎসনা কর এবং নিজেদের উপরই দুঃখ আফসোস কর। কিন্তু সেদিন তাদের আফসোসেও কোন উপকার হবে না।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “তারা জঘন্য চক্রান্তের ইচ্ছা করেছিল, তখন আমিও কৌশল করেছিলাম।' মুজাহিদ (রঃ) এটার এই তাফসীর করেছেন এবং এর স্বপক্ষে আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তিটি রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা চক্রান্ত করেছিল এবং আমিও এমন কৌশল করেছিলাম যে, তারা বুঝতেই পারে না।” (২৭:৫০) মুশরিকরা সত্যকে এড়িয়ে চলার জন্যে নানা প্রকারের কৌশল অবলম্বন করতো। আল্লাহ তাআলাও তখন তাদেরকে ধোকার মধ্যেই রেখে দেন এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি তাদের মাথার উপর এসে না পড়া পর্যন্ত তাদের চক্ষু খুললো না। এ জন্যেই এর পরেই প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণার খবর রাখি না? তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমি অবশ্যই তাদের সমস্ত গোপন বিষয় অবগত রয়েছি। আর আমার ফেরেশতারা তো তাদের নিকট থেকে সবকিছু লিপিবদ্ধ করে। অর্থাৎ আমি নিজেই তো তাদের সমস্ত গোপন বিষয়ের খবর রাখি, তদুপরি আমার নির্ধারিত ফেরেশতারা তাদের ছোট বড় সব আমলই লিপিবদ্ধ করে রাখছে।
আয-যুখরুফ 43:76
৭৪-৮০ নং আয়াতের তাফসীর: উপরে সৎ লোকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছিল এ জন্যে এখানে মন্দ ও অসৎ লোকদের অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, পাপীরা স্থায়ীভাবে জাহান্নামের আযাব। ভোগ করতে থাকবে। এক ঘন্টার জন্যেও তাদের ঐ শাস্তি হালকা করা হবে না। জাহান্নামে সে হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে থাকবে। সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে সে। নিরাশ হয়ে যাবে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম। দুষ্কর্যের মাধ্যমে তারা নিজেরাই নিজেদের উপর যুলুম করেছে। আমি রাসূল পাঠিয়েছিলাম, কিতাব নাযিল করেছিলাম এবং যুক্তি-প্রমাণ কায়েম করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের হঠকারিতা, অবাধ্যতা এবং সীমালংঘন হতে বিরত হয়নি। ফলে আমি তাদেরকে এর প্রতিফল প্রদান করেছি। এটা আমার তাদের প্রতি যুলুম নয়, আমি তো আমার বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুম করি না। জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিককে চীৎকার করে ডাক দিয়ে বলবেঃ ‘তোমার প্রতিপালক যেন আমাদেরকে নিঃশেষ করে দেন। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত ইয়ালা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মিম্বরের উপর এ আয়াতটি পড়তে শুনেন, অতঃপর তিনি বলেন যে, জাহান্নামীরা মৃত্যু কামনা করবে যাতে শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এটা ফায়সালা হয়ে গেছে যে, না তাদের মৃত্যু হবে এবং না তাদের শাস্তি হালকা করা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপর এ সিদ্ধান্ত নেই যে, তারা মৃত্যু বরণ করবে, আর তাদের হতে শাস্তি হালকা করা হবে না।” (৩৫:৩৬) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটা (উপদেশ) উপেক্ষা করবে যে নিতান্ত হতভাগা, যে মহা অগ্নিতে প্রবেশ করবে, অতঃপর সেখানে সে মরবেও না, বাঁচবেও না।” (৮৭:১১-১৩)।যখন জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিকের কাছে আবেদন করবে যে, আল্লাহ তাআলা যেন তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দেন, তখন মালিক উত্তরে বলবেঃ ‘তোমরা এখানে এভাবেই থাকবে, তোমাদের আর মৃত্যু হবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হলো এক হাজার বছর। অর্থাৎ তোমরা মরবেও না, মুক্তিও পাবে না এবং এখান হতে পালাতেও পারবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের দুস্কার্যের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যখন তিনি তাদের সামনে সত্যকে পেশ করেন অর্থাৎ তাদের সামনে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেন। তখন তারা তা মেনে নেয়া তো দূরের কথা, ওর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতঃ মুখ ফিরিয়ে নেয়। ওটা তাদের মনেই চায় না। তাই তারা হকপন্থীদেরকে ঘৃণার চোখে দেখে। তারা অসত্য ও অন্যায়ের দিকেই ঝুঁকে থাকে এবং অসৎপন্থীদের সাথেই তাদের খুব মিল মহব্বত। সুতরাং তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা আজ নিজেদেরকেই ভৎসনা কর এবং নিজেদের উপরই দুঃখ আফসোস কর। কিন্তু সেদিন তাদের আফসোসেও কোন উপকার হবে না।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “তারা জঘন্য চক্রান্তের ইচ্ছা করেছিল, তখন আমিও কৌশল করেছিলাম।' মুজাহিদ (রঃ) এটার এই তাফসীর করেছেন এবং এর স্বপক্ষে আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তিটি রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা চক্রান্ত করেছিল এবং আমিও এমন কৌশল করেছিলাম যে, তারা বুঝতেই পারে না।” (২৭:৫০) মুশরিকরা সত্যকে এড়িয়ে চলার জন্যে নানা প্রকারের কৌশল অবলম্বন করতো। আল্লাহ তাআলাও তখন তাদেরকে ধোকার মধ্যেই রেখে দেন এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি তাদের মাথার উপর এসে না পড়া পর্যন্ত তাদের চক্ষু খুললো না। এ জন্যেই এর পরেই প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণার খবর রাখি না? তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমি অবশ্যই তাদের সমস্ত গোপন বিষয় অবগত রয়েছি। আর আমার ফেরেশতারা তো তাদের নিকট থেকে সবকিছু লিপিবদ্ধ করে। অর্থাৎ আমি নিজেই তো তাদের সমস্ত গোপন বিষয়ের খবর রাখি, তদুপরি আমার নির্ধারিত ফেরেশতারা তাদের ছোট বড় সব আমলই লিপিবদ্ধ করে রাখছে।
আয-যুখরুফ 43:77
৭৪-৮০ নং আয়াতের তাফসীর: উপরে সৎ লোকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছিল এ জন্যে এখানে মন্দ ও অসৎ লোকদের অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, পাপীরা স্থায়ীভাবে জাহান্নামের আযাব। ভোগ করতে থাকবে। এক ঘন্টার জন্যেও তাদের ঐ শাস্তি হালকা করা হবে না। জাহান্নামে সে হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে থাকবে। সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে সে। নিরাশ হয়ে যাবে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম। দুষ্কর্যের মাধ্যমে তারা নিজেরাই নিজেদের উপর যুলুম করেছে। আমি রাসূল পাঠিয়েছিলাম, কিতাব নাযিল করেছিলাম এবং যুক্তি-প্রমাণ কায়েম করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের হঠকারিতা, অবাধ্যতা এবং সীমালংঘন হতে বিরত হয়নি। ফলে আমি তাদেরকে এর প্রতিফল প্রদান করেছি। এটা আমার তাদের প্রতি যুলুম নয়, আমি তো আমার বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুম করি না। জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিককে চীৎকার করে ডাক দিয়ে বলবেঃ ‘তোমার প্রতিপালক যেন আমাদেরকে নিঃশেষ করে দেন। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত ইয়ালা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মিম্বরের উপর এ আয়াতটি পড়তে শুনেন, অতঃপর তিনি বলেন যে, জাহান্নামীরা মৃত্যু কামনা করবে যাতে শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এটা ফায়সালা হয়ে গেছে যে, না তাদের মৃত্যু হবে এবং না তাদের শাস্তি হালকা করা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপর এ সিদ্ধান্ত নেই যে, তারা মৃত্যু বরণ করবে, আর তাদের হতে শাস্তি হালকা করা হবে না।” (৩৫:৩৬) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটা (উপদেশ) উপেক্ষা করবে যে নিতান্ত হতভাগা, যে মহা অগ্নিতে প্রবেশ করবে, অতঃপর সেখানে সে মরবেও না, বাঁচবেও না।” (৮৭:১১-১৩)।যখন জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিকের কাছে আবেদন করবে যে, আল্লাহ তাআলা যেন তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দেন, তখন মালিক উত্তরে বলবেঃ ‘তোমরা এখানে এভাবেই থাকবে, তোমাদের আর মৃত্যু হবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হলো এক হাজার বছর। অর্থাৎ তোমরা মরবেও না, মুক্তিও পাবে না এবং এখান হতে পালাতেও পারবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের দুস্কার্যের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যখন তিনি তাদের সামনে সত্যকে পেশ করেন অর্থাৎ তাদের সামনে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেন। তখন তারা তা মেনে নেয়া তো দূরের কথা, ওর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতঃ মুখ ফিরিয়ে নেয়। ওটা তাদের মনেই চায় না। তাই তারা হকপন্থীদেরকে ঘৃণার চোখে দেখে। তারা অসত্য ও অন্যায়ের দিকেই ঝুঁকে থাকে এবং অসৎপন্থীদের সাথেই তাদের খুব মিল মহব্বত। সুতরাং তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা আজ নিজেদেরকেই ভৎসনা কর এবং নিজেদের উপরই দুঃখ আফসোস কর। কিন্তু সেদিন তাদের আফসোসেও কোন উপকার হবে না।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “তারা জঘন্য চক্রান্তের ইচ্ছা করেছিল, তখন আমিও কৌশল করেছিলাম।' মুজাহিদ (রঃ) এটার এই তাফসীর করেছেন এবং এর স্বপক্ষে আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তিটি রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা চক্রান্ত করেছিল এবং আমিও এমন কৌশল করেছিলাম যে, তারা বুঝতেই পারে না।” (২৭:৫০) মুশরিকরা সত্যকে এড়িয়ে চলার জন্যে নানা প্রকারের কৌশল অবলম্বন করতো। আল্লাহ তাআলাও তখন তাদেরকে ধোকার মধ্যেই রেখে দেন এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি তাদের মাথার উপর এসে না পড়া পর্যন্ত তাদের চক্ষু খুললো না। এ জন্যেই এর পরেই প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণার খবর রাখি না? তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমি অবশ্যই তাদের সমস্ত গোপন বিষয় অবগত রয়েছি। আর আমার ফেরেশতারা তো তাদের নিকট থেকে সবকিছু লিপিবদ্ধ করে। অর্থাৎ আমি নিজেই তো তাদের সমস্ত গোপন বিষয়ের খবর রাখি, তদুপরি আমার নির্ধারিত ফেরেশতারা তাদের ছোট বড় সব আমলই লিপিবদ্ধ করে রাখছে।
আয-যুখরুফ 43:78
৭৪-৮০ নং আয়াতের তাফসীর: উপরে সৎ লোকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছিল এ জন্যে এখানে মন্দ ও অসৎ লোকদের অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, পাপীরা স্থায়ীভাবে জাহান্নামের আযাব। ভোগ করতে থাকবে। এক ঘন্টার জন্যেও তাদের ঐ শাস্তি হালকা করা হবে না। জাহান্নামে সে হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে থাকবে। সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে সে। নিরাশ হয়ে যাবে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম। দুষ্কর্যের মাধ্যমে তারা নিজেরাই নিজেদের উপর যুলুম করেছে। আমি রাসূল পাঠিয়েছিলাম, কিতাব নাযিল করেছিলাম এবং যুক্তি-প্রমাণ কায়েম করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের হঠকারিতা, অবাধ্যতা এবং সীমালংঘন হতে বিরত হয়নি। ফলে আমি তাদেরকে এর প্রতিফল প্রদান করেছি। এটা আমার তাদের প্রতি যুলুম নয়, আমি তো আমার বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুম করি না। জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিককে চীৎকার করে ডাক দিয়ে বলবেঃ ‘তোমার প্রতিপালক যেন আমাদেরকে নিঃশেষ করে দেন। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত ইয়ালা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মিম্বরের উপর এ আয়াতটি পড়তে শুনেন, অতঃপর তিনি বলেন যে, জাহান্নামীরা মৃত্যু কামনা করবে যাতে শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এটা ফায়সালা হয়ে গেছে যে, না তাদের মৃত্যু হবে এবং না তাদের শাস্তি হালকা করা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপর এ সিদ্ধান্ত নেই যে, তারা মৃত্যু বরণ করবে, আর তাদের হতে শাস্তি হালকা করা হবে না।” (৩৫:৩৬) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটা (উপদেশ) উপেক্ষা করবে যে নিতান্ত হতভাগা, যে মহা অগ্নিতে প্রবেশ করবে, অতঃপর সেখানে সে মরবেও না, বাঁচবেও না।” (৮৭:১১-১৩)।যখন জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিকের কাছে আবেদন করবে যে, আল্লাহ তাআলা যেন তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দেন, তখন মালিক উত্তরে বলবেঃ ‘তোমরা এখানে এভাবেই থাকবে, তোমাদের আর মৃত্যু হবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হলো এক হাজার বছর। অর্থাৎ তোমরা মরবেও না, মুক্তিও পাবে না এবং এখান হতে পালাতেও পারবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের দুস্কার্যের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যখন তিনি তাদের সামনে সত্যকে পেশ করেন অর্থাৎ তাদের সামনে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেন। তখন তারা তা মেনে নেয়া তো দূরের কথা, ওর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতঃ মুখ ফিরিয়ে নেয়। ওটা তাদের মনেই চায় না। তাই তারা হকপন্থীদেরকে ঘৃণার চোখে দেখে। তারা অসত্য ও অন্যায়ের দিকেই ঝুঁকে থাকে এবং অসৎপন্থীদের সাথেই তাদের খুব মিল মহব্বত। সুতরাং তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা আজ নিজেদেরকেই ভৎসনা কর এবং নিজেদের উপরই দুঃখ আফসোস কর। কিন্তু সেদিন তাদের আফসোসেও কোন উপকার হবে না।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “তারা জঘন্য চক্রান্তের ইচ্ছা করেছিল, তখন আমিও কৌশল করেছিলাম।' মুজাহিদ (রঃ) এটার এই তাফসীর করেছেন এবং এর স্বপক্ষে আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তিটি রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা চক্রান্ত করেছিল এবং আমিও এমন কৌশল করেছিলাম যে, তারা বুঝতেই পারে না।” (২৭:৫০) মুশরিকরা সত্যকে এড়িয়ে চলার জন্যে নানা প্রকারের কৌশল অবলম্বন করতো। আল্লাহ তাআলাও তখন তাদেরকে ধোকার মধ্যেই রেখে দেন এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি তাদের মাথার উপর এসে না পড়া পর্যন্ত তাদের চক্ষু খুললো না। এ জন্যেই এর পরেই প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণার খবর রাখি না? তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমি অবশ্যই তাদের সমস্ত গোপন বিষয় অবগত রয়েছি। আর আমার ফেরেশতারা তো তাদের নিকট থেকে সবকিছু লিপিবদ্ধ করে। অর্থাৎ আমি নিজেই তো তাদের সমস্ত গোপন বিষয়ের খবর রাখি, তদুপরি আমার নির্ধারিত ফেরেশতারা তাদের ছোট বড় সব আমলই লিপিবদ্ধ করে রাখছে।
আয-যুখরুফ 43:79
৭৪-৮০ নং আয়াতের তাফসীর: উপরে সৎ লোকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছিল এ জন্যে এখানে মন্দ ও অসৎ লোকদের অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, পাপীরা স্থায়ীভাবে জাহান্নামের আযাব। ভোগ করতে থাকবে। এক ঘন্টার জন্যেও তাদের ঐ শাস্তি হালকা করা হবে না। জাহান্নামে সে হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে থাকবে। সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে সে। নিরাশ হয়ে যাবে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম। দুষ্কর্যের মাধ্যমে তারা নিজেরাই নিজেদের উপর যুলুম করেছে। আমি রাসূল পাঠিয়েছিলাম, কিতাব নাযিল করেছিলাম এবং যুক্তি-প্রমাণ কায়েম করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের হঠকারিতা, অবাধ্যতা এবং সীমালংঘন হতে বিরত হয়নি। ফলে আমি তাদেরকে এর প্রতিফল প্রদান করেছি। এটা আমার তাদের প্রতি যুলুম নয়, আমি তো আমার বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুম করি না। জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিককে চীৎকার করে ডাক দিয়ে বলবেঃ ‘তোমার প্রতিপালক যেন আমাদেরকে নিঃশেষ করে দেন। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত ইয়ালা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মিম্বরের উপর এ আয়াতটি পড়তে শুনেন, অতঃপর তিনি বলেন যে, জাহান্নামীরা মৃত্যু কামনা করবে যাতে শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এটা ফায়সালা হয়ে গেছে যে, না তাদের মৃত্যু হবে এবং না তাদের শাস্তি হালকা করা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপর এ সিদ্ধান্ত নেই যে, তারা মৃত্যু বরণ করবে, আর তাদের হতে শাস্তি হালকা করা হবে না।” (৩৫:৩৬) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটা (উপদেশ) উপেক্ষা করবে যে নিতান্ত হতভাগা, যে মহা অগ্নিতে প্রবেশ করবে, অতঃপর সেখানে সে মরবেও না, বাঁচবেও না।” (৮৭:১১-১৩)।যখন জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিকের কাছে আবেদন করবে যে, আল্লাহ তাআলা যেন তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দেন, তখন মালিক উত্তরে বলবেঃ ‘তোমরা এখানে এভাবেই থাকবে, তোমাদের আর মৃত্যু হবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হলো এক হাজার বছর। অর্থাৎ তোমরা মরবেও না, মুক্তিও পাবে না এবং এখান হতে পালাতেও পারবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের দুস্কার্যের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যখন তিনি তাদের সামনে সত্যকে পেশ করেন অর্থাৎ তাদের সামনে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেন। তখন তারা তা মেনে নেয়া তো দূরের কথা, ওর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতঃ মুখ ফিরিয়ে নেয়। ওটা তাদের মনেই চায় না। তাই তারা হকপন্থীদেরকে ঘৃণার চোখে দেখে। তারা অসত্য ও অন্যায়ের দিকেই ঝুঁকে থাকে এবং অসৎপন্থীদের সাথেই তাদের খুব মিল মহব্বত। সুতরাং তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা আজ নিজেদেরকেই ভৎসনা কর এবং নিজেদের উপরই দুঃখ আফসোস কর। কিন্তু সেদিন তাদের আফসোসেও কোন উপকার হবে না।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “তারা জঘন্য চক্রান্তের ইচ্ছা করেছিল, তখন আমিও কৌশল করেছিলাম।' মুজাহিদ (রঃ) এটার এই তাফসীর করেছেন এবং এর স্বপক্ষে আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তিটি রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা চক্রান্ত করেছিল এবং আমিও এমন কৌশল করেছিলাম যে, তারা বুঝতেই পারে না।” (২৭:৫০) মুশরিকরা সত্যকে এড়িয়ে চলার জন্যে নানা প্রকারের কৌশল অবলম্বন করতো। আল্লাহ তাআলাও তখন তাদেরকে ধোকার মধ্যেই রেখে দেন এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি তাদের মাথার উপর এসে না পড়া পর্যন্ত তাদের চক্ষু খুললো না। এ জন্যেই এর পরেই প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণার খবর রাখি না? তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমি অবশ্যই তাদের সমস্ত গোপন বিষয় অবগত রয়েছি। আর আমার ফেরেশতারা তো তাদের নিকট থেকে সবকিছু লিপিবদ্ধ করে। অর্থাৎ আমি নিজেই তো তাদের সমস্ত গোপন বিষয়ের খবর রাখি, তদুপরি আমার নির্ধারিত ফেরেশতারা তাদের ছোট বড় সব আমলই লিপিবদ্ধ করে রাখছে।
আয-যুখরুফ 43:80
৭৪-৮০ নং আয়াতের তাফসীর: উপরে সৎ লোকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছিল এ জন্যে এখানে মন্দ ও অসৎ লোকদের অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, পাপীরা স্থায়ীভাবে জাহান্নামের আযাব। ভোগ করতে থাকবে। এক ঘন্টার জন্যেও তাদের ঐ শাস্তি হালকা করা হবে না। জাহান্নামে সে হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে থাকবে। সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে সে। নিরাশ হয়ে যাবে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম। দুষ্কর্যের মাধ্যমে তারা নিজেরাই নিজেদের উপর যুলুম করেছে। আমি রাসূল পাঠিয়েছিলাম, কিতাব নাযিল করেছিলাম এবং যুক্তি-প্রমাণ কায়েম করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের হঠকারিতা, অবাধ্যতা এবং সীমালংঘন হতে বিরত হয়নি। ফলে আমি তাদেরকে এর প্রতিফল প্রদান করেছি। এটা আমার তাদের প্রতি যুলুম নয়, আমি তো আমার বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুম করি না। জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিককে চীৎকার করে ডাক দিয়ে বলবেঃ ‘তোমার প্রতিপালক যেন আমাদেরকে নিঃশেষ করে দেন। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত ইয়ালা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মিম্বরের উপর এ আয়াতটি পড়তে শুনেন, অতঃপর তিনি বলেন যে, জাহান্নামীরা মৃত্যু কামনা করবে যাতে শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এটা ফায়সালা হয়ে গেছে যে, না তাদের মৃত্যু হবে এবং না তাদের শাস্তি হালকা করা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপর এ সিদ্ধান্ত নেই যে, তারা মৃত্যু বরণ করবে, আর তাদের হতে শাস্তি হালকা করা হবে না।” (৩৫:৩৬) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটা (উপদেশ) উপেক্ষা করবে যে নিতান্ত হতভাগা, যে মহা অগ্নিতে প্রবেশ করবে, অতঃপর সেখানে সে মরবেও না, বাঁচবেও না।” (৮৭:১১-১৩)।যখন জাহান্নামীরা জাহান্নামের রক্ষক মালিকের কাছে আবেদন করবে যে, আল্লাহ তাআলা যেন তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দেন, তখন মালিক উত্তরে বলবেঃ ‘তোমরা এখানে এভাবেই থাকবে, তোমাদের আর মৃত্যু হবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হলো এক হাজার বছর। অর্থাৎ তোমরা মরবেও না, মুক্তিও পাবে না এবং এখান হতে পালাতেও পারবে না। এরপর মহান আল্লাহ তাদের দুস্কার্যের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যখন তিনি তাদের সামনে সত্যকে পেশ করেন অর্থাৎ তাদের সামনে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেন। তখন তারা তা মেনে নেয়া তো দূরের কথা, ওর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতঃ মুখ ফিরিয়ে নেয়। ওটা তাদের মনেই চায় না। তাই তারা হকপন্থীদেরকে ঘৃণার চোখে দেখে। তারা অসত্য ও অন্যায়ের দিকেই ঝুঁকে থাকে এবং অসৎপন্থীদের সাথেই তাদের খুব মিল মহব্বত। সুতরাং তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা আজ নিজেদেরকেই ভৎসনা কর এবং নিজেদের উপরই দুঃখ আফসোস কর। কিন্তু সেদিন তাদের আফসোসেও কোন উপকার হবে না।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “তারা জঘন্য চক্রান্তের ইচ্ছা করেছিল, তখন আমিও কৌশল করেছিলাম।' মুজাহিদ (রঃ) এটার এই তাফসীর করেছেন এবং এর স্বপক্ষে আল্লাহ্ পাকের নিম্নের উক্তিটি রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা চক্রান্ত করেছিল এবং আমিও এমন কৌশল করেছিলাম যে, তারা বুঝতেই পারে না।” (২৭:৫০) মুশরিকরা সত্যকে এড়িয়ে চলার জন্যে নানা প্রকারের কৌশল অবলম্বন করতো। আল্লাহ তাআলাও তখন তাদেরকে ধোকার মধ্যেই রেখে দেন এবং তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি তাদের মাথার উপর এসে না পড়া পর্যন্ত তাদের চক্ষু খুললো না। এ জন্যেই এর পরেই প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণার খবর রাখি না? তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমি অবশ্যই তাদের সমস্ত গোপন বিষয় অবগত রয়েছি। আর আমার ফেরেশতারা তো তাদের নিকট থেকে সবকিছু লিপিবদ্ধ করে। অর্থাৎ আমি নিজেই তো তাদের সমস্ত গোপন বিষয়ের খবর রাখি, তদুপরি আমার নির্ধারিত ফেরেশতারা তাদের ছোট বড় সব আমলই লিপিবদ্ধ করে রাখছে।
আয-যুখরুফ 43:81
৮১-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- যদি এটা মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে তবে আমার মাথা নোয়াতে চিন্তা কি? না আমি তার কোন আদেশ অমান্য করি এবং না তার হুকুম হতে বিমুখ হই। যদি এরূপই হতো তবে আমি তো সর্বপ্রথম এটা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু মহান আল্লাহর সত্তা এরূপ নয় যে, কেউ তার সমান ও সমকক্ষ হতে পারে। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, শর্তরূপে যে বাক্য আনয়ন করা হয় তা পূর্ণ হয়ে যাওয়া জরুরী নয়। এমন কি ওর সম্ভাবনাও জরুরী নয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করতে পারতেন। পবিত্র ও মহান তিনি। তিনি আল্লাহ, এক, প্রবল পরাক্রমশালী।”(৩৯:৪)।কোন কোন তাফসীরকার (আরবী)-এর অর্থ ‘অস্বীকারকারী’ও করেছেন। যেমন হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) তাঁদের মধ্যে একজন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, এখানে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ অস্বীকারকারীদের অগ্রণী। আর এটা (আরবী) হবে, এবং যেটা ইবাদতের অর্থে হবে সেটা (আরবী) হবে। এর প্রমাণ হিসেবে এই ঘটনাটি রয়েছে যে, একটি মহিলা বিবাহের ছয় মাস পরেই সন্তান প্রসব করে। তখন হযরত উসমান (রাঃ) মহিলাটিকে রজম করার বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) প্রতিবাদ করে বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার কিতাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সন্তানের গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর সময়কাল হচ্ছে ত্রিশ মাস।”(৪৬:১৫) আর অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার (সন্তানের) দুই বছরে দুধ ছাড়ানো হয়। বর্ণনাকারী বলেন যে, হযরত আলী (রাঃ) যখন এই দলীল পেশ করলেন, (আরবী) অর্থাৎ “তখন হযরত উসমান (রাঃ) এটা অস্বীকার করতে পারলেন না। সুতরাং তিনি মহিলাটিকে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন। এখানেও (আরবী) শব্দ রয়েছে। কিন্তু এই উক্তির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, শর্তের জবাবে এ অর্থ ঠিকভাবে বসে না। এটা মেনে নিলে অর্থ দাঁড়াবে ? যদি রহমানের (আল্লাহর) সন্তান থাকে তবে আমিই হলাম প্রথম অস্বীকারকারী। কিন্তু এই কালামে কোন সৌন্দর্য থাকছে না। হ্যা, তবে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, এখানে (আরবী) শব্দটি শর্তের জন্যে নয়, বরং নাফী বা নেতিবাচক হিসেবে এসেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। তখন বাক্যটির অর্থ হবেঃ রহমান বা দয়াময় আল্লাহর কোন সন্তান নেই এবং আমিই তার প্রথম সাক্ষী।' হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা হলো এমন কালাম যা আরবদের পরিভাষায় রয়েছে। অর্থাৎ না আল্লাহর সন্তান আছে এবং না আমি তার উক্তিকারী। আবু সাখর (রঃ) বলেন যে, উক্তিটির ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘আমি তো প্রথম হতেই তাঁর ইবাদতকারী এবং এটা ঘোষণাকারী যে, তাঁর কোন সন্তান নেই এবং আমি তার তাওহীদকে স্বীকার করে নেয়ার ব্যাপারেও অগ্রণী। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘আমিই তাঁর প্রথম ইবাদতকারী এবং একত্ববাদী, আর তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন, এর অর্থ হলোঃ ‘আমিই প্রথম অস্বীকারকারী। অভিধানে এ দুটিই রয়েছে, অর্থাৎ (আরবী), তবে প্রথমটিই নিকটতর। কেননা, এটা শর্ত ও জাযা হয়েছে। কিন্তু এটা অসম্ভব। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ যদি তাঁর সন্তান হতো তবে আমিই সর্বপ্রথম তা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু তা হতে তিনি পবিত্র ও মুক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটিই পছন্দ করেছেন এবং যারা (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) বা নেতিবাচক বলেছেন তিনি তাঁদের এ উক্তি খণ্ডন করেছেন। আর এজন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা যা আরোপ করে তা হতে পবিত্র ও মহান, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অধিপতি এবং আরশের অধিকারী। তিনি তো এক, অভাবমুক্ত। তাঁর কোন নীর, সমকক্ষ ও সন্তান নেই।মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তাদেরকে যে দিবসের কথা বলা হয়েছে তার সম্মুখীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদেরকে তুমি বাক-বিতণ্ডা ও ক্রীড়া-কৌতুক করতে দাও। তারা এসব খেল-তামাশা ও ক্রীড়া-কৌতুকে লিপ্ত থাকবে এমতাবস্থায়ই তাদের উপর কিয়ামত এসে পড়বে। ঐ সময় তারা তাদের পরিণাম জানতে পারবে। এরপর মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গীর আরো বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যমীন ও আসমানের সমস্ত মাখলুক তার ইবাদতে লিপ্ত রয়েছে এবং সবাই তাঁর সামনে অপারগ ও শক্তিহীন। তিনিই প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে, তিনি তোমাদের গোপনীয় ও প্রকাশ্য বিষয় জানেন এবং তোমরা যা উপার্জন কর সেটাও তিনি জানেন।”(৬:৩) কত মহান তিনি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সবকিছুর সার্বভৌম অধিপতি! তিনি সর্বপ্রকারের দোষ হতে পবিত্র ও মুক্ত। তিনি সবারই অধিকর্তা। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এমন কেউ নেই যে তার কোন হুকুম টলাতে পারে। কেউ এমন নেই যে তাঁর মজীর পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সবকিছুই তার অধিকারভুক্ত। সবকিছুই তার ক্ষমতাধীন। কিয়ামতের জ্ঞান শুধু তারই আছে। তিনি ছাড়া কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময়ের জ্ঞান কারো নেই। তাঁর নিকট সবাই প্রত্যাবর্তিত হবে। প্রত্যেককেই তিনি তার কৃতকর্মের প্রতিফল প্রদান করবেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, সুপারিশের ক্ষমতা তাদের নেই। অর্থাৎ কাফিররা তাদের যেসব বাতিল মাবুদকে তাদের সুপারিশকারী মনে করে রেখেছে, তাদের কেউই সুপারিশের জন্যে সামনে এগিয়ে যেতে পারে না। কারো সুপারিশে তাদের কোন উপকার হবে না। এরপরে ইসতিসনা মুনকাতা রয়েছে অর্থাৎ তবে তারা ব্যতীত যারা সত্য উপলব্ধি করে ওর সাক্ষ্য দেয়। আর তারা নিজেরাও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন। আল্লাহ তা'আলা সৎ লোকদেরকে তাদের জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন এবং সেই সুপারিশ তিনি কবুল করবেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি যদি এই কাফিরদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তবে তারা জবাবে অবশ্যই বলবেঃ আল্লাহ। তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?' অর্থাৎ এটা বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, তারা আল্লাহ তা'আলাকে এককভাবে সৃষ্টিকর্তা মেনে নেয়ার পরেও অন্যদেরও তারা উপাসনা করছে যারা সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন! তারা একটুও চিন্তা করে দেখে না যে, সৃষ্টি যখন একজনই করেছেন তখন অন্যদের ইবাদত করা যায় কি করে? তাদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতা এতো বেশী বেড়ে গেছে যে, এই সহজ সরল কথাটি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্তও তারা বুঝতে পারে না। আর বুঝালেও তারা বুঝে না। তাই তো মহান আল্লাহ বিস্ময় প্রকাশ পূর্বক বলেনঃ ‘তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে! ইরশাদ হচ্ছেঃ মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের এ বক্তব্য বললেন অর্থাৎ স্বীয় প্রতিপালকের নিকট স্বীয় কওমের অবিশ্বাসকরণের অভিযোগ করলেন এবং বললেন যে, তারা ঈমান আনবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাসূল বললো- হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে।”(২৫:৩০) ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এই তাফসীরই করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, ইবনে মাসউদ (রঃ)-এর কিরআত (আরবী) (৪৩:৮৮) এই রূপ রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ “এটা তোমাদের নবী (সঃ)-এর উক্তি, তিনি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে স্বীয় কওমের অভিযোগ করেন।” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী)-এর দ্বিতীয় কিরআত (আরবী)-এর উপর যবর দিয়েও বর্ণনা করেছেন। আর তিনি এর দু'টি তালিকা বর্ণনা করেছেন। একটি এই যে, এটা (আরবী)-এর উপর হয়েছে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে। ক্রিয়া পদটি উহ্য মেনে নেয়া হবে। আর যখন (আরবী)-এর নীচে (আরবী) দিয়ে পড়া হবে তখন এটা (আরবী)-এর উপর (আরবী) হবে। তখন অর্থ হবেঃ কিয়ামতের জ্ঞান এবং এই উক্তির জ্ঞান তাঁরই রয়েছে। সূরার শেষে ইরশাদ হচ্ছেঃ “(হে নবী সঃ)! সুতরাং তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর এবং বলঃ সালাম; শীঘ্রই তারা জানতে পারবে।' অর্থাৎ নবী (সঃ) যেন এ কাফিরদের মন্দ কথার জবাব মন্দ কথা দ্বারা না দেন, বরং তাদের মন জয়ের জন্যে কথায় ও কাজে উভয় ক্ষেত্রেই যেন নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করেন এবং 'সালাম' (শান্তি) একথা বলেন। সত্বরই তারা প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে। এর দ্বারা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে মুশরিকদেরকে কঠিনভাবে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। আর এটা হয়েও গেল যে, তাদের উপর এমন শাস্তি আপতিত হলো যা টলবার নয়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বীনকে সমুন্নত করলেন এবং স্বীয় কালেমাকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিলেন। তিনি তার মুমিন ও মুসলিম বান্দাদেরকে শক্তিশালী করলেন। অতঃপর তাদেরকে জিহাদ ও নির্বাসনের হুকুম দিয়ে দুনিয়ায় এমনভাবে জয়যুক্ত করলেন যে, আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য লোক প্রবেশ করলো এবং প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়লো। সুতরাং প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। আর তিনিই সর্বাপেক্ষা ভাল জ্ঞান রাখেন।
আয-যুখরুফ 43:82
৮১-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- যদি এটা মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে তবে আমার মাথা নোয়াতে চিন্তা কি? না আমি তার কোন আদেশ অমান্য করি এবং না তার হুকুম হতে বিমুখ হই। যদি এরূপই হতো তবে আমি তো সর্বপ্রথম এটা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু মহান আল্লাহর সত্তা এরূপ নয় যে, কেউ তার সমান ও সমকক্ষ হতে পারে। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, শর্তরূপে যে বাক্য আনয়ন করা হয় তা পূর্ণ হয়ে যাওয়া জরুরী নয়। এমন কি ওর সম্ভাবনাও জরুরী নয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করতে পারতেন। পবিত্র ও মহান তিনি। তিনি আল্লাহ, এক, প্রবল পরাক্রমশালী।”(৩৯:৪)।কোন কোন তাফসীরকার (আরবী)-এর অর্থ ‘অস্বীকারকারী’ও করেছেন। যেমন হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) তাঁদের মধ্যে একজন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, এখানে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ অস্বীকারকারীদের অগ্রণী। আর এটা (আরবী) হবে, এবং যেটা ইবাদতের অর্থে হবে সেটা (আরবী) হবে। এর প্রমাণ হিসেবে এই ঘটনাটি রয়েছে যে, একটি মহিলা বিবাহের ছয় মাস পরেই সন্তান প্রসব করে। তখন হযরত উসমান (রাঃ) মহিলাটিকে রজম করার বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) প্রতিবাদ করে বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার কিতাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সন্তানের গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর সময়কাল হচ্ছে ত্রিশ মাস।”(৪৬:১৫) আর অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার (সন্তানের) দুই বছরে দুধ ছাড়ানো হয়। বর্ণনাকারী বলেন যে, হযরত আলী (রাঃ) যখন এই দলীল পেশ করলেন, (আরবী) অর্থাৎ “তখন হযরত উসমান (রাঃ) এটা অস্বীকার করতে পারলেন না। সুতরাং তিনি মহিলাটিকে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন। এখানেও (আরবী) শব্দ রয়েছে। কিন্তু এই উক্তির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, শর্তের জবাবে এ অর্থ ঠিকভাবে বসে না। এটা মেনে নিলে অর্থ দাঁড়াবে ? যদি রহমানের (আল্লাহর) সন্তান থাকে তবে আমিই হলাম প্রথম অস্বীকারকারী। কিন্তু এই কালামে কোন সৌন্দর্য থাকছে না। হ্যা, তবে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, এখানে (আরবী) শব্দটি শর্তের জন্যে নয়, বরং নাফী বা নেতিবাচক হিসেবে এসেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। তখন বাক্যটির অর্থ হবেঃ রহমান বা দয়াময় আল্লাহর কোন সন্তান নেই এবং আমিই তার প্রথম সাক্ষী।' হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা হলো এমন কালাম যা আরবদের পরিভাষায় রয়েছে। অর্থাৎ না আল্লাহর সন্তান আছে এবং না আমি তার উক্তিকারী। আবু সাখর (রঃ) বলেন যে, উক্তিটির ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘আমি তো প্রথম হতেই তাঁর ইবাদতকারী এবং এটা ঘোষণাকারী যে, তাঁর কোন সন্তান নেই এবং আমি তার তাওহীদকে স্বীকার করে নেয়ার ব্যাপারেও অগ্রণী। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘আমিই তাঁর প্রথম ইবাদতকারী এবং একত্ববাদী, আর তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন, এর অর্থ হলোঃ ‘আমিই প্রথম অস্বীকারকারী। অভিধানে এ দুটিই রয়েছে, অর্থাৎ (আরবী), তবে প্রথমটিই নিকটতর। কেননা, এটা শর্ত ও জাযা হয়েছে। কিন্তু এটা অসম্ভব। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ যদি তাঁর সন্তান হতো তবে আমিই সর্বপ্রথম তা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু তা হতে তিনি পবিত্র ও মুক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটিই পছন্দ করেছেন এবং যারা (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) বা নেতিবাচক বলেছেন তিনি তাঁদের এ উক্তি খণ্ডন করেছেন। আর এজন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা যা আরোপ করে তা হতে পবিত্র ও মহান, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অধিপতি এবং আরশের অধিকারী। তিনি তো এক, অভাবমুক্ত। তাঁর কোন নীর, সমকক্ষ ও সন্তান নেই।মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তাদেরকে যে দিবসের কথা বলা হয়েছে তার সম্মুখীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদেরকে তুমি বাক-বিতণ্ডা ও ক্রীড়া-কৌতুক করতে দাও। তারা এসব খেল-তামাশা ও ক্রীড়া-কৌতুকে লিপ্ত থাকবে এমতাবস্থায়ই তাদের উপর কিয়ামত এসে পড়বে। ঐ সময় তারা তাদের পরিণাম জানতে পারবে। এরপর মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গীর আরো বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যমীন ও আসমানের সমস্ত মাখলুক তার ইবাদতে লিপ্ত রয়েছে এবং সবাই তাঁর সামনে অপারগ ও শক্তিহীন। তিনিই প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে, তিনি তোমাদের গোপনীয় ও প্রকাশ্য বিষয় জানেন এবং তোমরা যা উপার্জন কর সেটাও তিনি জানেন।”(৬:৩) কত মহান তিনি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সবকিছুর সার্বভৌম অধিপতি! তিনি সর্বপ্রকারের দোষ হতে পবিত্র ও মুক্ত। তিনি সবারই অধিকর্তা। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এমন কেউ নেই যে তার কোন হুকুম টলাতে পারে। কেউ এমন নেই যে তাঁর মজীর পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সবকিছুই তার অধিকারভুক্ত। সবকিছুই তার ক্ষমতাধীন। কিয়ামতের জ্ঞান শুধু তারই আছে। তিনি ছাড়া কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময়ের জ্ঞান কারো নেই। তাঁর নিকট সবাই প্রত্যাবর্তিত হবে। প্রত্যেককেই তিনি তার কৃতকর্মের প্রতিফল প্রদান করবেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, সুপারিশের ক্ষমতা তাদের নেই। অর্থাৎ কাফিররা তাদের যেসব বাতিল মাবুদকে তাদের সুপারিশকারী মনে করে রেখেছে, তাদের কেউই সুপারিশের জন্যে সামনে এগিয়ে যেতে পারে না। কারো সুপারিশে তাদের কোন উপকার হবে না। এরপরে ইসতিসনা মুনকাতা রয়েছে অর্থাৎ তবে তারা ব্যতীত যারা সত্য উপলব্ধি করে ওর সাক্ষ্য দেয়। আর তারা নিজেরাও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন। আল্লাহ তা'আলা সৎ লোকদেরকে তাদের জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন এবং সেই সুপারিশ তিনি কবুল করবেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি যদি এই কাফিরদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তবে তারা জবাবে অবশ্যই বলবেঃ আল্লাহ। তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?' অর্থাৎ এটা বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, তারা আল্লাহ তা'আলাকে এককভাবে সৃষ্টিকর্তা মেনে নেয়ার পরেও অন্যদেরও তারা উপাসনা করছে যারা সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন! তারা একটুও চিন্তা করে দেখে না যে, সৃষ্টি যখন একজনই করেছেন তখন অন্যদের ইবাদত করা যায় কি করে? তাদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতা এতো বেশী বেড়ে গেছে যে, এই সহজ সরল কথাটি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্তও তারা বুঝতে পারে না। আর বুঝালেও তারা বুঝে না। তাই তো মহান আল্লাহ বিস্ময় প্রকাশ পূর্বক বলেনঃ ‘তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে! ইরশাদ হচ্ছেঃ মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের এ বক্তব্য বললেন অর্থাৎ স্বীয় প্রতিপালকের নিকট স্বীয় কওমের অবিশ্বাসকরণের অভিযোগ করলেন এবং বললেন যে, তারা ঈমান আনবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাসূল বললো- হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে।”(২৫:৩০) ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এই তাফসীরই করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, ইবনে মাসউদ (রঃ)-এর কিরআত (আরবী) (৪৩:৮৮) এই রূপ রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ “এটা তোমাদের নবী (সঃ)-এর উক্তি, তিনি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে স্বীয় কওমের অভিযোগ করেন।” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী)-এর দ্বিতীয় কিরআত (আরবী)-এর উপর যবর দিয়েও বর্ণনা করেছেন। আর তিনি এর দু'টি তালিকা বর্ণনা করেছেন। একটি এই যে, এটা (আরবী)-এর উপর হয়েছে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে। ক্রিয়া পদটি উহ্য মেনে নেয়া হবে। আর যখন (আরবী)-এর নীচে (আরবী) দিয়ে পড়া হবে তখন এটা (আরবী)-এর উপর (আরবী) হবে। তখন অর্থ হবেঃ কিয়ামতের জ্ঞান এবং এই উক্তির জ্ঞান তাঁরই রয়েছে। সূরার শেষে ইরশাদ হচ্ছেঃ “(হে নবী সঃ)! সুতরাং তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর এবং বলঃ সালাম; শীঘ্রই তারা জানতে পারবে।' অর্থাৎ নবী (সঃ) যেন এ কাফিরদের মন্দ কথার জবাব মন্দ কথা দ্বারা না দেন, বরং তাদের মন জয়ের জন্যে কথায় ও কাজে উভয় ক্ষেত্রেই যেন নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করেন এবং 'সালাম' (শান্তি) একথা বলেন। সত্বরই তারা প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে। এর দ্বারা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে মুশরিকদেরকে কঠিনভাবে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। আর এটা হয়েও গেল যে, তাদের উপর এমন শাস্তি আপতিত হলো যা টলবার নয়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বীনকে সমুন্নত করলেন এবং স্বীয় কালেমাকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিলেন। তিনি তার মুমিন ও মুসলিম বান্দাদেরকে শক্তিশালী করলেন। অতঃপর তাদেরকে জিহাদ ও নির্বাসনের হুকুম দিয়ে দুনিয়ায় এমনভাবে জয়যুক্ত করলেন যে, আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য লোক প্রবেশ করলো এবং প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়লো। সুতরাং প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। আর তিনিই সর্বাপেক্ষা ভাল জ্ঞান রাখেন।
আয-যুখরুফ 43:83
৮১-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- যদি এটা মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে তবে আমার মাথা নোয়াতে চিন্তা কি? না আমি তার কোন আদেশ অমান্য করি এবং না তার হুকুম হতে বিমুখ হই। যদি এরূপই হতো তবে আমি তো সর্বপ্রথম এটা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু মহান আল্লাহর সত্তা এরূপ নয় যে, কেউ তার সমান ও সমকক্ষ হতে পারে। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, শর্তরূপে যে বাক্য আনয়ন করা হয় তা পূর্ণ হয়ে যাওয়া জরুরী নয়। এমন কি ওর সম্ভাবনাও জরুরী নয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করতে পারতেন। পবিত্র ও মহান তিনি। তিনি আল্লাহ, এক, প্রবল পরাক্রমশালী।”(৩৯:৪)।কোন কোন তাফসীরকার (আরবী)-এর অর্থ ‘অস্বীকারকারী’ও করেছেন। যেমন হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) তাঁদের মধ্যে একজন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, এখানে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ অস্বীকারকারীদের অগ্রণী। আর এটা (আরবী) হবে, এবং যেটা ইবাদতের অর্থে হবে সেটা (আরবী) হবে। এর প্রমাণ হিসেবে এই ঘটনাটি রয়েছে যে, একটি মহিলা বিবাহের ছয় মাস পরেই সন্তান প্রসব করে। তখন হযরত উসমান (রাঃ) মহিলাটিকে রজম করার বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) প্রতিবাদ করে বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার কিতাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সন্তানের গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর সময়কাল হচ্ছে ত্রিশ মাস।”(৪৬:১৫) আর অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার (সন্তানের) দুই বছরে দুধ ছাড়ানো হয়। বর্ণনাকারী বলেন যে, হযরত আলী (রাঃ) যখন এই দলীল পেশ করলেন, (আরবী) অর্থাৎ “তখন হযরত উসমান (রাঃ) এটা অস্বীকার করতে পারলেন না। সুতরাং তিনি মহিলাটিকে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন। এখানেও (আরবী) শব্দ রয়েছে। কিন্তু এই উক্তির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, শর্তের জবাবে এ অর্থ ঠিকভাবে বসে না। এটা মেনে নিলে অর্থ দাঁড়াবে ? যদি রহমানের (আল্লাহর) সন্তান থাকে তবে আমিই হলাম প্রথম অস্বীকারকারী। কিন্তু এই কালামে কোন সৌন্দর্য থাকছে না। হ্যা, তবে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, এখানে (আরবী) শব্দটি শর্তের জন্যে নয়, বরং নাফী বা নেতিবাচক হিসেবে এসেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। তখন বাক্যটির অর্থ হবেঃ রহমান বা দয়াময় আল্লাহর কোন সন্তান নেই এবং আমিই তার প্রথম সাক্ষী।' হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা হলো এমন কালাম যা আরবদের পরিভাষায় রয়েছে। অর্থাৎ না আল্লাহর সন্তান আছে এবং না আমি তার উক্তিকারী। আবু সাখর (রঃ) বলেন যে, উক্তিটির ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘আমি তো প্রথম হতেই তাঁর ইবাদতকারী এবং এটা ঘোষণাকারী যে, তাঁর কোন সন্তান নেই এবং আমি তার তাওহীদকে স্বীকার করে নেয়ার ব্যাপারেও অগ্রণী। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘আমিই তাঁর প্রথম ইবাদতকারী এবং একত্ববাদী, আর তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন, এর অর্থ হলোঃ ‘আমিই প্রথম অস্বীকারকারী। অভিধানে এ দুটিই রয়েছে, অর্থাৎ (আরবী), তবে প্রথমটিই নিকটতর। কেননা, এটা শর্ত ও জাযা হয়েছে। কিন্তু এটা অসম্ভব। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ যদি তাঁর সন্তান হতো তবে আমিই সর্বপ্রথম তা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু তা হতে তিনি পবিত্র ও মুক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটিই পছন্দ করেছেন এবং যারা (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) বা নেতিবাচক বলেছেন তিনি তাঁদের এ উক্তি খণ্ডন করেছেন। আর এজন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা যা আরোপ করে তা হতে পবিত্র ও মহান, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অধিপতি এবং আরশের অধিকারী। তিনি তো এক, অভাবমুক্ত। তাঁর কোন নীর, সমকক্ষ ও সন্তান নেই।মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তাদেরকে যে দিবসের কথা বলা হয়েছে তার সম্মুখীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদেরকে তুমি বাক-বিতণ্ডা ও ক্রীড়া-কৌতুক করতে দাও। তারা এসব খেল-তামাশা ও ক্রীড়া-কৌতুকে লিপ্ত থাকবে এমতাবস্থায়ই তাদের উপর কিয়ামত এসে পড়বে। ঐ সময় তারা তাদের পরিণাম জানতে পারবে। এরপর মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গীর আরো বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যমীন ও আসমানের সমস্ত মাখলুক তার ইবাদতে লিপ্ত রয়েছে এবং সবাই তাঁর সামনে অপারগ ও শক্তিহীন। তিনিই প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে, তিনি তোমাদের গোপনীয় ও প্রকাশ্য বিষয় জানেন এবং তোমরা যা উপার্জন কর সেটাও তিনি জানেন।”(৬:৩) কত মহান তিনি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সবকিছুর সার্বভৌম অধিপতি! তিনি সর্বপ্রকারের দোষ হতে পবিত্র ও মুক্ত। তিনি সবারই অধিকর্তা। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এমন কেউ নেই যে তার কোন হুকুম টলাতে পারে। কেউ এমন নেই যে তাঁর মজীর পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সবকিছুই তার অধিকারভুক্ত। সবকিছুই তার ক্ষমতাধীন। কিয়ামতের জ্ঞান শুধু তারই আছে। তিনি ছাড়া কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময়ের জ্ঞান কারো নেই। তাঁর নিকট সবাই প্রত্যাবর্তিত হবে। প্রত্যেককেই তিনি তার কৃতকর্মের প্রতিফল প্রদান করবেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, সুপারিশের ক্ষমতা তাদের নেই। অর্থাৎ কাফিররা তাদের যেসব বাতিল মাবুদকে তাদের সুপারিশকারী মনে করে রেখেছে, তাদের কেউই সুপারিশের জন্যে সামনে এগিয়ে যেতে পারে না। কারো সুপারিশে তাদের কোন উপকার হবে না। এরপরে ইসতিসনা মুনকাতা রয়েছে অর্থাৎ তবে তারা ব্যতীত যারা সত্য উপলব্ধি করে ওর সাক্ষ্য দেয়। আর তারা নিজেরাও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন। আল্লাহ তা'আলা সৎ লোকদেরকে তাদের জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন এবং সেই সুপারিশ তিনি কবুল করবেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি যদি এই কাফিরদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তবে তারা জবাবে অবশ্যই বলবেঃ আল্লাহ। তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?' অর্থাৎ এটা বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, তারা আল্লাহ তা'আলাকে এককভাবে সৃষ্টিকর্তা মেনে নেয়ার পরেও অন্যদেরও তারা উপাসনা করছে যারা সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন! তারা একটুও চিন্তা করে দেখে না যে, সৃষ্টি যখন একজনই করেছেন তখন অন্যদের ইবাদত করা যায় কি করে? তাদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতা এতো বেশী বেড়ে গেছে যে, এই সহজ সরল কথাটি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্তও তারা বুঝতে পারে না। আর বুঝালেও তারা বুঝে না। তাই তো মহান আল্লাহ বিস্ময় প্রকাশ পূর্বক বলেনঃ ‘তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে! ইরশাদ হচ্ছেঃ মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের এ বক্তব্য বললেন অর্থাৎ স্বীয় প্রতিপালকের নিকট স্বীয় কওমের অবিশ্বাসকরণের অভিযোগ করলেন এবং বললেন যে, তারা ঈমান আনবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাসূল বললো- হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে।”(২৫:৩০) ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এই তাফসীরই করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, ইবনে মাসউদ (রঃ)-এর কিরআত (আরবী) (৪৩:৮৮) এই রূপ রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ “এটা তোমাদের নবী (সঃ)-এর উক্তি, তিনি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে স্বীয় কওমের অভিযোগ করেন।” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী)-এর দ্বিতীয় কিরআত (আরবী)-এর উপর যবর দিয়েও বর্ণনা করেছেন। আর তিনি এর দু'টি তালিকা বর্ণনা করেছেন। একটি এই যে, এটা (আরবী)-এর উপর হয়েছে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে। ক্রিয়া পদটি উহ্য মেনে নেয়া হবে। আর যখন (আরবী)-এর নীচে (আরবী) দিয়ে পড়া হবে তখন এটা (আরবী)-এর উপর (আরবী) হবে। তখন অর্থ হবেঃ কিয়ামতের জ্ঞান এবং এই উক্তির জ্ঞান তাঁরই রয়েছে। সূরার শেষে ইরশাদ হচ্ছেঃ “(হে নবী সঃ)! সুতরাং তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর এবং বলঃ সালাম; শীঘ্রই তারা জানতে পারবে।' অর্থাৎ নবী (সঃ) যেন এ কাফিরদের মন্দ কথার জবাব মন্দ কথা দ্বারা না দেন, বরং তাদের মন জয়ের জন্যে কথায় ও কাজে উভয় ক্ষেত্রেই যেন নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করেন এবং 'সালাম' (শান্তি) একথা বলেন। সত্বরই তারা প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে। এর দ্বারা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে মুশরিকদেরকে কঠিনভাবে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। আর এটা হয়েও গেল যে, তাদের উপর এমন শাস্তি আপতিত হলো যা টলবার নয়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বীনকে সমুন্নত করলেন এবং স্বীয় কালেমাকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিলেন। তিনি তার মুমিন ও মুসলিম বান্দাদেরকে শক্তিশালী করলেন। অতঃপর তাদেরকে জিহাদ ও নির্বাসনের হুকুম দিয়ে দুনিয়ায় এমনভাবে জয়যুক্ত করলেন যে, আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য লোক প্রবেশ করলো এবং প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়লো। সুতরাং প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। আর তিনিই সর্বাপেক্ষা ভাল জ্ঞান রাখেন।
আয-যুখরুফ 43:84
৮১-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- যদি এটা মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে তবে আমার মাথা নোয়াতে চিন্তা কি? না আমি তার কোন আদেশ অমান্য করি এবং না তার হুকুম হতে বিমুখ হই। যদি এরূপই হতো তবে আমি তো সর্বপ্রথম এটা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু মহান আল্লাহর সত্তা এরূপ নয় যে, কেউ তার সমান ও সমকক্ষ হতে পারে। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, শর্তরূপে যে বাক্য আনয়ন করা হয় তা পূর্ণ হয়ে যাওয়া জরুরী নয়। এমন কি ওর সম্ভাবনাও জরুরী নয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করতে পারতেন। পবিত্র ও মহান তিনি। তিনি আল্লাহ, এক, প্রবল পরাক্রমশালী।”(৩৯:৪)।কোন কোন তাফসীরকার (আরবী)-এর অর্থ ‘অস্বীকারকারী’ও করেছেন। যেমন হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) তাঁদের মধ্যে একজন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, এখানে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ অস্বীকারকারীদের অগ্রণী। আর এটা (আরবী) হবে, এবং যেটা ইবাদতের অর্থে হবে সেটা (আরবী) হবে। এর প্রমাণ হিসেবে এই ঘটনাটি রয়েছে যে, একটি মহিলা বিবাহের ছয় মাস পরেই সন্তান প্রসব করে। তখন হযরত উসমান (রাঃ) মহিলাটিকে রজম করার বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) প্রতিবাদ করে বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার কিতাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সন্তানের গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর সময়কাল হচ্ছে ত্রিশ মাস।”(৪৬:১৫) আর অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার (সন্তানের) দুই বছরে দুধ ছাড়ানো হয়। বর্ণনাকারী বলেন যে, হযরত আলী (রাঃ) যখন এই দলীল পেশ করলেন, (আরবী) অর্থাৎ “তখন হযরত উসমান (রাঃ) এটা অস্বীকার করতে পারলেন না। সুতরাং তিনি মহিলাটিকে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন। এখানেও (আরবী) শব্দ রয়েছে। কিন্তু এই উক্তির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, শর্তের জবাবে এ অর্থ ঠিকভাবে বসে না। এটা মেনে নিলে অর্থ দাঁড়াবে ? যদি রহমানের (আল্লাহর) সন্তান থাকে তবে আমিই হলাম প্রথম অস্বীকারকারী। কিন্তু এই কালামে কোন সৌন্দর্য থাকছে না। হ্যা, তবে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, এখানে (আরবী) শব্দটি শর্তের জন্যে নয়, বরং নাফী বা নেতিবাচক হিসেবে এসেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। তখন বাক্যটির অর্থ হবেঃ রহমান বা দয়াময় আল্লাহর কোন সন্তান নেই এবং আমিই তার প্রথম সাক্ষী।' হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা হলো এমন কালাম যা আরবদের পরিভাষায় রয়েছে। অর্থাৎ না আল্লাহর সন্তান আছে এবং না আমি তার উক্তিকারী। আবু সাখর (রঃ) বলেন যে, উক্তিটির ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘আমি তো প্রথম হতেই তাঁর ইবাদতকারী এবং এটা ঘোষণাকারী যে, তাঁর কোন সন্তান নেই এবং আমি তার তাওহীদকে স্বীকার করে নেয়ার ব্যাপারেও অগ্রণী। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘আমিই তাঁর প্রথম ইবাদতকারী এবং একত্ববাদী, আর তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন, এর অর্থ হলোঃ ‘আমিই প্রথম অস্বীকারকারী। অভিধানে এ দুটিই রয়েছে, অর্থাৎ (আরবী), তবে প্রথমটিই নিকটতর। কেননা, এটা শর্ত ও জাযা হয়েছে। কিন্তু এটা অসম্ভব। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ যদি তাঁর সন্তান হতো তবে আমিই সর্বপ্রথম তা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু তা হতে তিনি পবিত্র ও মুক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটিই পছন্দ করেছেন এবং যারা (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) বা নেতিবাচক বলেছেন তিনি তাঁদের এ উক্তি খণ্ডন করেছেন। আর এজন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা যা আরোপ করে তা হতে পবিত্র ও মহান, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অধিপতি এবং আরশের অধিকারী। তিনি তো এক, অভাবমুক্ত। তাঁর কোন নীর, সমকক্ষ ও সন্তান নেই।মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তাদেরকে যে দিবসের কথা বলা হয়েছে তার সম্মুখীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদেরকে তুমি বাক-বিতণ্ডা ও ক্রীড়া-কৌতুক করতে দাও। তারা এসব খেল-তামাশা ও ক্রীড়া-কৌতুকে লিপ্ত থাকবে এমতাবস্থায়ই তাদের উপর কিয়ামত এসে পড়বে। ঐ সময় তারা তাদের পরিণাম জানতে পারবে। এরপর মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গীর আরো বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যমীন ও আসমানের সমস্ত মাখলুক তার ইবাদতে লিপ্ত রয়েছে এবং সবাই তাঁর সামনে অপারগ ও শক্তিহীন। তিনিই প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে, তিনি তোমাদের গোপনীয় ও প্রকাশ্য বিষয় জানেন এবং তোমরা যা উপার্জন কর সেটাও তিনি জানেন।”(৬:৩) কত মহান তিনি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সবকিছুর সার্বভৌম অধিপতি! তিনি সর্বপ্রকারের দোষ হতে পবিত্র ও মুক্ত। তিনি সবারই অধিকর্তা। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এমন কেউ নেই যে তার কোন হুকুম টলাতে পারে। কেউ এমন নেই যে তাঁর মজীর পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সবকিছুই তার অধিকারভুক্ত। সবকিছুই তার ক্ষমতাধীন। কিয়ামতের জ্ঞান শুধু তারই আছে। তিনি ছাড়া কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময়ের জ্ঞান কারো নেই। তাঁর নিকট সবাই প্রত্যাবর্তিত হবে। প্রত্যেককেই তিনি তার কৃতকর্মের প্রতিফল প্রদান করবেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, সুপারিশের ক্ষমতা তাদের নেই। অর্থাৎ কাফিররা তাদের যেসব বাতিল মাবুদকে তাদের সুপারিশকারী মনে করে রেখেছে, তাদের কেউই সুপারিশের জন্যে সামনে এগিয়ে যেতে পারে না। কারো সুপারিশে তাদের কোন উপকার হবে না। এরপরে ইসতিসনা মুনকাতা রয়েছে অর্থাৎ তবে তারা ব্যতীত যারা সত্য উপলব্ধি করে ওর সাক্ষ্য দেয়। আর তারা নিজেরাও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন। আল্লাহ তা'আলা সৎ লোকদেরকে তাদের জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন এবং সেই সুপারিশ তিনি কবুল করবেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি যদি এই কাফিরদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তবে তারা জবাবে অবশ্যই বলবেঃ আল্লাহ। তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?' অর্থাৎ এটা বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, তারা আল্লাহ তা'আলাকে এককভাবে সৃষ্টিকর্তা মেনে নেয়ার পরেও অন্যদেরও তারা উপাসনা করছে যারা সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন! তারা একটুও চিন্তা করে দেখে না যে, সৃষ্টি যখন একজনই করেছেন তখন অন্যদের ইবাদত করা যায় কি করে? তাদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতা এতো বেশী বেড়ে গেছে যে, এই সহজ সরল কথাটি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্তও তারা বুঝতে পারে না। আর বুঝালেও তারা বুঝে না। তাই তো মহান আল্লাহ বিস্ময় প্রকাশ পূর্বক বলেনঃ ‘তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে! ইরশাদ হচ্ছেঃ মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের এ বক্তব্য বললেন অর্থাৎ স্বীয় প্রতিপালকের নিকট স্বীয় কওমের অবিশ্বাসকরণের অভিযোগ করলেন এবং বললেন যে, তারা ঈমান আনবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাসূল বললো- হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে।”(২৫:৩০) ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এই তাফসীরই করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, ইবনে মাসউদ (রঃ)-এর কিরআত (আরবী) (৪৩:৮৮) এই রূপ রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ “এটা তোমাদের নবী (সঃ)-এর উক্তি, তিনি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে স্বীয় কওমের অভিযোগ করেন।” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী)-এর দ্বিতীয় কিরআত (আরবী)-এর উপর যবর দিয়েও বর্ণনা করেছেন। আর তিনি এর দু'টি তালিকা বর্ণনা করেছেন। একটি এই যে, এটা (আরবী)-এর উপর হয়েছে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে। ক্রিয়া পদটি উহ্য মেনে নেয়া হবে। আর যখন (আরবী)-এর নীচে (আরবী) দিয়ে পড়া হবে তখন এটা (আরবী)-এর উপর (আরবী) হবে। তখন অর্থ হবেঃ কিয়ামতের জ্ঞান এবং এই উক্তির জ্ঞান তাঁরই রয়েছে। সূরার শেষে ইরশাদ হচ্ছেঃ “(হে নবী সঃ)! সুতরাং তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর এবং বলঃ সালাম; শীঘ্রই তারা জানতে পারবে।' অর্থাৎ নবী (সঃ) যেন এ কাফিরদের মন্দ কথার জবাব মন্দ কথা দ্বারা না দেন, বরং তাদের মন জয়ের জন্যে কথায় ও কাজে উভয় ক্ষেত্রেই যেন নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করেন এবং 'সালাম' (শান্তি) একথা বলেন। সত্বরই তারা প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে। এর দ্বারা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে মুশরিকদেরকে কঠিনভাবে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। আর এটা হয়েও গেল যে, তাদের উপর এমন শাস্তি আপতিত হলো যা টলবার নয়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বীনকে সমুন্নত করলেন এবং স্বীয় কালেমাকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিলেন। তিনি তার মুমিন ও মুসলিম বান্দাদেরকে শক্তিশালী করলেন। অতঃপর তাদেরকে জিহাদ ও নির্বাসনের হুকুম দিয়ে দুনিয়ায় এমনভাবে জয়যুক্ত করলেন যে, আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য লোক প্রবেশ করলো এবং প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়লো। সুতরাং প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। আর তিনিই সর্বাপেক্ষা ভাল জ্ঞান রাখেন।
আয-যুখরুফ 43:85
৮১-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- যদি এটা মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে তবে আমার মাথা নোয়াতে চিন্তা কি? না আমি তার কোন আদেশ অমান্য করি এবং না তার হুকুম হতে বিমুখ হই। যদি এরূপই হতো তবে আমি তো সর্বপ্রথম এটা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু মহান আল্লাহর সত্তা এরূপ নয় যে, কেউ তার সমান ও সমকক্ষ হতে পারে। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, শর্তরূপে যে বাক্য আনয়ন করা হয় তা পূর্ণ হয়ে যাওয়া জরুরী নয়। এমন কি ওর সম্ভাবনাও জরুরী নয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করতে পারতেন। পবিত্র ও মহান তিনি। তিনি আল্লাহ, এক, প্রবল পরাক্রমশালী।”(৩৯:৪)।কোন কোন তাফসীরকার (আরবী)-এর অর্থ ‘অস্বীকারকারী’ও করেছেন। যেমন হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) তাঁদের মধ্যে একজন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, এখানে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ অস্বীকারকারীদের অগ্রণী। আর এটা (আরবী) হবে, এবং যেটা ইবাদতের অর্থে হবে সেটা (আরবী) হবে। এর প্রমাণ হিসেবে এই ঘটনাটি রয়েছে যে, একটি মহিলা বিবাহের ছয় মাস পরেই সন্তান প্রসব করে। তখন হযরত উসমান (রাঃ) মহিলাটিকে রজম করার বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) প্রতিবাদ করে বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার কিতাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সন্তানের গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর সময়কাল হচ্ছে ত্রিশ মাস।”(৪৬:১৫) আর অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার (সন্তানের) দুই বছরে দুধ ছাড়ানো হয়। বর্ণনাকারী বলেন যে, হযরত আলী (রাঃ) যখন এই দলীল পেশ করলেন, (আরবী) অর্থাৎ “তখন হযরত উসমান (রাঃ) এটা অস্বীকার করতে পারলেন না। সুতরাং তিনি মহিলাটিকে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন। এখানেও (আরবী) শব্দ রয়েছে। কিন্তু এই উক্তির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, শর্তের জবাবে এ অর্থ ঠিকভাবে বসে না। এটা মেনে নিলে অর্থ দাঁড়াবে ? যদি রহমানের (আল্লাহর) সন্তান থাকে তবে আমিই হলাম প্রথম অস্বীকারকারী। কিন্তু এই কালামে কোন সৌন্দর্য থাকছে না। হ্যা, তবে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, এখানে (আরবী) শব্দটি শর্তের জন্যে নয়, বরং নাফী বা নেতিবাচক হিসেবে এসেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। তখন বাক্যটির অর্থ হবেঃ রহমান বা দয়াময় আল্লাহর কোন সন্তান নেই এবং আমিই তার প্রথম সাক্ষী।' হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা হলো এমন কালাম যা আরবদের পরিভাষায় রয়েছে। অর্থাৎ না আল্লাহর সন্তান আছে এবং না আমি তার উক্তিকারী। আবু সাখর (রঃ) বলেন যে, উক্তিটির ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘আমি তো প্রথম হতেই তাঁর ইবাদতকারী এবং এটা ঘোষণাকারী যে, তাঁর কোন সন্তান নেই এবং আমি তার তাওহীদকে স্বীকার করে নেয়ার ব্যাপারেও অগ্রণী। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘আমিই তাঁর প্রথম ইবাদতকারী এবং একত্ববাদী, আর তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন, এর অর্থ হলোঃ ‘আমিই প্রথম অস্বীকারকারী। অভিধানে এ দুটিই রয়েছে, অর্থাৎ (আরবী), তবে প্রথমটিই নিকটতর। কেননা, এটা শর্ত ও জাযা হয়েছে। কিন্তু এটা অসম্ভব। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ যদি তাঁর সন্তান হতো তবে আমিই সর্বপ্রথম তা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু তা হতে তিনি পবিত্র ও মুক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটিই পছন্দ করেছেন এবং যারা (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) বা নেতিবাচক বলেছেন তিনি তাঁদের এ উক্তি খণ্ডন করেছেন। আর এজন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা যা আরোপ করে তা হতে পবিত্র ও মহান, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অধিপতি এবং আরশের অধিকারী। তিনি তো এক, অভাবমুক্ত। তাঁর কোন নীর, সমকক্ষ ও সন্তান নেই।মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তাদেরকে যে দিবসের কথা বলা হয়েছে তার সম্মুখীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদেরকে তুমি বাক-বিতণ্ডা ও ক্রীড়া-কৌতুক করতে দাও। তারা এসব খেল-তামাশা ও ক্রীড়া-কৌতুকে লিপ্ত থাকবে এমতাবস্থায়ই তাদের উপর কিয়ামত এসে পড়বে। ঐ সময় তারা তাদের পরিণাম জানতে পারবে। এরপর মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গীর আরো বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যমীন ও আসমানের সমস্ত মাখলুক তার ইবাদতে লিপ্ত রয়েছে এবং সবাই তাঁর সামনে অপারগ ও শক্তিহীন। তিনিই প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে, তিনি তোমাদের গোপনীয় ও প্রকাশ্য বিষয় জানেন এবং তোমরা যা উপার্জন কর সেটাও তিনি জানেন।”(৬:৩) কত মহান তিনি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সবকিছুর সার্বভৌম অধিপতি! তিনি সর্বপ্রকারের দোষ হতে পবিত্র ও মুক্ত। তিনি সবারই অধিকর্তা। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এমন কেউ নেই যে তার কোন হুকুম টলাতে পারে। কেউ এমন নেই যে তাঁর মজীর পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সবকিছুই তার অধিকারভুক্ত। সবকিছুই তার ক্ষমতাধীন। কিয়ামতের জ্ঞান শুধু তারই আছে। তিনি ছাড়া কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময়ের জ্ঞান কারো নেই। তাঁর নিকট সবাই প্রত্যাবর্তিত হবে। প্রত্যেককেই তিনি তার কৃতকর্মের প্রতিফল প্রদান করবেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, সুপারিশের ক্ষমতা তাদের নেই। অর্থাৎ কাফিররা তাদের যেসব বাতিল মাবুদকে তাদের সুপারিশকারী মনে করে রেখেছে, তাদের কেউই সুপারিশের জন্যে সামনে এগিয়ে যেতে পারে না। কারো সুপারিশে তাদের কোন উপকার হবে না। এরপরে ইসতিসনা মুনকাতা রয়েছে অর্থাৎ তবে তারা ব্যতীত যারা সত্য উপলব্ধি করে ওর সাক্ষ্য দেয়। আর তারা নিজেরাও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন। আল্লাহ তা'আলা সৎ লোকদেরকে তাদের জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন এবং সেই সুপারিশ তিনি কবুল করবেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি যদি এই কাফিরদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তবে তারা জবাবে অবশ্যই বলবেঃ আল্লাহ। তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?' অর্থাৎ এটা বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, তারা আল্লাহ তা'আলাকে এককভাবে সৃষ্টিকর্তা মেনে নেয়ার পরেও অন্যদেরও তারা উপাসনা করছে যারা সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন! তারা একটুও চিন্তা করে দেখে না যে, সৃষ্টি যখন একজনই করেছেন তখন অন্যদের ইবাদত করা যায় কি করে? তাদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতা এতো বেশী বেড়ে গেছে যে, এই সহজ সরল কথাটি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্তও তারা বুঝতে পারে না। আর বুঝালেও তারা বুঝে না। তাই তো মহান আল্লাহ বিস্ময় প্রকাশ পূর্বক বলেনঃ ‘তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে! ইরশাদ হচ্ছেঃ মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের এ বক্তব্য বললেন অর্থাৎ স্বীয় প্রতিপালকের নিকট স্বীয় কওমের অবিশ্বাসকরণের অভিযোগ করলেন এবং বললেন যে, তারা ঈমান আনবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাসূল বললো- হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে।”(২৫:৩০) ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এই তাফসীরই করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, ইবনে মাসউদ (রঃ)-এর কিরআত (আরবী) (৪৩:৮৮) এই রূপ রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ “এটা তোমাদের নবী (সঃ)-এর উক্তি, তিনি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে স্বীয় কওমের অভিযোগ করেন।” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী)-এর দ্বিতীয় কিরআত (আরবী)-এর উপর যবর দিয়েও বর্ণনা করেছেন। আর তিনি এর দু'টি তালিকা বর্ণনা করেছেন। একটি এই যে, এটা (আরবী)-এর উপর হয়েছে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে। ক্রিয়া পদটি উহ্য মেনে নেয়া হবে। আর যখন (আরবী)-এর নীচে (আরবী) দিয়ে পড়া হবে তখন এটা (আরবী)-এর উপর (আরবী) হবে। তখন অর্থ হবেঃ কিয়ামতের জ্ঞান এবং এই উক্তির জ্ঞান তাঁরই রয়েছে। সূরার শেষে ইরশাদ হচ্ছেঃ “(হে নবী সঃ)! সুতরাং তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর এবং বলঃ সালাম; শীঘ্রই তারা জানতে পারবে।' অর্থাৎ নবী (সঃ) যেন এ কাফিরদের মন্দ কথার জবাব মন্দ কথা দ্বারা না দেন, বরং তাদের মন জয়ের জন্যে কথায় ও কাজে উভয় ক্ষেত্রেই যেন নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করেন এবং 'সালাম' (শান্তি) একথা বলেন। সত্বরই তারা প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে। এর দ্বারা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে মুশরিকদেরকে কঠিনভাবে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। আর এটা হয়েও গেল যে, তাদের উপর এমন শাস্তি আপতিত হলো যা টলবার নয়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বীনকে সমুন্নত করলেন এবং স্বীয় কালেমাকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিলেন। তিনি তার মুমিন ও মুসলিম বান্দাদেরকে শক্তিশালী করলেন। অতঃপর তাদেরকে জিহাদ ও নির্বাসনের হুকুম দিয়ে দুনিয়ায় এমনভাবে জয়যুক্ত করলেন যে, আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য লোক প্রবেশ করলো এবং প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়লো। সুতরাং প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। আর তিনিই সর্বাপেক্ষা ভাল জ্ঞান রাখেন।
আয-যুখরুফ 43:86
৮১-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- যদি এটা মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে তবে আমার মাথা নোয়াতে চিন্তা কি? না আমি তার কোন আদেশ অমান্য করি এবং না তার হুকুম হতে বিমুখ হই। যদি এরূপই হতো তবে আমি তো সর্বপ্রথম এটা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু মহান আল্লাহর সত্তা এরূপ নয় যে, কেউ তার সমান ও সমকক্ষ হতে পারে। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, শর্তরূপে যে বাক্য আনয়ন করা হয় তা পূর্ণ হয়ে যাওয়া জরুরী নয়। এমন কি ওর সম্ভাবনাও জরুরী নয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করতে পারতেন। পবিত্র ও মহান তিনি। তিনি আল্লাহ, এক, প্রবল পরাক্রমশালী।”(৩৯:৪)।কোন কোন তাফসীরকার (আরবী)-এর অর্থ ‘অস্বীকারকারী’ও করেছেন। যেমন হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) তাঁদের মধ্যে একজন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, এখানে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ অস্বীকারকারীদের অগ্রণী। আর এটা (আরবী) হবে, এবং যেটা ইবাদতের অর্থে হবে সেটা (আরবী) হবে। এর প্রমাণ হিসেবে এই ঘটনাটি রয়েছে যে, একটি মহিলা বিবাহের ছয় মাস পরেই সন্তান প্রসব করে। তখন হযরত উসমান (রাঃ) মহিলাটিকে রজম করার বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) প্রতিবাদ করে বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার কিতাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সন্তানের গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর সময়কাল হচ্ছে ত্রিশ মাস।”(৪৬:১৫) আর অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার (সন্তানের) দুই বছরে দুধ ছাড়ানো হয়। বর্ণনাকারী বলেন যে, হযরত আলী (রাঃ) যখন এই দলীল পেশ করলেন, (আরবী) অর্থাৎ “তখন হযরত উসমান (রাঃ) এটা অস্বীকার করতে পারলেন না। সুতরাং তিনি মহিলাটিকে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন। এখানেও (আরবী) শব্দ রয়েছে। কিন্তু এই উক্তির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, শর্তের জবাবে এ অর্থ ঠিকভাবে বসে না। এটা মেনে নিলে অর্থ দাঁড়াবে ? যদি রহমানের (আল্লাহর) সন্তান থাকে তবে আমিই হলাম প্রথম অস্বীকারকারী। কিন্তু এই কালামে কোন সৌন্দর্য থাকছে না। হ্যা, তবে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, এখানে (আরবী) শব্দটি শর্তের জন্যে নয়, বরং নাফী বা নেতিবাচক হিসেবে এসেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। তখন বাক্যটির অর্থ হবেঃ রহমান বা দয়াময় আল্লাহর কোন সন্তান নেই এবং আমিই তার প্রথম সাক্ষী।' হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা হলো এমন কালাম যা আরবদের পরিভাষায় রয়েছে। অর্থাৎ না আল্লাহর সন্তান আছে এবং না আমি তার উক্তিকারী। আবু সাখর (রঃ) বলেন যে, উক্তিটির ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘আমি তো প্রথম হতেই তাঁর ইবাদতকারী এবং এটা ঘোষণাকারী যে, তাঁর কোন সন্তান নেই এবং আমি তার তাওহীদকে স্বীকার করে নেয়ার ব্যাপারেও অগ্রণী। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘আমিই তাঁর প্রথম ইবাদতকারী এবং একত্ববাদী, আর তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন, এর অর্থ হলোঃ ‘আমিই প্রথম অস্বীকারকারী। অভিধানে এ দুটিই রয়েছে, অর্থাৎ (আরবী), তবে প্রথমটিই নিকটতর। কেননা, এটা শর্ত ও জাযা হয়েছে। কিন্তু এটা অসম্ভব। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ যদি তাঁর সন্তান হতো তবে আমিই সর্বপ্রথম তা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু তা হতে তিনি পবিত্র ও মুক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটিই পছন্দ করেছেন এবং যারা (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) বা নেতিবাচক বলেছেন তিনি তাঁদের এ উক্তি খণ্ডন করেছেন। আর এজন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা যা আরোপ করে তা হতে পবিত্র ও মহান, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অধিপতি এবং আরশের অধিকারী। তিনি তো এক, অভাবমুক্ত। তাঁর কোন নীর, সমকক্ষ ও সন্তান নেই।মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তাদেরকে যে দিবসের কথা বলা হয়েছে তার সম্মুখীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদেরকে তুমি বাক-বিতণ্ডা ও ক্রীড়া-কৌতুক করতে দাও। তারা এসব খেল-তামাশা ও ক্রীড়া-কৌতুকে লিপ্ত থাকবে এমতাবস্থায়ই তাদের উপর কিয়ামত এসে পড়বে। ঐ সময় তারা তাদের পরিণাম জানতে পারবে। এরপর মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গীর আরো বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যমীন ও আসমানের সমস্ত মাখলুক তার ইবাদতে লিপ্ত রয়েছে এবং সবাই তাঁর সামনে অপারগ ও শক্তিহীন। তিনিই প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে, তিনি তোমাদের গোপনীয় ও প্রকাশ্য বিষয় জানেন এবং তোমরা যা উপার্জন কর সেটাও তিনি জানেন।”(৬:৩) কত মহান তিনি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সবকিছুর সার্বভৌম অধিপতি! তিনি সর্বপ্রকারের দোষ হতে পবিত্র ও মুক্ত। তিনি সবারই অধিকর্তা। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এমন কেউ নেই যে তার কোন হুকুম টলাতে পারে। কেউ এমন নেই যে তাঁর মজীর পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সবকিছুই তার অধিকারভুক্ত। সবকিছুই তার ক্ষমতাধীন। কিয়ামতের জ্ঞান শুধু তারই আছে। তিনি ছাড়া কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময়ের জ্ঞান কারো নেই। তাঁর নিকট সবাই প্রত্যাবর্তিত হবে। প্রত্যেককেই তিনি তার কৃতকর্মের প্রতিফল প্রদান করবেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, সুপারিশের ক্ষমতা তাদের নেই। অর্থাৎ কাফিররা তাদের যেসব বাতিল মাবুদকে তাদের সুপারিশকারী মনে করে রেখেছে, তাদের কেউই সুপারিশের জন্যে সামনে এগিয়ে যেতে পারে না। কারো সুপারিশে তাদের কোন উপকার হবে না। এরপরে ইসতিসনা মুনকাতা রয়েছে অর্থাৎ তবে তারা ব্যতীত যারা সত্য উপলব্ধি করে ওর সাক্ষ্য দেয়। আর তারা নিজেরাও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন। আল্লাহ তা'আলা সৎ লোকদেরকে তাদের জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন এবং সেই সুপারিশ তিনি কবুল করবেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি যদি এই কাফিরদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তবে তারা জবাবে অবশ্যই বলবেঃ আল্লাহ। তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?' অর্থাৎ এটা বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, তারা আল্লাহ তা'আলাকে এককভাবে সৃষ্টিকর্তা মেনে নেয়ার পরেও অন্যদেরও তারা উপাসনা করছে যারা সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন! তারা একটুও চিন্তা করে দেখে না যে, সৃষ্টি যখন একজনই করেছেন তখন অন্যদের ইবাদত করা যায় কি করে? তাদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতা এতো বেশী বেড়ে গেছে যে, এই সহজ সরল কথাটি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্তও তারা বুঝতে পারে না। আর বুঝালেও তারা বুঝে না। তাই তো মহান আল্লাহ বিস্ময় প্রকাশ পূর্বক বলেনঃ ‘তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে! ইরশাদ হচ্ছেঃ মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের এ বক্তব্য বললেন অর্থাৎ স্বীয় প্রতিপালকের নিকট স্বীয় কওমের অবিশ্বাসকরণের অভিযোগ করলেন এবং বললেন যে, তারা ঈমান আনবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাসূল বললো- হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে।”(২৫:৩০) ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এই তাফসীরই করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, ইবনে মাসউদ (রঃ)-এর কিরআত (আরবী) (৪৩:৮৮) এই রূপ রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ “এটা তোমাদের নবী (সঃ)-এর উক্তি, তিনি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে স্বীয় কওমের অভিযোগ করেন।” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী)-এর দ্বিতীয় কিরআত (আরবী)-এর উপর যবর দিয়েও বর্ণনা করেছেন। আর তিনি এর দু'টি তালিকা বর্ণনা করেছেন। একটি এই যে, এটা (আরবী)-এর উপর হয়েছে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে। ক্রিয়া পদটি উহ্য মেনে নেয়া হবে। আর যখন (আরবী)-এর নীচে (আরবী) দিয়ে পড়া হবে তখন এটা (আরবী)-এর উপর (আরবী) হবে। তখন অর্থ হবেঃ কিয়ামতের জ্ঞান এবং এই উক্তির জ্ঞান তাঁরই রয়েছে। সূরার শেষে ইরশাদ হচ্ছেঃ “(হে নবী সঃ)! সুতরাং তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর এবং বলঃ সালাম; শীঘ্রই তারা জানতে পারবে।' অর্থাৎ নবী (সঃ) যেন এ কাফিরদের মন্দ কথার জবাব মন্দ কথা দ্বারা না দেন, বরং তাদের মন জয়ের জন্যে কথায় ও কাজে উভয় ক্ষেত্রেই যেন নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করেন এবং 'সালাম' (শান্তি) একথা বলেন। সত্বরই তারা প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে। এর দ্বারা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে মুশরিকদেরকে কঠিনভাবে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। আর এটা হয়েও গেল যে, তাদের উপর এমন শাস্তি আপতিত হলো যা টলবার নয়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বীনকে সমুন্নত করলেন এবং স্বীয় কালেমাকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিলেন। তিনি তার মুমিন ও মুসলিম বান্দাদেরকে শক্তিশালী করলেন। অতঃপর তাদেরকে জিহাদ ও নির্বাসনের হুকুম দিয়ে দুনিয়ায় এমনভাবে জয়যুক্ত করলেন যে, আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য লোক প্রবেশ করলো এবং প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়লো। সুতরাং প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। আর তিনিই সর্বাপেক্ষা ভাল জ্ঞান রাখেন।
আয-যুখরুফ 43:87
৮১-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- যদি এটা মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে তবে আমার মাথা নোয়াতে চিন্তা কি? না আমি তার কোন আদেশ অমান্য করি এবং না তার হুকুম হতে বিমুখ হই। যদি এরূপই হতো তবে আমি তো সর্বপ্রথম এটা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু মহান আল্লাহর সত্তা এরূপ নয় যে, কেউ তার সমান ও সমকক্ষ হতে পারে। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, শর্তরূপে যে বাক্য আনয়ন করা হয় তা পূর্ণ হয়ে যাওয়া জরুরী নয়। এমন কি ওর সম্ভাবনাও জরুরী নয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করতে পারতেন। পবিত্র ও মহান তিনি। তিনি আল্লাহ, এক, প্রবল পরাক্রমশালী।”(৩৯:৪)।কোন কোন তাফসীরকার (আরবী)-এর অর্থ ‘অস্বীকারকারী’ও করেছেন। যেমন হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) তাঁদের মধ্যে একজন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, এখানে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ অস্বীকারকারীদের অগ্রণী। আর এটা (আরবী) হবে, এবং যেটা ইবাদতের অর্থে হবে সেটা (আরবী) হবে। এর প্রমাণ হিসেবে এই ঘটনাটি রয়েছে যে, একটি মহিলা বিবাহের ছয় মাস পরেই সন্তান প্রসব করে। তখন হযরত উসমান (রাঃ) মহিলাটিকে রজম করার বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) প্রতিবাদ করে বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার কিতাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সন্তানের গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর সময়কাল হচ্ছে ত্রিশ মাস।”(৪৬:১৫) আর অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার (সন্তানের) দুই বছরে দুধ ছাড়ানো হয়। বর্ণনাকারী বলেন যে, হযরত আলী (রাঃ) যখন এই দলীল পেশ করলেন, (আরবী) অর্থাৎ “তখন হযরত উসমান (রাঃ) এটা অস্বীকার করতে পারলেন না। সুতরাং তিনি মহিলাটিকে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন। এখানেও (আরবী) শব্দ রয়েছে। কিন্তু এই উক্তির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, শর্তের জবাবে এ অর্থ ঠিকভাবে বসে না। এটা মেনে নিলে অর্থ দাঁড়াবে ? যদি রহমানের (আল্লাহর) সন্তান থাকে তবে আমিই হলাম প্রথম অস্বীকারকারী। কিন্তু এই কালামে কোন সৌন্দর্য থাকছে না। হ্যা, তবে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, এখানে (আরবী) শব্দটি শর্তের জন্যে নয়, বরং নাফী বা নেতিবাচক হিসেবে এসেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। তখন বাক্যটির অর্থ হবেঃ রহমান বা দয়াময় আল্লাহর কোন সন্তান নেই এবং আমিই তার প্রথম সাক্ষী।' হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা হলো এমন কালাম যা আরবদের পরিভাষায় রয়েছে। অর্থাৎ না আল্লাহর সন্তান আছে এবং না আমি তার উক্তিকারী। আবু সাখর (রঃ) বলেন যে, উক্তিটির ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘আমি তো প্রথম হতেই তাঁর ইবাদতকারী এবং এটা ঘোষণাকারী যে, তাঁর কোন সন্তান নেই এবং আমি তার তাওহীদকে স্বীকার করে নেয়ার ব্যাপারেও অগ্রণী। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘আমিই তাঁর প্রথম ইবাদতকারী এবং একত্ববাদী, আর তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন, এর অর্থ হলোঃ ‘আমিই প্রথম অস্বীকারকারী। অভিধানে এ দুটিই রয়েছে, অর্থাৎ (আরবী), তবে প্রথমটিই নিকটতর। কেননা, এটা শর্ত ও জাযা হয়েছে। কিন্তু এটা অসম্ভব। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ যদি তাঁর সন্তান হতো তবে আমিই সর্বপ্রথম তা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু তা হতে তিনি পবিত্র ও মুক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটিই পছন্দ করেছেন এবং যারা (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) বা নেতিবাচক বলেছেন তিনি তাঁদের এ উক্তি খণ্ডন করেছেন। আর এজন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা যা আরোপ করে তা হতে পবিত্র ও মহান, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অধিপতি এবং আরশের অধিকারী। তিনি তো এক, অভাবমুক্ত। তাঁর কোন নীর, সমকক্ষ ও সন্তান নেই।মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তাদেরকে যে দিবসের কথা বলা হয়েছে তার সম্মুখীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদেরকে তুমি বাক-বিতণ্ডা ও ক্রীড়া-কৌতুক করতে দাও। তারা এসব খেল-তামাশা ও ক্রীড়া-কৌতুকে লিপ্ত থাকবে এমতাবস্থায়ই তাদের উপর কিয়ামত এসে পড়বে। ঐ সময় তারা তাদের পরিণাম জানতে পারবে। এরপর মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গীর আরো বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যমীন ও আসমানের সমস্ত মাখলুক তার ইবাদতে লিপ্ত রয়েছে এবং সবাই তাঁর সামনে অপারগ ও শক্তিহীন। তিনিই প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে, তিনি তোমাদের গোপনীয় ও প্রকাশ্য বিষয় জানেন এবং তোমরা যা উপার্জন কর সেটাও তিনি জানেন।”(৬:৩) কত মহান তিনি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সবকিছুর সার্বভৌম অধিপতি! তিনি সর্বপ্রকারের দোষ হতে পবিত্র ও মুক্ত। তিনি সবারই অধিকর্তা। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এমন কেউ নেই যে তার কোন হুকুম টলাতে পারে। কেউ এমন নেই যে তাঁর মজীর পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সবকিছুই তার অধিকারভুক্ত। সবকিছুই তার ক্ষমতাধীন। কিয়ামতের জ্ঞান শুধু তারই আছে। তিনি ছাড়া কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময়ের জ্ঞান কারো নেই। তাঁর নিকট সবাই প্রত্যাবর্তিত হবে। প্রত্যেককেই তিনি তার কৃতকর্মের প্রতিফল প্রদান করবেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, সুপারিশের ক্ষমতা তাদের নেই। অর্থাৎ কাফিররা তাদের যেসব বাতিল মাবুদকে তাদের সুপারিশকারী মনে করে রেখেছে, তাদের কেউই সুপারিশের জন্যে সামনে এগিয়ে যেতে পারে না। কারো সুপারিশে তাদের কোন উপকার হবে না। এরপরে ইসতিসনা মুনকাতা রয়েছে অর্থাৎ তবে তারা ব্যতীত যারা সত্য উপলব্ধি করে ওর সাক্ষ্য দেয়। আর তারা নিজেরাও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন। আল্লাহ তা'আলা সৎ লোকদেরকে তাদের জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন এবং সেই সুপারিশ তিনি কবুল করবেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি যদি এই কাফিরদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তবে তারা জবাবে অবশ্যই বলবেঃ আল্লাহ। তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?' অর্থাৎ এটা বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, তারা আল্লাহ তা'আলাকে এককভাবে সৃষ্টিকর্তা মেনে নেয়ার পরেও অন্যদেরও তারা উপাসনা করছে যারা সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন! তারা একটুও চিন্তা করে দেখে না যে, সৃষ্টি যখন একজনই করেছেন তখন অন্যদের ইবাদত করা যায় কি করে? তাদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতা এতো বেশী বেড়ে গেছে যে, এই সহজ সরল কথাটি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্তও তারা বুঝতে পারে না। আর বুঝালেও তারা বুঝে না। তাই তো মহান আল্লাহ বিস্ময় প্রকাশ পূর্বক বলেনঃ ‘তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে! ইরশাদ হচ্ছেঃ মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের এ বক্তব্য বললেন অর্থাৎ স্বীয় প্রতিপালকের নিকট স্বীয় কওমের অবিশ্বাসকরণের অভিযোগ করলেন এবং বললেন যে, তারা ঈমান আনবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাসূল বললো- হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে।”(২৫:৩০) ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এই তাফসীরই করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, ইবনে মাসউদ (রঃ)-এর কিরআত (আরবী) (৪৩:৮৮) এই রূপ রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ “এটা তোমাদের নবী (সঃ)-এর উক্তি, তিনি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে স্বীয় কওমের অভিযোগ করেন।” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী)-এর দ্বিতীয় কিরআত (আরবী)-এর উপর যবর দিয়েও বর্ণনা করেছেন। আর তিনি এর দু'টি তালিকা বর্ণনা করেছেন। একটি এই যে, এটা (আরবী)-এর উপর হয়েছে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে। ক্রিয়া পদটি উহ্য মেনে নেয়া হবে। আর যখন (আরবী)-এর নীচে (আরবী) দিয়ে পড়া হবে তখন এটা (আরবী)-এর উপর (আরবী) হবে। তখন অর্থ হবেঃ কিয়ামতের জ্ঞান এবং এই উক্তির জ্ঞান তাঁরই রয়েছে। সূরার শেষে ইরশাদ হচ্ছেঃ “(হে নবী সঃ)! সুতরাং তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর এবং বলঃ সালাম; শীঘ্রই তারা জানতে পারবে।' অর্থাৎ নবী (সঃ) যেন এ কাফিরদের মন্দ কথার জবাব মন্দ কথা দ্বারা না দেন, বরং তাদের মন জয়ের জন্যে কথায় ও কাজে উভয় ক্ষেত্রেই যেন নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করেন এবং 'সালাম' (শান্তি) একথা বলেন। সত্বরই তারা প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে। এর দ্বারা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে মুশরিকদেরকে কঠিনভাবে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। আর এটা হয়েও গেল যে, তাদের উপর এমন শাস্তি আপতিত হলো যা টলবার নয়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বীনকে সমুন্নত করলেন এবং স্বীয় কালেমাকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিলেন। তিনি তার মুমিন ও মুসলিম বান্দাদেরকে শক্তিশালী করলেন। অতঃপর তাদেরকে জিহাদ ও নির্বাসনের হুকুম দিয়ে দুনিয়ায় এমনভাবে জয়যুক্ত করলেন যে, আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য লোক প্রবেশ করলো এবং প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়লো। সুতরাং প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। আর তিনিই সর্বাপেক্ষা ভাল জ্ঞান রাখেন।
আয-যুখরুফ 43:88
৮১-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- যদি এটা মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে তবে আমার মাথা নোয়াতে চিন্তা কি? না আমি তার কোন আদেশ অমান্য করি এবং না তার হুকুম হতে বিমুখ হই। যদি এরূপই হতো তবে আমি তো সর্বপ্রথম এটা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু মহান আল্লাহর সত্তা এরূপ নয় যে, কেউ তার সমান ও সমকক্ষ হতে পারে। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, শর্তরূপে যে বাক্য আনয়ন করা হয় তা পূর্ণ হয়ে যাওয়া জরুরী নয়। এমন কি ওর সম্ভাবনাও জরুরী নয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করতে পারতেন। পবিত্র ও মহান তিনি। তিনি আল্লাহ, এক, প্রবল পরাক্রমশালী।”(৩৯:৪)।কোন কোন তাফসীরকার (আরবী)-এর অর্থ ‘অস্বীকারকারী’ও করেছেন। যেমন হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) তাঁদের মধ্যে একজন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, এখানে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ অস্বীকারকারীদের অগ্রণী। আর এটা (আরবী) হবে, এবং যেটা ইবাদতের অর্থে হবে সেটা (আরবী) হবে। এর প্রমাণ হিসেবে এই ঘটনাটি রয়েছে যে, একটি মহিলা বিবাহের ছয় মাস পরেই সন্তান প্রসব করে। তখন হযরত উসমান (রাঃ) মহিলাটিকে রজম করার বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) প্রতিবাদ করে বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার কিতাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সন্তানের গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর সময়কাল হচ্ছে ত্রিশ মাস।”(৪৬:১৫) আর অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার (সন্তানের) দুই বছরে দুধ ছাড়ানো হয়। বর্ণনাকারী বলেন যে, হযরত আলী (রাঃ) যখন এই দলীল পেশ করলেন, (আরবী) অর্থাৎ “তখন হযরত উসমান (রাঃ) এটা অস্বীকার করতে পারলেন না। সুতরাং তিনি মহিলাটিকে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন। এখানেও (আরবী) শব্দ রয়েছে। কিন্তু এই উক্তির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, শর্তের জবাবে এ অর্থ ঠিকভাবে বসে না। এটা মেনে নিলে অর্থ দাঁড়াবে ? যদি রহমানের (আল্লাহর) সন্তান থাকে তবে আমিই হলাম প্রথম অস্বীকারকারী। কিন্তু এই কালামে কোন সৌন্দর্য থাকছে না। হ্যা, তবে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, এখানে (আরবী) শব্দটি শর্তের জন্যে নয়, বরং নাফী বা নেতিবাচক হিসেবে এসেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। তখন বাক্যটির অর্থ হবেঃ রহমান বা দয়াময় আল্লাহর কোন সন্তান নেই এবং আমিই তার প্রথম সাক্ষী।' হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা হলো এমন কালাম যা আরবদের পরিভাষায় রয়েছে। অর্থাৎ না আল্লাহর সন্তান আছে এবং না আমি তার উক্তিকারী। আবু সাখর (রঃ) বলেন যে, উক্তিটির ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘আমি তো প্রথম হতেই তাঁর ইবাদতকারী এবং এটা ঘোষণাকারী যে, তাঁর কোন সন্তান নেই এবং আমি তার তাওহীদকে স্বীকার করে নেয়ার ব্যাপারেও অগ্রণী। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘আমিই তাঁর প্রথম ইবাদতকারী এবং একত্ববাদী, আর তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন, এর অর্থ হলোঃ ‘আমিই প্রথম অস্বীকারকারী। অভিধানে এ দুটিই রয়েছে, অর্থাৎ (আরবী), তবে প্রথমটিই নিকটতর। কেননা, এটা শর্ত ও জাযা হয়েছে। কিন্তু এটা অসম্ভব। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ যদি তাঁর সন্তান হতো তবে আমিই সর্বপ্রথম তা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু তা হতে তিনি পবিত্র ও মুক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটিই পছন্দ করেছেন এবং যারা (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) বা নেতিবাচক বলেছেন তিনি তাঁদের এ উক্তি খণ্ডন করেছেন। আর এজন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা যা আরোপ করে তা হতে পবিত্র ও মহান, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অধিপতি এবং আরশের অধিকারী। তিনি তো এক, অভাবমুক্ত। তাঁর কোন নীর, সমকক্ষ ও সন্তান নেই।মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তাদেরকে যে দিবসের কথা বলা হয়েছে তার সম্মুখীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদেরকে তুমি বাক-বিতণ্ডা ও ক্রীড়া-কৌতুক করতে দাও। তারা এসব খেল-তামাশা ও ক্রীড়া-কৌতুকে লিপ্ত থাকবে এমতাবস্থায়ই তাদের উপর কিয়ামত এসে পড়বে। ঐ সময় তারা তাদের পরিণাম জানতে পারবে। এরপর মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গীর আরো বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যমীন ও আসমানের সমস্ত মাখলুক তার ইবাদতে লিপ্ত রয়েছে এবং সবাই তাঁর সামনে অপারগ ও শক্তিহীন। তিনিই প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে, তিনি তোমাদের গোপনীয় ও প্রকাশ্য বিষয় জানেন এবং তোমরা যা উপার্জন কর সেটাও তিনি জানেন।”(৬:৩) কত মহান তিনি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সবকিছুর সার্বভৌম অধিপতি! তিনি সর্বপ্রকারের দোষ হতে পবিত্র ও মুক্ত। তিনি সবারই অধিকর্তা। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এমন কেউ নেই যে তার কোন হুকুম টলাতে পারে। কেউ এমন নেই যে তাঁর মজীর পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সবকিছুই তার অধিকারভুক্ত। সবকিছুই তার ক্ষমতাধীন। কিয়ামতের জ্ঞান শুধু তারই আছে। তিনি ছাড়া কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময়ের জ্ঞান কারো নেই। তাঁর নিকট সবাই প্রত্যাবর্তিত হবে। প্রত্যেককেই তিনি তার কৃতকর্মের প্রতিফল প্রদান করবেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, সুপারিশের ক্ষমতা তাদের নেই। অর্থাৎ কাফিররা তাদের যেসব বাতিল মাবুদকে তাদের সুপারিশকারী মনে করে রেখেছে, তাদের কেউই সুপারিশের জন্যে সামনে এগিয়ে যেতে পারে না। কারো সুপারিশে তাদের কোন উপকার হবে না। এরপরে ইসতিসনা মুনকাতা রয়েছে অর্থাৎ তবে তারা ব্যতীত যারা সত্য উপলব্ধি করে ওর সাক্ষ্য দেয়। আর তারা নিজেরাও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন। আল্লাহ তা'আলা সৎ লোকদেরকে তাদের জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন এবং সেই সুপারিশ তিনি কবুল করবেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি যদি এই কাফিরদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তবে তারা জবাবে অবশ্যই বলবেঃ আল্লাহ। তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?' অর্থাৎ এটা বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, তারা আল্লাহ তা'আলাকে এককভাবে সৃষ্টিকর্তা মেনে নেয়ার পরেও অন্যদেরও তারা উপাসনা করছে যারা সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন! তারা একটুও চিন্তা করে দেখে না যে, সৃষ্টি যখন একজনই করেছেন তখন অন্যদের ইবাদত করা যায় কি করে? তাদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতা এতো বেশী বেড়ে গেছে যে, এই সহজ সরল কথাটি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্তও তারা বুঝতে পারে না। আর বুঝালেও তারা বুঝে না। তাই তো মহান আল্লাহ বিস্ময় প্রকাশ পূর্বক বলেনঃ ‘তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে! ইরশাদ হচ্ছেঃ মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের এ বক্তব্য বললেন অর্থাৎ স্বীয় প্রতিপালকের নিকট স্বীয় কওমের অবিশ্বাসকরণের অভিযোগ করলেন এবং বললেন যে, তারা ঈমান আনবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাসূল বললো- হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে।”(২৫:৩০) ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এই তাফসীরই করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, ইবনে মাসউদ (রঃ)-এর কিরআত (আরবী) (৪৩:৮৮) এই রূপ রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ “এটা তোমাদের নবী (সঃ)-এর উক্তি, তিনি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে স্বীয় কওমের অভিযোগ করেন।” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী)-এর দ্বিতীয় কিরআত (আরবী)-এর উপর যবর দিয়েও বর্ণনা করেছেন। আর তিনি এর দু'টি তালিকা বর্ণনা করেছেন। একটি এই যে, এটা (আরবী)-এর উপর হয়েছে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে। ক্রিয়া পদটি উহ্য মেনে নেয়া হবে। আর যখন (আরবী)-এর নীচে (আরবী) দিয়ে পড়া হবে তখন এটা (আরবী)-এর উপর (আরবী) হবে। তখন অর্থ হবেঃ কিয়ামতের জ্ঞান এবং এই উক্তির জ্ঞান তাঁরই রয়েছে। সূরার শেষে ইরশাদ হচ্ছেঃ “(হে নবী সঃ)! সুতরাং তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর এবং বলঃ সালাম; শীঘ্রই তারা জানতে পারবে।' অর্থাৎ নবী (সঃ) যেন এ কাফিরদের মন্দ কথার জবাব মন্দ কথা দ্বারা না দেন, বরং তাদের মন জয়ের জন্যে কথায় ও কাজে উভয় ক্ষেত্রেই যেন নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করেন এবং 'সালাম' (শান্তি) একথা বলেন। সত্বরই তারা প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে। এর দ্বারা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে মুশরিকদেরকে কঠিনভাবে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। আর এটা হয়েও গেল যে, তাদের উপর এমন শাস্তি আপতিত হলো যা টলবার নয়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বীনকে সমুন্নত করলেন এবং স্বীয় কালেমাকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিলেন। তিনি তার মুমিন ও মুসলিম বান্দাদেরকে শক্তিশালী করলেন। অতঃপর তাদেরকে জিহাদ ও নির্বাসনের হুকুম দিয়ে দুনিয়ায় এমনভাবে জয়যুক্ত করলেন যে, আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য লোক প্রবেশ করলো এবং প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়লো। সুতরাং প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। আর তিনিই সর্বাপেক্ষা ভাল জ্ঞান রাখেন।
আয-যুখরুফ 43:89
৮১-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও- যদি এটা মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে তবে আমার মাথা নোয়াতে চিন্তা কি? না আমি তার কোন আদেশ অমান্য করি এবং না তার হুকুম হতে বিমুখ হই। যদি এরূপই হতো তবে আমি তো সর্বপ্রথম এটা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু মহান আল্লাহর সত্তা এরূপ নয় যে, কেউ তার সমান ও সমকক্ষ হতে পারে। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, শর্তরূপে যে বাক্য আনয়ন করা হয় তা পূর্ণ হয়ে যাওয়া জরুরী নয়। এমন কি ওর সম্ভাবনাও জরুরী নয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করতে পারতেন। পবিত্র ও মহান তিনি। তিনি আল্লাহ, এক, প্রবল পরাক্রমশালী।”(৩৯:৪)।কোন কোন তাফসীরকার (আরবী)-এর অর্থ ‘অস্বীকারকারী’ও করেছেন। যেমন হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) তাঁদের মধ্যে একজন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, এখানে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ অস্বীকারকারীদের অগ্রণী। আর এটা (আরবী) হবে, এবং যেটা ইবাদতের অর্থে হবে সেটা (আরবী) হবে। এর প্রমাণ হিসেবে এই ঘটনাটি রয়েছে যে, একটি মহিলা বিবাহের ছয় মাস পরেই সন্তান প্রসব করে। তখন হযরত উসমান (রাঃ) মহিলাটিকে রজম করার বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) প্রতিবাদ করে বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার কিতাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সন্তানের গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর সময়কাল হচ্ছে ত্রিশ মাস।”(৪৬:১৫) আর অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তার (সন্তানের) দুই বছরে দুধ ছাড়ানো হয়। বর্ণনাকারী বলেন যে, হযরত আলী (রাঃ) যখন এই দলীল পেশ করলেন, (আরবী) অর্থাৎ “তখন হযরত উসমান (রাঃ) এটা অস্বীকার করতে পারলেন না। সুতরাং তিনি মহিলাটিকে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন। এখানেও (আরবী) শব্দ রয়েছে। কিন্তু এই উক্তির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, শর্তের জবাবে এ অর্থ ঠিকভাবে বসে না। এটা মেনে নিলে অর্থ দাঁড়াবে ? যদি রহমানের (আল্লাহর) সন্তান থাকে তবে আমিই হলাম প্রথম অস্বীকারকারী। কিন্তু এই কালামে কোন সৌন্দর্য থাকছে না। হ্যা, তবে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, এখানে (আরবী) শব্দটি শর্তের জন্যে নয়, বরং নাফী বা নেতিবাচক হিসেবে এসেছে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। তখন বাক্যটির অর্থ হবেঃ রহমান বা দয়াময় আল্লাহর কোন সন্তান নেই এবং আমিই তার প্রথম সাক্ষী।' হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা হলো এমন কালাম যা আরবদের পরিভাষায় রয়েছে। অর্থাৎ না আল্লাহর সন্তান আছে এবং না আমি তার উক্তিকারী। আবু সাখর (রঃ) বলেন যে, উক্তিটির ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘আমি তো প্রথম হতেই তাঁর ইবাদতকারী এবং এটা ঘোষণাকারী যে, তাঁর কোন সন্তান নেই এবং আমি তার তাওহীদকে স্বীকার করে নেয়ার ব্যাপারেও অগ্রণী। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘আমিই তাঁর প্রথম ইবাদতকারী এবং একত্ববাদী, আর তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন, এর অর্থ হলোঃ ‘আমিই প্রথম অস্বীকারকারী। অভিধানে এ দুটিই রয়েছে, অর্থাৎ (আরবী), তবে প্রথমটিই নিকটতর। কেননা, এটা শর্ত ও জাযা হয়েছে। কিন্তু এটা অসম্ভব। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ যদি তাঁর সন্তান হতো তবে আমিই সর্বপ্রথম তা স্বীকার করে নিতাম। কিন্তু তা হতে তিনি পবিত্র ও মুক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটিই পছন্দ করেছেন এবং যারা (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) বা নেতিবাচক বলেছেন তিনি তাঁদের এ উক্তি খণ্ডন করেছেন। আর এজন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা যা আরোপ করে তা হতে পবিত্র ও মহান, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অধিপতি এবং আরশের অধিকারী। তিনি তো এক, অভাবমুক্ত। তাঁর কোন নীর, সমকক্ষ ও সন্তান নেই।মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তাদেরকে যে দিবসের কথা বলা হয়েছে তার সম্মুখীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদেরকে তুমি বাক-বিতণ্ডা ও ক্রীড়া-কৌতুক করতে দাও। তারা এসব খেল-তামাশা ও ক্রীড়া-কৌতুকে লিপ্ত থাকবে এমতাবস্থায়ই তাদের উপর কিয়ামত এসে পড়বে। ঐ সময় তারা তাদের পরিণাম জানতে পারবে। এরপর মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গীর আরো বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যমীন ও আসমানের সমস্ত মাখলুক তার ইবাদতে লিপ্ত রয়েছে এবং সবাই তাঁর সামনে অপারগ ও শক্তিহীন। তিনিই প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে, তিনি তোমাদের গোপনীয় ও প্রকাশ্য বিষয় জানেন এবং তোমরা যা উপার্জন কর সেটাও তিনি জানেন।”(৬:৩) কত মহান তিনি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সবকিছুর সার্বভৌম অধিপতি! তিনি সর্বপ্রকারের দোষ হতে পবিত্র ও মুক্ত। তিনি সবারই অধিকর্তা। তিনি সর্বোচ্চ, সমুন্নত ও মহান। এমন কেউ নেই যে তার কোন হুকুম টলাতে পারে। কেউ এমন নেই যে তাঁর মজীর পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সবকিছুই তার অধিকারভুক্ত। সবকিছুই তার ক্ষমতাধীন। কিয়ামতের জ্ঞান শুধু তারই আছে। তিনি ছাড়া কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সঠিক সময়ের জ্ঞান কারো নেই। তাঁর নিকট সবাই প্রত্যাবর্তিত হবে। প্রত্যেককেই তিনি তার কৃতকর্মের প্রতিফল প্রদান করবেন।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, সুপারিশের ক্ষমতা তাদের নেই। অর্থাৎ কাফিররা তাদের যেসব বাতিল মাবুদকে তাদের সুপারিশকারী মনে করে রেখেছে, তাদের কেউই সুপারিশের জন্যে সামনে এগিয়ে যেতে পারে না। কারো সুপারিশে তাদের কোন উপকার হবে না। এরপরে ইসতিসনা মুনকাতা রয়েছে অর্থাৎ তবে তারা ব্যতীত যারা সত্য উপলব্ধি করে ওর সাক্ষ্য দেয়। আর তারা নিজেরাও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন। আল্লাহ তা'আলা সৎ লোকদেরকে তাদের জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন এবং সেই সুপারিশ তিনি কবুল করবেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি যদি এই কাফিরদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তবে তারা জবাবে অবশ্যই বলবেঃ আল্লাহ। তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?' অর্থাৎ এটা বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, তারা আল্লাহ তা'আলাকে এককভাবে সৃষ্টিকর্তা মেনে নেয়ার পরেও অন্যদেরও তারা উপাসনা করছে যারা সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন! তারা একটুও চিন্তা করে দেখে না যে, সৃষ্টি যখন একজনই করেছেন তখন অন্যদের ইবাদত করা যায় কি করে? তাদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতা এতো বেশী বেড়ে গেছে যে, এই সহজ সরল কথাটি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্তও তারা বুঝতে পারে না। আর বুঝালেও তারা বুঝে না। তাই তো মহান আল্লাহ বিস্ময় প্রকাশ পূর্বক বলেনঃ ‘তবুও তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে! ইরশাদ হচ্ছেঃ মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের এ বক্তব্য বললেন অর্থাৎ স্বীয় প্রতিপালকের নিকট স্বীয় কওমের অবিশ্বাসকরণের অভিযোগ করলেন এবং বললেন যে, তারা ঈমান আনবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাসূল বললো- হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে।”(২৫:৩০) ইমাম ইবনে জারীরও (রাঃ) এই তাফসীরই করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, ইবনে মাসউদ (রঃ)-এর কিরআত (আরবী) (৪৩:৮৮) এই রূপ রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ “এটা তোমাদের নবী (সঃ)-এর উক্তি, তিনি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে স্বীয় কওমের অভিযোগ করেন।” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী)-এর দ্বিতীয় কিরআত (আরবী)-এর উপর যবর দিয়েও বর্ণনা করেছেন। আর তিনি এর দু'টি তালিকা বর্ণনা করেছেন। একটি এই যে, এটা (আরবী)-এর উপর হয়েছে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে। ক্রিয়া পদটি উহ্য মেনে নেয়া হবে। আর যখন (আরবী)-এর নীচে (আরবী) দিয়ে পড়া হবে তখন এটা (আরবী)-এর উপর (আরবী) হবে। তখন অর্থ হবেঃ কিয়ামতের জ্ঞান এবং এই উক্তির জ্ঞান তাঁরই রয়েছে। সূরার শেষে ইরশাদ হচ্ছেঃ “(হে নবী সঃ)! সুতরাং তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর এবং বলঃ সালাম; শীঘ্রই তারা জানতে পারবে।' অর্থাৎ নবী (সঃ) যেন এ কাফিরদের মন্দ কথার জবাব মন্দ কথা দ্বারা না দেন, বরং তাদের মন জয়ের জন্যে কথায় ও কাজে উভয় ক্ষেত্রেই যেন নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করেন এবং 'সালাম' (শান্তি) একথা বলেন। সত্বরই তারা প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে। এর দ্বারা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে মুশরিকদেরকে কঠিনভাবে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। আর এটা হয়েও গেল যে, তাদের উপর এমন শাস্তি আপতিত হলো যা টলবার নয়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বীনকে সমুন্নত করলেন এবং স্বীয় কালেমাকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিলেন। তিনি তার মুমিন ও মুসলিম বান্দাদেরকে শক্তিশালী করলেন। অতঃপর তাদেরকে জিহাদ ও নির্বাসনের হুকুম দিয়ে দুনিয়ায় এমনভাবে জয়যুক্ত করলেন যে, আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য লোক প্রবেশ করলো এবং প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়লো। সুতরাং প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। আর তিনিই সর্বাপেক্ষা ভাল জ্ঞান রাখেন।