Tafseer ibn Kathir — আল-কামার 54:49 – আর-রাহমান 55:36
Contents
- আল-কামার 54:49
- আল-কামার 54:50
- আল-কামার 54:51
- আল-কামার 54:52
- আল-কামার 54:53
- আল-কামার 54:54
- আল-কামার 54:55
- আর-রাহমান 55:1
- আর-রাহমান 55:2
- আর-রাহমান 55:3
- আর-রাহমান 55:4
- আর-রাহমান 55:5
- আর-রাহমান 55:6
- আর-রাহমান 55:7
- আর-রাহমান 55:8
- আর-রাহমান 55:9
- আর-রাহমান 55:10
- আর-রাহমান 55:11
- আর-রাহমান 55:12
- আর-রাহমান 55:13
- আর-রাহমান 55:14
- আর-রাহমান 55:15
- আর-রাহমান 55:16
- আর-রাহমান 55:17
- আর-রাহমান 55:18
- আর-রাহমান 55:19
- আর-রাহমান 55:20
- আর-রাহমান 55:21
- আর-রাহমান 55:22
- আর-রাহমান 55:23
- আর-রাহমান 55:24
- আর-রাহমান 55:25
- আর-রাহমান 55:26
- আর-রাহমান 55:27
- আর-রাহমান 55:28
- আর-রাহমান 55:29
- আর-রাহমান 55:30
- আর-রাহমান 55:31
- আর-রাহমান 55:32
- আর-রাহমান 55:33
- আর-রাহমান 55:34
- আর-রাহমান 55:35
- আর-রাহমান 55:36
আল-কামার 54:49
৪৭-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: পাপী ও অপরাধী লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তারা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে এবং সত্য পথ হতে সরে গেছে। তারা সন্দেহ ও দুর্ভাবনার মধ্যে পতিত হয়েছে। এই দুষ্ট ও দুরাচার লোকগুলো কাফিরই হোক অথবা অন্য কোন দলের অপরাধী ও পাপী লোকই হোক, তাদের এই দুষ্কর্ম তাদেরকে উল্টোমুখে জাহান্নামের দিকে টানতে টানতে নিয়ে যাবে। এখানে যেমন তারা উদাসীন রয়েছে, তেমনই ওখানেও তারা বে-খবর থাকবে যে, না জানি তাদেরকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবেঃ তোমরা এখন জাহান্নামের অগ্নির স্বাদ গ্রহণ কর। মহান আল্লাহ বলেনঃ 'আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর ওর পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন।" (২৫:২) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার সুমহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর। যিনি সৃষ্টি করেন ও সুঠাম করেন। আর যিনি পরিমিত বিকাশ সাধন করেন ও পথ-নির্দেশ করেন।” (৮৭:১-৩)। আহলে সুন্নাতের ইমামগণ এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুককে সৃষ্টি করার পূর্বেই তার ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন এবং প্রত্যেক জিনিস প্রকাশিত হবার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলার কাছে লিখিত হয়ে গেছে। কাদরিয়া সম্প্রদায় এটা অস্বীকার করে। এ লোকগুলো সাহাবীদের (রাঃ) আখেরী যুগেই বেরিয়ে পড়েছিল। আহলে সুন্নাত ঐ লোকেদের মাযহাবের বিপক্ষে এই প্রকারের আয়াতগুলোকে পেশ করে থাকেন। আর এই বিষয়ের হাদীসগুলোকেও আমরা সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমানের ব্যাখ্যায় এই মাসআলার বিস্তারিত আলোচনায় লিপিবদ্ধ করেছি। এখানে শুধু ঐ হাদীসগুলো লিপিবদ্ধ করা হলো যেগুলো আয়াতের বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, মুশরিক কুরায়েশরা নবী (সঃ)-এর কাছে এসে তকদীর সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করে। তখন (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে আয়েব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, এ আয়াতগুলো তকদীর অস্বীকারকারীদের প্রতিবাদে অবতীর্ণ হয়।” (এটা বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যারারাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এ আয়াতগুলো পাঠ করে বলেনঃ “এই আয়াতগুলো আমার উম্মতের ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে যারা শেষ যামানায় জন্মলাভ করবে এবং তকদীরকে অবিশ্বাস করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আতা ইবনে আবি রিবাহ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি। ঐ সময় তিনি যমযম কূপ হতে পানি উঠাচ্ছিলেন। তাঁর কাপড়ের অঞ্চল ভিজা ছিল। আমি বললামঃ তকদীরের ব্যাপারে সমালোচনা করা হচ্ছে। কেউ এই মাসআলার পক্ষে রয়েছে এবং কেউ বিপক্ষে রয়েছে। তিনি তখন বললেনঃ “জনগণ এরূপ করছে।” আমি বললামঃ হ্যাঁ, এরূপই হচ্ছে। তখন তিনি বললেনঃ “আল্লাহর শপথ (আরবী)-এ আয়াতগুলো তাদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ। হয়েছে। জেনে রেখো যে, এ লোকগুলো হলো এই উম্মতের নিকৃষ্টতম লোক। তারা রোগাক্রান্ত হলে তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না। তাদের কাউকেও যদি আমি আমার সামনে দেখতে পাই তবে আমার অঙ্গুলি দ্বারা তার চক্ষু উঠিয়ে নিবো।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলা হলো, এমন একজন লোক এসেছে যে তকদীরকে বিশ্বাস করে না। তখন তিনি বললেন, আচ্ছা, তোমরা আমাকে তার। কাছে নিয়ে চল। জনগণ বললো, আপনি তো অন্ধ, সুতরাং আপনি তার কাছে গিয়ে কি করবেন? উত্তরে তিনি বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি আমি তাকে হাতে পাই তবে তার নাক কেটে নিবো এবং যদি তার গর্দান ধরতে পারি তবে তা উড়িয়ে দিবো। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে, বানু কাহরের নারীরা খাযরাজের চতুর্দিকে তাওয়াফ করতে আছে। তাদের দেহ নড়াচড়া করছে। তারা মুশরিকা নারী। এই উম্মতের প্রথম শিরক এটাই। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তাদের নির্বুদ্ধিতা এতো চরমে পৌঁছে যাবে যে, তারা আল্লাহ তাআলাকে কল্যাণ নির্ধারণকারী বলেও স্বীকার করবে না। যেমন তাকে অকল্যাণ নির্ধারণকারী বলে স্বীকার করেনি।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত নাফে' (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সিরিয়াবাসী একজন বন্ধু ছিল, যার সাথে তাঁর পত্র আদান প্রদান চলতো। তিনি শুনতে পেলেন যে, তাঁর ঐ বন্ধুটি তকদীর সম্পর্কে কিছু সমালোচনা করে থাকে। সুতরাং তৎক্ষণাৎ তিনি তাকে পত্র লিখেন- আমি শুনতে পেয়েছি যে, তুমি নাকি তকদীরের ব্যাপারে কিছু বিরূপ মন্তব্য করে থাকে। যদি একথা সত্য হয় তবে আজ হতে তুমি আমার নিকট থেকে কোন পত্র প্রাপ্তির আশা করো না। আজ হতে তোমার সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমার উম্মতের মধ্যে তকন্দীরকে অবিশ্বাসকারী লোকের আবির্ভাব ঘটবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে মাজুস (প্রাচীন পারসিক যাজক মণ্ডলী) থাকে। আমার উম্মতের মাজুসী হলো ঐ লোকগুলো যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না। তারা রোগাক্রান্ত হলে তোমরা তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তোমরা তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না।” (মুসনাদে আহমাদে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শীঘ্রই এই উম্মতের মধ্যে মাসখ’ হবে (অর্থাৎ লোকদের আকৃতি পরিবর্তিত হবে), জেনে রেখো যে, এ অবস্থা ঐ লোকদের হবে যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না এবং যারা যিনদীক (অর্থাৎ আল্লাহর একত্বে অবিশ্বাসী)।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামেউত তিরমিযীতেও এ হাদীসটি রয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জিনিসই আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাপে রয়েছে, এমনকি অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাও।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর এবং অপারগ ও নির্বোধ হয়ো না। অতঃপর যদি কোন ক্ষতি হয়ে যায় তবে বলো যে, এটা আল্লাহ কর্তৃকই নির্ধারিত ছিল এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। আর এরূপ কথা বলো নাঃ যদি এরূপ করতাম তবে এরূপ হতো। কেননা, এই ভাবে যদি বলাতে শয়তানী আমলের দরযা খুলে যায়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, যদি সমস্ত উম্মত একত্রিত হয়ে তোমার ঐ উপকার করার ইচ্ছা করে যা আল্লাহ তা'আলা তোমার ভাগ্যে লিখেননি তবে তারা তোমার ঐ উপকার কখনো করতে পারবে না। পক্ষান্তরে, যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তোমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা করে যা তোমার তকদীরে লিখা নেই তবে কখনো তারা তোমার ঐ ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। কলম শুকিয়ে গেছে এবং দফতর জড়িয়ে নিয়ে ভাঁজ করে দেয়া হয়েছে।হযরত ওয়ালীদ ইবনে উবাদাহ (রঃ)-এর পিতা হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ) যখন রোগ শয্যায় শায়িত হন এবং তাঁর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে যায় তখন হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তাঁর পিতাকে বলেনঃ “হে পিতঃ! আমাদেরকে কিছু অন্তিম উপদেশ দিন!” তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা, আমাকে বসিয়ে দাও।” তাকে বসিয়ে দেয়া হলে তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! ঈমানের স্বাদ তুমি গ্রহণ করতে পার না এবং আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে তোমার যে জ্ঞান রয়েছে তার শেষ সীমায় তুমি পৌঁছতে পার না যে পর্যন্ত না তকদীরের ভাল মন্দের উপর তোমার বিশ্বাস হয়।” হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তখন জিজ্ঞেস করলেনঃ “আব্বা! কি করে আমি জানতে পারবো যে, তকদীরের ভাল মন্দের উপর আমার ঈমান রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এই ভাবে তুমি জানতে পারবে যে, তুমি যা পেয়েছে তা পাওয়ারই ছিল এবং যা পাওনি তা পাওয়ারই ছিল না এই বিশ্বাস যখন তোমার থাকবে। হে আমার প্রিয় বৎস! জেনে রেখো যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে শুনেছিঃ “আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং ওকে বলেনঃ ‘লিখো।' তখনই কলম উঠে গেল এবং কিয়ামত পর্যন্ত যতো কিছু হবার আছে সবই লিখে ফেললো।” হে আমার প্রিয় ছেলে! যদি তুমি তোমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই বিশ্বাসের উপর না থাকো তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ ঈমানদার হতে পারে না যে পর্যন্ত না সে চারটির উপর ঈমান আনে। (এক) সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা’রূদ নেই, (দুই) আর সাক্ষ্য দেবে যে, আমি (মুহাম্মাদ সঃ) আল্লাহর রাসূল, তিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, (তিন) মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর বিশ্বাস রাখে এবং (চার) তকদীরের ভাল মন্দের উপর ঈমান আনে।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং দাউদ তায়ালেসী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ্তেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের তকদীর লিপিবদ্ধ করেছেন। ঐ সময় তাঁর আরশ পানির উপর ছিল।” (ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম।তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ গারীব বলেছেন)এরপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় ইচ্ছা ও আহকাম বিনা বাধায় জারী হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি নির্ধারণ করেছি তা যেমন হবেই, ঠিক তেমনি যে কাজের আমি ইচ্ছা করি তার জন্যে শুধু একবার ‘হও' বলাই যথেষ্ট হয়ে যায়, দ্বিতীয়বার গুরুত্বের জন্যে হুকুম দেয়ার কোনই প্রয়োজন হয় না। চোখের পলক ফেলা মাত্রই ঐ কাজ আমার চাহিদা অনুযায়ী হয়ে যায়। আরব কবি কি সুন্দরই না বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যখনই কোন কাজ করার ইচ্ছা করেন তখন শুধু বলেন হয়ে যাও’ আর তখনই তা হয়ে যায়।”আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমি ধ্বংস করেছি তোমাদের মত দলগুলোকে, অতএব ওটা হতে উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? আমার তাদেরকে শাস্তিদান ও লাঞ্ছিতকরণের মধ্যে তোমাদের জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ নেই কি? যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের এবং তাদের কামনা-বাসনার মধ্যে পর্দা ফেলে দেয়া হয়েছে, যেমন তাদের পূর্ববর্তী দলগুলোর সাথে করা হয়েছিল।” (৩৪:৫৪)তারা যা কিছু করেছে সবই তাদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলার বিশ্বস্ত ফেরেশতাগণের হাতে রক্ষিত আছে। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সবকিছুই আছে লিপিবদ্ধ। এমন কিছুই নেই লিখতে ছুটে গেছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! গুনাহকে তুচ্ছ মনে করো না, জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে এরও জবাবদিহি করতে হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত সুলাইমান ইবনে মুগীরা (রঃ) বলেনঃ “একদা আমি একটা গুনাহ করে ফেলি যেটাকে আমি অতি নগণ্য মনে করি। রাত্রে স্বপ্নে দেখি যে, একজন আগন্তুক এসে আমাকে বলছেনঃ হে সুলাইমান (রঃ)! (আরবী) অর্থাৎ “ছোট গুনাহগুলোকেও ছোট ও তুচ্ছ মনে করো না, এই ছোট গুনাহগুলোই বড় গুনাহ হয়ে যাবে। পাপ যদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রও হয় এবং ওগুলো করার পর বহু যুগ অতিবাহিত হয়েও যায় তথাপি ওগুলো আল্লাহ তাআলার কাছে স্পষ্টভাবে লিখিত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। পাপ হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো এবং এরূপ হয়ো না যে, অত্যন্ত ভারী হয়ে পুণ্যকার্যের দিকে এগিয়ে যাবে, বরং অঞ্চল উঁচু করে পুণ্য কাজের দিকে অগ্রসর হও। যখন কেউ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহকে মহব্বত করে তখন তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে চিন্তা-গবেষণার অভ্যাসের ইলহাম করা হয়। স্বীয় প্রতিপালকের নিকট হিদায়াত যাঞা কর এবং নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ কর। হিদায়াত ও সাহায্যকারী হিসেবে আল্লাহ তাআলাই তোমার জন্যে যথেষ্ট।” এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ সৎ এবং আল্লাহভীরু লোকেদের অবস্থা হবে। এই পাপী ও অপরাধী লোকেদের অবস্থার বিপরীত। এরা তো থাকবে বিপদ ও কষ্টের মধ্যে এবং অধঃমুখে তারা নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামে। আর এদের উপর হবে কঠিন ধমক ও শাসন গর্জন। পক্ষান্তরে ঐ সৎ ও আল্লাহভীরু থাকবে স্রোতস্বিনী বিধৌত জান্নাতে। তারা মর্যাদা ও সম্মান, সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ, দান ও ইহসান, সুখ ও শান্তি, নিয়ামত ও রহমত এবং সুন্দর ও মনোরম বাসভবনে অবস্থান করবে। অধিপতি ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে তারা গৌরবান্বিত হবে। যে আল্লাহ সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা এবং সবারই ভাগ্য নির্ধারণকারী। যিনি সবকিছুরই উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি ঐ আল্লাহভীরু লোকদের সব চাহিদাই পূর্ণ করবেন। তাদের মনোবাসনা মিটাতে মোটেই কার্পণ্য করবেন না তিনি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আদল ও ইনসাফকারী সৎলোকেরা আল্লাহ তা'আলার নিকট আলোর মিম্বরের উপর রহমানের (করুণাময় আল্লাহর) ডান দিকে থাকবে। আল্লাহ তাআলার দুই হাতই ডানই বটে। এই ন্যায় বিচারক ও ন্যায়পরায়ণ লোক ওরাই যারা তাদের আদেশসমূহে, নিজেদের পরিবার পরিজনের মধ্যে এবং যা কিছু তাদের অধিকারে রয়েছে সবগুলোর মধ্যেই আল্লাহর ফরমানের ব্যতিক্রম করে , বরং আদল ও ইনসাফের সাথেই কাজ করে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-কামার 54:50
৪৭-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: পাপী ও অপরাধী লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তারা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে এবং সত্য পথ হতে সরে গেছে। তারা সন্দেহ ও দুর্ভাবনার মধ্যে পতিত হয়েছে। এই দুষ্ট ও দুরাচার লোকগুলো কাফিরই হোক অথবা অন্য কোন দলের অপরাধী ও পাপী লোকই হোক, তাদের এই দুষ্কর্ম তাদেরকে উল্টোমুখে জাহান্নামের দিকে টানতে টানতে নিয়ে যাবে। এখানে যেমন তারা উদাসীন রয়েছে, তেমনই ওখানেও তারা বে-খবর থাকবে যে, না জানি তাদেরকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবেঃ তোমরা এখন জাহান্নামের অগ্নির স্বাদ গ্রহণ কর। মহান আল্লাহ বলেনঃ 'আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর ওর পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন।" (২৫:২) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার সুমহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর। যিনি সৃষ্টি করেন ও সুঠাম করেন। আর যিনি পরিমিত বিকাশ সাধন করেন ও পথ-নির্দেশ করেন।” (৮৭:১-৩)। আহলে সুন্নাতের ইমামগণ এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুককে সৃষ্টি করার পূর্বেই তার ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন এবং প্রত্যেক জিনিস প্রকাশিত হবার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলার কাছে লিখিত হয়ে গেছে। কাদরিয়া সম্প্রদায় এটা অস্বীকার করে। এ লোকগুলো সাহাবীদের (রাঃ) আখেরী যুগেই বেরিয়ে পড়েছিল। আহলে সুন্নাত ঐ লোকেদের মাযহাবের বিপক্ষে এই প্রকারের আয়াতগুলোকে পেশ করে থাকেন। আর এই বিষয়ের হাদীসগুলোকেও আমরা সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমানের ব্যাখ্যায় এই মাসআলার বিস্তারিত আলোচনায় লিপিবদ্ধ করেছি। এখানে শুধু ঐ হাদীসগুলো লিপিবদ্ধ করা হলো যেগুলো আয়াতের বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, মুশরিক কুরায়েশরা নবী (সঃ)-এর কাছে এসে তকদীর সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করে। তখন (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে আয়েব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, এ আয়াতগুলো তকদীর অস্বীকারকারীদের প্রতিবাদে অবতীর্ণ হয়।” (এটা বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যারারাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এ আয়াতগুলো পাঠ করে বলেনঃ “এই আয়াতগুলো আমার উম্মতের ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে যারা শেষ যামানায় জন্মলাভ করবে এবং তকদীরকে অবিশ্বাস করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আতা ইবনে আবি রিবাহ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি। ঐ সময় তিনি যমযম কূপ হতে পানি উঠাচ্ছিলেন। তাঁর কাপড়ের অঞ্চল ভিজা ছিল। আমি বললামঃ তকদীরের ব্যাপারে সমালোচনা করা হচ্ছে। কেউ এই মাসআলার পক্ষে রয়েছে এবং কেউ বিপক্ষে রয়েছে। তিনি তখন বললেনঃ “জনগণ এরূপ করছে।” আমি বললামঃ হ্যাঁ, এরূপই হচ্ছে। তখন তিনি বললেনঃ “আল্লাহর শপথ (আরবী)-এ আয়াতগুলো তাদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ। হয়েছে। জেনে রেখো যে, এ লোকগুলো হলো এই উম্মতের নিকৃষ্টতম লোক। তারা রোগাক্রান্ত হলে তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না। তাদের কাউকেও যদি আমি আমার সামনে দেখতে পাই তবে আমার অঙ্গুলি দ্বারা তার চক্ষু উঠিয়ে নিবো।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলা হলো, এমন একজন লোক এসেছে যে তকদীরকে বিশ্বাস করে না। তখন তিনি বললেন, আচ্ছা, তোমরা আমাকে তার। কাছে নিয়ে চল। জনগণ বললো, আপনি তো অন্ধ, সুতরাং আপনি তার কাছে গিয়ে কি করবেন? উত্তরে তিনি বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি আমি তাকে হাতে পাই তবে তার নাক কেটে নিবো এবং যদি তার গর্দান ধরতে পারি তবে তা উড়িয়ে দিবো। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে, বানু কাহরের নারীরা খাযরাজের চতুর্দিকে তাওয়াফ করতে আছে। তাদের দেহ নড়াচড়া করছে। তারা মুশরিকা নারী। এই উম্মতের প্রথম শিরক এটাই। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তাদের নির্বুদ্ধিতা এতো চরমে পৌঁছে যাবে যে, তারা আল্লাহ তাআলাকে কল্যাণ নির্ধারণকারী বলেও স্বীকার করবে না। যেমন তাকে অকল্যাণ নির্ধারণকারী বলে স্বীকার করেনি।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত নাফে' (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সিরিয়াবাসী একজন বন্ধু ছিল, যার সাথে তাঁর পত্র আদান প্রদান চলতো। তিনি শুনতে পেলেন যে, তাঁর ঐ বন্ধুটি তকদীর সম্পর্কে কিছু সমালোচনা করে থাকে। সুতরাং তৎক্ষণাৎ তিনি তাকে পত্র লিখেন- আমি শুনতে পেয়েছি যে, তুমি নাকি তকদীরের ব্যাপারে কিছু বিরূপ মন্তব্য করে থাকে। যদি একথা সত্য হয় তবে আজ হতে তুমি আমার নিকট থেকে কোন পত্র প্রাপ্তির আশা করো না। আজ হতে তোমার সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমার উম্মতের মধ্যে তকন্দীরকে অবিশ্বাসকারী লোকের আবির্ভাব ঘটবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে মাজুস (প্রাচীন পারসিক যাজক মণ্ডলী) থাকে। আমার উম্মতের মাজুসী হলো ঐ লোকগুলো যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না। তারা রোগাক্রান্ত হলে তোমরা তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তোমরা তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না।” (মুসনাদে আহমাদে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শীঘ্রই এই উম্মতের মধ্যে মাসখ’ হবে (অর্থাৎ লোকদের আকৃতি পরিবর্তিত হবে), জেনে রেখো যে, এ অবস্থা ঐ লোকদের হবে যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না এবং যারা যিনদীক (অর্থাৎ আল্লাহর একত্বে অবিশ্বাসী)।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামেউত তিরমিযীতেও এ হাদীসটি রয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জিনিসই আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাপে রয়েছে, এমনকি অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাও।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর এবং অপারগ ও নির্বোধ হয়ো না। অতঃপর যদি কোন ক্ষতি হয়ে যায় তবে বলো যে, এটা আল্লাহ কর্তৃকই নির্ধারিত ছিল এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। আর এরূপ কথা বলো নাঃ যদি এরূপ করতাম তবে এরূপ হতো। কেননা, এই ভাবে যদি বলাতে শয়তানী আমলের দরযা খুলে যায়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, যদি সমস্ত উম্মত একত্রিত হয়ে তোমার ঐ উপকার করার ইচ্ছা করে যা আল্লাহ তা'আলা তোমার ভাগ্যে লিখেননি তবে তারা তোমার ঐ উপকার কখনো করতে পারবে না। পক্ষান্তরে, যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তোমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা করে যা তোমার তকদীরে লিখা নেই তবে কখনো তারা তোমার ঐ ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। কলম শুকিয়ে গেছে এবং দফতর জড়িয়ে নিয়ে ভাঁজ করে দেয়া হয়েছে।হযরত ওয়ালীদ ইবনে উবাদাহ (রঃ)-এর পিতা হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ) যখন রোগ শয্যায় শায়িত হন এবং তাঁর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে যায় তখন হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তাঁর পিতাকে বলেনঃ “হে পিতঃ! আমাদেরকে কিছু অন্তিম উপদেশ দিন!” তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা, আমাকে বসিয়ে দাও।” তাকে বসিয়ে দেয়া হলে তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! ঈমানের স্বাদ তুমি গ্রহণ করতে পার না এবং আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে তোমার যে জ্ঞান রয়েছে তার শেষ সীমায় তুমি পৌঁছতে পার না যে পর্যন্ত না তকদীরের ভাল মন্দের উপর তোমার বিশ্বাস হয়।” হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তখন জিজ্ঞেস করলেনঃ “আব্বা! কি করে আমি জানতে পারবো যে, তকদীরের ভাল মন্দের উপর আমার ঈমান রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এই ভাবে তুমি জানতে পারবে যে, তুমি যা পেয়েছে তা পাওয়ারই ছিল এবং যা পাওনি তা পাওয়ারই ছিল না এই বিশ্বাস যখন তোমার থাকবে। হে আমার প্রিয় বৎস! জেনে রেখো যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে শুনেছিঃ “আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং ওকে বলেনঃ ‘লিখো।' তখনই কলম উঠে গেল এবং কিয়ামত পর্যন্ত যতো কিছু হবার আছে সবই লিখে ফেললো।” হে আমার প্রিয় ছেলে! যদি তুমি তোমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই বিশ্বাসের উপর না থাকো তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ ঈমানদার হতে পারে না যে পর্যন্ত না সে চারটির উপর ঈমান আনে। (এক) সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা’রূদ নেই, (দুই) আর সাক্ষ্য দেবে যে, আমি (মুহাম্মাদ সঃ) আল্লাহর রাসূল, তিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, (তিন) মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর বিশ্বাস রাখে এবং (চার) তকদীরের ভাল মন্দের উপর ঈমান আনে।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং দাউদ তায়ালেসী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ্তেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের তকদীর লিপিবদ্ধ করেছেন। ঐ সময় তাঁর আরশ পানির উপর ছিল।” (ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম।তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ গারীব বলেছেন)এরপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় ইচ্ছা ও আহকাম বিনা বাধায় জারী হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি নির্ধারণ করেছি তা যেমন হবেই, ঠিক তেমনি যে কাজের আমি ইচ্ছা করি তার জন্যে শুধু একবার ‘হও' বলাই যথেষ্ট হয়ে যায়, দ্বিতীয়বার গুরুত্বের জন্যে হুকুম দেয়ার কোনই প্রয়োজন হয় না। চোখের পলক ফেলা মাত্রই ঐ কাজ আমার চাহিদা অনুযায়ী হয়ে যায়। আরব কবি কি সুন্দরই না বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যখনই কোন কাজ করার ইচ্ছা করেন তখন শুধু বলেন হয়ে যাও’ আর তখনই তা হয়ে যায়।”আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমি ধ্বংস করেছি তোমাদের মত দলগুলোকে, অতএব ওটা হতে উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? আমার তাদেরকে শাস্তিদান ও লাঞ্ছিতকরণের মধ্যে তোমাদের জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ নেই কি? যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের এবং তাদের কামনা-বাসনার মধ্যে পর্দা ফেলে দেয়া হয়েছে, যেমন তাদের পূর্ববর্তী দলগুলোর সাথে করা হয়েছিল।” (৩৪:৫৪)তারা যা কিছু করেছে সবই তাদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলার বিশ্বস্ত ফেরেশতাগণের হাতে রক্ষিত আছে। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সবকিছুই আছে লিপিবদ্ধ। এমন কিছুই নেই লিখতে ছুটে গেছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! গুনাহকে তুচ্ছ মনে করো না, জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে এরও জবাবদিহি করতে হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত সুলাইমান ইবনে মুগীরা (রঃ) বলেনঃ “একদা আমি একটা গুনাহ করে ফেলি যেটাকে আমি অতি নগণ্য মনে করি। রাত্রে স্বপ্নে দেখি যে, একজন আগন্তুক এসে আমাকে বলছেনঃ হে সুলাইমান (রঃ)! (আরবী) অর্থাৎ “ছোট গুনাহগুলোকেও ছোট ও তুচ্ছ মনে করো না, এই ছোট গুনাহগুলোই বড় গুনাহ হয়ে যাবে। পাপ যদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রও হয় এবং ওগুলো করার পর বহু যুগ অতিবাহিত হয়েও যায় তথাপি ওগুলো আল্লাহ তাআলার কাছে স্পষ্টভাবে লিখিত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। পাপ হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো এবং এরূপ হয়ো না যে, অত্যন্ত ভারী হয়ে পুণ্যকার্যের দিকে এগিয়ে যাবে, বরং অঞ্চল উঁচু করে পুণ্য কাজের দিকে অগ্রসর হও। যখন কেউ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহকে মহব্বত করে তখন তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে চিন্তা-গবেষণার অভ্যাসের ইলহাম করা হয়। স্বীয় প্রতিপালকের নিকট হিদায়াত যাঞা কর এবং নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ কর। হিদায়াত ও সাহায্যকারী হিসেবে আল্লাহ তাআলাই তোমার জন্যে যথেষ্ট।” এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ সৎ এবং আল্লাহভীরু লোকেদের অবস্থা হবে। এই পাপী ও অপরাধী লোকেদের অবস্থার বিপরীত। এরা তো থাকবে বিপদ ও কষ্টের মধ্যে এবং অধঃমুখে তারা নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামে। আর এদের উপর হবে কঠিন ধমক ও শাসন গর্জন। পক্ষান্তরে ঐ সৎ ও আল্লাহভীরু থাকবে স্রোতস্বিনী বিধৌত জান্নাতে। তারা মর্যাদা ও সম্মান, সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ, দান ও ইহসান, সুখ ও শান্তি, নিয়ামত ও রহমত এবং সুন্দর ও মনোরম বাসভবনে অবস্থান করবে। অধিপতি ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে তারা গৌরবান্বিত হবে। যে আল্লাহ সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা এবং সবারই ভাগ্য নির্ধারণকারী। যিনি সবকিছুরই উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি ঐ আল্লাহভীরু লোকদের সব চাহিদাই পূর্ণ করবেন। তাদের মনোবাসনা মিটাতে মোটেই কার্পণ্য করবেন না তিনি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আদল ও ইনসাফকারী সৎলোকেরা আল্লাহ তা'আলার নিকট আলোর মিম্বরের উপর রহমানের (করুণাময় আল্লাহর) ডান দিকে থাকবে। আল্লাহ তাআলার দুই হাতই ডানই বটে। এই ন্যায় বিচারক ও ন্যায়পরায়ণ লোক ওরাই যারা তাদের আদেশসমূহে, নিজেদের পরিবার পরিজনের মধ্যে এবং যা কিছু তাদের অধিকারে রয়েছে সবগুলোর মধ্যেই আল্লাহর ফরমানের ব্যতিক্রম করে , বরং আদল ও ইনসাফের সাথেই কাজ করে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-কামার 54:51
৪৭-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: পাপী ও অপরাধী লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তারা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে এবং সত্য পথ হতে সরে গেছে। তারা সন্দেহ ও দুর্ভাবনার মধ্যে পতিত হয়েছে। এই দুষ্ট ও দুরাচার লোকগুলো কাফিরই হোক অথবা অন্য কোন দলের অপরাধী ও পাপী লোকই হোক, তাদের এই দুষ্কর্ম তাদেরকে উল্টোমুখে জাহান্নামের দিকে টানতে টানতে নিয়ে যাবে। এখানে যেমন তারা উদাসীন রয়েছে, তেমনই ওখানেও তারা বে-খবর থাকবে যে, না জানি তাদেরকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবেঃ তোমরা এখন জাহান্নামের অগ্নির স্বাদ গ্রহণ কর। মহান আল্লাহ বলেনঃ 'আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর ওর পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন।" (২৫:২) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার সুমহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর। যিনি সৃষ্টি করেন ও সুঠাম করেন। আর যিনি পরিমিত বিকাশ সাধন করেন ও পথ-নির্দেশ করেন।” (৮৭:১-৩)। আহলে সুন্নাতের ইমামগণ এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুককে সৃষ্টি করার পূর্বেই তার ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন এবং প্রত্যেক জিনিস প্রকাশিত হবার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলার কাছে লিখিত হয়ে গেছে। কাদরিয়া সম্প্রদায় এটা অস্বীকার করে। এ লোকগুলো সাহাবীদের (রাঃ) আখেরী যুগেই বেরিয়ে পড়েছিল। আহলে সুন্নাত ঐ লোকেদের মাযহাবের বিপক্ষে এই প্রকারের আয়াতগুলোকে পেশ করে থাকেন। আর এই বিষয়ের হাদীসগুলোকেও আমরা সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমানের ব্যাখ্যায় এই মাসআলার বিস্তারিত আলোচনায় লিপিবদ্ধ করেছি। এখানে শুধু ঐ হাদীসগুলো লিপিবদ্ধ করা হলো যেগুলো আয়াতের বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, মুশরিক কুরায়েশরা নবী (সঃ)-এর কাছে এসে তকদীর সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করে। তখন (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে আয়েব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, এ আয়াতগুলো তকদীর অস্বীকারকারীদের প্রতিবাদে অবতীর্ণ হয়।” (এটা বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যারারাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এ আয়াতগুলো পাঠ করে বলেনঃ “এই আয়াতগুলো আমার উম্মতের ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে যারা শেষ যামানায় জন্মলাভ করবে এবং তকদীরকে অবিশ্বাস করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আতা ইবনে আবি রিবাহ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি। ঐ সময় তিনি যমযম কূপ হতে পানি উঠাচ্ছিলেন। তাঁর কাপড়ের অঞ্চল ভিজা ছিল। আমি বললামঃ তকদীরের ব্যাপারে সমালোচনা করা হচ্ছে। কেউ এই মাসআলার পক্ষে রয়েছে এবং কেউ বিপক্ষে রয়েছে। তিনি তখন বললেনঃ “জনগণ এরূপ করছে।” আমি বললামঃ হ্যাঁ, এরূপই হচ্ছে। তখন তিনি বললেনঃ “আল্লাহর শপথ (আরবী)-এ আয়াতগুলো তাদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ। হয়েছে। জেনে রেখো যে, এ লোকগুলো হলো এই উম্মতের নিকৃষ্টতম লোক। তারা রোগাক্রান্ত হলে তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না। তাদের কাউকেও যদি আমি আমার সামনে দেখতে পাই তবে আমার অঙ্গুলি দ্বারা তার চক্ষু উঠিয়ে নিবো।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলা হলো, এমন একজন লোক এসেছে যে তকদীরকে বিশ্বাস করে না। তখন তিনি বললেন, আচ্ছা, তোমরা আমাকে তার। কাছে নিয়ে চল। জনগণ বললো, আপনি তো অন্ধ, সুতরাং আপনি তার কাছে গিয়ে কি করবেন? উত্তরে তিনি বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি আমি তাকে হাতে পাই তবে তার নাক কেটে নিবো এবং যদি তার গর্দান ধরতে পারি তবে তা উড়িয়ে দিবো। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে, বানু কাহরের নারীরা খাযরাজের চতুর্দিকে তাওয়াফ করতে আছে। তাদের দেহ নড়াচড়া করছে। তারা মুশরিকা নারী। এই উম্মতের প্রথম শিরক এটাই। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তাদের নির্বুদ্ধিতা এতো চরমে পৌঁছে যাবে যে, তারা আল্লাহ তাআলাকে কল্যাণ নির্ধারণকারী বলেও স্বীকার করবে না। যেমন তাকে অকল্যাণ নির্ধারণকারী বলে স্বীকার করেনি।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত নাফে' (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সিরিয়াবাসী একজন বন্ধু ছিল, যার সাথে তাঁর পত্র আদান প্রদান চলতো। তিনি শুনতে পেলেন যে, তাঁর ঐ বন্ধুটি তকদীর সম্পর্কে কিছু সমালোচনা করে থাকে। সুতরাং তৎক্ষণাৎ তিনি তাকে পত্র লিখেন- আমি শুনতে পেয়েছি যে, তুমি নাকি তকদীরের ব্যাপারে কিছু বিরূপ মন্তব্য করে থাকে। যদি একথা সত্য হয় তবে আজ হতে তুমি আমার নিকট থেকে কোন পত্র প্রাপ্তির আশা করো না। আজ হতে তোমার সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমার উম্মতের মধ্যে তকন্দীরকে অবিশ্বাসকারী লোকের আবির্ভাব ঘটবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে মাজুস (প্রাচীন পারসিক যাজক মণ্ডলী) থাকে। আমার উম্মতের মাজুসী হলো ঐ লোকগুলো যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না। তারা রোগাক্রান্ত হলে তোমরা তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তোমরা তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না।” (মুসনাদে আহমাদে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শীঘ্রই এই উম্মতের মধ্যে মাসখ’ হবে (অর্থাৎ লোকদের আকৃতি পরিবর্তিত হবে), জেনে রেখো যে, এ অবস্থা ঐ লোকদের হবে যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না এবং যারা যিনদীক (অর্থাৎ আল্লাহর একত্বে অবিশ্বাসী)।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামেউত তিরমিযীতেও এ হাদীসটি রয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জিনিসই আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাপে রয়েছে, এমনকি অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাও।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর এবং অপারগ ও নির্বোধ হয়ো না। অতঃপর যদি কোন ক্ষতি হয়ে যায় তবে বলো যে, এটা আল্লাহ কর্তৃকই নির্ধারিত ছিল এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। আর এরূপ কথা বলো নাঃ যদি এরূপ করতাম তবে এরূপ হতো। কেননা, এই ভাবে যদি বলাতে শয়তানী আমলের দরযা খুলে যায়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, যদি সমস্ত উম্মত একত্রিত হয়ে তোমার ঐ উপকার করার ইচ্ছা করে যা আল্লাহ তা'আলা তোমার ভাগ্যে লিখেননি তবে তারা তোমার ঐ উপকার কখনো করতে পারবে না। পক্ষান্তরে, যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তোমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা করে যা তোমার তকদীরে লিখা নেই তবে কখনো তারা তোমার ঐ ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। কলম শুকিয়ে গেছে এবং দফতর জড়িয়ে নিয়ে ভাঁজ করে দেয়া হয়েছে।হযরত ওয়ালীদ ইবনে উবাদাহ (রঃ)-এর পিতা হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ) যখন রোগ শয্যায় শায়িত হন এবং তাঁর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে যায় তখন হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তাঁর পিতাকে বলেনঃ “হে পিতঃ! আমাদেরকে কিছু অন্তিম উপদেশ দিন!” তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা, আমাকে বসিয়ে দাও।” তাকে বসিয়ে দেয়া হলে তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! ঈমানের স্বাদ তুমি গ্রহণ করতে পার না এবং আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে তোমার যে জ্ঞান রয়েছে তার শেষ সীমায় তুমি পৌঁছতে পার না যে পর্যন্ত না তকদীরের ভাল মন্দের উপর তোমার বিশ্বাস হয়।” হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তখন জিজ্ঞেস করলেনঃ “আব্বা! কি করে আমি জানতে পারবো যে, তকদীরের ভাল মন্দের উপর আমার ঈমান রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এই ভাবে তুমি জানতে পারবে যে, তুমি যা পেয়েছে তা পাওয়ারই ছিল এবং যা পাওনি তা পাওয়ারই ছিল না এই বিশ্বাস যখন তোমার থাকবে। হে আমার প্রিয় বৎস! জেনে রেখো যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে শুনেছিঃ “আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং ওকে বলেনঃ ‘লিখো।' তখনই কলম উঠে গেল এবং কিয়ামত পর্যন্ত যতো কিছু হবার আছে সবই লিখে ফেললো।” হে আমার প্রিয় ছেলে! যদি তুমি তোমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই বিশ্বাসের উপর না থাকো তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ ঈমানদার হতে পারে না যে পর্যন্ত না সে চারটির উপর ঈমান আনে। (এক) সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা’রূদ নেই, (দুই) আর সাক্ষ্য দেবে যে, আমি (মুহাম্মাদ সঃ) আল্লাহর রাসূল, তিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, (তিন) মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর বিশ্বাস রাখে এবং (চার) তকদীরের ভাল মন্দের উপর ঈমান আনে।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং দাউদ তায়ালেসী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ্তেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের তকদীর লিপিবদ্ধ করেছেন। ঐ সময় তাঁর আরশ পানির উপর ছিল।” (ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম।তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ গারীব বলেছেন)এরপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় ইচ্ছা ও আহকাম বিনা বাধায় জারী হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি নির্ধারণ করেছি তা যেমন হবেই, ঠিক তেমনি যে কাজের আমি ইচ্ছা করি তার জন্যে শুধু একবার ‘হও' বলাই যথেষ্ট হয়ে যায়, দ্বিতীয়বার গুরুত্বের জন্যে হুকুম দেয়ার কোনই প্রয়োজন হয় না। চোখের পলক ফেলা মাত্রই ঐ কাজ আমার চাহিদা অনুযায়ী হয়ে যায়। আরব কবি কি সুন্দরই না বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যখনই কোন কাজ করার ইচ্ছা করেন তখন শুধু বলেন হয়ে যাও’ আর তখনই তা হয়ে যায়।”আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমি ধ্বংস করেছি তোমাদের মত দলগুলোকে, অতএব ওটা হতে উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? আমার তাদেরকে শাস্তিদান ও লাঞ্ছিতকরণের মধ্যে তোমাদের জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ নেই কি? যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের এবং তাদের কামনা-বাসনার মধ্যে পর্দা ফেলে দেয়া হয়েছে, যেমন তাদের পূর্ববর্তী দলগুলোর সাথে করা হয়েছিল।” (৩৪:৫৪)তারা যা কিছু করেছে সবই তাদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলার বিশ্বস্ত ফেরেশতাগণের হাতে রক্ষিত আছে। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সবকিছুই আছে লিপিবদ্ধ। এমন কিছুই নেই লিখতে ছুটে গেছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! গুনাহকে তুচ্ছ মনে করো না, জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে এরও জবাবদিহি করতে হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত সুলাইমান ইবনে মুগীরা (রঃ) বলেনঃ “একদা আমি একটা গুনাহ করে ফেলি যেটাকে আমি অতি নগণ্য মনে করি। রাত্রে স্বপ্নে দেখি যে, একজন আগন্তুক এসে আমাকে বলছেনঃ হে সুলাইমান (রঃ)! (আরবী) অর্থাৎ “ছোট গুনাহগুলোকেও ছোট ও তুচ্ছ মনে করো না, এই ছোট গুনাহগুলোই বড় গুনাহ হয়ে যাবে। পাপ যদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রও হয় এবং ওগুলো করার পর বহু যুগ অতিবাহিত হয়েও যায় তথাপি ওগুলো আল্লাহ তাআলার কাছে স্পষ্টভাবে লিখিত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। পাপ হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো এবং এরূপ হয়ো না যে, অত্যন্ত ভারী হয়ে পুণ্যকার্যের দিকে এগিয়ে যাবে, বরং অঞ্চল উঁচু করে পুণ্য কাজের দিকে অগ্রসর হও। যখন কেউ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহকে মহব্বত করে তখন তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে চিন্তা-গবেষণার অভ্যাসের ইলহাম করা হয়। স্বীয় প্রতিপালকের নিকট হিদায়াত যাঞা কর এবং নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ কর। হিদায়াত ও সাহায্যকারী হিসেবে আল্লাহ তাআলাই তোমার জন্যে যথেষ্ট।” এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ সৎ এবং আল্লাহভীরু লোকেদের অবস্থা হবে। এই পাপী ও অপরাধী লোকেদের অবস্থার বিপরীত। এরা তো থাকবে বিপদ ও কষ্টের মধ্যে এবং অধঃমুখে তারা নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামে। আর এদের উপর হবে কঠিন ধমক ও শাসন গর্জন। পক্ষান্তরে ঐ সৎ ও আল্লাহভীরু থাকবে স্রোতস্বিনী বিধৌত জান্নাতে। তারা মর্যাদা ও সম্মান, সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ, দান ও ইহসান, সুখ ও শান্তি, নিয়ামত ও রহমত এবং সুন্দর ও মনোরম বাসভবনে অবস্থান করবে। অধিপতি ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে তারা গৌরবান্বিত হবে। যে আল্লাহ সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা এবং সবারই ভাগ্য নির্ধারণকারী। যিনি সবকিছুরই উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি ঐ আল্লাহভীরু লোকদের সব চাহিদাই পূর্ণ করবেন। তাদের মনোবাসনা মিটাতে মোটেই কার্পণ্য করবেন না তিনি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আদল ও ইনসাফকারী সৎলোকেরা আল্লাহ তা'আলার নিকট আলোর মিম্বরের উপর রহমানের (করুণাময় আল্লাহর) ডান দিকে থাকবে। আল্লাহ তাআলার দুই হাতই ডানই বটে। এই ন্যায় বিচারক ও ন্যায়পরায়ণ লোক ওরাই যারা তাদের আদেশসমূহে, নিজেদের পরিবার পরিজনের মধ্যে এবং যা কিছু তাদের অধিকারে রয়েছে সবগুলোর মধ্যেই আল্লাহর ফরমানের ব্যতিক্রম করে , বরং আদল ও ইনসাফের সাথেই কাজ করে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-কামার 54:52
৪৭-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: পাপী ও অপরাধী লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তারা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে এবং সত্য পথ হতে সরে গেছে। তারা সন্দেহ ও দুর্ভাবনার মধ্যে পতিত হয়েছে। এই দুষ্ট ও দুরাচার লোকগুলো কাফিরই হোক অথবা অন্য কোন দলের অপরাধী ও পাপী লোকই হোক, তাদের এই দুষ্কর্ম তাদেরকে উল্টোমুখে জাহান্নামের দিকে টানতে টানতে নিয়ে যাবে। এখানে যেমন তারা উদাসীন রয়েছে, তেমনই ওখানেও তারা বে-খবর থাকবে যে, না জানি তাদেরকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবেঃ তোমরা এখন জাহান্নামের অগ্নির স্বাদ গ্রহণ কর। মহান আল্লাহ বলেনঃ 'আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর ওর পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন।" (২৫:২) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার সুমহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর। যিনি সৃষ্টি করেন ও সুঠাম করেন। আর যিনি পরিমিত বিকাশ সাধন করেন ও পথ-নির্দেশ করেন।” (৮৭:১-৩)। আহলে সুন্নাতের ইমামগণ এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুককে সৃষ্টি করার পূর্বেই তার ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন এবং প্রত্যেক জিনিস প্রকাশিত হবার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলার কাছে লিখিত হয়ে গেছে। কাদরিয়া সম্প্রদায় এটা অস্বীকার করে। এ লোকগুলো সাহাবীদের (রাঃ) আখেরী যুগেই বেরিয়ে পড়েছিল। আহলে সুন্নাত ঐ লোকেদের মাযহাবের বিপক্ষে এই প্রকারের আয়াতগুলোকে পেশ করে থাকেন। আর এই বিষয়ের হাদীসগুলোকেও আমরা সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমানের ব্যাখ্যায় এই মাসআলার বিস্তারিত আলোচনায় লিপিবদ্ধ করেছি। এখানে শুধু ঐ হাদীসগুলো লিপিবদ্ধ করা হলো যেগুলো আয়াতের বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, মুশরিক কুরায়েশরা নবী (সঃ)-এর কাছে এসে তকদীর সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করে। তখন (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে আয়েব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, এ আয়াতগুলো তকদীর অস্বীকারকারীদের প্রতিবাদে অবতীর্ণ হয়।” (এটা বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যারারাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এ আয়াতগুলো পাঠ করে বলেনঃ “এই আয়াতগুলো আমার উম্মতের ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে যারা শেষ যামানায় জন্মলাভ করবে এবং তকদীরকে অবিশ্বাস করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আতা ইবনে আবি রিবাহ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি। ঐ সময় তিনি যমযম কূপ হতে পানি উঠাচ্ছিলেন। তাঁর কাপড়ের অঞ্চল ভিজা ছিল। আমি বললামঃ তকদীরের ব্যাপারে সমালোচনা করা হচ্ছে। কেউ এই মাসআলার পক্ষে রয়েছে এবং কেউ বিপক্ষে রয়েছে। তিনি তখন বললেনঃ “জনগণ এরূপ করছে।” আমি বললামঃ হ্যাঁ, এরূপই হচ্ছে। তখন তিনি বললেনঃ “আল্লাহর শপথ (আরবী)-এ আয়াতগুলো তাদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ। হয়েছে। জেনে রেখো যে, এ লোকগুলো হলো এই উম্মতের নিকৃষ্টতম লোক। তারা রোগাক্রান্ত হলে তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না। তাদের কাউকেও যদি আমি আমার সামনে দেখতে পাই তবে আমার অঙ্গুলি দ্বারা তার চক্ষু উঠিয়ে নিবো।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলা হলো, এমন একজন লোক এসেছে যে তকদীরকে বিশ্বাস করে না। তখন তিনি বললেন, আচ্ছা, তোমরা আমাকে তার। কাছে নিয়ে চল। জনগণ বললো, আপনি তো অন্ধ, সুতরাং আপনি তার কাছে গিয়ে কি করবেন? উত্তরে তিনি বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি আমি তাকে হাতে পাই তবে তার নাক কেটে নিবো এবং যদি তার গর্দান ধরতে পারি তবে তা উড়িয়ে দিবো। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে, বানু কাহরের নারীরা খাযরাজের চতুর্দিকে তাওয়াফ করতে আছে। তাদের দেহ নড়াচড়া করছে। তারা মুশরিকা নারী। এই উম্মতের প্রথম শিরক এটাই। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তাদের নির্বুদ্ধিতা এতো চরমে পৌঁছে যাবে যে, তারা আল্লাহ তাআলাকে কল্যাণ নির্ধারণকারী বলেও স্বীকার করবে না। যেমন তাকে অকল্যাণ নির্ধারণকারী বলে স্বীকার করেনি।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত নাফে' (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সিরিয়াবাসী একজন বন্ধু ছিল, যার সাথে তাঁর পত্র আদান প্রদান চলতো। তিনি শুনতে পেলেন যে, তাঁর ঐ বন্ধুটি তকদীর সম্পর্কে কিছু সমালোচনা করে থাকে। সুতরাং তৎক্ষণাৎ তিনি তাকে পত্র লিখেন- আমি শুনতে পেয়েছি যে, তুমি নাকি তকদীরের ব্যাপারে কিছু বিরূপ মন্তব্য করে থাকে। যদি একথা সত্য হয় তবে আজ হতে তুমি আমার নিকট থেকে কোন পত্র প্রাপ্তির আশা করো না। আজ হতে তোমার সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমার উম্মতের মধ্যে তকন্দীরকে অবিশ্বাসকারী লোকের আবির্ভাব ঘটবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে মাজুস (প্রাচীন পারসিক যাজক মণ্ডলী) থাকে। আমার উম্মতের মাজুসী হলো ঐ লোকগুলো যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না। তারা রোগাক্রান্ত হলে তোমরা তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তোমরা তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না।” (মুসনাদে আহমাদে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শীঘ্রই এই উম্মতের মধ্যে মাসখ’ হবে (অর্থাৎ লোকদের আকৃতি পরিবর্তিত হবে), জেনে রেখো যে, এ অবস্থা ঐ লোকদের হবে যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না এবং যারা যিনদীক (অর্থাৎ আল্লাহর একত্বে অবিশ্বাসী)।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামেউত তিরমিযীতেও এ হাদীসটি রয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জিনিসই আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাপে রয়েছে, এমনকি অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাও।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর এবং অপারগ ও নির্বোধ হয়ো না। অতঃপর যদি কোন ক্ষতি হয়ে যায় তবে বলো যে, এটা আল্লাহ কর্তৃকই নির্ধারিত ছিল এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। আর এরূপ কথা বলো নাঃ যদি এরূপ করতাম তবে এরূপ হতো। কেননা, এই ভাবে যদি বলাতে শয়তানী আমলের দরযা খুলে যায়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, যদি সমস্ত উম্মত একত্রিত হয়ে তোমার ঐ উপকার করার ইচ্ছা করে যা আল্লাহ তা'আলা তোমার ভাগ্যে লিখেননি তবে তারা তোমার ঐ উপকার কখনো করতে পারবে না। পক্ষান্তরে, যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তোমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা করে যা তোমার তকদীরে লিখা নেই তবে কখনো তারা তোমার ঐ ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। কলম শুকিয়ে গেছে এবং দফতর জড়িয়ে নিয়ে ভাঁজ করে দেয়া হয়েছে।হযরত ওয়ালীদ ইবনে উবাদাহ (রঃ)-এর পিতা হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ) যখন রোগ শয্যায় শায়িত হন এবং তাঁর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে যায় তখন হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তাঁর পিতাকে বলেনঃ “হে পিতঃ! আমাদেরকে কিছু অন্তিম উপদেশ দিন!” তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা, আমাকে বসিয়ে দাও।” তাকে বসিয়ে দেয়া হলে তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! ঈমানের স্বাদ তুমি গ্রহণ করতে পার না এবং আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে তোমার যে জ্ঞান রয়েছে তার শেষ সীমায় তুমি পৌঁছতে পার না যে পর্যন্ত না তকদীরের ভাল মন্দের উপর তোমার বিশ্বাস হয়।” হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তখন জিজ্ঞেস করলেনঃ “আব্বা! কি করে আমি জানতে পারবো যে, তকদীরের ভাল মন্দের উপর আমার ঈমান রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এই ভাবে তুমি জানতে পারবে যে, তুমি যা পেয়েছে তা পাওয়ারই ছিল এবং যা পাওনি তা পাওয়ারই ছিল না এই বিশ্বাস যখন তোমার থাকবে। হে আমার প্রিয় বৎস! জেনে রেখো যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে শুনেছিঃ “আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং ওকে বলেনঃ ‘লিখো।' তখনই কলম উঠে গেল এবং কিয়ামত পর্যন্ত যতো কিছু হবার আছে সবই লিখে ফেললো।” হে আমার প্রিয় ছেলে! যদি তুমি তোমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই বিশ্বাসের উপর না থাকো তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ ঈমানদার হতে পারে না যে পর্যন্ত না সে চারটির উপর ঈমান আনে। (এক) সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা’রূদ নেই, (দুই) আর সাক্ষ্য দেবে যে, আমি (মুহাম্মাদ সঃ) আল্লাহর রাসূল, তিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, (তিন) মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর বিশ্বাস রাখে এবং (চার) তকদীরের ভাল মন্দের উপর ঈমান আনে।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং দাউদ তায়ালেসী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ্তেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের তকদীর লিপিবদ্ধ করেছেন। ঐ সময় তাঁর আরশ পানির উপর ছিল।” (ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম।তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ গারীব বলেছেন)এরপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় ইচ্ছা ও আহকাম বিনা বাধায় জারী হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি নির্ধারণ করেছি তা যেমন হবেই, ঠিক তেমনি যে কাজের আমি ইচ্ছা করি তার জন্যে শুধু একবার ‘হও' বলাই যথেষ্ট হয়ে যায়, দ্বিতীয়বার গুরুত্বের জন্যে হুকুম দেয়ার কোনই প্রয়োজন হয় না। চোখের পলক ফেলা মাত্রই ঐ কাজ আমার চাহিদা অনুযায়ী হয়ে যায়। আরব কবি কি সুন্দরই না বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যখনই কোন কাজ করার ইচ্ছা করেন তখন শুধু বলেন হয়ে যাও’ আর তখনই তা হয়ে যায়।”আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমি ধ্বংস করেছি তোমাদের মত দলগুলোকে, অতএব ওটা হতে উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? আমার তাদেরকে শাস্তিদান ও লাঞ্ছিতকরণের মধ্যে তোমাদের জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ নেই কি? যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের এবং তাদের কামনা-বাসনার মধ্যে পর্দা ফেলে দেয়া হয়েছে, যেমন তাদের পূর্ববর্তী দলগুলোর সাথে করা হয়েছিল।” (৩৪:৫৪)তারা যা কিছু করেছে সবই তাদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলার বিশ্বস্ত ফেরেশতাগণের হাতে রক্ষিত আছে। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সবকিছুই আছে লিপিবদ্ধ। এমন কিছুই নেই লিখতে ছুটে গেছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! গুনাহকে তুচ্ছ মনে করো না, জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে এরও জবাবদিহি করতে হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত সুলাইমান ইবনে মুগীরা (রঃ) বলেনঃ “একদা আমি একটা গুনাহ করে ফেলি যেটাকে আমি অতি নগণ্য মনে করি। রাত্রে স্বপ্নে দেখি যে, একজন আগন্তুক এসে আমাকে বলছেনঃ হে সুলাইমান (রঃ)! (আরবী) অর্থাৎ “ছোট গুনাহগুলোকেও ছোট ও তুচ্ছ মনে করো না, এই ছোট গুনাহগুলোই বড় গুনাহ হয়ে যাবে। পাপ যদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রও হয় এবং ওগুলো করার পর বহু যুগ অতিবাহিত হয়েও যায় তথাপি ওগুলো আল্লাহ তাআলার কাছে স্পষ্টভাবে লিখিত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। পাপ হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো এবং এরূপ হয়ো না যে, অত্যন্ত ভারী হয়ে পুণ্যকার্যের দিকে এগিয়ে যাবে, বরং অঞ্চল উঁচু করে পুণ্য কাজের দিকে অগ্রসর হও। যখন কেউ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহকে মহব্বত করে তখন তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে চিন্তা-গবেষণার অভ্যাসের ইলহাম করা হয়। স্বীয় প্রতিপালকের নিকট হিদায়াত যাঞা কর এবং নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ কর। হিদায়াত ও সাহায্যকারী হিসেবে আল্লাহ তাআলাই তোমার জন্যে যথেষ্ট।” এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ সৎ এবং আল্লাহভীরু লোকেদের অবস্থা হবে। এই পাপী ও অপরাধী লোকেদের অবস্থার বিপরীত। এরা তো থাকবে বিপদ ও কষ্টের মধ্যে এবং অধঃমুখে তারা নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামে। আর এদের উপর হবে কঠিন ধমক ও শাসন গর্জন। পক্ষান্তরে ঐ সৎ ও আল্লাহভীরু থাকবে স্রোতস্বিনী বিধৌত জান্নাতে। তারা মর্যাদা ও সম্মান, সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ, দান ও ইহসান, সুখ ও শান্তি, নিয়ামত ও রহমত এবং সুন্দর ও মনোরম বাসভবনে অবস্থান করবে। অধিপতি ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে তারা গৌরবান্বিত হবে। যে আল্লাহ সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা এবং সবারই ভাগ্য নির্ধারণকারী। যিনি সবকিছুরই উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি ঐ আল্লাহভীরু লোকদের সব চাহিদাই পূর্ণ করবেন। তাদের মনোবাসনা মিটাতে মোটেই কার্পণ্য করবেন না তিনি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আদল ও ইনসাফকারী সৎলোকেরা আল্লাহ তা'আলার নিকট আলোর মিম্বরের উপর রহমানের (করুণাময় আল্লাহর) ডান দিকে থাকবে। আল্লাহ তাআলার দুই হাতই ডানই বটে। এই ন্যায় বিচারক ও ন্যায়পরায়ণ লোক ওরাই যারা তাদের আদেশসমূহে, নিজেদের পরিবার পরিজনের মধ্যে এবং যা কিছু তাদের অধিকারে রয়েছে সবগুলোর মধ্যেই আল্লাহর ফরমানের ব্যতিক্রম করে , বরং আদল ও ইনসাফের সাথেই কাজ করে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-কামার 54:53
৪৭-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: পাপী ও অপরাধী লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তারা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে এবং সত্য পথ হতে সরে গেছে। তারা সন্দেহ ও দুর্ভাবনার মধ্যে পতিত হয়েছে। এই দুষ্ট ও দুরাচার লোকগুলো কাফিরই হোক অথবা অন্য কোন দলের অপরাধী ও পাপী লোকই হোক, তাদের এই দুষ্কর্ম তাদেরকে উল্টোমুখে জাহান্নামের দিকে টানতে টানতে নিয়ে যাবে। এখানে যেমন তারা উদাসীন রয়েছে, তেমনই ওখানেও তারা বে-খবর থাকবে যে, না জানি তাদেরকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবেঃ তোমরা এখন জাহান্নামের অগ্নির স্বাদ গ্রহণ কর। মহান আল্লাহ বলেনঃ 'আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর ওর পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন।" (২৫:২) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার সুমহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর। যিনি সৃষ্টি করেন ও সুঠাম করেন। আর যিনি পরিমিত বিকাশ সাধন করেন ও পথ-নির্দেশ করেন।” (৮৭:১-৩)। আহলে সুন্নাতের ইমামগণ এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুককে সৃষ্টি করার পূর্বেই তার ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন এবং প্রত্যেক জিনিস প্রকাশিত হবার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলার কাছে লিখিত হয়ে গেছে। কাদরিয়া সম্প্রদায় এটা অস্বীকার করে। এ লোকগুলো সাহাবীদের (রাঃ) আখেরী যুগেই বেরিয়ে পড়েছিল। আহলে সুন্নাত ঐ লোকেদের মাযহাবের বিপক্ষে এই প্রকারের আয়াতগুলোকে পেশ করে থাকেন। আর এই বিষয়ের হাদীসগুলোকেও আমরা সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমানের ব্যাখ্যায় এই মাসআলার বিস্তারিত আলোচনায় লিপিবদ্ধ করেছি। এখানে শুধু ঐ হাদীসগুলো লিপিবদ্ধ করা হলো যেগুলো আয়াতের বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, মুশরিক কুরায়েশরা নবী (সঃ)-এর কাছে এসে তকদীর সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করে। তখন (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে আয়েব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, এ আয়াতগুলো তকদীর অস্বীকারকারীদের প্রতিবাদে অবতীর্ণ হয়।” (এটা বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যারারাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এ আয়াতগুলো পাঠ করে বলেনঃ “এই আয়াতগুলো আমার উম্মতের ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে যারা শেষ যামানায় জন্মলাভ করবে এবং তকদীরকে অবিশ্বাস করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আতা ইবনে আবি রিবাহ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি। ঐ সময় তিনি যমযম কূপ হতে পানি উঠাচ্ছিলেন। তাঁর কাপড়ের অঞ্চল ভিজা ছিল। আমি বললামঃ তকদীরের ব্যাপারে সমালোচনা করা হচ্ছে। কেউ এই মাসআলার পক্ষে রয়েছে এবং কেউ বিপক্ষে রয়েছে। তিনি তখন বললেনঃ “জনগণ এরূপ করছে।” আমি বললামঃ হ্যাঁ, এরূপই হচ্ছে। তখন তিনি বললেনঃ “আল্লাহর শপথ (আরবী)-এ আয়াতগুলো তাদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ। হয়েছে। জেনে রেখো যে, এ লোকগুলো হলো এই উম্মতের নিকৃষ্টতম লোক। তারা রোগাক্রান্ত হলে তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না। তাদের কাউকেও যদি আমি আমার সামনে দেখতে পাই তবে আমার অঙ্গুলি দ্বারা তার চক্ষু উঠিয়ে নিবো।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলা হলো, এমন একজন লোক এসেছে যে তকদীরকে বিশ্বাস করে না। তখন তিনি বললেন, আচ্ছা, তোমরা আমাকে তার। কাছে নিয়ে চল। জনগণ বললো, আপনি তো অন্ধ, সুতরাং আপনি তার কাছে গিয়ে কি করবেন? উত্তরে তিনি বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি আমি তাকে হাতে পাই তবে তার নাক কেটে নিবো এবং যদি তার গর্দান ধরতে পারি তবে তা উড়িয়ে দিবো। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে, বানু কাহরের নারীরা খাযরাজের চতুর্দিকে তাওয়াফ করতে আছে। তাদের দেহ নড়াচড়া করছে। তারা মুশরিকা নারী। এই উম্মতের প্রথম শিরক এটাই। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তাদের নির্বুদ্ধিতা এতো চরমে পৌঁছে যাবে যে, তারা আল্লাহ তাআলাকে কল্যাণ নির্ধারণকারী বলেও স্বীকার করবে না। যেমন তাকে অকল্যাণ নির্ধারণকারী বলে স্বীকার করেনি।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত নাফে' (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সিরিয়াবাসী একজন বন্ধু ছিল, যার সাথে তাঁর পত্র আদান প্রদান চলতো। তিনি শুনতে পেলেন যে, তাঁর ঐ বন্ধুটি তকদীর সম্পর্কে কিছু সমালোচনা করে থাকে। সুতরাং তৎক্ষণাৎ তিনি তাকে পত্র লিখেন- আমি শুনতে পেয়েছি যে, তুমি নাকি তকদীরের ব্যাপারে কিছু বিরূপ মন্তব্য করে থাকে। যদি একথা সত্য হয় তবে আজ হতে তুমি আমার নিকট থেকে কোন পত্র প্রাপ্তির আশা করো না। আজ হতে তোমার সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমার উম্মতের মধ্যে তকন্দীরকে অবিশ্বাসকারী লোকের আবির্ভাব ঘটবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে মাজুস (প্রাচীন পারসিক যাজক মণ্ডলী) থাকে। আমার উম্মতের মাজুসী হলো ঐ লোকগুলো যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না। তারা রোগাক্রান্ত হলে তোমরা তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তোমরা তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না।” (মুসনাদে আহমাদে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শীঘ্রই এই উম্মতের মধ্যে মাসখ’ হবে (অর্থাৎ লোকদের আকৃতি পরিবর্তিত হবে), জেনে রেখো যে, এ অবস্থা ঐ লোকদের হবে যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না এবং যারা যিনদীক (অর্থাৎ আল্লাহর একত্বে অবিশ্বাসী)।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামেউত তিরমিযীতেও এ হাদীসটি রয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জিনিসই আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাপে রয়েছে, এমনকি অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাও।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর এবং অপারগ ও নির্বোধ হয়ো না। অতঃপর যদি কোন ক্ষতি হয়ে যায় তবে বলো যে, এটা আল্লাহ কর্তৃকই নির্ধারিত ছিল এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। আর এরূপ কথা বলো নাঃ যদি এরূপ করতাম তবে এরূপ হতো। কেননা, এই ভাবে যদি বলাতে শয়তানী আমলের দরযা খুলে যায়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, যদি সমস্ত উম্মত একত্রিত হয়ে তোমার ঐ উপকার করার ইচ্ছা করে যা আল্লাহ তা'আলা তোমার ভাগ্যে লিখেননি তবে তারা তোমার ঐ উপকার কখনো করতে পারবে না। পক্ষান্তরে, যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তোমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা করে যা তোমার তকদীরে লিখা নেই তবে কখনো তারা তোমার ঐ ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। কলম শুকিয়ে গেছে এবং দফতর জড়িয়ে নিয়ে ভাঁজ করে দেয়া হয়েছে।হযরত ওয়ালীদ ইবনে উবাদাহ (রঃ)-এর পিতা হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ) যখন রোগ শয্যায় শায়িত হন এবং তাঁর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে যায় তখন হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তাঁর পিতাকে বলেনঃ “হে পিতঃ! আমাদেরকে কিছু অন্তিম উপদেশ দিন!” তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা, আমাকে বসিয়ে দাও।” তাকে বসিয়ে দেয়া হলে তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! ঈমানের স্বাদ তুমি গ্রহণ করতে পার না এবং আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে তোমার যে জ্ঞান রয়েছে তার শেষ সীমায় তুমি পৌঁছতে পার না যে পর্যন্ত না তকদীরের ভাল মন্দের উপর তোমার বিশ্বাস হয়।” হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তখন জিজ্ঞেস করলেনঃ “আব্বা! কি করে আমি জানতে পারবো যে, তকদীরের ভাল মন্দের উপর আমার ঈমান রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এই ভাবে তুমি জানতে পারবে যে, তুমি যা পেয়েছে তা পাওয়ারই ছিল এবং যা পাওনি তা পাওয়ারই ছিল না এই বিশ্বাস যখন তোমার থাকবে। হে আমার প্রিয় বৎস! জেনে রেখো যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে শুনেছিঃ “আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং ওকে বলেনঃ ‘লিখো।' তখনই কলম উঠে গেল এবং কিয়ামত পর্যন্ত যতো কিছু হবার আছে সবই লিখে ফেললো।” হে আমার প্রিয় ছেলে! যদি তুমি তোমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই বিশ্বাসের উপর না থাকো তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ ঈমানদার হতে পারে না যে পর্যন্ত না সে চারটির উপর ঈমান আনে। (এক) সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা’রূদ নেই, (দুই) আর সাক্ষ্য দেবে যে, আমি (মুহাম্মাদ সঃ) আল্লাহর রাসূল, তিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, (তিন) মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর বিশ্বাস রাখে এবং (চার) তকদীরের ভাল মন্দের উপর ঈমান আনে।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং দাউদ তায়ালেসী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ্তেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের তকদীর লিপিবদ্ধ করেছেন। ঐ সময় তাঁর আরশ পানির উপর ছিল।” (ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম।তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ গারীব বলেছেন)এরপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় ইচ্ছা ও আহকাম বিনা বাধায় জারী হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি নির্ধারণ করেছি তা যেমন হবেই, ঠিক তেমনি যে কাজের আমি ইচ্ছা করি তার জন্যে শুধু একবার ‘হও' বলাই যথেষ্ট হয়ে যায়, দ্বিতীয়বার গুরুত্বের জন্যে হুকুম দেয়ার কোনই প্রয়োজন হয় না। চোখের পলক ফেলা মাত্রই ঐ কাজ আমার চাহিদা অনুযায়ী হয়ে যায়। আরব কবি কি সুন্দরই না বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যখনই কোন কাজ করার ইচ্ছা করেন তখন শুধু বলেন হয়ে যাও’ আর তখনই তা হয়ে যায়।”আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমি ধ্বংস করেছি তোমাদের মত দলগুলোকে, অতএব ওটা হতে উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? আমার তাদেরকে শাস্তিদান ও লাঞ্ছিতকরণের মধ্যে তোমাদের জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ নেই কি? যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের এবং তাদের কামনা-বাসনার মধ্যে পর্দা ফেলে দেয়া হয়েছে, যেমন তাদের পূর্ববর্তী দলগুলোর সাথে করা হয়েছিল।” (৩৪:৫৪)তারা যা কিছু করেছে সবই তাদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলার বিশ্বস্ত ফেরেশতাগণের হাতে রক্ষিত আছে। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সবকিছুই আছে লিপিবদ্ধ। এমন কিছুই নেই লিখতে ছুটে গেছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! গুনাহকে তুচ্ছ মনে করো না, জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে এরও জবাবদিহি করতে হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত সুলাইমান ইবনে মুগীরা (রঃ) বলেনঃ “একদা আমি একটা গুনাহ করে ফেলি যেটাকে আমি অতি নগণ্য মনে করি। রাত্রে স্বপ্নে দেখি যে, একজন আগন্তুক এসে আমাকে বলছেনঃ হে সুলাইমান (রঃ)! (আরবী) অর্থাৎ “ছোট গুনাহগুলোকেও ছোট ও তুচ্ছ মনে করো না, এই ছোট গুনাহগুলোই বড় গুনাহ হয়ে যাবে। পাপ যদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রও হয় এবং ওগুলো করার পর বহু যুগ অতিবাহিত হয়েও যায় তথাপি ওগুলো আল্লাহ তাআলার কাছে স্পষ্টভাবে লিখিত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। পাপ হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো এবং এরূপ হয়ো না যে, অত্যন্ত ভারী হয়ে পুণ্যকার্যের দিকে এগিয়ে যাবে, বরং অঞ্চল উঁচু করে পুণ্য কাজের দিকে অগ্রসর হও। যখন কেউ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহকে মহব্বত করে তখন তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে চিন্তা-গবেষণার অভ্যাসের ইলহাম করা হয়। স্বীয় প্রতিপালকের নিকট হিদায়াত যাঞা কর এবং নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ কর। হিদায়াত ও সাহায্যকারী হিসেবে আল্লাহ তাআলাই তোমার জন্যে যথেষ্ট।” এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ সৎ এবং আল্লাহভীরু লোকেদের অবস্থা হবে। এই পাপী ও অপরাধী লোকেদের অবস্থার বিপরীত। এরা তো থাকবে বিপদ ও কষ্টের মধ্যে এবং অধঃমুখে তারা নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামে। আর এদের উপর হবে কঠিন ধমক ও শাসন গর্জন। পক্ষান্তরে ঐ সৎ ও আল্লাহভীরু থাকবে স্রোতস্বিনী বিধৌত জান্নাতে। তারা মর্যাদা ও সম্মান, সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ, দান ও ইহসান, সুখ ও শান্তি, নিয়ামত ও রহমত এবং সুন্দর ও মনোরম বাসভবনে অবস্থান করবে। অধিপতি ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে তারা গৌরবান্বিত হবে। যে আল্লাহ সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা এবং সবারই ভাগ্য নির্ধারণকারী। যিনি সবকিছুরই উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি ঐ আল্লাহভীরু লোকদের সব চাহিদাই পূর্ণ করবেন। তাদের মনোবাসনা মিটাতে মোটেই কার্পণ্য করবেন না তিনি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আদল ও ইনসাফকারী সৎলোকেরা আল্লাহ তা'আলার নিকট আলোর মিম্বরের উপর রহমানের (করুণাময় আল্লাহর) ডান দিকে থাকবে। আল্লাহ তাআলার দুই হাতই ডানই বটে। এই ন্যায় বিচারক ও ন্যায়পরায়ণ লোক ওরাই যারা তাদের আদেশসমূহে, নিজেদের পরিবার পরিজনের মধ্যে এবং যা কিছু তাদের অধিকারে রয়েছে সবগুলোর মধ্যেই আল্লাহর ফরমানের ব্যতিক্রম করে , বরং আদল ও ইনসাফের সাথেই কাজ করে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-কামার 54:54
৪৭-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: পাপী ও অপরাধী লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তারা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে এবং সত্য পথ হতে সরে গেছে। তারা সন্দেহ ও দুর্ভাবনার মধ্যে পতিত হয়েছে। এই দুষ্ট ও দুরাচার লোকগুলো কাফিরই হোক অথবা অন্য কোন দলের অপরাধী ও পাপী লোকই হোক, তাদের এই দুষ্কর্ম তাদেরকে উল্টোমুখে জাহান্নামের দিকে টানতে টানতে নিয়ে যাবে। এখানে যেমন তারা উদাসীন রয়েছে, তেমনই ওখানেও তারা বে-খবর থাকবে যে, না জানি তাদেরকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবেঃ তোমরা এখন জাহান্নামের অগ্নির স্বাদ গ্রহণ কর। মহান আল্লাহ বলেনঃ 'আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর ওর পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন।" (২৫:২) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার সুমহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর। যিনি সৃষ্টি করেন ও সুঠাম করেন। আর যিনি পরিমিত বিকাশ সাধন করেন ও পথ-নির্দেশ করেন।” (৮৭:১-৩)। আহলে সুন্নাতের ইমামগণ এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুককে সৃষ্টি করার পূর্বেই তার ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন এবং প্রত্যেক জিনিস প্রকাশিত হবার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলার কাছে লিখিত হয়ে গেছে। কাদরিয়া সম্প্রদায় এটা অস্বীকার করে। এ লোকগুলো সাহাবীদের (রাঃ) আখেরী যুগেই বেরিয়ে পড়েছিল। আহলে সুন্নাত ঐ লোকেদের মাযহাবের বিপক্ষে এই প্রকারের আয়াতগুলোকে পেশ করে থাকেন। আর এই বিষয়ের হাদীসগুলোকেও আমরা সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমানের ব্যাখ্যায় এই মাসআলার বিস্তারিত আলোচনায় লিপিবদ্ধ করেছি। এখানে শুধু ঐ হাদীসগুলো লিপিবদ্ধ করা হলো যেগুলো আয়াতের বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, মুশরিক কুরায়েশরা নবী (সঃ)-এর কাছে এসে তকদীর সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করে। তখন (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে আয়েব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, এ আয়াতগুলো তকদীর অস্বীকারকারীদের প্রতিবাদে অবতীর্ণ হয়।” (এটা বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যারারাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এ আয়াতগুলো পাঠ করে বলেনঃ “এই আয়াতগুলো আমার উম্মতের ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে যারা শেষ যামানায় জন্মলাভ করবে এবং তকদীরকে অবিশ্বাস করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আতা ইবনে আবি রিবাহ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি। ঐ সময় তিনি যমযম কূপ হতে পানি উঠাচ্ছিলেন। তাঁর কাপড়ের অঞ্চল ভিজা ছিল। আমি বললামঃ তকদীরের ব্যাপারে সমালোচনা করা হচ্ছে। কেউ এই মাসআলার পক্ষে রয়েছে এবং কেউ বিপক্ষে রয়েছে। তিনি তখন বললেনঃ “জনগণ এরূপ করছে।” আমি বললামঃ হ্যাঁ, এরূপই হচ্ছে। তখন তিনি বললেনঃ “আল্লাহর শপথ (আরবী)-এ আয়াতগুলো তাদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ। হয়েছে। জেনে রেখো যে, এ লোকগুলো হলো এই উম্মতের নিকৃষ্টতম লোক। তারা রোগাক্রান্ত হলে তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না। তাদের কাউকেও যদি আমি আমার সামনে দেখতে পাই তবে আমার অঙ্গুলি দ্বারা তার চক্ষু উঠিয়ে নিবো।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলা হলো, এমন একজন লোক এসেছে যে তকদীরকে বিশ্বাস করে না। তখন তিনি বললেন, আচ্ছা, তোমরা আমাকে তার। কাছে নিয়ে চল। জনগণ বললো, আপনি তো অন্ধ, সুতরাং আপনি তার কাছে গিয়ে কি করবেন? উত্তরে তিনি বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি আমি তাকে হাতে পাই তবে তার নাক কেটে নিবো এবং যদি তার গর্দান ধরতে পারি তবে তা উড়িয়ে দিবো। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে, বানু কাহরের নারীরা খাযরাজের চতুর্দিকে তাওয়াফ করতে আছে। তাদের দেহ নড়াচড়া করছে। তারা মুশরিকা নারী। এই উম্মতের প্রথম শিরক এটাই। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তাদের নির্বুদ্ধিতা এতো চরমে পৌঁছে যাবে যে, তারা আল্লাহ তাআলাকে কল্যাণ নির্ধারণকারী বলেও স্বীকার করবে না। যেমন তাকে অকল্যাণ নির্ধারণকারী বলে স্বীকার করেনি।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত নাফে' (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সিরিয়াবাসী একজন বন্ধু ছিল, যার সাথে তাঁর পত্র আদান প্রদান চলতো। তিনি শুনতে পেলেন যে, তাঁর ঐ বন্ধুটি তকদীর সম্পর্কে কিছু সমালোচনা করে থাকে। সুতরাং তৎক্ষণাৎ তিনি তাকে পত্র লিখেন- আমি শুনতে পেয়েছি যে, তুমি নাকি তকদীরের ব্যাপারে কিছু বিরূপ মন্তব্য করে থাকে। যদি একথা সত্য হয় তবে আজ হতে তুমি আমার নিকট থেকে কোন পত্র প্রাপ্তির আশা করো না। আজ হতে তোমার সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমার উম্মতের মধ্যে তকন্দীরকে অবিশ্বাসকারী লোকের আবির্ভাব ঘটবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে মাজুস (প্রাচীন পারসিক যাজক মণ্ডলী) থাকে। আমার উম্মতের মাজুসী হলো ঐ লোকগুলো যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না। তারা রোগাক্রান্ত হলে তোমরা তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তোমরা তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না।” (মুসনাদে আহমাদে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শীঘ্রই এই উম্মতের মধ্যে মাসখ’ হবে (অর্থাৎ লোকদের আকৃতি পরিবর্তিত হবে), জেনে রেখো যে, এ অবস্থা ঐ লোকদের হবে যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না এবং যারা যিনদীক (অর্থাৎ আল্লাহর একত্বে অবিশ্বাসী)।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামেউত তিরমিযীতেও এ হাদীসটি রয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জিনিসই আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাপে রয়েছে, এমনকি অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাও।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর এবং অপারগ ও নির্বোধ হয়ো না। অতঃপর যদি কোন ক্ষতি হয়ে যায় তবে বলো যে, এটা আল্লাহ কর্তৃকই নির্ধারিত ছিল এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। আর এরূপ কথা বলো নাঃ যদি এরূপ করতাম তবে এরূপ হতো। কেননা, এই ভাবে যদি বলাতে শয়তানী আমলের দরযা খুলে যায়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, যদি সমস্ত উম্মত একত্রিত হয়ে তোমার ঐ উপকার করার ইচ্ছা করে যা আল্লাহ তা'আলা তোমার ভাগ্যে লিখেননি তবে তারা তোমার ঐ উপকার কখনো করতে পারবে না। পক্ষান্তরে, যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তোমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা করে যা তোমার তকদীরে লিখা নেই তবে কখনো তারা তোমার ঐ ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। কলম শুকিয়ে গেছে এবং দফতর জড়িয়ে নিয়ে ভাঁজ করে দেয়া হয়েছে।হযরত ওয়ালীদ ইবনে উবাদাহ (রঃ)-এর পিতা হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ) যখন রোগ শয্যায় শায়িত হন এবং তাঁর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে যায় তখন হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তাঁর পিতাকে বলেনঃ “হে পিতঃ! আমাদেরকে কিছু অন্তিম উপদেশ দিন!” তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা, আমাকে বসিয়ে দাও।” তাকে বসিয়ে দেয়া হলে তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! ঈমানের স্বাদ তুমি গ্রহণ করতে পার না এবং আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে তোমার যে জ্ঞান রয়েছে তার শেষ সীমায় তুমি পৌঁছতে পার না যে পর্যন্ত না তকদীরের ভাল মন্দের উপর তোমার বিশ্বাস হয়।” হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তখন জিজ্ঞেস করলেনঃ “আব্বা! কি করে আমি জানতে পারবো যে, তকদীরের ভাল মন্দের উপর আমার ঈমান রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এই ভাবে তুমি জানতে পারবে যে, তুমি যা পেয়েছে তা পাওয়ারই ছিল এবং যা পাওনি তা পাওয়ারই ছিল না এই বিশ্বাস যখন তোমার থাকবে। হে আমার প্রিয় বৎস! জেনে রেখো যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে শুনেছিঃ “আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং ওকে বলেনঃ ‘লিখো।' তখনই কলম উঠে গেল এবং কিয়ামত পর্যন্ত যতো কিছু হবার আছে সবই লিখে ফেললো।” হে আমার প্রিয় ছেলে! যদি তুমি তোমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই বিশ্বাসের উপর না থাকো তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ ঈমানদার হতে পারে না যে পর্যন্ত না সে চারটির উপর ঈমান আনে। (এক) সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা’রূদ নেই, (দুই) আর সাক্ষ্য দেবে যে, আমি (মুহাম্মাদ সঃ) আল্লাহর রাসূল, তিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, (তিন) মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর বিশ্বাস রাখে এবং (চার) তকদীরের ভাল মন্দের উপর ঈমান আনে।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং দাউদ তায়ালেসী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ্তেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের তকদীর লিপিবদ্ধ করেছেন। ঐ সময় তাঁর আরশ পানির উপর ছিল।” (ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম।তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ গারীব বলেছেন)এরপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় ইচ্ছা ও আহকাম বিনা বাধায় জারী হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি নির্ধারণ করেছি তা যেমন হবেই, ঠিক তেমনি যে কাজের আমি ইচ্ছা করি তার জন্যে শুধু একবার ‘হও' বলাই যথেষ্ট হয়ে যায়, দ্বিতীয়বার গুরুত্বের জন্যে হুকুম দেয়ার কোনই প্রয়োজন হয় না। চোখের পলক ফেলা মাত্রই ঐ কাজ আমার চাহিদা অনুযায়ী হয়ে যায়। আরব কবি কি সুন্দরই না বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যখনই কোন কাজ করার ইচ্ছা করেন তখন শুধু বলেন হয়ে যাও’ আর তখনই তা হয়ে যায়।”আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমি ধ্বংস করেছি তোমাদের মত দলগুলোকে, অতএব ওটা হতে উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? আমার তাদেরকে শাস্তিদান ও লাঞ্ছিতকরণের মধ্যে তোমাদের জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ নেই কি? যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের এবং তাদের কামনা-বাসনার মধ্যে পর্দা ফেলে দেয়া হয়েছে, যেমন তাদের পূর্ববর্তী দলগুলোর সাথে করা হয়েছিল।” (৩৪:৫৪)তারা যা কিছু করেছে সবই তাদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলার বিশ্বস্ত ফেরেশতাগণের হাতে রক্ষিত আছে। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সবকিছুই আছে লিপিবদ্ধ। এমন কিছুই নেই লিখতে ছুটে গেছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! গুনাহকে তুচ্ছ মনে করো না, জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে এরও জবাবদিহি করতে হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত সুলাইমান ইবনে মুগীরা (রঃ) বলেনঃ “একদা আমি একটা গুনাহ করে ফেলি যেটাকে আমি অতি নগণ্য মনে করি। রাত্রে স্বপ্নে দেখি যে, একজন আগন্তুক এসে আমাকে বলছেনঃ হে সুলাইমান (রঃ)! (আরবী) অর্থাৎ “ছোট গুনাহগুলোকেও ছোট ও তুচ্ছ মনে করো না, এই ছোট গুনাহগুলোই বড় গুনাহ হয়ে যাবে। পাপ যদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রও হয় এবং ওগুলো করার পর বহু যুগ অতিবাহিত হয়েও যায় তথাপি ওগুলো আল্লাহ তাআলার কাছে স্পষ্টভাবে লিখিত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। পাপ হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো এবং এরূপ হয়ো না যে, অত্যন্ত ভারী হয়ে পুণ্যকার্যের দিকে এগিয়ে যাবে, বরং অঞ্চল উঁচু করে পুণ্য কাজের দিকে অগ্রসর হও। যখন কেউ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহকে মহব্বত করে তখন তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে চিন্তা-গবেষণার অভ্যাসের ইলহাম করা হয়। স্বীয় প্রতিপালকের নিকট হিদায়াত যাঞা কর এবং নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ কর। হিদায়াত ও সাহায্যকারী হিসেবে আল্লাহ তাআলাই তোমার জন্যে যথেষ্ট।” এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ সৎ এবং আল্লাহভীরু লোকেদের অবস্থা হবে। এই পাপী ও অপরাধী লোকেদের অবস্থার বিপরীত। এরা তো থাকবে বিপদ ও কষ্টের মধ্যে এবং অধঃমুখে তারা নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামে। আর এদের উপর হবে কঠিন ধমক ও শাসন গর্জন। পক্ষান্তরে ঐ সৎ ও আল্লাহভীরু থাকবে স্রোতস্বিনী বিধৌত জান্নাতে। তারা মর্যাদা ও সম্মান, সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ, দান ও ইহসান, সুখ ও শান্তি, নিয়ামত ও রহমত এবং সুন্দর ও মনোরম বাসভবনে অবস্থান করবে। অধিপতি ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে তারা গৌরবান্বিত হবে। যে আল্লাহ সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা এবং সবারই ভাগ্য নির্ধারণকারী। যিনি সবকিছুরই উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি ঐ আল্লাহভীরু লোকদের সব চাহিদাই পূর্ণ করবেন। তাদের মনোবাসনা মিটাতে মোটেই কার্পণ্য করবেন না তিনি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আদল ও ইনসাফকারী সৎলোকেরা আল্লাহ তা'আলার নিকট আলোর মিম্বরের উপর রহমানের (করুণাময় আল্লাহর) ডান দিকে থাকবে। আল্লাহ তাআলার দুই হাতই ডানই বটে। এই ন্যায় বিচারক ও ন্যায়পরায়ণ লোক ওরাই যারা তাদের আদেশসমূহে, নিজেদের পরিবার পরিজনের মধ্যে এবং যা কিছু তাদের অধিকারে রয়েছে সবগুলোর মধ্যেই আল্লাহর ফরমানের ব্যতিক্রম করে , বরং আদল ও ইনসাফের সাথেই কাজ করে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-কামার 54:55
৪৭-৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: পাপী ও অপরাধী লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তারা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে এবং সত্য পথ হতে সরে গেছে। তারা সন্দেহ ও দুর্ভাবনার মধ্যে পতিত হয়েছে। এই দুষ্ট ও দুরাচার লোকগুলো কাফিরই হোক অথবা অন্য কোন দলের অপরাধী ও পাপী লোকই হোক, তাদের এই দুষ্কর্ম তাদেরকে উল্টোমুখে জাহান্নামের দিকে টানতে টানতে নিয়ে যাবে। এখানে যেমন তারা উদাসীন রয়েছে, তেমনই ওখানেও তারা বে-খবর থাকবে যে, না জানি তাদেরকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবেঃ তোমরা এখন জাহান্নামের অগ্নির স্বাদ গ্রহণ কর। মহান আল্লাহ বলেনঃ 'আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর ওর পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন।" (২৫:২) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার সুমহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর। যিনি সৃষ্টি করেন ও সুঠাম করেন। আর যিনি পরিমিত বিকাশ সাধন করেন ও পথ-নির্দেশ করেন।” (৮৭:১-৩)। আহলে সুন্নাতের ইমামগণ এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুককে সৃষ্টি করার পূর্বেই তার ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন এবং প্রত্যেক জিনিস প্রকাশিত হবার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলার কাছে লিখিত হয়ে গেছে। কাদরিয়া সম্প্রদায় এটা অস্বীকার করে। এ লোকগুলো সাহাবীদের (রাঃ) আখেরী যুগেই বেরিয়ে পড়েছিল। আহলে সুন্নাত ঐ লোকেদের মাযহাবের বিপক্ষে এই প্রকারের আয়াতগুলোকে পেশ করে থাকেন। আর এই বিষয়ের হাদীসগুলোকেও আমরা সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমানের ব্যাখ্যায় এই মাসআলার বিস্তারিত আলোচনায় লিপিবদ্ধ করেছি। এখানে শুধু ঐ হাদীসগুলো লিপিবদ্ধ করা হলো যেগুলো আয়াতের বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, মুশরিক কুরায়েশরা নবী (সঃ)-এর কাছে এসে তকদীর সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করে। তখন (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে আয়েব (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, এ আয়াতগুলো তকদীর অস্বীকারকারীদের প্রতিবাদে অবতীর্ণ হয়।” (এটা বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যারারাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) এ আয়াতগুলো পাঠ করে বলেনঃ “এই আয়াতগুলো আমার উম্মতের ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে যারা শেষ যামানায় জন্মলাভ করবে এবং তকদীরকে অবিশ্বাস করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আতা ইবনে আবি রিবাহ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি। ঐ সময় তিনি যমযম কূপ হতে পানি উঠাচ্ছিলেন। তাঁর কাপড়ের অঞ্চল ভিজা ছিল। আমি বললামঃ তকদীরের ব্যাপারে সমালোচনা করা হচ্ছে। কেউ এই মাসআলার পক্ষে রয়েছে এবং কেউ বিপক্ষে রয়েছে। তিনি তখন বললেনঃ “জনগণ এরূপ করছে।” আমি বললামঃ হ্যাঁ, এরূপই হচ্ছে। তখন তিনি বললেনঃ “আল্লাহর শপথ (আরবী)-এ আয়াতগুলো তাদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ। হয়েছে। জেনে রেখো যে, এ লোকগুলো হলো এই উম্মতের নিকৃষ্টতম লোক। তারা রোগাক্রান্ত হলে তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না। তাদের কাউকেও যদি আমি আমার সামনে দেখতে পাই তবে আমার অঙ্গুলি দ্বারা তার চক্ষু উঠিয়ে নিবো।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলা হলো, এমন একজন লোক এসেছে যে তকদীরকে বিশ্বাস করে না। তখন তিনি বললেন, আচ্ছা, তোমরা আমাকে তার। কাছে নিয়ে চল। জনগণ বললো, আপনি তো অন্ধ, সুতরাং আপনি তার কাছে গিয়ে কি করবেন? উত্তরে তিনি বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি আমি তাকে হাতে পাই তবে তার নাক কেটে নিবো এবং যদি তার গর্দান ধরতে পারি তবে তা উড়িয়ে দিবো। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে, বানু কাহরের নারীরা খাযরাজের চতুর্দিকে তাওয়াফ করতে আছে। তাদের দেহ নড়াচড়া করছে। তারা মুশরিকা নারী। এই উম্মতের প্রথম শিরক এটাই। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তাদের নির্বুদ্ধিতা এতো চরমে পৌঁছে যাবে যে, তারা আল্লাহ তাআলাকে কল্যাণ নির্ধারণকারী বলেও স্বীকার করবে না। যেমন তাকে অকল্যাণ নির্ধারণকারী বলে স্বীকার করেনি।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত নাফে' (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সিরিয়াবাসী একজন বন্ধু ছিল, যার সাথে তাঁর পত্র আদান প্রদান চলতো। তিনি শুনতে পেলেন যে, তাঁর ঐ বন্ধুটি তকদীর সম্পর্কে কিছু সমালোচনা করে থাকে। সুতরাং তৎক্ষণাৎ তিনি তাকে পত্র লিখেন- আমি শুনতে পেয়েছি যে, তুমি নাকি তকদীরের ব্যাপারে কিছু বিরূপ মন্তব্য করে থাকে। যদি একথা সত্য হয় তবে আজ হতে তুমি আমার নিকট থেকে কোন পত্র প্রাপ্তির আশা করো না। আজ হতে তোমার সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমার উম্মতের মধ্যে তকন্দীরকে অবিশ্বাসকারী লোকের আবির্ভাব ঘটবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে মাজুস (প্রাচীন পারসিক যাজক মণ্ডলী) থাকে। আমার উম্মতের মাজুসী হলো ঐ লোকগুলো যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না। তারা রোগাক্রান্ত হলে তোমরা তাদেরকে দেখতে যেয়ো না এবং তারা মারা গেলে তোমরা তাদের জানাযায় হাযির হয়ো না।” (মুসনাদে আহমাদে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শীঘ্রই এই উম্মতের মধ্যে মাসখ’ হবে (অর্থাৎ লোকদের আকৃতি পরিবর্তিত হবে), জেনে রেখো যে, এ অবস্থা ঐ লোকদের হবে যারা তকদীরে বিশ্বাস করে না এবং যারা যিনদীক (অর্থাৎ আল্লাহর একত্বে অবিশ্বাসী)।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামেউত তিরমিযীতেও এ হাদীসটি রয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জিনিসই আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাপে রয়েছে, এমনকি অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাও।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর এবং অপারগ ও নির্বোধ হয়ো না। অতঃপর যদি কোন ক্ষতি হয়ে যায় তবে বলো যে, এটা আল্লাহ কর্তৃকই নির্ধারিত ছিল এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। আর এরূপ কথা বলো নাঃ যদি এরূপ করতাম তবে এরূপ হতো। কেননা, এই ভাবে যদি বলাতে শয়তানী আমলের দরযা খুলে যায়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, যদি সমস্ত উম্মত একত্রিত হয়ে তোমার ঐ উপকার করার ইচ্ছা করে যা আল্লাহ তা'আলা তোমার ভাগ্যে লিখেননি তবে তারা তোমার ঐ উপকার কখনো করতে পারবে না। পক্ষান্তরে, যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তোমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা করে যা তোমার তকদীরে লিখা নেই তবে কখনো তারা তোমার ঐ ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। কলম শুকিয়ে গেছে এবং দফতর জড়িয়ে নিয়ে ভাঁজ করে দেয়া হয়েছে।হযরত ওয়ালীদ ইবনে উবাদাহ (রঃ)-এর পিতা হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ) যখন রোগ শয্যায় শায়িত হন এবং তাঁর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে যায় তখন হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তাঁর পিতাকে বলেনঃ “হে পিতঃ! আমাদেরকে কিছু অন্তিম উপদেশ দিন!” তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা, আমাকে বসিয়ে দাও।” তাকে বসিয়ে দেয়া হলে তিনি বলেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! ঈমানের স্বাদ তুমি গ্রহণ করতে পার না এবং আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে তোমার যে জ্ঞান রয়েছে তার শেষ সীমায় তুমি পৌঁছতে পার না যে পর্যন্ত না তকদীরের ভাল মন্দের উপর তোমার বিশ্বাস হয়।” হযরত ওয়ালীদ (রঃ) তখন জিজ্ঞেস করলেনঃ “আব্বা! কি করে আমি জানতে পারবো যে, তকদীরের ভাল মন্দের উপর আমার ঈমান রয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এই ভাবে তুমি জানতে পারবে যে, তুমি যা পেয়েছে তা পাওয়ারই ছিল এবং যা পাওনি তা পাওয়ারই ছিল না এই বিশ্বাস যখন তোমার থাকবে। হে আমার প্রিয় বৎস! জেনে রেখো যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে শুনেছিঃ “আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং ওকে বলেনঃ ‘লিখো।' তখনই কলম উঠে গেল এবং কিয়ামত পর্যন্ত যতো কিছু হবার আছে সবই লিখে ফেললো।” হে আমার প্রিয় ছেলে! যদি তুমি তোমার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই বিশ্বাসের উপর না থাকো তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ ঈমানদার হতে পারে না যে পর্যন্ত না সে চারটির উপর ঈমান আনে। (এক) সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা’রূদ নেই, (দুই) আর সাক্ষ্য দেবে যে, আমি (মুহাম্মাদ সঃ) আল্লাহর রাসূল, তিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, (তিন) মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর বিশ্বাস রাখে এবং (চার) তকদীরের ভাল মন্দের উপর ঈমান আনে।” (এ হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং দাউদ তায়ালেসী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ্তেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের তকদীর লিপিবদ্ধ করেছেন। ঐ সময় তাঁর আরশ পানির উপর ছিল।” (ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম।তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ গারীব বলেছেন)এরপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় ইচ্ছা ও আহকাম বিনা বাধায় জারী হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ আমি নির্ধারণ করেছি তা যেমন হবেই, ঠিক তেমনি যে কাজের আমি ইচ্ছা করি তার জন্যে শুধু একবার ‘হও' বলাই যথেষ্ট হয়ে যায়, দ্বিতীয়বার গুরুত্বের জন্যে হুকুম দেয়ার কোনই প্রয়োজন হয় না। চোখের পলক ফেলা মাত্রই ঐ কাজ আমার চাহিদা অনুযায়ী হয়ে যায়। আরব কবি কি সুন্দরই না বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যখনই কোন কাজ করার ইচ্ছা করেন তখন শুধু বলেন হয়ে যাও’ আর তখনই তা হয়ে যায়।”আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমি ধ্বংস করেছি তোমাদের মত দলগুলোকে, অতএব ওটা হতে উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? আমার তাদেরকে শাস্তিদান ও লাঞ্ছিতকরণের মধ্যে তোমাদের জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ নেই কি? যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের এবং তাদের কামনা-বাসনার মধ্যে পর্দা ফেলে দেয়া হয়েছে, যেমন তাদের পূর্ববর্তী দলগুলোর সাথে করা হয়েছিল।” (৩৪:৫৪)তারা যা কিছু করেছে সবই তাদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলার বিশ্বস্ত ফেরেশতাগণের হাতে রক্ষিত আছে। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সবকিছুই আছে লিপিবদ্ধ। এমন কিছুই নেই লিখতে ছুটে গেছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! গুনাহকে তুচ্ছ মনে করো না, জেনে রেখো যে, আল্লাহর কাছে এরও জবাবদিহি করতে হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত সুলাইমান ইবনে মুগীরা (রঃ) বলেনঃ “একদা আমি একটা গুনাহ করে ফেলি যেটাকে আমি অতি নগণ্য মনে করি। রাত্রে স্বপ্নে দেখি যে, একজন আগন্তুক এসে আমাকে বলছেনঃ হে সুলাইমান (রঃ)! (আরবী) অর্থাৎ “ছোট গুনাহগুলোকেও ছোট ও তুচ্ছ মনে করো না, এই ছোট গুনাহগুলোই বড় গুনাহ হয়ে যাবে। পাপ যদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রও হয় এবং ওগুলো করার পর বহু যুগ অতিবাহিত হয়েও যায় তথাপি ওগুলো আল্লাহ তাআলার কাছে স্পষ্টভাবে লিখিত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। পাপ হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো এবং এরূপ হয়ো না যে, অত্যন্ত ভারী হয়ে পুণ্যকার্যের দিকে এগিয়ে যাবে, বরং অঞ্চল উঁচু করে পুণ্য কাজের দিকে অগ্রসর হও। যখন কেউ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহকে মহব্বত করে তখন তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে চিন্তা-গবেষণার অভ্যাসের ইলহাম করা হয়। স্বীয় প্রতিপালকের নিকট হিদায়াত যাঞা কর এবং নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ কর। হিদায়াত ও সাহায্যকারী হিসেবে আল্লাহ তাআলাই তোমার জন্যে যথেষ্ট।” এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ সৎ এবং আল্লাহভীরু লোকেদের অবস্থা হবে। এই পাপী ও অপরাধী লোকেদের অবস্থার বিপরীত। এরা তো থাকবে বিপদ ও কষ্টের মধ্যে এবং অধঃমুখে তারা নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামে। আর এদের উপর হবে কঠিন ধমক ও শাসন গর্জন। পক্ষান্তরে ঐ সৎ ও আল্লাহভীরু থাকবে স্রোতস্বিনী বিধৌত জান্নাতে। তারা মর্যাদা ও সম্মান, সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ, দান ও ইহসান, সুখ ও শান্তি, নিয়ামত ও রহমত এবং সুন্দর ও মনোরম বাসভবনে অবস্থান করবে। অধিপতি ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে তারা গৌরবান্বিত হবে। যে আল্লাহ সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা এবং সবারই ভাগ্য নির্ধারণকারী। যিনি সবকিছুরই উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি ঐ আল্লাহভীরু লোকদের সব চাহিদাই পূর্ণ করবেন। তাদের মনোবাসনা মিটাতে মোটেই কার্পণ্য করবেন না তিনি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আদল ও ইনসাফকারী সৎলোকেরা আল্লাহ তা'আলার নিকট আলোর মিম্বরের উপর রহমানের (করুণাময় আল্লাহর) ডান দিকে থাকবে। আল্লাহ তাআলার দুই হাতই ডানই বটে। এই ন্যায় বিচারক ও ন্যায়পরায়ণ লোক ওরাই যারা তাদের আদেশসমূহে, নিজেদের পরিবার পরিজনের মধ্যে এবং যা কিছু তাদের অধিকারে রয়েছে সবগুলোর মধ্যেই আল্লাহর ফরমানের ব্যতিক্রম করে , বরং আদল ও ইনসাফের সাথেই কাজ করে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর-রাহমান 55:1
হযরত যার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “ (আরবী)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হবে, না (আরবী) হবে?” তখন তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পূর্ণটাই পড়েছো?" সে উত্তর দেয়ঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা এক রাকআতে পড়ে থাকি।” তিনি তখন বলেনঃ “কবিতা যেমন তাড়াতাড়ি পড়া হয়, তুমি হয়তো এই ভাবেই কুরআনও পড়ে থাকো? এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপারই বটে। আল্লাহর নবী (সঃ) মুফাসসালের প্রাথমিক সূরাগুলোর কোন দুটি সূরা মিলিয়ে পড়তেন তা আমার খুব ভাল স্মরণ আছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে মুফাসসালের সর্বপ্রথম সূরা হলো এই সূরায়ে রহমান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের (রাঃ) সমাবেশে আগমন করেন এবং সূরায়ে রহমান প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নীরবে শুনতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি জ্বিনের রাত্রে এ সূরাটি পাঠ করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তমরূপে জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি (আরবী)-এই আয়াতে এসেছি তখনই তারা জবাবে বলেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার অনুগ্রহ সমূহের কোন অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্যে।” এই রিওয়াইয়াতটিই তাফসীরে ইবনে জারীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই এই সূরাটি পাঠ করেছিলেন অথবা তার সামনে এটা পাঠ করা হয়েছিল। ঐ সময় সাহাবীদেরকে নীরব থাকতে দেখে তিনি একথা বলেছিলেন। আর জ্বিনদের উত্তরের শব্দগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালকের এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি।” ১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় ফল ও করমে ওর মুখস্থকরণ খুবই সহজ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। এটা হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি। আর যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, দ্বারা ভাল ও মন্দ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথা বলা শিখানো অর্থ নেয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত। কারণ এর সাথে সাথেই কুরআন শিক্ষা দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা তিলাওয়াতে কুরআন বুঝানো হয়েছে। আর তিলাওয়াতে কুরআন কথা বলা সহজ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক অক্ষরকে ওর মাখরাজ হতে জিহ্বা বিনা কষ্টে আদায় করে থাকে। তা কণ্ঠ হতে বের হোক অথবা ওষ্ঠাধরকে মিলানোর মাধ্যমেই হোক। বিভিন্ন মাখরাজ এবং বিভিন্ন প্রকারের অক্ষরের উচ্চারণের পদ্ধতি আল্লাহ তা'আলা মানুষকে শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এতদুভয়ের আবর্তনের মধ্যে আছে টক্কর এবং না আছে কোন অস্থিরতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে চন্দ্রের নাগাল পায় এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) সকালকে বেরকারী, রাত্রিকে তিনি আরাম ও বিশ্রামের সময় বানিয়েছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের উপর রেখেছেন, এটা হলো পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।” (৬:৯৬)হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যদি সমস্ত মানুষের, জ্বিনের, চতুষ্পদ জন্তুসমূহের এবং পক্ষীকূলের চক্ষুগুলোর দৃষ্টিশক্তি একটি মাত্র মানুষের চোখে দিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূর্যের সামনে যে সত্তরটি পর্দা রয়েছে ওগুলোর মধ্যে একটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তবুও সম্ভব নয় যে, এই লোকটিও সূর্যের দিকে তাকাতে পারে। অথচ সূর্যের আলো কুরসীর আলোর সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং এটা চিন্তা করার বিষয় যে, আল্লাহ স্বীয় জান্নাতী বান্দাদের চোখে কি পরিমাণ নূর দিবেন যে, তারা তাদের মহান প্রতিপালকের চেহারাকেও খোলাখুলিভাবে তাদের চক্ষু দ্বারা বিনা বাধায় দেখতে পাবে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মেনে চলে তাঁরই বিধান। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, (আরবী) বলা হয় ঐ গাছকে যে গাছের গুঁড়ি আছে। কিন্তু (আরবী) এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, গুঁড়ি বিহীন লতা গাছকে (আরবী) বলা হয়, যে গাছ মাটির উপর ছড়িয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ তারকা যা আকাশে রয়েছে। এ উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান, যদিও প্রথম উক্তিটিকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) পছন্দ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটিও দ্বিতীয় উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।” (২২:১৮)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড অর্থাৎ আদল ও ইনসাফ। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (৫৭:২৫) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে সত্য ও ন্যায়ের সাথে সৃষ্টি করেছেন যাতে সমস্ত জিনিস সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকে। তাই তিনি বলেনঃ ওযনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওযনে কম দিয়ো না। অর্থাৎ যখন ওযন করবে তখন সঠিকভাবে ওযন করবে। কম-বেশী করবে না। অর্থাৎ নেয়ার সময় বেশী নিবে এবং দেয়ার সময় কম দিবে এরূপ করো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ন্যায়ের দণ্ড সোজা রেখে ওযন করো।” (১৭:৩৫)আল্লাহ তা'আলা আকাশকে সমুন্নত করেছেন, আর পৃথিবীকে নীচু করে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাতে মযবুত পাহাড় পর্বতকে পেরেকের মত করে গেড়ে দিয়েছেন যাতে এটা হেলা-দোলা ও নড়াচড়া না করে। আর তাতে যেসব সৃষ্টজীব বসবাস করছে তারা যেন শান্তিতে অবস্থান করতে পারে। হে মানুষ! তোমরা যমীনের সৃষ্টজীবের প্রতি লক্ষ্য করো, ওগুলোর বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ও সীমাহীন ক্ষমতার পরিমাপ করে নাও। সাথে সাথে যমীনের উৎপাদিত জিনিসের দিকে চেয়ে দেখো। এতে রঙ বেরঙ এর টক-মিষ্ট ফল, নানা প্রকারের সুগন্ধি বিশিষ্ট ফল। বিশেষ করে খেজুর বৃক্ষ যা একটি উপকারী বৃক্ষ এবং যা রোপিত হওয়ার পর হতে নিয়ে শুকনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এবং এর পরেও খাওয়ার কাজ দেয়। খেজুর একটি সাধারণ ফল। ওর উপর খোসা থাকে যাকে ভেদ করে এটা বের হয়ে আসে। অতঃপর ওটা হয় কাদার মত, এরপর হয় রসাল এবং এরপর পেকে গিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এটা খুবই উপকারী। আর এর গাছও হয় খুব সোজা ও সুন্দর।হযরত শা'বী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেনঃ “আমার দূত আপনার নিকট হতে ফিরে এসে বলেছে যে, আপনার ওখানে নাকি একটি বক্ষ রয়েছে যার মত স্বভাব বা প্রকৃতি অন্য কোন গাছের মধ্যে নেই। ওটা গর্দভের কানের মত যমীন হতে বের হয়। তারপর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে মুক্তার মত হয়, এরপর সবুজ বর্ণ ধারণ করে পান্নার (মূল্যবান সবুজ পাথর বিশেষ) মত হয়ে যায়, তারপর লাল বর্ণ। ধারণ করে লাল ইয়াকৃত বা পদ্মরাগের মত হয়। এরপর পেকে গিয়ে অতি উত্তম ও সুস্বাদু ফলে পরিণত হয়। তারপর শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের রক্ষণ এবং মুসাফিরদের পাথেয় হয়। সুতরাং যদি আমার দূতের বর্ণনা সত্য হয় তবে আমার ধারণায় এটা জান্নাতী গাছ।" তাঁর এই পত্রের জবাবে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাকে লিখেনঃ “এই পত্র আল্লাহর দাস এবং মুসলমানদের নেতা উমার (রাঃ)-এর পক্ষ হতে রোমক সম্রাট কায়সারের নিকট। আপনার দূত আপনাকে যে খবর দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। এ ধরনের গাছ আরবে প্রচুর রয়েছে। এটা ঐ গাছ যা আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পার্শ্বে জন্মিয়েছিলেন, যখন তাঁর পুত্র ঈসা (আঃ) তার গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হন। অতএব, হে বাদশাহ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে মা’রূদ মনে করবেন না। আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাকে তিনি মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন, অতঃপর তাকে বলেছিলেনঃ ‘হও’ ফলে সে হয়ে গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৫৯-৬০)(আরবী)-এর অর্থ (আরবী) ও করা হয়েছে যা খেজুর বৃক্ষের গর্দানের উপর বাকল বা আবরণের মত থাকে।এই যমীনে রয়েছে খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। -এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের ঐ সবুজ পাতা যাকে উপর হতে কেটে দেয়া হয় এবং শুকিয়ে নেয়াহয়।(আরবী)-এর অর্থ হলো সুগন্ধ গুল্ম অথবা ক্ষেতের সবুজ পাতা। ভাবার্থ এই যে, গম, যব ইত্যাদির ঐ দানা যা ওর মাথার উপর ভূষিসহ থাকে এবং যে পাতা ওগুলোর গাছের উপর জড়িয়ে থাকে। আর এটাও বলা হয়েছে যে, ক্ষেতের প্রথমেই উৎপাদিত পাতাকে তো বলা হয়, আর যখন তাতে দানা ধরে তখন ওকে বলা হয়। যেমন কবি যায়েদ ইবনে আমর স্বীয় প্রসিদ্ধ। কাসীদায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু’জন (হযরত মূসা আঃ ও হযরত হারূন আঃ) তাকে (ফিরাউনকে) বলোঃ কে মৃত্তিকায় শস্য উৎপাদন করেন? অতঃপর ওটা হতে চারা গাছ হয় যা আন্দোলিত হয় এবং তা হতে ওর মাথায় দানা বের করেন (কে তিনি? অর্থাৎ আল্লাহই এসব করে থাকেন)। সুতরাং এগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকারীর জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা উভয়ে (অর্থাৎ দানব ও মানব) তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? অর্থাৎ হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের আপাদমস্তক আল্লাহর নিয়ামত রাজির মধ্যে ডুবে রয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তোমরা আল্লাহ তাআলার কোন নিয়ামতকেই অস্বীকার করতে পার না। দু' একটি নিয়ামত হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু এখানে তো তোমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ জন্যেই তো মুমিন জ্বিনগুলো একথা শোন মাত্রই উত্তরে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি। সুতরাং আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর জবাবে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার নিয়ামতরাজির কোন একটিও অস্বীকার করতে পারি না।” হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রিসালাতের প্রাথমিক অবস্থায় যখন ইসলাম পুরোপুরিভাবে ঘোষিত হয়নি তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বায়তুল্লাহর রুকনের দিকে নামায পড়তে দেখেছি। ঐ সময় তিনি (আরবী) পাঠ করেছেন এবং মুশরিকরাও তা শ্রবণ করেছে।
আর-রাহমান 55:2
হযরত যার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “ (আরবী)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হবে, না (আরবী) হবে?” তখন তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পূর্ণটাই পড়েছো?" সে উত্তর দেয়ঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা এক রাকআতে পড়ে থাকি।” তিনি তখন বলেনঃ “কবিতা যেমন তাড়াতাড়ি পড়া হয়, তুমি হয়তো এই ভাবেই কুরআনও পড়ে থাকো? এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপারই বটে। আল্লাহর নবী (সঃ) মুফাসসালের প্রাথমিক সূরাগুলোর কোন দুটি সূরা মিলিয়ে পড়তেন তা আমার খুব ভাল স্মরণ আছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে মুফাসসালের সর্বপ্রথম সূরা হলো এই সূরায়ে রহমান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের (রাঃ) সমাবেশে আগমন করেন এবং সূরায়ে রহমান প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নীরবে শুনতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি জ্বিনের রাত্রে এ সূরাটি পাঠ করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তমরূপে জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি (আরবী)-এই আয়াতে এসেছি তখনই তারা জবাবে বলেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার অনুগ্রহ সমূহের কোন অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্যে।” এই রিওয়াইয়াতটিই তাফসীরে ইবনে জারীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই এই সূরাটি পাঠ করেছিলেন অথবা তার সামনে এটা পাঠ করা হয়েছিল। ঐ সময় সাহাবীদেরকে নীরব থাকতে দেখে তিনি একথা বলেছিলেন। আর জ্বিনদের উত্তরের শব্দগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালকের এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি।” ১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় ফল ও করমে ওর মুখস্থকরণ খুবই সহজ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। এটা হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি। আর যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, দ্বারা ভাল ও মন্দ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথা বলা শিখানো অর্থ নেয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত। কারণ এর সাথে সাথেই কুরআন শিক্ষা দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা তিলাওয়াতে কুরআন বুঝানো হয়েছে। আর তিলাওয়াতে কুরআন কথা বলা সহজ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক অক্ষরকে ওর মাখরাজ হতে জিহ্বা বিনা কষ্টে আদায় করে থাকে। তা কণ্ঠ হতে বের হোক অথবা ওষ্ঠাধরকে মিলানোর মাধ্যমেই হোক। বিভিন্ন মাখরাজ এবং বিভিন্ন প্রকারের অক্ষরের উচ্চারণের পদ্ধতি আল্লাহ তা'আলা মানুষকে শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এতদুভয়ের আবর্তনের মধ্যে আছে টক্কর এবং না আছে কোন অস্থিরতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে চন্দ্রের নাগাল পায় এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) সকালকে বেরকারী, রাত্রিকে তিনি আরাম ও বিশ্রামের সময় বানিয়েছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের উপর রেখেছেন, এটা হলো পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।” (৬:৯৬)হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যদি সমস্ত মানুষের, জ্বিনের, চতুষ্পদ জন্তুসমূহের এবং পক্ষীকূলের চক্ষুগুলোর দৃষ্টিশক্তি একটি মাত্র মানুষের চোখে দিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূর্যের সামনে যে সত্তরটি পর্দা রয়েছে ওগুলোর মধ্যে একটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তবুও সম্ভব নয় যে, এই লোকটিও সূর্যের দিকে তাকাতে পারে। অথচ সূর্যের আলো কুরসীর আলোর সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং এটা চিন্তা করার বিষয় যে, আল্লাহ স্বীয় জান্নাতী বান্দাদের চোখে কি পরিমাণ নূর দিবেন যে, তারা তাদের মহান প্রতিপালকের চেহারাকেও খোলাখুলিভাবে তাদের চক্ষু দ্বারা বিনা বাধায় দেখতে পাবে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মেনে চলে তাঁরই বিধান। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, (আরবী) বলা হয় ঐ গাছকে যে গাছের গুঁড়ি আছে। কিন্তু (আরবী) এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, গুঁড়ি বিহীন লতা গাছকে (আরবী) বলা হয়, যে গাছ মাটির উপর ছড়িয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ তারকা যা আকাশে রয়েছে। এ উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান, যদিও প্রথম উক্তিটিকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) পছন্দ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটিও দ্বিতীয় উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।” (২২:১৮)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড অর্থাৎ আদল ও ইনসাফ। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (৫৭:২৫) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে সত্য ও ন্যায়ের সাথে সৃষ্টি করেছেন যাতে সমস্ত জিনিস সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকে। তাই তিনি বলেনঃ ওযনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওযনে কম দিয়ো না। অর্থাৎ যখন ওযন করবে তখন সঠিকভাবে ওযন করবে। কম-বেশী করবে না। অর্থাৎ নেয়ার সময় বেশী নিবে এবং দেয়ার সময় কম দিবে এরূপ করো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ন্যায়ের দণ্ড সোজা রেখে ওযন করো।” (১৭:৩৫)আল্লাহ তা'আলা আকাশকে সমুন্নত করেছেন, আর পৃথিবীকে নীচু করে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাতে মযবুত পাহাড় পর্বতকে পেরেকের মত করে গেড়ে দিয়েছেন যাতে এটা হেলা-দোলা ও নড়াচড়া না করে। আর তাতে যেসব সৃষ্টজীব বসবাস করছে তারা যেন শান্তিতে অবস্থান করতে পারে। হে মানুষ! তোমরা যমীনের সৃষ্টজীবের প্রতি লক্ষ্য করো, ওগুলোর বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ও সীমাহীন ক্ষমতার পরিমাপ করে নাও। সাথে সাথে যমীনের উৎপাদিত জিনিসের দিকে চেয়ে দেখো। এতে রঙ বেরঙ এর টক-মিষ্ট ফল, নানা প্রকারের সুগন্ধি বিশিষ্ট ফল। বিশেষ করে খেজুর বৃক্ষ যা একটি উপকারী বৃক্ষ এবং যা রোপিত হওয়ার পর হতে নিয়ে শুকনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এবং এর পরেও খাওয়ার কাজ দেয়। খেজুর একটি সাধারণ ফল। ওর উপর খোসা থাকে যাকে ভেদ করে এটা বের হয়ে আসে। অতঃপর ওটা হয় কাদার মত, এরপর হয় রসাল এবং এরপর পেকে গিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এটা খুবই উপকারী। আর এর গাছও হয় খুব সোজা ও সুন্দর।হযরত শা'বী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেনঃ “আমার দূত আপনার নিকট হতে ফিরে এসে বলেছে যে, আপনার ওখানে নাকি একটি বক্ষ রয়েছে যার মত স্বভাব বা প্রকৃতি অন্য কোন গাছের মধ্যে নেই। ওটা গর্দভের কানের মত যমীন হতে বের হয়। তারপর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে মুক্তার মত হয়, এরপর সবুজ বর্ণ ধারণ করে পান্নার (মূল্যবান সবুজ পাথর বিশেষ) মত হয়ে যায়, তারপর লাল বর্ণ। ধারণ করে লাল ইয়াকৃত বা পদ্মরাগের মত হয়। এরপর পেকে গিয়ে অতি উত্তম ও সুস্বাদু ফলে পরিণত হয়। তারপর শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের রক্ষণ এবং মুসাফিরদের পাথেয় হয়। সুতরাং যদি আমার দূতের বর্ণনা সত্য হয় তবে আমার ধারণায় এটা জান্নাতী গাছ।" তাঁর এই পত্রের জবাবে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাকে লিখেনঃ “এই পত্র আল্লাহর দাস এবং মুসলমানদের নেতা উমার (রাঃ)-এর পক্ষ হতে রোমক সম্রাট কায়সারের নিকট। আপনার দূত আপনাকে যে খবর দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। এ ধরনের গাছ আরবে প্রচুর রয়েছে। এটা ঐ গাছ যা আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পার্শ্বে জন্মিয়েছিলেন, যখন তাঁর পুত্র ঈসা (আঃ) তার গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হন। অতএব, হে বাদশাহ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে মা’রূদ মনে করবেন না। আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাকে তিনি মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন, অতঃপর তাকে বলেছিলেনঃ ‘হও’ ফলে সে হয়ে গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৫৯-৬০)(আরবী)-এর অর্থ (আরবী) ও করা হয়েছে যা খেজুর বৃক্ষের গর্দানের উপর বাকল বা আবরণের মত থাকে।এই যমীনে রয়েছে খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। -এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের ঐ সবুজ পাতা যাকে উপর হতে কেটে দেয়া হয় এবং শুকিয়ে নেয়াহয়।(আরবী)-এর অর্থ হলো সুগন্ধ গুল্ম অথবা ক্ষেতের সবুজ পাতা। ভাবার্থ এই যে, গম, যব ইত্যাদির ঐ দানা যা ওর মাথার উপর ভূষিসহ থাকে এবং যে পাতা ওগুলোর গাছের উপর জড়িয়ে থাকে। আর এটাও বলা হয়েছে যে, ক্ষেতের প্রথমেই উৎপাদিত পাতাকে তো বলা হয়, আর যখন তাতে দানা ধরে তখন ওকে বলা হয়। যেমন কবি যায়েদ ইবনে আমর স্বীয় প্রসিদ্ধ। কাসীদায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু’জন (হযরত মূসা আঃ ও হযরত হারূন আঃ) তাকে (ফিরাউনকে) বলোঃ কে মৃত্তিকায় শস্য উৎপাদন করেন? অতঃপর ওটা হতে চারা গাছ হয় যা আন্দোলিত হয় এবং তা হতে ওর মাথায় দানা বের করেন (কে তিনি? অর্থাৎ আল্লাহই এসব করে থাকেন)। সুতরাং এগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকারীর জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা উভয়ে (অর্থাৎ দানব ও মানব) তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? অর্থাৎ হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের আপাদমস্তক আল্লাহর নিয়ামত রাজির মধ্যে ডুবে রয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তোমরা আল্লাহ তাআলার কোন নিয়ামতকেই অস্বীকার করতে পার না। দু' একটি নিয়ামত হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু এখানে তো তোমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ জন্যেই তো মুমিন জ্বিনগুলো একথা শোন মাত্রই উত্তরে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি। সুতরাং আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর জবাবে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার নিয়ামতরাজির কোন একটিও অস্বীকার করতে পারি না।” হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রিসালাতের প্রাথমিক অবস্থায় যখন ইসলাম পুরোপুরিভাবে ঘোষিত হয়নি তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বায়তুল্লাহর রুকনের দিকে নামায পড়তে দেখেছি। ঐ সময় তিনি (আরবী) পাঠ করেছেন এবং মুশরিকরাও তা শ্রবণ করেছে।
আর-রাহমান 55:3
হযরত যার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “ (আরবী)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হবে, না (আরবী) হবে?” তখন তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পূর্ণটাই পড়েছো?" সে উত্তর দেয়ঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা এক রাকআতে পড়ে থাকি।” তিনি তখন বলেনঃ “কবিতা যেমন তাড়াতাড়ি পড়া হয়, তুমি হয়তো এই ভাবেই কুরআনও পড়ে থাকো? এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপারই বটে। আল্লাহর নবী (সঃ) মুফাসসালের প্রাথমিক সূরাগুলোর কোন দুটি সূরা মিলিয়ে পড়তেন তা আমার খুব ভাল স্মরণ আছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে মুফাসসালের সর্বপ্রথম সূরা হলো এই সূরায়ে রহমান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের (রাঃ) সমাবেশে আগমন করেন এবং সূরায়ে রহমান প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নীরবে শুনতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি জ্বিনের রাত্রে এ সূরাটি পাঠ করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তমরূপে জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি (আরবী)-এই আয়াতে এসেছি তখনই তারা জবাবে বলেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার অনুগ্রহ সমূহের কোন অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্যে।” এই রিওয়াইয়াতটিই তাফসীরে ইবনে জারীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই এই সূরাটি পাঠ করেছিলেন অথবা তার সামনে এটা পাঠ করা হয়েছিল। ঐ সময় সাহাবীদেরকে নীরব থাকতে দেখে তিনি একথা বলেছিলেন। আর জ্বিনদের উত্তরের শব্দগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালকের এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি।” ১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় ফল ও করমে ওর মুখস্থকরণ খুবই সহজ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। এটা হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি। আর যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, দ্বারা ভাল ও মন্দ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথা বলা শিখানো অর্থ নেয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত। কারণ এর সাথে সাথেই কুরআন শিক্ষা দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা তিলাওয়াতে কুরআন বুঝানো হয়েছে। আর তিলাওয়াতে কুরআন কথা বলা সহজ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক অক্ষরকে ওর মাখরাজ হতে জিহ্বা বিনা কষ্টে আদায় করে থাকে। তা কণ্ঠ হতে বের হোক অথবা ওষ্ঠাধরকে মিলানোর মাধ্যমেই হোক। বিভিন্ন মাখরাজ এবং বিভিন্ন প্রকারের অক্ষরের উচ্চারণের পদ্ধতি আল্লাহ তা'আলা মানুষকে শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এতদুভয়ের আবর্তনের মধ্যে আছে টক্কর এবং না আছে কোন অস্থিরতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে চন্দ্রের নাগাল পায় এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) সকালকে বেরকারী, রাত্রিকে তিনি আরাম ও বিশ্রামের সময় বানিয়েছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের উপর রেখেছেন, এটা হলো পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।” (৬:৯৬)হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যদি সমস্ত মানুষের, জ্বিনের, চতুষ্পদ জন্তুসমূহের এবং পক্ষীকূলের চক্ষুগুলোর দৃষ্টিশক্তি একটি মাত্র মানুষের চোখে দিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূর্যের সামনে যে সত্তরটি পর্দা রয়েছে ওগুলোর মধ্যে একটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তবুও সম্ভব নয় যে, এই লোকটিও সূর্যের দিকে তাকাতে পারে। অথচ সূর্যের আলো কুরসীর আলোর সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং এটা চিন্তা করার বিষয় যে, আল্লাহ স্বীয় জান্নাতী বান্দাদের চোখে কি পরিমাণ নূর দিবেন যে, তারা তাদের মহান প্রতিপালকের চেহারাকেও খোলাখুলিভাবে তাদের চক্ষু দ্বারা বিনা বাধায় দেখতে পাবে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মেনে চলে তাঁরই বিধান। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, (আরবী) বলা হয় ঐ গাছকে যে গাছের গুঁড়ি আছে। কিন্তু (আরবী) এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, গুঁড়ি বিহীন লতা গাছকে (আরবী) বলা হয়, যে গাছ মাটির উপর ছড়িয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ তারকা যা আকাশে রয়েছে। এ উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান, যদিও প্রথম উক্তিটিকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) পছন্দ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটিও দ্বিতীয় উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।” (২২:১৮)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড অর্থাৎ আদল ও ইনসাফ। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (৫৭:২৫) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে সত্য ও ন্যায়ের সাথে সৃষ্টি করেছেন যাতে সমস্ত জিনিস সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকে। তাই তিনি বলেনঃ ওযনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওযনে কম দিয়ো না। অর্থাৎ যখন ওযন করবে তখন সঠিকভাবে ওযন করবে। কম-বেশী করবে না। অর্থাৎ নেয়ার সময় বেশী নিবে এবং দেয়ার সময় কম দিবে এরূপ করো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ন্যায়ের দণ্ড সোজা রেখে ওযন করো।” (১৭:৩৫)আল্লাহ তা'আলা আকাশকে সমুন্নত করেছেন, আর পৃথিবীকে নীচু করে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাতে মযবুত পাহাড় পর্বতকে পেরেকের মত করে গেড়ে দিয়েছেন যাতে এটা হেলা-দোলা ও নড়াচড়া না করে। আর তাতে যেসব সৃষ্টজীব বসবাস করছে তারা যেন শান্তিতে অবস্থান করতে পারে। হে মানুষ! তোমরা যমীনের সৃষ্টজীবের প্রতি লক্ষ্য করো, ওগুলোর বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ও সীমাহীন ক্ষমতার পরিমাপ করে নাও। সাথে সাথে যমীনের উৎপাদিত জিনিসের দিকে চেয়ে দেখো। এতে রঙ বেরঙ এর টক-মিষ্ট ফল, নানা প্রকারের সুগন্ধি বিশিষ্ট ফল। বিশেষ করে খেজুর বৃক্ষ যা একটি উপকারী বৃক্ষ এবং যা রোপিত হওয়ার পর হতে নিয়ে শুকনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এবং এর পরেও খাওয়ার কাজ দেয়। খেজুর একটি সাধারণ ফল। ওর উপর খোসা থাকে যাকে ভেদ করে এটা বের হয়ে আসে। অতঃপর ওটা হয় কাদার মত, এরপর হয় রসাল এবং এরপর পেকে গিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এটা খুবই উপকারী। আর এর গাছও হয় খুব সোজা ও সুন্দর।হযরত শা'বী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেনঃ “আমার দূত আপনার নিকট হতে ফিরে এসে বলেছে যে, আপনার ওখানে নাকি একটি বক্ষ রয়েছে যার মত স্বভাব বা প্রকৃতি অন্য কোন গাছের মধ্যে নেই। ওটা গর্দভের কানের মত যমীন হতে বের হয়। তারপর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে মুক্তার মত হয়, এরপর সবুজ বর্ণ ধারণ করে পান্নার (মূল্যবান সবুজ পাথর বিশেষ) মত হয়ে যায়, তারপর লাল বর্ণ। ধারণ করে লাল ইয়াকৃত বা পদ্মরাগের মত হয়। এরপর পেকে গিয়ে অতি উত্তম ও সুস্বাদু ফলে পরিণত হয়। তারপর শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের রক্ষণ এবং মুসাফিরদের পাথেয় হয়। সুতরাং যদি আমার দূতের বর্ণনা সত্য হয় তবে আমার ধারণায় এটা জান্নাতী গাছ।" তাঁর এই পত্রের জবাবে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাকে লিখেনঃ “এই পত্র আল্লাহর দাস এবং মুসলমানদের নেতা উমার (রাঃ)-এর পক্ষ হতে রোমক সম্রাট কায়সারের নিকট। আপনার দূত আপনাকে যে খবর দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। এ ধরনের গাছ আরবে প্রচুর রয়েছে। এটা ঐ গাছ যা আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পার্শ্বে জন্মিয়েছিলেন, যখন তাঁর পুত্র ঈসা (আঃ) তার গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হন। অতএব, হে বাদশাহ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে মা’রূদ মনে করবেন না। আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাকে তিনি মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন, অতঃপর তাকে বলেছিলেনঃ ‘হও’ ফলে সে হয়ে গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৫৯-৬০)(আরবী)-এর অর্থ (আরবী) ও করা হয়েছে যা খেজুর বৃক্ষের গর্দানের উপর বাকল বা আবরণের মত থাকে।এই যমীনে রয়েছে খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। -এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের ঐ সবুজ পাতা যাকে উপর হতে কেটে দেয়া হয় এবং শুকিয়ে নেয়াহয়।(আরবী)-এর অর্থ হলো সুগন্ধ গুল্ম অথবা ক্ষেতের সবুজ পাতা। ভাবার্থ এই যে, গম, যব ইত্যাদির ঐ দানা যা ওর মাথার উপর ভূষিসহ থাকে এবং যে পাতা ওগুলোর গাছের উপর জড়িয়ে থাকে। আর এটাও বলা হয়েছে যে, ক্ষেতের প্রথমেই উৎপাদিত পাতাকে তো বলা হয়, আর যখন তাতে দানা ধরে তখন ওকে বলা হয়। যেমন কবি যায়েদ ইবনে আমর স্বীয় প্রসিদ্ধ। কাসীদায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু’জন (হযরত মূসা আঃ ও হযরত হারূন আঃ) তাকে (ফিরাউনকে) বলোঃ কে মৃত্তিকায় শস্য উৎপাদন করেন? অতঃপর ওটা হতে চারা গাছ হয় যা আন্দোলিত হয় এবং তা হতে ওর মাথায় দানা বের করেন (কে তিনি? অর্থাৎ আল্লাহই এসব করে থাকেন)। সুতরাং এগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকারীর জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা উভয়ে (অর্থাৎ দানব ও মানব) তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? অর্থাৎ হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের আপাদমস্তক আল্লাহর নিয়ামত রাজির মধ্যে ডুবে রয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তোমরা আল্লাহ তাআলার কোন নিয়ামতকেই অস্বীকার করতে পার না। দু' একটি নিয়ামত হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু এখানে তো তোমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ জন্যেই তো মুমিন জ্বিনগুলো একথা শোন মাত্রই উত্তরে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি। সুতরাং আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর জবাবে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার নিয়ামতরাজির কোন একটিও অস্বীকার করতে পারি না।” হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রিসালাতের প্রাথমিক অবস্থায় যখন ইসলাম পুরোপুরিভাবে ঘোষিত হয়নি তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বায়তুল্লাহর রুকনের দিকে নামায পড়তে দেখেছি। ঐ সময় তিনি (আরবী) পাঠ করেছেন এবং মুশরিকরাও তা শ্রবণ করেছে।
আর-রাহমান 55:4
হযরত যার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “ (আরবী)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হবে, না (আরবী) হবে?” তখন তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পূর্ণটাই পড়েছো?" সে উত্তর দেয়ঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা এক রাকআতে পড়ে থাকি।” তিনি তখন বলেনঃ “কবিতা যেমন তাড়াতাড়ি পড়া হয়, তুমি হয়তো এই ভাবেই কুরআনও পড়ে থাকো? এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপারই বটে। আল্লাহর নবী (সঃ) মুফাসসালের প্রাথমিক সূরাগুলোর কোন দুটি সূরা মিলিয়ে পড়তেন তা আমার খুব ভাল স্মরণ আছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে মুফাসসালের সর্বপ্রথম সূরা হলো এই সূরায়ে রহমান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের (রাঃ) সমাবেশে আগমন করেন এবং সূরায়ে রহমান প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নীরবে শুনতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি জ্বিনের রাত্রে এ সূরাটি পাঠ করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তমরূপে জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি (আরবী)-এই আয়াতে এসেছি তখনই তারা জবাবে বলেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার অনুগ্রহ সমূহের কোন অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্যে।” এই রিওয়াইয়াতটিই তাফসীরে ইবনে জারীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই এই সূরাটি পাঠ করেছিলেন অথবা তার সামনে এটা পাঠ করা হয়েছিল। ঐ সময় সাহাবীদেরকে নীরব থাকতে দেখে তিনি একথা বলেছিলেন। আর জ্বিনদের উত্তরের শব্দগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালকের এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি।” ১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় ফল ও করমে ওর মুখস্থকরণ খুবই সহজ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। এটা হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি। আর যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, দ্বারা ভাল ও মন্দ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথা বলা শিখানো অর্থ নেয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত। কারণ এর সাথে সাথেই কুরআন শিক্ষা দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা তিলাওয়াতে কুরআন বুঝানো হয়েছে। আর তিলাওয়াতে কুরআন কথা বলা সহজ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক অক্ষরকে ওর মাখরাজ হতে জিহ্বা বিনা কষ্টে আদায় করে থাকে। তা কণ্ঠ হতে বের হোক অথবা ওষ্ঠাধরকে মিলানোর মাধ্যমেই হোক। বিভিন্ন মাখরাজ এবং বিভিন্ন প্রকারের অক্ষরের উচ্চারণের পদ্ধতি আল্লাহ তা'আলা মানুষকে শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এতদুভয়ের আবর্তনের মধ্যে আছে টক্কর এবং না আছে কোন অস্থিরতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে চন্দ্রের নাগাল পায় এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) সকালকে বেরকারী, রাত্রিকে তিনি আরাম ও বিশ্রামের সময় বানিয়েছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের উপর রেখেছেন, এটা হলো পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।” (৬:৯৬)হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যদি সমস্ত মানুষের, জ্বিনের, চতুষ্পদ জন্তুসমূহের এবং পক্ষীকূলের চক্ষুগুলোর দৃষ্টিশক্তি একটি মাত্র মানুষের চোখে দিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূর্যের সামনে যে সত্তরটি পর্দা রয়েছে ওগুলোর মধ্যে একটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তবুও সম্ভব নয় যে, এই লোকটিও সূর্যের দিকে তাকাতে পারে। অথচ সূর্যের আলো কুরসীর আলোর সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং এটা চিন্তা করার বিষয় যে, আল্লাহ স্বীয় জান্নাতী বান্দাদের চোখে কি পরিমাণ নূর দিবেন যে, তারা তাদের মহান প্রতিপালকের চেহারাকেও খোলাখুলিভাবে তাদের চক্ষু দ্বারা বিনা বাধায় দেখতে পাবে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মেনে চলে তাঁরই বিধান। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, (আরবী) বলা হয় ঐ গাছকে যে গাছের গুঁড়ি আছে। কিন্তু (আরবী) এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, গুঁড়ি বিহীন লতা গাছকে (আরবী) বলা হয়, যে গাছ মাটির উপর ছড়িয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ তারকা যা আকাশে রয়েছে। এ উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান, যদিও প্রথম উক্তিটিকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) পছন্দ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটিও দ্বিতীয় উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।” (২২:১৮)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড অর্থাৎ আদল ও ইনসাফ। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (৫৭:২৫) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে সত্য ও ন্যায়ের সাথে সৃষ্টি করেছেন যাতে সমস্ত জিনিস সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকে। তাই তিনি বলেনঃ ওযনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওযনে কম দিয়ো না। অর্থাৎ যখন ওযন করবে তখন সঠিকভাবে ওযন করবে। কম-বেশী করবে না। অর্থাৎ নেয়ার সময় বেশী নিবে এবং দেয়ার সময় কম দিবে এরূপ করো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ন্যায়ের দণ্ড সোজা রেখে ওযন করো।” (১৭:৩৫)আল্লাহ তা'আলা আকাশকে সমুন্নত করেছেন, আর পৃথিবীকে নীচু করে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাতে মযবুত পাহাড় পর্বতকে পেরেকের মত করে গেড়ে দিয়েছেন যাতে এটা হেলা-দোলা ও নড়াচড়া না করে। আর তাতে যেসব সৃষ্টজীব বসবাস করছে তারা যেন শান্তিতে অবস্থান করতে পারে। হে মানুষ! তোমরা যমীনের সৃষ্টজীবের প্রতি লক্ষ্য করো, ওগুলোর বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ও সীমাহীন ক্ষমতার পরিমাপ করে নাও। সাথে সাথে যমীনের উৎপাদিত জিনিসের দিকে চেয়ে দেখো। এতে রঙ বেরঙ এর টক-মিষ্ট ফল, নানা প্রকারের সুগন্ধি বিশিষ্ট ফল। বিশেষ করে খেজুর বৃক্ষ যা একটি উপকারী বৃক্ষ এবং যা রোপিত হওয়ার পর হতে নিয়ে শুকনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এবং এর পরেও খাওয়ার কাজ দেয়। খেজুর একটি সাধারণ ফল। ওর উপর খোসা থাকে যাকে ভেদ করে এটা বের হয়ে আসে। অতঃপর ওটা হয় কাদার মত, এরপর হয় রসাল এবং এরপর পেকে গিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এটা খুবই উপকারী। আর এর গাছও হয় খুব সোজা ও সুন্দর।হযরত শা'বী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেনঃ “আমার দূত আপনার নিকট হতে ফিরে এসে বলেছে যে, আপনার ওখানে নাকি একটি বক্ষ রয়েছে যার মত স্বভাব বা প্রকৃতি অন্য কোন গাছের মধ্যে নেই। ওটা গর্দভের কানের মত যমীন হতে বের হয়। তারপর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে মুক্তার মত হয়, এরপর সবুজ বর্ণ ধারণ করে পান্নার (মূল্যবান সবুজ পাথর বিশেষ) মত হয়ে যায়, তারপর লাল বর্ণ। ধারণ করে লাল ইয়াকৃত বা পদ্মরাগের মত হয়। এরপর পেকে গিয়ে অতি উত্তম ও সুস্বাদু ফলে পরিণত হয়। তারপর শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের রক্ষণ এবং মুসাফিরদের পাথেয় হয়। সুতরাং যদি আমার দূতের বর্ণনা সত্য হয় তবে আমার ধারণায় এটা জান্নাতী গাছ।" তাঁর এই পত্রের জবাবে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাকে লিখেনঃ “এই পত্র আল্লাহর দাস এবং মুসলমানদের নেতা উমার (রাঃ)-এর পক্ষ হতে রোমক সম্রাট কায়সারের নিকট। আপনার দূত আপনাকে যে খবর দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। এ ধরনের গাছ আরবে প্রচুর রয়েছে। এটা ঐ গাছ যা আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পার্শ্বে জন্মিয়েছিলেন, যখন তাঁর পুত্র ঈসা (আঃ) তার গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হন। অতএব, হে বাদশাহ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে মা’রূদ মনে করবেন না। আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাকে তিনি মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন, অতঃপর তাকে বলেছিলেনঃ ‘হও’ ফলে সে হয়ে গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৫৯-৬০)(আরবী)-এর অর্থ (আরবী) ও করা হয়েছে যা খেজুর বৃক্ষের গর্দানের উপর বাকল বা আবরণের মত থাকে।এই যমীনে রয়েছে খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। -এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের ঐ সবুজ পাতা যাকে উপর হতে কেটে দেয়া হয় এবং শুকিয়ে নেয়াহয়।(আরবী)-এর অর্থ হলো সুগন্ধ গুল্ম অথবা ক্ষেতের সবুজ পাতা। ভাবার্থ এই যে, গম, যব ইত্যাদির ঐ দানা যা ওর মাথার উপর ভূষিসহ থাকে এবং যে পাতা ওগুলোর গাছের উপর জড়িয়ে থাকে। আর এটাও বলা হয়েছে যে, ক্ষেতের প্রথমেই উৎপাদিত পাতাকে তো বলা হয়, আর যখন তাতে দানা ধরে তখন ওকে বলা হয়। যেমন কবি যায়েদ ইবনে আমর স্বীয় প্রসিদ্ধ। কাসীদায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু’জন (হযরত মূসা আঃ ও হযরত হারূন আঃ) তাকে (ফিরাউনকে) বলোঃ কে মৃত্তিকায় শস্য উৎপাদন করেন? অতঃপর ওটা হতে চারা গাছ হয় যা আন্দোলিত হয় এবং তা হতে ওর মাথায় দানা বের করেন (কে তিনি? অর্থাৎ আল্লাহই এসব করে থাকেন)। সুতরাং এগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকারীর জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা উভয়ে (অর্থাৎ দানব ও মানব) তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? অর্থাৎ হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের আপাদমস্তক আল্লাহর নিয়ামত রাজির মধ্যে ডুবে রয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তোমরা আল্লাহ তাআলার কোন নিয়ামতকেই অস্বীকার করতে পার না। দু' একটি নিয়ামত হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু এখানে তো তোমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ জন্যেই তো মুমিন জ্বিনগুলো একথা শোন মাত্রই উত্তরে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি। সুতরাং আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর জবাবে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার নিয়ামতরাজির কোন একটিও অস্বীকার করতে পারি না।” হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রিসালাতের প্রাথমিক অবস্থায় যখন ইসলাম পুরোপুরিভাবে ঘোষিত হয়নি তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বায়তুল্লাহর রুকনের দিকে নামায পড়তে দেখেছি। ঐ সময় তিনি (আরবী) পাঠ করেছেন এবং মুশরিকরাও তা শ্রবণ করেছে।
আর-রাহমান 55:5
হযরত যার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “ (আরবী)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হবে, না (আরবী) হবে?” তখন তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পূর্ণটাই পড়েছো?" সে উত্তর দেয়ঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা এক রাকআতে পড়ে থাকি।” তিনি তখন বলেনঃ “কবিতা যেমন তাড়াতাড়ি পড়া হয়, তুমি হয়তো এই ভাবেই কুরআনও পড়ে থাকো? এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপারই বটে। আল্লাহর নবী (সঃ) মুফাসসালের প্রাথমিক সূরাগুলোর কোন দুটি সূরা মিলিয়ে পড়তেন তা আমার খুব ভাল স্মরণ আছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে মুফাসসালের সর্বপ্রথম সূরা হলো এই সূরায়ে রহমান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের (রাঃ) সমাবেশে আগমন করেন এবং সূরায়ে রহমান প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নীরবে শুনতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি জ্বিনের রাত্রে এ সূরাটি পাঠ করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তমরূপে জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি (আরবী)-এই আয়াতে এসেছি তখনই তারা জবাবে বলেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার অনুগ্রহ সমূহের কোন অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্যে।” এই রিওয়াইয়াতটিই তাফসীরে ইবনে জারীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই এই সূরাটি পাঠ করেছিলেন অথবা তার সামনে এটা পাঠ করা হয়েছিল। ঐ সময় সাহাবীদেরকে নীরব থাকতে দেখে তিনি একথা বলেছিলেন। আর জ্বিনদের উত্তরের শব্দগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালকের এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি।” ১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় ফল ও করমে ওর মুখস্থকরণ খুবই সহজ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। এটা হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি। আর যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, দ্বারা ভাল ও মন্দ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথা বলা শিখানো অর্থ নেয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত। কারণ এর সাথে সাথেই কুরআন শিক্ষা দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা তিলাওয়াতে কুরআন বুঝানো হয়েছে। আর তিলাওয়াতে কুরআন কথা বলা সহজ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক অক্ষরকে ওর মাখরাজ হতে জিহ্বা বিনা কষ্টে আদায় করে থাকে। তা কণ্ঠ হতে বের হোক অথবা ওষ্ঠাধরকে মিলানোর মাধ্যমেই হোক। বিভিন্ন মাখরাজ এবং বিভিন্ন প্রকারের অক্ষরের উচ্চারণের পদ্ধতি আল্লাহ তা'আলা মানুষকে শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এতদুভয়ের আবর্তনের মধ্যে আছে টক্কর এবং না আছে কোন অস্থিরতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে চন্দ্রের নাগাল পায় এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) সকালকে বেরকারী, রাত্রিকে তিনি আরাম ও বিশ্রামের সময় বানিয়েছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের উপর রেখেছেন, এটা হলো পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।” (৬:৯৬)হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যদি সমস্ত মানুষের, জ্বিনের, চতুষ্পদ জন্তুসমূহের এবং পক্ষীকূলের চক্ষুগুলোর দৃষ্টিশক্তি একটি মাত্র মানুষের চোখে দিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূর্যের সামনে যে সত্তরটি পর্দা রয়েছে ওগুলোর মধ্যে একটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তবুও সম্ভব নয় যে, এই লোকটিও সূর্যের দিকে তাকাতে পারে। অথচ সূর্যের আলো কুরসীর আলোর সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং এটা চিন্তা করার বিষয় যে, আল্লাহ স্বীয় জান্নাতী বান্দাদের চোখে কি পরিমাণ নূর দিবেন যে, তারা তাদের মহান প্রতিপালকের চেহারাকেও খোলাখুলিভাবে তাদের চক্ষু দ্বারা বিনা বাধায় দেখতে পাবে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মেনে চলে তাঁরই বিধান। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, (আরবী) বলা হয় ঐ গাছকে যে গাছের গুঁড়ি আছে। কিন্তু (আরবী) এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, গুঁড়ি বিহীন লতা গাছকে (আরবী) বলা হয়, যে গাছ মাটির উপর ছড়িয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ তারকা যা আকাশে রয়েছে। এ উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান, যদিও প্রথম উক্তিটিকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) পছন্দ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটিও দ্বিতীয় উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।” (২২:১৮)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড অর্থাৎ আদল ও ইনসাফ। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (৫৭:২৫) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে সত্য ও ন্যায়ের সাথে সৃষ্টি করেছেন যাতে সমস্ত জিনিস সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকে। তাই তিনি বলেনঃ ওযনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওযনে কম দিয়ো না। অর্থাৎ যখন ওযন করবে তখন সঠিকভাবে ওযন করবে। কম-বেশী করবে না। অর্থাৎ নেয়ার সময় বেশী নিবে এবং দেয়ার সময় কম দিবে এরূপ করো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ন্যায়ের দণ্ড সোজা রেখে ওযন করো।” (১৭:৩৫)আল্লাহ তা'আলা আকাশকে সমুন্নত করেছেন, আর পৃথিবীকে নীচু করে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাতে মযবুত পাহাড় পর্বতকে পেরেকের মত করে গেড়ে দিয়েছেন যাতে এটা হেলা-দোলা ও নড়াচড়া না করে। আর তাতে যেসব সৃষ্টজীব বসবাস করছে তারা যেন শান্তিতে অবস্থান করতে পারে। হে মানুষ! তোমরা যমীনের সৃষ্টজীবের প্রতি লক্ষ্য করো, ওগুলোর বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ও সীমাহীন ক্ষমতার পরিমাপ করে নাও। সাথে সাথে যমীনের উৎপাদিত জিনিসের দিকে চেয়ে দেখো। এতে রঙ বেরঙ এর টক-মিষ্ট ফল, নানা প্রকারের সুগন্ধি বিশিষ্ট ফল। বিশেষ করে খেজুর বৃক্ষ যা একটি উপকারী বৃক্ষ এবং যা রোপিত হওয়ার পর হতে নিয়ে শুকনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এবং এর পরেও খাওয়ার কাজ দেয়। খেজুর একটি সাধারণ ফল। ওর উপর খোসা থাকে যাকে ভেদ করে এটা বের হয়ে আসে। অতঃপর ওটা হয় কাদার মত, এরপর হয় রসাল এবং এরপর পেকে গিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এটা খুবই উপকারী। আর এর গাছও হয় খুব সোজা ও সুন্দর।হযরত শা'বী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেনঃ “আমার দূত আপনার নিকট হতে ফিরে এসে বলেছে যে, আপনার ওখানে নাকি একটি বক্ষ রয়েছে যার মত স্বভাব বা প্রকৃতি অন্য কোন গাছের মধ্যে নেই। ওটা গর্দভের কানের মত যমীন হতে বের হয়। তারপর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে মুক্তার মত হয়, এরপর সবুজ বর্ণ ধারণ করে পান্নার (মূল্যবান সবুজ পাথর বিশেষ) মত হয়ে যায়, তারপর লাল বর্ণ। ধারণ করে লাল ইয়াকৃত বা পদ্মরাগের মত হয়। এরপর পেকে গিয়ে অতি উত্তম ও সুস্বাদু ফলে পরিণত হয়। তারপর শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের রক্ষণ এবং মুসাফিরদের পাথেয় হয়। সুতরাং যদি আমার দূতের বর্ণনা সত্য হয় তবে আমার ধারণায় এটা জান্নাতী গাছ।" তাঁর এই পত্রের জবাবে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাকে লিখেনঃ “এই পত্র আল্লাহর দাস এবং মুসলমানদের নেতা উমার (রাঃ)-এর পক্ষ হতে রোমক সম্রাট কায়সারের নিকট। আপনার দূত আপনাকে যে খবর দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। এ ধরনের গাছ আরবে প্রচুর রয়েছে। এটা ঐ গাছ যা আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পার্শ্বে জন্মিয়েছিলেন, যখন তাঁর পুত্র ঈসা (আঃ) তার গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হন। অতএব, হে বাদশাহ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে মা’রূদ মনে করবেন না। আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাকে তিনি মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন, অতঃপর তাকে বলেছিলেনঃ ‘হও’ ফলে সে হয়ে গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৫৯-৬০)(আরবী)-এর অর্থ (আরবী) ও করা হয়েছে যা খেজুর বৃক্ষের গর্দানের উপর বাকল বা আবরণের মত থাকে।এই যমীনে রয়েছে খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। -এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের ঐ সবুজ পাতা যাকে উপর হতে কেটে দেয়া হয় এবং শুকিয়ে নেয়াহয়।(আরবী)-এর অর্থ হলো সুগন্ধ গুল্ম অথবা ক্ষেতের সবুজ পাতা। ভাবার্থ এই যে, গম, যব ইত্যাদির ঐ দানা যা ওর মাথার উপর ভূষিসহ থাকে এবং যে পাতা ওগুলোর গাছের উপর জড়িয়ে থাকে। আর এটাও বলা হয়েছে যে, ক্ষেতের প্রথমেই উৎপাদিত পাতাকে তো বলা হয়, আর যখন তাতে দানা ধরে তখন ওকে বলা হয়। যেমন কবি যায়েদ ইবনে আমর স্বীয় প্রসিদ্ধ। কাসীদায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু’জন (হযরত মূসা আঃ ও হযরত হারূন আঃ) তাকে (ফিরাউনকে) বলোঃ কে মৃত্তিকায় শস্য উৎপাদন করেন? অতঃপর ওটা হতে চারা গাছ হয় যা আন্দোলিত হয় এবং তা হতে ওর মাথায় দানা বের করেন (কে তিনি? অর্থাৎ আল্লাহই এসব করে থাকেন)। সুতরাং এগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকারীর জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা উভয়ে (অর্থাৎ দানব ও মানব) তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? অর্থাৎ হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের আপাদমস্তক আল্লাহর নিয়ামত রাজির মধ্যে ডুবে রয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তোমরা আল্লাহ তাআলার কোন নিয়ামতকেই অস্বীকার করতে পার না। দু' একটি নিয়ামত হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু এখানে তো তোমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ জন্যেই তো মুমিন জ্বিনগুলো একথা শোন মাত্রই উত্তরে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি। সুতরাং আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর জবাবে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার নিয়ামতরাজির কোন একটিও অস্বীকার করতে পারি না।” হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রিসালাতের প্রাথমিক অবস্থায় যখন ইসলাম পুরোপুরিভাবে ঘোষিত হয়নি তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বায়তুল্লাহর রুকনের দিকে নামায পড়তে দেখেছি। ঐ সময় তিনি (আরবী) পাঠ করেছেন এবং মুশরিকরাও তা শ্রবণ করেছে।
আর-রাহমান 55:6
হযরত যার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “ (আরবী)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হবে, না (আরবী) হবে?” তখন তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পূর্ণটাই পড়েছো?" সে উত্তর দেয়ঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা এক রাকআতে পড়ে থাকি।” তিনি তখন বলেনঃ “কবিতা যেমন তাড়াতাড়ি পড়া হয়, তুমি হয়তো এই ভাবেই কুরআনও পড়ে থাকো? এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপারই বটে। আল্লাহর নবী (সঃ) মুফাসসালের প্রাথমিক সূরাগুলোর কোন দুটি সূরা মিলিয়ে পড়তেন তা আমার খুব ভাল স্মরণ আছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে মুফাসসালের সর্বপ্রথম সূরা হলো এই সূরায়ে রহমান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের (রাঃ) সমাবেশে আগমন করেন এবং সূরায়ে রহমান প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নীরবে শুনতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি জ্বিনের রাত্রে এ সূরাটি পাঠ করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তমরূপে জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি (আরবী)-এই আয়াতে এসেছি তখনই তারা জবাবে বলেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার অনুগ্রহ সমূহের কোন অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্যে।” এই রিওয়াইয়াতটিই তাফসীরে ইবনে জারীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই এই সূরাটি পাঠ করেছিলেন অথবা তার সামনে এটা পাঠ করা হয়েছিল। ঐ সময় সাহাবীদেরকে নীরব থাকতে দেখে তিনি একথা বলেছিলেন। আর জ্বিনদের উত্তরের শব্দগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালকের এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি।” ১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় ফল ও করমে ওর মুখস্থকরণ খুবই সহজ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। এটা হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি। আর যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, দ্বারা ভাল ও মন্দ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথা বলা শিখানো অর্থ নেয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত। কারণ এর সাথে সাথেই কুরআন শিক্ষা দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা তিলাওয়াতে কুরআন বুঝানো হয়েছে। আর তিলাওয়াতে কুরআন কথা বলা সহজ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক অক্ষরকে ওর মাখরাজ হতে জিহ্বা বিনা কষ্টে আদায় করে থাকে। তা কণ্ঠ হতে বের হোক অথবা ওষ্ঠাধরকে মিলানোর মাধ্যমেই হোক। বিভিন্ন মাখরাজ এবং বিভিন্ন প্রকারের অক্ষরের উচ্চারণের পদ্ধতি আল্লাহ তা'আলা মানুষকে শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এতদুভয়ের আবর্তনের মধ্যে আছে টক্কর এবং না আছে কোন অস্থিরতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে চন্দ্রের নাগাল পায় এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) সকালকে বেরকারী, রাত্রিকে তিনি আরাম ও বিশ্রামের সময় বানিয়েছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের উপর রেখেছেন, এটা হলো পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।” (৬:৯৬)হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যদি সমস্ত মানুষের, জ্বিনের, চতুষ্পদ জন্তুসমূহের এবং পক্ষীকূলের চক্ষুগুলোর দৃষ্টিশক্তি একটি মাত্র মানুষের চোখে দিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূর্যের সামনে যে সত্তরটি পর্দা রয়েছে ওগুলোর মধ্যে একটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তবুও সম্ভব নয় যে, এই লোকটিও সূর্যের দিকে তাকাতে পারে। অথচ সূর্যের আলো কুরসীর আলোর সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং এটা চিন্তা করার বিষয় যে, আল্লাহ স্বীয় জান্নাতী বান্দাদের চোখে কি পরিমাণ নূর দিবেন যে, তারা তাদের মহান প্রতিপালকের চেহারাকেও খোলাখুলিভাবে তাদের চক্ষু দ্বারা বিনা বাধায় দেখতে পাবে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মেনে চলে তাঁরই বিধান। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, (আরবী) বলা হয় ঐ গাছকে যে গাছের গুঁড়ি আছে। কিন্তু (আরবী) এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, গুঁড়ি বিহীন লতা গাছকে (আরবী) বলা হয়, যে গাছ মাটির উপর ছড়িয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ তারকা যা আকাশে রয়েছে। এ উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান, যদিও প্রথম উক্তিটিকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) পছন্দ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটিও দ্বিতীয় উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।” (২২:১৮)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড অর্থাৎ আদল ও ইনসাফ। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (৫৭:২৫) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে সত্য ও ন্যায়ের সাথে সৃষ্টি করেছেন যাতে সমস্ত জিনিস সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকে। তাই তিনি বলেনঃ ওযনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওযনে কম দিয়ো না। অর্থাৎ যখন ওযন করবে তখন সঠিকভাবে ওযন করবে। কম-বেশী করবে না। অর্থাৎ নেয়ার সময় বেশী নিবে এবং দেয়ার সময় কম দিবে এরূপ করো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ন্যায়ের দণ্ড সোজা রেখে ওযন করো।” (১৭:৩৫)আল্লাহ তা'আলা আকাশকে সমুন্নত করেছেন, আর পৃথিবীকে নীচু করে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাতে মযবুত পাহাড় পর্বতকে পেরেকের মত করে গেড়ে দিয়েছেন যাতে এটা হেলা-দোলা ও নড়াচড়া না করে। আর তাতে যেসব সৃষ্টজীব বসবাস করছে তারা যেন শান্তিতে অবস্থান করতে পারে। হে মানুষ! তোমরা যমীনের সৃষ্টজীবের প্রতি লক্ষ্য করো, ওগুলোর বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ও সীমাহীন ক্ষমতার পরিমাপ করে নাও। সাথে সাথে যমীনের উৎপাদিত জিনিসের দিকে চেয়ে দেখো। এতে রঙ বেরঙ এর টক-মিষ্ট ফল, নানা প্রকারের সুগন্ধি বিশিষ্ট ফল। বিশেষ করে খেজুর বৃক্ষ যা একটি উপকারী বৃক্ষ এবং যা রোপিত হওয়ার পর হতে নিয়ে শুকনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এবং এর পরেও খাওয়ার কাজ দেয়। খেজুর একটি সাধারণ ফল। ওর উপর খোসা থাকে যাকে ভেদ করে এটা বের হয়ে আসে। অতঃপর ওটা হয় কাদার মত, এরপর হয় রসাল এবং এরপর পেকে গিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এটা খুবই উপকারী। আর এর গাছও হয় খুব সোজা ও সুন্দর।হযরত শা'বী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেনঃ “আমার দূত আপনার নিকট হতে ফিরে এসে বলেছে যে, আপনার ওখানে নাকি একটি বক্ষ রয়েছে যার মত স্বভাব বা প্রকৃতি অন্য কোন গাছের মধ্যে নেই। ওটা গর্দভের কানের মত যমীন হতে বের হয়। তারপর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে মুক্তার মত হয়, এরপর সবুজ বর্ণ ধারণ করে পান্নার (মূল্যবান সবুজ পাথর বিশেষ) মত হয়ে যায়, তারপর লাল বর্ণ। ধারণ করে লাল ইয়াকৃত বা পদ্মরাগের মত হয়। এরপর পেকে গিয়ে অতি উত্তম ও সুস্বাদু ফলে পরিণত হয়। তারপর শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের রক্ষণ এবং মুসাফিরদের পাথেয় হয়। সুতরাং যদি আমার দূতের বর্ণনা সত্য হয় তবে আমার ধারণায় এটা জান্নাতী গাছ।" তাঁর এই পত্রের জবাবে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাকে লিখেনঃ “এই পত্র আল্লাহর দাস এবং মুসলমানদের নেতা উমার (রাঃ)-এর পক্ষ হতে রোমক সম্রাট কায়সারের নিকট। আপনার দূত আপনাকে যে খবর দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। এ ধরনের গাছ আরবে প্রচুর রয়েছে। এটা ঐ গাছ যা আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পার্শ্বে জন্মিয়েছিলেন, যখন তাঁর পুত্র ঈসা (আঃ) তার গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হন। অতএব, হে বাদশাহ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে মা’রূদ মনে করবেন না। আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাকে তিনি মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন, অতঃপর তাকে বলেছিলেনঃ ‘হও’ ফলে সে হয়ে গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৫৯-৬০)(আরবী)-এর অর্থ (আরবী) ও করা হয়েছে যা খেজুর বৃক্ষের গর্দানের উপর বাকল বা আবরণের মত থাকে।এই যমীনে রয়েছে খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। -এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের ঐ সবুজ পাতা যাকে উপর হতে কেটে দেয়া হয় এবং শুকিয়ে নেয়াহয়।(আরবী)-এর অর্থ হলো সুগন্ধ গুল্ম অথবা ক্ষেতের সবুজ পাতা। ভাবার্থ এই যে, গম, যব ইত্যাদির ঐ দানা যা ওর মাথার উপর ভূষিসহ থাকে এবং যে পাতা ওগুলোর গাছের উপর জড়িয়ে থাকে। আর এটাও বলা হয়েছে যে, ক্ষেতের প্রথমেই উৎপাদিত পাতাকে তো বলা হয়, আর যখন তাতে দানা ধরে তখন ওকে বলা হয়। যেমন কবি যায়েদ ইবনে আমর স্বীয় প্রসিদ্ধ। কাসীদায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু’জন (হযরত মূসা আঃ ও হযরত হারূন আঃ) তাকে (ফিরাউনকে) বলোঃ কে মৃত্তিকায় শস্য উৎপাদন করেন? অতঃপর ওটা হতে চারা গাছ হয় যা আন্দোলিত হয় এবং তা হতে ওর মাথায় দানা বের করেন (কে তিনি? অর্থাৎ আল্লাহই এসব করে থাকেন)। সুতরাং এগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকারীর জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা উভয়ে (অর্থাৎ দানব ও মানব) তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? অর্থাৎ হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের আপাদমস্তক আল্লাহর নিয়ামত রাজির মধ্যে ডুবে রয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তোমরা আল্লাহ তাআলার কোন নিয়ামতকেই অস্বীকার করতে পার না। দু' একটি নিয়ামত হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু এখানে তো তোমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ জন্যেই তো মুমিন জ্বিনগুলো একথা শোন মাত্রই উত্তরে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি। সুতরাং আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর জবাবে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার নিয়ামতরাজির কোন একটিও অস্বীকার করতে পারি না।” হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রিসালাতের প্রাথমিক অবস্থায় যখন ইসলাম পুরোপুরিভাবে ঘোষিত হয়নি তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বায়তুল্লাহর রুকনের দিকে নামায পড়তে দেখেছি। ঐ সময় তিনি (আরবী) পাঠ করেছেন এবং মুশরিকরাও তা শ্রবণ করেছে।
আর-রাহমান 55:7
হযরত যার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “ (আরবী)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হবে, না (আরবী) হবে?” তখন তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পূর্ণটাই পড়েছো?" সে উত্তর দেয়ঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা এক রাকআতে পড়ে থাকি।” তিনি তখন বলেনঃ “কবিতা যেমন তাড়াতাড়ি পড়া হয়, তুমি হয়তো এই ভাবেই কুরআনও পড়ে থাকো? এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপারই বটে। আল্লাহর নবী (সঃ) মুফাসসালের প্রাথমিক সূরাগুলোর কোন দুটি সূরা মিলিয়ে পড়তেন তা আমার খুব ভাল স্মরণ আছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে মুফাসসালের সর্বপ্রথম সূরা হলো এই সূরায়ে রহমান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের (রাঃ) সমাবেশে আগমন করেন এবং সূরায়ে রহমান প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নীরবে শুনতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি জ্বিনের রাত্রে এ সূরাটি পাঠ করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তমরূপে জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি (আরবী)-এই আয়াতে এসেছি তখনই তারা জবাবে বলেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার অনুগ্রহ সমূহের কোন অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্যে।” এই রিওয়াইয়াতটিই তাফসীরে ইবনে জারীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই এই সূরাটি পাঠ করেছিলেন অথবা তার সামনে এটা পাঠ করা হয়েছিল। ঐ সময় সাহাবীদেরকে নীরব থাকতে দেখে তিনি একথা বলেছিলেন। আর জ্বিনদের উত্তরের শব্দগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালকের এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি।” ১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় ফল ও করমে ওর মুখস্থকরণ খুবই সহজ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। এটা হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি। আর যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, দ্বারা ভাল ও মন্দ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথা বলা শিখানো অর্থ নেয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত। কারণ এর সাথে সাথেই কুরআন শিক্ষা দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা তিলাওয়াতে কুরআন বুঝানো হয়েছে। আর তিলাওয়াতে কুরআন কথা বলা সহজ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক অক্ষরকে ওর মাখরাজ হতে জিহ্বা বিনা কষ্টে আদায় করে থাকে। তা কণ্ঠ হতে বের হোক অথবা ওষ্ঠাধরকে মিলানোর মাধ্যমেই হোক। বিভিন্ন মাখরাজ এবং বিভিন্ন প্রকারের অক্ষরের উচ্চারণের পদ্ধতি আল্লাহ তা'আলা মানুষকে শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এতদুভয়ের আবর্তনের মধ্যে আছে টক্কর এবং না আছে কোন অস্থিরতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে চন্দ্রের নাগাল পায় এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) সকালকে বেরকারী, রাত্রিকে তিনি আরাম ও বিশ্রামের সময় বানিয়েছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের উপর রেখেছেন, এটা হলো পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।” (৬:৯৬)হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যদি সমস্ত মানুষের, জ্বিনের, চতুষ্পদ জন্তুসমূহের এবং পক্ষীকূলের চক্ষুগুলোর দৃষ্টিশক্তি একটি মাত্র মানুষের চোখে দিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূর্যের সামনে যে সত্তরটি পর্দা রয়েছে ওগুলোর মধ্যে একটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তবুও সম্ভব নয় যে, এই লোকটিও সূর্যের দিকে তাকাতে পারে। অথচ সূর্যের আলো কুরসীর আলোর সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং এটা চিন্তা করার বিষয় যে, আল্লাহ স্বীয় জান্নাতী বান্দাদের চোখে কি পরিমাণ নূর দিবেন যে, তারা তাদের মহান প্রতিপালকের চেহারাকেও খোলাখুলিভাবে তাদের চক্ষু দ্বারা বিনা বাধায় দেখতে পাবে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মেনে চলে তাঁরই বিধান। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, (আরবী) বলা হয় ঐ গাছকে যে গাছের গুঁড়ি আছে। কিন্তু (আরবী) এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, গুঁড়ি বিহীন লতা গাছকে (আরবী) বলা হয়, যে গাছ মাটির উপর ছড়িয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ তারকা যা আকাশে রয়েছে। এ উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান, যদিও প্রথম উক্তিটিকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) পছন্দ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটিও দ্বিতীয় উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।” (২২:১৮)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড অর্থাৎ আদল ও ইনসাফ। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (৫৭:২৫) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে সত্য ও ন্যায়ের সাথে সৃষ্টি করেছেন যাতে সমস্ত জিনিস সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকে। তাই তিনি বলেনঃ ওযনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওযনে কম দিয়ো না। অর্থাৎ যখন ওযন করবে তখন সঠিকভাবে ওযন করবে। কম-বেশী করবে না। অর্থাৎ নেয়ার সময় বেশী নিবে এবং দেয়ার সময় কম দিবে এরূপ করো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ন্যায়ের দণ্ড সোজা রেখে ওযন করো।” (১৭:৩৫)আল্লাহ তা'আলা আকাশকে সমুন্নত করেছেন, আর পৃথিবীকে নীচু করে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাতে মযবুত পাহাড় পর্বতকে পেরেকের মত করে গেড়ে দিয়েছেন যাতে এটা হেলা-দোলা ও নড়াচড়া না করে। আর তাতে যেসব সৃষ্টজীব বসবাস করছে তারা যেন শান্তিতে অবস্থান করতে পারে। হে মানুষ! তোমরা যমীনের সৃষ্টজীবের প্রতি লক্ষ্য করো, ওগুলোর বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ও সীমাহীন ক্ষমতার পরিমাপ করে নাও। সাথে সাথে যমীনের উৎপাদিত জিনিসের দিকে চেয়ে দেখো। এতে রঙ বেরঙ এর টক-মিষ্ট ফল, নানা প্রকারের সুগন্ধি বিশিষ্ট ফল। বিশেষ করে খেজুর বৃক্ষ যা একটি উপকারী বৃক্ষ এবং যা রোপিত হওয়ার পর হতে নিয়ে শুকনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এবং এর পরেও খাওয়ার কাজ দেয়। খেজুর একটি সাধারণ ফল। ওর উপর খোসা থাকে যাকে ভেদ করে এটা বের হয়ে আসে। অতঃপর ওটা হয় কাদার মত, এরপর হয় রসাল এবং এরপর পেকে গিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এটা খুবই উপকারী। আর এর গাছও হয় খুব সোজা ও সুন্দর।হযরত শা'বী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেনঃ “আমার দূত আপনার নিকট হতে ফিরে এসে বলেছে যে, আপনার ওখানে নাকি একটি বক্ষ রয়েছে যার মত স্বভাব বা প্রকৃতি অন্য কোন গাছের মধ্যে নেই। ওটা গর্দভের কানের মত যমীন হতে বের হয়। তারপর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে মুক্তার মত হয়, এরপর সবুজ বর্ণ ধারণ করে পান্নার (মূল্যবান সবুজ পাথর বিশেষ) মত হয়ে যায়, তারপর লাল বর্ণ। ধারণ করে লাল ইয়াকৃত বা পদ্মরাগের মত হয়। এরপর পেকে গিয়ে অতি উত্তম ও সুস্বাদু ফলে পরিণত হয়। তারপর শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের রক্ষণ এবং মুসাফিরদের পাথেয় হয়। সুতরাং যদি আমার দূতের বর্ণনা সত্য হয় তবে আমার ধারণায় এটা জান্নাতী গাছ।" তাঁর এই পত্রের জবাবে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাকে লিখেনঃ “এই পত্র আল্লাহর দাস এবং মুসলমানদের নেতা উমার (রাঃ)-এর পক্ষ হতে রোমক সম্রাট কায়সারের নিকট। আপনার দূত আপনাকে যে খবর দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। এ ধরনের গাছ আরবে প্রচুর রয়েছে। এটা ঐ গাছ যা আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পার্শ্বে জন্মিয়েছিলেন, যখন তাঁর পুত্র ঈসা (আঃ) তার গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হন। অতএব, হে বাদশাহ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে মা’রূদ মনে করবেন না। আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাকে তিনি মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন, অতঃপর তাকে বলেছিলেনঃ ‘হও’ ফলে সে হয়ে গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৫৯-৬০)(আরবী)-এর অর্থ (আরবী) ও করা হয়েছে যা খেজুর বৃক্ষের গর্দানের উপর বাকল বা আবরণের মত থাকে।এই যমীনে রয়েছে খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। -এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের ঐ সবুজ পাতা যাকে উপর হতে কেটে দেয়া হয় এবং শুকিয়ে নেয়াহয়।(আরবী)-এর অর্থ হলো সুগন্ধ গুল্ম অথবা ক্ষেতের সবুজ পাতা। ভাবার্থ এই যে, গম, যব ইত্যাদির ঐ দানা যা ওর মাথার উপর ভূষিসহ থাকে এবং যে পাতা ওগুলোর গাছের উপর জড়িয়ে থাকে। আর এটাও বলা হয়েছে যে, ক্ষেতের প্রথমেই উৎপাদিত পাতাকে তো বলা হয়, আর যখন তাতে দানা ধরে তখন ওকে বলা হয়। যেমন কবি যায়েদ ইবনে আমর স্বীয় প্রসিদ্ধ। কাসীদায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু’জন (হযরত মূসা আঃ ও হযরত হারূন আঃ) তাকে (ফিরাউনকে) বলোঃ কে মৃত্তিকায় শস্য উৎপাদন করেন? অতঃপর ওটা হতে চারা গাছ হয় যা আন্দোলিত হয় এবং তা হতে ওর মাথায় দানা বের করেন (কে তিনি? অর্থাৎ আল্লাহই এসব করে থাকেন)। সুতরাং এগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকারীর জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা উভয়ে (অর্থাৎ দানব ও মানব) তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? অর্থাৎ হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের আপাদমস্তক আল্লাহর নিয়ামত রাজির মধ্যে ডুবে রয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তোমরা আল্লাহ তাআলার কোন নিয়ামতকেই অস্বীকার করতে পার না। দু' একটি নিয়ামত হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু এখানে তো তোমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ জন্যেই তো মুমিন জ্বিনগুলো একথা শোন মাত্রই উত্তরে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি। সুতরাং আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর জবাবে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার নিয়ামতরাজির কোন একটিও অস্বীকার করতে পারি না।” হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রিসালাতের প্রাথমিক অবস্থায় যখন ইসলাম পুরোপুরিভাবে ঘোষিত হয়নি তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বায়তুল্লাহর রুকনের দিকে নামায পড়তে দেখেছি। ঐ সময় তিনি (আরবী) পাঠ করেছেন এবং মুশরিকরাও তা শ্রবণ করেছে।
আর-রাহমান 55:8
হযরত যার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “ (আরবী)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হবে, না (আরবী) হবে?” তখন তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পূর্ণটাই পড়েছো?" সে উত্তর দেয়ঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা এক রাকআতে পড়ে থাকি।” তিনি তখন বলেনঃ “কবিতা যেমন তাড়াতাড়ি পড়া হয়, তুমি হয়তো এই ভাবেই কুরআনও পড়ে থাকো? এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপারই বটে। আল্লাহর নবী (সঃ) মুফাসসালের প্রাথমিক সূরাগুলোর কোন দুটি সূরা মিলিয়ে পড়তেন তা আমার খুব ভাল স্মরণ আছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে মুফাসসালের সর্বপ্রথম সূরা হলো এই সূরায়ে রহমান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের (রাঃ) সমাবেশে আগমন করেন এবং সূরায়ে রহমান প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নীরবে শুনতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি জ্বিনের রাত্রে এ সূরাটি পাঠ করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তমরূপে জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি (আরবী)-এই আয়াতে এসেছি তখনই তারা জবাবে বলেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার অনুগ্রহ সমূহের কোন অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্যে।” এই রিওয়াইয়াতটিই তাফসীরে ইবনে জারীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই এই সূরাটি পাঠ করেছিলেন অথবা তার সামনে এটা পাঠ করা হয়েছিল। ঐ সময় সাহাবীদেরকে নীরব থাকতে দেখে তিনি একথা বলেছিলেন। আর জ্বিনদের উত্তরের শব্দগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালকের এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি।” ১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় ফল ও করমে ওর মুখস্থকরণ খুবই সহজ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। এটা হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি। আর যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, দ্বারা ভাল ও মন্দ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথা বলা শিখানো অর্থ নেয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত। কারণ এর সাথে সাথেই কুরআন শিক্ষা দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা তিলাওয়াতে কুরআন বুঝানো হয়েছে। আর তিলাওয়াতে কুরআন কথা বলা সহজ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক অক্ষরকে ওর মাখরাজ হতে জিহ্বা বিনা কষ্টে আদায় করে থাকে। তা কণ্ঠ হতে বের হোক অথবা ওষ্ঠাধরকে মিলানোর মাধ্যমেই হোক। বিভিন্ন মাখরাজ এবং বিভিন্ন প্রকারের অক্ষরের উচ্চারণের পদ্ধতি আল্লাহ তা'আলা মানুষকে শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এতদুভয়ের আবর্তনের মধ্যে আছে টক্কর এবং না আছে কোন অস্থিরতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে চন্দ্রের নাগাল পায় এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) সকালকে বেরকারী, রাত্রিকে তিনি আরাম ও বিশ্রামের সময় বানিয়েছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের উপর রেখেছেন, এটা হলো পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।” (৬:৯৬)হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যদি সমস্ত মানুষের, জ্বিনের, চতুষ্পদ জন্তুসমূহের এবং পক্ষীকূলের চক্ষুগুলোর দৃষ্টিশক্তি একটি মাত্র মানুষের চোখে দিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূর্যের সামনে যে সত্তরটি পর্দা রয়েছে ওগুলোর মধ্যে একটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তবুও সম্ভব নয় যে, এই লোকটিও সূর্যের দিকে তাকাতে পারে। অথচ সূর্যের আলো কুরসীর আলোর সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং এটা চিন্তা করার বিষয় যে, আল্লাহ স্বীয় জান্নাতী বান্দাদের চোখে কি পরিমাণ নূর দিবেন যে, তারা তাদের মহান প্রতিপালকের চেহারাকেও খোলাখুলিভাবে তাদের চক্ষু দ্বারা বিনা বাধায় দেখতে পাবে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মেনে চলে তাঁরই বিধান। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, (আরবী) বলা হয় ঐ গাছকে যে গাছের গুঁড়ি আছে। কিন্তু (আরবী) এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, গুঁড়ি বিহীন লতা গাছকে (আরবী) বলা হয়, যে গাছ মাটির উপর ছড়িয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ তারকা যা আকাশে রয়েছে। এ উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান, যদিও প্রথম উক্তিটিকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) পছন্দ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটিও দ্বিতীয় উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।” (২২:১৮)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড অর্থাৎ আদল ও ইনসাফ। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (৫৭:২৫) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে সত্য ও ন্যায়ের সাথে সৃষ্টি করেছেন যাতে সমস্ত জিনিস সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকে। তাই তিনি বলেনঃ ওযনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওযনে কম দিয়ো না। অর্থাৎ যখন ওযন করবে তখন সঠিকভাবে ওযন করবে। কম-বেশী করবে না। অর্থাৎ নেয়ার সময় বেশী নিবে এবং দেয়ার সময় কম দিবে এরূপ করো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ন্যায়ের দণ্ড সোজা রেখে ওযন করো।” (১৭:৩৫)আল্লাহ তা'আলা আকাশকে সমুন্নত করেছেন, আর পৃথিবীকে নীচু করে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাতে মযবুত পাহাড় পর্বতকে পেরেকের মত করে গেড়ে দিয়েছেন যাতে এটা হেলা-দোলা ও নড়াচড়া না করে। আর তাতে যেসব সৃষ্টজীব বসবাস করছে তারা যেন শান্তিতে অবস্থান করতে পারে। হে মানুষ! তোমরা যমীনের সৃষ্টজীবের প্রতি লক্ষ্য করো, ওগুলোর বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ও সীমাহীন ক্ষমতার পরিমাপ করে নাও। সাথে সাথে যমীনের উৎপাদিত জিনিসের দিকে চেয়ে দেখো। এতে রঙ বেরঙ এর টক-মিষ্ট ফল, নানা প্রকারের সুগন্ধি বিশিষ্ট ফল। বিশেষ করে খেজুর বৃক্ষ যা একটি উপকারী বৃক্ষ এবং যা রোপিত হওয়ার পর হতে নিয়ে শুকনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এবং এর পরেও খাওয়ার কাজ দেয়। খেজুর একটি সাধারণ ফল। ওর উপর খোসা থাকে যাকে ভেদ করে এটা বের হয়ে আসে। অতঃপর ওটা হয় কাদার মত, এরপর হয় রসাল এবং এরপর পেকে গিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এটা খুবই উপকারী। আর এর গাছও হয় খুব সোজা ও সুন্দর।হযরত শা'বী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেনঃ “আমার দূত আপনার নিকট হতে ফিরে এসে বলেছে যে, আপনার ওখানে নাকি একটি বক্ষ রয়েছে যার মত স্বভাব বা প্রকৃতি অন্য কোন গাছের মধ্যে নেই। ওটা গর্দভের কানের মত যমীন হতে বের হয়। তারপর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে মুক্তার মত হয়, এরপর সবুজ বর্ণ ধারণ করে পান্নার (মূল্যবান সবুজ পাথর বিশেষ) মত হয়ে যায়, তারপর লাল বর্ণ। ধারণ করে লাল ইয়াকৃত বা পদ্মরাগের মত হয়। এরপর পেকে গিয়ে অতি উত্তম ও সুস্বাদু ফলে পরিণত হয়। তারপর শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের রক্ষণ এবং মুসাফিরদের পাথেয় হয়। সুতরাং যদি আমার দূতের বর্ণনা সত্য হয় তবে আমার ধারণায় এটা জান্নাতী গাছ।" তাঁর এই পত্রের জবাবে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাকে লিখেনঃ “এই পত্র আল্লাহর দাস এবং মুসলমানদের নেতা উমার (রাঃ)-এর পক্ষ হতে রোমক সম্রাট কায়সারের নিকট। আপনার দূত আপনাকে যে খবর দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। এ ধরনের গাছ আরবে প্রচুর রয়েছে। এটা ঐ গাছ যা আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পার্শ্বে জন্মিয়েছিলেন, যখন তাঁর পুত্র ঈসা (আঃ) তার গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হন। অতএব, হে বাদশাহ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে মা’রূদ মনে করবেন না। আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাকে তিনি মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন, অতঃপর তাকে বলেছিলেনঃ ‘হও’ ফলে সে হয়ে গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৫৯-৬০)(আরবী)-এর অর্থ (আরবী) ও করা হয়েছে যা খেজুর বৃক্ষের গর্দানের উপর বাকল বা আবরণের মত থাকে।এই যমীনে রয়েছে খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। -এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের ঐ সবুজ পাতা যাকে উপর হতে কেটে দেয়া হয় এবং শুকিয়ে নেয়াহয়।(আরবী)-এর অর্থ হলো সুগন্ধ গুল্ম অথবা ক্ষেতের সবুজ পাতা। ভাবার্থ এই যে, গম, যব ইত্যাদির ঐ দানা যা ওর মাথার উপর ভূষিসহ থাকে এবং যে পাতা ওগুলোর গাছের উপর জড়িয়ে থাকে। আর এটাও বলা হয়েছে যে, ক্ষেতের প্রথমেই উৎপাদিত পাতাকে তো বলা হয়, আর যখন তাতে দানা ধরে তখন ওকে বলা হয়। যেমন কবি যায়েদ ইবনে আমর স্বীয় প্রসিদ্ধ। কাসীদায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু’জন (হযরত মূসা আঃ ও হযরত হারূন আঃ) তাকে (ফিরাউনকে) বলোঃ কে মৃত্তিকায় শস্য উৎপাদন করেন? অতঃপর ওটা হতে চারা গাছ হয় যা আন্দোলিত হয় এবং তা হতে ওর মাথায় দানা বের করেন (কে তিনি? অর্থাৎ আল্লাহই এসব করে থাকেন)। সুতরাং এগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকারীর জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা উভয়ে (অর্থাৎ দানব ও মানব) তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? অর্থাৎ হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের আপাদমস্তক আল্লাহর নিয়ামত রাজির মধ্যে ডুবে রয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তোমরা আল্লাহ তাআলার কোন নিয়ামতকেই অস্বীকার করতে পার না। দু' একটি নিয়ামত হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু এখানে তো তোমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ জন্যেই তো মুমিন জ্বিনগুলো একথা শোন মাত্রই উত্তরে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি। সুতরাং আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর জবাবে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার নিয়ামতরাজির কোন একটিও অস্বীকার করতে পারি না।” হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রিসালাতের প্রাথমিক অবস্থায় যখন ইসলাম পুরোপুরিভাবে ঘোষিত হয়নি তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বায়তুল্লাহর রুকনের দিকে নামায পড়তে দেখেছি। ঐ সময় তিনি (আরবী) পাঠ করেছেন এবং মুশরিকরাও তা শ্রবণ করেছে।
আর-রাহমান 55:9
হযরত যার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “ (আরবী)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হবে, না (আরবী) হবে?” তখন তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পূর্ণটাই পড়েছো?" সে উত্তর দেয়ঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা এক রাকআতে পড়ে থাকি।” তিনি তখন বলেনঃ “কবিতা যেমন তাড়াতাড়ি পড়া হয়, তুমি হয়তো এই ভাবেই কুরআনও পড়ে থাকো? এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপারই বটে। আল্লাহর নবী (সঃ) মুফাসসালের প্রাথমিক সূরাগুলোর কোন দুটি সূরা মিলিয়ে পড়তেন তা আমার খুব ভাল স্মরণ আছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে মুফাসসালের সর্বপ্রথম সূরা হলো এই সূরায়ে রহমান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের (রাঃ) সমাবেশে আগমন করেন এবং সূরায়ে রহমান প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নীরবে শুনতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি জ্বিনের রাত্রে এ সূরাটি পাঠ করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তমরূপে জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি (আরবী)-এই আয়াতে এসেছি তখনই তারা জবাবে বলেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার অনুগ্রহ সমূহের কোন অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্যে।” এই রিওয়াইয়াতটিই তাফসীরে ইবনে জারীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই এই সূরাটি পাঠ করেছিলেন অথবা তার সামনে এটা পাঠ করা হয়েছিল। ঐ সময় সাহাবীদেরকে নীরব থাকতে দেখে তিনি একথা বলেছিলেন। আর জ্বিনদের উত্তরের শব্দগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালকের এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি।” ১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় ফল ও করমে ওর মুখস্থকরণ খুবই সহজ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। এটা হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি। আর যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, দ্বারা ভাল ও মন্দ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথা বলা শিখানো অর্থ নেয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত। কারণ এর সাথে সাথেই কুরআন শিক্ষা দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা তিলাওয়াতে কুরআন বুঝানো হয়েছে। আর তিলাওয়াতে কুরআন কথা বলা সহজ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক অক্ষরকে ওর মাখরাজ হতে জিহ্বা বিনা কষ্টে আদায় করে থাকে। তা কণ্ঠ হতে বের হোক অথবা ওষ্ঠাধরকে মিলানোর মাধ্যমেই হোক। বিভিন্ন মাখরাজ এবং বিভিন্ন প্রকারের অক্ষরের উচ্চারণের পদ্ধতি আল্লাহ তা'আলা মানুষকে শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এতদুভয়ের আবর্তনের মধ্যে আছে টক্কর এবং না আছে কোন অস্থিরতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে চন্দ্রের নাগাল পায় এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) সকালকে বেরকারী, রাত্রিকে তিনি আরাম ও বিশ্রামের সময় বানিয়েছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের উপর রেখেছেন, এটা হলো পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।” (৬:৯৬)হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যদি সমস্ত মানুষের, জ্বিনের, চতুষ্পদ জন্তুসমূহের এবং পক্ষীকূলের চক্ষুগুলোর দৃষ্টিশক্তি একটি মাত্র মানুষের চোখে দিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূর্যের সামনে যে সত্তরটি পর্দা রয়েছে ওগুলোর মধ্যে একটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তবুও সম্ভব নয় যে, এই লোকটিও সূর্যের দিকে তাকাতে পারে। অথচ সূর্যের আলো কুরসীর আলোর সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং এটা চিন্তা করার বিষয় যে, আল্লাহ স্বীয় জান্নাতী বান্দাদের চোখে কি পরিমাণ নূর দিবেন যে, তারা তাদের মহান প্রতিপালকের চেহারাকেও খোলাখুলিভাবে তাদের চক্ষু দ্বারা বিনা বাধায় দেখতে পাবে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মেনে চলে তাঁরই বিধান। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, (আরবী) বলা হয় ঐ গাছকে যে গাছের গুঁড়ি আছে। কিন্তু (আরবী) এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, গুঁড়ি বিহীন লতা গাছকে (আরবী) বলা হয়, যে গাছ মাটির উপর ছড়িয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ তারকা যা আকাশে রয়েছে। এ উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান, যদিও প্রথম উক্তিটিকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) পছন্দ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটিও দ্বিতীয় উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।” (২২:১৮)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড অর্থাৎ আদল ও ইনসাফ। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (৫৭:২৫) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে সত্য ও ন্যায়ের সাথে সৃষ্টি করেছেন যাতে সমস্ত জিনিস সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকে। তাই তিনি বলেনঃ ওযনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওযনে কম দিয়ো না। অর্থাৎ যখন ওযন করবে তখন সঠিকভাবে ওযন করবে। কম-বেশী করবে না। অর্থাৎ নেয়ার সময় বেশী নিবে এবং দেয়ার সময় কম দিবে এরূপ করো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ন্যায়ের দণ্ড সোজা রেখে ওযন করো।” (১৭:৩৫)আল্লাহ তা'আলা আকাশকে সমুন্নত করেছেন, আর পৃথিবীকে নীচু করে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাতে মযবুত পাহাড় পর্বতকে পেরেকের মত করে গেড়ে দিয়েছেন যাতে এটা হেলা-দোলা ও নড়াচড়া না করে। আর তাতে যেসব সৃষ্টজীব বসবাস করছে তারা যেন শান্তিতে অবস্থান করতে পারে। হে মানুষ! তোমরা যমীনের সৃষ্টজীবের প্রতি লক্ষ্য করো, ওগুলোর বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ও সীমাহীন ক্ষমতার পরিমাপ করে নাও। সাথে সাথে যমীনের উৎপাদিত জিনিসের দিকে চেয়ে দেখো। এতে রঙ বেরঙ এর টক-মিষ্ট ফল, নানা প্রকারের সুগন্ধি বিশিষ্ট ফল। বিশেষ করে খেজুর বৃক্ষ যা একটি উপকারী বৃক্ষ এবং যা রোপিত হওয়ার পর হতে নিয়ে শুকনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এবং এর পরেও খাওয়ার কাজ দেয়। খেজুর একটি সাধারণ ফল। ওর উপর খোসা থাকে যাকে ভেদ করে এটা বের হয়ে আসে। অতঃপর ওটা হয় কাদার মত, এরপর হয় রসাল এবং এরপর পেকে গিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এটা খুবই উপকারী। আর এর গাছও হয় খুব সোজা ও সুন্দর।হযরত শা'বী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেনঃ “আমার দূত আপনার নিকট হতে ফিরে এসে বলেছে যে, আপনার ওখানে নাকি একটি বক্ষ রয়েছে যার মত স্বভাব বা প্রকৃতি অন্য কোন গাছের মধ্যে নেই। ওটা গর্দভের কানের মত যমীন হতে বের হয়। তারপর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে মুক্তার মত হয়, এরপর সবুজ বর্ণ ধারণ করে পান্নার (মূল্যবান সবুজ পাথর বিশেষ) মত হয়ে যায়, তারপর লাল বর্ণ। ধারণ করে লাল ইয়াকৃত বা পদ্মরাগের মত হয়। এরপর পেকে গিয়ে অতি উত্তম ও সুস্বাদু ফলে পরিণত হয়। তারপর শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের রক্ষণ এবং মুসাফিরদের পাথেয় হয়। সুতরাং যদি আমার দূতের বর্ণনা সত্য হয় তবে আমার ধারণায় এটা জান্নাতী গাছ।" তাঁর এই পত্রের জবাবে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাকে লিখেনঃ “এই পত্র আল্লাহর দাস এবং মুসলমানদের নেতা উমার (রাঃ)-এর পক্ষ হতে রোমক সম্রাট কায়সারের নিকট। আপনার দূত আপনাকে যে খবর দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। এ ধরনের গাছ আরবে প্রচুর রয়েছে। এটা ঐ গাছ যা আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পার্শ্বে জন্মিয়েছিলেন, যখন তাঁর পুত্র ঈসা (আঃ) তার গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হন। অতএব, হে বাদশাহ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে মা’রূদ মনে করবেন না। আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাকে তিনি মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন, অতঃপর তাকে বলেছিলেনঃ ‘হও’ ফলে সে হয়ে গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৫৯-৬০)(আরবী)-এর অর্থ (আরবী) ও করা হয়েছে যা খেজুর বৃক্ষের গর্দানের উপর বাকল বা আবরণের মত থাকে।এই যমীনে রয়েছে খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। -এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের ঐ সবুজ পাতা যাকে উপর হতে কেটে দেয়া হয় এবং শুকিয়ে নেয়াহয়।(আরবী)-এর অর্থ হলো সুগন্ধ গুল্ম অথবা ক্ষেতের সবুজ পাতা। ভাবার্থ এই যে, গম, যব ইত্যাদির ঐ দানা যা ওর মাথার উপর ভূষিসহ থাকে এবং যে পাতা ওগুলোর গাছের উপর জড়িয়ে থাকে। আর এটাও বলা হয়েছে যে, ক্ষেতের প্রথমেই উৎপাদিত পাতাকে তো বলা হয়, আর যখন তাতে দানা ধরে তখন ওকে বলা হয়। যেমন কবি যায়েদ ইবনে আমর স্বীয় প্রসিদ্ধ। কাসীদায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু’জন (হযরত মূসা আঃ ও হযরত হারূন আঃ) তাকে (ফিরাউনকে) বলোঃ কে মৃত্তিকায় শস্য উৎপাদন করেন? অতঃপর ওটা হতে চারা গাছ হয় যা আন্দোলিত হয় এবং তা হতে ওর মাথায় দানা বের করেন (কে তিনি? অর্থাৎ আল্লাহই এসব করে থাকেন)। সুতরাং এগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকারীর জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা উভয়ে (অর্থাৎ দানব ও মানব) তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? অর্থাৎ হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের আপাদমস্তক আল্লাহর নিয়ামত রাজির মধ্যে ডুবে রয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তোমরা আল্লাহ তাআলার কোন নিয়ামতকেই অস্বীকার করতে পার না। দু' একটি নিয়ামত হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু এখানে তো তোমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ জন্যেই তো মুমিন জ্বিনগুলো একথা শোন মাত্রই উত্তরে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি। সুতরাং আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর জবাবে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার নিয়ামতরাজির কোন একটিও অস্বীকার করতে পারি না।” হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রিসালাতের প্রাথমিক অবস্থায় যখন ইসলাম পুরোপুরিভাবে ঘোষিত হয়নি তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বায়তুল্লাহর রুকনের দিকে নামায পড়তে দেখেছি। ঐ সময় তিনি (আরবী) পাঠ করেছেন এবং মুশরিকরাও তা শ্রবণ করেছে।
আর-রাহমান 55:10
হযরত যার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “ (আরবী)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হবে, না (আরবী) হবে?” তখন তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পূর্ণটাই পড়েছো?" সে উত্তর দেয়ঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা এক রাকআতে পড়ে থাকি।” তিনি তখন বলেনঃ “কবিতা যেমন তাড়াতাড়ি পড়া হয়, তুমি হয়তো এই ভাবেই কুরআনও পড়ে থাকো? এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপারই বটে। আল্লাহর নবী (সঃ) মুফাসসালের প্রাথমিক সূরাগুলোর কোন দুটি সূরা মিলিয়ে পড়তেন তা আমার খুব ভাল স্মরণ আছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে মুফাসসালের সর্বপ্রথম সূরা হলো এই সূরায়ে রহমান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের (রাঃ) সমাবেশে আগমন করেন এবং সূরায়ে রহমান প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নীরবে শুনতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি জ্বিনের রাত্রে এ সূরাটি পাঠ করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তমরূপে জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি (আরবী)-এই আয়াতে এসেছি তখনই তারা জবাবে বলেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার অনুগ্রহ সমূহের কোন অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্যে।” এই রিওয়াইয়াতটিই তাফসীরে ইবনে জারীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই এই সূরাটি পাঠ করেছিলেন অথবা তার সামনে এটা পাঠ করা হয়েছিল। ঐ সময় সাহাবীদেরকে নীরব থাকতে দেখে তিনি একথা বলেছিলেন। আর জ্বিনদের উত্তরের শব্দগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালকের এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি।” ১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় ফল ও করমে ওর মুখস্থকরণ খুবই সহজ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। এটা হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি। আর যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, দ্বারা ভাল ও মন্দ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথা বলা শিখানো অর্থ নেয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত। কারণ এর সাথে সাথেই কুরআন শিক্ষা দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা তিলাওয়াতে কুরআন বুঝানো হয়েছে। আর তিলাওয়াতে কুরআন কথা বলা সহজ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক অক্ষরকে ওর মাখরাজ হতে জিহ্বা বিনা কষ্টে আদায় করে থাকে। তা কণ্ঠ হতে বের হোক অথবা ওষ্ঠাধরকে মিলানোর মাধ্যমেই হোক। বিভিন্ন মাখরাজ এবং বিভিন্ন প্রকারের অক্ষরের উচ্চারণের পদ্ধতি আল্লাহ তা'আলা মানুষকে শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এতদুভয়ের আবর্তনের মধ্যে আছে টক্কর এবং না আছে কোন অস্থিরতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে চন্দ্রের নাগাল পায় এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) সকালকে বেরকারী, রাত্রিকে তিনি আরাম ও বিশ্রামের সময় বানিয়েছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের উপর রেখেছেন, এটা হলো পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।” (৬:৯৬)হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যদি সমস্ত মানুষের, জ্বিনের, চতুষ্পদ জন্তুসমূহের এবং পক্ষীকূলের চক্ষুগুলোর দৃষ্টিশক্তি একটি মাত্র মানুষের চোখে দিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূর্যের সামনে যে সত্তরটি পর্দা রয়েছে ওগুলোর মধ্যে একটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তবুও সম্ভব নয় যে, এই লোকটিও সূর্যের দিকে তাকাতে পারে। অথচ সূর্যের আলো কুরসীর আলোর সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং এটা চিন্তা করার বিষয় যে, আল্লাহ স্বীয় জান্নাতী বান্দাদের চোখে কি পরিমাণ নূর দিবেন যে, তারা তাদের মহান প্রতিপালকের চেহারাকেও খোলাখুলিভাবে তাদের চক্ষু দ্বারা বিনা বাধায় দেখতে পাবে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মেনে চলে তাঁরই বিধান। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, (আরবী) বলা হয় ঐ গাছকে যে গাছের গুঁড়ি আছে। কিন্তু (আরবী) এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, গুঁড়ি বিহীন লতা গাছকে (আরবী) বলা হয়, যে গাছ মাটির উপর ছড়িয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ তারকা যা আকাশে রয়েছে। এ উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান, যদিও প্রথম উক্তিটিকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) পছন্দ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটিও দ্বিতীয় উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।” (২২:১৮)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড অর্থাৎ আদল ও ইনসাফ। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (৫৭:২৫) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে সত্য ও ন্যায়ের সাথে সৃষ্টি করেছেন যাতে সমস্ত জিনিস সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকে। তাই তিনি বলেনঃ ওযনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওযনে কম দিয়ো না। অর্থাৎ যখন ওযন করবে তখন সঠিকভাবে ওযন করবে। কম-বেশী করবে না। অর্থাৎ নেয়ার সময় বেশী নিবে এবং দেয়ার সময় কম দিবে এরূপ করো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ন্যায়ের দণ্ড সোজা রেখে ওযন করো।” (১৭:৩৫)আল্লাহ তা'আলা আকাশকে সমুন্নত করেছেন, আর পৃথিবীকে নীচু করে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাতে মযবুত পাহাড় পর্বতকে পেরেকের মত করে গেড়ে দিয়েছেন যাতে এটা হেলা-দোলা ও নড়াচড়া না করে। আর তাতে যেসব সৃষ্টজীব বসবাস করছে তারা যেন শান্তিতে অবস্থান করতে পারে। হে মানুষ! তোমরা যমীনের সৃষ্টজীবের প্রতি লক্ষ্য করো, ওগুলোর বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ও সীমাহীন ক্ষমতার পরিমাপ করে নাও। সাথে সাথে যমীনের উৎপাদিত জিনিসের দিকে চেয়ে দেখো। এতে রঙ বেরঙ এর টক-মিষ্ট ফল, নানা প্রকারের সুগন্ধি বিশিষ্ট ফল। বিশেষ করে খেজুর বৃক্ষ যা একটি উপকারী বৃক্ষ এবং যা রোপিত হওয়ার পর হতে নিয়ে শুকনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এবং এর পরেও খাওয়ার কাজ দেয়। খেজুর একটি সাধারণ ফল। ওর উপর খোসা থাকে যাকে ভেদ করে এটা বের হয়ে আসে। অতঃপর ওটা হয় কাদার মত, এরপর হয় রসাল এবং এরপর পেকে গিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এটা খুবই উপকারী। আর এর গাছও হয় খুব সোজা ও সুন্দর।হযরত শা'বী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেনঃ “আমার দূত আপনার নিকট হতে ফিরে এসে বলেছে যে, আপনার ওখানে নাকি একটি বক্ষ রয়েছে যার মত স্বভাব বা প্রকৃতি অন্য কোন গাছের মধ্যে নেই। ওটা গর্দভের কানের মত যমীন হতে বের হয়। তারপর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে মুক্তার মত হয়, এরপর সবুজ বর্ণ ধারণ করে পান্নার (মূল্যবান সবুজ পাথর বিশেষ) মত হয়ে যায়, তারপর লাল বর্ণ। ধারণ করে লাল ইয়াকৃত বা পদ্মরাগের মত হয়। এরপর পেকে গিয়ে অতি উত্তম ও সুস্বাদু ফলে পরিণত হয়। তারপর শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের রক্ষণ এবং মুসাফিরদের পাথেয় হয়। সুতরাং যদি আমার দূতের বর্ণনা সত্য হয় তবে আমার ধারণায় এটা জান্নাতী গাছ।" তাঁর এই পত্রের জবাবে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাকে লিখেনঃ “এই পত্র আল্লাহর দাস এবং মুসলমানদের নেতা উমার (রাঃ)-এর পক্ষ হতে রোমক সম্রাট কায়সারের নিকট। আপনার দূত আপনাকে যে খবর দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। এ ধরনের গাছ আরবে প্রচুর রয়েছে। এটা ঐ গাছ যা আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পার্শ্বে জন্মিয়েছিলেন, যখন তাঁর পুত্র ঈসা (আঃ) তার গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হন। অতএব, হে বাদশাহ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে মা’রূদ মনে করবেন না। আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাকে তিনি মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন, অতঃপর তাকে বলেছিলেনঃ ‘হও’ ফলে সে হয়ে গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৫৯-৬০)(আরবী)-এর অর্থ (আরবী) ও করা হয়েছে যা খেজুর বৃক্ষের গর্দানের উপর বাকল বা আবরণের মত থাকে।এই যমীনে রয়েছে খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। -এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের ঐ সবুজ পাতা যাকে উপর হতে কেটে দেয়া হয় এবং শুকিয়ে নেয়াহয়।(আরবী)-এর অর্থ হলো সুগন্ধ গুল্ম অথবা ক্ষেতের সবুজ পাতা। ভাবার্থ এই যে, গম, যব ইত্যাদির ঐ দানা যা ওর মাথার উপর ভূষিসহ থাকে এবং যে পাতা ওগুলোর গাছের উপর জড়িয়ে থাকে। আর এটাও বলা হয়েছে যে, ক্ষেতের প্রথমেই উৎপাদিত পাতাকে তো বলা হয়, আর যখন তাতে দানা ধরে তখন ওকে বলা হয়। যেমন কবি যায়েদ ইবনে আমর স্বীয় প্রসিদ্ধ। কাসীদায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু’জন (হযরত মূসা আঃ ও হযরত হারূন আঃ) তাকে (ফিরাউনকে) বলোঃ কে মৃত্তিকায় শস্য উৎপাদন করেন? অতঃপর ওটা হতে চারা গাছ হয় যা আন্দোলিত হয় এবং তা হতে ওর মাথায় দানা বের করেন (কে তিনি? অর্থাৎ আল্লাহই এসব করে থাকেন)। সুতরাং এগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকারীর জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা উভয়ে (অর্থাৎ দানব ও মানব) তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? অর্থাৎ হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের আপাদমস্তক আল্লাহর নিয়ামত রাজির মধ্যে ডুবে রয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তোমরা আল্লাহ তাআলার কোন নিয়ামতকেই অস্বীকার করতে পার না। দু' একটি নিয়ামত হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু এখানে তো তোমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ জন্যেই তো মুমিন জ্বিনগুলো একথা শোন মাত্রই উত্তরে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি। সুতরাং আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর জবাবে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার নিয়ামতরাজির কোন একটিও অস্বীকার করতে পারি না।” হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রিসালাতের প্রাথমিক অবস্থায় যখন ইসলাম পুরোপুরিভাবে ঘোষিত হয়নি তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বায়তুল্লাহর রুকনের দিকে নামায পড়তে দেখেছি। ঐ সময় তিনি (আরবী) পাঠ করেছেন এবং মুশরিকরাও তা শ্রবণ করেছে।
আর-রাহমান 55:11
হযরত যার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “ (আরবী)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হবে, না (আরবী) হবে?” তখন তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পূর্ণটাই পড়েছো?" সে উত্তর দেয়ঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা এক রাকআতে পড়ে থাকি।” তিনি তখন বলেনঃ “কবিতা যেমন তাড়াতাড়ি পড়া হয়, তুমি হয়তো এই ভাবেই কুরআনও পড়ে থাকো? এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপারই বটে। আল্লাহর নবী (সঃ) মুফাসসালের প্রাথমিক সূরাগুলোর কোন দুটি সূরা মিলিয়ে পড়তেন তা আমার খুব ভাল স্মরণ আছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে মুফাসসালের সর্বপ্রথম সূরা হলো এই সূরায়ে রহমান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের (রাঃ) সমাবেশে আগমন করেন এবং সূরায়ে রহমান প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নীরবে শুনতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি জ্বিনের রাত্রে এ সূরাটি পাঠ করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তমরূপে জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি (আরবী)-এই আয়াতে এসেছি তখনই তারা জবাবে বলেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার অনুগ্রহ সমূহের কোন অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্যে।” এই রিওয়াইয়াতটিই তাফসীরে ইবনে জারীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই এই সূরাটি পাঠ করেছিলেন অথবা তার সামনে এটা পাঠ করা হয়েছিল। ঐ সময় সাহাবীদেরকে নীরব থাকতে দেখে তিনি একথা বলেছিলেন। আর জ্বিনদের উত্তরের শব্দগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালকের এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি।” ১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় ফল ও করমে ওর মুখস্থকরণ খুবই সহজ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। এটা হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি। আর যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, দ্বারা ভাল ও মন্দ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথা বলা শিখানো অর্থ নেয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত। কারণ এর সাথে সাথেই কুরআন শিক্ষা দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা তিলাওয়াতে কুরআন বুঝানো হয়েছে। আর তিলাওয়াতে কুরআন কথা বলা সহজ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক অক্ষরকে ওর মাখরাজ হতে জিহ্বা বিনা কষ্টে আদায় করে থাকে। তা কণ্ঠ হতে বের হোক অথবা ওষ্ঠাধরকে মিলানোর মাধ্যমেই হোক। বিভিন্ন মাখরাজ এবং বিভিন্ন প্রকারের অক্ষরের উচ্চারণের পদ্ধতি আল্লাহ তা'আলা মানুষকে শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এতদুভয়ের আবর্তনের মধ্যে আছে টক্কর এবং না আছে কোন অস্থিরতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে চন্দ্রের নাগাল পায় এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) সকালকে বেরকারী, রাত্রিকে তিনি আরাম ও বিশ্রামের সময় বানিয়েছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের উপর রেখেছেন, এটা হলো পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।” (৬:৯৬)হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যদি সমস্ত মানুষের, জ্বিনের, চতুষ্পদ জন্তুসমূহের এবং পক্ষীকূলের চক্ষুগুলোর দৃষ্টিশক্তি একটি মাত্র মানুষের চোখে দিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূর্যের সামনে যে সত্তরটি পর্দা রয়েছে ওগুলোর মধ্যে একটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তবুও সম্ভব নয় যে, এই লোকটিও সূর্যের দিকে তাকাতে পারে। অথচ সূর্যের আলো কুরসীর আলোর সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং এটা চিন্তা করার বিষয় যে, আল্লাহ স্বীয় জান্নাতী বান্দাদের চোখে কি পরিমাণ নূর দিবেন যে, তারা তাদের মহান প্রতিপালকের চেহারাকেও খোলাখুলিভাবে তাদের চক্ষু দ্বারা বিনা বাধায় দেখতে পাবে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মেনে চলে তাঁরই বিধান। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, (আরবী) বলা হয় ঐ গাছকে যে গাছের গুঁড়ি আছে। কিন্তু (আরবী) এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, গুঁড়ি বিহীন লতা গাছকে (আরবী) বলা হয়, যে গাছ মাটির উপর ছড়িয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ তারকা যা আকাশে রয়েছে। এ উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান, যদিও প্রথম উক্তিটিকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) পছন্দ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটিও দ্বিতীয় উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।” (২২:১৮)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড অর্থাৎ আদল ও ইনসাফ। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (৫৭:২৫) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে সত্য ও ন্যায়ের সাথে সৃষ্টি করেছেন যাতে সমস্ত জিনিস সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকে। তাই তিনি বলেনঃ ওযনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওযনে কম দিয়ো না। অর্থাৎ যখন ওযন করবে তখন সঠিকভাবে ওযন করবে। কম-বেশী করবে না। অর্থাৎ নেয়ার সময় বেশী নিবে এবং দেয়ার সময় কম দিবে এরূপ করো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ন্যায়ের দণ্ড সোজা রেখে ওযন করো।” (১৭:৩৫)আল্লাহ তা'আলা আকাশকে সমুন্নত করেছেন, আর পৃথিবীকে নীচু করে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাতে মযবুত পাহাড় পর্বতকে পেরেকের মত করে গেড়ে দিয়েছেন যাতে এটা হেলা-দোলা ও নড়াচড়া না করে। আর তাতে যেসব সৃষ্টজীব বসবাস করছে তারা যেন শান্তিতে অবস্থান করতে পারে। হে মানুষ! তোমরা যমীনের সৃষ্টজীবের প্রতি লক্ষ্য করো, ওগুলোর বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ও সীমাহীন ক্ষমতার পরিমাপ করে নাও। সাথে সাথে যমীনের উৎপাদিত জিনিসের দিকে চেয়ে দেখো। এতে রঙ বেরঙ এর টক-মিষ্ট ফল, নানা প্রকারের সুগন্ধি বিশিষ্ট ফল। বিশেষ করে খেজুর বৃক্ষ যা একটি উপকারী বৃক্ষ এবং যা রোপিত হওয়ার পর হতে নিয়ে শুকনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এবং এর পরেও খাওয়ার কাজ দেয়। খেজুর একটি সাধারণ ফল। ওর উপর খোসা থাকে যাকে ভেদ করে এটা বের হয়ে আসে। অতঃপর ওটা হয় কাদার মত, এরপর হয় রসাল এবং এরপর পেকে গিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এটা খুবই উপকারী। আর এর গাছও হয় খুব সোজা ও সুন্দর।হযরত শা'বী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেনঃ “আমার দূত আপনার নিকট হতে ফিরে এসে বলেছে যে, আপনার ওখানে নাকি একটি বক্ষ রয়েছে যার মত স্বভাব বা প্রকৃতি অন্য কোন গাছের মধ্যে নেই। ওটা গর্দভের কানের মত যমীন হতে বের হয়। তারপর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে মুক্তার মত হয়, এরপর সবুজ বর্ণ ধারণ করে পান্নার (মূল্যবান সবুজ পাথর বিশেষ) মত হয়ে যায়, তারপর লাল বর্ণ। ধারণ করে লাল ইয়াকৃত বা পদ্মরাগের মত হয়। এরপর পেকে গিয়ে অতি উত্তম ও সুস্বাদু ফলে পরিণত হয়। তারপর শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের রক্ষণ এবং মুসাফিরদের পাথেয় হয়। সুতরাং যদি আমার দূতের বর্ণনা সত্য হয় তবে আমার ধারণায় এটা জান্নাতী গাছ।" তাঁর এই পত্রের জবাবে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাকে লিখেনঃ “এই পত্র আল্লাহর দাস এবং মুসলমানদের নেতা উমার (রাঃ)-এর পক্ষ হতে রোমক সম্রাট কায়সারের নিকট। আপনার দূত আপনাকে যে খবর দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। এ ধরনের গাছ আরবে প্রচুর রয়েছে। এটা ঐ গাছ যা আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পার্শ্বে জন্মিয়েছিলেন, যখন তাঁর পুত্র ঈসা (আঃ) তার গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হন। অতএব, হে বাদশাহ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে মা’রূদ মনে করবেন না। আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাকে তিনি মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন, অতঃপর তাকে বলেছিলেনঃ ‘হও’ ফলে সে হয়ে গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৫৯-৬০)(আরবী)-এর অর্থ (আরবী) ও করা হয়েছে যা খেজুর বৃক্ষের গর্দানের উপর বাকল বা আবরণের মত থাকে।এই যমীনে রয়েছে খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। -এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের ঐ সবুজ পাতা যাকে উপর হতে কেটে দেয়া হয় এবং শুকিয়ে নেয়াহয়।(আরবী)-এর অর্থ হলো সুগন্ধ গুল্ম অথবা ক্ষেতের সবুজ পাতা। ভাবার্থ এই যে, গম, যব ইত্যাদির ঐ দানা যা ওর মাথার উপর ভূষিসহ থাকে এবং যে পাতা ওগুলোর গাছের উপর জড়িয়ে থাকে। আর এটাও বলা হয়েছে যে, ক্ষেতের প্রথমেই উৎপাদিত পাতাকে তো বলা হয়, আর যখন তাতে দানা ধরে তখন ওকে বলা হয়। যেমন কবি যায়েদ ইবনে আমর স্বীয় প্রসিদ্ধ। কাসীদায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু’জন (হযরত মূসা আঃ ও হযরত হারূন আঃ) তাকে (ফিরাউনকে) বলোঃ কে মৃত্তিকায় শস্য উৎপাদন করেন? অতঃপর ওটা হতে চারা গাছ হয় যা আন্দোলিত হয় এবং তা হতে ওর মাথায় দানা বের করেন (কে তিনি? অর্থাৎ আল্লাহই এসব করে থাকেন)। সুতরাং এগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকারীর জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা উভয়ে (অর্থাৎ দানব ও মানব) তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? অর্থাৎ হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের আপাদমস্তক আল্লাহর নিয়ামত রাজির মধ্যে ডুবে রয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তোমরা আল্লাহ তাআলার কোন নিয়ামতকেই অস্বীকার করতে পার না। দু' একটি নিয়ামত হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু এখানে তো তোমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ জন্যেই তো মুমিন জ্বিনগুলো একথা শোন মাত্রই উত্তরে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি। সুতরাং আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর জবাবে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার নিয়ামতরাজির কোন একটিও অস্বীকার করতে পারি না।” হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রিসালাতের প্রাথমিক অবস্থায় যখন ইসলাম পুরোপুরিভাবে ঘোষিত হয়নি তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বায়তুল্লাহর রুকনের দিকে নামায পড়তে দেখেছি। ঐ সময় তিনি (আরবী) পাঠ করেছেন এবং মুশরিকরাও তা শ্রবণ করেছে।
আর-রাহমান 55:12
হযরত যার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “ (আরবী)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হবে, না (আরবী) হবে?” তখন তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পূর্ণটাই পড়েছো?" সে উত্তর দেয়ঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা এক রাকআতে পড়ে থাকি।” তিনি তখন বলেনঃ “কবিতা যেমন তাড়াতাড়ি পড়া হয়, তুমি হয়তো এই ভাবেই কুরআনও পড়ে থাকো? এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপারই বটে। আল্লাহর নবী (সঃ) মুফাসসালের প্রাথমিক সূরাগুলোর কোন দুটি সূরা মিলিয়ে পড়তেন তা আমার খুব ভাল স্মরণ আছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে মুফাসসালের সর্বপ্রথম সূরা হলো এই সূরায়ে রহমান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের (রাঃ) সমাবেশে আগমন করেন এবং সূরায়ে রহমান প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নীরবে শুনতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি জ্বিনের রাত্রে এ সূরাটি পাঠ করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তমরূপে জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি (আরবী)-এই আয়াতে এসেছি তখনই তারা জবাবে বলেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার অনুগ্রহ সমূহের কোন অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্যে।” এই রিওয়াইয়াতটিই তাফসীরে ইবনে জারীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই এই সূরাটি পাঠ করেছিলেন অথবা তার সামনে এটা পাঠ করা হয়েছিল। ঐ সময় সাহাবীদেরকে নীরব থাকতে দেখে তিনি একথা বলেছিলেন। আর জ্বিনদের উত্তরের শব্দগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালকের এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি।” ১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় ফল ও করমে ওর মুখস্থকরণ খুবই সহজ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। এটা হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি। আর যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, দ্বারা ভাল ও মন্দ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথা বলা শিখানো অর্থ নেয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত। কারণ এর সাথে সাথেই কুরআন শিক্ষা দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা তিলাওয়াতে কুরআন বুঝানো হয়েছে। আর তিলাওয়াতে কুরআন কথা বলা সহজ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক অক্ষরকে ওর মাখরাজ হতে জিহ্বা বিনা কষ্টে আদায় করে থাকে। তা কণ্ঠ হতে বের হোক অথবা ওষ্ঠাধরকে মিলানোর মাধ্যমেই হোক। বিভিন্ন মাখরাজ এবং বিভিন্ন প্রকারের অক্ষরের উচ্চারণের পদ্ধতি আল্লাহ তা'আলা মানুষকে শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এতদুভয়ের আবর্তনের মধ্যে আছে টক্কর এবং না আছে কোন অস্থিরতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে চন্দ্রের নাগাল পায় এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) সকালকে বেরকারী, রাত্রিকে তিনি আরাম ও বিশ্রামের সময় বানিয়েছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের উপর রেখেছেন, এটা হলো পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।” (৬:৯৬)হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যদি সমস্ত মানুষের, জ্বিনের, চতুষ্পদ জন্তুসমূহের এবং পক্ষীকূলের চক্ষুগুলোর দৃষ্টিশক্তি একটি মাত্র মানুষের চোখে দিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূর্যের সামনে যে সত্তরটি পর্দা রয়েছে ওগুলোর মধ্যে একটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তবুও সম্ভব নয় যে, এই লোকটিও সূর্যের দিকে তাকাতে পারে। অথচ সূর্যের আলো কুরসীর আলোর সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং এটা চিন্তা করার বিষয় যে, আল্লাহ স্বীয় জান্নাতী বান্দাদের চোখে কি পরিমাণ নূর দিবেন যে, তারা তাদের মহান প্রতিপালকের চেহারাকেও খোলাখুলিভাবে তাদের চক্ষু দ্বারা বিনা বাধায় দেখতে পাবে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মেনে চলে তাঁরই বিধান। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, (আরবী) বলা হয় ঐ গাছকে যে গাছের গুঁড়ি আছে। কিন্তু (আরবী) এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, গুঁড়ি বিহীন লতা গাছকে (আরবী) বলা হয়, যে গাছ মাটির উপর ছড়িয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ তারকা যা আকাশে রয়েছে। এ উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান, যদিও প্রথম উক্তিটিকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) পছন্দ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটিও দ্বিতীয় উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।” (২২:১৮)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড অর্থাৎ আদল ও ইনসাফ। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (৫৭:২৫) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে সত্য ও ন্যায়ের সাথে সৃষ্টি করেছেন যাতে সমস্ত জিনিস সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকে। তাই তিনি বলেনঃ ওযনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওযনে কম দিয়ো না। অর্থাৎ যখন ওযন করবে তখন সঠিকভাবে ওযন করবে। কম-বেশী করবে না। অর্থাৎ নেয়ার সময় বেশী নিবে এবং দেয়ার সময় কম দিবে এরূপ করো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ন্যায়ের দণ্ড সোজা রেখে ওযন করো।” (১৭:৩৫)আল্লাহ তা'আলা আকাশকে সমুন্নত করেছেন, আর পৃথিবীকে নীচু করে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাতে মযবুত পাহাড় পর্বতকে পেরেকের মত করে গেড়ে দিয়েছেন যাতে এটা হেলা-দোলা ও নড়াচড়া না করে। আর তাতে যেসব সৃষ্টজীব বসবাস করছে তারা যেন শান্তিতে অবস্থান করতে পারে। হে মানুষ! তোমরা যমীনের সৃষ্টজীবের প্রতি লক্ষ্য করো, ওগুলোর বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ও সীমাহীন ক্ষমতার পরিমাপ করে নাও। সাথে সাথে যমীনের উৎপাদিত জিনিসের দিকে চেয়ে দেখো। এতে রঙ বেরঙ এর টক-মিষ্ট ফল, নানা প্রকারের সুগন্ধি বিশিষ্ট ফল। বিশেষ করে খেজুর বৃক্ষ যা একটি উপকারী বৃক্ষ এবং যা রোপিত হওয়ার পর হতে নিয়ে শুকনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এবং এর পরেও খাওয়ার কাজ দেয়। খেজুর একটি সাধারণ ফল। ওর উপর খোসা থাকে যাকে ভেদ করে এটা বের হয়ে আসে। অতঃপর ওটা হয় কাদার মত, এরপর হয় রসাল এবং এরপর পেকে গিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এটা খুবই উপকারী। আর এর গাছও হয় খুব সোজা ও সুন্দর।হযরত শা'বী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেনঃ “আমার দূত আপনার নিকট হতে ফিরে এসে বলেছে যে, আপনার ওখানে নাকি একটি বক্ষ রয়েছে যার মত স্বভাব বা প্রকৃতি অন্য কোন গাছের মধ্যে নেই। ওটা গর্দভের কানের মত যমীন হতে বের হয়। তারপর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে মুক্তার মত হয়, এরপর সবুজ বর্ণ ধারণ করে পান্নার (মূল্যবান সবুজ পাথর বিশেষ) মত হয়ে যায়, তারপর লাল বর্ণ। ধারণ করে লাল ইয়াকৃত বা পদ্মরাগের মত হয়। এরপর পেকে গিয়ে অতি উত্তম ও সুস্বাদু ফলে পরিণত হয়। তারপর শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের রক্ষণ এবং মুসাফিরদের পাথেয় হয়। সুতরাং যদি আমার দূতের বর্ণনা সত্য হয় তবে আমার ধারণায় এটা জান্নাতী গাছ।" তাঁর এই পত্রের জবাবে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাকে লিখেনঃ “এই পত্র আল্লাহর দাস এবং মুসলমানদের নেতা উমার (রাঃ)-এর পক্ষ হতে রোমক সম্রাট কায়সারের নিকট। আপনার দূত আপনাকে যে খবর দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। এ ধরনের গাছ আরবে প্রচুর রয়েছে। এটা ঐ গাছ যা আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পার্শ্বে জন্মিয়েছিলেন, যখন তাঁর পুত্র ঈসা (আঃ) তার গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হন। অতএব, হে বাদশাহ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে মা’রূদ মনে করবেন না। আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাকে তিনি মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন, অতঃপর তাকে বলেছিলেনঃ ‘হও’ ফলে সে হয়ে গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৫৯-৬০)(আরবী)-এর অর্থ (আরবী) ও করা হয়েছে যা খেজুর বৃক্ষের গর্দানের উপর বাকল বা আবরণের মত থাকে।এই যমীনে রয়েছে খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। -এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের ঐ সবুজ পাতা যাকে উপর হতে কেটে দেয়া হয় এবং শুকিয়ে নেয়াহয়।(আরবী)-এর অর্থ হলো সুগন্ধ গুল্ম অথবা ক্ষেতের সবুজ পাতা। ভাবার্থ এই যে, গম, যব ইত্যাদির ঐ দানা যা ওর মাথার উপর ভূষিসহ থাকে এবং যে পাতা ওগুলোর গাছের উপর জড়িয়ে থাকে। আর এটাও বলা হয়েছে যে, ক্ষেতের প্রথমেই উৎপাদিত পাতাকে তো বলা হয়, আর যখন তাতে দানা ধরে তখন ওকে বলা হয়। যেমন কবি যায়েদ ইবনে আমর স্বীয় প্রসিদ্ধ। কাসীদায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু’জন (হযরত মূসা আঃ ও হযরত হারূন আঃ) তাকে (ফিরাউনকে) বলোঃ কে মৃত্তিকায় শস্য উৎপাদন করেন? অতঃপর ওটা হতে চারা গাছ হয় যা আন্দোলিত হয় এবং তা হতে ওর মাথায় দানা বের করেন (কে তিনি? অর্থাৎ আল্লাহই এসব করে থাকেন)। সুতরাং এগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকারীর জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা উভয়ে (অর্থাৎ দানব ও মানব) তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? অর্থাৎ হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের আপাদমস্তক আল্লাহর নিয়ামত রাজির মধ্যে ডুবে রয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তোমরা আল্লাহ তাআলার কোন নিয়ামতকেই অস্বীকার করতে পার না। দু' একটি নিয়ামত হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু এখানে তো তোমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ জন্যেই তো মুমিন জ্বিনগুলো একথা শোন মাত্রই উত্তরে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি। সুতরাং আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর জবাবে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার নিয়ামতরাজির কোন একটিও অস্বীকার করতে পারি না।” হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রিসালাতের প্রাথমিক অবস্থায় যখন ইসলাম পুরোপুরিভাবে ঘোষিত হয়নি তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বায়তুল্লাহর রুকনের দিকে নামায পড়তে দেখেছি। ঐ সময় তিনি (আরবী) পাঠ করেছেন এবং মুশরিকরাও তা শ্রবণ করেছে।
আর-রাহমান 55:13
হযরত যার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেঃ “ (আরবী)-এর মধ্যে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হবে, না (আরবী) হবে?” তখন তাকে জবাবে বলেনঃ “তুমি কি কুরআন পূর্ণটাই পড়েছো?" সে উত্তর দেয়ঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা এক রাকআতে পড়ে থাকি।” তিনি তখন বলেনঃ “কবিতা যেমন তাড়াতাড়ি পড়া হয়, তুমি হয়তো এই ভাবেই কুরআনও পড়ে থাকো? এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপারই বটে। আল্লাহর নবী (সঃ) মুফাসসালের প্রাথমিক সূরাগুলোর কোন দুটি সূরা মিলিয়ে পড়তেন তা আমার খুব ভাল স্মরণ আছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে মুফাসসালের সর্বপ্রথম সূরা হলো এই সূরায়ে রহমান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের (রাঃ) সমাবেশে আগমন করেন এবং সূরায়ে রহমান প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নীরবে শুনতে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আমি জ্বিনের রাত্রে এ সূরাটি পাঠ করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তমরূপে জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি (আরবী)-এই আয়াতে এসেছি তখনই তারা জবাবে বলেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার অনুগ্রহ সমূহের কোন অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্যে।” এই রিওয়াইয়াতটিই তাফসীরে ইবনে জারীরেও বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেই এই সূরাটি পাঠ করেছিলেন অথবা তার সামনে এটা পাঠ করা হয়েছিল। ঐ সময় সাহাবীদেরকে নীরব থাকতে দেখে তিনি একথা বলেছিলেন। আর জ্বিনদের উত্তরের শব্দগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালকের এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি।” ১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন এবং স্বীয় ফল ও করমে ওর মুখস্থকরণ খুবই সহজ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। এটা হযরত হাসান (রঃ)-এর উক্তি। আর যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, দ্বারা ভাল ও মন্দ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কথা বলা শিখানো অর্থ নেয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত। কারণ এর সাথে সাথেই কুরআন শিক্ষা দেয়ার বর্ণনা রয়েছে। এর দ্বারা তিলাওয়াতে কুরআন বুঝানো হয়েছে। আর তিলাওয়াতে কুরআন কথা বলা সহজ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক অক্ষরকে ওর মাখরাজ হতে জিহ্বা বিনা কষ্টে আদায় করে থাকে। তা কণ্ঠ হতে বের হোক অথবা ওষ্ঠাধরকে মিলানোর মাধ্যমেই হোক। বিভিন্ন মাখরাজ এবং বিভিন্ন প্রকারের অক্ষরের উচ্চারণের পদ্ধতি আল্লাহ তা'আলা মানুষকে শিখিয়েছেন। সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ নির্ধারিত কক্ষপথে আবর্তন করে। এতদুভয়ের আবর্তনের মধ্যে আছে টক্কর এবং না আছে কোন অস্থিরতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে চন্দ্রের নাগাল পায় এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) সকালকে বেরকারী, রাত্রিকে তিনি আরাম ও বিশ্রামের সময় বানিয়েছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের উপর রেখেছেন, এটা হলো পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।” (৬:৯৬)হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যদি সমস্ত মানুষের, জ্বিনের, চতুষ্পদ জন্তুসমূহের এবং পক্ষীকূলের চক্ষুগুলোর দৃষ্টিশক্তি একটি মাত্র মানুষের চোখে দিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর সূর্যের সামনে যে সত্তরটি পর্দা রয়েছে ওগুলোর মধ্যে একটিকে সরিয়ে ফেলা হয় তবুও সম্ভব নয় যে, এই লোকটিও সূর্যের দিকে তাকাতে পারে। অথচ সূর্যের আলো কুরসীর আলোর সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং এটা চিন্তা করার বিষয় যে, আল্লাহ স্বীয় জান্নাতী বান্দাদের চোখে কি পরিমাণ নূর দিবেন যে, তারা তাদের মহান প্রতিপালকের চেহারাকেও খোলাখুলিভাবে তাদের চক্ষু দ্বারা বিনা বাধায় দেখতে পাবে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মেনে চলে তাঁরই বিধান। মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, (আরবী) বলা হয় ঐ গাছকে যে গাছের গুঁড়ি আছে। কিন্তু (আরবী) এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, গুঁড়ি বিহীন লতা গাছকে (আরবী) বলা হয়, যে গাছ মাটির উপর ছড়িয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ তারকা যা আকাশে রয়েছে। এ উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান, যদিও প্রথম উক্তিটিকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) পছন্দ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরআন কারীমের নিম্নের আয়াতটিও দ্বিতীয় উক্তিটির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।” (২২:১৮)এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড অর্থাৎ আদল ও ইনসাফ। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে দলীল প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (৫৭:২৫) অনুরূপভাবে এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে সত্য ও ন্যায়ের সাথে সৃষ্টি করেছেন যাতে সমস্ত জিনিস সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকে। তাই তিনি বলেনঃ ওযনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওযনে কম দিয়ো না। অর্থাৎ যখন ওযন করবে তখন সঠিকভাবে ওযন করবে। কম-বেশী করবে না। অর্থাৎ নেয়ার সময় বেশী নিবে এবং দেয়ার সময় কম দিবে এরূপ করো না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ন্যায়ের দণ্ড সোজা রেখে ওযন করো।” (১৭:৩৫)আল্লাহ তা'আলা আকাশকে সমুন্নত করেছেন, আর পৃথিবীকে নীচু করে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাতে মযবুত পাহাড় পর্বতকে পেরেকের মত করে গেড়ে দিয়েছেন যাতে এটা হেলা-দোলা ও নড়াচড়া না করে। আর তাতে যেসব সৃষ্টজীব বসবাস করছে তারা যেন শান্তিতে অবস্থান করতে পারে। হে মানুষ! তোমরা যমীনের সৃষ্টজীবের প্রতি লক্ষ্য করো, ওগুলোর বিভিন্ন প্রকার, বিভিন্ন রূপ, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা এবং বিভিন্ন স্বভাব ও অভ্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ও সীমাহীন ক্ষমতার পরিমাপ করে নাও। সাথে সাথে যমীনের উৎপাদিত জিনিসের দিকে চেয়ে দেখো। এতে রঙ বেরঙ এর টক-মিষ্ট ফল, নানা প্রকারের সুগন্ধি বিশিষ্ট ফল। বিশেষ করে খেজুর বৃক্ষ যা একটি উপকারী বৃক্ষ এবং যা রোপিত হওয়ার পর হতে নিয়ে শুকনো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এবং এর পরেও খাওয়ার কাজ দেয়। খেজুর একটি সাধারণ ফল। ওর উপর খোসা থাকে যাকে ভেদ করে এটা বের হয়ে আসে। অতঃপর ওটা হয় কাদার মত, এরপর হয় রসাল এবং এরপর পেকে গিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এটা খুবই উপকারী। আর এর গাছও হয় খুব সোজা ও সুন্দর।হযরত শা'বী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রোমক সম্রাট হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখেনঃ “আমার দূত আপনার নিকট হতে ফিরে এসে বলেছে যে, আপনার ওখানে নাকি একটি বক্ষ রয়েছে যার মত স্বভাব বা প্রকৃতি অন্য কোন গাছের মধ্যে নেই। ওটা গর্দভের কানের মত যমীন হতে বের হয়। তারপর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে মুক্তার মত হয়, এরপর সবুজ বর্ণ ধারণ করে পান্নার (মূল্যবান সবুজ পাথর বিশেষ) মত হয়ে যায়, তারপর লাল বর্ণ। ধারণ করে লাল ইয়াকৃত বা পদ্মরাগের মত হয়। এরপর পেকে গিয়ে অতি উত্তম ও সুস্বাদু ফলে পরিণত হয়। তারপর শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের রক্ষণ এবং মুসাফিরদের পাথেয় হয়। সুতরাং যদি আমার দূতের বর্ণনা সত্য হয় তবে আমার ধারণায় এটা জান্নাতী গাছ।" তাঁর এই পত্রের জবাবে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাকে লিখেনঃ “এই পত্র আল্লাহর দাস এবং মুসলমানদের নেতা উমার (রাঃ)-এর পক্ষ হতে রোমক সম্রাট কায়সারের নিকট। আপনার দূত আপনাকে যে খবর দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। এ ধরনের গাছ আরবে প্রচুর রয়েছে। এটা ঐ গাছ যা আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর পার্শ্বে জন্মিয়েছিলেন, যখন তাঁর পুত্র ঈসা (আঃ) তার গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হন। অতএব, হে বাদশাহ! আল্লাহকে ভয় করুন এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে মা’রূদ মনে করবেন না। আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাকে তিনি মৃত্তিকা হতে সৃষ্টি করেছিলেন, অতঃপর তাকে বলেছিলেনঃ ‘হও’ ফলে সে হয়ে গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (৩:৫৯-৬০)(আরবী)-এর অর্থ (আরবী) ও করা হয়েছে যা খেজুর বৃক্ষের গর্দানের উপর বাকল বা আবরণের মত থাকে।এই যমীনে রয়েছে খোসা বিশিষ্ট দানা ও সুগন্ধ গুল্ম। -এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের ঐ সবুজ পাতা যাকে উপর হতে কেটে দেয়া হয় এবং শুকিয়ে নেয়াহয়।(আরবী)-এর অর্থ হলো সুগন্ধ গুল্ম অথবা ক্ষেতের সবুজ পাতা। ভাবার্থ এই যে, গম, যব ইত্যাদির ঐ দানা যা ওর মাথার উপর ভূষিসহ থাকে এবং যে পাতা ওগুলোর গাছের উপর জড়িয়ে থাকে। আর এটাও বলা হয়েছে যে, ক্ষেতের প্রথমেই উৎপাদিত পাতাকে তো বলা হয়, আর যখন তাতে দানা ধরে তখন ওকে বলা হয়। যেমন কবি যায়েদ ইবনে আমর স্বীয় প্রসিদ্ধ। কাসীদায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু’জন (হযরত মূসা আঃ ও হযরত হারূন আঃ) তাকে (ফিরাউনকে) বলোঃ কে মৃত্তিকায় শস্য উৎপাদন করেন? অতঃপর ওটা হতে চারা গাছ হয় যা আন্দোলিত হয় এবং তা হতে ওর মাথায় দানা বের করেন (কে তিনি? অর্থাৎ আল্লাহই এসব করে থাকেন)। সুতরাং এগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকারীর জন্যে নিদর্শন রয়েছে।” তাই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা উভয়ে (অর্থাৎ দানব ও মানব) তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? অর্থাৎ হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের আপাদমস্তক আল্লাহর নিয়ামত রাজির মধ্যে ডুবে রয়েছে। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তোমরা আল্লাহ তাআলার কোন নিয়ামতকেই অস্বীকার করতে পার না। দু' একটি নিয়ামত হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু এখানে তো তোমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ রয়েছে। এ জন্যেই তো মুমিন জ্বিনগুলো একথা শোন মাত্রই উত্তরে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার এমন কোন নিয়ামত নেই যা আমরা অস্বীকার করতে পারি। সুতরাং আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর জবাবে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! আমরা আপনার নিয়ামতরাজির কোন একটিও অস্বীকার করতে পারি না।” হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রিসালাতের প্রাথমিক অবস্থায় যখন ইসলাম পুরোপুরিভাবে ঘোষিত হয়নি তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বায়তুল্লাহর রুকনের দিকে নামায পড়তে দেখেছি। ঐ সময় তিনি (আরবী) পাঠ করেছেন এবং মুশরিকরাও তা শ্রবণ করেছে।
আর-রাহমান 55:14
১৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন, তিনি মানুষকে বেজে ওঠা খোলার মত শুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন নিধূম অগ্নিশিখা হতে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (জ্যোতি) হতে, জ্বিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নিধূম অগ্নিশিখা হতে এবং আদম (আঃ)-কে ঐ মাটি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে যার বর্ণনা তোমাদের সামনে করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার না করার হিদায়াত দান করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের নিয়ন্তা। অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই উদয়াচল এবং গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই অস্তাচল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলের অধিপতির।” (৭০:৪০) গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে সূর্য উদিত হওয়ার দুটি পৃথক জায়গা এবং অস্তমিত হওয়ারও দুটি পৃথক জায়গা। ওখান হতে সূর্য উপরে উঠে ও নীচে নেমে আসে। ঋতুর পরিবর্তনে এটা পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং তাকেই কর্মবিধায়ক বানিয়ে নাও।" (৭৩:৯) তাহলে এখানে মাশরিক ও মাগরিব দ্বারা এর জাতকে বুঝানো হয়েছে, আর দুটি মাশরিক ও দুটি মাগরিব দ্বারা বুঝানো হয়েছে সূর্যোদয়ের দুটি স্থানকে এবং সূর্যাস্তের দুটি স্থানকে। উদয় ও অস্তের দুটি করে পৃথক পৃথক স্থান থাকার মধ্যে মানবীয় উপকার ও কল্যাণ রয়েছে বলে আবারও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ “হে মানব ও জ্বিন জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে? তার ক্ষমতার দৃশ্য অবলোকন কর যে, দুটি সমুদ্র সমানভাবে চলতে রয়েছে। একটির পানি লবণাক্ত এবং অপরটির পানি মিষ্ট। কিন্তু না ওর পানি এর পানির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এর পানিকে লবণাক্ত করতে পারে, না এর পানি ওর সাথে মিশ্রিত হয়ে ওর পানিকে মিশ্র করতে পারে! বরং দুটোই নিজ নিজ গতিতে চলছে! উভয়ের মধ্যে এক অন্তরায় রয়েছে। সুতরাং না এটা ওটার সাথে এবং ওটা এটার সাথে মিশ্রিত বা মিলিত হতে পারে। এটা নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে এবং ওটাও নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে। আর কুদরতী ব্যবধান দুটোর মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ দুটোরই পানি মিলিতভাবে রয়েছে। সূরায়ে ফুরকানের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট সুপেয় এবং অপরটি লোনা, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” (২৫:৫৩)। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসমানের সমুদ্র ও যমীনের সমুদ্রকে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, আসমানে যে পানির ফোঁটা রয়েছে এবং যমীনের সমুদ্রে যে ঝিনুক রয়েছে, এ দুটোর মিলনে মুক্তা জন্ম লাভ করে। এ ঘটনাটি তো সত্য বটে, কিন্তু এই আয়াতের তাফসীর এভাবে করা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এ আয়াতে এ দুটি সমুদ্রের মাঝে বারযাখ বা অন্তরায় থাকার বর্ণনা রয়েছে যা এটাকে ওটা হতে এবং ওটাকে এটা হতে বাধা দিয়ে রেখেছে। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ দুটো সমুদ্র যমীনেই রয়েছে। এমনকি দুটো মিলিতভাবে রয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে দুটোর পানি পৃথক থাকছে। আসমান ও যমীনের মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে ওটাকে (আরবী) বলা হয় না। এ জন্যে সঠিক উক্তি এটাই যে, এ দুটো যমীনেরই সমুদ্র যে দুটোর বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে, একটি যে আসমানের এবং অপরটি যমীনের তা নয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, উভয় সমুদ্র হতে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল, অথচ এগুলো পাওয়া যায় আসলে একটি সমুদ্র হতে, কিন্তু দুটোর উপর এর প্রয়োগ হয়েছে এবং এরূপ প্রয়োগ বৈধ ও সঠিক। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য হতে রাসূলগণ আসেনি?” (৬:১৩০)আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, রাসূল শুধু মানুষের মধ্য হতেই হয়েছেন, জ্বিনদের মধ্য হতে কোন জ্বিন রাসূল রূপে আসেনি। তাহলে এখানে যেমন মানব ও দানবের মধ্য হতে রাসূল আগমনের প্রয়োগ শুদ্ধ হয়েছে, অনুরূপভাবে এই আয়াতেও দুটো সমুদ্রের উপরই মুক্তা ও প্রবাল উৎপন্ন হওয়ার প্রয়োগ সঠিক হয়েছে। অথচ এগুলো উৎপন্ন হয় শুধু একটিতে।(আরবী) অর্থাৎ মুক্তা তো একটি সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত জিনিস। আর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ছোট মুক্তাকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় বড় মুক্তাকে। এও বলা হয়েছে যে, উত্তম ও উচ্চমানের মুক্তাকে মারজান বলে। কারো কারো মতে লাল রঙ এর জওহর বা মূল্যবান পাথরকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় লাল মোহরকে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা প্রত্যেকটা হতে বহির্গত গোশত খেয়ে থাকো যা টাটকা হয় এবং পরিধানের অলংকার বের করে থাকো।” (৩৫:১২) মাছ তো লোনা ও মিষ্ট উভয় পানি হতেই বের হয়ে থাকে, কিন্তু মণি-মুক্তা শুধু লোনা পানির সমুদ্রে পাওয়া যায়, মিষ্ট পানির সমুদ্রে নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আসমানের পানির যে বিন্দু সমুদ্রের ঝিনুকের মুখে সোজাভাবে পড়ে তাতেই মুক্তার সৃষ্টি হয়। আর যখন ঝিনুকের মধ্যে পড়ে না তখন আম্বর (সুগন্ধি দ্রব্য বিশেষ) জন্ম লাভ করে। মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণের সময় ঝিনুকও মুখ খুলে দেয়। তাই এই নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর আবার বলেনঃ তোমাদের যে প্রতিপালকের এসব অসংখ্য নিয়ামত তোমাদের উপর রয়েছে তার কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সমুদ্রে বিচরণশীল পর্বত প্রমাণ অর্ণবপোতসমূহ তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন, যেগুলো হাজার হাজার মণ মাল এবং শত শত মানুষকে এদিক হতে ওদিকে নিয়ে যায়। এটাও আল্লাহ তা'আলারই নিয়ন্ত্রণাধীন। এই বিরাট নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি পুনরায় বলেনঃ এখন বল তো, তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ তোমরা অস্বীকার করবে?হযরত উমরাহ ইবনে সুওয়ায়েদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে ফুরাত নদীর তীরে ছিলাম। নদীতে একটি বিরাট জাহাজ চলে আসছিল। জাহাজটিকে আসতে দেখে হযরত আলী (রাঃ) ঐ জাহাজটির দিকে হাতের ইশারা করে (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “যিনি এই পর্বত প্রমাণ জাহাজকে নদীতে চালিত করেছেন ঐ আল্লাহর কসম! আমি হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যাও করিনি, হত্যা করার ইচ্ছাও করিনি এবং হত্যাকারীদের সাথে শরীকও ছিলাম না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর-রাহমান 55:15
১৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন, তিনি মানুষকে বেজে ওঠা খোলার মত শুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন নিধূম অগ্নিশিখা হতে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (জ্যোতি) হতে, জ্বিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নিধূম অগ্নিশিখা হতে এবং আদম (আঃ)-কে ঐ মাটি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে যার বর্ণনা তোমাদের সামনে করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার না করার হিদায়াত দান করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের নিয়ন্তা। অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই উদয়াচল এবং গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই অস্তাচল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলের অধিপতির।” (৭০:৪০) গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে সূর্য উদিত হওয়ার দুটি পৃথক জায়গা এবং অস্তমিত হওয়ারও দুটি পৃথক জায়গা। ওখান হতে সূর্য উপরে উঠে ও নীচে নেমে আসে। ঋতুর পরিবর্তনে এটা পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং তাকেই কর্মবিধায়ক বানিয়ে নাও।" (৭৩:৯) তাহলে এখানে মাশরিক ও মাগরিব দ্বারা এর জাতকে বুঝানো হয়েছে, আর দুটি মাশরিক ও দুটি মাগরিব দ্বারা বুঝানো হয়েছে সূর্যোদয়ের দুটি স্থানকে এবং সূর্যাস্তের দুটি স্থানকে। উদয় ও অস্তের দুটি করে পৃথক পৃথক স্থান থাকার মধ্যে মানবীয় উপকার ও কল্যাণ রয়েছে বলে আবারও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ “হে মানব ও জ্বিন জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে? তার ক্ষমতার দৃশ্য অবলোকন কর যে, দুটি সমুদ্র সমানভাবে চলতে রয়েছে। একটির পানি লবণাক্ত এবং অপরটির পানি মিষ্ট। কিন্তু না ওর পানি এর পানির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এর পানিকে লবণাক্ত করতে পারে, না এর পানি ওর সাথে মিশ্রিত হয়ে ওর পানিকে মিশ্র করতে পারে! বরং দুটোই নিজ নিজ গতিতে চলছে! উভয়ের মধ্যে এক অন্তরায় রয়েছে। সুতরাং না এটা ওটার সাথে এবং ওটা এটার সাথে মিশ্রিত বা মিলিত হতে পারে। এটা নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে এবং ওটাও নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে। আর কুদরতী ব্যবধান দুটোর মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ দুটোরই পানি মিলিতভাবে রয়েছে। সূরায়ে ফুরকানের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট সুপেয় এবং অপরটি লোনা, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” (২৫:৫৩)। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসমানের সমুদ্র ও যমীনের সমুদ্রকে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, আসমানে যে পানির ফোঁটা রয়েছে এবং যমীনের সমুদ্রে যে ঝিনুক রয়েছে, এ দুটোর মিলনে মুক্তা জন্ম লাভ করে। এ ঘটনাটি তো সত্য বটে, কিন্তু এই আয়াতের তাফসীর এভাবে করা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এ আয়াতে এ দুটি সমুদ্রের মাঝে বারযাখ বা অন্তরায় থাকার বর্ণনা রয়েছে যা এটাকে ওটা হতে এবং ওটাকে এটা হতে বাধা দিয়ে রেখেছে। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ দুটো সমুদ্র যমীনেই রয়েছে। এমনকি দুটো মিলিতভাবে রয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে দুটোর পানি পৃথক থাকছে। আসমান ও যমীনের মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে ওটাকে (আরবী) বলা হয় না। এ জন্যে সঠিক উক্তি এটাই যে, এ দুটো যমীনেরই সমুদ্র যে দুটোর বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে, একটি যে আসমানের এবং অপরটি যমীনের তা নয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, উভয় সমুদ্র হতে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল, অথচ এগুলো পাওয়া যায় আসলে একটি সমুদ্র হতে, কিন্তু দুটোর উপর এর প্রয়োগ হয়েছে এবং এরূপ প্রয়োগ বৈধ ও সঠিক। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য হতে রাসূলগণ আসেনি?” (৬:১৩০)আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, রাসূল শুধু মানুষের মধ্য হতেই হয়েছেন, জ্বিনদের মধ্য হতে কোন জ্বিন রাসূল রূপে আসেনি। তাহলে এখানে যেমন মানব ও দানবের মধ্য হতে রাসূল আগমনের প্রয়োগ শুদ্ধ হয়েছে, অনুরূপভাবে এই আয়াতেও দুটো সমুদ্রের উপরই মুক্তা ও প্রবাল উৎপন্ন হওয়ার প্রয়োগ সঠিক হয়েছে। অথচ এগুলো উৎপন্ন হয় শুধু একটিতে।(আরবী) অর্থাৎ মুক্তা তো একটি সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত জিনিস। আর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ছোট মুক্তাকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় বড় মুক্তাকে। এও বলা হয়েছে যে, উত্তম ও উচ্চমানের মুক্তাকে মারজান বলে। কারো কারো মতে লাল রঙ এর জওহর বা মূল্যবান পাথরকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় লাল মোহরকে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা প্রত্যেকটা হতে বহির্গত গোশত খেয়ে থাকো যা টাটকা হয় এবং পরিধানের অলংকার বের করে থাকো।” (৩৫:১২) মাছ তো লোনা ও মিষ্ট উভয় পানি হতেই বের হয়ে থাকে, কিন্তু মণি-মুক্তা শুধু লোনা পানির সমুদ্রে পাওয়া যায়, মিষ্ট পানির সমুদ্রে নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আসমানের পানির যে বিন্দু সমুদ্রের ঝিনুকের মুখে সোজাভাবে পড়ে তাতেই মুক্তার সৃষ্টি হয়। আর যখন ঝিনুকের মধ্যে পড়ে না তখন আম্বর (সুগন্ধি দ্রব্য বিশেষ) জন্ম লাভ করে। মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণের সময় ঝিনুকও মুখ খুলে দেয়। তাই এই নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর আবার বলেনঃ তোমাদের যে প্রতিপালকের এসব অসংখ্য নিয়ামত তোমাদের উপর রয়েছে তার কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সমুদ্রে বিচরণশীল পর্বত প্রমাণ অর্ণবপোতসমূহ তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন, যেগুলো হাজার হাজার মণ মাল এবং শত শত মানুষকে এদিক হতে ওদিকে নিয়ে যায়। এটাও আল্লাহ তা'আলারই নিয়ন্ত্রণাধীন। এই বিরাট নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি পুনরায় বলেনঃ এখন বল তো, তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ তোমরা অস্বীকার করবে?হযরত উমরাহ ইবনে সুওয়ায়েদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে ফুরাত নদীর তীরে ছিলাম। নদীতে একটি বিরাট জাহাজ চলে আসছিল। জাহাজটিকে আসতে দেখে হযরত আলী (রাঃ) ঐ জাহাজটির দিকে হাতের ইশারা করে (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “যিনি এই পর্বত প্রমাণ জাহাজকে নদীতে চালিত করেছেন ঐ আল্লাহর কসম! আমি হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যাও করিনি, হত্যা করার ইচ্ছাও করিনি এবং হত্যাকারীদের সাথে শরীকও ছিলাম না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর-রাহমান 55:16
১৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন, তিনি মানুষকে বেজে ওঠা খোলার মত শুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন নিধূম অগ্নিশিখা হতে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (জ্যোতি) হতে, জ্বিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নিধূম অগ্নিশিখা হতে এবং আদম (আঃ)-কে ঐ মাটি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে যার বর্ণনা তোমাদের সামনে করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার না করার হিদায়াত দান করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের নিয়ন্তা। অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই উদয়াচল এবং গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই অস্তাচল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলের অধিপতির।” (৭০:৪০) গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে সূর্য উদিত হওয়ার দুটি পৃথক জায়গা এবং অস্তমিত হওয়ারও দুটি পৃথক জায়গা। ওখান হতে সূর্য উপরে উঠে ও নীচে নেমে আসে। ঋতুর পরিবর্তনে এটা পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং তাকেই কর্মবিধায়ক বানিয়ে নাও।" (৭৩:৯) তাহলে এখানে মাশরিক ও মাগরিব দ্বারা এর জাতকে বুঝানো হয়েছে, আর দুটি মাশরিক ও দুটি মাগরিব দ্বারা বুঝানো হয়েছে সূর্যোদয়ের দুটি স্থানকে এবং সূর্যাস্তের দুটি স্থানকে। উদয় ও অস্তের দুটি করে পৃথক পৃথক স্থান থাকার মধ্যে মানবীয় উপকার ও কল্যাণ রয়েছে বলে আবারও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ “হে মানব ও জ্বিন জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে? তার ক্ষমতার দৃশ্য অবলোকন কর যে, দুটি সমুদ্র সমানভাবে চলতে রয়েছে। একটির পানি লবণাক্ত এবং অপরটির পানি মিষ্ট। কিন্তু না ওর পানি এর পানির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এর পানিকে লবণাক্ত করতে পারে, না এর পানি ওর সাথে মিশ্রিত হয়ে ওর পানিকে মিশ্র করতে পারে! বরং দুটোই নিজ নিজ গতিতে চলছে! উভয়ের মধ্যে এক অন্তরায় রয়েছে। সুতরাং না এটা ওটার সাথে এবং ওটা এটার সাথে মিশ্রিত বা মিলিত হতে পারে। এটা নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে এবং ওটাও নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে। আর কুদরতী ব্যবধান দুটোর মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ দুটোরই পানি মিলিতভাবে রয়েছে। সূরায়ে ফুরকানের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট সুপেয় এবং অপরটি লোনা, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” (২৫:৫৩)। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসমানের সমুদ্র ও যমীনের সমুদ্রকে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, আসমানে যে পানির ফোঁটা রয়েছে এবং যমীনের সমুদ্রে যে ঝিনুক রয়েছে, এ দুটোর মিলনে মুক্তা জন্ম লাভ করে। এ ঘটনাটি তো সত্য বটে, কিন্তু এই আয়াতের তাফসীর এভাবে করা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এ আয়াতে এ দুটি সমুদ্রের মাঝে বারযাখ বা অন্তরায় থাকার বর্ণনা রয়েছে যা এটাকে ওটা হতে এবং ওটাকে এটা হতে বাধা দিয়ে রেখেছে। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ দুটো সমুদ্র যমীনেই রয়েছে। এমনকি দুটো মিলিতভাবে রয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে দুটোর পানি পৃথক থাকছে। আসমান ও যমীনের মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে ওটাকে (আরবী) বলা হয় না। এ জন্যে সঠিক উক্তি এটাই যে, এ দুটো যমীনেরই সমুদ্র যে দুটোর বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে, একটি যে আসমানের এবং অপরটি যমীনের তা নয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, উভয় সমুদ্র হতে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল, অথচ এগুলো পাওয়া যায় আসলে একটি সমুদ্র হতে, কিন্তু দুটোর উপর এর প্রয়োগ হয়েছে এবং এরূপ প্রয়োগ বৈধ ও সঠিক। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য হতে রাসূলগণ আসেনি?” (৬:১৩০)আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, রাসূল শুধু মানুষের মধ্য হতেই হয়েছেন, জ্বিনদের মধ্য হতে কোন জ্বিন রাসূল রূপে আসেনি। তাহলে এখানে যেমন মানব ও দানবের মধ্য হতে রাসূল আগমনের প্রয়োগ শুদ্ধ হয়েছে, অনুরূপভাবে এই আয়াতেও দুটো সমুদ্রের উপরই মুক্তা ও প্রবাল উৎপন্ন হওয়ার প্রয়োগ সঠিক হয়েছে। অথচ এগুলো উৎপন্ন হয় শুধু একটিতে।(আরবী) অর্থাৎ মুক্তা তো একটি সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত জিনিস। আর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ছোট মুক্তাকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় বড় মুক্তাকে। এও বলা হয়েছে যে, উত্তম ও উচ্চমানের মুক্তাকে মারজান বলে। কারো কারো মতে লাল রঙ এর জওহর বা মূল্যবান পাথরকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় লাল মোহরকে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা প্রত্যেকটা হতে বহির্গত গোশত খেয়ে থাকো যা টাটকা হয় এবং পরিধানের অলংকার বের করে থাকো।” (৩৫:১২) মাছ তো লোনা ও মিষ্ট উভয় পানি হতেই বের হয়ে থাকে, কিন্তু মণি-মুক্তা শুধু লোনা পানির সমুদ্রে পাওয়া যায়, মিষ্ট পানির সমুদ্রে নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আসমানের পানির যে বিন্দু সমুদ্রের ঝিনুকের মুখে সোজাভাবে পড়ে তাতেই মুক্তার সৃষ্টি হয়। আর যখন ঝিনুকের মধ্যে পড়ে না তখন আম্বর (সুগন্ধি দ্রব্য বিশেষ) জন্ম লাভ করে। মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণের সময় ঝিনুকও মুখ খুলে দেয়। তাই এই নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর আবার বলেনঃ তোমাদের যে প্রতিপালকের এসব অসংখ্য নিয়ামত তোমাদের উপর রয়েছে তার কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সমুদ্রে বিচরণশীল পর্বত প্রমাণ অর্ণবপোতসমূহ তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন, যেগুলো হাজার হাজার মণ মাল এবং শত শত মানুষকে এদিক হতে ওদিকে নিয়ে যায়। এটাও আল্লাহ তা'আলারই নিয়ন্ত্রণাধীন। এই বিরাট নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি পুনরায় বলেনঃ এখন বল তো, তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ তোমরা অস্বীকার করবে?হযরত উমরাহ ইবনে সুওয়ায়েদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে ফুরাত নদীর তীরে ছিলাম। নদীতে একটি বিরাট জাহাজ চলে আসছিল। জাহাজটিকে আসতে দেখে হযরত আলী (রাঃ) ঐ জাহাজটির দিকে হাতের ইশারা করে (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “যিনি এই পর্বত প্রমাণ জাহাজকে নদীতে চালিত করেছেন ঐ আল্লাহর কসম! আমি হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যাও করিনি, হত্যা করার ইচ্ছাও করিনি এবং হত্যাকারীদের সাথে শরীকও ছিলাম না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর-রাহমান 55:17
১৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন, তিনি মানুষকে বেজে ওঠা খোলার মত শুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন নিধূম অগ্নিশিখা হতে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (জ্যোতি) হতে, জ্বিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নিধূম অগ্নিশিখা হতে এবং আদম (আঃ)-কে ঐ মাটি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে যার বর্ণনা তোমাদের সামনে করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার না করার হিদায়াত দান করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের নিয়ন্তা। অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই উদয়াচল এবং গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই অস্তাচল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলের অধিপতির।” (৭০:৪০) গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে সূর্য উদিত হওয়ার দুটি পৃথক জায়গা এবং অস্তমিত হওয়ারও দুটি পৃথক জায়গা। ওখান হতে সূর্য উপরে উঠে ও নীচে নেমে আসে। ঋতুর পরিবর্তনে এটা পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং তাকেই কর্মবিধায়ক বানিয়ে নাও।" (৭৩:৯) তাহলে এখানে মাশরিক ও মাগরিব দ্বারা এর জাতকে বুঝানো হয়েছে, আর দুটি মাশরিক ও দুটি মাগরিব দ্বারা বুঝানো হয়েছে সূর্যোদয়ের দুটি স্থানকে এবং সূর্যাস্তের দুটি স্থানকে। উদয় ও অস্তের দুটি করে পৃথক পৃথক স্থান থাকার মধ্যে মানবীয় উপকার ও কল্যাণ রয়েছে বলে আবারও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ “হে মানব ও জ্বিন জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে? তার ক্ষমতার দৃশ্য অবলোকন কর যে, দুটি সমুদ্র সমানভাবে চলতে রয়েছে। একটির পানি লবণাক্ত এবং অপরটির পানি মিষ্ট। কিন্তু না ওর পানি এর পানির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এর পানিকে লবণাক্ত করতে পারে, না এর পানি ওর সাথে মিশ্রিত হয়ে ওর পানিকে মিশ্র করতে পারে! বরং দুটোই নিজ নিজ গতিতে চলছে! উভয়ের মধ্যে এক অন্তরায় রয়েছে। সুতরাং না এটা ওটার সাথে এবং ওটা এটার সাথে মিশ্রিত বা মিলিত হতে পারে। এটা নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে এবং ওটাও নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে। আর কুদরতী ব্যবধান দুটোর মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ দুটোরই পানি মিলিতভাবে রয়েছে। সূরায়ে ফুরকানের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট সুপেয় এবং অপরটি লোনা, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” (২৫:৫৩)। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসমানের সমুদ্র ও যমীনের সমুদ্রকে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, আসমানে যে পানির ফোঁটা রয়েছে এবং যমীনের সমুদ্রে যে ঝিনুক রয়েছে, এ দুটোর মিলনে মুক্তা জন্ম লাভ করে। এ ঘটনাটি তো সত্য বটে, কিন্তু এই আয়াতের তাফসীর এভাবে করা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এ আয়াতে এ দুটি সমুদ্রের মাঝে বারযাখ বা অন্তরায় থাকার বর্ণনা রয়েছে যা এটাকে ওটা হতে এবং ওটাকে এটা হতে বাধা দিয়ে রেখেছে। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ দুটো সমুদ্র যমীনেই রয়েছে। এমনকি দুটো মিলিতভাবে রয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে দুটোর পানি পৃথক থাকছে। আসমান ও যমীনের মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে ওটাকে (আরবী) বলা হয় না। এ জন্যে সঠিক উক্তি এটাই যে, এ দুটো যমীনেরই সমুদ্র যে দুটোর বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে, একটি যে আসমানের এবং অপরটি যমীনের তা নয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, উভয় সমুদ্র হতে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল, অথচ এগুলো পাওয়া যায় আসলে একটি সমুদ্র হতে, কিন্তু দুটোর উপর এর প্রয়োগ হয়েছে এবং এরূপ প্রয়োগ বৈধ ও সঠিক। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য হতে রাসূলগণ আসেনি?” (৬:১৩০)আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, রাসূল শুধু মানুষের মধ্য হতেই হয়েছেন, জ্বিনদের মধ্য হতে কোন জ্বিন রাসূল রূপে আসেনি। তাহলে এখানে যেমন মানব ও দানবের মধ্য হতে রাসূল আগমনের প্রয়োগ শুদ্ধ হয়েছে, অনুরূপভাবে এই আয়াতেও দুটো সমুদ্রের উপরই মুক্তা ও প্রবাল উৎপন্ন হওয়ার প্রয়োগ সঠিক হয়েছে। অথচ এগুলো উৎপন্ন হয় শুধু একটিতে।(আরবী) অর্থাৎ মুক্তা তো একটি সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত জিনিস। আর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ছোট মুক্তাকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় বড় মুক্তাকে। এও বলা হয়েছে যে, উত্তম ও উচ্চমানের মুক্তাকে মারজান বলে। কারো কারো মতে লাল রঙ এর জওহর বা মূল্যবান পাথরকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় লাল মোহরকে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা প্রত্যেকটা হতে বহির্গত গোশত খেয়ে থাকো যা টাটকা হয় এবং পরিধানের অলংকার বের করে থাকো।” (৩৫:১২) মাছ তো লোনা ও মিষ্ট উভয় পানি হতেই বের হয়ে থাকে, কিন্তু মণি-মুক্তা শুধু লোনা পানির সমুদ্রে পাওয়া যায়, মিষ্ট পানির সমুদ্রে নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আসমানের পানির যে বিন্দু সমুদ্রের ঝিনুকের মুখে সোজাভাবে পড়ে তাতেই মুক্তার সৃষ্টি হয়। আর যখন ঝিনুকের মধ্যে পড়ে না তখন আম্বর (সুগন্ধি দ্রব্য বিশেষ) জন্ম লাভ করে। মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণের সময় ঝিনুকও মুখ খুলে দেয়। তাই এই নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর আবার বলেনঃ তোমাদের যে প্রতিপালকের এসব অসংখ্য নিয়ামত তোমাদের উপর রয়েছে তার কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সমুদ্রে বিচরণশীল পর্বত প্রমাণ অর্ণবপোতসমূহ তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন, যেগুলো হাজার হাজার মণ মাল এবং শত শত মানুষকে এদিক হতে ওদিকে নিয়ে যায়। এটাও আল্লাহ তা'আলারই নিয়ন্ত্রণাধীন। এই বিরাট নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি পুনরায় বলেনঃ এখন বল তো, তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ তোমরা অস্বীকার করবে?হযরত উমরাহ ইবনে সুওয়ায়েদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে ফুরাত নদীর তীরে ছিলাম। নদীতে একটি বিরাট জাহাজ চলে আসছিল। জাহাজটিকে আসতে দেখে হযরত আলী (রাঃ) ঐ জাহাজটির দিকে হাতের ইশারা করে (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “যিনি এই পর্বত প্রমাণ জাহাজকে নদীতে চালিত করেছেন ঐ আল্লাহর কসম! আমি হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যাও করিনি, হত্যা করার ইচ্ছাও করিনি এবং হত্যাকারীদের সাথে শরীকও ছিলাম না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর-রাহমান 55:18
১৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন, তিনি মানুষকে বেজে ওঠা খোলার মত শুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন নিধূম অগ্নিশিখা হতে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (জ্যোতি) হতে, জ্বিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নিধূম অগ্নিশিখা হতে এবং আদম (আঃ)-কে ঐ মাটি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে যার বর্ণনা তোমাদের সামনে করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার না করার হিদায়াত দান করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের নিয়ন্তা। অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই উদয়াচল এবং গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই অস্তাচল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলের অধিপতির।” (৭০:৪০) গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে সূর্য উদিত হওয়ার দুটি পৃথক জায়গা এবং অস্তমিত হওয়ারও দুটি পৃথক জায়গা। ওখান হতে সূর্য উপরে উঠে ও নীচে নেমে আসে। ঋতুর পরিবর্তনে এটা পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং তাকেই কর্মবিধায়ক বানিয়ে নাও।" (৭৩:৯) তাহলে এখানে মাশরিক ও মাগরিব দ্বারা এর জাতকে বুঝানো হয়েছে, আর দুটি মাশরিক ও দুটি মাগরিব দ্বারা বুঝানো হয়েছে সূর্যোদয়ের দুটি স্থানকে এবং সূর্যাস্তের দুটি স্থানকে। উদয় ও অস্তের দুটি করে পৃথক পৃথক স্থান থাকার মধ্যে মানবীয় উপকার ও কল্যাণ রয়েছে বলে আবারও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ “হে মানব ও জ্বিন জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে? তার ক্ষমতার দৃশ্য অবলোকন কর যে, দুটি সমুদ্র সমানভাবে চলতে রয়েছে। একটির পানি লবণাক্ত এবং অপরটির পানি মিষ্ট। কিন্তু না ওর পানি এর পানির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এর পানিকে লবণাক্ত করতে পারে, না এর পানি ওর সাথে মিশ্রিত হয়ে ওর পানিকে মিশ্র করতে পারে! বরং দুটোই নিজ নিজ গতিতে চলছে! উভয়ের মধ্যে এক অন্তরায় রয়েছে। সুতরাং না এটা ওটার সাথে এবং ওটা এটার সাথে মিশ্রিত বা মিলিত হতে পারে। এটা নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে এবং ওটাও নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে। আর কুদরতী ব্যবধান দুটোর মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ দুটোরই পানি মিলিতভাবে রয়েছে। সূরায়ে ফুরকানের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট সুপেয় এবং অপরটি লোনা, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” (২৫:৫৩)। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসমানের সমুদ্র ও যমীনের সমুদ্রকে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, আসমানে যে পানির ফোঁটা রয়েছে এবং যমীনের সমুদ্রে যে ঝিনুক রয়েছে, এ দুটোর মিলনে মুক্তা জন্ম লাভ করে। এ ঘটনাটি তো সত্য বটে, কিন্তু এই আয়াতের তাফসীর এভাবে করা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এ আয়াতে এ দুটি সমুদ্রের মাঝে বারযাখ বা অন্তরায় থাকার বর্ণনা রয়েছে যা এটাকে ওটা হতে এবং ওটাকে এটা হতে বাধা দিয়ে রেখেছে। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ দুটো সমুদ্র যমীনেই রয়েছে। এমনকি দুটো মিলিতভাবে রয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে দুটোর পানি পৃথক থাকছে। আসমান ও যমীনের মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে ওটাকে (আরবী) বলা হয় না। এ জন্যে সঠিক উক্তি এটাই যে, এ দুটো যমীনেরই সমুদ্র যে দুটোর বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে, একটি যে আসমানের এবং অপরটি যমীনের তা নয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, উভয় সমুদ্র হতে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল, অথচ এগুলো পাওয়া যায় আসলে একটি সমুদ্র হতে, কিন্তু দুটোর উপর এর প্রয়োগ হয়েছে এবং এরূপ প্রয়োগ বৈধ ও সঠিক। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য হতে রাসূলগণ আসেনি?” (৬:১৩০)আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, রাসূল শুধু মানুষের মধ্য হতেই হয়েছেন, জ্বিনদের মধ্য হতে কোন জ্বিন রাসূল রূপে আসেনি। তাহলে এখানে যেমন মানব ও দানবের মধ্য হতে রাসূল আগমনের প্রয়োগ শুদ্ধ হয়েছে, অনুরূপভাবে এই আয়াতেও দুটো সমুদ্রের উপরই মুক্তা ও প্রবাল উৎপন্ন হওয়ার প্রয়োগ সঠিক হয়েছে। অথচ এগুলো উৎপন্ন হয় শুধু একটিতে।(আরবী) অর্থাৎ মুক্তা তো একটি সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত জিনিস। আর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ছোট মুক্তাকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় বড় মুক্তাকে। এও বলা হয়েছে যে, উত্তম ও উচ্চমানের মুক্তাকে মারজান বলে। কারো কারো মতে লাল রঙ এর জওহর বা মূল্যবান পাথরকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় লাল মোহরকে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা প্রত্যেকটা হতে বহির্গত গোশত খেয়ে থাকো যা টাটকা হয় এবং পরিধানের অলংকার বের করে থাকো।” (৩৫:১২) মাছ তো লোনা ও মিষ্ট উভয় পানি হতেই বের হয়ে থাকে, কিন্তু মণি-মুক্তা শুধু লোনা পানির সমুদ্রে পাওয়া যায়, মিষ্ট পানির সমুদ্রে নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আসমানের পানির যে বিন্দু সমুদ্রের ঝিনুকের মুখে সোজাভাবে পড়ে তাতেই মুক্তার সৃষ্টি হয়। আর যখন ঝিনুকের মধ্যে পড়ে না তখন আম্বর (সুগন্ধি দ্রব্য বিশেষ) জন্ম লাভ করে। মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণের সময় ঝিনুকও মুখ খুলে দেয়। তাই এই নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর আবার বলেনঃ তোমাদের যে প্রতিপালকের এসব অসংখ্য নিয়ামত তোমাদের উপর রয়েছে তার কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সমুদ্রে বিচরণশীল পর্বত প্রমাণ অর্ণবপোতসমূহ তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন, যেগুলো হাজার হাজার মণ মাল এবং শত শত মানুষকে এদিক হতে ওদিকে নিয়ে যায়। এটাও আল্লাহ তা'আলারই নিয়ন্ত্রণাধীন। এই বিরাট নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি পুনরায় বলেনঃ এখন বল তো, তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ তোমরা অস্বীকার করবে?হযরত উমরাহ ইবনে সুওয়ায়েদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে ফুরাত নদীর তীরে ছিলাম। নদীতে একটি বিরাট জাহাজ চলে আসছিল। জাহাজটিকে আসতে দেখে হযরত আলী (রাঃ) ঐ জাহাজটির দিকে হাতের ইশারা করে (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “যিনি এই পর্বত প্রমাণ জাহাজকে নদীতে চালিত করেছেন ঐ আল্লাহর কসম! আমি হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যাও করিনি, হত্যা করার ইচ্ছাও করিনি এবং হত্যাকারীদের সাথে শরীকও ছিলাম না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর-রাহমান 55:19
১৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন, তিনি মানুষকে বেজে ওঠা খোলার মত শুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন নিধূম অগ্নিশিখা হতে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (জ্যোতি) হতে, জ্বিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নিধূম অগ্নিশিখা হতে এবং আদম (আঃ)-কে ঐ মাটি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে যার বর্ণনা তোমাদের সামনে করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার না করার হিদায়াত দান করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের নিয়ন্তা। অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই উদয়াচল এবং গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই অস্তাচল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলের অধিপতির।” (৭০:৪০) গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে সূর্য উদিত হওয়ার দুটি পৃথক জায়গা এবং অস্তমিত হওয়ারও দুটি পৃথক জায়গা। ওখান হতে সূর্য উপরে উঠে ও নীচে নেমে আসে। ঋতুর পরিবর্তনে এটা পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং তাকেই কর্মবিধায়ক বানিয়ে নাও।" (৭৩:৯) তাহলে এখানে মাশরিক ও মাগরিব দ্বারা এর জাতকে বুঝানো হয়েছে, আর দুটি মাশরিক ও দুটি মাগরিব দ্বারা বুঝানো হয়েছে সূর্যোদয়ের দুটি স্থানকে এবং সূর্যাস্তের দুটি স্থানকে। উদয় ও অস্তের দুটি করে পৃথক পৃথক স্থান থাকার মধ্যে মানবীয় উপকার ও কল্যাণ রয়েছে বলে আবারও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ “হে মানব ও জ্বিন জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে? তার ক্ষমতার দৃশ্য অবলোকন কর যে, দুটি সমুদ্র সমানভাবে চলতে রয়েছে। একটির পানি লবণাক্ত এবং অপরটির পানি মিষ্ট। কিন্তু না ওর পানি এর পানির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এর পানিকে লবণাক্ত করতে পারে, না এর পানি ওর সাথে মিশ্রিত হয়ে ওর পানিকে মিশ্র করতে পারে! বরং দুটোই নিজ নিজ গতিতে চলছে! উভয়ের মধ্যে এক অন্তরায় রয়েছে। সুতরাং না এটা ওটার সাথে এবং ওটা এটার সাথে মিশ্রিত বা মিলিত হতে পারে। এটা নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে এবং ওটাও নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে। আর কুদরতী ব্যবধান দুটোর মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ দুটোরই পানি মিলিতভাবে রয়েছে। সূরায়ে ফুরকানের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট সুপেয় এবং অপরটি লোনা, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” (২৫:৫৩)। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসমানের সমুদ্র ও যমীনের সমুদ্রকে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, আসমানে যে পানির ফোঁটা রয়েছে এবং যমীনের সমুদ্রে যে ঝিনুক রয়েছে, এ দুটোর মিলনে মুক্তা জন্ম লাভ করে। এ ঘটনাটি তো সত্য বটে, কিন্তু এই আয়াতের তাফসীর এভাবে করা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এ আয়াতে এ দুটি সমুদ্রের মাঝে বারযাখ বা অন্তরায় থাকার বর্ণনা রয়েছে যা এটাকে ওটা হতে এবং ওটাকে এটা হতে বাধা দিয়ে রেখেছে। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ দুটো সমুদ্র যমীনেই রয়েছে। এমনকি দুটো মিলিতভাবে রয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে দুটোর পানি পৃথক থাকছে। আসমান ও যমীনের মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে ওটাকে (আরবী) বলা হয় না। এ জন্যে সঠিক উক্তি এটাই যে, এ দুটো যমীনেরই সমুদ্র যে দুটোর বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে, একটি যে আসমানের এবং অপরটি যমীনের তা নয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, উভয় সমুদ্র হতে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল, অথচ এগুলো পাওয়া যায় আসলে একটি সমুদ্র হতে, কিন্তু দুটোর উপর এর প্রয়োগ হয়েছে এবং এরূপ প্রয়োগ বৈধ ও সঠিক। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য হতে রাসূলগণ আসেনি?” (৬:১৩০)আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, রাসূল শুধু মানুষের মধ্য হতেই হয়েছেন, জ্বিনদের মধ্য হতে কোন জ্বিন রাসূল রূপে আসেনি। তাহলে এখানে যেমন মানব ও দানবের মধ্য হতে রাসূল আগমনের প্রয়োগ শুদ্ধ হয়েছে, অনুরূপভাবে এই আয়াতেও দুটো সমুদ্রের উপরই মুক্তা ও প্রবাল উৎপন্ন হওয়ার প্রয়োগ সঠিক হয়েছে। অথচ এগুলো উৎপন্ন হয় শুধু একটিতে।(আরবী) অর্থাৎ মুক্তা তো একটি সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত জিনিস। আর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ছোট মুক্তাকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় বড় মুক্তাকে। এও বলা হয়েছে যে, উত্তম ও উচ্চমানের মুক্তাকে মারজান বলে। কারো কারো মতে লাল রঙ এর জওহর বা মূল্যবান পাথরকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় লাল মোহরকে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা প্রত্যেকটা হতে বহির্গত গোশত খেয়ে থাকো যা টাটকা হয় এবং পরিধানের অলংকার বের করে থাকো।” (৩৫:১২) মাছ তো লোনা ও মিষ্ট উভয় পানি হতেই বের হয়ে থাকে, কিন্তু মণি-মুক্তা শুধু লোনা পানির সমুদ্রে পাওয়া যায়, মিষ্ট পানির সমুদ্রে নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আসমানের পানির যে বিন্দু সমুদ্রের ঝিনুকের মুখে সোজাভাবে পড়ে তাতেই মুক্তার সৃষ্টি হয়। আর যখন ঝিনুকের মধ্যে পড়ে না তখন আম্বর (সুগন্ধি দ্রব্য বিশেষ) জন্ম লাভ করে। মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণের সময় ঝিনুকও মুখ খুলে দেয়। তাই এই নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর আবার বলেনঃ তোমাদের যে প্রতিপালকের এসব অসংখ্য নিয়ামত তোমাদের উপর রয়েছে তার কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সমুদ্রে বিচরণশীল পর্বত প্রমাণ অর্ণবপোতসমূহ তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন, যেগুলো হাজার হাজার মণ মাল এবং শত শত মানুষকে এদিক হতে ওদিকে নিয়ে যায়। এটাও আল্লাহ তা'আলারই নিয়ন্ত্রণাধীন। এই বিরাট নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি পুনরায় বলেনঃ এখন বল তো, তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ তোমরা অস্বীকার করবে?হযরত উমরাহ ইবনে সুওয়ায়েদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে ফুরাত নদীর তীরে ছিলাম। নদীতে একটি বিরাট জাহাজ চলে আসছিল। জাহাজটিকে আসতে দেখে হযরত আলী (রাঃ) ঐ জাহাজটির দিকে হাতের ইশারা করে (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “যিনি এই পর্বত প্রমাণ জাহাজকে নদীতে চালিত করেছেন ঐ আল্লাহর কসম! আমি হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যাও করিনি, হত্যা করার ইচ্ছাও করিনি এবং হত্যাকারীদের সাথে শরীকও ছিলাম না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর-রাহমান 55:20
১৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন, তিনি মানুষকে বেজে ওঠা খোলার মত শুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন নিধূম অগ্নিশিখা হতে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (জ্যোতি) হতে, জ্বিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নিধূম অগ্নিশিখা হতে এবং আদম (আঃ)-কে ঐ মাটি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে যার বর্ণনা তোমাদের সামনে করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার না করার হিদায়াত দান করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের নিয়ন্তা। অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই উদয়াচল এবং গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই অস্তাচল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলের অধিপতির।” (৭০:৪০) গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে সূর্য উদিত হওয়ার দুটি পৃথক জায়গা এবং অস্তমিত হওয়ারও দুটি পৃথক জায়গা। ওখান হতে সূর্য উপরে উঠে ও নীচে নেমে আসে। ঋতুর পরিবর্তনে এটা পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং তাকেই কর্মবিধায়ক বানিয়ে নাও।" (৭৩:৯) তাহলে এখানে মাশরিক ও মাগরিব দ্বারা এর জাতকে বুঝানো হয়েছে, আর দুটি মাশরিক ও দুটি মাগরিব দ্বারা বুঝানো হয়েছে সূর্যোদয়ের দুটি স্থানকে এবং সূর্যাস্তের দুটি স্থানকে। উদয় ও অস্তের দুটি করে পৃথক পৃথক স্থান থাকার মধ্যে মানবীয় উপকার ও কল্যাণ রয়েছে বলে আবারও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ “হে মানব ও জ্বিন জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে? তার ক্ষমতার দৃশ্য অবলোকন কর যে, দুটি সমুদ্র সমানভাবে চলতে রয়েছে। একটির পানি লবণাক্ত এবং অপরটির পানি মিষ্ট। কিন্তু না ওর পানি এর পানির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এর পানিকে লবণাক্ত করতে পারে, না এর পানি ওর সাথে মিশ্রিত হয়ে ওর পানিকে মিশ্র করতে পারে! বরং দুটোই নিজ নিজ গতিতে চলছে! উভয়ের মধ্যে এক অন্তরায় রয়েছে। সুতরাং না এটা ওটার সাথে এবং ওটা এটার সাথে মিশ্রিত বা মিলিত হতে পারে। এটা নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে এবং ওটাও নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে। আর কুদরতী ব্যবধান দুটোর মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ দুটোরই পানি মিলিতভাবে রয়েছে। সূরায়ে ফুরকানের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট সুপেয় এবং অপরটি লোনা, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” (২৫:৫৩)। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসমানের সমুদ্র ও যমীনের সমুদ্রকে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, আসমানে যে পানির ফোঁটা রয়েছে এবং যমীনের সমুদ্রে যে ঝিনুক রয়েছে, এ দুটোর মিলনে মুক্তা জন্ম লাভ করে। এ ঘটনাটি তো সত্য বটে, কিন্তু এই আয়াতের তাফসীর এভাবে করা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এ আয়াতে এ দুটি সমুদ্রের মাঝে বারযাখ বা অন্তরায় থাকার বর্ণনা রয়েছে যা এটাকে ওটা হতে এবং ওটাকে এটা হতে বাধা দিয়ে রেখেছে। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ দুটো সমুদ্র যমীনেই রয়েছে। এমনকি দুটো মিলিতভাবে রয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে দুটোর পানি পৃথক থাকছে। আসমান ও যমীনের মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে ওটাকে (আরবী) বলা হয় না। এ জন্যে সঠিক উক্তি এটাই যে, এ দুটো যমীনেরই সমুদ্র যে দুটোর বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে, একটি যে আসমানের এবং অপরটি যমীনের তা নয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, উভয় সমুদ্র হতে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল, অথচ এগুলো পাওয়া যায় আসলে একটি সমুদ্র হতে, কিন্তু দুটোর উপর এর প্রয়োগ হয়েছে এবং এরূপ প্রয়োগ বৈধ ও সঠিক। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য হতে রাসূলগণ আসেনি?” (৬:১৩০)আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, রাসূল শুধু মানুষের মধ্য হতেই হয়েছেন, জ্বিনদের মধ্য হতে কোন জ্বিন রাসূল রূপে আসেনি। তাহলে এখানে যেমন মানব ও দানবের মধ্য হতে রাসূল আগমনের প্রয়োগ শুদ্ধ হয়েছে, অনুরূপভাবে এই আয়াতেও দুটো সমুদ্রের উপরই মুক্তা ও প্রবাল উৎপন্ন হওয়ার প্রয়োগ সঠিক হয়েছে। অথচ এগুলো উৎপন্ন হয় শুধু একটিতে।(আরবী) অর্থাৎ মুক্তা তো একটি সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত জিনিস। আর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ছোট মুক্তাকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় বড় মুক্তাকে। এও বলা হয়েছে যে, উত্তম ও উচ্চমানের মুক্তাকে মারজান বলে। কারো কারো মতে লাল রঙ এর জওহর বা মূল্যবান পাথরকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় লাল মোহরকে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা প্রত্যেকটা হতে বহির্গত গোশত খেয়ে থাকো যা টাটকা হয় এবং পরিধানের অলংকার বের করে থাকো।” (৩৫:১২) মাছ তো লোনা ও মিষ্ট উভয় পানি হতেই বের হয়ে থাকে, কিন্তু মণি-মুক্তা শুধু লোনা পানির সমুদ্রে পাওয়া যায়, মিষ্ট পানির সমুদ্রে নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আসমানের পানির যে বিন্দু সমুদ্রের ঝিনুকের মুখে সোজাভাবে পড়ে তাতেই মুক্তার সৃষ্টি হয়। আর যখন ঝিনুকের মধ্যে পড়ে না তখন আম্বর (সুগন্ধি দ্রব্য বিশেষ) জন্ম লাভ করে। মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণের সময় ঝিনুকও মুখ খুলে দেয়। তাই এই নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর আবার বলেনঃ তোমাদের যে প্রতিপালকের এসব অসংখ্য নিয়ামত তোমাদের উপর রয়েছে তার কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সমুদ্রে বিচরণশীল পর্বত প্রমাণ অর্ণবপোতসমূহ তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন, যেগুলো হাজার হাজার মণ মাল এবং শত শত মানুষকে এদিক হতে ওদিকে নিয়ে যায়। এটাও আল্লাহ তা'আলারই নিয়ন্ত্রণাধীন। এই বিরাট নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি পুনরায় বলেনঃ এখন বল তো, তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ তোমরা অস্বীকার করবে?হযরত উমরাহ ইবনে সুওয়ায়েদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে ফুরাত নদীর তীরে ছিলাম। নদীতে একটি বিরাট জাহাজ চলে আসছিল। জাহাজটিকে আসতে দেখে হযরত আলী (রাঃ) ঐ জাহাজটির দিকে হাতের ইশারা করে (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “যিনি এই পর্বত প্রমাণ জাহাজকে নদীতে চালিত করেছেন ঐ আল্লাহর কসম! আমি হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যাও করিনি, হত্যা করার ইচ্ছাও করিনি এবং হত্যাকারীদের সাথে শরীকও ছিলাম না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর-রাহমান 55:21
১৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন, তিনি মানুষকে বেজে ওঠা খোলার মত শুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন নিধূম অগ্নিশিখা হতে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (জ্যোতি) হতে, জ্বিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নিধূম অগ্নিশিখা হতে এবং আদম (আঃ)-কে ঐ মাটি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে যার বর্ণনা তোমাদের সামনে করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার না করার হিদায়াত দান করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের নিয়ন্তা। অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই উদয়াচল এবং গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই অস্তাচল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলের অধিপতির।” (৭০:৪০) গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে সূর্য উদিত হওয়ার দুটি পৃথক জায়গা এবং অস্তমিত হওয়ারও দুটি পৃথক জায়গা। ওখান হতে সূর্য উপরে উঠে ও নীচে নেমে আসে। ঋতুর পরিবর্তনে এটা পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং তাকেই কর্মবিধায়ক বানিয়ে নাও।" (৭৩:৯) তাহলে এখানে মাশরিক ও মাগরিব দ্বারা এর জাতকে বুঝানো হয়েছে, আর দুটি মাশরিক ও দুটি মাগরিব দ্বারা বুঝানো হয়েছে সূর্যোদয়ের দুটি স্থানকে এবং সূর্যাস্তের দুটি স্থানকে। উদয় ও অস্তের দুটি করে পৃথক পৃথক স্থান থাকার মধ্যে মানবীয় উপকার ও কল্যাণ রয়েছে বলে আবারও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ “হে মানব ও জ্বিন জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে? তার ক্ষমতার দৃশ্য অবলোকন কর যে, দুটি সমুদ্র সমানভাবে চলতে রয়েছে। একটির পানি লবণাক্ত এবং অপরটির পানি মিষ্ট। কিন্তু না ওর পানি এর পানির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এর পানিকে লবণাক্ত করতে পারে, না এর পানি ওর সাথে মিশ্রিত হয়ে ওর পানিকে মিশ্র করতে পারে! বরং দুটোই নিজ নিজ গতিতে চলছে! উভয়ের মধ্যে এক অন্তরায় রয়েছে। সুতরাং না এটা ওটার সাথে এবং ওটা এটার সাথে মিশ্রিত বা মিলিত হতে পারে। এটা নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে এবং ওটাও নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে। আর কুদরতী ব্যবধান দুটোর মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ দুটোরই পানি মিলিতভাবে রয়েছে। সূরায়ে ফুরকানের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট সুপেয় এবং অপরটি লোনা, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” (২৫:৫৩)। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসমানের সমুদ্র ও যমীনের সমুদ্রকে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, আসমানে যে পানির ফোঁটা রয়েছে এবং যমীনের সমুদ্রে যে ঝিনুক রয়েছে, এ দুটোর মিলনে মুক্তা জন্ম লাভ করে। এ ঘটনাটি তো সত্য বটে, কিন্তু এই আয়াতের তাফসীর এভাবে করা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এ আয়াতে এ দুটি সমুদ্রের মাঝে বারযাখ বা অন্তরায় থাকার বর্ণনা রয়েছে যা এটাকে ওটা হতে এবং ওটাকে এটা হতে বাধা দিয়ে রেখেছে। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ দুটো সমুদ্র যমীনেই রয়েছে। এমনকি দুটো মিলিতভাবে রয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে দুটোর পানি পৃথক থাকছে। আসমান ও যমীনের মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে ওটাকে (আরবী) বলা হয় না। এ জন্যে সঠিক উক্তি এটাই যে, এ দুটো যমীনেরই সমুদ্র যে দুটোর বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে, একটি যে আসমানের এবং অপরটি যমীনের তা নয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, উভয় সমুদ্র হতে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল, অথচ এগুলো পাওয়া যায় আসলে একটি সমুদ্র হতে, কিন্তু দুটোর উপর এর প্রয়োগ হয়েছে এবং এরূপ প্রয়োগ বৈধ ও সঠিক। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য হতে রাসূলগণ আসেনি?” (৬:১৩০)আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, রাসূল শুধু মানুষের মধ্য হতেই হয়েছেন, জ্বিনদের মধ্য হতে কোন জ্বিন রাসূল রূপে আসেনি। তাহলে এখানে যেমন মানব ও দানবের মধ্য হতে রাসূল আগমনের প্রয়োগ শুদ্ধ হয়েছে, অনুরূপভাবে এই আয়াতেও দুটো সমুদ্রের উপরই মুক্তা ও প্রবাল উৎপন্ন হওয়ার প্রয়োগ সঠিক হয়েছে। অথচ এগুলো উৎপন্ন হয় শুধু একটিতে।(আরবী) অর্থাৎ মুক্তা তো একটি সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত জিনিস। আর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ছোট মুক্তাকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় বড় মুক্তাকে। এও বলা হয়েছে যে, উত্তম ও উচ্চমানের মুক্তাকে মারজান বলে। কারো কারো মতে লাল রঙ এর জওহর বা মূল্যবান পাথরকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় লাল মোহরকে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা প্রত্যেকটা হতে বহির্গত গোশত খেয়ে থাকো যা টাটকা হয় এবং পরিধানের অলংকার বের করে থাকো।” (৩৫:১২) মাছ তো লোনা ও মিষ্ট উভয় পানি হতেই বের হয়ে থাকে, কিন্তু মণি-মুক্তা শুধু লোনা পানির সমুদ্রে পাওয়া যায়, মিষ্ট পানির সমুদ্রে নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আসমানের পানির যে বিন্দু সমুদ্রের ঝিনুকের মুখে সোজাভাবে পড়ে তাতেই মুক্তার সৃষ্টি হয়। আর যখন ঝিনুকের মধ্যে পড়ে না তখন আম্বর (সুগন্ধি দ্রব্য বিশেষ) জন্ম লাভ করে। মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণের সময় ঝিনুকও মুখ খুলে দেয়। তাই এই নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর আবার বলেনঃ তোমাদের যে প্রতিপালকের এসব অসংখ্য নিয়ামত তোমাদের উপর রয়েছে তার কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সমুদ্রে বিচরণশীল পর্বত প্রমাণ অর্ণবপোতসমূহ তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন, যেগুলো হাজার হাজার মণ মাল এবং শত শত মানুষকে এদিক হতে ওদিকে নিয়ে যায়। এটাও আল্লাহ তা'আলারই নিয়ন্ত্রণাধীন। এই বিরাট নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি পুনরায় বলেনঃ এখন বল তো, তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ তোমরা অস্বীকার করবে?হযরত উমরাহ ইবনে সুওয়ায়েদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে ফুরাত নদীর তীরে ছিলাম। নদীতে একটি বিরাট জাহাজ চলে আসছিল। জাহাজটিকে আসতে দেখে হযরত আলী (রাঃ) ঐ জাহাজটির দিকে হাতের ইশারা করে (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “যিনি এই পর্বত প্রমাণ জাহাজকে নদীতে চালিত করেছেন ঐ আল্লাহর কসম! আমি হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যাও করিনি, হত্যা করার ইচ্ছাও করিনি এবং হত্যাকারীদের সাথে শরীকও ছিলাম না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর-রাহমান 55:22
১৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন, তিনি মানুষকে বেজে ওঠা খোলার মত শুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন নিধূম অগ্নিশিখা হতে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (জ্যোতি) হতে, জ্বিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নিধূম অগ্নিশিখা হতে এবং আদম (আঃ)-কে ঐ মাটি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে যার বর্ণনা তোমাদের সামনে করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার না করার হিদায়াত দান করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের নিয়ন্তা। অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই উদয়াচল এবং গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই অস্তাচল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলের অধিপতির।” (৭০:৪০) গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে সূর্য উদিত হওয়ার দুটি পৃথক জায়গা এবং অস্তমিত হওয়ারও দুটি পৃথক জায়গা। ওখান হতে সূর্য উপরে উঠে ও নীচে নেমে আসে। ঋতুর পরিবর্তনে এটা পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং তাকেই কর্মবিধায়ক বানিয়ে নাও।" (৭৩:৯) তাহলে এখানে মাশরিক ও মাগরিব দ্বারা এর জাতকে বুঝানো হয়েছে, আর দুটি মাশরিক ও দুটি মাগরিব দ্বারা বুঝানো হয়েছে সূর্যোদয়ের দুটি স্থানকে এবং সূর্যাস্তের দুটি স্থানকে। উদয় ও অস্তের দুটি করে পৃথক পৃথক স্থান থাকার মধ্যে মানবীয় উপকার ও কল্যাণ রয়েছে বলে আবারও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ “হে মানব ও জ্বিন জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে? তার ক্ষমতার দৃশ্য অবলোকন কর যে, দুটি সমুদ্র সমানভাবে চলতে রয়েছে। একটির পানি লবণাক্ত এবং অপরটির পানি মিষ্ট। কিন্তু না ওর পানি এর পানির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এর পানিকে লবণাক্ত করতে পারে, না এর পানি ওর সাথে মিশ্রিত হয়ে ওর পানিকে মিশ্র করতে পারে! বরং দুটোই নিজ নিজ গতিতে চলছে! উভয়ের মধ্যে এক অন্তরায় রয়েছে। সুতরাং না এটা ওটার সাথে এবং ওটা এটার সাথে মিশ্রিত বা মিলিত হতে পারে। এটা নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে এবং ওটাও নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে। আর কুদরতী ব্যবধান দুটোর মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ দুটোরই পানি মিলিতভাবে রয়েছে। সূরায়ে ফুরকানের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট সুপেয় এবং অপরটি লোনা, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” (২৫:৫৩)। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসমানের সমুদ্র ও যমীনের সমুদ্রকে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, আসমানে যে পানির ফোঁটা রয়েছে এবং যমীনের সমুদ্রে যে ঝিনুক রয়েছে, এ দুটোর মিলনে মুক্তা জন্ম লাভ করে। এ ঘটনাটি তো সত্য বটে, কিন্তু এই আয়াতের তাফসীর এভাবে করা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এ আয়াতে এ দুটি সমুদ্রের মাঝে বারযাখ বা অন্তরায় থাকার বর্ণনা রয়েছে যা এটাকে ওটা হতে এবং ওটাকে এটা হতে বাধা দিয়ে রেখেছে। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ দুটো সমুদ্র যমীনেই রয়েছে। এমনকি দুটো মিলিতভাবে রয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে দুটোর পানি পৃথক থাকছে। আসমান ও যমীনের মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে ওটাকে (আরবী) বলা হয় না। এ জন্যে সঠিক উক্তি এটাই যে, এ দুটো যমীনেরই সমুদ্র যে দুটোর বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে, একটি যে আসমানের এবং অপরটি যমীনের তা নয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, উভয় সমুদ্র হতে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল, অথচ এগুলো পাওয়া যায় আসলে একটি সমুদ্র হতে, কিন্তু দুটোর উপর এর প্রয়োগ হয়েছে এবং এরূপ প্রয়োগ বৈধ ও সঠিক। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য হতে রাসূলগণ আসেনি?” (৬:১৩০)আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, রাসূল শুধু মানুষের মধ্য হতেই হয়েছেন, জ্বিনদের মধ্য হতে কোন জ্বিন রাসূল রূপে আসেনি। তাহলে এখানে যেমন মানব ও দানবের মধ্য হতে রাসূল আগমনের প্রয়োগ শুদ্ধ হয়েছে, অনুরূপভাবে এই আয়াতেও দুটো সমুদ্রের উপরই মুক্তা ও প্রবাল উৎপন্ন হওয়ার প্রয়োগ সঠিক হয়েছে। অথচ এগুলো উৎপন্ন হয় শুধু একটিতে।(আরবী) অর্থাৎ মুক্তা তো একটি সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত জিনিস। আর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ছোট মুক্তাকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় বড় মুক্তাকে। এও বলা হয়েছে যে, উত্তম ও উচ্চমানের মুক্তাকে মারজান বলে। কারো কারো মতে লাল রঙ এর জওহর বা মূল্যবান পাথরকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় লাল মোহরকে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা প্রত্যেকটা হতে বহির্গত গোশত খেয়ে থাকো যা টাটকা হয় এবং পরিধানের অলংকার বের করে থাকো।” (৩৫:১২) মাছ তো লোনা ও মিষ্ট উভয় পানি হতেই বের হয়ে থাকে, কিন্তু মণি-মুক্তা শুধু লোনা পানির সমুদ্রে পাওয়া যায়, মিষ্ট পানির সমুদ্রে নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আসমানের পানির যে বিন্দু সমুদ্রের ঝিনুকের মুখে সোজাভাবে পড়ে তাতেই মুক্তার সৃষ্টি হয়। আর যখন ঝিনুকের মধ্যে পড়ে না তখন আম্বর (সুগন্ধি দ্রব্য বিশেষ) জন্ম লাভ করে। মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণের সময় ঝিনুকও মুখ খুলে দেয়। তাই এই নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর আবার বলেনঃ তোমাদের যে প্রতিপালকের এসব অসংখ্য নিয়ামত তোমাদের উপর রয়েছে তার কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সমুদ্রে বিচরণশীল পর্বত প্রমাণ অর্ণবপোতসমূহ তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন, যেগুলো হাজার হাজার মণ মাল এবং শত শত মানুষকে এদিক হতে ওদিকে নিয়ে যায়। এটাও আল্লাহ তা'আলারই নিয়ন্ত্রণাধীন। এই বিরাট নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি পুনরায় বলেনঃ এখন বল তো, তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ তোমরা অস্বীকার করবে?হযরত উমরাহ ইবনে সুওয়ায়েদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে ফুরাত নদীর তীরে ছিলাম। নদীতে একটি বিরাট জাহাজ চলে আসছিল। জাহাজটিকে আসতে দেখে হযরত আলী (রাঃ) ঐ জাহাজটির দিকে হাতের ইশারা করে (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “যিনি এই পর্বত প্রমাণ জাহাজকে নদীতে চালিত করেছেন ঐ আল্লাহর কসম! আমি হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যাও করিনি, হত্যা করার ইচ্ছাও করিনি এবং হত্যাকারীদের সাথে শরীকও ছিলাম না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর-রাহমান 55:23
১৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন, তিনি মানুষকে বেজে ওঠা খোলার মত শুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন নিধূম অগ্নিশিখা হতে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (জ্যোতি) হতে, জ্বিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নিধূম অগ্নিশিখা হতে এবং আদম (আঃ)-কে ঐ মাটি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে যার বর্ণনা তোমাদের সামনে করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার না করার হিদায়াত দান করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের নিয়ন্তা। অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই উদয়াচল এবং গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই অস্তাচল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলের অধিপতির।” (৭০:৪০) গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে সূর্য উদিত হওয়ার দুটি পৃথক জায়গা এবং অস্তমিত হওয়ারও দুটি পৃথক জায়গা। ওখান হতে সূর্য উপরে উঠে ও নীচে নেমে আসে। ঋতুর পরিবর্তনে এটা পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং তাকেই কর্মবিধায়ক বানিয়ে নাও।" (৭৩:৯) তাহলে এখানে মাশরিক ও মাগরিব দ্বারা এর জাতকে বুঝানো হয়েছে, আর দুটি মাশরিক ও দুটি মাগরিব দ্বারা বুঝানো হয়েছে সূর্যোদয়ের দুটি স্থানকে এবং সূর্যাস্তের দুটি স্থানকে। উদয় ও অস্তের দুটি করে পৃথক পৃথক স্থান থাকার মধ্যে মানবীয় উপকার ও কল্যাণ রয়েছে বলে আবারও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ “হে মানব ও জ্বিন জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে? তার ক্ষমতার দৃশ্য অবলোকন কর যে, দুটি সমুদ্র সমানভাবে চলতে রয়েছে। একটির পানি লবণাক্ত এবং অপরটির পানি মিষ্ট। কিন্তু না ওর পানি এর পানির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এর পানিকে লবণাক্ত করতে পারে, না এর পানি ওর সাথে মিশ্রিত হয়ে ওর পানিকে মিশ্র করতে পারে! বরং দুটোই নিজ নিজ গতিতে চলছে! উভয়ের মধ্যে এক অন্তরায় রয়েছে। সুতরাং না এটা ওটার সাথে এবং ওটা এটার সাথে মিশ্রিত বা মিলিত হতে পারে। এটা নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে এবং ওটাও নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে। আর কুদরতী ব্যবধান দুটোর মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ দুটোরই পানি মিলিতভাবে রয়েছে। সূরায়ে ফুরকানের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট সুপেয় এবং অপরটি লোনা, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” (২৫:৫৩)। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসমানের সমুদ্র ও যমীনের সমুদ্রকে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, আসমানে যে পানির ফোঁটা রয়েছে এবং যমীনের সমুদ্রে যে ঝিনুক রয়েছে, এ দুটোর মিলনে মুক্তা জন্ম লাভ করে। এ ঘটনাটি তো সত্য বটে, কিন্তু এই আয়াতের তাফসীর এভাবে করা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এ আয়াতে এ দুটি সমুদ্রের মাঝে বারযাখ বা অন্তরায় থাকার বর্ণনা রয়েছে যা এটাকে ওটা হতে এবং ওটাকে এটা হতে বাধা দিয়ে রেখেছে। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ দুটো সমুদ্র যমীনেই রয়েছে। এমনকি দুটো মিলিতভাবে রয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে দুটোর পানি পৃথক থাকছে। আসমান ও যমীনের মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে ওটাকে (আরবী) বলা হয় না। এ জন্যে সঠিক উক্তি এটাই যে, এ দুটো যমীনেরই সমুদ্র যে দুটোর বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে, একটি যে আসমানের এবং অপরটি যমীনের তা নয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, উভয় সমুদ্র হতে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল, অথচ এগুলো পাওয়া যায় আসলে একটি সমুদ্র হতে, কিন্তু দুটোর উপর এর প্রয়োগ হয়েছে এবং এরূপ প্রয়োগ বৈধ ও সঠিক। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য হতে রাসূলগণ আসেনি?” (৬:১৩০)আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, রাসূল শুধু মানুষের মধ্য হতেই হয়েছেন, জ্বিনদের মধ্য হতে কোন জ্বিন রাসূল রূপে আসেনি। তাহলে এখানে যেমন মানব ও দানবের মধ্য হতে রাসূল আগমনের প্রয়োগ শুদ্ধ হয়েছে, অনুরূপভাবে এই আয়াতেও দুটো সমুদ্রের উপরই মুক্তা ও প্রবাল উৎপন্ন হওয়ার প্রয়োগ সঠিক হয়েছে। অথচ এগুলো উৎপন্ন হয় শুধু একটিতে।(আরবী) অর্থাৎ মুক্তা তো একটি সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত জিনিস। আর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ছোট মুক্তাকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় বড় মুক্তাকে। এও বলা হয়েছে যে, উত্তম ও উচ্চমানের মুক্তাকে মারজান বলে। কারো কারো মতে লাল রঙ এর জওহর বা মূল্যবান পাথরকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় লাল মোহরকে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা প্রত্যেকটা হতে বহির্গত গোশত খেয়ে থাকো যা টাটকা হয় এবং পরিধানের অলংকার বের করে থাকো।” (৩৫:১২) মাছ তো লোনা ও মিষ্ট উভয় পানি হতেই বের হয়ে থাকে, কিন্তু মণি-মুক্তা শুধু লোনা পানির সমুদ্রে পাওয়া যায়, মিষ্ট পানির সমুদ্রে নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আসমানের পানির যে বিন্দু সমুদ্রের ঝিনুকের মুখে সোজাভাবে পড়ে তাতেই মুক্তার সৃষ্টি হয়। আর যখন ঝিনুকের মধ্যে পড়ে না তখন আম্বর (সুগন্ধি দ্রব্য বিশেষ) জন্ম লাভ করে। মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণের সময় ঝিনুকও মুখ খুলে দেয়। তাই এই নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর আবার বলেনঃ তোমাদের যে প্রতিপালকের এসব অসংখ্য নিয়ামত তোমাদের উপর রয়েছে তার কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সমুদ্রে বিচরণশীল পর্বত প্রমাণ অর্ণবপোতসমূহ তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন, যেগুলো হাজার হাজার মণ মাল এবং শত শত মানুষকে এদিক হতে ওদিকে নিয়ে যায়। এটাও আল্লাহ তা'আলারই নিয়ন্ত্রণাধীন। এই বিরাট নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি পুনরায় বলেনঃ এখন বল তো, তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ তোমরা অস্বীকার করবে?হযরত উমরাহ ইবনে সুওয়ায়েদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে ফুরাত নদীর তীরে ছিলাম। নদীতে একটি বিরাট জাহাজ চলে আসছিল। জাহাজটিকে আসতে দেখে হযরত আলী (রাঃ) ঐ জাহাজটির দিকে হাতের ইশারা করে (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “যিনি এই পর্বত প্রমাণ জাহাজকে নদীতে চালিত করেছেন ঐ আল্লাহর কসম! আমি হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যাও করিনি, হত্যা করার ইচ্ছাও করিনি এবং হত্যাকারীদের সাথে শরীকও ছিলাম না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর-রাহমান 55:24
১৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন, তিনি মানুষকে বেজে ওঠা খোলার মত শুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন নিধূম অগ্নিশিখা হতে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (জ্যোতি) হতে, জ্বিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নিধূম অগ্নিশিখা হতে এবং আদম (আঃ)-কে ঐ মাটি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে যার বর্ণনা তোমাদের সামনে করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার না করার হিদায়াত দান করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের নিয়ন্তা। অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই উদয়াচল এবং গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই অস্তাচল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলের অধিপতির।” (৭০:৪০) গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে সূর্য উদিত হওয়ার দুটি পৃথক জায়গা এবং অস্তমিত হওয়ারও দুটি পৃথক জায়গা। ওখান হতে সূর্য উপরে উঠে ও নীচে নেমে আসে। ঋতুর পরিবর্তনে এটা পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং তাকেই কর্মবিধায়ক বানিয়ে নাও।" (৭৩:৯) তাহলে এখানে মাশরিক ও মাগরিব দ্বারা এর জাতকে বুঝানো হয়েছে, আর দুটি মাশরিক ও দুটি মাগরিব দ্বারা বুঝানো হয়েছে সূর্যোদয়ের দুটি স্থানকে এবং সূর্যাস্তের দুটি স্থানকে। উদয় ও অস্তের দুটি করে পৃথক পৃথক স্থান থাকার মধ্যে মানবীয় উপকার ও কল্যাণ রয়েছে বলে আবারও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ “হে মানব ও জ্বিন জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে? তার ক্ষমতার দৃশ্য অবলোকন কর যে, দুটি সমুদ্র সমানভাবে চলতে রয়েছে। একটির পানি লবণাক্ত এবং অপরটির পানি মিষ্ট। কিন্তু না ওর পানি এর পানির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এর পানিকে লবণাক্ত করতে পারে, না এর পানি ওর সাথে মিশ্রিত হয়ে ওর পানিকে মিশ্র করতে পারে! বরং দুটোই নিজ নিজ গতিতে চলছে! উভয়ের মধ্যে এক অন্তরায় রয়েছে। সুতরাং না এটা ওটার সাথে এবং ওটা এটার সাথে মিশ্রিত বা মিলিত হতে পারে। এটা নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে এবং ওটাও নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে। আর কুদরতী ব্যবধান দুটোর মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ দুটোরই পানি মিলিতভাবে রয়েছে। সূরায়ে ফুরকানের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট সুপেয় এবং অপরটি লোনা, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” (২৫:৫৩)। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসমানের সমুদ্র ও যমীনের সমুদ্রকে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, আসমানে যে পানির ফোঁটা রয়েছে এবং যমীনের সমুদ্রে যে ঝিনুক রয়েছে, এ দুটোর মিলনে মুক্তা জন্ম লাভ করে। এ ঘটনাটি তো সত্য বটে, কিন্তু এই আয়াতের তাফসীর এভাবে করা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এ আয়াতে এ দুটি সমুদ্রের মাঝে বারযাখ বা অন্তরায় থাকার বর্ণনা রয়েছে যা এটাকে ওটা হতে এবং ওটাকে এটা হতে বাধা দিয়ে রেখেছে। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ দুটো সমুদ্র যমীনেই রয়েছে। এমনকি দুটো মিলিতভাবে রয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে দুটোর পানি পৃথক থাকছে। আসমান ও যমীনের মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে ওটাকে (আরবী) বলা হয় না। এ জন্যে সঠিক উক্তি এটাই যে, এ দুটো যমীনেরই সমুদ্র যে দুটোর বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে, একটি যে আসমানের এবং অপরটি যমীনের তা নয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, উভয় সমুদ্র হতে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল, অথচ এগুলো পাওয়া যায় আসলে একটি সমুদ্র হতে, কিন্তু দুটোর উপর এর প্রয়োগ হয়েছে এবং এরূপ প্রয়োগ বৈধ ও সঠিক। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য হতে রাসূলগণ আসেনি?” (৬:১৩০)আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, রাসূল শুধু মানুষের মধ্য হতেই হয়েছেন, জ্বিনদের মধ্য হতে কোন জ্বিন রাসূল রূপে আসেনি। তাহলে এখানে যেমন মানব ও দানবের মধ্য হতে রাসূল আগমনের প্রয়োগ শুদ্ধ হয়েছে, অনুরূপভাবে এই আয়াতেও দুটো সমুদ্রের উপরই মুক্তা ও প্রবাল উৎপন্ন হওয়ার প্রয়োগ সঠিক হয়েছে। অথচ এগুলো উৎপন্ন হয় শুধু একটিতে।(আরবী) অর্থাৎ মুক্তা তো একটি সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত জিনিস। আর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ছোট মুক্তাকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় বড় মুক্তাকে। এও বলা হয়েছে যে, উত্তম ও উচ্চমানের মুক্তাকে মারজান বলে। কারো কারো মতে লাল রঙ এর জওহর বা মূল্যবান পাথরকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় লাল মোহরকে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা প্রত্যেকটা হতে বহির্গত গোশত খেয়ে থাকো যা টাটকা হয় এবং পরিধানের অলংকার বের করে থাকো।” (৩৫:১২) মাছ তো লোনা ও মিষ্ট উভয় পানি হতেই বের হয়ে থাকে, কিন্তু মণি-মুক্তা শুধু লোনা পানির সমুদ্রে পাওয়া যায়, মিষ্ট পানির সমুদ্রে নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আসমানের পানির যে বিন্দু সমুদ্রের ঝিনুকের মুখে সোজাভাবে পড়ে তাতেই মুক্তার সৃষ্টি হয়। আর যখন ঝিনুকের মধ্যে পড়ে না তখন আম্বর (সুগন্ধি দ্রব্য বিশেষ) জন্ম লাভ করে। মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণের সময় ঝিনুকও মুখ খুলে দেয়। তাই এই নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর আবার বলেনঃ তোমাদের যে প্রতিপালকের এসব অসংখ্য নিয়ামত তোমাদের উপর রয়েছে তার কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সমুদ্রে বিচরণশীল পর্বত প্রমাণ অর্ণবপোতসমূহ তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন, যেগুলো হাজার হাজার মণ মাল এবং শত শত মানুষকে এদিক হতে ওদিকে নিয়ে যায়। এটাও আল্লাহ তা'আলারই নিয়ন্ত্রণাধীন। এই বিরাট নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি পুনরায় বলেনঃ এখন বল তো, তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ তোমরা অস্বীকার করবে?হযরত উমরাহ ইবনে সুওয়ায়েদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে ফুরাত নদীর তীরে ছিলাম। নদীতে একটি বিরাট জাহাজ চলে আসছিল। জাহাজটিকে আসতে দেখে হযরত আলী (রাঃ) ঐ জাহাজটির দিকে হাতের ইশারা করে (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “যিনি এই পর্বত প্রমাণ জাহাজকে নদীতে চালিত করেছেন ঐ আল্লাহর কসম! আমি হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যাও করিনি, হত্যা করার ইচ্ছাও করিনি এবং হত্যাকারীদের সাথে শরীকও ছিলাম না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর-রাহমান 55:25
১৪-২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন, তিনি মানুষকে বেজে ওঠা খোলার মত শুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন নিধূম অগ্নিশিখা হতে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (জ্যোতি) হতে, জ্বিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নিধূম অগ্নিশিখা হতে এবং আদম (আঃ)-কে ঐ মাটি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে যার বর্ণনা তোমাদের সামনে করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার না করার হিদায়াত দান করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের নিয়ন্তা। অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই উদয়াচল এবং গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের দুই অস্তাচল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলের অধিপতির।” (৭০:৪০) গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে সূর্য উদিত হওয়ার দুটি পৃথক জায়গা এবং অস্তমিত হওয়ারও দুটি পৃথক জায়গা। ওখান হতে সূর্য উপরে উঠে ও নীচে নেমে আসে। ঋতুর পরিবর্তনে এটা পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং তাকেই কর্মবিধায়ক বানিয়ে নাও।" (৭৩:৯) তাহলে এখানে মাশরিক ও মাগরিব দ্বারা এর জাতকে বুঝানো হয়েছে, আর দুটি মাশরিক ও দুটি মাগরিব দ্বারা বুঝানো হয়েছে সূর্যোদয়ের দুটি স্থানকে এবং সূর্যাস্তের দুটি স্থানকে। উদয় ও অস্তের দুটি করে পৃথক পৃথক স্থান থাকার মধ্যে মানবীয় উপকার ও কল্যাণ রয়েছে বলে আবারও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ “হে মানব ও জ্বিন জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে? তার ক্ষমতার দৃশ্য অবলোকন কর যে, দুটি সমুদ্র সমানভাবে চলতে রয়েছে। একটির পানি লবণাক্ত এবং অপরটির পানি মিষ্ট। কিন্তু না ওর পানি এর পানির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এর পানিকে লবণাক্ত করতে পারে, না এর পানি ওর সাথে মিশ্রিত হয়ে ওর পানিকে মিশ্র করতে পারে! বরং দুটোই নিজ নিজ গতিতে চলছে! উভয়ের মধ্যে এক অন্তরায় রয়েছে। সুতরাং না এটা ওটার সাথে এবং ওটা এটার সাথে মিশ্রিত বা মিলিত হতে পারে। এটা নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে এবং ওটাও নিজের সীমানার মধ্যে রয়েছে। আর কুদরতী ব্যবধান দুটোর মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ দুটোরই পানি মিলিতভাবে রয়েছে। সূরায়ে ফুরকানের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা গত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট সুপেয় এবং অপরটি লোনা, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” (২৫:৫৩)। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসমানের সমুদ্র ও যমীনের সমুদ্রকে বুঝানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, আসমানে যে পানির ফোঁটা রয়েছে এবং যমীনের সমুদ্রে যে ঝিনুক রয়েছে, এ দুটোর মিলনে মুক্তা জন্ম লাভ করে। এ ঘটনাটি তো সত্য বটে, কিন্তু এই আয়াতের তাফসীর এভাবে করা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, এ আয়াতে এ দুটি সমুদ্রের মাঝে বারযাখ বা অন্তরায় থাকার বর্ণনা রয়েছে যা এটাকে ওটা হতে এবং ওটাকে এটা হতে বাধা দিয়ে রেখেছে। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ দুটো সমুদ্র যমীনেই রয়েছে। এমনকি দুটো মিলিতভাবে রয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে দুটোর পানি পৃথক থাকছে। আসমান ও যমীনের মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে ওটাকে (আরবী) বলা হয় না। এ জন্যে সঠিক উক্তি এটাই যে, এ দুটো যমীনেরই সমুদ্র যে দুটোর বর্ণনা এ আয়াতে রয়েছে, একটি যে আসমানের এবং অপরটি যমীনের তা নয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, উভয় সমুদ্র হতে উৎপন্ন হয় মুক্তা ও প্রবাল, অথচ এগুলো পাওয়া যায় আসলে একটি সমুদ্র হতে, কিন্তু দুটোর উপর এর প্রয়োগ হয়েছে এবং এরূপ প্রয়োগ বৈধ ও সঠিক। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য হতে রাসূলগণ আসেনি?” (৬:১৩০)আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, রাসূল শুধু মানুষের মধ্য হতেই হয়েছেন, জ্বিনদের মধ্য হতে কোন জ্বিন রাসূল রূপে আসেনি। তাহলে এখানে যেমন মানব ও দানবের মধ্য হতে রাসূল আগমনের প্রয়োগ শুদ্ধ হয়েছে, অনুরূপভাবে এই আয়াতেও দুটো সমুদ্রের উপরই মুক্তা ও প্রবাল উৎপন্ন হওয়ার প্রয়োগ সঠিক হয়েছে। অথচ এগুলো উৎপন্ন হয় শুধু একটিতে।(আরবী) অর্থাৎ মুক্তা তো একটি সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত জিনিস। আর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ছোট মুক্তাকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় বড় মুক্তাকে। এও বলা হয়েছে যে, উত্তম ও উচ্চমানের মুক্তাকে মারজান বলে। কারো কারো মতে লাল রঙ এর জওহর বা মূল্যবান পাথরকে মারজান বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, মারজান বলা হয় লাল মোহরকে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা প্রত্যেকটা হতে বহির্গত গোশত খেয়ে থাকো যা টাটকা হয় এবং পরিধানের অলংকার বের করে থাকো।” (৩৫:১২) মাছ তো লোনা ও মিষ্ট উভয় পানি হতেই বের হয়ে থাকে, কিন্তু মণি-মুক্তা শুধু লোনা পানির সমুদ্রে পাওয়া যায়, মিষ্ট পানির সমুদ্রে নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আসমানের পানির যে বিন্দু সমুদ্রের ঝিনুকের মুখে সোজাভাবে পড়ে তাতেই মুক্তার সৃষ্টি হয়। আর যখন ঝিনুকের মধ্যে পড়ে না তখন আম্বর (সুগন্ধি দ্রব্য বিশেষ) জন্ম লাভ করে। মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষণের সময় ঝিনুকও মুখ খুলে দেয়। তাই এই নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর আবার বলেনঃ তোমাদের যে প্রতিপালকের এসব অসংখ্য নিয়ামত তোমাদের উপর রয়েছে তার কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সমুদ্রে বিচরণশীল পর্বত প্রমাণ অর্ণবপোতসমূহ তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন, যেগুলো হাজার হাজার মণ মাল এবং শত শত মানুষকে এদিক হতে ওদিকে নিয়ে যায়। এটাও আল্লাহ তা'আলারই নিয়ন্ত্রণাধীন। এই বিরাট নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি পুনরায় বলেনঃ এখন বল তো, তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ তোমরা অস্বীকার করবে?হযরত উমরাহ ইবনে সুওয়ায়েদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে ফুরাত নদীর তীরে ছিলাম। নদীতে একটি বিরাট জাহাজ চলে আসছিল। জাহাজটিকে আসতে দেখে হযরত আলী (রাঃ) ঐ জাহাজটির দিকে হাতের ইশারা করে (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “যিনি এই পর্বত প্রমাণ জাহাজকে নদীতে চালিত করেছেন ঐ আল্লাহর কসম! আমি হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যাও করিনি, হত্যা করার ইচ্ছাও করিনি এবং হত্যাকারীদের সাথে শরীকও ছিলাম না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আর-রাহমান 55:26
২৬-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, যমীনের সমস্ত মাখলূকই ধ্বংসশীল। এমন একদিন আসবে যে, এই ভূ-পৃষ্ঠে কিছুই থাকবে না। প্রত্যেক সৃষ্টজীবের মৃত্যু হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে সমস্ত আকাশবাসীও মরণের স্বাদ গ্রহণ করবে, তবে আল্লাহ যাকে চাইবেন সেটা অন্য কথা। শুধু আল্লাহর সত্তা বাকী থাকবে। তিনি সর্বদা আছেন এবং সর্বদা থাকবেন। তিনি মৃত্যু ও ধ্বংস হতে পবিত্র। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রথমে তো আল্লাহ তা'আলা জগত সৃষ্টির বর্ণনা দিলেন, অতঃপর সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা বর্ণনা করলেন।রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত দুআগুলোর মধ্যে একটি দু'আ নিম্নরূপও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে চিরঞ্জীব, হে স্বাধিষ্ট-বিশ্ববিধাতা! হে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা! হে মহিমময় ও মহানুভব! আপনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, আমরা আপনার করুণার মাধ্যমেই ফরিয়াদ করছি। আমাদের সমস্ত কাজ আপনি ঠিক করে দিন! চোখের পলক বরাবর সময়ও আমাদেরকে আমাদের নিজেদের কাছে সমর্পণ করবেন না এবং আপনার সৃষ্টির কারো কাছেও নয়।” হযরত শা’বী (রঃ) বলেনঃ “যখন তুমি পাঠ করবে তখন সাথে সাথে (আরবী) এটাও পড়ে নিয়ো।” এ আয়াতটি আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতইঃঅর্থাৎ “তাঁর (আল্লাহর) চেহারা বা সত্তা ব্যতীত সবকিছুই ধ্বংসশীল।” (২৮:৮৮)।এরপর আল্লাহু তা'আলা স্বীয় সত্তার প্রশংসায় বলেনঃ “তিনি মহিমময় ও মহানুভব।' অর্থাৎ তিনি সম্মান ও মর্যাদা লাভের যোগ্য। তিনি এই অধিকার রাখেন যে, তাঁর উচ্চপদ সুলভ মাহাত্ম্যকে স্বীকার করে নেয়া হবে, তার আনুগত্য মেনে নেয়া হবে এবং তার ফরমানের বিরুদ্ধাচরণ করা যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে ডেকে থাকে এবং তাঁরই সন্তুষ্টি চায় তাদের সাথে তুমি নিজের নফসকে আটক রেখো৷” (১৮:২৮) আর যেমন তিনি দান-খয়রাতকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে তাদের উক্তি উদ্ধৃত করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করে থাকি।” (৭৬:৯) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) -এর অর্থ হলো অর্থাৎ তিনি শ্রেষ্ঠত্ব ও আড়ম্বরপূর্ণ।সমস্ত জগতবাসী ধ্বংস হয়ে যাবে এই খবর দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা এই সংবাদ দিচ্ছেন যে, এরপরে তাদেরকে পরকালে মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট পেশ করা হবে। অতঃপর তিনি আদল ও ইনসাফের সাথে তাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন। এরপরে আল্লাহ পাক পুনরায় বলেনঃ হে দানব ও মানব! সুতরাং তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলূক হতে বেপরোয়া ও অভাবমুক্ত, বরং সমস্ত মাখলূক তারই মুখাপেক্ষী। সবাই তার কাছে ভিক্ষুক। তিনি ধনী, আর সবাই দরিদ্র। তিনি সবারই অভাব পূরণকারী। প্রত্যেক সৃষ্টজীব তাঁর দরবারে স্বীয় অভাব ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরে এবং ওগুলো পূরণের জন্যে তার কাছে আবেদন জানায়। তিনি প্রত্যহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যে রত। তিনি প্রত্যেক আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন, প্রত্যেক প্রার্থীকেই তিনি দান করেন। যাদের অবস্থা সংকীর্ণ তাদেরকে প্রশস্ততা প্রদান করেন। বিপদগ্রস্তদেরকে পরিত্রাণ দেন, রোগীদেরকে দান করেন সুস্থতা, দুঃখীদের দুঃখ দূর করেন, অসহায়ের প্রার্থনা কবূল করেন ও তাকে প্রশান্তি দান করেন, পাপীরা যখন তাদের পাপের জন্যে তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে তখন তিনি তাদের পাপ ক্ষমা করে দেন। জীবন তিনিই দান করেন এবং মৃত্যুও তিনিই ঘটিয়ে থাকেন। সমস্ত আকাশবাসী ও পৃথিবীবাসী তাঁর সামনে তাদের হস্ত প্রসারিত করে রয়েছে এবং অঞ্চল পেতে আছে। ছোটদেরকে তিনিই বড় করেন। তিনিই বন্দীদেরকে মুক্তি দেন। সৎলোকদের প্রয়োজন পৌঁছানোর শেষ সীমা, তাদের প্রার্থনার লক্ষ্যস্থল এবং তাদের অভাব অভিযোগের প্রত্যাবর্তন স্থল তিনিই। গোলামদের মুক্তিদান তিনিই করেন এবং সক্কাজের প্রতি আগ্রহীদেরকে তিনিই পুরস্কার দান করে থাকেন। এটাই তার মাহাত্ম্য। হযরত মুনীব ইযদী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। তখন আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ শান কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া, দুঃখ করা এবং লোকেদের উত্থান ও পতন ঘটানো।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবী) একথা বলেছেন।” অতঃপর তিনি বলেনঃ ঐ শান হলো এই যে, তিনি গুনাহ মাফ করেন, দুঃখ-কষ্ট দূর করেন, কোন সম্প্রদায়ের উত্থান দেন এবং কোন সম্প্রদায়ের পতন ঘটান। (ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে আসাকির (রঃ)-ও প্রায় এরূপই বর্ণনা করেছেন। সহীহ্ বুখারীতেও এ রিওয়াইয়াতটি মুআল্লাক রূপে হযরত আবু দারদা (রাঃ)-এর উক্তিতে বর্ণিত আছে। মুসনাদে বারেও কিছু কম বেশীর সাথে মার’রূপে এটা বর্ণিত আছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা লাওহে মাহফুকে সাদা মুক্তা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, যার দানা দুটি লাল পদ্মরাগের তৈরী। ওর কলম জ্যোতি, ওর কিতাব জ্যোতি, ওর প্রশস্ততা আসমান ও যমীনের সমান। তিনি প্রত্যহ ওটাকে তিনশত বার দেখে থাকেন। প্রত্যেক দর্শনে তিনি জীবনদান করেন, মৃত্যু ঘটান, ইযত দেন, লাঞ্ছিত করেন এবং যা ইচ্ছা করেন তা-ই করে থাকেন।
আর-রাহমান 55:27
২৬-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, যমীনের সমস্ত মাখলূকই ধ্বংসশীল। এমন একদিন আসবে যে, এই ভূ-পৃষ্ঠে কিছুই থাকবে না। প্রত্যেক সৃষ্টজীবের মৃত্যু হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে সমস্ত আকাশবাসীও মরণের স্বাদ গ্রহণ করবে, তবে আল্লাহ যাকে চাইবেন সেটা অন্য কথা। শুধু আল্লাহর সত্তা বাকী থাকবে। তিনি সর্বদা আছেন এবং সর্বদা থাকবেন। তিনি মৃত্যু ও ধ্বংস হতে পবিত্র। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রথমে তো আল্লাহ তা'আলা জগত সৃষ্টির বর্ণনা দিলেন, অতঃপর সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা বর্ণনা করলেন।রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত দুআগুলোর মধ্যে একটি দু'আ নিম্নরূপও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে চিরঞ্জীব, হে স্বাধিষ্ট-বিশ্ববিধাতা! হে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা! হে মহিমময় ও মহানুভব! আপনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, আমরা আপনার করুণার মাধ্যমেই ফরিয়াদ করছি। আমাদের সমস্ত কাজ আপনি ঠিক করে দিন! চোখের পলক বরাবর সময়ও আমাদেরকে আমাদের নিজেদের কাছে সমর্পণ করবেন না এবং আপনার সৃষ্টির কারো কাছেও নয়।” হযরত শা’বী (রঃ) বলেনঃ “যখন তুমি পাঠ করবে তখন সাথে সাথে (আরবী) এটাও পড়ে নিয়ো।” এ আয়াতটি আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতইঃঅর্থাৎ “তাঁর (আল্লাহর) চেহারা বা সত্তা ব্যতীত সবকিছুই ধ্বংসশীল।” (২৮:৮৮)।এরপর আল্লাহু তা'আলা স্বীয় সত্তার প্রশংসায় বলেনঃ “তিনি মহিমময় ও মহানুভব।' অর্থাৎ তিনি সম্মান ও মর্যাদা লাভের যোগ্য। তিনি এই অধিকার রাখেন যে, তাঁর উচ্চপদ সুলভ মাহাত্ম্যকে স্বীকার করে নেয়া হবে, তার আনুগত্য মেনে নেয়া হবে এবং তার ফরমানের বিরুদ্ধাচরণ করা যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে ডেকে থাকে এবং তাঁরই সন্তুষ্টি চায় তাদের সাথে তুমি নিজের নফসকে আটক রেখো৷” (১৮:২৮) আর যেমন তিনি দান-খয়রাতকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে তাদের উক্তি উদ্ধৃত করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করে থাকি।” (৭৬:৯) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) -এর অর্থ হলো অর্থাৎ তিনি শ্রেষ্ঠত্ব ও আড়ম্বরপূর্ণ।সমস্ত জগতবাসী ধ্বংস হয়ে যাবে এই খবর দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা এই সংবাদ দিচ্ছেন যে, এরপরে তাদেরকে পরকালে মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট পেশ করা হবে। অতঃপর তিনি আদল ও ইনসাফের সাথে তাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন। এরপরে আল্লাহ পাক পুনরায় বলেনঃ হে দানব ও মানব! সুতরাং তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলূক হতে বেপরোয়া ও অভাবমুক্ত, বরং সমস্ত মাখলূক তারই মুখাপেক্ষী। সবাই তার কাছে ভিক্ষুক। তিনি ধনী, আর সবাই দরিদ্র। তিনি সবারই অভাব পূরণকারী। প্রত্যেক সৃষ্টজীব তাঁর দরবারে স্বীয় অভাব ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরে এবং ওগুলো পূরণের জন্যে তার কাছে আবেদন জানায়। তিনি প্রত্যহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যে রত। তিনি প্রত্যেক আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন, প্রত্যেক প্রার্থীকেই তিনি দান করেন। যাদের অবস্থা সংকীর্ণ তাদেরকে প্রশস্ততা প্রদান করেন। বিপদগ্রস্তদেরকে পরিত্রাণ দেন, রোগীদেরকে দান করেন সুস্থতা, দুঃখীদের দুঃখ দূর করেন, অসহায়ের প্রার্থনা কবূল করেন ও তাকে প্রশান্তি দান করেন, পাপীরা যখন তাদের পাপের জন্যে তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে তখন তিনি তাদের পাপ ক্ষমা করে দেন। জীবন তিনিই দান করেন এবং মৃত্যুও তিনিই ঘটিয়ে থাকেন। সমস্ত আকাশবাসী ও পৃথিবীবাসী তাঁর সামনে তাদের হস্ত প্রসারিত করে রয়েছে এবং অঞ্চল পেতে আছে। ছোটদেরকে তিনিই বড় করেন। তিনিই বন্দীদেরকে মুক্তি দেন। সৎলোকদের প্রয়োজন পৌঁছানোর শেষ সীমা, তাদের প্রার্থনার লক্ষ্যস্থল এবং তাদের অভাব অভিযোগের প্রত্যাবর্তন স্থল তিনিই। গোলামদের মুক্তিদান তিনিই করেন এবং সক্কাজের প্রতি আগ্রহীদেরকে তিনিই পুরস্কার দান করে থাকেন। এটাই তার মাহাত্ম্য। হযরত মুনীব ইযদী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। তখন আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ শান কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া, দুঃখ করা এবং লোকেদের উত্থান ও পতন ঘটানো।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবী) একথা বলেছেন।” অতঃপর তিনি বলেনঃ ঐ শান হলো এই যে, তিনি গুনাহ মাফ করেন, দুঃখ-কষ্ট দূর করেন, কোন সম্প্রদায়ের উত্থান দেন এবং কোন সম্প্রদায়ের পতন ঘটান। (ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে আসাকির (রঃ)-ও প্রায় এরূপই বর্ণনা করেছেন। সহীহ্ বুখারীতেও এ রিওয়াইয়াতটি মুআল্লাক রূপে হযরত আবু দারদা (রাঃ)-এর উক্তিতে বর্ণিত আছে। মুসনাদে বারেও কিছু কম বেশীর সাথে মার’রূপে এটা বর্ণিত আছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা লাওহে মাহফুকে সাদা মুক্তা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, যার দানা দুটি লাল পদ্মরাগের তৈরী। ওর কলম জ্যোতি, ওর কিতাব জ্যোতি, ওর প্রশস্ততা আসমান ও যমীনের সমান। তিনি প্রত্যহ ওটাকে তিনশত বার দেখে থাকেন। প্রত্যেক দর্শনে তিনি জীবনদান করেন, মৃত্যু ঘটান, ইযত দেন, লাঞ্ছিত করেন এবং যা ইচ্ছা করেন তা-ই করে থাকেন।
আর-রাহমান 55:28
২৬-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, যমীনের সমস্ত মাখলূকই ধ্বংসশীল। এমন একদিন আসবে যে, এই ভূ-পৃষ্ঠে কিছুই থাকবে না। প্রত্যেক সৃষ্টজীবের মৃত্যু হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে সমস্ত আকাশবাসীও মরণের স্বাদ গ্রহণ করবে, তবে আল্লাহ যাকে চাইবেন সেটা অন্য কথা। শুধু আল্লাহর সত্তা বাকী থাকবে। তিনি সর্বদা আছেন এবং সর্বদা থাকবেন। তিনি মৃত্যু ও ধ্বংস হতে পবিত্র। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রথমে তো আল্লাহ তা'আলা জগত সৃষ্টির বর্ণনা দিলেন, অতঃপর সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা বর্ণনা করলেন।রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত দুআগুলোর মধ্যে একটি দু'আ নিম্নরূপও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে চিরঞ্জীব, হে স্বাধিষ্ট-বিশ্ববিধাতা! হে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা! হে মহিমময় ও মহানুভব! আপনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, আমরা আপনার করুণার মাধ্যমেই ফরিয়াদ করছি। আমাদের সমস্ত কাজ আপনি ঠিক করে দিন! চোখের পলক বরাবর সময়ও আমাদেরকে আমাদের নিজেদের কাছে সমর্পণ করবেন না এবং আপনার সৃষ্টির কারো কাছেও নয়।” হযরত শা’বী (রঃ) বলেনঃ “যখন তুমি পাঠ করবে তখন সাথে সাথে (আরবী) এটাও পড়ে নিয়ো।” এ আয়াতটি আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতইঃঅর্থাৎ “তাঁর (আল্লাহর) চেহারা বা সত্তা ব্যতীত সবকিছুই ধ্বংসশীল।” (২৮:৮৮)।এরপর আল্লাহু তা'আলা স্বীয় সত্তার প্রশংসায় বলেনঃ “তিনি মহিমময় ও মহানুভব।' অর্থাৎ তিনি সম্মান ও মর্যাদা লাভের যোগ্য। তিনি এই অধিকার রাখেন যে, তাঁর উচ্চপদ সুলভ মাহাত্ম্যকে স্বীকার করে নেয়া হবে, তার আনুগত্য মেনে নেয়া হবে এবং তার ফরমানের বিরুদ্ধাচরণ করা যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে ডেকে থাকে এবং তাঁরই সন্তুষ্টি চায় তাদের সাথে তুমি নিজের নফসকে আটক রেখো৷” (১৮:২৮) আর যেমন তিনি দান-খয়রাতকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে তাদের উক্তি উদ্ধৃত করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করে থাকি।” (৭৬:৯) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) -এর অর্থ হলো অর্থাৎ তিনি শ্রেষ্ঠত্ব ও আড়ম্বরপূর্ণ।সমস্ত জগতবাসী ধ্বংস হয়ে যাবে এই খবর দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা এই সংবাদ দিচ্ছেন যে, এরপরে তাদেরকে পরকালে মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট পেশ করা হবে। অতঃপর তিনি আদল ও ইনসাফের সাথে তাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন। এরপরে আল্লাহ পাক পুনরায় বলেনঃ হে দানব ও মানব! সুতরাং তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলূক হতে বেপরোয়া ও অভাবমুক্ত, বরং সমস্ত মাখলূক তারই মুখাপেক্ষী। সবাই তার কাছে ভিক্ষুক। তিনি ধনী, আর সবাই দরিদ্র। তিনি সবারই অভাব পূরণকারী। প্রত্যেক সৃষ্টজীব তাঁর দরবারে স্বীয় অভাব ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরে এবং ওগুলো পূরণের জন্যে তার কাছে আবেদন জানায়। তিনি প্রত্যহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যে রত। তিনি প্রত্যেক আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন, প্রত্যেক প্রার্থীকেই তিনি দান করেন। যাদের অবস্থা সংকীর্ণ তাদেরকে প্রশস্ততা প্রদান করেন। বিপদগ্রস্তদেরকে পরিত্রাণ দেন, রোগীদেরকে দান করেন সুস্থতা, দুঃখীদের দুঃখ দূর করেন, অসহায়ের প্রার্থনা কবূল করেন ও তাকে প্রশান্তি দান করেন, পাপীরা যখন তাদের পাপের জন্যে তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে তখন তিনি তাদের পাপ ক্ষমা করে দেন। জীবন তিনিই দান করেন এবং মৃত্যুও তিনিই ঘটিয়ে থাকেন। সমস্ত আকাশবাসী ও পৃথিবীবাসী তাঁর সামনে তাদের হস্ত প্রসারিত করে রয়েছে এবং অঞ্চল পেতে আছে। ছোটদেরকে তিনিই বড় করেন। তিনিই বন্দীদেরকে মুক্তি দেন। সৎলোকদের প্রয়োজন পৌঁছানোর শেষ সীমা, তাদের প্রার্থনার লক্ষ্যস্থল এবং তাদের অভাব অভিযোগের প্রত্যাবর্তন স্থল তিনিই। গোলামদের মুক্তিদান তিনিই করেন এবং সক্কাজের প্রতি আগ্রহীদেরকে তিনিই পুরস্কার দান করে থাকেন। এটাই তার মাহাত্ম্য। হযরত মুনীব ইযদী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। তখন আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ শান কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া, দুঃখ করা এবং লোকেদের উত্থান ও পতন ঘটানো।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবী) একথা বলেছেন।” অতঃপর তিনি বলেনঃ ঐ শান হলো এই যে, তিনি গুনাহ মাফ করেন, দুঃখ-কষ্ট দূর করেন, কোন সম্প্রদায়ের উত্থান দেন এবং কোন সম্প্রদায়ের পতন ঘটান। (ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে আসাকির (রঃ)-ও প্রায় এরূপই বর্ণনা করেছেন। সহীহ্ বুখারীতেও এ রিওয়াইয়াতটি মুআল্লাক রূপে হযরত আবু দারদা (রাঃ)-এর উক্তিতে বর্ণিত আছে। মুসনাদে বারেও কিছু কম বেশীর সাথে মার’রূপে এটা বর্ণিত আছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা লাওহে মাহফুকে সাদা মুক্তা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, যার দানা দুটি লাল পদ্মরাগের তৈরী। ওর কলম জ্যোতি, ওর কিতাব জ্যোতি, ওর প্রশস্ততা আসমান ও যমীনের সমান। তিনি প্রত্যহ ওটাকে তিনশত বার দেখে থাকেন। প্রত্যেক দর্শনে তিনি জীবনদান করেন, মৃত্যু ঘটান, ইযত দেন, লাঞ্ছিত করেন এবং যা ইচ্ছা করেন তা-ই করে থাকেন।
আর-রাহমান 55:29
২৬-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, যমীনের সমস্ত মাখলূকই ধ্বংসশীল। এমন একদিন আসবে যে, এই ভূ-পৃষ্ঠে কিছুই থাকবে না। প্রত্যেক সৃষ্টজীবের মৃত্যু হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে সমস্ত আকাশবাসীও মরণের স্বাদ গ্রহণ করবে, তবে আল্লাহ যাকে চাইবেন সেটা অন্য কথা। শুধু আল্লাহর সত্তা বাকী থাকবে। তিনি সর্বদা আছেন এবং সর্বদা থাকবেন। তিনি মৃত্যু ও ধ্বংস হতে পবিত্র। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রথমে তো আল্লাহ তা'আলা জগত সৃষ্টির বর্ণনা দিলেন, অতঃপর সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা বর্ণনা করলেন।রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত দুআগুলোর মধ্যে একটি দু'আ নিম্নরূপও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে চিরঞ্জীব, হে স্বাধিষ্ট-বিশ্ববিধাতা! হে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা! হে মহিমময় ও মহানুভব! আপনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, আমরা আপনার করুণার মাধ্যমেই ফরিয়াদ করছি। আমাদের সমস্ত কাজ আপনি ঠিক করে দিন! চোখের পলক বরাবর সময়ও আমাদেরকে আমাদের নিজেদের কাছে সমর্পণ করবেন না এবং আপনার সৃষ্টির কারো কাছেও নয়।” হযরত শা’বী (রঃ) বলেনঃ “যখন তুমি পাঠ করবে তখন সাথে সাথে (আরবী) এটাও পড়ে নিয়ো।” এ আয়াতটি আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতইঃঅর্থাৎ “তাঁর (আল্লাহর) চেহারা বা সত্তা ব্যতীত সবকিছুই ধ্বংসশীল।” (২৮:৮৮)।এরপর আল্লাহু তা'আলা স্বীয় সত্তার প্রশংসায় বলেনঃ “তিনি মহিমময় ও মহানুভব।' অর্থাৎ তিনি সম্মান ও মর্যাদা লাভের যোগ্য। তিনি এই অধিকার রাখেন যে, তাঁর উচ্চপদ সুলভ মাহাত্ম্যকে স্বীকার করে নেয়া হবে, তার আনুগত্য মেনে নেয়া হবে এবং তার ফরমানের বিরুদ্ধাচরণ করা যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে ডেকে থাকে এবং তাঁরই সন্তুষ্টি চায় তাদের সাথে তুমি নিজের নফসকে আটক রেখো৷” (১৮:২৮) আর যেমন তিনি দান-খয়রাতকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে তাদের উক্তি উদ্ধৃত করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করে থাকি।” (৭৬:৯) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) -এর অর্থ হলো অর্থাৎ তিনি শ্রেষ্ঠত্ব ও আড়ম্বরপূর্ণ।সমস্ত জগতবাসী ধ্বংস হয়ে যাবে এই খবর দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা এই সংবাদ দিচ্ছেন যে, এরপরে তাদেরকে পরকালে মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট পেশ করা হবে। অতঃপর তিনি আদল ও ইনসাফের সাথে তাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন। এরপরে আল্লাহ পাক পুনরায় বলেনঃ হে দানব ও মানব! সুতরাং তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলূক হতে বেপরোয়া ও অভাবমুক্ত, বরং সমস্ত মাখলূক তারই মুখাপেক্ষী। সবাই তার কাছে ভিক্ষুক। তিনি ধনী, আর সবাই দরিদ্র। তিনি সবারই অভাব পূরণকারী। প্রত্যেক সৃষ্টজীব তাঁর দরবারে স্বীয় অভাব ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরে এবং ওগুলো পূরণের জন্যে তার কাছে আবেদন জানায়। তিনি প্রত্যহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যে রত। তিনি প্রত্যেক আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন, প্রত্যেক প্রার্থীকেই তিনি দান করেন। যাদের অবস্থা সংকীর্ণ তাদেরকে প্রশস্ততা প্রদান করেন। বিপদগ্রস্তদেরকে পরিত্রাণ দেন, রোগীদেরকে দান করেন সুস্থতা, দুঃখীদের দুঃখ দূর করেন, অসহায়ের প্রার্থনা কবূল করেন ও তাকে প্রশান্তি দান করেন, পাপীরা যখন তাদের পাপের জন্যে তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে তখন তিনি তাদের পাপ ক্ষমা করে দেন। জীবন তিনিই দান করেন এবং মৃত্যুও তিনিই ঘটিয়ে থাকেন। সমস্ত আকাশবাসী ও পৃথিবীবাসী তাঁর সামনে তাদের হস্ত প্রসারিত করে রয়েছে এবং অঞ্চল পেতে আছে। ছোটদেরকে তিনিই বড় করেন। তিনিই বন্দীদেরকে মুক্তি দেন। সৎলোকদের প্রয়োজন পৌঁছানোর শেষ সীমা, তাদের প্রার্থনার লক্ষ্যস্থল এবং তাদের অভাব অভিযোগের প্রত্যাবর্তন স্থল তিনিই। গোলামদের মুক্তিদান তিনিই করেন এবং সক্কাজের প্রতি আগ্রহীদেরকে তিনিই পুরস্কার দান করে থাকেন। এটাই তার মাহাত্ম্য। হযরত মুনীব ইযদী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। তখন আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ শান কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া, দুঃখ করা এবং লোকেদের উত্থান ও পতন ঘটানো।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবী) একথা বলেছেন।” অতঃপর তিনি বলেনঃ ঐ শান হলো এই যে, তিনি গুনাহ মাফ করেন, দুঃখ-কষ্ট দূর করেন, কোন সম্প্রদায়ের উত্থান দেন এবং কোন সম্প্রদায়ের পতন ঘটান। (ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে আসাকির (রঃ)-ও প্রায় এরূপই বর্ণনা করেছেন। সহীহ্ বুখারীতেও এ রিওয়াইয়াতটি মুআল্লাক রূপে হযরত আবু দারদা (রাঃ)-এর উক্তিতে বর্ণিত আছে। মুসনাদে বারেও কিছু কম বেশীর সাথে মার’রূপে এটা বর্ণিত আছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা লাওহে মাহফুকে সাদা মুক্তা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, যার দানা দুটি লাল পদ্মরাগের তৈরী। ওর কলম জ্যোতি, ওর কিতাব জ্যোতি, ওর প্রশস্ততা আসমান ও যমীনের সমান। তিনি প্রত্যহ ওটাকে তিনশত বার দেখে থাকেন। প্রত্যেক দর্শনে তিনি জীবনদান করেন, মৃত্যু ঘটান, ইযত দেন, লাঞ্ছিত করেন এবং যা ইচ্ছা করেন তা-ই করে থাকেন।
আর-রাহমান 55:30
২৬-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, যমীনের সমস্ত মাখলূকই ধ্বংসশীল। এমন একদিন আসবে যে, এই ভূ-পৃষ্ঠে কিছুই থাকবে না। প্রত্যেক সৃষ্টজীবের মৃত্যু হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে সমস্ত আকাশবাসীও মরণের স্বাদ গ্রহণ করবে, তবে আল্লাহ যাকে চাইবেন সেটা অন্য কথা। শুধু আল্লাহর সত্তা বাকী থাকবে। তিনি সর্বদা আছেন এবং সর্বদা থাকবেন। তিনি মৃত্যু ও ধ্বংস হতে পবিত্র। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রথমে তো আল্লাহ তা'আলা জগত সৃষ্টির বর্ণনা দিলেন, অতঃপর সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা বর্ণনা করলেন।রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত দুআগুলোর মধ্যে একটি দু'আ নিম্নরূপও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে চিরঞ্জীব, হে স্বাধিষ্ট-বিশ্ববিধাতা! হে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা! হে মহিমময় ও মহানুভব! আপনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, আমরা আপনার করুণার মাধ্যমেই ফরিয়াদ করছি। আমাদের সমস্ত কাজ আপনি ঠিক করে দিন! চোখের পলক বরাবর সময়ও আমাদেরকে আমাদের নিজেদের কাছে সমর্পণ করবেন না এবং আপনার সৃষ্টির কারো কাছেও নয়।” হযরত শা’বী (রঃ) বলেনঃ “যখন তুমি পাঠ করবে তখন সাথে সাথে (আরবী) এটাও পড়ে নিয়ো।” এ আয়াতটি আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতইঃঅর্থাৎ “তাঁর (আল্লাহর) চেহারা বা সত্তা ব্যতীত সবকিছুই ধ্বংসশীল।” (২৮:৮৮)।এরপর আল্লাহু তা'আলা স্বীয় সত্তার প্রশংসায় বলেনঃ “তিনি মহিমময় ও মহানুভব।' অর্থাৎ তিনি সম্মান ও মর্যাদা লাভের যোগ্য। তিনি এই অধিকার রাখেন যে, তাঁর উচ্চপদ সুলভ মাহাত্ম্যকে স্বীকার করে নেয়া হবে, তার আনুগত্য মেনে নেয়া হবে এবং তার ফরমানের বিরুদ্ধাচরণ করা যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে ডেকে থাকে এবং তাঁরই সন্তুষ্টি চায় তাদের সাথে তুমি নিজের নফসকে আটক রেখো৷” (১৮:২৮) আর যেমন তিনি দান-খয়রাতকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে তাদের উক্তি উদ্ধৃত করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করে থাকি।” (৭৬:৯) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) -এর অর্থ হলো অর্থাৎ তিনি শ্রেষ্ঠত্ব ও আড়ম্বরপূর্ণ।সমস্ত জগতবাসী ধ্বংস হয়ে যাবে এই খবর দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা এই সংবাদ দিচ্ছেন যে, এরপরে তাদেরকে পরকালে মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট পেশ করা হবে। অতঃপর তিনি আদল ও ইনসাফের সাথে তাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন। এরপরে আল্লাহ পাক পুনরায় বলেনঃ হে দানব ও মানব! সুতরাং তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলূক হতে বেপরোয়া ও অভাবমুক্ত, বরং সমস্ত মাখলূক তারই মুখাপেক্ষী। সবাই তার কাছে ভিক্ষুক। তিনি ধনী, আর সবাই দরিদ্র। তিনি সবারই অভাব পূরণকারী। প্রত্যেক সৃষ্টজীব তাঁর দরবারে স্বীয় অভাব ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরে এবং ওগুলো পূরণের জন্যে তার কাছে আবেদন জানায়। তিনি প্রত্যহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যে রত। তিনি প্রত্যেক আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন, প্রত্যেক প্রার্থীকেই তিনি দান করেন। যাদের অবস্থা সংকীর্ণ তাদেরকে প্রশস্ততা প্রদান করেন। বিপদগ্রস্তদেরকে পরিত্রাণ দেন, রোগীদেরকে দান করেন সুস্থতা, দুঃখীদের দুঃখ দূর করেন, অসহায়ের প্রার্থনা কবূল করেন ও তাকে প্রশান্তি দান করেন, পাপীরা যখন তাদের পাপের জন্যে তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে তখন তিনি তাদের পাপ ক্ষমা করে দেন। জীবন তিনিই দান করেন এবং মৃত্যুও তিনিই ঘটিয়ে থাকেন। সমস্ত আকাশবাসী ও পৃথিবীবাসী তাঁর সামনে তাদের হস্ত প্রসারিত করে রয়েছে এবং অঞ্চল পেতে আছে। ছোটদেরকে তিনিই বড় করেন। তিনিই বন্দীদেরকে মুক্তি দেন। সৎলোকদের প্রয়োজন পৌঁছানোর শেষ সীমা, তাদের প্রার্থনার লক্ষ্যস্থল এবং তাদের অভাব অভিযোগের প্রত্যাবর্তন স্থল তিনিই। গোলামদের মুক্তিদান তিনিই করেন এবং সক্কাজের প্রতি আগ্রহীদেরকে তিনিই পুরস্কার দান করে থাকেন। এটাই তার মাহাত্ম্য। হযরত মুনীব ইযদী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। তখন আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ শান কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া, দুঃখ করা এবং লোকেদের উত্থান ও পতন ঘটানো।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবী) একথা বলেছেন।” অতঃপর তিনি বলেনঃ ঐ শান হলো এই যে, তিনি গুনাহ মাফ করেন, দুঃখ-কষ্ট দূর করেন, কোন সম্প্রদায়ের উত্থান দেন এবং কোন সম্প্রদায়ের পতন ঘটান। (ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে আসাকির (রঃ)-ও প্রায় এরূপই বর্ণনা করেছেন। সহীহ্ বুখারীতেও এ রিওয়াইয়াতটি মুআল্লাক রূপে হযরত আবু দারদা (রাঃ)-এর উক্তিতে বর্ণিত আছে। মুসনাদে বারেও কিছু কম বেশীর সাথে মার’রূপে এটা বর্ণিত আছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা লাওহে মাহফুকে সাদা মুক্তা দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, যার দানা দুটি লাল পদ্মরাগের তৈরী। ওর কলম জ্যোতি, ওর কিতাব জ্যোতি, ওর প্রশস্ততা আসমান ও যমীনের সমান। তিনি প্রত্যহ ওটাকে তিনশত বার দেখে থাকেন। প্রত্যেক দর্শনে তিনি জীবনদান করেন, মৃত্যু ঘটান, ইযত দেন, লাঞ্ছিত করেন এবং যা ইচ্ছা করেন তা-ই করে থাকেন।
আর-রাহমান 55:31
৩১-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: ফারেগ বা মুক্ত হওয়ার অর্থ এটা নয় যে, এ সময় কোন ব্যস্ততার মধ্যে রয়েছেন, বরং এটা ধমক হিসেবে বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু তোমাদের প্রতি মনোনিবেশ করার সময় নিকটবর্তী হয়ে গেছে। এখন সঠিকভাবে ফায়সালা হয়ে যাবে। এখন আল্লাহ তা'আলাকে আর কোন কিছুই মশগুল করবে না, বরং তিনি শুধু তোমাদেরই হিসাব গ্রহণ করবেন। আরবদের বাক পদ্ধতি অনুযায়ী একথা বলা হয়েছে। যেমন ক্রোধের সময় কেউ কাউকেও বলে থাকেঃ “আচ্ছা, অবসর সময়ে আমি তোমাকে দেখে নেবো।” এখানে এ অর্থ নয় যে, এখন সে ব্যস্ত রয়েছে। বরং ভাবার্থ হচ্ছেঃ একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমি তোমাকে দেখে নিবো এবং তোমার অসাবধানতায় ও উদাসীনতায় তোমাকে পাকড়াও করবে। (আরবী) দ্বারা মানব ও দাবনকে বুঝানো হয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (কবরে শায়িত ব্যক্তির চীৎকারের শব্দ) প্রত্যেক জিনিসই শুনতে পায় মানব ও দানব ব্যতীত।" অন্য রিওয়াইয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানুষ ও জ্বিন ছাড়া।" আর সূর বা শিঙ্গার হাদীসে। পরিষ্কারভাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ সাকালান হলো মানুষ ও জ্বিন। মহান আল্লাহ আবারও বলেনঃ সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? হে দানব ও মানব! তোমরা আল্লাহ তা'আলার হুকুম এবং তার নির্ধারণকৃত তকদীর হতে পালিয়ে গিয়ে বাঁচতে পারবে না, বরং তিনি তোমাদের সকলকেই পরিবেষ্টন করে রয়েছেন। তার হুকুম তোমাদের উপর বিনা বাধায় জারী রয়েছে। তোমরা যেখানেই যাবে সেখানেও তাঁরই রাজত্ব। এটা প্রকৃতভাবে ঘটবে হাশরের মাঠে। সেখানে সমস্ত মাখলুককে ফেরেশতামণ্ডলী চতুর্দিক হতে পরিবেষ্টন করবেন। চতুম্পার্শ্বে তাদের সাতটি করে সারি হবে। কোন লোকই আল্লাহর দলীল ছাড়া এদিক ওদিক যেতে পারবে না। আর দলীল আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সেদিন মানুষ বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? না, কোন আশ্রয় স্থল নেই। সেদিন ঠাই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট।” (৭৫:১০-১২) আল্লাহ পাক আরেক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা মন্দ কাজ করে তাদের মন্দ কাজের তুল্য শাস্তি দেয়া হবে, তাদের উপর লাঞ্ছনা সওয়ার হবে, তাদেরকে আল্লাহর পাকড়াও হতে কেউই রক্ষা করতে পারবে না, তাদের চেহারা অন্ধকার রাত্রির টুকরার মত হবে, তারা জাহান্নামবাসী, ওর মধ্যে তারা চিরকাল অবস্থানকারী।” (১০:২৭)(আরবী) শব্দের অর্থ হলো অগ্নিশিখা যা ধূম্র মিশ্রিত সবুজ রঙ এর, যা পুড়িয়ে বা ঝলসিয়ে দেয়। কেউ কেউ বলেন যে, এটা হলো ধূম্রবিহীন অগ্নির উপরের শিখা যা এমনভাবে ধাবিত হয় যে, যেন ওটা পানির তরঙ্গ। (আরবী) বলা হয় ধূম্রকে। এ শব্দটি নূনে যবর সহও এসে থাকে। এখানে কিন্তু কিরআত নূনে পেশসহই রয়েছে। কবি নাবেগার কবিতাতেও এ শব্দটি ধূমের অর্থে এসেছে। কবিতাংশটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটা আলোকিত হয় সলিতা বিশিষ্ট প্রদীপের আলোকের মত, যাতে আল্লাহ ধূম্র রাখেননি।” তবে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) দ্বারা ঐ অগ্নিশিখাকে বুঝানো হয়েছে যাতে ধূম্র থাকে না এবং তিনি তাঁর এ মতের প্রমাণ হিসেবে উমাইয়া ইবনে আবি সালাতের কবিতা পাঠ করে শুনিয়ে দেন। আর তিনি (আরবী)-এর অর্থ করেছেন শুধু ধূম্র যাতে শিখা থাকে। এর প্রমাণ স্বরূপ তিনি কবি নাবেগার উপরোক্তে কবিতাংশটি পেশ করেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ঐ পাতিল বা কড়াইকে বুঝানো হয়েছে যাকে গলানো হবে এবং জাহান্নামীদের মস্তকের উপর ঢেলে দেয়া হবে। মোটকথা, ভাবার্থ হচ্ছেঃ যদি তোমরা কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দান হতে পালাবার ইচ্ছা কর তবে ফেরেশতামণ্ডলী ও জাহান্নামের দারোগারা তোমাদের উপর আগুন বর্ষিয়ে, ধূম্র ছেড়ে দিয়ে এবং তোমাদের মাথায় গলিত পাতিল বহিয়ে দিয়ে তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনবে। না তোমরা তাদের মুকাবিলা করতে পারবে, না প্রতিরোধ করতে পারবে এবং না পারবে তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে। সুতরাং তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করা তোমাদের মোটেই উচিত নয়।
আর-রাহমান 55:32
৩১-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: ফারেগ বা মুক্ত হওয়ার অর্থ এটা নয় যে, এ সময় কোন ব্যস্ততার মধ্যে রয়েছেন, বরং এটা ধমক হিসেবে বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু তোমাদের প্রতি মনোনিবেশ করার সময় নিকটবর্তী হয়ে গেছে। এখন সঠিকভাবে ফায়সালা হয়ে যাবে। এখন আল্লাহ তা'আলাকে আর কোন কিছুই মশগুল করবে না, বরং তিনি শুধু তোমাদেরই হিসাব গ্রহণ করবেন। আরবদের বাক পদ্ধতি অনুযায়ী একথা বলা হয়েছে। যেমন ক্রোধের সময় কেউ কাউকেও বলে থাকেঃ “আচ্ছা, অবসর সময়ে আমি তোমাকে দেখে নেবো।” এখানে এ অর্থ নয় যে, এখন সে ব্যস্ত রয়েছে। বরং ভাবার্থ হচ্ছেঃ একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমি তোমাকে দেখে নিবো এবং তোমার অসাবধানতায় ও উদাসীনতায় তোমাকে পাকড়াও করবে। (আরবী) দ্বারা মানব ও দাবনকে বুঝানো হয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (কবরে শায়িত ব্যক্তির চীৎকারের শব্দ) প্রত্যেক জিনিসই শুনতে পায় মানব ও দানব ব্যতীত।" অন্য রিওয়াইয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানুষ ও জ্বিন ছাড়া।" আর সূর বা শিঙ্গার হাদীসে। পরিষ্কারভাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ সাকালান হলো মানুষ ও জ্বিন। মহান আল্লাহ আবারও বলেনঃ সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? হে দানব ও মানব! তোমরা আল্লাহ তা'আলার হুকুম এবং তার নির্ধারণকৃত তকদীর হতে পালিয়ে গিয়ে বাঁচতে পারবে না, বরং তিনি তোমাদের সকলকেই পরিবেষ্টন করে রয়েছেন। তার হুকুম তোমাদের উপর বিনা বাধায় জারী রয়েছে। তোমরা যেখানেই যাবে সেখানেও তাঁরই রাজত্ব। এটা প্রকৃতভাবে ঘটবে হাশরের মাঠে। সেখানে সমস্ত মাখলুককে ফেরেশতামণ্ডলী চতুর্দিক হতে পরিবেষ্টন করবেন। চতুম্পার্শ্বে তাদের সাতটি করে সারি হবে। কোন লোকই আল্লাহর দলীল ছাড়া এদিক ওদিক যেতে পারবে না। আর দলীল আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সেদিন মানুষ বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? না, কোন আশ্রয় স্থল নেই। সেদিন ঠাই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট।” (৭৫:১০-১২) আল্লাহ পাক আরেক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা মন্দ কাজ করে তাদের মন্দ কাজের তুল্য শাস্তি দেয়া হবে, তাদের উপর লাঞ্ছনা সওয়ার হবে, তাদেরকে আল্লাহর পাকড়াও হতে কেউই রক্ষা করতে পারবে না, তাদের চেহারা অন্ধকার রাত্রির টুকরার মত হবে, তারা জাহান্নামবাসী, ওর মধ্যে তারা চিরকাল অবস্থানকারী।” (১০:২৭)(আরবী) শব্দের অর্থ হলো অগ্নিশিখা যা ধূম্র মিশ্রিত সবুজ রঙ এর, যা পুড়িয়ে বা ঝলসিয়ে দেয়। কেউ কেউ বলেন যে, এটা হলো ধূম্রবিহীন অগ্নির উপরের শিখা যা এমনভাবে ধাবিত হয় যে, যেন ওটা পানির তরঙ্গ। (আরবী) বলা হয় ধূম্রকে। এ শব্দটি নূনে যবর সহও এসে থাকে। এখানে কিন্তু কিরআত নূনে পেশসহই রয়েছে। কবি নাবেগার কবিতাতেও এ শব্দটি ধূমের অর্থে এসেছে। কবিতাংশটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটা আলোকিত হয় সলিতা বিশিষ্ট প্রদীপের আলোকের মত, যাতে আল্লাহ ধূম্র রাখেননি।” তবে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) দ্বারা ঐ অগ্নিশিখাকে বুঝানো হয়েছে যাতে ধূম্র থাকে না এবং তিনি তাঁর এ মতের প্রমাণ হিসেবে উমাইয়া ইবনে আবি সালাতের কবিতা পাঠ করে শুনিয়ে দেন। আর তিনি (আরবী)-এর অর্থ করেছেন শুধু ধূম্র যাতে শিখা থাকে। এর প্রমাণ স্বরূপ তিনি কবি নাবেগার উপরোক্তে কবিতাংশটি পেশ করেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ঐ পাতিল বা কড়াইকে বুঝানো হয়েছে যাকে গলানো হবে এবং জাহান্নামীদের মস্তকের উপর ঢেলে দেয়া হবে। মোটকথা, ভাবার্থ হচ্ছেঃ যদি তোমরা কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দান হতে পালাবার ইচ্ছা কর তবে ফেরেশতামণ্ডলী ও জাহান্নামের দারোগারা তোমাদের উপর আগুন বর্ষিয়ে, ধূম্র ছেড়ে দিয়ে এবং তোমাদের মাথায় গলিত পাতিল বহিয়ে দিয়ে তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনবে। না তোমরা তাদের মুকাবিলা করতে পারবে, না প্রতিরোধ করতে পারবে এবং না পারবে তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে। সুতরাং তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করা তোমাদের মোটেই উচিত নয়।
আর-রাহমান 55:33
৩১-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: ফারেগ বা মুক্ত হওয়ার অর্থ এটা নয় যে, এ সময় কোন ব্যস্ততার মধ্যে রয়েছেন, বরং এটা ধমক হিসেবে বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু তোমাদের প্রতি মনোনিবেশ করার সময় নিকটবর্তী হয়ে গেছে। এখন সঠিকভাবে ফায়সালা হয়ে যাবে। এখন আল্লাহ তা'আলাকে আর কোন কিছুই মশগুল করবে না, বরং তিনি শুধু তোমাদেরই হিসাব গ্রহণ করবেন। আরবদের বাক পদ্ধতি অনুযায়ী একথা বলা হয়েছে। যেমন ক্রোধের সময় কেউ কাউকেও বলে থাকেঃ “আচ্ছা, অবসর সময়ে আমি তোমাকে দেখে নেবো।” এখানে এ অর্থ নয় যে, এখন সে ব্যস্ত রয়েছে। বরং ভাবার্থ হচ্ছেঃ একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমি তোমাকে দেখে নিবো এবং তোমার অসাবধানতায় ও উদাসীনতায় তোমাকে পাকড়াও করবে। (আরবী) দ্বারা মানব ও দাবনকে বুঝানো হয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (কবরে শায়িত ব্যক্তির চীৎকারের শব্দ) প্রত্যেক জিনিসই শুনতে পায় মানব ও দানব ব্যতীত।" অন্য রিওয়াইয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানুষ ও জ্বিন ছাড়া।" আর সূর বা শিঙ্গার হাদীসে। পরিষ্কারভাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ সাকালান হলো মানুষ ও জ্বিন। মহান আল্লাহ আবারও বলেনঃ সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? হে দানব ও মানব! তোমরা আল্লাহ তা'আলার হুকুম এবং তার নির্ধারণকৃত তকদীর হতে পালিয়ে গিয়ে বাঁচতে পারবে না, বরং তিনি তোমাদের সকলকেই পরিবেষ্টন করে রয়েছেন। তার হুকুম তোমাদের উপর বিনা বাধায় জারী রয়েছে। তোমরা যেখানেই যাবে সেখানেও তাঁরই রাজত্ব। এটা প্রকৃতভাবে ঘটবে হাশরের মাঠে। সেখানে সমস্ত মাখলুককে ফেরেশতামণ্ডলী চতুর্দিক হতে পরিবেষ্টন করবেন। চতুম্পার্শ্বে তাদের সাতটি করে সারি হবে। কোন লোকই আল্লাহর দলীল ছাড়া এদিক ওদিক যেতে পারবে না। আর দলীল আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সেদিন মানুষ বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? না, কোন আশ্রয় স্থল নেই। সেদিন ঠাই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট।” (৭৫:১০-১২) আল্লাহ পাক আরেক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা মন্দ কাজ করে তাদের মন্দ কাজের তুল্য শাস্তি দেয়া হবে, তাদের উপর লাঞ্ছনা সওয়ার হবে, তাদেরকে আল্লাহর পাকড়াও হতে কেউই রক্ষা করতে পারবে না, তাদের চেহারা অন্ধকার রাত্রির টুকরার মত হবে, তারা জাহান্নামবাসী, ওর মধ্যে তারা চিরকাল অবস্থানকারী।” (১০:২৭)(আরবী) শব্দের অর্থ হলো অগ্নিশিখা যা ধূম্র মিশ্রিত সবুজ রঙ এর, যা পুড়িয়ে বা ঝলসিয়ে দেয়। কেউ কেউ বলেন যে, এটা হলো ধূম্রবিহীন অগ্নির উপরের শিখা যা এমনভাবে ধাবিত হয় যে, যেন ওটা পানির তরঙ্গ। (আরবী) বলা হয় ধূম্রকে। এ শব্দটি নূনে যবর সহও এসে থাকে। এখানে কিন্তু কিরআত নূনে পেশসহই রয়েছে। কবি নাবেগার কবিতাতেও এ শব্দটি ধূমের অর্থে এসেছে। কবিতাংশটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটা আলোকিত হয় সলিতা বিশিষ্ট প্রদীপের আলোকের মত, যাতে আল্লাহ ধূম্র রাখেননি।” তবে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) দ্বারা ঐ অগ্নিশিখাকে বুঝানো হয়েছে যাতে ধূম্র থাকে না এবং তিনি তাঁর এ মতের প্রমাণ হিসেবে উমাইয়া ইবনে আবি সালাতের কবিতা পাঠ করে শুনিয়ে দেন। আর তিনি (আরবী)-এর অর্থ করেছেন শুধু ধূম্র যাতে শিখা থাকে। এর প্রমাণ স্বরূপ তিনি কবি নাবেগার উপরোক্তে কবিতাংশটি পেশ করেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ঐ পাতিল বা কড়াইকে বুঝানো হয়েছে যাকে গলানো হবে এবং জাহান্নামীদের মস্তকের উপর ঢেলে দেয়া হবে। মোটকথা, ভাবার্থ হচ্ছেঃ যদি তোমরা কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দান হতে পালাবার ইচ্ছা কর তবে ফেরেশতামণ্ডলী ও জাহান্নামের দারোগারা তোমাদের উপর আগুন বর্ষিয়ে, ধূম্র ছেড়ে দিয়ে এবং তোমাদের মাথায় গলিত পাতিল বহিয়ে দিয়ে তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনবে। না তোমরা তাদের মুকাবিলা করতে পারবে, না প্রতিরোধ করতে পারবে এবং না পারবে তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে। সুতরাং তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করা তোমাদের মোটেই উচিত নয়।
আর-রাহমান 55:34
৩১-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: ফারেগ বা মুক্ত হওয়ার অর্থ এটা নয় যে, এ সময় কোন ব্যস্ততার মধ্যে রয়েছেন, বরং এটা ধমক হিসেবে বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু তোমাদের প্রতি মনোনিবেশ করার সময় নিকটবর্তী হয়ে গেছে। এখন সঠিকভাবে ফায়সালা হয়ে যাবে। এখন আল্লাহ তা'আলাকে আর কোন কিছুই মশগুল করবে না, বরং তিনি শুধু তোমাদেরই হিসাব গ্রহণ করবেন। আরবদের বাক পদ্ধতি অনুযায়ী একথা বলা হয়েছে। যেমন ক্রোধের সময় কেউ কাউকেও বলে থাকেঃ “আচ্ছা, অবসর সময়ে আমি তোমাকে দেখে নেবো।” এখানে এ অর্থ নয় যে, এখন সে ব্যস্ত রয়েছে। বরং ভাবার্থ হচ্ছেঃ একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমি তোমাকে দেখে নিবো এবং তোমার অসাবধানতায় ও উদাসীনতায় তোমাকে পাকড়াও করবে। (আরবী) দ্বারা মানব ও দাবনকে বুঝানো হয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (কবরে শায়িত ব্যক্তির চীৎকারের শব্দ) প্রত্যেক জিনিসই শুনতে পায় মানব ও দানব ব্যতীত।" অন্য রিওয়াইয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানুষ ও জ্বিন ছাড়া।" আর সূর বা শিঙ্গার হাদীসে। পরিষ্কারভাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ সাকালান হলো মানুষ ও জ্বিন। মহান আল্লাহ আবারও বলেনঃ সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? হে দানব ও মানব! তোমরা আল্লাহ তা'আলার হুকুম এবং তার নির্ধারণকৃত তকদীর হতে পালিয়ে গিয়ে বাঁচতে পারবে না, বরং তিনি তোমাদের সকলকেই পরিবেষ্টন করে রয়েছেন। তার হুকুম তোমাদের উপর বিনা বাধায় জারী রয়েছে। তোমরা যেখানেই যাবে সেখানেও তাঁরই রাজত্ব। এটা প্রকৃতভাবে ঘটবে হাশরের মাঠে। সেখানে সমস্ত মাখলুককে ফেরেশতামণ্ডলী চতুর্দিক হতে পরিবেষ্টন করবেন। চতুম্পার্শ্বে তাদের সাতটি করে সারি হবে। কোন লোকই আল্লাহর দলীল ছাড়া এদিক ওদিক যেতে পারবে না। আর দলীল আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সেদিন মানুষ বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? না, কোন আশ্রয় স্থল নেই। সেদিন ঠাই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট।” (৭৫:১০-১২) আল্লাহ পাক আরেক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা মন্দ কাজ করে তাদের মন্দ কাজের তুল্য শাস্তি দেয়া হবে, তাদের উপর লাঞ্ছনা সওয়ার হবে, তাদেরকে আল্লাহর পাকড়াও হতে কেউই রক্ষা করতে পারবে না, তাদের চেহারা অন্ধকার রাত্রির টুকরার মত হবে, তারা জাহান্নামবাসী, ওর মধ্যে তারা চিরকাল অবস্থানকারী।” (১০:২৭)(আরবী) শব্দের অর্থ হলো অগ্নিশিখা যা ধূম্র মিশ্রিত সবুজ রঙ এর, যা পুড়িয়ে বা ঝলসিয়ে দেয়। কেউ কেউ বলেন যে, এটা হলো ধূম্রবিহীন অগ্নির উপরের শিখা যা এমনভাবে ধাবিত হয় যে, যেন ওটা পানির তরঙ্গ। (আরবী) বলা হয় ধূম্রকে। এ শব্দটি নূনে যবর সহও এসে থাকে। এখানে কিন্তু কিরআত নূনে পেশসহই রয়েছে। কবি নাবেগার কবিতাতেও এ শব্দটি ধূমের অর্থে এসেছে। কবিতাংশটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটা আলোকিত হয় সলিতা বিশিষ্ট প্রদীপের আলোকের মত, যাতে আল্লাহ ধূম্র রাখেননি।” তবে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) দ্বারা ঐ অগ্নিশিখাকে বুঝানো হয়েছে যাতে ধূম্র থাকে না এবং তিনি তাঁর এ মতের প্রমাণ হিসেবে উমাইয়া ইবনে আবি সালাতের কবিতা পাঠ করে শুনিয়ে দেন। আর তিনি (আরবী)-এর অর্থ করেছেন শুধু ধূম্র যাতে শিখা থাকে। এর প্রমাণ স্বরূপ তিনি কবি নাবেগার উপরোক্তে কবিতাংশটি পেশ করেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ঐ পাতিল বা কড়াইকে বুঝানো হয়েছে যাকে গলানো হবে এবং জাহান্নামীদের মস্তকের উপর ঢেলে দেয়া হবে। মোটকথা, ভাবার্থ হচ্ছেঃ যদি তোমরা কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দান হতে পালাবার ইচ্ছা কর তবে ফেরেশতামণ্ডলী ও জাহান্নামের দারোগারা তোমাদের উপর আগুন বর্ষিয়ে, ধূম্র ছেড়ে দিয়ে এবং তোমাদের মাথায় গলিত পাতিল বহিয়ে দিয়ে তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনবে। না তোমরা তাদের মুকাবিলা করতে পারবে, না প্রতিরোধ করতে পারবে এবং না পারবে তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে। সুতরাং তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করা তোমাদের মোটেই উচিত নয়।
আর-রাহমান 55:35
৩১-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: ফারেগ বা মুক্ত হওয়ার অর্থ এটা নয় যে, এ সময় কোন ব্যস্ততার মধ্যে রয়েছেন, বরং এটা ধমক হিসেবে বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু তোমাদের প্রতি মনোনিবেশ করার সময় নিকটবর্তী হয়ে গেছে। এখন সঠিকভাবে ফায়সালা হয়ে যাবে। এখন আল্লাহ তা'আলাকে আর কোন কিছুই মশগুল করবে না, বরং তিনি শুধু তোমাদেরই হিসাব গ্রহণ করবেন। আরবদের বাক পদ্ধতি অনুযায়ী একথা বলা হয়েছে। যেমন ক্রোধের সময় কেউ কাউকেও বলে থাকেঃ “আচ্ছা, অবসর সময়ে আমি তোমাকে দেখে নেবো।” এখানে এ অর্থ নয় যে, এখন সে ব্যস্ত রয়েছে। বরং ভাবার্থ হচ্ছেঃ একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমি তোমাকে দেখে নিবো এবং তোমার অসাবধানতায় ও উদাসীনতায় তোমাকে পাকড়াও করবে। (আরবী) দ্বারা মানব ও দাবনকে বুঝানো হয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (কবরে শায়িত ব্যক্তির চীৎকারের শব্দ) প্রত্যেক জিনিসই শুনতে পায় মানব ও দানব ব্যতীত।" অন্য রিওয়াইয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানুষ ও জ্বিন ছাড়া।" আর সূর বা শিঙ্গার হাদীসে। পরিষ্কারভাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ সাকালান হলো মানুষ ও জ্বিন। মহান আল্লাহ আবারও বলেনঃ সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? হে দানব ও মানব! তোমরা আল্লাহ তা'আলার হুকুম এবং তার নির্ধারণকৃত তকদীর হতে পালিয়ে গিয়ে বাঁচতে পারবে না, বরং তিনি তোমাদের সকলকেই পরিবেষ্টন করে রয়েছেন। তার হুকুম তোমাদের উপর বিনা বাধায় জারী রয়েছে। তোমরা যেখানেই যাবে সেখানেও তাঁরই রাজত্ব। এটা প্রকৃতভাবে ঘটবে হাশরের মাঠে। সেখানে সমস্ত মাখলুককে ফেরেশতামণ্ডলী চতুর্দিক হতে পরিবেষ্টন করবেন। চতুম্পার্শ্বে তাদের সাতটি করে সারি হবে। কোন লোকই আল্লাহর দলীল ছাড়া এদিক ওদিক যেতে পারবে না। আর দলীল আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সেদিন মানুষ বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? না, কোন আশ্রয় স্থল নেই। সেদিন ঠাই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট।” (৭৫:১০-১২) আল্লাহ পাক আরেক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা মন্দ কাজ করে তাদের মন্দ কাজের তুল্য শাস্তি দেয়া হবে, তাদের উপর লাঞ্ছনা সওয়ার হবে, তাদেরকে আল্লাহর পাকড়াও হতে কেউই রক্ষা করতে পারবে না, তাদের চেহারা অন্ধকার রাত্রির টুকরার মত হবে, তারা জাহান্নামবাসী, ওর মধ্যে তারা চিরকাল অবস্থানকারী।” (১০:২৭)(আরবী) শব্দের অর্থ হলো অগ্নিশিখা যা ধূম্র মিশ্রিত সবুজ রঙ এর, যা পুড়িয়ে বা ঝলসিয়ে দেয়। কেউ কেউ বলেন যে, এটা হলো ধূম্রবিহীন অগ্নির উপরের শিখা যা এমনভাবে ধাবিত হয় যে, যেন ওটা পানির তরঙ্গ। (আরবী) বলা হয় ধূম্রকে। এ শব্দটি নূনে যবর সহও এসে থাকে। এখানে কিন্তু কিরআত নূনে পেশসহই রয়েছে। কবি নাবেগার কবিতাতেও এ শব্দটি ধূমের অর্থে এসেছে। কবিতাংশটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটা আলোকিত হয় সলিতা বিশিষ্ট প্রদীপের আলোকের মত, যাতে আল্লাহ ধূম্র রাখেননি।” তবে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) দ্বারা ঐ অগ্নিশিখাকে বুঝানো হয়েছে যাতে ধূম্র থাকে না এবং তিনি তাঁর এ মতের প্রমাণ হিসেবে উমাইয়া ইবনে আবি সালাতের কবিতা পাঠ করে শুনিয়ে দেন। আর তিনি (আরবী)-এর অর্থ করেছেন শুধু ধূম্র যাতে শিখা থাকে। এর প্রমাণ স্বরূপ তিনি কবি নাবেগার উপরোক্তে কবিতাংশটি পেশ করেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ঐ পাতিল বা কড়াইকে বুঝানো হয়েছে যাকে গলানো হবে এবং জাহান্নামীদের মস্তকের উপর ঢেলে দেয়া হবে। মোটকথা, ভাবার্থ হচ্ছেঃ যদি তোমরা কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দান হতে পালাবার ইচ্ছা কর তবে ফেরেশতামণ্ডলী ও জাহান্নামের দারোগারা তোমাদের উপর আগুন বর্ষিয়ে, ধূম্র ছেড়ে দিয়ে এবং তোমাদের মাথায় গলিত পাতিল বহিয়ে দিয়ে তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনবে। না তোমরা তাদের মুকাবিলা করতে পারবে, না প্রতিরোধ করতে পারবে এবং না পারবে তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে। সুতরাং তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করা তোমাদের মোটেই উচিত নয়।
আর-রাহমান 55:36
৩১-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: ফারেগ বা মুক্ত হওয়ার অর্থ এটা নয় যে, এ সময় কোন ব্যস্ততার মধ্যে রয়েছেন, বরং এটা ধমক হিসেবে বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু তোমাদের প্রতি মনোনিবেশ করার সময় নিকটবর্তী হয়ে গেছে। এখন সঠিকভাবে ফায়সালা হয়ে যাবে। এখন আল্লাহ তা'আলাকে আর কোন কিছুই মশগুল করবে না, বরং তিনি শুধু তোমাদেরই হিসাব গ্রহণ করবেন। আরবদের বাক পদ্ধতি অনুযায়ী একথা বলা হয়েছে। যেমন ক্রোধের সময় কেউ কাউকেও বলে থাকেঃ “আচ্ছা, অবসর সময়ে আমি তোমাকে দেখে নেবো।” এখানে এ অর্থ নয় যে, এখন সে ব্যস্ত রয়েছে। বরং ভাবার্থ হচ্ছেঃ একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমি তোমাকে দেখে নিবো এবং তোমার অসাবধানতায় ও উদাসীনতায় তোমাকে পাকড়াও করবে। (আরবী) দ্বারা মানব ও দাবনকে বুঝানো হয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (কবরে শায়িত ব্যক্তির চীৎকারের শব্দ) প্রত্যেক জিনিসই শুনতে পায় মানব ও দানব ব্যতীত।" অন্য রিওয়াইয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানুষ ও জ্বিন ছাড়া।" আর সূর বা শিঙ্গার হাদীসে। পরিষ্কারভাবে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ সাকালান হলো মানুষ ও জ্বিন। মহান আল্লাহ আবারও বলেনঃ সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? হে দানব ও মানব! তোমরা আল্লাহ তা'আলার হুকুম এবং তার নির্ধারণকৃত তকদীর হতে পালিয়ে গিয়ে বাঁচতে পারবে না, বরং তিনি তোমাদের সকলকেই পরিবেষ্টন করে রয়েছেন। তার হুকুম তোমাদের উপর বিনা বাধায় জারী রয়েছে। তোমরা যেখানেই যাবে সেখানেও তাঁরই রাজত্ব। এটা প্রকৃতভাবে ঘটবে হাশরের মাঠে। সেখানে সমস্ত মাখলুককে ফেরেশতামণ্ডলী চতুর্দিক হতে পরিবেষ্টন করবেন। চতুম্পার্শ্বে তাদের সাতটি করে সারি হবে। কোন লোকই আল্লাহর দলীল ছাড়া এদিক ওদিক যেতে পারবে না। আর দলীল আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সেদিন মানুষ বলবেঃ আজ পালাবার স্থান কোথায়? না, কোন আশ্রয় স্থল নেই। সেদিন ঠাই হবে তোমার প্রতিপালকেরই নিকট।” (৭৫:১০-১২) আল্লাহ পাক আরেক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা মন্দ কাজ করে তাদের মন্দ কাজের তুল্য শাস্তি দেয়া হবে, তাদের উপর লাঞ্ছনা সওয়ার হবে, তাদেরকে আল্লাহর পাকড়াও হতে কেউই রক্ষা করতে পারবে না, তাদের চেহারা অন্ধকার রাত্রির টুকরার মত হবে, তারা জাহান্নামবাসী, ওর মধ্যে তারা চিরকাল অবস্থানকারী।” (১০:২৭)(আরবী) শব্দের অর্থ হলো অগ্নিশিখা যা ধূম্র মিশ্রিত সবুজ রঙ এর, যা পুড়িয়ে বা ঝলসিয়ে দেয়। কেউ কেউ বলেন যে, এটা হলো ধূম্রবিহীন অগ্নির উপরের শিখা যা এমনভাবে ধাবিত হয় যে, যেন ওটা পানির তরঙ্গ। (আরবী) বলা হয় ধূম্রকে। এ শব্দটি নূনে যবর সহও এসে থাকে। এখানে কিন্তু কিরআত নূনে পেশসহই রয়েছে। কবি নাবেগার কবিতাতেও এ শব্দটি ধূমের অর্থে এসেছে। কবিতাংশটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটা আলোকিত হয় সলিতা বিশিষ্ট প্রদীপের আলোকের মত, যাতে আল্লাহ ধূম্র রাখেননি।” তবে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) দ্বারা ঐ অগ্নিশিখাকে বুঝানো হয়েছে যাতে ধূম্র থাকে না এবং তিনি তাঁর এ মতের প্রমাণ হিসেবে উমাইয়া ইবনে আবি সালাতের কবিতা পাঠ করে শুনিয়ে দেন। আর তিনি (আরবী)-এর অর্থ করেছেন শুধু ধূম্র যাতে শিখা থাকে। এর প্রমাণ স্বরূপ তিনি কবি নাবেগার উপরোক্তে কবিতাংশটি পেশ করেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ঐ পাতিল বা কড়াইকে বুঝানো হয়েছে যাকে গলানো হবে এবং জাহান্নামীদের মস্তকের উপর ঢেলে দেয়া হবে। মোটকথা, ভাবার্থ হচ্ছেঃ যদি তোমরা কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দান হতে পালাবার ইচ্ছা কর তবে ফেরেশতামণ্ডলী ও জাহান্নামের দারোগারা তোমাদের উপর আগুন বর্ষিয়ে, ধূম্র ছেড়ে দিয়ে এবং তোমাদের মাথায় গলিত পাতিল বহিয়ে দিয়ে তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনবে। না তোমরা তাদের মুকাবিলা করতে পারবে, না প্রতিরোধ করতে পারবে এবং না পারবে তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে। সুতরাং তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করা তোমাদের মোটেই উচিত নয়।