Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আর-রাহমান 55:78 – আল-ওয়াকিয়া 56:21

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আর-রাহমান 55:78
  2. আল-ওয়াকিয়া 56:1
  3. আল-ওয়াকিয়া 56:2
  4. আল-ওয়াকিয়া 56:3
  5. আল-ওয়াকিয়া 56:4
  6. আল-ওয়াকিয়া 56:5
  7. আল-ওয়াকিয়া 56:6
  8. আল-ওয়াকিয়া 56:7
  9. আল-ওয়াকিয়া 56:8
  10. আল-ওয়াকিয়া 56:9
  11. আল-ওয়াকিয়া 56:10
  12. আল-ওয়াকিয়া 56:11
  13. আল-ওয়াকিয়া 56:12
  14. আল-ওয়াকিয়া 56:13
  15. আল-ওয়াকিয়া 56:14
  16. আল-ওয়াকিয়া 56:15
  17. আল-ওয়াকিয়া 56:16
  18. আল-ওয়াকিয়া 56:17
  19. আল-ওয়াকিয়া 56:18
  20. আল-ওয়াকিয়া 56:19
  21. আল-ওয়াকিয়া 56:20
  22. আল-ওয়াকিয়া 56:21

আর-রাহমান 55:78

৬২-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতগুলোতে যে দুটি জান্নাতের বর্ণনা রয়েছে এ দুটো জান্নাত ঐ দুটো জান্নাত অপেক্ষা নিম্ন মানের যে দুটোর বর্ণনা পূর্বে গত হলো। ঐ হাদীসের বর্ণনাও গত হয়েছে যাতে রয়েছে যে, দুটো জান্নাত স্বর্ণের ও দুটো জান্নাত রৌপ্যের। প্রথমটি বিশেষ নৈকট্য লাভকারীদের স্থান এবং দ্বিতীয়টি আসহাবে ইয়ামীনের স্থান। মোটকথা, এ দুটোর মান ঐ দুটোর তুলনায় কম। এর বহু প্রমাণ রয়েছে। একটি প্রমাণ এই যে, ঐ দুটির গুণাবলীর বর্ণনা এ দুটির পূর্বে দেয়া হয়েছে। সুতরাং পূর্বে বর্ণনা দেয়াই ঐ দুটির ফযীলতের বড় প্রমাণ। তারপর এখানে (আরবী) বলা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করছে যে, এ দুটি ঐ দুটি অপেক্ষা নিম্নমানের। ওখানে ঐ দুটির প্রশংসায় (আরবী) বলা হয়েছে অর্থাৎ বহু শাখা-পল্লব বিশিষ্ট বৃক্ষে পূর্ণ। আর এখানে বলা হয়েছে। (আরবী) অর্থাৎ ঘন সবুজ এই উদ্যান দু’টি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) সবুজ অর্থ করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো সজীতে পরিপূর্ণ। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ এতো বেশী পাকা পাকা ফল ধরে রয়েছে যে, সম্পূর্ণ বাগান সবুজ-শ্যামল মনে হচ্ছে। মোটকথা, ওখানে শাখাগুলোর প্রাচুর্যের বর্ণনা রয়েছে এবং এখানে গাছগুলোর আধিক্যের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সুতরাং এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, ঐগুলো ও এগুলোর মধ্যে বহু পার্থক্য রয়েছে। ঐ দুটি উদ্যানের দুটি প্রস্রবণের ব্যাপারে (আরবী) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে অর্থাৎ প্রবহমান দুটি প্রস্রবণ। আর এই দুটি উদ্যানের দুটি প্রস্রবণ সম্পর্কে (আরবী) ব্যবহার করা হয়েছে অর্থাৎ উচ্ছলিত দুটি প্রস্রবণ। আর এটা প্রকাশ্য ব্যাপার যে, উজ্জ্বলিত হওয়ার চেয়ে প্রবহমান হওয়া উচ্চতর।ঐখানে বলা হয়েছে যে, উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই প্রকার। আর এখানে বলা হয়েছে যে, উদ্যান দুটিতে রয়েছে ফলমূল-খর্জূর ও আনার। তাহলে এটা স্পষ্ট যে, পূর্বের উদ্যান দুটির শব্দগুলো সাধারণত্বের জন্যে। ওটা প্রকারের দিক দিয়ে এবং পরিমাণ বা সংখ্যার দিক দিয়েও এটার উপর ফযীলত রাখে। কেননা, এখানে শব্দটি নাকেরাহ বটে, কিন্তু হিসাবে (আরবী)-এর জন্যে। সুতরাং এটা বা সাধারণ হতে পারে না। এজন্যেই তাফসীর হিসেবে পরে (আরবী) ও (আরবী) বলে দিয়েছেন। যেমন (আরবী)-এর বা (আরবী) সংযোগ -এর উপর হয়ে থাকে। ইমাম বুখারী (রঃ) প্রমুখ মনীষীদের। (আরবী) বা শব্দ বিশ্লেষণও এটাই। খেজুর ও আনারকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ এই যে, অন্যান্য ফলের উপর এ দুটোর মর্যাদা রয়েছে।মুসনাদে আবদ ইবনে হুমাইদীতে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীদের কতক লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! জান্নাতে ফল আছে কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ, তথায় রয়েছে ফলমূল, খর্জুর ও আনার।” তারা আবার প্রশ্ন করেঃ “তারা (অর্থাৎ জান্নাতীরা) কি তথায় দুনিয়ার মত পানাহার করবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ হ্যাঁ, বরং বহুগুণে বেশী করবে। তারা পুনরায় প্রশ্ন করেঃ “তারা কি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরো করবে (অর্থাৎ তাদের পায়খানা প্রস্রাবের প্রয়োজন হবে কি?” তিনি উত্তর দেনঃ “না, বরং ঘর্ম আসার ফলে সবই হযম হয়ে যাবে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জান্নাতের খেজুর গাছের পাতা হবে জান্নাতীদের পোশাক। এটা লাল রঙ এর হবে, এর কাণ্ড হবে সবুজ পান্না। এর ফল হবে মধুর চেয়েও মিষ্ট এবং মাখনের চেয়েও নরম। এতে বিচি মোটেই থাকবে না।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি জান্নাতের দিকে দৃষ্টিপাত করে দেখি যে, ওর একটি আনার যেন শিবিকাসহ উট (অর্থাৎ এরূপ উটের মত বিরাট বিরাট)।” (এ হাদীসটিও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে সংখ্যায় অধিক, অত্যন্ত সুন্দরী এবং খুবই চরিত্রবতী সতী-সাধ্বী। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, হ্রগুলো যে গান গাইবে তাতে এও থাকবেঃ “আমরা সুন্দরী, চরিত্রবতী ও সতী-সাধ্বী। আমাদেরকে সম্মানিত স্বামীদের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে।” এই পূর্ণ হাদীসটি সূরায়ে ওয়াকিয়াহতে সত্বরই আসছে ইনশাআল্লাহ।(আরবী) শব্দটিকে তাশদীদ সহও পড়া হয়েছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা পুনরায় প্রশ্ন করছেনঃ সুতরাং হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তারা তাঁবুতে সুরক্ষিত হুর। এখানেও ঐ পার্থক্যই পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, ওখানে বলা হয়েছিল হরগুলো নিজেরাই তাদের চক্ষু নীচু করে রাখে, আর এখানে বলা হচ্ছে তাদের চক্ষু নীচু করানো হয়েছে। সুতরাং নিজেই কোন কাজ করা এবং অপরের দ্বারা করানো এই দুয়ের মধ্যে কত বড় পার্থক্য রয়েছে তা সহজেই অনুমেয়, যদিও সবাই তাঁবুতে সুরক্ষিত।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক মুসলমানের জন্যে খায়রাহ অর্থাৎ সতী-সাধ্বী, চরিত্রবতী ও উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্টা হ্র রয়েছে। প্রত্যেক খায়রাহ বা হরের জন্যে তাঁবু রয়েছে। প্রত্যেক তাঁবুর চারটি দরযা আছে, যেগুলো দিয়ে প্রত্যহ উপহার, উপঢৌকন, হাদিয়া এবং ইনআম আসতেই আছে। সেখানে না আছে কোন ঝগড়া-বিবাদ, না আছে কড়াকড়ি, না আছে ময়লা আবর্জনা এবং না আছে দুর্গন্ধ। বরং হরদের সাহচর্য, যারা শুভ্র ও উজ্জ্বল মুক্তার মত, যাদেরকে ইতিপূর্বে কোন মানুষ অথবা জ্বিন স্পর্শ করেনি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কায়েস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে একটি তাঁবু রয়েছে যা খাঁটি মুক্তা দ্বারা নির্মিত। ওর প্রস্থ ষাট মাইল। ওর প্রত্যেক কোণায় জান্নাতীরা রয়েছে যারা অন্য কোণার লোকদেরকে দেখতে পায় না। মুমিনরা তাদের কাছে আসা যাওয়া করতে থাকবে। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত রয়েছে। সহীহ মুসলিমেও হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে) অন্য বর্ণনায় তাঁবুটির প্রস্থ তিন মাইলের কথাও রয়েছে। হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতে মণি-মুক্তার তৈরী একটি তাঁবু রয়েছে। যার মোতির তৈরী সত্তরটি দরযা আছে। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত রয়েছে। সহীহ মুসলিমেও হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জান্নাতে একটি তাঁবু থাকবে যা মুক্তা দ্বারা নির্মিত হবে। ওর চার হাজারটি দরযা হবে এবং সমস্ত চৌকাঠ হবে সোনার তৈরী। একটি মারফু হাদীসে আছে যে, সবচেয়ে নিম্নমানের জান্নাতীর আশি হাজার খাদেম থাকবে এবং বাহাত্তরটি স্ত্রী হবে। আর মণি-মুক্তা ও যবরজদের প্রাসাদ হবে যা জাভিয়াহ হতে সানআ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (অর্থাৎ জাভিয়াহ হতে সানআ পর্যন্ত জায়গাদ্বয়ের মধ্যে যতটা ব্যবধান রয়েছে ততদূর পর্যন্ত ঐ প্রাসাদ পৌছে যাবে)।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এদেরকে (অর্থাৎ এই হ্রদেরকে) ইতিপূর্বে কোন মানুষ অথবা জ্বিন স্পর্শ করেনি। এই প্রকারের আয়াতের তাফসীর পূর্বে গত হয়েছে। তবে পূর্ববর্তী জান্নাতীদের হ্রদের গুণাবলী বর্ণনায় এ বাক্যটুকু বেশী আছে যে, তারা যেন প্রবাল ও পদ্মরাগ। এখানে এই হ্রদের ব্যাপারে এটা বলা হয়নি। আল্লাহ তাআলা আবারও বলেনঃ সুতরাং হে দানব ও মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তারা হেলান দিয়ে বসবে সবুজ তাকিয়ায় ও সুন্দর গালিচার উপরে। এই তাকিয়া হবে খুবই উন্নতমানের ও নকশাকৃত। এই তখৃত, বিছানা ও বালিশগুলো জান্নাতী বাগীচা ও পুষ্প বীথির উপর থাকবে। এগুলো হবে উচ্চমানের রেখাযুক্ত নকশীদার রেশমের এবং এটাই হবে তাদের বিছানা। কোনটা হবে লাল রঙ এর, কোনটা হবে হলদে রঙ এর এবং কোনটা হবে সবুজ রঙ এর। জান্নাতীদের কাপড় ও পোশাকও এরূপ মূল্যবান। দুনিয়ায় এমন কোন জিনিস নেই যার এগুলোর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এটা হবে মখমলের বিছানা ও গদি যা হবে অত্যন্ত নরম ও খাঁটি। তাতে কয়েকটি রঙ মিলিতভাবে থাকবে এবং নকশাকৃত হবে। আবু উবাইদা (রঃ) বলেন যে, আবকারী একটি জায়গার নাম যেখানে উন্নত মানের নকশীদার কাপড় বুনানো হয়। খলীল ইবনে আহমাদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক সুন্দর ও উত্তম জিনিসকে আরবরা আবকারী বলে থাকে। যেমন এক হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) সম্পর্কে বলেনঃ “আমি কোন আবকারীকে দেখিনি যে উমার (রাঃ)-এর মত বড় বড় বালতি টেনে থাকে।” এখানেও এটা খেয়াল রাখার বিষয় যে, পূর্ববর্ণিত জান্নাতদ্বয়ের বিছানা, গদি ও বালিশের যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা এগুলো হতে উন্নততর। ওখানে বর্ণিত হয়েছিল যে, ওর আস্তর অর্থাৎ ভিতরের কাপড় হবে খাঁটি ও পুরু রেশমের এবং উপরের কাপড়ের বর্ণনা দেয়া হয়নি। কারণ যার ভিতরের কাপড় এরূপ উচ্চমানের তার উপরের কাপড় কত উন্নতমানের হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। তারপর পূর্বের জান্নাতদ্বয়ের গুণাবলীর সমাপ্তিতে বলেছিলেনঃ উত্তম কাজের জন্যে উত্তম পুরস্কার ব্যতীত কি হতে পারে? তাহলে দেখা যায় যে, ঐ জান্নাতবাসীদের গুণাবলীর বর্ণনায় ইহসানের বর্ণনা দিয়েছেন যা মর্যাদার শেষ সীমা। যেমন হযরত জিবরাঈল (আঃ) যুক্ত হাদীসে রয়েছে, তিনি প্রথমে প্রশ্ন করেন ইসলাম সম্পর্কে, তারপর ঈমান সম্পর্কে এবং এরপর ইহসান সম্পর্কে।সুতরাং বেশ কয়েকটি যুক্তি রয়েছে যেগুলো দ্বারা এটা পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, পূর্ববর্তী দু’টি জান্নাতের বড় ফযীলত রয়েছে পরবর্তী দুটি জান্নাতের উপর। পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা যে, তিনি যেন আমাদেরকে ঐ জান্নাতে প্রবিষ্ট করেন যা ঐ জান্নাতদ্বয়ের মধ্যে হবে যেগুলোর গুণাবলী পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। আমীন! ‘অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ কত মহান তোমার প্রতিপালকের নাম যিনি মহিমময় ও মহানুভব। তিনি যুল-জালাল বা মহিমান্বিত। অর্থাৎ তিনি এই যোগ্যতা রাখেন যে, তাঁর মহিমাকে মেনে নেয়া হবে এবং তাঁর মহিমা ও গৌরবের প্রতি লক্ষ্য রেখে তার অবাধ্যাচরণ করা হবে না, বরং তার পূর্ণ। আনুগত্য করা হবে। তিনি এই যোগ্যতাও রাখেন যে, তার মর্যাদা রক্ষা করা হবে অর্থাৎ তার ইবাদত করা হবে এবং তার সাথে অন্য কারো ইবাদত করা হবে না। তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হবে এবং অকৃতজ্ঞ হওয়া চলবে না। তাঁকে স্মরণ করা হবে এবং ভুলে যাওয়া চলবে না। তিনি শ্রেষ্ঠত্ব ও গৌরবের অধিকারী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে মর্যাদা প্রদান কর এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নাও।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য হাদীসে রয়েছেঃ “পাকা চুল বিশিষ্ট মুসলমানকে, ন্যায় বিচারক বাদশাহকে এবং কুরআন পাঠকারীকে, যে কুরআন পাঠকারী ওর মধ্যে সীমালংঘন করে না (যথা হরফের মদ, গুনাহ ইত্যদি সীমার অতিরিক্ত করে না বা মাখরাজ পরিবর্তন করে না ইত্যাদি) এবং সীমা হতে ঘটিয়ে অন্যায় করে না। (অর্থাৎ নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে বা অজ্ঞতা বশতঃ ভুল অর্থ করে না), এই লোকদেরকে সম্মান করা, আল্লাহকে সম্মান করার শামিল।" হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) -এর সাথে ঝুলে পড়।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামে তিরমিযীতেও এ হাদীসটি আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে অরক্ষিত ও গারীব বলেছেন)হযরত রাবীআহ ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা (আরবী) -এর সাথে লটকে যাও।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)জাওহারী (রাঃ) বলেন যে, যখন কেউ কোন কিছুকে শক্ত করে ধরে নেয় তখন (আরবী) শব্দ আরবরা ব্যবহার করে থাকে। এই শব্দটিই এ হাদীসে এসেছে। তাহলে অর্থ হবেঃ অনুনয় বিনয়, আন্তরিকতা, অপারগতা এবং দারিদ্রের ভাব দেখিয়ে সদা-সর্বদা আল্লাহর অঞ্চলের সাথে ঝুলে পড়। সহীহ মুসলিমে ও সুনানে আরবাতে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায হতে সালাম ফিরানোর পর শুধু নিম্নের কালেমাগুলো পাঠ করা পর্যন্ত বসে থাকতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনিই শান্তি, আপনা হতেই শান্তি, হে মহিমময় ও মহানুভব! আপনি কল্যাণময়।”

আল-ওয়াকিয়া 56:1

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আমাকে সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ওয়াকিআহ, সূরায়ে মুরসালাত, সূরায়ে আম্মা ইয়াতাসাআলুন এবং সূরায়ে ইশ শামসু কুওভিরাত বৃদ্ধ করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু যাবিরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ রোগাক্রান্ত হন, যে রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর ঐ রোগের সময় হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার অভিযোগ কি?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমার পাপরাশি।” হযরত উসমান আবার প্রশ্ন করেনঃ “আপনার আকাক্ষা কি?" তিনি জবাব দেনঃ “আমার প্রতিপালকের রহমত।” হযরত উসমান (রাঃ) প্রশ্ন করেনঃ “কোন ডাক্তারকে পাঠিয়ে দেবো কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ডাক্তারই তো আমাকে রোগাক্রান্ত করেছেন?” হযরত উসমান (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার জন্যে কিছু মাল পাঠাবার নির্দেশ দিবো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমার মালের কোন প্রয়োজন নেই।” হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “আপনার পরে আপনার সন্তানদের কাজে লাগবে?” তিনি বললেনঃ “আমার সন্তানরা দরিদ্র হয়ে পড়বে আপনি এ আশংকা করেন? তাহলে জেনে রাখুন যে, আমি আমার সন্তানদেরকে প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠের নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠ করবে সে কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না বা না খেয়ে থাকবে না।” (এ হাদীসটি ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবূ যাবিয়াহ (রাঃ) কখনো এ সূরাটি রাত্রে পাঠ ছাড়তেন না। হযরত সাম্মাক ইবনে হারব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা আজ যেভাবে তোমাদের নামায পড়ছে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) এভাবেই নামায পড়তেন। তবে তোমাদের নামাযের চেয়ে তাঁর নামায তিনি হালকা করতেন। তিনি ফজরের নামাযে সূরায়ে ওয়াকিআহ এবং এ ধরনের সূরাগুলো তিলাওয়াত করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) ১-১২ নং আয়াতের তাফসীর: ওয়াকিয়াহ কিয়ামতের নাম। কেননা, এটা সংঘটিত হওয়া সুনিশ্চিত। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (৬৯:১৫) এটার সংঘটন অবশ্যম্ভাবী। না এটাকে কেউ টলাতে পারে, না কেউ হটাতে পারে। এটা নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত হবেই। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দাও ঐ দিন আসার পূর্বে যাকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না।” (৪২:৪৭) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এক ব্যক্তি চাইলো সংঘটিত হোক শাস্তি যা অবধারিত কাফিরদের জন্যে, এটা প্রতিরোধ করার কেউ নেই।” (৭০:১-২) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেই দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ হয়ে যাও, তখন হয়ে যাবে। তারই কথা সত্য, রাজত্ব তাঁরই, যেই দিন শিঙ্গায় ফুস্কার দেয়া হবে, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি বিজ্ঞানময়, সম্যক অবগত।” (৬:৭৩) কিয়ামত সংঘটনে কোন সন্দেহ নেই, বরং এটা চরম সত্য, এটা অবশ্যই সংঘটিত হবে।(আরবী) 'শব্দটি (আরবী) যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দ দুটি মাসদার। এটা কাউকেও করবে নীচ, কাউকেও করবে সমুন্নত। ঐদিন বহু লোক নীচতম ও হীনতম হয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে যারা দুনিয়ায় সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিল। পক্ষান্তরে বহু লোক সেদিন সমুন্নত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিও তারা দুনিয়ায় নিম্নশ্রেণীর লোক ছিল এবং মর্যাদার অধিকারী ছিল না। সেই দিন আল্লাহর শত্রুরা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ অবস্থায় জাহান্নামে চলে যাবে। আর তাঁর বন্ধু ও ভক্তরা সম্মানিত অবস্থায় জান্নাতে চলে যাবে। ঐদিন অহংকারীরা হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং বিনয়ীরা হবে সম্মানিত। এই কিয়ামত নিকটের ও দূরের লোকদেরকে সতর্ক করে দিবে। এটা নীচু হবে এবং নিকটের লোকদেরকে শুনিয়ে দিবে। তারপর উঁচু হবে এবং দূরের লোকদেরকে শুনাবে। পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং হেলা দোলা শুরু করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে।" (৯৯:১) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে, কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।” (২২:১)। এরপর বলেনঃ পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।" (৭৩:১৪) আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ফলে ওটা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলি-কণায়।(আরবী) ঐ অগ্নিস্ফুলিঙ্গকেও বলা হয় যেগুলো আগুন জ্বালাবার সময় পতঙ্গের মত উড়তে থাকে এবং উড়তে উড়তে নীচে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়, কিছুই থাকে না।(আরবী) ঐ জিনিসকে বলা হয় যাকে বাতাস উপরে তোলে নেয় এবং ছড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেমন শুষ্ক পাতার গুঁড়াকে বাতাস এদিক-ওদিক করে দেয়। এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, পাহাড় স্বীয় জায়গা হতে সরে পড়বে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে। একটি দল আরশের ডান দিকে হবে। তারা হবে ঐসব লোক যারা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান পার্শ্বদেশ হতে বের হয়েছিল এবং যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাদেরকে ডান দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা হবে জান্নাতীদের সাধারণ দল। দ্বিতীয় দলটি আরশের বাম দিকে হবে। এরা হবে ঐসব লোক যাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পার্শ্বদেশ হতে বের করা হয়েছিল। এদের বাম হাতে। আমলনামা দেয়া হবে এবং এদেরকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এরা সব জাহান্নামী। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে রক্ষা করুন!তৃতীয় দলটি মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হবেন। তারা হবেন বিশিষ্ট ল। তারা আসহাবুল ইয়ামীনের চেয়েও বেশী মর্যাদাবান ও নৈকট্য লাভকারী ।। ভরা হবেন জান্নাতবাসীদের নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবী, রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণ। ডান দিকের লোকদের চেয়ে তারা সংখ্যায় কম হবেন। সুতরাং হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ এই তিন শ্রেণীরই থাকবে, যেমন এই সূরার শেষে সংক্ষিপ্তভাবে তাদের এই তিনটি ভাগই করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২) সুতরাং এখানেও তিন শ্রেণী রয়েছে। এটা ঐ সময়, যখন (আরবী)-এর ঐ তাফসীর নেয়া হবে যা এটা অনুযায়ী হয়, অন্যথায় অন্য একটি উক্তি রয়েছে যা এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনও এটাই বলেছেন। দু'টি দল তো জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হবে” (৮১৪৭) বিভিন্ন প্রকারের অর্থাৎ প্রত্যেক আমলের আমলকারীর একটি দল হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা বিভক্ত হবে তিন শ্রেণীতে। ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী, তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) আয়াতগুলো পাঠ করেন, অতঃপর তার হস্তদ্বয়ের মুষ্টি বন্ধ করেন এবং বলেনঃ এগুলো জান্নাতী এবং আমি কোন পরোয়া করি না, আর এগুলো জাহান্নামী এবং আমার কোন পরোয়া নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ার দিকে সর্বপ্রথম কোন্ লোকগুলো যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তর দেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বললেনঃ “তারা হলো ঐ লোক যে, যখন তাদেরকে তাদের হক প্রদান করা হয় তখন তারা তা কবুল করে, তাদের উপর অন্যের হক থাকলে তা চাওয়া মাত্রই দিয়ে দেয় এবং তারা লোকদেরকে ঐ হুকুম করে যে হুকুম তাদের নিজেদেরকে করে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)সাবেকুন বা অগ্রবর্তী তোক কারা এ ব্যাপারে বহু উক্তি রয়েছে। যেমন নবীগণ, ইল্লীঈনবাসীগণ, হয়রত ইউশা ইবনে নুন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন, ঐ মুমিনরা যাদের বর্ণনা সরায়ে ইয়াসীনে। রয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর প্রথমে ঈমান এনেছিলেন, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি অগ্রগামী ছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা দুই কিবলামুখী হয়ে নামায পড়েছেন, প্রত্যেক উম্মতের ঐ লোকগুলো যারা নিজ নিজ নবীর উপর পূর্বে ঈমান এনেছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা সর্বাগ্রে জিহাদে গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এই উক্তিগুলো সবই সঠিক অর্থাৎ এই লোকগুলোই অগ্রবর্তী। যারা আগে বেড়ে গিয়ে অন্যদের উপর অগ্রবর্তী হয়ে আল্লাহ তা'আলার ফরমান কবুল করে থাকেন তারা সবাই সাবেকুনের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়।” (৩:১৩৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে অগ্রগামী হও এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রস্থ বা বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মত।” (৫৭:২১) সুতরাং এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি পুণ্যের কাজে অগ্রগামী হবে, সে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের দিকেও অগ্রবর্তীই থাকবে। প্রত্যেক আমলের প্রতিদান ঐ শ্রেণীরই হয়ে থাকে। যেমন সে আমল করে তেমনই সে ফল পায়। এ জন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত, তারাই থাকবে সুখদ উদ্যানে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আদম সন্তানের জন্যে আপনি দুনিয়া বানিয়েছেন, সেখানে তারা পানাহার করে থাকে এবং বিয়ে-শাদী করে থাকে। সুতরাং আখিরাত আপনি আমাদের জন্যেই করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আমি এরূপ করবে না।” ফেরেশতারা তিনবার প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে কখনো তাদের মত করবে না যাদেরকে আমি শুধু (আরবী) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছি।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম রাযীও (রঃ) তার কিতাবুররাদ্দে আলাল জাহমিয়্যাহ’ নামক কিতাবে এই আসারটি আনয়ন করেছেন। এর শব্দগুলো হলোঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যাকে আমি আমার নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তার সৎ সন্তানদেরকে ওর মত করবে না যাকে আমি বলেছিঃ হয়ে যাও’ তখন হয়ে গেছে”)

আল-ওয়াকিয়া 56:2

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আমাকে সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ওয়াকিআহ, সূরায়ে মুরসালাত, সূরায়ে আম্মা ইয়াতাসাআলুন এবং সূরায়ে ইশ শামসু কুওভিরাত বৃদ্ধ করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু যাবিরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ রোগাক্রান্ত হন, যে রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর ঐ রোগের সময় হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার অভিযোগ কি?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমার পাপরাশি।” হযরত উসমান আবার প্রশ্ন করেনঃ “আপনার আকাক্ষা কি?" তিনি জবাব দেনঃ “আমার প্রতিপালকের রহমত।” হযরত উসমান (রাঃ) প্রশ্ন করেনঃ “কোন ডাক্তারকে পাঠিয়ে দেবো কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ডাক্তারই তো আমাকে রোগাক্রান্ত করেছেন?” হযরত উসমান (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার জন্যে কিছু মাল পাঠাবার নির্দেশ দিবো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমার মালের কোন প্রয়োজন নেই।” হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “আপনার পরে আপনার সন্তানদের কাজে লাগবে?” তিনি বললেনঃ “আমার সন্তানরা দরিদ্র হয়ে পড়বে আপনি এ আশংকা করেন? তাহলে জেনে রাখুন যে, আমি আমার সন্তানদেরকে প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠের নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠ করবে সে কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না বা না খেয়ে থাকবে না।” (এ হাদীসটি ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবূ যাবিয়াহ (রাঃ) কখনো এ সূরাটি রাত্রে পাঠ ছাড়তেন না। হযরত সাম্মাক ইবনে হারব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা আজ যেভাবে তোমাদের নামায পড়ছে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) এভাবেই নামায পড়তেন। তবে তোমাদের নামাযের চেয়ে তাঁর নামায তিনি হালকা করতেন। তিনি ফজরের নামাযে সূরায়ে ওয়াকিআহ এবং এ ধরনের সূরাগুলো তিলাওয়াত করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) ১-১২ নং আয়াতের তাফসীর: ওয়াকিয়াহ কিয়ামতের নাম। কেননা, এটা সংঘটিত হওয়া সুনিশ্চিত। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (৬৯:১৫) এটার সংঘটন অবশ্যম্ভাবী। না এটাকে কেউ টলাতে পারে, না কেউ হটাতে পারে। এটা নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত হবেই। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দাও ঐ দিন আসার পূর্বে যাকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না।” (৪২:৪৭) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এক ব্যক্তি চাইলো সংঘটিত হোক শাস্তি যা অবধারিত কাফিরদের জন্যে, এটা প্রতিরোধ করার কেউ নেই।” (৭০:১-২) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেই দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ হয়ে যাও, তখন হয়ে যাবে। তারই কথা সত্য, রাজত্ব তাঁরই, যেই দিন শিঙ্গায় ফুস্কার দেয়া হবে, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি বিজ্ঞানময়, সম্যক অবগত।” (৬:৭৩) কিয়ামত সংঘটনে কোন সন্দেহ নেই, বরং এটা চরম সত্য, এটা অবশ্যই সংঘটিত হবে।(আরবী) 'শব্দটি (আরবী) যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দ দুটি মাসদার। এটা কাউকেও করবে নীচ, কাউকেও করবে সমুন্নত। ঐদিন বহু লোক নীচতম ও হীনতম হয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে যারা দুনিয়ায় সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিল। পক্ষান্তরে বহু লোক সেদিন সমুন্নত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিও তারা দুনিয়ায় নিম্নশ্রেণীর লোক ছিল এবং মর্যাদার অধিকারী ছিল না। সেই দিন আল্লাহর শত্রুরা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ অবস্থায় জাহান্নামে চলে যাবে। আর তাঁর বন্ধু ও ভক্তরা সম্মানিত অবস্থায় জান্নাতে চলে যাবে। ঐদিন অহংকারীরা হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং বিনয়ীরা হবে সম্মানিত। এই কিয়ামত নিকটের ও দূরের লোকদেরকে সতর্ক করে দিবে। এটা নীচু হবে এবং নিকটের লোকদেরকে শুনিয়ে দিবে। তারপর উঁচু হবে এবং দূরের লোকদেরকে শুনাবে। পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং হেলা দোলা শুরু করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে।" (৯৯:১) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে, কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।” (২২:১)। এরপর বলেনঃ পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।" (৭৩:১৪) আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ফলে ওটা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলি-কণায়।(আরবী) ঐ অগ্নিস্ফুলিঙ্গকেও বলা হয় যেগুলো আগুন জ্বালাবার সময় পতঙ্গের মত উড়তে থাকে এবং উড়তে উড়তে নীচে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়, কিছুই থাকে না।(আরবী) ঐ জিনিসকে বলা হয় যাকে বাতাস উপরে তোলে নেয় এবং ছড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেমন শুষ্ক পাতার গুঁড়াকে বাতাস এদিক-ওদিক করে দেয়। এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, পাহাড় স্বীয় জায়গা হতে সরে পড়বে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে। একটি দল আরশের ডান দিকে হবে। তারা হবে ঐসব লোক যারা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান পার্শ্বদেশ হতে বের হয়েছিল এবং যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাদেরকে ডান দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা হবে জান্নাতীদের সাধারণ দল। দ্বিতীয় দলটি আরশের বাম দিকে হবে। এরা হবে ঐসব লোক যাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পার্শ্বদেশ হতে বের করা হয়েছিল। এদের বাম হাতে। আমলনামা দেয়া হবে এবং এদেরকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এরা সব জাহান্নামী। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে রক্ষা করুন!তৃতীয় দলটি মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হবেন। তারা হবেন বিশিষ্ট ল। তারা আসহাবুল ইয়ামীনের চেয়েও বেশী মর্যাদাবান ও নৈকট্য লাভকারী ।। ভরা হবেন জান্নাতবাসীদের নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবী, রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণ। ডান দিকের লোকদের চেয়ে তারা সংখ্যায় কম হবেন। সুতরাং হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ এই তিন শ্রেণীরই থাকবে, যেমন এই সূরার শেষে সংক্ষিপ্তভাবে তাদের এই তিনটি ভাগই করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২) সুতরাং এখানেও তিন শ্রেণী রয়েছে। এটা ঐ সময়, যখন (আরবী)-এর ঐ তাফসীর নেয়া হবে যা এটা অনুযায়ী হয়, অন্যথায় অন্য একটি উক্তি রয়েছে যা এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনও এটাই বলেছেন। দু'টি দল তো জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হবে” (৮১৪৭) বিভিন্ন প্রকারের অর্থাৎ প্রত্যেক আমলের আমলকারীর একটি দল হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা বিভক্ত হবে তিন শ্রেণীতে। ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী, তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) আয়াতগুলো পাঠ করেন, অতঃপর তার হস্তদ্বয়ের মুষ্টি বন্ধ করেন এবং বলেনঃ এগুলো জান্নাতী এবং আমি কোন পরোয়া করি না, আর এগুলো জাহান্নামী এবং আমার কোন পরোয়া নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ার দিকে সর্বপ্রথম কোন্ লোকগুলো যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তর দেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বললেনঃ “তারা হলো ঐ লোক যে, যখন তাদেরকে তাদের হক প্রদান করা হয় তখন তারা তা কবুল করে, তাদের উপর অন্যের হক থাকলে তা চাওয়া মাত্রই দিয়ে দেয় এবং তারা লোকদেরকে ঐ হুকুম করে যে হুকুম তাদের নিজেদেরকে করে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)সাবেকুন বা অগ্রবর্তী তোক কারা এ ব্যাপারে বহু উক্তি রয়েছে। যেমন নবীগণ, ইল্লীঈনবাসীগণ, হয়রত ইউশা ইবনে নুন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন, ঐ মুমিনরা যাদের বর্ণনা সরায়ে ইয়াসীনে। রয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর প্রথমে ঈমান এনেছিলেন, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি অগ্রগামী ছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা দুই কিবলামুখী হয়ে নামায পড়েছেন, প্রত্যেক উম্মতের ঐ লোকগুলো যারা নিজ নিজ নবীর উপর পূর্বে ঈমান এনেছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা সর্বাগ্রে জিহাদে গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এই উক্তিগুলো সবই সঠিক অর্থাৎ এই লোকগুলোই অগ্রবর্তী। যারা আগে বেড়ে গিয়ে অন্যদের উপর অগ্রবর্তী হয়ে আল্লাহ তা'আলার ফরমান কবুল করে থাকেন তারা সবাই সাবেকুনের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়।” (৩:১৩৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে অগ্রগামী হও এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রস্থ বা বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মত।” (৫৭:২১) সুতরাং এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি পুণ্যের কাজে অগ্রগামী হবে, সে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের দিকেও অগ্রবর্তীই থাকবে। প্রত্যেক আমলের প্রতিদান ঐ শ্রেণীরই হয়ে থাকে। যেমন সে আমল করে তেমনই সে ফল পায়। এ জন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত, তারাই থাকবে সুখদ উদ্যানে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আদম সন্তানের জন্যে আপনি দুনিয়া বানিয়েছেন, সেখানে তারা পানাহার করে থাকে এবং বিয়ে-শাদী করে থাকে। সুতরাং আখিরাত আপনি আমাদের জন্যেই করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আমি এরূপ করবে না।” ফেরেশতারা তিনবার প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে কখনো তাদের মত করবে না যাদেরকে আমি শুধু (আরবী) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছি।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম রাযীও (রঃ) তার কিতাবুররাদ্দে আলাল জাহমিয়্যাহ’ নামক কিতাবে এই আসারটি আনয়ন করেছেন। এর শব্দগুলো হলোঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যাকে আমি আমার নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তার সৎ সন্তানদেরকে ওর মত করবে না যাকে আমি বলেছিঃ হয়ে যাও’ তখন হয়ে গেছে”)

আল-ওয়াকিয়া 56:3

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আমাকে সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ওয়াকিআহ, সূরায়ে মুরসালাত, সূরায়ে আম্মা ইয়াতাসাআলুন এবং সূরায়ে ইশ শামসু কুওভিরাত বৃদ্ধ করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু যাবিরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ রোগাক্রান্ত হন, যে রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর ঐ রোগের সময় হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার অভিযোগ কি?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমার পাপরাশি।” হযরত উসমান আবার প্রশ্ন করেনঃ “আপনার আকাক্ষা কি?" তিনি জবাব দেনঃ “আমার প্রতিপালকের রহমত।” হযরত উসমান (রাঃ) প্রশ্ন করেনঃ “কোন ডাক্তারকে পাঠিয়ে দেবো কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ডাক্তারই তো আমাকে রোগাক্রান্ত করেছেন?” হযরত উসমান (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার জন্যে কিছু মাল পাঠাবার নির্দেশ দিবো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমার মালের কোন প্রয়োজন নেই।” হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “আপনার পরে আপনার সন্তানদের কাজে লাগবে?” তিনি বললেনঃ “আমার সন্তানরা দরিদ্র হয়ে পড়বে আপনি এ আশংকা করেন? তাহলে জেনে রাখুন যে, আমি আমার সন্তানদেরকে প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠের নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠ করবে সে কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না বা না খেয়ে থাকবে না।” (এ হাদীসটি ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবূ যাবিয়াহ (রাঃ) কখনো এ সূরাটি রাত্রে পাঠ ছাড়তেন না। হযরত সাম্মাক ইবনে হারব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা আজ যেভাবে তোমাদের নামায পড়ছে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) এভাবেই নামায পড়তেন। তবে তোমাদের নামাযের চেয়ে তাঁর নামায তিনি হালকা করতেন। তিনি ফজরের নামাযে সূরায়ে ওয়াকিআহ এবং এ ধরনের সূরাগুলো তিলাওয়াত করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) ১-১২ নং আয়াতের তাফসীর: ওয়াকিয়াহ কিয়ামতের নাম। কেননা, এটা সংঘটিত হওয়া সুনিশ্চিত। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (৬৯:১৫) এটার সংঘটন অবশ্যম্ভাবী। না এটাকে কেউ টলাতে পারে, না কেউ হটাতে পারে। এটা নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত হবেই। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দাও ঐ দিন আসার পূর্বে যাকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না।” (৪২:৪৭) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এক ব্যক্তি চাইলো সংঘটিত হোক শাস্তি যা অবধারিত কাফিরদের জন্যে, এটা প্রতিরোধ করার কেউ নেই।” (৭০:১-২) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেই দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ হয়ে যাও, তখন হয়ে যাবে। তারই কথা সত্য, রাজত্ব তাঁরই, যেই দিন শিঙ্গায় ফুস্কার দেয়া হবে, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি বিজ্ঞানময়, সম্যক অবগত।” (৬:৭৩) কিয়ামত সংঘটনে কোন সন্দেহ নেই, বরং এটা চরম সত্য, এটা অবশ্যই সংঘটিত হবে।(আরবী) 'শব্দটি (আরবী) যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দ দুটি মাসদার। এটা কাউকেও করবে নীচ, কাউকেও করবে সমুন্নত। ঐদিন বহু লোক নীচতম ও হীনতম হয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে যারা দুনিয়ায় সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিল। পক্ষান্তরে বহু লোক সেদিন সমুন্নত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিও তারা দুনিয়ায় নিম্নশ্রেণীর লোক ছিল এবং মর্যাদার অধিকারী ছিল না। সেই দিন আল্লাহর শত্রুরা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ অবস্থায় জাহান্নামে চলে যাবে। আর তাঁর বন্ধু ও ভক্তরা সম্মানিত অবস্থায় জান্নাতে চলে যাবে। ঐদিন অহংকারীরা হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং বিনয়ীরা হবে সম্মানিত। এই কিয়ামত নিকটের ও দূরের লোকদেরকে সতর্ক করে দিবে। এটা নীচু হবে এবং নিকটের লোকদেরকে শুনিয়ে দিবে। তারপর উঁচু হবে এবং দূরের লোকদেরকে শুনাবে। পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং হেলা দোলা শুরু করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে।" (৯৯:১) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে, কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।” (২২:১)। এরপর বলেনঃ পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।" (৭৩:১৪) আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ফলে ওটা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলি-কণায়।(আরবী) ঐ অগ্নিস্ফুলিঙ্গকেও বলা হয় যেগুলো আগুন জ্বালাবার সময় পতঙ্গের মত উড়তে থাকে এবং উড়তে উড়তে নীচে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়, কিছুই থাকে না।(আরবী) ঐ জিনিসকে বলা হয় যাকে বাতাস উপরে তোলে নেয় এবং ছড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেমন শুষ্ক পাতার গুঁড়াকে বাতাস এদিক-ওদিক করে দেয়। এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, পাহাড় স্বীয় জায়গা হতে সরে পড়বে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে। একটি দল আরশের ডান দিকে হবে। তারা হবে ঐসব লোক যারা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান পার্শ্বদেশ হতে বের হয়েছিল এবং যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাদেরকে ডান দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা হবে জান্নাতীদের সাধারণ দল। দ্বিতীয় দলটি আরশের বাম দিকে হবে। এরা হবে ঐসব লোক যাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পার্শ্বদেশ হতে বের করা হয়েছিল। এদের বাম হাতে। আমলনামা দেয়া হবে এবং এদেরকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এরা সব জাহান্নামী। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে রক্ষা করুন!তৃতীয় দলটি মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হবেন। তারা হবেন বিশিষ্ট ল। তারা আসহাবুল ইয়ামীনের চেয়েও বেশী মর্যাদাবান ও নৈকট্য লাভকারী ।। ভরা হবেন জান্নাতবাসীদের নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবী, রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণ। ডান দিকের লোকদের চেয়ে তারা সংখ্যায় কম হবেন। সুতরাং হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ এই তিন শ্রেণীরই থাকবে, যেমন এই সূরার শেষে সংক্ষিপ্তভাবে তাদের এই তিনটি ভাগই করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২) সুতরাং এখানেও তিন শ্রেণী রয়েছে। এটা ঐ সময়, যখন (আরবী)-এর ঐ তাফসীর নেয়া হবে যা এটা অনুযায়ী হয়, অন্যথায় অন্য একটি উক্তি রয়েছে যা এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনও এটাই বলেছেন। দু'টি দল তো জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হবে” (৮১৪৭) বিভিন্ন প্রকারের অর্থাৎ প্রত্যেক আমলের আমলকারীর একটি দল হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা বিভক্ত হবে তিন শ্রেণীতে। ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী, তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) আয়াতগুলো পাঠ করেন, অতঃপর তার হস্তদ্বয়ের মুষ্টি বন্ধ করেন এবং বলেনঃ এগুলো জান্নাতী এবং আমি কোন পরোয়া করি না, আর এগুলো জাহান্নামী এবং আমার কোন পরোয়া নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ার দিকে সর্বপ্রথম কোন্ লোকগুলো যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তর দেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বললেনঃ “তারা হলো ঐ লোক যে, যখন তাদেরকে তাদের হক প্রদান করা হয় তখন তারা তা কবুল করে, তাদের উপর অন্যের হক থাকলে তা চাওয়া মাত্রই দিয়ে দেয় এবং তারা লোকদেরকে ঐ হুকুম করে যে হুকুম তাদের নিজেদেরকে করে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)সাবেকুন বা অগ্রবর্তী তোক কারা এ ব্যাপারে বহু উক্তি রয়েছে। যেমন নবীগণ, ইল্লীঈনবাসীগণ, হয়রত ইউশা ইবনে নুন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন, ঐ মুমিনরা যাদের বর্ণনা সরায়ে ইয়াসীনে। রয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর প্রথমে ঈমান এনেছিলেন, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি অগ্রগামী ছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা দুই কিবলামুখী হয়ে নামায পড়েছেন, প্রত্যেক উম্মতের ঐ লোকগুলো যারা নিজ নিজ নবীর উপর পূর্বে ঈমান এনেছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা সর্বাগ্রে জিহাদে গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এই উক্তিগুলো সবই সঠিক অর্থাৎ এই লোকগুলোই অগ্রবর্তী। যারা আগে বেড়ে গিয়ে অন্যদের উপর অগ্রবর্তী হয়ে আল্লাহ তা'আলার ফরমান কবুল করে থাকেন তারা সবাই সাবেকুনের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়।” (৩:১৩৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে অগ্রগামী হও এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রস্থ বা বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মত।” (৫৭:২১) সুতরাং এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি পুণ্যের কাজে অগ্রগামী হবে, সে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের দিকেও অগ্রবর্তীই থাকবে। প্রত্যেক আমলের প্রতিদান ঐ শ্রেণীরই হয়ে থাকে। যেমন সে আমল করে তেমনই সে ফল পায়। এ জন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত, তারাই থাকবে সুখদ উদ্যানে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আদম সন্তানের জন্যে আপনি দুনিয়া বানিয়েছেন, সেখানে তারা পানাহার করে থাকে এবং বিয়ে-শাদী করে থাকে। সুতরাং আখিরাত আপনি আমাদের জন্যেই করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আমি এরূপ করবে না।” ফেরেশতারা তিনবার প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে কখনো তাদের মত করবে না যাদেরকে আমি শুধু (আরবী) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছি।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম রাযীও (রঃ) তার কিতাবুররাদ্দে আলাল জাহমিয়্যাহ’ নামক কিতাবে এই আসারটি আনয়ন করেছেন। এর শব্দগুলো হলোঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যাকে আমি আমার নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তার সৎ সন্তানদেরকে ওর মত করবে না যাকে আমি বলেছিঃ হয়ে যাও’ তখন হয়ে গেছে”)

আল-ওয়াকিয়া 56:4

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আমাকে সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ওয়াকিআহ, সূরায়ে মুরসালাত, সূরায়ে আম্মা ইয়াতাসাআলুন এবং সূরায়ে ইশ শামসু কুওভিরাত বৃদ্ধ করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু যাবিরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ রোগাক্রান্ত হন, যে রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর ঐ রোগের সময় হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার অভিযোগ কি?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমার পাপরাশি।” হযরত উসমান আবার প্রশ্ন করেনঃ “আপনার আকাক্ষা কি?" তিনি জবাব দেনঃ “আমার প্রতিপালকের রহমত।” হযরত উসমান (রাঃ) প্রশ্ন করেনঃ “কোন ডাক্তারকে পাঠিয়ে দেবো কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ডাক্তারই তো আমাকে রোগাক্রান্ত করেছেন?” হযরত উসমান (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার জন্যে কিছু মাল পাঠাবার নির্দেশ দিবো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমার মালের কোন প্রয়োজন নেই।” হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “আপনার পরে আপনার সন্তানদের কাজে লাগবে?” তিনি বললেনঃ “আমার সন্তানরা দরিদ্র হয়ে পড়বে আপনি এ আশংকা করেন? তাহলে জেনে রাখুন যে, আমি আমার সন্তানদেরকে প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠের নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠ করবে সে কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না বা না খেয়ে থাকবে না।” (এ হাদীসটি ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবূ যাবিয়াহ (রাঃ) কখনো এ সূরাটি রাত্রে পাঠ ছাড়তেন না। হযরত সাম্মাক ইবনে হারব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা আজ যেভাবে তোমাদের নামায পড়ছে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) এভাবেই নামায পড়তেন। তবে তোমাদের নামাযের চেয়ে তাঁর নামায তিনি হালকা করতেন। তিনি ফজরের নামাযে সূরায়ে ওয়াকিআহ এবং এ ধরনের সূরাগুলো তিলাওয়াত করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) ১-১২ নং আয়াতের তাফসীর: ওয়াকিয়াহ কিয়ামতের নাম। কেননা, এটা সংঘটিত হওয়া সুনিশ্চিত। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (৬৯:১৫) এটার সংঘটন অবশ্যম্ভাবী। না এটাকে কেউ টলাতে পারে, না কেউ হটাতে পারে। এটা নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত হবেই। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দাও ঐ দিন আসার পূর্বে যাকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না।” (৪২:৪৭) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এক ব্যক্তি চাইলো সংঘটিত হোক শাস্তি যা অবধারিত কাফিরদের জন্যে, এটা প্রতিরোধ করার কেউ নেই।” (৭০:১-২) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেই দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ হয়ে যাও, তখন হয়ে যাবে। তারই কথা সত্য, রাজত্ব তাঁরই, যেই দিন শিঙ্গায় ফুস্কার দেয়া হবে, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি বিজ্ঞানময়, সম্যক অবগত।” (৬:৭৩) কিয়ামত সংঘটনে কোন সন্দেহ নেই, বরং এটা চরম সত্য, এটা অবশ্যই সংঘটিত হবে।(আরবী) 'শব্দটি (আরবী) যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দ দুটি মাসদার। এটা কাউকেও করবে নীচ, কাউকেও করবে সমুন্নত। ঐদিন বহু লোক নীচতম ও হীনতম হয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে যারা দুনিয়ায় সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিল। পক্ষান্তরে বহু লোক সেদিন সমুন্নত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিও তারা দুনিয়ায় নিম্নশ্রেণীর লোক ছিল এবং মর্যাদার অধিকারী ছিল না। সেই দিন আল্লাহর শত্রুরা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ অবস্থায় জাহান্নামে চলে যাবে। আর তাঁর বন্ধু ও ভক্তরা সম্মানিত অবস্থায় জান্নাতে চলে যাবে। ঐদিন অহংকারীরা হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং বিনয়ীরা হবে সম্মানিত। এই কিয়ামত নিকটের ও দূরের লোকদেরকে সতর্ক করে দিবে। এটা নীচু হবে এবং নিকটের লোকদেরকে শুনিয়ে দিবে। তারপর উঁচু হবে এবং দূরের লোকদেরকে শুনাবে। পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং হেলা দোলা শুরু করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে।" (৯৯:১) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে, কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।” (২২:১)। এরপর বলেনঃ পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।" (৭৩:১৪) আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ফলে ওটা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলি-কণায়।(আরবী) ঐ অগ্নিস্ফুলিঙ্গকেও বলা হয় যেগুলো আগুন জ্বালাবার সময় পতঙ্গের মত উড়তে থাকে এবং উড়তে উড়তে নীচে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়, কিছুই থাকে না।(আরবী) ঐ জিনিসকে বলা হয় যাকে বাতাস উপরে তোলে নেয় এবং ছড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেমন শুষ্ক পাতার গুঁড়াকে বাতাস এদিক-ওদিক করে দেয়। এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, পাহাড় স্বীয় জায়গা হতে সরে পড়বে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে। একটি দল আরশের ডান দিকে হবে। তারা হবে ঐসব লোক যারা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান পার্শ্বদেশ হতে বের হয়েছিল এবং যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাদেরকে ডান দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা হবে জান্নাতীদের সাধারণ দল। দ্বিতীয় দলটি আরশের বাম দিকে হবে। এরা হবে ঐসব লোক যাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পার্শ্বদেশ হতে বের করা হয়েছিল। এদের বাম হাতে। আমলনামা দেয়া হবে এবং এদেরকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এরা সব জাহান্নামী। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে রক্ষা করুন!তৃতীয় দলটি মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হবেন। তারা হবেন বিশিষ্ট ল। তারা আসহাবুল ইয়ামীনের চেয়েও বেশী মর্যাদাবান ও নৈকট্য লাভকারী ।। ভরা হবেন জান্নাতবাসীদের নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবী, রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণ। ডান দিকের লোকদের চেয়ে তারা সংখ্যায় কম হবেন। সুতরাং হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ এই তিন শ্রেণীরই থাকবে, যেমন এই সূরার শেষে সংক্ষিপ্তভাবে তাদের এই তিনটি ভাগই করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২) সুতরাং এখানেও তিন শ্রেণী রয়েছে। এটা ঐ সময়, যখন (আরবী)-এর ঐ তাফসীর নেয়া হবে যা এটা অনুযায়ী হয়, অন্যথায় অন্য একটি উক্তি রয়েছে যা এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনও এটাই বলেছেন। দু'টি দল তো জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হবে” (৮১৪৭) বিভিন্ন প্রকারের অর্থাৎ প্রত্যেক আমলের আমলকারীর একটি দল হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা বিভক্ত হবে তিন শ্রেণীতে। ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী, তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) আয়াতগুলো পাঠ করেন, অতঃপর তার হস্তদ্বয়ের মুষ্টি বন্ধ করেন এবং বলেনঃ এগুলো জান্নাতী এবং আমি কোন পরোয়া করি না, আর এগুলো জাহান্নামী এবং আমার কোন পরোয়া নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ার দিকে সর্বপ্রথম কোন্ লোকগুলো যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তর দেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বললেনঃ “তারা হলো ঐ লোক যে, যখন তাদেরকে তাদের হক প্রদান করা হয় তখন তারা তা কবুল করে, তাদের উপর অন্যের হক থাকলে তা চাওয়া মাত্রই দিয়ে দেয় এবং তারা লোকদেরকে ঐ হুকুম করে যে হুকুম তাদের নিজেদেরকে করে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)সাবেকুন বা অগ্রবর্তী তোক কারা এ ব্যাপারে বহু উক্তি রয়েছে। যেমন নবীগণ, ইল্লীঈনবাসীগণ, হয়রত ইউশা ইবনে নুন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন, ঐ মুমিনরা যাদের বর্ণনা সরায়ে ইয়াসীনে। রয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর প্রথমে ঈমান এনেছিলেন, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি অগ্রগামী ছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা দুই কিবলামুখী হয়ে নামায পড়েছেন, প্রত্যেক উম্মতের ঐ লোকগুলো যারা নিজ নিজ নবীর উপর পূর্বে ঈমান এনেছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা সর্বাগ্রে জিহাদে গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এই উক্তিগুলো সবই সঠিক অর্থাৎ এই লোকগুলোই অগ্রবর্তী। যারা আগে বেড়ে গিয়ে অন্যদের উপর অগ্রবর্তী হয়ে আল্লাহ তা'আলার ফরমান কবুল করে থাকেন তারা সবাই সাবেকুনের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়।” (৩:১৩৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে অগ্রগামী হও এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রস্থ বা বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মত।” (৫৭:২১) সুতরাং এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি পুণ্যের কাজে অগ্রগামী হবে, সে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের দিকেও অগ্রবর্তীই থাকবে। প্রত্যেক আমলের প্রতিদান ঐ শ্রেণীরই হয়ে থাকে। যেমন সে আমল করে তেমনই সে ফল পায়। এ জন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত, তারাই থাকবে সুখদ উদ্যানে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আদম সন্তানের জন্যে আপনি দুনিয়া বানিয়েছেন, সেখানে তারা পানাহার করে থাকে এবং বিয়ে-শাদী করে থাকে। সুতরাং আখিরাত আপনি আমাদের জন্যেই করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আমি এরূপ করবে না।” ফেরেশতারা তিনবার প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে কখনো তাদের মত করবে না যাদেরকে আমি শুধু (আরবী) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছি।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম রাযীও (রঃ) তার কিতাবুররাদ্দে আলাল জাহমিয়্যাহ’ নামক কিতাবে এই আসারটি আনয়ন করেছেন। এর শব্দগুলো হলোঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যাকে আমি আমার নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তার সৎ সন্তানদেরকে ওর মত করবে না যাকে আমি বলেছিঃ হয়ে যাও’ তখন হয়ে গেছে”)

আল-ওয়াকিয়া 56:5

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আমাকে সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ওয়াকিআহ, সূরায়ে মুরসালাত, সূরায়ে আম্মা ইয়াতাসাআলুন এবং সূরায়ে ইশ শামসু কুওভিরাত বৃদ্ধ করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু যাবিরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ রোগাক্রান্ত হন, যে রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর ঐ রোগের সময় হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার অভিযোগ কি?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমার পাপরাশি।” হযরত উসমান আবার প্রশ্ন করেনঃ “আপনার আকাক্ষা কি?" তিনি জবাব দেনঃ “আমার প্রতিপালকের রহমত।” হযরত উসমান (রাঃ) প্রশ্ন করেনঃ “কোন ডাক্তারকে পাঠিয়ে দেবো কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ডাক্তারই তো আমাকে রোগাক্রান্ত করেছেন?” হযরত উসমান (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার জন্যে কিছু মাল পাঠাবার নির্দেশ দিবো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমার মালের কোন প্রয়োজন নেই।” হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “আপনার পরে আপনার সন্তানদের কাজে লাগবে?” তিনি বললেনঃ “আমার সন্তানরা দরিদ্র হয়ে পড়বে আপনি এ আশংকা করেন? তাহলে জেনে রাখুন যে, আমি আমার সন্তানদেরকে প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠের নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠ করবে সে কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না বা না খেয়ে থাকবে না।” (এ হাদীসটি ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবূ যাবিয়াহ (রাঃ) কখনো এ সূরাটি রাত্রে পাঠ ছাড়তেন না। হযরত সাম্মাক ইবনে হারব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা আজ যেভাবে তোমাদের নামায পড়ছে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) এভাবেই নামায পড়তেন। তবে তোমাদের নামাযের চেয়ে তাঁর নামায তিনি হালকা করতেন। তিনি ফজরের নামাযে সূরায়ে ওয়াকিআহ এবং এ ধরনের সূরাগুলো তিলাওয়াত করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) ১-১২ নং আয়াতের তাফসীর: ওয়াকিয়াহ কিয়ামতের নাম। কেননা, এটা সংঘটিত হওয়া সুনিশ্চিত। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (৬৯:১৫) এটার সংঘটন অবশ্যম্ভাবী। না এটাকে কেউ টলাতে পারে, না কেউ হটাতে পারে। এটা নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত হবেই। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দাও ঐ দিন আসার পূর্বে যাকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না।” (৪২:৪৭) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এক ব্যক্তি চাইলো সংঘটিত হোক শাস্তি যা অবধারিত কাফিরদের জন্যে, এটা প্রতিরোধ করার কেউ নেই।” (৭০:১-২) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেই দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ হয়ে যাও, তখন হয়ে যাবে। তারই কথা সত্য, রাজত্ব তাঁরই, যেই দিন শিঙ্গায় ফুস্কার দেয়া হবে, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি বিজ্ঞানময়, সম্যক অবগত।” (৬:৭৩) কিয়ামত সংঘটনে কোন সন্দেহ নেই, বরং এটা চরম সত্য, এটা অবশ্যই সংঘটিত হবে।(আরবী) 'শব্দটি (আরবী) যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দ দুটি মাসদার। এটা কাউকেও করবে নীচ, কাউকেও করবে সমুন্নত। ঐদিন বহু লোক নীচতম ও হীনতম হয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে যারা দুনিয়ায় সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিল। পক্ষান্তরে বহু লোক সেদিন সমুন্নত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিও তারা দুনিয়ায় নিম্নশ্রেণীর লোক ছিল এবং মর্যাদার অধিকারী ছিল না। সেই দিন আল্লাহর শত্রুরা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ অবস্থায় জাহান্নামে চলে যাবে। আর তাঁর বন্ধু ও ভক্তরা সম্মানিত অবস্থায় জান্নাতে চলে যাবে। ঐদিন অহংকারীরা হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং বিনয়ীরা হবে সম্মানিত। এই কিয়ামত নিকটের ও দূরের লোকদেরকে সতর্ক করে দিবে। এটা নীচু হবে এবং নিকটের লোকদেরকে শুনিয়ে দিবে। তারপর উঁচু হবে এবং দূরের লোকদেরকে শুনাবে। পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং হেলা দোলা শুরু করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে।" (৯৯:১) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে, কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।” (২২:১)। এরপর বলেনঃ পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।" (৭৩:১৪) আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ফলে ওটা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলি-কণায়।(আরবী) ঐ অগ্নিস্ফুলিঙ্গকেও বলা হয় যেগুলো আগুন জ্বালাবার সময় পতঙ্গের মত উড়তে থাকে এবং উড়তে উড়তে নীচে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়, কিছুই থাকে না।(আরবী) ঐ জিনিসকে বলা হয় যাকে বাতাস উপরে তোলে নেয় এবং ছড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেমন শুষ্ক পাতার গুঁড়াকে বাতাস এদিক-ওদিক করে দেয়। এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, পাহাড় স্বীয় জায়গা হতে সরে পড়বে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে। একটি দল আরশের ডান দিকে হবে। তারা হবে ঐসব লোক যারা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান পার্শ্বদেশ হতে বের হয়েছিল এবং যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাদেরকে ডান দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা হবে জান্নাতীদের সাধারণ দল। দ্বিতীয় দলটি আরশের বাম দিকে হবে। এরা হবে ঐসব লোক যাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পার্শ্বদেশ হতে বের করা হয়েছিল। এদের বাম হাতে। আমলনামা দেয়া হবে এবং এদেরকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এরা সব জাহান্নামী। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে রক্ষা করুন!তৃতীয় দলটি মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হবেন। তারা হবেন বিশিষ্ট ল। তারা আসহাবুল ইয়ামীনের চেয়েও বেশী মর্যাদাবান ও নৈকট্য লাভকারী ।। ভরা হবেন জান্নাতবাসীদের নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবী, রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণ। ডান দিকের লোকদের চেয়ে তারা সংখ্যায় কম হবেন। সুতরাং হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ এই তিন শ্রেণীরই থাকবে, যেমন এই সূরার শেষে সংক্ষিপ্তভাবে তাদের এই তিনটি ভাগই করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২) সুতরাং এখানেও তিন শ্রেণী রয়েছে। এটা ঐ সময়, যখন (আরবী)-এর ঐ তাফসীর নেয়া হবে যা এটা অনুযায়ী হয়, অন্যথায় অন্য একটি উক্তি রয়েছে যা এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনও এটাই বলেছেন। দু'টি দল তো জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হবে” (৮১৪৭) বিভিন্ন প্রকারের অর্থাৎ প্রত্যেক আমলের আমলকারীর একটি দল হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা বিভক্ত হবে তিন শ্রেণীতে। ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী, তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) আয়াতগুলো পাঠ করেন, অতঃপর তার হস্তদ্বয়ের মুষ্টি বন্ধ করেন এবং বলেনঃ এগুলো জান্নাতী এবং আমি কোন পরোয়া করি না, আর এগুলো জাহান্নামী এবং আমার কোন পরোয়া নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ার দিকে সর্বপ্রথম কোন্ লোকগুলো যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তর দেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বললেনঃ “তারা হলো ঐ লোক যে, যখন তাদেরকে তাদের হক প্রদান করা হয় তখন তারা তা কবুল করে, তাদের উপর অন্যের হক থাকলে তা চাওয়া মাত্রই দিয়ে দেয় এবং তারা লোকদেরকে ঐ হুকুম করে যে হুকুম তাদের নিজেদেরকে করে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)সাবেকুন বা অগ্রবর্তী তোক কারা এ ব্যাপারে বহু উক্তি রয়েছে। যেমন নবীগণ, ইল্লীঈনবাসীগণ, হয়রত ইউশা ইবনে নুন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন, ঐ মুমিনরা যাদের বর্ণনা সরায়ে ইয়াসীনে। রয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর প্রথমে ঈমান এনেছিলেন, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি অগ্রগামী ছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা দুই কিবলামুখী হয়ে নামায পড়েছেন, প্রত্যেক উম্মতের ঐ লোকগুলো যারা নিজ নিজ নবীর উপর পূর্বে ঈমান এনেছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা সর্বাগ্রে জিহাদে গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এই উক্তিগুলো সবই সঠিক অর্থাৎ এই লোকগুলোই অগ্রবর্তী। যারা আগে বেড়ে গিয়ে অন্যদের উপর অগ্রবর্তী হয়ে আল্লাহ তা'আলার ফরমান কবুল করে থাকেন তারা সবাই সাবেকুনের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়।” (৩:১৩৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে অগ্রগামী হও এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রস্থ বা বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মত।” (৫৭:২১) সুতরাং এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি পুণ্যের কাজে অগ্রগামী হবে, সে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের দিকেও অগ্রবর্তীই থাকবে। প্রত্যেক আমলের প্রতিদান ঐ শ্রেণীরই হয়ে থাকে। যেমন সে আমল করে তেমনই সে ফল পায়। এ জন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত, তারাই থাকবে সুখদ উদ্যানে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আদম সন্তানের জন্যে আপনি দুনিয়া বানিয়েছেন, সেখানে তারা পানাহার করে থাকে এবং বিয়ে-শাদী করে থাকে। সুতরাং আখিরাত আপনি আমাদের জন্যেই করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আমি এরূপ করবে না।” ফেরেশতারা তিনবার প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে কখনো তাদের মত করবে না যাদেরকে আমি শুধু (আরবী) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছি।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম রাযীও (রঃ) তার কিতাবুররাদ্দে আলাল জাহমিয়্যাহ’ নামক কিতাবে এই আসারটি আনয়ন করেছেন। এর শব্দগুলো হলোঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যাকে আমি আমার নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তার সৎ সন্তানদেরকে ওর মত করবে না যাকে আমি বলেছিঃ হয়ে যাও’ তখন হয়ে গেছে”)

আল-ওয়াকিয়া 56:6

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আমাকে সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ওয়াকিআহ, সূরায়ে মুরসালাত, সূরায়ে আম্মা ইয়াতাসাআলুন এবং সূরায়ে ইশ শামসু কুওভিরাত বৃদ্ধ করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু যাবিরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ রোগাক্রান্ত হন, যে রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর ঐ রোগের সময় হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার অভিযোগ কি?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমার পাপরাশি।” হযরত উসমান আবার প্রশ্ন করেনঃ “আপনার আকাক্ষা কি?" তিনি জবাব দেনঃ “আমার প্রতিপালকের রহমত।” হযরত উসমান (রাঃ) প্রশ্ন করেনঃ “কোন ডাক্তারকে পাঠিয়ে দেবো কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ডাক্তারই তো আমাকে রোগাক্রান্ত করেছেন?” হযরত উসমান (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার জন্যে কিছু মাল পাঠাবার নির্দেশ দিবো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমার মালের কোন প্রয়োজন নেই।” হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “আপনার পরে আপনার সন্তানদের কাজে লাগবে?” তিনি বললেনঃ “আমার সন্তানরা দরিদ্র হয়ে পড়বে আপনি এ আশংকা করেন? তাহলে জেনে রাখুন যে, আমি আমার সন্তানদেরকে প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠের নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠ করবে সে কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না বা না খেয়ে থাকবে না।” (এ হাদীসটি ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবূ যাবিয়াহ (রাঃ) কখনো এ সূরাটি রাত্রে পাঠ ছাড়তেন না। হযরত সাম্মাক ইবনে হারব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা আজ যেভাবে তোমাদের নামায পড়ছে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) এভাবেই নামায পড়তেন। তবে তোমাদের নামাযের চেয়ে তাঁর নামায তিনি হালকা করতেন। তিনি ফজরের নামাযে সূরায়ে ওয়াকিআহ এবং এ ধরনের সূরাগুলো তিলাওয়াত করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) ১-১২ নং আয়াতের তাফসীর: ওয়াকিয়াহ কিয়ামতের নাম। কেননা, এটা সংঘটিত হওয়া সুনিশ্চিত। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (৬৯:১৫) এটার সংঘটন অবশ্যম্ভাবী। না এটাকে কেউ টলাতে পারে, না কেউ হটাতে পারে। এটা নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত হবেই। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দাও ঐ দিন আসার পূর্বে যাকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না।” (৪২:৪৭) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এক ব্যক্তি চাইলো সংঘটিত হোক শাস্তি যা অবধারিত কাফিরদের জন্যে, এটা প্রতিরোধ করার কেউ নেই।” (৭০:১-২) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেই দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ হয়ে যাও, তখন হয়ে যাবে। তারই কথা সত্য, রাজত্ব তাঁরই, যেই দিন শিঙ্গায় ফুস্কার দেয়া হবে, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি বিজ্ঞানময়, সম্যক অবগত।” (৬:৭৩) কিয়ামত সংঘটনে কোন সন্দেহ নেই, বরং এটা চরম সত্য, এটা অবশ্যই সংঘটিত হবে।(আরবী) 'শব্দটি (আরবী) যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দ দুটি মাসদার। এটা কাউকেও করবে নীচ, কাউকেও করবে সমুন্নত। ঐদিন বহু লোক নীচতম ও হীনতম হয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে যারা দুনিয়ায় সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিল। পক্ষান্তরে বহু লোক সেদিন সমুন্নত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিও তারা দুনিয়ায় নিম্নশ্রেণীর লোক ছিল এবং মর্যাদার অধিকারী ছিল না। সেই দিন আল্লাহর শত্রুরা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ অবস্থায় জাহান্নামে চলে যাবে। আর তাঁর বন্ধু ও ভক্তরা সম্মানিত অবস্থায় জান্নাতে চলে যাবে। ঐদিন অহংকারীরা হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং বিনয়ীরা হবে সম্মানিত। এই কিয়ামত নিকটের ও দূরের লোকদেরকে সতর্ক করে দিবে। এটা নীচু হবে এবং নিকটের লোকদেরকে শুনিয়ে দিবে। তারপর উঁচু হবে এবং দূরের লোকদেরকে শুনাবে। পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং হেলা দোলা শুরু করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে।" (৯৯:১) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে, কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।” (২২:১)। এরপর বলেনঃ পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।" (৭৩:১৪) আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ফলে ওটা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলি-কণায়।(আরবী) ঐ অগ্নিস্ফুলিঙ্গকেও বলা হয় যেগুলো আগুন জ্বালাবার সময় পতঙ্গের মত উড়তে থাকে এবং উড়তে উড়তে নীচে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়, কিছুই থাকে না।(আরবী) ঐ জিনিসকে বলা হয় যাকে বাতাস উপরে তোলে নেয় এবং ছড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেমন শুষ্ক পাতার গুঁড়াকে বাতাস এদিক-ওদিক করে দেয়। এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, পাহাড় স্বীয় জায়গা হতে সরে পড়বে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে। একটি দল আরশের ডান দিকে হবে। তারা হবে ঐসব লোক যারা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান পার্শ্বদেশ হতে বের হয়েছিল এবং যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাদেরকে ডান দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা হবে জান্নাতীদের সাধারণ দল। দ্বিতীয় দলটি আরশের বাম দিকে হবে। এরা হবে ঐসব লোক যাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পার্শ্বদেশ হতে বের করা হয়েছিল। এদের বাম হাতে। আমলনামা দেয়া হবে এবং এদেরকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এরা সব জাহান্নামী। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে রক্ষা করুন!তৃতীয় দলটি মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হবেন। তারা হবেন বিশিষ্ট ল। তারা আসহাবুল ইয়ামীনের চেয়েও বেশী মর্যাদাবান ও নৈকট্য লাভকারী ।। ভরা হবেন জান্নাতবাসীদের নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবী, রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণ। ডান দিকের লোকদের চেয়ে তারা সংখ্যায় কম হবেন। সুতরাং হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ এই তিন শ্রেণীরই থাকবে, যেমন এই সূরার শেষে সংক্ষিপ্তভাবে তাদের এই তিনটি ভাগই করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২) সুতরাং এখানেও তিন শ্রেণী রয়েছে। এটা ঐ সময়, যখন (আরবী)-এর ঐ তাফসীর নেয়া হবে যা এটা অনুযায়ী হয়, অন্যথায় অন্য একটি উক্তি রয়েছে যা এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনও এটাই বলেছেন। দু'টি দল তো জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হবে” (৮১৪৭) বিভিন্ন প্রকারের অর্থাৎ প্রত্যেক আমলের আমলকারীর একটি দল হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা বিভক্ত হবে তিন শ্রেণীতে। ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী, তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) আয়াতগুলো পাঠ করেন, অতঃপর তার হস্তদ্বয়ের মুষ্টি বন্ধ করেন এবং বলেনঃ এগুলো জান্নাতী এবং আমি কোন পরোয়া করি না, আর এগুলো জাহান্নামী এবং আমার কোন পরোয়া নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ার দিকে সর্বপ্রথম কোন্ লোকগুলো যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তর দেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বললেনঃ “তারা হলো ঐ লোক যে, যখন তাদেরকে তাদের হক প্রদান করা হয় তখন তারা তা কবুল করে, তাদের উপর অন্যের হক থাকলে তা চাওয়া মাত্রই দিয়ে দেয় এবং তারা লোকদেরকে ঐ হুকুম করে যে হুকুম তাদের নিজেদেরকে করে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)সাবেকুন বা অগ্রবর্তী তোক কারা এ ব্যাপারে বহু উক্তি রয়েছে। যেমন নবীগণ, ইল্লীঈনবাসীগণ, হয়রত ইউশা ইবনে নুন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন, ঐ মুমিনরা যাদের বর্ণনা সরায়ে ইয়াসীনে। রয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর প্রথমে ঈমান এনেছিলেন, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি অগ্রগামী ছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা দুই কিবলামুখী হয়ে নামায পড়েছেন, প্রত্যেক উম্মতের ঐ লোকগুলো যারা নিজ নিজ নবীর উপর পূর্বে ঈমান এনেছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা সর্বাগ্রে জিহাদে গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এই উক্তিগুলো সবই সঠিক অর্থাৎ এই লোকগুলোই অগ্রবর্তী। যারা আগে বেড়ে গিয়ে অন্যদের উপর অগ্রবর্তী হয়ে আল্লাহ তা'আলার ফরমান কবুল করে থাকেন তারা সবাই সাবেকুনের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়।” (৩:১৩৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে অগ্রগামী হও এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রস্থ বা বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মত।” (৫৭:২১) সুতরাং এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি পুণ্যের কাজে অগ্রগামী হবে, সে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের দিকেও অগ্রবর্তীই থাকবে। প্রত্যেক আমলের প্রতিদান ঐ শ্রেণীরই হয়ে থাকে। যেমন সে আমল করে তেমনই সে ফল পায়। এ জন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত, তারাই থাকবে সুখদ উদ্যানে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আদম সন্তানের জন্যে আপনি দুনিয়া বানিয়েছেন, সেখানে তারা পানাহার করে থাকে এবং বিয়ে-শাদী করে থাকে। সুতরাং আখিরাত আপনি আমাদের জন্যেই করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আমি এরূপ করবে না।” ফেরেশতারা তিনবার প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে কখনো তাদের মত করবে না যাদেরকে আমি শুধু (আরবী) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছি।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম রাযীও (রঃ) তার কিতাবুররাদ্দে আলাল জাহমিয়্যাহ’ নামক কিতাবে এই আসারটি আনয়ন করেছেন। এর শব্দগুলো হলোঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যাকে আমি আমার নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তার সৎ সন্তানদেরকে ওর মত করবে না যাকে আমি বলেছিঃ হয়ে যাও’ তখন হয়ে গেছে”)

আল-ওয়াকিয়া 56:7

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আমাকে সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ওয়াকিআহ, সূরায়ে মুরসালাত, সূরায়ে আম্মা ইয়াতাসাআলুন এবং সূরায়ে ইশ শামসু কুওভিরাত বৃদ্ধ করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু যাবিরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ রোগাক্রান্ত হন, যে রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর ঐ রোগের সময় হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার অভিযোগ কি?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমার পাপরাশি।” হযরত উসমান আবার প্রশ্ন করেনঃ “আপনার আকাক্ষা কি?" তিনি জবাব দেনঃ “আমার প্রতিপালকের রহমত।” হযরত উসমান (রাঃ) প্রশ্ন করেনঃ “কোন ডাক্তারকে পাঠিয়ে দেবো কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ডাক্তারই তো আমাকে রোগাক্রান্ত করেছেন?” হযরত উসমান (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার জন্যে কিছু মাল পাঠাবার নির্দেশ দিবো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমার মালের কোন প্রয়োজন নেই।” হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “আপনার পরে আপনার সন্তানদের কাজে লাগবে?” তিনি বললেনঃ “আমার সন্তানরা দরিদ্র হয়ে পড়বে আপনি এ আশংকা করেন? তাহলে জেনে রাখুন যে, আমি আমার সন্তানদেরকে প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠের নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠ করবে সে কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না বা না খেয়ে থাকবে না।” (এ হাদীসটি ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবূ যাবিয়াহ (রাঃ) কখনো এ সূরাটি রাত্রে পাঠ ছাড়তেন না। হযরত সাম্মাক ইবনে হারব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা আজ যেভাবে তোমাদের নামায পড়ছে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) এভাবেই নামায পড়তেন। তবে তোমাদের নামাযের চেয়ে তাঁর নামায তিনি হালকা করতেন। তিনি ফজরের নামাযে সূরায়ে ওয়াকিআহ এবং এ ধরনের সূরাগুলো তিলাওয়াত করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) ১-১২ নং আয়াতের তাফসীর: ওয়াকিয়াহ কিয়ামতের নাম। কেননা, এটা সংঘটিত হওয়া সুনিশ্চিত। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (৬৯:১৫) এটার সংঘটন অবশ্যম্ভাবী। না এটাকে কেউ টলাতে পারে, না কেউ হটাতে পারে। এটা নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত হবেই। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দাও ঐ দিন আসার পূর্বে যাকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না।” (৪২:৪৭) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এক ব্যক্তি চাইলো সংঘটিত হোক শাস্তি যা অবধারিত কাফিরদের জন্যে, এটা প্রতিরোধ করার কেউ নেই।” (৭০:১-২) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেই দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ হয়ে যাও, তখন হয়ে যাবে। তারই কথা সত্য, রাজত্ব তাঁরই, যেই দিন শিঙ্গায় ফুস্কার দেয়া হবে, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি বিজ্ঞানময়, সম্যক অবগত।” (৬:৭৩) কিয়ামত সংঘটনে কোন সন্দেহ নেই, বরং এটা চরম সত্য, এটা অবশ্যই সংঘটিত হবে।(আরবী) 'শব্দটি (আরবী) যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দ দুটি মাসদার। এটা কাউকেও করবে নীচ, কাউকেও করবে সমুন্নত। ঐদিন বহু লোক নীচতম ও হীনতম হয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে যারা দুনিয়ায় সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিল। পক্ষান্তরে বহু লোক সেদিন সমুন্নত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিও তারা দুনিয়ায় নিম্নশ্রেণীর লোক ছিল এবং মর্যাদার অধিকারী ছিল না। সেই দিন আল্লাহর শত্রুরা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ অবস্থায় জাহান্নামে চলে যাবে। আর তাঁর বন্ধু ও ভক্তরা সম্মানিত অবস্থায় জান্নাতে চলে যাবে। ঐদিন অহংকারীরা হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং বিনয়ীরা হবে সম্মানিত। এই কিয়ামত নিকটের ও দূরের লোকদেরকে সতর্ক করে দিবে। এটা নীচু হবে এবং নিকটের লোকদেরকে শুনিয়ে দিবে। তারপর উঁচু হবে এবং দূরের লোকদেরকে শুনাবে। পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং হেলা দোলা শুরু করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে।" (৯৯:১) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে, কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।” (২২:১)। এরপর বলেনঃ পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।" (৭৩:১৪) আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ফলে ওটা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলি-কণায়।(আরবী) ঐ অগ্নিস্ফুলিঙ্গকেও বলা হয় যেগুলো আগুন জ্বালাবার সময় পতঙ্গের মত উড়তে থাকে এবং উড়তে উড়তে নীচে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়, কিছুই থাকে না।(আরবী) ঐ জিনিসকে বলা হয় যাকে বাতাস উপরে তোলে নেয় এবং ছড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেমন শুষ্ক পাতার গুঁড়াকে বাতাস এদিক-ওদিক করে দেয়। এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, পাহাড় স্বীয় জায়গা হতে সরে পড়বে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে। একটি দল আরশের ডান দিকে হবে। তারা হবে ঐসব লোক যারা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান পার্শ্বদেশ হতে বের হয়েছিল এবং যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাদেরকে ডান দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা হবে জান্নাতীদের সাধারণ দল। দ্বিতীয় দলটি আরশের বাম দিকে হবে। এরা হবে ঐসব লোক যাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পার্শ্বদেশ হতে বের করা হয়েছিল। এদের বাম হাতে। আমলনামা দেয়া হবে এবং এদেরকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এরা সব জাহান্নামী। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে রক্ষা করুন!তৃতীয় দলটি মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হবেন। তারা হবেন বিশিষ্ট ল। তারা আসহাবুল ইয়ামীনের চেয়েও বেশী মর্যাদাবান ও নৈকট্য লাভকারী ।। ভরা হবেন জান্নাতবাসীদের নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবী, রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণ। ডান দিকের লোকদের চেয়ে তারা সংখ্যায় কম হবেন। সুতরাং হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ এই তিন শ্রেণীরই থাকবে, যেমন এই সূরার শেষে সংক্ষিপ্তভাবে তাদের এই তিনটি ভাগই করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২) সুতরাং এখানেও তিন শ্রেণী রয়েছে। এটা ঐ সময়, যখন (আরবী)-এর ঐ তাফসীর নেয়া হবে যা এটা অনুযায়ী হয়, অন্যথায় অন্য একটি উক্তি রয়েছে যা এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনও এটাই বলেছেন। দু'টি দল তো জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হবে” (৮১৪৭) বিভিন্ন প্রকারের অর্থাৎ প্রত্যেক আমলের আমলকারীর একটি দল হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা বিভক্ত হবে তিন শ্রেণীতে। ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী, তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) আয়াতগুলো পাঠ করেন, অতঃপর তার হস্তদ্বয়ের মুষ্টি বন্ধ করেন এবং বলেনঃ এগুলো জান্নাতী এবং আমি কোন পরোয়া করি না, আর এগুলো জাহান্নামী এবং আমার কোন পরোয়া নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ার দিকে সর্বপ্রথম কোন্ লোকগুলো যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তর দেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বললেনঃ “তারা হলো ঐ লোক যে, যখন তাদেরকে তাদের হক প্রদান করা হয় তখন তারা তা কবুল করে, তাদের উপর অন্যের হক থাকলে তা চাওয়া মাত্রই দিয়ে দেয় এবং তারা লোকদেরকে ঐ হুকুম করে যে হুকুম তাদের নিজেদেরকে করে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)সাবেকুন বা অগ্রবর্তী তোক কারা এ ব্যাপারে বহু উক্তি রয়েছে। যেমন নবীগণ, ইল্লীঈনবাসীগণ, হয়রত ইউশা ইবনে নুন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন, ঐ মুমিনরা যাদের বর্ণনা সরায়ে ইয়াসীনে। রয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর প্রথমে ঈমান এনেছিলেন, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি অগ্রগামী ছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা দুই কিবলামুখী হয়ে নামায পড়েছেন, প্রত্যেক উম্মতের ঐ লোকগুলো যারা নিজ নিজ নবীর উপর পূর্বে ঈমান এনেছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা সর্বাগ্রে জিহাদে গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এই উক্তিগুলো সবই সঠিক অর্থাৎ এই লোকগুলোই অগ্রবর্তী। যারা আগে বেড়ে গিয়ে অন্যদের উপর অগ্রবর্তী হয়ে আল্লাহ তা'আলার ফরমান কবুল করে থাকেন তারা সবাই সাবেকুনের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়।” (৩:১৩৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে অগ্রগামী হও এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রস্থ বা বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মত।” (৫৭:২১) সুতরাং এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি পুণ্যের কাজে অগ্রগামী হবে, সে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের দিকেও অগ্রবর্তীই থাকবে। প্রত্যেক আমলের প্রতিদান ঐ শ্রেণীরই হয়ে থাকে। যেমন সে আমল করে তেমনই সে ফল পায়। এ জন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত, তারাই থাকবে সুখদ উদ্যানে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আদম সন্তানের জন্যে আপনি দুনিয়া বানিয়েছেন, সেখানে তারা পানাহার করে থাকে এবং বিয়ে-শাদী করে থাকে। সুতরাং আখিরাত আপনি আমাদের জন্যেই করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আমি এরূপ করবে না।” ফেরেশতারা তিনবার প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে কখনো তাদের মত করবে না যাদেরকে আমি শুধু (আরবী) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছি।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম রাযীও (রঃ) তার কিতাবুররাদ্দে আলাল জাহমিয়্যাহ’ নামক কিতাবে এই আসারটি আনয়ন করেছেন। এর শব্দগুলো হলোঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যাকে আমি আমার নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তার সৎ সন্তানদেরকে ওর মত করবে না যাকে আমি বলেছিঃ হয়ে যাও’ তখন হয়ে গেছে”)

আল-ওয়াকিয়া 56:8

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আমাকে সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ওয়াকিআহ, সূরায়ে মুরসালাত, সূরায়ে আম্মা ইয়াতাসাআলুন এবং সূরায়ে ইশ শামসু কুওভিরাত বৃদ্ধ করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু যাবিরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ রোগাক্রান্ত হন, যে রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর ঐ রোগের সময় হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার অভিযোগ কি?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমার পাপরাশি।” হযরত উসমান আবার প্রশ্ন করেনঃ “আপনার আকাক্ষা কি?" তিনি জবাব দেনঃ “আমার প্রতিপালকের রহমত।” হযরত উসমান (রাঃ) প্রশ্ন করেনঃ “কোন ডাক্তারকে পাঠিয়ে দেবো কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ডাক্তারই তো আমাকে রোগাক্রান্ত করেছেন?” হযরত উসমান (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার জন্যে কিছু মাল পাঠাবার নির্দেশ দিবো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমার মালের কোন প্রয়োজন নেই।” হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “আপনার পরে আপনার সন্তানদের কাজে লাগবে?” তিনি বললেনঃ “আমার সন্তানরা দরিদ্র হয়ে পড়বে আপনি এ আশংকা করেন? তাহলে জেনে রাখুন যে, আমি আমার সন্তানদেরকে প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠের নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠ করবে সে কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না বা না খেয়ে থাকবে না।” (এ হাদীসটি ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবূ যাবিয়াহ (রাঃ) কখনো এ সূরাটি রাত্রে পাঠ ছাড়তেন না। হযরত সাম্মাক ইবনে হারব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা আজ যেভাবে তোমাদের নামায পড়ছে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) এভাবেই নামায পড়তেন। তবে তোমাদের নামাযের চেয়ে তাঁর নামায তিনি হালকা করতেন। তিনি ফজরের নামাযে সূরায়ে ওয়াকিআহ এবং এ ধরনের সূরাগুলো তিলাওয়াত করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) ১-১২ নং আয়াতের তাফসীর: ওয়াকিয়াহ কিয়ামতের নাম। কেননা, এটা সংঘটিত হওয়া সুনিশ্চিত। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (৬৯:১৫) এটার সংঘটন অবশ্যম্ভাবী। না এটাকে কেউ টলাতে পারে, না কেউ হটাতে পারে। এটা নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত হবেই। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দাও ঐ দিন আসার পূর্বে যাকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না।” (৪২:৪৭) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এক ব্যক্তি চাইলো সংঘটিত হোক শাস্তি যা অবধারিত কাফিরদের জন্যে, এটা প্রতিরোধ করার কেউ নেই।” (৭০:১-২) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেই দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ হয়ে যাও, তখন হয়ে যাবে। তারই কথা সত্য, রাজত্ব তাঁরই, যেই দিন শিঙ্গায় ফুস্কার দেয়া হবে, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি বিজ্ঞানময়, সম্যক অবগত।” (৬:৭৩) কিয়ামত সংঘটনে কোন সন্দেহ নেই, বরং এটা চরম সত্য, এটা অবশ্যই সংঘটিত হবে।(আরবী) 'শব্দটি (আরবী) যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দ দুটি মাসদার। এটা কাউকেও করবে নীচ, কাউকেও করবে সমুন্নত। ঐদিন বহু লোক নীচতম ও হীনতম হয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে যারা দুনিয়ায় সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিল। পক্ষান্তরে বহু লোক সেদিন সমুন্নত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিও তারা দুনিয়ায় নিম্নশ্রেণীর লোক ছিল এবং মর্যাদার অধিকারী ছিল না। সেই দিন আল্লাহর শত্রুরা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ অবস্থায় জাহান্নামে চলে যাবে। আর তাঁর বন্ধু ও ভক্তরা সম্মানিত অবস্থায় জান্নাতে চলে যাবে। ঐদিন অহংকারীরা হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং বিনয়ীরা হবে সম্মানিত। এই কিয়ামত নিকটের ও দূরের লোকদেরকে সতর্ক করে দিবে। এটা নীচু হবে এবং নিকটের লোকদেরকে শুনিয়ে দিবে। তারপর উঁচু হবে এবং দূরের লোকদেরকে শুনাবে। পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং হেলা দোলা শুরু করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে।" (৯৯:১) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে, কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।” (২২:১)। এরপর বলেনঃ পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।" (৭৩:১৪) আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ফলে ওটা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলি-কণায়।(আরবী) ঐ অগ্নিস্ফুলিঙ্গকেও বলা হয় যেগুলো আগুন জ্বালাবার সময় পতঙ্গের মত উড়তে থাকে এবং উড়তে উড়তে নীচে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়, কিছুই থাকে না।(আরবী) ঐ জিনিসকে বলা হয় যাকে বাতাস উপরে তোলে নেয় এবং ছড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেমন শুষ্ক পাতার গুঁড়াকে বাতাস এদিক-ওদিক করে দেয়। এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, পাহাড় স্বীয় জায়গা হতে সরে পড়বে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে। একটি দল আরশের ডান দিকে হবে। তারা হবে ঐসব লোক যারা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান পার্শ্বদেশ হতে বের হয়েছিল এবং যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাদেরকে ডান দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা হবে জান্নাতীদের সাধারণ দল। দ্বিতীয় দলটি আরশের বাম দিকে হবে। এরা হবে ঐসব লোক যাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পার্শ্বদেশ হতে বের করা হয়েছিল। এদের বাম হাতে। আমলনামা দেয়া হবে এবং এদেরকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এরা সব জাহান্নামী। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে রক্ষা করুন!তৃতীয় দলটি মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হবেন। তারা হবেন বিশিষ্ট ল। তারা আসহাবুল ইয়ামীনের চেয়েও বেশী মর্যাদাবান ও নৈকট্য লাভকারী ।। ভরা হবেন জান্নাতবাসীদের নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবী, রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণ। ডান দিকের লোকদের চেয়ে তারা সংখ্যায় কম হবেন। সুতরাং হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ এই তিন শ্রেণীরই থাকবে, যেমন এই সূরার শেষে সংক্ষিপ্তভাবে তাদের এই তিনটি ভাগই করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২) সুতরাং এখানেও তিন শ্রেণী রয়েছে। এটা ঐ সময়, যখন (আরবী)-এর ঐ তাফসীর নেয়া হবে যা এটা অনুযায়ী হয়, অন্যথায় অন্য একটি উক্তি রয়েছে যা এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনও এটাই বলেছেন। দু'টি দল তো জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হবে” (৮১৪৭) বিভিন্ন প্রকারের অর্থাৎ প্রত্যেক আমলের আমলকারীর একটি দল হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা বিভক্ত হবে তিন শ্রেণীতে। ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী, তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) আয়াতগুলো পাঠ করেন, অতঃপর তার হস্তদ্বয়ের মুষ্টি বন্ধ করেন এবং বলেনঃ এগুলো জান্নাতী এবং আমি কোন পরোয়া করি না, আর এগুলো জাহান্নামী এবং আমার কোন পরোয়া নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ার দিকে সর্বপ্রথম কোন্ লোকগুলো যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তর দেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বললেনঃ “তারা হলো ঐ লোক যে, যখন তাদেরকে তাদের হক প্রদান করা হয় তখন তারা তা কবুল করে, তাদের উপর অন্যের হক থাকলে তা চাওয়া মাত্রই দিয়ে দেয় এবং তারা লোকদেরকে ঐ হুকুম করে যে হুকুম তাদের নিজেদেরকে করে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)সাবেকুন বা অগ্রবর্তী তোক কারা এ ব্যাপারে বহু উক্তি রয়েছে। যেমন নবীগণ, ইল্লীঈনবাসীগণ, হয়রত ইউশা ইবনে নুন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন, ঐ মুমিনরা যাদের বর্ণনা সরায়ে ইয়াসীনে। রয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর প্রথমে ঈমান এনেছিলেন, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি অগ্রগামী ছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা দুই কিবলামুখী হয়ে নামায পড়েছেন, প্রত্যেক উম্মতের ঐ লোকগুলো যারা নিজ নিজ নবীর উপর পূর্বে ঈমান এনেছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা সর্বাগ্রে জিহাদে গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এই উক্তিগুলো সবই সঠিক অর্থাৎ এই লোকগুলোই অগ্রবর্তী। যারা আগে বেড়ে গিয়ে অন্যদের উপর অগ্রবর্তী হয়ে আল্লাহ তা'আলার ফরমান কবুল করে থাকেন তারা সবাই সাবেকুনের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়।” (৩:১৩৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে অগ্রগামী হও এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রস্থ বা বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মত।” (৫৭:২১) সুতরাং এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি পুণ্যের কাজে অগ্রগামী হবে, সে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের দিকেও অগ্রবর্তীই থাকবে। প্রত্যেক আমলের প্রতিদান ঐ শ্রেণীরই হয়ে থাকে। যেমন সে আমল করে তেমনই সে ফল পায়। এ জন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত, তারাই থাকবে সুখদ উদ্যানে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আদম সন্তানের জন্যে আপনি দুনিয়া বানিয়েছেন, সেখানে তারা পানাহার করে থাকে এবং বিয়ে-শাদী করে থাকে। সুতরাং আখিরাত আপনি আমাদের জন্যেই করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আমি এরূপ করবে না।” ফেরেশতারা তিনবার প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে কখনো তাদের মত করবে না যাদেরকে আমি শুধু (আরবী) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছি।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম রাযীও (রঃ) তার কিতাবুররাদ্দে আলাল জাহমিয়্যাহ’ নামক কিতাবে এই আসারটি আনয়ন করেছেন। এর শব্দগুলো হলোঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যাকে আমি আমার নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তার সৎ সন্তানদেরকে ওর মত করবে না যাকে আমি বলেছিঃ হয়ে যাও’ তখন হয়ে গেছে”)

আল-ওয়াকিয়া 56:9

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আমাকে সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ওয়াকিআহ, সূরায়ে মুরসালাত, সূরায়ে আম্মা ইয়াতাসাআলুন এবং সূরায়ে ইশ শামসু কুওভিরাত বৃদ্ধ করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু যাবিরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ রোগাক্রান্ত হন, যে রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর ঐ রোগের সময় হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার অভিযোগ কি?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমার পাপরাশি।” হযরত উসমান আবার প্রশ্ন করেনঃ “আপনার আকাক্ষা কি?" তিনি জবাব দেনঃ “আমার প্রতিপালকের রহমত।” হযরত উসমান (রাঃ) প্রশ্ন করেনঃ “কোন ডাক্তারকে পাঠিয়ে দেবো কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ডাক্তারই তো আমাকে রোগাক্রান্ত করেছেন?” হযরত উসমান (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার জন্যে কিছু মাল পাঠাবার নির্দেশ দিবো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমার মালের কোন প্রয়োজন নেই।” হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “আপনার পরে আপনার সন্তানদের কাজে লাগবে?” তিনি বললেনঃ “আমার সন্তানরা দরিদ্র হয়ে পড়বে আপনি এ আশংকা করেন? তাহলে জেনে রাখুন যে, আমি আমার সন্তানদেরকে প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠের নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠ করবে সে কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না বা না খেয়ে থাকবে না।” (এ হাদীসটি ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবূ যাবিয়াহ (রাঃ) কখনো এ সূরাটি রাত্রে পাঠ ছাড়তেন না। হযরত সাম্মাক ইবনে হারব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা আজ যেভাবে তোমাদের নামায পড়ছে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) এভাবেই নামায পড়তেন। তবে তোমাদের নামাযের চেয়ে তাঁর নামায তিনি হালকা করতেন। তিনি ফজরের নামাযে সূরায়ে ওয়াকিআহ এবং এ ধরনের সূরাগুলো তিলাওয়াত করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) ১-১২ নং আয়াতের তাফসীর: ওয়াকিয়াহ কিয়ামতের নাম। কেননা, এটা সংঘটিত হওয়া সুনিশ্চিত। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (৬৯:১৫) এটার সংঘটন অবশ্যম্ভাবী। না এটাকে কেউ টলাতে পারে, না কেউ হটাতে পারে। এটা নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত হবেই। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দাও ঐ দিন আসার পূর্বে যাকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না।” (৪২:৪৭) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এক ব্যক্তি চাইলো সংঘটিত হোক শাস্তি যা অবধারিত কাফিরদের জন্যে, এটা প্রতিরোধ করার কেউ নেই।” (৭০:১-২) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেই দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ হয়ে যাও, তখন হয়ে যাবে। তারই কথা সত্য, রাজত্ব তাঁরই, যেই দিন শিঙ্গায় ফুস্কার দেয়া হবে, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি বিজ্ঞানময়, সম্যক অবগত।” (৬:৭৩) কিয়ামত সংঘটনে কোন সন্দেহ নেই, বরং এটা চরম সত্য, এটা অবশ্যই সংঘটিত হবে।(আরবী) 'শব্দটি (আরবী) যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দ দুটি মাসদার। এটা কাউকেও করবে নীচ, কাউকেও করবে সমুন্নত। ঐদিন বহু লোক নীচতম ও হীনতম হয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে যারা দুনিয়ায় সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিল। পক্ষান্তরে বহু লোক সেদিন সমুন্নত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিও তারা দুনিয়ায় নিম্নশ্রেণীর লোক ছিল এবং মর্যাদার অধিকারী ছিল না। সেই দিন আল্লাহর শত্রুরা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ অবস্থায় জাহান্নামে চলে যাবে। আর তাঁর বন্ধু ও ভক্তরা সম্মানিত অবস্থায় জান্নাতে চলে যাবে। ঐদিন অহংকারীরা হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং বিনয়ীরা হবে সম্মানিত। এই কিয়ামত নিকটের ও দূরের লোকদেরকে সতর্ক করে দিবে। এটা নীচু হবে এবং নিকটের লোকদেরকে শুনিয়ে দিবে। তারপর উঁচু হবে এবং দূরের লোকদেরকে শুনাবে। পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং হেলা দোলা শুরু করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে।" (৯৯:১) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে, কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।” (২২:১)। এরপর বলেনঃ পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।" (৭৩:১৪) আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ফলে ওটা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলি-কণায়।(আরবী) ঐ অগ্নিস্ফুলিঙ্গকেও বলা হয় যেগুলো আগুন জ্বালাবার সময় পতঙ্গের মত উড়তে থাকে এবং উড়তে উড়তে নীচে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়, কিছুই থাকে না।(আরবী) ঐ জিনিসকে বলা হয় যাকে বাতাস উপরে তোলে নেয় এবং ছড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেমন শুষ্ক পাতার গুঁড়াকে বাতাস এদিক-ওদিক করে দেয়। এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, পাহাড় স্বীয় জায়গা হতে সরে পড়বে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে। একটি দল আরশের ডান দিকে হবে। তারা হবে ঐসব লোক যারা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান পার্শ্বদেশ হতে বের হয়েছিল এবং যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাদেরকে ডান দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা হবে জান্নাতীদের সাধারণ দল। দ্বিতীয় দলটি আরশের বাম দিকে হবে। এরা হবে ঐসব লোক যাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পার্শ্বদেশ হতে বের করা হয়েছিল। এদের বাম হাতে। আমলনামা দেয়া হবে এবং এদেরকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এরা সব জাহান্নামী। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে রক্ষা করুন!তৃতীয় দলটি মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হবেন। তারা হবেন বিশিষ্ট ল। তারা আসহাবুল ইয়ামীনের চেয়েও বেশী মর্যাদাবান ও নৈকট্য লাভকারী ।। ভরা হবেন জান্নাতবাসীদের নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবী, রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণ। ডান দিকের লোকদের চেয়ে তারা সংখ্যায় কম হবেন। সুতরাং হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ এই তিন শ্রেণীরই থাকবে, যেমন এই সূরার শেষে সংক্ষিপ্তভাবে তাদের এই তিনটি ভাগই করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২) সুতরাং এখানেও তিন শ্রেণী রয়েছে। এটা ঐ সময়, যখন (আরবী)-এর ঐ তাফসীর নেয়া হবে যা এটা অনুযায়ী হয়, অন্যথায় অন্য একটি উক্তি রয়েছে যা এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনও এটাই বলেছেন। দু'টি দল তো জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হবে” (৮১৪৭) বিভিন্ন প্রকারের অর্থাৎ প্রত্যেক আমলের আমলকারীর একটি দল হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা বিভক্ত হবে তিন শ্রেণীতে। ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী, তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) আয়াতগুলো পাঠ করেন, অতঃপর তার হস্তদ্বয়ের মুষ্টি বন্ধ করেন এবং বলেনঃ এগুলো জান্নাতী এবং আমি কোন পরোয়া করি না, আর এগুলো জাহান্নামী এবং আমার কোন পরোয়া নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ার দিকে সর্বপ্রথম কোন্ লোকগুলো যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তর দেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বললেনঃ “তারা হলো ঐ লোক যে, যখন তাদেরকে তাদের হক প্রদান করা হয় তখন তারা তা কবুল করে, তাদের উপর অন্যের হক থাকলে তা চাওয়া মাত্রই দিয়ে দেয় এবং তারা লোকদেরকে ঐ হুকুম করে যে হুকুম তাদের নিজেদেরকে করে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)সাবেকুন বা অগ্রবর্তী তোক কারা এ ব্যাপারে বহু উক্তি রয়েছে। যেমন নবীগণ, ইল্লীঈনবাসীগণ, হয়রত ইউশা ইবনে নুন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন, ঐ মুমিনরা যাদের বর্ণনা সরায়ে ইয়াসীনে। রয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর প্রথমে ঈমান এনেছিলেন, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি অগ্রগামী ছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা দুই কিবলামুখী হয়ে নামায পড়েছেন, প্রত্যেক উম্মতের ঐ লোকগুলো যারা নিজ নিজ নবীর উপর পূর্বে ঈমান এনেছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা সর্বাগ্রে জিহাদে গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এই উক্তিগুলো সবই সঠিক অর্থাৎ এই লোকগুলোই অগ্রবর্তী। যারা আগে বেড়ে গিয়ে অন্যদের উপর অগ্রবর্তী হয়ে আল্লাহ তা'আলার ফরমান কবুল করে থাকেন তারা সবাই সাবেকুনের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়।” (৩:১৩৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে অগ্রগামী হও এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রস্থ বা বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মত।” (৫৭:২১) সুতরাং এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি পুণ্যের কাজে অগ্রগামী হবে, সে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের দিকেও অগ্রবর্তীই থাকবে। প্রত্যেক আমলের প্রতিদান ঐ শ্রেণীরই হয়ে থাকে। যেমন সে আমল করে তেমনই সে ফল পায়। এ জন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত, তারাই থাকবে সুখদ উদ্যানে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আদম সন্তানের জন্যে আপনি দুনিয়া বানিয়েছেন, সেখানে তারা পানাহার করে থাকে এবং বিয়ে-শাদী করে থাকে। সুতরাং আখিরাত আপনি আমাদের জন্যেই করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আমি এরূপ করবে না।” ফেরেশতারা তিনবার প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে কখনো তাদের মত করবে না যাদেরকে আমি শুধু (আরবী) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছি।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম রাযীও (রঃ) তার কিতাবুররাদ্দে আলাল জাহমিয়্যাহ’ নামক কিতাবে এই আসারটি আনয়ন করেছেন। এর শব্দগুলো হলোঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যাকে আমি আমার নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তার সৎ সন্তানদেরকে ওর মত করবে না যাকে আমি বলেছিঃ হয়ে যাও’ তখন হয়ে গেছে”)

আল-ওয়াকিয়া 56:10

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আমাকে সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ওয়াকিআহ, সূরায়ে মুরসালাত, সূরায়ে আম্মা ইয়াতাসাআলুন এবং সূরায়ে ইশ শামসু কুওভিরাত বৃদ্ধ করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু যাবিরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ রোগাক্রান্ত হন, যে রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর ঐ রোগের সময় হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার অভিযোগ কি?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমার পাপরাশি।” হযরত উসমান আবার প্রশ্ন করেনঃ “আপনার আকাক্ষা কি?" তিনি জবাব দেনঃ “আমার প্রতিপালকের রহমত।” হযরত উসমান (রাঃ) প্রশ্ন করেনঃ “কোন ডাক্তারকে পাঠিয়ে দেবো কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ডাক্তারই তো আমাকে রোগাক্রান্ত করেছেন?” হযরত উসমান (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার জন্যে কিছু মাল পাঠাবার নির্দেশ দিবো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমার মালের কোন প্রয়োজন নেই।” হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “আপনার পরে আপনার সন্তানদের কাজে লাগবে?” তিনি বললেনঃ “আমার সন্তানরা দরিদ্র হয়ে পড়বে আপনি এ আশংকা করেন? তাহলে জেনে রাখুন যে, আমি আমার সন্তানদেরকে প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠের নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠ করবে সে কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না বা না খেয়ে থাকবে না।” (এ হাদীসটি ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবূ যাবিয়াহ (রাঃ) কখনো এ সূরাটি রাত্রে পাঠ ছাড়তেন না। হযরত সাম্মাক ইবনে হারব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা আজ যেভাবে তোমাদের নামায পড়ছে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) এভাবেই নামায পড়তেন। তবে তোমাদের নামাযের চেয়ে তাঁর নামায তিনি হালকা করতেন। তিনি ফজরের নামাযে সূরায়ে ওয়াকিআহ এবং এ ধরনের সূরাগুলো তিলাওয়াত করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) ১-১২ নং আয়াতের তাফসীর: ওয়াকিয়াহ কিয়ামতের নাম। কেননা, এটা সংঘটিত হওয়া সুনিশ্চিত। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (৬৯:১৫) এটার সংঘটন অবশ্যম্ভাবী। না এটাকে কেউ টলাতে পারে, না কেউ হটাতে পারে। এটা নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত হবেই। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দাও ঐ দিন আসার পূর্বে যাকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না।” (৪২:৪৭) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এক ব্যক্তি চাইলো সংঘটিত হোক শাস্তি যা অবধারিত কাফিরদের জন্যে, এটা প্রতিরোধ করার কেউ নেই।” (৭০:১-২) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেই দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ হয়ে যাও, তখন হয়ে যাবে। তারই কথা সত্য, রাজত্ব তাঁরই, যেই দিন শিঙ্গায় ফুস্কার দেয়া হবে, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি বিজ্ঞানময়, সম্যক অবগত।” (৬:৭৩) কিয়ামত সংঘটনে কোন সন্দেহ নেই, বরং এটা চরম সত্য, এটা অবশ্যই সংঘটিত হবে।(আরবী) 'শব্দটি (আরবী) যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দ দুটি মাসদার। এটা কাউকেও করবে নীচ, কাউকেও করবে সমুন্নত। ঐদিন বহু লোক নীচতম ও হীনতম হয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে যারা দুনিয়ায় সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিল। পক্ষান্তরে বহু লোক সেদিন সমুন্নত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিও তারা দুনিয়ায় নিম্নশ্রেণীর লোক ছিল এবং মর্যাদার অধিকারী ছিল না। সেই দিন আল্লাহর শত্রুরা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ অবস্থায় জাহান্নামে চলে যাবে। আর তাঁর বন্ধু ও ভক্তরা সম্মানিত অবস্থায় জান্নাতে চলে যাবে। ঐদিন অহংকারীরা হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং বিনয়ীরা হবে সম্মানিত। এই কিয়ামত নিকটের ও দূরের লোকদেরকে সতর্ক করে দিবে। এটা নীচু হবে এবং নিকটের লোকদেরকে শুনিয়ে দিবে। তারপর উঁচু হবে এবং দূরের লোকদেরকে শুনাবে। পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং হেলা দোলা শুরু করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে।" (৯৯:১) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে, কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।” (২২:১)। এরপর বলেনঃ পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।" (৭৩:১৪) আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ফলে ওটা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলি-কণায়।(আরবী) ঐ অগ্নিস্ফুলিঙ্গকেও বলা হয় যেগুলো আগুন জ্বালাবার সময় পতঙ্গের মত উড়তে থাকে এবং উড়তে উড়তে নীচে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়, কিছুই থাকে না।(আরবী) ঐ জিনিসকে বলা হয় যাকে বাতাস উপরে তোলে নেয় এবং ছড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেমন শুষ্ক পাতার গুঁড়াকে বাতাস এদিক-ওদিক করে দেয়। এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, পাহাড় স্বীয় জায়গা হতে সরে পড়বে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে। একটি দল আরশের ডান দিকে হবে। তারা হবে ঐসব লোক যারা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান পার্শ্বদেশ হতে বের হয়েছিল এবং যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাদেরকে ডান দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা হবে জান্নাতীদের সাধারণ দল। দ্বিতীয় দলটি আরশের বাম দিকে হবে। এরা হবে ঐসব লোক যাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পার্শ্বদেশ হতে বের করা হয়েছিল। এদের বাম হাতে। আমলনামা দেয়া হবে এবং এদেরকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এরা সব জাহান্নামী। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে রক্ষা করুন!তৃতীয় দলটি মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হবেন। তারা হবেন বিশিষ্ট ল। তারা আসহাবুল ইয়ামীনের চেয়েও বেশী মর্যাদাবান ও নৈকট্য লাভকারী ।। ভরা হবেন জান্নাতবাসীদের নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবী, রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণ। ডান দিকের লোকদের চেয়ে তারা সংখ্যায় কম হবেন। সুতরাং হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ এই তিন শ্রেণীরই থাকবে, যেমন এই সূরার শেষে সংক্ষিপ্তভাবে তাদের এই তিনটি ভাগই করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২) সুতরাং এখানেও তিন শ্রেণী রয়েছে। এটা ঐ সময়, যখন (আরবী)-এর ঐ তাফসীর নেয়া হবে যা এটা অনুযায়ী হয়, অন্যথায় অন্য একটি উক্তি রয়েছে যা এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনও এটাই বলেছেন। দু'টি দল তো জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হবে” (৮১৪৭) বিভিন্ন প্রকারের অর্থাৎ প্রত্যেক আমলের আমলকারীর একটি দল হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা বিভক্ত হবে তিন শ্রেণীতে। ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী, তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) আয়াতগুলো পাঠ করেন, অতঃপর তার হস্তদ্বয়ের মুষ্টি বন্ধ করেন এবং বলেনঃ এগুলো জান্নাতী এবং আমি কোন পরোয়া করি না, আর এগুলো জাহান্নামী এবং আমার কোন পরোয়া নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ার দিকে সর্বপ্রথম কোন্ লোকগুলো যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তর দেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বললেনঃ “তারা হলো ঐ লোক যে, যখন তাদেরকে তাদের হক প্রদান করা হয় তখন তারা তা কবুল করে, তাদের উপর অন্যের হক থাকলে তা চাওয়া মাত্রই দিয়ে দেয় এবং তারা লোকদেরকে ঐ হুকুম করে যে হুকুম তাদের নিজেদেরকে করে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)সাবেকুন বা অগ্রবর্তী তোক কারা এ ব্যাপারে বহু উক্তি রয়েছে। যেমন নবীগণ, ইল্লীঈনবাসীগণ, হয়রত ইউশা ইবনে নুন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন, ঐ মুমিনরা যাদের বর্ণনা সরায়ে ইয়াসীনে। রয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর প্রথমে ঈমান এনেছিলেন, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি অগ্রগামী ছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা দুই কিবলামুখী হয়ে নামায পড়েছেন, প্রত্যেক উম্মতের ঐ লোকগুলো যারা নিজ নিজ নবীর উপর পূর্বে ঈমান এনেছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা সর্বাগ্রে জিহাদে গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এই উক্তিগুলো সবই সঠিক অর্থাৎ এই লোকগুলোই অগ্রবর্তী। যারা আগে বেড়ে গিয়ে অন্যদের উপর অগ্রবর্তী হয়ে আল্লাহ তা'আলার ফরমান কবুল করে থাকেন তারা সবাই সাবেকুনের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়।” (৩:১৩৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে অগ্রগামী হও এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রস্থ বা বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মত।” (৫৭:২১) সুতরাং এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি পুণ্যের কাজে অগ্রগামী হবে, সে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের দিকেও অগ্রবর্তীই থাকবে। প্রত্যেক আমলের প্রতিদান ঐ শ্রেণীরই হয়ে থাকে। যেমন সে আমল করে তেমনই সে ফল পায়। এ জন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত, তারাই থাকবে সুখদ উদ্যানে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আদম সন্তানের জন্যে আপনি দুনিয়া বানিয়েছেন, সেখানে তারা পানাহার করে থাকে এবং বিয়ে-শাদী করে থাকে। সুতরাং আখিরাত আপনি আমাদের জন্যেই করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আমি এরূপ করবে না।” ফেরেশতারা তিনবার প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে কখনো তাদের মত করবে না যাদেরকে আমি শুধু (আরবী) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছি।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম রাযীও (রঃ) তার কিতাবুররাদ্দে আলাল জাহমিয়্যাহ’ নামক কিতাবে এই আসারটি আনয়ন করেছেন। এর শব্দগুলো হলোঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যাকে আমি আমার নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তার সৎ সন্তানদেরকে ওর মত করবে না যাকে আমি বলেছিঃ হয়ে যাও’ তখন হয়ে গেছে”)

আল-ওয়াকিয়া 56:11

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আমাকে সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ওয়াকিআহ, সূরায়ে মুরসালাত, সূরায়ে আম্মা ইয়াতাসাআলুন এবং সূরায়ে ইশ শামসু কুওভিরাত বৃদ্ধ করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু যাবিরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ রোগাক্রান্ত হন, যে রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর ঐ রোগের সময় হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার অভিযোগ কি?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমার পাপরাশি।” হযরত উসমান আবার প্রশ্ন করেনঃ “আপনার আকাক্ষা কি?" তিনি জবাব দেনঃ “আমার প্রতিপালকের রহমত।” হযরত উসমান (রাঃ) প্রশ্ন করেনঃ “কোন ডাক্তারকে পাঠিয়ে দেবো কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ডাক্তারই তো আমাকে রোগাক্রান্ত করেছেন?” হযরত উসমান (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার জন্যে কিছু মাল পাঠাবার নির্দেশ দিবো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমার মালের কোন প্রয়োজন নেই।” হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “আপনার পরে আপনার সন্তানদের কাজে লাগবে?” তিনি বললেনঃ “আমার সন্তানরা দরিদ্র হয়ে পড়বে আপনি এ আশংকা করেন? তাহলে জেনে রাখুন যে, আমি আমার সন্তানদেরকে প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠের নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠ করবে সে কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না বা না খেয়ে থাকবে না।” (এ হাদীসটি ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবূ যাবিয়াহ (রাঃ) কখনো এ সূরাটি রাত্রে পাঠ ছাড়তেন না। হযরত সাম্মাক ইবনে হারব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা আজ যেভাবে তোমাদের নামায পড়ছে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) এভাবেই নামায পড়তেন। তবে তোমাদের নামাযের চেয়ে তাঁর নামায তিনি হালকা করতেন। তিনি ফজরের নামাযে সূরায়ে ওয়াকিআহ এবং এ ধরনের সূরাগুলো তিলাওয়াত করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) ১-১২ নং আয়াতের তাফসীর: ওয়াকিয়াহ কিয়ামতের নাম। কেননা, এটা সংঘটিত হওয়া সুনিশ্চিত। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (৬৯:১৫) এটার সংঘটন অবশ্যম্ভাবী। না এটাকে কেউ টলাতে পারে, না কেউ হটাতে পারে। এটা নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত হবেই। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দাও ঐ দিন আসার পূর্বে যাকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না।” (৪২:৪৭) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এক ব্যক্তি চাইলো সংঘটিত হোক শাস্তি যা অবধারিত কাফিরদের জন্যে, এটা প্রতিরোধ করার কেউ নেই।” (৭০:১-২) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেই দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ হয়ে যাও, তখন হয়ে যাবে। তারই কথা সত্য, রাজত্ব তাঁরই, যেই দিন শিঙ্গায় ফুস্কার দেয়া হবে, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি বিজ্ঞানময়, সম্যক অবগত।” (৬:৭৩) কিয়ামত সংঘটনে কোন সন্দেহ নেই, বরং এটা চরম সত্য, এটা অবশ্যই সংঘটিত হবে।(আরবী) 'শব্দটি (আরবী) যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দ দুটি মাসদার। এটা কাউকেও করবে নীচ, কাউকেও করবে সমুন্নত। ঐদিন বহু লোক নীচতম ও হীনতম হয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে যারা দুনিয়ায় সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিল। পক্ষান্তরে বহু লোক সেদিন সমুন্নত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিও তারা দুনিয়ায় নিম্নশ্রেণীর লোক ছিল এবং মর্যাদার অধিকারী ছিল না। সেই দিন আল্লাহর শত্রুরা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ অবস্থায় জাহান্নামে চলে যাবে। আর তাঁর বন্ধু ও ভক্তরা সম্মানিত অবস্থায় জান্নাতে চলে যাবে। ঐদিন অহংকারীরা হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং বিনয়ীরা হবে সম্মানিত। এই কিয়ামত নিকটের ও দূরের লোকদেরকে সতর্ক করে দিবে। এটা নীচু হবে এবং নিকটের লোকদেরকে শুনিয়ে দিবে। তারপর উঁচু হবে এবং দূরের লোকদেরকে শুনাবে। পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং হেলা দোলা শুরু করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে।" (৯৯:১) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে, কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।” (২২:১)। এরপর বলেনঃ পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।" (৭৩:১৪) আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ফলে ওটা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলি-কণায়।(আরবী) ঐ অগ্নিস্ফুলিঙ্গকেও বলা হয় যেগুলো আগুন জ্বালাবার সময় পতঙ্গের মত উড়তে থাকে এবং উড়তে উড়তে নীচে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়, কিছুই থাকে না।(আরবী) ঐ জিনিসকে বলা হয় যাকে বাতাস উপরে তোলে নেয় এবং ছড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেমন শুষ্ক পাতার গুঁড়াকে বাতাস এদিক-ওদিক করে দেয়। এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, পাহাড় স্বীয় জায়গা হতে সরে পড়বে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে। একটি দল আরশের ডান দিকে হবে। তারা হবে ঐসব লোক যারা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান পার্শ্বদেশ হতে বের হয়েছিল এবং যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাদেরকে ডান দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা হবে জান্নাতীদের সাধারণ দল। দ্বিতীয় দলটি আরশের বাম দিকে হবে। এরা হবে ঐসব লোক যাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পার্শ্বদেশ হতে বের করা হয়েছিল। এদের বাম হাতে। আমলনামা দেয়া হবে এবং এদেরকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এরা সব জাহান্নামী। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে রক্ষা করুন!তৃতীয় দলটি মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হবেন। তারা হবেন বিশিষ্ট ল। তারা আসহাবুল ইয়ামীনের চেয়েও বেশী মর্যাদাবান ও নৈকট্য লাভকারী ।। ভরা হবেন জান্নাতবাসীদের নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবী, রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণ। ডান দিকের লোকদের চেয়ে তারা সংখ্যায় কম হবেন। সুতরাং হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ এই তিন শ্রেণীরই থাকবে, যেমন এই সূরার শেষে সংক্ষিপ্তভাবে তাদের এই তিনটি ভাগই করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২) সুতরাং এখানেও তিন শ্রেণী রয়েছে। এটা ঐ সময়, যখন (আরবী)-এর ঐ তাফসীর নেয়া হবে যা এটা অনুযায়ী হয়, অন্যথায় অন্য একটি উক্তি রয়েছে যা এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনও এটাই বলেছেন। দু'টি দল তো জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হবে” (৮১৪৭) বিভিন্ন প্রকারের অর্থাৎ প্রত্যেক আমলের আমলকারীর একটি দল হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা বিভক্ত হবে তিন শ্রেণীতে। ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী, তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) আয়াতগুলো পাঠ করেন, অতঃপর তার হস্তদ্বয়ের মুষ্টি বন্ধ করেন এবং বলেনঃ এগুলো জান্নাতী এবং আমি কোন পরোয়া করি না, আর এগুলো জাহান্নামী এবং আমার কোন পরোয়া নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ার দিকে সর্বপ্রথম কোন্ লোকগুলো যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তর দেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বললেনঃ “তারা হলো ঐ লোক যে, যখন তাদেরকে তাদের হক প্রদান করা হয় তখন তারা তা কবুল করে, তাদের উপর অন্যের হক থাকলে তা চাওয়া মাত্রই দিয়ে দেয় এবং তারা লোকদেরকে ঐ হুকুম করে যে হুকুম তাদের নিজেদেরকে করে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)সাবেকুন বা অগ্রবর্তী তোক কারা এ ব্যাপারে বহু উক্তি রয়েছে। যেমন নবীগণ, ইল্লীঈনবাসীগণ, হয়রত ইউশা ইবনে নুন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন, ঐ মুমিনরা যাদের বর্ণনা সরায়ে ইয়াসীনে। রয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর প্রথমে ঈমান এনেছিলেন, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি অগ্রগামী ছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা দুই কিবলামুখী হয়ে নামায পড়েছেন, প্রত্যেক উম্মতের ঐ লোকগুলো যারা নিজ নিজ নবীর উপর পূর্বে ঈমান এনেছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা সর্বাগ্রে জিহাদে গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এই উক্তিগুলো সবই সঠিক অর্থাৎ এই লোকগুলোই অগ্রবর্তী। যারা আগে বেড়ে গিয়ে অন্যদের উপর অগ্রবর্তী হয়ে আল্লাহ তা'আলার ফরমান কবুল করে থাকেন তারা সবাই সাবেকুনের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়।” (৩:১৩৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে অগ্রগামী হও এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রস্থ বা বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মত।” (৫৭:২১) সুতরাং এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি পুণ্যের কাজে অগ্রগামী হবে, সে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের দিকেও অগ্রবর্তীই থাকবে। প্রত্যেক আমলের প্রতিদান ঐ শ্রেণীরই হয়ে থাকে। যেমন সে আমল করে তেমনই সে ফল পায়। এ জন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত, তারাই থাকবে সুখদ উদ্যানে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আদম সন্তানের জন্যে আপনি দুনিয়া বানিয়েছেন, সেখানে তারা পানাহার করে থাকে এবং বিয়ে-শাদী করে থাকে। সুতরাং আখিরাত আপনি আমাদের জন্যেই করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আমি এরূপ করবে না।” ফেরেশতারা তিনবার প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে কখনো তাদের মত করবে না যাদেরকে আমি শুধু (আরবী) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছি।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম রাযীও (রঃ) তার কিতাবুররাদ্দে আলাল জাহমিয়্যাহ’ নামক কিতাবে এই আসারটি আনয়ন করেছেন। এর শব্দগুলো হলোঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যাকে আমি আমার নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তার সৎ সন্তানদেরকে ওর মত করবে না যাকে আমি বলেছিঃ হয়ে যাও’ তখন হয়ে গেছে”)

আল-ওয়াকিয়া 56:12

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আমাকে সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ওয়াকিআহ, সূরায়ে মুরসালাত, সূরায়ে আম্মা ইয়াতাসাআলুন এবং সূরায়ে ইশ শামসু কুওভিরাত বৃদ্ধ করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু যাবিরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ রোগাক্রান্ত হন, যে রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর ঐ রোগের সময় হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনার অভিযোগ কি?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমার পাপরাশি।” হযরত উসমান আবার প্রশ্ন করেনঃ “আপনার আকাক্ষা কি?" তিনি জবাব দেনঃ “আমার প্রতিপালকের রহমত।” হযরত উসমান (রাঃ) প্রশ্ন করেনঃ “কোন ডাক্তারকে পাঠিয়ে দেবো কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ডাক্তারই তো আমাকে রোগাক্রান্ত করেছেন?” হযরত উসমান (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার জন্যে কিছু মাল পাঠাবার নির্দেশ দিবো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমার মালের কোন প্রয়োজন নেই।” হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ “আপনার পরে আপনার সন্তানদের কাজে লাগবে?” তিনি বললেনঃ “আমার সন্তানরা দরিদ্র হয়ে পড়বে আপনি এ আশংকা করেন? তাহলে জেনে রাখুন যে, আমি আমার সন্তানদেরকে প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠের নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি প্রতি রাত্রে সূরায়ে ওয়াকিআহ পাঠ করবে সে কখনো অভাবগ্রস্ত হবে না বা না খেয়ে থাকবে না।” (এ হাদীসটি ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবূ যাবিয়াহ (রাঃ) কখনো এ সূরাটি রাত্রে পাঠ ছাড়তেন না। হযরত সাম্মাক ইবনে হারব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত জাবির ইবনে সামরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা আজ যেভাবে তোমাদের নামায পড়ছে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) এভাবেই নামায পড়তেন। তবে তোমাদের নামাযের চেয়ে তাঁর নামায তিনি হালকা করতেন। তিনি ফজরের নামাযে সূরায়ে ওয়াকিআহ এবং এ ধরনের সূরাগুলো তিলাওয়াত করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) ১-১২ নং আয়াতের তাফসীর: ওয়াকিয়াহ কিয়ামতের নাম। কেননা, এটা সংঘটিত হওয়া সুনিশ্চিত। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” (৬৯:১৫) এটার সংঘটন অবশ্যম্ভাবী। না এটাকে কেউ টলাতে পারে, না কেউ হটাতে পারে। এটা নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত হবেই। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দাও ঐ দিন আসার পূর্বে যাকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না।” (৪২:৪৭) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এক ব্যক্তি চাইলো সংঘটিত হোক শাস্তি যা অবধারিত কাফিরদের জন্যে, এটা প্রতিরোধ করার কেউ নেই।” (৭০:১-২) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যেই দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ হয়ে যাও, তখন হয়ে যাবে। তারই কথা সত্য, রাজত্ব তাঁরই, যেই দিন শিঙ্গায় ফুস্কার দেয়া হবে, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি বিজ্ঞানময়, সম্যক অবগত।” (৬:৭৩) কিয়ামত সংঘটনে কোন সন্দেহ নেই, বরং এটা চরম সত্য, এটা অবশ্যই সংঘটিত হবে।(আরবী) 'শব্দটি (আরবী) যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দ দুটি মাসদার। এটা কাউকেও করবে নীচ, কাউকেও করবে সমুন্নত। ঐদিন বহু লোক নীচতম ও হীনতম হয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে যারা দুনিয়ায় সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিল। পক্ষান্তরে বহু লোক সেদিন সমুন্নত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে যদিও তারা দুনিয়ায় নিম্নশ্রেণীর লোক ছিল এবং মর্যাদার অধিকারী ছিল না। সেই দিন আল্লাহর শত্রুরা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ অবস্থায় জাহান্নামে চলে যাবে। আর তাঁর বন্ধু ও ভক্তরা সম্মানিত অবস্থায় জান্নাতে চলে যাবে। ঐদিন অহংকারীরা হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং বিনয়ীরা হবে সম্মানিত। এই কিয়ামত নিকটের ও দূরের লোকদেরকে সতর্ক করে দিবে। এটা নীচু হবে এবং নিকটের লোকদেরকে শুনিয়ে দিবে। তারপর উঁচু হবে এবং দূরের লোকদেরকে শুনাবে। পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং হেলা দোলা শুরু করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে।" (৯৯:১) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে, কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।” (২২:১)। এরপর বলেনঃ পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “পর্বতসমূহ বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে।" (৭৩:১৪) আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ফলে ওটা পর্যবসিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলি-কণায়।(আরবী) ঐ অগ্নিস্ফুলিঙ্গকেও বলা হয় যেগুলো আগুন জ্বালাবার সময় পতঙ্গের মত উড়তে থাকে এবং উড়তে উড়তে নীচে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়, কিছুই থাকে না।(আরবী) ঐ জিনিসকে বলা হয় যাকে বাতাস উপরে তোলে নেয় এবং ছড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেমন শুষ্ক পাতার গুঁড়াকে বাতাস এদিক-ওদিক করে দেয়। এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, পাহাড় স্বীয় জায়গা হতে সরে পড়বে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে। একটি দল আরশের ডান দিকে হবে। তারা হবে ঐসব লোক যারা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান পার্শ্বদেশ হতে বের হয়েছিল এবং যাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাদেরকে ডান দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা হবে জান্নাতীদের সাধারণ দল। দ্বিতীয় দলটি আরশের বাম দিকে হবে। এরা হবে ঐসব লোক যাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পার্শ্বদেশ হতে বের করা হয়েছিল। এদের বাম হাতে। আমলনামা দেয়া হবে এবং এদেরকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এরা সব জাহান্নামী। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে রক্ষা করুন!তৃতীয় দলটি মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে হবেন। তারা হবেন বিশিষ্ট ল। তারা আসহাবুল ইয়ামীনের চেয়েও বেশী মর্যাদাবান ও নৈকট্য লাভকারী ।। ভরা হবেন জান্নাতবাসীদের নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবী, রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণ। ডান দিকের লোকদের চেয়ে তারা সংখ্যায় কম হবেন। সুতরাং হাশরের ময়দানে সমস্ত মানুষ এই তিন শ্রেণীরই থাকবে, যেমন এই সূরার শেষে সংক্ষিপ্তভাবে তাদের এই তিনটি ভাগই করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।” (৩৫:৩২) সুতরাং এখানেও তিন শ্রেণী রয়েছে। এটা ঐ সময়, যখন (আরবী)-এর ঐ তাফসীর নেয়া হবে যা এটা অনুযায়ী হয়, অন্যথায় অন্য একটি উক্তি রয়েছে যা এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে গত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনও এটাই বলেছেন। দু'টি দল তো জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেহে যখন আত্মা পুনঃ সংযোজিত হবে” (৮১৪৭) বিভিন্ন প্রকারের অর্থাৎ প্রত্যেক আমলের আমলকারীর একটি দল হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা বিভক্ত হবে তিন শ্রেণীতে। ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী, তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) আয়াতগুলো পাঠ করেন, অতঃপর তার হস্তদ্বয়ের মুষ্টি বন্ধ করেন এবং বলেনঃ এগুলো জান্নাতী এবং আমি কোন পরোয়া করি না, আর এগুলো জাহান্নামী এবং আমার কোন পরোয়া নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ার দিকে সর্বপ্রথম কোন্ লোকগুলো যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তর দেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বললেনঃ “তারা হলো ঐ লোক যে, যখন তাদেরকে তাদের হক প্রদান করা হয় তখন তারা তা কবুল করে, তাদের উপর অন্যের হক থাকলে তা চাওয়া মাত্রই দিয়ে দেয় এবং তারা লোকদেরকে ঐ হুকুম করে যে হুকুম তাদের নিজেদেরকে করে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)সাবেকুন বা অগ্রবর্তী তোক কারা এ ব্যাপারে বহু উক্তি রয়েছে। যেমন নবীগণ, ইল্লীঈনবাসীগণ, হয়রত ইউশা ইবনে নুন যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন, ঐ মুমিনরা যাদের বর্ণনা সরায়ে ইয়াসীনে। রয়েছে, যারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর প্রথমে ঈমান এনেছিলেন, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি অগ্রগামী ছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা দুই কিবলামুখী হয়ে নামায পড়েছেন, প্রত্যেক উম্মতের ঐ লোকগুলো যারা নিজ নিজ নবীর উপর পূর্বে ঈমান এনেছিলেন, ঐ লোকগুলো, যারা সর্বাগ্রে জিহাদে গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এই উক্তিগুলো সবই সঠিক অর্থাৎ এই লোকগুলোই অগ্রবর্তী। যারা আগে বেড়ে গিয়ে অন্যদের উপর অগ্রবর্তী হয়ে আল্লাহ তা'আলার ফরমান কবুল করে থাকেন তারা সবাই সাবেকুনের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়।” (৩:১৩৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে অগ্রগামী হও এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রস্থ বা বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মত।” (৫৭:২১) সুতরাং এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি পুণ্যের কাজে অগ্রগামী হবে, সে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের দিকেও অগ্রবর্তীই থাকবে। প্রত্যেক আমলের প্রতিদান ঐ শ্রেণীরই হয়ে থাকে। যেমন সে আমল করে তেমনই সে ফল পায়। এ জন্যেই মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত, তারাই থাকবে সুখদ উদ্যানে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আদম সন্তানের জন্যে আপনি দুনিয়া বানিয়েছেন, সেখানে তারা পানাহার করে থাকে এবং বিয়ে-শাদী করে থাকে। সুতরাং আখিরাত আপনি আমাদের জন্যেই করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আমি এরূপ করবে না।” ফেরেশতারা তিনবার প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে কখনো তাদের মত করবে না যাদেরকে আমি শুধু (আরবী) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছি।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম রাযীও (রঃ) তার কিতাবুররাদ্দে আলাল জাহমিয়্যাহ’ নামক কিতাবে এই আসারটি আনয়ন করেছেন। এর শব্দগুলো হলোঃ মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যাকে আমি আমার নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি তার সৎ সন্তানদেরকে ওর মত করবে না যাকে আমি বলেছিঃ হয়ে যাও’ তখন হয়ে গেছে”)

আল-ওয়াকিয়া 56:13

১৩-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা ঐ বিশিষ্ট নৈকট্যলাভকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তারা পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। এই পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি রয়েছে। যেমন একটি উক্তি হলো এই যে, পূর্ববর্তী দ্বারা পূর্ববর্তী উম্মতসমূহ এবং পরবর্তী দ্বারা এই উম্মত অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই উক্তিটিকেই পছন্দ করেছেন এবং এই উক্তির সবলতার পক্ষে ঐ হাদীসটি পেশ করেছেন যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা হলাম পরবর্তী, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরাই হবো পূর্ববর্তী।" এই উক্তির সহায়ক মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হাদীসটিও হতে পারে। তা হলোঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরআন কারীমের আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন এটা নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের উপর খুবই কঠিন ঠেকে। ঐ সময় (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহুসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা হবে জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ, বরং এক তৃতীয়াংশ এমনকি অর্ধাংশ। তোমরাই হবে জান্নাতবাসীদের অর্ধাংশ। আর বাকী অর্ধাংশ সমস্ত উম্মতের মধ্যে বন্টিত হবে যাদের মধ্যে তোমরাও থাকবে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদেও রয়েছে। হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) অবতীর্ণ হয় এবং তাতে বর্ণিত হয় যে, বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে, তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং আমাদের মধ্য হতে হবে কম সংখ্যক?" এটা অবতীর্ণ হওয়ার এক বছর পর (আরবী) অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে বহুসংখ্যক হবে এবং পরবর্তীদের মধ্য হতেও বহুসংখ্যক হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে উমার (রাঃ) শোন, হযরত আদম (আঃ) হতে আমি পর্যন্ত (অর্থাৎ হযরত আদম আঃ-এর যুগ হতে নিয়ে আমার যুগ পর্যন্ত) হলো (আরবী) বহুসংখ্যক। আর শুধু আমার উম্মতই হলো বা বহুসংখ্যক। আমরা আমাদের এই বহুসংখ্যককে পূর্ণ করার জন্যে ঐ হাবশীদেরকেও নিবো যারা উটের রাখাল, কিন্তু তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই।”এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই রিওয়াইয়াতের সনদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। হ্যাঁ, তবে বহু। সনদসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটিও প্রমাণিত যে, তিনি বলেছেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা আহলে জান্নাতের এক চতুর্থাংশ হবে ...... শেষ পর্যন্ত।” সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, এটা আমাদের জন্যে বড় সুসংবাদই বটে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) যে উক্তিটিকে পছন্দ করেছেন তাতে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। বরং প্রকৃতপক্ষে উক্তিটি খুবই দুর্বল। কেননা, কুরআনের ভাষা দ্বারা এই উম্মতের অন্যান্য সমস্ত উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। তাহলে আল্লাহ তা'আলার নিকট নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্য হতে বেশী এবং এই উম্মতের মধ্য হতে কম কি করে হতে পারে? হ্যাঁ, তবে এ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তগণ মিলে শুধু এই উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা হতে অধিক হবেন। কিন্তু বাহ্যতঃ তো এটা জানা যাচ্ছে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা হতে শুধু এই উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই বাক্যের তাফসীরে দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এই উম্মতের প্রথম যুগের লোকদের মধ্য হতে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অনেক বেশী হবে এবং পরবর্তী যুগের লোকদের মধ্য হতে কম হবে। এ উক্তিটি রীতি সম্মত। হযরত হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “নৈকট্য প্রাপ্তগণ তো গত হয়ে গেছেন। কিন্তু হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত করুন।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি বলেনঃ “এই উম্মতের মধ্যে যাঁরা গত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তগণ অনেক ছিলেন।” ইমাম ইবনে সীরীন (রঃ) একথাই বলেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে এই প্রথম যুগীয় লোকদের অনেকেই নৈকট্য প্রাপ্ত হয়েছেন এবং পরবর্তী যুগের লোকদের খুব কম সংখ্যকই এই মর্যাদা লাভ করেছেন। এ নিয়ম ধারাবাহিকভাবেই চলে আসছে। তাহলে ভাবার্থ এরূপ হওয়াও সম্ভব যে, প্রত্যেক উম্মতেরই প্রথম যুগের লোকদের মধ্যে নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক এবং পরবর্তী লোকদের মধ্যে এ সংখ্যা কম। কারণ সহীহ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বযুগের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, তারপর এর পরবর্তী যুগ, এরপর এর পরবর্তী যুগ, (শেষ পর্যন্ত)।" হ্যাঁ, তবে একটি হাদীসে এও এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মত। সুতরাং প্রথম যুগের বৃষ্টি উত্তম কি শেষ যুগের বৃষ্টি উত্তম তা আমার জানা নেই।” হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে এটাকে এই বিষয়ের উপর স্থাপন করা হবে যে, দ্বীনের জন্যে যেমন প্রথম যুগীয় লোকদের প্রয়োজন ছিল যারা পরবর্তী লোকদের জন্যে এর তাবলীগ করেছেন, অনুরূপভাবে শেষ যুগে এটাকে কায়েম রাখার জন্যে শেষ যুগীয় লোকদের প্রয়োজন রয়েছে। যাঁরা লোকদেরকে সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর উপর একত্রিত করবেন, এর রিওয়াইয়াত করবেন এবং জনগণের উপর এটা প্রকাশ করবেন। কিন্তু পূর্বযুগীয় লোকদেরই ফযীলত বেশী হবে। এটা ঠিক এরূপ যে, জমিতে প্রাথমিক বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয় এবং শেষের বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয়। কিন্তু জমি প্রাথমিক বৃষ্টি দ্বারাই বেশী উপকার লাভ করে থাকে। কেননা, প্রথম প্রথম যদি বৃষ্টি না হয় তবে শস্যের বীজ অংকুরিতই হবে না এবং জড় বা মূলও বসবে না। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে বিজয়ী থাকবে। তাদের শত্রুরা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। তাদের বিরোধীরা তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে এবং তারা ঐরূপই থাকবে।” মোটকথা, এই উম্মত বাকী সমস্ত উম্মত হতে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। আর এই উম্মতের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অন্যান্য উন্মতদের তুলনায় বহুগুণে বেশী হবে। তারা হবে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন। কেননা, দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়া এবং নবী (সঃ) সর্বাপেক্ষা মর্যাদা সম্পন্ন হওয়ার দিক দিয়ে এরাই সর্বোত্তম। ধারাবাহিকতার সাথে এ হাদীসটি প্রামাণ্য পৌছে গেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই উম্মতের মধ্য হতে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাবে এবং প্রতি সত্তর হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজার করে লোক থাকবে।হযরত আবূ মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কিয়ামতের দিন একটি বৃহৎ দলকে দাঁড় করানো হবে। তারা সংখ্যায় এতো অধিক হবে যে, অন্ধকার রাত্রির মত তারা যমীনের সমস্ত প্রান্তকে ঘিরে ফেলবে। ফেরেশতারা বলবেনঃ “সমস্ত নবী (আঃ)-এর সঙ্গে যত লোক এসেছে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথে তাদের সকলের সমষ্টির চেয়ে বহুগুণে বেশী এসেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)‘বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহু সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে এই হাদীসটিকে আনয়ন করা যুক্তিযুক্ত হবে যে হাদীসটিকে হাফিয আবু বকর বায়হাকী (রঃ) তাঁর ‘দালাইলুন নবুওয়াহ' নামক গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত আবূ জামাল জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফজরের নামায পড়তেন তখন তিনি পা দুটি মোড়ানো অবস্থাতেই সত্তর বার পাঠ করতেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবূলকারী।” তারপর বলতেনঃ “সত্তরের বদলে সাতশ’। একদিনে যার পাপ সাত শতেরও বেশী হয় তার জন্যে কল্যাণ নেই।” একথা তিনি দু'বার বলতেন। তারপর তিনি জনগণের দিকে মুখ করে বসতেন। স্বপ্ন তার নিকট প্রিয় ছিল বলে তিনি জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি?” আবূ জামাল (রাঃ) বলেন, একদা অভ্যাসমত রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলে আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হ্যাঁ, আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। তিনি বললেনঃ “আল্লাহ কল্যাণের সাথে সাক্ষাৎ দান করুন, অকল্যাণ হতে বাঁচিয়ে রাখুন, আমাদের জন্যে মঙ্গলজনক করুন, শত্রুদের জন্যে করুন ক্ষতিকর, ঐ আল্লাহ সর্বপ্রকারের প্রশংসার অধিকারী যিনি সারা বিশ্বের প্রতিপালক। তুমি এখন তোমার স্বপ্নের ঘটনা বর্ণনা কর।” আমি তখন বলতে শুরু করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি দেখি যে, একটি রাস্তা রয়েছে যা প্রশস্ত, সহজ, নরম ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। অসংখ্য লোক ঐ পথ ধরে চলছে। তারা চলতে চলতে একটি সবুজ-শ্যামল বাগান পেলো যার মত শস্য-শ্যামল ও চমৎকার বাগান আমি কখনো চোখে দেখিনি। ভিতর দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। নানা প্রকারের গাছ ফুলে ফলে ভরপুর রয়েছে। এখন আমি দেখি যে, প্রথম যে দলটি আসলো এবং ঐ বাগানের নিকট পৌঁছলো, তখন তারা তাদের সওয়ারীর গতি বেশ দ্রুত করলো এবং ডানে বামে না গিয়ে দ্রুত গতিতে ঐ স্থান অতিক্রম করলো। তারপর দ্বিতীয় দল আসলো যাদের সংখ্যা বেশী ছিল, যখন তারা এখানে পৌছলো তখন কতকগুলো লোক তাদের বাহনের পশুগুলোকে সেখানে চরাতে শুরু করলো, আর কতকগুলো লোক কিছু গ্রহণ করলো, অতঃপর সেখান হতে প্রস্থান করলো। তারপর আরো বহু লোকের একটি দল আসলো। যখন তারা এই সবুজ-শ্যামল বাগানের নিকট আসলো তখন তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “এটা সবচেয়ে উত্তম জায়গা।” আমি যেন তাদেরকে এখনো দেখতে পাচ্ছি যে, তারা ডানে বামে ঝুঁকে পড়েছে। আমি এসব দেখলাম। কিন্তু আমি তো চলতেই থাকলাম। যখন বহু দূরে চলে গেলাম তখন দেখলাম যে, সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট একটি মিম্বর বিছানো রয়েছে এবং আপনি সর্বোচ্চ সোপানে উপবেশন করেছেন। আর আপনার ডানদিকে এক ব্যক্তি রয়েছেন। তার চেহারা গোধূম বর্ণের, অঙ্গুলিগুলো মোটামোটা এবং দেহ লম্বা। যখন তিনি কথা বলছেন তখন সবাই নীরবে শুনছেন এবং জনগণ উঁচু হয়ে হয়ে মনোযোগের সাথে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিয়েছেন। আপনার বাম দিকে একটি লোক রয়েছেন, যাঁর দেহের গঠন মধ্যম, শরীর মোটা এবং চেহারায় বহু তিল রয়েছে। তাঁর চুল যেন পানিতে সিক্ত। যখন তিনি কথা বলছেন তখন তাঁর সম্মানার্থে সবাই ঝুঁকে পড়ছেন। আর সামনে একজন লোক রয়েছেন, তিনি স্বভাব-চরিত্রে এবং চেহারা ও আকৃতিতে আপনার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত। আপনারা সবাই তার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে আছেন। তাঁর সামনে একটি ক্ষীণ, পাতলা ও বৃদ্ধা উষ্ট্রী রয়েছে। আমি দেখলাম যে, আপনি যেন ওকে উঠাচ্ছেন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর এ অবস্থা দূরীভূত হলো। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “সরল, সোজা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা হলো ঐ দ্বীন যা নিয়ে আমি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এসেছি এবং যে হিদায়াতের উপর তোমরা রয়েছো। তুমি যে সবুজ শ্যামল বাগানটি দেখেছো ওটা হলো দুনিয়া এবং ওর মন মাতানো সাজ-সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র। আমার সাহাবীবর্গ তো ওটা অতিক্রম করে চলে যাবে। না আমরা তাতে লিপ্ত হবো, না ওটা। আমাদেরকে জড়িয়ে ধরবে। না ওর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক থাকবে, না আমরা ওর প্রতি আকৃষ্ট হবো। অতঃপর আমাদের পর দ্বিতীয় দল আসবে যারা সংখ্যায় আমাদের চেয়ে বেশী হবে। তাদের মধ্যে কতক লোকে তো দুনিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়বে। আর কেউ কেউ তা হতে প্রয়োজন মত গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা চলে যাবে এবং পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। তারপর তাদের পরে একটি বিরাট দল আসবে যারা এই দুনিয়ায় সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন হয়ে পড়বে। তারা ডানে বামে ঢুকে পড়বে। সুতরাং (আরবী) (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তারই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী)। এখন থাকলো তোমার কথা। তাহলে জেনে রেখো যে, তুমি তোমার সোজা সরল পথে চলতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত তুমি আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে।সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট মিম্বরের সর্বোচ্চ সোপানে যে তুমি আমাকে দেখেছো তার ব্যাখ্যা এই যে, দুনিয়ার আয়ু হচ্ছে সাত হাজার বছর। আমি শেষ বা সপ্তম হাজারে রয়েছি। আমার ডান দিকে গোধূম বর্ণের মোটা অঙ্গুলি বিশিষ্ট যে। লোকটিকে তুমি দেখেছো তিনি হলেন হযরত মূসা (আঃ)। যখন তিনি কথা বলেন তখন লোকেরা উচু হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং তার সাথে কথা বলে তাঁকে মর্যাদামণ্ডিত করেছেন। আর যে লোকটিকে তুমি আমার বাম দিকে দেখেছো, যিনি মোটা দেহ বিশিষ্ট এবং যার দেহের গঠন মধ্যম ধরনের আর যার চেহারায় বহু তিল রয়েছে এবং যার চুল পানিতে সিক্ত মনে হচ্ছে, তিনি হলেন হযরত ঈসা (আঃ)। যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্মান করেছেন। সেই হেতু আমরাও সবাই তাকে সম্মান করি। যে বৃদ্ধ লোকটিকে তুমি আমার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত দেখেছো তিনি হলেন আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)। আমরা সবাই তাঁকে চাই, তার অনুসরণ করি এবং তাঁর আনুগত্য করে থাকি। আর যে বৃদ্ধা উষ্ট্রীটিকে তুমি দেখেছো যে, আমি ওকে দাঁড় করাচ্ছি ওর দ্বারা কিয়ামত উদ্দেশ্য যা আমার উম্মতের উপর সংঘটিত হবে। না আমার পরে কোন নবী আছে এবং না আমার উম্মতের পরে কোন উম্মত আছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না এ প্রশ্ন করা ছেড়ে দেন। হ্যাঁ, তবে যখন কেউ নিজেই কোন স্বপ্নের কথা বলতো তখন তিনি ঐ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে দিতেন।” মহান আল্লাহ বলেনঃ নৈকট্যপ্রাপ্তদের বিশ্রামের পালঙ্গটি সোনার তার দ্বারা বুননকৃত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা (আরবী) ওযনে (আরবী)-এর অর্থে হবে। যেমন উষ্ট্রীর পেটের নীচে যেটা থাকে ওটাকে (আরবী) বলা হয়। তারা ঐ আসনে হেলান দিয়ে বসবে, পরস্পর মুখখামুখি হয়ে। কেউ কারো দিকে পিঠ করে বসবে না।তাদের সেবায় ঘোরাফিরা করবে চির কিশোরেরা। অর্থাৎ ঐ সেবকরা বয়সে একই অবস্থায় থাকবে। তারা বড়ও হবে না, বুড়োও হবে না এবং তাদের বয়সে কোন পরিবর্তনও হবে না, বরং তারা সদা কিশোরেই থাকবে।(আরবী) বলা হয় ঐ কুঁজাকে যাতে নালী বা চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস থাকে না। (আরবী) আর বলা হয় ঐ পানপাত্রকে যাতে চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস আছে। এগুলো সুরার প্রবহমান প্রস্রবণ হতে পূর্ণ করা থাকবে, যে সুরা কখনো শেষ হবার নয়। কেননা, ওর প্রস্রবণ সদা জারী থাকবে। এই সদা-কিশোরেরা সুরাপূর্ণ এই পানপাত্রগুলো তাদের নরম হাতে নিয়ে ঐ জান্নাতীদের সেবায় এদিক ওদিক ঘোরাফিরা করতে থাকবে। সেই সুরা পানে তাদের শিরঃপীড়াও হবে না এবং তারা জ্ঞানহারাও হবে না। সুতরাং পূর্ণমাত্রায় তারা ঐ সুরার স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে। মদের মধ্যে চারটি বিশেষণ রয়েছে। (এক) নেশা, (দুই) মাথাব্যথা, (তিন) বমি এবং (চার) প্রস্রাব। মহান প্রতিপালক আল্লাহ জান্নাতের সুরা বা মদের বর্ণনা দিয়ে ওকে এই চারটি দোষ হতে মুক্ত বলে ব্যক্ত করলেন। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ চির কিশোরেরা তাদের কাছে ঘোরাফিরা করবে তাদের পছন্দমত নানা প্রকারের ফলমূল নিয়ে এবং তাদের ঈপ্সিত পাখীর গোশত নিয়ে। যে ফল খাওয়ার তাদের ইচ্ছা হবে এবং যে গোশত খেতে তাদের মন চাইবে, সাথে সাথে তারা তা পাবে। এসব রকমারী খাবার নিয়ে তাদের এই চির কিশোরে সেবকরা সদা তাদের চারদিকে ঘোরাফিরা করবে। সুতরাং তাদের যখনই যা খেতে ইচ্ছা করবে তখনই তা তাদের নিকট থেকে নিয়ে নিবে। এই আয়াতে এই দলীল রয়েছে যে, মানুষ ফল বেছে বেছে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী খেতে পারে।হযরত ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার কওম মুররা আমাকে তাদের সাদকার মাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। আমি ঐ মাল নিয়ে মদীনায় পৌঁছি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। আমার সাথে যাকাতের বহু উট ছিল, উটগুলো যেন বালুকার উপর লেগে থাকা গাছগুলোতে চরানো যুবক উট। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কে?” আমি বললামঃ আমি ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “তুমি দূর পর্যন্ত তোমার বংশ তালিকা বর্ণনা কর।” আমি তখন মুররা ইবনে উবায়েদ পর্যন্ত বলে শুনালাম। আর সাথে সাথে আমি বললাম যে, এগুলো মুররা ইবনে উবায়েদের যাকাতের উট। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হাসলেন এবং বললেনঃ “এগুলো আমার কওমেরই উট, এগুলো আমার কওমের সাদুকার মাল। এগুলোতে সাদকার উটগুলোর চিহ্ন দিয়ে দাও এবং ওগুলোর সাথে এগুলোকে মিলিয়ে দাও।” অতঃপর তিনি আমার হাত ধরে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “খাবার কিছু আছে কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ আছে।" অতঃপর আমাদের কাছে চুর্ণ করা রুটির একটা বড় গামলা পাঠানো হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং আমি খেতে শুরু করলাম। আমি এদিক ওদিক হতে খাবার উঠাতে লাগলাম। তখন তিনি তাঁর হাত দ্বারা আমার হাত ধরে নিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা তো একই প্রকারের খাদ্য, সুতরাং একই জায়গা হতে খেতে থাকো। এরপর রসাল খেজুর অথবা শুষ্ক খেজুরের একটি থালা আসলো। আমি ওটা হতে শুধু আমার সামনের দিক হতে খেতে লাগলাম। তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পছন্দ মত থালার এদিক ওদিক হতে নিয়ে খাচ্ছিলেন এবং আমাকেও বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এখানে নানা প্রকারের খেজুর আছে। সুতরাং যেখান হতে ইচ্ছা খাও।” তারপর পানি আসলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাত ধৌত করলেন এবং ঐ ভিজা হাত স্বীয় চেহারার উপর, দুই বাহুর উপর এবং মাথার উপর তিনবার ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা অযু হলো ঐ জিনিস হতে যাকে আগুনে পরিবর্তিত করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বপ্ন খুব পছন্দ করতেন। কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না তা তিনি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন। কেউ কোন স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলে এবং তাতে তিনি আনন্দিত হলে ওটা খুব ভাল স্বপ্ন বলে জানা যেতো। একদা একটি স্ত্রীলোক তার কাছে এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে যেন কেউ আসলো এবং আমাকে মদীনা হতে নিয়ে গিয়ে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিলো। তারপর আমি এক ধমক শুনলাম, যার ফলে জান্নাতে হৈ চৈ পড়ে গেল। আমি চক্ষু উঠিয়ে তাকালে অমুকের পুত্র অমুক, অমুকের পুত্র অমুককে দেখতে পাই।” এভাবে স্ত্রীলোকটি বারোটি লোকের নাম করেন। এই বারোজন লোকেরই একটি বাহিনীকে মাত্র কয়েকদিন পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। মহিলাটি বলতে থাকেনঃ “এ লোকগুলো আতলাস (সাটিন) কাপড় পরিহিত ছিলেন। তাঁদের শিরাগুলো ফুটতে ছিল। নির্দেশ দেয়া হয়ঃ তাদেরকে নহরে বায়দাখ বা নহরে বায়খে নিয়ে যাও। যখন তারা ঐ নদীতে ডুব দিলেন তখন তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চাঁদের মত চমকাতে থাকলো। অতঃপর তাদের জন্যে সোনার থালায় খেজুর আনয়ন করা হয় যা তারা ইচ্ছামত খেলেন। তারপর নানা প্রকারের ফল-মূল তাঁদের কাছে হাযির করা হলো যেগুলো চারদিক হতে বাছাই। করে রাখা হয়েছিল। এগুলো হতেও তাঁরা তাঁদের মনের চাহিদা মত খেলেন। আমিও তাঁদের সাথে শরীক হলাম ও খেলাম।” কিছুদিন পর একজন দূত আসলো এবং বললোঃ “অমুক অমুক ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন যাদেরকে আপনি রণাঙ্গনে পাঠিয়েছিলেন।” দূতটি ঐ বারোজনেরই নাম করলো যে বারোজনকে ঐ মহিলাটি স্বপ্নে দেখেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সতী মহিলাটিকে আবার ডাকিয়ে নেন এবং তাঁকে বলেনঃ “পুনরায় তুমি তোমার স্বপ্নের বৃত্তান্তটি বর্ণনা কর।” মহিলাটি এবারও ঐ লোকগুলোরই নাম করলেন যাদের নাম ঐ দূতটি করেছিলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা মুসিলী (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি যেই ফল জান্নাতের গাছ হতে ভেঙ্গে আনবে, সাথে সাথে ঠিক ঐরূপই আর একটি ফল গাছে এসে লেগে যাবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নাতের পাখী বড় বড় উটের সমান হয়ে জান্নাতের গাছে চরে ও খেয়ে বেড়াবে।” এ কথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে ঐ পাখী তো বড় নিয়ামত উপভোগ করবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যারা এই পাখীর গোশত খাবে তারাই হবে বেশী নিয়ামতের অধিকারী।” তিনবার তিনি একথাই বলেন। তারপর বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! আমি আশা করি যে, তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে যারা এই পাখীগুলোর গোশত খাবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ)-এর সামনে ‘বা বৃক্ষের আলোচনা হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! তৃবা বৃক্ষ কি তা তুমি জান কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেনঃ “এটা হলো জান্নাতের একটি বৃক্ষ যার দৈর্ঘ্য ও বিস্তৃতি যে কত তা একমাত্র আল্লাহই জানেন! এর এক একটি শাখার ছায়ায় একজন অশ্বারোহী সত্তর বছর ধরে চলবে তবুও ওর ছায়া শেষ হবে না। ওর পাতাগুলো খুবই চওড়া ও বড় বড় হবে। ওর উপর বড় বড় উটের সমান সমান পাখী এসে বসবে। তার একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো এই পাখী বড় রকমের নিয়ামতের অধিকারী হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “এই পাখীগুলো অপেক্ষা বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে এগুলোকে ভক্ষণকারীরা। আমি আশা করি যে, তুমিও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু আবদিল্লাহ আল মুকাদ্দাসী (রঃ) তাঁর ‘সিফাতুল জান্নাহ’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। শেষের অংশটি হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাওসার' সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “এটা হলো জান্নাতী নহর, যা মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে দান করেছেন। এর পানি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। এর ধারে বড় বড় উটের সমান পাখী রয়েছে। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তাহলে তো এ পাখীগুলো বড়ই নিয়ামত উপভোগ করছে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলোকে ভক্ষণকারীরা এগুলো অপেক্ষাও বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে।” (এটা আবু বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে একটি পাখী রয়েছে যার সত্তর হাজার পাখা আছে। পাখীটি জান্নাতীর দস্তরখানে আসবে। প্রত্যেক পাখা হতে একপ্রকার রঙ বের হবে। যা দুধের চেয়েও সাদা, মাখনের চেয়েও নরম এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। তারপর দ্বিতীয় পাখা হতে দ্বিতীয় প্রকারের রঙ বের হবে। এভাবে প্রত্যেক পাখা হতে পৃথক পৃথক রঙ বের হয়ে আসবে। তারপর ঐ পাখীটি উড়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি খুবই গরীব। এর বর্ণনাকারী অসাফী এবং তার উস্তাদ দু'জনই দুর্বল)হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতী পাখী বড় বড় উটের মত, যেগুলো জান্নাতের ফল খায় এবং জান্নাতের নহরের পানি পান করে। জান্নাতী যে পাখীর গোশত খাওয়ার ইচ্ছা করবে ঐ পাখী তার সামনে চলে আসবে। সে যত চাইবে যে বাহুর গোশত পছন্দ করবে, খাবে। তারপর ঐ পাখী উড়ে যাবে এবং যেমন ছিল তেমনই হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “জান্নাতের যেই পাখীর গোশত তোমার খাওয়ার ইচ্ছা হবে ঐ পাখীর গোশত রান্নাকৃত অবস্থায় তোমার সামনে এসে যাবে।” (আরবী) শব্দটি অন্য কিরআতে যেরের সাথেও রয়েছে। পেশের সঙ্গে হলে তো অর্থ হবেঃ জান্নাতীদের জন্যে হরসমূহ রয়েছে। আর যেরের সাথে হলে ভাবার্থ এই হবে যে, এটা যেন পূর্ব ই'রাবেরই অনুসারী। যেমনঃ (আরবী)-এই কিরআত এবং যেমন (আরবী)-এই কিরআতে রয়েছে। আর এই অর্থও হতে পারে যে, কিশোরেরা নিজেদের সঙ্গে হুরদেরকেও নিয়ে নিবে। কিন্তু তারা থাকবে তাদের মহলে ও তাঁবুতে, সাধারণভাবে নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই হরগুলো এমন হবে যেমন সতেজ, সাদা ও পরিষ্কার মুক্তা হয়ে থাকে। যেমন সূরায়ে সাফফাতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা যেন সুরক্ষিত ডিম্ব।” সূরায়ে রহমানেও এই বিশেষণ তাফসীরসহ গত হয়েছে। এটা তাদের সৎ কার্যের প্রতিদান। অর্থাৎ এই উপঢৌকন তাদের সকর্মেরই ফল।সেথায় তারা শুনবে না কোন অসার অথবা পাপ বাক্য। ঘূণ্য ও মন্দ কথার একটি শব্দও তাদের কানে আসবে না। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেথায় তারা অসার বাক্য শুনবে না।” (৮৮:১১) হ্যাঁ, তবে তারা শুনবে শুধু ‘সালাম’ আর ‘সালাম’ বাণী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপঢৌকন হবে তাদের একে অপরকে সালাম করা।" (১০:১০) তাদের কথাবার্তা বাজে ও পাপ হতে পবিত্র হবে।

আল-ওয়াকিয়া 56:14

১৩-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা ঐ বিশিষ্ট নৈকট্যলাভকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তারা পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। এই পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি রয়েছে। যেমন একটি উক্তি হলো এই যে, পূর্ববর্তী দ্বারা পূর্ববর্তী উম্মতসমূহ এবং পরবর্তী দ্বারা এই উম্মত অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই উক্তিটিকেই পছন্দ করেছেন এবং এই উক্তির সবলতার পক্ষে ঐ হাদীসটি পেশ করেছেন যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা হলাম পরবর্তী, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরাই হবো পূর্ববর্তী।" এই উক্তির সহায়ক মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হাদীসটিও হতে পারে। তা হলোঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরআন কারীমের আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন এটা নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের উপর খুবই কঠিন ঠেকে। ঐ সময় (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহুসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা হবে জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ, বরং এক তৃতীয়াংশ এমনকি অর্ধাংশ। তোমরাই হবে জান্নাতবাসীদের অর্ধাংশ। আর বাকী অর্ধাংশ সমস্ত উম্মতের মধ্যে বন্টিত হবে যাদের মধ্যে তোমরাও থাকবে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদেও রয়েছে। হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) অবতীর্ণ হয় এবং তাতে বর্ণিত হয় যে, বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে, তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং আমাদের মধ্য হতে হবে কম সংখ্যক?" এটা অবতীর্ণ হওয়ার এক বছর পর (আরবী) অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে বহুসংখ্যক হবে এবং পরবর্তীদের মধ্য হতেও বহুসংখ্যক হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে উমার (রাঃ) শোন, হযরত আদম (আঃ) হতে আমি পর্যন্ত (অর্থাৎ হযরত আদম আঃ-এর যুগ হতে নিয়ে আমার যুগ পর্যন্ত) হলো (আরবী) বহুসংখ্যক। আর শুধু আমার উম্মতই হলো বা বহুসংখ্যক। আমরা আমাদের এই বহুসংখ্যককে পূর্ণ করার জন্যে ঐ হাবশীদেরকেও নিবো যারা উটের রাখাল, কিন্তু তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই।”এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই রিওয়াইয়াতের সনদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। হ্যাঁ, তবে বহু। সনদসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটিও প্রমাণিত যে, তিনি বলেছেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা আহলে জান্নাতের এক চতুর্থাংশ হবে ...... শেষ পর্যন্ত।” সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, এটা আমাদের জন্যে বড় সুসংবাদই বটে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) যে উক্তিটিকে পছন্দ করেছেন তাতে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। বরং প্রকৃতপক্ষে উক্তিটি খুবই দুর্বল। কেননা, কুরআনের ভাষা দ্বারা এই উম্মতের অন্যান্য সমস্ত উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। তাহলে আল্লাহ তা'আলার নিকট নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্য হতে বেশী এবং এই উম্মতের মধ্য হতে কম কি করে হতে পারে? হ্যাঁ, তবে এ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তগণ মিলে শুধু এই উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা হতে অধিক হবেন। কিন্তু বাহ্যতঃ তো এটা জানা যাচ্ছে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা হতে শুধু এই উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই বাক্যের তাফসীরে দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এই উম্মতের প্রথম যুগের লোকদের মধ্য হতে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অনেক বেশী হবে এবং পরবর্তী যুগের লোকদের মধ্য হতে কম হবে। এ উক্তিটি রীতি সম্মত। হযরত হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “নৈকট্য প্রাপ্তগণ তো গত হয়ে গেছেন। কিন্তু হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত করুন।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি বলেনঃ “এই উম্মতের মধ্যে যাঁরা গত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তগণ অনেক ছিলেন।” ইমাম ইবনে সীরীন (রঃ) একথাই বলেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে এই প্রথম যুগীয় লোকদের অনেকেই নৈকট্য প্রাপ্ত হয়েছেন এবং পরবর্তী যুগের লোকদের খুব কম সংখ্যকই এই মর্যাদা লাভ করেছেন। এ নিয়ম ধারাবাহিকভাবেই চলে আসছে। তাহলে ভাবার্থ এরূপ হওয়াও সম্ভব যে, প্রত্যেক উম্মতেরই প্রথম যুগের লোকদের মধ্যে নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক এবং পরবর্তী লোকদের মধ্যে এ সংখ্যা কম। কারণ সহীহ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বযুগের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, তারপর এর পরবর্তী যুগ, এরপর এর পরবর্তী যুগ, (শেষ পর্যন্ত)।" হ্যাঁ, তবে একটি হাদীসে এও এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মত। সুতরাং প্রথম যুগের বৃষ্টি উত্তম কি শেষ যুগের বৃষ্টি উত্তম তা আমার জানা নেই।” হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে এটাকে এই বিষয়ের উপর স্থাপন করা হবে যে, দ্বীনের জন্যে যেমন প্রথম যুগীয় লোকদের প্রয়োজন ছিল যারা পরবর্তী লোকদের জন্যে এর তাবলীগ করেছেন, অনুরূপভাবে শেষ যুগে এটাকে কায়েম রাখার জন্যে শেষ যুগীয় লোকদের প্রয়োজন রয়েছে। যাঁরা লোকদেরকে সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর উপর একত্রিত করবেন, এর রিওয়াইয়াত করবেন এবং জনগণের উপর এটা প্রকাশ করবেন। কিন্তু পূর্বযুগীয় লোকদেরই ফযীলত বেশী হবে। এটা ঠিক এরূপ যে, জমিতে প্রাথমিক বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয় এবং শেষের বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয়। কিন্তু জমি প্রাথমিক বৃষ্টি দ্বারাই বেশী উপকার লাভ করে থাকে। কেননা, প্রথম প্রথম যদি বৃষ্টি না হয় তবে শস্যের বীজ অংকুরিতই হবে না এবং জড় বা মূলও বসবে না। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে বিজয়ী থাকবে। তাদের শত্রুরা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। তাদের বিরোধীরা তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে এবং তারা ঐরূপই থাকবে।” মোটকথা, এই উম্মত বাকী সমস্ত উম্মত হতে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। আর এই উম্মতের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অন্যান্য উন্মতদের তুলনায় বহুগুণে বেশী হবে। তারা হবে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন। কেননা, দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়া এবং নবী (সঃ) সর্বাপেক্ষা মর্যাদা সম্পন্ন হওয়ার দিক দিয়ে এরাই সর্বোত্তম। ধারাবাহিকতার সাথে এ হাদীসটি প্রামাণ্য পৌছে গেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই উম্মতের মধ্য হতে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাবে এবং প্রতি সত্তর হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজার করে লোক থাকবে।হযরত আবূ মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কিয়ামতের দিন একটি বৃহৎ দলকে দাঁড় করানো হবে। তারা সংখ্যায় এতো অধিক হবে যে, অন্ধকার রাত্রির মত তারা যমীনের সমস্ত প্রান্তকে ঘিরে ফেলবে। ফেরেশতারা বলবেনঃ “সমস্ত নবী (আঃ)-এর সঙ্গে যত লোক এসেছে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথে তাদের সকলের সমষ্টির চেয়ে বহুগুণে বেশী এসেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)‘বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহু সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে এই হাদীসটিকে আনয়ন করা যুক্তিযুক্ত হবে যে হাদীসটিকে হাফিয আবু বকর বায়হাকী (রঃ) তাঁর ‘দালাইলুন নবুওয়াহ' নামক গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত আবূ জামাল জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফজরের নামায পড়তেন তখন তিনি পা দুটি মোড়ানো অবস্থাতেই সত্তর বার পাঠ করতেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবূলকারী।” তারপর বলতেনঃ “সত্তরের বদলে সাতশ’। একদিনে যার পাপ সাত শতেরও বেশী হয় তার জন্যে কল্যাণ নেই।” একথা তিনি দু'বার বলতেন। তারপর তিনি জনগণের দিকে মুখ করে বসতেন। স্বপ্ন তার নিকট প্রিয় ছিল বলে তিনি জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি?” আবূ জামাল (রাঃ) বলেন, একদা অভ্যাসমত রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলে আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হ্যাঁ, আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। তিনি বললেনঃ “আল্লাহ কল্যাণের সাথে সাক্ষাৎ দান করুন, অকল্যাণ হতে বাঁচিয়ে রাখুন, আমাদের জন্যে মঙ্গলজনক করুন, শত্রুদের জন্যে করুন ক্ষতিকর, ঐ আল্লাহ সর্বপ্রকারের প্রশংসার অধিকারী যিনি সারা বিশ্বের প্রতিপালক। তুমি এখন তোমার স্বপ্নের ঘটনা বর্ণনা কর।” আমি তখন বলতে শুরু করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি দেখি যে, একটি রাস্তা রয়েছে যা প্রশস্ত, সহজ, নরম ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। অসংখ্য লোক ঐ পথ ধরে চলছে। তারা চলতে চলতে একটি সবুজ-শ্যামল বাগান পেলো যার মত শস্য-শ্যামল ও চমৎকার বাগান আমি কখনো চোখে দেখিনি। ভিতর দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। নানা প্রকারের গাছ ফুলে ফলে ভরপুর রয়েছে। এখন আমি দেখি যে, প্রথম যে দলটি আসলো এবং ঐ বাগানের নিকট পৌঁছলো, তখন তারা তাদের সওয়ারীর গতি বেশ দ্রুত করলো এবং ডানে বামে না গিয়ে দ্রুত গতিতে ঐ স্থান অতিক্রম করলো। তারপর দ্বিতীয় দল আসলো যাদের সংখ্যা বেশী ছিল, যখন তারা এখানে পৌছলো তখন কতকগুলো লোক তাদের বাহনের পশুগুলোকে সেখানে চরাতে শুরু করলো, আর কতকগুলো লোক কিছু গ্রহণ করলো, অতঃপর সেখান হতে প্রস্থান করলো। তারপর আরো বহু লোকের একটি দল আসলো। যখন তারা এই সবুজ-শ্যামল বাগানের নিকট আসলো তখন তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “এটা সবচেয়ে উত্তম জায়গা।” আমি যেন তাদেরকে এখনো দেখতে পাচ্ছি যে, তারা ডানে বামে ঝুঁকে পড়েছে। আমি এসব দেখলাম। কিন্তু আমি তো চলতেই থাকলাম। যখন বহু দূরে চলে গেলাম তখন দেখলাম যে, সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট একটি মিম্বর বিছানো রয়েছে এবং আপনি সর্বোচ্চ সোপানে উপবেশন করেছেন। আর আপনার ডানদিকে এক ব্যক্তি রয়েছেন। তার চেহারা গোধূম বর্ণের, অঙ্গুলিগুলো মোটামোটা এবং দেহ লম্বা। যখন তিনি কথা বলছেন তখন সবাই নীরবে শুনছেন এবং জনগণ উঁচু হয়ে হয়ে মনোযোগের সাথে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিয়েছেন। আপনার বাম দিকে একটি লোক রয়েছেন, যাঁর দেহের গঠন মধ্যম, শরীর মোটা এবং চেহারায় বহু তিল রয়েছে। তাঁর চুল যেন পানিতে সিক্ত। যখন তিনি কথা বলছেন তখন তাঁর সম্মানার্থে সবাই ঝুঁকে পড়ছেন। আর সামনে একজন লোক রয়েছেন, তিনি স্বভাব-চরিত্রে এবং চেহারা ও আকৃতিতে আপনার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত। আপনারা সবাই তার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে আছেন। তাঁর সামনে একটি ক্ষীণ, পাতলা ও বৃদ্ধা উষ্ট্রী রয়েছে। আমি দেখলাম যে, আপনি যেন ওকে উঠাচ্ছেন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর এ অবস্থা দূরীভূত হলো। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “সরল, সোজা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা হলো ঐ দ্বীন যা নিয়ে আমি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এসেছি এবং যে হিদায়াতের উপর তোমরা রয়েছো। তুমি যে সবুজ শ্যামল বাগানটি দেখেছো ওটা হলো দুনিয়া এবং ওর মন মাতানো সাজ-সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র। আমার সাহাবীবর্গ তো ওটা অতিক্রম করে চলে যাবে। না আমরা তাতে লিপ্ত হবো, না ওটা। আমাদেরকে জড়িয়ে ধরবে। না ওর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক থাকবে, না আমরা ওর প্রতি আকৃষ্ট হবো। অতঃপর আমাদের পর দ্বিতীয় দল আসবে যারা সংখ্যায় আমাদের চেয়ে বেশী হবে। তাদের মধ্যে কতক লোকে তো দুনিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়বে। আর কেউ কেউ তা হতে প্রয়োজন মত গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা চলে যাবে এবং পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। তারপর তাদের পরে একটি বিরাট দল আসবে যারা এই দুনিয়ায় সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন হয়ে পড়বে। তারা ডানে বামে ঢুকে পড়বে। সুতরাং (আরবী) (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তারই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী)। এখন থাকলো তোমার কথা। তাহলে জেনে রেখো যে, তুমি তোমার সোজা সরল পথে চলতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত তুমি আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে।সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট মিম্বরের সর্বোচ্চ সোপানে যে তুমি আমাকে দেখেছো তার ব্যাখ্যা এই যে, দুনিয়ার আয়ু হচ্ছে সাত হাজার বছর। আমি শেষ বা সপ্তম হাজারে রয়েছি। আমার ডান দিকে গোধূম বর্ণের মোটা অঙ্গুলি বিশিষ্ট যে। লোকটিকে তুমি দেখেছো তিনি হলেন হযরত মূসা (আঃ)। যখন তিনি কথা বলেন তখন লোকেরা উচু হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং তার সাথে কথা বলে তাঁকে মর্যাদামণ্ডিত করেছেন। আর যে লোকটিকে তুমি আমার বাম দিকে দেখেছো, যিনি মোটা দেহ বিশিষ্ট এবং যার দেহের গঠন মধ্যম ধরনের আর যার চেহারায় বহু তিল রয়েছে এবং যার চুল পানিতে সিক্ত মনে হচ্ছে, তিনি হলেন হযরত ঈসা (আঃ)। যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্মান করেছেন। সেই হেতু আমরাও সবাই তাকে সম্মান করি। যে বৃদ্ধ লোকটিকে তুমি আমার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত দেখেছো তিনি হলেন আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)। আমরা সবাই তাঁকে চাই, তার অনুসরণ করি এবং তাঁর আনুগত্য করে থাকি। আর যে বৃদ্ধা উষ্ট্রীটিকে তুমি দেখেছো যে, আমি ওকে দাঁড় করাচ্ছি ওর দ্বারা কিয়ামত উদ্দেশ্য যা আমার উম্মতের উপর সংঘটিত হবে। না আমার পরে কোন নবী আছে এবং না আমার উম্মতের পরে কোন উম্মত আছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না এ প্রশ্ন করা ছেড়ে দেন। হ্যাঁ, তবে যখন কেউ নিজেই কোন স্বপ্নের কথা বলতো তখন তিনি ঐ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে দিতেন।” মহান আল্লাহ বলেনঃ নৈকট্যপ্রাপ্তদের বিশ্রামের পালঙ্গটি সোনার তার দ্বারা বুননকৃত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা (আরবী) ওযনে (আরবী)-এর অর্থে হবে। যেমন উষ্ট্রীর পেটের নীচে যেটা থাকে ওটাকে (আরবী) বলা হয়। তারা ঐ আসনে হেলান দিয়ে বসবে, পরস্পর মুখখামুখি হয়ে। কেউ কারো দিকে পিঠ করে বসবে না।তাদের সেবায় ঘোরাফিরা করবে চির কিশোরেরা। অর্থাৎ ঐ সেবকরা বয়সে একই অবস্থায় থাকবে। তারা বড়ও হবে না, বুড়োও হবে না এবং তাদের বয়সে কোন পরিবর্তনও হবে না, বরং তারা সদা কিশোরেই থাকবে।(আরবী) বলা হয় ঐ কুঁজাকে যাতে নালী বা চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস থাকে না। (আরবী) আর বলা হয় ঐ পানপাত্রকে যাতে চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস আছে। এগুলো সুরার প্রবহমান প্রস্রবণ হতে পূর্ণ করা থাকবে, যে সুরা কখনো শেষ হবার নয়। কেননা, ওর প্রস্রবণ সদা জারী থাকবে। এই সদা-কিশোরেরা সুরাপূর্ণ এই পানপাত্রগুলো তাদের নরম হাতে নিয়ে ঐ জান্নাতীদের সেবায় এদিক ওদিক ঘোরাফিরা করতে থাকবে। সেই সুরা পানে তাদের শিরঃপীড়াও হবে না এবং তারা জ্ঞানহারাও হবে না। সুতরাং পূর্ণমাত্রায় তারা ঐ সুরার স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে। মদের মধ্যে চারটি বিশেষণ রয়েছে। (এক) নেশা, (দুই) মাথাব্যথা, (তিন) বমি এবং (চার) প্রস্রাব। মহান প্রতিপালক আল্লাহ জান্নাতের সুরা বা মদের বর্ণনা দিয়ে ওকে এই চারটি দোষ হতে মুক্ত বলে ব্যক্ত করলেন। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ চির কিশোরেরা তাদের কাছে ঘোরাফিরা করবে তাদের পছন্দমত নানা প্রকারের ফলমূল নিয়ে এবং তাদের ঈপ্সিত পাখীর গোশত নিয়ে। যে ফল খাওয়ার তাদের ইচ্ছা হবে এবং যে গোশত খেতে তাদের মন চাইবে, সাথে সাথে তারা তা পাবে। এসব রকমারী খাবার নিয়ে তাদের এই চির কিশোরে সেবকরা সদা তাদের চারদিকে ঘোরাফিরা করবে। সুতরাং তাদের যখনই যা খেতে ইচ্ছা করবে তখনই তা তাদের নিকট থেকে নিয়ে নিবে। এই আয়াতে এই দলীল রয়েছে যে, মানুষ ফল বেছে বেছে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী খেতে পারে।হযরত ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার কওম মুররা আমাকে তাদের সাদকার মাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। আমি ঐ মাল নিয়ে মদীনায় পৌঁছি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। আমার সাথে যাকাতের বহু উট ছিল, উটগুলো যেন বালুকার উপর লেগে থাকা গাছগুলোতে চরানো যুবক উট। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কে?” আমি বললামঃ আমি ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “তুমি দূর পর্যন্ত তোমার বংশ তালিকা বর্ণনা কর।” আমি তখন মুররা ইবনে উবায়েদ পর্যন্ত বলে শুনালাম। আর সাথে সাথে আমি বললাম যে, এগুলো মুররা ইবনে উবায়েদের যাকাতের উট। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হাসলেন এবং বললেনঃ “এগুলো আমার কওমেরই উট, এগুলো আমার কওমের সাদুকার মাল। এগুলোতে সাদকার উটগুলোর চিহ্ন দিয়ে দাও এবং ওগুলোর সাথে এগুলোকে মিলিয়ে দাও।” অতঃপর তিনি আমার হাত ধরে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “খাবার কিছু আছে কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ আছে।" অতঃপর আমাদের কাছে চুর্ণ করা রুটির একটা বড় গামলা পাঠানো হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং আমি খেতে শুরু করলাম। আমি এদিক ওদিক হতে খাবার উঠাতে লাগলাম। তখন তিনি তাঁর হাত দ্বারা আমার হাত ধরে নিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা তো একই প্রকারের খাদ্য, সুতরাং একই জায়গা হতে খেতে থাকো। এরপর রসাল খেজুর অথবা শুষ্ক খেজুরের একটি থালা আসলো। আমি ওটা হতে শুধু আমার সামনের দিক হতে খেতে লাগলাম। তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পছন্দ মত থালার এদিক ওদিক হতে নিয়ে খাচ্ছিলেন এবং আমাকেও বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এখানে নানা প্রকারের খেজুর আছে। সুতরাং যেখান হতে ইচ্ছা খাও।” তারপর পানি আসলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাত ধৌত করলেন এবং ঐ ভিজা হাত স্বীয় চেহারার উপর, দুই বাহুর উপর এবং মাথার উপর তিনবার ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা অযু হলো ঐ জিনিস হতে যাকে আগুনে পরিবর্তিত করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বপ্ন খুব পছন্দ করতেন। কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না তা তিনি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন। কেউ কোন স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলে এবং তাতে তিনি আনন্দিত হলে ওটা খুব ভাল স্বপ্ন বলে জানা যেতো। একদা একটি স্ত্রীলোক তার কাছে এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে যেন কেউ আসলো এবং আমাকে মদীনা হতে নিয়ে গিয়ে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিলো। তারপর আমি এক ধমক শুনলাম, যার ফলে জান্নাতে হৈ চৈ পড়ে গেল। আমি চক্ষু উঠিয়ে তাকালে অমুকের পুত্র অমুক, অমুকের পুত্র অমুককে দেখতে পাই।” এভাবে স্ত্রীলোকটি বারোটি লোকের নাম করেন। এই বারোজন লোকেরই একটি বাহিনীকে মাত্র কয়েকদিন পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। মহিলাটি বলতে থাকেনঃ “এ লোকগুলো আতলাস (সাটিন) কাপড় পরিহিত ছিলেন। তাঁদের শিরাগুলো ফুটতে ছিল। নির্দেশ দেয়া হয়ঃ তাদেরকে নহরে বায়দাখ বা নহরে বায়খে নিয়ে যাও। যখন তারা ঐ নদীতে ডুব দিলেন তখন তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চাঁদের মত চমকাতে থাকলো। অতঃপর তাদের জন্যে সোনার থালায় খেজুর আনয়ন করা হয় যা তারা ইচ্ছামত খেলেন। তারপর নানা প্রকারের ফল-মূল তাঁদের কাছে হাযির করা হলো যেগুলো চারদিক হতে বাছাই। করে রাখা হয়েছিল। এগুলো হতেও তাঁরা তাঁদের মনের চাহিদা মত খেলেন। আমিও তাঁদের সাথে শরীক হলাম ও খেলাম।” কিছুদিন পর একজন দূত আসলো এবং বললোঃ “অমুক অমুক ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন যাদেরকে আপনি রণাঙ্গনে পাঠিয়েছিলেন।” দূতটি ঐ বারোজনেরই নাম করলো যে বারোজনকে ঐ মহিলাটি স্বপ্নে দেখেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সতী মহিলাটিকে আবার ডাকিয়ে নেন এবং তাঁকে বলেনঃ “পুনরায় তুমি তোমার স্বপ্নের বৃত্তান্তটি বর্ণনা কর।” মহিলাটি এবারও ঐ লোকগুলোরই নাম করলেন যাদের নাম ঐ দূতটি করেছিলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা মুসিলী (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি যেই ফল জান্নাতের গাছ হতে ভেঙ্গে আনবে, সাথে সাথে ঠিক ঐরূপই আর একটি ফল গাছে এসে লেগে যাবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নাতের পাখী বড় বড় উটের সমান হয়ে জান্নাতের গাছে চরে ও খেয়ে বেড়াবে।” এ কথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে ঐ পাখী তো বড় নিয়ামত উপভোগ করবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যারা এই পাখীর গোশত খাবে তারাই হবে বেশী নিয়ামতের অধিকারী।” তিনবার তিনি একথাই বলেন। তারপর বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! আমি আশা করি যে, তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে যারা এই পাখীগুলোর গোশত খাবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ)-এর সামনে ‘বা বৃক্ষের আলোচনা হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! তৃবা বৃক্ষ কি তা তুমি জান কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেনঃ “এটা হলো জান্নাতের একটি বৃক্ষ যার দৈর্ঘ্য ও বিস্তৃতি যে কত তা একমাত্র আল্লাহই জানেন! এর এক একটি শাখার ছায়ায় একজন অশ্বারোহী সত্তর বছর ধরে চলবে তবুও ওর ছায়া শেষ হবে না। ওর পাতাগুলো খুবই চওড়া ও বড় বড় হবে। ওর উপর বড় বড় উটের সমান সমান পাখী এসে বসবে। তার একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো এই পাখী বড় রকমের নিয়ামতের অধিকারী হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “এই পাখীগুলো অপেক্ষা বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে এগুলোকে ভক্ষণকারীরা। আমি আশা করি যে, তুমিও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু আবদিল্লাহ আল মুকাদ্দাসী (রঃ) তাঁর ‘সিফাতুল জান্নাহ’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। শেষের অংশটি হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাওসার' সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “এটা হলো জান্নাতী নহর, যা মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে দান করেছেন। এর পানি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। এর ধারে বড় বড় উটের সমান পাখী রয়েছে। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তাহলে তো এ পাখীগুলো বড়ই নিয়ামত উপভোগ করছে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলোকে ভক্ষণকারীরা এগুলো অপেক্ষাও বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে।” (এটা আবু বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে একটি পাখী রয়েছে যার সত্তর হাজার পাখা আছে। পাখীটি জান্নাতীর দস্তরখানে আসবে। প্রত্যেক পাখা হতে একপ্রকার রঙ বের হবে। যা দুধের চেয়েও সাদা, মাখনের চেয়েও নরম এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। তারপর দ্বিতীয় পাখা হতে দ্বিতীয় প্রকারের রঙ বের হবে। এভাবে প্রত্যেক পাখা হতে পৃথক পৃথক রঙ বের হয়ে আসবে। তারপর ঐ পাখীটি উড়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি খুবই গরীব। এর বর্ণনাকারী অসাফী এবং তার উস্তাদ দু'জনই দুর্বল)হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতী পাখী বড় বড় উটের মত, যেগুলো জান্নাতের ফল খায় এবং জান্নাতের নহরের পানি পান করে। জান্নাতী যে পাখীর গোশত খাওয়ার ইচ্ছা করবে ঐ পাখী তার সামনে চলে আসবে। সে যত চাইবে যে বাহুর গোশত পছন্দ করবে, খাবে। তারপর ঐ পাখী উড়ে যাবে এবং যেমন ছিল তেমনই হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “জান্নাতের যেই পাখীর গোশত তোমার খাওয়ার ইচ্ছা হবে ঐ পাখীর গোশত রান্নাকৃত অবস্থায় তোমার সামনে এসে যাবে।” (আরবী) শব্দটি অন্য কিরআতে যেরের সাথেও রয়েছে। পেশের সঙ্গে হলে তো অর্থ হবেঃ জান্নাতীদের জন্যে হরসমূহ রয়েছে। আর যেরের সাথে হলে ভাবার্থ এই হবে যে, এটা যেন পূর্ব ই'রাবেরই অনুসারী। যেমনঃ (আরবী)-এই কিরআত এবং যেমন (আরবী)-এই কিরআতে রয়েছে। আর এই অর্থও হতে পারে যে, কিশোরেরা নিজেদের সঙ্গে হুরদেরকেও নিয়ে নিবে। কিন্তু তারা থাকবে তাদের মহলে ও তাঁবুতে, সাধারণভাবে নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই হরগুলো এমন হবে যেমন সতেজ, সাদা ও পরিষ্কার মুক্তা হয়ে থাকে। যেমন সূরায়ে সাফফাতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা যেন সুরক্ষিত ডিম্ব।” সূরায়ে রহমানেও এই বিশেষণ তাফসীরসহ গত হয়েছে। এটা তাদের সৎ কার্যের প্রতিদান। অর্থাৎ এই উপঢৌকন তাদের সকর্মেরই ফল।সেথায় তারা শুনবে না কোন অসার অথবা পাপ বাক্য। ঘূণ্য ও মন্দ কথার একটি শব্দও তাদের কানে আসবে না। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেথায় তারা অসার বাক্য শুনবে না।” (৮৮:১১) হ্যাঁ, তবে তারা শুনবে শুধু ‘সালাম’ আর ‘সালাম’ বাণী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপঢৌকন হবে তাদের একে অপরকে সালাম করা।" (১০:১০) তাদের কথাবার্তা বাজে ও পাপ হতে পবিত্র হবে।

আল-ওয়াকিয়া 56:15

১৩-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা ঐ বিশিষ্ট নৈকট্যলাভকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তারা পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। এই পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি রয়েছে। যেমন একটি উক্তি হলো এই যে, পূর্ববর্তী দ্বারা পূর্ববর্তী উম্মতসমূহ এবং পরবর্তী দ্বারা এই উম্মত অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই উক্তিটিকেই পছন্দ করেছেন এবং এই উক্তির সবলতার পক্ষে ঐ হাদীসটি পেশ করেছেন যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা হলাম পরবর্তী, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরাই হবো পূর্ববর্তী।" এই উক্তির সহায়ক মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হাদীসটিও হতে পারে। তা হলোঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরআন কারীমের আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন এটা নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের উপর খুবই কঠিন ঠেকে। ঐ সময় (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহুসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা হবে জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ, বরং এক তৃতীয়াংশ এমনকি অর্ধাংশ। তোমরাই হবে জান্নাতবাসীদের অর্ধাংশ। আর বাকী অর্ধাংশ সমস্ত উম্মতের মধ্যে বন্টিত হবে যাদের মধ্যে তোমরাও থাকবে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদেও রয়েছে। হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) অবতীর্ণ হয় এবং তাতে বর্ণিত হয় যে, বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে, তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং আমাদের মধ্য হতে হবে কম সংখ্যক?" এটা অবতীর্ণ হওয়ার এক বছর পর (আরবী) অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে বহুসংখ্যক হবে এবং পরবর্তীদের মধ্য হতেও বহুসংখ্যক হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে উমার (রাঃ) শোন, হযরত আদম (আঃ) হতে আমি পর্যন্ত (অর্থাৎ হযরত আদম আঃ-এর যুগ হতে নিয়ে আমার যুগ পর্যন্ত) হলো (আরবী) বহুসংখ্যক। আর শুধু আমার উম্মতই হলো বা বহুসংখ্যক। আমরা আমাদের এই বহুসংখ্যককে পূর্ণ করার জন্যে ঐ হাবশীদেরকেও নিবো যারা উটের রাখাল, কিন্তু তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই।”এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই রিওয়াইয়াতের সনদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। হ্যাঁ, তবে বহু। সনদসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটিও প্রমাণিত যে, তিনি বলেছেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা আহলে জান্নাতের এক চতুর্থাংশ হবে ...... শেষ পর্যন্ত।” সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, এটা আমাদের জন্যে বড় সুসংবাদই বটে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) যে উক্তিটিকে পছন্দ করেছেন তাতে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। বরং প্রকৃতপক্ষে উক্তিটি খুবই দুর্বল। কেননা, কুরআনের ভাষা দ্বারা এই উম্মতের অন্যান্য সমস্ত উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। তাহলে আল্লাহ তা'আলার নিকট নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্য হতে বেশী এবং এই উম্মতের মধ্য হতে কম কি করে হতে পারে? হ্যাঁ, তবে এ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তগণ মিলে শুধু এই উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা হতে অধিক হবেন। কিন্তু বাহ্যতঃ তো এটা জানা যাচ্ছে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা হতে শুধু এই উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই বাক্যের তাফসীরে দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এই উম্মতের প্রথম যুগের লোকদের মধ্য হতে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অনেক বেশী হবে এবং পরবর্তী যুগের লোকদের মধ্য হতে কম হবে। এ উক্তিটি রীতি সম্মত। হযরত হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “নৈকট্য প্রাপ্তগণ তো গত হয়ে গেছেন। কিন্তু হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত করুন।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি বলেনঃ “এই উম্মতের মধ্যে যাঁরা গত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তগণ অনেক ছিলেন।” ইমাম ইবনে সীরীন (রঃ) একথাই বলেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে এই প্রথম যুগীয় লোকদের অনেকেই নৈকট্য প্রাপ্ত হয়েছেন এবং পরবর্তী যুগের লোকদের খুব কম সংখ্যকই এই মর্যাদা লাভ করেছেন। এ নিয়ম ধারাবাহিকভাবেই চলে আসছে। তাহলে ভাবার্থ এরূপ হওয়াও সম্ভব যে, প্রত্যেক উম্মতেরই প্রথম যুগের লোকদের মধ্যে নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক এবং পরবর্তী লোকদের মধ্যে এ সংখ্যা কম। কারণ সহীহ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বযুগের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, তারপর এর পরবর্তী যুগ, এরপর এর পরবর্তী যুগ, (শেষ পর্যন্ত)।" হ্যাঁ, তবে একটি হাদীসে এও এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মত। সুতরাং প্রথম যুগের বৃষ্টি উত্তম কি শেষ যুগের বৃষ্টি উত্তম তা আমার জানা নেই।” হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে এটাকে এই বিষয়ের উপর স্থাপন করা হবে যে, দ্বীনের জন্যে যেমন প্রথম যুগীয় লোকদের প্রয়োজন ছিল যারা পরবর্তী লোকদের জন্যে এর তাবলীগ করেছেন, অনুরূপভাবে শেষ যুগে এটাকে কায়েম রাখার জন্যে শেষ যুগীয় লোকদের প্রয়োজন রয়েছে। যাঁরা লোকদেরকে সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর উপর একত্রিত করবেন, এর রিওয়াইয়াত করবেন এবং জনগণের উপর এটা প্রকাশ করবেন। কিন্তু পূর্বযুগীয় লোকদেরই ফযীলত বেশী হবে। এটা ঠিক এরূপ যে, জমিতে প্রাথমিক বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয় এবং শেষের বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয়। কিন্তু জমি প্রাথমিক বৃষ্টি দ্বারাই বেশী উপকার লাভ করে থাকে। কেননা, প্রথম প্রথম যদি বৃষ্টি না হয় তবে শস্যের বীজ অংকুরিতই হবে না এবং জড় বা মূলও বসবে না। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে বিজয়ী থাকবে। তাদের শত্রুরা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। তাদের বিরোধীরা তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে এবং তারা ঐরূপই থাকবে।” মোটকথা, এই উম্মত বাকী সমস্ত উম্মত হতে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। আর এই উম্মতের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অন্যান্য উন্মতদের তুলনায় বহুগুণে বেশী হবে। তারা হবে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন। কেননা, দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়া এবং নবী (সঃ) সর্বাপেক্ষা মর্যাদা সম্পন্ন হওয়ার দিক দিয়ে এরাই সর্বোত্তম। ধারাবাহিকতার সাথে এ হাদীসটি প্রামাণ্য পৌছে গেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই উম্মতের মধ্য হতে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাবে এবং প্রতি সত্তর হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজার করে লোক থাকবে।হযরত আবূ মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কিয়ামতের দিন একটি বৃহৎ দলকে দাঁড় করানো হবে। তারা সংখ্যায় এতো অধিক হবে যে, অন্ধকার রাত্রির মত তারা যমীনের সমস্ত প্রান্তকে ঘিরে ফেলবে। ফেরেশতারা বলবেনঃ “সমস্ত নবী (আঃ)-এর সঙ্গে যত লোক এসেছে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথে তাদের সকলের সমষ্টির চেয়ে বহুগুণে বেশী এসেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)‘বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহু সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে এই হাদীসটিকে আনয়ন করা যুক্তিযুক্ত হবে যে হাদীসটিকে হাফিয আবু বকর বায়হাকী (রঃ) তাঁর ‘দালাইলুন নবুওয়াহ' নামক গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত আবূ জামাল জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফজরের নামায পড়তেন তখন তিনি পা দুটি মোড়ানো অবস্থাতেই সত্তর বার পাঠ করতেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবূলকারী।” তারপর বলতেনঃ “সত্তরের বদলে সাতশ’। একদিনে যার পাপ সাত শতেরও বেশী হয় তার জন্যে কল্যাণ নেই।” একথা তিনি দু'বার বলতেন। তারপর তিনি জনগণের দিকে মুখ করে বসতেন। স্বপ্ন তার নিকট প্রিয় ছিল বলে তিনি জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি?” আবূ জামাল (রাঃ) বলেন, একদা অভ্যাসমত রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলে আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হ্যাঁ, আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। তিনি বললেনঃ “আল্লাহ কল্যাণের সাথে সাক্ষাৎ দান করুন, অকল্যাণ হতে বাঁচিয়ে রাখুন, আমাদের জন্যে মঙ্গলজনক করুন, শত্রুদের জন্যে করুন ক্ষতিকর, ঐ আল্লাহ সর্বপ্রকারের প্রশংসার অধিকারী যিনি সারা বিশ্বের প্রতিপালক। তুমি এখন তোমার স্বপ্নের ঘটনা বর্ণনা কর।” আমি তখন বলতে শুরু করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি দেখি যে, একটি রাস্তা রয়েছে যা প্রশস্ত, সহজ, নরম ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। অসংখ্য লোক ঐ পথ ধরে চলছে। তারা চলতে চলতে একটি সবুজ-শ্যামল বাগান পেলো যার মত শস্য-শ্যামল ও চমৎকার বাগান আমি কখনো চোখে দেখিনি। ভিতর দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। নানা প্রকারের গাছ ফুলে ফলে ভরপুর রয়েছে। এখন আমি দেখি যে, প্রথম যে দলটি আসলো এবং ঐ বাগানের নিকট পৌঁছলো, তখন তারা তাদের সওয়ারীর গতি বেশ দ্রুত করলো এবং ডানে বামে না গিয়ে দ্রুত গতিতে ঐ স্থান অতিক্রম করলো। তারপর দ্বিতীয় দল আসলো যাদের সংখ্যা বেশী ছিল, যখন তারা এখানে পৌছলো তখন কতকগুলো লোক তাদের বাহনের পশুগুলোকে সেখানে চরাতে শুরু করলো, আর কতকগুলো লোক কিছু গ্রহণ করলো, অতঃপর সেখান হতে প্রস্থান করলো। তারপর আরো বহু লোকের একটি দল আসলো। যখন তারা এই সবুজ-শ্যামল বাগানের নিকট আসলো তখন তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “এটা সবচেয়ে উত্তম জায়গা।” আমি যেন তাদেরকে এখনো দেখতে পাচ্ছি যে, তারা ডানে বামে ঝুঁকে পড়েছে। আমি এসব দেখলাম। কিন্তু আমি তো চলতেই থাকলাম। যখন বহু দূরে চলে গেলাম তখন দেখলাম যে, সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট একটি মিম্বর বিছানো রয়েছে এবং আপনি সর্বোচ্চ সোপানে উপবেশন করেছেন। আর আপনার ডানদিকে এক ব্যক্তি রয়েছেন। তার চেহারা গোধূম বর্ণের, অঙ্গুলিগুলো মোটামোটা এবং দেহ লম্বা। যখন তিনি কথা বলছেন তখন সবাই নীরবে শুনছেন এবং জনগণ উঁচু হয়ে হয়ে মনোযোগের সাথে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিয়েছেন। আপনার বাম দিকে একটি লোক রয়েছেন, যাঁর দেহের গঠন মধ্যম, শরীর মোটা এবং চেহারায় বহু তিল রয়েছে। তাঁর চুল যেন পানিতে সিক্ত। যখন তিনি কথা বলছেন তখন তাঁর সম্মানার্থে সবাই ঝুঁকে পড়ছেন। আর সামনে একজন লোক রয়েছেন, তিনি স্বভাব-চরিত্রে এবং চেহারা ও আকৃতিতে আপনার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত। আপনারা সবাই তার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে আছেন। তাঁর সামনে একটি ক্ষীণ, পাতলা ও বৃদ্ধা উষ্ট্রী রয়েছে। আমি দেখলাম যে, আপনি যেন ওকে উঠাচ্ছেন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর এ অবস্থা দূরীভূত হলো। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “সরল, সোজা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা হলো ঐ দ্বীন যা নিয়ে আমি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এসেছি এবং যে হিদায়াতের উপর তোমরা রয়েছো। তুমি যে সবুজ শ্যামল বাগানটি দেখেছো ওটা হলো দুনিয়া এবং ওর মন মাতানো সাজ-সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র। আমার সাহাবীবর্গ তো ওটা অতিক্রম করে চলে যাবে। না আমরা তাতে লিপ্ত হবো, না ওটা। আমাদেরকে জড়িয়ে ধরবে। না ওর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক থাকবে, না আমরা ওর প্রতি আকৃষ্ট হবো। অতঃপর আমাদের পর দ্বিতীয় দল আসবে যারা সংখ্যায় আমাদের চেয়ে বেশী হবে। তাদের মধ্যে কতক লোকে তো দুনিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়বে। আর কেউ কেউ তা হতে প্রয়োজন মত গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা চলে যাবে এবং পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। তারপর তাদের পরে একটি বিরাট দল আসবে যারা এই দুনিয়ায় সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন হয়ে পড়বে। তারা ডানে বামে ঢুকে পড়বে। সুতরাং (আরবী) (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তারই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী)। এখন থাকলো তোমার কথা। তাহলে জেনে রেখো যে, তুমি তোমার সোজা সরল পথে চলতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত তুমি আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে।সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট মিম্বরের সর্বোচ্চ সোপানে যে তুমি আমাকে দেখেছো তার ব্যাখ্যা এই যে, দুনিয়ার আয়ু হচ্ছে সাত হাজার বছর। আমি শেষ বা সপ্তম হাজারে রয়েছি। আমার ডান দিকে গোধূম বর্ণের মোটা অঙ্গুলি বিশিষ্ট যে। লোকটিকে তুমি দেখেছো তিনি হলেন হযরত মূসা (আঃ)। যখন তিনি কথা বলেন তখন লোকেরা উচু হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং তার সাথে কথা বলে তাঁকে মর্যাদামণ্ডিত করেছেন। আর যে লোকটিকে তুমি আমার বাম দিকে দেখেছো, যিনি মোটা দেহ বিশিষ্ট এবং যার দেহের গঠন মধ্যম ধরনের আর যার চেহারায় বহু তিল রয়েছে এবং যার চুল পানিতে সিক্ত মনে হচ্ছে, তিনি হলেন হযরত ঈসা (আঃ)। যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্মান করেছেন। সেই হেতু আমরাও সবাই তাকে সম্মান করি। যে বৃদ্ধ লোকটিকে তুমি আমার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত দেখেছো তিনি হলেন আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)। আমরা সবাই তাঁকে চাই, তার অনুসরণ করি এবং তাঁর আনুগত্য করে থাকি। আর যে বৃদ্ধা উষ্ট্রীটিকে তুমি দেখেছো যে, আমি ওকে দাঁড় করাচ্ছি ওর দ্বারা কিয়ামত উদ্দেশ্য যা আমার উম্মতের উপর সংঘটিত হবে। না আমার পরে কোন নবী আছে এবং না আমার উম্মতের পরে কোন উম্মত আছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না এ প্রশ্ন করা ছেড়ে দেন। হ্যাঁ, তবে যখন কেউ নিজেই কোন স্বপ্নের কথা বলতো তখন তিনি ঐ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে দিতেন।” মহান আল্লাহ বলেনঃ নৈকট্যপ্রাপ্তদের বিশ্রামের পালঙ্গটি সোনার তার দ্বারা বুননকৃত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা (আরবী) ওযনে (আরবী)-এর অর্থে হবে। যেমন উষ্ট্রীর পেটের নীচে যেটা থাকে ওটাকে (আরবী) বলা হয়। তারা ঐ আসনে হেলান দিয়ে বসবে, পরস্পর মুখখামুখি হয়ে। কেউ কারো দিকে পিঠ করে বসবে না।তাদের সেবায় ঘোরাফিরা করবে চির কিশোরেরা। অর্থাৎ ঐ সেবকরা বয়সে একই অবস্থায় থাকবে। তারা বড়ও হবে না, বুড়োও হবে না এবং তাদের বয়সে কোন পরিবর্তনও হবে না, বরং তারা সদা কিশোরেই থাকবে।(আরবী) বলা হয় ঐ কুঁজাকে যাতে নালী বা চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস থাকে না। (আরবী) আর বলা হয় ঐ পানপাত্রকে যাতে চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস আছে। এগুলো সুরার প্রবহমান প্রস্রবণ হতে পূর্ণ করা থাকবে, যে সুরা কখনো শেষ হবার নয়। কেননা, ওর প্রস্রবণ সদা জারী থাকবে। এই সদা-কিশোরেরা সুরাপূর্ণ এই পানপাত্রগুলো তাদের নরম হাতে নিয়ে ঐ জান্নাতীদের সেবায় এদিক ওদিক ঘোরাফিরা করতে থাকবে। সেই সুরা পানে তাদের শিরঃপীড়াও হবে না এবং তারা জ্ঞানহারাও হবে না। সুতরাং পূর্ণমাত্রায় তারা ঐ সুরার স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে। মদের মধ্যে চারটি বিশেষণ রয়েছে। (এক) নেশা, (দুই) মাথাব্যথা, (তিন) বমি এবং (চার) প্রস্রাব। মহান প্রতিপালক আল্লাহ জান্নাতের সুরা বা মদের বর্ণনা দিয়ে ওকে এই চারটি দোষ হতে মুক্ত বলে ব্যক্ত করলেন। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ চির কিশোরেরা তাদের কাছে ঘোরাফিরা করবে তাদের পছন্দমত নানা প্রকারের ফলমূল নিয়ে এবং তাদের ঈপ্সিত পাখীর গোশত নিয়ে। যে ফল খাওয়ার তাদের ইচ্ছা হবে এবং যে গোশত খেতে তাদের মন চাইবে, সাথে সাথে তারা তা পাবে। এসব রকমারী খাবার নিয়ে তাদের এই চির কিশোরে সেবকরা সদা তাদের চারদিকে ঘোরাফিরা করবে। সুতরাং তাদের যখনই যা খেতে ইচ্ছা করবে তখনই তা তাদের নিকট থেকে নিয়ে নিবে। এই আয়াতে এই দলীল রয়েছে যে, মানুষ ফল বেছে বেছে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী খেতে পারে।হযরত ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার কওম মুররা আমাকে তাদের সাদকার মাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। আমি ঐ মাল নিয়ে মদীনায় পৌঁছি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। আমার সাথে যাকাতের বহু উট ছিল, উটগুলো যেন বালুকার উপর লেগে থাকা গাছগুলোতে চরানো যুবক উট। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কে?” আমি বললামঃ আমি ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “তুমি দূর পর্যন্ত তোমার বংশ তালিকা বর্ণনা কর।” আমি তখন মুররা ইবনে উবায়েদ পর্যন্ত বলে শুনালাম। আর সাথে সাথে আমি বললাম যে, এগুলো মুররা ইবনে উবায়েদের যাকাতের উট। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হাসলেন এবং বললেনঃ “এগুলো আমার কওমেরই উট, এগুলো আমার কওমের সাদুকার মাল। এগুলোতে সাদকার উটগুলোর চিহ্ন দিয়ে দাও এবং ওগুলোর সাথে এগুলোকে মিলিয়ে দাও।” অতঃপর তিনি আমার হাত ধরে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “খাবার কিছু আছে কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ আছে।" অতঃপর আমাদের কাছে চুর্ণ করা রুটির একটা বড় গামলা পাঠানো হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং আমি খেতে শুরু করলাম। আমি এদিক ওদিক হতে খাবার উঠাতে লাগলাম। তখন তিনি তাঁর হাত দ্বারা আমার হাত ধরে নিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা তো একই প্রকারের খাদ্য, সুতরাং একই জায়গা হতে খেতে থাকো। এরপর রসাল খেজুর অথবা শুষ্ক খেজুরের একটি থালা আসলো। আমি ওটা হতে শুধু আমার সামনের দিক হতে খেতে লাগলাম। তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পছন্দ মত থালার এদিক ওদিক হতে নিয়ে খাচ্ছিলেন এবং আমাকেও বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এখানে নানা প্রকারের খেজুর আছে। সুতরাং যেখান হতে ইচ্ছা খাও।” তারপর পানি আসলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাত ধৌত করলেন এবং ঐ ভিজা হাত স্বীয় চেহারার উপর, দুই বাহুর উপর এবং মাথার উপর তিনবার ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা অযু হলো ঐ জিনিস হতে যাকে আগুনে পরিবর্তিত করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বপ্ন খুব পছন্দ করতেন। কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না তা তিনি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন। কেউ কোন স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলে এবং তাতে তিনি আনন্দিত হলে ওটা খুব ভাল স্বপ্ন বলে জানা যেতো। একদা একটি স্ত্রীলোক তার কাছে এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে যেন কেউ আসলো এবং আমাকে মদীনা হতে নিয়ে গিয়ে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিলো। তারপর আমি এক ধমক শুনলাম, যার ফলে জান্নাতে হৈ চৈ পড়ে গেল। আমি চক্ষু উঠিয়ে তাকালে অমুকের পুত্র অমুক, অমুকের পুত্র অমুককে দেখতে পাই।” এভাবে স্ত্রীলোকটি বারোটি লোকের নাম করেন। এই বারোজন লোকেরই একটি বাহিনীকে মাত্র কয়েকদিন পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। মহিলাটি বলতে থাকেনঃ “এ লোকগুলো আতলাস (সাটিন) কাপড় পরিহিত ছিলেন। তাঁদের শিরাগুলো ফুটতে ছিল। নির্দেশ দেয়া হয়ঃ তাদেরকে নহরে বায়দাখ বা নহরে বায়খে নিয়ে যাও। যখন তারা ঐ নদীতে ডুব দিলেন তখন তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চাঁদের মত চমকাতে থাকলো। অতঃপর তাদের জন্যে সোনার থালায় খেজুর আনয়ন করা হয় যা তারা ইচ্ছামত খেলেন। তারপর নানা প্রকারের ফল-মূল তাঁদের কাছে হাযির করা হলো যেগুলো চারদিক হতে বাছাই। করে রাখা হয়েছিল। এগুলো হতেও তাঁরা তাঁদের মনের চাহিদা মত খেলেন। আমিও তাঁদের সাথে শরীক হলাম ও খেলাম।” কিছুদিন পর একজন দূত আসলো এবং বললোঃ “অমুক অমুক ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন যাদেরকে আপনি রণাঙ্গনে পাঠিয়েছিলেন।” দূতটি ঐ বারোজনেরই নাম করলো যে বারোজনকে ঐ মহিলাটি স্বপ্নে দেখেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সতী মহিলাটিকে আবার ডাকিয়ে নেন এবং তাঁকে বলেনঃ “পুনরায় তুমি তোমার স্বপ্নের বৃত্তান্তটি বর্ণনা কর।” মহিলাটি এবারও ঐ লোকগুলোরই নাম করলেন যাদের নাম ঐ দূতটি করেছিলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা মুসিলী (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি যেই ফল জান্নাতের গাছ হতে ভেঙ্গে আনবে, সাথে সাথে ঠিক ঐরূপই আর একটি ফল গাছে এসে লেগে যাবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নাতের পাখী বড় বড় উটের সমান হয়ে জান্নাতের গাছে চরে ও খেয়ে বেড়াবে।” এ কথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে ঐ পাখী তো বড় নিয়ামত উপভোগ করবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যারা এই পাখীর গোশত খাবে তারাই হবে বেশী নিয়ামতের অধিকারী।” তিনবার তিনি একথাই বলেন। তারপর বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! আমি আশা করি যে, তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে যারা এই পাখীগুলোর গোশত খাবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ)-এর সামনে ‘বা বৃক্ষের আলোচনা হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! তৃবা বৃক্ষ কি তা তুমি জান কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেনঃ “এটা হলো জান্নাতের একটি বৃক্ষ যার দৈর্ঘ্য ও বিস্তৃতি যে কত তা একমাত্র আল্লাহই জানেন! এর এক একটি শাখার ছায়ায় একজন অশ্বারোহী সত্তর বছর ধরে চলবে তবুও ওর ছায়া শেষ হবে না। ওর পাতাগুলো খুবই চওড়া ও বড় বড় হবে। ওর উপর বড় বড় উটের সমান সমান পাখী এসে বসবে। তার একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো এই পাখী বড় রকমের নিয়ামতের অধিকারী হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “এই পাখীগুলো অপেক্ষা বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে এগুলোকে ভক্ষণকারীরা। আমি আশা করি যে, তুমিও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু আবদিল্লাহ আল মুকাদ্দাসী (রঃ) তাঁর ‘সিফাতুল জান্নাহ’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। শেষের অংশটি হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাওসার' সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “এটা হলো জান্নাতী নহর, যা মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে দান করেছেন। এর পানি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। এর ধারে বড় বড় উটের সমান পাখী রয়েছে। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তাহলে তো এ পাখীগুলো বড়ই নিয়ামত উপভোগ করছে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলোকে ভক্ষণকারীরা এগুলো অপেক্ষাও বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে।” (এটা আবু বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে একটি পাখী রয়েছে যার সত্তর হাজার পাখা আছে। পাখীটি জান্নাতীর দস্তরখানে আসবে। প্রত্যেক পাখা হতে একপ্রকার রঙ বের হবে। যা দুধের চেয়েও সাদা, মাখনের চেয়েও নরম এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। তারপর দ্বিতীয় পাখা হতে দ্বিতীয় প্রকারের রঙ বের হবে। এভাবে প্রত্যেক পাখা হতে পৃথক পৃথক রঙ বের হয়ে আসবে। তারপর ঐ পাখীটি উড়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি খুবই গরীব। এর বর্ণনাকারী অসাফী এবং তার উস্তাদ দু'জনই দুর্বল)হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতী পাখী বড় বড় উটের মত, যেগুলো জান্নাতের ফল খায় এবং জান্নাতের নহরের পানি পান করে। জান্নাতী যে পাখীর গোশত খাওয়ার ইচ্ছা করবে ঐ পাখী তার সামনে চলে আসবে। সে যত চাইবে যে বাহুর গোশত পছন্দ করবে, খাবে। তারপর ঐ পাখী উড়ে যাবে এবং যেমন ছিল তেমনই হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “জান্নাতের যেই পাখীর গোশত তোমার খাওয়ার ইচ্ছা হবে ঐ পাখীর গোশত রান্নাকৃত অবস্থায় তোমার সামনে এসে যাবে।” (আরবী) শব্দটি অন্য কিরআতে যেরের সাথেও রয়েছে। পেশের সঙ্গে হলে তো অর্থ হবেঃ জান্নাতীদের জন্যে হরসমূহ রয়েছে। আর যেরের সাথে হলে ভাবার্থ এই হবে যে, এটা যেন পূর্ব ই'রাবেরই অনুসারী। যেমনঃ (আরবী)-এই কিরআত এবং যেমন (আরবী)-এই কিরআতে রয়েছে। আর এই অর্থও হতে পারে যে, কিশোরেরা নিজেদের সঙ্গে হুরদেরকেও নিয়ে নিবে। কিন্তু তারা থাকবে তাদের মহলে ও তাঁবুতে, সাধারণভাবে নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই হরগুলো এমন হবে যেমন সতেজ, সাদা ও পরিষ্কার মুক্তা হয়ে থাকে। যেমন সূরায়ে সাফফাতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা যেন সুরক্ষিত ডিম্ব।” সূরায়ে রহমানেও এই বিশেষণ তাফসীরসহ গত হয়েছে। এটা তাদের সৎ কার্যের প্রতিদান। অর্থাৎ এই উপঢৌকন তাদের সকর্মেরই ফল।সেথায় তারা শুনবে না কোন অসার অথবা পাপ বাক্য। ঘূণ্য ও মন্দ কথার একটি শব্দও তাদের কানে আসবে না। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেথায় তারা অসার বাক্য শুনবে না।” (৮৮:১১) হ্যাঁ, তবে তারা শুনবে শুধু ‘সালাম’ আর ‘সালাম’ বাণী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপঢৌকন হবে তাদের একে অপরকে সালাম করা।" (১০:১০) তাদের কথাবার্তা বাজে ও পাপ হতে পবিত্র হবে।

আল-ওয়াকিয়া 56:16

১৩-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা ঐ বিশিষ্ট নৈকট্যলাভকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তারা পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। এই পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি রয়েছে। যেমন একটি উক্তি হলো এই যে, পূর্ববর্তী দ্বারা পূর্ববর্তী উম্মতসমূহ এবং পরবর্তী দ্বারা এই উম্মত অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই উক্তিটিকেই পছন্দ করেছেন এবং এই উক্তির সবলতার পক্ষে ঐ হাদীসটি পেশ করেছেন যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা হলাম পরবর্তী, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরাই হবো পূর্ববর্তী।" এই উক্তির সহায়ক মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হাদীসটিও হতে পারে। তা হলোঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরআন কারীমের আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন এটা নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের উপর খুবই কঠিন ঠেকে। ঐ সময় (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহুসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা হবে জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ, বরং এক তৃতীয়াংশ এমনকি অর্ধাংশ। তোমরাই হবে জান্নাতবাসীদের অর্ধাংশ। আর বাকী অর্ধাংশ সমস্ত উম্মতের মধ্যে বন্টিত হবে যাদের মধ্যে তোমরাও থাকবে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদেও রয়েছে। হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) অবতীর্ণ হয় এবং তাতে বর্ণিত হয় যে, বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে, তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং আমাদের মধ্য হতে হবে কম সংখ্যক?" এটা অবতীর্ণ হওয়ার এক বছর পর (আরবী) অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে বহুসংখ্যক হবে এবং পরবর্তীদের মধ্য হতেও বহুসংখ্যক হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে উমার (রাঃ) শোন, হযরত আদম (আঃ) হতে আমি পর্যন্ত (অর্থাৎ হযরত আদম আঃ-এর যুগ হতে নিয়ে আমার যুগ পর্যন্ত) হলো (আরবী) বহুসংখ্যক। আর শুধু আমার উম্মতই হলো বা বহুসংখ্যক। আমরা আমাদের এই বহুসংখ্যককে পূর্ণ করার জন্যে ঐ হাবশীদেরকেও নিবো যারা উটের রাখাল, কিন্তু তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই।”এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই রিওয়াইয়াতের সনদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। হ্যাঁ, তবে বহু। সনদসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটিও প্রমাণিত যে, তিনি বলেছেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা আহলে জান্নাতের এক চতুর্থাংশ হবে ...... শেষ পর্যন্ত।” সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, এটা আমাদের জন্যে বড় সুসংবাদই বটে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) যে উক্তিটিকে পছন্দ করেছেন তাতে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। বরং প্রকৃতপক্ষে উক্তিটি খুবই দুর্বল। কেননা, কুরআনের ভাষা দ্বারা এই উম্মতের অন্যান্য সমস্ত উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। তাহলে আল্লাহ তা'আলার নিকট নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্য হতে বেশী এবং এই উম্মতের মধ্য হতে কম কি করে হতে পারে? হ্যাঁ, তবে এ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তগণ মিলে শুধু এই উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা হতে অধিক হবেন। কিন্তু বাহ্যতঃ তো এটা জানা যাচ্ছে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা হতে শুধু এই উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই বাক্যের তাফসীরে দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এই উম্মতের প্রথম যুগের লোকদের মধ্য হতে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অনেক বেশী হবে এবং পরবর্তী যুগের লোকদের মধ্য হতে কম হবে। এ উক্তিটি রীতি সম্মত। হযরত হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “নৈকট্য প্রাপ্তগণ তো গত হয়ে গেছেন। কিন্তু হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত করুন।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি বলেনঃ “এই উম্মতের মধ্যে যাঁরা গত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তগণ অনেক ছিলেন।” ইমাম ইবনে সীরীন (রঃ) একথাই বলেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে এই প্রথম যুগীয় লোকদের অনেকেই নৈকট্য প্রাপ্ত হয়েছেন এবং পরবর্তী যুগের লোকদের খুব কম সংখ্যকই এই মর্যাদা লাভ করেছেন। এ নিয়ম ধারাবাহিকভাবেই চলে আসছে। তাহলে ভাবার্থ এরূপ হওয়াও সম্ভব যে, প্রত্যেক উম্মতেরই প্রথম যুগের লোকদের মধ্যে নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক এবং পরবর্তী লোকদের মধ্যে এ সংখ্যা কম। কারণ সহীহ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বযুগের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, তারপর এর পরবর্তী যুগ, এরপর এর পরবর্তী যুগ, (শেষ পর্যন্ত)।" হ্যাঁ, তবে একটি হাদীসে এও এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মত। সুতরাং প্রথম যুগের বৃষ্টি উত্তম কি শেষ যুগের বৃষ্টি উত্তম তা আমার জানা নেই।” হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে এটাকে এই বিষয়ের উপর স্থাপন করা হবে যে, দ্বীনের জন্যে যেমন প্রথম যুগীয় লোকদের প্রয়োজন ছিল যারা পরবর্তী লোকদের জন্যে এর তাবলীগ করেছেন, অনুরূপভাবে শেষ যুগে এটাকে কায়েম রাখার জন্যে শেষ যুগীয় লোকদের প্রয়োজন রয়েছে। যাঁরা লোকদেরকে সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর উপর একত্রিত করবেন, এর রিওয়াইয়াত করবেন এবং জনগণের উপর এটা প্রকাশ করবেন। কিন্তু পূর্বযুগীয় লোকদেরই ফযীলত বেশী হবে। এটা ঠিক এরূপ যে, জমিতে প্রাথমিক বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয় এবং শেষের বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয়। কিন্তু জমি প্রাথমিক বৃষ্টি দ্বারাই বেশী উপকার লাভ করে থাকে। কেননা, প্রথম প্রথম যদি বৃষ্টি না হয় তবে শস্যের বীজ অংকুরিতই হবে না এবং জড় বা মূলও বসবে না। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে বিজয়ী থাকবে। তাদের শত্রুরা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। তাদের বিরোধীরা তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে এবং তারা ঐরূপই থাকবে।” মোটকথা, এই উম্মত বাকী সমস্ত উম্মত হতে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। আর এই উম্মতের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অন্যান্য উন্মতদের তুলনায় বহুগুণে বেশী হবে। তারা হবে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন। কেননা, দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়া এবং নবী (সঃ) সর্বাপেক্ষা মর্যাদা সম্পন্ন হওয়ার দিক দিয়ে এরাই সর্বোত্তম। ধারাবাহিকতার সাথে এ হাদীসটি প্রামাণ্য পৌছে গেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই উম্মতের মধ্য হতে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাবে এবং প্রতি সত্তর হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজার করে লোক থাকবে।হযরত আবূ মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কিয়ামতের দিন একটি বৃহৎ দলকে দাঁড় করানো হবে। তারা সংখ্যায় এতো অধিক হবে যে, অন্ধকার রাত্রির মত তারা যমীনের সমস্ত প্রান্তকে ঘিরে ফেলবে। ফেরেশতারা বলবেনঃ “সমস্ত নবী (আঃ)-এর সঙ্গে যত লোক এসেছে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথে তাদের সকলের সমষ্টির চেয়ে বহুগুণে বেশী এসেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)‘বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহু সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে এই হাদীসটিকে আনয়ন করা যুক্তিযুক্ত হবে যে হাদীসটিকে হাফিয আবু বকর বায়হাকী (রঃ) তাঁর ‘দালাইলুন নবুওয়াহ' নামক গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত আবূ জামাল জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফজরের নামায পড়তেন তখন তিনি পা দুটি মোড়ানো অবস্থাতেই সত্তর বার পাঠ করতেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবূলকারী।” তারপর বলতেনঃ “সত্তরের বদলে সাতশ’। একদিনে যার পাপ সাত শতেরও বেশী হয় তার জন্যে কল্যাণ নেই।” একথা তিনি দু'বার বলতেন। তারপর তিনি জনগণের দিকে মুখ করে বসতেন। স্বপ্ন তার নিকট প্রিয় ছিল বলে তিনি জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি?” আবূ জামাল (রাঃ) বলেন, একদা অভ্যাসমত রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলে আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হ্যাঁ, আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। তিনি বললেনঃ “আল্লাহ কল্যাণের সাথে সাক্ষাৎ দান করুন, অকল্যাণ হতে বাঁচিয়ে রাখুন, আমাদের জন্যে মঙ্গলজনক করুন, শত্রুদের জন্যে করুন ক্ষতিকর, ঐ আল্লাহ সর্বপ্রকারের প্রশংসার অধিকারী যিনি সারা বিশ্বের প্রতিপালক। তুমি এখন তোমার স্বপ্নের ঘটনা বর্ণনা কর।” আমি তখন বলতে শুরু করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি দেখি যে, একটি রাস্তা রয়েছে যা প্রশস্ত, সহজ, নরম ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। অসংখ্য লোক ঐ পথ ধরে চলছে। তারা চলতে চলতে একটি সবুজ-শ্যামল বাগান পেলো যার মত শস্য-শ্যামল ও চমৎকার বাগান আমি কখনো চোখে দেখিনি। ভিতর দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। নানা প্রকারের গাছ ফুলে ফলে ভরপুর রয়েছে। এখন আমি দেখি যে, প্রথম যে দলটি আসলো এবং ঐ বাগানের নিকট পৌঁছলো, তখন তারা তাদের সওয়ারীর গতি বেশ দ্রুত করলো এবং ডানে বামে না গিয়ে দ্রুত গতিতে ঐ স্থান অতিক্রম করলো। তারপর দ্বিতীয় দল আসলো যাদের সংখ্যা বেশী ছিল, যখন তারা এখানে পৌছলো তখন কতকগুলো লোক তাদের বাহনের পশুগুলোকে সেখানে চরাতে শুরু করলো, আর কতকগুলো লোক কিছু গ্রহণ করলো, অতঃপর সেখান হতে প্রস্থান করলো। তারপর আরো বহু লোকের একটি দল আসলো। যখন তারা এই সবুজ-শ্যামল বাগানের নিকট আসলো তখন তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “এটা সবচেয়ে উত্তম জায়গা।” আমি যেন তাদেরকে এখনো দেখতে পাচ্ছি যে, তারা ডানে বামে ঝুঁকে পড়েছে। আমি এসব দেখলাম। কিন্তু আমি তো চলতেই থাকলাম। যখন বহু দূরে চলে গেলাম তখন দেখলাম যে, সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট একটি মিম্বর বিছানো রয়েছে এবং আপনি সর্বোচ্চ সোপানে উপবেশন করেছেন। আর আপনার ডানদিকে এক ব্যক্তি রয়েছেন। তার চেহারা গোধূম বর্ণের, অঙ্গুলিগুলো মোটামোটা এবং দেহ লম্বা। যখন তিনি কথা বলছেন তখন সবাই নীরবে শুনছেন এবং জনগণ উঁচু হয়ে হয়ে মনোযোগের সাথে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিয়েছেন। আপনার বাম দিকে একটি লোক রয়েছেন, যাঁর দেহের গঠন মধ্যম, শরীর মোটা এবং চেহারায় বহু তিল রয়েছে। তাঁর চুল যেন পানিতে সিক্ত। যখন তিনি কথা বলছেন তখন তাঁর সম্মানার্থে সবাই ঝুঁকে পড়ছেন। আর সামনে একজন লোক রয়েছেন, তিনি স্বভাব-চরিত্রে এবং চেহারা ও আকৃতিতে আপনার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত। আপনারা সবাই তার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে আছেন। তাঁর সামনে একটি ক্ষীণ, পাতলা ও বৃদ্ধা উষ্ট্রী রয়েছে। আমি দেখলাম যে, আপনি যেন ওকে উঠাচ্ছেন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর এ অবস্থা দূরীভূত হলো। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “সরল, সোজা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা হলো ঐ দ্বীন যা নিয়ে আমি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এসেছি এবং যে হিদায়াতের উপর তোমরা রয়েছো। তুমি যে সবুজ শ্যামল বাগানটি দেখেছো ওটা হলো দুনিয়া এবং ওর মন মাতানো সাজ-সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র। আমার সাহাবীবর্গ তো ওটা অতিক্রম করে চলে যাবে। না আমরা তাতে লিপ্ত হবো, না ওটা। আমাদেরকে জড়িয়ে ধরবে। না ওর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক থাকবে, না আমরা ওর প্রতি আকৃষ্ট হবো। অতঃপর আমাদের পর দ্বিতীয় দল আসবে যারা সংখ্যায় আমাদের চেয়ে বেশী হবে। তাদের মধ্যে কতক লোকে তো দুনিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়বে। আর কেউ কেউ তা হতে প্রয়োজন মত গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা চলে যাবে এবং পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। তারপর তাদের পরে একটি বিরাট দল আসবে যারা এই দুনিয়ায় সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন হয়ে পড়বে। তারা ডানে বামে ঢুকে পড়বে। সুতরাং (আরবী) (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তারই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী)। এখন থাকলো তোমার কথা। তাহলে জেনে রেখো যে, তুমি তোমার সোজা সরল পথে চলতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত তুমি আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে।সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট মিম্বরের সর্বোচ্চ সোপানে যে তুমি আমাকে দেখেছো তার ব্যাখ্যা এই যে, দুনিয়ার আয়ু হচ্ছে সাত হাজার বছর। আমি শেষ বা সপ্তম হাজারে রয়েছি। আমার ডান দিকে গোধূম বর্ণের মোটা অঙ্গুলি বিশিষ্ট যে। লোকটিকে তুমি দেখেছো তিনি হলেন হযরত মূসা (আঃ)। যখন তিনি কথা বলেন তখন লোকেরা উচু হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং তার সাথে কথা বলে তাঁকে মর্যাদামণ্ডিত করেছেন। আর যে লোকটিকে তুমি আমার বাম দিকে দেখেছো, যিনি মোটা দেহ বিশিষ্ট এবং যার দেহের গঠন মধ্যম ধরনের আর যার চেহারায় বহু তিল রয়েছে এবং যার চুল পানিতে সিক্ত মনে হচ্ছে, তিনি হলেন হযরত ঈসা (আঃ)। যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্মান করেছেন। সেই হেতু আমরাও সবাই তাকে সম্মান করি। যে বৃদ্ধ লোকটিকে তুমি আমার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত দেখেছো তিনি হলেন আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)। আমরা সবাই তাঁকে চাই, তার অনুসরণ করি এবং তাঁর আনুগত্য করে থাকি। আর যে বৃদ্ধা উষ্ট্রীটিকে তুমি দেখেছো যে, আমি ওকে দাঁড় করাচ্ছি ওর দ্বারা কিয়ামত উদ্দেশ্য যা আমার উম্মতের উপর সংঘটিত হবে। না আমার পরে কোন নবী আছে এবং না আমার উম্মতের পরে কোন উম্মত আছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না এ প্রশ্ন করা ছেড়ে দেন। হ্যাঁ, তবে যখন কেউ নিজেই কোন স্বপ্নের কথা বলতো তখন তিনি ঐ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে দিতেন।” মহান আল্লাহ বলেনঃ নৈকট্যপ্রাপ্তদের বিশ্রামের পালঙ্গটি সোনার তার দ্বারা বুননকৃত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা (আরবী) ওযনে (আরবী)-এর অর্থে হবে। যেমন উষ্ট্রীর পেটের নীচে যেটা থাকে ওটাকে (আরবী) বলা হয়। তারা ঐ আসনে হেলান দিয়ে বসবে, পরস্পর মুখখামুখি হয়ে। কেউ কারো দিকে পিঠ করে বসবে না।তাদের সেবায় ঘোরাফিরা করবে চির কিশোরেরা। অর্থাৎ ঐ সেবকরা বয়সে একই অবস্থায় থাকবে। তারা বড়ও হবে না, বুড়োও হবে না এবং তাদের বয়সে কোন পরিবর্তনও হবে না, বরং তারা সদা কিশোরেই থাকবে।(আরবী) বলা হয় ঐ কুঁজাকে যাতে নালী বা চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস থাকে না। (আরবী) আর বলা হয় ঐ পানপাত্রকে যাতে চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস আছে। এগুলো সুরার প্রবহমান প্রস্রবণ হতে পূর্ণ করা থাকবে, যে সুরা কখনো শেষ হবার নয়। কেননা, ওর প্রস্রবণ সদা জারী থাকবে। এই সদা-কিশোরেরা সুরাপূর্ণ এই পানপাত্রগুলো তাদের নরম হাতে নিয়ে ঐ জান্নাতীদের সেবায় এদিক ওদিক ঘোরাফিরা করতে থাকবে। সেই সুরা পানে তাদের শিরঃপীড়াও হবে না এবং তারা জ্ঞানহারাও হবে না। সুতরাং পূর্ণমাত্রায় তারা ঐ সুরার স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে। মদের মধ্যে চারটি বিশেষণ রয়েছে। (এক) নেশা, (দুই) মাথাব্যথা, (তিন) বমি এবং (চার) প্রস্রাব। মহান প্রতিপালক আল্লাহ জান্নাতের সুরা বা মদের বর্ণনা দিয়ে ওকে এই চারটি দোষ হতে মুক্ত বলে ব্যক্ত করলেন। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ চির কিশোরেরা তাদের কাছে ঘোরাফিরা করবে তাদের পছন্দমত নানা প্রকারের ফলমূল নিয়ে এবং তাদের ঈপ্সিত পাখীর গোশত নিয়ে। যে ফল খাওয়ার তাদের ইচ্ছা হবে এবং যে গোশত খেতে তাদের মন চাইবে, সাথে সাথে তারা তা পাবে। এসব রকমারী খাবার নিয়ে তাদের এই চির কিশোরে সেবকরা সদা তাদের চারদিকে ঘোরাফিরা করবে। সুতরাং তাদের যখনই যা খেতে ইচ্ছা করবে তখনই তা তাদের নিকট থেকে নিয়ে নিবে। এই আয়াতে এই দলীল রয়েছে যে, মানুষ ফল বেছে বেছে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী খেতে পারে।হযরত ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার কওম মুররা আমাকে তাদের সাদকার মাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। আমি ঐ মাল নিয়ে মদীনায় পৌঁছি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। আমার সাথে যাকাতের বহু উট ছিল, উটগুলো যেন বালুকার উপর লেগে থাকা গাছগুলোতে চরানো যুবক উট। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কে?” আমি বললামঃ আমি ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “তুমি দূর পর্যন্ত তোমার বংশ তালিকা বর্ণনা কর।” আমি তখন মুররা ইবনে উবায়েদ পর্যন্ত বলে শুনালাম। আর সাথে সাথে আমি বললাম যে, এগুলো মুররা ইবনে উবায়েদের যাকাতের উট। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হাসলেন এবং বললেনঃ “এগুলো আমার কওমেরই উট, এগুলো আমার কওমের সাদুকার মাল। এগুলোতে সাদকার উটগুলোর চিহ্ন দিয়ে দাও এবং ওগুলোর সাথে এগুলোকে মিলিয়ে দাও।” অতঃপর তিনি আমার হাত ধরে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “খাবার কিছু আছে কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ আছে।" অতঃপর আমাদের কাছে চুর্ণ করা রুটির একটা বড় গামলা পাঠানো হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং আমি খেতে শুরু করলাম। আমি এদিক ওদিক হতে খাবার উঠাতে লাগলাম। তখন তিনি তাঁর হাত দ্বারা আমার হাত ধরে নিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা তো একই প্রকারের খাদ্য, সুতরাং একই জায়গা হতে খেতে থাকো। এরপর রসাল খেজুর অথবা শুষ্ক খেজুরের একটি থালা আসলো। আমি ওটা হতে শুধু আমার সামনের দিক হতে খেতে লাগলাম। তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পছন্দ মত থালার এদিক ওদিক হতে নিয়ে খাচ্ছিলেন এবং আমাকেও বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এখানে নানা প্রকারের খেজুর আছে। সুতরাং যেখান হতে ইচ্ছা খাও।” তারপর পানি আসলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাত ধৌত করলেন এবং ঐ ভিজা হাত স্বীয় চেহারার উপর, দুই বাহুর উপর এবং মাথার উপর তিনবার ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা অযু হলো ঐ জিনিস হতে যাকে আগুনে পরিবর্তিত করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বপ্ন খুব পছন্দ করতেন। কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না তা তিনি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন। কেউ কোন স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলে এবং তাতে তিনি আনন্দিত হলে ওটা খুব ভাল স্বপ্ন বলে জানা যেতো। একদা একটি স্ত্রীলোক তার কাছে এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে যেন কেউ আসলো এবং আমাকে মদীনা হতে নিয়ে গিয়ে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিলো। তারপর আমি এক ধমক শুনলাম, যার ফলে জান্নাতে হৈ চৈ পড়ে গেল। আমি চক্ষু উঠিয়ে তাকালে অমুকের পুত্র অমুক, অমুকের পুত্র অমুককে দেখতে পাই।” এভাবে স্ত্রীলোকটি বারোটি লোকের নাম করেন। এই বারোজন লোকেরই একটি বাহিনীকে মাত্র কয়েকদিন পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। মহিলাটি বলতে থাকেনঃ “এ লোকগুলো আতলাস (সাটিন) কাপড় পরিহিত ছিলেন। তাঁদের শিরাগুলো ফুটতে ছিল। নির্দেশ দেয়া হয়ঃ তাদেরকে নহরে বায়দাখ বা নহরে বায়খে নিয়ে যাও। যখন তারা ঐ নদীতে ডুব দিলেন তখন তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চাঁদের মত চমকাতে থাকলো। অতঃপর তাদের জন্যে সোনার থালায় খেজুর আনয়ন করা হয় যা তারা ইচ্ছামত খেলেন। তারপর নানা প্রকারের ফল-মূল তাঁদের কাছে হাযির করা হলো যেগুলো চারদিক হতে বাছাই। করে রাখা হয়েছিল। এগুলো হতেও তাঁরা তাঁদের মনের চাহিদা মত খেলেন। আমিও তাঁদের সাথে শরীক হলাম ও খেলাম।” কিছুদিন পর একজন দূত আসলো এবং বললোঃ “অমুক অমুক ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন যাদেরকে আপনি রণাঙ্গনে পাঠিয়েছিলেন।” দূতটি ঐ বারোজনেরই নাম করলো যে বারোজনকে ঐ মহিলাটি স্বপ্নে দেখেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সতী মহিলাটিকে আবার ডাকিয়ে নেন এবং তাঁকে বলেনঃ “পুনরায় তুমি তোমার স্বপ্নের বৃত্তান্তটি বর্ণনা কর।” মহিলাটি এবারও ঐ লোকগুলোরই নাম করলেন যাদের নাম ঐ দূতটি করেছিলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা মুসিলী (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি যেই ফল জান্নাতের গাছ হতে ভেঙ্গে আনবে, সাথে সাথে ঠিক ঐরূপই আর একটি ফল গাছে এসে লেগে যাবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নাতের পাখী বড় বড় উটের সমান হয়ে জান্নাতের গাছে চরে ও খেয়ে বেড়াবে।” এ কথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে ঐ পাখী তো বড় নিয়ামত উপভোগ করবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যারা এই পাখীর গোশত খাবে তারাই হবে বেশী নিয়ামতের অধিকারী।” তিনবার তিনি একথাই বলেন। তারপর বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! আমি আশা করি যে, তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে যারা এই পাখীগুলোর গোশত খাবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ)-এর সামনে ‘বা বৃক্ষের আলোচনা হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! তৃবা বৃক্ষ কি তা তুমি জান কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেনঃ “এটা হলো জান্নাতের একটি বৃক্ষ যার দৈর্ঘ্য ও বিস্তৃতি যে কত তা একমাত্র আল্লাহই জানেন! এর এক একটি শাখার ছায়ায় একজন অশ্বারোহী সত্তর বছর ধরে চলবে তবুও ওর ছায়া শেষ হবে না। ওর পাতাগুলো খুবই চওড়া ও বড় বড় হবে। ওর উপর বড় বড় উটের সমান সমান পাখী এসে বসবে। তার একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো এই পাখী বড় রকমের নিয়ামতের অধিকারী হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “এই পাখীগুলো অপেক্ষা বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে এগুলোকে ভক্ষণকারীরা। আমি আশা করি যে, তুমিও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু আবদিল্লাহ আল মুকাদ্দাসী (রঃ) তাঁর ‘সিফাতুল জান্নাহ’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। শেষের অংশটি হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাওসার' সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “এটা হলো জান্নাতী নহর, যা মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে দান করেছেন। এর পানি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। এর ধারে বড় বড় উটের সমান পাখী রয়েছে। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তাহলে তো এ পাখীগুলো বড়ই নিয়ামত উপভোগ করছে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলোকে ভক্ষণকারীরা এগুলো অপেক্ষাও বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে।” (এটা আবু বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে একটি পাখী রয়েছে যার সত্তর হাজার পাখা আছে। পাখীটি জান্নাতীর দস্তরখানে আসবে। প্রত্যেক পাখা হতে একপ্রকার রঙ বের হবে। যা দুধের চেয়েও সাদা, মাখনের চেয়েও নরম এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। তারপর দ্বিতীয় পাখা হতে দ্বিতীয় প্রকারের রঙ বের হবে। এভাবে প্রত্যেক পাখা হতে পৃথক পৃথক রঙ বের হয়ে আসবে। তারপর ঐ পাখীটি উড়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি খুবই গরীব। এর বর্ণনাকারী অসাফী এবং তার উস্তাদ দু'জনই দুর্বল)হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতী পাখী বড় বড় উটের মত, যেগুলো জান্নাতের ফল খায় এবং জান্নাতের নহরের পানি পান করে। জান্নাতী যে পাখীর গোশত খাওয়ার ইচ্ছা করবে ঐ পাখী তার সামনে চলে আসবে। সে যত চাইবে যে বাহুর গোশত পছন্দ করবে, খাবে। তারপর ঐ পাখী উড়ে যাবে এবং যেমন ছিল তেমনই হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “জান্নাতের যেই পাখীর গোশত তোমার খাওয়ার ইচ্ছা হবে ঐ পাখীর গোশত রান্নাকৃত অবস্থায় তোমার সামনে এসে যাবে।” (আরবী) শব্দটি অন্য কিরআতে যেরের সাথেও রয়েছে। পেশের সঙ্গে হলে তো অর্থ হবেঃ জান্নাতীদের জন্যে হরসমূহ রয়েছে। আর যেরের সাথে হলে ভাবার্থ এই হবে যে, এটা যেন পূর্ব ই'রাবেরই অনুসারী। যেমনঃ (আরবী)-এই কিরআত এবং যেমন (আরবী)-এই কিরআতে রয়েছে। আর এই অর্থও হতে পারে যে, কিশোরেরা নিজেদের সঙ্গে হুরদেরকেও নিয়ে নিবে। কিন্তু তারা থাকবে তাদের মহলে ও তাঁবুতে, সাধারণভাবে নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই হরগুলো এমন হবে যেমন সতেজ, সাদা ও পরিষ্কার মুক্তা হয়ে থাকে। যেমন সূরায়ে সাফফাতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা যেন সুরক্ষিত ডিম্ব।” সূরায়ে রহমানেও এই বিশেষণ তাফসীরসহ গত হয়েছে। এটা তাদের সৎ কার্যের প্রতিদান। অর্থাৎ এই উপঢৌকন তাদের সকর্মেরই ফল।সেথায় তারা শুনবে না কোন অসার অথবা পাপ বাক্য। ঘূণ্য ও মন্দ কথার একটি শব্দও তাদের কানে আসবে না। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেথায় তারা অসার বাক্য শুনবে না।” (৮৮:১১) হ্যাঁ, তবে তারা শুনবে শুধু ‘সালাম’ আর ‘সালাম’ বাণী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপঢৌকন হবে তাদের একে অপরকে সালাম করা।" (১০:১০) তাদের কথাবার্তা বাজে ও পাপ হতে পবিত্র হবে।

আল-ওয়াকিয়া 56:17

১৩-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা ঐ বিশিষ্ট নৈকট্যলাভকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তারা পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। এই পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি রয়েছে। যেমন একটি উক্তি হলো এই যে, পূর্ববর্তী দ্বারা পূর্ববর্তী উম্মতসমূহ এবং পরবর্তী দ্বারা এই উম্মত অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই উক্তিটিকেই পছন্দ করেছেন এবং এই উক্তির সবলতার পক্ষে ঐ হাদীসটি পেশ করেছেন যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা হলাম পরবর্তী, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরাই হবো পূর্ববর্তী।" এই উক্তির সহায়ক মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হাদীসটিও হতে পারে। তা হলোঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরআন কারীমের আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন এটা নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের উপর খুবই কঠিন ঠেকে। ঐ সময় (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহুসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা হবে জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ, বরং এক তৃতীয়াংশ এমনকি অর্ধাংশ। তোমরাই হবে জান্নাতবাসীদের অর্ধাংশ। আর বাকী অর্ধাংশ সমস্ত উম্মতের মধ্যে বন্টিত হবে যাদের মধ্যে তোমরাও থাকবে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদেও রয়েছে। হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) অবতীর্ণ হয় এবং তাতে বর্ণিত হয় যে, বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে, তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং আমাদের মধ্য হতে হবে কম সংখ্যক?" এটা অবতীর্ণ হওয়ার এক বছর পর (আরবী) অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে বহুসংখ্যক হবে এবং পরবর্তীদের মধ্য হতেও বহুসংখ্যক হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে উমার (রাঃ) শোন, হযরত আদম (আঃ) হতে আমি পর্যন্ত (অর্থাৎ হযরত আদম আঃ-এর যুগ হতে নিয়ে আমার যুগ পর্যন্ত) হলো (আরবী) বহুসংখ্যক। আর শুধু আমার উম্মতই হলো বা বহুসংখ্যক। আমরা আমাদের এই বহুসংখ্যককে পূর্ণ করার জন্যে ঐ হাবশীদেরকেও নিবো যারা উটের রাখাল, কিন্তু তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই।”এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই রিওয়াইয়াতের সনদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। হ্যাঁ, তবে বহু। সনদসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটিও প্রমাণিত যে, তিনি বলেছেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা আহলে জান্নাতের এক চতুর্থাংশ হবে ...... শেষ পর্যন্ত।” সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, এটা আমাদের জন্যে বড় সুসংবাদই বটে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) যে উক্তিটিকে পছন্দ করেছেন তাতে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। বরং প্রকৃতপক্ষে উক্তিটি খুবই দুর্বল। কেননা, কুরআনের ভাষা দ্বারা এই উম্মতের অন্যান্য সমস্ত উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। তাহলে আল্লাহ তা'আলার নিকট নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্য হতে বেশী এবং এই উম্মতের মধ্য হতে কম কি করে হতে পারে? হ্যাঁ, তবে এ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তগণ মিলে শুধু এই উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা হতে অধিক হবেন। কিন্তু বাহ্যতঃ তো এটা জানা যাচ্ছে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা হতে শুধু এই উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই বাক্যের তাফসীরে দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এই উম্মতের প্রথম যুগের লোকদের মধ্য হতে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অনেক বেশী হবে এবং পরবর্তী যুগের লোকদের মধ্য হতে কম হবে। এ উক্তিটি রীতি সম্মত। হযরত হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “নৈকট্য প্রাপ্তগণ তো গত হয়ে গেছেন। কিন্তু হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত করুন।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি বলেনঃ “এই উম্মতের মধ্যে যাঁরা গত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তগণ অনেক ছিলেন।” ইমাম ইবনে সীরীন (রঃ) একথাই বলেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে এই প্রথম যুগীয় লোকদের অনেকেই নৈকট্য প্রাপ্ত হয়েছেন এবং পরবর্তী যুগের লোকদের খুব কম সংখ্যকই এই মর্যাদা লাভ করেছেন। এ নিয়ম ধারাবাহিকভাবেই চলে আসছে। তাহলে ভাবার্থ এরূপ হওয়াও সম্ভব যে, প্রত্যেক উম্মতেরই প্রথম যুগের লোকদের মধ্যে নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক এবং পরবর্তী লোকদের মধ্যে এ সংখ্যা কম। কারণ সহীহ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বযুগের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, তারপর এর পরবর্তী যুগ, এরপর এর পরবর্তী যুগ, (শেষ পর্যন্ত)।" হ্যাঁ, তবে একটি হাদীসে এও এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মত। সুতরাং প্রথম যুগের বৃষ্টি উত্তম কি শেষ যুগের বৃষ্টি উত্তম তা আমার জানা নেই।” হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে এটাকে এই বিষয়ের উপর স্থাপন করা হবে যে, দ্বীনের জন্যে যেমন প্রথম যুগীয় লোকদের প্রয়োজন ছিল যারা পরবর্তী লোকদের জন্যে এর তাবলীগ করেছেন, অনুরূপভাবে শেষ যুগে এটাকে কায়েম রাখার জন্যে শেষ যুগীয় লোকদের প্রয়োজন রয়েছে। যাঁরা লোকদেরকে সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর উপর একত্রিত করবেন, এর রিওয়াইয়াত করবেন এবং জনগণের উপর এটা প্রকাশ করবেন। কিন্তু পূর্বযুগীয় লোকদেরই ফযীলত বেশী হবে। এটা ঠিক এরূপ যে, জমিতে প্রাথমিক বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয় এবং শেষের বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয়। কিন্তু জমি প্রাথমিক বৃষ্টি দ্বারাই বেশী উপকার লাভ করে থাকে। কেননা, প্রথম প্রথম যদি বৃষ্টি না হয় তবে শস্যের বীজ অংকুরিতই হবে না এবং জড় বা মূলও বসবে না। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে বিজয়ী থাকবে। তাদের শত্রুরা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। তাদের বিরোধীরা তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে এবং তারা ঐরূপই থাকবে।” মোটকথা, এই উম্মত বাকী সমস্ত উম্মত হতে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। আর এই উম্মতের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অন্যান্য উন্মতদের তুলনায় বহুগুণে বেশী হবে। তারা হবে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন। কেননা, দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়া এবং নবী (সঃ) সর্বাপেক্ষা মর্যাদা সম্পন্ন হওয়ার দিক দিয়ে এরাই সর্বোত্তম। ধারাবাহিকতার সাথে এ হাদীসটি প্রামাণ্য পৌছে গেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই উম্মতের মধ্য হতে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাবে এবং প্রতি সত্তর হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজার করে লোক থাকবে।হযরত আবূ মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কিয়ামতের দিন একটি বৃহৎ দলকে দাঁড় করানো হবে। তারা সংখ্যায় এতো অধিক হবে যে, অন্ধকার রাত্রির মত তারা যমীনের সমস্ত প্রান্তকে ঘিরে ফেলবে। ফেরেশতারা বলবেনঃ “সমস্ত নবী (আঃ)-এর সঙ্গে যত লোক এসেছে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথে তাদের সকলের সমষ্টির চেয়ে বহুগুণে বেশী এসেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)‘বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহু সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে এই হাদীসটিকে আনয়ন করা যুক্তিযুক্ত হবে যে হাদীসটিকে হাফিয আবু বকর বায়হাকী (রঃ) তাঁর ‘দালাইলুন নবুওয়াহ' নামক গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত আবূ জামাল জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফজরের নামায পড়তেন তখন তিনি পা দুটি মোড়ানো অবস্থাতেই সত্তর বার পাঠ করতেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবূলকারী।” তারপর বলতেনঃ “সত্তরের বদলে সাতশ’। একদিনে যার পাপ সাত শতেরও বেশী হয় তার জন্যে কল্যাণ নেই।” একথা তিনি দু'বার বলতেন। তারপর তিনি জনগণের দিকে মুখ করে বসতেন। স্বপ্ন তার নিকট প্রিয় ছিল বলে তিনি জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি?” আবূ জামাল (রাঃ) বলেন, একদা অভ্যাসমত রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলে আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হ্যাঁ, আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। তিনি বললেনঃ “আল্লাহ কল্যাণের সাথে সাক্ষাৎ দান করুন, অকল্যাণ হতে বাঁচিয়ে রাখুন, আমাদের জন্যে মঙ্গলজনক করুন, শত্রুদের জন্যে করুন ক্ষতিকর, ঐ আল্লাহ সর্বপ্রকারের প্রশংসার অধিকারী যিনি সারা বিশ্বের প্রতিপালক। তুমি এখন তোমার স্বপ্নের ঘটনা বর্ণনা কর।” আমি তখন বলতে শুরু করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি দেখি যে, একটি রাস্তা রয়েছে যা প্রশস্ত, সহজ, নরম ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। অসংখ্য লোক ঐ পথ ধরে চলছে। তারা চলতে চলতে একটি সবুজ-শ্যামল বাগান পেলো যার মত শস্য-শ্যামল ও চমৎকার বাগান আমি কখনো চোখে দেখিনি। ভিতর দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। নানা প্রকারের গাছ ফুলে ফলে ভরপুর রয়েছে। এখন আমি দেখি যে, প্রথম যে দলটি আসলো এবং ঐ বাগানের নিকট পৌঁছলো, তখন তারা তাদের সওয়ারীর গতি বেশ দ্রুত করলো এবং ডানে বামে না গিয়ে দ্রুত গতিতে ঐ স্থান অতিক্রম করলো। তারপর দ্বিতীয় দল আসলো যাদের সংখ্যা বেশী ছিল, যখন তারা এখানে পৌছলো তখন কতকগুলো লোক তাদের বাহনের পশুগুলোকে সেখানে চরাতে শুরু করলো, আর কতকগুলো লোক কিছু গ্রহণ করলো, অতঃপর সেখান হতে প্রস্থান করলো। তারপর আরো বহু লোকের একটি দল আসলো। যখন তারা এই সবুজ-শ্যামল বাগানের নিকট আসলো তখন তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “এটা সবচেয়ে উত্তম জায়গা।” আমি যেন তাদেরকে এখনো দেখতে পাচ্ছি যে, তারা ডানে বামে ঝুঁকে পড়েছে। আমি এসব দেখলাম। কিন্তু আমি তো চলতেই থাকলাম। যখন বহু দূরে চলে গেলাম তখন দেখলাম যে, সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট একটি মিম্বর বিছানো রয়েছে এবং আপনি সর্বোচ্চ সোপানে উপবেশন করেছেন। আর আপনার ডানদিকে এক ব্যক্তি রয়েছেন। তার চেহারা গোধূম বর্ণের, অঙ্গুলিগুলো মোটামোটা এবং দেহ লম্বা। যখন তিনি কথা বলছেন তখন সবাই নীরবে শুনছেন এবং জনগণ উঁচু হয়ে হয়ে মনোযোগের সাথে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিয়েছেন। আপনার বাম দিকে একটি লোক রয়েছেন, যাঁর দেহের গঠন মধ্যম, শরীর মোটা এবং চেহারায় বহু তিল রয়েছে। তাঁর চুল যেন পানিতে সিক্ত। যখন তিনি কথা বলছেন তখন তাঁর সম্মানার্থে সবাই ঝুঁকে পড়ছেন। আর সামনে একজন লোক রয়েছেন, তিনি স্বভাব-চরিত্রে এবং চেহারা ও আকৃতিতে আপনার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত। আপনারা সবাই তার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে আছেন। তাঁর সামনে একটি ক্ষীণ, পাতলা ও বৃদ্ধা উষ্ট্রী রয়েছে। আমি দেখলাম যে, আপনি যেন ওকে উঠাচ্ছেন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর এ অবস্থা দূরীভূত হলো। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “সরল, সোজা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা হলো ঐ দ্বীন যা নিয়ে আমি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এসেছি এবং যে হিদায়াতের উপর তোমরা রয়েছো। তুমি যে সবুজ শ্যামল বাগানটি দেখেছো ওটা হলো দুনিয়া এবং ওর মন মাতানো সাজ-সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র। আমার সাহাবীবর্গ তো ওটা অতিক্রম করে চলে যাবে। না আমরা তাতে লিপ্ত হবো, না ওটা। আমাদেরকে জড়িয়ে ধরবে। না ওর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক থাকবে, না আমরা ওর প্রতি আকৃষ্ট হবো। অতঃপর আমাদের পর দ্বিতীয় দল আসবে যারা সংখ্যায় আমাদের চেয়ে বেশী হবে। তাদের মধ্যে কতক লোকে তো দুনিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়বে। আর কেউ কেউ তা হতে প্রয়োজন মত গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা চলে যাবে এবং পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। তারপর তাদের পরে একটি বিরাট দল আসবে যারা এই দুনিয়ায় সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন হয়ে পড়বে। তারা ডানে বামে ঢুকে পড়বে। সুতরাং (আরবী) (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তারই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী)। এখন থাকলো তোমার কথা। তাহলে জেনে রেখো যে, তুমি তোমার সোজা সরল পথে চলতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত তুমি আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে।সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট মিম্বরের সর্বোচ্চ সোপানে যে তুমি আমাকে দেখেছো তার ব্যাখ্যা এই যে, দুনিয়ার আয়ু হচ্ছে সাত হাজার বছর। আমি শেষ বা সপ্তম হাজারে রয়েছি। আমার ডান দিকে গোধূম বর্ণের মোটা অঙ্গুলি বিশিষ্ট যে। লোকটিকে তুমি দেখেছো তিনি হলেন হযরত মূসা (আঃ)। যখন তিনি কথা বলেন তখন লোকেরা উচু হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং তার সাথে কথা বলে তাঁকে মর্যাদামণ্ডিত করেছেন। আর যে লোকটিকে তুমি আমার বাম দিকে দেখেছো, যিনি মোটা দেহ বিশিষ্ট এবং যার দেহের গঠন মধ্যম ধরনের আর যার চেহারায় বহু তিল রয়েছে এবং যার চুল পানিতে সিক্ত মনে হচ্ছে, তিনি হলেন হযরত ঈসা (আঃ)। যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্মান করেছেন। সেই হেতু আমরাও সবাই তাকে সম্মান করি। যে বৃদ্ধ লোকটিকে তুমি আমার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত দেখেছো তিনি হলেন আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)। আমরা সবাই তাঁকে চাই, তার অনুসরণ করি এবং তাঁর আনুগত্য করে থাকি। আর যে বৃদ্ধা উষ্ট্রীটিকে তুমি দেখেছো যে, আমি ওকে দাঁড় করাচ্ছি ওর দ্বারা কিয়ামত উদ্দেশ্য যা আমার উম্মতের উপর সংঘটিত হবে। না আমার পরে কোন নবী আছে এবং না আমার উম্মতের পরে কোন উম্মত আছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না এ প্রশ্ন করা ছেড়ে দেন। হ্যাঁ, তবে যখন কেউ নিজেই কোন স্বপ্নের কথা বলতো তখন তিনি ঐ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে দিতেন।” মহান আল্লাহ বলেনঃ নৈকট্যপ্রাপ্তদের বিশ্রামের পালঙ্গটি সোনার তার দ্বারা বুননকৃত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা (আরবী) ওযনে (আরবী)-এর অর্থে হবে। যেমন উষ্ট্রীর পেটের নীচে যেটা থাকে ওটাকে (আরবী) বলা হয়। তারা ঐ আসনে হেলান দিয়ে বসবে, পরস্পর মুখখামুখি হয়ে। কেউ কারো দিকে পিঠ করে বসবে না।তাদের সেবায় ঘোরাফিরা করবে চির কিশোরেরা। অর্থাৎ ঐ সেবকরা বয়সে একই অবস্থায় থাকবে। তারা বড়ও হবে না, বুড়োও হবে না এবং তাদের বয়সে কোন পরিবর্তনও হবে না, বরং তারা সদা কিশোরেই থাকবে।(আরবী) বলা হয় ঐ কুঁজাকে যাতে নালী বা চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস থাকে না। (আরবী) আর বলা হয় ঐ পানপাত্রকে যাতে চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস আছে। এগুলো সুরার প্রবহমান প্রস্রবণ হতে পূর্ণ করা থাকবে, যে সুরা কখনো শেষ হবার নয়। কেননা, ওর প্রস্রবণ সদা জারী থাকবে। এই সদা-কিশোরেরা সুরাপূর্ণ এই পানপাত্রগুলো তাদের নরম হাতে নিয়ে ঐ জান্নাতীদের সেবায় এদিক ওদিক ঘোরাফিরা করতে থাকবে। সেই সুরা পানে তাদের শিরঃপীড়াও হবে না এবং তারা জ্ঞানহারাও হবে না। সুতরাং পূর্ণমাত্রায় তারা ঐ সুরার স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে। মদের মধ্যে চারটি বিশেষণ রয়েছে। (এক) নেশা, (দুই) মাথাব্যথা, (তিন) বমি এবং (চার) প্রস্রাব। মহান প্রতিপালক আল্লাহ জান্নাতের সুরা বা মদের বর্ণনা দিয়ে ওকে এই চারটি দোষ হতে মুক্ত বলে ব্যক্ত করলেন। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ চির কিশোরেরা তাদের কাছে ঘোরাফিরা করবে তাদের পছন্দমত নানা প্রকারের ফলমূল নিয়ে এবং তাদের ঈপ্সিত পাখীর গোশত নিয়ে। যে ফল খাওয়ার তাদের ইচ্ছা হবে এবং যে গোশত খেতে তাদের মন চাইবে, সাথে সাথে তারা তা পাবে। এসব রকমারী খাবার নিয়ে তাদের এই চির কিশোরে সেবকরা সদা তাদের চারদিকে ঘোরাফিরা করবে। সুতরাং তাদের যখনই যা খেতে ইচ্ছা করবে তখনই তা তাদের নিকট থেকে নিয়ে নিবে। এই আয়াতে এই দলীল রয়েছে যে, মানুষ ফল বেছে বেছে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী খেতে পারে।হযরত ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার কওম মুররা আমাকে তাদের সাদকার মাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। আমি ঐ মাল নিয়ে মদীনায় পৌঁছি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। আমার সাথে যাকাতের বহু উট ছিল, উটগুলো যেন বালুকার উপর লেগে থাকা গাছগুলোতে চরানো যুবক উট। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কে?” আমি বললামঃ আমি ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “তুমি দূর পর্যন্ত তোমার বংশ তালিকা বর্ণনা কর।” আমি তখন মুররা ইবনে উবায়েদ পর্যন্ত বলে শুনালাম। আর সাথে সাথে আমি বললাম যে, এগুলো মুররা ইবনে উবায়েদের যাকাতের উট। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হাসলেন এবং বললেনঃ “এগুলো আমার কওমেরই উট, এগুলো আমার কওমের সাদুকার মাল। এগুলোতে সাদকার উটগুলোর চিহ্ন দিয়ে দাও এবং ওগুলোর সাথে এগুলোকে মিলিয়ে দাও।” অতঃপর তিনি আমার হাত ধরে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “খাবার কিছু আছে কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ আছে।" অতঃপর আমাদের কাছে চুর্ণ করা রুটির একটা বড় গামলা পাঠানো হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং আমি খেতে শুরু করলাম। আমি এদিক ওদিক হতে খাবার উঠাতে লাগলাম। তখন তিনি তাঁর হাত দ্বারা আমার হাত ধরে নিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা তো একই প্রকারের খাদ্য, সুতরাং একই জায়গা হতে খেতে থাকো। এরপর রসাল খেজুর অথবা শুষ্ক খেজুরের একটি থালা আসলো। আমি ওটা হতে শুধু আমার সামনের দিক হতে খেতে লাগলাম। তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পছন্দ মত থালার এদিক ওদিক হতে নিয়ে খাচ্ছিলেন এবং আমাকেও বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এখানে নানা প্রকারের খেজুর আছে। সুতরাং যেখান হতে ইচ্ছা খাও।” তারপর পানি আসলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাত ধৌত করলেন এবং ঐ ভিজা হাত স্বীয় চেহারার উপর, দুই বাহুর উপর এবং মাথার উপর তিনবার ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা অযু হলো ঐ জিনিস হতে যাকে আগুনে পরিবর্তিত করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বপ্ন খুব পছন্দ করতেন। কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না তা তিনি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন। কেউ কোন স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলে এবং তাতে তিনি আনন্দিত হলে ওটা খুব ভাল স্বপ্ন বলে জানা যেতো। একদা একটি স্ত্রীলোক তার কাছে এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে যেন কেউ আসলো এবং আমাকে মদীনা হতে নিয়ে গিয়ে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিলো। তারপর আমি এক ধমক শুনলাম, যার ফলে জান্নাতে হৈ চৈ পড়ে গেল। আমি চক্ষু উঠিয়ে তাকালে অমুকের পুত্র অমুক, অমুকের পুত্র অমুককে দেখতে পাই।” এভাবে স্ত্রীলোকটি বারোটি লোকের নাম করেন। এই বারোজন লোকেরই একটি বাহিনীকে মাত্র কয়েকদিন পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। মহিলাটি বলতে থাকেনঃ “এ লোকগুলো আতলাস (সাটিন) কাপড় পরিহিত ছিলেন। তাঁদের শিরাগুলো ফুটতে ছিল। নির্দেশ দেয়া হয়ঃ তাদেরকে নহরে বায়দাখ বা নহরে বায়খে নিয়ে যাও। যখন তারা ঐ নদীতে ডুব দিলেন তখন তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চাঁদের মত চমকাতে থাকলো। অতঃপর তাদের জন্যে সোনার থালায় খেজুর আনয়ন করা হয় যা তারা ইচ্ছামত খেলেন। তারপর নানা প্রকারের ফল-মূল তাঁদের কাছে হাযির করা হলো যেগুলো চারদিক হতে বাছাই। করে রাখা হয়েছিল। এগুলো হতেও তাঁরা তাঁদের মনের চাহিদা মত খেলেন। আমিও তাঁদের সাথে শরীক হলাম ও খেলাম।” কিছুদিন পর একজন দূত আসলো এবং বললোঃ “অমুক অমুক ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন যাদেরকে আপনি রণাঙ্গনে পাঠিয়েছিলেন।” দূতটি ঐ বারোজনেরই নাম করলো যে বারোজনকে ঐ মহিলাটি স্বপ্নে দেখেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সতী মহিলাটিকে আবার ডাকিয়ে নেন এবং তাঁকে বলেনঃ “পুনরায় তুমি তোমার স্বপ্নের বৃত্তান্তটি বর্ণনা কর।” মহিলাটি এবারও ঐ লোকগুলোরই নাম করলেন যাদের নাম ঐ দূতটি করেছিলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা মুসিলী (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি যেই ফল জান্নাতের গাছ হতে ভেঙ্গে আনবে, সাথে সাথে ঠিক ঐরূপই আর একটি ফল গাছে এসে লেগে যাবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নাতের পাখী বড় বড় উটের সমান হয়ে জান্নাতের গাছে চরে ও খেয়ে বেড়াবে।” এ কথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে ঐ পাখী তো বড় নিয়ামত উপভোগ করবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যারা এই পাখীর গোশত খাবে তারাই হবে বেশী নিয়ামতের অধিকারী।” তিনবার তিনি একথাই বলেন। তারপর বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! আমি আশা করি যে, তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে যারা এই পাখীগুলোর গোশত খাবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ)-এর সামনে ‘বা বৃক্ষের আলোচনা হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! তৃবা বৃক্ষ কি তা তুমি জান কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেনঃ “এটা হলো জান্নাতের একটি বৃক্ষ যার দৈর্ঘ্য ও বিস্তৃতি যে কত তা একমাত্র আল্লাহই জানেন! এর এক একটি শাখার ছায়ায় একজন অশ্বারোহী সত্তর বছর ধরে চলবে তবুও ওর ছায়া শেষ হবে না। ওর পাতাগুলো খুবই চওড়া ও বড় বড় হবে। ওর উপর বড় বড় উটের সমান সমান পাখী এসে বসবে। তার একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো এই পাখী বড় রকমের নিয়ামতের অধিকারী হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “এই পাখীগুলো অপেক্ষা বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে এগুলোকে ভক্ষণকারীরা। আমি আশা করি যে, তুমিও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু আবদিল্লাহ আল মুকাদ্দাসী (রঃ) তাঁর ‘সিফাতুল জান্নাহ’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। শেষের অংশটি হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাওসার' সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “এটা হলো জান্নাতী নহর, যা মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে দান করেছেন। এর পানি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। এর ধারে বড় বড় উটের সমান পাখী রয়েছে। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তাহলে তো এ পাখীগুলো বড়ই নিয়ামত উপভোগ করছে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলোকে ভক্ষণকারীরা এগুলো অপেক্ষাও বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে।” (এটা আবু বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে একটি পাখী রয়েছে যার সত্তর হাজার পাখা আছে। পাখীটি জান্নাতীর দস্তরখানে আসবে। প্রত্যেক পাখা হতে একপ্রকার রঙ বের হবে। যা দুধের চেয়েও সাদা, মাখনের চেয়েও নরম এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। তারপর দ্বিতীয় পাখা হতে দ্বিতীয় প্রকারের রঙ বের হবে। এভাবে প্রত্যেক পাখা হতে পৃথক পৃথক রঙ বের হয়ে আসবে। তারপর ঐ পাখীটি উড়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি খুবই গরীব। এর বর্ণনাকারী অসাফী এবং তার উস্তাদ দু'জনই দুর্বল)হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতী পাখী বড় বড় উটের মত, যেগুলো জান্নাতের ফল খায় এবং জান্নাতের নহরের পানি পান করে। জান্নাতী যে পাখীর গোশত খাওয়ার ইচ্ছা করবে ঐ পাখী তার সামনে চলে আসবে। সে যত চাইবে যে বাহুর গোশত পছন্দ করবে, খাবে। তারপর ঐ পাখী উড়ে যাবে এবং যেমন ছিল তেমনই হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “জান্নাতের যেই পাখীর গোশত তোমার খাওয়ার ইচ্ছা হবে ঐ পাখীর গোশত রান্নাকৃত অবস্থায় তোমার সামনে এসে যাবে।” (আরবী) শব্দটি অন্য কিরআতে যেরের সাথেও রয়েছে। পেশের সঙ্গে হলে তো অর্থ হবেঃ জান্নাতীদের জন্যে হরসমূহ রয়েছে। আর যেরের সাথে হলে ভাবার্থ এই হবে যে, এটা যেন পূর্ব ই'রাবেরই অনুসারী। যেমনঃ (আরবী)-এই কিরআত এবং যেমন (আরবী)-এই কিরআতে রয়েছে। আর এই অর্থও হতে পারে যে, কিশোরেরা নিজেদের সঙ্গে হুরদেরকেও নিয়ে নিবে। কিন্তু তারা থাকবে তাদের মহলে ও তাঁবুতে, সাধারণভাবে নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই হরগুলো এমন হবে যেমন সতেজ, সাদা ও পরিষ্কার মুক্তা হয়ে থাকে। যেমন সূরায়ে সাফফাতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা যেন সুরক্ষিত ডিম্ব।” সূরায়ে রহমানেও এই বিশেষণ তাফসীরসহ গত হয়েছে। এটা তাদের সৎ কার্যের প্রতিদান। অর্থাৎ এই উপঢৌকন তাদের সকর্মেরই ফল।সেথায় তারা শুনবে না কোন অসার অথবা পাপ বাক্য। ঘূণ্য ও মন্দ কথার একটি শব্দও তাদের কানে আসবে না। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেথায় তারা অসার বাক্য শুনবে না।” (৮৮:১১) হ্যাঁ, তবে তারা শুনবে শুধু ‘সালাম’ আর ‘সালাম’ বাণী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপঢৌকন হবে তাদের একে অপরকে সালাম করা।" (১০:১০) তাদের কথাবার্তা বাজে ও পাপ হতে পবিত্র হবে।

আল-ওয়াকিয়া 56:18

১৩-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা ঐ বিশিষ্ট নৈকট্যলাভকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তারা পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। এই পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি রয়েছে। যেমন একটি উক্তি হলো এই যে, পূর্ববর্তী দ্বারা পূর্ববর্তী উম্মতসমূহ এবং পরবর্তী দ্বারা এই উম্মত অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই উক্তিটিকেই পছন্দ করেছেন এবং এই উক্তির সবলতার পক্ষে ঐ হাদীসটি পেশ করেছেন যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা হলাম পরবর্তী, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরাই হবো পূর্ববর্তী।" এই উক্তির সহায়ক মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হাদীসটিও হতে পারে। তা হলোঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরআন কারীমের আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন এটা নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের উপর খুবই কঠিন ঠেকে। ঐ সময় (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহুসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা হবে জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ, বরং এক তৃতীয়াংশ এমনকি অর্ধাংশ। তোমরাই হবে জান্নাতবাসীদের অর্ধাংশ। আর বাকী অর্ধাংশ সমস্ত উম্মতের মধ্যে বন্টিত হবে যাদের মধ্যে তোমরাও থাকবে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদেও রয়েছে। হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) অবতীর্ণ হয় এবং তাতে বর্ণিত হয় যে, বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে, তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং আমাদের মধ্য হতে হবে কম সংখ্যক?" এটা অবতীর্ণ হওয়ার এক বছর পর (আরবী) অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে বহুসংখ্যক হবে এবং পরবর্তীদের মধ্য হতেও বহুসংখ্যক হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে উমার (রাঃ) শোন, হযরত আদম (আঃ) হতে আমি পর্যন্ত (অর্থাৎ হযরত আদম আঃ-এর যুগ হতে নিয়ে আমার যুগ পর্যন্ত) হলো (আরবী) বহুসংখ্যক। আর শুধু আমার উম্মতই হলো বা বহুসংখ্যক। আমরা আমাদের এই বহুসংখ্যককে পূর্ণ করার জন্যে ঐ হাবশীদেরকেও নিবো যারা উটের রাখাল, কিন্তু তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই।”এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই রিওয়াইয়াতের সনদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। হ্যাঁ, তবে বহু। সনদসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটিও প্রমাণিত যে, তিনি বলেছেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা আহলে জান্নাতের এক চতুর্থাংশ হবে ...... শেষ পর্যন্ত।” সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, এটা আমাদের জন্যে বড় সুসংবাদই বটে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) যে উক্তিটিকে পছন্দ করেছেন তাতে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। বরং প্রকৃতপক্ষে উক্তিটি খুবই দুর্বল। কেননা, কুরআনের ভাষা দ্বারা এই উম্মতের অন্যান্য সমস্ত উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। তাহলে আল্লাহ তা'আলার নিকট নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্য হতে বেশী এবং এই উম্মতের মধ্য হতে কম কি করে হতে পারে? হ্যাঁ, তবে এ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তগণ মিলে শুধু এই উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা হতে অধিক হবেন। কিন্তু বাহ্যতঃ তো এটা জানা যাচ্ছে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা হতে শুধু এই উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই বাক্যের তাফসীরে দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এই উম্মতের প্রথম যুগের লোকদের মধ্য হতে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অনেক বেশী হবে এবং পরবর্তী যুগের লোকদের মধ্য হতে কম হবে। এ উক্তিটি রীতি সম্মত। হযরত হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “নৈকট্য প্রাপ্তগণ তো গত হয়ে গেছেন। কিন্তু হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত করুন।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি বলেনঃ “এই উম্মতের মধ্যে যাঁরা গত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তগণ অনেক ছিলেন।” ইমাম ইবনে সীরীন (রঃ) একথাই বলেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে এই প্রথম যুগীয় লোকদের অনেকেই নৈকট্য প্রাপ্ত হয়েছেন এবং পরবর্তী যুগের লোকদের খুব কম সংখ্যকই এই মর্যাদা লাভ করেছেন। এ নিয়ম ধারাবাহিকভাবেই চলে আসছে। তাহলে ভাবার্থ এরূপ হওয়াও সম্ভব যে, প্রত্যেক উম্মতেরই প্রথম যুগের লোকদের মধ্যে নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক এবং পরবর্তী লোকদের মধ্যে এ সংখ্যা কম। কারণ সহীহ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বযুগের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, তারপর এর পরবর্তী যুগ, এরপর এর পরবর্তী যুগ, (শেষ পর্যন্ত)।" হ্যাঁ, তবে একটি হাদীসে এও এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মত। সুতরাং প্রথম যুগের বৃষ্টি উত্তম কি শেষ যুগের বৃষ্টি উত্তম তা আমার জানা নেই।” হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে এটাকে এই বিষয়ের উপর স্থাপন করা হবে যে, দ্বীনের জন্যে যেমন প্রথম যুগীয় লোকদের প্রয়োজন ছিল যারা পরবর্তী লোকদের জন্যে এর তাবলীগ করেছেন, অনুরূপভাবে শেষ যুগে এটাকে কায়েম রাখার জন্যে শেষ যুগীয় লোকদের প্রয়োজন রয়েছে। যাঁরা লোকদেরকে সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর উপর একত্রিত করবেন, এর রিওয়াইয়াত করবেন এবং জনগণের উপর এটা প্রকাশ করবেন। কিন্তু পূর্বযুগীয় লোকদেরই ফযীলত বেশী হবে। এটা ঠিক এরূপ যে, জমিতে প্রাথমিক বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয় এবং শেষের বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয়। কিন্তু জমি প্রাথমিক বৃষ্টি দ্বারাই বেশী উপকার লাভ করে থাকে। কেননা, প্রথম প্রথম যদি বৃষ্টি না হয় তবে শস্যের বীজ অংকুরিতই হবে না এবং জড় বা মূলও বসবে না। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে বিজয়ী থাকবে। তাদের শত্রুরা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। তাদের বিরোধীরা তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে এবং তারা ঐরূপই থাকবে।” মোটকথা, এই উম্মত বাকী সমস্ত উম্মত হতে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। আর এই উম্মতের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অন্যান্য উন্মতদের তুলনায় বহুগুণে বেশী হবে। তারা হবে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন। কেননা, দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়া এবং নবী (সঃ) সর্বাপেক্ষা মর্যাদা সম্পন্ন হওয়ার দিক দিয়ে এরাই সর্বোত্তম। ধারাবাহিকতার সাথে এ হাদীসটি প্রামাণ্য পৌছে গেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই উম্মতের মধ্য হতে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাবে এবং প্রতি সত্তর হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজার করে লোক থাকবে।হযরত আবূ মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কিয়ামতের দিন একটি বৃহৎ দলকে দাঁড় করানো হবে। তারা সংখ্যায় এতো অধিক হবে যে, অন্ধকার রাত্রির মত তারা যমীনের সমস্ত প্রান্তকে ঘিরে ফেলবে। ফেরেশতারা বলবেনঃ “সমস্ত নবী (আঃ)-এর সঙ্গে যত লোক এসেছে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথে তাদের সকলের সমষ্টির চেয়ে বহুগুণে বেশী এসেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)‘বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহু সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে এই হাদীসটিকে আনয়ন করা যুক্তিযুক্ত হবে যে হাদীসটিকে হাফিয আবু বকর বায়হাকী (রঃ) তাঁর ‘দালাইলুন নবুওয়াহ' নামক গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত আবূ জামাল জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফজরের নামায পড়তেন তখন তিনি পা দুটি মোড়ানো অবস্থাতেই সত্তর বার পাঠ করতেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবূলকারী।” তারপর বলতেনঃ “সত্তরের বদলে সাতশ’। একদিনে যার পাপ সাত শতেরও বেশী হয় তার জন্যে কল্যাণ নেই।” একথা তিনি দু'বার বলতেন। তারপর তিনি জনগণের দিকে মুখ করে বসতেন। স্বপ্ন তার নিকট প্রিয় ছিল বলে তিনি জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি?” আবূ জামাল (রাঃ) বলেন, একদা অভ্যাসমত রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলে আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হ্যাঁ, আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। তিনি বললেনঃ “আল্লাহ কল্যাণের সাথে সাক্ষাৎ দান করুন, অকল্যাণ হতে বাঁচিয়ে রাখুন, আমাদের জন্যে মঙ্গলজনক করুন, শত্রুদের জন্যে করুন ক্ষতিকর, ঐ আল্লাহ সর্বপ্রকারের প্রশংসার অধিকারী যিনি সারা বিশ্বের প্রতিপালক। তুমি এখন তোমার স্বপ্নের ঘটনা বর্ণনা কর।” আমি তখন বলতে শুরু করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি দেখি যে, একটি রাস্তা রয়েছে যা প্রশস্ত, সহজ, নরম ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। অসংখ্য লোক ঐ পথ ধরে চলছে। তারা চলতে চলতে একটি সবুজ-শ্যামল বাগান পেলো যার মত শস্য-শ্যামল ও চমৎকার বাগান আমি কখনো চোখে দেখিনি। ভিতর দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। নানা প্রকারের গাছ ফুলে ফলে ভরপুর রয়েছে। এখন আমি দেখি যে, প্রথম যে দলটি আসলো এবং ঐ বাগানের নিকট পৌঁছলো, তখন তারা তাদের সওয়ারীর গতি বেশ দ্রুত করলো এবং ডানে বামে না গিয়ে দ্রুত গতিতে ঐ স্থান অতিক্রম করলো। তারপর দ্বিতীয় দল আসলো যাদের সংখ্যা বেশী ছিল, যখন তারা এখানে পৌছলো তখন কতকগুলো লোক তাদের বাহনের পশুগুলোকে সেখানে চরাতে শুরু করলো, আর কতকগুলো লোক কিছু গ্রহণ করলো, অতঃপর সেখান হতে প্রস্থান করলো। তারপর আরো বহু লোকের একটি দল আসলো। যখন তারা এই সবুজ-শ্যামল বাগানের নিকট আসলো তখন তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “এটা সবচেয়ে উত্তম জায়গা।” আমি যেন তাদেরকে এখনো দেখতে পাচ্ছি যে, তারা ডানে বামে ঝুঁকে পড়েছে। আমি এসব দেখলাম। কিন্তু আমি তো চলতেই থাকলাম। যখন বহু দূরে চলে গেলাম তখন দেখলাম যে, সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট একটি মিম্বর বিছানো রয়েছে এবং আপনি সর্বোচ্চ সোপানে উপবেশন করেছেন। আর আপনার ডানদিকে এক ব্যক্তি রয়েছেন। তার চেহারা গোধূম বর্ণের, অঙ্গুলিগুলো মোটামোটা এবং দেহ লম্বা। যখন তিনি কথা বলছেন তখন সবাই নীরবে শুনছেন এবং জনগণ উঁচু হয়ে হয়ে মনোযোগের সাথে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিয়েছেন। আপনার বাম দিকে একটি লোক রয়েছেন, যাঁর দেহের গঠন মধ্যম, শরীর মোটা এবং চেহারায় বহু তিল রয়েছে। তাঁর চুল যেন পানিতে সিক্ত। যখন তিনি কথা বলছেন তখন তাঁর সম্মানার্থে সবাই ঝুঁকে পড়ছেন। আর সামনে একজন লোক রয়েছেন, তিনি স্বভাব-চরিত্রে এবং চেহারা ও আকৃতিতে আপনার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত। আপনারা সবাই তার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে আছেন। তাঁর সামনে একটি ক্ষীণ, পাতলা ও বৃদ্ধা উষ্ট্রী রয়েছে। আমি দেখলাম যে, আপনি যেন ওকে উঠাচ্ছেন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর এ অবস্থা দূরীভূত হলো। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “সরল, সোজা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা হলো ঐ দ্বীন যা নিয়ে আমি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এসেছি এবং যে হিদায়াতের উপর তোমরা রয়েছো। তুমি যে সবুজ শ্যামল বাগানটি দেখেছো ওটা হলো দুনিয়া এবং ওর মন মাতানো সাজ-সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র। আমার সাহাবীবর্গ তো ওটা অতিক্রম করে চলে যাবে। না আমরা তাতে লিপ্ত হবো, না ওটা। আমাদেরকে জড়িয়ে ধরবে। না ওর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক থাকবে, না আমরা ওর প্রতি আকৃষ্ট হবো। অতঃপর আমাদের পর দ্বিতীয় দল আসবে যারা সংখ্যায় আমাদের চেয়ে বেশী হবে। তাদের মধ্যে কতক লোকে তো দুনিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়বে। আর কেউ কেউ তা হতে প্রয়োজন মত গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা চলে যাবে এবং পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। তারপর তাদের পরে একটি বিরাট দল আসবে যারা এই দুনিয়ায় সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন হয়ে পড়বে। তারা ডানে বামে ঢুকে পড়বে। সুতরাং (আরবী) (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তারই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী)। এখন থাকলো তোমার কথা। তাহলে জেনে রেখো যে, তুমি তোমার সোজা সরল পথে চলতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত তুমি আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে।সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট মিম্বরের সর্বোচ্চ সোপানে যে তুমি আমাকে দেখেছো তার ব্যাখ্যা এই যে, দুনিয়ার আয়ু হচ্ছে সাত হাজার বছর। আমি শেষ বা সপ্তম হাজারে রয়েছি। আমার ডান দিকে গোধূম বর্ণের মোটা অঙ্গুলি বিশিষ্ট যে। লোকটিকে তুমি দেখেছো তিনি হলেন হযরত মূসা (আঃ)। যখন তিনি কথা বলেন তখন লোকেরা উচু হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং তার সাথে কথা বলে তাঁকে মর্যাদামণ্ডিত করেছেন। আর যে লোকটিকে তুমি আমার বাম দিকে দেখেছো, যিনি মোটা দেহ বিশিষ্ট এবং যার দেহের গঠন মধ্যম ধরনের আর যার চেহারায় বহু তিল রয়েছে এবং যার চুল পানিতে সিক্ত মনে হচ্ছে, তিনি হলেন হযরত ঈসা (আঃ)। যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্মান করেছেন। সেই হেতু আমরাও সবাই তাকে সম্মান করি। যে বৃদ্ধ লোকটিকে তুমি আমার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত দেখেছো তিনি হলেন আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)। আমরা সবাই তাঁকে চাই, তার অনুসরণ করি এবং তাঁর আনুগত্য করে থাকি। আর যে বৃদ্ধা উষ্ট্রীটিকে তুমি দেখেছো যে, আমি ওকে দাঁড় করাচ্ছি ওর দ্বারা কিয়ামত উদ্দেশ্য যা আমার উম্মতের উপর সংঘটিত হবে। না আমার পরে কোন নবী আছে এবং না আমার উম্মতের পরে কোন উম্মত আছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না এ প্রশ্ন করা ছেড়ে দেন। হ্যাঁ, তবে যখন কেউ নিজেই কোন স্বপ্নের কথা বলতো তখন তিনি ঐ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে দিতেন।” মহান আল্লাহ বলেনঃ নৈকট্যপ্রাপ্তদের বিশ্রামের পালঙ্গটি সোনার তার দ্বারা বুননকৃত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা (আরবী) ওযনে (আরবী)-এর অর্থে হবে। যেমন উষ্ট্রীর পেটের নীচে যেটা থাকে ওটাকে (আরবী) বলা হয়। তারা ঐ আসনে হেলান দিয়ে বসবে, পরস্পর মুখখামুখি হয়ে। কেউ কারো দিকে পিঠ করে বসবে না।তাদের সেবায় ঘোরাফিরা করবে চির কিশোরেরা। অর্থাৎ ঐ সেবকরা বয়সে একই অবস্থায় থাকবে। তারা বড়ও হবে না, বুড়োও হবে না এবং তাদের বয়সে কোন পরিবর্তনও হবে না, বরং তারা সদা কিশোরেই থাকবে।(আরবী) বলা হয় ঐ কুঁজাকে যাতে নালী বা চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস থাকে না। (আরবী) আর বলা হয় ঐ পানপাত্রকে যাতে চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস আছে। এগুলো সুরার প্রবহমান প্রস্রবণ হতে পূর্ণ করা থাকবে, যে সুরা কখনো শেষ হবার নয়। কেননা, ওর প্রস্রবণ সদা জারী থাকবে। এই সদা-কিশোরেরা সুরাপূর্ণ এই পানপাত্রগুলো তাদের নরম হাতে নিয়ে ঐ জান্নাতীদের সেবায় এদিক ওদিক ঘোরাফিরা করতে থাকবে। সেই সুরা পানে তাদের শিরঃপীড়াও হবে না এবং তারা জ্ঞানহারাও হবে না। সুতরাং পূর্ণমাত্রায় তারা ঐ সুরার স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে। মদের মধ্যে চারটি বিশেষণ রয়েছে। (এক) নেশা, (দুই) মাথাব্যথা, (তিন) বমি এবং (চার) প্রস্রাব। মহান প্রতিপালক আল্লাহ জান্নাতের সুরা বা মদের বর্ণনা দিয়ে ওকে এই চারটি দোষ হতে মুক্ত বলে ব্যক্ত করলেন। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ চির কিশোরেরা তাদের কাছে ঘোরাফিরা করবে তাদের পছন্দমত নানা প্রকারের ফলমূল নিয়ে এবং তাদের ঈপ্সিত পাখীর গোশত নিয়ে। যে ফল খাওয়ার তাদের ইচ্ছা হবে এবং যে গোশত খেতে তাদের মন চাইবে, সাথে সাথে তারা তা পাবে। এসব রকমারী খাবার নিয়ে তাদের এই চির কিশোরে সেবকরা সদা তাদের চারদিকে ঘোরাফিরা করবে। সুতরাং তাদের যখনই যা খেতে ইচ্ছা করবে তখনই তা তাদের নিকট থেকে নিয়ে নিবে। এই আয়াতে এই দলীল রয়েছে যে, মানুষ ফল বেছে বেছে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী খেতে পারে।হযরত ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার কওম মুররা আমাকে তাদের সাদকার মাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। আমি ঐ মাল নিয়ে মদীনায় পৌঁছি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। আমার সাথে যাকাতের বহু উট ছিল, উটগুলো যেন বালুকার উপর লেগে থাকা গাছগুলোতে চরানো যুবক উট। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কে?” আমি বললামঃ আমি ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “তুমি দূর পর্যন্ত তোমার বংশ তালিকা বর্ণনা কর।” আমি তখন মুররা ইবনে উবায়েদ পর্যন্ত বলে শুনালাম। আর সাথে সাথে আমি বললাম যে, এগুলো মুররা ইবনে উবায়েদের যাকাতের উট। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হাসলেন এবং বললেনঃ “এগুলো আমার কওমেরই উট, এগুলো আমার কওমের সাদুকার মাল। এগুলোতে সাদকার উটগুলোর চিহ্ন দিয়ে দাও এবং ওগুলোর সাথে এগুলোকে মিলিয়ে দাও।” অতঃপর তিনি আমার হাত ধরে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “খাবার কিছু আছে কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ আছে।" অতঃপর আমাদের কাছে চুর্ণ করা রুটির একটা বড় গামলা পাঠানো হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং আমি খেতে শুরু করলাম। আমি এদিক ওদিক হতে খাবার উঠাতে লাগলাম। তখন তিনি তাঁর হাত দ্বারা আমার হাত ধরে নিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা তো একই প্রকারের খাদ্য, সুতরাং একই জায়গা হতে খেতে থাকো। এরপর রসাল খেজুর অথবা শুষ্ক খেজুরের একটি থালা আসলো। আমি ওটা হতে শুধু আমার সামনের দিক হতে খেতে লাগলাম। তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পছন্দ মত থালার এদিক ওদিক হতে নিয়ে খাচ্ছিলেন এবং আমাকেও বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এখানে নানা প্রকারের খেজুর আছে। সুতরাং যেখান হতে ইচ্ছা খাও।” তারপর পানি আসলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাত ধৌত করলেন এবং ঐ ভিজা হাত স্বীয় চেহারার উপর, দুই বাহুর উপর এবং মাথার উপর তিনবার ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা অযু হলো ঐ জিনিস হতে যাকে আগুনে পরিবর্তিত করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বপ্ন খুব পছন্দ করতেন। কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না তা তিনি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন। কেউ কোন স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলে এবং তাতে তিনি আনন্দিত হলে ওটা খুব ভাল স্বপ্ন বলে জানা যেতো। একদা একটি স্ত্রীলোক তার কাছে এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে যেন কেউ আসলো এবং আমাকে মদীনা হতে নিয়ে গিয়ে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিলো। তারপর আমি এক ধমক শুনলাম, যার ফলে জান্নাতে হৈ চৈ পড়ে গেল। আমি চক্ষু উঠিয়ে তাকালে অমুকের পুত্র অমুক, অমুকের পুত্র অমুককে দেখতে পাই।” এভাবে স্ত্রীলোকটি বারোটি লোকের নাম করেন। এই বারোজন লোকেরই একটি বাহিনীকে মাত্র কয়েকদিন পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। মহিলাটি বলতে থাকেনঃ “এ লোকগুলো আতলাস (সাটিন) কাপড় পরিহিত ছিলেন। তাঁদের শিরাগুলো ফুটতে ছিল। নির্দেশ দেয়া হয়ঃ তাদেরকে নহরে বায়দাখ বা নহরে বায়খে নিয়ে যাও। যখন তারা ঐ নদীতে ডুব দিলেন তখন তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চাঁদের মত চমকাতে থাকলো। অতঃপর তাদের জন্যে সোনার থালায় খেজুর আনয়ন করা হয় যা তারা ইচ্ছামত খেলেন। তারপর নানা প্রকারের ফল-মূল তাঁদের কাছে হাযির করা হলো যেগুলো চারদিক হতে বাছাই। করে রাখা হয়েছিল। এগুলো হতেও তাঁরা তাঁদের মনের চাহিদা মত খেলেন। আমিও তাঁদের সাথে শরীক হলাম ও খেলাম।” কিছুদিন পর একজন দূত আসলো এবং বললোঃ “অমুক অমুক ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন যাদেরকে আপনি রণাঙ্গনে পাঠিয়েছিলেন।” দূতটি ঐ বারোজনেরই নাম করলো যে বারোজনকে ঐ মহিলাটি স্বপ্নে দেখেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সতী মহিলাটিকে আবার ডাকিয়ে নেন এবং তাঁকে বলেনঃ “পুনরায় তুমি তোমার স্বপ্নের বৃত্তান্তটি বর্ণনা কর।” মহিলাটি এবারও ঐ লোকগুলোরই নাম করলেন যাদের নাম ঐ দূতটি করেছিলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা মুসিলী (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি যেই ফল জান্নাতের গাছ হতে ভেঙ্গে আনবে, সাথে সাথে ঠিক ঐরূপই আর একটি ফল গাছে এসে লেগে যাবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নাতের পাখী বড় বড় উটের সমান হয়ে জান্নাতের গাছে চরে ও খেয়ে বেড়াবে।” এ কথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে ঐ পাখী তো বড় নিয়ামত উপভোগ করবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যারা এই পাখীর গোশত খাবে তারাই হবে বেশী নিয়ামতের অধিকারী।” তিনবার তিনি একথাই বলেন। তারপর বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! আমি আশা করি যে, তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে যারা এই পাখীগুলোর গোশত খাবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ)-এর সামনে ‘বা বৃক্ষের আলোচনা হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! তৃবা বৃক্ষ কি তা তুমি জান কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেনঃ “এটা হলো জান্নাতের একটি বৃক্ষ যার দৈর্ঘ্য ও বিস্তৃতি যে কত তা একমাত্র আল্লাহই জানেন! এর এক একটি শাখার ছায়ায় একজন অশ্বারোহী সত্তর বছর ধরে চলবে তবুও ওর ছায়া শেষ হবে না। ওর পাতাগুলো খুবই চওড়া ও বড় বড় হবে। ওর উপর বড় বড় উটের সমান সমান পাখী এসে বসবে। তার একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো এই পাখী বড় রকমের নিয়ামতের অধিকারী হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “এই পাখীগুলো অপেক্ষা বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে এগুলোকে ভক্ষণকারীরা। আমি আশা করি যে, তুমিও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু আবদিল্লাহ আল মুকাদ্দাসী (রঃ) তাঁর ‘সিফাতুল জান্নাহ’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। শেষের অংশটি হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাওসার' সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “এটা হলো জান্নাতী নহর, যা মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে দান করেছেন। এর পানি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। এর ধারে বড় বড় উটের সমান পাখী রয়েছে। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তাহলে তো এ পাখীগুলো বড়ই নিয়ামত উপভোগ করছে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলোকে ভক্ষণকারীরা এগুলো অপেক্ষাও বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে।” (এটা আবু বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে একটি পাখী রয়েছে যার সত্তর হাজার পাখা আছে। পাখীটি জান্নাতীর দস্তরখানে আসবে। প্রত্যেক পাখা হতে একপ্রকার রঙ বের হবে। যা দুধের চেয়েও সাদা, মাখনের চেয়েও নরম এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। তারপর দ্বিতীয় পাখা হতে দ্বিতীয় প্রকারের রঙ বের হবে। এভাবে প্রত্যেক পাখা হতে পৃথক পৃথক রঙ বের হয়ে আসবে। তারপর ঐ পাখীটি উড়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি খুবই গরীব। এর বর্ণনাকারী অসাফী এবং তার উস্তাদ দু'জনই দুর্বল)হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতী পাখী বড় বড় উটের মত, যেগুলো জান্নাতের ফল খায় এবং জান্নাতের নহরের পানি পান করে। জান্নাতী যে পাখীর গোশত খাওয়ার ইচ্ছা করবে ঐ পাখী তার সামনে চলে আসবে। সে যত চাইবে যে বাহুর গোশত পছন্দ করবে, খাবে। তারপর ঐ পাখী উড়ে যাবে এবং যেমন ছিল তেমনই হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “জান্নাতের যেই পাখীর গোশত তোমার খাওয়ার ইচ্ছা হবে ঐ পাখীর গোশত রান্নাকৃত অবস্থায় তোমার সামনে এসে যাবে।” (আরবী) শব্দটি অন্য কিরআতে যেরের সাথেও রয়েছে। পেশের সঙ্গে হলে তো অর্থ হবেঃ জান্নাতীদের জন্যে হরসমূহ রয়েছে। আর যেরের সাথে হলে ভাবার্থ এই হবে যে, এটা যেন পূর্ব ই'রাবেরই অনুসারী। যেমনঃ (আরবী)-এই কিরআত এবং যেমন (আরবী)-এই কিরআতে রয়েছে। আর এই অর্থও হতে পারে যে, কিশোরেরা নিজেদের সঙ্গে হুরদেরকেও নিয়ে নিবে। কিন্তু তারা থাকবে তাদের মহলে ও তাঁবুতে, সাধারণভাবে নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই হরগুলো এমন হবে যেমন সতেজ, সাদা ও পরিষ্কার মুক্তা হয়ে থাকে। যেমন সূরায়ে সাফফাতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা যেন সুরক্ষিত ডিম্ব।” সূরায়ে রহমানেও এই বিশেষণ তাফসীরসহ গত হয়েছে। এটা তাদের সৎ কার্যের প্রতিদান। অর্থাৎ এই উপঢৌকন তাদের সকর্মেরই ফল।সেথায় তারা শুনবে না কোন অসার অথবা পাপ বাক্য। ঘূণ্য ও মন্দ কথার একটি শব্দও তাদের কানে আসবে না। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেথায় তারা অসার বাক্য শুনবে না।” (৮৮:১১) হ্যাঁ, তবে তারা শুনবে শুধু ‘সালাম’ আর ‘সালাম’ বাণী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপঢৌকন হবে তাদের একে অপরকে সালাম করা।" (১০:১০) তাদের কথাবার্তা বাজে ও পাপ হতে পবিত্র হবে।

আল-ওয়াকিয়া 56:19

১৩-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা ঐ বিশিষ্ট নৈকট্যলাভকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তারা পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। এই পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি রয়েছে। যেমন একটি উক্তি হলো এই যে, পূর্ববর্তী দ্বারা পূর্ববর্তী উম্মতসমূহ এবং পরবর্তী দ্বারা এই উম্মত অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই উক্তিটিকেই পছন্দ করেছেন এবং এই উক্তির সবলতার পক্ষে ঐ হাদীসটি পেশ করেছেন যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা হলাম পরবর্তী, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরাই হবো পূর্ববর্তী।" এই উক্তির সহায়ক মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হাদীসটিও হতে পারে। তা হলোঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরআন কারীমের আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন এটা নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের উপর খুবই কঠিন ঠেকে। ঐ সময় (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহুসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা হবে জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ, বরং এক তৃতীয়াংশ এমনকি অর্ধাংশ। তোমরাই হবে জান্নাতবাসীদের অর্ধাংশ। আর বাকী অর্ধাংশ সমস্ত উম্মতের মধ্যে বন্টিত হবে যাদের মধ্যে তোমরাও থাকবে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদেও রয়েছে। হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) অবতীর্ণ হয় এবং তাতে বর্ণিত হয় যে, বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে, তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং আমাদের মধ্য হতে হবে কম সংখ্যক?" এটা অবতীর্ণ হওয়ার এক বছর পর (আরবী) অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে বহুসংখ্যক হবে এবং পরবর্তীদের মধ্য হতেও বহুসংখ্যক হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে উমার (রাঃ) শোন, হযরত আদম (আঃ) হতে আমি পর্যন্ত (অর্থাৎ হযরত আদম আঃ-এর যুগ হতে নিয়ে আমার যুগ পর্যন্ত) হলো (আরবী) বহুসংখ্যক। আর শুধু আমার উম্মতই হলো বা বহুসংখ্যক। আমরা আমাদের এই বহুসংখ্যককে পূর্ণ করার জন্যে ঐ হাবশীদেরকেও নিবো যারা উটের রাখাল, কিন্তু তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই।”এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই রিওয়াইয়াতের সনদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। হ্যাঁ, তবে বহু। সনদসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটিও প্রমাণিত যে, তিনি বলেছেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা আহলে জান্নাতের এক চতুর্থাংশ হবে ...... শেষ পর্যন্ত।” সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, এটা আমাদের জন্যে বড় সুসংবাদই বটে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) যে উক্তিটিকে পছন্দ করেছেন তাতে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। বরং প্রকৃতপক্ষে উক্তিটি খুবই দুর্বল। কেননা, কুরআনের ভাষা দ্বারা এই উম্মতের অন্যান্য সমস্ত উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। তাহলে আল্লাহ তা'আলার নিকট নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্য হতে বেশী এবং এই উম্মতের মধ্য হতে কম কি করে হতে পারে? হ্যাঁ, তবে এ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তগণ মিলে শুধু এই উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা হতে অধিক হবেন। কিন্তু বাহ্যতঃ তো এটা জানা যাচ্ছে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা হতে শুধু এই উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই বাক্যের তাফসীরে দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এই উম্মতের প্রথম যুগের লোকদের মধ্য হতে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অনেক বেশী হবে এবং পরবর্তী যুগের লোকদের মধ্য হতে কম হবে। এ উক্তিটি রীতি সম্মত। হযরত হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “নৈকট্য প্রাপ্তগণ তো গত হয়ে গেছেন। কিন্তু হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত করুন।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি বলেনঃ “এই উম্মতের মধ্যে যাঁরা গত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তগণ অনেক ছিলেন।” ইমাম ইবনে সীরীন (রঃ) একথাই বলেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে এই প্রথম যুগীয় লোকদের অনেকেই নৈকট্য প্রাপ্ত হয়েছেন এবং পরবর্তী যুগের লোকদের খুব কম সংখ্যকই এই মর্যাদা লাভ করেছেন। এ নিয়ম ধারাবাহিকভাবেই চলে আসছে। তাহলে ভাবার্থ এরূপ হওয়াও সম্ভব যে, প্রত্যেক উম্মতেরই প্রথম যুগের লোকদের মধ্যে নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক এবং পরবর্তী লোকদের মধ্যে এ সংখ্যা কম। কারণ সহীহ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বযুগের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, তারপর এর পরবর্তী যুগ, এরপর এর পরবর্তী যুগ, (শেষ পর্যন্ত)।" হ্যাঁ, তবে একটি হাদীসে এও এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মত। সুতরাং প্রথম যুগের বৃষ্টি উত্তম কি শেষ যুগের বৃষ্টি উত্তম তা আমার জানা নেই।” হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে এটাকে এই বিষয়ের উপর স্থাপন করা হবে যে, দ্বীনের জন্যে যেমন প্রথম যুগীয় লোকদের প্রয়োজন ছিল যারা পরবর্তী লোকদের জন্যে এর তাবলীগ করেছেন, অনুরূপভাবে শেষ যুগে এটাকে কায়েম রাখার জন্যে শেষ যুগীয় লোকদের প্রয়োজন রয়েছে। যাঁরা লোকদেরকে সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর উপর একত্রিত করবেন, এর রিওয়াইয়াত করবেন এবং জনগণের উপর এটা প্রকাশ করবেন। কিন্তু পূর্বযুগীয় লোকদেরই ফযীলত বেশী হবে। এটা ঠিক এরূপ যে, জমিতে প্রাথমিক বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয় এবং শেষের বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয়। কিন্তু জমি প্রাথমিক বৃষ্টি দ্বারাই বেশী উপকার লাভ করে থাকে। কেননা, প্রথম প্রথম যদি বৃষ্টি না হয় তবে শস্যের বীজ অংকুরিতই হবে না এবং জড় বা মূলও বসবে না। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে বিজয়ী থাকবে। তাদের শত্রুরা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। তাদের বিরোধীরা তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে এবং তারা ঐরূপই থাকবে।” মোটকথা, এই উম্মত বাকী সমস্ত উম্মত হতে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। আর এই উম্মতের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অন্যান্য উন্মতদের তুলনায় বহুগুণে বেশী হবে। তারা হবে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন। কেননা, দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়া এবং নবী (সঃ) সর্বাপেক্ষা মর্যাদা সম্পন্ন হওয়ার দিক দিয়ে এরাই সর্বোত্তম। ধারাবাহিকতার সাথে এ হাদীসটি প্রামাণ্য পৌছে গেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই উম্মতের মধ্য হতে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাবে এবং প্রতি সত্তর হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজার করে লোক থাকবে।হযরত আবূ মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কিয়ামতের দিন একটি বৃহৎ দলকে দাঁড় করানো হবে। তারা সংখ্যায় এতো অধিক হবে যে, অন্ধকার রাত্রির মত তারা যমীনের সমস্ত প্রান্তকে ঘিরে ফেলবে। ফেরেশতারা বলবেনঃ “সমস্ত নবী (আঃ)-এর সঙ্গে যত লোক এসেছে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথে তাদের সকলের সমষ্টির চেয়ে বহুগুণে বেশী এসেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)‘বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহু সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে এই হাদীসটিকে আনয়ন করা যুক্তিযুক্ত হবে যে হাদীসটিকে হাফিয আবু বকর বায়হাকী (রঃ) তাঁর ‘দালাইলুন নবুওয়াহ' নামক গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত আবূ জামাল জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফজরের নামায পড়তেন তখন তিনি পা দুটি মোড়ানো অবস্থাতেই সত্তর বার পাঠ করতেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবূলকারী।” তারপর বলতেনঃ “সত্তরের বদলে সাতশ’। একদিনে যার পাপ সাত শতেরও বেশী হয় তার জন্যে কল্যাণ নেই।” একথা তিনি দু'বার বলতেন। তারপর তিনি জনগণের দিকে মুখ করে বসতেন। স্বপ্ন তার নিকট প্রিয় ছিল বলে তিনি জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি?” আবূ জামাল (রাঃ) বলেন, একদা অভ্যাসমত রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলে আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হ্যাঁ, আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। তিনি বললেনঃ “আল্লাহ কল্যাণের সাথে সাক্ষাৎ দান করুন, অকল্যাণ হতে বাঁচিয়ে রাখুন, আমাদের জন্যে মঙ্গলজনক করুন, শত্রুদের জন্যে করুন ক্ষতিকর, ঐ আল্লাহ সর্বপ্রকারের প্রশংসার অধিকারী যিনি সারা বিশ্বের প্রতিপালক। তুমি এখন তোমার স্বপ্নের ঘটনা বর্ণনা কর।” আমি তখন বলতে শুরু করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি দেখি যে, একটি রাস্তা রয়েছে যা প্রশস্ত, সহজ, নরম ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। অসংখ্য লোক ঐ পথ ধরে চলছে। তারা চলতে চলতে একটি সবুজ-শ্যামল বাগান পেলো যার মত শস্য-শ্যামল ও চমৎকার বাগান আমি কখনো চোখে দেখিনি। ভিতর দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। নানা প্রকারের গাছ ফুলে ফলে ভরপুর রয়েছে। এখন আমি দেখি যে, প্রথম যে দলটি আসলো এবং ঐ বাগানের নিকট পৌঁছলো, তখন তারা তাদের সওয়ারীর গতি বেশ দ্রুত করলো এবং ডানে বামে না গিয়ে দ্রুত গতিতে ঐ স্থান অতিক্রম করলো। তারপর দ্বিতীয় দল আসলো যাদের সংখ্যা বেশী ছিল, যখন তারা এখানে পৌছলো তখন কতকগুলো লোক তাদের বাহনের পশুগুলোকে সেখানে চরাতে শুরু করলো, আর কতকগুলো লোক কিছু গ্রহণ করলো, অতঃপর সেখান হতে প্রস্থান করলো। তারপর আরো বহু লোকের একটি দল আসলো। যখন তারা এই সবুজ-শ্যামল বাগানের নিকট আসলো তখন তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “এটা সবচেয়ে উত্তম জায়গা।” আমি যেন তাদেরকে এখনো দেখতে পাচ্ছি যে, তারা ডানে বামে ঝুঁকে পড়েছে। আমি এসব দেখলাম। কিন্তু আমি তো চলতেই থাকলাম। যখন বহু দূরে চলে গেলাম তখন দেখলাম যে, সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট একটি মিম্বর বিছানো রয়েছে এবং আপনি সর্বোচ্চ সোপানে উপবেশন করেছেন। আর আপনার ডানদিকে এক ব্যক্তি রয়েছেন। তার চেহারা গোধূম বর্ণের, অঙ্গুলিগুলো মোটামোটা এবং দেহ লম্বা। যখন তিনি কথা বলছেন তখন সবাই নীরবে শুনছেন এবং জনগণ উঁচু হয়ে হয়ে মনোযোগের সাথে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিয়েছেন। আপনার বাম দিকে একটি লোক রয়েছেন, যাঁর দেহের গঠন মধ্যম, শরীর মোটা এবং চেহারায় বহু তিল রয়েছে। তাঁর চুল যেন পানিতে সিক্ত। যখন তিনি কথা বলছেন তখন তাঁর সম্মানার্থে সবাই ঝুঁকে পড়ছেন। আর সামনে একজন লোক রয়েছেন, তিনি স্বভাব-চরিত্রে এবং চেহারা ও আকৃতিতে আপনার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত। আপনারা সবাই তার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে আছেন। তাঁর সামনে একটি ক্ষীণ, পাতলা ও বৃদ্ধা উষ্ট্রী রয়েছে। আমি দেখলাম যে, আপনি যেন ওকে উঠাচ্ছেন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর এ অবস্থা দূরীভূত হলো। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “সরল, সোজা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা হলো ঐ দ্বীন যা নিয়ে আমি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এসেছি এবং যে হিদায়াতের উপর তোমরা রয়েছো। তুমি যে সবুজ শ্যামল বাগানটি দেখেছো ওটা হলো দুনিয়া এবং ওর মন মাতানো সাজ-সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র। আমার সাহাবীবর্গ তো ওটা অতিক্রম করে চলে যাবে। না আমরা তাতে লিপ্ত হবো, না ওটা। আমাদেরকে জড়িয়ে ধরবে। না ওর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক থাকবে, না আমরা ওর প্রতি আকৃষ্ট হবো। অতঃপর আমাদের পর দ্বিতীয় দল আসবে যারা সংখ্যায় আমাদের চেয়ে বেশী হবে। তাদের মধ্যে কতক লোকে তো দুনিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়বে। আর কেউ কেউ তা হতে প্রয়োজন মত গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা চলে যাবে এবং পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। তারপর তাদের পরে একটি বিরাট দল আসবে যারা এই দুনিয়ায় সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন হয়ে পড়বে। তারা ডানে বামে ঢুকে পড়বে। সুতরাং (আরবী) (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তারই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী)। এখন থাকলো তোমার কথা। তাহলে জেনে রেখো যে, তুমি তোমার সোজা সরল পথে চলতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত তুমি আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে।সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট মিম্বরের সর্বোচ্চ সোপানে যে তুমি আমাকে দেখেছো তার ব্যাখ্যা এই যে, দুনিয়ার আয়ু হচ্ছে সাত হাজার বছর। আমি শেষ বা সপ্তম হাজারে রয়েছি। আমার ডান দিকে গোধূম বর্ণের মোটা অঙ্গুলি বিশিষ্ট যে। লোকটিকে তুমি দেখেছো তিনি হলেন হযরত মূসা (আঃ)। যখন তিনি কথা বলেন তখন লোকেরা উচু হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং তার সাথে কথা বলে তাঁকে মর্যাদামণ্ডিত করেছেন। আর যে লোকটিকে তুমি আমার বাম দিকে দেখেছো, যিনি মোটা দেহ বিশিষ্ট এবং যার দেহের গঠন মধ্যম ধরনের আর যার চেহারায় বহু তিল রয়েছে এবং যার চুল পানিতে সিক্ত মনে হচ্ছে, তিনি হলেন হযরত ঈসা (আঃ)। যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্মান করেছেন। সেই হেতু আমরাও সবাই তাকে সম্মান করি। যে বৃদ্ধ লোকটিকে তুমি আমার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত দেখেছো তিনি হলেন আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)। আমরা সবাই তাঁকে চাই, তার অনুসরণ করি এবং তাঁর আনুগত্য করে থাকি। আর যে বৃদ্ধা উষ্ট্রীটিকে তুমি দেখেছো যে, আমি ওকে দাঁড় করাচ্ছি ওর দ্বারা কিয়ামত উদ্দেশ্য যা আমার উম্মতের উপর সংঘটিত হবে। না আমার পরে কোন নবী আছে এবং না আমার উম্মতের পরে কোন উম্মত আছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না এ প্রশ্ন করা ছেড়ে দেন। হ্যাঁ, তবে যখন কেউ নিজেই কোন স্বপ্নের কথা বলতো তখন তিনি ঐ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে দিতেন।” মহান আল্লাহ বলেনঃ নৈকট্যপ্রাপ্তদের বিশ্রামের পালঙ্গটি সোনার তার দ্বারা বুননকৃত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা (আরবী) ওযনে (আরবী)-এর অর্থে হবে। যেমন উষ্ট্রীর পেটের নীচে যেটা থাকে ওটাকে (আরবী) বলা হয়। তারা ঐ আসনে হেলান দিয়ে বসবে, পরস্পর মুখখামুখি হয়ে। কেউ কারো দিকে পিঠ করে বসবে না।তাদের সেবায় ঘোরাফিরা করবে চির কিশোরেরা। অর্থাৎ ঐ সেবকরা বয়সে একই অবস্থায় থাকবে। তারা বড়ও হবে না, বুড়োও হবে না এবং তাদের বয়সে কোন পরিবর্তনও হবে না, বরং তারা সদা কিশোরেই থাকবে।(আরবী) বলা হয় ঐ কুঁজাকে যাতে নালী বা চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস থাকে না। (আরবী) আর বলা হয় ঐ পানপাত্রকে যাতে চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস আছে। এগুলো সুরার প্রবহমান প্রস্রবণ হতে পূর্ণ করা থাকবে, যে সুরা কখনো শেষ হবার নয়। কেননা, ওর প্রস্রবণ সদা জারী থাকবে। এই সদা-কিশোরেরা সুরাপূর্ণ এই পানপাত্রগুলো তাদের নরম হাতে নিয়ে ঐ জান্নাতীদের সেবায় এদিক ওদিক ঘোরাফিরা করতে থাকবে। সেই সুরা পানে তাদের শিরঃপীড়াও হবে না এবং তারা জ্ঞানহারাও হবে না। সুতরাং পূর্ণমাত্রায় তারা ঐ সুরার স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে। মদের মধ্যে চারটি বিশেষণ রয়েছে। (এক) নেশা, (দুই) মাথাব্যথা, (তিন) বমি এবং (চার) প্রস্রাব। মহান প্রতিপালক আল্লাহ জান্নাতের সুরা বা মদের বর্ণনা দিয়ে ওকে এই চারটি দোষ হতে মুক্ত বলে ব্যক্ত করলেন। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ চির কিশোরেরা তাদের কাছে ঘোরাফিরা করবে তাদের পছন্দমত নানা প্রকারের ফলমূল নিয়ে এবং তাদের ঈপ্সিত পাখীর গোশত নিয়ে। যে ফল খাওয়ার তাদের ইচ্ছা হবে এবং যে গোশত খেতে তাদের মন চাইবে, সাথে সাথে তারা তা পাবে। এসব রকমারী খাবার নিয়ে তাদের এই চির কিশোরে সেবকরা সদা তাদের চারদিকে ঘোরাফিরা করবে। সুতরাং তাদের যখনই যা খেতে ইচ্ছা করবে তখনই তা তাদের নিকট থেকে নিয়ে নিবে। এই আয়াতে এই দলীল রয়েছে যে, মানুষ ফল বেছে বেছে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী খেতে পারে।হযরত ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার কওম মুররা আমাকে তাদের সাদকার মাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। আমি ঐ মাল নিয়ে মদীনায় পৌঁছি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। আমার সাথে যাকাতের বহু উট ছিল, উটগুলো যেন বালুকার উপর লেগে থাকা গাছগুলোতে চরানো যুবক উট। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কে?” আমি বললামঃ আমি ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “তুমি দূর পর্যন্ত তোমার বংশ তালিকা বর্ণনা কর।” আমি তখন মুররা ইবনে উবায়েদ পর্যন্ত বলে শুনালাম। আর সাথে সাথে আমি বললাম যে, এগুলো মুররা ইবনে উবায়েদের যাকাতের উট। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হাসলেন এবং বললেনঃ “এগুলো আমার কওমেরই উট, এগুলো আমার কওমের সাদুকার মাল। এগুলোতে সাদকার উটগুলোর চিহ্ন দিয়ে দাও এবং ওগুলোর সাথে এগুলোকে মিলিয়ে দাও।” অতঃপর তিনি আমার হাত ধরে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “খাবার কিছু আছে কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ আছে।" অতঃপর আমাদের কাছে চুর্ণ করা রুটির একটা বড় গামলা পাঠানো হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং আমি খেতে শুরু করলাম। আমি এদিক ওদিক হতে খাবার উঠাতে লাগলাম। তখন তিনি তাঁর হাত দ্বারা আমার হাত ধরে নিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা তো একই প্রকারের খাদ্য, সুতরাং একই জায়গা হতে খেতে থাকো। এরপর রসাল খেজুর অথবা শুষ্ক খেজুরের একটি থালা আসলো। আমি ওটা হতে শুধু আমার সামনের দিক হতে খেতে লাগলাম। তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পছন্দ মত থালার এদিক ওদিক হতে নিয়ে খাচ্ছিলেন এবং আমাকেও বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এখানে নানা প্রকারের খেজুর আছে। সুতরাং যেখান হতে ইচ্ছা খাও।” তারপর পানি আসলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাত ধৌত করলেন এবং ঐ ভিজা হাত স্বীয় চেহারার উপর, দুই বাহুর উপর এবং মাথার উপর তিনবার ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা অযু হলো ঐ জিনিস হতে যাকে আগুনে পরিবর্তিত করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বপ্ন খুব পছন্দ করতেন। কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না তা তিনি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন। কেউ কোন স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলে এবং তাতে তিনি আনন্দিত হলে ওটা খুব ভাল স্বপ্ন বলে জানা যেতো। একদা একটি স্ত্রীলোক তার কাছে এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে যেন কেউ আসলো এবং আমাকে মদীনা হতে নিয়ে গিয়ে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিলো। তারপর আমি এক ধমক শুনলাম, যার ফলে জান্নাতে হৈ চৈ পড়ে গেল। আমি চক্ষু উঠিয়ে তাকালে অমুকের পুত্র অমুক, অমুকের পুত্র অমুককে দেখতে পাই।” এভাবে স্ত্রীলোকটি বারোটি লোকের নাম করেন। এই বারোজন লোকেরই একটি বাহিনীকে মাত্র কয়েকদিন পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। মহিলাটি বলতে থাকেনঃ “এ লোকগুলো আতলাস (সাটিন) কাপড় পরিহিত ছিলেন। তাঁদের শিরাগুলো ফুটতে ছিল। নির্দেশ দেয়া হয়ঃ তাদেরকে নহরে বায়দাখ বা নহরে বায়খে নিয়ে যাও। যখন তারা ঐ নদীতে ডুব দিলেন তখন তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চাঁদের মত চমকাতে থাকলো। অতঃপর তাদের জন্যে সোনার থালায় খেজুর আনয়ন করা হয় যা তারা ইচ্ছামত খেলেন। তারপর নানা প্রকারের ফল-মূল তাঁদের কাছে হাযির করা হলো যেগুলো চারদিক হতে বাছাই। করে রাখা হয়েছিল। এগুলো হতেও তাঁরা তাঁদের মনের চাহিদা মত খেলেন। আমিও তাঁদের সাথে শরীক হলাম ও খেলাম।” কিছুদিন পর একজন দূত আসলো এবং বললোঃ “অমুক অমুক ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন যাদেরকে আপনি রণাঙ্গনে পাঠিয়েছিলেন।” দূতটি ঐ বারোজনেরই নাম করলো যে বারোজনকে ঐ মহিলাটি স্বপ্নে দেখেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সতী মহিলাটিকে আবার ডাকিয়ে নেন এবং তাঁকে বলেনঃ “পুনরায় তুমি তোমার স্বপ্নের বৃত্তান্তটি বর্ণনা কর।” মহিলাটি এবারও ঐ লোকগুলোরই নাম করলেন যাদের নাম ঐ দূতটি করেছিলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা মুসিলী (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি যেই ফল জান্নাতের গাছ হতে ভেঙ্গে আনবে, সাথে সাথে ঠিক ঐরূপই আর একটি ফল গাছে এসে লেগে যাবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নাতের পাখী বড় বড় উটের সমান হয়ে জান্নাতের গাছে চরে ও খেয়ে বেড়াবে।” এ কথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে ঐ পাখী তো বড় নিয়ামত উপভোগ করবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যারা এই পাখীর গোশত খাবে তারাই হবে বেশী নিয়ামতের অধিকারী।” তিনবার তিনি একথাই বলেন। তারপর বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! আমি আশা করি যে, তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে যারা এই পাখীগুলোর গোশত খাবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ)-এর সামনে ‘বা বৃক্ষের আলোচনা হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! তৃবা বৃক্ষ কি তা তুমি জান কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেনঃ “এটা হলো জান্নাতের একটি বৃক্ষ যার দৈর্ঘ্য ও বিস্তৃতি যে কত তা একমাত্র আল্লাহই জানেন! এর এক একটি শাখার ছায়ায় একজন অশ্বারোহী সত্তর বছর ধরে চলবে তবুও ওর ছায়া শেষ হবে না। ওর পাতাগুলো খুবই চওড়া ও বড় বড় হবে। ওর উপর বড় বড় উটের সমান সমান পাখী এসে বসবে। তার একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো এই পাখী বড় রকমের নিয়ামতের অধিকারী হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “এই পাখীগুলো অপেক্ষা বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে এগুলোকে ভক্ষণকারীরা। আমি আশা করি যে, তুমিও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু আবদিল্লাহ আল মুকাদ্দাসী (রঃ) তাঁর ‘সিফাতুল জান্নাহ’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। শেষের অংশটি হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাওসার' সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “এটা হলো জান্নাতী নহর, যা মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে দান করেছেন। এর পানি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। এর ধারে বড় বড় উটের সমান পাখী রয়েছে। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তাহলে তো এ পাখীগুলো বড়ই নিয়ামত উপভোগ করছে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলোকে ভক্ষণকারীরা এগুলো অপেক্ষাও বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে।” (এটা আবু বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে একটি পাখী রয়েছে যার সত্তর হাজার পাখা আছে। পাখীটি জান্নাতীর দস্তরখানে আসবে। প্রত্যেক পাখা হতে একপ্রকার রঙ বের হবে। যা দুধের চেয়েও সাদা, মাখনের চেয়েও নরম এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। তারপর দ্বিতীয় পাখা হতে দ্বিতীয় প্রকারের রঙ বের হবে। এভাবে প্রত্যেক পাখা হতে পৃথক পৃথক রঙ বের হয়ে আসবে। তারপর ঐ পাখীটি উড়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি খুবই গরীব। এর বর্ণনাকারী অসাফী এবং তার উস্তাদ দু'জনই দুর্বল)হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতী পাখী বড় বড় উটের মত, যেগুলো জান্নাতের ফল খায় এবং জান্নাতের নহরের পানি পান করে। জান্নাতী যে পাখীর গোশত খাওয়ার ইচ্ছা করবে ঐ পাখী তার সামনে চলে আসবে। সে যত চাইবে যে বাহুর গোশত পছন্দ করবে, খাবে। তারপর ঐ পাখী উড়ে যাবে এবং যেমন ছিল তেমনই হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “জান্নাতের যেই পাখীর গোশত তোমার খাওয়ার ইচ্ছা হবে ঐ পাখীর গোশত রান্নাকৃত অবস্থায় তোমার সামনে এসে যাবে।” (আরবী) শব্দটি অন্য কিরআতে যেরের সাথেও রয়েছে। পেশের সঙ্গে হলে তো অর্থ হবেঃ জান্নাতীদের জন্যে হরসমূহ রয়েছে। আর যেরের সাথে হলে ভাবার্থ এই হবে যে, এটা যেন পূর্ব ই'রাবেরই অনুসারী। যেমনঃ (আরবী)-এই কিরআত এবং যেমন (আরবী)-এই কিরআতে রয়েছে। আর এই অর্থও হতে পারে যে, কিশোরেরা নিজেদের সঙ্গে হুরদেরকেও নিয়ে নিবে। কিন্তু তারা থাকবে তাদের মহলে ও তাঁবুতে, সাধারণভাবে নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই হরগুলো এমন হবে যেমন সতেজ, সাদা ও পরিষ্কার মুক্তা হয়ে থাকে। যেমন সূরায়ে সাফফাতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা যেন সুরক্ষিত ডিম্ব।” সূরায়ে রহমানেও এই বিশেষণ তাফসীরসহ গত হয়েছে। এটা তাদের সৎ কার্যের প্রতিদান। অর্থাৎ এই উপঢৌকন তাদের সকর্মেরই ফল।সেথায় তারা শুনবে না কোন অসার অথবা পাপ বাক্য। ঘূণ্য ও মন্দ কথার একটি শব্দও তাদের কানে আসবে না। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেথায় তারা অসার বাক্য শুনবে না।” (৮৮:১১) হ্যাঁ, তবে তারা শুনবে শুধু ‘সালাম’ আর ‘সালাম’ বাণী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপঢৌকন হবে তাদের একে অপরকে সালাম করা।" (১০:১০) তাদের কথাবার্তা বাজে ও পাপ হতে পবিত্র হবে।

আল-ওয়াকিয়া 56:20

১৩-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা ঐ বিশিষ্ট নৈকট্যলাভকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তারা পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। এই পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি রয়েছে। যেমন একটি উক্তি হলো এই যে, পূর্ববর্তী দ্বারা পূর্ববর্তী উম্মতসমূহ এবং পরবর্তী দ্বারা এই উম্মত অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই উক্তিটিকেই পছন্দ করেছেন এবং এই উক্তির সবলতার পক্ষে ঐ হাদীসটি পেশ করেছেন যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা হলাম পরবর্তী, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরাই হবো পূর্ববর্তী।" এই উক্তির সহায়ক মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হাদীসটিও হতে পারে। তা হলোঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরআন কারীমের আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন এটা নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের উপর খুবই কঠিন ঠেকে। ঐ সময় (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহুসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা হবে জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ, বরং এক তৃতীয়াংশ এমনকি অর্ধাংশ। তোমরাই হবে জান্নাতবাসীদের অর্ধাংশ। আর বাকী অর্ধাংশ সমস্ত উম্মতের মধ্যে বন্টিত হবে যাদের মধ্যে তোমরাও থাকবে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদেও রয়েছে। হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) অবতীর্ণ হয় এবং তাতে বর্ণিত হয় যে, বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে, তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং আমাদের মধ্য হতে হবে কম সংখ্যক?" এটা অবতীর্ণ হওয়ার এক বছর পর (আরবী) অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে বহুসংখ্যক হবে এবং পরবর্তীদের মধ্য হতেও বহুসংখ্যক হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে উমার (রাঃ) শোন, হযরত আদম (আঃ) হতে আমি পর্যন্ত (অর্থাৎ হযরত আদম আঃ-এর যুগ হতে নিয়ে আমার যুগ পর্যন্ত) হলো (আরবী) বহুসংখ্যক। আর শুধু আমার উম্মতই হলো বা বহুসংখ্যক। আমরা আমাদের এই বহুসংখ্যককে পূর্ণ করার জন্যে ঐ হাবশীদেরকেও নিবো যারা উটের রাখাল, কিন্তু তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই।”এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই রিওয়াইয়াতের সনদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। হ্যাঁ, তবে বহু। সনদসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটিও প্রমাণিত যে, তিনি বলেছেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা আহলে জান্নাতের এক চতুর্থাংশ হবে ...... শেষ পর্যন্ত।” সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, এটা আমাদের জন্যে বড় সুসংবাদই বটে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) যে উক্তিটিকে পছন্দ করেছেন তাতে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। বরং প্রকৃতপক্ষে উক্তিটি খুবই দুর্বল। কেননা, কুরআনের ভাষা দ্বারা এই উম্মতের অন্যান্য সমস্ত উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। তাহলে আল্লাহ তা'আলার নিকট নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্য হতে বেশী এবং এই উম্মতের মধ্য হতে কম কি করে হতে পারে? হ্যাঁ, তবে এ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তগণ মিলে শুধু এই উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা হতে অধিক হবেন। কিন্তু বাহ্যতঃ তো এটা জানা যাচ্ছে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা হতে শুধু এই উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই বাক্যের তাফসীরে দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এই উম্মতের প্রথম যুগের লোকদের মধ্য হতে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অনেক বেশী হবে এবং পরবর্তী যুগের লোকদের মধ্য হতে কম হবে। এ উক্তিটি রীতি সম্মত। হযরত হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “নৈকট্য প্রাপ্তগণ তো গত হয়ে গেছেন। কিন্তু হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত করুন।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি বলেনঃ “এই উম্মতের মধ্যে যাঁরা গত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তগণ অনেক ছিলেন।” ইমাম ইবনে সীরীন (রঃ) একথাই বলেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে এই প্রথম যুগীয় লোকদের অনেকেই নৈকট্য প্রাপ্ত হয়েছেন এবং পরবর্তী যুগের লোকদের খুব কম সংখ্যকই এই মর্যাদা লাভ করেছেন। এ নিয়ম ধারাবাহিকভাবেই চলে আসছে। তাহলে ভাবার্থ এরূপ হওয়াও সম্ভব যে, প্রত্যেক উম্মতেরই প্রথম যুগের লোকদের মধ্যে নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক এবং পরবর্তী লোকদের মধ্যে এ সংখ্যা কম। কারণ সহীহ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বযুগের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, তারপর এর পরবর্তী যুগ, এরপর এর পরবর্তী যুগ, (শেষ পর্যন্ত)।" হ্যাঁ, তবে একটি হাদীসে এও এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মত। সুতরাং প্রথম যুগের বৃষ্টি উত্তম কি শেষ যুগের বৃষ্টি উত্তম তা আমার জানা নেই।” হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে এটাকে এই বিষয়ের উপর স্থাপন করা হবে যে, দ্বীনের জন্যে যেমন প্রথম যুগীয় লোকদের প্রয়োজন ছিল যারা পরবর্তী লোকদের জন্যে এর তাবলীগ করেছেন, অনুরূপভাবে শেষ যুগে এটাকে কায়েম রাখার জন্যে শেষ যুগীয় লোকদের প্রয়োজন রয়েছে। যাঁরা লোকদেরকে সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর উপর একত্রিত করবেন, এর রিওয়াইয়াত করবেন এবং জনগণের উপর এটা প্রকাশ করবেন। কিন্তু পূর্বযুগীয় লোকদেরই ফযীলত বেশী হবে। এটা ঠিক এরূপ যে, জমিতে প্রাথমিক বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয় এবং শেষের বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয়। কিন্তু জমি প্রাথমিক বৃষ্টি দ্বারাই বেশী উপকার লাভ করে থাকে। কেননা, প্রথম প্রথম যদি বৃষ্টি না হয় তবে শস্যের বীজ অংকুরিতই হবে না এবং জড় বা মূলও বসবে না। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে বিজয়ী থাকবে। তাদের শত্রুরা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। তাদের বিরোধীরা তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে এবং তারা ঐরূপই থাকবে।” মোটকথা, এই উম্মত বাকী সমস্ত উম্মত হতে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। আর এই উম্মতের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অন্যান্য উন্মতদের তুলনায় বহুগুণে বেশী হবে। তারা হবে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন। কেননা, দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়া এবং নবী (সঃ) সর্বাপেক্ষা মর্যাদা সম্পন্ন হওয়ার দিক দিয়ে এরাই সর্বোত্তম। ধারাবাহিকতার সাথে এ হাদীসটি প্রামাণ্য পৌছে গেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই উম্মতের মধ্য হতে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাবে এবং প্রতি সত্তর হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজার করে লোক থাকবে।হযরত আবূ মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কিয়ামতের দিন একটি বৃহৎ দলকে দাঁড় করানো হবে। তারা সংখ্যায় এতো অধিক হবে যে, অন্ধকার রাত্রির মত তারা যমীনের সমস্ত প্রান্তকে ঘিরে ফেলবে। ফেরেশতারা বলবেনঃ “সমস্ত নবী (আঃ)-এর সঙ্গে যত লোক এসেছে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথে তাদের সকলের সমষ্টির চেয়ে বহুগুণে বেশী এসেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)‘বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহু সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে এই হাদীসটিকে আনয়ন করা যুক্তিযুক্ত হবে যে হাদীসটিকে হাফিয আবু বকর বায়হাকী (রঃ) তাঁর ‘দালাইলুন নবুওয়াহ' নামক গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত আবূ জামাল জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফজরের নামায পড়তেন তখন তিনি পা দুটি মোড়ানো অবস্থাতেই সত্তর বার পাঠ করতেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবূলকারী।” তারপর বলতেনঃ “সত্তরের বদলে সাতশ’। একদিনে যার পাপ সাত শতেরও বেশী হয় তার জন্যে কল্যাণ নেই।” একথা তিনি দু'বার বলতেন। তারপর তিনি জনগণের দিকে মুখ করে বসতেন। স্বপ্ন তার নিকট প্রিয় ছিল বলে তিনি জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি?” আবূ জামাল (রাঃ) বলেন, একদা অভ্যাসমত রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলে আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হ্যাঁ, আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। তিনি বললেনঃ “আল্লাহ কল্যাণের সাথে সাক্ষাৎ দান করুন, অকল্যাণ হতে বাঁচিয়ে রাখুন, আমাদের জন্যে মঙ্গলজনক করুন, শত্রুদের জন্যে করুন ক্ষতিকর, ঐ আল্লাহ সর্বপ্রকারের প্রশংসার অধিকারী যিনি সারা বিশ্বের প্রতিপালক। তুমি এখন তোমার স্বপ্নের ঘটনা বর্ণনা কর।” আমি তখন বলতে শুরু করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি দেখি যে, একটি রাস্তা রয়েছে যা প্রশস্ত, সহজ, নরম ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। অসংখ্য লোক ঐ পথ ধরে চলছে। তারা চলতে চলতে একটি সবুজ-শ্যামল বাগান পেলো যার মত শস্য-শ্যামল ও চমৎকার বাগান আমি কখনো চোখে দেখিনি। ভিতর দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। নানা প্রকারের গাছ ফুলে ফলে ভরপুর রয়েছে। এখন আমি দেখি যে, প্রথম যে দলটি আসলো এবং ঐ বাগানের নিকট পৌঁছলো, তখন তারা তাদের সওয়ারীর গতি বেশ দ্রুত করলো এবং ডানে বামে না গিয়ে দ্রুত গতিতে ঐ স্থান অতিক্রম করলো। তারপর দ্বিতীয় দল আসলো যাদের সংখ্যা বেশী ছিল, যখন তারা এখানে পৌছলো তখন কতকগুলো লোক তাদের বাহনের পশুগুলোকে সেখানে চরাতে শুরু করলো, আর কতকগুলো লোক কিছু গ্রহণ করলো, অতঃপর সেখান হতে প্রস্থান করলো। তারপর আরো বহু লোকের একটি দল আসলো। যখন তারা এই সবুজ-শ্যামল বাগানের নিকট আসলো তখন তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “এটা সবচেয়ে উত্তম জায়গা।” আমি যেন তাদেরকে এখনো দেখতে পাচ্ছি যে, তারা ডানে বামে ঝুঁকে পড়েছে। আমি এসব দেখলাম। কিন্তু আমি তো চলতেই থাকলাম। যখন বহু দূরে চলে গেলাম তখন দেখলাম যে, সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট একটি মিম্বর বিছানো রয়েছে এবং আপনি সর্বোচ্চ সোপানে উপবেশন করেছেন। আর আপনার ডানদিকে এক ব্যক্তি রয়েছেন। তার চেহারা গোধূম বর্ণের, অঙ্গুলিগুলো মোটামোটা এবং দেহ লম্বা। যখন তিনি কথা বলছেন তখন সবাই নীরবে শুনছেন এবং জনগণ উঁচু হয়ে হয়ে মনোযোগের সাথে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিয়েছেন। আপনার বাম দিকে একটি লোক রয়েছেন, যাঁর দেহের গঠন মধ্যম, শরীর মোটা এবং চেহারায় বহু তিল রয়েছে। তাঁর চুল যেন পানিতে সিক্ত। যখন তিনি কথা বলছেন তখন তাঁর সম্মানার্থে সবাই ঝুঁকে পড়ছেন। আর সামনে একজন লোক রয়েছেন, তিনি স্বভাব-চরিত্রে এবং চেহারা ও আকৃতিতে আপনার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত। আপনারা সবাই তার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে আছেন। তাঁর সামনে একটি ক্ষীণ, পাতলা ও বৃদ্ধা উষ্ট্রী রয়েছে। আমি দেখলাম যে, আপনি যেন ওকে উঠাচ্ছেন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর এ অবস্থা দূরীভূত হলো। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “সরল, সোজা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা হলো ঐ দ্বীন যা নিয়ে আমি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এসেছি এবং যে হিদায়াতের উপর তোমরা রয়েছো। তুমি যে সবুজ শ্যামল বাগানটি দেখেছো ওটা হলো দুনিয়া এবং ওর মন মাতানো সাজ-সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র। আমার সাহাবীবর্গ তো ওটা অতিক্রম করে চলে যাবে। না আমরা তাতে লিপ্ত হবো, না ওটা। আমাদেরকে জড়িয়ে ধরবে। না ওর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক থাকবে, না আমরা ওর প্রতি আকৃষ্ট হবো। অতঃপর আমাদের পর দ্বিতীয় দল আসবে যারা সংখ্যায় আমাদের চেয়ে বেশী হবে। তাদের মধ্যে কতক লোকে তো দুনিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়বে। আর কেউ কেউ তা হতে প্রয়োজন মত গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা চলে যাবে এবং পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। তারপর তাদের পরে একটি বিরাট দল আসবে যারা এই দুনিয়ায় সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন হয়ে পড়বে। তারা ডানে বামে ঢুকে পড়বে। সুতরাং (আরবী) (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তারই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী)। এখন থাকলো তোমার কথা। তাহলে জেনে রেখো যে, তুমি তোমার সোজা সরল পথে চলতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত তুমি আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে।সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট মিম্বরের সর্বোচ্চ সোপানে যে তুমি আমাকে দেখেছো তার ব্যাখ্যা এই যে, দুনিয়ার আয়ু হচ্ছে সাত হাজার বছর। আমি শেষ বা সপ্তম হাজারে রয়েছি। আমার ডান দিকে গোধূম বর্ণের মোটা অঙ্গুলি বিশিষ্ট যে। লোকটিকে তুমি দেখেছো তিনি হলেন হযরত মূসা (আঃ)। যখন তিনি কথা বলেন তখন লোকেরা উচু হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং তার সাথে কথা বলে তাঁকে মর্যাদামণ্ডিত করেছেন। আর যে লোকটিকে তুমি আমার বাম দিকে দেখেছো, যিনি মোটা দেহ বিশিষ্ট এবং যার দেহের গঠন মধ্যম ধরনের আর যার চেহারায় বহু তিল রয়েছে এবং যার চুল পানিতে সিক্ত মনে হচ্ছে, তিনি হলেন হযরত ঈসা (আঃ)। যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্মান করেছেন। সেই হেতু আমরাও সবাই তাকে সম্মান করি। যে বৃদ্ধ লোকটিকে তুমি আমার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত দেখেছো তিনি হলেন আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)। আমরা সবাই তাঁকে চাই, তার অনুসরণ করি এবং তাঁর আনুগত্য করে থাকি। আর যে বৃদ্ধা উষ্ট্রীটিকে তুমি দেখেছো যে, আমি ওকে দাঁড় করাচ্ছি ওর দ্বারা কিয়ামত উদ্দেশ্য যা আমার উম্মতের উপর সংঘটিত হবে। না আমার পরে কোন নবী আছে এবং না আমার উম্মতের পরে কোন উম্মত আছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না এ প্রশ্ন করা ছেড়ে দেন। হ্যাঁ, তবে যখন কেউ নিজেই কোন স্বপ্নের কথা বলতো তখন তিনি ঐ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে দিতেন।” মহান আল্লাহ বলেনঃ নৈকট্যপ্রাপ্তদের বিশ্রামের পালঙ্গটি সোনার তার দ্বারা বুননকৃত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা (আরবী) ওযনে (আরবী)-এর অর্থে হবে। যেমন উষ্ট্রীর পেটের নীচে যেটা থাকে ওটাকে (আরবী) বলা হয়। তারা ঐ আসনে হেলান দিয়ে বসবে, পরস্পর মুখখামুখি হয়ে। কেউ কারো দিকে পিঠ করে বসবে না।তাদের সেবায় ঘোরাফিরা করবে চির কিশোরেরা। অর্থাৎ ঐ সেবকরা বয়সে একই অবস্থায় থাকবে। তারা বড়ও হবে না, বুড়োও হবে না এবং তাদের বয়সে কোন পরিবর্তনও হবে না, বরং তারা সদা কিশোরেই থাকবে।(আরবী) বলা হয় ঐ কুঁজাকে যাতে নালী বা চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস থাকে না। (আরবী) আর বলা হয় ঐ পানপাত্রকে যাতে চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস আছে। এগুলো সুরার প্রবহমান প্রস্রবণ হতে পূর্ণ করা থাকবে, যে সুরা কখনো শেষ হবার নয়। কেননা, ওর প্রস্রবণ সদা জারী থাকবে। এই সদা-কিশোরেরা সুরাপূর্ণ এই পানপাত্রগুলো তাদের নরম হাতে নিয়ে ঐ জান্নাতীদের সেবায় এদিক ওদিক ঘোরাফিরা করতে থাকবে। সেই সুরা পানে তাদের শিরঃপীড়াও হবে না এবং তারা জ্ঞানহারাও হবে না। সুতরাং পূর্ণমাত্রায় তারা ঐ সুরার স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে। মদের মধ্যে চারটি বিশেষণ রয়েছে। (এক) নেশা, (দুই) মাথাব্যথা, (তিন) বমি এবং (চার) প্রস্রাব। মহান প্রতিপালক আল্লাহ জান্নাতের সুরা বা মদের বর্ণনা দিয়ে ওকে এই চারটি দোষ হতে মুক্ত বলে ব্যক্ত করলেন। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ চির কিশোরেরা তাদের কাছে ঘোরাফিরা করবে তাদের পছন্দমত নানা প্রকারের ফলমূল নিয়ে এবং তাদের ঈপ্সিত পাখীর গোশত নিয়ে। যে ফল খাওয়ার তাদের ইচ্ছা হবে এবং যে গোশত খেতে তাদের মন চাইবে, সাথে সাথে তারা তা পাবে। এসব রকমারী খাবার নিয়ে তাদের এই চির কিশোরে সেবকরা সদা তাদের চারদিকে ঘোরাফিরা করবে। সুতরাং তাদের যখনই যা খেতে ইচ্ছা করবে তখনই তা তাদের নিকট থেকে নিয়ে নিবে। এই আয়াতে এই দলীল রয়েছে যে, মানুষ ফল বেছে বেছে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী খেতে পারে।হযরত ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার কওম মুররা আমাকে তাদের সাদকার মাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। আমি ঐ মাল নিয়ে মদীনায় পৌঁছি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। আমার সাথে যাকাতের বহু উট ছিল, উটগুলো যেন বালুকার উপর লেগে থাকা গাছগুলোতে চরানো যুবক উট। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কে?” আমি বললামঃ আমি ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “তুমি দূর পর্যন্ত তোমার বংশ তালিকা বর্ণনা কর।” আমি তখন মুররা ইবনে উবায়েদ পর্যন্ত বলে শুনালাম। আর সাথে সাথে আমি বললাম যে, এগুলো মুররা ইবনে উবায়েদের যাকাতের উট। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হাসলেন এবং বললেনঃ “এগুলো আমার কওমেরই উট, এগুলো আমার কওমের সাদুকার মাল। এগুলোতে সাদকার উটগুলোর চিহ্ন দিয়ে দাও এবং ওগুলোর সাথে এগুলোকে মিলিয়ে দাও।” অতঃপর তিনি আমার হাত ধরে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “খাবার কিছু আছে কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ আছে।" অতঃপর আমাদের কাছে চুর্ণ করা রুটির একটা বড় গামলা পাঠানো হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং আমি খেতে শুরু করলাম। আমি এদিক ওদিক হতে খাবার উঠাতে লাগলাম। তখন তিনি তাঁর হাত দ্বারা আমার হাত ধরে নিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা তো একই প্রকারের খাদ্য, সুতরাং একই জায়গা হতে খেতে থাকো। এরপর রসাল খেজুর অথবা শুষ্ক খেজুরের একটি থালা আসলো। আমি ওটা হতে শুধু আমার সামনের দিক হতে খেতে লাগলাম। তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পছন্দ মত থালার এদিক ওদিক হতে নিয়ে খাচ্ছিলেন এবং আমাকেও বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এখানে নানা প্রকারের খেজুর আছে। সুতরাং যেখান হতে ইচ্ছা খাও।” তারপর পানি আসলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাত ধৌত করলেন এবং ঐ ভিজা হাত স্বীয় চেহারার উপর, দুই বাহুর উপর এবং মাথার উপর তিনবার ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা অযু হলো ঐ জিনিস হতে যাকে আগুনে পরিবর্তিত করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বপ্ন খুব পছন্দ করতেন। কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না তা তিনি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন। কেউ কোন স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলে এবং তাতে তিনি আনন্দিত হলে ওটা খুব ভাল স্বপ্ন বলে জানা যেতো। একদা একটি স্ত্রীলোক তার কাছে এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে যেন কেউ আসলো এবং আমাকে মদীনা হতে নিয়ে গিয়ে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিলো। তারপর আমি এক ধমক শুনলাম, যার ফলে জান্নাতে হৈ চৈ পড়ে গেল। আমি চক্ষু উঠিয়ে তাকালে অমুকের পুত্র অমুক, অমুকের পুত্র অমুককে দেখতে পাই।” এভাবে স্ত্রীলোকটি বারোটি লোকের নাম করেন। এই বারোজন লোকেরই একটি বাহিনীকে মাত্র কয়েকদিন পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। মহিলাটি বলতে থাকেনঃ “এ লোকগুলো আতলাস (সাটিন) কাপড় পরিহিত ছিলেন। তাঁদের শিরাগুলো ফুটতে ছিল। নির্দেশ দেয়া হয়ঃ তাদেরকে নহরে বায়দাখ বা নহরে বায়খে নিয়ে যাও। যখন তারা ঐ নদীতে ডুব দিলেন তখন তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চাঁদের মত চমকাতে থাকলো। অতঃপর তাদের জন্যে সোনার থালায় খেজুর আনয়ন করা হয় যা তারা ইচ্ছামত খেলেন। তারপর নানা প্রকারের ফল-মূল তাঁদের কাছে হাযির করা হলো যেগুলো চারদিক হতে বাছাই। করে রাখা হয়েছিল। এগুলো হতেও তাঁরা তাঁদের মনের চাহিদা মত খেলেন। আমিও তাঁদের সাথে শরীক হলাম ও খেলাম।” কিছুদিন পর একজন দূত আসলো এবং বললোঃ “অমুক অমুক ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন যাদেরকে আপনি রণাঙ্গনে পাঠিয়েছিলেন।” দূতটি ঐ বারোজনেরই নাম করলো যে বারোজনকে ঐ মহিলাটি স্বপ্নে দেখেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সতী মহিলাটিকে আবার ডাকিয়ে নেন এবং তাঁকে বলেনঃ “পুনরায় তুমি তোমার স্বপ্নের বৃত্তান্তটি বর্ণনা কর।” মহিলাটি এবারও ঐ লোকগুলোরই নাম করলেন যাদের নাম ঐ দূতটি করেছিলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা মুসিলী (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি যেই ফল জান্নাতের গাছ হতে ভেঙ্গে আনবে, সাথে সাথে ঠিক ঐরূপই আর একটি ফল গাছে এসে লেগে যাবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নাতের পাখী বড় বড় উটের সমান হয়ে জান্নাতের গাছে চরে ও খেয়ে বেড়াবে।” এ কথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে ঐ পাখী তো বড় নিয়ামত উপভোগ করবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যারা এই পাখীর গোশত খাবে তারাই হবে বেশী নিয়ামতের অধিকারী।” তিনবার তিনি একথাই বলেন। তারপর বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! আমি আশা করি যে, তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে যারা এই পাখীগুলোর গোশত খাবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ)-এর সামনে ‘বা বৃক্ষের আলোচনা হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! তৃবা বৃক্ষ কি তা তুমি জান কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেনঃ “এটা হলো জান্নাতের একটি বৃক্ষ যার দৈর্ঘ্য ও বিস্তৃতি যে কত তা একমাত্র আল্লাহই জানেন! এর এক একটি শাখার ছায়ায় একজন অশ্বারোহী সত্তর বছর ধরে চলবে তবুও ওর ছায়া শেষ হবে না। ওর পাতাগুলো খুবই চওড়া ও বড় বড় হবে। ওর উপর বড় বড় উটের সমান সমান পাখী এসে বসবে। তার একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো এই পাখী বড় রকমের নিয়ামতের অধিকারী হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “এই পাখীগুলো অপেক্ষা বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে এগুলোকে ভক্ষণকারীরা। আমি আশা করি যে, তুমিও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু আবদিল্লাহ আল মুকাদ্দাসী (রঃ) তাঁর ‘সিফাতুল জান্নাহ’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। শেষের অংশটি হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাওসার' সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “এটা হলো জান্নাতী নহর, যা মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে দান করেছেন। এর পানি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। এর ধারে বড় বড় উটের সমান পাখী রয়েছে। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তাহলে তো এ পাখীগুলো বড়ই নিয়ামত উপভোগ করছে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলোকে ভক্ষণকারীরা এগুলো অপেক্ষাও বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে।” (এটা আবু বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে একটি পাখী রয়েছে যার সত্তর হাজার পাখা আছে। পাখীটি জান্নাতীর দস্তরখানে আসবে। প্রত্যেক পাখা হতে একপ্রকার রঙ বের হবে। যা দুধের চেয়েও সাদা, মাখনের চেয়েও নরম এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। তারপর দ্বিতীয় পাখা হতে দ্বিতীয় প্রকারের রঙ বের হবে। এভাবে প্রত্যেক পাখা হতে পৃথক পৃথক রঙ বের হয়ে আসবে। তারপর ঐ পাখীটি উড়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি খুবই গরীব। এর বর্ণনাকারী অসাফী এবং তার উস্তাদ দু'জনই দুর্বল)হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতী পাখী বড় বড় উটের মত, যেগুলো জান্নাতের ফল খায় এবং জান্নাতের নহরের পানি পান করে। জান্নাতী যে পাখীর গোশত খাওয়ার ইচ্ছা করবে ঐ পাখী তার সামনে চলে আসবে। সে যত চাইবে যে বাহুর গোশত পছন্দ করবে, খাবে। তারপর ঐ পাখী উড়ে যাবে এবং যেমন ছিল তেমনই হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “জান্নাতের যেই পাখীর গোশত তোমার খাওয়ার ইচ্ছা হবে ঐ পাখীর গোশত রান্নাকৃত অবস্থায় তোমার সামনে এসে যাবে।” (আরবী) শব্দটি অন্য কিরআতে যেরের সাথেও রয়েছে। পেশের সঙ্গে হলে তো অর্থ হবেঃ জান্নাতীদের জন্যে হরসমূহ রয়েছে। আর যেরের সাথে হলে ভাবার্থ এই হবে যে, এটা যেন পূর্ব ই'রাবেরই অনুসারী। যেমনঃ (আরবী)-এই কিরআত এবং যেমন (আরবী)-এই কিরআতে রয়েছে। আর এই অর্থও হতে পারে যে, কিশোরেরা নিজেদের সঙ্গে হুরদেরকেও নিয়ে নিবে। কিন্তু তারা থাকবে তাদের মহলে ও তাঁবুতে, সাধারণভাবে নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই হরগুলো এমন হবে যেমন সতেজ, সাদা ও পরিষ্কার মুক্তা হয়ে থাকে। যেমন সূরায়ে সাফফাতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা যেন সুরক্ষিত ডিম্ব।” সূরায়ে রহমানেও এই বিশেষণ তাফসীরসহ গত হয়েছে। এটা তাদের সৎ কার্যের প্রতিদান। অর্থাৎ এই উপঢৌকন তাদের সকর্মেরই ফল।সেথায় তারা শুনবে না কোন অসার অথবা পাপ বাক্য। ঘূণ্য ও মন্দ কথার একটি শব্দও তাদের কানে আসবে না। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেথায় তারা অসার বাক্য শুনবে না।” (৮৮:১১) হ্যাঁ, তবে তারা শুনবে শুধু ‘সালাম’ আর ‘সালাম’ বাণী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপঢৌকন হবে তাদের একে অপরকে সালাম করা।" (১০:১০) তাদের কথাবার্তা বাজে ও পাপ হতে পবিত্র হবে।

আল-ওয়াকিয়া 56:21

১৩-২৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা ঐ বিশিষ্ট নৈকট্যলাভকারীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তারা পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। এই পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি রয়েছে। যেমন একটি উক্তি হলো এই যে, পূর্ববর্তী দ্বারা পূর্ববর্তী উম্মতসমূহ এবং পরবর্তী দ্বারা এই উম্মত অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই উক্তিটিকেই পছন্দ করেছেন এবং এই উক্তির সবলতার পক্ষে ঐ হাদীসটি পেশ করেছেন যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা হলাম পরবর্তী, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরাই হবো পূর্ববর্তী।" এই উক্তির সহায়ক মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হাদীসটিও হতে পারে। তা হলোঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরআন কারীমের আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন এটা নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের উপর খুবই কঠিন ঠেকে। ঐ সময় (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহুসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা হবে জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ, বরং এক তৃতীয়াংশ এমনকি অর্ধাংশ। তোমরাই হবে জান্নাতবাসীদের অর্ধাংশ। আর বাকী অর্ধাংশ সমস্ত উম্মতের মধ্যে বন্টিত হবে যাদের মধ্যে তোমরাও থাকবে। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদেও রয়েছে। হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) অবতীর্ণ হয় এবং তাতে বর্ণিত হয় যে, বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে, তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে হবে বহু সংখ্যক এবং আমাদের মধ্য হতে হবে কম সংখ্যক?" এটা অবতীর্ণ হওয়ার এক বছর পর (আরবী) অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে বহুসংখ্যক হবে এবং পরবর্তীদের মধ্য হতেও বহুসংখ্যক হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “হে উমার (রাঃ) শোন, হযরত আদম (আঃ) হতে আমি পর্যন্ত (অর্থাৎ হযরত আদম আঃ-এর যুগ হতে নিয়ে আমার যুগ পর্যন্ত) হলো (আরবী) বহুসংখ্যক। আর শুধু আমার উম্মতই হলো বা বহুসংখ্যক। আমরা আমাদের এই বহুসংখ্যককে পূর্ণ করার জন্যে ঐ হাবশীদেরকেও নিবো যারা উটের রাখাল, কিন্তু তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই।”এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই রিওয়াইয়াতের সনদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। হ্যাঁ, তবে বহু। সনদসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উক্তিটিও প্রমাণিত যে, তিনি বলেছেনঃ “আমি আশা করি যে, তোমরা আহলে জান্নাতের এক চতুর্থাংশ হবে ...... শেষ পর্যন্ত।” সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, এটা আমাদের জন্যে বড় সুসংবাদই বটে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) যে উক্তিটিকে পছন্দ করেছেন তাতে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। বরং প্রকৃতপক্ষে উক্তিটি খুবই দুর্বল। কেননা, কুরআনের ভাষা দ্বারা এই উম্মতের অন্যান্য সমস্ত উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। তাহলে আল্লাহ তা'আলার নিকট নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্য হতে বেশী এবং এই উম্মতের মধ্য হতে কম কি করে হতে পারে? হ্যাঁ, তবে এ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তগণ মিলে শুধু এই উম্মতের নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা হতে অধিক হবেন। কিন্তু বাহ্যতঃ তো এটা জানা যাচ্ছে যে, সমস্ত উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা হতে শুধু এই উম্মতের নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই বাক্যের তাফসীরে দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এই উম্মতের প্রথম যুগের লোকদের মধ্য হতে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অনেক বেশী হবে এবং পরবর্তী যুগের লোকদের মধ্য হতে কম হবে। এ উক্তিটি রীতি সম্মত। হযরত হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “নৈকট্য প্রাপ্তগণ তো গত হয়ে গেছেন। কিন্তু হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত করুন।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি বলেনঃ “এই উম্মতের মধ্যে যাঁরা গত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তগণ অনেক ছিলেন।” ইমাম ইবনে সীরীন (রঃ) একথাই বলেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে এই প্রথম যুগীয় লোকদের অনেকেই নৈকট্য প্রাপ্ত হয়েছেন এবং পরবর্তী যুগের লোকদের খুব কম সংখ্যকই এই মর্যাদা লাভ করেছেন। এ নিয়ম ধারাবাহিকভাবেই চলে আসছে। তাহলে ভাবার্থ এরূপ হওয়াও সম্ভব যে, প্রত্যেক উম্মতেরই প্রথম যুগের লোকদের মধ্যে নৈকট্য প্রাপ্তদের সংখ্যা অধিক এবং পরবর্তী লোকদের মধ্যে এ সংখ্যা কম। কারণ সহীহ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বযুগের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, তারপর এর পরবর্তী যুগ, এরপর এর পরবর্তী যুগ, (শেষ পর্যন্ত)।" হ্যাঁ, তবে একটি হাদীসে এও এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মত। সুতরাং প্রথম যুগের বৃষ্টি উত্তম কি শেষ যুগের বৃষ্টি উত্তম তা আমার জানা নেই।” হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে এটাকে এই বিষয়ের উপর স্থাপন করা হবে যে, দ্বীনের জন্যে যেমন প্রথম যুগীয় লোকদের প্রয়োজন ছিল যারা পরবর্তী লোকদের জন্যে এর তাবলীগ করেছেন, অনুরূপভাবে শেষ যুগে এটাকে কায়েম রাখার জন্যে শেষ যুগীয় লোকদের প্রয়োজন রয়েছে। যাঁরা লোকদেরকে সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর উপর একত্রিত করবেন, এর রিওয়াইয়াত করবেন এবং জনগণের উপর এটা প্রকাশ করবেন। কিন্তু পূর্বযুগীয় লোকদেরই ফযীলত বেশী হবে। এটা ঠিক এরূপ যে, জমিতে প্রাথমিক বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয় এবং শেষের বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয়। কিন্তু জমি প্রাথমিক বৃষ্টি দ্বারাই বেশী উপকার লাভ করে থাকে। কেননা, প্রথম প্রথম যদি বৃষ্টি না হয় তবে শস্যের বীজ অংকুরিতই হবে না এবং জড় বা মূলও বসবে না। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল সদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে বিজয়ী থাকবে। তাদের শত্রুরা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। তাদের বিরোধীরা তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে এবং তারা ঐরূপই থাকবে।” মোটকথা, এই উম্মত বাকী সমস্ত উম্মত হতে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। আর এই উম্মতের মধ্যে নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা অন্যান্য উন্মতদের তুলনায় বহুগুণে বেশী হবে। তারা হবে বেশী মর্যাদা সম্পন্ন। কেননা, দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়া এবং নবী (সঃ) সর্বাপেক্ষা মর্যাদা সম্পন্ন হওয়ার দিক দিয়ে এরাই সর্বোত্তম। ধারাবাহিকতার সাথে এ হাদীসটি প্রামাণ্য পৌছে গেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই উম্মতের মধ্য হতে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাবে এবং প্রতি সত্তর হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজার করে লোক থাকবে।হযরত আবূ মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! কিয়ামতের দিন একটি বৃহৎ দলকে দাঁড় করানো হবে। তারা সংখ্যায় এতো অধিক হবে যে, অন্ধকার রাত্রির মত তারা যমীনের সমস্ত প্রান্তকে ঘিরে ফেলবে। ফেরেশতারা বলবেনঃ “সমস্ত নবী (আঃ)-এর সঙ্গে যত লোক এসেছে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথে তাদের সকলের সমষ্টির চেয়ে বহুগুণে বেশী এসেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)‘বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং বহু সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।” এই আয়াতের তাফসীরের স্থলে এই হাদীসটিকে আনয়ন করা যুক্তিযুক্ত হবে যে হাদীসটিকে হাফিয আবু বকর বায়হাকী (রঃ) তাঁর ‘দালাইলুন নবুওয়াহ' নামক গ্রন্থে আনয়ন করেছেন। হাদীসটি হলোঃ হযরত আবূ জামাল জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফজরের নামায পড়তেন তখন তিনি পা দুটি মোড়ানো অবস্থাতেই সত্তর বার পাঠ করতেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবূলকারী।” তারপর বলতেনঃ “সত্তরের বদলে সাতশ’। একদিনে যার পাপ সাত শতেরও বেশী হয় তার জন্যে কল্যাণ নেই।” একথা তিনি দু'বার বলতেন। তারপর তিনি জনগণের দিকে মুখ করে বসতেন। স্বপ্ন তার নিকট প্রিয় ছিল বলে তিনি জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি?” আবূ জামাল (রাঃ) বলেন, একদা অভ্যাসমত রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলে আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হ্যাঁ, আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। তিনি বললেনঃ “আল্লাহ কল্যাণের সাথে সাক্ষাৎ দান করুন, অকল্যাণ হতে বাঁচিয়ে রাখুন, আমাদের জন্যে মঙ্গলজনক করুন, শত্রুদের জন্যে করুন ক্ষতিকর, ঐ আল্লাহ সর্বপ্রকারের প্রশংসার অধিকারী যিনি সারা বিশ্বের প্রতিপালক। তুমি এখন তোমার স্বপ্নের ঘটনা বর্ণনা কর।” আমি তখন বলতে শুরু করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি দেখি যে, একটি রাস্তা রয়েছে যা প্রশস্ত, সহজ, নরম ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। অসংখ্য লোক ঐ পথ ধরে চলছে। তারা চলতে চলতে একটি সবুজ-শ্যামল বাগান পেলো যার মত শস্য-শ্যামল ও চমৎকার বাগান আমি কখনো চোখে দেখিনি। ভিতর দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। নানা প্রকারের গাছ ফুলে ফলে ভরপুর রয়েছে। এখন আমি দেখি যে, প্রথম যে দলটি আসলো এবং ঐ বাগানের নিকট পৌঁছলো, তখন তারা তাদের সওয়ারীর গতি বেশ দ্রুত করলো এবং ডানে বামে না গিয়ে দ্রুত গতিতে ঐ স্থান অতিক্রম করলো। তারপর দ্বিতীয় দল আসলো যাদের সংখ্যা বেশী ছিল, যখন তারা এখানে পৌছলো তখন কতকগুলো লোক তাদের বাহনের পশুগুলোকে সেখানে চরাতে শুরু করলো, আর কতকগুলো লোক কিছু গ্রহণ করলো, অতঃপর সেখান হতে প্রস্থান করলো। তারপর আরো বহু লোকের একটি দল আসলো। যখন তারা এই সবুজ-শ্যামল বাগানের নিকট আসলো তখন তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল এবং বলতে লাগলোঃ “এটা সবচেয়ে উত্তম জায়গা।” আমি যেন তাদেরকে এখনো দেখতে পাচ্ছি যে, তারা ডানে বামে ঝুঁকে পড়েছে। আমি এসব দেখলাম। কিন্তু আমি তো চলতেই থাকলাম। যখন বহু দূরে চলে গেলাম তখন দেখলাম যে, সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট একটি মিম্বর বিছানো রয়েছে এবং আপনি সর্বোচ্চ সোপানে উপবেশন করেছেন। আর আপনার ডানদিকে এক ব্যক্তি রয়েছেন। তার চেহারা গোধূম বর্ণের, অঙ্গুলিগুলো মোটামোটা এবং দেহ লম্বা। যখন তিনি কথা বলছেন তখন সবাই নীরবে শুনছেন এবং জনগণ উঁচু হয়ে হয়ে মনোযোগের সাথে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিয়েছেন। আপনার বাম দিকে একটি লোক রয়েছেন, যাঁর দেহের গঠন মধ্যম, শরীর মোটা এবং চেহারায় বহু তিল রয়েছে। তাঁর চুল যেন পানিতে সিক্ত। যখন তিনি কথা বলছেন তখন তাঁর সম্মানার্থে সবাই ঝুঁকে পড়ছেন। আর সামনে একজন লোক রয়েছেন, তিনি স্বভাব-চরিত্রে এবং চেহারা ও আকৃতিতে আপনার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত। আপনারা সবাই তার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে আছেন। তাঁর সামনে একটি ক্ষীণ, পাতলা ও বৃদ্ধা উষ্ট্রী রয়েছে। আমি দেখলাম যে, আপনি যেন ওকে উঠাচ্ছেন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর এ অবস্থা দূরীভূত হলো। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “সরল, সোজা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা হলো ঐ দ্বীন যা নিয়ে আমি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এসেছি এবং যে হিদায়াতের উপর তোমরা রয়েছো। তুমি যে সবুজ শ্যামল বাগানটি দেখেছো ওটা হলো দুনিয়া এবং ওর মন মাতানো সাজ-সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র। আমার সাহাবীবর্গ তো ওটা অতিক্রম করে চলে যাবে। না আমরা তাতে লিপ্ত হবো, না ওটা। আমাদেরকে জড়িয়ে ধরবে। না ওর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক থাকবে, না আমরা ওর প্রতি আকৃষ্ট হবো। অতঃপর আমাদের পর দ্বিতীয় দল আসবে যারা সংখ্যায় আমাদের চেয়ে বেশী হবে। তাদের মধ্যে কতক লোকে তো দুনিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়বে। আর কেউ কেউ তা হতে প্রয়োজন মত গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা চলে যাবে এবং পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। তারপর তাদের পরে একটি বিরাট দল আসবে যারা এই দুনিয়ায় সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন হয়ে পড়বে। তারা ডানে বামে ঢুকে পড়বে। সুতরাং (আরবী) (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয়ই আমরা তারই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী)। এখন থাকলো তোমার কথা। তাহলে জেনে রেখো যে, তুমি তোমার সোজা সরল পথে চলতে থাকবে, শেষ পর্যন্ত তুমি আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে।সাতটি সিঁড়ি বিশিষ্ট মিম্বরের সর্বোচ্চ সোপানে যে তুমি আমাকে দেখেছো তার ব্যাখ্যা এই যে, দুনিয়ার আয়ু হচ্ছে সাত হাজার বছর। আমি শেষ বা সপ্তম হাজারে রয়েছি। আমার ডান দিকে গোধূম বর্ণের মোটা অঙ্গুলি বিশিষ্ট যে। লোকটিকে তুমি দেখেছো তিনি হলেন হযরত মূসা (আঃ)। যখন তিনি কথা বলেন তখন লোকেরা উচু হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং তার সাথে কথা বলে তাঁকে মর্যাদামণ্ডিত করেছেন। আর যে লোকটিকে তুমি আমার বাম দিকে দেখেছো, যিনি মোটা দেহ বিশিষ্ট এবং যার দেহের গঠন মধ্যম ধরনের আর যার চেহারায় বহু তিল রয়েছে এবং যার চুল পানিতে সিক্ত মনে হচ্ছে, তিনি হলেন হযরত ঈসা (আঃ)। যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্মান করেছেন। সেই হেতু আমরাও সবাই তাকে সম্মান করি। যে বৃদ্ধ লোকটিকে তুমি আমার সাথে সম্পূর্ণরূপে সাদৃশ্যযুক্ত দেখেছো তিনি হলেন আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)। আমরা সবাই তাঁকে চাই, তার অনুসরণ করি এবং তাঁর আনুগত্য করে থাকি। আর যে বৃদ্ধা উষ্ট্রীটিকে তুমি দেখেছো যে, আমি ওকে দাঁড় করাচ্ছি ওর দ্বারা কিয়ামত উদ্দেশ্য যা আমার উম্মতের উপর সংঘটিত হবে। না আমার পরে কোন নবী আছে এবং না আমার উম্মতের পরে কোন উম্মত আছে।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না এ প্রশ্ন করা ছেড়ে দেন। হ্যাঁ, তবে যখন কেউ নিজেই কোন স্বপ্নের কথা বলতো তখন তিনি ঐ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে দিতেন।” মহান আল্লাহ বলেনঃ নৈকট্যপ্রাপ্তদের বিশ্রামের পালঙ্গটি সোনার তার দ্বারা বুননকৃত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা (আরবী) ওযনে (আরবী)-এর অর্থে হবে। যেমন উষ্ট্রীর পেটের নীচে যেটা থাকে ওটাকে (আরবী) বলা হয়। তারা ঐ আসনে হেলান দিয়ে বসবে, পরস্পর মুখখামুখি হয়ে। কেউ কারো দিকে পিঠ করে বসবে না।তাদের সেবায় ঘোরাফিরা করবে চির কিশোরেরা। অর্থাৎ ঐ সেবকরা বয়সে একই অবস্থায় থাকবে। তারা বড়ও হবে না, বুড়োও হবে না এবং তাদের বয়সে কোন পরিবর্তনও হবে না, বরং তারা সদা কিশোরেই থাকবে।(আরবী) বলা হয় ঐ কুঁজাকে যাতে নালী বা চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস থাকে না। (আরবী) আর বলা হয় ঐ পানপাত্রকে যাতে চুঙ্গি এবং ধরবার জিনিস আছে। এগুলো সুরার প্রবহমান প্রস্রবণ হতে পূর্ণ করা থাকবে, যে সুরা কখনো শেষ হবার নয়। কেননা, ওর প্রস্রবণ সদা জারী থাকবে। এই সদা-কিশোরেরা সুরাপূর্ণ এই পানপাত্রগুলো তাদের নরম হাতে নিয়ে ঐ জান্নাতীদের সেবায় এদিক ওদিক ঘোরাফিরা করতে থাকবে। সেই সুরা পানে তাদের শিরঃপীড়াও হবে না এবং তারা জ্ঞানহারাও হবে না। সুতরাং পূর্ণমাত্রায় তারা ঐ সুরার স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে। মদের মধ্যে চারটি বিশেষণ রয়েছে। (এক) নেশা, (দুই) মাথাব্যথা, (তিন) বমি এবং (চার) প্রস্রাব। মহান প্রতিপালক আল্লাহ জান্নাতের সুরা বা মদের বর্ণনা দিয়ে ওকে এই চারটি দোষ হতে মুক্ত বলে ব্যক্ত করলেন। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ চির কিশোরেরা তাদের কাছে ঘোরাফিরা করবে তাদের পছন্দমত নানা প্রকারের ফলমূল নিয়ে এবং তাদের ঈপ্সিত পাখীর গোশত নিয়ে। যে ফল খাওয়ার তাদের ইচ্ছা হবে এবং যে গোশত খেতে তাদের মন চাইবে, সাথে সাথে তারা তা পাবে। এসব রকমারী খাবার নিয়ে তাদের এই চির কিশোরে সেবকরা সদা তাদের চারদিকে ঘোরাফিরা করবে। সুতরাং তাদের যখনই যা খেতে ইচ্ছা করবে তখনই তা তাদের নিকট থেকে নিয়ে নিবে। এই আয়াতে এই দলীল রয়েছে যে, মানুষ ফল বেছে বেছে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী খেতে পারে।হযরত ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার কওম মুররা আমাকে তাদের সাদকার মাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। আমি ঐ মাল নিয়ে মদীনায় পৌঁছি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। আমার সাথে যাকাতের বহু উট ছিল, উটগুলো যেন বালুকার উপর লেগে থাকা গাছগুলোতে চরানো যুবক উট। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কে?” আমি বললামঃ আমি ইকরাশ ইবনে যুআয়েব (রাঃ)। তিনি বললেনঃ “তুমি দূর পর্যন্ত তোমার বংশ তালিকা বর্ণনা কর।” আমি তখন মুররা ইবনে উবায়েদ পর্যন্ত বলে শুনালাম। আর সাথে সাথে আমি বললাম যে, এগুলো মুররা ইবনে উবায়েদের যাকাতের উট। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হাসলেন এবং বললেনঃ “এগুলো আমার কওমেরই উট, এগুলো আমার কওমের সাদুকার মাল। এগুলোতে সাদকার উটগুলোর চিহ্ন দিয়ে দাও এবং ওগুলোর সাথে এগুলোকে মিলিয়ে দাও।” অতঃপর তিনি আমার হাত ধরে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “খাবার কিছু আছে কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ আছে।" অতঃপর আমাদের কাছে চুর্ণ করা রুটির একটা বড় গামলা পাঠানো হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং আমি খেতে শুরু করলাম। আমি এদিক ওদিক হতে খাবার উঠাতে লাগলাম। তখন তিনি তাঁর হাত দ্বারা আমার হাত ধরে নিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা তো একই প্রকারের খাদ্য, সুতরাং একই জায়গা হতে খেতে থাকো। এরপর রসাল খেজুর অথবা শুষ্ক খেজুরের একটি থালা আসলো। আমি ওটা হতে শুধু আমার সামনের দিক হতে খেতে লাগলাম। তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পছন্দ মত থালার এদিক ওদিক হতে নিয়ে খাচ্ছিলেন এবং আমাকেও বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এখানে নানা প্রকারের খেজুর আছে। সুতরাং যেখান হতে ইচ্ছা খাও।” তারপর পানি আসলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাত ধৌত করলেন এবং ঐ ভিজা হাত স্বীয় চেহারার উপর, দুই বাহুর উপর এবং মাথার উপর তিনবার ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেনঃ “হে ইকরাশ (রাঃ)! এটা অযু হলো ঐ জিনিস হতে যাকে আগুনে পরিবর্তিত করে ফেলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বপ্ন খুব পছন্দ করতেন। কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কি না তা তিনি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন। কেউ কোন স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলে এবং তাতে তিনি আনন্দিত হলে ওটা খুব ভাল স্বপ্ন বলে জানা যেতো। একদা একটি স্ত্রীলোক তার কাছে এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে যেন কেউ আসলো এবং আমাকে মদীনা হতে নিয়ে গিয়ে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিলো। তারপর আমি এক ধমক শুনলাম, যার ফলে জান্নাতে হৈ চৈ পড়ে গেল। আমি চক্ষু উঠিয়ে তাকালে অমুকের পুত্র অমুক, অমুকের পুত্র অমুককে দেখতে পাই।” এভাবে স্ত্রীলোকটি বারোটি লোকের নাম করেন। এই বারোজন লোকেরই একটি বাহিনীকে মাত্র কয়েকদিন পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। মহিলাটি বলতে থাকেনঃ “এ লোকগুলো আতলাস (সাটিন) কাপড় পরিহিত ছিলেন। তাঁদের শিরাগুলো ফুটতে ছিল। নির্দেশ দেয়া হয়ঃ তাদেরকে নহরে বায়দাখ বা নহরে বায়খে নিয়ে যাও। যখন তারা ঐ নদীতে ডুব দিলেন তখন তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চাঁদের মত চমকাতে থাকলো। অতঃপর তাদের জন্যে সোনার থালায় খেজুর আনয়ন করা হয় যা তারা ইচ্ছামত খেলেন। তারপর নানা প্রকারের ফল-মূল তাঁদের কাছে হাযির করা হলো যেগুলো চারদিক হতে বাছাই। করে রাখা হয়েছিল। এগুলো হতেও তাঁরা তাঁদের মনের চাহিদা মত খেলেন। আমিও তাঁদের সাথে শরীক হলাম ও খেলাম।” কিছুদিন পর একজন দূত আসলো এবং বললোঃ “অমুক অমুক ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন যাদেরকে আপনি রণাঙ্গনে পাঠিয়েছিলেন।” দূতটি ঐ বারোজনেরই নাম করলো যে বারোজনকে ঐ মহিলাটি স্বপ্নে দেখেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সতী মহিলাটিকে আবার ডাকিয়ে নেন এবং তাঁকে বলেনঃ “পুনরায় তুমি তোমার স্বপ্নের বৃত্তান্তটি বর্ণনা কর।” মহিলাটি এবারও ঐ লোকগুলোরই নাম করলেন যাদের নাম ঐ দূতটি করেছিলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা মুসিলী (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি যেই ফল জান্নাতের গাছ হতে ভেঙ্গে আনবে, সাথে সাথে ঠিক ঐরূপই আর একটি ফল গাছে এসে লেগে যাবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নাতের পাখী বড় বড় উটের সমান হয়ে জান্নাতের গাছে চরে ও খেয়ে বেড়াবে।” এ কথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে ঐ পাখী তো বড় নিয়ামত উপভোগ করবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যারা এই পাখীর গোশত খাবে তারাই হবে বেশী নিয়ামতের অধিকারী।” তিনবার তিনি একথাই বলেন। তারপর বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! আমি আশা করি যে, তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে যারা এই পাখীগুলোর গোশত খাবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ)-এর সামনে ‘বা বৃক্ষের আলোচনা হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! তৃবা বৃক্ষ কি তা তুমি জান কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেনঃ “এটা হলো জান্নাতের একটি বৃক্ষ যার দৈর্ঘ্য ও বিস্তৃতি যে কত তা একমাত্র আল্লাহই জানেন! এর এক একটি শাখার ছায়ায় একজন অশ্বারোহী সত্তর বছর ধরে চলবে তবুও ওর ছায়া শেষ হবে না। ওর পাতাগুলো খুবই চওড়া ও বড় বড় হবে। ওর উপর বড় বড় উটের সমান সমান পাখী এসে বসবে। তার একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে তো এই পাখী বড় রকমের নিয়ামতের অধিকারী হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “এই পাখীগুলো অপেক্ষা বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে এগুলোকে ভক্ষণকারীরা। আমি আশা করি যে, তুমিও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু আবদিল্লাহ আল মুকাদ্দাসী (রঃ) তাঁর ‘সিফাতুল জান্নাহ’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। শেষের অংশটি হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাওসার' সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ “এটা হলো জান্নাতী নহর, যা মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে দান করেছেন। এর পানি দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। এর ধারে বড় বড় উটের সমান পাখী রয়েছে। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তাহলে তো এ পাখীগুলো বড়ই নিয়ামত উপভোগ করছে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলোকে ভক্ষণকারীরা এগুলো অপেক্ষাও বেশী নিয়ামতের অধিকারী হবে।” (এটা আবু বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে একটি পাখী রয়েছে যার সত্তর হাজার পাখা আছে। পাখীটি জান্নাতীর দস্তরখানে আসবে। প্রত্যেক পাখা হতে একপ্রকার রঙ বের হবে। যা দুধের চেয়েও সাদা, মাখনের চেয়েও নরম এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। তারপর দ্বিতীয় পাখা হতে দ্বিতীয় প্রকারের রঙ বের হবে। এভাবে প্রত্যেক পাখা হতে পৃথক পৃথক রঙ বের হয়ে আসবে। তারপর ঐ পাখীটি উড়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি খুবই গরীব। এর বর্ণনাকারী অসাফী এবং তার উস্তাদ দু'জনই দুর্বল)হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতী পাখী বড় বড় উটের মত, যেগুলো জান্নাতের ফল খায় এবং জান্নাতের নহরের পানি পান করে। জান্নাতী যে পাখীর গোশত খাওয়ার ইচ্ছা করবে ঐ পাখী তার সামনে চলে আসবে। সে যত চাইবে যে বাহুর গোশত পছন্দ করবে, খাবে। তারপর ঐ পাখী উড়ে যাবে এবং যেমন ছিল তেমনই হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “জান্নাতের যেই পাখীর গোশত তোমার খাওয়ার ইচ্ছা হবে ঐ পাখীর গোশত রান্নাকৃত অবস্থায় তোমার সামনে এসে যাবে।” (আরবী) শব্দটি অন্য কিরআতে যেরের সাথেও রয়েছে। পেশের সঙ্গে হলে তো অর্থ হবেঃ জান্নাতীদের জন্যে হরসমূহ রয়েছে। আর যেরের সাথে হলে ভাবার্থ এই হবে যে, এটা যেন পূর্ব ই'রাবেরই অনুসারী। যেমনঃ (আরবী)-এই কিরআত এবং যেমন (আরবী)-এই কিরআতে রয়েছে। আর এই অর্থও হতে পারে যে, কিশোরেরা নিজেদের সঙ্গে হুরদেরকেও নিয়ে নিবে। কিন্তু তারা থাকবে তাদের মহলে ও তাঁবুতে, সাধারণভাবে নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই হরগুলো এমন হবে যেমন সতেজ, সাদা ও পরিষ্কার মুক্তা হয়ে থাকে। যেমন সূরায়ে সাফফাতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা যেন সুরক্ষিত ডিম্ব।” সূরায়ে রহমানেও এই বিশেষণ তাফসীরসহ গত হয়েছে। এটা তাদের সৎ কার্যের প্রতিদান। অর্থাৎ এই উপঢৌকন তাদের সকর্মেরই ফল।সেথায় তারা শুনবে না কোন অসার অথবা পাপ বাক্য। ঘূণ্য ও মন্দ কথার একটি শব্দও তাদের কানে আসবে না। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেথায় তারা অসার বাক্য শুনবে না।” (৮৮:১১) হ্যাঁ, তবে তারা শুনবে শুধু ‘সালাম’ আর ‘সালাম’ বাণী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের উপঢৌকন হবে তাদের একে অপরকে সালাম করা।" (১০:১০) তাদের কথাবার্তা বাজে ও পাপ হতে পবিত্র হবে।