Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-লাইল 92:1 – আদ-দুহা 93:10

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-লাইল 92:1
  2. আল-লাইল 92:2
  3. আল-লাইল 92:3
  4. আল-লাইল 92:4
  5. আল-লাইল 92:5
  6. আল-লাইল 92:6
  7. আল-লাইল 92:7
  8. আল-লাইল 92:8
  9. আল-লাইল 92:9
  10. আল-লাইল 92:10
  11. আল-লাইল 92:11
  12. আল-লাইল 92:12
  13. আল-লাইল 92:13
  14. আল-লাইল 92:14
  15. আল-লাইল 92:15
  16. আল-লাইল 92:16
  17. আল-লাইল 92:17
  18. আল-লাইল 92:18
  19. আল-লাইল 92:19
  20. আল-লাইল 92:20
  21. আল-লাইল 92:21
  22. আদ-দুহা 93:1
  23. আদ-দুহা 93:2
  24. আদ-দুহা 93:3
  25. আদ-দুহা 93:4
  26. আদ-দুহা 93:5
  27. আদ-দুহা 93:6
  28. আদ-দুহা 93:7
  29. আদ-দুহা 93:8
  30. আদ-দুহা 93:9
  31. আদ-দুহা 93:10

আল-লাইল 92:1

নবী করীম (সঃ) হযরত মুআযের (রঃ) প্রতি যে উক্তিটি করেছিলেন তা পূর্বেই গত হয়েছে। তাহলো “কেন তমি নামাযে (আরবি) এবং (আরবি) এই সূরাগুলো পাঠ কর না?”১-১১ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আলকামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সিরিয়ায় আগমন করেন এবং দামেস্কের মসজিদে গিয়ে দুই রাকআত নামায পড়েন। অতঃপর দুআ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে একজন উত্তম সাথী দান করুন!” এরপর হযরত আবুদ দারদা'র (রাঃ) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কোথাকার লোক? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একজন কুফার অধিবাসী।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “আপনি ইবনে উমি আবৃদ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন?” জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ) বলেনঃ “তিনি পড়তেন (আরবি)।” তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে এ সূরাটি এ ভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “আপনাদের মধ্যে কি বালিশ ওয়ালা (অর্থাৎ সফরে যার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিছানাপত্র থাকতো) এবং যিনি এমন কিছু গোপনীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে জ্ঞান অন্য কারো ছিল না এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর ভাষায় যিনি শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) নেই?”হযরত ইবরাহীম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর খোঁজে আগমন করেন। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)ও তাদেরকে খোঁজ করতে করতে পেয়ে যান। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআত অনুযায়ী কুরআন পাঠকারী কেউ আছেন কি? উত্তরে তারা বললেনঃ “আমরা সবাই (তার কিরআতের অনুসারী)।” তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহর কিরআত অধিক স্মরণকারী কে আছেন?” তাঁরা জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন? তিনি (আরবি) উত্তরে বললেন, “তিনি পাঠ করতেন।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ চায় যে, আমি যেন পাঠ করি। আল্লাহর কসম! তাদের কথা আমি মানব না’’’’ (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেন) মোট কথা, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর কিরআত এরূপ। হযরত আবুদ দারদা এ বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মারফু বলেও উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য জমহূরের কিরআত বর্তমানে কুরআনে উল্লিখিত কিরআতের অনুরূপ। আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের উপর ছেয়ে যাওয়া রাত্রির শপথ করছেন, সব কিছুকে আলোকমণ্ডিত করে দেয়া দিবসের শপথ করেছেন এবং সমস্ত নর-নারী, নর ও মাদী জীবসমূহের স্রষ্টা হিসেবে নিজের সত্ত্বার শপথ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।” (৭৮:৮) আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক জিনিসের জোড়া সৃষ্টি করেছি।” (৫১৪ ৪৯) এই শপথ করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ অবশ্যই তোমাদের কর্ম প্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির। অর্থাৎ তোমাদের প্রচেষ্টা এবং আমলসমূহ পরস্পরবিরোধী, একটি অন্যটির বিপরীত। যারা ভাল কাজ করছে তারাও আছে এবং যারা মন্দ কাজে লিপ্ত রয়েছে তারাও আছে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে ব্যক্তি দান করলো ও মুত্তাকী হলো অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার পথে খরচ করলো, মেপে মেপে পা বাড়ালো, প্রত্যেক কাজে আল্লাহর ভয় রাখলো আল্লাহর ওয়াদাকৃত পুরস্কারকে সত্য বলে জানলো এবং তাঁর পুণ্যের অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাস করলো, আর যা উত্তম। গ্রহণ করলো, আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো।(আরবি) শব্দের অর্থ ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, করা হয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ ‘নিয়ামত’ করেছেন। আবার কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, এর ভার্থ হলোঃ নামায, রোযা, যাকাত, সাদকা, সাদকায়ে ফিত্র এবং জান্নাত। মহান আল্লাহ বলে আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো। অর্থাৎ কল্যাণ, অত এ উত্তম বিনিময়ের পথ।পারে সে ব্যক্তি কার্পণ্য করলো এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলো এবং হুসন’ অর্থাৎ কিয়ামতের বিনিময়কে অবিশ্বাস করলো, তার জন্যে আমি সুগম করে দিবো কঠোর পরিণামের পথ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের অন্তঃকরণ ও তাদের চক্ষু উল্টিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবার কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং তাদেরকে আমি অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিবো।" (৬৪১১০) প্রত্যেক আমলের বিনিময় যে সেই আমলের অনুরূপ হয়ে থাকে এ সম্পর্কিত আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে বহু রয়েছে। যে ভাল কাজ করতে চায় তাকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করা হয়। পক্ষান্তরে যে মন্দ কাজ করতে চায় তাকে মন্দ কাজ করার সামর্থ্য প্রদান করা হয়। এ অর্থের সমর্থনে বহু হাদীসও রয়েছে। একটি হাদীস এই যে, একবার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের আমলসমূহ কি তকদীরের লিখন অনুযায়ী হয়ে থাকে?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বলেনঃ “হ্যা তকদীরের লিখন অনুযায়ীই আমল হয়ে থাকে।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ) তাহলে আমলের প্রয়োজন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সেই আমল সহজ হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা বাকী’ গারকাদে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলাম। তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে তোমাদের প্রত্যেকের স্থানই জান্নাতে অথবা জাহান্নামে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং লিপিবদ্ধ রয়েছে।” একথা শুনে জনগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমরা তো সেই ভরসায় নিষ্ক্রীয় হয়ে থাকলেই পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা আমল করে যাও, কারণ প্রত্যেক লোকের জন্য সেই আমলই সহজ করা হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ বর্ণনাটিই অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে এক টুকরো কাঠি ছিল এবং মাথা নীচু করে তিনি তা এদিক ওদিক করছিলেন। শব্দের মধ্যে কিছু কম বেশীও রয়েছে। উপরে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-এর একই ধরনের প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং নবী করীমের (সঃ) উত্তরও প্রায় একই রকমের রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতেও একই ধরনের বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীরেরই (রঃ) অন্য একটি বর্ণনায় দু'জন যুবকের একই রকম প্রশ্ন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর একই রকম উত্তর বর্ণিত রয়েছে। তারপর সেই দুই যুবকের নিম্নের উক্তিও উল্লিখিত রয়েছেঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সৎ আমল করতে থাকবো।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) হতেও একইভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসুলে কারীম (সঃ) বলেনঃ “প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় সূর্যের উভয় পাশে দু’জন ফেরেশতা উপস্থিত হন এবং উচ্চস্বরে দু'আ করেন, যে দু’আ মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সকল সৃষ্টি জীবই শুনতে পায়। তারা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! দানশীলকে পূর্ণ বিনিময় প্রদান করুন এবং কৃপণের মাল ধ্বংস করে দিন।” কুরআনে এ চারটি আয়াতের অর্থ এটাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোকের একটি খেজুরের বাগান ছিল। ঐ বাগানের একটি খেজুর গাছের শাখা একটি দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকেছিল। ঐ দরিদ্র লোকটি ছিল পুণ্যবান। তার সন্তান সন্ততিও ছিল। বাগানের মালিক খেজুর নামাতে এসে ঝুঁকে থাকা শাখার খেজুরও নির্দ্বিধায় নামিয়ে নিতো। নীচে দরিদ্র লোকটির আঙ্গিনায় পড়া খেজুরও সে কুড়িয়ে নিতো। এমনকি দরিদ্র লোকটির ছেলে মেয়েদের কেউ দু একটা খেজুর মুখে দিলে বাগানের ঐ মালিক তার মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঐ খেজুর বের করে নিতো। দরিদ্র লোকটি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তুমি যাও (আমি এর সুব্যবস্থা করছি)।” অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের সাথে দেখা করে বললেনঃ “তোমার যেই খেজুর গাছের শাখা অমুক দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকে আছে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দাও, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সেই গাছের বিনিময়ে জান্নাতে একটি গাছ দিবেন।” বাগানের মালিক বললোঃ “ঠিক আছে, দিয়ে দিলাম। কিন্তু উক্ত গাছের খেজুর আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। আমার বাগানে বহু গাছ আছে, কিন্তু ঐ গাছের মত সুস্বাদু খেজুর গাছ আর একটিও নেই।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুপচাপ ফিরে আসলেন। একটি লোক গোপনে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)এবং ঐ লোকেটির কথােপকথন শুনছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ গাছটি যদি আমার হয়ে যায় এবং আমি ওটা আপনাকে দিয়ে দিই তবে কি ঐ গাছের বিনিময়ে আমিও জান্নাতে একটি গাছ পেতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হা (অবশ্যই)। লোকটি তখন বাগান মালিকের কাছে গেলেন। তার নিজেরও একটি বাগান ছিল। প্রথমোক্ত বাগান-মালিক তাকে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আমার অমুক খেজুর গাছের বিনিময়ে জান্নাতের একটি গাছ দিতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে এই জবাব দিয়েছি। তার একথা শুনে আগন্তুক লোকটি তাকে বললেনঃ “তুমি কি গাছটি বিক্রি করতে চাও?" উত্তরে লোকটি বললোঃ “না। তবে হ্যা, ইতি মূল্য কেউ যদি দেয় তবে ভেবে দেখতে পারি। কিন্তু কে দিবে সেই মূল্য?" তখন আগন্তুক লোকটি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কত মূল্য তুমি চাও?”বাগান মালিক জবাব দিলোঃ “এর বিনিময়ে আমি চল্লিশটি খেজুর গাছ চাই।” আগন্তুক বললেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যায়। একটি গাছের বিনিময়ে চল্লিশটি গাছ।” তারপর উভয়ে অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আগন্তুক তাকে বললেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার ইপ্সিত মূল্যেই তোমার খেজুর গাছ ক্রয় করলাম।" মালিক বললোঃ “যদি তাই হয় তবে সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করে কথা পাকাপাকি করে নাও।” সুতরাং কয়েকজন লোক ডেকে নিয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ করা হলো এবং এইভাবে ক্রয় বিক্রয়ের কাজ পাকাপাকি হয়ে গেল। কিন্তু এতেও বাগান-মালিকের খুৎ খুঁৎ মনোভাব কাটলো না। সে বললোঃ “দেখো ভাই, আমরা এখান হতে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু বেচা কেনা সিদ্ধ হবে না?” ক্রেতা বললেনঃ “ঠিক আছে, তাই হবে।”বাগানের মালিক বললোঃ “আমি সম্মত হয়ে গেলাম যে তুমি আমাকে আমার এই খেজুর গাছের বিনিময়ে তোমার চল্লিশটি খেজুর গাছ প্রদান করবে। কিন্তু ভাই গাছগুলো ঘনশাখা বিশিষ্ট হওয়া চাই।” ক্রেতা বললেনঃ “আচ্ছা তা দিবো।” তারপর সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে এ বেচাকেনা সম্পন্ন হলো। তারপর তারা দুজন পৃথক হয়ে গেল (ক্রেতা লোকটি তখন আনন্দিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাযির হয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)। আমি ঐ বৃক্ষের মালিকানা লাভ করেছি এবং ওটা আপনাকে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ দরিদ্র লোকটির নিকট গিয়ে বললেনঃ “এই খেজুর গাছ তোমার এবং তোমার সন্তানদের মালিকানাভুক্ত হয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতসমূহ হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্পর্কে নাযিল হয়। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় তিনি বৃদ্ধ ও দুর্বল দাস-দাসীদেরকে মুসলমান হয়ে যাওয়ার পর আযাদ করে দিতেন। এ ব্যাপারে একবার তাঁর পিতা আবু কাহাফা (তিনি তখনো মুসলমান হননি) বলেনঃ “তুমি দুর্বল ও বৃদ্ধদেরকে মুক্ত করছো, অথচ যদি সকল যুবকদেরকে মুক্ত করতে তবে তারা তোমার কাজে আসততা। তারা তোমাকে সাহায্য করতে পারতো এবং শত্রুদের সাথে লড়াই করতে পারতো।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন “আব্বাজান! ইহলৌকিক লাভালাভ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করি।" এরপর এখান হতে সূরা শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করা এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া, এই উভয় অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-লাইল 92:2

নবী করীম (সঃ) হযরত মুআযের (রঃ) প্রতি যে উক্তিটি করেছিলেন তা পূর্বেই গত হয়েছে। তাহলো “কেন তমি নামাযে (আরবি) এবং (আরবি) এই সূরাগুলো পাঠ কর না?”১-১১ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আলকামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সিরিয়ায় আগমন করেন এবং দামেস্কের মসজিদে গিয়ে দুই রাকআত নামায পড়েন। অতঃপর দুআ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে একজন উত্তম সাথী দান করুন!” এরপর হযরত আবুদ দারদা'র (রাঃ) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কোথাকার লোক? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একজন কুফার অধিবাসী।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “আপনি ইবনে উমি আবৃদ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন?” জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ) বলেনঃ “তিনি পড়তেন (আরবি)।” তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে এ সূরাটি এ ভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “আপনাদের মধ্যে কি বালিশ ওয়ালা (অর্থাৎ সফরে যার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিছানাপত্র থাকতো) এবং যিনি এমন কিছু গোপনীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে জ্ঞান অন্য কারো ছিল না এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর ভাষায় যিনি শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) নেই?”হযরত ইবরাহীম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর খোঁজে আগমন করেন। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)ও তাদেরকে খোঁজ করতে করতে পেয়ে যান। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআত অনুযায়ী কুরআন পাঠকারী কেউ আছেন কি? উত্তরে তারা বললেনঃ “আমরা সবাই (তার কিরআতের অনুসারী)।” তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহর কিরআত অধিক স্মরণকারী কে আছেন?” তাঁরা জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন? তিনি (আরবি) উত্তরে বললেন, “তিনি পাঠ করতেন।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ চায় যে, আমি যেন পাঠ করি। আল্লাহর কসম! তাদের কথা আমি মানব না’’’’ (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেন) মোট কথা, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর কিরআত এরূপ। হযরত আবুদ দারদা এ বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মারফু বলেও উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য জমহূরের কিরআত বর্তমানে কুরআনে উল্লিখিত কিরআতের অনুরূপ। আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের উপর ছেয়ে যাওয়া রাত্রির শপথ করছেন, সব কিছুকে আলোকমণ্ডিত করে দেয়া দিবসের শপথ করেছেন এবং সমস্ত নর-নারী, নর ও মাদী জীবসমূহের স্রষ্টা হিসেবে নিজের সত্ত্বার শপথ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।” (৭৮:৮) আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক জিনিসের জোড়া সৃষ্টি করেছি।” (৫১৪ ৪৯) এই শপথ করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ অবশ্যই তোমাদের কর্ম প্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির। অর্থাৎ তোমাদের প্রচেষ্টা এবং আমলসমূহ পরস্পরবিরোধী, একটি অন্যটির বিপরীত। যারা ভাল কাজ করছে তারাও আছে এবং যারা মন্দ কাজে লিপ্ত রয়েছে তারাও আছে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে ব্যক্তি দান করলো ও মুত্তাকী হলো অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার পথে খরচ করলো, মেপে মেপে পা বাড়ালো, প্রত্যেক কাজে আল্লাহর ভয় রাখলো আল্লাহর ওয়াদাকৃত পুরস্কারকে সত্য বলে জানলো এবং তাঁর পুণ্যের অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাস করলো, আর যা উত্তম। গ্রহণ করলো, আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো।(আরবি) শব্দের অর্থ ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, করা হয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ ‘নিয়ামত’ করেছেন। আবার কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, এর ভার্থ হলোঃ নামায, রোযা, যাকাত, সাদকা, সাদকায়ে ফিত্র এবং জান্নাত। মহান আল্লাহ বলে আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো। অর্থাৎ কল্যাণ, অত এ উত্তম বিনিময়ের পথ।পারে সে ব্যক্তি কার্পণ্য করলো এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলো এবং হুসন’ অর্থাৎ কিয়ামতের বিনিময়কে অবিশ্বাস করলো, তার জন্যে আমি সুগম করে দিবো কঠোর পরিণামের পথ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের অন্তঃকরণ ও তাদের চক্ষু উল্টিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবার কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং তাদেরকে আমি অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিবো।" (৬৪১১০) প্রত্যেক আমলের বিনিময় যে সেই আমলের অনুরূপ হয়ে থাকে এ সম্পর্কিত আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে বহু রয়েছে। যে ভাল কাজ করতে চায় তাকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করা হয়। পক্ষান্তরে যে মন্দ কাজ করতে চায় তাকে মন্দ কাজ করার সামর্থ্য প্রদান করা হয়। এ অর্থের সমর্থনে বহু হাদীসও রয়েছে। একটি হাদীস এই যে, একবার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের আমলসমূহ কি তকদীরের লিখন অনুযায়ী হয়ে থাকে?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বলেনঃ “হ্যা তকদীরের লিখন অনুযায়ীই আমল হয়ে থাকে।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ) তাহলে আমলের প্রয়োজন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সেই আমল সহজ হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা বাকী’ গারকাদে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলাম। তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে তোমাদের প্রত্যেকের স্থানই জান্নাতে অথবা জাহান্নামে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং লিপিবদ্ধ রয়েছে।” একথা শুনে জনগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমরা তো সেই ভরসায় নিষ্ক্রীয় হয়ে থাকলেই পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা আমল করে যাও, কারণ প্রত্যেক লোকের জন্য সেই আমলই সহজ করা হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ বর্ণনাটিই অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে এক টুকরো কাঠি ছিল এবং মাথা নীচু করে তিনি তা এদিক ওদিক করছিলেন। শব্দের মধ্যে কিছু কম বেশীও রয়েছে। উপরে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-এর একই ধরনের প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং নবী করীমের (সঃ) উত্তরও প্রায় একই রকমের রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতেও একই ধরনের বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীরেরই (রঃ) অন্য একটি বর্ণনায় দু'জন যুবকের একই রকম প্রশ্ন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর একই রকম উত্তর বর্ণিত রয়েছে। তারপর সেই দুই যুবকের নিম্নের উক্তিও উল্লিখিত রয়েছেঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সৎ আমল করতে থাকবো।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) হতেও একইভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসুলে কারীম (সঃ) বলেনঃ “প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় সূর্যের উভয় পাশে দু’জন ফেরেশতা উপস্থিত হন এবং উচ্চস্বরে দু'আ করেন, যে দু’আ মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সকল সৃষ্টি জীবই শুনতে পায়। তারা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! দানশীলকে পূর্ণ বিনিময় প্রদান করুন এবং কৃপণের মাল ধ্বংস করে দিন।” কুরআনে এ চারটি আয়াতের অর্থ এটাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোকের একটি খেজুরের বাগান ছিল। ঐ বাগানের একটি খেজুর গাছের শাখা একটি দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকেছিল। ঐ দরিদ্র লোকটি ছিল পুণ্যবান। তার সন্তান সন্ততিও ছিল। বাগানের মালিক খেজুর নামাতে এসে ঝুঁকে থাকা শাখার খেজুরও নির্দ্বিধায় নামিয়ে নিতো। নীচে দরিদ্র লোকটির আঙ্গিনায় পড়া খেজুরও সে কুড়িয়ে নিতো। এমনকি দরিদ্র লোকটির ছেলে মেয়েদের কেউ দু একটা খেজুর মুখে দিলে বাগানের ঐ মালিক তার মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঐ খেজুর বের করে নিতো। দরিদ্র লোকটি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তুমি যাও (আমি এর সুব্যবস্থা করছি)।” অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের সাথে দেখা করে বললেনঃ “তোমার যেই খেজুর গাছের শাখা অমুক দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকে আছে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দাও, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সেই গাছের বিনিময়ে জান্নাতে একটি গাছ দিবেন।” বাগানের মালিক বললোঃ “ঠিক আছে, দিয়ে দিলাম। কিন্তু উক্ত গাছের খেজুর আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। আমার বাগানে বহু গাছ আছে, কিন্তু ঐ গাছের মত সুস্বাদু খেজুর গাছ আর একটিও নেই।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুপচাপ ফিরে আসলেন। একটি লোক গোপনে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)এবং ঐ লোকেটির কথােপকথন শুনছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ গাছটি যদি আমার হয়ে যায় এবং আমি ওটা আপনাকে দিয়ে দিই তবে কি ঐ গাছের বিনিময়ে আমিও জান্নাতে একটি গাছ পেতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হা (অবশ্যই)। লোকটি তখন বাগান মালিকের কাছে গেলেন। তার নিজেরও একটি বাগান ছিল। প্রথমোক্ত বাগান-মালিক তাকে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আমার অমুক খেজুর গাছের বিনিময়ে জান্নাতের একটি গাছ দিতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে এই জবাব দিয়েছি। তার একথা শুনে আগন্তুক লোকটি তাকে বললেনঃ “তুমি কি গাছটি বিক্রি করতে চাও?" উত্তরে লোকটি বললোঃ “না। তবে হ্যা, ইতি মূল্য কেউ যদি দেয় তবে ভেবে দেখতে পারি। কিন্তু কে দিবে সেই মূল্য?" তখন আগন্তুক লোকটি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কত মূল্য তুমি চাও?”বাগান মালিক জবাব দিলোঃ “এর বিনিময়ে আমি চল্লিশটি খেজুর গাছ চাই।” আগন্তুক বললেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যায়। একটি গাছের বিনিময়ে চল্লিশটি গাছ।” তারপর উভয়ে অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আগন্তুক তাকে বললেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার ইপ্সিত মূল্যেই তোমার খেজুর গাছ ক্রয় করলাম।" মালিক বললোঃ “যদি তাই হয় তবে সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করে কথা পাকাপাকি করে নাও।” সুতরাং কয়েকজন লোক ডেকে নিয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ করা হলো এবং এইভাবে ক্রয় বিক্রয়ের কাজ পাকাপাকি হয়ে গেল। কিন্তু এতেও বাগান-মালিকের খুৎ খুঁৎ মনোভাব কাটলো না। সে বললোঃ “দেখো ভাই, আমরা এখান হতে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু বেচা কেনা সিদ্ধ হবে না?” ক্রেতা বললেনঃ “ঠিক আছে, তাই হবে।”বাগানের মালিক বললোঃ “আমি সম্মত হয়ে গেলাম যে তুমি আমাকে আমার এই খেজুর গাছের বিনিময়ে তোমার চল্লিশটি খেজুর গাছ প্রদান করবে। কিন্তু ভাই গাছগুলো ঘনশাখা বিশিষ্ট হওয়া চাই।” ক্রেতা বললেনঃ “আচ্ছা তা দিবো।” তারপর সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে এ বেচাকেনা সম্পন্ন হলো। তারপর তারা দুজন পৃথক হয়ে গেল (ক্রেতা লোকটি তখন আনন্দিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাযির হয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)। আমি ঐ বৃক্ষের মালিকানা লাভ করেছি এবং ওটা আপনাকে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ দরিদ্র লোকটির নিকট গিয়ে বললেনঃ “এই খেজুর গাছ তোমার এবং তোমার সন্তানদের মালিকানাভুক্ত হয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতসমূহ হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্পর্কে নাযিল হয়। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় তিনি বৃদ্ধ ও দুর্বল দাস-দাসীদেরকে মুসলমান হয়ে যাওয়ার পর আযাদ করে দিতেন। এ ব্যাপারে একবার তাঁর পিতা আবু কাহাফা (তিনি তখনো মুসলমান হননি) বলেনঃ “তুমি দুর্বল ও বৃদ্ধদেরকে মুক্ত করছো, অথচ যদি সকল যুবকদেরকে মুক্ত করতে তবে তারা তোমার কাজে আসততা। তারা তোমাকে সাহায্য করতে পারতো এবং শত্রুদের সাথে লড়াই করতে পারতো।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন “আব্বাজান! ইহলৌকিক লাভালাভ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করি।" এরপর এখান হতে সূরা শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করা এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া, এই উভয় অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-লাইল 92:3

নবী করীম (সঃ) হযরত মুআযের (রঃ) প্রতি যে উক্তিটি করেছিলেন তা পূর্বেই গত হয়েছে। তাহলো “কেন তমি নামাযে (আরবি) এবং (আরবি) এই সূরাগুলো পাঠ কর না?”১-১১ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আলকামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সিরিয়ায় আগমন করেন এবং দামেস্কের মসজিদে গিয়ে দুই রাকআত নামায পড়েন। অতঃপর দুআ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে একজন উত্তম সাথী দান করুন!” এরপর হযরত আবুদ দারদা'র (রাঃ) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কোথাকার লোক? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একজন কুফার অধিবাসী।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “আপনি ইবনে উমি আবৃদ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন?” জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ) বলেনঃ “তিনি পড়তেন (আরবি)।” তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে এ সূরাটি এ ভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “আপনাদের মধ্যে কি বালিশ ওয়ালা (অর্থাৎ সফরে যার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিছানাপত্র থাকতো) এবং যিনি এমন কিছু গোপনীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে জ্ঞান অন্য কারো ছিল না এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর ভাষায় যিনি শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) নেই?”হযরত ইবরাহীম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর খোঁজে আগমন করেন। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)ও তাদেরকে খোঁজ করতে করতে পেয়ে যান। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআত অনুযায়ী কুরআন পাঠকারী কেউ আছেন কি? উত্তরে তারা বললেনঃ “আমরা সবাই (তার কিরআতের অনুসারী)।” তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহর কিরআত অধিক স্মরণকারী কে আছেন?” তাঁরা জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন? তিনি (আরবি) উত্তরে বললেন, “তিনি পাঠ করতেন।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ চায় যে, আমি যেন পাঠ করি। আল্লাহর কসম! তাদের কথা আমি মানব না’’’’ (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেন) মোট কথা, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর কিরআত এরূপ। হযরত আবুদ দারদা এ বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মারফু বলেও উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য জমহূরের কিরআত বর্তমানে কুরআনে উল্লিখিত কিরআতের অনুরূপ। আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের উপর ছেয়ে যাওয়া রাত্রির শপথ করছেন, সব কিছুকে আলোকমণ্ডিত করে দেয়া দিবসের শপথ করেছেন এবং সমস্ত নর-নারী, নর ও মাদী জীবসমূহের স্রষ্টা হিসেবে নিজের সত্ত্বার শপথ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।” (৭৮:৮) আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক জিনিসের জোড়া সৃষ্টি করেছি।” (৫১৪ ৪৯) এই শপথ করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ অবশ্যই তোমাদের কর্ম প্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির। অর্থাৎ তোমাদের প্রচেষ্টা এবং আমলসমূহ পরস্পরবিরোধী, একটি অন্যটির বিপরীত। যারা ভাল কাজ করছে তারাও আছে এবং যারা মন্দ কাজে লিপ্ত রয়েছে তারাও আছে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে ব্যক্তি দান করলো ও মুত্তাকী হলো অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার পথে খরচ করলো, মেপে মেপে পা বাড়ালো, প্রত্যেক কাজে আল্লাহর ভয় রাখলো আল্লাহর ওয়াদাকৃত পুরস্কারকে সত্য বলে জানলো এবং তাঁর পুণ্যের অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাস করলো, আর যা উত্তম। গ্রহণ করলো, আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো।(আরবি) শব্দের অর্থ ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, করা হয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ ‘নিয়ামত’ করেছেন। আবার কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, এর ভার্থ হলোঃ নামায, রোযা, যাকাত, সাদকা, সাদকায়ে ফিত্র এবং জান্নাত। মহান আল্লাহ বলে আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো। অর্থাৎ কল্যাণ, অত এ উত্তম বিনিময়ের পথ।পারে সে ব্যক্তি কার্পণ্য করলো এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলো এবং হুসন’ অর্থাৎ কিয়ামতের বিনিময়কে অবিশ্বাস করলো, তার জন্যে আমি সুগম করে দিবো কঠোর পরিণামের পথ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের অন্তঃকরণ ও তাদের চক্ষু উল্টিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবার কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং তাদেরকে আমি অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিবো।" (৬৪১১০) প্রত্যেক আমলের বিনিময় যে সেই আমলের অনুরূপ হয়ে থাকে এ সম্পর্কিত আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে বহু রয়েছে। যে ভাল কাজ করতে চায় তাকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করা হয়। পক্ষান্তরে যে মন্দ কাজ করতে চায় তাকে মন্দ কাজ করার সামর্থ্য প্রদান করা হয়। এ অর্থের সমর্থনে বহু হাদীসও রয়েছে। একটি হাদীস এই যে, একবার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের আমলসমূহ কি তকদীরের লিখন অনুযায়ী হয়ে থাকে?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বলেনঃ “হ্যা তকদীরের লিখন অনুযায়ীই আমল হয়ে থাকে।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ) তাহলে আমলের প্রয়োজন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সেই আমল সহজ হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা বাকী’ গারকাদে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলাম। তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে তোমাদের প্রত্যেকের স্থানই জান্নাতে অথবা জাহান্নামে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং লিপিবদ্ধ রয়েছে।” একথা শুনে জনগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমরা তো সেই ভরসায় নিষ্ক্রীয় হয়ে থাকলেই পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা আমল করে যাও, কারণ প্রত্যেক লোকের জন্য সেই আমলই সহজ করা হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ বর্ণনাটিই অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে এক টুকরো কাঠি ছিল এবং মাথা নীচু করে তিনি তা এদিক ওদিক করছিলেন। শব্দের মধ্যে কিছু কম বেশীও রয়েছে। উপরে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-এর একই ধরনের প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং নবী করীমের (সঃ) উত্তরও প্রায় একই রকমের রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতেও একই ধরনের বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীরেরই (রঃ) অন্য একটি বর্ণনায় দু'জন যুবকের একই রকম প্রশ্ন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর একই রকম উত্তর বর্ণিত রয়েছে। তারপর সেই দুই যুবকের নিম্নের উক্তিও উল্লিখিত রয়েছেঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সৎ আমল করতে থাকবো।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) হতেও একইভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসুলে কারীম (সঃ) বলেনঃ “প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় সূর্যের উভয় পাশে দু’জন ফেরেশতা উপস্থিত হন এবং উচ্চস্বরে দু'আ করেন, যে দু’আ মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সকল সৃষ্টি জীবই শুনতে পায়। তারা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! দানশীলকে পূর্ণ বিনিময় প্রদান করুন এবং কৃপণের মাল ধ্বংস করে দিন।” কুরআনে এ চারটি আয়াতের অর্থ এটাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোকের একটি খেজুরের বাগান ছিল। ঐ বাগানের একটি খেজুর গাছের শাখা একটি দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকেছিল। ঐ দরিদ্র লোকটি ছিল পুণ্যবান। তার সন্তান সন্ততিও ছিল। বাগানের মালিক খেজুর নামাতে এসে ঝুঁকে থাকা শাখার খেজুরও নির্দ্বিধায় নামিয়ে নিতো। নীচে দরিদ্র লোকটির আঙ্গিনায় পড়া খেজুরও সে কুড়িয়ে নিতো। এমনকি দরিদ্র লোকটির ছেলে মেয়েদের কেউ দু একটা খেজুর মুখে দিলে বাগানের ঐ মালিক তার মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঐ খেজুর বের করে নিতো। দরিদ্র লোকটি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তুমি যাও (আমি এর সুব্যবস্থা করছি)।” অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের সাথে দেখা করে বললেনঃ “তোমার যেই খেজুর গাছের শাখা অমুক দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকে আছে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দাও, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সেই গাছের বিনিময়ে জান্নাতে একটি গাছ দিবেন।” বাগানের মালিক বললোঃ “ঠিক আছে, দিয়ে দিলাম। কিন্তু উক্ত গাছের খেজুর আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। আমার বাগানে বহু গাছ আছে, কিন্তু ঐ গাছের মত সুস্বাদু খেজুর গাছ আর একটিও নেই।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুপচাপ ফিরে আসলেন। একটি লোক গোপনে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)এবং ঐ লোকেটির কথােপকথন শুনছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ গাছটি যদি আমার হয়ে যায় এবং আমি ওটা আপনাকে দিয়ে দিই তবে কি ঐ গাছের বিনিময়ে আমিও জান্নাতে একটি গাছ পেতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হা (অবশ্যই)। লোকটি তখন বাগান মালিকের কাছে গেলেন। তার নিজেরও একটি বাগান ছিল। প্রথমোক্ত বাগান-মালিক তাকে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আমার অমুক খেজুর গাছের বিনিময়ে জান্নাতের একটি গাছ দিতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে এই জবাব দিয়েছি। তার একথা শুনে আগন্তুক লোকটি তাকে বললেনঃ “তুমি কি গাছটি বিক্রি করতে চাও?" উত্তরে লোকটি বললোঃ “না। তবে হ্যা, ইতি মূল্য কেউ যদি দেয় তবে ভেবে দেখতে পারি। কিন্তু কে দিবে সেই মূল্য?" তখন আগন্তুক লোকটি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কত মূল্য তুমি চাও?”বাগান মালিক জবাব দিলোঃ “এর বিনিময়ে আমি চল্লিশটি খেজুর গাছ চাই।” আগন্তুক বললেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যায়। একটি গাছের বিনিময়ে চল্লিশটি গাছ।” তারপর উভয়ে অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আগন্তুক তাকে বললেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার ইপ্সিত মূল্যেই তোমার খেজুর গাছ ক্রয় করলাম।" মালিক বললোঃ “যদি তাই হয় তবে সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করে কথা পাকাপাকি করে নাও।” সুতরাং কয়েকজন লোক ডেকে নিয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ করা হলো এবং এইভাবে ক্রয় বিক্রয়ের কাজ পাকাপাকি হয়ে গেল। কিন্তু এতেও বাগান-মালিকের খুৎ খুঁৎ মনোভাব কাটলো না। সে বললোঃ “দেখো ভাই, আমরা এখান হতে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু বেচা কেনা সিদ্ধ হবে না?” ক্রেতা বললেনঃ “ঠিক আছে, তাই হবে।”বাগানের মালিক বললোঃ “আমি সম্মত হয়ে গেলাম যে তুমি আমাকে আমার এই খেজুর গাছের বিনিময়ে তোমার চল্লিশটি খেজুর গাছ প্রদান করবে। কিন্তু ভাই গাছগুলো ঘনশাখা বিশিষ্ট হওয়া চাই।” ক্রেতা বললেনঃ “আচ্ছা তা দিবো।” তারপর সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে এ বেচাকেনা সম্পন্ন হলো। তারপর তারা দুজন পৃথক হয়ে গেল (ক্রেতা লোকটি তখন আনন্দিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাযির হয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)। আমি ঐ বৃক্ষের মালিকানা লাভ করেছি এবং ওটা আপনাকে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ দরিদ্র লোকটির নিকট গিয়ে বললেনঃ “এই খেজুর গাছ তোমার এবং তোমার সন্তানদের মালিকানাভুক্ত হয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতসমূহ হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্পর্কে নাযিল হয়। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় তিনি বৃদ্ধ ও দুর্বল দাস-দাসীদেরকে মুসলমান হয়ে যাওয়ার পর আযাদ করে দিতেন। এ ব্যাপারে একবার তাঁর পিতা আবু কাহাফা (তিনি তখনো মুসলমান হননি) বলেনঃ “তুমি দুর্বল ও বৃদ্ধদেরকে মুক্ত করছো, অথচ যদি সকল যুবকদেরকে মুক্ত করতে তবে তারা তোমার কাজে আসততা। তারা তোমাকে সাহায্য করতে পারতো এবং শত্রুদের সাথে লড়াই করতে পারতো।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন “আব্বাজান! ইহলৌকিক লাভালাভ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করি।" এরপর এখান হতে সূরা শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করা এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া, এই উভয় অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-লাইল 92:4

নবী করীম (সঃ) হযরত মুআযের (রঃ) প্রতি যে উক্তিটি করেছিলেন তা পূর্বেই গত হয়েছে। তাহলো “কেন তমি নামাযে (আরবি) এবং (আরবি) এই সূরাগুলো পাঠ কর না?”১-১১ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আলকামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সিরিয়ায় আগমন করেন এবং দামেস্কের মসজিদে গিয়ে দুই রাকআত নামায পড়েন। অতঃপর দুআ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে একজন উত্তম সাথী দান করুন!” এরপর হযরত আবুদ দারদা'র (রাঃ) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কোথাকার লোক? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একজন কুফার অধিবাসী।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “আপনি ইবনে উমি আবৃদ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন?” জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ) বলেনঃ “তিনি পড়তেন (আরবি)।” তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে এ সূরাটি এ ভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “আপনাদের মধ্যে কি বালিশ ওয়ালা (অর্থাৎ সফরে যার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিছানাপত্র থাকতো) এবং যিনি এমন কিছু গোপনীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে জ্ঞান অন্য কারো ছিল না এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর ভাষায় যিনি শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) নেই?”হযরত ইবরাহীম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর খোঁজে আগমন করেন। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)ও তাদেরকে খোঁজ করতে করতে পেয়ে যান। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআত অনুযায়ী কুরআন পাঠকারী কেউ আছেন কি? উত্তরে তারা বললেনঃ “আমরা সবাই (তার কিরআতের অনুসারী)।” তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহর কিরআত অধিক স্মরণকারী কে আছেন?” তাঁরা জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন? তিনি (আরবি) উত্তরে বললেন, “তিনি পাঠ করতেন।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ চায় যে, আমি যেন পাঠ করি। আল্লাহর কসম! তাদের কথা আমি মানব না’’’’ (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেন) মোট কথা, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর কিরআত এরূপ। হযরত আবুদ দারদা এ বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মারফু বলেও উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য জমহূরের কিরআত বর্তমানে কুরআনে উল্লিখিত কিরআতের অনুরূপ। আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের উপর ছেয়ে যাওয়া রাত্রির শপথ করছেন, সব কিছুকে আলোকমণ্ডিত করে দেয়া দিবসের শপথ করেছেন এবং সমস্ত নর-নারী, নর ও মাদী জীবসমূহের স্রষ্টা হিসেবে নিজের সত্ত্বার শপথ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।” (৭৮:৮) আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক জিনিসের জোড়া সৃষ্টি করেছি।” (৫১৪ ৪৯) এই শপথ করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ অবশ্যই তোমাদের কর্ম প্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির। অর্থাৎ তোমাদের প্রচেষ্টা এবং আমলসমূহ পরস্পরবিরোধী, একটি অন্যটির বিপরীত। যারা ভাল কাজ করছে তারাও আছে এবং যারা মন্দ কাজে লিপ্ত রয়েছে তারাও আছে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে ব্যক্তি দান করলো ও মুত্তাকী হলো অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার পথে খরচ করলো, মেপে মেপে পা বাড়ালো, প্রত্যেক কাজে আল্লাহর ভয় রাখলো আল্লাহর ওয়াদাকৃত পুরস্কারকে সত্য বলে জানলো এবং তাঁর পুণ্যের অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাস করলো, আর যা উত্তম। গ্রহণ করলো, আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো।(আরবি) শব্দের অর্থ ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, করা হয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ ‘নিয়ামত’ করেছেন। আবার কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, এর ভার্থ হলোঃ নামায, রোযা, যাকাত, সাদকা, সাদকায়ে ফিত্র এবং জান্নাত। মহান আল্লাহ বলে আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো। অর্থাৎ কল্যাণ, অত এ উত্তম বিনিময়ের পথ।পারে সে ব্যক্তি কার্পণ্য করলো এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলো এবং হুসন’ অর্থাৎ কিয়ামতের বিনিময়কে অবিশ্বাস করলো, তার জন্যে আমি সুগম করে দিবো কঠোর পরিণামের পথ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের অন্তঃকরণ ও তাদের চক্ষু উল্টিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবার কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং তাদেরকে আমি অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিবো।" (৬৪১১০) প্রত্যেক আমলের বিনিময় যে সেই আমলের অনুরূপ হয়ে থাকে এ সম্পর্কিত আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে বহু রয়েছে। যে ভাল কাজ করতে চায় তাকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করা হয়। পক্ষান্তরে যে মন্দ কাজ করতে চায় তাকে মন্দ কাজ করার সামর্থ্য প্রদান করা হয়। এ অর্থের সমর্থনে বহু হাদীসও রয়েছে। একটি হাদীস এই যে, একবার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের আমলসমূহ কি তকদীরের লিখন অনুযায়ী হয়ে থাকে?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বলেনঃ “হ্যা তকদীরের লিখন অনুযায়ীই আমল হয়ে থাকে।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ) তাহলে আমলের প্রয়োজন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সেই আমল সহজ হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা বাকী’ গারকাদে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলাম। তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে তোমাদের প্রত্যেকের স্থানই জান্নাতে অথবা জাহান্নামে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং লিপিবদ্ধ রয়েছে।” একথা শুনে জনগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমরা তো সেই ভরসায় নিষ্ক্রীয় হয়ে থাকলেই পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা আমল করে যাও, কারণ প্রত্যেক লোকের জন্য সেই আমলই সহজ করা হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ বর্ণনাটিই অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে এক টুকরো কাঠি ছিল এবং মাথা নীচু করে তিনি তা এদিক ওদিক করছিলেন। শব্দের মধ্যে কিছু কম বেশীও রয়েছে। উপরে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-এর একই ধরনের প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং নবী করীমের (সঃ) উত্তরও প্রায় একই রকমের রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতেও একই ধরনের বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীরেরই (রঃ) অন্য একটি বর্ণনায় দু'জন যুবকের একই রকম প্রশ্ন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর একই রকম উত্তর বর্ণিত রয়েছে। তারপর সেই দুই যুবকের নিম্নের উক্তিও উল্লিখিত রয়েছেঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সৎ আমল করতে থাকবো।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) হতেও একইভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসুলে কারীম (সঃ) বলেনঃ “প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় সূর্যের উভয় পাশে দু’জন ফেরেশতা উপস্থিত হন এবং উচ্চস্বরে দু'আ করেন, যে দু’আ মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সকল সৃষ্টি জীবই শুনতে পায়। তারা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! দানশীলকে পূর্ণ বিনিময় প্রদান করুন এবং কৃপণের মাল ধ্বংস করে দিন।” কুরআনে এ চারটি আয়াতের অর্থ এটাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোকের একটি খেজুরের বাগান ছিল। ঐ বাগানের একটি খেজুর গাছের শাখা একটি দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকেছিল। ঐ দরিদ্র লোকটি ছিল পুণ্যবান। তার সন্তান সন্ততিও ছিল। বাগানের মালিক খেজুর নামাতে এসে ঝুঁকে থাকা শাখার খেজুরও নির্দ্বিধায় নামিয়ে নিতো। নীচে দরিদ্র লোকটির আঙ্গিনায় পড়া খেজুরও সে কুড়িয়ে নিতো। এমনকি দরিদ্র লোকটির ছেলে মেয়েদের কেউ দু একটা খেজুর মুখে দিলে বাগানের ঐ মালিক তার মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঐ খেজুর বের করে নিতো। দরিদ্র লোকটি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তুমি যাও (আমি এর সুব্যবস্থা করছি)।” অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের সাথে দেখা করে বললেনঃ “তোমার যেই খেজুর গাছের শাখা অমুক দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকে আছে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দাও, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সেই গাছের বিনিময়ে জান্নাতে একটি গাছ দিবেন।” বাগানের মালিক বললোঃ “ঠিক আছে, দিয়ে দিলাম। কিন্তু উক্ত গাছের খেজুর আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। আমার বাগানে বহু গাছ আছে, কিন্তু ঐ গাছের মত সুস্বাদু খেজুর গাছ আর একটিও নেই।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুপচাপ ফিরে আসলেন। একটি লোক গোপনে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)এবং ঐ লোকেটির কথােপকথন শুনছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ গাছটি যদি আমার হয়ে যায় এবং আমি ওটা আপনাকে দিয়ে দিই তবে কি ঐ গাছের বিনিময়ে আমিও জান্নাতে একটি গাছ পেতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হা (অবশ্যই)। লোকটি তখন বাগান মালিকের কাছে গেলেন। তার নিজেরও একটি বাগান ছিল। প্রথমোক্ত বাগান-মালিক তাকে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আমার অমুক খেজুর গাছের বিনিময়ে জান্নাতের একটি গাছ দিতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে এই জবাব দিয়েছি। তার একথা শুনে আগন্তুক লোকটি তাকে বললেনঃ “তুমি কি গাছটি বিক্রি করতে চাও?" উত্তরে লোকটি বললোঃ “না। তবে হ্যা, ইতি মূল্য কেউ যদি দেয় তবে ভেবে দেখতে পারি। কিন্তু কে দিবে সেই মূল্য?" তখন আগন্তুক লোকটি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কত মূল্য তুমি চাও?”বাগান মালিক জবাব দিলোঃ “এর বিনিময়ে আমি চল্লিশটি খেজুর গাছ চাই।” আগন্তুক বললেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যায়। একটি গাছের বিনিময়ে চল্লিশটি গাছ।” তারপর উভয়ে অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আগন্তুক তাকে বললেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার ইপ্সিত মূল্যেই তোমার খেজুর গাছ ক্রয় করলাম।" মালিক বললোঃ “যদি তাই হয় তবে সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করে কথা পাকাপাকি করে নাও।” সুতরাং কয়েকজন লোক ডেকে নিয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ করা হলো এবং এইভাবে ক্রয় বিক্রয়ের কাজ পাকাপাকি হয়ে গেল। কিন্তু এতেও বাগান-মালিকের খুৎ খুঁৎ মনোভাব কাটলো না। সে বললোঃ “দেখো ভাই, আমরা এখান হতে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু বেচা কেনা সিদ্ধ হবে না?” ক্রেতা বললেনঃ “ঠিক আছে, তাই হবে।”বাগানের মালিক বললোঃ “আমি সম্মত হয়ে গেলাম যে তুমি আমাকে আমার এই খেজুর গাছের বিনিময়ে তোমার চল্লিশটি খেজুর গাছ প্রদান করবে। কিন্তু ভাই গাছগুলো ঘনশাখা বিশিষ্ট হওয়া চাই।” ক্রেতা বললেনঃ “আচ্ছা তা দিবো।” তারপর সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে এ বেচাকেনা সম্পন্ন হলো। তারপর তারা দুজন পৃথক হয়ে গেল (ক্রেতা লোকটি তখন আনন্দিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাযির হয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)। আমি ঐ বৃক্ষের মালিকানা লাভ করেছি এবং ওটা আপনাকে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ দরিদ্র লোকটির নিকট গিয়ে বললেনঃ “এই খেজুর গাছ তোমার এবং তোমার সন্তানদের মালিকানাভুক্ত হয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতসমূহ হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্পর্কে নাযিল হয়। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় তিনি বৃদ্ধ ও দুর্বল দাস-দাসীদেরকে মুসলমান হয়ে যাওয়ার পর আযাদ করে দিতেন। এ ব্যাপারে একবার তাঁর পিতা আবু কাহাফা (তিনি তখনো মুসলমান হননি) বলেনঃ “তুমি দুর্বল ও বৃদ্ধদেরকে মুক্ত করছো, অথচ যদি সকল যুবকদেরকে মুক্ত করতে তবে তারা তোমার কাজে আসততা। তারা তোমাকে সাহায্য করতে পারতো এবং শত্রুদের সাথে লড়াই করতে পারতো।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন “আব্বাজান! ইহলৌকিক লাভালাভ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করি।" এরপর এখান হতে সূরা শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করা এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া, এই উভয় অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-লাইল 92:5

নবী করীম (সঃ) হযরত মুআযের (রঃ) প্রতি যে উক্তিটি করেছিলেন তা পূর্বেই গত হয়েছে। তাহলো “কেন তমি নামাযে (আরবি) এবং (আরবি) এই সূরাগুলো পাঠ কর না?”১-১১ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আলকামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সিরিয়ায় আগমন করেন এবং দামেস্কের মসজিদে গিয়ে দুই রাকআত নামায পড়েন। অতঃপর দুআ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে একজন উত্তম সাথী দান করুন!” এরপর হযরত আবুদ দারদা'র (রাঃ) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কোথাকার লোক? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একজন কুফার অধিবাসী।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “আপনি ইবনে উমি আবৃদ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন?” জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ) বলেনঃ “তিনি পড়তেন (আরবি)।” তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে এ সূরাটি এ ভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “আপনাদের মধ্যে কি বালিশ ওয়ালা (অর্থাৎ সফরে যার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিছানাপত্র থাকতো) এবং যিনি এমন কিছু গোপনীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে জ্ঞান অন্য কারো ছিল না এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর ভাষায় যিনি শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) নেই?”হযরত ইবরাহীম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর খোঁজে আগমন করেন। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)ও তাদেরকে খোঁজ করতে করতে পেয়ে যান। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআত অনুযায়ী কুরআন পাঠকারী কেউ আছেন কি? উত্তরে তারা বললেনঃ “আমরা সবাই (তার কিরআতের অনুসারী)।” তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহর কিরআত অধিক স্মরণকারী কে আছেন?” তাঁরা জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন? তিনি (আরবি) উত্তরে বললেন, “তিনি পাঠ করতেন।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ চায় যে, আমি যেন পাঠ করি। আল্লাহর কসম! তাদের কথা আমি মানব না’’’’ (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেন) মোট কথা, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর কিরআত এরূপ। হযরত আবুদ দারদা এ বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মারফু বলেও উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য জমহূরের কিরআত বর্তমানে কুরআনে উল্লিখিত কিরআতের অনুরূপ। আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের উপর ছেয়ে যাওয়া রাত্রির শপথ করছেন, সব কিছুকে আলোকমণ্ডিত করে দেয়া দিবসের শপথ করেছেন এবং সমস্ত নর-নারী, নর ও মাদী জীবসমূহের স্রষ্টা হিসেবে নিজের সত্ত্বার শপথ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।” (৭৮:৮) আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক জিনিসের জোড়া সৃষ্টি করেছি।” (৫১৪ ৪৯) এই শপথ করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ অবশ্যই তোমাদের কর্ম প্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির। অর্থাৎ তোমাদের প্রচেষ্টা এবং আমলসমূহ পরস্পরবিরোধী, একটি অন্যটির বিপরীত। যারা ভাল কাজ করছে তারাও আছে এবং যারা মন্দ কাজে লিপ্ত রয়েছে তারাও আছে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে ব্যক্তি দান করলো ও মুত্তাকী হলো অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার পথে খরচ করলো, মেপে মেপে পা বাড়ালো, প্রত্যেক কাজে আল্লাহর ভয় রাখলো আল্লাহর ওয়াদাকৃত পুরস্কারকে সত্য বলে জানলো এবং তাঁর পুণ্যের অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাস করলো, আর যা উত্তম। গ্রহণ করলো, আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো।(আরবি) শব্দের অর্থ ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, করা হয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ ‘নিয়ামত’ করেছেন। আবার কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, এর ভার্থ হলোঃ নামায, রোযা, যাকাত, সাদকা, সাদকায়ে ফিত্র এবং জান্নাত। মহান আল্লাহ বলে আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো। অর্থাৎ কল্যাণ, অত এ উত্তম বিনিময়ের পথ।পারে সে ব্যক্তি কার্পণ্য করলো এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলো এবং হুসন’ অর্থাৎ কিয়ামতের বিনিময়কে অবিশ্বাস করলো, তার জন্যে আমি সুগম করে দিবো কঠোর পরিণামের পথ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের অন্তঃকরণ ও তাদের চক্ষু উল্টিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবার কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং তাদেরকে আমি অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিবো।" (৬৪১১০) প্রত্যেক আমলের বিনিময় যে সেই আমলের অনুরূপ হয়ে থাকে এ সম্পর্কিত আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে বহু রয়েছে। যে ভাল কাজ করতে চায় তাকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করা হয়। পক্ষান্তরে যে মন্দ কাজ করতে চায় তাকে মন্দ কাজ করার সামর্থ্য প্রদান করা হয়। এ অর্থের সমর্থনে বহু হাদীসও রয়েছে। একটি হাদীস এই যে, একবার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের আমলসমূহ কি তকদীরের লিখন অনুযায়ী হয়ে থাকে?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বলেনঃ “হ্যা তকদীরের লিখন অনুযায়ীই আমল হয়ে থাকে।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ) তাহলে আমলের প্রয়োজন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সেই আমল সহজ হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা বাকী’ গারকাদে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলাম। তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে তোমাদের প্রত্যেকের স্থানই জান্নাতে অথবা জাহান্নামে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং লিপিবদ্ধ রয়েছে।” একথা শুনে জনগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমরা তো সেই ভরসায় নিষ্ক্রীয় হয়ে থাকলেই পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা আমল করে যাও, কারণ প্রত্যেক লোকের জন্য সেই আমলই সহজ করা হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ বর্ণনাটিই অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে এক টুকরো কাঠি ছিল এবং মাথা নীচু করে তিনি তা এদিক ওদিক করছিলেন। শব্দের মধ্যে কিছু কম বেশীও রয়েছে। উপরে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-এর একই ধরনের প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং নবী করীমের (সঃ) উত্তরও প্রায় একই রকমের রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতেও একই ধরনের বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীরেরই (রঃ) অন্য একটি বর্ণনায় দু'জন যুবকের একই রকম প্রশ্ন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর একই রকম উত্তর বর্ণিত রয়েছে। তারপর সেই দুই যুবকের নিম্নের উক্তিও উল্লিখিত রয়েছেঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সৎ আমল করতে থাকবো।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) হতেও একইভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসুলে কারীম (সঃ) বলেনঃ “প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় সূর্যের উভয় পাশে দু’জন ফেরেশতা উপস্থিত হন এবং উচ্চস্বরে দু'আ করেন, যে দু’আ মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সকল সৃষ্টি জীবই শুনতে পায়। তারা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! দানশীলকে পূর্ণ বিনিময় প্রদান করুন এবং কৃপণের মাল ধ্বংস করে দিন।” কুরআনে এ চারটি আয়াতের অর্থ এটাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোকের একটি খেজুরের বাগান ছিল। ঐ বাগানের একটি খেজুর গাছের শাখা একটি দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকেছিল। ঐ দরিদ্র লোকটি ছিল পুণ্যবান। তার সন্তান সন্ততিও ছিল। বাগানের মালিক খেজুর নামাতে এসে ঝুঁকে থাকা শাখার খেজুরও নির্দ্বিধায় নামিয়ে নিতো। নীচে দরিদ্র লোকটির আঙ্গিনায় পড়া খেজুরও সে কুড়িয়ে নিতো। এমনকি দরিদ্র লোকটির ছেলে মেয়েদের কেউ দু একটা খেজুর মুখে দিলে বাগানের ঐ মালিক তার মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঐ খেজুর বের করে নিতো। দরিদ্র লোকটি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তুমি যাও (আমি এর সুব্যবস্থা করছি)।” অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের সাথে দেখা করে বললেনঃ “তোমার যেই খেজুর গাছের শাখা অমুক দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকে আছে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দাও, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সেই গাছের বিনিময়ে জান্নাতে একটি গাছ দিবেন।” বাগানের মালিক বললোঃ “ঠিক আছে, দিয়ে দিলাম। কিন্তু উক্ত গাছের খেজুর আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। আমার বাগানে বহু গাছ আছে, কিন্তু ঐ গাছের মত সুস্বাদু খেজুর গাছ আর একটিও নেই।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুপচাপ ফিরে আসলেন। একটি লোক গোপনে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)এবং ঐ লোকেটির কথােপকথন শুনছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ গাছটি যদি আমার হয়ে যায় এবং আমি ওটা আপনাকে দিয়ে দিই তবে কি ঐ গাছের বিনিময়ে আমিও জান্নাতে একটি গাছ পেতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হা (অবশ্যই)। লোকটি তখন বাগান মালিকের কাছে গেলেন। তার নিজেরও একটি বাগান ছিল। প্রথমোক্ত বাগান-মালিক তাকে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আমার অমুক খেজুর গাছের বিনিময়ে জান্নাতের একটি গাছ দিতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে এই জবাব দিয়েছি। তার একথা শুনে আগন্তুক লোকটি তাকে বললেনঃ “তুমি কি গাছটি বিক্রি করতে চাও?" উত্তরে লোকটি বললোঃ “না। তবে হ্যা, ইতি মূল্য কেউ যদি দেয় তবে ভেবে দেখতে পারি। কিন্তু কে দিবে সেই মূল্য?" তখন আগন্তুক লোকটি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কত মূল্য তুমি চাও?”বাগান মালিক জবাব দিলোঃ “এর বিনিময়ে আমি চল্লিশটি খেজুর গাছ চাই।” আগন্তুক বললেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যায়। একটি গাছের বিনিময়ে চল্লিশটি গাছ।” তারপর উভয়ে অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আগন্তুক তাকে বললেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার ইপ্সিত মূল্যেই তোমার খেজুর গাছ ক্রয় করলাম।" মালিক বললোঃ “যদি তাই হয় তবে সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করে কথা পাকাপাকি করে নাও।” সুতরাং কয়েকজন লোক ডেকে নিয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ করা হলো এবং এইভাবে ক্রয় বিক্রয়ের কাজ পাকাপাকি হয়ে গেল। কিন্তু এতেও বাগান-মালিকের খুৎ খুঁৎ মনোভাব কাটলো না। সে বললোঃ “দেখো ভাই, আমরা এখান হতে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু বেচা কেনা সিদ্ধ হবে না?” ক্রেতা বললেনঃ “ঠিক আছে, তাই হবে।”বাগানের মালিক বললোঃ “আমি সম্মত হয়ে গেলাম যে তুমি আমাকে আমার এই খেজুর গাছের বিনিময়ে তোমার চল্লিশটি খেজুর গাছ প্রদান করবে। কিন্তু ভাই গাছগুলো ঘনশাখা বিশিষ্ট হওয়া চাই।” ক্রেতা বললেনঃ “আচ্ছা তা দিবো।” তারপর সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে এ বেচাকেনা সম্পন্ন হলো। তারপর তারা দুজন পৃথক হয়ে গেল (ক্রেতা লোকটি তখন আনন্দিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাযির হয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)। আমি ঐ বৃক্ষের মালিকানা লাভ করেছি এবং ওটা আপনাকে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ দরিদ্র লোকটির নিকট গিয়ে বললেনঃ “এই খেজুর গাছ তোমার এবং তোমার সন্তানদের মালিকানাভুক্ত হয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতসমূহ হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্পর্কে নাযিল হয়। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় তিনি বৃদ্ধ ও দুর্বল দাস-দাসীদেরকে মুসলমান হয়ে যাওয়ার পর আযাদ করে দিতেন। এ ব্যাপারে একবার তাঁর পিতা আবু কাহাফা (তিনি তখনো মুসলমান হননি) বলেনঃ “তুমি দুর্বল ও বৃদ্ধদেরকে মুক্ত করছো, অথচ যদি সকল যুবকদেরকে মুক্ত করতে তবে তারা তোমার কাজে আসততা। তারা তোমাকে সাহায্য করতে পারতো এবং শত্রুদের সাথে লড়াই করতে পারতো।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন “আব্বাজান! ইহলৌকিক লাভালাভ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করি।" এরপর এখান হতে সূরা শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করা এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া, এই উভয় অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-লাইল 92:6

নবী করীম (সঃ) হযরত মুআযের (রঃ) প্রতি যে উক্তিটি করেছিলেন তা পূর্বেই গত হয়েছে। তাহলো “কেন তমি নামাযে (আরবি) এবং (আরবি) এই সূরাগুলো পাঠ কর না?”১-১১ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আলকামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সিরিয়ায় আগমন করেন এবং দামেস্কের মসজিদে গিয়ে দুই রাকআত নামায পড়েন। অতঃপর দুআ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে একজন উত্তম সাথী দান করুন!” এরপর হযরত আবুদ দারদা'র (রাঃ) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কোথাকার লোক? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একজন কুফার অধিবাসী।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “আপনি ইবনে উমি আবৃদ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন?” জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ) বলেনঃ “তিনি পড়তেন (আরবি)।” তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে এ সূরাটি এ ভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “আপনাদের মধ্যে কি বালিশ ওয়ালা (অর্থাৎ সফরে যার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিছানাপত্র থাকতো) এবং যিনি এমন কিছু গোপনীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে জ্ঞান অন্য কারো ছিল না এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর ভাষায় যিনি শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) নেই?”হযরত ইবরাহীম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর খোঁজে আগমন করেন। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)ও তাদেরকে খোঁজ করতে করতে পেয়ে যান। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআত অনুযায়ী কুরআন পাঠকারী কেউ আছেন কি? উত্তরে তারা বললেনঃ “আমরা সবাই (তার কিরআতের অনুসারী)।” তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহর কিরআত অধিক স্মরণকারী কে আছেন?” তাঁরা জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন? তিনি (আরবি) উত্তরে বললেন, “তিনি পাঠ করতেন।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ চায় যে, আমি যেন পাঠ করি। আল্লাহর কসম! তাদের কথা আমি মানব না’’’’ (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেন) মোট কথা, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর কিরআত এরূপ। হযরত আবুদ দারদা এ বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মারফু বলেও উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য জমহূরের কিরআত বর্তমানে কুরআনে উল্লিখিত কিরআতের অনুরূপ। আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের উপর ছেয়ে যাওয়া রাত্রির শপথ করছেন, সব কিছুকে আলোকমণ্ডিত করে দেয়া দিবসের শপথ করেছেন এবং সমস্ত নর-নারী, নর ও মাদী জীবসমূহের স্রষ্টা হিসেবে নিজের সত্ত্বার শপথ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।” (৭৮:৮) আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক জিনিসের জোড়া সৃষ্টি করেছি।” (৫১৪ ৪৯) এই শপথ করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ অবশ্যই তোমাদের কর্ম প্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির। অর্থাৎ তোমাদের প্রচেষ্টা এবং আমলসমূহ পরস্পরবিরোধী, একটি অন্যটির বিপরীত। যারা ভাল কাজ করছে তারাও আছে এবং যারা মন্দ কাজে লিপ্ত রয়েছে তারাও আছে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে ব্যক্তি দান করলো ও মুত্তাকী হলো অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার পথে খরচ করলো, মেপে মেপে পা বাড়ালো, প্রত্যেক কাজে আল্লাহর ভয় রাখলো আল্লাহর ওয়াদাকৃত পুরস্কারকে সত্য বলে জানলো এবং তাঁর পুণ্যের অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাস করলো, আর যা উত্তম। গ্রহণ করলো, আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো।(আরবি) শব্দের অর্থ ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, করা হয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ ‘নিয়ামত’ করেছেন। আবার কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, এর ভার্থ হলোঃ নামায, রোযা, যাকাত, সাদকা, সাদকায়ে ফিত্র এবং জান্নাত। মহান আল্লাহ বলে আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো। অর্থাৎ কল্যাণ, অত এ উত্তম বিনিময়ের পথ।পারে সে ব্যক্তি কার্পণ্য করলো এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলো এবং হুসন’ অর্থাৎ কিয়ামতের বিনিময়কে অবিশ্বাস করলো, তার জন্যে আমি সুগম করে দিবো কঠোর পরিণামের পথ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের অন্তঃকরণ ও তাদের চক্ষু উল্টিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবার কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং তাদেরকে আমি অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিবো।" (৬৪১১০) প্রত্যেক আমলের বিনিময় যে সেই আমলের অনুরূপ হয়ে থাকে এ সম্পর্কিত আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে বহু রয়েছে। যে ভাল কাজ করতে চায় তাকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করা হয়। পক্ষান্তরে যে মন্দ কাজ করতে চায় তাকে মন্দ কাজ করার সামর্থ্য প্রদান করা হয়। এ অর্থের সমর্থনে বহু হাদীসও রয়েছে। একটি হাদীস এই যে, একবার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের আমলসমূহ কি তকদীরের লিখন অনুযায়ী হয়ে থাকে?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বলেনঃ “হ্যা তকদীরের লিখন অনুযায়ীই আমল হয়ে থাকে।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ) তাহলে আমলের প্রয়োজন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সেই আমল সহজ হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা বাকী’ গারকাদে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলাম। তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে তোমাদের প্রত্যেকের স্থানই জান্নাতে অথবা জাহান্নামে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং লিপিবদ্ধ রয়েছে।” একথা শুনে জনগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমরা তো সেই ভরসায় নিষ্ক্রীয় হয়ে থাকলেই পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা আমল করে যাও, কারণ প্রত্যেক লোকের জন্য সেই আমলই সহজ করা হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ বর্ণনাটিই অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে এক টুকরো কাঠি ছিল এবং মাথা নীচু করে তিনি তা এদিক ওদিক করছিলেন। শব্দের মধ্যে কিছু কম বেশীও রয়েছে। উপরে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-এর একই ধরনের প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং নবী করীমের (সঃ) উত্তরও প্রায় একই রকমের রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতেও একই ধরনের বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীরেরই (রঃ) অন্য একটি বর্ণনায় দু'জন যুবকের একই রকম প্রশ্ন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর একই রকম উত্তর বর্ণিত রয়েছে। তারপর সেই দুই যুবকের নিম্নের উক্তিও উল্লিখিত রয়েছেঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সৎ আমল করতে থাকবো।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) হতেও একইভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসুলে কারীম (সঃ) বলেনঃ “প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় সূর্যের উভয় পাশে দু’জন ফেরেশতা উপস্থিত হন এবং উচ্চস্বরে দু'আ করেন, যে দু’আ মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সকল সৃষ্টি জীবই শুনতে পায়। তারা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! দানশীলকে পূর্ণ বিনিময় প্রদান করুন এবং কৃপণের মাল ধ্বংস করে দিন।” কুরআনে এ চারটি আয়াতের অর্থ এটাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোকের একটি খেজুরের বাগান ছিল। ঐ বাগানের একটি খেজুর গাছের শাখা একটি দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকেছিল। ঐ দরিদ্র লোকটি ছিল পুণ্যবান। তার সন্তান সন্ততিও ছিল। বাগানের মালিক খেজুর নামাতে এসে ঝুঁকে থাকা শাখার খেজুরও নির্দ্বিধায় নামিয়ে নিতো। নীচে দরিদ্র লোকটির আঙ্গিনায় পড়া খেজুরও সে কুড়িয়ে নিতো। এমনকি দরিদ্র লোকটির ছেলে মেয়েদের কেউ দু একটা খেজুর মুখে দিলে বাগানের ঐ মালিক তার মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঐ খেজুর বের করে নিতো। দরিদ্র লোকটি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তুমি যাও (আমি এর সুব্যবস্থা করছি)।” অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের সাথে দেখা করে বললেনঃ “তোমার যেই খেজুর গাছের শাখা অমুক দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকে আছে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দাও, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সেই গাছের বিনিময়ে জান্নাতে একটি গাছ দিবেন।” বাগানের মালিক বললোঃ “ঠিক আছে, দিয়ে দিলাম। কিন্তু উক্ত গাছের খেজুর আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। আমার বাগানে বহু গাছ আছে, কিন্তু ঐ গাছের মত সুস্বাদু খেজুর গাছ আর একটিও নেই।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুপচাপ ফিরে আসলেন। একটি লোক গোপনে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)এবং ঐ লোকেটির কথােপকথন শুনছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ গাছটি যদি আমার হয়ে যায় এবং আমি ওটা আপনাকে দিয়ে দিই তবে কি ঐ গাছের বিনিময়ে আমিও জান্নাতে একটি গাছ পেতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হা (অবশ্যই)। লোকটি তখন বাগান মালিকের কাছে গেলেন। তার নিজেরও একটি বাগান ছিল। প্রথমোক্ত বাগান-মালিক তাকে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আমার অমুক খেজুর গাছের বিনিময়ে জান্নাতের একটি গাছ দিতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে এই জবাব দিয়েছি। তার একথা শুনে আগন্তুক লোকটি তাকে বললেনঃ “তুমি কি গাছটি বিক্রি করতে চাও?" উত্তরে লোকটি বললোঃ “না। তবে হ্যা, ইতি মূল্য কেউ যদি দেয় তবে ভেবে দেখতে পারি। কিন্তু কে দিবে সেই মূল্য?" তখন আগন্তুক লোকটি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কত মূল্য তুমি চাও?”বাগান মালিক জবাব দিলোঃ “এর বিনিময়ে আমি চল্লিশটি খেজুর গাছ চাই।” আগন্তুক বললেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যায়। একটি গাছের বিনিময়ে চল্লিশটি গাছ।” তারপর উভয়ে অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আগন্তুক তাকে বললেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার ইপ্সিত মূল্যেই তোমার খেজুর গাছ ক্রয় করলাম।" মালিক বললোঃ “যদি তাই হয় তবে সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করে কথা পাকাপাকি করে নাও।” সুতরাং কয়েকজন লোক ডেকে নিয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ করা হলো এবং এইভাবে ক্রয় বিক্রয়ের কাজ পাকাপাকি হয়ে গেল। কিন্তু এতেও বাগান-মালিকের খুৎ খুঁৎ মনোভাব কাটলো না। সে বললোঃ “দেখো ভাই, আমরা এখান হতে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু বেচা কেনা সিদ্ধ হবে না?” ক্রেতা বললেনঃ “ঠিক আছে, তাই হবে।”বাগানের মালিক বললোঃ “আমি সম্মত হয়ে গেলাম যে তুমি আমাকে আমার এই খেজুর গাছের বিনিময়ে তোমার চল্লিশটি খেজুর গাছ প্রদান করবে। কিন্তু ভাই গাছগুলো ঘনশাখা বিশিষ্ট হওয়া চাই।” ক্রেতা বললেনঃ “আচ্ছা তা দিবো।” তারপর সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে এ বেচাকেনা সম্পন্ন হলো। তারপর তারা দুজন পৃথক হয়ে গেল (ক্রেতা লোকটি তখন আনন্দিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাযির হয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)। আমি ঐ বৃক্ষের মালিকানা লাভ করেছি এবং ওটা আপনাকে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ দরিদ্র লোকটির নিকট গিয়ে বললেনঃ “এই খেজুর গাছ তোমার এবং তোমার সন্তানদের মালিকানাভুক্ত হয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতসমূহ হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্পর্কে নাযিল হয়। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় তিনি বৃদ্ধ ও দুর্বল দাস-দাসীদেরকে মুসলমান হয়ে যাওয়ার পর আযাদ করে দিতেন। এ ব্যাপারে একবার তাঁর পিতা আবু কাহাফা (তিনি তখনো মুসলমান হননি) বলেনঃ “তুমি দুর্বল ও বৃদ্ধদেরকে মুক্ত করছো, অথচ যদি সকল যুবকদেরকে মুক্ত করতে তবে তারা তোমার কাজে আসততা। তারা তোমাকে সাহায্য করতে পারতো এবং শত্রুদের সাথে লড়াই করতে পারতো।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন “আব্বাজান! ইহলৌকিক লাভালাভ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করি।" এরপর এখান হতে সূরা শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করা এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া, এই উভয় অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-লাইল 92:7

নবী করীম (সঃ) হযরত মুআযের (রঃ) প্রতি যে উক্তিটি করেছিলেন তা পূর্বেই গত হয়েছে। তাহলো “কেন তমি নামাযে (আরবি) এবং (আরবি) এই সূরাগুলো পাঠ কর না?”১-১১ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আলকামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সিরিয়ায় আগমন করেন এবং দামেস্কের মসজিদে গিয়ে দুই রাকআত নামায পড়েন। অতঃপর দুআ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে একজন উত্তম সাথী দান করুন!” এরপর হযরত আবুদ দারদা'র (রাঃ) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কোথাকার লোক? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একজন কুফার অধিবাসী।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “আপনি ইবনে উমি আবৃদ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন?” জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ) বলেনঃ “তিনি পড়তেন (আরবি)।” তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে এ সূরাটি এ ভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “আপনাদের মধ্যে কি বালিশ ওয়ালা (অর্থাৎ সফরে যার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিছানাপত্র থাকতো) এবং যিনি এমন কিছু গোপনীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে জ্ঞান অন্য কারো ছিল না এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর ভাষায় যিনি শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) নেই?”হযরত ইবরাহীম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর খোঁজে আগমন করেন। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)ও তাদেরকে খোঁজ করতে করতে পেয়ে যান। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআত অনুযায়ী কুরআন পাঠকারী কেউ আছেন কি? উত্তরে তারা বললেনঃ “আমরা সবাই (তার কিরআতের অনুসারী)।” তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহর কিরআত অধিক স্মরণকারী কে আছেন?” তাঁরা জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন? তিনি (আরবি) উত্তরে বললেন, “তিনি পাঠ করতেন।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ চায় যে, আমি যেন পাঠ করি। আল্লাহর কসম! তাদের কথা আমি মানব না’’’’ (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেন) মোট কথা, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর কিরআত এরূপ। হযরত আবুদ দারদা এ বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মারফু বলেও উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য জমহূরের কিরআত বর্তমানে কুরআনে উল্লিখিত কিরআতের অনুরূপ। আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের উপর ছেয়ে যাওয়া রাত্রির শপথ করছেন, সব কিছুকে আলোকমণ্ডিত করে দেয়া দিবসের শপথ করেছেন এবং সমস্ত নর-নারী, নর ও মাদী জীবসমূহের স্রষ্টা হিসেবে নিজের সত্ত্বার শপথ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।” (৭৮:৮) আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক জিনিসের জোড়া সৃষ্টি করেছি।” (৫১৪ ৪৯) এই শপথ করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ অবশ্যই তোমাদের কর্ম প্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির। অর্থাৎ তোমাদের প্রচেষ্টা এবং আমলসমূহ পরস্পরবিরোধী, একটি অন্যটির বিপরীত। যারা ভাল কাজ করছে তারাও আছে এবং যারা মন্দ কাজে লিপ্ত রয়েছে তারাও আছে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে ব্যক্তি দান করলো ও মুত্তাকী হলো অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার পথে খরচ করলো, মেপে মেপে পা বাড়ালো, প্রত্যেক কাজে আল্লাহর ভয় রাখলো আল্লাহর ওয়াদাকৃত পুরস্কারকে সত্য বলে জানলো এবং তাঁর পুণ্যের অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাস করলো, আর যা উত্তম। গ্রহণ করলো, আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো।(আরবি) শব্দের অর্থ ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, করা হয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ ‘নিয়ামত’ করেছেন। আবার কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, এর ভার্থ হলোঃ নামায, রোযা, যাকাত, সাদকা, সাদকায়ে ফিত্র এবং জান্নাত। মহান আল্লাহ বলে আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো। অর্থাৎ কল্যাণ, অত এ উত্তম বিনিময়ের পথ।পারে সে ব্যক্তি কার্পণ্য করলো এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলো এবং হুসন’ অর্থাৎ কিয়ামতের বিনিময়কে অবিশ্বাস করলো, তার জন্যে আমি সুগম করে দিবো কঠোর পরিণামের পথ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের অন্তঃকরণ ও তাদের চক্ষু উল্টিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবার কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং তাদেরকে আমি অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিবো।" (৬৪১১০) প্রত্যেক আমলের বিনিময় যে সেই আমলের অনুরূপ হয়ে থাকে এ সম্পর্কিত আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে বহু রয়েছে। যে ভাল কাজ করতে চায় তাকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করা হয়। পক্ষান্তরে যে মন্দ কাজ করতে চায় তাকে মন্দ কাজ করার সামর্থ্য প্রদান করা হয়। এ অর্থের সমর্থনে বহু হাদীসও রয়েছে। একটি হাদীস এই যে, একবার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের আমলসমূহ কি তকদীরের লিখন অনুযায়ী হয়ে থাকে?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বলেনঃ “হ্যা তকদীরের লিখন অনুযায়ীই আমল হয়ে থাকে।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ) তাহলে আমলের প্রয়োজন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সেই আমল সহজ হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা বাকী’ গারকাদে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলাম। তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে তোমাদের প্রত্যেকের স্থানই জান্নাতে অথবা জাহান্নামে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং লিপিবদ্ধ রয়েছে।” একথা শুনে জনগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমরা তো সেই ভরসায় নিষ্ক্রীয় হয়ে থাকলেই পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা আমল করে যাও, কারণ প্রত্যেক লোকের জন্য সেই আমলই সহজ করা হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ বর্ণনাটিই অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে এক টুকরো কাঠি ছিল এবং মাথা নীচু করে তিনি তা এদিক ওদিক করছিলেন। শব্দের মধ্যে কিছু কম বেশীও রয়েছে। উপরে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-এর একই ধরনের প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং নবী করীমের (সঃ) উত্তরও প্রায় একই রকমের রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতেও একই ধরনের বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীরেরই (রঃ) অন্য একটি বর্ণনায় দু'জন যুবকের একই রকম প্রশ্ন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর একই রকম উত্তর বর্ণিত রয়েছে। তারপর সেই দুই যুবকের নিম্নের উক্তিও উল্লিখিত রয়েছেঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সৎ আমল করতে থাকবো।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) হতেও একইভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসুলে কারীম (সঃ) বলেনঃ “প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় সূর্যের উভয় পাশে দু’জন ফেরেশতা উপস্থিত হন এবং উচ্চস্বরে দু'আ করেন, যে দু’আ মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সকল সৃষ্টি জীবই শুনতে পায়। তারা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! দানশীলকে পূর্ণ বিনিময় প্রদান করুন এবং কৃপণের মাল ধ্বংস করে দিন।” কুরআনে এ চারটি আয়াতের অর্থ এটাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোকের একটি খেজুরের বাগান ছিল। ঐ বাগানের একটি খেজুর গাছের শাখা একটি দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকেছিল। ঐ দরিদ্র লোকটি ছিল পুণ্যবান। তার সন্তান সন্ততিও ছিল। বাগানের মালিক খেজুর নামাতে এসে ঝুঁকে থাকা শাখার খেজুরও নির্দ্বিধায় নামিয়ে নিতো। নীচে দরিদ্র লোকটির আঙ্গিনায় পড়া খেজুরও সে কুড়িয়ে নিতো। এমনকি দরিদ্র লোকটির ছেলে মেয়েদের কেউ দু একটা খেজুর মুখে দিলে বাগানের ঐ মালিক তার মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঐ খেজুর বের করে নিতো। দরিদ্র লোকটি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তুমি যাও (আমি এর সুব্যবস্থা করছি)।” অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের সাথে দেখা করে বললেনঃ “তোমার যেই খেজুর গাছের শাখা অমুক দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকে আছে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দাও, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সেই গাছের বিনিময়ে জান্নাতে একটি গাছ দিবেন।” বাগানের মালিক বললোঃ “ঠিক আছে, দিয়ে দিলাম। কিন্তু উক্ত গাছের খেজুর আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। আমার বাগানে বহু গাছ আছে, কিন্তু ঐ গাছের মত সুস্বাদু খেজুর গাছ আর একটিও নেই।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুপচাপ ফিরে আসলেন। একটি লোক গোপনে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)এবং ঐ লোকেটির কথােপকথন শুনছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ গাছটি যদি আমার হয়ে যায় এবং আমি ওটা আপনাকে দিয়ে দিই তবে কি ঐ গাছের বিনিময়ে আমিও জান্নাতে একটি গাছ পেতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হা (অবশ্যই)। লোকটি তখন বাগান মালিকের কাছে গেলেন। তার নিজেরও একটি বাগান ছিল। প্রথমোক্ত বাগান-মালিক তাকে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আমার অমুক খেজুর গাছের বিনিময়ে জান্নাতের একটি গাছ দিতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে এই জবাব দিয়েছি। তার একথা শুনে আগন্তুক লোকটি তাকে বললেনঃ “তুমি কি গাছটি বিক্রি করতে চাও?" উত্তরে লোকটি বললোঃ “না। তবে হ্যা, ইতি মূল্য কেউ যদি দেয় তবে ভেবে দেখতে পারি। কিন্তু কে দিবে সেই মূল্য?" তখন আগন্তুক লোকটি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কত মূল্য তুমি চাও?”বাগান মালিক জবাব দিলোঃ “এর বিনিময়ে আমি চল্লিশটি খেজুর গাছ চাই।” আগন্তুক বললেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যায়। একটি গাছের বিনিময়ে চল্লিশটি গাছ।” তারপর উভয়ে অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আগন্তুক তাকে বললেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার ইপ্সিত মূল্যেই তোমার খেজুর গাছ ক্রয় করলাম।" মালিক বললোঃ “যদি তাই হয় তবে সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করে কথা পাকাপাকি করে নাও।” সুতরাং কয়েকজন লোক ডেকে নিয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ করা হলো এবং এইভাবে ক্রয় বিক্রয়ের কাজ পাকাপাকি হয়ে গেল। কিন্তু এতেও বাগান-মালিকের খুৎ খুঁৎ মনোভাব কাটলো না। সে বললোঃ “দেখো ভাই, আমরা এখান হতে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু বেচা কেনা সিদ্ধ হবে না?” ক্রেতা বললেনঃ “ঠিক আছে, তাই হবে।”বাগানের মালিক বললোঃ “আমি সম্মত হয়ে গেলাম যে তুমি আমাকে আমার এই খেজুর গাছের বিনিময়ে তোমার চল্লিশটি খেজুর গাছ প্রদান করবে। কিন্তু ভাই গাছগুলো ঘনশাখা বিশিষ্ট হওয়া চাই।” ক্রেতা বললেনঃ “আচ্ছা তা দিবো।” তারপর সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে এ বেচাকেনা সম্পন্ন হলো। তারপর তারা দুজন পৃথক হয়ে গেল (ক্রেতা লোকটি তখন আনন্দিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাযির হয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)। আমি ঐ বৃক্ষের মালিকানা লাভ করেছি এবং ওটা আপনাকে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ দরিদ্র লোকটির নিকট গিয়ে বললেনঃ “এই খেজুর গাছ তোমার এবং তোমার সন্তানদের মালিকানাভুক্ত হয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতসমূহ হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্পর্কে নাযিল হয়। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় তিনি বৃদ্ধ ও দুর্বল দাস-দাসীদেরকে মুসলমান হয়ে যাওয়ার পর আযাদ করে দিতেন। এ ব্যাপারে একবার তাঁর পিতা আবু কাহাফা (তিনি তখনো মুসলমান হননি) বলেনঃ “তুমি দুর্বল ও বৃদ্ধদেরকে মুক্ত করছো, অথচ যদি সকল যুবকদেরকে মুক্ত করতে তবে তারা তোমার কাজে আসততা। তারা তোমাকে সাহায্য করতে পারতো এবং শত্রুদের সাথে লড়াই করতে পারতো।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন “আব্বাজান! ইহলৌকিক লাভালাভ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করি।" এরপর এখান হতে সূরা শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করা এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া, এই উভয় অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-লাইল 92:8

নবী করীম (সঃ) হযরত মুআযের (রঃ) প্রতি যে উক্তিটি করেছিলেন তা পূর্বেই গত হয়েছে। তাহলো “কেন তমি নামাযে (আরবি) এবং (আরবি) এই সূরাগুলো পাঠ কর না?”১-১১ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আলকামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সিরিয়ায় আগমন করেন এবং দামেস্কের মসজিদে গিয়ে দুই রাকআত নামায পড়েন। অতঃপর দুআ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে একজন উত্তম সাথী দান করুন!” এরপর হযরত আবুদ দারদা'র (রাঃ) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কোথাকার লোক? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একজন কুফার অধিবাসী।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “আপনি ইবনে উমি আবৃদ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন?” জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ) বলেনঃ “তিনি পড়তেন (আরবি)।” তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে এ সূরাটি এ ভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “আপনাদের মধ্যে কি বালিশ ওয়ালা (অর্থাৎ সফরে যার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিছানাপত্র থাকতো) এবং যিনি এমন কিছু গোপনীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে জ্ঞান অন্য কারো ছিল না এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর ভাষায় যিনি শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) নেই?”হযরত ইবরাহীম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর খোঁজে আগমন করেন। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)ও তাদেরকে খোঁজ করতে করতে পেয়ে যান। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআত অনুযায়ী কুরআন পাঠকারী কেউ আছেন কি? উত্তরে তারা বললেনঃ “আমরা সবাই (তার কিরআতের অনুসারী)।” তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহর কিরআত অধিক স্মরণকারী কে আছেন?” তাঁরা জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন? তিনি (আরবি) উত্তরে বললেন, “তিনি পাঠ করতেন।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ চায় যে, আমি যেন পাঠ করি। আল্লাহর কসম! তাদের কথা আমি মানব না’’’’ (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেন) মোট কথা, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর কিরআত এরূপ। হযরত আবুদ দারদা এ বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মারফু বলেও উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য জমহূরের কিরআত বর্তমানে কুরআনে উল্লিখিত কিরআতের অনুরূপ। আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের উপর ছেয়ে যাওয়া রাত্রির শপথ করছেন, সব কিছুকে আলোকমণ্ডিত করে দেয়া দিবসের শপথ করেছেন এবং সমস্ত নর-নারী, নর ও মাদী জীবসমূহের স্রষ্টা হিসেবে নিজের সত্ত্বার শপথ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।” (৭৮:৮) আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক জিনিসের জোড়া সৃষ্টি করেছি।” (৫১৪ ৪৯) এই শপথ করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ অবশ্যই তোমাদের কর্ম প্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির। অর্থাৎ তোমাদের প্রচেষ্টা এবং আমলসমূহ পরস্পরবিরোধী, একটি অন্যটির বিপরীত। যারা ভাল কাজ করছে তারাও আছে এবং যারা মন্দ কাজে লিপ্ত রয়েছে তারাও আছে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে ব্যক্তি দান করলো ও মুত্তাকী হলো অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার পথে খরচ করলো, মেপে মেপে পা বাড়ালো, প্রত্যেক কাজে আল্লাহর ভয় রাখলো আল্লাহর ওয়াদাকৃত পুরস্কারকে সত্য বলে জানলো এবং তাঁর পুণ্যের অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাস করলো, আর যা উত্তম। গ্রহণ করলো, আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো।(আরবি) শব্দের অর্থ ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, করা হয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ ‘নিয়ামত’ করেছেন। আবার কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, এর ভার্থ হলোঃ নামায, রোযা, যাকাত, সাদকা, সাদকায়ে ফিত্র এবং জান্নাত। মহান আল্লাহ বলে আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো। অর্থাৎ কল্যাণ, অত এ উত্তম বিনিময়ের পথ।পারে সে ব্যক্তি কার্পণ্য করলো এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলো এবং হুসন’ অর্থাৎ কিয়ামতের বিনিময়কে অবিশ্বাস করলো, তার জন্যে আমি সুগম করে দিবো কঠোর পরিণামের পথ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের অন্তঃকরণ ও তাদের চক্ষু উল্টিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবার কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং তাদেরকে আমি অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিবো।" (৬৪১১০) প্রত্যেক আমলের বিনিময় যে সেই আমলের অনুরূপ হয়ে থাকে এ সম্পর্কিত আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে বহু রয়েছে। যে ভাল কাজ করতে চায় তাকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করা হয়। পক্ষান্তরে যে মন্দ কাজ করতে চায় তাকে মন্দ কাজ করার সামর্থ্য প্রদান করা হয়। এ অর্থের সমর্থনে বহু হাদীসও রয়েছে। একটি হাদীস এই যে, একবার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের আমলসমূহ কি তকদীরের লিখন অনুযায়ী হয়ে থাকে?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বলেনঃ “হ্যা তকদীরের লিখন অনুযায়ীই আমল হয়ে থাকে।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ) তাহলে আমলের প্রয়োজন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সেই আমল সহজ হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা বাকী’ গারকাদে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলাম। তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে তোমাদের প্রত্যেকের স্থানই জান্নাতে অথবা জাহান্নামে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং লিপিবদ্ধ রয়েছে।” একথা শুনে জনগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমরা তো সেই ভরসায় নিষ্ক্রীয় হয়ে থাকলেই পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা আমল করে যাও, কারণ প্রত্যেক লোকের জন্য সেই আমলই সহজ করা হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ বর্ণনাটিই অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে এক টুকরো কাঠি ছিল এবং মাথা নীচু করে তিনি তা এদিক ওদিক করছিলেন। শব্দের মধ্যে কিছু কম বেশীও রয়েছে। উপরে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-এর একই ধরনের প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং নবী করীমের (সঃ) উত্তরও প্রায় একই রকমের রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতেও একই ধরনের বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীরেরই (রঃ) অন্য একটি বর্ণনায় দু'জন যুবকের একই রকম প্রশ্ন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর একই রকম উত্তর বর্ণিত রয়েছে। তারপর সেই দুই যুবকের নিম্নের উক্তিও উল্লিখিত রয়েছেঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সৎ আমল করতে থাকবো।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) হতেও একইভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসুলে কারীম (সঃ) বলেনঃ “প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় সূর্যের উভয় পাশে দু’জন ফেরেশতা উপস্থিত হন এবং উচ্চস্বরে দু'আ করেন, যে দু’আ মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সকল সৃষ্টি জীবই শুনতে পায়। তারা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! দানশীলকে পূর্ণ বিনিময় প্রদান করুন এবং কৃপণের মাল ধ্বংস করে দিন।” কুরআনে এ চারটি আয়াতের অর্থ এটাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোকের একটি খেজুরের বাগান ছিল। ঐ বাগানের একটি খেজুর গাছের শাখা একটি দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকেছিল। ঐ দরিদ্র লোকটি ছিল পুণ্যবান। তার সন্তান সন্ততিও ছিল। বাগানের মালিক খেজুর নামাতে এসে ঝুঁকে থাকা শাখার খেজুরও নির্দ্বিধায় নামিয়ে নিতো। নীচে দরিদ্র লোকটির আঙ্গিনায় পড়া খেজুরও সে কুড়িয়ে নিতো। এমনকি দরিদ্র লোকটির ছেলে মেয়েদের কেউ দু একটা খেজুর মুখে দিলে বাগানের ঐ মালিক তার মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঐ খেজুর বের করে নিতো। দরিদ্র লোকটি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তুমি যাও (আমি এর সুব্যবস্থা করছি)।” অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের সাথে দেখা করে বললেনঃ “তোমার যেই খেজুর গাছের শাখা অমুক দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকে আছে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দাও, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সেই গাছের বিনিময়ে জান্নাতে একটি গাছ দিবেন।” বাগানের মালিক বললোঃ “ঠিক আছে, দিয়ে দিলাম। কিন্তু উক্ত গাছের খেজুর আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। আমার বাগানে বহু গাছ আছে, কিন্তু ঐ গাছের মত সুস্বাদু খেজুর গাছ আর একটিও নেই।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুপচাপ ফিরে আসলেন। একটি লোক গোপনে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)এবং ঐ লোকেটির কথােপকথন শুনছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ গাছটি যদি আমার হয়ে যায় এবং আমি ওটা আপনাকে দিয়ে দিই তবে কি ঐ গাছের বিনিময়ে আমিও জান্নাতে একটি গাছ পেতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হা (অবশ্যই)। লোকটি তখন বাগান মালিকের কাছে গেলেন। তার নিজেরও একটি বাগান ছিল। প্রথমোক্ত বাগান-মালিক তাকে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আমার অমুক খেজুর গাছের বিনিময়ে জান্নাতের একটি গাছ দিতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে এই জবাব দিয়েছি। তার একথা শুনে আগন্তুক লোকটি তাকে বললেনঃ “তুমি কি গাছটি বিক্রি করতে চাও?" উত্তরে লোকটি বললোঃ “না। তবে হ্যা, ইতি মূল্য কেউ যদি দেয় তবে ভেবে দেখতে পারি। কিন্তু কে দিবে সেই মূল্য?" তখন আগন্তুক লোকটি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কত মূল্য তুমি চাও?”বাগান মালিক জবাব দিলোঃ “এর বিনিময়ে আমি চল্লিশটি খেজুর গাছ চাই।” আগন্তুক বললেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যায়। একটি গাছের বিনিময়ে চল্লিশটি গাছ।” তারপর উভয়ে অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আগন্তুক তাকে বললেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার ইপ্সিত মূল্যেই তোমার খেজুর গাছ ক্রয় করলাম।" মালিক বললোঃ “যদি তাই হয় তবে সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করে কথা পাকাপাকি করে নাও।” সুতরাং কয়েকজন লোক ডেকে নিয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ করা হলো এবং এইভাবে ক্রয় বিক্রয়ের কাজ পাকাপাকি হয়ে গেল। কিন্তু এতেও বাগান-মালিকের খুৎ খুঁৎ মনোভাব কাটলো না। সে বললোঃ “দেখো ভাই, আমরা এখান হতে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু বেচা কেনা সিদ্ধ হবে না?” ক্রেতা বললেনঃ “ঠিক আছে, তাই হবে।”বাগানের মালিক বললোঃ “আমি সম্মত হয়ে গেলাম যে তুমি আমাকে আমার এই খেজুর গাছের বিনিময়ে তোমার চল্লিশটি খেজুর গাছ প্রদান করবে। কিন্তু ভাই গাছগুলো ঘনশাখা বিশিষ্ট হওয়া চাই।” ক্রেতা বললেনঃ “আচ্ছা তা দিবো।” তারপর সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে এ বেচাকেনা সম্পন্ন হলো। তারপর তারা দুজন পৃথক হয়ে গেল (ক্রেতা লোকটি তখন আনন্দিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাযির হয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)। আমি ঐ বৃক্ষের মালিকানা লাভ করেছি এবং ওটা আপনাকে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ দরিদ্র লোকটির নিকট গিয়ে বললেনঃ “এই খেজুর গাছ তোমার এবং তোমার সন্তানদের মালিকানাভুক্ত হয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতসমূহ হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্পর্কে নাযিল হয়। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় তিনি বৃদ্ধ ও দুর্বল দাস-দাসীদেরকে মুসলমান হয়ে যাওয়ার পর আযাদ করে দিতেন। এ ব্যাপারে একবার তাঁর পিতা আবু কাহাফা (তিনি তখনো মুসলমান হননি) বলেনঃ “তুমি দুর্বল ও বৃদ্ধদেরকে মুক্ত করছো, অথচ যদি সকল যুবকদেরকে মুক্ত করতে তবে তারা তোমার কাজে আসততা। তারা তোমাকে সাহায্য করতে পারতো এবং শত্রুদের সাথে লড়াই করতে পারতো।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন “আব্বাজান! ইহলৌকিক লাভালাভ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করি।" এরপর এখান হতে সূরা শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করা এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া, এই উভয় অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-লাইল 92:9

নবী করীম (সঃ) হযরত মুআযের (রঃ) প্রতি যে উক্তিটি করেছিলেন তা পূর্বেই গত হয়েছে। তাহলো “কেন তমি নামাযে (আরবি) এবং (আরবি) এই সূরাগুলো পাঠ কর না?”১-১১ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আলকামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সিরিয়ায় আগমন করেন এবং দামেস্কের মসজিদে গিয়ে দুই রাকআত নামায পড়েন। অতঃপর দুআ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে একজন উত্তম সাথী দান করুন!” এরপর হযরত আবুদ দারদা'র (রাঃ) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কোথাকার লোক? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একজন কুফার অধিবাসী।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “আপনি ইবনে উমি আবৃদ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন?” জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ) বলেনঃ “তিনি পড়তেন (আরবি)।” তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে এ সূরাটি এ ভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “আপনাদের মধ্যে কি বালিশ ওয়ালা (অর্থাৎ সফরে যার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিছানাপত্র থাকতো) এবং যিনি এমন কিছু গোপনীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে জ্ঞান অন্য কারো ছিল না এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর ভাষায় যিনি শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) নেই?”হযরত ইবরাহীম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর খোঁজে আগমন করেন। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)ও তাদেরকে খোঁজ করতে করতে পেয়ে যান। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআত অনুযায়ী কুরআন পাঠকারী কেউ আছেন কি? উত্তরে তারা বললেনঃ “আমরা সবাই (তার কিরআতের অনুসারী)।” তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহর কিরআত অধিক স্মরণকারী কে আছেন?” তাঁরা জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন? তিনি (আরবি) উত্তরে বললেন, “তিনি পাঠ করতেন।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ চায় যে, আমি যেন পাঠ করি। আল্লাহর কসম! তাদের কথা আমি মানব না’’’’ (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেন) মোট কথা, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর কিরআত এরূপ। হযরত আবুদ দারদা এ বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মারফু বলেও উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য জমহূরের কিরআত বর্তমানে কুরআনে উল্লিখিত কিরআতের অনুরূপ। আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের উপর ছেয়ে যাওয়া রাত্রির শপথ করছেন, সব কিছুকে আলোকমণ্ডিত করে দেয়া দিবসের শপথ করেছেন এবং সমস্ত নর-নারী, নর ও মাদী জীবসমূহের স্রষ্টা হিসেবে নিজের সত্ত্বার শপথ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।” (৭৮:৮) আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক জিনিসের জোড়া সৃষ্টি করেছি।” (৫১৪ ৪৯) এই শপথ করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ অবশ্যই তোমাদের কর্ম প্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির। অর্থাৎ তোমাদের প্রচেষ্টা এবং আমলসমূহ পরস্পরবিরোধী, একটি অন্যটির বিপরীত। যারা ভাল কাজ করছে তারাও আছে এবং যারা মন্দ কাজে লিপ্ত রয়েছে তারাও আছে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে ব্যক্তি দান করলো ও মুত্তাকী হলো অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার পথে খরচ করলো, মেপে মেপে পা বাড়ালো, প্রত্যেক কাজে আল্লাহর ভয় রাখলো আল্লাহর ওয়াদাকৃত পুরস্কারকে সত্য বলে জানলো এবং তাঁর পুণ্যের অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাস করলো, আর যা উত্তম। গ্রহণ করলো, আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো।(আরবি) শব্দের অর্থ ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, করা হয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ ‘নিয়ামত’ করেছেন। আবার কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, এর ভার্থ হলোঃ নামায, রোযা, যাকাত, সাদকা, সাদকায়ে ফিত্র এবং জান্নাত। মহান আল্লাহ বলে আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো। অর্থাৎ কল্যাণ, অত এ উত্তম বিনিময়ের পথ।পারে সে ব্যক্তি কার্পণ্য করলো এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলো এবং হুসন’ অর্থাৎ কিয়ামতের বিনিময়কে অবিশ্বাস করলো, তার জন্যে আমি সুগম করে দিবো কঠোর পরিণামের পথ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের অন্তঃকরণ ও তাদের চক্ষু উল্টিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবার কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং তাদেরকে আমি অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিবো।" (৬৪১১০) প্রত্যেক আমলের বিনিময় যে সেই আমলের অনুরূপ হয়ে থাকে এ সম্পর্কিত আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে বহু রয়েছে। যে ভাল কাজ করতে চায় তাকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করা হয়। পক্ষান্তরে যে মন্দ কাজ করতে চায় তাকে মন্দ কাজ করার সামর্থ্য প্রদান করা হয়। এ অর্থের সমর্থনে বহু হাদীসও রয়েছে। একটি হাদীস এই যে, একবার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের আমলসমূহ কি তকদীরের লিখন অনুযায়ী হয়ে থাকে?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বলেনঃ “হ্যা তকদীরের লিখন অনুযায়ীই আমল হয়ে থাকে।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ) তাহলে আমলের প্রয়োজন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সেই আমল সহজ হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা বাকী’ গারকাদে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলাম। তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে তোমাদের প্রত্যেকের স্থানই জান্নাতে অথবা জাহান্নামে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং লিপিবদ্ধ রয়েছে।” একথা শুনে জনগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমরা তো সেই ভরসায় নিষ্ক্রীয় হয়ে থাকলেই পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা আমল করে যাও, কারণ প্রত্যেক লোকের জন্য সেই আমলই সহজ করা হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ বর্ণনাটিই অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে এক টুকরো কাঠি ছিল এবং মাথা নীচু করে তিনি তা এদিক ওদিক করছিলেন। শব্দের মধ্যে কিছু কম বেশীও রয়েছে। উপরে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-এর একই ধরনের প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং নবী করীমের (সঃ) উত্তরও প্রায় একই রকমের রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতেও একই ধরনের বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীরেরই (রঃ) অন্য একটি বর্ণনায় দু'জন যুবকের একই রকম প্রশ্ন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর একই রকম উত্তর বর্ণিত রয়েছে। তারপর সেই দুই যুবকের নিম্নের উক্তিও উল্লিখিত রয়েছেঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সৎ আমল করতে থাকবো।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) হতেও একইভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসুলে কারীম (সঃ) বলেনঃ “প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় সূর্যের উভয় পাশে দু’জন ফেরেশতা উপস্থিত হন এবং উচ্চস্বরে দু'আ করেন, যে দু’আ মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সকল সৃষ্টি জীবই শুনতে পায়। তারা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! দানশীলকে পূর্ণ বিনিময় প্রদান করুন এবং কৃপণের মাল ধ্বংস করে দিন।” কুরআনে এ চারটি আয়াতের অর্থ এটাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোকের একটি খেজুরের বাগান ছিল। ঐ বাগানের একটি খেজুর গাছের শাখা একটি দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকেছিল। ঐ দরিদ্র লোকটি ছিল পুণ্যবান। তার সন্তান সন্ততিও ছিল। বাগানের মালিক খেজুর নামাতে এসে ঝুঁকে থাকা শাখার খেজুরও নির্দ্বিধায় নামিয়ে নিতো। নীচে দরিদ্র লোকটির আঙ্গিনায় পড়া খেজুরও সে কুড়িয়ে নিতো। এমনকি দরিদ্র লোকটির ছেলে মেয়েদের কেউ দু একটা খেজুর মুখে দিলে বাগানের ঐ মালিক তার মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঐ খেজুর বের করে নিতো। দরিদ্র লোকটি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তুমি যাও (আমি এর সুব্যবস্থা করছি)।” অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের সাথে দেখা করে বললেনঃ “তোমার যেই খেজুর গাছের শাখা অমুক দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকে আছে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দাও, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সেই গাছের বিনিময়ে জান্নাতে একটি গাছ দিবেন।” বাগানের মালিক বললোঃ “ঠিক আছে, দিয়ে দিলাম। কিন্তু উক্ত গাছের খেজুর আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। আমার বাগানে বহু গাছ আছে, কিন্তু ঐ গাছের মত সুস্বাদু খেজুর গাছ আর একটিও নেই।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুপচাপ ফিরে আসলেন। একটি লোক গোপনে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)এবং ঐ লোকেটির কথােপকথন শুনছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ গাছটি যদি আমার হয়ে যায় এবং আমি ওটা আপনাকে দিয়ে দিই তবে কি ঐ গাছের বিনিময়ে আমিও জান্নাতে একটি গাছ পেতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হা (অবশ্যই)। লোকটি তখন বাগান মালিকের কাছে গেলেন। তার নিজেরও একটি বাগান ছিল। প্রথমোক্ত বাগান-মালিক তাকে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আমার অমুক খেজুর গাছের বিনিময়ে জান্নাতের একটি গাছ দিতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে এই জবাব দিয়েছি। তার একথা শুনে আগন্তুক লোকটি তাকে বললেনঃ “তুমি কি গাছটি বিক্রি করতে চাও?" উত্তরে লোকটি বললোঃ “না। তবে হ্যা, ইতি মূল্য কেউ যদি দেয় তবে ভেবে দেখতে পারি। কিন্তু কে দিবে সেই মূল্য?" তখন আগন্তুক লোকটি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কত মূল্য তুমি চাও?”বাগান মালিক জবাব দিলোঃ “এর বিনিময়ে আমি চল্লিশটি খেজুর গাছ চাই।” আগন্তুক বললেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যায়। একটি গাছের বিনিময়ে চল্লিশটি গাছ।” তারপর উভয়ে অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আগন্তুক তাকে বললেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার ইপ্সিত মূল্যেই তোমার খেজুর গাছ ক্রয় করলাম।" মালিক বললোঃ “যদি তাই হয় তবে সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করে কথা পাকাপাকি করে নাও।” সুতরাং কয়েকজন লোক ডেকে নিয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ করা হলো এবং এইভাবে ক্রয় বিক্রয়ের কাজ পাকাপাকি হয়ে গেল। কিন্তু এতেও বাগান-মালিকের খুৎ খুঁৎ মনোভাব কাটলো না। সে বললোঃ “দেখো ভাই, আমরা এখান হতে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু বেচা কেনা সিদ্ধ হবে না?” ক্রেতা বললেনঃ “ঠিক আছে, তাই হবে।”বাগানের মালিক বললোঃ “আমি সম্মত হয়ে গেলাম যে তুমি আমাকে আমার এই খেজুর গাছের বিনিময়ে তোমার চল্লিশটি খেজুর গাছ প্রদান করবে। কিন্তু ভাই গাছগুলো ঘনশাখা বিশিষ্ট হওয়া চাই।” ক্রেতা বললেনঃ “আচ্ছা তা দিবো।” তারপর সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে এ বেচাকেনা সম্পন্ন হলো। তারপর তারা দুজন পৃথক হয়ে গেল (ক্রেতা লোকটি তখন আনন্দিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাযির হয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)। আমি ঐ বৃক্ষের মালিকানা লাভ করেছি এবং ওটা আপনাকে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ দরিদ্র লোকটির নিকট গিয়ে বললেনঃ “এই খেজুর গাছ তোমার এবং তোমার সন্তানদের মালিকানাভুক্ত হয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতসমূহ হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্পর্কে নাযিল হয়। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় তিনি বৃদ্ধ ও দুর্বল দাস-দাসীদেরকে মুসলমান হয়ে যাওয়ার পর আযাদ করে দিতেন। এ ব্যাপারে একবার তাঁর পিতা আবু কাহাফা (তিনি তখনো মুসলমান হননি) বলেনঃ “তুমি দুর্বল ও বৃদ্ধদেরকে মুক্ত করছো, অথচ যদি সকল যুবকদেরকে মুক্ত করতে তবে তারা তোমার কাজে আসততা। তারা তোমাকে সাহায্য করতে পারতো এবং শত্রুদের সাথে লড়াই করতে পারতো।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন “আব্বাজান! ইহলৌকিক লাভালাভ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করি।" এরপর এখান হতে সূরা শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করা এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া, এই উভয় অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-লাইল 92:10

নবী করীম (সঃ) হযরত মুআযের (রঃ) প্রতি যে উক্তিটি করেছিলেন তা পূর্বেই গত হয়েছে। তাহলো “কেন তমি নামাযে (আরবি) এবং (আরবি) এই সূরাগুলো পাঠ কর না?”১-১১ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আলকামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সিরিয়ায় আগমন করেন এবং দামেস্কের মসজিদে গিয়ে দুই রাকআত নামায পড়েন। অতঃপর দুআ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে একজন উত্তম সাথী দান করুন!” এরপর হযরত আবুদ দারদা'র (রাঃ) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কোথাকার লোক? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একজন কুফার অধিবাসী।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “আপনি ইবনে উমি আবৃদ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন?” জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ) বলেনঃ “তিনি পড়তেন (আরবি)।” তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে এ সূরাটি এ ভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “আপনাদের মধ্যে কি বালিশ ওয়ালা (অর্থাৎ সফরে যার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিছানাপত্র থাকতো) এবং যিনি এমন কিছু গোপনীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে জ্ঞান অন্য কারো ছিল না এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর ভাষায় যিনি শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) নেই?”হযরত ইবরাহীম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর খোঁজে আগমন করেন। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)ও তাদেরকে খোঁজ করতে করতে পেয়ে যান। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআত অনুযায়ী কুরআন পাঠকারী কেউ আছেন কি? উত্তরে তারা বললেনঃ “আমরা সবাই (তার কিরআতের অনুসারী)।” তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহর কিরআত অধিক স্মরণকারী কে আছেন?” তাঁরা জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন? তিনি (আরবি) উত্তরে বললেন, “তিনি পাঠ করতেন।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ চায় যে, আমি যেন পাঠ করি। আল্লাহর কসম! তাদের কথা আমি মানব না’’’’ (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেন) মোট কথা, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর কিরআত এরূপ। হযরত আবুদ দারদা এ বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মারফু বলেও উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য জমহূরের কিরআত বর্তমানে কুরআনে উল্লিখিত কিরআতের অনুরূপ। আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের উপর ছেয়ে যাওয়া রাত্রির শপথ করছেন, সব কিছুকে আলোকমণ্ডিত করে দেয়া দিবসের শপথ করেছেন এবং সমস্ত নর-নারী, নর ও মাদী জীবসমূহের স্রষ্টা হিসেবে নিজের সত্ত্বার শপথ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।” (৭৮:৮) আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক জিনিসের জোড়া সৃষ্টি করেছি।” (৫১৪ ৪৯) এই শপথ করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ অবশ্যই তোমাদের কর্ম প্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির। অর্থাৎ তোমাদের প্রচেষ্টা এবং আমলসমূহ পরস্পরবিরোধী, একটি অন্যটির বিপরীত। যারা ভাল কাজ করছে তারাও আছে এবং যারা মন্দ কাজে লিপ্ত রয়েছে তারাও আছে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে ব্যক্তি দান করলো ও মুত্তাকী হলো অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার পথে খরচ করলো, মেপে মেপে পা বাড়ালো, প্রত্যেক কাজে আল্লাহর ভয় রাখলো আল্লাহর ওয়াদাকৃত পুরস্কারকে সত্য বলে জানলো এবং তাঁর পুণ্যের অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাস করলো, আর যা উত্তম। গ্রহণ করলো, আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো।(আরবি) শব্দের অর্থ ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, করা হয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ ‘নিয়ামত’ করেছেন। আবার কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, এর ভার্থ হলোঃ নামায, রোযা, যাকাত, সাদকা, সাদকায়ে ফিত্র এবং জান্নাত। মহান আল্লাহ বলে আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো। অর্থাৎ কল্যাণ, অত এ উত্তম বিনিময়ের পথ।পারে সে ব্যক্তি কার্পণ্য করলো এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলো এবং হুসন’ অর্থাৎ কিয়ামতের বিনিময়কে অবিশ্বাস করলো, তার জন্যে আমি সুগম করে দিবো কঠোর পরিণামের পথ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের অন্তঃকরণ ও তাদের চক্ষু উল্টিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবার কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং তাদেরকে আমি অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিবো।" (৬৪১১০) প্রত্যেক আমলের বিনিময় যে সেই আমলের অনুরূপ হয়ে থাকে এ সম্পর্কিত আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে বহু রয়েছে। যে ভাল কাজ করতে চায় তাকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করা হয়। পক্ষান্তরে যে মন্দ কাজ করতে চায় তাকে মন্দ কাজ করার সামর্থ্য প্রদান করা হয়। এ অর্থের সমর্থনে বহু হাদীসও রয়েছে। একটি হাদীস এই যে, একবার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের আমলসমূহ কি তকদীরের লিখন অনুযায়ী হয়ে থাকে?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বলেনঃ “হ্যা তকদীরের লিখন অনুযায়ীই আমল হয়ে থাকে।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ) তাহলে আমলের প্রয়োজন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সেই আমল সহজ হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা বাকী’ গারকাদে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলাম। তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে তোমাদের প্রত্যেকের স্থানই জান্নাতে অথবা জাহান্নামে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং লিপিবদ্ধ রয়েছে।” একথা শুনে জনগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমরা তো সেই ভরসায় নিষ্ক্রীয় হয়ে থাকলেই পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা আমল করে যাও, কারণ প্রত্যেক লোকের জন্য সেই আমলই সহজ করা হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ বর্ণনাটিই অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে এক টুকরো কাঠি ছিল এবং মাথা নীচু করে তিনি তা এদিক ওদিক করছিলেন। শব্দের মধ্যে কিছু কম বেশীও রয়েছে। উপরে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-এর একই ধরনের প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং নবী করীমের (সঃ) উত্তরও প্রায় একই রকমের রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতেও একই ধরনের বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীরেরই (রঃ) অন্য একটি বর্ণনায় দু'জন যুবকের একই রকম প্রশ্ন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর একই রকম উত্তর বর্ণিত রয়েছে। তারপর সেই দুই যুবকের নিম্নের উক্তিও উল্লিখিত রয়েছেঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সৎ আমল করতে থাকবো।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) হতেও একইভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসুলে কারীম (সঃ) বলেনঃ “প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় সূর্যের উভয় পাশে দু’জন ফেরেশতা উপস্থিত হন এবং উচ্চস্বরে দু'আ করেন, যে দু’আ মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সকল সৃষ্টি জীবই শুনতে পায়। তারা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! দানশীলকে পূর্ণ বিনিময় প্রদান করুন এবং কৃপণের মাল ধ্বংস করে দিন।” কুরআনে এ চারটি আয়াতের অর্থ এটাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোকের একটি খেজুরের বাগান ছিল। ঐ বাগানের একটি খেজুর গাছের শাখা একটি দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকেছিল। ঐ দরিদ্র লোকটি ছিল পুণ্যবান। তার সন্তান সন্ততিও ছিল। বাগানের মালিক খেজুর নামাতে এসে ঝুঁকে থাকা শাখার খেজুরও নির্দ্বিধায় নামিয়ে নিতো। নীচে দরিদ্র লোকটির আঙ্গিনায় পড়া খেজুরও সে কুড়িয়ে নিতো। এমনকি দরিদ্র লোকটির ছেলে মেয়েদের কেউ দু একটা খেজুর মুখে দিলে বাগানের ঐ মালিক তার মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঐ খেজুর বের করে নিতো। দরিদ্র লোকটি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তুমি যাও (আমি এর সুব্যবস্থা করছি)।” অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের সাথে দেখা করে বললেনঃ “তোমার যেই খেজুর গাছের শাখা অমুক দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকে আছে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দাও, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সেই গাছের বিনিময়ে জান্নাতে একটি গাছ দিবেন।” বাগানের মালিক বললোঃ “ঠিক আছে, দিয়ে দিলাম। কিন্তু উক্ত গাছের খেজুর আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। আমার বাগানে বহু গাছ আছে, কিন্তু ঐ গাছের মত সুস্বাদু খেজুর গাছ আর একটিও নেই।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুপচাপ ফিরে আসলেন। একটি লোক গোপনে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)এবং ঐ লোকেটির কথােপকথন শুনছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ গাছটি যদি আমার হয়ে যায় এবং আমি ওটা আপনাকে দিয়ে দিই তবে কি ঐ গাছের বিনিময়ে আমিও জান্নাতে একটি গাছ পেতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হা (অবশ্যই)। লোকটি তখন বাগান মালিকের কাছে গেলেন। তার নিজেরও একটি বাগান ছিল। প্রথমোক্ত বাগান-মালিক তাকে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আমার অমুক খেজুর গাছের বিনিময়ে জান্নাতের একটি গাছ দিতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে এই জবাব দিয়েছি। তার একথা শুনে আগন্তুক লোকটি তাকে বললেনঃ “তুমি কি গাছটি বিক্রি করতে চাও?" উত্তরে লোকটি বললোঃ “না। তবে হ্যা, ইতি মূল্য কেউ যদি দেয় তবে ভেবে দেখতে পারি। কিন্তু কে দিবে সেই মূল্য?" তখন আগন্তুক লোকটি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কত মূল্য তুমি চাও?”বাগান মালিক জবাব দিলোঃ “এর বিনিময়ে আমি চল্লিশটি খেজুর গাছ চাই।” আগন্তুক বললেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যায়। একটি গাছের বিনিময়ে চল্লিশটি গাছ।” তারপর উভয়ে অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আগন্তুক তাকে বললেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার ইপ্সিত মূল্যেই তোমার খেজুর গাছ ক্রয় করলাম।" মালিক বললোঃ “যদি তাই হয় তবে সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করে কথা পাকাপাকি করে নাও।” সুতরাং কয়েকজন লোক ডেকে নিয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ করা হলো এবং এইভাবে ক্রয় বিক্রয়ের কাজ পাকাপাকি হয়ে গেল। কিন্তু এতেও বাগান-মালিকের খুৎ খুঁৎ মনোভাব কাটলো না। সে বললোঃ “দেখো ভাই, আমরা এখান হতে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু বেচা কেনা সিদ্ধ হবে না?” ক্রেতা বললেনঃ “ঠিক আছে, তাই হবে।”বাগানের মালিক বললোঃ “আমি সম্মত হয়ে গেলাম যে তুমি আমাকে আমার এই খেজুর গাছের বিনিময়ে তোমার চল্লিশটি খেজুর গাছ প্রদান করবে। কিন্তু ভাই গাছগুলো ঘনশাখা বিশিষ্ট হওয়া চাই।” ক্রেতা বললেনঃ “আচ্ছা তা দিবো।” তারপর সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে এ বেচাকেনা সম্পন্ন হলো। তারপর তারা দুজন পৃথক হয়ে গেল (ক্রেতা লোকটি তখন আনন্দিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাযির হয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)। আমি ঐ বৃক্ষের মালিকানা লাভ করেছি এবং ওটা আপনাকে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ দরিদ্র লোকটির নিকট গিয়ে বললেনঃ “এই খেজুর গাছ তোমার এবং তোমার সন্তানদের মালিকানাভুক্ত হয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতসমূহ হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্পর্কে নাযিল হয়। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় তিনি বৃদ্ধ ও দুর্বল দাস-দাসীদেরকে মুসলমান হয়ে যাওয়ার পর আযাদ করে দিতেন। এ ব্যাপারে একবার তাঁর পিতা আবু কাহাফা (তিনি তখনো মুসলমান হননি) বলেনঃ “তুমি দুর্বল ও বৃদ্ধদেরকে মুক্ত করছো, অথচ যদি সকল যুবকদেরকে মুক্ত করতে তবে তারা তোমার কাজে আসততা। তারা তোমাকে সাহায্য করতে পারতো এবং শত্রুদের সাথে লড়াই করতে পারতো।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন “আব্বাজান! ইহলৌকিক লাভালাভ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করি।" এরপর এখান হতে সূরা শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করা এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া, এই উভয় অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-লাইল 92:11

নবী করীম (সঃ) হযরত মুআযের (রঃ) প্রতি যে উক্তিটি করেছিলেন তা পূর্বেই গত হয়েছে। তাহলো “কেন তমি নামাযে (আরবি) এবং (আরবি) এই সূরাগুলো পাঠ কর না?”১-১১ নং আয়াতের তাফসীরমুসনাদে আহমদে হযরত আলকামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সিরিয়ায় আগমন করেন এবং দামেস্কের মসজিদে গিয়ে দুই রাকআত নামায পড়েন। অতঃপর দুআ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে একজন উত্তম সাথী দান করুন!” এরপর হযরত আবুদ দারদা'র (রাঃ) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কোথাকার লোক? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একজন কুফার অধিবাসী।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “আপনি ইবনে উমি আবৃদ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন?” জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ) বলেনঃ “তিনি পড়তেন (আরবি)।” তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে এ সূরাটি এ ভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “আপনাদের মধ্যে কি বালিশ ওয়ালা (অর্থাৎ সফরে যার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিছানাপত্র থাকতো) এবং যিনি এমন কিছু গোপনীয় জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে জ্ঞান অন্য কারো ছিল না এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর ভাষায় যিনি শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) নেই?”হযরত ইবরাহীম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর খোঁজে আগমন করেন। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)ও তাদেরকে খোঁজ করতে করতে পেয়ে যান। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এর কিরআত অনুযায়ী কুরআন পাঠকারী কেউ আছেন কি? উত্তরে তারা বললেনঃ “আমরা সবাই (তার কিরআতের অনুসারী)।” তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহর কিরআত অধিক স্মরণকারী কে আছেন?” তাঁরা জবাবে হযরত আলকামা (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। তখন হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনি হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-কে (আরবি) এ সূরাটি কিভাবে পড়তে শুনেছেন? তিনি (আরবি) উত্তরে বললেন, “তিনি পাঠ করতেন।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) একথা শুনে বললেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এভাবেই পড়তে শুনেছি। অথচ জনগণ চায় যে, আমি যেন পাঠ করি। আল্লাহর কসম! তাদের কথা আমি মানব না’’’’ (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেন) মোট কথা, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আবুদ দারদা (রাঃ)-এর কিরআত এরূপ। হযরত আবুদ দারদা এ বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মারফু বলেও উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য জমহূরের কিরআত বর্তমানে কুরআনে উল্লিখিত কিরআতের অনুরূপ। আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের উপর ছেয়ে যাওয়া রাত্রির শপথ করছেন, সব কিছুকে আলোকমণ্ডিত করে দেয়া দিবসের শপথ করেছেন এবং সমস্ত নর-নারী, নর ও মাদী জীবসমূহের স্রষ্টা হিসেবে নিজের সত্ত্বার শপথ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।” (৭৮:৮) আরো বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক জিনিসের জোড়া সৃষ্টি করেছি।” (৫১৪ ৪৯) এই শপথ করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলছেনঃ অবশ্যই তোমাদের কর্ম প্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির। অর্থাৎ তোমাদের প্রচেষ্টা এবং আমলসমূহ পরস্পরবিরোধী, একটি অন্যটির বিপরীত। যারা ভাল কাজ করছে তারাও আছে এবং যারা মন্দ কাজে লিপ্ত রয়েছে তারাও আছে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যে ব্যক্তি দান করলো ও মুত্তাকী হলো অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার পথে খরচ করলো, মেপে মেপে পা বাড়ালো, প্রত্যেক কাজে আল্লাহর ভয় রাখলো আল্লাহর ওয়াদাকৃত পুরস্কারকে সত্য বলে জানলো এবং তাঁর পুণ্যের অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাস করলো, আর যা উত্তম। গ্রহণ করলো, আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো।(আরবি) শব্দের অর্থ ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, করা হয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ ‘নিয়ামত’ করেছেন। আবার কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, এর ভার্থ হলোঃ নামায, রোযা, যাকাত, সাদকা, সাদকায়ে ফিত্র এবং জান্নাত। মহান আল্লাহ বলে আমি তার জন্যে সহজ পথ সুগম করে দিবো। অর্থাৎ কল্যাণ, অত এ উত্তম বিনিময়ের পথ।পারে সে ব্যক্তি কার্পণ্য করলো এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলো এবং হুসন’ অর্থাৎ কিয়ামতের বিনিময়কে অবিশ্বাস করলো, তার জন্যে আমি সুগম করে দিবো কঠোর পরিণামের পথ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের অন্তঃকরণ ও তাদের চক্ষু উল্টিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবার কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং তাদেরকে আমি অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিবো।" (৬৪১১০) প্রত্যেক আমলের বিনিময় যে সেই আমলের অনুরূপ হয়ে থাকে এ সম্পর্কিত আয়াত কুরআন কারীমের মধ্যে বহু রয়েছে। যে ভাল কাজ করতে চায় তাকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করা হয়। পক্ষান্তরে যে মন্দ কাজ করতে চায় তাকে মন্দ কাজ করার সামর্থ্য প্রদান করা হয়। এ অর্থের সমর্থনে বহু হাদীসও রয়েছে। একটি হাদীস এই যে, একবার হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের আমলসমূহ কি তকদীরের লিখন অনুযায়ী হয়ে থাকে?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বলেনঃ “হ্যা তকদীরের লিখন অনুযায়ীই আমল হয়ে থাকে।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ) তাহলে আমলের প্রয়োজন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সেই আমল সহজ হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা বাকী’ গারকাদে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলাম। তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে তোমাদের প্রত্যেকের স্থানই জান্নাতে অথবা জাহান্নামে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং লিপিবদ্ধ রয়েছে।” একথা শুনে জনগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমরা তো সেই ভরসায় নিষ্ক্রীয় হয়ে থাকলেই পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা আমল করে যাও, কারণ প্রত্যেক লোকের জন্য সেই আমলই সহজ করা হবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ বর্ণনাটিই অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে এক টুকরো কাঠি ছিল এবং মাথা নীচু করে তিনি তা এদিক ওদিক করছিলেন। শব্দের মধ্যে কিছু কম বেশীও রয়েছে। উপরে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-এর একই ধরনের প্রশ্ন সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং নবী করীমের (সঃ) উত্তরও প্রায় একই রকমের রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতেও একই ধরনের বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে জারীরেরই (রঃ) অন্য একটি বর্ণনায় দু'জন যুবকের একই রকম প্রশ্ন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর একই রকম উত্তর বর্ণিত রয়েছে। তারপর সেই দুই যুবকের নিম্নের উক্তিও উল্লিখিত রয়েছেঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সৎ আমল করতে থাকবো।” হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) হতেও একইভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসুলে কারীম (সঃ) বলেনঃ “প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় সূর্যের উভয় পাশে দু’জন ফেরেশতা উপস্থিত হন এবং উচ্চস্বরে দু'আ করেন, যে দু’আ মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সকল সৃষ্টি জীবই শুনতে পায়। তারা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! দানশীলকে পূর্ণ বিনিময় প্রদান করুন এবং কৃপণের মাল ধ্বংস করে দিন।” কুরআনে এ চারটি আয়াতের অর্থ এটাই।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোকের একটি খেজুরের বাগান ছিল। ঐ বাগানের একটি খেজুর গাছের শাখা একটি দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকেছিল। ঐ দরিদ্র লোকটি ছিল পুণ্যবান। তার সন্তান সন্ততিও ছিল। বাগানের মালিক খেজুর নামাতে এসে ঝুঁকে থাকা শাখার খেজুরও নির্দ্বিধায় নামিয়ে নিতো। নীচে দরিদ্র লোকটির আঙ্গিনায় পড়া খেজুরও সে কুড়িয়ে নিতো। এমনকি দরিদ্র লোকটির ছেলে মেয়েদের কেউ দু একটা খেজুর মুখে দিলে বাগানের ঐ মালিক তার মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঐ খেজুর বের করে নিতো। দরিদ্র লোকটি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আচ্ছা, তুমি যাও (আমি এর সুব্যবস্থা করছি)।” অতঃপর তিনি বাগানের মালিকের সাথে দেখা করে বললেনঃ “তোমার যেই খেজুর গাছের শাখা অমুক দরিদ্রলোকের ঘরের উপর ঝুঁকে আছে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দাও, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সেই গাছের বিনিময়ে জান্নাতে একটি গাছ দিবেন।” বাগানের মালিক বললোঃ “ঠিক আছে, দিয়ে দিলাম। কিন্তু উক্ত গাছের খেজুর আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। আমার বাগানে বহু গাছ আছে, কিন্তু ঐ গাছের মত সুস্বাদু খেজুর গাছ আর একটিও নেই।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুপচাপ ফিরে আসলেন। একটি লোক গোপনে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)এবং ঐ লোকেটির কথােপকথন শুনছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ গাছটি যদি আমার হয়ে যায় এবং আমি ওটা আপনাকে দিয়ে দিই তবে কি ঐ গাছের বিনিময়ে আমিও জান্নাতে একটি গাছ পেতে পারি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হা (অবশ্যই)। লোকটি তখন বাগান মালিকের কাছে গেলেন। তার নিজেরও একটি বাগান ছিল। প্রথমোক্ত বাগান-মালিক তাকে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে আমার অমুক খেজুর গাছের বিনিময়ে জান্নাতের একটি গাছ দিতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে এই জবাব দিয়েছি। তার একথা শুনে আগন্তুক লোকটি তাকে বললেনঃ “তুমি কি গাছটি বিক্রি করতে চাও?" উত্তরে লোকটি বললোঃ “না। তবে হ্যা, ইতি মূল্য কেউ যদি দেয় তবে ভেবে দেখতে পারি। কিন্তু কে দিবে সেই মূল্য?" তখন আগন্তুক লোকটি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কত মূল্য তুমি চাও?”বাগান মালিক জবাব দিলোঃ “এর বিনিময়ে আমি চল্লিশটি খেজুর গাছ চাই।” আগন্তুক বললেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যায়। একটি গাছের বিনিময়ে চল্লিশটি গাছ।” তারপর উভয়ে অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আগন্তুক তাকে বললেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার ইপ্সিত মূল্যেই তোমার খেজুর গাছ ক্রয় করলাম।" মালিক বললোঃ “যদি তাই হয় তবে সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করে কথা পাকাপাকি করে নাও।” সুতরাং কয়েকজন লোক ডেকে নিয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ করা হলো এবং এইভাবে ক্রয় বিক্রয়ের কাজ পাকাপাকি হয়ে গেল। কিন্তু এতেও বাগান-মালিকের খুৎ খুঁৎ মনোভাব কাটলো না। সে বললোঃ “দেখো ভাই, আমরা এখান হতে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু বেচা কেনা সিদ্ধ হবে না?” ক্রেতা বললেনঃ “ঠিক আছে, তাই হবে।”বাগানের মালিক বললোঃ “আমি সম্মত হয়ে গেলাম যে তুমি আমাকে আমার এই খেজুর গাছের বিনিময়ে তোমার চল্লিশটি খেজুর গাছ প্রদান করবে। কিন্তু ভাই গাছগুলো ঘনশাখা বিশিষ্ট হওয়া চাই।” ক্রেতা বললেনঃ “আচ্ছা তা দিবো।” তারপর সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে এ বেচাকেনা সম্পন্ন হলো। তারপর তারা দুজন পৃথক হয়ে গেল (ক্রেতা লোকটি তখন আনন্দিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাযির হয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)। আমি ঐ বৃক্ষের মালিকানা লাভ করেছি এবং ওটা আপনাকে দিয়ে দিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ দরিদ্র লোকটির নিকট গিয়ে বললেনঃ “এই খেজুর গাছ তোমার এবং তোমার সন্তানদের মালিকানাভুক্ত হয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীস)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতসমূহ হযরত আবু বকর (রাঃ) সম্পর্কে নাযিল হয়। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় তিনি বৃদ্ধ ও দুর্বল দাস-দাসীদেরকে মুসলমান হয়ে যাওয়ার পর আযাদ করে দিতেন। এ ব্যাপারে একবার তাঁর পিতা আবু কাহাফা (তিনি তখনো মুসলমান হননি) বলেনঃ “তুমি দুর্বল ও বৃদ্ধদেরকে মুক্ত করছো, অথচ যদি সকল যুবকদেরকে মুক্ত করতে তবে তারা তোমার কাজে আসততা। তারা তোমাকে সাহায্য করতে পারতো এবং শত্রুদের সাথে লড়াই করতে পারতো।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন “আব্বাজান! ইহলৌকিক লাভালাভ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করি।" এরপর এখান হতে সূরা শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।(আরবি) শব্দের অর্থ হলো মৃত্যুবরণ করা এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া, এই উভয় অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।

আল-লাইল 92:12

১২-২১ নং আয়াতের তাফসীরকাতাদা (রঃ) বলেন যে,(আরবি) এর ভাবার্থ হলোঃ আমার কাজ তো শুধু হালাল হারাম প্রকাশ করে দেয়া। এটাও অর্থ হয় যে, যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথে চলেছে নিশ্চয়ই তার আল্লাহর সঙ্গে মিলন ঘটবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তো পরলোকের ও ইহলোকের মালিক। আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি।মুসনাদে আহমদে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ভাষণে বলতে শুনেনঃ “(হে জনমণ্ডলী!) আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করছি।” তিনি একথা এতো উচ্চস্বরে বলছিলেন যে, বাজার থেকেও লোক তাঁর কথা শুনতে পাচ্ছিল। তিনি একথা বারবার বলছিলেন এমন কি তাঁর চাদর মুবারক তাঁর কাঁধ থেকে লুটিয়ে পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন যে জাহান্নামী ব্যক্তি সবচেয়ে কম শাস্তি প্রাপ্ত হবে তার পদদ্বয়ের নিচে দু'টুকরো অগ্নি স্ফুলিঙ্গ রাখা হবে, ঐ আগুনের তাপে লোকটির মগজ ফুটতে থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ মুসলিমে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যেই জাহান্নামীকে সবচেয়ে হালকা শাস্তি দেয়া হবে তার পদদ্বয়ে আগুনের এক জোড়া ফিতাযুক্ত সেণ্ডেল পরিয়ে দেয়া হবে, সেই আগুনের তাপে তার মাথার মগজ উনুনের উপরের হাঁড়ির পানির মত টগবগ করে ফুটতে থাকবে। যদিও তাকে সবচেয়ে কম শাস্তি দেয়া হবে তবুও সে মনে করবে যে, তার চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কাউকেও দেয়া হচ্ছে না।" মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেন, তাতে প্রবেশ করবে সেই নিতান্ত যে হতভাগা। অর্থাৎ এই জাহান্নামে শুধু ঐ লোকদেরকে পরিবেষ্টিত করে শাস্তি দেয়া হবে যারা অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। যারা ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমল করে না।মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শুধু শকী বা বদকার লোক ছাড়া কেউ জাহান্নামে যাবে না।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “শকী বা বদকার লোক কে?" উত্তরে তিনি বললেনঃ যে আনুগত্যপরায়ণ নয় এবং আল্লাহর ভয়ে যে পাপ কাজ হতে বিরত থাকে।”মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু তারা প্রবেশ করবে না যারা অস্বীকার করে।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অস্বীকারকারী কারা? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যারা আমার আনুগত্য করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যারা আমার নাফরমানী করেছে তারাই অস্বীকারকারী।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আর জাহান্নাম হতে বহু দূরে রাখা হবে পরম ' মুত্তাকীকে। যে নিজেকে ও নিজের ধন সম্পদকে পবিত্র করার জন্যে, দ্বীন দুনিয়ার পবিত্রতা লাভের জন্যে নিজের ধন মালকে আল্লাহর পথে দান করে। আর সে কারো সাথে এই জন্যে সদ্ব্যবহার করে না যে, তার উপর তার অনুগ্রহ রয়েছে, বরং ঐ ক্ষেত্রেও সে পরকালে জান্নাত লাভের আশা পোষণ করে এবং সেখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সন্তুষ্টি ও সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “অচিরেই এই ধরনের গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তি সন্তোষ লাভ করবে।” অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এই আয়াত হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর শানে নাযিল হয়। এমনকি কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এ ব্যাপারে সবারই মতৈক্য রয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এসবগুণ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) অবশ্যই রয়েছেন। কিন্তু এখানে সাধারণভাবে সকল উম্মতের কথা বলা হয়েছে। তবে হযরত আবু বকর (রাঃ) সবারই প্রথমে রয়েছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সিদ্দীক, পরহেযগার ও দানশীল। নিজের ধন মাল তিনি মহান প্রতিপালকের আনুগত্যে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্যার্থে মন খুলে দান করতেন। প্রত্যেকের সাথে তিনি সদ্ব্যবহার করতেন। এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার আশা করতেন না। কোন বিনিময় তিনি চাইতেন না। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য। ছোট হোক আর বড় হোক প্রত্যেকেরই উপর হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর অনুগ্রহের ছোঁয়া ছিল। শকীফ গোত্রপতি উরওয়া ইবনে মাসউদকে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) কিছু কড়া কথা শুনিয়ে ছিলেন। এবং ধমকিয়ে ছিলেন। তখন উরওয়া বলেছিলঃ “আমার উপর আপনার এমন কিছু অনুগ্রহ রয়েছে যার প্রতিদান দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি তা না হতো তবে আপনাকে অবশ্যই আমি জবাব দিতাম।” একজন বিশিষ্ট গোত্রপতির উপরও যখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর এমন অনুগ্রহ ছিল যে, তার সামনে তার মাথা উঁচু করে কথা বলার ক্ষমতা ছিল, তখন অন্যদের কথা আর কি বলা যাবে? এজন্যেই বলা হয়েছে যে, কারো প্রতি অনুগ্রহের বিনিময়ে পার্থিব কোন উপকার বা প্রতিদান তিনি চাইতেন না। শুধু আল্লাহর দীদার লাভই ছিল তার কাম্য।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জোড়া দান করবে তাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতের রক্ষক ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এ দিকে আসুন। এই দরজা সবচেয়ে উত্তম।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন ব্যক্তিকে কি সকল দরজা থেকে আহ্বান করা হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আর আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, তুমিও হবে তাদের অন্তর্ভুক্ত।

আল-লাইল 92:13

১২-২১ নং আয়াতের তাফসীরকাতাদা (রঃ) বলেন যে,(আরবি) এর ভাবার্থ হলোঃ আমার কাজ তো শুধু হালাল হারাম প্রকাশ করে দেয়া। এটাও অর্থ হয় যে, যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথে চলেছে নিশ্চয়ই তার আল্লাহর সঙ্গে মিলন ঘটবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তো পরলোকের ও ইহলোকের মালিক। আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি।মুসনাদে আহমদে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ভাষণে বলতে শুনেনঃ “(হে জনমণ্ডলী!) আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করছি।” তিনি একথা এতো উচ্চস্বরে বলছিলেন যে, বাজার থেকেও লোক তাঁর কথা শুনতে পাচ্ছিল। তিনি একথা বারবার বলছিলেন এমন কি তাঁর চাদর মুবারক তাঁর কাঁধ থেকে লুটিয়ে পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন যে জাহান্নামী ব্যক্তি সবচেয়ে কম শাস্তি প্রাপ্ত হবে তার পদদ্বয়ের নিচে দু'টুকরো অগ্নি স্ফুলিঙ্গ রাখা হবে, ঐ আগুনের তাপে লোকটির মগজ ফুটতে থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ মুসলিমে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যেই জাহান্নামীকে সবচেয়ে হালকা শাস্তি দেয়া হবে তার পদদ্বয়ে আগুনের এক জোড়া ফিতাযুক্ত সেণ্ডেল পরিয়ে দেয়া হবে, সেই আগুনের তাপে তার মাথার মগজ উনুনের উপরের হাঁড়ির পানির মত টগবগ করে ফুটতে থাকবে। যদিও তাকে সবচেয়ে কম শাস্তি দেয়া হবে তবুও সে মনে করবে যে, তার চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কাউকেও দেয়া হচ্ছে না।" মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেন, তাতে প্রবেশ করবে সেই নিতান্ত যে হতভাগা। অর্থাৎ এই জাহান্নামে শুধু ঐ লোকদেরকে পরিবেষ্টিত করে শাস্তি দেয়া হবে যারা অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। যারা ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমল করে না।মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শুধু শকী বা বদকার লোক ছাড়া কেউ জাহান্নামে যাবে না।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “শকী বা বদকার লোক কে?" উত্তরে তিনি বললেনঃ যে আনুগত্যপরায়ণ নয় এবং আল্লাহর ভয়ে যে পাপ কাজ হতে বিরত থাকে।”মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু তারা প্রবেশ করবে না যারা অস্বীকার করে।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অস্বীকারকারী কারা? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যারা আমার আনুগত্য করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যারা আমার নাফরমানী করেছে তারাই অস্বীকারকারী।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আর জাহান্নাম হতে বহু দূরে রাখা হবে পরম ' মুত্তাকীকে। যে নিজেকে ও নিজের ধন সম্পদকে পবিত্র করার জন্যে, দ্বীন দুনিয়ার পবিত্রতা লাভের জন্যে নিজের ধন মালকে আল্লাহর পথে দান করে। আর সে কারো সাথে এই জন্যে সদ্ব্যবহার করে না যে, তার উপর তার অনুগ্রহ রয়েছে, বরং ঐ ক্ষেত্রেও সে পরকালে জান্নাত লাভের আশা পোষণ করে এবং সেখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সন্তুষ্টি ও সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “অচিরেই এই ধরনের গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তি সন্তোষ লাভ করবে।” অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এই আয়াত হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর শানে নাযিল হয়। এমনকি কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এ ব্যাপারে সবারই মতৈক্য রয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এসবগুণ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) অবশ্যই রয়েছেন। কিন্তু এখানে সাধারণভাবে সকল উম্মতের কথা বলা হয়েছে। তবে হযরত আবু বকর (রাঃ) সবারই প্রথমে রয়েছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সিদ্দীক, পরহেযগার ও দানশীল। নিজের ধন মাল তিনি মহান প্রতিপালকের আনুগত্যে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্যার্থে মন খুলে দান করতেন। প্রত্যেকের সাথে তিনি সদ্ব্যবহার করতেন। এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার আশা করতেন না। কোন বিনিময় তিনি চাইতেন না। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য। ছোট হোক আর বড় হোক প্রত্যেকেরই উপর হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর অনুগ্রহের ছোঁয়া ছিল। শকীফ গোত্রপতি উরওয়া ইবনে মাসউদকে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) কিছু কড়া কথা শুনিয়ে ছিলেন। এবং ধমকিয়ে ছিলেন। তখন উরওয়া বলেছিলঃ “আমার উপর আপনার এমন কিছু অনুগ্রহ রয়েছে যার প্রতিদান দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি তা না হতো তবে আপনাকে অবশ্যই আমি জবাব দিতাম।” একজন বিশিষ্ট গোত্রপতির উপরও যখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর এমন অনুগ্রহ ছিল যে, তার সামনে তার মাথা উঁচু করে কথা বলার ক্ষমতা ছিল, তখন অন্যদের কথা আর কি বলা যাবে? এজন্যেই বলা হয়েছে যে, কারো প্রতি অনুগ্রহের বিনিময়ে পার্থিব কোন উপকার বা প্রতিদান তিনি চাইতেন না। শুধু আল্লাহর দীদার লাভই ছিল তার কাম্য।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জোড়া দান করবে তাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতের রক্ষক ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এ দিকে আসুন। এই দরজা সবচেয়ে উত্তম।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন ব্যক্তিকে কি সকল দরজা থেকে আহ্বান করা হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আর আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, তুমিও হবে তাদের অন্তর্ভুক্ত।

আল-লাইল 92:14

১২-২১ নং আয়াতের তাফসীরকাতাদা (রঃ) বলেন যে,(আরবি) এর ভাবার্থ হলোঃ আমার কাজ তো শুধু হালাল হারাম প্রকাশ করে দেয়া। এটাও অর্থ হয় যে, যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথে চলেছে নিশ্চয়ই তার আল্লাহর সঙ্গে মিলন ঘটবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তো পরলোকের ও ইহলোকের মালিক। আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি।মুসনাদে আহমদে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ভাষণে বলতে শুনেনঃ “(হে জনমণ্ডলী!) আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করছি।” তিনি একথা এতো উচ্চস্বরে বলছিলেন যে, বাজার থেকেও লোক তাঁর কথা শুনতে পাচ্ছিল। তিনি একথা বারবার বলছিলেন এমন কি তাঁর চাদর মুবারক তাঁর কাঁধ থেকে লুটিয়ে পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন যে জাহান্নামী ব্যক্তি সবচেয়ে কম শাস্তি প্রাপ্ত হবে তার পদদ্বয়ের নিচে দু'টুকরো অগ্নি স্ফুলিঙ্গ রাখা হবে, ঐ আগুনের তাপে লোকটির মগজ ফুটতে থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ মুসলিমে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যেই জাহান্নামীকে সবচেয়ে হালকা শাস্তি দেয়া হবে তার পদদ্বয়ে আগুনের এক জোড়া ফিতাযুক্ত সেণ্ডেল পরিয়ে দেয়া হবে, সেই আগুনের তাপে তার মাথার মগজ উনুনের উপরের হাঁড়ির পানির মত টগবগ করে ফুটতে থাকবে। যদিও তাকে সবচেয়ে কম শাস্তি দেয়া হবে তবুও সে মনে করবে যে, তার চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কাউকেও দেয়া হচ্ছে না।" মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেন, তাতে প্রবেশ করবে সেই নিতান্ত যে হতভাগা। অর্থাৎ এই জাহান্নামে শুধু ঐ লোকদেরকে পরিবেষ্টিত করে শাস্তি দেয়া হবে যারা অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। যারা ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমল করে না।মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শুধু শকী বা বদকার লোক ছাড়া কেউ জাহান্নামে যাবে না।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “শকী বা বদকার লোক কে?" উত্তরে তিনি বললেনঃ যে আনুগত্যপরায়ণ নয় এবং আল্লাহর ভয়ে যে পাপ কাজ হতে বিরত থাকে।”মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু তারা প্রবেশ করবে না যারা অস্বীকার করে।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অস্বীকারকারী কারা? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যারা আমার আনুগত্য করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যারা আমার নাফরমানী করেছে তারাই অস্বীকারকারী।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আর জাহান্নাম হতে বহু দূরে রাখা হবে পরম ' মুত্তাকীকে। যে নিজেকে ও নিজের ধন সম্পদকে পবিত্র করার জন্যে, দ্বীন দুনিয়ার পবিত্রতা লাভের জন্যে নিজের ধন মালকে আল্লাহর পথে দান করে। আর সে কারো সাথে এই জন্যে সদ্ব্যবহার করে না যে, তার উপর তার অনুগ্রহ রয়েছে, বরং ঐ ক্ষেত্রেও সে পরকালে জান্নাত লাভের আশা পোষণ করে এবং সেখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সন্তুষ্টি ও সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “অচিরেই এই ধরনের গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তি সন্তোষ লাভ করবে।” অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এই আয়াত হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর শানে নাযিল হয়। এমনকি কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এ ব্যাপারে সবারই মতৈক্য রয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এসবগুণ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) অবশ্যই রয়েছেন। কিন্তু এখানে সাধারণভাবে সকল উম্মতের কথা বলা হয়েছে। তবে হযরত আবু বকর (রাঃ) সবারই প্রথমে রয়েছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সিদ্দীক, পরহেযগার ও দানশীল। নিজের ধন মাল তিনি মহান প্রতিপালকের আনুগত্যে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্যার্থে মন খুলে দান করতেন। প্রত্যেকের সাথে তিনি সদ্ব্যবহার করতেন। এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার আশা করতেন না। কোন বিনিময় তিনি চাইতেন না। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য। ছোট হোক আর বড় হোক প্রত্যেকেরই উপর হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর অনুগ্রহের ছোঁয়া ছিল। শকীফ গোত্রপতি উরওয়া ইবনে মাসউদকে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) কিছু কড়া কথা শুনিয়ে ছিলেন। এবং ধমকিয়ে ছিলেন। তখন উরওয়া বলেছিলঃ “আমার উপর আপনার এমন কিছু অনুগ্রহ রয়েছে যার প্রতিদান দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি তা না হতো তবে আপনাকে অবশ্যই আমি জবাব দিতাম।” একজন বিশিষ্ট গোত্রপতির উপরও যখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর এমন অনুগ্রহ ছিল যে, তার সামনে তার মাথা উঁচু করে কথা বলার ক্ষমতা ছিল, তখন অন্যদের কথা আর কি বলা যাবে? এজন্যেই বলা হয়েছে যে, কারো প্রতি অনুগ্রহের বিনিময়ে পার্থিব কোন উপকার বা প্রতিদান তিনি চাইতেন না। শুধু আল্লাহর দীদার লাভই ছিল তার কাম্য।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জোড়া দান করবে তাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতের রক্ষক ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এ দিকে আসুন। এই দরজা সবচেয়ে উত্তম।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন ব্যক্তিকে কি সকল দরজা থেকে আহ্বান করা হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আর আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, তুমিও হবে তাদের অন্তর্ভুক্ত।

আল-লাইল 92:15

১২-২১ নং আয়াতের তাফসীরকাতাদা (রঃ) বলেন যে,(আরবি) এর ভাবার্থ হলোঃ আমার কাজ তো শুধু হালাল হারাম প্রকাশ করে দেয়া। এটাও অর্থ হয় যে, যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথে চলেছে নিশ্চয়ই তার আল্লাহর সঙ্গে মিলন ঘটবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তো পরলোকের ও ইহলোকের মালিক। আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি।মুসনাদে আহমদে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ভাষণে বলতে শুনেনঃ “(হে জনমণ্ডলী!) আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করছি।” তিনি একথা এতো উচ্চস্বরে বলছিলেন যে, বাজার থেকেও লোক তাঁর কথা শুনতে পাচ্ছিল। তিনি একথা বারবার বলছিলেন এমন কি তাঁর চাদর মুবারক তাঁর কাঁধ থেকে লুটিয়ে পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন যে জাহান্নামী ব্যক্তি সবচেয়ে কম শাস্তি প্রাপ্ত হবে তার পদদ্বয়ের নিচে দু'টুকরো অগ্নি স্ফুলিঙ্গ রাখা হবে, ঐ আগুনের তাপে লোকটির মগজ ফুটতে থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ মুসলিমে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যেই জাহান্নামীকে সবচেয়ে হালকা শাস্তি দেয়া হবে তার পদদ্বয়ে আগুনের এক জোড়া ফিতাযুক্ত সেণ্ডেল পরিয়ে দেয়া হবে, সেই আগুনের তাপে তার মাথার মগজ উনুনের উপরের হাঁড়ির পানির মত টগবগ করে ফুটতে থাকবে। যদিও তাকে সবচেয়ে কম শাস্তি দেয়া হবে তবুও সে মনে করবে যে, তার চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কাউকেও দেয়া হচ্ছে না।" মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেন, তাতে প্রবেশ করবে সেই নিতান্ত যে হতভাগা। অর্থাৎ এই জাহান্নামে শুধু ঐ লোকদেরকে পরিবেষ্টিত করে শাস্তি দেয়া হবে যারা অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। যারা ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমল করে না।মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শুধু শকী বা বদকার লোক ছাড়া কেউ জাহান্নামে যাবে না।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “শকী বা বদকার লোক কে?" উত্তরে তিনি বললেনঃ যে আনুগত্যপরায়ণ নয় এবং আল্লাহর ভয়ে যে পাপ কাজ হতে বিরত থাকে।”মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু তারা প্রবেশ করবে না যারা অস্বীকার করে।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অস্বীকারকারী কারা? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যারা আমার আনুগত্য করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যারা আমার নাফরমানী করেছে তারাই অস্বীকারকারী।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আর জাহান্নাম হতে বহু দূরে রাখা হবে পরম ' মুত্তাকীকে। যে নিজেকে ও নিজের ধন সম্পদকে পবিত্র করার জন্যে, দ্বীন দুনিয়ার পবিত্রতা লাভের জন্যে নিজের ধন মালকে আল্লাহর পথে দান করে। আর সে কারো সাথে এই জন্যে সদ্ব্যবহার করে না যে, তার উপর তার অনুগ্রহ রয়েছে, বরং ঐ ক্ষেত্রেও সে পরকালে জান্নাত লাভের আশা পোষণ করে এবং সেখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সন্তুষ্টি ও সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “অচিরেই এই ধরনের গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তি সন্তোষ লাভ করবে।” অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এই আয়াত হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর শানে নাযিল হয়। এমনকি কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এ ব্যাপারে সবারই মতৈক্য রয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এসবগুণ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) অবশ্যই রয়েছেন। কিন্তু এখানে সাধারণভাবে সকল উম্মতের কথা বলা হয়েছে। তবে হযরত আবু বকর (রাঃ) সবারই প্রথমে রয়েছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সিদ্দীক, পরহেযগার ও দানশীল। নিজের ধন মাল তিনি মহান প্রতিপালকের আনুগত্যে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্যার্থে মন খুলে দান করতেন। প্রত্যেকের সাথে তিনি সদ্ব্যবহার করতেন। এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার আশা করতেন না। কোন বিনিময় তিনি চাইতেন না। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য। ছোট হোক আর বড় হোক প্রত্যেকেরই উপর হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর অনুগ্রহের ছোঁয়া ছিল। শকীফ গোত্রপতি উরওয়া ইবনে মাসউদকে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) কিছু কড়া কথা শুনিয়ে ছিলেন। এবং ধমকিয়ে ছিলেন। তখন উরওয়া বলেছিলঃ “আমার উপর আপনার এমন কিছু অনুগ্রহ রয়েছে যার প্রতিদান দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি তা না হতো তবে আপনাকে অবশ্যই আমি জবাব দিতাম।” একজন বিশিষ্ট গোত্রপতির উপরও যখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর এমন অনুগ্রহ ছিল যে, তার সামনে তার মাথা উঁচু করে কথা বলার ক্ষমতা ছিল, তখন অন্যদের কথা আর কি বলা যাবে? এজন্যেই বলা হয়েছে যে, কারো প্রতি অনুগ্রহের বিনিময়ে পার্থিব কোন উপকার বা প্রতিদান তিনি চাইতেন না। শুধু আল্লাহর দীদার লাভই ছিল তার কাম্য।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জোড়া দান করবে তাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতের রক্ষক ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এ দিকে আসুন। এই দরজা সবচেয়ে উত্তম।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন ব্যক্তিকে কি সকল দরজা থেকে আহ্বান করা হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আর আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, তুমিও হবে তাদের অন্তর্ভুক্ত।

আল-লাইল 92:16

১২-২১ নং আয়াতের তাফসীরকাতাদা (রঃ) বলেন যে,(আরবি) এর ভাবার্থ হলোঃ আমার কাজ তো শুধু হালাল হারাম প্রকাশ করে দেয়া। এটাও অর্থ হয় যে, যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথে চলেছে নিশ্চয়ই তার আল্লাহর সঙ্গে মিলন ঘটবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তো পরলোকের ও ইহলোকের মালিক। আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি।মুসনাদে আহমদে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ভাষণে বলতে শুনেনঃ “(হে জনমণ্ডলী!) আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করছি।” তিনি একথা এতো উচ্চস্বরে বলছিলেন যে, বাজার থেকেও লোক তাঁর কথা শুনতে পাচ্ছিল। তিনি একথা বারবার বলছিলেন এমন কি তাঁর চাদর মুবারক তাঁর কাঁধ থেকে লুটিয়ে পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন যে জাহান্নামী ব্যক্তি সবচেয়ে কম শাস্তি প্রাপ্ত হবে তার পদদ্বয়ের নিচে দু'টুকরো অগ্নি স্ফুলিঙ্গ রাখা হবে, ঐ আগুনের তাপে লোকটির মগজ ফুটতে থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ মুসলিমে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যেই জাহান্নামীকে সবচেয়ে হালকা শাস্তি দেয়া হবে তার পদদ্বয়ে আগুনের এক জোড়া ফিতাযুক্ত সেণ্ডেল পরিয়ে দেয়া হবে, সেই আগুনের তাপে তার মাথার মগজ উনুনের উপরের হাঁড়ির পানির মত টগবগ করে ফুটতে থাকবে। যদিও তাকে সবচেয়ে কম শাস্তি দেয়া হবে তবুও সে মনে করবে যে, তার চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কাউকেও দেয়া হচ্ছে না।" মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেন, তাতে প্রবেশ করবে সেই নিতান্ত যে হতভাগা। অর্থাৎ এই জাহান্নামে শুধু ঐ লোকদেরকে পরিবেষ্টিত করে শাস্তি দেয়া হবে যারা অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। যারা ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমল করে না।মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শুধু শকী বা বদকার লোক ছাড়া কেউ জাহান্নামে যাবে না।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “শকী বা বদকার লোক কে?" উত্তরে তিনি বললেনঃ যে আনুগত্যপরায়ণ নয় এবং আল্লাহর ভয়ে যে পাপ কাজ হতে বিরত থাকে।”মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু তারা প্রবেশ করবে না যারা অস্বীকার করে।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অস্বীকারকারী কারা? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যারা আমার আনুগত্য করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যারা আমার নাফরমানী করেছে তারাই অস্বীকারকারী।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আর জাহান্নাম হতে বহু দূরে রাখা হবে পরম ' মুত্তাকীকে। যে নিজেকে ও নিজের ধন সম্পদকে পবিত্র করার জন্যে, দ্বীন দুনিয়ার পবিত্রতা লাভের জন্যে নিজের ধন মালকে আল্লাহর পথে দান করে। আর সে কারো সাথে এই জন্যে সদ্ব্যবহার করে না যে, তার উপর তার অনুগ্রহ রয়েছে, বরং ঐ ক্ষেত্রেও সে পরকালে জান্নাত লাভের আশা পোষণ করে এবং সেখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সন্তুষ্টি ও সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “অচিরেই এই ধরনের গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তি সন্তোষ লাভ করবে।” অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এই আয়াত হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর শানে নাযিল হয়। এমনকি কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এ ব্যাপারে সবারই মতৈক্য রয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এসবগুণ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) অবশ্যই রয়েছেন। কিন্তু এখানে সাধারণভাবে সকল উম্মতের কথা বলা হয়েছে। তবে হযরত আবু বকর (রাঃ) সবারই প্রথমে রয়েছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সিদ্দীক, পরহেযগার ও দানশীল। নিজের ধন মাল তিনি মহান প্রতিপালকের আনুগত্যে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্যার্থে মন খুলে দান করতেন। প্রত্যেকের সাথে তিনি সদ্ব্যবহার করতেন। এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার আশা করতেন না। কোন বিনিময় তিনি চাইতেন না। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য। ছোট হোক আর বড় হোক প্রত্যেকেরই উপর হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর অনুগ্রহের ছোঁয়া ছিল। শকীফ গোত্রপতি উরওয়া ইবনে মাসউদকে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) কিছু কড়া কথা শুনিয়ে ছিলেন। এবং ধমকিয়ে ছিলেন। তখন উরওয়া বলেছিলঃ “আমার উপর আপনার এমন কিছু অনুগ্রহ রয়েছে যার প্রতিদান দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি তা না হতো তবে আপনাকে অবশ্যই আমি জবাব দিতাম।” একজন বিশিষ্ট গোত্রপতির উপরও যখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর এমন অনুগ্রহ ছিল যে, তার সামনে তার মাথা উঁচু করে কথা বলার ক্ষমতা ছিল, তখন অন্যদের কথা আর কি বলা যাবে? এজন্যেই বলা হয়েছে যে, কারো প্রতি অনুগ্রহের বিনিময়ে পার্থিব কোন উপকার বা প্রতিদান তিনি চাইতেন না। শুধু আল্লাহর দীদার লাভই ছিল তার কাম্য।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জোড়া দান করবে তাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতের রক্ষক ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এ দিকে আসুন। এই দরজা সবচেয়ে উত্তম।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন ব্যক্তিকে কি সকল দরজা থেকে আহ্বান করা হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আর আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, তুমিও হবে তাদের অন্তর্ভুক্ত।

আল-লাইল 92:17

১২-২১ নং আয়াতের তাফসীরকাতাদা (রঃ) বলেন যে,(আরবি) এর ভাবার্থ হলোঃ আমার কাজ তো শুধু হালাল হারাম প্রকাশ করে দেয়া। এটাও অর্থ হয় যে, যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথে চলেছে নিশ্চয়ই তার আল্লাহর সঙ্গে মিলন ঘটবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তো পরলোকের ও ইহলোকের মালিক। আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি।মুসনাদে আহমদে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ভাষণে বলতে শুনেনঃ “(হে জনমণ্ডলী!) আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করছি।” তিনি একথা এতো উচ্চস্বরে বলছিলেন যে, বাজার থেকেও লোক তাঁর কথা শুনতে পাচ্ছিল। তিনি একথা বারবার বলছিলেন এমন কি তাঁর চাদর মুবারক তাঁর কাঁধ থেকে লুটিয়ে পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন যে জাহান্নামী ব্যক্তি সবচেয়ে কম শাস্তি প্রাপ্ত হবে তার পদদ্বয়ের নিচে দু'টুকরো অগ্নি স্ফুলিঙ্গ রাখা হবে, ঐ আগুনের তাপে লোকটির মগজ ফুটতে থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ মুসলিমে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যেই জাহান্নামীকে সবচেয়ে হালকা শাস্তি দেয়া হবে তার পদদ্বয়ে আগুনের এক জোড়া ফিতাযুক্ত সেণ্ডেল পরিয়ে দেয়া হবে, সেই আগুনের তাপে তার মাথার মগজ উনুনের উপরের হাঁড়ির পানির মত টগবগ করে ফুটতে থাকবে। যদিও তাকে সবচেয়ে কম শাস্তি দেয়া হবে তবুও সে মনে করবে যে, তার চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কাউকেও দেয়া হচ্ছে না।" মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেন, তাতে প্রবেশ করবে সেই নিতান্ত যে হতভাগা। অর্থাৎ এই জাহান্নামে শুধু ঐ লোকদেরকে পরিবেষ্টিত করে শাস্তি দেয়া হবে যারা অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। যারা ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমল করে না।মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শুধু শকী বা বদকার লোক ছাড়া কেউ জাহান্নামে যাবে না।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “শকী বা বদকার লোক কে?" উত্তরে তিনি বললেনঃ যে আনুগত্যপরায়ণ নয় এবং আল্লাহর ভয়ে যে পাপ কাজ হতে বিরত থাকে।”মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু তারা প্রবেশ করবে না যারা অস্বীকার করে।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অস্বীকারকারী কারা? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যারা আমার আনুগত্য করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যারা আমার নাফরমানী করেছে তারাই অস্বীকারকারী।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আর জাহান্নাম হতে বহু দূরে রাখা হবে পরম ' মুত্তাকীকে। যে নিজেকে ও নিজের ধন সম্পদকে পবিত্র করার জন্যে, দ্বীন দুনিয়ার পবিত্রতা লাভের জন্যে নিজের ধন মালকে আল্লাহর পথে দান করে। আর সে কারো সাথে এই জন্যে সদ্ব্যবহার করে না যে, তার উপর তার অনুগ্রহ রয়েছে, বরং ঐ ক্ষেত্রেও সে পরকালে জান্নাত লাভের আশা পোষণ করে এবং সেখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সন্তুষ্টি ও সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “অচিরেই এই ধরনের গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তি সন্তোষ লাভ করবে।” অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এই আয়াত হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর শানে নাযিল হয়। এমনকি কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এ ব্যাপারে সবারই মতৈক্য রয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এসবগুণ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) অবশ্যই রয়েছেন। কিন্তু এখানে সাধারণভাবে সকল উম্মতের কথা বলা হয়েছে। তবে হযরত আবু বকর (রাঃ) সবারই প্রথমে রয়েছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সিদ্দীক, পরহেযগার ও দানশীল। নিজের ধন মাল তিনি মহান প্রতিপালকের আনুগত্যে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্যার্থে মন খুলে দান করতেন। প্রত্যেকের সাথে তিনি সদ্ব্যবহার করতেন। এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার আশা করতেন না। কোন বিনিময় তিনি চাইতেন না। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য। ছোট হোক আর বড় হোক প্রত্যেকেরই উপর হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর অনুগ্রহের ছোঁয়া ছিল। শকীফ গোত্রপতি উরওয়া ইবনে মাসউদকে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) কিছু কড়া কথা শুনিয়ে ছিলেন। এবং ধমকিয়ে ছিলেন। তখন উরওয়া বলেছিলঃ “আমার উপর আপনার এমন কিছু অনুগ্রহ রয়েছে যার প্রতিদান দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি তা না হতো তবে আপনাকে অবশ্যই আমি জবাব দিতাম।” একজন বিশিষ্ট গোত্রপতির উপরও যখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর এমন অনুগ্রহ ছিল যে, তার সামনে তার মাথা উঁচু করে কথা বলার ক্ষমতা ছিল, তখন অন্যদের কথা আর কি বলা যাবে? এজন্যেই বলা হয়েছে যে, কারো প্রতি অনুগ্রহের বিনিময়ে পার্থিব কোন উপকার বা প্রতিদান তিনি চাইতেন না। শুধু আল্লাহর দীদার লাভই ছিল তার কাম্য।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জোড়া দান করবে তাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতের রক্ষক ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এ দিকে আসুন। এই দরজা সবচেয়ে উত্তম।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন ব্যক্তিকে কি সকল দরজা থেকে আহ্বান করা হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আর আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, তুমিও হবে তাদের অন্তর্ভুক্ত।

আল-লাইল 92:18

১২-২১ নং আয়াতের তাফসীরকাতাদা (রঃ) বলেন যে,(আরবি) এর ভাবার্থ হলোঃ আমার কাজ তো শুধু হালাল হারাম প্রকাশ করে দেয়া। এটাও অর্থ হয় যে, যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথে চলেছে নিশ্চয়ই তার আল্লাহর সঙ্গে মিলন ঘটবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তো পরলোকের ও ইহলোকের মালিক। আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি।মুসনাদে আহমদে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ভাষণে বলতে শুনেনঃ “(হে জনমণ্ডলী!) আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করছি।” তিনি একথা এতো উচ্চস্বরে বলছিলেন যে, বাজার থেকেও লোক তাঁর কথা শুনতে পাচ্ছিল। তিনি একথা বারবার বলছিলেন এমন কি তাঁর চাদর মুবারক তাঁর কাঁধ থেকে লুটিয়ে পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন যে জাহান্নামী ব্যক্তি সবচেয়ে কম শাস্তি প্রাপ্ত হবে তার পদদ্বয়ের নিচে দু'টুকরো অগ্নি স্ফুলিঙ্গ রাখা হবে, ঐ আগুনের তাপে লোকটির মগজ ফুটতে থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ মুসলিমে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যেই জাহান্নামীকে সবচেয়ে হালকা শাস্তি দেয়া হবে তার পদদ্বয়ে আগুনের এক জোড়া ফিতাযুক্ত সেণ্ডেল পরিয়ে দেয়া হবে, সেই আগুনের তাপে তার মাথার মগজ উনুনের উপরের হাঁড়ির পানির মত টগবগ করে ফুটতে থাকবে। যদিও তাকে সবচেয়ে কম শাস্তি দেয়া হবে তবুও সে মনে করবে যে, তার চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কাউকেও দেয়া হচ্ছে না।" মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেন, তাতে প্রবেশ করবে সেই নিতান্ত যে হতভাগা। অর্থাৎ এই জাহান্নামে শুধু ঐ লোকদেরকে পরিবেষ্টিত করে শাস্তি দেয়া হবে যারা অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। যারা ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমল করে না।মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শুধু শকী বা বদকার লোক ছাড়া কেউ জাহান্নামে যাবে না।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “শকী বা বদকার লোক কে?" উত্তরে তিনি বললেনঃ যে আনুগত্যপরায়ণ নয় এবং আল্লাহর ভয়ে যে পাপ কাজ হতে বিরত থাকে।”মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু তারা প্রবেশ করবে না যারা অস্বীকার করে।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অস্বীকারকারী কারা? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যারা আমার আনুগত্য করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যারা আমার নাফরমানী করেছে তারাই অস্বীকারকারী।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আর জাহান্নাম হতে বহু দূরে রাখা হবে পরম ' মুত্তাকীকে। যে নিজেকে ও নিজের ধন সম্পদকে পবিত্র করার জন্যে, দ্বীন দুনিয়ার পবিত্রতা লাভের জন্যে নিজের ধন মালকে আল্লাহর পথে দান করে। আর সে কারো সাথে এই জন্যে সদ্ব্যবহার করে না যে, তার উপর তার অনুগ্রহ রয়েছে, বরং ঐ ক্ষেত্রেও সে পরকালে জান্নাত লাভের আশা পোষণ করে এবং সেখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সন্তুষ্টি ও সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “অচিরেই এই ধরনের গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তি সন্তোষ লাভ করবে।” অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এই আয়াত হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর শানে নাযিল হয়। এমনকি কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এ ব্যাপারে সবারই মতৈক্য রয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এসবগুণ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) অবশ্যই রয়েছেন। কিন্তু এখানে সাধারণভাবে সকল উম্মতের কথা বলা হয়েছে। তবে হযরত আবু বকর (রাঃ) সবারই প্রথমে রয়েছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সিদ্দীক, পরহেযগার ও দানশীল। নিজের ধন মাল তিনি মহান প্রতিপালকের আনুগত্যে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্যার্থে মন খুলে দান করতেন। প্রত্যেকের সাথে তিনি সদ্ব্যবহার করতেন। এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার আশা করতেন না। কোন বিনিময় তিনি চাইতেন না। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য। ছোট হোক আর বড় হোক প্রত্যেকেরই উপর হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর অনুগ্রহের ছোঁয়া ছিল। শকীফ গোত্রপতি উরওয়া ইবনে মাসউদকে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) কিছু কড়া কথা শুনিয়ে ছিলেন। এবং ধমকিয়ে ছিলেন। তখন উরওয়া বলেছিলঃ “আমার উপর আপনার এমন কিছু অনুগ্রহ রয়েছে যার প্রতিদান দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি তা না হতো তবে আপনাকে অবশ্যই আমি জবাব দিতাম।” একজন বিশিষ্ট গোত্রপতির উপরও যখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর এমন অনুগ্রহ ছিল যে, তার সামনে তার মাথা উঁচু করে কথা বলার ক্ষমতা ছিল, তখন অন্যদের কথা আর কি বলা যাবে? এজন্যেই বলা হয়েছে যে, কারো প্রতি অনুগ্রহের বিনিময়ে পার্থিব কোন উপকার বা প্রতিদান তিনি চাইতেন না। শুধু আল্লাহর দীদার লাভই ছিল তার কাম্য।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জোড়া দান করবে তাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতের রক্ষক ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এ দিকে আসুন। এই দরজা সবচেয়ে উত্তম।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন ব্যক্তিকে কি সকল দরজা থেকে আহ্বান করা হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আর আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, তুমিও হবে তাদের অন্তর্ভুক্ত।

আল-লাইল 92:19

১২-২১ নং আয়াতের তাফসীরকাতাদা (রঃ) বলেন যে,(আরবি) এর ভাবার্থ হলোঃ আমার কাজ তো শুধু হালাল হারাম প্রকাশ করে দেয়া। এটাও অর্থ হয় যে, যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথে চলেছে নিশ্চয়ই তার আল্লাহর সঙ্গে মিলন ঘটবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তো পরলোকের ও ইহলোকের মালিক। আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি।মুসনাদে আহমদে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ভাষণে বলতে শুনেনঃ “(হে জনমণ্ডলী!) আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করছি।” তিনি একথা এতো উচ্চস্বরে বলছিলেন যে, বাজার থেকেও লোক তাঁর কথা শুনতে পাচ্ছিল। তিনি একথা বারবার বলছিলেন এমন কি তাঁর চাদর মুবারক তাঁর কাঁধ থেকে লুটিয়ে পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন যে জাহান্নামী ব্যক্তি সবচেয়ে কম শাস্তি প্রাপ্ত হবে তার পদদ্বয়ের নিচে দু'টুকরো অগ্নি স্ফুলিঙ্গ রাখা হবে, ঐ আগুনের তাপে লোকটির মগজ ফুটতে থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ মুসলিমে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যেই জাহান্নামীকে সবচেয়ে হালকা শাস্তি দেয়া হবে তার পদদ্বয়ে আগুনের এক জোড়া ফিতাযুক্ত সেণ্ডেল পরিয়ে দেয়া হবে, সেই আগুনের তাপে তার মাথার মগজ উনুনের উপরের হাঁড়ির পানির মত টগবগ করে ফুটতে থাকবে। যদিও তাকে সবচেয়ে কম শাস্তি দেয়া হবে তবুও সে মনে করবে যে, তার চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কাউকেও দেয়া হচ্ছে না।" মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেন, তাতে প্রবেশ করবে সেই নিতান্ত যে হতভাগা। অর্থাৎ এই জাহান্নামে শুধু ঐ লোকদেরকে পরিবেষ্টিত করে শাস্তি দেয়া হবে যারা অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। যারা ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমল করে না।মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শুধু শকী বা বদকার লোক ছাড়া কেউ জাহান্নামে যাবে না।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “শকী বা বদকার লোক কে?" উত্তরে তিনি বললেনঃ যে আনুগত্যপরায়ণ নয় এবং আল্লাহর ভয়ে যে পাপ কাজ হতে বিরত থাকে।”মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু তারা প্রবেশ করবে না যারা অস্বীকার করে।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অস্বীকারকারী কারা? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যারা আমার আনুগত্য করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যারা আমার নাফরমানী করেছে তারাই অস্বীকারকারী।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আর জাহান্নাম হতে বহু দূরে রাখা হবে পরম ' মুত্তাকীকে। যে নিজেকে ও নিজের ধন সম্পদকে পবিত্র করার জন্যে, দ্বীন দুনিয়ার পবিত্রতা লাভের জন্যে নিজের ধন মালকে আল্লাহর পথে দান করে। আর সে কারো সাথে এই জন্যে সদ্ব্যবহার করে না যে, তার উপর তার অনুগ্রহ রয়েছে, বরং ঐ ক্ষেত্রেও সে পরকালে জান্নাত লাভের আশা পোষণ করে এবং সেখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সন্তুষ্টি ও সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “অচিরেই এই ধরনের গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তি সন্তোষ লাভ করবে।” অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এই আয়াত হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর শানে নাযিল হয়। এমনকি কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এ ব্যাপারে সবারই মতৈক্য রয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এসবগুণ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) অবশ্যই রয়েছেন। কিন্তু এখানে সাধারণভাবে সকল উম্মতের কথা বলা হয়েছে। তবে হযরত আবু বকর (রাঃ) সবারই প্রথমে রয়েছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সিদ্দীক, পরহেযগার ও দানশীল। নিজের ধন মাল তিনি মহান প্রতিপালকের আনুগত্যে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্যার্থে মন খুলে দান করতেন। প্রত্যেকের সাথে তিনি সদ্ব্যবহার করতেন। এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার আশা করতেন না। কোন বিনিময় তিনি চাইতেন না। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য। ছোট হোক আর বড় হোক প্রত্যেকেরই উপর হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর অনুগ্রহের ছোঁয়া ছিল। শকীফ গোত্রপতি উরওয়া ইবনে মাসউদকে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) কিছু কড়া কথা শুনিয়ে ছিলেন। এবং ধমকিয়ে ছিলেন। তখন উরওয়া বলেছিলঃ “আমার উপর আপনার এমন কিছু অনুগ্রহ রয়েছে যার প্রতিদান দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি তা না হতো তবে আপনাকে অবশ্যই আমি জবাব দিতাম।” একজন বিশিষ্ট গোত্রপতির উপরও যখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর এমন অনুগ্রহ ছিল যে, তার সামনে তার মাথা উঁচু করে কথা বলার ক্ষমতা ছিল, তখন অন্যদের কথা আর কি বলা যাবে? এজন্যেই বলা হয়েছে যে, কারো প্রতি অনুগ্রহের বিনিময়ে পার্থিব কোন উপকার বা প্রতিদান তিনি চাইতেন না। শুধু আল্লাহর দীদার লাভই ছিল তার কাম্য।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জোড়া দান করবে তাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতের রক্ষক ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এ দিকে আসুন। এই দরজা সবচেয়ে উত্তম।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন ব্যক্তিকে কি সকল দরজা থেকে আহ্বান করা হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আর আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, তুমিও হবে তাদের অন্তর্ভুক্ত।

আল-লাইল 92:20

১২-২১ নং আয়াতের তাফসীরকাতাদা (রঃ) বলেন যে,(আরবি) এর ভাবার্থ হলোঃ আমার কাজ তো শুধু হালাল হারাম প্রকাশ করে দেয়া। এটাও অর্থ হয় যে, যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথে চলেছে নিশ্চয়ই তার আল্লাহর সঙ্গে মিলন ঘটবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তো পরলোকের ও ইহলোকের মালিক। আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি।মুসনাদে আহমদে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ভাষণে বলতে শুনেনঃ “(হে জনমণ্ডলী!) আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করছি।” তিনি একথা এতো উচ্চস্বরে বলছিলেন যে, বাজার থেকেও লোক তাঁর কথা শুনতে পাচ্ছিল। তিনি একথা বারবার বলছিলেন এমন কি তাঁর চাদর মুবারক তাঁর কাঁধ থেকে লুটিয়ে পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন যে জাহান্নামী ব্যক্তি সবচেয়ে কম শাস্তি প্রাপ্ত হবে তার পদদ্বয়ের নিচে দু'টুকরো অগ্নি স্ফুলিঙ্গ রাখা হবে, ঐ আগুনের তাপে লোকটির মগজ ফুটতে থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ মুসলিমে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যেই জাহান্নামীকে সবচেয়ে হালকা শাস্তি দেয়া হবে তার পদদ্বয়ে আগুনের এক জোড়া ফিতাযুক্ত সেণ্ডেল পরিয়ে দেয়া হবে, সেই আগুনের তাপে তার মাথার মগজ উনুনের উপরের হাঁড়ির পানির মত টগবগ করে ফুটতে থাকবে। যদিও তাকে সবচেয়ে কম শাস্তি দেয়া হবে তবুও সে মনে করবে যে, তার চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কাউকেও দেয়া হচ্ছে না।" মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেন, তাতে প্রবেশ করবে সেই নিতান্ত যে হতভাগা। অর্থাৎ এই জাহান্নামে শুধু ঐ লোকদেরকে পরিবেষ্টিত করে শাস্তি দেয়া হবে যারা অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। যারা ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমল করে না।মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শুধু শকী বা বদকার লোক ছাড়া কেউ জাহান্নামে যাবে না।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “শকী বা বদকার লোক কে?" উত্তরে তিনি বললেনঃ যে আনুগত্যপরায়ণ নয় এবং আল্লাহর ভয়ে যে পাপ কাজ হতে বিরত থাকে।”মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু তারা প্রবেশ করবে না যারা অস্বীকার করে।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অস্বীকারকারী কারা? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যারা আমার আনুগত্য করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যারা আমার নাফরমানী করেছে তারাই অস্বীকারকারী।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আর জাহান্নাম হতে বহু দূরে রাখা হবে পরম ' মুত্তাকীকে। যে নিজেকে ও নিজের ধন সম্পদকে পবিত্র করার জন্যে, দ্বীন দুনিয়ার পবিত্রতা লাভের জন্যে নিজের ধন মালকে আল্লাহর পথে দান করে। আর সে কারো সাথে এই জন্যে সদ্ব্যবহার করে না যে, তার উপর তার অনুগ্রহ রয়েছে, বরং ঐ ক্ষেত্রেও সে পরকালে জান্নাত লাভের আশা পোষণ করে এবং সেখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সন্তুষ্টি ও সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “অচিরেই এই ধরনের গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তি সন্তোষ লাভ করবে।” অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এই আয়াত হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর শানে নাযিল হয়। এমনকি কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এ ব্যাপারে সবারই মতৈক্য রয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এসবগুণ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) অবশ্যই রয়েছেন। কিন্তু এখানে সাধারণভাবে সকল উম্মতের কথা বলা হয়েছে। তবে হযরত আবু বকর (রাঃ) সবারই প্রথমে রয়েছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সিদ্দীক, পরহেযগার ও দানশীল। নিজের ধন মাল তিনি মহান প্রতিপালকের আনুগত্যে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্যার্থে মন খুলে দান করতেন। প্রত্যেকের সাথে তিনি সদ্ব্যবহার করতেন। এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার আশা করতেন না। কোন বিনিময় তিনি চাইতেন না। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য। ছোট হোক আর বড় হোক প্রত্যেকেরই উপর হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর অনুগ্রহের ছোঁয়া ছিল। শকীফ গোত্রপতি উরওয়া ইবনে মাসউদকে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) কিছু কড়া কথা শুনিয়ে ছিলেন। এবং ধমকিয়ে ছিলেন। তখন উরওয়া বলেছিলঃ “আমার উপর আপনার এমন কিছু অনুগ্রহ রয়েছে যার প্রতিদান দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি তা না হতো তবে আপনাকে অবশ্যই আমি জবাব দিতাম।” একজন বিশিষ্ট গোত্রপতির উপরও যখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর এমন অনুগ্রহ ছিল যে, তার সামনে তার মাথা উঁচু করে কথা বলার ক্ষমতা ছিল, তখন অন্যদের কথা আর কি বলা যাবে? এজন্যেই বলা হয়েছে যে, কারো প্রতি অনুগ্রহের বিনিময়ে পার্থিব কোন উপকার বা প্রতিদান তিনি চাইতেন না। শুধু আল্লাহর দীদার লাভই ছিল তার কাম্য।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জোড়া দান করবে তাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতের রক্ষক ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এ দিকে আসুন। এই দরজা সবচেয়ে উত্তম।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন ব্যক্তিকে কি সকল দরজা থেকে আহ্বান করা হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আর আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, তুমিও হবে তাদের অন্তর্ভুক্ত।

আল-লাইল 92:21

১২-২১ নং আয়াতের তাফসীরকাতাদা (রঃ) বলেন যে,(আরবি) এর ভাবার্থ হলোঃ আমার কাজ তো শুধু হালাল হারাম প্রকাশ করে দেয়া। এটাও অর্থ হয় যে, যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথে চলেছে নিশ্চয়ই তার আল্লাহর সঙ্গে মিলন ঘটবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তো পরলোকের ও ইহলোকের মালিক। আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি।মুসনাদে আহমদে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ভাষণে বলতে শুনেনঃ “(হে জনমণ্ডলী!) আমি তোমাদেরকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করছি।” তিনি একথা এতো উচ্চস্বরে বলছিলেন যে, বাজার থেকেও লোক তাঁর কথা শুনতে পাচ্ছিল। তিনি একথা বারবার বলছিলেন এমন কি তাঁর চাদর মুবারক তাঁর কাঁধ থেকে লুটিয়ে পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে।হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন যে জাহান্নামী ব্যক্তি সবচেয়ে কম শাস্তি প্রাপ্ত হবে তার পদদ্বয়ের নিচে দু'টুকরো অগ্নি স্ফুলিঙ্গ রাখা হবে, ঐ আগুনের তাপে লোকটির মগজ ফুটতে থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ মুসলিমে হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যেই জাহান্নামীকে সবচেয়ে হালকা শাস্তি দেয়া হবে তার পদদ্বয়ে আগুনের এক জোড়া ফিতাযুক্ত সেণ্ডেল পরিয়ে দেয়া হবে, সেই আগুনের তাপে তার মাথার মগজ উনুনের উপরের হাঁড়ির পানির মত টগবগ করে ফুটতে থাকবে। যদিও তাকে সবচেয়ে কম শাস্তি দেয়া হবে তবুও সে মনে করবে যে, তার চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কাউকেও দেয়া হচ্ছে না।" মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেন, তাতে প্রবেশ করবে সেই নিতান্ত যে হতভাগা। অর্থাৎ এই জাহান্নামে শুধু ঐ লোকদেরকে পরিবেষ্টিত করে শাস্তি দেয়া হবে যারা অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। যারা ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমল করে না।মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শুধু শকী বা বদকার লোক ছাড়া কেউ জাহান্নামে যাবে না।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “শকী বা বদকার লোক কে?" উত্তরে তিনি বললেনঃ যে আনুগত্যপরায়ণ নয় এবং আল্লাহর ভয়ে যে পাপ কাজ হতে বিরত থাকে।”মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু তারা প্রবেশ করবে না যারা অস্বীকার করে।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অস্বীকারকারী কারা? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যারা আমার আনুগত্য করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যারা আমার নাফরমানী করেছে তারাই অস্বীকারকারী।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আর জাহান্নাম হতে বহু দূরে রাখা হবে পরম ' মুত্তাকীকে। যে নিজেকে ও নিজের ধন সম্পদকে পবিত্র করার জন্যে, দ্বীন দুনিয়ার পবিত্রতা লাভের জন্যে নিজের ধন মালকে আল্লাহর পথে দান করে। আর সে কারো সাথে এই জন্যে সদ্ব্যবহার করে না যে, তার উপর তার অনুগ্রহ রয়েছে, বরং ঐ ক্ষেত্রেও সে পরকালে জান্নাত লাভের আশা পোষণ করে এবং সেখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সন্তুষ্টি ও সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “অচিরেই এই ধরনের গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তি সন্তোষ লাভ করবে।” অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এই আয়াত হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর শানে নাযিল হয়। এমনকি কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এ ব্যাপারে সবারই মতৈক্য রয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এসবগুণ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) অবশ্যই রয়েছেন। কিন্তু এখানে সাধারণভাবে সকল উম্মতের কথা বলা হয়েছে। তবে হযরত আবু বকর (রাঃ) সবারই প্রথমে রয়েছেন। কেননা, তিনি ছিলেন সিদ্দীক, পরহেযগার ও দানশীল। নিজের ধন মাল তিনি মহান প্রতিপালকের আনুগত্যে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্যার্থে মন খুলে দান করতেন। প্রত্যেকের সাথে তিনি সদ্ব্যবহার করতেন। এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার আশা করতেন না। কোন বিনিময় তিনি চাইতেন না। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য। ছোট হোক আর বড় হোক প্রত্যেকেরই উপর হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর অনুগ্রহের ছোঁয়া ছিল। শকীফ গোত্রপতি উরওয়া ইবনে মাসউদকে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) কিছু কড়া কথা শুনিয়ে ছিলেন। এবং ধমকিয়ে ছিলেন। তখন উরওয়া বলেছিলঃ “আমার উপর আপনার এমন কিছু অনুগ্রহ রয়েছে যার প্রতিদান দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি তা না হতো তবে আপনাকে অবশ্যই আমি জবাব দিতাম।” একজন বিশিষ্ট গোত্রপতির উপরও যখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর এমন অনুগ্রহ ছিল যে, তার সামনে তার মাথা উঁচু করে কথা বলার ক্ষমতা ছিল, তখন অন্যদের কথা আর কি বলা যাবে? এজন্যেই বলা হয়েছে যে, কারো প্রতি অনুগ্রহের বিনিময়ে পার্থিব কোন উপকার বা প্রতিদান তিনি চাইতেন না। শুধু আল্লাহর দীদার লাভই ছিল তার কাম্য।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জোড়া দান করবে তাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতের রক্ষক ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এ দিকে আসুন। এই দরজা সবচেয়ে উত্তম।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) কোন ব্যক্তিকে কি সকল দরজা থেকে আহ্বান করা হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, আর আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, তুমিও হবে তাদের অন্তর্ভুক্ত।

আদ-দুহা 93:1

হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইসমাঈল ইবনে কুসতুনতীন (রঃ) এবং হযরত শবল ইবনে ইবাদের (রঃ) সামনে কুরআন পাঠ করছিলেন। যখন তিনি (আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তারা উভয়েই বলেনঃ এখান হতে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক সূরার শেষে তাকবীর পাঠ করবেন। আমরা ইবনে কাসীর (রঃ)এর সামনে পাঠ করছিলাম, তিনি মুজাহিদ (রঃ)-এর সামনে পাঠ করলে তিনিও তাকে এই নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে অনুরূপ কথা বলেছিলেন। তিনি পাঠ করেছিলেন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সামনে। তিনিও তাঁকে এই হুকুম করেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পাঠ করেছিলেন হযরত উবাই ইবনে কাবের (রাঃ) সামনে। তিনিও তাঁকে এটারই আদেশ করেছিলেন। আর হযরত উবাই (রাঃ) পাঠ করেছিলেন রাসুলুল্লাহর সামনে এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এরই নির্দেশ দিয়েছিলেন।ইমামুল কিরআত হযরত আবু হাসানও (রঃ) এই সুন্নাতের বর্ণনাকারী। হযরত আবু হাতিম রাযী (রঃ) এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। কারণ আবুল হাসান বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। আবু হাতিম (রঃ) তাঁর নিকট হতে কোন হাদীসই নিতেন না। অনুরূপভাবে হযরত আবূ জাফর উকাইলীও (রঃ) তাঁকে মুনকারুল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু শায়েখ শিহাবুদ্দীন আবু শামাহ (রঃ) শারহি শা'তিবিয়্যায় হযরত ইমাম শাফিয়ী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একজন লোককে নামাযের মধ্যে এ তাকবীর বলতে শুনে বলেনঃ “তুমি ভাল কাজই করেছে এবং সুন্নাত পালন করেছে। এ ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, এ হাদীস সহীহ বা বিশুদ্ধ। এখন এ তাকবীর কোথায় ও কিভাবে পাঠ করতে হবে এ ব্যাপারে কারীদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) এই সূরা সমাপ্ত হওয়ার পর হতে এ তাকবীর পাঠ করতে হবে। অন্যেরা বলেছেন, (আরবি) সমাপ্ত হওয়ার পর হতে পড়তে হবে। আর কারো কারো মতে এটা পাঠের নিয়ম এই যে, শুধু আল্লাহু আকবার বলতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) বলতে হবে।কোন কোন কারী সূরা আদ্দোহা হতে এই তাকবীর পাঠ করার কারণ এই বলে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট অহী আসা কিছু দিনের জন্যে বন্ধ ছিল। তারপর হযরত জিব্রাঈল (আঃ) এই সূরা নিয়ে আসার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনন্দের আতিশয্যে তাকবীর পাঠ করেন। কিন্তু এই বর্ণনা এমন কোন সনদের সাথে বর্ণিত হয়নি যেটা দ্বারা এটাকে বিশুদ্ধ অথবা দুর্বল বলা যেতে পারে। এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।১-১১ নং আয়াতের তাফসীরহযরত জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এ কারণে তিনি একদিন বা দুদিন রাত্রে তাহাজ্জুদ নামাযের জন্যে উঠতে পারেননি। এটা জেনে একটি মহিলা এসে বলেঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমাকে তোমার শয়তান পরিত্যাগ করেছে।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জুনদুব (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে কয়েকদিন বিলম্ব হয়েছিল, এতে মুশরিকরা বলাবলি করতে শুরু করে যে, মুহাম্মদ(সঃ) কে তাঁর প্রতিপালক পরিত্যাগ করেছেন, তখন আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর আঙ্গুলে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হলে তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি শুধু একটি আঙ্গুল বৈ তো নও, আর আল্লাহর পথে তোমার এ যখম হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুই তিন দিন উঠতে পারেননি, এতেই ঐ মহিলাটি উপরোক্ত অশালীন উক্তি করেছিল। অতঃপর উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। জানা যায় যে, ঐ দুষ্টা মহিলাটি ছিল আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল। তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত নাযিল হোক। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আঙ্গুল আহত হওয়া এবং তাতে উপরোক্ত পংক্তি আকস্মিকভাবে তার মুখে উচ্চারিত হওয়ার কথা তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, কিন্তু তাহাজ্জুদ আদায়ে অসমর্থতা যে সেই কারণে হয়েছিল এবং এই আয়াতগুলো যে ঐ উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিল এ উক্তি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বলে উল্লিখিত হয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “আপনার প্রতিপালক আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট তো হননি?” তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে বিলম্ব হওয়ায় রাসূলুল্লাহ শংকিত হয়ে পড়েন। এ কারণে হযরত খাদীজা (রাঃ) উপরোক্ত মন্তব্য করেন। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ দুটি বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মুরসাল বলা হয়েছে। তবে খাদীজা (রাঃ)-এর নাম ও উক্তি উল্লেখ এ ক্ষেত্রে সমীচীন মনে হয় না। হ্যা, তবে হয় তো দুঃখ ও বেদনার বশবর্তী হয়েই তিনি এ ধরনের উক্তি করে থাকবেন। এটা অসম্ভব নয়। তবে এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইবনে ইসহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) যে সময় তার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন এবং খুবই কাছাকাছি হয়েছিলেন সে সময় এই ধরনের অহী অবতীর্ণ হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত উক্তির অসারতা প্রমাণের জন্যেই এ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রোদ্র ওঠার সময়ের দিনের আলো, রাত্রির নীরবতা এবং অন্ধকারের শপথ করেছেন। এগুলো মহান স্রষ্টার কুদরতের এবং সৃষ্টির ঐশ্বর্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “শপথ রজনীর যখন ওটা আচ্ছন্ন করে এবং শপথ দিবসের যখন ওটা আবির্ভূত হয়।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালক তোমাকে ছেড়েও দেননি। এবং তোমার সাথে শত্রুতাও করেননি। তোমার জন্যে পরকাল ইহকাল অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ইবাদত করতেন এবং দুনিয়া বিমুখ জীবন যাপন করতেন। নবী করীম (সঃ)-এর জীবনী যারা পাঠ করেছেন তাদের কাছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন।মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি খেজুর পাতার চাটাইর উপর শুয়েছিলেন। ফলে তার দেহের পার্শ্বদেশে চাটাইর দাগ পড়ে গিয়েছিল। তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর আমি তার দেহে হাত বুলিয়ে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! চাটাইর উপর আমাকে কিছু বিছিয়ে দেয়ার অনুমতি দিন! তিনি আমার এ কথা শুনে বললেনঃ “পৃথিবীর সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমি কোথায় এবং দুনিয়া কোথায়? আমার এবং দুনিয়ার দৃষ্টান্ত তো সেই পথচারী পথিকের মত যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণ করে, তারপর গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে চলে যায়।” (এ হাদীসটি জামে তিরযিমীতেও বর্ণিত হয়েছে এবং উসূলে হাদীসের পরিভাষায় হাদীসটি হাসান) আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমার প্রতিপালক তোমাকে আখেরাতে তোমার উম্মতের জন্যে এতো নিয়ামত দিবেন যে, তুমি খুশী হয়ে যাবে। তোমাকে বিশেষ সম্মান দান করা হবে। বিশেষভাবে হাউযে কাওসার দান করা হবে। সেই হাউযে কাওসারের কিনারায় খাটি মুক্তার তাঁবু থাকবে। ওর মাটি হবে নির্ভেজাল মিশক। এ সম্পর্কিত হাদীস অচিরেই বর্ণনা করা হবে। ইনশাআল্লাহ।একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যে সব ধনাগার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে সেগুলো একে একে তার উপর প্রকাশ করা হয়। এতে তিনি খুবই খুশী হন। তারপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। জান্নাতে তাঁকে এক হাজার মহল দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক মহলে পবিত্র স্ত্রী এবং উৎকৃষ্ট মানের খাদেম রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আমর আওযায়ী (রঃ) ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ। আল্লাহর নবী (সঃ) হতে না শুনে এ ধরনের হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব নয়)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) সন্তুষ্টির এটাও একটা কারণ যে, তাঁকে জানানো হয়ঃ তাঁর আহলে বাইতের মধ্য থেকে কেউ জাহান্নামে যাবে না। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা তাঁর শাফা'আত বুঝানো হয়েছে।হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা এমন আহলে বায়েত যাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার মুকাবিলায় আখেরাতকে পছন্দ করেছেন। তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবী শায়বা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নিয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ইয়াতীম থাকা অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন, হিফাযত করেছেন, প্রতিপালন করেছেন এবং আশ্রয় দিয়েছেন। নবী করিম (সঃ)-এর জন্ম লাভের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর জন্ম লাভের পর তার পিতা ইন্তেকাল করেন। ছয় বছর বয়সের সময় তাঁর স্নেহময়ী মাতা এই নশ্বর জগত হতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। তারপর তিনি তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। তার বয়স যখন আট বছর তার দাদাও পরপারে চলে যান। অতঃপর তিনি তার চাচা আবু তালিবের নিকট প্রতিপালিত হতে থাকেন। আবু তালিব তাকে সর্বাত্মক দেখাশুনা এবং সাহায্য করেন। তিনি তাঁর স্নেহের ভ্রাতুস্পুত্রকে খুবই সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন এবং স্বজাতির বিরোধিতার ঝড়ে মুকাবিলা করতেন। নিজেকে তিনি ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সের সময় নবী করীম (সঃ) নবুওয়াত লাভ করেন। কুরায়েশরা তখন তার ভীষণ বিরোধী এমনকি প্রাণের দুশমন হয়ে গেল। আবু তালিব মুশরিক মূর্তিপূজক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে সহায়তা দান করতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে লড়াই করতেন। এই সুব্যবস্থা আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও ইঙ্গিতেই হয়েছিল। নবী করীম (সঃ)-এর ইয়াতীমী অবস্থা এভাবেই কেটে যায়। আল্লাহ তা'আলা বিরুদ্ধবাদীদের নিকট হতে এভাবেই নবী করীমের (সঃ)-এর খিদমত নেন। হিজরতের কিছুদিনের পূর্বে আৰূ তালিবও ইন্তেকাল করেন। এবার কাফির মুশরিকরা কঠিনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আল্লাহ তা'আলা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দেন এবং মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়কে তার সাহায্যকারী বানিয়ে দেন। ঐ বুর্যগ আনসার ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এবং তার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আশ্রয় দিয়েছেন, জায়গা দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। আর শত্রুদের মুকাবিলায় বীরের মত সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের সবারই প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন! এ সবই আল্লাহর মেহেরবানী, অনুগ্রহ এবং রহম করমের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে বলেনঃ তোমাকে আল্লাহ তাআলা পথহারা দেখতে পেয়ে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। যেমন অন্যত্র রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “এ ভাবেই আমি নিজের আদেশে তোমার প্রতি রুহ অর্থাৎ জিবরাইল (আঃ) কে অথবা কুরআনকে অহী হিসেবে পাঠিয়েছি। ঈমান কি জিনিস তাও তোমার জানা ছিল না, কিতাব কাকে বলে তাও জানতে না তুমি। আমি এ কিতাবকে নুর বা জ্যোতি বানিয়ে এর দ্বারা আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেছি।” (৪২:৫২) কেউ কেউ বলেন, এখানে ভাবার্থ হলো এই যে, নবী করীম (সঃ) শৈশবে মক্কার গলিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়া যাওয়ার পতে রাত্রিকালে শয়তান তাঁর উটের লাগাম ধরে চলার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। তারপর জিবরাঈল (আঃ) এসে শয়তানকে যুঁদিয়ে আবিসিনিয়ায় রেখে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারীকে সঠিক পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।” এই উভয় উক্তিই বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন।আল্লাহ তাআলা এরপর বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তিনি (আল্লাহ) তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি তোমাকে অভাবমুক্ত করলেন ফলে ধৈর্যধারণকারী দরিদ্র এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ধনীর মর্যাদা তুমি লাভ করেছো। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন!কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এসব অবস্থা নবুওয়াতের পূর্বে হয়েছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন “ধন সম্পদের প্রাচুর্য প্রকৃত ধনশীলতা নয়, বরং প্রকৃত ধনশীলতা হচ্ছে মনের ধনশীলতা বা মনের সন্তুষ্টি।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন তা যথেষ্ট মনে করেছে এবং তাতেই সন্তুষ্ট হয়েছে সে সাফল্য লাভ করেছে।”এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে সম্বোধন করে বলেনঃ সুতরাং তুমি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হয়ো না, তাকে ধমক দিয়ো না এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করো না, বরং তার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং নিজের ইয়াতীম হওয়ার কথা ভুলে যেয়ো না। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ইয়াতীমের সাথে ঠিক এমনই ব্যবহার করতে হবে যেমন ব্যবহার পিতা নিজের সন্তানের সাথে করে থাকেন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আরো বলেনঃ প্রার্থীকে না করো না। তুমি যেমন পথহারা ছিলে, আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত বা পথের দিশা দিয়েছেন, তেমনি কেউ তোমাকে জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে রূঢ় ব্যবহার দ্বারা সরিয়ে দিয়ো না। গরীব, মিসকীন, এবং দুর্বল লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করো না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করো না। তাদেরকে কড়া কথা বলো না। ইয়াতীম মিসকীনদেরকে যদি কিছু না দিতে পার তবে ভাল ও নরম কথা বলে তাদেরকে বিদায় করো এবং ভালভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দাও। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ নিজের প্রতিপালকের নিয়ামতসমূহ বর্ণনা করতে থাকো। অর্থাৎ যেমন আমি তোমার দারিদ্রকে ঐশ্বর্যে পরিবর্তিত করেছি, তেমনই তুমিও আমার এ সব নিয়ামতের কথা বর্ণনা করতে থাকো। যেমন নবী করীম (সঃ) এর দু’আও ছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী করুন, ঐ নিয়ামতের কারণে আমাদেরকে আপনার প্রশংসাকারী করুন, ঐ নিয়ামত স্বীকারকারী করুন এবং পরিপূর্ণভাবে ঐ নিয়ামত আমাদেরকে দান করুন।” আবু না (রঃ) বলেনঃ “মুসলমানরা মনে করতেন যে, নিয়ামতের বর্ণনা দেয়াও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শামিল। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ “ যে ব্যক্তি অল্প পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। সে বেশী পেয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না সে আল্লাহ তা'আলার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না। নিয়ামত স্বীকার ও বর্ণনা করাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শামিল, আর নিয়ামত অস্বীকার করা অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক। দলবদ্ধভাবে থাকা রহমত লাভের কারণ এবং দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শাস্তির কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আনসারগণ সমস্ত প্রতিদান নিয়ে গেছেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “না, যে পর্যন্ত তোমরা তাদের জন্যে দু’আ করতে থাকবে এবং তাদের প্রশংসা করতে থাকবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যারা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না তারা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃহতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিয়ামত লাভ করার পর তার বর্ণনা করেছে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আর যে তা গোপন করেছে সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “কাউকে কোন অনুগ্রহ করা হলে তার উচিত সম্ভব হলে ঐ অনুগ্রহের প্রতিদান দেয়া, আর যদি সম্ভব না হয় তবে উচিত অন্ততঃপক্ষে ঐ অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করা এবং তার প্রশংসা করা। যে ব্যক্তি এই প্রশংসা করেছে সে কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি প্রশংসাও করেনি এবং নিয়ামতের কথা প্রকাশও করেনি সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা নবুওয়াতকে বুঝানো হয়েছে। এক বর্ণনায় রয়েছে যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন।হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো কল্যাণকর যে সব কথা নিজে জান, সে সব তাদের কাছেও বর্ণনা কর। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ নবুওয়াতের যে নিয়ামত ও কারামত তুমি লাভ করেছে সেটা বর্ণনা কর। ঐ কথা আলোচনা কর। আর সেইদিকে জনগণকে দাওয়াত দাও।কাজেই নবী করীম (সঃ) নিজের লোকদের কাছে অর্থাৎ যাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল তাদের কাছে প্রথমদিকে চুপি চুপি দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তাঁর উপর নামায ফরয হয়েছিল, তিনি সেই নামায আদায় করতেন।

আদ-দুহা 93:2

হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইসমাঈল ইবনে কুসতুনতীন (রঃ) এবং হযরত শবল ইবনে ইবাদের (রঃ) সামনে কুরআন পাঠ করছিলেন। যখন তিনি (আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তারা উভয়েই বলেনঃ এখান হতে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক সূরার শেষে তাকবীর পাঠ করবেন। আমরা ইবনে কাসীর (রঃ)এর সামনে পাঠ করছিলাম, তিনি মুজাহিদ (রঃ)-এর সামনে পাঠ করলে তিনিও তাকে এই নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে অনুরূপ কথা বলেছিলেন। তিনি পাঠ করেছিলেন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সামনে। তিনিও তাঁকে এই হুকুম করেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পাঠ করেছিলেন হযরত উবাই ইবনে কাবের (রাঃ) সামনে। তিনিও তাঁকে এটারই আদেশ করেছিলেন। আর হযরত উবাই (রাঃ) পাঠ করেছিলেন রাসুলুল্লাহর সামনে এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এরই নির্দেশ দিয়েছিলেন।ইমামুল কিরআত হযরত আবু হাসানও (রঃ) এই সুন্নাতের বর্ণনাকারী। হযরত আবু হাতিম রাযী (রঃ) এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। কারণ আবুল হাসান বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। আবু হাতিম (রঃ) তাঁর নিকট হতে কোন হাদীসই নিতেন না। অনুরূপভাবে হযরত আবূ জাফর উকাইলীও (রঃ) তাঁকে মুনকারুল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু শায়েখ শিহাবুদ্দীন আবু শামাহ (রঃ) শারহি শা'তিবিয়্যায় হযরত ইমাম শাফিয়ী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একজন লোককে নামাযের মধ্যে এ তাকবীর বলতে শুনে বলেনঃ “তুমি ভাল কাজই করেছে এবং সুন্নাত পালন করেছে। এ ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, এ হাদীস সহীহ বা বিশুদ্ধ। এখন এ তাকবীর কোথায় ও কিভাবে পাঠ করতে হবে এ ব্যাপারে কারীদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) এই সূরা সমাপ্ত হওয়ার পর হতে এ তাকবীর পাঠ করতে হবে। অন্যেরা বলেছেন, (আরবি) সমাপ্ত হওয়ার পর হতে পড়তে হবে। আর কারো কারো মতে এটা পাঠের নিয়ম এই যে, শুধু আল্লাহু আকবার বলতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) বলতে হবে।কোন কোন কারী সূরা আদ্দোহা হতে এই তাকবীর পাঠ করার কারণ এই বলে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট অহী আসা কিছু দিনের জন্যে বন্ধ ছিল। তারপর হযরত জিব্রাঈল (আঃ) এই সূরা নিয়ে আসার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনন্দের আতিশয্যে তাকবীর পাঠ করেন। কিন্তু এই বর্ণনা এমন কোন সনদের সাথে বর্ণিত হয়নি যেটা দ্বারা এটাকে বিশুদ্ধ অথবা দুর্বল বলা যেতে পারে। এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।১-১১ নং আয়াতের তাফসীরহযরত জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এ কারণে তিনি একদিন বা দুদিন রাত্রে তাহাজ্জুদ নামাযের জন্যে উঠতে পারেননি। এটা জেনে একটি মহিলা এসে বলেঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমাকে তোমার শয়তান পরিত্যাগ করেছে।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জুনদুব (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে কয়েকদিন বিলম্ব হয়েছিল, এতে মুশরিকরা বলাবলি করতে শুরু করে যে, মুহাম্মদ(সঃ) কে তাঁর প্রতিপালক পরিত্যাগ করেছেন, তখন আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর আঙ্গুলে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হলে তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি শুধু একটি আঙ্গুল বৈ তো নও, আর আল্লাহর পথে তোমার এ যখম হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুই তিন দিন উঠতে পারেননি, এতেই ঐ মহিলাটি উপরোক্ত অশালীন উক্তি করেছিল। অতঃপর উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। জানা যায় যে, ঐ দুষ্টা মহিলাটি ছিল আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল। তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত নাযিল হোক। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আঙ্গুল আহত হওয়া এবং তাতে উপরোক্ত পংক্তি আকস্মিকভাবে তার মুখে উচ্চারিত হওয়ার কথা তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, কিন্তু তাহাজ্জুদ আদায়ে অসমর্থতা যে সেই কারণে হয়েছিল এবং এই আয়াতগুলো যে ঐ উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিল এ উক্তি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বলে উল্লিখিত হয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “আপনার প্রতিপালক আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট তো হননি?” তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে বিলম্ব হওয়ায় রাসূলুল্লাহ শংকিত হয়ে পড়েন। এ কারণে হযরত খাদীজা (রাঃ) উপরোক্ত মন্তব্য করেন। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ দুটি বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মুরসাল বলা হয়েছে। তবে খাদীজা (রাঃ)-এর নাম ও উক্তি উল্লেখ এ ক্ষেত্রে সমীচীন মনে হয় না। হ্যা, তবে হয় তো দুঃখ ও বেদনার বশবর্তী হয়েই তিনি এ ধরনের উক্তি করে থাকবেন। এটা অসম্ভব নয়। তবে এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইবনে ইসহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) যে সময় তার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন এবং খুবই কাছাকাছি হয়েছিলেন সে সময় এই ধরনের অহী অবতীর্ণ হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত উক্তির অসারতা প্রমাণের জন্যেই এ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রোদ্র ওঠার সময়ের দিনের আলো, রাত্রির নীরবতা এবং অন্ধকারের শপথ করেছেন। এগুলো মহান স্রষ্টার কুদরতের এবং সৃষ্টির ঐশ্বর্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “শপথ রজনীর যখন ওটা আচ্ছন্ন করে এবং শপথ দিবসের যখন ওটা আবির্ভূত হয়।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালক তোমাকে ছেড়েও দেননি। এবং তোমার সাথে শত্রুতাও করেননি। তোমার জন্যে পরকাল ইহকাল অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ইবাদত করতেন এবং দুনিয়া বিমুখ জীবন যাপন করতেন। নবী করীম (সঃ)-এর জীবনী যারা পাঠ করেছেন তাদের কাছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন।মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি খেজুর পাতার চাটাইর উপর শুয়েছিলেন। ফলে তার দেহের পার্শ্বদেশে চাটাইর দাগ পড়ে গিয়েছিল। তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর আমি তার দেহে হাত বুলিয়ে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! চাটাইর উপর আমাকে কিছু বিছিয়ে দেয়ার অনুমতি দিন! তিনি আমার এ কথা শুনে বললেনঃ “পৃথিবীর সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমি কোথায় এবং দুনিয়া কোথায়? আমার এবং দুনিয়ার দৃষ্টান্ত তো সেই পথচারী পথিকের মত যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণ করে, তারপর গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে চলে যায়।” (এ হাদীসটি জামে তিরযিমীতেও বর্ণিত হয়েছে এবং উসূলে হাদীসের পরিভাষায় হাদীসটি হাসান) আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমার প্রতিপালক তোমাকে আখেরাতে তোমার উম্মতের জন্যে এতো নিয়ামত দিবেন যে, তুমি খুশী হয়ে যাবে। তোমাকে বিশেষ সম্মান দান করা হবে। বিশেষভাবে হাউযে কাওসার দান করা হবে। সেই হাউযে কাওসারের কিনারায় খাটি মুক্তার তাঁবু থাকবে। ওর মাটি হবে নির্ভেজাল মিশক। এ সম্পর্কিত হাদীস অচিরেই বর্ণনা করা হবে। ইনশাআল্লাহ।একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যে সব ধনাগার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে সেগুলো একে একে তার উপর প্রকাশ করা হয়। এতে তিনি খুবই খুশী হন। তারপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। জান্নাতে তাঁকে এক হাজার মহল দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক মহলে পবিত্র স্ত্রী এবং উৎকৃষ্ট মানের খাদেম রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আমর আওযায়ী (রঃ) ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ। আল্লাহর নবী (সঃ) হতে না শুনে এ ধরনের হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব নয়)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) সন্তুষ্টির এটাও একটা কারণ যে, তাঁকে জানানো হয়ঃ তাঁর আহলে বাইতের মধ্য থেকে কেউ জাহান্নামে যাবে না। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা তাঁর শাফা'আত বুঝানো হয়েছে।হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা এমন আহলে বায়েত যাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার মুকাবিলায় আখেরাতকে পছন্দ করেছেন। তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবী শায়বা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নিয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ইয়াতীম থাকা অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন, হিফাযত করেছেন, প্রতিপালন করেছেন এবং আশ্রয় দিয়েছেন। নবী করিম (সঃ)-এর জন্ম লাভের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর জন্ম লাভের পর তার পিতা ইন্তেকাল করেন। ছয় বছর বয়সের সময় তাঁর স্নেহময়ী মাতা এই নশ্বর জগত হতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। তারপর তিনি তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। তার বয়স যখন আট বছর তার দাদাও পরপারে চলে যান। অতঃপর তিনি তার চাচা আবু তালিবের নিকট প্রতিপালিত হতে থাকেন। আবু তালিব তাকে সর্বাত্মক দেখাশুনা এবং সাহায্য করেন। তিনি তাঁর স্নেহের ভ্রাতুস্পুত্রকে খুবই সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন এবং স্বজাতির বিরোধিতার ঝড়ে মুকাবিলা করতেন। নিজেকে তিনি ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সের সময় নবী করীম (সঃ) নবুওয়াত লাভ করেন। কুরায়েশরা তখন তার ভীষণ বিরোধী এমনকি প্রাণের দুশমন হয়ে গেল। আবু তালিব মুশরিক মূর্তিপূজক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে সহায়তা দান করতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে লড়াই করতেন। এই সুব্যবস্থা আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও ইঙ্গিতেই হয়েছিল। নবী করীম (সঃ)-এর ইয়াতীমী অবস্থা এভাবেই কেটে যায়। আল্লাহ তা'আলা বিরুদ্ধবাদীদের নিকট হতে এভাবেই নবী করীমের (সঃ)-এর খিদমত নেন। হিজরতের কিছুদিনের পূর্বে আৰূ তালিবও ইন্তেকাল করেন। এবার কাফির মুশরিকরা কঠিনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আল্লাহ তা'আলা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দেন এবং মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়কে তার সাহায্যকারী বানিয়ে দেন। ঐ বুর্যগ আনসার ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এবং তার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আশ্রয় দিয়েছেন, জায়গা দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। আর শত্রুদের মুকাবিলায় বীরের মত সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের সবারই প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন! এ সবই আল্লাহর মেহেরবানী, অনুগ্রহ এবং রহম করমের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে বলেনঃ তোমাকে আল্লাহ তাআলা পথহারা দেখতে পেয়ে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। যেমন অন্যত্র রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “এ ভাবেই আমি নিজের আদেশে তোমার প্রতি রুহ অর্থাৎ জিবরাইল (আঃ) কে অথবা কুরআনকে অহী হিসেবে পাঠিয়েছি। ঈমান কি জিনিস তাও তোমার জানা ছিল না, কিতাব কাকে বলে তাও জানতে না তুমি। আমি এ কিতাবকে নুর বা জ্যোতি বানিয়ে এর দ্বারা আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেছি।” (৪২:৫২) কেউ কেউ বলেন, এখানে ভাবার্থ হলো এই যে, নবী করীম (সঃ) শৈশবে মক্কার গলিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়া যাওয়ার পতে রাত্রিকালে শয়তান তাঁর উটের লাগাম ধরে চলার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। তারপর জিবরাঈল (আঃ) এসে শয়তানকে যুঁদিয়ে আবিসিনিয়ায় রেখে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারীকে সঠিক পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।” এই উভয় উক্তিই বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন।আল্লাহ তাআলা এরপর বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তিনি (আল্লাহ) তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি তোমাকে অভাবমুক্ত করলেন ফলে ধৈর্যধারণকারী দরিদ্র এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ধনীর মর্যাদা তুমি লাভ করেছো। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন!কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এসব অবস্থা নবুওয়াতের পূর্বে হয়েছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন “ধন সম্পদের প্রাচুর্য প্রকৃত ধনশীলতা নয়, বরং প্রকৃত ধনশীলতা হচ্ছে মনের ধনশীলতা বা মনের সন্তুষ্টি।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন তা যথেষ্ট মনে করেছে এবং তাতেই সন্তুষ্ট হয়েছে সে সাফল্য লাভ করেছে।”এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে সম্বোধন করে বলেনঃ সুতরাং তুমি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হয়ো না, তাকে ধমক দিয়ো না এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করো না, বরং তার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং নিজের ইয়াতীম হওয়ার কথা ভুলে যেয়ো না। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ইয়াতীমের সাথে ঠিক এমনই ব্যবহার করতে হবে যেমন ব্যবহার পিতা নিজের সন্তানের সাথে করে থাকেন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আরো বলেনঃ প্রার্থীকে না করো না। তুমি যেমন পথহারা ছিলে, আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত বা পথের দিশা দিয়েছেন, তেমনি কেউ তোমাকে জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে রূঢ় ব্যবহার দ্বারা সরিয়ে দিয়ো না। গরীব, মিসকীন, এবং দুর্বল লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করো না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করো না। তাদেরকে কড়া কথা বলো না। ইয়াতীম মিসকীনদেরকে যদি কিছু না দিতে পার তবে ভাল ও নরম কথা বলে তাদেরকে বিদায় করো এবং ভালভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দাও। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ নিজের প্রতিপালকের নিয়ামতসমূহ বর্ণনা করতে থাকো। অর্থাৎ যেমন আমি তোমার দারিদ্রকে ঐশ্বর্যে পরিবর্তিত করেছি, তেমনই তুমিও আমার এ সব নিয়ামতের কথা বর্ণনা করতে থাকো। যেমন নবী করীম (সঃ) এর দু’আও ছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী করুন, ঐ নিয়ামতের কারণে আমাদেরকে আপনার প্রশংসাকারী করুন, ঐ নিয়ামত স্বীকারকারী করুন এবং পরিপূর্ণভাবে ঐ নিয়ামত আমাদেরকে দান করুন।” আবু না (রঃ) বলেনঃ “মুসলমানরা মনে করতেন যে, নিয়ামতের বর্ণনা দেয়াও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শামিল। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ “ যে ব্যক্তি অল্প পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। সে বেশী পেয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না সে আল্লাহ তা'আলার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না। নিয়ামত স্বীকার ও বর্ণনা করাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শামিল, আর নিয়ামত অস্বীকার করা অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক। দলবদ্ধভাবে থাকা রহমত লাভের কারণ এবং দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শাস্তির কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আনসারগণ সমস্ত প্রতিদান নিয়ে গেছেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “না, যে পর্যন্ত তোমরা তাদের জন্যে দু’আ করতে থাকবে এবং তাদের প্রশংসা করতে থাকবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যারা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না তারা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃহতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিয়ামত লাভ করার পর তার বর্ণনা করেছে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আর যে তা গোপন করেছে সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “কাউকে কোন অনুগ্রহ করা হলে তার উচিত সম্ভব হলে ঐ অনুগ্রহের প্রতিদান দেয়া, আর যদি সম্ভব না হয় তবে উচিত অন্ততঃপক্ষে ঐ অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করা এবং তার প্রশংসা করা। যে ব্যক্তি এই প্রশংসা করেছে সে কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি প্রশংসাও করেনি এবং নিয়ামতের কথা প্রকাশও করেনি সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা নবুওয়াতকে বুঝানো হয়েছে। এক বর্ণনায় রয়েছে যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন।হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো কল্যাণকর যে সব কথা নিজে জান, সে সব তাদের কাছেও বর্ণনা কর। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ নবুওয়াতের যে নিয়ামত ও কারামত তুমি লাভ করেছে সেটা বর্ণনা কর। ঐ কথা আলোচনা কর। আর সেইদিকে জনগণকে দাওয়াত দাও।কাজেই নবী করীম (সঃ) নিজের লোকদের কাছে অর্থাৎ যাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল তাদের কাছে প্রথমদিকে চুপি চুপি দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তাঁর উপর নামায ফরয হয়েছিল, তিনি সেই নামায আদায় করতেন।

আদ-দুহা 93:3

হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইসমাঈল ইবনে কুসতুনতীন (রঃ) এবং হযরত শবল ইবনে ইবাদের (রঃ) সামনে কুরআন পাঠ করছিলেন। যখন তিনি (আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তারা উভয়েই বলেনঃ এখান হতে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক সূরার শেষে তাকবীর পাঠ করবেন। আমরা ইবনে কাসীর (রঃ)এর সামনে পাঠ করছিলাম, তিনি মুজাহিদ (রঃ)-এর সামনে পাঠ করলে তিনিও তাকে এই নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে অনুরূপ কথা বলেছিলেন। তিনি পাঠ করেছিলেন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সামনে। তিনিও তাঁকে এই হুকুম করেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পাঠ করেছিলেন হযরত উবাই ইবনে কাবের (রাঃ) সামনে। তিনিও তাঁকে এটারই আদেশ করেছিলেন। আর হযরত উবাই (রাঃ) পাঠ করেছিলেন রাসুলুল্লাহর সামনে এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এরই নির্দেশ দিয়েছিলেন।ইমামুল কিরআত হযরত আবু হাসানও (রঃ) এই সুন্নাতের বর্ণনাকারী। হযরত আবু হাতিম রাযী (রঃ) এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। কারণ আবুল হাসান বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। আবু হাতিম (রঃ) তাঁর নিকট হতে কোন হাদীসই নিতেন না। অনুরূপভাবে হযরত আবূ জাফর উকাইলীও (রঃ) তাঁকে মুনকারুল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু শায়েখ শিহাবুদ্দীন আবু শামাহ (রঃ) শারহি শা'তিবিয়্যায় হযরত ইমাম শাফিয়ী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একজন লোককে নামাযের মধ্যে এ তাকবীর বলতে শুনে বলেনঃ “তুমি ভাল কাজই করেছে এবং সুন্নাত পালন করেছে। এ ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, এ হাদীস সহীহ বা বিশুদ্ধ। এখন এ তাকবীর কোথায় ও কিভাবে পাঠ করতে হবে এ ব্যাপারে কারীদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) এই সূরা সমাপ্ত হওয়ার পর হতে এ তাকবীর পাঠ করতে হবে। অন্যেরা বলেছেন, (আরবি) সমাপ্ত হওয়ার পর হতে পড়তে হবে। আর কারো কারো মতে এটা পাঠের নিয়ম এই যে, শুধু আল্লাহু আকবার বলতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) বলতে হবে।কোন কোন কারী সূরা আদ্দোহা হতে এই তাকবীর পাঠ করার কারণ এই বলে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট অহী আসা কিছু দিনের জন্যে বন্ধ ছিল। তারপর হযরত জিব্রাঈল (আঃ) এই সূরা নিয়ে আসার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনন্দের আতিশয্যে তাকবীর পাঠ করেন। কিন্তু এই বর্ণনা এমন কোন সনদের সাথে বর্ণিত হয়নি যেটা দ্বারা এটাকে বিশুদ্ধ অথবা দুর্বল বলা যেতে পারে। এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।১-১১ নং আয়াতের তাফসীরহযরত জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এ কারণে তিনি একদিন বা দুদিন রাত্রে তাহাজ্জুদ নামাযের জন্যে উঠতে পারেননি। এটা জেনে একটি মহিলা এসে বলেঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমাকে তোমার শয়তান পরিত্যাগ করেছে।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জুনদুব (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে কয়েকদিন বিলম্ব হয়েছিল, এতে মুশরিকরা বলাবলি করতে শুরু করে যে, মুহাম্মদ(সঃ) কে তাঁর প্রতিপালক পরিত্যাগ করেছেন, তখন আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর আঙ্গুলে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হলে তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি শুধু একটি আঙ্গুল বৈ তো নও, আর আল্লাহর পথে তোমার এ যখম হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুই তিন দিন উঠতে পারেননি, এতেই ঐ মহিলাটি উপরোক্ত অশালীন উক্তি করেছিল। অতঃপর উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। জানা যায় যে, ঐ দুষ্টা মহিলাটি ছিল আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল। তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত নাযিল হোক। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আঙ্গুল আহত হওয়া এবং তাতে উপরোক্ত পংক্তি আকস্মিকভাবে তার মুখে উচ্চারিত হওয়ার কথা তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, কিন্তু তাহাজ্জুদ আদায়ে অসমর্থতা যে সেই কারণে হয়েছিল এবং এই আয়াতগুলো যে ঐ উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিল এ উক্তি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বলে উল্লিখিত হয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “আপনার প্রতিপালক আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট তো হননি?” তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে বিলম্ব হওয়ায় রাসূলুল্লাহ শংকিত হয়ে পড়েন। এ কারণে হযরত খাদীজা (রাঃ) উপরোক্ত মন্তব্য করেন। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ দুটি বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মুরসাল বলা হয়েছে। তবে খাদীজা (রাঃ)-এর নাম ও উক্তি উল্লেখ এ ক্ষেত্রে সমীচীন মনে হয় না। হ্যা, তবে হয় তো দুঃখ ও বেদনার বশবর্তী হয়েই তিনি এ ধরনের উক্তি করে থাকবেন। এটা অসম্ভব নয়। তবে এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইবনে ইসহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) যে সময় তার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন এবং খুবই কাছাকাছি হয়েছিলেন সে সময় এই ধরনের অহী অবতীর্ণ হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত উক্তির অসারতা প্রমাণের জন্যেই এ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রোদ্র ওঠার সময়ের দিনের আলো, রাত্রির নীরবতা এবং অন্ধকারের শপথ করেছেন। এগুলো মহান স্রষ্টার কুদরতের এবং সৃষ্টির ঐশ্বর্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “শপথ রজনীর যখন ওটা আচ্ছন্ন করে এবং শপথ দিবসের যখন ওটা আবির্ভূত হয়।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালক তোমাকে ছেড়েও দেননি। এবং তোমার সাথে শত্রুতাও করেননি। তোমার জন্যে পরকাল ইহকাল অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ইবাদত করতেন এবং দুনিয়া বিমুখ জীবন যাপন করতেন। নবী করীম (সঃ)-এর জীবনী যারা পাঠ করেছেন তাদের কাছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন।মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি খেজুর পাতার চাটাইর উপর শুয়েছিলেন। ফলে তার দেহের পার্শ্বদেশে চাটাইর দাগ পড়ে গিয়েছিল। তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর আমি তার দেহে হাত বুলিয়ে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! চাটাইর উপর আমাকে কিছু বিছিয়ে দেয়ার অনুমতি দিন! তিনি আমার এ কথা শুনে বললেনঃ “পৃথিবীর সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমি কোথায় এবং দুনিয়া কোথায়? আমার এবং দুনিয়ার দৃষ্টান্ত তো সেই পথচারী পথিকের মত যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণ করে, তারপর গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে চলে যায়।” (এ হাদীসটি জামে তিরযিমীতেও বর্ণিত হয়েছে এবং উসূলে হাদীসের পরিভাষায় হাদীসটি হাসান) আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমার প্রতিপালক তোমাকে আখেরাতে তোমার উম্মতের জন্যে এতো নিয়ামত দিবেন যে, তুমি খুশী হয়ে যাবে। তোমাকে বিশেষ সম্মান দান করা হবে। বিশেষভাবে হাউযে কাওসার দান করা হবে। সেই হাউযে কাওসারের কিনারায় খাটি মুক্তার তাঁবু থাকবে। ওর মাটি হবে নির্ভেজাল মিশক। এ সম্পর্কিত হাদীস অচিরেই বর্ণনা করা হবে। ইনশাআল্লাহ।একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যে সব ধনাগার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে সেগুলো একে একে তার উপর প্রকাশ করা হয়। এতে তিনি খুবই খুশী হন। তারপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। জান্নাতে তাঁকে এক হাজার মহল দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক মহলে পবিত্র স্ত্রী এবং উৎকৃষ্ট মানের খাদেম রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আমর আওযায়ী (রঃ) ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ। আল্লাহর নবী (সঃ) হতে না শুনে এ ধরনের হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব নয়)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) সন্তুষ্টির এটাও একটা কারণ যে, তাঁকে জানানো হয়ঃ তাঁর আহলে বাইতের মধ্য থেকে কেউ জাহান্নামে যাবে না। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা তাঁর শাফা'আত বুঝানো হয়েছে।হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা এমন আহলে বায়েত যাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার মুকাবিলায় আখেরাতকে পছন্দ করেছেন। তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবী শায়বা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নিয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ইয়াতীম থাকা অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন, হিফাযত করেছেন, প্রতিপালন করেছেন এবং আশ্রয় দিয়েছেন। নবী করিম (সঃ)-এর জন্ম লাভের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর জন্ম লাভের পর তার পিতা ইন্তেকাল করেন। ছয় বছর বয়সের সময় তাঁর স্নেহময়ী মাতা এই নশ্বর জগত হতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। তারপর তিনি তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। তার বয়স যখন আট বছর তার দাদাও পরপারে চলে যান। অতঃপর তিনি তার চাচা আবু তালিবের নিকট প্রতিপালিত হতে থাকেন। আবু তালিব তাকে সর্বাত্মক দেখাশুনা এবং সাহায্য করেন। তিনি তাঁর স্নেহের ভ্রাতুস্পুত্রকে খুবই সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন এবং স্বজাতির বিরোধিতার ঝড়ে মুকাবিলা করতেন। নিজেকে তিনি ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সের সময় নবী করীম (সঃ) নবুওয়াত লাভ করেন। কুরায়েশরা তখন তার ভীষণ বিরোধী এমনকি প্রাণের দুশমন হয়ে গেল। আবু তালিব মুশরিক মূর্তিপূজক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে সহায়তা দান করতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে লড়াই করতেন। এই সুব্যবস্থা আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও ইঙ্গিতেই হয়েছিল। নবী করীম (সঃ)-এর ইয়াতীমী অবস্থা এভাবেই কেটে যায়। আল্লাহ তা'আলা বিরুদ্ধবাদীদের নিকট হতে এভাবেই নবী করীমের (সঃ)-এর খিদমত নেন। হিজরতের কিছুদিনের পূর্বে আৰূ তালিবও ইন্তেকাল করেন। এবার কাফির মুশরিকরা কঠিনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আল্লাহ তা'আলা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দেন এবং মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়কে তার সাহায্যকারী বানিয়ে দেন। ঐ বুর্যগ আনসার ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এবং তার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আশ্রয় দিয়েছেন, জায়গা দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। আর শত্রুদের মুকাবিলায় বীরের মত সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের সবারই প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন! এ সবই আল্লাহর মেহেরবানী, অনুগ্রহ এবং রহম করমের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে বলেনঃ তোমাকে আল্লাহ তাআলা পথহারা দেখতে পেয়ে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। যেমন অন্যত্র রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “এ ভাবেই আমি নিজের আদেশে তোমার প্রতি রুহ অর্থাৎ জিবরাইল (আঃ) কে অথবা কুরআনকে অহী হিসেবে পাঠিয়েছি। ঈমান কি জিনিস তাও তোমার জানা ছিল না, কিতাব কাকে বলে তাও জানতে না তুমি। আমি এ কিতাবকে নুর বা জ্যোতি বানিয়ে এর দ্বারা আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেছি।” (৪২:৫২) কেউ কেউ বলেন, এখানে ভাবার্থ হলো এই যে, নবী করীম (সঃ) শৈশবে মক্কার গলিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়া যাওয়ার পতে রাত্রিকালে শয়তান তাঁর উটের লাগাম ধরে চলার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। তারপর জিবরাঈল (আঃ) এসে শয়তানকে যুঁদিয়ে আবিসিনিয়ায় রেখে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারীকে সঠিক পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।” এই উভয় উক্তিই বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন।আল্লাহ তাআলা এরপর বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তিনি (আল্লাহ) তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি তোমাকে অভাবমুক্ত করলেন ফলে ধৈর্যধারণকারী দরিদ্র এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ধনীর মর্যাদা তুমি লাভ করেছো। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন!কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এসব অবস্থা নবুওয়াতের পূর্বে হয়েছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন “ধন সম্পদের প্রাচুর্য প্রকৃত ধনশীলতা নয়, বরং প্রকৃত ধনশীলতা হচ্ছে মনের ধনশীলতা বা মনের সন্তুষ্টি।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন তা যথেষ্ট মনে করেছে এবং তাতেই সন্তুষ্ট হয়েছে সে সাফল্য লাভ করেছে।”এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে সম্বোধন করে বলেনঃ সুতরাং তুমি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হয়ো না, তাকে ধমক দিয়ো না এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করো না, বরং তার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং নিজের ইয়াতীম হওয়ার কথা ভুলে যেয়ো না। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ইয়াতীমের সাথে ঠিক এমনই ব্যবহার করতে হবে যেমন ব্যবহার পিতা নিজের সন্তানের সাথে করে থাকেন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আরো বলেনঃ প্রার্থীকে না করো না। তুমি যেমন পথহারা ছিলে, আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত বা পথের দিশা দিয়েছেন, তেমনি কেউ তোমাকে জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে রূঢ় ব্যবহার দ্বারা সরিয়ে দিয়ো না। গরীব, মিসকীন, এবং দুর্বল লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করো না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করো না। তাদেরকে কড়া কথা বলো না। ইয়াতীম মিসকীনদেরকে যদি কিছু না দিতে পার তবে ভাল ও নরম কথা বলে তাদেরকে বিদায় করো এবং ভালভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দাও। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ নিজের প্রতিপালকের নিয়ামতসমূহ বর্ণনা করতে থাকো। অর্থাৎ যেমন আমি তোমার দারিদ্রকে ঐশ্বর্যে পরিবর্তিত করেছি, তেমনই তুমিও আমার এ সব নিয়ামতের কথা বর্ণনা করতে থাকো। যেমন নবী করীম (সঃ) এর দু’আও ছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী করুন, ঐ নিয়ামতের কারণে আমাদেরকে আপনার প্রশংসাকারী করুন, ঐ নিয়ামত স্বীকারকারী করুন এবং পরিপূর্ণভাবে ঐ নিয়ামত আমাদেরকে দান করুন।” আবু না (রঃ) বলেনঃ “মুসলমানরা মনে করতেন যে, নিয়ামতের বর্ণনা দেয়াও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শামিল। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ “ যে ব্যক্তি অল্প পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। সে বেশী পেয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না সে আল্লাহ তা'আলার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না। নিয়ামত স্বীকার ও বর্ণনা করাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শামিল, আর নিয়ামত অস্বীকার করা অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক। দলবদ্ধভাবে থাকা রহমত লাভের কারণ এবং দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শাস্তির কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আনসারগণ সমস্ত প্রতিদান নিয়ে গেছেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “না, যে পর্যন্ত তোমরা তাদের জন্যে দু’আ করতে থাকবে এবং তাদের প্রশংসা করতে থাকবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যারা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না তারা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃহতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিয়ামত লাভ করার পর তার বর্ণনা করেছে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আর যে তা গোপন করেছে সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “কাউকে কোন অনুগ্রহ করা হলে তার উচিত সম্ভব হলে ঐ অনুগ্রহের প্রতিদান দেয়া, আর যদি সম্ভব না হয় তবে উচিত অন্ততঃপক্ষে ঐ অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করা এবং তার প্রশংসা করা। যে ব্যক্তি এই প্রশংসা করেছে সে কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি প্রশংসাও করেনি এবং নিয়ামতের কথা প্রকাশও করেনি সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা নবুওয়াতকে বুঝানো হয়েছে। এক বর্ণনায় রয়েছে যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন।হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো কল্যাণকর যে সব কথা নিজে জান, সে সব তাদের কাছেও বর্ণনা কর। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ নবুওয়াতের যে নিয়ামত ও কারামত তুমি লাভ করেছে সেটা বর্ণনা কর। ঐ কথা আলোচনা কর। আর সেইদিকে জনগণকে দাওয়াত দাও।কাজেই নবী করীম (সঃ) নিজের লোকদের কাছে অর্থাৎ যাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল তাদের কাছে প্রথমদিকে চুপি চুপি দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তাঁর উপর নামায ফরয হয়েছিল, তিনি সেই নামায আদায় করতেন।

আদ-দুহা 93:4

হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইসমাঈল ইবনে কুসতুনতীন (রঃ) এবং হযরত শবল ইবনে ইবাদের (রঃ) সামনে কুরআন পাঠ করছিলেন। যখন তিনি (আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তারা উভয়েই বলেনঃ এখান হতে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক সূরার শেষে তাকবীর পাঠ করবেন। আমরা ইবনে কাসীর (রঃ)এর সামনে পাঠ করছিলাম, তিনি মুজাহিদ (রঃ)-এর সামনে পাঠ করলে তিনিও তাকে এই নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে অনুরূপ কথা বলেছিলেন। তিনি পাঠ করেছিলেন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সামনে। তিনিও তাঁকে এই হুকুম করেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পাঠ করেছিলেন হযরত উবাই ইবনে কাবের (রাঃ) সামনে। তিনিও তাঁকে এটারই আদেশ করেছিলেন। আর হযরত উবাই (রাঃ) পাঠ করেছিলেন রাসুলুল্লাহর সামনে এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এরই নির্দেশ দিয়েছিলেন।ইমামুল কিরআত হযরত আবু হাসানও (রঃ) এই সুন্নাতের বর্ণনাকারী। হযরত আবু হাতিম রাযী (রঃ) এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। কারণ আবুল হাসান বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। আবু হাতিম (রঃ) তাঁর নিকট হতে কোন হাদীসই নিতেন না। অনুরূপভাবে হযরত আবূ জাফর উকাইলীও (রঃ) তাঁকে মুনকারুল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু শায়েখ শিহাবুদ্দীন আবু শামাহ (রঃ) শারহি শা'তিবিয়্যায় হযরত ইমাম শাফিয়ী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একজন লোককে নামাযের মধ্যে এ তাকবীর বলতে শুনে বলেনঃ “তুমি ভাল কাজই করেছে এবং সুন্নাত পালন করেছে। এ ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, এ হাদীস সহীহ বা বিশুদ্ধ। এখন এ তাকবীর কোথায় ও কিভাবে পাঠ করতে হবে এ ব্যাপারে কারীদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) এই সূরা সমাপ্ত হওয়ার পর হতে এ তাকবীর পাঠ করতে হবে। অন্যেরা বলেছেন, (আরবি) সমাপ্ত হওয়ার পর হতে পড়তে হবে। আর কারো কারো মতে এটা পাঠের নিয়ম এই যে, শুধু আল্লাহু আকবার বলতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) বলতে হবে।কোন কোন কারী সূরা আদ্দোহা হতে এই তাকবীর পাঠ করার কারণ এই বলে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট অহী আসা কিছু দিনের জন্যে বন্ধ ছিল। তারপর হযরত জিব্রাঈল (আঃ) এই সূরা নিয়ে আসার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনন্দের আতিশয্যে তাকবীর পাঠ করেন। কিন্তু এই বর্ণনা এমন কোন সনদের সাথে বর্ণিত হয়নি যেটা দ্বারা এটাকে বিশুদ্ধ অথবা দুর্বল বলা যেতে পারে। এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।১-১১ নং আয়াতের তাফসীরহযরত জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এ কারণে তিনি একদিন বা দুদিন রাত্রে তাহাজ্জুদ নামাযের জন্যে উঠতে পারেননি। এটা জেনে একটি মহিলা এসে বলেঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমাকে তোমার শয়তান পরিত্যাগ করেছে।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জুনদুব (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে কয়েকদিন বিলম্ব হয়েছিল, এতে মুশরিকরা বলাবলি করতে শুরু করে যে, মুহাম্মদ(সঃ) কে তাঁর প্রতিপালক পরিত্যাগ করেছেন, তখন আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর আঙ্গুলে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হলে তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি শুধু একটি আঙ্গুল বৈ তো নও, আর আল্লাহর পথে তোমার এ যখম হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুই তিন দিন উঠতে পারেননি, এতেই ঐ মহিলাটি উপরোক্ত অশালীন উক্তি করেছিল। অতঃপর উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। জানা যায় যে, ঐ দুষ্টা মহিলাটি ছিল আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল। তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত নাযিল হোক। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আঙ্গুল আহত হওয়া এবং তাতে উপরোক্ত পংক্তি আকস্মিকভাবে তার মুখে উচ্চারিত হওয়ার কথা তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, কিন্তু তাহাজ্জুদ আদায়ে অসমর্থতা যে সেই কারণে হয়েছিল এবং এই আয়াতগুলো যে ঐ উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিল এ উক্তি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বলে উল্লিখিত হয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “আপনার প্রতিপালক আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট তো হননি?” তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে বিলম্ব হওয়ায় রাসূলুল্লাহ শংকিত হয়ে পড়েন। এ কারণে হযরত খাদীজা (রাঃ) উপরোক্ত মন্তব্য করেন। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ দুটি বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মুরসাল বলা হয়েছে। তবে খাদীজা (রাঃ)-এর নাম ও উক্তি উল্লেখ এ ক্ষেত্রে সমীচীন মনে হয় না। হ্যা, তবে হয় তো দুঃখ ও বেদনার বশবর্তী হয়েই তিনি এ ধরনের উক্তি করে থাকবেন। এটা অসম্ভব নয়। তবে এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইবনে ইসহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) যে সময় তার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন এবং খুবই কাছাকাছি হয়েছিলেন সে সময় এই ধরনের অহী অবতীর্ণ হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত উক্তির অসারতা প্রমাণের জন্যেই এ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রোদ্র ওঠার সময়ের দিনের আলো, রাত্রির নীরবতা এবং অন্ধকারের শপথ করেছেন। এগুলো মহান স্রষ্টার কুদরতের এবং সৃষ্টির ঐশ্বর্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “শপথ রজনীর যখন ওটা আচ্ছন্ন করে এবং শপথ দিবসের যখন ওটা আবির্ভূত হয়।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালক তোমাকে ছেড়েও দেননি। এবং তোমার সাথে শত্রুতাও করেননি। তোমার জন্যে পরকাল ইহকাল অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ইবাদত করতেন এবং দুনিয়া বিমুখ জীবন যাপন করতেন। নবী করীম (সঃ)-এর জীবনী যারা পাঠ করেছেন তাদের কাছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন।মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি খেজুর পাতার চাটাইর উপর শুয়েছিলেন। ফলে তার দেহের পার্শ্বদেশে চাটাইর দাগ পড়ে গিয়েছিল। তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর আমি তার দেহে হাত বুলিয়ে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! চাটাইর উপর আমাকে কিছু বিছিয়ে দেয়ার অনুমতি দিন! তিনি আমার এ কথা শুনে বললেনঃ “পৃথিবীর সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমি কোথায় এবং দুনিয়া কোথায়? আমার এবং দুনিয়ার দৃষ্টান্ত তো সেই পথচারী পথিকের মত যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণ করে, তারপর গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে চলে যায়।” (এ হাদীসটি জামে তিরযিমীতেও বর্ণিত হয়েছে এবং উসূলে হাদীসের পরিভাষায় হাদীসটি হাসান) আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমার প্রতিপালক তোমাকে আখেরাতে তোমার উম্মতের জন্যে এতো নিয়ামত দিবেন যে, তুমি খুশী হয়ে যাবে। তোমাকে বিশেষ সম্মান দান করা হবে। বিশেষভাবে হাউযে কাওসার দান করা হবে। সেই হাউযে কাওসারের কিনারায় খাটি মুক্তার তাঁবু থাকবে। ওর মাটি হবে নির্ভেজাল মিশক। এ সম্পর্কিত হাদীস অচিরেই বর্ণনা করা হবে। ইনশাআল্লাহ।একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যে সব ধনাগার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে সেগুলো একে একে তার উপর প্রকাশ করা হয়। এতে তিনি খুবই খুশী হন। তারপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। জান্নাতে তাঁকে এক হাজার মহল দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক মহলে পবিত্র স্ত্রী এবং উৎকৃষ্ট মানের খাদেম রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আমর আওযায়ী (রঃ) ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ। আল্লাহর নবী (সঃ) হতে না শুনে এ ধরনের হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব নয়)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) সন্তুষ্টির এটাও একটা কারণ যে, তাঁকে জানানো হয়ঃ তাঁর আহলে বাইতের মধ্য থেকে কেউ জাহান্নামে যাবে না। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা তাঁর শাফা'আত বুঝানো হয়েছে।হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা এমন আহলে বায়েত যাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার মুকাবিলায় আখেরাতকে পছন্দ করেছেন। তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবী শায়বা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নিয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ইয়াতীম থাকা অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন, হিফাযত করেছেন, প্রতিপালন করেছেন এবং আশ্রয় দিয়েছেন। নবী করিম (সঃ)-এর জন্ম লাভের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর জন্ম লাভের পর তার পিতা ইন্তেকাল করেন। ছয় বছর বয়সের সময় তাঁর স্নেহময়ী মাতা এই নশ্বর জগত হতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। তারপর তিনি তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। তার বয়স যখন আট বছর তার দাদাও পরপারে চলে যান। অতঃপর তিনি তার চাচা আবু তালিবের নিকট প্রতিপালিত হতে থাকেন। আবু তালিব তাকে সর্বাত্মক দেখাশুনা এবং সাহায্য করেন। তিনি তাঁর স্নেহের ভ্রাতুস্পুত্রকে খুবই সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন এবং স্বজাতির বিরোধিতার ঝড়ে মুকাবিলা করতেন। নিজেকে তিনি ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সের সময় নবী করীম (সঃ) নবুওয়াত লাভ করেন। কুরায়েশরা তখন তার ভীষণ বিরোধী এমনকি প্রাণের দুশমন হয়ে গেল। আবু তালিব মুশরিক মূর্তিপূজক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে সহায়তা দান করতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে লড়াই করতেন। এই সুব্যবস্থা আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও ইঙ্গিতেই হয়েছিল। নবী করীম (সঃ)-এর ইয়াতীমী অবস্থা এভাবেই কেটে যায়। আল্লাহ তা'আলা বিরুদ্ধবাদীদের নিকট হতে এভাবেই নবী করীমের (সঃ)-এর খিদমত নেন। হিজরতের কিছুদিনের পূর্বে আৰূ তালিবও ইন্তেকাল করেন। এবার কাফির মুশরিকরা কঠিনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আল্লাহ তা'আলা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দেন এবং মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়কে তার সাহায্যকারী বানিয়ে দেন। ঐ বুর্যগ আনসার ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এবং তার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আশ্রয় দিয়েছেন, জায়গা দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। আর শত্রুদের মুকাবিলায় বীরের মত সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের সবারই প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন! এ সবই আল্লাহর মেহেরবানী, অনুগ্রহ এবং রহম করমের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে বলেনঃ তোমাকে আল্লাহ তাআলা পথহারা দেখতে পেয়ে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। যেমন অন্যত্র রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “এ ভাবেই আমি নিজের আদেশে তোমার প্রতি রুহ অর্থাৎ জিবরাইল (আঃ) কে অথবা কুরআনকে অহী হিসেবে পাঠিয়েছি। ঈমান কি জিনিস তাও তোমার জানা ছিল না, কিতাব কাকে বলে তাও জানতে না তুমি। আমি এ কিতাবকে নুর বা জ্যোতি বানিয়ে এর দ্বারা আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেছি।” (৪২:৫২) কেউ কেউ বলেন, এখানে ভাবার্থ হলো এই যে, নবী করীম (সঃ) শৈশবে মক্কার গলিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়া যাওয়ার পতে রাত্রিকালে শয়তান তাঁর উটের লাগাম ধরে চলার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। তারপর জিবরাঈল (আঃ) এসে শয়তানকে যুঁদিয়ে আবিসিনিয়ায় রেখে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারীকে সঠিক পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।” এই উভয় উক্তিই বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন।আল্লাহ তাআলা এরপর বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তিনি (আল্লাহ) তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি তোমাকে অভাবমুক্ত করলেন ফলে ধৈর্যধারণকারী দরিদ্র এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ধনীর মর্যাদা তুমি লাভ করেছো। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন!কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এসব অবস্থা নবুওয়াতের পূর্বে হয়েছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন “ধন সম্পদের প্রাচুর্য প্রকৃত ধনশীলতা নয়, বরং প্রকৃত ধনশীলতা হচ্ছে মনের ধনশীলতা বা মনের সন্তুষ্টি।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন তা যথেষ্ট মনে করেছে এবং তাতেই সন্তুষ্ট হয়েছে সে সাফল্য লাভ করেছে।”এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে সম্বোধন করে বলেনঃ সুতরাং তুমি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হয়ো না, তাকে ধমক দিয়ো না এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করো না, বরং তার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং নিজের ইয়াতীম হওয়ার কথা ভুলে যেয়ো না। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ইয়াতীমের সাথে ঠিক এমনই ব্যবহার করতে হবে যেমন ব্যবহার পিতা নিজের সন্তানের সাথে করে থাকেন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আরো বলেনঃ প্রার্থীকে না করো না। তুমি যেমন পথহারা ছিলে, আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত বা পথের দিশা দিয়েছেন, তেমনি কেউ তোমাকে জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে রূঢ় ব্যবহার দ্বারা সরিয়ে দিয়ো না। গরীব, মিসকীন, এবং দুর্বল লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করো না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করো না। তাদেরকে কড়া কথা বলো না। ইয়াতীম মিসকীনদেরকে যদি কিছু না দিতে পার তবে ভাল ও নরম কথা বলে তাদেরকে বিদায় করো এবং ভালভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দাও। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ নিজের প্রতিপালকের নিয়ামতসমূহ বর্ণনা করতে থাকো। অর্থাৎ যেমন আমি তোমার দারিদ্রকে ঐশ্বর্যে পরিবর্তিত করেছি, তেমনই তুমিও আমার এ সব নিয়ামতের কথা বর্ণনা করতে থাকো। যেমন নবী করীম (সঃ) এর দু’আও ছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী করুন, ঐ নিয়ামতের কারণে আমাদেরকে আপনার প্রশংসাকারী করুন, ঐ নিয়ামত স্বীকারকারী করুন এবং পরিপূর্ণভাবে ঐ নিয়ামত আমাদেরকে দান করুন।” আবু না (রঃ) বলেনঃ “মুসলমানরা মনে করতেন যে, নিয়ামতের বর্ণনা দেয়াও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শামিল। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ “ যে ব্যক্তি অল্প পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। সে বেশী পেয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না সে আল্লাহ তা'আলার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না। নিয়ামত স্বীকার ও বর্ণনা করাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শামিল, আর নিয়ামত অস্বীকার করা অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক। দলবদ্ধভাবে থাকা রহমত লাভের কারণ এবং দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শাস্তির কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আনসারগণ সমস্ত প্রতিদান নিয়ে গেছেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “না, যে পর্যন্ত তোমরা তাদের জন্যে দু’আ করতে থাকবে এবং তাদের প্রশংসা করতে থাকবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যারা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না তারা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃহতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিয়ামত লাভ করার পর তার বর্ণনা করেছে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আর যে তা গোপন করেছে সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “কাউকে কোন অনুগ্রহ করা হলে তার উচিত সম্ভব হলে ঐ অনুগ্রহের প্রতিদান দেয়া, আর যদি সম্ভব না হয় তবে উচিত অন্ততঃপক্ষে ঐ অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করা এবং তার প্রশংসা করা। যে ব্যক্তি এই প্রশংসা করেছে সে কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি প্রশংসাও করেনি এবং নিয়ামতের কথা প্রকাশও করেনি সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা নবুওয়াতকে বুঝানো হয়েছে। এক বর্ণনায় রয়েছে যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন।হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো কল্যাণকর যে সব কথা নিজে জান, সে সব তাদের কাছেও বর্ণনা কর। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ নবুওয়াতের যে নিয়ামত ও কারামত তুমি লাভ করেছে সেটা বর্ণনা কর। ঐ কথা আলোচনা কর। আর সেইদিকে জনগণকে দাওয়াত দাও।কাজেই নবী করীম (সঃ) নিজের লোকদের কাছে অর্থাৎ যাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল তাদের কাছে প্রথমদিকে চুপি চুপি দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তাঁর উপর নামায ফরয হয়েছিল, তিনি সেই নামায আদায় করতেন।

আদ-দুহা 93:5

হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইসমাঈল ইবনে কুসতুনতীন (রঃ) এবং হযরত শবল ইবনে ইবাদের (রঃ) সামনে কুরআন পাঠ করছিলেন। যখন তিনি (আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তারা উভয়েই বলেনঃ এখান হতে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক সূরার শেষে তাকবীর পাঠ করবেন। আমরা ইবনে কাসীর (রঃ)এর সামনে পাঠ করছিলাম, তিনি মুজাহিদ (রঃ)-এর সামনে পাঠ করলে তিনিও তাকে এই নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে অনুরূপ কথা বলেছিলেন। তিনি পাঠ করেছিলেন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সামনে। তিনিও তাঁকে এই হুকুম করেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পাঠ করেছিলেন হযরত উবাই ইবনে কাবের (রাঃ) সামনে। তিনিও তাঁকে এটারই আদেশ করেছিলেন। আর হযরত উবাই (রাঃ) পাঠ করেছিলেন রাসুলুল্লাহর সামনে এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এরই নির্দেশ দিয়েছিলেন।ইমামুল কিরআত হযরত আবু হাসানও (রঃ) এই সুন্নাতের বর্ণনাকারী। হযরত আবু হাতিম রাযী (রঃ) এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। কারণ আবুল হাসান বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। আবু হাতিম (রঃ) তাঁর নিকট হতে কোন হাদীসই নিতেন না। অনুরূপভাবে হযরত আবূ জাফর উকাইলীও (রঃ) তাঁকে মুনকারুল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু শায়েখ শিহাবুদ্দীন আবু শামাহ (রঃ) শারহি শা'তিবিয়্যায় হযরত ইমাম শাফিয়ী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একজন লোককে নামাযের মধ্যে এ তাকবীর বলতে শুনে বলেনঃ “তুমি ভাল কাজই করেছে এবং সুন্নাত পালন করেছে। এ ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, এ হাদীস সহীহ বা বিশুদ্ধ। এখন এ তাকবীর কোথায় ও কিভাবে পাঠ করতে হবে এ ব্যাপারে কারীদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) এই সূরা সমাপ্ত হওয়ার পর হতে এ তাকবীর পাঠ করতে হবে। অন্যেরা বলেছেন, (আরবি) সমাপ্ত হওয়ার পর হতে পড়তে হবে। আর কারো কারো মতে এটা পাঠের নিয়ম এই যে, শুধু আল্লাহু আকবার বলতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) বলতে হবে।কোন কোন কারী সূরা আদ্দোহা হতে এই তাকবীর পাঠ করার কারণ এই বলে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট অহী আসা কিছু দিনের জন্যে বন্ধ ছিল। তারপর হযরত জিব্রাঈল (আঃ) এই সূরা নিয়ে আসার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনন্দের আতিশয্যে তাকবীর পাঠ করেন। কিন্তু এই বর্ণনা এমন কোন সনদের সাথে বর্ণিত হয়নি যেটা দ্বারা এটাকে বিশুদ্ধ অথবা দুর্বল বলা যেতে পারে। এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।১-১১ নং আয়াতের তাফসীরহযরত জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এ কারণে তিনি একদিন বা দুদিন রাত্রে তাহাজ্জুদ নামাযের জন্যে উঠতে পারেননি। এটা জেনে একটি মহিলা এসে বলেঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমাকে তোমার শয়তান পরিত্যাগ করেছে।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জুনদুব (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে কয়েকদিন বিলম্ব হয়েছিল, এতে মুশরিকরা বলাবলি করতে শুরু করে যে, মুহাম্মদ(সঃ) কে তাঁর প্রতিপালক পরিত্যাগ করেছেন, তখন আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর আঙ্গুলে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হলে তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি শুধু একটি আঙ্গুল বৈ তো নও, আর আল্লাহর পথে তোমার এ যখম হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুই তিন দিন উঠতে পারেননি, এতেই ঐ মহিলাটি উপরোক্ত অশালীন উক্তি করেছিল। অতঃপর উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। জানা যায় যে, ঐ দুষ্টা মহিলাটি ছিল আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল। তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত নাযিল হোক। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আঙ্গুল আহত হওয়া এবং তাতে উপরোক্ত পংক্তি আকস্মিকভাবে তার মুখে উচ্চারিত হওয়ার কথা তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, কিন্তু তাহাজ্জুদ আদায়ে অসমর্থতা যে সেই কারণে হয়েছিল এবং এই আয়াতগুলো যে ঐ উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিল এ উক্তি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বলে উল্লিখিত হয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “আপনার প্রতিপালক আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট তো হননি?” তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে বিলম্ব হওয়ায় রাসূলুল্লাহ শংকিত হয়ে পড়েন। এ কারণে হযরত খাদীজা (রাঃ) উপরোক্ত মন্তব্য করেন। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ দুটি বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মুরসাল বলা হয়েছে। তবে খাদীজা (রাঃ)-এর নাম ও উক্তি উল্লেখ এ ক্ষেত্রে সমীচীন মনে হয় না। হ্যা, তবে হয় তো দুঃখ ও বেদনার বশবর্তী হয়েই তিনি এ ধরনের উক্তি করে থাকবেন। এটা অসম্ভব নয়। তবে এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইবনে ইসহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) যে সময় তার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন এবং খুবই কাছাকাছি হয়েছিলেন সে সময় এই ধরনের অহী অবতীর্ণ হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত উক্তির অসারতা প্রমাণের জন্যেই এ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রোদ্র ওঠার সময়ের দিনের আলো, রাত্রির নীরবতা এবং অন্ধকারের শপথ করেছেন। এগুলো মহান স্রষ্টার কুদরতের এবং সৃষ্টির ঐশ্বর্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “শপথ রজনীর যখন ওটা আচ্ছন্ন করে এবং শপথ দিবসের যখন ওটা আবির্ভূত হয়।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালক তোমাকে ছেড়েও দেননি। এবং তোমার সাথে শত্রুতাও করেননি। তোমার জন্যে পরকাল ইহকাল অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ইবাদত করতেন এবং দুনিয়া বিমুখ জীবন যাপন করতেন। নবী করীম (সঃ)-এর জীবনী যারা পাঠ করেছেন তাদের কাছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন।মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি খেজুর পাতার চাটাইর উপর শুয়েছিলেন। ফলে তার দেহের পার্শ্বদেশে চাটাইর দাগ পড়ে গিয়েছিল। তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর আমি তার দেহে হাত বুলিয়ে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! চাটাইর উপর আমাকে কিছু বিছিয়ে দেয়ার অনুমতি দিন! তিনি আমার এ কথা শুনে বললেনঃ “পৃথিবীর সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমি কোথায় এবং দুনিয়া কোথায়? আমার এবং দুনিয়ার দৃষ্টান্ত তো সেই পথচারী পথিকের মত যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণ করে, তারপর গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে চলে যায়।” (এ হাদীসটি জামে তিরযিমীতেও বর্ণিত হয়েছে এবং উসূলে হাদীসের পরিভাষায় হাদীসটি হাসান) আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমার প্রতিপালক তোমাকে আখেরাতে তোমার উম্মতের জন্যে এতো নিয়ামত দিবেন যে, তুমি খুশী হয়ে যাবে। তোমাকে বিশেষ সম্মান দান করা হবে। বিশেষভাবে হাউযে কাওসার দান করা হবে। সেই হাউযে কাওসারের কিনারায় খাটি মুক্তার তাঁবু থাকবে। ওর মাটি হবে নির্ভেজাল মিশক। এ সম্পর্কিত হাদীস অচিরেই বর্ণনা করা হবে। ইনশাআল্লাহ।একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যে সব ধনাগার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে সেগুলো একে একে তার উপর প্রকাশ করা হয়। এতে তিনি খুবই খুশী হন। তারপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। জান্নাতে তাঁকে এক হাজার মহল দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক মহলে পবিত্র স্ত্রী এবং উৎকৃষ্ট মানের খাদেম রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আমর আওযায়ী (রঃ) ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ। আল্লাহর নবী (সঃ) হতে না শুনে এ ধরনের হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব নয়)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) সন্তুষ্টির এটাও একটা কারণ যে, তাঁকে জানানো হয়ঃ তাঁর আহলে বাইতের মধ্য থেকে কেউ জাহান্নামে যাবে না। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা তাঁর শাফা'আত বুঝানো হয়েছে।হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা এমন আহলে বায়েত যাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার মুকাবিলায় আখেরাতকে পছন্দ করেছেন। তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবী শায়বা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নিয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ইয়াতীম থাকা অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন, হিফাযত করেছেন, প্রতিপালন করেছেন এবং আশ্রয় দিয়েছেন। নবী করিম (সঃ)-এর জন্ম লাভের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর জন্ম লাভের পর তার পিতা ইন্তেকাল করেন। ছয় বছর বয়সের সময় তাঁর স্নেহময়ী মাতা এই নশ্বর জগত হতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। তারপর তিনি তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। তার বয়স যখন আট বছর তার দাদাও পরপারে চলে যান। অতঃপর তিনি তার চাচা আবু তালিবের নিকট প্রতিপালিত হতে থাকেন। আবু তালিব তাকে সর্বাত্মক দেখাশুনা এবং সাহায্য করেন। তিনি তাঁর স্নেহের ভ্রাতুস্পুত্রকে খুবই সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন এবং স্বজাতির বিরোধিতার ঝড়ে মুকাবিলা করতেন। নিজেকে তিনি ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সের সময় নবী করীম (সঃ) নবুওয়াত লাভ করেন। কুরায়েশরা তখন তার ভীষণ বিরোধী এমনকি প্রাণের দুশমন হয়ে গেল। আবু তালিব মুশরিক মূর্তিপূজক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে সহায়তা দান করতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে লড়াই করতেন। এই সুব্যবস্থা আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও ইঙ্গিতেই হয়েছিল। নবী করীম (সঃ)-এর ইয়াতীমী অবস্থা এভাবেই কেটে যায়। আল্লাহ তা'আলা বিরুদ্ধবাদীদের নিকট হতে এভাবেই নবী করীমের (সঃ)-এর খিদমত নেন। হিজরতের কিছুদিনের পূর্বে আৰূ তালিবও ইন্তেকাল করেন। এবার কাফির মুশরিকরা কঠিনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আল্লাহ তা'আলা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দেন এবং মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়কে তার সাহায্যকারী বানিয়ে দেন। ঐ বুর্যগ আনসার ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এবং তার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আশ্রয় দিয়েছেন, জায়গা দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। আর শত্রুদের মুকাবিলায় বীরের মত সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের সবারই প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন! এ সবই আল্লাহর মেহেরবানী, অনুগ্রহ এবং রহম করমের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে বলেনঃ তোমাকে আল্লাহ তাআলা পথহারা দেখতে পেয়ে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। যেমন অন্যত্র রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “এ ভাবেই আমি নিজের আদেশে তোমার প্রতি রুহ অর্থাৎ জিবরাইল (আঃ) কে অথবা কুরআনকে অহী হিসেবে পাঠিয়েছি। ঈমান কি জিনিস তাও তোমার জানা ছিল না, কিতাব কাকে বলে তাও জানতে না তুমি। আমি এ কিতাবকে নুর বা জ্যোতি বানিয়ে এর দ্বারা আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেছি।” (৪২:৫২) কেউ কেউ বলেন, এখানে ভাবার্থ হলো এই যে, নবী করীম (সঃ) শৈশবে মক্কার গলিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়া যাওয়ার পতে রাত্রিকালে শয়তান তাঁর উটের লাগাম ধরে চলার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। তারপর জিবরাঈল (আঃ) এসে শয়তানকে যুঁদিয়ে আবিসিনিয়ায় রেখে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারীকে সঠিক পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।” এই উভয় উক্তিই বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন।আল্লাহ তাআলা এরপর বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তিনি (আল্লাহ) তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি তোমাকে অভাবমুক্ত করলেন ফলে ধৈর্যধারণকারী দরিদ্র এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ধনীর মর্যাদা তুমি লাভ করেছো। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন!কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এসব অবস্থা নবুওয়াতের পূর্বে হয়েছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন “ধন সম্পদের প্রাচুর্য প্রকৃত ধনশীলতা নয়, বরং প্রকৃত ধনশীলতা হচ্ছে মনের ধনশীলতা বা মনের সন্তুষ্টি।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন তা যথেষ্ট মনে করেছে এবং তাতেই সন্তুষ্ট হয়েছে সে সাফল্য লাভ করেছে।”এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে সম্বোধন করে বলেনঃ সুতরাং তুমি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হয়ো না, তাকে ধমক দিয়ো না এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করো না, বরং তার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং নিজের ইয়াতীম হওয়ার কথা ভুলে যেয়ো না। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ইয়াতীমের সাথে ঠিক এমনই ব্যবহার করতে হবে যেমন ব্যবহার পিতা নিজের সন্তানের সাথে করে থাকেন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আরো বলেনঃ প্রার্থীকে না করো না। তুমি যেমন পথহারা ছিলে, আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত বা পথের দিশা দিয়েছেন, তেমনি কেউ তোমাকে জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে রূঢ় ব্যবহার দ্বারা সরিয়ে দিয়ো না। গরীব, মিসকীন, এবং দুর্বল লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করো না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করো না। তাদেরকে কড়া কথা বলো না। ইয়াতীম মিসকীনদেরকে যদি কিছু না দিতে পার তবে ভাল ও নরম কথা বলে তাদেরকে বিদায় করো এবং ভালভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দাও। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ নিজের প্রতিপালকের নিয়ামতসমূহ বর্ণনা করতে থাকো। অর্থাৎ যেমন আমি তোমার দারিদ্রকে ঐশ্বর্যে পরিবর্তিত করেছি, তেমনই তুমিও আমার এ সব নিয়ামতের কথা বর্ণনা করতে থাকো। যেমন নবী করীম (সঃ) এর দু’আও ছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী করুন, ঐ নিয়ামতের কারণে আমাদেরকে আপনার প্রশংসাকারী করুন, ঐ নিয়ামত স্বীকারকারী করুন এবং পরিপূর্ণভাবে ঐ নিয়ামত আমাদেরকে দান করুন।” আবু না (রঃ) বলেনঃ “মুসলমানরা মনে করতেন যে, নিয়ামতের বর্ণনা দেয়াও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শামিল। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ “ যে ব্যক্তি অল্প পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। সে বেশী পেয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না সে আল্লাহ তা'আলার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না। নিয়ামত স্বীকার ও বর্ণনা করাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শামিল, আর নিয়ামত অস্বীকার করা অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক। দলবদ্ধভাবে থাকা রহমত লাভের কারণ এবং দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শাস্তির কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আনসারগণ সমস্ত প্রতিদান নিয়ে গেছেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “না, যে পর্যন্ত তোমরা তাদের জন্যে দু’আ করতে থাকবে এবং তাদের প্রশংসা করতে থাকবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যারা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না তারা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃহতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিয়ামত লাভ করার পর তার বর্ণনা করেছে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আর যে তা গোপন করেছে সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “কাউকে কোন অনুগ্রহ করা হলে তার উচিত সম্ভব হলে ঐ অনুগ্রহের প্রতিদান দেয়া, আর যদি সম্ভব না হয় তবে উচিত অন্ততঃপক্ষে ঐ অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করা এবং তার প্রশংসা করা। যে ব্যক্তি এই প্রশংসা করেছে সে কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি প্রশংসাও করেনি এবং নিয়ামতের কথা প্রকাশও করেনি সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা নবুওয়াতকে বুঝানো হয়েছে। এক বর্ণনায় রয়েছে যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন।হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো কল্যাণকর যে সব কথা নিজে জান, সে সব তাদের কাছেও বর্ণনা কর। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ নবুওয়াতের যে নিয়ামত ও কারামত তুমি লাভ করেছে সেটা বর্ণনা কর। ঐ কথা আলোচনা কর। আর সেইদিকে জনগণকে দাওয়াত দাও।কাজেই নবী করীম (সঃ) নিজের লোকদের কাছে অর্থাৎ যাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল তাদের কাছে প্রথমদিকে চুপি চুপি দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তাঁর উপর নামায ফরয হয়েছিল, তিনি সেই নামায আদায় করতেন।

আদ-দুহা 93:6

হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইসমাঈল ইবনে কুসতুনতীন (রঃ) এবং হযরত শবল ইবনে ইবাদের (রঃ) সামনে কুরআন পাঠ করছিলেন। যখন তিনি (আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তারা উভয়েই বলেনঃ এখান হতে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক সূরার শেষে তাকবীর পাঠ করবেন। আমরা ইবনে কাসীর (রঃ)এর সামনে পাঠ করছিলাম, তিনি মুজাহিদ (রঃ)-এর সামনে পাঠ করলে তিনিও তাকে এই নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে অনুরূপ কথা বলেছিলেন। তিনি পাঠ করেছিলেন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সামনে। তিনিও তাঁকে এই হুকুম করেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পাঠ করেছিলেন হযরত উবাই ইবনে কাবের (রাঃ) সামনে। তিনিও তাঁকে এটারই আদেশ করেছিলেন। আর হযরত উবাই (রাঃ) পাঠ করেছিলেন রাসুলুল্লাহর সামনে এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এরই নির্দেশ দিয়েছিলেন।ইমামুল কিরআত হযরত আবু হাসানও (রঃ) এই সুন্নাতের বর্ণনাকারী। হযরত আবু হাতিম রাযী (রঃ) এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। কারণ আবুল হাসান বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। আবু হাতিম (রঃ) তাঁর নিকট হতে কোন হাদীসই নিতেন না। অনুরূপভাবে হযরত আবূ জাফর উকাইলীও (রঃ) তাঁকে মুনকারুল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু শায়েখ শিহাবুদ্দীন আবু শামাহ (রঃ) শারহি শা'তিবিয়্যায় হযরত ইমাম শাফিয়ী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একজন লোককে নামাযের মধ্যে এ তাকবীর বলতে শুনে বলেনঃ “তুমি ভাল কাজই করেছে এবং সুন্নাত পালন করেছে। এ ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, এ হাদীস সহীহ বা বিশুদ্ধ। এখন এ তাকবীর কোথায় ও কিভাবে পাঠ করতে হবে এ ব্যাপারে কারীদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) এই সূরা সমাপ্ত হওয়ার পর হতে এ তাকবীর পাঠ করতে হবে। অন্যেরা বলেছেন, (আরবি) সমাপ্ত হওয়ার পর হতে পড়তে হবে। আর কারো কারো মতে এটা পাঠের নিয়ম এই যে, শুধু আল্লাহু আকবার বলতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) বলতে হবে।কোন কোন কারী সূরা আদ্দোহা হতে এই তাকবীর পাঠ করার কারণ এই বলে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট অহী আসা কিছু দিনের জন্যে বন্ধ ছিল। তারপর হযরত জিব্রাঈল (আঃ) এই সূরা নিয়ে আসার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনন্দের আতিশয্যে তাকবীর পাঠ করেন। কিন্তু এই বর্ণনা এমন কোন সনদের সাথে বর্ণিত হয়নি যেটা দ্বারা এটাকে বিশুদ্ধ অথবা দুর্বল বলা যেতে পারে। এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।১-১১ নং আয়াতের তাফসীরহযরত জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এ কারণে তিনি একদিন বা দুদিন রাত্রে তাহাজ্জুদ নামাযের জন্যে উঠতে পারেননি। এটা জেনে একটি মহিলা এসে বলেঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমাকে তোমার শয়তান পরিত্যাগ করেছে।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জুনদুব (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে কয়েকদিন বিলম্ব হয়েছিল, এতে মুশরিকরা বলাবলি করতে শুরু করে যে, মুহাম্মদ(সঃ) কে তাঁর প্রতিপালক পরিত্যাগ করেছেন, তখন আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর আঙ্গুলে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হলে তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি শুধু একটি আঙ্গুল বৈ তো নও, আর আল্লাহর পথে তোমার এ যখম হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুই তিন দিন উঠতে পারেননি, এতেই ঐ মহিলাটি উপরোক্ত অশালীন উক্তি করেছিল। অতঃপর উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। জানা যায় যে, ঐ দুষ্টা মহিলাটি ছিল আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল। তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত নাযিল হোক। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আঙ্গুল আহত হওয়া এবং তাতে উপরোক্ত পংক্তি আকস্মিকভাবে তার মুখে উচ্চারিত হওয়ার কথা তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, কিন্তু তাহাজ্জুদ আদায়ে অসমর্থতা যে সেই কারণে হয়েছিল এবং এই আয়াতগুলো যে ঐ উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিল এ উক্তি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বলে উল্লিখিত হয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “আপনার প্রতিপালক আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট তো হননি?” তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে বিলম্ব হওয়ায় রাসূলুল্লাহ শংকিত হয়ে পড়েন। এ কারণে হযরত খাদীজা (রাঃ) উপরোক্ত মন্তব্য করেন। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ দুটি বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মুরসাল বলা হয়েছে। তবে খাদীজা (রাঃ)-এর নাম ও উক্তি উল্লেখ এ ক্ষেত্রে সমীচীন মনে হয় না। হ্যা, তবে হয় তো দুঃখ ও বেদনার বশবর্তী হয়েই তিনি এ ধরনের উক্তি করে থাকবেন। এটা অসম্ভব নয়। তবে এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইবনে ইসহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) যে সময় তার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন এবং খুবই কাছাকাছি হয়েছিলেন সে সময় এই ধরনের অহী অবতীর্ণ হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত উক্তির অসারতা প্রমাণের জন্যেই এ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রোদ্র ওঠার সময়ের দিনের আলো, রাত্রির নীরবতা এবং অন্ধকারের শপথ করেছেন। এগুলো মহান স্রষ্টার কুদরতের এবং সৃষ্টির ঐশ্বর্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “শপথ রজনীর যখন ওটা আচ্ছন্ন করে এবং শপথ দিবসের যখন ওটা আবির্ভূত হয়।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালক তোমাকে ছেড়েও দেননি। এবং তোমার সাথে শত্রুতাও করেননি। তোমার জন্যে পরকাল ইহকাল অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ইবাদত করতেন এবং দুনিয়া বিমুখ জীবন যাপন করতেন। নবী করীম (সঃ)-এর জীবনী যারা পাঠ করেছেন তাদের কাছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন।মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি খেজুর পাতার চাটাইর উপর শুয়েছিলেন। ফলে তার দেহের পার্শ্বদেশে চাটাইর দাগ পড়ে গিয়েছিল। তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর আমি তার দেহে হাত বুলিয়ে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! চাটাইর উপর আমাকে কিছু বিছিয়ে দেয়ার অনুমতি দিন! তিনি আমার এ কথা শুনে বললেনঃ “পৃথিবীর সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমি কোথায় এবং দুনিয়া কোথায়? আমার এবং দুনিয়ার দৃষ্টান্ত তো সেই পথচারী পথিকের মত যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণ করে, তারপর গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে চলে যায়।” (এ হাদীসটি জামে তিরযিমীতেও বর্ণিত হয়েছে এবং উসূলে হাদীসের পরিভাষায় হাদীসটি হাসান) আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমার প্রতিপালক তোমাকে আখেরাতে তোমার উম্মতের জন্যে এতো নিয়ামত দিবেন যে, তুমি খুশী হয়ে যাবে। তোমাকে বিশেষ সম্মান দান করা হবে। বিশেষভাবে হাউযে কাওসার দান করা হবে। সেই হাউযে কাওসারের কিনারায় খাটি মুক্তার তাঁবু থাকবে। ওর মাটি হবে নির্ভেজাল মিশক। এ সম্পর্কিত হাদীস অচিরেই বর্ণনা করা হবে। ইনশাআল্লাহ।একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যে সব ধনাগার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে সেগুলো একে একে তার উপর প্রকাশ করা হয়। এতে তিনি খুবই খুশী হন। তারপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। জান্নাতে তাঁকে এক হাজার মহল দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক মহলে পবিত্র স্ত্রী এবং উৎকৃষ্ট মানের খাদেম রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আমর আওযায়ী (রঃ) ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ। আল্লাহর নবী (সঃ) হতে না শুনে এ ধরনের হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব নয়)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) সন্তুষ্টির এটাও একটা কারণ যে, তাঁকে জানানো হয়ঃ তাঁর আহলে বাইতের মধ্য থেকে কেউ জাহান্নামে যাবে না। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা তাঁর শাফা'আত বুঝানো হয়েছে।হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা এমন আহলে বায়েত যাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার মুকাবিলায় আখেরাতকে পছন্দ করেছেন। তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবী শায়বা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নিয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ইয়াতীম থাকা অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন, হিফাযত করেছেন, প্রতিপালন করেছেন এবং আশ্রয় দিয়েছেন। নবী করিম (সঃ)-এর জন্ম লাভের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর জন্ম লাভের পর তার পিতা ইন্তেকাল করেন। ছয় বছর বয়সের সময় তাঁর স্নেহময়ী মাতা এই নশ্বর জগত হতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। তারপর তিনি তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। তার বয়স যখন আট বছর তার দাদাও পরপারে চলে যান। অতঃপর তিনি তার চাচা আবু তালিবের নিকট প্রতিপালিত হতে থাকেন। আবু তালিব তাকে সর্বাত্মক দেখাশুনা এবং সাহায্য করেন। তিনি তাঁর স্নেহের ভ্রাতুস্পুত্রকে খুবই সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন এবং স্বজাতির বিরোধিতার ঝড়ে মুকাবিলা করতেন। নিজেকে তিনি ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সের সময় নবী করীম (সঃ) নবুওয়াত লাভ করেন। কুরায়েশরা তখন তার ভীষণ বিরোধী এমনকি প্রাণের দুশমন হয়ে গেল। আবু তালিব মুশরিক মূর্তিপূজক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে সহায়তা দান করতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে লড়াই করতেন। এই সুব্যবস্থা আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও ইঙ্গিতেই হয়েছিল। নবী করীম (সঃ)-এর ইয়াতীমী অবস্থা এভাবেই কেটে যায়। আল্লাহ তা'আলা বিরুদ্ধবাদীদের নিকট হতে এভাবেই নবী করীমের (সঃ)-এর খিদমত নেন। হিজরতের কিছুদিনের পূর্বে আৰূ তালিবও ইন্তেকাল করেন। এবার কাফির মুশরিকরা কঠিনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আল্লাহ তা'আলা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দেন এবং মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়কে তার সাহায্যকারী বানিয়ে দেন। ঐ বুর্যগ আনসার ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এবং তার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আশ্রয় দিয়েছেন, জায়গা দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। আর শত্রুদের মুকাবিলায় বীরের মত সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের সবারই প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন! এ সবই আল্লাহর মেহেরবানী, অনুগ্রহ এবং রহম করমের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে বলেনঃ তোমাকে আল্লাহ তাআলা পথহারা দেখতে পেয়ে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। যেমন অন্যত্র রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “এ ভাবেই আমি নিজের আদেশে তোমার প্রতি রুহ অর্থাৎ জিবরাইল (আঃ) কে অথবা কুরআনকে অহী হিসেবে পাঠিয়েছি। ঈমান কি জিনিস তাও তোমার জানা ছিল না, কিতাব কাকে বলে তাও জানতে না তুমি। আমি এ কিতাবকে নুর বা জ্যোতি বানিয়ে এর দ্বারা আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেছি।” (৪২:৫২) কেউ কেউ বলেন, এখানে ভাবার্থ হলো এই যে, নবী করীম (সঃ) শৈশবে মক্কার গলিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়া যাওয়ার পতে রাত্রিকালে শয়তান তাঁর উটের লাগাম ধরে চলার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। তারপর জিবরাঈল (আঃ) এসে শয়তানকে যুঁদিয়ে আবিসিনিয়ায় রেখে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারীকে সঠিক পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।” এই উভয় উক্তিই বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন।আল্লাহ তাআলা এরপর বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তিনি (আল্লাহ) তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি তোমাকে অভাবমুক্ত করলেন ফলে ধৈর্যধারণকারী দরিদ্র এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ধনীর মর্যাদা তুমি লাভ করেছো। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন!কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এসব অবস্থা নবুওয়াতের পূর্বে হয়েছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন “ধন সম্পদের প্রাচুর্য প্রকৃত ধনশীলতা নয়, বরং প্রকৃত ধনশীলতা হচ্ছে মনের ধনশীলতা বা মনের সন্তুষ্টি।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন তা যথেষ্ট মনে করেছে এবং তাতেই সন্তুষ্ট হয়েছে সে সাফল্য লাভ করেছে।”এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে সম্বোধন করে বলেনঃ সুতরাং তুমি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হয়ো না, তাকে ধমক দিয়ো না এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করো না, বরং তার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং নিজের ইয়াতীম হওয়ার কথা ভুলে যেয়ো না। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ইয়াতীমের সাথে ঠিক এমনই ব্যবহার করতে হবে যেমন ব্যবহার পিতা নিজের সন্তানের সাথে করে থাকেন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আরো বলেনঃ প্রার্থীকে না করো না। তুমি যেমন পথহারা ছিলে, আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত বা পথের দিশা দিয়েছেন, তেমনি কেউ তোমাকে জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে রূঢ় ব্যবহার দ্বারা সরিয়ে দিয়ো না। গরীব, মিসকীন, এবং দুর্বল লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করো না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করো না। তাদেরকে কড়া কথা বলো না। ইয়াতীম মিসকীনদেরকে যদি কিছু না দিতে পার তবে ভাল ও নরম কথা বলে তাদেরকে বিদায় করো এবং ভালভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দাও। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ নিজের প্রতিপালকের নিয়ামতসমূহ বর্ণনা করতে থাকো। অর্থাৎ যেমন আমি তোমার দারিদ্রকে ঐশ্বর্যে পরিবর্তিত করেছি, তেমনই তুমিও আমার এ সব নিয়ামতের কথা বর্ণনা করতে থাকো। যেমন নবী করীম (সঃ) এর দু’আও ছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী করুন, ঐ নিয়ামতের কারণে আমাদেরকে আপনার প্রশংসাকারী করুন, ঐ নিয়ামত স্বীকারকারী করুন এবং পরিপূর্ণভাবে ঐ নিয়ামত আমাদেরকে দান করুন।” আবু না (রঃ) বলেনঃ “মুসলমানরা মনে করতেন যে, নিয়ামতের বর্ণনা দেয়াও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শামিল। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ “ যে ব্যক্তি অল্প পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। সে বেশী পেয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না সে আল্লাহ তা'আলার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না। নিয়ামত স্বীকার ও বর্ণনা করাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শামিল, আর নিয়ামত অস্বীকার করা অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক। দলবদ্ধভাবে থাকা রহমত লাভের কারণ এবং দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শাস্তির কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আনসারগণ সমস্ত প্রতিদান নিয়ে গেছেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “না, যে পর্যন্ত তোমরা তাদের জন্যে দু’আ করতে থাকবে এবং তাদের প্রশংসা করতে থাকবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যারা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না তারা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃহতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিয়ামত লাভ করার পর তার বর্ণনা করেছে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আর যে তা গোপন করেছে সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “কাউকে কোন অনুগ্রহ করা হলে তার উচিত সম্ভব হলে ঐ অনুগ্রহের প্রতিদান দেয়া, আর যদি সম্ভব না হয় তবে উচিত অন্ততঃপক্ষে ঐ অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করা এবং তার প্রশংসা করা। যে ব্যক্তি এই প্রশংসা করেছে সে কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি প্রশংসাও করেনি এবং নিয়ামতের কথা প্রকাশও করেনি সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা নবুওয়াতকে বুঝানো হয়েছে। এক বর্ণনায় রয়েছে যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন।হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো কল্যাণকর যে সব কথা নিজে জান, সে সব তাদের কাছেও বর্ণনা কর। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ নবুওয়াতের যে নিয়ামত ও কারামত তুমি লাভ করেছে সেটা বর্ণনা কর। ঐ কথা আলোচনা কর। আর সেইদিকে জনগণকে দাওয়াত দাও।কাজেই নবী করীম (সঃ) নিজের লোকদের কাছে অর্থাৎ যাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল তাদের কাছে প্রথমদিকে চুপি চুপি দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তাঁর উপর নামায ফরয হয়েছিল, তিনি সেই নামায আদায় করতেন।

আদ-দুহা 93:7

হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইসমাঈল ইবনে কুসতুনতীন (রঃ) এবং হযরত শবল ইবনে ইবাদের (রঃ) সামনে কুরআন পাঠ করছিলেন। যখন তিনি (আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তারা উভয়েই বলেনঃ এখান হতে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক সূরার শেষে তাকবীর পাঠ করবেন। আমরা ইবনে কাসীর (রঃ)এর সামনে পাঠ করছিলাম, তিনি মুজাহিদ (রঃ)-এর সামনে পাঠ করলে তিনিও তাকে এই নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে অনুরূপ কথা বলেছিলেন। তিনি পাঠ করেছিলেন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সামনে। তিনিও তাঁকে এই হুকুম করেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পাঠ করেছিলেন হযরত উবাই ইবনে কাবের (রাঃ) সামনে। তিনিও তাঁকে এটারই আদেশ করেছিলেন। আর হযরত উবাই (রাঃ) পাঠ করেছিলেন রাসুলুল্লাহর সামনে এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এরই নির্দেশ দিয়েছিলেন।ইমামুল কিরআত হযরত আবু হাসানও (রঃ) এই সুন্নাতের বর্ণনাকারী। হযরত আবু হাতিম রাযী (রঃ) এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। কারণ আবুল হাসান বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। আবু হাতিম (রঃ) তাঁর নিকট হতে কোন হাদীসই নিতেন না। অনুরূপভাবে হযরত আবূ জাফর উকাইলীও (রঃ) তাঁকে মুনকারুল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু শায়েখ শিহাবুদ্দীন আবু শামাহ (রঃ) শারহি শা'তিবিয়্যায় হযরত ইমাম শাফিয়ী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একজন লোককে নামাযের মধ্যে এ তাকবীর বলতে শুনে বলেনঃ “তুমি ভাল কাজই করেছে এবং সুন্নাত পালন করেছে। এ ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, এ হাদীস সহীহ বা বিশুদ্ধ। এখন এ তাকবীর কোথায় ও কিভাবে পাঠ করতে হবে এ ব্যাপারে কারীদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) এই সূরা সমাপ্ত হওয়ার পর হতে এ তাকবীর পাঠ করতে হবে। অন্যেরা বলেছেন, (আরবি) সমাপ্ত হওয়ার পর হতে পড়তে হবে। আর কারো কারো মতে এটা পাঠের নিয়ম এই যে, শুধু আল্লাহু আকবার বলতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) বলতে হবে।কোন কোন কারী সূরা আদ্দোহা হতে এই তাকবীর পাঠ করার কারণ এই বলে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট অহী আসা কিছু দিনের জন্যে বন্ধ ছিল। তারপর হযরত জিব্রাঈল (আঃ) এই সূরা নিয়ে আসার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনন্দের আতিশয্যে তাকবীর পাঠ করেন। কিন্তু এই বর্ণনা এমন কোন সনদের সাথে বর্ণিত হয়নি যেটা দ্বারা এটাকে বিশুদ্ধ অথবা দুর্বল বলা যেতে পারে। এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।১-১১ নং আয়াতের তাফসীরহযরত জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এ কারণে তিনি একদিন বা দুদিন রাত্রে তাহাজ্জুদ নামাযের জন্যে উঠতে পারেননি। এটা জেনে একটি মহিলা এসে বলেঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমাকে তোমার শয়তান পরিত্যাগ করেছে।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জুনদুব (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে কয়েকদিন বিলম্ব হয়েছিল, এতে মুশরিকরা বলাবলি করতে শুরু করে যে, মুহাম্মদ(সঃ) কে তাঁর প্রতিপালক পরিত্যাগ করেছেন, তখন আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর আঙ্গুলে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হলে তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি শুধু একটি আঙ্গুল বৈ তো নও, আর আল্লাহর পথে তোমার এ যখম হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুই তিন দিন উঠতে পারেননি, এতেই ঐ মহিলাটি উপরোক্ত অশালীন উক্তি করেছিল। অতঃপর উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। জানা যায় যে, ঐ দুষ্টা মহিলাটি ছিল আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল। তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত নাযিল হোক। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আঙ্গুল আহত হওয়া এবং তাতে উপরোক্ত পংক্তি আকস্মিকভাবে তার মুখে উচ্চারিত হওয়ার কথা তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, কিন্তু তাহাজ্জুদ আদায়ে অসমর্থতা যে সেই কারণে হয়েছিল এবং এই আয়াতগুলো যে ঐ উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিল এ উক্তি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বলে উল্লিখিত হয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “আপনার প্রতিপালক আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট তো হননি?” তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে বিলম্ব হওয়ায় রাসূলুল্লাহ শংকিত হয়ে পড়েন। এ কারণে হযরত খাদীজা (রাঃ) উপরোক্ত মন্তব্য করেন। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ দুটি বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মুরসাল বলা হয়েছে। তবে খাদীজা (রাঃ)-এর নাম ও উক্তি উল্লেখ এ ক্ষেত্রে সমীচীন মনে হয় না। হ্যা, তবে হয় তো দুঃখ ও বেদনার বশবর্তী হয়েই তিনি এ ধরনের উক্তি করে থাকবেন। এটা অসম্ভব নয়। তবে এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইবনে ইসহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) যে সময় তার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন এবং খুবই কাছাকাছি হয়েছিলেন সে সময় এই ধরনের অহী অবতীর্ণ হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত উক্তির অসারতা প্রমাণের জন্যেই এ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রোদ্র ওঠার সময়ের দিনের আলো, রাত্রির নীরবতা এবং অন্ধকারের শপথ করেছেন। এগুলো মহান স্রষ্টার কুদরতের এবং সৃষ্টির ঐশ্বর্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “শপথ রজনীর যখন ওটা আচ্ছন্ন করে এবং শপথ দিবসের যখন ওটা আবির্ভূত হয়।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালক তোমাকে ছেড়েও দেননি। এবং তোমার সাথে শত্রুতাও করেননি। তোমার জন্যে পরকাল ইহকাল অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ইবাদত করতেন এবং দুনিয়া বিমুখ জীবন যাপন করতেন। নবী করীম (সঃ)-এর জীবনী যারা পাঠ করেছেন তাদের কাছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন।মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি খেজুর পাতার চাটাইর উপর শুয়েছিলেন। ফলে তার দেহের পার্শ্বদেশে চাটাইর দাগ পড়ে গিয়েছিল। তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর আমি তার দেহে হাত বুলিয়ে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! চাটাইর উপর আমাকে কিছু বিছিয়ে দেয়ার অনুমতি দিন! তিনি আমার এ কথা শুনে বললেনঃ “পৃথিবীর সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমি কোথায় এবং দুনিয়া কোথায়? আমার এবং দুনিয়ার দৃষ্টান্ত তো সেই পথচারী পথিকের মত যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণ করে, তারপর গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে চলে যায়।” (এ হাদীসটি জামে তিরযিমীতেও বর্ণিত হয়েছে এবং উসূলে হাদীসের পরিভাষায় হাদীসটি হাসান) আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমার প্রতিপালক তোমাকে আখেরাতে তোমার উম্মতের জন্যে এতো নিয়ামত দিবেন যে, তুমি খুশী হয়ে যাবে। তোমাকে বিশেষ সম্মান দান করা হবে। বিশেষভাবে হাউযে কাওসার দান করা হবে। সেই হাউযে কাওসারের কিনারায় খাটি মুক্তার তাঁবু থাকবে। ওর মাটি হবে নির্ভেজাল মিশক। এ সম্পর্কিত হাদীস অচিরেই বর্ণনা করা হবে। ইনশাআল্লাহ।একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যে সব ধনাগার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে সেগুলো একে একে তার উপর প্রকাশ করা হয়। এতে তিনি খুবই খুশী হন। তারপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। জান্নাতে তাঁকে এক হাজার মহল দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক মহলে পবিত্র স্ত্রী এবং উৎকৃষ্ট মানের খাদেম রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আমর আওযায়ী (রঃ) ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ। আল্লাহর নবী (সঃ) হতে না শুনে এ ধরনের হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব নয়)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) সন্তুষ্টির এটাও একটা কারণ যে, তাঁকে জানানো হয়ঃ তাঁর আহলে বাইতের মধ্য থেকে কেউ জাহান্নামে যাবে না। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা তাঁর শাফা'আত বুঝানো হয়েছে।হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা এমন আহলে বায়েত যাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার মুকাবিলায় আখেরাতকে পছন্দ করেছেন। তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবী শায়বা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নিয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ইয়াতীম থাকা অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন, হিফাযত করেছেন, প্রতিপালন করেছেন এবং আশ্রয় দিয়েছেন। নবী করিম (সঃ)-এর জন্ম লাভের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর জন্ম লাভের পর তার পিতা ইন্তেকাল করেন। ছয় বছর বয়সের সময় তাঁর স্নেহময়ী মাতা এই নশ্বর জগত হতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। তারপর তিনি তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। তার বয়স যখন আট বছর তার দাদাও পরপারে চলে যান। অতঃপর তিনি তার চাচা আবু তালিবের নিকট প্রতিপালিত হতে থাকেন। আবু তালিব তাকে সর্বাত্মক দেখাশুনা এবং সাহায্য করেন। তিনি তাঁর স্নেহের ভ্রাতুস্পুত্রকে খুবই সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন এবং স্বজাতির বিরোধিতার ঝড়ে মুকাবিলা করতেন। নিজেকে তিনি ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সের সময় নবী করীম (সঃ) নবুওয়াত লাভ করেন। কুরায়েশরা তখন তার ভীষণ বিরোধী এমনকি প্রাণের দুশমন হয়ে গেল। আবু তালিব মুশরিক মূর্তিপূজক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে সহায়তা দান করতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে লড়াই করতেন। এই সুব্যবস্থা আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও ইঙ্গিতেই হয়েছিল। নবী করীম (সঃ)-এর ইয়াতীমী অবস্থা এভাবেই কেটে যায়। আল্লাহ তা'আলা বিরুদ্ধবাদীদের নিকট হতে এভাবেই নবী করীমের (সঃ)-এর খিদমত নেন। হিজরতের কিছুদিনের পূর্বে আৰূ তালিবও ইন্তেকাল করেন। এবার কাফির মুশরিকরা কঠিনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আল্লাহ তা'আলা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দেন এবং মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়কে তার সাহায্যকারী বানিয়ে দেন। ঐ বুর্যগ আনসার ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এবং তার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আশ্রয় দিয়েছেন, জায়গা দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। আর শত্রুদের মুকাবিলায় বীরের মত সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের সবারই প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন! এ সবই আল্লাহর মেহেরবানী, অনুগ্রহ এবং রহম করমের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে বলেনঃ তোমাকে আল্লাহ তাআলা পথহারা দেখতে পেয়ে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। যেমন অন্যত্র রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “এ ভাবেই আমি নিজের আদেশে তোমার প্রতি রুহ অর্থাৎ জিবরাইল (আঃ) কে অথবা কুরআনকে অহী হিসেবে পাঠিয়েছি। ঈমান কি জিনিস তাও তোমার জানা ছিল না, কিতাব কাকে বলে তাও জানতে না তুমি। আমি এ কিতাবকে নুর বা জ্যোতি বানিয়ে এর দ্বারা আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেছি।” (৪২:৫২) কেউ কেউ বলেন, এখানে ভাবার্থ হলো এই যে, নবী করীম (সঃ) শৈশবে মক্কার গলিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়া যাওয়ার পতে রাত্রিকালে শয়তান তাঁর উটের লাগাম ধরে চলার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। তারপর জিবরাঈল (আঃ) এসে শয়তানকে যুঁদিয়ে আবিসিনিয়ায় রেখে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারীকে সঠিক পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।” এই উভয় উক্তিই বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন।আল্লাহ তাআলা এরপর বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তিনি (আল্লাহ) তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি তোমাকে অভাবমুক্ত করলেন ফলে ধৈর্যধারণকারী দরিদ্র এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ধনীর মর্যাদা তুমি লাভ করেছো। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন!কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এসব অবস্থা নবুওয়াতের পূর্বে হয়েছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন “ধন সম্পদের প্রাচুর্য প্রকৃত ধনশীলতা নয়, বরং প্রকৃত ধনশীলতা হচ্ছে মনের ধনশীলতা বা মনের সন্তুষ্টি।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন তা যথেষ্ট মনে করেছে এবং তাতেই সন্তুষ্ট হয়েছে সে সাফল্য লাভ করেছে।”এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে সম্বোধন করে বলেনঃ সুতরাং তুমি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হয়ো না, তাকে ধমক দিয়ো না এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করো না, বরং তার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং নিজের ইয়াতীম হওয়ার কথা ভুলে যেয়ো না। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ইয়াতীমের সাথে ঠিক এমনই ব্যবহার করতে হবে যেমন ব্যবহার পিতা নিজের সন্তানের সাথে করে থাকেন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আরো বলেনঃ প্রার্থীকে না করো না। তুমি যেমন পথহারা ছিলে, আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত বা পথের দিশা দিয়েছেন, তেমনি কেউ তোমাকে জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে রূঢ় ব্যবহার দ্বারা সরিয়ে দিয়ো না। গরীব, মিসকীন, এবং দুর্বল লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করো না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করো না। তাদেরকে কড়া কথা বলো না। ইয়াতীম মিসকীনদেরকে যদি কিছু না দিতে পার তবে ভাল ও নরম কথা বলে তাদেরকে বিদায় করো এবং ভালভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দাও। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ নিজের প্রতিপালকের নিয়ামতসমূহ বর্ণনা করতে থাকো। অর্থাৎ যেমন আমি তোমার দারিদ্রকে ঐশ্বর্যে পরিবর্তিত করেছি, তেমনই তুমিও আমার এ সব নিয়ামতের কথা বর্ণনা করতে থাকো। যেমন নবী করীম (সঃ) এর দু’আও ছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী করুন, ঐ নিয়ামতের কারণে আমাদেরকে আপনার প্রশংসাকারী করুন, ঐ নিয়ামত স্বীকারকারী করুন এবং পরিপূর্ণভাবে ঐ নিয়ামত আমাদেরকে দান করুন।” আবু না (রঃ) বলেনঃ “মুসলমানরা মনে করতেন যে, নিয়ামতের বর্ণনা দেয়াও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শামিল। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ “ যে ব্যক্তি অল্প পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। সে বেশী পেয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না সে আল্লাহ তা'আলার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না। নিয়ামত স্বীকার ও বর্ণনা করাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শামিল, আর নিয়ামত অস্বীকার করা অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক। দলবদ্ধভাবে থাকা রহমত লাভের কারণ এবং দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শাস্তির কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আনসারগণ সমস্ত প্রতিদান নিয়ে গেছেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “না, যে পর্যন্ত তোমরা তাদের জন্যে দু’আ করতে থাকবে এবং তাদের প্রশংসা করতে থাকবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যারা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না তারা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃহতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিয়ামত লাভ করার পর তার বর্ণনা করেছে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আর যে তা গোপন করেছে সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “কাউকে কোন অনুগ্রহ করা হলে তার উচিত সম্ভব হলে ঐ অনুগ্রহের প্রতিদান দেয়া, আর যদি সম্ভব না হয় তবে উচিত অন্ততঃপক্ষে ঐ অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করা এবং তার প্রশংসা করা। যে ব্যক্তি এই প্রশংসা করেছে সে কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি প্রশংসাও করেনি এবং নিয়ামতের কথা প্রকাশও করেনি সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা নবুওয়াতকে বুঝানো হয়েছে। এক বর্ণনায় রয়েছে যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন।হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো কল্যাণকর যে সব কথা নিজে জান, সে সব তাদের কাছেও বর্ণনা কর। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ নবুওয়াতের যে নিয়ামত ও কারামত তুমি লাভ করেছে সেটা বর্ণনা কর। ঐ কথা আলোচনা কর। আর সেইদিকে জনগণকে দাওয়াত দাও।কাজেই নবী করীম (সঃ) নিজের লোকদের কাছে অর্থাৎ যাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল তাদের কাছে প্রথমদিকে চুপি চুপি দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তাঁর উপর নামায ফরয হয়েছিল, তিনি সেই নামায আদায় করতেন।

আদ-দুহা 93:8

হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইসমাঈল ইবনে কুসতুনতীন (রঃ) এবং হযরত শবল ইবনে ইবাদের (রঃ) সামনে কুরআন পাঠ করছিলেন। যখন তিনি (আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তারা উভয়েই বলেনঃ এখান হতে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক সূরার শেষে তাকবীর পাঠ করবেন। আমরা ইবনে কাসীর (রঃ)এর সামনে পাঠ করছিলাম, তিনি মুজাহিদ (রঃ)-এর সামনে পাঠ করলে তিনিও তাকে এই নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে অনুরূপ কথা বলেছিলেন। তিনি পাঠ করেছিলেন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সামনে। তিনিও তাঁকে এই হুকুম করেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পাঠ করেছিলেন হযরত উবাই ইবনে কাবের (রাঃ) সামনে। তিনিও তাঁকে এটারই আদেশ করেছিলেন। আর হযরত উবাই (রাঃ) পাঠ করেছিলেন রাসুলুল্লাহর সামনে এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এরই নির্দেশ দিয়েছিলেন।ইমামুল কিরআত হযরত আবু হাসানও (রঃ) এই সুন্নাতের বর্ণনাকারী। হযরত আবু হাতিম রাযী (রঃ) এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। কারণ আবুল হাসান বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। আবু হাতিম (রঃ) তাঁর নিকট হতে কোন হাদীসই নিতেন না। অনুরূপভাবে হযরত আবূ জাফর উকাইলীও (রঃ) তাঁকে মুনকারুল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু শায়েখ শিহাবুদ্দীন আবু শামাহ (রঃ) শারহি শা'তিবিয়্যায় হযরত ইমাম শাফিয়ী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একজন লোককে নামাযের মধ্যে এ তাকবীর বলতে শুনে বলেনঃ “তুমি ভাল কাজই করেছে এবং সুন্নাত পালন করেছে। এ ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, এ হাদীস সহীহ বা বিশুদ্ধ। এখন এ তাকবীর কোথায় ও কিভাবে পাঠ করতে হবে এ ব্যাপারে কারীদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) এই সূরা সমাপ্ত হওয়ার পর হতে এ তাকবীর পাঠ করতে হবে। অন্যেরা বলেছেন, (আরবি) সমাপ্ত হওয়ার পর হতে পড়তে হবে। আর কারো কারো মতে এটা পাঠের নিয়ম এই যে, শুধু আল্লাহু আকবার বলতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) বলতে হবে।কোন কোন কারী সূরা আদ্দোহা হতে এই তাকবীর পাঠ করার কারণ এই বলে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট অহী আসা কিছু দিনের জন্যে বন্ধ ছিল। তারপর হযরত জিব্রাঈল (আঃ) এই সূরা নিয়ে আসার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনন্দের আতিশয্যে তাকবীর পাঠ করেন। কিন্তু এই বর্ণনা এমন কোন সনদের সাথে বর্ণিত হয়নি যেটা দ্বারা এটাকে বিশুদ্ধ অথবা দুর্বল বলা যেতে পারে। এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।১-১১ নং আয়াতের তাফসীরহযরত জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এ কারণে তিনি একদিন বা দুদিন রাত্রে তাহাজ্জুদ নামাযের জন্যে উঠতে পারেননি। এটা জেনে একটি মহিলা এসে বলেঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমাকে তোমার শয়তান পরিত্যাগ করেছে।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জুনদুব (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে কয়েকদিন বিলম্ব হয়েছিল, এতে মুশরিকরা বলাবলি করতে শুরু করে যে, মুহাম্মদ(সঃ) কে তাঁর প্রতিপালক পরিত্যাগ করেছেন, তখন আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর আঙ্গুলে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হলে তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি শুধু একটি আঙ্গুল বৈ তো নও, আর আল্লাহর পথে তোমার এ যখম হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুই তিন দিন উঠতে পারেননি, এতেই ঐ মহিলাটি উপরোক্ত অশালীন উক্তি করেছিল। অতঃপর উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। জানা যায় যে, ঐ দুষ্টা মহিলাটি ছিল আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল। তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত নাযিল হোক। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আঙ্গুল আহত হওয়া এবং তাতে উপরোক্ত পংক্তি আকস্মিকভাবে তার মুখে উচ্চারিত হওয়ার কথা তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, কিন্তু তাহাজ্জুদ আদায়ে অসমর্থতা যে সেই কারণে হয়েছিল এবং এই আয়াতগুলো যে ঐ উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিল এ উক্তি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বলে উল্লিখিত হয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “আপনার প্রতিপালক আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট তো হননি?” তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে বিলম্ব হওয়ায় রাসূলুল্লাহ শংকিত হয়ে পড়েন। এ কারণে হযরত খাদীজা (রাঃ) উপরোক্ত মন্তব্য করেন। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ দুটি বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মুরসাল বলা হয়েছে। তবে খাদীজা (রাঃ)-এর নাম ও উক্তি উল্লেখ এ ক্ষেত্রে সমীচীন মনে হয় না। হ্যা, তবে হয় তো দুঃখ ও বেদনার বশবর্তী হয়েই তিনি এ ধরনের উক্তি করে থাকবেন। এটা অসম্ভব নয়। তবে এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইবনে ইসহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) যে সময় তার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন এবং খুবই কাছাকাছি হয়েছিলেন সে সময় এই ধরনের অহী অবতীর্ণ হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত উক্তির অসারতা প্রমাণের জন্যেই এ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রোদ্র ওঠার সময়ের দিনের আলো, রাত্রির নীরবতা এবং অন্ধকারের শপথ করেছেন। এগুলো মহান স্রষ্টার কুদরতের এবং সৃষ্টির ঐশ্বর্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “শপথ রজনীর যখন ওটা আচ্ছন্ন করে এবং শপথ দিবসের যখন ওটা আবির্ভূত হয়।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালক তোমাকে ছেড়েও দেননি। এবং তোমার সাথে শত্রুতাও করেননি। তোমার জন্যে পরকাল ইহকাল অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ইবাদত করতেন এবং দুনিয়া বিমুখ জীবন যাপন করতেন। নবী করীম (সঃ)-এর জীবনী যারা পাঠ করেছেন তাদের কাছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন।মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি খেজুর পাতার চাটাইর উপর শুয়েছিলেন। ফলে তার দেহের পার্শ্বদেশে চাটাইর দাগ পড়ে গিয়েছিল। তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর আমি তার দেহে হাত বুলিয়ে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! চাটাইর উপর আমাকে কিছু বিছিয়ে দেয়ার অনুমতি দিন! তিনি আমার এ কথা শুনে বললেনঃ “পৃথিবীর সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমি কোথায় এবং দুনিয়া কোথায়? আমার এবং দুনিয়ার দৃষ্টান্ত তো সেই পথচারী পথিকের মত যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণ করে, তারপর গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে চলে যায়।” (এ হাদীসটি জামে তিরযিমীতেও বর্ণিত হয়েছে এবং উসূলে হাদীসের পরিভাষায় হাদীসটি হাসান) আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমার প্রতিপালক তোমাকে আখেরাতে তোমার উম্মতের জন্যে এতো নিয়ামত দিবেন যে, তুমি খুশী হয়ে যাবে। তোমাকে বিশেষ সম্মান দান করা হবে। বিশেষভাবে হাউযে কাওসার দান করা হবে। সেই হাউযে কাওসারের কিনারায় খাটি মুক্তার তাঁবু থাকবে। ওর মাটি হবে নির্ভেজাল মিশক। এ সম্পর্কিত হাদীস অচিরেই বর্ণনা করা হবে। ইনশাআল্লাহ।একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যে সব ধনাগার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে সেগুলো একে একে তার উপর প্রকাশ করা হয়। এতে তিনি খুবই খুশী হন। তারপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। জান্নাতে তাঁকে এক হাজার মহল দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক মহলে পবিত্র স্ত্রী এবং উৎকৃষ্ট মানের খাদেম রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আমর আওযায়ী (রঃ) ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ। আল্লাহর নবী (সঃ) হতে না শুনে এ ধরনের হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব নয়)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) সন্তুষ্টির এটাও একটা কারণ যে, তাঁকে জানানো হয়ঃ তাঁর আহলে বাইতের মধ্য থেকে কেউ জাহান্নামে যাবে না। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা তাঁর শাফা'আত বুঝানো হয়েছে।হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা এমন আহলে বায়েত যাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার মুকাবিলায় আখেরাতকে পছন্দ করেছেন। তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবী শায়বা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নিয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ইয়াতীম থাকা অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন, হিফাযত করেছেন, প্রতিপালন করেছেন এবং আশ্রয় দিয়েছেন। নবী করিম (সঃ)-এর জন্ম লাভের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর জন্ম লাভের পর তার পিতা ইন্তেকাল করেন। ছয় বছর বয়সের সময় তাঁর স্নেহময়ী মাতা এই নশ্বর জগত হতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। তারপর তিনি তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। তার বয়স যখন আট বছর তার দাদাও পরপারে চলে যান। অতঃপর তিনি তার চাচা আবু তালিবের নিকট প্রতিপালিত হতে থাকেন। আবু তালিব তাকে সর্বাত্মক দেখাশুনা এবং সাহায্য করেন। তিনি তাঁর স্নেহের ভ্রাতুস্পুত্রকে খুবই সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন এবং স্বজাতির বিরোধিতার ঝড়ে মুকাবিলা করতেন। নিজেকে তিনি ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সের সময় নবী করীম (সঃ) নবুওয়াত লাভ করেন। কুরায়েশরা তখন তার ভীষণ বিরোধী এমনকি প্রাণের দুশমন হয়ে গেল। আবু তালিব মুশরিক মূর্তিপূজক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে সহায়তা দান করতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে লড়াই করতেন। এই সুব্যবস্থা আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও ইঙ্গিতেই হয়েছিল। নবী করীম (সঃ)-এর ইয়াতীমী অবস্থা এভাবেই কেটে যায়। আল্লাহ তা'আলা বিরুদ্ধবাদীদের নিকট হতে এভাবেই নবী করীমের (সঃ)-এর খিদমত নেন। হিজরতের কিছুদিনের পূর্বে আৰূ তালিবও ইন্তেকাল করেন। এবার কাফির মুশরিকরা কঠিনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আল্লাহ তা'আলা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দেন এবং মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়কে তার সাহায্যকারী বানিয়ে দেন। ঐ বুর্যগ আনসার ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এবং তার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আশ্রয় দিয়েছেন, জায়গা দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। আর শত্রুদের মুকাবিলায় বীরের মত সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের সবারই প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন! এ সবই আল্লাহর মেহেরবানী, অনুগ্রহ এবং রহম করমের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে বলেনঃ তোমাকে আল্লাহ তাআলা পথহারা দেখতে পেয়ে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। যেমন অন্যত্র রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “এ ভাবেই আমি নিজের আদেশে তোমার প্রতি রুহ অর্থাৎ জিবরাইল (আঃ) কে অথবা কুরআনকে অহী হিসেবে পাঠিয়েছি। ঈমান কি জিনিস তাও তোমার জানা ছিল না, কিতাব কাকে বলে তাও জানতে না তুমি। আমি এ কিতাবকে নুর বা জ্যোতি বানিয়ে এর দ্বারা আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেছি।” (৪২:৫২) কেউ কেউ বলেন, এখানে ভাবার্থ হলো এই যে, নবী করীম (সঃ) শৈশবে মক্কার গলিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়া যাওয়ার পতে রাত্রিকালে শয়তান তাঁর উটের লাগাম ধরে চলার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। তারপর জিবরাঈল (আঃ) এসে শয়তানকে যুঁদিয়ে আবিসিনিয়ায় রেখে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারীকে সঠিক পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।” এই উভয় উক্তিই বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন।আল্লাহ তাআলা এরপর বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তিনি (আল্লাহ) তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি তোমাকে অভাবমুক্ত করলেন ফলে ধৈর্যধারণকারী দরিদ্র এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ধনীর মর্যাদা তুমি লাভ করেছো। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন!কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এসব অবস্থা নবুওয়াতের পূর্বে হয়েছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন “ধন সম্পদের প্রাচুর্য প্রকৃত ধনশীলতা নয়, বরং প্রকৃত ধনশীলতা হচ্ছে মনের ধনশীলতা বা মনের সন্তুষ্টি।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন তা যথেষ্ট মনে করেছে এবং তাতেই সন্তুষ্ট হয়েছে সে সাফল্য লাভ করেছে।”এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে সম্বোধন করে বলেনঃ সুতরাং তুমি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হয়ো না, তাকে ধমক দিয়ো না এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করো না, বরং তার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং নিজের ইয়াতীম হওয়ার কথা ভুলে যেয়ো না। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ইয়াতীমের সাথে ঠিক এমনই ব্যবহার করতে হবে যেমন ব্যবহার পিতা নিজের সন্তানের সাথে করে থাকেন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আরো বলেনঃ প্রার্থীকে না করো না। তুমি যেমন পথহারা ছিলে, আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত বা পথের দিশা দিয়েছেন, তেমনি কেউ তোমাকে জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে রূঢ় ব্যবহার দ্বারা সরিয়ে দিয়ো না। গরীব, মিসকীন, এবং দুর্বল লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করো না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করো না। তাদেরকে কড়া কথা বলো না। ইয়াতীম মিসকীনদেরকে যদি কিছু না দিতে পার তবে ভাল ও নরম কথা বলে তাদেরকে বিদায় করো এবং ভালভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দাও। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ নিজের প্রতিপালকের নিয়ামতসমূহ বর্ণনা করতে থাকো। অর্থাৎ যেমন আমি তোমার দারিদ্রকে ঐশ্বর্যে পরিবর্তিত করেছি, তেমনই তুমিও আমার এ সব নিয়ামতের কথা বর্ণনা করতে থাকো। যেমন নবী করীম (সঃ) এর দু’আও ছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী করুন, ঐ নিয়ামতের কারণে আমাদেরকে আপনার প্রশংসাকারী করুন, ঐ নিয়ামত স্বীকারকারী করুন এবং পরিপূর্ণভাবে ঐ নিয়ামত আমাদেরকে দান করুন।” আবু না (রঃ) বলেনঃ “মুসলমানরা মনে করতেন যে, নিয়ামতের বর্ণনা দেয়াও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শামিল। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ “ যে ব্যক্তি অল্প পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। সে বেশী পেয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না সে আল্লাহ তা'আলার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না। নিয়ামত স্বীকার ও বর্ণনা করাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শামিল, আর নিয়ামত অস্বীকার করা অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক। দলবদ্ধভাবে থাকা রহমত লাভের কারণ এবং দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শাস্তির কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আনসারগণ সমস্ত প্রতিদান নিয়ে গেছেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “না, যে পর্যন্ত তোমরা তাদের জন্যে দু’আ করতে থাকবে এবং তাদের প্রশংসা করতে থাকবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যারা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না তারা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃহতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিয়ামত লাভ করার পর তার বর্ণনা করেছে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আর যে তা গোপন করেছে সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “কাউকে কোন অনুগ্রহ করা হলে তার উচিত সম্ভব হলে ঐ অনুগ্রহের প্রতিদান দেয়া, আর যদি সম্ভব না হয় তবে উচিত অন্ততঃপক্ষে ঐ অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করা এবং তার প্রশংসা করা। যে ব্যক্তি এই প্রশংসা করেছে সে কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি প্রশংসাও করেনি এবং নিয়ামতের কথা প্রকাশও করেনি সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা নবুওয়াতকে বুঝানো হয়েছে। এক বর্ণনায় রয়েছে যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন।হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো কল্যাণকর যে সব কথা নিজে জান, সে সব তাদের কাছেও বর্ণনা কর। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ নবুওয়াতের যে নিয়ামত ও কারামত তুমি লাভ করেছে সেটা বর্ণনা কর। ঐ কথা আলোচনা কর। আর সেইদিকে জনগণকে দাওয়াত দাও।কাজেই নবী করীম (সঃ) নিজের লোকদের কাছে অর্থাৎ যাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল তাদের কাছে প্রথমদিকে চুপি চুপি দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তাঁর উপর নামায ফরয হয়েছিল, তিনি সেই নামায আদায় করতেন।

আদ-দুহা 93:9

হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইসমাঈল ইবনে কুসতুনতীন (রঃ) এবং হযরত শবল ইবনে ইবাদের (রঃ) সামনে কুরআন পাঠ করছিলেন। যখন তিনি (আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তারা উভয়েই বলেনঃ এখান হতে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক সূরার শেষে তাকবীর পাঠ করবেন। আমরা ইবনে কাসীর (রঃ)এর সামনে পাঠ করছিলাম, তিনি মুজাহিদ (রঃ)-এর সামনে পাঠ করলে তিনিও তাকে এই নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে অনুরূপ কথা বলেছিলেন। তিনি পাঠ করেছিলেন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সামনে। তিনিও তাঁকে এই হুকুম করেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পাঠ করেছিলেন হযরত উবাই ইবনে কাবের (রাঃ) সামনে। তিনিও তাঁকে এটারই আদেশ করেছিলেন। আর হযরত উবাই (রাঃ) পাঠ করেছিলেন রাসুলুল্লাহর সামনে এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এরই নির্দেশ দিয়েছিলেন।ইমামুল কিরআত হযরত আবু হাসানও (রঃ) এই সুন্নাতের বর্ণনাকারী। হযরত আবু হাতিম রাযী (রঃ) এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। কারণ আবুল হাসান বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। আবু হাতিম (রঃ) তাঁর নিকট হতে কোন হাদীসই নিতেন না। অনুরূপভাবে হযরত আবূ জাফর উকাইলীও (রঃ) তাঁকে মুনকারুল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু শায়েখ শিহাবুদ্দীন আবু শামাহ (রঃ) শারহি শা'তিবিয়্যায় হযরত ইমাম শাফিয়ী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একজন লোককে নামাযের মধ্যে এ তাকবীর বলতে শুনে বলেনঃ “তুমি ভাল কাজই করেছে এবং সুন্নাত পালন করেছে। এ ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, এ হাদীস সহীহ বা বিশুদ্ধ। এখন এ তাকবীর কোথায় ও কিভাবে পাঠ করতে হবে এ ব্যাপারে কারীদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) এই সূরা সমাপ্ত হওয়ার পর হতে এ তাকবীর পাঠ করতে হবে। অন্যেরা বলেছেন, (আরবি) সমাপ্ত হওয়ার পর হতে পড়তে হবে। আর কারো কারো মতে এটা পাঠের নিয়ম এই যে, শুধু আল্লাহু আকবার বলতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) বলতে হবে।কোন কোন কারী সূরা আদ্দোহা হতে এই তাকবীর পাঠ করার কারণ এই বলে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট অহী আসা কিছু দিনের জন্যে বন্ধ ছিল। তারপর হযরত জিব্রাঈল (আঃ) এই সূরা নিয়ে আসার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনন্দের আতিশয্যে তাকবীর পাঠ করেন। কিন্তু এই বর্ণনা এমন কোন সনদের সাথে বর্ণিত হয়নি যেটা দ্বারা এটাকে বিশুদ্ধ অথবা দুর্বল বলা যেতে পারে। এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।১-১১ নং আয়াতের তাফসীরহযরত জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এ কারণে তিনি একদিন বা দুদিন রাত্রে তাহাজ্জুদ নামাযের জন্যে উঠতে পারেননি। এটা জেনে একটি মহিলা এসে বলেঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমাকে তোমার শয়তান পরিত্যাগ করেছে।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জুনদুব (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে কয়েকদিন বিলম্ব হয়েছিল, এতে মুশরিকরা বলাবলি করতে শুরু করে যে, মুহাম্মদ(সঃ) কে তাঁর প্রতিপালক পরিত্যাগ করেছেন, তখন আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর আঙ্গুলে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হলে তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি শুধু একটি আঙ্গুল বৈ তো নও, আর আল্লাহর পথে তোমার এ যখম হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুই তিন দিন উঠতে পারেননি, এতেই ঐ মহিলাটি উপরোক্ত অশালীন উক্তি করেছিল। অতঃপর উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। জানা যায় যে, ঐ দুষ্টা মহিলাটি ছিল আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল। তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত নাযিল হোক। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আঙ্গুল আহত হওয়া এবং তাতে উপরোক্ত পংক্তি আকস্মিকভাবে তার মুখে উচ্চারিত হওয়ার কথা তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, কিন্তু তাহাজ্জুদ আদায়ে অসমর্থতা যে সেই কারণে হয়েছিল এবং এই আয়াতগুলো যে ঐ উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিল এ উক্তি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বলে উল্লিখিত হয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “আপনার প্রতিপালক আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট তো হননি?” তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে বিলম্ব হওয়ায় রাসূলুল্লাহ শংকিত হয়ে পড়েন। এ কারণে হযরত খাদীজা (রাঃ) উপরোক্ত মন্তব্য করেন। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ দুটি বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মুরসাল বলা হয়েছে। তবে খাদীজা (রাঃ)-এর নাম ও উক্তি উল্লেখ এ ক্ষেত্রে সমীচীন মনে হয় না। হ্যা, তবে হয় তো দুঃখ ও বেদনার বশবর্তী হয়েই তিনি এ ধরনের উক্তি করে থাকবেন। এটা অসম্ভব নয়। তবে এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইবনে ইসহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) যে সময় তার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন এবং খুবই কাছাকাছি হয়েছিলেন সে সময় এই ধরনের অহী অবতীর্ণ হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত উক্তির অসারতা প্রমাণের জন্যেই এ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রোদ্র ওঠার সময়ের দিনের আলো, রাত্রির নীরবতা এবং অন্ধকারের শপথ করেছেন। এগুলো মহান স্রষ্টার কুদরতের এবং সৃষ্টির ঐশ্বর্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “শপথ রজনীর যখন ওটা আচ্ছন্ন করে এবং শপথ দিবসের যখন ওটা আবির্ভূত হয়।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালক তোমাকে ছেড়েও দেননি। এবং তোমার সাথে শত্রুতাও করেননি। তোমার জন্যে পরকাল ইহকাল অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ইবাদত করতেন এবং দুনিয়া বিমুখ জীবন যাপন করতেন। নবী করীম (সঃ)-এর জীবনী যারা পাঠ করেছেন তাদের কাছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন।মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি খেজুর পাতার চাটাইর উপর শুয়েছিলেন। ফলে তার দেহের পার্শ্বদেশে চাটাইর দাগ পড়ে গিয়েছিল। তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর আমি তার দেহে হাত বুলিয়ে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! চাটাইর উপর আমাকে কিছু বিছিয়ে দেয়ার অনুমতি দিন! তিনি আমার এ কথা শুনে বললেনঃ “পৃথিবীর সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমি কোথায় এবং দুনিয়া কোথায়? আমার এবং দুনিয়ার দৃষ্টান্ত তো সেই পথচারী পথিকের মত যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণ করে, তারপর গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে চলে যায়।” (এ হাদীসটি জামে তিরযিমীতেও বর্ণিত হয়েছে এবং উসূলে হাদীসের পরিভাষায় হাদীসটি হাসান) আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমার প্রতিপালক তোমাকে আখেরাতে তোমার উম্মতের জন্যে এতো নিয়ামত দিবেন যে, তুমি খুশী হয়ে যাবে। তোমাকে বিশেষ সম্মান দান করা হবে। বিশেষভাবে হাউযে কাওসার দান করা হবে। সেই হাউযে কাওসারের কিনারায় খাটি মুক্তার তাঁবু থাকবে। ওর মাটি হবে নির্ভেজাল মিশক। এ সম্পর্কিত হাদীস অচিরেই বর্ণনা করা হবে। ইনশাআল্লাহ।একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যে সব ধনাগার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে সেগুলো একে একে তার উপর প্রকাশ করা হয়। এতে তিনি খুবই খুশী হন। তারপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। জান্নাতে তাঁকে এক হাজার মহল দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক মহলে পবিত্র স্ত্রী এবং উৎকৃষ্ট মানের খাদেম রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আমর আওযায়ী (রঃ) ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ। আল্লাহর নবী (সঃ) হতে না শুনে এ ধরনের হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব নয়)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) সন্তুষ্টির এটাও একটা কারণ যে, তাঁকে জানানো হয়ঃ তাঁর আহলে বাইতের মধ্য থেকে কেউ জাহান্নামে যাবে না। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা তাঁর শাফা'আত বুঝানো হয়েছে।হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা এমন আহলে বায়েত যাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার মুকাবিলায় আখেরাতকে পছন্দ করেছেন। তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবী শায়বা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নিয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ইয়াতীম থাকা অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন, হিফাযত করেছেন, প্রতিপালন করেছেন এবং আশ্রয় দিয়েছেন। নবী করিম (সঃ)-এর জন্ম লাভের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর জন্ম লাভের পর তার পিতা ইন্তেকাল করেন। ছয় বছর বয়সের সময় তাঁর স্নেহময়ী মাতা এই নশ্বর জগত হতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। তারপর তিনি তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। তার বয়স যখন আট বছর তার দাদাও পরপারে চলে যান। অতঃপর তিনি তার চাচা আবু তালিবের নিকট প্রতিপালিত হতে থাকেন। আবু তালিব তাকে সর্বাত্মক দেখাশুনা এবং সাহায্য করেন। তিনি তাঁর স্নেহের ভ্রাতুস্পুত্রকে খুবই সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন এবং স্বজাতির বিরোধিতার ঝড়ে মুকাবিলা করতেন। নিজেকে তিনি ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সের সময় নবী করীম (সঃ) নবুওয়াত লাভ করেন। কুরায়েশরা তখন তার ভীষণ বিরোধী এমনকি প্রাণের দুশমন হয়ে গেল। আবু তালিব মুশরিক মূর্তিপূজক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে সহায়তা দান করতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে লড়াই করতেন। এই সুব্যবস্থা আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও ইঙ্গিতেই হয়েছিল। নবী করীম (সঃ)-এর ইয়াতীমী অবস্থা এভাবেই কেটে যায়। আল্লাহ তা'আলা বিরুদ্ধবাদীদের নিকট হতে এভাবেই নবী করীমের (সঃ)-এর খিদমত নেন। হিজরতের কিছুদিনের পূর্বে আৰূ তালিবও ইন্তেকাল করেন। এবার কাফির মুশরিকরা কঠিনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আল্লাহ তা'আলা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দেন এবং মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়কে তার সাহায্যকারী বানিয়ে দেন। ঐ বুর্যগ আনসার ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এবং তার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আশ্রয় দিয়েছেন, জায়গা দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। আর শত্রুদের মুকাবিলায় বীরের মত সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের সবারই প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন! এ সবই আল্লাহর মেহেরবানী, অনুগ্রহ এবং রহম করমের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে বলেনঃ তোমাকে আল্লাহ তাআলা পথহারা দেখতে পেয়ে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। যেমন অন্যত্র রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “এ ভাবেই আমি নিজের আদেশে তোমার প্রতি রুহ অর্থাৎ জিবরাইল (আঃ) কে অথবা কুরআনকে অহী হিসেবে পাঠিয়েছি। ঈমান কি জিনিস তাও তোমার জানা ছিল না, কিতাব কাকে বলে তাও জানতে না তুমি। আমি এ কিতাবকে নুর বা জ্যোতি বানিয়ে এর দ্বারা আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেছি।” (৪২:৫২) কেউ কেউ বলেন, এখানে ভাবার্থ হলো এই যে, নবী করীম (সঃ) শৈশবে মক্কার গলিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়া যাওয়ার পতে রাত্রিকালে শয়তান তাঁর উটের লাগাম ধরে চলার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। তারপর জিবরাঈল (আঃ) এসে শয়তানকে যুঁদিয়ে আবিসিনিয়ায় রেখে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারীকে সঠিক পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।” এই উভয় উক্তিই বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন।আল্লাহ তাআলা এরপর বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তিনি (আল্লাহ) তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি তোমাকে অভাবমুক্ত করলেন ফলে ধৈর্যধারণকারী দরিদ্র এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ধনীর মর্যাদা তুমি লাভ করেছো। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন!কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এসব অবস্থা নবুওয়াতের পূর্বে হয়েছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন “ধন সম্পদের প্রাচুর্য প্রকৃত ধনশীলতা নয়, বরং প্রকৃত ধনশীলতা হচ্ছে মনের ধনশীলতা বা মনের সন্তুষ্টি।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন তা যথেষ্ট মনে করেছে এবং তাতেই সন্তুষ্ট হয়েছে সে সাফল্য লাভ করেছে।”এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে সম্বোধন করে বলেনঃ সুতরাং তুমি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হয়ো না, তাকে ধমক দিয়ো না এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করো না, বরং তার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং নিজের ইয়াতীম হওয়ার কথা ভুলে যেয়ো না। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ইয়াতীমের সাথে ঠিক এমনই ব্যবহার করতে হবে যেমন ব্যবহার পিতা নিজের সন্তানের সাথে করে থাকেন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আরো বলেনঃ প্রার্থীকে না করো না। তুমি যেমন পথহারা ছিলে, আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত বা পথের দিশা দিয়েছেন, তেমনি কেউ তোমাকে জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে রূঢ় ব্যবহার দ্বারা সরিয়ে দিয়ো না। গরীব, মিসকীন, এবং দুর্বল লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করো না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করো না। তাদেরকে কড়া কথা বলো না। ইয়াতীম মিসকীনদেরকে যদি কিছু না দিতে পার তবে ভাল ও নরম কথা বলে তাদেরকে বিদায় করো এবং ভালভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দাও। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ নিজের প্রতিপালকের নিয়ামতসমূহ বর্ণনা করতে থাকো। অর্থাৎ যেমন আমি তোমার দারিদ্রকে ঐশ্বর্যে পরিবর্তিত করেছি, তেমনই তুমিও আমার এ সব নিয়ামতের কথা বর্ণনা করতে থাকো। যেমন নবী করীম (সঃ) এর দু’আও ছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী করুন, ঐ নিয়ামতের কারণে আমাদেরকে আপনার প্রশংসাকারী করুন, ঐ নিয়ামত স্বীকারকারী করুন এবং পরিপূর্ণভাবে ঐ নিয়ামত আমাদেরকে দান করুন।” আবু না (রঃ) বলেনঃ “মুসলমানরা মনে করতেন যে, নিয়ামতের বর্ণনা দেয়াও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শামিল। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ “ যে ব্যক্তি অল্প পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। সে বেশী পেয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না সে আল্লাহ তা'আলার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না। নিয়ামত স্বীকার ও বর্ণনা করাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শামিল, আর নিয়ামত অস্বীকার করা অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক। দলবদ্ধভাবে থাকা রহমত লাভের কারণ এবং দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শাস্তির কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আনসারগণ সমস্ত প্রতিদান নিয়ে গেছেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “না, যে পর্যন্ত তোমরা তাদের জন্যে দু’আ করতে থাকবে এবং তাদের প্রশংসা করতে থাকবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যারা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না তারা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃহতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিয়ামত লাভ করার পর তার বর্ণনা করেছে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আর যে তা গোপন করেছে সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “কাউকে কোন অনুগ্রহ করা হলে তার উচিত সম্ভব হলে ঐ অনুগ্রহের প্রতিদান দেয়া, আর যদি সম্ভব না হয় তবে উচিত অন্ততঃপক্ষে ঐ অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করা এবং তার প্রশংসা করা। যে ব্যক্তি এই প্রশংসা করেছে সে কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি প্রশংসাও করেনি এবং নিয়ামতের কথা প্রকাশও করেনি সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা নবুওয়াতকে বুঝানো হয়েছে। এক বর্ণনায় রয়েছে যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন।হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো কল্যাণকর যে সব কথা নিজে জান, সে সব তাদের কাছেও বর্ণনা কর। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ নবুওয়াতের যে নিয়ামত ও কারামত তুমি লাভ করেছে সেটা বর্ণনা কর। ঐ কথা আলোচনা কর। আর সেইদিকে জনগণকে দাওয়াত দাও।কাজেই নবী করীম (সঃ) নিজের লোকদের কাছে অর্থাৎ যাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল তাদের কাছে প্রথমদিকে চুপি চুপি দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তাঁর উপর নামায ফরয হয়েছিল, তিনি সেই নামায আদায় করতেন।

আদ-দুহা 93:10

হযরত ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইসমাঈল ইবনে কুসতুনতীন (রঃ) এবং হযরত শবল ইবনে ইবাদের (রঃ) সামনে কুরআন পাঠ করছিলেন। যখন তিনি (আরবি) পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তারা উভয়েই বলেনঃ এখান হতে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক সূরার শেষে তাকবীর পাঠ করবেন। আমরা ইবনে কাসীর (রঃ)এর সামনে পাঠ করছিলাম, তিনি মুজাহিদ (রঃ)-এর সামনে পাঠ করলে তিনিও তাকে এই নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে অনুরূপ কথা বলেছিলেন। তিনি পাঠ করেছিলেন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর সামনে। তিনিও তাঁকে এই হুকুম করেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পাঠ করেছিলেন হযরত উবাই ইবনে কাবের (রাঃ) সামনে। তিনিও তাঁকে এটারই আদেশ করেছিলেন। আর হযরত উবাই (রাঃ) পাঠ করেছিলেন রাসুলুল্লাহর সামনে এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এরই নির্দেশ দিয়েছিলেন।ইমামুল কিরআত হযরত আবু হাসানও (রঃ) এই সুন্নাতের বর্ণনাকারী। হযরত আবু হাতিম রাযী (রঃ) এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। কারণ আবুল হাসান বর্ণনাকারী হিসেবে দুর্বল। আবু হাতিম (রঃ) তাঁর নিকট হতে কোন হাদীসই নিতেন না। অনুরূপভাবে হযরত আবূ জাফর উকাইলীও (রঃ) তাঁকে মুনকারুল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু শায়েখ শিহাবুদ্দীন আবু শামাহ (রঃ) শারহি শা'তিবিয়্যায় হযরত ইমাম শাফিয়ী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একজন লোককে নামাযের মধ্যে এ তাকবীর বলতে শুনে বলেনঃ “তুমি ভাল কাজই করেছে এবং সুন্নাত পালন করেছে। এ ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, এ হাদীস সহীহ বা বিশুদ্ধ। এখন এ তাকবীর কোথায় ও কিভাবে পাঠ করতে হবে এ ব্যাপারে কারীদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) এই সূরা সমাপ্ত হওয়ার পর হতে এ তাকবীর পাঠ করতে হবে। অন্যেরা বলেছেন, (আরবি) সমাপ্ত হওয়ার পর হতে পড়তে হবে। আর কারো কারো মতে এটা পাঠের নিয়ম এই যে, শুধু আল্লাহু আকবার বলতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) বলতে হবে।কোন কোন কারী সূরা আদ্দোহা হতে এই তাকবীর পাঠ করার কারণ এই বলে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট অহী আসা কিছু দিনের জন্যে বন্ধ ছিল। তারপর হযরত জিব্রাঈল (আঃ) এই সূরা নিয়ে আসার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনন্দের আতিশয্যে তাকবীর পাঠ করেন। কিন্তু এই বর্ণনা এমন কোন সনদের সাথে বর্ণিত হয়নি যেটা দ্বারা এটাকে বিশুদ্ধ অথবা দুর্বল বলা যেতে পারে। এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।১-১১ নং আয়াতের তাফসীরহযরত জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এ কারণে তিনি একদিন বা দুদিন রাত্রে তাহাজ্জুদ নামাযের জন্যে উঠতে পারেননি। এটা জেনে একটি মহিলা এসে বলেঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমাকে তোমার শয়তান পরিত্যাগ করেছে।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবি) এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জুনদুব (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে কয়েকদিন বিলম্ব হয়েছিল, এতে মুশরিকরা বলাবলি করতে শুরু করে যে, মুহাম্মদ(সঃ) কে তাঁর প্রতিপালক পরিত্যাগ করেছেন, তখন আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর আঙ্গুলে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হলে তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি শুধু একটি আঙ্গুল বৈ তো নও, আর আল্লাহর পথে তোমার এ যখম হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুই তিন দিন উঠতে পারেননি, এতেই ঐ মহিলাটি উপরোক্ত অশালীন উক্তি করেছিল। অতঃপর উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। জানা যায় যে, ঐ দুষ্টা মহিলাটি ছিল আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল। তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত নাযিল হোক। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আঙ্গুল আহত হওয়া এবং তাতে উপরোক্ত পংক্তি আকস্মিকভাবে তার মুখে উচ্চারিত হওয়ার কথা তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, কিন্তু তাহাজ্জুদ আদায়ে অসমর্থতা যে সেই কারণে হয়েছিল এবং এই আয়াতগুলো যে ঐ উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিল এ উক্তি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় গারীব বলে উল্লিখিত হয়েছে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত খাদীজা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “আপনার প্রতিপালক আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট তো হননি?” তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর আসতে বিলম্ব হওয়ায় রাসূলুল্লাহ শংকিত হয়ে পড়েন। এ কারণে হযরত খাদীজা (রাঃ) উপরোক্ত মন্তব্য করেন। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ দুটি বর্ণনাকে উসূলে হাদীসের পরিভাষায় মুরসাল বলা হয়েছে। তবে খাদীজা (রাঃ)-এর নাম ও উক্তি উল্লেখ এ ক্ষেত্রে সমীচীন মনে হয় না। হ্যা, তবে হয় তো দুঃখ ও বেদনার বশবর্তী হয়েই তিনি এ ধরনের উক্তি করে থাকবেন। এটা অসম্ভব নয়। তবে এ সব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইবনে ইসহাক (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) যে সময় তার স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন এবং খুবই কাছাকাছি হয়েছিলেন সে সময় এই ধরনের অহী অবতীর্ণ হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত উক্তির অসারতা প্রমাণের জন্যেই এ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়। এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রোদ্র ওঠার সময়ের দিনের আলো, রাত্রির নীরবতা এবং অন্ধকারের শপথ করেছেন। এগুলো মহান স্রষ্টার কুদরতের এবং সৃষ্টির ঐশ্বর্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “শপথ রজনীর যখন ওটা আচ্ছন্ন করে এবং শপথ দিবসের যখন ওটা আবির্ভূত হয়।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালক তোমাকে ছেড়েও দেননি। এবং তোমার সাথে শত্রুতাও করেননি। তোমার জন্যে পরকাল ইহকাল অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ইবাদত করতেন এবং দুনিয়া বিমুখ জীবন যাপন করতেন। নবী করীম (সঃ)-এর জীবনী যারা পাঠ করেছেন তাদের কাছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন।মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি খেজুর পাতার চাটাইর উপর শুয়েছিলেন। ফলে তার দেহের পার্শ্বদেশে চাটাইর দাগ পড়ে গিয়েছিল। তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর আমি তার দেহে হাত বুলিয়ে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! চাটাইর উপর আমাকে কিছু বিছিয়ে দেয়ার অনুমতি দিন! তিনি আমার এ কথা শুনে বললেনঃ “পৃথিবীর সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমি কোথায় এবং দুনিয়া কোথায়? আমার এবং দুনিয়ার দৃষ্টান্ত তো সেই পথচারী পথিকের মত যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণ করে, তারপর গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে চলে যায়।” (এ হাদীসটি জামে তিরযিমীতেও বর্ণিত হয়েছে এবং উসূলে হাদীসের পরিভাষায় হাদীসটি হাসান) আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমার প্রতিপালক তোমাকে আখেরাতে তোমার উম্মতের জন্যে এতো নিয়ামত দিবেন যে, তুমি খুশী হয়ে যাবে। তোমাকে বিশেষ সম্মান দান করা হবে। বিশেষভাবে হাউযে কাওসার দান করা হবে। সেই হাউযে কাওসারের কিনারায় খাটি মুক্তার তাঁবু থাকবে। ওর মাটি হবে নির্ভেজাল মিশক। এ সম্পর্কিত হাদীস অচিরেই বর্ণনা করা হবে। ইনশাআল্লাহ।একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যে সব ধনাগার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে সেগুলো একে একে তার উপর প্রকাশ করা হয়। এতে তিনি খুবই খুশী হন। তারপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। জান্নাতে তাঁকে এক হাজার মহল দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক মহলে পবিত্র স্ত্রী এবং উৎকৃষ্ট মানের খাদেম রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আমর আওযায়ী (রঃ) ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ। আল্লাহর নবী (সঃ) হতে না শুনে এ ধরনের হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব নয়)হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) সন্তুষ্টির এটাও একটা কারণ যে, তাঁকে জানানো হয়ঃ তাঁর আহলে বাইতের মধ্য থেকে কেউ জাহান্নামে যাবে না। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা তাঁর শাফা'আত বুঝানো হয়েছে।হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা এমন আহলে বায়েত যাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার মুকাবিলায় আখেরাতকে পছন্দ করেছেন। তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবী শায়বা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নিয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ইয়াতীম থাকা অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন, হিফাযত করেছেন, প্রতিপালন করেছেন এবং আশ্রয় দিয়েছেন। নবী করিম (সঃ)-এর জন্ম লাভের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর জন্ম লাভের পর তার পিতা ইন্তেকাল করেন। ছয় বছর বয়সের সময় তাঁর স্নেহময়ী মাতা এই নশ্বর জগত হতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। তারপর তিনি তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। তার বয়স যখন আট বছর তার দাদাও পরপারে চলে যান। অতঃপর তিনি তার চাচা আবু তালিবের নিকট প্রতিপালিত হতে থাকেন। আবু তালিব তাকে সর্বাত্মক দেখাশুনা এবং সাহায্য করেন। তিনি তাঁর স্নেহের ভ্রাতুস্পুত্রকে খুবই সম্মান করতেন, মর্যাদা দিতেন এবং স্বজাতির বিরোধিতার ঝড়ে মুকাবিলা করতেন। নিজেকে তিনি ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সের সময় নবী করীম (সঃ) নবুওয়াত লাভ করেন। কুরায়েশরা তখন তার ভীষণ বিরোধী এমনকি প্রাণের দুশমন হয়ে গেল। আবু তালিব মুশরিক মূর্তিপূজক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে সহায়তা দান করতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে লড়াই করতেন। এই সুব্যবস্থা আল্লাহপাকের ইচ্ছা ও ইঙ্গিতেই হয়েছিল। নবী করীম (সঃ)-এর ইয়াতীমী অবস্থা এভাবেই কেটে যায়। আল্লাহ তা'আলা বিরুদ্ধবাদীদের নিকট হতে এভাবেই নবী করীমের (সঃ)-এর খিদমত নেন। হিজরতের কিছুদিনের পূর্বে আৰূ তালিবও ইন্তেকাল করেন। এবার কাফির মুশরিকরা কঠিনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আল্লাহ তা'আলা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দেন এবং মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়কে তার সাহায্যকারী বানিয়ে দেন। ঐ বুর্যগ আনসার ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এবং তার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আশ্রয় দিয়েছেন, জায়গা দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। আর শত্রুদের মুকাবিলায় বীরের মত সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের সবারই প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন! এ সবই আল্লাহর মেহেরবানী, অনুগ্রহ এবং রহম করমের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে বলেনঃ তোমাকে আল্লাহ তাআলা পথহারা দেখতে পেয়ে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। যেমন অন্যত্র রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “এ ভাবেই আমি নিজের আদেশে তোমার প্রতি রুহ অর্থাৎ জিবরাইল (আঃ) কে অথবা কুরআনকে অহী হিসেবে পাঠিয়েছি। ঈমান কি জিনিস তাও তোমার জানা ছিল না, কিতাব কাকে বলে তাও জানতে না তুমি। আমি এ কিতাবকে নুর বা জ্যোতি বানিয়ে এর দ্বারা আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেছি।” (৪২:৫২) কেউ কেউ বলেন, এখানে ভাবার্থ হলো এই যে, নবী করীম (সঃ) শৈশবে মক্কার গলিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়া যাওয়ার পতে রাত্রিকালে শয়তান তাঁর উটের লাগাম ধরে চলার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। তারপর জিবরাঈল (আঃ) এসে শয়তানকে যুঁদিয়ে আবিসিনিয়ায় রেখে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারীকে সঠিক পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।” এই উভয় উক্তিই বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন।আল্লাহ তাআলা এরপর বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তিনি (আল্লাহ) তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তিনি তোমাকে অভাবমুক্ত করলেন ফলে ধৈর্যধারণকারী দরিদ্র এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী ধনীর মর্যাদা তুমি লাভ করেছো। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন!কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এসব অবস্থা নবুওয়াতের পূর্বে হয়েছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন “ধন সম্পদের প্রাচুর্য প্রকৃত ধনশীলতা নয়, বরং প্রকৃত ধনশীলতা হচ্ছে মনের ধনশীলতা বা মনের সন্তুষ্টি।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন তা যথেষ্ট মনে করেছে এবং তাতেই সন্তুষ্ট হয়েছে সে সাফল্য লাভ করেছে।”এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) কে সম্বোধন করে বলেনঃ সুতরাং তুমি ইয়াতীমের প্রতি কঠোর হয়ো না, তাকে ধমক দিয়ো না এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করো না, বরং তার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং নিজের ইয়াতীম হওয়ার কথা ভুলে যেয়ো না। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ইয়াতীমের সাথে ঠিক এমনই ব্যবহার করতে হবে যেমন ব্যবহার পিতা নিজের সন্তানের সাথে করে থাকেন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ) কে আরো বলেনঃ প্রার্থীকে না করো না। তুমি যেমন পথহারা ছিলে, আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত বা পথের দিশা দিয়েছেন, তেমনি কেউ তোমাকে জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে রূঢ় ব্যবহার দ্বারা সরিয়ে দিয়ো না। গরীব, মিসকীন, এবং দুর্বল লোকদের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করো না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করো না। তাদেরকে কড়া কথা বলো না। ইয়াতীম মিসকীনদেরকে যদি কিছু না দিতে পার তবে ভাল ও নরম কথা বলে তাদেরকে বিদায় করো এবং ভালভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দাও। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ নিজের প্রতিপালকের নিয়ামতসমূহ বর্ণনা করতে থাকো। অর্থাৎ যেমন আমি তোমার দারিদ্রকে ঐশ্বর্যে পরিবর্তিত করেছি, তেমনই তুমিও আমার এ সব নিয়ামতের কথা বর্ণনা করতে থাকো। যেমন নবী করীম (সঃ) এর দু’আও ছিলঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী করুন, ঐ নিয়ামতের কারণে আমাদেরকে আপনার প্রশংসাকারী করুন, ঐ নিয়ামত স্বীকারকারী করুন এবং পরিপূর্ণভাবে ঐ নিয়ামত আমাদেরকে দান করুন।” আবু না (রঃ) বলেনঃ “মুসলমানরা মনে করতেন যে, নিয়ামতের বর্ণনা দেয়াও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শামিল। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেনঃ “ যে ব্যক্তি অল্প পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। সে বেশী পেয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না সে আল্লাহ তা'আলার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো না। নিয়ামত স্বীকার ও বর্ণনা করাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শামিল, আর নিয়ামত অস্বীকার করা অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক। দলবদ্ধভাবে থাকা রহমত লাভের কারণ এবং দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শাস্তির কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আনসারগণ সমস্ত প্রতিদান নিয়ে গেছেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “না, যে পর্যন্ত তোমরা তাদের জন্যে দু’আ করতে থাকবে এবং তাদের প্রশংসা করতে থাকবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যারা মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না তারা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃহতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন নিয়ামত লাভ করার পর তার বর্ণনা করেছে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আর যে তা গোপন করেছে সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “কাউকে কোন অনুগ্রহ করা হলে তার উচিত সম্ভব হলে ঐ অনুগ্রহের প্রতিদান দেয়া, আর যদি সম্ভব না হয় তবে উচিত অন্ততঃপক্ষে ঐ অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করা এবং তার প্রশংসা করা। যে ব্যক্তি এই প্রশংসা করেছে সে কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি প্রশংসাও করেনি এবং নিয়ামতের কথা প্রকাশও করেনি সে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা নবুওয়াতকে বুঝানো হয়েছে। এক বর্ণনায় রয়েছে যে, এখানে নিয়ামত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন।হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো কল্যাণকর যে সব কথা নিজে জান, সে সব তাদের কাছেও বর্ণনা কর। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ নবুওয়াতের যে নিয়ামত ও কারামত তুমি লাভ করেছে সেটা বর্ণনা কর। ঐ কথা আলোচনা কর। আর সেইদিকে জনগণকে দাওয়াত দাও।কাজেই নবী করীম (সঃ) নিজের লোকদের কাছে অর্থাৎ যাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল তাদের কাছে প্রথমদিকে চুপি চুপি দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তাঁর উপর নামায ফরয হয়েছিল, তিনি সেই নামায আদায় করতেন।