Tafsir Abu Bakr Zakaria — ফুসসিলাত 41:1 – মুহাম্মাদ 47:38
Contents
- ফুসসিলাত 41:1
- ফুসসিলাত 41:2
- ফুসসিলাত 41:3
- ফুসসিলাত 41:4
- ফুসসিলাত 41:5
- ফুসসিলাত 41:6
- ফুসসিলাত 41:7
- ফুসসিলাত 41:8
- ফুসসিলাত 41:9
- ফুসসিলাত 41:10
- ফুসসিলাত 41:11
- ফুসসিলাত 41:12
- ফুসসিলাত 41:13
- ফুসসিলাত 41:14
- ফুসসিলাত 41:15
- ফুসসিলাত 41:16
- ফুসসিলাত 41:17
- ফুসসিলাত 41:18
- ফুসসিলাত 41:19
- ফুসসিলাত 41:20
- ফুসসিলাত 41:21
- ফুসসিলাত 41:22
- ফুসসিলাত 41:23
- ফুসসিলাত 41:24
- ফুসসিলাত 41:25
- ফুসসিলাত 41:26
- ফুসসিলাত 41:27
- ফুসসিলাত 41:28
- ফুসসিলাত 41:29
- ফুসসিলাত 41:30
- ফুসসিলাত 41:31
- ফুসসিলাত 41:32
- ফুসসিলাত 41:33
- ফুসসিলাত 41:34
- ফুসসিলাত 41:35
- ফুসসিলাত 41:36
- ফুসসিলাত 41:37
- ফুসসিলাত 41:38
- ফুসসিলাত 41:39
- ফুসসিলাত 41:40
- ফুসসিলাত 41:41
- ফুসসিলাত 41:42
- ফুসসিলাত 41:43
- ফুসসিলাত 41:44
- ফুসসিলাত 41:45
- ফুসসিলাত 41:46
- ফুসসিলাত 41:47
- ফুসসিলাত 41:48
- ফুসসিলাত 41:49
- ফুসসিলাত 41:50
- ফুসসিলাত 41:51
- ফুসসিলাত 41:52
- ফুসসিলাত 41:53
- ফুসসিলাত 41:54
- আশ-শূরা 42:1
- আশ-শূরা 42:2
- আশ-শূরা 42:3
- আশ-শূরা 42:4
- আশ-শূরা 42:5
- আশ-শূরা 42:6
- আশ-শূরা 42:7
- আশ-শূরা 42:8
- আশ-শূরা 42:9
- আশ-শূরা 42:10
- আশ-শূরা 42:11
- আশ-শূরা 42:12
- আশ-শূরা 42:13
- আশ-শূরা 42:14
- আশ-শূরা 42:15
- আশ-শূরা 42:16
- আশ-শূরা 42:17
- আশ-শূরা 42:18
- আশ-শূরা 42:19
- আশ-শূরা 42:20
- আশ-শূরা 42:21
- আশ-শূরা 42:22
- আশ-শূরা 42:23
- আশ-শূরা 42:24
- আশ-শূরা 42:25
- আশ-শূরা 42:26
- আশ-শূরা 42:27
- আশ-শূরা 42:28
- আশ-শূরা 42:29
- আশ-শূরা 42:30
- আশ-শূরা 42:31
- আশ-শূরা 42:32
- আশ-শূরা 42:33
- আশ-শূরা 42:34
- আশ-শূরা 42:35
- আশ-শূরা 42:36
- আশ-শূরা 42:37
- আশ-শূরা 42:38
- আশ-শূরা 42:39
- আশ-শূরা 42:40
- আশ-শূরা 42:41
- আশ-শূরা 42:42
- আশ-শূরা 42:43
- আশ-শূরা 42:44
- আশ-শূরা 42:45
- আশ-শূরা 42:46
- আশ-শূরা 42:47
- আশ-শূরা 42:48
- আশ-শূরা 42:49
- আশ-শূরা 42:50
- আশ-শূরা 42:51
- আশ-শূরা 42:52
- আশ-শূরা 42:53
- আয-যুখরুফ 43:1
- আয-যুখরুফ 43:2
- আয-যুখরুফ 43:3
- আয-যুখরুফ 43:4
- আয-যুখরুফ 43:5
- আয-যুখরুফ 43:6
- আয-যুখরুফ 43:7
- আয-যুখরুফ 43:8
- আয-যুখরুফ 43:9
- আয-যুখরুফ 43:10
- আয-যুখরুফ 43:11
- আয-যুখরুফ 43:12
- আয-যুখরুফ 43:13
- আয-যুখরুফ 43:14
- আয-যুখরুফ 43:15
- আয-যুখরুফ 43:16
- আয-যুখরুফ 43:17
- আয-যুখরুফ 43:18
- আয-যুখরুফ 43:19
- আয-যুখরুফ 43:20
- আয-যুখরুফ 43:21
- আয-যুখরুফ 43:22
- আয-যুখরুফ 43:23
- আয-যুখরুফ 43:24
- আয-যুখরুফ 43:25
- আয-যুখরুফ 43:26
- আয-যুখরুফ 43:27
- আয-যুখরুফ 43:28
- আয-যুখরুফ 43:29
- আয-যুখরুফ 43:30
- আয-যুখরুফ 43:31
- আয-যুখরুফ 43:32
- আয-যুখরুফ 43:33
- আয-যুখরুফ 43:34
- আয-যুখরুফ 43:35
- আয-যুখরুফ 43:36
- আয-যুখরুফ 43:37
- আয-যুখরুফ 43:38
- আয-যুখরুফ 43:39
- আয-যুখরুফ 43:40
- আয-যুখরুফ 43:41
- আয-যুখরুফ 43:42
- আয-যুখরুফ 43:43
- আয-যুখরুফ 43:44
- আয-যুখরুফ 43:45
- আয-যুখরুফ 43:46
- আয-যুখরুফ 43:47
- আয-যুখরুফ 43:48
- আয-যুখরুফ 43:49
- আয-যুখরুফ 43:50
- আয-যুখরুফ 43:51
- আয-যুখরুফ 43:52
- আয-যুখরুফ 43:53
- আয-যুখরুফ 43:54
- আয-যুখরুফ 43:55
- আয-যুখরুফ 43:56
- আয-যুখরুফ 43:57
- আয-যুখরুফ 43:58
- আয-যুখরুফ 43:59
- আয-যুখরুফ 43:60
- আয-যুখরুফ 43:61
- আয-যুখরুফ 43:62
- আয-যুখরুফ 43:63
- আয-যুখরুফ 43:64
- আয-যুখরুফ 43:65
- আয-যুখরুফ 43:66
- আয-যুখরুফ 43:67
- আয-যুখরুফ 43:68
- আয-যুখরুফ 43:69
- আয-যুখরুফ 43:70
- আয-যুখরুফ 43:71
- আয-যুখরুফ 43:72
- আয-যুখরুফ 43:73
- আয-যুখরুফ 43:74
- আয-যুখরুফ 43:75
- আয-যুখরুফ 43:76
- আয-যুখরুফ 43:77
- আয-যুখরুফ 43:78
- আয-যুখরুফ 43:79
- আয-যুখরুফ 43:80
- আয-যুখরুফ 43:81
- আয-যুখরুফ 43:82
- আয-যুখরুফ 43:83
- আয-যুখরুফ 43:84
- আয-যুখরুফ 43:85
- আয-যুখরুফ 43:86
- আয-যুখরুফ 43:87
- আয-যুখরুফ 43:88
- আয-যুখরুফ 43:89
- আদ-দুখান 44:1
- আদ-দুখান 44:2
- আদ-দুখান 44:3
- আদ-দুখান 44:4
- আদ-দুখান 44:5
- আদ-দুখান 44:6
- আদ-দুখান 44:7
- আদ-দুখান 44:8
- আদ-দুখান 44:9
- আদ-দুখান 44:10
- আদ-দুখান 44:11
- আদ-দুখান 44:12
- আদ-দুখান 44:13
- আদ-দুখান 44:14
- আদ-দুখান 44:15
- আদ-দুখান 44:16
- আদ-দুখান 44:17
- আদ-দুখান 44:18
- আদ-দুখান 44:19
- আদ-দুখান 44:20
- আদ-দুখান 44:21
- আদ-দুখান 44:22
- আদ-দুখান 44:23
- আদ-দুখান 44:24
- আদ-দুখান 44:25
- আদ-দুখান 44:26
- আদ-দুখান 44:27
- আদ-দুখান 44:28
- আদ-দুখান 44:29
- আদ-দুখান 44:30
- আদ-দুখান 44:31
- আদ-দুখান 44:32
- আদ-দুখান 44:33
- আদ-দুখান 44:34
- আদ-দুখান 44:35
- আদ-দুখান 44:36
- আদ-দুখান 44:37
- আদ-দুখান 44:38
- আদ-দুখান 44:39
- আদ-দুখান 44:40
- আদ-দুখান 44:41
- আদ-দুখান 44:42
- আদ-দুখান 44:43
- আদ-দুখান 44:44
- আদ-দুখান 44:45
- আদ-দুখান 44:46
- আদ-দুখান 44:47
- আদ-দুখান 44:48
- আদ-দুখান 44:49
- আদ-দুখান 44:50
- আদ-দুখান 44:51
- আদ-দুখান 44:52
- আদ-দুখান 44:53
- আদ-দুখান 44:54
- আদ-দুখান 44:55
- আদ-দুখান 44:56
- আদ-দুখান 44:57
- আদ-দুখান 44:58
- আদ-দুখান 44:59
- আল-জাসিয়া 45:1
- আল-জাসিয়া 45:2
- আল-জাসিয়া 45:3
- আল-জাসিয়া 45:4
- আল-জাসিয়া 45:5
- আল-জাসিয়া 45:6
- আল-জাসিয়া 45:7
- আল-জাসিয়া 45:8
- আল-জাসিয়া 45:9
- আল-জাসিয়া 45:10
- আল-জাসিয়া 45:11
- আল-জাসিয়া 45:12
- আল-জাসিয়া 45:13
- আল-জাসিয়া 45:14
- আল-জাসিয়া 45:15
- আল-জাসিয়া 45:16
- আল-জাসিয়া 45:17
- আল-জাসিয়া 45:18
- আল-জাসিয়া 45:19
- আল-জাসিয়া 45:20
- আল-জাসিয়া 45:21
- আল-জাসিয়া 45:22
- আল-জাসিয়া 45:23
- আল-জাসিয়া 45:24
- আল-জাসিয়া 45:25
- আল-জাসিয়া 45:26
- আল-জাসিয়া 45:27
- আল-জাসিয়া 45:28
- আল-জাসিয়া 45:29
- আল-জাসিয়া 45:30
- আল-জাসিয়া 45:31
- আল-জাসিয়া 45:32
- আল-জাসিয়া 45:33
- আল-জাসিয়া 45:34
- আল-জাসিয়া 45:35
- আল-জাসিয়া 45:36
- আল-জাসিয়া 45:37
- আল-আহকাফ 46:1
- আল-আহকাফ 46:2
- আল-আহকাফ 46:3
- আল-আহকাফ 46:4
- আল-আহকাফ 46:5
- আল-আহকাফ 46:6
- আল-আহকাফ 46:7
- আল-আহকাফ 46:8
- আল-আহকাফ 46:9
- আল-আহকাফ 46:10
- আল-আহকাফ 46:11
- আল-আহকাফ 46:12
- আল-আহকাফ 46:13
- আল-আহকাফ 46:14
- আল-আহকাফ 46:15
- আল-আহকাফ 46:16
- আল-আহকাফ 46:17
- আল-আহকাফ 46:18
- আল-আহকাফ 46:19
- আল-আহকাফ 46:20
- আল-আহকাফ 46:21
- আল-আহকাফ 46:22
- আল-আহকাফ 46:23
- আল-আহকাফ 46:24
- আল-আহকাফ 46:25
- আল-আহকাফ 46:26
- আল-আহকাফ 46:27
- আল-আহকাফ 46:28
- আল-আহকাফ 46:29
- আল-আহকাফ 46:30
- আল-আহকাফ 46:31
- আল-আহকাফ 46:32
- আল-আহকাফ 46:33
- আল-আহকাফ 46:34
- আল-আহকাফ 46:35
- মুহাম্মাদ 47:1
- মুহাম্মাদ 47:2
- মুহাম্মাদ 47:3
- মুহাম্মাদ 47:4
- মুহাম্মাদ 47:5
- মুহাম্মাদ 47:6
- মুহাম্মাদ 47:7
- মুহাম্মাদ 47:8
- মুহাম্মাদ 47:9
- মুহাম্মাদ 47:10
- মুহাম্মাদ 47:11
- মুহাম্মাদ 47:12
- মুহাম্মাদ 47:13
- মুহাম্মাদ 47:14
- মুহাম্মাদ 47:15
- মুহাম্মাদ 47:16
- মুহাম্মাদ 47:17
- মুহাম্মাদ 47:18
- মুহাম্মাদ 47:19
- মুহাম্মাদ 47:20
- মুহাম্মাদ 47:21
- মুহাম্মাদ 47:22
- মুহাম্মাদ 47:23
- মুহাম্মাদ 47:24
- মুহাম্মাদ 47:25
- মুহাম্মাদ 47:26
- মুহাম্মাদ 47:27
- মুহাম্মাদ 47:28
- মুহাম্মাদ 47:29
- মুহাম্মাদ 47:30
- মুহাম্মাদ 47:31
- মুহাম্মাদ 47:32
- মুহাম্মাদ 47:33
- মুহাম্মাদ 47:34
- মুহাম্মাদ 47:35
- মুহাম্মাদ 47:36
- মুহাম্মাদ 47:37
- মুহাম্মাদ 47:38
ফুসসিলাত 41:1
হা-মীম।
ফুসসিলাত 41:2
এটা রহমান, রহীম আল্লাহর কাছ থেকে নাযিলকৃত
ফুসসিলাত 41:3
এক কিতাব, বিশদভাবে বিবৃত হয়েছে এর আয়াতসমূহ, কুরআনরূপে আরবী ভাষায়, জ্ঞানী সম্পপ্রদায়ের জন্য,
ফুসসিলাত 41:4
সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। অতঃপর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। অতএব, তারা শুনবে না [১]।
[১] আলোচ্য সূরায় কুরাইশ কাফেরদের প্রত্যক্ষভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। তারা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর প্রাথমিক যুগে বলপূর্বক ইসলামকে নস্যাৎ করার এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার প্রতি বিশ্বাসীদেরকে নানাভাবে নির্যাতনের মাধ্যমে ভীত-সন্ত্রস্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু ইসলাম তাদের মর্জির বিপরীতে দিন দিন সমৃদ্ধ ও শক্তিশালীই হয়েছে। প্রথমে ওমর ইবন খাত্তাবের ন্যায় অসম সাহসী বীর পুরুষ ইসলামে দাখিল হন। অতঃপর সর্বজনস্বীকৃত কুরাইশ সরদার হামযা মুসলিম হয়ে যান। ফলে কুরাইশ কাফেররা ভীতি প্রদর্শনের পথ পরিত্যাগ করে প্রলোভন ও প্ররোচনার মাধ্যমে ইসলামের অগ্রযাত্ৰা ব্যাহত করার কৌশল চিন্তা করতে শুরু করে। এমনি ধরনের এক ঘটনা হাফেয। ইবন কাসীর মুসনাদে বায্যার, আবু ইয়া'লা ও বাগভী প্রমুখ বৰ্ণনা করেছেন।
ঘটনা হচ্ছে, কুরাইশ সরদার ওতবা ইবন রবীয়া একদিন একদল কুরাইশসহ মসজিদে হারামে উপবিষ্ট ছিল। অপরদিকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদের এক কোণে একাকী বসেছিলেন। ওতবা তার সঙ্গীদেরকে বলল, তোমরা যদি মত দাও, তবে আমি মুহাম্মদের সাথে কথাবার্তা বলি। আমি তার সামনে কিছু লোভনীয় বস্ত পেশ করব। যদি সে কবুল করে, তবে আমরা সেসব বস্তু তাকে দিয়ে দেব-যাতে সে আমাদের ধর্মের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান থেকে নিবৃত হয়। এটা তখনকার ঘটনা, যখন হযরত হামযা মুসলিম হয়ে গিয়েছিলেন এবং ইসলামের শক্তি দিন দিন বেড়ে চলছিল। ওতবার সঙ্গীরা সমস্বরে বলে উঠল, হে আবুল ওলীদ, (ওতবার ডাকনাম), আপনি অবশ্যই তার সাথে আলাপ করুন। ওতবা সেখান থেকে উঠে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গেল এবং কথাবার্তা শুরু করল: প্রিয় ভ্রাতুস্পুত্র। আপনি জানেন, কুরাইশ বংশে আপনার অসাধারণ মর্যাদা ও সম্মান রয়েছে। আপনার বংশ সুদুর বিস্তৃত এবং আমরা সবাই আপনার কাছে সম্মানার্হ। কিন্তু আপনি জাতিকে এক গুরুতর সংকটে জড়িত করে দিয়েছেন। আপনার আনীত দাওয়াত জাতিকে বিভক্ত করে দিয়েছে, তাদেরকে বোকা ঠাওরিয়েছে, তাদের উপাস্য দেবতা ও ধর্মের গায়ে কলঙ্ক আরোপ করেছে এবং তাদের পূর্বপুরুষদেরকে কাফের আখ্যায়িত করেছে। এখন আপনি আমার কথা শুনুন। আমি কয়েকটি বিষয় আপনার সামনে পেশ করছি, যাতে আপনি কোন একটি পছন্দ করে নেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবুল ওলীদ, বলুন, আপনি কি বলতে চান। আমি শুনব। আবুল ওলীদ বলল: ভ্রাতুস্পুত্র! যদি আপনার পরিচালিত দাওয়াতের উদ্দেশ্য ধন-সম্পদ অর্জন করা হয়, তবে আমরা ওয়াদা করছি, আপনাকে কুরাইশ গোত্রের সেরা বিত্তশালী করে দেব। আর যদি শাসনক্ষমতা অর্জন করা লক্ষ্য হয়, তবে আমরা আপনাকে কুরাইশের প্রধান সরদার মেনে নেব এবং আপনার আদেশ ব্যতীত কোন কাজ করব না। আপনি রাজত্ব চাইলে আমরা আপনাকে রাজারূপেও স্বীকৃতি দেব। পক্ষান্তরে যদি কোন জিন অথবা শয়তান আপনাকে দিয়ে এসব কাজ করায় বলে আপনি মনে করেন এবং আপনি সেটাকে বিতাড়িত করতে অক্ষম হয়ে থাকেন, তবে আমরা আপনার জন্যে চিকিৎসক ডেকে আনব, সে আপনাকে এই কষ্ট থেকে উদ্ধার করবে। এর যাবতীয় ব্যয়ভার আমরাই বহন করব। কেননা, আমরা জানি, মাঝে মাঝে জিন অথবা শয়তান মানুষকে কাবু করে ফেলে এবং চিকিৎসার ফলে তা সেরে যায়।
ওতবার এই দীর্ঘ বক্তৃতা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: আবুল ওলীদ। আপনার বক্তব্য শেষ হয়েছে কি? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, এবার আমার কথা শুনুন। সে বলল, অবশ্যই শুনব।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পক্ষ থেকে কোন জওয়াব দেয়ার পরিবর্তে আলোচ্য সূরা ‘ফুসসিলাত’ তেলাওয়াত করতে শুরু করে দিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেলাওয়াত করতে করতে যখন
فَاِنْ اَعْرَضُوْ افَقُلُ اَنْذَرْتُكُمْ صٰعِقَةًمِّثْلَ صٰعِقَةِ عَادٍوَّثَمُوْدَ
পর্যন্ত পৌঁছালেন, তখন ওতবা তাঁর মুখে হাত রেখে দিল এবং বংশ ও আত্মীয়তার কসম দিয়ে বলল, আমার প্রতি দয়া করুন, আর পাঠ করবেন না। অন্য বর্ণনায় এসেছে- রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেলাওয়াত শুরু করলে ওতবা চুপচাপ শুনতে থাকে এবং হাতের পিঠ পিছনে লাগিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেজদার আয়াতে পৌছে সেজদা করলেন এবং ওতবাকে বললেন: আবুল ওলীদ! আপনি যা শুনবার শুনলেন। এখন আপনি যা ইচ্ছা করতে পারেন। ওতবা সেখান থেকে উঠে তার লোকজনের দিকে চলল। তারা দূর থেকে ওতবাকে দেখে পরস্পর বলতে লাগল, আল্লাহর কসম, আবুল ওলীদের মুখমন্ডল বিকৃত দেখা যাচ্ছে। সে যে মুখ নিয়ে এখান থেকে গিয়েছিল, সে মুখ আর নেই। ওতবা মজলিসে পৌছলে সবাই বলল, বলুন, কি খবর আনলেন। ওতবা বলল, খবর এই: আল্লাহর কসম। আমি এমন কালাম শুনেছি, যা জীবনে কখনও শুনিনি। আল্লাহর কসম, সেটা জাদু নয়, কবিতা নয় এবং অতীন্দ্ৰিয়বাদীদের শয়তান থেকে অর্জিত কখনও নয়। হে কুরাইশ সম্প্রদায়, তোমরা আমার কথা মেনে নাও এবং ব্যাপারটি আমার কাছে সোপর্দ কর। আমার মতে তোমরা তার মোকাবেলা ও তাকে নির্যাতন করা থেকে সরে আসা এবং তাকে তার কাজ করতে দাও। কেননা, তার এই কালামের এক বিশেষ পরিণতি প্ৰকাশ পাবেই। তোমরা এখন অপেক্ষা কর। অবশিষ্ট আরবদের আচরণ দেখে যাও। যদি তারাই কুরাইশের সহযোগিতা ব্যতীত তাকে পরাভূত করে ফেলে, তবে বিনা শ্রমেই তোমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়ে যাবে। আর সে যদি সবার উপর প্রবল হয়ে যায়, তবে তার রাজত্ব হবে তোমাদেরই রাজত্ব; তার ইযযত হবে তোমাদেরই ইযযত। তখন তোমরাই হবে তার সাফল্যের অংশীদার। তার সঙ্গীরা তার একথা শুনে বলল, আবুল ওলীদ, তোমাকে তো মুহাম্মদ কথা দিয়ে জাদু করেছে। ওতবা বলল, আমারও অভিমত তাই। এখন তোমাদের যা মন চায়, তাই কর। [মুসান্নাফে ইবন আবী শাইবাহ ১৪/২৯৫, মুসনাদে আবি ইয়া'লা, হাদীস নং ১৮১৮, মুস্তাদরাকে হাকিম। ২/২৫৩, বাইহাকী, দালায়েল ২/২০০২-২০৪]
ফুসসিলাত 41:5
আর তারা বলে, 'তুমি যার প্রতি আমাদেরকে ডাকছ সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণ-আচ্ছাদিত, আমাদের কানে আছে বধিরতা এবং তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে পর্দা; কাজেই তুমি তোমার কাজ কর, নিশ্চয় আমরা আমাদের কাজ করব।’
ফুসসিলাত 41:6
বলুন, 'আমি কেবল তোমাদের মত একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ্ই কেবলমাত্র এক ইলাহ্। অতএব তোমরা তাঁর প্রতি দৃঢ়তা অবলম্বন কর এবং তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্য---
ফুসসিলাত 41:7
যারা যাকাত প্ৰদান করে না এবং তারাই আখিরাতের সাথে কুফরিকারী।
ফুসসিলাত 41:8
নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার [১]।
[১] মূল আয়াতে ممنون কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। এ কথাটির আরো দুটি অর্থ আছে। একটি অর্থ হচ্ছে, তা হবে এমন পুরস্কার যা স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে না বা সে জন্য খোঁটা দেয়া হবে না, যেমন কোন কৃপণ হিম্মত করে কোন কিছু দিলেও সে দানের কথা বার বার স্মরণ করিয়ে দেয়। আরেকটি অর্থ হচ্ছে, তা হবে এমন পুরস্কার যা কখনো হ্রাস পাবে না। উদ্দেশ্য এই যে, মুমিন ও সৎকর্মীদেরকে আখেরাতের স্থায়ী ও নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার দেয়া হবে। কোন কোন তফসীরবিদ এর অর্থ এই করেছেন যে, মুমিন ব্যক্তির অভ্যস্ত আমল কোন সময় কোন অসুস্থতা, সফর কিংবা অন্য কোন ওযরবশতঃ ছুটে গেলেও সে আমলের পুরস্কার ব্যাহত হয় না বরং আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাগণকে আদেশ করেন, আমার বান্দা সুস্থ অবস্থায় অথবা অবসর সময়ে যে আমল নিয়মিত করত, তার ওযর অবস্থায় সে আমল না করা সত্ত্বেও তার আমলনামায় তা লিখে দাও। এ বিষয়বস্তুর হাদীস সহীহ বোখারীতে বর্ণিত হয়েছে। [দেখুন-২৯৯৬]
ফুসসিলাত 41:9
বলুন, তোমরা কি তাঁর সাথেই কুফরী করবে যিনি যমীন সৃষ্টি করেছেন [১] দু'দিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ তৈরী করছ? তিনি সৃষ্টিকুলের রব!
[১] আলোচ্য আয়াতে মুশরিকদেরকে তাদের শিরক ও কুফরের কারণে এক সাবলীল ভঙ্গিতে হুশিয়ার করা উদ্দেশ্য। এতে আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টিগুণ তথা বিরাটকায় আকাশ ও পৃথিবীকে অসংখ্য রহস্যের উপর ভিত্তিশীল করে সৃষ্টি করার বিশদ বিবরণ দিয়ে তাদেরকে এই বলে শাসানো হয়েছে যে, তোমরা এমন নির্বোধ যে, মনে স্রষ্টা ও সর্বশক্তিমানের সাথেও অপরকে শরীক সাব্যস্ত করা? এমনি ধরনের হুশিয়ারী ও বিবরণ পবিত্র কুরআনের অন্যত্র এভাবে উল্লেখিত হয়েছে,
كَيْفَ تَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَكُنتُمْ أَمْوَاتًا فَأَحْيَاكُمْ ۖ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
[সূরা আল-বাকার: ২৮]
ফুসসিলাত 41:10
আর তিনি স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং তাতে দিয়েছেন বরকত এবং চার দিনের মধ্যে [১] এতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন সমভাবে যাচঞাকারীদের জন্য।
[১] আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির বিষয় পবিত্র কুরআনে সংক্ষেপে ও বিস্তারিতভাবে বহু জায়গায় বিবৃত হয়েছে, কিন্তু কোনটির পরে কোনটি সৃজিত হয়েছে, এর উল্লেখ সম্ভবত: মাত্র তিন আয়াতে করা হয়েছে- (এক) হা-মীম সাজদার আলোচ্য আয়াত, (দুই) সূরা বাক্বারার ২৯ নং আয়াত
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَىٰ إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ ۚ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
এবং (তিন) সূরা আন-নাযি"আতের নিম্নোক্ত আয়াত:
أَأَنتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاءُ ۚ بَنَاهَا *
رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوَّاهَا * وَأَغْطَشَ لَيْلَهَا وَأَخْرَجَ ضُحَاهَا *وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَٰلِكَ دَحَاهَا * أَخْرَجَ مِنْهَا مَاءَهَا وَمَرْعَاهَا * وَالْجِبَالَ أَرْسَاهَا
বাহ্যদৃষ্টিতে এসব বিষয়বস্তুর মধ্যে কিছু বিরোধও দেখা যায়। কেননা, সূরা বাকারাহ ও সূরা হা-মীম সেজদার আয়াত থেকে জানা যায় যে, আকাশের পূর্বে পৃথিবী সৃজিত হয়েছে এবং সূরা আন-নাযি’আতের আয়াত থেকে এর বিপরীতে জানা যায় যে, আকাশ সৃজিত হওয়ার পরে পৃথিবী সৃজিত হয়েছে। সবগুলো আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে মনে হয় যে, প্রথমে পৃথিবীর উপকরণ সৃজিত হয়েছে। এমতাবস্থায়ই ধুম্রকুঞ্জের আকারে আকাশের উপকরণ নির্মিত হয়েছে। এরপর পৃথিবীকে বর্তমান আকারে বিস্তৃত করা হয়েছে এবং এতে পর্বতমালা, বৃক্ষ ইত্যাদি সৃষ্টি করা হয়েছে। এরপর আকাশের তরল ধুম্রকুঞ্জের উপকরণকে সপ্ত আকাশে পরিণত করা হয়েছে। আশা করি সবগুলো আয়াতই এই বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। বাকী প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ্ তা'আলাই জানেন। সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের অধীনে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে কতিপয় প্রশ্ন ও উত্তর বর্ণিত হয়েছে। তাতে ইবন আব্বাস এ আয়াতের উপর্যুক্তরূপ ব্যাখ্যা করেছেন ৷ [বুখারী: কিতাবুত তাফসীর, বাব হা-মীম-আস-সাজদাহ]
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার হাত ধরে বললেন, “আল্লাহ মাটি সৃষ্টি করেছেন শনিবার, আর তাতে পাহাড় সৃষ্টি করেছেন রবিবার, গাছ-গাছালি সোমবার, অপছন্দনীয় সবকিছু মঙ্গলবার, আলো সৃষ্টি করেছেন বুধবার, আর যমীনে জীবজন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন বৃহস্পতিবার। আর আদমকে শুক্রবার আছরের পরে সর্বশেষ সৃষ্টি হিসেবে দিনের সর্বশেষ প্রহরে আসর থেকে রাত পর্যন্ত সময়ে সৃষ্টি করেছেন।” [মুসলিম: ২৭৮৯] এই হিসাব মতে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সাত দিনে হয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু কুরআনের আয়াত থেকে পরিস্কারভাবে জানা যায় যে, এই সৃষ্টিকাজ ছয় দিনে হয়েছে। এক আয়াতে আছেঃ “আমি আকাশ পৃথিবী ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছি এবং আমাকে কোন ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।” [সূরা কাফ: ৩৮] এ কারণে হাদীসবিদগণ উপরোক্ত বিশুদ্ধ বর্ণনাটির বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্ৰদান করেছেন। কেউ কেউ হাদীসটিকে অগ্রাহ্য বলে মনে করেছেন। আবার কেউ কেউ বর্ণনাটিকে কা’ব আহবারের উক্তি বলেও অভিহিত করেছেন। [ইবনে কাসীর] কিন্তু যেহেতু হাদীসটি সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, তাই এটাকে অগ্রাহ্য করার কোন সুযোগ নেই। আল্লামা মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দিন আল-আলবানী বলেন, এ হাদীসের সনদে কোন সমস্যা নেই। আর এ বর্ণনাটি কোনভাবেই কুরআনের বিরোধিতা করে না। যেমনটি কেউ কেউ মনে করে থাকে। কেননা, হাদীসটি শুধুমাত্র যমীন কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে তা বর্ণনা করে। আর তা ছিল সাতদিনে। আর কুরআনে এসেছে যে, আসমান ও যমীন সৃষ্টি হয়েছিল ছয় দিনে। আর যমীন সৃষ্টি হয়েছিল দুই দিনে। আসমান ও যমীন সৃষ্টির ছয়দিন এবং এ হাদীসে বর্ণিত সাতদিন ভিন্ন ভিন্ন সময় হতে পারে। আসমান ও যমীন ছয়দিনে সৃষ্টি হওয়ার পর যমীনকে আবার বসবাসের উপযোগী করার জন্য সাতদিন লেগেছিল। সুতরাং আয়াত ও সহীহ হাদীসের মধ্যে কোন বিরোধ নেই।
সারকথা এই যে, পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহকে একত্রিত করার ফলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিতরূপে জানা যায়, প্রথমত: আকাশ, পৃথিবী ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু মাত্র ছয় দিনে সৃজিত হয়েছে। সূরা হা-মীম সেজদার আয়াত থেকে দ্বিতীয়তঃ জানা যায় যে, পৃথিবী, পর্বতমালা, বৃক্ষরাজি ইত্যাদি সৃষ্টিতে পূর্ণ চার দিন লেগেছে। তৃতীয়ত: জানা যায় যে, আকাশমন্ডলীর সৃজনে দুদিন লেগেছিল। চতুর্থত: আসমান, যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সৃষ্টির পর যমীনকে বসবাসের উপযোগী করতে সাতদিন লেগেছিল। এ সাতদিনের সর্বশেষ দিন শুক্রবারের কিছু অংশ বেঁচে গিয়েছিল, যাতে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছিল।
কোন কোন মুফাসসির উপরোক্ত হাদীস অগ্রহণযোগ্য বিবেচনা করে আসমান ও যমীন সৃষ্টির ক্ষেত্রে শুধু কুরআনের ভাষ্যের উপর নির্ভর করেছেন। তাদের মতে, এসব আয়াতের বাহ্যিক অর্থ এই যে, আকাশ সৃষ্টির পরে পৃথিবীকে বিস্তৃত ও সম্পূর্ণ করা হয়েছে। তাই এটা অবান্তর নয় যে, পৃথিবী সৃষ্টির কাজ দু’ভাগে বিভক্ত। প্রথম দু'দিনে পৃথিবী ও তার উপরিভাগের পর্বতমালা ইত্যাদির উপকরণ সৃষ্টি করা হয়েছে। এরপর দু'দিনে সপ্ত আকাশ সৃজিত হয়েছে। এরপর দু'দিনে পৃথিবীর বিস্তৃতি ও তৎমধ্যবর্তী পর্বতমালা, বৃক্ষরাজি, নদনদী, ঝর্ণা ইত্যাদির সৃষ্টি সম্পন্ন করা হয়েছে। এভাবে পৃথিবী সৃষ্টির চার দিন উপযুপরি রইল না। সূরা হা-মীম সেজদার আয়াতে প্রথমে
خَلَقَ الْاَرْضَ فِىْ يَوْمَيْنِ
দুদিনে পৃথিবী সৃষ্টির কথা বলে মুশরিকদেরকে হুশিয়ার করা হয়েছে। অতঃপর আলাদা করে বলা হয়েছে-
وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِن فَوْقِهَا وَبَارَكَ فِيهَا وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ
“আর তিনি স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং তাতে দিয়েছেন বরকত এবং চার দিনের মধ্যে এতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন”। এতে তফসীরবিদগণ একমত যে, এই চার দিন প্রথমোক্ত দুদিনসহ; পৃথক চার দিন নয়। নতুবা তা সর্বমোট আট দিন হয়ে যাবে, যা কুরআনের বর্ণনার বিপরীত। এখন চিন্তা করলে জানা যায় যে,
خَلَقَ الْاَرْضَ فِىْ يَوْمَيْنِ
বলার পর যদি পবর্তমালা ইত্যাদির সৃষ্টিও দু'দিনে বলা হত, তবে মোট চারদিন আপনা-আপনিই জানা যেত, কিন্তু পবিত্র কুরআন পৃথিবী সৃষ্টির অবশিষ্টাংশ উল্লেখ করে বলেছে, এ হল মোট চার দিন। এতে বাহ্যত: ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এই চার দিন উপযুপরি ছিল না; বরং দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। দু'দিন আকাশ সৃষ্টির পূর্বে এবং দুদিন তার পরে। আয়াতে
وَجَعَلَ فِيْهَا رَوَاسِىَ مِنْ فَوْقِحَا
বাক্যে আকাশ সৃষ্টির পরবর্তী অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। [ইবন কাসীর]
ফুসসিলাত 41:11
তারপর তিনি আসমানের প্রতি ইচ্ছে করলেন, যা (পূর্বে) ছিল ধোঁয়া। অতঃপর তিনি ওটাকে (আসমান) ও যমীনকে বললেন, 'তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়।' তারা বলল, 'আমরা আসলাম অনুগত হয়ে।'
ফুসসিলাত 41:12
অত:পর তিনি সেগুলোকে সাত আসমানে পরিণত করলেন দু’দিনে এবং প্রত্যেক আসমানে তার নির্দেশ ওহী করে পাঠালেন এবং আমরা নিকটবর্তী আসমানকে সুশোভিত করলাম প্ৰদীপমালা দ্বারা এবং করলাম সুরক্ষিত। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের ব্যবস্থাপনা।
ফুসসিলাত 41:13
অতঃপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলুন, 'আমি তো তোমাদেরকে সতর্ক করছি এক ধ্বংসকর শাস্তি সম্পর্কে, ‘আদ ও সামুদের শাস্তির অনুরূপ।'
ফুসসিলাত 41:14
যখন তাদের কাছে তাদের সামনে ও পিছন থেকে রাসূলগণ এসে বলেছিলেন যে, 'তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করো না।' তারা বলেছিল, 'যদি আমাদের রব ইচ্ছে করতেন তবে তিনি অবশ্যই ফেরেশতা নাযিল করতেন। অতএব তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছ, নিশ্চয় আমরা তার সাথে কুফরী করলাম।'
ফুসসিলাত 41:15
অতঃপর 'আদ সম্প্রদায়, তারা যমীনে অযথা অহংকার করেছিল এবং বলেছিল, 'আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী কে আছে?' তবে কি তারা লক্ষ্য করে নি যে, নিশ্চয় আল্লাহ, যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী? আর তারা আমাদের নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করত।
ফুসসিলাত 41:16
তারপর আমরা তাদের উপর প্রেরণ করলাম ঝঞ্ঝাবায়ু [১] অশুভ দিনগুলোতে; যাতে আমরা তাদের আস্বাদন করাতে পারি জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি [২]। আর আখিরাতের শাস্তি তো তার চেয়ে বেশী লাঞ্ছনাদায়ক এবং তাদেরকে সাহায্য করা হবে না।
[১] এটা صاعقة এরই ব্যাখ্যা, যা পূর্বের ১৩ নং আয়াতে আদ ও সামুদের صاعقة বলে বর্ণিত
হয়েছে। صاعقة শব্দের আসল অর্থ অচেতন ও বেহুশকারী বস্তু। এ কারণেই বজ্রকেও صاعقة বলা হয়। আকস্মিক বিপদ অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আদ সম্প্রদায়ের উপর চাপানো ঝড়ও একটি صاعقة ছিল। একেই এখানে رِمْحًيا صَرْصَرًا নামে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস বুঝাতে এ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কেউ কেউ বলেনঃ এর অর্থ মারাত্মক “লু” প্রবাহ; কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাস এবং কারো কারো মতে এর অর্থ এমন বাতাস যা প্রবাহিত হওয়ার সময় প্রচণ্ড শব্দ সৃষ্টি হয়। তবে এ অর্থে সবাই একমত যে, শব্দটি প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। [দেখুন-তবারী] কুরআন মজীদের অন্যান্য স্থানে এ আযাব সম্পর্কে যেসব বিস্তারিত বর্ণনা আছে তা হচ্ছে, এ বাতাস উপর্যুপরি সাত দিন এবং আট রাত পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছিলো। এর প্রচণ্ডতায় মানুষ পড়ে গিয়ে এমনভাবে মৃত্যুবরণ করে এবং মরে মরে পড়ে থাকে যেমন খেজুরের ফাঁপা কাণ্ড পড়ে থাকে [আল-হাকিকাহ: ৭]। এ বাতাস যে জিনিসের ওপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে তাকেই জরাজীর্ণ করে ফেলেছে [আযযারিয়াত: ৪২]। যে সময় এ বাতাস এগিয়ে আসছিলো তখন আদ জাতির লোকেরা এই ভেবে আনন্দে মেতে উঠেছিলো যে মেঘ চারদিক থেকে ঘিরে আসছে। এখন বৃষ্টি হবে এবং তাদের আশা পূর্ণ হবে। কিন্তু তা এমনভাবে আসলো যে গোটা এলাকাই ধ্বংস করে রেখে গেল। [আল-আহকাফ: ২৪, ২৫]
[২] দাহহাক বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর তিন বছর পর্যন্ত বৃষ্টিপাত সম্পূর্ণ বন্ধ রাখেন। কেবল প্রবল শুষ্ক বাতাস প্রবাহিত হত। অবশেষে আট দিন ও সাত রাত্রি পর্যন্ত উপর্যুপরি তুফান চলতে থাকে [দেখুন, বাগভী, ফাতহুল কাদীর]
ফুসসিলাত 41:17
আর সামূদ সম্প্রদায়, আমরা তাদেরকে পথনির্দেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা সৎপথের পরিবর্তে অন্ধপথে চলা পছন্দ করেছিল। ফলে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তির বজ্রাঘাত তাদের পাকড়াও করল; তারা যা অর্জন করেছিল তার জন্য।
ফুসসিলাত 41:18
আর আমরা রক্ষা করলাম তাদেরকে, যারা ঈমান এনেছিল এবং যারা তাকওয়া অবলম্বন করত।
ফুসসিলাত 41:19
আর যেদিন আল্লাহর শত্রুদেরকে আগুনের দিকে সমবেত করা হবে, সেদিন তাদেরকে বিন্যস্ত করা হবে বিভিন্ন দলে।
ফুসসিলাত 41:20
পরিশেষে যখন তারা জাহান্নামের সন্নিকটে পৌঁছবে, তখন তাদের কান, চোখ ও ত্বক তাদের বিরুদ্ধে তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সাক্ষ্য দেবে [১]
[১] হাদীসে এসেছে, একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে ছিলাম। অকস্মাৎ তিনি হেসে উঠলেন, অতঃপর বললেন, তোমরা জান, আমি কি কারণে হেসেছি? আমরা আরয করলাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই জানেন। তিনি বললেন, আমি সে কথা স্মরণ করে হেসেছি, বা হাশরে হিসাবের জায়গায় বান্দা তার পালনকর্তাকে বলবে। সে বলবে হে রব, আপনি কি আমাকে যুলুম থেকে আশ্রয় দেননি? আল্লাহ বলবেন, অবশ্যই দিয়েছি। তখন বন্দা বলবে, তাহলে আমি আমার হিসাব নিকাশের ব্যাপারে অন্য কারও সাক্ষ্যে সন্তুষ্ট নই। আমার অস্তিত্বের মধ্য থেকেই কোন সাক্ষী না দাড়ালে আমি সন্তুষ্ট হব না। আল্লাহ তা'আলা বলবেন
كَفٰى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيْبًا
অর্থাৎ ভাল কথা, তুমি নিজেই তোমার হিসাব করে নাও। এরপর তার মুখে মোহর এটে দেয়া হবে এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে বলবে, অর্থাৎ তোমরা ধ্বংস হও, আমি তো দুনিয়াতে যা কিছু করেছি, তোমাদেরই সুখের জন্য করেছি। এখন তোমরাই আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে শুরু করলে। [মুসলিম: ২৯৩৯] অন্য বর্ণনায় এসেছে, এ ব্যক্তির মুখে মোহর এটে দেয়া হবে এবং উরুকে বলা হবে, তুমি কথা বল এবং তার ক্রিয়াকর্ম বর্ণনা কর। তখন মানুষের উরু, মাংস, অস্থি সকলেই তার কর্মের সাক্ষ্য দেবে। [মুসলিম:২৯৬৮]
যেসব আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, আখিরাত শুধু একটি আত্মিক জগত হবে না, বরং মানুষকে সেখানে দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে পুনরায় ঠিক তেমনি জীবিত করা হবে যেমনটি বর্তমানে তারা এই পৃথিবীতে জীবিত আছে-এ আয়াতটি তারই একটি। শুধু তাই নয়, যে দেহ নিয়ে তারা এই পৃথিবীতে আছে ঠিক সেই দেহই তাদের দেয়া হবে। যেসব উপাদান, অঙ্গ-প্রতঙ্গ এবং অণু-পরমাণুর সমন্বয়ে এই পৃথিবীতে তাদের দেহ গঠিত কিয়ামতের দিন সেগুলোই একত্রিত করে দেয়া হবে এবং যে দেহে অবস্থান করে সে পৃথিবীতে কাজ করেছিলো পূর্বের সেই দেহ দিয়েই তাকে উঠানো হবে। এ কথা সুস্পষ্ট যে, যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমন্বয়ে গঠিত দেহ নিয়ে সে পূর্বের জীবনে কোন অপরাধ করেছিলো সেই সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যেই যদি সে অবস্থান করে কেবল তখনি সে সেখানে সাক্ষ্য দিতে সক্ষম হবে। কুরআন মজীদের নিম্ন বর্ণিত আয়াতগুলোও এ বিষয়ের অকাট্য প্রমাণ। সূরা আল-ইসরা: ৪৯-৫১, ৯৮; আল-মুমিনুন: ৩৫-৩৮, ৮২-৮৩; আসসাজদাহ: ১০; ইয়াসীন: ৬৫-৭৯; আস-সাফফাতঃ ১৬-১৮; আল-ওয়াকি'আ: ৪৭-৫০ এবং আন-নাযি'আত: ১০-১৪।
ফুসসিলাত 41:21
আর তারা (জাহান্নামীরা) তাদের ত্বককে বলবে, 'কেন তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে?' তারা বলবে, আল্লাহ্ 'আমাদের বাকশক্তি দিয়েছেন, যিনি সবকিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন। আর তিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁরই কাছে তোমরা প্ৰত্যাবর্তিত হবে।'
ফুসসিলাত 41:22
'আর তোমরা কিছুই গোপন করতে না এ বিশ্বাসে যে, তোমাদের কান, চোখ ও ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না--- বরং তোমরা মনে করেছিলে যে, তোমরা যা করতে তার অনেক কিছুই আল্লাহ্ জানেন না।
ফুসসিলাত 41:23
‘আর তোমাদের রব সম্বন্ধে তোমাদের এ ধারণাই তোমাদের ধ্বংস করেছে। ফলে তোমরা হয়েছ ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।'
ফুসসিলাত 41:24
অতঃপর যদি তারা ধৈর্য ধারণ করে তবে আগুনই হবে তাদের আবাস। আর যদি তারা সস্তুষ্টি বিধান করতে চায় তবে তারা সন্তুষ্টিপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
ফুসসিলাত 41:25
আর আমরা তাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম মন্দ সহচরসমূহ, যারা তাদের সামনে ও পিছনে যা আছে তা তাদের দৃষ্টিতে শোভন করে দেখিয়েছিল। আর তাদের উপর শাস্তির বাণী সত্য হয়েছে, তাদের পূর্বে চলে যাওয়া জিন ও মানুষের বিভিন্ন জাতির ন্যায়। নিশ্চয় তারা ছিল ক্ষতিগ্রস্ত।
ফুসসিলাত 41:26
আর কাফিররা বলে, 'তোমরা এ কুরআনের নির্দেশ শোন না এবং তা আবৃত্তির সময় শোরগোল সৃষ্টি কর, যাতে তোমরা জয়ী হতে পার।'
ফুসসিলাত 41:27
সুতরাং আমরা অবশ্যই কাফিরদেরকে কঠিন শাস্তি আস্বাদন করাব এবং অবশ্যই আমরা তাদেরকে তাদের নিকৃষ্ট কার্যকলাপের প্রতিফল দেব।
ফুসসিলাত 41:28
এই আগুন, আল্লাহর দুশমনদের প্রতিদান; সেখানে তাদের জন্য স্থায়ী আবাস, আমাদের নিদর্শনাবলীর প্রতি তাদের অস্বীকৃতির প্রতিফলস্বরূপ।
ফুসসিলাত 41:29
আর কাফিররা বলবে, 'হে আমাদের রব! জিন ও মানুষের মধ্য থেকে যে দু'জন আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল তাদেরকে দেখিয়ে দিন, আমরা তাদের উভয়কে আমাদের পায়ের নিচে রাখব, যাতে তারা নিকৃষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়।'
ফুসসিলাত 41:30
নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ’, তারপর অবিচলিত থাকে, তাদের কাছে নাযিল হয় ফেরেশতা (এ বলে) যে, 'তোমরা ভীত হয়ে না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও।
ফুসসিলাত 41:31
'আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে। আর সেখানে তোমাদের জন্য থাকবে যা কিছু তোমাদের মন চাইবে এবং সেখানে তোমাদের জন্য থাকবে যা তোমরা দাবী করবে [১]।'
[১] ফেরেশতাগণ মুমিনদেরকে বলবে, তোমরা জান্নাতে মনে যা চাইবে তাই পাবে এবং যা দাবী করবে তাই সরবরাহ করা হবে। এর সারমর্ম এই যে, তোমাদের প্রতিটি বাসনা পূর্ণ হবে-তোমরা চাও বা না চাও। অতঃপর نُزُلا তথা আপ্যায়নের কথা বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এমন অনেক নেয়ামতও পাবে, যার আকাঙ্খাও তোমাদের অন্তরে সৃষ্টি হবে না। যেমন মেহমানের সামনে এমন অনেক বস্তুও আসে যার কল্পনাও পূর্বে করা হয় না, বিশেষতঃ যখন কোন বড় লোকেরা মেহমান হয়। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যদি জান্নাতী ব্যক্তি নিজ গৃহে সন্তান জন্মের বাসনা করে, তবে গৰ্ভধারণ, প্রসব, শিশুর দুধ ছাড়ানো এবং যৌবনে পদাৰ্পন সব এক মুহূর্তের মধ্যে হয়ে যাবে। [তিরমিয়ী: ২৫৬৩]
ফুসসিলাত 41:32
এটা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন হিসেবে।
ফুসসিলাত 41:33
আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম যে আল্লাহর দিকে আহবান জানায় এবং সৎকাজ করে। আর বলে, 'অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত [১]।'
[১] এটা মুমিনদের দ্বিতীয় অবস্থা। তারা কেবল নিজেদের ঈমান ও আমল নিয়েই সস্তুষ্ট থাকে না, বরং অপরকেও দাওয়াত দেয়। বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে? মুমিনদের সান্তুনা দেয়া এবং মনোবল সৃষ্টির পর এখন তাদেরকে তাদের আসল কাজের প্রতি উৎসাহিত করা হচ্ছে। আগের আয়াতে তাদের বলা হয়েছিলো, আল্লাহর বন্দেগীর ওপর দৃঢ়পদ হওয়া এবং এই পথ গ্রহণ করার পর পুনরায় তা থেকে বিচ্যুত না হওয়াটাই এমন একটা মৌলিক নেকী যা মানুষকে ফেরেশতার বন্ধু এবং জান্নাতের উপযুক্ত বানায়। এখন তাদের বলা হচ্ছে, এর পরবর্তী স্তর হচ্ছে, তোমরা নিজে নেক কাজ করো, অন্যদেরকে আল্লাহর বন্দেগীর দিকে ডাকো এবং ইসলামের ঘোষণা দেয়াই যেখানে নিজের জন্য বিপদাপদ ও দুঃখ-মুসিবতকে আহবান জানানোর শামিল এমন কঠিন পরিবেশেও দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে: আমি মুসলিম। মানুষের জন্য এর চেয়ে উচ্চস্তর আর নেই। কিন্তু আমি মুসলিম বলে কোন ব্যক্তির ঘোষণা করা, পরিণামের পরোয়া না করে সৃষ্টিকে আল্লাহর বন্দেগীর দিকে আহ্বান জানানো এবং কেউ যাতে ইসলাম ও তার ঝাণ্ডাবাহীদের দোষারোপ ও নিন্দাবাদ করার সুযোগ না পায় এ কাজ করতে গিয়ে নিজের তৎপরতাকে সেভাবে পবিত্র রাখা হচ্ছে পূর্ণ মাত্রার নেকী। এ থেকে বোঝা গেল যে, মানুষের সেই কথাই সর্বোত্তম ও সর্বোৎকৃষ্ট যাতে অপরকে সত্যের দাওয়াত দেয়া হয়। এতে মুখে, কলমে, অন্য কোনভাবে সর্বপ্রকার দাওয়াতই শামিল রয়েছে। আযানদাতাও এতে দাখিল আছে। কেননা, সে মানুষকে সালাতের দিকে আহ্বান করে। এ কারণেই আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আলোচ্য আয়াত মুয়াযযিন সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে دَعَآاِلَى اللهِ বাক্যের পর وَعَمِلَ صِالِحًا বলে আযান-ইকামতের মধ্যস্থলে দুরাকাআত সালাত বোঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আযান ও একমাতের মাঝখানে যে দো’আ হয়, তা প্রত্যাখ্যাত হয় না। [আবু দাউদ: ৫২১]
ফুসসিলাত 41:34
আর ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত করুন তা দ্বারা যা উৎকৃষ্ট; ফলে আপনার ও যার মধ্যে শক্ৰতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত।
ফুসসিলাত 41:35
আর এটি শুধু তারাই প্রাপ্ত হবে যারা ধৈর্যশীল। আর এর অধিকারী তারাই হবে কেবল যারা মহাভাগ্যবান।
ফুসসিলাত 41:36
আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা আপনাকে প্ররোচিত কর তবে আপনি আল্লাহর আশ্রয় চাইবেন, নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ [১]।
[১] বলা হয়েছে, শয়তানের প্রতারণার ব্যাপারে সাবধান থাকো। সে অত্যন্ত দরদী ও মঙ্গলকামী সেজে এই বলে তোমাদেরকে উত্তেজিত করবে যে, অমুক অত্যাচার কখনো বরদাশত করা উচিত নয়, অমুকের কাজের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া উচিত এবং এই আক্রমণের জবাবে লড়াই করা উচিত। তা না হলে তোমাদেরকে কাপুরুষ মনে করা হবে, এবং তোমাদের আদৌ কোন প্রভাব থাকবে না। এ ধরনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তোমরা যখন নিজেদের মধ্যে কোন অযথা উত্তেজনা অনুভব করবে তখন সাবধান হয়ে যাও। কারণ, তা শয়তানের প্ররোচনা। সে তোমাদের উত্তেজিত করে কোন ভুল সংঘটিত করাতে চায়। সাবধান হয়ে যাওয়ার পর মনে করো না, আমি আমার মেজাজকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখছি, শয়তান আমাকে দিয়ে কোন ত্রুটি করাতে পারবে না। নিজের ইচ্ছা শক্তির বিভ্রম হবে শয়তানের আরেকটি বেশী ভয়ংকর হাতিয়ার। এর চেয়ে বরং আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। কারণ তিনি যদি তাওফীক দান করেন ও রক্ষা করেন তবেই মানুষ ভুল-ত্রুটি থেকে রক্ষা পেতে পারে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে একবার এক ব্যক্তি হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে অকথ্য গালিগালাজ করতে থাকলো। আবু বকর চুপচাপ তার গালি শুনতে থাকলেন আর তার দিকে চেয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুচকি হাসতে থাকলেন। অবশেষে আবু বকর সিদ্দীক জবাবে তাকে একটি কঠোর কথা বলে ফেললেন। তার মুখ থেকে সে কথাটি বের হওয়া মাত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর চরম বিরক্তি ভাব ছেয়ে গেল এবং ক্রমে তা তার পবিত্র চেহারায় ফুটে উঠতে থাকলো। তিনি তখনই উঠে চলে গেলেন। আবু বকরও উঠে তাকে অনুসরণ করলেন এবং পথিমধ্যেই জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কি? সে যখন আমাকে গালি দিচ্ছিলো তখন আপনি চুপচাপ মুচকি হাসছিলেন। কিন্তু যখনই আমি তাকে জবাব দিলাম তখনই আপনি অসন্তুষ্ট হলেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তুমি যতক্ষণ চুপচাপ ছিলে ততক্ষণ একজন ফেরেশতা তোমার সাথে ছিল এবং তোমার পক্ষ থেকে জবাব দিচ্ছিলো। কিন্তু যখন তুমি নিজেই জবাব দিলে তখন ফেরেশতার স্থানটি শয়তান দখল করে নিল। আমি তো শয়তানের সাথে বসতে পারি না। [মুসনাদে আহমাদ: ২/৪৩৬]
ফুসসিলাত 41:37
আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে রাত ও দিন, সূর্য ও চাঁদ। তোমরা সূর্যকে সিজ্দা করো না, চাঁদকেও নয় [১]; আর সিজ্দা কর আল্লাহ্কে, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা কেবলমাত্র তাঁরই ইবাদত কর।
[১] অর্থাৎ এসব আল্লাহর প্রতিভূ নয় যে এগুলোর আকৃতিতে আল্লাহ নিজেকে প্রকাশ করছেন বলে মনে করে তাদের ইবাদত করতে শুরু করবে। বরং এগুলো আল্লাহর নিদর্শন এসব নিদর্শন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে তোমরা বিশ্ব জাহান ও তার ব্যবস্থাপনার সত্যতা ও বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারবে এবং এ কথাও জানতে পারবে যে নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালাম আল্লাহ সম্পর্কে যে তাওহীদের শিক্ষা দিচ্ছেন তাই প্রকৃত সত্য। সূর্য ও চাঁদের উল্লেখের পূর্বে দিন ও রাতের উল্লেখ করা হয়েছে এ বিষয়ে সাবধান করে দেয়ার জন্য যে রাতের বেলা সূর্যের অদৃশ্য হওয়া ও চাঁদের আবির্ভূত হওয়া এবং দিনের বেলা চাঁদের অদৃশ্য হওয়া ও সূর্যের আবির্ভূত হওয়া সুস্পষ্ট ভাবে এ কথা প্রমাণ করে যে, এ দুটির কোনটিই আল্লাহ বা আল্লাহ প্রতিভূ নয়। উভয়েই তাঁর একান্ত দাস। তারা আল্লাহর আইনের নিগড়ে বাধা পড়ে আবর্তন করছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাঁদ ও সূর্য সম্পর্কে মানুষের আকীদা-বিশ্বাসকে পরিশুদ্ধ করার জন্য বিভিন্নভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সন্তান ইব্রাহীম মারা গেলে সেদিনই সূর্যগ্রহণ হয়। লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো যে, ইব্রাহীমের মৃত্যুর কারণেই সূর্যগ্রহণ হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন যে, সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ করো মৃত্যু বা জীবনের জন্য হয় না। বরং এ দুটি আল্লাহর নিদর্শনাবলী থেকে দুটি নিদর্শন; যা তিনি তাঁর বান্দাদের দেখিয়ে থাকেন। সুতরাং যখন তোমরা এরূপ কিছু দেখবে, তখন সালাতের দিকে ধাবিত হবে ৷ [বুখারী: ১০৫৮]
ফুসসিলাত 41:38
অতঃপর যদি তারা অহংকার করে, তবে যারা আপনার রবের নিকটে রয়েছে তারা তো দিন ও রাতে তাঁর পবিত্ৰতা, মহিমা ঘোষণা করে এবং তারা ক্লান্তি বোধ করে না।
ফুসসিলাত 41:39
আর তাঁর একটি নিদর্শন এই যে, আপনি ভূমিকে দেখতে পান শুষ্ক ও ঊষর, অতঃপর যখন আমরা তাতে পানি বর্ষণ করি তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়। নিশ্চয় যিনি যমীনকে জীবিত করেন তিনি অবশ্যই মৃতদের জীবনদানকারী। নিশ্চয় তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
ফুসসিলাত 41:40
নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহে ইলহাদ করে, তারা আমার অগোচরে নয়। যে অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হবে সে কি শ্ৰেষ্ঠ, না যে কিয়ামতের দিন নিরাপদে উপস্থিত হবে সে? তোমরা যা ইচ্ছে আমল কর। তোমরা যা আমল কর, নিশ্চয় তিনি তার সম্যক দ্রষ্টা।
ফুসসিলাত 41:41
নিশ্চয় যারা তাদের কাছে কুরআন আসার পর তার সাথে কুফরী করে [১] (তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে); আর এ তো অবশ্যই এক সম্মানিত গ্রন্থ---
[১] এ আয়াতে ذكر বলে কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। [তবারী]
ফুসসিলাত 41:42
বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না---সামনে থেকেও না, পিছন থেকেও না। এটা প্রজ্ঞাময়, চিরপ্ৰশংসিতের কাছ থেকে নাযিলকৃত।
ফুসসিলাত 41:43
আপনাকে শুধু তা-ই বলা হয়, যা বলা হতো আপনার পূর্ববর্তী রাসূলগণকে। নিশ্চয় আপনার রব একান্তই ক্ষমাশীল এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিদাতা।
ফুসসিলাত 41:44
আর যদি আমরা এটাকে করতাম অনারবী ভাষায় কুরআন তবে তারা অবশ্যই বলত, 'এর আয়াতগুলো বিশদভাবে বিবৃত হয়নি কেন? ভাষা অনারবীয়, অথচ রাসূল আরবীয়! বলুন, ‘এটি মুমিনদের জন্য হেদায়াত ও আরোগ্য।' আর যারা ঈমান আনে না তাদের কানে রয়েছে বধিরতা এবং কুরআন এদের (অন্তরের) উপর অন্ধত্ব তৈরী করবে। তাদেরকেই ডাকা হবে দূরবর্তী স্থান থেকে।
ফুসসিলাত 41:45
আর অবশ্যই আমরা মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম, অতঃপর তাতে মতভেদ ঘটেছিল। আর যদি আপনার রবের পক্ষ থেকে একটি বাণী (সিদ্ধান্ত) পূর্বেই না থাকত তবে তাদের মধ্যে ফয়সালা হয়ে যেত। আর নিশ্চয় তারা এ কুরআন সম্বন্ধে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে।
ফুসসিলাত 41:46
যে সৎকাজ করে সে তার নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। আর আপনার রব তাঁর বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুমকারী নন।
ফুসসিলাত 41:47
কিয়ামতের জ্ঞান শুধু আল্লাহর কাছেই প্রত্যাবর্তিত হয়। তাঁর অজ্ঞাতসারে কোন ফল আবরণ হতে বের হয় না, কোন নারী গর্ভ ধারণ করে না এবং সন্তানও প্রসব করে না [১]। আর যেদিন আল্লাহ্ তাদেরকে ডেকে বলবেন, 'আমার শরীকেরা কোথায়?' তখন তারা বলবে, 'আমরা আপনার কাছে নিবেদন করি যে, এ ব্যাপারে আমাদের থেকে কোন সাক্ষী নেই।'
[১] একথা বলে শ্রোতাদেরকে দুটি বিষয় বুঝানো হয়েছে। একটি হচ্ছে, শুধু কিয়ামত নয়, বরং সমস্ত গায়েবী বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। গায়েবী বিষয়ে জ্ঞানের অধিকারী আর কেউ নেই। অপরটি হচ্ছে, যে আল্লাহ খুঁটিনাটি বিষয়সমূহের এত বিস্তারিত জ্ঞান রাখেন, কোন ব্যক্তির কাজ কর্ম তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অতএব তাঁর সার্বভৌম ক্ষমতার আওতায় নিৰ্ভয়ে যা ইচ্ছা তাই করা ঠিক নয়। দ্বিতীয় অর্থ অনুসারে এই বাক্যাংশের সম্পর্ক পরবর্তী বাক্যাংশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একথাটির পরেই যা বলা হয়েছে সে সম্পর্কে যদি চিন্তা করা হয় তাহলে বক্তব্যের ধারাক্রম থেকে আপনা আপনি একথার ইংগিত পাওয়া যায় যে, কিয়ামতের তারিখ জানার ধান্ধায় কোথায় পড়ে আছ? বরং চিন্তা করো কিয়ামত যখন আসবে তখন নিজের এসব গোমরাহীর জন্য কি দুর্ভোগ পোহাতে হবে। কিয়ামতের তারিখ সম্পর্কে প্ৰশ্নকারী এক ব্যক্তিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথার মাধ্যমেই জবাব দিয়েছিলেন। একবার সফরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমথ্যে এক ব্যক্তি দূর থেকে ডাকলো, হে মুহাম্মাদ ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, কি বলতে চাও, বলো। সে বললোঃ কিয়ামত কবে হবে? তিনি জবাবে বললেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা, কিয়ামত তো আসবেই। তুমি সে জন্য কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছো?” [বুখারী: ৬১৬৭, মুসলিম: ২৬৩৯]
ফুসসিলাত 41:48
আর আগে তারা যাদেরকে ডাকত তারা তাদের কাছ থেকে উধাও হয়ে যাবে এবং তারা বিশ্বাস করবে যে, তাদের পলায়নের কোন উপায় নেই।
ফুসসিলাত 41:49
মানুষ কল্যাণ প্রার্থনায় কোন ক্লান্তি বোধ করে না, কিন্তু যখন তাকে অকল্যাণ স্পর্শ করে তখন সে প্রচণ্ডভাবে হতাশ ও নিরাশ হয়ে পড়ে;
ফুসসিলাত 41:50
আর যদি দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করার পর আমরা তাকে আমার পক্ষ থেকে অনুগ্রহের আস্বাদন দেই, তখন সে অবশ্যই বলে থাকে, 'এ আমার প্রাপ্য এবং আমি মনে করি না যে, কিয়ামত সংঘটিত হবে। আর যদি আমাকে আমার রবের কাছে ফিরিয়ে নেয়াও হয়, তবুও তাঁর কাছে আমার জন্য কল্যাণই থাকবে।' অতএব, আমরা অবশ্যই কাফিরদেরকে তাদের আমল সম্বন্ধে অবহিত করব এবং তাদেরকে অবশ্যই আস্বাদন করাব কঠোর শাস্তি।
ফুসসিলাত 41:51
আর যখন আমরা মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও দূরে সরে যায়। আর যখন তাকে অকল্যাণ স্পর্শ করে তখন সে দীর্ঘ প্রার্থনাকারী হয়।
ফুসসিলাত 41:52
বলুন, 'তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি এ কুরআন আল্লাহর কাছ থেকে নাযিল হয়ে থাকে আর তোমরা এটা প্রত্যাখ্যান কর, তবে যে ব্যক্তি ঘোর বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত আছে, তার চেয়ে বেশী বিভ্রান্ত আর কে?’
ফুসসিলাত 41:53
অচিরেই আমরা তাদেরকে আমাদের নিদর্শনাবলী দেখাব, বিশ্ব জগতের প্রান্তসমূহে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে; যাতে তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, অবশ্যই এটা (কুরআন) সত্য। এটা কি আপনার রবের সম্পর্কে যথেষ্ট নয় যে, তিনি সব কিছুর উপর সাক্ষী ?
ফুসসিলাত 41:54
জেনে রাখুন, নিশ্চয় তারা তাদের রবের সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে সন্দিহান। জেনে রাখুন যে, নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।
আশ-শূরা 42:1
হা-মীম।
আশ-শূরা 42:2
‘আইন-সীন- কাফ।
আশ-শূরা 42:3
এভাবেই আপনার প্রতি এবং আপনার পূৰ্ববর্তীদের প্রতি ওহী করেন পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহ্ [১]।
[১] অহীর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, দ্রুত ইংগিত এবং গোপন ইংগিত [ইবন হাজার: ফাতহুল বারী: ১/২০৪]
আশ-শূরা 42:4
আসমানসমূহে যা আছে ও যমীনে যা আছে তা তাঁরই। তিনি সুউচ্চ, সুমহান।
আশ-শূরা 42:5
আসমানসমূহ উপর থেকে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়, আর ফেরেশতাগণ তাদের রবের সপ্ৰশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং যমীনে যারা আছে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। জেনে রাখুন, নিশ্চয় আল্লাহ, তিনিই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
আশ-শূরা 42:6
আর যারা তাঁর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে [১] গ্ৰহণ করে, আল্লাহ্ তাদের প্রতি সম্যক দৃষ্টিদাতা। আর আপনি তো তাদের উপর কর্মবিধায়ক নন।
[১] মূল আয়াতে أولياء, শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আরবী ভাষায় যার অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। বাতিল উপাস্যদের সম্পর্কে পথভ্রষ্ট মানুষদের বিভিন্ন আকীদা-বিশ্বাস এবং ভিন্ন ভিন্ন অনেক কর্মপদ্ধতি আছে। কুরআন মজীদে এগুলোকেই “আল্লাহ ছাড়া অন্যদের ওলী বা অভিভাবক বানানো” বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কুরআন মজীদে অনুসন্ধান করলে “ওলী’ শব্দটির কয়েকটি অর্থ জানা যায়। একঃ মানুষ যার কথামত কাজ করে, যার নির্দেশনা মেনে চলে এবং যার রচিত নিয়ম-পস্থা, রীতিনীতি এবং আইনকানুন অনুসরণ করে [আন নিসা: ১১৮-১২০; আল-আশরাফ: ৩, ২৭-৩০] দুইঃ যার দিকনির্দেশনার ওপর মানুষ আস্থা স্থাপন করে এবং মনে করে সে তাকে সঠিক রাস্তা প্রদর্শনকারী এবং ভ্রান্তি থেকে রক্ষাকারী। [আল বাকারাহ: ২৫৭; আল-ইসরা: ৯৭; আল-কাহাফ: ১৭ ও আল-জাসিয়া: ১৯] তিনঃ যার সম্পর্কে মানুষ মনে করে, আমি পৃথিবীতে যাই করি না কেন সে আমাকে তার কুফল থেকে রক্ষা করবে। এমনকি যদি আল্লাহ থাকেন এবং আখেরাত সংঘটিত হয় তাহলে তার আযাব থেকেও রক্ষা করবেন। [আন- নিসা: ১২৩-১৭৩; আল-আন’আম: ৫১; আর-রা'দ: ৩৭; আল-‘আনকাবুত: ২২; আল-আহ যাব: ৬৫; আয-যুমার: ৩] চারঃ যার সম্পর্কে মানুষ মনে করে, পৃথিবীতে তিনি অতি প্রাকৃতিক উপায়ে তাকে সাহায্য করেন, বিপদাপদে তাকে রক্ষা করেন। রুজি-রোজগার দান করেন, সন্তান দান করেন, ইচ্ছা পূরণ করেন এবং অন্যান্য সব রকম প্রয়োজন পূরণ করেন [হুদ:২০; আর-রা'দঃ ১৬, আল-আনকাবূত: ৪১]
আশ-শূরা 42:7
আর এভাবে আমরা আপনার প্রতি কুরআন নাযিল করেছি আরবী ভাষায়, যাতে আপনি মক্কা ও তার চারদিকের জনগণকে [১] সতর্ক করতে পারেন এবং সতর্ক করতে পারেন কেয়ামতের দিন সম্পর্কে, যাতে কোন সন্দেহ নেই। একদল থাকবে জান্নাতে আরেক দল জলন্ত আগুনে।
[১] এর অর্থ সকল জনপদ ও শহরের মূল ও ভিত্তি। এখানে মক্কা মোকাররমা বুঝানো হয়েছে। এই নামকরণের হেতু এই যে, এ শহরটি সমগ্ৰ বিশ্বের শহর-জনপদ এমনকি ভূ-পৃষ্ঠ অপেক্ষা আল্লাহ তা'আলার কাছে অধিক সম্মানিত ও শ্রেষ্ঠ। [তাবারী, ইবনে কাসীর] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করার সময় মক্কাকে সম্বোধন করে বলেছিলেন: অবশ্যই তুমি আমার কাছে আল্লাহর সমগ্ৰ পৃথিবী থেকে শ্রেষ্ঠ এবং সমগ্ৰ পৃথিবী অপেক্ষা অধিক প্রিয়। যদি আমাকে তোমার থেকে বহিস্কার করা না হত, তবে আমি কখনও স্বেচ্ছায় তোমাকে ত্যাগ করতাম না। [তিরমিযী: ৩৯২৬]
আশ-শূরা 42:8
আর আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে তাদেরকে একই উম্মত করতে পারতেন; কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছে তাকে স্বীয় অনুগ্রহে প্ৰবেশ করান। আর যালিমরা, তাদের কোন অভিভাবক নেই, কোন সাহায্যকারীও নেই।
আশ-শূরা 42:9
তারা কি আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্ৰহণ করেছে, কিন্তু আল্লাহ্, অভিভাবক তো তিনিই এবং তিনি মৃতকে জীবিত করেন। আর তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
আশ-শূরা 42:10
আর তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ করা না কেন---তার ফয়সালা তো আল্লাহরই কাছে। তিনিই আল্লাহ্ --- আমার রব; তাঁরই উপর আমি নির্ভর করেছি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী হই।
আশ-শূরা 42:11
তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং গৃহপালিত জন্তুর মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন জোড়া। এভাবে তিনি তোমাদের বংশ বিস্তার করেন; কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা।
আশ-শূরা 42:12
তাঁরই কাছে আসমানসমূহ ও যমীনের চাবিকাঠি। তিনি যার জন্যে ইচ্ছে তার রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং সংকুচিত করেন। নিশ্চয় তিনি সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।
আশ-শূরা 42:13
তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দ্বীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন নূহকে, আর যা আমরা ওহী করেছি আপনাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ‘ঈসাকে, এ বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে বিভেদ সৃষ্টি কর না [১]। আপনি মুশরিকদেরকে যার প্রতি ডাকছেন তা তাদের কাছে কঠিন মনে হয়। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে তার দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী হয় তাকে তিনি দ্বীনের দিকে হেদায়াত করেন।
[১] দ্বীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়ার পর আল্লাহ এ আয়াতে সর্বশেষ যে কথা বলেছেন তা হচ্ছে "দ্বীনে বিভেদ সৃষ্টি করো না’ কিংবা ‘তাতে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ো না। পূর্ববর্তী উম্মতদের কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষা গ্ৰহণ করে এ ধরনের কাজ থেকে সাবধান করে বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সামনে একটি সরল রেখা টানলেন। অত:পর এর ডানে ও বায়ে আরও কয়েকটি রেখা টেনে বললেন, ডান-বামের এসব রেখা শয়তানের আবিস্কৃত পথ। এর প্রত্যেকটিতে একটি করে শয়তান নিয়োজিত রয়েছে। সে মানুষকে সে পথেই চলার উপদেশ দেয়। অত:পর তিনি মধ্যবর্তী সকল রেখার দিকে ইশারা করে বললেন:
وَاَنَّ هٰذَاِصرَ اطِىْ مُسْتَقِيْمًا فَاتَّبِعُوْهُ
“আর এটা আমার সরল পথ, সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ কর।” [মুসনাদে আহমাদ: ১/৪৩৫] এ দৃষ্টান্তে সরল পথ বলে নবী-রাসূলগণের অভিন্ন দ্বীনের পথই বোঝান হয়েছে। এতে শাখা-প্ৰশাখা বের করা ও বিভেদ সৃষ্টি করা হারাম ও শয়তানের কাজ। এ সম্পর্কে হাদীসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তি মুসলিমদের জামাত (সামষ্টিকভাবে সকল উম্মত) থেকে অর্ধ হাত পরিমাণও দূরে সরে পড়ে, সে-ই ইসলামের বন্ধনই তার কাধ থেকে সরিয়ে দিল’। [আবু দাউদ: ৪৭৬০] তিনি আরও বলেন, ‘জামাত (তথা মুসলিম উম্মতের) উপর আল্লাহর হাত রয়েছে।’ [নাসায়ী: ৪০২০] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, “শয়তান মানুষের জন্য ব্যাঘ্রস্বরূপ। বাঘ ছাগলের পেছনে লাগে। অত:পর যে ছাগল পালের পেছনে অথবা এদিক ওদিক বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে সেটির উপরই পতিত হয়। তাই তোমাদের উচিত দলের সঙ্গে থাকা-পৃথক না থাকা। [মুসনাদে আহমাদ: ৫/২৩২] মনে রাখতে হবে যে, মুসলিমরা সবাই এক উম্মত; তাদের থেকে কেউ আলাদা কোন দল করে পৃথক হলে সে উম্মতের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ঘটালো। এটাই শরীআতে নিন্দনীয়।
আশ-শূরা 42:14
আর তাদের কাছে জ্ঞান আসার পর শুধুমাত্র পারস্পরিক বিদ্বেষবশত [১] তারা নিজেদের মধ্যে মতভেদ ঘটায়। আর এক নির্ধারিত কাল পর্যন্ত অবকাশ সম্পর্কে আপনার রবের পূর্ব সিদ্ধান্ত না থাকলে তাদের বিষয় ফয়সালা হয়ে যেত। আর তাদের পর যারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছে, নিশ্চয় তারা সে সম্পর্কে বিভ্ৰান্তিকর সন্দেহে রয়েছে।
[১] এই মতভেদ সৃষ্টির চালিকা শক্তি ছিল নিজের নাম ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা, পারস্পরিক জিদ ও একগুঁয়েমি, একে অপরকে পরাস্ত করার প্রচেষ্টা এবং সম্পদ ও মর্যাদা অর্জন প্রচেষ্টার ফল। [কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]
আশ-শূরা 42:15
সুতরাং আপনি আহ্বান করুন [১] এবং দৃঢ় থাকুন, যেভাবে আপনি আদিষ্ট হয়েছেন। আর আপনি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না; এবং বলুন, 'আল্লাহ্ যে কিতাব নাযিল করেছেন আমি তাতে ঈমান এনেছি এবং আমি আদিষ্ট হয়েছি তোমাদের মধ্যে ন্যায় বিচার করতে। আল্লাহ্ আমাদের রব এবং তোমাদেরও রব। আমাদের আমল আমাদের এবং তোমাদের আমল তোমাদের; আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোন বিবাদ-বিসম্বাদ নেই। আল্লাহ্ আমাদেরকে একত্র করবেন এবং ফিরে যাওয়া তারই কাছে [২]।'
[১] তাওহীদের দিকে, অথবা এ সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীনের দিকে। যার নির্দেশ তিনি সমস্ত নবী রাসূলদের দিয়েছেন এবং তার ওসিয়ত করেছেন। [জালালাইন; মুয়াসসার]
[২] হাফেয ইবনে কাসীর বলেন, দশটি বাক্য সম্বলিত এই আয়াতের প্রত্যেকটি বাক্যে বিশেষ বিশেষ বিধান বর্ণিত হয়েছে। সমগ্র কুরআনে আয়াতুল কুরসীই এর একমাত্র দৃষ্টান্ত। তাতেও দশটি বিধান বিধৃত হয়েছে। আলোচ্য আয়াতের প্রথম বিধান হচ্ছে فَلِذٰلِكَ فَادْعُ অর্থাৎ যদিও মুশরেকদের কাছে আপনার তাওহীদের দাওয়াত কঠিন মনে হয়, তথাপি আপনি এ দাওয়াত ত্যাগ করবেন না এবং উপর্যুপরি দাওয়াতের কাজ অব্যাহত রাখুন।
দ্বিতীয় বিধান وَاسْتَقِمُ كَمَآاُمِرْتَ অর্থাৎ আপনি এ দ্বীনে নিজে অবিচল থাকুন, যেমন আপনাকে আদেশ করা হয়েছে। যাবতীয় বিশ্বাস, কর্ম, চরিত্র, অভ্যাস ও সামাজিকতার যথাযথ সমতা ও ভারসাম্য কায়েম রাখুন। কোন দিকেই যেন কোনরূপ বাড়াবাড়ি না হয়। কাফেদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য এই দ্বীনের মধ্যে কোন রদবদল ও হ্রাস-বৃদ্ধি করবেন না। ‘কিছু নাও এবং কিছু দাও’ নীতির ভিত্তিতে এই পথভ্রষ্ট লোকদের সাথে কোন আপোষ করবেন না। বলাবাহুল্য, এরূপ দৃঢ়তা সহজসাধ্য নয়। এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহাবায়ে কেরামদের কেউ জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে বৃদ্ধ দেখাচ্ছে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: شَيَّبَتْنِيْ هُوْد অর্থাৎ সুরা হুদ আমাকে বৃদ্ধ করে দিয়েছে। সূরা হুদের ১১২ নং আয়াতে এ আদেশ এ ভাষায়ই ব্যক্ত হয়েছে। সেখানেও দ্বীনের উপর অবিচল থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তৃতীয় বিধান- وَلَاتَتَّبِعْ اَهْوَآءَهُمْ অর্থাৎ প্রচারের দায়িত্ব পালনে আপনি কারও বিরোধিতার পরওয়া করবেন না। শুধু কোন না কোন ভাবে ইসলামের গণ্ডির মধ্যে এসে যাক, এ লোভের বশবর্তী হয়ে এদের কুসংস্কার ও গোড়ামি এবং জাহেলী আচার-আচরণের জন্য দ্বীনের মধ্যে কোন অবকাশ সৃষ্টি করবেন না। আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে যেভাবে নাযিল করেছেন কেউ মানতে চাইলে সেই খাঁটি ও মূল দ্বীনকে যেন সরাসরি মেনে নেয়। অন্যথায় যে জাহান্নামে হুমড়ি খেয়ে পড়তে চায় পড়ুক। মানুষের ইচ্ছানুসারে আল্লাহর দ্বীনের পরিবর্তন সাধন করা যায় না। মানুষ যদি নিজের কল্যাণ চায় তাহলে যেন নিজেকেই পরিবর্তন করে দ্বীন অনুসারে গড়ে নেয়।
চতুর্থ বিধান-
وَقُلْ اٰمَنْتُ بِمَآ اَنْزَلَ اللهُ مِنْ كِتٰبٍ
অর্থাৎ আপনি ঘোষনা করুন: আল্লাহ তা'আলা যত কিতাব নাযিল করেছেন, সবগুলোর প্রতি আমি ঈমান এনেছি। অন্য কথায় আমি সেই বিভেদ সৃষ্টিকারী লোকদের মত নই যারা আল্লাহর প্রেরিত কোন কোন কিতাব মানে আবার কোন কোনটি মানে না। আমি আল্লাহর প্রেরিত প্রতিটি কিতাবই মানি।
পঞ্চম বিধান- وَاُمِرْتُ لِاَعْدِلَ بِيْنَكُمْ এই ব্যাপকার্থক আয়াতাংশের কয়েকটি অর্থ হয়ঃ একটি অর্থ হচ্ছে, আমি এসব দলাদলি থেকে দূরে থেকে নিরপেক্ষ ন্যায় নিষ্ঠা অবলম্বনের জন্য আদিষ্ট। কোন দলের স্বার্থে এবং কোন দলের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব করা আমার কাজ নয়। সব মানুষের সাথে আমার সমান সম্পর্ক। আর সে সম্পর্ক হচ্ছে ন্যায় বিচার ও ইনসাফের সম্পর্ক। যার যে বিষয়টি ন্যায় ও সত্য সে যত দূরেরই হোক না কেন আমি তার সহযোগী। আর যার যে বিষয়টি ন্যায় ও সত্যের পরিপন্থী সে আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হলেও আমি তার বিরোধী। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, আমি তোমাদের সামনে যে সত্য পেশ করার জন্য আদিষ্ট তাতে কারো জন্য কোন বৈষম্য নেই, বরং তা সবার জন্য সমান। তাতে নিজের ও পরের, বড়র ও ছোটর, গরীবের ও ধনীর, উচ্চের ও নীচের ভিন্ন ভিন্ন সত্য নেই। যা সত্য তা সবার জন্য সত্য। যা গোনাহ তা সবার জন্য গোনাহ। যা হারাম তা সবার জন্য হারাম এবং যা অপরাধ তা সবার জন্য অপরাধ। এই নির্ভেজাল বিধানে আমার নিজের জন্যও কোন ব্যতিক্রম নেই। তৃতীয় অর্থ হচ্ছে, আমি পৃথিবীতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আদিষ্ট। মানুষের মধ্যে ইনসাফ কয়েম করা এবং তোমাদের জীবনে ও তোমাদের সমাজে যে ভারসাম্যহীনতা ও বে-ইনসাফী রয়েছে তার ধ্বংস সাধনের দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে। পারস্পারিক বিবাদ-বিসংবাদের কোন মোকদ্দমা আমার কাছে আসলে তাতে ন্যায় বিচার করার নির্দেশ আমাকে দেয়া হয়েছে। চতুর্থ অর্থ এই যে, এখানে عدل এর অর্থ সাম্য। সুতরাং আয়াতের অর্থ হচ্ছে, আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, দ্বীনের যাবতীয় বিধি-বিধান তোমাদের মধ্যে সমান সমান রাখি, প্রত্যেক নবী ও প্রত্যেক কিতাবে বিশ্বাস স্থাপন করি এবং সব বিধান পালন করি-এরূপ নয় যে, কোন বিধান মানবো আর কোনটি অমান্য করব। অথবা কোনটির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব ও কোনটির প্রতি করব না।
ষষ্ট বিধান- اَللهُ رَبُّنَا وَرَبُّكُمْ আল্লাহকেই একমাত্র রব হিসেবে মানব। তিনি আমাদের ও তোমাদের রব। একথা তোমরা স্বীকার করে থাক। কিন্তু এ কথার কারণে একমাত্র আল্লাহরই যে ইবাদাত করতে হবে, তোমরা এটা মানতে রাজী নও। কিন্তু আমি তা মানি। আর আমার অনুসারীরা সবাই এটা মেনে একমাত্র আল্লাহরই ইবাদাত করে।
সপ্তম বিধান- لَنَآاَعْمَا لُنَاوَلَكُمْ اَعْمَالُكُمْ অর্থাৎ আমাদের কর্ম আমাদের কাজে আসবে, তোমাদের তাতে কোন লাভ-লোকসান হবে না। আর তোমাদের কর্ম তোমাদের কাজে আসবে, আমার তাতে কোন লাভ ও ক্ষতি নাই। কেউ কেউ বলেন, মক্কায় যখন কাফেরদের বিরুদ্ধে জেহাদ করার আদেশ অবতীর্ণ হয়নি, তখন এ আয়াত নাযিল হয়েছিল। পরে জেহাদের আদেশ অবতীর্ণ হওয়ায় এই বিধান রহিত হয়ে যায়। কেননা, জেহাদের সারমর্ম এই যে, যারা উপদেশ ও অনুরোধে প্রভাবিত হয় না, যুদ্ধের মাধ্যমে তাদেরকে পরাভূত করতে হবে। তাদেরকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দিলে চলবে না। কেউ কেউ বলেন, আয়াতটি রহিত হয়নি এবং উদ্দেশ্য এই যে, দলীলের মাধ্যমে সত্য প্রমাণিত হওয়ার পর তোমাদের না মানা কেবল শক্রুতা ও হঠকারিতা বশত:ই হতে পারে। শত্রুতা সৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর এখন প্রমাণাদির আলোচনা অর্থহীন। তোমাদের কর্ম তোমাদের সামনে এবং আমার কর্ম আমার সামনে থাকবে।
অষ্টম বিধান- لَاحُجَّةَ بَيْنَنَا وَبِيْنَكُمْ অর্থাৎ সত্য স্পষ্ট ও প্রমাণিত হওয়ার পরও যদি তোমরা শক্রতাকেই কাজে লাগাও, তবে তর্ক-বিতর্কের কোন অর্থ নেই। কাজেই আমাদেরও তোমাদের মধ্যে এমন কোন বিতর্ক নেই।
নবম বিধান- اَللهُ يَحْبمَعُ بِيْنَنَا অর্থাৎ কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে একত্রিত করবেন এবং প্রত্যেকের কর্মের প্রতিদান দেবেন।
দশম বিধান- وَاِلَيْهِ الْمَصِيْرُ অর্থাৎ আমরা সকলেই তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করব। সুতরাং তোমরা চিন্তা করে দেখ কি করলে তখন তোমরা উপকৃত হবে। [দেখুন, ইবনে কাসীর]
আশ-শূরা 42:16
আর আল্লাহর আহ্বানে সাড়া আসার পর যারা আল্লাহ্ সম্পর্কে বিতর্ক করে, তাদের যুক্তি-তর্ক তাদের রবের দৃষ্টিতে অসার এবং তাদের উপর রয়েছে তাঁর ক্ৰোধ এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
আশ-শূরা 42:17
আল্লাহ্, যিনি নাযিল করেছেন সত্যসহকারে কিতাব এবং মীযান [১]। আর কিসে আপনাকে জানাবে যে, সম্ভবত কিয়ামত আসন্ন?
[১] অতঃপর উল্লেখ করা হয়েছে যে, কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। এতে আল্লাহর হক ও বান্দার হকের জন্য পূর্ণাঙ্গ আইন-কানুন রয়েছে।
اَنْزَلَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ وَالْمِيْزَانَ
এখানে কিতাব' বলে কুরআনসহ সমস্ত আসমানী গ্ৰন্থকে বোঝানো হয়েছে এবং হক বলতে পূর্বোক্ত সত্যদ্বীনকে বোঝানো হয়েছে। ميزان এর শাব্দিক অর্থ দাঁড়ি-পাল্লা। এটা যেহেতু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার এবং অধিকার পূর্ণ মাত্রায় দেয়ার একটি মানদণ্ড তাই ইবনে আব্বাস এর তাফসীর করেছেন ন্যায় বিচার। মুজাহিদ বলেন, মানুষ যে দাঁড়ি-পাল্লা ব্যবহার করে এখানে তাই বোঝানো হয়েছে। সুতরাং হক শব্দের মধ্যে আল্লাহর যাবতীয় হক এবং ميزان শব্দের মধ্যে বান্দার যাবতীয় হকের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। আর তখন ‘হকসহকারে' এর অর্থ হবে, হকের বর্ণনা সম্বলিত। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে মীযান অর্থ আল্লাহর শরীয়ত, যা দাঁড়িপাল্লার মত ওজন করে ভুল ও শুদ্ধ, হক ও বাতিল, জুলুম ও ন্যায়বিচার এবং সত্য ও অসত্যের পার্থক্য স্পষ্ট করে দেয়। ওপরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ দিয়ে বলানো হয়েছে যে, “তোমাদের মধ্যে ইনসাফ করার জন্য আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে।” এখানে বলা হয়েছে যে, এই পবিত্ৰ কিতাব সহকারে সেই “মিযান’ এসে গেছে যার সাহায্যে এই ইনসাফ কায়েম করা যাবে। [তাবারী, কুরতুবী]
আশ-শূরা 42:18
যারা এটাতে ঈমান রাখে না তারাই তা ত্বরান্বিত করতে চায়। আর যারা ঈমান এনেছে তারা তা থেকে ভীত থাকে এবং তারা জানে যে, তা অবশ্যই সত্য। জেনে রাখুন, নিশ্চয় কিয়ামত সম্পর্কে যারা বাক-বিতণ্ডা করে তারা ঘোর বিভ্ৰান্তিতে নিপতিত।
আশ-শূরা 42:19
আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত কোমল; তিনি যাকে ইচ্ছে রিযিক দান করেন [১]। আর তিনি সর্বশক্তিমান, প্ৰবল পরাক্রমশালী।
[১] অভিধানে لطيف শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইবনে আব্বাস এর অর্থ করেছেন, দয়ালু, পক্ষান্তরে মুকাতিল করেছেন অনুগ্রহকারী। অন্য অর্থ, সুক্ষ্মদর্শী। মুকাতিল বলেন, আল্লাহ তা'আলা সমস্ত বান্দার প্রতিই দয়ালু। এমনকি কাফের এবং পাপাচারীর উপরও দুনিয়াতে তাঁর নেয়ামত বর্ষিত হয়। বান্দাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ ও কৃপা অসংখ্য প্রকার।
আল্লাহ তা'আলার রিযিক সমগ্র সৃষ্টির জন্যে ব্যাপক। স্থলে ও জলে বসবাসকারী যেসব জন্তু সম্পর্কে কেউ কিছুই জানে না, আল্লাহর রিযিক তাদের কাছেও পৌঁছে। আয়াতে যাকে ইচ্ছা রিযিক দেন, বলা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলার রিফিক অসংখ্য প্রকার। জীবনধারণের উপযোগী রিযিক সবাই পায়। এরপর বিশেষ প্রকারের রিযিক বন্টনে তিনি বিভিন্ন স্তর ও মাপ রেখেছেন। কাউকে ধন-সম্পদের রিযিক অধিক দান করেছেন। কাউকে স্বাস্থ্য ও শক্তির, কাউকে জ্ঞান এবং কাউকে অন্যান্য প্রকার রিফিক দিয়েছেন। এভাবে প্রত্যেক মানুষ অপরের মুখাপেক্ষীও থাকে এবং এই মুখাপেক্ষিতাই তাদেরকে পারস্পারিক সাহায্য ও সহযোগিতায় উদ্বুদ্ধ করে, যার উপর মানব সভ্যতার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত | [দেখুন, কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]
আশ-শূরা 42:20
যে কেউ আখিরাতের ফসল কামনা করে তার জন্য আমরা তার ফসল বাড়িয়ে দেই এবং যে কেউ দুনিয়ার ফসল কামনা করে আমরা তাকে তা থেকে কিছু দেই। আর আখেরাতে তার জন্য কিছুই থাকবে না [১]।
[১] একজন ঈমানদারের উচিত আখেরাতমুখী হওয়া। যে আখেরাতমুখী হবে সে দুনিয়া আখেরাত সবই পাবে। পক্ষান্তরে যে দুনিয়াকে প্রাধান্য দিবে। সে দুনিয়াও হারাবে আখেরাতও পাবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “মহান আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি আমার ইবাদতের জন্য নিজেকে নিয়োজিত কর; আমি তোমার বক্ষকে অমুখাপেক্ষিতা দিয়ে পূর্ণ করে দেব। তোমার দারিদ্রতাকে দূর করে দেব। আর যদি তা না কর আমি তোমার বক্ষ ব্যস্ততায় পূর্ণ করে দেব আর তোমার দারিদ্রতা অবশিষ্ট রেখে দেব।” [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৪৪৩, তিরমিয়ী: ২৪৬৬] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এ জাতিকে সুসংবাদ দাও আলো, উচ্চমর্যাদা, দ্বীন, সাহায্য, যমীনের বুকে প্রতিষ্ঠার। তবে এ উম্মতের মধ্যে যে কেউ আখেরাতের কাজ দুনিয়া হাসিলের জন্য করবে, আখেরাতে সে কিছুই পাবে না। [মুসনাদে আহমাদ: ৫/১৩৪]
আশ-শূরা 42:21
নাকি তাদের এমন কতগুলো শরীক রয়েছে, যারা এদের জন্য দ্বীন থেকে শরীআত প্রবর্তন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ্ দেননি? আর ফয়সালার ঘোষণা না থাকলে এদের মাঝে অবশ্যই সিদ্ধান্ত হয়ে যেত। আর যালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
আশ-শূরা 42:22
আপনি যালিমদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখবেন তাদের কৃতকর্মের জন্য; অথচ তা আপতিত হবে তাদেরই উপর। আর যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তারা থাকবে জান্নাতের উদ্যানসমূহে। তারা যা কিছু চাইবে তাদের রবের কাছে তাদের জন্য তা-ই থাকবে। এটাই তো মহা অনুগ্রহ।
আশ-শূরা 42:23
এটা হলো তা, যার সুসংবাদ আল্লাহ্ দেন তাঁর বান্দাদেরকে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে। বলুন, 'আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছ থেকে আত্মীয়তার সৌহার্দ্য ছাড়া অন্য কোন প্রতিদান চাই না [১]।' যে উত্তম কাজ করে আমরা তার জন্য এতে কল্যাণ বাড়িয়ে দেই। নিশ্চয় আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, গুণগ্ৰাহী।
[১] অর্থাৎ আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। তবে القربى এর ভালবাসা অবশ্যই প্রত্যাশা করি। এই শব্দটির ব্যাখ্যায় মুফাসসিরদের মধ্যে বেশ মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। এক দল মুফাসসির এ শব্দটিকে আত্মীয়তা (আত্মীয়তার বন্ধন) অর্থে গ্ৰহণ করেছেন এবং আয়াতের অর্থ বর্ণনা করেছেন এই যে, “আমি এ কাজের জন্য তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক বা বিনিময় চাই না। তবে তোমাদের ও আমাদের মাঝে আত্মীয়তার যে বন্ধন আছে তোমরা (কুরাইশরা)' অন্তত সেদিকে লক্ষ্য রাখবে এতটুকু আমি অবশ্যই চাই। তোমাদের উচিত ছিল আমার কথা মেনে নেয়া। কিন্তু যদি তোমরা তা না মানো তাহলে গোটা আরবের মধ্যে সবার আগে তোমরাই আমার সাথে দুশমনী করতে বদ্ধপরিকর হবে তা অন্তত করো না। তোমাদের অধিকাংশ গোত্রে আমার আত্মীয়তা রয়েছে। আত্মীয়তার অধিকার ও আত্মীয় বাৎসল্যের প্রয়োজন তোমরা অস্বীকার কর না। অতএব, আমি তোমাদের শিক্ষা, প্রচার ও কর্ম সংশোধনের যে দায়িত্ব পালন করি, এর কোন পারিশ্রমিক তোমাদের কাছে চাই না। তবে এতটুকু চাই যে, তোমরা আত্মীয়তার অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখ। মানা না মানা তোমাদের ইচ্ছা। কিন্তু শক্ৰতা প্রদর্শনে তো কমপক্ষে আত্মীয়তার সম্পর্ক প্রতিবন্ধক হওয়া উচিত। বলাবাহুল্য, আত্মীয়তার অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখা স্বয়ং তাদেরই কর্তব্য ছিল। একে কোন শিক্ষা ও প্রচারকার্যের পারিশ্রমিক বলে অভিহিত করা যায় না। অর্থাৎ আমি তোমাদের কাছে এটা চাই। এটা প্রকৃতপক্ষে কোন পারিশ্রমিক নয়। তোমরা একে পারিশ্রমিক মনে করলে ভুল হবে। যুগে যুগে নবী রাসুলগণ নিজ নিজ সম্প্রদায়কে পরিস্কার ভাষায় বলে দিয়েছেন, আমি তোমাদের মঙ্গলার্থে যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, তার কোন বিনিময় তোমাদের কাছে চাই না। আমার প্রাপ্য আল্লাহ তা'আলাই দেবেন। অতএব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলের সেরা নবী হয়ে স্বজাতির কাছে কেমন করে বিনিময় চাইবেন? ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরাইশদের যে গোত্রের সাথে সম্পর্ক রাখতেন, তার প্রত্যেকটি শাখা-পরিবারের সাথে তাঁর আত্মীয়তার জন্মগত সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। [মুসনাদে আহমাদ: ১/২২৯] তাই আল্লাহ বলেছেন, আপনি মুশরিকদের বলুন, দাওয়াতের জন্যে আমি তোমাদের কাছে কোন বিনিময় চাই না। আমি চাই, তোমরা আত্মীয়তার খাতিরে আমাকে তোমাদের মধ্যে অবাধে থাকতে দাও এবং আমার হেফাযত কর। আরবের অন্যান্য লোক আমার হেফাযত ও সাহায্যে অগ্রণী হলে তোমাদের জন্যে তা গৌরবের বিষয় হবে না।
কোন কোন মুফাসসির القربى শব্দটিকে নৈকট্য (নৈকট্য অর্জন) অর্থে গ্রহণ করেন এবং আয়াতটির অর্থ করেছেন, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নৈকট্যের আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া ছাড়া আমি তোমাদের কাছে এ কাজের জন্য আর কোন বিনিময় চাই না। অর্থাৎ তোমরা সংশোধিত হয়ে যাও। শুধু এটাই আমার পুরস্কার। এ ব্যাখ্যা হাসান বাসারী থেকে উদ্ধৃত হয়েছে পবিত্র কুরআনের অন্য এক স্থানে বিষয়টি এ ভাষায় বলা হয়েছেঃ ‘এদের বলে দাও, এ কাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। যার ইচ্ছা সে তার রবের পথ অনুসরণ করুক, (আমার পারিশ্রমিক শুধু এটাই)। [সূরা আল-ফুরকান: ৫৭] [দেখুন,তাবারী, ইবনে কাসীর, সা’দী]
আশ-শূরা 42:24
নাকি তারা বলে যে, সে আল্লাহ্ সম্পর্কে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে, যদি তা-ই হত তবে আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে আপনার হৃদয় মোহর করে দিতেন। আর আল্লাহ্ মিথ্যাকে মুছে দেন এবং নিজ বাণী দ্বারা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন। নিশ্চয় অন্তরসমূহে যা আছে সে বিষয়ে তিনি সবিশেষ অবগত।
আশ-শূরা 42:25
আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন ও পাপসমূহ মোচন করেন [১] এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন।
[১] আলোচ্য আয়াতে তাওবা কবুল করাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের বিশেষ গুণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা মুমিন বান্দার তাওবায় ঐ ব্যক্তির চেয়েও বেশী খুশী হন, যে কোন ঊষর মরুর বুকে ছিল, তার সাথে ছিল বাহন যার উপর ছিল তার খাদ্য ও পানীয়। এমতাবস্থায় সে ঘুমিয়ে পড়েছিল, জাগ্রত হয়ে দেখতে পেল যে, বাহনটি তার খাবার ও পানীয়সহ চলে গেছে। সে তার বাহনের খুঁজতে খুঁজতে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ল। তারপর সে বলল, যেখানে ছিলাম সেখানে গিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ব ও মারা যাব। সে তার হাতের উপর মাথা রেখে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিল, এমতাবস্থায় সে সচেতন হয়ে দেখল যে, তার বাহন ফিরে এসেছে এবং বাহনের উপর তার খাবার ও পানীয় তেমনিভাবে রয়েছে। তখন সে আনন্দে ভুল করে বলে ফেলল: আল্লাহ আপনি আমার বান্দা এবং আমি আপনার রব। আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দার তাওবাতে বাহন ও খাদ্য-পানীয় ফিরে পাওয়া লোকটি থেকেও বেশী খুশী হন। [মুসলিম: ২৭৪৪]
আশ-শূরা 42:26
আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তিনি তাদের ডাকে সাড়া দেন এবং তাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ বাড়িয়ে দেন; আর কাফিররা, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
আশ-শূরা 42:27
আর যদি আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের রিযিক প্রশস্ত করে দিতেন, তবে তারা যমীনে অবশ্যই সীমালংঘন করত; কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছেমত পরিমানেই নাযিল করে থাকেন। নিশ্চয় তিনি তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক অবহিত ও সর্বদ্ৰষ্টা।
আশ-শূরা 42:28
আর তাদের নিরাশ হওয়ার পরে তিনিই বৃষ্টি প্রেরণ করেন এবং তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন; এবং তিনিই অভিভাবক, অত্যন্ত প্ৰশংসিত।
আশ-শূরা 42:29
আর তাঁর অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি এবং এ দুয়ের মধ্যে তিনি যে সকল জীব-জন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন সেগুলো; আর তিনি যখন ইচ্ছে তখনই তাদেরকে সমবেত করতে সক্ষম।
আশ-শূরা 42:30
আর তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তোমাদের হাত যা অর্জন করেছে তার কারণে এবং অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন।
আশ-শূরা 42:31
আর তোমরা যমীনে (আল্লাহকে) অপারগকারী নও এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোন অভিভাবক নেই, কোন সাহায্যকারীও নেই।
আশ-শূরা 42:32
আর তাঁর অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে পর্বতসদৃশ সাগরে চলমান নৌযানসমূহ।
আশ-শূরা 42:33
তিনি ইচ্ছে করলে বায়ুকে স্তব্ধ করে দিতে পারেন; ফলে নৌযানসমূহ নিশ্চল হয়ে পড়বে সমুদ্রপৃষ্ঠে। নিশ্চয় এতে অনেক নিদর্শন রয়েছে, প্রত্যেক চরম ধৈর্যশীল ও একান্ত কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য।
আশ-শূরা 42:34
অথবা তিনি তারা যা অর্জন করেছে তার কারণে সেগুলোকে বিধ্বস্ত করে দিতে পারেন। আর অনেক (অর্জিত অপরাধ) তিনি ক্ষমাও করেন;
আশ-শূরা 42:35
আর আমার নিদর্শন সম্পর্কে যারা বিতর্ক করে তারা যেন জানতে পারে যে, তাদের কোন আশ্রয়স্থল নেই।
আশ-শূরা 42:36
সুতরাং তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা দুনিয়ার জীবনের ভোগ্য সামগ্ৰী মাত্র। আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা উত্তম ও স্থায়ী, তাদের জন্য যারা ঈমান আনে এবং তাদের রবের উপর নির্ভর করে।
আশ-শূরা 42:37
আর যারা কবীরা গোনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকে এবং যখন রাগান্বিত হয় তখন তারা ক্ষমা করে দেয় [১]।
[১] এটা খাঁটি মুমিনদের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ। তারা ক্রোধের সময় নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলে না, বরং তখনও ক্ষমা ও অনুকম্পা তাদের মধ্যে প্ৰবল থাকে। ফলে ক্ষমা করে দেয়। তারা রুক্ষ ও ক্রুদ্ধ স্বভাবের হয় না, বরং নম্র স্বভাব ও ধীর মেজাজের মানুষ হয়। তাদের স্বভাব প্রতিশোধ পরায়ণ হয় না। তারা আল্লাহর বান্দাদের সাথে ক্ষমার আচরণ করে এবং কোন কারণে ক্রোধান্বিত হলেও তা হজম করে। এটি মানুষের সর্বোত্তম গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত। কুরআন মজীদ একে অত্যন্ত প্রশংসার যোগ্য বলে ঘোষণা করেছে। [আলে ইমরান: ১৩৪] এবং একে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাফল্যের বড় বড় কারণসমূহের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে। [আলে। ইমরান: ১৫৯] অনুরুপভাবে হাদীসে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বৰ্ণনা করেছেনঃ “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যক্তিগত কারণে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে আল্লাহর কোন হুরমত বা মর্যাদার অবমাননা করা হলে তিনি শাস্তি বিধান করতেন।” [বুখারী: ৩৫৬০, মুসলিম:২৩২৭]
আশ-শূরা 42:38
আর যারা তাদের রবের ডাকে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে এবং তাদের কার্যাবলী পরস্পর পরামর্শের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। আর তাদেরকে আমরা যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।
আশ-শূরা 42:39
আর যারা, যখন তাদের উপর সীমালঙ্গন হয় তখন তারা তার প্ৰতিবিধান করে।
আশ-শূরা 42:40
আর মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় ও আপস-নিস্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে আছে। নিশ্চয় তিনি যালিমদেরকে পছন্দ করেন না।
আশ-শূরা 42:41
তবে অত্যাচারিত হওয়ার পর যারা প্রতিবিধান করে, তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্ৰহণ করা হবে না;
আশ-শূরা 42:42
শুধু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে যারা মানুষের উপর যুলুম করে এবং যমীনে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়, তাদেরই জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
আশ-শূরা 42:43
আর অবশ্যই যে ধৈর্য ধারণ করে এবং ক্ষমা করে দেয়, নিশ্চয় তা দৃঢ় সংকল্পেরই কাজ।
আশ-শূরা 42:44
আর আল্লাহ্ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, এরপর তার জন্য কোন অভিভাবক নেই। আর যালিমরা যখন শাস্তি দেখতে পাবে তখন আপনি তাদেরকে বলতে শুনবেন, 'ফিরে যাওয়ার কোন উপায় আছে কি?'
আশ-শূরা 42:45
আর আপনি তাদেরকে দেখতে পাবেন যে, তাদেরকে জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করা হচ্ছে; তারা অপমানে অবনত অবস্থায় আড় চোখে তাকাচ্ছে; আর যারা ঈমান এনেছে তারা কিয়ামতের দিন বলবে, 'নিশ্চয় ক্ষতিগ্ৰস্ত তারাই যারা নিজেদের ও নিজেদের পরিজনবর্গের ক্ষতি সাধন করেছে।' সাবধান, নিশ্চয় যালিমরা স্থায়ী শাস্তিতে নিপতিত থাকবে।
আশ-শূরা 42:46
আর আল্লাহ্ ছাড়া তাদেরকে সাহায্য করার জন্য তাদের কোন অভিভাবক থাকবে না। আর আল্লাহ্ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার কোন পথ নেই।
আশ-শূরা 42:47
তোমরা তোমাদের রবের ডাকে সাড়া দাও আল্লাহর পক্ষ থেকে সে দিন আসার আগে, যা অপ্রতিরোধ্য; যেদিন তোমাদের কোন আশ্রয়স্থল থাকবে না এবং তোমাদের কোন অস্বীকার থাকবে না [১]।
[১] আয়াতের শেষে مِّنْ نَّكِيْرٍ বলে কি বোঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে কয়েকটি অভিমত বর্ণিত হয়েছে। এক. সেদিন কেউ তার অপরাধ অস্বীকার করতে পারবে না। [জালালাইন] দুই. সে দিন কেউ কোনভাবেই আত্মগোপন করতে পারবে না। [ইবন কাসীর; মুয়াসসার] তিন. সেদিন তার জন্য কোন সাহায্যকারী থাকবে না। [তাবারী; সা’দী]
আশ-শূরা 42:48
অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আপনাকে তো আমরা এদের রক্ষক করে পাঠাইনি। আপনার কাজ তো শুধু বাণী পৌঁছে দেয়া। আর আমরা যখন মানুষকে আমাদের পক্ষ থেকে কোন রহমত আস্বাদন করাই তখন সে এতে উৎফুল্ল হয় এবং যখন তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের বিপদ-আপদ ঘটে, তখন তো মানুষ হয়ে পড়ে খুবই অকৃতজ্ঞ।
আশ-শূরা 42:49
আসমানসমূহ ও যমীনের আধিপত্য আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছে তা-ই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছে কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছে পুত্ৰ সন্তান দান করেন,
আশ-শূরা 42:50
অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছে তাকে করে দেন বন্ধ্যা; নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, ক্ষমতাবান।
আশ-শূরা 42:51
আর কোন মানুষেরই এমন মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ্ তার সাথে কথা বলবেন ওহীর মাধ্যম ছাড়া, অথবা পর্দার আড়াল ছাড়া, অথবা এমন দূত প্রেরণ ছাড়া, যে দূত তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ওহী করেন, তিনি সর্বোচ্চ, হিকমতওয়ালা।
আশ-শূরা 42:52
আর এভাবে [১] আমরা আপনার প্রতি আমাদের নির্দেশ থেকে রূহকে ওহী করেছি; আপনি তো জানতেন না কিতাব কি এবং ঈমান কি! কিন্তু আমরা এটাকে করেছি নূর, যা দ্বারা আমরা আমাদের বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে হেদায়াত দান করি; আর আপনি তো অবশ্যই সরল পথের দিকে দিকনির্দেশনা করেন---
[১] “এভাবে” অর্থ শুধু শেষ পদ্ধতি নয়, বরং ওপরের আয়াতে যে তিনটি পদ্ধতি উল্লেখিত হয়েছে তার সব কটি। আর "রূহ’ অর্থ অহী [তাবারী] অথবা এখানে রূহ বলে কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। কারণ, কুরআন হচ্ছে এমন রূহ যার দ্বারা অন্তরসমূহ জীবন লাভ করে। [জালালাইন]। কুরআন ও হাদীস থেকেই একথা প্রমাণিত যে, এই তিনটি পদ্ধতিতেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হিদায়াত দান করা হয়েছে। হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অহী আসার সূচনা হয়েছিলো সত্য স্বপ্নের আকারে [বুখারী: ৩] এই ধারা পরবর্তী সময় পর্যন্ত জারি ছিল। তাই হাদীসে তার বহু সংখ্যক স্বপ্নের উল্লেখ দেখা যায়। যার মাধ্যমে হয় তাকে কোনো শিক্ষা দেয়া হয়েছে কিংবা কোনো বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। তাছাড়া কুরআন মজীদে নবীর একটি স্বপ্নের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে [সূরা আল-ফাতহ: ২৭] তাছাড়া কতিপয় হাদীসে একথারও উল্লেখ আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমার মনে অমুক বিষয়টি সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে, কিংবা আমাকে একথাটি বলা হয়েছে বা আমাকেই নির্দেশ দান করা হয়েছে অথবা আমাকে এ কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এ ধরনের সব কিছু অহীর প্রথমোক্ত শ্রেণীর সাথে সম্পর্কিত। বেশীর ভাগ হাদীসে কুদসী এই শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত। মে'রাজে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দ্বিতীয় প্রকার অহী দ্বারা সম্মানিত করা হয়েছে। কতিপয় হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের নির্দেশ দেয়া এবং তা নিয়ে তার বার বার দরখাস্ত পেশ করার কথা যেভাবে উল্লেখিত হয়েছে তা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, সে সময় কথাবার্তা হয়েছিলো যেমনটি তুর পাহাড়ের পাদদেশে মূসা আলাইহিস সালাম ও আল্লাহর মধ্যে হয়েছিলো। এরপর থাকে অহীর তৃতীয় শ্রেণী। এ ব্যাপারে কুরআন নিজেই সাক্ষ্য দান করে যে, কুরআনকে জিবরাঈল আমীনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌছানো হয়েছে [আল-বাকারাহ: ৯৭. আশ-শু'আরা: ১৯২-১৯৫]
আশ-শূরা 42:53
সে আল্লাহর পথ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে তার মালিক। জেনে রাখুন, সব বিষয় আল্লাহরই দিকে ফিরে যাবে।
আয-যুখরুফ 43:1
হা - মীম।
আয-যুখরুফ 43:2
সুস্পষ্ট কিতাবের শপথ ;
আয-যুখরুফ 43:3
নিশ্চয় আমরা এটাকে (অবতীর্ণ) করেছি আরবী (ভাষায়) কুরআন, যাতে তোমরা বুঝতে পার।
আয-যুখরুফ 43:4
আর নিশ্চয় তা আমাদের কাছে উন্মুল কিতাবে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, হিকমতপূর্ণ।
আয-যুখরুফ 43:5
আমরা কি তোমাদের থেকে এ উপদেশবাণী সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নেব এ কারণে যে, তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়?
আয-যুখরুফ 43:6
আর পূর্ববতীদের কাছে আমরা বহু নবী প্রেরণ করেছিলাম।
আয-যুখরুফ 43:7
আর যখনই তাদের কাছে কোন নবী এসেছে তারা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে।
আয-যুখরুফ 43:8
ফলে যারা এদের চেয়ে শক্তিতে প্রবল ছিল তাদেরকে আমরা ধ্বংস করেছিলাম ; আর গত হয়েছে পূর্ববর্তীদের অনুরূপ দৃষ্টান্ত।
আয-যুখরুফ 43:9
আর আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছে?’ তারা অবশ্যই বলবে, ‘এগুলো তো সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞই ’
আয-যুখরুফ 43:10
যিনি তোমাদের জন্য যমীনকে বানিয়েছেন শয্যা [১] এবং তাতে বানিয়েছেন তোমাদের চলার পথ [২], যাতে তোমরা সঠিক পথ পেতে পার ;
[১] উদ্দেশ্য এই যে, পৃথিবীর বাহ্যিক আকার শয্যা বা বিছানার মত এবং এতে বিছানার অনুরূপ আরাম পাওয়া যায়। সুতরাং এটা গোলাকার হওয়ার পরিপন্থী নয়। অন্যান্য স্থানেও পৃথিবীকে বিছানা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। [সূরা ত্বা-হা: ৫৩, সূরা আন-নাবা: ৬]
লক্ষণীয় যে, সে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তা হচ্ছে, مهد শব্দটির এক অর্থ হচ্ছে, সুস্থির বিছানা বা শয্যা। অপর অর্থ হচ্ছে, ‘দোলনা’। অর্থাৎ একটি শিশু যেভাবে তার দোলনার মধ্যে আরামে শুয়ে থাকে মহাশূন্যে ভাসমান এই বিশাল গ্রহকে তোমাদের জন্য তেমনি আরামের জায়গা বানিয়ে দিয়েছেন। [ইবনে কাসীর, জালালাইন, আয়সার আত-তাফাসির]
[২] ভূ-পৃষ্ঠে পাহাড়ের মাঝে গিরিপথ এবং পাহাড়ী ও সমতল ভূমি অঞ্চলে নদী হচ্ছে সেই সব প্রাকৃতিক পথ যা আল্লাহ তৈরী করেছেন [তাবারী, সা’দী]
আয-যুখরুফ 43:11
আর যিনি আসমান থেকে বারি বর্ষণ করেন পরিমিতভাবে [১]। অতঃপর তা দ্বারা আমরা সঞ্জীবিত করি নির্জীব জনপদকে। এভাবেই তোমাদেরকে বের করা হবে।
[১] অর্থাৎ প্রত্যেক অঞ্চলের জন্য বৃষ্টির একটা গড় পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন যা দীর্ঘকাল প্রতি বছর একই ভাবে চলতে থাকে। এ ক্ষেত্রে এমন কোন অনিয়ম নেই যে কখনো বছরে দুই ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হবে আবার কখননো দু’ইশ ইঞ্চি হবে। তাছাড়াও তিনি বিভিন্ন মওসুমের বিভিন্ন সময়ে বৃষ্টিকে বিক্ষিপ্ত করে এমনভাবে বর্ষণ করেন সাধারণত তা ব্যাপক মাত্রায় ভূমির উৎপাদন ক্ষমতার জন্য উপকারী হয়। এটাও তাঁর জ্ঞান ও কৌশলেরই অংশ যে, তিনি ভূ-পৃষ্ঠের কিছু অংশকে প্রায় পুরোপুরিই বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত করে পানি ও লতাগুল্ম শূন্য মরুভূমি বানিয়ে দিয়েছেন এবং অপর কিছু অঞ্চলে কখনো দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেন আবার কখনো ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বর্ষন করেন। [দেখুন, তাবারী]
আয-যুখরুফ 43:12
আর যিনি সকল প্রকারের জোড়া যুগল সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এমন নৌযান ও গৃহপালিত জন্তু যাতে তোমরা আরোহণ কর ;
আয-যুখরুফ 43:13
যাতে তোমরা এর পিঠে স্থির হয়ে বসতে পার, তারপর তোমাদের রবের অনুগ্রহ স্মরণ করবে যখন তোমরা এর উপর স্থির হয়ে বসবে; এবং বলবে [১], ‘পবিত্ৰ-মহান তিনি, যিনি এগুলোকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। আর আমরা সমর্থ ছিলাম না এদেরকে বশীভূত করতে।
[১] সওয়ারীর পিঠে বসার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে যেসব কথা উচ্চারিত হতো সেগুলোই এ আয়াতের উদ্দেশ্য ও অভিপ্ৰায়ের সর্বোত্তম বাস্তব ব্যাখ্যা। আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, সফরে রওয়ানা হওয়ার সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সওয়ারীর জন্তুর উপর সওয়ার হওয়ার পর তিনবার ‘আল্লাহু আকবর’ বলতেন। তারপর سُبْحٰنَ الَّذِىْ سَخَّرلَنَا থেকে শুরু করে لَمُنْقَلِبُوْنَ পর্যন্ত পাঠ করতেন। তারপর এই বলে দো'আ করতেনঃ
اللّٰهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِيْ سَفَرِنَا هَذَاالْبِرَّ وَالتَّقْوَىِ وَمِنَ الْعَمَلِ مَاتَرْضَى اللّٰهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هٰذَاوَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ اللّٰهُمَّ أَنْتَ الصَّا حِبُ فيِ السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فيِ الْأَهْلِ اللّٰهُمَّ إَنِّي أَعُوذُبِكا مِنْ وَ عْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ وَسُوءِ الْمُنقَلَبِ فِي الْمَالِ وَالْأَهْلِ
‘আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুক ফী সাফারিনা হায্যাল বিররা ওয়াত তাকওয়া ওয়া মিনাল আমালে মা তারদা। আল্লাহুম্মা হাওয়িন আলাইনা সাফারানা হাযা ওয়াতওয়ে ‘আন্না বু’দাহ। আল্লাহুম্মা আনতাস সাহিবু ফিস সাফারে ওয়াল খালিফাতু ফিল আহলে। আল্লাহুম্মা ইন্নি ‘আউযু বিকা মিন ওয়া‘সা-ইস সাফারে ওয়া কাআবাতিল মানযারে ওয়া সুয়িল মুনকালাবে ফিল মালে ওয়াল আহিল।’ [মুসলিম: ২৩৯২]
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিসমিল্লাহ বলে রিকাবে পা রাখলেন এবং সওয়ার হওয়ার পর ‘আলহামদুলিল্লাহ' বললেন। তারপর এ আয়াত অর্থাৎ سُبْحٰنَ الَّذِىْ سَخَّرَلَنَا থেকে শুরু করে لَمُنْقَلِبُوْنَ পর্যন্ত বললেন, তারপর ‘আলহামদুলিল্লাহ' তিনবার ও ‘আল্লাহু আকবার তিনবার বললেন এবং তারপর বললেনঃ “আপনি অতি পবিত্র। তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আমি নিজের প্রতি যুলুম করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দিন।” এরপর তিনি হেসে ফেললেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি কারণে হাসলেন। তিনি বললেন, বান্দা (হে রব, আমাকে ক্ষমা করে দিন) বললে আল্লাহর কাছে তা বড়ই পছন্দনীয় হয়। তিনি বলেনঃ আমার এই বান্দা জানে যে, আমি ছাড়া ক্ষমাশীল আর কেউ নেই। [মুসনাদে আহমদ: ১/৯৭, আবু দাউদ: ২৬০২, তিরমিযীঃ ৩৪৪৬]
আয-যুখরুফ 43:14
‘আর নিশ্চয় আমারা আমাদের রবের কাছেই প্রত্যাবর্তনকারী।’
আয-যুখরুফ 43:15
আর তারা তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে তাঁর অংশ সাব্যস্ত করেছে [১]। নিশ্চয়ই মানুষ স্পষ্ট অকৃতজ্ঞ।
[১] অংশ বানিয়ে দেয়ার অর্থ আল্লাহর কোন বান্দাকে তাঁর সন্তান ঘোষণা করা। কেননা সন্তান অনিবাৰ্যরূপেই পিতার স্বগোত্রীয় এবং তার অস্তিত্বের একটি অংশ। তাই কোন ব্যক্তিকে আল্লাহর কন্যা বা পুত্র বলার অর্থ এই যে, তাকে আল্লাহর অস্তিত্ব ও সত্তায় শরীক করা। মুশরিকরা ফেরেশতাগণকে 'আল্লাহর কন্যা-সন্তান’ আখ্যা দিত। [দেখুন, জালালাইন, আল-মুয়াসসার]
আয-যুখরুফ 43:16
নাকি তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা হতে কন্যা সন্তান গ্ৰহণ করেছেন এবং তোমাদেরকে বিশিষ্ট করেছেন পুত্ৰ সন্তান দ্বারা?
আয-যুখরুফ 43:17
আর যখন তাদের কাউকে সুসংবাদ দেয়া হয় যা রহমানের প্রতি তারা দৃষ্টান্ত পেশ করে তা দ্বারা, তখন তার মুখমণ্ডল মলিন হয়ে যায়, এমতাবস্থায় যে সে দুঃসহ যাতনাক্লিষ্ট।
আয-যুখরুফ 43:18
আর যে অলংকারে লালিত-পালিত হয় এবং সে বিতর্ককালে স্পষ্ট বক্তব্যে অসমর্থ সে কি?
(আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত হবে?)
আয-যুখরুফ 43:19
আর তারা রহমানের বান্দা ফেরেশতাগণকে নারী গণ্য করেছে ; এদের সৃষ্টি কি তারা দেখেছিল? তাদের সাক্ষ্য অবশ্যই লিপিবদ্ধ করা হবে এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে।
আয-যুখরুফ 43:20
তারা আরও বলে, ‘রহমান ইচ্ছে করলে আমরা এদের ইবাদাত করতাম না।’ এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই ; তারা তো শুধু মনগড়া কথা বলছে।
আয-যুখরুফ 43:21
নাকি আমরা তাদেরকে কুরআনের আগে কোন কিতাব দিয়েছি অতঃপর তারা তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে আছে?
আয-যুখরুফ 43:22
বরং তারা বলে, ‘নিশ্চয় আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এক মতাদর্শের উপর পেয়েছি এবং নিশ্চয় আমরা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণে হেদায়াতপ্ৰাপ্ত হব।’
আয-যুখরুফ 43:23
আর এভাবেই আপনার পূর্বে কোন জনপদে যখনই আমরা কোন সতর্ককারী পাঠিয়েছি তখনই তার বিলাসপ্রিয়রা বলেছে, ‘নিশ্চয় আমারা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এক মতাদর্শে পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে থাকব।’
আয-যুখরুফ 43:24
সে সতর্ককারী বলেছে, ‘তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যে পথে পেয়েছ, আমি যদি তোমাদের জন্য তার চেয়ে উৎকৃষ্ট পথ নিয়ে আসি তবুও কি (তোমরা তাদের অনুসরণ করবে)?’ তারা বলেছে, ‘নিশ্চয় তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছ আমরা তার সাথে কুফরিকারী।’
আয-যুখরুফ 43:25
ফলে আমরা তাদের থেকে প্রতিশোধ নিলাম। সুতরাং দেখুন, মিথ্যারোপকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছে!
আয-যুখরুফ 43:26
আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম তার পিতা এবং তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমরা যেগুলোর ইবাদাত করা নিশ্চয় আমি তাদের থেকে সম্পৰ্কমুক্ত।
আয-যুখরুফ 43:27
তবে তিনি ব্যতীত যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর নিশ্চয় তিনি শীঘ্রই আমাকে সৎপথে পরিচালিত করবেন।’
আয-যুখরুফ 43:28
আর এ ঘোষণাকে তিনি চিরন্তন বাণীরূপে রেখে গিয়েছেন তার উত্তরসূরীদের মধ্যে, যাতে তারা ফিরে আসে।
আয-যুখরুফ 43:29
বরং আমি তাদেরকে এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরকে দিয়েছিলাম ভোগ করতে, অবশেষে তাদের কাছে আসল সত্য এবং স্পষ্ট বর্ণনাকারী রাসূল।
আয-যুখরুফ 43:30
আর যখন তাদের কাছে সত্য আসল, তখন তারা বলল, ‘এ তো জাদু এবং নিশ্চয় আমরা তার সাথে কুফরিকারী।’
আয-যুখরুফ 43:31
আর তারা বলে, ‘এ কুরআন কেন নাযিল করা হল না দুই জনপদের কোন মহান ব্যক্তির উপর? ’
আয-যুখরুফ 43:32
তারা কি আপনার রবের রহমত [১] বন্টন করে? আমরাই দুনিয়ার জীবনে তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করি এবং তাদের একজনকে অন্যের উপর মর্যাদায় উন্নীত করি যাতে একে অন্যের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে ; আর আপনার রবের রহমত তারা যা জমা করে তা থেকে উৎকৃষ্টতর।
[১] এখানে রবের রহমত অর্থ তাঁর বিশেষ রহমত, অর্থাৎ নবুওয়াত। [সা’দী, জালালাইন]
আয-যুখরুফ 43:33
আর সব মানুষ এক মতাবলম্বী হয়ে পড়বে, এ আশংকা না থাকলে দয়াময়ের সাথে যারা কুফরী করে, তাদেরকে আমারা দিতাম তাদের ঘরের জন্য রৌপ্য-নির্মিত ছাদ ও সিঁড়ি যাতে তারা আরোহণ করে,
আয-যুখরুফ 43:34
এবং তাদের ঘরের জন্য দরজা ও পালংক---যাতে তারা হেলান দেয়,
আয-যুখরুফ 43:35
আর (অনুরূপ দিতাম) স্বর্ণ নির্মিতও [১] ; এবং এ সবই তো শুধু দুনিয়ার জীবনের ভোগ-সম্ভার। আর আখিরাত আপনার রবের নিকট মুত্তাকীদের জন্যই।
[১] কাফেররা বলেছিল, মক্কা ও তায়েফের কোন বড় ধনাঢ্য ব্যক্তিকে নবী করা হল না কেন? ৩৩ থেকে ৩৫ নং আয়াতসমূহে এর দ্বিতীয় জওয়াব দেয়া হয়েছে। এর সারমর্ম এই যে, নিঃসন্দেহে নবুওয়তের জন্যে কিছু যোগ্যতা ও শর্ত থাকা জরুরী। কিন্তু ধন-দৌলতের প্রাচুর্যের ভিত্তিতে কাউকে নবুওয়ত দেয়া যায় না। কেননা, ধন-দৌলত আমার দৃষ্টিতে এত নিকৃষ্ট ও হেয় যে, সব মানুষের কাফের হয়ে যাওয়ার আশংকা না থাকলে আমি সব কাফেরের উপর স্বর্ণ-রৌপ্যের বৃষ্টি বর্ষণ করতাম। এই সম্পদ তো এমন সব মানুষের কাছেও আছে যাদের ঘূণ্য কাজ-কর্মের পংকিলতায় গোটা সমাজ পূতিগন্ধময় হয়ে যায়। অথচ একেই তোমরা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড বানিয়ে রেখেছ। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "দুনিয়া আল্লাহর কাছে যদি মশার এক পাখার সমানও মর্যাদা রাখত, তবে আল্লাহ কোন কাফেরকে দুনিয়া থেকে এক ঢোক পানিও দিতেন না।” [তিরমিয়ী:২৩২০]
আয-যুখরুফ 43:36
আর যে রহমানের যিকর থেকে বিমুখ হয় আমারা তার জন্য নিয়োজিত করি এক শয়তান, অতঃপর সে হয় তার সহচর।
আয-যুখরুফ 43:37
আর নিশ্চয় তারাই (শয়তানরা) মানুষদেরকে সৎপথ থেকে বাধা দেয়, অথচ মানুষরা (ভ্ৰষ্ট পথে থাকার পরও) মনে করে তারা (নিজেরা) হেদায়াতপ্ৰাপ্ত [১]।
[১] অর্থাৎ শয়তানরা সে সমস্ত লোকদেরকে সৎ পথ থেকে দূরে রাখে যারা আল্লাহর স্মরণ হতে বিমুখ। শয়তানরা স্মরণবিমুখ লোকদের জন্য ভ্ৰষ্ট পথকে সুশোভিত করে দেখায়, আর আল্লাহর উপর ঈমান ও সৎকাজ করাকে অপছন্দনীয় করে রাখে। আর আল্লাহর স্মরণ বিমুখ লোকেরা শয়তানের পক্ষ থেকে সুশোভিত করার কারণে তারা যে ভ্ৰষ্ট মতাদর্শের উপর রয়েছে সেটাকেই হক ও হেদায়াতের পথ মনে করতে থাকে। [দেখুন-মুয়াসসার]
আয-যুখরুফ 43:38
অবশেষে যখন সে আমাদের নিকট আসবে, তখন সে শয়তানকে বলবে, হায় ! আমার ও তোমার মধ্যে যদি পূর্ব ও পশ্চিমের ব্যবধান থাকত!’ সুতরাং এ সহচর কতই না নিকৃষ্ট !
আয-যুখরুফ 43:39
আর আজ তোমাদের এ অনুতাপ তোমাদের কোন কাজেই আসবে না, যেহেতু তোমরা যুলুম করেছিলে; নিশ্চয় তোমরা সকলেই শাস্তিতে শরীক।
আয-যুখরুফ 43:40
আপনি কি শোনাতে পারবেন বধিরকে অথবা হেদায়াত দিতে পারবেন অন্ধকে ও যে স্পষ্ট বিভ্ৰান্তিতে আছে?
আয-যুখরুফ 43:41
অতঃপর যদি আমারা আপনাকে নিয়ে যাই, তবে নিশ্চয় আমরা তাদের থেকে প্রতিশোধ নেব [১] ;
[১] কাতাদাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চলে গেছেন এখন প্রতিশোধ নেয়া বাকী আছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে তার উম্মাতের মধ্যে এমন কিছু দেখাননি যা তার মনোকষ্টের কারণ হবে। শেষ পর্যন্ত রাসূল চলে গেলেন। অন্যান্য নবীগণের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ছিল, তারা তাদের জীবদ্দশাতেই তাদের উম্মাতের উপর শাস্তি আপতিত হতে দেখেছিলেন। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৪৪৭]
আয-যুখরুফ 43:42
অথবা আমারা তাদেরকে যে শাস্তির ওয়াদা দিয়েছি, আপনাকে আমরা তা দেখাই, তবে নিশ্চয় তাদের উপর আমরা পূর্ণ ক্ষমতাবান।
আয-যুখরুফ 43:43
কাজেই আপনার প্রতি যা ওহী করা হয়েছে তা দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করুন। নিশ্চয় আপনি সরল পথে রয়েছেন।
আয-যুখরুফ 43:44
আর নিশ্চয় এ কুরআন আপনার ও আপনার সম্প্রদায়ের জন্য যিকর [১] ; এবং অচিরেই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে।
[১] আয়াতের এক অর্থ হচ্ছে, এ কুরআন আপনার ও আপনার কাওমের জন্য স্মরনিকাস্বরূপ। অপর অর্থ হচ্ছে, এ কুরআন আপনার ও আপনার কাওমের জন্য খুবই সম্মানের বস্তু। অর্থাৎ, সুখ্যাতির বিষয়। উদ্দেশ্য এই যে, কুরআন পাক আপনার ও আপনার সম্প্রদায়ের জন্য মহাসম্মান ও সুখ্যাতির কারণ। [তাবারী]
আয-যুখরুফ 43:45
আর আপনার পূর্বে আমরা আমাদের রাসূলগণ থেকে যাদেরকে প্রেরণ করেছিলাম তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, আমরা কি রহমান ছাড়া ইবাদত করা যায় এমন কোন ইলাহ স্থির করেছিলাম [১]?
[১] এখানে প্রশ্ন হয় যে, পূর্ববতী নবী-রাসূলগণ তো মারা গেছেন। তাদেরকে জিজ্ঞেস করার আদেশ কিরূপে দেয়া হল? অধিকাংশ তফসীরবিদের মতে আয়াতের অর্থ এই যে, নবী-রাসূলগণের অনুসারীদের জিজ্ঞেস করুন। কোন কোন বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইসরা ও মি'রাজের রাত্রে নবী-রাসূলদেরকে এ প্রশ্ন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। [বাগভী, ফাতহুল কাদীর]
আয-যুখরুফ 43:46
আর অবশ্যই মূসাকে আমরা আমাদের নিদর্শনাবলীসহ ফির’আউন ও তার নেতৃবর্গের নিকট পাঠিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘নিশ্চয় আমি সৃষ্টিকুলের রবের একজন রাসূল। ’
আয-যুখরুফ 43:47
অতঃপর যখন তিনি তাদের কাছে আমাদের নিদর্শনাবলীসহ আসলেন তখনি তারা তা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতে লাগল।
আয-যুখরুফ 43:48
আর আমরা তাদেরকে যে নিদর্শনই দেখিয়েছি তা ছিল তার অনুরূপ নিদর্শনের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর। আর আমরা তাদেরকে শাস্তি দিয়ে পাকড়াও করলাম যাতে তারা ফিরে আসে।
আয-যুখরুফ 43:49
আর তারা বলেছিল, ‘হে জাদুকর ! তোমার রবের কাছে তুমি আমাদের জন্য তা প্রার্থনা কর যা তিনি তোমার সাথে অঙ্গীকার করেছেন, নিশ্চয়ই আমরা সৎপথ অবলম্বন করব।’
আয-যুখরুফ 43:50
অতঃপর যখন আমরা তাদের থেকে শাস্তি সরিয়ে নিলাম তখনই তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে বসল।
আয-যুখরুফ 43:51
আর ফির’আউন তার সম্পপ্রদায়ের মধ্যে ঘোষণা করে বলল, ‘হে আমার সম্পপ্ৰদায় ! মিসর রাজ্য কি আমার নয়? আর এ নদীগুলো আমার পাদদেশে প্রবাহিত ; তোমরা কি দেখছ না?
আয-যুখরুফ 43:52
নাকি আমি এ ব্যক্তি হতে শ্রেষ্ঠ নই, যে হীন এবং স্পষ্ট কথা বলতেও প্রায় অক্ষম !
আয-যুখরুফ 43:53
‘তবে তাকে (মূসা) কেন দেয়া হল না স্বৰ্ণ-বলয় অথবা তার সংগে কেন আসল না ফেরেশতাগণ দলবদ্ধভাবে? ’
আয-যুখরুফ 43:54
এভাবে সে তার সম্প্রদায়কে বোকা বানাল, ফলে তারা তার কথা মেনে নিল ৷ নিশ্চয় তারা ছিল এক ফাসিক সম্পপ্ৰদায়।
আয-যুখরুফ 43:55
অতঃপর যখন তারা আমাদেরকে ক্ৰোধাম্বিত করল তখন আমরা তাদের থেকে প্ৰতিশোধ নিলাম এবং নিমজ্জিত করলাম তাদের সকলকে একত্রিতভাবে।
আয-যুখরুফ 43:56
ফলে পরবর্তীদের জন্য আমারা তাদেরকে করে রাখলাম অতীত ইতিহাস ও দৃষ্টান্ত।
আয-যুখরুফ 43:57
আর যখনই মারইয়াম-তনয়ের দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়, তখন আপনার সম্পপ্ৰদায় তাতে শোরগোল আরম্ভ করে দেয়।
আয-যুখরুফ 43:58
আর তারা বলে, ‘আমাদের উপাস্যগুলো শ্ৰেষ্ঠ না ‘ঈসা?’ এরা শুধু বাক-বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তাকে আপনার সামনে পেশ করে। বরং এরা এক ঝগড়াটে সম্প্রদায়।
আয-যুখরুফ 43:59
তিনি তো কেবল আমারই এক বান্দা, যার উপর আমরা অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে বানিয়েছিলাম বনী ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত [১]।
[১] এটা নাসারাদের সে বিভ্ৰান্তির জওয়াব, যার ভিত্তিতে তারা ঈসা আলাইহিসসালাম কে উপাস্য স্থির করেছিল। পিতা ব্যতীত জন্ম গ্রহণের বিষয়টিকে তারা তার ইলাহ হওয়ার প্রমাণস্বরূপ পেশ করেছিল। আল্লাহ তা'আলা এর খণ্ডনে বলেন, এটা তো নিছক আমার কুদরতের এক প্রদর্শনী ছিল। আমি স্বভাবাতীত কাজ করারও ক্ষমতা রাখি। পিতা ব্যতীত জন্মগ্রহণ করা খুব বেশি স্বভাবাতীত কাজ নয়। কেননা, আদমকে পিতা-মাতা ব্যতীত সৃষ্টি করা হয়েছে। তাছাড়া আল্লাহ্ তা'আলা ঈসা আলাইহিস সালামকে তাঁর অসীম ক্ষমতার নমুনা বানানোর অন্য অর্থ, তাকে এমন মু'জিযা দান করা যা না তার পূর্বে কাউকে দেয়া হয়েছিলো না তার পরে। তিনি মাটি দিয়ে পাখি তৈরী করে তাতে ফুঁ দিতেন আর অমনি তা জীবন্ত পাখি হয়ে যেতো। তিনি জন্মান্ধকে দৃষ্টিশক্তি দান করতেন এবং কুণ্ঠ রোগীকে সুস্থ করতেন। এমনকি মৃত মানুষকে পর্যন্ত জীবিত করতেন। আল্লাহর বাণীর তাৎপর্য হচ্ছে, শুধু অসাধারণ জন্ম এবং এসব বড় বড় মু'জিযার কারণে তাকে আল্লাহর দাসত্বের উর্ধে মনে করা এবং আল্লাহর পুত্ৰ বলে আখ্যায়িত করে তার উপাসনা করা নিতান্তই ভ্ৰান্তি। একজন বান্দা হওয়ার চেয়ে অধিক কোন মর্যাদা তার ছিল না। তাকে নিয়ামতসমূহ দিয়ে অভিসিক্ত করে আল্লাহ তাঁর অসীম ক্ষমতার নমুনা বানিয়ে দিয়েছিলেন। [দেখুন,তাবারী]
আয-যুখরুফ 43:60
আর যদি আমরা ইচ্ছে করতাম তবে তোমাদের পরিবর্তে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা যমীনে উত্তরাধিকারী হত [১]।
[১] অধিকাংশ তাফসীরবিদ এখানে منكم শব্দটির অর্থ করেছেন, بدلاًمنكم বা তোমাদের পরিবর্তে। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, আমি ইচ্ছা করলে এমন কাজও করতে পারি, যার নযীর এপর্যন্ত কায়েম হয়নি। অর্থাৎ মানুষের ঔরসে ফেরেশতাও সৃষ্টি করতে পারি। [ফাতহুল কাদীর]
আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, خيلفون। এর অর্থ তারা যমীনের খলীফা বা প্রতিনিধির মর্যাদা লাভ করত। অথবা তোমাদের স্থলাভিষিক্ত হতো। আয়াতের আরেক অর্থ হচ্ছে, তারা তোমাদের মত বংশবিস্তার করত। ফেরেশতারা উত্তরাধিকার রেখে যেত। [ইবনে কাসীর, বাগভী]
আয-যুখরুফ 43:61
আর নিশ্চয় ‘ঈসা কিয়ামতের নিশ্চিত নিদর্শন ; কাজেই তোমারা কিয়ামতে সন্দেহ করোনা। আর তোমরা আমারই অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।
আয-যুখরুফ 43:62
শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই বাধা না দেয়, নিশ্চয় সে তোমাদের প্ৰকাশ্য শক্ৰ।
আয-যুখরুফ 43:63
আর ‘ঈসা যখন স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ আসল, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কাছে এসেছি হিকমতসহ এবং তোমরা যে কিছু বিষয়ে মতভেদ করছ, তা স্পষ্ট করে দেয়ার জন্য। কাজেই তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং আমার আনুগত্য কর’।
আয-যুখরুফ 43:64
নিশ্চয় আল্লাহ, তিনি আমার রব এবং তোমাদেরও রব, অতএব তোমরা তাঁর ‘ইবাদাত কর ; এটাই সরল পথ।’
আয-যুখরুফ 43:65
অতঃপর তাদের মধ্য থেকে কতগুলো দল মতানৈক্য করল, কাজেই যালিমদের জন্য দুর্ভোগ যন্ত্রণাদায়ক দিনের শাস্তির !
আয-যুখরুফ 43:66
তারা তো তাদের অজ্ঞাতসারে হঠাৎ করে কিয়ামত আসারই অপেক্ষা করছে।
আয-যুখরুফ 43:67
বন্ধুরা সেদিন হয়ে পড়বে একে অন্যের শত্ৰু, মুত্তাকীরা ছাড়া।
আয-যুখরুফ 43:68
হে আমার বান্দাগণ ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং তোমরা চিন্তিতও হবে না।
আয-যুখরুফ 43:69
যারা আমার আয়াতে ঈমান এনেছিল এবং যারা ছিল মুসলিম---
আয-যুখরুফ 43:70
তোমরা এবং তোমাদের স্ত্রীগণ [১] সানন্দে জান্নাতে প্ৰবেশ কর।
[১] কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ মূল আয়াতে أزواج শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যা স্ত্রীদের বুঝাতেও ব্যবহৃত হতে পারে, আবার কোন ব্যক্তির একই পথের পথিক সমমনা ও সহপাঠী বন্ধুদের বুঝাতেও ব্যবহৃত হয়। এই ব্যাপক অৰ্থবোধক শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে এ জন্য যে, তার মধ্যে যেন এই উভয় অর্থই শামিল হয়। ঈমানদারদের ঈমানদার স্ত্রীরা এবং তাদের মুমিন বন্ধুরাও জান্নাতে তাদের সাথে থাকবে। [আদওয়াউল বয়ান]
আয-যুখরুফ 43:71
স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্ৰদক্ষিণ করা হবে ; সেখানে মন যা চায় এবং যাতে নয়ন তৃপ্ত হয় তাই থাকবে। আর সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে।
আয-যুখরুফ 43:72
আর এটাই জান্নাত, তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে, তোমাদের কাজের ফলস্বরূপ।
আয-যুখরুফ 43:73
সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তা থেকে তোমরা খাবে।
আয-যুখরুফ 43:74
নিশ্চয় অপরাধীরা জাহান্নামের শাস্তিতে স্থায়ী হবে ;
আয-যুখরুফ 43:75
তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না এবং তারা তাতে হতাশ হয়ে পড়বে।
আয-যুখরুফ 43:76
আর আমরা তাদের প্রতি যুলুম করিনি, কিন্তু তারা নিজেরাই ছিল যালিম।
আয-যুখরুফ 43:77
তারা চিৎকার করে বলবে, ‘হে মালেক [১], তোমার রব যেন আমাদেরকে নিঃশেষ করে দেন।’ সে বলবে, ‘নিশ্চয় তোমারা অবস্থানকারী হবে।’
[১] মালেক অর্থ জাহান্নামের ব্যবস্থাপক ফেরেশতার নাম। কথার ইংগিত থেকে এটিই প্রকাশ পাচ্ছে। [ইবনে কাসীর]
আয-যুখরুফ 43:78
আল্লাহ বলবেন, ‘অবশ্যই আমারা তমাদের কাছে সত্য নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু তোমাদের বেশীর ভাগই ছিলে সত্য অপছন্দকারী।’
আয-যুখরুফ 43:79
নাকি তারা কোন ব্যাপারে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ করেছে? নিশ্চয় আমিই তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকারী।
আয-যুখরুফ 43:80
নাকি তারা মনে করে যে, আমরা তাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণা শুনতে পাই না? অবশ্যই হ্যাঁ। আর আমাদের ফেরেশতাগণ তাদের কাছে থেকে সবকিছু লিখছে।
আয-যুখরুফ 43:81
বলুন, ‘দয়াময় আল্লাহর কোন সন্তান থাকলে আমি হতাম তাঁর ইবাদতে ঘৃণাকারীদের অগ্রণী [১] ;
[১] ওপরে عَابِدِيْنَ এর অর্থ করা হয়েছে, ঘৃণাকারী। এটা আরবী বিভিন্ন বাকরীতিতে ব্যবহৃত আছে। অন্য অনুবাদ হচ্ছে, বলুন হে মুহাম্মাদ! যদি রহমানের কোন সন্তান থাকে যেটা তোমরা তোমাদের কথায় দাবী করছ, তবে তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করণে ও তোমাদের দাবী অস্বীকারকরণে আমি প্রথম আল্লাহর উপর মুমিন। কারণ, তাঁর কোন সন্তান থাকতে পারে না। [তাবারী]
তখন عَابِدِيْنَ শব্দের অর্থ হবে, مُؤْمِنِيْنَ আর কথার বাকী অংশ উহ্য থাকবে। তাছাড়া আরেক অনুবাদ হচ্ছে, ইবাদতকারী। অর্থাৎ যদি ধরে নেয়া হয়, তাঁর সন্তান আছে তারপরও আমি আল্লাহরই ইবাদাত করব। কারণ, আমি তাঁর বান্দা। আর বান্দা স্রষ্টার নির্দেশের বাইরে যেতে পারে না। [ইবন কাসীর] কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর সন্তান হওয়া কোন পর্যায়ে সম্ভব। বরং উদ্দেশ্য একথা ব্যক্ত করা যে, আমি কোন শক্রতা ও হঠকারিতাবশতঃ তোমাদের বিশ্বাস অস্বীকার করছি না; বরং প্রমাণাদির আলোকেই করছি। বিশুদ্ধ প্রমাণাদি দ্বারা আল্লাহর সন্তান থাকা প্রমাণিত হলে আমি অবশ্যই তা মেনে নিতাম। কিন্তু সর্বপ্রকার দলীল এর বিপক্ষে। কাজেই মেনে নেয়ার প্রশ্নই উঠে না। এ থেকে জানা গেল যে, মিথ্যাপন্থীদের সাথে বিতর্কের সময় নিজের সত্যপ্রিয়তা ফুটানোর উদ্দেশ্যে একথা বলা জায়েয ও সমীচীন যে, তোমার দাবী সত্য প্রমাণিত হলে আমি মেনে নিতাম। কেননা, মাঝে মাঝে এধরনের কথায় প্রতিপক্ষের মনে নম্রতা সৃষ্টি হয়, যা তাকে সত্য গ্রহণে উৎসাহিত করে। [দেখুন, তাবারী; কুরতুবী; ইবন কাসীরা আদওয়াউল বায়ান]
আয-যুখরুফ 43:82
‘তারা যা আরোপ করে তা থেকে আসমানসমূহ ও যমীনের রব এবং ‘আরশের রব পবিত্ৰ-মহান।
আয-যুখরুফ 43:83
অতএব আপনি তাদেরকে ছেড়ে দিন তারা মগ্ন থাকুক বেহুদা কথায় এবং মত্ত থাকুক খেল-তামাশায় যে দিনের ওয়াদা দেয়া হয়েছে তার সম্মুখীন হওয়ার আগ পর্যন্ত।
আয-যুখরুফ 43:84
আর তিনিই সত্য ইলাহ্ আসমানে এবং তিনিই সত্য ইলাহ্ যমীনে। আর তিনি হিকমতওয়ালা, সর্বজ্ঞ।
আয-যুখরুফ 43:85
আর তিনি বরকতময়, যার কর্তৃত্বে রয়েছে আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছু। আর কিয়ামতের জ্ঞান শুধু তাঁরই আছে এবং তাঁরই কাছে তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে।
আয-যুখরুফ 43:86
আর তিনি ছাড়া তারা যাদেরকে ডাকে, তারা সুপারিশের মালিক হবে না, তবে তারা ছাড়া, যারা জেনে-শুনে সত্য সাক্ষ্য দেয়।
আয-যুখরুফ 43:87
আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে, তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ।’ অতঃপর তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে?
আয-যুখরুফ 43:88
আর তার (রাসূল) এ উক্তিঃ ‘হে আমার রব ! নিশ্চয় এরা এমন সম্প্রদায় যারা ঈমান আনবে না।’
আয-যুখরুফ 43:89
কাজেই আপনি তাদেরকে উপেক্ষা করুন এবং বলুন, ‘সালাম' ; অতঃপর তারা শীঘ্রই জানতে পারবে।
আদ-দুখান 44:1
হা - মীম।
আদ-দুখান 44:2
শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের [১]।
[১] ‘সুস্পষ্ট কিতাব' বলে কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। [সা'দী, মুয়াসসার, জালালাইন]
আদ-দুখান 44:3
নিশ্চয় আমরা এটা নাযিল করেছি এক মুবারক রাতে [১] ; নিশ্চয় আমরা সতর্ককারী।
[১] গ্রহণযোগ্য তাফসীরবিদদের মতে এখানে কদরের রাত্ৰি বোঝানো হয়েছে, যা রমযান মাসের শেষ দশকে হয়। সূরা কদরে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, পবিত্র কুরআন শবে-কদরে নাযিল হয়েছে। এতে বোঝা গেল যে, এখানেও বরকতের রাত্রি বলে শবে-কদরই বোঝানো হয়েছে। এ রাত্রিকে “মোবারক” বলার কারণ এই যে, এ রাত্ৰিতে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে অসংখ্য কল্যাণ ও বরকত নাযিল হয়। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, দুনিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা পয়গম্বরগণের প্রতি যত কিতাব নাযিল করেছেন, তা সবই রমযান মাসেরই বিভিন্ন তারিখে নাযিল হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর সহীফাসমূহ রমযানের প্রথম তারিখে, তাওরাত ছয় তারিখে, যাবুর বার তারিখে, ইঞ্জীল আঠার তারিখে এবং কুরআন চব্বিশ তারিখ অতিবাহিত হওয়ার পর (পঁচিশের রাত্ৰিতে) অবতীর্ণ হয়েছে। [মুসনাদে আহমাদ: ৪/১০৭]
আদ-দুখান 44:4
সে রাতে প্রত্যেক চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্থিরকৃত হয় [১],
[১] ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, এর অর্থ কুরআন অবতরণের রাত্রি অর্থাৎ, শবে-কদরে সৃষ্টি সম্পর্কিত সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা স্থির করা হয়, যা পরবর্তী শবে-কদর পর্যন্ত এক বছরে সংঘটিত হবে। অর্থাৎ, এ বছর কারা কারা জন্মগ্রহণ করবে, কে কে মারা যাবে এবং এ বছর কি পরিমাণ রিযিক দেয়া হবে। মাহদভী বলেন, এর অর্থ এই যে, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তকদীরে পূর্বাহ্নে, স্থিরীকৃত সকল ফয়সালা এ রাত্রিতে সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাগণের কাছে অৰ্পণ করা হয়। কেননা, কুরআন ও হাদীসের অন্যান্য বর্ণনা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ তা'আলা এসব ফয়সালা মানুষের জন্মের পূর্বেই সৃষ্টিলগ্নে লিখে দিয়েছেন। অতএব, এ রাত্রিতে এগুলোর স্থির করার অর্থ এই যে, যে ফেরেশতাগণের মাধ্যমে ফয়সালা ও তাকদীর প্রয়োগ করা হয়, এ রাত্ৰিতে সারা বছরের বিধানাবলী তাদের কাছে অৰ্পণ করা হয়। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, তুমি কোন মানুষকে বাজারে হাঁটাচলা করতে দেখবে অথচ তার নাম মৃতদের তালিকায়। তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করে বললেন, প্রতি বছরই এ বিষয়গুলো নির্ধারিত হয়ে যায়। [মুস্তাদরাকে হাকিম:২/৪৪৮-৪৪৯]
আদ-দুখান 44:5
আমাদের পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, নিশ্চয় আমরা রাসূল প্রেরণকারী
আদ-দুখান 44:6
আপনার রবের রহমতস্বরূপ ; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ—
আদ-দুখান 44:7
আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু’য়ের মধ্যবতী সমস্ত কিছুর রব, যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাসী
হও।
আদ-দুখান 44:8
তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই, তিনি জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু ঘটান ; তিনি তোমাদের রব এবং তোমাদের পিতৃপুরুষদেরও রব।
আদ-দুখান 44:9
বরং তারা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে খেল -- তামাসা করছে।
আদ-দুখান 44:10
অতএব আপনি অপেক্ষা করুন সে দিনের যেদিন স্পষ্ট ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হবে আকাশ [১],
[১] আলোচ্য আয়াতসমূহে উল্লেখিত ধোঁয়া সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের তিন প্রকার উক্তি বর্ণিত আছে। প্রথম উক্তি এই যে, এটা কেয়ামতের অন্যতম আলামত বা কেয়ামতের সন্নিকটবতী সময়ে সংঘটিত হবে। এই উক্তি আলী, ইবন আব্বাস, ইবন ওমর, আবু হুরায়রা, রাদিয়াল্লাহু আনহুম ও হাসান বসরী রাহেমাহুল্লাহ প্রমুখ থেকে বর্ণিত আছে। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এ ভবিষ্যদ্বানী অতীতে পূর্ণ হয়ে গেছে এবং এতে মক্কার সে দুর্ভিক্ষ বোঝানো হয়েছে, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দো'আর ফলে মক্কাবাসীদের উপর অর্পিত হয়েছিল। তারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছিল এবং মৃত জন্তু পর্যন্ত খেতে বাধ্য হয়েছিল। আকাশে বৃষ্টি ও মেঘের পরিবর্তে ধুম্র দৃষ্টিগোচর হত। এ উক্তি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রমুখের। তৃতীয় উক্তি এই যে, এখানে মক্কা বিজয়ের দিন মক্কার আকাশে উত্থিত ধূলিকণাকে ধুম্র বলা হয়েছে। এ উক্তি আবদুর রহমান আ'রাজ প্রমুখের। প্রথমোক্ত উক্তিদ্বয়ই সমধিক প্রসিদ্ধ। তৃতীয় উক্তি ইবনে-কাসীরের মতে অগ্রাহ্য। সহীহ হাদীসসমূহে দ্বিতীয় উক্তিই অবলম্বিত হয়েছ। প্রথমোক্ত উক্তিদ্বয়ের বর্ণনাসমূহ নিম্নরূপঃ
হুযায়ফা ইবনে আসীদ বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন। আমারা তখন পরস্পর কেয়ামতের সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। তিনি বললেন, যত দিন তোমারা তোমরা দশটি আলামত না দেখ, ততদিন কেয়ামত হবে না [১] পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়, [২] দোখান তথা ধুম্র, [৩] দাব্বা (বা বিচিত্র ধরণের প্রাণী), [৪] ইয়াজুজ-মাজুজের আবির্ভাব, [৫] ঈসা আলাইহিস্সালাম-এর অবতরণ, [৬] দাজ্জালের আবির্ভাব, (৭) পূর্বে ভূমিধাস(৮) পশ্চিমে ভূমিধস, (৯) আরব উপদ্বীপে ভূমিধস, (১০) আদন থেকে এক অগ্নি বের হবে এবং মানুষকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাবে। মানুষ যেখানে রাত্রিযাপন করতে আসবে, অগ্নিও থেমে যাবে, যেখানে দুপুরে বিশ্রামের জন্যে আসবে, সেখানে অগ্নিও থেমে যাবে। [মুসলিম: ২৯০১] এছাড়া কিছু সহীহ ও হাসান হাদীসও একথা প্রমাণ করে যে, ‘দোখান’ ধুম্র কেয়ামতের ভবিষ্যৎ আলামতসমূহের অন্যতম। কুরআনের বাহ্যিক ভাষাও এর সাক্ষ্য দেয়।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, কাফেররা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দাওয়াত কবুল করতে অস্বীকার করল এবং কুফৱীকেই আঁকড়ে রইল, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের উপর দো’আ করলেন যে, হে আল্লাহ এদের উপর ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর আমলের দুর্ভিক্ষের ন্যায় দুর্ভিক্ষ চাপিয়ে দিন। ফলে কাফেররা ভয়ংকর দুর্ভিক্ষে পতিত হল। এমনকি, তারা অস্থি এবং মৃত জন্তুও ভক্ষণ করতে লাগল। তারা আকাশের দিকে তাকালে ধুম্র ব্যতীত কিছুই দৃষ্টিগোচর হত না। এক বর্ণনায় আছে, তাদের কেউ আকাশের দিকে তাকালে ক্ষুধার তীব্রতায় সে কেবল ধুম্রের মত দেখত। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ তার বক্তব্যের প্রমাণ স্বরূপ এ আয়াতখানি তেলাওয়াত করলেন। দুর্ভিক্ষ প্রপীড়িত জনগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আবেদন করল, আপনি আপনার মুদার গোত্রের জন্য আল্লাহর কাছে বৃষ্টির দো'আ করুন। নতুবা আমরা সবাই ধ্বংস হয়ে যাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম দো'আ করলে, বৃষ্টি হল। তখন
اِنَّاكَاشِفُواالُعَذَابِ قَلِيْلًا
আয়াত নাযিল হল। অর্থাৎ, আমরা কিছু দিনের জন্যে তোমাদের থেকে আযাব প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। কিন্তু তোমরা বিপদমুক্ত হয়ে গেলে আবার কুফরের দিকে ফিরে যাবে। বাস্তবে তাই হল, তারা তাদের পূর্বাবস্থায় ফিরে গেল। তখন আল্লাহ তা'আলা
يَوْمَ نَبْطِشُ الْبَطْشَةَ الْكُبْرٰى اِنَّامُنْتَقِمُونَ
আয়াত নাযিল করলেন। অর্থাৎ যেদিন আমরা প্রবলভাবে পাকড়াও করব, সেদিনের ভয় কর। অতঃপর ইবনে-মাসউদ বললেন, এই প্রবল পাকড়াও বদর যুদ্ধে হয়ে গেছে। এই ঘটনা বর্ণনা করার পর তিনি আরও বললেন, পাঁচটি বিষয় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, দোখান তথা ধুম্র, রোম (এর পারসিকদের উপর জয়লাভ), চাঁদ (দ্বিখণ্ডিত হওয়া), পাকড়াও (যা বদরের প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল) ও লেযাম (বা স্থায়ী আযাব)। [বুখারী: ৪৮০৯, মুসলিম: ২৭৯৮]
আদ-দুখান 44:11
তা আবৃত করে ফেলবে লোকদেরকে। এটা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
আদ-দুখান 44:12
(তারা বলবে) ‘হে আমাদের রব! আমাদের থেকে শাস্তি দূর করুন, নিশ্চয় আমরা মুমিন হব।’
আদ-দুখান 44:13
তারা কি করে উপদেশ গ্ৰহণ করবে? অথচ ইতোপূর্বে তাদের কাছে এসেছে স্পষ্ট এক রাসূল;
আদ-দুখান 44:14
তারপর তারা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং বলেছিল, ‘এ এক শিক্ষাপ্রাপ্ত পাগল !’
আদ-দুখান 44:15
নিশ্চয় আমারা অল্প সময়ের জন্য শাস্তি রহিত করব --- (কিন্তু) নিশ্চয় তোমরা তোমাদের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।
আদ-দুখান 44:16
যেদিন আমরা প্রবলভাবে পাকড়াও করব, সেদিন নিশ্চয় আমরা হব প্রতিশোধ গ্রহণকারী।
আদ-দুখান 44:17
আর অবশ্যই এদের আগে আমরা ফির’আউন সম্প্রদায়কে পরীক্ষা করেছিলাম এবং তাদের কাছেও এসেছিলেন এক সম্মানিত রাসূল [১],
[১] মূল আয়াতে كريم শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দটি যখন মানুষের জন্য ব্যবহার করা হয় তখন তার দ্বারা বুঝানো হয় এমন ব্যক্তিকে যে অত্যন্ত ভদ্র ও শিষ্ট আচার-আচরণ এবং অতীব প্রশংসনীয় গুণাবলীর অধিকারী। সাধারণ গুণাবলী বুঝাতে এ শব্দ ব্যবহৃত হয় না। এখানে মূসা আলাইহিস সালামকে উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [তিবারী, কুরতুবী]
আদ-দুখান 44:18
(তিনি ফিরআউনকে বলেছিলেন) ‘আল্লাহর বান্দাদেরকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও [১]। নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল।
[১] মূল আয়াতে أدُّوْا বলা হয়েছে। আয়াতাংশের একটি অনুবাদ হচ্ছে আল্লাহর বান্দাদেরকে আমার কাছে সোর্পদ করো। এই অনুবাদ অনুসারে এটা ইতোপূর্বে সূরা আল-আ’রাফ এর ১০৫, সূরা ত্বাহার ৪৭ এবং আশ-শু'আরার ১৭ নং আয়াতে ‘বনী ইসরাঈলদের আমার সাথে যেতে দাও’ বলে যে দাবী করা হয়েছে সেই দাবীর সমার্থক।
আদ-দুখান 44:19
‘আর তোমারা আল্লাহর বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করো না, নিশ্চয় আমি তোমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আসব।
আদ-দুখান 44:20
‘আর নিশ্চয় আমি আমার রব ও তোমাদের রবের আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যাতে তোমরা আমাকে পাথরের আঘাত হানতে না পার [১]।
[১] تِرْجُمُوْنِ শব্দের অর্থ প্রস্তর বর্ষণে হত্যা করা। এর অপর অর্থ কাউকে গালি দেয়াও হয়। এখানে উভয় অর্থই হতে পারে, কিন্তু প্ৰথম অর্থ নেয়াই অধিক সঙ্গত। কেননা, ফির’আউনের সম্প্রদায় মুসা আলাইহিস সালাম-কে হত্যার হুমকি দিচ্ছিল। [তাবারী, ইবনে কাসীর]
আদ-দুখান 44:21
‘আর যদি তোমরা আমার কথায় বিশ্বাস স্থাপন না কর, তবে তোমরা আমাকে ছেড়ে যাও।’
আদ-দুখান 44:22
অতঃপর মূসা তার রবকে ডাকলেন, ‘নিশ্চয় এরা এক অপরাধী সম্পপ্রদায়।’
আদ-দুখান 44:23
(আল্লাহ্ বললেন) ‘সুতরাং আপনি আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রাতে বের হয়ে পড়ুন, নিশ্চয় তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করা হবে।’
আদ-দুখান 44:24
আর সমুদ্রকে স্থির থাকতে দিন [১], নিশ্চয় তারা হবে এক ডুবন্ত বাহিনী।
[১] মূসা আলাইহিস সালাম সঙ্গীগণসহ সমুদ্র পার হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে কামনা করবেন যে, সমুদ্র পুনরায় আসল অবস্থায় ফিরে যাক, যাতে ফির’আউনের বাহিনী পার হতে না পারে। তাই আল্লাহ তা’আলা তাকে বলে দিলেন, তোমরা পার হওয়ার পর সমুদ্রকে শান্ত ও আচল অবস্থায় থাকতে দাও এবং পুনরায় পানি চলমান হওয়ার চিন্তা করো না- যাতে ফির’আউন শুষ্ক ও তৈরী পথ দেখে সমুদ্রের মধ্যস্থলে প্ৰবেশ করে। তখন আমি সমুদ্রকে চলমান করে দেব এবং তারা নিমজ্জিত হবে। [দেখুন,তাবারী]
আদ-দুখান 44:25
তারা পিছনে রেখে গিয়েছিল অনেক উদ্যান ও প্রস্রবণ ;
আদ-দুখান 44:26
শস্যক্ষেত্র ও সুরম্য প্রাসাদ,
আদ-দুখান 44:27
আর বিলাস উপকরণ, তাতে তারা আনন্দ পেত।
আদ-দুখান 44:28
এরূপই ঘটেছিল এবং আমরা এ সবকিছুর উত্তরাধিকারী করেছিলাম ভিন্ন [১] সম্প্রদায়কে।
[১] অন্যত্র বলা হয়েছে যে, এই ভিন্ন জাতি হচ্ছে বনী-ইসরাঈল। [সূরা আশ-শু'আরা: ৫৯] অবশ্য বনী-ইসরাঈল পুনরায় মিসরে আগমন করেছিল বলে ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুরা আশ-শু'আরার ৫৯ নং আয়াতের তফসীরে এর বিস্তারিত জবাবও দেয়া হয়েছে।
আদ-দুখান 44:29
অতঃপর আসমান এবং যমীন তাদের জন্য অশ্রুপাত করেনি এবং তারা অবকাশপ্ৰাপ্তও ছিল না।
আদ-দুখান 44:30
আর অবশ্যই আমারা উদ্ধার করেছিলাম বণী - ইসরাঈলকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি হতে
আদ-দুখান 44:31
ফির’আউন থেকে ; নিশ্চয় সে ছিল সীমালঙ্ঘনকারীদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়।
আদ-দুখান 44:32
আর আমরা জেনে শুনেই তাদেরকে সকল সৃষ্টির উপর নির্বাচিত করেছিলাম।
আদ-দুখান 44:33
আর আমারা তাদেরকে এমন নিদর্শনাবলী দিয়েছিলাম যাতে ছিল সুস্পষ্ট পরীক্ষা [১] ;
[১] এখানে লাঠি, দীপ্তিময় শুভ্ৰ হাত ইত্যাদি মু'জিযা বোঝানো হয়েছে। بلاء শব্দের দু'অৰ্থ
পুরস্কার ও পরীক্ষা। এখানে উভয় অর্থ অনায়াসে সম্ভবপর। [দেখুন, কুরতুবী]
আদ-দুখান 44:34
নিশ্চয় তারা বলেই থাকে,
আদ-দুখান 44:35
‘আমাদের প্রথম মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই নেই এবং আমরা পুনরূত্থিত হবার নই।
আদ-দুখান 44:36
‘অতএব তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে নিয়ে আস।’
আদ-দুখান 44:37
তারা কি শ্রেষ্ঠ না তুব্বা’ সম্প্রদায় [১] ও তাদের পূর্বে যারা ছিল তারা? আমারা তাদেরকে ধ্বংস করেছিলাম। নিশ্চয় তারা ছিল অপরাধী।
[১] কুরআনে দু’জায়গায় তুব্বার উল্লেখ রয়েছে- এখানে এবং সুরা ক্বাফে। কিন্তু উভয় জায়গায় কেবল নামই উল্লেখ করা হয়েছে-কোন বিস্তারিত ঘটনা বিবৃত হয়নি। তাই এরা কোন জনগোষ্ঠী এ সম্পর্কে তফসীরবিদগণ বিভিন্ন উক্তি করেছেন। বাস্তবে তুব্বা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম নয়, বরং এটা ইয়ামনের হিমইয়ারী সম্রাটদের উপাধিবিশেষ। তারা দীর্ঘকাল পর্যন্ত ইয়ামনের পশ্চিমাংশকে রাজধানী করে আরব, শাম, ইরাক ও আফ্রিকার কিছু অংশ শাসন করেছে। এই সমাটগণকে তাবাবি’য়ায়ে-ইয়ামন বলা হয়। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে তাদের মধ্যবর্তী এক সম্রাটকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে, যার নাম আসা’আদ আবু কুরাইব ইবনে মাদিকারেব। যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়াত লাভের কমপক্ষে সাত’শ বছর পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে। হিমইয়ারী সম্রাটদের মধ্যে তার রাজত্বকাল সর্বাধিক ছিল। সে তার শাসনামলে অনেক দেশ জয় করে সমরকন্দ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বৰ্ণনা করেন, এই দিগ্বিজয়কালে একবার সে মদীনা মুনাওয়ারার জনপদ অতিক্রম করে এবং তা করায়ত্ত করার ইচ্ছা করে। মদীনাবাসীরা দিনের বেলায় তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত এবং রাত্ৰিতে তার আতিথেয়তা করত। ফলে সে লজ্জিত হয়ে মদীনা জয়ের ইচ্ছা পরিত্যাগ করে। এ সময়েই মদীনার দু’জন ইহুদী আলেম তাকে হুশিয়ার করে দেয় যে, এই শহর সে করায়ত্ত করতে পারবে না; কারণ, এটা শেষ নবীর হিজরতভূমি। সম্রাট ইহুদী আলেমাদ্বয়কে সাথে নিয়ে ইয়ামন প্ৰব্যাবর্তন করে এবং তাদের শিক্ষা ও প্রচারে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্ৰহণ করে। অতঃপর তার সম্প্রদায়ও সে দ্বীন গ্রহণ করে। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তারা আবার মূর্তিপূজা ও অগ্নিপূজা শুরু করে দেয়। ফলে তাদের উপর আল্লাহর গযব নাযিল হয়। এ থেকে জানা যায় যে, তুব্বার সম্প্রদায় ইসলাম গ্ৰহণ করেছিল, কিন্তু পরে পথভ্রষ্ট হয়ে আল্লাহর গযবে পতিত হয়েছিল। এ কারণেই কুরআনের উভয় জায়গায় তুব্বার সম্প্রদায় উল্লেখ করা হয়েছে; শুধু তুব্বা উল্লেখিত হয়নি? [দেখুন, তাবারী, ইবন কাসীর, কুরতুবী]
কোন কোন হাদীস থেকে এর সমর্থন পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তোমরা তুব্বাকে মন্দ বলো না; কারণ সে ইসলাম গ্ৰহণ করেছিল। [মুসনাদে আহমাদ: ৫/৩৪০]
আদ-দুখান 44:38
আর আমারা আসমানসমূহ,যমীন ও এ দু’য়ের মধ্যকার কোন কিছুই খেলার ছলে সৃষ্টি করিনি;
আদ-দুখান 44:39
আমরা এ দু'টিকে যথাযথভাবেই সৃষ্টি করেছি, কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না।
আদ-দুখান 44:40
নিশ্চয় ফয়সালার দিনটি তাদের সবার জন্য নির্ধারিত সময়।
আদ-দুখান 44:41
সেদিন এক বন্ধু অন্য বন্ধুর কোন কাজে আসবে না এবং তারা সাহায্যও পাবে না।
আদ-দুখান 44:42
তবে আল্লাহ যার প্রতি দয়া করেন তার কথা স্বতন্ত্র। নিশ্চয় তিনিই মহাপরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।
আদ-দুখান 44:43
নিশ্চয় যাক্কূম গাছ হবে [১] ---
[১] যাক্কুমের স্বরূপ সম্পর্কে সূরা আস-সাফফাতে কিছু জরুরী বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, কুরআনের আয়াত থেকে বাহ্যতঃ জানা যায়, যাক্কুম কাফেরদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করার আগেই খাওয়ানো হবে। [ফাতহুল কাদীর] কেননা, এখানে মানুষকে খাওয়ানোর পর জাহান্নামের মধ্যস্থলে টেনে নিয়ে যাওয়ার আদেশ উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অন্য সূরায় বলা হয়েছে,
لَآكِلُونَ مِن شَجَرٍ مِّن زَقُّومٍ - فَمَالِئُونَ مِنْهَا الْبُطُونَ- فَشَارِبُونَ عَلَيْهِ مِنَ الْحَمِيمِ فَشَارِبُونَ شُرْبَ الْهِيمِ [সূরা আল- ওয়াকি'আঃ ৫২-৫৬]
আদ-দুখান 44:44
পাপীর খাদ্য ;
আদ-দুখান 44:45
গলিত তামার মত, পেটের মধ্যে ফুটতে থাকবে
আদ-দুখান 44:46
ফুটন্ত পানি ফুটার মত।
আদ-দুখান 44:47
(বলা হবে) তাকে ধর এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে,
আদ-দুখান 44:48
তারপর তার মাথার উপর ফুটন্ত পানির শাস্তি ঢেলে দাও -
আদ-দুখান 44:49
(বলা হবে) ‘আস্বাদন কর, নিশ্চয় তুমিই সম্মানিত, অভিজাত !
আদ-দুখান 44:50
‘নিশ্চয় এটা তা-ই, যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করতে।’
আদ-দুখান 44:51
নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে [১]—
[১] শান্তি ও নিরাপত্তার জায়গা অর্থ এমন জায়গা যেখানে কোন প্রকার আশংকা থাকবে না। কোন দুঃখ, অস্থিরতা, বিপদ, আশংকা এবং পরিশ্রম ও কষ্ট থাকবে না। হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতবাসীদের বলে দেয়া হবে, তোমরা এখানে চিরদিন সুস্থ থাকবে, কখনো রোগাক্রান্ত হবে না, চিরদিন জীবিত থাকবে, কখনো মরবে না চিরদিন সুখী থাকবে কখনো দুর্দশাগ্ৰস্ত হবে না এবং চিরদিন যুবক থাকবে, কখনো বৃদ্ধ হবে না। [মুসলিম: ২৮৩৭]
আদ-দুখান 44:52
উদ্যান ও ঝর্ণার মাঝে,
আদ-দুখান 44:53
তারা পরবে মিহি ও পুরু রেশমী বস্ত্র এবং বসবে মুখোমুখি হয়ে।
আদ-দুখান 44:54
এরূপই ঘটবে ; আর আমরা তাদেরকে বিয়ে দিয়ে দেব ডাগর নয়না হূরদের সাথে,
আদ-দুখান 44:55
সেখানে তারা প্রশান্ত চিত্তে বিবিধ ফলমূল আনতে বলবে।
আদ-দুখান 44:56
প্রথম মৃত্যুর পর তারা সেখানে আর মৃত্যু আস্বাদন করবে না [১]। আর তিনি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করবেন-
[১] অর্থাৎ একবার মৃত্যুর পর আর কোন মৃত্যু হবে না। এ নিয়ম জাহান্নামীদের জন্যেও। কিন্তু সেটা তাদের জন্যে অধিক কঠোর এবং জান্নাতীদের জন্যে অধিক আনন্দ ও সুখের বিষয় হবে। কারণ, যত বড় নেয়ামতই হোক, তা বিলুপ্ত হওয়ার কল্পনা নিশ্চিতরূপেই মনে বিপদের রেখাপাত করে। জান্নাতীরা যখন কল্পনা করবে যে, এসব নেয়ামত তাদের কাছ থেকে কখনও ছিনিয়ে নেয়া হবে না, তখন এটা তাদের আনন্দকে আরও বৃদ্ধি করে দেবে। [দেখুন, ইবনে কাসীর]
আদ-দুখান 44:57
আপনার রবের অনুগ্রহস্বরূপ [১]। এটাই তো মহাসাফল্য।
[১] এ আয়াতে জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়া এবং জান্নাত লাভ করাকে আল্লাহ তাঁর দয়ার ফলশ্রুতি বলে আখ্যায়িত করছেন। এর দ্বারা মানুষকে এই সত্য সম্পর্কে অবহিত করা উদ্দেশ্য যে, আল্লাহর অনুগ্রহ না হওয়া পর্যন্ত কোন ব্যক্তির ভাগ্যেই এই সফলতা আসতে পারে না। আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া ব্যক্তি তার সৎকর্ম করার তাওফীক বা সামৰ্থ কিভাবে লাভ করবে? তাছাড়া ব্যক্তি দ্বারা যত উত্তম কাজই সম্পন্ন হোক না কেন তা পূর্ণাঙ্গ ও পূর্ণতর হতে পারে না। সুতরাং সে কাজ সম্পর্কে দাবী করে একথা বলা যাবে না যে, তাতে কোন ত্রুটি বা অপূর্ণতা নেই। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ যে তিনি বান্দার দুর্বলতা এবং তার কাজকর্মের অপূর্ণতাসমূহ উপেক্ষা করে তার খেদমত কবুল করেন এবং তাকে পুরস্কৃত করে ধন্য করেন। অন্যথায়, তিনি যদি সূক্ষ্মভাবে হিসেব নিতে শুরু করেন তাহলে কার এমন দুঃসাহস আছে যে নিজের বাহুবলে জান্নাত লাভ করার দাবী করতে পারে? হাদীসে একথাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেনঃ “আমল করো এবং নিজের সাধ্যমত সব সর্বাধিক সঠিক কাজ করার চেষ্টা করো। জেনে রাখো, কোন ব্যক্তিকে শুধু তার আমল জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না।” লোকেরা বললোঃ হে আল্লাহর রাসূল, আপনার আমলও কি পারবে না? তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, আমিও শুধু আমার আমলের জোরে জান্নাতে যেতে পারবো না। তবে আমার রব যদি তার রহমত দ্বারা আমাকে আচ্ছাদিত করেন।” [বুখারী: ৬৪৬৭]
আদ-দুখান 44:58
অতঃপর নিশ্চয় আমরা আপনার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে তারা উপদেশ গ্ৰহণ করে।
আদ-দুখান 44:59
কাজেই আপনি প্রতীক্ষা করুন, নিশ্চয় তারা প্ৰতীক্ষমাণ।
আল-জাসিয়া 45:1
হা - মীম।
আল-জাসিয়া 45:2
এ কিতাব মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর কাছ থেকে নাযিলকৃত।
আল-জাসিয়া 45:3
নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীনে মুমিনদের জন্য রয়েছে বহু নিদর্শন।
আল-জাসিয়া 45:4
আর তোমাদের সৃষ্টি এবং জীব-জন্তুর বিস্তারে বহু নিদর্শন রয়েছে এমন সম্প্রদায়ের জন্য, যারা নিশ্চিত বিশ্বাস স্থাপন করে ;
আল-জাসিয়া 45:5
আর রাত ও দিনের পরিবর্তনে এবং আল্লাহ আকাশ হতে যে রিযক (পানি) বর্ষণ করেন, অতঃপর তিনি তা দ্বারা যমীনকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন তাতে এবং বায়ুর পরিবর্তনে অনেক নিদর্শন রয়েছে, এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা বোঝে।
আল-জাসিয়া 45:6
এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমরা আপনার কাছে তিলাওয়াত করছি যথাযথভাবে। কাজেই আল্লাহ এবং তাঁর আয়াতের পরে তারা আর কোন বাণীতে ঈমান আনবে [১]
[১] অর্থাৎ আল্লাহর সত্ত্বা ও তাঁর ইবাদতের ক্ষেত্রে “ওয়াহদানিয়াত” বা একত্বের সপক্ষে স্বয়ং আল্লাহর পেশকৃত এসব যুক্তি-প্রমাণ সামনে আসার পরও যখন এসব লোক ঈমান গ্ৰহণ করছে না তখন এমন কি জিনিস আর আসতে পারে যার কারণে ঈমানের সম্পদ তাদের ভাগ্যে জুটবে? আল্লাহর কালামই তো সেই চূড়ান্ত বস্তু যার মাধ্যমে কোন ব্যক্তি এই নিয়ামত লাভ করতে পারে। আর একটি অদেখা সত্য সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টির জন্য সর্বাধিক যুক্তি সঙ্গত যেসব দলীল-প্রমাণ পেশ করা সম্ভব তা এই পবিত্ৰ কালামে পেশ করা হয়েছে। এরপরও যদি কেউ অস্বীকার করতেই বদ্ধপরিকর থাকে তাহলে করতে থাকুক। তার অস্বীকৃতির ফলে প্রকৃত সত্যের কোন পরিবর্তন হবে না [দেখুন, তাবারী]
আল-জাসিয়া 45:7
দুর্ভোগ প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী পাপীর [১],
[১] কোন কোন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, এই আয়াত নদীর ইবনে হারেছ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, কোন কোন বর্ণনা থেকে হারেছ ইবন কালদাহ সম্পর্কে, আবার কোন এক বর্ণনা থেকে আবু জাহল ও তার সঙ্গীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হওয়ার কথা জানা যায়। আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করার জন্য প্রকৃতপক্ষে কোন ব্যক্তি বিশেষকে নির্দিষ্ট করার প্রয়োজন নেই। كل শব্দ ব্যক্ত করছে যে, যে কেউ এসব বিশেষণে বিশেষিত, তার জন্যই দুর্ভোগ - একজন হোক অথবা তিন জন। [কুরতবী, বাগভী]
আল-জাসিয়া 45:8
সে আল্লাহর আয়াতসমূহ শোনে যা তার কাছে তিলাওয়াত করা হয়, তারপর সে ঔদ্ধত্যের সাথে অটল থাকে যেন সে তা শোনেনি। অতএব, আপনি তাকে সুসংবাদ দিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির;
আল-জাসিয়া 45:9
আর যখন সে আমাদের কোন আয়াত অবগত হয়, তখন সে সেটাকে পরিহাসের পাত্র রূপে গ্রহন করে। তাদেরই জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।
আল-জাসিয়া 45:10
তাদের সামনে রয়েছে জাহান্নাম ; তাদের কৃতকর্ম তাদের কোন কাজে আসবে না, তারা আল্লাহ্র পরিবর্তে যাদেরকে অভিভাবক স্থির করেছে ওরাও নয়। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।
আল-জাসিয়া 45:11
এ কুরআন সৎপথের দিশারী ; আর যারা তাদের রবের আয়াতসমূহের সাথে কুফরী করে,তাদের জন্য রয়েছে খুবই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
আল-জাসিয়া 45:12
আল্লাহ, যিনি সাগরকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন, যেন তাঁর আদেশে তাতে নৌযানসমূহ চলাচল করতে পারে। আর যেন তোমরা তাঁর অনুগ্রহ তালাশ করতে পার [১] এবং যেন তোমরা (তাঁর প্রতি) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।
[১] পবিত্র কুরআনে ‘অনুগ্রহ তালাশ করা’ এর অর্থ সাধারণত জীবিকা উপার্জনের চেষ্টা -প্রচেষ্টা হয়ে থাকে। এখানে এরূপ অর্থ হতে পারে যে, তোমাদেরকে সমুদ্রে জাহাজ চালনার শক্তি দেয়া হয়েছে, যাতে তোমরা ব্যবসা বাণিজ্য করতে পার। এরূপ অৰ্থও সম্ভবপর যে, সমুদ্রে আমি অনেক উপকারী বস্তু সৃষ্টি করে সমুদ্রকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছি, যাতে তোমারা সেগুলো খোঁজ করে উপকৃত হও [দেখুন, তবারী, সাদী]
আল-জাসিয়া 45:13
আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন আসমানসমূহ ও যমীনের সমস্ত কিছু নিজ অনুগ্রহে, নিশ্চয় এতে অনেক নিদর্শনাবলী রয়েছে, এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে।
আল-জাসিয়া 45:14
যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বলুন, ‘তারা যেন ক্ষমা করে ওদেরকে, যারা আল্লাহর দিনগুলোর প্রত্যাশা করে না। যাতে আল্লাহ প্ৰত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের কৃতকর্মের জন্য প্রতিদান দিতে পারেন। ’
আল-জাসিয়া 45:15
যে সৎকাজ করে সে তার কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কাজ করলে তা তারই উপর বর্তাবে, তারপর তোমাদেরকে তোমাদের রবের দিকেই প্রত্যাবর্তিত করা হবে।
আল-জাসিয়া 45:16
আর অবশ্যই আমরা বনী ইসরাঈলকে কিতাব, কর্তৃত্ব [১] ও নবুওয়াত দান করেছিলাম এবং তাদেরকে রিযিক প্ৰদান করেছিলাম উত্তম বস্তু হতে, আর দিয়েছিলাম তাদেরকে সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব।
[১] হুকুম শব্দের কয়েকটি অর্থ হতে পারে। এক-কিতাবের জ্ঞান ও উপলব্ধি এবং দ্বীনের অনুভূতি। দুই-কিতাবের অভিপ্রায় অনুসারে কাজ করার কৌশল। তিন-বিভিন্ন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা। চার-ক্ষমতা বা রাজত্ব। [কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]
আল-জাসিয়া 45:17
আর আমারা তাদেরকে দ্বীনের যাবতীয় বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণাদি দান করেছিলাম। তাদের কাছে জ্ঞান আসার পরও তারা শুধু পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ মতবিরোধ করেছিল। তারা যে সব বিষয়ে মতবিরোধ করত, নিশ্চয় আপনার রব কিয়ামতের দিন তাদের মধ্যে সে সব বিষয়ে ফয়সালা করে দেবেন।
আল-জাসিয়া 45:18
তারপর আমরা আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করেছি দ্বীনের বিশেষ বিধানের উপর ; কাজেই আপনি তার অনুসরণ করুন। আর যারা জানে না তাদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করবেন না।
আল-জাসিয়া 45:19
নিশ্চয় তারা আল্লাহ্র মুকাবিলায় আপনার কোনই কাজে আসবে না; আর নিশ্চয় যালিমরা একে অন্যের বন্ধু ; এবং আল্লাহ্ মুত্তাকীদের বন্ধু।
আল-জাসিয়া 45:20
এ কুরআন মানুষের জন্য আলোকবর্তিকা এবং হেদায়াত ও রহমত এমন সম্প্রদায়ের জন্য, যারা নিশ্চিত বিশ্বাস করে।
আল-জাসিয়া 45:21
নাকি যারা দুষ্কর্ম করেছে তারা মনে করে যে, আমরা জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে তাদেরকে ওদের মত গণ্য করব যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে? তাদের বিচার-সিদ্ধান্ত কতই না মন্দ !
আল-জাসিয়া 45:22
আর আল্লাহ্ আসমানসমূহ ও যমীনকে সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে এবং যাতে প্রত্যেক ব্যাক্তিকে তার কাজ অনুযায়ী ফল দেয়া যেতে পারে। আর তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।
আল-জাসিয়া 45:23
তবে কি আপনি লক্ষ্য করেছেন তাকে, যে তার খেয়াল-খুশীকে নিজ ইলাহ্ বানিয়ে নিয়েছে? আর তার কাছে জ্ঞান আসার পর আল্লাহ তাকে বিভ্রান্ত করেছেন [১] এবং তিনি তার কান ও হৃদয়ে মোহর করে দিয়েছেন। আর তিনি তার চোখের উপর রেখেছেন আবরণ। অতএব আল্লাহর পরে কে তাকে হেদায়েত দিবে? তবু কি তোমরা উপদেশ গ্ৰহণ করবে না?
[১] এই বাক্যাংশের একটি অর্থ হতে পারে এই যে, জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর পক্ষ থেকে সে ব্যক্তিকে গোমরাহীর মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে। কেননা সে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার দাস হয়ে গিয়েছিলো। আরেকটি অর্থ হতে পারে এই যে, সে তার প্রবৃত্তির ইচ্ছা ও কামনা-বাসনাকে ইলাহ বানিয়ে বসেছে এ বিষয়টি জেনে আল্লাহ তাকে গোমরাহীর মধ্যে নিক্ষেপ করেছেন। [দেখুন, কুরতুবী]
আল-জাসিয়া 45:24
আর তারা বলে, ‘একমাত্র দুনিয়ার জীবনই আমাদের জীবন, আমরা মরি ও বাঁচি, আর কাল-ই কেবল আমাদেরকে ধবংস করে [১]।’ বস্তুত এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞান নেই, তারা তো শুধু ধারণাই করে।
[১] دهر শব্দের অর্থ আসলে মহাকাল, অর্থাৎ জগতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সময়ের সমষ্টি। কখনও দীর্ঘ সময়কালকেও دهر বলা হয়। কাফেররা বলেছে যে, আল্লাহর আদেশ ও ইচ্ছার সাথে জীবন ও মৃত্যুর কোন সম্পর্ক নেই, বরং এগুলো প্রাকৃতিক কারণের অধীন। মৃত্যু সম্পর্কে তো সকলেই প্রত্যক্ষ করে যে, মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও শক্তি-সামর্থ্য ব্যবহারের কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে এবং দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পর সম্পূর্ণ নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এরই নাম মৃত্যু। জীবনও তদ্রুপ, কোন ইলাহী আদেশে নয়, বরং উপকরণের প্রাকৃতিক গতিশীলতার মাধ্যমেই তা অর্জিত হয়। মূলত: কাফের ও মুশরিকরা মহাকালের চক্রকেই সৃষ্টিজগত ও তার সমস্ত অবস্থার কারণ সাব্যস্ত করত এবং সবকিছুকে তারই কর্ম বলে অভিহিত করত। অথচ এগুলো সব প্রকৃতপক্ষে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কুদরত ও ইচ্ছায় সম্পন্ন হয়ে থাকে। তাই সহীহ হাদীসসমূহে দাহর তথা মহাকালকে মন্দ বলতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা, কাফেররা যে শক্তিকে দাহর শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করে, প্রকৃতপক্ষে সেই কুদরত ও শক্তি আল্লাহ তা'আলারই। তাই দাহরকে মন্দ বলার ফল প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বনী আদম ‘দাহর’ তথা মহাকালকে গালি দেয়, অথচ আল্লাহ বলেন, আমিই প্রকৃতপক্ষে মহাকাল, আমিই রাত - দিনের পরিবর্তন ঘটাই। [বুখারী: ৫৭১৩]
আল-জাসিয়া 45:25
আর তাদের কাছে যখন আমাদের সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হয় তখন তাদের কোন যুক্তি থাকে না শুধু এ কথা ছাড়া যে, তোমারা সত্যবাদী হলে আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে নিয়ে আস।
আল-জাসিয়া 45:26
বলুন, ‘আল্লাহই তোমাদেরকে জীবন দান করেন তারপর তোমাদের মৃত্যু ঘটান। তারপর তিনি তোমাদেরকে কিয়ামতের দিনে একত্র করবেন, যাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু বেশীর ভাগ মানুষ তা জানে না।’
আল-জাসিয়া 45:27
আর আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই ; এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন বাতিলপন্থীরা হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
আল-জাসিয়া 45:28
আর আপনি প্রত্যেক জাতিকে দেখবেন ভয়ে নতজানু [১], প্ৰত্যেক জাতিকে তার কিতাবের [২] প্রতি ডাকা হবে, (এবং বলা হবে) ‘আজ তোমাদেরকে তারই প্রতিফল দেয়া হবে যা তোমরা আমল করতে।
[১] جاثية এর অর্থ নতজানু হয়ে বসা। ভয়ের কারণে এভাবে বসবে। كُلَّ اُمَّةٍ (প্ৰত্যেক দল) শব্দ থেকে বাহ্যতঃ বোঝা যায় যে, মুমিন, কাফের, সৎ ও অসৎ নির্বিশেষে সকলেই হাশরের ময়দানে ভয়ে নতজানু হয়ে বসবে। সেখানে হাশরের ময়দানের এবং আল্লাহর আদালতের এমন ভীতি সৃষ্টি হবে যে, বড় বড় অহংকারীদের অহংকারও উবে যাবে। সেখানে সবাই অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নতজানু হবে। কোন কোন আয়াত ও বর্ণনায় রয়েছে যে, হাশরের ময়দানে নবী-রাসূল ও সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিগণ ভীত হবেন না। এটা আলোচ্য আয়াতের পরিপন্থী নয়; কেননা, অল্প কিছুক্ষণের জন্যে এই ভয় ও ত্রাস নবী-রাসূল ও সৎ লোকদের মধ্যেও দেখা দেয়া সম্ভবপর। কিন্তু যেহেতু খুব অল্প সময়ের জন্যে এই ভয় দেখা দেবে, তাই একে না হওয়ার পর্যায়ে রেখে দেয়া হয়েছে। আবার এটাও সম্ভবপর যে, প্রত্যেক দল বলে অধিকাংশ হাশরবাসী বোঝানো হয়েছে। তাছাড়া كل শব্দটি মাঝে মাঝে অধিকাংশের অর্থেও ব্যবহৃত হয়। [দেখুন, ইবনে কাসীর, কুরতুবী সা’দী]
[২] অধিকাংশ তফসীরবিদের মতে এখানে কিতাব অর্থ দুনিয়াতে ফেরেশতাগণের লিখিত আমলনামা। হাশরের ময়দানে এসব আমলনামা উড়ানো হবে এবং প্রত্যেকের আমলনামা তার হাতে পৌঁছে যাবে। তাকে বলা হবে, তুমি তোমার আমলনামা পাঠ কর এবং নিজেই হিসাব কর কি প্রতিফল তোমার পাওয়া উচিত। আমলনামার দিকে আহবান করার অর্থ আমলের হিসাবের দিকে আহবান করা। [দেখুন, ইবনে কাসীর সা’দী]
আল-জাসিয়া 45:29
‘এই আমাদের লেখনি, যা তোমাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে সত্যভাবে। নিশ্চয় তোমরা যা আমল করতে তা আমরা লিপিবদ্ধ করেছিলাম।’
আল-জাসিয়া 45:30
অতঃপর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে পরিণামে তাদের রব তাদেরকে প্রবেশ করাবেন স্বীয় রহমতে। এটাই সুস্পষ্ট সাফল্য।
আল-জাসিয়া 45:31
আর যারা কুফরী করেছে (তাদেরকে বলা হবে), ‘তোমাদের কাছে কি আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়নি? অতঃপর তোমরা অহংকার করেছিলে এবং তোমরা ছিলে এক অপরাধী সম্প্রদায়।’
আল-জাসিয়া 45:32
আর যখন বলা হয়, ‘নিশ্চয় আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; এবং কিয়ামত--- এতে কোন সন্দেহ নেই, তখন তোমরা বলে থাক, ‘আমরা জানি না কিয়ামত কী; আমরা কেবল অনুমান করি এবং আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী নই।’
আল-জাসিয়া 45:33
আর তাদের মন্দ কাজগুলোর কুফল তাদের কাছে প্ৰকাশিত হবে এবং যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত তা তাদেরকে পরিবেষ্টন করবে।
আল-জাসিয়া 45:34
আর বলা হবে, ‘আজ আমারা তোমাদেরকে ছেড়ে রাখব যেমন তোমরা এ দিনের সাক্ষাতের বিষয়টি ছেড়ে গিয়েছিলে। আর তোমাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোন সাহায্যকারীও থাকবে না ।
আল-জাসিয়া 45:35
‘এটা এ জন্যে যে, তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে ঠাট্টা-বিদ্রূপের পাত্র বানিয়েছিলে এবং দুনিয়ার জীবন তোমাদেরকে প্রতারিত করেছিল।’ সুতরাং আজ না তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে, আর না তাদেরকে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের সুযোগ দেয়া হবে।
আল-জাসিয়া 45:36
অতএব, সকল প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আসমানসমূহের রব, যমীনের রব ও সকল সৃষ্টির রব।
আল-জাসিয়া 45:37
আর আসমানসমূহ ও যমীনের যাবতীয় গৌরব-গরিমা তাঁরই [১] এবং তিনি মহা পরাক্রমশালী, হিকমতওয়ালা।
[১] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, “বড়ত্ব আমার বস্ত্র আর অহংকার আমার চাদর; যে কেউ এ দু'টির কোন একটি নিয়ে টানাহেঁচড়া করবে, আমি তাকে জাহান্নামের অধিবাসী করে ছাড়বো।” [মুসলিম: ২৬২০]
আল-আহকাফ 46:1
হা-মীম।
আল-আহকাফ 46:2
এ কিতাব পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর কাছ থেকে নাযিলকৃত;
আল-আহকাফ 46:3
আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই আমরা যথাযথ ভাবে ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছি। আর যারা কুফরী করেছে, তাদেরকে যে বিষয়ে ভীতিপ্ৰদৰ্শন করা হয়েছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে আছে।
আল-আহকাফ 46:4
বলুন, ‘তোমরা আমাকে সংবাদ দাও, তোমারা আল্লাহ্র পরিবর্তে যাদেরকে ডাক আমাকে দেখাও তো তারা যমীনে কী সৃষ্টি করেছে অথবা আসমানসমূহে তাদের কোন অংশীদারিত্ব আছে কি? এর পূর্ববতী কোন কিতাব অথবা পরম্পরাগত কোন জ্ঞান থাকলে তা তোমরা আমার কাছে নিয়ে আস যদি তোমরা সত্যবাদী হও [১]।’
[১] এ আয়াতে মুশরেকদের শির্ক এর দাবি বাতিল করার জন্য তাদের দাবীর সপক্ষে দলিল চাওয়া হয়েছে। কেননা, সাক্ষ্য-প্রমাণ ব্যতীত কোন দাবি গ্ৰহণীয় হয় না। দলিলের যত প্রকার রয়েছে, সবগুলো আয়াতে উল্লেখ করে প্রমাণ করা হয়েছে যে, মুশরেকদের দাবির পক্ষে কোন দলিল নেই। তাই এহেন দলিলবিহীন দাবিতে অটল থাকা নিরেট পথভ্ৰষ্টতা। আয়াতে দলিলকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্ৰথম: যুক্তিভিত্তিক দলিল। এর খণ্ডন বলা হয়েছে
اِرُوْنِىْ مَاذَاخَلَقُوْامِنَ الْاَرْضِاَمْ لَهُمْ شِرْكٌ فِى السَّمٰوٰتِ
“এরা যমীনে কি সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও অথবা আসমানসমূহে তাদের কোন অংশীদারিত্ব আছে কি?” দ্বিতীয় প্রকার ইতিহাসভিত্তিক দলিল। বলাবাহুল্য আল্লাহর ব্যাপারে কেবল সেই ইতিহাসভিত্তিক দলিল গ্রহণীয় হতে পারে; যা স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। যেমন তাওরাত, ইঞ্জীল; কুরআন ইত্যাদি কিতাব অথবা আল্লাহ মনোনীত নবী ও রাসূলগণের উক্তি। এই দুই প্রকারের মধ্যে প্রথম প্রকারের খণ্ডনে বলা হয়েছে
اِيْتُوْفِى بِكِتٰبٍ مِّنْ قِبْلِ هٰذَآ
অর্থাৎ তোমাদের মূর্তি পূজার কোন দলিল থাকলে কোন ইলাহী কিতাব পেশ কর, যাতে মূর্তি পূজার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এর পর দ্বিতীয় প্রকার ঐতিহাসিক দলীল পেশ করার আহবান জানিয়ে বলা হয়েছে, اَوْاَثٰرَةٍمِّنْ عِلْمً অর্থাৎ কিতাব আনতে না পারলে কমপক্ষে রাসূলগণের পরম্পরাগত কোন উক্তি পেশ কর। তাও পেশ করতে না পারলে তোমাদের কথা ও কাজ পথ ভ্ৰষ্টতা বৈ কিছুই নয়। এর পরবর্তী আয়াতে তাদের শির্কের তৃতীয় প্রকার দলীল পেশ করে তা খণ্ডন করা হয়েছে। কারণ, তারা হয়ত বলতে পারে যে, তাদেরকে আমরা আল্লাহর শরীক এজন্যই সাব্যস্ত করি যে, তারা আমাদের আহবানে সাড়া দিয়ে আমাদের কোন উপকার সাধন কিংবা অপকার থেকে আমাদের বাঁচাতে পারবে। তাদের সে দলিল পেশের সম্ভাবনাকে নাকচ করে বলা হয়েছে যে, তারা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে আহবান করছে তারা কিয়ামত পর্যন্ত তাদের আহবানে সাড়া দিতে পারবে না। সুতরাং তাদের শির্কের সপক্ষে কোন যুক্তি বা দলিলই অবশিষ্ট রইল না। [দেখুন, ইবনে কাসীর]
আল-আহকাফ 46:5
আর সে ব্যাক্তির চেয়ে বেশী বিভ্রান্ত কে যে আল্লাহ্র পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা কিয়ামতের দিন পর্যন্ত তাকে সাড়া দেবে না? এবং এগুলো তাদের আহ্বান সম্বদ্ধেও গাফেল।
আল-আহকাফ 46:6
আর যখন কিয়ামতের দিন মানুষকে একত্র করা হবে তখন সেগুলো হবে এদের শত্রু এবং এরা তাদের ইবাদাত অস্বীকার করবে।
আল-আহকাফ 46:7
আর যখন তাদের কাছে আমাদের সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হয় তখন যারা কুফরী করেছে তাদের কাছে সত্য আসার পর তারা বলে, ‘এ তো সুস্পষ্ট জাদু।’
আল-আহকাফ 46:8
নাকি তারা বলে যে, ‘সে এটা উদ্ভাবন করেছে।’ বলুন, ‘যদি আমি এটা উদ্ভাবন করে থাকি, তবে তোমারা আমাকে আল্লাহ্র শাস্তি থেকে বাঁচাতে কিছুরই মালিক নও। তোমরা যে বিষয়ে আলোচনায় লিপ্ত আছ, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবগত। আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসেবে তিনিই যথেষ্ট এবং তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
আল-আহকাফ 46:9
বলুন, ‘রাসূলদের মধ্যে আমিই প্রথম নই। আর আমি জানি না, আমার ও তোমাদের ব্যাপারে কী করা হবে; আমি আমার প্রতি যা ওহী করা হয় শুধু তারই অনুসরণ করি। আর আমি তো এক স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্ৰ।’
আল-আহকাফ 46:10
বলুন, ‘তোমরা আমাকে জানাও, যদি এ কুরআন আল্লাহর কাছ থেকে নাযিল হয়ে থাকে এবং তোমরা তার সাথে কুফরী কর, আর বনী ইসরাঈলের একজন অনুরূপ কিতাবের আয়াতের উপর সাক্ষ্য দিয়ে তাতে ঈমান আনল; আর তোমরা ঔদ্ধত্য প্ৰকাশ করলে, (তাহলে তোমাদের পরিণাম কি হবে?) নিশ্চয় আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না [১]।
[১] এ আয়াত এবং সূরা আশ-শু'আরার ১৯৬ ও ১৯৭ নং আয়াতের অর্থ একই রকম। সারমর্ম এই যে, যেসব ইহুদী ও নাসারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রেসালাত ও কুরআন অমান্য করে, তারা স্বয়ং তাদের কিতাব সম্পর্কেও অজ্ঞ। কেননা, বনী ইসরাঈলের অনেক আলেম তাদের কিতাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুওয়াত ও নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছেন। সে আলেমগণের সাক্ষ্য কি এই মূর্খদের জন্যে যথেষ্ট নয়? এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, তোমরা আমার নবুওয়াত দাবিকে ভ্রান্ত এবং কুরআনকে আমার রচনা বল। এর এক জওয়াব পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেউ বাস্তবে নবী না হয়ে নিজেকে নবী বলে মিথ্যা দাবি করলে তার দুনিয়াতে নিপাত হয়ে যাওয়া জরুরি, যাতে জনসাধারণ প্রতারিত না হয়। এ জওয়াবই যথেষ্ট, কিন্তু তোমরা যদি না মান তবে এ সম্ভাবনার প্রতিও লক্ষ্য কর যে, আমার দাবি যদি সত্য হয় এবং কুরআন আল্লাহর কিতাব হয় আর তোমরা একে অমান্য করেই যাও, তবে তোমাদের পরিণতি কি হবে, বিশেষত যখন তোমাদের বনী ইসরাঈলেরই কোন মান্যবার ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, এটা আল্লাহর কিতাব, অতঃপর সে নিজেও মুসলিম হয়ে যায়? এ জ্ঞান লাভের পরও যদি তোমরা জেদ ও অহংকারে অটল থাক, তবে তোমরা গুরুতর শাস্তির যোগ্য হয়ে যাবে। আয়াতে বনী ইসরাঈলের কোন বিশেষ আলেমের নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং এটাও নির্দিষ্ট করা হয়নি যে, এ সাক্ষ্য আয়াত অবতরণের পূর্বেই জনসমক্ষে এসে গেছে, না ভবিষ্যতে আসবে। তাই বনী ইসরাঈলের কোন ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করার ওপর আয়াতের অর্থ নির্ভরশীল নয়। আল্লাহর বাণীর প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, কুরআন তোমাদের সামনে যে শিক্ষা পেশ করছে তা কোন অভিনব জিনিস নয়। পৃথিবীতে প্রথমবারের মত শুধুমাত্র তোমাদের সামনেই তা পেশ করা হয়নি যে, তোমরা ওজর পেশ করে বলবেঃ এ ধরনের কথা তো ইতোপূর্বে মানব জাতির কাছে আর আসেনি। তাই আমরা কি করে তা মানতে পারি। ইতোপূর্বেও এসব শিক্ষা এভাবেই অহীর মাধ্যমে বনী ইসরাঈলীদের কাছে তাওরাত ও অন্যান্য আসমানী কিতাব রূপে এসেছিলো। বনী ইসরাঈলদের একজন সাধারণ মানুষও তা মেনে নিয়েছিলো এবং একথা স্বীকার করে নিয়োছিলো যে অহীই হচ্ছে এসব শিক্ষা নাযিল হওয়ার মাধ্যম। তাই অহী এবং এই শিক্ষা দুর্বোধ্য জিনিস তোমরা সে দাবী করতে পার না। আসল কথা হলো, তোমাদের গর্ব, অহংকার এবং ভিত্তিহীন আত্মম্ভরিতা ঈমানের পথে অন্তরায়। খ্যাতনামা ইহুদী আলেম আবদুল্লাহ ইবন সালামসহ যত ইহুদী ও নাসারা ইসলাম গ্ৰহণ করেছেন, তারা সবাই এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, এ আয়াত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, দাহহাক প্রমুখ তাফসীরবিদগণ তাই বলেছেন। যদিও আবদুল্লাহ ইবনে সালাম এই আয়াত নাযিল হওয়ার পরে মদীনায় ইসলাম গ্ৰহণ করেন। তারপরও এ আয়াতটি মক্কায় অবতীর্ণ হওয়ার পরিপন্থি নয়। এমতাবস্থায় আয়াতটি ভবিষ্যদ্বনি হিসেবে গণ্য হইবে। [দেখুন, তাবারী]
আল-আহকাফ 46:11
আর যারা কুফরী করেছে তারা যারা ঈমান এনেছে তাদের সম্পর্কে বলে, ‘যদি এটা ভাল হত তবে তারা এর দিকে আমাদেরকে অতিক্রম করে যেতে পারত না [১]। আর যখন তারা এটা দ্বারা হেদায়াত পায়নি তখন তারা অচিরেই বলবে, ‘এ এক পুরোনো মিথ্যা।’
[১] কুরাইশ নেতারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করার জন্য যেসব যুক্তি কাজে লাগাতো এটা তার একটা। তারা বলতো, ‘এ কুরআন যদি সত্য হতো এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি একটি সঠিক জিনিসের দাওয়াত দিতেন তাহলে কওমের নেতারা, গোত্ৰসমূহের অধিপতিরা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অগ্রসর হয়ে তা গ্ৰহণ করতো। এটা কি করে হতে পারে যে, কতিপয় অনভিজ্ঞ বালক এবং কিছু সংখ্যক নীচু পর্যায়ের ক্রীতদাস যেমন বিলাল, আম্মার, সুহাইব, খাব্বাব প্রমূখ সর্বাগ্রে ঈমান আনবে অথচ কওমের গণ্যমান্য ব্যক্তি যারা জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ এবং আজ পর্যন্ত কওম যাদের জ্ঞান-বুদ্ধি ও ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে আসছে তারা তা প্রত্যাখ্যান করবে? নতুন এই ধর্মে মন্দ কিছু অবশ্যই আছে। তাই কওমের গণ্যমান্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তা মানছে না। অতএব, তোমরাও তা থেকে দূরে সরে যাও, এই প্রতারণামূলক যুক্তি খাড়া করে তারা সাধারণ মানুষকে শান্ত করে রাখার চেষ্টা করতো। তারা মূলত: অহংকারবশেই উপরোক্ত ধরনের কূটতর্কের অবতারণা করত। অহংকার ও গর্ব মানুষের জ্ঞান বুদ্ধিকেও বিকৃত করে দেয়। অহংকারী ব্যক্তি নিজের বুদ্ধিকেই ভালমন্দের মাপকাঠি বলে মনে করতে থাকে। সে যা পছন্দ করে না, অন্যেরা তা পছন্দ করলে সে সবাইকে বোকা মনে করে, অথচ বাস্তবে সে নিজেই বোকা। সূরা আল-আন’আমের ৫৩ নং আয়াতেও কাফেরদের এ ধরনের উক্তি বর্ণিত হয়েছে। [দেখুন, তাবারী, ইবনে কাসীর]
আল-আহকাফ 46:12
আর এর আগে ছিল মূসার কিতাব পথ প্রদর্শক ও রহমতস্বরূপ। আর এ কিতাব (তার) সত্যায়নকারী, আরবী ভাষায়, যেন তা যালিমদেরকে সতর্ক করে, আর তা মুহসিনদের জন্য সুসংবাদ [১]।
[১] এ আয়াত থেকে প্রমাণ পাওয়া গেল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন অভিনব রাসূল এবং কুরআন কোন অভিনব কিতাব নয় যে, এতে ঈমান আনতে আপত্তি হবে। বরং এর আগে মূসা আলাইহিস সালাম রাসূলরূপে আগমন করেছেন এবং তার প্রতি তাওরাত নাযিল হয়েছিল। ইহুদী ও নাসারা এমনকি কাফেরদের অনেকেই তা স্বীকার করে। [দেখুন, তাবারী।]
আল-আহকাফ 46:13
নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ’ তারপর অবিচল থাকে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।
আল-আহকাফ 46:14
তারাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, তারা যা আমল করত তার পুরস্কার স্বরূপ।
আল-আহকাফ 46:15
আর আমরা মানুষকে তার মাতা -পিতার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে গর্ভে ধারণ করে কষ্টের সাথে এবং প্রসব করে কষ্টের সাথে, তাকে গর্ভে ধারণ করতে [১] ও তার স্তন্য ছাড়াতে লাগে ত্ৰিশ মাস [২], অবশেষে যখন সে পূর্ণ শক্তিপ্রাপ্ত হয় [৩] এবং চল্লিশ বছরে উপনীত হয়, তখন সে বলে ‘হে আমার রব ! আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন, যাতে আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি আপনি যে অনুগ্রহ করেছেন, তার জন্য এবং যাতে আমি এমন সৎকাজ করতে পারি যা আপনি পছন্দ করেন; আর আমার জন্য আমার সন্তান–সন্ততিদেরকে সংশোধন করে দিন, নিশ্চয় আমি আপনারই অভিমুখী হলাম এবং নিশ্চয় আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত ।
[১] অর্থাৎ পিতা-মাতার সেবা যত্ন ও আনুগত্য জরুরি হওয়ার এক কারণ এই যে, তারা তোমাদের জন্যে অনেক কষ্টই সহ্য করেন। বিশেষত মাতার কষ্ট অনেক বেশি হয়ে থাকে। এখানে কেবল মাতার কষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। মাতা দীর্ঘ নয় মাস তোমাদেরকে গর্ভে ধারণ করে। এছাড়া এ সময়ে তাকে অনেক দুঃখকষ্ট সহ্য করতে হয়। এরপর প্রসবকালে অসহনীয় প্রসব বেদনার পর তোমরা ভূমিষ্ঠ হও।
আয়াতের শুরুতেই পিতা-মাতা উভয়ের সাথে সদ্ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু এ স্থলে কেবল মাতার কষ্টের কথা উল্লেখ করার তাৎপর্য এই যে, মাতার পরিশ্রম ও কষ্ট অপরিহার্য ও জরুরী। গর্ভধারণের সময় কষ্ট, প্রসব বেদনার কষ্ট সর্বাবস্থায় ও সব সন্তানের ক্ষেত্রে মাতাকেই সহ্য করতে হয়। পিতার জন্যে লালন পালনের কষ্ট সহ্য করা সর্বাবস্থায় জরুরি হয় না। পিতা ধনাঢ্য হলে এবং তার চাকর বাকর থাকলে অপরের মাধ্যমে সন্তান দেখাশোনা করতে পারে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সন্তানের ওপর মাতার হক বেশি রেখেছেন। এক হাদীসে তিনি বলেন, ‘মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর, অতঃপর মাতার সাথে, অতঃপর মাতার সাথে, তঃপর পিতার সাথে, অতঃপর নিকট আত্মীয়ের সাথে’। [মুসলিম: ৪৬২২]
[২] সন্তানদের যদিও মা-বাপ উভয়েরই সেবা করতে হবে কিন্তু গুরুত্বের দিক দিয়া মায়ের অধিকার এ কারণে বেশী যে, সে সন্তানের জন্য বেশী কষ্ট স্বীকার করে। এ আয়াত এ দিকেই ইংগিত করে। বিভিন্ন সহীহ হাদীস থেকেও এ বিষয়টি জানা যায়। আয়াতেও মায়ের তিনগুণ বেশী অধিকারের প্রতি ইংগিত দেয়া হয়েছেঃ [১] কষ্ট করে মা তাকে গর্ভে ধারণ করেছে। [২] কষ্ট করেই তাকে প্রসব করেছে এবং [৩] গৰ্ভধারণ ও দুধ পান করাতে ৩০ মাস লেগেছে। সন্তানকে গর্ভে ধারণ ও প্রসবের কষ্টের পরও মাতা রেহাই পায় না। এর পরে সন্তানের খাদ্যও আল্লাহ তা'আলা মাতার স্তনে রেখে দিয়েছেন। মাতা তাকে স্তন্যদান করে। আয়াতে বলা হয়েছে যে, সন্তানকে গর্ভে ধারণ এবং স্তন্য ছাড়ানো ত্ৰিশ মাসে হয়। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এই আয়াত দৃষ্টে বলেন যে, গর্ভ ধারণের সর্বনিম্ন সময়কাল ছয় মাস। কেননা সূরা আল বাকারাহ এর ২৩৩ নং আয়াতে স্তন্যদানের সর্বোচ্চ সময়কাল পূর্ণ দু’বছর নির্দিষ্ট করা হয়েছে অথচ এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, সন্তানকে গর্ভে ধারণ এবং স্তন্যদান ছাড়ানো ত্ৰিশ মাসে হয়। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু এর খেলাফতকালে জনৈকা মহিলার গর্ভ থেকে ছয় মাসে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে গেলে তিনি একে অবৈধ গর্ভ সাব্যস্ত করে শাস্তির আদেশ জারি করেন। কেননা, এটা সাধারণ নিয়ম বহির্ভূত ছিল। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এই সংবাদ অবগত হয়ে খলিফাকে শাস্তি কার্যকর করতে বারণ করলেন এবং আলোচ্য আয়াত দ্বারা প্রমাণ করে দিলেন যে, গর্ভধারণের সর্বনিম সময়কাল ছয় মাস। খলিফা তার যুক্তিপ্ৰমাণ কবুল করে শাস্তির আদেশ প্রত্যাহার করেন। এ কারণেই সমস্ত আলেমগণ একমত যে, গর্ভধারণের সর্বনিম্ন সময়কাল ছয় মাস হওয়া সম্ভবপর। এর কম সময়ে সন্তান সুস্থ ও পূর্ণাঙ্গ জন্মগ্রহণ করতে পারে না। তবে সর্বোচ্চ কতদিন সন্তান গর্ভে থাকতে পারে, এ সম্পর্কে অভ্যাস বিভিন্নরূপ। এমনিভাবে স্তন্যদানের সর্বোচ্চ সময়কাল দু’বছর নির্ধারিত। কিন্তু সর্বনিম্ন সময়কাল নির্দিষ্ট নেই। কোন কোন নারীর দুধই হয় না এবং কারও কারও দুধ কয়েক মাসেই শুকিয়ে যায়। কতক শিশু মায়ের দুধ পান করে না ফলে অন্য দুধ পান করাতে হয়। [দেখুন, ইবনে কাসীর]
[৩] أشد এর শাব্দিক অর্থ শক্তি সামর্থ্য। পবিত্র কুরআনের মোট ছয়টি স্থানে এ শব্দটি এসেছে। তন্মধ্যে সূরা আল-আন’আমের ১৫২, সূরা ইউসুফের ১২, সূরা আল-ইসরার ৩৪, সূরা আল-কাহফ এর ৮২, সূরা আল-কাসাসের ১৪ নং আয়াতে এর তাফসীর করা হয়েছে, প্রাপ্ত বয়স বলে।
আল-আহকাফ 46:16
‘ওরাই তারা, আমরা যাদের সৎ আমলগুলো কবুল করি এবং মন্দ কাজগুলো ক্ষমা করি, তারা জান্নাতবাসীদের মধ্যে হবে [১]। এদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা সত্য ওয়াদা।
[১] এ আয়াতের বিধান অত্যন্ত ব্যাপক। এমনকি সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলোও এর অন্তর্ভুক্ত। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর এক উক্তি থেকে আয়াতের ব্যাপকতা বোঝা যায়। মুহাম্মদ ইবনে হাতেম বর্ণনা করেন, একবার আমি আমীরুল মুমেনীন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন তার কাছে আরও কিছু লোক উপস্থিত ছিল। তারা উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর চরিত্রে কিছু দোষ আরোপ করলে তিনি বললেন: "উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সে লোকদের অন্যতম ছিলেন, যাদের কথা আল্লাহ তা'আলা
اُولٰٓيِكَ الَّذِيْنَ فَتَقَبَّلُ عَنْهُم اَحْسَنَ مَاءَمِلُوْاوَنَتَجَا وَزُعَنْ سَيِّاٰتِيمْ فِيْٓ اَصْحٰبِ الْجَنَّةِ
আয়াতে ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহর কসম। উসমান ও তার সঙ্গীদের ক্ষেত্রেই এই আয়াত প্রযোজ্য। এ বাক্যটি তিনি তিনবার বললেন। [দেখুন, ইবনে কাসীর]
আল-আহকাফ 46:17
আর যে তার মাতা-পিতাকে বলে, ‘আফসোস তোমাদের জন্য ! তোমরা কি আমাকে এ ওয়াদা দাও যে, আমাকে পুনরুখিত করা হবে অথচ আমার আগে বহু প্ৰজন্ম গত হয়েছে [১]?’ তখন তার মাতা-পিতা আল্লাহ্র কাছে ফরিয়াদ করে বলে, ‘দুর্ভোগ তোমার জন্য ! তুমি ঈমান আনয়ন কর, নিশ্চয় আল্লাহ্র ওয়াদা সত্য। তখন সে বলে, ‘এ তো অতীত কালের উপকথা ছাড়া কিছুই নয়।’
[১] পূর্বের আয়াতসমূহে মাতা-পিতার সেবাযত্ন ও আনুগত্য সম্পর্কিত নির্দেশ ব্যক্ত হয়েছিল। এ আয়াতে সে ব্যক্তির আযাব ও শাস্তি উল্লেখিত হয়েছে, যে পিতা-মাতার সাথে অসদ্ব্যবহার ও কটুক্তি করে। বিশেষতঃ পিতা-মাতা যখন তাকে ইসলাম ও সৎকর্মের দিকে দাওয়াত দেয়, তখন তাদের কথা অমান্য করা দ্বিগুণ পাপ। ইবনে কাসীর বলেন, যে কোন লোক পিতা-মাতার সাথে অসদ্ব্যবহার করবে, তার ক্ষেত্রেই এ আয়াত প্রযোজ্য হবে। এ আয়াতটি কোন অবস্থাতেই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট করা যাবে না। (যেমনটি শীয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা করার চেষ্টা চালায় ) [দেখুন, ইবনে কাসীর]
আল-আহকাফ 46:18
এরা তো তারা, যাদের উপর সত্য হয়েছে আযাবের সে ফয়সালা, যা সত্য হয়েছিল সে সব উম্মতের জন্য যারা গত হয়ে গেছে এদের আগে, জিন ও ইনসান থেকে। নিশ্চয় তারা ছিল ক্ষতিগ্ৰস্ত।
আল-আহকাফ 46:19
আর প্রত্যেকের জন্য তাদের আমল অনুসারে মর্যাদা রয়েছে ; এবং যাতে আল্লাহ প্রত্যেকের কাজের পুর্ণ প্রতিফল দিতে পারেন। আর তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না [১]।
[১] অর্থাৎ না ভাল লোকদের ত্যাগ ও কুরবানী নষ্ট হবে না মন্দ লোকদেরকে তাদের প্রকৃত অপরাধের অধিক শাস্তি দেয়া হবে। সৎ ব্যক্তি যদি তার পুরস্কার থেকে বঞ্চিত থাকে কিংবা প্রকৃত প্ৰাপ্যের চেয়ে কম পুরস্কার পায় তাহলে তা যুলুম। আবার খারাপ লোক যদি তার কৃত অপরাধের চেয়ে বেশী শাস্তি পায় তাহলে সেটাও যুলুম। [দেখুন,তাবারী, মুয়াসসার]
আল-আহকাফ 46:20
আর যারা কুফরী করেছে যেদিন তাদেরকে জাহান্নামের সামনে পেশ করা হবে (সেদিন তাদেরকে বলা হবে) ‘তোমরা তোমাদের দুনিয়ার জীবনেই যাবতীয় সুখ-সম্ভার নিয়ে গেছ এবং সেগুলো উপভোগও করেছ। সুতরাং আজ তোমাদেরকে দেয়া হবে অবমাননাকর শাস্তি [১] ; কারণ তোমারা যমীনে অন্যায়ভাবে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে এবং তোমারা নাফরমানী করতে।’
[১] অর্থাৎ কাফেরদেরকে বলা হবে, তোমরা কিছু ভাল কাজ দুনিয়াতে করে থাকলে তার প্রতিদানও তোমাদেরকে পার্থিব আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসের আকারে দেয়া হয়েছে। এখন আখেরাতে তোমাদের কোন প্ৰাপ্য নেই। এ থেকে জানা যায় যে, কাফেরদের যেসব সৎকাজ ঈমানের অনুপস্থিতিতে আল্লাহর কাছে গ্রহণীয় নয়; আখেরাতে সেগুলো মূল্যহীন; কিন্তু দুনিয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সেগুলোর প্রতিদান দিয়ে দেন। কাজেই কাফেররা দুনিয়াতে যেসব বিষয় বৈভব, ধন-দৌলত, মান-সম্ভ্রম, প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদি লাভ করে, সেগুলো তাদের দানশীলতা, সহানুভূতি, সততা ইত্যাদি সৎকর্মের প্রতিফল হয়ে থাকে। মুমিনদের জন্যে এরূপ নয়। তারা দুনিয়াতে ধন-সম্পদ, মানসম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদি নেয়ামত লাভ করলেও আখেরাতের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হবে না।
আলোচ্য আয়াতে দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মগ্ন থাকার কারণে কাফেরদের উদ্দেশ্যে শাস্তিবাণী উচ্চারিত হয়েছে। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণ দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বর্জন করার অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন। তাদের জীবনালেখ্য এর সাক্ষ্য দেয়। [দেখুন, ইবনে কাসীর]
আল-আহকাফ 46:21
আর স্মরণ করুন, ‘আদ সম্প্রদায়ের ভাইয়ের কথা, যখন সে আহকাফে [১] স্বীয় সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছিল। যার আগে এবং পরেও সতর্ককারী এসেছিলেন (এ বলে) যে, ‘তোমারা আল্লাহ ছাড়া কারোও ইবাদত করো না। নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের শাস্তির আশংকা করছি।’
[১] যেহেতু কুরাইশ নেতারা তাদের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা পোষণ করতো এবং নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও মোড়লিপনার কারণে আনন্দে আত্মহারা ছিল তাই এখানে তাদেরকে ‘আদ কাওমের কাহিনী শুনানো হচ্ছে। আরবে ‘আদি জাতি এভাবে পরিচিত ছিল যে, প্রাচীনকালে এই ভূখণ্ডে তারা ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী কওম। আয়াতে বর্ণিত أُحْقَافٌ শব্দটি حِقْفٌ শব্দের বহুবচন। এর আভিধানিক অর্থ বালুর এমন সব লম্বা লম্বা টিলা যা উচ্চতায় পাহাড়ের সমান নয়। পারিভাষিক অর্থে এটা আরব মরুভূমির দক্ষিণ পশ্চিম অংশের নাম, বর্তমানে যেখানে কোন জনবসতি নেই। [দেখুন, তাবারী] আহক্বাফ অঞ্চলের বর্তমান অবস্থা দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারে না যে, এক সময় এখানে জাঁকালো সভ্যতার অধিকারী একটি শক্তিশালী জাতি বাস করতো। সম্ভবত হাজার হাজার বছর পূর্বে এটা এক উর্বর অঞ্চল ছিল। পরে আবহাওয়ার পরিবর্তন একে মরুভূমিতে পরিণত করেছে। বর্তমানে এটা সৌদী আরবের আর-রুবউল খালীর মরু এলাকায় অবস্থিত। যার আভ্যন্তরীণ এলাকায় যাওয়ার সাহসও কারো নেই।
আল-আহকাফ 46:22
তারা বলেছিল, ‘তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্যগুলো থেকে নিবৃত্ত করতে এসেছ? তুমি যদি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাক তবে আমাদেরকে যার ওয়াদা করছ তা নিয়ে আস।’
আল-আহকাফ 46:23
তিনি বললেন, ‘এ জ্ঞান তো শুধু আল্লাহ্রই কাছে। আর আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি শুধু তা-ই তোমাদের কাছে প্রচার করি, কিন্তু আমি দেখছি, তোমারা এক মূর্খ সম্প্রদায়।
আল-আহকাফ 46:24
‘অতঃপর যখন তারা তাদের উপত্যকার দিকে মেঘ আসতে দেখল তখন বলতে লাগল, ‘এ তো মেঘ আমাদেরকে বৃষ্টি দান করবে।’ না, বরং এটাই তো তা, যা তোমারা ত্বারান্বিত করতে চেয়েছ, এক ঝড়, এতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
আল-আহকাফ 46:25
‘এটা তার রবের নির্দেশে সব কিছুকে ধবংস করে দেবে।’ অতঃপর তাদের পরিণাম এ হল যে, তাদের বসতিগুলো ছাড়া আর কিছুই দেখা গেল না। এভাবে আমরা অপরাধী সম্পপ্রদায়কে প্রতিফল দিয়ে থাকি।
আল-আহকাফ 46:26
আর অবশ্যই আমারা তাদেরকে যেভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম তোমাদেরকে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত করিনি [১] ; আর আমারা তাদেরকে দিয়েছিলাম কান, চোখ ও হৃদয় ; অতঃপর তাদের কান, চোখ ও হৃদয় তাদের কোন কাজে আসেনি ; যখন তারা আল্লাহ্র আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল। আর যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত, তা-ই তাদেরকে পরিবেষ্টন করল।
[১] অর্থাৎ অর্থ, সম্পদ, শক্তি, ক্ষমতা কোন বিষয়েই তোমাদের ও তাদের মধ্যে কোন তুলনা হয় না। তোমাদের ক্ষমতার ব্যাপ্তি মক্কা শহরের বাইরে কোথাও নেই। কিন্তু তারা পৃথিবীর একটি বড় অংশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিলো [দেখুন, তাবারী]
আল-আহকাফ 46:27
আর অবশ্যই আমরা ধ্বংস করেছিলাম তোমাদের চারপাশের জনপদসমূহ ; এবং আমরা বিভিন্নভাবে আয়াতসমূহ বিবৃত করেছিলাম,যাতে তারা ফিরে আসে।
আল-আহকাফ 46:28
অতঃপর তারা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য আল্লাহ্র পরিবর্তে যাদেরকে ইলাহরূপে গ্ৰহণ করেছিল তারা তাদেরকে সাহায্য করল না কেন? বরং তাদের ইলাহগুলো তাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেল। আর এটা ছিল তাদের মিথ্যাচার ; এবং যা তারা অলীক উদ্ভাবন করছিল।
আল-আহকাফ 46:29
আর স্মরণ করুন, যখন আমরা আপনার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম জিনদের একটি দলকে [১], যারা মনোযোগসহকারে কুররান পাঠ শুনছিল। অতঃপর যখন তারা তার কাছে উপস্থিত হল, তারা বলল, ‘চুপ করে শুন।’ অতঃপর যখন কুরআন পাঠ সমাপ্ত হল তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল সতর্ককারীরূপে।
[১] মক্কার কাফেরদেরকে শোনানোর জন্যে পূর্বেকার আয়াতসমূহে কুফার ও অহংকারের নিন্দা ও ধ্বংসকারিতা বর্ণিত হয়েছে। আলোচ্য আয়াতসমূহে তাদেরকে লজ্জা দেয়ার উদ্দেশ্যে জিনদের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, জিনরা কার ও গর্বে তোমাদের চেয়েও বেশি, কিন্তু কুরআন শুনে তাদের অন্তরও বিগলিত হয়ে গেছে এবং ইসলাম গ্ৰহণ করেছে। তোমাদেরকে আল্লাহ তা’আলা জিনদের চেয়ে বেশি জ্ঞান-বুদ্ধি ও চেতনা দান করেছেন; কিন্তু তোমরা ইসলাম গ্রহণ করছ না।
জিনদের কুরআন শ্রবণ ও ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সহীহ হাদীসসমূহে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়াত লাভের পর থেকে জিন জাতিকে আকাশের সংবাদ সংগ্রহ থেকে নিবৃত্ত রাখা হয়। সেমতে তাদের কেউ সংবাদ শোনার মানসে উপরে গেলে তাকে উল্কাপিণ্ড নিক্ষেপ করে বিতাড়িত করা হত। জিনরা এই নতুন পরিস্থিতির কারণ উদঘাটনে সচেষ্ট হল এবং তাদের বিভিন্ন দল কারণ অনুসন্ধানে পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে কয়েকজন সাথীসহ ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন সাহাবীসহ বাতনে নাখলা নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। তাঁর ওকায বাজারে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। আরবরা আমাদের যুগের প্রদর্শনীর মত বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ বিশেষ দিনে মেলার আয়োজন করত। এসব মেলায় বহুলোক উপস্থিত থাকত, দোকান খোলা হত এবং সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হত। ওকায নামক স্থানে প্রতি বছর এমনি ধরনের এক মেলা বসত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্ভবতঃ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সেখানে গমন করছিলেন। নাখলা নামক স্থানে তিনি যখন ফজরের সালাতে কুরআন পাঠ করছিলেন, তখন জিনদের অনুসন্ধানী দলটি সেখানে দিয়ে পৌছল। তারা কুরআন পাঠ শুনে বলতে লাগল, এই সে নতুন ঘটনা, যার কারণে আমাদেরকে আকাশের সংবাদ সংগ্রহে নিবৃত্ত করা হয়েছে। [বুখারী: ৭৭৩, মুসলিম: ৪৪৯, তিরমিয়ী: ৩৩২৩, নাসায়ী: আল- কুবরা ১১৬৪]
অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, জিনরা সেখানে পৌঁছে পরস্পর বলতে লাগল, চুপ করে কুরআন শুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাত শেষ করলে জিনরা ইসলামের সত্যতায় বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের সম্পপ্রদায়ের কাছে ফিরে গেল এবং তদন্তকার্যের রিপোর্ট পেশ করে একথাও বলল, আমরা মুসলিম হয়ে গেছি। তোমাদেরও ইসলাম গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরা জিন অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এই জিনদের গমনাগমন এবং তাদের কুরআন পাঠ শুনে ইসলাম গ্রহণের বিষয় কিছুই জানতেন না। সূরা জিনে আল্লাহ তা'আলা তাকে এ বিষয়ে অবহিত করেন। আরও এক বর্ণনায় আছে, নসীবাঈন নামক স্থানের অধিবাসী এই জিনদের সংখ্যা ছিল নয় অথবা সাত। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৪৫৬]
অন্যান্য হাদীসে জিনদের আগমনের ঘটনা অন্যভাবেও ব্যক্ত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে একাধিক ঘটনা বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত হওয়ার কারণে এসব বর্ণনায় কোন বৈপরীত্য নেই। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, জিনরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে বার বার আগমন করেছে। খাফফায়ী বলেন, সবগুলো হাদীস একত্রিত করলে দেখা যায় যে, জিনদের আগমনের ঘটনা ছয় বার সংঘটিত হয়েছে।
আল-আহকাফ 46:30
তারা বলেছিল, ‘হে আমাদের সম্প্রদায় ! নিশ্চয় আমারা এমন এক কিতাবের পাঠ শুনেছি যা নাযিল হয়েছে মূসার পরে, এটা তার সম্মুখস্থ কিতাবকে সত্যায়ন করে এবং সত্য ও সরল পথের দিকে হেদায়াত করে।
আল-আহকাফ 46:31
‘হে আমাদের সম্প্রদায়! আল্লাহর দিকে আহবানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তাঁর উপর ঈমান আন, তিনি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন [১] এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে তোমাদেরকে রক্ষা করবেন।’
[১] يَغْفِرْلِكُمْ مِّنْ ذُذُوْبِكُمْ এর من অব্যয়টি আসলে ‘কোন কোন' এর অর্থ নির্দেশ করে। এখানে এই অর্থ নেয়া হলে বাক্যের ফায়দা এই হবে যে, ইসলাম গ্ৰহণ করলে কোন কোন গোনাহ মাফ হবে, অর্থাৎ আল্লাহর হক মাফ হবে-বান্দার হক মাফ হবে না। কেউ কেউ من অব্যয়টিকে বর্ণনাসূচক সাব্যস্ত করেছেন। এমতাবস্থায় এ ব্যাখ্যা নিস্প্রয়োজন। [জালালাইন, আইসারুততাফসীর]
আল-আহকাফ 46:32
আর যে আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর প্রতি সাড়া না দেয় তবে সে যমীনে আল্লাহ্কে অপারগকারী নয়। আর আল্লাহ ছাড়া তার কোন অভিভাবক নেই। তারাই সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।
আল-আহকাফ 46:33
আর তারা কি দেখে না যে, নিশ্চয় আল্লাহ্, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবন দান করতেও সক্ষম? অবশ্যই হ্যাঁ, নিশ্চয় তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
আল-আহকাফ 46:34
আর যারা কুফরী করেছে যেদিন তাদেরকে পেশ করা হবে জাহান্নামের আগুনের কাছে, (সেদিন তাদেরকে বলা হবে) ‘এটা কি সত্য নয়? ’ তারা বলবে, ‘আমাদের রবের শপথ ! অবশ্যই হ্যাঁ। তিনি বলবেন, ‘সুতরাং শাস্তি আস্বাদন কর ; কারণ তোমরা কুফরী করেছিলে।’
আল-আহকাফ 46:35
অতএব আপনি ধৈর্য ধারণ করুন যেমন ধৈর্য ধারণ করেছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ। আর আপনি তাদের জন্য তাড়াহুড়ো করবেন না। তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে তা যেদিন তারা দেখতে পাবে, সেদিন তাদের মনে হবে, তারা যেন দিনের এক দণ্ডের বেশী দুনিয়াতে অবস্থান করেনি। এ এক ঘোষণা, সুতরাং পাপাচারী সম্প্রদায়কেই কেবল ধ্বংস করা হবে।
মুহাম্মাদ 47:1
যারা কুফরী করেছে এবং অন্যকে আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত করেছে তিনি তাদের আমলসমূহ ব্যর্থ করে দিয়েছেন [১]।
সূরা মুহাম্মাদের অপর নাম সূরা কিতাল। কেননা, এতে “কিতাল” তথা জেহাদের বিধি-বিধান বর্ণিত হয়েছে। মদীনায় হিজরতের পরেই এই সূরা নাযিল হয়েছে। এমনকি, এর
وَكَاَيِّنْ فَرْيَةٍ هِىَ اَشَدُّ قُوَّةًمِّنْ قَرْيَتِكَ
আয়াত সম্পর্কে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে যে এটি মক্কায় অবতীর্ণ আয়াত। কেননা, এই আয়াতটি তখন নাযিল হয়েছিল, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে বের হয়েছিলেন এবং মক্কার জনবসতি ও বায়তুল্লাহর দিকে দৃষ্টিপাত করে বলেছিলেনঃ হে মক্কা নগরী। জগতের সমস্ত নগরের মধ্যে তুমিই আমার কাছে প্ৰিয়। যদি মক্কার অধিকাসীরা আমাকে এখান থেকে বহিষ্কার না করত, তবে আমি স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে কখনও তোমাকে ত্যাগ করতাম না। [তিরমিয়ী: ৩৮৬০] তফসীরবিদগণের পরিভাষায় যে আয়াত হিজরতের সফরে অবতীর্ণ হয়েছে, তাকে মক্কায় অবতীর্ণ আয়াত বলে অভিহিত করা হয়। মোটকথা এই যে, এই সূরা মদীনায় হিজরতের অব্যবহিত পরেই অবতীর্ণ হয়েছে এবং মদীনায় পৌঁছেই কাফেরদের সাথে জেহাদ ও যুদ্ধের বিধানাবলী নাযিল হয়েছে। [ফাতহুল কাদীরা]
[১] মূল আয়াতে اَضَلَّ اَءْمَالَهُمْ উল্লেখিত হয়েছে। অর্থাৎ তাদের কাজ-কর্মের বিপদ্গামী করে দিয়েছেন, পথভ্রষ্ট করে দিয়েছেন। [দেখুন-আয়সারুত-তাফসীর, ফাতহুল কাদীর]
মুহাম্মাদ 47:2
আর যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং মুহাম্মদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তাতে ঈমান এনেছে, আর তা-ই তাদের রবের পক্ষ হতে প্রেরিত সত্য, তিনি তাদের মন্দ কাজগুলো বিদূরিত করবেন এবং তাদের অবস্থা ভাল করবেন [১]।
[১] আয়াতে বর্ণিত بال শব্দটি কখনও অবস্থার অর্থে এবং কখনও অন্তরের অর্থে ব্যাবহৃত হয়। [ফাতহুল কাদীর, কুরতুবী]
মুহাম্মাদ 47:3
এটা এজন্যে যে, যারা কুফরী করেছে তারা বাতিলের অনুসরণ করেছে এবং যারা ঈমান এনেছে তারা তাদের রবের প্রেরিত সত্যের অনুসরণ করেছে। এভাবে আল্লাহ মানুষের জন্য তাদের দৃষ্টান্তসমূহ উপস্থাপন করেন [১]।
[১] আয়াতের অন্য অর্থ হচ্ছে, এভাবে আল্লাহ তা'আলা উভয় দলকে তাদের অবস্থান সঠিকভাবে বলে দেন। তাদের একদল বাতিলের অনুসরণ করতে বদ্ধপরিকর। তাই আল্লাহ তা'আলা তাদের সমস্ত চেষ্টা-সাধনাকে নিস্ফল করে দিয়েছেন। কিন্তু অপর দল ন্যায় ও সত্যের আনুগত্য গ্ৰহণ করেছে। তাই আল্লাহ তাদেরকে সমস্ত অকল্যাণ থেকে মুক্ত করে তাদের অবস্থা সংশোধন করে দিয়েছেন [দেখুন- কুরতুবী, ফাতহুলকাদীর, বাগভী]
মুহাম্মাদ 47:4
অতএব যখন তোমরা কাফিরদের সাথে যুদ্ধে মুকাবিলা কর তখন ঘাড়ে আঘাত কর, অবশেষে যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে মজবুতভাবে বাঁধ ; তারপর হয় অনুকম্পা, নয় মুক্তিপণ। যতক্ষণ না যুদ্ধ এর ভার (অস্ত্র) নামিয়ে না ফেলে। এরূপই, আর আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদের থেকে প্ৰতিশোধ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি চান তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট হতে দেন না।
মুহাম্মাদ 47:5
অচিরেই তিনি তাদেরকে পথনির্দেশ করবেন [১] এবং তাদের অবস্থা ভাল করে দিবেন।
[১] এখানে হেদায়াত করা বা পথপ্রদর্শনের অর্থ স্পষ্টত জান্নাতের দিকে পথপ্রদর্শন করা। [কুরতুবী]
মুহাম্মাদ 47:6
আর তিনি তাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পরিচয় তিনি তাদেরকে জানিয়েছিলেন [১]।
[১] রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: এই আল্লাহর কসম, যিনি আমাকে সত্য ধর্মসহ প্রেরণ করেছেন, তোমরা দুনিয়াতে যেমন তোমাদের স্ত্রী ও গৃহকে চিন, তার চাইতেও বেশী জান্নাতে তোমাদের স্থান ও স্ত্রীদেরকে চিনবে [বুখারী: ৬৫৩৫]
মুহাম্মাদ 47:7
হে মুমিনগণ ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা সমূহ সুদৃঢ় করবেন।
মুহাম্মাদ 47:8
আর যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য রয়েছে ধ্বংস এবং তিনি তাদের আমলসমূহ ব্যর্থ করে দিয়েছেন।
মুহাম্মাদ 47:9
এটা এজন্যে যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তারা তা অপছন্দ করেছে। কাজেই তিনি তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন।
মুহাম্মাদ 47:10
তবে কি তারা যমীনে ভ্ৰমণ করে দেখেনি তাদের পূর্ববতীদের পরিণাম কি হয়েছে? আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করেছেন। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে অনুরূপ পরিণাম।
মুহাম্মাদ 47:11
এটা এজন্যে যে, নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক এবং নিশ্চয় কাফিরদের কোন অভিভাবক নেই [১]।
[১] مولى শব্দটি অনেক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ অভিভাবক [মুয়াসসার, বাগভী] এখানে এই অর্থই বোঝানো হয়েছে। এর আরেক অর্থ মালিক। কুরআনের অন্যত্র কাফেরদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:
ثُمَّ رُدُّوا إِلَى اللَّهِ مَوْلَاهُمُ الْحَقِّ ۚ أَلَا لَهُ الْحُكْمُ وَهُوَ أَسْرَعُ الْحَاسِبِينَ
- ‘অতঃপর তাদেরকে (কাফেরদের) তাদের মাওলার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।' [সূরা আল-আন’আম: ৬২]
মুহাম্মাদ 47:12
নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে আল্লাহ তাদেরকে প্ৰবেশ করাবেন জান্নাতে যার নীচে নহরসমূহ প্রবাহিত ; কিন্তু যারা কুফরী করেছে তারা ভোগ বিলাস করে এবং খায় যেমন চতুষ্পদ জন্তুরা খায় [১] ; আর জাহান্নামই তাদের নিবাস।
[১] অর্থাৎ জীবজন্তু খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে কোনরূপ পরিমাণ-পরিমাপ মেনে চলে না। অনুরূপভাবে কাফেররাও খাদ্য-পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন নিয়মনীতির ধার ধারে না। দেখুন- [ফাতহুল কাদীর, কুরতুবী] তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুমিন এক খাদ্যনালীতে খাবার গ্রহণ করে পক্ষান্তরে কাফের যেন সাতটি খাদ্যনালীর মাধ্যমে খাবার গলধকরণ করে। [বুখারী: ৫৩৯৩]
মুহাম্মাদ 47:13
আর তারা আপনার যে জনপদ থেকে আপনাকে বিতাড়িত করেছে তার চেয়েও বেশী শক্তিশালী বহু জনপদ ছিল ; আমরা তাদেরকে ধ্বংস করেছি অতঃপর তাদের সাহায্যকারী কেউ ছিল না [১]।
[১] মক্কা ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনে বড় দুঃখ ছিল। তিনি যখন হিজরত করতে বাধ্য হলেন তখন শহরের বাইরে গিয়ে তিনি শহরের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “হে মক্কা ! আল্লাহর কাছে তুমি দুনিয়ার সব শহরের চেয়ে প্ৰিয়। আর আল্লাহর সমস্ত শহরের মধ্যে আমি তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসি। যদি মুশরিকরা আমাকে বের করে না দিতো তাহলে আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।” [মুসনাদে আহমাদ: ৪/৩০৫, তিরমিয়ী: ৩৯২৫, ইবন মাজাহঃ ৩১০৮]
মুহাম্মাদ 47:14
যে ব্যক্তি তার রব প্রেরিত সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত, সে কি তার ন্যায় যার কাছে নিজের মন্দ কাজগুলো শোভন করে দেয়া হয়েছে এবং যারা নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেছে?
মুহাম্মাদ 47:15
মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত : তাতে আছে নির্মল পানির নহরসমূহ, আছে দুধের নহরসমূহ যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহরসমূহ, আছে পরিশোধিত মধুর নহরসমূহ [১] এবং সেখানে তাদের জন্য থাকবে প্রত্যেক প্রকারের ফলমূল। আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা (মুত্তাকীরা) কি তাদের ন্যায় যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং যাদেরকে পান করানো হবে ফুটন্ত পানি, ফলে তা তাদের নাড়ীভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিবে?
[১] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে রয়েছে পানির সাগর, মধুর সাগর, দুধের সাগর এবং মদের সাগর। তারপর সেগুলো থেকে আরো নালাসমূহ প্রবাহিত করা হবে। [তিরমিয়ী: ২৫৭১]
মুহাম্মাদ 47:16
আর তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক আপনার কথা মনোযোগের সাথে শুনে, অবশেষে আপনার কাছ থেকে বের হয়ে যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত তাদেরকে বলে, ‘এ মাত্র সে কী বলল?’ এরাই তারা, যাদের অন্তরসমূহে আল্লাহ মোহর করে দিয়েছেন এবং তারা অনুসরণ করেছে নিজেদের খেয়াল-খুশীর।
মুহাম্মাদ 47:17
আর যারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছে আল্লাহ তাদের হিদায়াত বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে তাদের তাকওয়া প্ৰদান করেন [১]।
[১] অর্থাৎ তারা নিজেরদের মধ্যে যে তাকওয়ার যোগ্যতা সৃষ্টি করে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সে তাওফীকই দান করেন। [দেখুন-ফাতহুল কাদীর]
মুহাম্মাদ 47:18
সুতরাং তারা কি শুধু এজন্যে অপেক্ষা করছে যে, কিয়ামত তাদের কাছে এসে পড়ুক আকস্মিকভাবে? কিয়ামতের লক্ষণসমূহ [১] তো এসেই পড়েছে ! অতঃপর কিয়ামত এসে পড়লে তারা উপদেশ গ্ৰহণ করবে কেমন করে!
[১] মূলে أَشْرَاطٌ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এ শব্দের অর্থ আলামত বা লক্ষণ। এখানে কেয়ামতের প্রাথমিক আলামতসমূহ উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত হচ্ছে আল্লাহর শেষ নবীর আগমন যার পরে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী আসবে না। হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুলি উঠিয়ে বললেন, “আমার আগমন ও কিয়ামত এ দু অঙ্গুলির মত।” [বুখারী: ৬৫০৩, মুসলিম: ২৯৫০, মুসনাদে আহমাদ: ৫/৩৮৮]
মুহাম্মাদ 47:19
কাজেই জেনে রাখুন যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই [১]। আর ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার ও মুমিন নর-নারীদের ক্রটির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্পর্কে অবগত রয়েছেন।
[১] আলোচ্য আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে: আপনি জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়। [তবারী, মুয়াসসার]
মুহাম্মাদ 47:20
আর যারা ঈমান এনেছে তারা বলে, ‘একটি সূরা নাযিল হয় না কেন?’ অতঃপর যদি ‘মুহকাম’ [১] কোন সূরা নাযিল হয় এবং তাতে যুদ্ধের কোন নির্দেশ থাকে আপনি দেখবেন যাদের অন্তরে রোগ আছে তারা মৃত্যুভয়ে বিহ্বল মানুষের মত আপনার দিকে তাকাচ্ছে [২]। সুতরাং তাদের জন্য উত্তম হতো---
[১] কাতাদাহ রাহেমাহুল্লাহ বলেন: যেসব সূরায় যুদ্ধ ও জেহাদের বিধানাবলী বিধৃত হয়েছে, সেগুলো সব মুহকমাহ তথা অরহিত। [কুরতুবী]
[২] তাদের এ অবস্থা অন্যত্র এভাবে বর্ণনা করা হয়েছেঃ “আপনি কি সে লোকদের দেখেছেন যাদের বলা হয়েছিলো, নিজের হাতকে সংযত রাখো, সালাত কায়েম করো এবং যাকাত দাও। এখন তাদেরকে যখন যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তখন তাদের এক দলের অবস্থা এই যে, মানুষকে এমন ভয় পাচ্ছে যে ভয় আল্লাহকে করা উচিত। বরং তার চেয়েও বেশী ভয় পাচ্ছে। তারা বলছে, হে আমাদের রব ! আমাদেরকে যুদ্ধের এ নির্দেশ কেন দিলে? আমাদেরকে আরো কিছু অবকাশ দিলে না কেন? [সূরা আন-নিসাঃ ৭৭]
মুহাম্মাদ 47:21
আনুগত্য ও ন্যায়সংগত বাক্য ; অতঃপর চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে যদি তারা আল্লাহ্র প্রতি প্রদত্ত অঙ্গিকার সত্যে পরিণত করত তবে তাদের জন্য তা অবশ্যই কল্যাণকর হত।
মুহাম্মাদ 47:22
সুতরাং অবাধ্য হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলে সম্ভবত তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্নীয়তার বন্ধন [১] ছিন্ন করবে।
[১] أرْحَامٌ শব্দটি رِحْمٌ এর বহুবচন। এর অর্থ জননীর গর্ভাশয়। সাধারণ সম্পর্ক ও আত্মীয়তার ভিত্তি সেখান থেকেই সুচিত হয়, তাই বাকপদ্ধতিতে رِحْمٌ শব্দটি আত্মীয়তা ও সম্পর্কের অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইসলাম আর্তীয়তার হক আদায় করার জন্যে খুবই তাকীদ করেছে। হাদীসে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা’আলা বলেন, যে ব্যক্তি আত্মীয়তা বজায় রাখবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে নৈকট্য দান করবেন এবং যে ব্যক্তি আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ছিন্ন করবেন। [বুখারী: ৫৫২৯]
আত্মীয় ও সম্পর্কশীলদের সাথে কথায়, কর্মে ও অর্থ ব্যয়ে সহৃদয় ব্যবহার করার জোর নির্দেশ আছে। অন্য এক হাদীসে আছে, আল্লাহ তা'আলা যেসব গোনাহের শাস্তি দুনিয়াতেও দেন এবং আখেরাতেও দেন, সেগুলোর মধ্যে নিপীড়ন ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার সমান কোন গোনাহ নেই। [ইবনে মাজাহঃ ৪২১১]
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন: যে ব্যক্তি আয়ুবৃদ্ধি ও রুযী রোযগারে বরকত কামনা করে সে যেন আত্মীয়তার সাথে সহৃদয় ব্যবহার করে। [মুসনাদে আহমাদ ৫/২৭৯] সহীহ হাদীসসমূহে আরও বলা হয়েছে যে, আত্মীয়তার অধিকারের ক্ষেত্রে অপরপক্ষ থেকে সদ্ব্যবহার আশা করা উচিত নয়। যদি অপরপক্ষ সম্পর্ক ছিন্ন ও অসৌজন্যমূলক ব্যবহারও করে, তবুও তার সাথে তোমার সদ্ব্যবহার করা উচিত। এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ সে ব্যক্তি আত্নীয়ের সাথে সদ্ব্যবহারকারী নয় যে কোন প্রতিদানের সমান সদ্ব্যবহার করে; বরং সেই সদ্ব্যবহারকারী, যে অপরপক্ষ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করলেও সদ্ব্যবহার অব্যাহত রাখে। [বুখারী: ৫৫৩২]
মুহাম্মাদ 47:23
এরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ লা'নত করেছেন, ফলে তিনি তাদের বধির করেন এবং তাদের দৃষ্টিসমূহকে অন্ধ করেন।
মুহাম্মাদ 47:24
তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা রয়েছে?
মুহাম্মাদ 47:25
নিশ্চয় যারা নিজেদের কাছে সৎপথ স্পষ্ট হওয়ার পর তা থেকে পৃষ্ঠপ্ৰদৰ্শন করে, শয়তান তাদের কাজকে শোভন করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়।
মুহাম্মাদ 47:26
এটা এজন্যে যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তা যারা অপছন্দ করে তাদেরকে ওরা বলে, ‘অচিরেই আমরা কোন কোন বিষয়ে তোমাদের আনুগত্য করব।’ আর আল্লাহ জানেন তাদের গোপন অভিসন্ধিসমূহ।
মুহাম্মাদ 47:27
সুতরাং কেমন হবে তাদের দশা ! যখন ফেরেশতারা তাদের চেহারা ও পৃষ্ঠাদেশে আঘাত করতে করতে প্ৰাণ হরণ করবে।
মুহাম্মাদ 47:28
এটা এজন্যে যে, তারা এমন সব বিষয় অনুসরণ করেছে যা আল্লাহর অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে এবং তারা তাঁর সন্তুষ্টিকে অপছন্দ করেছে ; সুতরাং তিনি তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন।
মুহাম্মাদ 47:29
নাকি যাদের অন্তরে রোগ আছে তারা মনে করে যে, আল্লাহ কখনো তাদের বিদ্বেষভাব প্ৰকাশ করে দেবেন না [১]?
[১] أضغان শব্দটি صغن এর বহুবচন। এর অর্থ গোপন শক্রতা ও বিদ্বেষ। [বাগভী, ফাতহুল কাদীর]
মুহাম্মাদ 47:30
আর আমরা ইচ্ছে করলে আপনাকে তাদের পরিচয় দিতাম ; ফলে আপনি তাদের লক্ষণ দেখে তাদেরকে চিনতে পারতেন। তবে আপনি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবেন। আর আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় আমল সম্পর্কে জানেন।
মুহাম্মাদ 47:31
আর আমারা অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব, যতক্ষণ না আমরা জেনে নেই তোমাদের মধ্যে জিহাদকারী ও ধৈর্যশীলদেরকে এবং আমরা তোমাদের কর্মকাণ্ড পরীক্ষা করি।
মুহাম্মাদ 47:32
নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে, মানুষকে আল্লাহ্র পথ থেকে নিবৃত্ত করেছে এবং নিজেদের কাছে হিদায়াত সুস্পষ্ট হওয়ার পর রাসূলের বিরোধিতা করেছে, তারা আল্লাহ্র কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। আর অচিরেই তিনি তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল করে দেবেন।
মুহাম্মাদ 47:33
হে মুমিনগণ ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর, আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করো না।
মুহাম্মাদ 47:34
নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে নিবৃত্ত করেছে, তারপর কাফির অবস্থায় মারা গেছে, আল্লাহ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না।
মুহাম্মাদ 47:35
কাজেই তোমরা হীনবল হয়ো না এবং সন্ধির প্রস্তাব করো না [১], যখন তোমরা প্রবল ; আর আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে আছেন [২] এবং তিনি তোমাদের কর্মফল কখনো ক্ষুণ্ন করবেন না [৩]।
[১] এ আয়াতে কাফেরদেরকে সন্ধির আহবান জানাতে নিষেধ করা হয়েছে [বাগভী] কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে
وَإِن جَنَحُوا لِلسَّلْمِ فَاجْنَحْ لَهَا
অর্থাৎ কাফেররা যদি সন্ধির দিকে ঝুকে পড়ে, তবে আপনিও বুকে পড়ুন। [সূরা আল-আনফাল: ৬১]
[২] এখানে সঙ্গে থাকার অর্থ, সাহায্য-সহযোগিতা ও জ্ঞানে সাথে থাকা। নতুবা আল্লাহ তাঁর আরাশের উপরই রয়েছেন।
[৩] অর্থাৎ যখন তোমাদের মধ্যে তিনটি গুণ থাকবে তখন তোমাদের জন্য হীনবল হওয়া, কাফেরদের সাথে সন্ধি করা উচিত হবেনা। আর সে গুণ তিনটি হলো, ১. যখন তোমাদের এ ঈমান থাকবে যে, তোমরা কাফেরদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং তোমরা কাফেরদের উপর প্রবল, ২. আল্লাহ সাহায্য-সহযোগিতাকারী হিসেবে তোমাদের সাথে আছেন বলে তোমাদের ঈমান থাকবে, ৩. আর আল্লাহ তোমাদের কোন কাজের প্রতিদান দেয়ায় এতটুকুও কমতি করবেন না। [দেখুন- তবারী, বাগভী, ফাতহুল কাদীর]
মুহাম্মাদ 47:36
দুনিয়ার জীবন তো শুধু খেল-তামাশা ও অর্থহীন কথাবার্তা। আর যদি তোমরা ঈমান আন এবং তাকওয়া অবলম্বন কর তবে আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের পুরস্কার দেবেন এবং তিনি তোমাদের ধন-সম্পদ চান না [১]।
[১] আয়াতে বাহ্যিক অর্থ এই যে, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের কাছে তোমাদের ধনসম্পদ চান না। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তোমাদের ধনসম্পদ তোমাদের কাছ থেকে নিজের কোন উপকারের জন্যে চান না ; বরং তোমাদেরই উপকারের জন্যে চান। এই আয়াতেও يُؤْتِكُمْ اُخْورَكُمْ শব্দ দ্বারা এই উপকারের উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ তোমাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করার জন্যে বলার কারণ এই যে, তোমরা সওয়াবের প্রতি সর্বাধিক মুখাপেক্ষী হবে। তখন এই ব্যয় তোমাদেরই কাজে লাগবে এবং সেখানে তোমাদেরকে এর প্রতিদান দেয়া হবে। এর নজীর হচ্ছে এই আয়াত:
مَٓااُرِيْدُمِنْحُم مِّنْ رِّزْقٍ
অর্থাৎ আল্লাহ বলেন: আমি তাদের কাছে নিজের জন্যে কোন জীবনোপকরণ চাই না। আমার এর প্রয়োজনও নেই। [দেখুন-ইবন কাসীর, বাগভী, কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]
মুহাম্মাদ 47:37
তোমাদের কাছ থেকে তিনি তা চাইলে ও তার জন্য তোমাদের উপর চাপ দিলে তোমারা তো কার্পণ্য করবে এবং তখন তিনি তোমাদের বিদ্বেষভাব প্রকাশ করে দেবেন [১]।
[১] আয়াতের সারমর্ম এই যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তোমাদের কাছে সমস্ত ধন-সম্পদ চাইতেন, তবে তোমারা কার্পণ্য করতে। কৃপণতার কারণে যে অপ্রিয়ভাব তোমাদের অন্তরে থাকত, তা অবশ্যই প্ৰকাশ হয়ে পড়ত। তাই তিনি তোমাদের ধন-সম্পদের মধ্য থেকে সামান্য একটি অংশ তোমাদের উপর ফরয করেছেন। কিন্তু তোমরা তাতেও কৃপণতা শুরু করেছ। [ফাতহুল কাদীর, মুয়াসসার]
মুহাম্মাদ 47:38
দেখ, তোমারাই তো তারা যাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে বলা হচ্ছে অথচ তোমাদের কেউ কেউ কার্পণ্য করছে। তবে যে কার্পণ্য করছে সে তো কার্পণ্য করছে নিজেরই প্রতি [১]। আর আলাহ অভাবমুক্ত এবং তোমারা অভাবগ্রস্ত। আর যদি তোমারা বিমুখ হও, তবে তিনি তোমাদের ছাড়া অন্য সম্প্রদায়কে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন; তারপর তারা তোমাদের মত হবে না [২]।
[১] অর্থাৎ তোমাদেরকে তোমাদের ধন-সম্পদের কিছু অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করার দাওয়াত দেয়া হলে তোমাদের কেউ কেউ এতে কৃপণতা করে। যে ব্যক্তি এতেও কৃপণতা করে, সে আল্লাহর কোন ক্ষতি করে না; বরং এর মাধ্যমে সে নিজেরই ক্ষতি করে। [ফাতহুল কাদীর, সাদী]
[১] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সাহাবায়ে কেরামের সামনে এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন, তখন তারা বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ, তারা কোন জাতি, যাদেরকে আমাদের স্থলে আনা হবে, অতঃপর আমাদের মত শরীয়তের বিধানাবলীর প্রতি বিমুখ হবে না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মজলিসে উপস্থিত সালমান ফারেসী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর উরুতে হাত মেরে বললেন: সে এবং তার জাতি। যদি সত্য দ্বীন সপ্তর্ষিমণ্ডলস্থ নক্ষত্রেও থাকত, (যেখানে মানুষ পৌঁছতে পারে না)। তবে পারস্যের কিছু সংখ্যক লোক সেখানেও পৌঁছে সত্যদ্বান হাসিল করতো এবং তা মেনে চলত। [হিব্বান: ৭১২৩, তিরমিয়ী: ৩২৬০, ৩২৬১]
এখানে এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণীর উদ্দেশ্য হচ্ছে, যদি কোন সম্প্রদায় আল্লাহর দ্বীন থেকে, রাসূলের সুন্নাত থেকে দূরে সরে যায়, রাসূলের দ্বীনের সাহায্য করতে পিছপা হয়, তবে আল্লাহ তাদের পরিবর্তে অন্য কাউকে এর স্থলাভিষিক্ত করবেন, তারা হতে পারে আরব, হতে পারে অনারব, হতে পারে কাছে কিংবা দূরের কোন জাতি। ইতিহাস থেকে প্রমাণিত যে আল্লাহ তা’আলা বিভিন্ন জাতির মাধ্যমে তাঁর দ্বীনের জন্য এ খেদমত নিয়েছেন। তারা সবাই পারস্য কিংবা কোন সুনির্দিষ্ট এক জাতি ছিল না। পারস্যের লোকদের মধ্য থেকে যারা এ কাজের আঞ্জাম দিয়েছেন তাদের মধ্যে বিখ্যাত হচ্ছেন, ইমাম বুখারী, তিরমিয়ী, ইবন মাজাহ, নাসায়ী সহ আরও অনেকে। তারা সবাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অনুসারী ছিলেন। এ ব্যাপারে শী'আ, রাফেয়ী, মু'তাযিলা কিংবা খারেজীদের কোন সামান্যতমও খেদমত ছিল না। বরং তাদের মতবাদ খণ্ডন করতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের যে সমস্ত ইমাম পরিশ্রম করেছেন এ আয়াত তাদেরকেও শামিল করে।