Tafsir Abu Bakr Zakaria — আল-মুদ্দাসসির 74:1 – আল-বুরূজ 85:22
Contents
- আল-মুদ্দাসসির 74:1
- আল-মুদ্দাসসির 74:2
- আল-মুদ্দাসসির 74:3
- আল-মুদ্দাসসির 74:4
- আল-মুদ্দাসসির 74:5
- আল-মুদ্দাসসির 74:6
- আল-মুদ্দাসসির 74:7
- আল-মুদ্দাসসির 74:8
- আল-মুদ্দাসসির 74:9
- আল-মুদ্দাসসির 74:10
- আল-মুদ্দাসসির 74:11
- আল-মুদ্দাসসির 74:12
- আল-মুদ্দাসসির 74:13
- আল-মুদ্দাসসির 74:14
- আল-মুদ্দাসসির 74:15
- আল-মুদ্দাসসির 74:16
- আল-মুদ্দাসসির 74:17
- আল-মুদ্দাসসির 74:18
- আল-মুদ্দাসসির 74:19
- আল-মুদ্দাসসির 74:20
- আল-মুদ্দাসসির 74:21
- আল-মুদ্দাসসির 74:22
- আল-মুদ্দাসসির 74:23
- আল-মুদ্দাসসির 74:24
- আল-মুদ্দাসসির 74:25
- আল-মুদ্দাসসির 74:26
- আল-মুদ্দাসসির 74:27
- আল-মুদ্দাসসির 74:28
- আল-মুদ্দাসসির 74:29
- আল-মুদ্দাসসির 74:30
- আল-মুদ্দাসসির 74:31
- আল-মুদ্দাসসির 74:32
- আল-মুদ্দাসসির 74:33
- আল-মুদ্দাসসির 74:34
- আল-মুদ্দাসসির 74:35
- আল-মুদ্দাসসির 74:36
- আল-মুদ্দাসসির 74:37
- আল-মুদ্দাসসির 74:38
- আল-মুদ্দাসসির 74:39
- আল-মুদ্দাসসির 74:40
- আল-মুদ্দাসসির 74:41
- আল-মুদ্দাসসির 74:42
- আল-মুদ্দাসসির 74:43
- আল-মুদ্দাসসির 74:44
- আল-মুদ্দাসসির 74:45
- আল-মুদ্দাসসির 74:46
- আল-মুদ্দাসসির 74:47
- আল-মুদ্দাসসির 74:48
- আল-মুদ্দাসসির 74:49
- আল-মুদ্দাসসির 74:50
- আল-মুদ্দাসসির 74:51
- আল-মুদ্দাসসির 74:52
- আল-মুদ্দাসসির 74:53
- আল-মুদ্দাসসির 74:54
- আল-মুদ্দাসসির 74:55
- আল-মুদ্দাসসির 74:56
- আল-কিয়ামা 75:1
- আল-কিয়ামা 75:2
- আল-কিয়ামা 75:3
- আল-কিয়ামা 75:4
- আল-কিয়ামা 75:5
- আল-কিয়ামা 75:6
- আল-কিয়ামা 75:7
- আল-কিয়ামা 75:8
- আল-কিয়ামা 75:9
- আল-কিয়ামা 75:10
- আল-কিয়ামা 75:11
- আল-কিয়ামা 75:12
- আল-কিয়ামা 75:13
- আল-কিয়ামা 75:14
- আল-কিয়ামা 75:15
- আল-কিয়ামা 75:16
- আল-কিয়ামা 75:17
- আল-কিয়ামা 75:18
- আল-কিয়ামা 75:19
- আল-কিয়ামা 75:20
- আল-কিয়ামা 75:21
- আল-কিয়ামা 75:22
- আল-কিয়ামা 75:23
- আল-কিয়ামা 75:24
- আল-কিয়ামা 75:25
- আল-কিয়ামা 75:26
- আল-কিয়ামা 75:27
- আল-কিয়ামা 75:28
- আল-কিয়ামা 75:29
- আল-কিয়ামা 75:30
- আল-কিয়ামা 75:31
- আল-কিয়ামা 75:32
- আল-কিয়ামা 75:33
- আল-কিয়ামা 75:34
- আল-কিয়ামা 75:35
- আল-কিয়ামা 75:36
- আল-কিয়ামা 75:37
- আল-কিয়ামা 75:38
- আল-কিয়ামা 75:39
- আল-কিয়ামা 75:40
- আল-ইনসান 76:1
- আল-ইনসান 76:2
- আল-ইনসান 76:3
- আল-ইনসান 76:4
- আল-ইনসান 76:5
- আল-ইনসান 76:6
- আল-ইনসান 76:7
- আল-ইনসান 76:8
- আল-ইনসান 76:9
- আল-ইনসান 76:10
- আল-ইনসান 76:11
- আল-ইনসান 76:12
- আল-ইনসান 76:13
- আল-ইনসান 76:14
- আল-ইনসান 76:15
- আল-ইনসান 76:16
- আল-ইনসান 76:17
- আল-ইনসান 76:18
- আল-ইনসান 76:19
- আল-ইনসান 76:20
- আল-ইনসান 76:21
- আল-ইনসান 76:22
- আল-ইনসান 76:23
- আল-ইনসান 76:24
- আল-ইনসান 76:25
- আল-ইনসান 76:26
- আল-ইনসান 76:27
- আল-ইনসান 76:28
- আল-ইনসান 76:29
- আল-ইনসান 76:30
- আল-ইনসান 76:31
- আল-মুরসালাত 77:1
- আল-মুরসালাত 77:2
- আল-মুরসালাত 77:3
- আল-মুরসালাত 77:4
- আল-মুরসালাত 77:5
- আল-মুরসালাত 77:6
- আল-মুরসালাত 77:7
- আল-মুরসালাত 77:8
- আল-মুরসালাত 77:9
- আল-মুরসালাত 77:10
- আল-মুরসালাত 77:11
- আল-মুরসালাত 77:12
- আল-মুরসালাত 77:13
- আল-মুরসালাত 77:14
- আল-মুরসালাত 77:15
- আল-মুরসালাত 77:16
- আল-মুরসালাত 77:17
- আল-মুরসালাত 77:18
- আল-মুরসালাত 77:19
- আল-মুরসালাত 77:20
- আল-মুরসালাত 77:21
- আল-মুরসালাত 77:22
- আল-মুরসালাত 77:23
- আল-মুরসালাত 77:24
- আল-মুরসালাত 77:25
- আল-মুরসালাত 77:26
- আল-মুরসালাত 77:27
- আল-মুরসালাত 77:28
- আল-মুরসালাত 77:29
- আল-মুরসালাত 77:30
- আল-মুরসালাত 77:31
- আল-মুরসালাত 77:32
- আল-মুরসালাত 77:33
- আল-মুরসালাত 77:34
- আল-মুরসালাত 77:35
- আল-মুরসালাত 77:36
- আল-মুরসালাত 77:37
- আল-মুরসালাত 77:38
- আল-মুরসালাত 77:39
- আল-মুরসালাত 77:40
- আল-মুরসালাত 77:41
- আল-মুরসালাত 77:42
- আল-মুরসালাত 77:43
- আল-মুরসালাত 77:44
- আল-মুরসালাত 77:45
- আল-মুরসালাত 77:46
- আল-মুরসালাত 77:47
- আল-মুরসালাত 77:48
- আল-মুরসালাত 77:49
- আল-মুরসালাত 77:50
- আন-নাবা 78:1
- আন-নাবা 78:2
- আন-নাবা 78:3
- আন-নাবা 78:4
- আন-নাবা 78:5
- আন-নাবা 78:6
- আন-নাবা 78:7
- আন-নাবা 78:8
- আন-নাবা 78:9
- আন-নাবা 78:10
- আন-নাবা 78:11
- আন-নাবা 78:12
- আন-নাবা 78:13
- আন-নাবা 78:14
- আন-নাবা 78:15
- আন-নাবা 78:16
- আন-নাবা 78:17
- আন-নাবা 78:18
- আন-নাবা 78:19
- আন-নাবা 78:20
- আন-নাবা 78:21
- আন-নাবা 78:22
- আন-নাবা 78:23
- আন-নাবা 78:24
- আন-নাবা 78:25
- আন-নাবা 78:26
- আন-নাবা 78:27
- আন-নাবা 78:28
- আন-নাবা 78:29
- আন-নাবা 78:30
- আন-নাবা 78:31
- আন-নাবা 78:32
- আন-নাবা 78:33
- আন-নাবা 78:34
- আন-নাবা 78:35
- আন-নাবা 78:36
- আন-নাবা 78:37
- আন-নাবা 78:38
- আন-নাবা 78:39
- আন-নাবা 78:40
- আন-নাযিআত 79:1
- আন-নাযিআত 79:2
- আন-নাযিআত 79:3
- আন-নাযিআত 79:4
- আন-নাযিআত 79:5
- আন-নাযিআত 79:6
- আন-নাযিআত 79:7
- আন-নাযিআত 79:8
- আন-নাযিআত 79:9
- আন-নাযিআত 79:10
- আন-নাযিআত 79:11
- আন-নাযিআত 79:12
- আন-নাযিআত 79:13
- আন-নাযিআত 79:14
- আন-নাযিআত 79:15
- আন-নাযিআত 79:16
- আন-নাযিআত 79:17
- আন-নাযিআত 79:18
- আন-নাযিআত 79:19
- আন-নাযিআত 79:20
- আন-নাযিআত 79:21
- আন-নাযিআত 79:22
- আন-নাযিআত 79:23
- আন-নাযিআত 79:24
- আন-নাযিআত 79:25
- আন-নাযিআত 79:26
- আন-নাযিআত 79:27
- আন-নাযিআত 79:28
- আন-নাযিআত 79:29
- আন-নাযিআত 79:30
- আন-নাযিআত 79:31
- আন-নাযিআত 79:32
- আন-নাযিআত 79:33
- আন-নাযিআত 79:34
- আন-নাযিআত 79:35
- আন-নাযিআত 79:36
- আন-নাযিআত 79:37
- আন-নাযিআত 79:38
- আন-নাযিআত 79:39
- আন-নাযিআত 79:40
- আন-নাযিআত 79:41
- আন-নাযিআত 79:42
- আন-নাযিআত 79:43
- আন-নাযিআত 79:44
- আন-নাযিআত 79:45
- আন-নাযিআত 79:46
- আবাসা 80:1
- আবাসা 80:2
- আবাসা 80:3
- আবাসা 80:4
- আবাসা 80:5
- আবাসা 80:6
- আবাসা 80:7
- আবাসা 80:8
- আবাসা 80:9
- আবাসা 80:10
- আবাসা 80:11
- আবাসা 80:12
- আবাসা 80:13
- আবাসা 80:14
- আবাসা 80:15
- আবাসা 80:16
- আবাসা 80:17
- আবাসা 80:18
- আবাসা 80:19
- আবাসা 80:20
- আবাসা 80:21
- আবাসা 80:22
- আবাসা 80:23
- আবাসা 80:24
- আবাসা 80:25
- আবাসা 80:26
- আবাসা 80:27
- আবাসা 80:28
- আবাসা 80:29
- আবাসা 80:30
- আবাসা 80:31
- আবাসা 80:32
- আবাসা 80:33
- আবাসা 80:34
- আবাসা 80:35
- আবাসা 80:36
- আবাসা 80:37
- আবাসা 80:38
- আবাসা 80:39
- আবাসা 80:40
- আবাসা 80:41
- আবাসা 80:42
- আত-তাকভীর 81:1
- আত-তাকভীর 81:2
- আত-তাকভীর 81:3
- আত-তাকভীর 81:4
- আত-তাকভীর 81:5
- আত-তাকভীর 81:6
- আত-তাকভীর 81:7
- আত-তাকভীর 81:8
- আত-তাকভীর 81:9
- আত-তাকভীর 81:10
- আত-তাকভীর 81:11
- আত-তাকভীর 81:12
- আত-তাকভীর 81:13
- আত-তাকভীর 81:14
- আত-তাকভীর 81:15
- আত-তাকভীর 81:16
- আত-তাকভীর 81:17
- আত-তাকভীর 81:18
- আত-তাকভীর 81:19
- আত-তাকভীর 81:20
- আত-তাকভীর 81:21
- আত-তাকভীর 81:22
- আত-তাকভীর 81:23
- আত-তাকভীর 81:24
- আত-তাকভীর 81:25
- আত-তাকভীর 81:26
- আত-তাকভীর 81:27
- আত-তাকভীর 81:28
- আত-তাকভীর 81:29
- আল-ইনফিতার 82:1
- আল-ইনফিতার 82:2
- আল-ইনফিতার 82:3
- আল-ইনফিতার 82:4
- আল-ইনফিতার 82:5
- আল-ইনফিতার 82:6
- আল-ইনফিতার 82:7
- আল-ইনফিতার 82:8
- আল-ইনফিতার 82:9
- আল-ইনফিতার 82:10
- আল-ইনফিতার 82:11
- আল-ইনফিতার 82:12
- আল-ইনফিতার 82:13
- আল-ইনফিতার 82:14
- আল-ইনফিতার 82:15
- আল-ইনফিতার 82:16
- আল-ইনফিতার 82:17
- আল-ইনফিতার 82:18
- আল-ইনফিতার 82:19
- আল-মুতাফফিফীন 83:1
- আল-মুতাফফিফীন 83:2
- আল-মুতাফফিফীন 83:3
- আল-মুতাফফিফীন 83:4
- আল-মুতাফফিফীন 83:5
- আল-মুতাফফিফীন 83:6
- আল-মুতাফফিফীন 83:7
- আল-মুতাফফিফীন 83:8
- আল-মুতাফফিফীন 83:9
- আল-মুতাফফিফীন 83:10
- আল-মুতাফফিফীন 83:11
- আল-মুতাফফিফীন 83:12
- আল-মুতাফফিফীন 83:13
- আল-মুতাফফিফীন 83:14
- আল-মুতাফফিফীন 83:15
- আল-মুতাফফিফীন 83:16
- আল-মুতাফফিফীন 83:17
- আল-মুতাফফিফীন 83:18
- আল-মুতাফফিফীন 83:19
- আল-মুতাফফিফীন 83:20
- আল-মুতাফফিফীন 83:21
- আল-মুতাফফিফীন 83:22
- আল-মুতাফফিফীন 83:23
- আল-মুতাফফিফীন 83:24
- আল-মুতাফফিফীন 83:25
- আল-মুতাফফিফীন 83:26
- আল-মুতাফফিফীন 83:27
- আল-মুতাফফিফীন 83:28
- আল-মুতাফফিফীন 83:29
- আল-মুতাফফিফীন 83:30
- আল-মুতাফফিফীন 83:31
- আল-মুতাফফিফীন 83:32
- আল-মুতাফফিফীন 83:33
- আল-মুতাফফিফীন 83:34
- আল-মুতাফফিফীন 83:35
- আল-মুতাফফিফীন 83:36
- আল-ইনশিকাক 84:1
- আল-ইনশিকাক 84:2
- আল-ইনশিকাক 84:3
- আল-ইনশিকাক 84:4
- আল-ইনশিকাক 84:5
- আল-ইনশিকাক 84:6
- আল-ইনশিকাক 84:7
- আল-ইনশিকাক 84:8
- আল-ইনশিকাক 84:9
- আল-ইনশিকাক 84:10
- আল-ইনশিকাক 84:11
- আল-ইনশিকাক 84:12
- আল-ইনশিকাক 84:13
- আল-ইনশিকাক 84:14
- আল-ইনশিকাক 84:15
- আল-ইনশিকাক 84:16
- আল-ইনশিকাক 84:17
- আল-ইনশিকাক 84:18
- আল-ইনশিকাক 84:19
- আল-ইনশিকাক 84:20
- আল-ইনশিকাক 84:21
- আল-ইনশিকাক 84:22
- আল-ইনশিকাক 84:23
- আল-ইনশিকাক 84:24
- আল-ইনশিকাক 84:25
- আল-বুরূজ 85:1
- আল-বুরূজ 85:2
- আল-বুরূজ 85:3
- আল-বুরূজ 85:4
- আল-বুরূজ 85:5
- আল-বুরূজ 85:6
- আল-বুরূজ 85:7
- আল-বুরূজ 85:8
- আল-বুরূজ 85:9
- আল-বুরূজ 85:10
- আল-বুরূজ 85:11
- আল-বুরূজ 85:12
- আল-বুরূজ 85:13
- আল-বুরূজ 85:14
- আল-বুরূজ 85:15
- আল-বুরূজ 85:16
- আল-বুরূজ 85:17
- আল-বুরূজ 85:18
- আল-বুরূজ 85:19
- আল-বুরূজ 85:20
- আল-বুরূজ 85:21
- আল-বুরূজ 85:22
আল-মুদ্দাসসির 74:1
হে বস্ত্ৰাচ্ছাদিত! [১]
[১] সূরা আল-মুদ্দাস্সির সম্পূর্ণ প্রাথমিক যুগে অবতীর্ণ সূরাসমূহের অন্যতম। এ কারণেই কেউ কেউ একে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ সুরাও বলেছেন। কিন্তু সহীহ বৰ্ণনা অনুযায়ী সর্বপ্রথম সূরা আল-আলাকের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। [ইবন কাসীর]
________________________________________
সূরা সংক্রান্ত আলোচনাঃ
আয়াত সংখ্যাঃ ৫৬ আয়াত।
নাযিল হওয়ার স্থানঃ মক্কী।
রহমান, রহীম আল্লাহ্র নামে
[১] হাদীসে এসেছে, সর্ব প্রথম হেরা গিরি গুহায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ফেরেশতা জিবরাইল আগমন করে ইকরা সূরার প্রাথমিক আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনান। ফেরেশতার এই অবতরণ ও ওহীর তীব্ৰতা প্ৰথম পর্যায়ে ছিল। ফলে এর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদিজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার নিকট গমন করলেন এবং তার কাছে বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করলেন। এরপর বেশ কিছুদিন পর্যন্ত ওহীর আগমন বন্ধ থাকে। বিরতির এই সময়কালকে “ফ্যাতরাতুল ওহী” বলা হয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীসে এই সময়কালের উল্লেখ করে বলেন, একদিন আমি পথ চলা অবস্থায় হঠাৎ একটি আওয়াজ শুনে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, হেরা গিরিগুহার সেই ফেরেশতা আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে এক জায়গায় একটি ঝুলন্ত চেয়ারে উপবিষ্ট রয়েছেন। তাকে এই আকৃতিতে দেখে আমি প্রথম সাক্ষাতের ন্যায় আবার ভীত ও আতংকিত হয়ে পড়লাম। আমি গৃহে ফিরে এলাম এবং গৃহের লোকজনকে বললাম, আমাকে বস্ত্ৰাবৃত করে দাও। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য আয়াত নাযিল হল। [বুখারী: ৪, মুসলিম: ১৬১]
আল-মুদ্দাসসির 74:2
উঠুন, অতঃপর সতর্ক করুন, [১] ,
[১] এখানে সর্বপ্রথম নির্দেশ হচ্ছে, قُم অর্থাৎ উঠুন। এর আক্ষরিক অর্থ ‘দাঁড়ান’ও হতে পারে। অর্থাৎ আপনি বস্ত্ৰাচ্ছাদন পরিত্যাগ করে দন্ডায়মান হোন। এখানে কাজের জন্যে প্রস্তুত হওয়ার অর্থ নেয়াও অবান্তর নয়। উদ্দেশ্য এই যে, এখন আপনি সাহস করে জনশুদ্ধির দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হন। أنذر শব্দটি إنذار থেকে উদ্ভুত অর্থ সতর্ক করা। এখানে মক্কার কাফেরদেরকে সতর্ক করতে বলা হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর]
আল-মুদ্দাসসির 74:3
আর আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন।
আল-মুদ্দাসসির 74:4
আর আপনার পরিচ্ছদ পবিত্ৰ করুন [১] ,
[১] এখানে বর্ণিত ثياب শব্দটি ثوب এর বহুবচন। এর আসল ও আক্ষরিক অর্থ কাপড়। কখনও কখনও অন্তর, মন, চরিত্র ও কর্মকেও বলা হয়। এটি একটি ব্যাপক অৰ্থবোধক কথা। এর একটি অর্থ হল, আপনি আপনার পোশাক-পরিচ্ছদ নাপাক বস্তু থেকে পবিত্র রাখুন। কারণ শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদের পবিত্রতা এবং ‘রূহ’ বা আত্মার পবিত্ৰতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। [সা‘দী] একথাটির আরেকটি অর্থ হলো, নিজের পোশাক পরিচ্ছদ নৈতিক দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র রাখুন। নিজেকে পবিত্র রাখুন। অন্য কথায় এর অর্থ হলো নৈতিক দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র থাকা এবং উত্তম নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হওয়া। অর্থাৎ নিজের নৈতিক চরিত্রকে পবিত্র রাখুন এবং সব রকমের দোষ-ত্রুটি থেকে দূরে থাকুন। [কুরতুবী] সুতরাং নির্দেশের অর্থ হবে এই যে, আপন পোশাক ও দেহকে বাহ্যিক অপবিত্ৰতা থেকে পবিত্র রাখুন এবং অন্তর ও মনকে ভ্রান্ত বিশ্বাস ও চিন্তাধারা থেকে এবং কুচরিত্র থেকে মুক্ত রাখুন। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্রতা পছন্দ করেন। এক আয়াতে আছে,
اِنَّ اللهَ يُحِبُّ التَّوَّابِيْنَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِيْنَ [সূরা আল-বাকারাহ: ২২২]
ছাড়া হাদীসে ‘পবিত্রতাকে ঈমানের অর্ধাংশ’ [মুসলিম: ২২৩] বলা হয়েছে। তাই মুসলিমকে সর্বাবস্থায় শরীর, স্থান ও পোশাককে বাহ্যিক নাপাকী থেকে এবং অন্তরকে আভ্যন্তরীণ অশুচি, যেমন লোক-দেখানো, অহংকার ইত্যাদি থেকে পবিত্র রাখার প্রতি সচেষ্ট হতে হবে। [সা‘দী]
আল-মুদ্দাসসির 74:5
আর শির্ক পরিহার করে চলুন [১] ,
[১] আয়াতে উল্লেখিত الرجز শব্দের এক অর্থ, শাস্তি। অর্থাৎ শাস্তিযোগ্য কাজ। [ফাতহুল কাদীর]। এখানে এর অর্থ হতে পারে, পৌত্তলিকতা ও প্রতিমা পূজা। তাছাড়া সাধারণভাবে সকল গোনাহ ও অপরাধ বোঝানোর জন্যও শব্দটি ব্যবহৃত হতে পারে। তাই আয়াতের অর্থ এই যে, প্রতিমা পূজা, শাস্তিযোগ্য কর্মকাণ্ড অথবা গোনাহ্ পরিত্যাগ করুন। সকল প্রকার ছোট ও বড় অন্যায় ও গুনাহের কাজ পরিত্যাগ করুন । [সা’দী]
আল-মুদ্দাসসির 74:6
আর বেশী পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করবেন না [১]।
[১] এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হলো, আপনি যার প্রতিই ইহ্সান বা অনুগ্রহ করবেন, নিঃস্বাৰ্থভাবে করবেন। আপনার অনুগ্রহ ও বদান্যতা এবং দানশীলতা ও উত্তম আচরণ হবে একমাত্র আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে। ইহ্সান বা মহানুভবতার বিনিময়ে কোন প্রকার পার্থিব স্বাৰ্থ লাভের বিন্দুমাত্ৰ আকাঙ্খাও করবেন না; বেশি পাওয়ার আশায়ও ইহ্সান করবেন না। দ্বিতীয় অর্থ হলো, নবুওয়াতের যে দায়িত্ব আপনি পালন করছেন এবং এর বিনিময়ে কোন প্রকার ব্যক্তি স্বাৰ্থ উদ্ধার করবেন না; যদিও অনেক বড় ও মহান একটি কাজ করে চলেছেন কিন্তু নিজের দৃষ্টিতে নিজের কাজকে বড় কাজ বলে কখনো মনে করবেন না এবং কোন সময় এ চিন্তাও যেন আপনার মনে উদিত না হয় যে, নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করে আর এ কাজে প্রাণপণ চেষ্টা-সাধনা করে আপনি আপনার রবের প্রতি কোন অনুগ্রহ করছেন। [দেখুন: কুরতুবী]
আল-মুদ্দাসসির 74:7
আর আপনার রবের জন্যেই ধৈর্য ধারণ করুন।
আল-মুদ্দাসসির 74:8
অতঃপর যখন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে [১]
[১] ناقور শব্দের অর্থ শিংগা এবং نُقِرَ বলে শিংগায় ফুঁ দিয়ে আওয়াজ বের করা বোঝানো হয়েছে। এখানে শিঙ্গার দ্বিতীয় ফুঁ তথা কবর থেকে উঠে হাশরের ময়দানে জড়ো হওয়ার জন্য যে ফুঁক দেয়া হবে তা উদ্দেশ্য। [বাগভী, সা‘দী]
আল-মুদ্দাসসির 74:9
সেদিন হবে এক সংকটের দিন-
আল-মুদ্দাসসির 74:10
যা কাফিরদের জন্য সহজ নয় [১]।
[১] এ বাক্যটি থেকে স্বতঃই প্রতিভাত হয় যে, সেদিনটি ঈমানদারদের জন্য হবে খুবই সহজ এবং এর সবটুকু কঠোরতা সত্যকে অমান্যকারীদের জন্য নির্দিষ্ট হবে। [সা‘দী]
আল-মুদ্দাসসির 74:11
ছেড়ে দিন আমাকে ও যাকে আমি সৃষ্টি করেছি একাকী [১] ।
[১] একথাটির দু‘টি অর্থ হতে পারে এবং দু‘টি অর্থই সঠিক। এক, আমি যখন তাকে সৃষ্টি করেছিলাম সে সময় সে কোন প্রকার ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি এবং মর্যাদা ও নেতৃত্বের অধিকারী ছিল না, সে একা ছিল। আমি তাকে সেসব দান করেছি। দুই, একমাত্র আমিই তার সৃষ্টিকর্তা। অন্য যেসব উপাস্যের প্রভুত্ব কায়েম রাখার জন্য সে আপনার দেয়া তাওহীদের দাওয়াতের বিরোধিতায় এত তৎপর, তাদের কেউই তাকে সৃষ্টি করার ব্যাপারে আমার সাথে শরীক ছিল না। [কুরতুবী]
আল-মুদ্দাসসির 74:12
আর আমি তাকে দিয়েছি বিপুল ধন- সম্পদ [১]
[১] কেয়ামত দিবস সকল কাফেরের জন্যেই কঠিন হবে-একথা বর্ণনা করার পর জনৈক দুষ্টমতি কাফেরের অবস্থা ও তার কঠোর শাস্তি বর্ণিত হয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তার নাম ওলীদ ইবনে মুগীরা। তার দশ বারটি পুত্ৰ সন্তান ছিল। তাদের মধ্যে খালেদ ইবনে ওয়ালীদ ইতিহাসে অনেক বেশী প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। আল্লাহ্ তা'আলা তাকে ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্তুতির প্রাচুর্য দান করেছিলেন। [ইবন কাসীর] ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার ভাষায়, তার ফসলের ক্ষেত ও বাগ-বাগিচা মক্কা থেকে তায়েফ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এমনকি তার ক্ষেতের ফসল ও বাগানের আমদানী সারা বছর তথা শীত ও গ্ৰীষ্ম সব ঋতুতে অব্যাহত থাকত। তাকে আরবের সরদার গণ্য করা হত। জনসাধারণের মধ্যে তার বিশেষ বিশেষ উপাধি ছিল। সে গর্ব ও অহংকারবশতঃ নিজেকে ওহীদ ইবনুল-ওহীদ অর্থাৎ এককের পুত্র একক বলত। তার দাবী ছিল এই যে, সম্প্রদায়ের মধ্যে সেও তার পিতা মুগীরা অদ্বিতীয়। [কুরতুবী, বাগভী]
আল-মুদ্দাসসির 74:13
এবং নিত্যসঙ্গী পুত্ৰগণ [১],
[১] এসব পুত্ৰ সন্তানদের জন্য شهود শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে। এক, রুযী রোজগারের জন্য তাদের দৌড় ঝাপ করতে বা সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতে কিংবা বিদেশ যাত্রা করতে হয় না। তাদের বাড়ীতে এত খাদ্য মজুদ আছে যে, তারা সর্বক্ষণ বাপের কাছে উপস্থিত থাকে বরং তাকে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত থাকে। [ইবনকাসীর] দুই, তার সবগুলো সস্তানই নামকরা এবং প্রভাবশালী, তারা বাপের সাথে দরবার ও সভা-সমিতিতে উপস্থিত থাকে। [কুরতুবী]
আল-মুদ্দাসসির 74:14
আর তাকে দিয়েছি স্বাচ্ছন্দ জীবনের প্রচুর উপকরণ-
আল-মুদ্দাসসির 74:15
এর পরও সে কামনা করে যে, আমি তাকে আরও বেশী দেই [১] !
[১] একথার একটি অর্থ হলো, এসব সত্ত্বেও তার লালসা ও আকাঙ্খার শেষ নেই। এত কিছু লাভ করার পরও সে সর্বক্ষণ এ চিন্তায় বিভোর যে, দুনিয়ার সব নিয়ামত ও ভোগের উপকরণ সে কিভাবে লাভ করতে পারবে। দুই, হাসান বাসরী ও আরো কয়েকজন মনীষী বর্ণনা করেছেন যে, সে বলত, মুহাম্মাদের একথা যদি সত্য হয়ে থাকে যে, মৃত্যুর পর আরো একটি জীবন আছে এবং সেখানে জান্নাত বলেও কিছু একটা থাকবে তাহলে সে জান্নাত আমার জন্যই তৈরী করা হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর]
আল-মুদ্দাসসির 74:16
কখনো নয়, সে তো আমাদের নিদর্শনসমূহের বিরুদ্ধাচারী।
আল-মুদ্দাসসির 74:17
অচিরেই আমি তাকে চড়ার [১] শাস্তি দিয়ে কষ্ট-ক্লান্ত করব।
[১] আল্লাহ্ তা‘আলা সে পাপিষ্ঠকে কি শাস্তি দিবেন আয়াতে তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, তাকে ক্লান্ত-ক্লিষ্ট করা হবে চড়ার শাস্তি দানের মাধ্যমে। কিন্তু কোথায় চড়ানো হবে? বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, তাকে আগুনের পাহাড়ে চড়তে বাধ্য করা হবে, তারপর সেখান থেকে নীচের দিকে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, তাকে পিচ্ছিল এক পাহাড়ে চড়তে বাধ্য করা হবে। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, সে পাহাড়টিতে হাত রাখা মাত্রই তা গলতে আরম্ভ করবে, এভাবে প্রতি পদে পদে পা ডুবে যাবে। মূলত শান্তিবিহীন অতি কষ্টের শাস্তি তাকে দেওয়া হবে। [ইবন কাসীর; কুরতুবী]
আল-মুদ্দাসসির 74:18
সে তো চিন্তা করল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল।
আল-মুদ্দাসসির 74:19
সুতরাং ধ্বংস হোক সে! কেমন করে সে এ সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ করল !
আল-মুদ্দাসসির 74:20
তারপরও ধ্বংস হোক সে! কেমন করে সে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হল !
আল-মুদ্দাসসির 74:21
তারপর সে তাকাল।
আল-মুদ্দাসসির 74:22
তারপর সে ভ্ৰকুঞ্চিত করল ও মুখ বিকৃত করল।
আল-মুদ্দাসসির 74:23
তারপর সে পিছন ফিরল এবং অহংকার করল।
আল-মুদ্দাসসির 74:24
অতঃপর সে বলল, ‘এ তো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত জাদু ভিন্ন আর কিছু নয় [১] ,
[১] উদ্দেশ্য এই যে, এই হতভাগা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়ত অস্বীকার করার জন্য অনেক চিন্তা-ভাবনার পর প্রস্তাব করল, তাকে জাদুকর বলা হোক। এই ঘৃণ্য প্রস্তাবের কারণেই আল্লাহ্ তা‘আলা কুরআনে তার প্রতি বার বার অভিসম্পাত করেছেন। [ইবন কাসীর]
আল-মুদ্দাসসির 74:25
‘এ তো মানুষেরই কথা।’
আল-মুদ্দাসসির 74:26
অচিরেই আমি তাকে দগ্ধ করব ‘সাকার’ এ
আল-মুদ্দাসসির 74:27
আর আপনাকে কিসে জানাবে ‘সাকার’ কী?
আল-মুদ্দাসসির 74:28
এটা অবশিষ্ট রাখবে না এবং ছেড়েও দেবে না [১]।
[১] এর দু‘টি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হলো, যাকেই এর মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। তাকেই সে জ্বলিয়ে ছাই করে দেবে। কিন্তু জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়েও সে রক্ষা পাবে না। বরং আবার তাকে জীবিত করা হবে এবং আবার জ্বালানো হবে। [ইবন কাসীর] আরেক জায়গায় বলা হয়েছেঃ ‘সেখানে সে মরে নিঃশেষ হয়েও যাবে না আবার বেঁচেও থাকবে না’ [সূরা আল-আ‘লা: ১৩]।
আল-মুদ্দাসসির 74:29
এটা তো শরীরের চামড়া পুড়িয়ে কালো করে দেবে,
আল-মুদ্দাসসির 74:30
‘সাকার’-এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশজন প্রহরী।
আল-মুদ্দাসসির 74:31
আর আমরা তো জাহান্নামের প্রহরী কেবল ফেরেশ্তাদেরকেই করেছি [১]; কাফিরদের পরীক্ষাস্বরূপই আমরা তাদের এ সংখ্যা উল্লেখ করেছি যাতে কিতাবপ্রাপ্তদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে, আর যারা ঈমান এনেছে তাদের ঈমান বেড়ে যায়। আর কিতাবপ্রাপ্তরা ও মুমিনরা সন্দেহ পোষণ না করে। আর যেন এর ফলে যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তারা ও কাফিররা বলে, আল্লাহ্ এ (সংখ্যার) উপমা [২] (উল্লেখ করা) দ্বারা কি ইচ্ছা করেছেন?’ এভাবে আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছে হেদায়াত করেন। আর আপনার রবের বাহিনী সম্পর্কে তিনি ছাড়া কেউ জানে না। আর জাহান্নামের এ বর্ণনা তো মানুষের জন্য এক উপদেশ মাত্র।
[১] এখান থেকে “আপনার রবের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন” পর্যন্ত বাক্যগুলোতে একটি ভিন্ন প্ৰসংগ আলোচিত হয়েছে। “জাহান্নামের কর্মচারীর সংখ্যা শুধু উনিশ জন হবে” একথা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে শুনে যারা সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছিল এবং কথাটা নিয়ে হাসি ঠাট্টা করতে শুরু করেছিল, তাই প্রাসঙ্গিক বক্তব্যের মাঝখানে বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় ছেদ টেনে তাদের কথার জবাব দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের দৈহিক শক্তির সাথে তুলনা করে তাদের শক্তি সম্পর্কে অনুমান করা তোমাদের বোকামী ও নিৰ্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা মানুষ নয়, বরং ফেরেশতা। তোমাদের পক্ষে অনুমান করাও সম্ভব নয় যে, কি সাঙ্ঘাতিক শক্তিধর ফেরেশতা আল্লাহ্ তা'আলা সৃষ্টি করেছেন। [দেখুন, ইবন কাসীর]
[২] ‘উপমা’ বলে এখানে আল্লাহ্ তা‘আলা যে উনিশ সংখ্যক প্রহরীর কথা বলেছেন সে কথাটিই উদ্দেশ্য। তারা বলছিল, এ সংখ্যা উল্লেখ করার কী হেকমত ছিল? [ইবন কাসীর, কুরতুবী]
আল-মুদ্দাসসির 74:32
কখনোই না [১], চাঁদের শপথ,
‘দ্বিতীয় রুকূ’
[১] অর্থাৎ এটা কোন ভিত্তিহীন কথা নয় যে তা নিয়ে এভাবে হাসি তামাসা বা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা যাবে। [দেখুন, তাবারী]
আল-মুদ্দাসসির 74:33
শপথ রাতের, যখন তার অবসান ঘটে,
আল-মুদ্দাসসির 74:34
শপথ প্রভাতকালের, যখন তা আলোকোজ্জ্বল হয় -
আল-মুদ্দাসসির 74:35
নিশ্চয় জাহান্নাম ভয়াবহ বিপদসমূহের অন্যতম,
আল-মুদ্দাসসির 74:36
মানুষের জন্য সতর্ককারীস্বরূপ-
আল-মুদ্দাসসির 74:37
তোমাদের মধ্যে যে অগ্রসর হতে চায় কিংবা যে পিছিয়ে পড়তে চায় তার জন্য [১] ।
[১] এখানে অগ্ৰে যাওয়ার অর্থ ঈমান ও আনুগত্যের দিকে অগ্রণী হওয়া। আর পশ্চাতে থাকার অর্থ ঈমান ও আনুগত্য থেকে পশ্চাতে থাকা। উদ্দেশ্য এই যে, জাহান্নামের শাস্তি থেকে সতর্ক করা সব মানুষের জন্যে ব্যাপক। অতঃপর এই সতর্কবাণী শুনে কেউ ঈমান ও আনুগত্যের প্রতি অগ্রণী হয় এবং কোন কোন হতভাগা এরপরও পশ্চাতে থেকে যায়। [সা‘দী]
আল-মুদ্দাসসির 74:38
প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ [১] ,
[১] رَهِيْنَةٌ এর অর্থ এখানে প্রত্যেকের আটক ও বন্দী হওয়া। ঋণের পরিবর্তে বন্ধকী দ্রব্য যেমন মহাজনের হাতে আটক থাকে-মালিক তাকে কোন কাজে লাগাতে পারে না, তেমনি কেয়ামতের দিন প্রত্যেকেই তার গোনাহের বিনিময়ে আটক ও বন্দী থাকবে। কিন্তু, আসহাবুল-ইয়ামীন’ তথা ডানদিকের সৎলোকগণ এ থেকে মুক্ত থাকবে। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর]
আল-মুদ্দাসসির 74:39
তবে ডানপন্থীরা নয়,
আল-মুদ্দাসসির 74:40
বাগ-বাগিচার মধ্যে তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করবে –
আল-মুদ্দাসসির 74:41
অপরাধীদের সম্পর্কে,
আল-মুদ্দাসসির 74:42
‘তোমাদেরকে কিসে ‘সাকার’- এ নিক্ষেপ করেছে?’
আল-মুদ্দাসসির 74:43
তারা বলবে ‘আমরা সালাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না [১] ,
[১] এর অর্থ হলো, যেসব মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে সালাত ঠিকমত আদায় করেছে আমরা তাদের মধ্যে অন্তরভুক্ত ছিলাম না। [কুরতুবী]
আল-মুদ্দাসসির 74:44
আর আমরা অভাবগ্ৰস্তকে খাদ্য দান করতাম না [১] ,
[১] এ থেকে জানা যায় কোন অভাবী মানুষকে সামর্থ থাকা সত্ত্বেও খাবার না দেয়া বা সাহায্য না করা মানুষের দোযখ যাওয়ার কারণসমূহের মধ্যে একটা কারণ। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর, কুরতুবী]
আল-মুদ্দাসসির 74:45
এবং আমরা অনর্থক আলাপকারীদের সাথে বেহুদা আলাপে মগ্ন থাকতাম।
আল-মুদ্দাসসির 74:46
‘আর আমরা প্রতিদান দিবসে মিথ্যারোপ করতাম,
আল-মুদ্দাসসির 74:47
‘অবশেষে আমাদের কাছে মৃত্যু আগমন করে [১]। ’
[১] অর্থাৎ মৃত্যু পর্যন্ত আমরা এ নীতি ও কর্মপন্থা অনুসরণ করেছি। শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত বিষয় তথা মৃত্যু আমাদের সামনে এসে হাজির হয়েছে; তখন আমাদের সব আশা-কৌশলের সমাপ্তি হয়। [সা‘দী]
আল-মুদ্দাসসির 74:48
ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন উপকার করবে না [১]।
[১] এখানে هُم সর্বনাম দ্বারা সেসব অপরাধীকে বোঝানো হয়েছে, পূর্বের আয়াতে যারা তাদের চারটি অপরাধ স্বীকার করেছে- [১] তারা সালাত আদায় করত না, [২] তারা কোন অভাবগ্ৰস্ত ফকীরকে আহার্য দিত না; অর্থাৎ দরিদ্রদের প্রয়োজনে ব্যয় করত না, [৩] ভ্ৰান্ত লোকেরা ইসলাম ও ঈমানের বিরুদ্ধে যেসব কথাবার্তা বলত অথবা গোনাহ ও অশ্লীল কাজে লিপ্ত হত, তারাও তাদের সাথে তাতে লিপ্ত হত এবং সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করত না, [৪] তারা কেয়ামত অস্বীকার করত। এর দ্বারা প্রমাণিত হল যে, যেসব অপরাধী এসব গোনাহ করে এবং কেয়ামত অস্বীকার করার মত কুফরী করে, তাদের জন্যে কারও সুপারিশ উপকারী হবে না। কেননা, তারা কাফের। কাফেরদের জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি কাউকে দেয়া হবে না। কেউ করলে গ্রহনীয় হবে না। [দেখুন: ইবন কাসীর; বাগভী; বাদা’ই‘উত তাফসীর] কুরআনের অন্যান্য আয়াত ও অনেক সহীহ্ হাদীসে প্রমাণিত আছে যে, নবী-রাসূলগণ, শহীদগণ এবং সৎকর্মপরায়ণগণ-এমন কি সাধারণ মুমিনগণও আল্লাহ্র পক্ষ থেকে অনুমতি প্ৰাপ্তির পর অন্যান্য মুমিনদের জন্যে সুপারিশ করবেন এবং তা কবুলও হবে। তবে কাফের মুশরিকদের কারও জন্য কোন সুপারিশ কাজে আসবে না।
আল-মুদ্দাসসির 74:49
অতঃপর তাদের কী হয়েছে যে, তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় উপদেশ হতে?
আল-মুদ্দাসসির 74:50
তারা যেন ভীত-ত্ৰস্ত হয়ে পলায়নরত একপাল গাধা-
আল-মুদ্দাসসির 74:51
যারা সিংহের ভয়ে পলায়ন করেছে [১] ।
[১] حُمُرٌ مُّسْتَنْفِرَةٌ অর্থ বন্য গাধা। আর قسورة এর অর্থ সিংহ বা তীরান্দাজ শিকারী। এ স্থলে উভয় অর্থ বর্ণিত আছে। [ফাতহুল কাদীর]
আল-মুদ্দাসসির 74:52
বরং তাদের মধ্যকার প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্ৰন্থ দেয়া হোক [১]।
[১] অর্থাৎ তারা চায় যে, আল্লাহ্ তা‘আলা যদি সত্যি সত্যিই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবী হিসেবে পাঠিয়ে থাকেন তাহলে তিনি মক্কার প্রত্যেক নেতা ও সমাজপতিদের কাছে যেন একখানা করে পত্র লিখে পাঠান যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যিই আমার নবী, তোমরা তাঁর আনুগত্য করো। [ফাতহুল কাদীর] কুরআন মজীদের অন্য এক জায়গায় মক্কার কাফেরদের এ উক্তিরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, “আল্লাহর রাসূলদের যা দেয়া হয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত তা আমাদের দেয়া না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা মেনে নেব না।” [সূরা আল-আন‘আম: ২৪] অন্য এক জায়গায় তাদের এ দাবীও উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, “আপনি আমাদের চোখের সামনে আসমানে উঠে যান এবং সেখান থেকে লিখিত কিতাব নিয়ে আসেন, আমরা তা পড়ে দেখবো।” [সূরা আল-ইসরা: ৯৩]
আল-মুদ্দাসসির 74:53
কখনো নয় [১]; বরং তারা আখেরাতকে ভয় করে না [২]।
[১] অর্থাৎ তাদের এ ধরনের কোন দাবী কক্ষনো পূরণ করা হবে না। [কুরতুবী]
[২] অর্থাৎ এদের ঈমান না আনার আসল কারণ এটা নয় যে, তাদের এ দাবী পূরণ করা হচ্ছে না। বরং এর আসল কারণ হলো এরা আখেরাতের ব্যাপারে বেপরোয়া ও নির্ভীক। [ফাতহুল কাদীর] এরা এ পৃথিবীকেই পরম পাওয়া মনে করে নিয়েছে। [কুরতুবী]
আল-মুদ্দাসসির 74:54
নিশ্চয় এ কুরআন তো সকলের জন্য উপদেশবাণী [১]।
[১] এখানে تذكرة তথা ‘উপদেশ’ বলে কুরআন মজীদ বোঝানো হয়েছে। কেননা, এর শাব্দিক অর্থ স্মারক। [ইবন কাসীর]
আল-মুদ্দাসসির 74:55
অতএব যার ইচ্ছে সে তা থেকে উপদেশ গ্ৰহণ করুক।
আল-মুদ্দাসসির 74:56
আর আল্লাহ্র ইচ্ছে ছাড়া কেউ উপদেশ গ্ৰহণ করতে পারে না; তিনিই যোগ্য যে, একমাত্র তাঁরই তাকওয়া অবলম্বন করা হবে, আর তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী [১]।
[১] আল্লাহ্ তা‘আলা اهْلُ التَّقُوٰى এই অর্থে যে, একমাত্র তারই তাকওয়া অবলম্বন করা যায়। তিনি ব্যতীত আর কারও তাকওয়া অবলম্বন করতে বলা যায় না। একমাত্র তাঁকেই ভয় করা এবং তাঁর নাফরমানী থেকেই বেঁচে থাকা জরুরী। আর وَاَهْلُ الْمَغْفِرَةِ হওয়ার উদ্দেশ্য এই যে, তিনিই অপরাধী গোনাহ্গারের অপরাধ ও গোনাহ্ যখন ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন। অন্য কেউ এরূপ উচ্চমনা হতে পারে না। [দেখুন, ইবন কাসীর]
আল-কিয়ামা 75:1
আমি শপথ করছি কিয়ামতের দিনের [১] ,
সূরা সংক্রান্ত আলোচনাঃ
আয়াত সংখ্যাঃ ৪০ আয়াত।
নাযিল হওয়ার স্থানঃ মক্কী।
রহমান, রহীম আল্লাহ্র নামে
[১] কারও বিরোধী মনোভাব খন্ডন করার জন্যে শপথ করা হলে শপথের পূর্বে لا ব্যবহৃত হয়। আরবী বাক-পদ্ধতিতে এই ব্যবহার প্রসিদ্ধ ও সুবিদিত। এ শব্দ দ্বারা বক্তব্য শুরু করাই প্রমাণ করে যে, আগে থেকে কোন বিষয়ে আলোচনা চলছিল যার প্রতিবাদ করার জন্য এ সূরা নাযিল হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা যা বলেছো তা ঠিক নয়। আমি কসম করে বলছি, প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এটি। অর্থাৎ কেয়ামত অবশ্যম্ভাবী। [দেখুন, ইবন কাসীর]
আল-কিয়ামা 75:2
আমি আরও শপথ করছি ভর্ৎসনাকারী আত্মার [১]।
[১] لوامة শব্দটি لوم থেকে উদ্ভূত। অর্থ তিরস্কার ও ধিক্কার দেয়া। ‘নাফসে লাওয়ামা’ বলে এমন নফস বোঝানো হয়েছে, যে নিজের কাজকর্মের হিসাব নিয়ে নিজেকে ধিক্কার দেয়। অর্থাৎ কৃত গোনাহ অথবা ওয়াজিব কর্মে ত্রুটির কারণে নিজেকে ভর্ৎসনা করে বলে যে, তুই এমন করলি কেন? সৎকর্ম সম্পর্কেও নিজেকে এই বলে তিরস্কার করে যে, আরও বেশী সৎকাজ সম্পাদন করে উচ্চমর্যাদা লাভ করলে না কেন? সারকথা, কামেল মুমিন ব্যক্তি সর্বদাই তার প্রত্যেক সৎ ও অসৎ কাজের জন্যে নিজেকে তিরস্কারই করে। গোনাহ্ অথবা ওয়াজিব কর্মে ক্রটির কারণে তিরস্কার করার হেতু স্পষ্ট। সৎকাজে তিরস্কার করার কারণ এই যে, নাফস ইচ্ছা করলে আরও বেশী সৎকাজ করতে পারত। সে বেশী সৎকাজ করল না কেন? এই অর্থের ভিত্তিতেই হাসান বাসরী রাহেমাহুল্লাহ নাফসে-লাওয়ামার তফসীর করেছেন ‘নফসে-মুমিনাহ।’ তিনি বলেছেনঃ আল্লাহ্র কসম, মুমিন তো সর্বদা সর্বাবস্থায় নিজেকে ধিক্কারই দেয়। সৎকর্মসমুহেও সে আল্লাহ্র শানের মোকাবেলায় আপন কর্মে অভাব ও ক্রটি অনুভব করে। [কুরতুবী] কেননা, আল্লাহ্র শানের হক পুরোপুরি আদায় করা সাধ্যাতীত ব্যাপার। ফলে তার দৃষ্টিতে ক্ৰটি থাকে এবং তজ্জন্যে নিজেকে ধিক্কার দেয়। পক্ষান্তরে অসৎ কাজ হলে মুমিনের কাছে এটা অত্যন্ত কঠোর হয়ে দেখা দেয় ফলে সে নিজেকে ধিক্কার দেয়। [বাগভী] মূলতঃ নাফস তিনটি গুণে গুণান্বিত হয়। নফসে আম্মারা, লাওয়ামা ও মুতমায়িন্নাহ। সাধারণত নাফসে আম্মারা বা খারাপ কাজে উদগ্ৰীবকারী আত্মা প্রতিটি মানুষেরই মজ্জাগত ও স্বভাবগত। সে মানুষকে মন্দ কাজে লিপ্ত হতে জোরদার আদেশ করে। কিন্তু ঈমান, সৎকর্ম ও সাধনার বলে সে নফসে-লাওয়ামা হয়ে যায় এবং মন্দ কাজ ও ক্রটির কারণে অনুতপ্ত হতে শুরু করে। এটাকেই অনেকে বিবেক বলে। কিন্তু মন্দ কাজ থেকে সে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয় না। অতঃপর সৎকর্মে উন্নতি ও আল্লাহ্র নৈকট্যলাভে চেষ্টা করতে করতে যখন শরীয়তের আদেশ-নিষেধ প্রতিপালন তার মজ্জাগত ব্যাপার হয়ে যায় এবং শরীয়তবিরোধী কাজের প্রতি স্বভাবগত ঘৃণা অনুভব করতে থাকে, তখন এই নফসই মুতমায়িন্নাহ বা সন্তুষ্টচিত্ত উপাধি প্ৰাপ্ত হয়। এ ধরনের নাফস যাদের অর্জিত হয় তারা দ্বীনী ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ বা প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে মুক্ত হয়ে ‘কালবে সালীম' বা সুস্থ হৃদয়ের অধিকারী হয়। আর এ সমস্ত লোকদের প্রশংসায় আল্লাহ্ তা’আলা অন্য আয়াতে বলেছেন, ‘যে দিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না; ‘সে দিন উপকৃত হবে শুধু সে, যে আল্লাহ্র কাছে আসবে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে।” [সূরা আশ-শু‘আরা: ৮৮-৮৯]
আল-কিয়ামা 75:3
মানুষ কি মনে করে যে, আমরা কখনোই তার অস্থিসমূহ একত্র করতে পারব না?
আল-কিয়ামা 75:4
অবশ্যই হ্যাঁ, আমরা তার আঙ্গুলের আগা পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম [১]।
[১] অর্থাৎ বড় বড় হাড়গুলো একত্রিত করে পুনরায় তোমার দেহের কাঠামো প্রস্তুত করা এমন কিছুই নয়। আমিতো তোমার দেহের সূক্ষ্মতম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এমনকি তোমার আঙ্গুলের জোড়গুলোও পুনরায় ঠিক তেমন করে বানাতে সক্ষম যেমন তা এর আগে ছিল, তবে তোমাদের পুনরুথিত করতে অসক্ষম হওয়ার কোন কারণ নেই। [কুরতুবী]
আল-কিয়ামা 75:5
বরং মানুষ তার ভবিষ্যতেও পাপাচার করতে চায় [১]।
[১] তারা যে কিয়ামত ও আখেরাতকে অস্বীকার করে তার মূল কারণ হলো, তারা চায় আজ পর্যন্ত তারা পৃথিবীতে যেরূপ লাগামহীন জীবন যাপন করে এসেছে ভবিষ্যতেও ঠিক তেমনি করতে পারে। আজ পর্যন্ত তারা যে ধরনের জুলুম-অত্যাচার, বেঈমানী, পাপাচার ও দুষ্কর্ম করে এসেছে ভবিষ্যতেও তা করার অবাধ স্বাধীনতা যেন তাদের থাকে। এভাবে সে অসৎকাজ করতেই থাকে, সৎপথে ফিরে আসতে চায় না। [মুয়াসসার, ফাতহূল কাদীর] কোন কোন মুফাসসির বলেন, আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ‘বরং সে তার সম্মুখস্থ বস্তু অর্থাৎ কিয়ামতকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করতে চায়।’ কারণ, এর পরই বলা হয়েছে, “সে প্রশ্ন করে কখন কিয়ামত আসবে” । এ তাফসীরটি ইবনে কাসীর প্রাধান্য দিয়েছেন।
আল-কিয়ামা 75:6
সে প্রশ্ন করে, ‘কখন কিয়ামতের দিন আসবে?’
আল-কিয়ামা 75:7
যখন চোখ স্থির হয়ে যাবে [১] ,
[১] برق এর আভিধানিক অর্থ হলো বিদ্যুতের ঝলকে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া। কিন্তু প্রচলিত আরবী বাকরীতিতে কথাটি শুধু এ একটি অর্থ জ্ঞাপকই নয়। বরং ভীতি-বিহবলতা, বিস্ময় অথবা কোন দুর্ঘটনার আকস্মিকতায় যদি কেউ হতবুদ্ধি হয়ে যায় এবং সে ভীতিকর দৃশ্যের প্রতি তার চক্ষু স্থির-নিবদ্ধ হয়ে যায় যা সে দেখতে পাচ্ছে তাহলে এ অবস্থা বুঝাতেও একথাটি বলা হয়ে থাকে। [দেখুন, ইবন কাসীরা] একথাটিই কুরআন মাজীদের আরেক জায়গায় এভাবে বলা হয়েছে, “আল্লাহ্ তো তাদের অবকাশ দিচ্ছেন সেদিন পর্যন্ত যেদিন চক্ষুসমূহ স্থির হয়ে যাবে।”
আল-কিয়ামা 75:8
এবং চাঁদ হয়ে পড়বে কিরণহীন [১],
[১] এখানে কেয়ামতের পরিস্থিতি বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ যখন চক্ষুতে ধাঁধা লেগে গেল— কেয়ামতের দিন সবার দৃষ্টিতে ধাঁধা লেগে যাবে। ফলে চক্ষু স্থির কোন বস্তু দেখতে পারবে না এবং চন্দ্র জ্যোতিহীন হয়ে যাবে। [ইবন কাসীর] তাছাড়া আরেকটি অনুবাদ হচ্ছে, চন্দ্র গায়েব হয়ে যাবে, চন্দ্র বলতে কিছু আর থাকবে না। [কুরতুবী]
আল-কিয়ামা 75:9
আর যখন সূর্য ও চাঁদকে একত্র করা হবে [১] –
[১] চাঁদের আলোহীন হয়ে যাওয়া এবং চাঁদ ও সূর্যের পরস্পর একাকার হয়ে যাওয়ার অর্থ, মুজাহিদ বলেন, দু‘টিকে একত্রে পেঁচানো হবে। [আত-তাফসীরুস সহীহ]
আল-কিয়ামা 75:10
সে-দিন মানুষ বলবে, ‘আজ পালাবার স্থান কোথায় ?’
আল-কিয়ামা 75:11
কখনোই নয়, কোন আশ্রয়স্থল নেই।
আল-কিয়ামা 75:12
সেদিন ঠাঁই হবে আপনার রবেরই কাছে।
আল-কিয়ামা 75:13
সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী আগে পাঠিয়েছে ও কী পিছনে রেখে গেছে [১]।
[১] মূল বাক্যটি হলো بِمَاقَدَّمَوَاَخَّرَ অর্থাৎ মানুষকে সেদিন অবহিত করা হবে যা সে অগ্ৰে প্রেরণ করেছে ও পশ্চাতে ছেড়ে এসেছে। এটা একটা ব্যাপক অর্থব্যঞ্জক বাক্য। এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে এবং সম্ভবত সবগুলোই এখানে প্রযোজ্য। এর একটি অর্থ হলো, দুনিয়ার জীবনে মানুষ মৃত্যুর পূর্বে কি কি নেক কাজ বা বদ কাজ করে আখেরাতের জন্য অগ্রিম পাঠিয়ে দিয়েছিল সেদিন তাকে তা জানিয়ে দেয়া হবে। আর দুনিয়াতে সে নিজের ভাল এবং মন্দ কাজের কি ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করে এসেছিল যা তার দুনিয়া ছেড়ে চলে আসার পরও পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে দীর্ঘ দিন পর্যন্ত চলেছিল সে হিসেবও তার সামনে পেশ করা হবে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম বলেন, মানুষ মৃত্যুর পূর্বে যে সৎকাজ করে নেয়, তা সে অগ্ৰে প্রেরণ করে এবং যে সৎ অথবা অসৎ, উপকারী অথবা অপকারী কাজ ও প্রথা এমন ছেড়ে যায়, যা তার মৃত্যুর পর মানুষ বাস্তবায়িত করে, তা সে পশ্চাতে রেখে আসে। (এর সওয়াব অথবা শাস্তি সে পেতে থাকবে।) [দেখুন, বাগাভী; কুরতুবী] দ্বিতীয় অর্থ হলো, যেসব কাজ সে আগে করেছে এবং যেসব কাজ সে পরে করেছে দিন তারিখ সহ তার পুরো হিসেব তার সামনে পেশ করা হবে। কাতাদা রাহেমাহুল্লাহ বলেন, قدّم বলে এমন সৎকাজ বোঝানো হয়েছে, যা মানুষ জীবদ্দশায় করে নেয় এবং أخّر বলে এমন সৎকাজ বোঝানো হয়েছে, যা সে করতে পারত, কিন্তু করেনি এবং সুযোগ নষ্ট করে দিয়েছে। [কুরতুবী]
আল-কিয়ামা 75:14
বরং মানুষ নিজের সম্পর্কে সম্যক অবগত [১] ,
[১] আয়াতে بصيرة শব্দটির অর্থ যদি ‘চক্ষুষ্মান’ ধরা হয়, তখন আয়াতের অর্থ এই যে, যদিও ন্যায়বিচারের বিধি অনুযায়ী মানুষকে তার প্রত্যেকটি কর্ম সম্পর্কে হাশরের মাঠে অবহিত করা হবে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর প্রয়োজন নেই। কেননা, মানুষ তার কর্ম সম্পর্কে খুব জ্ঞাত। সে কি করেছে, তা সে নিজেই জানে। তাই আখেরাতের আদালতে হাজির করার সময় প্রত্যেক কাফের, মুনাফিক, পাপী ও অপরাধী নিজেই বুঝতে পারবে যে, সে কি কাজ করে এসেছে এবং কোন অবস্থায় নিজ প্রভুর সামনে দাঁড়িয়ে আছে; সে যতই অস্বীকার করুক বা ওযর পেশ করুক। [ইবন কাসীর] এছাড়া হাশরের মাঠে প্ৰত্যেকে তার সৎ কর্ম স্বচক্ষে দেখতেও পাবে। অন্য আয়াতে আছে وَوَجَدُوُامَاعَمِلُوْاحَاضِرًا অর্থাৎ “দুনিয়াতে মানুষ যা করেছে, হাশরের মাঠে তাকে উপস্থিত পাবে” [সূরা আল-কাহাফ: ৪৯] সুতরাং তারা তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করবে। এখানে মানুষকে নিজের সম্পর্কে চক্ষুষ্মান বলার অর্থ তাই।
পক্ষান্তরে যদি بصيرة শব্দের অর্থ ‘প্রমাণ’ হয় তখন আয়াতের অর্থ হবে এই যে, মানুষ নিজেই নিজের সম্পর্কে প্রমাণস্বরূপ হবে। সে অস্বীকার করলেও তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্বীকার করবে। [দেখুন, কুরতুবী]
আল-কিয়ামা 75:15
যদিও সে নানা অজুহাতের অবতারণা করে।
আল-কিয়ামা 75:16
তাড়াতাড়ি ওহী আয়ত্ত করার জন্য আপনি তা নিয়ে আপনার জিহ্বাকে দ্রুত সঞ্চালন করবেন না।
আল-কিয়ামা 75:17
নিশ্চয় এর সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমাদেরই।
আল-কিয়ামা 75:18
কাজেই যখন আমরা তা পাঠ করি আপনি সে পাঠের অনুসরণ করুন,
আল-কিয়ামা 75:19
তারপর তার বর্ণনার দায়িত্ব নিশ্চিতভাবে আমাদেরই [১]।
[১] এ আয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে একটি বিশেষ নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যা ওহী নাযিল হওয়ার সময় অবতীর্ণ আয়াতগুলো সম্পর্কিত। নির্দেশ এই যে, যখন জিবরাঈল আলাইহিস্ সালাম কুরআনের কিছু আয়াত নিয়ে আগমন করতেন, তখন তা পাঠ করার সময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বিবিধ চিন্তায় জড়িত হয়ে পড়তেন যেন কোথায়ও এর শ্রবণ ও তদনুযায়ী পাঠে কোন পার্থক্য না হয়ে যায় বা কোথাও এর কোন অংশ, কোন বাক্য স্মৃতি থেকে উধাও না হয়ে যায়। এই চিন্তার কারণে যখন জিবরাঈল আলাইহিস্ সালাম কোন আয়াত শোনাতেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথে সাথে পাঠ করতেন এবং জিহবা নেড়ে দ্রুত আবৃত্তি করতেন, যাতে বার বার পড়ে তা মুখস্থ করে নেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই পরিশ্রম ও কষ্ট দূর করার উদ্দেশ্যে এ আয়াতসমূহে আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন পাঠ করানো, মুখস্থ করানো ও মুসলিমদের কাছে হুবহু পেশ করানোর দায়িত্ব নিজেই গ্ৰহণ করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলে দিয়েছেন যে, আপনি এই উদ্দেশ্যে জিহবাকে দ্রুত নাড়া দেয়ার কষ্ট করবেন না। আয়াতসমুহকে আপনার অন্তরে সংরক্ষণ করা এবং হুবহু আপনার দ্বারা পাঠ করিয়ে দেয়া আমার দায়িত্ব। কাজেই আপনি এ চিন্তা পরিত্যাগ করুন। সুতরাং যখন আমি অর্থাৎ আমার পক্ষ থেকে জিবরাঈল আলাইহিস্ সালাম কুরআন পাঠ করে, তখন আপনি সাথে সাথে পাঠ করবেন না; বরং চুপ করে শুনবেন এবং আমার পাঠের পর পাঠ করবেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাই করতেন। তিনি জিবরাঈল থেকে শুনতেন তারপর জিবরাঈল চলে গেলে তা অনুরূপ পড়তেন যেমন জিবরাঈল পড়েছেন। [দেখুন, বুখারী: ৫, মুসলিম, ৪৪৮] এখানে কুরআন অনুসরণ করান মানে চুপ করে জিবরাঈলের পাঠ শ্রবণ করা। অবশেষে বলা হয়েছে আপনি এ চিন্তাও করবেন না যে, অবতীর্ণ আয়াতসমূহের সঠিক মর্ম ও উদ্দেশ্য কি? এটা বুঝিয়ে দেয়াও আমার দায়িত্ব। আমি কুরআনের প্রতিটি শব্দ ও তার উদ্দেশ্য আপনার কাছে ফুটিয়ে তুলব। [দেখুন, ইবন কাসীর]
আল-কিয়ামা 75:20
কখনো না, বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে ভালবাস;
আল-কিয়ামা 75:21
আর তোমরা আখেরাতকে উপেক্ষা কর [১]।
[১] অর্থাৎ মানুষ আখেরাত অস্বীকার করে কারণ তারা সংকীর্ণমনা ও স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন; তাই তাদের দৃষ্টি কেবল এ দুনিয়ার ফলাফলের প্রতি নিবদ্ধ থাকে। আর আখেরাতে যে ফলাফলের প্রকাশ ঘটবে তাকে তারা আদৌ কোন গুরুত্ব দেয় না। তারা মনে করে, যে স্বাৰ্থ বা ভোগের উপকরণ বা আনন্দ এখানে লাভ করা সম্ভব তারই অন্বেষণে সবটুকু পরিশ্রম করা এবং প্রচেষ্টা চালানো উচিত, এভাবে তারা দুনিয়াকে চিরস্থায়ী মনে করে। [ইবন কাসীর; মুয়াস্সার]
আল-কিয়ামা 75:22
সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে,
আল-কিয়ামা 75:23
তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে [১]।
[১] অর্থাৎ সেদিন কিছু মুখমন্ডল হাসি-খুশী ও সজীব হবে এবং তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, আখেরাতে জান্নাতীগণ স্বচক্ষে আল্লাহ্ তা‘আলার দীদার (দর্শন) লাভ করবে। আহলে সুন্নাত-ওয়াল-জামা‘আতের সকল আলেম ও ফেকাহবিদ এ বিষয়ে একমত। বহু সংখ্যক হাদীসে এর যে ব্যাখ্যা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে তা হলো, আখেরাতে আল্লাহ্র নেক্কার বান্দাদের আল্লাহ্র সাক্ষাত লাভের সৌভাগ্য হবে। এক হাদীসে এসেছে, “তোমরা প্রকাশ্যে সুস্পষ্টভাবে তোমাদের রবকে দেখতে পাবে” [বুখারী: ৭৪৩৫, ৫৫৪, ৪৭৩, ৪৮৫১, ৭৪৩৪, ৭৪৩৬] অন্য হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, বেহশতবাসীরা বেহেশতে প্রবেশ করার পর আল্লাহ্ তা'আলা তাদের জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা কি চাও যে, আমি তোমাদের আরো কিছু দান করি? তারা আরয করবে, আপনি কি আমাদের চেহারা দীপ্তিময় করেননি? আপনি কি আমাদের জান্নাতে প্ৰবেশ করাননি এবং জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেননি? তখন আল্লাহ্ তা‘আলা পর্দা সরিয়ে দেবেন। ইতিপূর্বে তারা যেসব পুরষ্কার লাভ করেছে তার কোনটিই তাদের কাছে তাদের ‘রবের’ সাক্ষাতলাভের সম্মান ও সৌভাগ্য থেকে অধিক প্রিয় হবে না। এটিই হচ্ছে সে অতিরিক্ত পুরস্কার যার কথা কুরআনে এভাবে বলা হয়েছে, অর্থাৎ “যারা নেক কাজ করেছে তাদের জন্য উত্তম পুরস্কার রয়েছে। আর এছাড়া অতিরিক্ত পুরস্কারও রয়েছে।” (সূরা ইউনুস: ২৬) [মুসলিম: ১৮১, তিরমিয়ী: ২৫৫২, মুসনাদে আহমাদ: ৪/৩৩৩] অন্য হাদীসে এসেছে, সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমরা কি কিয়ামতের দিন আমাদের রবকে দেখতে পাবো? জবাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যখন মেঘের আড়াল থাকে না তখন সূর্য ও চাঁদকে দেখতে তোমাদের কি কোন কষ্ট হয়? সবাই বলল, না। তিনি বললেন, তোমরা তোমাদের রবকে এরকমই স্পষ্ট দেখতে পাবে। [বুখারী: ৭৪৩৭, মুসলিম: ১৮২] এ সমস্ত হাদীস এবং অন্য আরো বহু হাদীসের ভিত্তিতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অনুসারীগণ প্রায় সর্বসম্মতভাবেই এ আয়াতের যে অর্থ করেন তাহলো, জান্নাতবাসীগণ আখেরাতে মহান আল্লাহ্র সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হবে। কুরআন মজীদের এ আয়াত থেকেও তার সমর্থন পাওয়া যায়। “কক্ষনো নয়, তারা (অর্থাৎ পাপীগণ)” সেদিন তাদের রবের সাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত হবে। [সূরা আল-মুতাফ্ফিফীন: ১৫] এ থেকে স্বতই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, এ বঞ্চনা হবে পাপীদের জন্য নেক্কারদের জন্য নয়। [দেখুন, ইবন কাসীর]
আল-কিয়ামা 75:24
আর কোন কোন মুখমণ্ডল হয়ে পড়বে বিবর্ণ,
আল-কিয়ামা 75:25
আশংকা করবে যে, এক ধ্বংসকারী বিপর্যয় তাদের উপর আপতিত হবে।
আল-কিয়ামা 75:26
অবশ্যই [১], যখন প্ৰাণ কণ্ঠাগত হবে,
[১] এখানে كلا শব্দ দ্বারা ‘অবশ্যই’ অর্থ উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে। [মুয়াস্সার]
আল-কিয়ামা 75:27
এবং বলা হবে, ‘কে তাকে রক্ষা করবে ?’
আল-কিয়ামা 75:28
তখন তার প্রত্যয় হবে যে, এটা বিদায়ক্ষণ।
আল-কিয়ামা 75:29
আর পায়ের গোছার সঙ্গে পায়ের গোছা জড়িয়ে যাবে [১]।
[১] ساق এর প্রসিদ্ধ অর্থ পায়ের গোছা। গোছার সাথে জড়িয়ে পড়ার এক অর্থ এই যে, তখন অস্থিরতার কারণে এক গোছা দ্বারা অন্য গোছার উপর আঘাত করবে। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, দুর্বলতার আতিশয্যে এক পা অপর পায়ের উপর থাকলে তা সরাতে চাইলেও সক্ষম হবে না। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, তখন হবে দুনিয়ার শেষ দিন এবং আখেরাতের প্রথম দিনের সম্মিলন। তাই মানুষ দুনিয়ার শেষ দিন এবং আখেরাতের বিরহ-বেদনা এবং আখেরাতে কি হবে না হবে তার চিন্তায় পেরেশান থাকবে। অর্থাৎ সে সময় দু‘টি বিপদ একসাথে এসে হাজির হবে। একটি এ পৃথিবী এবং এর সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার বিপদ। আরেকটি, একজন অপরাধী হিসেবে গ্রেফতার হয়ে আখেরাতের জীবনে যাওয়ার বিপদ যার মুখোমুখি হতে হবে প্রত্যেক কাফের মুনাফিক এবং পাপীকে। [দেখুন, ইবন কাসীরা]
আল-কিয়ামা 75:30
সেদিন আপনার রবের কাছেই সকলকে হাঁকিয়ে নেয়া হবে।
আল-কিয়ামা 75:31
সুতরাং সে বিশ্বাস করে নি এবং সালাতও আদায় করে নি।
‘দ্বিতীয় রুকূ’
আল-কিয়ামা 75:32
বরং সে মিথ্যারোপ করেছিল এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
আল-কিয়ামা 75:33
তারপর সে তার পরিবার পরিজনের কাছে চলে গিয়েছিল অহংকার করে,
আল-কিয়ামা 75:34
দুর্ভোগ তোমার জন্য, দুর্ভোগ !
আল-কিয়ামা 75:35
আবার দুর্ভোগ তোমার জন্য, দুর্ভোগ [১] !
[১] أولى অর্থ ধ্বংস, দুর্ভোগ। সর্বনাশ হোক তোমার! মন্দ, ধ্বংস এবং দুর্ভাগ্য হোক তোমার! এখানে কাফিরদেরকে খুবই মারাত্মকভাবে সাবধান করে দেয়া হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] ইবন কাসীর বলেন: এটি একটি শ্লেষ বাক্যও হতে পারে। কুরআন মজীদের আরো এক জায়গায় এ ধরনের বাক্য প্রয়োগ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, জাহান্নামে আযাব দেয়ার সময় পাপী লোকদের বলা হবেঃ “নাও, এর মজা আস্বাধন করে নাও। তুমি অতি বড় সম্মানী মানুষ কিনা।” [সূরা আদ-দুখান: ৪৯]
আল-কিয়ামা 75:36
মানুষ কি মনে করে যে, তাকে এমনি ছেড়ে দেয়া হবে [১] ?
[১] আয়াতের অর্থ হলো, মানুষ কি নিজেকে মনে করে যে তার স্রষ্টা তাকে এ পৃথিবীতে দায়িত্বহীন করে ছেড়ে দিয়েছেন? এ-কথাটিই কুরআন মজীদের অন্য একস্থানে এভাবে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা‘আলা কাফেরদের বলবেন, “তোমরা কি মনে করেছো যে, আমি তোমাদের অনৰ্থক সৃষ্টি করেছি? তোমাদেরকে কখনো আমার কাছে ফিরে আসতে হবে না?” [সূরা আল মুমিনূন: ১১৫] এ দু‘টি স্থানে মৃত্যুর পরের জীবনের অনিবার্যতার প্রমাণ প্রশ্নের আকারে পেশ করা হয়েছে। প্রশ্নের তাৎপর্য হলো আখেরাত যে অবশ্যই হবে তার প্রমাণ। [দেখুন, ইবন কাসীর]
আল-কিয়ামা 75:37
সে কি বীর্যের স্থলিত শুক্রবিন্দু ছিল না?
আল-কিয়ামা 75:38
তারপর সে ‘আলাকা’য় পরিণত হয়। অতঃপর আল্লাহ্ তাকে সৃষ্টি করেন এবং সুঠাম করেন।
আল-কিয়ামা 75:39
অতঃপর তিনি তা থেকে সৃষ্টি করেন যুগল--- নর ও নারী।
আল-কিয়ামা 75:40
তবুও কি সে স্রষ্টা মৃতকে পুনর্জীবিত করতে সক্ষম নন [১] ?
[১] এক বর্ণনায় এসেছে, সাহাবীগণের একজন তার ঘরের ছাদে সালাত আদায় করত; যখনই সূরা আল-কিয়ামাহ এর এ আয়াতে পৌঁছত তখনই সে বলত: “পবিত্র ও মহান তুমি, অবশ্যই হ্যাঁ”, লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তা শুনেছি।” [আবু দাউদ: ৮৮৪]
আল-ইনসান 76:1
কালপ্রবাহে মানুষের উপর কি এমন এক সময় আসে নি [১] যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না [২] ?
[১] সূরা ‘আল-ইনসান’ এর অপর নাম সূরা আদ্-দাহ্র। সাহাবায়ে কিরাম সূরাটিকে সূরা ‘হাল আতা আলাল ইনসান’ বলতেন। [দেখুন, বুখারী: ৮৮০; মুসলিম: ৮৭৯] এতে মানব সৃষ্টির আদি-অন্ত, কর্মের প্রতিদান ও শাস্তি, কেয়ামত জান্নাত ও জাহান্নামের বিশেষ বিশেষ অবস্থার উপর বিশুদ্ধ ও সাবলীল ভঙ্গিতে আলোকপাত করা হয়েছে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুক্রবার দিন ফজরের সালাতে “সূরা আলিফ লাম মীম তানযীল আস-সাজদাহ” এবং “হাল আতা আলাল ইনসান” সূরা পড়তেন। [বুখারী: ৮৯১, মুসলিম: ৮৮০, ৮৭৯]
________________________________________
সূরা সংক্রান্ত আলোচনাঃ
আয়াত সংখ্যাঃ ৩১ আয়াত।
নাযিল হওয়ার স্থানঃ মাদানী, মতান্তরে মক্কী।
। রহমান, রহীম আল্লাহ্র নামে ।
[১] هل অব্যয়টি আসলে প্রশ্নবোধকরূপে ব্যবহৃত হয়। মাঝে মাঝে কোন জাজ্বল্যমান ও প্রকাশ্য বিষয়কে প্রশ্নের আকারে ব্যক্ত করা যায়, যাতে তার প্রকাশ্যতা আরও জোরদার হয়ে যায়। [ফাতহুল কাদীর] উদ্দেশ্য এই যে, যাকেই জিজ্ঞাসা করবে, সে এ উত্তরই দিবে, অপর কোন সম্ভাবনাই নেই।
[২] আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, মানুষের উপর এমন দীর্ঘ এক সময় অতিবাহিত হয়েছে, যখন পৃথিবীতে তার নাম-নিশানা এমন কি, আলোচনা পর্যন্ত ছিল না। আয়াতে বৰ্ণিত “যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না” এর অর্থ বর্ণনায় কয়েকটি মত রয়েছে, এক. এখানে মানবসৃষ্টির পূর্বের অবস্থা ব্যক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ এ অন্তহীন মহাকালের মধ্যে একটি দীর্ঘ সময় তো এমন অতিবাহিত হয়েছে যখন মানব প্ৰজাতির আদৌ কোন অস্তিত্ব ছিল না। তারপর মহাকাল প্রবাহে এমন একটি সময় আসল যখন মানুষ নামের একটি প্রজাতির সূচনা করা হল। [কুরতুবী] দুই. সে একটি ধড় ছিল যার কোন নাম-নিশানা ছিল না। পরবর্তীতে রূহ এর মাধ্যমে তাকে স্মরণীয় করা হয়েছে। [বাগভী; কুরতুবী]
আল-ইনসান 76:2
আমরা তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্রবিন্দু থেকে [১], আমরা তাকে পরীক্ষা করব [২]; তাই আমরা তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন [৩]।
[১] এখানে মানব সৃষ্টির সূচনা এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, আমি মানুষকে মিশ্র বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছি। বলাবাহুল্য এখানে নর ও নারীর মিশ্র বীর্য বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের সৃষ্টি পুরুষ ও নারীর দু‘টি আলাদা বীর্য দ্বারা হয়নি। বরং দু‘টি বীর্য সংমিশ্রিত হয়ে যখন একটি হয়ে গিয়েছে তখন সে সংমিশ্রিত বীর্য থেকে মানুষ সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ তফসীরবিদ তাই বলেছেন। [বাগভী; কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]
[২] এই বাক্যে মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও রহস্য বিধৃত হয়েছে। অর্থাৎ মানুষকে এভাবে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য তাকে পরীক্ষা করা। [কুরতুবী] এটাই হলো দুনিয়ায় মানুষের এবং মানুষের জন্য দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থান ও মর্যাদা।
[৩] বলা হয়েছে ‘আমরা তাকে বানিয়েছি শ্রবণশক্তি ও ‘দৃষ্টিশক্তির অধিকারী’। বিবেকবুদ্ধির অধিকারী করেছি বললে এর সঠিক অর্থ প্ৰকাশ পায়। আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধির শক্তি দিয়েছেন যাতে সে পরীক্ষা দেয়ার উপযুক্ত হতে পারে। [কুরতুবী]
আল-ইনসান 76:3
নিশ্চয় আমরা তাকে পথ নির্দেশ দিয়েছি, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় সে অকৃতজ্ঞ হবে [১]।
[১] এ আয়াত পূর্বের আয়াতে বর্ণিত পরীক্ষার ফলে মানুষের কি অবস্থা হয়েছে তা বিধৃত হয়েছে। বলা হয়েছে, আমি রাসূল ও আসমানী গ্রন্থের মাধ্যমে তাকে পথ বলে দিয়েছি যে, এই পথ জান্নাতের দিকে এবং ঐ পথ জাহান্নামের দিকে যায়। এরপর তাকে ক্ষমতা দিয়েছি যে কোন পথ অবলম্বন করার। সুতরাং আমি তাকে শুধু জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধি দিয়েই ছেড়ে দেইনি। বরং এগুলো দেয়ার সাথে সাথে তাকে পথও দেখিয়েছি যাতে সে জানতে পারে শোকরিয়ার পথ কোন্টি এবং কুফরীর পথ কোন্টি। এরপর যে পথই সে অবলম্বন করুক না কেন তার জন্য সে নিজেই দায়ী। এ বিষয়টিই অন্যত্র এভাবে বলা হয়েছে, “আমরা তাকে দু‘টি পথ (অর্থাৎ ভাল ও মন্দ পথ) স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছি।” [সূরা আল-বালাদ: ১০] অন্যত্র বলা হয়েছে এভাবে, “শপথ (মানুষের) প্রবৃত্তির আর সে সত্তার যিনি তাকে (সব রকম বাহ্যিক) ও আভ্যন্তরীণ শক্তি দিয়ে শক্তিশালী করেছেন। আর পাপাচার ও তাকওয়া-পরহেজগারীর অনুভূতি দু’টোই তার ওপর ইলহাম করেছেন।” [সূরা আশ-শামস: ৭-৮]
আল-ইনসান 76:4
নিশ্চয় আমরা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি শেকল, গলার বেড়ি ও লেলিহান আগুন [১]।
[১] এখান থেকে উপরোক্ত আয়াতসমূহে বর্ণিত দু‘টি শ্রেণীর প্রতিফল ও পরিণাম উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের মধ্যকার কাফেরদের জন্যে রয়েছে শিকল, বেড়ি ও জাহান্নাম। আর ঈমান ও ইবাদত পালনকারীদের জন্যে রয়েছে অফুরন্ত নেয়ামত। [কুরতুবী]
আল-ইনসান 76:5
নিশ্চয় সৎকর্মশীলেরা [১] পান করবে এমন পূৰ্ণপাত্ৰ-পানীয় থেকে যার মিশ্রণ হবে কাফূর [২]---
[১] তারা এমন সব মানুষ যারা পুরোপুরি তাদের রবের আনুগত্য করেছে, তাঁর পক্ষ থেকে অৰ্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালন করেছে এবং তাঁর পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ কাজসমূহ থেকে বিরত রয়েছে। [কুরতুবী]
[২] সর্বপ্রথম পানীয় বস্তুর উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদেরকে এমন শরাবের পাত্র দেয়া হবে, যাতে কাফুরের মিশ্রণ থাকবে। অর্থাৎ তা হবে এমন একটি প্রাকৃতিক ঝর্ণাধারা যার পানি হবে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন এবং শীতল আর তার খোশবু হবে অনেকটা কর্পূরের মত। কোন কোন তফসীরকারক বলেনঃ কাফুর জান্নাতের একটি ঝরণার নাম। এই শরাবের স্বাদ ও গুণ বৃদ্ধি করার জন্যে তাতে এই ঝরণার পানি মিলানো হবে। যদি কাফুরের প্রসিদ্ধ অর্থ নেয়া হয়, তবে জরুরী নয় যে, জান্নাতের কাফুর দুনিয়ার কাফুরের ন্যায় অখাদ্য হবে। বরং সেই কাফুরের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হবে। [দেখুন, কুরতুবী; ইবন কাসীর]
আল-ইনসান 76:6
এমন একটি প্রস্রবণ যা থেকে আল্লাহ্র বান্দাগণ [১] পান করবে, তারা এ প্রস্রবণকে যথেচ্ছা প্রবাহিত করবে [২]।
[১] ‘আল্লাহ্র বান্দাগণ’ কিংবা ‘রাহমানের বান্দাগণ’ শব্দগুলো আভিধানিক অর্থে সমস্ত মানুষের জন্যই ব্যবহৃত হতে পারে। কারণ সবাই আল্লাহ্র বান্দা। কিন্তু তা সত্ত্বেও কুরআন মজীদে যেখানেই এ ধরনের শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তার দ্বারা আল্লাহ্র নেক্কার বান্দাগণকেই বুঝানো হয়েছে। অসৎলোক, যারা নিজেরাই নিজেদেরকে আল্লাহ্র বন্দেগী তথা দাসত্বের বাইরে রেখেছে, তারা যেন এর যোগ্য-ই নয় যে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাদেরকে নিজের মহান নামের সাথে যুক্ত করে অথবা এর মত সম্মানিত উপাধিতে ভূষিত করবেন।
[২] অর্থাৎ জান্নাতের মধ্যে যেখানেই তারা চাইবে সেখানেই এ ঝর্ণা বইতে থাকবে। এ জন্য তাদের নির্দেশ বা ইংগিতই যথেষ্ট হবে। [ইবন কাসীর]
আল-ইনসান 76:7
তারা মানত পূর্ণ করে [১] এবং সে দিনের ভয়ে করে, যে দিনের অকল্যাণ হবে ব্যাপক।
[১] এতে বিধৃত হয়েছে যে, সৎকর্মশীল বান্দাগণকে এসব নেয়ামত কিসের ভিত্তিতে দেয়া হবে। অর্থাৎ তারা আল্লাহ্র ওয়াস্তে যে কাজের মানত করে, তা পূর্ণ করে। ‘মানত’ বলা হয় নিজের জন্যে এমন কোন কাজ ওয়াজিব করে নেয়া, যা শরীয়তের তরফ থেকে তার দায়িত্বে ওয়াজিব নয়। এরূপ মানত পূর্ণ করা শরীয়তের আইনে ওয়াজিব। [কুরতুবী] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমাদের কেউ যদি আল্লাহ্র আনুগত্য করার মানত করে সে যেন তা পূর্ণ করে, আর কেউ যদি নাফরমানির মানত করে সে যেন নাফরমানি না করে।” [বুখারী: ৬৭০০] এখানে মানত পূর্ণ করাকে জান্নাতীদের মহান প্রতিদান ও অফুরন্ত নেয়ামত লাভের কারণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। তবে কাতাদাহ রাহেমাহুল্লাহ বলেন, এখানে نذر শব্দ দ্বারা ‘কর্তব্য’ বোঝানো হয়েছে। তখন অর্থ হবে, তারাই জান্নাতের অধিকারী হবে যারা নিজেদের কর্তব্য যেমন সালাত, সাওম, হজ, উমরা ইত্যাদি যথাযথভাবে পালন করেছে। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]
আল-ইনসান 76:8
আর তারা মহব্বত থাকা সাপেক্ষে [১] অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে [২] খাবার দান করে [৩] ,
[১] অর্থাৎ জান্নাতীদের এসব নেয়ামত একারণেও যে, তারা দুনিয়াতে অভাবগ্ৰস্ত, এতীম ও বন্দীদেরকে আহার্য দান করত। অধিকাংশ তাফসীরকারকের মতে, এখানে حبه এর সর্বনাম দ্বারা طعام বা খাবার উদ্দেশ্য। অর্থাৎ খাদ্য অত্যন্ত প্রিয় ও আকর্ষণীয় হওয়া সত্ত্বেও এবং নিজেরাই খাদ্যের মুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও নেক্কার লোকেরা তা অন্যদেরকে খাওয়ান। আবু সুলাইমান আদ-দারানী বলেন, حبه এর সর্বনাম দ্বারা الله তা‘আলাকেই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তারা আল্লাহ্ তা‘আলার মহব্বতে এরূপ করে থাকে। পরবর্তী আয়াতাংশ ‘আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যেই তোমাদের খাওয়াচ্ছি’ এ অর্থকেই সমর্থন করে। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]
[২] এ আয়াতে বন্দী বলতে কাফের হোক বা মুসলিম, যুদ্ধবন্দী হোক বা অপরাধের কারণে বন্দী হোক সব রকম বন্দীকে বুঝানো হয়েছে। বন্দী অবস্থায় তাদেরকে খাদ্য দেয়া, মুসলিম কিংবা অমুসলিম, সর্বাবস্থায় একজন অসহায় মানুষকে –যে তার খাবার সংগ্রহের জন্য নিজে কোন চেষ্টা করতে পারে না- খাবার দেয়া অতি বড় সওয়াবের কাজ। [দেখুন, কুরতুবী]
[৩] কোন গরীবকে খেতে দেয়া যদিও বড় নেকীর কাজ, কিন্তু কোন অভাবী মানুষের অন্যান্য অভাব পূরণ করাও একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে খেতে দেয়ার মতই নেক কাজ। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমরা কয়েদি মুক্ত কর, ক্ষুধার্তকে খাওয়াও এবং অসুস্থদের সুশ্রুষা কর” । [বুখারী: ৩০৪৬]
আল-ইনসান 76:9
এবং বলে, ‘শুধু আল্লাহ্র সস্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে খাবার দান করি, আমরা তোমাদের কাছ থেকে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয় [১] ।
[১] গরীবদের খাবার দেয়ার সময় মুখে একথা বলতে হবে এমনটা জরুরী নয়। মনে মনেও একথা বলা যেতে পারে। আল্লাহ্র কাছে মুখে বলার যে মর্যাদা অন্তরে বলারও সে একই মর্যাদা। তবে একথা মুখে বলার উল্লেখ করা হয়েছে এ জন্য যে, যাকে সাহায্য করা হবে তাকে যেন নিশ্চিত করা যায় যে, আমরা তার কাছে কোন প্রকার কৃতজ্ঞতা অথবা বিনিময় চাই না, যাতে সে চিন্তামুক্ত হয়ে খাবার গ্রহণ করতে পারে। [ইবন কাসীর]
আল-ইনসান 76:10
‘নিশ্চয় আমরা আশংকা করি আমাদের রবের কাছ থেকে এক ভীতিপ্ৰদ ভয়ংকর দিনের।’
আল-ইনসান 76:11
পরিণামে আল্লাহ্ তাদেরকে রক্ষা করবেন সে দিনের অনিষ্ট হতে এবং তাদেরকে প্ৰদান করবেন হাস্যোজ্জ্বলতা ও উৎফুল্লতা [১]।
[১] অর্থাৎ চেহারার সজীবতা ও মনের আনন্দ। অন্য কথায় কিয়ামতের দিনের সমস্ত কঠোরতা ও ভয়াবহতা শুধু কাফেরদের জন্যই নির্দিষ্ট হবে। নেক্কার লোকেরা সেদিন কিয়ামতের সব রকম দুঃখ-কষ্ট থেকে নিরাপদ থাকবে এবং আনন্দিত ও উৎফুল্ল হবে। একথাটিই অন্যত্র এভাবে বলা হয়েছে: “চরম হতবুদ্ধিকর সে অবস্থা তাদেরকে অস্থির ও বিহ্বল করবে না। ফেরেশতারা অগ্রসর হয়ে অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাদের গ্রহণ করবে এবং বলবে এটা তোমাদের সেদিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেয়া হতো।” [সূরা আল-আম্বিয়া : ১০৩] এ বিষয়টিই আরেক জায়গায় আরো স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, “যে ব্যক্তি সৎকাজ নিয়ে আসবে সে তার তুলনায় অধিক উত্তম প্রতিদান লাভ করবে। এসব লোক সেদিনের ভয়াবহতা থেকেও নিরাপদ থাকবে।” [সূরা আন-নামল: ৮৯]
আল-ইনসান 76:12
আর তাদের সবরের [১] পুরস্কারস্বরূপ তিনি তাদেরকে প্রদান করবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্ৰ।
[১] এখানে ‘সবর’ শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বরং প্রকৃতপক্ষে সৎকর্মশীল ঈমানদারগণের গোটা পার্থিব জীবনকেই ‘সবর’ বা ধৈর্যের জীবন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। জ্ঞান হওয়ার বা ঈমান আনার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন ব্যক্তির নিজের অবৈধ আশা আকাংখাকে অবদমিত করা, আল্লাহ্র নির্দিষ্ট সীমাসমূহ মেনে চলা, আল্লাহ্র নির্ধারিত ফরযসমূহ পালন করা, হারাম পন্থায় লাভ করা যায় এরূপ প্রতিটি স্বার্থ ও ভোগের উপকরণ পরিত্যাগ করা, ন্যায় ও সত্যপ্রীতির কারণে যে ক্ষতি মৰ্মবেদনা ও দুঃখ-কষ্ট এসে ঘিরে ধরে তা বরদাশত করা-এসবই আল্লাহ্র এ ওয়াদার ওপর আস্থা রেখে করা যে, এ সদাচরণের সুফল এ পৃথিবীতে নয় বরং মৃত্যুর পরে আরেকটি জীবনে পাওয়া যাবে। এটা এমন একটা কর্মপন্থা যা মুমিনের গোটা জীবনকেই সবরের জীবনে রূপান্তরিত করে। এটা সাৰ্বক্ষণিক সবর, স্থায়ী সবর, সর্বাত্মক সবর এবং জীবনব্যাপী সবর। [দেখুন, সা‘দী]
আল-ইনসান 76:13
সেখানে তারা হেলান দিয়ে আসীন থাকবে সুসজ্জিত আসনে, তারা সেখানে খুব গরম অথবা খুব শীত দেখবে না [১] ।
[১] কারণ খুব গরম ও খুব শীত তো জাহান্নাম থেকে নিৰ্গত হয়। জান্নাতবাসীরা সেটা কোনক্রমেই পাবে না। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “জাহান্নাম তার রবের কাছে অভিযোগ করল যে, হে রব! আমার একাংশ (গরম অংশ) অপর অংশ (ঠাণ্ডা অংশ) কে শেষ করে দিল। তখন তাকে দু’টি নিঃশ্বাস ফেলার অনুমতি দেয়া হলো। একটি শীতকালে অপরটি গ্ৰীষ্মকালে। সেটাই তা তোমরা কঠিন গরম আকারে গ্ৰীষ্মকালে পাও এবং কঠিন শীত আকারে শীতকালে অনুভব কর।” [বুখারী: ৩২৬০, মুসলিম: ৬১৭]
আল-ইনসান 76:14
আর তাদের উপর সন্নিহিত থাকবে গাছের ছায়া এবং তার ফলমূলের থোকাসমূহ সম্পূর্ণরূপে তাদের আয়ত্তাধীন করা হবে।
আল-ইনসান 76:15
আর তাদের উপর ঘুরে ঘুরে পরিবেশন করা হবে রৌপ্যপাত্ৰে [১] এবং স্ফটিক-সচ্ছ পানপাত্রে---
[১] পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে যে, “তাদের সামনে সবসময় স্বর্ণপাত্ৰসমূহ পরিবেশিত হতে থাকবে।” [সূরা আয-যুখরুফ: ৭১] এ থেকে জানা গেল যে, সেখানে কোন সময় স্বর্ণপাত্র এবং কোন সময় রৌপ্য পাত্ৰ ব্যবহার করা হবে।
আল-ইনসান 76:16
রূপার স্ফটিক পাত্ৰে [১], তারা তা পরিমাণ করবে সম্পূর্ণ-পরিমিতভাবে [২]।
[১] দুনিয়ার রৌপ্য-পাত্ৰ গাঢ় ও মোটা হয়ে থাকে-আয়নার মত স্বচ্ছ হয় না। পক্ষান্তরে কাঁচ নির্মিত পাত্র রৌপ্যের মত শুভ্ৰ হয় না। উভয়ের মধ্যে বৈপরীত্য আছে, কিন্তু জান্নাতের বৈশিষ্ট্য এই যে, সেখানকার রৌপ্য আয়নার মত স্বচ্ছ হবে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেনঃ জান্নাতের সব বস্তুর নজীর দুনিয়াতেও পাওয়া যায়। তবে দুনিয়ার রৌপ্য নির্মিত গ্লাস ও পাত্রঃ জান্নাতের পাত্রের ন্যায় স্বচ্ছ নয়। [ইবন কাসীর]
[২] অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার চাহিদা অনুপাতে পানপাত্র ভরে ভরে দেয়া হবে। তা তাদের চাহিদার চেয়ে কম হবে না আবার বেশীও হবে না। অন্য কথায়, জান্নাতের খাদেমরা এত সতর্ক এবং সুবিবেচক হবে যে, যাকে তারা পানিপাত্র পরিবেশন করবে সে কি পরিমাণ শরাব পান করতে চায় সে সম্পর্কে তারা পুরোপুরি আন্দাজ করতে পারবে। এর আরেক অর্থ হতে পারে, জান্নাতীরা নিজেরাই তাদের ইচ্ছানুসারে যথাযথ পরিমাণ নির্ধারণ করে নিবে। [সা‘দী]
আল-ইনসান 76:17
আর সেখানে তাদেরকে পান করানো হবে যান্জাবীল মিশ্ৰিত পূৰ্ণপাত্ৰ-পানীয় [১]
[১] যানজাবিল এর প্রসিদ্ধ অর্থ শুকনা আদা। কাতাদা বলেন, যানজাবিল বা আদা মিশ্রিত হবে। [আত-তাফসীরুস সহীহ] আরবরা শরাবে এর মিশ্রণ পছন্দ করত। তাই জান্নাতেও একে পছন্দ করা হয়েছে। মূলত: জান্নাতের বস্তু ও দুনিয়ার বস্তু নামেই কেবল অভিন্ন। বৈশিষ্ট্যে উভয়ের মধ্যে অনেক ব্যবধান। তাই দুনিয়ার আদার আলোকে জান্নাতের আদাকে বোঝার উপায় নেই। [ফাতহুল কাদীর] তবে মুজাহিদ বলেন, এখানে যানজাবিল বলে একটি ঝর্ণাধারাকেই বুঝানো হয়েছে, যা থেকে ‘মুকাররাবীন’ বা নৈকট্যবান ব্যক্তিগণ পান করবে। [ফাতহুল কাদীর]
আল-ইনসান 76:18
জান্নাতের এমন এক প্রস্রবণের, যার নাম হবে সালসাবীল [১]।
[১] অর্থাৎ তা হবে একটা প্রাকৃতিক ঝর্ণাধারা যার নাম হবে ‘সালসাবীল’। এক হাদীসে এসেছে, জনৈক ইয়াহূদী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, যখন এ যমীন ও আসমান অন্য কোন যমীন ও আসমান দিয়ে পরিবর্তিত হবে তখন মানুষ কোথায় থাকবে? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তারা পুলসিরাতের নিকটে অন্ধকারে থাকবে। ইয়াহুদী আবার বলল, কারা সর্বপ্রথম পার হবে? রাসূল বললেন, দরিদ্র মুহাজিরগণ। ইয়াহুদী বলল, জান্নাতে প্রবেশের সময় তাদের উপঢৌকন কি? রাসূল বললেন, মাছের পেটের কলিজা, ইয়াহূদী বলল, এরপর কি খাওয়ানো হবে? রাসূল বললেন, জান্নাতের একটি ষাঁড় তাদের জন্য জবাই করা হবে তারা তার অংশ থেকে খাবে। ইয়াহূদী বলল, তাদের পানীয় কি হবে? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, একটি ঝর্ণা ধারা থেকে যার নাম হবে সালসাবীল” [মুসলিম: ৩১৫]
আল-ইনসান 76:19
আর তাদের উপর প্রদক্ষিণ করবে চির কিশোরগণ, যখন আপনি তাদেরকে দেখবেন তখন মনে করবেন তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা।
আল-ইনসান 76:20
আর আপনি যখন সেখানে দেখবেন, দেখতে পাবেন স্বাচ্ছন্দ্য এবং বিশাল রাজ্য।
আল-ইনসান 76:21
তাদের আবরণ হবে সূক্ষ্ম সবুজ রেশম ও স্থূল রেশম, আর তারা অলংকৃত হবে রৌপ্য নির্মিত কংকনে [১], আর তাদের রব তাদেরকে পান করবেন পবিত্ৰ পানীয়।
[১] আয়াতে ব্যবহৃত أساور শব্দটি سوار এর বহুবচন অর্থ কংকন যা হাতে পরিধান করার অলংকারবিশেষ। এই আয়াতে রূপার কংকন এবং অন্য কয়েক আয়াতে স্বর্ণের কংকন উল্লেখ করা হয়েছে [যেমন সূরা আল-কাহফ: ৩১, আল-হাজ্জ:২৩, ফাতির: ৩৩]। উভয়ের মধ্যে বিরোধ নেই। কেননা কোন সময় রূপার এবং কোন সময় স্বর্ণের কংকন ব্যবহৃত হতে পারে। অথবা মনমতো কেউ রূপার এবং কেউ স্বর্ণের ব্যবহার করতে পারে। [ফাতহুল কাদীর]
আল-ইনসান 76:22
‘নিশ্চয় এটা তোমাদের পুরস্কার; আর তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা ছিল প্রসংশাযোগ্য।
আল-ইনসান 76:23
নিশ্চয় আমরা আপনার প্রতি কুরআন নাযিল করেছি ক্রমে ক্ৰমে।
‘দ্বিতীয় রুকূ’
আল-ইনসান 76:24
কাজেই আপনি ধৈর্যের সাথে আপনার রবের নির্দেশের প্রতীক্ষা করুন এবং তাদের মধ্য থেকে কোন পাপিষ্ঠ বা ঘোর অকৃতজ্ঞ কাফিরের আনুগত্য করবেন না।
আল-ইনসান 76:25
আর আপনার রবের নাম স্মরণ করুন সকালে ও সন্ধ্যায়।
আল-ইনসান 76:26
আর রাতের কিছু অংশে তাঁর প্রতি সিজ্দাবনত হোন আর রাতের দীর্ঘ সময় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন।
আল-ইনসান 76:27
নিশ্চয় তারা ভালবাসে দুনিয়ার জীবনকে আর তারা তাদের সামনের কঠিন দিনকে উপেক্ষা করে চলে [১]।
[১] অর্থাৎ মক্কার কাফেররা যে কারণে আখলাক ও আকীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে গোমরাহীকে আঁকড়ে ধরে থাকতে আগ্রহী এবং তাদের কান নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্যের আহ্বানের প্রতি অমনযোগী, প্রকৃতপক্ষে সে কারণ হলো, তাদের দুনিয়া-পূজা এবং আখেরাত সম্পর্কে নিরুদ্বিগ্নতা, উদাসীনতা ও বেপরোয়া ভাব। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর]
আল-ইনসান 76:28
আমরা তাদেরকে সৃষ্টি করেছি এবং তাদের গঠন সুদৃঢ় করেছি। আর আমরা যখন ইচ্ছে করব তাদের স্থানে তাদের মত (কাউকে) দিয়ে পরিবর্তন করে দেব [১]।
[১] এ আয়াতাংশের কয়েকটি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হতে পারে, যখনই ইচ্ছা আমি তাদের ধ্বংস করে তাদের স্থলে অন্য মানুষদের নিয়ে আসতে পারি, যারা তাদের কাজ-কর্ম ও আচার-আচরণে এদের থেকে ভিন্ন প্রকৃতির হবে। এর দ্বিতীয় অর্থ হতে পারে, যখনই ইচ্ছা আমি এদের আকার-আকৃতি ও গুণাবলি নিকৃষ্টরূপে পরিবর্তন করে দিতে পারি। [কুরতুবী]
আল-ইনসান 76:29
নিশ্চয় এটা এক উপদেশ, অতএব যে ইচ্ছে করে সে যেন তার রবের দিকে একটি পথ গ্রহণ করে।
আল-ইনসান 76:30
আর তোমরা ইচ্ছে করতে সক্ষম হবে না যদি না আল্লাহ্ ইচ্ছে করেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
আল-ইনসান 76:31
তিনি যাকে ইচ্ছে তাঁর অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত করেন, কিন্তু যালেমরা- তাদের জন্য তিনি প্ৰস্তুত রেখেছেন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
আল-মুরসালাত 77:1
শপথ কল্যাণস্বরূপ প্রেরিত বায়ুর,
[১] আবদুল্লাহ্ ইবনে-মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমরা এক গুহায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে উপস্থিত ছিলাম। ইত্যবসরে সূরা মুরাসালাত অবতীর্ণ হল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরাটি আবৃত্তি করলেন আর আমি তা শুনে মুখস্থ করলাম। সূরার মিষ্টতায় তার মুখমন্ডল সতেজ দেখাচ্ছিল। হঠাৎ একটি সাপ আমাদের উপর আক্রমণোদ্যত হলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে হত্যা করার আদেশ দিলেন। আমরা সাপের দিকে অগ্রসর হলাম, কিন্তু তা পালিয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা যেমন তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ হয়েছ, তেমনি সেও তোমাদের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ হয়েছে। [বুখারী: ৩৩১৭, মুসলিম: ২২৩৪]
সূরা সংক্রান্ত আলোচনাঃ
আয়াত সংখ্যাঃ ৫০ আয়াত।
নাযিল হওয়ার স্থানঃ মক্কী।
। রহমান, রহীম আল্লাহ্র নামে।
আল-মুরসালাত 77:2
অতঃপর প্রলয়ংকরী ঝটিকার,
আল-মুরসালাত 77:3
শপথ প্ৰচণ্ড সঞ্চালনকারীর,
আল-মুরসালাত 77:4
অতঃপর সুস্পষ্টরূপে পার্থক্যকারীর,
আল-মুরসালাত 77:5
অতঃপর তাদের, যারা মানুষের অন্তরে পৌঁছে দেয় উপদেশ--- [১]
[১] এই সূরার প্রথমে আল্লাহ্ তা‘আলা পাঁচটি বস্তুর শপথ করে কেয়ামতের নিশ্চিত আগমনের কথা ব্যক্ত করেছেন। যে পাঁচটি জিনিসের শপথ করা হয়েছে কুরআনুল কারীম সেগুলোকে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেনি, বরং সেগুলোর নামের পরিবর্তে পাঁচটি বিশেষণ উল্লেখ করেছে। যেমন বলা হয়েছে, (এক) একের পর এক প্রেরিত বা কল্যাণ হিসেবে প্রেরিত, (দুই) অত্যন্ত দ্রুত এবং প্রচন্ডবেগে প্রবাহিত, (তিন) ভালভাবে বিক্ষিপ্তকারী, (চার) ভালভাবে বিচ্ছিন্নকারী এবং (পাঁচ) স্মরণকে জাগ্রতকারী। লক্ষণীয় যে, এগুলো কোন প্ৰাণী বা বস্তুর বিশেষণ, নাম নয়। কিন্তু এগুলো কার বিশেষণ তা পুরোপুরি নির্দিষ্ট করা হয় নি। তাই এ সম্পর্কে বিভিন্নরূপে তাফসীর বর্ণিত আছে। এক দল বলেন, প্রথম তিনটি দ্বারা বাতাস এবং পরের দু‘টি দ্বারা ফেরেশতা বুঝানো হয়েছে। [ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর] অপর এক দল বলেন, প্রথম দু‘টি দ্বারা বাতাস এবং পরের তিনটি দ্বারা ফেরেশতা বুঝানো হয়েছে। [মুয়াসসার] তৃতীয় এক দল বলেন, প্রথম তিনটি বিশেষণ দ্বারা বাতাস, চতুর্থটি দ্বারা কুরআন এবং পঞ্চমটি দ্বারা ফেরেশ্তা বুঝানো হয়েছে। [জালালাইন, আয়সারুত তাফসীর] কেউ কেউ বলেন যে প্রতিটি বিশেষণ দ্বারা ফেরেশতাদের বুঝানো হয়েছে। সম্ভবত ফেরেশতাগণের বিভিন্ন দল এসব বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষিত। [দেখুন, কুরতুবী] তবে ইমাম তাবারী বলেন, প্রথম আয়াত দ্বারা ফেরেশ্তা বা বাতাস- দুটিই উদ্দেশ্য হতে পারে। দ্বিতীয় আয়তটি দ্বারা প্রবাহিত বাতাস; আর তৃতীয় আয়াতটির মাধ্যমে বাতাস, বৃষ্টি বা ফেরেশ্তা সবই উদ্দেশ্য হতে পারে। চতুর্থটি দ্বারা যেকোনো সত্য-মিথ্যা পার্থক্যকারী উদ্দেশ্য হতে পারে, চাই তা ফেরেশ্তা হোক বা কুরআন হোক, বা অন্য কিছু হোক। আর পঞ্চমটির মাধ্যমে ফেরেশতাদের উদ্দেশ্য করা হয়েছে।
আল-মুরসালাত 77:6
ওযর-আপত্তি রহিতকরণ ও সতর্ক করার জন্য [১]
[১] এ আয়াতটি আগের আয়াতের সাথে সম্পৃক্ত। বলা হয়েছে, যে ফেরেশতারা যে উপদেশ ও ওহী নিয়ে আসে তার মাধ্যমে সৃষ্টির পক্ষ থেকে ওজর পেশ করার সুযোগ বন্ধ করা এবং আল্লাহ্র পক্ষ থেকে আযাবের ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য থাকে। ফাররা বলেন, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে যে উপদেশ-বাণী বা ওহী আসে তা মুমিনদের জন্যে ওযর-আপত্তি রহিত করার কারণ হয় এবং কাফেরদের জন্যে সতর্ককারী হয়ে যায়। [ফিাতহুল কাদীর]
আল-মুরসালাত 77:7
নিশ্চয় তোমাদেরকে যে প্ৰতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা অবশ্যম্ভাবী।
আল-মুরসালাত 77:8
যখন নক্ষত্ররাজির আলো নির্বাপিত করা হবে,
আল-মুরসালাত 77:9
আর যখন আকাশ বিদীর্ণ করা হবে,
আল-মুরসালাত 77:10
আর যখন পর্বতমালা চূৰ্ণবিচূর্ণ করা হবে,
আল-মুরসালাত 77:11
আর যখন রাসূলগণকে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত করা হবে [১] ,
[১] এখানে আল্লাহ্ তা‘আলার ওয়াদা বা ভীতিপ্ৰদ বিষয়সমূহ বাস্তবায়ন মুহূর্তের কতিপয় ভয়ানক অবস্থা বর্ণনা করে বলেন যে, প্রথমে সব নক্ষত্র জ্যোতিহীন হয়ে যাবে এবং ঝরে যাবে। দ্বিতীয় অবস্থা এই যে, আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে। তৃতীয় অবস্থা এই যে, পর্বতসমূহ চূর্ণ হয়ে বিক্ষিপ্ত ধূলি-কণা হওয়ার পর নাই হয়ে যাবে। চতুর্থ অবস্থা হলো, নবী-রাসূলগণের জন্যে তাদের ও তাদের উম্মতের মাঝে বিচারের জন্য উপস্থিত হওয়ার যে সময় নিরূপিত হয়েছিল, তারা যখন সে সময়ে পৌছে যাবেন এবং তাদেরকে জড়ো করা হবে। [মুয়াসসার, সা‘দী]
আল-মুরসালাত 77:12
এ-সব স্থগিত রাখা হয়েছে কোন্ দিনের জন্য?
আল-মুরসালাত 77:13
বিচার দিনের জন্য।
আল-মুরসালাত 77:14
আর আপনাকে কিসে জানাবে বিচার দিন কী?
আল-মুরসালাত 77:15
সেদিন দুর্ভোগ মিথ্যারোপকারীদের জন্য [১]।
[১] ويل দ্বারা উদ্দেশ্য ধ্বংস, দুর্ভোগ । অর্থাৎ কতই না দুর্ভোগ ও ধ্বংস রয়েছে সেসব লোকের জন্য, যারা সেদিনের আগমনের খবরকে মিথ্যা বলে মনে করেছিল। আল্লাহ্ তাদেরকে শপথ করে বলেছেন, কিন্তু তারা তা বিশ্বাস করে নি। ফলে তারা কঠোর ও কঠিন শাস্তির যোগ্য হয়ে উঠল। [সা‘দী]
আল-মুরসালাত 77:16
আমরা কি পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করিনি?
আল-মুরসালাত 77:17
তারপর আমরা পরবর্তীদেরকে তাদের অনুগামী করব [১]।
[১] এটা আখেরাতের স্বপক্ষে ঐতিহাসিক প্ৰমাণ। এতে বর্তমান লোকদেরকে অতীত লোকদের অবস্থা থেকে শিক্ষা গ্ৰহণ করতে বলা হয়েছে। আদ, সামুদ, কাওমে-লুত, কাওমে-ফির‘আউন ইত্যাদিকে আল্লাহ্ ধ্বংস করেছেন। সে ধারাবাহিকতায় মক্কার কাফেরদেরকেও তিনি ধ্বংস করবেন। [দেখুন, তাবারী; ফাতহুল কাদীর] এই আযাব বদর, ওহুদ প্রভৃতি যুদ্ধে তাদের উপর পতিত হয়েছে। আর যদি দুনিয়াতে সে আযাব নাও আসে, আখেরাতে তা অবশ্যই আসবে। [ফাতহুল কাদীর]
আল-মুরসালাত 77:18
অপরাধীদের প্রতি আমরা এরূপই করে থাকি।
আল-মুরসালাত 77:19
সেদিন দুর্ভোগ মিথ্যারোপকারীদের জন্য।
আল-মুরসালাত 77:20
আমরা কি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি হতে সৃষ্টি করিনি?
আল-মুরসালাত 77:21
তারপর আমরা তা রেখেছি নিরাপদ আধারে [১] ,
[১] অর্থাৎ মায়ের গর্ভস্থল। একে মহান আল্লাহ্ তা‘আলা মুক্ত বাতাস থেকেও সংরক্ষণ করেছেন। [তাতিস্মাতু আদ্ওয়াউল বায়ান]
আল-মুরসালাত 77:22
এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত,
আল-মুরসালাত 77:23
অতঃপর আমরা পরিমাপ করেছি, সুতরাং আমরা কত নিপুণ পরিমাপকারী [১] !
[১] এটা মৃত্যুর পরের জীবনের সম্ভাব্যতার স্পষ্ট প্রমাণ। আল্লাহ্ তা‘আলার এ বাণীর অর্থ হলো, যখন আমি নগণ্য এক ফোটা বীর্য থেকে সূচনা করে তোমাকে পূর্ণাঙ্গ একজন মানুষ বানাতে সক্ষম হয়েছি তখন পুনরায় তোমাদের অন্য কোনভাবে সৃষ্টি করতে সক্ষম হবো না কেন? আমার যে সৃষ্টি কর্মের ফলশ্রুতিতে তুমি আজ জীবিত ও বর্তমান তা একথা প্রমাণ করে যে, আমি অসীম ক্ষমতার অধিকারী। আমি এমন অক্ষম নই যে, একবার সৃষ্টি করার পর তোমাদেরকে পুনরায় আর সৃষ্টি করতে পারবো না। [আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর]
আল-মুরসালাত 77:24
সেদিন দুর্ভোগ মিথ্যারোপকারীদের জন্য [১]।
[১] এখানে এ আয়াতংশ যে অর্থ প্রকাশ করছে তা হলো, মৃত্যুর পরের জীবনের সম্ভাব্যতার এ স্পষ্ট প্রমাণ সামনে থাকা সত্ত্বেও যারা তা অস্বীকার করছে তাদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য। [দেখুন, সা‘দী] সুতরাং তারা আখেরাত ও পুনরুত্থান নিয়ে যত ইচ্ছা হাসি রঙ-তামাসা ও ঠাট্টা-বিদ্রুপ করুক এবং এর ওপর বিশ্বাস স্থাপনকারী লোকদের তারা যত ইচ্ছা ‘সেকেলে’ অন্ধবিশ্বাসী এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন বলতে থাকুক। যে দিনকে এরা মিথ্যা বলছে যখন সেদিনটি আসবে তখন তারা জানতে পারবে, সেটিই তাদের জন্য ধ্বংসের দিন।
আল-মুরসালাত 77:25
আমরা কি যমীনকে সৃষ্টি করিনি ধারণকারীরূপে,
আল-মুরসালাত 77:26
জীবিত ও মৃতের জন্য [১] ?
[১] অর্থাৎ ভূমি জীবিত মানুষকে তার পৃষ্ঠে এবং সকল মৃতকে তার পেটে ধারণ করে। [সা‘দী; মুয়াসসার]
আল-মুরসালাত 77:27
আর আমরা তাতে স্থাপন করেছি সুদৃঢ় উচ্চ পর্বতমালা এবং তোমাদেরকে পান করিয়েছি সুপেয় পানি [১]।
[১] অর্থাৎ এ পৃথিবীর অভ্যন্তরে সুপেয় পানি সৃষ্টি করা হয়েছে। এর পৃষ্ঠদেশের উপরেও সুপেয় পানির নদী ও খাল প্রবাহিত করা হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে বলেছেন, “তোমরা যে পানি পান কর তা সম্পর্কে আমাকে জানাও তোমরা কি সেটা মেঘ হতে নামিয়ে আন, না আমরা সেটা বর্ষণ করি? আমরা ইচ্ছে করলে তা লবণাক্ত করে দিতে পারি। তবুও কেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না ?” [সূরা আল-ওয়াকি‘আহ: ৬৮-৭০]
আল-মুরসালাত 77:28
সেদিন দুর্ভোগ মিথ্যারোপকারীদের জন্য [১] ।
[১] এখানে এ আয়াতাংশ এ অর্থে বলা হয়েছে যে যেসব লোক আল্লাহ্ তা‘আলার কুদরত ও কর্মকৌশলের এ বিস্ময়কর নমুনা দেখেও আখেরাতের সম্ভাব্যতা ও যৌক্তিকতা অস্বীকার করছে এবং এ দুনিয়ার ধ্বংসের পর আল্লাহ্ তা‘আলা আরো একটি দুনিয়া সৃষ্টি করবেন এবং সেখানে মানুষের কাছ থেকে তার কাজের হিসেব গ্রহণ করবেন এ বিষয়টিকেও যারা মিথ্যা মনে করছে, তারা তাদের এ খামখেয়ালীতে মগ্ন থাকতে চাইলে থাকুক। তাদের ধারণা ও বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত এসব কিছু যেদিন বাস্তব হয়ে দেখা দেবে, সেদিন তারা বুঝতে পারবে যে, এ বোকামির মাধ্যমে তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের ব্যবস্থা করেছে মাত্ৰ।
আল-মুরসালাত 77:29
তোমরা যাতে মিথ্যারোপ করতে, চল তারই দিকে।
আল-মুরসালাত 77:30
চল তিন শাখাবিশিষ্ট আগুনের ছায়ার দিকে,
আল-মুরসালাত 77:31
যে ছায়া শীতল নয় এবং যা রক্ষা করে না অগ্নিশিখা হতে,
আল-মুরসালাত 77:32
নিশ্চয় জাহান্নাম উৎক্ষেপন করবে বৃহৎ স্ফুলিংগ অট্টালিকাতুল্য,
আল-মুরসালাত 77:33
তা যেন পীতবর্ণ উটের শ্রেণী [১] ,
[১] অর্থাৎ জাহান্নামের প্রত্যেকটি স্ফুলিঙ্গ প্রাসাদের মত বড় হবে। আর যখন এসব বড় বড় স্ফুলিঙ্গ উথিত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে এবং চারদিকে উড়তে থাকবে তখন মনে হবে যেন কালো কিছুটা হলুদ বর্ণের উটসমূহ লম্ফ ঝম্ফ করছে। [মুয়াসসার]
আল-মুরসালাত 77:34
সেদিন দুর্ভোগ মিথ্যারূপকারীদের জন্য।
আল-মুরসালাত 77:35
এটা এমন এক দিন যেদিন না তারা কথা বলবে [১] ,
[১] অর্থাৎ সেদিন কেউ কথা বলতে পারবে না এবং কাউকে কৃতকর্মের ওযর পেশ করার অনুমতি দেয়া হবে না। অন্যান্য আয়াতে কাফেরদের কথা বলা এবং ওযর পেশ করার কথা রয়েছে। সেটা এর পরিপন্থী নয়। কেননা, হাশরের ময়দানে বিভিন্ন স্থান আসবে। কোন স্থানে ওযর পেশ করা নিষিদ্ধ থাকবে এবং কোন স্থানে অনুমতি দেয়া হবে। [ইবন কাসীর]
আল-মুরসালাত 77:36
আর না তাদেরকে অনুমতি দেয়া হবে ওযর পেশ করার।
আল-মুরসালাত 77:37
সেদিন দুর্ভোগ মিথ্যারোপকারীদের জন্য।
আল-মুরসালাত 77:38
‘এটাই ফয়সালার দিন, আমরা একত্র করেছি তোমাদেরকে এবং পূৰ্ববর্তীদেরকে।’
আল-মুরসালাত 77:39
অতঃপর তোমাদের কোন কৌশল থাকলে তা প্রয়োগ কর আমার বিরুদ্ধে [১]।
[১] অর্থাৎ দুনিয়ায় তো তোমরা অনেক কৌশল ও চাতুর্যের আশ্রয় নিতে। এখন এখানে কোন কৌশল বা আশ্রয় নিয়ে আমার পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারলে তা একটু করে দেখাও। কিন্তু আজ তোমাদের কোন কৌশল কাজে আসবে না। আজ তোমরা পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবে না। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ্ বলেন, “হে জিন ও মানব সম্প্রদায়! আসমানসমূহ ও যমীনের সীমা তোমরা যদি অতিক্রম করতে পার অতিক্রম কর, কিন্তু তোমরা অতিক্রম করতে পারবে না সনদ ছাড়া।” [সূরা আর-রহমান: ৩৩] [সা‘দী]
আল-মুরসালাত 77:40
সেদিন দুর্ভোগ মিথ্যারোপকারীদের জন্য।
আল-মুরসালাত 77:41
নিশ্চয় মুত্তাকীরা [১] থাকবে ছায়ায় ও প্রস্রবণ বহুল স্থানে,
‘দ্বিতীয় রুকূ’
[১] মুত্তাকী শব্দ বলে এখানে সেসব লোকদের বুঝানো হয়েছে যারা আখেরাতকে মিথ্যা বলে অস্বীকার করা থেকে বিরত থেকেছে এবং আখেরাতকে মেনে নিয়ে এ বিশ্বাসে জীবন যাপন করেছে যে, আখেরাতে আমাদেরকে নিজেদের কথাবার্তা, কাজ-কর্ম এবং স্বভাব চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। তাই কথাবার্তা, কাজ-কর্মে সত্যবাদিতার প্রমাণ রেখেছে এবং তারা ফরয ও ওয়াজিব সঠিক মত আদায় করেছে। [দেখুন, সা‘দী]
আল-মুরসালাত 77:42
আর তাদের বাঞ্ছিত ফলমূলের প্রাচুর্যের মধ্যে।
আল-মুরসালাত 77:43
‘তোমাদের কর্মের পুরস্কারস্বরূপ তোমরা তৃপ্তির সাথে পানাহার কর।’
আল-মুরসালাত 77:44
এভাবে আমরা মুহসিনদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।
আল-মুরসালাত 77:45
সেদিন দুর্ভোগ মিথ্যারোপকারীদের জন্য।
আল-মুরসালাত 77:46
তোমরা খাও এবং ভোগ করে নাও অল্প কিছুদিন, তোমরা তো অপরাধী [১]।
[১] অর্থাৎ কিছুদিন খেয়ে-দেয়ে নাও এবং আরাম করে নাও। তোমরা তো অপরাধী; অবশেষে কঠোর আযাব ভোগ করতে হবে। নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে একথা দুনিয়াতে মিথ্যারোপকারীদেরকে বলা হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, ক্ষণস্থায়ী আরাম-আয়েশের পর তোমাদের কপালে আযাবই আযাব রয়েছে। [দেখুন, সা‘দী]
আল-মুরসালাত 77:47
সেদিন দুর্ভোগ মিথ্যারোপকারীদের জন্য।
আল-মুরসালাত 77:48
যখন তাদেরকে বলা হয়, রুকু কর তখন তারা রুকু করে না [১]।
[১] এখানে অধিকাংশ তফসীরবিদের মতে রুকুর পারিভাষিক অর্থই উদ্দেশ্য। অর্থ এই যে, যখন তাদেরকে সালাতের দিকে আহ্বান করা হত, তখন তারা সালাত পড়ত না। কাজেই আয়াতে রুকু বলে পুরো সালাত বোঝানো হয়েছে। [বাগভী; ইবন কাসীর; সা‘দী]
আল-মুরসালাত 77:49
সেদিন দুর্ভোগ মিথ্যারোপকারীদের জন্য।
আল-মুরসালাত 77:50
কাজেই তারা কুরআনের পরিবর্তে আর কোন্ কথায় ঈমান আনবে [১]!
[১] অর্থাৎ মানুষকে হক ও বাতিলের পার্থক্য বুঝিয়ে দেয়ার এবং হিদায়াতের পথ দেখানোর জন্য সবচেয়ে বড় জিনিস যা হতে পারতো তা কুরআন আকারে নাযিল করা হয়েছে। তারা যখন কুরআনের মত অপূর্ব, অলংকারপূর্ণ, তত্ত্বপূর্ণ ও সুস্পষ্ট প্রমাণাদিমণ্ডিত কিতাবে ঈমান আনল না, তখন এরপর আর কোন্ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে? এ কুরআন পড়ে বা শুনেও যদি একে বাদ দিয়ে আর অন্য কোন জিনিসের দিকে ধাবিত হয় তবে তাদের মত দুর্ভাগা আর কে হতে পারে? [দেখুন, সা‘দী]
আন-নাবা 78:1
তারা একে অন্যের কাছে কী বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে?
সূরা সংক্রান্ত আলোচনাঃ
আয়াত সংখ্যাঃ ৪০ আয়াত।
নাযিল হওয়ার স্থানঃ মক্কী।
। রহমান, রহীম আল্লাহ্র নামে।
আন-নাবা 78:2
মহাসংবাদটির বিষয়ে [১],
[১] অর্থাৎ তারা কি বিষয়ে পরস্পরে জিজ্ঞাসাবাদ করছে? অতঃপর আল্লাহ্ নিজেই উত্তর দিয়েছেন যে, মহাখবর সম্পর্কে। তাফসীরবিদ মুজাহিদ বলেন, এখানে মহাখবর বলে কুরআনকে উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। কাতাদাহ বলেন, এখানে মহাখবর বলে কেয়ামত বোঝানো হয়েছে। এখানে এটাই প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত। [ইবন কাসীর]
আন-নাবা 78:3
যে বিষয়ে তারা মতানৈক্য করছে [১],
[১] আয়াতের আরেকটি অর্থ হচ্ছেঃ “এ ব্যাপারে তারা নানা ধরনের কথা বলছে ও ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে ফিরছে।” অন্য অর্থ এও হতে পারে, দুনিয়ার পরিণাম সম্পর্কে তারা নিজেরাও কোন একটি অভিন্ন আকীদা পোষণ করে না বরং “তাদের মধ্যে এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়।” কেউ কেউ আবার আখেরাত পুরোপুরি অস্বীকার করতো না, তবে তা ঘটতে পারে কিনা, এ ব্যাপারে তাদের সন্দেহ ছিল। কুরআন মজীদে এ ধরনের লোকদের এ উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে, “আমরা তো মাত্র একটি ধারণাই পোষণ করি, আমাদের কোন নিশ্চিত বিশ্বাস নেই।” [সূরা আল-জাসিয়াহ, ৩২] আবার কেউ কেউ একদম পরিষ্কার বলতো, “আমাদের এ দুনিয়ার জীবনটিই সবকিছু এবং মরার পর আমাদের আর কখনো দ্বিতীয়বার উঠানো হবে না।” [সূরা আল-আন‘আম: ২৯]; “আমাদের এই দুনিয়ার জীবনটিই সব কিছু। এখানেই আমরা মরি, এখানেই জীবন লাভ করি এবং সময়ের চক্র ছাড়া আর কিছুই নেই যা আমাদের ধ্বংস করে।” [সূরা আল-জাসিয়াহ্: ২৪] [ফাতহুল কাদীর]
আন-নাবা 78:4
কখনো না [১], তারা অচিরেই জানতে পারবে;
[১] অর্থাৎ আখেরাত সম্পর্কে যেসব কথা এরা বলে যাচ্ছে এগুলো সবই ভুল। এরা যা কিছু মনে করেছে ও বুঝেছে তা কোনক্রমেই সঠিক নয়। [মুয়াসসার]
আন-নাবা 78:5
তারপর বলি কখনো না, তারা অচিরেই জানতে পারবে।
আন-নাবা 78:6
আমরা কি করিনি যমীনকে শয্যা
আন-নাবা 78:7
আর পর্বতসমূহকে পেরেক ?
আন-নাবা 78:8
আর আমরা সৃষ্টি করেছি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায়,
আন-নাবা 78:9
আর তোমাদের ঘুমকে করেছি বিশ্ৰাম [১],
[১] মানুষকে দুনিয়ায় কাজ করার যোগ্য করার জন্য মহান আল্লাহ্ অত্যন্ত কর্মকুশলতা সহকারে তার প্রকৃতিতে ঘুমের এক চাহিদা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। কর্মের ক্লান্তির পর ঘুম তাকে স্বস্তি, আরাম ও শান্তি দান করে। [সা‘দী]
আন-নাবা 78:10
আর করেছি রাতকে আবরণ,
আন-নাবা 78:11
আর করেছি দিনকে জীবিকা আহরণের সময়,
আন-নাবা 78:12
আর আমরা নির্মাণ করেছি তোমাদের উপরে সুদৃঢ় সাত আকাশ [১]
[১] সুস্থিত ও মজবুত বলা হয়েছে এ অর্থে যে, আকাশ তৈরি হয়েছে অত্যন্ত দৃঢ়-সংঘবদ্ধভাবে, তার মধ্যে সামান্যতম পরিবর্তনও কখনো হয় না, ধ্বংস হয় না, ফেটে যায় না। [তাবারী]
আন-নাবা 78:13
আর আমরা সৃষ্টি করেছি প্রোজ্জ্বল দীপ [১]।
[১] এখানে সূর্যকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে, যা সমগ্ৰ পৃথিবীর মানুষের জন্য প্রজ্জ্বলিত প্ৰদীপ। [ইবন কাসীর]
আন-নাবা 78:14
আর আমরা বর্ষণ করেছি মেঘমালা হতে প্রচুর বারি [১] ,
[১] معصرات শব্দটি معصرة এর বহুবচন। এর অর্থ জলে পরিপূর্ণ মেঘমালা। [তাবারী]
আন-নাবা 78:15
যাতে তা দ্বারা আমরা উৎপন্ন করি শস্য, উদ্ভিদ,
আন-নাবা 78:16
ও ঘন সন্নিবিষ্ট উদ্যান।
আন-নাবা 78:17
নিশ্চয় নির্ধারিত আছে বিচার দিন [১];
[১] অর্থাৎ যে দিন মহান আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির মাঝে বিচার-মীমাংসা করবেন সে দিন তথা কেয়ামত নির্দিষ্ট সময়েই আসবে। [মুয়াসসার]
আন-নাবা 78:18
সেদিন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে তখন তোমরা দলে দলে আসবে [১] ,
[১] অন্যান্য আয়াত থেকে জানা যায় যে, দু’বার শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে। প্রথম ফুৎকারের সাথে সাথে সমগ্র বিশ্ব ধ্বংস প্রাপ্ত হবে এবং দ্বিতীয় ফুৎকারের সাথে সাথে পুনরায় জীবিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। এ সময় বিশ্বের পূর্ববতী ও পরবর্তী সব মনুষ দলে দলে আল্লাহ্র কাছে উপস্থিত হবে। এ স্থানে শিংগার দ্বিতীয় ফুঁকের কথা বলা হয়েছে। এর আওয়াজ বুলন্দ হবার সাথে সাথেই প্রথম থেকে শেষ- সমস্ত মরা মানুষ অকস্মাৎ জেগে উঠবে। [ফাতহুল কাদীর]
আন-নাবা 78:19
আর আকাশ উন্মুক্ত করা হবে, ফলে তা হবে বহু দ্বারবিশিষ্ট [১]।
[১] “আকাশ খুলে দেয়া হবে” এর মানে এটাও হতে পারে যে, উর্ধজগতে কোন বাধা ও বন্ধন থাকবে না। আসমানে বিভিন্ন দরজা তৈরি হয়ে সেগুলো হতে সবদিক থেকে ফেরেশতারা নেমে আসতে থাকবে। [ইবন কাসীর]
আন-নাবা 78:20
আর চলমান করা হবে পর্বতসমূহকে, ফলে সেগুলো হয়ে যাবে মরীচিকা [১] ,
[১] পাহাড়ের চলার ও মরীচিকায় পরিণত হবার মানে হচ্ছে, দেখতে দেখতে মুহুর্তের মধ্যে পর্বতমালা স্থানচ্যুত হয়ে যাবে। তারপর ভেঙ্গে চূৰ্ণ বিচূর্ণ হয়ে এমনভাবে মরীচিকার মতো ছড়িয়ে পড়বে যে, মনে হবে সেখানে কিছু আছে, কিন্তু কিছু নেই। এর পরই যেখানে একটু আগে বিশাল পর্বত ছিল সেখানে আর কিছুই থাকবে না। এ অবস্থাকে অন্যত্র বলা হয়েছেঃ “এরা আপনাকে জিজ্ঞেস করছে, সেদিন এ পাহাড় কোথায় চলে যাবে? এদের বলে দিন, আমার রব তাদেরকে ধূলোয় পরিণত করে বাতাসে উড়িয়ে দেবেন এবং যমীনকে এমন একটি সমতল প্রান্তরে পরিণত করে দেবেন যে, তার মধ্যে কোথাও একটুও অসমতল ও উঁচুনীচু জায়গা এবং সামন্যতম ভাঁজও দেখতে পাবে না।” [সূরা ত্বা-হা: ১০৫-১০৭] [ইবন কাসীর]
আন-নাবা 78:21
নিশ্চয় জাহান্নাম ওৎ পেতে অপেক্ষমান;
আন-নাবা 78:22
সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য প্রত্যাবর্তনস্থল।
আন-নাবা 78:23
সেখানে তারা যুগ যুগ ধরে অবস্থান করবে [১]।
[১] অর্থাৎ তারা সেখানে অবস্থানকারী হবে সুদীর্ঘ বছর। আয়াতে ব্যবহৃত أحقاب শব্দটি حقب এর বহুবচন। এর অর্থ নির্ধারণ নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও স্বাভাবিকভাবে বলা যায় যে, এর দ্বারা ‘সুদীর্ঘ সময়’ উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। সুতরাং أحقاب দ্বারা তখন কোন সুনির্দিষ্ট সময় বোঝা উচিত হবে না। তাই উপরে এর অনুবাদ করা হয়েছে, ‘যুগ যুগ ধরে’। এর মানে হচ্ছে, একের পর এক আগমনকারী দীর্ঘ সময় তারা সেখানে অবস্থান করবে। এমন একটি ধারাবাহিক যুগ যে, একটি যুগ শেষ হবার পর আর একটি যুগ শুরু হয়ে যায়। একের পর এক আসতেই থাকবে এবং এমন কোন যুগ হবে না যার পর আর কোন যুগ আসবে না। [দেখুন: ইবন কাসীর] কুরআনের ৩৪ জায়গায় জাহান্নামবাসীদের জন্য ‘খুলুদ’ (চিরন্তন) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তিন জায়গায় কেবল ‘খুলুদ’ বলেই শেষ করা হয়নি বরং তার সাথে “আবাদান” (চিরকাল) শব্দও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এক জায়গায় পরিষ্কার বলা হয়েছে, “তারা চাইবে জাহান্নাম থেকে বের হয়ে যেতে। কিন্তু তারা কখনো সেখান থেকে বের হতে পারবে না এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী আযাব।” [সূরা আল-মায়েদাহ : ৩৭]
আন-নাবা 78:24
সেখানে তারা আস্বাদন করবে না শীতলতা, না কোন পানীয়---
আন-নাবা 78:25
ফুটন্ত পানি ও পুঁজ ছাড়া [১];
[১] মূলে গাস্সাক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ হয়ঃ পুঁজ, রক্ত, পুঁজ মেশানো রক্ত এবং চোখ ও গায়ের চামড়া থেকে বিভিন্ন ধরনের কঠোর দৈহিক নির্যাতনের ফলে যেসব রস বের হয়, যা প্রচণ্ড দুৰ্গন্ধযুক্ত। [ইবন কাসীর]
আন-নাবা 78:26
এটাই উপযুক্ত প্রতিফল [১]।
[১] অর্থাৎ জাহান্নামে তাদেরকে যে শাস্তি দেয়া হবে, তা ন্যায় ও ইনসাফের দৃষ্টিতে তাদের বাতিল বিশ্বাস ও কুকর্মের অনুরূপ হবে। এতে কোন বাড়াবাড়ি হবে না। [মুয়াসসার, সা‘দী]
আন-নাবা 78:27
নিশ্চয় তারা কখনো হিসেবের আশা করত না,
আন-নাবা 78:28
আর তারা আমাদের নিদর্শনাবলীতে কঠোরভাবে মিথ্যারোপ করেছিল [১]।
[১] এ হচ্ছে তাদের জাহান্নামের ভয়াবহ আযাব ভোগ করার কারণ। তারা আল্লাহ্র সামনে হাজির হয়ে নিজেদের আসনের হিসেব পেশ করার সময়ের কোন আশা করত না। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ্ যেসব আয়াত পাঠিয়েছিলেন সেগুলো মেনে নিতে তারা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করত এবং সেগুলোকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করত। [ফাতহুল কাদীর]
আন-নাবা 78:29
আর সবকিছুই আমরা সংরক্ষণ করেছি লিখিতভাবে।
আন-নাবা 78:30
অতঃপর তোমরা আস্বাদ গ্রহণ কর, আমরা তো তোমাদের শাস্তিই শুধু বৃদ্ধি করব।
আন-নাবা 78:31
নিশ্চয় মুত্তাকীদের জন্য আছে সাফল্য,
‘দ্বিতীয় রুকূ’
আন-নাবা 78:32
উদ্যানসমূহ, আঙ্গুরসমূহ,
আন-নাবা 78:33
আর সমবয়স্কা [১] উদ্ভিন্ন যৌবনা তরুণী
[১] এর অর্থ এও হতে পারে যে, তারা পরস্পর সমবয়স্কা হবে। [মুয়াসসার, সা‘দী]
আন-নাবা 78:34
এবং পরিপূর্ণ পানিপাত্র।
আন-নাবা 78:35
সেখানে তারা শুনবে না কোন অসার ও মিথ্যা বাক্য [১] ;
[১] জান্নাতে কোন কটুকথা ও আজেবাজে গল্পগুজব হবে না। কেউ কারো সাথে মিথ্যা বলবে না এবং কারো কথাকে মিথ্যাও বলবে না। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়টিকে জান্নাতের বিরাট নিয়ামত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। [সা‘দী]
আন-নাবা 78:36
আপনার রবের পক্ষ থেকে পুরস্কার, যথোচিত দানস্বরূপ [১] ,
[১] লক্ষণীয় যে, এসব নেয়ামত বর্ণনা করে বলা হয়েছে, জান্নাতের এসব নেয়ামত মুমিনদের প্রতিদান এবং আপনার রবের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত দান। এখানে জান্নাতের নেয়ামতসমূহকে প্রথমে কর্মের প্রতিদান ও পরে আল্লাহ্র দান বলা হয়েছে। প্রতিদান শব্দের পরে আবার যথেষ্ট পুরস্কার দেবার কথা বলার অর্থ এ দাঁড়ায় যে, তারা নিজেদের সৎকাজের বিনিময়ে যে প্রতিদান লাভের অধিকারী হবে কেবলমাত্র ততটুকুই তাদেরকে দেয়া হবে না বরং তার ওপর অতিরিক্ত পুরস্কার এবং অনেক বেশী পুরস্কার দেয়া হবে। বিপরীত পক্ষে জাহান্নামবাসীদের জন্য কেবলমাত্র এতটুকুই বলা হয়েছে যে, তাদেরকে তাদের কাজের পূর্ণ প্রতিফল দেয়া হবে। অর্থাৎ তাদের যে পরিমাণ অপরাধ তার চেয়ে বেশী শাস্তি দেয়া হবে না এবং কমও দেয়া হবে না। [দেখুন, তাতিম্মাতু আদ্ওয়াউল বায়ান] কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে একথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন সূরা ইউনুস ২৬-২৭ আয়াত, আন নাম্ল ৮৯-৯০ আয়াত, আল কাসাস ৮৪ আয়াত, সাবা ৩৩ আয়াত এবং আল মু‘মিন ৪০ আয়াত।
আন-নাবা 78:37
যিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুর রব, দয়াময়; তাঁর কাছে আবেদন-নিবেদনের শক্তি তাদের থাকবে না [১]।
[১] এই বাক্যটি পূর্বের বাক্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এর অর্থ এই হবে যে, এটি সে-রবের পক্ষ থেকে প্রতিদান, যিনি আসমান ও যমীনের রব; তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে কেয়ামতের ময়দানে কারও কথা বলার ক্ষমতা হবে না; যদি-না তিনি অনুমতি দেন। [মুয়াসসার]
আন-নাবা 78:38
সেদিন রূহ্ ও ফেরেশ্তাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁরাবে [১]; সেদিন কেউ কথা বলবে না, তবে ‘রহমান’ যাকে অনুমতি দেবেন সে ছাড়া, এবং সে সঠিক কথা বলবে [২]।
[১] অধিকাংশ তাফসীরকারগণের মতে ‘রূহ’ বলে এখানে জিবরাঈল আলাইহিস্ সালামকে বোঝানো হয়েছে। [মুয়াসসার, সা‘দী] ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে যে, রূহ দ্বারা আল্লাহ্ তা‘আলার এক বড় আকৃতির ফেরেশতাকে বোঝানো হয়েছে। কাতাদাহ বলেন, এখানে রূহ বলে আদম সন্তানদেরকে বোঝানো হয়েছে। শেষোক্ত দু‘টি তাফসীর অনুযায়ী দুটি সারি হবে- একটি রূহের ও অপরটি ফেরেশতাগণের। [আত-তাফসীর আস-সাহীহ]
[২] এখানে কথা বলা মানে শাফা‘আত করা বলা হয়েছে। শাফা‘আত করতে হলে যে ব্যক্তিকে যে গুনাহগারের জন্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে শাফা‘আত করার অনুমতি দেয়া হবে একমাত্র সে-ই তার জন্য শাফা‘আত করতে পারবে। আর শাফা‘আতকারীকে সঠিক ও যথার্থ সত্য কথা বলতে হবে। অন্যায় সুপারিশ করতে পারবে না। [দেখুন, কুরতুবী]
আন-নাবা 78:39
এ দিনটি সত্য; অতএব যার ইচ্ছে সে তার রবের নিকট আশ্রয় গ্ৰহণ করুক।
আন-নাবা 78:40
নিশ্চয় আমরা তোমাদেরকে আসন্ন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করলাম; যেদিন মানুষ তার কৃতকর্ম দেখতে পাবে এবং কাফির বলবে, ‘হায়! আমি যদি মাটি হতাম [১] !’
[১] আবদুল্লাহ ইবনে আমর, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম থেকে বর্ণিত আছে, কেয়ামতের দিন সমগ্র ভূপৃষ্ঠ এক সমতল ভূমি হয়ে যাবে। এতে মানব, জিন, গৃহপালিত জন্তু এবং বন্য জন্তু সবাইকে একত্রিত করা হবে। জন্তুদের মধ্য কেউ দুনিয়াতে অন্য জন্তুর উপর জুলুম করে থাকলে তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নেয়া হবে। এমন কি কোন শিংবিশিষ্ট ছাগল কোন শিংবিহীন ছাগলকে মেরে থাকলে সেদিন তার প্রতিশোধ নেয়া হবে। এই কর্ম সমাপ্ত হলে সব জন্তুকে আদেশ করা হবেঃ মাটি হয়ে যাও। তখন সব মাটি হয়ে যাবে। এই দৃশ্য দেখে কাফেররা আকাঙ্ক্ষা করবে - হায়। আমরাও যদি মাটি হয়ে যেতাম। এরূপ হলে আমরা হিসাব-নিকাশ ও জাহান্নামের আযাব থেকে বেঁচে যেতাম। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৩৪৫, ৪/৫৭৫, মুসনাদে ইসহাক ইবনে রাহওয়াই: ৩২২, সিলসিলা সহীহা: ১৯৬৬]
আন-নাযিআত 79:1
শপথ [১] নির্মমভাবে উৎপাটনকারীদের [২] ,
সূরা সংক্রান্ত আলোচনাঃ
আয়াত সংখ্যাঃ ৪৬ আয়াত।
নাযিল হওয়ার স্থানঃ মক্কী।
রহমান, রহীম আল্লাহ্র নামে
[১] এ সূরার শুরুতে কতিপয় গুণ ও অবস্থা বর্ণনা করে তাদের শপথ করা হয়েছে। এ পাঁচটি গুণাবলী কোন কোন সত্তার সাথে জড়িত, একথাও এখানে পরিস্কার করে বলা হয়নি। কিন্তু বিপুল সংখ্যক সাহাবী ও তাবেঈন এবং অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এখানে ফেরেশতাদের কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া শপথের জওয়াবও উহ্য রাখা হয়েছে। মূলত কেয়ামত ও হাশর-নশর অবশ্যই হবে এবং সেগুলো নিঃসন্দেহে সত্য, একথার ওপরই এখানে কসম খাওয়া হয়েছে। [কুরতুবী] অথবা কসম ও কসমের কারণ এক হতে পারে, কেননা ফেরেশ্তাদের প্রতি ঈমান আনা ঈমানের স্তম্ভসমূহের মধ্যে অন্যতম। [সা‘দী]
[২] বলা হয়েছে, যারা নির্মমভাবে টেনে আত্মা উৎপাটন করে। এটা যাদের শপথ করা হয়েছে সে ফেরেশতাগণের প্রথম বিশেষণ। অধিকাংশ সাহাবী ও তাবেয়ী বলেন, ডুব দিয়ে টানা এবং আস্তে আস্তে বের করে আনা এমন সব ফেরেশতার কাজ যারা মৃত্যুকালে মানুষের শরীরে গভীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তার প্রতিটি শিরা উপশিরা থেকে তার প্রাণ বায়ু টেনে বের করে আনে। এখানে আযাবের, সেসব ফেরেশতা বোঝানো হয়েছে, যারা কাফেরের আত্না নির্মমভাবে বের করে। [ফাতহুল কাদীর]
আন-নাযিআত 79:2
আর মৃদুভাবে বন্ধনমুক্তকারীদের [১]
[১] এটা যাদের শপথ করা হয়েছে সে ফেরেশতাগণের দ্বিতীয় বিশেষণ। বলা হয়েছে যে, যে ফেরেশতা মুমিনের রূহ কবজ করার কাজে নিয়োজিত আছে, সে আনায়াসে রূহ কবজ করে- কঠোরতা করে না। প্রকৃত কারণ এই যে কাফেরের আত্না বের করার সময় থেকেই বরযখের আযাব সামনে এসে যায়। এতে তার আত্মা অস্থির হয়ে দেহে আত্মগোপন করতে চায়। ফেরেশতা জোরে-জবরে টাঁনা-হেঁচড়া করে তাকে বের করে। পক্ষান্তরে মুমিনের রূহের সামনে বরযখের সওয়াব নেয়ামত ও সুসংবাদ ভেসে উঠে। ফলে সে দ্রুতবেগে সেদিকে যেতে চায়। [কুরতুবী]
আন-নাযিআত 79:3
আর তীব্ৰ গতিতে সন্তরণকারীদের [১] ,
[১] এটা তাদের তৃতীয় বিশেষণ। سابحات এর আভিধানিক অর্থ সাঁতার কাটা। এই সাঁতারু বিশেষণটিও মৃত্যুর ফেরেশতাগণের সাথে সর্ম্পকযুক্ত। মানুষের রূহ কবজ করার পর তারা দ্রুতগতিতে আকাশের দিকে নিয়ে যায়। [কুরতুবী]
আন-নাযিআত 79:4
আর দ্রুতবেগে অগ্রসরমানদের [১] ,
[১] এটা তাদের চতুৰ্থ বিশেষণ। উদ্দেশ্য এই যে, যে আত্মা ফেরেশতাগণের হস্তগত হয় তাকে ভাল অথবা মন্দ ঠিকানায় পৌছানোর কাজে তারা দ্রুততায় একে অপরকে ডিঙ্গিয়ে যায়। তারা মুমিনের আত্মাকে জান্নাতের আবহাওয়ায় ও নেয়ামতের জায়গায় এবং কাফেরের আত্মাকে জাহান্নামের আবহাওয়ায় ও আযাবের জায়গায় পৌছিয়ে দেয়। [ফাতহুল কাদীর]
আন-নাযিআত 79:5
অতঃপর সব কাজ নির্বাহকারীদের [১]।
[১] পঞ্চম বিশেষণ। অর্থাৎ মৃত্যুর ফেরেশতাদের সর্বশেষ কাজ এই যে, তারা আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশে দুনিয়ার বিভিন্ন কাজ নির্বাহের ব্যবস্থা করে। [সা‘দী]
আন-নাযিআত 79:6
সেদিন প্রকম্পিতকারী প্রকম্পিত করবে,
আন-নাযিআত 79:7
তাকে অনুসরণ করবে পরবর্তী কম্পনকারী [১] ,
[১] প্রথম প্রকম্পনকারী বলতে এমন প্রকম্পন বুঝানো হয়েছে, যা পৃথিবী ও তার মধ্যকার সমস্ত জিনিস ধ্বংস করে দেবে। আর দ্বিতীয় প্রকম্পন বলতে যে কম্পনে সমস্ত মৃতরা জীবিত হয়ে যমীনের মধ্য থেকে বের হয়ে আসবে তাকে বুঝানো হয়েছে। [মুয়াস্সার] অন্যত্র এ অবস্থাটি নিমোক্তভাবে বর্ণিত হয়েছেঃ “আর শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে। তখন পৃথিবী ও আকাশসমূহে যা কিছু আছে সব মরে পড়ে যাবে, তবে কেবলমাত্র তারাই জীবিত থাকবে যাদের আল্লাহ্ (জীবিত রাখতে) চাইবেন। তারপর দ্বিতীয়বার ফুঁক দেয়া হবে। তখন তারা সবাই আবার হঠাৎ উঠে দেখতে থাকবে।” [সূরা আয-যুমার: ৬৮] এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাত্রির দুই তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হলে দাঁড়িয়ে বলতেন, হে মানুষ! তোমরা আল্লাহ্র যিকর কর, তোমরা আল্লাহ্র যিকর কর। ‘রাজেফাহ’ (প্রকম্পণকারী) তো এসেই গেল (প্রায়), তার পিছনে আসবে ‘রাদেফাহ’ (পশ্চাতে আগমনকারী), মৃত্যু তার কাছে যা আছে তা নিয়ে হাজির, মৃত্যু তার কাছে যা আছে তা নিয়ে হাজির। সাহাবী উবাই ইবনে কা'ব বলেন, আমি বললাম হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি আপনার উপর বেশী বেশী সালাত (দরুদ) পাঠ করি। এ সালাত পাঠের পরিমান কেমন হওয়া উচিত? তিনি বললেন, তোমার যা ইচ্ছা। আমি বললাম, (আমার যাবতীয় দো‘আর) এক চতুর্থাংশ? তিনি বললেন, যা তোমার ইচ্ছা। তবে যদি এর থেকেও বেশী কর তবে সেটা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে। আমি বললাম, অর্ধেকাংশ? তিনি বললেন, যা তোমার ইচ্ছা। তবে যদি এর থেকেও বেশী কর তবে সেটা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে। আমি বললাম, দুই তৃতীয়াংশ? তিনি বললেন, যা তোমার ইচ্ছা। তবে যদি এর থেকেও বেশী কর তবে সেটা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে। আমি বললাম, তাহলে আমি আপনার জন্য আমার সালাতের সবটুকুই নির্ধারণ করব, (অর্থাৎ আমার যাবতীয় দো‘আ হবে আপনার উপর সালাত বা দরুদ প্রেরণ) তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে তা তোমার যাবতীয় চিন্তা দূর করে দিবে এবং তোমার গোনাহ ক্ষমা করে দিবে।” (তিরমিয়ী: ২৪৫৭, মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৫১৩, দ্বিয়া: আলমুখতারাহ: ৩/৩৮৮, ৩৯০]
আন-নাযিআত 79:8
অনেক হৃদয় সেদিন সন্ত্রস্ত হবে [১] ,
[১] “কতক হৃদয়” বলতে কাফের ও নাফরমানদের বোঝানো হয়েছে। কিয়ামতের দিন তারা ভীত ও আতঙ্কিত হবে। [মুয়াস্সার] সৎ মু‘মিন বান্দাদের ওপর এ ভীতি প্রভাব বিস্তার করবে না। অন্যত্র তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “সেই চরম ভীতি ও আতংকের দিনে তারা একটুও পেরেশান হবে না এবং ফেরেশতারা এগিয়ে এসে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাবে। তারা বলতে থাকবে, তোমাদের সাথে এ দিনটিরই ওয়াদা করা হয়েছিল।” [সূরা আল-আম্বিয়া:১০৩]
আন-নাযিআত 79:9
তাদের দৃষ্টিসমূহ ভীতি-বিহ্বলতায় নত হবে।
আন-নাযিআত 79:10
তারা বলে, ‘আমরা কি আগের অবস্থায় ফিরে যাবই---
আন-নাযিআত 79:11
চূৰ্ণবিচূর্ণ অস্থিতে পরিণত হওয়ার পরও?’
আন-নাযিআত 79:12
তারা বলে, ‘তাই যদি হয় তবে তো এটা এক সর্বনাশা প্ৰত্যাবর্তন।’
আন-নাযিআত 79:13
এ তো শুধু এক বিকট আওয়াজ [১] ,
[১] অর্থাৎ আল্লাহ্র জন্য এটা কোন কঠিন কাজ নয়। এ কাজটি করতে তাঁকে কোন বড় রকমের প্রস্তুতি নিতে হবে না। এর জন্য শুধুমাত্র একটি ধমক বা আওয়াজই যথেষ্ট। এরপরই তোমরা সমতল ময়দানে আবির্ভূত হবে। [ইবন কাসীর]
আন-নাযিআত 79:14
তখনই ময়দানে [১] তাদের আবির্ভাব হবে।
[১] আয়াতে বর্ণিত ساهرة শব্দের অর্থ সমতল ময়দান। কেয়ামতে পূনরায় যে ভূপৃষ্ঠ সৃষ্টি করা হবে, তা সমতল হবে। একেই আয়াতে ساهرة বলে ব্যক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ জমিনের উপরিভাগও হতে পারে। [ইবন কাসীর]
আন-নাযিআত 79:15
আপনার কাছে মূসার বৃত্তান্ত পৌঁছেছে কি [১] ?
[১] কাফেরদের অবিশ্বাস, হটকারিতা ও শক্রতার ফলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে মর্মপীড়া অনুভব করতেন, তা দূর করার উদ্দেশ্যে মূসা আলাইহিস্ সালাম ও ফির‘আউনের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, শত্রুরা কেবল আপনাকেই কষ্ট দেয়নি, পূর্ববর্তী সকল রাসূলকেও কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু তাদের পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। সুতরাং আপনিও সবর করুন। [দেখুন, কুরতুবী]
আন-নাযিআত 79:16
যখন তাঁর রব পবিত্র উপত্যকা ‘তুওয়া’য় তাঁকে ডেকে বলেছিলেন,
আন-নাযিআত 79:17
‘ফির‘আউনের কাছে যান, সে তো সীমালঙ্ঘন করেছে, ’
আন-নাযিআত 79:18
অতঃপর বলুন, ‘তোমার কি আগ্ৰহ আছে যে, তুমি পবিত্র হও—
আন-নাযিআত 79:19
‘আর আমি তোমাকে তোমার রবের দিকে পথপ্রদর্শন করি, যাতে তুমি তাঁকে ভয় কর ?’
আন-নাযিআত 79:20
অতঃপর তিনি তাকে মহানিদর্শন দেখালেন [১]।
[১] বড় নিদর্শন বলতে সবগুলো মুজিযা উদ্দেশ্য হতে পারে। আবার লাঠির অজগর হয়ে যাওয়া এবং হাত শুভ্র হওয়ার কথাও বুঝানো হতে পারে। [কুরতুবী, মুয়াসসার]
আন-নাযিআত 79:21
কিন্তু সে মিথ্যারোপ করল এবং অবাধ্য হল।
আন-নাযিআত 79:22
তারপর সে পিছনে ফিরে প্রতিবিধানে সচেষ্ট হল [১]।
[১] অর্থাৎ হককে বাতিল দ্বারা প্ৰতিহত করতে চেষ্টা করতে লাগল। [ইবন কাসীর]
আন-নাযিআত 79:23
অতঃপর সে সকলকে সমবেত করে ঘোষণা দিল,
আন-নাযিআত 79:24
অতঃপর বলল, ‘আমিই তোমাদের সর্বোচ্চ রব।’
আন-নাযিআত 79:25
অতঃপর আল্লাহ্ তাকে আখেরাতে ও দুনিয়ায় কঠিন শাস্তিতে পাকড়াও করলেন [১]।
[১] نكال শব্দের অর্থ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, যা দেখে অন্যরাও আতঙ্কিত হয়ে যায় এবং শিক্ষা পায়। [কুরতুবী]
আন-নাযিআত 79:26
নিশ্চয় যে ভয় করে তার জন্য তো এতে শিক্ষা রয়েছে।
আন-নাযিআত 79:27
তোমাদেরকে [১] সৃষ্টি করা কঠিন, না আসমান সৃষ্টি? তিনিই তা নির্মাণ করেছেন [২];
‘দ্বিতীয় রুকূ’
[১] কিয়ামত ও মৃত্যুর পরের জীবন যে সম্ভব এবং তা যে সৃষ্টি জগতের পরিবেশ পরিস্থিতির যুক্তিসংগত দাবী একথার যৌক্তিকতা এখানে পেশ করা হয়েছে। [ইবন কাসীর]
[২] এখানে মরে মাটিতে পরিণত হওয়ার পর পুনরুজ্জীবন কিরূপে হবে, কাফেরদের এই বিস্ময়ের জওয়াব দেওয়া হয়েছে। এখানে সৃষ্টি করা মানে দ্বিতীয়বার মানুষ সৃষ্টি করা। মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে এই যুক্তিটিই কুরআনের বিভিন্ন স্থানে পেশ করা হয়েছে। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছেঃ “আর যিনি আকাশ ও পৃথিবী তৈরি করেছেন, তিনি কি এই ধরনের জিনিসগুলোকে (পুনর্বার) সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন না? কেন নয়? তিনি তো মহাপরাক্রমশালী স্রষ্টা। সৃষ্টি করার কাজ তিনি খুব ভালো করেই জানেন।” [সূরা ইয়াসীন: ৮১] অন্যত্র আরও বলা হয়েছেঃ “অবশ্যি আকাশসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করা মানুষ সৃষ্টির চাইতে অনেক বেশী বড় কাজ। কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না। [সূরা গাফির: ৫৭ আয়াত] [ইবন কাসীর]
আন-নাযিআত 79:28
তিনি এর ছাদকে সুউচ্চ করেছেন ও সুবিন্যস্ত করেছেন।
আন-নাযিআত 79:29
আর তিনি এর রাতকে করেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং প্ৰকাশ করেছেন এর সূর্যালোক;
আন-নাযিআত 79:30
আর যমীনকে এর পর বিস্তৃত করেছেন [১]।
[১] “এরপর তিনি যমীনকে বিছিয়েছেন ”- এর অর্থ এ নয় যে, আকাশ সৃষ্টি করার পরই আল্লাহ্ পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। কেননা, কুরআনে কোথাও পৃথিবী সৃষ্টির ব্যাপারটি আগে এবং আকাশ সৃষ্টির ব্যাপারটি পরে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন সূরা আল-বাকারার ২৯ নং আয়াতে। কিন্তু এ আয়াতে আকাশ সৃষ্টির ব্যাপারটি আগে এবং পৃথিবী সৃষ্টির ব্যাপারটি পরে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি আসলে কোন বিপরীতধর্মী বক্তব্য নয়। কেননা, পৃথিবী সৃষ্টি আকাশ সৃষ্টির পূর্বে হলেও পৃথিবী বিস্তৃতকরণ, পানি ও তৃণ বের করা, পাহাড় স্থাপন ইত্যাদি করা হয়েছে আকাশ সৃষ্টির পর। [ইবন কাসীর]
আন-নাযিআত 79:31
তিনি তা থেকে বের করেছেন তার পানি ও তৃণভূমি,
আন-নাযিআত 79:32
আর পর্বতকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছেন;
আন-নাযিআত 79:33
এসব তোমাদের ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুগুলোর ভোগের জন্য।
আন-নাযিআত 79:34
অতঃপর যখন মহাসংকট উপস্থিত হবে [১]
[১] এই মহাসংকট ও বিপর্যয় হচ্ছে কিয়ামত। এ-জন্য এখানে “আত-তাম্মাতুল কুবরা” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। “তাম্মাহ্” বলতে এমন ধরনের মহাবিপদ, বিপর্যয় ও সংকট বুঝায় যা সবকিছুর উপর ছেয়ে যায়। এরপর আবার তার সাথে “কুবরা” (মহা) শব্দ ব্যবহার করে একথা প্ৰকাশ করা হয়েছে যে সেই বিপদ, সংকট ও বিপর্যয় হবে অতি ভয়াবহ ও ব্যাপক। [দেখুন, কুরতুবী]
আন-নাযিআত 79:35
মানুষ যা করেছে তা সে সেদিন স্মরণ করবে,
আন-নাযিআত 79:36
আর প্রকাশ করা হবে জাহান্নাম দর্শকদের জন্য,
আন-নাযিআত 79:37
সুতরাং যে সীমালঙ্ঘন করে,
আন-নাযিআত 79:38
এবং দুনিয়ার জীবনকে অগ্ৰাধিকার দেয়।
আন-নাযিআত 79:39
জাহান্নামই হবে তার আবাস [১]।
[১] এ আয়াতে জাহান্নামীদের কথা বর্ণনা করা হয়েছে: যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে, আর পার্থিব জীবনকে আখেরাতের উপর অগ্ৰাধিকার দেবে অর্থাৎ আখেরাতের কাজ ভুলে গিয়ে দুনিয়ার সুখ ও আনন্দকেই অগ্ৰাধিকার দিবে; তার সম্পর্কে বলা হয়েছে, জাহান্নামই তার আবাস বা ঠিকানা। [সা‘দী]
আন-নাযিআত 79:40
আর যে তার রবের অবস্থানকে [১] ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিজকে বিরত রাখে,
[১] রাবের অবস্থানের দু‘টি অর্থ হতে পারে, এক. রবের সামনে হাজির হয়ে হিসাব নিকাশের সম্মুখীন হতে হবে- এ বিশ্বাস করে প্রবৃত্তির অনুসরণ হতে যে নিজেকে হেফাযত করেছে তার জন্য রয়েছে জান্নাত। দুই. রবের যে সুমহান মর্যাদা তাঁর এ উচ্চ মর্তবার কথা স্মরণ করে অন্যায় অশ্লিল কাজ এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থেকেছে সে জান্নাতে যাবে। উভয় অর্থই এখানে সঠিক। [বাদা’ই‘উত তাফসীর]
আন-নাযিআত 79:41
জান্নাতই হবে তার আবাস।
আন-নাযিআত 79:42
তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কিয়ামত সম্পর্কে, তা কখন ঘটবে?’
আন-নাযিআত 79:43
তা আলোচনার কি জ্ঞান আপনার আছে ?
আন-নাযিআত 79:44
এর পরম জ্ঞান আপনার রবেরই কাছে [১];
[১] এ সম্পর্কে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “তারা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে কিয়ামত কখন ঘটবে। বলুন, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আমার প্রতিপালকেরই আছে। শুধু তিনিই যথাসময়ে উহার প্রকাশ ঘটাবেন; ওটা আকাশমন্ডলী ও যমীনে একটি ভয়ংকর ঘটনা হবে। হঠাৎ করেই উহা তোমাদের উপর আসবে।’ আপনি এ বিষয়ে সবিশেষ জ্ঞাত মনে করে তারা আপনাকে প্রশ্ন করে। বলুন, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আল্লাহ্রই আছে, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না।’ [সূরা আল-আরাফ: ১৮৭] এখানে ঠিক এটাকে বলা হয়েছে যে, এর পরম জ্ঞান রয়েছে আপনার রবের কাছেই। হাদীসে জিবরাঈল নামক প্রসিদ্ধ হাদীসেও জিবরাঈলের প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একই উত্তর দিয়ে বলেছিলেন, “যাকে প্রশ্ন করা হয়েছে সে প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশী জানে না” । [বুখারী: ৫০]
আন-নাযিআত 79:45
যে এটার ভয় রাখে আপনি শুধু তার সতর্ককারী।
আন-নাযিআত 79:46
যেদিন তারা তা দেখতে পাবে সেদিন তাদের মনে হবে যেন তারা দুনিয়ায় মাত্ৰ এক সন্ধ্যা অথবা এক প্ৰভাত অবস্থান করেছে [১] !
[১] দুনিয়ার জীবনের স্বল্পতার বিষয়বস্তুটি পবিত্র কুরআনের অন্যান্য স্থানেও বর্ণিত হয়েছে। যেমন, সূরা ইউনুস, আল-ইসরা, ত্বা-হা, আল-মুমিনূন, আর-রূম, ইয়াসীন ও আহকাফে এ দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
আবাসা 80:1
তিনি ভ্ৰকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন [১] ,
সূরা সম্পর্কিত তথ্যঃ
এ সূরাটি সাহাবী আবদুল্লাহ্ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এর সাথে বিশেষভাবে জড়িত। তাঁর মা উম্মে মাকতুম ছিলেন খাদীজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার পিতা খুওয়াইলিদের সহোদর বোন। তিনি ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের শ্যালক। বংশ মর্যাদার দিক দিয়ে সমাজের সাধারণ শ্রেণীভুক্ত নন বরং অভিজাত বংশীয় ছিলেন। আবদুল্লাহ্ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু অন্ধ হওয়ার কারণে জানতে পারেননি যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যের সাথে আলোচনারত আছেন। তিনি মজলিসে প্রবেশ করেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আওয়াজ দিতে শুরু করেন এবং বার বার আওয়াজ দেন। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কুরআন এর একটি আয়াতের পাঠ জিজ্ঞাসা করেন এবং সাথে সাথে জওয়াব দিতে পীড়াপীড়ি করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন মক্কার কাফের নেতৃবর্গের সাথে আলোচনায় মশগুল ছিলেন। এই নেতৃবর্গ ছিলেন ওতবা ইবনে রবীয়া, আবু জাহল ইবনে হিশাম এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিতৃব্য আব্বাস। তিনি তখনও মুসলিম হননি। এরূপ ক্ষেত্রে আবদুল্লাহ্ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এর এভাবে কথা বলা এবং মামুলী প্রশ্ন নিয়ে তাৎক্ষনিক জওয়াবের জন্য পীড়াপীড়ি করা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে বিরক্তিকর ঠেকে। এই বিরক্তির প্রধান কারণ ছিল এই যে, আবদুল্লাহ্ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু পাক্কা মুসলিম ছিলেন এবং সদা সবৰ্দা মজলিসে উপস্থিত থাকতেন। তিনি এই প্রশ্ন অন্য সময়ও রাখতে পারতেন। তাঁর জওয়াব বিলম্বিত করার মধ্যে কোন ধর্মীয় ক্ষতির আশংকা ছিল না। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা নবীর এ বিরক্তি প্রকাশ পছন্দ করলেন না। তিনি আয়াত নাযিল করে তার প্রতিকার করেন। [দেখুন: তিরমিয়ী: ৩৩২৮, ৩৩৩১, মুয়াত্তা মালেক: ১/২০৩]
___________________
[১] عبس শব্দের অর্থ রুষ্টতা অবলম্বন করা এবং চোখে মুখে বিরক্তি প্ৰকাশ করা। تولى শব্দের অর্থ মুখ ফিরিয়ে নেয়া। [জালালাইন|
আবাসা 80:2
কারণ তাঁর কাছে অন্ধ লোকটি আসল।
আবাসা 80:3
আর কিসে আপনাকে জানাবে যে, --- সে হয়ত পরিশুদ্ধ হত,
আবাসা 80:4
অথবা উপদেশ গ্ৰহণ করত, ফলে সে উপদেশ তার উপকারে আসত [১]।
[১] অর্থাৎ আপনি কি জানেন এই সাহাবী যা জিজ্ঞেস করেছিল তা তাকে শিক্ষা দিলে সে তা দ্বারা পরিশুদ্ধ হতে পারত কিংবা কমপক্ষে আল্লাহ্ তা‘আলাকে স্মরণ করে উপকার লাভ করতে পারত। [দেখুন, মুয়াসসার; সা‘দী]
আবাসা 80:5
আর যে পরোয়া করে না,
আবাসা 80:6
আপনি তার প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন।
আবাসা 80:7
অথচ সে নিজে পরিশুদ্ধ না হলে আপনার কোন দায়িত্ব নেই,
আবাসা 80:8
অপরদিকে যে আপনার কাছে ছুটে এলো,
আবাসা 80:9
আর সে সশঙ্কচিত্ত,
আবাসা 80:10
আপনি তার থেকে উদাসীন হলেন;
আবাসা 80:11
কখনো নয়, এটা তো উপদেশ বাণী [১] ,
[১] অর্থাৎ এমনটি কখনো করবেন না। যে সব লোক আল্লাহ্কে ভুলে আছে এবং যারা নিজেদের দুনিয়াবী সহায়-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অহংকারে মত্ত হয়ে আছে, তাদেরকে অযথা গুরুত্ব দিবেন না। ইসলাম, অহি বা কুরআন এমন কিছু নয় যে, যে ব্যক্তি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে তার সামনে নতজানু হয়ে তা পেশ করতে হবে। বরং সে সত্যের যতটা মুখাপেক্ষী নয় সত্যও তার ততটা মুখাপেক্ষী নয়। বরং তাদেরই ইসলামের মহত্তের সামনে নতজানু হতে হবে। [তাতিম্মাতু আদ্ওয়াউল বায়ান]
আবাসা 80:12
কাজেই যে ইচ্ছে করবে সে এটা স্মরণ রাখবে,
আবাসা 80:13
এটা আছে মর্যাদা সম্পন্ন লিপিসমূহে
আবাসা 80:14
যা উন্নত, পবিত্ৰ [১] ,
[১] مكرمة অর্থ সম্মানিত, মর্যাদাসম্পন্ন। مرفوعة বলে এর মর্যাদা অনেক উচ্চ-তা বোঝানো হয়েছে। [ইবন কাসীর] আর مطهرة বলে বোঝানো হয়েছে হাসান বসরীর মতে, যাবতীয় নাপাক থেকে পবিত্র। সুদ্দী বলেন, এর অর্থ কাফেররা এটা পাওয়ার অধিকারী নয়। তাদের হাত থেকে পবিত্র। হাসান থেকে অপর বর্ণনায় বলা হয়েছে, এর অর্থ মুশরিকদের উপর নাযিল হওয়া থেকে পবিত্র। [কুরতুবী] ইবন কাসীর বলেন, এর অর্থ এটি বাড়তি-কমতি ও অপবিত্রতা থেকে পবিত্র ও মুক্ত।
আবাসা 80:15
লেখক বা দূতদের হাতে [১]।
[১] سفرة শব্দটি سافر এর বহুবচন হতে পারে। তখন অর্থ হবে লিপিকার বা লেখক। আর যদি سفرة শব্দটি سفارة থেকে আসে, তখন এর অর্থ দূতগণ। এই শব্দ দ্বারা ফেরেশতা উদ্দেশ্য হতে পারে, আবার রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদেরও উদ্দেশ্য হতে পারে। প্রথমটিই অধিক শুদ্ধ। সহীহ হাদীসে এ السَّفَرَةُ الكِرَامُ الْبَرَرَةُ এর তাফসীর ফেরেশতাদেরই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘কেরাআতে বিশেষজ্ঞ কুরআন পাঠক সম্মানিত নেককার দূতদের (ফেরেশতাদের) সাথে থাকবে আর যে ব্যক্তি বিশেষজ্ঞ নয় কিন্তু কষ্টে সৃষ্টি পড়ে সে দ্বিগুণ সওয়াব পাবে। [বুখারী: ৪৯৩৭, মুসলিম: ৭৯৮] [ইবন কাসীর]
আবাসা 80:16
(যারা) মহাসম্মানিত ও নেককার।
আবাসা 80:17
মানুষ ধ্বংস হোক! সে কত অকৃতজ্ঞ [১] !
[১] এর অর্থ, সে কত বড় সত্য-অস্বীকারকারী। তাছাড়া এ আয়াতের আর একটি অর্থ হতে পারে। অর্থাৎ “কোন জিনিসটি তাকে সত্য অস্বীকার করতে উদ্ধুদ্ধ করেছে?” [তাবারী]
আবাসা 80:18
তিনি তাকে কোন বস্তু থেকে সৃষ্টি করেছেন?
আবাসা 80:19
শুক্রবিন্দু থেকে, তিনি তাকে সৃষ্টি করেন, পরে তার পরিমিত বিকাশ সাধন করেন [১] ,
[১] قدّره অর্থাৎ সুপরিমিত করেছেন, তার গঠন-প্রকৃতি, আকার-আকৃতি সুপরিমিতভাবে সৃষ্টি করেছেন। قدّره শব্দের এরূপ অৰ্থও হতে পারে যে, মানুষ যখন মাতৃগর্ভে সৃষ্টি হতে থাকে তখন আল্লাহ্ তা‘আলা তার কাজ, বয়স, রিযিক, ভাগ্য ইত্যাদি তকদীর নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাছাড়া পূর্ব থেকেই প্রতিটি মানুষের জন্য নির্দিষ্ট করা আছে তার গায়ের রং কি হবে, সে কতটুকু উচুঁ হবে, তার দেহ কতটুকু কি পরিমাণ মোটা ও পরিপুষ্ট হবে। এত সব সত্ত্বেও সে তার রবের সাথে কুফরী করে। [দেখুন, কুরতুবী]
আবাসা 80:20
তারপর তার জন্য পথ সহজ করে দেন [১] ;
[১] অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা স্বীয় ক্ষমতা-বলে মাতৃগর্ভে মানুষকে সৃষ্টি করেন। তারপর তিনিই তার অপার শক্তির মাধ্যমে মাতৃগৰ্ভ থেকে জীবিত ও পুর্ণাঙ্গ মানুষের বাইরে আসার পথ সহজ করে দেয়। ফলে দেহটি সহী-সালামতে বাইরে চলে আসে এবং মায়েরও এতে তেমন কোন দৈহিক ক্ষতি হয় না। এছাড়া আয়াতের আরেকটি অর্থ হচ্ছে, দুনিয়ায় তিনি তার জন্য নিজের জন্য ভালো বা মন্দ, কৃতজ্ঞতা বা অকৃতজ্ঞতা আনুগত্য বা অবাধ্যতার মধ্যে সে কোন পথ চায় তা তার সামনে খুলে রেখে দিয়েছেন এবং পথ তার জন্য সহজ করে দিয়েছেন। ফলে সে শুকরিয়া আদায় করে সৎপথ গ্রহণ করতে পারে, আবার কুফরী করে বিপথে যেতে পারে। [দেখুন, ইবন কাসীর]
আবাসা 80:21
এরপর তার মৃত্যু ঘটান এবং তাকে কবরস্থ করেন।
আবাসা 80:22
এরপর যখন ইচ্ছে তিনি তাকে পুনর্জীবিত করবেন [১]।
[১] অর্থাৎ মৃত্যুর পর আল্লাহ্ তা‘আলাই মানুষকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। একমাত্র তিনিই এগুলো করার ক্ষমতা রাখেন। তারপরও মানুষ তাঁকে অস্বীকার করে, তাঁর হক আদায় করে না। [সা‘দী] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, দুই ফুৎকারের মধ্যবর্তী সময় হবে চল্লিশ। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর সাথীরা বলল, চল্লিশ দিন? আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, আমি এটা বলতে অস্বীকার করছি, তারা বলল, চল্লিশ বছর? তিনি বললেন, আমি এটা বলতেও অস্বীকার করছি। তারা বলল, তাহলে কি চল্লিশ মাস? তিনি বললেন, আমি এটাও বলতে অস্বীকার করছি। তবে মানুষের সবকিছু পঁচে যায় একমাত্র মেরুদণ্ডের নিমভাগের একটি ছোট্ট কোষ ব্যতীত। তার উপরই আবার সৃষ্টি জড়ো হবে।” [বুখারী: ৪৮১৪, মুসলিম: ২৯৫৫]
আবাসা 80:23
কখনো নয়, তিনি তাকে যা আদেশ করেছেন, সে এখনো তা পূর্ণ করেনি।
আবাসা 80:24
অতঃপর মানুষ যেন তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ্য করে [১] !
[১] মানবসৃষ্টির সূচনা উল্লেখ করার পর মানুষ যে খাদ্যের নেয়ামত ভোগ করে, এখানে সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ খাদ্য সম্পর্কে তার একবার চিন্তা করা প্রয়োজন – কিভাবে এই খাদ্য উৎপন্ন হয়। আল্লাহ্ যদি এর উপকরণগুলো সরবরাহ না করতেন তাহলে কি জমি থেকে এই খাদ্য উৎপন্ন করার ক্ষমতা মানুষের ছিল? এসব নেয়ামতসমূহ তিনি মানুষকে দিয়েছেন যাতে মানুষ কিয়ামতের প্রস্তুতির জন্য এর সাহায্যে আল্লাহ্র ইবাদত করে। [কুরতুবী]
আবাসা 80:25
নিশ্চয় আমরা প্রচুর বারি বর্ষণ করি,
আবাসা 80:26
তারপর আমরা যমীনকে যথাযথভাবে বিদীর্ণ করি;
আবাসা 80:27
অতঃপর তাতে আমরা উৎপন্ন করি শস্য;
আবাসা 80:28
আঙ্গুর, শাক-সব্জি,
আবাসা 80:29
যায়তূন, খেজুরগাছ,
আবাসা 80:30
অনেক গাছবিশিষ্ট উদ্যান,
আবাসা 80:31
ফল এবং গবাদি খাদ্য [১] ,
[১] أبّ শব্দটির উপরোক্ত অর্থ ইবনে আব্বাস ও উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম থেকে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। [সহীহ ইবনে খুযাইমাহ: ২১৭২]
আবাসা 80:32
এগুলো তোমাদের ও তোমাদের চতুস্পদ জন্তুদের ভোগের জন্য [১]।
[১] অর্থাৎ কেবল তোমাদের জন্যই নয়, তোমাদের যেসব গবাদি-গৃহপালিত পশু রয়েছে, তাদের জন্যও। এসব নেয়ামতের দিকে দৃষ্টিপাত করলে মহান আল্লাহ্র ইবাদত, তার প্রতি শুকরিয়া আদায় করা ও তার নির্দেশাবলি মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা ফুটে ওঠে।
আবাসা 80:33
অতঃপর যখন তীক্ষ্ন আওয়াজ আসবে [১] ,
[১] আয়াতে বর্ণিত الصاخة শব্দটির মূল অর্থ হলো, ‘এমন কঠোর ডাক যার ফলে মানুষ শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলে।’ এখানে কিয়ামতের দ্বিতীয় শিংগাধ্বনির কথা বলা হয়েছে। যা পুনরুত্থানের শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া বোঝায়। এই বিকট আওয়ায বুলন্দ হবার সাথে সাথেই মরা মানুষেরা জীবিত হয়ে উঠবে এবং কেয়ামতের মাঠে উপস্থিত হবে। [মুয়াসসার, জালালাইন]
আবাসা 80:34
সেদিন মানুষ পালিয়ে যাবে তার ভাইয়ের কাছ থেকে,
আবাসা 80:35
এবং তার মাতা, তার পিতা,
আবাসা 80:36
তার পত্নী ও তার সন্তান থেকে [১] ,
[১] এখানে হাশরের ময়দানে সমাবেশের দিন বোঝানো হয়েছে, সেদিন প্রত্যেক মানুষ আপন চিন্তায় বিভোর হবে। সেদিন মানুষ তার অতি-নিকটাত্মীয়কে দেখলেও মুখ লুকাবে এবং পালিয়ে বেড়াবে। [ইবন কাসীর] প্ৰায় এই একই ধরনের বিষয়বস্তু বর্ণিত হয়েছে সূরা মা‘আরিজের ১০ থেকে ১৪ পর্যন্ত আয়াতে।
আবাসা 80:37
সেদিন তাদের প্রত্যেকের হবে এমন গুরুতর অবস্থা যা তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে [১]।
[১] প্ৰত্যেক মানুষ তার ভ্রাতার কাছ থেকে এবং পিতা মাতা স্ত্রী এবং সন্তানদের কাছ থেকে সেদিন মুখ লুকিয়ে ফিরবে। দুনিয়াতে পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতা ভ্রাতাদের মধ্যে হয়। এর চেয়ে বেশী পিতা-মাতাকে সাহায্য করার চিন্তা করা হয় এবং স্বভাবগত কারণে এর চেয়েও বেশী স্ত্রী এবং সন্তানদের সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আয়াতে নীচ থেকে উপরের সম্পর্ক যথাক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে। [কাতাদা: দেখুন, ইবন কাসীর] হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ একেবারেই উলংগ হয়ে উঠবে। একথা শুনে তার পবিত্র স্ত্রীদের মধ্য থেকে কোন একজন ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদের লজ্জাস্থান কি সেদিন সবার সামনে খোলা থাকবে? জবাবে রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আয়াতটি তেলাওয়াত করে বলেন, সেদিন অন্যের দিকে তাকাবার মতো হুঁশ ও চেতনা কারো থাকবে না। [নাসাঈ: ২০৮৩, তিরমিয়ী: ৩৩৩২, ইবনে মাজাহঃ ৪২৭৬, মুসনাদে আহমাদ: ৬/৮৯]।
আবাসা 80:38
অনেক চেহারা সেদিন হবে উজ্জ্বল,
আবাসা 80:39
সহাস্য ও প্রফুল্ল,
আবাসা 80:40
আর অনেক চেহারা সেদিন হবে ধূলিধূসর
আবাসা 80:41
সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা।
আবাসা 80:42
এরাই কাফির ও পাপাচারী।
আত-তাকভীর 81:1
সূর্যকে যখন নিষ্প্রভ করা হবে [১] ,
সূরা সম্পর্কিত তথ্যঃ
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে কেউ কেয়ামতকে প্রত্যক্ষ দেখতে চায় সে যেন সূরা ‘ইযাস সামছু কুওয়িরাত, ইযাস সামায়ুন ফাতারাত ও ইযাস সামায়ূন সাক্কাত’ পড়ে। [তিরমিয়ী: ৩৩৩৩, মুসনাদে আহমাদ: ২/২৭, ৩৬, ১০০, মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৫১৫] এখানে প্রথম ছয়টি আয়াতের ভাষ্য কিয়ামতের প্রথম অংশ অর্থাৎ শিঙ্গায় প্রথমবার যে ফুৎকার দেয়া হবে তার সাথে সংশ্লিষ্ট। উবাই ইবন কাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, ‘কেয়ামতের পূর্বে ছয়টি নিদর্শন রয়েছে। মানুষ যখন হাটে-বাজারে থাকবে, তখন হঠাৎ সূর্যের আলো চলে যাবে এবং তারকারাজি দেখা যাবে; ফলে তারা আশ্চর্য হবে। তারা তাকিয়ে দেখার সময়েই হঠাৎ করে তারাগুলো খসে পড়বে। এরপর পাহাড়গুলো মাটির উপর পড়বে, নড়া-চড়া করবে: এবং পুড়ে যাবে; ফলে বিক্ষিপ্ত ধুলোর মত হয়ে যাবে। তখন মানুষ জিনের কাছে এবং জিন মানুষের কাছে ছুটে আসবে। জন্তু-জানোয়ার-পাখি সব মিশে যাবে এবং একে অপরের সাথে একত্রিত হবে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “আর যখন বন্য পশুগুলোকে একত্র করা হবে” [সূরা তাকভীর: ৫] তারপর জিন মানুষদের বলবে, আমরা তোমাদের নিকট সংবাদ নিয়ে আসছি। তারা যখন সাগরের নিকট যাবে তখন দেখবে তাতে আগুন জ্বলছে। এ সময়ে সপ্ত যমীন পর্যন্ত এবং সপ্ত আসমান পর্যন্ত এক ফাটল ধরবে। এরপর এক বায়ু এসে তাদেরকে মৃত্যুবরণ করাবে।’ [তাবারী]
____________________
[১] আরবী ভাষায় তাকভীর মানে হচ্ছে গুটিয়ে নেয়া। মাথায় পাগড়ী বাঁধার জন্য “তাকভীরুল ‘ইমামাহ” বলা হয়ে থাকে। কারণ ইমামা তথা পাগড়ী লম্বা কাপড়ের হয়ে থাকে এবং মাথার চারদিকে তা জড়িয়ে নিতে হয়। এই সাদৃশ্য ও সম্পর্কের কারণে সূর্য থেকে যে আলোক রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়ে সমগ্র সৌরজগতে ছড়িয়ে পড়ে তাকে পাগড়ীর সাথে তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন এই সূর্যকে গুটিয়ে নেয়া হবে। অর্থাৎ তার আলোক বিচ্ছুরণ বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া كُوِّرَتْ এর অপর অর্থ নিক্ষেপ করাও হয়ে থাকে। হাদীসে এসেছে, “চাঁদ ও সূর্যকে কিয়ামতের দিন পেঁচিয়ে রাখা হবে।” [বুখারী: ৩২০০] [ইবন কাসীর]
আত-তাকভীর 81:2
আর যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে [১] ,
[১] অর্থাৎ যে বাঁধনের কারণে তারা নিজেদের কক্ষপথে ও নিজেদের জায়গায় বাঁধা আছে তা খুলে যাবে এবং সমস্ত গ্ৰহ-তারকা বিশ্ব-জাহানের চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। এ ছাড়াও তারা শুধু ছড়িয়েই পড়বে না বরং এই সঙ্গে আলোহীন হয়ে অন্ধকারও হয়ে যাবে। [সাদী]
আত-তাকভীর 81:3
আর পর্বতসমূহকে যখন চলমান করা হবে [১] ,
[১] পাহাড়সমূহকে কয়েকটি পর্যায়ে চলমান করা হবে। প্রথমে তা বিক্ষিপ্ত বালুরাশির মত হবে, তারপর তা ধূনিত পশমের মত হবে, সবশেষে তা উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণা হয়ে যাবে এবং তার জায়গায় আর অবস্থিত থাকবে না। [সাদী]
আত-তাকভীর 81:4
আর যখন পূর্ণগর্ভা মাদী উট উপেক্ষিত হবে [১] ,
[১] আরবদেরকে কিয়ামতের ভায়াবহ অবস্থা বুঝাবার জন্য এটি ছিল একটি চমৎকার বর্ণনা পদ্ধতি। কেননা কুরআন আরবদেরই সম্বোধন করা হয়েছে। আরবদের কাছে গর্ভবর্তী মাদী উট, যার প্রসবের সময় অতি নিকটে, তার চাইতে বেশী মূল্যবান আর কোন সম্পাদই ছিল না। এ সময় তার হেফাজত ও দেখাশুনার জন্য সবচেয়ে বেশী যত্ন নেয়া হতো। এই ধরনের উষ্ট্রীদের থেকে লোকদের গাফেল হয়ে যাওয়ার মানে এই দাঁড়ায় যে, তখন নিশ্চয়ই এমন কোন কঠিন বিপদ লোকদের ওপর এসে পড়বে যার ফলে তাদের নিজেদের এই সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ সংরক্ষণের কথা তাদের খেয়ালই থাকবে না। [ইবন কাসীর, সাদী]
আত-তাকভীর 81:5
আর যখন বন্য পশুগুলো একত্র করা হবে,
আত-তাকভীর 81:6
আর যখন সাগরকে অগ্নিউত্তাল করা হবে [১],
[১] এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। একটি অর্থ হল অগ্নিসংযোগ করা ও প্রজ্জ্বলিত করা। কেউ কেউ বলেন, সমুদ্রগুলোকে স্ফীত করা হবে। কেউ কেউ এর অর্থ নিয়েছেন, পানি পূর্ণ করা হবে। অন্য কেউ অর্থ নিয়েছেন মিশ্রিত করা অর্থাৎ সমস্ত সমুদ্র এক করে দেয়া হবে, ফলে লবনাক্ত ও সুমিষ্ট পানি একাকার হয়ে যাবে। হাসান ও কাতাদাহ রাহেমাহুমাল্লাহ বলেন, এর অর্থ তার পানিসমূহ নিঃশেষ হয়ে যাবে ফলে তাতে এক ফোটা পানিও থাকবে না। [কুরতুবী]
আত-তাকভীর 81:7
আর যখন আত্মাগুলোকে সমগোত্রীয়দের সাথে মিলিয়ে দেয়া হবে [১] ,
[১] এর অর্থ হচ্ছে, যখন মানুষকে জোড়া জোড়া করা হবে। অর্থাৎ মানুষের আমল অনুসারে তাদের শ্রেণীবিভাগ করা হবে। যখন হাশরে সমবেত লোকদেরকে বিভিন্ন দলে দলবদ্ধ করে দেয়া হবে। এই দলবদ্ধকরণ ঈমান ও কর্মের দিক দিয়ে করা হবে। কাফের এক জায়গায় ও মুমিন এক জায়গায়। কাফের এবং মুমিনের মধ্যেও কর্ম এবং অভ্যাসের পার্থক্য থাকে। এদিকে দিয়ে কাফেরদেরও বিভিন্ন প্রকার দল হবে আর মুমিনদেরও বিশ্বাস এবং কর্মের ভিত্তিতে দল হবে। যারা ভাল হোক মন্দ হোক একই প্রকার কর্ম করবে তাদেরকে এক জায়গায় জড়ো করা হবে। উদাহরণত ইহুদীরা ইহুদীদের সাথে, নাসারারা নাসারাদের সাথে, মুনাফিকরা মুনাফিকদের সাথে এক জায়গায় সমবেত হবে। মূলত হাশরে লোকদের তিনটি প্রধান দল হবে- ১। পূর্ববর্তী সৎকর্মী লোকদের ২। আসহাবুল ইয়ামীনের এবং ৩। আসহাবুশ শিমালের দল। প্রথমোক্ত দুই দল মুক্তি পাবে এবং তৃতীয় দলটি হবে কাফের পাপাচারীদের। তারা মুক্তি পাবে না। [তাবারী, কুরতুবী] এ আয়াতের আরেকটি অর্থও হতে পারে। আর তা হল, ‘যখন আত্মাকে দেহের সাথে পুনঃমিলিত করা হবে’ । কেয়ামতের সময়ে সকলকে জীবিত করার জন্য প্রথমে দেহকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে। অতঃপর আত্মাকে দেহের সাথে সংযোজন করা হবে। [কুরতুবী, ইবন কাসীর] এ আয়াত এবং এর পূর্ববর্তী আয়াত থেকে কিয়ামতের দ্বিতীয় অংশের আলোচনা শুরু হচ্ছে।
আত-তাকভীর 81:8
আর যখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে [১] জিজ্ঞেস করা হবে,
[১] المَوْءُوْدَةُ শব্দের অর্থ জীবন্ত প্রোথিত কন্যা। জাহেলিয়াত যুগের কোন কোন আরব গোত্ৰ কন্যা সন্তানকে লজ্জাকর মনে করত এবং জীবন্তই মাটিতে প্রোথিত করে দিত। [ইবন কাসীর, কুরতুবী] পরবর্তীতে ইসলাম এই কুপ্রথার মূলোৎপাটন করে।
আত-তাকভীর 81:9
কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল [১]?
[১] কোন কোন মুফাসসির বলেন, এই আয়াতের বর্ণনাভঙ্গীতে মারাত্মক ধরনের ক্রোধের প্রকাশ দেখা যায়। যে পিতা বা মাতা তাদের মেয়েকে জীবিত পুঁতে ফেলেছে আল্লাহ্র কাছে তারা এত বেশী ঘৃণিত হবে যে, তাদেরকে সম্বোধন করে একথা জিজ্ঞেস করা হবে না, তোমরা এই নিষ্পাপ শিশুটিকে হত্যা করেছিলে কোন অপরাধে? বরং তাদের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে ছোট্ট নিরপরাধ মেয়েকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাকে কোন অপরাধে মেরে ফেলা হয়েছিল? [ইবন কাসীর]
আত-তাকভীর 81:10
আর যখন আমলনামাগুলো উন্মোচিত করা হবে,
আত-তাকভীর 81:11
আর যখন আসমানের আবরণ অপসারিত করা হবে [১],
[১] كشطت এর আভিধানিক অর্থ জন্তুর চামড়া খসানো। [কুরতুবী] এর অর্থ অপসারণ করা, সরিয়ে নেয়া। এ হিসেবে আয়াতের অর্থ এই যে, যখন মাথার উপর ছাদের ন্যায় বিস্তৃত এই আকাশকে অপসারিত করা হবে। [মুয়াসসার, সাদী]
আত-তাকভীর 81:12
আর যখন জাহান্নামকে ভীষণভাবে প্ৰজ্জ্বলিত করা হবে,
আত-তাকভীর 81:13
আর যখন জান্নাত নিকটবর্তী করা হবে,
আত-তাকভীর 81:14
তখন প্ৰত্যেক ব্যক্তিই জানবে সে কি উপস্থিত করেছে [১]।
[১] অর্থাৎ কেয়ামতের উপরোক্ত পরিস্থিতিতে প্রত্যেকই জেনে নিবে সে কি নিয়ে এসেছে। অর্থাৎ সৎকর্ম কিংবা অসৎকর্ম সব তার দৃষ্টির সামনে এসে যাবে। [মুয়াসিসার]
আত-তাকভীর 81:15
সুতরাং আমি শপথ করছি পশ্চাদপসরণকারী নক্ষত্রের,
আত-তাকভীর 81:16
যা চলমান, অপসৃয়মাণ,
আত-তাকভীর 81:17
শপথ রাতের যখন তা শেষ হয়, [১]
[১] عَسْعَسَ শব্দটির দু‘টি অর্থ হতে পারে। একটি উপরে আছে, তা হচ্ছে বিদায় নেয়া, শেষ হওয়া। অপর অর্থ হল আগমন করা, প্রবেশ করা। তখন আয়াতটির অর্থ হয়, শপথ রাতের, যখন তা আগমন করে। [ইবন কাসীর]
আত-তাকভীর 81:18
শপথ প্ৰভাতের যখন তার আবির্ভাব হয়,
আত-তাকভীর 81:19
নিশ্চয়ই এ কুরআন সম্মানিত রাসূলের আনীত বাণী [১]
[১] এখানে সম্মানিত বাণীবাহক رَسُوْلٍ كَرِيْمٍ বলতে অহী আনার কাজে লিপ্ত ফেরেশতা জিবরাঈল আলাইহিস্ সালামকে বোঝানো হয়েছে। পরবর্তী আয়াতে এ-কথাটি আরো সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে। নবী-রাসূলগণের মতো ফেরেশতাগণের বেলায়ও রাসূল শব্দ ব্যবহৃত হয়। উল্লেখিত সবগুলো বিশেষণ জিবরাঈল আলাইহিস্ সালাম এর জন্যে বিনা দ্বিধায় প্রযোজ্য। তিনি যে শক্তিশালী, তা অন্যত্রও বলা হয়েছে, عَلَّمَهٗ شَدِيْدُالْقُوٰى “তাঁকে শিক্ষা দান করে শক্তিশালী” [সূরা আন-নাজম: ৫] । তিনি যে আরশ ও আকাশবাসী ফেরেশতাগণের মান্যবর তা মি'রাজের হাদীস দ্বারা প্ৰমাণিত আছে; তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাথে নিয়ে আকাশে পৌছলে তাঁর আদেশে ফেরেশতারা আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেয়। তিনি যে أمين তথা বিশ্বাসভাজন তা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না; আল্লাহ্ তা’আলা নিজেই তার আমানত বা বিশ্বস্ততার ঘোষণা দিয়েছেন, তাকে অহীর আমানত দিয়েছেন। [ইবন কাসীর, কুরতুবী]
আর কুরআনকে “বাণীবাহকের বাণী” বলার অর্থ এই নয় যে, এটি ঐ সংশ্লিষ্ট ফেরেশতার নিজের কথা। বরং “বাণীবাহকের বাণী” শব্দ দু‘টিই একথা প্ৰকাশ করছে যে, এটি সেই সত্তার বাণী যিনি তাকে বাণীবাহক করে পাঠিয়েছেন। সূরা ‘আল-হাক্কা’র ৪০ আয়াতে এভাবে কুরআনকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী বলা হয়েছে। সেখানেও এর অর্থ এই নয় যে, এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের রচনা। বরং একে “রাসূলে করীমের” বাণী বলে একথা সুস্পষ্ট করা হয়েছে যে, আল্লাহ্র রাসূল হিসেবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটি পেশ করছেন, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ হিসেবে নয়। উভয় স্থানে বাণীকে ফেরেশতা ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সম্পর্কিত করার কারণ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ্র বাণী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে বাণীবহনকারী ফেরেশতার মুখ থেকে এবং লোকদের সামনে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছিল। [বাদায়িউত তাফসীর]
আত-তাকভীর 81:20
যে সামর্থ্যশালী, আরশের মালিকের কাছে মর্যাদা সম্পন্ন,
আত-তাকভীর 81:21
সে মান্য সেখানে, বিশ্বাসভাজন [১]।
[১] অর্থাৎ এই কুরআন একজন সম্মানিত দূতের আনীত কালাম। তিনি শক্তিশালী, আরাশের অধিপতির কাছে মর্যাদাশীল। তিনি ফেরেশতাদের নিকট মান্য। সমস্ত ফেরেশতা তাকে মান্য করে। তিনি আল্লাহ্র বিশ্বাসভাজন; পয়গাম আনা নেয়ার কাজে তার তরফ থেকে বিশ্বাসভঙ্গ ও কম বেশী করার সম্ভাবনা নেই। নিজের পক্ষ থেকে তিনি কোন কথা আল্লাহ্র অহীর সাথে মিশিয়ে দেবেন না। বরং তিনি এমন পর্যায়ের আমানতদার যে, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে যা কিছু বলা হয় সেগুলো তিনি হুবহু পৌছিয়ে দেন। [মুয়াসসার, সাদী]
আত-তাকভীর 81:22
আর তোমাদের সাথী উন্মাদ নন [১],
[১] এখানে সাথী বলতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝানো হয়েছে। যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উম্মাদ বলত এতে তাদেরকে জওয়াব দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের এ ধারণা ঠিক নয় যে, কুরআনে যা কিছু বর্ণনা করা হচ্ছে এগুলো কোন পাগলের প্রলাপ বা শয়তানের বক্তব্য। [কুরতুবী]
আত-তাকভীর 81:23
তিনি তো তাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখেছেন [১] ,
[১] অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরাঈল আলাইহিস্ সালামকে প্রকাশ্য দিগন্তে, মূল আকৃতিতে দেখেছেন। অন্যত্র বলা হয়েছে,
فَاسْتَوٰى ٭ وَهُوَبِالْاُفْقِ الْاَعْلٰى
“সে নিজ আকৃতিতে স্থির হয়েছিল, তখন সে উর্ধ্বদিগন্তে” [সূরা আন-নাজম: ৬-৭] [ইবন কাসীর] এই দেখার কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, তিনি ওহী নিয়ে আগমনকারী জিবরাঈল আলাইহিস্ সালাম এর সাথে পরিচিত ছিলেন। তাকে আসল আকার আকৃতিতেও দেখেছিলেন। তাই এই ওহীতে কোনরূপ সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই।
আত-তাকভীর 81:24
তিনি গায়েবী বিষয় সম্পর্কে কৃপণ নয় [১]।
[১] অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের কাছ থেকে কোন কথা গোপন রাখেন না। গায়েব থেকে তার কাছে যে-সব তথ্য বা অহী আসে তা সবই তিনি একটুও কমবেশী না করে তোমাদের কাছে বর্ণনা করেন। [সা‘দী]
আত-তাকভীর 81:25
আর এটা কোন অভিশপ্ত শয়তানের বাক্য নয়।
আত-তাকভীর 81:26
কাজেই তোমরা কোথায় যাচ্ছ ?!
আত-তাকভীর 81:27
এ তো শুধু সৃষ্টিকুলের জন্য উপদেশ,
আত-তাকভীর 81:28
তোমাদের মধ্যে যে সরল পথে চলতে চায়, তার জন্য [১]।
[১] অন্য কথায় বলা যায়, এ বাণীটি তো সারা দুনিয়ার মানুষের জন্য উপদেশ একথা ঠিক, কিন্তু এর থেকে ফায়দা একমাত্র সেই ব্যক্তি হাসিল করতে পারে যে নিজে সত্য-সরল পথে চলতে চায়। এ উপদেশ থেকে উপকৃত হবার জন্য মানুষের সত্য-সন্ধানী ও সত্য প্রিয় হওয়া প্ৰথম শর্ত। [বাদায়িউত তাফসীর]
আত-তাকভীর 81:29
আর তোমরা ইচ্ছে করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ ইচ্ছে করেন [১]।
[১] অর্থাৎ তোমরা সরল পথে চলতে চাইলে এবং আল্লাহ্র দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে চাইলেই থাকতে পারবে না যতক্ষণ আল্লাহ্ ইচ্ছা না করবেন। সুতরাং তাঁর কাছেই তাওফীক কামনা করো। তবে এটা সত্য যে, কেউ যদি আল্লাহ্র পথে চলতে ইচ্ছে করে তবে আল্লাহ্ও তাকে সেদিকে চলতে সহযোগিতা করেন। মূলত আল্লাহ্র ইচ্ছা হওয়ার পরই বান্দার সে পথে চলার তাওফীক হয়। বান্দার ইচ্ছা আল্লাহ্র ইচ্ছা অনুসারেই হয়। তবে যদি ভাল কাজ হয় তাতে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি থাকে, এটাকে বলা হয় ‘আল্লাহ্র শরীয়তগত ইচ্ছা’ । পক্ষান্তরে খারাপ কাজ হলে আল্লাহ্র ইচ্ছায় সংঘটিত হলেও তাতে তাঁর সন্তুষ্টি থাকে না। এটাকে বলা হয় ‘আল্লাহর প্রাকৃতিক ইচ্ছা’ । এ দু' ধরনের ইচ্ছার মধ্যে পার্থক্য না করার কারণে অতীতে ও বর্তমানে অনেক দল ও ফের্কার উদ্ভব ঘটেছে। [দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-ইস্তেকামাহ: ১/৪৩৩; মিনহাজুস সুন্নাহ: ৩/১৬৪]
আল-ইনফিতার 82:1
যখন আসমান বিদীর্ণ হবে,
সূরা সংক্রান্ত আলোচনাঃ
আয়াত সংখ্যাঃ ১৯ আয়াত।
নাযিল হওয়ার স্থানঃ মক্কী।
। রহমান, রহীম আল্লাহ্র নামে ।
আল-ইনফিতার 82:2
আর যখন নক্ষত্রমণ্ডলী বিক্ষিপ্তভাবে ঝরে পরবে,
আল-ইনফিতার 82:3
আর যখন সাগরগুলো বিস্ফোরিত করা হবে,
আল-ইনফিতার 82:4
আর যখন সাগরগুলো বিস্ফোরিত করা হবে,
[১] প্রথম তিনটি আয়াতে কিয়ামতের প্রথম পর্বের উল্লেখ করা হয়েছে এবং এই আয়াতে দ্বিতীয় পর্বের কথা বলা হয়েছে। কবর খুলে ফেলার মানে হচ্ছে, তা খুলে তা থেকে মানুষকে আবার নতুন করে জীবিত করে উঠানো। [কুরতুবী]
আল-ইনফিতার 82:5
তখন প্রত্যেকে জানবে, সে কী আগে পাঠিয়েছে ও কী পিছনে রেখে গিয়েছে [১]।
[১] অর্থাৎ আকাশ বিদীর্ণ হওয়া, নক্ষত্ৰসমূহ ঝরে পড়া, সমুদ্র একাকার হয়ে যাওয়া, কবর থেকে মৃতদের বের হয়ে আসা ইত্যাকার কেয়ামতের ঘটনা যখন ঘটে যাবে, তখন প্রত্যেকেই জেনে নিবে সে কি অগ্ৰে প্রেরণ করেছে এবং কি পশ্চাতে ছেড়েছে। মূলে বলা হয়েছে, تَافَرَّمَتْ وَاَخَّرَتْ। এ শব্দগুলোর কয়েকটি অর্থ হতে পারে এবং সবগুলো অর্থই এখানে প্রযোজ্য। এক. যে ভালো ও মন্দ কাজ করে মানুষ আগে পাঠিয়ে দিয়েছে তাকে مَا قَدَّمَتْ এবং যেগুলো করতে সে বিরত থেকেছে তাকে مَاأخَّرَتْ বলা যায়। সুতরাং কেয়ামতের দিনে প্রত্যেকেই জেনে নিবে সে সৎ অসৎ কি কর্ম করেছে এবং কি সৎ অসৎ কর্ম করেনি। [তাবারী] দুই. যা কিছু প্ৰথমে করেছে তা تَافَرَّمَتْ এবং যা কিছু পরে করেছে তা مَاأَخَّرَتْ এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ সম্পাদনের ধারাবাহিকতা ও তারিখ অনুসারে মানুষের প্রত্যেকটি কাজের হিসেব সম্বলিত আমলনামা তার সামনে এসে যাবে। [মুয়াসসার] তিন. যেসব ভালো বা মন্দ কাজ মানুষ তার জীবনে করেছে সেগুলো تَافَرَّمَتْ এর অন্তরভুক্ত। এ মানুষের সমাজে এসব কাজের যে প্রভাব ও ফলাফল সে নিজের পেছনে রেখে এসেছে সেগুলো مَاأَخَّرَتْ এর অন্তর্ভুক্ত। কাজটি সৎ হলে তার সওয়াব সে পেতে থাকবে এবং অসৎ হলে তার গোনাহ আমলানামায় লিখিত হতে থাকবে। হাদীসে আছে “যে ব্যক্তি ইসলামে কোন উত্তম সুন্নত ও নিয়ম চালু করে সে তার সওয়াব সবসময় পেতে থাকবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কোন কুপ্ৰথা অথবা পাপ কাজ চালু করে যতদিন মানুষ এই পাপ কাজ করবে: ততদিন তার আমলনামায় এর গোনাহ লিখিত হতে থাকবে।” [তিরমিয়ী: ২৬৭৫, ইবনে মাজাহ: ২০৭, মুসনাদে আহমাদ: ২/৫০৪] [আত-তাফসীরুসসহীহ]
আল-ইনফিতার 82:6
হে মানুষ! কিসে তোমাকে তোমার মহান রব সম্পর্কে বিভ্ৰান্ত করল?
আল-ইনফিতার 82:7
যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুঠাম করেছেন এবং সুসামঞ্জস্য করেছেন [১] ,
[১] অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ তোমাকে এই পূর্ণাঙ্গ মানবিক আকৃতি দান করেছেন। তোমার সামনে সব রকমের প্রাণী রয়েছে, তাদের মোকাবিলায় তোমার সবচেয়ে সুন্দর শারীরিক কাঠামো এবং শ্রেষ্ঠ ও উন্নত শক্তি একেবারেই সুস্পষ্ট। অন্যত্র বলা হয়েছে, “অবশ্যই আমরা সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে” । [আদওয়াউল বায়ান]
আল-ইনফিতার 82:8
যে আকৃতিতে চেয়েছেন, তিনি তোমাকে গঠন করেছেন [১]।
[১] এখানে মানুষ সৃষ্টির প্রারম্ভিক পর্যায় প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তদুপরি তোমার সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে সুবিন্যস্ত করেছেন। এরপর বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা‘আলা সব মানুষকে, যাকে যেরূপে ইচ্ছা সে আকার-আকৃতিতে সৃষ্টি করতে পারেন। তিনি কোটি কোটি মানুষের আকার আকৃতি এমনভাবে গঠন করেছেন যে, পরস্পরের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য ও পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। আর তা আল্লাহ্ তা’আলার এক বড় নিদর্শন। [আদওয়াউল বায়ান]
আল-ইনফিতার 82:9
কখনো নয়, তোমরা তো প্রতিদান দিবসে মিথ্যারোপ করে থাক [১];
[১] অর্থাৎ যে জিনিসটি তোমাদেরকে ধোঁকায় ফেলে দিয়েছে, তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে তা হল এই ধারণা যে, দুনিয়ার এই কর্মজগতের পরে আর কোন কর্মফল, প্রতিদান ও বিচারের জগত নেই। এ বিভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন ধারণাই তোমাকে আল্লাহ্ থেকে গাফেল করে দিয়েছে, মহান আল্লাহ্ সম্পর্কে বিভ্ৰান্তিতে ফেলেছে। [ইবন কাসীর]
আল-ইনফিতার 82:10
আর নিশ্চয় নিয়োজিত আছেন তোমাদের উপর সংরক্ষকদল;
আল-ইনফিতার 82:11
সম্মানিত লেখকবৃন্দ;
আল-ইনফিতার 82:12
তারা জানে তোমরা যা কর [১]।
[১] অর্থাৎ ফেরেশতারা প্রত্যেক ব্যক্তির প্রত্যেকটি কাজ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। সব জায়গায় সব অবস্থায় সকল ব্যক্তির সাথে তারা এমনভাবে লেগে আছে যে, তারা জানতেই পারছে না যে, কেউ তাদের কাজ পরিদর্শন করছে। কোন ব্যক্তি কোন নিয়তে কি কাজ করেছে তাও তারা জানতে পারে। তাই তাদের তৈরি করা রেকর্ড একটি পুর্ণাঙ্গ রেকর্ড। এই রেকর্ডের বাইরে কোন কথা নেই। এ সম্পর্কেই সূরা কাহাফের ৪৯ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ “কিয়ামতের দিন অপরাধীরা অবাক হয়ে দেখবে তাদের সামনে যে আমলনামা পেশ করা হচ্ছে তার মধ্যে তাদের ছোট বড় কোন একটি কাজও অলিখিত থেকে যায়নি । যা কিছু তারা করেছিল সব হুবহু ঠিক তেমনিভাবেই তাদের সামনে আনা হয়েছে’’। [করতুবী]
আল-ইনফিতার 82:13
পুণ্যবানেরা তো থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দ্যো [১];
[১] পূণ্যবানেরা কি কি নেয়ামতে থাকবে সেটা জানতে হলে আমাদেরকে পবিত্র কুরআনের অন্যত্র একটু দেখতে হবে। অন্যত্র এসেছে, “অবশ্যই পূণ্যবানদের ‘আমলনামা ‘ইল্লিয়্যীনে, ‘ইল্লিয়্যীন সম্পর্কে আপনি কী জানেন? ওটা চিহ্নিত ‘আমলনামা। যারা আল্লাহ্র সান্নিধ্য প্রাপ্ত তারা তা দেখে। পূণ্যবানগণ তো থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দ্যে, তারা সুসজ্জিত আসনে বসে অবলোকন করবে। আপনি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের দীপ্তি দেখতে পাবেন। তাদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় হতে পান করান হবে; ওটার মোহর মিস্কের, এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক। ওটার মিশ্রণ হবে তাস্নীমের; তা একটা প্রস্রবণ, যা থেকে সান্নিধ্যপ্রাপ্তরা পান করে। [সূরা আল-মুতাফফিফীন; ১৮-২৮]
আল-ইনফিতার 82:14
আর পাপাচারীরা তো থাকবে জাহান্নামে [১];
[১] পাপাচারীরা কি কঠিন শাস্তিতে থাকবে সেটা জানতেও আমাদেরকে পবিত্র কুরআনের অন্যত্র দেখতে হবে, সেখানে বলা হয়েছে, “কখনো না, পাপাচারীদের ‘আমলনামা তো সিজ্জীনে আছে। সিজ্জীন সম্পর্কে আপনি কী জানেন? ওটা চিহ্নিত ‘আমলনামা। সেদিন দুর্ভোগ হবে অস্বীকারকারীদের, যারা কর্মফল দিনকে অস্বীকার করে, শুধু প্ৰত্যেক পাপিষ্ঠ সীমালংঘনকারী এটাকে অস্বীকার করে; তার কাছে আমাদের আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হলে সে বলে, ‘এটা পূর্ববর্তীদের উপকথা।’ কখনো নয়; বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের হৃদয়ে জঙ্ ধরিয়েছে। না, অবশ্যই সেদিন তারা তাদের প্রতিপালক হতে অন্তরিত থাকবে; তারপর তারা তো জাহান্নামে প্রবেশ করবে; তারপর বলা হবে, ‘এটাই তা যাকে তোমরা অস্বীকার করতে।” [সূরা আল-মুতাফফিফীন: ৭-১৭]
আল-ইনফিতার 82:15
তারা প্ৰতিদান দিবসে তাতে দগ্ধ হবে;
আল-ইনফিতার 82:16
আর তারা সেখান থেকে অন্তৰ্হিত হতে পারবে না [১]।
[১] জাহান্নামীরা কোন সময় জাহান্নাম থেকে পৃথক হবে না, অনুপস্থিত থাকতে পারবে না; মৃত্যুর মাধ্যমেও নয়, বের হওয়ার মাধ্যমেও নয়। সেখানে তাদের জন্যে চিরকালীন আযাবের নির্দেশ আছে। [মুয়াসসার,সা‘দী]
আল-ইনফিতার 82:17
আর কিসে আপনাকে জানাবে : প্রতিদান দিবস কী?
আল-ইনফিতার 82:18
তারপর বলি, কিসে আপনাকে জানাবে : প্রতিদান দিবস কী?
আল-ইনফিতার 82:19
সেদিন কেউ কারও জন্য কিছু করার মালিক হবে না; আর সেদিন সব বিষয়ের কর্তৃত্ব হবে আল্লাহ্র [১]।
[১] অর্থাৎ হাশরের ময়দানে কোন ব্যক্তি নিজ ইচ্ছায় অন্যের কোন উপকার করতে পারবে না এবং কারও কষ্ট লাঘবও করতে পারবে না; অপর ব্যক্তি তার যত প্রিয় ও কাছের মানুষ-ই হোক না কেন। অনুরূপভাবে সুপারিশও কারও নিজ ইচ্ছার উপর হবে না, যে পর্যন্ত আল্লাহ্ কাউকে কারও জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি না দেন। একমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলাই সকল আদেশের মালিক। তিনি স্বীয় কৃপায় কাউকে সুপারিশের অনুমতি দিলে এবং তা কবুল করলে তাও তাঁরই আদেশ হবে। [ইবন কাসীর, সা‘দী]
আল-মুতাফফিফীন 83:1
দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয় [১] ,
আয়াত সংখ্যাঃ ৩৬ আয়াত।
নাযিল হওয়ার স্থানঃ মক্কী।
সূরা সংক্রান্ত আলোচনাঃ
বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ্র সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনায় তশরীফ আনেন, তখন মদীনাবাসীদের সাধারণ কাজ কারবার ‘কাইল’ তথা মাপের মাধ্যমে সম্পন্ন হত। তারা এ ব্যাপারে চুরি করা ও কম মাপায় খুবই অভ্যস্ত ছিল। এর প্রেক্ষিতে সূরা আল-মুতাফফেফীন নাযিল হয়। এই সূরা নাযিল হওয়ার পর তারা এই বদ-আভ্যাস থেকে বিরত হয় এবং এমন বিরত হয় যে, আজ পর্যন্ত তাদের সুখ্যাতি সৰ্বজনবিদিত। [নাসায়ী: আস-সুনানুল কুবরা: ১১৫৯০, ইবনে মাজহ: ২২২৩]
______________________
[১] تَطْفِيْفٌ এর অর্থ মাপে কম করা। যে এরূপ করে তাকে বলা হয় مُطَفِّف। [কুরতুবী] কুরআনের এই আয়াত ও বিভিন্ন হাদীসে মাপ ও ওজনে কম করাকে হারাম করা হয়েছে এবং সঠিকভাবে ওজন ও পরিমাপ করার জন্য কড়া তাগিদ করা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছেঃ “ইনসাফ সহকারে পুরো ওজন ও পরিমাপ করো। আমি কাউকে তার সামর্থের চাইতে বেশীর জন্য দায়িত্বশীল করি না।” [সূরা আল-আন‘আমঃ ১৫২] আরও বলা হয়েছেঃ “মাপার সময় পুরো মাপবে এবং সঠিক পাল্লা দিয়ে ওজন করবে।” [সূরা আল-ইসরা: ৩৫] অন্যত্র তাকীদ করা হয়েছে: “ওজনে বাড়াবাড়ি করো না, ঠিক ঠিকভাবে ইনসাফের সাথে ওজন করো এবং পাল্লায় কম করে দিয়ো না। [সূরা আর-রহমান: ৮-৯)। শু‘আইব আলাইহিস্ সালামের সম্প্রদায়ের ওপর এ অপরাধের কারণে আযাব নাযিল হয় যে, তাদের মধ্যে ওজনে ও মাপে কম দেওয়ার রোগ সাধারণভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং শু'আইব আলাইহিস্ সালাম এর বারবার নসীহত করা সত্ত্বেও এ সম্প্রদায়টি এ অপরাধমূলক কাজটি থেকে বিরত থাকেনি। তবে আয়াতে উল্লেখিত تطفيف শুধু মাপ ও ওজনের মধ্যেই সীমিত থাকবে না; বরং মাপ ও ওজনের মাধ্যমে হোক, গণনার মাধ্যমে হোক অথবা অন্য কোন পন্থায় প্রাপককে তার প্রাপ্য কম দিলে তা تطفيف এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে হারাম হবে। সুতরাং প্রত্যেক প্রাপকের প্রাপ্য পূর্ণমাত্রায় দেয়াই যে আয়াতের উদ্দেশ্য এ কথা বলাই বাহুল্য। উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু জনৈক ব্যক্তিকে আসরের সালাতে না দেখে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। সে একটি ওজর পেশ করল। তখন তিনি তাকে বললেন, طفَّفت অর্থাৎ ‘তুমি আল্লাহ্র প্রাপ্য আদায়ে কমতি করেছ।’ এই উক্তি উদ্ধৃত করে ইমাম মালেক রাহেমাহুল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে পূর্ণমাত্রায় দেয়া ও কম করা আছে [মুয়াত্তা মালেক: ১/১২, নং ২২] । তাছাড়া ঝগড়া-বিবাদের সময় নিজের দলীল-প্রমাণাদি পেশ করার পর প্রতিপক্ষের দলীল-প্রমাণাদি পেশ করার সুযোগ দেয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। [সা‘দী]
আল-মুতাফফিফীন 83:2
যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে,
আল-মুতাফফিফীন 83:3
আর যখন তাদেরকে মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।
আল-মুতাফফিফীন 83:4
তারা কি বিশ্বাস করে না যে, তারা পুনরুথিত হবে।
আল-মুতাফফিফীন 83:5
মহাদিনে ?
আল-মুতাফফিফীন 83:6
যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ সৃষ্টিকুলের রবের সামনে ! [১]
[১] ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘যেদিন সমস্ত মানুষ জগতসমূহের রবের সামনে দাঁড়াবে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের কানের মধ্যভাগ পর্যন্ত ঘামে ডুবে থাকবে।’ [বুখারী: ৬৫৩১, মুসলিম: ২৮৬২] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘কিয়ামতের দিন সূর্যকে সৃষ্টির এত নিকটে আনা হবে যে, তাদের মধ্যে দুরত্ব হবে এক ‘মাইল’ । বর্ণনাকারী বলেন: আমি জানি না এখানে মাইল বলে পরিচিত এক মাইল না সুরমাদানি (যা আরবিতে মাইল বলা হয় তা) বুঝানো হয়েছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘মানুষ তাদের স্বীয় আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে নিমজ্জিত থাকবে। কারও ঘাম হবে গোড়ালি পর্যন্ত, কারও হবে হাঁটু পর্যন্ত। আবার কারও ঘাম হবে কোমর পর্যন্ত; কারও ঘাম মুখের লাগামের মত হবে।’ তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মুখের দিকে ইশারা করেন। [মুসলিম: ২৮৬৪]
আল-মুতাফফিফীন 83:7
কখনো না, পাপাচারীদের আমলনামা তো সিজ্জীনে [১] আছে।
[১] سجين শব্দটি سجن থেকে গৃহীত। سجن অর্থ সংকীর্ণ জায়গায় বন্দী করা। [ইবন কাসীর] আর سجّين এর অর্থ চিরস্থায়ী কয়েদ। [মুয়াসসার] এটি একটি বিশেষ স্থানের নাম। যেখানে কাফেরদের রূহ অবস্থান করে। অথবা এখানেই তাদের আমলনামা থাকে। [জালালাইন]
আল-মুতাফফিফীন 83:8
আর কিসে আপনাকে জানাবে ‘সিজ্জীন’ কী?
আল-মুতাফফিফীন 83:9
চিহ্নিত আমলনামা [১]।
[১] مرقوم শব্দের কয়েকটি অর্থ আছে, লিখিত, চিহ্নিত এবং মোহরাঙ্কিত। [কুরতুবী] অর্থাৎ কিতাবটি লিখা শেষ হওয়ার পর তাতে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে ফলে তাতে হ্রাস বৃদ্ধি ঘটবে না। আর কিতাব বলতে, আমলনামা বোঝানো হয়েছে। ইবনে কাসীর বলেন, এটা সিজ্জীনের তাফসীর নয়; বরং পূর্ববতী كِتٰبَ الْفُجَّارِ এর বর্ণনা। অর্থ এই যে, কাফের ও পাপাচারীদের আমলনামা মোহর লাগিয়ে সংরক্ষিত করা হবে। ফলে এতে হ্রাস-বৃদ্ধি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকবে না। এই সংরক্ষণের স্থান হবে সিজ্জীন। এর প্রমাণ আমরা বারা ইবনে আযিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীসে দেখতে পাই। সেখানে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ্ কাফেরদের রূহ হরণ হওয়ার পর বলবেন,
اكْتُبُوا كِتَابَه فيِ سِجِّيْنٍ فيِ الأَرْضِ السُّفْلٰى
“তার কিতাবকে সর্বনিম্ন যমীনে সিজ্জীনে লিখে রাখ’’। [মুসনাদে আহমাদঃ ৪/২৮৭]
আল-মুতাফফিফীন 83:10
সেদিন দুর্ভোগ হবে মিথ্যারোপকারীদের,
আল-মুতাফফিফীন 83:11
যারা প্রতিদান দিবসে মিথ্যারোপ করে,
আল-মুতাফফিফীন 83:12
আর শুধু প্রত্যেক পাপিষ্ঠ সীমালংঘনকারীই এতে মিথ্যারোপ করে;
আল-মুতাফফিফীন 83:13
যখন তার কাছে আমাদের আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হয় তখন সে বলে, (এ তো) ‘পূর্ববর্তীদের উপকথা।’
আল-মুতাফফিফীন 83:14
কখনো নয়; বরং তারা যা অর্জন করেছে তা-ই তাদের হৃদয়ে জঙ্ ধরিয়েছে [১]।
[১] ران শব্দটি رين থেকে উদ্ভূত। অর্থ প্রাধান্য বিস্তার করা। [কুরতুবী] ঢেকে ফেলা। [তাতিস্মাতু আদওয়াইল বায়ান] যাজ্জাজ বলেন, মরিচা ও ময়লা। [কুরতুবী] অর্থাৎ শাস্তি ও পুরস্কারকে গল্প বা উপকথা গণ্য করার কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই। কিন্তু যে কারণে তারা একে গল্প বলছে তা হচ্ছে এই যে, এরা যেসব গোনাহে লিপ্ত রয়েছে তাদের অন্তরে মরিচা ধরেছে। মরিচা যেমন লোহাকে খেয়ে মাটিতে পরিণত করে দেয়, তেমনি তাদের পাপের মরিচা তাদের অন্তরের যোগ্যতা নিঃশেষ করে দিয়েছে। ফলে তারা ভাল ও মন্দের পার্থক্য বোঝেনা। ফলে পুরোপুরি যুক্তিসংগত কথাও এদের কাছে গল্প বলে মনে হচ্ছে। [ইবন কাসীর] এই জং ও মরীচার ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: বান্দা যখন কোন গোনাহ করে, তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। সে তওবা করলে দাগটি উঠে যায়। কিন্তু যদি সে গোনাহ করে যেতেই থাকে তাহলে সমগ্র দিলের ওপর তা ছেয়ে যায়। [তিরমিয়ী: ৩৩৩৪ ইবনে মজাহঃ ৪২৪৪]
আল-মুতাফফিফীন 83:15
কখনো নয়; নিশ্চয় সেদিন তারা তাদের রব হতে অন্তরিত থাকবে [১];
[১] অর্থাৎ কেয়ামতের দিন এই কাফেররা তাদের রবের দীদার বা দর্শন ও যেয়ারত থেকে বঞ্চিত থাকবে এবং পর্দার আড়ালে অবস্থান করবে। এই আয়াত থেকে জানা যায় যে, সেদিন মুমিনগণ আল্লাহ্ তা‘আলার দীদার ও যেয়ারত লাভে ধন্য হবে। নতুবা কাফেরদেরকে পর্দার অন্তরালে রাখার কোন উপকারিতা নেই। [ইবন কাসীর]
আল-মুতাফফিফীন 83:16
তারপর নিশ্চয় তারা জাহান্নামে দগ্ধ হবে;
আল-মুতাফফিফীন 83:17
তারপর বলা হবে, ‘এটাই তা যাতে তোমরা মিথ্যারোপ করতে।’
আল-মুতাফফিফীন 83:18
কখনো নয়, নিশ্চয় পূণ্যবানদের আমলনামা ‘ইল্লিয়ইয়্যীনে’ [১] ,
[১] কারও কারও মতে عِلِّيِّيْنَ শব্দটি علوّ এর বহুবচন। উদ্দেশ্য উচ্চতা। [ইবন কাসীর] আবার কেউ কেউ বলেন, এটা জায়গার নাম- বহুবচন নয়। [কুরতুবী; ইবন কাসীর] বারা ইবনে আযেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর হাদীসে এসেছে যে, ফেরশেতাগণ রূহ নিয়ে উঠতেই থাকবেন
حَتّٰى يُنْتَهٰى بِهِ إِلَى السَّمَاءِ السَّا بِعَةِ فَيَقُولُ اللهُ عَزَّ وَ جَلَّ اكْتُبُو اكِتَابَ عَبْدِي فِي عِلِّيِّينَ
“শেষ পর্যন্ত সপ্তম আসমানে উঠবেন তখন মহান আল্লাহ্ বলবেন, আমার বান্দার কিতাব ইল্লিয়্যীনে লিখে নাও” [মুসনাদে আহমাদ: ৪/২৮৭] । এ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ইল্লিয়্যীন সপ্তম আকাশে আরশের কাছে এক স্থানের নাম। এতে মুমিনদের রূহ ও আমলনামা রাখা হয়। [ইবন কাসীর ইবন আব্বাস থেকে]
আল-মুতাফফিফীন 83:19
আর কিসে আপনাকে জানাবে ‘ইল্লিয়্যীন’ কী?
আল-মুতাফফিফীন 83:20
চিহ্নিত আমলনামা [১]।
[১] এখানেও এটাই সঠিক যে, এটা ‘ইল্লিয়্যীন’ এর কোন বিশেষণ নয়, বরং পূর্বে উল্লেখিত كِتٰبَ الْاَبْرَارِ এর বিশেষণ। [দেখুন, কুরতুবী; ইবন কাসীর] এর প্রমাণ উপরোক্ত বারা ইবনে আযেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে,
فَيَقُولُ اللهُ عَزَّ وَ جَلَّ اكْتُبُو اكِتَابَ عَبْدِي فِي عِلِّيِّينَ
“অতঃপর মহান আল্লাহ্ বলবেন, আমার বান্দার আমলনামা ইল্লিয়্যীন লিখে রাখ” । সুতরাং ইল্লিয়্যীন কিতাব নয় বরং আমলনামা বা কিতাব কপি করে রাখার স্থান।
আল-মুতাফফিফীন 83:21
(আল্লাহ্র) সান্নিধ্যপ্রাপ্তরাই তা অবলোকন করে [১]।
[১] يشهد শব্দটি شهود থেকেউদ্ভূত। شهود এর এক অর্থ প্রত্যক্ষ করা, তত্ত্বাবধান করা। তখন আয়াতের উদ্দেশ্য হবে এই যে, সৎকর্মশীলদের আমলনামার প্রতি আসমানের নৈকট্যশীল ফেরেশতাগণ দেখবে অর্থাৎ তত্ত্বাবধান ও হেফাযত করবে। [ইবন কাসীর] তাছাড়া شهود এর আরেক অর্থ উপস্থিত হওয়া। [উসাইমীন, তাফসীরুল কুরআনিল আয়ীম]। তখন يشهده এর সর্বনাম দ্বারা ইল্লিয়্যীন বোঝানো হবে। আর এর অর্থ হবে, প্রতি আসমানের নৈকট্যপ্রাপ্তগণ সেখানে হাজির হবেন এবং সেটাকে হেফাযত করবেন; কেননা এটা নেক আমলকারীর জন্য জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা পত্র এবং জান্নাতে যাওয়ার সফলতার গ্যারান্টি। [আইসারুত তাফসীর] এটা ঐ সময়ই হবে, যখন ইল্লিয়্যীন দ্বারা আমলনামা বোঝানো হবে। আর যদি ইল্লিয়্যীন দ্বারা নৈকট্যপ্রাপ্তদের রূহের স্থান ধরা হয়, তখন আয়াতের অর্থ হবে, নৈকট্যশীলগণের রূহ্ এই ইল্লিয়্যীন নামক স্থানে উপস্থিত হবে। সে হিসেবে ইল্লিয়্যীন ঈমানদারদের রুহের আবাসস্থল; যেমন সিজ্জীন কাফেরদের রূহের আবাসস্থল। এর স্বপক্ষে একটি হাদীস থেকে ধারণা পাওয়া যায়, আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “শহীদগণের রূহ আল্লাহ্র সান্নিধ্যে সবুজ পাখিদের মধ্যে থাকবে এবং জান্নাতের বাগ-বাগিচা ও নহরসমূহে ভ্রমণ করবে। তাদের বাসস্থানে আরাশের নিচে ঝুলন্ত প্ৰদীপ থাকবে।” [মুসলিম: ১৮৮৭] এ থেকে বোঝা গেল যে, শহীদগণের রূহ্ আরাশের নিচে থাকবে এবং জান্নাতে ভ্ৰমণ করতে পারবে। তাছাড়া পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে বলা হয়েছে,
عِنْدَسِدْرَةِالْمُنْتَهٰى ٭ عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَلْوٰى
এ থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে, জান্নাত সিদরাতুল মুনতাহার সন্নিকটে। সিদরাতুল মুনতাহা যে সপ্তম আকাশে, এ কথা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তাই আত্মার স্থান ইল্লিয়্যীন জান্নাতের সংলগ্ন এবং আত্মাসমূহ জান্নাতের বাগিচায় ভ্ৰমণ করে। অতএব, আত্মার স্থান জান্নাতও বলা যায়। তাই কোন কোন মুফাসসির ইল্লিয়্যীন এর ব্যাখ্যা করেছেন জান্নাত। [সা‘দী]
আল-মুতাফফিফীন 83:22
নিশ্চয় পুণ্যবানগণ থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দ্যে,
আল-মুতাফফিফীন 83:23
সুসজ্জিত আসনে বসে তারা দেখতে থাকবে।
আল-মুতাফফিফীন 83:24
আপনি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের দীপ্তি দেখতে পাবেন,
আল-মুতাফফিফীন 83:25
তাদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় হতে পান করান হবে;
আল-মুতাফফিফীন 83:26
যার মোহর হবে মিসকে্র [১] , আর এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্ৰতিযোগিতা করুক [২]।
[১] মূলে “খিতামুহু মিস্ক বলা হয়েছে। এর একটি অর্থ হচ্ছে, যেসব পাত্রে এই শরাব রাখা হবে তার ওপর মাটি বা মোমের পরিবর্তে মিশকের মোহর লাগানো থাকবে। এ অর্থের দিক দিয়ে আয়াতের অর্থ হয়: এটি হবে উন্নত পর্যায়ের পরিচ্ছন্ন শরাব। এর দ্বিতীয় অর্থ হতে পারে: এই শরাব যখন পানকারীদের গলা থেকে নামবে তখন শেষের দিকে তারা মিশকের খুশবু পাবে। [ফাতহুল কাদীর] এই অবস্থাটি দুনিয়ার শরাবের সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে শরাবের বোতল খোলার সাথে সাথেই একটি বোটকা গন্ধ নাকে লাগে। পান করার সময়ও এর দুৰ্গন্ধ অনুভূত হতে থাকে এবং গলা দিয়ে নামবার সময় মস্তিষ্কের অভ্যন্তরেও পচা গন্ধ পৌছে যায়। এর ফলে শরাবীর চেহারায় বিস্বাদের একটা ভাব জেগে ওঠে।
[২] কোন বিশেষ পছন্দনীয় জিনিস অর্জন করার জন্যে কয়েকজনের ধাবিত হওয়া ও দৌড়া, যাতে অপরের আগে সে তা অর্জন করতে সক্ষম হয় এর নাম تنافس। এখানে জন্নাতের নেয়ামতরাজি উল্লেখ করার পর আল্লাহ্ তা'আলা গাফেল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, আজ তোমরা যেসব বস্তুকে প্রিয় ও কাম্য মনে করে সেগুলো অর্জন করার জন্যে অগ্রে চলে যাওয়ার চেষ্টায় রত আছ, সেগুলো অসম্পূর্ণ ও ধ্বংসশীল নেয়ামত। এসব নেয়ামত প্রতিযোগিতার যোগ্য নয়। এসব ক্ষণস্থায়ী সুখের সামগ্ৰী হাতছাড়া হয়ে গেলেও তেমন দুঃখের কারণ নয়। হ্যাঁ, জান্নাতের নেয়ামতরাজির জন্যই প্রতিযোগিতা করা উচিত। এগুলো সব দিক দিয়ে সম্পূর্ণ চিরস্থায়ী।
আল-মুতাফফিফীন 83:27
আর তার মিশ্রণ হবে তাস্নীমের [১] ,
[১] তাসনীম মানে উন্নত ও উঁচু। [ফাতহুল কাদীর] কোন কোন মুফাসসির বলেন, কোন ঝরণাকে তাসনীম বলার মানে হচ্ছে এই যে, তা উঁচু থেকে প্রবাহিত হয়ে নীচের দিকে আসে। [ফাতহুল কাদীর]
আল-মুতাফফিফীন 83:28
এটা এক প্রস্রবণ, যা থেকে সান্নিধ্যপ্রাপ্তরা পান করে।
আল-মুতাফফিফীন 83:29
নিশ্চয় যারা অপরাধ করেছে তারা মুমিনদেরকে উপহাস করত, [১]
[১] অর্থাৎ একথা ভাবতে ভাবতে ঘরের দিকে ফিরতো: আজ তো বড়ই মজা। ওমুক মুসলিমকে বিদ্রুপ করে, তাকে চোখা চোখা বাক্যবাণে বিদ্ধ করে বড়ই মজা পাওয়া গেছে এবং সাধারণ মানুষের সামনে তাকে চরমভাবে অপদস্থ করা গেছে। মোটকথাঃ তারা মু‘মিনদের নিয়ে অপমানজনক কথা-বার্তা, আচার আচরণ, ইশারা-ইঙ্গিত করত। আর মজা লাভ করত। [ফাতহুল কাদীর]
আল-মুতাফফিফীন 83:30
আর যখন তারা মুমিনদের কাছ দিয়ে যেত তখন তারা চোখ টিপে বিদ্ররূপ করত।
আল-মুতাফফিফীন 83:31
আর যখন তাদের আপনজনের কাছে ফিরে আসত তখন তারা ফিরত উৎফুল্ল হয়ে,
আল-মুতাফফিফীন 83:32
আর যখন মুমিনদেরকে দেখত তখন বলত, ‘নিশ্চয় এরা পথভ্ৰষ্ট [১]।’
[১] অর্থাৎ এরা বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে গেছে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের চক্করে ফেলে দিয়েছেন। ফলে এরা নিজেরা নিজেদেরকে দুনিয়ার লাভ, স্বাৰ্থ ও ভোগ-বিলাসিতা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে এবং সব রকমের আশংকা ও বিপদ আপদের মুখোমুখি হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] যা কিছু এদের সামনে উপস্থিত আছে তা কেবল এ অনিশ্চিত আশায় ত্যাগ করছে যে, এদের সাথে মৃত্যুর পরে কি এক জান্নাত দেবার ওয়াদা করা হয়েছে, আর পরবর্তী জগতে নাকি কোন জাহান্নাম হবে, এদেরকে তার আযাবের ভয় দেখানো হয়েছে এবং তার ফলেই এরা আজ এ দুনিয়ায় সবকিছু কষ্ট বরদাশত করে যাচ্ছে। এভাবে যুগে যুগে মুমিনদেরকে অপমানজনক কথা সহ্য করতে হয়েছে। বর্তমানেও কেউ দ্বীনদার হলে তার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করতে শোনা যায়। [উসাইমীন, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম]
আল-মুতাফফিফীন 83:33
অথচ তাদেরকে মুমিনদের তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠানো হয়নি [১]।
[১] এই ছোট বাক্যটিতে বিদ্রুপকারীদের জন্য বড়ই শিক্ষাপ্রদ হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে অর্থাৎ ধরে নেয়া যাক মুসলিমরা যা কিছুর প্রতি ঈমান এনেছে সবকিছুই ভুল। কিন্তু তাতে তারা তোমাদের তো কোন ক্ষতি করছে না। যে জিনিসকে তারা সত্য মনে করেছে সেই অনুযায়ী তারা নিজেরাই আমল করছে। তোমরা তাদের সমালোচনা করছ কেন? আল্লাহ্ কি তোমাদেরকে এই দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন? মুমিনদের কর্মকাণ্ড হেফাযত করার দায়িত্ব তো তোমাদেরকে দেয়া হয়নি। তাহলে সেটা করতে যাবে কেন? এটাকেই তোমাদের উদ্দেশ্য বানিয়েছ কেন? [দেখুন, ইবন কাসীর]
আল-মুতাফফিফীন 83:34
অতএব আজ মুমিনগণ উপহাস করবে কাফিরদেরকে,
আল-মুতাফফিফীন 83:35
সুসজ্জিত আসনে বসে তারা দেখতে থাকবে।
আল-মুতাফফিফীন 83:36
কাফিররা তাদের কৃতকর্মের ফল পেল তো?
আল-ইনশিকাক 84:1
যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে [১] ,
[১] আর সেটা হবে কিয়ামতের দিন। [ইবন কাসীর]
আল-ইনশিকাক 84:2
আর তার রবের আদেশ পালন করবে এবং এটাই তার করণীয় [১]।
[১] এখানে কেয়ামতের দিন আকাশ ও পৃথিবীর উপর আল্লাহ্ তা‘আলার কর্তৃত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, وَاَذِنَتْ لِرَبِّهَا وَحُقَّتْ এর মধ্যে أذنت অর্থ শুনেছে তথা আদেশ পালন করেছে। সে হিসেবে وَاَذِنَتْ لِرَبِّهَا এর শাব্দিক অর্থ হয়, “সে নিজের রবের হুকুম শুনবে।” এর মানে শুধুমাত্র হুকুম শুনা নয় বরং এর মানে সে হুকুম শুনে একজন অনুগতের ন্যায় নির্দেশ পালন করেছে এবং একটুও অবাধ্যতা প্ৰকাশ করেনি। [সা‘দী] আর حُقّت এর অর্থ ‘আদেশ পালন করাই তার ওয়াজিব কর্তব্য ছিল’। কারণ সে একজন মহান বাদশার কর্তৃত্বাধীন ও পরিচালনাধীন। যাদের নির্দেশ অমান্য করা যায় না, আর তার হুকুমের বিপরীত করা যায় না। [ইবন কাসীর; সা‘দী]
আল-ইনশিকাক 84:3
আর যখন যমীনকে সম্প্রসারিত করা হবে [১]।
[১] مُدّت এর অর্থ টেনে লম্বা করা, ছড়িয়ে দেয়া। [ইবন কাসীর] পৃথিবীকে ছড়িয়ে দেবার মানে হচ্ছে, সাগর নদী ও সমস্ত জলাশয় ভরে দেয়া হবে। পাহাড়গুলো চুৰ্ণবিচূর্ণ করে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়া হবে। পৃথিবীর সমস্ত উঁচু নীচু জায়গা সমান করে সমগ্ৰ পৃথিবীটাকে একটি সমতল প্রান্তরে পরিণত করা হবে। কুরআনের অন্যত্র এই অবস্থাটিকে নিমোক্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, মহান আল্লাহ্ “তাকে একটা সমতল প্রান্তরে পরিণত করে দেবেন। সেখানে তোমরা কোন উঁচু জায়গা ও ভাঁজ দেখতে পাবে না।” [সূরা ত্ব-হা: ১০৬-১০৭] হাদীসে এসেছে, ‘কেয়ামতের দিন পৃথিবীকে চামড়ার ন্যায় টেনে সম্প্রসারিত করা হবে। তারপর মানুষের জন্য সেখানে কেবলমাত্র পা রাখার জায়গাই থাকবে।” [মুস্তাদরাকে হাকিম: ৪/৫৭১] একথাটি ভালোভাবে বুঝে নেয়ার জন্য এ বিষয়টিও সামনে রাখতে হবে যে, সেদিন সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষের জন্ম হয়েছে ও হবে সবাইকে একই সংগে জীবিত করে আল্লাহ্র আদালতে পেশ করা হবে। এ বিরাট জনগোষ্ঠীকে এক জায়গায় দাঁড় করাবার জন্য সমস্ত সাগর, নদী, জলাশয়, পাহাড়, পর্বত, উপত্যকা, মালভূমি, তথা উঁচু-নীচু সব জায়গা ভেঙ্গে-চুরে ভরাট করে সারা দুনিয়াটাকে একটি বিস্তীর্ণ প্রান্তরে পরিণত করা হবে। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর; সা‘দী]
আল-ইনশিকাক 84:4
আর যমীন তার অভ্যন্তরে যা আছে তা বাইরে নিক্ষেপ করবে ও শূন্যগর্ভ হবে [১]।
[১] অর্থাৎ পৃথিবী তার গর্ভস্থিত সবকিছু উদগিরণ করে একেবারে শূন্যগর্ভ হয়ে যাবে। পৃথিবীর গর্ভে গুপ্ত ধন-ভাণ্ডার, খনি এবং সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত মৃত মানুষের দেহকণা ইত্যাদি রয়েছে। যমীন এসব বস্তু আপন গৰ্ভ থেকে বাইরে নিক্ষেপ করবে। অনুরূপভাবে যত মৃত মানুষ তার মধ্যে রয়েছে সবাইকে ঠেলে বাইরে বের করে দেবে। [ফাতহুল কাদীর; সা‘দী]
আল-ইনশিকাক 84:5
এবং তার রবের আদেশ পালন করবে এটাই তার করণীয় [১]।
[১] যখন এসব ঘটনাবলী ঘটবে তখন কি হবে, একথা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। কারণ এ পরবর্তী বক্তব্যগুলো নিজে নিজেই তা প্ৰকাশ করে দিচ্ছে। এ বক্তব্যগুলোতে বলা হচ্ছেঃ হে মানুষ! তুমি তোমার রবের দিকে এগিয়ে চলছো। শীঘ্র তাঁর সামনে হাযির হয়ে যাবে। তখন তোমার আমলনামা তোমার হাতে দেয়া হবে। আর তোমার আমলনামা অনুযায়ী তোমাকে পুরস্কার দেয়া হবে। [কুরতুবী] সুতরাং উপরোক্ত ঘটনাবলী ঘটলে কি হবে তা সহজেই বুঝা যায় যে, মানুষ তখন পুনরুথিত হবে। তখন পুনরুত্থানের ব্যাপারে কেউ সন্দেহ পোষণ করবে না। কারণ বাস্তবতা যখন এসে যাবে তখন সন্দেহ করার আর সুযোগ কোথায়?
আল-ইনশিকাক 84:6
হে মানুষ! তুমি তোমার রবের কাছে পৌছা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, অতঃপর তুমি তাঁর সাক্ষাত লাভ করবে [১]।
[১] كدح এর অর্থ কোন কাজে পূর্ণ চেষ্টা ও শক্তি ব্যয় করা। [ফাতহুল কাদীর] মানুষের প্রত্যেক চেষ্টা ও অধ্যবসায় আল্লাহ্র দিকে চূড়ান্ত হবে। অর্থাৎ মানুষ দুনিয়ায় যা কিছু কষ্ট-সাধনা প্ৰচেষ্টা ও সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে সে সম্পর্কে সে মনে করতে পারে যে তা কেবল দুনিয়ার জীবন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ এবং দুনিয়াবী স্বাৰ্থ লাভ করাই এর উদ্দেশ্য। কিন্তু আসলে সে সচেতন বা অচেতনভাবে নিজের রবের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে এবং অবশেষে তাকে তাঁর কাছেই পৌঁছতে হবে। মানুষ এখানে যে চেষ্টা-চরিত্র করছে, পরিশেষে তার পালনকর্তার কাছে পৌছে এর সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটবে এবং এর শুভ অথবা অশুভ পরিণতি সামনে এসে যাবে। অথবা এর অর্থ প্রত্যেক মানুষ আখেরাতে তার পালনকর্তার সাথে সাক্ষাৎ করবে এবং হিসাবের জন্যে তাঁর সামনে উপস্থিত হবে। [দেখুন, কুরতুবী] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাক্ষাত করতে চায়, আল্লাহ্ও তার সাক্ষাত করতে পছন্দ করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাক্ষাত করতে চায় না, আল্লাহ্ও তার সাথে সাক্ষাত করতে অপছন্দ করেন।’ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা-অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য কোন স্ত্রী- বলেন, ‘আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি।’ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তা নয়। কিন্তু মুমিন ব্যক্তির যখন মৃত্যু ঘণিয়ে আসে, তখন তাকে আল্লাহ্ তা'আলার সস্তুষ্টি ও সম্মানের সুসংবাদ দেওয়া হয়। তখন তার কাছে মৃত্যু অপেক্ষা অন্য কিছু প্রিয় হতে পারে না। এভাবে সে আল্লাহ্র সাক্ষাত করতে পছন্দ করে, তাই আল্লাহ্ তা‘আলাও তার সাথে সাক্ষাত করতে পছন্দ করেন। আর কাফির ব্যক্তিকে মৃত্যুর সময় আল্লাহ্র আযাব ও শাস্তির সংবাদ দেওয়া হয়, তখন মৃত্যু অপেক্ষা অপ্রিয় আর কিছু থাকে না। সে আল্লাহ্র সাক্ষাত অপছন্দ করে বিধায় আল্লাহ্ তা'আলা তার সাথে সাক্ষাত অপছ ন্দকরেন’। [বুখারী: ৬৫০৭, মুসলিম: ২৬৮৩]
আল-ইনশিকাক 84:7
অতঃপর যাকে তার ‘আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে।
আল-ইনশিকাক 84:8
তার হিসেব-নিকেশ সহজেই নেয়া হবে [১]
[১] এতে মুমিনদের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাদের আমলনামা ডান হাতে আসবে এবং তাদের সহজ হিসাব নিয়ে জান্নাতের সুসংবাদ দান করা হবে। তারা তাদের পরিবার-পরিজনের কাছে হৃষ্টচিত্তে ফিরে যাবে। তার হিসেব নেয়ার ব্যাপারে কড়াকড়ি করা হবে না। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে না, ওমুক ওমুক কাজ তুমি কেন করেছিলে? ঐসব কাজ করার ব্যাপারে তোমার কাছে কি কি ওযর আছে? নেকীর সাথে সাথে গোনাহও তার আমলনামায় অবশ্যি লেখা থাকবে। কিন্তু গোনাহের তুলনায় নেকীর পরিমাণ বেশী হবার কারণে তার অপরাধগুলো উপেক্ষা করা হবে এবং সেগুলো মাফ করে দেয়া হবে। কুরআন মজিদে অসৎকর্মশীল লোকদের কঠিন হিসেব-নিকেশের জন্য “সু-উল হিসাব” (খারাপভাবে হিসেব নেয়া) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। [সূরা আর-রা‘দ ১৮] সৎলোকদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “এরা এমন লোক যাদের সৎকাজগুলো আমি গ্রহণ করে নেবো এবং অসৎকাজগুলো মাফ করে দেবো। ”[সূরা আল-আহকাফ ১৬] আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, কেয়ামতের দিন যার হিসাব নেয়া হবে, সে আযাব থেকে রক্ষা পাবে না। এ কথা শুনে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা প্রশ্ন করলেন, কুরআনেকি فَسَوْفَ يُحَا سَبْ مِاَبًا يَّسِيْرًا বলা হয়নি? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এই আয়াতে যাকে সহজ হিসাব বলা হয়েছে, সেটা প্রকৃতপক্ষে পরিপূর্ণ হিসাব নয়; বরং কেবল আল্লাহ্ রাব্ববুল আলামীনের সামনে পেশ করা। যে ব্যক্তির কাছ থেকে তার কাজকর্মের পুরোপুরি হিসাব নেয়া হবে, সে আযাব থেকে কিছুতেই রক্ষা পাবে না। [বুখারীঃ ৪৯৩৯, মুসলিম: ২৮৭৬]
আল-ইনশিকাক 84:9
এবং সে তার স্বজনদের কাছে [১] প্ৰফুল্লচিত্তে ফিরে যাবে;
[১] কোন কোন মুফাসসির বলেন, নিজের লোকজন বলতে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ও সাখী-সহযোগীদের কথা বুঝানো হয়েছে। তাদেরকেও একইভাবে মাফ করে দেয়া হয়ে থাকবে। কাতাদাহ বলেন, এখানে পরিবার বলে জান্নাতে তার যে পরিবার থাকবে তাদের বোঝানো হয়েছে। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
আল-ইনশিকাক 84:10
আর যাকে তার ‘আমলনামা তার পিঠের পিছনদিক থেকে দেয়া হবে,
আল-ইনশিকাক 84:11
সে অবশ্যই তার ধ্বংস ডাকবে;
আল-ইনশিকাক 84:12
এবং জ্বলন্ত আগুনে দগ্ধ হবে;
আল-ইনশিকাক 84:13
নিশ্চয় সে তার স্বজনদের মধ্যে আনন্দে ছিল,
আল-ইনশিকাক 84:14
নিশ্চয় সে তার স্বজনদের মধ্যে আনন্দে ছিল,
[১] অর্থাৎ যার আমলনামা তার পিঠের দিক থেকে বাম হাতে আসবে, সে মরে মাটি হয়ে যাওয়ার আকাঙ্খা করবে, যাতে আযাব থেকে বেঁচে যায়। কিন্তু সেখানে তা সম্ভবপর হবে না। তাকে জাহান্নামে দাখিল করা হবে। এর এক কারণ এই বলা হয়েছে যে, সে দুনিয়াতে তার পরিবার-পরিজনের মধ্যে আখেরাতের প্রতি উদাসীন হয়ে আনন্দ-উল্লাসে দিন যাপন করত। সে তার রবের কাছে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে বিশ্বাসী ছিল না। হিসাব-নিকাশের জন্য পুনরুথিত হবে না। কারণ সে পুনরুত্থানে ও আখেরাতে মিথ্যারোপ করত। [ফাতহুল কাদীর]
আল-ইনশিকাক 84:15
হ্যাঁ, [১] নিশ্চয় তার রব তার উপর সম্যক দৃষ্টি দানকারী।
[১] অর্থাৎ সে যা মনে করেছে তা ঠিক নয়। সে অবশ্যই তার রবের কাছে ফিরে যাবে। অবশ্যই সে পুনরুথিত হবে। [ফাতহুল কাদীর]
আল-ইনশিকাক 84:16
অতঃপর আমি শপথ করছি [১] পশ্চিম আকাশের
[১] এখানে আল্লাহ্ তা‘আলা তিনটি বস্তুর শপথ করে মানুষকে আবার اِنَّكَ كَادِحٌ اِلٰى رَبِّكَ আয়াতে বর্ণিত বিষয়ের প্রতি মনোযোগী করেছেন। শপথের জওয়াবে বলা হয়েছে যে, মানুষ এক অবস্থার উপর স্থিতিশীল থাকে না বরং তার অবস্থা প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হতে থাকে। যৌবন থেকে বাৰ্ধক্য, বাৰ্ধক্য থেকে মৃত্যু, মৃত্যু থেকে বরযখ (মৃত্যু ও কিয়ামতের মাঝখানের জীবন), বরযখ থেকে পুনরুজ্জীবন, পুনরুজ্জীবন থেকে হাশরের ময়দান তারপর হিসেব-নিকেশ এবং শাস্তি ও পুরস্কারের অসংখ্য মনযিল মানুষকে অতিক্রম করতে হবে। এ বিভিন্ন পৰ্যায় প্রমাণ করছে যে, একমাত্র আল্লাহ্ই তার মা‘বুদ, তিনি বান্দাদের কর্মকাণ্ড নিজস্ব প্রজ্ঞা ও রহমতে নিয়ন্ত্রণ করেন। আর বান্দা মুখাপেক্ষী, অপারগ, মহান প্রবল পরাক্রমশালী দয়ালু আল্লাহ্র কর্তৃত্বাধীন। [বাদায়‘উত তাফসীর; ফাতহুল কাদীর; সা‘দী]
আল-ইনশিকাক 84:17
আর শপথ রাতের এবং তা যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার,
আল-ইনশিকাক 84:18
এবং শপথ চাঁদের, যখন তা পূর্ণ হয়;
আল-ইনশিকাক 84:19
অবশ্যই তোমরা এক স্তর থেকে অন্য স্তরে আরোহণ করবে [১]।
[১] اتسق শব্দটি وسق থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ একত্রিত করা, পূর্ণ করা। চন্দ্রের একত্রিত করার অর্থ তার আলোকে একত্রিত করা। এটা চৌদ্দ তারিখের রাত্রিতে হয়, যখন চন্দ্র পূর্ণ হয়ে যায়। [ইবন কাসীর] এখানে চন্দ্রের বিভিন্ন অবস্থার দিকে ইঙ্গিত রয়েছে। চন্দ্ৰ প্ৰথমে খুবই সরু ধনুকের মতো দেখা যায়। এরপর প্রত্যহ এর আলো বৃদ্ধি পেতে পেতে পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে যায়। অবিরাম ও উপর্যুপরি পরিবর্তনের সাক্ষ্যদাতা উপরোক্ত বস্তুগুলোর শপথ করে আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন, “অবশ্যই তোমরা ধাপে ধাপে আরোহণ করবে” । طبق এর অর্থ অবস্থা, স্তর, পর্যায় ইত্যাদি [ইবন কাসীর] تَرْكَبُنَّ শব্দটি ركوب থেকে। এর অর্থ আরোহণ করা। অর্থ এই যে, হে মানুষ, তোমরা সর্বদাই এক স্তর থেকে অন্য স্তরে আরোহণ করতে থাকবে। উদ্দেশ্য এই যে, সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত মানুষ কোন সময় এক অবস্থায় স্থির থাকে না, বরং তার ওপর পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন আসতে থাকে। স্বাভাবিকভাবে যে সমস্ত পরিবর্তন হয় তা তো লক্ষণীয়। তাছাড়া মানুষ নিজেও আল্লাহ্র দেয়া সহজ-সরল দ্বীন থেকে বিমুখ হয়ে অন্যান্য বাতিল দ্বীনের অনুসরণে প্রবৃত্ত হয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমরা তোমাদের পূর্বের লোকদের হাতে হাতে বিঘাতে বিঘাতে অনুসরণ করতে থাকবে, এমনকি তারা যদি ষাণ্ডার গর্তে ঢুকে থাকে তোমরাও তাদের অনুসরণ করে তাতে ঢুকবে” সাহাবায়ে কিরাম বললেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! ইয়াহূদ ও নাসারা? তিনি বললেন, “তারা নয়তো কারা?” [বুখারী: ৭৩২০, মুসলিম: ২৬৬৯] [ইবন কাসীর] এখানে ইবন জারীর আত-তাবারীর মত হচ্ছে, মানুষকে অবশ্যই কঠিন থেকে কঠিন পর্যায় অতিক্রম করতে হবে। আখেরাতের পর্যায়গুলোও উদ্দেশ্য হতে পারে। [তাবারী; ইবন কাসীর]
আল-ইনশিকাক 84:20
অতঃপর তাদের কি হল যে, তারা ঈমান আনে না?
আল-ইনশিকাক 84:21
আর যখন তাদের কাছে কুরআন পাঠ করা হলে তখন তারা সিজ্দা করে না [১] ?
[১] অর্থাৎ যখন তাদের সামনে সুস্পষ্ট হেদায়েত পরিপূর্ণ কুরআন পাঠ করা হয়, তখনও তারা আল্লাহ্র দিকে নত হয় না। سجود এর আভিধানিক অর্থ নত হওয়া, আনুগত্য করা। বলাবাহুল্য, এখানে পারিভাষিক সাজদার পাশাপাশি আল্লাহ্র সামনে আনুগত্য সহকারে নত হওয়া তথা বিনীত হওয়াও উদ্দেশ্য। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এ সূরা পরে সাজদাহ করলেন, তারপর লোকদের দিকে ফিরে জানালেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং এ সূরা পড়ার পরে সাজদাহ করেছেন। [মুসলিম: ৫৭৮] অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি এশার সালাতে এ সূরা পাঠের পর সাজদাহ করলেন, এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হওয়ার পর বললেন, আমি আবুল কাসেম (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পিছনে সাজদাহ করেছি, সুতরাং তার সাথে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সাজদাহ করবই।” [বুখারী: ১০৭৮, মুসলিম: ৫৭৮]
আল-ইনশিকাক 84:22
বরং কাফিররা মিথ্যারোপ করে।
আল-ইনশিকাক 84:23
আর তারা যা পোষণ করে আল্লাহ্ তা সবিশেষ অবগত।
আল-ইনশিকাক 84:24
কাজেই আপনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন;
আল-ইনশিকাক 84:25
কিন্তু যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তাদের জন্য রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার।
আল-বুরূজ 85:1
শপথ বুরূজবিশিষ্ট [১] আসমানের,
[১] بُرُوْجٌ শব্দটি بُرْجٌ এর বহুবচন। অর্থ বড় প্রাসাদ ও দুর্গ। অন্য আয়াতে আছে, وَلَوْكُنُتُمْ فِىْ بُرُوْجٍ مُّشَيَّدَةٍ এখানে এই অর্থই বোঝানো হয়েছে। [কুরতুবী] অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে আলোচ্য আয়াতে بُرُوجٌ এর অর্থ বড় বড় গ্রহ-নক্ষত্র। কয়েকজন তাফসীরবিদ এ স্থলে অর্থ নিয়েছেন প্রাসাদ। অর্থাৎ সেসব গৃহ, যা আকাশে প্রহরী ও তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতাদের জন্যে নির্ধারিত। আবার কারও কারও মতে, এ অর্থ সুন্দর সৃষ্টি। অর্থাৎ সুন্দর সৃষ্টি আসমানের শপথ। তবে ইমাম ইবন জারীর আত-তাবারীর মত হচ্ছে, এখানে সূর্য ও চন্দ্রের অবস্থানস্থলসমূহ। আর তার সংখ্যা বারটি। সূর্য তার প্রতিটিতে একমাস চলে। আর চন্দ্র এর প্রতিটিতে দুইদিন ও একদিনের তিনভাগের এক অংশ সময় চলে। এতে করে চাঁদের আটাশটি অবস্থান হয়। তারপর সে দু‘দিন গোপন থাকে। এই বারটির প্রত্যেকটি একেকটি بُرْجٌ । চন্দ্র ও সূর্য আকাশের গতিতে গতিশীল হয়ে এসব بُرْجٌ এর মধ্যে অবতরণ করে। [ইবন কাসীর] তাই আয়াতের অর্থ হবে, সেই আসমানের শপথ, যাতে রয়েছে চাঁদ ও সূর্যের অবতরণস্থানসমূহ, অনুরূপ তাতে রয়েছে সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্রের অবতরনস্থলসমূহ, যেগুলো নিয়ম মেনে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চলছে। এ সুন্দর চলন ও সুন্দর নিয়মই আল্লাহ্র অপার শক্তি, রহমত, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রমাণ বহন করছে। [সা’দী]
আল-বুরূজ 85:2
আর প্রতিশ্রুত দিনের,
আল-বুরূজ 85:3
এবং দ্রষ্টা ও দৃষ্টের [১]---
[১] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “وَالُيَوْمِ الْمَوْعُوْدِ বা প্ৰতিশ্রুত দিনের অর্থ কেয়ামতের দিন। আর مشهود এর অর্থ আরাফার দিন এবং شاهد এর অর্থ শুক্রবার দিন। জুম'আর দিনের চেয়ে উত্তম কোন দিনে কোন সূর্য উদিত হয়নি এবং ডুবেওনি। সেদিন এমন একটি সময় আছে, কোন মুমিন বান্দা যখনই কোন কল্যাণের দো'আ করে তখনই তার দো'আ কবুল করা হয়। অথবা যদি কোন অকল্যাণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয় তখনই তাকে আল্লাহ্ তা থেকে আশ্রয় দেয়।” [তিরমিয়ী: ৩৩৩৯]
আল-বুরূজ 85:4
অভিশপ্ত হয়েছিল [১] কুণ্ডের অধিপতিরা--- [২]
[১] এখানে আল্লাহ্ তা‘আলা চারটি বস্তুর শপথ করার পর মূল কথা বর্ণনা করেছেন। (এক) বুরূজবিশিষ্ট আকাশের; (দুই) কেয়ামত দিবসের; (তিন) আরাফার দিনের এবং (চার) শুক্রবারের। এসব শপথের সম্পর্ক এই যে, এগুলো আল্লাহ্ তা'আলার পরিপূর্ণ শক্তি, কেয়ামতের হিসাব-নিকাশ এবং শাস্তি ও প্রতিদানের দলীল। শুক্রবার ও আরাফার দিন মুসলিমদের জন্যে আখেরাতের পুঁজি সংগ্রহের পবিত্ৰ দিন।
[২] যারা বড় বড় গর্তের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে ঈমানদারদেরকে তার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল এবং তাদের জ্বলে পুড়ে মরার বীভৎস দৃশ্য নিজেদের চোখে দেখেছিল তাদেরকে এখানে গর্তওয়ালা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, তাদের ওপর আল্লাহ্র লা‘নত পড়েছিল এবং তারা আল্লাহ্র আযাবের অধিকারী হয়েছিল। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] এর আরেক অর্থ ধ্বংস হয়েছিল। [সা‘দী]
গর্তে আগুন জ্বলিয়ে ঈমানদারদেরকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করার ঘটনা সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। সুহাইব রুমী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। এক বাদশার কাছে একজন যাদুকর ছিল। বৃদ্ধ বয়সে সে বাদশাহকে বললো, একটি ছেলেকে আমার কাছে নিযুক্ত করো, সে আমার কাছ থেকে এ জাদু শিখে নেবে। বাদশাহ জাদু শেখার জন্য জাদুকরের কাছে একটি ছেলেকে নিযুক্ত করলো। কিন্তু সেই ছেলেটি জাদুকরের কাছে আসা যাওয়ার পথে একজন রাহেবের (যিনি সম্ভবত ঈসা আলাইহিস সালামের দ্বীনের অনুসারী একজন সাধক ছিলেন) সাক্ষাত গুণে সে অলৌকিক শক্তির অধিকারীও হয়ে গেলো। সে অন্ধদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে এবং কুষ্ঠরোগ নিরাময় করতে লাগলো। ছেলেটি তাওহীদের প্রতি ঈমান এনেছে, একথা জানতে পেরে বাদশাহ প্ৰথমে রাহেবকে হত্যা করলো তারপর ছেলেটিকে হত্যা করতে চাইলো। কিন্তু কোন অস্ত্ৰ দিয়েই এবং কোনভাবেই তাকে হত্যা করতে পারলো না। শেষে ছেলেটি বললো, যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে চাও তাহলে প্রকাশ্য জনসমাবেশে “বিস্মি রাব্বিল গুলাম” (অর্থাৎ এই ছেলেটির রবের নামে) বাক্য উচ্চারণ করে আমাকে তীর মারো, তাতেই আমি মারা যাবো। বাদশাহ তাই করলো। ফলে ছেলেটি মারা গেলো। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে লোকেরা চিৎকার করে উঠলো, আমরা এই ছেলেটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। বাদশাহর সভাসদরা তাকে বললো, এখন তো তাই হয়ে গেলো যা থেকে আপনি বাঁচতে চাচ্ছিলেন। লোকেরা আপনার ধর্ম ত্যাগ করে এ ছেলেটির ধর্মগ্রহণ করেছে। এ অবস্থা দেখে বাদশাহ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলো। সে রাস্তার পাশে গর্ত খনন করালো। তাতে আগুন জ্বালালো। যারা ঈমান ত্যাগ করতে রাজী হলো না তাদের সবাইকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করলো। [মুসলিম: ৩০০৫ তিরমিয়ী: ৩৩৪০]।
আল-বুরূজ 85:5
যে কুণ্ডে ছিল ইন্ধনপূর্ণ আগুন,
আল-বুরূজ 85:6
যখন তারা এর পাশে উপবিষ্ট ছিল;
আল-বুরূজ 85:7
এবং তারা মুমিনদের সাথে যা করছিল তা প্রত্যক্ষ করছিল।
আল-বুরূজ 85:8
আর তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু এ কারণে যে, তারা ঈমান এনেছিল পরাক্রমশালী ও প্রশংসার যোগ্য আল্লাহ্র উপর---
আল-বুরূজ 85:9
আসমানমূহ ও যমীনের সর্বময় কর্তৃত্ব যাঁর; আর আল্লাহ্ সবকিছুর প্রত্যক্ষদর্শী।
আল-বুরূজ 85:10
নিশ্চয় যারা মুমিন নরনারীকে বিপদাপন্ন করেছে [১] তারপর তাওবা করেনি [২] তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি, আর তাদের জন্য আছে দহন যন্ত্রণা [৩]।
[১] فتنوا শব্দের এক অর্থ হচ্ছে, أحرقوا বা জ্বালিয়েছিল। অপর অর্থ পরীক্ষা করা। বিপদে ফেলা। [ফাতহুল কাদীর]
[২] কাফেরদের জাহান্নামের আযাব ও দহন যন্ত্রণার খবর দেয়ার সাথে সাথে কুরআন বলছে যে, এই আযাব তাদের ওপর পতিত হবে, যারা এই দুষ্কর্মের কারণে অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেনি। এতে তাদেরকে তাওবার দাওয়াত দেয়া হয়েছে। হাসান বসরী বলেন: বাস্তবিকই আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও কৃপার কোন তুলনা নেই। তারা তো আল্লাহ্র নেক বান্দাদেরকে জীবিত দগ্ধ করে তামাশা দেখছে, আল্লাহ্ তা‘আলা এরপরও তাদেরকে তওবা ও মাগফিরাতের দাওয়াত দিচ্ছেন। [ইবনুল কাইয়্যেম, বাদায়ে‘উস তাফসীর; ইবন কাসীর]
[৩] এখানে অত্যাচারী কাফেরদের শাস্তি বর্ণিত হয়েছে, যারা মুমিনদেরকে কেবল ঈমানের কারণে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিল। শাস্তি প্রসঙ্গে দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে- (এক) তাদের জন্যে আখেরাতে জাহান্নামের আযাব রয়েছে, (দুই) তাদের জন্যে দহন যন্ত্রণা রয়েছে। এখানে দ্বিতীয়টি প্রথমটিরই বর্ণনা ও তাকীদ হতে পারে। অর্থাৎ জাহান্নামে গিয়ে তারা চিরকাল দহন যন্ত্রণা ভোগ করবে। এটাও সম্ভবপর যে, দ্বিতীয় বাক্যে দুনিয়ার শাস্তি বর্ণিত হয়েছে। প্রখ্যাত আলেম রবী ইবনে আনাস বলেন, মুমিনদেরকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করার পর অগ্নি স্পর্শ করার পূর্বেই আল্লাহ্ তা'আলা তাদের রূহ্ কবজ করে নেন। এভাবে তিনি তাদেরকে দহন যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেন। ফলে তাদের মৃতদেহই কেবল অগ্নিতে দগ্ধ হয়। অতঃপর এই অগ্নি আরও বেশি প্রজ্বলিত হয়ে তার লেলিহান শিখা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে যারা মুসলিমদের অগ্নি দগ্ধ হওয়ার তামাশা দেখছিল, তারাও এই আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। [ফাতহুল কাদীর]
আল-বুরূজ 85:11
নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; এটাই মহাসাফল্য।
আল-বুরূজ 85:12
নিশ্চয় আপনার রবের পাকড়াও বড়ই কঠিন।
আল-বুরূজ 85:13
তিনিই অস্তিত্ব দান করেন ও পুনরাবর্তন ঘটান,
আল-বুরূজ 85:14
এবং তিনি ক্ষমাশীল, অতিস্নেহময় [১] ,
[১] الودود শব্দটির কয়েকটি অর্থ বর্ণিত আছে। কারও কারও মতে, ‘ওয়াদূদ’ বলা হয় তাকে যার কোন সন্তান নেই। অর্থাৎ যার এমন কেউ নেই যার প্রতি মন টানতে থাকবে। [ফাতহুল কাদীর] তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এর অর্থ, প্রিয় বা প্রিয়পাত্র। [ইবন কাসীর] যার ভালবাসায় কোন খাদ নেই। যারা তাঁকে ভালবাসেন তিনিও তাদেরকে ভালবাসেন। অন্য আয়াতে আল্লাহ্ বলেন, ‘তিনি তাদেরকে ভালবাসেন আর তারাও তাঁকে ভালবাসে’। [সূরা আল-মায়েদাহ: ৫৪] তিনি এমন সত্তা যাঁকে তার ভালবাসার পাত্ররা এমন ভালবাসে যে ভালবাসার কোন উদাহরণ দেয়া সম্ভব হয় না। যার কোন তুলনা নেই। তাঁর খালেস বান্দাদের অন্তরে তাঁর যে ভালবাসা রয়েছে সেটার তুলনা কোন ভালবাসা দিয়ে দেয়া যাবে না। আর এজন্যই ভালবাসা হচ্ছে আল্লাহ্র দাসত্বের মূল কথা। যে ভালবাসার কারণে যাবতীয় ভালবাসার পাত্রের উপর সেটা স্থান করে নেয়। অন্য ভালবাসা যদি আল্লাহ্র ভালবাসার অনুগামী না হয় তবে সেটা বান্দার জন্য বিপদ ও শাস্তির কারণ হয়। [সা‘দী]
আল-বুরূজ 85:15
‘আরশের অধিকারী ও সম্মানিত।
আল-বুরূজ 85:16
তিনি যা ইচ্ছে তা-ই করেন [১]।
[১] “তিনি ক্ষমাশীল” বলে এই মৰ্মে আশান্বিত করা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি গোনাহ করা থেকে বিরত হয়ে যদি তাওবা করে তাহলে সে আল্লাহ্র রহমত লাভ করতে পারে। তিনি গোনাহগারদের প্রতি এতই ক্ষমাশীল যে, তাদেরকে লজ্জা দেন না। আর তাঁর আনুগত্যকারী বন্ধুদেরকে অতিশয় ভালবাসেন। [ফাতহুল কাদীর] “অতিস্নেহময়” বলে الودود শব্দের পূর্ণ অর্থ প্রকাশ পায় না। কারণ, স্নেহ ও ভালবাসার মধ্যে খাটি হলেই তবে তাকে ‘ওয়াদূদ’ বলা যাবে। তিনি নিজের সৃষ্টিকে অত্যধিক ভালোবাসেন। তাকে তিনি কেবল তখনই শাস্তি দেন যখন সে বিদ্রোহাত্মক আচরণ করা থেকে বিরত হয় না। এখানে غَفُوْر বা ক্ষমাকারী বলার পরে وَدُوْدٌ বা অতি স্নেহময় বলে এটাই বুঝাচ্ছেন যে, যারা অন্যায় করে তারপর তাওবাহ করবে, তাদেরকে তিনি শুধু ক্ষমাই করবেন না বরং নিখাদভাবে ভালও বাসবেন। [সা‘দী] “আরশের মালিক” বলে মানুষের মধ্যে এ অনুভূতি জাগানো হয়েছে যে তিনি যেহেতু আরশের মালিক। আর আরশ সবকিছুর উপরে। তাই তিনিও সবকিছুর উপরে। [ইবন কাসীর] সবকিছু মহান আল্লাহ্র আরশের সামনে অতি নগন্য। বরং সমস্ত আসমান, যমীন ও কুরসী সবগুলোকেই আরশ শামিল করে। [সা’দী] কাজেই তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে কেউ তাঁর হাত থেকে নিস্তার পেতে পারে না। “শ্রেষ্ঠ সম্মানিত” বলে এ ধরনের বিপুল মর্যাদাসম্পন্ন সত্তার প্রতি অশোভন আচরণ করার হীন মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে মানুষকে
সতর্ক করা হয়েছে। তাছাড়া এটি আরাশের গুণও হতে পারে। [ইবন কাসীর] তাঁর শেষ গুণটি বর্ণনা করে বলা হয়েছে, “তিনি যা চান তাই করেন।” অর্থাৎ আল্লাহ্ যে কাজটি করতে চান তাতে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা এ সমগ্র সৃষ্টিকুলের কারো নেই। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে মৃত্যু শয্যায় কেউ জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনাকে কি কোন ডাক্তার দেখেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তারা বললেন, ডাক্তার কী বলেছেন? তিনি বললেন, ডাক্তার আমাকে বলেছেন, আমি যা ইচ্ছা তাই করি। [ইবন কাসীর]
আল-বুরূজ 85:17
আপনার কাছে কি পৌঁছেছে সৈন্যবাহিনীর বৃত্তান্ত---
আল-বুরূজ 85:18
ফির‘আউন ও সামূদের ?
আল-বুরূজ 85:19
তবু কাফিররা মিথ্যারোপ করায় রত;
আল-বুরূজ 85:20
আর আল্লাহ্ সবদিক থেকে তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।
আল-বুরূজ 85:21
বস্তুত এটা সম্মানিত কুরআন,
আল-বুরূজ 85:22
সংরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ।