Lafzullah

Tafsir Fathul Majid — আন-নিসা 4:1 – আন-নাহল 16:103

Author / source: AbdulRahman Bin Hasan Al-Alshaikh

Contents
  1. আন-নিসা 4:1
  2. আন-নিসা 4:24
  3. আন-নিসা 4:25
  4. আন-নিসা 4:31
  5. আন-নিসা 4:36
  6. আন-নিসা 4:43
  7. আন-নিসা 4:58
  8. আন-নিসা 4:59
  9. আন-নিসা 4:94
  10. আন-নিসা 4:101
  11. আন-নিসা 4:102
  12. আন-নিসা 4:127
  13. আন-নিসা 4:135
  14. আন-নিসা 4:136
  15. আন-নিসা 4:141
  16. আন-নিসা 4:171
  17. আন-নিসা 4:176
  18. আল-মায়িদা 5:3
  19. আল-মায়িদা 5:12
  20. আল-মায়িদা 5:32
  21. আল-মায়িদা 5:45
  22. আল-মায়িদা 5:67
  23. আল-মায়িদা 5:82
  24. আল-মায়িদা 5:89
  25. আল-মায়িদা 5:100
  26. আল-মায়িদা 5:105
  27. আল-মায়িদা 5:109
  28. আল-আনআম 6:122
  29. আল-আনআম 6:158
  30. আল-আরাফ 7:26
  31. আল-আরাফ 7:31
  32. আল-আরাফ 7:54
  33. আল-আরাফ 7:167
  34. আল-আরাফ 7:180
  35. আল-আনফাল 8:1
  36. আল-আনফাল 8:41
  37. আত-তাওবা 9:37
  38. আত-তাওবা 9:60
  39. আত-তাওবা 9:122
  40. আত-তাওবা 9:123
  41. ইউনুস 10:11
  42. ইউনুস 10:12
  43. ইউনুস 10:19
  44. ইউনুস 10:20
  45. ইউনুস 10:21
  46. ইউনুস 10:24
  47. ইউনুস 10:25
  48. ইউনুস 10:45
  49. ইউনুস 10:61
  50. ইউনুস 10:98
  51. হুদ 11:5
  52. হুদ 11:6
  53. হুদ 11:7
  54. হুদ 11:8
  55. হুদ 11:17
  56. হুদ 11:123
  57. আর-রাদ 13:1
  58. আর-রাদ 13:5
  59. আর-রাদ 13:11
  60. আর-রাদ 13:16
  61. আর-রাদ 13:17
  62. আর-রাদ 13:18
  63. আর-রাদ 13:30
  64. আর-রাদ 13:35
  65. ইবরাহীম 14:4
  66. ইবরাহীম 14:5
  67. ইবরাহীম 14:18
  68. ইবরাহীম 14:31
  69. ইবরাহীম 14:52
  70. আন-নাহল 16:1
  71. আন-নাহল 16:2
  72. আন-নাহল 16:8
  73. আন-নাহল 16:9
  74. আন-নাহল 16:70
  75. আন-নাহল 16:71
  76. আন-নাহল 16:72
  77. আন-নাহল 16:90
  78. আন-নাহল 16:103

আন-নিসা 4:1

নামকরণ ও অবতীর্ণের সময়কাল: (النِّسَاءُ) নিসা শব্দের অর্থ নারীগণ, মহিলাগণ। এ সূরায় মহিলাদের সাথে বিবাহ বন্ধন, ওয়ারিশসহ তাদের সার্বিক অধিকার ও ইসলাম ধর্মে তাদের মর্যাদার কথা আলোচনা করা হয়েছে বিধায় অত্র সূরার নাম সূরা আন্ নিসা (বা নারীগণ) করা হয়েছে। এ সূরা সম্পূর্ণই মদীনায় অবতীর্ণ হয়। ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন: একটি আয়াত মক্কা বিজয়ের দিন মক্কাতে অবতীর্ণ হয়েছে তা হল: (إِنَّ اللّٰهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمٰنٰتِ إِلٰٓي أَهْلِهَا) “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে।” এছাড়াও নাযিলের সময়কালের ব্যাপারে কয়েকটি বর্ণনা পাওয়া যায়। ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন: সঠিক কথা হল সূরাটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। (তাফসীর কুরতুবী ৫/৩) আয়িশাহ (রাঃ)‎ বলেন: সূরা নিসা অবতীর্ণকালীন সময়ে আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ছিলাম। অর্থাৎ তিনি আমাকে বিবাহ করে তাঁর ঘরে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৯৯৩) আর এ বিষয়ে সকলে একমত যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আয়িশার (রাঃ) সাথে মদীনায় বাসর করেছেন। (ফাতহুল কাদীর, অত্র সূরার তাফসীর) সূরা নিসার ফযীলত: এটি বিধি-বিধান সম্বলিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা। এ সূরাতে ইয়াতীমের অধিকার, বিবাহের সর্বোচ্চ সংখ্যা, উত্তরাধিকার, যে সকল নারীদের বিবাহ করা হারাম তাদের বর্ণনা, পুরুষদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা, শির্ক বর্জিত এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত ও তার নিয়ম-পদ্ধতি, মুশরিকদের ইহলৌকিক ও পরলৌকিক বিধান, শরীয়তে সুন্নাতে রাসূলের গুরুত্বসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)‎ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: সূরা নিসায় পাঁচটি আয়াত রয়েছে, যদি আমি সারা দুনিয়া পেতাম তাহলে তত খুশি হতাম না যত খুশি হয়েছি এ আয়াতগুলো পেয়ে। আয়াত পাঁচটি হল: ১. (إِنَّ اللّٰهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ) “আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না।”(সূরা নিসা ৪:৪০) ২. (إِنْ تَجْتَنِبُوْا كَبَا۬ئِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ.. ) “তোমাদেরকে যে সকল কবীরা গুনাহ থেকে নিষেধ করা হয়েছে তা হতে বিরত থাকলে ...” (সূরা নিসা ৪:৩১) ৩. (إِنَّ اللّٰهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُّشْرَكَ بِه۪ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذٰلِكَ لِمَنْ يَّشَا۬ءُ) “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরীক করা ক্ষমা করেন না। এটা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা নিসা ৪:৪৮) ৪. (وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَّلَمُوْآ أَنْفُسَهُمْ جَا۬ءُوْكَ) “যখন তারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল তখন যদি তারা তোমার নিকট আসত।” (সূরা নিসা ৪:৬৪) ৫. (وَمَنْ يَّعْمَلْ سُوْ۬ءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَه۫ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ) “যে ব্যক্তি কোন মন্দ কাজ করে অথবা নিজের প্রতি জুলুম পরে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে।” (সূরা নিসা ৪:১১০)। (হাকিম ২/৩০৫, মুরসাল সহীহ) ১ নং আয়াতের তাফসীর: সূরার শুরুতেই আল্লাহ তা‘আলা সারা জাহানের মানুষকে তাক্বওয়া তথা তাঁকে ভয় করে চলার নির্দেশ দিচ্ছেন। তাক্বওয়া হল, আল্লাহ তা‘আলার আদেশসমূহ মেনে চলা, নিষেধসমূহ বর্জন করা, একমাত্র তাঁর ইবাদত করা এবং তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক না করা। যে জাতি তাক্বওয়া অবলম্বন করে চলবে সে জাতি দুনিয়াতে সফলতা ও পরকালে মুক্তি লাভ করবে। তাক্বওয়ার ফলাফল সূরা বাকারাতে আলোচনা করা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মহান কুদরতের ব্যাপারে অবগত করে বলছেন, তিনি সমস্ত মানুষকে একজন মাত্র ব্যক্তি আদম (আঃ) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর স্ত্রী হাওয়াকেও তাঁর থেকে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ এ একজন মানুষ থেকে সৃষ্টি করে পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও আত্মীয়তার সুদৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছেন। পারস্পরিক এ সহানুভূতি ও সহমর্মিতায় উদ্বুদ্ধ হয়েই একে অন্যের অধিকারের প্রতি সজাগ থাকে এবং উঁচু-নীচু, ধনী-গরীব, ইতর-ভদ্রের ব্যবধান ভুলে গিয়ে একই মানদণ্ডে সম্পর্ক তৈরি করে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: মহিলাদেরকে পাঁজর হতে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সবচেয়ে উঁচু পাঁজর হচ্ছে বেশি বক্র। সুতরাং তুমি যদি তাকে সম্পূর্ণ সোজা করতে চাও তবে তাকে ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি তার মধ্যে কিছু বক্রতা রেখে দিয়ে উপকার লাভ করতে চাও তাহলে উপকার নিতে পারবে। (সহীহ বুখারী হা: ৩৩৩১) অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা এ দু’জন (আদম ও হাওয়া ‘আলাইহিমাস সালাম) ব্যক্তি থেকে সারা পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন রং ও ভাষা-ভাষী করে নারী-পুরুষে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সে দুজন ব্যক্তি থেকে মানুষ দিনান্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিভিন্ন জায়াগায় ছড়িয়ে বসবাস করছে যেখানে পূর্বে কখনো বসবাস ছিল না। تَسَا۬ءَلُوْنَ ‘তোমরা একে অপরের কাছে আবেদন কর’ অর্থাৎ সেই আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর, যে আল্লাহ তা‘আলার নামে একে অপরের কাছে চেয়ে থাক, যেমন বলা হয়: আল্লাহর ওয়াস্তে তোমার কাছে চাচ্ছি। وَالْأَرْحَامَ ‘আত্মীয়তাকে (সম্পর্ক ছিন্ন করাকে) ভয় কর’ অর্থাৎ আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে বিরত থাক। বরং আত্মীয়তা সম্পর্ক বহাল রাখ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ যাবতীয় সৃষ্টিকে সৃষ্টি করলেন। এমনকি যখন তাঁর সৃষ্টি কাজ শেষ করলেন, তখন আত্মীয়তা সম্পর্ক বলে উঠলো: সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে আপনার আশ্রয় লাভকারীদের এটাই যথাযোগ্য স্থান। তিনি (আল্লাহ) বললেন: হ্যাঁ, তুমি কি এতে খুশি নও যে, তোমার সাথে যে ব্যক্তি সুসম্পর্ক রাখবে আমিও তার সাথে সুসম্পর্ক রাখব। আর যে তোমার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমিও তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করব? সে (রক্ত সম্পর্ক) বলল: হ্যাঁ, সন্তুষ্ট হে আমার রব। আল্লাহ বললেন: তাহলে এ মর্যাদা তোমাকে দেয়া হল। (সহীহ বুখারী হা: ৫৯৮৭) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: لَيْسَ الوَاصِلُ بِالْمُكَافِئِ، وَلَكِنِ الوَاصِلُ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا কেউ কিছু প্রদান করে, ফলে আমিও প্রদান করি এটা আত্মীয়তায় সম্পর্ক বহাল রাখা নয়। বরং আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রাখা হল, কেউ যদি সম্পর্ক ছিন্ন করে তার সাথে বহাল রাখা। (সহীহ বুখারী হা: ৫৯৯১) যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে তাদের ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না। (সহীহ বুখারী হা: ৫৯৮৪) সুতরাং আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করা এবং তাঁর নির্দেশাবলী পালন করা ও নিষেধাজ্ঞা বর্জন করে চলা প্রত্যেক মু’মিনের দায়িত্ব। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ঈমানী দায়িত্ব। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. পৃথিবীর সকল মানুষ একজন নর ও নারী থেকে সৃষ্ট। ২. তাক্বওয়ার গুরুত্ব জানতে পারলাম। ৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রাখা ওয়াজিব। ৪. আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুর সম্পর্কে অবগত রয়েছেন।

আন-নিসা 4:24

২৪ নং আয়াতের তাফসীর: (المُحْصَنَاتُ مِنَ النِّسَا۬ءِ) শানে নুযূল: আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ)‎ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আওতাসের যুদ্ধে কতকগুলো সধবা স্ত্রীলোক বন্দি হয়ে আসে। আমরা তাদের সাথে সহবাস করতে অপছন্দ করলাম কারণ তাদের স্বামী রয়েছে। আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (সহীহ মুসলিম হা: ১৪৫৬) অর্থাৎ যে সকল নারীদের স্বামী রয়েছে তাদের বিবাহ করা হারাম যতক্ষণ সে স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে থাকবে। তবে যদি মুসলিমরা কাফির জাতির ওপর বিজয় লাভ করে, তাদের নারীদের হস্তগত করে নেয় তাহলে তাদের কাফির স্বামী থাকতেও তাদের বিবাহ করা দূষণীয় নয়। আর কোন মুসলিম নারীর শরীয়তসম্মত বিবাহ বিচ্ছিন্ন না হলে তার সাথে বিবাহ বন্ধন হারাম। সুতরাং যে সকল নারী স্বামীদের ছেড়ে দিয়ে অন্য পুরুষের সাথে অভিভাবক ছাড়া নিজে নিজেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তাদের সে বিবাহ অবৈধ। বিবাহ শরীয়তসম্মত হবে না, যতদিন তারা এ অবস্থায় থাকবে ততদিন ব্যভিচারে লিপ্ত থাকবে। এ ছাড়া বাকিদেরকে বিবাহ করা বৈধ। উল্লেখ্য: محصنات শব্দটি কুরআনে চারটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে- ১. সধবা স্ত্রী। যেমন অত্র সূরার ২৪ নং আয়াত: (وَّالْمُحْصَنٰتُ مِنَ النِّسَا۬ءِ) ২. স্বাধীন মহিলা। যেমন: (وَمَنْ لَّمْ يَسْتَطِعْ مِنْكُمْ طَوْلًا أَنْ يَّنْكِحَ الْمُحْصَنٰتِ) ৩. ব্যভিচার থেকে পবিত্র। যেমন: (مُحْصَنٰتٍ غَيْرَ مُسٰفِحٰتٍ) ৪. মুসলিম নারী। যেমন: فإن أحصن (ফাতহুল কাদীর, ১/৫৯৯) (مُّحْصِنِیْنَ غَیْرَ مُسٰفِحِیْنَ) ‘বিয়ে করার জন্য তোমরা তাদের কামনা করবে, ব্যভিচারের জন্য নয়’ অর্থাৎ অন্যান্য নারীদের হালাল করে দেয়া হয়েছে এ শর্তে যে, তোমরা মাহর দিয়ে বিবাহের মাধ্যমে গ্রহণ করবে। অর্থের বিনিময়ে উপপতœী হিসেবে ব্যবহার করার জন্য নয়। এ আয়াত দ্বারাও মুতা বিবাহর অবৈধতা বুঝা যাচ্ছে এবং অর্থ দিয়ে বিনা বিবাহে উপভোগ করাও হারাম। (فِیْمَا تَرٰضَیْتُمْ بِھ۪ مِنْۭ بَعْدِ الْفَرِیْضَةِ) ‘মাহর ধার্য করার পর কোন বিষয়ে উভয়ে একমত হও’ অর্থাৎ মাহর ধার্য করার পর স্বামীর পক্ষ থেকে মাহর এর অতিরিক্ত কিছু দেয়া অথবা স্ত্রীর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টচিত্তে মাফ করে দেয়ার ব্যাপারে উভয়ে একমত হলে তাতে কোন গুনাহ হবে না। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. জাহিলী যুগের সকল বিবাহ পদ্ধতি হারাম। তবে যা ইসলামের সাথে সামঞ্জস্য রাখে তা ব্যতীত। ২. বংশজাত, দুধ সম্পর্কীয় ও বৈবাহিক সম্পর্কীয় যাদের বিবাহ করা হারাম তাদের ব্যাপারে জানতে পারলাম। ৩. পালক পুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ বৈধ। তাদের সাথে পর্দা ওয়াজিব। ৪. আপন দুই বোনকে একত্রে বিবাহ হারাম। ৫. অন্যের স্ত্রীকে বলপ্রয়োগপূর্বক বিবাহ হারাম। ৬. খবরে ওয়াহিদ দ্বারা কুরআনের ওপর বৃদ্ধি শরীয়তসিদ্ধ।

আন-নিসা 4:25

২৫ নং আয়াতের তাফসীর: যে সকল পুরুষ স্বাধীন মু’মিন নারীকে বিবাহ করতে আর্থিক সক্ষম নয় তবে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তাদের জন্য বৈধ রয়েছে যে, তারা মু’মিন দাসীদেরকে তাদের মালিকের অনুমতি সাপেক্ষে বিবাহ করতে পারবে। তাদের মাহর দিতে হবে যেমন স্বাধীন মু’মিনা নারীকে দেয়া হয়। অবশ্যই যেন এসব দাসী ব্যভিচার থেকে পুত-পবিত্র থাকে এবং যাতে কোন পরকিয়ায় জড়িত না থাকে। মোটকথা, একজন স্বাধীন মুসলিম ব্যক্তির একজন ক্রীতদাসীকে বিবাহ করা বৈধ চারটি শর্তে: ১. বাহ্যিক পবিত্র থাকতে হবে। ২. অভ্যন্তরীণ পবিত্র থাকতে হবে। অর্থাৎ প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে কোন প্রকার ব্যভিচারে লিপ্ত থাকতে পারবে না। ৩. স্বাধীন মু’মিন নারীকে মাহর ও ভরণ পোষণ দিতে অক্ষম। ৪. যে ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা করে। যদি ক্রীতদাসীরা বিবাহিত হয়ে যায় বা ইসলাম কবুল করে নেয়, আর ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাহলে স্বাধীন ব্যক্তিকে যে ১০০ বেত্রাঘাত করা হয় তাদেরকে তার অর্ধেক চল্লিশটি বেত্রাঘাত করতে হবে। আর অবিবাহিত হলে শিক্ষামূলক শাস্তি দিলেই হবে। এর পরেও যদি দাসীকে বিবাহ না করে ধৈর্য ধারণ করে তাহলে তাই উত্তম। (তাফসীরে সা‘দী, পৃঃ ১৫৬) আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. যারা স্বাধীন মু’মিনা নারীকে বিবাহ করতে অক্ষম তারা দাসীদের চারটি শর্তে বিবাহ করতে পারে। তবে এ থেকেও ধৈর্য ধারণ শ্রেয়। ২. দাসীদের শাস্তি স্বাধীনাদের অর্ধেক।

আন-নিসা 4:31

৩১ নং আয়াতের তাফসীর: যারা কাবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবে তাদের ফযীলত বর্ণনা করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের অন্যান্য সকল গুনাহ ও মন্দ কাজ মোচন করে দেবেন এবং সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাবেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমুআ থেকে আর এক জুমুআ ও এক রমাযান থেকে আর এক রমাযান এর মধ্যবর্তী গুনাহসমূহের কাফফারাস্বরূপ, তবে যদি কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৩৩) কবীরা তথা মহাপাপসমূহের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে মুফাসসিরগণ অনেক মতামত প্রদান করেছেন। সকল মতামতের সারাংশ নিয়ে এসেছেন ইমাম তাহাবী তাঁর আকিদা তাহাবীয়াতে। সেখানেও প্রায় ১-১৪টি সংজ্ঞা উল্লেখ করেছেন। সবচেয়ে উত্তম সংজ্ঞা হল; (كُلُّ ذَنْبٍ مَا تَوَعَّدَ اللَّهُ عَلَيْهَ بِنَارٍ أَوْ عَذَابٍ أَوْ غَضَبٍ أَوْ لَعْنَةٍ) প্রত্যেক ঐ সব অপরাধ যেগুলো করার কারণে আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নাম, শাস্তি, তাঁর ক্রোধ অথবা তাঁর লা’নতের ধমক দিয়েছেন। (আকীদা তাহাবীয়া) কাবীরা গুনাহর সংখ্যা কত এ নিয়েও অনেক মতামত বিদ্যমান। ইমাম যাহাবী (রহঃ) প্রণীত “কবীরা গুনাহ” কিতাবে সত্তরটির মত কবীরা গুনাহর বর্ণনা করেছেন। এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে তাফসীর ইবনে কাসীরে। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. কবীরা গুনাহ থেকে দূরে থাকা ওয়াজিব এবং নেকীর কাজ। ২. কবীরা গুনাহ ক্ষমার জন্য তাওবাহ করা শর্ত। ৩. কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলে আল্লাহ তা‘আলা সাগীরাহ গুনাহ এমনিতেই মাফ করে দেবেন।

আন-নিসা 4:36

৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের উলুহিয়ার বা এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং সাথে সাথে উলুহিয়া বিধ্বংসী আমল শির্ক করা থেকে নিষেধ করছেন। একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুয়ায বিন জাবালকে বলেন, হে মুয়ায (রাঃ) তুমি কি জান! বান্দার ওপর আল্লাহ তা‘আলার হক কী? এবং আল্লাহ তা‘আলার ওপর বান্দার হক কী? মুয়ায (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল অধিক জানেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, বান্দার ওপর আল্লাহ তা‘আলার হক হল: বান্দা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর বান্দা যখন এ কাজ করবে তখন আল্লাহ তা‘আলার ওপর বান্দার হক হল: আল্লাহ তা‘আলা তাকে শাস্তি দেবেন না। (সহীহ বুখারী হা: ২৮৫৬) আল্লাহ তা‘আলার হকের সাথে সাথে মানুষের মাঝে যারা সবচেয়ে বেশি সৎ আচরণ পাবার হকদার মাতা-পিতার কথা উল্লেখ করেছেন। যেখানেই আল্লাহ তা‘আলা নিজের কথা বলেছেন সেখানেই পিতা-মাতার হকের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَقَضٰي رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوْآ إِلَّآ إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا) “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ব্যতীত অন্য কারও ‘ইবাদত কর না ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর।”(সূরা ইসরা ১৭:২৩) পিতা-মাতার সাথে সৎ আচরণের পরেই নিকট আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকিন, পাড়া-প্রতিবেশি, মুসাফির ও ক্রীতদাস-দাসীদের সাথেও সৎ আচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ، حَتّٰي ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ জিবরীল আমাকে সর্বদা প্রতিবেশীর ব্যাপারে অসীয়ত করতে থাকে এমনকি আমার মনে হল অচিরেই আমার ওয়ারিশ বানিয়ে দেবে। (সহীহ বুখারী হা: ৬০১৫) (وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبٰي وَالْجَارِ الْجُنُبِ) ‘নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী’ইবনু আব্বাস (রাঃ)‎ বলেন, (وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبٰي) হল এমন প্রতিবেশী যার সাথে আত্মীয়তা আছে। الجارالجنب হল যার সাথে আত্মীয়তা সম্পর্ক নেই। কেউ কেউ বলেন, প্রথমটা হল মুসলিম, আর দ্বিতীয়টা হল অমুসলিম। والصاحب بالجنب কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল: স্ত্রী, কেউ বলেছেন; সৎবন্ধু। আর কেউ বলেন, বাড়িতে অবস্থান ও ভ্রমণে যে বন্ধু। (وَمَا مَلَکَتْ اَیْمَانُکُمْ) ‘দক্ষিণ হস্ত যাদের মালিক হয়েছে’ অর্থাৎ ক্রীতদাস-দাসী। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তুমি যা খাও তোমার দাস-দাসীকে তাই খাওয়াও। তুমি যা পর তোমার দাস-দাসীকেও তা-ই পরাও। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, যদি তোমার কর্মচারী খাবার নিয়ে আসে তাহলে তাকে সাথে নিয়ে বসে খাও, না খেলে এক লোকমা বা দুই লোকমা দিয়ে দাও। কেননা সে আগুনের তাপ সহ্য করেছে। (সহীহ বুখারী হা: ৫৪৬০) তারপর আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে ভালবাসেন না তাদের আলোচনা উল্লেখ করেছেন। মাতরাফ (রহঃ) বলেন: আমার নিকট আবূ যার (রাঃ)‎-এর একটি বর্ণনা পৌঁছে ছিল। আমার মনের আশা ছিল তার সাথে সাক্ষাত করার। একদিন তাঁর সাথে সাক্ষাত হয়ে গেল। আমি বললাম: হে আবূ যার, আমার কাছে পৌঁছেছে যে, আপনি নাকি মনে করেন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনাদের এ হাদীস বলেছেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তিন প্রকার লোককে ভালবাসেন, আবার তিন প্রকার লোককে অপছন্দ করেন। তিনি বললেন: হ্যাঁ সত্য। তুমি কি মনে কর আমি আমার বন্ধুর ব্যাপারে মিথ্যা বলব! যে তিন প্রকার লোককে আল্লাহ তা‘আলা ভালবাসেন না তারা হল, অহঙ্কারী দাম্ভিক। তোমরা কি কিতাবে পাওনি? তখন (إِنَّ اللّٰهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالًا فَخُوْرَا) ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক, অহঙ্কারীকে।’এ আয়াতটি পাঠ করেন। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সকল ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য করতে হবে। ২. ইবাদত বিধ্বংসী শির্ক থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। ৩. পিতা-মাতাসহ অন্যান্যদের সাথে সদাচরণ করতে হবে। ৪. অহঙ্কারী ও দাম্ভিক লোকেদের আল্লাহ তা‘আলা ভালবাসেন না।

আন-নিসা 4:43

৪৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মু’মিন বান্দাদেরকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাত ও সালাতের স্থান মাসজিদের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছেন। এ বিধান ছিল মদ হারাম হবার পূর্বে। আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি মদ তিনটি পর্যায়ে হারাম হয়েছে। এটি ছিল দ্বিতীয় পর্যায়। এ আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে সূরা বাক্বারার ২১৯ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সাথে আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদেরকে অপবিত্র অবস্থায় সালাত ও মাসজিদের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছেন। তবে কেউ যদি মাসজিদের এক দরজা থেকে অন্য দরজায় যেতে বাধ্য হয় মাসজিদে অবস্থান ব্যতীত তাহলে তার জন্য তা বৈধ। তারপর আল্লাহ তা‘আলা তায়াম্মুমের বিধান ও যাদের জন্য তা শরীয়তসিদ্ধ করে দিয়েছেন তাদের বর্ণনা দিচ্ছেন। শরীয়ত কর্তৃক তায়াম্মুমের অনুমতি প্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ নিম্নরূপ: ১. অসুস্থ ব্যক্তি, যিনি আশঙ্কা করেন যে, পানি ব্যবহার করলে অসুস্থতা বৃদ্ধি পাবে। ২. মুসাফির, দূরে সফর করুক বা কাছেই সফর করুক যদি পানি না পায় তাহলে তিনি তায়াম্মুম করে সালাত আদায় করতে পারেন। যদি পানি না থাকে বাড়িতে অবস্থানকারী ব্যক্তিদের জন্যও তায়াম্মুম শরীয়াতসিদ্ধ। এখানে রোগী ও মুসাফিরের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হল সাধারণত এদের প্রয়োজন বেশি দেখা দেয়। ৩. পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন পূরণকারী পানি না পেলে তায়াম্মুম করবে। ৪. স্ত্রীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক করার পরও যদি সালাতের সময় হয়ে যায় কিন্তু পানি না পায় তাহলে তায়াম্মুম করে সালাত আদায় করবে। তারপরেও সালাত বিলম্ব করা বা ছেড়ে দেয়ার কোন সুযোগ নেই। তারপর তায়াম্মুমের পদ্ধতি বলা হচ্ছে। প্রথমে উভয় হাত মাটিতে একবার মেরে মুখমণ্ডল মাসেহ করবে তারপর উভয় হাতের কব্জী পর্যন্ত মাসেহ করবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমার জন্য এরূপ করাই যথেষ্ট ছিল- এই বলে তিনি দু’হাত মাটিতে মারলেন এবং উভয় হাতে ফুঁ দিলেন (যাতে বেশি বালু থাকলে পড়ে যায়) তারপর উভয় হাত দ্বারা তার চেহারা ও হাতের কব্জী পর্যন্ত মাসেহ করলেন। (সহীহ বুখারী হা: ৩৮) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একবারই মাটিতে দু’হাত মেরেছেন, দু’বার না। দু’বার মাটিতে হাত মারা এবং কনুই পর্যন্ত মাসেহ করার হাদীস দুর্বল। (দারাকুতনী: ১/১৮০) ইমাম বুখারী অধ্যায় রচনা করেছেন: باب التيمم ضربة “তায়াম্মুমের জন্য মাটিতে হাত মারা একবার”-এর অধ্যায়। صعيدا طيبا “পবিত্র মাটি” পৃথিবীর সমস্ত মাটি মুসলিমদের জন্য সালাত ও তায়াম্মুমের জন্য পবিত্র। তবে হাদীসে যে স্থানগুলোর কথা বাদ দেয়া হয়েছে সেগুলো ব্যতীত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আমার জন্য পৃথিবীর মাটি সালাতের জায়গা। অতএব পুরুষদের জন্য কোন অবস্থাতেই সালাত বর্জনের সুযোগ নেই, মহিলাদের জন্যও না, তবে বিশেষ কয়েক দিন ব্যতীত। (সহীহ বুখারী হা: ৩৩৫) আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. অপবিত্র অবস্থায় সালাত আদায় ও মাসজিদে অবস্থান হারাম। তবে কেউ মাসজিদের এক দরজা হতে অন্য দরজা দিয়ে গমন করতে বাধ্য হলে তা জায়েয। ২. তায়াম্মুমের বিধান জানতে পারলাম। ৩. তায়াম্মুমের জন্য হাত মাটিতে মারতে হবে মাত্র একবার। ৪. গোসল ফরয হলে যথাযসম্ভব তা তাড়াতাড়ি সেরে নেয়া উত্তম। ৫. পানি না পেলে অপবিত্র অবস্থাতেই তায়াম্মুম করে সালাত আদায় করে নেয়া বৈধ।

আন-নিসা 4:58

৫৮ নং আয়াতের তাফসীর: অধিকাংশ মুফাসসিরে কিরামের মতে, এ আয়াত উসমান বিন তালহা (রাঃ)‎-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তিনি বংশগতভাবেই কাবা শরীফের তত্ত্বাবধায়ক এবং তার চাবির রক্ষক ছিলেন। তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাবাতে উপস্থিত হয়ে তাওয়াফসহ অন্যান্য কাজ শেষ করে উসমান বিন তালহাকে ডেকে পাঠালেন। তারপর তাঁর হাতে কাবার চাবি হস্তান্তর করে দিয়ে বলেন, এগুলো তোমার চাবি। আজকের দিন অঙ্গীকার পূরণের দিন। (ইবনে কাসীর, ২/৩৭৯) এ আয়াত বিশেষ কারণে অবতীর্ণ হলেও তা সকল প্রকার আমানতকে শামিল করে। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: أَدِّ الْأَمَانَةَ إِلٰي مَنِ ائْتَمَنَكَ، وَلَا تَخُنْ مَنْ خَانَكَ যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে তার কাছে আমানত ফিরিয়ে দাও। আর যে খিয়ানত করেছে তার সাথে খিয়ানত কর না। (আবূ দাঊদ হা: ৩৫৩৪, তিরমিযী হা: ১২৬৪, সহীহ) তারপর আল্লাহ তা‘আলা সকল শ্রেণির মানুষকে সম্বোধন করে ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচারকার্য সম্পন্ন করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: إِنَّ اللّٰهَ مَعَ الْقَاضِي مَا لَمْ يَجُرْ فَإِذَا جَارَ وَكَّلَهُ إِلَي نَفْسِهِ বিচারক যতক্ষণ পর্যন্ত জুলুম করে না ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা তার সাথে থাকেন। অতঃপর সে যখন জুলুম শুরু করে দেয়, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে তার নিজের ওপর ছেড়ে দেন। (ইবনু মাযাহ হা: ২৩২১, হাসান) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেন: কিয়ামতের দিন ন্যায়-বিচারকারীরা দয়াময় আল্লাহ তা‘আলার ডান পাশে নূরের মিন্বারের ওপর থাকবে। আল্লাহ তা‘আলার উভয় হাত ডান হাত, যারা বিচারে, পরিবারে এবং যাদের দায়িত্ব গ্রহণ করে তাদের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে (তারা সবাই এতে শামিল)। (সহীহ মুসলিম হা: ১৮২৭) তাই আমানত ফিরিয়ে দেয়া, ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচার বজায় রাখা প্রতিটি মু’মিন মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. আমানত রক্ষা করা ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য। ২. বিচার-ফায়সালায় ন্যায় পন্থা অবলম্বন করা ওয়াজিব। ৩. আল্লাহ তা‘আলার হাত রয়েছে, এমনকি তার উভয় হাত ডান হাত।

আন-নিসা 4:59

৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: শানে নুযূল: আলী (রাঃ)‎ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং একজন আনসারীকে নেতৃত্ব দান করেন। ইবনু আব্বাসের বর্ণনায় রয়েছে: তিনি হলেন আবদুল্লাহ বিন হুযাফাহ (রাঃ)‎। যখন তারা বের হলেন, হঠাৎ তিনি সেনা বাহিনীর ওপর কোন বিষয়ে রাগান্বিত হন। অতঃপর তিনি বললেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি তোমাদেরকে আমার আনুগত্য করার নির্দেশ দেননি? তারা বলল হ্যাঁ। তিনি বললেন: তোমরা জ্বালানী কাঠ জমা কর, তারপর আগুন এনে কাঠগুলো জ্বালিয়ে দাও। অতঃপর নির্দেশ দিয়ে বললেন: আমি তোমাদেরকে এ আগুনে প্রবেশ করার নির্দেশ দিচ্ছি। তখন সেনারা তাতে প্রবেশ করার উপক্রম করল। এমন সময় একজন যুবক বললেন: আপনারা আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলার রাসূলের কাছে আশ্রয় নিয়েছেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে কিছু না জানা পর্যন্ত তড়িঘড়ি করবেন না। তিনি যদি তাতে প্রবেশ করার নির্দেশ দেন তাহলে প্রবেশ করবেন। আলী (রাঃ)‎ বলেন: সকলে রাসূলের নিকট ফিরে এসে ঘটনাটি বলল। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমরা যদি তাতে প্রবেশ করতে তাহলে কোনদিন তথা হতে বের হতে পারতে না। আনুগত্য কেবল সৎ কাজে। (সহীহ বুখারী হা: ৭১৪৫, ৪৫৮৪, সহীহ মুসলিম হা: ১৮৪০, ১৮৩৪) (وَاُولِی الْاَمْرِ مِنْکُمْ) (উলুল আমর) ‘যারা তোমাদের মধ্যে ক্ষমতার অধিকারী’ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: أُولُو الْأَمْرِ مِنْكُمْ হল: আলেম ও দীনদার ব্যক্তিবর্গ। তাফসীর মুয়াসসারে বলা হয়েছে: (أُولُو الْأَمْرِ مِنْكُمْ) উলুল আমর হল শাসক শ্রেণি। ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা ভাল জানেন। আয়াতে শাসক ও আলেম সকল প্রকার ক্ষমতাধর ব্যক্তি শামিল। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর) অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নিজের আনুগত্য ও রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং নেতা ও শাসকদেরও। আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় আনুগত্যের সাথে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আনুগত্য ওয়াজিব করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: (أَطِيْعُوا اللّٰهَ وَأَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَلَا تُبْطِلُوْآ أَعْمَالَكُمْ) “আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর। আর নিজেদের আমল নষ্ট কর‎ না।”(সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৩৩) অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আনুগত্য স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই আয়াতে أَطِيْعُوا (তোমরা আনুগত্য কর) শব্দটি আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উভয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু (أُولُو الْأَمْرِ مِنْكُمْ) নেতা, শাসকের) পূর্বে ব্যবহার করেননি। তার মানে হল- নেতা বা শাসকের আনুগত্য আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর ন্যস্ত। যদি শাসক বা আলেমের নির্দেশ আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ মোতাবেক হয় তাহলে অবশ্যই আনুগত্য করতে হবে এবং এ আনুগত্য করা ওয়াজিব। কেননা এটা মূলত নেতার আনুগত্য নয়, আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য। আর যদি নেতা এমন আনুগত্যের দিকে আহ্বান করে বা নির্দেশ দেয় যা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নির্দেশের বিরুদ্ধে যেমন শানে নুযূলে জানলাম তাহলে নেতা কখনো আনুগত্যের পাত্র হবেন না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الخَالِقِ খালেকের (আল্লাহ তা‘আলার) অবাধ্যে কোন মাখলুকের আনুগত্য নেই। (মিশকাত হা: ৩৬৯৬, সহীহ) অন্যত্র নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: একজন মুসলিম ব্যক্তির আবশ্যক হল নেতার আনুগত্য করবে এবং তার কথা শুনবে, সে ব্যক্তি নেতার নির্দেশ পছন্দ করুক আর অপছন্দ করুক। যদি নেতা আল্লাহ তা’আলার অবাধ্য কোন কাজের নির্দেশ না দেয়, যদি আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য কোন কাজের নির্দেশ দেয় তাহলে তার অনুসরণ করা যাবে না এবং আনুগত্যও করা যাবে না। (সহীহ বুখারী হা: ৭১৪৪, সহীহ বুখারী কিতাবুল ইমারাহ হা: ৩৮) যদি কোন নেতা, শাসক, ইমাম, এবং আলেম-উলামাদের পথ নির্দেশনা ও তরিকা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের পথ নির্দেশনা ও তরিকা অনুযায়ী হয় তাহলে অবশ্যই মান্য করা আবশ্যক। অন্যথায় কখনো অনুসরণ করা যাবে না। এরপরেও আলেম বা শাসকের আনুগত্য করতে গিয়ে যদি কোন বিষয়ে বিবাদ দেখা দেয় তাহলে ফায়সালার প্রত্যাবর্তনস্থল কী হবে তারও দিক-নির্দেশনা আল্লাহ তা‘আলা প্রদান করেছেন। তা কোন ওয়ালী আওয়ালিয়া বুজুরগানে দীন বা মানব রচিত কিতাব নয়। তা হল আল্লাহ তা‘আলার কিতাব কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহীহ হাদীস। যারা কোন বিষয়ে বিবাদ দেখা দিলে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যাবে তারাই আল্লাহ তা‘আলা ও আখিরাতে বিশ্বাসী। যারা আল্লাহ তা‘আলা ও আখিরাতে বিশ্বাসী না তারা কোন বিষয়ে বিবাদ দেখা দিলে কুরআন সুন্নাহ বাদ দিয়ে এদিক-সেদিক দৌড়াবে। মীসাংসার জন্য কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়া পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম। সুতরাং প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির আবশ্যক হলো আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের আনুগত্য করবে, সেই সাথে নেতার আনুগত্য করবে যদি নেতা কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক নেতৃত্ব দেয়। অন্যথায় নেতা আনুগত্যের পাত্র হবে না। আর কোন বিষয়ে বিবাদ দেখা দিলে তার সমাধান নিব কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ থেকে মানব রচিত কোন বিধান বা মতামত থেকে নয়। ‎ আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একচ্ছত্র আনুগত্য করা ওয়াজিব। ২. নেতার আনুগত্য আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল। ৩. ধর্মীয় সকল বিবাদের মীমাংসার প্রত্যাবর্তনস্থল একমাত্র কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ। ৪. যাদের বিবাদের মীমাংসা স্থল কুরআন ও সুন্নাহ তাদের পরিণতি শুভ।

আন-নিসা 4:94

৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: শানে নুযূল: ইবনু আব্বাস (রাঃ)‎ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবীদের পাশ দিয়ে বানী সুলাইম গোত্রের এক লোক তার ছাগল নিয়ে যাচ্ছিল। সে সাহাবীদেরকে সালাম দিল। সাহাবীগণ বলল: সে আমাদের থেকে বাঁচার জন্য সালাম দিয়েছে। তাই সাহাবীগণ তাকে ধরে হত্যা করল, ছাগলগুলো নিয়ে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আগমন করল। তখন (أَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْآ إِذَا ضَرَبْتُمْ... ) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তিরমিযী হা: ৩০৩০, আহমাদ হা: ২৪৬২, সহীহ) (فَعِنْدَ اللّٰهِ مَغَانِمُ كَثِيْرَةٌ) ‘কারণ আল্লাহর নিকট তোমাদের জন্য প্রচুর গনীমত রয়েছে।’ অর্থাৎ এ কিছু ছাগল থেকে আল্লাহ তা‘আলার নিকট অনেক উত্তম সম্পদ রয়েছে। যা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আনুগত্যশীলদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, তোমরাও তো পূর্বে এরূপ ছিলে। তোমরা ঈমান এনেছিলে কিন্তু প্রকাশ করতে পারনি। আজ তোমরা শক্তিশালী হয়েছ বলে যাচাই-বাছাই না করে যা ইচ্ছা তাই করবে। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন। অতএব তোমাদের দায়িত্ব হল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নেয়া। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. যুদ্ধ ও জিহাদের জন্য ভ্রমণ করা শরীয়তসম্মত। ২. সকল কাজে যাচাই-বাছাই করা অবশ্যক। ৩. দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হওয়াকে নিন্দা করা হল। ৪. অন্যের অবস্থা দেখে উপদেশ গ্রহণ করা উচিত।

আন-নিসা 4:101

১০১ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মুসাফিরকে সফরে থাকাকালীন সালাত কসর (চার রাকআতবিশিষ্ট সালাত দু‘রাকআত করে আদায়) করার অনুমতি প্রদান করেছেন। তবে অবশ্যই সফর কোন শরীয়তসম্মত বা বৈধ কাজের জন্য হতে হবে। এটাই অধিকাংশ আলেমদের অভিমত। তাই শরীয়ত অবাধ্য কোন কাজে সফর করলে তাতে কসর করা বৈধ হবে না। যেমন চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ইত্যাদি কাজের জন্য বের হওয়া। (إِنْ خِفْتُمْ) “যদি তোমাদের ভয় হয়”। এ কথা অবস্থার দিকে লক্ষ করে বলা হয়েছে। কেননা তখন সারা আরব-ভূমি যুদ্ধ ক্ষেত্রে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। কোন অবস্থাতেই সফর বিপদ মুক্ত ছিল না। কুরআনের এরূপ অনেক বিধান অধিকাংশ অবস্থার দিকে লক্ষ করে নাযিল হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, (لَا تَاْكُلُوا الرِّبَا اَضَعَافًأ مُّضَاعَفًا) তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। তার মানে কি এই- চক্রবৃদ্ধি না হলে সুদ খাওয়া যাবে? না বরং তখন আরবরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেত, তাই এভাবে বলা হয়েছে। অনুরূপ: (تُكْرِهُوْا فَتَيٰتِكُمْ عَلَي الْبِغَا۬ءِ إِنْ أَرَدْنَ تَحَصُّنًا) তোমাদের দাসীগণ সতীত্ব রক্ষা করতে চাইলে পার্থিব জীবনের ধন-লালসায় তাদেরকে ব্যভিচারিণী হতে বাধ্য কর না”(সূরা নূর ২৪:৩৩) এর অর্থ কি এই যে, তারা ব্যভিচার করতে চাইলে অনুমতি দিয়ে দাও। বরং তারা সতিত্ব রক্ষা করতে চাইতো তাই আল্লাহ তা‘আলা এ কথা বলেছেন। তাই ভয় না থাকলেও যে কোন বৈধ সফরে সালাত কসর করা যাবে। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর) ইয়ালা বিন উমাইয়া (রাঃ)‎ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: উমার (রাঃ)‎-কে জিজ্ঞেস করলাম আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, (فَلَیْسَ عَلَیْکُمْ جُنَاحٌ اَنْ تَقْصُرُوْا مِنَ الصَّلٰوةِﺣ اِنْ خِفْتُمْ) ‘যদি তোমাদের আশঙ্কা হয়, কাফিররা তোমাদের জন্য ফেতনা সৃষ্টি করবে, তবে সালাত সংক্ষিপ্ত করলে তোমাদের কোন দোষ নেই’ এখন কি আল্লাহ তা‘আলা মানুষদের নিরাপত্তা দেননি? (তাহলে কসর করতে হবে কেন?) উমার (রাঃ)‎ বললেন: তুমি যাতে আশ্চর্য হয়েছো আমিও তাতে আশ্চর্য হয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছেন: এটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে দান। অতএব আল্লাহ তা‘আলার দান কবূল কর। (মুসনাদ আহমাদ হা: ১৭৪, সহীহ) সফরের দূরত্ব: কতদূর গেলে সফর হবে এবং কসরের সালাত বৈধ হবে এরূপ কোন সীমা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্ধারণ করে দেননি। বরং কুরআনে ও সহীহ হাদীসে শুধু সফরের কথা এসেছে। তাই মানুষের কাছে সফর বলে মনে হয় এমন দূরত্বে গেলেই কসরের সালাত পড়তে পারবে। (জাদুল মাআদ ১/৪৬, সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ: ১/৪৮১) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবীদের যুগে তিন মাইল, পাঁচ মাইল, দশ মাইল ইত্যাদি দূরত্বে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে ও সাহাবীগণ কসর সালাত আদায় করতেন। (ইরওয়াউল গালীল ৩/১৫-১৮) কারণ উক্ত দূরত্ব সে সময়ে সফর বলে তাদের নিকট গণ্য হত। কতদিনের সফরে গেলে সালাত কসর করে আদায় করতে পারবে এ বিষয়েও নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন সময়সীমা নির্ধারণ করে দেননি। তাই এ নিয়ে বেশ মতভিন্নতা পাওয়া যায়। সেহেতু কোন ব্যক্তি কোথাও স্থায়ী বসবাস বা দীর্ঘদিন অবস্থানের উদ্দেশ্য ছাড়া যতদিনের জন্যই সফর করুক না কেন তার জন্য মুসাফিরের হুকুম প্রযোজ্য হবে। (ইরওয়াউল গালীল ৩/২৮, সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ ১/৪৯৭) আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. বৈধ সফরে সালাত কসর করার বিধান জানতে পারলাম। ২. কসরের জন্য ভয় থাকা আবশ্যক না। ৩. কসরের জন্য নির্ধারিত কোন দূরত্ব ও সময়সীমা নেই।

আন-নিসা 4:102

১০২ নং আয়াতের তাফসীর: শানে নুযূল: আবূ আইয়াশ (রাঃ)‎ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: উসফান নামক স্থানে আমরা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ছিলাম, আমরা মুশরিকদের মুখোমুখি হয়েছিলাম। তখন খালিদ বিন ওয়ালিদ ছিল মুশরিকদের নেতা। তারা আমাদের ও কেবলার মাঝে অবস্থান করছিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নিয়ে যোহর সালাত আদায় করলেন। তখন মুশরিকরা বলল: তারা এমন এক অবস্থায় ছিল আমরা হামলা করতে পারতাম। তারপর তারা বলল: তাদের কাছে (মুসলিমদের) এমনটি সালাত আসবে যা তাদের সন্তান সন্ততি ও নিজেদের থেকে অধিক প্রিয়। তখন এ আয়াত নিয়ে জিবরীল (আঃ) যোহর ও আসর সালাতের মাঝে আসেন। (নাসাঈ হা: ১৫৪৯, ১৫৫০, সহীহ। অত্র আয়াতে সালাতুল খাওফের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সহীহ হাদীসে সালাতুল খাওফের কয়েকটি নিয়ম বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে এ আয়াতে বর্ণিত নিয়মটি হল দু’দলের এক দল ইমামের সাথে অস্ত্রসহ এক রাকআত সালাত আদায় করে নেবে, অন্য দল শত্র“দের পাহারায় নিযুক্ত থাকবে। এ দল রাকআত আদায় করে নিলে পাহারারত দল এসে এক রাকাত আদায় করে নেবে। পরে আবার রেওয়াজ বদল করে উভয় দলের বাকি এক রাকআত আদায় করে প্রথম দল সালাম ফিরিয়ে চলে যাবে, ইমাম সালাম না ফিরিয়ে বসে থাকবে পরের দলের সাথে একত্রে সালাম ফেরাবেন। (وَدَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَوْ تَغْفُلُوْنَ) ‘কাফিররা কামনা করে যেন তোমরা তোমাদের অস্ত্রশস্ত্র ও আসবাবপত্র সম্বন্ধে অসতর্ক হও’ অর্থাৎ তোমরা জিহাদ করা ও শত্র“দের বিরুদ্ধে সরঞ্জামাদী তৈরি করতে গাফেল থাক আর দুনিয়ার ভোগ সামগ্রী নিয়ে ব্যস্ত থাক যাতে শত্র“রা অতর্কিত হামলা চালিয়ে তোমাদের শেষ করে দিতে পারে। এটাই তাদের কামনা। (وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ) ‘তোমাদের কোন দোষ নেই’ অর্থাৎ যদি বৃষ্টি, অসুস্থতা ও অন্য কোন শরয়ী কারণে যুদ্ধ থেকে অব্যাহতি নিতে হয় তাহলে কোন গুনাহ নেই। তবে যেন কোন অবস্থাতেই সতর্কতা থেকে গাফেল হওয়া চলবেনা। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: এ আয়াতটি আবদুর রহমান আতিকের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৪৫৯৯) আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সালাতুল খাওফ শরীয়তসিদ্ধ। ২. সালাতুল খাওফের নিয়ম-বিধি। ৩. শত্র“দের বিরুদ্ধে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে। ৪. এ আয়াতের অন্যতম শিক্ষা হল জামা‘আতে সালাত আদায় করা আবশ্যক।

আন-নিসা 4:127

১২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি এ আয়াতের ব্যাপারে বলেন: কোন ব্যক্তির নিকট কোন ইয়াতীম মেয়ে থাকলে সে তাকে লালন-পালন করত, তার সম্পদে উত্তরাধিকারী হয়ে যেত এমনকি বাগানেও শরীক হত। তখন মেয়েকে বিবাহ করার প্রতি উৎসাহিত হত এবং অন্যত্র বিবাহ দিত না এই ভয়ে যে, অন্য পুরুষ তার সম্পদে ভাগ বসাবে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৪৭৪) (وَمَا يُتْلٰي عَلَيْكُمْ) ‘যা পাঠ করে শুনানো হয়েছে’বলতে এ সূরার শুরুর আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেখানে ইয়াতীম মেয়েদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। لَا تُؤْتُوْنَهُنَّ ‘তোমরা প্রদান কর না’ অর্থাৎ তোমরা ইয়াতীম মেয়েদের সম্পদ হরণ করার জন্য বিবাহ কর কিন্তু বিবাহের মোহরানা প্রদান কর না। এবং নিজেরা বিবাহ না করলেও সম্পদ চলে যাবে বলে অন্যত্র বিবাহ দাও না। এখানে দু’ভাবে পড়া যায় (১) في অব্যয় উহ্য ধরে, তখন অর্থ হবে: তাদেরকে তোমরা বিবাহ করতে আগ্রহী হলেও মোহরানা প্রদান কর না। عن অব্যয় উহ্য ধরে, তখন অর্থ হবে: তাদেরকে তোমরা বিবাহ করতে আগ্রহী নও। অর্থাৎ ইয়াতীম মেয়ে সুন্দর সুশ্রী হলে অভিভাবকরা বিবাহ করে নিত, আর কুশ্রী হলে অন্যত্র বিবাহ দিত না এই ভয়ে যে, অন্যজন সম্পদে ভাগ বসাবে। এখানে উভয় প্রকার জুলুম থেকেই নিষেধ করা হয়েছে। (وَالْمُسْتَضْعَفِيْنَ مِنَ...) ‘অসহায় শিশুদের সম্বন্ধে’ আর আল্লাহ তা‘আলা দুর্বল তথা ছোট শিশু ও নারীদের ব্যাপারেও ফাতওয়া দেবেন। তোমরা তোদের প্রাপ্ত অধিকার দিয়ে দাও। জাহিলী যুগের মত বঞ্চিত কর না। ইয়াতীমদের ব্যাপারে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রেখ। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. ইসলামই সর্বপ্রথম মহিলা ও শিশুদের মীরাসের অধিকার প্রদান করেছে। ২. কারো প্রতি জুলুম না করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা ইসলামের নির্দেশ।

আন-নিসা 4:135

১৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা‘আলা এখানে মু’মিনদেরকে ন্যায়ের ওপর সর্বদা প্রতিষ্ঠিত থাকতে নির্দেশ দিচ্ছেন। কোন অবস্থাতেই যেন ন্যায় থেকে বিচ্যুত হয়ে ডান-বামে সরে না যায় এবং ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে যেন কোন ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনা প্রভাবিত না করে। (شُھَدَا۬ئَ لِلہِ) ‘আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ’ অর্থাৎ ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা ও ন্যায় সাক্ষ্য প্রদান করা যেন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে খুশি করার জন্য হয়। যদিও এ ন্যায় সাক্ষ্য নিজের পিতা-মাতা ও আত্মীয় স্বজনের বিরুদ্ধে যায়। (فَاللّٰهُ أَوْلٰي بِهِمَا) ‘আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর’অর্থাৎ কোন ধনভাণ্ডারের ধন ও কোন দরিদ্রের দারিদ্রতার ভয় যেন তোমাদেরকে সত্য কথা বলার পথে বাঁধা না দেয়। আল্লাহ তা‘আলা তাদের তত্ত্বাবধায়ক, তাদের কল্যাণের ব্যাপারে তিনি ভাল জানেন। (فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوٰٓي) ‘সুতরাং তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ কর‎ না’প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না অর্থাৎ প্রবৃত্তির অনুসরণ যেন তোমাদেরকে পক্ষপাতিত্ব বা বিদ্বেষ করতে বাধ্য না করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (يیٰٓاَیُّھَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللہَ وَاٰمِنُوْا بِرَسُوْلِھ۪ یُؤْتِکُمْ کِفْلَیْنِ مِنْ رَّحْمَتِھ۪ وَیَجْعَلْ لَّکُمْ نُوْرًا تَمْشُوْنَ بِھ۪ وَیَغْفِرْ لَکُمْﺚ وَاللہُ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌﭫ)‏ “হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন, তিনি তাঁর অনুগ্রহে তোমাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন এবং তিনি তোমাদেরকে দেবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা চলবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”(সূরা হাদীদ ৫৭:২৮) আর যদি প্রবৃত্তির অনুসরণ করে সাক্ষ্য বিকৃতি ও পরিবর্তন কর তাহলে জেনে রেখ তোমরা যা কর আল্লাহ তা‘আলা সব জানেন। অতএব সাক্ষ্য ও বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা সর্বস্তরের মু’মিনদের জন্যই আবশ্যক। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. বিচার ফায়সালা ও সাক্ষ্য দানে ন্যায়ের অনুসরণ করা ওয়াজিব। ২. মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া হারাম। ৩. সাক্ষ্য নিজের বিপক্ষে গেলেও সত্য কথা বলা উচিত। ৪. কোন কিছুর লোভ বা ভয় যেন সত্য সাক্ষ্য প্রদান থেকে বিচ্যুত না করে।

আন-নিসা 4:136

১৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে পরিপূর্ণভাবে ঈমানে প্রবেশ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। এর অর্থ এ নয় যে, ঈমান আনয়নকারীদেরকে পুনরায় ঈমান আনতে হবে বরং ঈমান আনয়নকারী ঈমানকে পরিপূর্ণ করে নেবে। আর যারা ঈমান আনবে না তারাই পথভ্রষ্ট। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে অথবা (বলেছেন) ষাটের কিছু বেশি শাখা আছে। এর সর্বোত্তম শাখা হচ্ছে: লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ ‘আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কোন সত্যিকার ইলাহ নেই’ বলা এবং সাধারণ অর্থাৎ নিম্নস্তরের শাখা হচ্ছে চলার পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়া। আর লজ্জা হচ্ছে ঈমানের একটি বিশেষ শাখা। (সহীহ মুসলিম হা: ৩৫)

আন-নিসা 4:141

১৪১ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে মুনাফিকদের কথা বলা হচ্ছে। যদি মু’মিনদের কোন বিজয় হত মুনাফিকরা বলত আমরা তো তোমাদের সাথেই ছিলাম। আর যদি কাফিরদের বিজয় হত তারা কাফিরদেরকে বলত, আমরা কি তোমাদেরকে মু’মিনদের হাত থেকে রক্ষা করিনি। আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন তাদের ফায়সালা করবেন তাদেরকে এ দ্বিমুখীতার পরিণতি জানিয়ে দেবেন। (وَلَنْ يَّجْعَلَ اللّٰهُ لِلْكٰفِرِيْنَ عَلَي الْمُؤْمِنِيْنَ سَبِيْلًا) “এবং আল্লাহ কখনই মু’মিনদের বিরুদ্ধে কাফিরদের জন্য কোন পথ রাখবেন না।” এ আয়াতের কয়েকটি দিক আলেমগণ বর্ণনা করেছেন: ১. আলী বিন আবূ তালেব ও ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: কিয়ামতের দিন মু’মিনদের ওপর কাফিররা বিজয় লাভ করতে পারবে না। ২. হুজ্জত ও প্রমাণাদির দিক দিয়ে কাফিররা মুসলিমদের ওপর জয়লাভ করতে পারবে না। ৩. কাফিরদের এমন বিজয় আসবে না যাতে মুসলিমদের রাজত্ব ও প্রতিপত্তি একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়। এ মতের সমর্থনে হাদীস এসেছে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৮৯) ৪. যতদিন মুসলিমরা নিজেদের দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে বাতিলের সাথে আপোষ করবে না এবং অন্যায় কাজে বাধা দেবে ততদিন পর্যন্ত কাফিররা তাদের ওপর জয়লাভ করতে পারবে না। ইবনুল আরাবী বলেন: এটি সব থেকে উত্তম কথা। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَمَآ أَصَابَكُمْ مِّنْ مُّصِيْبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيْكُمْ وَيَعْفُوْا عَنْ كَثِيْرٍ )‏ “তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তো তোমাদেরই হাতের কামাইয়ের ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন।”(সূরা শুরা ৪২:৩০, তাফসীর কুরতুবী ৫/৩১৬) আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. মুনাফিকদের দ্বিমুখী নীতি সম্পর্কে অবগত হলাম। ২. মুনাফিকরা সুবিধাবাদী। ৩. মুসলিমরা যতদিন সঠিক দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে ও বাতিলের সাথে আপোষ করবে না ততদিন বিজয়ী থাকবে।

আন-নিসা 4:171

১৭১ নং আয়াতের তাফসীর: غلو (অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি করা) শব্দের তাৎপর্য হল, কোন বস্তুকে তার নির্ধারিত সীমা থেকে বাড়িয়ে দেয়া। আল্লাহ তা‘আলা আহলে কিতাবদেরকে ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছেন। এ অপরাধ খ্রিস্টানদের মধ্যে বেশি বিদ্যমান। যেমন তারা ঈসা (আঃ)-এর সত্যতার ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছে। এমনকি আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে যে মর্যাদা দান করেছেন তারা তার ঊর্ধ্বে তুলে দিয়েছিল। তারা ঈসা (আঃ)-কে নাবীর মর্যাদা থেকে ইলাহের মর্যাদায় তুলে দিয়েছে। তারা ধর্ম যাজকদেরকে মা‘বূদ বানিয়ে নিয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (اِتَّخَذُوْآ أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ) “তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পণ্ডিতগণকে ও সংসার-বিরাগিগণকে তাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করেছে।”(সূরা তাওবাহ ৯:৩১) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খ্রিস্টানদের বাড়াবাড়ি দেখে উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন: তোমরা আমার ব্যাপারে তেমন বাড়াবাড়ি করো না যেমন খ্রিস্টানরা ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে করেছে। আমি কেবল একজন আল্লাহ তা‘আলার বান্দা ও রাসূল, সুতরাং তোমরা আমাকে আল্লাহ তা‘আলার বান্দা ও রাসূল বলে সম্বোধন কর। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৪৫) অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মানুষদেরকে সর্তক করে বলেন: তোমরা আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে সত্য ছাড়া আর কিছু বলবে না। আয়াতের এ অংশ তিনটি জিনিস শামিল করে: (১) আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে মিথ্যারোপ করা যাবে না। (২) বিনা জ্ঞানে আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলী, নাম কাজ ও শরীয়াতের ব্যাপারে মুখ খোলা যাবে না। (৩) আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে যা বলবে সত্য বলবে। তাই আল্লাহ তা‘আলা খ্রিস্টানদেরকে বলছেন, তোমরা যে বলে থাক আল্লাহ তা‘আলা তিনজনের একজন, ঈসা আল্লাহ তা‘আলার সন্তান, মারইয়াম আল্লাহ তা‘আলার স্ত্রী ইত্যাদি সব মিথ্যা এবং এসব আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে অপবাদ মাত্র। (إِنَّمَا الْمَسِيْحُ عِيْسٰي) ‘মারইয়ামের ছেলে ‘ঈসা মসীহ’ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার একজন বান্দা, তিনি আল্লাহ তা‘আলার সন্তান নন। একটি মাত্র কথা ‘কুন’(হয়ে যাও) দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা মারইয়ামের গর্ভে পিতা ছাড়া সৃষ্টি করেছেন। এবং যেসকল রূহ দ্বারা তিনি মানুষ সৃষ্টি করেন তার মধ্যে ঈসা (আঃ) অন্যতম একটি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَالَّتِيْٓ أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيْهَا مِنْ رُّوْحِنَا وَجَعَلْنٰهَا وَابْنَهَآ اٰيَةً لِّلْعٰلَمِيْنَ)‏ “এবং স্মরণ কর‎ সে নারী (মারইয়াম)-কে, যে নিজ সতীত্বকে রক্ষা করেছিল, অতঃপর তার মধ্যে আমি আমার রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং তাকে ও তার পুত্রকে করেছিলাম বিশ্ববাসীর জন্য এক নিদর্শন। (সূরা আম্বিয়া ২১:৯১) এরূপ ঘটনা সূরা মায়িদার ৭৫ নং, সূরা আল ইমরানের ৫৯ নং, সূরা তাহরীমের ১২ নং আয়াতে উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সত্য কোন মা‘বূদ নেই, তার কোন শরীক নেই, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলার বান্দা ও রাসূল, ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার বান্দা ও রাসূল, তিনি আল্লাহ তা‘আলার একটি কথা যা মারইয়ামের প্রতি ফুঁকে দিয়েছেলেন, তিনি আল্লাহ তা‘আলার রূহসমূহের অন্যতম একটি রূহ, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, তার যে আমলই থাকুক না কেন আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৩৫) অতএব আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলগণের প্রতি যেভাবে ঈমান আনা দরকার সেভাবে ঈমান আন। আর “তিন বল না”। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা তিনজন- এ কথা বল না। যারা এ কথা বলে তারা কাফির। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (لَقَدْ كَفَرَ الَّذِيْنَ قَالُوْآ إِنَّ اللّٰهَ ثَالِثُ ثَلٰثَةٍ م وَمَا مِنْ إلٰهٍ إِلَّآ إِلٰهٌ وَّاحِدٌ) “যারা বলে, ‘আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন, তারা কুফরী করেছে- এক ইলাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ সত্যিকার নেই।”(সূরা মায়িদাহ ৫:৭৩) তাই আমরাও যেন আমাদের নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-সহ কোন নাবী, ওলী-আওলিয়ার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি না করি। আমরা প্রত্যেক নাবীকে তার উপযুক্ত মর্যাদা প্রদান করবো, মর্যাদার নামে সীমালংঘন করবো না। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা হারাম। ২. বিনা জ্ঞানে আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে কথা বলা হারাম। ৩. ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার একজন বান্দা ও রাসূল। ৪. তিনজন আল্লাহ- এ কথা যারা বলে তারা কাফির। ৫. নাবী ও ওলী আওলিয়াদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা নিষেধ।

আন-নিসা 4:176

১৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: শানে নুযূল: জাবের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা আমি অসুস্থ হলাম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার নিকট আগমন করলেন। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি আমার বোনদের জন্য এক তৃতীয়াংশ সম্পদ অসীয়ত করব? তিনি বললেন: (আরো একটু বৃদ্ধি করে তাদের প্রতি) ইহসান কর, আমি বললাম: তাহলে অর্ধেক দেই? তিনি বললেন: (আরো একটু বৃদ্ধি করে তাদের প্রতি) ইহসান কর। জাবের (রাঃ)‎ বলেন, তারপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বের হলেন অতঃপর আমার কাছে আগমন করে বললেন, আমার মনে হয় এ অসুখে তুমি মারা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা আয়াত নাযিল করে তোমার বোনদের অংশ বর্ণনা করে দিয়েছেন আর তা হল দুই তৃতীয়াংশ। এরপর জাবের (রাঃ)‎ বলতেন: (يَسْتَفْتُوْنَكَ قُلِ اللّٰهُ....) এ আয়াতটি আমার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। (আবূ দাঊদ হা: ২৮৮৭, সহীহ) এ আয়াতকে আয়াতুস সাইফ বা গ্রীস্মকালের আয়াত বলা হয় । কারণ তা গ্রীস্মকালে নাযিল হয়েছে। (মুসনাদ আহমাদ ১/২৬, সহীহ) كَلَالَة ‘কালালাহ’ বলা হয় ঐ মৃত ব্যক্তিকে যার পিতা-মাতা নেই এবং সন্তান নেই। কেউ কেউ বলেছেন, যে মৃত ব্যক্তির কোন পুত্র নেই। পুত্র বলতে পুত্র ও পৌত্র উভয়কে বলা হয়। আর বোন বলতে সহোদর বোন ও বৈমাত্রেয় উভয় বোনকে বলা হয়। যদি কোন ব্যক্তি মারা যায় আর যদি তার কোন সন্তান না থাকে কিন্তু বোন থাকে তাহলে বোন একাই সমস্ত সম্পদের অর্ধেক অংশ পাবে। আর দু’জন হলে দুই তৃতীয়াংশ পাবে। অনুরূপভাবে বোন মারা গেলে সে ভাই ওয়ারিশদার হবে তবে শর্ত হল যদি বোনের কোন সন্তান না থাকে। এবং যদি পিতা না থাকে। যেহেতু ভাইয়ের চেয়ে পিতা সম্পর্কের দিক দিয়ে নিকটতম। সুতরাং পিতার বর্তমানে ভাই উত্তরাধিকারী হবে না। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. কোন বিষয় না জানা থাকলে জ্ঞানীদের নিকট জিজ্ঞাসা করে জেনে নেয়া উচিত। ২. ইসলামই সর্বপ্রথম নারীদেরকে উত্তরাধিকারের অংশ প্রদান করেছে। ৩. আল্লাহ তা‘আলা বিধি-বিধান প্রদান করেছেন যাতে মানুষ সঠিক পথ পায়।

আল-মায়িদা 5:3

৩ নং আয়াতের তাফসীর: ১ নং আয়াতে বলা হয়েছে (إِلَّا مَا يُتْلٰي عَلَيْكُمْ) অর্থাৎ তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হল তবে যা তেলাওয়াত করে শুনানো হবে তা ব্যতীত। সে অংশটুকুর ব্যাখ্যা হল এ আয়াত। অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা সেসব প্রাণীর বর্ণনা দিয়েছেন যার কতকগুলো সর্বাবস্থায় সম্পূর্ণ হারাম, আর কতকগুলো জন্তু খাওয়া হালাল কিন্তু কারণবশত তা হারাম। الْمَیْتَةُ বা মৃত বলতে সেসব জীবিত স্থলচর চতুষ্পদ জন্তুকে বুঝানো হয়েছে যা যবাই করে খাওয়া হালাল, কিন্তু যদি অস্বাভাবিক অবস্থায় যবাই বা শিকার বিহীন অবস্থায় মারা যায় তাহলে তা হারাম। তবে জলচল মৃত প্রাণী হালাল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সাগরের পানি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: তার পানি পবিত্র ও তার মৃত হালাল। الدَّمُ বা রক্ত বলতে, পশু জবেহ করার সময় যে রক্ত দ্রুত গতিতে বের হয় তা হারাম। আর গোস্তের সাথে যে রক্ত মিশ্রিত থাকে তা হালাল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আমাদের জন্য দুটি মৃত ও দুটি রক্ত হালাল করে দেয়া হয়েছে। মৃত দুটি হল- মাছ ও টিড্ডি, আর রক্ত হল কলিজা ও প্লীহা। (ইবনু মাযাহ হা: ৩২১৮, সহীহ) (وَمَآ أُهِلَّ لِغَيْرِ اللّٰهِ بِه۪) ‘আল্লাহ ব্যতীত অপরের নামে জবেহকৃত পশু’ অর্থাৎ যা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যের নাম নিয়ে জবেহ করা হয় তা হারাম। আল্লাহ তা‘আলার নাম নিয়ে যদি কোন দরগাহ, মাজার বা খানকাতে আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কোন ব্যক্তির সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য জবেহ করা হয় তাও হারাম। এটা (وَمَا ذُبِحَ عَلَي النُّصُبِ) বা মূর্তিপূজার বেদীর ওপর বলি দেয়ার শামিল। সাবেত বিন যহহাক (রাঃ) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে জনৈক ব্যক্তি ‘বাওয়ানা’ নামক স্থানে একটি উট জবাই করার নযর করে। এ বিষয়ে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন: সেখানে এমন কোন প্রতিমা আছে কি যার ইবাদত করা হয়? তারা বললেন: না। তিনি বললেন: সেখানে কি জাহিলী যুগের কোন অনুষ্ঠান পালন করা হয়? তারা বললেন: না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: তোমার নযর পূর্ণ কর। (আবূ দাঊদ হা: ৩৩১৫, সহীহ) এ হাদীস প্রমাণ করে, যেসব ওরস ও দরগায় গাইরুল্লাহর ইবাদত করা হয় সেখানে কোন নযর-মানত করা হারাম এবং তা খাওয়াও হারাম। الْمُنْخَنِقَةُ হল, যেকোনভাবে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া প্রাণী। الْمَوْقُوْذَةُ হল, যে প্রাণী আঘাতে মারা যায়। الْمُتَرَدِّیَةُ ওপর থেকে পড়ে মরে যাওয়া প্রাণী। النَّطِيحَةُ অন্য প্রাণীর দ্বারা ক্ষত হয়ে মারা যাওয়া প্রাণী। وَمَآ اَکَلَ السَّبُعُ হিংস্র প্রাণী যে জন্তু খেয়েছে। তবে এসব প্রাণী মারা যাবার পূর্বে মুমূর্ষু অবস্থায় যদি আল্লাহ তা‘আলার নামে যবেহ করা যায় তবে হালাল। (তাফসীরে সা‘দী, পৃঃ ২৭) অনুরূপভাবে যেসব জন্তু খাওয়া হালাল তা যদি কোন হিংস্র প্রাণী আক্রমণ করে, আর সে অবস্থায় মারা যায় তাহলে তা হারাম, তবে যদি মারা যাওয়ার পূর্বে জবেহ করা সম্ভব হয় তাহলে তা খাওয়া বৈধ। (وَأَنْ تَسْتَقْسِمُوْا بِالْأَزْلَامِ) ‘জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা হয়’ অর্থাৎ তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা হারাম। এর দু’টি অর্থ: ১. তীরের মাধ্যমে বণ্টন করা। ২. তীরের মাধ্যমে ভাগ্য পরীক্ষা করা। প্রথম অর্থের ব্যাপারে বলা হয়, জুয়া ইত্যাদিতে জবেহকৃত পশুর মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রে উক্ত তীর ব্যবহার করা হত। ফলে কেউ প্রাপ্য অংশের চেয়ে বেশি পেত, আবার কেউ বঞ্চিত হত। দ্বিতীয় অর্থের ব্যাপারে বলা হয়েছে- কোন কর্মের শুরুতে বিশেষ তীরের মাধ্যমে লোকেরা ভাগ্য পরীক্ষা করত, যদি হ্যাঁ লেখা উঠত তাহলে কাজ করত, আর না লেখা উঠলে কাজ করত না, আর হ্যাঁ বা না কোন লেখা না উঠলে পুনরায় পরীক্ষা করত। আল্লাহ তা‘আলা এসব কাজ হারাম করেছেন। এবং তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করে অর্জিত সম্পদ খাওয়াও হারাম করেছেন। এসব পাপ কাজ শয়তানের আনুগত্যের নামান্তর। (اَلْيَوْمَ يَئِسَ.....وَاخْشَوْنِ) ‘আজ কাফিররা তোমাদের দীনের বিরুদ্ধাচরণে হতাশ হয়েছে...’ আজ বলতে আরাফা দিবসকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আরাফা দিবসে কাফিররা তোমাদের দীনের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে যে, তারা কোনদিন তোমাদেরকে শির্কের দিকে নিয়ে যেতে পারবে না, তাদের দীনের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। অতএব তাদেরকে ভয় না করে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‏"‏إِنَّ الشَّيْطَانَ قَدْ أَيِسَ أَنْ يَعْبُدَهُ الْمُصَلُّونَ فِي جَزِيرَةِ الْعَرَبِ وَلَكِنْ فِي التَّحْرِيشِ بَيْنَهُمْ‏"‏‏.‏ আরব ভূখণ্ডে মুসল্লীগণ শয়তানের উপাসনা করবে, এ বিষয়ে শয়তান নিরাশ হয়ে পড়েছে। তবে তাদের একজনকে অন্যের বিরুদ্ধে উস্কিয়ে দেয়ার ব্যাপারে নিরাশ হয়নি। (সহীহ মুসলিম হা: ৬৯৯৬) (اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ) ‘আজ (আরাফা দিবসে) তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম’ এটা হল আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এ উম্মাতের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত। আল্লাহ তা‘আলা ইসলাম দিয়ে আদম (আঃ)-সহ অসংখ্য নাবী রাসূল প্রেরণ করেছেন, সে ইসলামকে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাধ্যমে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। এ উম্মাত অন্য কোন দীন বা নাবীর প্রতি মুখাপেক্ষী নয়। এ নাবী শেষ নাবী, তাকে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীর সকল মানব ও জিন জাতির জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। অতএব যা ইসলামে হালাল হওয়ার মত তা হালাল করে দেয়া হয়েছে, আর যা হারাম হওয়ার মত তা হারাম করে দেয়া হয়েছে। এরপর হালাল বা হারাম করার কিছুই নেই। আল্লাহ তা‘আলা যা দিয়েছেন সবই সত্য এবং পরিপূর্ণ। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَّعَدْلًا) “সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে তোমার প্রতিপালকের বাণী পরিপূর্ণ।”(সূরা আনআম ৬:১১৫) তাই নতুন করে দীন ইসলামে কোন কিছু প্রবেশ করানোর সুযোগ নেই। ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি দীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন করল আর তা ভাল মনে করল সে ব্যক্তির বিশ্বাস হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দীন প্রচারে খিয়ানত করেছেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: (اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِيْنًا) “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম।”যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর জীবদ্দশায় পূর্ণ ইসলাম পেয়েছেন এবং প্রচার করেছেন, অতএব নতুন কোন সংযোজন-বিয়োজনের সুযোগ নেই। তারেক বিন শিহাব বলেন: এক ইয়াহূদী উমার (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে বলল: হে আমীরুল মু’মিনীন, আপনাদের কিতাবের এমন একটি আয়াত তেলাওয়াত করেন যদি তা আমাদের ইয়াহূদী সম্প্রদায়ের ওপর অবতীর্ণ হত তাহলে আমরা সে দিনকে ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করে নিতাম। তিনি বললেন: তা কোন্ দিন? সে বলল: (اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ...... )। উমার (রাঃ) বললেন: আল্লাহর শপথ যেদিন এ আয়াত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং কোন্ সময়ে হয়েছে সে সম্পর্কে আমি অধিক জানি। আরাফায় জুমার দিন বিকালে অবতীর্ণ হয়েছে। (মুসনাদ আহমাদ: ১/২৮, সহীহ) সহীহ বুখারীতে ৪৬০৬ নং হাদীসেও এরূপ বর্ণনা রয়েছে। (فَمَنِ اضْطُرَّ فِيْ مَخْمَصَةٍ... ) ‘তবে কেউ পাপের দিকে না ঝুঁকে ক্ষুধার তাড়নায় (উল্লিখিত নিষিদ্ধ বস্তু খেতে) বাধ্য হলে’ অর্থাৎ যে ব্যক্তি এসব হারাম খাদ্য খেতে বাধ্য হবে তার জন্য খাওয়া হালাল। তবে যেন আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যাচরণ উদ্দেশ্য না হয় এবং সীমালঙ্ঘন করা না হয়। অর্থাৎ প্রাণ বাঁচানোর জন্য যতটুকু প্রয়োজন শুধু ততটুকু ছাড়া বেশি যেন না খায়। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. যেসকল পশু খাওয়া হারাম তা জানতে পারলাম। ২. তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা হারাম এবং এ জাতীয় কাজ করে অর্জিত সম্পদও হারাম। ৩. মাজার, কবর, দরগাহ ও খানকাতে জবেহ করা হারাম এবং তা শির্কে আকবার। ৪. হিংস্র প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জন্তু জবেহ করা সম্ভব হলে তা খাওয়া হালাল। ৫. ইসলামে নতুন কিছু সংযোজন করা হারাম; কেননা দীন পরিপূর্ণ। ৬. যখন মানুষ খাবারের অভাবে মৃত্যুর আশঙ্কা করবে তখন প্রাণ রক্ষার্থে হারাম বা মৃত জন্তু খাওয়া হালাল। ৭. ইসলামের দু’টি ঈদ-উৎসব (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা) ছাড়া বার্ষিক পালনীয় অন্য কোন বাৎসরিক ঈদ-উৎসব নেই।

আল-মায়িদা 5:12

১২ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে সেসব অঙ্গীকার ও প্রতিশ্র“তি পূর্ণ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন, যা তিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাধ্যমে গ্রহণ করেছেন। আর তাদেরকে হক প্রতিষ্ঠা ও ন্যায্য সাক্ষ্য প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদেরকে তাঁর ঐ সকল পুরস্কার ও অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে প্রদান করেছেন। অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ঐ অঙ্গীকার ও প্রতিশ্র“তির কথা উল্লেখ করেছেন যা ইতোপূর্বে বানী ইসরাঈলদের থেকে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার পরেও তা পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। এখানে পরোক্ষভাবে মুসলিমদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তোমরা যেন বানী ইসরাঈলের মত অঙ্গীকার ভঙ্গ না কর। তাহলে তাদের ওপর যে আপদ আপতিত হয়েছিল, তোমাদের ওপরও তা বর্তাবে। বানী ইসরাঈলের জন্য আল্লাহ তা‘আলা বারজন নেতা নিযুক্ত করেছিলেন। এ বারজনের নাম তাফসীর ইবনু কাসীরসহ অন্যান্য গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। আমাদের নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন আকাবায় আনসারীদের থেকে বায়আত গ্রহণ করেন তখনও বারজন নেতা ছিল। (ইবনু হিশাম ২/৫২-৫৬) বিশিষ্ট তাবেয়ী মাসরুক (রহঃ) বলেন: একদা আমরা আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদের সাথে বসেছিলাম, তিনি আমাদেরকে কুরআন তেলাওয়াত করে শুনাচ্ছিলেন। তাঁকে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল: হে আবূ আব্দুর রহমান! আপনারা কি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কত জন খলীফা এ উম্মাতের দায়িত্ব নেবে। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বললেন: ইরাক আগমনের পর তুমি ছাড়া অন্য কেউ এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেনি। হ্যাঁ, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছি, তিনি বলেছেন: বানী ইসরাঈলদের নেতার মত বার জন। (মুসনাদ আহমাদ হা: ১/৩৯৭) জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি: বারজন ব্যক্তি দায়িত্ব না নেয়া পর্যন্ত মানুষের নেতৃত্ব বহাল থাকবে। তারপর নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চুপিসারে কিছু কথা বললেন যা আমার কাছে অস্পষ্ট থেকে গেল। আমার পিতাকে জিজ্ঞাসা করলাম, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কী বললেন? তিনি বললেন: সবাই কুরাইশ থেকে হবেন। (সহীহ বুখারী হা: ৭২২২) তবে এ হাদীস দ্বারা শিয়ারা দলীল দিয়ে বলে যে, এতে তাদের বারজন ইমামকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। তাদের এ দাবী ভিত্তিহীন। (اِنِّیْ مَعَکُمْ) ‘আমি তোমাদের সঙ্গে আছি’ তারপর আল্লাহ তা‘আলা ঐসব নেতাদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, তিনি তাঁর প্রত্যক্ষ সাহায্য ও সহযোগিতা দ্বারা তাদের সাথে রয়েছেন। মহান আল্লাহ স্ব-স্বত্ত্বায় আরশের উপর রয়েছেন। আর দর্শন, শ্রবণ, জ্ঞান, ক্ষমতা ও সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে বান্দার সাথে রয়েছেন। মহান আল্লাহর বান্দার সাথে থাকা দু’ প্রকার- (১) সাধারণভাবে সকলের সাথে থাকেন (২) বিশেষ ব্যক্তি ও গুণের অধিকারীদের সাথে থাকেন। (১) সাধারণভাবে সকলের সাথে থাকেন- এ অর্থ হল আল্লাহ তা‘আলা তাঁর জ্ঞান, দর্শন, শ্রবণ ও ক্ষমতা ইত্যাদির মাধ্যমে সব কিছু বেষ্টন করে আছেন। তাঁর সারা মাখলূকাতে কী হচ্ছে সব কিছু একই সাথে দেখেন, শুনেন ও জানেন। এমনকি একটি কালো পিপীলিকা গভীর রাতে কালো পাথরের নিচে চলাচল করলেও মহান আল্লাহ তা দেখেন, তার পায়ের শব্দ শুনেন এবং সে পিপীলিকার চলাচল সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। কোন কিছু আল্লাহ তা‘আলার কাছে অস্পষ্ট নয়। সুতরাং এ অর্থে আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক জীব-জন্তু, মু’মিন-কাফির, সৎ-অসৎ সবার সাথে রয়েছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَھُوَ مَعَکُمْ اَیْنَ مَا کُنْتُمْ وَاللہُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِیْرٌ) “তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেন।” (সূরা হাদীদ ৫৭:৪) (২) বিশেষ ব্যক্তি ও গুণের অধিকারীদের সাথে থাকেন- অর্থাৎ যারা আল্লাহর প্রিয়পাত্র তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা দানের মাধ্যমে তাদের সাথে রয়েছেন। যেমন মুত্তাকি ও ধৈর্যশীলদের সাথে আল্লাহ আছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন: (إِنَّ اللہَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ) আল্লাহ তাদেরই সঙ্গে আছেন যারা তাক্ওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎ কর্মপরায়ণ। (সূরা নাহল ১৬:১২৮) অত্র আয়াত এ অর্থেই ব্যবহার হয়েছে। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবূ বকর (রাঃ) হিজরতের সময় যখন গারে ছূরে ছিলেন তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে বলেন: (إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُوْلُ لِصَاحِبِه۪ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللہَ َ مَعَنَا) ‘যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল; সে তখন তার সঙ্গীকে বলেছিল, ‘চিন্তা কর না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’(সূরা তাওবা ৯:৪০) এখানে নিরাপত্তা ও সাহায্য প্রদানের মাধ্যমে সাথে রয়েছেন। মূসা ও হারুন (আঃ) কে যখন ফির‘আউনের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন তখন তাঁরা উভয়ে গ্রেফতারের আশংকা করলেন, তখন তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (قَالَ لَا تَخَافَآ إِنَّنِيْ مَعَكُمَآ أَسْمَعُ وَأَرٰي ) ‘তিনি বললেন: ‘তোমরা ভয় কর না, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, আমি শুনি ও আমি দেখি।’(ত্বহা ২০:৪৬) আল্লাহ তা‘আলা ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন, যেমন তিনি বলেন: (وَاصْبِرُوْا ط إِنَّ اللہَ مَعَ الصّٰبِرِيْنَ) “তোমরা ধৈর্য ধারণ কর; নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।”(সূরা নাহল ১৬:১২৬) সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার বান্দার সাথে থাকার অর্থ এই নয় যে, তিনি স্ব-স্বত্তায় প্রত্যেকের সাথে রয়েছেন। যেমন কতক গোমরাহ ব্যক্তিরা বলে থাকে- যত কল্লা তত আল্লাহ। বরং আল্লাহ তা‘আলা স্ব-সত্তায় আরশের উপর থেকে তাঁর জ্ঞান, দর্শন ও শ্রবণ দ্বারা প্রত্যেকের সাথে রয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা আরশে রয়েছে এ কথা যেমন কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত তেমনি তিনি সবার সাথে রয়েছেন এ কথাও প্রমাণিত। সুতরাং আল্লাহ তা’আলার এ সকল গুণকে অস্বীকার করা ও অপব্যাখ্যা করার কোন সুযোগ নেই। আল্লাহ তা’আলা প্রতিশ্রুতি দিলেন যদি তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর, রাসূলদের প্রতি ঈমান আন, তাদেরকে সহযোগিতা কর এবং আল্লাহ তা‘আলাকে খুশি করার জন্য তাঁর পথে ব্যয় কর, তাহলে অবশ্যই তিনি জান্নাত দেবেন। আর কুফরী করলে জাহান্নাম ছাড়া কিছুই নেই। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. বানী ঈসরাঈলরা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কৃত অঙ্গীকার পালন না করার কারণে শাস্তির মুখোমুখি হয়েছিল। এদের থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। ২. সৎ আমল জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম একটি ওসীলা । ৩. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্মান ও সহযোগিতা করা ঈমানের দাবী। ৪. আয়াতে বর্ণিত বিধান পালন করলে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সহযোগিতা ও সাহায্য প্রদান করবেন। ৫. আল্লাহ তা‘আলা স্ব-স্বত্ত্বায় আরশের ওপর থেকে তাঁর দর্শন, শ্রবণ, জ্ঞান ও ক্ষমতার দ্বারা প্রত্যেকের সাথে রয়েছেন। ৬. আল্লাহ তা‘আলা স্ব-স্বত্ত্বায় সর্বত্র বিরাজমান- এটি একটি শিরকী ও কুফরী আকীদাহ।

আল-মায়িদা 5:32

৩২ নং আয়াতের তাফসীর: আদম (আঃ)-এর পুত্র কাবীল-হাবীলকে হত্যা করার কারণে আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাঈলের ওপর বিধান দিলেন যে, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা অথবা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করা সকল মানুষকে হত্যা করার শামিল। আর কাউকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা সকল মানুষকে বাঁচানোর শামিল। এ বিধান শুধু বানী ইসরাঈলের জন্য সীমাবদ্ধ নয় বরং আমাদের জন্যও প্রযোজ্য। সুলাইমান বিন আলী আররিবয়ী (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি হাসান বাসরীকে জিজ্ঞাসা করলাম: হে আবূ সাঈদ! এ আয়াতের বিধান বানী ইসরাঈলের মত আমাদের জন্যও কি প্রযোজ্য? তিনি বললেন: হ্যাঁ। সে সত্তার শপথ যিনি ছাড়া কোন মা‘বূদ নেই। এ বিধান যেমন বানী ইসরাঈলের জন্য ছিল তেমনি আমাদের জন্যও প্রাযোজ্য। বানী ইসরাঈলের রক্তের চেয়ে আমাদের রক্তের মর্যাদা কোনক্রমেই কম নয়। (ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর, তাবারী, ৬/১৩১) ইসলাম মানবতার ধর্ম। এরূপ মানবতাপূর্ণ বিধান ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম নেই। তাই যারা ইসলামকে সেকেলে ধর্ম বলে বা ইসলামের ব্যাপারে আঙ্গুল তুলে কথা বলে তাদের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব রয়েছে। অজ্ঞতা ও মূর্খতাবশত তারা এরূপ কথা বলে। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. অন্যায়ভাবে হত্যা করা বা ফাসাদ সৃষ্টির পরিণতি খুবই ভয়াবহ। ২. অধিকাংশরাই অপরাধে জড়িত হয়েছে তাদের নিকট প্রমাণাদি আসার পর। ৩. ইসলাম পরিপূর্ণভাবে মাবনাধিকার সংরক্ষণ করেছে।

আল-মায়িদা 5:45

৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: তাওরাতে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহূদীদের ওপর ফরয করে দিয়েছিলেন যে, কোন ব্যক্তি কাউকে হত্যা করলে কিসাসস্বরূপ তাকেও হত্যা করা হবে, কেউ কারো চোখ, নাক, কান বা দাঁত ক্ষতি করলে কিসাসস্বরূপ তারও অনুরূপ ক্ষতি করা হবে। এ বিধান আমাদের জন্যও প্রযোজ্য। কেননা পূর্ববতীদের শরীয়ত আমাদের জন্যও শরীয়ত যদি আমাদের শরীয়ত তা রহিত না করে। হাসান বাসরী (রহঃ) বলেন: এ বিধান তাদের জন্য এবং সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। (وَالْجُرُوْحَ قِصَاصٌ) ‘জখমের বদলে অনুরূপ জখম’এতে সকল মুসলিম সমান। নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সবাই সমান যখন তা স্বেচ্ছায় করা হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: الْمُسْلِمُونَ تَتَكَافَأُ دِمَاؤُهُمْ মুসলিমরা রক্তের অধিকারে সবাই সমান। (আবূ দাঊদ হা: ২৭৫১, ইবনু মাযাহ হা: ২৬৮৫, সহীহ) (فَمَنْ تَصَدَّقَ بِه۪ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّه۫) ‘তবে কেউ তা ক্ষমা করে দিলে তা তার (ক্ষমাকারীর) জন্য পাপের কাফফারা হবে।’অর্থাৎ ক্ষমাকারীর জীবনের অতীতের গুনাহ আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দিবেন। আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাঁর ফুফু রুবাঈ এক দাসীর একটি দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছিল। ফলে দাসীর মালিকের কাছে ক্ষমা চাওয়া হল কিন্তু ক্ষমা করল না। তারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আগমন করল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, কিসাস আদায় কর। রুবাঈ এর ভাই আনাস বিন নযর বলল: ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! অমুকের দাঁত ভাঙ্গা হবে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ: আল্লাহ তা‘আলার কিতাবে যেহেতু কিসাস আছে। তিনি বললেন: যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ, কখনো তার দাঁত ভাঙ্গা হবে না। বর্ণনাকারী আনাস (রাঃ) বলেছেন: পরে দাসীর মালিক/সম্প্রদায় বিষয়টি ক্ষমা করে দিলো এবং কিসাস ছেড়ে দিলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللّٰهِ مَنْ لَوْ إِقْتَسَمَ عَلَي اللّٰهِ لَأَبَرَّهُ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলার কতক বান্দা এমন রয়েছে যদি আল্লাহ তা‘আলার নামে তারা শপথ করে আল্লাহ তা‘আলা তা পূর্ণ করেন। (সহীহ বুখারী হা: ২৭০৩, সহীহ মুসলিম হা: ১৯০৩) সুতরাং কিসাস আদায় করলে একদিক দিয়ে যেমন ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে অন্য দিকে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. হত্যা, যখম ও আঘাতের কিসাস আদায় করা ওয়াজিব। ২. কিসাস আদায় করতে গিয়ে জুলুম করা হারাম। ৩. কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হবার পর ক্ষমা করে দিলে এতে তার গুনাহ মাফ হবে।

আল-মায়িদা 5:67

৬৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁর প্রদত্ত রিসালাত পরিপূর্ণভাবে পৌঁছে দিতে। এ রিসালাত পৌঁছে দিতে সকল বাধা বিপত্তি থেকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে হিফাযত করবেন। আয়িশাহ (রাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি এ ধারণা করবে যে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিছু জিনিস গোপন করেছেন, সে ব্যক্তি নিঃসন্দেহে মিথ্যাবাদী। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: (يَآأَيُّهَا الرَّسُوْلُ بَلِّغْ مَآ أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَّبِّكَ.... ) “হে রাসূল! তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার কর।”(সহীহ বুখারী হা: ৪৬১২) একদা আলী (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হল যে, আপনাদের নিকট কুরআন ব্যতীত অহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হওয়া কোন জিনিস আছে কি? উত্তরে তিনি কসম করে বললেন: না। তবে কুরআন উপলব্ধি করার জ্ঞান, আল্লাহ তা‘আলা যাকে দান করেন। (সহীহ বুখারী হা: ১১১) বিদায় হজ্বের সময় এক লক্ষ অথবা এক লক্ষ চল্লিশ হাজার সাহাবীদের সামনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন: তোমরা আমার ব্যাপারে কী বলবে, আমি কি পৌঁছে দিয়েছি? তারা সকলেই বলেছিলেন: আপনি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। অবশেষে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আকাশের দিকে আঙ্গুল তুলে ইঙ্গিত করে তিনবার বললেন: হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো। (সহীহ মুসলিম হা: ১২১৮) এ আয়াত তাদের প্রতিবাদ করছে যারা বলে- নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষের ভয়ে দীনের অনেক বিধান গোপন করেছেন। আর যারা বলে- কুরআন ত্রিশ পারার অধিক তাদের কথাও মিথ্যা। সুতরাং নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেমন তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পৌঁছে দিয়েছেন তেমনি তাঁর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতিটি অনুসারীর সাধ্যমত দাওয়াতী কাজ করা অবশ্য কর্তব্য। যে ব্যক্তি যে স্তরের ও পর্যায়ের তাকে তদনুযায়ী অবশ্যই দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করতে হবে। (مَآ أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَّبِّكَ) ‘তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে’ অর্থাৎ তাবলীগ কর যা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। এখানে তাবলীগের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। যার ফলে কেউ ইসলামের নামে যে কোন পুস্তক বা কারো মতাদর্শের তাবলীগ করতে পারে না। তাবলীগ করতে হবে তার যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পক্ষ থেকে নাযিল করেছেন। আর তা হল- কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ। সুতরাং প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির সচেতন হওয়া উচিত, সে কিসের তাবলীগ করছে? তা কি কুরআন ও সুন্নাহর তাবলীগ? না কোন মতাদর্শের তাবলীগ! স্বপ্নে পাওয়া বিষয়ের তাবলীগ? না পীর-বুজুর্গের তরীকার তাবলীগ? তাবলীগ যেমন আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ, বিষয়বস্তুও তেমন হতে হবে আল্লাহ তা‘আলার দেয়া, নচেৎ শ্রম যতই হোক না কেন আল্লাহ তা‘আলার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার আশা করা যায় না। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তাবলীগ হল কুরআন ও সহীহ হাদীসের তাবলীগ, কোন মনগড়া বিষয়ের তাবলীগ নয়। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। ২. দায়িত্ব পালনে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সকল প্রকার সাহায্য দিয়েছেন। ৩. নাবীদের ওয়ারিশ হিসেবে আলিমদের কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর তাবলীগ করা ওয়াজিব। ৪. তাবলীগ করতে হবে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর নিয়ম-পদ্ধতি ও সীমারেখার আলোকে।

আল-মায়িদা 5:82

৮২ নং আয়াতের তাফসীর: ৮২-৮৬ নং আয়াতে পূর্ববর্তী জাতির মধ্য হতে যারা ইসলাম ও মুসলিমদের প্রধান শত্র“ এবং যারা বন্ধুত্বের দিক দিয়ে অধিক নিকটবর্তী তাদের পরিচয় বর্ণনা করা হয়েছে। ইসলাম ও মুসলিমদের প্রধান শত্র“ হল ইয়াহূদী ও মুশরিকরা। তাদেরকে বাহ্যিক মুসলিমদের কল্যাণকামী দেখা গেলেও ভেতরে ভেতরে এরা মুসলিমদের ক্ষতি ও সমূলে ধ্বংস করার নীল-নকশা করে থাকে। যেমন মদীনায় ইয়াহূদীগণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে হত্যা করার জন্য কয়েকবার অপচেষ্টা করেছিল। আজও মুসলিমদেরকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য তাদের অপচেষ্টা অব্যাহত আছে, যার দরুন একের পর এক মুসলিম দেশগুলো দখল, তাদের ওপর হামলা ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে মুসলিমদের প্রতি সৌহার্দ্য, ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধূত্বের দিক থেকে অধিক নিকটবর্তী হল খ্রিস্টানগণ। এদের মধ্যে নম্রতা, উদারতা, ক্ষমাশীলতা ও ধর্মাবলম্বিতা তুলনামূলক অন্যদের চেয়ে বেশি রয়েছে। এদের অধিকাংশ ইসলাম গ্রহণ করেছে। যেমন হাবশার বাদশা নাজ্জাশী ও তাঁর সহচর্যগণ। বদর যুদ্ধে কুরাইশদের বড় বড় নেতারা নিহত হওয়ার পর তারা বলল: হাবশায় যে সকল মুসলিম রয়েছে তাদেরকে এনে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতে পারো। অতএব বাদশা নাজ্জাশীর জন্য কিছু উপঢৌকনসহ দু’জন বিজ্ঞ ব্যক্তিকে প্রেরণ কর হয়তো তিনি সেখানকার মুসলিমদেরকে ফেরত দেবেন। কুরাইশরা আমর বিন আস ও আব্দুল্লাহ বিন রবী‘আহকে উপঢৌকনসহ প্রেরণ করল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ কথা শুনে নাজ্জাশীর প্রতি একটি চিঠিসহ আমর বিন উমাইয়্যাহ আয-যমরীকে প্রেরণ করলেন। চিঠি নিয়ে আগমন করলে নাজ্জাশী তা পড়ার পর জাফর বিন আবূ তালেব ও মুহাজির সাহাবীদের ডাকলেন এবং তথাকার খ্রিস্টান পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের নিয়ে আসলেন। অতঃপর জাফরকে কুরআন তেলাওয়াত করতে বললেন, তিনি সূরা মারইয়াম-এর কিছু অংশ তেলাওয়াত করলেন। এতে তাদের চোখ দিয়ে অশ্র“ ঝঁরতে থাকে। এদের ব্যাপারেই আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করেছেন: (وَلَتَجِدَنَّ اَقْرَبَھُمْ مَّوَدَّةً لِّلَّذِیْنَ اٰمَنُوا الَّذِیْنَ قَالُوْٓا اِنَّا نَصٰرٰی) “এবং যারা বলে ‘আমরা খ্রিস্টান’ মানুষের মধ্যে তাদেরকেই তুমি মু’মিনদের নিকটতর বন্ধুত্বে দেখবে।” (কুরতুবী)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَجَعَلْنَا فِیْ قُلُوْبِ الَّذِیْنَ اتَّبَعُوْھُ رَاْفَةً وَّرَحْمَةً) “এবং তার অনুসারীদের অন্তরে দিয়েছিলাম করুণা ও দয়া।”(সূরা হাদীদ ৫৭:২৭) মুসলিমদের প্রতি তাদের সৌহার্দ্য, ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্বের কয়েকটি কারণ আল্লাহ তা‘আলা তুলে ধরেছেন। (১) (قِسِّیْسِیْنَ وَرُھْبَانًا) ‘পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগী’ অর্থাৎ তাদের মাঝে আলেম ও ইবাদতগুজারী মানুষ ছিল। তারা সত্য অনুধাবন করতে পেরেছে, তারা বুঝতে পেরেছে এ কুরআন সত্য এবং এর অনুসারীরাই সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত। (২) (وَّاَنَّھُمْ لَا یَسْتَکْبِرُوْنَ) ‘আর তারা অহঙ্কারও করে না’অর্থাৎ সত্য গ্রহণ ও মেনে নিতে তাদের কোন অহংকার ও হঠকারিতা নেই। সত্য জানার পর অংকারবশত তা বর্জন করে না। সুতরাং সত্য জানার পর মাথা পেতে নেয়া উচিত, কোন কিছুর দোহাই দিয়ে বা অহংকারবশত তা বর্জন করা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার নামান্তর মাত্র। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. ইসলাম ও মুসলিমদের প্রধান শত্রু হল ইয়াহূদী জাতি। ২. অমুসলিমদের মধ্য হতে ইসলাম ও মুসিলমদের বন্ধুত্বের নিকটবর্তী হল খ্রিস্টানরা, যারা স্ব ধর্মের ওপর বহাল রয়েছে। ৩. সাধারণত নম্র, ভদ্র ও উদার মনের মানুষেরাই আল্লাহ তা‘আলার দীন গ্রহণে অগ্রগামী।

আল-মায়িদা 5:89

৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: قَسَم (কসম), حَلَف (হলফ) يَمين (ইয়ামীন) তিনটি আরবি প্রতিশব্দ যার বাংলা অর্থ: শপথ করা। শপথ তিন প্রকার- ১. لغو (লাগু) ২. غموس (গুমূস) ৩. منعقد (মুনআকিদ)। ১. لغو (অনর্থক) এমন শপথকে বলে যা মানুষ কথায় কথায় ইচ্ছা, উদ্দেশ্য ও প্রয়োজন ছাড়াই ব্যবহার করে। যেমন بلي والله ، لا والله (হ্যাঁ, আল্লাহর কসম; না, আল্লাহর কসম) ইত্যাদি। এ শপথের কোন কাফফারা বা পাকড়াও নেই। ২. غموس (মিথ্যা শপথ) অতীতকালের কোন বিষয়ে জেনে বুঝে মিথ্যা শপথ করা। যেমন কোন কাজ করেছে, মিথ্যা শপথ করে বলল করিনি। অনুরূপ কোন কাজ করেনি, মিথ্যা শপথ করে বলল করেছি। এ প্রকার শপথ এতই মারাত্মক যে, দুনিয়াতে এর কোন কাফফারা নেই। এটা কবীরা গুনাহ যা তাওবাহ ব্যতীত ক্ষমা হবে না। ৩. منعقدة ঐ শপথকে বলে যা মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে এবং নিয়্যতসহ ভবিষ্যতে কোন কিছু করা বা না করার ব্যাপারে শপথ করে। শপথের কাফফারা: কেউ এ ধরণের শপথ করে ভঙ্গ করলে তার কাফফারা হল: ১. দশজন মিসকীনকে মধ্যম মানের খাদ্য খাওয়ানো যা নিজেরা খায়। অথবা প্রত্যেক মিসকিনকে অর্ধ সা করে খাদ্য প্রদান করবে। (আমাদের দেশের ওজন অনুপাতে প্রায় সোয়া এক কেজি)। (তাফসীর মুয়াসসার, পৃঃ ১২২) ২. অথবা দশজন দরিদ্রকে পোশাক প্রদান করা, যা দ্বারা সালাত আদায় করা যেতে পারে। কোন কোন আলিম খাদ্য ও পোশাক সমাজের প্রচলিত নিয়ম নীতিকে অনুসরণীয় মনে করেন। ৩. অথবা একজন দাস বা দাসী আযাদ করা। ইমাম শাওকানী (রহঃ) বলেন: আয়াতটি ব্যাপক। তাই দাস, মু’মিন হোক বা কাফির যেকোন একটি আযাদ করলেই হবে। (তাফসীর ফাতহুল কাদীর, অত্র আয়াতের তাফসীর) ৪. উল্লিখিত তিনটির যে কোন একটি পালনে অক্ষম হলে তাকে তিন দিন সওম বা রোযা পালন করতে হবে। তিনদিন ধারাবাহিকভাবে, না ভেঙ্গে ভেঙ্গে সওম রাখবে তা নিয়ে মতানৈক্য পাওয়া যায়। সঠিক কথা হল উভয় অবস্থাই বৈধ। (আয়সারুত তাফাসীর, ১/৫৬৪) অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা শপথকে সংরক্ষণ করতে বলেছেন। অর্থাৎ অযথা শপথ করা থেকে বিরত থাক, আর শপথ করে ফেললেই পরিপূর্ণভাবে পূর্ণ কর, অথবা পূর্ণ না করতে পারলে যথাযথ কাফফারা আদায় করে দাও। এ সম্পর্কে সূরা বাক্বারার ২২৫ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. শপথ আল্লাহ তা‘আলার একটি বিধান, তাই এ বিধান নিয়ে খেল-তামাশা করা উচিত নয়। ২. শপথ করে তা পালন না করতে পারলে কাফফারা দিতে হবে। ৩. অতীতকালীন কোন বিষয়ে মিথ্যা শপথ করলে তার কোন কাফফারা নেই বরং তা কবীরা গুনাহ হবে। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে তাওবা করতে হবে। ৪. শপথের ব্যাপারে সকলের সতর্ক থাকা উচিত, অযথা ও অহেতুক বিষয়কে কেন্দ্র করে আল্লাহ তা‘আলার নামে শপথ করা উচিত নয়, এতে আল্লাহ তা‘আলার সম্মান ক্ষুণœ হয়।

আল-মায়িদা 5:100

১০০ নং আয়াতের তাফসীর: কোন খারাপ বস্তু ভাল বস্তুর সমান নয়। যেমন কাফির মু’মিনের সমান নয়। পাপাচারী ব্যক্তি আনুগত্যশীল ব্যক্তির সমান নয়। অজ্ঞ জ্ঞানী ব্যক্তির সমান নয়। বিদআতী সুন্নাতের অনুসারী ব্যক্তির সমান নয়। হারাম মাল হালাল মালের সমান নয় যদিও খারাপের আধিক্য মানুষকে আকৃষ্ট করে। (তাফসীর মুয়াসসার পৃঃ ১২৪) এরূপ দৃষ্টান্ত দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (أَمْ نَجْعَلُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ كَالْمُفْسِدِيْنَ فِي الْأَرْضِ ز أَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِيْنَ كَالْفُجَّارِ) “যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে আমি কি তাদেরকে ঐসব লোকের সমান করে দেব, যারা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়? অথবা আমি কি মুত্তাক্বীদেরকে গুনাহগারদের সমান করে দেব?” (সূরা সাদ ৩৮:২৮) সুতরাং আধিক্য কোন জিনিসের ভাল বা সত্যের মাপকাঠি নয়। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. ভাল ও মন্দ সমান নয়। ২. আল্লাহকে ভয় করে চললেই বান্দার জীবনে সর্ব প্রকারের সফলতা আসে।

আল-মায়িদা 5:105

১০৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন বান্দাদেরকে নিজেদের সংশোধন করে নেয়া ও কল্যাণকর কাজ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। যারা নিজেদেরকে সংশোধন করে নিয়েছে এবং ভাল কাজে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, পথভ্রষ্টরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। তারা নিকটবর্তী হোক বা দূরবর্তী হোক। অনেকে এ আয়াত দ্বারা মনে করে নিজেরাই সংশোধন হয়ে ভাল কাজ করলেই হবে, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা দেয়ার প্রয়োজন নেই। এরূপ ধারণা ভুল। কারণ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা দেয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরয। এ ফরয ত্যাগ করলে অচিরেই আযাব আসতে পারে। আবূ বাকর (রাঃ)-এ আয়াতের মর্মার্থ যখন অবগত হলেন তখন তিনি বললেন: হে মানব সকল! তোমরা আয়াতকে ভুল জায়গায় ব্যবহার করছ। আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি “লোকেরা যখন কাউকে কোন পাপ কাজে লিপ্ত দেখে পরিবর্তন করার চেষ্টা করবে না তখন সম্ভবত আল্লাহ তা‘আলা অচিরেই আযাব দ্বারা পাকড়াও করবেন। (আহমাদ, তিরযিমী হা: ২১৭৮, আবূ দাঊদ হা: ৪৩৩৮, সহীহ ) সুতরাং আয়াতের সঠিক ভাবার্থ হল: অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বুঝানো সত্ত্বেও যদি তারা খারাপ কাজ থেকে বিরত না থাকে এবং সৎ পথ অবলম্বন না করে তাহলে এ অবস্থায় তোমাদের কোন ক্ষতি হবে না। তোমরা সৎ পথে আছ এবং পাপ হতে বিরত রয়েছে। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সর্ব প্রথম নিজেদেরকে সংশোধন করে নিয়ে সৎ পথে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। ২. সৎ পথে আহ্বান করতে হবে অসৎ পথ হতে বাধা দিতে হবে। ৩. দাওয়াত দেয়ার পর কেউ সৎ পথ অবলম্বন না করলে তার জন্য চিন্তার কারণ নেই।

আল-মায়িদা 5:109

১০৯ নং আয়াতের তাফসীর: কিয়ামতের দিন সকল নাবী-রাসূলদেরকে আল্লাহ তা‘আলা একত্রিত করে জিজ্ঞাসা করবেন তাদের উম্মাতের ব্যাপারে তারা তাদের থেকে কিরূপ জবাব বা সাড়া ও আচরণ পেয়েছে? অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (فَلَنَسْئَلَنَّ الَّذِيْنَ أُرْسِلَ إِلَيْهِمْ وَلَنَسْئَلَنَّ الْمُرْسَلِيْنَ)‏ “অতঃপর যাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করা হয়েছিল তাদেরকে আমি অবশ্যই জিজ্ঞাসা করব এবং রাসূলগণকেও জিজ্ঞাসা করব।”(সূরা আ‘রাফ ৭:৬) জবাবে তারা কিয়ামতের কঠিন পরিস্থিতি দেখে বলবে, এ ব্যাপারে আমাদের কোন জ্ঞান নেই। হাসান বসরী, সুদ্দী ও মুজাহিদ (রহ.) বলেন: কিয়ামতের ভয়াবহতা দেখে নাবীরা এ কথা বলবে। (ইবনু কাসীর ৩/২৫৬) আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. নাবী-রাসূলদেরকে উম্মাতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। ২. প্রকৃতপক্ষে গায়েবের সকল চাবিকাঠি আল্লাহ তা‘আলার কাছে, এর একমাত্র মালিক তিনিই। ৩. নাবী-রাসূলগণও গায়েব জানতেন না, শুধু ওয়াহীর মাধ্যমে তাদেরকে যতটুকু তথ্য দেয়া হত ততটুকুই তারা জানতেন।

আল-আনআম 6:122

১২২ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা একটি দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। যে মু’মিন ব্যক্তি মৃত তথা পথভ্রষ্ট ছিল অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাকে জীবিত তথা ঈমান দিলেন, হিদায়াত দান করলেন এবং কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী হবার তাওফীক দান করলেন, এ ব্যক্তির মত কি ঐ ব্যক্তি যে কুফরীর অন্ধকারে নিমজ্জিত ও সেখান থেকে বের হতে পারে না? না, কখনো তারা দু’জন সমান হতে পারে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَمَا يَسْتَوِي الْأَعْمٰي وَالْبَصِيْرُ - وَلَا الظُّلُمٰتُ وَلَا النُّوْرُ - وَلَا الظِّلُّ وَلَا الْحَرُوْرُ - وَمَا يَسْتَوِي الْأَحْيَا۬ءُ وَلَا الْأَمْوَاتُ) “আর সমান নয় অন্ধ ও দৃষ্টিমান ব্যক্তি এবং সমান নয় অন্ধকার ও আলো এবং সমান নয় ছায়া ও রৌদ্র। আর সমান নয় জীবিত ও মৃত।”(সূরা ফাতির ৩৫:১৯-২২) সুতরাং একজন মু’মিন ও একজন কাফির কখনো সমান হতে পারে না। বরং মু’মিনরাই সফলকাম ও মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ।

আল-আনআম 6:158

১৫৮ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদেরকে ধমক দিয়ে বলছেন, তারা কি নিদর্শনের অপেক্ষায় রয়েছে? জেনে রেখ! যেদিন নিদর্শন চলে আসবে সেদিন ঈমান আনলে কারো ঈমান কোন কাজে আসবে না যদি পূর্ব থেকে ঈমান না থাকে। কেননা তাওবাহ কবূল বা ঈমানের জন্য অন্যতম শর্ত হল: গরগরা আসার বা সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত হবার পূর্বে তাওবাহ বা ঈমান আনতে হবে। সহীহ হাদীস প্রমাণ করে যে, আয়াতে উল্লেখিত “তোমার প্রতিপালকের কোন নিদর্শন” দ্বারা উদ্দেশ্য হল পশ্চিামাকাশে সূর্য উদয়, এটাই অধিকাংশ মুফাসসিরদের উক্তি। (তাফসীর তাবারী ৮/৯৬-১০২, ইবনু কাসীর ৩/৩৩৬-৩৭১ ও কুরতুবী) ইমাম ত্বাবারী (রহঃ) উক্ত আয়াতের ব্যাপারে মুফাসসিরদের উক্তি উল্লেখ করার পর বলেন: এ মতগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সঠিক মত হচ্ছে যা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত হাদীস সমর্থিত, তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: এ ব্যাপারটি তখনই হবে যখন পশ্চিমাকাশে সূর্য উদয় হবে। (তাফসীর তাবারী ৮/১০৩) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: পশ্চিমাকাশে সূর্য উদয় না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। যখন সূর্য পশ্চিমাকাশে উদয় হবে তখন মানুষ তা দেখতে পাবে এবং সকলেই ঈমান আনবে। কিন্তু তখন কারো ঈমান উপকারে আসবে না, যদি পূর্ব থেকে ঈমান না এনে থাকে অথবা ঈমান আনার পর কোন সৎ আমল না করে থাকে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৩৫, ৬৫০৬) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেন: أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ جَعَلَ بِالْمَغْرِبِ بَابًا مَسِيرَةُ عَرْضِهِ سَبْعُونَ عَامًا لِلتَّوْبَةِ لَا يُغْلَقُ مَا لَمْ تَطْلُعْ الشَّمْسُ مِنْ قِبَلِهِ وَذَلِكَ قَوْلُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ { يَوْمَ يَأْتِي بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ لَا يَنْفَعُ نَفْسًا إِيمَانُهَا } আল্লাহ তা‘আলা তাওবার জন্য পশ্চিমে একটি দরজা খুলে রেখেছেন যার প্রস্থ সত্তর বছরের সমান। সেদিক থেকে (অর্থাৎ পশ্চিম) সূর্য উদয় না হওয়া পর্যন্ত তা বন্ধ করা হবে না। এদিকেই আল্লাহ তা‘আলা ইঙ্গিত করে বলেন: “যেদিন তোমার প্রতিপালকের কোন নিদর্শন আসবে সেদিন তার ঈমান কাজে আসবে না।”(তিরমিযী, হা: ৩৫৩৫, সহীহ। ইবনে কাসীর ৩/৩৬৯.) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি সূর্য পশ্চিম আকাশে উদয়ের পূর্বে তাওবাহ করবে তার তাওবাহ কবূল করা হবে। (মুসনাদ আহমাদ হা: ৭৬৯৭) তাই সময় ফুরিয়ে যাবার পূর্বে সময়ের মূল্যায়ন করা উচিত। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন ফায়সালা করার জন্য আসবেন, এখানে আল্লাহ তা‘আলার আগমন সিফাত বা গুণ প্রমাণিত হল, তবে আল্লাহ তা‘আলার আগমন কিরূপ তা তিনিই ভাল জানেন, আমরা জানিনা। ২. কিয়ামতের অন্যতম একটি বড় আলামত পশ্চিমাকাশে সূর্যোদয় হওয়া, এ আলামত প্রকাশ হবার পর ঈমান আনলে কোন কাজে আসবে না। ৩. আল্লাহ তা‘আলা উপরে আছেন, যদি সর্বত্র থাকতেন তাহলে আসার কথা উল্লেখ করা হত না।

আল-আরাফ 7:26

২৬ নং আয়াতের তাফসীরঃ মানুষের ওপর আল্লাহ তা‘আলার অন্যতম অনুগ্রহ হল তিনি তাদের লজ্জাস্থান ঢাকার ও সৌন্দর্যের জন্য পোশাক দান করেছেন। ريشا হল সেই পোশাক যা সৌন্দর্য প্রকাশ ও বেশ ভষণের জন্য পরিধান করা হয়। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: ريش হল সম্পদ। (সহীহ বুখারী, অত্র আয়াতের তাফসীর) (وَلِبَاسُ التَّقْوٰي ذٰلِكَ خَيْرٌ) ‘আর তাক্বওয়ার পোষাক, এটাই সর্বোত্তম’ আয়াতের এ অংশের অর্থ কী তা নিয়ে অনেক মতামত পাওয়া যায়- ইকরামা (রহঃ) বলেন: মুত্তাকিরা কিয়ামতের দিন যা পরিধান করবে। ইবনু জুরাইজ বলেন: তা হল ঈমান। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: তাক্বওয়ার লিবাস; তা হল সৎ আমল। আল্লামা সা‘দী (রহঃ) বলেন: তা হল অন্তর ও রূহের সৌন্দর্য। (তাফসীর সা’দী: পৃঃ ২৮৪) সঠিক কথা হল আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশিত আমল বাস্তবায়ন করা এবং তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকা। এটাই মু’মিনের জন্য উত্তম পোশাক। (তাফসীর মুয়াসসার, পৃঃ ১৫৩) অতএব যে উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহ তা‘আলা পোশাক দিলেন সে উদ্দেশ্য যেন কোনক্রমেই নষ্ট না করি এবং অশ্লিল ও বের্পদা হয়ে নিজেদেরকে পণ্যের মত প্রদর্শন করে না বেড়াই।

আল-আরাফ 7:31

৩১ নং আয়াতের তাফসীর: শানে নুযূল: ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: জাহিলী যুগে জনৈক মহিলা উলঙ্গ অবস্থায় বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করছিল আর বলছিল: কে আমাকে উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করতে সহযোগিতা করবে? তার লজ্জাস্থানে মাত্র এক টুকরা কাপড় রেখে বলছিল: الْيَوْمَ يَبْدُو بَعْضُهُ أَوْ كُلُّهُ فَمَا بَدَا مِنْهُ فَلاَ أُحِلُّهُ আজ কিছু বা সম্পূর্ণ উলঙ্গ হবে, যা কিছু প্রকাশ পাবে তা ঢাকব না, তখন এ আয়াত নাযিল হয়। (সহীহ মুসলিম হা: ৩০২৬) অন্য বর্ণনায় রয়েছে: জাহিলী যুগের মহিলারা উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করত, তবে হুমস ব্যতীত। হুমস হল কুরাইশ ও তাদের সন্তানাদি। এরা উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করত না, বরং তাদের পুরুষেরা তাওয়াফ করতে আগত পুরুষদের জন্য কাপড় দিত, আর মহিলারা আগত মহিলাদের কাপড় দিত। হুমস- তারা মুযদালেফায় যেত না, সব মানুষ আ‘রাফাতে অবস্থান করত। (সহীহ মুসলিম হা: ১২১৯) আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের মনগড়া বিধানের প্রতিবাদ করে মানব জাতির জন্য বিধান দিলেন যেন প্রত্যেকে সালাতের সময় সৌন্দর্য গ্রহণ তথা ভাল পোশাক পরিধান করে। বিশেষ করে জুমু‘আর দিন ও ঈদের দিন। সুগন্ধি ব্যবহার সৌন্দর্যের অন্তর্ভুক্ত। আর মিসওয়াক করা তার পরিপূর্ণতা। সর্বোত্তম পোশাক হল সাদা পোশাক। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: তোমরা সাদা পোশাক পরিধান কর, কেননা পোশাকের মাঝে সাদা পোশাক উত্তম এবং এর দ্বারা মৃতদের কাফন দাও। (আবূ দাঊদ হা: ৪০৬১, তিরমিযী হা: ৯৯৪, সহীহ) مَسْجِدٍ মাসজিদ বলতে সালাতের সময়কে বুঝানো হয়েছে। (وكُلُوْا وَاشْرَبُوْا وَلَا تُسْرِفُوْا) ‘খাও এবং পান কর’ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: যত ইচ্ছা খাও এবং যত ইচ্ছা পরিধান কর। তবে অপচয় ও অহংকার করলে তুমি ভুল করবে। (সহীহ বুখারী, পোশাক অধ্যায়) অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন: আল্লাহ তা‘আলা খাওয়া ও পান করা হালাল করেছেন যদি তাতে অপচয় ও অহংকার না হয়। (তাবারী ১২/৩৯৪, হা: ১৪৫২৯) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: তোমরা খাও, পান কর এবং দান কর, তবে অহংকার করে নয় ও অপচয় করে নয়। কারণ আল্লাহ তা‘আলা নেয়ামতের ব্যবহার বান্দার কাছ থেকে দেখতে চান। (ইবনু মাযাহ হা: ৩৬০৫, হাসান) সুতরাং অপচয় সকল ক্ষেত্রে অপছন্দনীয়, এ জন্যই বলা হয়েছে; “অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই” (সূরা ইসরা ১৭:২৭)। অপচয় দু’ভাবে হতে পারে; নষ্ট করার মাধ্যমে এবং অতিরিক্ত ব্যয় করার মাধ্যমে। তাই এ থেকে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সালাতের জন্য সাধ্যপক্ষে ভাল পোশাক পরিধান করা কর্তব্য। সেই সাথে সুগন্ধি ব্যবহার ও মিসওয়াক করা মুস্তাহাব। ২. অপচয় করা হারাম। এ থেকে আমাদের অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে।

আল-আরাফ 7:54

৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রুবুবিয়্যাহ ও অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করেছেন। তিনি ছয়দিনে আকাশসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এ ছয় দিন হল রবিবার, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার। শুক্রবারে আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছেন। শনিবার সম্পর্কে বলা হয় এ দিনে কোন কিছু সৃষ্টি করেননি। এ জন্যই এ দিনকে يوم السبت বা শনিবার বলা হয়। سبت অর্থ ছিন্ন করা। অর্থাৎ এ দিনে সৃষ্টির কাজ ছিন্ন বা শেষ ছিল। (তাফসীর ইবনু কাসীর , সা‘দী, অত্র আয়াতের তাফসীর) তবে শনিবার সৃষ্টি সূচনা করেছেন বলেও বর্ণনা পাওয়া যায়। (সহীহ মুসলিম হা: ৭২৩১) এ সম্পর্কে ইমাম ইবনু জারীর (রহঃ) তিনটি মত বর্ণনা করেছেন। (১) তাওরাতধারীরা বলে: রবিবারে সৃষ্টির কাজ শুরু করা হয়েছে, (২) ইঞ্জিলধারীরা বলে: সোমবারে শুরু করা হয়েছে। (৩) আর আমরা মুসলিমরা বলি, আল্লাহ তা‘আলা শনিবার সৃষ্টির কাজ শুরু করেছেন। কাজ শেষ করেছেন শুক্রবারে। তবে এ দিনগুলো কি দুনিয়ার দিনের সমান সময়বিশিষ্ট, না অন্য কিছু? এ সম্পর্কে ইবনু আব্বাস, মুজাহিদ ও কা‘ব আল আহবার (রহঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা যে ছয়দিনে আকাশ-জমিন সৃষ্টি করেছেন তার একদিন দুনিয়ার এক হাজার দিনের সমান যা আমরা গণনা করে থাকি। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, ইবনু জারীর (রহঃ)-সহ অনেকে এ মত সমর্থন করেছেন। তবে অধিকাংশ আলেম বলেন: আল্লাহ তা‘আলা যে ছয়দিনে আকাশ-জমিন সৃষ্টি করেছেন তা দুনিয়ার যেটুকু সময় নিয়ে আমরা দিন গণনা করি তারই সমান, এক হাজার দিনের সমান নয়। ছয় দিনে আকাশ-জমিন সৃষ্টির হিকমত কী? কারণ আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করতঃ কুন (হয়ে যাও) বললেই তো হয়ে যায়। এ প্রশ্নের জবাব হল- এর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদেরকে যে কোন কাজ সহনশীলতা ও ধীর-স্থিরতার সাথে সম্পন্ন করা শিক্ষা দিচ্ছেন। (ফাতহুল মাজীদ ফী তাফসীরে সূরাতুল হাদীদ, ড. আওজ মুহাম্মাদ ইউসুফ, আজহার বিশ্ববিদ্যালয়) (ثُمَّ اسْتَوٰي عَلَي الْعَرْشِ) ‘অতঃপর তিনি আরশের ওপর সমুন্নত হলেন।’ আল্লাহ তা‘আলার অবস্থান সম্পর্কে এরূপ আরও ৭টি আয়াত রয়েছে। সূরা ইউনুস ৩, সূরা রাদ ২, ত্বা-হা- ৫, ফুরকান ৫৯, সিজদাহর ৪-৫ এবং হাদীদের ৪ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। এ সাতটি আয়াতেই الْعَرْشُ ‘আরশ’ শব্দের পরে عَلَي বা উপরে অব্যয়টি ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ হল আরশের ওপর। اسْتَوَي শব্দটি ৪টি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে বলে সালাফদের থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়: (১) صَعِدَ (২) اِرْتَفَعَ (৩) عَلَا এ তিনটির অর্থ একই তথা উপরে উঠা (৪) اِسْتَقَرَّ এর অর্থ ভিন্ন। আরবি ভাষাবিদগণ এ বিষয়ে একমত যে, যখন اسْتَوَي শব্দটি عَلَي অব্যয়যোগে ব্যবহার হবে তখন এর অর্থ একটাই হবে- তা হল উপরে উঠা। (শরহুল আকীদাহ ওয়াসিতিয়্যা পৃঃ ২৩৭) আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপর রয়েছেন- এ ব্যাপারে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হল: সাহাবী মু‘আবিয়াহ বিন হাকাম আস সুলামী (রাঃ) যখন রাসূল (সাঃ) এর কাছে তাঁর দাসীকে আযাদ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন তখন রাসূল (সাঃ) বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। মু‘আবিয়াহ বিন হাকাম (রাঃ) বলছেন; আমি সেই দাসীকে নিয়ে আসলাম। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেই দাসীটিকে লক্ষ করে বললেন: أين الله؟ قالت: في السماء، قال: من أنا؟ قالت: أنت رسول الله، قال: أعتقها، فإنها مؤمنة অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা কোথায়? দাসী বলল: আকাশের উপর। তিনি (সাঃ) আবার বললেন: আমি কে? দাসী বলল: আপনি আল্লাহর রাসূল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: তাকে আযাদ করে দাও, সে মু’মিনা নারী। (সহীহ মুসলিম হা: ২২২৭) এ সকল আয়াত ও হাদীসের আলোকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের এটাই আকীদাহ, আল্লাহ তা‘আলা স্বস্বত্ত্বায় আরশের ওপর আছেন; সেখান থেকে তিনি সবকিছু দেখছেন, শুনছেন, জানছেন। তিনি সর্বত্র বিরাজমান নন। তিনি তাঁর শ্রবণ, দর্শন ও জ্ঞানের দিক দিয়ে আমাদের সাথে রয়েছেন। কিন্তু আরশের ওপর কিভাবে আছেন তা আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল (সাঃ) আমাদের জানাননি; তাই আমরা জানি না। এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা নিষেধ। ইমাম মালিক (রহঃ)-কে যখন জিজ্ঞাসা করা হল, আল্লাহ তা‘আলা আরশে কিভাবে আছেন? তিনি জবাবে বললেন: আল্লাহ তা‘আলা আরশের উপরে আছেন তা জানা কথা। কিন্তু কিভাবে আছেন তা অজ্ঞাত, এ ব্যাপারে ঈমান রাখা ওয়াজিব এবং প্রশ্ন করা বিদআত। আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপর রয়েছেন- এ কথা যারা মানতে পারে না তারা বিভিন্ন যুক্তি-প্রমাণ পেশ করে থাকে। সালাফগণ তাদের যথার্থ উত্তর দিয়ে আল্লাহ তা‘আলার আরশের ওপর অবস্থান সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহ যেভাবে সংবাদ দিয়েছে সেভাবে প্রমাণিত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলার আরশের হাকীকত ও ধরন তিনি ছাড়া কেউ জানে না। (يَطْلُبُه حَثِيْثًا) ‘তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে’- حثيثا এর অর্থ হল: অতি দ্রুত গতিতে। অর্থাৎ একটির পর দ্বিতীয়টি দ্রুত চলে আসে। দিনের আলো এলে রাতের অন্ধকার সঙ্গে সঙ্গেই নিঃশেষ হয়ে যায় এবং রাত এলে দিনের আলোও নিভে যায়। চন্দ্র-সূর্য তারকারাজি সব কিছুই আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশের অধীন। তিনি যেভাবে পরিচালনা করেন সেভাবেই হয়। এসব আল্লাহ তা‘আলার বড় বড় মাখলুক, এসব জিনিস দ্বারা তাকে চেনা যায়। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। ২. আল্লাহ তা‘আলা স্বস্বত্ত্বায় আরশের ওপর আছেন, সর্বত্র বিরাজমান নন। সবকিছুই আল্লাহ তা‘আলার আজ্ঞাধীন।

আল-আরাফ 7:167

১৬৭ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহূদীদের ব্যাপারে বলেছেন, অবশ্যই তিনি কিয়ামত পর্যন্ত এমন লোক প্রেরণ করবেন যারা ইয়াহূদীদেরকে তাদের নাফরমানী, আল্লাহ তা‘আলার নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করা এবং শরীয়তের অপব্যাখ্যা করার কারণে কিয়ামত পর্যন্ত কঠিন শাস্তি দিতে থাকবে। আলী বিন আবূ তালহা বলেন: এটা হল তাদের ওপর জিযিয়া, আর যারা তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেবে তারা হল মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর উম্মাত। (তাফসীর তাবারী, হা: ১৫২৯৯) প্রমাণ: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনা থেকে এসব ইয়াহূদীদেরকে বিতাড়িত করে দিয়েছিলেন এবং উমার (রাঃ) ও বিতাড়িত করে দিয়েছিলেন। আজও এ ইয়াহূদীরা যাযাবরের মত ঠিকানাহীন ঘুরে বেড়াত যদি ফিলিস্তিনের মুসলিমরা আশ্রয় না দিত। যা আল্লাহ তা‘আলা ভবিষ্যত বাণী করেছেন: (ضُرِبَتْ عَلَیْھِمُ الذِّلَّةُ اَیْنَمَا ثُقِفُوْٓا اِلَّا بِحَبْلٍ مِّنَ اللہِ وَحَبْلٍ مِّنَ النَّاسِ وَبَا۬ءُوْ بِغَضَبٍ مِّنَ اللہِ وَضُرِبَتْ عَلَیْھِمُ الْمَسْکَنَةُﺚ ذٰلِکَ بِاَنَّھُمْ کَانُوْا یَکْفُرُوْنَ بِاٰیٰتِ اللہِ وَیَقْتُلُوْنَ الْاَنْۭبِیَا۬ئَ بِغَیْرِ حَقٍّﺚ ذٰلِکَ بِمَا عَصَوْا وَّکَانُوْا یَعْتَدُوْنَ)‏ “আল্লাহ তা‘আলার প্রতিশ্র“তি ও মানুষের প্রতিশ্র“তির বাইরে যেখানেই তাদের পাওয়া গেছে সেখানেই তারা লাঞ্ছিত। এবং তারা আল্লাহ তা‘আলার ক্রোধে পতিত হয়েছে এবং তাদের ওপর দারিদ্র নিপতিত হয়েছে। এসব এজন্য যে, তারা আল্লাহ তা‘আলার আয়াতকে অস্বীকার করেছে এবং নাবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। আর এ কারণেও যে, তার সীমালঙ্ঘন করেছে।” (সূরা আলি ইমরান ৩:১১২) নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা শাস্তি দানে দ্রুততর এবং তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. ইয়াহূদীদের ওপর কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলার অভিশাপ। ২. দুনিয়া ও পরকাল উভয় জগতে এদের লাঞ্ছনা।

আল-আরাফ 7:180

১৮০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা‘আলার সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে সেসব নাম দিয়ে তাঁকে ডাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। আর যারা তাঁর নামে ইলহাদ করে তাদেরকে বর্জন করার নির্দেশ দিচ্ছেন। আল্লাহ তা‘আলার সকল নামই সুন্দর। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার প্রতিটি নামই পরিপূর্ণ গুণাবলীর ওপর প্রমাণ বহন করে। এজন্য তাঁর প্রতিটি নাম উত্তম ও সুন্দর। যেমন ‘আলীম’ অর্থাৎ সকল বিষয়ের ও জিনিসের ব্যাপারে তাঁর জ্ঞান পরিব্যাপ্ত, কোন জিনিস তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলার নিরানব্বইটি নাম রয়েছে অর্থাৎ একশ; একটি ব্যতীত। যে ব্যক্তি তা গণনা করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তা‘আলা বেজোড় তিনি বেজোড়কে ভালবাসেন। (সহীহ বুখারী হা: ৬৪১০, সহীহ মুসলিম হা: ২৬৭৭) গণনার অর্থ হল নামগুলোর প্রতি যথাযথ ঈমান আনা, এক একটি ইসলামের সাথে বরকতের জন্য পাঠ করা, তা মুখস্ত করা, তাঁর অর্থ বুঝা, সেসব গুণে গুণান্বিত হওয়া এবং কোন প্রকার বিকৃতি না করা। (মিরকাত ৫/৭১, মিশকাত) তবে এ নিরানব্বইটি নামের মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার নাম সীমাবদ্ধ নয় বরং এ ছাড়াও আল্লাহ তা‘আলার অনেক নাম রয়েছে যা তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: হে আল্লাহ তা‘আলা! আমি তোমার প্রত্যেক ঐ নামের ওয়াসীলায় চাচ্ছি যদ্বারা তোমার নিজের নাম রেখেছ অথবা তোমার কোন মাখলুককে তা জানিয়েছ অথবা তোমার কিতাবে নাযিল করেছ অথবা যা নিজের কাছে গোপন রেখেছ। (আহমাদ ১/৩৯১, আহমাদ শাকের বলেন, সহীহ, ৫/পৃঃ ২৬৬) (وَذَرُوا الَّذِيْنَ يُلْحِدُوْنَ) ‘যারা তাঁর নাম বিকৃত করে তাদেরকে বর্জন কর’ - الحاد (ইলহাদ)-এর অর্থ হল একদিকে ঝুঁকে পড়া। দীনের মধ্যে ইলহাদ হল, বক্রপথ অবলম্বন করা বা ধর্মত্যাগী হওয়া। আল্লাহ তা‘আলার নামে ইলহাদ করা তিনভাবে হতে পারে- ১. আল্লাহ তা‘আলার নামের পরিবর্তন করা, যেমন মুশরিকরা করত। উদাহারণস্বরূপ আল্লাহ তা‘আলা থেকে লাত। আযীয থেকে উযযা ইত্যাদি। ২. আল্লাহ তা‘আলার নামে মনগড়া অতিরিক্ত সংযোজন করা যা তিনি আদেশ করেননি বা অপব্যাখ্যা করা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বলেছেন: (يَدُ اللّٰهِ فَوْقَ أَيْدِيْهِمْ) “আল্লাহ তা‘আলার হাত তাদের হাতের ওপর।” এখানে বলা যে, আল্লাহ তা‘আলার কুদরতী হাত তাদের হাতের ওপর। ৩. তার নাম কম করে দেয়া। যেমন তাকে একটি নির্দিষ্ট নামেই ডাকা। (ফাতহুল কাদীর, ২/৩৪৪) সুতরাং কুরআন ও সহীহ হাদীসে আল্লাহ তা‘আলার যে সকল সিফাত বা গুণাবলী এসেছে তা কোন প্রকার পরিবর্তন পরিবর্ধন ও বিকৃতি না করে স্বস্থানে বহাল রেখে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. আল্লাহ তা‘আলার সুন্দর সুন্দর নামসমূহ হিফয ও আমল করার নামই গণনা করা, এর ফযীলত রয়েছে। ২. যারা আল্লাহ তা‘আলার নামে ইলহাদ করে তাদের বর্জন করা আবশ্যক। ৩. ইলহাদের অর্থ জানলাম।

আল-আনফাল 8:1

নামকরণ ও প্রাসঙ্গিক কথা: الْاَنْفَالُ শব্দটি نَفْلٌ এর বহুবচন, অর্থ অতিরিক্ত। আনফাল ঐ সম্পদকে বলা হয় যা কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করে মুসলিমদের হস্তগত হয়। একে গনীমতের মালও বলা হয়। তবে একে আনফাল বলা হয় এ জন্য যে, যুদ্ধলব্ধ মাল পূর্ববর্তী জাতিদের জন্য হারাম ছিল, শুধু এ উম্মাতের জন্য তা হালাল করা হয়েছে তাই একে অতিরিক্ত হালাল বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: (وَأُحِلَّتْ لِيَ الْغَنَائِمُ وَلَمْ تَحِلَّ لِأَحَدٍ قَبْلِيْ) আমার জন্য গনীমত হালাল করে দেয়া হয়েছে, অথচ আমার পূর্বে কারো জন্য তা হালাল ছিল না। এ সূরার প্রথম আয়াতে আনফাল শব্দটি উল্লেখ রয়েছে, সূরাটিতে আনফালের বিধি-বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে বলে এ নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এ সূরাকে সূরা বদরও বলা হয়। (ফাতহুল কাদীর, ২/৩৫৯) এ সূরাটি মদীনায় অবতীর্ণ। তবে ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: সাতটি আয়াত ব্যতীত। তা হল ... (وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا) থেকে পরবর্তী সাত আয়াত (৩০-৩৭) পর্যন্ত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মাগরিবের সালাতে এ সূরা তেলাওয়াত করতেন। (মাযমাউয যাওয়ায়েদ, ২/১১৮, সহীহ, ফাতহুল কাদীর, ২/৩৫৯) সাঈদ বিন যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ)-কে সূরা আনফালের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেন: এটা বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৪৫) শানে নুযূল: সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: বদরের দিন আমার ভাইকে হত্যা করা হয়। ফলে তার বদলে আমি সাঈদ বিন আসকে হত্যা করলাম। অতঃপর তার তরবারী নিয়ে নাবী (সাঃ)-এর নিকট আসলাম। নাবী (সাঃ) বললেন: যাও, এটা যেখান থেকে এনেছ সেখানে রেখে দাও! আমি ফিরে আসলাম কিন্তু আমার ভাইকে হত্যা ও আমার পাওয়া তরবারী নিয়ে নেয়ার কারণে আমার যে অবস্থা হয়েছিল তা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কেউ জানে না। কিছু জায়গা অতিক্রম করার পরেই সূরা আনফাল অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ আহমাদ ১/৪৮০, সনদ সহীহ) অন্য বর্ণনায় রয়েছে: সা‘দ (রাঃ) বলেন: বদরের দিন আমি একটি তরবারী নিয়ে আসলাম এবং বললাম, হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাঃ)! আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের থেকে আমার অন্তরকে মুক্ত করেছেন, সুতরাং আমাকে এ তরবারীখানা দিয়ে দিন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: এটা তোমারও না, আমারও না। আমি বললাম: সম্ভবত আমার মত কষ্টের সম্মুখিন হয়নি এমন কাউকে দিয়ে দেয়া হবে। তারপর আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাঃ) আমার কাছে আসলেন এবং বললেন: তুমি যখন তরবারী চেয়েছিলে তখন তার মালিক আমি ছিলাম না, এখন আমার হয়েছে তাই আমি তা তোমাকে দিয়ে দিলাম। তখন এ সূরা নাযিল হয়। (তিরমিযী হা: ৩০৭৯, আবূ দাঊদ হা: ২৭৪০ হাদীসটির মূল সহীহ মুসলিমে বিদ্যমান।) এ ছাড়াও আরো শানে নুযূল পাওয়া যায়। (বিস্তারিত দ্র: তাফসীর ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর) আল্লাহর নামে শুরু করছি, যিনি পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু। ১ নং আয়াতের তাফসীরঃ শানে নুযূল: এ আয়াতের কয়েকটি শানে নুযূল পাওয়া যায় তার মধ্যে দুটি উল্লেখ করা হল: ১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: নাবী (সাঃ) বলেছেন: যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করবে তার জন্য এই এই রয়েছে। যে ব্যক্তি কাউকে বন্দি করবে তার জন্য এই এই রয়েছে। তখন বৃদ্ধরা ঝাণ্ডা নিয়ে বসে রইল আর যুবকরা গনীমতের আশায় হত্যা করার জন্য দ্রুত ধাবিত হল। তখন বৃদ্ধরা যুবকদের বলতে লাগল: তোমাদের সাথে আমাদেরকেও শরীক করিও। কেননা আমরাও তোমাদের পিছনে ছিলাম। তোমাদের কেউ ক্ষত-বিক্ষত হলে আমাদের কাছে এসেছ। অতঃপর তারা এ বিবাদ নিয়ে নাবী (সাঃ)-এর নিকট আগমন করল। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (আবূ দাঊদ হা: ২৭৩৭, সহীহ) ২. সা‘দ বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি বদরের দিন একটি তরবারী নিয়ে এসে বললাম: হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা আজ আমার অন্তরকে মুশরিকদের থেকে পরিচ্ছন্ন করেছেন। এ তরবারী খানা আমাকে দিন। তিনি (সাঃ) বললেন: এ তরবারী তোমারও না আমারও না। আমি বললাম: হয়তো এ তরবারী এমন কাউকে দেয়া হবে যে আমার মত বিপদের সম্মুখীন হয়নি। তারপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমার কাছে আসলেন এবং বললেন: তুমি আমার কাছে এ তরবারীটি চেয়েছিলে কিন্তু তখন সেটা আমার ছিল না; এখন এটা আমার হয়েছে তাই তোমাকে তা দিয়ে দিলাম। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সহীহ মুসলিম হা: ১৭৪৮, তিরমিযী হা: ৩০৭৯, আবূ দাঊদ হা: ২৭৪০, সহীহ) আনফাল দ্বারা উদ্দেশ্য কী এ ব্যাপারে আলিমদের পাঁচটি উক্তি পাওয়া যায়। এ পাচঁটি উক্তি আল্লামা শানক্বীতি (রহঃ) স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করার পর বলেন: আমার কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য কথা হল যা ইমাম কুরতুবী (রহঃ) তাঁর তাফসীর গ্রন্থে জমহুরদের উদ্বৃতি দিয়ে বলেন: (وَاعْلَمُوْآ أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ) এ আয়াত দ্বারা (يَسْئَلُوْنَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ) এ আয়াতটি রহিত হয়ে গেছে। তবে আবূ উবায়দা (রাঃ) বলেছেন যে, বদরের গনীমত পাঁচ ভাগ করা হয়নি। কেননা আয়াতটি বদরের গনীমত বণ্টনের পর অবতীর্ণ হয়েছে এ কথা সঠিক নয়। কারণ আলী (রাঃ) হতে প্রমাণিত যে, তিনি বলেন: বদরের গনীমতের মাল থেকে প্রাপ্য অংশ হিসেবে আমার একটি উটনী ছিল। রাসূলুল্লাহ (রাঃ) সেদিন আমাকে গনীমতের মালের এক পঞ্চমাংশ থেকে উটনীটি দিয়েছিলেন। (সহীহ মুসলিম হা: ১৯৭৯) মোটকথা (وَاعْلَمُوْآ أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ) ৪১ নং আয়াতটি প্রমাণ করছে আয়াতের শুরুতে যে গনীমতের মাল রাসূলের (সাঃ) ব্যাপারে বলা হয়েছে তা শুধু রাসূলের (সাঃ) সাথে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পাঁচ ভাগের এক ভাগ রাসূলের (সাঃ) এর জন্য আর বাকি চার ভাগ যোদ্ধাদের জন্য। (আযওয়াউল বায়ান, অত্র আয়াতের তাফসীর) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) চারটি পদ্ধতিতে সাহাবীদের মাঝে গনীমতের মাল বন্টন করে দিতেন। ১. এ কথা ঘোষণা করে দেয়া যে, যে ব্যক্তি কোন বিরোধী শত্রুকে হত্যা করবে- নিহত ব্যক্তির সামগ্রী যা তার সাথে থাকবে সেগুলো হত্যাকারী পাবে। এসব সামগ্রী গনীমতের সাধারণ মালের সাথে জমা হবে না। ২. বড় কোন সৈন্যদল থেকে কোন দলকে পৃথক করে কোন বিশেষ দিকে জিহাদ করার জন্য পাঠিয়ে দেয়া এবং এমন নির্দেশ দেয়া যে, এদিক থেকে যেসব গনীমত আসবে সেগুলো উল্লিখিত বিশেষ দলের জন্য নির্দিষ্ট হবে যারা সে অভিযানে অংশগ্রহণ করবে। তবে এতে শুধু এতটুকু করতে হবে যে, সমস্ত মালামাল থেকে এক পঞ্চমাংশ সাধারণ মুসলিমদের প্রয়োজনে বায়তুল মালে জমা দিতে হবে। ৩. বায়তুল মালে গনীমতের যে এক পঞ্চমাংশ জমা করা হয়, তা থেকে কোন বিশেষ যোদ্ধাকে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য প্রতিদান হিসেবে আমীরের কল্যাণ বিবেচনা অনুযায়ী কিছু দান করা। ৪. গনীমতের সমস্ত মাল থেকে কিছু অংশ পৃথক করে নিয়ে সেবক লোকেদের মধ্যে পুরস্কারস্বরূপ দান করা, যারা মুজাহিদ বা সৈনিকদের ঘোড়া প্রভৃতির দেখাশুনা করে এবং তাদের বিভিন্ন কাজে সাহায্য করে। (তাফসীর ইবনু কাসীর) পরিশেষে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করা, নিজেদের মাঝে সদভাব স্থাপন এবং আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ দিচ্ছেন। নিজেদের মাঝে সদভাব স্থাপনের অন্যতম উপায় হল: পরস্পর ভাল ব্যবহার করা, কারো দ্বারা মন্দ কিছু ঘটে গেলে ক্ষমা করে দেয়া, অপরের দোষত্র“টি না খোঁজা ও পরনিন্দা না করা ইত্যাদি। আর আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের আনুগত্য করার ব্যাপারটি তো ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোন মু’মিন আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের বাইরে যেতে পারে না। এটাই ঈমানের পরিচয়। সুতরাং সকল মু’মিনের উচিত দীনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে। আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণে কোন কাজ করবে না এবং তাদের নির্দেশ বহির্ভূত কোন আমল করবে না। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. গনীমতের সম্পদ পূর্ববর্তী সকল উম্মাতের জন্য হারাম ছিল, যা আমাদের জন্য হালাল; তাই তাকে গনীমত বলা হয়। ২. নিজেদের মাঝে সদভাব স্থাপনের অন্যতম মাধ্যম হল: পরস্পর ভাল ব্যবহার করা ও অনাকাক্সিক্ষত কিছু ঘটে গেলে ক্ষমা করে দেয়া। ৩. তাক্বওয়া বা আল্লাহ তা‘আলা ভীতি সৌহার্দ্য ও ঐক্যের প্রতীক।

আল-আনফাল 8:41

৪১ নং আয়াতের তাফসীরঃ এ আয়াতে গনীমতের মাল বণ্টন পদ্ধতির বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। গনীমত ও ফাঈ এর মধ্যে ফকিহগণ পার্থক্য করেছেন। এখানে গনীমতের সম্পদ বণ্টন পদ্ধতি উল্লেখ করা হল। ফাঈ এর আলোচনা সূরা হাশরে আসবে- ইনশা-আল্লাহ। গনীমত হল যা শত্রুদের থেকে যুদ্ধ শেষে প্রাপ্ত হয়। এ সম্পদ পাঁচভাগে ভাগ করা হবে। চার ভাগ মুজাহিদদের মাঝে সমানভাবে বণ্টন করে দিতে হবে। তাতে পদাতিক বাহিনীকে একভাগ আর অশ্বারোহী বাহিনীকে তিন ভাগ দিতে হবে। একভাগ তার, আর দুইভাগ ঘোড়ার। ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ঘোড়ার দুই অংশ ও মালিকের জন্য এক অংশ নির্ধারণ করেছেন। (সহীহ বুখারী হা: ২৮৬৩) আর পাঁচভাগের একভাগ আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্য। এ এক ভাগকে আবার পাঁচভাগে ভাগ করা হবে। প্রথমভাগ আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্য। এ সম্পদ মুসলিমদের কল্যাণকর কাজে ব্যয় করা হবে। দ্বিতীয়ভাগ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকটাত্মীয়দের জন্য। তারা হল বানী হাশেম ও বানী মুত্তালিব। যাদের জন্য যাকাতের মাল হারাম। তৃতীয়ভাগ ইয়াতীমদের জন্য। চতুর্থভাগ মিসকিনদের জন্য যারা গরীব দুঃখী অসহায়। পঞ্চমভাগ: পথিকদের জন্য। একথাই নাবী (সাঃ) বলেছেন: একপঞ্চমাংশ তোমাদের মধ্যে ফেরত দেয়া হবে। (সহীহ নাসাঈ হা: ৪১৪৯, সহীহ।) (يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَي الْجَمْعَانِ) ‘মীমাংসার দিনে, যেদিন উভয় সেনা দল মুখোমুখি হয়েছিল’“ফায়সালার দিন”বলতে হক বাতিলের মাঝে চূড়ান্ত ফায়সালার দিন, আর সে দিন হল বদর যুদ্ধের দিন। কারণ মুসলিম ও কাফিরদের মাঝে এটাই প্রথম ধর্মযুদ্ধ যাতে ইসলাম বিজয়ী হয়েছিল এবং ইসলাম ও কুফরীর মাঝে প্রকাশ্যে ফায়সালা হয়ে গিয়েছিল। আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. গনীমতের সম্পদ বণ্টন নীতি জানলাম। ২. বদরের দিনকে ফায়সালার দিন বলার কারণ অবগত হলাম।

আত-তাওবা 9:37

৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদেরকে ভর্ৎসনা করেছেন। কারণ তারা খারাপ চিন্তাধারা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার শরীয়াতে হস্তক্ষেপ করত। অশ্লীল প্রবৃত্তি দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার বিধানকে পরিবর্তন করত এবং আল্লাহ তা‘আলা যা হালাল করেছেন তা হারাম আর যা হারাম করেছেন তা হালাল করে নিত। প্রাক ইসলামী যুগে মুশরিকরা তাদের সুবিধার্থে মুহাররাম মাসকে সফর মাসে নিয়ে যেত। ফলে মুহাররাম মাসকে হালাল মনে করে লুণ্ঠন, হত্যা ও লুটপাট চালাত। النَّسِیْ۬ ئُ হারাম মাসের যে কোন সময়ে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও হত্যা হালাল করে নেয়ার জন্য মুশরিকরা মনগড়া যে অপকৌশল গ্রহণ করত তাকেই ‘নাসী’ বলা হয়। এর দ্বারা তাদের কুফরী ও পথভ্রষ্টতা আরো বৃদ্ধি পায়। কারণ: ১. এসব নিজেদের তৈরি করা, যা আল্লাহ তা‘আলার নির্ধারিত শরীয়তের বহির্ভূত। ২. তারা হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল বানিয়ে নিয়েছে। ৩. পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে দীনের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার বান্দাদের ধোঁকা দিচ্ছে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. হারামকে হালাল করার জন্য শরীয়তে অপকৌশল গ্রহণ করা হারাম। ২. শয়তান কাফিরদের কাছে খারাপ আমল সুশোভিত করে দিয়েছে। ৩. নিজেদের সুবিধা হাসিলের জন্য ইসলামী শরীয়তে হস্তক্ষেপ করা কুফরী কাজ।

আত-তাওবা 9:60

৬০ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে সদাক্বাহ তথা যাকাতের সম্পদ ব্যয় করার খাত উল্লেখ করা হয়েছে। যাকাতের সম্পদ আট শ্রেণির সকলের মাঝে বণ্টন করতে হবে, না কোন একশ্রেণিকে দিলেই হবে? এ ব্যাপারে বিভিন্ন মতামত পাওয়া গেলেও সঠিক কথা হল যখন যেথায় বেশি প্রয়োজন হবে তখন সে খাতেই ব্যয় করা উত্তম। আটটি খাতের সংক্ষিপ্ত বিবরণ: ১. ফকীর: ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: সদাক্বাহ ধনী ও সুস্থ সবল লোকের জন্য হালাল নয়। (আবূ দাঊদ হা: ১৬৩৪, তিরমিযী হা: ৬৫২, সনদ সহীহ) দুজন লোক রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে সাদাকার মাল চাইল। তিনি (সাঃ) তখন তাদের আপাদমস্তক লক্ষ করে বুঝতে পারলেন যে, তারা সুস্থ ও সবল লোক। তিনি (সাঃ) তাদেরকে বললেন: তোমরা চাইলে আমি দিতে পারি। কিন্তু জেনে রেখ! ধনী, শক্তিশালী উপার্জনে সক্ষম ব্যক্তির জন্য এতে কোন অংশ নেই। (আবূ দাঊদ হা: ১৬৩৩, নাসাঈ হা: ২৫৯৭, সনদ সহীহ) ফকীর কারা এ হাদীস দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে গেল। অতএব যারা উপার্জনে অক্ষম বা সর্বহারা তারাই ফকীর বলে গণ্য হবে। ২. মিসকীন: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: মিসকীন সেই ব্যক্তি নয় যে এক লোকমা বা দু’ লোকমা, একটি খেজুর, দুটি খেজুরের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে চেয়ে বেড়ায়। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ! তাহলে মিসকীন কে? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: যার কাছে এমন কিছু নেই যার দ্বারা সে অমুখাপেক্ষী হতে পারে, যার এমন অবস্থা প্রকাশ পায় না যা দেখে তাকে সদাক্বাহ দেয়া হবে এবং মানুষের কাছেও চায় না। (সহীহ বুখারী হা: ১৪৭৯) হাদীস দ্বারা বুঝ গেল যারা ফকীর থেকে একটু স্বচ্ছল তারাই মিসকীন। ৩. তহসীলদার বা যাকাত সংগ্রহকারী: এ থেকে উদ্দেশ্য সরকারের সে সব কর্মচারী যারা যাকাত ও সদাক্বাহ আদায় ও বণ্টন এবং হিসাব-নিকাশের কাজে নিয়োজিত থাকে। (পারিশ্রমিক ও বেতন স্বরূপ এদেরকে যাকাতের মাল থেকে দেয়া যাবে।) ৪. যাদের মনকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা আবশ্যক: প্রথমতঃ সে কাফির যে ইসলামের প্রতি অনুরাগী হয়। এমন ব্যক্তিকে সাহায্য করলে আশা করা যায় যে, সে ইসলাম কবূল করবে। দ্বিতীয়তঃ সে সকল নওমুসলিম যাকে ইসলামে দৃঢ় থাকার জন্য সাহায্য করা হয়। তৃতীয়তঃ সে লোকও এতে শামিল যাকে সাহায্য করলে আশা করা যায় যে, সে নিজের এলাকার লোকেদেরকে মুসলিমদের ওপর হামলা করা থেকে বিরত রাখবে এবং অনুরূপভাবে সে নিজের নিকটতম মুসলিমদেরকে রক্ষা করবে। আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: নাবী (সাঃ)-এর কাছে কিছু জিনিস প্রেরণ করা হল। এরপর তিনি সেগুলো চারজনের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। আর বললেন: তাদেরকে (এর দ্বারা) ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করছি। ...........হাদীসের শেষ পর্যন্ত। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৬৭) ৫. দাসমুক্তি: নাবী (সাঃ) বলেন: তিন প্রকার লোকেদের সাহায্য করা আল্লাহ তা‘আলার ওপর আবশ্যক। ১. ঐ যোদ্ধা যে আল্লাহ তা‘আলার পথে জিহাদ করে। ২. ঐ চুক্তিবদ্ধ দাস, যে তার চুক্তির টাকা আদায়ের ইচ্ছা করে। এরূপ চুক্তিবদ্ধ দাস যাকাতের সম্পদের হকদার। ৩. ঐ ব্যক্তি যে বিবাহ করতে চায় পবিত্র থাকার জন্য। (তিরমিযী হা: ১৬৫৫, নাসাঈ হা: ৩১২০, সনদ সহীহ) ৬. ঋণগ্রস্ত লোক: প্রথমত: ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি দ্বারা উদ্দেশ্য যে ব্যক্তি নিজ পরিবারের খরচাদি এবং জীবনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে লোকেদের কাছে ঋণ গ্রহণ করেছে। আর তার কাছে এমন কোন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নেই যা বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে পারে। দ্বিতীয়ত: এমন যামিনদার ব্যক্তি যে কারো যামিন হয়েছে, অতঃপর যামানতের টাকা তার আসল যিম্মাদার আদায় করতে না পারায় তার ঘাড়ে এসে পড়েছে। তৃতীয়ত: যার ফসলাদি দুর্যোগ এসে ধ্বংস করে দিয়েছে বা বাণিজ্য ও শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত এবং নিঃস্ব হয়েছে ফলে সে ঋণগ্রস্ত হয়ে গেছে। ৭. আল্লাহর পথ: অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদ করে তাদের সরঞ্জাম, অস্ত্রশস্ত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় বাবদ এবং মুজাহিদদের ব্যয় বাবদ। অন্য একটি হাদীসে হাজ্জ ও উমরাকে ফী সাবীলিল্লাহ’র অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে। কতক আলিম বলেন: ইসলামী দাওয়াত ও তাবলীগের কাজও ফী সাবিলিল্লাহর অন্তর্ভুক্ত। কারণ এতেও জিহাদের মতই আল্লাহ তা‘আলার কালেমাকে উঁচু করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। ৮. মুসাফির: যদি কোন মুসাফির বৈধ সফরে সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে- অথচ সে তার এলাকায় প্রচুর সম্পদের অধিকারী সে ব্যক্তি প্রয়োজন মিটানোর জন্য যাকাতের হকদার। তবে যার ব্যয় বহন করা ওয়াজিব তাকে যাকাত দেয়া যাবে না। যেমন পিতা-মাতা, স্ত্রী ও সন্তান। যদি রাষ্ট্র প্রধান ছেলে যাকাতের সম্পদ থেকে পিতাকে দেয় তাহলে তা বৈধ। অনুরূপ স্ত্রী তার সম্পদ থেকে স্বামীকে যাকাত দিতে পারে যদি স্বামী যাকাত পাওয়ার যোগ্য হয়। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদের স্ত্রী যায়নাব  রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে এসে বললেন: আমি আমার স্বামীকে যাকাত দিতে চাই এটা কি সঠিক হবে? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: হ্যাঁ। এতে তোমার দু’টি প্রতিদান রয়েছে, এক. যাকাত প্রদানের জন্য, দুই. আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য। (সহীহ বুখারী হা: ১৪৬৬, সহীহ মুসলিম হা: ১০০০) যাকাতের নিসাব: ১. স্বর্ণ, রোপ্য ও নগদ টাকার যাকাত: কারো মালিকানায় বিশ দিনার অর্থাৎ সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়াান্ন ভরি রোপ্য বা তার সমপরিমাণ নগদ টাকা থাকলে এবং এক বছর পূর্ণ হলে চল্লিশ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ শতকরা আড়াই টাকা হিসেবে যাকাত দিতে হবে। ২. ব্যবসার মালের যাকাত: ব্যবসার মালপত্রের দাম নিসাব পরিমাণ হলে এবং পূর্ণ এক বছর থাকলে শতকরা আড়াই টাকা হারে যাকাত দিতে হবে। ৩. গৃহপালিত পশুর যাকাত: গৃহপালিত পশুর যাকাত ফরয হওয়ার জন্য শর্ত হল এমন পশু হওয়া যা সারা বছর এমনি মাঠে চড়ে বেড়ায় তা দেখা শুনা করতে তেমন কোন খরচ হয় না। ক. উট: সর্বনিম্ন পরিমাণ হল ৫ হতে ৯টি, এতে যাকাত দিতে হবে একটি ছাগল। খ. গরু বা মহিষ: সর্বনিম্ন পরিমাণ হল ৩০ হতে ৩৯টি, এতে যাকাত দিতে হবে এক বছরের একটি বাচ্চা গরু। গ. ছাগল বা ভেড়া: সর্বনিম্ন পরিমাণ হল ৪০ হতে ১২০টি, এতে যাকাত দিতে হবে একটি ছাগল। সর্বক্ষেত্রে শর্ত হল এক বছর পূর্ণ হতে হবে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. যাকাত ব্যয়ের খাত জানতে পারলাম। ২. যাকাতের প্রকৃত হকদার কারা তাও অবগত হলাম। ৩. যাকাতের নিসাব জানতে পারলাম।

আত-তাওবা 9:122

১২২ নং আয়াতের তাফসীর: কোন কোন মুফাসসিরগণ বলেন: জিহাদের আদেশের সাথে এ আয়াতের সম্পর্ক রয়েছে। উদ্দেশ্য হল, যখন পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে জিহাদ থেকে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিদের জন্য কঠিন শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তখন সাহাবীগণ সতর্ক হয়ে গেলেন এবং যখনই জিহাদের ডাক আসত তখনই সকলেই তাতে শরীক হওয়ার চেষ্টা করতেন। এ আয়াতে তাদেরকে আদেশ দেয়া হয়েছে যে, সমস্ত জিহাদ এমন নয় যে, তাতে সকলকে শরীক হওয়া জরুরী। বরং একদলের শরীক হলেই যথেষ্ট হবে। তাদের একদল জিহাদ করবে অন্য দল ইলম অর্জন করবে। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হল: জিহাদের আয়াতের সাথে এ আয়াতের কোন সম্পর্ক নেই। বরং এতে দীনের জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব ও তার প্রতি উদ্বুুদ্ধ করা হয়েছে এবং তার পদ্ধতির কথা বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেক গোত্র বা জামা‘আত থেকে কিছু মানুষ দীনি শিক্ষা অর্জনের জন্য আপন বাড়ি-ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে এবং ফিরে এসে স্বগোত্রের লোকেদের ভীতি প্রদর্শন করবে। মূলত আয়াতটি ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন ফরয হওয়ার প্রমাণ বহন করে। কারণ আয়াতের অর্থ হল: নাবী (সাঃ) সকল যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেননি, সুতরাং তাঁকে রেখে সবাই জিহাদে বের হয়ে যাবে এটা তাদের জন্য সংগত নয়, বরং এক দল মু’মিন তাঁর সাথে থেকে যাবে। তারা দীনী শিক্ষা গ্রহণ করবে। মুজাহিদরা ফিরে আসলে তাদের সব শিক্ষা দেবে যা নাবী (সাঃ) থেকে তারা শিখেছে। তবে তা ফরযে কিফায়াহ, ফরযে আইন নয়। ধর্মীয় জ্ঞানার্জন দু’প্রকার: ১. ফরযে আইন: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির ওপর (ধর্মীয়) জ্ঞানার্জন ফরয। (সহীহুল জামে হা: ৩৯১৩) যেমন আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কে জানা, রাসূল মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে জানা এবং দীন সম্পর্কে জানা। ২. ফরযে কিফায়াহ: তা হল ধর্মের ব্যাপারে গভীর জ্ঞানার্জন করা। এ প্রকার জ্ঞানার্জন করা অনেক ফযীলতের কাজ। নাবী (সাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি এমন পথে চলে যে পথে জ্ঞানার্জন করা যায় আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। ফেরেশতারা ঐ ব্যক্তির প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাদের ডানা বিছিয়ে দেয়। একজন জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য আকাশ-জমিনে যারা আছে এমনকি সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। ইবাদতকারীর ওপর আলেমের ফযীলত তেমন সকল তারকার ওপর পূর্ণিমার চাঁদের ফযীলত যেমন। আলেমরাই নাবীদের ওয়ারিশ, নাবীরা কোন টাকা পয়সার ওয়ারিশ বানিয়ে যাননি, তারা কেবল জ্ঞানের ওয়ারিশ বানিয়ে গেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করবে সে একটা পরিপূর্ণ অংশ গ্রহণ করল। (তিরমিযী হা: ২৬৮২, আবূ দাঊদ হা: ৩৬৪১, সহীহ) সুতরাং প্রত্যেক মু’মিন জিহাদে বের হয়ে যাবে এমন নয়, বরং তাদের একদল দীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করবে। তাছাড়া ফরয জ্ঞান তো সকলকে অর্জন করতেই হবে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. জিহাদ ফরযে কিফায়াহ। তাই সকল মু’মিনের জিহাদে বের হওয়া আবশ্যক নয়, মুসলিম নেতা যখন সকলকে জিহাদে শরীক হতে বলবেন বা অমুসলিমরা যদি মুসলিমদের দেশে আক্রমন করে তাহলে সকলের ওপর আবশ্যক হয়ে যায়। ২. যে জ্ঞান অর্জন না করলে ইবাদত পালন করতে পারবে না তা অর্জন করা ওয়াজিব। ৩. দীনের গভীর জ্ঞানার্জন করা ফযীলতের কাজ।

আত-তাওবা 9:123

১২৩ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার এক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নিয়ম বর্ণনা করা হয়েছে। তা হল, কাফিরদের মধ্যে যারা তোমাদের নিকটবর্তী প্রথমে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে। যেমন নাবী (সাঃ) প্রথমে আরব উপদ্বীপে বসবাসকারী মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন করেছেন যারা তাঁর নিকটতম লোক ছিলেন। (وَلْيَجِدُوْا فِيْكُمْ غِلْظَةً) ‘তারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা দেখতে পায়’ অর্থাৎ কাফিররা যেন তোমাদের মনকে কঠোর পায়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللّٰهِ ط وَالَّذِيْنَ مَعَه۫ أَشِدَّا۬ءُ عَلَي الْكُفَّارِ رُحَمَا۬ءُ بَيْنَهُمْ)‏ “মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। যারা তাঁর সাথে আছে তারা কাফিরদের ওপর কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে সহানুভূতিশীল, কোমল।” (সূরা ফাতহ ৪৮:২৯) অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (أَذِلَّةٍ عَلَي الْمُؤْمِنِيْنَ أَعِزَّةٍ عَلَي الْكٰفِرِيْنَ) “তারা মু’মিনদের প্রতি কোমল ও কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে।”(সূরা মায়িদাহ ৫:৫৪) সুতরাং মু’মিনরা কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর হবে। তাদের রীতি-নীতি বর্জনে এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদে কোনক্রমেই তাদের প্রতি নরম মনোভাব দেখানো যাবে না। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. আল্লাহ তা‘আলার দীন প্রতিষ্ঠা ও ফেতনা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত জিহাদ করা ওয়াজিব। ২. নিকটবর্তী কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করা শরীয়তের নির্দেশ। ৩. আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সাহায্য দ্বারা মু’মিন-মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন।

ইউনুস 10:11

১১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দার প্রতি অনুগ্রহ এবং দয়া যে, তারা যেভাবে নাবী-রাসূলগণের কাছে শাস্তির ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করত যদি আল্লাহ তা‘আলা ঐ অনুপাতে তাদেরকে শাস্তি দিয়ে দিতেন তাহলে তারা সকলেই ধ্বংস হয়ে যেত। বরং আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে কিছু সময়ের জন্য অবকাশ দেন। যদি আল্লাহ তা‘আলা তাদের অপরাধের কারণে পাকড়াও করেন তাহলে পৃথিবীর বুকে তাদের কোন অস্তিত্বই থাকবে না। বরং আল্লাহ তা‘আলা সহনশীল। আর আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াতের মাধ্যমে তাদেরকে বদ্দু‘আ করতে নিষেধ করছেন যে, তোমরা তোমাদের স্ত্রী-পরিজনদের ওপর তাড়াতাড়ি শাস্তি আসার ব্যাপারে বদ্দু‘আ করিও না। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: তোমরা নিজেদের ওপর, সন্তানের ওপর, সম্পদের ওপর বদ্দু‘আ কর না। কেননা তোমাদের বদদু‘আ এমন সময়ে যেন না হয় যে সময় আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে দু‘আ কবূল করা হয়, অতঃপর তিনি তোমাদের সে বদ্দু‘আ কবূল করেন। (সহীহ মুসলিম হা: ৩০০৯, আবূ দাঊদ হা: ১৫৩২) যেমন মানুষ অনেক সময় বিরক্তিবোধ করে স্ত্রী, সন্তান ও সম্পদকে বলে থাকে যে, তোমার ধ্বংস হোক বা তুমি মরে গেলেই ভাল হয় ইত্যাদি বদ্দু‘আ। আয়াত হতে শিক্ষনীয় বিষয়: ১. বান্দার প্রতি আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ। ২. অপরাধ করার সাথে সাথেই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাকে শাস্তি প্রদান করেন না। ৩. শাস্তির ব্যাপারে তাড়াতাড়ি করা যাবে না। ৪. কারো জন্য রাগের বশবতী হয়ে বদদু‘আ করা যাবে না ইত্যাদি।

ইউনুস 10:12

১২ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াতে অধিকাংশ মানুষের একটি চিরাচরিত অভ্যাস বর্ণনা করা হয়েছে যে, মানুষ যখন বিপদে পড়ে বা কোন দুঃখ-দুর্দশা তাকে স্পর্শ করে তখন সে খুব বিনয়ী হয়ে শুয়ে, বসে এবং দাঁড়িয়ে সর্বদা আল্লাহ তা‘আলাকে ডাকে। আর যখনই সে বিপদ থেকে মুক্ত হয় তখন সাথে সাথেই সে আল্লাহ তা‘আলাকে ভুলে যায়। এমনভাবে ভুলে যায় যেন ইতোপূর্বে তার কোন দুঃখ-কষ্ট বা বিপদাপদ ছিল না। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (وَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ ضُرٌّ دَعَا رَبَّه۫ مُنِيْبًا إِلَيْهِ ثُمَّ إِذَا خَوَّلَه۫ نِعْمَةً مِّنْهُ نَسِيَ مَا كَانَ يَدْعُوْآ إِلَيْهِ مِنْ قَبْلُ) “আর যখন মানুষের ওপর কোন বিপদ এসে পড়ে তখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করতে থাকে একাগ্রচিত্তে তাঁর অভিমুখী হয়ে। পরে যখন তিনি তাকে নিজের পক্ষ থেকে নিয়ামত দান করেন তখন সে ভুলে যায় সে কথা যার জন্য পূর্বে তাঁকে আহ্বান করেছিল।” (সূরা যুমার ৩৯:৮) আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন: (فَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ ضُرٌّ دَعَانَا ز ثُمَّ إِذَا خَوَّلْنٰهُ نِعْمَةً مِّنَّا لا قَالَ إِنَّمَآ أُوْتِيْتُه۫ عَلٰي عِلْمٍ) “মানুষকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করলে সে আমাকে ডাকে, অতঃপর যখন আমি তার প্রতি অনুগ্রহ প্রদান করি আমার পক্ষ থেকে তখন সে বলে: আমাকে এটা দেয়া হয়েছে আমার জ্ঞানের বিনিময়ে।” (সূরা যুমার ৩৯:৪৯) এটা ছিল পূর্ববর্তী লোকদের অভ্যাস যে, তারা সুখের সময় যদিও মূর্তি পূজা করত কিন্তু বিপদের সময় তারা আল্লাহ তা‘আলাকেই ডাকত। যদিও তারা ছিল মুশরিক। কিন্তু বর্তমান যুগের লোকেরা সুখের সময় তো আল্লাহ তা‘আলাকে ডাকেই না বরং বিপদে পড়লেও তারা আল্লাহ তা‘আলার কাছে প্রার্থনা না করে চলে যায় ফকির বাবার মাজারে, বিভিন্ন কবরের কাছে অথচ আল্লাহ তা‘আলা এসমস্ত বদ আমল কোন অবস্থায় গ্রহণ করেন না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: কেউ এমন আমল করল যে, তাতে আমার সাথে অন্যকে শরীক করল, আমি তাকে ও তার আমলকে ছেড়ে দেই অর্থাৎ গ্রহণ করি না। (সহীহ মুসিলম হা: ৭৬৬৬) বিপদাপদে পড়লে আল্লাহ তা‘আলাকে ডাকতে হবে, আল্লাহ তা‘আলার কাছে চাইতে হবে। তিনিই সকল বিপদাপদ থেকে মুক্তি দিতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে বিপদ থেকে মুক্তি পাবার পর যেন আল্লাহ তা‘আলাকে ভুলে আবার অপরাধমূলক কাজে জড়িত না হই। আয়াত হতে শিক্ষনীয় বিষয়: ১. বিপদে ও সুখে সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলাকেই ডাকতে হবে। ২. আল্লাহ তা‘আলার সাথে অংশীদার স্থাপন করা যাবে না। ৩. যে মন্দ অভ্যাসের কথা বলা হয়েছে তা পরিবর্তন করতে হবে। ৪. বিপদে ধৈর্যহারা হওয়া যাবে না। ৫. বিপদ কেটে গেলে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করতে হবে ইত্যাদি।

ইউনুস 10:19

১৯ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন যে, সমস্ত আদম সন্তান প্রথমত তাওহীদে তথা আল্লাহ তা‘আলার একত্বে বিশ্বাসী একই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন পৃথিবীর বুকে শির্কের কোন নাম-গন্ধও ছিল না। সকলেই আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করত, আল্লাহ তা‘আলাকে প্রভু হিসেবে মানত, তারা একই দীনের অনুসারী ছিল। কিন্তু কিছু যুগ অতিবাহিত হওয়ার পর মানুষের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। যেমন নূহ (عليه السلام)-এর যুগ পর্যন্ত মানুষ তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তীতে তাদের মাঝে একত্ববাদে মতবিরোধ সৃষ্টি হয় এবং কিছু মানুষ আল্লাহ তা‘আলার সাথে অন্যদেরকেও উপাস্য, প্রয়োজন পূরণকারী এবং দুঃখ-কষ্ট মোচনকারী ভাবতে আরম্ভ করল এবং ইবাদত শুরু করল। তখন আল্লাহ তা‘আলা রাসূল প্রেরণ করেন, যারা রাসূলের অনুসরণ করল তারা মুক্তি পেয়ে গেল আর যারা অস্বীকার করল তারা ধ্বংস হয়ে গেল। (وَلَوْلَا كَلِمَةٌ سَبَقَتْ مِنْ رَّبِّكَ) অর্থাৎ যদি আল্লাহ তা‘আলার এ ফায়সালা না হত যে, পূর্ণ প্রমাণ সাব্যস্ত হবার পূর্বে কাউকে শাস্তি দেব না অনুরূপ তিনি সৃষ্টি জগতের হিসাব নিকাশের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত না করে থাকতেন তাহলে অবশ্যই তিনি তাদের মাঝে ঘটিত মতবিরোধের ফায়সালা করে দিতেন এবং মু’মিনদেরকে বড় সুখী ও কাফিরদেরকে শাস্তি ও কষ্টের সম্মুখীন করতেন। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ করা যাবে না। ২. তাওহীদের ওপর অটল থাকতে হবে। ৩. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুসরণ করা প্রত্যেক মু’মিনের জন্য আবশ্যক।

ইউনুস 10:20

২০ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াত দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদের একটি দাবীর কথা তুলে ধরেছেন যে, যখন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর কোন বিধান নাযিল করা হয় তখন তারা বলে: যদি তাকে নাবী হিসেবে প্রেরণই করা হয় তাহলে তাঁর ওপর তাঁর রবের পক্ষ থেকে সামূদ সম্প্রদায়ের ন্যায় উষ্ট্রী প্রেরণ করা হয় না কেন, এই সাফা পাহাড় স্বর্ণে পরিণত হয় না কেন, অথবা মক্কার পাহাড়গুলো অন্যত্র সরে যায় না কেন? মূলত তারা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে বড় ধরনের মু‘জিযাহ কামনা করছে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা ভাল করেই জানেন যে, মু‘জিযাহ প্রকাশ করা হলে কে ঈমান আনবে আর কে ঈমান আনবে না। আল্লাহ তা‘আলা সকল বিষয়েই সক্ষম। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (تَبٰرَکَ الَّذِیْٓ اِنْ شَا۬ئَ جَعَلَ لَکَ خَیْرًا مِّنْ ذٰلِکَ جَنّٰتٍ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِھَا الْاَنْھٰرُﺫ وَیَجْعَلْ لَّکَ قُصُوْرًاﭙ بَلْ کَذَّبُوْا بِالسَّاعَةِ وَاَعْتَدْنَا لِمَنْ کَذَّبَ بِالسَّاعَةِ سَعِیْرًا) “কত মহান তিনি যিনি ইচ্ছা করলে তোমাকে দিতে পারেন এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বস্তু উদ্যানসমূহ যার নিম্নদেশে নদী-নালাসমূহ প্রবাহিত হয় এবং তিনি দিতে পারেন তোমাকে প্রাসাদসমূহ! কিন্তু তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে আর যারা কিয়ামতকে অস্বীকার করে তাদের জন্য আমি প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত অগ্নি।” (সূরা ফুরকান ২৫:১০-১১) সুতরাং তিনি জানেন যে, মু‘জিযাহ প্রকাশ করা হলেও তা তাদের কোন উপকারে আসবে না। কক্ষনো তারা তাতে ঈমান আনবে না, যার কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এই ধরনের মু‘জিযাহ প্রকাশ করে দেখান নি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (إِنَّ الَّذِيْنَ حَقَّتْ عَلَيْهِمْ كَلِمَتُ رَبِّكَ لَا يُؤْمِنُوْنَ) “নিশ্চয়ই যাদের বিরুদ্ধে তোমার প্রতিপালকের বাক্য সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছে, তারা ঈমান আনবে না।” (সূরা ইউনুস ১০: ৯৬) আর দাবী অনুপাতে মুজিযাহ দেখানোর পরেও যদি কোন জাতি ঈমান না আনে তাহলে তাদেরকে সত্বর ধ্বংস করে দেয়া হবে। তাই আল্লাহ তা‘আলার হিকমত তাদের দাবী অনুপাতে মুজিযাহ না দিয়ে অবকাশ দিলেন, তারা অপেক্ষা করুক, অচিরেই বুঝতে পারবে সত্য প্রত্যাখ্যানের পরিণতি কত ভয়াবহ। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. অদৃশ্যের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার নিকটই রয়েছে, অন্য কেউ তা জানে না। ২. আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে যেকোন ধরনের মু‘জিযাহ প্রকাশ করতে পারেন।

ইউনুস 10:21

২১ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা অধিকাংশ মানুষের একটি বদ স্বভাবের সংবাদ দিচ্ছেন যে, যখন মানুষ বিপদে পড়ে, দুঃখ-কষ্ট তাকে স্পর্শ করে, অভাব-অনটন দেখা দেয় ইত্যাদি যত আপদ-বিপদ রয়েছে এসব আপদ-বিপদ থেকে তিনি মুক্তি দান করেন, যেমন দুঃখের পর সুখ দান করেন, অভাবের পর সচ্ছলতা দান করেন, অসুখ-বিসুখের পর সুস্থতা দান করেন তখন মানুষ এসব নেয়ামত পেয়ে আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনের বিরুদ্ধে অপকৌশল করে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার এসব নেয়ামতকে অস্বীকার করে, তাঁর নিদর্শন নিয়ে ঠাঁট্টা বিদ্রƒপ করে ও তাঁর সাথে কুফরী ও শির্ক করে। আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সে সকল অপকৌশল গ্রহণকারীদেরকে জানিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন: বলে দাও আল্লাহ তা‘আলা তাদের থেকে অধিক ক্রিয়াশীল কৌশল গ্রহণ করতে সক্ষম। তিনি তাদেরকে পাকড়াও করার ক্ষমতা রাখেন, তিনি চাইলে অবিলম্বে তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার ফেরেশতাগণ তা লিপিবদ্ধ করে রাখছেন, যথাসময়ে তার উপযুক্ত প্রতিদান দিবেন। এই আয়াতের তাফসীর অত্র সূরার ১২ নং আয়াতের তাফসীরের সমার্থবোধক। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. এই আয়াতের একটি শিক্ষা হল যে, মানুষের কোন কাজই আল্লাহ তা‘আলার নিকট গোপন থাকে না, চাই তা প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে হোক। ২. অধিকাংশ মানুষ আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতের অকৃতজ্ঞ।

ইউনুস 10:24

২৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে দুনিয়ার জীবনের একটি উপমা পেশ করছেন। আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষন করে ভূ-পৃষ্ঠে বিভিন্ন উদ্ভিদ, তরুলতা ও ঘন ঘন ঘাস ইত্যাদি জন্মান। এসব উদ্ভিদ থেকে কিছু রয়েছে যা মানুষ খায় এবং কিছু রয়েছে যা পশুপাখি খায়। অতঃপর যখন তা পরিপক্ক হয়, জমিন সবুজ শ্যামলে সুশোভিত হয়ে যায় ও নয়নাভিরাম হয়ে ওঠে এবং আর মালিকের কাছে পূর্ণ অধিকারে চলে আসে বলে মনে করে তখন দিনে বা রাতে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এমন এক আযাব আসে যা কাটা ফসলের ন্যায় স্তুপে পরিণত করে ক্ষেত পরিষ্কার হয়ে যায়, যেন গতকালও এখানে কিছুই ছিল না। অনুরূপ এই পার্থিব জীবন, মানুষ তা সুন্দর করে সাজিয়ে তোলে, কত আশা, কত স্বপ্ন দেখে। এভাবে স্বপ্নভরা পৃথিবীটা সাজিয়ে নেয়ার পর এমন একটি দিন আসে যখন তাকে এ ধরা থেকে বিদায় নিতে হয়। তেমনি একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে এ পৃথিবীটাও, এরও কোন অস্তিত্ব থাকবে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَاضْرِبْ لَهُمْ مَّثَلَ الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا كَمَا۬ءٍ أَنْزَلْنٰهُ مِنَ السَّمَا۬ءِ فَاخْتَلَطَ بِه۪ نَبَاتُ الْأَرْضِ فَأَصْبَحَ هَشِيْمًا تَذْرُوْهُ الرِّيَاحُ ط وَكَانَ اللّٰهُ عَلٰي كُلِّ شَيْءٍ مُّقْتَدِرًا) “তাদের নিকট উপমা বর্ণনা কর পার্থিব জীবনের: তা হল পানির ন্যায় যা আমি বর্ষণ করি আকাশ হতে, যার সংমিশ্রণে মাটির গাছপালা সবুজ শ্যামল হয়ে উৎপন্ন হয়। অতঃপর সেটা বিশুষ্ক হয়ে এমন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় যে, বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান।” (সূরা কাহাফ ১৮:৪৫) এরূপ উপমা বর্ণনা করে আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন: (كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُه۫ ثُمَّ يَهِيْجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُوْنُ حُطَامًا ط وَفِي الْاٰخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيْدٌ لا وَّمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللّٰهِ وَرِضْوَانٌ ط وَمَا الْحَيٰوةُ الدُّنْيَآ إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُوْرِ)‏ “এর উপমা বৃষ্টি, যার দ্বারা উৎপন্ন শস্য-সম্ভার কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, অতঃপর ওটা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি ওটা হলুদ বর্ণ দেখতে পাও, অবশেষে তা খড় কুটায় পরিণত হয়।” (সূরা হাদীদ ৫৭:২০) আর আল্লাহ তা‘আলা এ সমস্ত দৃষ্টান্ত অনর্থক বর্ণনা করেননি, এ সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেন উপদেশ গ্রহণ করার জন্য, দুনিয়ার ওপর আখিরাতকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য ও আখিরাতের প্রতি ঈমান আনার জন্য। আর উপদেশ কেবল তারাই গ্রহণ করে যারা জ্ঞানী অর্থাৎ যাদের দীনের বিষয়ে সার্বিক জ্ঞান রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (ثُمَّ يُخْرِجُ بِه۪ زَرْعًا مُّخْتَلِفًا أَلْوَانُه۫ ثُمَّ يَهِيْجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَجْعَلُه۫ حُطَامًا ط إِنَّ فِيْ ذٰلِكَ لَذِكْرٰي لِأُولِي الْأَلْبَابِ) “তারপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, অবশেষে তিনি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে খড়-কুটায় পরিণত করেন? অবশ্য এতে রয়েছে উপদেশ জ্ঞানীদের জন্য।” (সূরা যুমার ৩৯:২১) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়, একদিন তা শেষ হয়ে যাবে। ২. দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দেয়া যাবে না। ৩. দুনিয়াতে কেউ স্থায়ী হবে না, যতই সুন্দর করে দুনিয়াকে সাজাই সব সাজ ত্যাগ করে চলে যেতে হবে।

ইউনুস 10:25

২৫ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বের আয়াতে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের বর্ণনা দেয়ার পর এখানে আখিরাতের শান্তি ও চিরস্থায়ী আবাসস্থল জান্নাতের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তিনি তোমাদেরকে دَارِ السَّلٰمِ তথা জান্নাতের দিকে আহ্বান করেন। জান্নাতের অন্যতম একটি নাম হল ‘দারুস-সালাম’। সুতরাং দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য না দিয়ে আখিরাতের শান্তিময় জীবনকেই প্রাধান্য দেয়া উচিত। জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মাঝে বেরিয়ে আসলেন এবং বললেন: আমি স্বপ্নে দেখলাম জিবরীল আমার মাথার কাছে ও মিকাঈল আমার পায়ের কাছে। একজন অপরজনকে বলছেন: এ ব্যক্তির একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করুন। তখন তিনি বললেন: হে ঘুমন্ত ব্যক্তি! আপনি শুনুন। আপনার কান শুনছে, অন্তর অনুধাবন করছে! আপনার ও আপনার উম্মতের উপমা হল যেমন একজন বাদশাহ, তিনি একটি ঘর বানিয়েছেন এবং তাতে একটি বড় কক্ষ তৈরি করেছেন আর তাতে বিছিয়ে দিয়েছেন একটি বড় খাদ্যের দস্তরখানা। তারপর একজন দূত প্রেরণ করলেন, সে মানুষদেরকে খাবারের জন্য আহ্বান করে। ফলে কেউ আহ্বানে সাড়া দিয়ে আসল, আর কেউ কেউ সাড়া দিল না। আল্লাহ তা‘আলা হলেন বাদশাহ, বাড়িটি হল ইসলাম, কক্ষটি হল জান্নাত এবং আপনি আহ্বানকারী হলেন মুহাম্মাদ। সুতরাং যে ব্যক্তি আপনার আহ্বানে সাড়া দেবে সে ইসলামে প্রবেশ করল আর যে ইসলামে প্রবেশ করল সে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তার ফলমূল ও নেয়ামত উপভোগ করবে। (তিরমিযী হা: ২৮৬০, সহীহুল জামে হা: ২৪৬৫) সুতরাং যারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ডাকে সাড়া দেবে, তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাত লাভ করবে এবং তাঁর নেয়ামতসমূহ উপভোগ করতে পারবে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. আল্লাহ তা‘আলা মানুষদেরকে জান্নাতের দিকে আহ্বান করেন। সুতরাং যারা তাঁর ডাকে সাড়া দেবে তারা জান্নাতেরই পথ পাবে। ২. আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা সঠিক পথ দেখান।

ইউনুস 10:45

৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মানুষদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, তারা যখন স্ব-স্ব কবর থেকে উঠে হিসাব-নিকাশের জন্য হাশরের ময়দানে একত্রিত হবে তখন কিয়ামতের ভয়াবহতা দেখে মনে হবে তারা দুনিয়াতে একদিনের কিছু সময় অবস্থান করেছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَیَوْمَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ یُقْسِمُ الْمُجْرِمُوْنَﺃ مَا لَبِثُوْا غَیْرَ سَاعَةٍ) “যেদিন কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে, সেদিন পাপীরা শপথ করে বলবে যে, তারা মুহূর্তকালের বেশি অবস্থান করেনি।” (সূরা রূম ৩০:৫৫) আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন: (كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوْآ إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا)‏ “যেদিন তারা তা দেখবে, তাতে তাদের মনে হবে যেন তারা (পৃথিবীতে) এক সন্ধ্যা অথবা এক সকালের অধিক অবস্থান করেনি।” (সূরা নাযিআত ৭৯:৪৬) হাশরের মাঠে মানুষের বিভিন্ন অবস্থা হবে, যা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে। কখনো কেউ কাউকে চিনতে পারবে না, আবার তারা একে অপরকে চিনতে পারবে কখনো পিতা তার সন্তানকে চিনবে, ভাই তার ভাইকে চিনবে যেমনভাবে তারা দুনিয়াতে একে অপরকে চিনত। কিন্তু তারা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে, কেউ কারো প্রতি কোন দৃষ্টিপাত করবে না। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّوْرِ فَلَآ أَنْسَابَ بَيْنَهُمْ يَوْمَئِذٍ وَّلَا يَتَسَا۬ءَلُوْنَ)‏ “সুতরাং যেদিন শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়া হবে সেদিন পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না, এবং একে অপরের খোঁজ-খবর নেবে না।” (সূরা মু’মিনুন ২৩:১০১) আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন: (وَلَا یَسْئَلُ حَمِیْمٌ حَمِیْمًاﭙﺊ یُّبَصَّرُوْنَھُمْﺚ یَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ یَفْتَدِیْ مِنْ عَذَابِ یَوْمِئِذٍۭ بِبَنِیْھِﭚﺫ وَصَاحِبَتِھ۪ وَاَخِیْھِﭛﺫ وَفَصِیْلَتِھِ الَّتِیْ تُؤْیْھِﭜﺫ وَمَنْ فِی الْاَرْضِ جَمِیْعًاﺫ ثُمَّ یُنْجِیْھِﭝﺫ کَلَّاﺚ اِنَّھَا لَظٰیﭞﺫ)‏ “আর কোন অন্তরঙ্গ বন্ধু কোন অন্তরঙ্গ বন্ধুর খোঁজ নেবে না, তাদেরকে সামনা-সামনি করা হবে। অপরাধী সেই দিনের আযাব থেকে বাঁচার বিনিময়ে দিতে চাইবে সন্তান-সন্ততিকে, তার স্ত্রী ও ভাইকে, আর তার গোষ্ঠীকে, যারা তাকে আশ্রয় দিত। এবং পৃথিবীর সকলকে, যাতে এসব কিছু তাকে মুক্তি দিতে পারে। না, কক্ষনো নয়, নিশ্চয়ই এটা লেলিহান অগ্নি শিখা।” (সূরা মা‘আরিজ ৭০:১০-১৫) প্রকৃতপক্ষে যারা আল্লাহ তা‘আলার সাক্ষাতকে অস্বীকার করে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَيْلٌ يَّوْمَئِذٍ لِّلْمُكَذِّبِيْنَ)‏ “সেদিন দুর্ভোগ মিথ্যা আরোপকারীদের জন্য।” (সূরা মুরসালাত ৭৭:১৫) আল্লাহ তা‘আলা তাদের এই ক্ষতিটাকে চার ভাগে বিভক্ত করেছেন। যথা: (১) ঈমানের দিক দিয়ে, (২) সৎ আমলের দিক দিয়ে, (৩) সৎ কাজের পরামর্শের ব্যাপারে ও (৪) ধৈর্য ধারণের পরামর্শের ব্যাপারে। (সূরা আসর) যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَالْعَصْرِﭐﺫ اِنَّ الْاِنْسَانَ لَفِیْ خُسْرٍﭑﺫ اِلَّا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّﺃ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِﭒﺟ) “কসম যুগের, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং পরস্পরকে উপদেশ দেয় সত্যের এবং উপদেশ দেয় সবরের।” (সূরা আসর ১০৩:১-৩) সুতরাং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত তারাই যারা দুনিয়াতে থাকতে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করেনি। যারা ঈমান ও ইসলামের পরওয়া না করে যেমন খুশি চলাফেরা করেছে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সকল মানুষকে আখিরাতে হাজির করা হবে, কাউকে ছেড়ে দেয়া হবে না। ২. দুনিয়ার জীবন খুবই ক্ষণিকের মনে হবে। ৩. কিয়ামতের মাঠে পরস্পর পরস্পরকে চিনতে পারবে।

ইউনুস 10:61

৬১ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং মু’মিনদেরকে সম্বোধন করে বলছেন যে, তিনি সমস্ত সৃষ্টির অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছেন এবং সর্বক্ষণ তিনি মানুষের সকল অবস্থা অবলোকন করছেন। আকাশ ও পৃথিবীর ছোট বড় কোন বস্তুই তাঁর নিকট লুক্কায়িত নয়। তিনি দৃশ্য, অদৃশ্য সবই জানেন। কারণ তাঁরই নিকট রয়েছে অদৃশ্যের চাবিকাঠি। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (وَعِنْدَه۫ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَآ إِلَّا هُوَ ط وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ط وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَّرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِيْ ظُلُمٰتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَّلَا يَابِسٍ إِلَّا فِيْ كِتٰبٍ مُّبِيْنٍ)‏ “সকল গায়েবের চাবিকাঠি তাঁরই নিকট রয়েছে, তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা জানে না। জলে ও স্থলে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত, তাঁর অজ্ঞাতসারে একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোন শস্যকণাও অঙ্কুরিত হয় না অথবা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোন বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে (লাওহে মাহফুজে) নেই।” (সূরা আনআম ৬:৫৯) জলে-স্থলে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত। তাঁর অজ্ঞাতসারে একটি পাতাও পড়ে না, মৃত্তিকার অন্ধকারে এমন কোন শষ্যকণা অথবা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক কোন বস্তু পড়ে না, যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই। তিনি রিযিকের যিম্মাদার ও দায়িত্বশীল। ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকল সৃষ্টি জীব মানুষ হোক বা জিন হোক, পশু হোক বা পক্ষীকুল হোক, মোট কথা তিনি সমুদয় প্রাণীকে তার প্রয়োজন মত খাদ্য দেন। সুতরাং যে আল্লাহ তা‘আলা সব কিছু দেখেন ও শোনেন তাঁকে ভয় করে চলা উচিত। কিছু বলার বা কিছু করার পূর্বে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, কেননা তিনি সব কিছুর হিসাব নেবেন। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. আল্লাহ তা‘আলা সকল কিছু জানেন, তার নিকট কোন কিছু লুকায়িত থাকে না। ২. গায়েব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই জানেন অন্য কেউ নয়। ৩. সকল কিছুর রিযিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।

ইউনুস 10:98

৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে لَوْلَا শব্দটি আফসোস প্রকাশের জন্য هلا এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, অর্থাৎ আমি যে জনপদগুলোকে ধ্বংস করেছি, তার মধ্য থেকে কোন একটি জনপদবাসী কেন এমন হল না যে, এমন সময়ে ঈমান নিয়ে আসত, যে সময়ে ঈমান আনলে তাদের উপকারে আসতো। তবে ইউনুস (عليه السلام)-এর সম্প্রদায় ব্যতীত, তাদের ব্যাপারটি স্বতন্ত্র। যখন তারা ঈমান আনল তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর থেকে আযাব রহিত করে দিলেন। সংক্ষিপ্ত ঘটনা হল যখন ইউনুস (عليه السلام) দেখলেন যে, তাঁর দাওয়াত ও তাবলীগে তাঁর সম্প্রদায় ঈমান আনছে না, তখন তিনি নিজ জাতিকে জানিয়ে দিলেন যে, তিনদিন পর তোমাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি আসবে এবং তিনি নিজে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লেন। যখন তাঁর জাতি মেঘের মত তাদের ওপর আযাবের লক্ষণাদি দেখতে পেল, তখন তারা শিশু, নারী এমনকি জীবজন্তু সমেত এক মাঠে সমবেত হল এবং আল্লাহ তা‘আলার দরবারে কাকুতি-মিনতির সাথে তাওবাহ ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করল এবং ঈমান আনল। আল্লাহ তা‘আলা তাদের তাওবাহ কবূল করে তাদের থেকে আযাব রহিত করে নিলেন। ইউনুস (عليه السلام) পথচারী পথিকের নিকট থেকে নিজ জাতির অবস্থা সম্পর্কে অবগত হতে থাকলেন। পরিশেষে তিনি যখন জানতের পারলেন যে, তাঁর জাতির ওপর আযাব আসেনি তখন যেহেতু সে জাতি তাঁকে মিথ্যাজ্ঞান করতে পারে তাই তিনি সে জাতির নিকট ফিরে যাওয়া পছন্দ করলেন না। বরং তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি অন্য কোন দিকে চলে গেলেন। এ সফরে তাঁকে নৌকা থেকে লটারী করে সাগরে ফেলে দিলে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে মাছ তাকে গিলে ফেলে। তাঁর অধিক পরিমাণ ইবাদত ও সৎআমল এবং তাওবা ইস্তিগফারের ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর তাওবা কবূল করতঃ মাছের পেট থেকে জীবিত অবস্থায় নদীর তীরে তরুলতাহীন শূন্য এলাকায় রেখে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। অতঃপর সুস্থ হয়ে আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে নিজ জাতির কাছে ফিরে আসেন। জাতির লোকেরা তাঁর প্রতি ঈমান আনল এবং শির্কী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতে লাগল, ফলে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার সম্পদ ভোগ করার সুযোগ করে দেন। তবে ইউনুস (عليه السلام)-এর সম্প্রদায় কখন ঈমান এনেছে এ বিষয়ে মুফাসসিরগণ মতানৈক্য করেছেন। কেউ বলেন, শাস্তি দেখার পর আবার কেউ বলেন, তখন তারা শাস্তি অবলোকন করেছিল তবে আয়াত অনুযায়ী প্রথম ব্যাখ্যাই সঠিক। এ সম্পর্কে বিস্তারিত সূরা সফফাতের ১৩৯-১৪৮ নং আয়াতে আলোচনা রয়েছে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. ঈমানদারদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলা রহমত নাযিল ও দয়া করেন। ২. আল্লাহ তা‘আলা সহজে তাঁর বান্দাদের শাস্তি দিতে চান না।

হুদ 11:5

৫ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:: শানে নুযূল: উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে অনেক মতামত পাওয়া যায়। তবে সহীহ বুখারীর বর্ণনানুপাতে সেই সকল মুসলিমদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে যারা লজ্জার খাতিরে পেশাব-পায়খানার সময় এবং স্ত্রী-সহবাসের সময় উলঙ্গ হওয়াকে অপছন্দ করত; এই ভেবে যে, আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে দেখছেন। ফলে তারা এই সময় লজ্জাস্থান আবৃত করার নিমিত্তে নিজেদের বক্ষদেশকে ঘুরিয়ে দিত। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৮১) আল্লাহ তা‘আলা উক্ত আয়াতে বর্ণনা করছেন যে, রাতের অন্ধকারে যখন তারা বিছানাতে নিজেদেরকে কাপড় দ্বারা আচ্ছাদিত করে, তখনও তিনি তাদেরকে দেখেন ও তাদের চুপে চুপে ও প্রকাশ্যে আলাপনকেও তিনি জানেন। অর্থাৎ তাঁর নিকট কোন কিছু গোপন থাকে না। তোমাদের প্রকাশ্য বিষয়টা যেমন গোপনটাও ঠিক তেমনি। অর্থাৎ তিনি প্রকাশ্য বিষয় যেমন জানেন, গোপন বিষয়ও তেমন জানেন। উদ্দেশ্য হল লজ্জা-শরম আপন জায়গায় ঠিক আছে, কিন্ত তাতে এত বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। কারণ যে সত্তার কারণে তারা এরূপ করে, তাঁর নিকট তা গুপ্ত নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْاِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِھ۪ نَفْسُھ۫ﺊ وَنَحْنُ اَقْرَبُ اِلَیْھِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِیْدِﭟ)‏ “আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার অন্তর তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি। আমি তার ঘাড়ের শাহ রগ অপেক্ষাও নিকটতর।” (সূরা ক্বফ ৫০:১৬) শুধু তাই নয় আল্লাহ তা‘আলা মানুষের গোপন বিষয় তো জানেনই এমনকি মানুষ অন্তরে কী চিন্তা-ভাবনা করে তাও তিনি জানেন। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা থেকে আমাদের কোন কিছু গোপন করার সুযোগ নেই। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. আল্লাহ তা‘আলা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল বিষয় সম্পর্কে জানেন। ২. আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কে মুশরিকদের সঠিক জ্ঞান নেই। ৩. লজ্জা-শরম একটি ভূষণ, তাই তা সঠিক জায়গায় ব্যবহার করা উচিত।

হুদ 11:6

৬ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর একটি বিশাল বড় দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা তুলে ধরেছেন। ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকল সৃষ্টিজীব, মানুষ হোক বা জিন হোক, পশু হোক বা পক্ষী হোক, ছোট হোক বা বড় হোক, জলচর হোক আর স্থলচর হোক মোট কথা তিনি সমুদয় প্রাণীকে তার প্রয়োজন মত জীবিকা দিয়ে থাকেন। আমরা যদি একটু চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাই দুনিয়াতে কোটি কোটি মানুষ রয়েছে যাদের রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহ তা‘আলা নিয়েছেন, এমনকি একটি পিপীলিকার রুযীও আল্লাহ তা‘আলা দিয়েছেন। মানুষের কত রিযিক প্রয়োজন তার চেয়ে হাজার হাজার টন রিযিক প্রয়োজন এমন প্রাণী সমুদ্রে বাস করে। তাদের রিযিকেরও ব্যবস্থা আল্লাহ তা‘আলা করেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (وَکَاَیِّنْ مِّنْ دَا۬بَّةٍ لَّا تَحْمِلُ رِزْقَھَاﺣ اَللہُ یَرْزُقُھَا وَاِیَّاکُمْﺘ وَھُوَ السَّمِیْعُ الْعَلِیْمُ ‏) এমন কত জীবজন্তু আছে যারা নিজেদের খাদ্য মওজুদ রাখে না। আল্লাহই রিযিক দান করেন তাদেরকে ও তোমাদেরকে; এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা আনকাবুত ২৯:৬০) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: (لَوْ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَوَكَّلُونَ عَلَي اللّٰهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرُزِقْتُمْ كَمَا يُرْزَقُ الطَّيْرُ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا) যদি তোমরা আল্লাহর ওপর প্রকৃত ভরসা কর যেমন ভরসা করা উচিত তাহলে তেমনভাবে রিযিক দেবেন যেমনভাবে রিযিক পাখিদেরকে দিয়ে থাকেন। পাখিরা সকাল বেলা খালি পেটে বের হয় এবং বিকেল বেলা ভরা পেটে ফিরে আসে। (তিরমিযী হা: ২৩৪৪, সহীহ) আর তিনি তাদের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থান সম্পর্কে জানেন। এখানে স্থায়ী অবস্থান (مستقر) বলতে বুঝানো হয়েছে মায়ের গর্ভাশয় এবং مستودع বা অস্থায়ী অবস্থানস্থল হল পিতার পিঠ। ইমাম শাওকানী বলেন, مستقر হল মায়ের গর্ভাশয় এবং مستودع হল পৃথিবীর সেই অংশ যেখানে মানুষকে দাফন করা হয়। মোট কথা স্থায়ী অবস্থান বলতে এমন স্থানকে বুঝানো হয়েছে যেখানে প্রতিটি প্রাণী অবস্থান করে, ঘুরে-ফিরে আসে। যেমন মানুষের বাড়ি, পাখিদের বাসা, সাপের গর্ত ইত্যাদি। আর مُسْتَقَرَّ বলা হয়, যে স্থানে যাতায়াত করে ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক অবস্থান। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা প্রতিটি প্রাণীর স্থায়ী অস্থায়ী অবস্থানক্ষেত্র সম্পর্কে জানেন। কে রিযিক অন্বেষণের জন্য কোথায় যায়, রিযিক আহরণ করে কোথায় ফিরে আসে সব আল্লাহ তা‘আলা জানেন এবং তা লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সমস্ত মাখলুকের রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহ তা‘আলার। ২. আল্লাহ তা‘আলা সকলের স্থায়ী ও অস্থায়ী আবাসস্থল সম্পর্কে অবগত আছেন ইত্যাদি।

হুদ 11:7

৭ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:: অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, তিনি সাত আকাশ ও জমিন ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। প্রথম দিন হল শনিবার আর শেষ দিন হল শুক্রবার। যখন আকাশ-জমিন সৃষ্টি করেন তখন আল্লাহ তা‘আলার আরশ ছিল সাত আকাশের ওপর সাগরের ওপরে। হাদীসেও এসেছে; আল্লাহ তা‘আলা আকাশ জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। তখন তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর। (সহীহ বুখারী হা: ২৬৫৩) অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা আকাশ-জমিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য বর্ণনা করে বলেন: এ আকাশ-জমিন সৃষ্টি করেছি মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য, কে উত্তম আমল করে। তিনি এগুলোকে অনর্থক সৃষ্টি করেননি। আর যারা এরূপ ধারণা করবে তারা যেন কুফরী করল এবং তাদের জন্য জাহান্নামের শাস্তি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَمَا خَلَقْنَا السَّمَا۬ءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا بَاطِلًا ط ذٰلِكَ ظَنُّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا ج فَوَيْلٌ لِّلَّذِيْنَ كَفَرُوْا مِنَ النَّارِ) “আর আমি আসমান, জমিন এবং উভয়ের মধ্যে অবস্থিত কোন কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করিনি; এরূপ ধারণা তো তাদের যারা কাফির। সুতরাং কাফিরদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুর্ভোগ।” (সূরা স্বদ ৩৮:২৭) (فِيْ سِتَّةِ أَيَّامٍ) এ সম্পর্কে সূরা আ‘রাফের ৫৪ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে। আর আল্লাহ তা‘আলার মানুষ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য হল কে উত্তম কাজ করে তা দেখার জন্য। তারপর আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে বলেন: তুমি যদি তাদেরকে বল যে তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তখন তারা বলবে, এটা জাদু ব্যতীত অন্য কিছু নয়। জাদুর যেমন প্রকৃত সত্য বলতে কিছু নেই তেমনি পুনরুত্থানের প্রকৃত ব্যাপার বলতে কিছু নেই। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে পুনরুত্থিত করবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই এবং এতে আল্লাহ তা‘আলা সক্ষম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَهُوَ الَّذِيْ يَبْدَؤُا الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيْدُه۫ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ) “তিনি সৃষ্টির সূচনা করেন, তারপর তিনিই আবার তা পুনরাবৃত্তি করবেন এটা তাঁর জন্য খুবই সহজ।” (সূরা রূম ৩০:২৭) সুতরাং প্রত্যেক মু’মিন ব্যক্তিকে পুনরুত্থানের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে, অন্যথায় ঈমান থাকবে না। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১.আল্লাহ তা‘আলা আকাশ-জমিন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। ২. পৃথিবী ও আকাশ সৃষ্টির পূর্বে আরশ ছিল পানির ওপর। ৩. আল্লাহ মানুষকে এ পরীক্ষা করার জন্য পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন যে, কে সৎ কর্মে উত্তম। ৪. মানুষকে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হবে।

হুদ 11:8

৮ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:: উক্ত আয়াতে কাফির, মুশরিকদের একটি মন্দ অভ্যাসের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আমি যখন তাদের থেকে কোন শাস্তিকে কিছু দিন/সময় পিছিয়ে দেই তাহলে তারা আল্লাহ তা‘আলাকে দোষারোপ করে ও বলে যে, কিসে এই শাস্তিকে আটকে রেখেছে। আল্লাহ তা‘আলা শাস্তি দিতে অক্ষম। অথচ তারা জানে না যে, এই পিছিয়ে দেয়াটা তাদের প্রতি একটা অনুগ্রহ আর এই শাস্তি একদিন অবশ্যই আসবে। এই শাস্তি যখন আসবে তখন তা তাদের সকলকে গ্রাস করে নেবে, সকলকে ধ্বংস করে দেবে। কেউ তখন সেই শাস্তিকে প্রতিরোধ করতে পারবে না। সুতরাং শাস্তি পিছিয়ে দেয়ার ফলে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করা ঠিক নয়। আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি যেকোন সময় আসতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা তাতে অক্ষম নন; বরং তিনি তা দিতে সক্ষম। أمة শব্দটি পবিত্র কুরআনে একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- (১) জাতি অর্থে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَلِكُلِّ أُمَّةٍ رَّسُوْلٌ) “প্রত্যেক জাতির জন্য (পাঠানো হয়েছে) একজন রাসূল।” (সূরা ইউনুস ১০:৪৭) (২) দল অর্থে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (وَلَمَّا وَرَدَ مَا۬ءَ مَدْيَنَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مِّنَ النَّاسِ) “যখন সে মাদইয়ানের কূপের নিকট পৌঁছল, দেখল, একদল লোক।” (সূরা কাসাস-২৮:২৩) (৩) মতাদর্শ অর্থে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (إِنَّا وَجَدْنَآ اٰبَا۬ءَنَا عَلٰٓي أُمَّةٍ) “আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে পেয়েছি এক মতাদর্শের ওপর।” (সূরা যুখরুফ ৪৩:২৩) (৪) ইমাম অর্থে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (إِنَّ إِبْرٰهِيْمَ كَانَ أُمَّةً) “নিশ্চয়ই‎ ইব্রাহীম ছিল এক ‘উম্মাত’।” (সূরা নাহল ১৬:১২০) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. আল্লাহ তা‘আলা শাস্তি দ্রুতও দিতে পারেন বিলম্বেও দিতে পারেন। ২. আল্লাহ তা‘আলার শাস্তিকে প্রতিহত করার মত কেউ নেই।

হুদ 11:17

১৭ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:: আল্লাহ তা‘আলা এখানে ঐ সকল মু’মিনদের অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন যারা তাঁর সেই প্রকৃতির ওপর রয়েছে যার ওপর তিনি তাঁর বান্দাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। যারা মনে প্রাণে স্বীকার করে যে, আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّيْنِ حَنِيْفًا ط فِطْرَتَ اللّٰهِ الَّتِيْ فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا ط لَا تَبْدِيْلَ لِخَلْقِ اللّٰهِ ط ذٰلِكَ الدِّيْنُ الْقَيِّمُ) “অতএব তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখ; এটাই আল্লাহর ফিতরাত (প্রকৃতি) যার ওপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই সরল-সঠিক দীন।” (সূরা রূম ৩০:৩০) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: সকল শিশু প্রকৃতির ওপর জন্ম গ্রহণ করে, অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহূদী , খ্রিস্টান, অগ্নিপূজক বানায়। (সহীহ বুখারী হা: ১৩৫৯) (وَيَتْلُوْهُ شَاهِدٌ مِّنْهُ) বলতে কুরআন অথবা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বুঝানো হয়েছে। যা সঠিক পথের দিকে আহ্বান করে। অনুরূপ মূসা (عليه السلام)-এর কিতাবও সত্যের দিকে পথ প্রদর্শন করত ও রহমতের কারণ বটে। এগুলো একজন মু’মিন ব্যক্তির ঈমানের ওপর সাক্ষী। সুতরাং সে একজন বিশ্বাসী বা ঈমানদার। আর সে সমস্ত দল তা ইয়াহূদী বা খ্রিস্টান, মাজূসী যাই হোক না কেন যারা এতে ঈমান আনবে না তারা নিঃসন্দেহে কাফির আর তারা জাহান্নামী। তাই একজন কাফির ও একজন মু’মিন সমান হতে পারে না। (فَلَا تَكُ فِيْ مِرْيَةٍ) আর আল্লাহ তা‘আলা এই কিতাব অবতীর্ণ করেছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই এবং এই ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (ال۬مّ۬ تَنْزِیْلُ الْکِتٰبِ لَا رَیْبَ فِیْھِ مِنْ رَّبِّ الْعٰلَمِیْنَ)‏ “আলিফ- লাম- মীম-; এ কিতাব বিশ্বজগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, এতে কোন সন্দেহ নেই।” (সূরা সিজদাহ ৩২:১-২) (أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يُؤْمِنُوْنَ) অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষ রয়েছে তাদেরকে যতই উপদেশ নসীহত করা হোক না কেন তারা উপদেশও গ্রহণ করবে না এবং ঈমানও আনবে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَمَآ أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِيْنَ) “তুমি যতই আকাক্সক্ষা কর না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাসী নয়।” (সূরা ইউসূফ ১২:১০৩) সুতরাং তারা ঈমান আনবে না আর তাদেরই আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. মানুষ প্রকৃতপক্ষে ইসলামের ওপরই জন্ম গ্রহণ করে। ২. কুরআন আল্লাহ তা‘আলার কিতাব তাতে সন্দেহ পোষণ করা যাবে না। ৩. এক ধরনের লোক রয়েছে যারা উপদেশ শোনে বটে, কিন্তু ঈমান আনে না তাদের মত হওয়া যাবে না।

হুদ 11:123

১২৩ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: এখানে আল্লাহ তা‘আলা খবর দিচ্ছেন যে, আকাশ ও জমিনের গায়েবের সকল বিষয় একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা জানেন। আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কেউ জানে না। অত্র সূরার শুরু থেকেই বুঝা গেছে যে, কোন নাবীই গায়েব জানতেন না। সুতরাং যদি কোন নাবী গায়েব না জানেন তাহলে আর কে এমন আছে যে গায়েব জানবে? আর কিয়ামতের দিন কর্তা কর্ম সমস্ত কিছু আল্লাহ তা‘আলার দিকেই ফিরে যাবে। তিনি সমস্ত বিষয়ে মীমাংসা করে দেবেন আর এ কারণেই তিনি একমাত্র তাঁরই ইবাদত করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন। তাকে ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করা যাবে না এবং তা করলে শির্ক হবে। আর পরিশেষে বলেছেন যে, সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার ওপরই ভরসা করতে হবে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত ভরসা করা যায় এমন কেউ নেই। এ সম্পর্কে অনেক আলোচনা পূর্বে গত হয়েছে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. গায়েব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা জানেন, অন্য কেউ নয়। ২. ইবাদত ও তাওয়াক্কুল একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্যই করতে হবে। ৩. আল্লাহ তা‘আলা বান্দার সকল কর্ম সম্পর্কে অবগত, তাই তিনি প্রত্যেককে তার কর্ম অনুপাতেই প্রতিদান দিবেন।

আর-রাদ 13:1

নামকরণ: الرَّعْدِ অর্থ বজ্রধ্বনি। বজ্রধ্বনিসহ পৃথিবীর সব কিছু আল্লাহ তা‘আলার তাসবীহ পাঠ করে। এ সম্পর্কে অত্র সূরার ১৩ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে, সেখান থেকেই উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। সূরার শুরুতে আল্লাহ তা‘আলার মহত্ব, বড়ত্ব ও রুবুবিয়্যাহ, পুনরুত্থানের ব্যাপারে কাফেরদের আশ্চর্যবোধ, গায়েবসহ সকল সূক্ষ্ম খবরাদি আল্লাহ তা‘আলা রাখেন এবং মানুষকে সংরক্ষণ ও তাদের আমল হিফাযতের জন্য নিযুক্ত ফেরেশতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সত্য-মিথ্যার উপমা, যারা আল্লাহ তা‘আলার আহ্বানে সাড়া দেয় তাদের উত্তম প্রতিদান, যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাদের খারাপ পরিণতি, মানুষকে পরিমিত রিযিক দেয়ার হিকমত এবং যারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে অন্যকে অংশীস্থাপন করে তাদের পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তারপর জান্নাতের উপমা, নাবীদের স্ত্রী ও বংশধর দেয়া এবং আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমতা ও কাফেরদের নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করা সম্পর্কে আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। ১ নং আয়াতের তাফসীর: ال۬مّ۬رٰ -(আলিফ-লাম-মীম-রা) এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ সম্পর্কে সূরা বাকারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এর আসল উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই জানেন। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, এগুলো এমন কিতাবের আয়াত যা দীনের মূল ও শাখা-প্রশাখাসহ যা কিছু মানুষের প্রয়োজন তার দিক-নির্দেশনা প্রদান করে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা এ কিতাবে যা সংবাদ দিয়েছেন তা সত্য, যে সকল নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা ন্যায়। সুতরাং যে ব্যক্তি কুরআনের প্রতি ঈমান এনে তাঁর নির্দেশানুযায়ী আমল করবে সে সত্যানুরাগী ও সঠিক পথের অনুসারী। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এ কুরআনের প্রতি ঈমান আনে না হয়তো অজ্ঞতার কারণে অথবা তার প্রতি বিমুখ হয়ে। সুতরাং নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা সত্য, কোন সংশয় নেই। এখানে মূলত কাফির, মুশরিকদের সংশয় দূরীভূত করা হয়েছে যারা মনে করে এ কুরআন আল্লাহ তা‘আলার কিতাব বা ঐশীগ্রন্থ নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ التَّوْرٰةَ وَالْأِنْجِيْلَ) “তিনি সত্যসহকারে আপনার উপর কিতাব নাযিল করেছেন যা পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী। তিনি আরো নাযিল করেছেন তাওরাত ও ইঞ্জিল।” (সূরা আলি ইমরান ৩:৩) সুতরাং কুরআন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতারিত কিতাব যাতে কোন রকম সন্দেহের অবকাশ নেই। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. কুরআন আল্লাহ তা‘আলার কালাম, এতে কোন সংশয় নেই। ২. কুরআনের সকল নির্দেশ ও নিষেধ ন্যায়সঙ্গত এবং সকল সংবাদ সত্য। ৩. অধিকাংশ লোক ঈমান আনবে না এটাই আল্লাহ তা‘আলার ভবিষ্যত বাণী।

আর-রাদ 13:5

৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলছেন: হে রাসূল! কাফিররা যে তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে তা কোন আশ্চর্য হবার বিষয় নয়। তাদের স্বভাবই এরকম। আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শন প্রত্যক্ষ করছে এমনকি তারা স্বীকারও করছে যে, সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা‘আলা। এতদসত্বেও তারা কিয়ামত ও পুনরুত্থান দিবসকে অস্বীকার করে। এমনকি তারা বলে যে, আমরা যখন পচে-গলে মাটিতে পরিণত হয়ে যাব তখনো কি আমাদেরকে পুনরায় জীবিত করা হবে? তারা যেন এটা বিশ্বাসই করতে চায় না। অথচ তারা জানে না যে, আকাশ-জমিন সৃষ্টি করা তাদের সৃষ্টি থেকে অধিক কঠিন, দ্বিতীয়বারের সৃষ্টি প্রথমবারের সৃষ্টির তুলনায় অধিক সহজ। আল্লাহ তা‘আলা এতে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللّٰهَ الَّذِيْ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضَ وَلَمْ يَعْيَ بِخَلْقِهِنَّ بِقَادِرٍ عَلٰٓي أَنْ يُّحْيِيَ الْمَوْتٰي ط بَلٰٓي إِنَّه۫ عَلٰي كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ)‏ “তারা কি এটুকুও বোঝে না, যে আল্লাহ তা‘আলা জমিন ও আসমান সৃষ্টি করলেন এবং এগুলো সৃষ্টি করতে তিনি ক্লান্ত হননি, সেই আল্লাহ তা‘আলা মৃত্যুকে অবশ্যই জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন। কেন নয়? নিশ্চয়ই তিনি সব কিছুর উপর শক্তিশালী।” (সূরা আহক্বাফ ৪৬:৩৩) সুতরাং পুনরায় জীবিত করা আল্লাহ তা‘আলার নিকট কোন কঠিন কাজ নয়। এরপরেও যারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না তাদের গলাতেই বেড়ী পড়িয়ে দেয়া হবে এবং তারাই হবে জাহান্নামী। তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে। কেউ তাদেরকে সেখান থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَجَعَلْنَا الْأَغْلَالَ فِيْ أَعْنَاقِ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا) “এবং আমি কাফিরদের গলায় বেড়ী পরিয়ে দেব।” (সূরা সাবা ৩৪:৩৩) আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন: (إِنَّا جَعَلْنَا فِيْٓ أَعْنَاقِهِمْ أَغْلٰلًا فَهِيَ إِلَي الْأَذْقَانِ فَهُمْ مُّقْمَحُوْنَ)‏ “আমি তাদের গলায় শৃঙ্খল পরিয়েছি, তা তাদের চিবুক পর্যন্ত, ফলে তারা ঈমান আনবে না।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৮) সুতরাং যারা পুনরুত্থান দিবস ও কিয়ামত দিবসকে অস্বীকার করবে তাদেরকে কঠিনভাবে শাস্তি দেয়া হবে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. কাফিরদের অস্বীকার করাতে আশ্চর্য হবার কিছুই নেই কারণ তাদের অভ্যাসই হল অস্বীকার করা। ২. কাফিরদের শাস্তি হিসেবে তাদের গলদেশে লোহার বেড়ী পরিয়ে দেয়া হবে। ৩. কিয়ামত ও পুনরুত্থান দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব।

আর-রাদ 13:11

১১ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে বলা হচ্ছে যে, মানুষের সামনে-পিছনে, ডানে-বামে তাকে রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য প্রহরী নিযুক্ত রয়েছে। مُعَقِّبٰتٌ শব্দটি معقبة এর বহুবচন। অর্থ এক জনের পর অপর জন্য আসা। অর্থাৎ একজন ফেরেশতা চলে গেলে অন্য ফেরেশতা আগমন করে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করে। তারা অনিষ্টকারীর অনিষ্ট থেকে মানুষকে সংরক্ষণ করে। এবং একদলকে নিযুক্ত করা হয়েছে তাদের কার্যকলাপসমূহ লিখে রাখার জন্য। যার উপর ভিত্তি করে তাদেরকে আখিরাতে প্রতিদান দেয়া হবে। এই প্রহরী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “তোমাদের কাছে ফেরেশতারা পালাক্রমে আগমণ করে থাকেন দিবসে ও রজনীতে। ফজর ও আসরের সালাতের সময় উভয় দলের মিলন ঘটে। রাত্রে অবস্থানকারী ফেরেশতাগণ রাত্রি শেষে আকাশে উঠে যান। বান্দাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন: তোমরা আমার বান্দাদেরকে কী অবস্থায় ছেড়ে এসেছ? তারা উত্তরে বলেন: আমরা তাদের কাছে আগমণের সময় সালাতের অবস্থায় তাদেরকে পেয়েছি এবং বিদায়ের সময়ও তাদেরকে সালাতের অবস্থায় ছেড়ে এসেছি। (সহীহ বুখারী হা: ৫৫৫) হেফাযতকারী ফেরেশতাদের কাজ শুধু পার্থিব বিপদাপদ থেকে রক্ষা করাই নয় বরং তারা মানুষকে পাপ কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখারও চেষ্টা করে। মানুষের মনে সাধুতা ও আল্লাহ তা‘আলাভীতির প্রেরণা জাগ্রত করে যাতে সে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে। এরপরও যদি সে ফেরেশতাদের প্রেরণার প্রতি উদাসীন হয়ে পাপ কাজে লিপ্ত হয়, তবে তারা দু‘আ ও চেষ্টা করে যাতে সে শীঘ্র তাওবা করে ক্ষমা করিয়ে নেয়। অগত্যা যদি কোনরূপেই হুশিয়ার না হয় তখন তার আমলনামায় গোনাহ লেখা হয়। (إِنَّ اللّٰهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ) -এই আয়াতের তাফসীর ভাল-মন্দ দুদিকেই করা যায়: (১) কোন জাতি যদি নিজেদের অবস্থানকে ভাল ও উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে চায় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা সে ভাল ও উন্নতির সুযোগ করে দেন। হাত গুটিয়ে বসে থাকলে আল্লাহ তা‘আলা অবস্থার পরিবর্তন করে দিবেন না। (২) কোন জাতি যদি পাপ কাজ ও কুফরী করে নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে নেয় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের থেকে নেয়ামত ছিনিয়ে নেন। মোটকথা মানুষের চিন্তা-চেতনা, কাজ-কর্ম যেদিকে ধাবিত হয় আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সেদিকে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। তারা যদি ভাল ও উন্নতির দিকে যায় আল্লাহ তা‘আলা তাদের উন্নতির পথ খুলে দেন, আর যদি পাপ ও কুফরী করে নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঢেলে দেয় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের থেকে নেয়ামত ছিনিয়ে নিয়ে ধ্বংস করে দেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (ذٰلِكَ بِأَنَّ اللّٰهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّرًا نِّعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلٰي قَوْمٍ حَتّٰي يُغَيِّرُوْا مَا بِأَنْفُسِهِمْ) “এটা এজন্য যে, যদি কোন সম্প্রদায় নিজের অবস্থার পরিবর্তন না করে তবে আল্লাহ তা‘আলা এমন নন যে, তিনি তাদেরকে যে সম্পদ দান করেছেন, সেটা পরিবর্তন করবেন।” (সূরা আনফাল ৮:৫৩) সুতরাং এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক জাতিকে তাদের অবস্থায় উন্নতি এবং নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ মাত্রায় পেতে হলে সকল প্রকার খারাপ ও নাফরমানীমূলক কাজ পরিত্যাগ করতে হবে। অন্যথায় তা সম্ভব নয়। আর আল্লাহ তা‘আলা যদি কারো অনিষ্ট করতে চান তাহলে এমন কেউ নেই যে, তাঁর অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবে। অতএব সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. মানুষকে রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য দিবা-রাত্রিতে ফেরেশতা নিযুক্ত করা হয়েছে, তারা পার্থিব রক্ষা করার পাশাপাশি সকল আমল সংরক্ষণ করে। ২. প্রত্যেক জাতিকে নিজ চেষ্টার মাধ্যমে তার নেয়ামতকে পূর্ণ করে নিতে হবে। ৩. আল্লাহ তা‘আলা কোন জাতিকে ততক্ষণ ধ্বংস করেন না যতক্ষণ না নিজেদের অবস্থাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

আর-রাদ 13:16

১৬ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াতের ১ম অংশে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জবান থেকে আকাশ-জমিনের প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলা এ স্বীকারোক্তি নিচ্ছেন। অন্যত্র বলা হয়েছে মুশরিকরাও আল্লাহ তা‘আলার এ প্রকার তাওহীদ স্বীকার করত। কিন্তু তারা তাওহীদে রুবুবিয়্যাহ স্বীকার করলেও ইবাদত করত আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যান্য প্রতিমার। আল্লাহ তা‘আলাকে ছেড়ে এমন সৃষ্টিদেরকে অভিভাবক, বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক মনে করত যারা নিজেদের লাভ-ক্ষতিরও ক্ষমতা রাখে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, (قُلْ أَتَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ مَا لَا يَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَّلَا نَفْعًا) “বল: তোমরা কি আল্লাহ ব্যতীত এমন কিছুর ইবাদত কর, যারা তোমাদের ক্ষতি বা উপকার করার কোন ক্ষমতা রাখে না?” (সূরা মায়েদা ৫:৭৬) সুতরাং আল্লাহ তা‘আলাকে সব কিছুর মালিক মনে করা সত্ত্বেও তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যের ইবাদত করা এটা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। পরবর্তীতে আল্লাহ তা‘আলা দৃষ্টান্ত পেশ করছেন, যেমনভাবে দৃষ্টিহীন ও দৃষ্টিমান এবং অন্ধকার ও আলো সমান হতে পারে না তেমনি তাওহীদপন্থী ও মুশরিক সমান হতে পারে না। কেননা তাওহীদপন্থীর হৃদয় তাওহীদের জ্যোতিতে আলোকিত থাকে, আর মুশরিক অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যের উপাসনা করে তারা তা হতে বঞ্চিত। ফলে সে তাওহীদের আলো দেখতে পায় না। কেননা সে এ ব্যাপারে অন্ধ। অনুরূপভাবে আলো ও অন্ধকার যেমন সমান নয় তেমনি এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতকারী যার হৃদয় ঈমানী জ্যোতিতে পরিপূর্ণ এবং মুশরিক, যার হৃদয় অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দ্বারা পরিপূর্ণ তারা কক্ষনো এক হতে পারে না। (أَمْ جَعَلُوْا لِلّٰهِ شُرَكَا۬ءَ خَلَقُوْا كَخَلْقِه) অর্থাৎ মুশরিকরা যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার অংশীদার স্থির করছে তারা আল্লাহর সৃষ্টির মত কোন কিছু সৃষ্টি করেছে কি? ফলে তাদের কাছে বিষয়টি সাদৃশ্যপূর্ণ লাগছে যে, কে সৃষ্টিকর্তা আর সৃষ্টিকর্তা নয় তা আলাদা করা যাচ্ছে না, তাই তারা সবার ইবাদত করছে। বিষয়টি তো এমন নয়। বরং মুশরিকরাও স্বীকার করে যে, আল্লাহ তা‘আলাই একমাত্র স্রষ্টা। তাহলে কেন তাদের ইবাদত কর এবং তাদের মাধ্যম ধরে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জন করতে চাও। তাদের কথা আল্লাহ তুলে ধরে বলেন: (مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَي اللّٰهِ زُلْفٰي) “আমরা তো এদের উপাসনা এজন্য করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্যে পৌঁছে দেয়।” (সূরা যুমার ৩৯:৩) সুতরাং সব কিছুর মালিক, স্রষ্টা ও অধিপতি একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা এ কথা জানার পরেও যারা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করে তাহলে তাদের জন্য অপমানকর শাস্তি রয়েছে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. মক্কার মুশরিকরা স্বীকার করত ও বিশ্বাস করত যে, সব কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা কিন্তু ইবাদত করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যের পূজা করত। ২. ঈমানদার আর মুশরিক সমান হতে পারে না যেমনিভাবে আলো ও অন্ধকার সমান নয়। ৩. কোন ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলাকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করলেই মুমিন হবে না যতক্ষণ না সকল ইবাদত আল্লাহ তা‘আলার জন্য করে।

আর-রাদ 13:17

১৭ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে সত্য-মিথ্যা, আসল-নকল, আসলের স্থায়ীত্ব ও নকলের অস্থায়ীত্বের দু‘টো দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। পথের দিশারী ও জীবন সংবিধান সম্বলিত কুরআনকে বৃষ্টির সাথে তুলনা করা হয়েছে। কেননা কুরআনের উপকারিতা বৃষ্টির উপকারিতার মতই ব্যাপক। আর উপত্যকাকে তুলনা করেছেন হৃদয়ের সঙ্গে। কেননা উপত্যকায় পানি গিয়ে স্থির হয়ে যায়, যেমন কুরআনের মাধ্যমে ঈমান মু’মিনের হৃদয়ে স্থির হয়ে যায়। ফলে তার হৃদয়ে ভাল জিনিসগুলো স্থান পায় এবং কুফরী বিশ্বাস তার থেকে দূরে সরে যায়, যেমন পানির উপরের ফেনা তার উপর থেকে আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যায়, অথবা বাতাস তা শেষ করে দেয়। ফলে আসল জিনিসটাই টিকে থাকে আর বাতিল যেগুলো ছিল তা দূরীভূত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আল্লাহ তা‘আলা আমাকে যে হিদায়াত ও ইলম দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার উদাহরণ হল জমিনের উপর পতিত প্রবল বৃষ্টির ন্যায়। কোন কোন ভূমি থাকে উর্বর যা পানি চুষে নিয়ে প্রচুর পরিমাণে ঘাসপাতা ও সবুজ তরুলতা উৎপন্ন করে। আর কোন কোন ভূমি আছে যা কঠিন, পানি আটকে রাখে, পরে আল্লাহ তা‘আলা তা দিয়ে মানুষের উপকার করেন। তারা নিজেরা পান করে, পশুপাখিকে পান করায় এবং চাষাবাদের কাজে লাগায়। কোন কোন জমি আছে মসৃণ সমতল তা পানি আটকে রাখে না এবং কোন ঘাসপাতা উৎপন্নও করে না। এ হল সে ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে দীনের জ্ঞান লাভ করে এবং আল্লাহ তা‘আলা আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তা থেকে উপকৃত হয়। ফলে সে নিজে শিক্ষা গ্রহণ করে অপরকে শিক্ষা দেয়। (সহীহ বুখারী হা: ৭৯) দ্বিতীয় একটি দৃষ্টান্ত হল, সোনা-রূপা, লৌহ ও তামা। এগুলোকে আগুনে তাপ দেয়া হয়। আগুনে তাপ দেয়ার সময় এগুলিতেও ফেনা জাতীয় জিনিস উত্থিত হয়। যেমন দুটো জিনিসে ফেনা উত্থিত হবার পর তা দূর হয়ে যায় তেমনি হক্বের উপরও কখনো কখনো বাতিল ছেয়ে যায়। অবশেষে বাতিল দূর হয়ে যায় এবং হক্ব পৃথকভাবেই থেকে যায়। যেমন পানির উপর থেকে ফেনা চলে গেলে তা পরিষ্কারভাবে থেকে যায়। সুতরাং বাতিল জিনিস কখনো কখনো প্রাধান্য বিস্তার লাভ করলেও তা চিরস্থায়ী হয় না। তা অবশেষে বিদায় নিয়ে চলে যায় এবং সত্যই টিকে থাকে। এভাবে আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনের অনেক জায়গায় হক্ব ও বাতিলের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “যারা কুফরী করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ, পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু সে যখন সেখানে উপস্থিত হয় তখন কিছুই দেখতে পায় না। এবং সে পাবে সেথায় আল্লাহকে, অতঃপর তিনি তার কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দিবেন। আল্লাহ হিসেব গ্রহণে তৎপর। অথবা তাদের কর্ম গভীর সমুদ্র তলের অন্ধকার সদৃশ, যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ, যার ঊর্ধ্বে মেঘপুঞ্জ, অন্ধকারপুঞ্জ স্তরের উপর স্তর, এমনকি সে হাত বের করলে তা আদৌ দেখতে পাবে না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দান করেন না তার জন্য কোন জ্যোতিই নেই।” (সূরা নূর ২৪:৩৯-৪০) এখানে কুফরকে বাতিল এর সাথে উপমা দেয়া হয়েছে। أَوْدِيَةٌ শব্দটি واد-এর বহুবচন, অর্থ উপত্যকা। (فَسَالَتْ أَوْدِيَةٌم بِقَدَرِهَا) অর্থাৎ প্রত্যেক উপত্যকার যেটুকু পরিমাণ পানি দরকার তা ধারণ করে নেয়। زَبَدً অর্থ ময়লা আর্বজনা। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সত্য সর্বদা সমাগত, মিথ্যা সর্বদা বিতাড়িত। মিথ্যা কখনো চূড়ান্তভাবে জয় লাভ করতে পারে না। ২. ঈমান হল হক্ব আর কুফর হল বাতিল।

আর-রাদ 13:18

১৮ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রতিদানের কথা বর্ণনা করছেন যারা তাঁর ডাকে সাড়া দেয় আর যারা তাঁর ডাকে সাড়া দেয়া না। যারা আল্লাহ তা‘আলার ডাকে সাড়া দেয় তথা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান আনে ও সৎ আমল করে তারা উভয়কালে শান্তিতে থাকবে। তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং তারা দুশ্চিন্তা গ্রস্তও হবে না। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (إنَّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَأَقَامُوا الصَّلوٰةَ وَاٰتَوُا الزَّكوٰةَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ ج وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُوْنَ) “নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে তাদের রবের কাছে এসব আমলের প্রতিদান মওজুদ রয়েছে। আর তাদের কোন ভয় নেই, চিন্তাও নেই।” (সূরা বাক্বারা ২:২৭৭) الْحُسْنٰي অর্থ দুনিয়াতে সহযোগিতা করা এবং আখিরাতে চিরস্থায়ী নেয়ামত ভোগ করা। আর যারা আল্লাহ তা‘আলার ডাকে সাড়া দেয়া না তথা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করে, রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। তাদের অবস্থা এমন হবে যে, যদি তারা সমস্ত পৃথিবী ও তার সমপরিমাণ সম্পদের মালিক হত, তাহলে তা বিনিময়স্বরূপ দিয়ে শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে চায়তো। বস্তুত কিয়ামতের দিন কারো নিকট থেকে কোন কিছুই গ্রহণ করা হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (إِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا وَمَاتُوْا وَهُمْ كُفَّارٌ فَلَنْ يُّقْبَلَ مِنْ أَحَدِهِمْ مِّلْءُ الْأَرْضِ ذَهَبًا وَّلَوِ افْتَدٰي بِه۪) “নিশ্চয়ই যারা কুফরী করেছে এবং কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে তাদের পক্ষ থেকে পৃথিবী ভরা স্বর্ণও বিনিময় স্বরূপ প্রদান করতে চাইলে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না।” (সূরা আলি ইমরান ৩:৯১) আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন, (إِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَوْ أَنَّ لَهُمْ مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيْعًا وَّمِثْلَه۫ مَعَه۫ لِيَفْتَدُوْا بِه۪ مِنْ عَذَابِ يَوْمِ الْقِيٰمَةِ مَا تُقُبِّلَ مِنْهُمْ ج وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ)‏ “নিশ্চয়ই যারা কুফরী করেছে, যদি তাদের কাছে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ থাকে এবং তার সাথে সমপরিমাণ আরও থাকে আর এগুলোর বিনিময়ে কিয়ামাতের দিন শাস্তি থেকে রেহাই পেতে চায়, তবুও তাদের নিতট হতে তা কবূল করা হবে না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা মায়েদা ৫:৩৬) তাদের হিসাব হবে খুবই কঠিন। তাদের ছোট-বড় প্রত্যেকটি কর্মের হিসাব নেয়া হবে। আর যাদের হিসাব চাওয়া হবে তারা মুক্তি পাবে না। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যার হিসাব চাওয়া হবে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে। (সহীহ বুখারী হা: ১০৩, সহীহ মুসলিম হা: ৭৪০৮) সুতরাং যারা আল্লাহ তা‘আলার ডাকে সাড়া দিবে না তারা দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত হবে এবং আখিরাতেও কঠিন শাস্তি ভোগ করবে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: (১) যারা মু’মিন তারা আখিরাতে নিষ্কৃতি লাভ করবে আর যারা কাফির তারা কঠিন শাস্তি ভোগ করবে। (২) আল্লাহ তা‘আলা যার হিসাব নিবেন সে শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না। (৩) জাহান্নাম বড় কষ্টের জায়গা, সেখানে আরামে থাকা যাবে না।

আর-রাদ 13:30

৩০ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন যে, তোমাকে যেমনভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হচ্ছে অনুরূপভাবে তোমার পূর্ববর্তী নবীদেরকেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছিল। সুতরাং তুমি মন খারাপ কর না। তোমাকে যেরূপ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তাদেরকেও অনুরূপ তাদের উম্মতদেরকে আমার বিধান পাঠ করে শুনানোর ও তাদের সতর্ক করার দায়িত্ব দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা তা শুনেনি বরং মিথ্যা মনে করেছে। ফলে তাদেরকে শাস্তি পেয়ে বসেছে। অতএব তাদেরও তাদের পূর্ববর্তীদের শাস্তির কথা লক্ষ্য করা উচিৎ। তারা এ শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (تَاللّٰهِ لَقَدْ أَرْسَلْنَآ إِلٰٓي أُمَمٍ مِّنْ قَبْلِكَ فَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطٰنُ أَعْمَالَهُمْ فَهُوَ وَلِيُّهُمُ الْيَوْمَ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ - ‏ وَمَآ أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ إِلَّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِي اخْتَلَفُوْا فِيْهِ لا وَهُدًى وَّرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُّؤْمِنُوْنَ) “শপথ আল্লাহর! আমি তোমার পূর্বেও বহু জাতির নিকট রাসূল প্রেরণ করেছি; কিন্তু শয়তান ঐসব জাতির কার্যকলাপ তাদের দৃষ্টিতে শোভন করেছিল; সুতরাং সে-ই আজ তাদের অভিভাবক এবং তাদেরই জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আমি তো তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি যারা এ বিষয়ে মতভেদ করে তাদেরকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেবার জন্য এবং মু’মিনদের জন্য পথনির্দেশ ও দয়াস্বরূপ।” (সূরা নাহল ১৬:৬৩-৬৪) অতএব, তুমি মানুষকে এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করার দিকে দা‘ওয়াত দিয়ে যাও এবং তাদের কথার উপর ধৈর্য ধারণ কর, নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ তা‘আলাই তোমাকে সাহায্য করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِّنْ قَبْلِكَ فَصَبَرُوْا عَلٰي مَا كُذِّبُوْا وَأُوْذُوْا حَتّٰي أَتٰهُمْ نَصْرُنَا ج وَلَا مُبَدِّلَ لِكَلِمٰتِ اللّٰهِ ج وَلَقَدْ جَا۬ءَكَ مِنْ نَّبَاْئِ الْمُرْسَلِيْنَ) “মিথ্যা প্রতিপন্ন করা ও কষ্ট দেয়া সত্ত্বেও তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল যে পর্যন্ত না আমার সাহায্য তাদের নিকট এসেছে। আল্লাহর আদেশ কেউ পরিবর্তন করতে পারে না, রাসূলগণের সম্বন্ধে কিছু সংবাদ তো তোমার নিকট এসেছেই।” (সূরা আনয়াম ৬:৩৪) অত্র আয়াত থেকে তাদের এটা লক্ষ্য করা উচিৎ যে, কিভাবে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অনুগত লোকদেরকে সাহায্য করেছিলেন এবং কিভাবে তাদেরকে জয়যুক্ত করেছিলেন এবং কিভাবে অস্বীকারকারীদেরকে শাস্তি প্রদান করেছিলেন। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. মানুষের তিরস্কারমূলক কথাবার্তার কারণে ইসলামের দিকে মানুষকে আহ্বান করা বন্ধ করা যাবে না। বরং দাওয়াতী কাজ চালিয়ে যেতে হবে। ২. সর্বাবস্থায় ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করতে হবে।

আর-রাদ 13:35

৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বের আয়াতে কাফিরদের অশুভ পরিণামের পর অত্র আয়াতে মু’মিনদের শুভ পরিণামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যাতে জান্নাত লাভের প্রতি আগ্রহ ও আকাক্সক্ষা সৃষ্টি হয়। মু’মিনদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে তার উপমা হল তার তলদেশে নদী প্রবাহিত। জান্নাতের খাবার ও ছায়া চিরস্থায়ী যা কখনো শেষ হবে না। সেখানে থাকবে দুধের, মধুর এবং শরাবের নহর যা কখনো নষ্ট হবে না। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “মুত্তাকীদের জন্য এমন জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছে, যার মধ্যে বহমান থাকবে পরিস্কার পানির নহর, এমন দুধের নহর যার স্বাদ অপরিবর্তনীয় এবং আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু শরাবের নহর, আরো আছে এমন মধুর নহর যা খাঁটি ও স্বচ্ছ। তাদের জন্য আরো থাকবে সব রকমের ফল এবং তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত। (যে এমন জান্নাতের ভাগী হবে সে কি) তাদের মত হতে পারে, যারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে এবং যাদেরকে এমন ফুটন্ত পানি পান করানো হবে যা তাদের নাড়ি-ভুঁড়ি পর্যন্ত কেটে ফেলবে?” (সূরা মুহাম্মদ ৪৭:১৫) তাদের জন্য তথায় আরো থাকবে ফলমূল ও সন্নিহিত বৃক্ষ ছায়া। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (وَّفَاكِهَةٍ كَثِيْرَةٍ لا ‏ لَّا مَقْطُوْعَةٍ وَّلَا مَمْنُوْعَةٍ)‏ “প্রচুর ফলমূল, যা শেষ হবে না ও যা নিষিদ্ধও হবে না।” (সূরা ওয়াক্বিয়া ৫৬:৩২-৩৩) আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন: (وَدَانِيَةً عَلَيْهِمْ ظِلَالُهَا وَذُلِّلَتْ قُطُوْفُهَا تَذْلِيْلًا) “জান্নাতের বৃক্ষছায়া তাদের উপর ঝুঁকে থাকবে এবং ওর ফলমূল সম্পূর্ণরূপে তাদের আয়ত্বাধীন থাকবে।” (সূরা দাহর ৭৬:১৪) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: সর্বশেষ যে ব্যক্তি জান্নাতে যাবে তাকে দুনিয়া ও দশটি দুনিয়া সমপরিমাণ জান্নাত দেয়া হবে। (সহীহ বুখারী হা: ৬৫৭১) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেছেন: জান্নাতে এমন একটি গাছ আছে যার তলদেশ দিয়ে একজন আরোহী একশত বছর চলাচল করেও শেষ করতে পারবে না। (সহীহ বুখারী হা: ৩২৫২) এ ছাড়াও জান্নাতে নেয়ামত সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত ও হাদীস রয়েছে যা যথাস্থানে আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ। সুতরাং এ নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত পেতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই ঈমানের সাথে সৎ আমল করতে হবে। অন্যথায় আশা করে বসে থাকলে হবে না। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. জান্নাতে চার ধরনের নহর থাকবে। তা হল- দুধের, মধুর, পানির ও শরাবের। ২. মু’মিনদের জন্য জান্নাতে সকল প্রকার ফলমূল থাকবে।

ইবরাহীম 14:4

৪ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন যে, তিনি সকল রাসূলকে তাদের স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছেন। যাতে উম্মাতের কাছে দীনের দাওয়াত দিতে কোন প্রকার জটিলতা সৃষ্টি না হয়, বুঝাতে কোন প্রকার কষ্টের সম্মুখীন হতে না হয়। কারণ রাসূল যদি এক ভাষাভাষী হন আর যাদের কাছে তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছে তারা অন্য ভাষাভাষী হয় তাহলে যে উদ্দেশ্যে রাসূল প্রেরণ করা হয়েছে তা হাসিল হবে না। রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্যই হল, তিনি তাদের কাছে দীনের বিধানাবলী সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরবেন তারা বুঝে সে অনুপাতে জীবন যাপন করবে। কিন্তু মানুষ যদি রাসূলের কথাই না বুঝে, আর মানুষের সমস্যা বুঝে যদি সমাধান না দিতে পারেন তাহলে রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্যই পূরণ হবে না। সুতরাং যে এলাকায় যে ভাষার প্রচলন সে এলাকার জন্য সে ভাষাভাষী ব্যক্তিকেই মনোনীত রাসূল হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। আমাদের রাসূল তো আরবি ভাষাভাষী ছিলেন কিন্তু তিনি তো আরবদের রাসূল নন, তিনি সারা জাহানের রাসূল (সূরা আ‘রাফ ৭:১৫৮) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন প্রত্যেক জাতির কাছে তাদের স্বভাষায় রাসূল প্রেরণ করা হয়েছে, আমাকে প্রত্যেক লাল, কালো অর্থাৎ সারা পৃথিবীবাসীর জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। (সহীহ মুসলিম হা: ৫২১) তাহলে আমরা কি করব? আমরা কি মানুষের কাছে দাওয়াত দেয়ার সময় আরবিতে দাওয়াত দেব, আরবিতে ওয়াজ-নসিহত করব, আরবিতে জুমু‘আর খুৎবা পড়ব না মাতৃভাষায় করব? উত্তর অত্র আয়াতেই আল্লাহ তা‘আলা বলে দিয়েছেন। রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্যই হল মানুষের কাছে দীনের কথা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা। সুতরাং যে জাতির নিকট যে ভাষায় ব্যক্ত করলে বুঝতে পারবে তাদের কাছে সে ভাষায় ব্যক্ত করা উচিত। এর মাঝে জুমু‘আর খুৎবাও শামিল, কারণ জুমু‘আর খুৎবা হল একটি দাওয়াত, ওয়াজ এবং দীনের বিধি বিধান বর্ণনা করার অন্যতম মাধ্যম। এখানে যদি আরবিতে বলা হয় তাহলে ওয়াজ নসিহতের কোন উদ্দেশ্যই ঠিক থাকবে না? অতএব জুমু‘আর খুৎবাও রাসূলের পদ্ধতিতে মানুষের বোধগম্য মাতৃভাষায় প্রদান করতে হবে। (فَيُضِلُّ اللّٰهُ مَنْ يَّشَا۬ءُ) অর্থাৎ রাসূলদের দাওয়াত পাওয়া সত্ত্বেও সবাই মু’মিন-মুসলিম হবে না, বরং আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা করবেন এবং যাকে তাওফীক দেবেন সেই কেবল হিদায়াত পাবে, অন্য কেউ নয়। এ সম্পর্কে অত্র সূরার প্রথম আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. প্রত্যেক রাসূলকে স্বগোত্রীয় ভাষায় প্রেরণ করা হয়েছে। ২. জুমু‘আর খুৎবা মানুষ যে ভাষায় দিলে বুঝতে পারে সে ভাষাতেই হতে হবে।

ইবরাহীম 14:5

৫ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দাওয়াত দেয়ার প্রতি উৎসাহী করণার্থে মূসা (عليه السلام)-এর কথা নিয়ে এসেছেন। মূসা (عليه السلام)-কে আল্লাহ তা‘আলা অনেক নিদর্শন, মু‘জিযাহ ও দলীল-প্রমাণসহ বানী ইসরাঈলের কাছে প্রেরণ করেছেন তাদেরকে কুফর, গোমরাহ ও অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বের করে ঈমান ও জ্ঞানের আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য, অনুরূপ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কেও সারা পৃথিবীর জন্য প্রেরণ করেছেন যাতে তিনি মানুষকে কুফর ও গোমরাহীর পথ থেকে ঈমান ও জ্ঞানের আলোর দিকে নিয়ে আসতে পারেন। তাই নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্ভয়ে আল্লাহ তা‘আলার পথে মানুষকে আহ্বান করেছেন, আল্লাহ তা‘আলা তাকে হিফাযত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (يٰٓأَيُّهَا الرَّسُوْلُ بَلِّغْ مَآ أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَّبِّكَ ط وَإِنْ لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَه۫ ط وَاللّٰهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ ط إِنَّ اللّٰهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكٰفِرِيْنَ) “হে রাসূল! তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার কর; যদি না কর তবে তুমি তাঁর রিসালাত প্রচার করলে না। আল্লাহ তোমাকে মানুষ হতে রক্ষা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” (সূরা মায়িদা ৫:৬৭) (أَيّٰمِ اللّٰهِ) ‘আল্লাহর দিবসগুলো’ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: এর অর্থ হল আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতসমূহ। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাঈলদেরকে যে সকল নেয়ামত দান করেছেন সেসব নেয়ামত। আর এগুলো মূলত অনুধাবন করে তারা, যারা অধিক ধৈর্যশীল এবং যারা অধিক কৃতজ্ঞ, তারা ব্যতীত অন্যরা এটা বুঝে না এবং উপদেশও গ্রহণ করে না। বরং তারা উপদেশ গ্রহণ করার পরিবর্তে বিমুখ হয়ে যায়। ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা দুটি মহৎ গুণ; যার ওপর নির্ভর করে ঈমান, এজন্য এখানে এ দুটি গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ শব্দ দুটি অতিশয়োক্তিরূপে এসেছে। صَبَّارٍ অর্থ অধিক ধৈর্যশীল, شَكُوْر অর্থ অধিক কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞার পূর্বে ধৈর্যের উল্লেখ করার কারণ হল কৃতজ্ঞতা ধৈর্যের ফলাফল। যাদের মাঝে এ দুটি গুণ রয়েছে, তারা সকল ক্ষেত্রেই সফলকাম হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: মু’মিনদের ব্যাপারটাই আশ্চর্যজনক। এটা মু’মিন ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে নয়। যদি কোন ভাল কিছু পায় তাহলে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করে, এটা তার জন্য কল্যাণ, আর যদি খারাপ কিছুতে আক্রান্ত হয় তাহলে ধৈর্য ধারণ করে, এটাও তার জন্য কল্যাণ। (সহীহ মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ হা: ১৮৯৩৪) আয়াতের শিক্ষা: ১. ছোটদের দ্বারাও কখনো বড়দের জন্য দৃষ্টান্ত পেশ করা যায়। ২. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পূর্ববর্তী নাবী-রাসূলদের মত নবুওয়াতের পূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ৩. বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করা একটি মহৎ গুণ।

ইবরাহীম 14:18

১৮ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদের সৎ আমলগুলোর একটি দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। প্রচণ্ড ঝড় এলে ছাই যেমন বাতাসের সাথে উড়ে যায় তেমনি কাফিরদের সৎ আমল যথা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, মেহমানদারী করা ও অন্যকে সহযোগিতা করা ইত্যাদি যা তারা করত কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে তা কোন কাজে আসবে না, ছাইয়ের মত উড়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (وَالَّذِیْنَ کَفَرُوْٓا اَعْمَالُھُمْ کَسَرَابٍۭ بِقِیْعَةٍ یَّحْسَبُھُ الظَّمْاٰنُ مَا۬ئًﺚ حثج اِذَا جَا۬ءَھ۫ لَمْ یَجِدْھُ شَیْئًا وَّوَجَدَ اللہَ عِنْدَھ۫ فَوَفّٰٿھُ حِسَابَھ۫ﺚ وَاللہُ سَرِیْعُ الْحِسَابِﭶﺫ)‏ “যারা কুফরী করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ, পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু সে যখন সেখানে উপস্থিত হয় তখন কিছুই দেখতে পায় না। এবং সে পাবে সেথায় আল্লাহকে, অতঃপর তিনি তার কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দেবেন। আল্লাহ হিসেব গ্রহণে তৎপর।” (সূরা নূর ২৪:৩৯) অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَقَدِمْنَآ إِلٰي مَا عَمِلُوْا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنٰهُ هَبَا۬ءً مَّنْثُوْرًا )‏ “আমি তাদের কৃতকর্মের দিকে অগ্রসর হব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।” (সূরা ফুরকান - ২৫:২৩) সুতরাং ঈমান বিহীন কোন আমল গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে যারা বলেন, কাফির অবস্থায় সৎ আমল যেমন কাজে আসে না তেমনি মু’মিন অবস্থায় গুনাহ করলে ক্ষতি হয়না। এটা ভুল ও ভ্রান্ত চিন্তা চেতনা, কারণ মু’মিন অবস্থায় গুনাহ করলে ঈমানের ক্ষতি হয় তা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সুস্পষ্ট। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. ঈমান বিহীন সৎ আমল কোন কাজে আসবে না। ২. আল্লাহ তা‘আলার বিধানের সাথে কুফরী করা যাবে না। আর যদি কুফরী করা হয় তাহলে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।

ইবরাহীম 14:31

৩১ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাধ্যমে মু’মিন বান্দাদেরকে আদেশ করছেন, তারা যেন সালাত আদায় করে, গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করে। এ ব্যয় এর মাঝে যাকাত, সাদকাহ ও অন্যান্য নফল দান অন্তর্ভুক্ত। এসব আমল সেদিন আগমনের আগেই করতে বলা হয়েছে, যেদিন কোন ক্রয়-বিক্রয় থাকবে না এবং থাকবে না কোন বন্ধুত্ব। অর্থাৎ কিয়ামত দেবসের পূর্বেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (يٰٓأَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْآ أَنْفِقُوْا مِمَّا رَزَقْنٰكُمْ مِّنْ قَبْلِ أَنْ يَّأْتِيَ يَوْمٌ لَّا بَيْعٌ فِيْهِ وَلَا خُلَّةٌ وَّلَا شَفَاعَةٌ ط وَالْكٰفِرُوْنَ هُمُ الظّٰلِمُوْنَ ) “হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা হতে তোমরা ব্যয় কর এমন এক দিন আসার আগে যেদিন কোন বেচা-কেনা, বন্ধুত্ব এবং সুপারিশ কাজে আসবে না। মূলত কাফিররাই অত্যাচারী।” (সূরা বাক্বারাহ ২:২৫৪) সেদিন কেউ কারো কোন উপকারও করতে পারবেনা। এ সর্ম্পকে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَاتَّقُوْا يَوْمًا لَّا تَجْزِيْ نَفْسٌ عَنْ نَّفْسٍ شَيْئًا وَّلَا يُقْبَلُ مِنْهَا عَدْلٌ وَّلَا تَنْفَعُهَا شَفَاعَةٌ وَّلَا هُمْ يُنْصَرُوْنَ) “আর তোমরা এমন এক দিনকে ভয় কর যেদিন কোন ব্যক্তি কোন ব্যক্তি হতে কিছু মাত্র উপকৃত হবে না এবং কারও নিকট হতে বিনিময় গৃহীত হবে না, কারও শাফা‘আত (সুপারিশ) কাজে লাগবে না এবং তারা সাহায্য প্রাপ্তও হবে না।” (সূরা বাক্বারাহ ২:১২৩) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: (فَالْيَوْمَ لَا يُؤْخَذُ مِنْكُمْ فِدْيَةٌ وَّلَا مِنَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا) “আজ তোমাদের নিকট হতে কোন মুক্তিপণ নেয়া হবে না এবং কাফিরদের নিকট হতেও নয়। ” (সূরা হাদীদ ৫৭:১৫) অত্র আয়াতে মূলত দান করার মহত্ত্ব বুঝানো হয়েছে, সে দান অবশ্যই কিয়ামত সংঘটিত হবার পূর্বেই হতে হবে, কারণ যখন নির্ধারিত সময় চলে আসবে তখন শুধু দান-সাদাকা নয় কোন প্রকার সৎ আমলই গ্রহণ করা হবে না। তাই আমাদের উচিত যাবতীয় ভাল কাজ মৃত্যুর পূর্বেই করা। কেননা মৃত্যুর পর ভাল মন্দ কোন কাজ করার সুযোগ থাকেব না। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. কিয়ামতের দিন মানুষের সর্ম্পক ছিন্ন হয়ে যাবে, তবে ঈমান ও তাকওয়ার সম্পর্ক বহাল থাকবে। ২. আল্লাহ তা‘আলা মানুষের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল বিষয় সম্পর্কে জানেন। ৩. দুনিয়া আমল করার জায়গা আর আখিরাত প্রতিদান গ্রহণের জায়গা, আখিরাত আমলের জায়গা নয়।

ইবরাহীম 14:52

৫২ নং আয়াতের তাফসীর: هٰذَا بَلٰغٌ বার্তা- বলতে কুরআনকে বুঝানো হয়েছে, অর্থাৎ এ কুরআন মানুষের জন্য বার্তা, যদি কুরআনের বার্তা শুনে ঈমান আনে তাহলে কুরআন তার জন্য সুসংবাদ দিবে, আর যদি বার্তা শুনে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে কুরআন তাকে জাহান্নামের বিষয়ে সতর্ক করবে, তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। সুতরাং এ কুরআন দিয়ে অবাধ্যদেরকে আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করা হবে। কুরআন নাযিল করার অন্যতম আরো হিকমত হল যে, মানুষ যাতে জেনে নিতে পারে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সত্য কোন মা‘বূদ নেই। কুরআনে এ ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ এ কুরআন থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। প্রথম হিকমতের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (كِتٰبٌ أُحْكِمَتْ اٰيٰتُه۪ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِنْ لَّدُنْ حَكِيْمٍ خَبِيْرٍ لا أَلَّا تَعْبُدُوْآ إِلَّا اللّٰهَ) ‏ “এটা এমন গ্রন্থ যার আয়াতগুলো সুদৃঢ়, অতঃপর বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞের পক্ষ থেকে। তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করবে না।” (সূর হূদ ১১:১-২) দ্বিতীয় হিকমতের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (كِتٰبٌ أَنْزَلْنٰهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوْآ اٰيٰتِه۪ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُوا الْأَلْبَابِ)‏ “(এ কুরআন) একটি বরকতময় কিতাব, আমি তা তোমার প্রতি নাযিল করেছি যেন মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং জ্ঞানবান লোকেরা উপদেশ গ্রহণ করে।” (সূরা স্ব-দ ৩৮:২৯) সুতরাং যারা কুরআন থেকে শিক্ষা নেয় তারাই প্রকৃত জ্ঞানী তাই বলতে পারি জ্ঞানী হওয়ার মানদণ্ড হল কুরআনকে গ্রহণ করা। যার মাঝে কুরআনের জ্ঞান নেই সে প্রকৃত জ্ঞানী নয়। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে কুরআন থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রকৃত জ্ঞানী হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন! আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. কুরআন মাজীদ মানবজাতির জন্য একটি সতর্কবার্তা এবং জ্ঞানী লোকদের জন্য উপদেশবাণী। ২. আল্লাহ তা‘আলাই সত্যিকার মা‘বূদ বা ইবাদতের হকদার।

আন-নাহল 16:1

নামকরণ: النَّحْلِ- আন্-নাহল শব্দের অর্থ: মৌমাছি, মধুমক্ষিকা, মধুকর, ভ্রমর ইত্যাদি। উক্ত সূরার ৬৮ নং আয়াতে মৌমাছি সম্পর্কে আলোচনা বিবৃত হয়েছে বিধায় উক্ত সূরাকে “আন্ নাহল” নামে নামকরণ করা হয়েছে। সূরাতে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের আলোচনা স্থান পেয়েছে সূরার শুরুর দিকে কিয়ামতের নিকটবর্তীতা, চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি ও তার উপকারিতা, আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করে বিভিন্ন বৃক্ষ, তরুলতা ইত্যাদি উৎপন্নসহ গণনাতীত নেয়ামত সম্পর্কে তুলে ধরা হয়েছে। সব কিছুর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, মুশরিকদের বাতিল মা‘বূদ কিছুই সৃষ্টি করেনি, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়েছে। যারা মানুষকে পথভ্রষ্টতা ও খারাপ কাজের দিকে আহ্বান করে তারা আহুত ব্যক্তিদেরও অপরাধ বহন করবে, কাফির ও মু’মিনের আত্মা কবচ করার সময়কালীন অবস্থা, আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে মুশরিকদের স্বেচ্ছাচারিতাপূর্ণ ধারণা ও তাওহীদের বাণী দিয়ে প্রত্যেক জাতির কাছে নাবী প্রেরণ, মানব জাতি আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার দয়াদ্রতা, কয়েকটি উপমা, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একজন সাক্ষী নিয়ে আসা হবে এবং নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কেও সাক্ষী হিসেবে নিয়ে আসা হবে, ঈমানে পরিপূর্ণ অন্তরবিশিষ্ট মুসলিম ব্যক্তি কুফরী করতে বাধ্য হলে তার বিধান, হালাল-হারামের মানদণ্ড ইসলামী শরীয়ত, সবশেষে হিকমত ও উত্তম কথার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার পথে মানুষকে আহ্বান এবং ক্ষমা ও ধৈর্য ধারণ করার দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ১ নং আয়াতের তাফসীর: (أَتٰٓي أَمْرُ اللّٰهِ)- এখানে আল্লাহ তা‘আলার আদেশ আসবেই বলতে কিয়ামতকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। সুতরাং তা সত্বর কামনা করা উচিত নয়। এখানে অতীতকালীন ক্রিয়া দ্বারা বর্ণনা করার কারণ হল যে, যেহেতু এটা বাস্তবায়িত হবার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই, অবশ্যই এটা বাস্তবায়িত হবে। সেদিক বিবেচনা করে أَتٰٓي অতীতকালীন ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (اِقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِيْ غَفْلَةٍ مُّعْرِضُوْنَ) “মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।” (সূরা আম্বিয়া ২১:১) অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (اِقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ)‏ “কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে, চন্দ্র ফেটে গেছে।” (সূরা কামার ৫৪:১) তাই আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি বা কিয়ামত সংঘটিত হবার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করতে নিষেধ করেছেন। কারণ এ শাস্তি যখন এসে যাবে তখন কেউ তা প্রতিহত করতে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَيَسْتَعْجِلُوْنَكَ بِالْعَذَابِ ط وَلَوْلَآ أَجَلٌ مُّسَمًّي لَّجَا۬ءَهُمُ الْعَذَابُ ط وَلَيَأْتِيَنَّهُمْ بَغْتَةً وَّهُمْ لَا يَشْعُرُوْنَ ‏ يَسْتَعْجِلُوْنَكَ بِالْعَذَابِ ط وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمُحِيْطَةٌم بِالْكٰفِرِيْنَ) ‏ “তারা তোমাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে। যদি নির্ধারিত কাল না থাকত তবে শাস্তি তাদের ওপর অবশ্যই আসত। নিশ্চয়ই তাদের ওপর শাস্তি আসবে আকস্মিকভাবে, তারা টেরও পাবে না। তারা তোমাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে, জাহান্নাম তো কাফিরদেরকে পরিবেষ্টন করবেই।” (সূরা আনকাবুত ২৯:৫৩-৫৪) এরূপ সূরা শুরার ২৮ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। মুশরিকরা আল্লাহ তা‘আলার সাথে যে অংশী স্থাপন করে তাত্থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে, তাঁর কোন শরীক নেই, তিনি একক ও অদ্বিতীয়। অতএব কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এ ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করা যাবে না। শাস্তি আসতে বিলম্বের কারণে মনে করা যাবে না যে, এটা বাস্তবায়িত হবে না, বরং নির্ধারিত সময়ে তা অবশ্যই আসবে। আর এ ব্যাপারে প্রত্যেক মুসলিমকে অন্তরে বিশ্বাস রাখতে হবে যে, কিয়ামত নির্ধারিত সময়ে অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. কিয়ামত অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে, আর এ ব্যাপারে বিশ্বাস রাখতে হবে, কোন প্রকার সন্দেহ পোষণ করা যাবে না । ২. সকল অংশী স্থাপনকারীর অংশী হওয়া থেকে আল্লাহ তা‘আলা সুমহান ও পবিত্র।

আন-নাহল 16:2

২ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে الرُوْحُ বলতে ওয়াহী বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা নাবী ও রাসূলদের প্রতি যে ওয়াহী করার ইচ্ছা করেন, ফেরেশতারা আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে তাদের কাছে সে ওয়াহী নিয়ে অবতীর্ণ হন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَكَذٰلِكَ أَوْحَيْنَآ إِلَيْكَ رُوْحًا مِّنْ أَمْرِنَا) “আর এভাবেই আমি তোমার প্রতি ওয়াহী করেছি রূহ (কুরআন) আমার নির্দেশে” (সূরা শুরা ৪২:৫২) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: (رَفِيْعُ الدَّرَجٰتِ ذُو الْعَرْشِ ج يُلْقِي الرُّوْحَ مِنْ أَمْرِه۪ عَلٰي مَنْ يَّشَا۬ءُ مِنْ عِبَادِه۪ لِيُنْذِرَ يَوْمَ التَّلَاقِ) ‏ “তিনি সমুচ্চ মর্যাদার অধিকারী, আরশের অধিপতি, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা রূহ (ওয়াহী) প্রেরণ করেন স্বীয় আদেশসহ, যাতে সে সতর্ক করতে পারে সাক্ষাত (কিয়ামত) দিবস সম্পর্কে।” (সূরা মু’মিন ৪০:১৫) ওয়াহী নাযিল করা কোন ফেরেশতা বা মানুষের কর্তৃত্বাধীন নয়, বরং আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ইচ্ছামত তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যার প্রতি খুশি ওয়াহী করেন। তারপর ওয়াহী নাযিল করার উদ্দেশ্য বর্ণনা করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘তোমরা সতর্ক কর‎ যে, নিশ্চয়ই আমি ব্যতীত কোন সত্যিকার মা‘বূদ নেই; সুতরাং আমাকে ভয় কর‎।’ অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই সকল ইবাদত পাওয়ার যোগ্য এবং তাঁকেই ভয় করা উচিত। এ ওয়াহী দিয়েই সকল নাবী-রাসূলকে প্রেরণ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَمَآ أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُوْلٍ إِلَّا نُوْحِيْ إِلَيْهِ أَنَّه۫ لَآ إِلٰهَ إِلَّآ أَنَا فَاعْبُدُوْنِ )‏ “আমি তোমার পূর্বে যখন কোন রাসূল প্রেরণ করেছি তার প্রতি এ ওয়াহী করেছি, ‘আমি ব্যতীত অন্য কোন সত্যিকার মা‘বূদ নেই; সুতরাং আমারই ‘ইবাদত কর‎।’’ (সূরা আম্বিয়া ২১:২৫) এ সম্পর্কে অনেক আয়াত রয়েছে যেমন সূরা যুখরুফের ৪৫ নং ও সূরা আম্বিয়ার ১০৮ নং আয়াত ইত্যাদি। অতএব যুগে যুগে রাসূল প্রেরণ করার প্রধান উদ্দেশ্য হল পৃথিবীতে এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা এবং মানুষের মাঝে আল্লাহ তা‘আলার ভয় সৃষ্টি করা। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. ওয়াহী প্রেরণ করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে পারলাম আর তা হল এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা এবং মানুষের মাঝে তাঁর ভয় সঞ্চার করা।

আন-নাহল 16:8

৮ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করছেন যে, তিনি ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা সৃষ্টি করেছেন বাহন হিসেবে ব্যবহার করার জন্য এবং সৌন্দর্যের জন্য। আগের দিনে মানুষের একমাত্র বাহন ও বোঝা বহনকারী হিসেবে ব্যবহৃত হত ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা। বর্তমানে বিভিন্ন যানবাহন ও মালবাহী গাড়ী তৈরি হওয়ায় এসব প্রাণী বাহন ও বোঝা বহনে প্রায় ব্যবহার ছেড়ে দেয়া হয়েছে, তবুও মরুর দেশসহ অনুন্নত দেশে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। ভবিষ্যতে এমন দিন আসবে যেদিন আবার মানুষ এসব প্রাণীগুলোকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করবে। সৌন্দর্যের বিষয়টি হল মানুষ এসব লালন-পালন করে তৃপ্তি লাভ করে, আনন্দ উপভোগ করে এবং এসব প্রাণী যখন সারিবদ্ধভাবে চলাচল করে তখন দেখতে খুব সুন্দর দেখায়। তাছাড়া ঘোড়ার সৌন্দর্যের কথা বলার অবকাশ রাখে না। ঘোড়াকে সাজিয়ে তার ওপর বসলে অন্য রকম আনন্দই লাগে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: উট মানুষের সম্মান, ছাগল তাতে বরকত রয়েছে এবং ঘোড়ার মাথার চুলে কল্যাণ রয়েছে। (ইবনু মাযাহ হা: ২৩০৫, সিলসিলা সহীহাহ হা: ১৭৬৩) আয়াতে ঘোড়াকে খচ্চর ও গাধার সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অনেকে মনে করেন যে, এগুলো শুধু বোঝা বহন ও সৌন্দর্যের জন্য, খচ্চর ও গাধার ন্যায় ঘোড়াও খাওয়া নিষেধ। তাদের বুঝ সঠিক হলেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে ঘোড়ার গোস্ত খাওয়ার প্রমাণ রয়েছে। সুতরাং ঘোড়া খাওয়া নিষেধ করা যাবে না। কারণ হাদীসে এসেছে “জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খায়বারের দিবসে গাধার মাংসকে হারাম করেছেন আর ঘোড়ার মাংস ভক্ষণ করার অনুমতি দিয়েছেন।” (সহীহ বুখারী হা: ৫৫২০, সহীহ মুসলিম হা: ১৪০৭) তবে ঘোড়ার যাকাত নেই। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: মুসলিম ব্যক্তির দাসে ও ঘোড়ায় কোন যাকাত নেই। (সহীহ বুখারী হা: ১৪৬৩, সহীহ মুসলিম হা: ৯৮২) (وَيَخْلُقُ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ) অর্থাৎ এমন কিছু সৃষ্টি করবেন যা কুরআন নাযিল হওয়ার সময়কার ব্যক্তিরা জানত না। যেমন বাস, ট্রেন, জলজাহাজ, বিমান ও রকেটসহ অত্যাধুনিক সকল উপকরণ ও ভবিষ্যতে আরো যা কিছু সৃষ্টি হবে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. ঘোড়ার মাংস খাওয়া বৈধ, ঘোড়ার যাকাত নেই। ২. গাধা ও খচ্চরের মাংস খাওয়া হারাম। ৩. এগুলো বোঝা বহন করার জন্য আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টি করেছেন।

আন-নাহল 16:9

৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে قَصْدُ السَّبِيْلِ বলতে সিরাতুল মুসতাকিম বা সরল পথকে বুঝানো হয়েছে। যাতে কোন প্রকার বক্রতা নেই। যে পথে চললে আল্লাহ তা‘আলার সাক্ষাত পাওয়া যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَأَنَّ هٰذَا صِرَاطِيْ مُسْتَقِيْمًا فَاتَّبِعُوْهُ ج وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيْلِه۪) “আর নিশ্চয়ই এ পথই আমার সহজ-সরল পথ। সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ করবে এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করবে।” (সূরা আনয়াম ৬:১৫৩) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: (وَأَنِ اعْبُدُوْنِيْ هٰذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيْمٌ) “আর আমারই ইবাদত কর, এটাই সরল-সঠিক পথ।” (সূরা ইয়াসিন ৩৬:৬১) আল্লাহ তা‘আলার দায়িত্ব হল সরল সঠিক পথের দিশা দেয়া এবং তিনি তা করেছেন। সরল সঠিক পথের দিশা দেয়ার সাথে সাথে একথাও বলে দিয়েছেন যে, সরল পথের পথিমধ্যে কিছু বক্র পথও রয়েছে, যে পথে চললে সে আল্লাহ তা‘আলার রহমত থেকে দূরে সরে যাবে। সে পথে চললে গোমরাহ হয়ে যাবে। সাহাবী জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলছেন একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি সরল রেখা টানলেন, আর ডান দিকে দুটি রেখা টানলেন ও বাম দিকে দুটি রেখা টানলেন। তারপর মাঝের সরল রেখার ওপর হাত রেখে বললেন: এটা হল আল্লাহ তা‘আলার পথ। (ইবনু মাযাহ হা: ১১, সহীহ) আল্লাহ তা‘আলা উভয় পথেরই বর্ণনা দিয়ে সিরাতে মুসতাকিম তথা সরল সঠিক পথে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে কোন পথে চলতে বাধ্য করে দেননি। যদি বাধ্য করে দেয়া হত তাহলে পরীক্ষা নেয়ার কোনই প্রয়োজন ছিল না। সুতরাং সঠিক ও ভুল পথের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা‘আলা সঠিক পথে চলার নির্দেশ দিয়ে উক্ত পথে চলার ফলাফল বর্ণনা করে দিয়েছেন যাতে হাতে-নাতে শিক্ষা দেয়ার জন্য মানুষ আল্লাহ তা‘আলাকে দোষারোপ করতে না পারে। তাছাড়া আল্লাহ তা‘আলা পথপ্রদর্শক হিসেবে যুগে যুগে নাবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “যারা সৎ পথ অবলম্বন করবে তারা নিজেদেরই মঙ্গলের জন্য সৎ পথ অবলম্বন করবে এবং যারা পথভ্রষ্ট হবে তারা পথভ্রষ্ট হবে নিজেদেরই ধ্বংসের জন্য এবং কেউ অন্য কারো (পাপের) ভার বহন করবে না। আমি রাসূল না পাঠান পর্যন্ত‎ কাউকেও শাস্তি‎ দেই না।” (সূরা ইসরা ১৭:১৫) সুতরাং কেউ যদি পথভ্রষ্ট হয় তাহলে আল্লাহকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই। কারণ তিনি সব কিছু বিস্তারিত বর্ণনা করে দিয়ে যুগে যুগে নাবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন, আর কেউ হিদায়াত প্রাপ্ত হলে তা আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া। (وَلَوْ شَا۬ءَ لَهَدَاكُمْ أَجْمَعِيْنَ) আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, তিনি চাইলে সকলকে হেদায়েত দান করতে পারতেন। এর দ্বারা কোন মানুষ এমনটি বলতে পারবে না যে, আল্লাহ তা‘আলা চাননি তাই আমি হিদায়াত পাইনি। তাই আল্লাহ তা‘আলার কারণে আমাকে জাহান্নামে যেতে হলে সেখানে আমার কোন হাত নেই। এটি ভুল, কারণ পূর্বেই বলা হয়েছে মানুষকে সৃষ্টি করার পর জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে হিদায়াত ও গোমরাহ উভয় পথ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পর স্বাধীনতা দিয়েছেন, সে তার খুশি মত যে কোন রাস্তা বেছে নিতে পারবে। তবে কোন্ পথে চললে কী ফলাফল হবে তাও বর্ণনা করে দিয়েছেন। সুতরাং যারা খাল কেটে কুমির আনে তারা হিদায়াতের উপযুক্ত হতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَلَوْ شَا۬ءَ اللّٰهُ لَجَمَعَهُمْ عَلَي الْهُدٰي فَلَا تَكُوْنَنَّ مِنَ الْـجٰهِلِيْنَ) “আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের সকলকে অবশ্যই সৎ পথে একত্র করতেন। সুতরাং তুমি মুর্খদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (সূরা আনয়াম ৬:৩৫) অতএব মানুষ ইচ্ছা করে যে পথ বেছে নেবে সে ঐ পথেরই অনুসারী হবে। এতে কাউকে দোষারোপ করা যাবে না। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সরল ও বক্রপথ উভয়টা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে। ২. আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে কোন কাজ করার ব্যাপারে বাধ্য করেন না। ৩. রাসূল প্রেরণ করার পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা কোন জাতিকে শাস্তি দেন না। ৪. সরল-সঠিক পথ একটিই তা হল, কুরআন ও সহীহ সুন্নার অনুসরণ করা। কোন তরীকা, পথ-মত ও ব্যক্তির আদর্শ হতে পারে না। ৫. হিদায়েত দেয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ তা‘আলা, তবে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে হিদায়াত দেন না যারা হিদায়াত গ্রহণ করার চেষ্টা করে না।

আন-নাহল 16:70

৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে অস্তিত্বহীন থেকে সৃষ্টি করে কাউকে পূর্ণ বার্ধক্যে উপনীত করেন, কাউকে সে অবস্থার পূর্বেই মৃত্যু দান করেন। যখন মানুষের স্বাভাবিক বয়স পার হয়ে যায়, তখন তার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এমন কি কখনো কখনো স্মৃতিশক্তি সম্পূর্ণ লোপ পেয়ে যায়, ফলে সে শিশুতে পরিণত হয়ে যায়। এটাকেই أَرْذَلِ الْعُمُرِ বলা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَمِنْكُمْ مَّنْ يُّتَوَفّٰي وَمِنْكُمْ مَّنْ يُّرَدُّ إِلٰٓي أَرْذَلِ الْعُمُرِ لِكَيْلَا يَعْلَمَ مِنْۭ بَعْدِ عِلْمٍ شَيْئًا) “তোমাদের মধ্যে কারও কারও মৃত্যু ঘটানো হয় এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে প্রত্যাবৃত্ত করা হয় হীনতম বয়সে, যার ফলে তারা যা কিছু জানত সে সম্বন্ধে তারা সজ্ঞান থাকে না।” (সূরা হাজ্জ্ব ২২:৫) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: (اَللّٰهُ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ مِّنْ ضَعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِنْۭ بَعْدِ ضَعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِنْۭ بَعْدِ قُوَّةٍ ضَعْفًا وَّشَيْبَةً) “আল্লাহ তিনি, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেন দুর্বল অবস্থায়, অতঃপর তিনি দুর্বলতার পর শক্তি দিয়েছেন, তারপর শক্তির পর পুনরায় দিয়েছেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য।” (সূরা রূম ৩০:৫৪) সহীহ হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হওয়া থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الجُبْنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ البُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أُرَدَّ إِلَي أَرْذَلِ العُمُرِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الدُّنْيَا، وَعَذَابِ القَبْرِ হে আল্লাহ তা‘আলা! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি কাপুরুষতা থেকে, কৃপণতা থেকে, বার্ধক্যে উপনীত হওয়া থেকে, দুনিয়ার ফেতনা ও কবরের আযাব থেকে। (সহীহ বুখারী হা: ৬৩৪৭) এরূপ দুর্বল মানুষকে কি আল্লাহ তা‘আলা আবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না? অবশ্যই তিনি সৃষ্টি করতে সক্ষম। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সৃষ্টির সূচনা ও পুনত্থানের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।

আন-নাহল 16:71

৭১ নং আয়াতের তাফসীর: যারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে অংশী স্থাপন করে তাদের জন্য একটি বাস্তব বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। রিযিকের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা সব মানুষকে সমান করেননি। কাউকে অঢেল সম্পদ দিয়ে ধনী বানিয়েছেন, কাউকে সম্পদ কম দিয়ে দরিদ্র বানিয়েছেন। কাউকে রাজত্ব দিয়েছেন, কাউকে রাজত্ব দেননি, কাউকে সুস্থ শরীর ও উত্তম কাঠামো দিয়েছেন, কাউকে পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ করেছেন। এভাবে বিভিন্ন রিযিক দিয়ে একজনকে অন্যজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা দান করেছেন। যারা ধনী তারা কি গরীবদেরকে নিজেদের ধন-সম্পদে শরীক বানাতে পছন্দ করে? যারা মালিক তারা কি দাসদেরকে নিজেদের সম্পদ ও রাজত্বে শরীক বানাতে পছন্দ করে? যারা সুস্থ ও সকল ত্র“টিমুক্ত তারা কি পাগল ও বিকলাঙ্গ লোকদেরকে নিজেদের পরিবারে অংশীদার বানাতে পছন্দ করে? না, কেউ এসব পছন্দ করে না। সুতরাং মানুষ সবাই মাখলুক হওয়া সত্ত্বেও যদি এরূপ সাধারণ বিষয়ে শরীক বানাতে অপছন্দ করে তাহলে কিভাবে স্রষ্টার সাথে সৃষ্টিকে শরীক বানাও? এটা কি স্রষ্টা পছন্দ করবেন? সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা সকল শরীক থেকে মুক্ত ও পবিত্র। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (ضَرَبَ لَكُمْ مَّثَلًا مِّنْ أَنْفُسِكُمْ ط هَلْ لَّكُمْ مِّنْ مَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ مِّنْ شُرَكَا۬ءَ فِيْ مَا رَزَقْنٰكُمْ فَأَنْتُمْ فِيْهِ سَوَا۬ءٌ تَخَافُوْنَهُمْ كَخِيْفَتِكُمْ أَنْفُسَكُمْ) “আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন: আমি তোমাদেরকে যে রিযিক দান করেছি, তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের কেউ কি তাতে অংশীদার, যার ফলে তোমরা ও তারা সমান? তোমরা কি তাদেরকে সেরূপ ভয় কর, যেরূপ তোমরা নিজেদের লোককে ভয় কর?” (সূরা রূম-৩০:২৮) এ আয়াতে আরেকটি বিষয়ের প্রতিবাদ করা হচ্ছে। তা হল যারা বিশ্বাস করে সমাজের সবাই সমান থাকবে, কেউ ধনী হবে কেউ গরীব হবে এমন হতে পারবে না। অর্থাৎ সমাজতন্ত্র। তাদের এরূপ দাবী ও বিশ্বাস গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আর্থিকভাবে সবাই সমান হলে কেউ কাউকে পরওয়া করবে না, কারো কাজ কেউ করে দেবে না, কারো অধীনস্ত কেউ মেনে নেবে না। মানুষের জীবনযাপন দুর্বিসহ হয়ে যাবে। জমিনে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হবে। তাই আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَلَوْلَآ أَنْ يَّكُوْنَ النَّاسُ أُمَّةً وَّاحِدَةً لَّجَعَلْنَا لِمَنْ يَّكْفُرُ بِالرَّحْمٰنِ لِبُيُوْتِهِمْ سُقُفًا مِّنْ فِضَّةٍ وَّمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُوْنَ)‏ “(সত্য অস্বীকারে) মানুষ এক উম্মতে পরিণত হয়ে পড়বে, এই আশঙ্কা না থাকলে দয়াময় আল্লাহকে যারা অস্বীকার করে, তাদেরকে আমি দিতাম তাদের গৃহের জন্য রৌপ্য নির্মিত ছাদ ও সিঁড়ি যাতে তারা আরোহণ করে।” (সূরা যুখরুফ ৪৩:৩৩) (أَفَبِنِعْمَةِ اللّٰهِ يَجْحَدُوْنَ) অর্থাৎ এসব আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতকে অস্বীকার করার কোন সুযোগ আছে কি? আল্লাহ তা‘আলা তিরস্কারের সাথে বলছেন: আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতকে কুফরী ও অবাধ্য কাজে ব্যবহার করা এবং নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় না করা কুফরী করার শামিল। অতএব মানুষ নিজের জন্য যা পছন্দ করে না তা আল্লাহ তা‘আলার জন্য সাব্যস্ত করা খুবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. রিযিকের ক্ষেত্রে মানুষের মাঝে তারতম্য আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত নিয়ম। ২. সমাজতন্ত্রের দাবী ও কর্মসূচি ইসলাম সমর্থন করে না।

আন-নাহল 16:72

৭২ নং আয়াতের তাফসীর: حفدة এর অর্থ কয়েকটি হতে পারে। যেমন أولاد الأولاد নাতি-নাতনি। الخدم সেবক ইত্যাদি। এখানে আল্লাহ তা‘আলা মানুষের প্রতি তাঁর স্বীয় অনুগ্রহের কথা বর্ণনা করছেন যে, তিনি মানুষের মধ্য হতেই তাদের জন্য স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ একই জাতি ও আকৃতির, যাতে চলা-ফেরা, ওঠা-বসা ও অন্যান্য সকল বিষয়ে উপযোগী ও সামঞ্জস্য হয়। পুরুষরা যদি এক জাতির হয় আর নারীরা অন্য জাতির হলে চলা-ফেরা, ওঠা-বসা ইত্যাদি কোন বিষয়ে সামঞ্জস্য হবে না এবং বসবাসও করতে পারবে না। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার দয়া যে, তিনি একই জাতি থেকে স্ত্রীদের দান করেছেন যাতে ভালবাসা, রহমত ও প্রশান্তি অর্জিত হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَمِنْ اٰيَاتِه۪ٓ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوْآ إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَّوَدَّةً وَّرَحْمَةً ط إِنَّ فِيْ ذٰلِكَ لَاٰيٰتٍ لِّقَوْمٍ يَّتَفَكَّرُوْنَ) “আর তার দৃষ্টান্তগুলোর মধ্যে একটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে স্ত্রীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ কর এবং তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া। নিশ্চয়ই এতে ঐসব লোকের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যারা গভীরভাবে চিন্তা করে।” (সূরা রূম ৩০:২১) আল্লাহ তা‘আলার আরো অনুগ্রহ হল তিনি স্বামী-স্ত্রীর মাধ্যমে সন্তানাদি সৃষ্টি করেন। এটা একটি নেয়ামত, আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে স্বামী-স্ত্রীর মিলনের মাধ্যমে সন্তান না দিয়ে আকাশ থেকে দিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তাদের মাধ্যমে সন্তান দেয়ার অন্যতম একটি হিকমত হল এতে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে, সন্তানের প্রতি একটি মায়া-মহব্বত থাকবে, সন্তান মাতা-পিতাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করবে এবং একটি দায়িত্ববোধ থাকবে। এছাড়াও মানুষকে তিনি অনেক পবিত্র রিযিক দান করেছেন। সুতরাং যে আল্লাহ তা‘আলা এসব নেয়ামত দান করলেন তাকে বাদ দিয়ে এমন কারো প্রতি ঈমান আনা ও ইবাদত করা কক্ষনোই কাম্য হতে পারে না, যারা কোন কিছু দিতে পারে না। তাই প্রত্যেকের উচিত এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করা, অন্য কারো নয়। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. মানব জাতির মধ্য হতে স্ত্রী-সন্তান-সন্ততি আল্লাহর দান, যা অন্য কেউ দিতে পারে না।

আন-নাহল 16:90

৯০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা‘আলা উক্ত আয়াতে তাঁর বান্দাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনদেরকে দান করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিষেধ করেছেন অশ্লীলতা, সীমালঙ্ঘন ও অসৎ কাজ করতে। الْعَدْلِ এর শাব্দিক অর্থ ন্যায়পরায়ণতা, ইনসাফ করা ও অবিচার না করা। আদল আল্লাহ তা‘আলার হকের ক্ষেত্রেও করতে হবে এবং মানুষের হকের ক্ষেত্রেও করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা ও বান্দার যত হক রয়েছে তা যথাযথভাবে আদায় করে দেয়াই হল আদল। তা আর্থিক হোক, শারীরিক হোক বা অন্য যে কোন হক হোক। বাড়াবাড়ি করা যাবে না এবং শিথিলতাও করা যাবে না। অনুরূপ আদল এর অন্যতম একটি অর্থ হল ন্যায়বিচার করা। অর্থাৎ বিচারের ক্ষেত্রে কারো পক্ষপাতিত্ব না করা। আল্লাহ তা‘আলা ন্যায় বিচার সম্পর্কে বলেন: (يٰٓأَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا كُوْنُوْا قَوّٰمِيْنَ لِلّٰهِ شُهَدَا۬ءَ بِالْقِسْطِ ز وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَاٰنُ قَوْمٍ عَلٰٓي أَلَّا تَعْدِلُوْا ط اِعْدِلُوْا قف هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوٰي) “হে মু’মিনগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানে তোমরা অবিচল থাক; কোন সম্প্রদায়ের শত্র“তা যেন তোমাদেরকে এর প্রতি উদ্যত না করে যে, তোমরা ন্যায়বিচার করবে না, তোমরা ন্যায়বিচার কর, এটা তাকওয়ার অধিকতর নিকটবর্তী।” (সূরা মায়িদা ৫:৮) ইহসান অর্থ হল সদাচরণ, ক্ষমা ও সহানুভূতি দেখানো এবং অনুগ্রহ করা। অর্থাৎ আবশ্যক দায়িত্ব্ ও কর্তব্য পালন করার পরেও এবং যথাযথ হক দিয়ে দেয়ার পরেও অতিরিক্ত কিছু করা বা দেয়া। যেমন কোন শ্রমিকের প্রাপ্য একশত টাকার সাথে দশ টাকা বেশি দিলেন, এটা তার প্রতি ইহসান। আল্লাহ তা‘আলা সদাচরণ সম্পর্কে বলেন: (وَأَحْسِنْ كَمَآ أَحْسَنَ اللّٰهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ) “তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না।” (সূরা ক্বাসাস ২৮:৭৭) হাদীসে এসেছে; রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: ارْحَمُوا مَنْ فِي الأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاء জমিনে যারা রয়েছে তাদের প্রতি রহম কর আকাশে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদেরকে রহম করবেন। (তিরমিযী হা: ১৯২৪, সহীহ) ইহসানের অন্যতম আরেকটি অর্থ হল একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য ইবাদত করা এবং সুন্দরভাবে তা সম্পন্ন করা। হাদীসে এসেছে: (أَنْ تَعْبُدَ اللّٰهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ) তুমি এমনভাবে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে যেন তাঁকে দেখছো, যদি না দেখতে পাও তাহলে জেনে রেখো, আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে দেখছেন। (সহীহ বুখারী হা: ৫০, সহীহ মুসলিম হা: ৮) পূর্বে আদলের আলোচনা করার পর এখানে আবার আত্মীয়-স্বজনের অধিকার সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে তার উদ্দেশ্য, এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা। আল্লাহ তা‘আলা আত্মীয়-স্বজনের হক সম্পর্কে বলেন: (فَاٰتِ ذَا الْقُرْبٰي حَقَّه۫ وَالْمِسْكِيْنَ وَابْنَ السَّبِيْلِ ط ذٰلِكَ خَيْرٌ لِّلَّذِيْنَ يُرِيْدُوْنَ وَجْهَ اللّٰهِ ز وَأُولٰ۬ئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ) “অতএব আত্মীয়-স্বজনকে তাদের হক দিয়ে দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরদেরকেও। এটা তাদের জন্য উত্তম, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, আর তারাই হল সফলকাম।” (সূরা রূম ৩০:৩৮) হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে আল্লাহ তা‘আলা তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবেন, আর যে সম্পর্ক ছিন্ন করবে তার সাথে আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। (সহীহ বুখারী হা: ৫৯৮৭) আর অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার তো কোন সীমা নেই। চিত্ত বিনোদন, সংস্কৃতি ও প্রগতির নামে আজ অশ্লীলতা, নোংরামী ও বেহায়াপনা লাগামহীন হয়ে গেছে। অশ্লীলতা ও অসৎ কাজ (মানুষের বিবেকও বলে দেয় যে) কক্ষনোই ভাল নয়। আল্লাহ তা‘আলা অশ্লীলতা, অসৎ কার্য ও সীমালংঘন না করার ব্যাপারে বলেন: (قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّـيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ) “বল:‎ নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা আর পাপ ও অন্যায় বিরোধিতা।” (সূরা আ‘রাফ ৭:৩৩) وَالْبَغْيِ অর্থ সীমালংঘন ও অত্যাচার। শরীয়ত যে সীমারেখা দিয়েছে তার বাইরে যাওয়াই হল সীমালংঘন করা। অন্যের হক নষ্ট করাও সীমালংঘন করার অন্তর্ভুক্ত। অতএব আমাদের প্রত্যেকের উচিত, আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ অনুপাতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা, মানুষের সাথে সদাচরণ করা, আত্মীয়তার হক যথাযথভাবে আদায় করা এবং মন্দ ও অশ্লীলকার্য পরিহার করা। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সৎ কাজ করতে হবে, অসৎ কাজ করা যাবে না। ২. কোন কিছুর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা যাবে না। ৩. আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করতে হবে। ৪. সকল ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার ও ন্যায় নীতি গ্রহণ করতে হবে। ৫. অশ্লীল কার্য পরিহার করতে হবে।

আন-নাহল 16:103

১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নিজের সত্তার শপথ করে বলছেন যে, তিনি জানেন কাফির-মুশরিকরা বলবে: এ কুরআন আল্লাহ তা‘আলার কিতাব নয় বরং তাকে একজন লোক শিক্ষা দেয় আর সে তা এসে আমাদের নিকট বর্ণনা করে। তারা বলত, যেমন তাদের কথা আল্লাহ তা‘আলা তুলে ধরে বলেন: (وَقَالُوْآ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ اكْتَتَبَهَا فَهِيَ تُمْلٰي عَلَيْهِ بُكْرَةً وَّأَصِيْلًا) “তারা বলে: ‘এগুলো তো সেকালের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তার নিকট পাঠ করা হয়।’’ (সূরা ফুরক্বান ২৫:৫) তারা আরো বলত, (فَقَالَ إِنْ هٰذَآ إِلَّا سِحْرٌ يُّؤْثَرُ)‏ “এবং বলল: এটা চিরাচরিত জাদু ছাড়া আর কিছু নয়, (সূরা মুদ্দাচ্ছির ৭৪:২৪) يُلْحِدُوْنَ অর্থ হক থেকে বিচ্যুত, অর্থাৎ যে সকল মানুষের কথা সত্য নয়, সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, এমনকি তারা আরবি ভাষায় কথাও বলতে পারে না। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. কুরআন কারো শিক্ষা দেয়া কিতাব নয়, বরং আল্লাহ তা‘আলার কালাম, তিনিই এটি নাযিল করেছেন। ২. কুরআন আরবি ভাষায় অবতীর্ণ যার ভাষা অলঙ্কার ও সাহিত্যশৈলী সুউচ্চ।