Lafzullah

Tafsir Fathul Majid — আল-ইসরা 17:1 – আত-তালাক 65:1

Author / source: AbdulRahman Bin Hasan Al-Alshaikh

Contents
  1. আল-ইসরা 17:1
  2. আল-ইসরা 17:12
  3. আল-ইসরা 17:15
  4. আল-ইসরা 17:25
  5. আল-ইসরা 17:36
  6. আল-ইসরা 17:59
  7. আল-ইসরা 17:60
  8. আল-ইসরা 17:100
  9. আল-কাহফ 18:50
  10. আল-কাহফ 18:54
  11. আল-আম্বিয়া 21:91
  12. আল-আম্বিয়া 21:104
  13. আল-হাজ্জ 22:25
  14. আল-হাজ্জ 22:41
  15. আল-মুমিনুন 23:17
  16. আন-নূর 24:3
  17. আন-নূর 24:26
  18. আন-নূর 24:35
  19. আন-নূর 24:55
  20. আন-নূর 24:61
  21. আল-ফুরকান 25:20
  22. আন-নামল 27:59
  23. আন-নামল 27:82
  24. আল-আনকাবুত 29:45
  25. আল-আনকাবুত 29:46
  26. আর-রূম 30:54
  27. লুকমান 31:12
  28. লুকমান 31:33
  29. লুকমান 31:34
  30. আল-আহযাব 33:6
  31. আল-আহযাব 33:35
  32. আল-আহযাব 33:36
  33. আল-আহযাব 33:37
  34. আল-আহযাব 33:38
  35. আল-আহযাব 33:49
  36. আল-আহযাব 33:52
  37. আল-আহযাব 33:55
  38. আল-আহযাব 33:56
  39. আল-আহযাব 33:69
  40. সাবা 34:46
  41. ফাতির 35:1
  42. ফাতির 35:2
  43. ফাতির 35:3
  44. আয-যুমার 39:9
  45. আয-যুমার 39:23
  46. আয-যুমার 39:67
  47. ফুসসিলাত 41:46
  48. আশ-শূরা 42:15
  49. আল-ফাতহ 48:15
  50. আল-ফাতহ 48:29
  51. আল-হুজুরাত 49:11
  52. আল-হুজুরাত 49:12
  53. আল-হুজুরাত 49:13
  54. আল-হাদীদ 57:25
  55. আল-মুমতাহিনা 60:12
  56. আল-মুমতাহিনা 60:13
  57. আত-তালাক 65:1

আল-ইসরা 17:1

নামকরণ: উক্ত সূরাতে ‘বানী ইসরাঈল’-এর সম্পর্কে আলোচনা থাকার কারণে এ নামে নামকরণ করা হয়েছে। একে ‘সূরাতুস সুবহান’-ও বলা হয়। কেননা সূরার শুরুতে ‘সুবহান’ শব্দের উল্লেখ রয়েছে। আবার একে ‘সূরা ইসরা’-ও বলা হয়। যা অত্র সূরার প্রথম আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। ইবনু মাসউদ (রাঃ) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করে বলেন: সূরা কাহফ, মারইয়াম এবং বানী ইসরাঈল হল সে পুরাতন সূরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত যেগুলো মক্কায় প্রথম প্রথম নাযিল হয় এবং যেগুলো আমার পুরাতন হিফযকৃত সূরা। (সহীহ বুখারী হা: ৪৯৯৪) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সূরা বানী ইসরাঈল এবং সূরা যুমার তেলাওয়াত না করে ঘুমাতেন না। (তিরমিযী হা: ৩৪০৫, সহীহ) সূরা বানী ইসরাঈল মক্কায় অবতীর্ণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা, সূরার শুরুতে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অন্যতম একটি বড় মু‘জিযাহ ইসরা ও মি‘রাজের আলোচনা করা হয়েছে। পূর্ববর্তী উম্মাত বানী ইসরাঈলদের বিবরণ, কুরআনের মর্যাদা, মানুষের আমল লিপিবদ্ধকরণ, যারা কেবল দুনিয়ার জন্য আমল করে তাদের পরিণতি, পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ এবং ৩১-৩৮ নং আয়াত পর্যন্ত কয়েকটি বিধি-বিধান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সূরার শেষের দিকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মর্যাদা, রূহ সম্পর্কে ইয়াহূদীদের উত্তর, মক্কার মুশরিকদের দাবী খণ্ডন, সর্বশেষ আল্লাহ তা‘আলার একত্ব ও গুণাবলীর কথা বলে ইতি করা হয়েছে। ১ নং আয়াতের তাফসীর: سُبْحَانَ শব্দটি ক্রিয়ামূল, অর্থ হল انزه الله تنزيهاً অর্থাৎ আমি সকল দোষ-ত্র“টি থেকে আল্লাহ তা‘আলাকে পবিত্র ও মহান ঘোষণা করছি। সাধারণত সুবহানাল্লাহ এর ব্যবহার তখন হয় যখন অতীব কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করা হয়। উদ্দেশ্য হল বাহ্যিক উপায় উপকরণের দিক দিয়ে মানুষের কাছে এ ঘটনা অসম্ভব মনে হলেও আল্লাহ তা‘আলার কাছে কোন কঠিন ব্যাপার নয়। কেননা তিনি কোন উপায় উপকরণের মুখাপেক্ষী নন। তিনি কোন কাজ করার ইচ্ছা করলে ‘হও’ বললে হয়ে যায়। সুতরাং সকল অক্ষমতা, দুর্বলতা ও প্রতিবন্ধকতা থেকে আল্লাহ তা‘আলা র পবিত্রতা বর্ণনা করছি। ইসরা ও মি‘রাজের পরিচয়: ইসরা অর্থ রাতের বেলা ভ্রমণ করা। পরে لَيْلًا উল্লেখ করে রাতের স্বল্পতার কথা পরিস্কার করা হয়েছে। আর এর জন্যই لَيْلًا শব্দকে অনির্দিষ্ট নিয়ে আসা হয়েছে। অর্থাৎ রাতের এক অংশে বা সামান্য সময়ে। চল্লিশ রাতের এ সুদীর্ঘ সফর করতে সম্পূর্ণ রাত লাগেনি বরং রাতের এক সমান্য অংশে সম্পন্ন হয়ে গেছে। ইসলামের পরিভাষায় নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিশেষ মু‘জিযাহস্বরূপ তাঁকে মাসজিদে হারাম এর চত্বর থেকে মাসজিদে আকসা পর্যন্ত রাত্রিকালে জিবরীলের সাথে বিশেষ বাহনে জাগ্রতাবস্থায় যে ভ্রমণ করানো হয়, তাকে ইসরা বলা হয়। আর মি‘রাজ হল ঊর্ধ্বগমনের মাধ্যম, যা ঊর্ধ্বগমন অর্থেও ব্যবহৃত হয়। ইসলামী পরিভাষায় নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাসজিদে আকসা হতে সপ্ত আকাশ ও তদুর্ধ্বে স্ব-শরীরে জাগ্রতাবস্থায় বিভিন্ন নিদর্শন পরিদর্শন করার যে মু‘জিযাহ লাভ করেন তাকেই মি‘রাজ বলা হয়। (শরহু আকীদাহ তাহাবীয়্যাহ ২২৩ পৃ:) ইসরা ও মি‘রাজ স্বশরীরে জাগ্রত অবস্থায় হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে بِعَبْدِه۪ শব্দটির প্রয়োগ করেছেন আর بِعَبْدِه۪ দ্বারা শরীর ও রূহ উভয়টিই অন্তর্ভুক্ত করে। শুধু রূহ নয় বা শুধু শরীর নয়। ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন: নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নুবওয়াত লাভের পর স্ব-শরীরে আত্মা ও দেহসহ জাগ্রতাবস্থায় একই রাতে ইসরা ও মি‘রাজ সংঘটিত হয়। এটাই অধিকাংশ ইসলামী মনীষীদের মত এবং সঠিক মত। (ফাতহুল বারী ১৫/৪৪) মি‘রাজের দিন-তারিখ: মি‘রাজ একটি সত্য ও সুপ্রসিদ্ধ ঘটনা যা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে প্রমাণিত। কিন্তু এ ইসরা ও মি‘রাজ সংঘটিত হওয়ার নির্দিষ্ট দিন-তারিখ কুরআন ও সুন্নায় উল্লেখ না থাকায় বিদ্বানগণ অনেক মতামত ব্যক্ত করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দশটি মত আল ইয়ালা গ্রন্থের ৩৫৯-৩৬০, আর রাহীকুল মাখতুম প্রন্থের ১৩৭ এবং আল বিদাআল হাওলিয়া গ্রন্থের ২৭০-২৭৪ নং পৃষ্ঠায় আলোচনা করেছেন। এসব মতামত পর্যালোচনা করলে এটাই প্রমাণিত হয় যে, ইসরা ও মি‘রাজের নির্দিষ্ট কোন দিন-তারিখ জানা নেই। ইমাম ইবনু কাসীর বলেন: যে হাদীসে বলা হয়েছে ইসরা ও মি‘রাজ রজব মাসের ২৭শে রাত্রিতে সংঘটিত হয়েছে সে হাদীস সঠিক নয়। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ ৩/১০৭) ইমাম আবূ শামাহ বলেন: অনেক আলোচক বলে থাকেন যে, ইসরা ও মি‘রাজ রজব মাসে সংঘটিত হয়েছে। মূলত এটা হাদীস শাস্ত্রের পণ্ডিতদের কাছে এক ডাহা মিথ্যা কথা। (আল বায়েস ফী ইনাকারিল বিদা পৃ: ৭১) ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহঃ) বলেন: মি‘রাজ সংঘটিত হওয়ার মাস, দশক বা নির্ধারিত দিনের কোন অকাট্য প্রমাণ নেই। (যাদুল মা‘আদ ১/৫৭) উক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয় ইসরা ও মি‘রাজ ২৭শে রজব হয়নি। তাছাড়া সবার জানা মি‘রাজের রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হয়। খাদিজা (রাঃ) মারা যান নবুওয়াতের ১০ম বছর রমযান মাসে। তখনও পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয পাননি। তাহলে কিভাবে সে রমযান মাসের দু’মাস আগে রজব মাসে মি‘রাজ হতে পারে? সুতরাং প্রচলিত সমাজে শবে মি‘রাজ উদ্যাপনের রাত বা মাসটি কুরআন, সহীহ হাদীস ও বাস্তব ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী এক বানোয়াট মিথ্যা তারিখ ছাড়া কিছুই নয়। তাই এ রাতকে কেন্দ্র করে সালাতুর রাগাইব, বিশেষ সিয়াম পালন, রাত ভর সবাই মিলে ইবাদত করা, সিন্নী বিতরণ ও আনন্দ উৎসব করার কোন প্রমাণ নেই। এ সবই বিদআত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে, কোন সাহাবী ও তাবেয়ী এবং প্রসিদ্ধ ইমামগণ করেননি। ইসরা ও মি‘রাজের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মক্কায় প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াতী কাজ শুরু করেন তখন কাফির-মুশরিকদের থেকে বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি আসে এবং নানা নির্যাতনের শিকার হন। এতদসত্ত্বেও তিনি দাওয়াতী কাজ করেই যেতেন। নিজের দুঃখ-কষ্ট প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজার সাথে ভাগ করে নিতেন, সাথে দাওয়াতী কাজের বাধা-বিপত্তিতে সাহায্য করতেন প্রাণপ্রিয় চাচা আবূ তালেব। কিন্তু নবুওয়াতের দশম বছরের রজব মাসে চাচা আবূ তালেব মারা যান, চাচা আবূ তালেবের মৃত্যুর তিন দিন, মতান্তরে দু’মাস পর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজাও মারা যান। এখন মক্কাতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আশ্রয়স্থল বলতে কোন জায়গা রইল না। (আর-রাহীকুল মাখতুম ) তাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মনবেদনাকে দূর করে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা মি‘রাজের ব্যবস্থা করেন। অন্য আরেকটি উদ্দেশ্য আল্লাহ তা‘আলা কুরআনেই উল্লেখ করেছেন, তা হল “যাতে আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাই।” এছাড়াও রাসূলের মু’জিযাহ, সালাত ফরযসহ বিভিন্ন বিধান প্রদানের উদ্দেশ্যেই মি‘রাজ হয়। মি‘রাজে বিভিন্ন নিদর্শন দর্শন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাসজিদে হারামের চত্বর হতে বোরাক নামক (খচ্চর আর গাধার মাঝারি সাইজের) একটি প্রাণীতে আরোহণপূর্বক মাসজিদে আকসা (জেরুযালেম) পর্যন্ত রাতে আগমন করেন। সেখানে সকল নাবীদের ইমামতি করেন (এ ইমামতি যাওয়ার পথে করেছেন, না আসার পথে করেছেন তা নিয়ে ইমাম ইবনু কাসীর ও ইবনু হাজার আসকালানী ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন)। অতঃপর সেখান থেকে ঊর্ধ্বাকাশে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতি আকাশে অবস্থানরত নাবীর সাথে দেখা করেন এবং পরিচয় হয়। তারপর সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছেন। সেখানে আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথা হয়, কিন্তু দেখা হয়নি। আয়েশা (রাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি বলবে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলাকে দেখেছেন সে মিথ্যা বলবে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৮৫৫) তারপর জান্নাত জাহান্নাম দেখেন, অধিকাংশ জান্নাতী দরিদ্র গরীব লোকেরা আর অধিকাংশ জাহান্নামী মহিলা দেখতে পেলেন। এ আয়াতের তাফসীরে ঈমাম বুখারী (عليه السلام) তার সহীহুল বুখারী গ্রন্থে উল্লেখ করেন। আবু হুরাইরা < বলেন, মি‘রাজের রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট দুটো পাত্র পেশ করা হল। একটি ছিল মদের আর অপরটি ছিল দুধের। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উভয় পাত্র দেখলেন, অতঃপর দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলেন। তখন জিবরীল (عليه السلام) বললেন: সকল প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার, যিনি আপনাকে সঠিক পথের হেদায়েত দিয়েছেন। যদি আপনি মদের পাত্র গ্রহণ করতেন তাহলে আপনার উম্মত বিভ্রান্ত হয়ে যেত। (সহীহ বুখারী: ৪৭০৯, সহীহ মুসলিম: ১৬৮-১৭২) অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, “জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন, যখন কুরাইশরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলতে লাগল তখন আমি একটি পাথরের ওপর উঠে দাঁড়ালাম। আর আল্লাহ তা‘আলা আমার জন্য বাইতুল মাকদাস উন্মুক্ত করে দিলেন। আমি তা দেখছিলাম এবং তাঁর নিদর্শন সম্পর্কে তাদেরকে সংবাদ দিচ্ছিলাম।” (সহীহ বুখারী: ৪৭১০) এছাড়াও অনেক নিদর্শন রয়েছে যা বিস্তারিত হাদীস গ্রন্থে বিদ্যমান। (الَّذِيْ بَارَكْنَا حَوْلَه) এখানে বায়তুল মাকদাস এর মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে যে, তার চতুর্দিক দিয়ে বরকতে ভরপুর। তা হল গাছ-গাছালি, নদ-নদী, ফল-মূল, শস্য ইত্যাদি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, (وَنَجَّيْنٰهُ وَلُوْطًا إِلَي الْأَرْضِ الَّتِيْ بٰرَكْنَا فِيْهَا لِلْعٰلَمِيْنَ)‏ “এবং আমি তাকে ও লূতকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলাম সে দেশে, যেথায় আমি কল্যাণ রেখেছি বিশ্ববাসীর জন্য। ”(সূরা আম্বিয়া ২১:৭১) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, (وَلِسُلَيْمٰنَ الرِّيْحَ عَاصِفَةً تَجْرِيْ بِأَمْرِه۪ٓ إِلَي الْأَرْضِ الَّتِيْ بَارَكْنَا فِيْهَا ط وَكُنَّا بِكُلِّ شَيْءٍ عٰلِمِيْنَ) “এবং সুলায়মানের বশীভূত করে দিয়েছিলাম প্রচণ্ড বায়ূকে; সে বায়ু তার আদেশত্র“মে প্রবাহিত হতো সে দেশের দিকে যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি; প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত।” (সূরা আম্বিয়া ২১:৮১) সুতরাং প্রত্যেক মু’মিনের বিশ্বাস করতে হবে ইসরা ও মি‘রাজ সত্য, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ব-শরীরে হয়েছিল, কিন্তু কোন নির্দিষ্ট দিন-তারিখ জানা নেই। এ মি‘রাজকে কেন্দ্র করে কোন বিশেষ ইবাদত শরীয়তসম্মত নয়। তাই এসব থেকে বেঁচে থাকা কর্তব্য। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. ইসরা ও মি‘রাজ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একটি বড় মু‘জিযাহ। ২. মি‘রাজ স্বশরীরে ও জাগ্রত অবস্থায় হয়েছে । ৩. বায়তুল মাকদাস এর মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হলাম। ৪. মি‘রাজের রাতে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলার বড় বড় নিদর্শন দেখেছেন। ৫. মি‘রাজ এর অন্যতম শিক্ষা হল আল্লাহ তা‘আলা ঊর্ধ্বে রয়েছেন, তিনি স্বসত্ত্বায় সর্বত্র বিরাজমান নন। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঊর্ধ্বগমন ছাড়া পৃথিবীতে কখনো তাঁর কাছে যেতে পারেননি। ৬. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মি‘রাজের রাতে আল্লাহ তা‘আলাকে স্বচক্ষে দেখেননি।

আল-ইসরা 17:12

১২ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মাত্র দুটি নিদর্শন বর্ণনা করছেন যা প্রমাণ করে যে, একমাত্র তিনিই রব এবং তিনিই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য, তাঁর কোনই শরীক নেই এবং তিনি ছাড়া আর কেউ ইবাদতের হকদার নয়। এ নিদর্শন দু’টি হল রাত আর দিন। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَمِنْ اٰيٰتِهِ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ) “তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে রজনী ও দিবস, সূর্য ও চন্দ্র।” (সূরা হা-মীম সাজদাহ ৪১:৩৭) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, (إِنَّ فِيْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَاٰيٰتٍ لِّأُولِي الْأَلْبَابِ) “নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টির মধ্যে এবং দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে জ্ঞানবানদের জন্য স্পষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে।” (সূরা আলি-ইমরান ৩:১৯০) এ ব্যাপারে অসংখ্য আয়াত কুরআনে বিদ্যমান। যেমন সূরা ফুসসিলাত ৩৭ নং, সূরা ইউনুস ৬ নং সূরা মুমিনূনের ৮০ নং আয়াত। তিনি দিবসকে করেছেন আলোকিত, যাতে করে মানুষ জমিনে বিচরণ করে তাদের জীবিকা উপার্জন করতে পারে, কার্য সম্পাদন করতে পারে এবং রাত্রিকে করেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন যাতে তারা দিবসের ক্লান্তির পর বিশ্রাম গ্রহণ করতে পারে। যদি সর্বদা দিন তথা আলোকোজ্জ্বল থাকত তাহলে মানুষ বিশ্রাম গ্রহণ করতে পারত না, দিবসে কাজ করতে করতে এক পর্যায়ে শেষ হয়ে যেত। আর যদি শুধু রাত্রি থাকত তাহলে তাদের একই অবস্থা হত। তাই আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “বল:‎ ‘তোমরা ভেবে দেখছ কি, আল্লাহ যদি রাতকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করেন, আল্লাহ ব্যতীত এমন কোন মা‘বূদ আছে, যে তোমাদেরকে আলো এনে দিতে পারে? তবুও কি তোমরা কর্ণপাত করবে না? বল:‎ ‘তোমরা ভেবে দেখছ কি, আল্লাহ যদি দিনকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করেন, আল্লাহ ব্যতীত এমন কোন মা‘বূদ আছে, যে তোমাদের জন্য রাতের আবির্ভাব ঘটাবে যাতে তোমরা বিশ্রাম করতে পার? তবুও কি তোমরা ভেবে দেখবে না? তিনিই তাঁর দয়ায় তোমাদের জন্য করেছেন রাত ও দিন, যাতে তোমরা বিশ্রাম করতে পার এবং তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং যেন তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” (সূরা ক্বাসাস ২৮:৭১-৭৩) আর এ দিন-রাত পরিবর্তনের মাঝে আরেকটি উপকারিতা হল দিন, সপ্তাহ, মাস ও বৎসর গণনা করে তারিখ নির্ধারণ করা। যদি সর্বদা দিন বা রাত থাকত তাহলে এ হিসাব-নিকাশ করা যেত না। কেননা মাস ও বৎসরের হিসাবের সাথে দুনিয়াবী ও ধর্মীয় অনেক বিধি-বিধান জড়িত। সুতরাং এ সব বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়াটা মানুষের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার দয়া ও রহমত। এ সম্পর্কেও সূরা ইউনূস এ আলোচনা করা হয়েছে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. দিন-রাত দুটি নিদর্শন যা প্রমাণ করে আল্লাহ তা‘আলা একক ও সত্য মা‘বূদ। ২. দিন-রাতের পরিবর্তনের মাঝে মানুষের অনেক উপকার নিহিত রয়েছে। ৩. দিন-রাতের পরিবর্তনের সাথে ধর্মীয় অনেক বিধি-বিধান সম্পৃক্ত।

আল-ইসরা 17:15

১৫ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন, যে ব্যক্তি সৎ পথের অনুসরণ করবে, তাঁর উত্তম প্রতিদান নিজেই ভোগ করবে। আর যে অসৎ পথের অনুসরণ করলে সে নিজেকেই পথভ্রষ্ট করল এবং জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিল, এতে অন্য কেউ দায়ী নয়। নিজের পাপের বোঝা নিজেকেই বহন করতে হবে, অন্য কেউ বহন করবে না। এরূপ অনেক আয়াত রয়েছে, যেমন সূরা ফাতিরের ১৮ নং, সূরা আন‘আমের ১৬৪ নং এবং সূরা বাকারাহর ১৩৪ নং আয়াত। তবে যে নিজে পথভ্রষ্ট হয় এবং অন্যকেও ভ্রষ্ট করে সে তার নিজের ভ্রষ্টতার বোঝা বহন করবে এবং যাদেরকে ভ্রষ্ট করেছে তাদের গুনাহর বোঝাও (তাদের গুনাহর কোন কমতি না করেই) তাকে বহন করতে হবে। এ কথাও কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (لِيَحْمِلُوْآ أَوْزَارَهُمْ كَامِلَةً يَّوْمَ الْقِيٰمَةِ لا وَمِنْ أَوْزَارِ الَّذِيْنَ يُضِلُّوْنَهُمْ بِغَيْرِ عِلْمٍ ط أَلَا سَا۬ءَ مَا يَزِرُوْنَ‏)‏ “ফলে কিয়ামত দিবসে তারা বহন করবে তাদের পাপভার পূর্ণ মাত্রায় এবং পাপভার তাদেরও যাদেরকে তারা অজ্ঞতাহেতু পথভ্রষ্ট করেছে। দেখ, তারা যা বহন করবে তা কত নিকৃষ্ট!” (সূরা নাহল ১৬:২৫) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: مَنْ دَعَا إِلَي هُدًي، كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا، وَمَنْ دَعَا إِلَي ضَلَالَةٍ، كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الْإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا যে ব্যক্তি সৎ পথের দিকে মানুষকে আহ্বান করবে সে ব্যক্তি তেমন প্রতিদান পাবে যেমন প্রতিদান সে সৎপথের অনুসরণকারী পাবে, তাদের কারো প্রতিদান কম করা হবে না। আর যে ব্যক্তি কোন পথভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান করবে সে ব্যক্তি তেমন গুনাহগার হবে যেমন গুনাহগার হবে সে ভ্রষ্টতার অনুসারী ব্যক্তি, তাদের কারো গুনাহ কমিয়ে দেয়া হবে না। (সহীহ মুসলিম হা: ২৬৭৪) অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মানুষের প্রতি তাঁর একটি রহমতের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি রাসূল প্রেরণ করে সত্য-মিথ্যা ও শরীয়ত সম্পর্কে অবগত না করা পর্যন্ত কোন জাতিকে ধ্বংস করেন না। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (رُسُلاً مُّبَشِّرِيْنَ وَمُنْذِرِيْنَ لِئَلَّا يَكُوْنَ لِلنَّاسِ عَلَي اللّٰهِ حُجَّةٌۭ بَعْدَ الرُّسُلِ ط وَكَانَ اللّٰهُ عَزِيْزًا حَكِيْمًا) “সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূল আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা নিসা ৪:১৬৫) যারাই জাহান্নামে যাবে তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের কাছে কি কোন রাসূল আগমন করেনি? সবাই স্বীকার করবে, যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন, (کُلَّمَآ اُلْقِیَ فِیْھَا فَوْجٌ سَاَلَھُمْ خَزَنَتُھَآ اَلَمْ یَاْتِکُمْ نَذِیْرٌﭗ قَالُوْا بَلٰی قَدْ جَا۬ءَنَا نَذِیْرٌﺃ فَکَذَّبْنَا وَقُلْنَا مَا نَزَّلَ اللہُ مِنْ شَیْءٍﺊ اِنْ اَنْتُمْ اِلَّا فِیْ ضَلٰلٍ کَبِیْرٍﭘ)‏ “যখনই তাতে কোন দলকে নিক্ষেপ করা হবে, তখনই তাদেরকে জাহান্নামের রক্ষীরা জিজ্ঞেস করবেঃ তোমাদের নিকট কি কোন সতর্ককারী আসেনি? তারা উত্তরে বলবে: হ্যাঁ আমাদের নিকট সতর্ককারী এসেছিল, আমরা তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিলাম এবং বলেছিলাম: আল্লাহ কিছুই নাযিল করেনি, তোমরা তো মহা গুমরাহীতে রয়েছ।” (সূরা মুলক ৬৭:৮-৯) এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূল প্রেরণ ও কিতাব অবতরণ ছাড়া আল্লাহ তা‘আলা কোন জাতিকে আযাব দিবেন না। তবে যদি কোন্ জাতি বা কোন্ ব্যক্তির কাছে তাঁর বার্তা না পৌঁছে, সে ফায়সালা কিয়ামতের দিন তিনিই করবেন। সেখানে অবশ্যই কারো সাথে অবিচার করা হবে না। বধির, পাগল, নির্বোধ এবং দু’নাবীর মধ্যবর্তী যুগে মৃত্যুবরণকারী (যাদের কাছে দীনের দাওয়াত পৌঁছে নাই) ব্যক্তিদের ব্যাপারও। এদের ব্যাপারে কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রতি ফেরেশতা প্রেরণ করবেন এবং ফেরেশতারা তাদেরকে বলবেন যে, জাহান্নামে প্রবেশ কর। অতএব তারা যদি আল্লাহ তা‘আলার এ নির্দেশ মেনে নিয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করে তাহলে জাহান্নাম তাদের জন্য ফুল বাগান হয়ে যাবে। অন্যথায় তাদেরকে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহীহুল জামে হা: ৮৮১, ইবনু হিব্বান ৯/২২৬) মুসলিম শিশুরা জান্নাতে যাবে তবে কাফির-মুশরিকদের শিশুদের ব্যাপারে মতামত রয়েছে। কেউ বলেছেন, জান্নাতে যাবে; কেউ বলেছেন জাহান্নামে যাবে। ইমাম ইবনু কাসীর বলেন: হাশরের মাঠে তাদের পরীক্ষা করা হবে, যারা আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশের আনুগত্য করবে তারা জান্নাতে যাবে, আর যারা অবাধ্য হবে তারা জাহান্নামে যাবে। (ইবনু কাসীর) ইমাম বুখারী যে বর্ণনা নিয়ে এসেছেন তাতে বুঝা যায় কাফির-মুশরিকদের শিশুরাও জাহ্ন্নাামে যাবে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. প্রত্যেক মানুষ তার নিজের পাপ বহন করবে। কেউ কারো পাপ বহন করবে না, তবে অন্যকে পাপের দিকে আহ্বান করলে অনুসারী ব্যক্তির সমান পাপের ভার বহন করতে হবে। ২. আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সতর্ক না করা পর্যন্ত শাস্তি দেন না। ৩. আল্লাহ তা‘আলার দয়া/রহমত নামে একটি সিফাত আছে তা জানা গেল।

আল-ইসরা 17:25

২৫ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, মানুষ অন্তরে যা কিছু গোপন করে সেগুলো তিনি অধিক জানেন। কোন কাজ প্রকাশ্যে করা হোক, অপ্রকাশ্যে করা হোক, আলোতে করা হোক আর অন্ধকারে করা হোক, মানুষ দেখুক আর না-ই দেখুক, সব খবর তিনি রাখেন। তাঁর জ্ঞান থেকে কোন কিছু লুকানোর সুযোগ নেই। অন্যত্র তিনি বলেন: (إِنَّ اللّٰهَ عَالِمُ غَيْبِ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ ط إِنَّه۫ عَلِيْمٌۭ بِذَاتِ الصُّدُوْرِ‏)‏ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও জমিনের যাবতীয় অদৃশ্য বিষয় পরিজ্ঞাত। অন্তরে যা কিছু রয়েছে সে সম্বন্ধেও তিনি সবকিছু অবগত।” (সূরা ফাতির ৩৫:৩৮) اوابِيْنَ শব্দের অর্থ: অভিমুখী হওয়া, ফিরে আসা। কেউ কেউ বলেন, اوابِيْنَ বলা ঐ সমস্ত সৎ লোকদেরকে যারা মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে নফল সালাত পড়ে। কারো মতে, যারা চাশ্তের সালাত আদায় করে তাদেরকেই اوابِيْنَ বলা হয়। অন্য একদল বলেন, যারা প্রত্যেক পাপ কার্যের পর তাওবা করে তাড়াতাড়ি মঙ্গলের দিকে ফিরে আসে এবং নির্জনে নিজেদের পাপের কথা স্মরণ করে আন্তরিকতার সাথে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাদেরকে اوابِيْنَ বলা হয়। উবায়েদ (রহঃ) বলেন যে, اوابِيْنَ হচ্ছে তারাই যারা বারবারই কোন মজলিস হতে ওঠার পর এই দু‘আ পাঠ করে: اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لِيْ مَا أَصَبْتُ فِيْ مَجْلِسِيْ هَذَا হে আল্লাহ এ মজলিসে যা ভুল করেছি তা ক্ষমা করে দাও। ইমাম ইবনে জারীর (রহঃ) বলেন, সঠিক উক্তি হচ্ছে, যারা গুণাহ হতে তাওবা করে অবাধ্যতা থেকে আনুগত্যের দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তা‘আলার কাছে যা ঘৃণ্য তা ছেড়ে দিয়ে তাঁর সন্তুষ্টিমূলক কাজ করে তারাই হল اوابِيْنَ । (ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর) এখান থেকেই চাশতের সালাতকে আওয়াবিনের সালাত বলা হয়। কারণ এ সময় মু’মিনরা আল্লাহ তা‘আলার দিকে ফিরে আসে, যে সময় সাধারণত সকলে কাজ কর্মে ব্যস্ত থাকে। (সহীহ মুসলিম হা: ৭৪৮) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: (১) আল্লাহ তা‘আলা মানুষের বাহ্যিক জিনিস দেখে বিচার করেন না বরং তার নিয়তের প্রতি লক্ষ্য করেন। (২) মানুষের অন্তরের খবরও আল্লাহ তা‘আলা রাখেন, তিনি অন্তরযামী।

আল-ইসরা 17:36

৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: قفا-يقفو এর অর্থ পেছনে পড়া। অর্থাৎ যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার পেছনে পড়ো না, আন্দাজে কথা বলো না। ইবনু আব্বাস ও কাতাদাহ (রহঃ) বলেন: যা দেখনি বলো না, দেখেছি। যা শোননি বলো না, শুনেছি। আর যা জান না বলো না, জানি। মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: এমন কাউকে তিরস্কার করো না যার ব্যাপারে তোমার কোন জ্ঞান নেই। সুতরাং যে বিষয়ে জ্ঞান নেই সে বিষয়ে কথা বলা, যা সঠিকভাবে শোনা নেই তা বলা সম্পূর্ণ নিষেধ। তা দুনিয়ার কোন ব্যাপারে হোক আর ধর্মীয় কোন ব্যাপারে হোক। ধর্মীয় ব্যাপারে আরো কঠোরভাবে নিষেধ রয়েছে। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: كَفَي بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ একজন ব্যক্তি মিথ্যুক হওয়ার জন্য এতটুকুই যতেষ্ট যে, সে যা শুনবে (যাচাই বাছাই না করে) তাই বলে বেড়ায়। (সহীহ মুসলিম হা: ৫) আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (يٰٓأَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اجْتَنِبُوْا كَثِيْرًا مِّنَ الظَّنِّ ز إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ) “ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা বেশি বেশি অনুমান করা থেকে বিরত থাক। কারণ, কোন কোন অনুমান গুনাহের কাজ।” (সূরা হুজরাত ৪৯:১২) হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমরা ধারণা করা থেকে বেঁচে থাক, ধারণা হচ্ছে জঘন্য মিথ্যা কথা। (সহীহ বুখারী হা: ৫১৪৩, সহীহ মুসলিম হা: ১৪১৩) কারণ কিয়ামতের দিন মানুষের চক্ষু, কর্ণ ও অন্তরকে জিজ্ঞেস করা হবে। চক্ষুকে জিজ্ঞেস করা হবে সে কী দেখেছিল, কর্ণকে জিজ্ঞেস করা হবে সে কী শুনেছিল, আর অন্তরকে জিজ্ঞেস করা হবে সে কী চিন্তা ভাবনা করেছে। কিয়ামতের দিন এদের বাকশক্তি দেয়া হবে আর এরা তখন স্বাক্ষী দেবে। এ আয়াত থেকে অনেক বিদ্বানগণ তাকলীদ করা নিষেধ করেছেন, কারণ যিনি তাকলীদ করেন তিনি বিনা জ্ঞানে যার তাকলীদ করা হয় তার অনুসরণ করে থাকেন। অথচ যে বিষয়ে জ্ঞান নেই সে বিষয়ে আমল করতে আল্লাহ তা‘আলা নিষেধ করেছেন। (আযওয়াউল বায়ান, অত্র আয়াতের তাফসীর) অতএব কোন কিছু বলার পূর্বে আমাদের ভেবেচিন্তে বলা উচিত, যা বলছি তা কি আমি সঠিকভাবে জানি? যদি না জানা থাকে তাহলে বিরত থাকাই কল্যাণকর। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. কোন বিষয়ে সঠিক জ্ঞান না থাকলে সে বিষয়ে কথা বলা নিষেধ। ২. ধারণা করে কথা বলা একটি জঘন্যতম পাপ। ৩. চক্ষু, কর্ণ, অন্তর এদের জবান কিয়ামতের দিন খুলে দেয়া হবে আর এরা তখন সাক্ষ্য দেবে।

আল-ইসরা 17:59

৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: শানে নুযূল: ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: মক্কাবাসী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আবেদন করল সাফা পাহাড় তাদের জন্য স্বর্ণে পরিণত করে দেয়ার জন্য এবং মক্কা থেকে পাহাড়-পর্বত সরিয়ে দেয়ার জন্য, তারা সেখানে আবাদ করবে। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট ওয়াহী আসল। এতে তাকে বলা হল, আপনি যদি তাদেরকে অবকাশ দেন তাহলে অবকাশ দেয়া হবে আর যদি তারা যা চায় তা দিতে বলেন, তাহলে তা-ই দেব কিন্তু এর পরেও যদি তারা অস্বীকার করে তাহলে তারা তাদের পূর্ববর্তী জাতির মত ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে অবকাশ দেয়ার কথা বললেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (আহমাদ হা: ২৫৮, বাইহাক্বী ফিল কুবরা হা: ৩৮০) (লুবাবুন নুকুল ফি আসবাবিন নুযূল-পৃ.১৭০) এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করছেন যে, মানুষের ইচ্ছা অনুযায়ী নিদর্শন প্রেরণ করা আল্লাহ তা‘আলার জন্য কোন কঠিন কাজ নয়। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা এ থেকে বিরত থাকেন এ জন্য যে, পূর্বের জাতিরাও এরূপ নিদর্শন দাবী করেছিল তাদের তা দেয়ার পর তারা তাতে ঈমান আনার বিপরীতে কুফরী করল। ফলে তারা ধ্বংস হয়ে যায়। অনুরূপভাবে তাদেরকেও যদি তিনি নিদর্শন দিয়ে দেন আর তারা তাতে কুফরী করে তাহলে তাদেরকেও ধ্বংস করা হবে। যার ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের ইচ্ছানুযায়ী নিদর্শন অবতীর্ণ করেন না। উদাহরণস্বরূপ আল্লাহ তা‘আলা সামূদ জাতির কথা উল্লেখ করেছেন, তাদের দাবী অনুযায়ী দশমাসের গর্ভবতী উষ্ট্রী দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এ নিদর্শন পাওয়ার পরেও নাবীর প্রতি ঈমান না আনা ও আল্লাহ তা‘আলার এ নিদর্শনকে হত্যার কারণে ভীষণ ভূমিকম্প এবং ওপর থেকে বিকট ও ভয়াবহ এক গর্জন দ্বারা তাদের ধ্বংস করে দেয়া হয়। ফলে সবাই যার যার স্থানে একযোগে অধোমুখী হয়ে ভূতলশায়ী হল (সূরা আ‘রাফ ৭:৭৮, হূদ ১১::৬৭-৬৮) এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হল এমনভাবে, যেন তারা কোনদিন সেখানে বসবাস করেনি। এদের সম্পর্কে সূরা আ‘রাফের ৭৩-৭৯ নং আয়াতের আলোচনা করা হয়েছে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. নিদর্শন প্রেরণ করার একমাত্র উদ্দেশ্য হল মানুষকে সতর্ক করা। ২. নিদর্শন প্রেরণ করা আল্লাহ তা‘আলার নিকট কোন কঠিন কাজ নয়। ৩. নিদর্শন অমান্য করলে সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি এসে যায়।

আল-ইসরা 17:60

৬০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করছেন যে, তিনি সমস্ত মানুষকে পরিবেষ্টন করে আছেন। সুতরাং কোন মানুষ তাঁর রাসূলের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না, তারা যত শক্তিশালীই হোক না কেন। (وَمَا جَعَلْنَا الرُّؤْيَا الَّتِيْٓ أَرَيْنٰكَ.... ) এখানে أَرَيْنٰكَ বলতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে মি‘রাজের রাত্রিতে যা দেখানো হয়েছিল তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। (وَالشَّجَرَةَ الْمَلْعُوْنَةَ) বলতে যাক্কুম বৃক্ষকে বুঝানো হয়েছে। (اَذٰلِکَ خَیْرٌ نُّزُلًا اَمْ شَجَرَةُ الزَّقُّوْمِﮍاِنَّا جَعَلْنٰھَا فِتْنَةً لِّلظّٰلِمِیْنَﮎاِنَّھَا شَجَرَةٌ تَخْرُجُ فِیْٓ اَصْلِ الْجَحِیْمِﮏﺫ) “এ সকল আপ্যায়ন উত্তম, নাকি যাক্কুম গাছ? আমি তা সৃষ্টি করেছি জালিমদের জন্য শাস্তিস্বরূপ। এটি এমন বৃক্ষ, যা উৎপন্ন হয় দোযখের তলদেশ থেকে।” (সূরা স্বফ্ফাত ৩৭:৬২-৬৪) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. জাহান্নাম থেকে যে বৃক্ষ উৎগত হয় সে সম্পর্কে জানলাম।

আল-ইসরা 17:100

১০০ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা অধিকাংশ মানুষের একটি বদ-অভ্যাসের কথা বর্ণনা করছেন। মানুষ মনে করে আল্লাহ তা‘আলার কাছে ধন সম্পদের অভাব নেই, তিনি তো আমাদেরকে অঢেল সম্পদ দিলেই পারেন। আমাদের দূরবস্থা ও অভাব অনটনে থাকতে হতো না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আমার কাছে ধন-সম্পদের যে ভাণ্ডার রয়েছে যা কখনো ফুরিয়ে যাবে না, তা যদি তোমাদেরকে দেয়া হয় তাহলে তোমরা এ কথা জানা সত্ত্বেও মানুষকে দান করবে না এ আশংকায় যে, যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে আমরা অভাবে পড়ে যাব। অথচ আমি সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষকে ধন-সম্পদ ও নেয়ামত দান করেই আসছি। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: يَدُ اللّٰهِ مَلْأَي لاَ يَغِيضُهَا نَفَقَةٌ، سَحَّاءُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ، وَقَالَ: أَرَأَيْتُمْ مَا أَنْفَقَ مُنْذُ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ، فَإِنَّهُ لَمْ يَغِضْ مَا فِي يَدِهِ আল্লাহ তা‘আলার হাত ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ, দিন-রাত ব্যয় করাতেও তা কমে না। তোমরা কি লক্ষ্য করেছ, আকাশ-জমিন সৃষ্টির পর থেকে কত ব্যয় করে আসছেন, কিন্তু তার পরেও তাঁর হাতে যা রয়েছে তা কমে না। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭১১) কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা পরিমিতভাবে দিয়ে থাকেন। অধিক দিলে ফাসাদ সৃষ্টি হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَلَوْ بَسَطَ اللہُ الرِّزْقَ لِعِبَادِھ۪ لَبَغَوْا فِی الْاَرْضِ وَلٰکِنْ یُّنَزِّلُ بِقَدَرٍ مَّا یَشَا۬ئُ اِنَّھ۫ بِعِبَادِھ۪ خَبِیْرٌۭ بَصِیْرٌ‏)‏ “আল্লাহ তাঁর (সকল) বান্দাদের রুযী বাড়িয়ে দিলে তারা পৃথিবীতে অবশ্যই সীমালঙ্ঘন করত; কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছামত পরিমাণেই দিয়ে থাকেন। তিনি তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক জানেন ও দেখেন।” (সূরা শুরা ৪২:২৭) (خَشْيَةَ الْإِنْفَاقِ) অর্থ- خشية ان ينفقوا فيفتقروا অর্থাৎ এ ভয়ে যে, দান করলে ধন শেষ হয়ে যাবে, ফলে তারা নিঃস্ব হয়ে যাবে। মানুষ সংকীর্ণ চিত্তের অধিকারী হওয়ায় কার্পণ্য করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (أَمْ لَهُمْ نَصِيْبٌ مِّنَ الْمُلْكِ فَإِذًا لَّا يُؤْتُوْنَ النَّاسَ نَقِيْرًا ‏)‏ “তাদের কি রাজত্বে কোন অংশ আছে? যদি তাদের কোন অংশ থাকত তাহলে লোকদের তিল পরিমাণও দিত না।” (সূরা নিসা ৪:৫৩) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: (إِنَّ الْإِنْسَانَ خُلِقَ هَلُوْعًا لا إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوْعًا لا ‏ وَّإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوْعًا ‏)‏ “নিশ্চয়ই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অস্থিরমনা রূপে; যখন তাকে বিপদ স্পর্শ করে তখন সে হয় হা-হুতাশকারী। আর যখন কল্যাণ তাকে স্পর্শ করে তখন সে হয় অতি কৃপণ।” (সূরা মাআ‘রিজ ৭০:১৯-২১) সুতরাং আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার আগে নিজের অবস্থানের দিকে লক্ষ্য করা উচিত। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. দান করার ব্যাপারে কোন কৃপণতা করা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা যা কিছু দিবেন তা থেকে সাধ্যমত দান করতে হবে।

আল-কাহফ 18:50

৫০ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আদম ও আদম সন্তানের সাথে ইবলীস শয়তানের শত্র“তার সংবাদ দিচ্ছেন। আল্লাহ তা‘আলা আদম (عليه السلام) কে সৃষ্টি করার পর সকল ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সম্মান ও তাঁর নির্দেশ পানলার্থে আদম (عليه السلام) কে সিজদা দেয়ার জন্য। তখন সকলেই সিজদা করল কিন্তু ইবলীস করল না। এ সম্পর্কে সূরা হিজর ও সূরা আ‘রাফ- এ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ইবলীস শয়তান জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত, সে আগুনের তৈরি, সে আদম সন্তানের অন্তর্ভুক্ত নয়। (সূরা আ‘রাফ ৭:১২) অর্থাৎ সে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ ভঙ্গ করল, নিজের অহংকার ও বড়ত্বের কারণে সিজদা করল না। সে বলল (أَأَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا) “আমি কি তাকে সিজদা করবো যাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন?” (সূরা ইসরা ১৭:৬১) যে শয়তান আল্লাহ তা‘আলা ও মানব জাতির পিতা আদম (عليه السلام)-এর সাথে এমন আচরণ করল তার ব্যাপারে সতর্ক করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তোমরা কি এ শয়তান ও তার বংশধরদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে নেবে? তারা তো তোমাদের শত্র“। সুতরাং এরপরেও যারা শয়তানকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে নেবে, এসব জালিমদের প্রতিদান কতইনা খারাপ হবে। অতএব শয়তানকে কখনো ওলী হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না এবং তার অনুসারীদেরকেও ওলী হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। কারণ তারা কখনো ভাল পথ দেখায় না বরং আলোর পথ থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্র“, সুতরাং তাকে তোমরা শত্র“রূপেই গ্রহণ কর। (সূরা ফাতির ৩৫:৬) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. শয়তানের পথ বাহ্যিকভাবে যতই ভাল হোক না কেন তার অনুসরণ করা যাবে না। ২. শয়তান মানুষের কল্যাণ চায় না, সে কল্যাণের নামে অকল্যাণের দিকে নিয়ে যায়।

আল-কাহফ 18:54

৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: মানুষের কাছে সঠিক পথ তুলে ধরার জন্য কুরআনে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। কখনো ওয়াজ-নসিহত করার পথ অবলম্বন করা হয়েছে, কখনো ঘটনাবলী উল্লেখ করা হয়েছে, আবার কখনো উদাহরণ বর্ণনা করা হয়েছে। উপমা একটি ভাষা অলংকার, প্রত্যেক ভাষায় উপমার ব্যবহার পাওয়া যায়। উপমার দ্বারা উপমিত বস্তু বা বিষয়কে সহজে বুঝানোর চেষ্টা করা হয়। তাই বলা হয়- ضرب الامثال لتقريب الاذهان উপমা বর্ণনা করা হয় সহজে বুঝানোর জন্য। তাই আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে প্রত্যেক প্রকার উপমা বর্ণনা করেছেন, যাতে মানুষ সঠিক পথ সহজে বুঝতে পেরে তার অনুসরণ করে। কুরআনে অনেক উপমা সম্বলিত আয়াত রয়েছে। যেমন- মু’মিন মুনাফিকদের উপমা সূরা বাকারার শুরুর দিকে রয়েছে, যারা আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য ও যারা মানুষকে দেখানোর জন্য ব্যয় করে তাদের উপমা সূরা বাকারার ২৬১ নং আয়াতে, যারা সুদ খায় তাদের উপমা সূরা বাকারার ২৭৫ নং আয়াতে, দুনিয়ার জীবনের উপমা সূরা ইউনুসের ২৪ নং আয়াতে, জান্নাতের উপমা সূরা মুহাম্মাদের ১৫ নং আয়াতে; এভাবে যারা সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত ও যারা পথভ্রষ্ট তাদের উপমা, যারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক করে তাদের উপমা কুরআনে বর্ণিত আছে। (وَكَانَ الْإِنْسَانُ أَكْثَرَ شَيْءٍ جَدَلًا) এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম বুখারী (রহঃ) উল্লেখ করেন “একদা রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফাতেমা ও আলীর (রাঃ) বাড়িতে আগমন করেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন: তোমরা যে শুয়ে রয়েছ, সালাত আদায় করছ না কেন? উত্তরে আলী (রাঃ) বললেন: হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমাদের প্রাণ আল্লাহ তা‘আলার হাতে রয়েছে। যখন তিনি ইচ্ছা করেন তখনই আমাদের উঠিয়ে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আলীর মুখে এ কথা শুনে আর কিছু না বলে ফিরে যেতে উদ্যত হন। ফেরবার পথে তিনি হাঁটুর ওপর হাত মেরে বলতে বলতে যাচ্ছিলেন: মানুষ অধিকাংশ ব্যাপারেই বিতর্ক করে। (মুসনাদ আহমাদ ১/১১২, সহীহ বুখারী: ৪৭২৪) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. কোন বিষয়ে বেশি বেশি তর্ক-বিতর্ক করা যাবে না। ২. কুরআনে প্রত্যেক প্রকার উপমা বর্ণনা করা হয়েছে যাতে সঠিক পথ চিনতে ভুল না হয়।

আল-আম্বিয়া 21:91

৯১ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে মারইয়াম (عليه السلام)-এর কথা আলোচনা করা হয়েছে। তিনি তাঁর সতীত্বকে হেফাযত করেছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা জিবরীল (عليه السلام)-এর মাধ্যমে তাঁর মাঝে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলেন, এর মাধ্যমেই তিনি গর্ভবতী হয়েছিলেন। বিনা স্বামীতে সন্তান জন্ম দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাকে এবং সন্তান ঈসা (عليه السلام)কে শিশুকালে কথা বলা ও অন্যান্য মুজিযাহ দিয়ে উভয়কে বিশ্ববাসীর জন্য নিদর্শন করেছিলেন। তাঁর স¤পর্কে সূরা মারইয়ামে আলোচনা করা হয়েছে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) নিজের সতীত্বকে হেফাযত করেছিলেন, কোন পরপুরুষের সাথে খারাপ কাজ করেন নি। ২. মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) ও ঈসা (عليه السلام) উভয়ে বিশ্ববাসীর জন্য নিদর্শন।

আল-আম্বিয়া 21:104

১০৪ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমতা, মহত্ব ও বড়ত্বের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা সাত আকাশকে তাঁর ডান হাতে গুটিয়ে নেবেন। লেখক লেখার পর খাতাপত্র যেমন গুটিয়ে নেয় তেমনি আল্লাহ তা‘আলা আকাশকে গুটিয়ে নেবেন। তারকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে যাবে, চন্দ্র-সূর্য আলোহীন হয়ে যাবে। ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: একদা জনৈক ইয়াহূদী পন্ডিত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আগমন করে বলল: হে মুহাম্মাদ! আমরা পাই যে, আল্লাহ তা‘আলা আকাশসমূহ এক আঙ্গুলের ওপর রাখবেন, জমিন এক আঙ্গুলের ওপর রাখবেন, গাছ-পালা এক আঙ্গুলের ওপর রাখবেন, পানি এক আঙ্গুলের ওপর রাখবেন, কাদা এক আঙ্গুলের ওপর রাখবেন এবং সারা সৃষ্টি এক আঙ্গুলের ওপর রাখবেন; অতঃপর বলবেন আমিই রাজাধিরাজ। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার কথার সত্যতার কারণে হেসে দিলেন এমনকি তার দাঁত প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল। তখন তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করেন: (وَمَا قَدَرُوا اللّٰهَ حَقَّ قَدْرِه۪ وَالْأَرْضُ جَمِيْعًا قَبْضَتُه۫ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِه۪ سُبْحَانَه۫ وَتَعَالٰي عَمَّا يُشْرِكُوْنَ) “তারা আল্লাহর যথাযথ সম্মান করে না। সমস্ত পৃথিবী কিয়ামতের দিন থাকবে তাঁর হাতের মুষ্ঠিতে এবং আকাশমন্ডলী থাকবে ভাঁজকৃত তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাকে তাঁর সাথে শরীক করে তিনি তার থেকে ঊর্ধ্বে।” (সূরা যুমার ৩৯:৬৭) (সহীহ বুখারী হা: ৪৮১১, সহীহ মুসলিম হা: ২৭৮৬) অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: যেভাবে আমি সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবে পুনরায় আবার সৃষ্টি করব। আর আমি এতে পূর্ণমাত্রায় সক্ষম। যেমন হাদীসে এসেছে: ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: তোমাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার সামনে উলঙ্গ পায়ে ও উলঙ্গ দেহে এবং খাৎনাবিহীন অবস্থায় একত্রিত করা হবে। তারপর তিনি তেলাওয়াত করেন: (كَمَا بَدَأْنَآ أَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِيْدُه۫ ط وَعْدًا عَلَيْنَا ط إِنَّا كُنَّا فٰعِلِيْنَ) ‘যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব; এ আমার কৃত ওয়াদা, আমি এটা পালন করবই।” (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৪৭, সহীহ মুসলিম হা: ১০১৭) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা সাত আকাশ গুটিয়ে নেবেন। অতঃপর সকল বস্তু পুনরায় আবার সৃষ্টি করা হবে। ২. আল্লাহ তা‘আলা মহা শক্তি ও ক্ষমতার মালিক যা এ আয়াত থেকে বুঝা যায়।

আল-হাজ্জ 22:25

২৫ নং আয়াতের তাফসীর: যারা নিজেরা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে কুফরী করবে এবং মানুষকে ঈমান আনতে বাধা দিবে এমনকি মাসজিদে হারাম যা স্থানীয় ও বহিরাগত সকলের জন্য সমান তা হতে বাধা দিবে তারা মক্কার কাফির হোক আর অন্য যে কোন এলাকার কাফির হোক তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। যেমন ৬ষ্ঠ হিজরীতে মক্কার মুশরিকরা মুসলিমদেকে উমরা করতে বাধা দিয়েছিল। মাসজিদে হারামে ইবাদত করার অধিকার সকলের সমান। সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হোক কিংবা বিদেশী হোক। তবে কোন অমুসলিম তাতে প্রবেশ করতে পারবে না। উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ঐ সকল কাফির-মুশরিকদের কথা বর্ণনা করেছেন যারা কুফরী করত এবং মানুষকে হজ্জ পালন করা থেকে বাধা দিত। তাদের জন্য থাকবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (يَسْأَلُوْنَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيْهِ ط قُلْ قِتَالٌ فِيْهِ كَبِيْرٌ ط وَصَدٌّ عَنْ سَبِيْلِ اللّٰهِ وَكُفْرٌۭ بِه۪ وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ ق وَإِخْرَاجُ أَهْلِه۪ مِنْهُ أَكْبَرُ عِنْدَ اللّٰهِ) “তারা তোমাকে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে প্রশ্ন করে; তুমি বল, তাতে যুদ্ধ করা বড় অপরাধ। আর আল্লাহর পথে বাধা দেয়া এবং তাঁর সাথে কুফরী করা ও মসজিদে হারামে প্রবেশে বাধা দেয়া এবং এর অধিবাসীদেরকে সেখান থেকে বের করে দেয়া আল্লাহর কাছে আরও বড় গুনাহ।” (সূরা বাক্বারাহ ২:২১৭) إِلْحَادٍ অর্থ অপব্যাখ্যা করা, বাঁকা পথ অবলম্বন করা। এখানে কুফর ও শিরকসহ সমস্ত পাপকেই বুঝানো হয়েছে। এমনকি কিছু আলেম কুরআনের শব্দ থেকে এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, যদি কেউ হারামের মধ্যে পাপের ইচ্ছা পোষণ করে সেও এ সতর্কবাণীর আওতায় পড়বে। কেউ কেউ বলেছেন, পাপের শুধু ইচ্ছা করলেই পাকড়াও হবে না। তবে ইচ্ছা যদি কাজে পরিণত করার কাছাকাছি পৌঁছে যায় তাহলে সে অবশ্যই শাস্তিযোগ্য হবে। সুতরাং জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচতে হলে আমাদের উচিত সৎ কাজ করা আর মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দেয়া। কাউকে সৎ কাজ করার ব্যাপারে বাধা দেয়া যাবে না। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. মানুষকে সৎ কাজ থেকে বাধা দেয়া যাবে না। ২. মাসজিদুল হারামের মর্যাদা সম্পর্কে জানা গেল।

আল-হাজ্জ 22:41

৪১ নং আয়াতের তাফসীর: মু’মিনদেরকে পৃথিবীতে আল্লাহ তা‘আলা প্রতিষ্ঠিত করলে তাদের ইসলামী রাষ্ট্রের যে মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে তা উক্ত আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। মু’মিনরা খেলাফতের দায়িত্ব পেলে সর্ব প্রথম সালাত কায়েম করবে এবং সকল মুসলিমদেরকে সালাত আদায় করতে বাধ্য করবে। রাষ্ট্রের মধ্যে যাদের যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে তাদের থেকে যাকাত আদায় করে নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করবে এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও আল্লাহ তা‘আলার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সৎ কাজের নির্দেশ করবে এবং অসৎ কাজ থেকে বাধা দিবে। এ যদি হয় একটি রাষ্ট্রের মূলমন্ত্র এবং দায়িত্বশীলদের প্রধান কর্তব্য তাহলে সে রাষ্ট্রে কোন অন্যায়-অবিচার, খুন-গুম, অশ্লীলতা-বেহায়াপনা, চুরি-ডাকাতি এবং দুর্নীতি থাকবেনা। কারণ সালাত মানুষকে অশ্লীলতা, অন্যায় কাজসহ যাবতীয় শরীয়ত গর্হিত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। কোন নামাযী ব্যক্তি অন্যায় কাজে জড়িত হয় না, দুর্নীতি করে না, রাষ্ট্রের মাল আত্মসাৎ করে না। যাকাত আদায় হলে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সকল অপরাধ উঠে যাবে। আর এসব কাজে রাষ্ট্রীয় নির্দেশ না থাকলে অসৎ কাজে জড়িত হওয়া কার দুঃসাহস হবে? এরূপ শান্তিপূর্ণ ও আদর্শ রাষ্ট্র খেলাফতে রাশেদা ও প্রথম শতাব্দীর ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তাঁরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঐ সমস্ত উদ্দেশ্য সাধন করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সে কারণে তাদের রাষ্ট্রে কোন অন্যায়, অবিচার ও দুর্নীতি লক্ষ্য করা যায়নি। এ যুগগুলোকে বলা হয় স্বর্ণযুগ। মানুষগুলো সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিল, তাদের দুর্নীতি ধরার জন্য কমিশন গঠন করতে হয়নি, বিচার-ফায়সালার জন্য আলাদা কোন ট্র্যাইবুনাল গঠন করা হয়নি। প্রত্যেকেই আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে স্বীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। সুতরাং গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি যা কিছু রয়েছে কোন কিছ্ইু পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না, অরাজকতা দূর করতে পারবে না, যদি ইসলামের বিধানের দিকে সকলে ফিরে না আসে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرٰٓي اٰمَنُوْا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكٰتٍ مِّنَ السَّمَا۬ءِ وَالْأَرْضِ وَلٰكِنْ كَذَّبُوْا فَأَخَذْنٰهُمْ بِمَا كَانُوْا يَكْسِبُوْنَ)‏ “যদি সে সকল জনপদের অধিবাসী ঈমান আনত ও তাক্বওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ উন্মুক্ত করে দিতাম, কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল; সুতরাং তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি।” (সূরা আ‘রাফ ৭:৯৬) অতএব প্রতিটি মুসলিম শাসকের উচিত হবে ইসলামের অনুশাসন মেনে রাষ্ট্র পরিচালনা করা, এতে দুনিয়াতে যেমন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, তেমনি সে শাসক নাগরিকের সৎ আমলের নেকীর অংশ পাবেন। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. মুসলিম শাসকদের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান দায়িত্বগুলো জানতে পারলাম। ২. যে দেশ বা এলাকার লোক ঈমান ও তাক্বওয়া অবলম্বন করবে তাদেরকে আকাশ ও জমিনের বরকত দেয়া হবে। ৩. দেশে সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান এবং ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে বাধা দিলে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে।

আল-মুমিনুন 23:17

১৭ নং আয়াতের তাফসীর: মানব জাতির সৃষ্টির কথা আলোচনা করার পর আল্লাহ তা‘আলা আকাশসমূহ সৃষ্টির বর্ণনা দিচ্ছেন। মানব সৃষ্টির তুলনায় আকাশসমূহের সৃষ্টি আরো অধিক কঠিন কাজ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, আমি তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সপ্তস্তর। যেমন আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে বলেন: সপ্ত আকাশ, পৃথিবী এবং তাদের অন্ত‎র্বর্তী সমস্ত‎ কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:৪৪) আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন: (أَلَمْ تَرَوْا كَيْفَ خَلَقَ اللّٰهُ سَبْعَ سَمٰوٰتٍ طِبَاقًا)‏ “তোমরা লক্ষ্য করনি আল্লাহ তা‘আলা কিভাবে সাত আসমানকে স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন?” (সূরা নুহ ৭১:১৫) এ সকল সৃষ্টির কথাই প্রমাণ করে যে, সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত দ্বিতীয় আর কেউ নেই। এবং আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টির বিষয়ে অসতর্কও নন। বরং তিনি প্রত্যেক বিষয়ের যথাযথ খবর রাখেন। কোথায় কী হয় না হয় সব কিছ্ইু তিনি জানেন। (আল্লাহ তা‘আলা অধিক জ্ঞাত) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়। ২. আকাশ ও জমিন সাতটি।

আন-নূর 24:3

৩ নং আয়াতের তাফসীর: শানে নুযূল: আমর বিন শু‘আইব তার পিতা হতে, তার পিতা তার দাদা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ছিল যাকে বলা হত “মুরসেদ”। সে মুসলিম বন্দীদেরকে মক্কা থেকে মদীনায় নিয়ে যেত। বর্ণনাকারী বলেন, মক্কায় একজন অসতী মহিলা ছিল, তার নাম ছিল “আন্নাক”। ঐ লোকটি বিবাহ করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট অনুমতি চাইলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)‎ চুপ করে রইলেন, তাকে কোন উত্তর দিলেন না। এমতাবস্থায় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তিরমিযী হা: ৩১৭৭, নাসাঈ হা: ৩২২৮, সনদ হাসান) এ আয়াতের ব্যাপারে তাফসীরে অনেক মত পাওয়া যায়। কেউ কেউ বলেছেন: অধিক সময় এ রকমই হয়ে থাকে তাই এ রকম বলা হয়েছে। আয়াতের অর্থ হলন সাধারণতঃ ব্যভিচারী ব্যক্তি বিবাহের জন্য নিজের মত ব্যভিচারিণীকেই পছন্দ করে থাকে। সে জন্য দেখা যায় অধিকাংশ ব্যভিচারী নারী-পুরুষ তাদেরই অনুরূপ ব্যভিচারী নারী-পুরুষের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক করে থাকে বা করতে পছন্দ করে। মূলত এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য হল মু’মিনদেরকে সতর্ক করা যে, ব্যভিচার যেমন একটি জঘন্যতম কাজ ও মহাপাপ, তেমনি ব্যভিচারী ব্যক্তির সাথে বিবাহ ও দাম্পত্য জীবনের সম্পর্ক গড়াও অবৈধ। ইমাম শাওকানী (رحمه الله) এ মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন: এখানে نكاح বলতে বিবাহ উদ্দেশ্য নয়, বরং সহবাস করা অর্থে ব্যবহার হয়েছে। উদ্দেশ্য হলন ব্যভিচারের নিকৃষ্টতা ও জঘন্যতা বর্ণনা করা। আর আয়াতের অর্থ হলন ব্যভিচারী ব্যক্তি নিজ যৌনকামনা চরিতার্থ করার জন্য অবৈধ রাস্তা অবলম্বন করে ব্যভিচারিণী মহিলার কাছেই যেয়ে থাকে। অনুরূপ ব্যভিচারিণী মহিলাও যৌনকামনা চরিতার্থ করার জন্য ব্যভিচারী পুরুষের কাছে যেয়ে থাকে। কিন্তু মু’মিনদের জন্য এ রকম কাজ করা হারাম। এখানে ব্যভিচারীর সাথে মুশরিক নারী-পুরুষের আলোচনা এজন্য করা হয়েছে যে, শিরকের সাথে ব্যভিচারের সামঞ্জস্য আছে। একজন মুশরিক যেরূপ আল্লাহ তা‘আলাকে ছেড়ে দিয়ে অন্যের নিকট মাথা নত করে, অনুরূপ একজন ব্যভিচারী নিজের জৈবিক চাহিদা মিটানোর জন্য নিজের স্ত্রীকে বাদ দিয়ে অন্যের সাথে মিলামিশা করে। কিন্তু আল্লামা শানকিতী (رحمه الله) বলেছেন, এখানে نكاح দ্বারা মিলন করা বা সহবাস করার অর্থ সঠিক নয়। কারণ ব্যভিচারী নারী-পুরুষের সাথে মুশরিক নারী-পুরুষের কথা সম্পৃক্ত করেছেন। একজন ব্যভিচারী মুসলিম ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় একজন মুশরিক নারীকে বিবাহ করা। আবার একজন ব্যভিচারী নারীর জন্য বৈধ নয় একজন ব্যভিচারী মুশরিক পুরুষকে বিবাহ করা। যেমন সূরা বাকারার ২২১ নং আয়াতে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং কোন অবস্থাতেই মুশরিক নারী-পুরুষকে বিবাহ করা বৈধ নয়। কেউ কেউ বলেছেন, এ আয়াতটি মানসুখ বা রহিত। এ কথার কোন দলীল নেই। কারণ সূরা নূর মদীনায় অবতীর্ণ, কোন কিছু তাকে রহিত করেনি। ব্যভিচারী নারী-পুরুষকে মু’মিনদের জন্য বিবাহ করা হারাম করা হয়েছে। সুতরাং এরূপ জঘন্যতম কাজ করা থেকে সতর্ক থাকতে হবে, সেই সাথে যারা এরূপ কাজ করে তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. মু’মিন সর্বদা মু’মিনকে বিবাহ করবে, যিনাকারী বা মুশরিক নারী-পুরুষ তার জন্য হারাম। পক্ষান্তরে ব্যভিচারী নারী-পুরুষ তাদের মত ব্যক্তিদেরকে পছন্দ করে থাকে।

আন-নূর 24:26

২৬ নং আয়াতের তাফসীর: শানে নুযূল: মুনাফিকরা যখন আয়িশাহ -কে মিথ্যা অপবাদ দিল তখন আল্লাহ তা‘আলা অভিযোগ থেকে মুক্ত করার জন্য এ আয়াতটি নাযিল করেন। উক্ত আয়াতে মূলত বলা হচ্ছে যে, নাবী-রাসূলগণ যেমন সৎ ও পূতঃপবিত্র, তাদের স্ত্রীগণও কখনো অসৎ হতে পারে না। সুতরাং তাদের স্ত্রীগণও সৎ ও সতী-সাধ্বী। আর অসৎ স্ত্রীগণ তো অসৎ লোকদের জন্য, কোন সৎ লোকদের জন্য অসৎ স্ত্রী নয়। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. নাবীদের স্ত্রীগণও তাদের মতই সতী-সাধ্বী। ২. সৎ লোকেরা কোন সময় অসৎ মেয়েদেরকে বিবাহ করবে না। বরং অসৎ লোকেরাই অসৎ মেয়েদেরকে বিবাহ করবে।

আন-নূর 24:35

৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াতে বলা হচ্ছে যে, আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং আকামণ্ডলী ও জমিনের নূর বা আলো। এটি الحسي والمعنوي তথা ইন্দ্রিয়গত ও অর্থগত উভয় দিক থেকে। তা হলন আল্লাহ তা‘আলা সত্ত্বাগত নূর, তাঁর হিযাব নূর। তাঁর হিযাব যদি খুলে দেয়া হয় তাহলে সৃষ্টির যে পর্যন্ত তাঁর জ্যোতি যাবে ততদূর পুড়ে যাবে। (সহীহ মুসলিম হা: ৭৯) অর্থগত হলন আল্লাহ তা‘আলার কিতাব নূর, শরীয়ত নূর, মু’মিন বান্দাদের অন্তরের ঈমানও নূর। যদি মু’মিনের অন্তরে এ নূর না থাকত তাহলে তাগুতের অন্ধকার তাদেরকে আচ্ছাদিত করে নিত। এতে বুঝা যায়, আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্ব আছে, যদি অস্তিত্ব না-ই থাকত তাহলে পৃথিবী ও আকাশে আলো থাকত না, আর পৃথিবী ও আকাশের কেউই সুপথপ্রাপ্ত হত না। মানুষ প্রদীপের আলো দ্বারা যেমন পথ চলাচল করে, তেমনি আল্লাহ তা‘আলার আলো দিয়ে মানুষ সঠিক পথের সন্ধান পায় যা জান্নাতের দিকে চলে গেছে। আল্লাহ তা‘আলা আকাশমণ্ডলী ও জমিনের আলো এ কথা সহীহ হাদীসের দ্বারাও প্রমাণিত। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)‎ তাহাজ্জুদের সালাতে দাঁড়িয়ে সানায় পড়তেন: اللَّهُمَّ لَكَ الحَمْدُ، أَنْتَ نُورُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ হে আল্লাহ তা‘আলা! তোমারই যাবতীয় প্রশংসা। তুমি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী এবং উভয়ের মধ্যে অবস্থিত সকল কিছুর জ্যোতি। (সহীহ বুখারী হা: ৬৩১৭, সহীহ মুসলিম হা: ৭৬৯) এরপর আল্লাহ তাঁর নূরের উপমা পেশ করেছেন, যে নূর হল মু’মিনের অন্তরে ঈমান ও কুরআনের নূর। আল্লাহ তা‘আলার জ্যোতির উপমা হলন যেমন একটি তাকে একটি প্রদীপ রাখা আছে এবং তা রাখা আছে একটি কাঁচের আবরণের ভিতর। আর ওর মধ্যে এমন এক বরকতময় গাছের বিশেষ ধরনের তেল ভরা হয়েছে; যা বিনা দিয়াশলাই-এ নিজে নিজেই আলোকিত হওয়ার উপক্রম। এভাবে সমস্ত আলো একটি তাকে জমা হয়েছে এবং তা আলোয় আলোময় হয়ে রয়েছে। অনুরূপ আল্লাহ তা‘আলার নাযিলকৃত দলীল-প্রমাণের অবস্থা যা অতি স্পষ্ট এবং একটি অন্যের তুলনায় আরো উত্তম। যা আলোর ওপর আলো। যা প্রাচ্যের নয়, পাশ্চাত্যেরও নয়। অর্থাৎ পূর্বের নয়, পশ্চিমেরও নয়। এর অর্থ হল ঐ বৃক্ষ এমন এক খোলা ময়দান ও বৃক্ষহীন প্রান্তরে বিদ্যমান যার ওপর সূর্যের আলো সব সময় পড়ে। لنوره এখানে তাঁর নূর বলতে ইসলাম ও ঈমানকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ঈমান ও ইসলাম গ্রহণ করার মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের নির্দেশিত পথে চলার সুযোগ করে দেন। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সমগ্র আকাশ-জমিন ও এদের মধ্যে যা কিছু আছে সকল কিছুর নূর বা জ্যোতি একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। ২. আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্ব রয়েছে। ৩. যায়তুন বৃক্ষের ফযীলত সম্পর্কে জানা গেল। ৪. আল্লাহ তা‘আলার নূরের একটি উপমা পাওয়া গেল।

আন-নূর 24:55

৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা সঠিক ঈমান ও আমলের ওপর প্রতিষ্ঠিত মু’মিনদেরকে প্রতিশ্র“তি দিচ্ছেন যে, তিনি তাদের জমিনে খেলাফত দান করবেন যেমন ইতোপূর্বে যারা সঠিক ঈমান ও আমলের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তাদেরকে জমিনে খেলাফত দান করেছিলেন। জমিনে তাদের ক্ষমতা থাকবে তারা যা বলবে তা করতে পারবে। কুরআনে অনেক আয়াত রয়েছে যা প্রমাণ করে যারা সঠিক ঈমান ও আমলের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা জমিনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাদেরকে খেলাফত দান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (اَلَّذِيْنَ إِنْ مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلٰوةَ وَاٰتَوُا الزَّكٰوةَ وَأَمَرُوْا بِالْمَعْرُوْفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ ط وَلِلّٰهِ عَاقِبَةُ الْأُمُوْرِ) “আমি এদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করলে এরা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দিবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দিবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে; আর সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহ তা‘আলার এখতিয়ারে।” (সূরা হজ্জ ২২:৪১) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: (يٰٓأَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْآ إِنْ تَنْصُرُوا اللّٰهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ) “হে ঐসব লোক, যারা ঈমান এনেছ! তোমরা যদি আল্লাহ তা‘আলাকে সাহায্য কর তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের কদমকে মযবুত করে দেবেন।” (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৭) এ সম্পর্কে আরো বলেন: (عَسٰي رَبُّكُمْ أَنْ يُّهْلِكَ عَدُوَّكُمْ وَيَسْتَخْلِفَكُمْ فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرَ كَيْفَ تَعْمَلُوْنَ) ‘শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের শত্র“কে ধ্বংস করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে জমিনে তাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন, অতঃপর তোমরা কী কর তা তিনি লক্ষ্য করবেন।’ (সূরা আ‘রাফ ৭:১২৯) (وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِيْنَهُمُ) ‘তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দীনকে যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন’ সে দীন হল ইসলাম। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِيْنًا) “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম।” (সূরা মায়িদা ৫:৩) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: لَا يَبْقَي عَلَي ظَهْرِ الْأَرْضِ بَيْتُ مَدَرٍ، وَلَا وَبَرٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللّٰهُ كَلِمَةَ الْإِسْلَامِ، بِعِزِّ عَزِيزٍ أَوْ ذُلِّ ذَلِيلٍ، إِمَّا يُعِزُّهُمُ اللّٰهُ فَيَجْعَلُهُمْ مِنْ أَهْلِهَا، أَوْ يُذِلُّهُمْ فَيَدِينُونَ لَهَا পৃথিবীর বুকে তৈরি করা মাটি ও খড়ের প্রত্যেক বাড়িতে আল্লাহ ইসলামের বাণী প্রবেশ করাবেন। কোন ক্ষমতাসীন ব্যক্তিকে ক্ষমতায় অথবা পরাক্রমশালীদেরকে সম্মানিত করে অথবা অপদস্থদেরকে অপমানিত করে। হয়তো তাদেরকে সম্মানিত করবেন, ফলে তাদেরকে ইসলামের অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত করবেন অথবা তাদেরকে অপমানিত করবেন ফলে তারা সে দীনের অনুসারী হবে। (মুসনাদ আহমাদ হা: ২৩৮১৪, সহীহ) (وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِّنْۭ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا) অর্থাৎ মু’মিনদের সঠিক ঈমান ও আমলের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য আরো ফলাফল হল তাদের ভয়কে নিরাপত্তায় পরিবর্তন করে দেবেন। অর্থাৎ নিজেদের সংখ্যালঘিষ্ঠতার কারণে, অস্ত্রহীনতার কারণে বা অন্যান্য যে সকল কারণে সর্বদা কাফিরদের থেকে ভয় পেয়ে থাকে অথবা অন্য যে কোন ভয় থাকুক তা থাকবে না। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আল্লাহ তা‘আলা যখন দীনকে পূর্ণতা দান করবেন তখন একজন আরোহী সানআ থেকে হাজরামাওত পর্যন্ত সফর করবে, আল্লাহ তা‘আলার ভয় ছাড়া অন্য কোন ভয় থাকবে না। (সহীহ বুখারী হা: ৩৮৫২) কিছুসংখ্যক বিদ্বান এ প্রতিশ্র“তিকে সাহাবায়ে কিরামদের সাথে অথবা খোলাফায়ে রাশেদীনের সাথে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। কিন্তু এ সীমাবদ্ধতার কোন দলীল নেই। সুতরাং যদি মুসলিমরা সঠিক ঈমান ও আমলের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে তাহলে আল্লাহ তা‘আলা উক্ত প্রতিশ্র“তি যে কোন সময় বাস্তবে রূপ দান করবেন। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. ঈমানদার বান্দাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা জমিনের প্রতিনিধি বানাবেন। ২. তারা আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে, আর কাউকে শরীক করবে না। ৩. তাদের অন্তরে কোন প্রকার ভয় কাজ করবে না।

আন-নূর 24:61

৬১ নং আয়াতের তাফসীর: যে সকল মুসলিমরা কোন অঙ্গহানির কারণে শরীয়তের ওয়াজিব বিধান পালন করতে অক্ষম, তাদেরকে সে বিধান না পালন করার জন্য পাকড়াও করা হবে না এবং তাদের দীনের ও ঈমানের কোন ক্ষতি হবে না। যেমন যারা অন্ধ, খোঁড়া, এমন অসুস্থ চলতে পারে না ও অনুরূপ ব্যক্তিরা জিহাদ ও তৎসদৃশ কাজে অংশ গ্রহণ করতে পারে না। কারণ জিহাদে যেতে হলে দৃষ্টিসস্পন্ন ও বিকলাঙ্গতামুক্ত হতে হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (لَيْسَ عَلَي الْأَعْمٰي حَرَجٌ وَّلَا عَلَي الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَّلَا عَلَي الْمَرِيْضِ حَرَجٌ ط وَمَنْ يُّطِعِ اللّٰهَ وَرَسُوْلَه۫ يُدْخِلْهُ جَنّٰتٍ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهٰرُ ج وَمَنْ يَّتَوَلَّ يُعَذِّبْهُ عَذَابًا أَلِيْمًا)‏ “অবশ্য যদি অন্ধ, খোঁড়া ও রোগী জিহাদে না আসে তাহলে কোনো দোষ নেই। যে কেউ আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের কথা মেনে চলবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নীচে ঝর্ণাধারা বহমান। আর যে ব্যক্তি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে তাকে তিনি যন্ত্রণাদায়ক আযাব দেবেন।” (সূরা ফাতহ ৪৮:১৭) অনুরূপ সূরা তাওবার ৯১-৯২ নং আয়াতে বলা হয়েছে। (أَنْ تَأْكُلُوْا مِنْم بُيُوْتِكُمْ) এখানে তোমাদের গৃহ বলতে তোমাদের সন্তানদের গৃহে। কারণ নিজের গৃহে খাওয়া দাওয়া করতে অসুবিধার কোন প্রশ্নই আসতে পারে না। হাদীসে এসেছে: মানুষ যা উপার্জন করে তার মধ্যে উত্তম উপার্জন হল সন্তান। (তিরমিযী হা: ১৩৫৮, ইবনু মাযাহ হা: ২২৯০, সহীহ) সুতরাং সন্তানের বাড়িতে খাবে এতে কোন অসুবিধা নেই। (مَا مَلَكْتُمْ مَّفَاتِحَه) অর্থাৎ যে সকল বাড়ির কর্তৃত্ব পেয়েছন হয় দায়িত্বশীল হিসেবে বা অন্য কারণে, সে সকল বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করতে কোন অসুবিধা নেই। প্রাথমিক যুগে কারো বাড়িতে খাদ্যগ্রহণ করাটা অপছন্দনীয় মনে করা হত, আবার একাকী খাওয়াও ভাল মনে করা হত না এমনকি যদি তাদের মনিবেরা তাদের ধন-ভাণ্ডারের চাবি দিত তথাপি তারা সেখান থেকে খাবার অনুমতি থাকলেও খেত না। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাদের এ জাহিলী প্রথা দূর করণার্থে বিধান নাযিল করেন যে, তোমরা তোমাদের পিতৃ গৃহে, বন্ধুদের গৃহে, যাদের ধন-ভাণ্ডারের চাবি তোমাদের নিকট রয়েছে তাদের ধন-ভাণ্ডার থেকে প্রয়োজন মোতাবেক খাওয়াতে এবং পৃথক বা একত্রিতভাবে খাওয়াতে তোমাদের কোন দোষ নেই। (فَسَلِّمُوْا عَلٰٓي أَنْفُسِكُمْ) অর্থাৎ নিজের বাড়ি হোক আর অন্যের বাড়ি হোক প্রবেশের পূর্বে ভিতরে অবস্থানরত মানুষদের সালাম দিবে। অনেকে নিজের স্ত্রী, মা-বাবাদেরকে সালাম দিতে কুণ্ঠাবোধ করে; না, এমনটি হওয়া উচিত নয়। বরং তারা সালাম পাওয়ার আরো বেশি হকদার। (تَحِيَّةً مِّنْ عِنْدِ اللّٰهِ) অর্থাৎ বাড়িতে প্রবেশকালে السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللّٰهِ বা السَّلاَمُ عَلَيْنَا وَعَلَي عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ) বলা এটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অভিবাদন এবং তিনি তা শরীয়ত সিদ্ধ করে দিয়েছেন। এতে বরকত রয়েছে এবং তোমরা যত কথা বলে থাক তার মধ্যে এটি উত্তম। সুতরাং প্রতিটি মু’মিন ব্যক্তির উচিত নিজ বাড়িসহ অন্যের বাড়িতে প্রবেশকালে ভিতরে অবস্থানরত ব্যক্তিদের সালাম দেয়া। নিজের লোকদেরকে সালাম দিতে কুণ্ঠাবোধ করবে না। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. যারা বিকলাঙ্গ তারা যদি অসুবিধার কারণে জিহাদে বা এরূপ ফরয জাতীয় কোন কাজ তরক করে তাতে তাদের কোন গুনাহ নেই। ২. কারো বাড়িতে খাওয়াটা কোন দোষের বিষয় নয়। ৩. দাস-দাসী তার মনিবের মাল থেকে প্রয়োজন মোতাবেক খাদ্য গ্রহণ করতে পারবে। ৪. কারো গৃহে প্রবেশ করার পূর্বে প্রথমে সালাম প্রদান করতে হবে। ৫. একাকী খাওয়া বৈধ তবে একাকী খাওয়ার চেয়ে একত্রিতভাবে খাওয়াতে বরকত বেশি।

আল-ফুরকান 25:20

২০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা‘আলা মূলত অত্র সূরার ৭ নং আয়াতে রাসূলের ব্যাপারে খাদ্যগ্রহণ করা, বাজারে যাওয়ার ওযর-আপত্তির জবাব উল্লেখ করেছেন যে, শুধু এ রাসূলই নয় বরং প্রত্যেক রাসূলই এরূপ করেছে। সুতরাং এটা কোন অবাস্তব বিষয় নয়। আর এ কারণে যদি কেউ নবুওয়াত অস্বীকার করে তাহলে সেটা হবে সবচেয়ে বড় মূর্খতা। (وَجَعَلْنَا بَعْضَكُمْ لِبَعْضٍ فِتْنَةً) আল্লাহ তা‘আলা বলেনন আমি একজনকে অপরের জন্য করেছি পরীক্ষাস্বরূপ। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন: (وَكَذٰلِكَ فَتَنَّا بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لِّيَقُوْلُوْآ أَهٰٓؤُلَا۬ءِ مَنَّ اللّٰهُ عَلَيْهِمْ مِّنْۭ بَيْنِنَا) “আমি এভাবে তাদের একদলকে অন্যদল দ্বারা পরীক্ষা করেছি যেন তারা বলে, ‘আমাদের মধ্যে কি এদের প্রতিই আল্লাহ তা‘আলা অনুগ্রহ করলেন? আল্লাহ তা‘আলা কি কৃতজ্ঞ লোকদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত নন?” (আনআম ৬:৫৩) ইমাম কুরতুবী এখানে فِتْنَةً শব্দের তাফসীর করেছেন যে, এর অর্থ হল: প্রত্যেক মানুষ তার সঙ্গী-সাথী দ্বারা পরীক্ষিত যেমন একজন গরীব লোক ধনী ব্যক্তির মাধ্যমে পরীক্ষিত। গরীব ব্যক্তি ধনী ব্যক্তির সম্পদ দেখে হিংসা করতে পারবে না এবং তাকে যা দিবে তা ব্যতীত কোন কিছু গ্রহণও করতে পারবে না। অনুরূপভাবে ধনী লোক গরীব লোকের মাধ্যমে পরীক্ষিত, সে তাকে ধমক দিবে না, ভর্ৎসনা করবে না এবং তাঁর প্রতি স্নেহপরায়ণ হবে। আর প্রত্যেকেই এ ব্যাপারে ধৈর্যশীল হবে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সর্বাবস্থায় ধৈর্য ধারণ করতে হবে। ২. একজন মানুষ অন্য মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ।

আন-নামল 27:59

৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবীকে নির্দেশ প্রদান করেছেন, তিনি যেন আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করেন এবং তিনি যেন শান্তি কামনা করেন তাদের ওপর যাদেরকে রিসালাত দ্বারা মনোনীত করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُوْنَ- وَسَلَامٌ عَلَي الْمُرْسَلِيْنَ - وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ) “তারা যা বলে থাকে তা থেকে তোমার‎ প্রতিপালক মহিমান্বিত যিনি সকল ক্ষমতার অধিকারী। ‘সালাম’ বর্ষিত হোক রাসূলগণের প্রতি। আর সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার, যিনি সারা বিশ্বের প্রতিপালক।” (সূরা সফফাত ৩৭:১৮০-১৮২) তবে ইবনু আব্বাস (رضي الله عنه) বললেন: এখানে (علي عباده) তাঁর দাস দ্বারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবীদেরকে বুঝানো হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না তারা কখনো উত্তম হতে পারে না। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলাই উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। আর সকলকে তাঁরই ইবাদত করতে হবে নতুবা কঠিন শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই প্রশংসা করতে হবে। ২. মানুষের জন্য শান্তিকামী হতে হবে। বদদু‘আ করা যাবে না।

আন-নামল 27:82

৮২ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে কিয়ামতের পূর্বে কিয়ামতের নির্দশন হিসেবে একটি জন্তু ভূগর্ভ হতে বের হবে সে কথাই বলা হচ্ছে যে, যখন আল্লাহ তা‘আলার কথা অনুপাতে শাস্তি এসে পড়বে ঠিক তখনই আল্লাহ তা‘আলা ভূগর্ভ হতে একটি প্রাণী নির্গত করবেন যা মানুষের সাথে কথা বলবে। যেমন হাদীসে এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমরা দশটি নিদর্শন দেখতে পাও। তা হল প্রথম, সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে, জন্তু (যা মানুষের সাথে কথা বলবে) এভাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দশটি নিদর্শনের কথা উল্লেখ করেন। (তিরমিযী হা: ২১৮৩, সহীহ) সাহাবী আবূ হুরাইরাহ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ছয়টি আলামত প্রকাশ হওয়ার পূর্বেই তাড়াতাড়ি আমল কর। সেগুলো হচ্ছে- পশ্চিমাকাশে সূর্যোদয়, ধোঁয়া, দাজ্জাল, ভূ-প্রাণী, তোমাদের কারো মৃত্যু অথবা কিয়ামত। (সহীহ মুসলিম হা: ৩২৮) হাদীস থেকে বুঝা যাচ্ছেন কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ভূগর্ভ থেকে একটি জন্তু নির্গত হবে যা মানুষের সাথে কথা বলবে। আরো বুঝা যাচ্ছেন এ জীবটি সাধারণ জন্তুর মত প্রজনন প্রক্রিয়ায় হবে না বরং অকস্মাৎ জমিন ফুড়ে বের হবে। ইমাম ইবনু কাসীর (رحمه الله) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন: এখানে ভূ-প্রাণী আবির্ভাবের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। আর তা তখনই হবে যখন মানুষ ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করবে, আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশাবলী বর্জন করবে এবং সত্য দীনকে বিকৃত করে ফেলবে। এমন সময় আল্লাহ তা‘আলা জমিন থেকে অলৌকিক প্রাণী বের করবেন এবং মানুষ তার সাথে কথা বলবে। (তাফসীর ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: ঘোষিত শাস্তি হবে আলেমদের মৃত্যবরণ করার মাধ্যমে, ইলম চলে যাওয়ার মাধ্যমে এবং কুরআন তুলে নেয়ার মাধ্যমে। তারপর তিনি বলেন: কুরআন তুলে নেয়ার পূর্বে বেশি বেশি তেলাওয়াত কর। শ্রোতাগণ বললেন: কুরআনের এসব পাণ্ডুলিপি তুলে নেয়া সম্ভব কিন্তু, মানুষের অন্তরে যা মুখস্ত রক্ষিত আছে তা কিভাবে তুলে নেয়া হবে। তিনি বললেন: একদা একটি রাত্রি অতিবাহিত করার পর যখন তারা সকালে উপনীত হবে তখন তাদের অন্তর কুরআন শূণ্য হয়ে যাবে। এমনকি তারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” পড়াও ভুলে যাবে। তখন তারা জাহিলী যুগের কবিতা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। আর তখনই তাদের ওপর ঘোষিত শাস্তি এসে যাবে। (তাফসীর কুরতুবী ১৩/২৩২) ভূ-প্রাণীটির ধরন নির্ধারণে আলেমদের মাঝে মতামত পরিলক্ষিত হয়। ইমাম কুরতুবী  বলেন: তার একটি মত হল, প্রাণীটি সালেহ (عليه السلام)-এর উটের বাচ্চা। এ মতটিই অধিক সঠিক, এ মতের স্বপক্ষে তিনি প্রমাণ নিয়ে এসেছেন যা আবূ দাউদ আত তায়ালিসী হুযাইফা ইবনে উসাইদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। (তাফসীর কুরতুবী ১৩/২৩৫, মুসতাদরাক হাকেম ৪/৪৮৪, দুর্বল) আব্দুল্লাহ বিন আমর (رضي الله عنه) বলেন: উক্ত প্রাণীটি হচ্ছে তামীম আদ দারী থেকে বর্ণিত দাজ্জালের ঘটনা সম্বলিত হাদীসে উল্লিখিত সংবাদবাহী প্রাণী। আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন। পশুটির বের হওয়ার স্থান: পশুটির বের হওয়ার স্থান নিয়ে আলিমদের মাঝে কিছু মতামত পরিলক্ষিত হয়। কেউ বলেছেন: পশুটি মক্কার বৃহৎ মসজিদ থেকে বের হবে। আবার বলা হয় পশুটি তিনবার বের হবে। একবার কোন এক মরু এলাকায় বের হয়ে আবার লুকিয়ে যাবে। অতঃপর কোন এক জনবসতিতে বের হবে। সর্বশেষ মসজিদে হারামে বের হবে। এ ছাড়াও আরো উক্তি রয়েছে, তবে অধিকাংশ উক্তিগুলোই প্রমাণ করে তা মক্কা মুকাররামা থেকে বের হবে। (আত তাযকিরাহ পৃ: ৬৯৭-৬৯৮, ইশাআহ পৃ: ১৭৬-১৭৭) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. কিয়ামতের পূর্বে একটি বিশেষ জন্তু মানুষের সাথে কথা বলবে। ২. কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে।

আল-আনকাবুত 29:45

৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: (اُتْلُ مَآ أُوْحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتٰبِ) আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তাঁর ওপর অবতীর্ণ কিতাব কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করার নির্দেশ দিচ্ছেন। তেলাওয়াতের অর্থ হলন পাঠ করা, অর্থ অনুধাবন করা, যে সকল বিষয়ে সংবাদ দেয়া হয়েছে তা বিশ্বাস করা, কুরআনের হিদায়াত গ্রহণ করা, যা আদেশ করা হয়েছে তা পালন করা এবং যা থেকে নিষেধ করা হয়েছে তা থেকে বিরত থাকা। (তাফসীর সা‘দী) এ সম্পর্কে সূরা কাহফের ২৭ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে। (وَالْمُنْكَرِ...... وَأَقِمِ الصَّلٰوةَ) আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে সকলকে সালাত আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেছেন। অতঃপর সালাত আদায় করার ফযীলত বর্ণনা করে বলেন: সালাত ব্যক্তিকে অশ্লীল ও মন্দ কার্য হতে রক্ষা করে। الْفَحْشَا۬ءِ হলন এমন অশ্লীল গুনাহের কাজ যা মানুষের কুপ্রবৃত্তি কামনা করে। وَالْمُنْكَرِ হল- ঐসকল গুনাহ যা ধর্মীয় ও স্বাভাবিক জ্ঞান অপছন্দ করে। সালাত এ উভয়টি হতে বাধা দেয়ার কারণ হলন যে ব্যক্তি সালাতের রুকন, শর্তসমূহ যথাযথভাবে ঠিক রেখে আদায় করে তখন সালাত তার অন্তরকে আলোকিত ও পবিত্র করে। ফলে সে ব্যক্তির ঈমান ও তাক্বওয়া এবং ভাল কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। অপর দিকে খারাপ কাজের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয়। সুতরাং সালাত আদায় করার জন্য জরুরী হচ্ছে রুকন-আরকানসহ শর্তাবলী সর্বদা সংরক্ষন করা। (وَلَذِكْرُ اللّٰهِ أَكْبَرُ) ‘আল্লাহ তা‘আলার স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ’ আব্দুল্লাহ বিন রবী‘আহ বলেন: ইবনু আব্বাস আমাকে বললেন: তুমি কি জান আল্লাহর (وَلَذِكْرُ اللّٰهِ أَكْبَرُ) এ কথার অর্থ কী? আমি বললাম হ্যাঁ, তিনি বললেনন তা কী? আমি বললাম: সালাতে তাসবীহ, তাকবীর, প্রশংসা করা ও কুরআন তেলাওয়াত করা। তিনি বললেন: তুমি একটি আশ্চর্যজনক কথা বলেছো। বিষয়টি এরূপ নয়, বরং আল্লাহ বলেছেন: প্রত্যেক আদেশ পালন ও নিষেধ থেকে বিরত থাকার সময় আল্লাহকে স্মরণ করা। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. কুরআন তেলাওয়াত করার অর্থ হল তা পাঠ করা, অর্থ বুঝা ও আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। ২. সালাত কায়েম প্রত্যেকের ওপর আবশ্যক, কেননা সালাত ব্যক্তিকে অশ্লীল ও মন্দ কার্য থেকে বিরত রাখে। ৩. আল্লাহ তা‘আলাকে স্মরণ করলে আল্লাহ তা‘আলাও তার বান্দাকে স্মরণ করেন।

আল-আনকাবুত 29:46

৪৬ নং আয়াতের তাফসীর: আলোচ্য আয়াতে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেয়ার একটি মূলনীতি বর্ণনা করা হয়েছে। বিশেষ করে যদি তারা আহলে কিতাব হয় তাহলে এ নীতির দিকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে। কারণ তারা আসমানী কিতাব প্রাপ্ত, তাদের কাছে জ্ঞান রয়েছে। সূরা নাহলে মুশরিকদের সাথেও অনুরূপ নীতি অবলম্বন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যখন মানুষকে দীনের পথে আহ্বান করবে তখন নম্র-ভদ্রভাবে সুন্দর কথাবার্তার দ্বারা তাদেরকে ডাকবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (فَقُوْلَا لَه۫ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّه۫ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشٰي) ‘তোমরা তার সাথে নম্র কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সূরা ত্বা-হা- ২০:৪৪) তবে যদি সীমালঙ্ঘন করে অর্থাৎ আহলে কিতাবরা দাওয়াত কবূল না করে, উল্টো খারাপ আচরণ করে তাহলে তাদেরকে বলবে: ‘আমাদের প্রতি ও তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে আমরা ঈমান এনেছি এবং আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহ তো একই এবং আমরা তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণকারী।’ এসম্পর্কে সূরা নাহলের ১২৫ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে। (مُسْلِمُوْنَ ..... وَقُوْلُوْآ اٰمَنَّا بِالَّذِيْ) অর্থাৎ হে আহলে কিতাবরা! তোমরা জান তোমাদের ও আমাদের মা‘বূদ একজন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। আমরা তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। সুতরাং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা উচিত। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (قُلْ يٰٓأَهْلَ الْكِتٰبِ تَعَالَوْا إِلٰي كَلِمَةٍ سَوَا۬ءٍۭ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللّٰهَ وَلَا نُشْرِكَ بِه۪ شَيْئًا وَّلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ ط فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُوْلُوا اشْهَدُوْا بِأَنَّا مُسْلِمُوْنَ)‏ “বলুন, হে আহলে কিতাবরা! তোমরা আস এমন একটি কালেমার দিকে যা তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে সমান, তা হল, আমরা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কারো ইবাদত করব না এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করব না এবং আমাদের কেউ অপর কাউকে রব হিসেবে গ্রহণ করবে না। এরপরও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমরা মুসলিম।” (সূরা আলি ইমরান ৩:৬৪) হাদীসে এসেছে: আবূ হুরাইরাহ (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আহলে কিতাবগণ ইবরানী ভাষায় তাওরাত পাঠ করত আর মুসলিমদের জন্য তার তাফসীর করত আরবি ভাষায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা আহলে কিতাবদেরকে সত্যও মনে কর না, মিথ্যাও মনে কর না। বরং তোমরা বল, আমরা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি, আমাদের নিকট যা অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতি এবং আহলে কিতাবের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতি ঈমান এনেছি। আর আমাদের প্রভু ও তোমাদের প্রভু একই প্রভু, এবং আমরা তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণকারী। (সহীহ বুখারী হা: ৪৪৮৫, ৭৩৬২, ৭৫৪২) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. ইসলামে কোন বাড়াবাড়ি নেই, কাউকে বাধ্য করে ইসলামে প্রবেশ করানোর নির্দেশ নেই। ২. ইসলামের সত্যতা তুলে ধরার পরেও কেউ দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলে তার দায়িত্ব আল্লাহ তা‘আলার। ৩. আহলে কিতাবদের কোন বাণী শুনলে তা সত্য বা মিথ্যা কোনটাই মনে করা যাবে না। ৪. সকলের সত্যিকার উপাস্য একজনই তিনি হলেন আল্লাহ তা‘আলা।

আর-রূম 30:54

৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা‘আলা সামগ্রীক মানব জীবনের তিনটি অবস্থা তুলে ধরছেন। প্রথমত মানুষকে সৃষ্টি করেছেন দুর্বল বস্তু তথা বীর্য থেকে। দ্বিতীয়ত এ দুর্বল বীর্য থেকে সৃষ্টি করার পর শিশুত্বের দুর্বলতা থেকে উত্তরণ করে সুঠাম দেহ ও গঠন দ্বারা যৌবন বয়সে শক্তিশালী করেছেন। তৃতীয়ত আবার বৃদ্ধ বয়সে দুর্বল অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন। যে মানুষকে এত দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে তার অঙ্ককার দেখানোর কোন সুযোগ নেই। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. মানুষকে দুর্বল জিনিস থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে যার ফলে অবশেষে সে দুর্বলই হয়ে পড়ে।

লুকমান 31:12

১২ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে লুকমান (عليه السلام) সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা তাকে হিকমাত বা প্রজ্ঞা দান করেছিলেন। বিশিষ্ট তাবেয়ী কাতাদাহ (رحمه الله) বলেন: লুকমান (عليه السلام)-কে প্রদত্ত হিকমত ছিল দীনের সঠিক বুঝ। তিনি নাবী ছিলেন না এবং তাঁর কাছে ওয়াহী করা হয়নি। ইবনু কাসীর (رحمه الله) বলেন: তাঁর হিকমতটা ছিল জ্ঞান, সঠিক বুঝ ও স্বপ্নের তাবীর। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর) একদা তাকে কেউ জিজ্ঞেস করল, আপনি এ জ্ঞান-বুদ্ধি কিভাবে অর্জন করলেন? তিনি উত্তরে বলেলেন: সদ্ব্যবহার করে, আমানত রক্ষা করে, বাজে কথা থেকে দূরে থেকে এবং নীরবতা অবলম্বন করে। তাঁর প্রজ্ঞা ও হিকমতপূর্ণ একটি ঘটনা সম্পর্কে এরকমও প্রসিদ্ধ আছে যে, তিনি একজন দাস ছিলেন। একদা তাঁকে তাঁর মালিক বললেন: ছাগল জবেহ করে তার মধ্য হতে সর্বোৎকৃষ্ট দুই টুকরো গোশ্ত কেটে নিয়ে এস। সুতরাং তিনি জিভ ও হৃৎপিন্ড নিয়ে আসলেন। অন্য একদিন তাঁর মালিক তাঁকে ছাগল জবেহ করে তার মধ্য হতে সবচেয়ে নিকৃষ্ট দু টুকরো গোশ্ত নিয়ে আসার আদেশ করলে তিনি পুনরায় জিভ ও হৃদপিন্ড নিয়ে আসলেন। এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বললেন: জিভ ও হৃদপিন্ড যদি ঠিক থাকে তাহলে তা সর্বোৎকৃষ্ট জীব। আর যদি তা নষ্ট হয়ে যায় তাহলে তার চেয়ে নিকৃষ্ট জীব আর কিছু হতে পারে না। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর) আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে যেহেতু হিকমত দান করেছেন সেজন্য তিনি আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করেন। কেননা যারা শুকরিয়া আদায় করে তারা মূলত তা নিজেদের কল্যাণের জন্যই করে। আর যদি কেউ অকৃতজ্ঞ হয় তাহলে অকৃতজ্ঞতার পরিণাম নিজের ওপরেই বর্তাবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (مَنْ كَفَرَ فَعَلَيْهِ كُفْرُه۫ ج وَمَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِأَنْفُسِهِمْ يَمْهَدُوْنَ) “যে ব্যক্তি কুফরী করে, তারই ওপর পড়বে তার কুফরীর ফল। আর যে ব্যক্তি নেক কাজ করে, তারা নিজেদেরই জন্য সুখের ঠিকানা করে নিচ্ছে।” (সূরা রূম ৩০:৪৪) সুতরাং মানুষ যে কাজই করুক না কেন তার ভাল মন্দ ফলাফল নিজের ওপরই বর্তাবে। এতে আল্লাহ তা‘আলার কোন লাভ বা ক্ষতি হবে না। কেননা আল্লাহ মানুষের মুখাপেক্ষী নন। আর এটাও বুঝা যাচ্ছে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে যে নেয়ামত দান করেছেন তার জন্য শুকরিয়া আদায় করা উচিত। লুকমান (عليه السلام) সম্পর্কে সালাফগণ দুটি মত প্রকাশ করেছেন, কেউ বলেছেন তিনি নাবী ছিলেন, আবার কেউ বলেছেন; তিনি শুধুমাত্র সৎ ব্যক্তি ছিলেন। অধিকাংশরাই দ্বিতীয় মত পোষণ করেছেন। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. লুকমান হাকীম ছিলেন একজন সৎ ব্যক্তি, তিনি নাবী ছিলেন না। ২. মানুষের কৃতকর্মের ফল তার নিজের ওপরই বর্তাবে। কেউ ভাল কাজ করলে তা তার আবার কেউ খারাপ কাজ করলে তাও তারই। ৩. আল্লাহ তা‘আলা বান্দার সকল জিনিস থেকে অমুখাপেক্ষী। ৪. যারা আল্লাহ তা‘আলার কৃতজ্ঞ হয়, আল্লাহ তা‘আলা তাদের মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি করে দেন।

লুকমান 31:33

৩৩ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদেরকে তাঁর নির্দেশ পালন ও নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত বিষয় থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে তাক্বওয়াবান হওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করছেন এবং কিয়ামতের কঠিন মুহূর্তের ভয় প্রদর্শন করে বলছেন: সেদিন একমাত্র তাক্বওয়া ও সৎ আমল ব্যতীত সন্তান পিতার কোন উপকারে আসবে না এবং পিতাও সন্তানের কোনই উপকারে আসবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (یَوْمَ یَفِرُّ الْمَرْئُ مِنْ اَخِیْھِﭱﺫ وَاُمِّھ۪ وَاَبِیْھِﭲﺫ وَصَاحِبَتِھ۪ وَبَنِیْھِﭳﺚ لِکُلِّ امْرِیٍٔ مِّنْھُمْ یَوْمَئِذٍ شَاْنٌ یُّغْنِیْھِﭴ) “সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তাঁর নিজের ভাই হতে, এবং তার মাতা, তার পিতা, তার স্ত্রী ও তার সন্তান হতে, তাদের প্রত্যেকের সেদিন এমন গুরুতর অবস্থা হবে যা তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে।” (সূরা আবাসা ৮০:৩৪-৩৭) এখানে ঐ শ্রেণির পিতা-পুত্রকে বুঝানো হয়েছে যাদের মধ্যে একজন মু’মিন, অপরজন কাফির। কেননা মু’মিন পিতা কিংবা পুত্র স্বীয় কাফির পুত্রের কিংবা পিতার শাস্তি বিন্দুমাত্রও হ্রাস করতে পারবে না। তবে যদি উভয়ে মু’মিন হয় তাহলে পিতা-মাতা সন্তানের জন্য এবং সন্তান পিতা-মাতার জন্য সুপারিশ করতে পারবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيْمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَآ أَلَتْنٰهُمْ مِّنْ عَمَلِهِمْ مِّنْ شَيْءٍ ط كُلُّ امْرِئٍۭ بِمَا كَسَبَ رَهِيْنٌ) “এবং যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তান-সন্ততিও ঈমানে তাদের অনুসারী হয়, তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং আমি তাদের কর্মফলের ঘাটতি করব না, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।” (সূরা তুর ৫২:২১) তারপর আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে নসীহত করেছেন যে, দুনিয়ার চাকচিক্যময় জীবন যেন তোমাদেরকে ধোঁকায় না ফেলে। তোমরা দুনিয়ার চাক্যচিক্যে পড়ে আখিরাতকে ভুলে যেও না। তোমরা শয়তানের প্রতারণায় পড়ো না। শয়তান শুধু ধোঁকা দিতেই জানে, সে কখনো কারো উপকার করবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (يَعِدُهُمْ وَيُمَنِّيْهِمْ ط وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطٰنُ إِلَّا غُرُوْرًا‏)‏ “(শয়তান) সে তাদেরকে প্রতিশ্র“তি দেয় এবং তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করে; আর শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্র“তি দেয় তা ছলনামাত্র।” (সূরা নিসা ৪:১২০) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করতে হবে। ২. পার্থিব মোহে পড়ে পরকালকে ভোলা যাবে না। ৩. কিয়ামতের দিন কেউ কারো কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারবে না।

লুকমান 31:34

৩৪ নং আয়াতের তাফসীর: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা এমন পাঁচটি জিনিসের বর্ণনা দিচ্ছেন যেগুলো সম্পর্কে একমাত্র তিনি ব্যতীত আর কেউ জানে না। আর এগুলোই হল সেই গায়েবের চাবিকাঠি যেগুলো সম্পর্কে সূরা আন‘আমের ৫৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে। এ পাঁচটি বিষয় একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই জ্ঞানায়ত্ব। হাদীসে এসেছে: ইবনু উমার (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: “অদৃশ্যের চাবিকাঠি পাঁচটি। যেগুলো আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত আর কেউ জানে না। ১. কিয়ামতের জ্ঞান ২. বৃষ্টি বর্ষণ করা, তথা কখন কোথায় বৃষ্টি বর্ষণ হবে তা তিনিই জানেন। ৩. মাতৃগর্ভে যা আছে ৪. আগামীকাল মানুষ কী উপার্জন করবে। ৫. এবং কার কোথায় মৃত্যু হবে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬২৭, ৪৭৭৮, ৭৩৭৯) ইমাম বুখারী (رحمه الله) এ আয়াতের তাফসীরে উল্লে¬খ করেছেন যে, আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জনগণের মাজলিসে বসেছিলেন, এমন সময় তাঁর নিকট জনৈক লোক এসে তাঁকে ঈমান, ইসলাম ও ইহসান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পর বলল: কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে? তিনি উত্তর দিলেন, এটা প্রশ্নকারীর চেয়ে উত্তরদাতা বেশি জানে না। তবে আমি তোমাকে এর কতগুলো নিদর্শনের কথা বলছি। যখন দাসী তার মনিবকে জন্ম দেবে এবং যখন উলঙ্গ পা ও উলঙ্গ দেহবিশিষ্ট লোক যারা ছাগল চরাতো তারা বড় বড় অট্টালিকা তৈরী করে প্রতিযোগিতা করবে। এগুলো হল কিয়ামতের নিদর্শন। পাঁচটি বিষয় যা আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত আর কেউ জানেন না। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৭৭, সহীহ মুসলিম হা: ১০০৯) এ সম্পর্কে আরো তাফসীর সূরা আন‘আমের ৫৯ নং আয়াতে করা হয়েছে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. অদৃশ্যের চাবিকাঠি পাঁচটি। ২. অদৃশ্যের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা রাখেন, অন্য কেউ নয়।

আল-আহযাব 33:6

৬ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা দিচ্ছেন যে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মু’মিনদের নিজেদের অপেক্ষা তাদের নিকট অধিক ঘনিষ্ঠতর। তাদের নিজেদের চেয়ে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের জন্য অধিক কল্যাণকামী, এবং তাদের প্রতি স্নেহপরায়ণ। মানুষ নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, আর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আমার ও আমার উম্মাতের দৃষ্টান্ত হল ঐ ব্যক্তির ন্যায়-যে আগুন প্রজ্জ্বলিত করল, ফলে কীট-পতঙ্গ তাতে এসে পড়তে লাগল, তোমরাও আগুনে পড়তেছিলে, আর আমি তোমাদেরকে বাধা দিচ্ছিলাম। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪২৭, সহীহ মুসলিম হা: ২২৮৪) সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কোন বিষয়ে তাদেরকে যে সিদ্ধান্ত দেবেন তাই তাদেরকে মনে নিতে হবে। কোন প্রকার দ্বিমত পোষণ করা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُوْنَ حَتّٰي يُحَكِّمُوْكَ فِيْمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوْا فِيْٓ أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوْا تَسْلِيْمًا)‏ “কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মু’মিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের মধ্যে বিবদমান বিষয়ের বিচারভার তোমার ওপর অর্পণ না করে; অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা থাকে এবং সম্পূর্ণরূপে তা মেনে না নেয়।” (সূরা নিসা ৪:৬৫) হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ঐ সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মু’মিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার নিকট তার নিজের থেকে, তার সম্পদ থেকে, তার সন্তান-সন্ততি থেকে এবং সমস্ত জিনিস থেকে অধিক প্রিয় না হই। (সহীহ বুখারী হা: ১৫) উমার (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: হে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আল্লাহ তা‘আলার শপথ আপনি আমার নিকট সকল জিনিস থেকে বেশি প্রিয়। কিন্তু নিজের জীবনের চেয়ে বেশি নন। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: হে উমার! তোমরা জীবন থেকেও আমাকে বেশি না ভালবাসা পর্যন্ত তুমি মু’মিন হতে পারবে ন। তখন উমার (রাঃ) বললেন: হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আপনি আমার নিকট সকল জিনিস থেকে প্রিয় এমনকি নিজের জীবন থেকেও। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: এখন তুমি মু’মিন হয়েছো। (সহীহ বুখারী হা: ৬৬৩২) ইমাম বুখারী (رحمه الله) এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করেন: আবূ হুরাইরাহ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: দুনিয়া ও পরকালে সমস্ত মানুষের চেয়ে মু’মিনের জন্য আমিই ঘনিষ্ঠতম। তোমরা ইচ্ছা করলে: (اَلنَّبِيُّ أَوْلٰي بِالْمُؤْمِنِيْنَ) এ আয়াতটি পড়তে পার। সুতরাং কোন মু’মিন ব্যক্তি যদি সম্পদ রেখে মৃত্যু বরণ করে তাহলে তার হকদার হবে তার উত্তরাধিকারীরা। আর যদি কোন মু’মিন ব্যক্তি ঋণ অথবা অসহায় সন্তানাদি রেখে মারা যায় তাহলে সে যেন আমার কাছেই আসে, আমি তার অভিভাবক। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৮১, সহীহ মুসলিম হা: ১৬১৯) এরপর আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীদের বিধান দিয়ে বলেন, নাবীপত্মীগণ মু’মিনদের মাতৃতুল্য। আর এ মাতৃতুল্য হল হুরমাত ও সম্মানের ক্ষেত্রে; জন্মদাতা মাতা হিসেবে নয়, তাদেরকে বিবাহ করা হারাম এবং তাদের সাথে পর্দা করা ওয়াজিব যেমন অত্র সূরার ৫৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মু’মিনদের পিতৃতুল্য। যেমন হাদীসে এসেছে: আবূ হুরাইরাহ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আমি তোমাদের জন্য তোমাদের পিতাদের স্থলাভিষিক্ত আমি তোমাদেরকে শিক্ষা দিচ্ছি যে, তোমাদের কেউ পায়খানায় গেলে কিবলার দিকে যেন মুখ এবং পিঠ না করে বসে। ডান হাতে যেন ঢিলা ব্যবহার না করে এবং ডান হাতে যেন ইসতিনজাও না করে। (আবূ দাঊদ হা: ৮, নাসায়ী হা: ৪০, ইবনু মাযাহ হা: ৩১৩, সহীহ) তবে এ পিতা ধর্মীয় দিক দিয়ে পিতা, জন্মদাতা হিসেবে নয়। কেননা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কোন পুরুষের পিতা নন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ وَلٰكِنْ رَّسُوْلَ اللّٰهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّيْنَ ط وَكَانَ اللّٰهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيْمًا) “মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদের মধ্যকার কোন পুরুষের পিতা নয়, বরং তিনি আল্লহর রাসূল এবং সর্বশেষ নাবী। আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (সূরা আহযাব ৩৩:৪০) সুতরাং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ধর্মীয় দিক দিয়ে মু’মিনদের পিতা এবং তাঁর স্ত্রীগণ হলেন মাতা। তারা প্রকৃত জন্মদাতা পিতা-মাতা নন। তাই তাদের কন্যাদেরকে বিবাহ করা বৈধ। (وَأُولُوا الْأَرْحَامِ) এখানে মূলত ইসলামের প্রথম যুগে যে বিধান কার্যকর ছিল সেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, মুহাজিরগণ কোন প্রকার বংশীয় সম্পর্ক ব্যতিরেকেই আনসারদের মৃত্যুর পর তাদের সম্পত্তির ওয়ারিশ হত। আর এদিক দিয়ে তারা ছিল একে অপরের খুবই নিকটাত্মীয়। কিন্তু পরবর্তীতে মিরাসের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর এ বিধান বাতিল হয়ে যায়। তবে একটি পথ খোলা থাকে, তা হল কেউ যদি কাউকে সাহায্য, অনুগ্রহ বা সহযোগিতা, সদাচরণবশত কিছু দিতে চায় তাহলে অসিয়তের মাধ্যমে দিতে পারবে। এ সম্পর্কে সূরা আনফালের শেষ আয়াতেও আলোচনা করা হয়েছে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সকল জিনিস থেকে এমনকি নিজের জীবন থেকেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বেশি ভালবাসতে হবে। অন্যথায় মু’মিন হওয়া যাবে না। আর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হলো তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ করা। ২. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীদেরকে মায়ের মত সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। ৪. কেউ যদি কাউকে সাহায্য করণার্থে তার সম্পত্তি থেকে কিছু দিতে চায় তাহলে সেক্ষেত্রে ওয়ারিশ ব্যতীত অন্যদের ক্ষেত্রে অসিয়ত করতে পারবে। কিন্তু ওয়ারীশদের ক্ষেত্রে অসিয়ত গ্রহণ যোগ্য হবে না। ৫. একজন মু’মিন ব্যক্তি অন্য মু’মিনকে নিজের নিকটাত্মীয়দের মত এমনকি নিজের ভাইয়ের মত মনে করতে হবে।

আল-আহযাব 33:35

৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: শানে নযূল: উম্মে আম্মারাহ আল আনসারী (رضي الله عنها) হতে বর্ণিত, তিনি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আসলেন এবং বললেন: (কুরআনে) যা কিছু বলা হয় শুধুমাত্র পুরুষদের সম্পর্কেই বলা হয় মহিলাদের উদ্দেশ্যে কিছুই বলা হয় না বা আলোচনা করা হয় না। তখন এ আয়াতটি নাযিল হয়। (তিরমিযী হা: ৩২১১, সহীহ) উম্মুল মু’মিনীন উম্মে সালামাহ (رضي الله عنها) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলেন। কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা পুরুষদের কথা উলে¬খ করেছেন, আর আমাদের কথা আলোচনা করা হয়নি কেন? উম্মে সালামাহ (رضي الله عنها) বলেন: একদিন আমি আমার ঘরে বসে থাকা অবস্থায় মিম্বর হতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শব্দ শুনতে পেলাম। ঐ সময় তিনি মিম্বরে এ আয়াতটি পাঠ করলেন অর্থাৎ এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (নাসায়ী হা: ১১৪০৫) এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের ১১টি গুণাবলী উল্লেখ করেছেন। যারা এসব গুণে গুণান্বিত হবে তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা ও মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন। ইসলাম নারীদের সৎ আমল ও পুরুষের সৎ আমলের প্রতিদানের মাঝে কোন পার্থক্য করেনি। বরং উভয়ের প্রতিদান সমান করে দিয়েছেন। الْقَانِتِيْنَ শব্দের অর্থ হল শান্তভাবে আনুগত্য করা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (أَمَّنْ هُوَ قَانِتٌ اٰنَا۬ءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَّقَآئِمًا يَّحْذَرُ الْاٰخِرَةَ وَيَرْجُوْا رَحْمَةَ رَبِّه۪ ط قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِيْنَ يَعْلَمُوْنَ وَالَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ ط إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُوا الْأَلْبَابِ)‏ “তারা কি ঐ ব্যক্তির সমান, যে ব্যক্তি রাতে সিজদারত অবস্থায় অথবা দাঁড়িয়ে ‘ইবাদত করে’ আখিরাতকে ভয় করে এবং তার প্রতিপালকের রহমত প্রত্যাশা করে? তুমি বল! যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? জ্ঞানবান লোকেরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে।” (সূরা যুমার ৩৯:৯) “صادقين” অর্থাৎ কথা বলার সময় সত্য কথা বলা। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমরা অবশ্যই সত্য কথা বলবে: কেননা সত্য কল্যাণের দিকে পথ প্রদর্শন করে। আর কল্যাণ জান্নাতের দিকে পথ প্রদর্শন করে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৬০৭) (وَالذّٰكِرِيْنَ اللّٰهَ كَثِيْرًا) অধিক পরিমাণে আল্লাহ তা‘আলার যিকির করার নির্দেশ এবং তার যৌক্তিকতা ও তাৎপর্য: কুরআনুল কারীমের একাধিক স্থানে আল্লাহ তা‘আলার যিকিরের কথা বলা হয়েছে। কখনো যিকিরের নির্দেশ, কখনো উৎসাহ, কখনো যিকিরকারীদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ভালবাসেন, কখনো আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে স্মরণ করেন বিভিন্নভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তাই সর্বদা আল্লাহ তা‘আলাকে স্মরণ করা আল্লাহ তা‘আলা ভালবাসেন। সে জন্য রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন; সর্বোত্তম সম্পদ হলন কৃতজ্ঞ আত্মা, আল্লাহ তা‘আলার যিকির করে এমন জিহ্বা এবং এমন মু’মিন স্ত্রী যে ঈমানে সহযোগিতা করে। (মুসনাদ আহমাদ হা: ২২৩৯২) তাছাড়া যাবতীয় ইবাদতের মধ্যে যিকির অধিকতর সহজ। এটা আদায় করতে অন্যান্য ইবাদতের মত শরীয়ত তেমন কোন শর্তারোপ করেনি। অযুসহ বা বিনা অযুতে উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে সব সময় আল্লাহ তা‘আলার যিকির করতে পারা যায়। তবে কিভাবে করতে হবে তা সূরা সামনে বর্ণনা করা হবে ইনশাআল্লাহ। সুতরাং প্রত্যেক মু’মিনের এসব গুণে গুণান্বিত হওয়া উচিত। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. ইবাদতের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সকলেই সমান, কারো মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

আল-আহযাব 33:36

৩৬ নং আয়াতের তাফসীর: শানে নুযূল: ইবনে জারীর আত-তাবারী সহীহ সনদে কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেন যে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যয়নব বিনতে জাহশ -কে যায়েদ বিন হারেসা (রাঃ)-এর জন্য বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন: আমি মনে করলাম যে, তিনি তাকে তাঁর নিজের বিবাহের জন্য প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু যয়নব যখন জানতে পারলেন যে, যায়েদের জন্য এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তখন যয়নব (রাঃ) এ প্রস্তাব অস্বীকার করলেন। তখন এ আয়াতটি নাযিল হয়। (কুরতুবী, লুবানুন নুকুল ফী আসবাবে নুযুল:পৃঃ ২২২) এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন পুরুষ ও নারীদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বলছেন, তারা কখনো আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূলের ফয়সালার অবাধ্য হয় না এবং এটা তাদের উচিতও না। আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিধান পাওয়া মাত্রই সাথে সাথে তা আমলে পরিণত করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُوْنَ حَتّٰي يُحَكِّمُوْكَ فِيْمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوْا فِيْٓ أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوْا تَسْلِيْمًا) “কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মু’মিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবদমান বিষয়াদির বিচারভার তোমার ওপর অর্পণ না করে; অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা থাকে এবং সম্পূর্ণরূপে তা মেনে না নেয়।” (সূরা নিসা ৪:৬৫) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: (فَلْيَحْذَرِ الَّذِيْنَ يُخَالِفُوْنَ عَنْ أَمْرِه۪ٓ أَنْ تُصِيْبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيْبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ) “সুতরাং যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদের ওপর পতিত হবে অথবা পতিত হবে তাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি‎।” (সূরা নূর ২৪:৬৩) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ঐ সত্ত্বার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি যা নিয়ে এসেছি তার প্রবৃত্তি সে অনুগামী হয়।” (সরহুস সুন্নাহ, মিশকাত হা: ১৬৭) সুতরাং দল, তরীকা ও মাযহাবের দোহাই দিয়ে কোন অবস্থাতেই আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের ফয়সালার অবাধ্য হওয়া যাবে না। বরং প্রত্যেক মু’মিন আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের ফয়সালা মাথা পেতে মেনে নিবে এবং সাথে সাথে তা পালন করবে। কারণ যারা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ অমান্য করবে তারা প্রকাশ্য পথভ্রষ্ট। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূলের বিধান ও ফয়সালা মোতাবেক জীবন পরিচালনা করতে হবে। ২. আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্তের ওপর কোন কথা বলা যাবে না। ৩. আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশের অবাধ্য হওয়া সুস্পষ্ট কুফরী।

আল-আহযাব 33:37

৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: শানে নুযূল: আনাস বিন মালিক (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত (وَتُخْفِيْ فِيْ نَفْسِكَ مَا اللّٰهُ مُبْدِيْهِ) -এ আয়াতটি যয়নব বিনতে জাহাশ ও যায়েদ বিন হারেসার ব্যাপারে নাযিল হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৮৭, সহীহ মুসলিম হা: ৮৬, ১৪২৮) উক্ত আয়াতে “যার প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এবং তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)ও অনুগ্রহ করেছেন” বলে উল্লেখ করা হয়েছে সে ব্যক্তিটি হল রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পালক পুত্র যায়েদ বিন হারেসা। সেই অনুগ্রহ ছিল এই যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে দীন ইসলাম গ্রহণ করার সুযোগ দিয়েছেন এবং তাকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছেন। তার প্রতি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুগ্রহ ছিল এই যে, তিনি তাকে দীনি তরবিয়ত দান করেন ও তাকে স্বাধীন করে পুত্র বানিয়ে নেন এবং আপন ফুফু উমাইয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিবের মেয়ের সাথে বিবাহ দেন। “مبديه” যে বিষয়টি প্রকাশ করে দিয়েছিলেন সেটি হল, আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে যয়নবকে পুনরায় বিবাহ দেবেন। (فَلَمَّا قَضٰي زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا....) যখন যয়নবের ইদ্দত পূর্ণ হয়ে গেল তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করিয়ে দিলেন। হাদীসে এসেছে, আনাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: যখন যয়নব তার ইদ্দত পূর্ণ করল তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যায়েদ বিন হারেসাকে বললেন: তুমি যাও এবং তাকে আমার ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দাও অর্থাৎ আমার বিবাহের প্রস্তাব পৌঁছে দাও যায়েদ তার নিকট গেল, যখন তিনি আটা খামীর করছিলেন। যায়েদ বলেন: যখন আমি তাকে দেখলাম তখন তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আমার ওপর এমনভাবে প্রাধান্য পেয়ে গেল যে, আমি তার দিকে তাকিয়ে কথা বলব, এমন সামর্থ্য ছিল না। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছেন। বরং আমি মুখ ফিরিয়ে বসলাম এবং তাকে বললাম, তুমি সুসংবাদ গ্রহণ কর আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাকে প্রস্তাব দিয়েছেন। যয়নব বলল: আমি আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ ছাড়া কিছুই করব না। তখন তিনি সালাতে দাঁড়ালেন, এদিকে কুরআন নাযিল হয়ে গেল এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার গৃহে তার অনুমতি ছাড়াই প্রবেশ করলেন। (মুসনাদ আহমাদ হা: ১৯৫-১৯৬, নাসায়ী হা: ১১৪১০, সহীহ) অন্য এক হাদীসে রয়েছে যে, আনাস হতে বর্ণিত, যয়নব (رضي الله عنها) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অন্যান্য স্ত্রীদের কাছে গর্ব করে বলতেন, তোমাদের বিবাহ দিয়েছেন তোমাদের পরিবার। আর আমার বিবাহ দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা সপ্তম আকাশের ওপর থেকে। (সহীহ বুখারী হা: ৭৪২০) এ বিবাহ দেয়ার সবচেয়ে বড় একটি কারণ আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন যে, যাতে করে মানুষেরা এটা মনে করা থেকে বিরত থাকে যে, পোষ্য-পুত্রদের স্ত্রীদেরকে বিবাহ করা বৈধ নয়। যেমনটি জাহেলী যুগে চালু ছিল। এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিলেন যে, পোষ্য-পুত্রদের স্ত্রীদেরকে বিবাহ করা বৈধ, এরা আপন ছেলেদের মত নয়। আল্লাহ তা‘আলা: (وَحَلَآئِلُ أَبْنَآئِكُمُ الَّذِيْنَ مِنْ أَصْلَابِكُمْ لا وَأَنْ تَجْمَعُوْا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ط إِنَّ اللّٰهَ كَانَ غَفُوْرًا رَّحِيْمًا)‏ “তোমাদের ঔরসজাত পুত্রবধুকে এবং দুই বোনকে একসাথে বিয়ে করাও হারাম করা হয়েছে। তবে আগে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।” (সূরা নিসা ৪:২৩) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. মানুষের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করতে হবে, কঠোর হওয়া যাবে না। তবে কারণবশত সেটি ভিন্ন কথা। ২. সদা-সর্বদা আল্লাহ তা‘আলাকেই ভয় করা উচিত। আর আল্লাহ তা‘আলাই এ ব্যাপারে অধিক হকদার। ৩. ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পূর্বে কোন তালাক প্রাপ্তা মহিলাকে বিবাহ করা যাবে না। ৪. পোষ্যপুত্রদের স্ত্রীদের বিবাহ করা বৈধ, তাই তাদের সাথে পর্দা করে চলা ওয়াজিব।

আল-আহযাব 33:38

৩৮ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে মূলত মুনাফিকদের কথার উত্তর দেয়া হয়েছে যে, তারা বলত: মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পোষ্যপুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ করেছেন। তাদের এ কথার প্রতিবাদ স্বরূপ আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, এতে কোনই দোষ নেই বরং এটি আল্লাহ তা‘আলার একটি বিধান। এ বিধান পূর্বের নাবীদের ওপরও ছিল।

আল-আহযাব 33:49

৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বে যায়েদ কর্তৃক যায়নাবকে তালাক দেয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। যায়েদ ও যায়নাবের দৈহিক মিলন হয়েছিল। যায়নাবের ইদ্দত শেষ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এ আয়াতে বিবাহোত্তর দৈহিক মিলনের পূর্বে তালাক দিলে স্ত্রীর বিধান কী হবে সে কথাই আলোচনা করা হয়েছে। বিবাহোত্তর দৈহিক মিলনের পূর্বে স্ত্রীকে তালাক দিলে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর ইদ্দত পালন করতে হবে না। সূরা বাকারার ২২৮ নং আয়াতে যে শ্রেণির তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর ইদ্দত পালনের কথা বলা হয়েছে তা থেকে এ শ্রেণির নারী ভিন্ন। যা এ আয়াত থেকে স্পষ্টই বুঝা যায়। এমতাবস্থায় সে চাইলে কোন প্রকার ইদ্দত ছাড়াই অন্য স্বামীর নিকট বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। তবে যদি বিবাহের পর দৈহিক মিলনের পূর্বে স্বামী মারা যায় তাহলে ঐ স্ত্রীকে চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করতেই হবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (وَالَّذِيْنَ يُتَوَفَّوْنَ مِنْكُمْ وَيَذَرُوْنَ أَزْوَاجًا يَّتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَّعَشْرًا) “আর তোমাদের মধ্যে স্ত্রী রেখে যারা মারা যায় তাদের স্ত্রীরা চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করবে।” (সূরা বাকরাহ ২:২৩৪) এক্ষেত্রে আরো একটি বিধান হল যে, বিবাহের পর স্ত্রীকে যদি দৈহিক মিলনের পূর্বে তালাক দেয় তাহলে স্ত্রী তার নির্ধারিত মাহরের অর্ধেক পাবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (وَإِنْ طَلَّقْتُمُوْهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوْهُنَّ وَقَدْ فَرَضْتُمْ لَهُنَّ فَرِيْضَةً فَنِصْفُ مَا فَرَضْتُمْ إِلَّآ أَنْ يَّعْفُوْنَ أَوْ يَعْفُوَ الَّذِيْ بِيَدِه۪ عُقْدَةُ النِّكَاحِ) “আর যদি তোমরা তাদের মাহর ধার্য করার পর তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিয়ে দাও তবে যা নির্ধারণ করেছ তার অর্ধেক (স্ত্রী) পাবে। তবে যদি তারা ক্ষমা করে অথবা যার হাতে বিয়ের বন্ধন সে ক্ষমা করে।” (সূরা বাকরাহ ২:২৩৭) আর যদি মাহর নির্ধারণ না থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে সাধ্যানুসারে তাদেরকে কিছু অর্থ সামগ্রী দিয়ে দিবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (لَا جُنَاحَ عَلَیْکُمْ اِنْ طَلَّقْتُمُ النِّسَا۬ئَ مَا لَمْ تَمَسُّوْھُنَّ اَوْ تَفْرِضُوْا لَھُنَّ فَرِیْضَةًﺊ وَّمَتِّعُوْھُنَّﺆ عَلَی الْمُوْسِعِ قَدَرُھ۫ وَعَلَی الْمُقْتِرِ قَدَرُھ۫ﺆ مَتَاعًۭا بِالْمَعْرُوْفِﺆ حَقًّا عَلَی الْمُحْسِنِیْنَﰻ) “তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের স্পর্শ করার আগে এবং তাদের জন্য মাহর ধার্য করার আেেগ যদি তালাক দিয়ে দাও, তবে তাতে তোমাদের কোন গুনাহ নেই। তোমরা তাদের কিছু খরচ দেবে, ধনীরা তাদের সাধ্যমত দেবে এবং গরীবরাও তাদের সাধ্য অনুযায়ী দেবে। ন্যায়সঙ্গতভাবে খরচ প্রদান করা সৎ কর্মশীলদের ওপর দায়িত্ব।” (সূরা বাকারাহ ২:২৩৬) হাদীসে এসেছে, সাহল বিন সা‘দ ও আবী উসাইদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাইমুনাহ বিনতে শারাহীল -কে বিবাহ করলেন। অতঃপর সে যখন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আসল তখন তিনি তার দিকে হাত বাড়ালেন। কিন্তু সে যেন এটা অপছন্দ করল। তখন তিনি আবূ উসাইদ (রাঃ)-কে হুকুম করলেন যে, তার বিদায়ের সামান তৈরী করে দেয়া হোক এবং মূল্যবান দু‘খানা কাপড় তাকে পরিয়ে দেয়া হোক। (সহীহ বুখারী হা: ৫২৫৬-৭) কোন প্রকার কষ্ট না দিয়ে, ইজ্জত ও সম্মানের সাথে কিছু দিয়ে বিদায় করে দেয়াটাই হচ্ছে সৌজন্যর সাথে বিদায় করে দেয়া। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. দৈহিক মিলনের পূর্বে স্ত্রীকে তালাক দিলে স্ত্রীকে কোন ইদ্দত পালন করতে হবে না, তবে যদি স্বামী মারা যায় তাহলে চার মাস দশদিন তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে। ২. দৈহিক মিলনের পূর্বে তালাক দিলে স্ত্রী নির্ধারিত মাহরের অর্ধেক পাবে। আর যদি মাহর নির্ধারিত না হয় তাহলে সাধ্যানুসারে যতটুকু সম্ভব ততটুকু দিয়ে দেবে।

আল-আহযাব 33:52

৫২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা‘আলা পূর্ববর্তী আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীদের মাঝে পালা ভাগ না করার এখতিয়ার দেয়ার পর যখন তাঁর স্ত্রীরা দুনিয়াবী সকল প্রকার আরাম-আয়েশের পরিবর্তে সন্তুষ্ট চিত্তে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে বসবাস করাকে পছন্দ করেছিলেন তখন তাদের এ কর্মের বদৌলতে তাদের মর্যাদা এভাবে দিলেন যে, অত্র আয়াত নাযিল করে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বিদ্যমান স্ত্রীগণ ছাড়া অন্য কোন মহিলাকে বিবাহ করা বা তাদের কাউকে তালাক দিয়ে তাঁর পরিবর্তে অন্য কাউকে বিবাহ করতে নিষেধ করে দিলেন। অবশ্য পরে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ ব্যাপারে এখতিয়ার দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি আর কোন বিবাহ করেননি (ইবনে কাসীর)। তবে দাসীদের ব্যাপারে এ বিধান প্রযোজ্য নয়। তিনি চাইলে আরো দাসী গ্রহণ করতে পারেন। এ ব্যাপারে তাঁকে নিষেধ করা হয়নি। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর সন্তুষ্ট হলে উত্তম বিনিময় পাওয়া যায়।

আল-আহযাব 33:55

৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্বে পর্দার বিধান আলোচনা করার পর এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ঐ সকল লোকদের বর্ণনা দিচ্ছেন যাদের সাথে দেখা করা শরীয়তসম্মত। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর মু’মিন নারীদেরকে বল:‎ তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নিম্নগামী (সংযত) করে ও তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে; তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তাদের ঘাড় ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে, তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনা মুক্ত নিষ্কাম পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারও নিকট তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদ না ফেলে। হে মু’মিগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সূরা নূর ২৪:৩১) যখন পর্দার আয়াত নাযিল হয় তখন বাবা, সন্তান ও নিকটাত্মীয়গণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলেন আমাদেরও কি পর্দার আড়াল থেকে কথা বলতে হবে? তখন এ আয়াত নাযিল হয়। (কুরতুবী) আয়াতে যে সকল পুরুষদের সাথে দেখা করা বৈধ তাদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে, কিন্তু তাতে চাচা ও খালুর কথা উল্লেখ করা হয়নি। উত্তর হল চাচা ও খালুর বিধান পিতার মতই, তাই উল্লেখ করা হয়নি। এ সম্পর্কে সূরা নূরের ৩১ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।

আল-আহযাব 33:56

৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ঐ সম্মান ও মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হয়েছে যা আসমানে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ফেরেশতাদের নিকট বিদ্যমান। তা এই যে, আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদের নিকট নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সম্মান ও প্রশংসা করেন এবং তাঁর ওপর রহমত বর্ষণ করেন। আর ফেরেশতাগণও নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মর্যাদার জন্য দু‘আ করেন। তার সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা বিশ্ববাসীকে আদেশ করছেন তারাও যেন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করে। যাতে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রশংসায় ঊর্ধ্ব ও নিম্ন উভয় জগৎ একত্রিত হয়ে যায়। আবুল আলিয়া  বলেন: (নাবীর প্রতি) আল্লাহ তা‘আলার সালাত হলো: ফেরেশতাদের কাছে তাঁর প্রশংসা করা। আর ফেরেশতাদের সালাত হলো: নাবীর জন্য দু’আ করা। (সহীহ বূখারী, অত্র আয়াতের তাফসীর) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পড়ার জন্য উম্মাতের প্রতি তাঁর নির্দেশ ও পদ্ধতি: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর উম্মাতকে দরূদ পড়ার ব্যাপারে অনেক জায়গায় নির্দেশ প্রদান করেছেন। এ ব্যাপারে মুতাওতির হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো কা‘ব বিন উজরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: বলা হলো হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল! আপনাকে কিভাবে সালাম দেব তা জানতে পারলাম। কিন্তু সালাত কিভাবে পড়ব? তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দরূদে ইবরাহীমের কথা বললেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৯৭) এছাড়াও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাতে শব্দের একটু ভিন্নতা পাওয়া যায়। তবে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করার উত্তম শব্দ ও দরূদ হলো দরূদে ইবরাহীম। তবে আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু কিছু দরূদ পাওয়া যায় যেমন ’’يا نبي سلام عليك يا حبيب سلام عليك‘‘ এগুলোর কোন নির্ভরযোগ্য বর্ণনা নেই। এগুলো একশ্রেণির নামধারী তথাকথিত আলেম নামক ধর্মব্যবসায়ীদের তৈরি করা কথা। তাই চার রাকাতবিশিষ্ট সালাতের উভয় বৈঠকে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব। আবার কেউ সুন্নাত বলেছেন। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর) তাছাড়া আযান শেষে, মসজিদে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার পূর্বে, জানাযার সালাতে, ঈদের সালাতে, আল্লাহ তা‘আলার কাছে কিছু চেয়ে দু‘আ করার শেষে ও কবর যিয়ারতের সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা মুস্তাহাব। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করার পদ্ধতি: পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা যায় এবং সে দরূদ আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদের মাধ্যমে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে পৌঁছে দেন। যেমন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন ; তোমরা আমার কবরকে অনুষ্ঠানের জায়গা বানিয়ে নিও না এবং তোমাদের বাড়ি ঘরকে কবর বানিয়ে নিও না, আর তোমরা আমার প্রতি দরূদ প্রেরণ কর। তোমরা যেখান থেকেই আমার প্রতি দরূদ পাঠ কর তা আমার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। (আবূ দাঊদ হা: ২০৪২, সনদ সহীহ) অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: জমিনে আল্লাহ তা‘আলার কতগুলো ভ্রাম্যমান ফেরেশতা রয়েছে, তারা আমার উম্মাতের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেয়। (আহমাদ ১/৪৪১, নাসায়ী হা: ১২৮১, সনদ সহীহ) অতএব নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সালাম ও তাঁর প্রতি দরূদ প্রেরণের জন্য পাখি হয়ে মদীনাতে যেতে হবে না এবং কোন হাজী সাহেবকেও বলে দিতে হবে না যে, আমার সালাম নাবীর রওজায় পৌঁছে দেবেন। বরং পৃথিবীর যেখান থেকেই দরূদ পাঠ করা হোক না কেন তা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে পৌঁছে যাবে। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করার ফযীলত ও না পাঠ করলে অপরাধ: নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন। (সহীহ মুসলিম ১/৩০৬, আবূ দাঊদ হা: ১৫৩০) তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেন: ঐ ব্যক্তির নাক ধূলোয় ধূসরিত হোক, যে ব্যক্তির নিকট আমার নাম উচ্চারণ করা হলো কিন্তু আমার প্রতি দরূদ পাঠ করল না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: الْبَخِيلُ مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ، ثُمَّ لَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ সে ব্যক্তি কৃপণ যার কাছে আমার নাম উচ্চারণ করা হলে দরূদ পাঠ করে না। (মুসনাদ আহমাদ হা: ১৭৩৬, সহীহ) সুতরাং যে কোন আমল সুন্নাতী তরীকায় আদায় করলে তার নেকীর আশা করা যায়, অন্যথায় তার কোন নেকী পাওয়ার আশা করা যায় না বরং পাপের ভাগী হতে হবে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর দরূদ পাঠ করার ফযীলত সম্পর্কে জানা গেল। ২. স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা এবং ফেরেশতারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর দরূদ পাঠ করেন। ৩. যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর দরূদ পাঠ করে না সে হল বড় কৃপণ। ৪. সুন্নাতী দরূদ পাঠ করতে হবে, কোন প্রকার বিদ‘আতী দরূপ পাঠ করা যাবে না।

আল-আহযাব 33:69

৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: কাফির-মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও মু’মিনদেরকে যেভাবে কষ্ট দিত আল্লাহ তা‘আলা মুু‘মিনদেরকে নিষেধ করছেন তারাও যেন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে কষ্ট না দেয়। তারা মূসা (عليه السلام)-কে কষ্ট দিয়েছিল, তোমরাও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে কষ্ট দিওনা। মূসা (عليه السلام)-এর উম্মাতেরা যেভাবে তাকে কষ্ট দিয়েছিল তার বর্ণনা হাদীসে এসেছে, আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: মূসা (عليه السلام) ছিলেন একজন লজ্জাশীল লোক। তাঁর লজ্জার কারণে তাঁর শরীরের কোন অংশ কারো সামনে খুলতেন না। ফলে বানী ইসরাঈলের লোকেরা তাকে কষ্ট দিতে লাগল। তারা বলল: সম্ভবত তাঁর শরীরে ধবল রোগ বা ঐ ধরনের কোন খুঁত আছে, তাঁর অন্ডকোষদ্বয় বড় ইত্যাদি। তখন আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলেন তাঁকে এ সকল দোষ থেকে মুক্ত করবেন যা তারা মূসার ব্যাপারে বলছিল। একদা মূসা (عليه السلام) নির্জনে কাপড় খুলে পাথরের ওপর রেখে একাকী গোসল করতে লাগলেন। গোসল শেষে মূসা কাপড় নেয়ার জন্য আসলেন, এদিকে পাথর তাঁর কাপড় নিয়ে পালাতে লাগল। তখন মূসা তাঁর লাঠি নিয়ে পাথরের পিছন পিছন ছুটলেন এবং তিনি কাপড় কাপড় বলে পাথরকে ডাকতে লাগলেন। অবশেষে পাথর বানী ইসরাঈলের এক জনসভায় এসে থামল। তারা মূসা (عليه السلام)-কে উলঙ্গ অবস্থায় দেখল এবং তারা যে সন্দেহ করেছিল তা হতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে মুক্ত করে দিলেন। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪০৪, সহীহ মুসলিম হা: ১৫৬)

সাবা 34:46

৪৬ নং আয়াতের তাফসীর: নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে এটা হল মক্কার কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রমাণ ও দাওয়াত যে, আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ের উপদেশ দিচ্ছি, তোমরা একনিষ্ঠতার সাথে সত্যানুসন্ধানের জন্য উঠে পড়, তা সমষ্টিগত হোক আর একাকী হোক, তারপর চিন্তা করে দেখ তোমাদের সাথী মুহাম্মাদ কি পাগল? তাঁর মাঝে কি পাগলের কোন গুণাগুণ আছে? তাঁর চলা-ফেরায়, কথা বার্তায়, লেবাস-পোষাকে? না কি তিনি একজন নাবী, যিনি তোমাদের সম্মুখে আগত কঠিন শাস্তি থেকে ভীতি প্রদর্শন করছেন? তোমরা যদি এসব চিন্তা করে দেখ তাহলে অবশ্যই জানতে পারবে যে, তিনি কোন পাগল নন, তিনি একজন রাসূল যিনি আগত কঠিন শাস্তি সম্পর্কে ভয় দেখাচ্ছেন। তাছাড়া তোমরা কিভাবে পাগল বল? তিনি তোমাদের সাথে বড় হয়েছেন, তোমাদের এলাকার সন্তান, বহিরাগত কোন এলাকা থেকে আসেননি? সুতরাং তাঁকে পাগল বলা তোমাদের সমীচীন নয়। হাদীসে বলা হয়েছে। ইবনু ‘আব্বাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: একদা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাফা পাহাড়ের ওপর আরোহণ করে বললেন: “ইয়া স্ববা-হা-হু” (আরবরা যখন দুঃখজনক কোন বিষয়ে ঘোষণা দিতেন তখন এ শব্দটি বা এ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করতেন) তখন কুরাইশরা তাঁর নিকট একত্রিত হলো। অতঃপর তারা বলল: তোমার কী হয়েছে? তখন তিনি বললেন: যদি আমি বলি যে, শত্র“ সৈন্য তোমাদের ওপর হামলা করতে আসছে এবং এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা সকালে বা সন্ধ্যায় তোমাদেরকে আক্রমণ করে বসবে, তাহলে কি তোমরা আমার কথাকে সত্য বলে মেনে নিবে? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন: আমি তোমাদেরকে ঐ শাস্তি থেকে ভয় দেখাচ্ছি যা তোমাদের সামনে রয়েছে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৮০১) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মূলত একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা। তিনি কোন পাগল নন।

ফাতির 35:1

নামকরণ: “فاطر” ফাত্বির শব্দের অর্থ সৃষ্টিকর্তা, তৈরিকারী ইত্যাদি। আল্লাহ তা‘আলার অন্যতম একটি নাম হল ফাত্বির। অর্থাৎ তিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, সব কিছু করেছেন। অত্র সূরার প্রথম আয়াতে উল্লেখিত فاطر (ফাত্বির) শব্দ থেকেই এ নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। অত্র সূরায় কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা স্থান পেয়েছে: (১) ফেরেশতারা আল্লাহ তা‘আলার সংবাদ বাহক, (২) আল্লাহ তা‘আলা কিছু দিতে চাইলে বা বারণ করতে চাইলে তার প্রতিরোধক কেউ নেই, (৩) আল্লাহ তা‘আলার প্রতিশ্র“তি সত্য, শয়তানের প্রতিশ্র“তি মিথ্যা এবং সে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করে, (৪) মানব সৃষ্টির উপাদান ও ধারাক্রম, (৫) আল্লাহ তা‘আলা অমুখাপেক্ষী এবং সব সৃষ্টি তাঁর মুখাপেক্ষী, (৬) আখিরাতে কেউ কারো পাপের বোঝা বহন করবে না, (৭) কেবল আলেম সমাজ আল্লাহ তা‘আলাকে বেশি ভয় করেন, (৮) মানুষ তার কর্মের জন্য দায়ী, সুতরাং যারা আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ ভঙ্গ করতঃ তাঁর সাথে শিরক করবে, অন্যায় কাজে লিপ্ত হবে এবং রাসূলের অবাধ্য হবে তাদের কর্মের পরিণাম তাদেরকেই ভোগ করতে হবে ইত্যাদি। ১ নং আয়াতের তাফসীর: সূরার শুরুতেই আল্লাহ তা‘আলা নিজের প্রশংসা করে বলেছেন, তিনি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা এবং ফেরেশতাদেরকে কয়েক ডানাবিশিষ্ট করে তৈরি করেছেন। ফেরেশ্তাদের কারো দু’টি পাখা, কারো তিনটি পাখা আবার কারো চারটি পাখা রয়েছে। আবার কারো এরচেয়েও বেশি রয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে, “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মি‘রাজের রাত্রিতে জিব্রীল (عليه السلام)-কে দেখলেন। তার ছিল ছয়শত ডানা। প্রত্যেক দু’ ডানার মাঝে ব্যবধান ছিল পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তের ব্যবধানের সমপরিমাণ।” (সহীহ বুখারী হা: ৩২৩২, সহীহ মুসলিম হা: ১৭৪) আর এ জন্যই আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যা ইচ্ছা বৃদ্ধি করেন। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা অন্য কেউ নয়। ২. ফেরেশ্তাদের পাখা বা ডানা আছে এ কথা জানতে পারলাম।

ফাতির 35:2

২ নং আয়াতের তাফসীর: সকল রহমতের উৎস একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, তিনি যদি কাউকে কোন কিছু দান করতে চান বা কারো প্রতি কোন অনুগ্রহ করতে চান তাহলে তা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তিনি ব্যতীত আর কারো নেই। আর যদি কারো থেকে কোন কিছু ছিনিয়ে নিতে চান তাহলে তা ফিরিয়ে দেবার ক্ষমতা তিনি ব্যতীত আর কারো নেই। যেমন হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফরয সালাতের সালাম ফিরানোর পর এ দু‘আ পাঠ করতেনন ্র لٰا إِلٰهَ إِلاَّ اللّٰهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَي كُلِّ شَيْئٍ قَدِيرٌ اللّٰهُمَّ لاَ مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلاَ مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ وَلاَ يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ গ্ধ আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কোন সঠিক মা‘বূদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন অংশীদার নেই, রাজ্য-রাজত্ব ও প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি প্রত্যেক বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান। হে আল্লাহ তা‘আলা! তুমি যা দান করো তা কেউ রোধ করতে পারে না এবং যা বন্ধ করে দাও তা কেউ দিতে পারে না এবং কোন প্রভাবশালীর প্রভাব কোনই উপকারে আসবে না তোমার ক্ষমতার সামনে। (সহীহ মুসলিম হা: ১৩৬৬) আল্লাহ তা‘আলা অন্য এক আয়াতে বলেন: (وَإِنْ يَّمْسَسْكَ اللّٰهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَه۫ٓ إِلَّا هُوَ ج وَإِنْ يُّرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَآدَّ لِفَضْلِه۪ ط يُصِيْبُ بِه۪ مَنْ يَّشَا۬ءُ مِنْ عِبَادِه۪ ط وَهُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ)‏ ‘‘যদি আল্লাহ তোমাকে কষ্ট দিতে চান তাহলে তিনি ব্যতীত তা মোচনকারী আর কেউ নেই এবং আল্লাহ যদি তোমার মঙ্গল চান তবে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি মঙ্গল দান করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’’ (সূরা ইউনুস ১০:১০৭) সুতরাং যিনি সকল রহমতের উৎস তাঁর কাছেই চাওয়া উচিত। তিনি দান করলে কেউ পতিরোধ করতে পারবে না, আর না দিলে তা কেউ এনেও দিতে পারবে না। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়: ১. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কোন কিছু দান করার ক্ষমতা কারো নেই, আবার আল্লাহ তা‘আলা দান করলে বাধা দেয়ারও কেউ নেই। অতএব আমাদের একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার কাছেই চাওয়া উচিত।

ফাতির 35:3

৩ নং আয়াতের তাফসীর: অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর সকল মানুষকে তাঁর প্রদত্ত নিয়ামতের কথা স্মরণ করার নির্দেশ প্রদান করছেন। তারপর প্রশ্নাকারে বলছেন: আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কোন সৃষ্টিকর্তা আছে কি, যিনি আকাশ-জমিন থেকে রিযিক দেন? না, তিনি ছাড়া কেউ নেই, তিনিই সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা এবং তিনিই একমাত্র মা‘বূদ। আল্লাহ তা‘আলার বাণী, (أَمَّنْ هٰذَا الَّذِيْ يَرْزُقُكُمْ إِنْ أَمْسَكَ رِزْقَه۫ ج بَلْ لَّجُّوْا فِيْ عُتُوٍّ وَّنُفُوْرٍ) “এমন কে আছে যে, তোমাদেরকে রিযিক দান করবে, তিনি যদি রিযিক বন্ধ করে দেন? বরং তারা অবাধ্যতা ও সত্য বিমুখতায় অবিচল রয়েছে।” (সূরা মুলক ৬৭:২১) সুতরাং রিযকদাতা যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা। তাই ইবাদত পাবার যোগ্যও তিনিই। তিনি ব্যতীত আর কারো ইবাদত করা যাবে না। যারা তাকে ব্যতীত অন্যের ইবাদত করে তারা হলো বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট।

আয-যুমার 39:9

৯ নম্বর আয়াতের তাফসীর : আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াতে ঈমানদার আর কাফিরের মধ্যে পার্থক্যের উপমা দিচ্ছেন। আল্লাহ বলেন : যারা দৈনন্দিন ইবাদতের পাশাপাশি রাত্রিকালে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতে মশগুল থাকে, সে কখনো সিজদাবনত হয়ে তাঁর ইবাদত করে আবার কখনো দাঁড়িয়ে। কখনো এ ব্যক্তির সমান মর্যাদা লাভ করতে পারে না ঐ ব্যক্তি, যে আল্লাহ তা‘আলার সাথে শরীক করে ও তাঁর দেয়া বিধানকে অস্বীকার করে। যেমন অন্যত্র আল্লাহ এ সম্পর্কে বলেন, (لَيْسُوْا سَوَا۬ءً ط مِنْ أَهْلِ الْكِتٰبِ أُمَّةٌ قَآئِمَةٌ يَّتْلُوْنَ اٰيٰتِ اللّٰهِ اٰنَا۬ءَ الَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُوْنَ)‏ “তারা সবাই সমান নয়; আহলে কিতাবদের মধ্যে একটি দল রয়েছে দীনের ওপর অটল, তারা রাতের বেলা আল্লাহর আয়াত তেলাওয়াত করে এবং সিজদা করে।” (সূরা আলি ‘ইমরান ৩ : ১১৩) তাঁর মর্যাদা অবশ্যই কাফির ব্যক্তির থেকে বেশি হবে। কেননা এ সকল আমলের দ্বারা তার মন আখিরাতের ভয়ে ভীত এবং প্রভুর রহমতের আশাধারী হয়। অর্থাৎ ভয় ও আশা উভয় অবস্থা-ই তার মধ্যে পাওয়া যায়, যা প্রকৃত ঈমানের পরিচয়। এরা দুজন কখনো সমান হতে পারে না। ভয় ও আশা সম্পর্কে সহীহ হাদীস রয়েছে। ‘আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, একটি লোকের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার নিকট গমন করেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করেন : নিজেকে তুমি কী অবস্থায় পাচ্ছ? উত্তরে লোকটি বলল : নিজেকে আমি এমন অবস্থায় পাচ্ছি যে, আমি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করছি এবং তাঁর রহমতের আশা করছি। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : এরূপ সময়ে যার অন্তরে এ দুটো জিনিস একত্রিত হয় তার আশা আল্লাহ তা‘আলা পূরণ করে থাকেন এবং যা হতে সে ভয় পায় তা হতে তাকে মুক্তি দান করেন। (নাসায়ী হা. ১০৬২, ইবনু মাজাহ হা. ৪২৬১) এরপর আল্লাহ মূর্খের ওপর জ্ঞানী ব্যক্তির মর্যাদার কথা বর্ণনা করে বলেন যে, জ্ঞানী ব্যক্তি ও মূর্খ ব্যক্তি কখনো সমান হতে পারে না। জ্ঞানী ব্যক্তির মর্যাদা মূর্খ ব্যক্তির চেয়ে বেশি। জ্ঞানীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন : (يَرْفَعِ اللّٰهُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مِنْكُمْ لا وَالَّذِيْنَ أُوْتُوا الْعِلْمَ دَرَجٰتٍ ط وَاللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِيْرٌ)‏ “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা আরো উন্নত করে দেবেন। তোমরা যা কিছু কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।” (সূরা মুজাদালাহ ৫৮ : ১১) অন্ধ এবং চক্ষুষ্মান ব্যক্তি যেমন সমান হতে পারে না তেমনি জ্ঞানী ও মূর্খ কখনো সমান হতে পারে না। তবে এখানে জ্ঞানী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যারা কুরআন ও সহীহ হাদীসের জ্ঞানে জ্ঞানী, যারা তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে জ্ঞান রাখে, যারা শরীয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখে এবং সে অনুপাতে আমল করে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. তাহাজ্জুদের সলাত অনেক মর্যাদাপূর্ণ, তাই যথাসম্ভব কম হলেও নিয়মিত আদায় করা উচিত। ২. কুফরীর ওপর ঈমানের মর্যাদা সম্পর্কে জানা গেল। ৩. মূর্খ ব্যক্তিদের ওপর জ্ঞানীদের মর্যাদা অনেক বেশি।

আয-যুমার 39:23

২৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর : (أَحْسَنَ الْحَدِيْثِ) ‘অতি উত্তম বাণী’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল কুরআনুল কারীম। (مُّتَشَابِهًا) এর অর্থ কুরআনের শ্র“তিমধুর ও সুখপাঠ্য বাণী, তার সাহিত্যশৈলী, শব্দালঙ্কার, অর্থের সত্যতা ইত্যাদি গুণাবলীতে পারস্পরিক সাদৃশ্যপূর্ণতা। অথবা কুরআন পূর্ব আসমানী গ্রন্থসমূহের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। অর্থাৎ কুরআন অন্য সকল আসমানী কিতাবের অনুরূপ ও সত্যায়নকারী সর্বোত্তম কিতাব। مَّثَانِيَ ‘বার বার তেলাওয়াত করা হয়’ অর্থাৎ এ কুরআনে কাহিনী, আদেশ-উপদেশ ও বিধি-বিধানগুলোকে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন : যারা আল্লাকে ভয় করে তারাই ঐ সকল আযাব ও শাস্তির ধমক ও সর্তকবাণী বুঝতে পারে। যার ফলে আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে তাদের দেহ শিউরে ওঠে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন : তাদের দেহ-মন অর্থাৎ মু’মিন বান্দাদের মন আল্লাহ তা‘আলার স্মরণে নরম হয়ে যায়। এর কারণ হল, যখন তাদের মনে আল্লাহ তা‘আলার করুণা, ক্ষমা ও অনুগ্রহ লাভের আশা জাগে তখন তাদের অন্তর নরম হয়ে যায় এবং তখন তারা আল্লাহ তা‘আলার স্মরণে মগ্ন হয়ে পড়ে। কাতাদাহ (রহঃ) বলেন, এতে আল্লাহ তা‘আলার আওলীয়াগণের গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে তাঁদের অন্তর কম্পিত হয়, তাঁদের চোখ অশ্র“সিক্ত হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা‘আলার যিকির দ্বারা তাঁরা মনে শান্তি পান। যিকির করতে গিয়ে তাঁরা নেশাগ্রস্ত মাতালদের মত সংজ্ঞাহীন হয়ে যান না। কারণ দলবদ্ধভাবে মাতালের মত উঁচু আওয়াজ করে যিকির করা শরীয়ত পরিপন্থী। এ সম্পর্কে যত বর্ণনা রয়েছে সব মানুষের তৈরি করা কথা, একটাও আল্লাহ তা‘আলার রাসূলের হাদীস নয়। আসমা বিনতে আবূ বকর (রাঃ) বলেন : সাহাবায়ে কেরামের সাধারণ অবস্থা ছিল তা-ই। তাদের সামনে কুরআন তেলাওয়াত করা হলে তাদের চক্ষু অশ্র“সিক্ত হয়ে যেত এবং দেহ শিউরে উঠত। (কুরতুবী) ইমাম ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন, এ বিষয়ে মু’মিনগণ কাফিরদের থেকে কয়েক দিক দিয়ে স্বতন্ত্র। প্রথমত : মু’মিনদের শ্রাব্যবস্তু হল কুরআনুল কারীম, আর কাফিরদের হল নির্লজ্জ গায়িকাদের গান-বাজনা। দ্বিতীয়ত : মু’মিনরা কুরআন শোনে ভয়, আশা, অনুধাবন, উপলব্ধির সাথে। আর তারা আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমার আশায় কান্না করেন এবং সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। পক্ষান্তরে কাফিররা হৈ-হুল্লা করে এবং খেলাধূলায় ব্যস্ত থাকে। মু’মিনগণ কুরআন শুনে আদব ও বিনয় প্রকাশ করে যার ফলে শাস্তির কথায় তাদের দেহ শিউরে ওঠে এবং তাদের অন্তর আল্লাহ তা‘আলার প্রতি আসক্ত হয়ে যায়। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. মু’মিনদের বৈশিষ্ট্যাবলী সম্পর্কে জানলাম। ২. কাউকে হিদায়াত দান আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত আর কারো ক্ষমতা নেই। ৩. প্রতিটি আমল ছোট হোক আর বড় হোক তা শরীয়তসম্মত পন্থায় হতে হবে, অন্যথায় আল্লাহ তা‘আলার কাছে কবূল হবে না।

আয-যুমার 39:67

৬৭ নম্বর আয়াতের তাফসীর : কাফির-মুশরিকরা আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখে না তাই তারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে শরীক করে থাকে। মূলত আল্লাহ তা‘আলার চেয়ে বড় মর্যাদাবান, রাজত্বের অধিকারী এবং ক্ষমতাবান আর কেউ নেই। তাঁর ক্ষমতা এমন যে, কিয়ামতের মাঠে তিনি সমস্ত পৃথিবীকে তাঁর হাতের মুষ্টিতে নিয়ে নেবেন এবং আকাশসমূহকে ভাঁজ করে ডান হাতে নিয়ে নেবেন। যেমন হাদীসে বলা হয়েছে ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ইয়াহূদী পণ্ডিত নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বলল : হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমরা (কিতাবে) পাই যে, আল্লাহ তা‘আলা আকাশসমূহকে এক আঙ্গুলে, জমিনসমূহকে এক আঙ্গুলে, গাছ-পালাকে এক আঙ্গুলে, পানি ও স্থলকে এক আঙ্গুলে এবং অন্যান্য সমস্ত সৃষ্টিজীবকে এক আঙ্গুলে রাখবেন এবং বলবেন : আমিই বাদশা। তখন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার কথার সত্যতা প্রমাণে মুচকি হাসলেন এবং এ আয়াতটি পাঠ করলেন। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮১১, সহীহ মুসলিম হা. ২৭৮৬) অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন : আল্লাহ তা‘আলা জমিনকে কবজ করে নেবেন এবং আকাশসমূহকে ডান হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে বলবেন : আমিই বাদশা। জমিনের বাদশারা কোথায়। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮১২, সহীহ মুসলিম হা. ২৭৮৭) সুতরাং আল্লাহ তা‘আলাই সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাবান। কাফির-মুশরিকরা তাঁর মর্যাদার ব্যাপারে কোনই জ্ঞান রাখে না, তাই তারা তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করে। যদি তারা আল্লাহ তা‘আলার যথাযথ মর্যাদার কথা বুঝত তাহলে তারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করত না। বরং তাঁকে যথাযথ মূল্যায়ন করত। مَطْوِيّٰتٌ শব্দের অর্থ হলো পেঁচিয়ে, গুটিয়ে কোন জিনিসকে ভাঁজ করে নেয়া। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. আল্লাহ তা‘আলাকে যথার্থ মর্যাদা দেয়া আবশ্যক । ২. আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন আকাশ জমিনকে ভাঁজ করে হাতে নেবেন। ৩. আল্লাহ তা‘আলার হাত আছে এটা জানা গেল, কিন্তু কেমন তা জানা যায়না তবে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, তাঁর জন্য মানানসই হাত রয়েছে।

ফুসসিলাত 41:46

৪৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর : আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা ভাল কাজ করে তার প্রতিদান তারা পাবে আর যারা মন্দ আমল করে তার পরিণাম তাকেই ভোগ করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন : (إِنْ أَحْسَنْتُمْ أَحْسَنْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ قف وَإِنْ أَسَأْتُمْ فَلَهَا) তোমরা সৎকর্ম করলে সৎকর্ম নিজেদের (কল্যাণের) জন্য করবে এবং মন্দ কর্ম করলে তাও করবে নিজেদের (ক্ষতির) জন্য। (সূরা ইসরা ১৭ : ৭) আল্লাহ তা‘আলা কারো প্রতি বিন্দু পরিমাণ জুলুম করবেন না। এ সম্পর্কে সূরা জাসিয়াহ্র ১৫ নম্বর আয়াত, আলি ইমরানের ১৮২ ও ১৮৩ নম্বর আয়াত, সূরা হাজ্জের ১০ও ১১ নম্বর আয়াতসহ অনেক স্থানে আলোচনা করা হয়েছে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন : يَا عِبَادِي إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَي نَفْسِي، وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا، فَلَا تَظَالَمُوا হে আমার বান্দা! আমি নিজের প্রতি জুলুম করা হারাম করে নিয়েছি এবং তোমাদের মাঝেও হারাম করে দিয়েছি, সুতরাং তোমরা পরস্পর জুলুম করো না। (সহীহ মুসলিম হা. ২৫৭৭) কিয়ামতের মাঠে মানুষ ভাল-মন্দ যে ফলাফল পাবে তা তার কৃতকর্মের কারণে, আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর বিন্দু পরিমাণ জুলুম করবেন না। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. প্রত্যেককে তার নিজ নিজ কৃতকর্মের ফলাফল দেয়া হবে। ২. আল্লাহ তা‘আলা নিজের জন্য জুলুম করা হারাম করে নিয়েছেন এবং বান্দাদের মাঝেও তা হারাম করে দিয়েছেন।

আশ-শূরা 42:15

১৫ নম্বর আয়াতের তাফসীর : এটি এমন একটি মর্যাদাসম্পন্ন আয়াত, যেখানে আল্লাহ তা‘আলা পৃথক পৃথকভাবে দশটি হুকুম বা বিধান বর্ণনা করেছেন- আয়াতুল কুরসী ব্যতীত পবিত্র কুরআনে এরূপ আয়াত আর নেই। বিধানগুলো হলো। প্রথম বিধান : (فَلِذٰلِكَ فَادْعُ) অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিয়েছেন যে, হে নাবী! তোমার প্রতি যা ওয়াহী করা হয়েছে তারই দিকে সমস্ত মানব জাতিকে দা‘ওয়াত দাও। তারা যেন এরই ওপর আমল করে। অর্থাৎ মানব জাতির ওপর দায়িত্ব হলো অন্যকে সঠিক দীনের দা‘ওয়াত দেয়া; কোন দল, তরীকা বা মতাদর্শের দিকে নয়। দ্বিতীয় বিধান : (وَاسْتَقِمْ كَمَآ أُمِرْتَ) অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যে সঠিক দীনের কথা বলেছেন সে দীনের ওপর নিজেকে অটল-অবিচল রাখা, সে পথ থেকে বিচ্যুত না হওয়া। তৃতীয় বিধান : (وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَا۬ءَهُمْ) অর্থাৎ কাফির-মুশরিকরা যেভাবে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ‘ইবাদত করে সেগুলো থেকে নিজে বেঁচে থাকা এবং অন্যকেও বাঁচিয়ে রাখা। চতুর্থ বিধান : (اٰمَنْتُ بِمَآ أَنْزَلَ اللّٰهُ مِنْ كِتٰبٍ) অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যে কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছেন সেগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। এমনটি যেন না হয় যেমনটি ইয়াহূদীরা করত, তারা কিতাবের এক অংশের প্রতি ঈমান আনত আর অন্য অংশের প্রতি কুফরী করত। পঞ্চম বিধান : (وَأُمِرْتُ لِأَعْدِلَ بَيْنَكُمُ) অর্থাৎ “আমি তোমাদের মধ্যে ইনসাফ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি” মানুষের মধ্যে ন্যায় বিচার কায়েম করতে হবে। কোনভাবেই কোন প্রকার অন্যায় বিচার-ফায়সালা করা যাবে না। ষষ্ঠ বিধান : (اَللّٰهُ رَبُّنَا وَرَبُّكُمْ) অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিযিকদাতা একমাত্র আল্লাহ। তিনি সকলের রব- এ কথা স্বীকার করা। সপ্তম বিধান : (لَنَآ أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ) অর্থাৎ কাফির-মুশরিকদের সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক না রাখা, সর্বপ্রকার সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা। আর প্রত্যেকের কৃতকর্মের ফল তাকেই ভোগ করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন : (وَإِنْ كَذَّبُوْكَ فَقُلْ لِّيْ عَمَلِيْ وَلَكُمْ عَمَلُكُمْ ج أَنْتُمْ بَرِيْ۬ئُوْنَ مِمَّآ أَعْمَلُ وَأَنَا بَرِيْ۬ءٌ مِّمَّا تَعْمَلُوْنَ)‏ “এবং তারা যদি তোমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে তবে তুমি বল : ‎ ‘আমার কর্ম (কর্মফল) আমার এবং তোমাদের কর্ম (কর্মফল) তোমাদের জন্য। আমি যা করি সে বিষয়ে তোমরা দায়মুক্ত এবং তোমরা যা কর‎ সে বিষয়ে আমিও দায়মুক্ত।’’ (সূরা ইউনুস ১০ : ৪১) সুদ্দী (রহঃ) বলেন : এ বিধান মক্কায় ছিল, আর মদীনায় জিহাদের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে তা রহিত হয়ে যায়। কেননা জিহাদের সারমর্ম হল যারা উপদেশ ও অনুরোধে প্রভাবিত হবে না তাদেরকে যুদ্ধের মাধ্যমে পরাভূত করতে হবে। তাদেরকে তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। তবে সঠিক কথা হল, রহিত হয়নি বরং দলীলের মাধ্যমে সত্য প্রমাণিত হওয়ার পর সত্য বর্জন করলে তাদের সাথে কোন সম্পর্ক থাকবে না। অষ্টম বিধান : (لَا حُجَّةَ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ) অর্থাৎ কাফির-মুশরিকদেরকে এ কথা স্পষ্টভাবে বলে দেয়া যে, সত্য স্পষ্ট হয়ে যাবার পর আমাদের মধ্যে এবং তোমাদের মধ্যে কোন প্রকার ঝগড়া-বিবাদ, তর্ক-বিতর্কের প্রয়োজন নেই। ৯ম বিধান : (اَللّٰهُ يَجْمَعُ بَيْنَنَا) অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা সকলকে একত্রিত করবেন এ বিশ্বাস পোষণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন : (قُلْ يَجْمَعُ بَيْنَنَا رَبُّنَا ثُمَّ يَفْتَحُ بَيْنَنَا بِالْحَقِّ ط وَهُوَ الْفَتَّاحُ الْعَلِيْمُ) ‏ “বল, আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে একত্রিত করবেন, অতঃপর তিনি আমাদের মধ্যে বিচার করবেন সঠিকভাবে, আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী, সর্বজ্ঞ।” (সূরা সাবা ৩৪ : ২৬) ১০ম বিধান : (وَإِلَيْهِ الْمَصِيْرُ) অর্থাৎ সকলের মৃত্যুর পর প্রত্যাবর্তন তাঁরই নিকট- বিশ্বাস পোষণ করা। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. আল্লাহ তা‘আলার পথে অটল থাকতে হবে এবং মানুষকে তাঁর পথে ডাকতে হবে। ২. প্রবৃত্তির অনুসরণ করা যাবে না। ৩. ন্যায় বিচার করতে হবে, কোন প্রকার জুলুম করা যাবে না।

আল-ফাতহ 48:15

১৫ নম্বর আয়াতের তাফসীর : আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে খায়বার বিজয় ও সেখানে প্রভুত গনীমতের মাল লাভের ওয়াদা দিয়েছেন। খায়বার মদীনা পার্শ্ববর্তী একটি এলাকা যেখানে ইয়াহূদীরা বসবাস করত। যে-সকল বেদুঈনরা হুদায়বিয়ায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে অংশগ্রহণ করেনি তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন যে, তারা যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবীদেরকে খায়বার বিজয়ের পর গনীমতের মাল নেয়ার জন্য যেতে দেখে তখন বলে, আমাদেরকেও সাথে নাও। যাতে গনীমত নিতে পারি। কারণ তারা লক্ষণাদি দেখে জানতে পারে যে, খায়বার বিজয় হবে এবং অনেক গনীমত পাবে। অথচ তারা পূর্বে শত্র“দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে পিছপা ছিল। ‎আল্লাহ তা‘আলা‎ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিয়ে তাদেরকে গনীমতের ভাগ দিতে নিষেধ করেছেন। এটা তাদের অপরাধের শাস্তি। কেননা ‎আল্লাহ তা‘আলা‎ খায়বারের গনীমতের মাল তাদেরকে দেয়ার অঙ্গীকার দিয়েছেন যারা হুদায়বিয়াতে শরীক হয়েছিল। (يُرِيْدُوْنَ أَنْ يُبَدِّلُوْا كَلَامَ اللّٰهِ) ‘এরা আল্লাহর কথা বদলে দিতে চায়’ মুজাহিদ (রহঃ) বলেন : এটা ‎আল্লাহ তা‘আলা‎র সে প্রতিশ্রুতি যা হুদায়বিয়ায় যারা শরীক হয়েছে তাদেরকে দিয়েছেন। অর্থাৎ হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারীরাই খায়বারের গনীমত পাবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা হুদায়বিয়ায় অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের জন্য খায়বারের যুদ্ধে শরীক হওয়া ও গনীমতের মালে অংশীদার হওয়া বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। কিন্তু এসব পেছনে থাকা লোকেরাও শরীক হতে চায়। ইবনু জায়েদ বলেন : এটা হল ‎আল্লাহ তা‘আলা‎র কথা : “আল্লাহ যদি তোমাকে তাদের কোন দলের নিকট ফেরত আনেন এবং তারা অভিযানে বের হবার জন্য তোমার অনুমতি প্রার্থনা করে, তখন তুমি বলবে, ‘তোমরা আমার সাথে কখনও বের হবে না এবং আমার সঙ্গী হয়ে কখনও শত্র“র সাথে যুদ্ধ করবে না। তোমরা প্রথমবার বসে থাকাই পছন্দ করেছিলে; সুতরাং যারা পেছনে থাকে তাদের সাথে বসেই থাক।” (সূরা তাওবা ৯ : ৮৩) অতএব শুধু গনীমতের আশায় যুদ্ধ করা উচিত নয় বরং যুদ্ধ করতে হবে দীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য। যুদ্ধ করতে গিয়ে সম্পদও পাওয়া গেলে আলহামদুলিল্লাহ। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. আল্লাহ তা‘আলা হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারীদেরকে খায়বারের গনীমতের প্রতিশ্রতি প্রদান করেছেন। ২. মুনাফিকদের কার্যকলাপ সম্পর্কে জানতে পারলাম।

আল-ফাতহ 48:29

২৯ নম্বর আয়াতের তাফসীর : সমগ্র কুরআনের কোথাও আল্লাহ তা‘আলা নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নাম নিয়ে আহ্বান করেননি বরং তাঁর গুণাবলী ও পদবীর মাধ্যমে আহ্বান করেছেন, যেমন (يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ, يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ) ইত্যাদি। কিন্তু অন্যান্য নাবীদের ক্ষেত্রে তাদের নাম ধরে আহ্বান করেছেন যেমন (يَا إِبْرَاهِيمُ, يَا مُوسَي) ইত্যাদি। কুরআনের মাত্র চার জায়গায় নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নাম মুহম্মাদ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নামের পাশে তাঁর উপাধি ও পদবীও উল্লেখ করা হয়েছে যা তাঁর মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছে। এসব স্থানে তাঁর নাম উল্লেখ করার মধ্যে উপকারিতা হল হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রে আলী (রাঃ) যখন তাঁর নাম “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” লিপিবদ্ধ করেন তখন কাফিররা এটা মিটিয়ে “মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ” লিপিবদ্ধ করতে পীড়াপীড়ি করে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলার আদেশে তা মেনে নেন। পরিবর্তে আল্লাহ তা‘আলা এ স্থানে বিশেষভাবে তাঁর নামের সাথে “রাসূলুল্লাহ” শব্দ কুরআনে উল্লেখ করে একে চিরস্থায়ী করে দিলেন যা কিয়ামত পর্যন্ত লিখিত ও পঠিত হবে। এ সম্পর্কে সূরা হুজুরাতে আরও আলোচনা আসবে ইনশাআল্লাহ। (وَالَّذِيْنَ مَعَه) ‘যারা তাঁর সাথে আছে’ অর্থাৎ সাহাবীগণ। ‎আল্লাহ তা‘আলা‎ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রিসালাতের পর সাহাবীদের প্রশংসনীয় কয়েকটি গুণাবলীর কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ প্রতিকুল পরিবেশ ও শত নির্যাতনের পরেও ঈমান ও আমলের মাধ্যমে সাহাবীরা যে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন পৃথিবীর কোথাও এমন কোন ইতিহাস মেলে না। তাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উম্মাতের জন্য সাহাবীদেরকে নমুনা হিসেবে রেখে যান এবং তাদের অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। সে জন্য কুরআনেও তাদের গুণাবলী ও লক্ষণাদি বর্ণনা করে তাদের অনুসরণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এস্থলে তাদের প্রথম যে গুণ উল্লেখ করা হয়েছে তা হল : (أَشِدَّا۬ءُ عَلَي الْكُفَّارِ رُحَمَا۬ءُ بَيْنَهُمْ) ‘যারা তাঁর সাথে আছে তারা কাফিরদের ওপর কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে সহানুভূতিশীল, কোমল’ কাফিরদের মোকাবেলায় তাদের কঠোরতা সর্বক্ষেত্রেই প্রমাণিত হয়েছে। তারা ইসলামের জন্য বংশগত সম্পর্ক বিসর্জন দিয়েছেন, বদরের যুদ্ধে নিজের কাফির পিতাকে হত্যা করতে ইতস্ততবোধ করেননি। আর নিজেদের মাঝে সহানুভূতি ও আন্তরিকতার উপমা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। মুহাজিররা মদীনায় হিজরত করে আসলে আনসাররা নিজেদের সম্পদে ও জায়গায় ভাগ দিয়েছেন এমনকি নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে মুহাজির ভাইদের জন্য বৈধ করে দিতে কুন্ঠাবোধ করেননি। অন্যত্র ‎আল্লাহ তা‘আলা‎ বলেছেন : (یٰٓاَیُّھَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا مَنْ یَّرْتَدَّ مِنْکُمْ عَنْ دِیْنِھ۪ فَسَوْفَ یَاْتِی اللہُ بِقَوْمٍ یُّحِبُّھُمْ وَیُحِبُّوْنَھ۫ٓﺫ اَذِلَّةٍ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ اَعِزَّةٍ عَلَی الْکٰفِرِیْنَ) “হে মু’মিনগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ দীন হতে ফিরে গেলে শীঘ্রই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং যারা তাঁকে ভালবাসবে; তারা মু’মিনদের প্রতি কোমল ও কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে।” (সূরা মায়িদা ৫ : ৫৪) দ্বিতীয় গুণ : তারা রুকু-সিজদা তথা ইবাদতে পাবন্দি। (تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا) ‘তুমিতাদেরকে দেখবে রুকূ-সিজদারত অবস্থায় আল্লাহর মেহেরবানী ও সন্তুষ্টি তালাশে মগ্ন’ অর্থাৎ তারা বেশি বেশি সালাত আদায় করে যার অন্যতম রুকন হল রুকু ও সিজদা। তারা সালাতকে এত ভালবাসে যে, রাতে-দিনে সুযোগ পেলেই আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য সালাতে মশগুল হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন : (تَتَجَافٰي جُنُوْبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَّطَمَعًا ز وَّمِمَّا رَزَقْنٰهُمْ يُنْفِقُوْنَ ‏)‏ “তাদের দেহ-পার্শ বিছানা থেকে আলাদা হয়ে যায় যে, তারা তাদের প্রতিপালককে আহ্বান করতে থাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।” (সূরা সিজদাহ ৩২ : ১৬) (سِيْمَاهُمْ فِيْ وُجُوْهِهِمْ مِّنْ أَثَرِ السُّجُوْدِ) ‘তাদের চেহারায় সিজদার আলামত রয়েছে’ হাসান বাসরী (রহঃ) বলেন : এর অর্থ হল মুসল্লীদের মুখমণ্ডলের সেই নূর যা কিয়ামতের দিন প্রকাশ পাবে। একদা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমাযানের ২১ তারিখের রাতে ফজরের সালাত আদায় করলেন (রাতের বেলা বৃষ্টি হয়েছিল) ফলে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কপালে পানি ও কাদার চিহ্ন লেগে ছিল। হাসান বাসরী বলেন : কিয়ামতের দিন তা শুভ্রু হয়ে থাকবে। (সহীহ বুখারী হা. ২০১৮) আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসে রয়েছে... যখন আল্লাহ তা‘আলা বান্দার মাঝে বিচার করা শেষ করবেন তখন তিনি জাহান্নামীদের মধ্য হতে যাদেরকে ইচ্ছা করবেন জাহান্নাম হতে বের করতে ফেরেশতাদের নির্দেশ দেবেন যারা “লা ইলাহা ইল্লালাহ” বলেছে কিন্তু কোন শিরক করেনি। ফেরেশতারা তাদেরকে জাহান্নামে সিজদার আলামত দেখে চিনতে পারবে, আগুন আদম সন্তানের সব কিছু খেয়ে ফেলবে কিন্তু সিজদার আলামত পুড়তে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামের আগুনের জন্য সিজদার আলামত পুড়িয়ে দেয়া হারাম করে দিয়েছেন। (সহীহ বুখারী হা. ৭৪৩৮, মুসলিম হা. ১৮২) ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন : আমার কাছে এ সংবাদ এসেছে যে, খ্রিস্টানরা সিরিয়া বিজয়ী সাহাবীদেরকে দেখলে বলত- এরা মূসার অনুসারী হাওয়ারীদের থেকে উত্তম। কারণ এ উম্মাতের কথা পূর্ববর্তী কিতাবে উল্লেখ রয়েছে, আর এ উম্মাতের সর্বশ্রেষ্ঠ হল রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবী। আল্লাহ তা‘আলা আসামানী কিতাবে বিশেষভাবে তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা এখানে বলেছেন : তাদের উপমা রয়েছে তাওরাতে এবং তাদের উপমা রয়েছে ইঞ্জিলে। তা হল এই যে, যেমন একটি শস্যক্ষেত, যার চারাগাছগুলো অঙ্কুরিত হয়ে পরে সেগুলো শক্ত ও পুষ্ট হয় পরে তা কাণ্ডের ওপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে যা চাষীকে আনন্দিত করে। এমনিভাবে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবীগণ শুরুতে খুবই নগণ্য সংখ্যক ছিলেন। এক সময়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যতীত মাত্র তিনজন মুসলিম ছিলেন। পুরুষদের মধ্যে আবূ বকর, মহিলাদের মধ্যে খাদীজা ও বালকদের মধ্যে আলী (রাঃ)-এরপর আস্তে আস্তে তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এমনকি বিদায় হাজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে হাজ্জে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের সংখ্যা ছিল দেড় লক্ষাধিক। ইমাম বাগাভী বলেন : ইঞ্জিলে সাহাবায়ে কেরাম এর দৃষ্টান্ত আছে যে, তারা শুরুতে নগণ্য সংখ্যক হবে তারপর তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং শক্তি অর্জিত হবে। এ আয়াতের ভিত্তিতেই ঈমাম মালিক (রহঃ) বলেছেন : রাফিজিরা কাফির। কারণ তারা সাহাবীদের ব্যাপারে বিদ্বেষ পোষণ করে। কেননা যারাই সাহাবীদেরকে গালিগালাজ ও বিদ্বেষ পোষণ করবে এ আয়াতের ভিত্তিতে তারা কাফির। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : لَا تَسُبُّوا أَصْحَابِي، فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَنْفَقَ أَحَدُكُمْ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ তোমরা আমার সাহাবীদেরকে গালি দিও না। ঐ সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ তোমাদের কেউ যদি উহুদ পরিমাণ স্বর্ণ ‎আল্লাহ তা‘আলা‎র রাস্তায় ব্যয় করে তাহলেও তাদের একমুদ বা অর্ধ মুদ সমপরিমাণ ব্যায়ের সাওয়াব পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। (সহীহ মুসলিম হা. ২৫৪০) (لِيَغِيْظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ) ‘এভাবে আল্লাহ মু’মিনদের সমৃদ্ধি দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেন’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা সাহাবায়ে কেরামকে উল্লেখিত গুণে গুণান্বিত করেছেন এবং তাদেরকে দুর্বলতার পর শক্তি এবং সংখ্যাস্বল্পতার পর সংখ্যাধিক্য দান করেছেন যাতে এগুলো দেখে কাফিরদের অন্তর্জ্বালা হয় এবং তারা হিংসার অনলে দগ্ধ হয়। আবূ ওরওয়া যুবায়রী (রহঃ) বলেন : একবার আমরা ইমাম মালেক (রহঃ)-এর মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। জনৈক ব্যক্তি কোন একজন সাহাবীকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে কিছু বক্তব্য রাখল। তখন ইমাম মালেক অত্র আয়াতটি পূর্ণ তেলাওয়াত করতঃ যখন (لِيَغِيْظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ) পর্যন্ত পৌঁছলেন তখন বললেন : যার অন্তরে কোন একজন সাহাবীর প্রতি ক্রোধ আছে সে এ আয়াতের শাস্তি ভোগ করবে। (কুরতুবী) (وَعَدَ اللّٰهُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا) ‘যারা ঈমান আনে’ এখানে من অব্যয়টি বর্ণনামূলক, অর্থ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ঈমানদার ও সৎআমলকারী মু’মিনদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ওয়াদা দিয়েছেন তাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন এবং অনেক উত্তম প্রতিদান দেবেন। এ থেকে জানা গেল সকল সাহাবী প্রকৃত ঈমানদার, তাদের সবাইকে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাদের সবাই জান্নাতী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন : (وَالسّٰبِقُوْنَ الْأَوَّلُوْنَ مِنَ الْمُهٰجِرِيْنَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِيْنَ اتَّبَعُوْهُمْ بِإِحْسَانٍ لا رَّضِيَ اللّٰهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِيْ تَحْتَهَا الْأَنْهٰرُ خٰلِدِيْنَ فِيْهَآ أَبَدًا ط ذٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ ‏)‏ “মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর ওপর সন্তুষ্ট এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার নিুদেশে নদী প্রবাহিত হয়, যেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে। এটাই হল মহাসাফল্য।” (সূরা তাওবা ৯ : ১০০) সুতরাং সাহাবীদের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করা, তাদেরকে গালিগালাজ করা এবং তাদেরকে নিয়ে সমালোচনা করা ঈমানের পরিপন্থী কাজ। একজন মু’মিনের অন্তর ও মুখে সাহাবীদের ব্যাপারে ভাল ও স্বচ্ছ ধারণা থাকবে। তাদেরকে ভালবাসা ঈমান ও দীন আর তাদের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করা কুফরী ও মুনাফিকী। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াত ও রিসালাতের স্বীকৃতি পেলাম। ২. সাহাবীদের ফযীলত জানতে পারলাম। ৩. যারা বেশি বেশি সালাত আদায় করে তাদের ফযীলত অন্যান্যদের ওপর অনেক বেশি। ৪. সাহাবীদের ব্যাপারে বিদ্বেষ পোষণ করা কুফরী, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়।

আল-হুজুরাত 49:11

১১ নম্বর আয়াতের তাফসীর : মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ কখনো একাকী বাস করতে পারে না। সমাজে বাস করতে হলে সমাজের ভারসাম্য ও স্থীতিশীলতা বজায় রাখা আবশ্যক। সে জন্য আল্লাহ তা‘আলা নিম্নোক্ত বিধানগুলো দিলেন। আয়াতের শুরুতেই আবারও মু’মিনদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে যেমন সূরার শুরুতে করা হয়েছে। সুতরাং আলোচ্য বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করতে হবে। কোন ব্যক্তিকে নিয়ে উপহাস করা, ঠাট্টা করা, মন্দ নামে ডাকা, সম্মানের হানি করা এবং তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্ন করার সকল পন্থা ইসলামে হারাম। অনেকে মানুষের আকার-অবয়ব, অস্বচ্ছলতা ইত্যাদি নিয়ে তুচ্ছ মনে করে উপহাস ও ঠাট্টা করে থাকে। তা কোন সময় কথা, কোন সময় ইশারা-ইঙ্গিত আবার কোন সময় অভিনয় করার মাধ্যমেও হতে পারে। এরূপ করা হারাম, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদায় হাজ্জে বলে গেছেন : তোমাদের সম্পদ সম্মান আজকের দিনের মতো হারাম। একজন ব্যক্তি অন্যকে নিয়ে তখনই ঠাট্টা ও বিদ্রূপ করতে পারে যখন তাকে হীন ও ছোট মনে করে এবং নিজেকে বড় মনে করে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেছেন : আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের আকৃতি ও সম্পদের দিকে দৃষ্টিপাত করেন না। বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমল। (সহীহ মুসলিম হা. ৬৭০৮) অথচ ঈমান ও আমলের দিক দিয়ে কে উত্তম তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন। আল্লাহ তা‘আলা ঠাট্টাকারীদেরকে তিরস্কার ও ধমকে দিয়ে বলেন : (اَلَّذِيْنَ يَلْمِزُوْنَ الْمُطَّوِّعِيْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ فِي الصَّدَقٰتِ وَالَّذِيْنَ لَا يَجِدُوْنَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُوْنَ مِنْهُمْ ط سَخِرَ اللّٰهُ مِنْهُمْ ز وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ‏)‏ “মু’মিনদের মধ্যে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সদকা দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ব্যতিরেকে কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ করে ও বিদ্রূপ করে; তাদের জন্য আছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (আত্ তাওবাহ ৯ : ৭৯) (وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ) অর্থাৎ মানুষকে দোষারোপ করো না। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন : (وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةِ) “প্রত্যেক পশ্চাতে ও সম্মুখে পরনিন্দাকারীর দুর্ভোগ।” (সূরা আল হুমাযাহ্ ১০৪ : ১) অন্যত্র মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন : (هَمَّازٍ مَّشَّا۬ءٍ ۭ بِنَمِيْمٍ ‏)‏ “দোষারোপকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়।” (আল ক্বালাম ৬৮ : ১১) (وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ....) শানে নুযূল : শা‘বী (রহঃ) বলেন, আমাকে আবূ জারির ইবনু যহ্হাক হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : উক্ত আয়াতটি বানী সালামাহ্দের ব্যাপারে নাযিল হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় আগমন করলেন। আমাদের প্রত্যেকের প্রায় দু থেকে তিনটি নাম ছিল। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন কাউকে কোন এক নামে ডাকতেন তখন লোকেরা বলল : হে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ নামে ডাকলে সে অসন্তুষ্ট হয়। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (আহমাদ ৪/২৬০, আরদাত দাবী হা. ৪৯৬২, ইবনু মাজাহ্ হা. ৩৭৪১, সহীহ) কারো উপহাস করা, কাউকে নিয়ে ঠাট্টা করা, দোষারোপ করা, মন্দ নামে ডাকা ইত্যাদি সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে। ফলে সমাজে অশান্তি নেমে আসে। এ রোগ মহিলাদের মাঝে বেশি। তাই তাদের কথা পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. মানুষকে নিয়ে ঠাট্টা করা হারাম। ২. কাউকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করা ও মন্দ নামে ডাকাও হারাম। ৩. এ সব কাজ সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে। ৪. আয়াতে মহিলাদেরকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ এ সকল কাজে তারাই অগ্রগামী।

আল-হুজুরাত 49:12

১২ নম্বর আয়াতের তাফসীর : এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে অহেতুক কারো ব্যাপারে বেশি বেশি কু-ধারণা করা থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। কারণ অধিকাংশ ধারণাই পাপ, এতে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, সুসম্পর্ক বিনষ্ট হয়, যার সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা হয় তাকে নিয়ে গীবত ও নিন্দা করা হয়। এসব কিছুই পরস্পরের মধ্যে শত্র“তার সৃষ্টি করে যার ফলে সমাজে অশান্তি সৃষ্টি হয়। একজন মু’মিন অন্য মু’মিনের ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা পাপ কাজ। বরং মু’মিনদের পরস্পরের প্রতি ধারণা হবে ভাল। তাই মু’মিনদের ব্যাপারে অনাকাক্সিক্ষত কোন সংবাদ শুনলেই খারাপ ধারণা করা যাবে না, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য জানতে হবে। যেমন আয়িশাহ (রাঃ)-এর ব্যাপারে মুনাফিকরা যখন খারাপ কথা প্রচার শুরু করল তখন কতক মু’মিনও তা বিশ্বাস করে খারাপ ধারণা করেছিল। আল্লাহ তা‘আলা তাদের তিরস্কার করে বললেন : যখন মু’মিন এমন সংবাদ শুনল তখন নিজেদের ব্যাপারে কেন ভাল ধারণা করেনি? তবে কেউ অন্যায় ও শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত হলে তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে থাকো, কেননা ধারণা করা বড় মিথ্যা। অন্যের প্রতি কু-ধারণা পোষণ করো না এবং অন্যের দোষ-ত্র“টির খোঁজে লিপ্ত হয়ো না। তোমরা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ করো না এবং পরস্পর সম্পর্ক ছিন্ন করো না বরং হে আল্লাহ তা‘আলার বান্দাগণ পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে জীবনযাপন কর। (সহীহ বুখারী হা. ৬৭২৪, সহীহ মুসলিম হা. ২৫৬৩) (وَلَا تَجَسَّسُوا) অর্থাৎ তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না, গোয়েন্দাগিরী করো না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গোয়েন্দাগিরী খারাপ কাজে হয়ে থাকে। এটাকে আরবিতে التحسس বলা হয়। আর التحسس (অর্থাৎ তালাশ করা) অধিকাংশ সময় কল্যাণকর কাজে হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন : (يٰبَنِيَّ اذْهَبُوْا فَتَحَسَّسُوْا مِنْ يُّوْسُفَ وَأَخِيْهِ) ‏‏ ‘হে আমার পুত্রগণ! তোমরা যাও, ইউসুফ ও তার সহোদর ভাইয়ের অনুসন্ধান কর‎।’ (সূরা ইউসুফ ১২ : ৮৭) সুতরাং কারো ক্ষতি বা হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য দোষ বা ব্যক্তিগত বিষয় খুঁজে বেড়ানো নিষেধ। আল্লামা আলূসী তাফসীর রুহুল মা‘আনীতে বলেন : التجسس শব্দের অর্থ অন্যের গোপন বিষয় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা। যে সকল দোষ উল্লেখ করাকে মানুষ খারাপ মনে করে কিংবা অন্য কেউ তা জানুক সে তা পছন্দ করে না এমন সব বিষয় জানার চেষ্টা করা। আবূ বারযাহ আসলামী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা আমাদেরকে বক্তৃতার সময় বললেন : তোমাদের যাদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি অথচ মুখে ঈমান এনেছ, তোমরা মুসলিমদের দোষ-ত্র“টি খুঁজে বের করো না। যে ব্যক্তি মুসলিমদের দোষ-ত্র“টির পেছনে লেগে থাকে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ঘরের মধ্যেই অপমানিত করবেন। (আবূ দাঊদ হা. ৪৮৮২, সহীহ) অপরের বাড়িতে উঁকি মেরে দেখাও দোষ খোঁজার অন্তর্ভুক্ত। হাদীসে বলা হয়েছে, কেউ বিনা অনুমতিতে কারোর ঘরে উঁকি মেরে দেখলে তার চোখ ফুটা করে দাও। (সহীহ বুখারী হা. ৫৯২৪) অন্য বর্ণনায় এসেছে : যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের কথা শোনার জন্য কান খাড়া করে অথচ তারা তা অপছন্দ করে, কিয়ামতের দিন তার দুই কানে গলিত শিশা ঢালা হবে। (সহীহ বুখারী হা. ৭০৪২) তবে মুসলিম সরকার ইসলামী রাষ্ট্রের শত্র“দের তথ্য সংগ্রহ ও রাষ্ট্রোদ্রোহীদের অবস্থান জানার জন্য গোয়েন্দা নিযুক্ত রাখতে পারেন। (وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا) ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যেন কারো গীবত না করে’ অর্থাৎ অন্য লোকের কাছে কোন ব্যক্তির দোষ-ত্র“টি তার অনুপস্থিতিতে বলো না যা শুনলে সে ব্যক্তি কষ্ট পায়। আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : বলা হলো : হে আল্লাহর রাসূল! গীবত কী? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : তোমার ভাইদের এমন কিছু উল্লেখ করো যা সে অপছন্দ করে। বলা হলো : আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইদের মাঝে থাকে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : তুমি যা বলছ তা যদি তার মাঝে থাকে তাহলে তুমি তার গীবত করলে আর যদি না থাকে তাহলে তুমি তাকে অপবাদ দিলে। (সহীহ মুসলিম হা. ২৫৮৯) গীবত এমন একটি জঘন্য ও নিন্দনীয় অপরাধ, আল্লাহ তা‘আলা তা মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। গীবত অঙ্গ-ভঙ্গি, কথা ও কাজ যে কোনভাবে হতে পাবে। গীবত করা ও শ্রবণ করা সমান অপরাধ। আলোচ্য আয়াতে উল্লেখিত বেশি বেশি ধারণা করা, গোয়েন্দাগিরি করা ও গীবত করা একেতো হারাম আবার এগুলো এমন ধ্বংসাত্মক আচরণ যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত মানুষের মাঝে দ্বন্দ্ব, কলহ, বিবাদ ও ফাসাদ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে মহিলাদের মাঝে গীবত করার প্রচলন বেশি। তারা দুজন একত্রিত হলে তৃতীয় আরেক জনের গীবত না করে ওঠেই না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الجَنَّةَ যে ব্যক্তি আমার কাছে তার দুচোয়ালের মধ্যবর্তী স্থান ও দু’রানের মধ্যবর্তী স্থান সংরক্ষণের দায়িত্ব নেবে আমি তার জান্নাতের যাওয়ার দায়িত্ব নেব। (সহীহ বুখারী হা. ৬৪৭৪) অর্থাৎ যে ব্যক্তি মুখ দিয়ে কোন প্রকার পাপ করবে না এবং লজ্জাস্থানের অপব্যবহার করবে না রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার জান্নাতে প্রবেশের দায়িত্ব নেবেন। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা, সম্মানহানি করা হারাম করেছেন এবং কারো প্রতি খারাপ ধারণা করবে তাও হারাম করেছেন। (সিলসিলা সহীহাহ হা. ৩৪২০) অতএব আমাদের সকলের উচিত এসব ঘৃণ্য আচরণ পরিহার করে সুন্দর, সুখী ও সমৃদ্ধশালী পরিবার ও সমাজ গঠন করা। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. অহেতুক কারো ব্যাপারে কু-ধারণা করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। ২. ফাসাদ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে গোয়েন্দাগিরি করা হারাম। ৩. গীবত একটি ঘৃণ্য আচরণ যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে।

আল-হুজুরাত 49:13

১৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর : এতক্ষণ সামাজিক বিধি-বিধান আলোচনা করার পর আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে সৃষ্টির সূচনার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, তোমরা একজন মাত্র নর-নারী তথা আদম ও হাওয়া (আঃ) থেকে সৃষ্ট। আল্লাহ তা‘আলা মানুকে চারটি পদ্ধতিতে সৃষ্টি করেছেন। (১) কোন নারী-পুরুষ ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন, যেমন আদম (আঃ)। (২) পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছেন নারী ছাড়া, যেমন হাওয়া (আঃ), (৩) নারী থেকে সৃষ্টি করেছেন কোন পুরুষ ছাড়াই, যেমন ঈসা (আঃ), (৪) নারী-পুরুষের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন যেমন সকল মানুষ। আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টি করার পর বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছেন যাতে একে অপরকে চিনতে পারে। যেমন সে অমুকের ছেলে, সে অমুক গোত্রের লোক ইত্যাদি। এ জন্য বিভিন্ন গোত্র ও জাতিতে বিভক্ত করেন যে, অমুক গোত্র অমুক গোত্র থেকে, অমুক জাতি অমুক জাতি থেকে শ্রেষ্ঠ। আর শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি একটিই, তা হলো তাকওয়া। সে কৃষ্ণাঙ্গ হোক বা শ্বেতাঙ্গ হোক, আরবি হোক আর অনারবি হোক, প্রাচুর্যশালী হোক আর নিঃস্ব হোক। আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো : কোন্ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি সম্মানিত? জবাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বেশি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করেছে সে বেশি সম্মানিত.....। (সহীহ বুখারী হা. ৩৩৮৩) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : إِنَّ اللّٰهَ لَا يَنْظُرُ إِلَي صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَي قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের আকৃতি ও সম্পদের দিকে লক্ষ্য করেন না। বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখবেন। (সহীহ মুসলিম হা. ২৫৬৩) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদায় হাজ্জে বলেছেন : তাকওয়া ব্যতীত অন্য কোন কিছুর কারণে আরবের ওপর কোন অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া- অধ্যায় : বিদায় হাজ্জ) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. মানব জাতির উৎস আদম ও হাওয়া (আঃ)। ২. মানব জাতিকে বিভিন্ন গোত্রে ও জাতিতে বিভক্ত করা হয়েছে পরস্পরে পরিচয় লাভের জন্য । ৩. শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি একমাত্র তাকওয়া। গোত্র, জাতি বা দেশ নয়।

আল-হাদীদ 57:25

২৫ নম্বর আয়াতের তাফসীর : بِالْبَيِّنٰتِ (প্রমাণসমূহ) অর্থাৎ মুজিযাহ, দলীল-প্রমাণাদি ও ঐসব আলামত যা রাসূলের সত্যতার প্রমাণ বহন করে তা দিয়ে রাসূল প্রেরণ করছি। وَالْمِيْزَانَ (তুলাদণ্ড) বলতে ন্যায়নীতি বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা লোকদের মাঝে সুবিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হল দাড়িপাল্লা। দাঁড়িপাল্লা অবতীর্ণ করার অর্থ হল মানুষের মাঝে সঠিক ওজন প্রতিষ্ঠা করা। (وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيْدَ) হাসান বাসরী (রহঃ) বলেন : এখানে انزال অর্থ সৃষ্টি করা, তৈরি করা। যেমন সূরা আন‘আমের ১৪৩ নম্বর আয়াতে انزال দ্বারা সৃষ্টি করার অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ভাষাবিদগণ বলেন : খনিজ থেকে লোহা বের করেছেন, অতঃপর ওয়াহীর মাধ্যমে তা তৈরির জ্ঞান দান করেছেন। (ইবনু কাসীর) হাদীদ শব্দটি কুরআনে ৬ জায়গায় ব্যবহার হয়েছে। সূরা ইসরার ৫০ নম্বর, সূরা কাহফের ৯৬ নম্বর, সূরা হাজ্জের ২১ নম্বর, সূরা সাবার ১০ নম্বর, সূরা ক্বাফের ২২ নম্বর এবং সূরা হাদীদের অত্র আয়াত। প্রত্যেকটিতেই লোহার উপরকরণ অর্থে ব্যবহার হয়েছে। তবে সূরা ক্বাফের আয়াতে প্রত্যক্ষ করা অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অত্র আয়াতের তাফসীরে ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন : যাদের কাছে প্রমাণ পৌঁছার পরেও সত্য গ্রহণে অবাধ্য হবে এবং সত্যের বিরোধিতা করবে তাদের প্রতিরোধক হিসাবে লোহা দিয়েছেন। এজন্য নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবুওয়াত পাওয়ার পর তের বছর মক্কায় অবস্থান করে তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে সত্যের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারপর হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন এবং কেউ ইসলামের বিরোধিতা করলে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের বিধান দিয়েছেন। (وَّمَنَافِعُ لِلنَّاسِ) অর্থাৎ মানুষের জীবন-যাপনে এর অনেক উপকারিতা রয়েছে, যেমন লোহা দ্বারা কৃষি কাজের উপকরণ তৈরি করা, দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত দা, চাকু ইত্যাদি তৈরি করা। যুদ্ধ-জিহাদের অস্ত্র তৈরি হয় এ লোহা দ্বারাই। (ইবনু কাসীর) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. আল্লাহ লোহা অবতীর্ণ করেছেন মানুষের নানাবিধ উপকারের জন্য।

আল-মুমতাহিনা 60:12

১২ নম্বর আয়াতের তাফসীর : এ আয়াতটিকে مبايعة النساء বা মহিলাদের বাইআতের আয়াত বলা হয়। যখন মক্কা বিজয় হল তখন মক্কার মহিলাগণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আগমন করে বাইআত গ্রহণ করতে লাগল। আয়িশাহ (রাঃ) বলেন : যে সকল মহিলা হিজরত করে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আসত তাদেরকে এ আয়াত দ্বারা পরীক্ষা করতেন। আয়িশাহ (রাঃ) বলেন : মু’মিনা নারী এ সকল শর্ত মেনে নিলে তাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতেন : আমি কথার মাধ্যমে তোমার বাইআত গ্রহণ করলাম। আয়িশাহ (রাঃ) বলেন : আল্লাহ তা‘আলার শপথ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাত কখনো কোন মহিলার হাত স্পর্শ করেনি। (সহীহ বুখারী হা. ৫২৮৮) قد بايعتك علي ذلك অর্থাৎ এভাবে তোমার বাইআত নিলাম। এরূপ কথার মাধ্যমেই তিনি বাইআত নিতেন। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৯১) উম্মু আতিয়াহ (রাঃ) বলেন : আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে বাইআত গ্রহণ করতাম। তখন তিনি আমাদের কাছে এ আয়াত পাঠ করতেন। আর আমাদেরকে মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে বুকের কাপড় ছিঁড়ে, গালে শরীরে আঘাত করে আওয়াজের সাথে কান্না করতে নিষেধ করেছেন। তখন এক মহিলা হাত গুটিয়ে নিল। বলল : অমুক মহিলা আমার অমুকের মৃত্যুর সময় বিলাপ করে কান্নাতে সাহায্য করেছিল। অতএব এর বিনিময় হিসাবে তার মৃত্যুতে আমাকে বিলাপ করে কান্না করতে হবেই। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে কিছুই বললেন না। এরপর সে মহিলা চলে গেলে তারপর কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বাইআত করলো। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৯২) ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আবূ বকর, উমার ও উসমান (রাঃ)-এর ঈদুল ফিতরের সালাতে উপস্থিত ছিলাম। তারা প্রত্যেকেই খুৎবা প্রদানের পূর্বেই সালাত আদায় করেছেন, অতঃপর খুৎবা প্রদান করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুৎবা অবস্থায় মিম্বার হতে নেমে পড়েন। এখনো যেন ঐ দৃশ্য আমার চোখের সামনে রয়েছে। লোকদেরকে বসানো হচ্ছিল এবং তিনি তাদের মধ্য দিয়ে আসছিলেন। অবশেষে স্ত্রীলোকদের নিকট আসলেন। তাঁর সাথে বেলাল (রাঃ) ছিলেন। সেখানে এ আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৯৫) এ কথাগুলোর বাইআত আকাবার বাইআতেও নিয়েছিলেন। সেখানে বলা হয়েছে যদি এ শর্তগুলো পূরণ কর তাহলে তোমাদের জন্য জান্নাত। (সহীহ বুখারী হা. ৩৮৯৩) এ বাইআতগুলোতে সালাত, সিয়াম, হাজ্জ ও যাকাতের কথা উল্লেখ নেই। কারণ এগুলো ইসলামের রুকন এবং দীনের অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিধান। তাই উল্লেখ করার প্রয়োজন হয় না। সেজন্য বিশেষ করে এ আয়াতে বর্ণিত জিনিসের বাইআত গ্রহণ করতেন কারণ এ অপরাধগুলোর প্রচলন সমাজে বেশি ছিল, বিশেষ করে মহিলাদের মাঝে। وَّلَا يَسْرِقْنَ (চুরি করবে না) তবে স্বামী যদি কৃপণ হয় আর স্ত্রী ও সন্তানাদীর ব্যয় যথারীতি বহন না করে তাহলে যতটুকু না হলেই নয় ততটুকু স্বামীর অজান্তে না বলে নিতে পারবে। যেমন বুখারীতে এ সম্পর্কে আবূ সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা থেকে বর্ণনা আছে। (সহীহ বুখারী হা. ৫৩৭০) (وَلَا يَعْصِيْنَكَ فِيْ مَعْرُوْفٍ) উম্মু সালামাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে বিলাপ করে কান্না করবে না। অন্যত্র তিনি বলেন : لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الخُدُودَ، وَشَقَّ الجُيُوبَ، وَدَعَا بِدَعْوَي الجَاهِلِيَّةِ যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গাল চাপড়ায়, চুল ছেঁড়ে, কাপড় ফাড়ে এবং জাহিলি যুগের রীতিনীতি ডেকে নিয়ে আসে সে আমাদের মধ্যে নয়। (সহীহ বুখারী হা. ১২৯৭-১২৯৮) আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে জিনিসগুলোর বাইআত নিতেন তা জানতে পারলাম। ২. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কোন দিন কোন মহিলার হাত স্পর্শ করেননি। ৩. বাইআত নেবেন একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান। কোন পীর, ফকীর ও দরবেশ ইত্যাদি নয়। ৪. স্বামী কৃপণতাবশত ভরণপোষণ বহন না করলে স্ত্রী না বলে ভরণপোষণের অর্থ নিলে চুরির অন্তর্ভুক্ত হবে না। ৫. মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গাল চাপড়িয়ে, কাপড় ছেঁড়া ও উচ্চস্বরে কান্না ইত্যাদি হারাম। এর অন্তর্ভুক্ত হল শোক দিবস পালন করা, চল্লিশা, কুলখানি ও তৃতীয় দিনের আয়োজন ইত্যাদি। ৬. ইসলামী বিধানের আওতায় নারী-পুরুষ সবাই সমান।

আল-মুমতাহিনা 60:13

১৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর : সূরার শুরুতে যেমন আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদের সাথে বন্ধুত্বসূলভ সম্পর্ক করতে নিষেধ করেছেন সূরার শেষেও সে কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। (قَوْمًا غَضِبَ اللّٰهُ) ‘আল্লাহ যে সম্প্রদায়ের প্রতি রাগান্বিত’ সে সম্প্রদায় হল ইয়াহূদ, খ্রিস্টান ও সকল কাফির শ্রেণি। যেমন আমরা সূরা ফাতিহা পাঠ কালে বলি ‘তাদের পথ নয় যারা গযবপ্রাপ্ত এবং তাদের পথও নয় যারা পথভ্রষ্ট।’ (كَمَا يَئِسَ الْكُفَّارُ) এখানে ইমাম ইবনু কাসীর (রহঃ) দুটি কথা বর্ণনা করেছেন : ১. যেমন জীবিত কাফিররা তাদের মৃত কবরস্থ কাফিরদের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে, এরপর তারাও তাদের সাথে মিলিত হবে। কারণ তারা পুনরুত্থানে বিশ্বাস করে না। তাদের এ বিশ্বাসের কারণে কবরস্থ কাফিরদের পুনর্জীবিত হওয়ার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে। ২. যেমন নিরাশ হয়ে গেছে সকল কল্যাণ থেকে কাফিররা যারা কবরস্থ আছে তাদের বিষয়ে। প্রকৃত অবস্থা দেখে কবরস্থ কাফিররা আখিরাতে আল্লাহ তা‘আলার রহমতের আশা থেকে নিরাশ হয়ে গেছে। (তাফসীর মুয়াসসার)। সুতরাং কাফিরদের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। তাহলেই মুসলিমরা আবার স্বর্ণ যুগে ফিরে যেতে পারবে। ঈমানের পূর্ণ স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করা হারাম। ২. ইয়াহূদ, খ্রিস্টানসহ সকল প্রকার কাফিরদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার ক্রোধ। ৩. কাফিররা মারা যাওয়ার পর বুঝতে পারবে তারা আল্লাহ তা‘আলার কোনরূপ রহমত পাবে না।

আত-তালাক 65:1

নামকরণ : الطلَاق শব্দটি ক্রিয়ামূল। অত্র সূরার প্রথম আয়াতে উক্ত ক্রিয়ামূলের ক্রিয়া ব্যবহার হয়েছে। সেখান থেকেই উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। তাছাড়া এ সূরাতে ত্বালাক সংক্রান্ত বিধি-বিধান আলোচনা করা হয়েছে। الطلَاق (ত্বালাক) শব্দের অর্থ : বন্ধন মুক্ত করা। যেমন বলা হয় : اطلق الاسير বন্দী মুক্ত করা হয়েছে। শারঈ পরিভাষায় ত্বালাক বলা হয় حل قيد النكاح بلفظ الطلاق ونحوه ত্বালাক বা অনুরূপ শব্দ দ্বারা বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করা। (সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ ৩ : ২৩২) ত্বালাকের শর্তাবলী : ত্বালাক ইসলামে একটি জটিল বিষয়। এটা নিয়ে ঠাট্টা করতেও নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিষেধ করেছেন। (আবূ দাঊদ হা. ২১৯৪, তিরমিযী হা. ১১৮৪ শাইখ আলবানী হাসান বলেছেন আবার কেউ কেউ দুর্বল বলেছেন)। ১. ত্বালাক স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে দিতে হয়। ২. স্বামী প্রাপ্তবয়স্ক ও জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে। ৩. ত্বালাক স্বেচ্ছায় (একাধিক স্ত্রী থাকলে নির্দিষ্ট করে) ও ইঙ্গিতে বা সরাসরি শব্দ উল্লেখ করে দিতে হবে। ৪. ঋতু অবস্থায় নয় এবং স্ত্রীর সাথে সহবাস করা হয়নি এমন পবিত্র অবস্থায় অথবা গর্ভবতী অবস্থায় ত্বালাক দিতে হবে। (বিস্তারিত দেখুন সহীহ ফিকহুস স্ন্নুাহ, ত্বালাক অধ্যায়) ১ নম্বর আয়াতের তাফসীর : আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্মানের সাথে তাঁর উম্মাতকে তাঁর অনুসারী হিসাবে সম্বোধন করে ত্বালাকের বিধি-বিধান শেখাচ্ছেন। (فَطَلِّقُوْهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ) অর্থাৎ ইদ্দতের মাঝে ত্বালাক দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। لِعِدَّتِهِنَّ এর لا (লাম) অক্ষরটি তাওক্বীত বা সময় নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ لأول অথবা لاستقبال عدتهن বা ইদ্দতের শুরুতে ত্বালাক দাও। ইদ্দত হল স্ত্রী ঋতু বা মাসিক থেকে পবিত্র হওয়া, যে পবিত্র অবস্থায় স্বামী তার সাথে সহবাস করেনি। তাই স্ত্রী ঋতু বা মাসিক থেকে পবিত্র থাকা অবস্থায় সহবাসের পূর্বেই (ত্বালাকের প্রয়োজন হলে) ত্বালাক দিতে বলা হয়েছে। অথবা স্ত্রী গর্ভবতী এমন সময় ত্বালাক দিতে পারে। (তাফসীর সা‘দী) এভাবেই ত্বালাক দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইবনু উমার (রাঃ)-কে বলেছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে তাঁর স্ত্রীকে ঋতু অবস্থায় ত্বালাক দেন। উমার (রাঃ) এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন : তাকে নির্দেশ দাও, সে যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয় এবং নিজের কাছে রেখে দেয় যতক্ষণ না সে মহিলা পবিত্র হয়ে আবার ঋতুবতী হয় এবং আবার পবিত্র হয়। অতঃপর সে যদি ইচ্ছা করে তাকে রেখে দেবে আর যদি ইচ্ছা করে তবে সহবাসের পূর্বেই তাকে ত্বালাক দেবে। আর এটাই ত্বালাকের নিয়ম, যে নিয়মে আল্লাহ তা‘আলা স্ত্রীদের ত্বালাক দিতে বলেছেন। (সহীহ মুসলিম, সহীহ বুখারী হা. ৪৯০৮)। তাই স্ত্রীকে তার ঋতু/মাসিক অবস্থায় অথবা সহবাস করা হয়েছে এমন পবিত্র অবস্থায় ত্বালাক দেওয়াকে শরীয়তে বিদআত ত্বালাক বলা হয়। (ইবনু কাসীর)। সেজন্য এরূপ বিদআত থেকে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। রাগবশত যেন এরূপ পাপ কাজে লিপ্ত না হই। বি. দ্র. এক বৈঠকে তিন ত্বালাক দিলে তিন ত্বালাক গণ্য হবে না, এক ত্বালাক গণ্য হবে? এ নিয়ে তিনটি মত পাওয়া যায়। তবে সঠিক মত হল এক বৈঠকে তিন ত্বালাক দিলে এক ত্বালাক বলে গণ্য হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আবূ বকর ও উমার (রাঃ)-এর যুগের প্রথম দু বছর এ বিধান চালু ছিল। (সহীহ মুসলিম হা. ১৪৭২) প্রসিদ্ধ হিদায়া গ্রন্থে একত্রে তিন ত্বালাককে বিদ‘আতী ত্বালাক বলা হয়েছে। (হিদায়া, ত্বালাক অধ্যায়) তবে ইসলামী রাষ্ট্রের ইমাম যদি কল্যাণস্বরূপ বা শাস্তিস্বরূপ একত্রে দেওয়া তিন ত্বালাককে তিন ত্বালাক বলে গণ্য করেন যেমন উমার (রাঃ) করেছিলেন তাহলে তা গণ্য হতে পারে। (সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ ৩/২৯০) (وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ) অর্থাৎ ইদ্দতের সময় গণনা করে রাখবে। কারণ স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চাইলে যাতে সময়মত ফিরিয়ে নিতে পারে। (لَا تُخْرِجُوْهُنَّ مِنْ ۭ بُيُوْتِهِنَّ) ‘তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বের করে দিও না’ অর্থাৎ ইদ্দত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ তিন ঋতু বা মাসিক অতিক্রম না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে তোমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিওনা এবং তারাও যেন বের হয়ে না যায়। কারণ থাকা ও ভরণ পোষণের দায়িত্ব তোমাদের (স্বামীদের) ওপর। (إِلَّآ أَنْ يَّأْتِيْنَ بِفَاحِشَةٍ مُّبَيِّنَةٍ) ‘যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়’ অর্থাৎ যদি তারা প্রকাশ্যে কোন খারাপ কাজ করে যেমন ব্যভিচার তাহলে বাড়ি থেকে বের করে দাও। (لَا تَدْرِيْ لَعَلَّ اللّٰهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذٰلِكَ أَمْرًا) ‘তুমি জান না, হয়তো আল্লাহ এর পর কোন উপায় বের করে দেবেন’ অর্থাৎ পুরুষের অন্তরে ত্বালাক প্রাপ্তা নারীর প্রতি চাহিদা ও আকর্ষণ সৃষ্টি করে দেবেন ফলে সে ফিরিয়ে নেয়ার প্রতি অনুপ্রাণিত হবে। কেননা প্রথম ও দ্বিতীয় ত্বালাকের পর স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার রাখে। তাই কোন কোন মুফাসসির বলেছেন, এখানে আল্লাহ তা‘আলা এক ত্বালাকের কথা বলেছেন এবং তিন ত্বালাক দিতে নিষেধ করেছেন। কারণ শরীয়ত যদি তিন ত্বালাক কার্যকর করেই দেয় তাহলে এ কথার কোন অর্থ থাকে না। হয়তো আল্লাহ তা‘আলা কোন নতুন উপায় বের করে দেবেন। কারণ তিন ত্বালাক বা ত্বালাকে বায়েন হয়ে গেলে ফিরিয়ে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। এ আয়াতকে কেন্দ্র করেই ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেছেন : বায়েন ত্বালাক প্রাপ্তা নারীর জন্য স্বামীর কাছে কোন বাসস্থান ও ভরণ-পোষণের অধিকান নেই। এ বিষয়ে আরো দুটি মত আছে তবে এটাই সঠিক। (তাওযীহুল আহকাম শরহু বুলুগুল মারাম ৫/৫৭০) সুতরাং ত্বালাকের সুন্নাতী পদ্ধতি হল সহবাস করা হয়নি এমন পবিত্র অবস্থায় এক ত্বালাক দেওয়া। সহবাস করা হয়েছে বা স্ত্রী ঋতুবতী এমন সময় ত্বালাক দেওয়া অথবা একত্রে তিন ত্বালাক দেওয়া সুন্নাতের খেলাফ যা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এ বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকা জরুরী। আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় : ১. ত্বালাক পরিচিতি ও তার শর্তসমূহ জানলাম। ২. ত্বালাক দিলে দিতে হবে ইদ্দতের সময়ে, ইদ্দত হলো সহবাস করা হয়নি এমন পবিত্র অবস্থা। ৩. ঋতু/মাসিক অবস্থায় ত্বালাক দিলে ত্বালাক গণ্য হবে না। ৪. দুই ত্বালাক দেওয়ার পরেও স্ত্রীকে স্বামী ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার রাখে। ৫. ত্বালাকে বায়েনের পূর্ব পর্যন্ত স্ত্রীর বাসস্থান ও ভরণ-পোষণ স্বামীর দায়িত্বে।