Tafseer ibn Kathir — আল-ফাতিহা 1:1 – আল-বাকারা 2:20
Contents
- আল-ফাতিহা 1:1
- আল-ফাতিহা 1:2
- আল-ফাতিহা 1:3
- আল-ফাতিহা 1:4
- আল-ফাতিহা 1:5
- আল-ফাতিহা 1:6
- আল-ফাতিহা 1:7
- আল-বাকারা 2:1
- আল-বাকারা 2:2
- আল-বাকারা 2:3
- আল-বাকারা 2:4
- আল-বাকারা 2:5
- আল-বাকারা 2:6
- আল-বাকারা 2:7
- আল-বাকারা 2:8
- আল-বাকারা 2:9
- আল-বাকারা 2:10
- আল-বাকারা 2:11
- আল-বাকারা 2:12
- আল-বাকারা 2:13
- আল-বাকারা 2:14
- আল-বাকারা 2:15
- আল-বাকারা 2:16
- আল-বাকারা 2:17
- আল-বাকারা 2:18
- আল-বাকারা 2:19
- আল-বাকারা 2:20
আল-ফাতিহা 1:1
এই সূরাটির নাম ‘সূরা-ই-আল ফাতিহাহ্। কোন কিছু আরম্ভ করার নাম ‘ফাতিহাহ’ বা উদ্ঘাটিকা। কুরআন কারীমের মধ্যে প্রথম এই সূরাটি লিখিত হয়েছে বলে একে সূরা-ই-আল ফাতিহাহ্ বলা হয়। তাছাড়া নামাযের মধ্যে এর দ্বারাই কিরাআত আরম্ভ করা হয় বলেও একে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে। উম্মুল কিতাব’ও এর অপর একটি নাম। জমহুর বা অধিকাংশ ইমামগণ এ মতই পোষণ করে থাকেন। কিন্তু হাসান বসরী (রঃ) এবং ইবনে সীরীন (রঃ) একথা স্বীকার করেন না। তাঁরা বলেন যে, ‘লাও-হি মাহফুয বা সুরক্ষিত ফলকের নামও উম্মুল কিতাব। হাসানের উক্তি এই যে, প্রকাশ্য আয়াতগুলোকে উম্মুল কিতাব বলা হয়। জামেউত তিরমিযীর একটি বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) এই সূরাটি হলো উম্মুল কুরআন, উম্মুল কিতাব, সাবআ মাসানী এবং কুরআন আযীম'। এই সূরাটির নাম ‘সূরাতুল হামদ’ এবং সূরাতুস্ সালাত'ও বটে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি সালাতকে (অর্থাৎ সূরা-ই-ফাতিহাকে আমার মধ্যে এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অর্ধেক অর্ধেক করে ভাগ করে দিয়েছি। যখন বান্দা বলে (আরবী) তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। এই হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, সূরা-ই-ফাতিহার নাম সূরা- ই-সালাতও বটে। কেননা এই সূরাটি নামাযের মধ্যে পাঠ করা শর্ত রয়েছে। এই সূরার আর একটি নাম সূরাতুশ শিফা। দারিমীর মধ্যে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, সূরা-ই-ফাতিহা প্রত্যেক বিষ ক্রিয়ায় আঁরেগ্যিদানকারী। এর আর একটি নাম সূরাতুর রকিয়্যাহ'। হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) সাপে কাটা রুগীর উপর ফু দিলে সে ভাল হয়ে যায়। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ এটা যে রকিয়্যাহ (অর্থাৎ পড়ে ফুঁ দেয়ার সূরা) তা তুমি কেমন করে জানলে?'হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ সূরাকে আসাসুল কুরআন বলতেন। অর্থাৎ কুরআনের মূল বা ভিত্তি। আর এই সূরার ভিত্তি হলো (আরবী) সুফইয়ান বিন উয়াইনাহ (রঃ) বলেন যে, এই সূরার নাম অফিয়াহ্। ইয়াহ্ইয়া বিন কাসীর (রাঃ) বলেন যে, এর নাম কাফিয়াও বটে। কেননা, এটা অন্যান্য সূরাকে বাদ দিয়েও একাই যথেষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু অন্য কোন সূরা একে বাদ দিয়ে যথেষ্ট হয় না। কোন কোন মুরসাল (যে হাদীসের সনদের ইনকিতা' শেষের দিকে হয়েছে অর্থাৎ সাহাবীর নামই বাদ পড়েছে এবং তাবেঈ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নাম করে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাকে হাদীসে’ মুরসাল বলে) হাদীসের মধ্যেও একথা এসেছে যে, উম্মুল কুরআন সবারই স্থলাভিষিক্ত হতে পারে, কিন্তু অন্যান্য সূরাগুলো উম্মুল কুরআনের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। (আল্লামা যামাখশারীর তাফসীর-ই-কাশশাফ দ্রব্য)একে সূরাতুস সালাত এবং সূরাতুল কাজও বলা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), কাতাদাহ (রঃ) এবং আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এই সূরাটি মাক্কী। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), আতা’ বিন ইয়াসার (রঃ) এবং ইমাম যুহরী (রঃ) বলেন যে, এই সূরাটি মাদানী। এটাও একটি অভিমত যে, এই সূরাটি দুইবার অবতীর্ণ হয়েছে। একবার মক্কায় এবং অন্যবার মদীনায়। কিন্তু প্রথমটিই বেশী সঠিক ও অভ্রান্ত। কেননা অন্য আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি তোমাকে সাবআ মাসানী (বারবার আবৃত্ত সাতটি আয়াত) প্রদান করেছি'।' (১৫:৮৭) আল্লাহ তা'আলাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জানেন।আবু লাইস সমরকন্দীর (রঃ) একটি অভিমত কুরতুবী (রঃ) এও নকল করেছেন যে, এই সূরাটির প্রথম অর্ধাংশ মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং শেষ অর্ধাংশ মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু হাদীসের পরিভাষায় এই কথাটিও সম্পূর্ণ গারীব বা দুর্বল। এ সূরার আয়াত সম্পর্কে সবাই একমত যে ওগুলি ৭টা। কিন্তু আমর বিন উবায়েদ ৮টা এবং হুসাইন যফী ৬টাও বলেছেন। এ দুটো মতই সাধারণ মতের বহির্ভূত ও পরিপন্থী (আরবী) এই সূরাটির পৃথক আয়াত কিনা তাতে মতভেদ রয়েছে। সমস্ত কারী, সাহাবী (রাঃ) এবং তাবেঈর (রঃ) একটি বিরাট দল এবং পরবর্তী যুগের অনেক বয়োবৃদ্ধ মুরব্বী একে সূরা -ই-ফাতিহার প্রথম, পূর্ণ একটি পৃথক আয়াত বলে থাকেন। কেউ কেউ একে সূরা-ই-ফাতিহারই অংশ বিশেষ বলে মনে করেন। আর কেউ কেউ একে এর প্রথমে মানতে বা স্বীকার করতেই চান না। যেমন মদীনা শরীফের কারী ও ফকীহগণের এই তিনটিই অভিমত। ইনশাআল্লাহ পূর্ণ বিবরণ সামনে প্রদত্ত হবে। এই সূরাটির শব্দ হলো পঁচিশটি এবং অক্ষর হলো একশো তেরটি। ইমাম বুখারী (রঃ) সহীহ বুখারীর কিতাবুত তাফসীরের মধ্যে লিখেছেনঃ “এই সূরাটির নাম উম্মুল কিতাব' রাখার কারণ এই যে, কুরআন মাজীদের লিখন এ সূরা হতেই আরম্ভ হয়ে থাকে এবং নামাযের কিরআতও এ থেকেই শুরু হয়। একটি অভিমত এও আছে যে, যেহেতু পূর্ণ কুরআন কারীমের বিষয়াবলী সংক্ষিপ্তভাবে এর মধ্যে নিহিত রয়েছে, সেহেতু এর নাম উম্মুল কিতাব হয়েছে। কারণ, আরব দেশের মধ্যে এ প্রথা চালু আছে যে, তারা একটি ব্যাপক কাজ বা কাজের মূলকে ওর অধীনস্থ শাখাগুলির ‘উম্ম’ বা ‘মা’ বলে থাকে। যেমন (আরবী) তারা ঐ চামড়াকে বলে যা সম্পূর্ণ মাথাকে ঘিরে রয়েছে এবং সামরিক বাহিনীর পতাকাকেও তারা (আরবী) বলে থাকে যার নীচে জনগণ একত্রিত হয়। কবিদের কবিতার মধ্যেও একথার ভুরি ভুরি প্রমাণ পাওয়া যায়। মক্কা শরীফকেও উম্মুল কুরা বলার কারণ এই যে, ওটাই সারা বিশ্ব জাহানের প্রথম ঘর। পৃথিবী সেখান হতেই ব্যাপ্তি ও বিস্তার লাভ করেছে। নামাযের কিরআত ওটা হতেই শুরু হয় এবং সাহাবীগণ কুরআন কারীম লিখার সময় একেই প্রথমে লিখেছিলেন বলে একে ফাতিহাও বলা হয়। এর আর একটি সঠিক নাম ‘সাবআ মাসানীও রয়েছে, কেননা এটা নামাযের মধ্যে বারবার পঠিত হয়। একে প্রতি রাকাতেই পাঠ করা হয়। মাসানীর অর্থ আরও আছে যা ইনশাআল্লাহ যথাস্থানে বর্ণিত হবে। মুসনাদে-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উম্মুল কুরা' সম্পর্কে বলেছেনঃ 'এটাই উম্মুল কুরআন এটাই সাবআ মাসানী এবং এটাই কুরআনে আযীম। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এটাই ‘উম্মুল কুরআন, এটাই 'ফাতিহাতুল কিতাব’ এবং এটাই সাবআ মাসানী।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াইতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী)-এর সাতটি আয়াত। (আরবী) ও ওগুলোর মধ্যে একটি আয়াত। এরই নাম সাবআ মাসানী’, এটাই, কুরআনে আযীম, এটাই ‘উম্মুল কিতাব, এটাই ‘ফাতিহাতুল কিতাব’ এবং এটাই কুরআনে আযীম।ইমাম দারকুতনীও (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থে এরূপ একটি হাদীস এনেছেন এবং তিনি তার সমস্ত বর্ণনাকারীদেরই নির্ভরযোগ্য বলেছেন। বায়হাকীতে রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরায়রাহ (রাঃ) সাবআ মাসানী’র ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ ‘এটা সূরা-ই-ফাতিহা এবং -এর সপ্তম আয়াত। (আরবী)-এর আলোচনায় (আরবী)-এর বর্ণনা পূর্ণভাবে দেওয়া হবে।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ আপনার লিখিত কুরআন কারীমের প্রারম্ভে আপনি সূরা-ই-ফাতিহা লিখেননি কেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ যদি আমি লিখতাম তবে প্রত্যেক সূরারই প্রথমে ওটাকে লিখতাম। আবু বকর বিন আবি দাউদ (রঃ) বলেনঃ একথার ভাবার্থ এই যে, . নামাযের মধ্যে তা পাঠ করা হয় এবং সমস্ত মুসলমানের এটা মুখস্থ আছে বলে তা’ লিখার আর প্রয়োজন হয় না। দালাইলুন নবুওয়াত’ এ ইমাম বায়হাকী (রঃ) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে রয়েছে যে, এই সুরাটি সর্বপ্রথম অবর্তীণ হয়েছে। বাকিলানীর (রঃ) তিনটি উক্তি বর্ণিত হয়েছেঃ (১) সূরা-ই-ফাতিহা সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। (২) (আরবী) সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। (৩) (আরবী) সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। শেষ উক্তিটিই সঠিক। এর পূর্ণ বিবরণ ইনশাআল্লাহ যথাস্থানে আসবে। সূরা-ই-ফাতিহার ফযীলত ও মাহাত্ম্যঃ মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি নামায পড়ছিলাম, এমন সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডাক দিলেন, আমি কোন উত্তর দিলাম না। নামায শেষ করে আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ এতক্ষণ তুমি কি কাজ করছিলে? আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি নামাযে ছিলাম। তিনি বললেনঃ আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশ কি তুমি শুননি? (আরবী) অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সঃ) ডাকে সাড়া দাও যখন তাঁরা তোমাদেরকে আহ্বান করেন। (৮:২৪) জেনে রেখো, মসজিদ হতে যাবার পূর্বেই আমি তোমাদেরকেই বলে দিচ্ছি, পবিত্র কুরআনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সূরা কোটি। অতঃপর তিনি আমার হাত ধরে মসজিদ হতে চলে যাবার ইচ্ছে করলে আমি তাকে তার অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম। তিনি বললেনঃ ‘ঐ সূরাটি হলো (আরবী) এটাই সাবআ’ মাসানী এবং এটাই কুরআন আযীম যা আমাকে দেয়া হয়েছে। এভাবেই এই বর্ণনাটি সহীহ বুখারী শরীফ, সুনান-ই আবি দাউদ এবং সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও অন্য সনদে বর্ণিত হয়েছে। ওয়াকেদী (রঃ) এই ঘটনাটি হযরত উবাই ইবনে কা'বের (রাঃ) বলে বর্ণনা করেছেন। মুআত্তা-ই-ইমাম মালিকে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) কে ডাক দিলেন। তিনি নামায পড়ছিলেন। নামায শেষ করে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তিনি বলেনঃ তিনি (নবী সঃ) স্বীয় হাতখানা আমার হাতের উপর রাখলেন। মসজিদ হতে বের হতে হতেই বললেনঃ আমি চাচ্ছি যে, মসজিদ হতে বের হওয়ার পূর্বেই তোমাকে এমন একটি সূরার কথা বলবো যার মত সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনে নেই। এখন আমি এই আশায় আস্তে আস্তে চলতে লাগলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম-“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেই সূরাটি কি? তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ নামাযের প্রারম্ভে তোমরা কি পাঠ কর?' আমি বললাম (আরবী) তিনি বললেনঃ “এই সূরা সেটি। সাবআ’ মাসানী এবং কুরআন আযীম যা আমাকে দেয়া হয়েছে তাও এই সূৱাই বটে। এই হাদীসটির শেষ বর্ণনাকারী হলেন আবু সাঈদ (রঃ)। এর উপর ভিত্তি করে ইবনে আসীর এবং তাঁর সঙ্গীগণ প্রতারিত হয়েছেন এবং তাঁকে আবু সাঈদ বিন মুআল্লা মনে করেছেন। এ আবু সাঈদ অন্য লোক, ইনি খাসাইর কৃতদাস এবং তাবেঈগণের অন্তর্ভুক্ত। আর উক্ত আবু সাঈদ আনসারী (রাঃ) একজন সাহাবী। তার হাদীস মুত্তাসিল (যে হাদীসের সনদের মধ্যে কোন স্তরে কোন রাবী বাদ না পড়ে অর্থাৎ সকল রাবীর নামই যথাস্থানে উল্লেখ থাকে তাকে হাদীসে মুত্তাসিল বলে) এবং বিশুদ্ধ। পক্ষান্তরে এই হাদীসটি বাহ্যতঃ পরিত্যাজ্য যদি আবু সাঈদ তাবেঈর হযরত উবাই (রাঃ) হতে শুনা সাব্যস্ত না হয়। আর যদি শুনা সাব্যস্ত হয় তবে হাদীসটি যথার্থতার শর্তের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। এই হাদীসটির আরও অনেক সূত্র রয়েছে। মুসনাদ-ই- আহমাদে রয়েছে, হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উবাই বিন কা'বের (রাঃ) নিকট যান যখন তিনি নামায পড়ছিলেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে উবাই (রাঃ)! এতে তিনি (তার ডাকের প্রতি মনোযোগ দেন কিন্তু কোন উত্তর দেন নি। আবার তিনি বলেনঃ “হে উবাই (রাঃ)!' তিনি বলেনঃ ‘আস্সালামু আলাইকা।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘ওয়াআলাইকাস সালাম। তারপর বলেনঃ “হে উবাই (রাঃ)! আমি তোমাকে ডাক দিলে উত্তর দাওনি কেন?' তিনি বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি নামাযে ছিলাম।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন উপরোক্ত আয়াতটিই পাঠ করে বলেনঃ তুমি কি এই আয়াতটি শুননি? তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাঁ (আমি শুনেছি) এরূপ কাজ আর আমার দ্বারা হবে না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ তুমি কি চাও যে, তোমাকে আমি এমন একটি সূরার কথা বলে দেই যার মত কোন সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল এবং কুরআনের মধ্যেই নেই? তিনি বলেনঃ হ্যা অবশ্যই বলুন।' তিনি বলেনঃ এখান থেকে যাবার পূর্বেই আমি তোমাকে তা বলে দেবো।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার হাত ধরে চলতে চলতে অন্য কথা বলতে থাকেন, আর আমি ধীর গতিতে চলতে থাকি। এই ভয়ে যে না জানি কথা থেকে যায় আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাড়ীতে পৌছে যান। অবশেষে দরজার নিকট পৌছে আমি তাঁকে তাঁর অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেই।' তিনি বলেনঃ নামাযে কি পড়’ আমি উম্মুল কুরা’ পড়ে শুনিয়ে দেই।' তিনি বলেনঃ “সেই আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, এরূপ কোন সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল, জবুর এবং কুরআনের মধ্যে নেই। এটাই হলো ‘সাবআ মাসানী'। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে আরও একটু বেশী আছে। তা হলো এই যে, এটাই বড় কুরআন যা আমাকে দান করা হয়েছে। এই হাদীসটি সংজ্ঞা ও পরিভাষা অনুযায়ী হাসান ও সহীহ। হযরত আনাস (রাঃ) হতেও এ অধ্যায়ে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। মুসনাদ-ই-আহমাদেও এইভাবে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে পরিভাষার প্রেক্ষিতে হাসান গারীব বলে থাকেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ বিন জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করি। সে সময় সবেমাত্র তিনি সৌচ ক্রিয়া সম্পাদন করেছেন। আমি তিনবার সালাম দেই কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না। তিনি তো বাড়ীর মধ্যেই চলে গেলেন, আমি দুঃখিত, ও মর্মাহত অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করি। অল্পক্ষণ পরেই পবিত্র হয়ে তিনি আগমন করেন এবং তিনবার সালামের জওয়াব দেন। অতঃপর বলেন, “হে আবদুল্লাহ বিন জাবির (রাঃ)! জেনে রেখো, সম্পূর্ণ কুরআনের মধ্যে সর্বোত্তম সূরা হলো (আরবী) এই সূরাটি। এর ইসনাদ খুব চমক্কার। এর বর্ণনাকারী ইবনে আকীলের হাদীস বড় বড় ইমামগণ বর্ণনা করে থাকেন। এই আবদুল্লাহ বিন জাবির বলতে আবদী সাহাবীকে (রাঃ) বুঝানো হয়েছে। ইবনুল জাওযীর কথা এটাই। আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। হাফিয ইবনে আসাকীরের (রঃ) অভিমত এই যে, ইনি হলেন আবদুল্লাহ বিন জাবির আনসারী বিয়াযী (রাঃ)। কুরআনের আয়াত ও সূরাসমূহ এবং ওগুলোর পারস্পরিক মর্যাদাএই হাদীস এবং এ ধরনের অন্যান্য হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণ বের করে ইবনে রাহ্ইয়াহ, আবু বকর বিন আরবী, ইবনুল হাযার (রঃ) প্রমুখ অধিকাংশ আলেমগণ বলেছেন যে, কোন আয়াত এবং কোন সূরা অপর কোন আয়াত ও সূরার চেয়ে বেশী মর্যাদার অধিকারী। আবার অন্য একদলের ধারণা এই যে, আল্লাহর কালাম সবই সমান। একের উপর অন্যের প্রাধান্য দিলে যে অসুবিধার সৃষ্টি হবে তা হলো অন্য আয়াত ও সূরাগুলি কম মর্যাদা সম্পন্ন রূপে পরিগণিত ও প্রতিপন্ন হবে। অথচ আল্লাহপাকের সমস্ত কালামই সমমর্যাদাপূর্ণ। কুরতুবী এটাই নকল করেছেন আশআরী, আবু বকর বাকিল্লানী, আবু হাতিম ইবনে হাব্বান কূসতী, আবু হাব্বান এবং ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া হতে। ইমাম মালিক (রঃ) হতেও এই মর্মের অন্য একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে।সূরা-ই-ফাতিহার মর্যাদার ব্যাপারে উপরোল্লিখিত হাদীসসমূহ ছাড়াও আরও হাদীস রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফের ফাযায়িলুল কুরআন অধ্যায়ে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “একবার আমরা সফরে ছিলাম। এক স্থানে আমরা অবতরণ করি। হঠাৎ একটি দাসী এসে বললোঃ “এ জায়গার গোত্রের নেতাকে সাপে কেটেছে। আমাদের লোকেরা এখন সবাই অনুপস্থিত। ঝাড় ফুক দিতে পারে এমন কেউ আপনাদের মধ্যে আছে কি? আমাদের মধ্য হতে একটি লোক তার সাথে গেল। সে যে ঝাড় ফুকও জানতো তা আমরা জানতাম না। তথায় গিয়ে সে কিছু ঝাড় ফুক করলো। আল্লাহর অপার মহিমায় তৎক্ষণাৎ সে সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করলো। অনন্তর সে ৩০টি ছাগী দিল এবং আমাদের আতিথেয়তায় অনেক দুধও পাঠিয়ে দিল। সে ফিরে আসলে আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ “তোমার কি এ বিদ্যা জানা ছিল?' সে বললোঃ 'আমিতো শুধু সূরা-ই-ফাতিহা পড়ে ফুক দিয়েছি। আমরা বললামঃ “তাহলে এ প্রাপ্ত মাল এখনও স্পর্শ করো না। প্রথমে ক্লাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করো।' মদীনায় আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এ ঘটনা আনুপূর্বিক বর্ণনা করলাম। তিনি বললেনঃ “এটা যে ফুক দেয়ার সূরা তা সে কি করে জানলো? এ মাল ভাগ করো। আমার জন্যেও একভাগ রেখো।' সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই আবি দাউদেও এ হাদীসটি রয়েছে। সহীহ মুসলিমের কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, ফুক দাতা হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) ছিলেন।সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই নাসাঈর মধ্যে হাদীস আছে যে, একদা হযরত জিব্রাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটে বসেছিলেন, এমন সময়ে উপর হতে এক বিকট শব্দ আসলো। হযরত জিব্রাঈল (আঃ) উপরের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ আজ আকাশের ঐ দরজাটি খুলে গেছে যা ইতিপূর্বে কখনও খুলেনি। অতঃপর সেখান হতে একজন ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বললেন, আপনি খুশি হোন! এমন দুটি নূর আপনাকে দেয়া হলো যা ইতিপূর্বে কাউকেও দেয়া হয়নি। তা হলো সূরা-ই-ফাতিহা ও সূরা-ই- বাকারার শেষ আয়াতগুলো। ওর এক একটি অক্ষরের উপর নূর রয়েছে। এটা সুনান-ই-নাসাঈর শব্দ। সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নামাযে উম্মুল কুরআন পড়লো না তার নামায অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ পূর্ণ নয়। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আমরা যদি ইমামের পিছনে থাকি তা হলে? তিনি বললেনঃ “তাহলেও চুপে চুপে পড়ে নিও। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি, তিনি বলতেন যে, আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ “আমি নামাযকে আমার এবং আমার বান্দার মধ্যে অর্ধ-অর্ধ করে ভাগ করেছি এবং আমার বান্দা আমার কাছে যা চায়। তা আমি তাকে দিয়ে থাকি। যখন বান্দা বলে, (আরবী) তখন আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমার বান্দা আমার প্রশংসা করলো’ বান্দা যখন বলে, (আরবী) তখন আল্লাহ বলেনঃ অর্থাৎ বান্দা আমার গুণাগুণ বর্ণনা করলো। বান্দা যখন বলে, (আরবী) তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমার বান্দা আমার মাহাত্ম্য বর্ণনা করলো।' কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেন (আরবী) অর্থাৎ ‘বান্দা আমার উপর (সবকিছু) সর্মপণ করলো। যখন বান্দা বলে (আরবী) তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা আমার ও আমার বান্দার মধ্যেকার কথা এবং আমার বান্দা আমার নিকট যা চাইবে আমি তাকে তাই দেবো' অতঃপর বান্দা শেষ পর্যন্ত পড়ে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এসব আমার বান্দার জন্যে এবং সে যা কিছু চাইলো তা সবই তার জন্য।' সুনান-ই নাসাঈর মধ্যে এই বর্ণনাটি আছে। কোন কোন বর্ণনার শব্দগুলির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই হাদীসটিকে পরিভাষা অনুযায়ী হাসান বলেছেন। আবু জারাআ' একে সঠিক বলেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেও এ হাদীসটি লম্বা ও চওড়াভাবে রয়েছে। ওর বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত উবাই বিন কা'ব (রাঃ)। ইবনে জারীরের একটি বর্ণনায় এ হাদীসটির মধ্যে এই শব্দগুলিও রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘এটা আমার জন্য যা অবশিষ্ট রয়েছে তা আমার বান্দার জন্য।' অবশ্য এ হাদীসটি এর উসূল বা মূলনীতির পরিভাষা অনুসারে গারীব বা দুর্বল। আলোচ্য হাদীসের উপকার সমূহ, তৎসম্পর্কিত আলোচনা ও ফাতিহার অন্যান্য বৈশিষ্ট্য। এখন এই হাদীসের উপকারিতা ও লাভালাভ লক্ষ্যণীয় বিষয়। প্রথমতঃ এই হাদীসের মধ্যে (আরবী) অর্থাৎ নামাযের সংযোজন রয়েছে এবং তার তাৎপর্যও ভাবার্থ হচ্ছে কিরআত। যেমন কুরআনের মধ্যে অন্যান্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ স্বীয় নামায (কিরআত) কে খুব উচ্চৈঃস্বরে পড়ো না আর খুব নিম্ন স্বরেও না, বরং মধ্যম স্বরে পড়।' (১৭:১১০) এর তাফসীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে প্রকাশ্যভাবে বর্ণিত আছে যে, এখানে (আরবী) এর অর্থ হলো কিরাআত বা কুরআন পঠন। এভাবে উপরোক্ত হাদীসে কিরাআতকে সালাত বলা হয়েছে। এতে নামাযের মধ্যে কিরাআতের যে গুরুত্ব রয়েছে তা বিলক্ষণ জানা যাচ্ছে। আরও প্রকাশ থাকে যে, কিরআত নামাযের একটি মস্তবড় স্তম্ভ (এ জন্যেই এককভাবে ইবাদতের নাম নিয়ে ওর একটি অংশ অর্থাৎ কিরা'আতকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। অপরপক্ষে এমনও হয়েছে যে, এককভাবে কিরাআতের নাম নিয়ে তার অর্থ নামায নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলার কথাঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘ফজরের কুরআনের সময় ফেরেশতাকে উপস্থিত করা হয়।' (১৭:৭৮) এখানে কুরআনের ভাবার্থ হলো নামায। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, ফজরের নামাযের সময় রাত্রি ও দিনের ফেরেশতাগণ একত্রিত হন। এই আয়াত ও হাদীসসমূহ দ্বারা বিলক্ষণ জানা গেল যে, নামাযে কিরাআত পাঠ খুবই জরুরী এবং আলেমগণও এ বিষয়ে একমত। দ্বিতীয়তঃ নামাযে সূরা-ই ফাতিহা পড়াই জরুরী কি না এবং কুরআনের মধ্য হতে যা কিছু পড়ে নেওয়াই যথেষ্ট কি না এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচরগণ বলেন যে, নির্ধারিতভাবে যে সূরা ফাতিহাই পড়তে হবে এটা জরুরী নয়। বরং কুরআনের মধ্য হতে যা কিছু পড়ে নেবে তাই যথেষ্ট। তাঁর দলীল হলো (আরবী) (৭৩:২০) এই আয়াতটি। অর্থাৎ কুরআনের মধ্য হতে যা কিছু সহজ হয় তাই পড়ে নাও।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে যে হাদীস আছে তাতে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাড়াতাড়ি নামায আদায়কারী এক ব্যক্তিকে বললেনঃ যখন তুমি নামাযের জন্যে দাঁড়াবে তখন তাকবীর বলবে এবং কুরআনের মধ্য হতে যা তোমার নিকট সহজ বোধ হবে তাই পড়বে।' তারা বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে সূরা ফাতিহা পড়ার কথা নির্দিষ্টভাবে বলেন না এবং যে কোন কিছু পড়াকেই যথেষ্ট বলে মনে করলেন। দ্বিতীয় মত এই যে, সূরা ফাতিহা পড়াই জরুরী এবং অপরিহার্য এবং তা পড়া ছাড়া নামায হয় না। অন্যান্য সমস্ত ইমামের এটাই মত। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং তাঁদের ছাত্র ও জমহুর উলামা সবারই এটাই অভিমত। এই হাদীসটি তাঁদের দলীল যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি যে কোন নামায পড়লো এবং তাতে উম্মুল কুরআন পাঠ করলো না, ঐ নামায অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ-পূর্ণ নয়। এরকমই ঐসব বুযুর্গ ব্যক্তিদের এটাও দলীল যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সূরা-ই ফাতিহা পড়ে না তার নামায হয় না।' সহীহ ইবনে খুযাইমাহ্ ও সহীহ ইবনে হিব্বানের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ নামায হয় না যার মধ্যে উম্মুল কুরআন পড়া না হয়। এ ছাড়া আরও বহু হাদীস রয়েছে। এখানে আমাদের বিতর্কমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনার তেমন প্রয়োজন নেই। কারণ এ আলোচনা অতি ব্যাপক ও দীর্ঘ। আমরা তো সংক্ষিপ্তভাবে শুধু উপরোক্ত মনীষীর দলীলসমূহ এখানে বর্ণনা করে। দিলাম। এখন এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, ইমাম শাফিঈ (রঃ) প্রভৃতি মহান আলেমদের একটি দলের মাযহাব এটাই যে, প্রতি রাকাআতে সূরা-ই-ফাতিহা পড়া ওয়াজিব এবং অন্যান্য লোকের মতে অধিকাংশ রাকআতে পড়া ওয়াজিব। হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং বসরার অধিকাংশ লোকেই বলেন যে, নামাযসমূহের মধ্যে কোন এক রাকাআতে সূরা ফাতিহা পড়ে নেয়া ওয়াজিব। কেননা হাদীসের মধ্যে সাধারণভাবে নামাযের উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর অনুসারী সুফিয়ান সাওরী (রঃ) ও আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, ফাতিহাকেই নির্দিষ্টভাবে পড়ার কোন কথা নেই বরং অন্য কিছু পড়লেই যথেষ্ট হবে। কারণ পবিত্র কুরআনের মধ্যে (আরবী) শব্দটি রয়েছে। আল্লাহ তাআলাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। কিন্তু এটা স্মরণ রাখা উচিত যে, সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছেঃ 'যে ব্যক্তি ফরয ইত্যাদি নামাযে সূরা-ই-ফাতিহা এবং অন্য সূরা পড়লো না তার নামায হলো না। তবে অবশ্যই এ হাদীসটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এসব কথার বিস্তারিত আলোচনার জন্যে শরীয়তের আহকামের বড় বড় কিতাব রয়েছে। আল্লাহ তা'আলাই এসব ব্যাপারে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ জ্ঞানের অধিকারী।তৃতীয়তঃ মুকতাদীগণের উপর সূরা-ই-ফাতিহা পাঠ ওয়াজিব হওয়ার প্রশ্নে আলেমদের তিনটি অভিমত রয়েছে। (১) সূরা ফাতিহা পাঠ ইমামের উপর যেমন ওয়াজিব, মুকতাদির উপরও তেমনই ওয়াজিব।(২) মুকতাদির উপর কিরাআত একবারেই ওয়াজিব নয়। সূরা ফাতিহাও নয় এবং অন্য সূরাও নয়। তাদের দলীল-প্রমাণ মুসনাদ-ই-আহমাদের সেই হাদীসটি, যার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার জন্যে ইমাম রয়েছে, ইমামের কিরাআতই তার কিরাআত। কিন্তু বর্ণনাটি হাদীসের পরিভাষায় একান্ত দুর্বল এবং স্বয়ং এটা হযরত জাবিরের (রাঃ) কথা দ্বারা বর্ণিত আছে। যদিও এই মারফু (যে হাদীসের সনদ রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্যন্ত পৌছেছে অর্থাৎ স্বয়ং তাঁর হাদীস বলে সাব্যস্ত হয়েছে তাকে মারফু হাদীস বলে) হাদীসটির অন্যান্য সনদও রয়েছে, কিন্তু কোন সনদই অভ্রান্ত ও সঠিক নয়। অবশ্য আল্লাহই এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জানেন। (৩) যে নামাযে ইমাম আস্তে কিরাআত পড়েন তাতে তো মুকতাদির উপর কিরাআত পাঠ ওয়াজিব, কিন্তু যে নামাযে উচ্চৈঃস্বরে কিরআত পড়া হয় তাতে ওয়াজিব নয়। তাদের দলীল প্রমাণ হচ্ছে সহীহ মুসলিমের হাদীসটি। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অনুসরণ করার জন্যে ইমাম নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁর তাকবীরের পরে তাকবীর বল এবং যখন তিনি পাঠ করেন তখন তোমরা চুপ থাক।' সুনানের মধ্যেও এই হাদীসটি রয়েছে। ইমাম মুসলিম (রঃ) এর বিশুদ্ধতা স্বীকার করেছেন। ইমাম শাফিঈরও (রঃ) প্রথম মত এটাই এবং ইমাম আহমদ (রঃ) হতেও এরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে। এই সব মাসয়ালা এখানে বর্ণনা করার আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, সূরা-ই ফাতিহার সঙ্গে শরীয়তের নির্দেশাবলীর যতটা সম্পর্ক রয়েছে অন্য কোন সূরার সঙ্গে ততটা সম্পর্ক নেই। মুসনাদ-ই-বাজ্জাজের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'যখন তোমরা বিছানায় শয়ন কর তখন যদি সূরা-ই-ফাতিহা এবং (আরবী) সূরা পড়ে নাও, তাহলে মৃত্যু ছাড়া প্রত্যেক জিনিস হতে নিরাপদে থাকবে।' ইসতি‘আযাহ বা (আরবী) ‘আউযুবিল্লাহ’-এর তাফসীর এবং তার আহকাম ও নির্দেশাবলী পবিত্র কুরআনে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ক্ষমা করে দেয়ার অভ্যাস কর, ভাল কাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খদের দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নাও, যদি শয়তানের কোন কুমন্ত্রণা এসে যায় তবে সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।' (৭:১৯৯-২০০) অন্য এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘অমঙ্গলকে মঙ্গলের দ্বারা প্রতিহত কর, তারা যা কিছু বর্ণনা করছে তা আমি খুব ভালভাবে জানি। বলতে থাক-হে আল্লাহ! শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং তাদের উপস্থিতি হতে আমরা আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।' (২৩:৯৬-৯৮)অন্য এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘অমঙ্গলকে মঙ্গল দ্বারা পতিহত কর, তাহলে তোমার এবং অন্যের মধ্যে শক্রতা রয়েছে তা এমন হবে যে, যেন সে অকৃত্রিম সাহায্যকারী বন্ধু'। (৪১:৩৪) এ কাজটি ধৈর্যশীল ও ভাগ্যবান ব্যক্তিদের জন্যে। অর্থাৎ যখন কুমন্ত্রণা এসে পড়ে তখন সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।এই মর্মে এই তিনটিই আয়াত আছে এবং এই অর্থের অন্য কোন আয়াত নেই। আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতসমূহের মাধ্যমে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, মানুষের শক্রতার সবচাইতে ভাল ঔষুধ হলো প্রতিদানে তাদের সঙ্গে সৎ ব্যবহার করা। এরূপ করলে তারা তখন শত্রুতা করা থেকেই বিরত থাকবেন না, বরং অকৃত্রিম বন্ধুতে পরিণত হবে। আর শয়তানদের শত্রুতা হতে নিরাপত্তার জন্যে আল্লাহ তারই নিকট আশ্রয় চাইতে বলছেন। কেননা এই শয়তানরূপী অপবিত্র শক্রদেরকে উত্তম ব্যবহারের দ্বারাও আয়ত্তে আনা কখনো সম্ভব নয়। কারণ সে। মানুষের বিনাশ ও ধ্বংসের মধ্যে আমোদ পায় এবং তার পুরাতন শক্রতা হযরত হাওয়া ও হযরত আদম (আঃ)-এর সময় হতেই অব্যাহত রয়েছে। কুরআন ঘোষণা করছেঃ “হে আদমের সন্তানেরা! তোমাদেরকে যেন এই শয়তান পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত না করে ফেলে, যেমন তোমাদের বাপ-মাকে পথভ্রষ্ট করে। চির সুখের জান্নাত হতে বের করে দিয়েছিল। অন্য স্থানে বলা হচ্ছেঃ ‘শয়তান তোমাদের শত্রু, তাকে শত্রুই মনে কর। তার দলের তো এটাই কামনা যে তোমরা দোযখবাসী হয়ে যাও। কি! আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানের সঙ্গে এবং তার সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছো? তারা তো তোমাদের পরম শত্রু। জেনে রেখো যে, অত্যাচারীদের জন্যে জঘন্য প্রতিদান রয়েছে। এতো সেই শয়তান যে আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)কে বলেছিলঃ “আমি তোমার একান্ত শুভাকাংখী। তা হলে চিন্তার বিষয় যে, আমাদের সঙ্গে তার চালচলন কি হতে পারে? আমাদের জন্যেই তো সে শপথ করে বলেছিলঃ মহা সম্মানিত আল্লাহর শপথ! আমি তাদেরকে বিপথে নিয়ে যাবো। তবে হ্যা, যারা তার খাটি বান্দা তারা নিরাপদে থাকবে। এ জন্যে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা কুরআন পাঠের সময় বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর।' (১৬:৯৮) ঈমানদারগণ ও প্রভুর উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের উপরে তার কোন ক্ষমতাই নেই। আর ক্ষমতা তো শুধু তাদের উপরই রয়েছে যারা তার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে এবং আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে শিরক করে থাকে। কারীদের একটি দল ও অন্যেরা বলে থাকেন যে, কুরআন পাঠের পর (আরবী) পড়া উচিত। এতে দু'টি উপকার রয়েছে। এক তো হলোঃ কুরআনের বর্ণনারীতির উপর আমল এবং দ্বিতীয় হলোঃ ইবাদত শেষে অহংকার দমন। আবু হাতিম সিজিসতানী এবং ইবনে ফাল্ফা হামযার এই নীতিই নকল করেছেন। যেমন আরুল কাসিম ইউসুফ বিন আলী বিন জানাদাহ (রঃ) স্বীয় কিতাব “আল ইবাদাতুল কামিল’-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। কিন্তু হাদীসের পরিভাষায় এর ইসনাদ গারীব। ইমাম যারী (রঃ) স্বীয় তাফসীরের মধ্যে এটা নকল করেছেন এবং বলেছেন যে, ইবরাহীম নাখয়ী (রঃ) ও দাউদ যাহেরীরও (রঃ) এই অভিমত। কুরতুবী (রঃ) ইমাম মালিকের (রঃ) মাযহাবও এটাই বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ইবনুল আরাবী একে গারীব বলে থাকেন। একটি মাযহাব এরূপ আছে যে, প্রথমে ও শেষে এই দু’বার (আরবী) পড়া উচিত। তাহলে দুটি দলীলই একত্রিত হয়ে যাবে। জমহুর উলামার প্রসিদ্ধ মাযহাব এই যে, কুরআন পাঠের পূর্বে (আরবি) পাঠ করা উচিত, তাহলে কুমন্ত্রণা হতে রক্ষা পাওয়া যাবে। সুতরাং ঐ বুযুর্গদের নিকট আয়াতের অর্থ হবেঃ “যখন তুমি পড়বে অর্থাৎ তুমি পড়ার ইচ্ছা করবে। যেমন নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তুমি নামায পড়ার জন্যে দাঁড়াও" (তবে ওযু করে নাও)-এর অর্থ হলোঃ যখন তুমি নামাযের জন্য দাঁড়াবার ইচ্ছা কর।' হাদীসগুলোর ধারা অনুসারে এই অর্থটিই সঠিক বলে মনে হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে আছে যে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মামাযের জন্য দাঁড়াতেন তখন (আরবী) বলে নামায আরম্ভ করতেন অতঃপর, (আরবী) তিনবার পড়ে (আরবী) ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ পড়তেন। তারপর পড়তেনঃ (আরবী) সুনান-ই-আরবার মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এই অধ্যায়ে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ-হাদীস এটাই। (আরবী) শব্দের অর্থ হলো গলা টিপে ধরা, (আরবী) শব্দের অর্থ হলো অহংকার এবং (আরবী) শব্দের অর্থ হলো কবিতা পাঠ। ইবনে মাজা (রঃ) স্বীয় সুনানে এই অর্থ বর্ণনা করেছেন। তাতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে প্রবেশ করেই তিনবার। (আরবী) তিনবার এবং তিনবার (আরবী) পাঠ করতেন। অতঃপর (আরবী) পড়তেন। সুনান-ই-ইবনে মাজাতেও অন্য সনদে এই হাদীসটি সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে। মুসনাদ-ই- আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার (আরবী) তাকবীর বলতেন। অতঃপর (আরবী) তিনবার বলতেন। অতঃপর (আরবী) শেষ পর্যন্ত পড়তেন। মুসনাদে-ই-আবি ইয়ালার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সামনে দুটি লোকের ঝগড়া বেধে যায়। ক্রোধে একজনের নাসারন্ধ্র ফুলে উঠে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি লোকটি (আরবী) পড়ে নেয় তবে তার ক্রোধ এখনই ঠাণ্ডা ও স্তিমিত হয়ে যাবে।' ইমাম নাসাঈ (রঃ) স্বীয় কিতাব (আরবী)-এর মধ্যেও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামেউত তিরমিযীর মধ্যেও হাদীসটি রয়েছে; একটি বর্ণনায় আরও একটু বেশী আছে, তা এই যে, হযরত মুআয (রাঃ) লোকটাকে তা পড়তে বলেন। কিন্তু সে তা পড়লো না এবং ক্রোধ উত্তরোত্তর বেড়েই চললো। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এই বৃদ্ধি যুক্ত বর্ণনাটি মুরসাল। কেননা আবদুর রহমান বিন আবু লাইলা, যিনি হযরত মুআ (রাঃ) হতে সেটি বর্ণনা করেছেন, হযরত মুআযের (রাঃ) সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হওয়াই সাব্যস্ত হয় না। কারণ তিনি বিশ বছর পূর্বে নশ্বর দুনিয়া হতে বিদায় নিয়েছিলেন। কিন্তু হতে পারে যে, হয়তো আবদুর রহমান হযরত উবাই বিন কাব (রাঃ) হতে ওটা শুনেছেন। তিনিও এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী এবং তিনি ওটাকে হযরত মুআয পর্যন্ত পৌছিয়ে দিয়েছেন। কেননা, এ ঘটনার সময় তো বহু সাহাবী (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনান-ই- আবি দাউদ এবং সুনা-ই-নাসাঈর মধ্যেও বিভিন্ন সনদে এবং বিভিন্ন শব্দে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। এ সম্পর্কে আরও হাদীস রয়েছে। এখানে সমস্ত কিছু বর্ণনা করলে আলোচনা খুব দীর্ঘায়িত হয়ে যাবে। এ সবের বর্ণনার জন্য যিকর, ওযীফা এবং আমলের বহু কিতাব রয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাই খুব বেশী জানেন। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জিব্রাঈল (আঃ) সর্বপ্রথম যখন প্রত্যাদেশ নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন তখন প্রথমে (আরবী) পড়ার নির্দেশ দেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, প্রথম দফায় হযরত জিব্রাঈল (আঃ) হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর নিকট ওয়াহী এনে বলেনঃ “আঊযু পড়ুন।' তিনি পাঠ (আরবী) করেন। হযরত জিব্রাঈল (আঃ) পুনরায় বলেনঃ (আরবী) পাঠ করুন। তারপরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন আপনার সেই প্রভুর নামে পাঠ করুন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন যে, সর্বপ্রথম সূরা-যা আল্লাহ তা'আলা হযরত জিব্রাঈলের (আঃ) মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ (রাঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেন তা এটাই। কিন্তু হাদীসটি গারীব এবং এর সনদের মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে। শুধু জেনে রাখার জন্যেই এখানে এটা বর্ণনা করলাম। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন। ‘মাসআলাহ’ বা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য বিষয়ঃ জামহুর উলামার মতে ‘ইসতি‘আযাহু’ বা ‘আঊযুবিল্লাহ' পড়া মুসতাহাব, ওয়াজিব নয়। সুতরাং তা না পড়লে পাপ হবে না। আ’তা বিন আবি রিবাহের (রঃ) অভিমত এই যে, কুরআন পাঠের সময় আঊযু পড়া ওয়াজিব-নামাযের মধ্যেই হোক বা নামাযের বাইরেই হোক। ইমাম রাযী (রঃ) এই কথাটি নকল করেছেন। ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, জীবনে একবার মাত্র পড়লেই কর্তব্য পালন হয়ে যাবে। হযরত আতার (রঃ) কথার দলীল প্রমাণ হলো আয়াতের প্রকাশ্য শব্দগুলো। কেননা, এতে (আরবি) শব্দটি ‘আমর’ বা নির্দেশ সূচক ক্রিয়াপদ। আর আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী আমর’ অবশ্যকরণীয় কার্যের জন্যেই ব্যবহৃত হয়। ঠিক দ্রুপ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সদা সর্বদা এর উপর আমলও তা অবশ্যকরণীয় হওয়ার দলীল। এর দ্বারা শয়তানের দুষ্টুমি ও দুস্কৃতি দূর হয় এবং তা দূর হওয়াও একরূপ ওয়াজিব। আর যা দ্বারা ওয়াজিব পূর্ণ হয় সেটাও ওয়াজিব হয়ে দাঁড়ায়। আশ্রয় প্রার্থনা অধিক সতর্কতা বিশিষ্ট হয়ে থাকে এবং অবশ্যকরণীয় কাজের এটাও একটা পন্থা বটে। কোন কোন আলেমের কথা এই যে, “আউযু' পাঠ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপরই ওয়াজিব ছিল, তার উম্মতের উপর ওয়াজিব নয়। ইমাম মালিক (রঃ) হতে এটাও বর্ণনা করা হয় যে, ফরয নামাযের নয় বরং রামাযান শরীফের প্রথম রাত্রির নামাযে ‘আউযু' পড়া উচিত। জিজ্ঞাস্যঃ ইমাম শাফিঈ (রঃ) স্বীয় ইমলা’র মধ্যে লিখেছেন যে, আউযুবিল্লাহ জোরে সশব্দে পড়তে হবে কিন্তু আস্তে পড়লেও তেমন কোন দোষ নেই। ইমাম শাফিঈ (রঃ) স্বীয় কিতাবুল উম্ম’ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থে লিখেছেন যে, জোরে ও আস্তে উভয়ভাবেই পড়ার অধিকার রয়েছে। কারণ হযরত ইবনে উমর (রঃ) হতে ধীরে পড়ার এবং হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে উচ্চৈঃস্বরে পড়ার কথা সাব্যস্ত আছে। প্রথম রাকআত ছাড়া অন্যান্য রাকআতে আউযুবিল্লাহ পড়ার ব্যাপারে ইমাম শাফিঈর (রঃ) দু’টি মত রয়েছে। প্রথমটি মুসতাহাব হওয়ার এবং দ্বিতীয়টি মুসতাহাব না হওয়ার। প্রাধান্য দ্বিতীয় মতের উপরই রয়েছে। আল্লাহ তা'আলাই সঠিক ও সুষ্ঠু জ্ঞানের অধিকারী। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম আবু হানীফার (রঃ) নিকট শুধু (আরবি) পড়াই যথেষ্ট। কিন্তু কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) পড়তে হবে। আবার কেউ বলেনঃ (আরবি) পাঠ করতে হবে। সাওরী (রঃ) এবং আওযায়ীর (রঃ) এটাই মাযহাব। কেউ কেউ আবার বলেন যে, (আরবি) পড়তে হবে। তা হলে আয়াতের সমস্ত শব্দের উপর আমল হয়ে যাবে এবং তার সাথে হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) হাদীসের উপর আমল করা হবে। একথা পূর্বেও বলা হয়েছে। কিন্তু এ প্রসঙ্গে যেসব বিশুদ্ধ হাদীস ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে ঐগুলোই অনুসরণের পক্ষে সর্বোত্তম। আল্লাহ তাআলাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন।ইমাম আবু হানিফা (রঃ) ও ইমাম মুহাম্মাদের (রঃ) মতে নামাযের মধ্যে আউযুবিল্লাহ পড়া হয় তিলাওয়াতের জন্য। আর ইমাম আবু ইউসুফের (রঃ) মতে নামাযের জন্য পাঠ করা হয়। সুতরাং মুকতাদীরও পড়ে নেয়া উচিত যদিও সে কিরআত পড়ে না। ঈদের নামাযেও প্রথম তাকবীরের পর পড়ে নেয়া দরকার। জমহুরের মাযহাব এই যে, ঈদের নামাযে সমস্ত তাকবীর বলার পর আউযুবিল্লাহ পড়তে হবে, তারপর কিরআত পড়তে হবে। আউযুবিল্লাহের মধ্যে রয়েছে বিস্ময়কর উপকার ও মাহাত্ম্য। আজে বাজে কথা বলার ফলে মুখে যে অপবিত্রতা আসে তা বিদূরিত হয়। ঠিক দ্রুপ এর দ্বারা মহান আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা হয় এবং তার ব্যাপক ও একচ্ছত্র ক্ষমতার কথা স্বীকার করা হয়। আর আধ্যাত্মিক প্রকাশ্য শত্রুর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্বীয় দুর্বলতা ও অপারগতার কথা স্বীকার করে নেয়া হয়। কেননা মানুষ শক্রর মুকাবিলা করা যায়। অনুগ্রহ ও সদ্ব্যবহার দ্বারা তার শত্রুতা দূর করা যায়। যেমন পবিত্র কুরআনের ঐ আয়াতগুলির মধ্যে রয়েছে যেগুলি ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় আমার বিশিষ্ট বান্দাদের উপর তোমার কর্তৃত্ব চলবে না, আল্লাহর প্রতিনিধিত্বই যথেষ্ট।' (১৭:৬৫) আল্লাহ পাক ইসলামের শত্রুদের মুকাবিলায় ফেরেশতা পাঠিয়েছেন এবং তাদের গর্ব খর্ব করেছেন। এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, যে মুসলিম কাফিরের হাতে মৃত্যুবরণ করেন, তিনি শহীদ হন। যে সেই গোপনীয় শত্রু শয়তানের হাতে মারা পড়ে সে আল্লাহর দরবার থেকে হবে বহিষ্কৃত, বিতাড়িত। মুসলমানের উপর কাফিরেরা জয়যুক্ত হলে মুসলমান প্রতিদান পেয়ে থাকেন। কিন্তু যার উপর শয়তান জয়যুক্ত হয় সে ধ্বংস হয়ে যায়। শয়তান মানুষকে দেখতে পায় কিন্তু মানুষ শয়তানকে দেখতে পায় বলে কুরআন কারীমের শিক্ষা হলোঃ “তোমরা তার অনিষ্ট হতে তার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর যিনি তাকে (শয়তানকে) দেখতে পান কিন্তু সে তাঁকে দেখতে পায় না।আউযুবিল্লাহ পড়া হলো আল্লাহ তা'আলার নিকট বিনীত হয়ে প্রার্থনা করা এবং প্রত্যেক অনিষ্টকারীর অনিষ্ট হতে তার নিকট আশ্রয় চাওয়া। (আরবি)-এর অর্থ হলো অনিষ্ট দূর করা, আর (আরবি)-এর অর্থ হলো মঙ্গল ও কল্যাণ লাভ করা। এর প্রমাণ হিসেবে মুতানাব্বির এই কবিতাটি দ্রষ্টব্যঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘হে সেই পরিত্র সত্তা, যে সত্তার সাথে সাথে আমার সমুদয় আশা ভরসা বিজড়িত হয়েছে, এবং হে সেই পালনকর্তা যাঁর নিকট আমি সমস্ত অমঙ্গল থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। যা তিনি ভেঙ্গে দেন তা কেউ জোড়া দিতে পারে এবং যা তিনি জোড়া দেন তা কেউ ভাঙ্গতে পারে না। (আরবি)-এর অর্থ হলো এই যে, আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি যেন বিতাড়িত শয়তান ইহজগতে ও পরজগতে আমার কোন ক্ষতি করতে না পারে। যে নির্দেশাবলী পালনের জন্যে আমি আদিষ্ট হয়েছি তা পালনে যেন আমি বিরত না হয়ে পড়ি। আবার যা করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে তা যেন আমি করে না ফেলি। এটা তো বলাই বহুল্য যে, শয়তানের অনিষ্ট হতে একমাত্র আল্লাহ পাক ছাড়া আর কেউ রক্ষা করতে পারে না। এ জন্যে বিশ্ব প্রভু আল্লাহ মানুষরূপী শয়তানের দুষ্কার্য ও অন্যায় হতে নিরাপত্তা লাভ করার যে পন্থা শেখালেন তা হলো তাদের সঙ্গে সদাচরণ। কিন্তু জ্বিন রূপী শয়তানের দুষ্টুমি ও দুষ্কৃতি হতে রক্ষা পাওয়ার যে উপায় তিনি বলে দিলেন তা হলো তার স্বরণে আশ্রয় প্রার্থনা। কেননা, না তাকে ঘুষ দেওয়া যায়, না তার সাথে সদ্ব্যবহারের ফলে সে দুষ্টুমি হতে বিরত হয়। তার অনিষ্ট হতে তো বাঁচাতে পারেন একমাত্র আল্লাহ রাব্দুল ইযত। প্রাথমিক তিনটি আয়াতে এ বিষয় আলোচিত হয়েছে। সূরা-ইআরাফে আছেঃ (আরবি) (৭:১৯৯)। সূরা-ই-হা-মীম সেজদায় আছেঃ (আরবি) (৪১:৩৪) এবং সূরা-ই মুমেনূনে রয়েছেঃ (আরবি) (২৩:৯৬) এই তিনটি আয়াতের বিস্তারিত বর্ণনা ও অনুবাদ ইতিপূর্বেই করা হয়েছে। সুতরাং পুনরাবৃত্তির আর তেমন প্রয়োজন নেই। (আরবি) শয়তান -শব্দটির আভিধানিক বিশ্লেষণআরবী ভাষার অভিধানে (আরবি) শব্দটি (আরবি) থেকে উদগত। এর আভিধানিক অর্থ হলো দূরত্ব। যেহেতু এই মারদুদ ও অভিশপ্ত শয়তান প্রকৃতগতভাবে মানব প্রকৃতি হতে দূরে রয়েছে, বরং নিজের দুষ্কৃতির কারণে প্রত্যেক মঙ্গল ও কল্যাণ হতে দূরে আছে, তাই তাকে শয়তান বলা হয়। একথাও বলা হয়েছে যে, এটা (আরবি) হতে গঠিত হয়েছে। কেননা সে আগুন হতে সৃষ্টি হয়েছে এবং (আরবি) এর অর্থ এটাই। কেউ কেউ বলেন যে, অর্থের দিক দিয়ে দুটোই ঠিক। কিন্তু প্রথমটিই বিশুদ্ধতর। আরব কবিদের কবিতার মধ্যে এর সত্যতা প্রমাণিত হয় সর্বোতভাবে। প্রসঙ্গক্রমে কবি উমাইয়া বিন আবিসসালাতের কবিতাটি এইঃ (আরবি) অনুরূপভাবে কবি নাবেগার কবিতার মধ্যেও এ শব্দটি (আরবি) হতে গঠিত হয়েছে এবং দূর হওয়ার অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। কবি নাবেগার কবিতাটি এইঃ (আরবি) সীবাওয়াইর উক্তি আছে যে, যখন কেউ শয়তানী কাজ করে তখন আরবেরা বলেঃ (আরবি) কিন্তু (আরবি) বলে না। এ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এ শব্দটি (আরবি) হতে নয়, বরং (আরবি) হতেই নেয়া হয়েছে। এর সঠিক অর্থ হচ্ছে দূরত্ব। কোন জ্বিন, মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু দুষ্টুমি করলে তাকে শয়তান বলা হয়। কুরআন পাকে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ এভাবেই আমি মানব ও দানব শয়তানদেরকে প্রত্যেক নবীর শত্রু করেছি যারা একে অপরের নিকট প্রতারণামূলক বানানো কথা পৌছিয়ে থাকে। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু যর (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ “হে আবূ যর (রাঃ)! দানব ও মানব শয়তানগণ হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর। আমি বলি, মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে? তিনি বলেনঃ হাঁ। সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু যর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ স্ত্রীলোক, গাধা এবং কালো কুকুর নামায ভেঙ্গে নষ্ট করে দেয়। তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লাল, হলদে কুকুর হতে কালো কুকুরকে স্বতন্ত্র করার কারণ ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ কালো কুকুর শয়তান।হযরত যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি তার পিতা হতে বর্ণনা করেনঃ হযরত উমার (রাঃ) একবার তকী ঘোড়ার উপরে আরোহণ করেন। ঘোড়াটির সগর্বে চলতে থাকে। হযরত উমার ঘোড়াটিকে মারপিটও করতে থাকেন। কিন্তু ওর সদর্প চাল আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি নেমে পড়েন এবং বলেনঃ তুমি তো আমার আরোহণের জন্যে কোন শয়তানকে ধরে এনেছ! আমার মনে অহংকারের ভাব এসে গেছে। সুতরাং আমি নেমে পড়াই ভাল মনে করলাম।' (আরবি) শব্দটি - (আরবি) এর ওজনে (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সে মারদুদ বা বিতাড়িত। অর্থাৎ প্রত্যেক মঙ্গল হতে সে দূরে আছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অবশ্যই আমি দুনিয়ার আকাশকে তারকারাজি দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং ওগুলোকে শয়তানদের তাড়ন করেছি। তারা বড় বড় ফেরেশতাদের কথা শুনতে পায় না এবং তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য চতুর্দিক হতে মারা হয়, আর তাদের জন্যে চিরস্থায়ী শাস্তি রয়েছে। তাদের মধ্য হতে কেউ কোন কথা ছোঁ মেরে নিয়ে পালালে একটা উজ্জ্বল অগ্নিশিখা তার পিছনে ধাওয়া করে। অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘আকাশে আমি স্তম্ভ তৈরী করেছি এবং দর্শকদের জন্যে একে প্রত্যেক বিতাড়িত শয়তান হতে নিরাপদ করেছি। কিন্তু কেউ কোন কথা চুরি করে নিয়ে যায় তখন একটা উজ্জ্বল আলোক শিখা তার পিছু ধাওয়া করে।' (১৫:১৬-১৮) এরকম আরও বহু আয়াত রয়েছে (আরবি) এর একটা অর্থ (আরবি) ও করা হয়েছে। যেহেতু শয়তান মানুষকে কুমন্ত্রণা এবং ভ্রান্তির দ্বারা রজম করে থাকে এ জন্যে তাকে ‘রাজীম' অর্থাৎ ‘রাজেম' বলা হয়। অতীব মেহেরবান পরম করুণাময় আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি। সকল সাহাবী (রাঃ) আল্লাহর কিতাব কুরআন মজীদকে বিসমিল্লাহর দ্বারাই আরম্ভ করেছেন। আলেমগণ এ বিষয়ে একমত যে, সূরা-ই-নামল'-এর এটা একটা আয়াত। তবে এটা প্রত্যেক সূরার প্রারম্ভে একটা পৃথক আয়াত কি-না, বা প্রত্যেক সূরার একটা আয়াতের অংশ বিশেষ কি-না, কিংবা এটা কি শুধুমাত্র সূরা-ই-ফাতিহারই আয়াত-অন্য সূরার নয়, কিংবা এক সূরাকে অন্য সূরা হতে পৃথক করার জন্যেই কি একে লিখা হয়েছে এবং এটা আয়াত নয়, এ সব বিষয়ে বেশ মতভেদ রয়েছে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যুগের আলেমগণের মধ্যে এ ব্যাপারে মতবিরোধ চলে আসছে এবং আপন স্থানে এর বিস্তারিত বিবরণও রয়েছে। সুনান-ই-আবি দাউদে সহীহ সনদের সঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে এক সূরাকে অন্য সূরা হতে অনায়াসে পৃথক করতে পারতেন না। ‘মুসতাদরিক-ই-হাকিমের মধ্যেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। একটা মুরসাল হাদীসে হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রাঃ) হতেও হাদীসটি রেওয়ায়িত করা হয়েছে। সহীহ ইবনে খুযাইমার মধ্যে হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) “বিসমিল্লাহ'-কে সূরা-ই-ফাতিহার পূর্বে নামাযে পড়েছেন এবং তাকে একটা পৃথক আয়াতরূপে গণনা করেছেন। কিন্তু এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী উমার বিন হারূন বালখী উসূলে হাদীসের পরিভাষায় দুর্বল। এর অনুসরণে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেও একটা হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং অনুরূপভাবে হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ হতেও বর্ণিত আছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ), হযরত আতা' (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত মাকহুল (রঃ) এবং হযরত যুহরীর (রঃ) এটাই নীতি ও অভিমত যে, ‘বিসমিল্লাহ' সূরা-ই-বারাআত' ছাড়া কুরআনের প্রত্যেক সূরারই একটা পৃথক আয়াত। এসব সাহাবী (রাঃ) ও তাবেঈ (রঃ) ছাড়াও হযরত আবদুল্লাহ বিন মুবারক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদের (রঃ) একটি কাওলে এবং ইসহাক বিন রাহওয়াহ (রঃ) ও আবু উবাইদ কাসিম বিন সালামেরও (রঃ) এটাই মাযহাব। তবে ইমাম মালিক (রঃ) এবং ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ও তাঁদের সহচরগণ বলেন যে, ‘বিসমিল্লাহ' সূরা-ই-ফাতিহারও আয়াত নয় বা অন্য কোন সূরারও আয়াত নয়।ইমাম শাফিঈর (রঃ) একটি কাওল এই যে, এটা সূরা-ই-ফাতিহার একটি আয়াত বটে কিন্তু অন্য কোন সূরার আয়াত নয়। তার একটা কাওল এও আছে যে, এটা প্রত্যেক সূরার প্রথম আয়াতের অংশ বিশেষ। কিন্তু হাদীসের পরিভাষায় এই দুই কাওল বা উক্তিই হচ্ছে গারীব। দাউদ (রঃ) বলেন যে, এটা প্রত্যেক সূরার প্রথমে একটা পৃথক আয়াত-সূরার অন্তর্ভুক্ত নয়। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে এবং আবু বকর রাযী, আবু হাসান কুরখীরও এ মাযহাবই বর্ণনা করেছেন। তিনি ইমাম আবু হানীফার (রঃ) একজন বড় মর্যাদাসম্পন্ন সহচর। এ হল বিসমিল্লাহর সূরা-ই-ফাতিহার আয়াত হওয়া না হওয়ার আলেচনা। এখন একে উচ্চৈঃস্বরে পড়তে হবে না নিম্নস্বরে এ নিয়েও মতভেদের অবকাশ রয়েছে। যারা একে সূরা-ই-ফাতিহার পৃথক একটা আয়াত মনে করেন তারা একে নিম্নস্বরে পড়ার পক্ষপাতি। এখন অবশিষ্ট রইলেন শুধু ঐ সব লোক যাঁরা বলেন যে, এটা প্রত্যেক সূরার প্রথম। তাঁদের মধ্যেও আবার মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফিঈর (রঃ) মাযহাব এই যে, সূরাই-ফাতিহা ও প্রত্যেক সূরার পূর্বে একে উচ্চৈঃস্বরে পড়তে হবে। সাহাবা (রাঃ), তাবেঈন (রঃ) এবং মুসলমানদের পূর্ববর্তী যুগের ইমামগণের এটাই মাযহাব। সাহাবীগণের (রাঃ) মধ্যে একে উচ্চৈঃস্বরে পড়ার পক্ষপাতি হলেন হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুআবিয়া (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উসমান (রাঃ)। হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উসমান (রাঃ) হতেও গারীব বা দুর্বল সনদে ইমাম খতীব (রঃ) এটা নকল করেছেন। বায়হাকী (রঃ) ও ইবনে আবদুল বারী (রঃ) হযরত উমার (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) হতেও এটা বর্ণনা করেছেন। তাবেঈগণের মধ্যে হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত আবু কালাবাহ (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ), হযরত আলী বিন হাসান (রঃ), তাঁর ছেলে মুহাম্মদ সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), আতা’ (রঃ), তাউস (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), সা'লিম (রঃ), মুহাম্মদ বিন কা'ব কারজী (রঃ), উবাইদ (রঃ), আবূ বকর বিন মুহাম্মদ বিন আমর (রঃ), ইবনে হারাম আবূ ওয়ায়েল (রঃ), ইবনে সীরীন (রঃ), মুহাম্মদ বিন মুনকাদির (র), আলী বিন আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রঃ), তাঁর ছেলে মুহাম্মদ নাফি, ইবনে উমারের (রাঃ) গোলাম (রঃ), যায়েদ বিন আসলাম (রঃ), উমার বিন আবদুল আযীয (রঃ), আরযাক বিন কায়েস (রঃ), হাবীব বিন আবি সাবিত (রঃ), আবু শা’শা' (রঃ), মাকহুল (রঃ), আবদুল্লাহ বিন মুগাফফাল বিন মাকরান (রঃ), এবং বায়হাকীর বর্ণনায় আবদুল্লাহ বিন সাফওয়ান (রঃ), মুহাম্মদ বিন হানাফিয়্যাহ (রঃ) এবং আবদুল বারের বর্ণনায় আমর বিন দীনার (রঃ)। এরা সবাই নামাযের যেখানে কিরআত উচ্চৈঃস্বরে পড়া হয়, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীমকেও উচ্চ শব্দে পড়তেন। এর একটি প্রধান দলীল এই যে, এটা যখন সূরা ই ফাতিহারই একটা আয়াত তখন পূর্ণ সূরার ন্যায় একে উচ্চৈঃস্বরে পড়তে হবে। তাছাড়া সুনান-ই-নাসাঈ, সহীহ ইবনে খুযাইমা, সহীহ ইবনে হিব্বান, মুসতাদরিক-ই- হাকিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) নামায পড়লেন এবং কিরাআতে উচ্চ শব্দে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়লেন এবং নামায শেষে বললেনঃ “তোমাদের সবার চাইতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামাযের সঙ্গে আমার নামাযেরই সামঞ্জস্য বেশী। দারকুতনী, খাতীব এবং বায়হাকী প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। সুনান-ই-আবি দাউদ ও জামেউত তিরমিযীর মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' দ্বারা নামায আরম্ভ করতেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, হাদীসটি খুব সঠিক নয়। মুসতাদরিক-ই-হাকিমের মধ্যে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীমকে ' উচ্চৈঃস্বরে পড়তেন। ইমাম হাকীম (রঃ) এ হাদীসকে সঠিক বলেছেন। সহীহ বুখারীতে আছে যে, হযরত আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরাআত কিরূপ ছিল? তিনি বললেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক খাড়া শব্দকে লম্বা করে পড়তেন। অতঃপর তিনি (আরবি) পাঠ করে শুনালেন এবং বললেন (আরবি)-কে মদ (লম্বা) করেছেন (আরবি)-এর উপর মদ করেছেন ও (আরবি)-এর উপর মদ করেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সুনান-ই-আবি দাউদ, সহীহ ইবনে খুযাইমা এবং মুসতাদরিক-ই-হাকিমে হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক আয়াত শেষে থামতেন এবং তাঁর কিরাআত পৃথক পৃথক হতো। যেমন (আরবি) পড়ে থামতেন, তারপর (আরবি) পড়তেন, পুনরায় থেমে (আরবি) পড়তেন। এইভাবে তিনি পড়তেন। দারাকুতনী (রঃ) এ হাদীসটিকে সঠিক বলেছেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম হাকিম (রঃ) হয়রত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) মদীনায় নামায পড়ালেন এবং ‘বিসমিল্লাহ' পড়লেন না। সে সময় যেসব মুহাজির সাহাবী (রাঃ) উপস্থিত ছিলেন তাঁরা এতে আপত্তি জানালেন। সুতরাং তিনি পুনরায় যখন নামায পড়ানোর জন্য দাড়ালেন তখন ‘বিসমিল্লাহ' পাঠ করলেন। প্রায় নিশ্চিতরূপেই উল্লিখিত সংখ্যক হাদীস এ মাযহাবের দলীলের জন্যে যথেষ্ট। এখন বাকী থাকলে তাদের বিপক্ষের হাদীস, বর্ণনা, সনদ, দুর্বলতা ইত্যাদি। ওগুলোর জন্যে অন্য জায়গা রয়েছে।দ্বিতীয় মাযহাব এই যে, ‘বিসমিল্লাহ’ জোরে পড়তে হবে না। খলীফা চতুষ্টয়, আবদুল্লাহ বিন মুগাফফাল, তাবেঈন ও পরবর্তী যুগের দলসমূহ হতে এটা সাব্যস্ত আছে। আবূ হানীফা (রঃ), সাওরী (রঃ) এবং আহমদ বিন হাম্বলের (রঃ) এটাই মাযহাব। ইমাম মালিকের (রঃ) মাযহাব এই যে, ‘বিসমিল্লাহ' পড়তেই হবে না, জোরেও নয়, আস্তেও নয়। তাঁর প্রথম দলীল তো সহীহ মুসলিমের হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি যাতে রয়েছে যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযকে তাকবীর ও কিরাআতকে (আরবি) দ্বারা শুরু করতেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে আছে যে, হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ ‘আমি নবী (সঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ) এবং হযরত উসমানের (রাঃ) পিছনে নামায পড়েছি। তারা সবাই (আরবি) দ্বারা নামায আরম্ভ করতেন। সহীহ মুসলিমের মধ্যে আছে যে, বিসমিল্লাহ বলতেন না। কিরাআতের প্রথমেও না, শেষেও না। সুনানের মধ্যে হযরত মাগফাল (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। এ হলো ঐসব ইমামের ‘বিসমিল্লাহ' আস্তে পড়ার দলীল। এ প্রসঙ্গে এটাও স্মর্তব্য যে, এ কোন বড় রকমের মতভেদ নয়। প্রত্যেক দলই অন্য দলের নামাযকে শুদ্ধ বলে থাকেন।বিসমিল্লাহ’র ফযীলতের বর্ণনাতাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত উসমান বিন আফফান (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে ‘বিসমিল্লাহ' সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “এ তো আল্লাহ তাআলার নাম। আল্লাহর বড় নাম এবং এই বিসমিল্লাহর মধ্যে এতদুর নৈকট্য রয়েছে যেমন রয়েছে চক্ষুর কালো অংশও সাদা অংশের মধ্যে।” ইবনে মরদুওয়াইর (রঃ) তাফসীরের মধ্যেও এরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে মরদুওয়াই'-এর মধ্যে এ বর্ণনাটিও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ হযরত ঈসার (আঃ) আম্মা হযরত মরঈয়াম (আঃ) যখন তাঁকে মক্তবে নিয়ে গিয়ে শিক্ষকের সামনে বসালেন তখন তাকে বললেনঃ ‘বিসমিল্লাহ' লিখুন। হযরত ঈসা (আঃ) বললেনঃ ‘বিসমিল্লাহ কি?' শিক্ষক উত্তর দিলেনঃ আমি জানি না।' তিনি বললেনঃ (আরবি)-এর ভাবার্থ হলো (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহর উচ্চতা।' (আরবি)-এর ভাবার্থ হলো (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহর আলোক। (আরবি)-এর তাৎপর্য হলো (আরবি) বা আল্লাহর রাজত্ব (আরবি) বলে উপাস্যদের উপাস্যকে। (আরবি)-বলে দুনিয়া ও আখেরাতের করুণাময় কৃপানিধানকে, এবং আখেরাতে যিনি দয়া প্রদর্শন করবেন তাকে (আরবি) বলা হয়। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যেও এ বর্ণনাটি রয়েছে। কিন্তু সনদের দিক দিয়ে তা খুবই গরীব বা দুর্বল। হতে পারে যে, এটি কোন সাহাবী (রাঃ) প্রমুখ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে কিংবা হতে পারে যে, বানী ইসরাঈলের বর্ণনাসমূহের মধ্যে এটা একটা বর্ণনা। এর মারফু হাদীস হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। অবশ্য আল্লাহ পাকই এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের একমাত্র অধিকারী। ইবনে মরদুওয়াই এর তাফসীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমার উপর এমন একটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে যার মত আয়াত হযরত সুলাইমান ছাড়া অন্য কোন নবীর উপর অবতীর্ণ হয়নি। আয়াতটি হলো ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম'।' হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন পূর্ব দিকে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, বায়ু মণ্ডলী স্তব্ধ হয়ে যায়, তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ সমুদ্র প্রশান্ত হয়ে উঠে, জন্তুগুলো কান লাগিয়ে মনোযোগ সহকারে শুনতে থাকে, আকাশ থেকে অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হয়ে শয়তানকে বিতাড়ন করে এবং বিশ্বপ্রভু স্বীয় সম্মান ও মর্যাদার কসম করে বলেনঃ “যে জিনিসের উপর আমার এ নাম নেওয়া যাবে তাতে অবশ্যই বরকত হবে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, দোযখের ১৯টি দারোগার হাত হতে যে বাঁচতে চায় সে যেন ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' পাঠ করে। এতেও ঘটেছে ১৯টি অক্ষরের সমাবেশ। প্রত্যেকটি অক্ষর প্রত্যেক ফেরেশতার জন্যে রক্ষক হিসেবে কাজ করবে। কুরতবীর সমর্থনে ইবনে আতিয়াহ্ এটা বর্ণনা করেছেন এবং এর পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি আরও একটি হাদীস এনেছেন। তাতে রয়েছেঃ “আমি স্বচক্ষে ত্রিশের বেশী ফেরেশতা দেখেছি যারা এটা নিয়ে তাড়াহুড়া করছিলেন। এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেই সময় বলেছিলেন যখন একটি লোক (আরবি) পাঠ করেছিলেন। এর মধ্যে ত্রিশের বেশী অক্ষর রয়েছে। তৎসংখ্যক ফেরেশতাও অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এ রকমই বিসমিল্লাহ’র মধ্যে উনিশটি অক্ষর আছে এবং তথায় ফেরেশতার সংখ্যাও হবে উনিশ। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর। সোয়ারীর উপর তার পিছনে যে সাহাবী (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন তাঁর বর্ণনাটি, এইঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উষ্ট্ৰীটির কিছু পদস্খলন ঘটলে আমি বললাম যে শয়তানের সর্বনাশ হোক। তখন তিনি বললেনঃ এরূপ বলো না, এতে শয়তান গর্বভরে ফুলে উঠে। এবং মনে করে যে, যেন সেইই স্বীয় শক্তির বলে ফেলে দিয়েছে। তবে হাঁ, ‘বিসমিল্লাহ' বলাতে সে মাছির মত লাঞ্ছিত ও হৃগর্ব হয়ে পড়ে।' ইমাম নাসাঈ (রঃ) স্বীয় কিতাব ‘আমালুল ইয়াওমে ওয়াল লাইলাহ' এর মধ্যে এবং ইবনে মরদুওয়াই (রঃ) স্বীয় তাফসীরের মধ্যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং সাহাবীর (রাঃ) নাম বলেছেন উসামা বিন উমায়ের (রাঃ)। আর তার মধ্যেই আছেঃ ‘বিসমিল্লাহ’ বল। এটা একমাত্র বিসমিল্লাহরই বরকত।' এ জন্যেই প্রত্যেক কাজ ও কথার প্রারম্ভে বিসমিল্লাহ বলা মুসতাহাব। খুৎবার শুরুতেও বিসমিল্লাহ বলা উচিত। হাদীসে আছে যে, বিসমিল্লাহর দ্বারা যে কাজ আরম্ভ করা না হয় তা কল্যাণহীন ও বরকতশূন্য থাকে। পায়খানায় যাওয়ার সময়ও বিসমিল্লাহ বলবে। মুসনাদ-ই- আহমাদ এবং সুনানের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ), হযরত সাঈদ বিন যায়েদ (রাঃ) এবং হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ওজুর সময় বিসমিল্লাহ বলে না তার অর্য হয় না। এ হাদীসটি হাসান বা উত্তম। কোন কোন আলেম তো অযুর সময় বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব বলে থাকেন। প্রাণী যবাই করার সময়েও বিসমিল্লাহ বলা মুসতাহাব। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং একটি দলের ধারণা এটাই। কেউ কেউ যিকিরের সময় এবং কেউ কেউ সাধারণভাবে একে ওয়াজিব বলে থাকেন। এর বিশদ বর্ণনা ইনশাআল্লাহ আবার অতি সত্বরই আসবে।ইমাম ফাখরুদ্দনি রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে এই আয়াতটির ফযীলত সম্পর্কে বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন। একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যদি তুমি তোমার স্ত্রীর নিকট গিয়ে সহমিলনের প্রাক্কালে বিসমিল্লাহ পড়ে নাও আর তাতেই যদি আল্লাহ কোন সন্তান দান করেন, তাহলে তার নিজের ও তার সমস্ত ঔরসজাত সন্তানের নিঃশ্বাসের সংখ্যার সমান পূণ্য তোমার আমলনামায় লিখা হবে। কিন্তু এ বর্ণনাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি এটা কোথাও পাইনি। খাওয়ার সময়েও বিসমিল্লাহ পড়া মুসতাহাব। সহীহ মুসলিমে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমার বিন আবু সালামাকে (রঃ) যিনি তাঁর সহধর্মিনী হযরত উম্মে সালমার (রাঃ) পূর্ব স্বামীর পুত্র ছিলেন, বলেনঃ ‘বিসমিল্লাহ বল, ডান হাতে, খাও এবং তোমার সামনের দিক থেকে খেতে থাক।' কোন কোন আলেম এ সময়েও বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব বলে থাকেন। স্ত্রীর সঙ্গে মিলনের সময়েও বিসমিল্লাহ বলা উচিত। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ স্বীয় স্ত্রীর সঙ্গে মিলনের ইচ্ছে করলে যেন সে এটা পাঠ করেঃ (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহর নামের সঙ্গে আরম্ভ করছি। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এবং যা আমাদেরকে দান করবেন তাকেও শয়তানের কবল হতে রক্ষা করুন।তিনি আরও বলেন যে, এই মিলনের ফলে যদি সে গর্ভধারণ করে তবে শয়তান সেই সন্তানের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এখান হতে এটাও জানা গেল যে, বিসমিল্লাহর, (আরবি) এর সম্পর্ক কার সঙ্গে রয়েছে। ব্যাকরণগত শব্দ বিন্যাসঃ ব্যাকরণবিদগণের এতে দু’টি মত রয়েছে। দুটোই কাছাকাছি। কেউ একে (আরবি) বলেন আবার কেউ (আরবি) বলেন। প্রত্যেকেরই দলীল প্রমাণ কুরআন থেকে পাওয়া যায়। যারা একে (আরবি)-এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে থাকেন তাঁরা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আমার আরম্ভ আল্লাহর নামের সঙ্গে। কুরআন পাকে রয়েছেঃ (১১:৪১) (আরবি) এ আয়াতে (আরবি) অর্থাৎ (আরবি) প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে। আর যারা একে (আরবি)-এর সঙ্গে উহ্য বলে থাকেন সে (আরবি) ই হোক বা (আরবি) ই হোক, যেমন এবং (আরবি) তাদের দলীল হচ্ছে কুরআন কারীমের এই নিরূপ আয়াতটিঃ (আরবি) প্রকৃতপক্ষে দুটোই সঠিক ও শুদ্ধ। কেননা, (আরবি) এর জন্যেও (আরবি) হওয়া জরুরী। তাহলে এটা ইচ্ছাধীন রয়েছে যে, (আরবি) কে উহ্য মনে করা হোক এবং ওর (আরবি) কে সেই (আরবি) অনুসারে দাঁড় করানো হোক যার নাম পূর্বে নেয়া হয়েছে। দাঁড়ান হোক, বসা হোক, খানাপিনা হোক, কুরআন পাঠ হোক বা অযু ও নামায ইত্যাদি হোক, এসবের প্রথমে বরকত লাভের উদ্দেশ্যে সাহায্য চাওয়ার জন্যে এবং প্রার্থনা মঞ্জুরীর জন্যে আল্লাহর নাম নেয়া ইসলামী শরীয়তের একটি বিধান। আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচাইতে ভাল জানেন। ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতিমের তাফসীর ও মুসনাদে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সর্বপ্রথম যখন হযরত জিব্রাঈল (আঃ) হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর নিকট ওয়াহী নিয়ে আসেন তখন বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! বলুন– (আরবি) আবার বলুনঃ (আরবি)উদ্দেশ্য ছিল যেন উঠা, বসা, পড়া, খাওয়া সব কিছুই আল্লাহর নামে আরম্ভ হয়। (আরবি) ইসম শব্দটির তাহকীকঃ (আরবি) অর্থাৎ নামটাই কি ‘মুসাম্মা’ অর্থাৎ নামযুক্ত না অন্য কিছু? এ ব্যাপারে তিন দল আলিমের তিন রকম উক্তি রয়েছে। প্রথম এই যে, নামটাই হচ্ছে মুসাম্মা বা নামযুক্ত। আবু উবাইদাহ এবং সিবওয়াইয়ের কথা এটাই। বাকিল্লানী এবং ইবনে ফুরকও এটাই পছন্দ করেন। মুহাম্মদ ইবনে উমর ইবনে খাতীব রাজী স্বীয় তাফসীরের সূচনায় লিখেছেনঃ “হাসভিয়্যাহ কারামিয়্যাহ এবং আশরিয়্যাহগণ বলেন যে, (আরবি) হলো (আরবি) কিন্তু (আরবি) হতে পৃথক এবং মুতাযিলারা বলেন যে, (আরবি) হলো (আরবি) হতে আলাদা। আমাদের মতে টা দু'টো থেকেই আলাদা। আমরা বলি যে, যদি (আরবি)-এর উদ্দেশ্যে (আরবি) হয় যা শব্দসমূহের অংশ বা অক্ষরসমূহের সমষ্টি, তবে তো এটা অবশ্যম্ভাবীরূপে সাব্যস্ত হয় যে, (আরবি) এটা হতে পৃথক। আর যদি (আরবি) হতে উদ্দেশ্য হয় (আরবি) তবে তো এ একটা স্পষ্টকে স্পষ্ট করার কাজ যা শুধু নিরর্থক ও বাজে কাজেরই নামান্তর। সুতরাং এটা সুস্পষ্ট কথা যে, বাজে আলোচনায় সময়ের অপচয় একটা নিছক অনর্থক কাজ। অতঃপর (আরবি) ও (আরবি) কে পৃথকীকরণের উপর দলীল প্রমাণ আনা হয়েছে যে, কখনও (আরবি) হয় কিন্তু (আরবি) মোটেই হয় না। যেমন (আরবি) বা অস্তিত্বহীন শব্দটি। কখনও আবার একটি (আরবি) কয়েকটি (আরবি) হয়। যেমন (আরবি) বা একার্থবোধক শব্দ। আবার কখনও (আরবি) একটি হয় এবং (আরবি) হয় কয়েকটি। যেমন (আরবি), সুতরাং বুঝা গেল যে, (আরবি) ও (আরবি) এক জিনিস নয়। অর্থাৎ নাম এক জিনিস এবং ‘মুসাম্মা’ বা নামধারী অন্য জিনিস। কারণ (আরবি) যদি (আরবি) কেই ধরা হয় তবে আগুনের নাম নেয়া মাত্রই তার দাহন ও গরম অনুভূত হওয়া উচিত এবং বরফের নাম নিলেই ঠাণ্ডা অনুভূত হওয়া। দরকার। অথচ কোন জ্ঞানীই একথা বলেন না-বলতে পারেন না। এর দলীল প্রমাণ এই যে, আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহর অনেক উত্তম নাম রয়েছে, তোমরা ঐসব নাম দ্বারা আল্লাহকে ডাকতে থাক। হাদীস শরীফে আছে যে, আল্লাহ তা'আলার ৯৯টা নাম আছে। তাহলে চিন্তার বিষয় যে, নাম কত বেশী আছে। অথচ (আরবি) একটিই এবং তিনি হলেন অংশীবিহীন এক অদ্বিতীয় আল্লাহ। এরকমই (আরবি) কে এ আয়াতে (আরবি)-এর দিকে সম্বন্ধ লাগান হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি) ইত্যাদি। (আরবি)-ও এটাই চায় যে, (আরবি) ও (আরবি) অর্থাৎ নাম ও নামধারী আলাদা জিনিস। কারণ (আরবি) দ্বারা সম্পূর্ণ অন্য এক বিরোধী বস্তুকে বুঝায়। এরকমই আল্লাহ তা'আলার উপরোক্ত নির্দেশঃ (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলাকে তাঁর নামসমূহ দ্বারাই ডাক। এটাও এ বিষয়ের দলীল প্রমাণ যে, নাম এক জিনিস এবং নামধারী আলাদা জিনিস। এখন যারা (আরবি)-কে এক বলেন তাদের দলীল এই যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তোমার মহান প্রভুর অতি সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন কল্যাণময় নাম রয়েছে।' (৫৫:৭৮) নামকে কল্যাণময় ও মর্যাদাসম্পন্ন বলা হয়েছে, অথচ স্বয়ং আল্লাহই কল্যাণময়। এর সহজ উত্তর এই যে, সেই পবিত্র প্রভুর কারণেই তাঁর নামও শ্রেষ্ঠত্বপূর্ণ হয়েছে। তাদের দ্বিতীয় দলীল এই যে, যখন কোন ব্যক্তি বলেঃ যয়নাবের উপর তালাক’, তখন তালাক শুধু সেই ব্যক্তির ঐ স্ত্রীর উপর হয়ে থাকে যার নাম যয়নাব। যদি নাম ও নামধারীর মধ্যে পার্থক্য থাকতো তবে শুধু নামের উপরই তালাক পড়তো, নামধারীর উপর কি করে পড়তো? এর উত্তর এই যে, এ কথার ভাবার্থ হয় এইরূপঃ যার নাম যয়নাব তার উপর তালাক- (আরবি) এর (আরবি) হতে আলাদা হওয়া এই দলীলের উপর ভিত্তি করে যে, (আরবি) বলা হয় কারও নাম নির্ধারণ করাকে। আর এটা সুস্পষ্ট কথা যে, এটা এক জিনিস এবং নামধারী অন্য জিনিস। ইমাম রাযীর (রঃ) কথা এটাই। এ সবকিছু (আরবি)-এর সম্পর্কে আলোচনা ছিল। এখন (আরবি) শব্দ সম্পর্কে আলোচনা শুরু হচ্ছে। (আরবি) আল্লাহ শব্দটির তাহকীকঃ (আরবি) বরকত বিশিষ্ট ও উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন মহান প্রভুর একটি বিশিষ্ট নাম। বলা হয় যে, এটাই (আরবি) কেননা, সমুদয় উত্তম গুণের সঙ্গে এটাই গুণান্বিত হয়ে থাকে। যেমন পবিত্র কুরআনে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনিই সেই আল্লাহ যিনি ছাড়া অন্য কেউ উপাস্য নেই, তিনি প্রকাশ্য ও অদৃশ্য বস্তুসমূহের জ্ঞাতা, তিনি বড়ই মেহেরবান, পরম দয়ালু। তিনি এমন উপাস্য যে, তিনি ছাড়া আর কেউ উপাস্য নেই, তিনি বাদশাহ, পবিত্র, নিরাপত্তা প্রদানকারী, আশ্রয়দাতা, রক্ষাকর্তা, প্রবল মহাপরাক্রম গর্বের অধিকারী, সুমহান। আল্লাহ তাআলা মানুষের অংশীবাদ হতে পবিত্র। তিনি সষ্টিকারী, উদ্ভাবন কর্তা, রূপশিল্পী তাঁরই জন্য উত্তম উত্তম নামসমূহ রয়েছে, তিনি মহান পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।' (৫৯:২২-২৪) এ আয়াতসমূহে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সবগুলোই গুণবাচক নাম এবং ওগুলো ‘আল্লাহ’ শব্দেরই বিশেষণ। সুতরাং মূল ও প্রকৃত নাম ‘আল্লাহ’। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহর জন্যে পবিত্র ও উত্তম নাম রয়েছে, সুতরাং তোমরা তাঁকে ঐসব নাম ধরে ডাক।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলার নিরানব্বইটি নাম রয়েছে। এক শতের একটা কম। যে ওগুলো গণনা করবে সে বেহেশতে প্রবেশ করবে। 'জামেউত তিরমিযী ও সুনান-ই-ইবনে মাজার বর্ণনায় এ নামগুলোর ব্যাখ্যাও এসেছে। ঐ দুই হাদীস গ্রন্থের বর্ণনায় শব্দের কিছু পার্থক্য আছে এবং সংখ্যায় কিছু কম-বেশী রয়েছে। ইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে কোন কোন লোক হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর পাঁচ হাজার নাম আছে। এক হাজার নাম তো কুরআন মাজীদ ও হাদীসে রয়েছে, এক হাজার আছে তাওরাতে, এক হাজার আছে ইঞ্জিলে, এক হাজার আছে যাবুরে এবং এক হাজার আছে লাওহে মাহফুযে'। ‘আল্লাহ’ এমন একটি নাম যা একমাত্র আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ছাড়া আর কারও নেই। এ কারণেই এর মূল উত্স কি তা আরবদের নিকটেও অজানা রয়েছে। এমনকি (আরবি) এর ও তাদের জানা নেই। বরং ব্যাকরণবিদগণের একটি বড় দলের ধারণা যে, এটা (আরবি) অর্থাৎ এটা কোন কিছু হতে বের হয়নি এবং এটা হতেও অন্য কিছু বের হয়নি। কুরতুবি (রঃ) উলামা-ই-কিরামের একটি বিরাট দলের পক্ষ থেকে এই নীতিটি নকল করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম শাফেঈ (রঃ), ইমাম খাত্তাবী (রঃ), ইমামুল হারামাইন (রঃ), ইমাম গাযযালী (রঃ) প্রমুখ বিদগ্ধ মনীষীগণ। খলীল (রঃ) এবং সিবওয়াইহ্ (রঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) এতে আবশ্যকীয়। ইমাম খাত্তাবী (রঃ)-এর প্রমাণরূপে বলেছেন যে, (আরবি) তো বলা হয়ে থাকে কিন্তু (আরবি) বলতে শুনা যায় না। যদি (আরবি) শব্দের (আরবি) মূল শব্দের অন্তর্ভুক্ত হতো তবে আহ্বান সূচক শব্দ (আরবি) ব্যবহৃত হতো না। কেননা, আরবী ব্যাকরণ অনুসারে (আরবি) বিশিষ্ট (আরবি)-এর পূর্বে আহ্বান সূচক শব্দের ব্যবহার বৈধ নয়। কোন কোন বিদ্বান লোকের এ অভিমতও রয়েছে যে, এ শব্দটি মূল উৎস বিশিষ্ট। তারা এর দলীলরূপে রূবা ইবনু আজ্জাজের একটি কবিতা পেশ করেন। কবিতাটি নিম্নরূপঃ (আরবি) এতে (আরবি) হিসেবে (আরবি)-এর বর্ণনায় আছে যার (আরবি) হয় (আরবি) যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, তিনি (আরবি) পড়তেন। এর ভাবার্থ হলো ইবাদত। অর্থাৎ তার উপাসনা করা হয় এবং তিনি কারও উপাসনা করেন না। মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ মনীষীবৃন্দ বলেনঃ “আলোচ্য শব্দটি (আরবি) বা অন্য শব্দ থেকে নির্গত হওয়ার অনুকূলে। কেউ কেউ (আরবি) এই আয়াতকে দলীলরূপে এনেছেনঃ অনুরূপভাবে অন্য আয়াতেও আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘আসমানে ও যমীনে তিনিই একমাত্র আল্লাহ।' (৪৩:৮৪)এবং তিনিই একমাত্র সত্ত্বা যিনি আকাশেও উপাস্য এবং পৃথিবীতেও উপাস্য। সিবওয়াইহ (রঃ) খলীল (রঃ) থেকে নকল করেছেন যে, (আরবি) মূলে ছিল (আরবি) যেমন (আরবি) অতঃপর (আরবি)-এর পরিবর্তে (আরবি) আনা হয়েছে। যেমন (আরবি) মূলে (আরবি) ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) মূলে (আরবি) ছিল। সম্মানের জন্যে পূর্বে (আরবি) আনা হয়েছে। সিবওয়াইহের পছন্দনীয় মত এটাই। আরব কবিদের কবিতার মধ্যেও এ শব্দটি পাওয়া যায়। যেমনঃ (আরবি) কাসাই ও ফারা বলেন যে, এটা মূলে ছিল (আরবি) অতঃপর (আরবি) কে লুপ্ত করে প্রথম (আরবি) কে দ্বিতীয় (আরবি) এ (আরবি) করা হয়েছে। (আরবি)-এর মধ্যে (আরবি) শব্দদ্বয় (আরবি) হয়েছে। হাসানের (রঃ) কিরআতে (আরবি) ই রয়েছে। এটা (আরবি) হতে নেয়া হয়েছে। এবং এর অর্থ হলো (আরবি) জ্ঞান লোপ পাওয়াকে (আরবি) বলে। আরবী ভাষায় (আরবি) এবং (আরবি) ও (আরবি) ঐ সময়ে বলা হয় যখন তাদেরকে বিয়াবান জঙ্গলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহ ও তাঁর গুণাবলীর বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মানুষ হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে বলে সেই পবিত্র সত্ত্বাকে ‘আল্লাহ’ বলা হয়ে থাকে। এদিক দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, এ শব্দটি মূলে (আরবি) ছিল (আরবি) টি (আরবি) তে পরিবর্তিত হয়েছে। যেমন (আরবি) শব্দকে (আরবি) ও শব্দকে (আরবি) বলা হয়। ইমাম রাযীর (রঃ) মত এই যে, এই শব্দটি (আরবি) হতে নেয়া হয়েছে এবং তা (আরবি) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ আমি অমুক হতে অনাবিল শান্তি ও আরাম লাভ করেছি। কেননা, জ্ঞান ও বিবেকের শান্তি শুধু আল্লাহর যিকরেই রয়েছে এবং আত্মার প্রকৃত খুশী একমাত্র তারই পরিচয়ে রয়েছে। একমাত্র তিনিই হলেন পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ, তিনি ছাড়া অন্য কেউ এরূপ নয়। এ কারণেই তাকে ‘আল্লাহ’ বলা হয়। কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ মুমিনদের অন্তর শুধুমাত্র আল্লাহর যিকরের দ্বারাই অনাবিল শান্তি লাভ করে থাকে। (১৩:২৮) এটাও একটা মত যে, শব্দটি (আরবি) হতে নেয়া হয়েছে, যার অর্থ হয় গুপ্ত হওয়া ও পর্দা করা। এও বলা হয়েছে যে, শব্দটি (আরবি) হতে গৃহীত হয়েছে। বান্দা যেহেতু বিনয়ের সাথে সদা তার দিকে ঝুঁকে থাকে এবং সর্বাবস্থায়ই তাঁরই কৃপা ও করুণার অঞ্চল ধরে থাকে, সেহেতু তাকে আল্লাহ বলা হয়। একটা মত এও আছে যে, আরবের লোকেরা (আরবি) ঐ সময়ে বলে যখন কেউ কোন দৈব দুর্ঘটনার ফলে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং অনন্য তাকে আশ্রয় দেয় ও রক্ষা করে। যেহেতু সমস্ত সৃষ্টজীবকে বিপদ হতে মুক্তিদাতা একমাত্র মহান আল্লাহ, তাই তাকে ‘আল্লাহ’ বলা হয়। যেমন কুরআন পাকে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনিই রক্ষা করেন ও আশ্রয় দেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কাউকেও রক্ষা করা যায় না।' (২৩:৮৯) আর প্রকৃত অনুগ্রহকারী একমাত্র তিনিই। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তোমাদের উপর যতগুলো দান রয়েছে সবই আল্লাহ প্রদত্ত। তিনিই আহার দাতা। (১৬:৫৩) সুতরাং তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনিই আহার্য দেন তাঁকে আহার্য দেয়া হয় না। (৬:১৪) তিনিই প্রত্যেক জিনিসের আবিষ্কারক। তাই তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তুমি বল-আলাহর তরফ হতেই প্রত্যেক জিনিসের অস্তিত্ব লাভ হয়েছে।' (৪:৭৮) ইমাম রাযীর (রঃ) গৃহীত মাযহাব এই যে (আরবি) শব্দটি (আরবি) নয়। খলীল (রঃ), সিবওয়াইহ (রঃ) এবং অধিকাংশ উসূলিয়ীন ও ফাকীহদের এটাই অভিমত। এর অনেক দলীল-প্রমাণও রয়েছে। এটি (আরবি) হলে এর অর্থের মধ্যেও বহু একক শব্দও জড়িত থাকতো। অথচ এরূপ হয় না। আবার শব্দটিকে (আরবি) বানানো হয় এবং এর অনেকগুলো (আরবি) ও আসে। যেমন রহমান রাহীম’ ‘মালিক কদুস' ইত্যাদি। সুতরাং বুঝা গেল যে, এটা নয়। কুরআন মাজীদের এক জায়গায় আছে (আরবি) এখানে এটা (আরবি) হয়েছে। আলোচ্য শব্দটির (আরবি) না হওয়ার একটি দলীল প্রমাণ রূপে নিম্নের (আরবি) (১৯:৬৫) এই আয়াতটি বর্ণনা করা হয়। আল্লাহ তাআলাই এ ব্যাপারে সবচাইতে ভাল জানেন।কোন কোন লোক একথাও বলেছেন যে, (আরবি) শব্দ আরবী নয় বরং (রঃ) ইরানী শব্দ। কিন্তু ইমাম রাযী (রঃ) একে দুর্বল বলেছেন এবং আসলেও এটা দুর্বল। ইমাম রাযী (রঃ) বলেন যে, মাখলুক' বা সৃষ্টজীব দুই প্রকার। এক প্রকার হলেন তারাই যারা আল্লাহর মারিফাতের সাগর সৈকতে পৌছে গেছেন। দ্বিতীয় প্রকার হলো ওরাই যারা তা হতে বঞ্চিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বরং সে বিস্ময়ের অন্ধকারে এবং বন্ধুর কন্টকাকীর্ণ উপত্যকায় পড়ে রয়েছে এবং সমস্ত আধ্যাত্মিক শক্তি সে হারিয়ে ফেলে একেবারে নিঃস্ব ও রিক্তহস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু যে ব্যক্তি মারিফাতের ধারে কাছে পৌছে গেছে এবং আল্লাহর নূর ও ঔজ্জ্বল্যের বাগানে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে থেমে গেছে সে সেখানেই দিশেহারা ও হতভম্ব হয়ে রয়ে গেছে। মোট কথা কেউ পূর্ণভাবে আল্লাহর পরিচিতি লাভ করতে পারেনি। সুতরাং এখন সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, সেই মহান সত্ত্বার নামই ‘আল্লাহ’। সমস্ত সৃষ্টজীব তারই মুখাপেক্ষী, তারই সামনে মস্তক অবনতকারী এবং তাঁকেই অনুসন্ধানকারী। আল্লামা খলীল বিন আহমাদ ফারাহদীর (রঃ) কথা অনুসারে ‘আল্লাহ’ শব্দের অর্থ অন্য উৎস থেকেও করা যেতে পারে। আরবের বাক পদ্ধতিতে প্রত্যেক উঁচু জিনিসকে (আরবি) বলা হয়, আর যেহেতু বিশ্ব প্রভু সবচেয়ে উঁচু ও বড় এ জন্য তাকেও আল্লাহ বলা হয়। আবার (আরবি)-এর অর্থ হলো ইবাদত করা এবং (আরবি)-এর অর্থ হলো আদেশ পালন ও কুরবানী করণ আর আল্লাহরই ইবাদত করা হয় এবং তাঁরই নামে কুরবানী দেওয়া হয় বলে তাকেও আল্লাহ বলা হয়। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) কিরাআতে আছে। (আরবি)-এর মূল হচ্ছে (আরবি) কালিমার স্থলে (আরবি) এসে ওটা লুপ্ত হয়েছে, অতঃপর (আরবি)-এর (আরবি) টি অতিরিক্ত (আরবি) কে (আরবি)-এর জন্য আনা হয়েছিল, তার সঙ্গে মিলে গেছে এবং দুই (আরবি) এ হয়েছে। ফলে (আরবি) বিশিষ্ট একটা (আরবি) রয়ে গেছে এবং সম্মানের জন্যে (আরবি) বলা হয়েছে। (আরবি) (আরবী) আর রহমানির রাহিম (আরবি) শব্দ দুটিকে (আরবি) থেকে নেওয়া হয়েছে। অর্থের দিক দিয়ে দু’টোর মধ্যেই মুবালাগাহ' বা আধিক্য রয়েছে, তবে ‘রাহীমের চেয়ে রহমানের মধ্যে আধিক্য বেশী আছে। আল্লামা ইবনে জারীরের (রঃ) কথামত জানা যায় যে, এতে প্রায় সবাই একমত। পূর্ববর্তী যুগের সালফে সালেহীন বা কোন আলেমের তাফসীরের মাধ্যমেও এটা জানা যায়। হযরত ঈসা (আঃ) এই অর্থই নিয়েছেন, যা ইতিপূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে-তা এই যে, রাহমানের অর্থ হলো দুনিয়া ও আখেরাতে দয়া প্রদর্শনকারী এবং রাহীমের অর্থ শুধু আখেরাতে রহমকারী। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি) নয়। কারণ যদি তা এ রকমই হত তবে (আরবি) এর সঙ্গে মিলে যেতো। অথচ কুরআন পাকের মধ্যে (আরবি) (৩৩:৪৩) এসেছে। মুরাদের বরাতে ইবনুল আমবারী (রঃ) বলেছেন যে, (আরবি) হচ্ছে ইব্রানী নাম, আরবী নয়। আবু ইসহাক যাজ্জাজ ‘মা’আনিল কুরআন' নামক অনবদ্য পুস্তকে লিখেছেন যে, আহমাদ বিন ইয়াহ্ইয়ার মতানুসারে রাহীম আরবী শব্দ এবং রাহমান ইবরানী শব্দ। দুটিকে একত্রিত করা হয়েছে। কিন্তু আবু ইসহাক বলেন যে, এ কথাটি তেমন মনে ধরে না। এ শব্দটি (আরবি) হওয়ার দলীলরূপে কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, জামেউত তিরমিযীর সহীহ হাদীসে আছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা রয়েছেঃ “আমি রাহমান, আমি রহমকে সৃষ্টি করেছি এবং স্বীয় নাম হতেও এ নামটি বের করেছি। যে একে সংযুক্ত করবে আমিও তাকে যুক্ত করবে এবং যে অকে কেটে দেবে আমিও তাকে কেটে দেব।' এখন প্রকাশ্য হাদীসের বিরোধিতা ও অস্বীকার করার কোন উপায় বা অবকাশ নেই। এখন রইলো কাফিরদের এ নামকে অস্বীকার করার কথাটা। এটা শুধু তাদের অজ্ঞতা, মূর্খতা ও বোকামী ছাড়া আর কিছু নয়। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, ‘রাহমান’ ও ‘রাহীমের একই অর্থ যেমন (আরবি) ও (আরবি) শব্দদ্বয়। আবু উবাইদারও (রঃ) একই মত। একটা মত এও আছে যে, (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর মত নয় (আরবি) শব্দের মধ্যে অবশ্যম্ভাবীরূপে (আরবি) হয়ে থাকে। যেমন (আরবি) ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যে খুবই রাগান্বিত এবং একেবারে অগ্নিশর্মা হয়। আর (আরবি) শুধু (আরবি) ও (আরবি) এর জন্যই আসে যা (আরবি) শূন্য থাকে। আবু আলী ফারসী বলেন যে, (আরবি) শব্দটি সাধারণ (আরবি) যা সর্ব প্রকারের দয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং শুধু আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত থাকে। আর ‘রাহীমের সম্পর্ক শুধু মুমিনদের সঙ্গে যেমন আল্লাহ পাক বলেন, (আরবি) অর্থাৎ তিনি মুমিনদের প্রতি দয়ালু। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই দুটি নামই করুণা ও দয়া বিশিষ্ট। একের মধ্যে অন্যের তুলনায় দয়া ও করুণা বেশী আছে। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) এই বর্ণনায় (আরবি) শব্দটি রয়েছে। খাত্তাবী ও অন্যেরা এর অর্থ (আরবি) করে থাকেন। যেমন হাদীসের মধ্যে আছেঃ “আল্লাহ তা'আলা (আরবি) বিশিষ্ট অর্থাৎ স্ত্র, বিনীয় ও দয়ালু। প্রত্যেক কাজে তিনি বিনয়, তা ও সরলতা পছন্দ করেন। তিনি ম্রতা ও সরলতার প্রতি এমন নিয়ামত বর্ষণ করেন যা কঠোরতার প্রতি করেন না।ইবনুল মুবারক বলেন, 'রাহমান তাকেই বলে যার কাছে চাইলে তিনি দান করেন, আর রাহীম তাকে বলে যার কাছে না চাইলে তিনি রাগান্বিত হন। জামেউত তিরমিযীতে আছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট যে ব্যক্তি চায় না তিনি তার প্রতি রাগান্বিত হন। কোন একজন কবির কবিতায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তুমি আল্লাহর নিকট চাওয়া ছেড়ে দিলেই তিনি রাগান্বিত হন, অথচ বনী আদমের নিকট চাওয়া হলে সে অসন্তুষ্ট হয়ে থাকে। আযরামী বলেন যে, রাহমানের অর্থ হলো যিনি সমুদয় সৃষ্ট জীবের প্রতি করুণা বর্ষণকারী। আর রাহীমের অর্থ হলো যিনি মুমিনদের উপর দয়া বর্ষণকারী। যেমন কুরআন কারীমের নিম্নের দু'টি আয়াতের মধ্যে রয়েছেঃ (আরবি) এখানে মহান আস্নাহ (আরবি) শব্দের সঙ্গে (আরবি) শব্দটির উল্লেখ করেছেন যাতে শব্দটি স্বীয় সাধারণ দয়া ও করুণার অর্থে জড়িত থাকতে পারে। কিন্তু মুমিনদের বর্ণন্যর সঙ্গে (আরবি) শব্দটির উল্লেখ করেছেন, যেমন বলেছেন (আরবি) সুতরাং জানা গেল যে, (আরবি)-এর মধ্যে- (আরবি)-এর তুলনায় অনেক (আরবি) গুণে বেশী আছে। কিন্তু হাদীসের একটি দু'আর মধ্যে (আরবি) এ ভাবেও এসেছে। রাহমান' নামটি আল্লাহ তা'আলার জন্যেই নির্ধারিত। তিনি ছাড়া আর কারও এ নাম হতে পারে না। যেমন আল্লাহ তাআলার নির্দেশ রয়েছেঃ “আল্লাহকে ডাকো বা রাহমানকে ডাকো, যে নামেই চাও তাঁকে ডাকতে থাকো। তার অনেক ভাল ভাল নাম রয়েছে। অন্য একটি আয়াতে আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তোমার পূর্ববর্তী নবীগণকে জিজ্ঞেস কর যে, রাহমান ছাড়া তাদের কোন মাবুদ ছিল কি যার তারা ইবাদত করতো?' (৪৩:৪৫) মুসাইলামা কায্যাব যখন নবুওয়াতের দাবী করে এবং নিজেকে রাহমানুল ইয়ামামা' নামে অভিহিত করে, আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে অত্যন্ত লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত করেন এবং চরম মিথ্যাবাদী নামে সে সারা দেশে সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। আজও তাকে মুসাইলামা কায্যাব বলা হয় এবং প্রত্যেক মিথ্যা দাবীদারকে তার সাথে তুলনা করা হয়। আজ প্রত্যেক পল্লীবাসী ও শহরবাসী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত আবালবৃদ্ধ সবাই তাকে বিলক্ষণ চেনে।কেউ কেউ বলেন যে, রাহমানের চেয়ে রাহীমের মধ্যেই বেশী (আরবি) রয়েছে। কেননা, এ শব্দের সঙ্গে পূর্ব শব্দের (আরবি) করা হয়েছে, আর যার (আরবি) করা হয় তা অপেক্ষা (আরবি) ই বেশী জোরদার হয়ে থাকে। এর উত্তর এই যে, এখানে (আরবি)-ই হয়নি, বরং এতো (আরবি) এবং (আরবি) এর মধ্যে এ নিয়ম প্রযোজ্য নয়। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার এমন নাম নেয়া হয়েছে যে নামের মধ্যে তাঁর কোন অংশীদার নেই এবং রাহমানকেই সর্বপ্রথম ওর বিশেষণ রূপে বর্ণনা করা হয়েছে, সুতরাং এ নাম রাখাও অন্যের জন্যে নিষিদ্ধ। যেমন আল্লাহ পাক স্বয়ং বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহকে ডাক বা রাহমানকে ডাকো, যে নামেই চাও ডাকো, তার জন্যে বেশ ভাল ভাল সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে।মুসাইলামা কাযযাব এ জঘন্যতম আস্পর্ধা দেখালেও সে সমূলে ধ্বংস হয়েছিল এবং তার ভ্রষ্ট সঙ্গীদের ছাড়া এটা অন্যের উপর চালু হয়নি। রাহীম বিশেষণটির সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা অন্যদেরকেও বিশেষিত করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) (৯:১২) এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীকে (সঃ) বলেছেন। এভাবেই তিনি স্বীয় কতগুলি নাম দ্বারা অন্যদেরকেও স্মরণ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন (৭৬:২) (আরবি) এখানে আল্লাহ তাআলা মানুষকে (আরবি) ও (আরবি) বলেছেন। মোটকথা এই যে, আল্লাহর কতগুলো নাম এমন রয়েছে যেগুলোর প্রয়োগ ও ব্যবহার অন্য অর্থে অন্যের উপরও হতে পারে এবং কতগুলো নাম আবার আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উপর ব্যবহৃত হতেই পারে না। যেমন আল্লাহ, রাহমান, খালেক এবং রাজ্জাক ইত্যাদি। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা প্রথম নাম নিয়েছেন আল্লাহ', অতঃপর ওর বিশেষণ রূপে রাহমান এনেছেন। কেননা রাহীমের তুলনায় এর বিশেষত্ব ও প্রসিদ্ধি অনেক গুণে বেশী। আল্লাহ সর্বপ্রথম তার সবচেয়ে বিশিষ্ট নাম নিয়েছেন, কেননা নিয়ম রয়েছে সর্বপ্রথম সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন নাম নেয়া। তারপরে তিনি অপেক্ষাকৃত কম পর্যায়ের ও নিম্ন মানের এবং তারও পরে তদপেক্ষা কমটা নিয়েছেন। এখন যদি প্রশ্ন করা হয় যে, রাহমানের মধ্যে যখন রাহীম অপেক্ষা (আরবি) বেশী আছে, তখন তাকেই যথেষ্ট মনে করা হয়নি কেন? এর উত্তরে হযরত আতা’ খুরাসানীর (রঃ) এ কথাটি পেশ করা যেতে পারে যে, রহমান রাখতো সেই জন্যে রাহীম শব্দটিও আনা হয়েছে যাতে কোন সংশয়ের অবকাশ না থাকে। রাহমান ও রাহীম শুধু আল্লাহ তা'আলারই নাম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), একথাটি নকল করেছেন। কেউ কেউ বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা (আরবি) (১৭:১১০) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করার পূর্বে কুরাইশ কাফিরেরা রাহমানের সঙ্গে পরিচিতিই ছিল না। এ আয়াত দ্বারা আল্লাহপাক তাদের ধারণা খণ্ডন করেন। হুদায়বিয়ার সন্ধির বছরেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ) কে বলেছিলেনঃ ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম লিখ।' কাফির কুরাইশরা তখন বলেছিল আমরা রাহমান ও রাহীমকে চিনি না। সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটি রয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, তারা বলেছিলঃ “আমরা ইয়ামামার রাহমানকে চিনি, অন্য কাউকেও চিনি না।' এভাবে কুরআন পাকের অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ যখন তাদেরকে বলা হয়-রাহমানের সামনে তোমরা সিজদাহ কর, তখন তারা আরও হিংস্র হয়ে উঠে এবং বলে-রাহমান কে যে আমরা তোমার কথা মতই তাকে সিজদা করবো?' (২৫:৬০) এ সবের সঠিক ভাব ও তাৎপর্য এই যে, এই দুষ্ট লোকগুলি অহঙ্কার ও শত্রুতার বশবর্তী হয়েই রাহমানকে অস্বীকার করতো, কিন্তু তারা যে রাহমানকে বুঝতে না বা তার সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিল তা নয়। কেননা অজ্ঞতা যুগের প্রাচীন কবিতাগুলোর মধ্যে আল্লাহর এই রাহমান নামটি দেখতে পাওয়া যায়। ওগুলো অজ্ঞতা যুগের ঐসব জাহেলী কবিরই কবিতা। হযরত হাসান (রঃ) বলেনঃ রাহমান নামটি অন্যের জন্যে নিষিদ্ধ। ওটা স্বয়ং আল্লাহর নাম। এ নামের উপর লোকের কোন অধিকার নেই।' হযরত উম্মে সালমার (রাঃ) হাদীসটি পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক আয়াতে থামতেন এবং এভাবেই একটা দল বিসমিল্লাহির উপর আয়াত করে তাকে আলাদাভাবে পড়ে থাকেন। আবার কেউ কেউ মিলিয়েও পড়েন। দুইটি জযম একত্রিত হওয়ায় মীমে যের দিয়ে থাকেন। জমহুরের এটাই অভিমত। কোন কোন আরব মীমকে যবর দিয়ে পড়েন। তারা হামযার’ যবরটি ‘মীমকে দিয়ে থাকেন। যেমন- (আরবি) ইবনে আতিয়্যাহ বলেনঃ “আমার জানা মতে যবরের কিরাআতটি কোন লোক থেকে বর্ণিত হয়নি। আয়াত নং ১ এর তাফসীরসাতজন কারীই (আরবি)-এর (আরবি) কে পেশ দিয়ে পড়ে থাকেন এবং (আরবি) কে (আরবি) বা উদ্দেশ্য ও বিধেয় বলে থাকেন। সুফইয়ান বিন উয়াইনা এবং রু’বাহ বিন আফ্যাজের মতে ‘দাল’ যবরের সঙ্গে হবে এবং এখানে ক্রিয়াপদ উহ্য রয়েছে। ইবনে আবী ইবলাহ (আরবি)-এর দল কে ও (আরবি)-এর প্রথম ‘লাম’ এদুটোকেই পেশ দিয়ে পড়ে থাকেন এবং এ লামটিকে প্রথমটির (আরবি) করে থাকেন। যদিও আরবদের ভাষায় এর প্রমাণ বিদ্যমান, তথাপি এটা সংখ্যায় অতি নগণ্য। হযরত হাসান (রঃ) এবং হযরত যায়েদ ইবনে আলী (রঃ) এই দুই অক্ষরকে যের দিয়ে পড়ে থাকেন এবং দাল’ কে ‘লামের' (আরবি) করেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ এই যে, কৃতজ্ঞতা শুধু আল্লাহর জন্যে, তিনি ছাড়া আর কেউ এর যোগ্য নয়, সে সৃষ্ট জীবের মধ্যে যে কেউ হোক না কেন। কেননা, সমুদয় দান যা আমরা গণনা করতে পারি না এবং তার মালিক ছাড়া কারও সেই সংখ্যা জানা নেই, সবই তার কাছ থেকেই আগত। তিনিই তার আনুগত্যের সমুদয় মালমসলা আমাদেরকে দান করেছেন। আমরা যেন তাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলতে পারি সেজন্যে তিনি আমাদেরকে শারীরিক সমুদয় নিয়ামত দান করেছেন। অতঃপর ইহলৌকিক অসংখ্য নিয়ামত এবং জীবনের সমস্ত প্রয়োজন আমাদের অধিকার ছাড়াই তিনি আমাদের নিকট না চাইতেই পৌছিয়ে দিয়েছেন। তার সদা বিরাজমান অনুকম্পা এবং তার প্রস্তুতকৃত পবিত্র সুখের স্থান, সেই অবিনশ্বর জান্নাত আমরা কিভাবে লাভ করতে পারি তাও তিনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন। সুতরাং আমরা এখন নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, এসবের যিনি মালিক, প্রথম ও শেষ সমুদয় কৃতজ্ঞতা একমাত্র তাঁরই ন্যায্য প্রাপ্য। এটা একটা প্রশংসামূলক বাক্য। আল্লাহ পাক নিজের প্রশংসা নিজেই করেছেন এবং ঐ প্রসঙ্গেই তিনি যেন বলে দিলেনঃ তোমরা বল (আরবি) অর্থাৎ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্যে।' কেউ কেউ বলেন যে, আলহামদু লিল্লাহ' বলে আল্লাহ তা'আলার পবিত্র নাম ও বড় বড় গুণাবলীর দ্বারা তার প্রশংসা করা হয়। আর (আরবি) বলে তার দান ও অনুগ্রহের জন্যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু একথাটি সঠিক নয়। কেননা আরবী ভাষায় যারা পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন তারা এ বিষয়ে এক মত যে, (আরবি)-এর স্থলে (আরবি) ও (আরবি)-এর স্থলে- ব্যবহৃত হয়ে থাকে। জাফর সাদিক এবং ইবনে আতা' প্রমুখ সুফীগণ এটাই বলে থাকেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক কৃতজ্ঞের কৃতজ্ঞতা প্রকাশক কথা হলো, (আরবি) কুরতুবী (রঃ) ইবনে জারীরের (রঃ) কথাকে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ করার জন্যে এ দলীল বর্ণনা করেছেন যে, যদি কেউ (আরবি) বলে তবে ওটাও নির্ভুল হবে। প্রকৃতপক্ষে আল্লামা ইবনে জারীরের কথায় পূর্ণ সমালোচনা ও পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে। পরবর্তী যুগের আলেমদের মধ্যে এটা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, প্রশংসিত ব্যক্তির প্রত্যক্ষ গুণাবলীর জন্য বা পরোক্ষ গুণাবলীর জন্য মুখে তার প্রশংসা করার নাম হামদ। আর শুধুমাত্র পরোক্ষ গুণাবলীর জন্যে তার প্রশংসা করার নাম শুকর এবং তা অন্তঃকরণ, জিহ্বা এবং কাজের দ্বারাও করা হয়। আরব কবিদের কবিতাও এর সাক্ষ্য ও দলীলরূপে পেশ করা যেতে পারে। তবে (আরবি) শব্দটি (আরবি) কি (আরবি) শব্দটি এ বিষয়ে কিছুটা মতভেদ বিদ্যমান রয়েছে। সঠিক ও অভ্রান্ত কথা এই যে, ওদের মধ্যে (আরবি) ও (আরবি)-এর সম্পর্ক রয়েছে। এক দিক দিয়ে (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দ হতে (আরবি) কেননা এটা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় গুণের সাথেই সমভাবে সম্পর্কিত ও সংযুক্ত। পবিত্রতা ও দান উভয়ের জন্যেই (আরবি) বলা চলে। আবার শুধু জিহ্বা দিয়ে তা আদায় করা হয় বলে এটা (আরবি) এবং (আরবি) শব্দটি হচ্ছে (আরবি), কেননা ওটা কথা কাজ ও অন্তঃকরণ -এ তিনটার উপরেই সমানভাবে বলা হয়। আবার পরোক্ষ গুণের উপর বলা হয় বলে (আরবি) শব্দটি (আরবি) পবিত্রতার উপর বলা হয় না বরং (আরবি) একথা বলা যেতে পারে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। আবু নসর ইসমাইল বিন হাম্মাদ জওহারী (রঃ) বলেন যে, (আরবি) অর্থাৎ প্রশংসা শব্দটি (আরবি) অর্থাৎ তিরস্কারের উল্টা। বলা হয়- (আরবি)(আরবি)-এর মধ্যে (আরবি)-এর চেয়েও বেশী বা আধিক্য রয়েছে (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দ হতে দাতার দানের উপর তার প্রশংসা করাকে আরবী ভাষায় (আরবি) বলা হয় (আরবি) এবং (আরবি) এ দু’ভাবেই প্রয়োগ করা চলে। কিন্তু লামের সঙ্গে বলাই বেশী সমীচীন ও শোভনীয় (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতেও বেশী , (আরবি) কেননা জীবিত ও মৃত এমনকি জড় পদার্থের উপরেও (আরবি) শব্দটি ব্যবহৃত হয়। অনুগ্রহের পূর্বে ও পরে, প্রত্যক্ষ গুণাবলীর উপর ও পরোক্ষ গুণাবলীর উপর তার ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে বলেই ওর (আরবি) হওয়া সাব্যস্ত হলো। অবশ্য এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। (আরবি)' ‘হামদ’ শব্দের তাফসীর ও পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অভিমতহযরত উমার (রাঃ) একবার বলেছিলেনঃ (আরবি) এবং কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, (আরবি) কে আমরা জানি, কিন্তু (আরবি) এর ভাবার্থ কি? হযরত আলী (রাঃ), উত্তরে বললেনঃ আল্লাহ তাআলা এ কথাটিকে নিজের জন্যে পছন্দ করেছেন এবং কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, এটা বললে আল্লাহকে খুবই ভাল লাগে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এটা কৃতজ্ঞতা প্রকাশক বাক্য। এর উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার বান্দা আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। সুতরাং এই কথাটির মধ্যে শুকর ছাড়া আল্লাহর দানসমূহ, হেদায়াত, অনুগ্রহ প্রভৃতির স্বীকারোক্তি রয়েছে। হযরত কা'ব আহ্বারের (রাঃ) অভিমত এই যে, একথাটি আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা। হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, এটা আল্লাহ পাকের চাদর। একটা হাদীসে একথাও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা (আরবি) বললেই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়ে যাবে। এখন তিনি তোমাদের উপর বরকত দান করবেন।হযরত আসওয়াদ বিন সারী’ (রাঃ) একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে আরয করেনঃ “আমি মহান আল্লাহর প্রশংসার কয়েকটি কবিতা রচনা করেছি। অনুমতি পেলে শুনিয়ে দেবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা নিজের প্রশংসা শুনতে পছন্দ করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সুনান-ই নাসায়ী, জামেউত তিরমিযী এবং সুনান-ই-ইবনে মাজাহয় হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সর্বোত্তম যিকর (আরবি) হচ্ছে এবং সর্বোত্তম প্রার্থনা হচ্ছে (আরবি), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে পরিভাষা অনুযায়ী হাসান গারীব' বলে থাকেন। সুনান-ই-ইবনে মাজাহয় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাঁর বান্দাকে কিছু দান করার পর যদি সে তার জন্যে আলহামদুল্লিাহ' পাঠ করে তবে তার প্রদত্ত বস্তুই গৃহীত বস্তু হতে উত্তম হবে। আল্লাহর রাসূল (সঃ) আরও বলেনঃ “যদি আল্লাহ আমার উম্মতের মধ্যে কোন লোককে দুনিয়া দান করেন এবং সে যদি তার জন্য আলহামদুল্লিাহ' পাঠ করে তবে এ কথাটি সমস্ত দুনিয়া জাহান হতে উত্তম হবে।' কুরতুবী (রঃ) বলেনঃএর ভাবার্থ এই যে, আল হামদুলিল্লাহ' বলার তাওফীক লাভ যত বড় নিয়ামত, সারা দুনিয়া জাহান দান করাও ততো বড় নিয়ামত নয়। কেননা দুনিয়া তো নশ্বর ও ধ্বংসশীল, কিন্তু একথার পুণ্য অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী। যেমন পবিত্র কুরআনের মধ্যে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ধনদৌলত ও সন্তান সন্ততি দুনিয়ার সৌন্দর্য মাত্র, কিন্তু সত্যার্যাবলী চিরস্থায়ী পুণ্য বিশিষ্ট এবং উত্তম আশাবাহক।' (১৮:৪৬) সুনান-ই-ইবনে মাজাহর মধ্যে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ একদা এক ব্যক্তি এই দু'আ পাঠ করলোঃ (আরবি)এতে ফেরেশতাগণ পুণ্য লিখার ব্যাপারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। অবশেষে তারা আল্লাহ পাকের নিকট আরয করলেনঃ আপনার এক বান্দা এমন একটা কালেমা পাঠ করেছে যার পুণ্য আমরা কি লিখবো বুঝতে পারছি না। বিশ্ব প্রভু সব কিছু জানা সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করলেনঃ “সে কী কথা বলেছে?' তাঁরা বললেন যে, সে এই কালেমা বলেছে। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “সে যা বলেছে তোমরা হুবহু তাই লিখে নাও। আমি তার সাথে সাক্ষাতের সময়ে নিজেই তার যোগ্য প্রতিদান দেবো।'কুরতুবী (রঃ) আলেমদের একটি দল হতে নকল করেছেন যে, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু' হতেও আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ উত্তম। কেননা, এর মধ্যে অহূদানিয়্যাত বা একত্ববাদ ও, প্রশংসা দুটোই রয়েছে। কিন্তু অন্যান্য আলেমগণের ধারণা এই যে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ই উত্তম। কেননা ঈমান ও কুফরের মধ্যে এটাই পার্থক্যের সীমারেখা টেনে দেয়। আর এটা বলাবার জন্যই কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করা হয়, যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে। আরও একটি মারফু হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণ যা কিছু বলেছি তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু অহ্দাহু লা শারীকালাহু।” হযরত জাবিরের (রাঃ) একটি মারফু হাদীস ইতিপূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, সর্বোত্তম যিক্র হলো ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ এবং সর্বোত্তম প্রার্থনা হলো আল হামদু লিল্লাহ'। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ‘আল হামদু’র আলিফ লাম ইসতিগরাকের জন্যে ব্যবহৃত অর্থাৎ সমস্ত প্রকারের হামদ' বা স্ততিবাদ একমাত্র আল্লাহর জন্যেই সাব্যস্ত। যেমন হাদীসে রয়েছেঃ “হে আল্লাহ! সমুদয় প্রশংসা তোমারই জন্যে, সারা দেশ তোমারই, তোমারই হাতে সামগ্রিক মঙ্গল নিহিত রয়েছে এবং সমস্ত কিছু তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করে থাকে।সর্বময় কর্তাকে রব' বলা হয় এবং এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে নেতা এবং সঠিকভাবে সজ্জিত ও সংশোধনকারী। এসব অর্থ হিসেবে আল্লাহ তা'আলার জন্যে এ পবিত্র নামটিই শোভনীয় হয়েছে। রব’ শব্দটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্যে ব্যবহৃত হতে পারে না। তবে সম্বৰূপদরূপে ব্যবহৃত হলে সে অন্য কথা। যেমন (আরবি) বা গৃহস্বামী ইত্যাদি। কারো কারো মতে এটাই ইসমে আযম। (আরবি)' শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। আল্লাহ ছাড়া সমুদয় সৃষ্টবস্তুকে (আরবি) বলা হয় (আরবি) শব্দটিও বহু বচন এবং এ শব্দের এক বচনই হয় না। আকাশের সৃষ্টজীব এবং জল ও স্থলের সৃষ্টজীবকেও (আরবি) অর্থাৎ কয়েকটি (আরবি) বলা হয়। অনুরূপভাবে এক একটি যুগ-কাল ও এক একটি সময়কেও বলা হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে যে, এর দ্বারা সমুদয় সৃষ্টজীবকেই বুঝায়, নভোমণ্ডলেরই হোক বা ভূমণ্ডলের হোক অথবা এ দুয়ের মধ্যবর্তী জায়গারই হোক এবং তা আমাদের জানাই হোক বা অজানাই থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেই এর ভাবার্থরূপে দানব ও মানব বর্ণিত হয়েছে। হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং ইবনে জুরাইজ (রঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে কিন্তু সনদ হিসেবে এটা নির্ভরযোগ্য নয়। একথার দলীলরূপে কুরআন পাকের এ আয়াতটিও বর্ণনা করা হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘যেন তিনি আলামীনের জন্যে অর্থাৎ দানব ও মানবের জন্যে ভয় প্রদর্শক হয়ে যান।' ফারা (রঃ) ও আবু উবায়দার (রঃ) মতে প্রতিটি বিবেকসম্পন্ন প্রাণীকে ‘আলাম বলা হয়। দানব, মানব ও শয়তানকে ‘আলাম বলা হবে। জন্তুকে ‘আলাম বলা হবে না। হযরত যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) এবং হযরত আবু মাহীসেন (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক প্রাণীকেই ‘আলাম বলা হয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক শ্রেণীকে একটা আলাম বলা হয়।ইবনে মারওয়ান বিন হাকাম উরফে জা’দ, যার উপাধি ছিল হিমার, যিনি বানূ উমাইয়াদের আমলে একজন খলীফা ছিলেন, তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সতেরো হাজার ‘আলম সৃষ্টি করেছেন। আকাশে অবস্থিত সবগুলো একটা ‘আলম, যমীনে অবস্থিত সবগুলো একটা আলম এবং বাকীগুলো আল্লাহ তা'আলাই জানেন। মানুষের নিকট ওগুলো অজ্ঞাত।' আবুল ‘আলিয়া (রঃ) বলেন যে, সমস্ত মানুষ একটা ‘আলম, সমস্ত জ্বিন একটা ‘আলম, এবং এ দুটো ছাড়া আরো আঠারো হাজার বা চৌদ্দ হাজার ‘আলম রয়েছে। ফেরেশতাগণ যমীনের উপর আছেন। যমীনের চারটি প্রান্ত রয়েছে এবং প্রত্যেক প্রান্তে সাড়ে তিন হাজার ‘আলম রয়েছে। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা শুধুমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এ বর্ণনাটি সম্পূর্ণ গারীব বা অপরিচিত। এ ধরনের কথা যে পর্যন্ত না সহীহ দলীল ও অকাট্য প্রমাণ দ্বারা সাব্যস্ত হয়, আদৌ মানবার যোগ্য নয়। রাব্বল আলামীন’র ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে হুমাইরী (রঃ) বলেন যে, বিশ্বজাহানে এক হাজার জাতি রয়েছে। ছয়শো আছে জলে, আর চারশো আছে স্থলে। সাঈদ বিন মুসাইয়্যেব (রঃ) হতেও এটা বর্ণিত হয়েছে। একটা দুর্বল বর্ণনায় আছে যে, হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) খিলাফত কালে এক বছর ফড়িং দেখা যায়নি। এমনকি অনুসন্ধান করেও এর কোন পাত্তা মিলেনি। তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন এবং সিরিয়া ও ইরাকে অশ্বারোহী পাঠিয়ে দিলেন এজন্য যে, কোনও স্থানে ফড়িং দেখা যায় কিনা। ইয়ামন যাত্রী অল্প বিস্তর ফড়িং ধরে এনে আমীরুল মুমেনীনের সামনে হাযির করলেন। তিনি তা দেখে তাকবীর ধ্বনি করলেন এবং বললেন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতে শুনেছিঃ “আল্লাহ তা'আলা এক হাজার জাতি সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্য ছয়শো পানিতে, চারশো স্থলে। তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম যে জাতি ধ্বংস হবে তা হবে ফড়িং। অতঃপর ক্রমাগত সব জাতিই একে একে ধ্বংস হয়ে যাবে যেমনভাবে তসবীহের সূতা কেটে গেলে দানাগুলি ক্রমাগত ঝরে পড়ে। কিন্তু এ হাদীসের রাবী বা বর্ণনাকারী মুহাম্মদ বিন ঈসা হিলালী দুর্বল। হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়্যেব (রঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। ওয়াহিব বিন মামবাহ বলেন যে, আঠারো হাজার ‘আলামের মধ্যে সারা। দুনিয়া একটি ‘আলম। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, চল্লিশ হাজার ‘আলামের মধ্যে সারা দুনিয়া একটা ‘আলম। যাযাজ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা ইহজগত ও পরজগতে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন সবই ‘আলম। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, এ মতটিই সত্য। কেননা এর মধ্যে সমস্ত ‘আলমই জড়িত রয়েছে। যেমন ফিরআউনের বিশ্বপ্রভু কৈ' এই প্রশ্নের উত্তরে হযরত মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ ‘আসমান, যমীন এবং এ দুয়ের মধ্যে স্থলে যা কিছু আছে সবারই তিনি প্রভূ।'(আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দ হতে নেওয়া হয়েছে। কেননা, আলম সৃষ্ট বস্তু তার সৃষ্টিকারীর অস্তিত্বের পরিচয় বহন করে এবং তাঁর একত্ববাদের চিহ্নরূপে কাজ করে থাকে। যেমন কবি ইবনে মুতায এর কথাঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহর অবাধ্য হওয়া বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে, এবং এটাও বিস্ময়জনক যে, কিভাবে অস্বীকারকারী তাকে অস্বীকার করছে। অথচ প্রতিটি জিনিসের মধ্যেই এমন স্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে যা প্রকাশ্যভাবে তার একত্ববাদের পরিচয় বহন করছে।
আল-ফাতিহা 1:2
এর তাফসীর পূর্বেই করা হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির আর কোন প্রয়োজন নেই। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, মহান আল্লাহ (আরবি)-এর বিশেষণের পর (আরবি) নামক বিশেষণটি ভয় প্রদর্শনের পর আশা ভরসার উদ্রেক কল্পে আনয়ন করেছেন। যেমন তিনি অন্যত্র বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আমার বান্দাগণকে সংবাদ দাও যে, আমি ক্ষমতাশালী ও দয়ালু এবং আমার শাস্তিও বেদনাদায়ক। (১৫:৪৯-৫০) তিনি আরও বলেছেনঃ “তোমার প্রভু সত্বরই শাস্তি প্রদানকারী এবং তিনি দয়ালু ও ক্ষমাশীলও বটে।রব’ শব্দটির মধ্যে ভয় প্রদর্শন রয়েছে এবং রাহমান’ ও ‘রাহীম' শব্দ দুইটির মধ্যে আশা ভরসা রয়েছে। সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যদি ঈমানদারগণ আল্লাহর ক্রোধ এবং তার ভীষণ শাস্তি সম্পর্কে পূর্ণভাবে অবহিত হতো তবে তাদের অন্তর হতে বেহেশতের নন্দন কাননের লোভ লালসা সরে যেতো এবং কাফিরেরা যদি আল্লাহ তা'আলার দান ও দয়া দাক্ষিণ্য সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞান রাখতে তবে তারা কখনও নিরাশ ও হতাশাগ্রস্ত হতো না।'
আল-ফাতিহা 1:3
কারীদের কেউ কেউ একে (আরবি) পড়েছেন এবং অন্যান্য সবাই (আরবি) পড়েছেন। এই দুই পঠনই বিশুদ্ধ, মুতাওয়াতির এবং অনুমোদিত সাতটি কিরাআতের অন্তর্গত (আরবি) এর (আরবি) কে যেরের সঙ্গে যমের সঙ্গে এবং (আরবি) ও (আরবি) ও পড়া হয়েছে। প্রথম পঠন দুইটি অর্থ হিসেবে অগ্রগণ্য এবং দুটোই শুদ্ধতর ও উত্তম। ইমাম যামাখশারী (রঃ) (আরবি) কেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কেননা, মক্কা ও মদীনাবাসীদের কিরআত এটাই। তাছাড়া কুরআন মাজীদের মধ্যে (আরবি) এবং (আরবি) রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) হতেও নকল করা হয়েছে যে, তিনি (আরবি) এবং (আরবি)-এর উপর ভিত্তি করে (আরবি) পড়েছেন। কিন্তু এটা শাজ-বিরল এবং অত্যন্ত গারীব। আবু বকর বিন আবি দাউদ (রঃ) এতে আরও একটি গারীব বর্ণনা পেশ করেছেন, তা হচ্ছে এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর তিনজন খলীফা (রাঃ), হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এবং তাঁর ছেলে (আরবি) পড়তেন। ইবনে শিহাব বলেন যে, সর্বপ্রথম মারওয়ান (আরবি) পড়েছিলেন। কিন্তু আমাদের ধারণা এই যে, এ কিরআতের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে মারওয়ানের সম্যক অবগতি ছিল, যা স্বয়ং বর্ণনাকারী শিহাবের ছিল না। আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন।ইবনে মিরদুওয়াই কয়েকটা সনদের সঙ্গে এটা বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) পড়তেন (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দ হতে নেয়া হয়েছে। যেমন কুরআন পাকে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থৎ “নিশ্চয়ই পৃথিবী ও তার উপরিভাগের সমুদয় সৃষ্ট বস্তুর মালিক আমিই এবং আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” (১৯:৪০) তিনি আরও বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি বল-আমি মানুষের প্রভুর নিকট ও মানুষের মালিকের নিকট আশ্রয় চাচ্ছি (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দ হতে নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক কুরআন মাজীদে বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আজ রাজ্য কার? শুধুমাত্র মহাশক্তিশালী এক আল্লাহরই।' (৪০:১৬) তিনি আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তার কথাই সত্য এবং সমস্ত রাজ্য তারই? আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আজকে আল্লাহই রাজ্যের অধিকারী এবং আজকের দিন কাফিরদের জন্যে অত্যন্ত কঠিন দিন।' (২৫:২৬) মহান আল্লাহর এ উক্তি অনুসারের কিয়ামতের দিনের সঙ্গে তার অধিকারকে নির্দিষ্ট করার অর্থ এই নয় যে, কিয়ামত ছাড়া অন্যান্য জিনিসের অধিকারী হতে তিনি অস্বীকার করছেন, কেননা ইতিপূর্বে তিনি স্বীয় বিশেষণ রাব্বল আলামীন' রূপে বর্ণনা করেছেন এবং ওর মধ্যেই দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই জড়িত রয়েছে। কিয়ামতের দিনের সঙ্গে অধিকারকে নির্দিষ্টকরণের কারণ এই যে, সেই দিন তো আর কেউ সার্বিক অধিকারের দাবীদারই হবে না। বরং সেই প্রকৃত অধিকারী আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কেউ মুখ পর্যন্ত খুলতে পারবে না। এমনকি টু শব্দটিও করতে পারবে না। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ প্রাণী ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে, আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন সে ছাড়া আর কেউ কথা বলতে পারবে না এবং সে কথাও ঠিক ঠিক বলবে।' (৭৮:৩৮) অন্য এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ রাহমানুর রাহীমের সামনে সমস্ত শব্দ নত হয়ে যাবে। এবং ক্ষীণকণ্ঠের গুন্ গুন্ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাবে না।' (২০:১০৮) তিনি আরও বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘কিয়ামত আসবে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ কথা বলতে বা মুখ খুলতে পারবে না, তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগ্য এবং কেউ হবে ভাগ্যবান। (১১:১০৫)।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘সেদিন তার রাজত্বে তিনি ছাড়া আর কেউই থাকবে না, যেমন দুনিয়ার বুকে রূপক অর্থে ছিল।' (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সমগ্র সষ্ট জীবের হিসাব দেয়ার দিন অর্থাৎ কিয়ামতের দিন, যেদিন সমস্ত ভাল-মন্দ কাজের ন্যায্য ও চুলচেরা প্রতিদান দেয়া হবে। হ্যা, তবে যদি মহান আল্লাহ কোন কাজ নিজ গুণে মার্জনা করেন তবে তা হবে তার ইচ্ছা ভিত্তিক কাজ। সাহাবা (রাঃ), তাবেঈন (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় সৎ ব্যক্তিগণ হতেও এটা বর্ণিত হয়েছে। কোন কোন ব্যক্তি হতে এ কথাও বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে। আল্লাহ কিয়ামত ঘটাতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ কথাটাকে দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু বাহ্যতঃ এ দুটো কথার মধ্যে কোন বিরোধ নাই, প্রত্যেক কথার কথক অপরের কথার সত্যতা প্রমাণ করছে। তবে প্রথম কথাটি ভাবার্থের জন্যে বেশী প্রামাণ্য। যেমন আল্লাহ পাকের ঘোষণা রয়েছেঃ (আরবি) এবং দ্বিতীয় কথাটি নিম্নের এ আয়াতের অনুরূপঃ(আরবি) অর্থাৎ যেদিন তিনি বলবেন হও’ তখনই হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। কেননা মহান আল্লাহই সব কিছুরই প্রকৃত মালিক। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি)সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইয়রা (রাঃ) হতে এই মারফু হাদীসটি বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তির নাম আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যন্ত জঘন্য, ও নিকৃষ্ট যাকে শাহান শাহ বা রাজাধিরাজ বলতে হয়। কারণ সব কিছুরই প্রকৃত মালিক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। উক্ত সহীহ হাদীস গ্রন্থদ্বয়ের মধ্যে এসেছে যে, আল্লাহ পাক সেদিন সমগ্র যমীনকে স্বীয় মুষ্ঠির মধ্যে গ্রহণ করবেন এবং আকাশ তার দক্ষিণ হস্তে ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ হয়ে জড়িয়ে থাকবে, অতঃপর তিনি বলবেনঃ ‘আমি আজ প্রকৃত বাদশাহ, যমীনের সেই প্রতাপশালী বাদশাহরা কোথায় গেল? কোথায় রয়েছে। সেই মদমত্ত অহংকারীগণ? কুরআন কারীমে আরও রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ আজ রাজত্ব কার? শুধুমাত্র মহাপরাক্রান্ত এক আল্লাহরই'। অন্যকে তাই শুধু রূপক অর্থে মালিক বলা হয়েছে। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা নিশ্চয় তালুতকে তোমাদের জন্যে মালিক বা বাদশাহ করে পাঠিয়েছেন।' (২:২৪৭) এখানে তালুতকে মালিক বলা হয়েছে। অনুরূপভাবে (আরবি) এই শব্দও এসেছে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে (আরবি) শব্দ এসেছে এবং কুরআন মাজীদের একটি আয়াতে আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তিনি তোমাদের মধ্যে নবী করেছেন এবং তোমাদেরকে বাদশাহ বানিয়েছেন।' (৫:২১) সহীহ বুখারী ও মুসলিমে একটি হাদীসে আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘সিংহাসনে অধিষ্ঠিত বাদশাহদের ন্যায়।' (আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রতিদান, প্রতিফল এবং হিসাব নিকাশ। যেমন আল্লাহ তা'আলা কুরআন পাকের মধ্যে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘সেদিন আল্লাহ তাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান দেবেন।' (২৪:২৫) পবিত্র কুরআনের অন্য জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আমাদেরকে কি প্রতিদান দেয়া হবে' হাদীসে আছেঃ পণ্ডিত সেই ব্যক্তি যে নিজেই নিজের কাছে প্রতিদান নেয় এবং এমন কার্যাবলী সম্পাদন করে যা অবধারিত মৃত্যুর পরে কাজে লাগে।' অর্থাৎ নিজের আত্মার কাছে নিজেই হিসাব নিকাশ নিয়ে থাকে। যেমন হযরত ফারুকে আযম (রাঃ) বলেছেনঃ তোমাদের হিসাব নিকাশ গৃহীত হওয়ার পূর্বে তোমরা নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ কর এবং তোমাদের কার্যাবলী দাড়ি পাল্লায় ওজন হওয়ার পূর্বে তোমরা নিজেরাই ওজন কর এবং তোমরা আল্লাহর সামনে উপস্থাপিত হওয়ার পূর্বে সেই বড় উপস্থিতির জন্যে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ কর যেদিন তোমাদের কোন কাজ গোপন থাকবে না। যেমন স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যেদিন তোমাদেরকে হাযির করা হবে সেদিন তোমাদের কোন কথা আল্লাহর নিকট গোপন থাকবে না।' (৬৯:১৮)
আল-ফাতিহা 1:4
সাতজন কারী এবং জমহুর একে (আরবি) (ঈয়্যাকা) পড়েছেন। আমর বিন সাঈদ তাশদীদ ছাড়া একে হালকা করে (আরবি) (ইয়্যাকা) পড়েছেন। কিন্তু এ কিরাআত বিরল ও পরিত্যাজ্য। কেননা (আরবি) ইয়্যা-এর অর্থ হচ্ছে সূর্যের আলো। আবার কেউ কেউ (আরবি) এ (আয়াকা) আবার কেউ কেউ (আরবি) (হাইয়্যাকা) ও পড়েছেন। আরব কবিদের কবিতায়ও (হাইয়্যাকা) আছে। যেমন- (আরবি)ইয়াহইয়া বিন অসাব ও আমাশ ছাড়া সকল কারীর কাছেই (আরবি)-এর পঠন নূনের যবরের সঙ্গে। কিন্তু এঁরা দু'জন প্রথম নূনটিকে যের দিয়ে পড়ে থাকেন। বানূ আসাদ, রাবীআ' এবং বানূ তামীম গোত্রের লোকেরাও এরকমই পড়ে থাকেন। ইবাদত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সার্বিক অপমান ও নীচতা। তারীকে মোয়াববাদ’ সাধারণ ঐ পথকে বলে যা সবচেয়ে হীন ও নিকৃষ্ট হয়ে থাকে। এ রকমই (আরবি) ঐ উটকে বলা হয় যা হীনতা ও দুর্বলতার চরম সীমায় পদার্পণ করে। শরীয়তের পরিভাষায় প্রেম, বিনয়, নম্রতা এবং ভীতির সমষ্টির নাম ‘ইবাদত' (আরবি) শব্দটি (আরবি) , একে পূর্বে আনা হয়েছে, অতঃপর তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যাতে তার গুরুত্ব বেড়ে যায় এবং সাহায্য প্রার্থনার জন্যে যেন একমাত্র আল্লাহই বিশিষ্ট হয়ে যান। তা হলে বাক্যটির অর্থ এ দাঁড়ায়ঃ আমরা আপনার ছাড়া আর কারো ইবাদত করি না এবং আপনার ছাড়া আর কারো উপর নির্ভর করি না। আর এটাই হচ্ছে পূর্ণ আনুগত্য ও বিশ্বাস। সালাফে সালেহীন বা পূর্বযুগীয় প্রবীণ ও বয়োবৃদ্ধ গুরুজনদের কেউ কেউ এ মত পোষণ করেন যে, সম্পূর্ণ কুরআনের গোপন তথ্য রয়েছে সূরা ফাতিহার মধ্যে এবং এ পূর্ণ সূরাটির গোপন তথ্য রয়েছে (আরবি) নামক এই আয়াতটির মধ্যে। আয়াতটির প্রথমাংশে রয়েছে শিরকের প্রতি অসন্তুষ্টি এবং দ্বিতীয়াংশে রয়েছে স্বীয় ক্ষমতার উপর অনাস্থা ও মহা শক্তিশালী আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা। এ সম্পর্কীয় আরও বহু আয়াত কুরআন পাকে বিদ্যমান রয়েছে। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারই ইবাদ কর ও তারই উপর নির্ভর কর এবং (জেনে রেখ যে,) তোমরা যা করছে তা হতে তোমাদের প্রভু উদাসীন নন। (১১:১২) তিনি আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ বলে দাও-তিনি রাহমান, আমরা তার উপর ঈমান এনেছি এবং তাঁরই উপর আমরা ভরসা করেছি।' (৬৭:২৯) আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ পূর্ব ও পশ্চিমের প্রভু তিনিই, তিনি ছাড়া আর কেউ উপাস্য নেই, সুতরাং তাঁকেই একমাত্র কার্যসম্পাদনকারীরূপে গ্রহণ কর।' (৭০:৯)(আরবি) এই আয়াত-ই-কারীমের মধ্যেও এই বিষয়টিই রয়েছে। পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে সম্মুখস্থ কাউকে লক্ষ্য করে সম্বোধন ছিল না। কিন্তু এ আয়াতটিতে আল্লাহ পাককে সম্বোধন করা হয়েছে এবং এতে বেশ সুন্দর পারস্পরিক সম্বন্ধ রয়েছে। কেননা বান্দা যখন আল্লাহর গুণাবলী বর্ণনা করলো তখন সে যেন মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহর সম্মুখে হাযির হয়ে গেল। এখন সে মালিককে সম্বোধন করে স্বীয় দীনতা, হীনতা ও দারিদ্রতা প্রকাশ করলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে আল্লাহ! আমরা তো আপনার হীন ও দুর্বল দাস মাত্র এবং আমরা সর্বকার্যে, সর্বাবস্থা ও সাধনায় একমাত্র আপনারই মুখাপেক্ষী। এ আয়াতে একথারও প্রমাণ রয়েছে যে, এর পূর্ববর্তী সমস্ত বাক্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে খবর দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা স্বীয় উত্তম গুণাবলীর জন্যে নিজের প্রশংসা নিজেই করেছিলেন এবং বান্দাদেরকে ঐ শব্দগুলি দিয়েই তার প্রশংসা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এজন্যেই যে ব্যক্তি এ সূরাটি জানা সত্ত্বেও নামাযে তা পাঠ করে না তার নামায হয় না। যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে হযরত উবাদাহ বিন সাবিত হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তির নামাযকে নামায বলা যায় না যে নামাযের মধ্যে সূরা-ই-ফাতিহা পাঠ করে না। সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে, আল্লাহ বলেছেনঃ আমি নামাযকে আমার মধ্যে ও আমার বান্দার মধ্যে অর্ধেক অর্ধেক ভাগ করে নিয়েছি। অর্ধেক অংশ আমার ও বাকী অর্ধেক অংশ আমার বান্দার। বান্দা যা চাইবে তাকে তাই দেয়া হবে। বান্দা যখন (আরবি) বলে, তখন আল্লাহ বলেনঃ “আমার বান্দা আমার প্রশংসা করলো।” বান্দা যখন বলে, (আরবি) তখন তিনি বলেনঃ ‘আমার বান্দা আমার গুণগান করলো। যখন সে বলে (আরবি) তখন তিনি বলেনঃ “আমার বান্দা আমার শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করলো। সে যখন বলে (আরবি) তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা আমার এবং আমার বান্দার মধ্যেকার কথা এবং আমার বান্দার জন্যে তাই রয়েছে যা সে চাইবে। অতঃপর বান্দা যখন শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলে তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন এ সব তো আমার বান্দার জন্যে এবং আমার বান্দা যা চাইবে তার জন্যে। তাই রয়েছে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছেঃ “হে আমার প্রভূ! আমরা বিশেষভাবে একত্ববাদে বিশ্বাসী, আমরা ভয় করি এবং মহান সত্তায় সকল সময়ে আশা রাখি। আপনি ছাড়া আর কারও আমরা ইবাদতও করি না, কাউকে ভয় করি না এবং কারও উপর আশাও রাখি না। আর (আরবি)-এর তাৎপর্য ও ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমরা আপনার পূর্ণ আনুগত্য বরণ করি ও আমাদের সকল কার্যে একমাত্র আপনারই কাছে সহায়তা প্রার্থনা করি।কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন তোমরা একমাত্র তাঁরই উপাসনা কর এবং তোমাদের সকল কার্যে তারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর।' (আরবি) কে পূর্বে আনার কারণ এই যে, ইবাদতই হচ্ছে মূল ঈপ্সিত বিষয়, আর সাহায্য চাওয়া ইবাদতেরই মাধ্যম ও ব্যবস্থা। আর সাধারণ নিয়ম হচ্ছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে পূর্বে বর্ণনা করা এবং কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে পরে বর্ণনা করা। আল্লাহ তা'আলাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন।যদি প্রশ্ন করা হয় যে, এখানে বহুবচন অর্থাৎ আমরা ব্যবহার করার কি প্রয়োজন? যদি এটা বহুবচনের জন্যে হয় তবে উক্তিকারী তো একজনই। আর যদি সম্মান ও মর্যাদার জন্যে হয় তবে এ স্থানে এটা খুবই অশোভনীয়। কেননা, এখানে তো দীনতা ও বিনয় প্রকাশ করাই মুখ্য উদ্দেশ্য। এ প্রশ্নের উত্তর এই .যে, একজন বান্দা যেন সমস্ত বান্দার পক্ষ থেকে সংবাদ দিচ্ছে, বিশেষ করে যখন সে জামা'আতের সঙ্গে নামাযে দাঁড়ায় ও ইমাম নির্বাচিত হয়। সুতরাং সে যেন নিজেরও তার সমস্ত মুমিন ভাই-এর পক্ষ থেকে নতশিরে স্বীকার করছে যে, তারা সবাই তার দীনহীন বান্দা এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্যে সৃষ্ট হয়েছে, আর সে তাদের পক্ষ থেকে মঙ্গলের নিমিত্তে আগে বেড়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে এটা সম্মানের জন্যে। বান্দা যখন ইবাদত বন্দেগীতে আত্মনিয়োগ করে তখন যেন তাকেই বলা হয়ঃ “তুমি দ্র, তোমার সম্মান আমার দরবারে খুবই বেশী। সুতরাং তুমি (আরবি) বলে নিজেকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ কর। কিন্তু যখন ইবাদত হতে আলাদা হবে তখন আমরা বলবে না, যদিও হাজার হাজার বা লাখ লাখ লোকের মধ্যে অবস্থান কর। কেননা, সবাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী ও তার দরবারে নিঃস্ব ভিক্ষুক। কারও কারও মতে (আরবি)-এর মধ্যে যতটা বিনয় ও নম্রতার ভাব রয়েছে। (আরবি)-এর মধ্যে ততটা নেই। কেননা এর মধ্যে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও ইবাদতের উপযুক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। অথচ আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ ও যথোপযুক্ত ইবাদত করতে কোন বান্দা কোন ক্রমেই সক্ষম নয়। কোন কবি বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমাকে তাঁর দাস বলেই ডাকো, কেননা এটাই আমার সর্বোত্তম নাম। যেখানে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বড় বড় দানের কথা উল্লেখ করেছেন সেখানেই শুধু তিনি তাঁর রাসূলের (সঃ) (আরবি) নাম বা দাস নিয়েছেন। বড় বড় নিয়ামত যেমন কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ করা, নামাযে দাঁড়ানো, মিরাজ করানো ইত্যাদি। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) (১৮:১) আরও বলেছেনঃ (৭২:১৯) (আরবি) অন্যত্র বলেছেনঃ (১৭:১) (আরবি)সঙ্গে সঙ্গে কুরআন মাজীদের মধ্যে এ শিক্ষা দিয়েছেনঃ “হে নবী (সঃ)! বিরুদ্ধবাদীদের অবিশ্বাসের ফলে যখন তোমার মন সংকীর্ণ হয়ে পড়ে তখন তুমি আমার ইবাদতে লিপ্ত হয়ে যাও।' তাই নির্দেশ হচ্ছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি জানি যে, শত্রুদের কথা তোমার মনে কষ্ট দিচ্ছে, সুতরাং সে সময় তুমি স্বীয় প্রভুর প্রশংসাকীর্তণ কর এবং সিজদাহ কর। আর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তোমার প্রভুর ইবাদতে লেগে থাক।' (১৫:৯৭-৯৯) ইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে কোন কোন লোক হতে নকল করেছেন যে, উবুদিয়তের মান রিসালতের মান হতে উত্তম। কেননা, ইবাদতের সম্পর্ক সৃষ্ট বান্দা হতে সৃষ্টিকর্তার দিকে হয়ে থাকে, আর রিসালাতের সম্পর্ক হয় সৃষ্টিকর্তা থেকে সৃষ্টির দিকে এবং এ দলীলের দ্বারাও যে, বান্দার সমস্ত সংশোধনমূলক কার্যের জিম্মাদার হন স্বয়ং আল্লাহ, আর রাসূল (সঃ) তাঁর উম্মতের সৎ কার্যাবলীর অভিভাবক হয়ে থাকেন। কিন্তু এ কথাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং এর দুটো দলীলই দুর্বল ও ভিত্তিহীন। বড়ই দুঃখের বিষয় এই যে, ইমাম ফাখরুদ্দীন রাযী না একে দুর্বল বললেন আর না একে পরিত্যাগ করলেন না এর বিরোধিতা করলেন। . কোন কোন সুফীর মত এই যে, ইবাদত করা হয় সাধারণতঃ পুণ্য লাভের উদ্দেশ্যে অথবা শাস্তি প্রতিরোধ করার মানসে। তিনি বলেন এটা কোন উপকারী কাজ নয়। কেননা, তখন উদ্দেশ্য থাকে শুধু স্বীয় স্বার্থ সিদ্ধির। ইবাদতের সবচেয়ে উত্তম পন্থা এই যে, মানুষ সেই মহান সত্তার ইবাদত করবে যিনি সমুদয় গুণে গুণান্বিত, ইবাদত করবে শুধু তার সত্তার জন্যে এবং উদ্দেশ্য অন্য কিছু আর থাকবে না। এজন্যেই নামাযের নিয়্যাত হয় শুধু আল্লাহর জন্যে নামায পড়ার। যদি ওটা পুণ্যলাভ ও শাস্তি হতে বাঁচার জন্যে হয় তবে তা বাতিল হয়ে যাবে। অন্য দল এটা খণ্ডন করে থাকেন এবং বলে থাকেন যে, পুণ্যের আশায় ও শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে ইবাদত করলেও ওটা একমাত্র আল্লাহর জন্যে হওয়াতে কোন অসুবিধে নেই। এর দলীল এই যে,একজন বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাজির হয়ে আরয করলোঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার মত পড়তে জানি না এবং মু'আযের (রাঃ) মতও নয়। আমি তো শুধু আল্লাহর নিকট জান্নাত চাই এবং জাহান্নাম হতে মুক্তি কামনা করি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ আমরাও তারই কাছাকাছি (উদ্দেশ্যে নামায) পড়ে থাকি।'
আল-ফাতিহা 1:5
আলোচ্য শব্দটি জমহুর (আরবি) পড়েছেন। কেউ কেউ (আরবি). পড়েছেন এবং (আরবি) দ্বারাও একটা পঠনের কথা বর্ণিত আছে। যারা বলেন যে, বনী উজরাহ্ ও বনী কালবের পঠন এটাই। যেহেতু বান্দা প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করেছে এবং তার গুণাবলী বর্ণনা করেছে, সেহেতু এখন তার কর্তব্য হবে স্বীয় প্রয়োজন পূরণের জন্যে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা। যেমন পূর্বেই হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘অর্ধেক অংশ আমার ও অর্ধেক অংশ আমার বান্দর এবং আমার বান্দার জন্যে তাই রয়েছে যা সে চাইবে। একটু চিন্তা করলেই দেখা যাবে যে, (আরবি)-এর মধ্যে কি পরিমাণ সূক্ষ্মতা ও প্রকৃষ্টতা রয়েছে। প্রথমে বিশ্ব প্রভুর যথোপযুক্ত প্রশংসা ও গুণকীর্তন, অতঃপর নিজের ও মুসলিম ভাইদের প্রয়োজন পূরণের জন্য আকুল প্রার্থনা। প্রার্থিত বস্তু লাভের এটাই উৎকৃষ্ট পন্থা। এ উত্তম পন্থা নিজে পছন্দ করেই মহান আল্লাহ এ পন্থা স্বীয় বান্দাদের বাতলিয়ে দিলেন। কখনও কখনও প্রার্থনার সময় প্রার্থী স্বীয় অবস্থা ও প্রয়োজন প্রকাশ করে থাকে। যেমন হযরত মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ হে আমার প্রভু! যে কোন মঙ্গলই আপনি আমার নিকট পাঠান, আমি তার প্রত্যাশী ও মুখাপেক্ষী।' (২৮:২৪) হযরত ইউনুস (আঃ) দু'আর সময় বলেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আপনি ছাড়া আর কেউ উপাস্য নেই, আমি সর্বান্তঃকরণে আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং নিশ্চয় আমি অত্যাচারীগণের অন্তর্ভুক্ত হয়েছি।' (২১:৮৭) কোন কোন প্রার্থনায় প্রার্থী শুধুমাত্র প্রশংসা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেই নীরব থাকে। যেমন কবির কথাঃ (আরবি)অর্থাৎ আমার প্রয়োজনের বর্ণনা দেয়ার তেমন কোন দরকার নেই, তোমার দয়াপূর্ণ দানই আমার জন্যে যথেষ্ট। আমি জানি যে, দান ও সুবিচার তোমার পবিত্র ও চিরাচরিত অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত। শুধু তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করে দেয়া, তোমার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করাই আমার প্রয়োজন পূরণের জন্যে যথেষ্ট।এখানে হিদায়াতের অর্থ ইরশাদ ও তাওফীক অর্থাৎ সুপথ প্রদর্শন ও সক্ষমতা প্রদান। কখনও এই ‘হিদায়াত' শব্দটি নিজেই (আরবি) বা সকর্মক ক্রিয়া হয়ে থাকে, যেমন এখানে হয়েছে। তাহলে (আরবি) এ সবেরই অর্থ হবে আমাদেরকে প্রদান করুন। অন্যত্র রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ আমি তাদেরকে ভাল ও মন্দ এ দুটি পথ দেখিয়েছি।' (৯০:১০) কখনও ‘হিদায়াত’ শব্দটি (আরবি) এর সঙ্গে (আরবি)বা সকর্মক ক্রিয়া হয়ে থাকে। যেমন বলেছেনঃ (আরবি) (১৬:১২১) এবং অন্য জায়গায় বলেছেন (আরবি) (৩৭:২৩) এখানে হিদায়াতের অর্থ পথ প্রদর্শন ও রাস্তা বাতলান। এইরূপ ঘোষণা রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি অবশ্যই সরল পথ প্রদর্শন করেছে।' (৪২:৫২) আবার কখনও (আরবি) শব্দটি (আরবি) এর সঙ্গে (আরবি) হয়ে থাকে। যেমন জ্বিন বা দানবের কথা কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ সেই আল্লাহর সমুদয় প্রশংসা যিনি আমাদেরকে এর জন্যে পথ দেখিয়েছেন।' (৭:৪৩) (অর্থাৎ অনুগ্রহ পূর্বক সৎপথে পরিচালিত হওয়ার তাওফীক দান করেছেন) (আরবি) এর কয়েকটি অর্থ আছে। ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে সুস্পষ্ট, সরল ও পরিষ্কার রাস্তা যার কোন জায়গা বা কোন অংশই বাঁকা নয়। এ প্রসঙ্গে কবি জারীর বিন ' আতিয়া আল-খাতফী বলেনঃ (আরবি)রূপক অর্থে (আরবি) এর ব্যবহার আরবীয়দের কাছে কথা এবং কাজের উপরও হয়ে থাকে। আবার (আরবি) এর বিশেষণ কখনও সোজা হয় এবং কখনও বাকা হয়। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাসসিরগণ হতে এর বহু তাফসীর নকল করা হয়েছে এবং ওগুলোর সারাংশ প্রায় একই, আর তা হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য। একটি মারফু হাদীসে আছে যে, (আরবি) হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) ইবনে জারীরও (রঃ) এরূপই বর্ণনা করেছেন। কুরআন কারীমের ফযীলত সম্পর্কীয় হাদীসে ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহর কিতাব এই কুরআন পাক হচ্ছে শক্ত রশি বা রঞ্জু, জ্ঞানপূর্ণ উপদেশ এবং সরল পথ বা সিরাতুম মুসতাকীম। (মুসনাদ-ই-আহমাদ ও জামে তিরমিযী) হযরত আলীরও (রাঃ) এটাই অভিমত। আল্লাহই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) উক্তি রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! (আরবি) বলুন। অর্থাৎ আমাদেরকে হিদায়াত বিশিষ্ট পথের ইলহাম করুন এবং তা হলো আল্লাহর দ্বীন, যার মধ্যে কোন বক্রতা নেই। তার নিকট থেকে এ কথাও বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ইসলাম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও বহু সাহাবী (রাঃ) হতেও এ তাফসীরই নকল করা হয়েছে। হযরত জাবির (রাঃ) বলেন (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছে ইসলাম যা আকাশ, পৃথিবী ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সমুদয় বস্তু হতে প্রশস্ততম। ইবনে হানাফিয়্যাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহর সেই দ্বীন যা ছাড়া অন্য দ্বীন গ্রহণীয় নয়। আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলামের (রঃ) উক্তি এই যে, (আরবি) হচ্ছে ইসলাম। মুসনাদ-ই-আহমদের একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা (আরবি) এর একটা দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। (তা এই যে,) সীরাতে মুসতাকীমের দুই দিকে দুইটি প্রাচীর রয়েছে। তাতে কয়েকটি খোলা দরজা আছে। দরজাগুলির উপর পর্দা লটকানো রয়েছে। সীরাতে মুসতাকীমের প্রবেশ দ্বারে সব সময়ের জন্যে একজন আহবানকারী নিযুক্ত রয়েছে। সে বলছে- হে জনমণ্ডলী! তোমরা সবাই এই সোজা পথ ধরে চলে যাও, আঁকা বাঁকা পথে যেওনা। ঐ রাস্তার উপরে একজন আহ্বানকারী রয়েছে। যে কেউ এ দরজাগুলির কোন একটি খুলতে চাচ্ছে সে বলছে-সাবধান, তা খোল , যদি খোল, তবে সোজা পথ থেকে সরে পড়বে। সীরাতে মুসতাকীম হচ্ছে ইসলাম, প্রাচীরগুলো আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ, প্রবেশ দ্বারে আহ্বানকারী হচ্ছে কুরআন কারীম এবং রাস্তার উপরের আহ্বানকারী হচ্ছে আল্লাহর ভয় যা প্রত্যেক ঈমানদারের অন্তরে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে উপদেষ্টা রূপে অবস্থান করে থাকে। এ হাদীসটি মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম, তাফসীর-ইইবনে জারীর, জামে তিরমিযী এবং সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও রয়েছে এবং এর ইসনাদ হাসান সহীহ। আল্লাহই এ ব্যাপারে সবচাইতে ভাল জানেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘হক বা সত্য'। তাঁর এ কথাটিই সবচাইতে ব্যাপক এবং এসব কথার মধ্যে পারস্পরিক কোন বিরোধ নেই।হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে নবী (সঃ) ও তাঁর পরবর্তী দু’জন খলীফা (রাঃ)। আবুল আলিয়া (রঃ) এ কথাটির সত্যতা ও উৎকৃষ্টতা অপকটে স্বীকার করেন। প্রকৃতপক্ষে এ সব মত সঠিক এবং একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। নবী করীম (সঃ) এবং তাঁর দু'জন খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ও হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) অনুসারীগণ ন্যায় ও সত্যের অনুসারী, যারা ইসলামের অনুসারী তারা পবিত্র কুরআনকে মান্যকারী এবং কুরআন আল্লাহর কিতাব, তাঁর সুদৃঢ় রঞ্জু এবং তার সোজা পথ। অতঃপর সীরাতে মুসতাকীমের তাফসীরের ব্যাপারে এ সমুদয় উক্তিই সঠিক এবং একে অপরের সত্যতা সমর্থনকারী। অতএব সমুদয় প্রশংসা একমাত্র আল্লাহরই জন্যে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ সীরাতে মুসতাকীম সেই পুণ্য সনাতন পথ যার উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে ছেড়ে গিয়েছেন। ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীরের (রঃ) ফায়সালা হচ্ছে এইঃ ‘আমার নিকট এ আয়াতের সর্বোত্তম তাফসীর এই যে, আমাদেরকে যেন এমন কাজের তাওফীক দেয়া হয় যা আল্লাহ তা'আলার ইঙ্গিত কাজ এবং যার উপর চললে আল্লাহ তাঁর বান্দার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং তাকে পুরস্কৃত করেন। এটাই সীরাতে মুসতাকীম। কেননা, তাকে এমন দানে ভূষিত করা হবে যে দান দ্বারা আল্লাহর মনোনীত বান্দাদেরকে ভূষিত করা হয়েছিল। যাঁরা নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং সৎ প্রকৃতির লোক ছিলেন। যারা ইসলাম ও রাসূলগণের (আঃ) সত্যতা সর্বোতভাবে স্বীকার করেছিলেন এবং কুরআনকে হাতে দাঁতে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছিলেন, যারা আল্লাহর নির্দেশাবলী নতশিরে মেনে চলে ছিলেন ও আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়াবলী হতে বিরত রয়েছিলেন। আর নবী করীম (সঃ), তাঁর চার খলীফা (রাঃ) ও সমস্ত সৎ বান্দার পথে চলবার তাওফীক দেয়া, এটাই হচ্ছে সীরাতে মুসতাকীম।”যদি প্রশ্ন করা হয় যে, মুমিনের তো পূর্বেই আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত লাভ হয়ে গেছে, সুতরাং নামাযে বা বাইরে হিদায়াত চাওয়ার আর প্রয়োজন কি? তবে সেই প্রশ্নের উত্তর এই যে, এতে উদ্দেশ্য হচ্ছে হিদায়াতের উপর সদা প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক চাওয়া। কেননা, বান্দা প্রতিটি মুহূর্তে ও সর্বাবস্থায় প্রতিনিয়তই আল্লাহ তা'আলার আশাধারী ও মুখাপেক্ষী। সে নিজে স্বীয় জীবনের লাভ ক্ষতির মালিক নয়। বরং নিশিদিন সে আল্লাহরই প্রত্যাশী ও মুখাপেক্ষী। এ জন্যেই আল্লাহ পাক তাকে শিখিয়েছেন যে, সে যেন সর্বদা হিদায়াত প্রার্থনা করে এবং তার উপর সদা প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক চাইতে থাকে। ভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তাঁর দরজায় ভিক্ষুক করে নিয়েছেন। সে আল্লাহকে ডাকলে আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দিয়ে তার আকুল প্রার্থনা মঞ্জুর করার গুরু দায়িত্ব স্কন্ধে নিয়েছেন। বিশেষ করে দরিদ্র, অসহায় ও মুহতাজ ব্যক্তি যখন দিনরাত আল্লাহকে ডাকতে থাকে এবং প্রয়োজন পূরণের প্রার্থনা জানায়, আল্লাহ তখন তার সেই আকুল প্রার্থনা কবুলের জিম্মাদার হয়ে যান। আল্লাহ পাক কুরআন মাজীদে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উপর, তাঁর রাসূলের উপর, সেই কিতাবের উপর যা তিনি তাঁর রাসূলের উপর অবতীর্ণ করেছেন এবং ঐ সমুদয় কিতাবের উপর যা ইতিপূর্বে অবতীর্ণ করেছেন, এ সব কিছুর উপর তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর।' (৪:১৩৬) এ আয়াতে ঈমানদারগণকে ঈমান আনয়নের নির্দেশ দেয়া এমনই, যেমন হিদায়াত প্রাপ্তগণকে হিদায়াত চাওয়ার নির্দেশ দেয়া। এই দুই স্থানেই উদ্দেশ্য হচ্ছে তার উপরে অটল, অনড় ও দ্বিধাহীনচিত্তে স্থির থাকা। আর এমন কার্যাবলী সদা সম্পাদন করা যা উদ্দেশ্য লাভে সহায়তা করে। এর উপর এ প্রতিবাদ উঠতে পারে না যে, এ তো হলো ‘তাহসীলে হাসিল অর্থাৎ প্রাপ্ত জিনিসের পুনঃ প্রাপ্তি। আল্লাহ এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। দেখুন মহান আল্লাহ তাঁর ঈমানদার বান্দাগণকে নিম্নের এ প্রার্থনা করারও নির্দেশ দিচ্ছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের পর। আমাদের অন্তরসমূহ বাঁকা করবেন না এবং আমাদেরকে আপনার নিকট হতে করুণা প্রদান করুন, নিশ্চয় আপনি মহান দাতা।' (৩:৮)এটাও বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) মাগরিবের তৃতীয় রাকআতে সূরা-ই ফাতিহার পরে এ আয়াতটি নিম্ন স্বরে পড়তেন। সুতরাং (আরবি) এর অর্থ দাঁড়ালোঃ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে সরল ও সোজা পথের উপর অটল ও স্থির রাখুন। এবং তা হতে আমাদেরকে দূরে অপসারিত করে ফেলবেন না।”
আল-ফাতিহা 1:6
৬-৭ নং আয়াতের তাফসীরএর বর্ণনা পূর্বেই গত হয়েছে যে, বান্দার এ কথার উপর মহান আল্লাহ বলেন, এটা আমার বান্দার জন্যে এবং আমার বান্দার জন্যে ঐ সব কিছুই রয়েছে যা সে চাইবে।' এ আয়াতটি সীরাতে মুসতাকীমের তাফসীর এবং ব্যাকরণবিদ বা নাহ্বীদের নিকট এটা ‘সীরাতে মুসতাকীম' হতে বদল হয়েছে এবং আত বায়ানও হতে পারে। আল্লাহ তা'আলাই এ সম্পর্কে সবচাইতে ভাল জানেন। আর যারা আল্লাহর পুরস্কার লাভ করেছে তাদের বর্ণনা সূরা-ই-নিসার মধ্যে এসেছে। ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের অনুগত হয়, এরূপ ব্যক্তিগণও ঐ মহান ব্যক্তিগণের সহচর হবেন যাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ করেছেন, অর্থাৎ নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও নেক্কারগণ। আর ঐ মহাপুরুষগণ উত্তম সহচর। এ অনুগ্রহ আল্লাহর পক্ষ হতে এবং সর্বজ্ঞ হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।' (৪:৬৯-৭০) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ঐ সব ফেরেশতা, নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং সৎলোকের পথে পরিচালিত করুন যাদেরকে আপনি আপনার আনুগত্য ও ইবাদতের কারণে পুরস্কৃত করেছেন।” উল্লিখিত আয়াতটি নিম্ন বর্ণিত আয়াতের মত। (৪:৬৯) (আরবি)হযরত রাবী' বিন আনাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে নবীগণ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ) এর অর্থ নিয়েছেন মুমিনগণ’ এবং হযরত অকী (রঃ) নিয়েছেন মুসলমানগণ।' আবদুর রহমান (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সহচরবর্গ (রাঃ)। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) কথাই বেশী ব্যাপক। আল্লাহ তা'আলাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন (আরবি) এই নামক শব্দটিতে জমহুরের পঠনে (আরবি) (গাইরি) আছে অর্থাৎ (আরবি) অক্ষরের নীচে ‘যের ' এবং তা বিশেষণ করা হয়েছে। আল্লামা যামাখশারী বলেছেন যে, (আরবি) কে যবরের সঙ্গে পড়া হয়েছে এবং তা ‘হাল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং হযরত উমার বিন খাত্তাবের (রাঃ) পঠন এটাই (আরবি) এর সর্বনামটি ওর (আরবি) এবং হচ্ছে (আরবি), তাহলে অর্থ হচ্ছেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সরল সোজা পথ প্রদর্শন করুন, ঐ সব লোকের পথ যাদেরকে আপনি পুরস্কৃত করেছেন, যারা হিদায়াত বা সুপথ প্রাপ্ত এবং অটল অবিচলিত ছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) অনুগত ছিলেন। যারা আল্লাহর নির্দেশ পালনকারী ও নিষিদ্ধ কাজ হতে দূরে-বহুদূরে অবস্থানকারী ছিলেন। আর ঐ সব লোকের পথ হতে রক্ষা করুন যাদের উপর আপনার ধূমায়িত ক্রোধ ও অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে, যারা সত্যকে জেনে শুনেও তা থেকে দূরে সরে গেছে এবং পথভ্রষ্ট লোকেদের পথ হতেও আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখুন যাদের সঠিক পথ সম্পর্কে কোন ধারণা ও জ্ঞানই নেই, যারা পথভ্রষ্ট হয়ে লক্ষ্যহীনভাবে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়ায় এবং তাদেরকে সরল, সঠিক পুণ্য পথ দেখানো হয় না।কথার মধ্যে খুব বেশী গুরুত্ব আনয়নের জন্যে (আরবি) অক্ষরটিকে (আরবি) এর পরে আনা হয়েছে, যেন জানতে পারা যায় যে, এখানে ভুলপথ দুইটি। একটি ইয়াহূদীদের পথ এবং অপরটি খৃষ্টানদের পথ। কোন কোন নাবী বা ব্যাকরণবিদ বলেছেন যে, এখানে (আরবি) শব্দটি (আরবি) বা প্রভেদ সৃষ্টির জন্যে এসেছে। তা হলে এটা (আরবি) হতে পারে। কেননা যাদের উপর অনুগ্রহ করা হয়েছে তাদের মধ্য হতে এ (আরবি) হচ্ছে অথচ এরা তাদের অন্তর্ভুক্তই ছিল না। কিন্তু আমরা যে তাফসীর করেছি এটাই বেশী উত্তম। আরব কবিদের কবিতায় এরূপ দেখা যায় যে, তারা বিশেষ্যকে লোপ করে শুধুমাত্র বিশেষণের বর্ণনা দিয়ে থাকেন। যেমন নিম্নের কবিতায় রয়েছেঃ (আরবি)এখানে (আরবি) শব্দের আগে (আরবি) নামক বিশেষ্যটিকে সোপ করা হয়েছে এবং পরবর্তী পর্যায়ের বিশেষণকে যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। এভাবেই আয়াতেও বিশেষণের বর্ণনা রয়েছে এবং (আরবি)-নামক বিশেষ্যকে লোপ করা হয়েছে (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ অভিশপ্তদের পথে নয় (আরবি) এর উল্লেখ না করে (আরবি) এর উল্লেখই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। পূর্ব শব্দগুলিই এটা প্রমাণ করছে। পূর্বে এ শব্দটি দুইবার এসেছে। কেউ কেউ বলেন যে (আরবি) এর শব্দটি অতিরিক্ত। তাদের মতে বাক্যটি হবে নিম্নরূপঃ (আরবি) এবং আরব কবিদের কবিতাতেও এর সাক্ষ্য রয়েছে। যেমন কবি আজ্জাজ বলেনঃ (আরবি)এখানে (আরবি) শব্দটি অতিরিক্ত। কিন্তু সঠিক কথা সেইটাই যা আমরা ইতিপূর্বে লিখেছি। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) হতে সহীহ সনদে (আরবি) পড়াও বর্ণিত আছে। আবু উবাইদ আল কাসেম বিন সাল্লাম “কিতাবু ফাযাইলিল কুরআন' এর মধ্যে একথা বর্ণনা করেছেন। হযরত উবাই বিন কা'ব (রাঃ) হতেও এরূপ বর্ণিত আছে। এ মহান ব্যক্তিদ্বয় হতে যদি এটা ব্যাখ্যাদান রূপেও প্রকাশ পেয়ে থাকে তবে তো এটা আমাদের মতেরই সহায়ক হবে। তা হলো এই যে, (আরবি) কে (আরবি) এর জন্যে আনা হয়েছে, যাতে এ সন্দেহ না থাকে যে, এটা (আরবি) এর (আরবি) উপর হয়েছে এবং এ জন্যেও যে, যাতে দুইটি পথের পার্থক্য অনুধাবন করা যায়, যেন প্রত্যেকেই এ দুটো পথ থেকে বেঁচে থাকে। ঈমানদারদের পন্থা তো এটাই যে, সত্যের জ্ঞানও থাকতে, হবে এবং তার আমলও থাকতে হবে। ইয়াহূদীদের আমল নেই এবং খৃষ্টানদের জ্ঞান নেই। এজন্যেই ইয়াহূদীরা অভিশপ্ত হলো এবং খৃষ্টানেরা হলো পথভ্রষ্ট। কেননা, জেনে শুনে ইচ্ছাকৃতভাবে আমল পরিত্যাগ করা লা'নত বা অভিশাপের কারণ হয়ে দাড়ায়। খৃষ্টানেরা যদিও একটা জিনিসের ইচ্ছে করে, কিন্তু তার সঠিক পথ তারা পায় না। কেননা, তাদের কর্মপন্থা ভুল এবং তারা সত্যের অনুসরণ হতে দূরে সরে পড়েছে। অভিশাপ ও পথভ্রষ্টতা এই দুই দলের তো রয়েছেই কিন্তু ইয়াহুদী অভিশাপের অংশে একধাপ এগিয়ে রয়েছে। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ এরা পূর্ব হতেই পথভ্রষ্ট এবং অনেককেই পথভ্রষ্ট করেছে এবং তারা সোজা পথ হতে ভ্রষ্ট রয়েছে। (৫:৭৭) একথার সমর্থনে বহু হাদীস ও বর্ণনা পেশ করা যেতে পারে। মুসনাদ-ই-আহমাদে আছে যে, হযরত আদী বিন হাতিম (রাঃ) বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সেনাবাহিনী একদা আমার ফুফুকে এবং কতকগুলো লোককে বন্দী করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এনে হাজির করেন। আমার ফুফু তখন বলেনঃ “আমাকে দেখা শোনা করার লোক দূরে সরে রয়েছে এবং আমি একজন অধিক বয়স্কা অচলা বৃদ্ধা। আমি কোন খিদমতের যোগ্য নই। সুতরাং দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আল্লাহ আপনার উপরও দয়া করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “যে তোমার খবরাখবর নিয়ে থাকে সে ব্যক্তিটি কে?' তিনি বললেন-আদী বিন হাতিম।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “সে কি ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ) হতে এদিক ওদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বিনা শর্তে মুক্তি দিয়ে দেন। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফিরে আসেন তখন তার সাথে আর একটি লোক ছিলেন। খুব সম্ভব তিনি হযরত আলীই (রাঃ) ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ যাও, তার কাছে গিয়ে সোয়ারীর প্রার্থনা কর।' আমার ফুফু তাঁর কাছে প্রার্থনা জানালে সঙ্গে সঙ্গে তা মঞ্জুর হয় এবং তিনি সোয়ারী পেয়ে যান। তিনি এখান হতে মুক্তি লাভ করে সোজা আমার নিকট চলে আসেন এবং বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) দানশীলতা তোমার পিতা হাতিমকেও ছাড়িয়ে গেছে। তার কাছে একবার কেউ গেলে আর শূন্য হস্তে ফিরে আসে না।' একথা শুনে আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাজির হই। আমি দেখি যে, ছোট ছেলে ও বৃদ্ধা স্ত্রীলোকেরা তাঁর কাছে অবাধে যাতায়াত করছে এবং তিনি তাদের সাথে অকুণ্ঠচিত্তে অকৃত্রিমভাবে আলাপ আলোচনা করছেন। এ দেখে আমার বিশ্বাস হলো যে, তিনি কাইসার ও কিসরার মত বিশাল রাজত্ব ও সম্মানের অভিলাষী নন। তিনি আমাকে দেখে বলেনঃ ‘আদী! (আরবি) বলা হতে পালিয়ে বেড়াচ্ছ কেন? আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ উপাসনার যোগ্য আছে কি? (আরবি) বলা হতে এখন তুমি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ কেন? মহা সম্মানিত আল্লাহ পাক থেকে বড় আর কেউ আছে কি? (তার এই কথাগুলো এবং তাঁর সরলতা ও অকৃত্রিমতা আমার উপর এমনভাবে দাগ কাটলো ও ক্রিয়াশীল হলো যে,) আমি তৎক্ষণাৎ কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম। তাতে তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং বলেনঃ (আরবি) দ্বারা ইয়াহূদকে বুঝানো হয়েছে এবং (আরবি) দ্বারা খৃষ্টানগণকে বুঝানো হয়েছে। আরও একটি হাদীসে আছে যে, হযরত আদীর (রাঃ) প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই তাফসীরই করেছিলেন। এ হাদীসের অনেক সনদ আছে এবং বিভিন্ন শব্দে সে সব বর্ণিত হয়েছে।বানূ কাইনের একটি লোক 'ওয়াদীউল কুরায়' রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এটাই প্রশ্ন করেছিলেন এবং উত্তরে তিনি একথাই বলেছিলেন। কোন কোন বর্ণনায় তাঁর নাম দেয়া হয়েছে আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ)। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)- এর তাফসীরে হযরত আবু যার (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) এবং আরও বহু সাহাবী (রাঃ) হতেও এ তাফসীর মকল করা হয়েছে। হযরত রাবী' বিন আনাস (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণও একথাই বলেন। বরং ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো বলেন যে, মুফাসসিরগণের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই। এই ইমামগণের এতোফসীরের একটি দলীল হচ্ছে ঐ হাদীসটি যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে সূরা-ই-বাকারার এ আয়াতটি যাতে বানী ইসরাঈলগণকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে। (২:৯০) (আরবি) এ আয়াতের মধ্যে আছে যে, তাদের উপর অভিশাপের পর অভিশাপ অবতীর্ণ। হয়েছে এবং সূরা-ই-মায়েদার (আরবি) (৫৪৬০) এই আয়াতের মধ্যেও রয়েছে যে, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ অবতীর্ণ হয়েছে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ বানী ইসরাঈলদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদের উপর দাউদ (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ) এর কথায় অভিশাপ দেয়া হয়েছে; কারণ তারা অবাধ্য হয়েছিল ও সীমা অতিক্রম করেছিল। এসব লোক কোন খারাপ কাজ হতে একে অপরকে বাধা দিতো না। নিশ্চয়ই তাদের কাজ ছিল অত্যন্ত জঘন্য। (৫:৭৮-৭৯)ইতিহাসের পুস্তকসমূহে বর্ণিত আছে যে, যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল যখন খাঁটি ধর্মের অনুসন্ধানে স্বীয় বন্ধুবান্ধব ও সাথী-সঙ্গীসহ বেরিয়ে পড়লেন এবং এদিক ওদিক বিচরণের পর শেষে সিরিয়ায় আসলেন, তখন ইয়াহূদীরা তাদেরকে বললোঃ “আল্লাহর অভিশাপের কিছু অংশ না নেয়া পর্যন্ত আপনারা আমাদের ধর্মে আসতেই পারবেন না। তারা উত্তরে বললেনঃ তা হতে বাঁচার উদ্দেশ্যেই তো আমরা সত্য ধর্মের অনুসন্ধানে বের হয়েছি, কাজেই কিরূপে তা গ্রহণ করতে পারি? তারা খৃষ্টানদের সাথে সাক্ষাৎ করলে তারা বললোঃ “আল্লাহ তা'আলার লা'নত ও অসন্তুষ্টির কিছু অংশ না নেয়া পর্যন্ত আপনারা আমাদের ধর্মেও আসতে পারবেন না। তারা বললেনঃ আমরা এটাও করতে পারি না। তারপর হযরত যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল স্বাভাবিক ধর্মের উপরই রয়ে গেলেন। তিনি মুর্তি পূজা ও স্বগোত্রীয় ধর্মত্যাগ করলেন, কিন্তু ইয়াহুদী ও খৃষ্টান ধর্ম কোন ক্রমেই গ্রহণ করলেন না। তবে তার সঙ্গী সাথীরা খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করলো, কেননা ইয়াহূদীদের ধর্মের সঙ্গে এর অনেকটা মিল ছিল। যায়েদের ধর্মেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন অরাকা বিন নাওফিল। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নবুওতের যুগ পেয়েছিলেন এবং আল্লাহর হিদায়াত তাঁকে সুপথ প্রদর্শন করেছিল। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর উপর ঈমান এনেছিলেন ও সেই সময় পর্যন্ত যে ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছিল তিনি তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হউন। জিজ্ঞাস্যঃ (আরবি) এবং (আরবি)-এর মধ্যে অতি সামান্য পার্থক্য রয়েছে। এজন্যে উলামা-ই-কিরামের সহীহ মাযহাৰ এই যে, এ পার্থক্য ক্ষমার্হ (আরবি) এর সহীহ মাখরাজ হচ্ছে জিহবার প্রথম প্রান্ত এবং ওর পার্শ্বের চোয়াল। আর (আরবি) এর মাখরাজ হচ্ছে জিহবার এক দিক এবং সম্মুখের উপরের দুই দাঁতের প্রান্ত। দ্বিতীয় কথা এই যে, এই দুটি অক্ষর হচ্ছে (আরবি) এবং (আরবি) সুতরাং যে ব্যক্তির পক্ষে এই দুইটি অক্ষরের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হবে সে যদি কে (আরবি) এর মত পড়ে ফেলে তবে তার অপরাধ অমার্জনীয় নয়, বরং তাকে ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখা হবে। একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) কে সবচেয়ে সঠিকভাবে পড়তে আমিই পারি। কিন্তু হাদীসটি সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন ও দুর্বল। পরিচ্ছেদএই কল্যাণময় ও বরকতপূর্ণ সূরাটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর সমষ্টি। এই সাতটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলার যোগ্য প্রশংসা, তার শ্রেষ্ঠত্ব, পবিত্র নামসমূহ এবং উচ্চতম বিশেষণের সুন্দর বর্ণনা রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই রোজ কিয়ামতের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং বান্দাদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে যে, তারা যেন সেই মহান প্রভুর নিকট অত্যন্ত বিনীতভাবে যাচ্ঞা করে, যেন তার কাছে নিজের দারিদ্র ও অসহায়ত্বের কথা অকপটে স্বীকার করে, তাকে সব সময় অংশীবিহীন ও তুলনাবিহীন মনে করে, খাটি অন্তরে তাঁর ইবাদত; তাঁর অহদানিয়াত বা একত্ববাদে বিশ্বাস করে, তার কাছে সরল সোজা পথ ও তার উপর সুদৃঢ় ও অটল থাকার জন্যে নিশিদিন আকুল প্রার্থনা জানায়। এই অবিসম্বাদিত পথই একদিন তাকে রোজ কিয়ামতের পুলসিরাত পার করাবে এবং নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং নেককারদের পার্শ্বে জান্নাতুল ফিরদাউসের নন্দন কাননে স্থান দেবে। সাথে সাথে আলোচ্য সূরাটির মধ্যে যাবতীয় সকার্যাবলী সম্পাদনের প্রতি নিরন্তর উৎসাহ দেয়া হয়েছে যাতে কিয়ামতের দিন বান্দা আত্মকৃত নেকী ও পুন্যসমূহ সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে এবং মিথ্যা ও অন্যায় পথে চলা থেকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে, যাতে কিয়ামতের দিনেও সে বাতিলপন্থীদের দল থেকে দূরে থাকতে পারে। এই বাতিলপন্থী দল হচ্ছে ইয়াহূদী এবং খৃষ্টান।ধীরস্থির ও সূক্ষ্মভাবে জাগ্রত মস্তিষ্ক নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে দেখলে অতি সহজেই অনুধাবন করা যাবে যে, আল্লাহ তা'আলার বর্ণনারীতি কি সুন্দর! আলোচ্য সূরায় (আরবি) নামক বাক্যাংশে দানের ইসনাদ বা সম্পর্ক আল্লাহর দিকে করা হয়েছে এবং (আরবি) বলা হয়েছে (আরবি) কিন্তু এর ইসনাদ করা হয়নি; বরং এখানে কর্তাকেই লোপ করা হয়েছে এবং (আরবি) বলা হয়েছে। এখানে বিশ্ব প্রভুর মহান মর্যাদার প্রতি যথাযোগ্য লক্ষ্য রাখা হয়েছে। অবশ্য প্রকৃতপক্ষে মূল কর্তা আল্লাহ তা'লাই। যেমন অন্যস্থানে বলা হয়েছে (আরবি) এরূপভাবেই ভ্রষ্টতার ইসনাদ পথভ্রষ্টের দিকেই করা হয়েছে। অথচ অন্য এক জায়গায় আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ যাকে সুপথ প্রদর্শন করেন সে সুপথ প্রাপ্ত এবং যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন তার কোন বন্ধু ও পথ প্রদর্শক নেই।' (১৮:১৭) আর এক জায়গায় আছে, (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন পথ প্রদর্শক নেই এবং সে তো স্বীয় অবাধ্যতার মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে ফিরছে?' (৭:১৮৬) এ রকমই আরও বহু আয়াত রয়েছে যদ্দ্বারা একথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, পথ প্রদর্শনকারী ও পথ বিভ্রান্তকারী হচ্ছেন একমাত্র মহান আল্লাহ।কাদরিয়্যাহ দল, যারা কতকগুলো অস্পষ্ট আয়াতকে দলীলরূপে গ্রহণ করে বলে থাকে যে, বান্দা তার ইচ্ছাধীন ও মুক্ত স্বাধীন, সে নিজেই পছন্দ করে এবং নিজেই সম্পাদন করে। কিন্তু তাদের একথা ভ্রমাত্মক ও প্রমাদপূর্ণ। এটা খণ্ডনের জন্যে ভূরি ভূরি স্পষ্ট আয়াতসমূহ বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু বাতিল পন্থীদের এটাই রীতি যে, তারা স্পষ্ট আয়াতকে পরিহার করে অস্পষ্ট আয়াতের পিছনে লেগে থাকে। বিশুদ্ধ হাদীসে আছেঃ “যখন তোমরা ঐ লোকদেরকে দেখ যারা অস্পষ্ট আয়াতসমূহের পিছনে লেগে থাকে তখন বুঝে নিও যে, তারা ওই যাদের নাম স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা নিয়েছেন এবং স্বীয় কিতাবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং তোমরা তাদের থেকে সতর্ক থাক। এ নির্দেশনামায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর ইঙ্গিত এই আয়াতের প্রতি রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ সুতরাং যাদের অন্তরে বঞতা রয়েছে তারা গোলযোগ সৃষ্টি এবং এর (মনগড়া) ব্যাখ্যা অন্বেষণের উদ্দেশ্যে এর ঐ অংশের পিছনে পড়ে থাকে যা দুর্বোধ্য ও অস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট। সুতরাং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, বিদআতীদের অনুকূলে কুরআন পাকের মধ্যে সঠিক ও অকাট্য দলীল একটিও নেই। কুরআন মাজীদের আগমন সূচিত হয়েছে সত্য ও মিথ্যা, হিদায়াত ও গুমরাহীর মধ্যে পার্থক্য প্রদর্শনের জন্যেই। বৈপরীত্ব ও মতবিরোধের জন্যে অসেনি বা তার অবকাশও এতে নেই। এতে মহাবিজ্ঞ ও প্রশংসিত আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ হয়েছে লাওহে মাহফু’ বা রক্ষিত ফলক থেকে।" পরিচ্ছেদসূরা ফাতিহা শেষ করে আমীন বলা মুসতাহাব (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দটির মত এবং এটা (আরবি) ও পড়া হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছেঃ “ হে আল্লাহ! আপনি কবুল করুন। আমীন বলা মুসতাহাব হওয়ার দলীল হলো ঐ হাদীসটি যা মুসনাদ-ই-আহমদ, সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামে তিরমিযীতে হযরত অয়েল বিন হুজর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবি) পড়ে আমীন বলতে শুনেছি। তিনি স্বর দীর্ঘ করতেন।” সুনান-ই- আবি দাউদে আছে যে, তিনি স্বর উচ্চ করতেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সশব্দ আমীন তার নিকটবর্তী প্রথম সারির লোকেরা স্পষ্টতঃই শুনতে পেতেন। সুনান-ই-আবি দাউদ ও সুনান-ই-ইবনে মাজায় এ হাদীসটি আছে। সুনান-ই-ইবনে মাজায় এও আছে যে, আমীনের শব্দে গোটা মসজিদ প্রতিধ্বনিত হয়ে বেজে উঠতো।' ইমাম দারে-কুতনীও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং একে 'হাসান' বলে মন্তব্য করেছেন। হযরত বেলাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “আমার পূর্বে ‘আমীন' বলবে না।"হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত জাফর সাদিক (রঃ) হতে 'আমীন' বলা বর্ণিত আছে। যেমন কুরআন মজীদের মধ্যে (আরবি) (৫:২) রয়েছে। আমাদের সহচরেরা বলেন যে, নামাযের বাইরে থাকলেও ‘আমীন' বলতে হবে। তবে যে ব্যক্তি নামাযে থাকবে তার জন্যে বেশী জোর দেয়া হয়েছে। নামাযী একাকী হোক বা মুকতাদী হোক বা ইমাম হোক, সর্বাবস্থায় তাকে আমীন বলতেই হবে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন ইমাম ‘আমীন' বলেন তখন তোমরাও আমীন বল। যার আমীন বলার শব্দ ফেরেশতাদের আমীনের সঙ্গে মিলিত হয় তার পূর্বেকার সমস্ত পাপ মোচন হয়ে যায়।সহীহ মুসলিম শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের মধ্যে কেউ নামাযে ‘আমীন' বলে এবং ফেরেশতারাও আকাশে ‘আমীন বলেন, আর একের আমীনের সঙ্গে অন্যের ‘আমীন মিলিত হয় তখন তার পূর্বেকার সমস্ত গোনাহ মাফ হয়ে যায়। এর ভাবার্থ এই যে, তার আমীন ও ফেরেশতাদের ‘আমীন' বলার সময় একই হয় বা কবুল হওয়া হিসেবে অনুরূপ হয় অথবা আন্তরিকতায় অনুরূপ হয়। সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু মূসা আশ'আরী (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছেঃ “যখন ইমাম (আরবি) বলেন তখন তোমরা ‘আমীন' বল, আলাহ কবুল করবেন।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমীনের অর্থ কি' তিনি বললেনঃ হে আল্লাহ! আপনি কবুল করুন। জওহারী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘যেন এরূপই হয়।' ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে আমাদের আশা ভঙ্গ করবেন না। অধিকাংশ আলেম বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের প্রার্থনা কবুল করুন।' মুজাহিদ (রঃ), জাফর সাদিক (রঃ) এবং হিলাল বিন সিয়াফ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলার নাম সমূহের মধ্যে আমীনও একটি নাম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মার’ রূপে এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। কিন্তু তা বিশুদ্ধ নয়।ইমাম মালিকের (রঃ) সহচরগণের মাযহাব এই যে, ইমাম ‘আমীন’ বলবেন , শুধু মুকতাদীগণ ‘আমীন’ বলবেন। কেননা ইমাম মালিকের (রঃ) মুআত্তার হাদীসে আছে :যখন ইমাম (আরবি) বলে তখন তোমরা আমীন’ বল। এ রকমই তার দলীলের সমর্থনে সহীহ মুসলিমে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতেও একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন ইমাম (আরবি) বলে তখন তোমরা আমীন বল।' কিন্তু সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীস ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে-'যখন ইমাম আমীন বলে তখন তোমরাও আমীন’ বল।' হাদীসে এটাও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) বলে ‘আমীন’ বলতেন। উচ্চৈস্বরে পঠিত নামাযে মুকতাদী উচ্চৈস্বরে আমীন বলবে কিনা সে বিষয়ে আমাদের সহচরদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এর ব্যাখ্যা এই যে, যদি ইমাম ‘আমীন' বলতে ভুলে যান তবে মুকতাদীগণ জোরে আমীন বলবে। যদি ইমাম নিজেই উচ্চৈস্বরে আমীন বলেন তবে নতুন কথা মতে মুকতাদী জোরে আমীন বলবে না। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) এটাই মাযহাব। ইমাম মালিক হতেও এরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে। কেননা, নামাযের অন্যান্য যিকরের মত এটাও একটা যি। সুতরাং অন্যান্য যি যেমন উচ্চ শব্দে হয়, তেমনই এটাও উচ্চ শব্দে পড়া হবে না। কিন্তু পূর্ব যুগীয় মনীষীদের কথা এই যে, “আমীন’ উচ্চ শব্দেও পড়া যায়। ইমাম আহমদ বিন হাম্বলেরও (রঃ) মাযহাব এটাই এবং দ্বিতীয় বর্ণনা অনুসারে ইমাম মালিকের (রঃ) এটাই মাযহাব। এর দলীল ঐ হাদীসটি যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, আমীনের শব্দে মসজিদের মধ্যে গুঞ্জন ধ্বনির রব উঠতো। এখানে আমাদের তৃতীয় আরও ইমাম।একটি মত আছে, তা এই যে, যদি মসজিদ ছোট হয় তবে মুকতাদী জোরে আমীন বলবে না। কেননা। তারা ইমামের কিরাআত শুনছে। আর যদি মসজিদ বড় হয় তবে আমীন জোরে বলবে, যেন মসজিদের প্রান্তে প্রান্তে ‘আমীনের’ শব্দ পৌছে যায়। আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদ-ই- আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট ইয়াহুদীদের আলোচনা হলে তিনি বলেনঃ “আমাদের তিনটা জিনিসের উপর ইয়াহুদীদের যতটা হিংসা বিদ্বেষ আছে ততোটা হিংসা অন্য কোন বস্তুর উপর নেই। (১) জুমআ, আল্লাহ আমাদেরকে তার প্রতি হিদায়াত করেছেন ও পথ দেখিয়েছেন এবং তারা এ থেকে ভ্রষ্ট রয়েছে। (২) কিবলাহ্ এবং (৩) ইমামের পিছনে আমাদের আমীন বলা। সুনান-ই-ইবনে মাজার হাদীসে রয়েছেঃ সালাম’ ও ‘আমীন’ ইয়াহুদীদের যতোটা বিরক্তি উৎপাদন করে অন্য কোন জিনিস তা করে না। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রাঃ) বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইয়াহূদীরা তোমাদের আমীনের উপর যত হিংসা করে অন্য কাজে ততোটা করে। তোমরা আমীন খুব বেশী বেশী বল।' এর সনদে বর্ণনাকারী তালহা বিন আমর উসূলে হাদীসের পরিভাষা অনুযায়ী দুর্বল। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমীন, আল্লাহর মুমিন বান্দাদের উপর তার মোহর। হ্যরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নামাযে ‘আমীন' বলা এবং প্রার্থনায় আমীন’ বলা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আমার প্রতি একটি বিশেষ দান, যা আমার পূর্বে অন্য কাউকে দান করা হয়নি। হাঁ, তবে এটুকু বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসার (আঃ) বিশেষ প্রার্থনার উপর হযরত হারুন (আঃ) আমীন বলতেন। তোমরা তোমাদের প্রার্থনা আমীনের উপর শেষ কর। তাহলে তোমাদের পক্ষেও আল্লাহ তা কবুল করবেন।” এ হাদীসটিকে সামনে রেখে কুরআন মাজীদের ঐ শব্দগুলো লক্ষ্য করুন যা হযরত মূসার (আঃ) প্রার্থনায় বলা হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ এবং মূসা বললো -হে আমাদের প্রভু! আপনি ফিরআউনকে ও তার সভাসদবর্গকে ইহলৌকিক জীবনে সৌন্দর্য ও সম্পদ দান করেছেন যার ফলে সে অন্যদেরকে আপনার পথ হতে সরিয়ে নিয়ে বিপথে চালিত করছে; হে আমাদের প্রভু! আপনি তাদের ধন মাল ধ্বংস করুন এবং তাদের অন্তরকে কঠোর করে দিন, সুতরাং তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেখার পূর্ব পর্যন্ত ঈমান আনবে না।' (১০:৮৮) হযরত মূসার (আঃ) এ দু'আ ককূলের ঘোষণা নিম্নের এসব শব্দ দ্বারা করা হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনি বললেন তোমাদের দু'জনের প্রার্থনা মঞ্জুর করা হলো সুতরাং তোমরা দৃঢ় থাক এবং মুখদের পথে যেয়ো না।' (১০:৮৯)দু'আ শুধু হযরত মূসা (আঃ) করেছিলেন এবং হযরত হারূণ (আঃ) শুধু ‘আমীন’ বলেছিলেন। কিন্তু কুরআনে এই দু'আর সংযোগ দু’জনের দিকেই করা হয়েছে। কতগুলো লোক একে প্রমাণ রূপে গ্রহণ করে বলে থাকেন যে, যে ব্যক্তি কোন দু'আর উপর আমীন বলে সে যেন নিজেই দু'আ করলো। এখন এ প্রমাণকে সামনে রেখে আবার তাঁরা কিয়াস করেন যে, মুকতাদীকে কিরাআত পড়তে হবে না। কেননা, তার সূরা ফাতিহার উপর আমীন’ বলাই কিরাআতের স্থলাভিষিক্ত হবে। তারা এ হাদীসটিকেও দলীল রূপে পেশ করেনঃ যার ইমাম থাকে, ইমামের কিরাআতই তার কিরাআত। (মুসনাদ-ই- আহমাদ)হযরত বেলাল (রাঃ) বলতেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমীনে' আমার অগ্রবর্তী হবেন, না।' এঁরা এটা টেনে এনে যেহুরী নামাযে ইমামের পিছনে মুকতাদীর সূরা-ই-ফাতিহা না পড়া সাব্যস্ত করতে চান। আল্লাহ তাআলাই এসব বিষয়ে সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইমাম যখ (আরবি) বলার পর আমীন বলে এবং যমীনবাসীদের আমীনের সঙ্গে আসমান বাসীদের ‘আমীন' বলার শব্দও মিলিত হয়, তখন আল্লাহ বান্দার পূর্বের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেন। আমীন বলার দৃষ্টান্ত এরূপ যেমন, এক ব্যক্তি এক গোত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে যুদ্ধ করলো ও জয় লাভ করলো। অতঃপর যুদ্ধলব্ধ মাল জমা করলো। এখন সে অংশ নেয়ার জন্যে নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করলো। কিন্তু তার নাম বেরই হলো না এবং সে কোন অংশও পেলো না। এতে সে বিস্মিত হয়ে বললো -এ কেন হবে? তখন সে উত্তর পেলো তোমার আমীন’ না বলার কারণে।”________________________________________ সূরা-ই-বাকারাহ এবং তার মাহাত্ম্য ও গুণাবলীহযরত মা'কাল বিন ইয়াসার (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সূরা-ই-বাকারাহ্ কুরআনের কুঁজ এবং তার চূড়া। এর এক একটি আয়াতের সঙ্গে ৮০ জন ফেরেশতা উর্ধগগন থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। বিশেষ করে আয়াতুল কুরসী তো খাস আরশ হতে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এই সূরার সঙ্গে মিলানো হয়েছে। সূরা-ই-ইয়াসীন কুরআনের অন্তর বিশেষ। যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন ও পরকাল লাভের জন্যে তা পড়ে, তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। এ সূরাটিকে মরণোন্মুখ ব্যক্তির সম্মুখে পাঠ কর।' (মুসনাদ-ইআহমদ)এ হাদীসের সনদের এক স্থানে (আরবি) আছে, যার ফলে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির নাম অজানা ছিল। কিন্তু মুসনাদ-ই আহমাদেরই অপর একটি বর্ণনায় তার নাম আবু উসমান এসেছে। এ হাদীসটি এভাবেই সুনান-ই আবি দাউদ, সুনান-ই-নাসাঈ এবং সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও রয়েছে। জামে তিরমিযীর একটি দুর্বল সনদ বিশিষ্ট হাদীসে আছেঃ প্রত্যেক জিনিসেরই একটা উচ্চতা থাকে। কুরআন মাজীদের উচ্চতা হচ্ছে সূরা-ই-বাকারাহ্। এই সূরার মধ্যে এমন একটি আয়াত আছে যা সমস্ত আসমানের নেতা এবং সেটি হচ্ছে ‘আয়াতুল কুরসী'। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সহীহ মুসলিম, জামে তিরমিযী এবং সুনান-ই- নাসাঈর মধ্যে বর্ণিত হাদীসে আছেঃ ‘তোমরা নিজেদের ঘরকে কবরে পরিণত করো না, যে ঘরে সূরা-ই বাকারাহ পাঠ করা হয় তথায় শয়তান প্রবেশ করতে পারে না।' ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান সহীহ বলেছেন। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, যে ঘরে সূরা-ই-বাকারাহ পড়া হয় সেখান হতে শয়তান পলায়ন করে। এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারীকে ইয়াহইয়া বিন মুঈন তো নির্ভরযোগ্য বলেছেন বটে, কিন্তু ইমাম আহমাদ প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ তার হাদীসকে অস্বীকার্য বলেছেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) হতেও এরূপ কথাই বর্ণিত আছে। হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) তার ‘আল ইয়াওমু ওয়াল লাইলাতু’ নামক পুস্তকের মধ্যে এবং ইমাম হাকিম স্বীয় গ্রন্থ মুসতাদরাক’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই’ এ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কাউকেও যেন, এরূপ না পাই যে, সে এক পায়ের উপর অন্য পা চড়িয়ে পড়তে থাকে; কিন্তু সূরা-ই-বাকারাহ পড়ে না। জেনে ব্রেখো, যে ঘরে এই বরকতময় সূরাটি পাঠ করা হয় সেখান হতে শয়তান ছুটে পালিয়ে যায়। সবচেয়ে জঘন্য ও লাঞ্ছিত সেই ঘর যে ঘরে আল্লাহর কিতাব পাঠ করা হয় না।'ইমাম নাসাঈ (রঃ) স্বীয় ‘আল-ইয়াওমু ওয়াল লাইলাতু' গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। মুসনাদ-ই- দারিমীর মধ্যে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যে ঘরে সূরা-ই-বাকারাহ পড়া হয় সেই ঘর থেকে শয়তান গুহ্যদ্বার দিয়ে বায়ু নিঃসরণ করতে করতে পলায়ন করে। প্রত্যেক জিনিসেরই উচ্চতা থাকে এবং কুরআন কারীমের উচ্চতা হচ্ছে সূরা-ই-বাকারাহ। প্রত্যেক বস্তুরই সারাংশ আছে এবং কুরআনের সারাংশ হচ্ছে বড় সূরাগুলি।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রাঃ) উক্তি আছে যে, যে ঘরে সূরা ই-বাকারার প্রথম চারটি আয়াত, আয়াতুল কুরসী, তার পরবর্তী দু’টি আয়াত এবং সব শেষের তিনটি আয়াত, একুনে দশটি আয়াত পাঠ করা হয়, শয়তান। সেই ঘরে ঐ রাত্রে যেতে পারে না এবং সেইদিন ঐ বাড়ীর লোকদের শয়তান অথবা কোন খারাপ জিনিস কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে না। এ আয়াতগুলি পাগলের উপর পড়লে তার পাগলামীও দূর হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘যেমন প্রত্যেক জিনিসের উচ্চতা থাকে তেমনই কুরআনের উচ্চতা হচ্ছে সূরা-ই- বাকারাহ। যে ব্যক্তি রাত্রিকালের নীরব ক্ষণে নিজের নিভৃত কক্ষে তা পাঠ করে, তিন রাত্রি পর্যন্ত শয়তান সেই ঘরে যেতে পারে না। আর দিনের বেলায় যদি ঘরে পড়ে তবে তিন দিন পর্যন্ত সেই ঘরে শয়তান পা দিতে পারে না (তাবরানী, ইবনে হিব্বান ও ইবনে মিরদুওয়াই)। জামে তিরমিযী, সুনান-ই-নাসাঈ এবং সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটা ছোট্ট সেনাবাহিনী এক জায়গায় পাঠালেন এবং তিনি তার নেতৃত্বভার এমন ব্যক্তির উপর অর্পণ করলেন যিনি বলেছিলেনঃ ‘আমার সূরা-ই-বাকারাহ মুখস্থ আছে। সে সময় একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বললেনঃ ‘আমিও তা মুখস্ত করতাম। কিন্তু পরে আমি এই ভয় করেছিলাম যে, না জানি আমি তার উপর আমল করতে পারবে কি না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ কুরআন শিক্ষা কর, কুরআন পাঠ কর। যে ব্যক্তি তা শিখে ও পাঠ করে, অতঃপর তার উপর আমলও করে, তার উপমা এরকম যেমন মিশক পরিপূর্ণ পাত্র, যার সুগন্ধি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আর যে ব্যক্তি তা শিক্ষা করলো, অতঃপর ঘুমিয়ে পড়লে তার দৃষ্টান্ত সেই পাত্রের মত যার মধ্যে মিশক তো ভরা রয়েছে, কিন্তু উপর হতে মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান বলেছেন এবং মুরসাল বর্ণনাও রয়েছে। আল্লাহই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত উসাইদ বিন হুজাইর (রাঃ) একদা রাত্রে সূরা-ই-বাকারার পাঠ আরম্ভ করেন। তাঁর ঘোড়াটি, যা তার পার্শ্বেই বাঁধা ছিল, হঠাৎ করে লাফাতে শুরু করে। তিনি পাঠ বন্ধ করলে ঘোড়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আবার তিনি পড়তে আরম্ভ করেন এবং ঘোড়াও লাফাতে শুরু করে। তিনি পুনরায় পড়া বন্ধ করেন এবং ঘোড়াটিও স্তব্ধ হয়ে থেমে যায়। তৃতীয় বারও এরূপই ঘটে। তার শিশু পুত্র ইয়াহইয়া ঘোড়ার পার্শ্বেই শুয়ে ছিল। কাজেই তিনি ভয় করলেন যে, না জানি ছেলের আঘাত লেগে যায়। সুতরাং তিনি পড়া বন্ধ করে ছেলেকে উঠিয়ে নেন। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করেন যে, ঘোড়ার চমকে উঠার কারণ কি? সকালে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাজির হয়ে ঘটনাটি আনুপূর্বিক বর্ণনা করেন। তিনি শুনতে থাকেন ও বলতে থাকেনঃ ‘উসাইদ! তুমি পড়েই যেতে!' হযরত উসাইদ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! তৃতীয় বারের পরে প্রিয় পুত্র ইয়াহইয়ার কারণে আমি পড়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। অতঃপর আমি মাথা আকাশের দিকে উঠালে ছায়ার ন্যায় একটা জ্যোতির্ময় জিনিস দেখতে পাই এবং দেখতে দেখতেই তা উপরের দিকে উথিত হয়ে শূন্যমার্গে মিলিয়ে যায়। রাসললাহ (সঃ) তখন বললেনঃ তুমি কি জান সেটা কি ছিল? তারা ছিলেন গগন বিহারী অগণিত জ্যোতির্ময় ফেরেশতা। তোমার (পড়ার শব্দ শুনে তারা একপদে নিকটে এসেছিলেন। যদি তুমি পাঠ বন্ধ না করতে তবে তারা সকাল পর্যন্ত এরকমই থাকতেন এবং মদীনার সকল লোক তা দেখে চক্ষু জুড়াতো। একটি ফেরেশতাও তাদের দৃষ্টির অন্তরাল হতেন না।' এ হাদীসটি কয়েকটি হাদীসের পুস্তকে বিভিন্ন সনদের সঙ্গে বিদ্যমান রয়েছে। এছাড়া ইমাম কাসিম বিন সাল্লাম স্বীয় কিতাৰ কিতাবু ফাযাইলিল কুরআন’-এ আবদুল্লাহ বিন সাহিল থেকে রিওয়ায়ত করেছেন। আল্লাহই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। এরই কাছাকাছি রয়েছে হযরত সাবিত বিন কায়েস বিন শাম্মসের ঘটনাটি। তা হচ্ছেঃ একদা মদীনাবাসী রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করেনঃ “আমরা গত রাত্রে দেখেছি যে, হযরত সাবিতের (রাঃ) পর্ণ কুটীর খানা সারা রাত ধরে উজ্জ্বল প্রদীপের আলোকে ঝলমল করছে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ ‘সত রাত্রে সে সুরা-ই-বাকারাহ পড়েছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেনঃ হ্যা, সত্যই আমি রাত্রে সূরা বাকারাহ পড়েছিলাম। এর ইসনাদ তো খুব উত্তম। কিন্তু এতে কিছুটা সন্দেহ রয়েছে এবং এটা মুরসালও বটে। সুতরাং আল্লাহই নিঃসন্দেহে এ সম্পর্কে সুষ্ঠু ও উত্তম জ্ঞানের অধিকারী।সূরা-ই-বাকারাহ ও সূরা-ই-আলে ইমরানের গুণাবলীনবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা অভিনিবেশ সহকারে সূরা-ই-বাকারাহ শিক্ষা কর। কারণ এর শিক্ষা অতি কল্যাণকর এবং এ শিক্ষার বর্জন অতি বেদনাদায়ক। এমনকি বাতিলপন্থী যাদুকরও এর ক্ষমতা রাখে না।'অতঃপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেনঃ ‘সূরা-ই-বাকারাহ ও সূরা-ই আলে ইমরান শিক্ষা কর। এ দু'টি হচ্ছে জ্যোতির্ময় নূর বিশিষ্ট সূরা। এরা এদের পাঠকের উপর সামিয়ানা, মেঘমালা অথবা পাখির ঝাঁকের ন্যায় কিয়ামতের দিন ছায়া বিস্তার করবে। কুরআনের পাঠক কবর থেকে উঠে দেখতে পাবে যে, এক জ্যোতির্ময় মুখমণ্ডল বিশিষ্ট সুন্দর যুবক তার পাশে দাঁড়িয়ে বলছেঃ “আপনি আমাকে চিনেন কি?' এ বলবেঃ না'। সে বলবেঃ ‘আমি সেই কুরআন যে তোমাকে দিনে ক্ষুধার্থ ও পিপাসার্ত রেখেছিল এবং রাত্রে বিছানা দূরে সরিয়ে সদা জাগ্রত রেখেছিল। প্রত্যেক ব্যবসায়ী তার ব্যবসার পিছনে রয়েছে; কিন্তু আজ সমুদয় ব্যবসা তোমার পিছনে আছে। আজ তার দক্ষিণ হস্তে রাজ্য এবং অনন্তকালের জন্যে বাম হস্তে চির অবস্থান দেয়া হবে। তার মস্তকে সার্বিক সম্মান ও অনন্ত মর্যাদার মুকুট পরানো হবে। তার বাপ-মাকে এমন দু'টি সুন্দর মূল্যবান পরিধেয় বস্ত্র পরানো হবে যার মূল্যের সামনে সারা দুনিয়া জাহান অতি নগণ্য মনে হবে। তারা বিচলিত হয়ে বলবেঃ ‘এ দয়া ও অনুগ্রহ, এ পুরস্কার ও অবদানের কারণ কি? তখন তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমাদের ছেলেদের কুরআন পাঠের কারণে তোমাদেরকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ ‘পড়ে যাও এবং ধীরে ধীরে বেহেশতের সোপানে আরোহণ কর।' সুতরাং তারা পড়তে থাকবে ও উচ্চ হতে উচ্চতর সোপানে আরোহণ করবে। সে ধীরে ধীরেই পাঠ করুক বা তাড়াতাড়ি পাঠ করুক।' সুনান-ই-ইবনে মাজায় এ হাদীসটি আংশিকভাবে বর্ণিত আছে। এর ইসনাদ হাসান এবং মুসলিমের শর্ত বিদ্যমান। এর বর্ণনাকারী বশীর বিন মুহাজির হতে ইমাম মুসলিমও (রঃ) বর্ণনা নিয়েছেন এবং ইমাম ইবনে মুঈনও তাকে নির্ভরযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। ইমাম নাসাঈর (রঃ) মতে এতে কোন দোষ নেই। হাঁ, তবে ইমাম আহমাদ (রঃ) তাকে মুনকারুল হাদীস বলেছেন এবং এর কারণ দেখাতে গিয়ে তিনি বলেছেনঃ “আমি ব্যাপক অনুসন্ধান করে দেখলাম যৈ, সে অদ্ভুত হাদীস এনে থাকে। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, তার কতকগুলো হাদীসের বিরুদ্ধাচরণ করা হয়েছে। আবু হাতিম রাযীর ফায়সালা এই যে, তার হাদীস লিখা যেতে পারে; কিন্তু দলীল রূপে গৃহীত হতে পারে না। ইবনে ‘আদীর কথা এই যে, তার এমন কতকগুলো বর্ণনা আছে যেগুলোর অনুসরণ করা যায় না। ইমাম দারকুতনী (রঃ) বলেনঃ এটা সবল নয়। আমি বলি যে, তার এই বর্ণনার কতকগুলো বিষয় অন্য সনদেও এসেছে।মুসনাদ-ই- আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ কুরআন পাঠ করতে থাকো, কারণ তা তার পাঠকের জন্যে কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। দু'টি জ্যোতির্ময় সূরা, সূরা-ই- বাকারাহ্ ও সূরা-ই-আলে ইমরান পড়তে থাকে। এ দুটো সূরা কিয়ামতের দিন এমনভাবে আসবে যেমন দুটো সামিয়ানা, দুটো মেঘ খণ্ড অথবা পাখির দুটো বিরাট ঝক। তাছাড়া সে তার পাঠকদের পক্ষ হতে আল্লাহ তা'আলার নিকট সুপারিশ করবে।' পুনরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ সূরা-ই-বাকারাহ পড়তে থাকো; কেননা, এর পাঠে বরকত আছে এবং তা বর্জন বা পরিত্যাগ করাতে সমূহ আফসোস আছে। এর শক্তি বাতিলপন্থীদের নেই।' সহীহ মুসলিম শরীফেও অনুরূপ হাদীস আছে।মুসনাদ-ই-আহমাদের আর একটি হাদীসে আছেঃ কিয়ামতের দিন কুরআন ও কুরআন পাঠকদের আহবান করা হবে। সূরা-ই-বাকারাহ ও সূরা-ই-আলে ইমরান অগ্রে অগ্রে চলবে। মেঘ ছায়া অথবা পাখির ঝাঁকের মত (চলতে থাকবে)। এর বেশ উঁটের সঙ্গে বিশ্ব প্রতিপালকের নিকট সুপারিশ করবে। সহীহ মুসলিম ও জামে তিরমিযীতেও এ হাদীসটি আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান গারীব বলেছেন। এক ব্যক্তি নামাযে সূরা-ই-বারাকাহ ও সূরা-ই-আলে ইমরান পাঠ করলেন। তা শেষ করলে পর হযরত কা'ব (রাঃ) বলেনঃ 'যে আল্লাহর অধিকারে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এতে আল্লাহর ঐ নাম রয়েছে যে নাম ধরে প্রার্থনা করলে তা সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়ে থাকে। এখন লোকটি হযরত কা'বের (রাঃ) নিকট আরজ করলেনঃ “আমাকে বলে দিন ঐ নামটি কি?' হযরত কা'ব (রাঃ) তা অস্বীকার করে বললেনঃ যদি আমি বলে দেই তবে ভয় হয় যে, আপনি হয়তো ঐ নামের বরকতে এমন প্রার্থনা করবেন যা আমার ও আপনার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) বলেনঃ “তোমাদের ভাইকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। যে, যেন মানুষ একটা উঁচু পাহাড়ের উপর চড়ে রয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় দুটি সবুজ বৃক্ষ রয়েছে এবং ও দুটোর মধ্য হতে শব্দ হচ্ছেঃ তোমাদের মধ্যে কেউ -সূরা-ই-বাকারার পাঠক আছে কি? যখন কেউ বলছে যে, হাঁ আছে, তখন বৃক্ষদ্বয় ফলসহ তার দিকে ঝুঁকে পড়ছে এবং এ লোকটি ওদের শাখার উপর বসে যাচ্ছে এবং গাছগুলি তখন তাকে উপরে উঠিয়ে নিচ্ছে। হযরত উম্মে দারদা (রাঃ) বলেন যে, একজন কুরআনের পাঠক তার প্রতি বেশীকে মেরে ফেলে। অতঃপর প্রতিশোধ গ্রহণ আইনে তাকেও মেরে ফেলা হয়। তারপর কুরআন এক একটি সূরা হয়ে তার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে আরম্ভ করে। শেষ পর্যন্ত তার পাশে শধুমাত্র সূরা-ই-বাকারাহ ও সূরা-ই-আলে ইমরান বাকী রয়ে যায়। এক জুমআ’র পরে সূরা-ই-আলে ইমরানও পৃথক হয়ে পড়ে। আবার এক জুমআ অতিবাহিত হলে দৈব বাণী হয়ঃ আমার কথার পরিবর্তন নেই এবং আমি আমার বান্দাদের উপর আদৌ অত্যাচার করি না।' সুতরাং এই বরকতময় সূরাটিও অর্থাৎ সূরা-ই-বাকারাও পৃথক হয়ে পড়ে। ভাবার্থ এই যে, এই সূরা দু’টি তার পক্ষ থেকে বিপদ ও শাস্তির বাধা স্বরূপ হয়ে থাকে এবং কবরে তাকে পরিতুষ্ট করতে থাকে। সর্বশেষে তার পাপের আধিক্যের ফলে এদের সুপারিশও কার্যকরী হয় না।ইয়াযীদ বিন আসওয়াদ জুরশী বলেন যে, এই সূরা দুটি যে ব্যক্তি দিনে পাঠ করে সে সারা দিন কপটতা থেকে মুক্ত থাকে। আর যে ব্যক্তি রাত্রে তা পাঠ করে সে সারা রাতে কপটতা থেকে মুক্ত থাকে। স্বয়ং হযরত ইয়াযীদ (রাঃ) সকাল সন্ধ্যায় কুরআন মাজীদ ছাড়াও এ দু'টি সূরাকে সাধারণ অজীফারূপে পাঠ করতেন। হযরত উমার ফারুক (রাঃ) বলতেনঃ 'যে ব্যক্তি এ দু'টি সূরা রাত্রে পাঠ করবে সে আল্লাহর অনুগত বান্দাদের অন্তুর্ভুক্ত হবে। এর সনদ মুনকাতি'। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরা দু’টি (রাত্রির নামাযে) এক রাকাতে পড়তেন।সাতটি দীর্ঘ সূরার মর্যাদারাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তাওরাতের স্থলে আমাকে দীর্ঘ সাতটি সূরা দেয়া হয়েছে, ইঞ্জীলের স্থলে আমি দু'শো আয়াত বিশিষ্ট সূরাসমূহ প্রাপ্ত হয়েছি এবং যায়ূরের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে আমাকে দুশোর কম বিশিষ্ট সূরাগুলো দেয়া হয়েছে। অতঃপর আমাকে বিশেষ মর্যাদা হিসেবে সূরা-ই-কাফ থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত সূরাগুলো দেয়া হয়েছে।' এ হাদীসটি গারীব এবং এর এক বর্ণনাকারী সাঈদ বিন আবূ বাশীর সম্পর্কে কিছুটা সমালোচনা রয়েছে। আল্লাহই এ সম্পর্কে খুব ভাল জানেন। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, যে ব্যক্তি এই সাতটি সূরা লাভ করে সে খুব বড় আলেম। এই বর্ণনাটিও গারীব। মুসনাদ-ই-আহমাদেও এ রেওয়ায়েতটি আছে।একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন এবং তাদের মধ্যে এমন একজনকে নেতৃত্ব দান করেন যার সূরা-ই-বাকারাহ মুখস্থ ছিল অথচ বয়সে তিনি সবচেয়ে ছোট ছিলেন। হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) নিম্নের (আরবি) (১৫:৮৭) এ আয়াতের তাফসীরেও বলেন যে, এর ভাবার্থ নিম্নলিখিত সাতটি দীর্ঘ সূরাঃ(১) সূরা-ই-বাকারাহু, (২) সূরা-ই- আলে-ইমরান, (৩) সূরা-ই-নিসা, (৪) সূরা-ই-মায়েদা, (৫) সূরা-ই-আনআম, (৬) সূরা-ই আ’রাফ এবং (৭) সূরা-ই ইউনুস। মুজাহিদ (রঃ), মাকহুল (রঃ), আতিয়্যাহ বিন কায়েস (রঃ), আবু মুহাম্মদ ফারেসী (রঃ), শাদ্দাদ বিন আউস (রঃ) এবং ইয়াহইয়া ইবনে হারিস জিমারী (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।
আল-ফাতিহা 1:7
৬-৭ নং আয়াতের তাফসীরএর বর্ণনা পূর্বেই গত হয়েছে যে, বান্দার এ কথার উপর মহান আল্লাহ বলেন, এটা আমার বান্দার জন্যে এবং আমার বান্দার জন্যে ঐ সব কিছুই রয়েছে যা সে চাইবে।' এ আয়াতটি সীরাতে মুসতাকীমের তাফসীর এবং ব্যাকরণবিদ বা নাহ্বীদের নিকট এটা ‘সীরাতে মুসতাকীম' হতে বদল হয়েছে এবং আত বায়ানও হতে পারে। আল্লাহ তা'আলাই এ সম্পর্কে সবচাইতে ভাল জানেন। আর যারা আল্লাহর পুরস্কার লাভ করেছে তাদের বর্ণনা সূরা-ই-নিসার মধ্যে এসেছে। ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের অনুগত হয়, এরূপ ব্যক্তিগণও ঐ মহান ব্যক্তিগণের সহচর হবেন যাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ করেছেন, অর্থাৎ নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও নেক্কারগণ। আর ঐ মহাপুরুষগণ উত্তম সহচর। এ অনুগ্রহ আল্লাহর পক্ষ হতে এবং সর্বজ্ঞ হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।' (৪:৬৯-৭০) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ঐ সব ফেরেশতা, নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং সৎলোকের পথে পরিচালিত করুন যাদেরকে আপনি আপনার আনুগত্য ও ইবাদতের কারণে পুরস্কৃত করেছেন।” উল্লিখিত আয়াতটি নিম্ন বর্ণিত আয়াতের মত। (৪:৬৯) (আরবি)হযরত রাবী' বিন আনাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে নবীগণ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ) এর অর্থ নিয়েছেন মুমিনগণ’ এবং হযরত অকী (রঃ) নিয়েছেন মুসলমানগণ।' আবদুর রহমান (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সহচরবর্গ (রাঃ)। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) কথাই বেশী ব্যাপক। আল্লাহ তা'আলাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন (আরবি) এই নামক শব্দটিতে জমহুরের পঠনে (আরবি) (গাইরি) আছে অর্থাৎ (আরবি) অক্ষরের নীচে ‘যের ' এবং তা বিশেষণ করা হয়েছে। আল্লামা যামাখশারী বলেছেন যে, (আরবি) কে যবরের সঙ্গে পড়া হয়েছে এবং তা ‘হাল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং হযরত উমার বিন খাত্তাবের (রাঃ) পঠন এটাই (আরবি) এর সর্বনামটি ওর (আরবি) এবং হচ্ছে (আরবি), তাহলে অর্থ হচ্ছেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সরল সোজা পথ প্রদর্শন করুন, ঐ সব লোকের পথ যাদেরকে আপনি পুরস্কৃত করেছেন, যারা হিদায়াত বা সুপথ প্রাপ্ত এবং অটল অবিচলিত ছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) অনুগত ছিলেন। যারা আল্লাহর নির্দেশ পালনকারী ও নিষিদ্ধ কাজ হতে দূরে-বহুদূরে অবস্থানকারী ছিলেন। আর ঐ সব লোকের পথ হতে রক্ষা করুন যাদের উপর আপনার ধূমায়িত ক্রোধ ও অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে, যারা সত্যকে জেনে শুনেও তা থেকে দূরে সরে গেছে এবং পথভ্রষ্ট লোকেদের পথ হতেও আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখুন যাদের সঠিক পথ সম্পর্কে কোন ধারণা ও জ্ঞানই নেই, যারা পথভ্রষ্ট হয়ে লক্ষ্যহীনভাবে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়ায় এবং তাদেরকে সরল, সঠিক পুণ্য পথ দেখানো হয় না।কথার মধ্যে খুব বেশী গুরুত্ব আনয়নের জন্যে (আরবি) অক্ষরটিকে (আরবি) এর পরে আনা হয়েছে, যেন জানতে পারা যায় যে, এখানে ভুলপথ দুইটি। একটি ইয়াহূদীদের পথ এবং অপরটি খৃষ্টানদের পথ। কোন কোন নাবী বা ব্যাকরণবিদ বলেছেন যে, এখানে (আরবি) শব্দটি (আরবি) বা প্রভেদ সৃষ্টির জন্যে এসেছে। তা হলে এটা (আরবি) হতে পারে। কেননা যাদের উপর অনুগ্রহ করা হয়েছে তাদের মধ্য হতে এ (আরবি) হচ্ছে অথচ এরা তাদের অন্তর্ভুক্তই ছিল না। কিন্তু আমরা যে তাফসীর করেছি এটাই বেশী উত্তম। আরব কবিদের কবিতায় এরূপ দেখা যায় যে, তারা বিশেষ্যকে লোপ করে শুধুমাত্র বিশেষণের বর্ণনা দিয়ে থাকেন। যেমন নিম্নের কবিতায় রয়েছেঃ (আরবি)এখানে (আরবি) শব্দের আগে (আরবি) নামক বিশেষ্যটিকে সোপ করা হয়েছে এবং পরবর্তী পর্যায়ের বিশেষণকে যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। এভাবেই আয়াতেও বিশেষণের বর্ণনা রয়েছে এবং (আরবি)-নামক বিশেষ্যকে লোপ করা হয়েছে (আরবি) এর ভাবার্থ হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ অভিশপ্তদের পথে নয় (আরবি) এর উল্লেখ না করে (আরবি) এর উল্লেখই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। পূর্ব শব্দগুলিই এটা প্রমাণ করছে। পূর্বে এ শব্দটি দুইবার এসেছে। কেউ কেউ বলেন যে (আরবি) এর শব্দটি অতিরিক্ত। তাদের মতে বাক্যটি হবে নিম্নরূপঃ (আরবি) এবং আরব কবিদের কবিতাতেও এর সাক্ষ্য রয়েছে। যেমন কবি আজ্জাজ বলেনঃ (আরবি)এখানে (আরবি) শব্দটি অতিরিক্ত। কিন্তু সঠিক কথা সেইটাই যা আমরা ইতিপূর্বে লিখেছি। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) হতে সহীহ সনদে (আরবি) পড়াও বর্ণিত আছে। আবু উবাইদ আল কাসেম বিন সাল্লাম “কিতাবু ফাযাইলিল কুরআন' এর মধ্যে একথা বর্ণনা করেছেন। হযরত উবাই বিন কা'ব (রাঃ) হতেও এরূপ বর্ণিত আছে। এ মহান ব্যক্তিদ্বয় হতে যদি এটা ব্যাখ্যাদান রূপেও প্রকাশ পেয়ে থাকে তবে তো এটা আমাদের মতেরই সহায়ক হবে। তা হলো এই যে, (আরবি) কে (আরবি) এর জন্যে আনা হয়েছে, যাতে এ সন্দেহ না থাকে যে, এটা (আরবি) এর (আরবি) উপর হয়েছে এবং এ জন্যেও যে, যাতে দুইটি পথের পার্থক্য অনুধাবন করা যায়, যেন প্রত্যেকেই এ দুটো পথ থেকে বেঁচে থাকে। ঈমানদারদের পন্থা তো এটাই যে, সত্যের জ্ঞানও থাকতে, হবে এবং তার আমলও থাকতে হবে। ইয়াহূদীদের আমল নেই এবং খৃষ্টানদের জ্ঞান নেই। এজন্যেই ইয়াহূদীরা অভিশপ্ত হলো এবং খৃষ্টানেরা হলো পথভ্রষ্ট। কেননা, জেনে শুনে ইচ্ছাকৃতভাবে আমল পরিত্যাগ করা লা'নত বা অভিশাপের কারণ হয়ে দাড়ায়। খৃষ্টানেরা যদিও একটা জিনিসের ইচ্ছে করে, কিন্তু তার সঠিক পথ তারা পায় না। কেননা, তাদের কর্মপন্থা ভুল এবং তারা সত্যের অনুসরণ হতে দূরে সরে পড়েছে। অভিশাপ ও পথভ্রষ্টতা এই দুই দলের তো রয়েছেই কিন্তু ইয়াহুদী অভিশাপের অংশে একধাপ এগিয়ে রয়েছে। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ এরা পূর্ব হতেই পথভ্রষ্ট এবং অনেককেই পথভ্রষ্ট করেছে এবং তারা সোজা পথ হতে ভ্রষ্ট রয়েছে। (৫:৭৭) একথার সমর্থনে বহু হাদীস ও বর্ণনা পেশ করা যেতে পারে। মুসনাদ-ই-আহমাদে আছে যে, হযরত আদী বিন হাতিম (রাঃ) বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সেনাবাহিনী একদা আমার ফুফুকে এবং কতকগুলো লোককে বন্দী করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এনে হাজির করেন। আমার ফুফু তখন বলেনঃ “আমাকে দেখা শোনা করার লোক দূরে সরে রয়েছে এবং আমি একজন অধিক বয়স্কা অচলা বৃদ্ধা। আমি কোন খিদমতের যোগ্য নই। সুতরাং দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আল্লাহ আপনার উপরও দয়া করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “যে তোমার খবরাখবর নিয়ে থাকে সে ব্যক্তিটি কে?' তিনি বললেন-আদী বিন হাতিম।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “সে কি ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ) হতে এদিক ওদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বিনা শর্তে মুক্তি দিয়ে দেন। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফিরে আসেন তখন তার সাথে আর একটি লোক ছিলেন। খুব সম্ভব তিনি হযরত আলীই (রাঃ) ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ যাও, তার কাছে গিয়ে সোয়ারীর প্রার্থনা কর।' আমার ফুফু তাঁর কাছে প্রার্থনা জানালে সঙ্গে সঙ্গে তা মঞ্জুর হয় এবং তিনি সোয়ারী পেয়ে যান। তিনি এখান হতে মুক্তি লাভ করে সোজা আমার নিকট চলে আসেন এবং বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) দানশীলতা তোমার পিতা হাতিমকেও ছাড়িয়ে গেছে। তার কাছে একবার কেউ গেলে আর শূন্য হস্তে ফিরে আসে না।' একথা শুনে আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাজির হই। আমি দেখি যে, ছোট ছেলে ও বৃদ্ধা স্ত্রীলোকেরা তাঁর কাছে অবাধে যাতায়াত করছে এবং তিনি তাদের সাথে অকুণ্ঠচিত্তে অকৃত্রিমভাবে আলাপ আলোচনা করছেন। এ দেখে আমার বিশ্বাস হলো যে, তিনি কাইসার ও কিসরার মত বিশাল রাজত্ব ও সম্মানের অভিলাষী নন। তিনি আমাকে দেখে বলেনঃ ‘আদী! (আরবি) বলা হতে পালিয়ে বেড়াচ্ছ কেন? আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ উপাসনার যোগ্য আছে কি? (আরবি) বলা হতে এখন তুমি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ কেন? মহা সম্মানিত আল্লাহ পাক থেকে বড় আর কেউ আছে কি? (তার এই কথাগুলো এবং তাঁর সরলতা ও অকৃত্রিমতা আমার উপর এমনভাবে দাগ কাটলো ও ক্রিয়াশীল হলো যে,) আমি তৎক্ষণাৎ কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম। তাতে তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং বলেনঃ (আরবি) দ্বারা ইয়াহূদকে বুঝানো হয়েছে এবং (আরবি) দ্বারা খৃষ্টানগণকে বুঝানো হয়েছে। আরও একটি হাদীসে আছে যে, হযরত আদীর (রাঃ) প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই তাফসীরই করেছিলেন। এ হাদীসের অনেক সনদ আছে এবং বিভিন্ন শব্দে সে সব বর্ণিত হয়েছে।বানূ কাইনের একটি লোক 'ওয়াদীউল কুরায়' রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এটাই প্রশ্ন করেছিলেন এবং উত্তরে তিনি একথাই বলেছিলেন। কোন কোন বর্ণনায় তাঁর নাম দেয়া হয়েছে আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ)। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)- এর তাফসীরে হযরত আবু যার (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) এবং আরও বহু সাহাবী (রাঃ) হতেও এ তাফসীর মকল করা হয়েছে। হযরত রাবী' বিন আনাস (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণও একথাই বলেন। বরং ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো বলেন যে, মুফাসসিরগণের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই। এই ইমামগণের এতোফসীরের একটি দলীল হচ্ছে ঐ হাদীসটি যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে সূরা-ই-বাকারার এ আয়াতটি যাতে বানী ইসরাঈলগণকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে। (২:৯০) (আরবি) এ আয়াতের মধ্যে আছে যে, তাদের উপর অভিশাপের পর অভিশাপ অবতীর্ণ। হয়েছে এবং সূরা-ই-মায়েদার (আরবি) (৫৪৬০) এই আয়াতের মধ্যেও রয়েছে যে, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ অবতীর্ণ হয়েছে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ বানী ইসরাঈলদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদের উপর দাউদ (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ) এর কথায় অভিশাপ দেয়া হয়েছে; কারণ তারা অবাধ্য হয়েছিল ও সীমা অতিক্রম করেছিল। এসব লোক কোন খারাপ কাজ হতে একে অপরকে বাধা দিতো না। নিশ্চয়ই তাদের কাজ ছিল অত্যন্ত জঘন্য। (৫:৭৮-৭৯)ইতিহাসের পুস্তকসমূহে বর্ণিত আছে যে, যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল যখন খাঁটি ধর্মের অনুসন্ধানে স্বীয় বন্ধুবান্ধব ও সাথী-সঙ্গীসহ বেরিয়ে পড়লেন এবং এদিক ওদিক বিচরণের পর শেষে সিরিয়ায় আসলেন, তখন ইয়াহূদীরা তাদেরকে বললোঃ “আল্লাহর অভিশাপের কিছু অংশ না নেয়া পর্যন্ত আপনারা আমাদের ধর্মে আসতেই পারবেন না। তারা উত্তরে বললেনঃ তা হতে বাঁচার উদ্দেশ্যেই তো আমরা সত্য ধর্মের অনুসন্ধানে বের হয়েছি, কাজেই কিরূপে তা গ্রহণ করতে পারি? তারা খৃষ্টানদের সাথে সাক্ষাৎ করলে তারা বললোঃ “আল্লাহ তা'আলার লা'নত ও অসন্তুষ্টির কিছু অংশ না নেয়া পর্যন্ত আপনারা আমাদের ধর্মেও আসতে পারবেন না। তারা বললেনঃ আমরা এটাও করতে পারি না। তারপর হযরত যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল স্বাভাবিক ধর্মের উপরই রয়ে গেলেন। তিনি মুর্তি পূজা ও স্বগোত্রীয় ধর্মত্যাগ করলেন, কিন্তু ইয়াহুদী ও খৃষ্টান ধর্ম কোন ক্রমেই গ্রহণ করলেন না। তবে তার সঙ্গী সাথীরা খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করলো, কেননা ইয়াহূদীদের ধর্মের সঙ্গে এর অনেকটা মিল ছিল। যায়েদের ধর্মেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন অরাকা বিন নাওফিল। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নবুওতের যুগ পেয়েছিলেন এবং আল্লাহর হিদায়াত তাঁকে সুপথ প্রদর্শন করেছিল। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর উপর ঈমান এনেছিলেন ও সেই সময় পর্যন্ত যে ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছিল তিনি তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হউন। জিজ্ঞাস্যঃ (আরবি) এবং (আরবি)-এর মধ্যে অতি সামান্য পার্থক্য রয়েছে। এজন্যে উলামা-ই-কিরামের সহীহ মাযহাৰ এই যে, এ পার্থক্য ক্ষমার্হ (আরবি) এর সহীহ মাখরাজ হচ্ছে জিহবার প্রথম প্রান্ত এবং ওর পার্শ্বের চোয়াল। আর (আরবি) এর মাখরাজ হচ্ছে জিহবার এক দিক এবং সম্মুখের উপরের দুই দাঁতের প্রান্ত। দ্বিতীয় কথা এই যে, এই দুটি অক্ষর হচ্ছে (আরবি) এবং (আরবি) সুতরাং যে ব্যক্তির পক্ষে এই দুইটি অক্ষরের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হবে সে যদি কে (আরবি) এর মত পড়ে ফেলে তবে তার অপরাধ অমার্জনীয় নয়, বরং তাকে ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখা হবে। একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) কে সবচেয়ে সঠিকভাবে পড়তে আমিই পারি। কিন্তু হাদীসটি সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন ও দুর্বল। পরিচ্ছেদএই কল্যাণময় ও বরকতপূর্ণ সূরাটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর সমষ্টি। এই সাতটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলার যোগ্য প্রশংসা, তার শ্রেষ্ঠত্ব, পবিত্র নামসমূহ এবং উচ্চতম বিশেষণের সুন্দর বর্ণনা রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই রোজ কিয়ামতের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং বান্দাদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে যে, তারা যেন সেই মহান প্রভুর নিকট অত্যন্ত বিনীতভাবে যাচ্ঞা করে, যেন তার কাছে নিজের দারিদ্র ও অসহায়ত্বের কথা অকপটে স্বীকার করে, তাকে সব সময় অংশীবিহীন ও তুলনাবিহীন মনে করে, খাটি অন্তরে তাঁর ইবাদত; তাঁর অহদানিয়াত বা একত্ববাদে বিশ্বাস করে, তার কাছে সরল সোজা পথ ও তার উপর সুদৃঢ় ও অটল থাকার জন্যে নিশিদিন আকুল প্রার্থনা জানায়। এই অবিসম্বাদিত পথই একদিন তাকে রোজ কিয়ামতের পুলসিরাত পার করাবে এবং নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং নেককারদের পার্শ্বে জান্নাতুল ফিরদাউসের নন্দন কাননে স্থান দেবে। সাথে সাথে আলোচ্য সূরাটির মধ্যে যাবতীয় সকার্যাবলী সম্পাদনের প্রতি নিরন্তর উৎসাহ দেয়া হয়েছে যাতে কিয়ামতের দিন বান্দা আত্মকৃত নেকী ও পুন্যসমূহ সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে এবং মিথ্যা ও অন্যায় পথে চলা থেকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে, যাতে কিয়ামতের দিনেও সে বাতিলপন্থীদের দল থেকে দূরে থাকতে পারে। এই বাতিলপন্থী দল হচ্ছে ইয়াহূদী এবং খৃষ্টান।ধীরস্থির ও সূক্ষ্মভাবে জাগ্রত মস্তিষ্ক নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে দেখলে অতি সহজেই অনুধাবন করা যাবে যে, আল্লাহ তা'আলার বর্ণনারীতি কি সুন্দর! আলোচ্য সূরায় (আরবি) নামক বাক্যাংশে দানের ইসনাদ বা সম্পর্ক আল্লাহর দিকে করা হয়েছে এবং (আরবি) বলা হয়েছে (আরবি) কিন্তু এর ইসনাদ করা হয়নি; বরং এখানে কর্তাকেই লোপ করা হয়েছে এবং (আরবি) বলা হয়েছে। এখানে বিশ্ব প্রভুর মহান মর্যাদার প্রতি যথাযোগ্য লক্ষ্য রাখা হয়েছে। অবশ্য প্রকৃতপক্ষে মূল কর্তা আল্লাহ তা'লাই। যেমন অন্যস্থানে বলা হয়েছে (আরবি) এরূপভাবেই ভ্রষ্টতার ইসনাদ পথভ্রষ্টের দিকেই করা হয়েছে। অথচ অন্য এক জায়গায় আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ যাকে সুপথ প্রদর্শন করেন সে সুপথ প্রাপ্ত এবং যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন তার কোন বন্ধু ও পথ প্রদর্শক নেই।' (১৮:১৭) আর এক জায়গায় আছে, (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন পথ প্রদর্শক নেই এবং সে তো স্বীয় অবাধ্যতার মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে ফিরছে?' (৭:১৮৬) এ রকমই আরও বহু আয়াত রয়েছে যদ্দ্বারা একথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, পথ প্রদর্শনকারী ও পথ বিভ্রান্তকারী হচ্ছেন একমাত্র মহান আল্লাহ।কাদরিয়্যাহ দল, যারা কতকগুলো অস্পষ্ট আয়াতকে দলীলরূপে গ্রহণ করে বলে থাকে যে, বান্দা তার ইচ্ছাধীন ও মুক্ত স্বাধীন, সে নিজেই পছন্দ করে এবং নিজেই সম্পাদন করে। কিন্তু তাদের একথা ভ্রমাত্মক ও প্রমাদপূর্ণ। এটা খণ্ডনের জন্যে ভূরি ভূরি স্পষ্ট আয়াতসমূহ বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু বাতিল পন্থীদের এটাই রীতি যে, তারা স্পষ্ট আয়াতকে পরিহার করে অস্পষ্ট আয়াতের পিছনে লেগে থাকে। বিশুদ্ধ হাদীসে আছেঃ “যখন তোমরা ঐ লোকদেরকে দেখ যারা অস্পষ্ট আয়াতসমূহের পিছনে লেগে থাকে তখন বুঝে নিও যে, তারা ওই যাদের নাম স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা নিয়েছেন এবং স্বীয় কিতাবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং তোমরা তাদের থেকে সতর্ক থাক। এ নির্দেশনামায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর ইঙ্গিত এই আয়াতের প্রতি রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ সুতরাং যাদের অন্তরে বঞতা রয়েছে তারা গোলযোগ সৃষ্টি এবং এর (মনগড়া) ব্যাখ্যা অন্বেষণের উদ্দেশ্যে এর ঐ অংশের পিছনে পড়ে থাকে যা দুর্বোধ্য ও অস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট। সুতরাং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, বিদআতীদের অনুকূলে কুরআন পাকের মধ্যে সঠিক ও অকাট্য দলীল একটিও নেই। কুরআন মাজীদের আগমন সূচিত হয়েছে সত্য ও মিথ্যা, হিদায়াত ও গুমরাহীর মধ্যে পার্থক্য প্রদর্শনের জন্যেই। বৈপরীত্ব ও মতবিরোধের জন্যে অসেনি বা তার অবকাশও এতে নেই। এতে মহাবিজ্ঞ ও প্রশংসিত আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ হয়েছে লাওহে মাহফু’ বা রক্ষিত ফলক থেকে।" পরিচ্ছেদসূরা ফাতিহা শেষ করে আমীন বলা মুসতাহাব (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দটির মত এবং এটা (আরবি) ও পড়া হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছেঃ “ হে আল্লাহ! আপনি কবুল করুন। আমীন বলা মুসতাহাব হওয়ার দলীল হলো ঐ হাদীসটি যা মুসনাদ-ই-আহমদ, সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামে তিরমিযীতে হযরত অয়েল বিন হুজর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবি) পড়ে আমীন বলতে শুনেছি। তিনি স্বর দীর্ঘ করতেন।” সুনান-ই- আবি দাউদে আছে যে, তিনি স্বর উচ্চ করতেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সশব্দ আমীন তার নিকটবর্তী প্রথম সারির লোকেরা স্পষ্টতঃই শুনতে পেতেন। সুনান-ই-আবি দাউদ ও সুনান-ই-ইবনে মাজায় এ হাদীসটি আছে। সুনান-ই-ইবনে মাজায় এও আছে যে, আমীনের শব্দে গোটা মসজিদ প্রতিধ্বনিত হয়ে বেজে উঠতো।' ইমাম দারে-কুতনীও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং একে 'হাসান' বলে মন্তব্য করেছেন। হযরত বেলাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “আমার পূর্বে ‘আমীন' বলবে না।"হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত জাফর সাদিক (রঃ) হতে 'আমীন' বলা বর্ণিত আছে। যেমন কুরআন মজীদের মধ্যে (আরবি) (৫:২) রয়েছে। আমাদের সহচরেরা বলেন যে, নামাযের বাইরে থাকলেও ‘আমীন' বলতে হবে। তবে যে ব্যক্তি নামাযে থাকবে তার জন্যে বেশী জোর দেয়া হয়েছে। নামাযী একাকী হোক বা মুকতাদী হোক বা ইমাম হোক, সর্বাবস্থায় তাকে আমীন বলতেই হবে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন ইমাম ‘আমীন' বলেন তখন তোমরাও আমীন বল। যার আমীন বলার শব্দ ফেরেশতাদের আমীনের সঙ্গে মিলিত হয় তার পূর্বেকার সমস্ত পাপ মোচন হয়ে যায়।সহীহ মুসলিম শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের মধ্যে কেউ নামাযে ‘আমীন' বলে এবং ফেরেশতারাও আকাশে ‘আমীন বলেন, আর একের আমীনের সঙ্গে অন্যের ‘আমীন মিলিত হয় তখন তার পূর্বেকার সমস্ত গোনাহ মাফ হয়ে যায়। এর ভাবার্থ এই যে, তার আমীন ও ফেরেশতাদের ‘আমীন' বলার সময় একই হয় বা কবুল হওয়া হিসেবে অনুরূপ হয় অথবা আন্তরিকতায় অনুরূপ হয়। সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু মূসা আশ'আরী (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছেঃ “যখন ইমাম (আরবি) বলেন তখন তোমরা ‘আমীন' বল, আলাহ কবুল করবেন।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমীনের অর্থ কি' তিনি বললেনঃ হে আল্লাহ! আপনি কবুল করুন। জওহারী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘যেন এরূপই হয়।' ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে আমাদের আশা ভঙ্গ করবেন না। অধিকাংশ আলেম বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের প্রার্থনা কবুল করুন।' মুজাহিদ (রঃ), জাফর সাদিক (রঃ) এবং হিলাল বিন সিয়াফ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলার নাম সমূহের মধ্যে আমীনও একটি নাম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মার’ রূপে এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। কিন্তু তা বিশুদ্ধ নয়।ইমাম মালিকের (রঃ) সহচরগণের মাযহাব এই যে, ইমাম ‘আমীন’ বলবেন , শুধু মুকতাদীগণ ‘আমীন’ বলবেন। কেননা ইমাম মালিকের (রঃ) মুআত্তার হাদীসে আছে :যখন ইমাম (আরবি) বলে তখন তোমরা আমীন’ বল। এ রকমই তার দলীলের সমর্থনে সহীহ মুসলিমে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতেও একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন ইমাম (আরবি) বলে তখন তোমরা আমীন বল।' কিন্তু সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীস ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে-'যখন ইমাম আমীন বলে তখন তোমরাও আমীন’ বল।' হাদীসে এটাও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) বলে ‘আমীন’ বলতেন। উচ্চৈস্বরে পঠিত নামাযে মুকতাদী উচ্চৈস্বরে আমীন বলবে কিনা সে বিষয়ে আমাদের সহচরদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এর ব্যাখ্যা এই যে, যদি ইমাম ‘আমীন' বলতে ভুলে যান তবে মুকতাদীগণ জোরে আমীন বলবে। যদি ইমাম নিজেই উচ্চৈস্বরে আমীন বলেন তবে নতুন কথা মতে মুকতাদী জোরে আমীন বলবে না। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) এটাই মাযহাব। ইমাম মালিক হতেও এরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে। কেননা, নামাযের অন্যান্য যিকরের মত এটাও একটা যি। সুতরাং অন্যান্য যি যেমন উচ্চ শব্দে হয়, তেমনই এটাও উচ্চ শব্দে পড়া হবে না। কিন্তু পূর্ব যুগীয় মনীষীদের কথা এই যে, “আমীন’ উচ্চ শব্দেও পড়া যায়। ইমাম আহমদ বিন হাম্বলেরও (রঃ) মাযহাব এটাই এবং দ্বিতীয় বর্ণনা অনুসারে ইমাম মালিকের (রঃ) এটাই মাযহাব। এর দলীল ঐ হাদীসটি যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, আমীনের শব্দে মসজিদের মধ্যে গুঞ্জন ধ্বনির রব উঠতো। এখানে আমাদের তৃতীয় আরও ইমাম।একটি মত আছে, তা এই যে, যদি মসজিদ ছোট হয় তবে মুকতাদী জোরে আমীন বলবে না। কেননা। তারা ইমামের কিরাআত শুনছে। আর যদি মসজিদ বড় হয় তবে আমীন জোরে বলবে, যেন মসজিদের প্রান্তে প্রান্তে ‘আমীনের’ শব্দ পৌছে যায়। আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদ-ই- আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট ইয়াহুদীদের আলোচনা হলে তিনি বলেনঃ “আমাদের তিনটা জিনিসের উপর ইয়াহুদীদের যতটা হিংসা বিদ্বেষ আছে ততোটা হিংসা অন্য কোন বস্তুর উপর নেই। (১) জুমআ, আল্লাহ আমাদেরকে তার প্রতি হিদায়াত করেছেন ও পথ দেখিয়েছেন এবং তারা এ থেকে ভ্রষ্ট রয়েছে। (২) কিবলাহ্ এবং (৩) ইমামের পিছনে আমাদের আমীন বলা। সুনান-ই-ইবনে মাজার হাদীসে রয়েছেঃ সালাম’ ও ‘আমীন’ ইয়াহুদীদের যতোটা বিরক্তি উৎপাদন করে অন্য কোন জিনিস তা করে না। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রাঃ) বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইয়াহূদীরা তোমাদের আমীনের উপর যত হিংসা করে অন্য কাজে ততোটা করে। তোমরা আমীন খুব বেশী বেশী বল।' এর সনদে বর্ণনাকারী তালহা বিন আমর উসূলে হাদীসের পরিভাষা অনুযায়ী দুর্বল। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমীন, আল্লাহর মুমিন বান্দাদের উপর তার মোহর। হ্যরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নামাযে ‘আমীন' বলা এবং প্রার্থনায় আমীন’ বলা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আমার প্রতি একটি বিশেষ দান, যা আমার পূর্বে অন্য কাউকে দান করা হয়নি। হাঁ, তবে এটুকু বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসার (আঃ) বিশেষ প্রার্থনার উপর হযরত হারুন (আঃ) আমীন বলতেন। তোমরা তোমাদের প্রার্থনা আমীনের উপর শেষ কর। তাহলে তোমাদের পক্ষেও আল্লাহ তা কবুল করবেন।” এ হাদীসটিকে সামনে রেখে কুরআন মাজীদের ঐ শব্দগুলো লক্ষ্য করুন যা হযরত মূসার (আঃ) প্রার্থনায় বলা হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ এবং মূসা বললো -হে আমাদের প্রভু! আপনি ফিরআউনকে ও তার সভাসদবর্গকে ইহলৌকিক জীবনে সৌন্দর্য ও সম্পদ দান করেছেন যার ফলে সে অন্যদেরকে আপনার পথ হতে সরিয়ে নিয়ে বিপথে চালিত করছে; হে আমাদের প্রভু! আপনি তাদের ধন মাল ধ্বংস করুন এবং তাদের অন্তরকে কঠোর করে দিন, সুতরাং তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেখার পূর্ব পর্যন্ত ঈমান আনবে না।' (১০:৮৮) হযরত মূসার (আঃ) এ দু'আ ককূলের ঘোষণা নিম্নের এসব শব্দ দ্বারা করা হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনি বললেন তোমাদের দু'জনের প্রার্থনা মঞ্জুর করা হলো সুতরাং তোমরা দৃঢ় থাক এবং মুখদের পথে যেয়ো না।' (১০:৮৯)দু'আ শুধু হযরত মূসা (আঃ) করেছিলেন এবং হযরত হারূণ (আঃ) শুধু ‘আমীন’ বলেছিলেন। কিন্তু কুরআনে এই দু'আর সংযোগ দু’জনের দিকেই করা হয়েছে। কতগুলো লোক একে প্রমাণ রূপে গ্রহণ করে বলে থাকেন যে, যে ব্যক্তি কোন দু'আর উপর আমীন বলে সে যেন নিজেই দু'আ করলো। এখন এ প্রমাণকে সামনে রেখে আবার তাঁরা কিয়াস করেন যে, মুকতাদীকে কিরাআত পড়তে হবে না। কেননা, তার সূরা ফাতিহার উপর আমীন’ বলাই কিরাআতের স্থলাভিষিক্ত হবে। তারা এ হাদীসটিকেও দলীল রূপে পেশ করেনঃ যার ইমাম থাকে, ইমামের কিরাআতই তার কিরাআত। (মুসনাদ-ই- আহমাদ)হযরত বেলাল (রাঃ) বলতেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমীনে' আমার অগ্রবর্তী হবেন, না।' এঁরা এটা টেনে এনে যেহুরী নামাযে ইমামের পিছনে মুকতাদীর সূরা-ই-ফাতিহা না পড়া সাব্যস্ত করতে চান। আল্লাহ তাআলাই এসব বিষয়ে সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইমাম যখ (আরবি) বলার পর আমীন বলে এবং যমীনবাসীদের আমীনের সঙ্গে আসমান বাসীদের ‘আমীন' বলার শব্দও মিলিত হয়, তখন আল্লাহ বান্দার পূর্বের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেন। আমীন বলার দৃষ্টান্ত এরূপ যেমন, এক ব্যক্তি এক গোত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে যুদ্ধ করলো ও জয় লাভ করলো। অতঃপর যুদ্ধলব্ধ মাল জমা করলো। এখন সে অংশ নেয়ার জন্যে নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করলো। কিন্তু তার নাম বেরই হলো না এবং সে কোন অংশও পেলো না। এতে সে বিস্মিত হয়ে বললো -এ কেন হবে? তখন সে উত্তর পেলো তোমার আমীন’ না বলার কারণে।”________________________________________ সূরা-ই-বাকারাহ এবং তার মাহাত্ম্য ও গুণাবলীহযরত মা'কাল বিন ইয়াসার (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সূরা-ই-বাকারাহ্ কুরআনের কুঁজ এবং তার চূড়া। এর এক একটি আয়াতের সঙ্গে ৮০ জন ফেরেশতা উর্ধগগন থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। বিশেষ করে আয়াতুল কুরসী তো খাস আরশ হতে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এই সূরার সঙ্গে মিলানো হয়েছে। সূরা-ই-ইয়াসীন কুরআনের অন্তর বিশেষ। যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন ও পরকাল লাভের জন্যে তা পড়ে, তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। এ সূরাটিকে মরণোন্মুখ ব্যক্তির সম্মুখে পাঠ কর।' (মুসনাদ-ইআহমদ)এ হাদীসের সনদের এক স্থানে (আরবি) আছে, যার ফলে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির নাম অজানা ছিল। কিন্তু মুসনাদ-ই আহমাদেরই অপর একটি বর্ণনায় তার নাম আবু উসমান এসেছে। এ হাদীসটি এভাবেই সুনান-ই আবি দাউদ, সুনান-ই-নাসাঈ এবং সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও রয়েছে। জামে তিরমিযীর একটি দুর্বল সনদ বিশিষ্ট হাদীসে আছেঃ প্রত্যেক জিনিসেরই একটা উচ্চতা থাকে। কুরআন মাজীদের উচ্চতা হচ্ছে সূরা-ই-বাকারাহ্। এই সূরার মধ্যে এমন একটি আয়াত আছে যা সমস্ত আসমানের নেতা এবং সেটি হচ্ছে ‘আয়াতুল কুরসী'। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সহীহ মুসলিম, জামে তিরমিযী এবং সুনান-ই- নাসাঈর মধ্যে বর্ণিত হাদীসে আছেঃ ‘তোমরা নিজেদের ঘরকে কবরে পরিণত করো না, যে ঘরে সূরা-ই বাকারাহ পাঠ করা হয় তথায় শয়তান প্রবেশ করতে পারে না।' ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান সহীহ বলেছেন। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, যে ঘরে সূরা-ই-বাকারাহ পড়া হয় সেখান হতে শয়তান পলায়ন করে। এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারীকে ইয়াহইয়া বিন মুঈন তো নির্ভরযোগ্য বলেছেন বটে, কিন্তু ইমাম আহমাদ প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ তার হাদীসকে অস্বীকার্য বলেছেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) হতেও এরূপ কথাই বর্ণিত আছে। হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) তার ‘আল ইয়াওমু ওয়াল লাইলাতু’ নামক পুস্তকের মধ্যে এবং ইমাম হাকিম স্বীয় গ্রন্থ মুসতাদরাক’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই’ এ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কাউকেও যেন, এরূপ না পাই যে, সে এক পায়ের উপর অন্য পা চড়িয়ে পড়তে থাকে; কিন্তু সূরা-ই-বাকারাহ পড়ে না। জেনে ব্রেখো, যে ঘরে এই বরকতময় সূরাটি পাঠ করা হয় সেখান হতে শয়তান ছুটে পালিয়ে যায়। সবচেয়ে জঘন্য ও লাঞ্ছিত সেই ঘর যে ঘরে আল্লাহর কিতাব পাঠ করা হয় না।'ইমাম নাসাঈ (রঃ) স্বীয় ‘আল-ইয়াওমু ওয়াল লাইলাতু' গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। মুসনাদ-ই- দারিমীর মধ্যে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যে ঘরে সূরা-ই-বাকারাহ পড়া হয় সেই ঘর থেকে শয়তান গুহ্যদ্বার দিয়ে বায়ু নিঃসরণ করতে করতে পলায়ন করে। প্রত্যেক জিনিসেরই উচ্চতা থাকে এবং কুরআন কারীমের উচ্চতা হচ্ছে সূরা-ই-বাকারাহ। প্রত্যেক বস্তুরই সারাংশ আছে এবং কুরআনের সারাংশ হচ্ছে বড় সূরাগুলি।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রাঃ) উক্তি আছে যে, যে ঘরে সূরা ই-বাকারার প্রথম চারটি আয়াত, আয়াতুল কুরসী, তার পরবর্তী দু’টি আয়াত এবং সব শেষের তিনটি আয়াত, একুনে দশটি আয়াত পাঠ করা হয়, শয়তান। সেই ঘরে ঐ রাত্রে যেতে পারে না এবং সেইদিন ঐ বাড়ীর লোকদের শয়তান অথবা কোন খারাপ জিনিস কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে না। এ আয়াতগুলি পাগলের উপর পড়লে তার পাগলামীও দূর হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘যেমন প্রত্যেক জিনিসের উচ্চতা থাকে তেমনই কুরআনের উচ্চতা হচ্ছে সূরা-ই- বাকারাহ। যে ব্যক্তি রাত্রিকালের নীরব ক্ষণে নিজের নিভৃত কক্ষে তা পাঠ করে, তিন রাত্রি পর্যন্ত শয়তান সেই ঘরে যেতে পারে না। আর দিনের বেলায় যদি ঘরে পড়ে তবে তিন দিন পর্যন্ত সেই ঘরে শয়তান পা দিতে পারে না (তাবরানী, ইবনে হিব্বান ও ইবনে মিরদুওয়াই)। জামে তিরমিযী, সুনান-ই-নাসাঈ এবং সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটা ছোট্ট সেনাবাহিনী এক জায়গায় পাঠালেন এবং তিনি তার নেতৃত্বভার এমন ব্যক্তির উপর অর্পণ করলেন যিনি বলেছিলেনঃ ‘আমার সূরা-ই-বাকারাহ মুখস্থ আছে। সে সময় একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বললেনঃ ‘আমিও তা মুখস্ত করতাম। কিন্তু পরে আমি এই ভয় করেছিলাম যে, না জানি আমি তার উপর আমল করতে পারবে কি না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ কুরআন শিক্ষা কর, কুরআন পাঠ কর। যে ব্যক্তি তা শিখে ও পাঠ করে, অতঃপর তার উপর আমলও করে, তার উপমা এরকম যেমন মিশক পরিপূর্ণ পাত্র, যার সুগন্ধি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আর যে ব্যক্তি তা শিক্ষা করলো, অতঃপর ঘুমিয়ে পড়লে তার দৃষ্টান্ত সেই পাত্রের মত যার মধ্যে মিশক তো ভরা রয়েছে, কিন্তু উপর হতে মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান বলেছেন এবং মুরসাল বর্ণনাও রয়েছে। আল্লাহই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, হযরত উসাইদ বিন হুজাইর (রাঃ) একদা রাত্রে সূরা-ই-বাকারার পাঠ আরম্ভ করেন। তাঁর ঘোড়াটি, যা তার পার্শ্বেই বাঁধা ছিল, হঠাৎ করে লাফাতে শুরু করে। তিনি পাঠ বন্ধ করলে ঘোড়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আবার তিনি পড়তে আরম্ভ করেন এবং ঘোড়াও লাফাতে শুরু করে। তিনি পুনরায় পড়া বন্ধ করেন এবং ঘোড়াটিও স্তব্ধ হয়ে থেমে যায়। তৃতীয় বারও এরূপই ঘটে। তার শিশু পুত্র ইয়াহইয়া ঘোড়ার পার্শ্বেই শুয়ে ছিল। কাজেই তিনি ভয় করলেন যে, না জানি ছেলের আঘাত লেগে যায়। সুতরাং তিনি পড়া বন্ধ করে ছেলেকে উঠিয়ে নেন। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করেন যে, ঘোড়ার চমকে উঠার কারণ কি? সকালে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর দরবারে হাজির হয়ে ঘটনাটি আনুপূর্বিক বর্ণনা করেন। তিনি শুনতে থাকেন ও বলতে থাকেনঃ ‘উসাইদ! তুমি পড়েই যেতে!' হযরত উসাইদ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! তৃতীয় বারের পরে প্রিয় পুত্র ইয়াহইয়ার কারণে আমি পড়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। অতঃপর আমি মাথা আকাশের দিকে উঠালে ছায়ার ন্যায় একটা জ্যোতির্ময় জিনিস দেখতে পাই এবং দেখতে দেখতেই তা উপরের দিকে উথিত হয়ে শূন্যমার্গে মিলিয়ে যায়। রাসললাহ (সঃ) তখন বললেনঃ তুমি কি জান সেটা কি ছিল? তারা ছিলেন গগন বিহারী অগণিত জ্যোতির্ময় ফেরেশতা। তোমার (পড়ার শব্দ শুনে তারা একপদে নিকটে এসেছিলেন। যদি তুমি পাঠ বন্ধ না করতে তবে তারা সকাল পর্যন্ত এরকমই থাকতেন এবং মদীনার সকল লোক তা দেখে চক্ষু জুড়াতো। একটি ফেরেশতাও তাদের দৃষ্টির অন্তরাল হতেন না।' এ হাদীসটি কয়েকটি হাদীসের পুস্তকে বিভিন্ন সনদের সঙ্গে বিদ্যমান রয়েছে। এছাড়া ইমাম কাসিম বিন সাল্লাম স্বীয় কিতাৰ কিতাবু ফাযাইলিল কুরআন’-এ আবদুল্লাহ বিন সাহিল থেকে রিওয়ায়ত করেছেন। আল্লাহই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। এরই কাছাকাছি রয়েছে হযরত সাবিত বিন কায়েস বিন শাম্মসের ঘটনাটি। তা হচ্ছেঃ একদা মদীনাবাসী রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করেনঃ “আমরা গত রাত্রে দেখেছি যে, হযরত সাবিতের (রাঃ) পর্ণ কুটীর খানা সারা রাত ধরে উজ্জ্বল প্রদীপের আলোকে ঝলমল করছে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ ‘সত রাত্রে সে সুরা-ই-বাকারাহ পড়েছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেনঃ হ্যা, সত্যই আমি রাত্রে সূরা বাকারাহ পড়েছিলাম। এর ইসনাদ তো খুব উত্তম। কিন্তু এতে কিছুটা সন্দেহ রয়েছে এবং এটা মুরসালও বটে। সুতরাং আল্লাহই নিঃসন্দেহে এ সম্পর্কে সুষ্ঠু ও উত্তম জ্ঞানের অধিকারী।সূরা-ই-বাকারাহ ও সূরা-ই-আলে ইমরানের গুণাবলীনবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা অভিনিবেশ সহকারে সূরা-ই-বাকারাহ শিক্ষা কর। কারণ এর শিক্ষা অতি কল্যাণকর এবং এ শিক্ষার বর্জন অতি বেদনাদায়ক। এমনকি বাতিলপন্থী যাদুকরও এর ক্ষমতা রাখে না।'অতঃপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেনঃ ‘সূরা-ই-বাকারাহ ও সূরা-ই আলে ইমরান শিক্ষা কর। এ দু'টি হচ্ছে জ্যোতির্ময় নূর বিশিষ্ট সূরা। এরা এদের পাঠকের উপর সামিয়ানা, মেঘমালা অথবা পাখির ঝাঁকের ন্যায় কিয়ামতের দিন ছায়া বিস্তার করবে। কুরআনের পাঠক কবর থেকে উঠে দেখতে পাবে যে, এক জ্যোতির্ময় মুখমণ্ডল বিশিষ্ট সুন্দর যুবক তার পাশে দাঁড়িয়ে বলছেঃ “আপনি আমাকে চিনেন কি?' এ বলবেঃ না'। সে বলবেঃ ‘আমি সেই কুরআন যে তোমাকে দিনে ক্ষুধার্থ ও পিপাসার্ত রেখেছিল এবং রাত্রে বিছানা দূরে সরিয়ে সদা জাগ্রত রেখেছিল। প্রত্যেক ব্যবসায়ী তার ব্যবসার পিছনে রয়েছে; কিন্তু আজ সমুদয় ব্যবসা তোমার পিছনে আছে। আজ তার দক্ষিণ হস্তে রাজ্য এবং অনন্তকালের জন্যে বাম হস্তে চির অবস্থান দেয়া হবে। তার মস্তকে সার্বিক সম্মান ও অনন্ত মর্যাদার মুকুট পরানো হবে। তার বাপ-মাকে এমন দু'টি সুন্দর মূল্যবান পরিধেয় বস্ত্র পরানো হবে যার মূল্যের সামনে সারা দুনিয়া জাহান অতি নগণ্য মনে হবে। তারা বিচলিত হয়ে বলবেঃ ‘এ দয়া ও অনুগ্রহ, এ পুরস্কার ও অবদানের কারণ কি? তখন তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমাদের ছেলেদের কুরআন পাঠের কারণে তোমাদেরকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ ‘পড়ে যাও এবং ধীরে ধীরে বেহেশতের সোপানে আরোহণ কর।' সুতরাং তারা পড়তে থাকবে ও উচ্চ হতে উচ্চতর সোপানে আরোহণ করবে। সে ধীরে ধীরেই পাঠ করুক বা তাড়াতাড়ি পাঠ করুক।' সুনান-ই-ইবনে মাজায় এ হাদীসটি আংশিকভাবে বর্ণিত আছে। এর ইসনাদ হাসান এবং মুসলিমের শর্ত বিদ্যমান। এর বর্ণনাকারী বশীর বিন মুহাজির হতে ইমাম মুসলিমও (রঃ) বর্ণনা নিয়েছেন এবং ইমাম ইবনে মুঈনও তাকে নির্ভরযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। ইমাম নাসাঈর (রঃ) মতে এতে কোন দোষ নেই। হাঁ, তবে ইমাম আহমাদ (রঃ) তাকে মুনকারুল হাদীস বলেছেন এবং এর কারণ দেখাতে গিয়ে তিনি বলেছেনঃ “আমি ব্যাপক অনুসন্ধান করে দেখলাম যৈ, সে অদ্ভুত হাদীস এনে থাকে। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, তার কতকগুলো হাদীসের বিরুদ্ধাচরণ করা হয়েছে। আবু হাতিম রাযীর ফায়সালা এই যে, তার হাদীস লিখা যেতে পারে; কিন্তু দলীল রূপে গৃহীত হতে পারে না। ইবনে ‘আদীর কথা এই যে, তার এমন কতকগুলো বর্ণনা আছে যেগুলোর অনুসরণ করা যায় না। ইমাম দারকুতনী (রঃ) বলেনঃ এটা সবল নয়। আমি বলি যে, তার এই বর্ণনার কতকগুলো বিষয় অন্য সনদেও এসেছে।মুসনাদ-ই- আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ কুরআন পাঠ করতে থাকো, কারণ তা তার পাঠকের জন্যে কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। দু'টি জ্যোতির্ময় সূরা, সূরা-ই- বাকারাহ্ ও সূরা-ই-আলে ইমরান পড়তে থাকে। এ দুটো সূরা কিয়ামতের দিন এমনভাবে আসবে যেমন দুটো সামিয়ানা, দুটো মেঘ খণ্ড অথবা পাখির দুটো বিরাট ঝক। তাছাড়া সে তার পাঠকদের পক্ষ হতে আল্লাহ তা'আলার নিকট সুপারিশ করবে।' পুনরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ সূরা-ই-বাকারাহ পড়তে থাকো; কেননা, এর পাঠে বরকত আছে এবং তা বর্জন বা পরিত্যাগ করাতে সমূহ আফসোস আছে। এর শক্তি বাতিলপন্থীদের নেই।' সহীহ মুসলিম শরীফেও অনুরূপ হাদীস আছে।মুসনাদ-ই-আহমাদের আর একটি হাদীসে আছেঃ কিয়ামতের দিন কুরআন ও কুরআন পাঠকদের আহবান করা হবে। সূরা-ই-বাকারাহ ও সূরা-ই-আলে ইমরান অগ্রে অগ্রে চলবে। মেঘ ছায়া অথবা পাখির ঝাঁকের মত (চলতে থাকবে)। এর বেশ উঁটের সঙ্গে বিশ্ব প্রতিপালকের নিকট সুপারিশ করবে। সহীহ মুসলিম ও জামে তিরমিযীতেও এ হাদীসটি আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান গারীব বলেছেন। এক ব্যক্তি নামাযে সূরা-ই-বারাকাহ ও সূরা-ই-আলে ইমরান পাঠ করলেন। তা শেষ করলে পর হযরত কা'ব (রাঃ) বলেনঃ 'যে আল্লাহর অধিকারে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এতে আল্লাহর ঐ নাম রয়েছে যে নাম ধরে প্রার্থনা করলে তা সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়ে থাকে। এখন লোকটি হযরত কা'বের (রাঃ) নিকট আরজ করলেনঃ “আমাকে বলে দিন ঐ নামটি কি?' হযরত কা'ব (রাঃ) তা অস্বীকার করে বললেনঃ যদি আমি বলে দেই তবে ভয় হয় যে, আপনি হয়তো ঐ নামের বরকতে এমন প্রার্থনা করবেন যা আমার ও আপনার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) বলেনঃ “তোমাদের ভাইকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। যে, যেন মানুষ একটা উঁচু পাহাড়ের উপর চড়ে রয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় দুটি সবুজ বৃক্ষ রয়েছে এবং ও দুটোর মধ্য হতে শব্দ হচ্ছেঃ তোমাদের মধ্যে কেউ -সূরা-ই-বাকারার পাঠক আছে কি? যখন কেউ বলছে যে, হাঁ আছে, তখন বৃক্ষদ্বয় ফলসহ তার দিকে ঝুঁকে পড়ছে এবং এ লোকটি ওদের শাখার উপর বসে যাচ্ছে এবং গাছগুলি তখন তাকে উপরে উঠিয়ে নিচ্ছে। হযরত উম্মে দারদা (রাঃ) বলেন যে, একজন কুরআনের পাঠক তার প্রতি বেশীকে মেরে ফেলে। অতঃপর প্রতিশোধ গ্রহণ আইনে তাকেও মেরে ফেলা হয়। তারপর কুরআন এক একটি সূরা হয়ে তার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে আরম্ভ করে। শেষ পর্যন্ত তার পাশে শধুমাত্র সূরা-ই-বাকারাহ ও সূরা-ই-আলে ইমরান বাকী রয়ে যায়। এক জুমআ’র পরে সূরা-ই-আলে ইমরানও পৃথক হয়ে পড়ে। আবার এক জুমআ অতিবাহিত হলে দৈব বাণী হয়ঃ আমার কথার পরিবর্তন নেই এবং আমি আমার বান্দাদের উপর আদৌ অত্যাচার করি না।' সুতরাং এই বরকতময় সূরাটিও অর্থাৎ সূরা-ই-বাকারাও পৃথক হয়ে পড়ে। ভাবার্থ এই যে, এই সূরা দু’টি তার পক্ষ থেকে বিপদ ও শাস্তির বাধা স্বরূপ হয়ে থাকে এবং কবরে তাকে পরিতুষ্ট করতে থাকে। সর্বশেষে তার পাপের আধিক্যের ফলে এদের সুপারিশও কার্যকরী হয় না।ইয়াযীদ বিন আসওয়াদ জুরশী বলেন যে, এই সূরা দুটি যে ব্যক্তি দিনে পাঠ করে সে সারা দিন কপটতা থেকে মুক্ত থাকে। আর যে ব্যক্তি রাত্রে তা পাঠ করে সে সারা রাতে কপটতা থেকে মুক্ত থাকে। স্বয়ং হযরত ইয়াযীদ (রাঃ) সকাল সন্ধ্যায় কুরআন মাজীদ ছাড়াও এ দু'টি সূরাকে সাধারণ অজীফারূপে পাঠ করতেন। হযরত উমার ফারুক (রাঃ) বলতেনঃ 'যে ব্যক্তি এ দু'টি সূরা রাত্রে পাঠ করবে সে আল্লাহর অনুগত বান্দাদের অন্তুর্ভুক্ত হবে। এর সনদ মুনকাতি'। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সূরা দু’টি (রাত্রির নামাযে) এক রাকাতে পড়তেন।সাতটি দীর্ঘ সূরার মর্যাদারাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তাওরাতের স্থলে আমাকে দীর্ঘ সাতটি সূরা দেয়া হয়েছে, ইঞ্জীলের স্থলে আমি দু'শো আয়াত বিশিষ্ট সূরাসমূহ প্রাপ্ত হয়েছি এবং যায়ূরের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে আমাকে দুশোর কম বিশিষ্ট সূরাগুলো দেয়া হয়েছে। অতঃপর আমাকে বিশেষ মর্যাদা হিসেবে সূরা-ই-কাফ থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত সূরাগুলো দেয়া হয়েছে।' এ হাদীসটি গারীব এবং এর এক বর্ণনাকারী সাঈদ বিন আবূ বাশীর সম্পর্কে কিছুটা সমালোচনা রয়েছে। আল্লাহই এ সম্পর্কে খুব ভাল জানেন। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, যে ব্যক্তি এই সাতটি সূরা লাভ করে সে খুব বড় আলেম। এই বর্ণনাটিও গারীব। মুসনাদ-ই-আহমাদেও এ রেওয়ায়েতটি আছে।একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন এবং তাদের মধ্যে এমন একজনকে নেতৃত্ব দান করেন যার সূরা-ই-বাকারাহ মুখস্থ ছিল অথচ বয়সে তিনি সবচেয়ে ছোট ছিলেন। হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) নিম্নের (আরবি) (১৫:৮৭) এ আয়াতের তাফসীরেও বলেন যে, এর ভাবার্থ নিম্নলিখিত সাতটি দীর্ঘ সূরাঃ(১) সূরা-ই-বাকারাহু, (২) সূরা-ই- আলে-ইমরান, (৩) সূরা-ই-নিসা, (৪) সূরা-ই-মায়েদা, (৫) সূরা-ই-আনআম, (৬) সূরা-ই আ’রাফ এবং (৭) সূরা-ই ইউনুস। মুজাহিদ (রঃ), মাকহুল (রঃ), আতিয়্যাহ বিন কায়েস (রঃ), আবু মুহাম্মদ ফারেসী (রঃ), শাদ্দাদ বিন আউস (রঃ) এবং ইয়াহইয়া ইবনে হারিস জিমারী (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।
আল-বাকারা 2:1
সূরা-ই-বাকারার সমস্তটাই মদীনা শরীফে অবতীর্ণ হয়েছে এবং প্রথম যেসব সূরা অবতীর্ণ হয়েছে, এটাও তন্মধ্যে একটি। তবে অবশ্যই এর (আরবি) (২:২৮১) এই আয়াতটি সবশেষে অবতীর্ণ হয়েছে একথা বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ কুরআন মাজীদের মধ্যে সবশেষে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে এরূপ সম্ভাবনা রয়েছে। সম্ভবতঃ তা শেষের দিকে অবতীর্ণ হয়েছে। এইভাবে সুদের নিষিদ্ধতার আয়াতগুলোও শেষের দিকে নাযিল হয়েছে। হযরত খালিদ বিন মি‘দান সূরা-ই-বাকারাহকে (আরবি) অর্থাৎ কুরআনের শিবির বলতেন। কিছু সংখ্যক আলেমের উক্তি আছে যে, এর মধ্যে এক হাজার সংবাদ, এক হাজার অনুজ্ঞা এবং এক হাজার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এতে দু'শো সাতাশিটি আয়াত আছে। এর শব্দ হচ্ছে ছ’হাজার দুশো একুশটি এবং এতে অক্ষর আছে। পঁচিশ হাজার পাচশ’ টি।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সূরাটি মাদানী। হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রাঃ), হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রাঃ) এবং বহু ইমাম, আলেম এবং মুফাসির হতে সর্বসম্মতভাবে এটাই বর্ণিত হয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এর একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা সূরা-ই-বাকারাহ্, সূরা-ই-আলে-ইমরান, সূরা-ই-নিসা ইত্যাদি বল না, বরং এরূপ বল যে, ঐ সূরা যার মধ্যে গাভীর বর্ণনা আছে, ঐ সূরা যার মধ্যে ইমরানের পরিবার পরিজন বা সন্তানাদির বর্ণনা রয়েছে এবং ঐরূপভাবেই কুরআন কারীমের সমস্ত সূরার নাম উল্লেখ কর। কিন্তু এ হাদীসটি গারীব। বরং এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশ হওয়াই সঠিক নয়। এর বর্ণনাকারী ঈসা বিন মাইমূন ও আবু সালমা খাওমাস দুর্বল। তাদের বর্ণনা দ্বারা সনদ নেয়া যেতে পারে না। এর বিপরীত সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বানে ওয়াদীতে শয়তানের উপর পাথর নিক্ষেপ করেছিলেন। বায়তুল্লাহ তাঁর বাম দিকে ছিল এবং মিনা ছিল ডান দিকে এবং তিনি বলছিলেন, এ স্থান হতেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) পাথর নিক্ষেপ করেছিলেন যার উপর সূরা-ই-বাকারাহ অবতীর্ণ হয়েছিল। যদিও এ হাদীস দ্বারাই পরিষ্কারভাবে সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, সূরা-ই-বাকরাহ’ ইত্যাদি বলা জায়েয, তবুও আরও কিছু বর্ণনা করা হচ্ছে।ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেন যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদের (রাঃ) মধ্যে কিছু অলসতা লক্ষ্য করলেন তখন তিনি তাদেরকে (আরবি) বলে ডাক দিলেন। খুব সম্ভব এটা হুনায়েনের যুদ্ধের ঘটনা হবে। যখন মুসলিম সৈন্যদের পদস্খলন ঘটেছিল, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তারেদকে ‘হে গাছওয়ালাগণ!' অর্থাৎ হে বায়াতে রিযওয়ান কারীগণ” এবং “হে সূরা-ইবাকারাহ ওয়ালাগণ’ বলে ডাক দিয়েছিলেন। যেন তাদের মধ্যে আনন্দ ও বীরত্বের সৃষ্টি হয়। সুতরাং সেই ডাক শোনা মাত্রই সাহাবীগণ (রাঃ) চুতর্দিক থেকে বিদ্যুৎ গতিতে দৌড়ে আসলেন। মুসায়লামা, যে মিথ্যা নবুওয়াতের দাবী করেছিল, তার সাথে যুদ্ধ করার সময়েও ইয়ামামার রণ প্রান্তরে বানু হানীফার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মুসলমানদেরকে বেশ বিচলিত ও সন্ত্রস্ত করেছিল এবং তাঁদের পা টলমল করে উঠেছিল, তখন সাহাবীগণ (রাঃ) এভাবেই লোকদেরকে (আরবি) বলে ডাক দিয়েছিলেন। সেই শব্দ শুনে সবাই ফিরে এসে একত্রিত হয়েছিলেন, আর এমন শৌর্য ও বীরত্বের সাথে প্রাণপণে যুদ্ধ করেছিলেন যে, মহান আল্লাহ তা'আলা সেই ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকেই জয়ী করেছিলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল ও সাহাবীগণের উপর সব সময় সন্তুষ্ট থাকুন।(আরবি)-এর মত (আরবি) বা খণ্ডকৃত অক্ষরগুলো যা অনেক সূরার প্রথমে এসেছে, এগুলোর তাফসীরের ব্যাপারে মুফাসসিরদের মধ্যে বেশ মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে,ওগুলোর মর্মার্থ শুধুমাত্র আল্লাহ পাকই সম্যক অবহিত। অন্য কেউ এগুলোর অর্থ জানে না। এ জন্যে তারা এ অক্ষরগুলোর কোন তাফসীর করেন না। ইমাম কুরতুবী (রঃ) একথা হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে নকল করেছেন। আমির শাবী (রঃ), সুফইয়ান সাওরী (রঃ) এবং রাবী' বিন খাইসামও (রঃ) এই অভিমতের সমর্থনকারী। আবুল হাতিম বিন হাব্বানও (রঃ) এই মতকে পছন্দ করেন। আবার কতকগুলো লোক এ অক্ষরগুলোরও তাফসীর করে থাকেন এবং তা করতে গিয়ে বিভিন্নরূপ তাৎপর্য বর্ণনা করেন। এতে অনেক কিছু মতভেদও পরিলক্ষিত হয়। আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেন যে, এগুলো সরাসমহেরই নাম। আল্লামা আবুল কাসিম মাহমুদ বিন উমার যামাখশারী, তাঁর কাশশাফ’ নামক তাফসীরে লিখেছেন যে, অধিকাংশ লোক এ কথার উপরই একমত। বিখ্যাত বৈয়াকরণ সিবওয়াইহও এই অভিমত পোষণ করেছেন। এর দলীল সহীহ বুখারী ও মুসলিমের ঐ হাদীসটি যার মধ্যে এ কথা আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জুমআর দিন ফজরের নামাযে (আরবি) এবং (আরবি) নামক সূরাদ্বয়। পড়তেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) এবং (আরবি) সব সূরাসমূহের প্রথম অংশ যদ্দ্বারা সূরা আরম্ভ হয়ে থাকে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, (আরবি) কুরআনের নামসমূহের মধ্যে একটি বিশেষ নাম। হযরত কাতাদাহ (রঃ) এবং হযরত যায়েদ বিন আসলামেরও (রঃ) উক্তি এটাই। সম্ভবতঃ এ উক্তির মর্ম ও ভাবার্থ হযরত আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ বিন আসলামের (রাঃ) উক্তির সাথে মিলে যায় যে উক্তিতে তিনি বলেন যে, এগুলো সূরাসমূহেরই নাম, কুরআন কারীমের নাম নয়। প্রত্যেক সূরাকে কুরআন বলা যেতে পারে, কিন্তু (আরবি) পূর্ণ কুরআনের নাম হতে পারে না। কারণ, যখন কোন লোক বলেঃ আমি (আরবি) পড়েছি’ তখন বাহ্যতঃ এটাই বুঝা যাবে যে, সে সূরা-ই-আরাফ পড়েছে, পূর্ণ কুরআন মাজীদ পড়েনি। আল্লাহ পাকই এসব ব্যাপারে সঠিক ও সর্বোত্তম জ্ঞানের অধিকারী।কোন কোন মুফাসৃসির বলেন যে, এগুলো আল্লাহ পাকেরই নাম। হযরত শাবী (রঃ) হযরত সালিম বিন আবদুল্লাহ (রঃ) এবং ইসমাঈল বিন আবদুর। রহমান সুদ্দী কাবীর (রঃ) একথাই বলে থাকেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) আল্লাহ তা'আলার একটি বিশেষ নাম। অন্য বর্ণনায় আছে যে, (আরবি) এবং (আরবি) এসব আল্লাহ পাকের বিশেষ নাম। হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। অন্য রেওয়ায়িতে আছে যে, এগুলো আল্লাহর কসম বা শপথ এবং তাঁর নামও বটে। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, এগুলো কসম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)। হতে এও বর্ণিত আছে যে, তার অর্থ হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ আমিই আল্লাহ -সবচেয়ে বেশী জান্তা। হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রাঃ) থেকেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলার নামের পৃথক পৃথক অক্ষর আছে। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, (আরবি), এবং এই তিনটি অক্ষর আরবী বর্ণনমালার উনত্রিশটি অক্ষরসমূহের অন্তর্গত যা সমস্ত ভাষায় সমভাবে এসে থাকে। ওগুলোর প্রত্যেকটি অক্ষর আল্লাহ তা'আলার এক একটি নামের আদ্যক্ষর এবং তাঁর নিয়ামত ও বিপদ আপদের নাম, আর এর মধ্যে সম্প্রদায়সমূহের সময়কাল ও তাদের আয়ুর বর্ণনা সম্পর্কে ইঙ্গিত রয়েছে। হযরত ঈসা (আঃ) বিস্মিতভাবে বলেছিলেন যে, তারা কি করে অবিশ্বাস করছে! অথচ তাদের মুখে তো আল্লাহর নাম রয়েছে। তাঁর প্রদত্ত আহার্যে তারা লালিত পালিত হচ্ছে! মহান প্রভূর নাম (আরবি) শব্দটি (আরবি) দ্বারা আরম্ভ হয়, (আরবি) দ্বারা তাঁর (আরবি) নামটি শুরু হয় এবং (আরবি) দ্বারা তার (আরবি) নামটি আরম্ভ হয় (আরবি) অর্থ (আরবি) অর্থাৎ দানসমূহ, (আরবি) -এর অর্থ আল্লাহ তাআলার (আরবি) অর্থাৎ তার দয়া দাক্ষিণ্য ও করুণা এবং (আরবি)-এর অর্থ আল্লাহ পাকের (আরবি) অর্থাৎ তাঁর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য। (আরবি)-এর অর্থ এক বছর, (আরবি) এর অর্থ ত্রিশ বছর এবং (আরবি)-এর অর্থ চল্লিশ বছর (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এসব মতের মধ্যে সামঞ্জস্য দান করেছেন অর্থাৎ সাব্যস্ত করেছেন যে, এর মধ্যে এমন কোন মতবিরোধ নেই যা একে অপরের উল্টো। হতে পারে যে, এগুলো সূরাসমূহেরও নাম, আল্লাহ তাআলারও নাম এবং সূরার আদ্য শব্দসমূহও বটে। উহার এক একটি অক্ষর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার এক একটি নাম, এক একটি গুণ এবং সময় প্রভৃতির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এক একটি শব্দ কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। রাবী বিন আনাস এবং আবুল আলিয়া প্রমুখ সুধীবৃন্দ বলেন যে, এগুলো দ্বারা আল্লাহর নাম, তাঁর গুণাবলী বা সময়কালও বুঝা যেতে পারে। যেমন" (আরবি) শব্দটি। এর একটি অর্থ হচ্ছে “দ্বীন বা ধর্ম। যেমন কুরআন মাজীদের মধ্যে আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এ ধর্মের উপরই পেয়েছি। (৪৩:২২) দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে বান্দা। যেমন-আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন আল্লাহর অনুগত বান্দা। (১৬:১২০ তৃতীয় অর্থ হচ্ছে ‘দল। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ একদল লোককে দেখতে পেলেন, যারা (পশুগুলোকে) পানি পান করাচ্ছিল।' (২৮:২৩) অন্য স্থানে আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘আমি প্রত্যেক দলে রাসূল পাঠিয়েছি।' (১৬:৩৬) চতুর্থ হচ্ছে ‘সময়’ ও কাল’ যেমন কুরআন পাকে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ উভয়ের মধ্যে যে ব্যক্তি পরিত্রাণ পেলে সে বললো এবং বহুদিন পর এটা তার স্মরণ হলো।' (১২:৪৫)সুতরাং যেমন এখানে (আরবি) নামক শব্দের কয়েকটি অর্থ হলো, তদ্রুপ এটাও সম্ভব যে, এই (আরবি) এরও কয়েকটি অর্থ হবে। ইমাম ইবনে জারীরের (রঃ) এই বিশ্লেষণের বিপক্ষে আমরা বলতে পারি যে, আবুল আলিয়া (রঃ) যে তাফসীর করেছেন তার ভাবার্থ হচ্ছে-একটি শব্দ এক সঙ্গে একই স্থানে এসব অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর (আরবি) ইত্যাদি শব্দগুলো কয়েকটি অর্থে আসে যাকে আরবী পরিভাষায় (আরবি) বলা হয়, এগুলোর অর্থ তো অবশ্যই প্রত্যেক স্থলে পৃথক পৃথক হয়। কিন্তু প্রত্যেক স্থলে একটি অর্থ হয়ে থাকে যা রচনা পদ্ধতির ইঙ্গিত দ্বারা বুঝা যায়। একই স্থানে সমস্ত অর্থ হতে পারে না এবং একই স্থানে সমস্ত অর্থ গ্রহণ করার ব্যাপারে উসূল-শাস্ত্রবিদগণের মধ্যে খুবই মতবিরোধ রয়েছে এবং এটা আমাদের তাফসীরের বিষয় নয়। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। দ্বিতীয়তঃ (আরবি) প্রভৃতি শব্দগুলোর অর্থ অনেক এবং এগুলো এজন্যই গঠন করা হয়েছে, আর তা পূর্বের বাক্য ও শব্দের উপর ঠিকভাবে বসে যাচ্ছে। কিন্তু একটি অক্ষরকে এমন একটি নামের সঙ্গে চিহ্নিত করা-যে নাম ছাড়া অন্য একটি নামের উপরও ওটা চিহ্নিত হতে পারে এবং একে অপরের উপর কোন দিক দিয়েই কোন মর্যাদাও নেই, তাহলে এরূপ কথা জ্ঞান ও বিবেক দ্বারা অনুধাবন করা যায় না। তবে যদি নকল করা হয়ে থাকে সেটা অন্য কথা। কিন্তু এখানে মতৈক্য না থেকে বরং মতানৈক্য রয়ে গেছে। কাজেই এ ফায়সালা বেশ চিন্তা সাপেক্ষ। এখন কতকগুলো অরবী কবিতা যা একথার দলীলরূপে পেশ করা হয় যে, শব্দের বর্ণনার জন্যে শুধুমাত্র প্রথম অক্ষরটি বলা হয়ে থাকে, এটা অবশ্য ঠিকই। কিন্তু ঐ কবিতার মধ্যে এমন বাকরীতি বর্তমান থাকে যা তার অস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। একটা অক্ষর বলা মাত্রই পুরো কথাটি বোধগম্য হয়ে যায়। কিন্তু এখানে এইরূপ নয়। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, একটি হাদীসে আছেঃ(আরবি) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি মুসলমানকে হত্যা করার কাজে অর্ধেক কথা দিয়েও সাহায্য করে এর ভাবার্থ এই যে, (আরবি) পূর্ণভাবে না বলে শুধুমাত্র (আরবি) বলে। মুজাহিদু (রঃ) বলেন যে, সূরাসমূহের প্রথমে যে অক্ষরগুলো আছে যেমন (আরবি) ইত্যাদি এ সবগুলোই (আরবি) কোন কোন আরবী ভাষাবিদ বলেন যে, এই অক্ষরগুলো যা পৃথক পৃথকভাবে ২৮টি আছে, তন্মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ করে বাকীগুলোকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন কেউ বলে থাকেঃ আমার পুত্র লিখে, (আরবি) তখন ভাবার্থ এই দাঁড়ায় যে, তার পুত্র এ ধরনের ২৮টি অক্ষর লিখে। কিন্তু প্রথম কয়েকটির নাম উল্লেখ করে বাকীগুলো ছেড়ে দেয়া হয়েছে। পুনরুক্ত অক্ষরগুলোকে বাদ দিয়ে সূরাসমূহের প্রথমে এ প্রকারের চৌদ্দটি অক্ষর এসেছে। অক্ষরগুলো হচ্ছেঃ (আরবি) এসব একত্রিত করলে (আরবি) গঠিত হয়। সংখ্যা হিসেবে এ অক্ষরগুলো হয় চৌদ্দটি এবং মোট অক্ষর হলো আটাশটি। সুতরাং এগুলো পুরো অর্ধেক হচ্ছে এবং এগুলো পরিত্যক্ত অক্ষরগুলো হতে বেশী মর্যাদাপূর্ণ। এ নিপুণতাও এর মধ্যে পরিলক্ষিত হয় যে, যত প্রকারের অক্ষর রয়েছে ততো প্রকারেরই অধিক সংখ্যক এর মধ্যে এসে গেছে। অর্থাৎ (আরবি) ইত্যাদি। সুবহানাল্লাহ! প্রত্যেক জিনিসের মধ্যেই বিশ্বপ্রভুর মাহাত্ম প্রকাশ পাচ্ছে। এটা সুনিশ্চিত কথা যে, আল্লাহ তাআলার কথা কখনও বাজে ও অর্থহীন হতে পারে না। তার কথা এ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। কিন্তু কতকগুলো নির্বোধ বলে থাকে যে, এসব অক্ষরের কোন তাৎপর্য বা অর্থই নেই। তারা সম্পূর্ণ ভুলের উপর রয়েছে। ওগুলোর কোন না কোন অর্থ অবশ্যই রয়েছে। যদি নিস্পাপ নবী (সঃ) হতে তার কোন অর্থ সাব্যস্ত হয় তবে আমরা সেই অর্থ করবো ও বুঝবো। আর যদি নবী (সঃ) কোন অর্থ না করে থাকেন তবে আমরাও কোন অর্থ করবো না, বরং বিশ্বাস করবো যে, তা আল্লাহর নিকট থেকে এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সম্পর্কে কোন ব্যাখ্যা দান করেননি এবং আলেমদের মধ্যে এ ব্যাপারে অত্যধিক মতভেদ রয়েছে। যদি কারও কোন কথার দলীল জানা থাকে তবে ভাল কথা, সে তা মেনে নেবে। নতুবা মঙ্গল এই যে, এগুলো আল্লাহপাকের কথা তা বিশ্বাস করবে এবং এও বিশ্বাস করবে যে, এগুলোর অর্থ অবশ্যই আছে, যা একমাত্র আল্লাহই জানেন, আমাদের নিকট তা প্রকাশ পায়নি। এ অক্ষরগুলো আনার দ্বিতীয় হেকমত ও অন্তর্নিহিত কারণ এই যে, এগুলো। দ্বারা সূরাসমূহের সূচনা জানা যায়। কিন্তু এ কারণটি দুর্বল। কেননা এছাড়াও অন্য জিনিস দ্বারা সূরাগুলোর বিভিন্নতা জানা যায়। আর যে সূরাগুলোর প্রথমে এ অক্ষরগুলো নেই ওগুলোর প্রথম ও শেষ কি জানা যায় না? আবার সূরাগুলোর প্রথমে বিসমিল্লাহর লিখন ও পঠন কি ওগুলোকে অন্য সূরা. থেকে পৃথক করে দেয় না? ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এর একটা রহস্য এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, যেহেতু মুশরিকরা আল্লাহর কিতাব শুনতোই না, কাজেই তাদেরকে শুনাবার জন্য অক্ষরগুলো আনা হয়েছে যেন নিয়মিত পাঠ আরম্ভ দ্বারা তাদের মন কিছুটা আকর্ষণ করা যায়। কিন্তু এ কারণটিও দুর্বল। কেননা, যদি এরূপই হতো তবে প্রত্যেক সূরা এই অক্ষরগুলো দ্বারা আরম্ভ করা হতো, অথচ তা করা হয়নি। বরং অধিকাংশ সূরাই তা থেকে শূন্য রয়েছে। আবার তাই যদি হতো তবে যখনই মুশরিকদের সাথে কথা বলা আরম্ভ করা হতো তখনই শুধু এই অক্ষরগুলো আনা উচিত ছিল, এটা নয় যে, শুধু সূরাগুলো আরম্ভ করার সময়ই এই অক্ষরগুলো আনা উচিত। তাছাড়া এটাও একটা চিন্তা ভাবনার বিষয় যে, এই সূরাটি অর্থাৎ সূরা-ই-বাকারাহ এবং এর পরবর্তী সূরা অর্থাৎ সূরা-ই-আলে ইমরান মদীনা শরীফেই অবতীর্ণ হয়েছে, অথচ এ দুটো সূরা অবতীর্ণ হওয়ার সময় মক্কার মুশরিকরা তথায় ছিলই না। তা হলে এ দু’টি সূরার পূর্বে অক্ষরগুলো আসলো কেন? তবে হাঁ, এখানে আর একটি হিকমত বর্ণনা করা হয়েছে। তা এই যে, এগুলো আনায় কুরআন মাজীদের একটা মুজিযা বা অলৌকিকত্ব প্রকাশ পেয়েছে, যা আনয়ন করতে সমস্ত সৃষ্টজীব অপারগ হয়েছে। অক্ষরগুলো দৈনন্দিন ব্যবহৃত অক্ষর দ্বারা বিন্যস্ত হলেও তা সৃষ্টজীবের কথা হতে সম্পূর্ণ পৃথক। মুবারাদ (রঃ) ও এবং মুহাক্কিক আলেমগণের একটি দল ফারা ও (রঃ) কাতরাব (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।যামাখশারী (রঃ) তাফসীরী-ই-কাশশাফের মধ্যে এ কথার সমর্থনে অনেক কিছু বলেছেন। শায়খ ইমাম আল্লামা আবু আব্বাস হযরত ইবনে তাইমিয়াহ (রঃ) এবং হাফিয মুজতাহিদ আবুল আজ্জাজ মজ্জীও (রঃ) এই ইমাম ইবনে তাইমিয়ার বরাতে হিকমতটি বর্ণনা করেছেন। যামাখশারী (রঃ) বলেন যে, সমস্ত অক্ষর একত্রিতভাবে না আসার এটাই কারণ। হাঁ, তবে ঐ অক্ষরগুলোকে বার বার আনার কারণ হচ্ছে মুশরিকদের বার বার অপারগ ও লা-জবাব করে দেয়া, তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করা। যেমনভাবে কুরআন কারীমের মধ্যে অধিকাংশ কাহিনী ও ঘটনা কয়েকবার বর্ণনা করা হয়েছে এবং বার বার স্পষ্ট ভাষায় কুরআনের অনুরূপ কিতাব আনার ব্যাপারে তাদের অপারগতার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কোন স্থানে শুধুমাত্র একটি অক্ষর এসেছে। যেমন (আরবি) কোন কোন স্থানে এসেছে দু’টি অক্ষর, যেমন , (আরবি) কোন জায়গায় তিনটি অক্ষর এসেছে, যেমন (আরবি), কোন কোন স্থানে চারটি অক্ষর এসেছে, যেমন (আরবি) এবং কোন কোন জায়গায় এসেছে পাঁচটি অক্ষর যেমন (আরবি) এবং (আরবি) কেননা, আরবদের শব্দগুলো সমস্তই এরকমই এক অক্ষর বিশিষ্ট, দুই অক্ষর বিশিষ্ট, তিন অক্ষর বিশিষ্ট, চার অক্ষর বিশিষ্ট এবং পাঁচ অক্ষর বিশিষ্ট। তাদের পাঁচ অক্ষরের বেশী শব্দ নাই। যখন এ কথাই হলো যে, এ অক্ষরগুলো কুরআন মাজীদের মধ্যে মু'জিযা বা অলৌকিক স্বরূপ আনা হয়েছে তখন যে সূরাগুলোর প্রথমে এ অক্ষরগুলো। এসেছে সেখানে কুরআনেরও আলোচনা হওয়া এবং এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণনা হওয়া উচিত। হয়েছেও তাই উনিত্রিশটি সূরায় এগুলো এসেছে। যেমনঃ (২:১-২) (আরবি) এখানেও এ অক্ষরগুলোর পরে বর্ণনা আছে যে, এই কুরআন আল্লাহর কালাম হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। অন্য স্থানে আল্লাহপাক বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ এমন যে, তিনি ব্যতীত মা'বুদ রূপে গ্রহণযোগ্য আর কেউ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, যাবতীয় বস্তুর সংরক্ষণকারী, তিনি বাস্তব সত্যের সঙ্গে তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছেন বা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যতা প্রতিপাদনকারী। (৩:১-৩) এখানেও এ অক্ষরগুলোর পরে কুরআন কারীমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা হয়েছে। অন্য জায়গায় তিনি বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ এ একটি কিতাব যা তোমার উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে, সুতরাং তোমার অন্তরে যেন মোটেই সংকীর্ণতা না আসে।' (৭:১-২) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ এ একটি কিতাব, যা আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি, যেন তুমি মানুষকে তাদের প্রভুর নির্দেশক্রমে অন্ধকার হতে আলোর দিকে বের করে আন।' (১৪:১-২) আবার ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ এই কিতাব বিশ্বপ্রভুর তরফ হতে অবতীর্ণ হওয়াতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই।' (৩২:১-২) আল্লাহপাক আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘পরম করুণাময় অতি দয়ালুর পক্ষ হতে অবতীর্ণ।' (৪১:১-২) আরও এক জায়গায় তিনি বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ এরূপে মহাপরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তোমার প্রতি ও তোমার পূর্বে যারা অতীত হয়েছে তাদের প্রতি ওয়াহী পাঠিয়েছেন।' (৪২:১-৩) এরকমই অন্যান্য সূরার গোড়া বা সূচনাংশের প্রতি চিন্তা করলে জানা যাবে যে, এসব অক্ষরের পরে পবিত্র কালামের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহান মর্যাদার বর্ণনা রয়েছে, যদ্দ্বারা এ কথা ভালভাবে জানা যায় যে, এ অক্ষরগুলো মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অপারগতা প্রমাণ করার জন্যেই আনা হয়েছে। আল্লাহই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে। ভাল জানেন। কতকগুলো তোক এটাও বলেছে যে, এ অক্ষরগুলো দ্বারা সময়কাল জানান হয়েছে এবং হাঙ্গামা, যুদ্ধ ও এরূপ অন্যান্য কাজের সময় বাতলানো হয়েছে। কিন্তু কথাটি সম্পূর্ণ দুর্বল ও ভিত্তিহীন মনে হচ্ছে। একথার দলীলরূপে একটি হাদীসও বর্ণিত হয়ে থাকে। কিন্তু একদিকে তো তা দুর্বল, অপর দিকে হাদীসটি দ্বারা কথাটির সত্যতার চেয়ে বাতিল হওয়াই বেশী সাব্যস্ত হচ্ছে। ঐ হাদীসটি মুহাম্মদ বিন ইসহাক বিন ইয়াসার বর্ণনা করেছেন যিনি সাধারণতঃ মাগাযী বা যুদ্ধ বিগ্রহের ইতিহাস লেখক। ঐ হাদীসটির মধ্যে আছে যে, আবূ ইয়াসার বিন আখতার নামক একজন ইয়াহূদী একদা তার কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে এসে উপস্থিত হয়। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরাই-বাকারার প্রথম আয়াত পাঠ করছিলেনঃ (আরবি)এ শুনে সঙ্গে সঙ্গে সে তার ভাই হুয়াই বিন আখতাবের নিকট এসে বলেঃ ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সূরা-ই-বাকারার এই প্রথম আয়াতটি পড়তে শুনেছি। সে জিজ্ঞেস করেঃ তুমি কি স্বয়ং শুনেছো?' সে বলেঃ হ্যা, আমি নিজে শুনেছি। হুয়াই তার সঙ্গীগণসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয় এবং বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি এ আয়াতটি পাঠ করেছিলেন তা কি সত্য?' তিনি বলেন হ্যা, সত্য। সে বলেঃ তবে শুনুন! আপনার পূর্বে যতগুলো নবী এসেছিলেন তাদের কাউকেই একথা বলা হয়নি যে, তাঁর দেশ ও ধর্মের অস্তিত্ব কতদিন থাকবে। কিন্তু আপনাকে তা বলে দেয়া হয়েছে। অতঃপর সে দাড়িয়ে লোকদেরকে বলতে থাকেঃ 'শুনে রাখো! (আরবি)-এর সংখ্যা হলো এক, (আরবি)-এর ত্রিশ এবং (আরবি) চল্লিশ, একুনে একাত্তর হলো। তোমরা কি সেই নবীর অনুসরণ করতে চাও যার দেশ ও উম্মতের সময়কাল মোট একাত্তর বছর হবে? অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখোমুখী হয়ে জিজ্ঞেস করেঃ এ রকম আর কোন আয়াত আছে কি?' তিনি বলেনঃ হ্যা , (আরবি) সে বলে এটা খুব ভারী ও অত্যন্ত লম্বা। (আরবি)-এর এক, (আরবি)-এর ত্রিশ, (আরবি)-এর চল্লিশ এবং (আরবি) এর নব্বই। একুনে হলো একশো একষট্টি বছর।' সে বলেঃ এরূপ আরও কোন আয়াত আছে কি? তিনি বলেনঃ হ্যা (আরবি), সে বলেঃ ‘এটাও খুব ভারী ও দীর্ঘ (আরবি) এর এক, (আরবি)-এর ত্রিশ, (আরবি)-এর দু’শশা, একুনে দু’শো একত্রিশ বছর হলো। আরও কি এরূপ আয়াত আছে?' তিনি বলেনঃ হ্যা, (আরবি), সে বলেঃ ‘এত অতিরিক্ত ভারী (আরবি) -এর এক, (আরবি)-এর ত্রিশ, (আরবি)-এর চল্লিশ এবং (আরবি)-এর দুশো, একুনে দু’শশা একাত্তর হলো। এখনতো মুশকিল হয়ে পড়লো আর কথাও ভুল হয়ে গেল। ও লোকেরা! চল যাই।' আবু ইয়াসির তার ভাই ও অন্যান্য ইয়াহূদী আলেমকে বললোঃ “কি বিস্ময়জনক ব্যাপার যে, এসব অক্ষরের সমষ্টি হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে দেয়া হয়েছে একাত্তর, একশো একত্রিশ, দুশো একত্রিশ, দু'শো একাত্তর, সর্বমোট সাতশো চার বছর হলো। তারা বললোঃ কাজ তো এলো মেলো হয়ে গেল।কতকগুলো লোকের ধারণা এই যে, নিম্নের আয়াতটি এই লোকদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছিলঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনি এমন সত্তা, যিনি তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। যার একাংশে ঐ আয়াতসমূহ রয়েছে যা অস্পষ্ট মর্ম হতে সংরক্ষিত, এ আয়াতগুলোই। কিতাবের মূল ভিত্তি, আর অন্যান্যগুলো অস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট।' (৩:৭) এ হাদীসের স্থিতি সম্পূর্ণরূপে মুহাম্মদ বিন সাইব কালবীর উপর রয়েছে এবং যে হাদীসের বর্ণনাকারী একজন হয়, মুহাদ্দিসগণ তা দলীলরূপে গ্রহণ করেন না এবং করতেও পারেন না। আর যদিও এটা মেনে নেয়া হয় এবং এরকম প্রত্যেক অক্ষরের সংখ্যা বের করা হয় তবে যে চৌদ্দটি অক্ষর আমরা বের করেছি ওগুলোর সংখ্যা অনেক হয়ে যাবে এবং ওগুলোর মধ্যে যে অক্ষরগুলো কয়েকবার এসেছে সেগুলোর সংখ্যা গণনাও কয়েকবার হবে। সুতরাং গণনা অত্যন্ত দীর্ঘ হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।
আল-বাকারা 2:2
ইবনু জুরাইজ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, এখানে (আরবি) শব্দটি। (আরবি)-র অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), সুদ্দী (রঃ), মুকাতিল বিন হিব্বান, (রঃ) যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) এবং ইবনে জুরাইজেরও (রঃ) এটাই মত। আরবী ভাষায় এই দু’টি শব্দ অধিকাংশই একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হয়ে থাকে। কারণ আরবরা। এতদুভয়ের মাঝে তেমন কোন পার্থক্য করে না। ইমাম বুখারী (রঃ) হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) থেকেও এটাই নকল করেছেন। ভাবার্থ এই যে, (আরবি) প্রকৃত পক্ষে দূরের ইঙ্গিতের জন্যে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ হচ্ছে ‘ঐ’ কিন্তু আবার কখনও কখনও নিকটবর্তী বস্তুর জন্যেও আসে। তখন তার অর্থ হবে ‘এই'। এখানেও এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। যামাখশারী (রঃ) (আরবি) বলেন যে, এই দ্বারা (আরবি)-এর দিকে ইশারা করা হয়েছে। যেমন নিম্নের এ আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘গরুটি বৃদ্ধও নয় আর একেবারে বাচ্চাও নয়, বরং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী জোয়ান।' (২:৬৮) অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘এটা আল্লাহর নির্দেশ, যিনি তোমাদের মধ্যে নির্দেশ দেন।' (৬০:১০) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ইনিই হলেন আল্লাহ।' এ রকম আরও বহু স্থান আছে যেখানে পূর্বোল্লিখিত বস্তুর দিকে (আরবি) দ্বারা ইশারা করা হয়েছে। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এই দ্বারা কুরআন মাজীদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা অবতীর্ণ করার অঙ্গীকার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে করা হয়েছিল। কেউ তাওরাতের দিকে কেউ ইঞ্জিলের দিকে ইঙ্গিতের কথাও বলেছেন। এই প্রকারের দশটি মত রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ মুফাসসির ওগুলোকে দুর্বল বলেছেন।(আরবি) এর অর্থ কুরআন কারীম। যারা বলেছেন যে, (আরবি) বলে তাওরাত ও ইঞ্জিলের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তারা খুব দূরের রাস্তা অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন অথবা খুব কষ্ট স্বীকার করেছেন। অকারণে এমন কথা বলেছেন যার সুষ্ঠু ও সঠিক জ্ঞান আদৌ তাঁদের নেই। (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে সংশয় ও সন্দেহ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে এ অর্থ বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবুদারদা (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত আবু মালিক নাফি’ (রঃ), যিনি হযরত ইবনে উমারের কৃতদাস, আতা’ (রঃ), আবুল আলিয়া (রঃ), রাবী’ বিন আনাস (রঃ), মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদাহ (রঃ) এবং ইসমাঈল বিন আবু খালিদ (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বলেন যে, মুফাসসিরগণের মধ্যে এতে কোন মতভেদ নেই। (আরবী) শব্দটি আরবদের কবিতায় অপবাদের অর্থেও এসেছে। যেমন প্রখ্যাত কবি জামীল বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘বুসাইনা বললো-হে জামীল! তুমি আমাকে অপবাদ দিয়েছে। আমি তখন বললাম-হে বুসাইনা! আমরা উভয়েই উভয়ের অপবাদ দানকারী।এছাড়া প্রয়োজনের অর্থেও এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আরব কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তেহামার নিম্নভূমি থেকে এবং খাইবারের মালভূমি থেকেও সব প্রয়োজন মিটিয়ে নিলাম, অবশেষে তলোয়ার গুটিয়ে নিলাম। তাহলে (আরবি)-এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, এই কুরআন আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। যেমন সূরা-ই-সিজদার মধ্যে আছেঃ (নিশ্চয় এই কুরআন) বিশ্ব প্রতিপালকের তরফ হতে অবতীর্ণ। কেউ কেউ বলেছেন যে, এটা (আরবি) হলেও (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ (আরবি) ‘তোমরা এতে আদৌ সন্দেহ করো না। কোন কোন কার (আরবি) এর উপরে করে (আরবি) থাকেন এবং (আরবি) কে পৃথক বাক্য রূপে পাঠ করেন। কিন্তু (আরবি) এর উপর (আরবি) করা বা না থামা খুবই উত্তম। কেননা, একই বিষয় এভাবেই সূরা-ই-সিজদার আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে এবং এর মধ্যে তুলনামূলক ভাবে (আরবি) এর চেয়ে বেশী (আরবি) হয় (আরবি) শব্দটি আরবী ব্যাকরণ হিসেবে হয়ে হতে পারে এবং হিসেবে ও হতে পারে। এ স্থানে হিদায়াতকে মুক্তাকীনের সঙ্গে বিশিষ্ট করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ এই কুরআন ঈমানদারদের জন্যে হিদায়াত ও শিফা বা আরোগ্য স্বরূপ এবং অবিশ্বাসীদের কর্ণ বধির এবং চক্ষু অন্ধ।' (৪১:৪৪) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘এ কুরআন ঈমানদারদের জন্যে হিদায়াত ও শিফা বা প্রতিষেধক ও রহমত এবং অত্যাচারী লোকদের শুধু ক্ষয়-ক্ষতি বেড়ে চলেছে।' (১৭:৮২) এ বিষয়ের আরও ভূরি ভূরি আয়াত রয়েছে এবং এগুলোর বার্থ এই যে, যদিও কুরআন কারীম সকলের জন্যেই হিদায়াত স্বরূপ, তথাপি শুধু সৎ লোকেরাই এর দ্বারা উপকার পেয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে লোক সকল! তোমাদের নিকট তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে উপদেশ ও অন্তর-রোগের আরোগ্য এসে গেছে, যা মু'মিনদের জন্যে হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ।' (১০:৫৭)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হিদায়াতের অর্থ হচ্ছে আলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, মুত্তাকীন তারাই যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতঃ শিরক হতে দূরে থাকেন এবং আল্লাহ তা'আলার নির্দেশাবলী মেনে চলেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, মুত্তাকীন তারাই যারা আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করতঃ হিদায়াতকে পরিত্যাগ করেন না এবং তাঁর রহমতের আশা রেখে তার তরফ থেকে অবতীর্ণ কিতাবকে বিশ্বাস করে থাকেন। সুফইয়ান সাওরী (রঃ) ও হযরত হাসান বসরী বলেন, 'মুত্তাকীন তারাই যারা হারাম থেকে বেঁচে থাকেন এবং অবশ্য করণীয় কাজ নত মস্তকে পালন করে থাকেন। হযরত আবু বাকর বিন আইয়াশ (রঃ) বলেন, 'আমাকে হযরত আমাশ (রঃ) প্রশ্ন করেন, মুত্তাকী কারা?' আমি উত্তর দেই। তখন তিনি বলেন, হযরত কালবী (রঃ) কে একটু জিজ্ঞেস করে দেখুন।তিনি বলেন- মুত্তাকীন তাঁরাই যারা কাবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকেন। এতে দু'জনেই একমত হন।" হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, মুত্তাকীন তাঁরাই যাঁদের সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা আলোচ্য আয়াতের পরে বলেনঃ (আরবি)যারা অদৃষ্ট বিষয়গুলিতে বিশ্বাস করে এবং যথা নিয়মে নামায কায়েম রাখে, আর আমি তাদেরকে যে সব রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে, আর তোমার প্রতি (হে রাসূল) যা নাযিল করা হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা নাযিল করা হয়েছিল তাতে যারা বিশ্বাস করে এবং আখেরাত সম্বন্ধে যারা দৃঢ় ইয়াকীন রাখে।' (২:৩-৪)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেন যে, এসব গুণ মুত্তাকীনের মধ্যে একত্রে জমা হয়। জামে তিরমিযী ও সুনান-ই-ইবনে মাজার হাদীসে আতীয়াহ সা'দী থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ বান্দা প্রকৃত মুত্তাকী হতে পারে না যে পর্যন্ত না সে ঐ সমুদয় জিনিস ছেড়ে দেয় যাতে কোন দোষ নেই এই ভয়ে যে, দোষের মধ্যে যেন না পড়ে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে আছে, হযরত মু'আয বিন জাবাল (রাঃ) বলেনঃ “কিয়ামতের দিন যখন সমস্ত মানুষকে একটি ময়দানে আটক করা হবে সে সময় একজন আহ্বানকারী ডাক দিয়ে বলবেন, মুত্তাকীন কোথায়? এ ডাক শুনে তারা দাড়িয়ে যাবেন এবং আল্লাহ তাদেরকে তাঁর বাহুতে নিয়ে নেবেন এবং কোন পর্দা ছাড়াই তাদেরকে স্বীয় দর্শন দ্বারা সম্মানিত করবেন। আবু আফীফ (রঃ) স্বীয় উস্তাদ মুআয (রঃ) কে প্রশ্ন করেনঃ জনাব! মুত্তাকীন কে?' তিনি বলেন, যারা শিরক হতে এবং মুর্তিপূজা হতে বেঁচে থাকেন এবং খাটি অন্তরে তাঁর ইবাদত করেন, তাদেরকেই এরূপ সম্মানের সঙ্গে জান্নাতে পৌছিয়ে দেয়া হবে।' কখনও কখনও হিদায়াতের অর্থ হয় অন্তরের মধ্যে ঈমানের স্থিতিশীলতা। বান্দার অন্তরে এই হিদায়াতের উপর মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ক্ষমতা রাখে না। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হচ্ছেঃ (আরবি)অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! যাকে তুমি হিদায়াত করতে চাও তাকে হিদায়াত করতে পার না।' (২৮:৫৬) আল্লাহ পাক আরও বলেনঃ অর্থাৎ তাদেরকে হিদায়াত করার দায়িত্ব তোমার নেই।' (২:২৭২) অন্য স্থানে তিনি বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার পথ প্রদর্শনকারী কেউ নেই।' (৭:১৮৬) আর এক জায়গায় তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যাকে তিনি পথ প্রদর্শন করেন সে-ই পথ প্রাপ্ত, আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন (হে নবী (সঃ)!) তুমি তার জন্যে কস্মিনকালেও সাহায্যকারী ও পথ প্রদর্শক পাবে না।' (১৮:১৭)এই প্রকারের আরও আয়াত আছে। কখনও কখনও হিদায়াতের অর্থ হয়ে থাকে সত্য, সত্যকে প্রকাশ করা এবং সত্য পথ প্রদর্শন করা। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ অর্থাৎ নিশ্চয়ই তুমি সোজা পথ প্রদর্শনকারী।' (৪২:৫২) অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তুমি তো শুধু ভয় প্রদর্শক এবং প্রত্যেক কওমের জন্যে ভয় প্রদর্শক আছে।' (১৩:৭) পবিত্র কুরআনের অন্য স্থানে আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘আমি সামুদ সম্প্রদায়কে সত্য পথ দেখিয়েছি, কিন্তু তারা সত্য পথের পরিবর্তে অন্ধত্বকে পছন্দ করেছে।' (৪১:১৭) অন্য স্থানে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘আমি তাদেরকে দু'টি পথ দেখিয়েছি অর্থাৎ মঙ্গল ও অমঙ্গলের পথ।' (আরবি) শব্দের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে খারাপ বা অপছন্দনীয় জিনিস থেকে বেঁচে থাকা। এটা মূলে ছিল (আরবি) যা (আরবি) হতে নেয়া হয়েছে। কবি নাবিগা যুবিয়ানী বলেনঃ (আরবি) অনুরূপভাবে আরও একজন কবি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ সূর্য কিরণকে আড়াল করে সে (নারী)র ওড়না নিক্ষেপ করলো আর এভাবে স্বীয় কব্জি ও করতল মিলিয়ে সুন্দরভাবে নিজেকে রক্ষা করলো।'হযরত উমর বিন খাত্তাব (রাঃ) হযরত উবাই বিন কাবকে (রাঃ) প্রশ্ন করেনঃ তাওয়া কি?' তিনি উত্তরে বলেনঃ কাঁটাযুক্ত দুর্গম পথে চলার আপনার কোন দিন সুযোগ ঘটেছে কি?' তিনি বলেনঃ ‘হ’ তখন হযরত উবাই (রাঃ) বলেনঃ “সেখানে আপনি কি করেন?হযরত উমর (রাঃ) বলেনঃ ‘কাপড় ও শরীরকে কাঁটা হতে রক্ষা করার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করি। তখন হযরত উবাই (রাঃ) বলেনঃ ও ঐ রকমই নিজেকে রক্ষা করার নাম। ইবনুল মুআ'য তাঁর নিম্নের কবিতায় এ অর্থই গ্রহণ করেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘ছোট ও বড় পাপসমূহ পরিত্যাগ কর, এটাই তাওয়া। এমনভাবে কাজ কর যেমন বন্ধুর কন্টকাকীর্ণ পথের পথিক যা দেখে সে সম্পর্কে সতর্ক ও সজাগ থাকে। ছোট পাপগুলোকেও হালকা মনে করনা, জেনে রেখো যে, ছোট ছোট নুড়ি পাথর দ্বারাই পর্বত তৈরী হয়ে থাকে।হযরত আবু দারদা (রাঃ) স্বীয় কবিতায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ মানুষ চায় যে, তার অন্তরের বাসনা কামনা পূরণ হোক, কিন্তু আল্লাহ তা অস্বীকার করেন। শুধু মাত্র সেটাই পূরণ হয় যেটা তিনি চান। মানুষ বলে এটা আমার লাভ আর এটা আমার মাল, কিন্তু আল্লাহর তাকওয়াই’ হচ্ছে তার লাভ ও মাল থেকে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।সুনান-ই-ইবনে মাজার হাদীসে হযরত আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ মানুষ সর্বোত্তম উপকার যা লাভ করে তা হচ্ছে আল্লাহর ভয়, এর পর সতী সাধ্বী স্ত্রী; স্বামী যখন তার দিকে চায় তখন সে তাকে সন্তুষ্ট করে এবং তাকে যা নির্দেশ দেয় তা সে পালন করে, কোন কসম দিলে তা পূর্ণ করে দেখায় এবং সে অনুপস্থিত থাকলে তার স্ত্রী তার মাল এবং স্বীয় নফসের রক্ষণাবেক্ষণ করে।
আল-বাকারা 2:3
হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন যে, সত্য বলে স্বীকার করাকে ঈমান বলে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাই বলেন। হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, ‘আমলকে ঈমান বলা হয়। হযরত রাবী’ বিন আনাস (রাঃ) বলেন যে, ঈমান আনার অর্থ হচ্ছে অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করা। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এসব মতের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য নেই। এগুলোর একই অর্থ। ভাবার্থ এই যে, তারা মুখের দ্বারা, অন্তর দ্বারা ও আমল দ্বারা অদৃশ্যের উপর ঈমান আনে এবং আল্লাহর ভয় রাখে। 'ঈমান' শব্দটি আল্লাহর উপর, তার কিতাব সমূহের উপর এবং তাঁর রাসূলগণের (আঃ) উপর বিশ্বাস স্থাপন করা-এ কয়টির সমষ্টিকে বুঝিয়ে থাকে। আমি বলি যে, আভিধানিক অর্থে শুধু সত্য বলে স্বীকার করাকেই ঈমান বলে। কুরআন মাজীদের মধ্যেও এ অর্থের ব্যবহার এসেছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং ঈমানদারগণকে সত্য বলে স্বীকার করে। (৯:৬১) হযরত ইউসুফ (আঃ) এর ভ্রাতাগণ তাদের পিতাকে বলেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আমরা সত্যবাদী হলেও আপনি আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না। (১২:১৭)এভাবে ‘ঈমান শব্দটি ইয়াকীনের অর্থেও এসে থাকে যখন ওটা আমলের বর্ণনার সঙ্গে মিলিত হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (১০৩:৩) (আরবি) কিন্তু যখন ওটা সাধারণভাবে ব্যবহৃত হবে তখন ঈমানে শরঈ' হবে-অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকারোক্তি এবং কার্যসাধনা এই তিনের সমষ্টির নাম। অধিকাংশ ইমামের এটাই মাযহাব। ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রঃ), ইমাম আবু উবাইদাহ (রঃ) প্রভৃতি ইমামগণ একমত হয়ে বর্ণনা করেছেন। যে, মুখে উচ্চাণ করা ও কার্যসাধন করার নাম হচ্ছে ঈমান এবং ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি হয়ে থাকে। এর প্রমাণ আছে বহু হাদীসে যা আমরা বুখারী শরীফের শরাহতে বর্ণনা করেছি।কেউ কেউ ঈমানের অর্থ করেছেন আল্লাহর ভয়।' যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় যারা তাদের প্রভুকে না দেখেই ভয় করে।' (৬৭:১২) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহকে না দেখেই ভয় করেছে এবং (আল্লাহর দিকে) প্রত্যাবর্তনকারী অন্তর নিয়ে এসেছে।' (৪০:৩৩) প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর ভয়ই হচ্ছে ঈমান ও ইলমের সারাংশ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহকে তাঁর আলেম বান্দাগণই ভয় করে থাকে। (৩৫:২৮) কেউ কেউ বলেছেন যে, তারা বাহ্যিকভাবে যেমন ঈমান আনে তদ্রুপ ভিতরেও ঈমান এনে থাকে। তারা ঐ মুনাফিকদের মত নয় যাদের সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যখন তারা মুমিনদের সাথে মিলিত হয় তখন তারা বলে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং যখন তারা তাদের শয়তানদের সন্নিকটে একাকী হয় তখন বলে, নিশ্চয় আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি, আমরা শুধু উপহাস করছিলাম।' (২:১৪) অন্য জায়গায় মুনাফিকদের অবস্থা নিম্নরূপ বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ মুনাফিকেরা যখন তোমার নিকট আগমন করে তখন বলে আমরা (অন্তরের সঙ্গে) সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয় আপনি আল্লাহর রাসূল, আর এটা তো আল্লাহ ভালভাবে অবগত আছেন যে, তুমি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয় মুনাফিকরাই মিথ্যাবাদী।' (৬৩:১)এই অর্থ হিসেবে (আরবি) শব্দটি (আরবি) হবে, অর্থাৎ তারা ঈমান আনয়ন করে এমন অবস্থায় যে, মানুষ হতে তা পোগন থাকে। এখানে আয়াতে যে (আরবি) শব্দটি রয়েছে তার অর্থ সম্বন্ধেও মুফাসৃসিরগণের মধ্যে অনেক মতভেদ রয়েছে। কিন্তু ঐ সবগুলোই সঠিক এবং সব অর্থই নেয়া যেতে পারে। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর উপর, ফেরেশতাদের উপর,কিতাবসমূহের উপর, কিয়ামতের উপর, বেহেশতের উপর, দোযখের উপর, আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের উপর এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। কাতাদাহ্ বিন দায়মারও (রঃ) এটাই মত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ঐ সব গোপনীয় জিনিস যা দৃষ্টির অন্তরালে রয়েছে। যেমন জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি যা কুরআন মাজীদে উল্লিখিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে যা এসেছে সবই (আরবি) এর অন্তর্গত। হযরত জার (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ কুরআন'। আতা’ বিন আবু রাবাহ্ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীই হচ্ছে অদৃশ্যের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী। ইসমাঈল বিন আবু খালিদ (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ইসলামের সমুদয় গোপনীয় বিষয়সমূহ। যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে ভাগ্যের উপর বিশ্বাস স্থাপন। সুতরাং এ সমস্ত কথা অর্থ হিসেবে একই। কেননা এসব জিনিসই অদৃশ্য এবং (আরবি) এর তাফসীরের মধ্যে এসবই জড়িত রয়েছে এবং সবগুলোর উপরেই ঈমান আনা ওয়াজিব। একদা হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রাঃ) মজলিসে সাহাবীগণের (রাঃ) গুণাবলীর আলোচনা চলছিল। তিনি বলেনঃ যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে দেখেছেন। তাদের তো কর্তব্যই হলো তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা; কিন্তু আল্লাহর শপথ! ঈমানী মর্যাদার দিক দিয়ে তাঁরাই উত্তম যারা না দেখেই তাঁকে বিশ্বাস করে থাকেন। অতঃপর তিনি (আরবি) থেকে শুরু করে (আরবি) পর্যন্ত পাঠ করলেন। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) ইমাম হাকিম (রঃ) এই বর্ণনাটিকে সঠিক বলে থাকেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেও এ বিষয়ের একটি হাদীস আছে। ইবনে মাহীরীজ (রঃ) আবূ জুমআ’ (রাঃ) নামক সাহাবীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এমন একটি হাদীস আমাকে শুনিয়ে দিন যা আপনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছেন। তিনি বলেনঃ আচ্ছা, আমি আপনাকে খুবই ভাল একটা হাদীস শুনাচ্ছি। একবার আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সঙ্গে নাশতা করছিলাম। আমাদের সঙ্গে হযরত আবু উবাইদাহ বিন জাররাহও (রাঃ) ছিলেন। তিনি বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের চেয়েও উত্তম আর কেউ আছে কি? আমরা আপনার সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেছি, আপনার সঙ্গে ধর্ম যুদ্ধে অংশ নিয়েছি।' তিনি বলেনঃ হাঁ, আছে। ঐ সমুদয় লোক তোমাদের চেয়ে উত্তম যারা তোমাদের পরে আসবে এবং আমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে অথচ তারা আমাকে দেখতেও পাবে না।তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে হযরত সালিহ বিন জুবাইর (রঃ) বলেন হযরত আবু জুমআ আনসারী বায়তুল মুকাদ্দাসে আমাদের নিকট আগমন করেন। রিযা বিন হাইঅহও (রাঃ) আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। তিনি ফিরে যেতে লাগলে আমরা তাঁকে পৌছিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলি। তিনি আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হবার সময় বলেনঃ 'আপনাদের এই অনুগ্রহের প্রতিদান ও হক আদায় করা আমার উচিত। শুনে রাখুন! আমি আপনাদেরকে এমন একটা হাদীস শুনাবো যা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি। আমরা বলিঃ “আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন! আমাদেরকে তা অবশ্যই বলুন'। তিনি বললেনঃ‘শুনুন! আমরা দশজন লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। হযরত মুআয বিন জাবালও (রাঃ) ছিলেন। আমরা বলিঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমাদের চেয়েও কি বড় পুণ্যের অধিকারী আর কেউ হবে? আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি এবং আপনার অনুসরণ করেছি। তিনি বললেনঃ “তোমরা কেন করবে না? আল্লাহর রাসূল (সঃ) তো স্বয়ং তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছেন। আকাশ হতে আল্লাহর ওয়াহী তোমাদের সামনেই মুহুর্মুহু অবতীর্ণ হচ্ছে। ঈমান তো ঐ সব লোকের যারা তোমাদের পরে আসবে, তারা দুই জিলদের মধ্যে কিতাব পাবে এবং তার উপরেই ঈমান এনে আমল করবে। তারাই তোমাদের দ্বিগুণ পুণ্যের অধিকারী।” এ হাদীসটি তাদের প্রার্থনা কবুল হওয়ার দলীল যাতে মুহাদ্দিসগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আমি এ বিষয়টি বুখারী শরীফের শারাতে খুব স্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করেছি। কেননা পরবর্তীদের প্রশংসা এর উপরে ভিত্তি করেই হচ্ছে এবং এই হিসেবেই তাদেরকে বড় পুণ্যের অধিকারী বলা হয়েছে। নতুবা সাধারণভাবে তো সাহাবীগণই (রাঃ) প্রত্যেক দিক দিয়েই উত্তম। আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। অন্য একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীগণকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের মতে ঈমান আনার ব্যাপারে সর্বোত্তম কে?' তারা বলেনঃ “ফেরেশতাগণ।' তিনি বলেন, তারা কেন ঈমান আনবে না? তারা তো প্রভুর নিকটেই আছে। সাহাবীগণ (রাঃ) বলেন, তারপর নবীগণ (আঃ)।' তিনি বলেন, 'তারা ঈমান আনবে না কেন? তাদের উপর তো ওয়াহী অবতীর্ণ হয়ে থাকে। তারা বলেন, ‘তাহলে আমরা।' তিনি বলেন, তোমরা ঈমান কবুল কেন করবে না? আমি তোমাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছি। জেনে রেখো, আমার মতে সর্বোত্তম ঈমানদার তারাই হবে যারা তোমাদের পরে আসবে। সহীফাসমূহের মধ্যে তারা লিখিত পুস্তক পাবে এবং তার উপরেই তারা ঈমান আনবে।' এর সনদে মুগীরা বিন কায়েস রয়েছে। আবূ হাতিম রাযী তাকে মুনকারুল হাদীস' বলে থাকেন। কিন্তু তারই মত একটি হাদীস দুর্বল সনদে মুসনাদ-ই-আবূ ইয়ালা', তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এবং মুসতাদরাক-ই-হাকিমের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে। এবং হাকীম (রঃ) তাকে সহীহ বলেছেন। হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতেও তারই মত মারফু' রূপে বর্ণিত আছে। আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত বুদাইলা বিনতে আসলাম (রাঃ) বলেনঃ বানু হারিসার মসজিদে আমরা যোহর বা আসরের নামাযে ছিলাম এবং আমাদের মুখ বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ছিল। দুই রাকাত পড়েছি এমন সময়ে কোন একজন এসে সংবাদ দিল যে, নবী (সঃ) বাইতুল্লাহর দিকে মুখ করেছেন। শোনা মাত্রই আমরা ঘুরে গেলাম। স্ত্রী লোকেরা পুরুষদের জায়গায় চলে আসলো এবং পুরুষেরা স্ত্রীলোকদের জায়গায় চলে গেল এবং বাকী দুই রাকআত আমরা বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে আদায় করলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি বললেনঃ ‘এসব লোক তারাই যারা অদৃশ্যের উপর বিশ্বাস করে থাকে। এই ইসনাদে এই হাদীসটি গরীব।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ তারা ফরয নামায আদায় করে, রুকূ' সিজদাহ্, তিলাওয়াত, নম্রতা এবং মনোযোগ প্রতিষ্ঠিত করে।' কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, নামায প্রতিষ্ঠিত করার অর্থ হচ্ছে নামাযের সময়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা, ভালভাবে অযু করা এবং রুকূ' ও সিজদাহ্ যথাযথভাবে আদায় করা। মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, সময়ের হিফাযত করা, পূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করা “রুকূ ও সিজদাহ্ ধীরস্থিরভাবে আদায় করা, ভালভাবে কুরআন পাঠ করা, আত্তাহিয়্যাতু এবং দুরূদ পাঠ করার নাম হচ্ছে ইকামাতে সালাত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে যাকাত আদায় করা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে মানুষের তার সন্তান সন্ততিকে পানাহার করাননা। এটা যাকাতের হকুমের পূর্বেকার আয়াত।হযরত যহাক (রাঃ) বলেন যে, সূরা-ই- বারাআতের মধ্যে যাকাতের যে সাতটি আয়াত আছে তা অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে এই নির্দেশ ছিল যে,বান্দা যেন নিজ সাধ্য অনুসারে কমবেশী কিছু দান করতে থাকে। কাতাদাহ্ (রঃ) বলেনঃ ‘এই মাল তোমাদের নিকট আল্লাহর আমানত, অতি সত্বরই এটা তোমাদের থেকে পৃথক হয়ে যাবে। সুতরাং ইহলৌকিক জীবনে তা থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় কর।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি সাধারণ। যাকাত, সন্তান সন্ততির জন্যে খরচ এবং যেসব লোককে দেয়া প্রয়োজন এ সব কিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। এ জন্যে মহান প্রভু একটা সাধারণ বিশেষণ বর্ণনা করেছেন এবং সাধারণভাবে প্রশংসা করেছেন, কাজেই সব খরচই এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে।আমি বলি যে, কুরআন কারীমের মধ্যে অধিকাংশ জায়গায় নামায ও মাল খরচ করার বর্ণনা মিলিতভাবে এসেছে। এজন্যে নামায হচ্ছে আল্লাহর হক এবং তাঁর ইবাদত-যা তাঁর একত্ববাদ, প্রশংসা, শ্রেষ্ঠত্ব, তার দিকে প্রত্যাবর্তন, তাঁর উপর ভরসা এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করার নাম। আর খরচ করা হচ্ছে সৃষ্ট জীবের প্রতি অনুগ্রহ করা-যার দ্বারা তাদের উপকার হয়। এর সবচেয়ে বেশী হকদার হচ্ছে তার পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন এবং দাসদাসী। অতঃপর দূরের লোক এবং অপরিচিত ব্যক্তিরা তার হকদার। সুতরাং অবশ্যকরণীয় সমস্ত ব্যয় ও ফরয যাকাত এর অন্তর্ভুক্ত। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি। (১) আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ ও মুহাম্মদ (সঃ)-এর প্রেরিতত্বের সাক্ষ্য প্রদান। (২) নামায প্রতিষ্ঠিত করণ। (৩) যাকাত প্রদান। (৪) রমযান শরীফের রোযা পালন এবং (৫) বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্জ কার্য সম্পাদন। এ সম্পর্কে আরও বহু হাদীস রয়েছে। আরবী ভাষায় সালাতের অর্থ হচ্ছে প্রার্থনা। আরব কবিদের কবিতা এর সাক্ষ্য দেয়। সালাতের প্রয়োগ হয়েছে নামাযের উপর যা রুকু সিজদাহ এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট কতকগুলি কার্যের নাম এবং যা নির্দিষ্ট সময়ে কতকগুলি নির্দিষ্ট শর্ত , সিফাত ও পদ্ধতির মাধ্যমে পালিত হয়। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “সালাত নামাযকে বলার কারণ এই যে, নামাযী ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট স্বীয় কার্যের পুণ্য প্রার্থনা করে এবং তার নিকট তার প্রয়োজন যাজ্ঞা করে। কেউ কেউ বলেছেনঃ “যে দুটি শিরা পৃষ্ঠদেশ থেকে মেরুদণ্ডের অস্থির দু দিকে এসে থাকে তাকে আরবী ভাষায় (আরবি) বলা হয়। নামাযের এটা নড়ে থাকে বলে একে (আরবি) বলা হয়েছে। কিন্তু এ কথাটি সঠিক নয়। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে, এটা (আরবি) হতে নেয়া হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে সংলগ্ন ও সংযুক্ত থাকা। যেমন কুরআন মাজীদে আছে (আরবি) অর্থাৎ দুর্ভাগা ব্যক্তি ছাড়া কেউই দোযখে চিরকাল থাকবে না।' (৯২:১৫) কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বলেছেন যে, যখন কাঠকে সোজা করার জন্যে আগুনের উপর রাখা হয় তখন আরববাসীরা (আরবি) বলে থাকে। নামাযের মাধ্যমে আত্মার বক্রতাকে সোজা করা হয় বলে একে (আরবি) বলে। যেমন কুরআন মাজীদে আছে (আরবি) অর্থাৎ ‘নিশ্চয় নামায নির্লজ্জতা ও অসৎ কাজ হতে বিরত রাখে।' (২৯:৪৫)। কিন্তু এর অর্থ প্রার্থনা হওয়াই সর্বাপেক্ষা সঠিক ও প্রসিদ্ধ। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। যাকাত শব্দের আলোচনা ইনশাআল্লাহ পরে আসবে।
আল-বাকারা 2:4
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তুমি তোমার প্রভু আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে যা কিছু এনেছে এবং তোমার পূর্ববর্তী নবীগণ (আঃ) যা কিছু এনেছিলো তারা ঐ সমুদয়ের সত্যতা স্বীকার করে। এ নয় যে, কোনটা মানে ও কোনটা মানে না, বরং প্রভুর সমস্ত কথাই বিশ্বাস করে এবং পরকালের উপরও দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।' অর্থাৎ পুনরুত্থান, কিয়ামত, জান্নাত, জাহান্নাম, হিসাব, মীযান ইত্যাদি সমস্তই পূর্ণভাবে বিশ্বাস করে। কিয়ামত দুনিয়া ধ্বংসের পরে আসবে বলে তাকে আখেরাত বলা হয়েছে। কোন কোন মুফাসির বলেছেন যে,পূর্বে যাদের অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ইত্যাদি বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে, তাদেরই দ্বিতীয় বার এই বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে।অর্থাৎ ঈমানদার আরবেরই মুমিন হোক বা আহলে কিতাব হোক বা অন্য যে কোন হোক। মুজাহিদ (রঃ), আবুল আলিয়া (রঃ), রাবী' বিন আনাস (রঃ) এবং কাতাদার (রঃ) এটাই মত। কেউ কেউ বলেছেন যে, এ দুটো একই কিন্তু এ থেকে উদ্দেশ্য হচ্ছে আহলে কিতাব। এই দুই অবস্থায় (আরবি) টি হ এবং (আরবি) এর (আরবি) হবে -এর উপর। যেমন- (৮৭:১-৪) (আরবি)এখানে (আরবি)-এর (আরবি) হয়েছে (আরবি)-এর উপর। এই প্রকারের (আরবি) সংযোগ কবিদের কবিতাতেও এসেছে। তৃতীয় মত এই যে, প্রথম (আরবি) তো হচ্ছে আরব মুমিনদের এবং (আরবি)-হতে আহলে কিতাবের মুমিনদের (আরবি) ধরা হবে। কুরআন বিশারদ মনীষী হযরত সুদী (রঃ) এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং অন্যান্য কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে নকল করেছেন এবং আল্লামা ইবনে জারীরও (রাঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। এর প্রমাণ স্বরূপ তিনি এই আয়াতটি এনেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ বস্তুতঃ আহলে কিতাবের মধ্যে এমন লোকও আছে যে আল্লাহ তাআলার উপর এবং যা তোমাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে তার উপর ও যা তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে তার উপরও বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহকে ভয় করে। (৩:১৯৮) অনুরূপ ভাবে আরও এক জায়গায় ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ যাদেরকে আমি এর পূর্বে কিতাব দিয়েছিলাম তার উপর তারা ঈমান এনে থাকে এবং যখন তাদের নিকট কুরআন পাঠ করা হয় তখন তারা বলেআমরা এর উপর ঈমান আনলাম এবং আমাদের প্রভুর তরফ হতে সত্যরূপে বিশ্বাস করলাম, আমরা এর পূর্বেই তো মুসলমান ছিলাম। তাদেরকে তাদের ধৈর্যের বিনিময়ে ও মন্দের পরিবর্তে ভাল করার এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করার বিনিময়ে দ্বিগুণ প্রতিদান দেয়া হবে।' (২৮:৫২-৫৪) এ ছাড়া সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, তিন ব্যক্তিকে তাঁদের কাজের বিনিময়ে দ্বিগুণ পুণ্য দেয়া হবেঃ (১) ঐ আহলে কিতাব-যে তার নবীর (আঃ) উপর ঈমান এনেছে এবং সেই সঙ্গে আমার উপরও ঈমান রেখেছে। (২) সেই কৃতদাস-যে আল্লাহর হক আদায় করে এবং স্বীয় মনিবেরও হক আদায় করে। (৩) ঐ ব্যক্তি-যে তার দাসীকে ভালভাবে শিক্ষা দিয়ে তাকে আযাদ করে দেয়, অতঃপর তাকে বিয়ে করে। ইমাম ইবনে জারীরের (রঃ) এই পার্থক্যের সম্বন্ধ এর দ্বারাও জানা যায় যে, এ সূরার প্রথমে মুমিন ও কাফিরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেমন কাফিরের দুটি অংশ আছে, কাফির ও মুনাফিক, দ্রুপ মুমিনদেরও দুটি ভাগ রয়েছে, আরবী মুমিন ও কিতাবী মুমিন। আমি বলি-বাহ্যিক দৃষ্টিতে বুঝা যায় যে, মুজাহিদের একথাটিই সঠিকঃ সূরা-ই- বাকারার প্রথম চারটি আয়াতে মুমিনদের আলোচনা আছে, এবং তার পরবর্তী তেরোটি আয়াতে মুনাফিকদের সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং এ চারটি আয়াত প্রত্যেক মুমিনের জন্যে সাধারণ বা সমভাবে প্রযোজ্য। সে আরবী হোক আযমী হোক, কিতাবী হোক, মানবের মধ্যে হোক বা দানবের মধ্যেই হোক না কেন। কারণ, এর মধ্যে প্রত্যেকটি গুণ অন্যের ক্ষেত্রেই একেবারে জরুরী শর্ত। একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটা হতেই পারে না। অদৃশ্যের উপর ঈমান আনা, নামায প্রতিষ্ঠা করা এবং যাকাত দেয়া শুদ্ধ নয়, যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এবং পূর্ববর্তী নবীগণের উপর যে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল তার উপর ঈমান আনবে এবং সঙ্গে সঙ্গে পরকালের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে। যেমন প্রথম তিনটি পরবর্তী তিনটি ছাড়া বিশ্বাসযোগ্য নয়। দ্রুপ, পরবর্তী তিনটিও পূর্ববর্তী তিনটি ছাড়া পরিশুদ্ধ হয় না। এই জন্যে ঈমানদারদের প্রতি আল্লাহ পাকের নির্দেশ হচ্ছেঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উপর, তাঁর রাসূলের উপর, তাঁর রাসূলের উপর যে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে তার উপর এবং পূর্বে যে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল তার উপর বিশ্বাস স্থাপন কর।' অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, অত্যাচারী ছাড়া সমস্ত আহলে কিতাবের সঙ্গে ঝগড়ার ব্যাপারে তোমরা উত্তম পন্থা অবলম্বন কর এবং বল-আমাদের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার উপর এবং তোমাদের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার উপরও আমরা সমভাবে বিশ্বাস স্থাপন করছি; আমাদেরও তোমাদের ইবাদতের প্রভু একই।পবিত্র কুরআনের আর এক স্থানে ঘোষিত হয়েছেঃ “হে আহলে কিতাব! তোমাদের উপর আমি যা অবতীর্ণ করেছি তার উপর তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর, এটা তোমাদের নিকট যা আছে তার সত্যতা স্বীকারকারী।' অন্য জায়গায় আছে, “হে আহলে কিতাব! তোমরা কোন জিনিসের উপরই নও যে পর্যন্ত না তোমরা তাওরাত, ইঞ্জীল এবং যা তোমাদের প্রভুর নিকট হতে তোমাদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে তা প্রতিষ্ঠিত রাখো।' অন্য জায়গায় সমস্ত ঈমানদারকে সংবাদ প্রদান রূপে কুরআন মাজীদে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ) বিশ্বাস রাখে সেই বিষয়ের প্রতি যা তার প্রতি তার প্রভুর পক্ষ হতে নাযিল করা হয়েছে এবং মুমিনগণও সকলেই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তার বার্তাবাহকগণের প্রতি এই মর্মে যে, আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কাউকেও কোন পার্থক্য করি। আল্লাহ রাব্বল আলামীন আরও বলেছেনঃ যারা আল্লাহর উপর ও তার রাসূলগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং রাসূলদের (আঃ) মধ্যে কাউকেও কোন পার্থক্য করে না। এ বিষয়ে আরও বহু আয়াত রয়েছে যার মধ্যে প্রত্যেক মুসলমানের আল্লাহর উপর, তাঁর সমস্ত রাসূলের উপর এবং সমস্ত কিতাবের উপর ঈমান আনার কথা স্পষ্টাক্ষরে উল্লেখ করা হয়েছে। আহলে কিতাবের ঈমানদারগণের যে একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা অবশ্য একটা অন্য কথা। কেননা তাদের কিতাবের উপর তাদের ঈমান হয় পূর্ণ পরিণত। অতঃপর যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করে তখন কুরআন কারীমের উপরও তাদের ঈমান পূর্ণ পরিণত হয়ে থাকে। এ জন্যই তারা দ্বিগুণ পুণ্যের অধিকারী হয়। এই উম্মতের লোকেরও পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের উপর ঈমান আনে বটে, কিন্তু তাদের ঈমান হয় সংক্ষিপ্ত আকারে। যেমন সহীহ হাদীসের মধ্যে আছে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ ‘আহলে কিতাব তোমার নিকট কোন সংবাদ প্রচার করলে তোমরা তাকে সত্যও বল না আর মিথ্যাও বল না বরং বলে দাও-যা কিছু আমাদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে তার উপরও বিশ্বাস করি এবং যা কিছু তোমাদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে তার উপরও আমরা বিশ্বাস রাখি।' কোন কোন স্থলে এমনও হয়ে থাকে যে, যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর উপর ঈমান আনে, তুলনামূলকভাবে আহলে কিতাব অপেক্ষা তাদের ঈমানই বেশী পূর্ণ ও দৃঢ় হয়। এই হিসেবে তারা হয় তো আহলে কিতাব অপেক্ষা বেশী পুণ্য লাভ করবে; যদিও তারা তাদের নবীর (আঃ) উপর এবং শেষ নবীর (সঃ) উপর ঈমান আনার কারণে দ্বিগুণ পুণ্যের অধিকারী। কিন্তু এরা ঈমানের পরিপক্কতার কারণে পুণ্যে তাদেরকেও ছাড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জানেন।
আল-বাকারা 2:5
অর্থাৎ ঐ সব লোক, যাদের গুণাবলী পূর্বে বর্ণিত হয়েছে, যেমন অদৃশ্যের উপর ঈমান আনা, নামায কায়েম করা, আল্লাহর দেয়া বন্ধু হতে দান করা, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার উপর ঈমান আনা, তাঁর পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস রাখা, পরকালের প্রতি বিশ্বাস রেখে তথায় উপকার দেয় এরূপ কাজ করা এবং মন্দ ও হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকা। এসব লোকই হিদায়াত প্রাপ্ত, এদেরকেই আল্লাহর নূর ও তাঁর সূক্ষ্ম অন্তদৃষ্টি দ্বারা ভূষিত করা হয়েছে। আর এ সমুদয় লোকের জন্যেই ইহকালে ও পরকালে সফলতা রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হিদায়াতের তাফসীর করেছেন নূর ও দৃঢ়তা দ্বারা এবং ফালাহ’ -এর তাফসীর করেছেন প্রয়োজন মিটে যাওয়া ও পাপ এবং দুস্কার্য থেকে বেঁচে যাওয়া ইত্যাদি দ্বারা।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেছেনঃ ‘এসব লোক স্বীয় প্রভুর পক্ষ হতে নূর, দলীল, দৃঢ়তা এবং সত্যতার উপর সুপ্রতিষ্ঠিত রয়েছে, আর এরাই তাদের পবিত্র কার্যাবলীর কারণে পুণ্য ও চিরস্থায়ী জান্নাত লাভের দাবীদার এবং এরাই শাস্তি হতে দূরে সরে থাকবে।' ইবনে জারীর (রঃ) আরও বলেন যে, দ্বিতীয় (আরবি)-এর ইঙ্গিত হয়েছে, আহলে কিতাবের দিকে, যার (আরবি) তার পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। এ হিসেবে (আরবি) প্রথম আয়াত হতে পৃথক হবে এবং (আরবি) হয়ে (আরবি) হবে এবং তার (আরবি) হবে (আরবি)। কিন্তু তার ইঙ্গিত পূর্বোল্লিখিত গুণাবলীর অধিকারীদের দিকে হওয়াই বেশী পছন্দনীয় মত। তারা আহলে কিতাব হোক অথবা আরবের মুমিনই হোক।।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) আরবের মুমিনগণকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে এবং তার পরবর্তী বাক্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে আহলে কিতাবের মুমিনগণ। অতঃপর এই উভয় দলের জন্যেই শুভ সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, এরা হিদায়াত প্রাপ্ত ও সফলকাম। পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, এ আয়াতগুলো সাধারণ এবং ইঙ্গিত ও সাধারণ। আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জানেন।মুজাহিদ (রঃ) আবুল আলিয়া, (রঃ), রাবী' বিন আনাস (রাঃ) এবং কাতাদাহ (রঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। একবার কেউ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে প্রশ্ন করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পবিত্র কুরআনের কতগুলো আয়াত তো আমাদেরকে উৎসাহিত করছে এবং আমাদের মনে অনন্ত আশার সঞ্চার করছে, কিন্তু কতকগুলো আয়াত আবার আমাদের আশা ভরসাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছে এবং নৈরাশ্যের সাগরে নিক্ষেপ করছে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ ‘এসো! আমি তোমাদের জান্নাত ও জাহান্নামীদের পরিচয় পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেই।' অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত পাঠ করে বললেনঃ এরা তো জান্নাতী।' সাহাবীগণ (রাঃ) খুশী হয়ে বললেনঃ “আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের আশা আছে যে, আমরা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবো।' অতঃপর তিনি (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত পড়লেন এবং বললেনঃ “এরা জাহান্নামী। তাঁরা বললেনঃ ‘আমরা এরূপ নই।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ হাঁ (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)।
আল-বাকারা 2:6
অর্থাৎ যারা সত্যকে গোপন করতে অভ্যস্ত এবং তাদের ভাগ্যে এই আছে, তারা কখনও সেই ওয়াহীকে বিশ্বাস করবে না, যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন অন্য এক স্থানে বলা হয়েছেঃ যেসব লোকের উপর আল্লাহর কথা সাব্যস্ত হয়ে গেছে, তারা ঈমান আনবে না, যদিও তাদের কাছে সমস্ত নিদর্শন এসে যায়-যে পর্যন্ত না তারা বেদনাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে। এমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা দুষ্টমতি আহলে কিতাবদের সম্পর্কে বলেছেনঃ যদিও তুমি আহলে কিতাবের নিকট সমস্ত দলীল-প্রমাণ নিয়ে আস, তথাপি তারা তোমার কিবলার অনুসরণ করবে না। অর্থাৎ ঐ অর্বাচীন দুর্ভাগাদের সৌভাগ্য লাভ হবেই না, কাজেই পথভ্রষ্টদের সুপথ প্রাপ্তি কিরূপে হবে? হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের জন্যে আফসোস করো না। তোমার কাজ তো শুধু রিসালাতের হক আদায় করে দেয়া। যারা মেনে নেবে তারা ভাগ্যবান, আর যারা মানবে না, তবে ঠিক আছে, তোমার দায়িত্ব ঠিক মতোই পালন হয়ে গেছে। আমি স্বয়ং অনতি বিলম্বে তাদের হিসাব নিয়ে নেবো। তুমি তো শুধু ভয় প্রদর্শক মাত্র। আল্লাহই প্রত্যেক কাজের সমাধানকারী।'হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ ব্যাপারে খুবই আগ্রহ ছিল যে, সবাই যেন ঈমানদার হয়ে যায় এবং হিদায়েত কবুল করে নেয়। কিন্তু মহান প্রভু বলে দিলেন যে, এ সৌভাগ্য প্রত্যেকের জন্যে নয়। এ দান ভাগ করে দেয়া হয়েছে। যার ভাগ্যে এর অংশ পড়েছে আপনা আপনি তোমার কথা মেনে নেবে, আর যে হতভাগা সে কখনও মানবে না। সুতরাং অর্থ এই যে, যারা কুরআন কারীমকে অস্বীকার করে তারা বলেঃ “আমরা পূর্বের কিতাবগুলোকে মেনে থাকি। তাদেরকে ভয় দেখিয়ে কোন লাভ নেই। কেননা প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের কিতাবকেও মানে না। কারণ, তার মধ্যে তোমাকেও মানার অনুরূপ অঙ্গীকার রয়েছে। তাহলে তারা যখন ঐ কিতাব ও ঐ নবীর (আঃ) উপদেশ মানছে না; যাকে তারা মানতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছে, তখন হে নবী (সঃ)! তোমার কথাকে তারা কি করে মানতে পারে?আবুল আলিয়ার (রঃ) মত এই যে, এই আয়াতটি খন্দকের যুদ্ধে ঐ নেতৃবর্গের সম্বন্ধে নাযিল হয়েছে যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার ফরমান রয়েছেঃ (১৪:২৮) (আরবি)কিন্তু যে অর্থ আমরা প্রথমে বর্ণনা করেছি সেটাই বেশী প্রকাশমান এবং অন্যান্য আয়াতের সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ। আল্লাহই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। ঐ হাদীসটির উপর পুনরায় চোখ ফিরানো উচিত যা ইবনে আবি হাতিমের উদ্ধৃতি দিয়ে এখনই বর্ণিত হয়েছে (আরবি) প্রথম বাক্যটির (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ ভয় দেখানো না দেখানো সমান, কোন অবস্থাতেই তারা ঈমান আনবে না (আরবি) তার (আরবি) হওয়াও সম্ভব। কেননা অনুমিত বাক্য হচ্ছেঃ (আরবি) এবং (আরবি) হয়ে যাবে (আরবি) আল্লাহই প্রত্যেক বিষয়ে সবচেয়ে ভাল ও সুষ্ঠ জ্ঞানের অধিকারী।
আল-বাকারা 2:7
মুফাসসির হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেছেন যে, (আরবি)-এর অর্থ মোহর করে দেয়া। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ ‘অর্থাৎ শয়তান তাদের উপর বিপুলভাবে জয়লাভ করেছে এবং তারা তারই আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত তাদের অন্তরে ও কানে আল্লাহর মোহর লেগে গেছে এবং চোখের উপর পর্দা পড়ে গেছে। সুতরাং তারা হিদায়াতকে দেখতেও পাচ্ছে না, শুনতেও পাচ্ছে না। এবং তা বুঝতেও পারছে না!' হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ ‘পাপ মানুষের অন্তরে চড়ে বসে এবং তাকে চারদিক থেকে ঘিরে নেয়। এটাই হচ্ছে মোহর। অন্তর ও কানের জন্যে প্রচলিত অর্থে মোহর ব্যবহৃত হয়।' মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ “পবিত্র কুরআনে (আরবি) এবং (আরবি) এই তিন প্রকারের শব্দ এসেছে (আরবি) শব্দটি (আরবি) হতে কম এবং (আরবি) (আরবি) শব্দটি হতে কম (আরবি) সবচেয়ে বেশী।' মুজাহিদ (রঃ তাঁর হাতটি দেখিয়ে বললেনঃ ‘অন্তর হাতের তালুর মত। বান্দার পাপের কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। বান্দা একটা পাপ করলে তখন তার কনিষ্ঠ অঙ্গুলিটি বন্ধ হয়ে গেল। দুটো পাপ করল তখন তার দ্বিতীয় অঙ্গুলিও বন্ধ হয়ে গেল। এভাবে সমস্ত অঙ্গুলি বন্ধ হয়ে গেল। এখন মুষ্টি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেল এবং ওর ভিতরে কোন জিনিস অনুপ্রবেশ করতে পারবে না। এভাবেই নিরন্তর পাপের ফলে অন্তরের উপর কালো পর্দা পড়ে যায় এবং মোহর লেগে যায়। তখন আর সত্য তার মধ্যে ক্রিয়াশীল হয় না। একে ও (আরবি) বলা হয়। ভাবার্থ হলো এই যে, তার অহমিকা, এবং সত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। যেমন বলা হয় যে, অমুক ব্যক্তি এ কথা শুনা হতে বধির হয়ে গেছে। উদ্দেশ্য হয় এই যে, অহংকার করে সে এ কথার দিকে কান দেয়নি।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেছেন যে, এ অর্থ ঠিক হতে পারে না। কেননা, এখানে তো স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, তিনি তাদের অন্তরে মোহর করে দিয়েছেন। যামাখশারী (রঃ) এ খণ্ডনের অনেক কিছু খণ্ডন করেছেন এবং পাঁচটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কিন্তু সবগুলোই নিরর্থক, বাজে এবং মু'তাযেলী হওয়ার ফলে তাকে কল্পনার আশ্রয়ে এগুলো বানিয়ে নিতে হয়েছে। কেননা তার কাছে এটা খুবই খারাপ কথা যে, মহান আল্লাহ কারও অন্তরে মোহর করে দেবেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, তিনি অন্যান্য পরিষ্কার ও স্পষ্ট আয়াতগুলির উপর আদৌ কোন চিন্তা গবেষণা করেননি। পবিত্র কুরআনের এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ যখন তারা বক্রই রইলো তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে আরও বক্র করে দিলেন। তিনি আরও বলেছেনঃ “আমি তাদের অন্তর ও চক্ষুকে এমনভাবে ফিরিয়ে দেই, যেন তারা প্রথম থেকেই ঈমান আনেনি এবং তাদেরকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেই যে, তারা অবাধ্যতার মধ্যে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ফিরতে থাকে। এ ধরনের আরও আয়াত রয়েছে যা স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে, তাদের সত্যকে পরিত্যাগ ও মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরে থাকার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরের উপর মোহর করে দিয়েছেন এবং তাদের অন্তর থেকে হিদায়াত বিদূরিত করেছেন। এটা একটা সরাসরি ও প্রত্যক্ষ সুবিচার আর সুবিচার ভাল বই কোন দিন মন্দ হয় না। যদি যামাখশারীও চিন্তাদৃষ্টি দ্বারা এ আয়াতগুলির প্রতি লক্ষ্য করতেন তবে তিনি ঐ ব্যাখ্যা দিতেন না। আল্লাহ তা'আলাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জানেন। ইমাম কুরতুবী (রঃ) বলেনঃ “উম্মতের ইজমা আছে যে, মহান আল্লাহ মোহর করাকেও নিজের একটি বিশেষ গুণ রূপে বর্ণনা করেছেন যে, মোহর কাফিরদের কুফরীর প্রতিদান স্বরূপ হয়ে থাকে। যেমন তিনি বলেছেনঃ বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তার উপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন। হাদীসেও আছে। যে, আল্লাহ তা'আলা অন্তরকে পরিবর্তন করে থাকেন। প্রার্থনায় আছেঃ “হে অন্তরের পরিবর্তন আনয়নকারী! আমাদের অন্তরকে আপনার ধর্মের উপর অটল রাখুন।' হযরত হুজাইফা (রাঃ) হতে ফিত্রার অধ্যায়ে, একটি সহীহ হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘অন্তরের মধ্যে ফিত্না এমনভাবে উপস্থিত হয় যেমন ছেড়া মাদুরের একটা খড়কুটা। যে অন্তর তা গ্রহণ করে নেয় তাতে একটা কালো দাগ পড়ে যায় এবং যে অন্তরের মধ্যে এই ফিৎনা ক্রিয়াশীল হয় না তাতে একটা সাদা দাগ পড়ে যায়, আর সেই শুভ্রতা বাড়তে বাড়তে সম্পূর্ণ সাদা হয়ে গিয়ে সমস্ত অন্তরকে আলোকে উদ্ভাসিত করে দেয়। অতঃপর ফিৎনা এই অন্তরের কোন ক্ষতি করতে পারে না। পক্ষান্তরে, অন্য অন্তরে কৃষ্ণতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যায় এবং শেষে সমস্ত অন্তরকে কালো মসিময় করে দেয়। তখন তা উল্টানো কলসের মত হয়ে যায়, ভাল কথাও তার ভাল লাগে না এবং মন্দ কথাও খারাপ লাগে না।ইমাম ইবনে জারীরের (রঃ) ফায়সালা এই যে, হাদীসে এসেছেঃ মুমিন যখন পাপ করে তখন তার অন্তরে একটা কালো দাগ হয়ে যায়। যদি সে পাপ কার্য হতে ফিরে আসে ও বিরত হয়, তবে ঐ দাগটি আপনি সরে যায় এবং তার অন্তর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। আর যদি সে গুনাহ করতেই থাকে তবে সেই পাপও ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তার সমস্ত অন্তরকে ছেয়ে ফেলে। এটাই সেই মরিচা যার বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছেঃ “নিশ্চয় তাদের খারাপ কাজের কারণে তাদের অন্তরে মরিচা পড়ে গেছে' (সুনান-ই-নাসাঈ, জামেউত তিরমিযী, তাফসীর-ই-ইবেন জারীর)। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাহলে জানা গেল যে, পাপের প্রাচুর্য অন্তরের উপর পর্দা ফেলে দেয় এবং এর পরে আল্লাহর মোহর হয়ে যায়। একেই বলে খাম এবং তবা'। এরূপ অন্তরের মধ্যে ঈমান প্রবেশ করার ও কুফর বের হওয়ার আর কোন পথ থাকে না। এই মোহরের বর্ণনাই এই আলোচ্য আয়াতে করা হয়েছে। আর এটা আমাদের চোখের দেখা যে, যখন। কোন জিনিসের মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হয়, তখন যে পর্যন্ত মোহর ভেঙ্গে না যায় সে পর্যন্ত তার ভিতরে কিছু যেতেও পারে না এবং তা থেকে কিছু বেরও হতে পারে না। এ রকমই কাফিরদের অন্তরে ও কানে আল্লাহর মোহর লেগে গেছে, সেই মোহর না সরা পর্যন্ত তার ভিতরে হিদায়াত প্রবেশ করতে পারবে এবং তা থেকে কুফরও বেরিয়ে আসতে পারবে না। (আরবি)-এর উপর পূর্ণ বিরতি আছে এবং (আরবি) পৃথক পৃথক বাক্য (আরবি) ও (আরবি) অন্তর ও কানের উপর হয় এবং (আরবি) অর্থাৎ পর্দা চোখের উপর পড়ে। যেমন এটা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) প্রমুখ গণ্যমান্য সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে। পবিত্র কুরআনে আছেঃ (৪২:২৪) (আরবি) অন্য স্থানে আছেঃ (৪৫:২৩) (আরবি) এই আয়াতগুলোতে অন্তরের ও কানের উপর (আরবি)-এর উল্লেখ আছে এবং চোখের উপর আছে পর্দার উল্লেখ। তাহলে সম্ভবতঃ তাদের নিকট (আরবি) ক্রিয়াপদ উহ্য আছে এবং (আরবি)-এর অনুসরণে (আরবি) শব্দটিকে (আরবি) হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। কুরআন কারীমের আয়াত (আরবি)-এর মধ্যেও তাই এসেছে। প্রসঙ্গক্রমে আরব কবির একটি কবিতা নিম্নরূপঃ (আরবি) এখানে (আরবি) উহ্য থেকে শব্দকে (আরবি) দিয়েছে। অনুরূপভাবে আরও একটি কবিতার চরণঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘আমি তোমার স্বামীকে রণপ্রান্তরে দেখেছি গলায় তলোয়ার লটকানো অবস্থায় এবং কটি দেশে বর্শা বাঁধা অবস্থায়। এখানেও (আরবি) শব্দটি উহ্য থেকে (আরবি) শব্দকে (আরবি) দিয়েছে।সূরার প্রথম চারটি আয়াতে মুমিনদের বিশেষণ বর্ণিত হয়েছে, অতঃপর এই দু’টি আয়াতে কাফিরদের বর্ণনা দেয়া হলো। এখন কপটাচারী মুনাফিকদের বিস্তারিত আলোচনা হতে যাচ্ছে যারা বাহ্যতঃ ঈমানদাররূপে প্রকাশ পায়, কিন্তু প্রকতপক্ষে ও গোপনে গোপনে তারা কাফির। সাধারণতঃ তাদের চতুরতা গোপন থেকে যায় বলে তাদের আলোচনা কিছুটা বিস্তারিতভাবে হয়েছে এবং তাদের অনেক কিছু নিদর্শনও বর্ণনা করা হয়েছে। তাদেরই সম্বন্ধে সূরা-ইবারাআত অবতীর্ণ হয়েছে এবং সূরা-ই-নূর প্রভৃতিতে তাদের সম্বন্ধেই আলোচনা রয়েছে যাতে তাদের থেকে পূর্ণভাবে রক্ষা পাওয়া যায় এবং মুসলমানেরা তাদের জঘন্য ও নিন্দনীয় স্বভাব থেকে দূরে সরে থাকতে পারে। তাই মহান আল্লাহ বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছেনঃ
আল-বাকারা 2:8
৮-৯ নং আয়াতের তাফসীর‘নিফাক’-এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে ভাল-র প্রকাশ ও মন্দ গোপন করা। নিফাক’ দু’ প্রকারঃ (১) বিশ্বাস জনিত ও (২) কার্য জনিত। প্রথম প্রকারের মুনাফিক তো চির জাহান্নামী এবং দ্বিতীয় প্রকারের মুনাফিক জঘন্যতম পাপী। ইনশাআল্লাহ আপন জায়গায় এর বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হবে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, মুনাফিকের কথা তার কাজের উল্টো, তার গোপনীয়তা তার প্রকাশ্যের বিপরীত। তার আগমন তার প্রস্থানের উল্টো এবং উপস্থিতি অনুপস্থিতির বিপরীত হয়ে থাকে। নিফাক ও কপটতা মক্কায় তো ছিলই না, বরং সেখানে ছিল তার বিপরীত। কতকগুলো এমন ছিলেন যারা বাহ্যতঃ ও আপাতঃদৃষ্টিতে কাফিরদের সঙ্গে থাকতেন কিন্তু অঙ্কুরে ছিলেন মুসলমান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মক্কা ছেড়ে মদীনায় হিজরত করলেন তখন এখানকার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয় আনসার উপাধি লাভ করে তাঁর সঙ্গী হলেন ও অন্ধকার যুগের মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে মুসলমান হলেন। কিন্তু ইয়াহূদীরা তখনও যেই তিমিরের সেই তিমিরে থেকে মহান আল্লাহর এ দান হতে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থাকলো। তাদের মধ্যে শুধু আবদুল্লাহ বিন সালাম এই সত্য ধর্মের সুশীতল ছায়ায়আশ্রয় গ্রহণ করলেন। তখন পর্যন্ত মুনাফিকদের জঘন্যতম। দল সৃষ্টি হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এসব ইয়াহুদী ও আরবের অন্যান্য কতকগুলো গোত্রের সঙ্গে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়ে ছিলেন। এই দল সৃষ্টির সূচনা এইভাবে হয় যে, মদীনা শরীফে ইয়াহূদীদের ছিল তিনটি গোত্রঃ (১) বান্ কাইনুকা, (২) বান্ নাযীর এবং (৩) বানু কুরাইযাহ। বানু কাইনুকা ছিল খাযরাজের মিত্র এবং বাকী দুটি গোত্র ছিল আউসের মিত্র। যখন বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হলো এবং মহান আল্লাহ মুসলমানদেরকে জয়যুক্ত করলেন, ইসলামের জয়ডংকা চারদিকে বেজে উঠলো ও তার অপূর্ব দীপ্তি ও আঁকজমক চতুর্দিকে বিকশিত হয়ে উঠলো, মুসলমানদের শক্তি প্রতিষ্ঠিত হলো এবং কাফিরদের গর্ব খর্ব হয়ে গেল, তখনই এই খবীস দলের গোড়া পত্তন হলো। আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল খাযরাজ গোত্রের লোক হলেও আউসও খাযরাজ উভয় দলের লোকই তাকে খুব সম্মান করতো। এমনকি নিয়মিত আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে বাদশাহ বলে ঘোষণা দেওয়ার পূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। এমতাবস্থায় আকস্মিকভাবে এই গোত্রের মন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলো। ফলে তার বাদশাহ হওয়ার আশার গুড়ে বালি পড়লো। এই দুঃখ পরিতাপ তো তার অন্তরে ছিলই, এদিকে ইসলামের অপ্রত্যাশিত ক্ৰমোন্নতি আর ওদিকে যুদ্ধের উপর্যুপরি বিজয় দুন্দুভি তাকে একেবারে পাগল প্রায় করে তুললো। এখন সে চিন্তা করলো যে, এমনিতে কাজ হবে না। কাজেই সে ঝট করে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে নিলো এবং অন্তরে কাফির থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। দলের যা কিছু লোক তার অধীনে ছিল তাদেরকেও সে এই গোপন পন্থা বাতলিয়ে দিলো এবং এভাবেই মদীনা ও তার আশে পাশে কপটাচারীদের একটি দল রাতারাতি কায়েম হয়ে গেল। আল্লাহর ফলে এই কপটদের মধ্যে মক্কার মুহাজিরদের একজনও ছিলেন না, আর থাকবেনই বা কেন? এই সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ তো নিজেদের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ও ধনসম্পদ সবকিছু আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর সঙ্গে এসেছিলেন! আল্লাহ তাদের সবার প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।এই কপটেরা আউস ও খাযরাজ গোত্রভুক্ত ছিল এবং কতক ইয়াহুদীও তাদের দলে ছিল। এই আয়াতে আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের কপটতার বর্ণনা রয়েছে। আবুল আলিয়া (রঃ) হযরত হাসান (রঃ), কাতাদাহ (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) এটাই বর্ণনা করেছেন। বিশ্ব প্রভু আল্লাহ পাক এখানে কপটাচারীদের অনেকগুলো বদ অভ্যাসের বর্ণনা দিয়েছেন, যেন মুসলমানেরা তাদের বাহ্যিক অবস্থা দেখে প্রতারিত না হয় এবং তাদেরকে মুসলমান মনে করে অসতর্ক না থাকে, নচেৎ একটা বিরাট বড় হাঙ্গামা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এটা স্মরণ রাখা উচিত যে, অসৎকে সৎ মনে করার পরিণাম খুবই খারাপ ও ভয়াবহ। যেমন এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, এরা মুখে তো অবশ্যই স্বীকার করছে, কিন্তু অন্তরে ঈমান নেই। এভাবেই সূরা-ই- মুনাফিকুনের মধ্যেও বলা হয়েছেঃ মুনাফিকরা তোমার নিকট এসে বলে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ জানেন যে, তুমি তাঁর রাসূল।' কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মুনাফিকদের কথা তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না বলেই তাদের জোরদার সাক্ষ্য দান সত্ত্বেও আল্লাহ তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলে স্পষ্টাক্ষরে ঘোষণা করলেন। যেমন তিনি বললেনঃ 'আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা। মিথ্যাবাদী। এখানেও বললেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা ঈমানদার নয়।' তারা ঈমানকে প্রকাশ করে ও কুফরীকে গোপন রেখে নিজেদের বোকামী দ্বারা আল্লাহকে ধোকা দিচ্ছে এবং মনে করছে যে, এটা তাদেরকে আল্লাহর কাছে উপকার ও সুযোগ সুবিধে দেবে এবং কতকগুলো মুমিন তাদের প্রতারণার জালে আবদ্ধ হবে। কুরআন মাজীদের অন্য স্থানে আছেঃ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে উথিত করবেন সেদিন যেমন তারা দুনিয়ায় মুমিনদের সামনে কসম করত, আল্লাহর সামনেও তেমনই কসম করবে এবং মনে করবে যে, তারাও কতটা সাবধান! নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।' এখানেও তাদের ভুল বিশ্বাসের পক্ষে তিনি বলেন যে, প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের কার্য্যের মন্দ পরিণতি সম্পর্কে অবহিতই নয়। এ ধোকা তো তারা নিজেদেরকেই দিচ্ছে। যেমন কালামে পাকের অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ “নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয় এবং তিনিও তাদেরকে ধোকা দেন অর্থাৎ ফলাফল দান করেন। কোন কোন কারী ইয়াদাইনা পড়েছেন আবার কেউ কেউ ইউখাদেউনা পড়েছেন। দুটো কিরাআতেরই ভাবার্থ এক। এখন যদি কেউ পশ্ন করে যে, মুনাফিকরা আল্লাহকে ও মুমিনদেরকে কেমন করে থোকা দেবে? ওরা তো মনের বিপক্ষে যা কিছু প্রকাশ করে থাকে তা তো শুধু তাদের নিরাপত্তার খাতিরে। তবে উত্তরে বলা যাবে যে, যে ব্যক্তি কোন বিপদ থেকে রক্ষা পাবার উদ্দেশ্যে এ রকম কথা বলে আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা প্রতারক বলা হয়। মুনাফিকরাও হত্যা, বন্দী হওয়া এবং ইহলৌকিক শাস্তি হতে নিরাপত্তা লাভের উদ্দেশ্যে এই চালাকি করতো এবং মনের বিপরীত কৰা বাইরে প্রকাশ করতো, এজন্যে তাদেরকে প্রতারক বলা হয়েছে। তাদের এ কাজ দুনিয়ার লোককে কিছু ধোকা দিলেও প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেকেই ধোকা দিচ্ছে। কারণ তার মধ্যে মঙ্গল ও সফলতা রয়েছে বলে তারা মনে করে কিন্তু প্রকতপক্ষে এটা শান্তি ও আল্লাহর ক্রোধের কারণ হবে এবং তাদেরকে এমন শাস্তি দেয়া হবে যা তাদের সহ্য করার ক্ষমতা হবে না। সুতরাং এই প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা তাদের অশান্তির কারণ হবে, যে কাজের পরিণাম তারা নিজেদের জন্যে ভাল মনে করছে তা তাদের জন্যে অত্যন্ত খারাপ হবে। তাদের কুফরী, সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের কারণে তাদের প্রভু তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয় যে, তাদের বোধশক্তিই নেই। তারা ভুল ধারণাতেই মত্ত রয়েছে।ইবনে জুরাইয (রঃ) এর তাফসীর করতে গিয়ে বলেন যে, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কালেমা মুখে প্রকাশ করে তারা জীবনের নিরাপত্তা কামনা করে। এই কালেমাটি তাদের অন্তরে স্থান পায় না। হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, মুনাফিকদের অবস্থা এই-ইঃ তাদের মুখ পৃথক, অন্তর পৃথক, কাজ পৃথক, বিশ্বাস পৃথক, সকাল পৃথক, সন্ধ্যা পৃথক, তারা নৌকার মত যা বাতাসে কখনও এদিকে ঘুরে কখনও ওদিকে ঘুরে।
আল-বাকারা 2:9
৮-৯ নং আয়াতের তাফসীর‘নিফাক’-এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে ভাল-র প্রকাশ ও মন্দ গোপন করা। নিফাক’ দু’ প্রকারঃ (১) বিশ্বাস জনিত ও (২) কার্য জনিত। প্রথম প্রকারের মুনাফিক তো চির জাহান্নামী এবং দ্বিতীয় প্রকারের মুনাফিক জঘন্যতম পাপী। ইনশাআল্লাহ আপন জায়গায় এর বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হবে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, মুনাফিকের কথা তার কাজের উল্টো, তার গোপনীয়তা তার প্রকাশ্যের বিপরীত। তার আগমন তার প্রস্থানের উল্টো এবং উপস্থিতি অনুপস্থিতির বিপরীত হয়ে থাকে। নিফাক ও কপটতা মক্কায় তো ছিলই না, বরং সেখানে ছিল তার বিপরীত। কতকগুলো এমন ছিলেন যারা বাহ্যতঃ ও আপাতঃদৃষ্টিতে কাফিরদের সঙ্গে থাকতেন কিন্তু অঙ্কুরে ছিলেন মুসলমান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মক্কা ছেড়ে মদীনায় হিজরত করলেন তখন এখানকার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয় আনসার উপাধি লাভ করে তাঁর সঙ্গী হলেন ও অন্ধকার যুগের মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে মুসলমান হলেন। কিন্তু ইয়াহূদীরা তখনও যেই তিমিরের সেই তিমিরে থেকে মহান আল্লাহর এ দান হতে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থাকলো। তাদের মধ্যে শুধু আবদুল্লাহ বিন সালাম এই সত্য ধর্মের সুশীতল ছায়ায়আশ্রয় গ্রহণ করলেন। তখন পর্যন্ত মুনাফিকদের জঘন্যতম। দল সৃষ্টি হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এসব ইয়াহুদী ও আরবের অন্যান্য কতকগুলো গোত্রের সঙ্গে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়ে ছিলেন। এই দল সৃষ্টির সূচনা এইভাবে হয় যে, মদীনা শরীফে ইয়াহূদীদের ছিল তিনটি গোত্রঃ (১) বান্ কাইনুকা, (২) বান্ নাযীর এবং (৩) বানু কুরাইযাহ। বানু কাইনুকা ছিল খাযরাজের মিত্র এবং বাকী দুটি গোত্র ছিল আউসের মিত্র। যখন বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হলো এবং মহান আল্লাহ মুসলমানদেরকে জয়যুক্ত করলেন, ইসলামের জয়ডংকা চারদিকে বেজে উঠলো ও তার অপূর্ব দীপ্তি ও আঁকজমক চতুর্দিকে বিকশিত হয়ে উঠলো, মুসলমানদের শক্তি প্রতিষ্ঠিত হলো এবং কাফিরদের গর্ব খর্ব হয়ে গেল, তখনই এই খবীস দলের গোড়া পত্তন হলো। আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল খাযরাজ গোত্রের লোক হলেও আউসও খাযরাজ উভয় দলের লোকই তাকে খুব সম্মান করতো। এমনকি নিয়মিত আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে বাদশাহ বলে ঘোষণা দেওয়ার পূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। এমতাবস্থায় আকস্মিকভাবে এই গোত্রের মন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলো। ফলে তার বাদশাহ হওয়ার আশার গুড়ে বালি পড়লো। এই দুঃখ পরিতাপ তো তার অন্তরে ছিলই, এদিকে ইসলামের অপ্রত্যাশিত ক্ৰমোন্নতি আর ওদিকে যুদ্ধের উপর্যুপরি বিজয় দুন্দুভি তাকে একেবারে পাগল প্রায় করে তুললো। এখন সে চিন্তা করলো যে, এমনিতে কাজ হবে না। কাজেই সে ঝট করে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে নিলো এবং অন্তরে কাফির থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। দলের যা কিছু লোক তার অধীনে ছিল তাদেরকেও সে এই গোপন পন্থা বাতলিয়ে দিলো এবং এভাবেই মদীনা ও তার আশে পাশে কপটাচারীদের একটি দল রাতারাতি কায়েম হয়ে গেল। আল্লাহর ফলে এই কপটদের মধ্যে মক্কার মুহাজিরদের একজনও ছিলেন না, আর থাকবেনই বা কেন? এই সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ তো নিজেদের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ও ধনসম্পদ সবকিছু আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর সঙ্গে এসেছিলেন! আল্লাহ তাদের সবার প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।এই কপটেরা আউস ও খাযরাজ গোত্রভুক্ত ছিল এবং কতক ইয়াহুদীও তাদের দলে ছিল। এই আয়াতে আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের কপটতার বর্ণনা রয়েছে। আবুল আলিয়া (রঃ) হযরত হাসান (রঃ), কাতাদাহ (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) এটাই বর্ণনা করেছেন। বিশ্ব প্রভু আল্লাহ পাক এখানে কপটাচারীদের অনেকগুলো বদ অভ্যাসের বর্ণনা দিয়েছেন, যেন মুসলমানেরা তাদের বাহ্যিক অবস্থা দেখে প্রতারিত না হয় এবং তাদেরকে মুসলমান মনে করে অসতর্ক না থাকে, নচেৎ একটা বিরাট বড় হাঙ্গামা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এটা স্মরণ রাখা উচিত যে, অসৎকে সৎ মনে করার পরিণাম খুবই খারাপ ও ভয়াবহ। যেমন এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, এরা মুখে তো অবশ্যই স্বীকার করছে, কিন্তু অন্তরে ঈমান নেই। এভাবেই সূরা-ই- মুনাফিকুনের মধ্যেও বলা হয়েছেঃ মুনাফিকরা তোমার নিকট এসে বলে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ জানেন যে, তুমি তাঁর রাসূল।' কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মুনাফিকদের কথা তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না বলেই তাদের জোরদার সাক্ষ্য দান সত্ত্বেও আল্লাহ তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলে স্পষ্টাক্ষরে ঘোষণা করলেন। যেমন তিনি বললেনঃ 'আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা। মিথ্যাবাদী। এখানেও বললেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা ঈমানদার নয়।' তারা ঈমানকে প্রকাশ করে ও কুফরীকে গোপন রেখে নিজেদের বোকামী দ্বারা আল্লাহকে ধোকা দিচ্ছে এবং মনে করছে যে, এটা তাদেরকে আল্লাহর কাছে উপকার ও সুযোগ সুবিধে দেবে এবং কতকগুলো মুমিন তাদের প্রতারণার জালে আবদ্ধ হবে। কুরআন মাজীদের অন্য স্থানে আছেঃ “যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে উথিত করবেন সেদিন যেমন তারা দুনিয়ায় মুমিনদের সামনে কসম করত, আল্লাহর সামনেও তেমনই কসম করবে এবং মনে করবে যে, তারাও কতটা সাবধান! নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।' এখানেও তাদের ভুল বিশ্বাসের পক্ষে তিনি বলেন যে, প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের কার্য্যের মন্দ পরিণতি সম্পর্কে অবহিতই নয়। এ ধোকা তো তারা নিজেদেরকেই দিচ্ছে। যেমন কালামে পাকের অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ “নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয় এবং তিনিও তাদেরকে ধোকা দেন অর্থাৎ ফলাফল দান করেন। কোন কোন কারী ইয়াদাইনা পড়েছেন আবার কেউ কেউ ইউখাদেউনা পড়েছেন। দুটো কিরাআতেরই ভাবার্থ এক। এখন যদি কেউ পশ্ন করে যে, মুনাফিকরা আল্লাহকে ও মুমিনদেরকে কেমন করে থোকা দেবে? ওরা তো মনের বিপক্ষে যা কিছু প্রকাশ করে থাকে তা তো শুধু তাদের নিরাপত্তার খাতিরে। তবে উত্তরে বলা যাবে যে, যে ব্যক্তি কোন বিপদ থেকে রক্ষা পাবার উদ্দেশ্যে এ রকম কথা বলে আরবী ভাষায় তাকে (আরবি) বা প্রতারক বলা হয়। মুনাফিকরাও হত্যা, বন্দী হওয়া এবং ইহলৌকিক শাস্তি হতে নিরাপত্তা লাভের উদ্দেশ্যে এই চালাকি করতো এবং মনের বিপরীত কৰা বাইরে প্রকাশ করতো, এজন্যে তাদেরকে প্রতারক বলা হয়েছে। তাদের এ কাজ দুনিয়ার লোককে কিছু ধোকা দিলেও প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেকেই ধোকা দিচ্ছে। কারণ তার মধ্যে মঙ্গল ও সফলতা রয়েছে বলে তারা মনে করে কিন্তু প্রকতপক্ষে এটা শান্তি ও আল্লাহর ক্রোধের কারণ হবে এবং তাদেরকে এমন শাস্তি দেয়া হবে যা তাদের সহ্য করার ক্ষমতা হবে না। সুতরাং এই প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা তাদের অশান্তির কারণ হবে, যে কাজের পরিণাম তারা নিজেদের জন্যে ভাল মনে করছে তা তাদের জন্যে অত্যন্ত খারাপ হবে। তাদের কুফরী, সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের কারণে তাদের প্রভু তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয় যে, তাদের বোধশক্তিই নেই। তারা ভুল ধারণাতেই মত্ত রয়েছে।ইবনে জুরাইয (রঃ) এর তাফসীর করতে গিয়ে বলেন যে, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কালেমা মুখে প্রকাশ করে তারা জীবনের নিরাপত্তা কামনা করে। এই কালেমাটি তাদের অন্তরে স্থান পায় না। হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, মুনাফিকদের অবস্থা এই-ইঃ তাদের মুখ পৃথক, অন্তর পৃথক, কাজ পৃথক, বিশ্বাস পৃথক, সকাল পৃথক, সন্ধ্যা পৃথক, তারা নৌকার মত যা বাতাসে কখনও এদিকে ঘুরে কখনও ওদিকে ঘুরে।
আল-বাকারা 2:10
পীড়ার অর্থ এখানে সংশয় ও সন্দেহ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং অন্যান্য কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রাঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত আবুল আলিয়া (রঃ), হযরত রাবী' বিন আনাস (রঃ) এবং হযরত কাতাদারও (রঃ) এটাই মত। হযরত ইকরামা (রঃ) এবং হযরত তাউস (রঃ) এর তাফসীর করেছেন রিয়া বা কৃত্রিমতা এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এর তাফসীর ‘নিফাক' বা কপটতাও বর্ণিত হয়েছে। হযরত যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেন যে, এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে ধর্মীয় রোগ, শারীরিক রোগ নয়। ইসলাম সম্পর্কে তাদের সংশয় ও সন্দেহজনিত একটা বিশেষ রোগ ছিল, আল্লাহ তাদের সেই রোগ বাড়িয়ে দিলেন। যেমন কুরআন মাজীদে আছেঃ ‘ঈমানদারদের ঈমান আরও বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় এবং তারা এতে আরও আনন্দ উপভোগ করে; আর যাদের অন্তরে রোগ আছে তাদের এই অশ্লীলতা ও অপবিত্রতা আরও বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ তাদের পাপ ও গুমরাহী আরও বেড়ে যায় এবং এই প্রতিদান তাদের কাজের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপুর্ণ।এই তাফসীরই উত্তম। এই ফরমানও ঠিক এরই মতঃ (আল্লাহ) হিদায়াত প্রাপ্তদের হিদায়াত বৃদ্ধি করে দেন এবং তাদেরকে পরহেযগারী দান করেন। কারীগণ ইয়াকযেবুনকে ইউকায়েবুনাও পড়েছেন। মুনাফিকদের মধ্যে এই বদ অভ্যাস ছিল যে, তারা মিথ্যা কথাও বলতো এবং অবিশ্বাসও করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুনাফিকদেরকে চেনা সত্ত্বেও তাদেরকে হত্যা করেননি। এর কারণ এই যে, সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমারকে (রাঃ) বলেনঃ মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর সঙ্গীগণকে হত্যা করে থাকেন এ চর্চা হওয়াটা আমি আদৌ পছন্দ করি না।' ভাবার্থ এই যে, কপটদেরকে তাদের অন্তরের কুফরীর জন্যে যে হত্যা করা হয়েছে, আশে পাশের মরুচারী বেদুঈনদের এটা জানা থাকবে না। তাদের দৃষ্টি তো শুধু বাহ্যিকের উপরই থাকবে। সুতরাং যখন তাদের মধ্যে এ সংবাদ প্রচারিত হবে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের সঙ্গীগণকে হত্যা করেছেন তখন তারা হয়তো ভয়ে ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে। কুরতুবী (রঃ) বলেনঃ “আমাদের আলেমদেরও এটাই মত। ঠিক এরূপভাবেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুআল্লাফাতে কুবকে (অর্থাৎ যাদের মন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা হতো) মালধন দান করতেন, যদিও তিনি তাদের খারাপ আকীদা সম্পর্কে অবহিত থাকতেন।হযরত ইমাম মালিকও (রঃ) মুনাফিকদের হত্যা না করার কারণ এটাই বর্ণনা করেছেন। যেমন মুহাম্মদ বিন জাহাম (রঃ), কাযী ইসমাঈল (রঃ) এবং আবহারী (রঃ) নকল করেছেন। হযরত ইবনে মাজেশনের (রঃ) কথায় একটি কারণ এও নকল করা হয়েছেঃ নবী (সঃ)-এর উম্মত যেন জানতে পারে যে, বিচারক নিজের অবগতির উপর ফায়সালা করতে পারেন না, মুনাফিকদেরকে হত্যা না করার এটাও ছিল অন্যতম কারণ। অন্যান্য ধর্মীয় নীতির ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এ বিষয়ে সবাই একমত যে, বিচারক শুধু নিজের অবগতির উপর ভিত্তি করে কাউকে হত্যা করতে পারেন না। হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) আরও একটি কারণ বর্ণনা করেছেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেনঃ মুনাফিকরা নিজেদের ঈমানের কথা মুখে প্রকাশ করতো বলেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে হত্যা করা হতে বিরত ছিলেন, যদিও তিনি জানতেন যে, তাদের অন্তর এর বিপরীত, কিন্তু এ প্রকাশ্য কথাই হত্যা করার সিদ্ধান্তকে দূরে সরিয়ে রাখতো।' একথার সমর্থনে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম ইত্যাদির বিশুদ্ধ হাদীসও পেশ করা যেতে পারে।একটি হাদীসে আছে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। করার জন্যে আদিষ্ট হয়েছি যে পর্যন্ত না তারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে। যখন তারা এটা বলে দেবে তখন তারা তাদের জান ও মাল আমার কাছ থেকে বাঁচিয়ে নেবে এবং তাদের হিসাব মহাসম্মানিত আল্লাহর উপর ন্যস্ত থাকবে।' উদ্দেশ্য এই যে, এ কালেমা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাদের উপর ইসলামের প্রকাশ্য নির্দেশাবলী চালু হয়ে যাবে। এখন যদি তাদের আন্তরিক বিশ্বাসও এর অনুরূপ হয় তবে তো এটা আখেরাতে তাদের মুক্তির কারণ হবে, নতুবা এটা সেখানে কোনই উপকারে আসবে না। কিন্তু দুনিয়ার বুকে তাদের উপর অন্যান্য মুসলমানদের আইন চালু থাকবে। এসব লোকের নাম ধাম এখানে যদিও মুসলমানদের নামের তালিকার অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু আখেরাতে ঠিক পুলসিরাতের উপর মুসলমানদের মধ্য হতে তাদেরকে দূরে পৃথক করে দেয়া হবে। তখন তার অন্ধকারে বিচলিত হয়ে উচ্চশব্দে মুলমানদেরকে ডাক দিয়ে বলবেঃ ‘আমরা কি তোমাদেরই সঙ্গে একত্রে ছিলাম না? উত্তর আসবেঃ ‘ছিলে বটে, কিন্তু তোমরা কপটতার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলে এবং অপেক্ষমান ও সন্দিহান থেকে প্রবৃত্তির ফাদে জড়িয়ে পড়েছিলে, ঠিক এমতাবস্থায় আল্লাহর নির্দেশ এসে গেছে। মোট কথা, পরকালেও মুনাফিকরা মুসলমানদের পিছনে থেকে তাদেরকে জড়িয়ে থাকতে সচেষ্ট হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদেরকে আলাদা করে দূরে সরিয়ে দেয়া হবে। তাদের মধ্যে ও তাদের আশা আকাংখার মধ্যে বাধার বিন্ধ্যাচল সৃষ্টি হয়ে যাবে, তারা মুসলমানদের সঙ্গে সিজদায় পড়ে যাবে, কিন্তু সিজদা করতে সক্ষম হবে না। যেমন এটা হাদীসসমূহে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। কোন কোন বিশ্লেষণকারীর মতে তাদেরকে হত্যা না করার কারণ ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) বিদ্যমানতায় তাদের দুষ্টুমি মারাত্মক ধরনের কোন ক্ষতির কারণ ছিল না। কেননা, মহান আল্লাহ ওয়াহীর দ্বারা মুসলমানদেরকে তাদের দুষ্টুমি হতে রক্ষা করতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহর (সঃ) পরে আল্লাহ না করুন, যদি এরূপ লোক থাকে যাদের কপটতা প্রকাশ পেয়ে যায় এবং মুসলমানেরা ভালভাবে জানতে পারে তবে তাদেরকে হত্যা করে দেয়া উচিত হবে। ইমাম মালিকের (রঃ) মতে নিফাক ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সোনালী যুগে। কিন্তু আজকাল আছে ‘যিনদাকাহ বা ধর্মহীনতা এবং আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসহীনতা। যিন্দীক' বা আল্লাহর একত্ববাদে অবিশ্বাসীদের সম্বন্ধে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে যে, তাদের কুফরী প্রকাশ পেলে তাদেরকে হত্যা করার কথা বলা হবে কি না? আর যে যিন্দীকরা অন্য মানুষকে তার শিক্ষা দিয়ে থাকে এবং যারা শিক্ষা দেয় না তাদের মধ্যে কোন পার্থক্যের সীমারেখা টানতে হবে কি এই কুফরী কয়েকবার প্রকাশ পেলেও কি এই নির্দেশ কিংবা একবার হলেও কি এই নির্দেশ? আবার এ ব্যাপারেও মতভেদ আছে যে, এই ইসলাম গ্রহণ বা এই কুফরী হতে প্রত্যাবর্তন স্বয়ং তাদের পক্ষ থেকে হলে বা তাদের উপর বিজয় লাভের পর হলে কি এ নির্দেশই থাকবে? মোট কথা এসব বিষয়ে মতভেদ আছে। কিন্তু ঐগুলো বর্ণনার জায়গা হচ্ছে আহকামের কিতাবসমূহ, তাফসীর নয়। সুতরাং আমরাও তা আর বর্ণনা করতে চাইনে।চৌদ্দজন প্রধান ও কুখ্যাত লোকের নিফাক' রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিশ্চিত রূপেই জানতেন। এসব কলুষিত লোক তারাই ছিল যারা তাবুকের যুদ্ধে পরস্পরের সুপরিকল্পিত পরামর্শক্রমে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে প্রতারণা করবেই। তারা তাকে হত্যা করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র এটেছিল যে, রাতের দুর্ভেদ্য অন্ধকারে যখন তিনি অমুক ঘাটির নিকটবর্তী হবেন তখন তাঁর উষ্ট্রিকে তারা তাড়া করবে। এর ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘাঁটির মধ্যে পড়ে যাবেন। আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় নবীকে (সঃ) তাঁর ওয়াহীর মাধ্যমে এই মারাত্মক জঘন্য কপটতার কথা জানিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুজাইফাকে (রাঃ) ডেকে এ ঘটনার সংবাদ দেন, এমন কি এক এক করে ঐ কপটদের নাম পর্যন্তও তিনি বলে দেন। তথাপি তিনি উপরোক্ত কারণে তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ জারী করলেন না। এরা ছাড়া অন্যান্য মুনাফিকদের নাম তার জানা ছিল। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাদের আশে পাশের কতকগুলো বেদুঈন হচ্ছে মুনাফিক এবং কতক (দুষ্ট প্রকৃতির মুনাফিক) মদীনাতেও আছে, তোমরা তাদেরকে জান না, কিন্তু আমি তাদেরকে জানি।' (৯:১০১) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ এই নাপাক অন্তর বিশিষ্ট বিবাদী ও অহংকারী মুনাফিকরা যদি তাদের দুষ্টুমি থেকে বিরত না হয় তবে আমিও তাদের ছেড়ে দেবো না এবং তারা মদীনার মাটিতে আশে পাশে খুব কমই অবশিষ্ট থাকবে। তাদের উপর অভিশাপ দেওয়া হবে, যেখানেই পাওয়া যাবে তাদেরকে মারা ও ধরা হবে এবং টুকরো টুকরো করে দেয়া হবে।' (৩৩:৬০-৬১) এই আয়াতগুলো থেকে জানা গেল যে, ঐ মুনাফিকরা কে কে ছিল, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তা জানতেন না। তবে তাদের নিন্দনীয় স্বভাবের যে বর্ণনা দেয়া হয়েছিল তা যাদের মধ্যে পাওয়া যেতো, তাদের উপর নিফাক প্রযোজ্য হতো। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক স্পষ্টভাবেই বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আমি যদি ইচ্ছে করি তবে তোমাকে আমি তাদেরকে দেখিয়ে দিতে পারি, কিন্তু তুমি নিশান ও কথাবার্তার মধ্যেই তাদেরকে চিনে নেবে।' (৪৭:৩০)এই কপটাচারী মুনাফিকদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিল আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সাল। হযরত যায়েদ বিন আরকাম (রাঃ) তার কপটতাপূর্ণ স্বভাব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে সাক্ষ্য দানও করেছিলেন, যা ইতিপূর্বে। মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বিবৃত হয়েছে। এ সত্ত্বেও আমরা দেখতে পাই যখন সে মারা যাচ্ছে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জানাযার নামায পড়েছেন। এবং অন্যান্য মুসলমান সাহাবীদের (রাঃ) মত তারও দাফন কার্যে অংশগ্রহণ করেছেন। এমন কি হযরত উসমান (রাঃ) যখন একটু জোর দিয়ে তার কপটতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, তখন তিনি বলছেনঃ আরবের লোক সমালোচনা করবে যে, মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর সহচরগণকে হত্যা করে থাকেন, এ আমি চাই না।'সহীহ হাদীসের বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার বা না করার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি ক্ষমা প্রার্থনা করাকেই পছন্দ করেছি। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি যদি জানতাম যে সত্তর বারের অধিক ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাকে মার্জনা করা হবে, তবে আমি অবশ্যই তার অধিকই করতাম।
আল-বাকারা 2:11
১১-১২ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতেও মুনাফিকদের বর্ণনা রয়েছে এবং এই ধূলির ধরণীতে তাদের বিবাদ বিপর্যয় সৃষ্টি, কুফর এবং অবাধ্যতা সম্পর্কে মুসলমানদেরকে হুঁশিয়ার ও সতর্ক করা হচ্ছে। অর্থাৎ এ দুনিয়ায় আল্লাহর অবাধ্য হওয়া এবং অপরকে নাফরমান ও অবাধ্য হওয়ার আদেশ করাই হচ্ছে দুনিয়ার বুকে বিবাদ সৃষ্টি করা। আর যমীন ও আসমানের শান্তি রয়েছে আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যখন তাদেরকে আল্লাহর অবাধ্যতা হতে বিরত থাকতে বলা হয়, তখন তারা বলে আমরা তো সঠিক সনাতন পথের উপরেই প্রতিষ্ঠিত রয়েছি।' হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) বলেনঃ ‘এই স্বভাবের লোক আজ পর্যন্ত আসেনি।' ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যামানায় তো এরূপ বদ। স্বভাবের লোক বিদ্যমান ছিলই কিন্তু এখন যারা আসবে তারা ওদের চেয়েও নিকৃষ্ট হবে। এটা যেন মনে না করা হয় যে, হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) বলেনঃ এরূপ বদ স্বভবের জঘন্য লোকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে ছিলই না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ঐ মুনাফিকদের বিবাদ ও গণ্ডগোল সৃষ্টি করার অর্থ হচ্ছে তারা এসব কাজ করতে যা করতে আল্লাহ তা'আলা নিষেধ করেছিলেন এবং তাঁর ফরযগুলোও তারা হেলা করে নষ্ট করতো। শুধু তাই নয়, আল্লাহ তাআলার সত্য ধর্মের প্রতি তারা সন্দেহ পোষণ করতো এবং তার সত্যতার উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতো না। মুমিনদের কাছে আসলে তাদের ঈমানের কথা তারা প্রচার করতে অথচ তাদের অন্তর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) সম্বন্ধে সন্দেহে পরিপূর্ণ ছিল। তারা সুযোগ সুবিধা পেলেই আল্লাহর শত্রুদের সাহায্য ও সহায়তা করতো এবং তার সৎ বান্দাদের বিরুদ্ধাচরণ করতো। আর এতসব করা সত্ত্বেও নিজেদেরকে শান্তিকামী মনে করতো। কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করাকেও কুরআন মাজীদে ফাসাদ বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ কাফিররা পরস্পর একে অপরের বন্ধু, যদি তোমরা এরূপ না কর (অর্থাৎ যদি ঐ কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন কর) তবে যমীনের বুকে ভীষণ হাঙ্গামা ও গণ্ডগোল ছড়িয়ে পড়বে। (৮:৭৩) এই আয়াতটি মুসলমানও কাফিরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করে দিল। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা মু'মিনদেরকে ছেড়ে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তোমরা কি নিজেদের প্রতিকুলে আল্লাহর স্পষ্ট প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করে নিতে চাও’ (৪:১৪৪) অর্থাৎ তোমাদের মুক্তির সনদ কেটে যাক এই কি তোমরা চাও? অতঃপর তিনি আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ মুনাফিকরা জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে অবস্থান করবে এবং তোমরা তাদের জন্যে কখনই কোন সাহায্য সহায়তাকারী পাবে না।' (৪:১৪৫)মুনাফিকদের বাহ্যিক আচরণ ভাল ছিল বলে মুসলমানদের নিকট তাদের প্রকৃত অবস্থা গোপন থেকে যায়। তারা মু'মিনগণকে মুখমিষ্টি অথচ অবাস্তব কথা দিয়ে ধোকা দেয় এবং তাদের মিথ্যা দাবী ও কাফিরদের কাছে তাদের গোপন বন্ধুত্বের ফলে মুসলমানগণকে ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। সুতরাং বিবাদ ও হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী এই মুনাফিকরাই। অতএব যদি এরা কুফরের উপরেই কায়েম থাকতো তবে তাদের ভয়াবহ ষড়যন্ত্র ও গভীর চতুরতা কখনও মুসলমানদের জন্য এত ক্ষতিকর হতো না। আর যদি তারা পূর্ণ মুসলমান হয়ে যেতো এবং ভিতর ও বাহির তাদের এক হতো তবে তারা এই নশ্বর দুনিয়ার নিরাপত্তা লাভের সাথে সাথে আখেরাতের মুক্তি ও সফলতার অধিকারী হয়ে যেতো। এত ভয়াবহ পন্থা অবলম্বন করা সত্ত্বেও যখন তাদেরকে শান্তি প্রতিষ্ঠার উপদেশ দেয়া হয়, তখন তারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলেঃ আমরা তো শান্তি স্থাপনকারী,আমরা কারও সাথে বিবাদ করতে চাইনে। আমরা মুমিন ও কাফির এই দুই দলের মধ্যে সন্ধির প্রস্তাব দিয়ে ঐক্য বজায় রাখতে চাই।' হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তারা বলতোঃ ‘আমরা দুই দল অর্থাৎ মুসলমান ও আহলে কিতাবের মধ্যে সন্ধি স্থাপনকারী। কিন্তু আল্লাহ পাক বলেন যে, এ শুধু তাদের মুখ। যাকে তারা সন্ধি বলছে এটাই তো প্রকৃত বিবাদ। কিন্তু তাদের বোধশক্তি নেই।
আল-বাকারা 2:12
১১-১২ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতেও মুনাফিকদের বর্ণনা রয়েছে এবং এই ধূলির ধরণীতে তাদের বিবাদ বিপর্যয় সৃষ্টি, কুফর এবং অবাধ্যতা সম্পর্কে মুসলমানদেরকে হুঁশিয়ার ও সতর্ক করা হচ্ছে। অর্থাৎ এ দুনিয়ায় আল্লাহর অবাধ্য হওয়া এবং অপরকে নাফরমান ও অবাধ্য হওয়ার আদেশ করাই হচ্ছে দুনিয়ার বুকে বিবাদ সৃষ্টি করা। আর যমীন ও আসমানের শান্তি রয়েছে আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যখন তাদেরকে আল্লাহর অবাধ্যতা হতে বিরত থাকতে বলা হয়, তখন তারা বলে আমরা তো সঠিক সনাতন পথের উপরেই প্রতিষ্ঠিত রয়েছি।' হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) বলেনঃ ‘এই স্বভাবের লোক আজ পর্যন্ত আসেনি।' ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যামানায় তো এরূপ বদ। স্বভাবের লোক বিদ্যমান ছিলই কিন্তু এখন যারা আসবে তারা ওদের চেয়েও নিকৃষ্ট হবে। এটা যেন মনে না করা হয় যে, হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) বলেনঃ এরূপ বদ স্বভবের জঘন্য লোকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে ছিলই না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ঐ মুনাফিকদের বিবাদ ও গণ্ডগোল সৃষ্টি করার অর্থ হচ্ছে তারা এসব কাজ করতে যা করতে আল্লাহ তা'আলা নিষেধ করেছিলেন এবং তাঁর ফরযগুলোও তারা হেলা করে নষ্ট করতো। শুধু তাই নয়, আল্লাহ তাআলার সত্য ধর্মের প্রতি তারা সন্দেহ পোষণ করতো এবং তার সত্যতার উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতো না। মুমিনদের কাছে আসলে তাদের ঈমানের কথা তারা প্রচার করতে অথচ তাদের অন্তর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) সম্বন্ধে সন্দেহে পরিপূর্ণ ছিল। তারা সুযোগ সুবিধা পেলেই আল্লাহর শত্রুদের সাহায্য ও সহায়তা করতো এবং তার সৎ বান্দাদের বিরুদ্ধাচরণ করতো। আর এতসব করা সত্ত্বেও নিজেদেরকে শান্তিকামী মনে করতো। কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করাকেও কুরআন মাজীদে ফাসাদ বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ কাফিররা পরস্পর একে অপরের বন্ধু, যদি তোমরা এরূপ না কর (অর্থাৎ যদি ঐ কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন কর) তবে যমীনের বুকে ভীষণ হাঙ্গামা ও গণ্ডগোল ছড়িয়ে পড়বে। (৮:৭৩) এই আয়াতটি মুসলমানও কাফিরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করে দিল। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা মু'মিনদেরকে ছেড়ে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তোমরা কি নিজেদের প্রতিকুলে আল্লাহর স্পষ্ট প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করে নিতে চাও’ (৪:১৪৪) অর্থাৎ তোমাদের মুক্তির সনদ কেটে যাক এই কি তোমরা চাও? অতঃপর তিনি আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ মুনাফিকরা জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে অবস্থান করবে এবং তোমরা তাদের জন্যে কখনই কোন সাহায্য সহায়তাকারী পাবে না।' (৪:১৪৫)মুনাফিকদের বাহ্যিক আচরণ ভাল ছিল বলে মুসলমানদের নিকট তাদের প্রকৃত অবস্থা গোপন থেকে যায়। তারা মু'মিনগণকে মুখমিষ্টি অথচ অবাস্তব কথা দিয়ে ধোকা দেয় এবং তাদের মিথ্যা দাবী ও কাফিরদের কাছে তাদের গোপন বন্ধুত্বের ফলে মুসলমানগণকে ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। সুতরাং বিবাদ ও হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী এই মুনাফিকরাই। অতএব যদি এরা কুফরের উপরেই কায়েম থাকতো তবে তাদের ভয়াবহ ষড়যন্ত্র ও গভীর চতুরতা কখনও মুসলমানদের জন্য এত ক্ষতিকর হতো না। আর যদি তারা পূর্ণ মুসলমান হয়ে যেতো এবং ভিতর ও বাহির তাদের এক হতো তবে তারা এই নশ্বর দুনিয়ার নিরাপত্তা লাভের সাথে সাথে আখেরাতের মুক্তি ও সফলতার অধিকারী হয়ে যেতো। এত ভয়াবহ পন্থা অবলম্বন করা সত্ত্বেও যখন তাদেরকে শান্তি প্রতিষ্ঠার উপদেশ দেয়া হয়, তখন তারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলেঃ আমরা তো শান্তি স্থাপনকারী,আমরা কারও সাথে বিবাদ করতে চাইনে। আমরা মুমিন ও কাফির এই দুই দলের মধ্যে সন্ধির প্রস্তাব দিয়ে ঐক্য বজায় রাখতে চাই।' হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তারা বলতোঃ ‘আমরা দুই দল অর্থাৎ মুসলমান ও আহলে কিতাবের মধ্যে সন্ধি স্থাপনকারী। কিন্তু আল্লাহ পাক বলেন যে, এ শুধু তাদের মুখ। যাকে তারা সন্ধি বলছে এটাই তো প্রকৃত বিবাদ। কিন্তু তাদের বোধশক্তি নেই।
আল-বাকারা 2:13
ভাবার্থ এই যে, যখন এই মুনাফিকদেরকে সাহাবীদের (রাঃ) মত আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাদের উপর, কিতাবসমূহের উপর এবং রাসূলগণের (আঃ) উপর ঈমান আনতে, মৃত্যুর পর পুনর্জীবন এবং বেহেশত ও দোযখের সত্যতা স্বীকার করতে ও রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য বরণ করতে ভাল কাজ করতে ও মন্দ কাজ হতে বিরত থাকতে বলা হয় তখন এই অভিশপ্ত দলটি এরূপ ঈমান আনাকে নির্বোধদের ঈমান আনা বলে আখ্যায়িত করে থাকে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) ও অন্যান্য কয়েকজন সাহাবী (রাঃ), রাবী বিন আনাস (রঃ), আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) প্রমুখও এই তাফসীর বর্ণনা করেছেন (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহুবচন যেমন (আরবি) শব্দের (আরবি) বহুবচন (আরবি) শব্দের বহুবচন (আরবি)এসে থাকে। মূর্খ, দুর্বল অভিমত, স্বল্পজ্ঞান বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং যারা লাভ ক্ষতি মাসলিহাত সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না তাদেরকে বলা হয়। কুরআন মাজীদের এক জায়গায় আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা অল্প বুদ্ধিসম্পন্নদেরকে স্বীয় মাল প্রদান করো না যা আল্লাহ তোমাদের জন্যে জীবন ধারণের উপরকণ করে দিয়েছেন।' (৪:৫) সাধারণ মুফাসৃসিরগণের অভিমত এই যে, এই আয়াতে (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে নারীগণ ও ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা। ঐ মুশরিকদের উপর এখানেও বিশ্বপ্রভু আল্লাহ জোর দিয়ে বলছেন যে, নির্বোধ তো এরাই, কিন্তু সাথে সাথে তারা এতই গণ্ডমূর্খ যে, নিজেদের নির্বুদ্ধিতার অনুভূতিও রাখে না এবং মূর্খতা ও ভ্রষ্টতা অনুধাবন করতে পারে না। এর চেয়ে বেশী তাদের অন্ধত্ব, দৃষ্টিহীনতা এবং সুপথ থেকে দূরে সরে থাকা আর কি হতে পারে?
আল-বাকারা 2:14
১৪-১৫ নং আয়াতের তাফসীরভাবার্থ এই যে এসব মুনাফিকগণ মুসলমানদের নিকট এসে নিজেদের ঈমান, বন্ধুত্ব ও মঙ্গল কামনার কথা প্রকাশ করে তাদেরকে ধোকায় ফেলতে চায়, যাতে জান ও মালের নিরাপত্তা এসে যায় এবং যুদ্ধলব্ধ মালেও ভাগ পাওয়া যায়। আর যখন নিজেদের দলে থাকে তখন তাদের হয়েই কথা বলে। শব্দের অর্থ এখানে (আরবি) এবং (আরবি) অর্থাৎ তারা প্রত্যাবর্তন করে, পৌছে, গোপনে বা নিভৃতে থাকে এবং যায়। সুতরাং (আরবি) এখানে (আরবি)-এর সঙ্গে (আরবি) হয়ে ফিরে যাওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবি), কিন্তু প্রথমটিই সঠিক। ইবনে জারীরের (রঃ) কথার সারাংশ এটাই। (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে নেতা, বড় দলপতি এবং সর্দার। যেমন ‘আহ্বার’ বা ইয়াহূদী আলেমগণ, কুরায়েশ কাফিরদের সর্দারগণ এবং কপটগণ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং অন্যান্য সাহাবীগণের (রাঃ) মতে (আরবি) হচ্ছে তাদের প্রধান, কাফির সর্দারগণ এবং তাদের সমবিশ্বাসী লোকও বটে। এই ইয়াহুদী নেতারাও নবুওয়াতকে অবিশ্বাস করার এবং কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার পরামর্শ দিতো। মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে তাদের সাথী সঙ্গী। তারা হয় মুশরিক ছিল, হয় মুনাফিক ছিল। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ঐসব লোক খারাপ কাজ ও শিরকের কাজে তাদের সর্দার ছিল। আবুল আলিয়া (রঃ), সুদ্দী (রঃ) এবং রাবী বিন আনাসও (রঃ) এ তাফসীরই করে থাকেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক পথভ্রষ্টকারী ও অবাধ্যকে (আরবি) বলা হয়। তারা। জ্বিন বা দানব থেকেই হোক অথবা মানব থেকেই হোক। কুরআন কারীমের মধ্যেও এসেছেঃ (৬:১১২) (আরবি) হাদীস শরীফে এসেছেঃ ‘আমরা জ্বিন ও মানুষের শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে কি শয়তান আছে? তিনি উত্তরে বলেনঃ হাঁ যখন এই মুনাফিকরা মুসলমানদের সঙ্গে মিলিত হয় তখন বলেঃ “আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি, অর্থাৎ যেমন তোমরা, তেমনই আমরা, আমরা তো তাদেরকে উপহাস করছিলাম।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত রাবী বিন আনাস (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ (রঃ) -এর তাফসীরও এটাই। মহান আল্লাহ তাদেরকে উত্তর দিতে গিয়ে তাদের প্রতারণামূলক কার্যের মুকাবিলায় বলেন যে, আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে উপহাস করবেন এবং অবাধ্যতার মধ্যে উদভ্রান্ত হয়ে ফিরতে দেবেন। যেমন কুরআন মাজীদের এক জায়গায় আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘কিয়ামতের দিন মুনাফিক নর ও নারী মুমিনদেরকে বলবে, একটু থামো, আমরাও তোমাদের আলো দ্বারা একটু উপকার গ্রহণ করি। বলা হবেপিছনে ফিরে আলো অনুসন্ধান কর, ফিরা মাত্রই মধ্যস্থলে একটি প্রাচীরের আড়াল দেয়া হবে, যার মধ্যে দরজা থাকবে, এর এদিকে থাকবে রহমত এবং ওদিকে থাকবে শাস্তি।' (৫৭:১৩) অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা ঘোষনা করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ কাফিরেরা যেন আমার ঢিল দেয়াকে তাদের জন্যে মঙ্গলজনক মনে। করে, তাদের পাপ আরও বেড়ে যাক এজন্যেই আমি তাদের ঢিল দিচ্ছি।' (৩:১৭৮) সুতরাং কুরআন মাজীদের যেখানেই (আরবি) ইত্যাদি শব্দগুলো এসেছে সেখানেই ভাবার্থ হবে এটাই। অন্য একদল বলেন যে, এসব শব্দ শুধুমাত্র ভয় দেখানো এবং সতর্ক করার জন্যে এসেছে। তাদের পাপ কার্য এবং শিরক ও কুফরের জন্যে তাদেরকে তিরস্কার করা হয়েছে। মুফাসসিরগণ বলেন যে, এ শব্দগুলি শুধু তাদেরকে উত্তর দেয়ার জন্যে আনা হয়েছে। যেমন, কোন ভাল লোক কোন প্রতারকের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেয়ে তার উপর জয়যুক্ত হওয়ার পর তাকে বলেঃ দেখ! আমি কেমন করে তোমাকে প্রতারিত করেছি। অথচ তার পক্ষ থেকে প্রতারণা হয় নাই। এরকমই আল্লাহ তাআলার কথাঃ (আরবি)(আরবি) (৩:৫৪) এবং (আরবি) (২:১৫) ইত্যাদি। নচেৎ মহান আল্লাহর সত্তা প্রতারণা ও উপহাস থেকে পবিত্র। ভাবার্থ এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তাদের প্রতারণা ও বিদ্রুপের উপযুক্ত প্রতিফল দেবেন। কাজেই বিনিময়ে ঐ শব্দগুলোই ব্যবহার করা হয়েছে। দু'টি শব্দের অর্থ দুই জায়গায় পৃথক পৃথক হবে। যেমন কুরআন মাজীদে আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ মন্দের বিনিময় ঐরূপ মন্দই হয়।' (৪২:৪০) অন্যস্থানে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ যে তোমাদের উপর বাড়াবাড়ি করে তোমরাও তার উপর বাড়াবাড়ি কর।' (২:১৯৪) তাহলে বুঝা গেল যে, প্রতিশোধ গ্রহণ করা অন্যায় নয়। বাড়াবাড়ির মুকাবিলায় প্রতিশোধ নেয়া বাড়াবাড়ি নয়। কিন্তু দুই স্থানে একই শব্দ আছে, অথচ প্রথম অন্যায় ও বাড়াবাড়ি হচ্ছে জুলুম এবং দ্বিতীয় অন্যায় ও বাড়াবাড়ি হচ্ছে সুবিচার। আর একটি ভাবার্থ এই যে, মুনাফিকরা তাদের এই নাপাক নীতি দ্বারা মুসলমানদেরকে উপহাস ও বিদ্রুপ করতো। মহান আল্লাহও তাদের সঙ্গে এইরূপই করলেন যে, দুনিয়ায় তাদেরকে তিনি নিরাপত্তা দান করলেন, তারা এতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল, অথচ এটা অস্থায়ী নিরাপত্তা। কিয়ামতের দিন তাদের কোন নিরাপত্তা নেই। এখানে যদিও তাদের জান ও মাল রক্ষা পেয়ে গেল, কিন্তু আল্লাহর নিকট তারা বেদনাদায়ক শাস্তির শিকারে পরিণত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই কথাটিকেই বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। কেননা বিনা কারণে যে ধোকা ও বিদ্রুপ হয়, আল্লাহ তা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তবে প্রতিশোধ হিসেবে আল্লাহ পাকের দিকে এসব শব্দের সম্বন্ধ লাগানোতে কোন দোষ নেই। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) একথাই বলেন যে, এটা তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ ও শাস্তি। (আরবি)-এর অর্থ ঢিল দেয়া এবং বাড়ানো বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ রাব্বল আলামীন বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা কি ধারণা করেছে যে, তাদের মাল ও সন্তানাদির আধিক্য দ্বারা তাদের জন্যে আমি মঙ্গল ও কল্যাণকেই ত্বরান্বিত করছি? বস্তুতঃ তাদের সঠিক বোধই নেই।' (২৩:৫৫-৫৬) আল্লাহ রাব্বল ইযত আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ এভাবেই আমি তাদেরকে ঢিল দেয়ার পর এমনভাবে টেনে ধরব যে, তারা কোন দিক-দিশাই পাবে না।' (৬৮:৪৪) (আরবি) তাহলে ভাবার্থ দাঁড়াল এই যে, এদিকে এরা পাপ করছে আর ওদিকে তাদের দুনিয়ার সুখ-সম্পদ ও ধনৈশ্বর্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, কাজেই এরা সুখী হচ্ছে, অথচ প্রকৃতপক্ষে এটা একটা শাস্তিই বটে। যেমন আল্লাহ তা'আলা :কুরআন পাকে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যখন তারা উপদেশ ভুলে গেল, তখন আমি তাদের উপর সমস্ত জিনিসের দরজা খুলে দিলাম, অতঃপর যা তাদেরকে দেয়া হলো তার উপর যখন তারা সর্বোতভাবে খুশী হলো, হঠাৎ করে অতর্কিতে আমি তাদেরকে আঁকড়ে ধরলাম, সুতরাং তারা ভীত সন্ত্রস্ত ও নিরাশ হয়ে পড়লো। অত্যাচারীদের মূলোৎপাটন করে ধ্বংস করে দেয়া হলো এবং বলা হলো যে, সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জন্যে।' (৬:৪৪-৪৫)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে ঢিল দেয়ার জন্যে এবং তাদের অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ বাড়িয়ে দেয়ার জন্যে তাদেরকে অধিক পরিমাণে ঢিল দেয়া হয়। কোন জিনিসের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়াকে বলা হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন পানি সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন আমি তাদেরকে নৌকায় উঠালাম।' (৬৯:১১) পথভ্রষ্টতাকে (আরবি) বলা হয়। সুতরাং আয়াতটির ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, পথভ্রষ্টতা ও কুফরীর মধ্যে ডুবে গেছে এবং এই নাপাকী তাদেরকে ঘিরে ফেলেছে। এখন তারা ঐ কাদার মধ্যেই নেমে যাচ্ছে এবং ঐ নাপাকীর মধ্যে ঢুকে পড়ছে। আর এর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার সমস্ত পথ তাদের বন্ধ হয়ে গেছে। তারা এখন পাঁকের মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে আছে। তদুপরি তারা। বধির এবং নির্বোধ। সুতরাং তারা কিভাবে মুক্তি পেতে পারে? চোখের অন্ধত্বের জন্যে আরবী ভাষায় (আরবি) শব্দ ব্যবহৃত হয়, আর অন্তরের জন্যে ব্যবহৃত হয় (আরবি) শব্দটি। কিন্তু কখনও আবার অন্তরের জন্য (আরবি) ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন কুরআন পাকে আছে (আরবি) অর্থাৎ তাদের সেই অন্তর অন্ধ যা রয়েছে তাদের সীনার মধ্যে। (২২:৪৬)
আল-বাকারা 2:15
১৪-১৫ নং আয়াতের তাফসীরভাবার্থ এই যে এসব মুনাফিকগণ মুসলমানদের নিকট এসে নিজেদের ঈমান, বন্ধুত্ব ও মঙ্গল কামনার কথা প্রকাশ করে তাদেরকে ধোকায় ফেলতে চায়, যাতে জান ও মালের নিরাপত্তা এসে যায় এবং যুদ্ধলব্ধ মালেও ভাগ পাওয়া যায়। আর যখন নিজেদের দলে থাকে তখন তাদের হয়েই কথা বলে। শব্দের অর্থ এখানে (আরবি) এবং (আরবি) অর্থাৎ তারা প্রত্যাবর্তন করে, পৌছে, গোপনে বা নিভৃতে থাকে এবং যায়। সুতরাং (আরবি) এখানে (আরবি)-এর সঙ্গে (আরবি) হয়ে ফিরে যাওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে (আরবি), কিন্তু প্রথমটিই সঠিক। ইবনে জারীরের (রঃ) কথার সারাংশ এটাই। (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে নেতা, বড় দলপতি এবং সর্দার। যেমন ‘আহ্বার’ বা ইয়াহূদী আলেমগণ, কুরায়েশ কাফিরদের সর্দারগণ এবং কপটগণ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং অন্যান্য সাহাবীগণের (রাঃ) মতে (আরবি) হচ্ছে তাদের প্রধান, কাফির সর্দারগণ এবং তাদের সমবিশ্বাসী লোকও বটে। এই ইয়াহুদী নেতারাও নবুওয়াতকে অবিশ্বাস করার এবং কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার পরামর্শ দিতো। মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে তাদের সাথী সঙ্গী। তারা হয় মুশরিক ছিল, হয় মুনাফিক ছিল। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ঐসব লোক খারাপ কাজ ও শিরকের কাজে তাদের সর্দার ছিল। আবুল আলিয়া (রঃ), সুদ্দী (রঃ) এবং রাবী বিন আনাসও (রঃ) এ তাফসীরই করে থাকেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক পথভ্রষ্টকারী ও অবাধ্যকে (আরবি) বলা হয়। তারা। জ্বিন বা দানব থেকেই হোক অথবা মানব থেকেই হোক। কুরআন কারীমের মধ্যেও এসেছেঃ (৬:১১২) (আরবি) হাদীস শরীফে এসেছেঃ ‘আমরা জ্বিন ও মানুষের শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে কি শয়তান আছে? তিনি উত্তরে বলেনঃ হাঁ যখন এই মুনাফিকরা মুসলমানদের সঙ্গে মিলিত হয় তখন বলেঃ “আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি, অর্থাৎ যেমন তোমরা, তেমনই আমরা, আমরা তো তাদেরকে উপহাস করছিলাম।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত রাবী বিন আনাস (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ (রঃ) -এর তাফসীরও এটাই। মহান আল্লাহ তাদেরকে উত্তর দিতে গিয়ে তাদের প্রতারণামূলক কার্যের মুকাবিলায় বলেন যে, আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে উপহাস করবেন এবং অবাধ্যতার মধ্যে উদভ্রান্ত হয়ে ফিরতে দেবেন। যেমন কুরআন মাজীদের এক জায়গায় আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘কিয়ামতের দিন মুনাফিক নর ও নারী মুমিনদেরকে বলবে, একটু থামো, আমরাও তোমাদের আলো দ্বারা একটু উপকার গ্রহণ করি। বলা হবেপিছনে ফিরে আলো অনুসন্ধান কর, ফিরা মাত্রই মধ্যস্থলে একটি প্রাচীরের আড়াল দেয়া হবে, যার মধ্যে দরজা থাকবে, এর এদিকে থাকবে রহমত এবং ওদিকে থাকবে শাস্তি।' (৫৭:১৩) অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা ঘোষনা করেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ কাফিরেরা যেন আমার ঢিল দেয়াকে তাদের জন্যে মঙ্গলজনক মনে। করে, তাদের পাপ আরও বেড়ে যাক এজন্যেই আমি তাদের ঢিল দিচ্ছি।' (৩:১৭৮) সুতরাং কুরআন মাজীদের যেখানেই (আরবি) ইত্যাদি শব্দগুলো এসেছে সেখানেই ভাবার্থ হবে এটাই। অন্য একদল বলেন যে, এসব শব্দ শুধুমাত্র ভয় দেখানো এবং সতর্ক করার জন্যে এসেছে। তাদের পাপ কার্য এবং শিরক ও কুফরের জন্যে তাদেরকে তিরস্কার করা হয়েছে। মুফাসসিরগণ বলেন যে, এ শব্দগুলি শুধু তাদেরকে উত্তর দেয়ার জন্যে আনা হয়েছে। যেমন, কোন ভাল লোক কোন প্রতারকের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেয়ে তার উপর জয়যুক্ত হওয়ার পর তাকে বলেঃ দেখ! আমি কেমন করে তোমাকে প্রতারিত করেছি। অথচ তার পক্ষ থেকে প্রতারণা হয় নাই। এরকমই আল্লাহ তাআলার কথাঃ (আরবি)(আরবি) (৩:৫৪) এবং (আরবি) (২:১৫) ইত্যাদি। নচেৎ মহান আল্লাহর সত্তা প্রতারণা ও উপহাস থেকে পবিত্র। ভাবার্থ এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তাদের প্রতারণা ও বিদ্রুপের উপযুক্ত প্রতিফল দেবেন। কাজেই বিনিময়ে ঐ শব্দগুলোই ব্যবহার করা হয়েছে। দু'টি শব্দের অর্থ দুই জায়গায় পৃথক পৃথক হবে। যেমন কুরআন মাজীদে আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ মন্দের বিনিময় ঐরূপ মন্দই হয়।' (৪২:৪০) অন্যস্থানে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ যে তোমাদের উপর বাড়াবাড়ি করে তোমরাও তার উপর বাড়াবাড়ি কর।' (২:১৯৪) তাহলে বুঝা গেল যে, প্রতিশোধ গ্রহণ করা অন্যায় নয়। বাড়াবাড়ির মুকাবিলায় প্রতিশোধ নেয়া বাড়াবাড়ি নয়। কিন্তু দুই স্থানে একই শব্দ আছে, অথচ প্রথম অন্যায় ও বাড়াবাড়ি হচ্ছে জুলুম এবং দ্বিতীয় অন্যায় ও বাড়াবাড়ি হচ্ছে সুবিচার। আর একটি ভাবার্থ এই যে, মুনাফিকরা তাদের এই নাপাক নীতি দ্বারা মুসলমানদেরকে উপহাস ও বিদ্রুপ করতো। মহান আল্লাহও তাদের সঙ্গে এইরূপই করলেন যে, দুনিয়ায় তাদেরকে তিনি নিরাপত্তা দান করলেন, তারা এতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল, অথচ এটা অস্থায়ী নিরাপত্তা। কিয়ামতের দিন তাদের কোন নিরাপত্তা নেই। এখানে যদিও তাদের জান ও মাল রক্ষা পেয়ে গেল, কিন্তু আল্লাহর নিকট তারা বেদনাদায়ক শাস্তির শিকারে পরিণত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই কথাটিকেই বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। কেননা বিনা কারণে যে ধোকা ও বিদ্রুপ হয়, আল্লাহ তা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তবে প্রতিশোধ হিসেবে আল্লাহ পাকের দিকে এসব শব্দের সম্বন্ধ লাগানোতে কোন দোষ নেই। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) একথাই বলেন যে, এটা তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ ও শাস্তি। (আরবি)-এর অর্থ ঢিল দেয়া এবং বাড়ানো বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ রাব্বল আলামীন বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা কি ধারণা করেছে যে, তাদের মাল ও সন্তানাদির আধিক্য দ্বারা তাদের জন্যে আমি মঙ্গল ও কল্যাণকেই ত্বরান্বিত করছি? বস্তুতঃ তাদের সঠিক বোধই নেই।' (২৩:৫৫-৫৬) আল্লাহ রাব্বল ইযত আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ এভাবেই আমি তাদেরকে ঢিল দেয়ার পর এমনভাবে টেনে ধরব যে, তারা কোন দিক-দিশাই পাবে না।' (৬৮:৪৪) (আরবি) তাহলে ভাবার্থ দাঁড়াল এই যে, এদিকে এরা পাপ করছে আর ওদিকে তাদের দুনিয়ার সুখ-সম্পদ ও ধনৈশ্বর্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, কাজেই এরা সুখী হচ্ছে, অথচ প্রকৃতপক্ষে এটা একটা শাস্তিই বটে। যেমন আল্লাহ তা'আলা :কুরআন পাকে বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যখন তারা উপদেশ ভুলে গেল, তখন আমি তাদের উপর সমস্ত জিনিসের দরজা খুলে দিলাম, অতঃপর যা তাদেরকে দেয়া হলো তার উপর যখন তারা সর্বোতভাবে খুশী হলো, হঠাৎ করে অতর্কিতে আমি তাদেরকে আঁকড়ে ধরলাম, সুতরাং তারা ভীত সন্ত্রস্ত ও নিরাশ হয়ে পড়লো। অত্যাচারীদের মূলোৎপাটন করে ধ্বংস করে দেয়া হলো এবং বলা হলো যে, সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জন্যে।' (৬:৪৪-৪৫)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে ঢিল দেয়ার জন্যে এবং তাদের অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ বাড়িয়ে দেয়ার জন্যে তাদেরকে অধিক পরিমাণে ঢিল দেয়া হয়। কোন জিনিসের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়াকে বলা হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন পানি সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন আমি তাদেরকে নৌকায় উঠালাম।' (৬৯:১১) পথভ্রষ্টতাকে (আরবি) বলা হয়। সুতরাং আয়াতটির ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, পথভ্রষ্টতা ও কুফরীর মধ্যে ডুবে গেছে এবং এই নাপাকী তাদেরকে ঘিরে ফেলেছে। এখন তারা ঐ কাদার মধ্যেই নেমে যাচ্ছে এবং ঐ নাপাকীর মধ্যে ঢুকে পড়ছে। আর এর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার সমস্ত পথ তাদের বন্ধ হয়ে গেছে। তারা এখন পাঁকের মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে আছে। তদুপরি তারা। বধির এবং নির্বোধ। সুতরাং তারা কিভাবে মুক্তি পেতে পারে? চোখের অন্ধত্বের জন্যে আরবী ভাষায় (আরবি) শব্দ ব্যবহৃত হয়, আর অন্তরের জন্যে ব্যবহৃত হয় (আরবি) শব্দটি। কিন্তু কখনও আবার অন্তরের জন্য (আরবি) ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন কুরআন পাকে আছে (আরবি) অর্থাৎ তাদের সেই অন্তর অন্ধ যা রয়েছে তাদের সীনার মধ্যে। (২২:৪৬)
আল-বাকারা 2:16
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তারা হিদায়াতকে ছেড়ে গুমরাহীকে গ্রহণ করেছিল। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “ঈমানের পরিবর্তে কুফরীকে গ্রহণ করেছিল।" মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ তারা ঈমান আনার পরে কাফির হয়েছিল।' কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ “তারা হিদায়াতের চাইতে গুমরাহীকেই অধিক পছন্দ করেছিল। যেমন অন্যস্থানে সামূদ সম্প্রদায় সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি সামূদ কাউমকে সুপথ দেখিয়েছিলাম, কিন্তু তারা সুপথের তুলনায় ভ্রান্ত পথকে পছন্দ করেছিল। ভাবার্থ এই যে, মুনাফিকরা হিদায়াত হতে সরে গিয়ে গুমরাহীর উপর এসে গেছে এবং হিদায়াতের পরিবর্তে গুমরাহীকেই গ্রহণ করেছে। এখন ঈমান এনে পুনরায় কাফির হয়েছে। হয়তো বা আসলেই ঈমান লাভের সৌভাগ্য হয়নি। মুনাফিকদের মধ্যে দুই প্রকারের লোক ছিল। যেমন কুরআন পাকে এসেছেঃ (আরবি)অর্থাৎ এটা এই হেতু যে, তারা ঈমান এনেছে, অতঃপর কাফির হয়েছে, অতএব তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে।' (৬৩:৩) আবার এমনও মুনাফিক ছিল যাদের ভাগ্যে ঈমান লাভই ঘটেনি। সুতরাং এরা এই সওদায় কোন উপকারও লাভ করেনি এবং পথও প্রাপ্ত হয়নি, বরং হিদায়াতের বাগান হতে বের হয়ে কাটার জঙ্গলে পড়ে গেছে। নিরাপত্তার প্রশস্ত মাঠ হতে বেরিয়ে ভীতিপ্রদ অন্ধকার ঘরে এবং সুন্নতের পবিত্র বাগান হতে বের হয়ে বিদ'আতের শুষ্ক জঙ্গলে এসে পড়েছে।
আল-বাকারা 2:17
১৭-১৮ নং আয়াতের তাফসীর(আরবি) কে আরবীতে (আরবি) ও বলে। এর বহুবচন (আরবি) আসে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ এই দৃষ্টান্তগুলো আমি মানুষের জন্যে বর্ণনা করে থাকি, যেগুলো শুধু আলেমরাই বুঝে থাকে।' (২৯:৪৩) আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, যে মুনাফিকরা সঠিক পথের পরিবর্তে ভ্রান্তপথ এবং দৃষ্টির পরিবর্তে দৃষ্টিহীনতাকে ক্রয় করে থাকে, তাদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে অন্ধকারে আগুন জ্বালিয়েছে, তার ফলে আশে পাশের জিনিস তার চোখে পড়েছে। মনের উদ্বিগ্নতা দূর হয়ে উপকার লাভের আশার সঞ্চার হয়েছে, এমন সময়ে হঠাৎ আগুন নিভে গেছে এবং চারিদিক ভীষণ অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। কাজেই সে রাস্তা দেখেতে পাচ্ছে। এছাড়া লোকটি বধির, সে কারও কথা শুনতে পায় না, সে বোবা, তার কথা রাস্তার কোন লোককে জিজ্ঞেস করতেও পারে না, সে অন্ধ, আলোতেও সে কাজ চালাতে পারে না। এখন তাহলে সে পথ পাবে কি করে? মুনাফিকরা ঠিক তারই মত। সঠিক পথ ছেড়ে দিয়ে তারা পথ হারিয়ে ফেলেছে এবং ভাল ছেড়ে দিয়ে মন্দের কামনা করছে। এই উদাহরণে বুঝা যাচ্ছে যে, ঐসব লোক ঈমান ককূল করার পরে কুফরী করেছিল। যেমন কুরআন কারীমে কয়েক জায়গায় এটা স্পষ্টভাবে বিদ্যমান আছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরের মধ্যে সুদ্দী (রঃ) হতে এটাই নকল করেছেন, অতঃপর বলেছেন যে, এই তুলনা সম্পূর্ণরূপে সঠিক। কেননা, প্রথমে এই মুনাফিকরা ঈমানের আলো লাভ করেছিল। অতঃপর তাদের কপটতার ফলে তা নিভে গেছে এবং এর ফলে তারা অস্থির হয়ে পড়েছে, আর ধর্মের অস্থিরতার চেয়ে বড় অস্থিরতা আর কি হতে পারে? ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, যাদের এ উপমা বর্ণনা করা হয়েছে তাদের ভাগ্যে কখনও ঈমান লাভ ঘটেনি। কেননা ইতিপূর্বে আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যদিও তারা মুখে আল্লাহ তা'আলার উপর এবং কিয়ামতের উপর ঈমান আনার কথা বলছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ঈমানদার নয়। তবে সঠিক কথা এই যে, এই পবিত্র আয়াতে তাদের কুফরও নিফাকের সময়কার খবর দেয়া হয়েছে। এর দ্বারা এ অস্বীকৃতি বুঝায় না যে, এই কুফর ও নিফাকের অবস্থার পূর্বে তারা ঈমান এনেছিল। বরং হতে পারে যে, তারা ঈমান আনার পর তা হতে সরে পড়েছিল। অতঃপর তাদের অন্তরে মোহর করে দেয়া হয়েছে। যেমন কুরআন মাজীদে বলা হয়েছেঃ “এটা এজন্যে যে, তারা ঈমান এনেছে, অতঃপর কাফির হয়েছে, অতএব তাদের অন্তরে মোহর করে দেয়া হয়েছে, তারা কিছুই বুঝে। এই কারণে উপমায় আলো ও অন্ধকারের উল্লেখ আছে। অর্থাৎ ঈমানের কালেমা প্রকাশ করার কারণে দুনিয়ায় কিছু আলো হয়ে গেছে। কিন্তু অন্তরে কুফরী থাকার কারণে আখেরাতের অন্ধকার তাদেরকে ঘিরে নিয়েছে। একটি দলের উপমা একটি লোকের সঙ্গে প্রায়ই এসে থাকে। কুরআন পাকের অন্যস্থানে আছেঃ “তুমি তাদেরকে দেখবে যে, তারা চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তোমার দিকে দেখছে সেই ব্যক্তির মত যার উপর মরণের অজ্ঞানতা এসে গেছে। অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘তোমাদেরকে সৃষ্টি করা এবং মরণের পর পুনরুজ্জীবিত করা একটি প্রাণের মতই।' (৩১:২৮) অন্য জায়গায় আছেঃ যারা তাওরাত শিক্ষা করে কিন্তু সে অনুযায়ী কাজ করে না তাদের উপমায় বলা হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘গাধার মত-যে কিতাবসমূহের বোঝা বহন করে থাকে।' (৬২:৫) এইসব আয়াতে দলের উপমা একের সঙ্গে দেয়া হয়েছে। এ রকমই। উল্লিখিত আয়াতে মুনাফিক দলের উপমা একটি লোকের সঙ্গে দেয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, অনুমিত বাক্য হবে নিম্নরূপঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদের ঘটনার দৃষ্টান্ত ঐসব লোকের ঘটনার মত যারা আগুন জ্বালিয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, আগুন জ্বালায় তো একজন, কিন্তু এমন একটি দলের জন্যে জ্বালিয়ে থাকে যে দল তার সাথে রয়েছে। অন্য কেউ বলেন যে, এখানে (আরবি)-এর অর্থ (আরবি)হবে। যেমন কবিদের কবিতায়ও এরূপ আছে।আমি বলি যে, স্বয়ং এই উদাহরণেও তত একবচনের রূপের পরেই বহুবচনের রূপ এসেছে। যেমন (আরবি) এবং (আরবি) এভাবে বলায় ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে। আল্লাহ তাদের আলো ছিনিয়ে নিয়েছেন -এর অর্থ এই যে, যে আলো তাদের জন্যে উপকারী ছিল তা সরিয়ে নিয়েছেন এবং যেমনভাবে আগুন নিবে যাবার পর তা ধুয়া এবং অন্ধকার থেকে যায় দ্রুপ তাদের কাছে ক্ষতিকর জিনিস যেমন সন্দেহ, কুফর এবং নিফাক রয়ে গেছে, সুতরাং তারা নিজেরাও পথ দেখতে পায় না, অন্যের ভাল কথাও শুনতে পায় না এবং কারও কাছে প্রশ্নও করতে পারে না। এখন পুনরায় সঠিকপথে আসা অসম্ভব হয়ে গেছে। এর সমর্থনে মুফাসসিরগণের অনেক কথা রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় আগমনের পর কতকগুলো লোক ইসলাম গ্রহণ করে, কিন্তু পরে আবার মুনাফিক হয়ে যায়। তাদের উপমা এ লোকটির মত যে অন্ধকারে রয়েছে। অতঃপর আগুন জ্বালিয়ে আলো লাভ করছে এবং আশে পাশের ভালমন্দ জিনিস দেখতে পেয়েছে। আর কোন পথে কি আছে তা সবই জানতে পেরেছে। এমন সময় হঠাৎ আগুন নিভে গেছে, ফলে আলো হারিয়ে গেছে। এখন পথে কি আছে না আছে তা জানতে পারে না। ঠিক এরকমই মুনাফিকরা শিরক ও কুফরের অন্ধকারে ছিল। অতঃপর ঈমান এনে ভাল-মন্দ অর্থাৎ হারাম হালাল ইত্যাদি দেখতে থাকে। কিন্তু পুনরায় কাফির হয়ে যায় এবং তখন আর হারাম, হালাল, ভাল ও মন্দের মধ্যে কোন পার্থক্য করতে পারে না।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আলোর অর্থ ঈমান এবং অন্ধকারের অর্থ ভ্রান্তপথ ও কুফরী। এসব লোক সঠিক পথেই ছিল। কিন্তু আবার দুষ্টুমি করে ভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, হিদায়াত ও ঈমানদারীর দিকে মুখ করাকে উপমায় আশে পাশের জিনিসকে আলোকিত করার সঙ্গে তাবীর করা হয়েছে। হযরত আতা খুরাসানীর (রঃ) অভিমত এই যে, মুনাফিক কখনও কখনও ভাল জিনিস দেখে নেয় এবং চিনেও নেয়। কিন্তু আবার তার অন্তরের অন্ধত্ব তার উপর জয়যুক্ত হয়ে যায়। হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত আবদুর রহমান (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ), এবং রাবী (রঃ) হতেও এটাই নকল করা হয়েছে। হযরত আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেনঃ মুনাফিকদের। অবস্থা এটাই যে, তারা ঈমান আনে এবং তার পবিত্র আলোকে তাদের অন্তর উজ্জ্বল হয়ে উঠে, যেমন আগুন জ্বালালে তার আশে পাশের জিনিস আলোকিত হয়। কিন্তু আবার কুফরীর কারণে আলো শেষ হয়ে যায়, যেমন আলো নিভে গেলে অন্ধকার ছেয়ে যায়।আমাদের এসব কথা তো ঐ তাফসীরের সমর্থনে ছিল যে, যে মুনাফিকদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে তারা ঈমান এনেছিল, অতঃপর কুফরী করেছে। এখন ইমাম ইবনে জারীরের (রঃ) সমর্থনে যে তাফসীর রয়েছে তা নিম্নরূপঃ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এটা মুনাফিকদের দৃষ্টান্ত যে, তারা ইসলামের কারণে সম্মান পেয়ে যায়। মুসলমানদের মধ্যে বিয়ে চলতে থাকে। উত্তরাধিকার এবং গণীমতের মাল অংশ ইত্যাদি পেতে থাকে। কিন্তু মরণের সঙ্গে সঙ্গেই এ সম্মান হারিয়ে যায়। যেমন আগুনের আলো নিভে গেলেই শেষ হয়ে যায়। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, মুনাফিক যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করে তখন তার অন্তরে আলো সৃষ্টি হয়। অতঃপর যখনই সন্দেহ করে তখনই তা চলে যায়। যেমনভাবে কাঠ যতক্ষণ জ্বলতে থাকে ততক্ষণ আলো থাকে, যেমনই নিভে যায় তেমনিই তা শেষ হয়ে যায়। হযরত কাতাদার (রঃ) কথা এই যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলায় মুনাফিক ইহলৌকিক লাভ, যেমন মুসলমানদের ছেলে-মেয়ে, লেন-দেন, উত্তরাধিকারের মাল বন্টন এবং জান-মালের নিরাপত্তা ইত্যাদি পেয়ে যায়। কিন্তু তাদের অন্তরে ঈমান এবং তাদের কাজে সততা পাওয়া যায় না বলে মরণের সময় এসব লাভ ছিনিয়ে নেয়া হয়, যেমন আগুনের আলো যা নিভে যায়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অন্ধকারের মধ্যে ছেড়ে দেয়ার অর্থ মরণের পর শাস্তি হওয়া। কিন্তু পুনরায় স্বীয় কুফর ও নিফাকের কারণে সুপথ ও সত্যের উপর কায়েম থাকা তাদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়। সুদীর (রঃ) কথা এই যে, মরণের সময় মুনাফিকদের অসৎ কাজগুলি তাদের উপর অন্ধকারের মত ছেয়ে যায় এবং মঙ্গলের এমন কোন আলো তাদের উপর অবশিষ্ট থাকে না যা তাদের একত্ববাদের সত্যতা প্রমাণ করে। তারা সত্য শোনা হতে বধির, সঠিক পথ দেখা ও বুঝা হতে অন্ধ। তারা সঠিক পথের দিকে ফিরে যেতে পারে , তাদের এ সৌভাগ্যও হয় না, তার উপদেশও লাভ করতে পারে না।
আল-বাকারা 2:18
১৭-১৮ নং আয়াতের তাফসীর(আরবি) কে আরবীতে (আরবি) ও বলে। এর বহুবচন (আরবি) আসে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ এই দৃষ্টান্তগুলো আমি মানুষের জন্যে বর্ণনা করে থাকি, যেগুলো শুধু আলেমরাই বুঝে থাকে।' (২৯:৪৩) আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, যে মুনাফিকরা সঠিক পথের পরিবর্তে ভ্রান্তপথ এবং দৃষ্টির পরিবর্তে দৃষ্টিহীনতাকে ক্রয় করে থাকে, তাদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে অন্ধকারে আগুন জ্বালিয়েছে, তার ফলে আশে পাশের জিনিস তার চোখে পড়েছে। মনের উদ্বিগ্নতা দূর হয়ে উপকার লাভের আশার সঞ্চার হয়েছে, এমন সময়ে হঠাৎ আগুন নিভে গেছে এবং চারিদিক ভীষণ অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। কাজেই সে রাস্তা দেখেতে পাচ্ছে। এছাড়া লোকটি বধির, সে কারও কথা শুনতে পায় না, সে বোবা, তার কথা রাস্তার কোন লোককে জিজ্ঞেস করতেও পারে না, সে অন্ধ, আলোতেও সে কাজ চালাতে পারে না। এখন তাহলে সে পথ পাবে কি করে? মুনাফিকরা ঠিক তারই মত। সঠিক পথ ছেড়ে দিয়ে তারা পথ হারিয়ে ফেলেছে এবং ভাল ছেড়ে দিয়ে মন্দের কামনা করছে। এই উদাহরণে বুঝা যাচ্ছে যে, ঐসব লোক ঈমান ককূল করার পরে কুফরী করেছিল। যেমন কুরআন কারীমে কয়েক জায়গায় এটা স্পষ্টভাবে বিদ্যমান আছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরের মধ্যে সুদ্দী (রঃ) হতে এটাই নকল করেছেন, অতঃপর বলেছেন যে, এই তুলনা সম্পূর্ণরূপে সঠিক। কেননা, প্রথমে এই মুনাফিকরা ঈমানের আলো লাভ করেছিল। অতঃপর তাদের কপটতার ফলে তা নিভে গেছে এবং এর ফলে তারা অস্থির হয়ে পড়েছে, আর ধর্মের অস্থিরতার চেয়ে বড় অস্থিরতা আর কি হতে পারে? ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, যাদের এ উপমা বর্ণনা করা হয়েছে তাদের ভাগ্যে কখনও ঈমান লাভ ঘটেনি। কেননা ইতিপূর্বে আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যদিও তারা মুখে আল্লাহ তা'আলার উপর এবং কিয়ামতের উপর ঈমান আনার কথা বলছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ঈমানদার নয়। তবে সঠিক কথা এই যে, এই পবিত্র আয়াতে তাদের কুফরও নিফাকের সময়কার খবর দেয়া হয়েছে। এর দ্বারা এ অস্বীকৃতি বুঝায় না যে, এই কুফর ও নিফাকের অবস্থার পূর্বে তারা ঈমান এনেছিল। বরং হতে পারে যে, তারা ঈমান আনার পর তা হতে সরে পড়েছিল। অতঃপর তাদের অন্তরে মোহর করে দেয়া হয়েছে। যেমন কুরআন মাজীদে বলা হয়েছেঃ “এটা এজন্যে যে, তারা ঈমান এনেছে, অতঃপর কাফির হয়েছে, অতএব তাদের অন্তরে মোহর করে দেয়া হয়েছে, তারা কিছুই বুঝে। এই কারণে উপমায় আলো ও অন্ধকারের উল্লেখ আছে। অর্থাৎ ঈমানের কালেমা প্রকাশ করার কারণে দুনিয়ায় কিছু আলো হয়ে গেছে। কিন্তু অন্তরে কুফরী থাকার কারণে আখেরাতের অন্ধকার তাদেরকে ঘিরে নিয়েছে। একটি দলের উপমা একটি লোকের সঙ্গে প্রায়ই এসে থাকে। কুরআন পাকের অন্যস্থানে আছেঃ “তুমি তাদেরকে দেখবে যে, তারা চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তোমার দিকে দেখছে সেই ব্যক্তির মত যার উপর মরণের অজ্ঞানতা এসে গেছে। অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘তোমাদেরকে সৃষ্টি করা এবং মরণের পর পুনরুজ্জীবিত করা একটি প্রাণের মতই।' (৩১:২৮) অন্য জায়গায় আছেঃ যারা তাওরাত শিক্ষা করে কিন্তু সে অনুযায়ী কাজ করে না তাদের উপমায় বলা হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘গাধার মত-যে কিতাবসমূহের বোঝা বহন করে থাকে।' (৬২:৫) এইসব আয়াতে দলের উপমা একের সঙ্গে দেয়া হয়েছে। এ রকমই। উল্লিখিত আয়াতে মুনাফিক দলের উপমা একটি লোকের সঙ্গে দেয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, অনুমিত বাক্য হবে নিম্নরূপঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদের ঘটনার দৃষ্টান্ত ঐসব লোকের ঘটনার মত যারা আগুন জ্বালিয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, আগুন জ্বালায় তো একজন, কিন্তু এমন একটি দলের জন্যে জ্বালিয়ে থাকে যে দল তার সাথে রয়েছে। অন্য কেউ বলেন যে, এখানে (আরবি)-এর অর্থ (আরবি)হবে। যেমন কবিদের কবিতায়ও এরূপ আছে।আমি বলি যে, স্বয়ং এই উদাহরণেও তত একবচনের রূপের পরেই বহুবচনের রূপ এসেছে। যেমন (আরবি) এবং (আরবি) এভাবে বলায় ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে। আল্লাহ তাদের আলো ছিনিয়ে নিয়েছেন -এর অর্থ এই যে, যে আলো তাদের জন্যে উপকারী ছিল তা সরিয়ে নিয়েছেন এবং যেমনভাবে আগুন নিবে যাবার পর তা ধুয়া এবং অন্ধকার থেকে যায় দ্রুপ তাদের কাছে ক্ষতিকর জিনিস যেমন সন্দেহ, কুফর এবং নিফাক রয়ে গেছে, সুতরাং তারা নিজেরাও পথ দেখতে পায় না, অন্যের ভাল কথাও শুনতে পায় না এবং কারও কাছে প্রশ্নও করতে পারে না। এখন পুনরায় সঠিকপথে আসা অসম্ভব হয়ে গেছে। এর সমর্থনে মুফাসসিরগণের অনেক কথা রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় আগমনের পর কতকগুলো লোক ইসলাম গ্রহণ করে, কিন্তু পরে আবার মুনাফিক হয়ে যায়। তাদের উপমা এ লোকটির মত যে অন্ধকারে রয়েছে। অতঃপর আগুন জ্বালিয়ে আলো লাভ করছে এবং আশে পাশের ভালমন্দ জিনিস দেখতে পেয়েছে। আর কোন পথে কি আছে তা সবই জানতে পেরেছে। এমন সময় হঠাৎ আগুন নিভে গেছে, ফলে আলো হারিয়ে গেছে। এখন পথে কি আছে না আছে তা জানতে পারে না। ঠিক এরকমই মুনাফিকরা শিরক ও কুফরের অন্ধকারে ছিল। অতঃপর ঈমান এনে ভাল-মন্দ অর্থাৎ হারাম হালাল ইত্যাদি দেখতে থাকে। কিন্তু পুনরায় কাফির হয়ে যায় এবং তখন আর হারাম, হালাল, ভাল ও মন্দের মধ্যে কোন পার্থক্য করতে পারে না।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আলোর অর্থ ঈমান এবং অন্ধকারের অর্থ ভ্রান্তপথ ও কুফরী। এসব লোক সঠিক পথেই ছিল। কিন্তু আবার দুষ্টুমি করে ভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, হিদায়াত ও ঈমানদারীর দিকে মুখ করাকে উপমায় আশে পাশের জিনিসকে আলোকিত করার সঙ্গে তাবীর করা হয়েছে। হযরত আতা খুরাসানীর (রঃ) অভিমত এই যে, মুনাফিক কখনও কখনও ভাল জিনিস দেখে নেয় এবং চিনেও নেয়। কিন্তু আবার তার অন্তরের অন্ধত্ব তার উপর জয়যুক্ত হয়ে যায়। হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত আবদুর রহমান (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ), এবং রাবী (রঃ) হতেও এটাই নকল করা হয়েছে। হযরত আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেনঃ মুনাফিকদের। অবস্থা এটাই যে, তারা ঈমান আনে এবং তার পবিত্র আলোকে তাদের অন্তর উজ্জ্বল হয়ে উঠে, যেমন আগুন জ্বালালে তার আশে পাশের জিনিস আলোকিত হয়। কিন্তু আবার কুফরীর কারণে আলো শেষ হয়ে যায়, যেমন আলো নিভে গেলে অন্ধকার ছেয়ে যায়।আমাদের এসব কথা তো ঐ তাফসীরের সমর্থনে ছিল যে, যে মুনাফিকদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে তারা ঈমান এনেছিল, অতঃপর কুফরী করেছে। এখন ইমাম ইবনে জারীরের (রঃ) সমর্থনে যে তাফসীর রয়েছে তা নিম্নরূপঃ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এটা মুনাফিকদের দৃষ্টান্ত যে, তারা ইসলামের কারণে সম্মান পেয়ে যায়। মুসলমানদের মধ্যে বিয়ে চলতে থাকে। উত্তরাধিকার এবং গণীমতের মাল অংশ ইত্যাদি পেতে থাকে। কিন্তু মরণের সঙ্গে সঙ্গেই এ সম্মান হারিয়ে যায়। যেমন আগুনের আলো নিভে গেলেই শেষ হয়ে যায়। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, মুনাফিক যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করে তখন তার অন্তরে আলো সৃষ্টি হয়। অতঃপর যখনই সন্দেহ করে তখনই তা চলে যায়। যেমনভাবে কাঠ যতক্ষণ জ্বলতে থাকে ততক্ষণ আলো থাকে, যেমনই নিভে যায় তেমনিই তা শেষ হয়ে যায়। হযরত কাতাদার (রঃ) কথা এই যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলায় মুনাফিক ইহলৌকিক লাভ, যেমন মুসলমানদের ছেলে-মেয়ে, লেন-দেন, উত্তরাধিকারের মাল বন্টন এবং জান-মালের নিরাপত্তা ইত্যাদি পেয়ে যায়। কিন্তু তাদের অন্তরে ঈমান এবং তাদের কাজে সততা পাওয়া যায় না বলে মরণের সময় এসব লাভ ছিনিয়ে নেয়া হয়, যেমন আগুনের আলো যা নিভে যায়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অন্ধকারের মধ্যে ছেড়ে দেয়ার অর্থ মরণের পর শাস্তি হওয়া। কিন্তু পুনরায় স্বীয় কুফর ও নিফাকের কারণে সুপথ ও সত্যের উপর কায়েম থাকা তাদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়। সুদীর (রঃ) কথা এই যে, মরণের সময় মুনাফিকদের অসৎ কাজগুলি তাদের উপর অন্ধকারের মত ছেয়ে যায় এবং মঙ্গলের এমন কোন আলো তাদের উপর অবশিষ্ট থাকে না যা তাদের একত্ববাদের সত্যতা প্রমাণ করে। তারা সত্য শোনা হতে বধির, সঠিক পথ দেখা ও বুঝা হতে অন্ধ। তারা সঠিক পথের দিকে ফিরে যেতে পারে , তাদের এ সৌভাগ্যও হয় না, তার উপদেশও লাভ করতে পারে না।
আল-বাকারা 2:19
১৯-২০ নং আয়াতের তাফসীরএটা দ্বিতীয় উদাহরণ যা দ্বিতীয় প্রকারের মুনাফিকদের জন্যে বর্ণনা করা হয়েছে। এরা সেই সম্প্রদায় যাদের নিকট কখনও সত্য প্রকাশ পেয়ে থাকে। এবং কখনও সন্দেহে পতিত হয়। সন্দেহের সময় তাদের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মত (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে বৃষ্টিপাত ও বর্ষণ। কেউ কেউ এর অর্থ মেঘও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু খুব প্রসিদ্ধ অর্থ হচ্ছে বৃষ্টি বা অন্ধকারে বর্ষে। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সন্দেহ, কুফর ও নিফাক। (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে বজ্র, যা ভয়ংকর শব্দের দ্বারা অন্তর কাঁপিয়ে তোলে। মুনাফিকের অবস্থাও ঠিক এইরূপ। সব সময় তার মনে ভয়, সন্ত্রাস ও উদ্বেগ থাকে। যেমন কুরআন মজীদের এক জায়গায় আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ প্রত্যেক শব্দকে তারা নিজেদের উপরই মনে করে থাকে।' (৬৩:৪) অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ “এই মুনাফিকরা শপথ করে বলে থাকে যে, তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ভীত লোক, যদি তারা কোন আশ্রয়স্থল পথ পায় তবে নিশ্চয়ই কুঞ্চিত হয়ে সেখানেই প্রবেশ করবে। বিদ্যুতের সঙ্গে সেই ঈমানের আলোর তুলনা করা হয়েছে যা কখনও কখনও তাদের অন্তরে উজ্জ্বল হয়ে উঠে, সে সময়ে তারা মরণের ভয়ে তাদের অঙ্গুলিগুলো কানের মধ্যে ভরে দেয়, কিন্তু ওটা তাদের কোন উপকারে আসে। এরা আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও ইচ্ছার অধীন রয়েছে। সুতরাং এরা বাঁচতে পারে না। আল্লাহ তাআলা এক জায়গায় বলেছেনঃ তোমাদের নিকট কি ঐ সেনাবাহিনীর কাহিনী পৌঁছেছে, অর্থাৎ ফিরআউন ও সামূদের? বরং কাফিরেরা অবিশ্বাস করার মধ্যে রয়েছে। আর আল্লাহ তাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে রয়েছেন। বিদ্যুতের চক্ষুকে কেড়ে নেয়ার অর্থ হচ্ছে তার শক্তি ও কাঠিন্য এবং ঐ মুনাফিকদের দৃষ্টি শক্তিতে দুর্বলতার অর্থ হচ্ছে তাদের ঈমানের দুর্বলতা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেনঃ এর ভাবার্থ এই যে, কুরআন মাজীদের মজবুত আয়াতগুলো ঐ মুনাফিকদের প্রকৃত অবস্থা খুলে দেবে ও তাদের গোপনীয় দোষ প্রকাশ করবে এবং আপন ঔজ্জ্বল্যের দ্বারা তাদেরকে হতভম্ব করে দেবে। যখন তাদের উপর অন্ধকার ছেয়ে যায় তখন তারা দাড়িয়ে যায়, অর্থাৎ যখন তাদের ঈমান প্রকাশ পায় তখন তাদের অন্তর কিছু উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং তারা এর অনুসরণ করতে থাকে। কিন্তু যেমনই সংশয় ও সন্দেহের উদ্রেক হয় তেমনই অন্তরের মধ্যে অন্ধকার ছেয়ে যায় এবং তখন সে হয়রান পেরেশান হয়ে যায়। এর ভাব এও হতে পারে যে, যখন ইসলামের কিছুটা উন্নতি সাধিত হয়, তখন তাদের মনে কিছুটা স্থিরতা আসে, কিন্তু যখনই ওর বিপরীত পরিলক্ষিত হয় তখনই তারা কুফরীর দিকে ফিরে যায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ কতকগুলো লোক এমনও আছে যারা প্রান্তে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করতে থাকে অতঃপর মঙ্গল পৌছলে স্থির থাকে এবং অমঙ্গল পৌছলে তৎক্ষণাৎ ফিরে যায়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তাদের আলোতে চলার অর্থ হচ্ছে সত্যকে জেনে ইসলামের কালেমা পাঠ করা এবং অন্ধকারে থেমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে কুফরীর দিকে ফিরে যাওয়া। আরও বহু মুফাসসিরেরও এটাই মত আর সবচেয়ে বেশী সঠিক ও স্পষ্টও হচ্ছে এটাই। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কিয়ামতের দিনেও তাদের এই অবস্থা হবে যে, যখন লোকদেরকে তাদের ঈমানের পরিমাপ অনুযায়ী আলো দেয়া হবে, কেউ পাবে বহু মাইল পর্যন্ত, কেউ কেউ তারও বেশী, কেউ তার চেয়ে কম, এমনকি শেষ পর্যন্ত কেউ এতটুকু পাবে যে, কখনও আলোকিত হবে এবং কখনও অন্ধকার। কিছু লোকে এমনও হবে যে, তারা একটু দূরে গিয়েই থেমে যাবে, আবার কিছু দূর পর্যন্ত আলো পাবে, আবার নিবে যাবে। আবার কতকগুলো এমন দুর্ভাগা লোকও হবে যে, তাদের আলো সম্পূর্ণ রূপে নিভে যাবে। এরাই হবে পূর্ণ মুনাফিক, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার ফরমান রয়েছেঃ “যেদিন মুনাফিক নর ও নারী ঈমানদারগণকে ডাক দিয়ে বলবে-একটু থামো, আমাদেরকেও আসতে দাও যেন আমরাও তোমাদের আলো দ্বারা উপকৃত হই,তখন বলা হবে, তোমাদের পিছনে ফিরে যাও এবং আলো অনুসন্ধান কর।' মুমিন নারী ও পুরুষের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, সেইদিন তুমি মুমিন পুরুষ ও নারীর সামনে ও ডানে আলো দেখতে পাবে এবং তাদেরকে বলা হবে-আজকে তোমাদের জন্য বেহেশতের সুসংবাদ, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হচ্ছে। আল্লাহ পাক আরও বলেনঃ “যেদিন আল্লাহ তা'আলা নবী (সঃ) কে, মুমিনগণকে অপমানিত করবেন না। তাদের সামনে ও ডানে আলো থাকবে এবং তারা বলতে থাকবে-হে আমাদের প্রভু! আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন! নিশ্চয়ই আপনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। এই আয়াতসমূহের পর নিম্নের এ বিষয়ের হাদীসগুলিও উল্লেখযোগ্যঃ নবী (সঃ) বলেছেন, মুমিনদের কেউ কেউ মদীনা হতে আদন পর্যন্ত আলো পাবে। কেউ কেউ তার চেয়ে কম পাবে। এমনকি কেউ কেউ এত কম পাবে যে, শুধুমাত্র পা রাখার জায়গা পর্যন্ত আলোকিত হবে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ মুমিনগণকে তাদের আমলের পরিমাপ অনুযায়ী আলো দেয়া হবে। কেউ কেউ পাবে খেজুর গাছের সমান জায়গা ব্যাপী, কেউ পাবে হযরত আদমের (আঃ) পায়ের সমান স্থান ব্যাপী, কেউ কেউ শুধু এতটুকু পাবে যে, তার বৃদ্ধাঙ্গুলি মাত্র আলোকিত হবে কখনও জ্বলে উঠবে আবার কখনও নিবে যাবে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, আমল অনুযায়ী তারা আলো পাবে, সেই আলোতে তারা পুলসিরাত অতিক্রম করবে। কোন কোন লোকের নূর পাহাড়ের সমান হবে, কারও হবে খেজুর গাছের সমান, আর সবচেয়ে ছোট নূর ঐ লোকটার হবে, যার শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলির উপর নূর থাকবে। ওটা কখনও জ্বলে উঠবে এবং কখনও নিভে যাবে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন সমস্ত একত্ববাদীকে নূর দেয়া হবে। যখন মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে তখন একত্ববাদীরা ভয় পেয়ে বলবেঃ “ হে আল্লাহ! আমাদের নরকে পূর্ণ করে দিন। (মুসনাদ-ই- ইবনে আবি হাতিম)। যহহাক বিন মাযাহিমেরও (রঃ) এটাই মত। এ হাদীসসমূহ দ্বারা বুঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন কয়েক প্রকারের লোক হবেঃ (১) খাটি মুমিন যাদের বর্ণনা পূর্বের চারটি আয়াতে হয়েছে। (২) আঁটি কাফির, যার বর্ণনা তার পরবর্তী দু'টি আয়াতে হয়েছে। (৩) মুনাফিক-এদের আবার দু'টি ভাগ আছে। প্রথম হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক যাদের উপমা আগুনের আলো দিয়ে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় হচ্ছে সেই মুনাফিক যারা সন্দেহের মধ্যে আছে। কখনও ঈমানের আলো জ্বলে, কখনও নিভে যায়। তাদের উপমা বৃষ্টির সঙ্গে দেয়া হয়েছে। এরা প্রথম প্রকারের মুনাফিক হতে কিছু কম দোষী। ঠিক এই ভাবেই সূরা-ই নূরের মধ্যেও আল্লাহ তা'আলা মুমিনের ও তার অন্তরের আলোর উপমা সেই উজ্জ্বল প্রদীপের সঙ্গে দিয়েছেন যা উজ্জ্বল চিমনীর মধ্যে থাকে এবং স্বয়ং চিমনিও উজ্জ্বল তারকার মত হয়। যেহেতু একেতো স্বয়ং ঈমানদারের অন্তর উজ্জ্বল, দ্বিতীয়তঃ খাটি শরীয়ত দিয়ে তাকে সাহায্য করা হয়েছে। সুতরাং এ হচ্ছে নূরের উপর নূর। এভাবেই অন্য স্থানে কাফেরদের উপমাও তিনি বর্ণনা করেছেন যারা মূর্খতা বশতঃ নিজেদেরকে অন্য কিছু একটা মনে করে, অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা কিছুই নয়। তিনি বলেছেনঃ “ঐ কাফিরদের কার্যাবলীর দৃষ্টান্ত সেই মরীচিকার ন্যায় যাকে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে। শেষ পর্যন্ত কাছে এসে দেখে, কিন্তু কিছুই পায় না। অন্যস্থানে ঐ কাফিরদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন যারা খাঁটি মূর্খতায় জড়িত হয়ে পড়েছে। বলছেন যে, তারা গভীর সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকারের মত যে সমুদ্রে ঢেউ এর পর ঢেউ খেলছে আবার আকাশ মেঘে ঢাকা রয়েছে এবং অন্ধকার ছেয়ে গেছে, এমনকি নিজের হাত পর্যন্ত দেখা যায় না। আসল কথা এই যে, যার জন্যে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নূর থাকে না সে নুর পাবে কোথায়? সুতরাং কাফেরদেরও দুটি ভাগ হলো। প্রথম হলো ওরাই যারা অন্যদেরকে কুফরীর দিকে আহ্বান করে এবং দ্বিতীয় হচ্ছে যারা তাদেরকে অনুকরণ করে থাকে। যেমন সূরা-ই-হজ্জের প্রথমে রয়েছেঃ কতক লোকে এমন আছে যারা অজ্ঞানতা সত্ত্বেও আল্লাহ সম্বন্ধে ঝগড়া করে এবং প্রত্যেক দুষ্ট শয়তানের অনুকরণ করে থাকে। আর এক জায়গায় আছেঃ কতকগুলো লোক জ্ঞান, সঠিক পথ এবং উজ্জ্বল কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্বন্ধে ঝগড়া করে থাকে। সূরাই ওয়াকিয়ার প্রথমে ও শেষে এবং সূরা-ই নিসার মধ্যে মুমিনদেরও দুই প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে। তারা হচ্ছে সাবেকিন ও আসহাব-ই ইয়ামীন অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী এবং পরহেযগার ও সৎ ব্যক্তিগণ। সুতরাং এ আয়াতসমূহ দ্বারা জানা গেল যে, মুমিনদের দু’টি দল-আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী ও সৎ। কাফিরদেরও দু’টি দল-কুফরের দিকে আহ্বানকারী ও তাদের অনুসরণকারী। মুনাফিকদেরও দু'টি ভাগ-খাঁটি ও পাকা মুনাফিক এবং সেই মুনাফিক যাদের মধ্যে নিফাকের এক আধটি শাখা আছে।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার মধ্যে তিনটি অভ্যাস আছে সে পাকা মুনাফিক। আর যার মধ্যে একটি আছে তার মধ্যে নিফাকের একটি অভ্যাস আছে যে পর্যন্ত না সে তা পরিত্যাগ করে। (তিনটি অভ্যাস হচ্ছে কথা বলার সময় মিথ্যাবলা, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা এবং গচ্ছিত দ্রব্য আত্মসাৎ করা)। এর দ্বারা সাব্যস্ত হলো যে, কখনও কখনও মানুষের মধ্যে নিফাকের কিছু অংশ থাকে। তা কার্য সম্বন্ধীয়ই হোক বা বিশ্বাস সম্বন্ধীয়ই থাকে। যেমন আয়াত ও হাদীস দ্বারা জানা গেল। পূর্ববর্তী একটি জামা'আত এবং উলামা-ই-কিরামের একটি দলেরও এটাই মাযহাব। এর বর্ণনা পূর্বে হয়ে গেছে এবং আগামীতে হবে ইনশাআল্লাহ।মুসনাদ-ই-আহমাদে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘অন্তর চার প্রকারঃ (১) সেই পরিষ্কার অন্তর যা উজ্জ্বল প্রদীপের মত ঝলমল করে। (২) ঐ অন্তর যা পর্দায় ঢাকা থাকে। (৩) উল্টো অন্তর এবং (৪) মিশ্রিত অন্তর। প্রথমটি হচ্ছে মুমিনের অন্তর যা পূর্ণভাবে উজ্জ্বল। দ্বিতীয়টা কাফিরের অন্তর যার উপর পর্দা পড়ে রয়েছে। তৃতীয়টি খাঁটি মুনাফিকের অন্তর যা জেনে শুনে অস্বীকার করে এবং ৪র্থটি হচ্ছে মুনাফিকের অন্তর যার মধ্যে ঈমান ও নিফাক। এ দুটোর সংমিশ্রণ রয়েছে। ঈমানের দৃষ্টান্ত সেই সবুজ উদ্ভিদের মত যা নির্মল পানি দ্বারা বেড়ে ওঠে। নিফাকের উপমা ঐ ফোড়ার ন্যায় যার মধ্যে রক্ত ও পুঁজ বাড়তে থাকে। এখন যে মূল বেড়ে যায়, তার প্রভাব অন্যের উপর পড়ে থাকে। এই হাদীসটি সনদ হিসেবে খুবই মজবুত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কান ও চক্ষু ধ্বংস করে দেবেন। ভাবার্থ এই যে, তারা যখন সত্যকে জেনে ছেড়ে দিয়েছে, তাহলে তাদের জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। অর্থাৎ তিনি ইচ্ছে করলে শাস্তি দেবেন বা ক্ষমা করে দেবেন।এখানে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদেরকে তার শাস্তি ও মহা শক্তির ভয় দেখাবার জন্যেই কাদীর' শব্দ ব্যবহার করেছেন। এখানে (আরবি)-এর অর্থে (আরবি)শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন (আরবি)-এর অর্থে (আরবি)শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইমাম ইবনে জারীর বলেন যে, এই দু’টি উদাহরণ হচ্ছে একই প্রকারের মুনাফিকের জন্যে (আরবি) এখানে (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ‘এবং অর্থে। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তাদের অন্তর্গত কোন ফাসিক ও কাফির ব্যক্তির অনুসরণ করো না। (৭৬:২৪) কিংবা (আরবি) শব্দটি ইখতিয়ার’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, অর্থাৎ এই দৃষ্টান্ত বর্ণনা কর অথবা ঐ দৃষ্টান্ত বর্ণনা কর। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, (আরবি)এখানে সমান অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আরবী বাক পদ্ধতি আছেঃ (আরবি)যামাখশারী (রঃ) এই ব্যাখ্যাই দিয়েছেন। তাহলে অর্থ হবে যে, দৃষ্টান্তসমূহের মধ্যে যা চাও তাই বর্ণনা কর, দুটোই তাদের অবস্থার অনুরূপ হবে। কিন্তু আমাদের ধারণা এই যে, এটা মুনাফিকদের শ্রেণী হিসেবে এসেছে, তাদের অবস্থা ও বিশেষণ বিভিন্ন প্রকারের। যেমন সূরা-ই-বারাআতের মধ্যে (আরবি) এবং (আরবি) করে করে তাদের অনেক শ্রেণী অনেক কাজ এবং অনেক কথার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। দুটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে দু’প্রকার মুনাফিকের যা তাদের অবস্থা ও গুণাবলীর সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন সূরা-ই-নূরের মধ্যে দুই প্রকারের কাফিরের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম প্রকার হচ্ছে কুফরীর দিকে আহ্বানকারী এবং দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে তাদের অনুসরণকারী। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।
আল-বাকারা 2:20
১৯-২০ নং আয়াতের তাফসীরএটা দ্বিতীয় উদাহরণ যা দ্বিতীয় প্রকারের মুনাফিকদের জন্যে বর্ণনা করা হয়েছে। এরা সেই সম্প্রদায় যাদের নিকট কখনও সত্য প্রকাশ পেয়ে থাকে। এবং কখনও সন্দেহে পতিত হয়। সন্দেহের সময় তাদের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মত (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে বৃষ্টিপাত ও বর্ষণ। কেউ কেউ এর অর্থ মেঘও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু খুব প্রসিদ্ধ অর্থ হচ্ছে বৃষ্টি বা অন্ধকারে বর্ষে। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সন্দেহ, কুফর ও নিফাক। (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে বজ্র, যা ভয়ংকর শব্দের দ্বারা অন্তর কাঁপিয়ে তোলে। মুনাফিকের অবস্থাও ঠিক এইরূপ। সব সময় তার মনে ভয়, সন্ত্রাস ও উদ্বেগ থাকে। যেমন কুরআন মজীদের এক জায়গায় আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ প্রত্যেক শব্দকে তারা নিজেদের উপরই মনে করে থাকে।' (৬৩:৪) অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ “এই মুনাফিকরা শপথ করে বলে থাকে যে, তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ভীত লোক, যদি তারা কোন আশ্রয়স্থল পথ পায় তবে নিশ্চয়ই কুঞ্চিত হয়ে সেখানেই প্রবেশ করবে। বিদ্যুতের সঙ্গে সেই ঈমানের আলোর তুলনা করা হয়েছে যা কখনও কখনও তাদের অন্তরে উজ্জ্বল হয়ে উঠে, সে সময়ে তারা মরণের ভয়ে তাদের অঙ্গুলিগুলো কানের মধ্যে ভরে দেয়, কিন্তু ওটা তাদের কোন উপকারে আসে। এরা আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও ইচ্ছার অধীন রয়েছে। সুতরাং এরা বাঁচতে পারে না। আল্লাহ তাআলা এক জায়গায় বলেছেনঃ তোমাদের নিকট কি ঐ সেনাবাহিনীর কাহিনী পৌঁছেছে, অর্থাৎ ফিরআউন ও সামূদের? বরং কাফিরেরা অবিশ্বাস করার মধ্যে রয়েছে। আর আল্লাহ তাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে রয়েছেন। বিদ্যুতের চক্ষুকে কেড়ে নেয়ার অর্থ হচ্ছে তার শক্তি ও কাঠিন্য এবং ঐ মুনাফিকদের দৃষ্টি শক্তিতে দুর্বলতার অর্থ হচ্ছে তাদের ঈমানের দুর্বলতা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেনঃ এর ভাবার্থ এই যে, কুরআন মাজীদের মজবুত আয়াতগুলো ঐ মুনাফিকদের প্রকৃত অবস্থা খুলে দেবে ও তাদের গোপনীয় দোষ প্রকাশ করবে এবং আপন ঔজ্জ্বল্যের দ্বারা তাদেরকে হতভম্ব করে দেবে। যখন তাদের উপর অন্ধকার ছেয়ে যায় তখন তারা দাড়িয়ে যায়, অর্থাৎ যখন তাদের ঈমান প্রকাশ পায় তখন তাদের অন্তর কিছু উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং তারা এর অনুসরণ করতে থাকে। কিন্তু যেমনই সংশয় ও সন্দেহের উদ্রেক হয় তেমনই অন্তরের মধ্যে অন্ধকার ছেয়ে যায় এবং তখন সে হয়রান পেরেশান হয়ে যায়। এর ভাব এও হতে পারে যে, যখন ইসলামের কিছুটা উন্নতি সাধিত হয়, তখন তাদের মনে কিছুটা স্থিরতা আসে, কিন্তু যখনই ওর বিপরীত পরিলক্ষিত হয় তখনই তারা কুফরীর দিকে ফিরে যায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ কতকগুলো লোক এমনও আছে যারা প্রান্তে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করতে থাকে অতঃপর মঙ্গল পৌছলে স্থির থাকে এবং অমঙ্গল পৌছলে তৎক্ষণাৎ ফিরে যায়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তাদের আলোতে চলার অর্থ হচ্ছে সত্যকে জেনে ইসলামের কালেমা পাঠ করা এবং অন্ধকারে থেমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে কুফরীর দিকে ফিরে যাওয়া। আরও বহু মুফাসসিরেরও এটাই মত আর সবচেয়ে বেশী সঠিক ও স্পষ্টও হচ্ছে এটাই। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কিয়ামতের দিনেও তাদের এই অবস্থা হবে যে, যখন লোকদেরকে তাদের ঈমানের পরিমাপ অনুযায়ী আলো দেয়া হবে, কেউ পাবে বহু মাইল পর্যন্ত, কেউ কেউ তারও বেশী, কেউ তার চেয়ে কম, এমনকি শেষ পর্যন্ত কেউ এতটুকু পাবে যে, কখনও আলোকিত হবে এবং কখনও অন্ধকার। কিছু লোকে এমনও হবে যে, তারা একটু দূরে গিয়েই থেমে যাবে, আবার কিছু দূর পর্যন্ত আলো পাবে, আবার নিবে যাবে। আবার কতকগুলো এমন দুর্ভাগা লোকও হবে যে, তাদের আলো সম্পূর্ণ রূপে নিভে যাবে। এরাই হবে পূর্ণ মুনাফিক, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার ফরমান রয়েছেঃ “যেদিন মুনাফিক নর ও নারী ঈমানদারগণকে ডাক দিয়ে বলবে-একটু থামো, আমাদেরকেও আসতে দাও যেন আমরাও তোমাদের আলো দ্বারা উপকৃত হই,তখন বলা হবে, তোমাদের পিছনে ফিরে যাও এবং আলো অনুসন্ধান কর।' মুমিন নারী ও পুরুষের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, সেইদিন তুমি মুমিন পুরুষ ও নারীর সামনে ও ডানে আলো দেখতে পাবে এবং তাদেরকে বলা হবে-আজকে তোমাদের জন্য বেহেশতের সুসংবাদ, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হচ্ছে। আল্লাহ পাক আরও বলেনঃ “যেদিন আল্লাহ তা'আলা নবী (সঃ) কে, মুমিনগণকে অপমানিত করবেন না। তাদের সামনে ও ডানে আলো থাকবে এবং তারা বলতে থাকবে-হে আমাদের প্রভু! আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন! নিশ্চয়ই আপনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। এই আয়াতসমূহের পর নিম্নের এ বিষয়ের হাদীসগুলিও উল্লেখযোগ্যঃ নবী (সঃ) বলেছেন, মুমিনদের কেউ কেউ মদীনা হতে আদন পর্যন্ত আলো পাবে। কেউ কেউ তার চেয়ে কম পাবে। এমনকি কেউ কেউ এত কম পাবে যে, শুধুমাত্র পা রাখার জায়গা পর্যন্ত আলোকিত হবে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ মুমিনগণকে তাদের আমলের পরিমাপ অনুযায়ী আলো দেয়া হবে। কেউ কেউ পাবে খেজুর গাছের সমান জায়গা ব্যাপী, কেউ পাবে হযরত আদমের (আঃ) পায়ের সমান স্থান ব্যাপী, কেউ কেউ শুধু এতটুকু পাবে যে, তার বৃদ্ধাঙ্গুলি মাত্র আলোকিত হবে কখনও জ্বলে উঠবে আবার কখনও নিবে যাবে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, আমল অনুযায়ী তারা আলো পাবে, সেই আলোতে তারা পুলসিরাত অতিক্রম করবে। কোন কোন লোকের নূর পাহাড়ের সমান হবে, কারও হবে খেজুর গাছের সমান, আর সবচেয়ে ছোট নূর ঐ লোকটার হবে, যার শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলির উপর নূর থাকবে। ওটা কখনও জ্বলে উঠবে এবং কখনও নিভে যাবে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন সমস্ত একত্ববাদীকে নূর দেয়া হবে। যখন মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে তখন একত্ববাদীরা ভয় পেয়ে বলবেঃ “ হে আল্লাহ! আমাদের নরকে পূর্ণ করে দিন। (মুসনাদ-ই- ইবনে আবি হাতিম)। যহহাক বিন মাযাহিমেরও (রঃ) এটাই মত। এ হাদীসসমূহ দ্বারা বুঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন কয়েক প্রকারের লোক হবেঃ (১) খাটি মুমিন যাদের বর্ণনা পূর্বের চারটি আয়াতে হয়েছে। (২) আঁটি কাফির, যার বর্ণনা তার পরবর্তী দু'টি আয়াতে হয়েছে। (৩) মুনাফিক-এদের আবার দু'টি ভাগ আছে। প্রথম হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক যাদের উপমা আগুনের আলো দিয়ে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় হচ্ছে সেই মুনাফিক যারা সন্দেহের মধ্যে আছে। কখনও ঈমানের আলো জ্বলে, কখনও নিভে যায়। তাদের উপমা বৃষ্টির সঙ্গে দেয়া হয়েছে। এরা প্রথম প্রকারের মুনাফিক হতে কিছু কম দোষী। ঠিক এই ভাবেই সূরা-ই নূরের মধ্যেও আল্লাহ তা'আলা মুমিনের ও তার অন্তরের আলোর উপমা সেই উজ্জ্বল প্রদীপের সঙ্গে দিয়েছেন যা উজ্জ্বল চিমনীর মধ্যে থাকে এবং স্বয়ং চিমনিও উজ্জ্বল তারকার মত হয়। যেহেতু একেতো স্বয়ং ঈমানদারের অন্তর উজ্জ্বল, দ্বিতীয়তঃ খাটি শরীয়ত দিয়ে তাকে সাহায্য করা হয়েছে। সুতরাং এ হচ্ছে নূরের উপর নূর। এভাবেই অন্য স্থানে কাফেরদের উপমাও তিনি বর্ণনা করেছেন যারা মূর্খতা বশতঃ নিজেদেরকে অন্য কিছু একটা মনে করে, অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা কিছুই নয়। তিনি বলেছেনঃ “ঐ কাফিরদের কার্যাবলীর দৃষ্টান্ত সেই মরীচিকার ন্যায় যাকে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে। শেষ পর্যন্ত কাছে এসে দেখে, কিন্তু কিছুই পায় না। অন্যস্থানে ঐ কাফিরদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন যারা খাঁটি মূর্খতায় জড়িত হয়ে পড়েছে। বলছেন যে, তারা গভীর সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকারের মত যে সমুদ্রে ঢেউ এর পর ঢেউ খেলছে আবার আকাশ মেঘে ঢাকা রয়েছে এবং অন্ধকার ছেয়ে গেছে, এমনকি নিজের হাত পর্যন্ত দেখা যায় না। আসল কথা এই যে, যার জন্যে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নূর থাকে না সে নুর পাবে কোথায়? সুতরাং কাফেরদেরও দুটি ভাগ হলো। প্রথম হলো ওরাই যারা অন্যদেরকে কুফরীর দিকে আহ্বান করে এবং দ্বিতীয় হচ্ছে যারা তাদেরকে অনুকরণ করে থাকে। যেমন সূরা-ই-হজ্জের প্রথমে রয়েছেঃ কতক লোকে এমন আছে যারা অজ্ঞানতা সত্ত্বেও আল্লাহ সম্বন্ধে ঝগড়া করে এবং প্রত্যেক দুষ্ট শয়তানের অনুকরণ করে থাকে। আর এক জায়গায় আছেঃ কতকগুলো লোক জ্ঞান, সঠিক পথ এবং উজ্জ্বল কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্বন্ধে ঝগড়া করে থাকে। সূরাই ওয়াকিয়ার প্রথমে ও শেষে এবং সূরা-ই নিসার মধ্যে মুমিনদেরও দুই প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে। তারা হচ্ছে সাবেকিন ও আসহাব-ই ইয়ামীন অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী এবং পরহেযগার ও সৎ ব্যক্তিগণ। সুতরাং এ আয়াতসমূহ দ্বারা জানা গেল যে, মুমিনদের দু’টি দল-আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী ও সৎ। কাফিরদেরও দু’টি দল-কুফরের দিকে আহ্বানকারী ও তাদের অনুসরণকারী। মুনাফিকদেরও দু'টি ভাগ-খাঁটি ও পাকা মুনাফিক এবং সেই মুনাফিক যাদের মধ্যে নিফাকের এক আধটি শাখা আছে।সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার মধ্যে তিনটি অভ্যাস আছে সে পাকা মুনাফিক। আর যার মধ্যে একটি আছে তার মধ্যে নিফাকের একটি অভ্যাস আছে যে পর্যন্ত না সে তা পরিত্যাগ করে। (তিনটি অভ্যাস হচ্ছে কথা বলার সময় মিথ্যাবলা, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা এবং গচ্ছিত দ্রব্য আত্মসাৎ করা)। এর দ্বারা সাব্যস্ত হলো যে, কখনও কখনও মানুষের মধ্যে নিফাকের কিছু অংশ থাকে। তা কার্য সম্বন্ধীয়ই হোক বা বিশ্বাস সম্বন্ধীয়ই থাকে। যেমন আয়াত ও হাদীস দ্বারা জানা গেল। পূর্ববর্তী একটি জামা'আত এবং উলামা-ই-কিরামের একটি দলেরও এটাই মাযহাব। এর বর্ণনা পূর্বে হয়ে গেছে এবং আগামীতে হবে ইনশাআল্লাহ।মুসনাদ-ই-আহমাদে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘অন্তর চার প্রকারঃ (১) সেই পরিষ্কার অন্তর যা উজ্জ্বল প্রদীপের মত ঝলমল করে। (২) ঐ অন্তর যা পর্দায় ঢাকা থাকে। (৩) উল্টো অন্তর এবং (৪) মিশ্রিত অন্তর। প্রথমটি হচ্ছে মুমিনের অন্তর যা পূর্ণভাবে উজ্জ্বল। দ্বিতীয়টা কাফিরের অন্তর যার উপর পর্দা পড়ে রয়েছে। তৃতীয়টি খাঁটি মুনাফিকের অন্তর যা জেনে শুনে অস্বীকার করে এবং ৪র্থটি হচ্ছে মুনাফিকের অন্তর যার মধ্যে ঈমান ও নিফাক। এ দুটোর সংমিশ্রণ রয়েছে। ঈমানের দৃষ্টান্ত সেই সবুজ উদ্ভিদের মত যা নির্মল পানি দ্বারা বেড়ে ওঠে। নিফাকের উপমা ঐ ফোড়ার ন্যায় যার মধ্যে রক্ত ও পুঁজ বাড়তে থাকে। এখন যে মূল বেড়ে যায়, তার প্রভাব অন্যের উপর পড়ে থাকে। এই হাদীসটি সনদ হিসেবে খুবই মজবুত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কান ও চক্ষু ধ্বংস করে দেবেন। ভাবার্থ এই যে, তারা যখন সত্যকে জেনে ছেড়ে দিয়েছে, তাহলে তাদের জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। অর্থাৎ তিনি ইচ্ছে করলে শাস্তি দেবেন বা ক্ষমা করে দেবেন।এখানে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদেরকে তার শাস্তি ও মহা শক্তির ভয় দেখাবার জন্যেই কাদীর' শব্দ ব্যবহার করেছেন। এখানে (আরবি)-এর অর্থে (আরবি)শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন (আরবি)-এর অর্থে (আরবি)শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইমাম ইবনে জারীর বলেন যে, এই দু’টি উদাহরণ হচ্ছে একই প্রকারের মুনাফিকের জন্যে (আরবি) এখানে (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ‘এবং অর্থে। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তাদের অন্তর্গত কোন ফাসিক ও কাফির ব্যক্তির অনুসরণ করো না। (৭৬:২৪) কিংবা (আরবি) শব্দটি ইখতিয়ার’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, অর্থাৎ এই দৃষ্টান্ত বর্ণনা কর অথবা ঐ দৃষ্টান্ত বর্ণনা কর। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, (আরবি)এখানে সমান অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আরবী বাক পদ্ধতি আছেঃ (আরবি)যামাখশারী (রঃ) এই ব্যাখ্যাই দিয়েছেন। তাহলে অর্থ হবে যে, দৃষ্টান্তসমূহের মধ্যে যা চাও তাই বর্ণনা কর, দুটোই তাদের অবস্থার অনুরূপ হবে। কিন্তু আমাদের ধারণা এই যে, এটা মুনাফিকদের শ্রেণী হিসেবে এসেছে, তাদের অবস্থা ও বিশেষণ বিভিন্ন প্রকারের। যেমন সূরা-ই-বারাআতের মধ্যে (আরবি) এবং (আরবি) করে করে তাদের অনেক শ্রেণী অনেক কাজ এবং অনেক কথার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। দুটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে দু’প্রকার মুনাফিকের যা তাদের অবস্থা ও গুণাবলীর সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন সূরা-ই-নূরের মধ্যে দুই প্রকারের কাফিরের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম প্রকার হচ্ছে কুফরীর দিকে আহ্বানকারী এবং দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে তাদের অনুসরণকারী। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।