Tafseer ibn Kathir — আল-বাকারা 2:21 – আল-বাকারা 2:70
Contents
- আল-বাকারা 2:21
- আল-বাকারা 2:22
- আল-বাকারা 2:23
- আল-বাকারা 2:24
- আল-বাকারা 2:25
- আল-বাকারা 2:26
- আল-বাকারা 2:27
- আল-বাকারা 2:28
- আল-বাকারা 2:29
- আল-বাকারা 2:30
- আল-বাকারা 2:31
- আল-বাকারা 2:32
- আল-বাকারা 2:33
- আল-বাকারা 2:34
- আল-বাকারা 2:35
- আল-বাকারা 2:36
- আল-বাকারা 2:37
- আল-বাকারা 2:38
- আল-বাকারা 2:39
- আল-বাকারা 2:40
- আল-বাকারা 2:41
- আল-বাকারা 2:42
- আল-বাকারা 2:43
- আল-বাকারা 2:44
- আল-বাকারা 2:45
- আল-বাকারা 2:46
- আল-বাকারা 2:47
- আল-বাকারা 2:48
- আল-বাকারা 2:49
- আল-বাকারা 2:50
- আল-বাকারা 2:51
- আল-বাকারা 2:52
- আল-বাকারা 2:53
- আল-বাকারা 2:54
- আল-বাকারা 2:55
- আল-বাকারা 2:56
- আল-বাকারা 2:57
- আল-বাকারা 2:58
- আল-বাকারা 2:59
- আল-বাকারা 2:60
- আল-বাকারা 2:61
- আল-বাকারা 2:62
- আল-বাকারা 2:63
- আল-বাকারা 2:64
- আল-বাকারা 2:65
- আল-বাকারা 2:66
- আল-বাকারা 2:67
- আল-বাকারা 2:68
- আল-বাকারা 2:69
- আল-বাকারা 2:70
আল-বাকারা 2:21
২১-২২ নং আয়াতের তাফসীরএখান থেকে আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ বা একত্ববাদ ও তাঁর উলুহিয়্যাতের বর্ণনা শুরু হচ্ছে। তিনি স্বীয় বান্দাগণকে অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বের দিকে টেনে এনেছেন, তিনিই প্রত্যেক প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নিয়ামত দান করেছেন, তিনিই যমীনকে বিছানা স্বরূপ বানিয়েছেন এবং আকাশকে ছাদ করেছেন। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ আমি আকাশকে নিরাপদ চাঁদোয়া বা ছাদ বানিয়েছি এবং এতদসত্ত্বেও তারা নিদর্শনাবলী হতে মুখ ফিরিয়ে থাকে। আকাশ হতে বারিধারা বর্ষণ করার অর্থ হচ্ছে মেঘমালা হতে বৃষ্টি বর্ষণ করা এমন সময়ে যখন মানুষ ও পূর্ণ মুখাপেক্ষী থাকে। অতঃপর ঐ পানি থেকে বিভিন্ন প্রকারের ফলমূল উৎপন্ন করা, যা থেকে মানুষ এবং জীবজন্তু উপকৃত হয়। যেমন কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় এর বর্ণনা এসেছে। এক স্থানে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমাদের জন্যে যমীনকে বিছানা ও আকাশকে ছাদ স্বরূপ বানিয়েছেন, সুন্দর সুন্দর কমনীয় আকৃতি দান করেছেন, ভাল ভাল এবং স্বাদে অতুলনীয় আহার্য পৌছিয়েছেন, তিনিই আল্লাহ যিনি বরকতময় সারা বিশ্বজগতের প্রতিপালক, সকলের সৃষ্টিকর্তা, সকলের আহারদাতা, সকলের মালিক আল্লাহ তাআলাই এবং এ জন্যেই তিনি সর্বপ্রকার ইবাদত ও তাঁর জন্যে অংশীদার স্থাপন না করার আসল হকদার। এজন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার জন্যে অংশীদার স্থাপন করো না, তোমরা তো বিলক্ষণ জান ও বুঝ।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় পাপ কোনটি? তিনি উত্তরে বলেনঃ সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করা। আর একটি হাদীসে আছে, হযরত মু'আযকে (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ বান্দার উপরে আল্লাহর হক কি তা কি তুমি জান? (তা হচ্ছে এই যে,) তাঁর ইবাদত। করবে এবং তাঁর ইবাদতে অন্য কাউকেও অংশীদার করবে না। অন্য একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যেন কেউ একথা না বলে যে, যা আল্লাহ একা চান ও অমুক চায়। বরং যেন এই কথা বলে যে, যা কিছু আল্লাহ একাই চান অতঃপর অমুক চায়। হযরত আয়িশার (রাঃ) বৈমাত্রেয় ভাই হযরত তুফাইল বিন সাখবারাহ (রাঃ) বলেনঃ “আমি স্বপ্নে কতকগুলো ইয়াহূদকে দেখে জিজ্ঞেস করলামঃ “তোমরা কে?' তারা বললোঃ “আমরা ইয়াহূদী।' আমি বললাম, আফসোস! তোমাদের মধ্যে বড় অন্যায় এই আছে যে, তোমরা হযরত উযায়েরকে (রাঃ) আল্লাহর পুত্র বলে থাক। তারা বললোঃ ‘তোমরাও ভাল লোক, কিন্তু দুঃখের বিষয়, তোমরা বলে থাক যে, যা আল্লাহ চান ও মুহাম্মদ (সঃ) চান।' অতঃপর আমি খৃষ্টানদের দলের নিকট গেলাম এবং তারাও এ উত্তর দিল। সকাল হলে আমি আমার স্বপ্নের কথা কতকগুলি লোককে বললাম, অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে তার কাছেও ঘটনাটি বর্ণনা করলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর কারও কাছে স্বপ্নের কথা বর্ণনা করেছ কি?' আমি বললাম জি হাঁ। তখন তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহর হামদ ও সানা বর্ণনা করার পর বললেনঃ তুফাইল (রাঃ) একটি স্বপ্ন দেখেছে এবং তোমাদের কারও কারও কাছে বর্ণনাও করেছে। আমি তোমাদেরকে একথাটি বলা হতে বিরত রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অমুক অমুক কার্যের কারণে এ পর্যন্তও বলতে পারিনি। স্মরণ রেখো! এখন হতে আর কখনও যা আল্লাহ চান ও মুহাম্মদ (সঃ) চান’ একথা বলবে, বরং বলবে যা শুধু মাত্র আল্লাহ একাই চান’ (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই)।এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললঃ যা আল্লাহ চান ও হযরত মুহাম্মদ (সঃ) চান। তিনি বললেনঃ তুমি কি আমাকে আল্লাহর অংশীদার করছো? এ কথা বল-যা আল্লাহ একাই চান’ (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই)। এ সমস্ত কথা সরাসরি একত্ববাদের বিপরীত। আল্লাহর একত্ববাদের জন্যে এসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জানেন। সমস্ত কাফির ও মুনাফিককে আল্লাহ তা'আলা তার ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর অর্থাৎ তার একত্ববাদের অনুসারী হয়ে যাও, তাঁর সঙ্গে কাউকেও অংশীদার করো না-যে কোন উপকারও করতে পারে না এবং ক্ষতিও না। তোমরা তো জান যে তিনি ছাড়া কোন প্রভু নেই, তিনি তোমাদেরকে আহার্য দান করেন এবং তোমরা এটাও জান যে আল্লাহর রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে এই একত্ববাদের দিকে আহ্বান করেছেন এবং যার সত্যতায় কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। শিরক এটা থেকেও বেশী গোপনীয় যেমন পীপিলিকা-যা অন্ধকার রাতে কোন পরিষ্কার পাথরের উপর চলতে থাকে। মানুষের একথা বলা যে-যদি এ কুকুর না থাকতো তবে রাত্রে চোর আমাদের ঘরে ঢুকে পড়তো-এটাও শিরক। মানুষের একথা বলা যে, যদি হাঁস বাড়ীতে না থাকতো তবে চুরি হয়ে যেতো, এটাও শিরক। কারও একথা বলা। যে, যা আল্লাহ চান ও আপনি চান’ একথাও শিরক। কারও একথা বলা যে, যদি আল্লাহ না হতেন অমুক না হতো' এ সমস্তই শিরকের কথা।সহীহ হাদীসে আছে কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললেনঃ যা আল্লাহ চান ও আপনি চান, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ তুমি কি আমাকে আল্লাহর অংশীদার রূপে দাঁড় করছো? অন্য হাদীসে আছেঃ তোমরা কতই না উত্তম লোক হতে যদি তোমরা শিরক না করতে! তোমরা বলছে যে, যা আল্লাহ চান এবং অমুক চায়।' হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে -এর অর্থ হচ্ছে অংশীদার ও সমতুল্য। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তোমরা তাওরাত ও ইঞ্জীল পড়ছ এবং জানছো যে আল্লাহ অংশীদার বিহীন, অতঃপর জেনেশুনে জ্ঞাতসারে আল্লাহ তা'আলার জন্যে অংশীদার স্থাপন করছ কেন?মুসনাদ-ই- আহমাদে আছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মহাসম্মানিত আল্লাহ হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) কে পাঁচটি জিনিসের নির্দেশ দিয়ে বললেনঃ ‘এগুলোর উপর আমল কর এবং বানী ইসরাঈলকেও এর উপর আমল করার নির্দেশ দাও।' তিনি এ ব্যাপারে প্রায়ই বিলম্ব করে দিলে হযরত ঈসা (আঃ) তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেনঃ আপনার উপর বিশ্ব প্রভুর যে নির্দেশ ছিল যে,পাঁচটি কাজ আপনি নিজেও পালন করবেন এবং অপরকেও পালন করার নির্দেশ দিবেন। সুতরাং আপনি নিজেই বলে দিন বা আমি পেীছিয়ে দিই।' হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) বললেনঃ আমার ভয় হচ্ছে যে, যদি আপনি আমার অগ্রগামী হয়ে যান, তবে না জানি আমাকে শাস্তি দেয়া হবে বা মাটির মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) বানী ইসরাঈলকে বাইতুল মুকাদ্দাসে একত্রিত করলেন। যখন মসজিদ ভরে গেল তখন তিনি উঁচু স্থানে বসলেন, আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তনের পর বললেনঃ আল্লাহপাক আমাকে পাঁচটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমি নিজেও পালন করি এবং তোমাদেরকেও পালন করার নির্দেশ দেই। (তা হচ্ছে এই যে) (১) তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করবে না। এর দৃষ্টান্ত এই রূপ যেমন একটি লোক নিজস্ব মাল দিয়ে একটি গোলাম খরিদ করলো। গোলাম কাজ কাম করে এবং যা পায় তা অন্য লোককে দিয়ে দেয়। লোকটির গোলাম এরূপ হওয়া কি তোমরা পছন্দ কর? ঠিক এরকমই তোমাদের সৃষ্টিকর্তা, তোমাদের আহার্য দাতা, তোমাদের প্রকৃত মালিক এক আল্লাহ, যার কোন অংশীদার নেই। সুতরাং তোমরা তাঁরই ইবাদত করবে এবং তার সঙ্গে অন্য কাউকেও অংশীদার করবে। (২) তোমরা নামায প্রতিষ্ঠিত করবে। বান্দা যখন নামাযের মধ্যে এদিক ওদিক না তাকায় তখন আল্লাহ তাআলা তার মুখোমুখী হন। যখন তোমরা নামায পড়বে তখন সাবধান! এদিক ওদিক তাকাবে না। (৩) তোমরা রোযা রাখবে। এর দৃষ্টান্ত এই যে, যেমন একটি লোকের কাছে থলে ভর্তি মৃগনাভি রয়েছে, যার সুগন্ধে তার সমস্ত সঙ্গীর মস্তিষ্ক সুবাসিত হয়েছে। স্মরণ রেখো যে, রোযাদার ব্যক্তির মুখের সুগন্ধি আল্লাহর নিকট এই মৃগনাভির সুগন্ধি হতেও বেশী পছন্দনীয়। (৪) সাদকা ও দান খায়রাত করতে থাকবে। এর দৃষ্টান্ত এরূপ যে, যেমন কোন এক ব্যক্তিকে শত্রুরা বন্দী করে ফেলেছে এবং তার ঘাড়ের সঙ্গে হাত বেঁধে দিয়েছে গর্দান উড়িয়ে দেয়ার জন্য বধ্যভূমিতে নিয়ে চলেছে। তখন সে বলছেঃ “আমাকে তোমরা মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দাও।' সুতরাং কম বেশী যা কিছু ছিল তা দিয়ে সে তার প্রাণ রক্ষা করলো। (৫) খুব বেশী তাঁর নামের অযিফা পাঠ করবে এবং তার খুব যিক্র করবে। এর দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মত যার পিছনে খুব দ্রুত বেগে শত্রু দৌড়িয়ে আসছে এবং সে একটি মজবুত দুর্গে ঢুকে পড়ছে ও সেখানে নিরাপত্তা পেয়ে যাচ্ছে। এভাবে আল্লাহর যিকর দ্বারা শয়তান হতে রক্ষা পাওয়া যায়।'একথা বলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবার বলেনঃ ‘আমিও তোমাদের পাঁচটি জিনিসের নির্দেশ দিচ্ছি, যার নির্দেশ মহান আল্লাহ আমাকে দিয়েছেনঃ (১) মুসলমানদের দলকে আঁকড়ে ধরে থাকবে। (আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং স্বীয় যুগের মুসলমান শাসন কর্তার নির্দেশাবলী মেনে চলা)। (২) (ধর্মীয় উপদেশ) শ্রবণ করা। (৩) মান্য করা। (৪) হিজরত করা এবং (৫) আল্লাহর পথে জিহাদ করা। যে ব্যক্তি কনিষ্ঠাঙ্গুলি পরিমাণ দল থেকে সরে গেল সে নিজের গলদেশ হতে ইসলামের হাঁসুলী নিক্ষেপ করে দিল। হ্যা, তবে যদি সে ফিরে আসে তবে তা অন্য কথা। যে ব্যক্তি অজ্ঞতা যুগের নাম ধরে ডেকে থাকে। সে দোযখের খড়কুটো। জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদিও সে রোযাদার ও নামাযী হয়?' তিনি বললেন, যদিও সে নামায পড়ে রোযা রাখে এবং নিজেকে মুসলমান মনে করে। মুসলমানদেরকে তাদের সেই নামে ডাকতে থাকা যে নাম স্বয়ং কল্যাণময় আল্লাহ তা'আলা রেখেছেন, (তা হচ্ছে) মুসলেমীন, মুমেনীন এবং ইবাদুল্লাহ।'এ হাদীসটি হাসান। এই আয়াতের মধ্যেও এটাই বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তোমাদেরকে আহার্য দিচ্ছেন। সুতরাং ইবাদতও তাঁরই কর। তাঁর সঙ্গে কাউকেও অংশীদার করো না। এ আয়াত দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে যে, ইবাদতের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদের পূর্ণ খেয়াল রাখা উচিত। সমগ্র ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই। ইমাম রাযী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্বের উপরেও এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ গ্রহণ করেছেন এবং প্রকৃত পক্ষেও এই আয়াতটি আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্বের উপরে খুব বড় দলিল। আকাশ ও পৃথিবীর বিভিন্ন আকার, বিভিন্ন রং, বিভিন্ন স্বভাব এবং বিভিন্ন উপকারের প্রাণীসমূহ, ওদের সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব, তার ব্যাপক ক্ষমতা ও নৈপুণ্য এবং তার বিরাট সাম্রাজ্যের সাক্ষ্য বহন করছে।কোন একজন বেদুঈনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ আল্লাহ যে আছে তার প্রমাণ কি? সে উত্তরে বলেছিলঃ সুবহানাল্লাহ! উটের বিষ্ঠা দেখে উট আছে এর প্রমাণ পাওয়া যায়, পায়ের চিহ্ন দেখে পথিকের পথ চলার প্রমাণ পাওয়া যায়; তাহলে এই যে বড় বড় নক্ষত্র বিশিষ্ট আকাশ, বহু পথ বিশিষ্ট যমীন, বড় বড় ঢেউ বিশিষ্ট সমুদ্র কি সেই মহাজ্ঞানী ও সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ দেয় না?খলীফা হারুনুর রশীদ হযরত ইমাম মালিককে প্রশ্ন করেছিলেনঃ আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ কি?' তিনি বলেছিলেনঃভাষা পৃথক হওয়া, শব্দ আলাদা হওয়া, স্বর মাধুর্য পৃথক হওয়া আল্লাহ আছেন বলে সাব্যস্ত করছে। হযরত ইমাম আবু হানীফাকেও (রঃ) এই প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেনঃ “আমাকে ছেড়ে দাও, আমি এখন অন্য চিন্তায় আছি। জনগণ আমাকে বলেছে যে, একখানা বড় নৌকা আছে যার মধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়ের মাল রয়েছে, ওর না আছে কোন রক্ষক বা না আছে কোন চালক। এটা সত্ত্বেও ওটা বরাবর নদীতে যাতায়াত করছে এবং বড় বড় ঢেউগুলো নিজে নিজেই চিরে ফেড়ে চলে যাচ্ছে। থামবার জায়গায় থামছে, চলবার জায়গায় চলছে, ওতে কোন মাঝিও নেই, কোন নিয়ন্ত্রকও নেই।' তখন প্রশ্নকারীরা বললোঃ আপনি কি বাজে চিন্তায় পড়ে আছেন? কোন্ জ্ঞানী এ কথা বলতে পারে যে, এত বড় নৌকা শৃংখলার সাথে তরঙ্গময় নদীতে আসছে-যাচ্ছে অথচ ওর কোন চালক নেই? তিনি বললেনঃ ‘আফসোস তোমাদের জ্ঞানে! একটি নৌকা চালক ছাড়া শৃংখলার সঙ্গে চলতে পারে না, কিন্তু এই সারা দুনিয়া, আসমান ও যমীনের সমুদয় জিনিস ঠিকভাবে আপন আপন কাজে লেগে রয়েছে অথচ ওর কোন মালিক, পরিচালক এবং সৃষ্টিকর্তা নেই? উত্তর শুনে তারা হতভম্ব হয়ে গেল এবং সত্য জেনে নিয়ে মুসলমান হয়ে গেল।হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) কেও এই প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ উঁত গাছের একই পাতা একই স্বাদ। ওকে পোকা, মৌমাছি, গরু, ছাগল, হরিণ ইত্যাদি সবাই খেয়ে থাকে ও চরে থাকে। এটা খেয়েই পোকা হতে রেশম বের হয়, মৌমাছি মধু দেয়, হরিণের মধ্যে মৃগনাভি জন্মলাভ করে এবং গরু-ছাগল গোবর ও লাদি দেয়। এটা কি ঐ কথার স্পষ্ট দলীল নয় যে, একই পাতার মধ্যে বিভিন্ন প্রকৃতির সৃষ্টিকারী একজন আছেন” তাকেই আমরা আল্লাহ মেনে থাকি, তিনিই আবিষ্কারক এবং তিনিই শিল্পী। হযরত ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) নিকটেও একবার আল্লাহর অসিত্বের উপর দলীল চাওয়া হলে তিনি বলেনঃ ' জেনে রেখো! এখানে একটি মজবুত দুর্গ রয়েছে। তাতে কোন দরজা নেই, কোন পথ নেই এমনকি ছিদ্র পর্যন্তও নেই। বাহিরটা চাদির মত চকচক করছে এবং ভিতরটা সোনার মত জ্বল জ্বল করছে, আর উপর নীচ, ডান বাম চারদিক সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ রয়েছে। বাতাস পর্যন্তও ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না। হঠাৎ ওর একটি প্রাচীর ভেঙ্গে পড়লো এবং ওর ভিতর হতে চক্ষু কর্ণ বিশিষ্ট, চলৎ শক্তি সম্পন্ন সুন্দর আকৃতি অধিকারী একটি জীবন্ত প্রাণী বেরিয়ে আসলো। আচ্ছা বলতো এই রুদ্ধ ও নিরাপদ ঘরে এ প্রাণীটির সৃষ্টিকারী কেউ আছে কি নেই? সেই স্রষ্টার অস্তিত্ব মানবীয় অস্তিত্ব হতে উচ্চতর এবং তার ক্ষমতা অসীম কি-না? তার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, ডিমকে দেখ, ওর চারদিকে বন্ধ রয়েছে, তথাপি মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ওর ভিতর জীবন্ত মুরগীর বাচ্চা সৃষ্টি করেছেন। এটাই আল্লাহর অস্তিত্ব ও তার একত্ববাদের প্রমাণহযরত আবু নুয়াস (রঃ) এই জিজ্ঞাস্য বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেছিলেনঃ ‘আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হওয়া ও তা হতে বৃক্ষরাজি সৃষ্টি হওয়া এবং তরতাজা শাখার উপর সুস্বাদু ফলের অবস্থান আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব এবং তার একত্ববাদের দলীল হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। ইবনে মুআয (রঃ) বলেনঃ ‘আফসোস! আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা এবং তাঁর সত্তাকে অবিশ্বাস করার। উপর মানুষ কি করে সাহসিকতা দেখাচ্ছে অথচ প্রত্যেক জিনিসই সেই বিশ্ব প্রতিপালকের অস্তিত্ব এবং তার অংশীবিহীন হওয়ার উপর সাক্ষ্য প্রদান করছে! অন্যান্য গুরুজনের বচন হচ্ছে তোমরা আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত কর, ওর উচ্চতা, প্রশস্ততা, ওর ছোট বড় উজ্জ্বল তারকারাজির প্রতি লক্ষ্য কর, ওগুলির ঔজ্জ্বল্য ও আঁকজমক, ওদের আবর্তন ও স্থিরতা এবং ওদের প্রকাশ পাওয়া ও গোপন হওয়ার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ কর। অতঃপর সমুদ্রের দিকে চেয়ে দেখ যার ঢেউ খেলতে রয়েছে ও পৃথিবীকে ঘিরে আছে। তারপর উচু নীচু পাহাড়গুলোর দিকে দেখ যা যমীনের বুকে গাড়া রয়েছে এবং ওকে নড়তে দেয়, ওদের রং ও আকৃতি বিভিন্ন। বিভিন্ন প্রকারের সৃষ্ট বস্তুর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ কর, আবার ক্ষেত্র ও বাগানসমূহকে সবুজ সজীবকারী ইতস্ততঃ প্রবাহমান সুদৃশ্য নদীগুলোর দিকে তাকাও, ক্ষেত্র ও বাগানের সবজীগুলো এবং ওদের নানা প্রকার ফল, ফুল এবং সুস্বাদু মেওয়াগুলোর কথা চিন্তা কর যে, মাটিও এক এবং পানিও এক, কিন্তু আকৃতি, গন্ধ, রং স্বাদ এবং উপকার দান পৃথক পৃথক। এসব কারিগরী কি তোমাদেরকে বলে দেয় না যে, ওদের একজন কারিগর আছেন? এসব আবিষ্কৃত জিনিস কি উচ্চরবে বলে না যে, ওদের আবিষ্কারক কোন একজন আছেন? এ সমৃদয় সৃষ্টজীব কি স্বীয় সষ্টিকর্তার অস্তিত্ব, তাঁর, সত্তা ও একত্ববাদের সাক্ষ্য প্রদান করে না? এ হচ্ছে দলীলের বোঝা বা মহা সম্মানিত ও মহা মর্যাদাবান আল্লাহ স্বীয় সত্তাকে স্বীকার করার জন্যে প্রত্যেক চক্ষুর সামনে রেখে দিয়েছেন যা তার ব্যাপক ক্ষমতা, পূর্ণ নৈপুণ্য, অদ্বিতীয় রহমত, অতুলনীয় দান এবং অফুরন্ত অনুগ্রহের উপর সাক্ষ্য দান করার জন্য যথেষ্ট। আমরা স্বীকার করছি যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন পালনকর্তা, সৃষ্টিকর্তা এবং রক্ষাকর্তা নেই। তিনি ছাড়া কোন সত্য উপাস্যও নেই এবং নিঃসন্দেহে তিনি ছাড়া সিজদার হকদারও আর কেউ নেই। হ্যা, হে দুনিয়ার লোকেরা! তোমরা শুনে রেখো যে, আমার আস্থা ও ভরসা তাঁরই উপর রয়েছে, আমার কাকুতি মিনতি প্রার্থনা তারই নিকট, তারই সামনে আমার মস্তক অবনত হয়, তিনিই আমার আশ্রয় স্থল, সুতরাং আমি তারই নাম জপছি।
আল-বাকারা 2:22
২১-২২ নং আয়াতের তাফসীরএখান থেকে আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ বা একত্ববাদ ও তাঁর উলুহিয়্যাতের বর্ণনা শুরু হচ্ছে। তিনি স্বীয় বান্দাগণকে অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বের দিকে টেনে এনেছেন, তিনিই প্রত্যেক প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নিয়ামত দান করেছেন, তিনিই যমীনকে বিছানা স্বরূপ বানিয়েছেন এবং আকাশকে ছাদ করেছেন। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ আমি আকাশকে নিরাপদ চাঁদোয়া বা ছাদ বানিয়েছি এবং এতদসত্ত্বেও তারা নিদর্শনাবলী হতে মুখ ফিরিয়ে থাকে। আকাশ হতে বারিধারা বর্ষণ করার অর্থ হচ্ছে মেঘমালা হতে বৃষ্টি বর্ষণ করা এমন সময়ে যখন মানুষ ও পূর্ণ মুখাপেক্ষী থাকে। অতঃপর ঐ পানি থেকে বিভিন্ন প্রকারের ফলমূল উৎপন্ন করা, যা থেকে মানুষ এবং জীবজন্তু উপকৃত হয়। যেমন কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় এর বর্ণনা এসেছে। এক স্থানে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমাদের জন্যে যমীনকে বিছানা ও আকাশকে ছাদ স্বরূপ বানিয়েছেন, সুন্দর সুন্দর কমনীয় আকৃতি দান করেছেন, ভাল ভাল এবং স্বাদে অতুলনীয় আহার্য পৌছিয়েছেন, তিনিই আল্লাহ যিনি বরকতময় সারা বিশ্বজগতের প্রতিপালক, সকলের সৃষ্টিকর্তা, সকলের আহারদাতা, সকলের মালিক আল্লাহ তাআলাই এবং এ জন্যেই তিনি সর্বপ্রকার ইবাদত ও তাঁর জন্যে অংশীদার স্থাপন না করার আসল হকদার। এজন্যে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার জন্যে অংশীদার স্থাপন করো না, তোমরা তো বিলক্ষণ জান ও বুঝ।সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় পাপ কোনটি? তিনি উত্তরে বলেনঃ সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করা। আর একটি হাদীসে আছে, হযরত মু'আযকে (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ বান্দার উপরে আল্লাহর হক কি তা কি তুমি জান? (তা হচ্ছে এই যে,) তাঁর ইবাদত। করবে এবং তাঁর ইবাদতে অন্য কাউকেও অংশীদার করবে না। অন্য একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যেন কেউ একথা না বলে যে, যা আল্লাহ একা চান ও অমুক চায়। বরং যেন এই কথা বলে যে, যা কিছু আল্লাহ একাই চান অতঃপর অমুক চায়। হযরত আয়িশার (রাঃ) বৈমাত্রেয় ভাই হযরত তুফাইল বিন সাখবারাহ (রাঃ) বলেনঃ “আমি স্বপ্নে কতকগুলো ইয়াহূদকে দেখে জিজ্ঞেস করলামঃ “তোমরা কে?' তারা বললোঃ “আমরা ইয়াহূদী।' আমি বললাম, আফসোস! তোমাদের মধ্যে বড় অন্যায় এই আছে যে, তোমরা হযরত উযায়েরকে (রাঃ) আল্লাহর পুত্র বলে থাক। তারা বললোঃ ‘তোমরাও ভাল লোক, কিন্তু দুঃখের বিষয়, তোমরা বলে থাক যে, যা আল্লাহ চান ও মুহাম্মদ (সঃ) চান।' অতঃপর আমি খৃষ্টানদের দলের নিকট গেলাম এবং তারাও এ উত্তর দিল। সকাল হলে আমি আমার স্বপ্নের কথা কতকগুলি লোককে বললাম, অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে তার কাছেও ঘটনাটি বর্ণনা করলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর কারও কাছে স্বপ্নের কথা বর্ণনা করেছ কি?' আমি বললাম জি হাঁ। তখন তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহর হামদ ও সানা বর্ণনা করার পর বললেনঃ তুফাইল (রাঃ) একটি স্বপ্ন দেখেছে এবং তোমাদের কারও কারও কাছে বর্ণনাও করেছে। আমি তোমাদেরকে একথাটি বলা হতে বিরত রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অমুক অমুক কার্যের কারণে এ পর্যন্তও বলতে পারিনি। স্মরণ রেখো! এখন হতে আর কখনও যা আল্লাহ চান ও মুহাম্মদ (সঃ) চান’ একথা বলবে, বরং বলবে যা শুধু মাত্র আল্লাহ একাই চান’ (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই)।এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললঃ যা আল্লাহ চান ও হযরত মুহাম্মদ (সঃ) চান। তিনি বললেনঃ তুমি কি আমাকে আল্লাহর অংশীদার করছো? এ কথা বল-যা আল্লাহ একাই চান’ (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই)। এ সমস্ত কথা সরাসরি একত্ববাদের বিপরীত। আল্লাহর একত্ববাদের জন্যে এসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জানেন। সমস্ত কাফির ও মুনাফিককে আল্লাহ তা'আলা তার ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর অর্থাৎ তার একত্ববাদের অনুসারী হয়ে যাও, তাঁর সঙ্গে কাউকেও অংশীদার করো না-যে কোন উপকারও করতে পারে না এবং ক্ষতিও না। তোমরা তো জান যে তিনি ছাড়া কোন প্রভু নেই, তিনি তোমাদেরকে আহার্য দান করেন এবং তোমরা এটাও জান যে আল্লাহর রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে এই একত্ববাদের দিকে আহ্বান করেছেন এবং যার সত্যতায় কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। শিরক এটা থেকেও বেশী গোপনীয় যেমন পীপিলিকা-যা অন্ধকার রাতে কোন পরিষ্কার পাথরের উপর চলতে থাকে। মানুষের একথা বলা যে-যদি এ কুকুর না থাকতো তবে রাত্রে চোর আমাদের ঘরে ঢুকে পড়তো-এটাও শিরক। মানুষের একথা বলা যে, যদি হাঁস বাড়ীতে না থাকতো তবে চুরি হয়ে যেতো, এটাও শিরক। কারও একথা বলা। যে, যা আল্লাহ চান ও আপনি চান’ একথাও শিরক। কারও একথা বলা যে, যদি আল্লাহ না হতেন অমুক না হতো' এ সমস্তই শিরকের কথা।সহীহ হাদীসে আছে কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বললেনঃ যা আল্লাহ চান ও আপনি চান, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ তুমি কি আমাকে আল্লাহর অংশীদার রূপে দাঁড় করছো? অন্য হাদীসে আছেঃ তোমরা কতই না উত্তম লোক হতে যদি তোমরা শিরক না করতে! তোমরা বলছে যে, যা আল্লাহ চান এবং অমুক চায়।' হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে -এর অর্থ হচ্ছে অংশীদার ও সমতুল্য। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তোমরা তাওরাত ও ইঞ্জীল পড়ছ এবং জানছো যে আল্লাহ অংশীদার বিহীন, অতঃপর জেনেশুনে জ্ঞাতসারে আল্লাহ তা'আলার জন্যে অংশীদার স্থাপন করছ কেন?মুসনাদ-ই- আহমাদে আছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মহাসম্মানিত আল্লাহ হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) কে পাঁচটি জিনিসের নির্দেশ দিয়ে বললেনঃ ‘এগুলোর উপর আমল কর এবং বানী ইসরাঈলকেও এর উপর আমল করার নির্দেশ দাও।' তিনি এ ব্যাপারে প্রায়ই বিলম্ব করে দিলে হযরত ঈসা (আঃ) তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেনঃ আপনার উপর বিশ্ব প্রভুর যে নির্দেশ ছিল যে,পাঁচটি কাজ আপনি নিজেও পালন করবেন এবং অপরকেও পালন করার নির্দেশ দিবেন। সুতরাং আপনি নিজেই বলে দিন বা আমি পেীছিয়ে দিই।' হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) বললেনঃ আমার ভয় হচ্ছে যে, যদি আপনি আমার অগ্রগামী হয়ে যান, তবে না জানি আমাকে শাস্তি দেয়া হবে বা মাটির মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) বানী ইসরাঈলকে বাইতুল মুকাদ্দাসে একত্রিত করলেন। যখন মসজিদ ভরে গেল তখন তিনি উঁচু স্থানে বসলেন, আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তনের পর বললেনঃ আল্লাহপাক আমাকে পাঁচটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমি নিজেও পালন করি এবং তোমাদেরকেও পালন করার নির্দেশ দেই। (তা হচ্ছে এই যে) (১) তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করবে না। এর দৃষ্টান্ত এই রূপ যেমন একটি লোক নিজস্ব মাল দিয়ে একটি গোলাম খরিদ করলো। গোলাম কাজ কাম করে এবং যা পায় তা অন্য লোককে দিয়ে দেয়। লোকটির গোলাম এরূপ হওয়া কি তোমরা পছন্দ কর? ঠিক এরকমই তোমাদের সৃষ্টিকর্তা, তোমাদের আহার্য দাতা, তোমাদের প্রকৃত মালিক এক আল্লাহ, যার কোন অংশীদার নেই। সুতরাং তোমরা তাঁরই ইবাদত করবে এবং তার সঙ্গে অন্য কাউকেও অংশীদার করবে। (২) তোমরা নামায প্রতিষ্ঠিত করবে। বান্দা যখন নামাযের মধ্যে এদিক ওদিক না তাকায় তখন আল্লাহ তাআলা তার মুখোমুখী হন। যখন তোমরা নামায পড়বে তখন সাবধান! এদিক ওদিক তাকাবে না। (৩) তোমরা রোযা রাখবে। এর দৃষ্টান্ত এই যে, যেমন একটি লোকের কাছে থলে ভর্তি মৃগনাভি রয়েছে, যার সুগন্ধে তার সমস্ত সঙ্গীর মস্তিষ্ক সুবাসিত হয়েছে। স্মরণ রেখো যে, রোযাদার ব্যক্তির মুখের সুগন্ধি আল্লাহর নিকট এই মৃগনাভির সুগন্ধি হতেও বেশী পছন্দনীয়। (৪) সাদকা ও দান খায়রাত করতে থাকবে। এর দৃষ্টান্ত এরূপ যে, যেমন কোন এক ব্যক্তিকে শত্রুরা বন্দী করে ফেলেছে এবং তার ঘাড়ের সঙ্গে হাত বেঁধে দিয়েছে গর্দান উড়িয়ে দেয়ার জন্য বধ্যভূমিতে নিয়ে চলেছে। তখন সে বলছেঃ “আমাকে তোমরা মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দাও।' সুতরাং কম বেশী যা কিছু ছিল তা দিয়ে সে তার প্রাণ রক্ষা করলো। (৫) খুব বেশী তাঁর নামের অযিফা পাঠ করবে এবং তার খুব যিক্র করবে। এর দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মত যার পিছনে খুব দ্রুত বেগে শত্রু দৌড়িয়ে আসছে এবং সে একটি মজবুত দুর্গে ঢুকে পড়ছে ও সেখানে নিরাপত্তা পেয়ে যাচ্ছে। এভাবে আল্লাহর যিকর দ্বারা শয়তান হতে রক্ষা পাওয়া যায়।'একথা বলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবার বলেনঃ ‘আমিও তোমাদের পাঁচটি জিনিসের নির্দেশ দিচ্ছি, যার নির্দেশ মহান আল্লাহ আমাকে দিয়েছেনঃ (১) মুসলমানদের দলকে আঁকড়ে ধরে থাকবে। (আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং স্বীয় যুগের মুসলমান শাসন কর্তার নির্দেশাবলী মেনে চলা)। (২) (ধর্মীয় উপদেশ) শ্রবণ করা। (৩) মান্য করা। (৪) হিজরত করা এবং (৫) আল্লাহর পথে জিহাদ করা। যে ব্যক্তি কনিষ্ঠাঙ্গুলি পরিমাণ দল থেকে সরে গেল সে নিজের গলদেশ হতে ইসলামের হাঁসুলী নিক্ষেপ করে দিল। হ্যা, তবে যদি সে ফিরে আসে তবে তা অন্য কথা। যে ব্যক্তি অজ্ঞতা যুগের নাম ধরে ডেকে থাকে। সে দোযখের খড়কুটো। জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদিও সে রোযাদার ও নামাযী হয়?' তিনি বললেন, যদিও সে নামায পড়ে রোযা রাখে এবং নিজেকে মুসলমান মনে করে। মুসলমানদেরকে তাদের সেই নামে ডাকতে থাকা যে নাম স্বয়ং কল্যাণময় আল্লাহ তা'আলা রেখেছেন, (তা হচ্ছে) মুসলেমীন, মুমেনীন এবং ইবাদুল্লাহ।'এ হাদীসটি হাসান। এই আয়াতের মধ্যেও এটাই বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তোমাদেরকে আহার্য দিচ্ছেন। সুতরাং ইবাদতও তাঁরই কর। তাঁর সঙ্গে কাউকেও অংশীদার করো না। এ আয়াত দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে যে, ইবাদতের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদের পূর্ণ খেয়াল রাখা উচিত। সমগ্র ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই। ইমাম রাযী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্বের উপরেও এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ গ্রহণ করেছেন এবং প্রকৃত পক্ষেও এই আয়াতটি আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্বের উপরে খুব বড় দলিল। আকাশ ও পৃথিবীর বিভিন্ন আকার, বিভিন্ন রং, বিভিন্ন স্বভাব এবং বিভিন্ন উপকারের প্রাণীসমূহ, ওদের সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব, তার ব্যাপক ক্ষমতা ও নৈপুণ্য এবং তার বিরাট সাম্রাজ্যের সাক্ষ্য বহন করছে।কোন একজন বেদুঈনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ আল্লাহ যে আছে তার প্রমাণ কি? সে উত্তরে বলেছিলঃ সুবহানাল্লাহ! উটের বিষ্ঠা দেখে উট আছে এর প্রমাণ পাওয়া যায়, পায়ের চিহ্ন দেখে পথিকের পথ চলার প্রমাণ পাওয়া যায়; তাহলে এই যে বড় বড় নক্ষত্র বিশিষ্ট আকাশ, বহু পথ বিশিষ্ট যমীন, বড় বড় ঢেউ বিশিষ্ট সমুদ্র কি সেই মহাজ্ঞানী ও সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ দেয় না?খলীফা হারুনুর রশীদ হযরত ইমাম মালিককে প্রশ্ন করেছিলেনঃ আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ কি?' তিনি বলেছিলেনঃভাষা পৃথক হওয়া, শব্দ আলাদা হওয়া, স্বর মাধুর্য পৃথক হওয়া আল্লাহ আছেন বলে সাব্যস্ত করছে। হযরত ইমাম আবু হানীফাকেও (রঃ) এই প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেনঃ “আমাকে ছেড়ে দাও, আমি এখন অন্য চিন্তায় আছি। জনগণ আমাকে বলেছে যে, একখানা বড় নৌকা আছে যার মধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়ের মাল রয়েছে, ওর না আছে কোন রক্ষক বা না আছে কোন চালক। এটা সত্ত্বেও ওটা বরাবর নদীতে যাতায়াত করছে এবং বড় বড় ঢেউগুলো নিজে নিজেই চিরে ফেড়ে চলে যাচ্ছে। থামবার জায়গায় থামছে, চলবার জায়গায় চলছে, ওতে কোন মাঝিও নেই, কোন নিয়ন্ত্রকও নেই।' তখন প্রশ্নকারীরা বললোঃ আপনি কি বাজে চিন্তায় পড়ে আছেন? কোন্ জ্ঞানী এ কথা বলতে পারে যে, এত বড় নৌকা শৃংখলার সাথে তরঙ্গময় নদীতে আসছে-যাচ্ছে অথচ ওর কোন চালক নেই? তিনি বললেনঃ ‘আফসোস তোমাদের জ্ঞানে! একটি নৌকা চালক ছাড়া শৃংখলার সঙ্গে চলতে পারে না, কিন্তু এই সারা দুনিয়া, আসমান ও যমীনের সমুদয় জিনিস ঠিকভাবে আপন আপন কাজে লেগে রয়েছে অথচ ওর কোন মালিক, পরিচালক এবং সৃষ্টিকর্তা নেই? উত্তর শুনে তারা হতভম্ব হয়ে গেল এবং সত্য জেনে নিয়ে মুসলমান হয়ে গেল।হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) কেও এই প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ উঁত গাছের একই পাতা একই স্বাদ। ওকে পোকা, মৌমাছি, গরু, ছাগল, হরিণ ইত্যাদি সবাই খেয়ে থাকে ও চরে থাকে। এটা খেয়েই পোকা হতে রেশম বের হয়, মৌমাছি মধু দেয়, হরিণের মধ্যে মৃগনাভি জন্মলাভ করে এবং গরু-ছাগল গোবর ও লাদি দেয়। এটা কি ঐ কথার স্পষ্ট দলীল নয় যে, একই পাতার মধ্যে বিভিন্ন প্রকৃতির সৃষ্টিকারী একজন আছেন” তাকেই আমরা আল্লাহ মেনে থাকি, তিনিই আবিষ্কারক এবং তিনিই শিল্পী। হযরত ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের (রঃ) নিকটেও একবার আল্লাহর অসিত্বের উপর দলীল চাওয়া হলে তিনি বলেনঃ ' জেনে রেখো! এখানে একটি মজবুত দুর্গ রয়েছে। তাতে কোন দরজা নেই, কোন পথ নেই এমনকি ছিদ্র পর্যন্তও নেই। বাহিরটা চাদির মত চকচক করছে এবং ভিতরটা সোনার মত জ্বল জ্বল করছে, আর উপর নীচ, ডান বাম চারদিক সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ রয়েছে। বাতাস পর্যন্তও ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না। হঠাৎ ওর একটি প্রাচীর ভেঙ্গে পড়লো এবং ওর ভিতর হতে চক্ষু কর্ণ বিশিষ্ট, চলৎ শক্তি সম্পন্ন সুন্দর আকৃতি অধিকারী একটি জীবন্ত প্রাণী বেরিয়ে আসলো। আচ্ছা বলতো এই রুদ্ধ ও নিরাপদ ঘরে এ প্রাণীটির সৃষ্টিকারী কেউ আছে কি নেই? সেই স্রষ্টার অস্তিত্ব মানবীয় অস্তিত্ব হতে উচ্চতর এবং তার ক্ষমতা অসীম কি-না? তার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, ডিমকে দেখ, ওর চারদিকে বন্ধ রয়েছে, তথাপি মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ওর ভিতর জীবন্ত মুরগীর বাচ্চা সৃষ্টি করেছেন। এটাই আল্লাহর অস্তিত্ব ও তার একত্ববাদের প্রমাণহযরত আবু নুয়াস (রঃ) এই জিজ্ঞাস্য বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেছিলেনঃ ‘আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হওয়া ও তা হতে বৃক্ষরাজি সৃষ্টি হওয়া এবং তরতাজা শাখার উপর সুস্বাদু ফলের অবস্থান আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব এবং তার একত্ববাদের দলীল হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। ইবনে মুআয (রঃ) বলেনঃ ‘আফসোস! আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা এবং তাঁর সত্তাকে অবিশ্বাস করার। উপর মানুষ কি করে সাহসিকতা দেখাচ্ছে অথচ প্রত্যেক জিনিসই সেই বিশ্ব প্রতিপালকের অস্তিত্ব এবং তার অংশীবিহীন হওয়ার উপর সাক্ষ্য প্রদান করছে! অন্যান্য গুরুজনের বচন হচ্ছে তোমরা আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত কর, ওর উচ্চতা, প্রশস্ততা, ওর ছোট বড় উজ্জ্বল তারকারাজির প্রতি লক্ষ্য কর, ওগুলির ঔজ্জ্বল্য ও আঁকজমক, ওদের আবর্তন ও স্থিরতা এবং ওদের প্রকাশ পাওয়া ও গোপন হওয়ার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ কর। অতঃপর সমুদ্রের দিকে চেয়ে দেখ যার ঢেউ খেলতে রয়েছে ও পৃথিবীকে ঘিরে আছে। তারপর উচু নীচু পাহাড়গুলোর দিকে দেখ যা যমীনের বুকে গাড়া রয়েছে এবং ওকে নড়তে দেয়, ওদের রং ও আকৃতি বিভিন্ন। বিভিন্ন প্রকারের সৃষ্ট বস্তুর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ কর, আবার ক্ষেত্র ও বাগানসমূহকে সবুজ সজীবকারী ইতস্ততঃ প্রবাহমান সুদৃশ্য নদীগুলোর দিকে তাকাও, ক্ষেত্র ও বাগানের সবজীগুলো এবং ওদের নানা প্রকার ফল, ফুল এবং সুস্বাদু মেওয়াগুলোর কথা চিন্তা কর যে, মাটিও এক এবং পানিও এক, কিন্তু আকৃতি, গন্ধ, রং স্বাদ এবং উপকার দান পৃথক পৃথক। এসব কারিগরী কি তোমাদেরকে বলে দেয় না যে, ওদের একজন কারিগর আছেন? এসব আবিষ্কৃত জিনিস কি উচ্চরবে বলে না যে, ওদের আবিষ্কারক কোন একজন আছেন? এ সমৃদয় সৃষ্টজীব কি স্বীয় সষ্টিকর্তার অস্তিত্ব, তাঁর, সত্তা ও একত্ববাদের সাক্ষ্য প্রদান করে না? এ হচ্ছে দলীলের বোঝা বা মহা সম্মানিত ও মহা মর্যাদাবান আল্লাহ স্বীয় সত্তাকে স্বীকার করার জন্যে প্রত্যেক চক্ষুর সামনে রেখে দিয়েছেন যা তার ব্যাপক ক্ষমতা, পূর্ণ নৈপুণ্য, অদ্বিতীয় রহমত, অতুলনীয় দান এবং অফুরন্ত অনুগ্রহের উপর সাক্ষ্য দান করার জন্য যথেষ্ট। আমরা স্বীকার করছি যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন পালনকর্তা, সৃষ্টিকর্তা এবং রক্ষাকর্তা নেই। তিনি ছাড়া কোন সত্য উপাস্যও নেই এবং নিঃসন্দেহে তিনি ছাড়া সিজদার হকদারও আর কেউ নেই। হ্যা, হে দুনিয়ার লোকেরা! তোমরা শুনে রেখো যে, আমার আস্থা ও ভরসা তাঁরই উপর রয়েছে, আমার কাকুতি মিনতি প্রার্থনা তারই নিকট, তারই সামনে আমার মস্তক অবনত হয়, তিনিই আমার আশ্রয় স্থল, সুতরাং আমি তারই নাম জপছি।
আল-বাকারা 2:23
২৩-২৪ নং আয়াতের তাফসীরনবুওয়াতের উপর আলোচনাতাওহীদের পর এখন নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছেঃ “আমি যে পবিত্র কুরআন আমার বিশিষ্ট বান্দা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছি তাকে যদি তোমরা আমার বাণী বলে বিশ্বাস না কর তবে তোমরা ও তোমাদের সাহায্যকারীরা সব মিলে পূর্ণ কুরআন তো নয় বরং শুধুমাত্র ওর একটি সূরার মত সূরা আনয়ন কর। তোমরা তো তা করতে কখনও সক্ষম হবে না, তা হলে ওটিযে আল্লাহর কালাম এতে সন্দেহ করছে কেন?” (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সাহায্যকারী ও অংশীদার, যারা তাদেরকে সাহায্য ও সহযোগিতা করত। তাহলে ভাবার্থ হলো এইঃ “যাদেরকে তোমরা পূজনীয়রূপে স্বীকার করছ তাদেরকেও ডাকো এবং তাদের সাহায্য ও সহযোগিতায় হলেও এটির মত একটি সূরা রচনা কর।”হষরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তোমরা তোমাদের শাসনকর্তা এবং বাকপটু ও বাগ্মীদের নিকট হতেও সাহায্য নিয়ে নাও। কুরান পাকের এই মুজিযার প্রকাশ এবং এই রীতির বাণী কয়েক স্থানে আছে। সূরা-ই কাসাসের মধ্যে আছেঃ “ (হে নবী সঃ) তুমি বলে দাও যে, যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে আল্লাহর নিকট হতে অন্য কোন কিতাব নিয়ে এসো সৎ পথ প্রদর্শনে এ দু’টো (কুরআন ও তাওরাত) অপেক্ষা অধিক উৎকৃষ্ট হয়, তা হলে আমিও তার অনুসরণ করবো।” আল্লাহ তাআলা সূরা-ই-বানী ঈসরাইলে বলেছেনঃ “তুমি বলে দাও যে, যদি মানুষ ও জ্বিন এ উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয় যে, এরূপ কুরআন রচনা করে আনবে, তথাপিও তার অনুরূপ আনয়ন করতে পারবে না, যদিও তারা একে অন্যের সাহায্যকারী হয়।”সূরা-ই-হূদে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তবে কি তারা এরূপ বলে যে, এটা তুমি নিজেই রচনা করেছ? বলে দাও, তোমরাও তাহলে ওর অনুরূপ রচিত দশটি সূরা আনয়ন কর এবং আল্লাহকে ছাড়া যাকে যাকে ডাকতে পার ডেকে আন যদি তোমরা সত্যবাদী হও।" সূরা-ই- ইউনুসে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “এ কুরআন কল্পনাপ্রসূত নয় যে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও দ্বারা প্রকাশিত হয়েছে, বরং এটা তো সেই কিতাবসমূহের সত্যতা প্রমাণকারী যা এর পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এটা আবশ্যকীয় বিধানসমূহের ব্যাখ্যা দানকারী, এতে কোন সন্দেহ নেই, এটা বিশ্ব প্রভুর পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয়েছে। তারা কি এরূপ বলে যে, এটা তোমার স্বরচিত? তুমি বলে দাও, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা-ই এনে দাও এবং আল্লাহকে ছাড়া যাকে পার ডাকো যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” এ সমস্ত আয়াত তো মক্কা মুকাররামায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং মক্কাবাসীকে এর মুকাবিলায় অসমর্থ সাব্যস্ত করে মদীনা শরীফেও, এ বিষয়ের পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যেমন উপরের আয়াত।(আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটিকে কেউ কেউ কুরআনের দিকে ফিরিয়েছেন। অর্থাৎ এর (কুরআনের) মত কোন একটি সূরা রচনা কর। কেউ কেউ সর্বনামটি মুহাম্মদ (সঃ)-এর দিকে ফিরিয়েছেন। অর্থাৎ তার মত কোন নিরক্ষর লোক এরূপ হতেই পারে না যে, লেখাপড়া কিছু না জেনেও এমন বাণী রচনা করতে পারে যার মত বাণী কারও দ্বারা রচিত হতে পারে না। কিন্তু প্রথম মৃতটিই সঠিক।মুজাহিদ (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), আমর বিন মাসউদ (রঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং অধিকাংশ চিন্তাবিদের এটাই মত। ইমাম ইবনে জারীর তাবারী (রঃ), যামাখৃশারী এবং ইমাম রাষীও (রঃ) এই মত পছন্দ করেছেন। এটাকে প্রাধান্য দেয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমটি এই যে, এতে সবারই প্রতি ধমক রয়েছে। একত্রিত করে এবং পৃথক পৃথক করেও, সে নিরক্ষরই হোক বা আহলে কিতাব ও শিক্ষিত লোকই হোক, এতে এই মুজিযার পূর্ণতা রয়েছে এবং শুধুমাত্র অশিক্ষিত লোকদেরকে অপারগ করা অপেক্ষা এতে বেশী গুরুত্ব এসেছে। আবার দশটি সূরা আনতে বলা এবং ওটা আনতে না পারার ভবিষ্যদ্বাণী করাও এটাই প্রমাণ করছে যে, এর ভাবার্থ কুরআনই হবে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ব্যক্তিত্ব নয়। সুতরাং এই সাধারণ ঘোষণা, যা বার বার করা হয়েছে, এবং সঙ্গে সঙ্গে এই ভবিষ্যদ্বাণীও করা হয়েছে যে, এরা এর উপর সক্ষম নয়। এ ঘোষণা একবার মক্কায় করা হয়েছে এবং পরে মদীনাতেও এর পুনরাবৃত্তি হয়েছে। আর ঐসব লোক, যাদের মাতৃভাষা আরবী ছিল এবং নিজেদের বাকপটুতা ও বাগ্মীতার জন্যে গর্ববোধ করতো তারা সবাই এর মুকাবিলা করতে অসমর্থ হয়েছিল। তারা পূর্ণ কুরআনের উত্তর দিতে পারেইনি।' দশটি সূরাও নয় এমনকি একটি আয়াতেরও উত্তর দিতে সমর্থ হয়নি। সূতরাং পবিত্র কুরআনের একটি মু'জিযা তো এই যে, তারা এর মত একটি ছোট সূরাও রচনা করতে পারেনি। দ্বিতীয় মুজিযাকুরআন কারীমের দ্বিতীয় মু'জিযা এই যে, তারা কখনও এর মত কিছুই রচনা করতে পারবে না যদিও তারা সবাই একত্রিত হয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত চেষ্টা করে, আল্লাহ তাআলার ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা প্রমাণিত হয়ে গেল। সেই যুগেও কারও সাহস হয়নি, তার পরে আজ পর্যন্তও হয়নি। এবং কিয়ামত পর্যন্তও কারও সাহস হবে না। আর এ হবেই বা কিরূপে? যেমনভাবে আল্লাহর সত্তা অতুলনীয়, তার বাণীও তদ্রুপ অতুলনীয়। প্রকৃত ব্যাপারও এটাই যে, কুরআন পাককে এক ন্যর দেখলেই তার প্রকাশ্য ও গোপনীয়, শাব্দিক ও অর্থগত সব কিছু এমনভাবে প্রকাশ পায় যা সৃষ্টজীবের শক্তির বাইরে। স্বয়ং বিশ্বপ্রভু বলছেনঃ “এটা এমন কিতাব যার আয়াতগুলো প্রজ্ঞাময়, মহাজ্ঞাতার পক্ষ হতে (প্রমাণাদি দ্বারা) জোরদার করা হয়েছে, অতঃপর বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।” সুতরাং শব্দ সংক্ষিপ্ত এবং অর্থ বিশ্লেষিত কিংবা শব্দ বিশ্লেষিত এবং অর্থ সংক্ষিপ্ত। কাজেই কুরআন স্বীয় শব্দ ও রচনায় অতুলনীয়, এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সারা দুনিয়া সম্পূর্ণরূপে অপারগ ও অসমর্থ। পূর্ব যুগের যেসব সংবাদ দুনিয়ার অজানা ছিল তা হুবহু এই পাক কালামে বর্ণিত হয়েছে, আগামীতে যা ঘটবে তারও আলোচনা রয়েছে এবং অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে সমস্ত ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা সত্যই বলেছেনঃ “তোমার প্রভুর কথা সংবাদের সত্যতায় এবং নির্দেশের ন্যায্যতায় পূর্ণ হয়েছে। এই পবিত্র কুরআন সমস্তটাই সত্য, সত্যবাদিতা, সুবিচার এবং হিদায়াতে ভরপুর। কুরআন কাব্য নয়পবিত্র কুরআনের মধ্যে কোন আজে বাজে কথা, ক্রীড়া-কৌতুক এবং মিথ্যা অপবাদ নেই যা সাধারণতঃ কবিদের কবিতায় পাওয়া যায়। বরং তাদের কবিতার কদর ও মূল্য ওরই উপর নির্ভর করে। মশহুর প্রবাদ আছে যে, (আরবি) অর্থাৎ যা খুব বেশী মিথ্যা তা খুব বেশী সুস্বাদু। লম্বা চওড়া জোরালো প্রশংসামূলক কবিতাগুলোকে দেখা যায় যে, তা অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা মিশ্রিত। ওতে থাকবে নারীদের প্রশংসা ও সৌন্দর্য বর্ণনা, ঘোড়া ও মদের প্রশংসা, কোন মানুষের বাড়ানো তারীফ, উষ্ট্ৰীসমূহের ভূষণ ও সাজ-সজ্জা, বীরত্বের অতিরঞ্জিত গীত, যুদ্ধের চালবাজী কিংবা ডর-ভয়ের কাল্পনিক দৃশ্য। এতে না আছে কোন দুনিয়ার উপকার, না আছে কোন দ্বীনের উপকার। এতে শুধু কবির বাকপটুতা ও কথা শিল্প প্রকাশ পায়। চরিত্রের উপরেও ওর কোন ভাল প্রভাব পড়ে না, আমলের উপরেও না। পুরো কাসিদার মধ্যে দু' একটি ভাল কবিতা হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু বাকী সবগুলোই আজে বাজে কথায় ভর্তি থাকে। পক্ষান্তরে, কুরআন পাকের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে,ওর এক একটি শব্দ ভাষা-মাধুর্যে, দ্বীন ও দুনিয়ার উপকারে এবং মঙ্গল ও কল্যাণে ভরপুর। আবার বাক্যের বিন্যাস ও সৌন্দর্য, শব্দের গাঁথুনী, রচনার গঠন শৈলী অর্থের সুস্পষ্টতা এবং বিষয়ের পবিত্রতা যেন সোনায় সোহাগা। এর খবরের আস্বাদন, এর বর্ণনাকৃত ঘটনাবলীর সরলতা মৃত সঞ্জীবনী, এর সংক্ষেপণ উচ্চ আদর্শ, এর বিশ্লেষণ মু'জিযার প্রাণ। এর কোন কিছুর পুনরাবৃত্তি দ্বিগুণ স্বাদ দিয়ে থাকে। মনে হয় যেন খাটি মুক্তার বৃষ্টি বর্ষণ হচ্ছে। বার বার পড়লেও মনে বিরক্তি আসবে না। স্বাদ গ্রহণ করতে থাকলে সব সময় নতুন স্বাদ পাওয়া যাবে। বিষয়বস্তু অনুধাবন করতে থাকলে শেষ হবে না। এটা একমাত্র কুরআন পাকের বৈশিষ্ট্য। এর চাটনীর মজা এবং মিষ্টতার স্বাদের কথা তাঁকেই জিজ্ঞেস করা। উচিত যাকে মহান আল্লাহ জ্ঞান, অনুভূতি এবং বিদ্যাবুদ্ধির কিছু অংশ দান করেছেন। এর ভয়,প্রদর্শন, ধমক এবং শাস্তির বর্ণনা মজবুত পাহাড়কেও নড়িয়ে দেয়, মানুষের অন্তর তো কি ছার। এর অঙ্গীকার, সুসংবাদ, দান ও অনুগ্রহের বর্ণনা অন্তরের শুষ্ক কুঁড়ির মুখ খুলে দেয়। এটা ইচ্ছা ও আকাংখার প্রশমিত আবেগের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী এবং বেহেশত ও আরামের সুন্দর সুন্দর দৃশ্য চোখের সামনে উপস্থাপনকারী। এতে মন আনন্দিত হয় এবং খুলে যায়। এতে আগ্রহ উৎপাদক ঘোষণা হচ্ছেঃ “অতএব এইরুপ লোকদের জন্য কত কি নয়ন জুড়ানো আসবাব যে গায়েবী ভাণ্ডারে মওজুদ রয়েছে এটা কারও জানা নেই।”আরও বলা হচ্ছেঃ “এবং তার (বেহেশতের) মধ্যে মনঃপুত ও চক্ষু জুড়ানো দ্রব্যাদি রয়েছে।” ভয় প্রদর্শন ও ধমকরূপে বলা হচ্ছেঃ “তোমরা কি তার হতে, যিনি আকাশে রয়েছেন, নির্ভয় রয়েছে যে, তিনি তোমাদেরকে যমীনের মধ্যে ধ্বসিয়ে দেন, অতঃপর ঐ যমীন থর থর করতে থাকে? না কি তোমরা নির্ভয় হয়ে গেছে এটা হতে যে, যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি এক প্রচণ্ড বায়ু প্রেরণ করে দেন? সুতরাং তোমরা সত্ত্বরই জানতে পারবে যে, ভয় প্রদর্শন কিরূপ ছিল।” আরও বলা হচ্ছেঃ “অতঃপর তাদের পাপের কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি।” উপদেশ দান রূপে বলা হয়েছেঃ “যদিও আমি। তাদেরকে কয়েক বছর ধরে সুখ-সম্ভোগে রেখেছি তাতে কি হয়েছে? অতঃপর যার ওয়াদা তাদেরকে দেয়া হয়েছিল তা এসে গেল। যে আঁকজমকের মধ্যে তাঁরা ছিল তা তাদের কোন কাজে আসলো না। মোটকথা এভাবে আল্লাহ কুরআন পাকের মধ্যে যখন যে বিষয় ধরেছেন তাকে পূর্ণতায় পৌছিয়ে ছেড়েছেন। আর একে বিভিন্ন প্রকারের বাকপটুতা, ভাষালংকার এবং নিপুণতা দ্বারা পরিপূর্ণ করেছেন। নির্দেশাবলী ও নিষেধাজ্ঞার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, প্রত্যেক নির্দেশের মধ্যে মঙ্গল, সততা, লাভ এবং পবিত্রতার একত্র সমাবেশ ঘটেছে, আর প্রত্যেক নিষেধাজ্ঞা পাপ, হীনতা, ইতরামি এবং ভ্রষ্টতা কর্তনকারী। হযরত ইবনে মাউদ (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ বলেছেন যে, যখন কুরআন মাজীদের মধ্যে (আরবি) শুনতে পাও তখন তোমরা কান লাগিয়ে দাও, হয়তো কোন ভাল কাজের হুকুম দেয়া হবে, বা কোন মন্দ কাজ হতে নিষেধ করা হবে। স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তিনি। তোমাদেরকে ভাল কাজের আদেশ করেন এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখেন, পবিত্র জিনিস হালাল করেন এবং অপবিত্র জিনিস হারাম করেন, যে ভারী শিকল পায়ে জড়ানো ছিল এবং যে গলাবন্ধ গলায় দেয়া ছিল তা তিনি দূরে নিক্ষেপ করেন।”কুরআন কারীমের মধ্যে আছে কিয়ামতের বর্ণনা, তথাকার ভয়াবহ দৃশ্য, বেহেশত ও দোযখের বর্ণনা, দয়া ও কষ্টের পূর্ণ বিবরণ। আরও রয়েছে আল্লাহর মনোনীত বান্দাগণের জন্যে নানা প্রকার নিয়ামতের বর্ণনা ও তার শত্রুদের জন্যে নানা প্রকার শাস্তির বর্ণনা। কোথাও বা আছে সুসংবাদ এবং কোথায়ও আছে ভয় প্রদর্শন। কোন স্থানে আছে সৎকার্যের প্রতি আগ্রহ উৎপাদন এবং কোন স্থানে আছে মন্দ কাজ হতে বাধা প্রদান। কোন জায়গায় আছে দুনিয়ার প্রতি উদাসীনতার শিক্ষা এবং কোন জায়গায় আছে আখেরাতের প্রতি আগ্রহের শিক্ষা। এ সমুদয় আয়াতই মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শন করে এবং আল্লাহর পছন্দনীয় শরীয়তের দিকে ঝুকিয়ে দেয়, অন্তুরের কালিমা দূর করে, শয়তানী পথগুলো বন্ধ করে এবং মন্দ ক্রিয়া নষ্ট করে থাকে।সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবীকে (আঃ) এমন মু'জিযা দেয়া হয়েছিল যা দেখে মানুষ তাদের উপর ঈমান এনেছিল, কিন্তু আমার মজিযা আল্লাহর ওয়াহী অর্থাৎ পবিত্র কুরআন। কাজেই আমি আশা করি যে, কিয়ামতের দিন অন্যান্য নবীদের (আঃ) অপেক্ষা আমার অনুসারী বেশী হবে।” কেননা, অন্যান্য নবীদের (আঃ) মু'জিযা তাঁদের সঙ্গেই বিদায় নিয়েছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই মু’জিয়া কিয়ামত পর্যন্ত বাকী থাকবে। জনগণ ওটা দেখতে থাকবে এবং ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ ফরমানঃ “আমার মু'জিযা ওয়াহী যা আমাকে দেয়া হয়েছে” এর ভাবার্থ এই যে, এই কুরআনকে তার জন্যেই বিশিষ্ট করা হয়েছে এবং এটা একমাত্র তাকেই দেয়া হয়েছে যা প্রতিযোগিতায় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সারা দুনিয়াকে হার মানিয়ে দিয়েছে। পক্ষান্তরে অন্যান্য আসমানী কিতাব অধিকাংশ আলেমের মতে এই বিশেষণ হতে শূন্য রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সত্যতার উপর এবং ইসলাম ধর্মের সত্যতার উপর এই মুজিযা ছাড়াও আরও এত দলীল আছে যে, তা গুণে শেষ করা যায় না। আল্লাহর জন্যেই সমুদয় প্রশংসা।কোন কোন ইসলামী দর্শন বেত্তা কুরআন কারীমের মু'জিয়া হওয়াকে এমন পন্থায় বর্ণনা করেছেন যে, তা আলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত এবং মু'তাযিলার কথারই অন্তর্ভুক্ত। তারা বলেন যে, হয়তো বা কুরআন নিজেই মু'জিয়া, এর মত কিছু রচনা করা মানুষের সাধ্যের বাইরে। এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার তাদের ক্ষমতাই নেই। কিংবা যদিও এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্ভব এবং এটা মানবীয় শক্তির বাইরে নয়, তথাপি তাদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্যে আহ্বান করা হচ্ছে। তারা কঠিন শক্রতার মধ্যে রয়েছে, সত্য ধর্মকে দুনিয়ার বুক থেকে মুছে ফেলার জন্যে তারা সর্বশক্তি ব্যয় করতে এবং সব কিছু ধ্বংস করতে সদা প্রস্তুত রয়েছে। তবুও তারা কুরআন কারীমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না। এটা কুরআনের পক্ষ হতেই হচ্ছে যে, তাদের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কুরআন তাদেরকে বাধা দিচ্ছে যার ফলে তারা এর অনুরূপ পেশ করতে অপারগ হচ্ছে।যদিও শেষের মতটি তলোপছন্দনীয় নয়, তথাপি তাকেও যদি মেনে নেয়া হয় তবে তার দ্বারাও কুরআনের মু'জিযা হওয়া সাব্যস্ত হচ্ছে। এটা সত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় ও তর্কের খাতিরে নিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়া হলেও কুরআনের মুজিযা হওয়াই সাব্যস্ত হচ্ছে। ইমাম রাযী (রঃ) হোট ছোট সূৰ্বর প্রশ্নের উত্তরে এই পন্থাই অবলম্বন করেছেন।(আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে জ্বালানী, যা দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়। যেমন গাছের ডাল, কাঠ, খড়ি ইত্যাদি। কুরআন কারীমের এক জায়গায় আছেঃ “অত্যাচারী লোকেরা দোযখের জ্বালানী কাঠ।” অন্য স্থানে আছেঃ “তোমরা ও তোমাদের ঐ সব মাবুদ, আল্লাহকে ছেড়ে যাদের তোমরা ইবাদত করতে, দোযখের খড়ি হবে, তোমরা সব ওর মধ্যে আসবে। যদি তারা সত্য মা'বুদ হতো তবে সেখানে আগমন করতো না। প্রকৃতপক্ষে তারা সবাই চিরকাল অবস্থানকারী (আরবি) বলা হয় পাথরকে। এখানে অর্থ হচ্ছে গন্ধকের পাথর যা অত্যন্ত কালো, বড় এবং দুর্গন্ধময়, যার আগুনে অত্যন্ত তেজ থাকে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে নিরাপদে রাখুন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার সঙ্গে • সঙ্গেই এই পাথরগুলো প্রথম আকাশে সৃষ্টি করা হয়েছে। (তাফসীর-ই-ইবনে) জারীর, মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম, মুসতাদরিক-ই-হাকিম)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং অন্যান্য কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে সুদ্দী (রঃ) নকল করেছেন যে, দোযখের মধ্যে এই কালো গন্ধকের পাথরও থাকবে যার কঠিন আগুন দ্বারা কাফিরদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই পাথরগুলোর দুর্গন্ধ মৃতদেহের দুর্গন্ধের চেয়েও বেশী কঠিন। মুহাম্মদ বিন আলী (রঃ) এবং ইবনে জুরাইও (রঃ) বলেন যে, গন্ধকের অর্থ হচ্ছে বড় বড় ও শক্ত শক্ত পাথর। কেউ কেউ বলেছেন যে, এটা হতে উদ্দেশ্য হচ্ছে ঐ পাথরগুলো যেগুলোর ছবি ইত্যাদি বানানো হতো, অতঃপর ঐগুলোকে পূজা করা হতো। যেমন এক জায়গায় আছেঃ “তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের ইবাদত করতে, তারা জাহান্নামের জ্বালানী খড়ি।”কুরতুবী (রঃ) এবং রাযী (রঃ) এই মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, গন্ধকের পাথরে আগুন ধরা কোন নতুন কথা নয়। কাজেই ভাবার্থ হবে এই মূর্তিগুলোই এবং আরও অন্যান্য পাথর-আল্লাহ্ পাককে ছাড়া যেগুলো যে কোন আকারে পূজনীয় হবে। কিন্তু এই যুক্তিটা জোরালো যুক্তি নয়। কেননা, যখন গন্ধকের পাথর দিয়ে আগুন উসকানো হয়, তখন এটা জানা কথা যে, এর তাপ ও প্রখরতা সাধারণ আগুন হতে বহুগুণে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। ওর জ্বাল, স্ফীতি এবং শিখাও খুব বেশী হবে। তাছাড়া পূর্ববর্তী গুরুজনেরাও এর তাফসীর এটাই বর্ণনা করেছেন। এরকমই পাথরগুলোতে আগুন লাগাও সর্বজন বিদিত এবং আয়াতের উদ্দেশ্যও হচ্ছে আগুনের তেজ এবং স্ফীতি বর্ণনা করা, আর এটা বর্ণনা করার জন্যও পাথরের অর্থ গন্ধকের পাথর মনে করাই বেশী যুক্তিযুক্ত। কেননা, এতে আগুনও তেজ হবে এবং শাস্তিও কঠিন হবে। কুরআন মাজীদে রয়েছেঃ“যখন অগ্নিশিখা হালকা হয়, আমি তখন ওকে আরও উকিয়ে দেই।” আরও একটি হাদীসে আছে যে, প্রত্যেক কষ্টদায়ক জিনিস আগুনে আছে। কিন্তু এ হাদীসটি সুরক্ষিত ও পরিচিত নয়। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, এর দু'টো অর্থ আছে। একটি এই যে, প্রত্যেক সেই ব্যক্তি জাহান্নামী যে অপরকে কষ্ট দেয়। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, প্রত্যেক কষ্টদায়ক জিনিস আগুনে বিদ্যমান থাকবে যা জাহান্নামীদেরকে শাস্তি দেবে।(আরবি) অর্থাৎ তৈরী করা হয়েছে। বাহ্যতঃ ভাবার্থ বুঝা যাচ্ছে যে, ঐ আগুন কাফিরদের জন্যে তৈরী করা হয়েছে। এর ভাবার্থ পাথরও হতে পারে। অর্থাৎ ঐ পাথর কাফিরদের জন্য তৈরী করা হয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদেরও (রাঃ) এটাই মত। প্রকৃতপক্ষে এই দু' অর্থে কোন বিরোধ নেই। কেননা, আগুন জ্বালাবার জন্যেই পাথর তৈরী করা, আর আগুন তৈরী করার জন্যে পাথর তৈরী করা জরুরী। সুতরাং একে অপরের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি কুফরীর উপর রয়েছে তার জন্যও ঐ শাস্তি তৈরী আছে। এই আয়াত দ্বারা এই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে যে, জাহান্নাম এখনও বিদ্যমান ও সৃষ্ট রয়েছে। কেননা, (আরবি)শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর দলীল স্বরূপ বহু হাদীসও রয়েছে। একটি সুদীর্ঘ হাদীসে আছে, জান্নাত ও জাহান্নামে ঝগড়া হলো (শেষ পর্যন্ত)। দ্বিতীয় হাদীসে আছেঃ “জাহান্নাম আল্লাহ তা'আলার নিকট দু’টি শ্বাস গ্রহণের অনুমতি চাইলো এবং তাকে শীতকালে একটি এবং গ্রীষ্মকালে একটি শ্বাস নেয়ার অনুমিত দেয়া হলো।” ৩য় হাদীসে আছে, সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “আমরা একদিন একটি বড় শব্দ শুনতে পাই। আমরা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করিঃ “এটা কিসের শব্দ?” তিনি বলেনঃ “সত্তর বছর পূর্বে একটি পাথর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, আজ তা তথায় পৌছেছে।” ৪র্থ হাদীস এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূর্য গ্রহণের নামায পড়া অবস্থায় জাহান্নামকে দেখেছিলেন। ৫ম হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিরাযের রাত্রে জাহান্নাম ও তার শাস্তি অবলোকন করেছিলেন। এরকমই আরও সহীহ মুতাওয়াতির হাদীস রয়েছে। মু'তাযিলারা নিজেদের অজ্ঞতার কারণে এটা স্বীকার করে না এবং বিপরীত কথা বলে থাকে। কাযী-ই-উনদুলুস মুনজির বিন সাঈদ বালুতীও তাদের অনুকরণ করেছেন। ইমাম রাযী (রঃ) এর বিশ্লেষণঃইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে লিখেছেনঃ “কেউ যদি বলে যে, সূরা-ই-কাওসার, সূরা-ই-আসর এবং সূরা-ই-আল কাফিরুনের মত ছোট ছোট সূরাগুলোও (আরবি), শব্দেরই অন্তর্ভুক্ত, আর এটা সর্বজনবিদিত যে, এরকম সূরা কিংবা এর সমপর্যায়ের কোন সূরা রচনা করা সম্ভব, সুতরাং একে মানবীয় শক্তির বাইরে বলা নেহায়েত হঠধর্মী ও অযথা পক্ষপাতিত্ব করারই শামিল, তাহলে আমি উত্তরে বলব যে, আমরা তো কুরআন মাজীদের মু'জিযা হওয়ার দু’টি পন্থা বর্ণনা করে দ্বিতীয় পন্থাকে এজন্যেই পছন্দ করেছি যে, আমরা বলি, যদি এই ছোট সূরাগুলোও ভাষার সৈৗন্দর্য ও অলংকারের দিক দিয়ে এরকমই হয় যে,ওগুলোকেও মু'জিযা বলা যেতে পারে এবং ওর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব না হয়, তবে তো আমাদের উদ্দেশ্য লাভ হয়েই গেল। কেননা, এরূপ সূরা রচনা মানুষের সাধ্যের মধ্যে হওয়া সত্ত্বেও তারা এরূপ সূরা রচনা করতে পারছে না। এটা একথারই দলীল যে, ছোট ছোট আয়াতগুলোসহ সম্পূর্ণ কুরআনই মু'জিযা।” এটা তো ইমাম রাযীর (রঃ) কথা। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, প্রকৃতপক্ষে কুরআন কারীমের ছোট বড় প্রত্যেকটি সূরা মু'জিযা এবং মানুষ এর অনুরূপ রচনা করতে সম্পূর্ণ অসমর্থ ও অপারগ।ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, মানুষ যদি গভীর চিন্তা সহকারে শুধুমাত্র সূরা আল-আসর'কে বুঝবার চেষ্টা করে তাহলেই যথেষ্ট। হযরত আমর বিন আস (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে প্রতিনিধি হিসেবে মুসাইলামা কাযযাবের নিকট উপস্থিত হলে সে তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “তুমি তো মক্কা থেকেই আসছো, আচ্ছা বলতো আজকাল কোন নতুন ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছে?” তিনি বলেনঃ সম্প্রতি একটি সংক্ষিপ্ত সূরা অবতীর্ণ হয়েছে যা অত্যন্ত চারুবাক ও ভাষার সৌন্দর্য ও অলংকারে পরিপূর্ণ এবং খুবই ব্যাপক।” অতঃপর সূরা-ইআল-আসর পড়ে শুনান। মুসাইলামা কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ওর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বলেঃ “আমার উপরও এ রকমই একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে।” তিনি বলেনঃ “ঠিক আছে, শুনাও দেখি।” সে বলেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওহে জংলী ইদুর! তোমার অস্তিত্ব তো দুটি কান ও বক্ষ ছাড়া কিছুই নয়, বাকী তো তোমার সবই নগণ্য।” অতঃপর সে বলেঃ বল হে আমর! কেমন হয়েছে। তিনি (আমর রাঃ) বলেনঃ আমাকে জিজ্ঞেস করছো কি? তুমি তো সবই জান যে, এর সবই মিথ্যা। কোথায় এই বাজে কথা আর কোথায় সেই জ্ঞান ও দর্শনপূর্ণ বাণী।”
আল-বাকারা 2:24
২৩-২৪ নং আয়াতের তাফসীরনবুওয়াতের উপর আলোচনাতাওহীদের পর এখন নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছেঃ “আমি যে পবিত্র কুরআন আমার বিশিষ্ট বান্দা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছি তাকে যদি তোমরা আমার বাণী বলে বিশ্বাস না কর তবে তোমরা ও তোমাদের সাহায্যকারীরা সব মিলে পূর্ণ কুরআন তো নয় বরং শুধুমাত্র ওর একটি সূরার মত সূরা আনয়ন কর। তোমরা তো তা করতে কখনও সক্ষম হবে না, তা হলে ওটিযে আল্লাহর কালাম এতে সন্দেহ করছে কেন?” (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সাহায্যকারী ও অংশীদার, যারা তাদেরকে সাহায্য ও সহযোগিতা করত। তাহলে ভাবার্থ হলো এইঃ “যাদেরকে তোমরা পূজনীয়রূপে স্বীকার করছ তাদেরকেও ডাকো এবং তাদের সাহায্য ও সহযোগিতায় হলেও এটির মত একটি সূরা রচনা কর।”হষরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তোমরা তোমাদের শাসনকর্তা এবং বাকপটু ও বাগ্মীদের নিকট হতেও সাহায্য নিয়ে নাও। কুরান পাকের এই মুজিযার প্রকাশ এবং এই রীতির বাণী কয়েক স্থানে আছে। সূরা-ই কাসাসের মধ্যে আছেঃ “ (হে নবী সঃ) তুমি বলে দাও যে, যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে আল্লাহর নিকট হতে অন্য কোন কিতাব নিয়ে এসো সৎ পথ প্রদর্শনে এ দু’টো (কুরআন ও তাওরাত) অপেক্ষা অধিক উৎকৃষ্ট হয়, তা হলে আমিও তার অনুসরণ করবো।” আল্লাহ তাআলা সূরা-ই-বানী ঈসরাইলে বলেছেনঃ “তুমি বলে দাও যে, যদি মানুষ ও জ্বিন এ উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয় যে, এরূপ কুরআন রচনা করে আনবে, তথাপিও তার অনুরূপ আনয়ন করতে পারবে না, যদিও তারা একে অন্যের সাহায্যকারী হয়।”সূরা-ই-হূদে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তবে কি তারা এরূপ বলে যে, এটা তুমি নিজেই রচনা করেছ? বলে দাও, তোমরাও তাহলে ওর অনুরূপ রচিত দশটি সূরা আনয়ন কর এবং আল্লাহকে ছাড়া যাকে যাকে ডাকতে পার ডেকে আন যদি তোমরা সত্যবাদী হও।" সূরা-ই- ইউনুসে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “এ কুরআন কল্পনাপ্রসূত নয় যে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও দ্বারা প্রকাশিত হয়েছে, বরং এটা তো সেই কিতাবসমূহের সত্যতা প্রমাণকারী যা এর পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এটা আবশ্যকীয় বিধানসমূহের ব্যাখ্যা দানকারী, এতে কোন সন্দেহ নেই, এটা বিশ্ব প্রভুর পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয়েছে। তারা কি এরূপ বলে যে, এটা তোমার স্বরচিত? তুমি বলে দাও, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা-ই এনে দাও এবং আল্লাহকে ছাড়া যাকে পার ডাকো যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” এ সমস্ত আয়াত তো মক্কা মুকাররামায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং মক্কাবাসীকে এর মুকাবিলায় অসমর্থ সাব্যস্ত করে মদীনা শরীফেও, এ বিষয়ের পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যেমন উপরের আয়াত।(আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটিকে কেউ কেউ কুরআনের দিকে ফিরিয়েছেন। অর্থাৎ এর (কুরআনের) মত কোন একটি সূরা রচনা কর। কেউ কেউ সর্বনামটি মুহাম্মদ (সঃ)-এর দিকে ফিরিয়েছেন। অর্থাৎ তার মত কোন নিরক্ষর লোক এরূপ হতেই পারে না যে, লেখাপড়া কিছু না জেনেও এমন বাণী রচনা করতে পারে যার মত বাণী কারও দ্বারা রচিত হতে পারে না। কিন্তু প্রথম মৃতটিই সঠিক।মুজাহিদ (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), আমর বিন মাসউদ (রঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং অধিকাংশ চিন্তাবিদের এটাই মত। ইমাম ইবনে জারীর তাবারী (রঃ), যামাখৃশারী এবং ইমাম রাষীও (রঃ) এই মত পছন্দ করেছেন। এটাকে প্রাধান্য দেয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমটি এই যে, এতে সবারই প্রতি ধমক রয়েছে। একত্রিত করে এবং পৃথক পৃথক করেও, সে নিরক্ষরই হোক বা আহলে কিতাব ও শিক্ষিত লোকই হোক, এতে এই মুজিযার পূর্ণতা রয়েছে এবং শুধুমাত্র অশিক্ষিত লোকদেরকে অপারগ করা অপেক্ষা এতে বেশী গুরুত্ব এসেছে। আবার দশটি সূরা আনতে বলা এবং ওটা আনতে না পারার ভবিষ্যদ্বাণী করাও এটাই প্রমাণ করছে যে, এর ভাবার্থ কুরআনই হবে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ব্যক্তিত্ব নয়। সুতরাং এই সাধারণ ঘোষণা, যা বার বার করা হয়েছে, এবং সঙ্গে সঙ্গে এই ভবিষ্যদ্বাণীও করা হয়েছে যে, এরা এর উপর সক্ষম নয়। এ ঘোষণা একবার মক্কায় করা হয়েছে এবং পরে মদীনাতেও এর পুনরাবৃত্তি হয়েছে। আর ঐসব লোক, যাদের মাতৃভাষা আরবী ছিল এবং নিজেদের বাকপটুতা ও বাগ্মীতার জন্যে গর্ববোধ করতো তারা সবাই এর মুকাবিলা করতে অসমর্থ হয়েছিল। তারা পূর্ণ কুরআনের উত্তর দিতে পারেইনি।' দশটি সূরাও নয় এমনকি একটি আয়াতেরও উত্তর দিতে সমর্থ হয়নি। সূতরাং পবিত্র কুরআনের একটি মু'জিযা তো এই যে, তারা এর মত একটি ছোট সূরাও রচনা করতে পারেনি। দ্বিতীয় মুজিযাকুরআন কারীমের দ্বিতীয় মু'জিযা এই যে, তারা কখনও এর মত কিছুই রচনা করতে পারবে না যদিও তারা সবাই একত্রিত হয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত চেষ্টা করে, আল্লাহ তাআলার ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা প্রমাণিত হয়ে গেল। সেই যুগেও কারও সাহস হয়নি, তার পরে আজ পর্যন্তও হয়নি। এবং কিয়ামত পর্যন্তও কারও সাহস হবে না। আর এ হবেই বা কিরূপে? যেমনভাবে আল্লাহর সত্তা অতুলনীয়, তার বাণীও তদ্রুপ অতুলনীয়। প্রকৃত ব্যাপারও এটাই যে, কুরআন পাককে এক ন্যর দেখলেই তার প্রকাশ্য ও গোপনীয়, শাব্দিক ও অর্থগত সব কিছু এমনভাবে প্রকাশ পায় যা সৃষ্টজীবের শক্তির বাইরে। স্বয়ং বিশ্বপ্রভু বলছেনঃ “এটা এমন কিতাব যার আয়াতগুলো প্রজ্ঞাময়, মহাজ্ঞাতার পক্ষ হতে (প্রমাণাদি দ্বারা) জোরদার করা হয়েছে, অতঃপর বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।” সুতরাং শব্দ সংক্ষিপ্ত এবং অর্থ বিশ্লেষিত কিংবা শব্দ বিশ্লেষিত এবং অর্থ সংক্ষিপ্ত। কাজেই কুরআন স্বীয় শব্দ ও রচনায় অতুলনীয়, এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সারা দুনিয়া সম্পূর্ণরূপে অপারগ ও অসমর্থ। পূর্ব যুগের যেসব সংবাদ দুনিয়ার অজানা ছিল তা হুবহু এই পাক কালামে বর্ণিত হয়েছে, আগামীতে যা ঘটবে তারও আলোচনা রয়েছে এবং অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে সমস্ত ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা সত্যই বলেছেনঃ “তোমার প্রভুর কথা সংবাদের সত্যতায় এবং নির্দেশের ন্যায্যতায় পূর্ণ হয়েছে। এই পবিত্র কুরআন সমস্তটাই সত্য, সত্যবাদিতা, সুবিচার এবং হিদায়াতে ভরপুর। কুরআন কাব্য নয়পবিত্র কুরআনের মধ্যে কোন আজে বাজে কথা, ক্রীড়া-কৌতুক এবং মিথ্যা অপবাদ নেই যা সাধারণতঃ কবিদের কবিতায় পাওয়া যায়। বরং তাদের কবিতার কদর ও মূল্য ওরই উপর নির্ভর করে। মশহুর প্রবাদ আছে যে, (আরবি) অর্থাৎ যা খুব বেশী মিথ্যা তা খুব বেশী সুস্বাদু। লম্বা চওড়া জোরালো প্রশংসামূলক কবিতাগুলোকে দেখা যায় যে, তা অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা মিশ্রিত। ওতে থাকবে নারীদের প্রশংসা ও সৌন্দর্য বর্ণনা, ঘোড়া ও মদের প্রশংসা, কোন মানুষের বাড়ানো তারীফ, উষ্ট্ৰীসমূহের ভূষণ ও সাজ-সজ্জা, বীরত্বের অতিরঞ্জিত গীত, যুদ্ধের চালবাজী কিংবা ডর-ভয়ের কাল্পনিক দৃশ্য। এতে না আছে কোন দুনিয়ার উপকার, না আছে কোন দ্বীনের উপকার। এতে শুধু কবির বাকপটুতা ও কথা শিল্প প্রকাশ পায়। চরিত্রের উপরেও ওর কোন ভাল প্রভাব পড়ে না, আমলের উপরেও না। পুরো কাসিদার মধ্যে দু' একটি ভাল কবিতা হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু বাকী সবগুলোই আজে বাজে কথায় ভর্তি থাকে। পক্ষান্তরে, কুরআন পাকের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে,ওর এক একটি শব্দ ভাষা-মাধুর্যে, দ্বীন ও দুনিয়ার উপকারে এবং মঙ্গল ও কল্যাণে ভরপুর। আবার বাক্যের বিন্যাস ও সৌন্দর্য, শব্দের গাঁথুনী, রচনার গঠন শৈলী অর্থের সুস্পষ্টতা এবং বিষয়ের পবিত্রতা যেন সোনায় সোহাগা। এর খবরের আস্বাদন, এর বর্ণনাকৃত ঘটনাবলীর সরলতা মৃত সঞ্জীবনী, এর সংক্ষেপণ উচ্চ আদর্শ, এর বিশ্লেষণ মু'জিযার প্রাণ। এর কোন কিছুর পুনরাবৃত্তি দ্বিগুণ স্বাদ দিয়ে থাকে। মনে হয় যেন খাটি মুক্তার বৃষ্টি বর্ষণ হচ্ছে। বার বার পড়লেও মনে বিরক্তি আসবে না। স্বাদ গ্রহণ করতে থাকলে সব সময় নতুন স্বাদ পাওয়া যাবে। বিষয়বস্তু অনুধাবন করতে থাকলে শেষ হবে না। এটা একমাত্র কুরআন পাকের বৈশিষ্ট্য। এর চাটনীর মজা এবং মিষ্টতার স্বাদের কথা তাঁকেই জিজ্ঞেস করা। উচিত যাকে মহান আল্লাহ জ্ঞান, অনুভূতি এবং বিদ্যাবুদ্ধির কিছু অংশ দান করেছেন। এর ভয়,প্রদর্শন, ধমক এবং শাস্তির বর্ণনা মজবুত পাহাড়কেও নড়িয়ে দেয়, মানুষের অন্তর তো কি ছার। এর অঙ্গীকার, সুসংবাদ, দান ও অনুগ্রহের বর্ণনা অন্তরের শুষ্ক কুঁড়ির মুখ খুলে দেয়। এটা ইচ্ছা ও আকাংখার প্রশমিত আবেগের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী এবং বেহেশত ও আরামের সুন্দর সুন্দর দৃশ্য চোখের সামনে উপস্থাপনকারী। এতে মন আনন্দিত হয় এবং খুলে যায়। এতে আগ্রহ উৎপাদক ঘোষণা হচ্ছেঃ “অতএব এইরুপ লোকদের জন্য কত কি নয়ন জুড়ানো আসবাব যে গায়েবী ভাণ্ডারে মওজুদ রয়েছে এটা কারও জানা নেই।”আরও বলা হচ্ছেঃ “এবং তার (বেহেশতের) মধ্যে মনঃপুত ও চক্ষু জুড়ানো দ্রব্যাদি রয়েছে।” ভয় প্রদর্শন ও ধমকরূপে বলা হচ্ছেঃ “তোমরা কি তার হতে, যিনি আকাশে রয়েছেন, নির্ভয় রয়েছে যে, তিনি তোমাদেরকে যমীনের মধ্যে ধ্বসিয়ে দেন, অতঃপর ঐ যমীন থর থর করতে থাকে? না কি তোমরা নির্ভয় হয়ে গেছে এটা হতে যে, যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি এক প্রচণ্ড বায়ু প্রেরণ করে দেন? সুতরাং তোমরা সত্ত্বরই জানতে পারবে যে, ভয় প্রদর্শন কিরূপ ছিল।” আরও বলা হচ্ছেঃ “অতঃপর তাদের পাপের কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি।” উপদেশ দান রূপে বলা হয়েছেঃ “যদিও আমি। তাদেরকে কয়েক বছর ধরে সুখ-সম্ভোগে রেখেছি তাতে কি হয়েছে? অতঃপর যার ওয়াদা তাদেরকে দেয়া হয়েছিল তা এসে গেল। যে আঁকজমকের মধ্যে তাঁরা ছিল তা তাদের কোন কাজে আসলো না। মোটকথা এভাবে আল্লাহ কুরআন পাকের মধ্যে যখন যে বিষয় ধরেছেন তাকে পূর্ণতায় পৌছিয়ে ছেড়েছেন। আর একে বিভিন্ন প্রকারের বাকপটুতা, ভাষালংকার এবং নিপুণতা দ্বারা পরিপূর্ণ করেছেন। নির্দেশাবলী ও নিষেধাজ্ঞার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, প্রত্যেক নির্দেশের মধ্যে মঙ্গল, সততা, লাভ এবং পবিত্রতার একত্র সমাবেশ ঘটেছে, আর প্রত্যেক নিষেধাজ্ঞা পাপ, হীনতা, ইতরামি এবং ভ্রষ্টতা কর্তনকারী। হযরত ইবনে মাউদ (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ বলেছেন যে, যখন কুরআন মাজীদের মধ্যে (আরবি) শুনতে পাও তখন তোমরা কান লাগিয়ে দাও, হয়তো কোন ভাল কাজের হুকুম দেয়া হবে, বা কোন মন্দ কাজ হতে নিষেধ করা হবে। স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তিনি। তোমাদেরকে ভাল কাজের আদেশ করেন এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখেন, পবিত্র জিনিস হালাল করেন এবং অপবিত্র জিনিস হারাম করেন, যে ভারী শিকল পায়ে জড়ানো ছিল এবং যে গলাবন্ধ গলায় দেয়া ছিল তা তিনি দূরে নিক্ষেপ করেন।”কুরআন কারীমের মধ্যে আছে কিয়ামতের বর্ণনা, তথাকার ভয়াবহ দৃশ্য, বেহেশত ও দোযখের বর্ণনা, দয়া ও কষ্টের পূর্ণ বিবরণ। আরও রয়েছে আল্লাহর মনোনীত বান্দাগণের জন্যে নানা প্রকার নিয়ামতের বর্ণনা ও তার শত্রুদের জন্যে নানা প্রকার শাস্তির বর্ণনা। কোথাও বা আছে সুসংবাদ এবং কোথায়ও আছে ভয় প্রদর্শন। কোন স্থানে আছে সৎকার্যের প্রতি আগ্রহ উৎপাদন এবং কোন স্থানে আছে মন্দ কাজ হতে বাধা প্রদান। কোন জায়গায় আছে দুনিয়ার প্রতি উদাসীনতার শিক্ষা এবং কোন জায়গায় আছে আখেরাতের প্রতি আগ্রহের শিক্ষা। এ সমুদয় আয়াতই মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শন করে এবং আল্লাহর পছন্দনীয় শরীয়তের দিকে ঝুকিয়ে দেয়, অন্তুরের কালিমা দূর করে, শয়তানী পথগুলো বন্ধ করে এবং মন্দ ক্রিয়া নষ্ট করে থাকে।সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবীকে (আঃ) এমন মু'জিযা দেয়া হয়েছিল যা দেখে মানুষ তাদের উপর ঈমান এনেছিল, কিন্তু আমার মজিযা আল্লাহর ওয়াহী অর্থাৎ পবিত্র কুরআন। কাজেই আমি আশা করি যে, কিয়ামতের দিন অন্যান্য নবীদের (আঃ) অপেক্ষা আমার অনুসারী বেশী হবে।” কেননা, অন্যান্য নবীদের (আঃ) মু'জিযা তাঁদের সঙ্গেই বিদায় নিয়েছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই মু’জিয়া কিয়ামত পর্যন্ত বাকী থাকবে। জনগণ ওটা দেখতে থাকবে এবং ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ ফরমানঃ “আমার মু'জিযা ওয়াহী যা আমাকে দেয়া হয়েছে” এর ভাবার্থ এই যে, এই কুরআনকে তার জন্যেই বিশিষ্ট করা হয়েছে এবং এটা একমাত্র তাকেই দেয়া হয়েছে যা প্রতিযোগিতায় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সারা দুনিয়াকে হার মানিয়ে দিয়েছে। পক্ষান্তরে অন্যান্য আসমানী কিতাব অধিকাংশ আলেমের মতে এই বিশেষণ হতে শূন্য রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সত্যতার উপর এবং ইসলাম ধর্মের সত্যতার উপর এই মুজিযা ছাড়াও আরও এত দলীল আছে যে, তা গুণে শেষ করা যায় না। আল্লাহর জন্যেই সমুদয় প্রশংসা।কোন কোন ইসলামী দর্শন বেত্তা কুরআন কারীমের মু'জিয়া হওয়াকে এমন পন্থায় বর্ণনা করেছেন যে, তা আলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত এবং মু'তাযিলার কথারই অন্তর্ভুক্ত। তারা বলেন যে, হয়তো বা কুরআন নিজেই মু'জিয়া, এর মত কিছু রচনা করা মানুষের সাধ্যের বাইরে। এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার তাদের ক্ষমতাই নেই। কিংবা যদিও এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্ভব এবং এটা মানবীয় শক্তির বাইরে নয়, তথাপি তাদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্যে আহ্বান করা হচ্ছে। তারা কঠিন শক্রতার মধ্যে রয়েছে, সত্য ধর্মকে দুনিয়ার বুক থেকে মুছে ফেলার জন্যে তারা সর্বশক্তি ব্যয় করতে এবং সব কিছু ধ্বংস করতে সদা প্রস্তুত রয়েছে। তবুও তারা কুরআন কারীমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না। এটা কুরআনের পক্ষ হতেই হচ্ছে যে, তাদের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কুরআন তাদেরকে বাধা দিচ্ছে যার ফলে তারা এর অনুরূপ পেশ করতে অপারগ হচ্ছে।যদিও শেষের মতটি তলোপছন্দনীয় নয়, তথাপি তাকেও যদি মেনে নেয়া হয় তবে তার দ্বারাও কুরআনের মু'জিযা হওয়া সাব্যস্ত হচ্ছে। এটা সত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় ও তর্কের খাতিরে নিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়া হলেও কুরআনের মুজিযা হওয়াই সাব্যস্ত হচ্ছে। ইমাম রাযী (রঃ) হোট ছোট সূৰ্বর প্রশ্নের উত্তরে এই পন্থাই অবলম্বন করেছেন।(আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে জ্বালানী, যা দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়। যেমন গাছের ডাল, কাঠ, খড়ি ইত্যাদি। কুরআন কারীমের এক জায়গায় আছেঃ “অত্যাচারী লোকেরা দোযখের জ্বালানী কাঠ।” অন্য স্থানে আছেঃ “তোমরা ও তোমাদের ঐ সব মাবুদ, আল্লাহকে ছেড়ে যাদের তোমরা ইবাদত করতে, দোযখের খড়ি হবে, তোমরা সব ওর মধ্যে আসবে। যদি তারা সত্য মা'বুদ হতো তবে সেখানে আগমন করতো না। প্রকৃতপক্ষে তারা সবাই চিরকাল অবস্থানকারী (আরবি) বলা হয় পাথরকে। এখানে অর্থ হচ্ছে গন্ধকের পাথর যা অত্যন্ত কালো, বড় এবং দুর্গন্ধময়, যার আগুনে অত্যন্ত তেজ থাকে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে নিরাপদে রাখুন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার সঙ্গে • সঙ্গেই এই পাথরগুলো প্রথম আকাশে সৃষ্টি করা হয়েছে। (তাফসীর-ই-ইবনে) জারীর, মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম, মুসতাদরিক-ই-হাকিম)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং অন্যান্য কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে সুদ্দী (রঃ) নকল করেছেন যে, দোযখের মধ্যে এই কালো গন্ধকের পাথরও থাকবে যার কঠিন আগুন দ্বারা কাফিরদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই পাথরগুলোর দুর্গন্ধ মৃতদেহের দুর্গন্ধের চেয়েও বেশী কঠিন। মুহাম্মদ বিন আলী (রঃ) এবং ইবনে জুরাইও (রঃ) বলেন যে, গন্ধকের অর্থ হচ্ছে বড় বড় ও শক্ত শক্ত পাথর। কেউ কেউ বলেছেন যে, এটা হতে উদ্দেশ্য হচ্ছে ঐ পাথরগুলো যেগুলোর ছবি ইত্যাদি বানানো হতো, অতঃপর ঐগুলোকে পূজা করা হতো। যেমন এক জায়গায় আছেঃ “তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের ইবাদত করতে, তারা জাহান্নামের জ্বালানী খড়ি।”কুরতুবী (রঃ) এবং রাযী (রঃ) এই মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, গন্ধকের পাথরে আগুন ধরা কোন নতুন কথা নয়। কাজেই ভাবার্থ হবে এই মূর্তিগুলোই এবং আরও অন্যান্য পাথর-আল্লাহ্ পাককে ছাড়া যেগুলো যে কোন আকারে পূজনীয় হবে। কিন্তু এই যুক্তিটা জোরালো যুক্তি নয়। কেননা, যখন গন্ধকের পাথর দিয়ে আগুন উসকানো হয়, তখন এটা জানা কথা যে, এর তাপ ও প্রখরতা সাধারণ আগুন হতে বহুগুণে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। ওর জ্বাল, স্ফীতি এবং শিখাও খুব বেশী হবে। তাছাড়া পূর্ববর্তী গুরুজনেরাও এর তাফসীর এটাই বর্ণনা করেছেন। এরকমই পাথরগুলোতে আগুন লাগাও সর্বজন বিদিত এবং আয়াতের উদ্দেশ্যও হচ্ছে আগুনের তেজ এবং স্ফীতি বর্ণনা করা, আর এটা বর্ণনা করার জন্যও পাথরের অর্থ গন্ধকের পাথর মনে করাই বেশী যুক্তিযুক্ত। কেননা, এতে আগুনও তেজ হবে এবং শাস্তিও কঠিন হবে। কুরআন মাজীদে রয়েছেঃ“যখন অগ্নিশিখা হালকা হয়, আমি তখন ওকে আরও উকিয়ে দেই।” আরও একটি হাদীসে আছে যে, প্রত্যেক কষ্টদায়ক জিনিস আগুনে আছে। কিন্তু এ হাদীসটি সুরক্ষিত ও পরিচিত নয়। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, এর দু'টো অর্থ আছে। একটি এই যে, প্রত্যেক সেই ব্যক্তি জাহান্নামী যে অপরকে কষ্ট দেয়। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, প্রত্যেক কষ্টদায়ক জিনিস আগুনে বিদ্যমান থাকবে যা জাহান্নামীদেরকে শাস্তি দেবে।(আরবি) অর্থাৎ তৈরী করা হয়েছে। বাহ্যতঃ ভাবার্থ বুঝা যাচ্ছে যে, ঐ আগুন কাফিরদের জন্যে তৈরী করা হয়েছে। এর ভাবার্থ পাথরও হতে পারে। অর্থাৎ ঐ পাথর কাফিরদের জন্য তৈরী করা হয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদেরও (রাঃ) এটাই মত। প্রকৃতপক্ষে এই দু' অর্থে কোন বিরোধ নেই। কেননা, আগুন জ্বালাবার জন্যেই পাথর তৈরী করা, আর আগুন তৈরী করার জন্যে পাথর তৈরী করা জরুরী। সুতরাং একে অপরের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি কুফরীর উপর রয়েছে তার জন্যও ঐ শাস্তি তৈরী আছে। এই আয়াত দ্বারা এই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে যে, জাহান্নাম এখনও বিদ্যমান ও সৃষ্ট রয়েছে। কেননা, (আরবি)শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর দলীল স্বরূপ বহু হাদীসও রয়েছে। একটি সুদীর্ঘ হাদীসে আছে, জান্নাত ও জাহান্নামে ঝগড়া হলো (শেষ পর্যন্ত)। দ্বিতীয় হাদীসে আছেঃ “জাহান্নাম আল্লাহ তা'আলার নিকট দু’টি শ্বাস গ্রহণের অনুমতি চাইলো এবং তাকে শীতকালে একটি এবং গ্রীষ্মকালে একটি শ্বাস নেয়ার অনুমিত দেয়া হলো।” ৩য় হাদীসে আছে, সাহাবীগণ (রাঃ) বলেনঃ “আমরা একদিন একটি বড় শব্দ শুনতে পাই। আমরা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করিঃ “এটা কিসের শব্দ?” তিনি বলেনঃ “সত্তর বছর পূর্বে একটি পাথর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, আজ তা তথায় পৌছেছে।” ৪র্থ হাদীস এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূর্য গ্রহণের নামায পড়া অবস্থায় জাহান্নামকে দেখেছিলেন। ৫ম হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিরাযের রাত্রে জাহান্নাম ও তার শাস্তি অবলোকন করেছিলেন। এরকমই আরও সহীহ মুতাওয়াতির হাদীস রয়েছে। মু'তাযিলারা নিজেদের অজ্ঞতার কারণে এটা স্বীকার করে না এবং বিপরীত কথা বলে থাকে। কাযী-ই-উনদুলুস মুনজির বিন সাঈদ বালুতীও তাদের অনুকরণ করেছেন। ইমাম রাযী (রঃ) এর বিশ্লেষণঃইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে লিখেছেনঃ “কেউ যদি বলে যে, সূরা-ই-কাওসার, সূরা-ই-আসর এবং সূরা-ই-আল কাফিরুনের মত ছোট ছোট সূরাগুলোও (আরবি), শব্দেরই অন্তর্ভুক্ত, আর এটা সর্বজনবিদিত যে, এরকম সূরা কিংবা এর সমপর্যায়ের কোন সূরা রচনা করা সম্ভব, সুতরাং একে মানবীয় শক্তির বাইরে বলা নেহায়েত হঠধর্মী ও অযথা পক্ষপাতিত্ব করারই শামিল, তাহলে আমি উত্তরে বলব যে, আমরা তো কুরআন মাজীদের মু'জিযা হওয়ার দু’টি পন্থা বর্ণনা করে দ্বিতীয় পন্থাকে এজন্যেই পছন্দ করেছি যে, আমরা বলি, যদি এই ছোট সূরাগুলোও ভাষার সৈৗন্দর্য ও অলংকারের দিক দিয়ে এরকমই হয় যে,ওগুলোকেও মু'জিযা বলা যেতে পারে এবং ওর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব না হয়, তবে তো আমাদের উদ্দেশ্য লাভ হয়েই গেল। কেননা, এরূপ সূরা রচনা মানুষের সাধ্যের মধ্যে হওয়া সত্ত্বেও তারা এরূপ সূরা রচনা করতে পারছে না। এটা একথারই দলীল যে, ছোট ছোট আয়াতগুলোসহ সম্পূর্ণ কুরআনই মু'জিযা।” এটা তো ইমাম রাযীর (রঃ) কথা। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, প্রকৃতপক্ষে কুরআন কারীমের ছোট বড় প্রত্যেকটি সূরা মু'জিযা এবং মানুষ এর অনুরূপ রচনা করতে সম্পূর্ণ অসমর্থ ও অপারগ।ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, মানুষ যদি গভীর চিন্তা সহকারে শুধুমাত্র সূরা আল-আসর'কে বুঝবার চেষ্টা করে তাহলেই যথেষ্ট। হযরত আমর বিন আস (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে প্রতিনিধি হিসেবে মুসাইলামা কাযযাবের নিকট উপস্থিত হলে সে তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “তুমি তো মক্কা থেকেই আসছো, আচ্ছা বলতো আজকাল কোন নতুন ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছে?” তিনি বলেনঃ সম্প্রতি একটি সংক্ষিপ্ত সূরা অবতীর্ণ হয়েছে যা অত্যন্ত চারুবাক ও ভাষার সৌন্দর্য ও অলংকারে পরিপূর্ণ এবং খুবই ব্যাপক।” অতঃপর সূরা-ইআল-আসর পড়ে শুনান। মুসাইলামা কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ওর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বলেঃ “আমার উপরও এ রকমই একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে।” তিনি বলেনঃ “ঠিক আছে, শুনাও দেখি।” সে বলেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওহে জংলী ইদুর! তোমার অস্তিত্ব তো দুটি কান ও বক্ষ ছাড়া কিছুই নয়, বাকী তো তোমার সবই নগণ্য।” অতঃপর সে বলেঃ বল হে আমর! কেমন হয়েছে। তিনি (আমর রাঃ) বলেনঃ আমাকে জিজ্ঞেস করছো কি? তুমি তো সবই জান যে, এর সবই মিথ্যা। কোথায় এই বাজে কথা আর কোথায় সেই জ্ঞান ও দর্শনপূর্ণ বাণী।”
আল-বাকারা 2:25
যেহেতু এর পূর্বে কাফির ও ধর্মদ্রোহীদের শাস্তি ও লাঞ্ছনার বর্ণনা দেয়া হয়েছে, কাজেই এখানে মুমিন ও সৎলোকদের প্রতিদান, পুণ্য ও সম্মানের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কুরআনের (আরবি) হওয়ার এটাও একটা অর্থ এবং সঠিক অর্থ এটাই যে, এতে প্রত্যেক বিষয় জোড়া জোড়া রয়েছে। এর বিস্তারিত বিবরণও উপযুক্ত জায়গায় দেয়া হবে। ভাবার্থ এই যে, ঈমানের সঙ্গে কুফরের এবং কুফরের সঙ্গে ঈমানের পুণ্যের সঙ্গে পাপের ও পাপের সঙ্গে পুণ্যের বর্ণনা অবশ্যই আসে। যে জিনিসের বর্ণনা দেয়া হয় সঙ্গে সঙ্গে তার বিপরীত জিনিসেরও বর্ণনা দেয়া হয়। কোন জিনিসের বর্ণনা দিয়ে কোন জায়গায় তার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয় (আরবি) এরকমই।জান্নাতের তলদেশ দিয়ে নদী বয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে তার বৃক্ষরাজী ও অট্টালিকার নিম্নদেশ দিয়ে বয়ে যাওয়া। হাদীস শরীফে আছে যে, তথায় নদী প্রবাহিত হয়, কিন্তু গর্ত নেই। অন্য হাদীসে আছে যৈ, কাওসার নদীর দু'ধারে খাঁটি মুক্তার গম্বুজ আছে, তার মাটি হচ্ছে খাটি মৃগনাভি, তার কুচি পাথরগুলো হচ্ছে মণি-মুক্তা ও অতি মূল্যবান পাথর। আল্লাহ্ তা'আলা অনুগ্রহ করে যেন আমাদেরকে ঐ নিয়ামত দান করেন। তিনি বড় অনুগ্রহশীল ও দয়ালু। হাদীসে আছে যে, জান্নাতের নদীগুলো মুশকের পাহাড়ের নিম্নদেশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)। হযরত আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। জান্নাতবাসীদের এই কথা “ইতিপূর্বে আমাদেরকে দেয়া হয়েছিল।এর ভাবার্থ এই যে, দুনিয়াতেও তাদেরকে এই ‘গুলো দেয়া হয়েছিল। তাদের এটা বলার কারণ এই যে, বাহ্যিক আকারে এটা সম্পূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ হবে।ইয়াহ্ইয়া বিন কাসীর (রঃ) বলেন যে, এক পেয়ালা আসবে, তা সে খাবে আর এক পেয়ালা আসলে বলবেঃ “এটা এতো এখন খেলাম।” ফেরেশতারা বলবেনঃ “খেতে থাকুন। বরং এক হলেও স্বাদ আলাদা। তিনি আরও বলেন যে, বেহেশতের ঘাস হচ্ছে জাফরান এবং পাহাড়গুলো হচ্ছে মুশকের। ছোট ছোট সুন্দর ছেলেরা ফল এনে হাজির করছে এবং তারা খাচ্ছে। আবার আনলে তারা বলছেঃ ওটা এখনই তো খেলাম।" তারা উত্তর দিচ্ছেঃ জনাব! রং ও রূপ তো এক, কিন্তু স্বাদ পৃথক; খেয়ে দেখুন।" খেয়েই তারা আরও সুস্বাদু অনুভব করছে। সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার এটাই অর্থ। দুনিয়ার ফলের সঙ্গেও নামে ও আকারে সাদৃশ্য থাকবে, কিন্তু স্বাদ হবে পৃথক।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাদৃশ্য শুধু নামে হবে, নচেৎ কোথায় এখানকার জিনিস আর কোথায় ওখানকার জিনিস। এখানে তো শুধু নামই আছে। আবদুর রহমানের (রাঃ) কথা এই যে, দুনিয়ার ফলের মত ফল দেখে বলবেঃ “এটা তো খেয়েছি। কিন্তু যখন খাবে তখন বুঝবে যে, মজা অন্য কিছু। তথায় তারা যেসব স্ত্রী পাবে তারা মলিনতা, অপবিত্রতা, মাসিক ঋতু প্রস্রাব, পায়খানা, থুথু ইত্যাদি হতে সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবে। হযরত হাওয়াও (আঃ) প্রথমে মাসিক ঋতু হতে পবিত্র ছিলেন। কিন্তু অবাধ্যতা প্রকাশ পাওয়া মাত্রই তার উপরেও এ বিপদ এসে যায়। কিন্তু একথাটি সনদ হিসেবে গরীব বা দুর্বল।আর একটি গরীব মারফু হাদীসে আছে যে, হায়েয, পায়খানা, থুথু হতে পাক। হাকিম (রঃ) এই হাদীসটিকে শায়খাইনের শর্তের উপরে সঠিক বলেছেন। কিন্তু এ দাবী সত্য নয়। এর একজন বর্ণনাকারী হচ্ছে আবদুর রাযযাক বিন উমার বাযীঈ, যার হাদীসকে আবু হাতিম বাসতী দলীলরূপে গ্রহণের যোগ্য মনে করেন না। প্রকাশ্যভাবে জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মার নয়। বরং এটা হযরত কাতাদা (রাঃ)-এর কথা। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।
আল-বাকারা 2:26
২৬-২৭ নং আয়াতের তাফসীরহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং অন্য কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন উপরের তিনটি আয়াতে মুনাফিকদের দুটি দৃষ্টান্ত বর্ণিত হলো অর্থাৎ আগুন ও পানি, তখন তারা বলতে লাগলো যে, এরকম ছোট ছোট দৃষ্টান্ত আল্লাহ তা'আলা কখনও বর্ণনা করেন। তার প্রতিবাদে আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত দুটি অবতীর্ণ করেন। হযরত কাতাদাহ (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরআন পাকের মধ্যে মাকড়সা ও মাছির দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয় তখন মুশষিকরা বলতে থাকে যে, কুরআনের মত আল্লাহর কিতাবে এরকম নিকৃষ্ট প্রাণীর বর্ণনা দেয়ার কি প্রয়োজন। তাদের একথার উত্তরে আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং বলা হয় যে, সত্যের বর্ণনা দিতে আল্লাহ আদৌ লজ্জাবোধ করেন না, তা কমই হোক বা বেশীই হোক। কিন্তু এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এই আয়াতগুলো বুঝি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে, অথচ তা নয়। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন। এগুলো অবতীর্ণ হওয়ার কারণ অন্যান্য গুরুজন হতেও এরকমই বর্ণিত হয়েছে।হযরত রাবী বিন আনাস (রাঃ) বলেন যে, এটা একটা মজবুত দৃষ্টান্ত যা দুনিয়ার দৃষ্টান্তরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। মশা ক্ষুধার্ত থাকা পর্যন্ত জীবিত থাকে এবং মোটা তাজা হলেই মারা যায়। এ রকমই এ লোকেরাও যখন ইহলৌকিক সুখ সম্ভোগ প্রাণভরে ভোগ করে তখনই আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পাকড়াও করেন। যেমন আল্লাহ পাক এক জায়গায় বলেনঃ “যখন এরা আমার উপদেশ ভুলে যায়, তখন আমি তাদের জন্যে সমস্ত জিনিসের, দরজা খুলে দেই, শেষ পর্যন্ত তারা গর্বভরে চলতে থাকে, এমন সময় হঠাৎ আমি তাদেরকে পাকড়াও করি।” ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবি হাতিয় (রঃ) এইরূপ বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রথম মতটি পছন্দ করেছেন এবং সম্বন্ধও এরই বেশী ভাল মনে হচ্ছে। তাহলে ভাবার্থ হলো এই যে, ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম এবং বৃহৎ হতে বৃহত্তম কোন দৃষ্টান্ত বর্ণনা করতে আল্লাহ পাক লজ্জা ও সংকোচ বোধ করেন না (আরবি) শব্দটি এখানে নিম্নমানের অর্থ বুঝাবার জন্যে ব্যবহৃত হয়েছে (আরবি) শব্দটি (আরবি) হওয়ায় ওকে (আরবি) দেয়া হয়েছে। কিংবা (আরবি) শব্দটি (আরবি) এবং (আরবি) –এর (আরবি) হয়েছে। ইবনে জারীর (রঃ) (আরবি) শব্দটির (আরবি) হওয়া এবং (আরবি) শব্দটির ওর (আরবি) দ্বারা (আরবি) হওয়াকে পছন্দ করেছেন এবং আরবদের কালামেও এটা খুব বেশী প্রচলিত আছে। তারা (আরবি) ও (আরবি)-এর কে এ দু'টোরই (আরবি) দিয়ে থাকে। এজন্যই এটা কখনও (আরবি) হয় এবং (আরবি) কখনও হয়। যেমন হযরত হাসসান বিন সাবিতের (রাঃ) কবিতায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “অন্যদের উপর আমাদের শুধু এটুকুই মর্যাদা যথেষ্ট যে, আমাদের অন্তর আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর প্রেমে পরিপূর্ণ।” লুপ্ত (আরবী)-এর ভিত্তিতেও (আরবী) শব্দটি (আরবী) হতে পারে এবং ওর পূর্বে (আরবী) শব্দটি উহ্য মেনে নেয়া হবে। কাসাঈ (রঃ) এবং কারা (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। যোক (রঃ) ও ইবরাহীম বিন আবলাহ (রঃ) (আরবি) পড়ে থাকেন। ইবনে জনী (রঃ) বলেন যে, এটা (আরবি) এর (আরবি) হবে এবং (আরবি) শব্দটিকে লুপ্ত মেনে নেয়া হবে। যেমন, (আরবি) অর্থ (আরবি) একটি তো হলো এই যে, ওর চেয়েও হালকা ও খারাপ জিনিস। যেমন কেউ কোন লোকের কৃপণতা ইত্যাদির কথা বর্ণনা করলে অন্যজন বলে যে, সে আরও উপরে। তখন ভাবার্থ এই হয় যে, এই দোষে সে আরও নীচে নেমে গেছে। কাসাঈ এবং আবূ আবীদ এটাই বলে থাকেন। একটি হাদীসে আছে যে, যদি দুনিয়ার কদর আল্লাহর কাছে একটি মশার ডানার সমানও হতো তবে কোন কাফিরকে এক ঢাকে পানিও দেয়া হতো না। দ্বিতীয় অর্থ এই যে,ওর চেয়ে বেশী বড়। কেননা, মশার চেয়ে ছোট প্রাণী আর কি হতে পারে? কাতাদাহ বিন দাআমার এটাই মত ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেন। সহীহ মুসলিম শরীফে আছে যে, যদি কোন মুসলমানকে কাঁটা লাগে বা এর চেয়েও বেশী তবে তার জন্যেও তার মর্যাদা বেড়ে যায় এবং পাপ মোচন হয়। এ হাদীসেও (আরবি) শব্দটি আছে। তাহলে ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, যেমন এ ছোট বড় জিনিসগুলো সৃষ্টি করতে আল্লাহ তা'আলা লজ্জাবোধ করেন না, তেমনই ওগুলোকে দৃষ্টান্ত স্বরূপ বর্ণনা করতেও তার কোন দ্বিধা ও সংকোচ নেই। কুরআন কারীমের মধ্যে আল্লাহ পাক এক জায়গায় বলেছেনঃ হে লোক সকল! একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে, তোমরা কান লাগিয়ে শোননা আল্লাহকে ছেড়ে যাকে তোমরা ডাকছে, তারা যদি সবাই একত্রিত হয় তবুও একটি মাছিও তারা সষ্টি করতে পারবে না বরং মাছি যদি একত্রিত হয় তবুও একটি মাছিও তারা তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নেয় তবে এরা ওর কাছ থেকে তা ফিরিয়ে আনতে পারবে না। উপাসক ও উপাস্য উভয়েই খুবই দুর্বল।" অন্য স্থানে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “আল্লাহ ছাড়া অন্যান্যদেরকে যারা তাদের মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার জালের ন্যায়, যার ঘর সমূদয় ঘর হতে নরম ও দুর্বল। অন্যত্র তিনি বলেছেনঃ “আল্লাহর তা'আলা কালিমায়ে তাইয়্যেবার কেমন দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন, এটা একটি পবিত্র বৃক্ষের ন্যায় যার শিকড়গুলো খুবই শক্ত এবং ওর শাখাগুলো উপর দিকে যাচ্ছে। ওটা আল্লাহর আদেশে প্রত্যেক মৌসুমে ফল দিয়ে থাকে; এবং আল্লাহ দৃষ্টান্তগুলো এ উদ্দেশ্যে বর্ণনা করে থাকেন, যেন তারা খুব বুঝে নেয়। আর অপবিত্র কালেমার দৃষ্টান্ত এইরূপ, যেমন একটি নিকৃষ্ট বৃক্ষ, যা যমীনের উপর থেকে উপড়িয়ে নেয়া যায়, ওর কোন স্থায়িত্ব নেই। আল্লাহ তাআলা ঈমানদার লোকদেরকে সেই অটল বাক্যের দরুন ইহকালে ও পরকালের সুদৃঢ় রাখেন, এবং জালিমদেরকে বিভ্রান্ত করে দেন এবং আল্লাহ যা চান তাই করেন।” অন্যস্থানে আল্লাহ তাআলা সেই ক্রীতদাসের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন যার কোন জিনিসের উপর স্বাধীনতা নেই।” তিনি অন্যত্র বলেছেনঃ “আল্লাহ দুই ব্যক্তির দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন যাদের মধ্যে একজন তো বোবা এবং সে কোন কিছুর উপরেই ক্ষমতা রাখে না, সে তার মনিবের উপর বোঝা স্বরূপ, সে যেখানেই যায়, অপকার ছাড়া উপকারের কিছু আনতে পারে না, এবং দ্বিতীয় সেই ব্যক্তি যে ন্যায় ও সত্যের আদেশ করে, এ দুজন কি সমান হতে পারে।” অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ “আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বয়ং তোমাদেরই দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছেন, তোমরা কি তোমাদের নিজেদের জিনিসে তোমাদের গোলামদেরকে শরীক ও সমান অংশদীর মনে করছো? অন্যত্র বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছেন যার বহু সমান সমান অংশীদার রয়েছে। অপর জায়গায় আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “এই দৃষ্টান্তগুলো আমি আলেমগণের জন্যে বর্ণনা করে থাকি এবং একমাত্র আলেমগণই তা অনুধাবন করতে থাকে। এ ছাড়া আরও বহু দৃষ্টান্ত কুরআন পাকের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে।পূর্বযুগের কোন একজন মনীষী বলেছেনঃ “যখন আমি কুরআন মাজীদের কোন দৃষ্টান্ত শুনি এবং বুঝতে পারি না তখন আমার কান্না এসে যায়। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, এ দৃষ্টান্তগুলো শুধুমাত্র আলেমরাই বুঝে থাকে।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, দৃষ্টান্ত ছোটই হোক আর বড়ই হোক, ঈমানদারগণ ওর উপর ঈমান এনে থাকে, ওকে সত্য বলে বিশ্বাস করে এবং তা দ্বারা সুপথ পেয়ে থাকে। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, তারা ওকে আত্মাহুর কালাম মনে করে (আরবি) এর (আরবি) টির (আরবি) হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ মু'মিন এ দৃষ্টান্তকে আল্লাহর পক্ষ হতে সত্য মনে করে, আর কাফিরেরা কথা বানিয়ে থাকে। যেমন সূরা-ই-মুদ্দাসসিরে আছেঃ “এবং দোযখের কর্মচারী আমি শুধু ফেরেস্তাদেরকেই নিযুক্ত করেছি, আর আমি তাদের সংখ্যা শুধু এরূপ রেখেছি যা কাফিরদের বিভ্রান্তির উপকরণ হয়, এজন্যে যে, কিতাবীগণ যেন বিশ্বস্ত হয় এবং ঈমানদারদের ঈমান আরও বর্ধিত হয়, আর কিতাবীগণ ও মুমিনগণ সন্দেহ না করে, আর যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তারা এবং কাফিরেরা যেন বলে যে, এ . বিস্ময়কর উপমা দ্বারা আল্লাহর উদ্দেশ্য কি এরূপেই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করে থাকেন, আর যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করে থাকেন; আর তোমার প্রভুর সৈন্যবাহিনীকে তিনি ছাড়া কেউই জানে না আর এটা শুধু মানুষের উপদেশের জন্যে। এখানেও হিদায়াত ও গুমরাহীর বর্ণনা রয়েছে। সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুনাফিক পথভ্রষ্ট হয় এবং মু'মিন সুপথ প্রাপ্ত হয়। মুনাফিকরা ভ্রান্তির মধ্যে বেড়ে চলে, কেননা এ দৃষ্টান্ত যে সত্য তা জানা সত্ত্বেও তারা একে অবিশ্বাস করে, আর মু'মিন এটা বিশ্বাস করে ঈমান আরও বাড়িয়ে নেয়।(আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে মুনাফিক। কেউ কেউ এর অর্থ নিয়েছেন কাফির’-যারা জেনে শুনে অস্বীকার করে। হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা খারেজীগণকে বুঝান হয়েছে। একথার সনদ যদি হযরত সা’দ (রাঃ) থেকে। হওয়া সঠিক হয়, তবে ভাবার্থ হবে এই যে, এ তাফসীর অর্থের দিক দিয়ে এ নয় যে, এর ভাবার্থ খারেজীরা বরং ঐ দলটিও ফাসিকদের অন্তর্ভুক্ত যারা নাহারওয়ানে’ হযরত আলীর (রাঃ) উপর আক্রমণ চালিয়েছিল। তাহলে এরা যদিও আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় বিদ্যমান ছিল না, তথাপি তাদের জঘন্য দোষের কারণে অর্থের দিক দিয়ে তারাও ফাসিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। তারা ন্যায় ও সঠিক ঈমানের আনুগত্য হতে বেরিয়ে গিয়েছিল এবং ইসলামী শরীয়ত হতে সরে পড়েছিল বলে তাদেরকে খারেজী বলা হয়েছে।যে ব্যক্তি আনুগত্য হতে বেরিয়ে যায়, আরবী পরিভাষায় তাকে ফাসিক বলা হয়। ছাল সরিয়ে শীষ বের হলে আরবের (আরবি) বলে থাকে। ইদুর গর্ত থেকে বেরিয়ে ক্ষতি সাধন করতে থাকে বলে ওকেও বলা হয়। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পাঁচটি প্রাণী ‘ফাসিক। কাবা শরীফের মধ্যে এবং ওর বাইরে এদেরকে হত্যা করে দেয়া হবে। এগুলো হচ্ছেঃ ১। কাক, ২। চিল, ৩। বিচ্ছু, ৪। ইঁদুর এবং ৫। কালো কুকুর। সুতরাং কাফির এবং প্রত্যেক অবাধ্যই ফাসিকের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কাফির ফাসিক সবচেয়ে কঠিন এবং সবচেয়ে খারাপ। আর এ আয়াতে ফাসিকের ভাবার্থ হচ্ছে কাফির। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।এর বড় দলীল এই যে, পরে তাদের দোষ বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, তাঁর নির্দেশ অমান্য করা, যমীনে ঝগড়া-বিবাদ করা, আর কাফিরেরাই এসব দোষে জড়িত রয়েছে, মুমিনদের বিশেষণ তো এর সম্পূর্ণ বিরপীত হয়ে থাকে। যেমন সূরা-ই-রাদে বর্ণিত হয়েছেঃ “যে ব্যক্তি এই বিশ্বাস রাখে যে, যা কিছু তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার উপর নাযিল হয়েছে, তা সবই সত্য-এ ব্যক্তি কি তার মত হতে পারে যে অন্ধ? বস্তুতঃ উপদেশ তো বুদ্ধিমান লোকেরাই গ্রহণ করে থাকে। যারা আল্লাহর সঙ্গে যা অঙ্গীকার করেছে তা পুরো করে এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না। আর তারা এমন যে, আল্লাহ যে সম্পর্কসমূহ বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তা বহাল রাখে এবং তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে ও কঠিন শাস্তির আশংকা করে।” একটু আগে বেড়ে বলা হয়েছেঃ “আর যারা আল্লাহর অঙ্গীকারসমূহকে তা শক্ত করার পর ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যে সম্পর্কসমূহ বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, তা ছিন্ন করে এবং দুনিয়ায় ফিত্না ফাসাদ করে, এমন লোকদের উপর হবে লান এবং তাদের পরিণাম হবে অশুভ।” আল্লাহ পাক স্বীয় বান্দাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন। এখানে অঙ্গীকারের অর্থ এটাই আর তা হচ্ছে আল্লাহর সম্পূর্ণ নির্দেশ মেনে চলা এবং সমস্ত নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকা। তাকে ভেঙ্গে দেয়ার অর্থ হচ্ছে তার উপর আমল না করা। কেউ কেউ বলেন যে, অঙ্গীকার ভঙ্গকারীরা হচ্ছে আহলে কিতাবের কাফির ও মুনাফিকরা। অঙ্গীকার হচ্ছে ওটাই যা তাওরাতে তাদের কাছে নেয়া হয়েছিল যে, তারা ওর সমস্ত কথা মেনে চলবে, মুহাম্মদ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করবে, তার নবুওয়াতের প্রতি বিশ্বাস করবে এবং তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা সত্য মনে করবে। আর অঙ্গীকার ভঙ্গ করা এই যে, জেনেশুনে তারা তার নবুওয়াত ও আনুগত্য অস্বীকার করেছে এবং অঙ্গীকার সত্ত্বেও ওকে গোপন করেছে, আর পার্থিব স্বার্থের কারণে ওর উল্টো করেছে।ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) এই কথাকে পছন্দ করে থাকেন এবং মুকাতিল বিন হিব্বানেরও (রঃ) এটাই কথা। কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থে কোন নির্দিষ্ট দলকে বুঝায় না, বরং সমস্ত কাফির, মুশরিক ও মুনাফিককে বুঝায়। অঙ্গীকারের ভাবার্থ এই যে, আল্লাহর একত্ববাদ এবং তাঁর নবীর (সঃ) নবুওয়াতকে স্বীকার করাযার প্রমাণে প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী ও বড় বড় মু'জিযাবিদ্যমান রয়েছে। আর ওটা ভেঙ্গে দেয়ার অর্থ হচ্ছে তাওহীদ ও সুন্নাত হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া এবং অস্বীকার করা। এই কথাটিই বেশী মজবুত ও যুক্তিসঙ্গত। ইমাম যামাখশারীর (রঃ) ঝোকও এদিকেই। তিনি বলেন যে, অঙ্গীকারের অর্থ হচ্ছে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করা-যা মানবীয় প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া অঙ্গীকারের দিন এর অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল। আল্লাহ পাক বলেছিলেনঃ “আমি কি তোমাদের প্রভু নই?” তখন সবাই উত্তর দিয়েছিলঃ “হাঁ, নিশ্চয় আপনি আমাদের প্রভু। অতঃপর যেসব কিতাব দেয়া হয়েছে তাতেও অঙ্গীকার করানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তোমরা আমার অঙ্গীকার পুরো কর, আমিও অেমাদের অঙ্গীকার পুরো করব।" কেউ কেউ বলেন যে, অঙ্গীকারের ভাবার্থ হচ্ছে সেই অঙ্গীকার যা আত্মসমূহের নিকট হতে নেয়া হয়েছিল, যখন তাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে বের করা হয়েছিল। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “তোমাদের প্রভু যখন আদম (আঃ) এর সন্তানদের নিকট অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, আমিই তোমাদের প্রভু এবং তারা সবাই স্বীকার করেছিল। আর একে ভেঙ্গে দেয়ার অর্থ হচ্ছে একে ছেড়ে দেয়া। এ সমুদয় কথা তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে উদ্ধৃত করা হয়েছে। মুনাফিকের লক্ষণহযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর অঙ্গীকার ভেঙ্গে দেয়া যা মুনাফিকদের কাজ ছিল, তা হচ্ছে এই ছয়টি অভ্যাসঃ (১) কথা বলার সময় মিথ্যা বলা, (২) প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা, (৩) গচ্ছিত বস্তু আত্মসাৎ করা, (৪) আল্লাহর অঙ্গীকার দৃঢ় করণের পর তা ভঙ্গ করা (৫) যা অবিচ্ছিন্ন রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা বিচ্ছিন্ন করা এবং (৬) পৃথিবীতে বিবাদের সৃষ্টি করা। তাদের এই ছয়টি অভ্যাস তখনই প্রকাশ পায় যখন তারা জয়যুক্ত হয়। আর যখন তারা পরাজিত হয় তখন তারা প্রথম তিনটি কাজ করে থাকে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, কুরআনের আদেশ ও নিষেধাবলী পড়া, সত্য বলিয়া জানা, অতঃপর না মানাও ছিল অঙ্গীকার ভঙ্গ করা। আল্লাহ যা মিলিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন-এর ভাবার্থ হচ্ছে আত্মীয়তার বন্ধন অবিচ্ছিন্ন রাখা এবং আত্মীয়দের হক আদায় করা ইত্যাদি। যেমন কুরআন মাজীদের এক জায়গায় আছেঃ “সুতরাং যদি তোমরা (যুদ্ধ হতে) সরে থাকো, তবে কি তোমাদের এ সম্ভাবনা আছে যে, তোমরা ভূ-পৃষ্ঠে বিবাদ সৃষ্টি কর এবং পরস্পর আত্মীয়তা কর্তন করে ফেল?” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একেই প্রাধান্য দিয়েছেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, আয়াতটি সাধারণ। যা মিলিত রাখার ও আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তা তারা ছিন্ন করেছিল এবং আদায় করেনি (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে আখেরাতে যারা ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “তাদের উপর হবে লা'নত এবং তাদের পরিণাম হবে খারাপ।"হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন যে, কুরআন মাজীদে মুসলমান ছাড়া অন্যদেরকে যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত বলা হয়েছে সেখানে ভাবার্থ হবে কাফির এবং যেখানে মুসলমানকে ক্ষতিগ্রস্ত বলা হয়েছে সেখানে অর্থ হবে পাপী (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর বহুবচন। জনগণ প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে এবং দুনিয়ার মোহে পড়ে আল্লাহর রহমত হতে সরে গেছে বলে তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত বলা হয়েছে। মুনাফিক ও কাফির ব্যবসায়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মতই। যখন দয়া অনুগ্রহের খুবই প্রয়োজন হবে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন-সেই দিন এরা আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত থাকবে।
আল-বাকারা 2:27
২৬-২৭ নং আয়াতের তাফসীরহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং অন্য কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন উপরের তিনটি আয়াতে মুনাফিকদের দুটি দৃষ্টান্ত বর্ণিত হলো অর্থাৎ আগুন ও পানি, তখন তারা বলতে লাগলো যে, এরকম ছোট ছোট দৃষ্টান্ত আল্লাহ তা'আলা কখনও বর্ণনা করেন। তার প্রতিবাদে আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত দুটি অবতীর্ণ করেন। হযরত কাতাদাহ (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরআন পাকের মধ্যে মাকড়সা ও মাছির দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয় তখন মুশষিকরা বলতে থাকে যে, কুরআনের মত আল্লাহর কিতাবে এরকম নিকৃষ্ট প্রাণীর বর্ণনা দেয়ার কি প্রয়োজন। তাদের একথার উত্তরে আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং বলা হয় যে, সত্যের বর্ণনা দিতে আল্লাহ আদৌ লজ্জাবোধ করেন না, তা কমই হোক বা বেশীই হোক। কিন্তু এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এই আয়াতগুলো বুঝি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে, অথচ তা নয়। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন। এগুলো অবতীর্ণ হওয়ার কারণ অন্যান্য গুরুজন হতেও এরকমই বর্ণিত হয়েছে।হযরত রাবী বিন আনাস (রাঃ) বলেন যে, এটা একটা মজবুত দৃষ্টান্ত যা দুনিয়ার দৃষ্টান্তরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। মশা ক্ষুধার্ত থাকা পর্যন্ত জীবিত থাকে এবং মোটা তাজা হলেই মারা যায়। এ রকমই এ লোকেরাও যখন ইহলৌকিক সুখ সম্ভোগ প্রাণভরে ভোগ করে তখনই আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পাকড়াও করেন। যেমন আল্লাহ পাক এক জায়গায় বলেনঃ “যখন এরা আমার উপদেশ ভুলে যায়, তখন আমি তাদের জন্যে সমস্ত জিনিসের, দরজা খুলে দেই, শেষ পর্যন্ত তারা গর্বভরে চলতে থাকে, এমন সময় হঠাৎ আমি তাদেরকে পাকড়াও করি।” ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবি হাতিয় (রঃ) এইরূপ বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রথম মতটি পছন্দ করেছেন এবং সম্বন্ধও এরই বেশী ভাল মনে হচ্ছে। তাহলে ভাবার্থ হলো এই যে, ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম এবং বৃহৎ হতে বৃহত্তম কোন দৃষ্টান্ত বর্ণনা করতে আল্লাহ পাক লজ্জা ও সংকোচ বোধ করেন না (আরবি) শব্দটি এখানে নিম্নমানের অর্থ বুঝাবার জন্যে ব্যবহৃত হয়েছে (আরবি) শব্দটি (আরবি) হওয়ায় ওকে (আরবি) দেয়া হয়েছে। কিংবা (আরবি) শব্দটি (আরবি) এবং (আরবি) –এর (আরবি) হয়েছে। ইবনে জারীর (রঃ) (আরবি) শব্দটির (আরবি) হওয়া এবং (আরবি) শব্দটির ওর (আরবি) দ্বারা (আরবি) হওয়াকে পছন্দ করেছেন এবং আরবদের কালামেও এটা খুব বেশী প্রচলিত আছে। তারা (আরবি) ও (আরবি)-এর কে এ দু'টোরই (আরবি) দিয়ে থাকে। এজন্যই এটা কখনও (আরবি) হয় এবং (আরবি) কখনও হয়। যেমন হযরত হাসসান বিন সাবিতের (রাঃ) কবিতায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “অন্যদের উপর আমাদের শুধু এটুকুই মর্যাদা যথেষ্ট যে, আমাদের অন্তর আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর প্রেমে পরিপূর্ণ।” লুপ্ত (আরবী)-এর ভিত্তিতেও (আরবী) শব্দটি (আরবী) হতে পারে এবং ওর পূর্বে (আরবী) শব্দটি উহ্য মেনে নেয়া হবে। কাসাঈ (রঃ) এবং কারা (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। যোক (রঃ) ও ইবরাহীম বিন আবলাহ (রঃ) (আরবি) পড়ে থাকেন। ইবনে জনী (রঃ) বলেন যে, এটা (আরবি) এর (আরবি) হবে এবং (আরবি) শব্দটিকে লুপ্ত মেনে নেয়া হবে। যেমন, (আরবি) অর্থ (আরবি) একটি তো হলো এই যে, ওর চেয়েও হালকা ও খারাপ জিনিস। যেমন কেউ কোন লোকের কৃপণতা ইত্যাদির কথা বর্ণনা করলে অন্যজন বলে যে, সে আরও উপরে। তখন ভাবার্থ এই হয় যে, এই দোষে সে আরও নীচে নেমে গেছে। কাসাঈ এবং আবূ আবীদ এটাই বলে থাকেন। একটি হাদীসে আছে যে, যদি দুনিয়ার কদর আল্লাহর কাছে একটি মশার ডানার সমানও হতো তবে কোন কাফিরকে এক ঢাকে পানিও দেয়া হতো না। দ্বিতীয় অর্থ এই যে,ওর চেয়ে বেশী বড়। কেননা, মশার চেয়ে ছোট প্রাণী আর কি হতে পারে? কাতাদাহ বিন দাআমার এটাই মত ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেন। সহীহ মুসলিম শরীফে আছে যে, যদি কোন মুসলমানকে কাঁটা লাগে বা এর চেয়েও বেশী তবে তার জন্যেও তার মর্যাদা বেড়ে যায় এবং পাপ মোচন হয়। এ হাদীসেও (আরবি) শব্দটি আছে। তাহলে ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, যেমন এ ছোট বড় জিনিসগুলো সৃষ্টি করতে আল্লাহ তা'আলা লজ্জাবোধ করেন না, তেমনই ওগুলোকে দৃষ্টান্ত স্বরূপ বর্ণনা করতেও তার কোন দ্বিধা ও সংকোচ নেই। কুরআন কারীমের মধ্যে আল্লাহ পাক এক জায়গায় বলেছেনঃ হে লোক সকল! একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে, তোমরা কান লাগিয়ে শোননা আল্লাহকে ছেড়ে যাকে তোমরা ডাকছে, তারা যদি সবাই একত্রিত হয় তবুও একটি মাছিও তারা সষ্টি করতে পারবে না বরং মাছি যদি একত্রিত হয় তবুও একটি মাছিও তারা তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নেয় তবে এরা ওর কাছ থেকে তা ফিরিয়ে আনতে পারবে না। উপাসক ও উপাস্য উভয়েই খুবই দুর্বল।" অন্য স্থানে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “আল্লাহ ছাড়া অন্যান্যদেরকে যারা তাদের মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার জালের ন্যায়, যার ঘর সমূদয় ঘর হতে নরম ও দুর্বল। অন্যত্র তিনি বলেছেনঃ “আল্লাহর তা'আলা কালিমায়ে তাইয়্যেবার কেমন দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন, এটা একটি পবিত্র বৃক্ষের ন্যায় যার শিকড়গুলো খুবই শক্ত এবং ওর শাখাগুলো উপর দিকে যাচ্ছে। ওটা আল্লাহর আদেশে প্রত্যেক মৌসুমে ফল দিয়ে থাকে; এবং আল্লাহ দৃষ্টান্তগুলো এ উদ্দেশ্যে বর্ণনা করে থাকেন, যেন তারা খুব বুঝে নেয়। আর অপবিত্র কালেমার দৃষ্টান্ত এইরূপ, যেমন একটি নিকৃষ্ট বৃক্ষ, যা যমীনের উপর থেকে উপড়িয়ে নেয়া যায়, ওর কোন স্থায়িত্ব নেই। আল্লাহ তাআলা ঈমানদার লোকদেরকে সেই অটল বাক্যের দরুন ইহকালে ও পরকালের সুদৃঢ় রাখেন, এবং জালিমদেরকে বিভ্রান্ত করে দেন এবং আল্লাহ যা চান তাই করেন।” অন্যস্থানে আল্লাহ তাআলা সেই ক্রীতদাসের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন যার কোন জিনিসের উপর স্বাধীনতা নেই।” তিনি অন্যত্র বলেছেনঃ “আল্লাহ দুই ব্যক্তির দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন যাদের মধ্যে একজন তো বোবা এবং সে কোন কিছুর উপরেই ক্ষমতা রাখে না, সে তার মনিবের উপর বোঝা স্বরূপ, সে যেখানেই যায়, অপকার ছাড়া উপকারের কিছু আনতে পারে না, এবং দ্বিতীয় সেই ব্যক্তি যে ন্যায় ও সত্যের আদেশ করে, এ দুজন কি সমান হতে পারে।” অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ “আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বয়ং তোমাদেরই দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছেন, তোমরা কি তোমাদের নিজেদের জিনিসে তোমাদের গোলামদেরকে শরীক ও সমান অংশদীর মনে করছো? অন্যত্র বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছেন যার বহু সমান সমান অংশীদার রয়েছে। অপর জায়গায় আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “এই দৃষ্টান্তগুলো আমি আলেমগণের জন্যে বর্ণনা করে থাকি এবং একমাত্র আলেমগণই তা অনুধাবন করতে থাকে। এ ছাড়া আরও বহু দৃষ্টান্ত কুরআন পাকের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে।পূর্বযুগের কোন একজন মনীষী বলেছেনঃ “যখন আমি কুরআন মাজীদের কোন দৃষ্টান্ত শুনি এবং বুঝতে পারি না তখন আমার কান্না এসে যায়। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, এ দৃষ্টান্তগুলো শুধুমাত্র আলেমরাই বুঝে থাকে।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, দৃষ্টান্ত ছোটই হোক আর বড়ই হোক, ঈমানদারগণ ওর উপর ঈমান এনে থাকে, ওকে সত্য বলে বিশ্বাস করে এবং তা দ্বারা সুপথ পেয়ে থাকে। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, তারা ওকে আত্মাহুর কালাম মনে করে (আরবি) এর (আরবি) টির (আরবি) হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ মু'মিন এ দৃষ্টান্তকে আল্লাহর পক্ষ হতে সত্য মনে করে, আর কাফিরেরা কথা বানিয়ে থাকে। যেমন সূরা-ই-মুদ্দাসসিরে আছেঃ “এবং দোযখের কর্মচারী আমি শুধু ফেরেস্তাদেরকেই নিযুক্ত করেছি, আর আমি তাদের সংখ্যা শুধু এরূপ রেখেছি যা কাফিরদের বিভ্রান্তির উপকরণ হয়, এজন্যে যে, কিতাবীগণ যেন বিশ্বস্ত হয় এবং ঈমানদারদের ঈমান আরও বর্ধিত হয়, আর কিতাবীগণ ও মুমিনগণ সন্দেহ না করে, আর যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তারা এবং কাফিরেরা যেন বলে যে, এ . বিস্ময়কর উপমা দ্বারা আল্লাহর উদ্দেশ্য কি এরূপেই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করে থাকেন, আর যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করে থাকেন; আর তোমার প্রভুর সৈন্যবাহিনীকে তিনি ছাড়া কেউই জানে না আর এটা শুধু মানুষের উপদেশের জন্যে। এখানেও হিদায়াত ও গুমরাহীর বর্ণনা রয়েছে। সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা মুনাফিক পথভ্রষ্ট হয় এবং মু'মিন সুপথ প্রাপ্ত হয়। মুনাফিকরা ভ্রান্তির মধ্যে বেড়ে চলে, কেননা এ দৃষ্টান্ত যে সত্য তা জানা সত্ত্বেও তারা একে অবিশ্বাস করে, আর মু'মিন এটা বিশ্বাস করে ঈমান আরও বাড়িয়ে নেয়।(আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে মুনাফিক। কেউ কেউ এর অর্থ নিয়েছেন কাফির’-যারা জেনে শুনে অস্বীকার করে। হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা খারেজীগণকে বুঝান হয়েছে। একথার সনদ যদি হযরত সা’দ (রাঃ) থেকে। হওয়া সঠিক হয়, তবে ভাবার্থ হবে এই যে, এ তাফসীর অর্থের দিক দিয়ে এ নয় যে, এর ভাবার্থ খারেজীরা বরং ঐ দলটিও ফাসিকদের অন্তর্ভুক্ত যারা নাহারওয়ানে’ হযরত আলীর (রাঃ) উপর আক্রমণ চালিয়েছিল। তাহলে এরা যদিও আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় বিদ্যমান ছিল না, তথাপি তাদের জঘন্য দোষের কারণে অর্থের দিক দিয়ে তারাও ফাসিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। তারা ন্যায় ও সঠিক ঈমানের আনুগত্য হতে বেরিয়ে গিয়েছিল এবং ইসলামী শরীয়ত হতে সরে পড়েছিল বলে তাদেরকে খারেজী বলা হয়েছে।যে ব্যক্তি আনুগত্য হতে বেরিয়ে যায়, আরবী পরিভাষায় তাকে ফাসিক বলা হয়। ছাল সরিয়ে শীষ বের হলে আরবের (আরবি) বলে থাকে। ইদুর গর্ত থেকে বেরিয়ে ক্ষতি সাধন করতে থাকে বলে ওকেও বলা হয়। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পাঁচটি প্রাণী ‘ফাসিক। কাবা শরীফের মধ্যে এবং ওর বাইরে এদেরকে হত্যা করে দেয়া হবে। এগুলো হচ্ছেঃ ১। কাক, ২। চিল, ৩। বিচ্ছু, ৪। ইঁদুর এবং ৫। কালো কুকুর। সুতরাং কাফির এবং প্রত্যেক অবাধ্যই ফাসিকের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কাফির ফাসিক সবচেয়ে কঠিন এবং সবচেয়ে খারাপ। আর এ আয়াতে ফাসিকের ভাবার্থ হচ্ছে কাফির। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।এর বড় দলীল এই যে, পরে তাদের দোষ বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, তাঁর নির্দেশ অমান্য করা, যমীনে ঝগড়া-বিবাদ করা, আর কাফিরেরাই এসব দোষে জড়িত রয়েছে, মুমিনদের বিশেষণ তো এর সম্পূর্ণ বিরপীত হয়ে থাকে। যেমন সূরা-ই-রাদে বর্ণিত হয়েছেঃ “যে ব্যক্তি এই বিশ্বাস রাখে যে, যা কিছু তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার উপর নাযিল হয়েছে, তা সবই সত্য-এ ব্যক্তি কি তার মত হতে পারে যে অন্ধ? বস্তুতঃ উপদেশ তো বুদ্ধিমান লোকেরাই গ্রহণ করে থাকে। যারা আল্লাহর সঙ্গে যা অঙ্গীকার করেছে তা পুরো করে এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না। আর তারা এমন যে, আল্লাহ যে সম্পর্কসমূহ বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তা বহাল রাখে এবং তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে ও কঠিন শাস্তির আশংকা করে।” একটু আগে বেড়ে বলা হয়েছেঃ “আর যারা আল্লাহর অঙ্গীকারসমূহকে তা শক্ত করার পর ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যে সম্পর্কসমূহ বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, তা ছিন্ন করে এবং দুনিয়ায় ফিত্না ফাসাদ করে, এমন লোকদের উপর হবে লান এবং তাদের পরিণাম হবে অশুভ।” আল্লাহ পাক স্বীয় বান্দাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন। এখানে অঙ্গীকারের অর্থ এটাই আর তা হচ্ছে আল্লাহর সম্পূর্ণ নির্দেশ মেনে চলা এবং সমস্ত নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকা। তাকে ভেঙ্গে দেয়ার অর্থ হচ্ছে তার উপর আমল না করা। কেউ কেউ বলেন যে, অঙ্গীকার ভঙ্গকারীরা হচ্ছে আহলে কিতাবের কাফির ও মুনাফিকরা। অঙ্গীকার হচ্ছে ওটাই যা তাওরাতে তাদের কাছে নেয়া হয়েছিল যে, তারা ওর সমস্ত কথা মেনে চলবে, মুহাম্মদ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করবে, তার নবুওয়াতের প্রতি বিশ্বাস করবে এবং তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা সত্য মনে করবে। আর অঙ্গীকার ভঙ্গ করা এই যে, জেনেশুনে তারা তার নবুওয়াত ও আনুগত্য অস্বীকার করেছে এবং অঙ্গীকার সত্ত্বেও ওকে গোপন করেছে, আর পার্থিব স্বার্থের কারণে ওর উল্টো করেছে।ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) এই কথাকে পছন্দ করে থাকেন এবং মুকাতিল বিন হিব্বানেরও (রঃ) এটাই কথা। কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থে কোন নির্দিষ্ট দলকে বুঝায় না, বরং সমস্ত কাফির, মুশরিক ও মুনাফিককে বুঝায়। অঙ্গীকারের ভাবার্থ এই যে, আল্লাহর একত্ববাদ এবং তাঁর নবীর (সঃ) নবুওয়াতকে স্বীকার করাযার প্রমাণে প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী ও বড় বড় মু'জিযাবিদ্যমান রয়েছে। আর ওটা ভেঙ্গে দেয়ার অর্থ হচ্ছে তাওহীদ ও সুন্নাত হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া এবং অস্বীকার করা। এই কথাটিই বেশী মজবুত ও যুক্তিসঙ্গত। ইমাম যামাখশারীর (রঃ) ঝোকও এদিকেই। তিনি বলেন যে, অঙ্গীকারের অর্থ হচ্ছে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করা-যা মানবীয় প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া অঙ্গীকারের দিন এর অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল। আল্লাহ পাক বলেছিলেনঃ “আমি কি তোমাদের প্রভু নই?” তখন সবাই উত্তর দিয়েছিলঃ “হাঁ, নিশ্চয় আপনি আমাদের প্রভু। অতঃপর যেসব কিতাব দেয়া হয়েছে তাতেও অঙ্গীকার করানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তোমরা আমার অঙ্গীকার পুরো কর, আমিও অেমাদের অঙ্গীকার পুরো করব।" কেউ কেউ বলেন যে, অঙ্গীকারের ভাবার্থ হচ্ছে সেই অঙ্গীকার যা আত্মসমূহের নিকট হতে নেয়া হয়েছিল, যখন তাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে বের করা হয়েছিল। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “তোমাদের প্রভু যখন আদম (আঃ) এর সন্তানদের নিকট অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, আমিই তোমাদের প্রভু এবং তারা সবাই স্বীকার করেছিল। আর একে ভেঙ্গে দেয়ার অর্থ হচ্ছে একে ছেড়ে দেয়া। এ সমুদয় কথা তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে উদ্ধৃত করা হয়েছে। মুনাফিকের লক্ষণহযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর অঙ্গীকার ভেঙ্গে দেয়া যা মুনাফিকদের কাজ ছিল, তা হচ্ছে এই ছয়টি অভ্যাসঃ (১) কথা বলার সময় মিথ্যা বলা, (২) প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা, (৩) গচ্ছিত বস্তু আত্মসাৎ করা, (৪) আল্লাহর অঙ্গীকার দৃঢ় করণের পর তা ভঙ্গ করা (৫) যা অবিচ্ছিন্ন রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা বিচ্ছিন্ন করা এবং (৬) পৃথিবীতে বিবাদের সৃষ্টি করা। তাদের এই ছয়টি অভ্যাস তখনই প্রকাশ পায় যখন তারা জয়যুক্ত হয়। আর যখন তারা পরাজিত হয় তখন তারা প্রথম তিনটি কাজ করে থাকে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, কুরআনের আদেশ ও নিষেধাবলী পড়া, সত্য বলিয়া জানা, অতঃপর না মানাও ছিল অঙ্গীকার ভঙ্গ করা। আল্লাহ যা মিলিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন-এর ভাবার্থ হচ্ছে আত্মীয়তার বন্ধন অবিচ্ছিন্ন রাখা এবং আত্মীয়দের হক আদায় করা ইত্যাদি। যেমন কুরআন মাজীদের এক জায়গায় আছেঃ “সুতরাং যদি তোমরা (যুদ্ধ হতে) সরে থাকো, তবে কি তোমাদের এ সম্ভাবনা আছে যে, তোমরা ভূ-পৃষ্ঠে বিবাদ সৃষ্টি কর এবং পরস্পর আত্মীয়তা কর্তন করে ফেল?” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একেই প্রাধান্য দিয়েছেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, আয়াতটি সাধারণ। যা মিলিত রাখার ও আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তা তারা ছিন্ন করেছিল এবং আদায় করেনি (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে আখেরাতে যারা ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “তাদের উপর হবে লা'নত এবং তাদের পরিণাম হবে খারাপ।"হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন যে, কুরআন মাজীদে মুসলমান ছাড়া অন্যদেরকে যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত বলা হয়েছে সেখানে ভাবার্থ হবে কাফির এবং যেখানে মুসলমানকে ক্ষতিগ্রস্ত বলা হয়েছে সেখানে অর্থ হবে পাপী (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর বহুবচন। জনগণ প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে এবং দুনিয়ার মোহে পড়ে আল্লাহর রহমত হতে সরে গেছে বলে তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত বলা হয়েছে। মুনাফিক ও কাফির ব্যবসায়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মতই। যখন দয়া অনুগ্রহের খুবই প্রয়োজন হবে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন-সেই দিন এরা আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত থাকবে।
আল-বাকারা 2:28
আল্লাহর অস্তিত্ব সম্বন্ধে জোরালো দলীলসমূহ আল্লাহ তা'আলা বিদ্যমান রয়েছেন, তিনি ব্যাপক ক্ষমতবান এবং তিনিই সৃষ্টিকর্তা ইত্যাদি প্রমাণ করার পর এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ “কেমন করে তোমরা আল্লাহর অস্তিত্বকে অবিশ্বাস করছো? অথচ তোমাদেরকে অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বে আনয়নকারী তো একমাত্র তিনিই। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেছেনঃ “তারা কি কোন জিনিস ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে? কিংবা নিজেরাই সৃষ্টিকর্তা নাকি? বা তারা কি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? (কখনও নয়) বরং তারা বিশ্বাস করে না।” অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ “নিঃসন্দেহে মানুষের উপর কালের মধ্যে এমন একটি সময় অতীত হয়েছে, যখন সে কোন উল্লেখযোগ্য বস্তুই ছিল না। এ ধরনের আরও বহু আয়াত রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ কাফিরেরা যে বলবে- “হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে দু’বার মেরেছেন এবং দু’বার জীবিত করেছেন, আমরা আমাদের পাপসমূহ স্বীকার করছি, এর ভাবার্থ এবং এই আয়াতের ভাবার্থ একই যে, তোমরা তোমাদের পিতার পৃষ্ঠে মৃত ছিলে। অর্থাৎ কিছুই ছিলে না। তিনিই তোমাদেরকে জীবিত করেছেন, আবার তোমাদেরকে মারবেন। অর্থাৎ মৃত্যু একদিন অবশ্যই আসবে। আবার তিনি তোমাদেরকে কবর হতে উঠাবেন। এভাবেই মরণ দু'বার এবং জীবন দু’বার। আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, কবরে মানুষকে জীবিত করা হয়। আবদুর রহমান বিন যায়েদের (রঃ) বর্ণনা আছে যে, হযরত আদমের (আঃ) পৃষ্ঠে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অতঃপর তাদের কাছে আহাদ বা অঙ্গীকার নিয়ে আল্লাহ তাদেরকে প্রাণহীন করেছেন। আবার মায়ের পেটে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাদের উপর ইহলৌকিক মৃত্যু এসেছে। আবার কিয়ামতের দিন তাদেরকে জীবিত করবেন। কিন্তু এ মতটি দুর্বল। প্রথম মতটিই সঠিক। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং তাবেঈগণের একটি দলেরও এটাই মত। কুরআন মাজীদে আর এক জায়গায় আছেঃ “আল্লাহই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেন, আবার তিনিই মারেন, অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে একত্রিত করবেন।” যেসব পাথর ও ছবিকে মুশরিকরা পূজা করত, কুরআন ওগুলোকেও মৃত বলেছে। আল্লাহ বলেনঃ “ঐ সব মৃত, জীবিত নয়।” যমীন সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তাদের জন্যে মৃত জমীনও নিদর্শন যাকে আমি জীবিত। করি এবং তা হতে দানা বের হয় যা তারা খেয়ে থাকে।”
আল-বাকারা 2:29
পূর্বের আয়াতে মহান আল্লাহ ঐ দলীলসমূহ বর্ণনা করেছিলেন যা স্বয়ং মানুষের মধ্যে রয়েছে। এখন আল্লাহ পাক এই পবিত্র আয়াতে ঐ দলীলসমূহের বর্ণনা দিচ্ছেন যা দৈনন্দিন মানুষের চোখের সামনে ভাসছে (আরবি) শব্দটি এখানে ইচ্ছা করা ও মনঃসংযোগ করা অর্থে এসেছে। কেননা এর (আরবি) এসেছে (আরবি) এবং (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ঠিক করা এবং নির্মাণ করা (আরবি) শব্দটি (আরবি)-অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলছেন যে, প্রত্যেক জিনিস সম্বন্ধে তাঁর জানা আছে। যেমন তিনি অন্যত্র বলেছেনঃ “যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি জানেন না?” এ আয়াতটির ব্যাখ্যা যেন সূরা-ই- হা-মীম আস্ সিজদাহর এ আয়াতটিঃ “ (হে নবী সঃ!) তুমি বলে দাও, তোমরা কি এমন আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস করছ, যিনি যমীনকে দু’দিনে সৃষ্টি করেছেন, আর তোমরা তার শরীক সাব্যস্ত করছ তিনিই সারা বিশ্বের প্রতিপালক। আর তিনি যমীনের, তার উপরিভাগে পর্বতমালা সৃষ্টি করেছেন, আর তাতে চার দিনে তার অধিবাসীবৃন্দের খাদ্যসমূহের ব্যবস্থা করেছেন, এটা জিজ্ঞাসুগণের জন্যে পূর্ণ (বর্ণনা)। অতঃপর তিনি আকাশের প্রতি মনোনিবেশ করলেন, আর তা (তখন) ধূম্রবৎ ছিল, তিনি তাকে এবং যমীনকে বললেন-তোমরা উভয়ে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় (আমীর নির্দেশ শিরোধার্য করে নিতে) এস; তখন উভয়ে বললো আমরা সানন্দে (উক্ত আদেশাবলীর জন্যে) প্রস্তুত রয়েছি। অতঃপর দু'দিনে আল্লাহ সাতটি আকাশ সৃষ্টি করলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তার কাজ ভাগ করে দিলেন এবং দুনিয়ার আকাশকে তারকারাজি দ্বারা সুশশাভিত করলেন এবং তাকে রক্ষার ব্যবস্থা করলেন। এটা তাঁরই নির্ধারিত পরিমাণ, যিনি মহাপরাক্রান্ত জ্ঞানময়।” সৃষ্টিসমূহের বিন্যাসঃএ আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মহান আল্লাহ প্রথমে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর সাতটি আকাশ নির্মাণ করেছেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি, অট্টালিকা নির্মাণের এটাই নিয়ম যে, প্রথমে নির্মাণ করা হয় নীচের অংশ এবং পরে উপরের অংশ। মুফাসসিরগণ এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন যা ইনশাআল্লাহ এখনই আসছে। কিন্তু এটা বুঝে নেয়া উচিত যে, আল্লাহ পাক অন্য স্থানে বলেছেনঃ “আচ্ছা! তোমাদেরকে সৃষ্টি করাই কি কঠিন কাজ, নাকি আসমান? আল্লাহ ওটা (এরূপে) নির্মাণ করেছেন যে, ওর ছাদ উঁচু করেছেন এবং ওকে সঠিকভাবে নির্মাণ করেছেন। আর ওর রাতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করেছেন এবং ওর দিনকে প্রকাশ করেছেন। আর এরপর জমীনকে বিছিয়ে দিয়েছেন। তা হতে পানি ও তৃণ বের করেছেন এবং পর্বতসমূহ স্থাপন করেছেন। (তিনি এ সব কিছু করেছেন) তোমাদের ও তোমাদের পশুগুলোর উপকারের জন্যে।” এ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন যে, তিনি আকাশের পরে যমীন সৃষ্টি করেছেন। কোন কোন মনীষী তো বলেছেন যে, উপরের আয়াতটিতে (আরবি) শুধু (আরবি)-এর জন্যে এসেছে, (আরবি)-এর জন্যে নয়। অর্থাৎ ভাবার্থ এই নয় যে, যমীনের পরে আকাশের সৃষ্টি কার্য আরম্ভ করেছেন, বরং উদ্দেশ্য শুধু সংবাদ দেয়া যে, আকাশসমূহও সৃষ্টি করেছেন এবং জমীনও সৃষ্টি করেছেন। আরব কবিদের কবিতায় এ দৃষ্টান্ত রয়েছে যে, কোন কোন স্থলে (আরবি) শুধুমাত্র খবর দেয়ার জন্যেই সংযুক্ত হয়ে থাকে-“আগে ও পরে’ উদ্দেশ্য হয় না।কেউ কেউ বলেছেন যে, পরবর্তী আয়াতটিতে আসমানের সৃষ্টির পরে যমীন বিছিয়ে দেয়া ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে, সৃষ্টি করা নয়। তাহলে ঠিক আছে যে, প্রথমে যমীন সৃষ্টি করেছেন, পরে আসমান। অতঃপর যমীনকে ঠিকভাবে সাজিয়েছেন। এতে আয়াত দুটি পরস্পর বিরোধী আর থাকলো না। এ দোষ হতে মহান আল্লাহর কালাম সম্পূর্ণ মুক্ত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ অর্থই করেছেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার আরশ পানির উপরে ছিল। এর পূর্বে তিনি কোন কিছু সৃষ্টি করেননি। অতঃপর যখন তিনি অন্যান্য জিনিস সৃষ্টি করার ইচ্ছে করেন, তখন তিনি পানি হতে ধূম্র বের করেন এবং সেই ধূম্র উপরে উঠে যায়। তা হতে তিনি আকাশ সৃষ্টি করেন। তারপর পানি শুকিয়ে যায় এবং ওকে তিনি যমীনে পরিণত করেন। এবং পরে পৃথক পৃথকভাবে সাতটি যমীন করেন। রোববার ও সোমবার এই দু’দিনে সাতটি যমীন নির্মিত হয়। যমীন আছে মাছের উপরে, মাছ ওটাই যার বর্ণনা কুরআন মাজীদের (আরবি) এই আয়াতটিতে রয়েছে। মাছ আছে পানির উপরে, পানি আছে, সাফাতের পিঠের উপর এবং সাফাত আছে ফেরেশতার পিঠের উপর এবং ফেরেশতা আছেন পাথরের উপর, এটা ঐ পাথর, যার বর্ণনা হযরত লোকমান করেছেন। পাথরটি আছে বাতাসের উপর, আসমানেও নেই এবং যমীনেও নেই। যমীন কাঁপতে থাকলে আল্লাহ তার উপর পাহাড় স্থাপন করেন, তখন তা থেমে যায়। আল্লাহ তাআলার এ কথার অর্থ এটাইঃ “আমি ভূ-পৃষ্ঠে পর্বতমালা স্থাপন করেছি, যেন তা তাদেরকে নিয়ে টলমল করতে না পারে। পাহাড়, যমীনে উৎপাদিত শস্য এবং যমীনের প্রত্যেকটি জিনিস মঙ্গল ও বুধ এই দুদিনে সৃষ্টি করেন। এরই বর্ণনা পূর্বে বর্ণিত আয়াতটিতে রয়েছে। অতঃপর তিনি আকাশের প্রতি মনোনিবেশ করেন। ওটা ছিল ধূম্র।। অতঃপর তা হতে সাতটি আকাশ নির্মাণ করেন। এটা বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এই দু'দিনে নির্মিত হয়। শুক্রবার আকাশ ও পৃথিবীর নির্মাণ কার্য জমা হয়েছিল বলে তাকে জুমআ বলা হয়েছে।আকাশে তিনি ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করেন-যার জ্ঞান তিনি ছাড়া আর কারও নেই। দুনিয়ার আকাশকে তারকারাজি দ্বারা সুশোভিত করেন এবং ওগুলোকে শয়তান হতে নিরাপত্তা লাভের মাধ্যম বানিয়ে দেন। এসব সৃষ্টি করার পর বিশ্বপ্রভু আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত হন। যেমন তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তিনিই যিনি আসমানসমূহ ও জমীনকে এবং ঐ সমুদয় বস্তুকে, যা এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে, ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত হন।" জগত সৃষ্টির মোট সময়ঃতাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে-হযরত আবদুল্লাহ বিন সাঈদ (রাঃ) বলেন যে, রোববার হতে মাখলুকের সৃষ্টিকার্য আরম্ভ হয়। দুদিনে সৃষ্টি করা হয় যমীন, দু’দিনে যমীনের সমস্ত জিনিস এবং দু’দিনে আসমান সৃষ্টি করা হয়। শুক্রবারের শেষাংশে আসমানের নির্মাণ কার্য শেষ হয়। ঐ সময়েই হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয় এবং ঐ সময়েই কিয়ামত সংঘটিত হবে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, মহান আল্লাহ পৃথিবীকে আকাশের পূর্বে সৃষ্টি করেছেন। ওটা হতে যে ধোঁয়া উপরের দিকে উঠেছে তা হতে আকাশ নির্মাণ করেন-যা একটির উপর আর একটি এভাবে সাতটি এবং যমীনও একটির নীচে আরেকটি এভাবে সাতটি। এ আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে জানা যাচ্ছে যে, পৃথিবীকে আকাশের পূর্বে সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন সূরা-ই-সিজদাহর মধ্যে রয়েছে। আলেমগণ এ বিষয়ে একমত। শুধুমাত্র কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, আকাশ যমীনের পূর্বে সৃষ্টি হয়েছে। কুরতুবী (রঃ) এ ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। (আরবি)-এর আয়াতকে সামনে রেখে ইনি বলেন যে, আকাশের সৃষ্টির বর্ণনা পৃথিবীর পূর্বে রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে আছে, হযরত আব্বাস (রাঃ) এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন যে, যমীন তো আকাশসমূহের পূর্বে সৃষ্ট হয়েছে, কিন্তু বিছানো হয়েছে পরে। সাধারণ আলেমদেরও উত্তর এটাই। সুরা-ই- (আরবি)-এর তাফসীরেও ইনশাআল্লাহ এর বর্ণনা দেয়া হবে। ফলকথা এই যে, যমীন বিছানো হয়েছে পরে। কুরআন মাজীদের মধ্যে (আরবি) শব্দটি আছে এবং এর পরে পানি , চারা, পাহাড় ইত্যাদির বর্ণনা আছে। এ শব্দটির ব্যাখ্যা যেন নিম্নরূপঃ মহান আল্লাহ যে যে জিনিসের বৃদ্ধির ক্ষমতা এই যমীনে রেখেছিলেন, ঐ সবকে প্রকাশ করে দিলেন এবং এর ফলে বিভিন্ন আকারের ও বিভিন্ন শ্রেণীর উৎপাদন রেরিয়ে আসলো। এভাবেই আকাশেও স্থির ও গতিশীল তারকারাজি ইত্যাদি নির্মাণ করলেন।সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই-নাসাঈতে হাদীস আছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার হাত ধরে বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা মাটি সৃষ্টি করেছেন শনিবারে, পাহাড় রোববারে, বৃক্ষরাজি সোমবারে, খারাপ জিনিসগুলো মঙ্গলবারে, আললা বুধবারে, জীবজন্তু বৃহস্পতিবারে এবং হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করেন শুক্রবারে আসরের পর সেই দিনের শেষ সময়ে আসরের পর থেকে নিয়ে রাত পর্যন্ত।” এ হাদীসটি ‘গারাইব-ই-মুসলিম’ এর মধ্যে রয়েছে। ইমাম ইবনে মাদীনী (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ এর বিরূপ সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন যে, এটা হযরত কাবের (রাঃ) নিজস্ব উক্তি এবং হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হযরত কাবের (রাঃ) একথা শুনেছেন এবং কতক বর্ণনাকারী একে ভুলবশতঃ মারফু হাদীস হিসেবে ধরে নিয়েছেন। ইমাম বায়হাকী (রঃ) এটাই বলেন।
আল-বাকারা 2:30
মহান আল্লাহর এই অনুগ্রহের কথা চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, জিন হযরত আদম (আঃ)কে সৃষ্টি করার পূর্বে ফেরেশতাদের মধ্যে ওর আলোচনা করেন, যার বর্ণনা এ আয়াতের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ যেন নবী (সঃ) কে সম্বোধন করে বলছেন যে, হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি মানব সৃষ্টির ঘটনাটি স্মরণ কর এবং তোমার উম্মতকে জানিয়ে দাও। আবূ উবাইদাহ (রঃ) বলেন যে, এখানে শব্দটি (আরবি) বা (আরবি)অতিরিক্ত। কিন্তু ইবনে জারীর (রঃ) এবং অন্যান্য মুফাসসিরগণ এটা অগ্রাহ্য করেন।খিলাফতের মূল তত্ত্বঃ(আরবি) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে যুগের পর যুগ ধরে পরস্পর স্থলাভিষিক্ত হওয়া। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “তিনি এমন যিনি তোমাদেরকে যমীনের খলীফা বানিয়েছেন।” অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ যদি আমি চাইতাম তবে এ যমীনে ফেরেশতাগণকে তোমাদের খলীফা বানিয়ে দিতাম। আর এক জায়গায় আল্লাহ বলেছেনঃ তাদের পরে তাদের খলীফা অর্থাৎ স্থলাভিষিক্ত খারাপ লোকেরা হয়েছে। একটি অপ্রচলিত পঠনে (আরবি) খালায়ফাহ্ও পড়া হয়েছে। কোন কোন মুফাসৃসির বলেন যে, খলীফা শব্দ দ্বারা শুধুমাত্র হযরত আদম (আঃ) কে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। তাফসীর-ই-রাযী প্রতি কিতাবের মধ্যে এই মতভেদ বর্ণনা করা হয়েছে। বাহ্যতঃ জানা যাচ্ছে যে, ভাবার্থ এটা নয়। এর প্রমাণ তো ফেরেশতাদের নিম্নের উক্তিটিঃ “তারা জমীনে ফাসাদ করবে ও রক্তারক্তি করবে। এটা স্পষ্ট কথা যে, তারা এটা হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানদের সম্পর্কে বলেছিলেন-খাস করে তার সম্পর্কে নয়।ফেরেশতারা এটা কি করে জেনেছিলেন, সেটা অন্য কথা। হয়তো মানব প্রকৃতির চাহিদা লক্ষ্য করেই তারা এটা বলেছিলেন। কেননা, এটা বলে দেয়া হয়েছিল যে, তাদেরকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হবে। কিংবা হয়তো খলীফা শব্দের ভাবার্থ জেনেই তারা এটা বুঝেছিলেন যে, মানুষ হবে ন্যায় অন্যায়ের ফায়সালাকারী, অনাচারকে প্রতিহতকারী। এবং অবৈধ ও পাপের কাজে বাধাদানকারী। অথবা তারা জমীনের প্রথম সৃষ্টজীবকে দেখেছিলেন বলেই মানুষকেও তাদের মাপকাঠিতে ফেলেছিলেন। এটা মনে রাখা দরকার যে, ফেরেশতাদের এই আর্য প্রতিবাদমূলক ছিল না বা তারা যে এটা বানী আদমের প্রতি হিংসার বশবর্তী হয়ে বলেছিলেন তাও নয়। ফেরেশতাদের মর্যাদা সম্পর্কে কুরআনে ঘোষণা হচ্ছেঃ “যে কথা বলার তাদের অনুমতি নেই, তাতে তারা মুখ খুলে না।” (এটাও স্পষ্ট কথা যে, ফেরেশতাদের স্বভাব হিংসা হতে পবিত্র) বরং সঠিক ভাবার্থ এই যে তাদের এ প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র এর হিকমত জানবার ও এর রহস্য প্রকাশ করবার, যা তাদের বোধশক্তির উর্ধে ছিল। আল্লাহ তে জানতেনই যে, এ শ্রেষ্ঠ জীব বিবাদ ও ঝগড়াটে হবে। কাজেই ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এ-রকম মাখলুক সৃষ্টি করার মধ্যে বিশ্বপ্রভুর কি নিপূর্ণতা রয়েছে। যদি ইবাদতেরই উদ্দেশ্যে হয়, তবে ইবাদত তো আমরাই করছি। আমাদের মুখেই তো সদা তার তাসবীহ ও প্রশংসাগীত উচ্চারিত হচ্ছে এবং আমরা ঝগড়া বিবাদ ইত্যাদি হতেও পবিত্র। তথাপি এরূপ বিবাদী মাখলুক সৃষ্টি করার মধ্যে কি যৌক্তিকতা রয়েছে?" মহান আল্লাহ তাঁদের এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন যে, তারা দুনিয়ায় ঝগড়া-বিবাদ, কাটাকাটি, মারামারি ইত্যাদি করবে এই জ্ঞান তার আছে। তথাপি তাদেরকে সৃষ্টি করার মধ্যে যে নিপূণতা ও দূরদর্শিতা রয়েছে তা একমাত্র তিনিই জানেন। তিনি জানেন যে, তাদের মধ্যে নবী রাসূল; সত্যবাদী, শহীদ, সত্যের উপাসক, ওয়ালী, সৎ, আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী, আলেম, খোদাভীরু, প্রভৃতি মহা-মানবদের জন্ম লাভ ঘটবে, যারা তাঁর নির্দেশাবলী যথারীতি মান্য করবে এবং তারা তাঁর বার্তাবাহকদের ডাকে সাড়া দেবে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে আছে যে, দিনের ফেরেশতাগণ সুবহে সাদেকের সময় আসেন এবং আসরের সময় চলে যান। সে সময় রাতের ফেরেশতাগণ আগমন করেন, তারা আবার সকালে চলে যান। আগমনকারীগণ যখন আগমন করেন তখন অন্যেরা চলে যান। কাজেই তারা ফজর ও আসরে জনগণকে পেয়ে থাকেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে তার প্রশ্নের উত্তরে দুই দলই একথা বলেনঃ “আমরা যাবার সময় আপনার বান্দাদেরকে নামাযে পেয়ে ছিলাম এবং আসার সময়ও তাদেরকে নামাযে ছেড়ে এসেছি।”এটাই হলো মানব সৃষ্টির যৌক্তিকতা যার সম্বন্ধে মহান আল্লাহ ফেরেশতাগণকে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয় আমি জানি যার তোমরা জাননা।” ঐ ফেরেস্তাগণকে তা দেখবার জন্যও পাঠান হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দিনের আমলগুলো রাত্রির পূর্বে এবং রাত্রির আমলগুলো দিবসের পূর্বে আল্লাহর নিকট উঠে যায়।” মোটকথা মানব সৃষ্টির মধ্যে যে ব্যাপক দুরদর্শিতা নিহিত ছিল সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন যে, এটা তাদের আমরাই আপনার তাসবীহ পাঠ করি’ একথার উত্তরে বলা হয়েছে যে, আল্লাহই সব জানেন অর্থাৎ ফেরেশতারা নিজেদের দলের সবকে সমান মনে করে থাকে, অথচ প্রকৃতপক্ষে তা নয়। কেননা, তাদের মধ্যে ইবলিসও একজন। তৃতীয় মত এই যে, ফেরেশতাদের এটা বলার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের পরিবর্তে তাদেরকেই যেন ভু-পৃষ্ঠে বাস করতে দেয়া হয়। এর উত্তরেই আল্লাহ পাক বলেন যে, আকাশই তাদের বসবাসের উপযুক্ত স্থান, এটা একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই জানেন।হাসান (রঃ), কাতাদাহ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাগণকে সংবাদ দিয়েছিলেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, পরামর্শ নিয়েছিলেন। কিন্তু এর অর্থও সংবাদ দেয়া হতে পারে, তা না হলে একথাটি অর্থহীন হয়ে পড়ে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন মক্কা হতে যমীন ছড়ানো ও বিছানো হয় তখন সর্বপ্রথম বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করেন ফেরেশতাগণ। তখন আল্লাহ বলেনঃ “ আমি যমীনে খলীফা বানাবো অর্থাৎ মক্কায়।” এর হাদীসটি মুরসাল; আবার এতে দুর্বলতা এবং এতে ‘মুদরজও রয়েছে, অর্থাৎ যমীনের ভাবার্থ মক্কা' নেয়া এটা বর্ণনাকারীর নিজস্ব ধারণা। বাহ্যতঃ জানা যাচ্ছে যে, যমীন' থেকে ভাবার্থ হচ্ছে সাধারণ। এর দ্বারা সমস্ত যমীনকেই বুঝানো হয়েছে। ফেরেশতাগণ এটা শুনে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, ঐ খলীফা দিয়ে কি কাজ হবে? উত্তরে বলা হয়েছিল যে, তার সন্তানদের মধ্যে এমন লোকও হবে যারা ভূ-পৃষ্ঠে ঝগড়া বিবাদ, কাটাকাটি মারামারি করবে এবং একে অপরের প্রতি হিংসা করবে। তাদের মধ্যে ওরা সুবিচার করবে এবং আমার আহকাম তাদের মধ্যে চালু করবে।এটা হতে ভাবার্থ হচ্ছে হযরত আদম (আঃ) এবং আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে ও সৃষ্টজীবের মধ্যে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে তাঁর স্থলবর্তীগণ, কিন্তু বিবাদীরা ও খুনাখুনিকারীরা খলীফা নয়। এখানে খিলাফতের ভাবার্থ হচ্ছে এক যুগীয় লোকের পরে অন্য যুগীয় লোকের আগমন (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের ওজনে এসেছে। যখন একের পরে অন্যজন তার স্থলবর্তী হয় তখন আরবেরা বলে থাকেঃ (আরবি) অর্থাৎ অমুক ব্যক্তি অমুক ব্যক্তির খলীফা হয়েছে। যেমন কুরআন মাজীদে রয়েছেঃ “আমি তাদের পরে তোমাদেরকে খলীফা করে তোমরা কিরূপ আমল কর তা দেখতে চাই।”এজন্যেই বড় সম্রাটকে খলীফা বলা হয়। কেননা তিনি পূর্ববর্তী বাদশাহুদের স্থলাভিষিক্ত হয়ে থাকেন। মুহাম্মদ বিন ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো যমীনে অবস্থানকারী, একে আবাদকারী। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, পূর্বে ভূ-পৃষ্ঠে জ্বিনেরা বাস করতো। তারা কাটাকাটি, মারামারি ও লুটতরাজ করতো। অতঃপর ইবলিসকে পাঠান হলে সে ও তার সঙ্গীরা তাদেরকে মেরে ধরে দ্বীপে ও পাহাড়ে তাড়িয়ে দেয়। অতঃপর হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করে যমীনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তিনি যমীনে বসতি স্থাপন করেন। কাজেই তিনি যেন তাঁর পূর্ববর্তীদের খলীফা বা স্থলবর্তী হলেন। সুতরাং মহান আল্লাহ যখন ফেরেশতাগণকে বলেনঃ “আমি যমীনে বসবাসকারী মাখলক সৃষ্টি করতে চাই।” এর উত্তরে ফেরেশতাগণ যা বলেছিলেন তার দ্বারা তারা আদম (আঃ)-এর সন্তানাদিকেই বুঝাতে চেয়েছিলেন।সে সময় শুধু যমীন ছিল, কোন বসতি ছিল না। কোন কোন সাহাবী (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাগণকে বনী আদমের কার্যাবলী সম্বন্ধে পূর্বেই অবহিত করেছিলেন বলেই তারা এ প্রশ্ন করেছিলেন। আবার এও বর্ণিত আছে যে, জ্বিনদের ফাসাদের উপর অনুমান করেই তারা বানী আদমের ফাসাদের কথা বলেছিলেন।হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আদম (আঃ)-এর দু'হাজার বছর পূর্ব হতে জ্বিনেরা যমীনে বসবাস করতো। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতাদেরকে বুধবারে, জ্বিনদেরকে বৃস্পতিবারে এবং হযরত আদম (আঃ) কে শুক্রবারে সৃষ্টি করা হয়েছে। হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতাদেরকে বানী আদমের কার্যাবলী সম্বন্ধে পূর্বেই জানান হয়েছিল বলে তারা প্রশ্ন করেছিলেন। আবু জাফর মুহাম্মদ বিন আলী (রঃ) বলেন যে, সাজল’ নামক একজন ফেরেশতা আছেন। হারুত ও মারূত ছিলেন তাঁর সঙ্গী। দৈনিক তিনবার লাওহে মাহফুজের প্রতি দৃষ্টিপাত করার অনুমতি সাজলকে দেয়া হয়েছিল। একদা তিনি হযরত আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি প্রভৃতি বিষয়ক কার্যাবলী অবলোকন করতঃ তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে গোপনে বলে দেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর ইচ্ছার কথা প্রকাশ করলে এঁরা দুজন এ প্রশ্ন করেন। কিন্তু বর্ণনাটি গরীব এবং গ্রহণের অযোগ্য। তারা দু’জন প্রশ্ন করেছিলেন, একথা কুরআন মাজীদের বাকরীতির উল্টো।এও বর্ণিত আছে যে, এ প্রশ্নকারী ফেরেশতারা ছিলেন দশ হাজার। তাঁদের সবাইকেই পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। এটাও ইসরাঈলী বর্ণনা এবং খুবই গরীব বা দুর্বল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে এ প্রশ্ন করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল এবং এও জানিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, এই মাখলূক অবাধ্য হবে। তখন তারা বিস্মিতভাবে মানুষ সৃষ্টির যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানবার জন্যে প্রশ্ন করেছিলেন মাত্র। তারা কোন পরামর্শও দেননি অস্বীকারও করেননি বা কোন প্রতিবাদও করেননি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন হযরত আদম (আঃ) এর সৃষ্টিকার্য আরম্ভ হয় তখন ফেরেশতাগণ বলেছিলেনঃ “আমাদের অপেক্ষা বেশী মর্যাদা সম্পন্ন ও বিদ্বান মাখলুক সৃষ্ট হওয়া অসম্ভব।" এর কারণে তাদের উপর আল্লাহর পরীক্ষা এসে যায় এবং কোন সৃষ্টজীবই পরীক্ষা হতে নিস্তার পায়নি। যমীন ও আসমানের উপরেও পরীক্ষা এসেছিল এবং ওরা অবনত মস্তকে ও সন্তুষ্ট চিত্তে আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করেছিল।ফেরেশতাদের তাসবীহ ও তাকদীসের অর্থ হচ্ছে মহান আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করা, নামায পড়া, বেয়াদবী হতে বেঁচে থাকা, তার শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা এবং তার অবাধ্য না হওয়া। (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে পবিত্রতা। পবিত্র ভূমিকে (আরবি) বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হচ্ছেনঃ “কোন কালামটি সর্বোত্তম?” উত্তরে তিনি বলছেনঃ “ওটা হচ্ছে ঐ কালামটি যা মহান আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদের জন্যে পছন্দ করেছেন। ঐ কালামটি হচ্ছেঃ (আরবি) (সহীহ মুসলিম)।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিরাজের রাত্রে আকাশে ফেরেশতাদের এই তাসবীহ শুনেছিলেনঃ (আরবি)ইমাম কুরতবী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ এই আয়াত হতে দলীল গ্রহণ করেছেন যে, খলীফা নির্ধারণ করা ওয়াজিব। তিনি মতবিরোধের মীমাংসা করবেন, ঝগড়া বিবাদ মিটিয়ে দেবেন, অত্যচারী হতে অত্যাচারিত ব্যক্তির প্রতিশোধ নেবেন, ‘হুদুদ কায়েম করবেন,,অন্যায় ও পাপের কাজ হতে জনগণকে বিরত রাখবেন ইত্যাদি বড় বড় কাজগুলো যার সমাধান ইমাম ছাড়া হতে পারে না। এসব কাজ ওয়াজিব এবং এগুলো ইমাম ছাড়া পুরো হতে পারে, আর যা ছাড়া কোন ওয়াজিব পুরো হয় না ওটাও ওয়াজিব। সুতরাং খলীফা নির্ধারণ করা ওয়াজিব সাব্যস্ত হলো। ইমামতি হয়তো বা কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট শব্দের দ্বারা লাভ করা যাবে। যেমন আহলে সুন্নাতের একটি জামা'আতের হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) সম্পর্কে ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) খিলাফতের জন্যে তার নাম নিয়েছিলেন। কিংবা কুরআন ও হাদীসে ওঁর দিকে ইঙ্গিত আছে। যেমন আহলে সুন্নাতেরই অপর একটি দলের প্রথম খলীফার ব্যাপারে ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইঙ্গিতে খিলাফতের জন্যে তাঁর নাম উল্লেখ করেছিলেন। অথবা হয়তো একজন খলীফা তার পরবর্তী খলীফার নাম বলে যাবেন। যেমন হযরত আবু বকর (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ) কে তাঁর স্থলবর্তী করে গিয়েছিলেন। কিংবা তিনি হয়তো সৎলোকদের একটি কমিটি গঠন করে খলীফা নির্বাচনের দায়িত্বভার তাঁদের উপর অর্পণ করে যাবেন যেমন হযরত উমার (রাঃ) এরূপ করেছিলেন। অথবা আহলে হিলওয়াল আ (অর্থাৎ প্রভাবশালী সেনাপতিগণ, আলেমগণ, সৎলোকগণ ইত্যাদি) একত্রিতভাবে তাঁর হাতে রাআত করবেন, তাদের কেউ কেউ বায়আত করে নিলে জমহূরের মতে তাঁকে মেনে নেয়া ওয়াজিব হয়ে যাবে। মক্কা ও মদীনার ইমাম তা হতে ইজমা নকল করেছেন। অথবা কেউ যদি জনগণকে জোরপূর্বক তাঁর কর্তৃত্বাধীন করে নেয় তবে হাঙ্গামা ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে তারও আনুগত্য স্বীকার করা ওয়াজিব।ইমাম শাফিঈ (রঃ) পরিষ্কার ভাষায় এর ফায়সালা করেছেন। এ বায়আত গ্রহণের সময় সাক্ষীদের উপস্থিতি ওয়াজিব কি না এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, এটা শর্ত। আবার কারও মতে শর্ত বটে, কিন্তু দু’জন সাক্ষীই যথেষ্ট। জবাঈ (রঃ) বলেন যে, বায়আত গ্রহণকারী ও যার হাতে বায়আত গ্রহণ করা হচ্ছে এ দু’জন ছাড়া চারজন সাক্ষীর প্রয়োজন। যেমন হযরত উমার (রাঃ) পরামর্শ সভার জন্যে ছয়জন লোক নির্ধারণ করেছিলেন। অতঃপর তারা হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রাঃ) কে অধিকার দিয়েছিলেন এবং তিনি বাকী চারজনের উপস্থিতিতে হযরত উসমান (রাঃ)-এর হাতে বায়আত করেছিলেন। কিন্তু এটা হতে দলীল গ্রহণের ব্যাপারে সমালোচনা আছে।ইমাম হওয়ার জন্যে পুরুষ লোক হওয়া, আযাদ হওয়া, বালিগ হওয়া, বিবেক সম্পন্ন হওয়া, মুসলমান হওয়া, সুবিচারক হওয়া, ধর্মশাস্ত্রে সুপণ্ডিত হওয়া, চক্ষু বিশিষ্ট হওয়া, সুস্থ ও সঠিক অঙ্গ বিশিষ্ট হওয়া, যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী হওয়া, সাধারণ অভিমত সম্পর্কে অভিজ্ঞ হওয়া এবং কুরায়েশী হওয়া ওয়াজিব।এটাই সঠিক মত। হাঁ, তবে হাশিমী হওয়া ও দোষমুক্ত হওয়া শর্ত নয়। গালী রাফেযী এ শর্ত দু’টি আরোপ করে থাকে। ইমাম যদি ফাসিক হয়ে যায় তবে তাকে পদচ্যুত করা উচিত কিনা এ বিষয়ে মতভেদ আছে। সঠিক মত এই যে, তাকে পদচ্যুত করা হবে না। কেননা হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে পর্যন্ত না তোমরা এমন ভোলাখুলি কুফরী লক্ষ্য কর যার কুফরী হওয়ার প্রকাশ্য দলীল আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাদের নিকট বিদ্যমান থাকে।” অনুরূপভাবে ইমাম নিজেই পদত্যাগ করতে পারে কিনা সে বিষয়েও মতবিরোধ রয়েছে। হযরত হাসান বিন আলী (রাঃ) নিজে নিজেই পদত্যাগ করেছিলেন এবং ইমামের দায়িত্ব হযরত মুআবিয়াকে (রাঃ) অর্পণ করেছিলেন। কিন্তু এটা ওজরের কারণে ছিল এবং যার জন্যে তার প্রশংসা করা হয়েছে। ভূ-পৃষ্ঠে একাধিক ইমাম একই সময়ে হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের মধ্যে কোন কাজ সম্মিলিতভাবে হতে যাচ্ছে এমন সময় কেউ যদি বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে তবে তাকে হত্যা করে দাও, সে যে কেউই হোক না। কেন।" জমহুরের এটাই মাযহাব এবং বহু গুরুজনও এর উপর ইজমা নকল করেছেন। যাদের মধ্যে ইমামুল হারামাইনও (রঃ) একজন।কারামিয়াহদের (শীআ'হ) কথা এই যে, একই সময়ে দুই বা ততোধিক ইমাম হতে পারে। যেমন হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত মুআবিয়া (রাঃ) দু’জনই আনুগত্যের যোগ্য ছিলেন। এই দলটি বলে যে, যখন একই সময়ে দুই অথবা ততোধিক নবী হওয়া জায়েয, তখন ইমামদের হওয়া জায়েয হবে না কেন? নবুওয়াতের মর্যাদা তো নিঃসন্দেহে ইমামতের মর্যাদা হতে বহু উর্ধে। কিন্তু উপরের লেখা হাদীসে জানা গেল যে, অন্যকে হত্যা করে দিতে হবে। সুতরাং সঠিক মাযহাব ওটাই যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। ইমামুল হারামাইন তার শিক্ষক আবু ইসহাক হতে বর্ণনা করেছেন যে, একই সময়ে দুই বা ততোধিক ইমাম নিযুক্ত করা তখনই জায়েয হয়, যখন মুসলমানদের সাম্রাজ্য খুবই প্রশস্ত হয় এবং চতুর্দিকে বিস্তার লাভ করে ও দু’জন ইমামের মধ্যে কয়েকটি দেশের ব্যবধান থাকে। ইমামুল হারামাইন এতে সন্দেহ পোষণ করেন। খুলাফায়ে বানী আব্বাস ইরাকে, খুলাফায়ে বানী ফাতিমা মিসরে এবং উমাইয়া বংশধরগণ পশ্চিমে ইমামতের কার্য চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আমার ধারণায় তো অবস্থা এইরূপই ছিল। ইনশাআল্লাহ এর বিস্তারিত বিবরণ কিতাবুল আহকামের কোন উপযুক্ত স্থানে দেয়া হবে।
আল-বাকারা 2:31
৩১-৩৩ নং আয়াতের তাফসীরএখানে একথারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা একটা বিশেষ জ্ঞানে হযরত আদম (আঃ) কে ফেরেশতাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন।এটা ফেরেশতাদের হযরত আদম (আঃ) কে সিজদা করার পরের ঘটনা। কিন্তু তাঁকে সৃষ্টি করার মধ্যে মহান আল্লাহর যে হিকমত নিহিত ছিল এবং যা ফেরেশতাগণ জানতেন না, তার সাথে সম্বন্ধযুক্ত হওয়ার কারণে এ ঘটনাকেই পূর্বে বর্ণনা করেছেন এবং ফেরেশতাদের সিজদা করার ঘটনা, যা পূর্বে ঘটেছিল তা পরে বর্ণনা করেছেন, যেন খলীফা সৃষ্টি করার যৌক্তিকতা ও নিপূণতা প্রকাশ পায় এবং জানা যায় যে, হযরত আদম (আঃ)-এর মর্যাদা ও সম্মান লাভ হয়েছে। এমন এক বিদ্যার কারণে যে বিদ্যা ফেরেশতাদের নেই। আল্লাহ পাক বলেন যে, তিনি হযরত আদম (আঃ) কে সমুদয় বস্তুর নাম শিখিয়ে দেন, অর্থাৎ তাঁর সন্তানদের নাম, সমস্ত জীব জন্তুর নাম, যমীন, আসমান, পাহাড় পর্বত, জল-স্থল, ঘোড়া, গাধা, বরতন, পশু-পাখী, ফেরেশতা ও তারকারাজি ইত্যাদি সমুদয় ছোট বড় জিনিসের নাম।হযরত ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, তাঁকে ফেরেশতা ও মানুষের নাম শিখানো হয়েছিল। কেননা এর পরে (আরবি) শব্দটি এসেছে এবং এটা বিবেক সম্পন্ন প্রাণীর জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু ইবনে জারীরের (রঃ) একথাটি বিবেক সম্মত কথা নয় যে, যেখানে বিবেক সম্পন্ন ও বিবেকহীন একত্রিত হয়ে থাকে, সেখানে যে শব্দ আনা হয় তা শুধু বুদ্ধিজীবিদের জন্যেই আনা হয়। যেমন কুরআন মাজীদে আছেঃ “আল্লাহ সমুদয় সৃষ্টজীবকে পানি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, তাদের মধ্যে কতকগুলো পেটের ভরে ধীরে ধীরে চলে, কতকগুলো চলে দুই পায়ের ভরে, আবার কতকগুলো চার পায়ের ভরে চলে থাকে। আল্লাহ যা চান তাই সৃষ্টি করে থাকেন এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান।" সুতরাং এই আয়াতে প্রকাশিত হলো যে, বিবেকহীন প্রাণীও এর অন্তর্ভুক্ত কিন্তু (আরবি) বা শব্দের রূপ এসেছে বিবেক সম্পন্নদের। তা ছাড়া হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রাঃ) পঠনে ও আছে। হযরত উবাই বিন কা‘আবের (রাঃ) পঠনে (আরবি) ও আছে। সঠিক কথা এই যে, হযরত আদম (আঃ) কে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জিনিসের নামই শিখিয়ে ছিলেন। প্রজাতিগত নাম, গুণগত নাম এবং ক্রিয়াগত নামও শিখিয়েছিলেন। যেমন হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) কথা আছে যে, গুহ্যদ্বার দিয়ে নির্গত বায়ুর নামও শিখিয়েছিলেন (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর)। একটি সুদীর্ঘ হাদীসএ আয়াতের তাফসীরে ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটি এনেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন ঈমানদারগণ একত্রিত হয়ে বলবে-“আমরা যদি কোন একজনকে সুপারিশকারীরূপে আল্লাহর নিকট পাঠাতাম তবে কতই ভাল হতো। সুতরাং তারা সবাই মিলে হযরত আদম (আঃ)-এর নিকট আসবে এবং তাকে বলবে আপনি আমাদের সবারই পিতা। আল্লাহ পাক আপনাকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেছেন, স্বীয় ফেরেশতাদের দ্বারা আপনাকে সিজদা করিয়েছেন, আপনাকে সব জিনিসের নাম শিখিয়েছেন। সুতরাং আপনি আমাদের জন্যে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করুন যেন আমরা আমাদের এই স্থানে শান্তি লাভ করতে পারি।' এ কথা শুনে তিনি উত্তরে বলবেনঃ ‘আমার এ যোগ্যতা নেই। তার স্বীয় পাপের কথা স্মরণ হয়ে যাবে, সুতরাং তিনি লজ্জিত হবেন। তিনি বলবেনঃ তোমরা হযরত নূহের (আঃ) কাছে যাও। তিনি প্রথম রাসূল যাকে আল্লাহ পৃথিবীবাসীর নিকট পাঠিয়েছিলেন। তারা এ উত্তর শুনে ষত নূহের (আঃ) নিকট আসবে। তিনিও এ উত্তরই দেবেন এবং আল্লাহর ইমর বিরুদ্ধে স্বীয় পুত্রের জন্যে প্রার্থনার কথা স্মরণ করে তিনি লজ্জিত হবেন এবং বলবেনঃ ‘তোমরা রাহমানের (আল্লাহর) বন্ধু হযরত ইবরাহীমের (আঃ) নিকট যাও।' তারা সব তাঁর কাছে আসবে কিন্তু এখানেও ঐ উত্তরই পাবে। তিনি বলবেনঃ “তোমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও, তার সাথে অল্লাহ এ কথা বলেছিলেন এবং তাঁকে তাওরাত দান করেছিলেন। এ কথা শুনে। মই হযরত মূসার (আঃ) নিকট আসবে এবং তার নিকট এ প্রার্থনাই জানাবে। কিন্তু এখানেও একই উত্তর পাবে। প্রতিশোধ গ্রহণ ছাড়াই একটি লোককে মেরে ফেলার কণা তার স্বরুণ হয়ে যাবে এবং তিনি লজ্জাবোধ করবেন ও বলবেনঃ ‘তোমরা হযরত ঈসার (আঃ) কাছে যাও। তিনি আল্লাহর বান্দা, তাঁর রাসূল, তার কালেমা এবং তাঁর রূহু। এরা সব এখানে আসবে কিন্তু এখানেও ঐ উত্তরই পাবে। তিনি বলবেনঃ তোমরা মুহাম্মদ (সঃ)-এর নিকট যাও। তাঁর পূর্বেও পরের সমস্ত পাপ মার্জনা করা হয়েছে। তারা সবাই আমার নিকট আসবে। আমি অগ্রসর হব। আমার প্রভুকে দেখা মাত্রই আমি সিজদায় পড়ে যাব। যে পর্যন্ত আল্লাহ পাককে মঞ্জুর হবে, আমি সিজদায় পড়েই থাকবো। অতঃপর আল্লাহ বলবেনঃ ‘মাথা উঠাও, যাজ্ঞা কর, দেয়া হবে; বল, শোনা হবে। এবং সুপারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। তখন আমি আমার মস্তক উত্তোলন করবো এবং আল্লাহর প্রশংসা করবো যা তিনি আমাকে ঐ সময়েই শিখিয়ে দিবেন। অতঃপর আমি সুপারিশ করবো। আমার জন্যে সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। তাদেরকে আমি বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে পুনরায় তাঁর নিকট ফিরে আসবে। আবার আমার প্রভুকে দেখে এ রকমই সিজদায় পড়ে যাবো। পুনরায় সুপারিশ করবো। আমার জন্যে সীমা নির্ধারিত হবে। তাদেরকেও বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে তৃতীয়বার আসবো। আবার চতুর্থবার আসবো। শেষ পর্যন্ত দোযখে শুধুমাত্র ওরাই থাকবে যাদেরকে কুরআন মাজীদ বন্দী রেখেছে এবং যাদের জন্য জাহান্নামে চির অবস্থান ওয়াজিব হয়ে গেছে (অর্থাৎ মুশরিক ও কাফির)।সহীহ মুসলিম, সুনান-ই- নাসাঈ, সুনান-ই- ইবনে মাজাহ্ ইত্যাদির মধ্যে শাফাআতের এই হাদীসটি বিদ্যমান রয়েছে। এখানে এই হাদীসটি আনার উদ্দেশ্য এই যে, এই হাদীসটির মধ্যে এ কথাটিও আছেঃ লোকেরা হযরত আদম (আঃ) কে বলবে ‘আল্লাহ আপনাকে সব জিনিষের নাম শিখিয়েছেন। অতঃপর ঐ জিনিষগুলো ফেরেশতাদের সামনে পেশ করেন এবং তাদেরকে বলেন-'তোমরা যদি তোমাদের একথায় সত্যবাদী হও যে, সমস্ত মাখলুক অপেক্ষা ভোমৱাই বেশী জ্ঞানী বা একথাই সঠিক যে, যমীনে আল্লাহ খলীফা বানাইবেন না, তবে এসব জিনিসের নাম বল। এটাও বর্ণিত আছে যে, যদি তোমরা এ কথায় সত্যবাদী হও বানী আদম বিবাদ বিসম্বাদ ও রক্তারক্তি করবে, তবে এ গুলোর নাম বল। কিন্তু প্রথমটিই বেশী সঠিক মত। যেন এতে এ ধমক রয়েছে যে, আচ্ছা! তোমরা যে বলছো যমীনে খলীফা হওয়ার যোগ্যে আমরাই, মানুষ নয়, যদি তোমরা এতে সত্যবাদী হও তবে যেসব জিনিষ তোমাদের সামনে বিদ্যমান রয়েছে সেগুলোর নাম বলতো? আর যদি তোমরা তা বলতে না পার তবে তোমাদের এটা বুঝে নেয়া উচিত যে, যা তোমাদের সামনে বিদ্যমান রয়েছে সেগুলোরই নাম তোমরা বলতে পারলে না, তবে ভবিষ্যতে আগত জিনিষের জ্ঞান তোমাদের কিরূপে হতে পারে? ' ফেরেশতারা এটা শোনা মাত্রাই আল্লাহ তা'আলার পবিত্র ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে এবং তাদের জ্ঞানের স্বল্পতা বর্ণনা করতে আরম্ভ করলেন। আর বললেন যে, হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে যতটুকু শিখিয়েছেন, আমরা ততটুকুই জানি। সমস্ত জিনিষকে পরিবেষ্টনকারী জ্ঞান তো একমাত্র আপনারই আছে। আপনিই সমুদয় জিনিষের সংবাদ রাখেন। আপনার সমুদয় আদেশ ও নিষেধ হিকমত পরিপূর্ণ। যাকে কিছু শিখিয়ে দেন তাও হিকমত এবং যাকে শিক্ষা হতে বঞ্চিত রাখেন সেও হিকমতে। আপনি মহা প্রজ্ঞাময় ও ন্যায় বিচারক।‘সুবহানাল্লাহ’-এর তাফসীর ও তার অর্থহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, 'সুবহানাল্লাহ' -এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর পবিত্রতা, অর্থাৎ তিনি সমস্ত অশ্লীলতা থেকে পবিত্র। হযরত উমার (রাঃ) একদা হযরত আলী (রাঃ) এবং তাঁর পার্শ্বে উপবিষ্ট অন্য কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তো জানি, কিন্তু সুবহানাল্লাহ' কি কালেমা?” হযরত আলী (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “এ কালেমাটি মহান আল্লাহ নিজের জন্যে পছন্দ করেন এবং এতে তিনি খুব খুশী হন, আর এটা বলা তাঁর নিকট খুবই প্রিয়।” হযরত মাইমুন বিন মাহান (রঃ) বলেন যে, ওতে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব এবং সমস্ত অশ্লীলতা হতে পবিত্র হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। হযরত আদম (আঃ) এভাবে নাম বলেছেনঃ “আপনার নাম জিবরাইল (আঃ), আপনার নাম মিকাঈল (আঃ), আপনার নাম ইসরাফীল (আঃ) এমন কি তাকে চিল, কাক ইত্যাদি সব কিছুর নাম জিজ্ঞেস করা হলে তিনি সবই বলে দেন। ফেরেশতারা যখন হযরত আদম (আঃ)-এর মর্যাদার কথা বুঝতে পারলেন তখন আল্লাহ পাক তাদেরকে বললেনঃ “দেখ, আমি তোমাদেরকে পূর্বেই বলেছিলাম যে, আমি প্রত্যেক প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয় জানি।” যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “তোমরা উচ্চস্বরে বল (বা না বল), আল্লাহ গোপন হতে গোপনতম খবর জানেন। আরেক জায়গায় আছে “এ লোকেরা সেই আল্লাহকে কেন সিজদা করে না যিনি আকাশসমূহের ও পৃথিবীর গোপনীয় জিনিসগুলো বের করে থাকেন এবং যিনি তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সই জানেন? আল্লাহ একাই উপাস্য এবং তিনিই আরশ-ই-আযীমের প্রভু। তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন রাখ আমি তা জানি।” ভাবার্থ এই যে, ইবলীসের অন্তরে যে ফখর ও অহংকার লুকায়িত ছিল আল্লাহ অ জানতেন। আর ফেরেশতারা যা বলেছিলেন তাতে ছিল প্রকাশ্য কথা। তাহলে আল্লাহ তা'আলা যে বললেনঃ “তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন রাখ, আমি সবই জানি” এর অর্থ দাঁড়ালো এই যে, ফেরেশতারা যা প্রকাশ করেছিলেন তা আল্লাহ জানেন এবং ইবলীস তার অন্তরে যা গোপন রেখেছিল সেটাও তিনি জানতেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) ও সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং সাওরীরও এটাই মত। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাকে পছন্দ করেছেন। আবুল আলিয়া (রঃ), রাবী বিন আনাস (রঃ), হাসান (রঃ) এবং কাতাদার (রঃ) কথা এই যে, ফেরেশতাদের গোপনীয় কথা ছিলঃ যে মাখলূকই আল্লাহ পাক সৃষ্টি করুন না কেন, আমরাই তাদের চাইতে বেশী জ্ঞানী ও মর্যাদাবান হবো।' কিন্তু পরে এটা প্রমাণিত হয়ে গেল এবং তারাও জানতে পারলেন যে, জ্ঞান ও মর্যাদা দুটোতেই হযরত আদম (আঃ) তাঁদের উপর প্রাধান্য লাভ করেছেন। হযরত আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলেনঃ “যেমন তোমরা এসব জিনিসের নাম অবহিত নও, দ্রুপ তোমরা এটাও জানতে পার না যে, তাদের মধ্যে ভাল ও মন্দ উভয়ই হবে। তাদের মধ্যে কতকগুলো অনুগত হবে এবং কতকগুলো হবে অবাধ্য। আর পূর্বেই আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আমাকে বেহেশত ও দোযখ দু'টোই পুরণ করতে হবে। কিন্তু তোমাদেরকে তার সংবাদ দেইনি। এখন ফেরেশতাগণ হযরত আদম (আঃ) কে প্রদত্ত জ্ঞান উপলব্ধি করে তাঁর প্রধান্য স্বীকার করে নেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, সবচেয়ে উত্তম মত হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) মতটি। তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তা'আলা যেন বলছেনঃ ‘ফেরেশতামণ্ডলী! আকাশ ও পৃথিবীর অদৃশ্যের জ্ঞান, তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয়তার জ্ঞান আমার আছে। তাদের প্রকাশ্য কথা এবং ইবলীসের গোপনীয় অহংকারের কথাও আল্লাহ জানতেন। এতে গোপনকারী শুধুমাত্র ইবলীস ছিল। কিন্তু বহুবচনের বা (আরবি) রূপ আনা হয়েছে। কেননা, আরবে এই প্রচলন আছে ও তাদের কথায় এটা পাওয়া যায় যে, তারা এক বা কয়েকজনের একটি কাজকে সকলের দিকে সম্বন্ধ লাগিয়ে থাকে। তারা বলে থাকেঃ সৈন্যগণকে মেরে ফেলা হয়েছে বা তারা পরাজিত হয়েছে। অথচ পরাজয় বা হত্যা একজনের বা কয়েকজনের হয়ে থাকে, কিন্তু তারা বহু বচনের রূপ এনে। থাকে।বানূ তামীম গোত্রের একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে তার ঘরের পিছন হতে ডেকেছিল। কিন্তু কুরআন মাজীদে এর বর্ণনা নিম্নরূপে এসেছেঃ “যারা তোমাকে (নবী সঃ)-কে ঘরের পিছন থেকে ডেকে থাকে....।' তা হলে দেখা যাচ্ছে যে, ডাক দিয়েছিল একজনই কিন্তু রূপ আনা হয়েছে বহু বচনের। কাজেই ফেরেশতাদের মধ্যে গোপনকারী শুধু শয়তান হলেও বহু বচনের রূপ ব্যবহার করা হয়েছে।
আল-বাকারা 2:32
৩১-৩৩ নং আয়াতের তাফসীরএখানে একথারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা একটা বিশেষ জ্ঞানে হযরত আদম (আঃ) কে ফেরেশতাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন।এটা ফেরেশতাদের হযরত আদম (আঃ) কে সিজদা করার পরের ঘটনা। কিন্তু তাঁকে সৃষ্টি করার মধ্যে মহান আল্লাহর যে হিকমত নিহিত ছিল এবং যা ফেরেশতাগণ জানতেন না, তার সাথে সম্বন্ধযুক্ত হওয়ার কারণে এ ঘটনাকেই পূর্বে বর্ণনা করেছেন এবং ফেরেশতাদের সিজদা করার ঘটনা, যা পূর্বে ঘটেছিল তা পরে বর্ণনা করেছেন, যেন খলীফা সৃষ্টি করার যৌক্তিকতা ও নিপূণতা প্রকাশ পায় এবং জানা যায় যে, হযরত আদম (আঃ)-এর মর্যাদা ও সম্মান লাভ হয়েছে। এমন এক বিদ্যার কারণে যে বিদ্যা ফেরেশতাদের নেই। আল্লাহ পাক বলেন যে, তিনি হযরত আদম (আঃ) কে সমুদয় বস্তুর নাম শিখিয়ে দেন, অর্থাৎ তাঁর সন্তানদের নাম, সমস্ত জীব জন্তুর নাম, যমীন, আসমান, পাহাড় পর্বত, জল-স্থল, ঘোড়া, গাধা, বরতন, পশু-পাখী, ফেরেশতা ও তারকারাজি ইত্যাদি সমুদয় ছোট বড় জিনিসের নাম।হযরত ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, তাঁকে ফেরেশতা ও মানুষের নাম শিখানো হয়েছিল। কেননা এর পরে (আরবি) শব্দটি এসেছে এবং এটা বিবেক সম্পন্ন প্রাণীর জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু ইবনে জারীরের (রঃ) একথাটি বিবেক সম্মত কথা নয় যে, যেখানে বিবেক সম্পন্ন ও বিবেকহীন একত্রিত হয়ে থাকে, সেখানে যে শব্দ আনা হয় তা শুধু বুদ্ধিজীবিদের জন্যেই আনা হয়। যেমন কুরআন মাজীদে আছেঃ “আল্লাহ সমুদয় সৃষ্টজীবকে পানি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, তাদের মধ্যে কতকগুলো পেটের ভরে ধীরে ধীরে চলে, কতকগুলো চলে দুই পায়ের ভরে, আবার কতকগুলো চার পায়ের ভরে চলে থাকে। আল্লাহ যা চান তাই সৃষ্টি করে থাকেন এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান।" সুতরাং এই আয়াতে প্রকাশিত হলো যে, বিবেকহীন প্রাণীও এর অন্তর্ভুক্ত কিন্তু (আরবি) বা শব্দের রূপ এসেছে বিবেক সম্পন্নদের। তা ছাড়া হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রাঃ) পঠনে ও আছে। হযরত উবাই বিন কা‘আবের (রাঃ) পঠনে (আরবি) ও আছে। সঠিক কথা এই যে, হযরত আদম (আঃ) কে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জিনিসের নামই শিখিয়ে ছিলেন। প্রজাতিগত নাম, গুণগত নাম এবং ক্রিয়াগত নামও শিখিয়েছিলেন। যেমন হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) কথা আছে যে, গুহ্যদ্বার দিয়ে নির্গত বায়ুর নামও শিখিয়েছিলেন (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর)। একটি সুদীর্ঘ হাদীসএ আয়াতের তাফসীরে ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটি এনেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন ঈমানদারগণ একত্রিত হয়ে বলবে-“আমরা যদি কোন একজনকে সুপারিশকারীরূপে আল্লাহর নিকট পাঠাতাম তবে কতই ভাল হতো। সুতরাং তারা সবাই মিলে হযরত আদম (আঃ)-এর নিকট আসবে এবং তাকে বলবে আপনি আমাদের সবারই পিতা। আল্লাহ পাক আপনাকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেছেন, স্বীয় ফেরেশতাদের দ্বারা আপনাকে সিজদা করিয়েছেন, আপনাকে সব জিনিসের নাম শিখিয়েছেন। সুতরাং আপনি আমাদের জন্যে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করুন যেন আমরা আমাদের এই স্থানে শান্তি লাভ করতে পারি।' এ কথা শুনে তিনি উত্তরে বলবেনঃ ‘আমার এ যোগ্যতা নেই। তার স্বীয় পাপের কথা স্মরণ হয়ে যাবে, সুতরাং তিনি লজ্জিত হবেন। তিনি বলবেনঃ তোমরা হযরত নূহের (আঃ) কাছে যাও। তিনি প্রথম রাসূল যাকে আল্লাহ পৃথিবীবাসীর নিকট পাঠিয়েছিলেন। তারা এ উত্তর শুনে ষত নূহের (আঃ) নিকট আসবে। তিনিও এ উত্তরই দেবেন এবং আল্লাহর ইমর বিরুদ্ধে স্বীয় পুত্রের জন্যে প্রার্থনার কথা স্মরণ করে তিনি লজ্জিত হবেন এবং বলবেনঃ ‘তোমরা রাহমানের (আল্লাহর) বন্ধু হযরত ইবরাহীমের (আঃ) নিকট যাও।' তারা সব তাঁর কাছে আসবে কিন্তু এখানেও ঐ উত্তরই পাবে। তিনি বলবেনঃ “তোমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও, তার সাথে অল্লাহ এ কথা বলেছিলেন এবং তাঁকে তাওরাত দান করেছিলেন। এ কথা শুনে। মই হযরত মূসার (আঃ) নিকট আসবে এবং তার নিকট এ প্রার্থনাই জানাবে। কিন্তু এখানেও একই উত্তর পাবে। প্রতিশোধ গ্রহণ ছাড়াই একটি লোককে মেরে ফেলার কণা তার স্বরুণ হয়ে যাবে এবং তিনি লজ্জাবোধ করবেন ও বলবেনঃ ‘তোমরা হযরত ঈসার (আঃ) কাছে যাও। তিনি আল্লাহর বান্দা, তাঁর রাসূল, তার কালেমা এবং তাঁর রূহু। এরা সব এখানে আসবে কিন্তু এখানেও ঐ উত্তরই পাবে। তিনি বলবেনঃ তোমরা মুহাম্মদ (সঃ)-এর নিকট যাও। তাঁর পূর্বেও পরের সমস্ত পাপ মার্জনা করা হয়েছে। তারা সবাই আমার নিকট আসবে। আমি অগ্রসর হব। আমার প্রভুকে দেখা মাত্রই আমি সিজদায় পড়ে যাব। যে পর্যন্ত আল্লাহ পাককে মঞ্জুর হবে, আমি সিজদায় পড়েই থাকবো। অতঃপর আল্লাহ বলবেনঃ ‘মাথা উঠাও, যাজ্ঞা কর, দেয়া হবে; বল, শোনা হবে। এবং সুপারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। তখন আমি আমার মস্তক উত্তোলন করবো এবং আল্লাহর প্রশংসা করবো যা তিনি আমাকে ঐ সময়েই শিখিয়ে দিবেন। অতঃপর আমি সুপারিশ করবো। আমার জন্যে সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। তাদেরকে আমি বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে পুনরায় তাঁর নিকট ফিরে আসবে। আবার আমার প্রভুকে দেখে এ রকমই সিজদায় পড়ে যাবো। পুনরায় সুপারিশ করবো। আমার জন্যে সীমা নির্ধারিত হবে। তাদেরকেও বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে তৃতীয়বার আসবো। আবার চতুর্থবার আসবো। শেষ পর্যন্ত দোযখে শুধুমাত্র ওরাই থাকবে যাদেরকে কুরআন মাজীদ বন্দী রেখেছে এবং যাদের জন্য জাহান্নামে চির অবস্থান ওয়াজিব হয়ে গেছে (অর্থাৎ মুশরিক ও কাফির)।সহীহ মুসলিম, সুনান-ই- নাসাঈ, সুনান-ই- ইবনে মাজাহ্ ইত্যাদির মধ্যে শাফাআতের এই হাদীসটি বিদ্যমান রয়েছে। এখানে এই হাদীসটি আনার উদ্দেশ্য এই যে, এই হাদীসটির মধ্যে এ কথাটিও আছেঃ লোকেরা হযরত আদম (আঃ) কে বলবে ‘আল্লাহ আপনাকে সব জিনিষের নাম শিখিয়েছেন। অতঃপর ঐ জিনিষগুলো ফেরেশতাদের সামনে পেশ করেন এবং তাদেরকে বলেন-'তোমরা যদি তোমাদের একথায় সত্যবাদী হও যে, সমস্ত মাখলুক অপেক্ষা ভোমৱাই বেশী জ্ঞানী বা একথাই সঠিক যে, যমীনে আল্লাহ খলীফা বানাইবেন না, তবে এসব জিনিসের নাম বল। এটাও বর্ণিত আছে যে, যদি তোমরা এ কথায় সত্যবাদী হও বানী আদম বিবাদ বিসম্বাদ ও রক্তারক্তি করবে, তবে এ গুলোর নাম বল। কিন্তু প্রথমটিই বেশী সঠিক মত। যেন এতে এ ধমক রয়েছে যে, আচ্ছা! তোমরা যে বলছো যমীনে খলীফা হওয়ার যোগ্যে আমরাই, মানুষ নয়, যদি তোমরা এতে সত্যবাদী হও তবে যেসব জিনিষ তোমাদের সামনে বিদ্যমান রয়েছে সেগুলোর নাম বলতো? আর যদি তোমরা তা বলতে না পার তবে তোমাদের এটা বুঝে নেয়া উচিত যে, যা তোমাদের সামনে বিদ্যমান রয়েছে সেগুলোরই নাম তোমরা বলতে পারলে না, তবে ভবিষ্যতে আগত জিনিষের জ্ঞান তোমাদের কিরূপে হতে পারে? ' ফেরেশতারা এটা শোনা মাত্রাই আল্লাহ তা'আলার পবিত্র ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে এবং তাদের জ্ঞানের স্বল্পতা বর্ণনা করতে আরম্ভ করলেন। আর বললেন যে, হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে যতটুকু শিখিয়েছেন, আমরা ততটুকুই জানি। সমস্ত জিনিষকে পরিবেষ্টনকারী জ্ঞান তো একমাত্র আপনারই আছে। আপনিই সমুদয় জিনিষের সংবাদ রাখেন। আপনার সমুদয় আদেশ ও নিষেধ হিকমত পরিপূর্ণ। যাকে কিছু শিখিয়ে দেন তাও হিকমত এবং যাকে শিক্ষা হতে বঞ্চিত রাখেন সেও হিকমতে। আপনি মহা প্রজ্ঞাময় ও ন্যায় বিচারক।‘সুবহানাল্লাহ’-এর তাফসীর ও তার অর্থহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, 'সুবহানাল্লাহ' -এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর পবিত্রতা, অর্থাৎ তিনি সমস্ত অশ্লীলতা থেকে পবিত্র। হযরত উমার (রাঃ) একদা হযরত আলী (রাঃ) এবং তাঁর পার্শ্বে উপবিষ্ট অন্য কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তো জানি, কিন্তু সুবহানাল্লাহ' কি কালেমা?” হযরত আলী (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “এ কালেমাটি মহান আল্লাহ নিজের জন্যে পছন্দ করেন এবং এতে তিনি খুব খুশী হন, আর এটা বলা তাঁর নিকট খুবই প্রিয়।” হযরত মাইমুন বিন মাহান (রঃ) বলেন যে, ওতে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব এবং সমস্ত অশ্লীলতা হতে পবিত্র হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। হযরত আদম (আঃ) এভাবে নাম বলেছেনঃ “আপনার নাম জিবরাইল (আঃ), আপনার নাম মিকাঈল (আঃ), আপনার নাম ইসরাফীল (আঃ) এমন কি তাকে চিল, কাক ইত্যাদি সব কিছুর নাম জিজ্ঞেস করা হলে তিনি সবই বলে দেন। ফেরেশতারা যখন হযরত আদম (আঃ)-এর মর্যাদার কথা বুঝতে পারলেন তখন আল্লাহ পাক তাদেরকে বললেনঃ “দেখ, আমি তোমাদেরকে পূর্বেই বলেছিলাম যে, আমি প্রত্যেক প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয় জানি।” যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “তোমরা উচ্চস্বরে বল (বা না বল), আল্লাহ গোপন হতে গোপনতম খবর জানেন। আরেক জায়গায় আছে “এ লোকেরা সেই আল্লাহকে কেন সিজদা করে না যিনি আকাশসমূহের ও পৃথিবীর গোপনীয় জিনিসগুলো বের করে থাকেন এবং যিনি তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সই জানেন? আল্লাহ একাই উপাস্য এবং তিনিই আরশ-ই-আযীমের প্রভু। তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন রাখ আমি তা জানি।” ভাবার্থ এই যে, ইবলীসের অন্তরে যে ফখর ও অহংকার লুকায়িত ছিল আল্লাহ অ জানতেন। আর ফেরেশতারা যা বলেছিলেন তাতে ছিল প্রকাশ্য কথা। তাহলে আল্লাহ তা'আলা যে বললেনঃ “তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন রাখ, আমি সবই জানি” এর অর্থ দাঁড়ালো এই যে, ফেরেশতারা যা প্রকাশ করেছিলেন তা আল্লাহ জানেন এবং ইবলীস তার অন্তরে যা গোপন রেখেছিল সেটাও তিনি জানতেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) ও সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং সাওরীরও এটাই মত। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাকে পছন্দ করেছেন। আবুল আলিয়া (রঃ), রাবী বিন আনাস (রঃ), হাসান (রঃ) এবং কাতাদার (রঃ) কথা এই যে, ফেরেশতাদের গোপনীয় কথা ছিলঃ যে মাখলূকই আল্লাহ পাক সৃষ্টি করুন না কেন, আমরাই তাদের চাইতে বেশী জ্ঞানী ও মর্যাদাবান হবো।' কিন্তু পরে এটা প্রমাণিত হয়ে গেল এবং তারাও জানতে পারলেন যে, জ্ঞান ও মর্যাদা দুটোতেই হযরত আদম (আঃ) তাঁদের উপর প্রাধান্য লাভ করেছেন। হযরত আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলেনঃ “যেমন তোমরা এসব জিনিসের নাম অবহিত নও, দ্রুপ তোমরা এটাও জানতে পার না যে, তাদের মধ্যে ভাল ও মন্দ উভয়ই হবে। তাদের মধ্যে কতকগুলো অনুগত হবে এবং কতকগুলো হবে অবাধ্য। আর পূর্বেই আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আমাকে বেহেশত ও দোযখ দু'টোই পুরণ করতে হবে। কিন্তু তোমাদেরকে তার সংবাদ দেইনি। এখন ফেরেশতাগণ হযরত আদম (আঃ) কে প্রদত্ত জ্ঞান উপলব্ধি করে তাঁর প্রধান্য স্বীকার করে নেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, সবচেয়ে উত্তম মত হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) মতটি। তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তা'আলা যেন বলছেনঃ ‘ফেরেশতামণ্ডলী! আকাশ ও পৃথিবীর অদৃশ্যের জ্ঞান, তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয়তার জ্ঞান আমার আছে। তাদের প্রকাশ্য কথা এবং ইবলীসের গোপনীয় অহংকারের কথাও আল্লাহ জানতেন। এতে গোপনকারী শুধুমাত্র ইবলীস ছিল। কিন্তু বহুবচনের বা (আরবি) রূপ আনা হয়েছে। কেননা, আরবে এই প্রচলন আছে ও তাদের কথায় এটা পাওয়া যায় যে, তারা এক বা কয়েকজনের একটি কাজকে সকলের দিকে সম্বন্ধ লাগিয়ে থাকে। তারা বলে থাকেঃ সৈন্যগণকে মেরে ফেলা হয়েছে বা তারা পরাজিত হয়েছে। অথচ পরাজয় বা হত্যা একজনের বা কয়েকজনের হয়ে থাকে, কিন্তু তারা বহু বচনের রূপ এনে। থাকে।বানূ তামীম গোত্রের একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে তার ঘরের পিছন হতে ডেকেছিল। কিন্তু কুরআন মাজীদে এর বর্ণনা নিম্নরূপে এসেছেঃ “যারা তোমাকে (নবী সঃ)-কে ঘরের পিছন থেকে ডেকে থাকে....।' তা হলে দেখা যাচ্ছে যে, ডাক দিয়েছিল একজনই কিন্তু রূপ আনা হয়েছে বহু বচনের। কাজেই ফেরেশতাদের মধ্যে গোপনকারী শুধু শয়তান হলেও বহু বচনের রূপ ব্যবহার করা হয়েছে।
আল-বাকারা 2:33
৩১-৩৩ নং আয়াতের তাফসীরএখানে একথারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা একটা বিশেষ জ্ঞানে হযরত আদম (আঃ) কে ফেরেশতাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন।এটা ফেরেশতাদের হযরত আদম (আঃ) কে সিজদা করার পরের ঘটনা। কিন্তু তাঁকে সৃষ্টি করার মধ্যে মহান আল্লাহর যে হিকমত নিহিত ছিল এবং যা ফেরেশতাগণ জানতেন না, তার সাথে সম্বন্ধযুক্ত হওয়ার কারণে এ ঘটনাকেই পূর্বে বর্ণনা করেছেন এবং ফেরেশতাদের সিজদা করার ঘটনা, যা পূর্বে ঘটেছিল তা পরে বর্ণনা করেছেন, যেন খলীফা সৃষ্টি করার যৌক্তিকতা ও নিপূণতা প্রকাশ পায় এবং জানা যায় যে, হযরত আদম (আঃ)-এর মর্যাদা ও সম্মান লাভ হয়েছে। এমন এক বিদ্যার কারণে যে বিদ্যা ফেরেশতাদের নেই। আল্লাহ পাক বলেন যে, তিনি হযরত আদম (আঃ) কে সমুদয় বস্তুর নাম শিখিয়ে দেন, অর্থাৎ তাঁর সন্তানদের নাম, সমস্ত জীব জন্তুর নাম, যমীন, আসমান, পাহাড় পর্বত, জল-স্থল, ঘোড়া, গাধা, বরতন, পশু-পাখী, ফেরেশতা ও তারকারাজি ইত্যাদি সমুদয় ছোট বড় জিনিসের নাম।হযরত ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, তাঁকে ফেরেশতা ও মানুষের নাম শিখানো হয়েছিল। কেননা এর পরে (আরবি) শব্দটি এসেছে এবং এটা বিবেক সম্পন্ন প্রাণীর জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু ইবনে জারীরের (রঃ) একথাটি বিবেক সম্মত কথা নয় যে, যেখানে বিবেক সম্পন্ন ও বিবেকহীন একত্রিত হয়ে থাকে, সেখানে যে শব্দ আনা হয় তা শুধু বুদ্ধিজীবিদের জন্যেই আনা হয়। যেমন কুরআন মাজীদে আছেঃ “আল্লাহ সমুদয় সৃষ্টজীবকে পানি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, তাদের মধ্যে কতকগুলো পেটের ভরে ধীরে ধীরে চলে, কতকগুলো চলে দুই পায়ের ভরে, আবার কতকগুলো চার পায়ের ভরে চলে থাকে। আল্লাহ যা চান তাই সৃষ্টি করে থাকেন এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান।" সুতরাং এই আয়াতে প্রকাশিত হলো যে, বিবেকহীন প্রাণীও এর অন্তর্ভুক্ত কিন্তু (আরবি) বা শব্দের রূপ এসেছে বিবেক সম্পন্নদের। তা ছাড়া হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রাঃ) পঠনে ও আছে। হযরত উবাই বিন কা‘আবের (রাঃ) পঠনে (আরবি) ও আছে। সঠিক কথা এই যে, হযরত আদম (আঃ) কে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জিনিসের নামই শিখিয়ে ছিলেন। প্রজাতিগত নাম, গুণগত নাম এবং ক্রিয়াগত নামও শিখিয়েছিলেন। যেমন হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) কথা আছে যে, গুহ্যদ্বার দিয়ে নির্গত বায়ুর নামও শিখিয়েছিলেন (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর)। একটি সুদীর্ঘ হাদীসএ আয়াতের তাফসীরে ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটি এনেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন ঈমানদারগণ একত্রিত হয়ে বলবে-“আমরা যদি কোন একজনকে সুপারিশকারীরূপে আল্লাহর নিকট পাঠাতাম তবে কতই ভাল হতো। সুতরাং তারা সবাই মিলে হযরত আদম (আঃ)-এর নিকট আসবে এবং তাকে বলবে আপনি আমাদের সবারই পিতা। আল্লাহ পাক আপনাকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেছেন, স্বীয় ফেরেশতাদের দ্বারা আপনাকে সিজদা করিয়েছেন, আপনাকে সব জিনিসের নাম শিখিয়েছেন। সুতরাং আপনি আমাদের জন্যে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করুন যেন আমরা আমাদের এই স্থানে শান্তি লাভ করতে পারি।' এ কথা শুনে তিনি উত্তরে বলবেনঃ ‘আমার এ যোগ্যতা নেই। তার স্বীয় পাপের কথা স্মরণ হয়ে যাবে, সুতরাং তিনি লজ্জিত হবেন। তিনি বলবেনঃ তোমরা হযরত নূহের (আঃ) কাছে যাও। তিনি প্রথম রাসূল যাকে আল্লাহ পৃথিবীবাসীর নিকট পাঠিয়েছিলেন। তারা এ উত্তর শুনে ষত নূহের (আঃ) নিকট আসবে। তিনিও এ উত্তরই দেবেন এবং আল্লাহর ইমর বিরুদ্ধে স্বীয় পুত্রের জন্যে প্রার্থনার কথা স্মরণ করে তিনি লজ্জিত হবেন এবং বলবেনঃ ‘তোমরা রাহমানের (আল্লাহর) বন্ধু হযরত ইবরাহীমের (আঃ) নিকট যাও।' তারা সব তাঁর কাছে আসবে কিন্তু এখানেও ঐ উত্তরই পাবে। তিনি বলবেনঃ “তোমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও, তার সাথে অল্লাহ এ কথা বলেছিলেন এবং তাঁকে তাওরাত দান করেছিলেন। এ কথা শুনে। মই হযরত মূসার (আঃ) নিকট আসবে এবং তার নিকট এ প্রার্থনাই জানাবে। কিন্তু এখানেও একই উত্তর পাবে। প্রতিশোধ গ্রহণ ছাড়াই একটি লোককে মেরে ফেলার কণা তার স্বরুণ হয়ে যাবে এবং তিনি লজ্জাবোধ করবেন ও বলবেনঃ ‘তোমরা হযরত ঈসার (আঃ) কাছে যাও। তিনি আল্লাহর বান্দা, তাঁর রাসূল, তার কালেমা এবং তাঁর রূহু। এরা সব এখানে আসবে কিন্তু এখানেও ঐ উত্তরই পাবে। তিনি বলবেনঃ তোমরা মুহাম্মদ (সঃ)-এর নিকট যাও। তাঁর পূর্বেও পরের সমস্ত পাপ মার্জনা করা হয়েছে। তারা সবাই আমার নিকট আসবে। আমি অগ্রসর হব। আমার প্রভুকে দেখা মাত্রই আমি সিজদায় পড়ে যাব। যে পর্যন্ত আল্লাহ পাককে মঞ্জুর হবে, আমি সিজদায় পড়েই থাকবো। অতঃপর আল্লাহ বলবেনঃ ‘মাথা উঠাও, যাজ্ঞা কর, দেয়া হবে; বল, শোনা হবে। এবং সুপারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। তখন আমি আমার মস্তক উত্তোলন করবো এবং আল্লাহর প্রশংসা করবো যা তিনি আমাকে ঐ সময়েই শিখিয়ে দিবেন। অতঃপর আমি সুপারিশ করবো। আমার জন্যে সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। তাদেরকে আমি বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে পুনরায় তাঁর নিকট ফিরে আসবে। আবার আমার প্রভুকে দেখে এ রকমই সিজদায় পড়ে যাবো। পুনরায় সুপারিশ করবো। আমার জন্যে সীমা নির্ধারিত হবে। তাদেরকেও বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে তৃতীয়বার আসবো। আবার চতুর্থবার আসবো। শেষ পর্যন্ত দোযখে শুধুমাত্র ওরাই থাকবে যাদেরকে কুরআন মাজীদ বন্দী রেখেছে এবং যাদের জন্য জাহান্নামে চির অবস্থান ওয়াজিব হয়ে গেছে (অর্থাৎ মুশরিক ও কাফির)।সহীহ মুসলিম, সুনান-ই- নাসাঈ, সুনান-ই- ইবনে মাজাহ্ ইত্যাদির মধ্যে শাফাআতের এই হাদীসটি বিদ্যমান রয়েছে। এখানে এই হাদীসটি আনার উদ্দেশ্য এই যে, এই হাদীসটির মধ্যে এ কথাটিও আছেঃ লোকেরা হযরত আদম (আঃ) কে বলবে ‘আল্লাহ আপনাকে সব জিনিষের নাম শিখিয়েছেন। অতঃপর ঐ জিনিষগুলো ফেরেশতাদের সামনে পেশ করেন এবং তাদেরকে বলেন-'তোমরা যদি তোমাদের একথায় সত্যবাদী হও যে, সমস্ত মাখলুক অপেক্ষা ভোমৱাই বেশী জ্ঞানী বা একথাই সঠিক যে, যমীনে আল্লাহ খলীফা বানাইবেন না, তবে এসব জিনিসের নাম বল। এটাও বর্ণিত আছে যে, যদি তোমরা এ কথায় সত্যবাদী হও বানী আদম বিবাদ বিসম্বাদ ও রক্তারক্তি করবে, তবে এ গুলোর নাম বল। কিন্তু প্রথমটিই বেশী সঠিক মত। যেন এতে এ ধমক রয়েছে যে, আচ্ছা! তোমরা যে বলছো যমীনে খলীফা হওয়ার যোগ্যে আমরাই, মানুষ নয়, যদি তোমরা এতে সত্যবাদী হও তবে যেসব জিনিষ তোমাদের সামনে বিদ্যমান রয়েছে সেগুলোর নাম বলতো? আর যদি তোমরা তা বলতে না পার তবে তোমাদের এটা বুঝে নেয়া উচিত যে, যা তোমাদের সামনে বিদ্যমান রয়েছে সেগুলোরই নাম তোমরা বলতে পারলে না, তবে ভবিষ্যতে আগত জিনিষের জ্ঞান তোমাদের কিরূপে হতে পারে? ' ফেরেশতারা এটা শোনা মাত্রাই আল্লাহ তা'আলার পবিত্র ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে এবং তাদের জ্ঞানের স্বল্পতা বর্ণনা করতে আরম্ভ করলেন। আর বললেন যে, হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে যতটুকু শিখিয়েছেন, আমরা ততটুকুই জানি। সমস্ত জিনিষকে পরিবেষ্টনকারী জ্ঞান তো একমাত্র আপনারই আছে। আপনিই সমুদয় জিনিষের সংবাদ রাখেন। আপনার সমুদয় আদেশ ও নিষেধ হিকমত পরিপূর্ণ। যাকে কিছু শিখিয়ে দেন তাও হিকমত এবং যাকে শিক্ষা হতে বঞ্চিত রাখেন সেও হিকমতে। আপনি মহা প্রজ্ঞাময় ও ন্যায় বিচারক।‘সুবহানাল্লাহ’-এর তাফসীর ও তার অর্থহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, 'সুবহানাল্লাহ' -এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর পবিত্রতা, অর্থাৎ তিনি সমস্ত অশ্লীলতা থেকে পবিত্র। হযরত উমার (রাঃ) একদা হযরত আলী (রাঃ) এবং তাঁর পার্শ্বে উপবিষ্ট অন্য কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তো জানি, কিন্তু সুবহানাল্লাহ' কি কালেমা?” হযরত আলী (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “এ কালেমাটি মহান আল্লাহ নিজের জন্যে পছন্দ করেন এবং এতে তিনি খুব খুশী হন, আর এটা বলা তাঁর নিকট খুবই প্রিয়।” হযরত মাইমুন বিন মাহান (রঃ) বলেন যে, ওতে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব এবং সমস্ত অশ্লীলতা হতে পবিত্র হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। হযরত আদম (আঃ) এভাবে নাম বলেছেনঃ “আপনার নাম জিবরাইল (আঃ), আপনার নাম মিকাঈল (আঃ), আপনার নাম ইসরাফীল (আঃ) এমন কি তাকে চিল, কাক ইত্যাদি সব কিছুর নাম জিজ্ঞেস করা হলে তিনি সবই বলে দেন। ফেরেশতারা যখন হযরত আদম (আঃ)-এর মর্যাদার কথা বুঝতে পারলেন তখন আল্লাহ পাক তাদেরকে বললেনঃ “দেখ, আমি তোমাদেরকে পূর্বেই বলেছিলাম যে, আমি প্রত্যেক প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয় জানি।” যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “তোমরা উচ্চস্বরে বল (বা না বল), আল্লাহ গোপন হতে গোপনতম খবর জানেন। আরেক জায়গায় আছে “এ লোকেরা সেই আল্লাহকে কেন সিজদা করে না যিনি আকাশসমূহের ও পৃথিবীর গোপনীয় জিনিসগুলো বের করে থাকেন এবং যিনি তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সই জানেন? আল্লাহ একাই উপাস্য এবং তিনিই আরশ-ই-আযীমের প্রভু। তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন রাখ আমি তা জানি।” ভাবার্থ এই যে, ইবলীসের অন্তরে যে ফখর ও অহংকার লুকায়িত ছিল আল্লাহ অ জানতেন। আর ফেরেশতারা যা বলেছিলেন তাতে ছিল প্রকাশ্য কথা। তাহলে আল্লাহ তা'আলা যে বললেনঃ “তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন রাখ, আমি সবই জানি” এর অর্থ দাঁড়ালো এই যে, ফেরেশতারা যা প্রকাশ করেছিলেন তা আল্লাহ জানেন এবং ইবলীস তার অন্তরে যা গোপন রেখেছিল সেটাও তিনি জানতেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) ও সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং সাওরীরও এটাই মত। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাকে পছন্দ করেছেন। আবুল আলিয়া (রঃ), রাবী বিন আনাস (রঃ), হাসান (রঃ) এবং কাতাদার (রঃ) কথা এই যে, ফেরেশতাদের গোপনীয় কথা ছিলঃ যে মাখলূকই আল্লাহ পাক সৃষ্টি করুন না কেন, আমরাই তাদের চাইতে বেশী জ্ঞানী ও মর্যাদাবান হবো।' কিন্তু পরে এটা প্রমাণিত হয়ে গেল এবং তারাও জানতে পারলেন যে, জ্ঞান ও মর্যাদা দুটোতেই হযরত আদম (আঃ) তাঁদের উপর প্রাধান্য লাভ করেছেন। হযরত আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলেনঃ “যেমন তোমরা এসব জিনিসের নাম অবহিত নও, দ্রুপ তোমরা এটাও জানতে পার না যে, তাদের মধ্যে ভাল ও মন্দ উভয়ই হবে। তাদের মধ্যে কতকগুলো অনুগত হবে এবং কতকগুলো হবে অবাধ্য। আর পূর্বেই আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আমাকে বেহেশত ও দোযখ দু'টোই পুরণ করতে হবে। কিন্তু তোমাদেরকে তার সংবাদ দেইনি। এখন ফেরেশতাগণ হযরত আদম (আঃ) কে প্রদত্ত জ্ঞান উপলব্ধি করে তাঁর প্রধান্য স্বীকার করে নেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, সবচেয়ে উত্তম মত হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) মতটি। তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তা'আলা যেন বলছেনঃ ‘ফেরেশতামণ্ডলী! আকাশ ও পৃথিবীর অদৃশ্যের জ্ঞান, তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয়তার জ্ঞান আমার আছে। তাদের প্রকাশ্য কথা এবং ইবলীসের গোপনীয় অহংকারের কথাও আল্লাহ জানতেন। এতে গোপনকারী শুধুমাত্র ইবলীস ছিল। কিন্তু বহুবচনের বা (আরবি) রূপ আনা হয়েছে। কেননা, আরবে এই প্রচলন আছে ও তাদের কথায় এটা পাওয়া যায় যে, তারা এক বা কয়েকজনের একটি কাজকে সকলের দিকে সম্বন্ধ লাগিয়ে থাকে। তারা বলে থাকেঃ সৈন্যগণকে মেরে ফেলা হয়েছে বা তারা পরাজিত হয়েছে। অথচ পরাজয় বা হত্যা একজনের বা কয়েকজনের হয়ে থাকে, কিন্তু তারা বহু বচনের রূপ এনে। থাকে।বানূ তামীম গোত্রের একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে তার ঘরের পিছন হতে ডেকেছিল। কিন্তু কুরআন মাজীদে এর বর্ণনা নিম্নরূপে এসেছেঃ “যারা তোমাকে (নবী সঃ)-কে ঘরের পিছন থেকে ডেকে থাকে....।' তা হলে দেখা যাচ্ছে যে, ডাক দিয়েছিল একজনই কিন্তু রূপ আনা হয়েছে বহু বচনের। কাজেই ফেরেশতাদের মধ্যে গোপনকারী শুধু শয়তান হলেও বহু বচনের রূপ ব্যবহার করা হয়েছে।
আল-বাকারা 2:34
ফেরেশতাদের সিজদা এবং আদম (আঃ)-এর মর্যাদাআল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-এর এই বড় মর্যাদার কথা বর্ণনা করে মানুষের উপর তার বড় অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করেছেন এবং তাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর সামনে ফেরেশতাদেরকে সিজদা করার নির্দেশ দেয়ার সংবাদ দিয়েছেন। এর প্রমাণ রূপে বহু হাদীস রয়েছে। একটি তো শাফায়াতের হাদীস যা একটু আগেই বর্ণিত হলো। দ্বিতীয় হাদীসে আছে যে, হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলেনঃ “আমাকে হযরত আদম (আঃ)-এর সহিত সাক্ষাৎ করিয়ে দিন যিনি নিজেও বেহেশত হতে বের হয়েছিলেন এবং আমাদেরকেও বের করেছিলেন। দুই নবী (আঃ) একত্রিত হলে হযরত মূসা (আঃ) তাকে বলেনঃ আপনি কি সেই আদম (আঃ) যাকে আল্লাহ স্বহস্তে সৃষ্টি করেছেন, স্বীয় রূহ তাঁর মধ্যে ফুকেছেন এবং তাঁর সামনে ফেরেশতাদেরকে সিজদা করিয়েছেন।' পূর্ণ হাদীস ইনশাআল্লাহ অতি সত্বরই বর্ণিত হবে।শয়তান কিহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইবলীস ফেরেশতাদের একটি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল যাদেরকে জ্বীন বলা হয়। তারা অগ্নিশিখা দ্বারা সৃষ্ট ছিল। তার নাম ছিল হারিস এবং সে বেহেশতের খাজাঞ্চি ছিল। এই গোত্রটি ছাড়া অন্যান্য সব ফেরেশতা আলো দ্বারা সৃষ্ট ছিল। কুরআন মাজীদের মধ্যেও এই জ্বীনদের সৃষ্টি কথা বর্ণনা করা হয়েছে, (আরবি) অগ্নিশিখার যে প্রখরতা উপর দিকে উঠে তাকে (আরবি)বলা হয়। এর দ্বারাই জ্বীনদের সৃষ্টি করা হয়েছিল। আর মানুষকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছিল। প্রথমে জ্বীনেরা পৃথিবীতে বাস করতো। তারা বিবাদ বিসম্বাদ ও কাটাকাটি, মারামারি করতে থাকলে আল্লাহ তা'আলা ইবলীসকে ফেরেশতাদের সেনাবাহিনী দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দেন। ওদেরকেই জ্বীন বলা হতো।ইবলীস ও তার সঙ্গীরা তাদেরকে মেরে কেটে সমুদ্র দ্বীপে এবং পর্বত প্রান্তে তাড়িয়ে দেয়। ইবলীসের অন্তরে এই অহংকাক্সের সৃষ্টি হয়ে গেল যে, সে ছাড়া আর কারও দ্বারা এ কাৰ্ষ সাধন সম্ভব হয়নি। তার অন্তুরের এ পাপ ও আমিত্বের কথা একমাত্র আল্লাহই জানতেন। যখন বিশ্বপ্রভু বললেনঃ “আমি যমীনে খলীফা বানাতে চাই” তখন ফেরেশতারা আরজ করেছিলেনঃ “আপনি এদেরকে কেন সৃষ্টি করবেন যারা পূর্বসম্প্রদায়ের মত ঝগড়া ফাসাদও রক্তারক্তি করবে?” তখন আল্লাহ উত্তরে বললেনঃ “আমি জানি যা তোমরা জাননা, অর্থাৎ ইবলীসের অন্তরে যে ফর ও অহংকার আছে তার জ্ঞান আমারই আছে, তোমাদের নেই।”অতঃপর হযরত আদম (আঃ)-এর মাটি উঠিয়ে আনা হলো। তা ছিল খুবই মসৃণ ও উত্তম। তা খামীর করা হলে আল্লাহ তা'আলা তার দ্বারা হযরত আদম (আঃ) কে হন্তে সৃষ্টি করলেন। চল্লিশ দিন পর্যন্ত তা এ রকমই পুতুলের আকারে ছিল। ইবলীস আসতো ও তার উপর লাথি মেরে দেখতো যে, ওটা কেনফাপা জিনিসের মত শব্দকারী মাটি। অতঃপর সে মুখের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে পিছনের ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসতো এবং আবার পিছন দিয়ে ঢুকে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেতো। অতঃপর সে বলতোঃ প্রকৃতপক্ষে এটা কোন জিনিসই নয়। আমি যদি এর উপর বিজয়ী হই তবে একে আমি ধ্বংস করে ছাড়বো এবং যদি এর শাসনভার আমার উপর অর্পিত হয় তবে আমি কখনও এটা স্বীকার করবো না।” অতঃপর আল্লাহ অ'আলা এর মধ্যে কুঁদিয়ে রূহ ভৱে দিলেন। ওটা যেখান পর্যন্ত পৌছলো, রক্ত-গোশত হতে থাকলো। যখন রূহ নাভি পর্যন্ত পৌছলো তখন তিনি স্বীয় শরীরকে দেখে খুশী হয়ে গেলেন। এবং তৎক্ষণাৎ উঠার ইচ্ছে করলেন। কিন্তু রূহ তখনও নীচের অংশে পৌছেনি বলে উঠতে পারলেন না। এই তাড়াহুড়ার বর্ণনাই নিম্নের আয়াতে রয়েছেঃ “মানুষকে অধৈর্য ও ত্রস্তরূপে সৃষ্টি করা হয়েছে।” খুণী বা দুবে কোন অবস্থাতেই তার ধৈর্য নেই। যখন রূহ শরীরে পৌছে গেল এবং হাঁচি এলো তখন তিনি বলেনঃ (আরবি) তখন আল্লাহ পাক উত্তরে বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ তোমার প্রতি সদয় হোক।তারপর শুধুমাত্র ইবলীসের সঙ্গী ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আদম (আঃ) কে সিজদা কর।” সবাই সিজদা করলেন, কিন্তু ইবলীসের অহংকার প্রকাশ পেয়ে গেল, সে অমান্য করলো এবং বললোঃ “আমি তার চেয়ে উত্তম, তার চেয়ে আমি বয়সে বড়, তার চেয়ে আমি বেশী শক্তিশালী, সে সৃষ্ট হয়েছে মাটি দ্বারা, আমি সৃষ্ট হয়েছি আগুন দ্বারা এবং আগুন মাটি অপেক্ষা শক্তিশালী।" তার এ অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাকে স্বীয় রহমত হতে বঞ্চিত করে দেন এবং এ জন্যেই তাকে ইবলীস বলা হয়।তার অবাধ্যতার শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ তা'আলা তাকে বিতাড়িত শয়তান করে দিলেন। অতঃপর তিনি হযরত আদম (আঃ) কে মানুষ, জীবজন্তু, জমীন, সমুদ্র পাহাড়-পর্বত ইত্যাদির নাম বলে দিয়ে তাঁকে ঐ সব ফেরেশতার সামনে হাজির করলেন যারা ইবলীসের সঙ্গী ছিল ও আগুন দ্বারা সৃষ্ট ছিল। মহান আল্লাহ তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা যদি এ কথায় সত্যবাদী হও যে, আমি জমীনে খলীফা পাঠাবো না, তবে তোমরা আমাকে এ জিনিসগুলোর নাম বলে দাও?” যখন ফেরেশতারা দেখলো যে, আল্লাহ তাদের পূর্ব কথায় অসন্তুষ্ট হয়েছেন, কাজেই তারা বললোঃ হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র। আমরা আমাদের পূর্ব কথা হতে প্রত্যাবর্তন করছি এবং স্বীকার করছি যে, আমরা ভবিষ্যতের কথা জানি। আমরা তো শুধু ঐটুকুই জানতে পারি যেটুকু আপনি আমাদেরকে জানিয়ে দেবেন। আমরা তো শুধু ঐটুকুই জানতে পারি যেটুকু আপনি আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছেন। এখন আল্লাহ পাক হযরত আদম (আঃ)কে ওগুলোর নাম তাদেরকে বলে দিতে আদেশ করলেন। হযরত আদম (আঃ) তাদেরকে ওগুলোর নাম বলে দিলেন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে সম্বোধন কব্রে বললেনঃ “হে ফেরেশতার দল! আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আকাশ জমীনের অদৃশ্য বস্তুর জ্ঞান একমাত্র আমারই আছে আর কারও নেই? আমি প্রত্যেক গোপনীয় বিষয় ঠিক ঐরূপই জানি যেমন জানি প্রকাশ্য বিষয়সমূহ। অর্থাৎ ইবলীসের গোপনীয় অহংকারের কথাও আমি জানতাম। আর তোমরা তার মোটেই খবর রাখতে না।" কিন্তু এ মতটি গরীব এবং এর মধ্যে এমন কতকগুলো কথা আছে সেগুলো সমালোচনার যোগ্য। আমরা যদি ওগুলো পৃথক পৃথকভাবে বর্ণনা করি তবে বিষয়টি খুব দীর্ঘ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত এ হাদীসটির সনদও ওটাই যা হতে তার প্রসিদ্ধ তাফসীর বর্ণিত আছে। এ রুকমই আরও একটি হাদীস বর্ণিত আছে, তাতে কিছুহ্রাস বৃদ্ধিও রয়েছে। তার মধ্যে এটাও আছে যে, ভূপৃষ্ঠের মাটি নেয়ার জন্যে হযরত জিবরাঈল (আঃ) জমীনে গেলে জমীন বললোঃ “আপনি আমা হতে কিছু কমিয়ে দেবেন এ জন্যে আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।” তিনি ফিব্রে অসলেন। অতঃ আল্লাহ তা'আলা মরণের ফেরেশতা (আযরাইল আঃ) কে পাঠালেন। জমীন তাকেও ঐ কথাই বললো। কিন্তু তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমি যে মহান আল্লাহর আদেশ পুৱা না করেই ফিরে যাবো এ থেকে আমিও তাঁর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।” সুতরাং তিনি সমস্ত ভূ-পৃষ্ঠ হতে একমুষ্টি মাটি গ্রহণ করলেন। মাটির রং কোন স্থানে লাল, কোন জায়গায় সাদা এবং কোথাও বা কালো ছিল বলে মানুষের রং বিভিন্ন প্রকারের হয়েছে। কিন্তু এ হাদীসটিও বনী ইসরাঈলের কথায় পরিপূর্ণ। এর মধ্যে বেশীর ভাগই পূর্ববর্তী লোকদের কথা মিলিয়ে দেয়া হয়েছে। ওগুলো সাহাবীদের (রাঃ) কথা হলেও তাঁরা হয়তো পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ হতে তা গ্রহণ করে থাকবেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। হাকিম তার মুসতাদরিক’ গ্রন্থে এরূপ বহু বর্ণনা এনেছেন এবং ওগুলোর সনদকে বুখারীর (রঃ) শর্তের উপর বলেছেন। ভাবার্থ এই যে, যখন আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বললেনঃ “তোমরা হযরত আদম (আঃ) কে সিজদা কর”-ইবলীসও এই সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কেননা, যদিও সে তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কিন্তু সে তাদের মতই ছিল এবং তাদের মতই কাজ করতো। সুতরাং সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত সেও ছিল। আর এজন্যেই অমান্য করার শাস্তি তাকে ভোগ করতে হয়েছে। এর ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ। (আরবি)-এর তাফসীরে আসবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন সে, অবাধ্যতার পূর্বে যে ফেরেশতাদের মধ্যে ছিল, তার নাম আযীল। ভূ-পৃষ্ঠে ছিল তার বাসস্থান। বিদ্যা ও জ্ঞানে সে খুব বড় ছিল। এ জন্যেই তার মস্তিষ্ক অহংকারের ভরপুর ছিল। তার ও তার দলের সম্পর্ক ছিল জ্বীনদের সঙ্গে। তার চারটি ডানা ছিল। সে ছিল বেহেশতের খাজাঞ্চী। জমীন ও দুনিয়ার আকাশের সে ছিল সম্রাট। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, ইবলীস কখনও ফেরেশতা ছিল না। তার মূল বা গোড়া হলো জ্বীন হতে। যেমন হযরত আদম (আঃ)-এর মূল মানুষ হতে। এর ইসনাদ সঠিক।আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) ও শহর বিন হাওশাব (রঃ) -এর এটাই মত। হযরত সা’দ বিন মাসউদ (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতাগণ। জীনদের কতককে মেরে ফেলেছিলেন এবং কতকগুলোকে বন্দী করে আকাশের উপর নিয়ে গিয়েছিলেন। তথায় তারা ইবাদতের জন্যে রয়ে গিয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, প্রথমে আল্লাহ একটি মাখলুক সৃষ্টি করেন। হযরত আদম (আঃ)-কে সিজদা করার জন্যে তাদেরকে নির্দেশ দেন। তা তারা অমান্য করে এবং এর ফলে তাদেরকে পুড়িয়ে ফেলা হয়। অতঃপর তিনি দ্বিতীয় মাখলুক সৃষ্টি করেন তাদেরও এ অবস্থাই ঘটে। তার পরে তিনি তৃতীয় মাখলুক সৃষ্টি করেন এবং তারা আদেশ পালন করে। কিন্তু এ হাদীসটিও গরীব এবং এর ইসনাদ সঠিক নয়। এর একজন বর্ণনাকারীর উপর সন্দেহ পোষণ করা হয়। সুতরাং এটা প্রমাণ যোগ্য নয়। ইবলীসের গোড়াই ছিল কুফর ও ভ্রান্তির উপর। কিছু দিন সঠিকভাবে চলেছিল। কিন্তু পুনরায় স্বীয় মূলের উপর এসে পড়েছিল। সিজদা করার নির্দেশ পালন ছিল আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার ও হযরত আদম (আঃ)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন।কেউ কেউ বলেন যে, এই সিজদাহ্ ছিল সালাম প্রদান ও সম্মান প্রদর্শনের সিজদা। হযরত ইউসুফ (আঃ). এর ব্যাপারে রয়েছে যে, তিনি তার পিতাকে সিংহাসনে বসিয়ে দেন এবং সবাই সিজদায় পড়ে যায়। তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেনঃ “হে পিতা! এটাই আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা যা আমার প্রভু সত্যরূপে দেখিয়েছেন। পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্য এটা বৈধ ছিল, কিন্তু আমাদের ধর্মে এটা রহিত হয়ে গেছে।হযরত মুআয (রাঃ) বলেনঃ “আমি সিরিয়াবাসীকে তাদের নেতৃবর্গ এবং আলেমদের সামনে সিজদা করতে দেখেছিলাম। কাজেই আল্লাহর রাসূল (সঃ) কে বলি-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি সিজদা পাওয়ার বেশী হকদার।" তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি যদি কোন মানুষকে কোন মানুষের সামনে সিজদা করার অনুমতি দিতে পারতাম তবে নারীদেরকে নির্দেশ দিতাম যে, তারা যেন তাদের স্বামীকে সিজদা করে। কেননা তাদের ওদের উপর বড় হক রয়েছে।" ইমাম রাযী (রঃ) এটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, সিজদা ছিল আল্লাহ তা'আলার জন্যে। হযরত আদম (আঃ) কিবলাহ হিসেবে ছিলেন। কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। প্রথম মতটিই বেশী স্পষ্ট এবং উত্তম বলে মনে হচ্ছে। এই সিজদা ছিল হযরত আদম (আঃ)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সালাম প্রদান হিসেবে। আর এটা মহান আল্লাহর আনুগত্যের উপরেই ছিল। কেননা ওটা ছিল তাঁর নির্দেশ, কাজেই ওটা অবশ্যই পালনীয় ছিল। ইমাম রাযীও (রঃ) এই মতকেই জোরালো বলেছেন এবং অন্য দুটি মতকে দুর্বল বলেছেন। মত দু’টির একটি হচ্ছে হযরত আদম (আঃ)-এর কিবলাহ হিসেবে হওয়া, এতে বড় একটা মর্যাদা প্রকাশ পায় না। আর অপরটি হচ্ছে সিজদার ভাবার্থ লওয়া অপারগতা ও হীনতা স্বীকার, মাটিতে কপাল রেখে প্রকৃত সিজদাহ্ করা নয়। কিন্তু এ দুটো ব্যাখ্যাই দুর্বল। হযরত কাতাদ (রঃ) বলেন যে, এই অহংকারের পাপই ছিল সর্বপ্রথম পাপ যা ইবলীস হতে প্রকাশ পেয়েছে। বিশুদ্ধ হাদীসে আছে যে, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে বেহেশতে প্রবেশ লাভ করবে না। এই অহংকার, কুফর এবং অবাধ্যতার কারণেই ইবলীসের গলদেশে অবিসম্পাতের গলাবন্ধ লেগে গেছে এবং মহান আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়ে তার দরবার হতে বিতাড়িত হয়েছে। (আরবি)-এখানে শব্দটি (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাদেরকে ডুবানো হলো সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। অন্যত্র বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।” কবিদের কবিতাতেও শব্দটি এ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তা হলে অর্থ হচ্ছেঃ “সে কাফির হয়ে গেল।” ইবনে ফোরাক বলেন যে, সে আল্লাহর ইলমে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কুরতুবী (রঃ) একেই প্রাধান্য দিয়েছেন এবং একটি মাসয়ালা বর্ণনা করেছেন যে, কোন লোকের হাতে অলৌকিক কিছু প্রকাশ পাওয়া তার আল্লাহর ওয়ালী হওয়ার প্রমাণ নয়-যদিও কতকগুলো সূফী ও ব্রাফেযী এর বিপরীত বলে থাকে। কেননা, আমরা কারও জন্যে এ কথার ফায়সালা দিতে পারি না যে, সে ঈমানের অবস্থাতেই আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হবে। এ শয়তানের প্রতি লক্ষ্য করলেই বুঝা যাবে যে, ওয়ালী তো দুরের কথা, সে ফেরেশতা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু শেষে কাফিরদের নেতা হয়ে গেল। তাছাড়া কতকগুলো অলৌকিক কাজ যা বাহ্যত কারামাত রূপে পরিলক্ষিত হয়, তা আল্লাহর ওয়ালীগণ ছাড়া অন্যান্য লোকের হাতেও প্রকাশ পেয়ে থাকে। এমনকি ফাসিক, ফাজির, মুশরিক এবং কাফিরের হাতেও প্রকাশ পেয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন মাজীদের (আরবি) (৪৪:১০) এই আয়াতটি অদ্ভরে গোপন রেখে যখন ইবনে সাইয়াদ নামক একজন কাফিরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “বলতো, আমি অন্তুরে কি গোপন রেখেছি?" সে বলঃ (আরবি)। কোন বর্ণনায় আছে যে, রাগের সময় সে এত ফুলে উঠতো যে, তার দেহ দ্বারা সে সমস্ত পথ বন্ধ করে দিতে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) তাকে হত্যা করেন।দাজ্জালের এরূপ বহু কথা তো হাদীসসমূহে এসেছে। যেমন তার আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করা, ভূ-পৃষ্ঠ হতে শস্য উৎপাদন করা, পৃথিবীর ধনভাণ্ডার তার পিছনে লেগে যাওয়া, এক যুবককে হত্যা করে পুনরায় জীবিত করা ইত্যাদি। হযরত লায়েস বিন সা'দ (রাঃ) এবং হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ “যদি তোমরা কোন মানুষকে পানির উপর চলতে দেখ, তবে তাকে আল্লাহর ওয়ালী মনে করো না, যে পর্যন্ত না তার সমস্ত কাজ কর্ম কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী হয়।” আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত ফেরেশতার উপর এই সিজদার নির্দেশ ছিল, যদিও একটি দলের এই মতও রয়েছে যে, এই নির্দেশ শুধু জমীনের ফেরেশতাদের উপর ছিল। কিন্তু এটা ঠিক নয়। কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছেঃ “ইবলীস ছাড়া সমস্ত ফেরেশতাই সিজদা করেছিল।” এখানে শুধু ইবলীসকেই পৃথক করা হয়েছে। কাজেই বুঝা যাচ্ছে যে, সিজদার এ আদেশ ছিল সাধারণ। জমীন ও আসমান উভয় স্থানের ফেরেশতাদের উপরই সিজদার নির্দেশ ছিল। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-বাকারা 2:35
৩৫-৩৬ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আদম (আঃ)-এর এটা অন্য মর্যাদা ও সম্মানের বর্ণনা। ফেরেশতাদেরকে সিজদা করানোর পর আল্লাহ তা'আলা তাদের স্বামী-স্ত্রীকে বেহেশতে স্থান দিলেন এবং সব জিনিসের উপর অধিকার দিয়ে দিলেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এর মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” তিনি বলেনঃ “তিনি নবীও ছিলেন এবং রাসলও ছিলেন। এমন কি আল্লাহ তাআলা তার সামনে কথাবার্তা বলেছেন এবং তাঁকে বলেছেন-“তুমি ও তোমার স্ত্রী বেহেশতে অবস্থান কর। সাধারণ মুফাসসিরগণের ধারণা এই যে, আসমানী বেহেশতে তাদের বাসের জায়গা করা হয়েছিল। কিন্তু মু'তাযিলাহ্ ও কাদরিয়্যাগণ বলে যে, এ বেহেশত ছিল যমীনের উপর। সূরা-ই-আ'রাফে এর বর্ণনা ইনশাআল্লাহ আসবে। কুরআন পাকের বাকরীতি দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, বেহেশতে অবস্থানের পূর্বে হযরত হাওয়াকে (আঃ) সৃষ্টি করা হয়েছিল।মুহাম্মদ বিন ইসহাক (রঃ) বলেন যে, আহলে কিতাব ইত্যাদি আলেমগণ হতে ইবনে আব্বাসের (রাঃ) বর্ণনা অনুসারে বর্ণিত আছে যে, ইবলীসকে ধমক ও ভীতি প্রদর্শনের পর হযরত আদম (আঃ)-এর জ্ঞান প্রকাশ করতঃ তার উপর তন্দ্রা চাপিয়ে দেন। অতঃপর তার বাম পাঁজর হতে হযরত হাওয়া (আঃ) কে সৃষ্টি করেন। চোখ খোলামাত্র হযরত আদম (আঃ) তাঁকে দেখতে পান এবং রক্ত ও গোশতের কারণে অন্তরে তাঁর প্রতি প্রেম ও ভালবাসার সৃষ্টি হয়। অতঃপর বিশ্বপ্রভু উভয়কে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন এবং বেহেশতে বাস করার নির্দেশ দেন। কেউ কেউ বলেন যে, হযরত আদম (আঃ)-এর বেহেশতে প্রবেশের পর হযরত হাওয়া (আঃ)কে সৃষ্টি করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) প্রভৃতি সাহাবীগণ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, ইবলীসকে জান্নাত হতে বের করে দেয়ার পরে হযরত আদম (আঃ) কে তথায় জায়গা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে সময় তিনি একাকী ছিলেন। সুতরাং তার ঘুমের অবস্থায় হযরত হাওয়াকে (আঃ) তাঁর পাঁজর হতে সৃষ্টি করা হয়। জেগে ওঠার পর তাঁকে সামনে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কে? তুমি কেনই বা সৃষ্টি হলে? হযরত হাওয়া উত্তরে বলেনঃ “আমি একটি নারী, আপনার শান্তির কারণ রূপে আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।”তৎক্ষণাৎ ফেরেশতাগণ হযরত আদম (আঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “বলুন তার নাম কি?" হযরত আদম (আঃ) বলেন ‘হাওয়া। তারা বলেনঃ “এ নামের কারণ কি?” তিনি বলেনঃ “তাকে এক জীবিত হতে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে।” তথায় আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)কে ডাক দিয়ে বলেনঃ “হে আদম (আঃ)! তুমি ও তোমার স্ত্রী বেহেশতের মধ্যে সুখে স্বাচ্ছন্দে অবস্থান কর। এবং মনে যা চায় তাই খাও ও পান কর, আর এই বৃক্ষের নিকট যেয়ো না।”এই বিশেষ বৃক্ষ হতে নিষেধ করা একটা পরীক্ষা ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, এটা আঙ্গুরের গাছ ছিল। আবার কেউ বলেন যে, এটা ছিল গমের গাছ। কেউ বলেছেন শীষ, কেউ বলেছেন খেজুর এবং কেউ কেউ ডুমুরও বলেছেন। ঐ গাছের ফল খেয়ে মানবীয় প্রয়োজন (পায়খানা-প্রস্রাব) দেখা দিতে এবং ওটা বেহেশতের যোগ্য নয়। কেউ কেউ বলেন যে, ঐ গাছের ফল খেয়ে ফেরেশতাগণ চিরজীবন লাভ করতেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ওটা কোন একটি গাছ ছিল যা থেকে আল্লাহ পাক নিষেধ করেছিলেন। ওটা যে কোন নির্দিষ্ট গাছ ছিল তা কুরআন কারীম বা কোন সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয় না। তাছাড়া এ ব্যাপারে মুফাসৃসিরগণের মধ্যে খুবই মতভেদ রয়েছে। এটা জানলেও আমাদের কোন লাভ নেই। এবং না জানলেও কোন ক্ষতি নেই। সুতরাং এ জন্যে মাথা ঘামানোর প্রয়োজনই বা কি? মহান আল্লাহই এটা খুব ভাল জানেন। ইমাম রাযীও (রঃ) এই ফায়সালাই দিয়েছেন। এবং সঠিক কথাও এটাই বটে।(আরবি) এর (আরবি) সর্বনামটি কেউ কেউ (আরবি)-এর দিকে ফিরিয়েছেন, আবার কেউ কেউ (আরবি)-এর দিকে ফিরিয়েছেন। একটি কিরআতে (আরবি) এরূপও রয়েছে। তবে অর্থ হবেঃ শতয়ান তাদের দুজনকে বেহেশত হতে পৃথক করে দেয়। আর দ্বিতীয়টির অর্থ হবেঃ ‘ঐ গাছের কারণেই শয়তান তাদের দুজনকে ভুলিয়ে দেয়।' (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর কারণেও এসে থাকে যেমন। (আরবি)-এর মধ্যে এসেছে। ঐ অবাধ্যতার কারণে তাদের বেহেশতী পোষাক, সেই পবিত্র স্থান, ঐ উত্তম আহার্য ইত্যাদি সব কিছুই ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং তাদের বলা হয়ঃ ‘এখন পৃথিবীতেই তোমাদের আহার্য ইত্যাদি রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত তোমরা সেখানেই পড়ে থাকবে এবং তথায় উপকার লাভ করবে।' সাপ ও ইবলীসের গল্প, ইবলীস কিভাবে বেহেশতে পৌছে, কি প্রকারে সে কুমন্ত্রণা দেয় ইত্যাদি লম্বা চওড়া গল্প মুফাসৃসিরগণ এখানে এনেছেন। কিন্তু ওগুলো সবই বানী ইসরাঈলের ভাণ্ডারের অংশ বিশেষ। তথাপি আমরা তা সূরা-ই-আরাফের মধ্যে বর্ণনা করবো। কেননা, এ ঘটনার বর্ণনা তথায় কিছু বিস্তারিত ভাবে রয়েছে।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের একটি হাদীসে আছে যে, গাছের ফল মুখে দেয়া মাত্রই বেহেশতী পোষাক তাঁর শরীরে হতে পড়ে যায়। নিজেকে উলঙ্গ দেখে হযরত আদম (আঃ) এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে থাকেন। কিন্তু দেহ দীর্ঘ ছিল বলে তা গাছে আটকে যায়। আল্লাহ পাক বলেনঃ হে আদম (আঃ)! আমা হতে কি পলায়ন করছো?' তিনি আরয করেনঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনা হতে পালিয়ে যাইনি, লজ্জায় মুখ ঢেকে ঘুরে বেড়াচ্ছি।' অন্য বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম (আঃ)! আমার নিকট হতে চলে যাও। আমার মর্যাদার শপথ! আমার নিকটে আমার অবাধ্য থাকতে পারে না। তোমার মত আমি এত মাখলুক সৃষ্টি করবো যে, তাদের দ্বারা পৃথিবী ভরে যাবে। অতঃপর যদি তারা আমার অবাধ্য হয় তবে আমি অবশ্যই তাদেরকেও অবাধ্যদের ঘরে পৌছিয়ে দেবো।' এ বর্ণনাটি গরীব। এর মধ্যে ইনকিতা বরং ই’যালও আছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আদম (আঃ) আসরের পর হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বেহেশতে ছিলেন। হযরত হাসান (রাঃ) বলেন যে, এই এক ঘন্টা ছিল একশো ত্রিশ বছরের সমান। বাঈ বিন আনাস (রাঃ) বলেন যে, নবম ও দশম ঘন্টায় হযরত আদম (আঃ) বহিষ্কৃত হন। তাঁর সঙ্গে বেহেশতের গাছের একটি শাখা ছিল। এবং মাথায় ছিল বেহেশতের একটি মুকুট। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) ভারতে অবতরণ করেন। তার সঙ্গে কালো পাথর (হাজারে আসওয়াদ) ছিল এবং বেহেশতের বৃক্ষের পাতা ছিল যা তিনি ভারতে ছড়িয়ে দেন এবং ওটা দ্বারা সুগন্ধময় গাছের জন্ম লাভ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, তিনি ভারতের ‘দাহনা শহরে অবতরণ করেন। একটি বর্ণনায় আছে যে, তিনি মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী স্থানে অবতরণ করেন। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) ভারতে এবং হযরত হাওয়া (আঃ) জিদ্দায় অবতরণ করেন। আর ইবলীস বসরা হতে কয়েক মাইল দূরে ‘দাস্তামিসানে নিক্ষিপ্ত হয় এবং সাপ ‘ইসহানে পতিত হয়।হযরত ইবনে উমারের (রাঃ) মতে হযরত আদম (আঃ) সাফা পাহাড়ের উপর অবতরণ করেন। অবতরণের সময় হযরত আদম (আঃ)-এর হাত জানুর উপর ছিল এবং মাথা ছিল নিম্নমুখী। আর ইবলীসের অঙ্গুলীর উপর অঙ্গুলী রাখা ছিল এবং মাথা ছিল আকাশের দিকে। হযরত আবু মূসা (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ) কে প্রত্যেক জিনিসের কারিগরী শিখিয়েছিলেন এবং বেহেশতী ফলের পাথেয় দিয়েছিলেন। একটি হাদীসে আছে যে, সমস্ত দিনের মধ্যে সর্বোত্তম দিন হচ্ছে শুক্রবারের দিন। ঐ দিনেই হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়, ঐদিনেই বেহেশতে প্রবেশ করানো হয় এবং ঐদিনেই বেহেশত হতে বের করে দেয়া হয়। ইমাম রাযী (রাঃ) বলেনঃ ‘এটা যে ধমক ও ভীতি প্রদর্শনের আয়াত তার কয়েকটি যুক্তি আছে। একটি এই যে, সামান্য পদস্খলনের জন্যে হযরত আদম (আঃ) কে কতই না গুরুতর শাস্তি দেয়া হলো। কোন কবি কতই না সুন্দর কথা বলেছেনঃ তোমারা পাপের পর পাপ করছো অথচ জান্নাতের প্রার্থী হচ্ছো? তোমরা কি ভুলে গেছে যে, তোমাদের পিতা আদম (আঃ) কে শুধু একটি লঘু পাপের কারণে জান্নাত হতে বের করে দেয়া হয়েছে? ইবনুল কাসেম বলেছেনঃ “আমরা তো এখানে শত্রুদের হাতে বন্দী রয়েছি, দেখ, কখন আমরা নিরাপদে স্বদেশে পৌছবো।' ফাতহ্ মুসেলী বলেনঃ “আমরা জান্নাতবাসী ছিলাম। শয়তান আমাদেরকে বন্দী করে দুনিয়ায় এনেছে। এখন সে আমাদের জন্যে এখানে চিন্তা ও দুঃখ ছাড়া আর কি রেখেছে? এ বন্দীত্বের শিকল তখনই ভাঙ্গবে যখন আমরা ঐ স্থানে পৌছবো, যে স্থান হতে আমাদেরকে বের করা :হয়েছে।যদি কোন প্রতিবাদাকরী এ প্রতিবাদ করে যে, হযরত আদম (আঃ) যখন আসমানী বেহেশতে ছিলেন, তখন শয়তান আল্লাহর দরবার হতে বিতাড়িত হয়েছিল। তবে আবার তথায় কিভাবে পৌছলো? এর প্রথম উত্তর ভো এই হবে যে, ঐ বেহেশত ছিল যমীনে, এরূপ একটি মত তো আছেই। এ ছাড়া আরও উত্তর এই যে, সম্মানিত অবস্থায় তার প্রবেশ নিষেধ ছিল। কিন্তু লাঞ্ছিত অবস্থায় ও চুরি করে যাওয়া বাধা ছিল না। যেহেতু তাওরাতে আছে যে, সে সাপের মুখে বসে বেহেশতে গিয়েছিল। এও একটি উত্তর যে, সে বেহেশতে যায়নি, বরং বাহির থেকেই কুমন্ত্রণা দিয়েছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, যমীনে থেকেই সে তাঁর অন্তরে কুমন্ত্রণা দিয়েছিল। কুরতুবী (রঃ) এখানে সর্প সম্পর্কীয় এবং তাকে মেরে ফেলার হুকুমের হাদীসগুলিও এনেছেন, যা খুবই উত্তম ও উপকারী হয়েছে।
আল-বাকারা 2:36
৩৫-৩৬ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আদম (আঃ)-এর এটা অন্য মর্যাদা ও সম্মানের বর্ণনা। ফেরেশতাদেরকে সিজদা করানোর পর আল্লাহ তা'আলা তাদের স্বামী-স্ত্রীকে বেহেশতে স্থান দিলেন এবং সব জিনিসের উপর অধিকার দিয়ে দিলেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এর মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?” তিনি বলেনঃ “তিনি নবীও ছিলেন এবং রাসলও ছিলেন। এমন কি আল্লাহ তাআলা তার সামনে কথাবার্তা বলেছেন এবং তাঁকে বলেছেন-“তুমি ও তোমার স্ত্রী বেহেশতে অবস্থান কর। সাধারণ মুফাসসিরগণের ধারণা এই যে, আসমানী বেহেশতে তাদের বাসের জায়গা করা হয়েছিল। কিন্তু মু'তাযিলাহ্ ও কাদরিয়্যাগণ বলে যে, এ বেহেশত ছিল যমীনের উপর। সূরা-ই-আ'রাফে এর বর্ণনা ইনশাআল্লাহ আসবে। কুরআন পাকের বাকরীতি দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, বেহেশতে অবস্থানের পূর্বে হযরত হাওয়াকে (আঃ) সৃষ্টি করা হয়েছিল।মুহাম্মদ বিন ইসহাক (রঃ) বলেন যে, আহলে কিতাব ইত্যাদি আলেমগণ হতে ইবনে আব্বাসের (রাঃ) বর্ণনা অনুসারে বর্ণিত আছে যে, ইবলীসকে ধমক ও ভীতি প্রদর্শনের পর হযরত আদম (আঃ)-এর জ্ঞান প্রকাশ করতঃ তার উপর তন্দ্রা চাপিয়ে দেন। অতঃপর তার বাম পাঁজর হতে হযরত হাওয়া (আঃ) কে সৃষ্টি করেন। চোখ খোলামাত্র হযরত আদম (আঃ) তাঁকে দেখতে পান এবং রক্ত ও গোশতের কারণে অন্তরে তাঁর প্রতি প্রেম ও ভালবাসার সৃষ্টি হয়। অতঃপর বিশ্বপ্রভু উভয়কে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন এবং বেহেশতে বাস করার নির্দেশ দেন। কেউ কেউ বলেন যে, হযরত আদম (আঃ)-এর বেহেশতে প্রবেশের পর হযরত হাওয়া (আঃ)কে সৃষ্টি করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) প্রভৃতি সাহাবীগণ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, ইবলীসকে জান্নাত হতে বের করে দেয়ার পরে হযরত আদম (আঃ) কে তথায় জায়গা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে সময় তিনি একাকী ছিলেন। সুতরাং তার ঘুমের অবস্থায় হযরত হাওয়াকে (আঃ) তাঁর পাঁজর হতে সৃষ্টি করা হয়। জেগে ওঠার পর তাঁকে সামনে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কে? তুমি কেনই বা সৃষ্টি হলে? হযরত হাওয়া উত্তরে বলেনঃ “আমি একটি নারী, আপনার শান্তির কারণ রূপে আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।”তৎক্ষণাৎ ফেরেশতাগণ হযরত আদম (আঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “বলুন তার নাম কি?" হযরত আদম (আঃ) বলেন ‘হাওয়া। তারা বলেনঃ “এ নামের কারণ কি?” তিনি বলেনঃ “তাকে এক জীবিত হতে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে।” তথায় আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)কে ডাক দিয়ে বলেনঃ “হে আদম (আঃ)! তুমি ও তোমার স্ত্রী বেহেশতের মধ্যে সুখে স্বাচ্ছন্দে অবস্থান কর। এবং মনে যা চায় তাই খাও ও পান কর, আর এই বৃক্ষের নিকট যেয়ো না।”এই বিশেষ বৃক্ষ হতে নিষেধ করা একটা পরীক্ষা ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, এটা আঙ্গুরের গাছ ছিল। আবার কেউ বলেন যে, এটা ছিল গমের গাছ। কেউ বলেছেন শীষ, কেউ বলেছেন খেজুর এবং কেউ কেউ ডুমুরও বলেছেন। ঐ গাছের ফল খেয়ে মানবীয় প্রয়োজন (পায়খানা-প্রস্রাব) দেখা দিতে এবং ওটা বেহেশতের যোগ্য নয়। কেউ কেউ বলেন যে, ঐ গাছের ফল খেয়ে ফেরেশতাগণ চিরজীবন লাভ করতেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ওটা কোন একটি গাছ ছিল যা থেকে আল্লাহ পাক নিষেধ করেছিলেন। ওটা যে কোন নির্দিষ্ট গাছ ছিল তা কুরআন কারীম বা কোন সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয় না। তাছাড়া এ ব্যাপারে মুফাসৃসিরগণের মধ্যে খুবই মতভেদ রয়েছে। এটা জানলেও আমাদের কোন লাভ নেই। এবং না জানলেও কোন ক্ষতি নেই। সুতরাং এ জন্যে মাথা ঘামানোর প্রয়োজনই বা কি? মহান আল্লাহই এটা খুব ভাল জানেন। ইমাম রাযীও (রঃ) এই ফায়সালাই দিয়েছেন। এবং সঠিক কথাও এটাই বটে।(আরবি) এর (আরবি) সর্বনামটি কেউ কেউ (আরবি)-এর দিকে ফিরিয়েছেন, আবার কেউ কেউ (আরবি)-এর দিকে ফিরিয়েছেন। একটি কিরআতে (আরবি) এরূপও রয়েছে। তবে অর্থ হবেঃ শতয়ান তাদের দুজনকে বেহেশত হতে পৃথক করে দেয়। আর দ্বিতীয়টির অর্থ হবেঃ ‘ঐ গাছের কারণেই শয়তান তাদের দুজনকে ভুলিয়ে দেয়।' (আরবি) শব্দটি (আরবি)-এর কারণেও এসে থাকে যেমন। (আরবি)-এর মধ্যে এসেছে। ঐ অবাধ্যতার কারণে তাদের বেহেশতী পোষাক, সেই পবিত্র স্থান, ঐ উত্তম আহার্য ইত্যাদি সব কিছুই ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং তাদের বলা হয়ঃ ‘এখন পৃথিবীতেই তোমাদের আহার্য ইত্যাদি রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত তোমরা সেখানেই পড়ে থাকবে এবং তথায় উপকার লাভ করবে।' সাপ ও ইবলীসের গল্প, ইবলীস কিভাবে বেহেশতে পৌছে, কি প্রকারে সে কুমন্ত্রণা দেয় ইত্যাদি লম্বা চওড়া গল্প মুফাসৃসিরগণ এখানে এনেছেন। কিন্তু ওগুলো সবই বানী ইসরাঈলের ভাণ্ডারের অংশ বিশেষ। তথাপি আমরা তা সূরা-ই-আরাফের মধ্যে বর্ণনা করবো। কেননা, এ ঘটনার বর্ণনা তথায় কিছু বিস্তারিত ভাবে রয়েছে।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের একটি হাদীসে আছে যে, গাছের ফল মুখে দেয়া মাত্রই বেহেশতী পোষাক তাঁর শরীরে হতে পড়ে যায়। নিজেকে উলঙ্গ দেখে হযরত আদম (আঃ) এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে থাকেন। কিন্তু দেহ দীর্ঘ ছিল বলে তা গাছে আটকে যায়। আল্লাহ পাক বলেনঃ হে আদম (আঃ)! আমা হতে কি পলায়ন করছো?' তিনি আরয করেনঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনা হতে পালিয়ে যাইনি, লজ্জায় মুখ ঢেকে ঘুরে বেড়াচ্ছি।' অন্য বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম (আঃ)! আমার নিকট হতে চলে যাও। আমার মর্যাদার শপথ! আমার নিকটে আমার অবাধ্য থাকতে পারে না। তোমার মত আমি এত মাখলুক সৃষ্টি করবো যে, তাদের দ্বারা পৃথিবী ভরে যাবে। অতঃপর যদি তারা আমার অবাধ্য হয় তবে আমি অবশ্যই তাদেরকেও অবাধ্যদের ঘরে পৌছিয়ে দেবো।' এ বর্ণনাটি গরীব। এর মধ্যে ইনকিতা বরং ই’যালও আছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আদম (আঃ) আসরের পর হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বেহেশতে ছিলেন। হযরত হাসান (রাঃ) বলেন যে, এই এক ঘন্টা ছিল একশো ত্রিশ বছরের সমান। বাঈ বিন আনাস (রাঃ) বলেন যে, নবম ও দশম ঘন্টায় হযরত আদম (আঃ) বহিষ্কৃত হন। তাঁর সঙ্গে বেহেশতের গাছের একটি শাখা ছিল। এবং মাথায় ছিল বেহেশতের একটি মুকুট। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) ভারতে অবতরণ করেন। তার সঙ্গে কালো পাথর (হাজারে আসওয়াদ) ছিল এবং বেহেশতের বৃক্ষের পাতা ছিল যা তিনি ভারতে ছড়িয়ে দেন এবং ওটা দ্বারা সুগন্ধময় গাছের জন্ম লাভ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, তিনি ভারতের ‘দাহনা শহরে অবতরণ করেন। একটি বর্ণনায় আছে যে, তিনি মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী স্থানে অবতরণ করেন। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) ভারতে এবং হযরত হাওয়া (আঃ) জিদ্দায় অবতরণ করেন। আর ইবলীস বসরা হতে কয়েক মাইল দূরে ‘দাস্তামিসানে নিক্ষিপ্ত হয় এবং সাপ ‘ইসহানে পতিত হয়।হযরত ইবনে উমারের (রাঃ) মতে হযরত আদম (আঃ) সাফা পাহাড়ের উপর অবতরণ করেন। অবতরণের সময় হযরত আদম (আঃ)-এর হাত জানুর উপর ছিল এবং মাথা ছিল নিম্নমুখী। আর ইবলীসের অঙ্গুলীর উপর অঙ্গুলী রাখা ছিল এবং মাথা ছিল আকাশের দিকে। হযরত আবু মূসা (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ) কে প্রত্যেক জিনিসের কারিগরী শিখিয়েছিলেন এবং বেহেশতী ফলের পাথেয় দিয়েছিলেন। একটি হাদীসে আছে যে, সমস্ত দিনের মধ্যে সর্বোত্তম দিন হচ্ছে শুক্রবারের দিন। ঐ দিনেই হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়, ঐদিনেই বেহেশতে প্রবেশ করানো হয় এবং ঐদিনেই বেহেশত হতে বের করে দেয়া হয়। ইমাম রাযী (রাঃ) বলেনঃ ‘এটা যে ধমক ও ভীতি প্রদর্শনের আয়াত তার কয়েকটি যুক্তি আছে। একটি এই যে, সামান্য পদস্খলনের জন্যে হযরত আদম (আঃ) কে কতই না গুরুতর শাস্তি দেয়া হলো। কোন কবি কতই না সুন্দর কথা বলেছেনঃ তোমারা পাপের পর পাপ করছো অথচ জান্নাতের প্রার্থী হচ্ছো? তোমরা কি ভুলে গেছে যে, তোমাদের পিতা আদম (আঃ) কে শুধু একটি লঘু পাপের কারণে জান্নাত হতে বের করে দেয়া হয়েছে? ইবনুল কাসেম বলেছেনঃ “আমরা তো এখানে শত্রুদের হাতে বন্দী রয়েছি, দেখ, কখন আমরা নিরাপদে স্বদেশে পৌছবো।' ফাতহ্ মুসেলী বলেনঃ “আমরা জান্নাতবাসী ছিলাম। শয়তান আমাদেরকে বন্দী করে দুনিয়ায় এনেছে। এখন সে আমাদের জন্যে এখানে চিন্তা ও দুঃখ ছাড়া আর কি রেখেছে? এ বন্দীত্বের শিকল তখনই ভাঙ্গবে যখন আমরা ঐ স্থানে পৌছবো, যে স্থান হতে আমাদেরকে বের করা :হয়েছে।যদি কোন প্রতিবাদাকরী এ প্রতিবাদ করে যে, হযরত আদম (আঃ) যখন আসমানী বেহেশতে ছিলেন, তখন শয়তান আল্লাহর দরবার হতে বিতাড়িত হয়েছিল। তবে আবার তথায় কিভাবে পৌছলো? এর প্রথম উত্তর ভো এই হবে যে, ঐ বেহেশত ছিল যমীনে, এরূপ একটি মত তো আছেই। এ ছাড়া আরও উত্তর এই যে, সম্মানিত অবস্থায় তার প্রবেশ নিষেধ ছিল। কিন্তু লাঞ্ছিত অবস্থায় ও চুরি করে যাওয়া বাধা ছিল না। যেহেতু তাওরাতে আছে যে, সে সাপের মুখে বসে বেহেশতে গিয়েছিল। এও একটি উত্তর যে, সে বেহেশতে যায়নি, বরং বাহির থেকেই কুমন্ত্রণা দিয়েছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, যমীনে থেকেই সে তাঁর অন্তরে কুমন্ত্রণা দিয়েছিল। কুরতুবী (রঃ) এখানে সর্প সম্পর্কীয় এবং তাকে মেরে ফেলার হুকুমের হাদীসগুলিও এনেছেন, যা খুবই উত্তম ও উপকারী হয়েছে।
আল-বাকারা 2:37
যে কথাগুলো হযরত আদম (আঃ) শিখে ছিলেন তা কুরআন মাজীদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। তা হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা দুইজন বললো-হে আমাদের প্রভু! নিশ্চয় আমরা আমাদের নফসের উপরে অত্যাচার করেছি, আপনি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে হয়ে যাবো।' (৭:২৩) অধিকাংশ লোকের এটাই অভিমত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে হজ্জের নির্দেশাবলী শিক্ষা করাও বর্ণিত আছে। হযরত উবাইদ বিন উমাইর (রাঃ) বলেন যে, কথাগুলি নিম্নরূপঃ হে আল্লাহ! যে ভুল আমি করেছি, তা কি আমার জন্মের পূর্বে আমার ভাগ্যে লিপিবদ্ধ ছিল, না আমি নিজেই তা আবিষ্কার করেছি। উত্তর হলোঃ তুমি নিজে আবিষ্কার করনি, বরং আমি তোমার ভাগ্যে তা লিখে রেখেছিলাম। এটা শুনে তিনি বললেন হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দিল।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, হযরত আদম (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি কি আমাকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেননি এবং স্বীয় রূহ কি আমার মধ্যে ফুকে দেননি? আপনি কি আমার হাঁচির উপর (আরবি) বলেননি? আপনার দয়া কি আপনার ক্রোধের উপর প্রাধান্য লাভ করেনি? আমার সৃষ্টির পূর্বেই কি এই ভুল আমার ভাগ্যে লিপিবদ্ধ করেননি? উত্তর হলোঃ হ, এ সব কিছুই করেছি।' তখন বললেনঃ “তা হলে হে আমার প্রভু! আমার তওবা কবূল হওয়ার পর পুনরায় আমি জান্নাত পেতে পারি কি? উত্তর হলোঃ হাঁ।' এটাই ঐকথাগুলো যা হযরত আদম (আঃ) আল্লাহর নিকট শিখেছিলেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের আর একটি মারফু হাদীসে আছে যে, হযরত আদম (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি যদি এ পাপ হতে ফিরে যাই তবে কি পুনরায় বেহেশতে যেতে পারব? উত্তর হলোঃ হ’। আল্লাহ্ নিকট হতে কথাগুলো শিক্ষা করার এটাই অর্থ। কিন্তু এ হাদীসটি গরীব হওয়ার সাথে সাথে মুনকাতিও বটে। কোন কোন মুরুব্বী হতে বর্ণিত আছে যে, কথাগুলো নিম্নরূপঃ হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই, আপনি পবিত্র, আমি আপনার প্রশংসা করছি, হে আমার প্রভু! নিশ্চয় আমি আমার আত্মার উপর জুলুম করেছি, সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, নিশ্চয় আপনি উত্তম ক্ষমাশীল। হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া অন্য কেউ মাবুদ নেই, আমি আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি এবং প্রশংসা করছি, হে আমার প্রভু! নিশ্চয় আমি আমার আত্মার উপর অত্যাচার করেছি, সুতরাং আপনি আমার প্রতি দয়া প্রদর্শন। করুন, নিশ্চয়ই আপনি উত্তম দয়ালু। হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই, আমি আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং প্রশংসা করছি, হে আমার প্রভু! নিশ্চয় আমি আমার নাসের উপর জুলুম করেছি, সুতরাং আপনি আমার তাওবা কবুল করুন, নিশ্চয় আপনি তাওবা কবূলকারী ও পরম দয়ালু। কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছেঃ “এই লোকেরা কি জানেনা যে, আল্লাহ। তা'আলা তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন?” অন্যত্র রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি কোন খারাপ কাজ করে বা স্বীয় আত্মার উপর অত্যাচার করে বসে, অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে দেখে নেবে যে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন এবং তাকে স্বীয় করুণার মধ্যে নিয়ে নিবেন। আর এক জায়গায় আছেঃ “যে ব্যক্তি তাওবা করে এবং ভাল কাজ করে .....।' এসব আয়াতে বর্ণনা আছে যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন। ঐ রকমই এখানেও রয়েছে যে, সেই আল্লাহ তাওবাকারীদের তাওবা ককূলকারী এবং অত্যন্ত দয়ালু। আল্লাহ তা'আলার করুণা ও দয়া এত সাধারণ যে, তিনি তাঁর পাপী বান্দাদেরকেও স্বীয় রহমতের দরজা হতে ফিরিয়ে দেন না। সত্যই তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি বান্দাদের অনুতাপ গ্রহণকারী এবং পরম দয়ালু।
আল-বাকারা 2:38
৩৮-৩৯ নং আয়াতের তাফসীরজগতের চিত্রজান্নাত হতে বের করার সময় হযরত আদম (আঃ), হযরত হাওয়া (আঃ) ও ইবলীসকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছিল তারই বর্ণনা হচ্ছে যে, জগতে কিতাবাদি ও নবী রাসূলগণকে পাঠান হবে, অলৌকিক ঘটনাবলী প্রকাশ করা হবে, দলীল প্রমাণাদি বর্ণিত হবে, সত্যপথ প্রকাশ করে দেয়া হবে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কেও পাঠান হবে এবং তার প্রতি কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ করা হবে। অতঃপর, যারা আপন আপন যুগের নবী ও কিতাবের অনুসরণ করবে, পরকালে তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং দুনিয়া হাত ছাড়া হওয়ার কারণে তারা কোন চিন্তাও করবে না। সুরা-ই-ত-হা’র মধ্যে এটাই বলা হয়েছেঃ “আমার হিদায়াতের অনুসারীরা পথভ্রষ্ট হবে না। এবং হতভাগ্য হবে না, আর আমার স্মরণ হতে মুখ প্রত্যাবর্তনকারী দুনিয়ার সংকীর্ণতায় এবং আখেরাতের অপমানজনক শাস্তিতে গ্রেফতার হবে।”এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, অস্বীকারকারী ও মিথ্যা পতিপন্নকারীরা জাহান্নামের মধ্যে চিরদিন অবস্থান করবে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যারা মূল দোযখী তাদের মরণও হবে না বা তারা ভাল জীবনও লাভ করবে না। তবে হাঁ, যেসব একত্ববাদী ও সুন্নাতের অনুসারীকে কিছু পাপের জন্যে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে, তারা পুড়ে কয়লা হয়ে মরে যাবে। পুনরায় তাদেরকে সুপারিশের মাধ্যমে বের করা হবে। সহীহ মুসলিম শরীফেও এই হাদীসটি আছে। দ্বিতীয়বার যে জান্নাত হতে বের হওয়ার হুকুম বর্ণিত হয়েছে ঐ ব্যাপারে কতক লোক বলেনঃ “এটা এজন্যেই যে, এখানে অন্যান্য আহকাম বৰ্ণনা করার ছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, প্রথমবার বেহেশত হতে প্রথম আকাশে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং দ্বিতীয়ার প্রথম আকাশ হতে পৃথিবীতে নামান হয়েছিল। কিন্তু প্রথমটিই সঠিক কথা। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-বাকারা 2:39
৩৮-৩৯ নং আয়াতের তাফসীরজগতের চিত্রজান্নাত হতে বের করার সময় হযরত আদম (আঃ), হযরত হাওয়া (আঃ) ও ইবলীসকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছিল তারই বর্ণনা হচ্ছে যে, জগতে কিতাবাদি ও নবী রাসূলগণকে পাঠান হবে, অলৌকিক ঘটনাবলী প্রকাশ করা হবে, দলীল প্রমাণাদি বর্ণিত হবে, সত্যপথ প্রকাশ করে দেয়া হবে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কেও পাঠান হবে এবং তার প্রতি কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ করা হবে। অতঃপর, যারা আপন আপন যুগের নবী ও কিতাবের অনুসরণ করবে, পরকালে তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং দুনিয়া হাত ছাড়া হওয়ার কারণে তারা কোন চিন্তাও করবে না। সুরা-ই-ত-হা’র মধ্যে এটাই বলা হয়েছেঃ “আমার হিদায়াতের অনুসারীরা পথভ্রষ্ট হবে না। এবং হতভাগ্য হবে না, আর আমার স্মরণ হতে মুখ প্রত্যাবর্তনকারী দুনিয়ার সংকীর্ণতায় এবং আখেরাতের অপমানজনক শাস্তিতে গ্রেফতার হবে।”এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, অস্বীকারকারী ও মিথ্যা পতিপন্নকারীরা জাহান্নামের মধ্যে চিরদিন অবস্থান করবে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যারা মূল দোযখী তাদের মরণও হবে না বা তারা ভাল জীবনও লাভ করবে না। তবে হাঁ, যেসব একত্ববাদী ও সুন্নাতের অনুসারীকে কিছু পাপের জন্যে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে, তারা পুড়ে কয়লা হয়ে মরে যাবে। পুনরায় তাদেরকে সুপারিশের মাধ্যমে বের করা হবে। সহীহ মুসলিম শরীফেও এই হাদীসটি আছে। দ্বিতীয়বার যে জান্নাত হতে বের হওয়ার হুকুম বর্ণিত হয়েছে ঐ ব্যাপারে কতক লোক বলেনঃ “এটা এজন্যেই যে, এখানে অন্যান্য আহকাম বৰ্ণনা করার ছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, প্রথমবার বেহেশত হতে প্রথম আকাশে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং দ্বিতীয়ার প্রথম আকাশ হতে পৃথিবীতে নামান হয়েছিল। কিন্তু প্রথমটিই সঠিক কথা। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-বাকারা 2:40
৪০-৪১ নং আয়াতের তাফসীরবানী ইসরাঈলকে ইসলামের আমন্ত্রণউল্লিখিত আয়াত দুটিতে বানী ইসরাঈলকে ইসলাম গ্রহণের ও মুহাম্মদ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। কি সুন্দর রীতিতে তাদেরকে বুঝানো হচ্ছে যে, তোমরা এক নবীরই সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত এবং তোমাদের হাতে আল্লাহর কিতাব বিদ্যমান রয়েছে, আর কুরআন কারীম এর সত্যতা স্বীকার করছে। সুতরাং তোমাদের জন্যে এটা মোটেই উচিত নয় যে, তোমরাই সর্বপ্রথম অস্বীকারকারী হয়ে যাবে। হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর নাম ছিল ইসরাঈল (আঃ)। তাহলে যেন তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, তোমরা আমার সৎ ও অনুগত বান্দারই সন্তান। সুতরাং তোমাদের সম্মানিত পূর্বপুরুষের মত তোমাদেরও সত্যর অনুসরণ করা উচিত। যেমন বলা হয়ে থাকে যে, তুমি দানশীলের ছেলে, সুতরাং তুমি দানশীলতায় অগ্রগামী হয়ে যাও। তুমি বীরের পুত্র, সুতরাং বীরত্ব প্রদর্শন কর। তুমি বিদ্বানের ছেলে, সুতরাং বিদ্যায় পূর্ণতা লাভ কর।অন্য স্থানে এ রচনা রীতি এভাবে এসেছেঃ “আমার কৃতজ্ঞ বান্দা হযরত নূহ (আঃ)-এর সঙ্গে যাদেরকে বিশ্বব্যাপী তুফান হতে রক্ষা করেছিলাম, এরা তাদেরই সন্তান। একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইয়াহূদীদের একটি দলকে জিজ্ঞেস করেনঃ হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর নাম যে ইসরাঈল ছিল তা কি তোমরা জান না?' তারা সবাই শপথ করে বলেঃ‘আল্লাহর শপথ! এটা সত্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহ্! আপনি সাক্ষী থাকুন। ‘ইসরাঈল’-এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে আল্লাহর বান্দা। তাদেরকে ঐ সব অনুগ্রহের কথা স্মরণ করানো হচ্ছে যা ব্যাপক ক্ষমতার বড় বড় নিদর্শন ছিল। যেমন পাথর হতে নদী প্রবাহিত করা, মান্না’ ও ‘সালওয়া' অবতরণ করা, ফিরআউনের দলবল হতে রক্ষা করা, তাদের মধ্যে হতেই নবী রাসূল প্রেরণ করা, তাদেরকে সাম্রাজ্য ও রাজতু দান করা ইত্যাদি।আমার অঙ্গীকার পুরো কর, অর্থাৎ তোমাদের কাছে যে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, যখন মুহাম্মদ (সঃ) আগমন করবেন এবং তার উপর আমার কিতাব অবতীর্ণ হবে তখন তোমরা তার উপর ও কিতাবের উপর ঈমান আনবে। তিনি তোমাদের বোঝা হালকা করবেন, তোমাদের শৃংখল ভেঙ্গে দেবেন এবং গলাবন্ধ দুরে নিক্ষেপ করে দেবেন। আর আমার অঙ্গীকারও পুরো হয়ে যাবে এইভাবে যে, আমি এই ধর্মের কঠিন নির্দেশগুলো যা তোমরা নিজেদের উপরে চাপিয়ে রেখেছো, সরিয়ে দেবো এবং শেষ যুগের নবীর (সঃ) মাধ্যমে একটি সহজ ধর্ম প্রদান করবো। অন্য জায়গায় এর বর্ণনা এভাবে হচ্ছেঃ যদি তোমরা নামায প্রতিষ্ঠিত কর ও যাকাত আদায় কর এবং আমাকে উত্তম ঋণ প্রদান কর তবে আমি তোমাদের অমঙ্গল দূর করে দেবে এবং তোমাদেরকে প্রবাহমান নদী বিশিষ্ট বেহেশতে প্রবেশ করাবো। এই ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাওরাতে অঙ্গীকার করা হয়েছিলঃ হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে এমন এক বড় মর্যাদা সম্পন্ন রাসূল সৃষ্টি করবো যার অনুসরণ করা সমস্ত সৃষ্টজীবের প্রতি ফরয করে দেবো, এবং দ্বিগুণ প্রতিদান প্রদান করবো।'হযরত ইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সম্পর্কে বড় বড় নবীগণের ভবিষ্যদ্বানী উদ্ধৃত করেছেন। এও বর্ণিত আছে যে, বান্দার অঙ্গীকারের অর্থ হচ্ছে ইসলামকে মান্য করা এবং তার উপর আমল করা। আর আল্লাহর অঙ্গীকার পুরো করার অর্থ হচ্ছে-তাদের প্রতি সস্তৃষ্ট হয়ে তাদেরকে বেহেশত দান করা। আমাকেই ভয় কর এর অর্থ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাঁর বান্দারদেরকে বলছেন যে, তাঁর বান্দাদের তাঁকে ভয় করা উচিত। কেননা, যদি তারা তাঁকে ভয় না করে তবে তাদের উপরও এমন শাস্তি এসে পড়বে যে শাস্তি তাদের পূর্ববর্তীদের উপর এসেছিল। বর্ণনা রীতি কি চমৎকার যে, উৎসাহ প্রদানের পরই ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে। উৎসাহ ও ভয় প্রদর্শন একত্রিত করে সত্য গ্রহণ ও মুহাম্মদ (সঃ)-এর অনুসরণের প্রতি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কুরআন মাজীদ হতে উপদেশ গ্রহণ করতে, তাতে বর্ণিত নির্দেশাবলী পালন করতে এবং নিষিদ্ধ কার্য হতে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এজন্যেই এর পরেই আল্লাহ তাদেরকে বলেছেন যে, তারা যেন সেই কুরআনের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে যা তাদের নিজস্ব কিতাবেরও সত্যতা স্বীকার করে। এটা এনেছেন এমন নবী যিনি নিরক্ষর আরবী, সুসংবাদ প্রদানকারী, ভয় প্রদর্শনকারী, আলোকময় প্রদীপ সদৃশ, যার নাম মুহাম্মদ (সঃ),যিনি তাওরাত ও ইঞ্জীলকে সত্য প্রতিপন্নকারী এবং যিনি সত্যের বিস্তার সাধনকারী। তাওরাত ও ইঞ্জীলেও মুহাম্মদ (সঃ)-এর বর্ণনা ছিল বলে তাঁর আগমনই ছিল তাওরাত ও ইঞ্জীলের সত্যতার প্রমাণ। আর এ জন্যেই তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, তিনি তাদের কিতাবের সত্যতার প্রমাণরূপে আগমন করেছেন। সুতরাং তাদের অবগতি সত্ত্বেও যেন তারা তাঁকে প্রথম অস্বীকার না করে বসে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি কুরআনের দিকে ফিরেছে। কেননা পূর্বে (আরবি) এসেছে। প্রকৃতপক্ষে দু’টি মতই সঠিক। কেননা কুরআনকে মান্য করার অর্থ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মান্য করা এবং রাসূলের (সঃ) সত্যতা স্বীকার করে নেয়া। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে বানী ইসরাঈলের প্রথম কাফির। কারণ কুরায়েশ বংশীয় কাফিরেরাও তো কুফরী ও অস্বীকার করেছিল। কিন্তু বানী ইসরাঈলের কুফরী ছিল আহলে কিতাবের প্রথম দলের কুফরী। এজন্যেই তাদেরকে প্রথম কাফির বলা হয়েছে। তাদের সেই অবগতি ছিল যা অন্যদের ছিল না। আমার আয়াতসমূহের পরিবর্তে তুচ্ছ বিনিময় গ্রহণ করো না। এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, বানী ইসরাঈল যেন আল্লাহর আয়াতসমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁর রাসূলের (সঃ) সত্যতা স্বীকার পরিত্যাগ না করে। এর বিনিময়ে যদি সারা দুনিয়াও তারা পেয়ে যায় তথাপি আখেরাতের তুলনায় এটা অতি তুচ্ছ ও নগণ্য। আর এটা স্বয়ং তাদের কিতাবেও বিদ্যমান আছে।সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে বিদ্যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, তা যদি কেউ দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে শিক্ষা করে তবে সে কিয়ামতের দিন বেহেশতের সুগন্ধি পর্যন্ত পাবে না।' নির্ধারণ না করে ধর্মীয় বিদ্যা শিক্ষা দেয়ার মজুরী নেয়া বৈধ। শিক্ষক যেন স্বচ্ছলভাবে জীবন যাপন করতে পারেন, এবং স্বীয় প্রয়োজনাদি পুরো করতে পারেন তজ্জন্যে বায়তুলমাল হতে গ্রহণ করাও তাঁর জন্যে বৈধ। যদি বায়তুল মাল হতে কিছুই পাওয়া না যায় এবং বিদ্যা শিক্ষা দেয়ার কারণে শিক্ষক অন্য কাজ করারও সুযোগ না পান তবে তার জন্যে বেতন নির্ধারণ করাও বৈধ। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং জমহর উলামার এটাই মাযহাব।সহীহ বুখারী শরীফের ঐ হাদীসটিও এর দলীল যা হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি নির্ধারণ করে মজুরী নিয়েছেন এবং একটি সাপে কাটা রোগীর উপর কুরআন পড়ে ফুক দিয়েছেন। এ ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করা হলে তিনি বলেনঃ যার উপরে তোমরা বিনিময় গ্রহণ করে থাক তার সবচেয়ে বেশী হকদার হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। অন্য একটি সুদীর্ঘ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি স্ত্রীলোকের সঙ্গে একটি পুরুষ লোকের বিয়ে দিয়েছেন এবং তাকে বলেছেনঃ “তোমার সঙ্গে এই নারীর বিয়ে দিলাম এই মোহরের উপরে যে, তোমার যেটুকু কুরআন মাজীদ মুখস্থ আছে তা তুমি তাকে মুখস্থ করিয়ে দেবে।সুনান-ই-আবি দাউদের একটি হাদীসে আছে যে, একটি লোক আহলে সুফফাদের কোন একজনকে কিছু কুরআন মাজীদ শিখিয়েছিলেন। তার বিনিময়ে তিনি তাকে একটি কামান উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছিলেন। লোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এই সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি বলেনঃ “তুমি যদি আগুনের কামান নেয়া পছন্দ কর তবে তা গ্রহণ কর। সুতরাং তিনি তা ছেড়ে দেন। হযরত উবাই বিন কা'ব (রাঃ) হতেও এইরূপই একটি মারফু হাদীস বর্ণিত আছে। এই দু’টি হাদীসের ভাবার্থ এই যে, তিনি যখন একমাত্র আল্লাহর জন্যেই এই নিয়্যাতে শিখিয়েছিলেন, তখন আর তার জন্যে উপটৌকন গ্রহণে স্বীয় পুণ্য নষ্ট করার কি প্রয়োজন? কিন্তু যখন প্রথম হতে বিনিময় গ্রহণের উদ্দেশ্যে শিক্ষা দেয়া হবে তখন নিঃসন্দেহে জায়েয হবে। যেমন উপরের দু'টি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ সবচেয়ে বেশী জানেন।শুধুমাত্র আল্লাহকেই ভয় করার অর্থ এই যে, আল্লাহর রহমতের আশায় তার ইবাদত ও আনুগত্যে লেগে থাকতে হবে এবং তার শাস্তির ভয়ে তার অবাধ্যতা ত্যাগ করতে হবে। এই দু’অবস্থাতেই স্বীয় প্রভুর পক্ষ হতে সে একটি জ্যোতির উপর থাকে। মোটকথা তাদেরকে ভয় দেখানো হচ্ছে যে, তারা যেন দুনিয়ার লোভে তাদের কিতাবে উল্লিখিত নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সত্যতা গোপন না করে এবং দুনিয়ার শাসন ক্ষমতার মোহে পড়ে বিরুদ্ধাচরণ না করে, বরং প্রভুকে ভয় করতঃ সত্যকে প্রকাশ করতে থাকে।
আল-বাকারা 2:41
৪০-৪১ নং আয়াতের তাফসীরবানী ইসরাঈলকে ইসলামের আমন্ত্রণউল্লিখিত আয়াত দুটিতে বানী ইসরাঈলকে ইসলাম গ্রহণের ও মুহাম্মদ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। কি সুন্দর রীতিতে তাদেরকে বুঝানো হচ্ছে যে, তোমরা এক নবীরই সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত এবং তোমাদের হাতে আল্লাহর কিতাব বিদ্যমান রয়েছে, আর কুরআন কারীম এর সত্যতা স্বীকার করছে। সুতরাং তোমাদের জন্যে এটা মোটেই উচিত নয় যে, তোমরাই সর্বপ্রথম অস্বীকারকারী হয়ে যাবে। হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর নাম ছিল ইসরাঈল (আঃ)। তাহলে যেন তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, তোমরা আমার সৎ ও অনুগত বান্দারই সন্তান। সুতরাং তোমাদের সম্মানিত পূর্বপুরুষের মত তোমাদেরও সত্যর অনুসরণ করা উচিত। যেমন বলা হয়ে থাকে যে, তুমি দানশীলের ছেলে, সুতরাং তুমি দানশীলতায় অগ্রগামী হয়ে যাও। তুমি বীরের পুত্র, সুতরাং বীরত্ব প্রদর্শন কর। তুমি বিদ্বানের ছেলে, সুতরাং বিদ্যায় পূর্ণতা লাভ কর।অন্য স্থানে এ রচনা রীতি এভাবে এসেছেঃ “আমার কৃতজ্ঞ বান্দা হযরত নূহ (আঃ)-এর সঙ্গে যাদেরকে বিশ্বব্যাপী তুফান হতে রক্ষা করেছিলাম, এরা তাদেরই সন্তান। একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইয়াহূদীদের একটি দলকে জিজ্ঞেস করেনঃ হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর নাম যে ইসরাঈল ছিল তা কি তোমরা জান না?' তারা সবাই শপথ করে বলেঃ‘আল্লাহর শপথ! এটা সত্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহ্! আপনি সাক্ষী থাকুন। ‘ইসরাঈল’-এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে আল্লাহর বান্দা। তাদেরকে ঐ সব অনুগ্রহের কথা স্মরণ করানো হচ্ছে যা ব্যাপক ক্ষমতার বড় বড় নিদর্শন ছিল। যেমন পাথর হতে নদী প্রবাহিত করা, মান্না’ ও ‘সালওয়া' অবতরণ করা, ফিরআউনের দলবল হতে রক্ষা করা, তাদের মধ্যে হতেই নবী রাসূল প্রেরণ করা, তাদেরকে সাম্রাজ্য ও রাজতু দান করা ইত্যাদি।আমার অঙ্গীকার পুরো কর, অর্থাৎ তোমাদের কাছে যে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, যখন মুহাম্মদ (সঃ) আগমন করবেন এবং তার উপর আমার কিতাব অবতীর্ণ হবে তখন তোমরা তার উপর ও কিতাবের উপর ঈমান আনবে। তিনি তোমাদের বোঝা হালকা করবেন, তোমাদের শৃংখল ভেঙ্গে দেবেন এবং গলাবন্ধ দুরে নিক্ষেপ করে দেবেন। আর আমার অঙ্গীকারও পুরো হয়ে যাবে এইভাবে যে, আমি এই ধর্মের কঠিন নির্দেশগুলো যা তোমরা নিজেদের উপরে চাপিয়ে রেখেছো, সরিয়ে দেবো এবং শেষ যুগের নবীর (সঃ) মাধ্যমে একটি সহজ ধর্ম প্রদান করবো। অন্য জায়গায় এর বর্ণনা এভাবে হচ্ছেঃ যদি তোমরা নামায প্রতিষ্ঠিত কর ও যাকাত আদায় কর এবং আমাকে উত্তম ঋণ প্রদান কর তবে আমি তোমাদের অমঙ্গল দূর করে দেবে এবং তোমাদেরকে প্রবাহমান নদী বিশিষ্ট বেহেশতে প্রবেশ করাবো। এই ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাওরাতে অঙ্গীকার করা হয়েছিলঃ হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে এমন এক বড় মর্যাদা সম্পন্ন রাসূল সৃষ্টি করবো যার অনুসরণ করা সমস্ত সৃষ্টজীবের প্রতি ফরয করে দেবো, এবং দ্বিগুণ প্রতিদান প্রদান করবো।'হযরত ইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সম্পর্কে বড় বড় নবীগণের ভবিষ্যদ্বানী উদ্ধৃত করেছেন। এও বর্ণিত আছে যে, বান্দার অঙ্গীকারের অর্থ হচ্ছে ইসলামকে মান্য করা এবং তার উপর আমল করা। আর আল্লাহর অঙ্গীকার পুরো করার অর্থ হচ্ছে-তাদের প্রতি সস্তৃষ্ট হয়ে তাদেরকে বেহেশত দান করা। আমাকেই ভয় কর এর অর্থ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাঁর বান্দারদেরকে বলছেন যে, তাঁর বান্দাদের তাঁকে ভয় করা উচিত। কেননা, যদি তারা তাঁকে ভয় না করে তবে তাদের উপরও এমন শাস্তি এসে পড়বে যে শাস্তি তাদের পূর্ববর্তীদের উপর এসেছিল। বর্ণনা রীতি কি চমৎকার যে, উৎসাহ প্রদানের পরই ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে। উৎসাহ ও ভয় প্রদর্শন একত্রিত করে সত্য গ্রহণ ও মুহাম্মদ (সঃ)-এর অনুসরণের প্রতি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কুরআন মাজীদ হতে উপদেশ গ্রহণ করতে, তাতে বর্ণিত নির্দেশাবলী পালন করতে এবং নিষিদ্ধ কার্য হতে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এজন্যেই এর পরেই আল্লাহ তাদেরকে বলেছেন যে, তারা যেন সেই কুরআনের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে যা তাদের নিজস্ব কিতাবেরও সত্যতা স্বীকার করে। এটা এনেছেন এমন নবী যিনি নিরক্ষর আরবী, সুসংবাদ প্রদানকারী, ভয় প্রদর্শনকারী, আলোকময় প্রদীপ সদৃশ, যার নাম মুহাম্মদ (সঃ),যিনি তাওরাত ও ইঞ্জীলকে সত্য প্রতিপন্নকারী এবং যিনি সত্যের বিস্তার সাধনকারী। তাওরাত ও ইঞ্জীলেও মুহাম্মদ (সঃ)-এর বর্ণনা ছিল বলে তাঁর আগমনই ছিল তাওরাত ও ইঞ্জীলের সত্যতার প্রমাণ। আর এ জন্যেই তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, তিনি তাদের কিতাবের সত্যতার প্রমাণরূপে আগমন করেছেন। সুতরাং তাদের অবগতি সত্ত্বেও যেন তারা তাঁকে প্রথম অস্বীকার না করে বসে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি কুরআনের দিকে ফিরেছে। কেননা পূর্বে (আরবি) এসেছে। প্রকৃতপক্ষে দু’টি মতই সঠিক। কেননা কুরআনকে মান্য করার অর্থ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মান্য করা এবং রাসূলের (সঃ) সত্যতা স্বীকার করে নেয়া। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে বানী ইসরাঈলের প্রথম কাফির। কারণ কুরায়েশ বংশীয় কাফিরেরাও তো কুফরী ও অস্বীকার করেছিল। কিন্তু বানী ইসরাঈলের কুফরী ছিল আহলে কিতাবের প্রথম দলের কুফরী। এজন্যেই তাদেরকে প্রথম কাফির বলা হয়েছে। তাদের সেই অবগতি ছিল যা অন্যদের ছিল না। আমার আয়াতসমূহের পরিবর্তে তুচ্ছ বিনিময় গ্রহণ করো না। এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, বানী ইসরাঈল যেন আল্লাহর আয়াতসমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁর রাসূলের (সঃ) সত্যতা স্বীকার পরিত্যাগ না করে। এর বিনিময়ে যদি সারা দুনিয়াও তারা পেয়ে যায় তথাপি আখেরাতের তুলনায় এটা অতি তুচ্ছ ও নগণ্য। আর এটা স্বয়ং তাদের কিতাবেও বিদ্যমান আছে।সুনান-ই-আবি দাউদের মধ্যে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে বিদ্যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, তা যদি কেউ দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে শিক্ষা করে তবে সে কিয়ামতের দিন বেহেশতের সুগন্ধি পর্যন্ত পাবে না।' নির্ধারণ না করে ধর্মীয় বিদ্যা শিক্ষা দেয়ার মজুরী নেয়া বৈধ। শিক্ষক যেন স্বচ্ছলভাবে জীবন যাপন করতে পারেন, এবং স্বীয় প্রয়োজনাদি পুরো করতে পারেন তজ্জন্যে বায়তুলমাল হতে গ্রহণ করাও তাঁর জন্যে বৈধ। যদি বায়তুল মাল হতে কিছুই পাওয়া না যায় এবং বিদ্যা শিক্ষা দেয়ার কারণে শিক্ষক অন্য কাজ করারও সুযোগ না পান তবে তার জন্যে বেতন নির্ধারণ করাও বৈধ। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং জমহর উলামার এটাই মাযহাব।সহীহ বুখারী শরীফের ঐ হাদীসটিও এর দলীল যা হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি নির্ধারণ করে মজুরী নিয়েছেন এবং একটি সাপে কাটা রোগীর উপর কুরআন পড়ে ফুক দিয়েছেন। এ ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করা হলে তিনি বলেনঃ যার উপরে তোমরা বিনিময় গ্রহণ করে থাক তার সবচেয়ে বেশী হকদার হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। অন্য একটি সুদীর্ঘ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি স্ত্রীলোকের সঙ্গে একটি পুরুষ লোকের বিয়ে দিয়েছেন এবং তাকে বলেছেনঃ “তোমার সঙ্গে এই নারীর বিয়ে দিলাম এই মোহরের উপরে যে, তোমার যেটুকু কুরআন মাজীদ মুখস্থ আছে তা তুমি তাকে মুখস্থ করিয়ে দেবে।সুনান-ই-আবি দাউদের একটি হাদীসে আছে যে, একটি লোক আহলে সুফফাদের কোন একজনকে কিছু কুরআন মাজীদ শিখিয়েছিলেন। তার বিনিময়ে তিনি তাকে একটি কামান উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছিলেন। লোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এই সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি বলেনঃ “তুমি যদি আগুনের কামান নেয়া পছন্দ কর তবে তা গ্রহণ কর। সুতরাং তিনি তা ছেড়ে দেন। হযরত উবাই বিন কা'ব (রাঃ) হতেও এইরূপই একটি মারফু হাদীস বর্ণিত আছে। এই দু’টি হাদীসের ভাবার্থ এই যে, তিনি যখন একমাত্র আল্লাহর জন্যেই এই নিয়্যাতে শিখিয়েছিলেন, তখন আর তার জন্যে উপটৌকন গ্রহণে স্বীয় পুণ্য নষ্ট করার কি প্রয়োজন? কিন্তু যখন প্রথম হতে বিনিময় গ্রহণের উদ্দেশ্যে শিক্ষা দেয়া হবে তখন নিঃসন্দেহে জায়েয হবে। যেমন উপরের দু'টি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ সবচেয়ে বেশী জানেন।শুধুমাত্র আল্লাহকেই ভয় করার অর্থ এই যে, আল্লাহর রহমতের আশায় তার ইবাদত ও আনুগত্যে লেগে থাকতে হবে এবং তার শাস্তির ভয়ে তার অবাধ্যতা ত্যাগ করতে হবে। এই দু’অবস্থাতেই স্বীয় প্রভুর পক্ষ হতে সে একটি জ্যোতির উপর থাকে। মোটকথা তাদেরকে ভয় দেখানো হচ্ছে যে, তারা যেন দুনিয়ার লোভে তাদের কিতাবে উল্লিখিত নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সত্যতা গোপন না করে এবং দুনিয়ার শাসন ক্ষমতার মোহে পড়ে বিরুদ্ধাচরণ না করে, বরং প্রভুকে ভয় করতঃ সত্যকে প্রকাশ করতে থাকে।
আল-বাকারা 2:42
৪২-৪৩ নং আয়াতের তাফসীরতিরস্কারঃইয়াহূদীদেরকে এ বদ অভ্যাসের জন্যে তিরস্কার করা হচ্ছে যে, তারা জানা সত্ত্বেও কখনও তো সত্য ও মিথ্যাকে মিশ্রিত করতো, আবার কখনও সত্যকে গোপন করতো এবং মিথ্যাকে প্রকাশ করতো। তাদেরকে এ কুঅভ্যাস ত্যাগ করতে বলা হচ্ছে এবং উপদেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন সত্যকে প্রকাশ করে ও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে। আর তারা যেন ন্যায় ও অন্যায়, সত্য ও মিথ্যাকে মিশ্রিত না করে, আল্লাহর বান্দাদের মঙ্গল কামনা করে, ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের বিদ'আতকে ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে মিশ্রিত না করে। আর তারা তাদের কিতাবে মুহাম্মদ (সঃ) সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী পাচ্ছে তা যে সর্বসাধারণের মধ্যে প্রকাশ করতে কার্পণ্য না করে।(আরবি) শব্দটি জযম বিশিষ্ট ও যবর বিশিষ্ট দুই-ই হতে পারে। অর্থাৎ এটা ওটার মধ্যে একত্রিত করো না। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) পঠন (আরবি) ও আছে। তখন এটা (আরবি) হবে এবং পরের বাক্যটিও (আরবি) হবে। তখন অর্থ হবে এইঃ সত্যকে সত্য জেনে এ রকম নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজ করো না এবং অর্থ এও হবেঃ এই গোপন করা ও মিশ্রিত করার শাস্তি যে কি হতে পারে তা জানা সত্তেও তোমরা এই পাপের কাজ করতে রয়েছে!’ অতঃপর তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে নামায পড়ে, তাঁকে যাকাত প্রদান করে, তার উম্মতের সাথে রুকু ও সিজদায় অংশগ্রহণ করতে থাকে, তাদের সাথে মিলেমিশে থাকে এবং তারা নিজেরাও যেন তাঁরই উম্মত হয়ে যায়। আনুগত্য ও অন্তরঙ্গতাকেও যাকাত বলা হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে এটাই বলেছেন। দু'শ ও ততোধিক দিরহামের উপর যাকাত ওয়াজিব হয়ে থাকে। নামায ও যাকাত ফরয ও ওয়াজিব। এ দু'টো ছাড়া আমল ব্যর্থ হয়ে যায়। কেউ কেউ যাকাতের অর্থ ফিত্রাও নিয়েছেন। রুকুকারীদের সাথে রুকু কর, এর অর্থ এই যে, তারা যেন ভাল কাজে মুমিনদের সাথে অংশগ্রহণ করে। আর ঐ কাজগুলোর মধ্যে নামাযই হলো সর্বোত্তম। এ আয়াত দ্বারা অধিকাংশ ‘আলিম জামা'আতের সাথে নামায ফরয হওয়ার দলীল গ্রহণ করেছেন। এখানে ইমাম কুরতবী (রঃ) জামা'আত সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
আল-বাকারা 2:43
৪২-৪৩ নং আয়াতের তাফসীরতিরস্কারঃইয়াহূদীদেরকে এ বদ অভ্যাসের জন্যে তিরস্কার করা হচ্ছে যে, তারা জানা সত্ত্বেও কখনও তো সত্য ও মিথ্যাকে মিশ্রিত করতো, আবার কখনও সত্যকে গোপন করতো এবং মিথ্যাকে প্রকাশ করতো। তাদেরকে এ কুঅভ্যাস ত্যাগ করতে বলা হচ্ছে এবং উপদেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন সত্যকে প্রকাশ করে ও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে। আর তারা যেন ন্যায় ও অন্যায়, সত্য ও মিথ্যাকে মিশ্রিত না করে, আল্লাহর বান্দাদের মঙ্গল কামনা করে, ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের বিদ'আতকে ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে মিশ্রিত না করে। আর তারা তাদের কিতাবে মুহাম্মদ (সঃ) সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী পাচ্ছে তা যে সর্বসাধারণের মধ্যে প্রকাশ করতে কার্পণ্য না করে।(আরবি) শব্দটি জযম বিশিষ্ট ও যবর বিশিষ্ট দুই-ই হতে পারে। অর্থাৎ এটা ওটার মধ্যে একত্রিত করো না। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) পঠন (আরবি) ও আছে। তখন এটা (আরবি) হবে এবং পরের বাক্যটিও (আরবি) হবে। তখন অর্থ হবে এইঃ সত্যকে সত্য জেনে এ রকম নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজ করো না এবং অর্থ এও হবেঃ এই গোপন করা ও মিশ্রিত করার শাস্তি যে কি হতে পারে তা জানা সত্তেও তোমরা এই পাপের কাজ করতে রয়েছে!’ অতঃপর তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে নামায পড়ে, তাঁকে যাকাত প্রদান করে, তার উম্মতের সাথে রুকু ও সিজদায় অংশগ্রহণ করতে থাকে, তাদের সাথে মিলেমিশে থাকে এবং তারা নিজেরাও যেন তাঁরই উম্মত হয়ে যায়। আনুগত্য ও অন্তরঙ্গতাকেও যাকাত বলা হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে এটাই বলেছেন। দু'শ ও ততোধিক দিরহামের উপর যাকাত ওয়াজিব হয়ে থাকে। নামায ও যাকাত ফরয ও ওয়াজিব। এ দু'টো ছাড়া আমল ব্যর্থ হয়ে যায়। কেউ কেউ যাকাতের অর্থ ফিত্রাও নিয়েছেন। রুকুকারীদের সাথে রুকু কর, এর অর্থ এই যে, তারা যেন ভাল কাজে মুমিনদের সাথে অংশগ্রহণ করে। আর ঐ কাজগুলোর মধ্যে নামাযই হলো সর্বোত্তম। এ আয়াত দ্বারা অধিকাংশ ‘আলিম জামা'আতের সাথে নামায ফরয হওয়ার দলীল গ্রহণ করেছেন। এখানে ইমাম কুরতবী (রঃ) জামা'আত সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
আল-বাকারা 2:44
উপদেশঃ অর্থাৎ কিতাবীদেরকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে যে, যারা অন্যকে ভাল কাজের আদেশ করে থাকে-অথচ নিজেরা তা পালন করে না। তাদের জন্যে কঠিন শাস্তি রয়েছে-এটা জানা সত্ত্বেও যে কিতাবীরা এ কাজ করছে এটা বড়ই বিস্ময়জনক ব্যাপারই বটে। তাই তাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা অপরকে যেমন খোদাভীতি ও পবিত্রতার কথা শিক্ষা দিচ্ছে, তাদের নিজেদেরও তার উপর আমল করা উচিত। অপরকে নামায রোযার নির্দেশ দেয়া আর নিজে পালন না করা বড়ই লজ্জার কথা। জনগণকে বলার পূর্বে মানুষের উচিত নিজে আমলকারী হওয়া। অর্থ এও হচ্ছে যে, তারা অন্যদেরকে তো তাদের কিতাবকে অস্বীকার করতে নিষেধ করছে অথচ আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সঃ) কে অস্বীকার করে নিজেরাই তাদের কিতাবকে অস্বীকার করছে। ভাবার্থ এও হতে পারে যে, তারা অন্যদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বলছে, অথচ ইহলৌকিক ভয়ের কারণে তারা নিজেরাই ইসলাম কবুল করছে না।হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন যে, মানুষ পূর্ণ জ্ঞানী হতে পারে না যে পর্যন্ত না সে ঐসব লোকের শত্রু হয়ে যায় যারা আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করে থাকে এবং যে পর্যন্ত না সে স্বীয় নাফসের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে যায়। ঐসব ইয়াহুদী ঘুষ পেলে অসত্যকেও সত্য বলে দিতো, কিন্তু নিজেরা ওর উপর আমল করতো না। এ কারণেই আল্লাহ তাদের নিন্দে করেছেন।একটি সূক্ষ্ম পার্থক্যএখানে এটা স্মরণ রাখতে হবে যে, ভাল কাজের নির্দেশ দেয়ার জন্যে তাদেরকে তিরস্কার করা হয়নি, বরং তারা নিজেরা পালন না করার জন্যে তিরস্কৃত হয়েছে। ভাল কথা বলা তো ভালই, বরং এটা তো ওয়াজিব, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মানুষের নিজেরও তার প্রতি আমল করা উচিত। যেমন হযরত শুআইব (আঃ) বলেছেনঃ ‘আমি এরূপ নই যে, তোমাদেরকে বিরত রাখি আর নিজে করি, আমার উদ্দেশ্য তো হচ্ছে সাধ্যানুসারে সংস্কার সাধন, এবং আমার শক্তি তো আল্লাহর সাহায্যের উপর নির্ভরশীল, আমি তার উপরই ভরসা করি এবং তার দিকেই প্রত্যাবর্তন করি।' সুতরাং ভাল কাজ করতে বলা ওয়াজিব এবং নিজে করাও ওয়াজিব। একটি না করলে অন্যটিও ব্যর্থ হয়ে যাবে তা নয়। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আলেমদের মত এটাই। যদিও কতকগুলো লোকের মত এই যে, যারা নিজেরা খারাপ কাজ করে তারা যেন অপরকে ভাল কাজের কথা না বলে। কিন্তু এটা সঠিক কথা নয়। আবার এসব লোকের এ আয়াতকে দলীল রূপে পেশ করা মোটেই ঠিক নয়। বরং সঠিক কথা এটাই যে, ভাল কাজের নির্দেশ দেবে এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখবে এবং নিজেও পালন করবে ও বিরত থাকবে। যদি দু'টোই ছেড়ে দেয় তবে দ্বিগুণ পাপী হবে এবং একটি ছাড়লে একগুণ পাপী হবে।আমলহীন উপদেশ দাতার শাস্তিতিরানী (রঃ)-এর মু'জিম কাবীর’-এ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘যে আলেম জনগণকে ভাল কথা শিক্ষা দেয় কিন্তু নিজে আমল করে না তার দৃষ্টান্ত ঐ প্রদীপের মত যে লোক তার আলো দ্বারা উপকার লাভ করে কিন্তু তা নিজে পুড়ে থাকে। এ হাদীসটি গরীব বা দুর্বল।মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মিরাজের রাত্রে আমি দেখেছি যে, কতকগুলো লোকের ওষ্ঠ আগুনের কাঁচি দ্বারা কাটা হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, এরা কারা? তখন আমাকে বলা হলো যে, এরা আপনার উম্মতের বক্তা, উপদেশ দাতা ও আলেম। এরা মানুষকে ভাল কথা শিক্ষা দিতো কিন্তু নিজে আমল করতো না, জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বুঝতো না। অন্য হাদীসে আছে যে, তাদের জিহ্বা ও ওষ্ঠ উভয়ই কাটা হচ্ছিল। হাদীসটি বিশুদ্ধ।ইবনে হিব্বান (রঃ), ইবনে আবি হাতিম, ইবনে মিরদুওয়াই প্রভৃতি মনীষীদের লিখিত কিতাবের মধ্যে এটা বিদ্যমান আছে। আবু অল (রঃ) বলেন যে, একদা হযরত উসামা (রাঃ) কে বলা হয়ঃ আপনি হযরত উসমান (রাঃ) কে কিছু বলেন না? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আপনাদেরকে শুনিয়ে বললেই কি শুধু বলা হবে? আমি তো গোপনে তাকে সব সময়েই বলে আসছি। কিন্তু আমি কোন কাজ ছড়াতে চাইনে। আল্লাহর শপথ! আমি কোন লোককে সর্বোত্তম বলবো না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন একটি লোককে আনা হবে এবং তাকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে। তার নাড়ীভূড়ি বেরিয়ে আসবে এবং সে তার চারদিকে ঘুরতে থাকবে। অন্যান্য দোযখবাসীরা তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ জনাব আপনি তো আমাদেরকে ভাল কাজের আদেশ করতেন এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করতেন, আপনার এ অবস্থা কেন?' সে বলবেঃ ‘আফসোস! আমি তোমাদেরকে বলতাম কিন্তু নিজে আমল করতাম না। আমি তোমাদেরকে বিরত রাখতাম কিন্তু নিজে বিরত থাকতাম না। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যেও এ বর্ণনাটি আছে।মুসনাদের আরো একটি হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা অশিক্ষিতদেরকে যত ক্ষমা করবেন তত ক্ষমা তিনি শিক্ষিতদেরকে করবেন না। কোন কোন হাদীসে এটাও আছে যে, আলেমকে যদি একবার ক্ষমা করা হয় তবে সাধারণ লোককে সত্তর বার ক্ষমা করা হবে। বিদ্ধান ও মূর্খ এক হতে পারে না। কুরআন মাজীদে আছেঃ যারা জানে ও যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে? উপদেশ তো জ্ঞানীরাই গ্রহণ করে থাকে। ইবনে আসাকীরের কিতাবের মধ্যে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জান্নাতবাসীরা জাহান্নামবাসীরদেরকে দেখে বলবে-“আপনাদের উপদেশ শুনেই তো আমরা জান্নাতবাসী হয়েছি, আপনারা জাহান্নামে এসে পড়েছেন কেন? তারা বলবে-আফসোস! আমরা তোমাদেরকে বলতাম বটে, কিন্তু নিজেরা আমল করতাম না। একটি ঘটনাহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে এক ব্যক্তি বলেনঃ জনাব! আমি ভাল কাজের হুকুম করতে ও মন্দ কাজ হতে জনগণকে বিরত রাখতে চাই।' তিনি বললেনঃ তুমি কি এ ধাপ পর্যন্ত পৌছে গেছো?' লোকটি বলেঃ ‘হ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘এক স্থানে তো আল্লাহ পাক বলেছেন-'তোমরা জনগণকে ভাল কাজের আদেশ করছো আর নিজেদের সম্বন্ধে বেখবর রয়েছে।' অন্যত্র বলেছেন- তোমরা কেন বলছো যা নিজেরা কর না? আল্লাহর নিকট এটা খুব অসন্তুষ্টির কারণ যে, তোমরা বলবে যা নিজেরা করবে না। অন্য আয়াতে হযরত শুআইব (আঃ)-এর কথাঃ যে কাজ হতে আমি তোমাদেরকে বিরত রাখি তাতে আমি তোমাদের বিরুদ্ধাচরণ করতে চাইনে, আমার উদ্দেশ্য শুধু সাধ্যানুসারে সংস্কার সাধন। আচ্ছা বলতো-তুমি কি এই তিনটি আয়াত হতে নির্ভয়ে রয়েছে?' সে বলেঃ না।' তিনি বলেনঃ তুমি স্বীয় না হতেই আরম্ভ কর (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই)। তিবরানীর একটি দুর্বল হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন :“যে জনগণকে কোন কথা বা কাজের দিকে আহ্বান করে এবং নিজে করে না, সে আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে অবস্থান করে যে পর্যন্ত না সে নিজে তার আমলে লেগে যায়। হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনাকৃত তিনটি আয়াতকে সামনে রেখে বলেনঃ “এরই কারণে আমি গল্প বলা পছন্দ করি না।'
আল-বাকারা 2:45
৪৫-৪৬ নং আয়াতের তাফসীরএ আয়াতে মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতের কাজে ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে।কর্তব্য পালন করতে এবং নামায পড়তে বলা হয়েছে। রোযা রাখাও হচ্ছে ধৈর্য ধারণ করা। এ জন্যেই রমযান মাসকে ধৈর্যের মাস বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “রোযা অর্ধেক ধৈর্য। ধৈর্যের ভাবার্থ পাপের কাজ হতে বিরত থাকাও বটে। এ আয়াতে যদি ধৈর্যের ভাবার্থ এটাই হয়ে থাকে তবে মন্দ কাজ হতে বিরত থাকাও পুণ্যের কাজ করা এ দুটোরই বর্ণনা হয়ে গেছে। পুণ্যের কার্যসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে নামায। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ ধৈর্য দু'প্রকার। (১) বিপদের সময় ধৈর্য, (২) পাপের কাজ হতে বিরত থাকার ব্যাপারে ধৈর্য। দ্বিতীয় ধৈর্য প্রথম ধৈর্য হতে উত্তম।' হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) বলেনঃ প্রত্যেক জিনিস আল্লাহর পক্ষ হতে হয়ে থাকে মানুষের এটা স্বীকার করা, পুণ্য প্রার্থনা করা এবং বিপদের প্রতিদানের ভাণ্ডার আল্লাহর নিকটে আছে এ মনে করার নাম ধৈর্য।' আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে ধৈর্যধারণ করলেও আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করা হয়। পুণ্যের কাজে নামায দ্বারা বিশেষ সাহায্য পাওয়া যায়। স্বয়ং কুরআন মাজীদে ঘোষিত হয়েছেঃ “তোমরা নামায প্রতিষ্ঠিত কর, নিশ্চয় এ নামায সমুদয় নির্লজ্জ ও অশোভনীয় কাজ হতে বিরত রাখে, আর আল্লাহর স্মরণই হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম বস্তু।' হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখনই কোন কঠিন ও চিন্তাযুক্ত কাজের সম্মুখীন হতেন তখনই তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন।খন্দকের যুদ্ধে রাতের বেলায় হযরত হুযাইফা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খেদমতে হাজির হলে তাকে নামাযে দেখতে পান। হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ বদর যুদ্ধের রাত্রে আমরা সবাই শুয়ে গেছি, আর দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা রাত নামাযে রয়েছেন। সকাল পর্যন্ত তিনি নামায ও প্রার্থনায় লেগে রয়েছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে আছে যে, নবী করীম (সঃ) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে দেখতে পান যে, তিনি ক্ষুধার জ্বালায় পেটের ব্যাথায় ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। তিনি ফারসী ভাষায় তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘তোমার পেটে কি ব্যথা আছে?' তিনি বলেনঃ হাঁ।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘উঠো, নামায আরম্ভ কর, এতে রোগমুক্তি রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) সফরে তার ভাই কাসামের (রাঃ) মৃত্যু সংবাদ পেয়ে (আরবি) (২:১৫৬) পাঠ করতঃ পথের এক ধারে সরে গিয়ে উটকে বসিয়ে দেন এবং নামায শুরু করেন। দীর্ঘক্ষণ নামায পড়ার পর সাওয়ারীর নিকট আসেন এবং এই আয়াত দু’টি পড়তে থাকেন। মোটকথা ধৈর্য ও নামায এ দু'টো দ্বারা আল্লাহর করুণা লাভ করা যায়।(আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি কেউ কেউ (আরবি)-এর দিকে ফিরিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর (আরবি) হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ (আরবি) শব্দটি। যেমন কারূণের ঘটনায় (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি এবং মন্দের বিনিময়ে ভাল করার হুকুমে (আরবি) এর (আরবি) সর্বনামটি। ভাবার্থ এই যে, ধৈর্য ও নামায এ দু'টি প্রত্যেকের সাধ্যের মধ্যে নয়। এ অংশ হচ্ছে ঐ দলের জন্যে যারা আল্লাহকে ভয় করে থাকে। অর্থাৎ কুরআনকে মান্যকারী সত্য মুমিন, বিনয়ী, আনুগত্য স্বীকারকারী এবং জান্নাতের অঙ্গীকার ও জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শনের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীরগণই এ বিশেষণে বিশেষিত হবে। যেমন হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেনঃ ‘এটা খুব কঠিন কাজ। কিন্তু যার উপরে আল্লাহর অনুগ্রহ হয় তার জন্যে সহজ। ইবনে জারীর (রঃ) আয়াতটির অর্থ করতে গিয়ে বলেন যে, এটাও ইয়াহুদীদেরকে লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে। কিন্তু স্পষ্ট কথা এই যে, বর্ণনাটি তাদের জন্যে হলেও। আদেশ হিসেবে সাধারণ। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। বিনয়ীগণসামনে এগিয়ে (আরবি)-এর বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে, এখানে ধারণা অর্থ বিশ্বাস, যদিও এটা সন্দেহের অর্থেও এসে থাকে। যেমন (আরবি) শব্দটি অন্ধকারের অর্থেও আসে এবং আলোর অর্থেও আসে। অনুরূপভাবে (আরবি) শব্দটি অভিযোগকারী ও অভিযোগের প্রতিকারকারী উভয়ের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এরকম আরও বহু শব্দ আছে যেগুলো দু'টি বিভিন্ন জিনিসের উপর ব্যবহৃত হয়ে থাকে (আরবি) শব্দটি (আরবি) এ অর্থে ব্যবহার আরব কবিদের কবিতায়ও দেখা যায়। স্বয়ং কুরআন মাজীদেরই অন্য স্থানে আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘পাপীরা জাহান্নাম দেখে বিশ্বাস করে নেবে যে, নিশ্চয় তারা তার মধ্যে পতিত হয়ে যাবে।' (১৮:৫৩) এখানেও (আরবি) শব্দটি (আরবি) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এমন কি হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে এরকম প্রত্যেক জায়গাতে শব্দটি (আরবি)-এর (আরবি) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।আবুল আলিয়াও (রঃ) এখানে (আরবি)-এর অর্থ (আরবি) করে থাকেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), রাবী' বিন আনাস (রঃ) এবং কাতাদারও (রঃ) মত এটাই। ইবনে জুরাইযও (রঃ) এ কথাই বলেন। কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আমার বিশ্বাস ছিল যে, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে (৬৯:২০)।একটি সহীহ হাদীসে আছে যে, কিয়ামতের দিন এক পাপীকে আল্লাহ তা'আলা বলবেন-“আমি কি তোমাকে স্ত্রী ও সন্তানাদি দেইনি? তোমার প্রতি কি নানা প্রকারের অনুগ্রহ করিনি, ঘোড়া ও উটকে কি তোমার অধীনস্থ করিনি? তোমাকে কি শান্তি, আরাম, আহার্য ও পানীয় দেইনি? সে বলবে-হা', হে প্রভু! এ সব কিছুই ছিল, তখন আল্লাহ বলবেন-“তবে তোমার কি এই জ্ঞান ও বিশ্বাস ছিল না যে, তোমাকে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে? সে বলবে-হাঁ, হে প্রভু! এর প্রতি আমার বিশ্বাস ছিল। আল্লাহ বলবেন-“তুমি যেমন আমাকে ভুলে গিয়েছিলে তেমনই আমিও তোমাকে ভুলে গেলাম। এ হাদীসেও (আরবি) এ শব্দটি এসেছে এবং (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর আরও বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ (আরবি) (৫৯:১৯)-এর তাফসীরে আসবে।
আল-বাকারা 2:46
৪৫-৪৬ নং আয়াতের তাফসীরএ আয়াতে মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতের কাজে ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে।কর্তব্য পালন করতে এবং নামায পড়তে বলা হয়েছে। রোযা রাখাও হচ্ছে ধৈর্য ধারণ করা। এ জন্যেই রমযান মাসকে ধৈর্যের মাস বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “রোযা অর্ধেক ধৈর্য। ধৈর্যের ভাবার্থ পাপের কাজ হতে বিরত থাকাও বটে। এ আয়াতে যদি ধৈর্যের ভাবার্থ এটাই হয়ে থাকে তবে মন্দ কাজ হতে বিরত থাকাও পুণ্যের কাজ করা এ দুটোরই বর্ণনা হয়ে গেছে। পুণ্যের কার্যসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে নামায। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ ধৈর্য দু'প্রকার। (১) বিপদের সময় ধৈর্য, (২) পাপের কাজ হতে বিরত থাকার ব্যাপারে ধৈর্য। দ্বিতীয় ধৈর্য প্রথম ধৈর্য হতে উত্তম।' হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) বলেনঃ প্রত্যেক জিনিস আল্লাহর পক্ষ হতে হয়ে থাকে মানুষের এটা স্বীকার করা, পুণ্য প্রার্থনা করা এবং বিপদের প্রতিদানের ভাণ্ডার আল্লাহর নিকটে আছে এ মনে করার নাম ধৈর্য।' আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে ধৈর্যধারণ করলেও আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করা হয়। পুণ্যের কাজে নামায দ্বারা বিশেষ সাহায্য পাওয়া যায়। স্বয়ং কুরআন মাজীদে ঘোষিত হয়েছেঃ “তোমরা নামায প্রতিষ্ঠিত কর, নিশ্চয় এ নামায সমুদয় নির্লজ্জ ও অশোভনীয় কাজ হতে বিরত রাখে, আর আল্লাহর স্মরণই হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম বস্তু।' হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখনই কোন কঠিন ও চিন্তাযুক্ত কাজের সম্মুখীন হতেন তখনই তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন।খন্দকের যুদ্ধে রাতের বেলায় হযরত হুযাইফা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খেদমতে হাজির হলে তাকে নামাযে দেখতে পান। হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ বদর যুদ্ধের রাত্রে আমরা সবাই শুয়ে গেছি, আর দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা রাত নামাযে রয়েছেন। সকাল পর্যন্ত তিনি নামায ও প্রার্থনায় লেগে রয়েছেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে আছে যে, নবী করীম (সঃ) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে দেখতে পান যে, তিনি ক্ষুধার জ্বালায় পেটের ব্যাথায় ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। তিনি ফারসী ভাষায় তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘তোমার পেটে কি ব্যথা আছে?' তিনি বলেনঃ হাঁ।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘উঠো, নামায আরম্ভ কর, এতে রোগমুক্তি রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) সফরে তার ভাই কাসামের (রাঃ) মৃত্যু সংবাদ পেয়ে (আরবি) (২:১৫৬) পাঠ করতঃ পথের এক ধারে সরে গিয়ে উটকে বসিয়ে দেন এবং নামায শুরু করেন। দীর্ঘক্ষণ নামায পড়ার পর সাওয়ারীর নিকট আসেন এবং এই আয়াত দু’টি পড়তে থাকেন। মোটকথা ধৈর্য ও নামায এ দু'টো দ্বারা আল্লাহর করুণা লাভ করা যায়।(আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি কেউ কেউ (আরবি)-এর দিকে ফিরিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর (আরবি) হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ (আরবি) শব্দটি। যেমন কারূণের ঘটনায় (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি এবং মন্দের বিনিময়ে ভাল করার হুকুমে (আরবি) এর (আরবি) সর্বনামটি। ভাবার্থ এই যে, ধৈর্য ও নামায এ দু'টি প্রত্যেকের সাধ্যের মধ্যে নয়। এ অংশ হচ্ছে ঐ দলের জন্যে যারা আল্লাহকে ভয় করে থাকে। অর্থাৎ কুরআনকে মান্যকারী সত্য মুমিন, বিনয়ী, আনুগত্য স্বীকারকারী এবং জান্নাতের অঙ্গীকার ও জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শনের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীরগণই এ বিশেষণে বিশেষিত হবে। যেমন হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেনঃ ‘এটা খুব কঠিন কাজ। কিন্তু যার উপরে আল্লাহর অনুগ্রহ হয় তার জন্যে সহজ। ইবনে জারীর (রঃ) আয়াতটির অর্থ করতে গিয়ে বলেন যে, এটাও ইয়াহুদীদেরকে লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে। কিন্তু স্পষ্ট কথা এই যে, বর্ণনাটি তাদের জন্যে হলেও। আদেশ হিসেবে সাধারণ। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। বিনয়ীগণসামনে এগিয়ে (আরবি)-এর বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে, এখানে ধারণা অর্থ বিশ্বাস, যদিও এটা সন্দেহের অর্থেও এসে থাকে। যেমন (আরবি) শব্দটি অন্ধকারের অর্থেও আসে এবং আলোর অর্থেও আসে। অনুরূপভাবে (আরবি) শব্দটি অভিযোগকারী ও অভিযোগের প্রতিকারকারী উভয়ের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এরকম আরও বহু শব্দ আছে যেগুলো দু'টি বিভিন্ন জিনিসের উপর ব্যবহৃত হয়ে থাকে (আরবি) শব্দটি (আরবি) এ অর্থে ব্যবহার আরব কবিদের কবিতায়ও দেখা যায়। স্বয়ং কুরআন মাজীদেরই অন্য স্থানে আছেঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘পাপীরা জাহান্নাম দেখে বিশ্বাস করে নেবে যে, নিশ্চয় তারা তার মধ্যে পতিত হয়ে যাবে।' (১৮:৫৩) এখানেও (আরবি) শব্দটি (আরবি) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এমন কি হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে এরকম প্রত্যেক জায়গাতে শব্দটি (আরবি)-এর (আরবি) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।আবুল আলিয়াও (রঃ) এখানে (আরবি)-এর অর্থ (আরবি) করে থাকেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), রাবী' বিন আনাস (রঃ) এবং কাতাদারও (রঃ) মত এটাই। ইবনে জুরাইযও (রঃ) এ কথাই বলেন। কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আমার বিশ্বাস ছিল যে, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে (৬৯:২০)।একটি সহীহ হাদীসে আছে যে, কিয়ামতের দিন এক পাপীকে আল্লাহ তা'আলা বলবেন-“আমি কি তোমাকে স্ত্রী ও সন্তানাদি দেইনি? তোমার প্রতি কি নানা প্রকারের অনুগ্রহ করিনি, ঘোড়া ও উটকে কি তোমার অধীনস্থ করিনি? তোমাকে কি শান্তি, আরাম, আহার্য ও পানীয় দেইনি? সে বলবে-হা', হে প্রভু! এ সব কিছুই ছিল, তখন আল্লাহ বলবেন-“তবে তোমার কি এই জ্ঞান ও বিশ্বাস ছিল না যে, তোমাকে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে? সে বলবে-হাঁ, হে প্রভু! এর প্রতি আমার বিশ্বাস ছিল। আল্লাহ বলবেন-“তুমি যেমন আমাকে ভুলে গিয়েছিলে তেমনই আমিও তোমাকে ভুলে গেলাম। এ হাদীসেও (আরবি) এ শব্দটি এসেছে এবং (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর আরও বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ (আরবি) (৫৯:১৯)-এর তাফসীরে আসবে।
আল-বাকারা 2:47
উপদেশ ও আল্লাহর নিয়ামতসমূহের বিস্তারিত আলোচনাবানী ইসরাঈলের বাপ দাদার উপর মহান আল্লাহ যে নিয়ামত দান করেছিলেন তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের মধ্যে রাসূল হয়েছেন, তাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে এবং তাদের যুগের অন্যান্য লোকের উপর তাদেরকে মর্যাদা দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “নিশ্চয় আমি তাদেরকে জ্ঞান বিজ্ঞানে সারা বিশ্বজগতের উপর মর্যাদা দান করেছি।' অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “এবং যখন মূসা (আঃ) বললোঃ- “হে আমার গোত্র তোমাদের উপর আল্লাহর যে নিয়ামত রয়েছে তা স্মরণ কর, যেমন, তিনি তোমাদের মধ্যে নবীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাদেরকে বাদশাহ বানিয়েছেন এবং তোমাদেরকে এমন জিনিস দিয়েছেন যা সারা বিশ্বের আর কাউকেও দেয়া হয়নি। সমস্ত লোকের উপর মর্যাদা লাভের অর্থ হচ্ছে তাদের যুগের সমস্ত লোকের উপর। কেননা, মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মত নিশ্চিতরূপে তাদের চেয়ে উত্তম। এ উম্মত সম্বন্ধে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “তোমরা উত্তম সম্প্রদায়, যে সম্প্রদায়কে জনমণ্ডলীর জন্যে প্রকাশ করা হয়ছে.....।মুসনাদসমূহের ও সুনানের মধ্যে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘তোমরা সত্তরতম উম্মত এবং তোমরা সর্বোত্তম ও মর্যাদবান। এ প্রকারের বহু হাদীস ইনশাআল্লাহ (আরবি) এর তাফসীরে আসবে। আবার এও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে সমস্ত লোকের উপর একটি বিশেষ প্রকারের ফযীলত', ওর দ্বারা সর্বপ্রকারের ফযীলত সাব্যস্ত হয় না। ইমাম রাযী (রঃ) এটাই বলেছেন। কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। এটাও বলা হয়েছে, তাদের মর্যাদা সমস্ত উম্মতের উপর এই দিক দিয়ে যে, নবীগণ তাদের মধ্য হতেই হয়ে এসেছেন। কিন্তু এর মধ্যেও চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কেননা, এরকম সাধারণভাবে দেখতে গেলে তাদের পূর্ববর্তীগণও এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রকৃতপক্ষে আগের নবীগণ (আঃ) এদের মধ্য হতে ছিলেন না। যেমন ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ)। আর হযরত মুহাম্মদও (সঃ) তাদের মধ্য হতে ছিলেন না-যিনি ছিলেন সর্বশেষ নবী এবং যিনি সমস্ত সৃষ্টজীবের মধ্যে সর্বোত্তম আর যিনি হচ্ছেন দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানে সমস্ত আদম সন্তানের নেতা (তাঁর উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক)
আল-বাকারা 2:48
শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শননিয়ামতসমূহের বর্ণনার পর এখন শাস্তি হতে ভয় দেখান হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে যে, কেউ কারও কোন উপকার করবে না। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেছেনঃ কেউ কারও বোঝা বহন করবে না। আর এক জায়গায় বলেছেনঃ সেদিন প্রত্যেক লোকে এক বিস্ময়কর অবস্থায় পড়ে থাকবে।' অন্য স্থানে আছেঃ ‘হে লোকেরা! তোমরা তোমাদের প্রভুকে ভয় কর, ঐদিনকে ভয় কর যেদিন পিতা পুত্রের এবং পুত্র পিতার কোন উপকার করতে পারবে না। আরও বলেছেনঃ না কোন কাফিরের জন্যে কেউ সুপারিশ করবে, না তার সুপারিশ কবুল করা হবে। আর এক জায়গায় আছেঃ ঐ কাফিরদের জন্যে সুপারিশকারীদের সুপারিশ কোন উপকারে আসবে না। অন্য এক জায়গায় জাহান্নামবাসীদের এ উক্তি নকল করা হয়েছেঃ 'আফসোস! আমাদের না আছে কোন সুপারিশকারী এবং না আছে কোন বন্ধু। এক স্থানে আছে :মুক্তিপণও গ্রহণ করা হবে না।' আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “যে ব্যক্তি কুফরীর অবস্থায় মারা যায় সে যদি শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে পৃথিবীপূর্ণ সোনা প্রদান করে তবে তাও গ্রহণ করা হবে না। মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ কাফিরদের নিটক যদি সারা পৃথিবীর জিনিস এবং ওর মত আরও থাকে, আর কিয়ামতের দিন সে ঐ সমুদয় জিনিস মুক্তিপণ হিসেবে প্রদান করে শাস্তি হতে বাঁচতে চায়, তাহলেও কবুল করা হবে না এবং তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে জড়িত থাকবে।” আল্লাহ রাব্বল আলামীন আরও বলেনঃ “তারা মোটা রকমের মুক্তিপণ দিলেও তা গ্রহণ করা হবে না। আর এক জায়গায় বলেনঃ “আজ না তোমাদের নিকট হতে বিনিময় গ্রহণ করা হবে, না কাফিরদের নিকট হতে, তোমাদের অবস্থানস্থল জাহান্নাম, ওর আগুনই তোমাদের প্রভু।' ভাবার্থ এই যে, ঈমান ছাড়া শুধুমাত্র সুপারিশের উপর নির্ভর করলে তা কিয়ামতের দিন কোন কাজে আসবে না। কুরআন মাজীদে এক জায়গায় আছেঃ “তোমরা ঐ দিন আসার পূর্বে পুণ্য কামিয়ে নাও যেদিন না ক্রয় বিক্রয় হবে, না কোন বন্ধুত্ব থাকবে। এখানে (আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিনিময় এবং বিনিময় ও মুক্তিপণের একই অর্থ।হযরত আলী (রাঃ) হতে একটি দীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, শাফাআত এর অর্থ নফল এবং আদল’-এর অর্থ ফরয। কিন্তু এখানে এ কথাটি গরীব বা দুর্বল, প্রথম কথাটিই সঠিক। একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে প্রশ্ন করা হয়ঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ‘আদল’-এর অর্থ কি?' তিনি বলেনঃ মুক্তিপণ। তার সাহায্য করা হবে না'-এর অর্থ এই যে, তার কোন সাহায্যকারী থাকবে না, আত্মীয়তার বন্ধন কেটে যাবে, তার জন্যে কারও অন্তরে দয়া থাকবে না এবং তার নিজেরও কোন শক্তি থাকবে না। কুরআন মাজীদের আর এক জায়গায় আছেঃ “তিনি আশ্রয় দিয়ে থাকেন এবং তাঁর পাকড়াও হতে আশ্রয়দাতা কেউই নেই।' অন্যত্র আছেঃ ‘সেদিন না কেউ আল্লাহর শাস্তি প্রদানের ন্যায় শাস্তি প্রদানকারী হবে, আর না তার বন্ধনের ন্যয় কেউ বন্ধনকারী হবে।' আর এক জায়গায় আছেঃ “তোমাদের কি হলো যে, তোমরা একে অন্যকে সাহায্য করছো না? বরং তারা সেদিন সবাই নতশির থাকবে। অন্য স্থানে রয়েছেঃ “আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তারা তাঁর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে পূজা করতো, আজ সেই পূজনীয়গণ তাদের পূজকদের সাহায্য করছে কেন?' বরং তারা তাদেরকে হারিয়ে ফেলেছে। ভাবার্থ এই যে, প্রমাণাদি নষ্ট হয়ে গেছে, ঘুষ কেটে গেছে, সুপারিশ বন্ধ হয়েছে, পরস্পরের সাহায্য সহানুভূতি দূর হয়ে গেছে। আজ মাকেদ্দমা চলে গেছে সেই ন্যায় বিচারক, মহাপ্রতাপাম্বিত সারাজাহানের মালিক আল্লাহর হাতে, যার বিচারালয়ে সুপারিশকারীদের সুপারিশ এবং সাহায্যকারীদের সাহায্য কোন কাজে আসবে না, বরং সমস্ত পাপের প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করতে হবে। তবে বান্দার প্রতি তাঁর পরম করুণা ও দয়া এই যে, তাদেরকে তাদের পাপের প্রতিদান ঠিক পাপের সমানুপাতেই দেয়া হবে, আর পুণ্যের প্রতিদান দেয়া হবে কমপক্ষে দশগুণ বাড়িয়ে। আল্লাহ পাক কুরআন মাজীদের মধ্যে এক জায়গায় বলেছেনঃ “থামাও তাদেরকে, তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এখন তোমাদের কি হলো যে, একে অপরকে সাহায্য করছো না? বরং সেদিন তারা সবাই নতশিরে থাকবে।
আল-বাকারা 2:49
৪৯-৫০ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতসমূহে মহান আল্লাহ হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর সন্তানদেরকে লক্ষ্য করে বলছেন যে, আল্লাহর সেই অনুগ্রহের কথা তাদের স্মরণ করা উচিত যে, তিনি তাদেরকে ফিরআউনের জঘন্যতম শাস্তি হতে রক্ষা করেছেন। অভিশপ্ত ফির'আউন স্বপ্নে দেখেছিল যে, বায়তুল মুকাদ্দাসের দিক হতে এক আগুন জ্বলে উঠে মিসরের প্রত্যেক কিবতীর ঘরে প্রবেশ করেছে, কিন্তু তা বানী ইসরাঈলের ঘরে যায়নি। এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা ছিল এই যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে এমন একটি ছেলে জন্মগ্রহণ করবে যার হাতে তার অহংকার চূর্ণ হয়ে যাবে এবং তার খোদায়ী দাবীর চরম শাস্তি তার হাতেই হবে। এজন্যেই সেই অভিশপ্ত ব্যক্তি চারদিকে এ নির্দেশ জারী করে দিল যে, বানী ইসরাঈলের ঘরে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, সরকারী লোক যাচাই করে দেখবে। যদি পুত্র সন্তান হয় তবে তৎক্ষণাৎ তাকে মেরে ফেলা হবে। আর যদি মেয়ে সন্তান হয় তবে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। আরও ঘোষণা করলো যে, বানী ইসরাঈলের দ্বারা কঠিন ও ভারী কাজ করিয়ে নেয়া হবে এবং তাদের মাথার উপরে ভারী ভারী বোঝা চাপিয়ে দেয়া হবে। এখানে শাস্তির তাফসীর পুত্র সন্তান হত্যার দ্বারা করা হয়েছে। সূরা-ই-ইবরাহীমে একের সংযোগ অন্যের উপর করা হয়েছে। এর পূর্ণ ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই কাসাসের প্রথমে দেয়া হবে।(আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘লাগিয়ে দেয়া এবং সদা করতে থাকা। অর্থাৎ তারা বরাবরই কষ্ট দিয়ে আসছিল। যেহেতু এই আয়াতের পূর্বে বলেছিলেন যে, তারা যেন আল্লাহর পুরস্কার রূপে দেয়া নিয়ামতের কথা স্মরণ করে। এজন্যে ফিরআউনীদের শাস্তিকে ব্যাখ্যা হিসেবে পুত্র সন্তান হত্যা দ্বারা বর্ণনা করেছেন। আর সূরা-ই-ইবরাহীমের প্রথমে বলেছিলেন যে, তারা যেন আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ করে এজন্যে সেখানে সংযোগের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন, যাতে নিয়ামতের সংখ্যা বেশী হয়। অর্থাৎ বিভিন্ন শাস্তি হতে এবং পুত্র সন্তান হত্যা হতে তাদেরকে হযরত মূসা (আঃ)-এর মাধ্যমে রক্ষা করেছিলেন। মিসরের আমালীক কাফির বাদশাহদেরকে ফির'আউন বলা হতো। যেমন রূমের কাফির বাদশাহকে কাইসার, পারস্যের কাফির বাদশাহকে কিসরা, ইয়ামনের কাফির বাদশাহকে ‘তুব্বা, হাবশের কাফির বাদশাহকে নাজ্জাসী এবং ভারতের কাফির বাদশাহকে বলা হতো বাতলীমুস। ঐ ফিরআউনের নাম ছিল ওয়ালিদ বিন মুসআব বিন রাইহান। কেউ কেউ মুসআব বিন রাইয়ানও বলেছেন। আমালীক বিন আউদ বিন আরদাম বিন সাম বিন নূহের সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার কুনইয়াত ছিল আবু মাররাহ্। প্রকৃতপক্ষে সে ইসতাগার ফারসীদের মুলোদ্ভূত ছিল। তার উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। আল্লাহ পাক বলেন যে, এ মুক্তি দেয়ার মধ্যে তাঁর পক্ষ হতে এক অতি নিয়ামত ছিল। (আরবি)-এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে নিয়ামত। পরীক্ষা ভাল ও মন্দ উভয়ের সাথেই হয়ে থাকে। কিন্তু (আরবি)-এর শব্দ সাধারণতঃ মন্দের পরীক্ষার জন্যে এবং (আরবি) এর শব্দ মঙ্গলের পরীক্ষার জন্যে এসে থাকে। এটা বলা হয়েছে যে, এতে অর্থাৎ ঐ শাস্তি এবং পুত্র সন্তানদের হত্যা করার মধ্যে তাদের পরীক্ষা ছিল। কুরতবী (রঃ) দ্বিতীয় ভাবকে জমহরের কথা বলে থাকেন। তাহলে এতে ইঙ্গিত হবে যবাহ ইত্যাদির দিকে এবং (আরবি)-এর অর্থ হবে মন্দ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, তিনি তাদেরকে ফির'আউনের দল হতে বাঁচিয়ে নিয়েছেন। তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে বেরিয়ে গিয়েছিল এবং ফির'আউন তাদেরকে ধরার জন্যে দলবলসহ বেরিয়ে পড়েছিল। অতঃপর আল্লাহ তাআলা সমুদ্রকে বিভক্ত করে দিয়ে তাদেরকে পার করেছিলেন এবং তাদের চোখের সামনে ফিরআউনের তার সৈন্যবানিহীসহ ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। এসব কথার বিস্তারিত বর্ণনা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই-শু’রার মধ্যে আসবে।আমর বিন মাইমুন আওদী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে নিয়ে বের হন তখন ফিরআউন এ সংবাদ পেয়ে তার লোকজনকে বলে যে, তারা যেন মোরগের ডাকের সাথে সাথে বেরিয়ে পড়ে এবং তাদেরকে ধরে যেন হত্যা করে দেয়। কিন্তু সেই রাতে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমে মোরগ ডাকেনি। অতঃপর মোরগের ডাক শোনা মাত্রই ফিরআউন একটি ছাগী যবাহ্ করে এবং বলেঃ আমি এর কলিজা খাওয়ার পূর্বেই ছয় লাখ কিবতী সৈন্য আমার সামনে হাজির চাই। সুতরাং সৈন্যরা হাজির হয়ে গেল। ফিরআউন এই দলবল নিয়ে বড়ই জাকজমকের সাথে বানী ইসরাঈলকে ধ্বংস করার জন্যে বেরিয়ে বানী ইসরাঈলকে তারা সমুদ্রের ধারে পেয়ে গেল। এখন বানী ইসরাঈলের নিকট বিরাট পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে পড়লো। পিছনে সরলে ফিরআউনদের তরবারীর নীচে পড়তে হবে, আবার সামনে এগুলে মাছে গ্রাস করে নেবে। সে সময় হযরত ইউসা বিন নূন বললেন যে, হে আল্লাহর নবী (আঃ)! এখন কি করা যায়? তিনি বলেনঃ “আল্লাহর নির্দেশ আগে আগে রয়েছে। এটা শোনা মাত্রই তিনি ঘোড়া নিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিন্তু গভীর পানিতে যখন ঘোড়া ডুবতে লাগলো তখন তিনি ধারে ফিরে আসলেন এবং জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে মূসা! প্রভুর সাহায্য কোথায়? আমরা আপনাকেও মিথ্যাবাদী মনে করি না, প্রভুকেও নয়।' তিনবার তিনি এরকমই করলেন। এখন হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট ওয়াহী আসলোঃ “হে মূসা (আঃ)! তোমার লাঠিটি নদীর উপর মার।' লাঠি মারা মাত্রই পানির মধ্যে রাস্তা হয়ে গেল এবং পানি পাহাড়ের মত উঁচু হয়ে গেল। হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারীগণ ঐ রাস্তা দিয়ে পার হয়ে গেলেন। তাদেরকে এভাবে পার হতে দেখে ফিরআউন ও তার সঙ্গীরা এ পথে তাদের ঘোড়া ছেড়ে দিল। যখন সবাই তার মধ্যে এসে গেল তখন আল্লাহ পানিকে মিলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। দুই দিকের পানি একাকার হয়ে গেল এবং তারা সবাই ডুবে মরে গেল। বানী ইসরাঈল নদীর অপর তীরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ক্ষমতার এ দৃশ্য স্বচক্ষে অবলোকন করলো। তারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলো। নিজেদের মুক্তি এবং ফিরআউনের ধ্বংস তাদের জন্য খুশীর কারণ হয়ে গেল। এও বর্ণিত আছে যে, এটা আশূরার দিন ছিল। অর্থাৎ মহরম মাসের ১০ তারিখ।মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় এসে যখন দেখলেন যে, ইয়াহূদীরা আশূরার রোযা রয়েছে, তখন তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ এইদিন তোমরা রোযা রাখ কেন? তারা উত্তরে বলেঃ ‘এজন্যে যে, এ কল্যাণময় দিনে বানী ইসরাঈল ফিরআউনের হাত হতে মুক্তি পেয়েছিল এবং তাদের শত্রুরা ডুবে মরেছিল। তারই কৃতজ্ঞতা প্রকাশরূপে হযরত মূসা (আঃ) এ রোযা রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের অপেক্ষা মূসা (আঃ)-এর আমিই বেশী হকদার। সুতরাং রাসূলুল্লাহও (সঃ) ঐ দিন রোযা রাখেন এবং জনগণকে রোযা রাখতে নির্দেশ দেন। সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই- ইবনে মাজার মধ্যেও এ হাদীসটি আছে। অন্য একটি দুর্বল হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ঐ দিন আল্লাহ্ তা'আলা বানী ইসরাঈলের জন্যে পানি উঁচু করে দিয়েছিলেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী জায়দুলআমা দুর্বল এবং তার শিক্ষক ইয়াযীদ রেকাশী তার চেয়েও বেশী দুর্বল।
আল-বাকারা 2:50
৪৯-৫০ নং আয়াতের তাফসীরএই আয়াতসমূহে মহান আল্লাহ হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর সন্তানদেরকে লক্ষ্য করে বলছেন যে, আল্লাহর সেই অনুগ্রহের কথা তাদের স্মরণ করা উচিত যে, তিনি তাদেরকে ফিরআউনের জঘন্যতম শাস্তি হতে রক্ষা করেছেন। অভিশপ্ত ফির'আউন স্বপ্নে দেখেছিল যে, বায়তুল মুকাদ্দাসের দিক হতে এক আগুন জ্বলে উঠে মিসরের প্রত্যেক কিবতীর ঘরে প্রবেশ করেছে, কিন্তু তা বানী ইসরাঈলের ঘরে যায়নি। এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা ছিল এই যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে এমন একটি ছেলে জন্মগ্রহণ করবে যার হাতে তার অহংকার চূর্ণ হয়ে যাবে এবং তার খোদায়ী দাবীর চরম শাস্তি তার হাতেই হবে। এজন্যেই সেই অভিশপ্ত ব্যক্তি চারদিকে এ নির্দেশ জারী করে দিল যে, বানী ইসরাঈলের ঘরে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, সরকারী লোক যাচাই করে দেখবে। যদি পুত্র সন্তান হয় তবে তৎক্ষণাৎ তাকে মেরে ফেলা হবে। আর যদি মেয়ে সন্তান হয় তবে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। আরও ঘোষণা করলো যে, বানী ইসরাঈলের দ্বারা কঠিন ও ভারী কাজ করিয়ে নেয়া হবে এবং তাদের মাথার উপরে ভারী ভারী বোঝা চাপিয়ে দেয়া হবে। এখানে শাস্তির তাফসীর পুত্র সন্তান হত্যার দ্বারা করা হয়েছে। সূরা-ই-ইবরাহীমে একের সংযোগ অন্যের উপর করা হয়েছে। এর পূর্ণ ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই কাসাসের প্রথমে দেয়া হবে।(আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘লাগিয়ে দেয়া এবং সদা করতে থাকা। অর্থাৎ তারা বরাবরই কষ্ট দিয়ে আসছিল। যেহেতু এই আয়াতের পূর্বে বলেছিলেন যে, তারা যেন আল্লাহর পুরস্কার রূপে দেয়া নিয়ামতের কথা স্মরণ করে। এজন্যে ফিরআউনীদের শাস্তিকে ব্যাখ্যা হিসেবে পুত্র সন্তান হত্যা দ্বারা বর্ণনা করেছেন। আর সূরা-ই-ইবরাহীমের প্রথমে বলেছিলেন যে, তারা যেন আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ করে এজন্যে সেখানে সংযোগের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন, যাতে নিয়ামতের সংখ্যা বেশী হয়। অর্থাৎ বিভিন্ন শাস্তি হতে এবং পুত্র সন্তান হত্যা হতে তাদেরকে হযরত মূসা (আঃ)-এর মাধ্যমে রক্ষা করেছিলেন। মিসরের আমালীক কাফির বাদশাহদেরকে ফির'আউন বলা হতো। যেমন রূমের কাফির বাদশাহকে কাইসার, পারস্যের কাফির বাদশাহকে কিসরা, ইয়ামনের কাফির বাদশাহকে ‘তুব্বা, হাবশের কাফির বাদশাহকে নাজ্জাসী এবং ভারতের কাফির বাদশাহকে বলা হতো বাতলীমুস। ঐ ফিরআউনের নাম ছিল ওয়ালিদ বিন মুসআব বিন রাইহান। কেউ কেউ মুসআব বিন রাইয়ানও বলেছেন। আমালীক বিন আউদ বিন আরদাম বিন সাম বিন নূহের সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার কুনইয়াত ছিল আবু মাররাহ্। প্রকৃতপক্ষে সে ইসতাগার ফারসীদের মুলোদ্ভূত ছিল। তার উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। আল্লাহ পাক বলেন যে, এ মুক্তি দেয়ার মধ্যে তাঁর পক্ষ হতে এক অতি নিয়ামত ছিল। (আরবি)-এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে নিয়ামত। পরীক্ষা ভাল ও মন্দ উভয়ের সাথেই হয়ে থাকে। কিন্তু (আরবি)-এর শব্দ সাধারণতঃ মন্দের পরীক্ষার জন্যে এবং (আরবি) এর শব্দ মঙ্গলের পরীক্ষার জন্যে এসে থাকে। এটা বলা হয়েছে যে, এতে অর্থাৎ ঐ শাস্তি এবং পুত্র সন্তানদের হত্যা করার মধ্যে তাদের পরীক্ষা ছিল। কুরতবী (রঃ) দ্বিতীয় ভাবকে জমহরের কথা বলে থাকেন। তাহলে এতে ইঙ্গিত হবে যবাহ ইত্যাদির দিকে এবং (আরবি)-এর অর্থ হবে মন্দ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, তিনি তাদেরকে ফির'আউনের দল হতে বাঁচিয়ে নিয়েছেন। তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে বেরিয়ে গিয়েছিল এবং ফির'আউন তাদেরকে ধরার জন্যে দলবলসহ বেরিয়ে পড়েছিল। অতঃপর আল্লাহ তাআলা সমুদ্রকে বিভক্ত করে দিয়ে তাদেরকে পার করেছিলেন এবং তাদের চোখের সামনে ফিরআউনের তার সৈন্যবানিহীসহ ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। এসব কথার বিস্তারিত বর্ণনা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই-শু’রার মধ্যে আসবে।আমর বিন মাইমুন আওদী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে নিয়ে বের হন তখন ফিরআউন এ সংবাদ পেয়ে তার লোকজনকে বলে যে, তারা যেন মোরগের ডাকের সাথে সাথে বেরিয়ে পড়ে এবং তাদেরকে ধরে যেন হত্যা করে দেয়। কিন্তু সেই রাতে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমে মোরগ ডাকেনি। অতঃপর মোরগের ডাক শোনা মাত্রই ফিরআউন একটি ছাগী যবাহ্ করে এবং বলেঃ আমি এর কলিজা খাওয়ার পূর্বেই ছয় লাখ কিবতী সৈন্য আমার সামনে হাজির চাই। সুতরাং সৈন্যরা হাজির হয়ে গেল। ফিরআউন এই দলবল নিয়ে বড়ই জাকজমকের সাথে বানী ইসরাঈলকে ধ্বংস করার জন্যে বেরিয়ে বানী ইসরাঈলকে তারা সমুদ্রের ধারে পেয়ে গেল। এখন বানী ইসরাঈলের নিকট বিরাট পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে পড়লো। পিছনে সরলে ফিরআউনদের তরবারীর নীচে পড়তে হবে, আবার সামনে এগুলে মাছে গ্রাস করে নেবে। সে সময় হযরত ইউসা বিন নূন বললেন যে, হে আল্লাহর নবী (আঃ)! এখন কি করা যায়? তিনি বলেনঃ “আল্লাহর নির্দেশ আগে আগে রয়েছে। এটা শোনা মাত্রই তিনি ঘোড়া নিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিন্তু গভীর পানিতে যখন ঘোড়া ডুবতে লাগলো তখন তিনি ধারে ফিরে আসলেন এবং জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে মূসা! প্রভুর সাহায্য কোথায়? আমরা আপনাকেও মিথ্যাবাদী মনে করি না, প্রভুকেও নয়।' তিনবার তিনি এরকমই করলেন। এখন হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট ওয়াহী আসলোঃ “হে মূসা (আঃ)! তোমার লাঠিটি নদীর উপর মার।' লাঠি মারা মাত্রই পানির মধ্যে রাস্তা হয়ে গেল এবং পানি পাহাড়ের মত উঁচু হয়ে গেল। হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারীগণ ঐ রাস্তা দিয়ে পার হয়ে গেলেন। তাদেরকে এভাবে পার হতে দেখে ফিরআউন ও তার সঙ্গীরা এ পথে তাদের ঘোড়া ছেড়ে দিল। যখন সবাই তার মধ্যে এসে গেল তখন আল্লাহ পানিকে মিলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। দুই দিকের পানি একাকার হয়ে গেল এবং তারা সবাই ডুবে মরে গেল। বানী ইসরাঈল নদীর অপর তীরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ক্ষমতার এ দৃশ্য স্বচক্ষে অবলোকন করলো। তারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলো। নিজেদের মুক্তি এবং ফিরআউনের ধ্বংস তাদের জন্য খুশীর কারণ হয়ে গেল। এও বর্ণিত আছে যে, এটা আশূরার দিন ছিল। অর্থাৎ মহরম মাসের ১০ তারিখ।মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় এসে যখন দেখলেন যে, ইয়াহূদীরা আশূরার রোযা রয়েছে, তখন তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ এইদিন তোমরা রোযা রাখ কেন? তারা উত্তরে বলেঃ ‘এজন্যে যে, এ কল্যাণময় দিনে বানী ইসরাঈল ফিরআউনের হাত হতে মুক্তি পেয়েছিল এবং তাদের শত্রুরা ডুবে মরেছিল। তারই কৃতজ্ঞতা প্রকাশরূপে হযরত মূসা (আঃ) এ রোযা রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের অপেক্ষা মূসা (আঃ)-এর আমিই বেশী হকদার। সুতরাং রাসূলুল্লাহও (সঃ) ঐ দিন রোযা রাখেন এবং জনগণকে রোযা রাখতে নির্দেশ দেন। সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই- ইবনে মাজার মধ্যেও এ হাদীসটি আছে। অন্য একটি দুর্বল হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ঐ দিন আল্লাহ্ তা'আলা বানী ইসরাঈলের জন্যে পানি উঁচু করে দিয়েছিলেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী জায়দুলআমা দুর্বল এবং তার শিক্ষক ইয়াযীদ রেকাশী তার চেয়েও বেশী দুর্বল।
আল-বাকারা 2:51
৫১-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর এখানেও মহান আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) যখন চল্লিশ দিনের অঙ্গীকারে বানী ইসরাঈলের নিকট হতে তূর পাহাড়ে চলে যান তখন তারা ইতিমধ্যেই বাছুর পূজা আরম্ভ করে দেয়। অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) তাদের নিকট ফিরে আসলে তারা এ শিরক হতে তওবা করে। তাই, আল্লাহ পাক বলেন যে, এত বড় অপরাধের পরেও তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। এটা বানী ইসরাঈলের প্রতি তাঁর কম বড় অনুগ্রহ নয়। কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছেঃ “যখন আমি মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে ত্রিশ রাত্রির ওয়াদা করেছিলাম এবং আরও দশ বাড়িয়ে পুরো চল্লিশ করেছিলাম।' বলা হয় যে, এ ওয়াদার সময়কাল ছিল জীক’কাদার পুরো মাস এবং জিলহজ্জ মাসের দশ দিন। এটা ফিরআউনীদের হাত হতে মুক্তি পাওয়ার পরের ঘটনা। “কিতাব’-এর ভাবার্থ তাওরাত এবং ফুরকান প্রত্যেক ঐ জিনিসকে বলা হয় যা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে এবং হিদায়াত ও গুমরাহীর মধ্যে পার্থক্য করে থাকে। এ কিতাবটিও উক্ত ঘটনার পরে পেয়েছিলেন। যেমন সূরা-ই-আরাফের এ ঘটনার বর্ণনা রীতি দ্বারা প্রকাশ পাচ্ছে। অন্যত্র রয়েছে ‘আমি পূর্ব যুগীয় লোকদেরকে ধ্বংস করার পর মূসা (আঃ) কে এ কিতাব দিয়েছিলাম যা সমুদয় লোকের জন্য উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ এবং হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ, যেন তারা উপদেশ লাভ করে।' এটাও বলা হয়েছে টি অতিরিক্ত এবং স্বয়ং কিতাবকেই ফুরকান বলা হয়েছে। কিন্তু এটা গরীব। কেউ কেউ বলেন যে, কিতাবের উপরে ফুরকানের সংযোগ হয়েছে, অর্থাৎ ‘কিতাবও দিয়েছি এবং মু'জিযাও দিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে অর্থ হিসেবে দু'টোর অর্থ একই এবং এ রকম দু’নামের একই জিনিস সংযোগরূপে আরবদের কথায় দেখা যায়। আরব কবিদের কবিতাগুলোও এর সাক্ষ্য বহন করে।
আল-বাকারা 2:52
৫১-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর এখানেও মহান আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) যখন চল্লিশ দিনের অঙ্গীকারে বানী ইসরাঈলের নিকট হতে তূর পাহাড়ে চলে যান তখন তারা ইতিমধ্যেই বাছুর পূজা আরম্ভ করে দেয়। অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) তাদের নিকট ফিরে আসলে তারা এ শিরক হতে তওবা করে। তাই, আল্লাহ পাক বলেন যে, এত বড় অপরাধের পরেও তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। এটা বানী ইসরাঈলের প্রতি তাঁর কম বড় অনুগ্রহ নয়। কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছেঃ “যখন আমি মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে ত্রিশ রাত্রির ওয়াদা করেছিলাম এবং আরও দশ বাড়িয়ে পুরো চল্লিশ করেছিলাম।' বলা হয় যে, এ ওয়াদার সময়কাল ছিল জীক’কাদার পুরো মাস এবং জিলহজ্জ মাসের দশ দিন। এটা ফিরআউনীদের হাত হতে মুক্তি পাওয়ার পরের ঘটনা। “কিতাব’-এর ভাবার্থ তাওরাত এবং ফুরকান প্রত্যেক ঐ জিনিসকে বলা হয় যা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে এবং হিদায়াত ও গুমরাহীর মধ্যে পার্থক্য করে থাকে। এ কিতাবটিও উক্ত ঘটনার পরে পেয়েছিলেন। যেমন সূরা-ই-আরাফের এ ঘটনার বর্ণনা রীতি দ্বারা প্রকাশ পাচ্ছে। অন্যত্র রয়েছে ‘আমি পূর্ব যুগীয় লোকদেরকে ধ্বংস করার পর মূসা (আঃ) কে এ কিতাব দিয়েছিলাম যা সমুদয় লোকের জন্য উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ এবং হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ, যেন তারা উপদেশ লাভ করে।' এটাও বলা হয়েছে টি অতিরিক্ত এবং স্বয়ং কিতাবকেই ফুরকান বলা হয়েছে। কিন্তু এটা গরীব। কেউ কেউ বলেন যে, কিতাবের উপরে ফুরকানের সংযোগ হয়েছে, অর্থাৎ ‘কিতাবও দিয়েছি এবং মু'জিযাও দিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে অর্থ হিসেবে দু'টোর অর্থ একই এবং এ রকম দু’নামের একই জিনিস সংযোগরূপে আরবদের কথায় দেখা যায়। আরব কবিদের কবিতাগুলোও এর সাক্ষ্য বহন করে।
আল-বাকারা 2:53
৫১-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর এখানেও মহান আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) যখন চল্লিশ দিনের অঙ্গীকারে বানী ইসরাঈলের নিকট হতে তূর পাহাড়ে চলে যান তখন তারা ইতিমধ্যেই বাছুর পূজা আরম্ভ করে দেয়। অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) তাদের নিকট ফিরে আসলে তারা এ শিরক হতে তওবা করে। তাই, আল্লাহ পাক বলেন যে, এত বড় অপরাধের পরেও তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। এটা বানী ইসরাঈলের প্রতি তাঁর কম বড় অনুগ্রহ নয়। কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছেঃ “যখন আমি মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে ত্রিশ রাত্রির ওয়াদা করেছিলাম এবং আরও দশ বাড়িয়ে পুরো চল্লিশ করেছিলাম।' বলা হয় যে, এ ওয়াদার সময়কাল ছিল জীক’কাদার পুরো মাস এবং জিলহজ্জ মাসের দশ দিন। এটা ফিরআউনীদের হাত হতে মুক্তি পাওয়ার পরের ঘটনা। “কিতাব’-এর ভাবার্থ তাওরাত এবং ফুরকান প্রত্যেক ঐ জিনিসকে বলা হয় যা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে এবং হিদায়াত ও গুমরাহীর মধ্যে পার্থক্য করে থাকে। এ কিতাবটিও উক্ত ঘটনার পরে পেয়েছিলেন। যেমন সূরা-ই-আরাফের এ ঘটনার বর্ণনা রীতি দ্বারা প্রকাশ পাচ্ছে। অন্যত্র রয়েছে ‘আমি পূর্ব যুগীয় লোকদেরকে ধ্বংস করার পর মূসা (আঃ) কে এ কিতাব দিয়েছিলাম যা সমুদয় লোকের জন্য উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ এবং হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ, যেন তারা উপদেশ লাভ করে।' এটাও বলা হয়েছে টি অতিরিক্ত এবং স্বয়ং কিতাবকেই ফুরকান বলা হয়েছে। কিন্তু এটা গরীব। কেউ কেউ বলেন যে, কিতাবের উপরে ফুরকানের সংযোগ হয়েছে, অর্থাৎ ‘কিতাবও দিয়েছি এবং মু'জিযাও দিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে অর্থ হিসেবে দু'টোর অর্থ একই এবং এ রকম দু’নামের একই জিনিস সংযোগরূপে আরবদের কথায় দেখা যায়। আরব কবিদের কবিতাগুলোও এর সাক্ষ্য বহন করে।
আল-বাকারা 2:54
এখানে তাদের তাওবার পন্থা বর্ণনা করা হচ্ছে। তারা বাছুরের পূজা করেছিল এবং তার প্রেম তাদের অন্তরে বদ্ধমূল হয়েছিল। অতঃপর হযরত মূসার (আঃ) বুঝানোর ফলে তাদের সম্বিৎ ফিরে আসে এবং তারা লজ্জিত হয় ও নিজেদের পথভ্রষ্টতার কথা বিশ্বাস করতঃ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। তখন তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তাদের মধ্যে যারা বাছুর পূজা করেছে তাদেরকে যেন হত্যা করে ঐসব লোকে যারা এতে যোগ দেয়নি। তারা তাই করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করেন এবং হত্যাকারী ও নিহত সবকেই ক্ষমা করে দেন। এর পূর্ণ বর্ণনা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই- তা-হা’য় আসবে। হযরত মূসা (আঃ)-এর তাদের সৃষ্টিকর্তার নিকট তাওবা করার নির্দেশ দেয়ার অর্থ এই যে, তাদেরকে যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যকে পূজা করা-এর চেয়ে বড় জুলুম আর অত্যাচার আর কী হতে পারে? একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে মহান আল্লাহর নির্দেশ শুনিয়েদেন এবং যেসব লোক বাছুর পূজা করেছিল তাদেরকে বসিয়ে দেন এবং অন্যান্য লোক দাড়িয়ে গিয়ে তাদেরকে হত্যা করতে শুরু করে। আল্লাহ তাআলার হুকুমে অন্ধকার ছেয়ে যায়। অতঃপর তাদেরকে বিরত রাখা হয়। তখন গণনা করে দেখা যায় যে, সত্তর হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছে। এরপর সারা গোত্রের তাওবা কবূল হয়ে যায়। ওটা একটি কঠিন নির্দেশ ছিল যা তারা পালন করেছিল এবং আপন ও পর সকলকেই সমানভাবে হত্যা করেছিল। এরই ফলে পরম করুণাময় আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করেছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে বলেছিলেনঃ যথেষ্ট হয়েছে, মহান আল্লাহ নিহতদেরকে শহীদের পুণ্যদান করেছেন। হত্যাকারী ও অবশিষ্ট লোকদের তাওবা আল্লাহ পাক ককূল করেছেন এবং তাদেকে জিহাদের পূণ্য দান করেছেন।' হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ) এভাবে তাদের গোত্রের হত্যাকার্য দর্শন করে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ! এখন তো বনী ইসরাঈল দুনিয়ার বুক হতে মুছে যাবে!' সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয় এবং বিশ্বপ্রভু বলেনঃ “হে আমার নবীগণ! তোমরা নিহতদের জন্যে দুঃখ করো না, তারা আমার নিকট শহীদদের মর্যাদা পেয়েছে। তারা এখানে জীবিত রয়েছে ও আহার্য পাচ্ছে। তখন তাদের ও গোত্রের লোকদের সান্ত্বনা লাভ হয় এবং স্ত্রীলোকদের ও শিশুদের বিলাপ বন্ধ হয়, তরবারী, বর্শা, ছোরা ইত্যাদি থেমে যায়। পিতা পুত্র ও ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তারক্তি বন্ধ হয়ে যায় এবং পরম দয়ালু আল্লাহ তাদের তাওবা কবূল করেন।
আল-বাকারা 2:55
৫৫-৫৬ নং আয়াতের তাফসীরহযরত মূসা (আঃ) যখন বানী ইসরাঈলের সত্তরজন লোককে সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী তূর পাহাড়ে যান এবং ঐ লোকগুলি আল্লাহর কথা শুনতে পায়, তখন তারা মূসা (আঃ) কে বলে যে, তারা আল্লাহকে সামনে না দেখা পর্যন্ত ঈমান আনবে না। এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রশ্নের ফলে দেখতে দেখতেই তাদের উপর আকাশ হতে বিদ্যুৎ পড়ে যায় এবং এক ভয়াবহ উচ্চ শব্দ হয়, তার ফলে তারা সবাই মরে যায়। এদিকে হযরত মূসা (আঃ) বিলাপ করতে থাকেন এবং কেঁদে কেঁদে মহান আল্লাহর নিকট আরজ করেনঃ “হে আল্লাহ্! আমি বানী ইসরাঈলকে কি উত্তর দেবো! এরা তো তাদের মধ্যে উত্তম ও নেতৃস্থানীয় লোক ছিল। হে প্রভু! আপনার এরূপ করার ইচ্ছে থাকলে ইতিপূর্বেই তাদেরকে ও আমাকে মেরে ফেলতেন। হে আল্লাহ! অজ্ঞ লোকেদের অজ্ঞতার কারণে আমাকে ধরবেন না।তার এ প্রার্থনা কবূল হয় এবং তাকে বলা হয় যে, এরাও বাছুর পূজকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের শাস্তি হয়ে গেল। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে জীবিত করেন। মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ) তাঁর গোত্রের নিকট আসেন এবং তাদেরকে বাছুর পূজতে দেখেন, তিনি তার ভাই হারূনকে (আঃ) ও সামেরীকে তিরস্কার করেন। অতঃপর বাছুরকে পুড়িয়ে ফেলেন এবং ওর ছাই নদীতে ভাসিয়ে দেন। তারপর তাদের মধ্যে হতে উত্তম লোকদেরকে বেছে নেন। তাদের সংখ্যা ছিল সত্তর। তাওবা করাবার জন্যে তিনি তাদেরকে নিয়ে তূর পাহাড়ে চলে যান। তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাওবা কর, রোযা রাখ, পবিত্র হয়ে যাও এবং কাপড় পাক কর। যখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে নিয়ে ভূরে সীনায় পৌছেন , তখন ঐলোকগুলো বলেঃ “হে নবী (আঃ)! আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন যেন তিনি তাঁর কথা আমাদেরকেও শুনিয়ে দেন।হযরত মূসা (আঃ) পাহাড়ের কাছে পৌছলে এক খণ্ড মেঘ এসে সারা পাহাড় ঢেকে নেয় এবং তিনি ওরই ভিতর ভিতর আল্লাহ তা'আলার নিকটবর্তী হয়ে যান। আল্লাহ পাকের কথা আরম্ভ হলে হযরত মূসার (আঃ) কপাল আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেই সময় কেউ তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখতো না। লোকেরা এগিয়ে গেলে তারা মেঘের মধ্যে প্রবেশ করে এবং সবাই সিজদায় পড়ে যায়। হযরত মূসার (আঃ) প্রার্থনার ফলে তাঁর সঙ্গীয় বানী ইসরাঈলও আল্লাহ তা'আলার কথা শুনতে থাকে। তার কথা শেষ হলে মেঘ সরে যায় এবং হযরত মূসা (আঃ) তাদের নিকট চলে আসেন। তখন তারা তাকে বলেঃ “হে মূসা (আঃ)! আমরা কখনও ঈমান আনবো না যে পর্যন্ত আমরা আমাদের প্রভুকে আমাদের সামনে দেখতে পাই। এ ঔদ্ধত্যের ফলে। এক ভূমিকম্প আসে এবং তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যায়। এখন হযরত মূসা (আঃ) খাটি অন্তরে প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন এবং বলেন যে, এর চেয়ে তো বরং এর পূর্বেই মরে যাওয়া ভাল ছিল। নির্বোধদের কার্যের জন্যে আল্লাহ পাক যেন তাকে ধ্বংস না করেন। ওরা তো বানী ইসরাঈলের মধ্যে উত্তম লোক ছিল। এখন তিনি একাই ফিরে গেলে তাদেরকে কি উত্তর দেবেন? কেই বা তাঁর কথা বিশ্বাস করবে এবং কেই বা আর তাঁর উপর ঈমান আনবে? সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যেন তার তাওবা কবূল করেন ও তার প্রতি দয়া করেন।হযরত মূসা (আঃ) এভাবে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে প্রার্থনা করতে থাকেন। অবশেষে তার প্রার্থনা মঞ্জুর হয় এবং আল্লাহ ঐ মৃতদেরকে পুনর্জীবিত করেন। এখন সবাই সম্মিলিতভাবে বানী ইসরাঈলের পক্ষ হতে তাওবা করতে আরম্ভ করে। তাদেরকে বলা হয় যে, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের জীবনকে ধ্বংস করবে এবং একে অপরকে হত্যা করবে, সেই পর্যন্ত তাদের তাওবা ককূল করা হবে না। সুদ্দী কাবীর (রঃ) বলেন যে, এটা বানী ইসরাঈলের পরস্পর রক্তারক্তির পরের ঘটনা। এর দ্বারা এটাও জানা যাচ্ছে যে, এ সম্বোধন সাধারণ হলেও প্রকৃতপক্ষে এটা দ্বারা উদ্দেশ্য এই সত্তর ব্যক্তিই বটে।ইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে এই সত্তর ব্যক্তির ঘটনায় লিখেন যে, তারা জীবিত হওয়ার পর বলেছিলঃ “হে নবী (আঃ)! আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন যে, তিনি যেন আমাদেরকে নবী করেন। তিনি প্রার্থনা করেন এবং তা ককূল হয়। কিন্তু এ কথাটি গরীব। হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগে হযরত হারূন (আঃ) ছাড়া এবং তার পরে হযরত ইউশা (আঃ) ছাড়া আর কোন নবী থাকার প্রমাণ নেই। আহলে কিতাব এটাও দাবী করে যে, ঐসব লোক তাদের প্রার্থনা অনুযায়ী ঐ স্থানেই আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখেছিল। এটাও ভুল কথা। কেননা, হযরত মূসা (আঃ) স্বয়ং যখন আল্লাহকে দর্শনের প্রার্থনা করেন তখন তাঁকে নিষেধ করা হয়। তাহলে এই সত্তরজন লোক দীদার-ই-ইলাহীর ঔজ্জ্বল্য কিরূপে সহ্য করতো?এ আয়াতের তাফসীরে আর একটি মত এও আছে যে, তারা বলেঃ হযরত! আমার কি জানি? আল্লাহ স্বয়ং প্রকাশিত হয়ে আমাদেরকে বলেন না কেন? তিনি আপনার সাথে কথা বলবেন আর আমাদের সাথে বলবেন না এর কারণ কি হতে পারে? যে পর্যন্ত না আমরা তাকে স্বচক্ষে দেখতে পাই, কখনও ঈমান আনবো না।' এ কথার কারণে তাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ ও অভিশাপ বর্ষিত হয় এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। পুনরায় জীবিত করা হয়। অতঃপর মূসা (আঃ) তাদেরকে বলেনঃ “এখন তোমরা তাওরাতকে ধরে রাখো।' তারা আবার অস্বীকার করে। এবার ফেরেশতাগণ পাহাড় উঠিয়ে এনে তাদের মাথার উপর লটকিয়ে রেখে বলেন যে, এবার না মানলে তাদের উপর পাহাড় নিক্ষেপ করা হবে। এর দ্বারা এও জানা গেল যে, মৃত্যুর পরে জীবিত হয়ে পুনরায় তারা ‘মুকাল্লাফ’ হয়েছিল অর্থাৎ তাদের প্রতি আল্লাহর আহকাম জারী হয়েছিল। মাঅরদী বলেছেন যে, কেউ কেউ বলেছেনঃ “যখন তারা আল্লাহর এই বড় নিদর্শন দেখলো, মৃত্যুর পরে জীবিত হলো তখন শরীয়তের নির্দেশাবলী তাদের উপর হতে সরে গেল। কেননা, তখন তো তারা সব কিছু মানতে বাধ্য ছিল। দ্বিতীয় দল বলেন যে, এটা নয়, বরং এটা সত্ত্বেও তাদের উপর শরীয়তের আহকাম জারী থাকবে। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, সঠিক কথা এটাই। এসব ঘটনা তাদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘটেছিল। এটা তাদেরকে শরীয়ত পালন হতে আযাদ করতে পারে না। স্বয়ং বানী ইসরাঈলও বড় বড় অলৌকিক ঘটনা দেখেছিল। স্বয়ং তাদের উপরেই এমন এমন ঘটনা ঘটেছিল যা ছিল সম্পূর্ণরূপে অসাধারণ ও স্বভাব বিরুদ্ধ। তা সত্ত্বেও তো তাদের উপর শরীয়তের নির্দেশাবলী চালু ছিল। এ রকমই এটাও। এটাই সঠিক ও স্পষ্ট কথা। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।
আল-বাকারা 2:56
৫৫-৫৬ নং আয়াতের তাফসীরহযরত মূসা (আঃ) যখন বানী ইসরাঈলের সত্তরজন লোককে সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী তূর পাহাড়ে যান এবং ঐ লোকগুলি আল্লাহর কথা শুনতে পায়, তখন তারা মূসা (আঃ) কে বলে যে, তারা আল্লাহকে সামনে না দেখা পর্যন্ত ঈমান আনবে না। এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রশ্নের ফলে দেখতে দেখতেই তাদের উপর আকাশ হতে বিদ্যুৎ পড়ে যায় এবং এক ভয়াবহ উচ্চ শব্দ হয়, তার ফলে তারা সবাই মরে যায়। এদিকে হযরত মূসা (আঃ) বিলাপ করতে থাকেন এবং কেঁদে কেঁদে মহান আল্লাহর নিকট আরজ করেনঃ “হে আল্লাহ্! আমি বানী ইসরাঈলকে কি উত্তর দেবো! এরা তো তাদের মধ্যে উত্তম ও নেতৃস্থানীয় লোক ছিল। হে প্রভু! আপনার এরূপ করার ইচ্ছে থাকলে ইতিপূর্বেই তাদেরকে ও আমাকে মেরে ফেলতেন। হে আল্লাহ! অজ্ঞ লোকেদের অজ্ঞতার কারণে আমাকে ধরবেন না।তার এ প্রার্থনা কবূল হয় এবং তাকে বলা হয় যে, এরাও বাছুর পূজকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের শাস্তি হয়ে গেল। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে জীবিত করেন। মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ) তাঁর গোত্রের নিকট আসেন এবং তাদেরকে বাছুর পূজতে দেখেন, তিনি তার ভাই হারূনকে (আঃ) ও সামেরীকে তিরস্কার করেন। অতঃপর বাছুরকে পুড়িয়ে ফেলেন এবং ওর ছাই নদীতে ভাসিয়ে দেন। তারপর তাদের মধ্যে হতে উত্তম লোকদেরকে বেছে নেন। তাদের সংখ্যা ছিল সত্তর। তাওবা করাবার জন্যে তিনি তাদেরকে নিয়ে তূর পাহাড়ে চলে যান। তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাওবা কর, রোযা রাখ, পবিত্র হয়ে যাও এবং কাপড় পাক কর। যখন হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে নিয়ে ভূরে সীনায় পৌছেন , তখন ঐলোকগুলো বলেঃ “হে নবী (আঃ)! আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন যেন তিনি তাঁর কথা আমাদেরকেও শুনিয়ে দেন।হযরত মূসা (আঃ) পাহাড়ের কাছে পৌছলে এক খণ্ড মেঘ এসে সারা পাহাড় ঢেকে নেয় এবং তিনি ওরই ভিতর ভিতর আল্লাহ তা'আলার নিকটবর্তী হয়ে যান। আল্লাহ পাকের কথা আরম্ভ হলে হযরত মূসার (আঃ) কপাল আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেই সময় কেউ তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখতো না। লোকেরা এগিয়ে গেলে তারা মেঘের মধ্যে প্রবেশ করে এবং সবাই সিজদায় পড়ে যায়। হযরত মূসার (আঃ) প্রার্থনার ফলে তাঁর সঙ্গীয় বানী ইসরাঈলও আল্লাহ তা'আলার কথা শুনতে থাকে। তার কথা শেষ হলে মেঘ সরে যায় এবং হযরত মূসা (আঃ) তাদের নিকট চলে আসেন। তখন তারা তাকে বলেঃ “হে মূসা (আঃ)! আমরা কখনও ঈমান আনবো না যে পর্যন্ত আমরা আমাদের প্রভুকে আমাদের সামনে দেখতে পাই। এ ঔদ্ধত্যের ফলে। এক ভূমিকম্প আসে এবং তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যায়। এখন হযরত মূসা (আঃ) খাটি অন্তরে প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন এবং বলেন যে, এর চেয়ে তো বরং এর পূর্বেই মরে যাওয়া ভাল ছিল। নির্বোধদের কার্যের জন্যে আল্লাহ পাক যেন তাকে ধ্বংস না করেন। ওরা তো বানী ইসরাঈলের মধ্যে উত্তম লোক ছিল। এখন তিনি একাই ফিরে গেলে তাদেরকে কি উত্তর দেবেন? কেই বা তাঁর কথা বিশ্বাস করবে এবং কেই বা আর তাঁর উপর ঈমান আনবে? সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যেন তার তাওবা কবূল করেন ও তার প্রতি দয়া করেন।হযরত মূসা (আঃ) এভাবে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে প্রার্থনা করতে থাকেন। অবশেষে তার প্রার্থনা মঞ্জুর হয় এবং আল্লাহ ঐ মৃতদেরকে পুনর্জীবিত করেন। এখন সবাই সম্মিলিতভাবে বানী ইসরাঈলের পক্ষ হতে তাওবা করতে আরম্ভ করে। তাদেরকে বলা হয় যে, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের জীবনকে ধ্বংস করবে এবং একে অপরকে হত্যা করবে, সেই পর্যন্ত তাদের তাওবা ককূল করা হবে না। সুদ্দী কাবীর (রঃ) বলেন যে, এটা বানী ইসরাঈলের পরস্পর রক্তারক্তির পরের ঘটনা। এর দ্বারা এটাও জানা যাচ্ছে যে, এ সম্বোধন সাধারণ হলেও প্রকৃতপক্ষে এটা দ্বারা উদ্দেশ্য এই সত্তর ব্যক্তিই বটে।ইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে এই সত্তর ব্যক্তির ঘটনায় লিখেন যে, তারা জীবিত হওয়ার পর বলেছিলঃ “হে নবী (আঃ)! আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন যে, তিনি যেন আমাদেরকে নবী করেন। তিনি প্রার্থনা করেন এবং তা ককূল হয়। কিন্তু এ কথাটি গরীব। হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগে হযরত হারূন (আঃ) ছাড়া এবং তার পরে হযরত ইউশা (আঃ) ছাড়া আর কোন নবী থাকার প্রমাণ নেই। আহলে কিতাব এটাও দাবী করে যে, ঐসব লোক তাদের প্রার্থনা অনুযায়ী ঐ স্থানেই আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখেছিল। এটাও ভুল কথা। কেননা, হযরত মূসা (আঃ) স্বয়ং যখন আল্লাহকে দর্শনের প্রার্থনা করেন তখন তাঁকে নিষেধ করা হয়। তাহলে এই সত্তরজন লোক দীদার-ই-ইলাহীর ঔজ্জ্বল্য কিরূপে সহ্য করতো?এ আয়াতের তাফসীরে আর একটি মত এও আছে যে, তারা বলেঃ হযরত! আমার কি জানি? আল্লাহ স্বয়ং প্রকাশিত হয়ে আমাদেরকে বলেন না কেন? তিনি আপনার সাথে কথা বলবেন আর আমাদের সাথে বলবেন না এর কারণ কি হতে পারে? যে পর্যন্ত না আমরা তাকে স্বচক্ষে দেখতে পাই, কখনও ঈমান আনবো না।' এ কথার কারণে তাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ ও অভিশাপ বর্ষিত হয় এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। পুনরায় জীবিত করা হয়। অতঃপর মূসা (আঃ) তাদেরকে বলেনঃ “এখন তোমরা তাওরাতকে ধরে রাখো।' তারা আবার অস্বীকার করে। এবার ফেরেশতাগণ পাহাড় উঠিয়ে এনে তাদের মাথার উপর লটকিয়ে রেখে বলেন যে, এবার না মানলে তাদের উপর পাহাড় নিক্ষেপ করা হবে। এর দ্বারা এও জানা গেল যে, মৃত্যুর পরে জীবিত হয়ে পুনরায় তারা ‘মুকাল্লাফ’ হয়েছিল অর্থাৎ তাদের প্রতি আল্লাহর আহকাম জারী হয়েছিল। মাঅরদী বলেছেন যে, কেউ কেউ বলেছেনঃ “যখন তারা আল্লাহর এই বড় নিদর্শন দেখলো, মৃত্যুর পরে জীবিত হলো তখন শরীয়তের নির্দেশাবলী তাদের উপর হতে সরে গেল। কেননা, তখন তো তারা সব কিছু মানতে বাধ্য ছিল। দ্বিতীয় দল বলেন যে, এটা নয়, বরং এটা সত্ত্বেও তাদের উপর শরীয়তের আহকাম জারী থাকবে। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, সঠিক কথা এটাই। এসব ঘটনা তাদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘটেছিল। এটা তাদেরকে শরীয়ত পালন হতে আযাদ করতে পারে না। স্বয়ং বানী ইসরাঈলও বড় বড় অলৌকিক ঘটনা দেখেছিল। স্বয়ং তাদের উপরেই এমন এমন ঘটনা ঘটেছিল যা ছিল সম্পূর্ণরূপে অসাধারণ ও স্বভাব বিরুদ্ধ। তা সত্ত্বেও তো তাদের উপর শরীয়তের নির্দেশাবলী চালু ছিল। এ রকমই এটাও। এটাই সঠিক ও স্পষ্ট কথা। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।
আল-বাকারা 2:57
উপরে বর্ণিত হয়েছিল যে, আল্লাহ তাদেরকে অমুক অমুক বিপদ হতে রক্ষা করেছিলেন। এখানে বর্ণিত হচ্ছে যে, মহান আল্লাহ তাদেরকে অমুক অমুক সুখ সম্ভোগ দান করেছেন।(আরবি) শব্দটি (আরবি)শব্দের বহুবচন। এটা আকাশকে ঢেকে রাখে বলে একে (আরবি) বলা হয়ে থাকে। এটা একটা সাদা রঙ্গের মেঘ ছিল যা তীহের মাঠে তাদের উপর ছায়া করেছিল। যেমন সুনান-ই-নাসাঈ ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থের মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত একটি সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বলেন যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ), রাবী' বিন আনাস (রঃ), আবু মুযলিজ (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) এটাই বলেছেন। হাসান (রঃ) এবং কাতাদাও (রঃ) এ কথাই বলেন। অন্যান্য লোক বলেন যে, এ মেঘ সাধারণ মেঘ হতে বেশী ঠাণ্ডা ও উত্তম ছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা ঐ মেঘ ছিল যার মধ্যে মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন আগমন করবেন। আবূ হুযাইফার (রঃ) এটাই উক্তি।এ আয়াতটির মধ্যে এর বর্ণনা রয়েছেঃ ‘এসব লোক কি এরই অপেক্ষা করছে যে, আল্লাহ তাআলা মেঘের মধ্যে আসবেন এবং তার ফেরেশতামণ্ডলী?' এটা ঐ মেঘ যার মধ্যে বদরের যুদ্ধে ফেরেশতাগণ অবতরণ করেছিলেন।‘মান্না’ ও ‘সালওয়া’যে মান্না, তাদেরকে দেয়া হতো তা গাছের উপর অবতারণ করা হতো। তারা সকালে গিয়ে তা জমা করতো এবং ইচ্ছে মত খেয়ে নিতো। ওটা আঠা জাতীয় জিনিস ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, শিশিরের সঙ্গে ওর সাদৃশ্য ছিল। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, শিলার মত মান্না তাদের ঘরে নেমে আসতো, যা দুধের চেয়ে সাদা ও মধু অপেক্ষা বেশী মিষ্ট ছিল। সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত অবতারিত হতে থাকতো। প্রত্যেক লোক তার বাড়ীর জন্যে ঐ পরিমাণ নিয়ে নিতো যা ঐ দিনের জন্যে যথেষ্ট হতো। কেউ বেশী নিলে তা পচে যেতো। শুক্রবারে তারা শুক্র ও শনি এ দু’দিনের জন্যে গ্রহণ করতো। কেননা, শনিবার ছিল তাদের জন্যে সাপ্তাহিক খুশীর দিন। সে দিন তারা জীবিকা অন্বেষণ করতো। রাবী' বিন আনাস (রঃ) বলেন যে, মান্না' ছিল মধু জাতীয় জিনিস যা তারা পানি দিয়ে মিশিয়ে পান করতো। শাবঈ (রঃ) বলেনঃ “তোমাদের এ মধু ঐ মান্না’ -এর সত্তর ভাগের একভাগ। মাত্র। কবিতাতেও মান্না মধু অর্থে এসেছে। মোটকথা এই যে, তা একটি জিনিস ছিল যা তারা বিনা পরিশ্রমে লাভ করতো। শুধু ওটাকেই খেলে ওটা ছিল খাওয়ার জিনিস, পানির সাথে মিশ্রিত করলে তা ছিল পানের জিনিস এবং অন্য কিছুর সঙ্গে মিশ্রিত করলে তা অন্য জিনিস হয়ে যেতো। কিন্তু এখানে মান্নার ভাবার্থ এটা নয়, বরং ভাবার্থ হচ্ছে পৃথক একটা খাওয়ার জিনিস।সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন মান্না ব্যাঙ-এর ছাতার অন্তর্গত এবং ওর পানি চক্ষু রোগের ঔষধ। ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান বলেছেন। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে আছেঃ “আজওয়াহ নামক মদীনার এক প্রকার খেজুর হচ্ছে বেহেশতী খাদ্য ও বিষক্রিয়া নষ্টকারী এবং ব্যাঙের ছাতা মান্না এর অন্তর্গত ও চক্ষুরোগে আরোগ্যদানকারী।" এ হাদীসটি হাসান গারীব। আরও বহু পন্থায় এটা বর্ণিত আছে। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, ঐ গাছের ব্যাপারে সাহাবীগণের (রাঃ) মধ্যে মতভেদ রয়েছে যা মাটির উপরে হয় এবং যার মূল শক্ত হয় না। কেউ বললেন যে, ওটা ব্যাঙের ছাতা। তখন তিনি বললেন যে, ব্যাঙের ছাতা তো মান্না'-এর অন্তর্ভুক্ত এবং ওর পানি চক্ষু রোগের ঔষধ।' সালওয়া এক প্রকার পাখী, চড়ুই পাখি হতে কিছু বড়, বরং অনেকটা লাল। দক্ষিণা বায়ু প্রবাহিত হতো এবং ঐ পাখিগুলোকে জমা করে দিতো। বানী ইসরাঈল নিজেদের প্রয়োজন মত ওগুলো ধরতো এবং যবাহ করে খেতো। একদিন খেয়ে বেশী হলে তা শড়ে যেতো। শুক্রবারে তারা দুই দিনের জন্যে জমা করতো। কেননা, শনিবার তাদের জন্যে সাপ্তাহিক খুশীর দিন ছিল। সেই দিন তারা ইবাদতে মশগুল থাকতত এবং ঐদিন শিকার করা তাদের জন্যে নিষিদ্ধ ছিল। কোন কোন লোক বলেছেন যে, ঐ পাখিগুলো কবুতরের সমান ছিল। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে এক মাইল জায়গা ব্যাপী ঐ পাখিগুলোর বর্শা পরিমাণ উঁচু স্থূপ জমে যেতো। ঐ তীহের মাঠে ঐ দু'টো জিনিস তাদের খাদ্যরূপে প্রেরিত হতো, যেখানে তারা তাদের নবীকে বলেছিলঃ 'এ জঙ্গলে আমাদের আহারের ব্যবস্থা কিরূপে হবে?' তখন তাদের উপর ‘মান্না’ ও ‘সালওয়া' অবতারিত হয়েছিল। হযরত মূসাকে (আঃ) পানির জন্যে আবেদন জানানো হলে বিশ্বপ্রভু তাঁকে একটি পাথরের উপর লাঠি মারতে বলেন। লাঠি মারতেই ওটা হতে বারোটি ঝরণা প্রবাহিত হয়। বানী ইসরাঈলের বারোটি দল ছিল। প্রত্যেক দল নিজের জন্যে একটি করে ঝরণা ভাগ করে নেয়। সেই মরুময় প্রান্তরে ছায়া ছাড়া চলা কঠিন বলে তারা ছায়ার জন্যে প্রার্থনা জানায়। তখন মহান আল্লাহ তুর পাহাড় দ্বারা তাদের উপর ছায়া করে দেন। এখন বাকী থাকে বস্ত্র। আল্লাহর হুকুমে যে কাপড় তারা পরেছিল, তাদের দেহ বাড়ার সাথে সাথে কাপড়ও বাড়তে থাকলো। এক বছরের শিশুর কাপড় তার দেহ বেড়ে ওঠার সাথে সাথে বেড়ে যেতো। সেই কাপড় ছিড়তেও না ময়লাও হতো না। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন জায়গায় এসব নিয়ামতের বর্ণনা রয়েছে।হাজলী (রঃ) বলেন যে, সালওয়া’ মধুকে বলা হয়। কিন্তু এটা তার ভুল কথা। সাওরাজ (রঃ) এবং জাওহারী (রঃ) এই দু'জনও একথাই বলেছেন এবং এর প্রমাণরূপে আরব কবিদের কবিতা ও কতকগুলো আরবী বাকরীতি পেশ করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে, এটা একটা ঔষধের নাম। কাসাঈ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) শব্দটি এক বচন এবং এর বহু বচন (আরবি) এসে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর এক বচন ও বহু বচনের একই রূপ। অর্থাৎ- (আরবি) শব্দটি। মোট কথা এই দু'টি আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত ছিল, যা খাওয়া তাদের জন্যে বৈধ ছিল। কিন্তু ঐ লোকগুলো তার ঐ সব নিয়ামতের জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি এবং ওটাই ছিল তাদের নাসের উপর অত্যাচার।সাহাবীদের (রাঃ) বৈশিষ্ট্য এবং তাদের মর্যাদাবানী ইসরাঈলের এ নক্সাকে সামনে রেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তাঁরা কঠিন কঠিন বিপদের সম্মুখীন হয়েও এবং সীমাহীন দুঃখ কষ্ট সহ্য করেও রাসূলুল্লাহর (সঃ) আনুগত্যের উপর ও আল্লাহ তা'আলার ইবাদতের উপর অটল ছিলেন। না তাঁরা মুজিযা দেখতে চেয়েছিলেন, না দুনিয়ার কোন আরাম চেয়েছিলেন। তাকের যুদ্ধে তারা ক্ষুধার জ্বালায় যখন কাতর হয়ে পড়েন, তখন যার কাছে যেটুকু খাবার ছিল সবকে জমা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট হাজির করে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের এ খাবারে বরকতের জন্য প্রার্থনা করুন।” আল্লাহর রাসূল (সঃ) প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তা'আলা সে প্রার্থনা মঞ্জুর করতঃ তাতে বরকত দান করেন। তাঁরা খেয়ে পরিতৃপ্ত হন এবং খাবারের পাত্র ভর্তি করে নেন। পিপাসায় তাদের প্রাণ শুকিয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দু'আর বরকতে এক খণ্ড মেঘ এসে পানি বর্ষিয়ে দেয়। তারা নিজেরা পান করেন পশুকে পান করান এবং মশক, কলস ইত্যাদি ভর্তি করে নেন। সুতরাং সাহাবীদের এই অটলতা, দৃঢ়তা, পূর্ণ আনুগত্য এবং খাটি একত্ববাদীতা তাদেরকে হযরত মূসা (আঃ)-এর সহচরদের উপর নিশ্চিতরূপে মর্যাদা দান করেছে।
আল-বাকারা 2:58
৫৮-৫৯ নং আয়াতের তাফসীর জিহাদের নির্দেশ ও তা অমান্য করণহযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে নিয়ে যখন মিসরে আসেন এবং তাদেরকে পবিত্র ভূমিতে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়, যা ছিল তাদের পৈত্রিক ভূমি ও তথায় তাদেরকে আমালুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার নির্দেশ দেয়া হয়, তখন তারা কাপুরুষতা প্রদর্শন করে, যার শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে তীহের মাঠ নিক্ষেপ করা হয়। যেমন সূরা-ই- মায়েদায় বর্ণিত হয়েছে। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে বায়তুল মুকাদ্দাস। সুদ্দী (রঃ), রাবী (রঃ), কাতাদাহ্ (রঃ) এবং আবু মুসলিম (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ এটাই বলেছেন। কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে বলেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা পবিত্র ভূমিতে গমন কর যা তোমাদের ভাগ্যে লিখে দেয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা ‘আরীহা' নামক জায়গাকে বুঝান হয়েছে। আবার কেউ কেউ মিসরের কথা বলেছেন। কিন্তু এর ভাবার্থ “বায়তুল মুকাদ্দাস’ হওয়াই সঠিক কথা। এটা তীহ' হতে বের হওয়ার পরের ঘটনা। শুক্রবার সন্ধ্যার সময় আল্লাহ তা'আলা স্থানটি মুসলমানদের দ্বারা বিজিত করান। এমন কি তাদের জন্যে সূর্যকে কিছুক্ষণের তরে থামিয়ে দিয়েছিলেন, যেন তাদের বিজয় লাভ সম্ভব হয়ে যায়।বিজয়ের পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে নতশিরে উক্ত শহরে প্রবেশ করার নির্দেশ দেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) সিজদার অর্থ রুকু নিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন যে, এখানে সিজদার অর্থ বিনয় ও নম্রতা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দরজাটি ছিল কিবলার দিকে। ওর নাম ছিল বাবুল হিত্তাহ। ইমাম রাযী (রঃ) একথাও বলেছেন যে, দরজার অর্থ হচ্ছে এখানে কিবলার দিক। সিজদার পরিবর্তে তারা জানুর ভরে যেতে আরম্ভ করে এবং পার্শ্বদেশের ভরে প্রবেশ করতে থাকে। মস্তক নত করার পরিবর্তে উচু করে। (আরবি)শব্দের অর্থ হচ্ছে ক্ষমা। কেউ কেউ বলেন যে, এটা সত্যের নির্দেশ। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এতে পাপের স্বীকারোক্তি রয়েছে। হাসান (রঃ) এবং কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এটার অর্থ হচ্ছেঃ “হে আল্লাহ! আমাদের ভুল ত্রুটিগুলো দূর করে দিন।”অতঃপর তাদের সাথে ওয়াদা করা হচ্ছে যে, যদি তারা এটাই বলতে বলতে শহরে প্রবেশ করে এবং বিজয়ের সময়েও বিনয় প্রকাশ করতঃ আল্লাহর নিয়ামত ও নিজেদের পাপের কথা স্বীকার করে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে এটা তাঁর নিকট খুবই প্রিয় বলে তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে সূরা-ই- (আরবি) অবতীর্ণ হয়। এর মধ্যেই এ নির্দেশ দেয়া হয়ঃ “যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং তুমি জনগণকে দেখবে যে তারা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করছে, তখন তুমি তোমার প্রভুর তাসবীহ পাঠ ও প্রশংসা কীর্তন করবে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে, নিশ্চয় তিনি তাওবা কবূলকারী।” এ সূরার মধ্যে যেন যিক্র ও ক্ষমা প্রার্থনার বর্ণনা রয়েছে, তেমনই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণের ইঙ্গিত রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত উমারের (রাঃ) সামনে এ ভাবার্থও বর্ণনা করেছিলেন এবং তা তিনি খুব পছন্দ করেছিলেন।মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন শহরে প্রবেশ করেন, তখন অত্যন্ত বিনয় ও দারিদ্র তার উপর বিরাজ করছিল। তিনি স্বীয় মস্তক এত নীচু করেছিলেন যে, তার উন্ত্রীর জিনে ঠেকে গিয়েছিল। শহরে প্রবেশ করেই তিনি প্রথম প্রহরের আট রাকআত নামায আদায় করেন। ওটা ‘যুহা’র নামায ছিল এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশক নামাযও বটে। দুটোই মুহাদ্দিসগণের কথা।হযরত সা'দ বিন আবি ওক্কাস (রাঃ) ইরান দেশ বিজয়ের পর যখন কিসরার শাহী প্রাসাদে পৌছেন, তখন তিনিও সেই সুন্নাত অনুযায়ী আট রাকআত নামায আদায় করেন। এক সালামে দুই রাকআত করে পড়া কারও কারও মাযহাবে আছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, একই সালামে আট রাকআত পড়তে হবে। আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।সহীহ বুখারী শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বানী ইসরাঈলকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তারা যেন সিজদা করা অবস্থায় ও (আরবি) বলতে বলতে দরজায় প্রবেশ করে। কিন্তু তারা তা পরিবর্তন করে ফেলে এবং জানু ভরে ও (আরবি)বলতে বলতে চলতে থাকে। সুনান-ই-নাসাঈ, মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাক, সুনান-ই-আবি দাউদ, সহীহ মুসলিম এবং জামেউত ক্রিমিযীর মধ্যেও শব্দের বিভিন্নতার সঙ্গে এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। এর সনদ বিশুদ্ধ। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। যাতল হানযাল' নামক ঘাঁটির নিকটবর্তী হলে রাসুলুল্লাহ বলেনঃ “এ ঘাঁটির দৃষ্টান্ত বানী ইসরাঈলের সেই দরজার মত যেখান দিয়ে তাদেরকে নতশিরে এবং (আরবি) বলতে বলতে প্রবেশ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল ও তাদেরকে তাদের পাপ ক্ষমা করে দেয়ার ওয়াদা দেয়া হয়েছিল।” হযরত বারআ’ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) (২:১৪২) নির্বোধ ইয়াহুদীগণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর কথা পরিবর্তন করেছিল। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর পরিবর্তে তারা (আরবি) বলেছিল। তাদের নিজের ভাষায় ওটা ছিল (আরবি) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তাদের এ পরিবর্তনকে বর্ণনা করেন যে, নতশিরে চলার পরিবর্তে তারা জানুর ভরে এবং (আরবি)এর পরিবর্তে (আরবি) (গম) বলতে বলতে চলছিল। হযরত আতা' (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), যহহাক (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), রাবী' বিন আনাস (রঃ), কাতাদাহ (রঃ) এবং ইয়াহইয়াও (রঃ) এটাই বর্ণনা করেছেন। ভাবার্থ এই যে, তাদেরকে যে কথা ও কাজের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তারা তা উপহাস করে উড়িয়ে দিয়েছিল, যা ছিল প্রকাশ্য বিরুদ্ধাচরণ। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি শাস্তি অবতীর্ণ করেন। তিনি বলেনঃ “আমি অত্যাচারীদের উপর তাদের পাপের কারণে আসমানী শাস্তি অবতীর্ণ করেছি।" কেউ বলেছেন অভিশাপ, আবার কেউ বলেছেন মহামারী।একটি মারফু হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মহামারী একটি শান্তি। ওটা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা শুনবে যে, অমুক জায়গায় মহামারী আছে তখন তোমরা তথায় যেয়ো না।” তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এটা দুঃখ, রোগ এবং শাস্তি, যা দ্বারা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল।”
আল-বাকারা 2:59
৫৮-৫৯ নং আয়াতের তাফসীর জিহাদের নির্দেশ ও তা অমান্য করণহযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে নিয়ে যখন মিসরে আসেন এবং তাদেরকে পবিত্র ভূমিতে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়, যা ছিল তাদের পৈত্রিক ভূমি ও তথায় তাদেরকে আমালুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার নির্দেশ দেয়া হয়, তখন তারা কাপুরুষতা প্রদর্শন করে, যার শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে তীহের মাঠ নিক্ষেপ করা হয়। যেমন সূরা-ই- মায়েদায় বর্ণিত হয়েছে। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে বায়তুল মুকাদ্দাস। সুদ্দী (রঃ), রাবী (রঃ), কাতাদাহ্ (রঃ) এবং আবু মুসলিম (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ এটাই বলেছেন। কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে বলেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা পবিত্র ভূমিতে গমন কর যা তোমাদের ভাগ্যে লিখে দেয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা ‘আরীহা' নামক জায়গাকে বুঝান হয়েছে। আবার কেউ কেউ মিসরের কথা বলেছেন। কিন্তু এর ভাবার্থ “বায়তুল মুকাদ্দাস’ হওয়াই সঠিক কথা। এটা তীহ' হতে বের হওয়ার পরের ঘটনা। শুক্রবার সন্ধ্যার সময় আল্লাহ তা'আলা স্থানটি মুসলমানদের দ্বারা বিজিত করান। এমন কি তাদের জন্যে সূর্যকে কিছুক্ষণের তরে থামিয়ে দিয়েছিলেন, যেন তাদের বিজয় লাভ সম্ভব হয়ে যায়।বিজয়ের পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে নতশিরে উক্ত শহরে প্রবেশ করার নির্দেশ দেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) সিজদার অর্থ রুকু নিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন যে, এখানে সিজদার অর্থ বিনয় ও নম্রতা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দরজাটি ছিল কিবলার দিকে। ওর নাম ছিল বাবুল হিত্তাহ। ইমাম রাযী (রঃ) একথাও বলেছেন যে, দরজার অর্থ হচ্ছে এখানে কিবলার দিক। সিজদার পরিবর্তে তারা জানুর ভরে যেতে আরম্ভ করে এবং পার্শ্বদেশের ভরে প্রবেশ করতে থাকে। মস্তক নত করার পরিবর্তে উচু করে। (আরবি)শব্দের অর্থ হচ্ছে ক্ষমা। কেউ কেউ বলেন যে, এটা সত্যের নির্দেশ। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এতে পাপের স্বীকারোক্তি রয়েছে। হাসান (রঃ) এবং কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এটার অর্থ হচ্ছেঃ “হে আল্লাহ! আমাদের ভুল ত্রুটিগুলো দূর করে দিন।”অতঃপর তাদের সাথে ওয়াদা করা হচ্ছে যে, যদি তারা এটাই বলতে বলতে শহরে প্রবেশ করে এবং বিজয়ের সময়েও বিনয় প্রকাশ করতঃ আল্লাহর নিয়ামত ও নিজেদের পাপের কথা স্বীকার করে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে এটা তাঁর নিকট খুবই প্রিয় বলে তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে সূরা-ই- (আরবি) অবতীর্ণ হয়। এর মধ্যেই এ নির্দেশ দেয়া হয়ঃ “যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং তুমি জনগণকে দেখবে যে তারা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করছে, তখন তুমি তোমার প্রভুর তাসবীহ পাঠ ও প্রশংসা কীর্তন করবে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে, নিশ্চয় তিনি তাওবা কবূলকারী।” এ সূরার মধ্যে যেন যিক্র ও ক্ষমা প্রার্থনার বর্ণনা রয়েছে, তেমনই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণের ইঙ্গিত রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত উমারের (রাঃ) সামনে এ ভাবার্থও বর্ণনা করেছিলেন এবং তা তিনি খুব পছন্দ করেছিলেন।মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন শহরে প্রবেশ করেন, তখন অত্যন্ত বিনয় ও দারিদ্র তার উপর বিরাজ করছিল। তিনি স্বীয় মস্তক এত নীচু করেছিলেন যে, তার উন্ত্রীর জিনে ঠেকে গিয়েছিল। শহরে প্রবেশ করেই তিনি প্রথম প্রহরের আট রাকআত নামায আদায় করেন। ওটা ‘যুহা’র নামায ছিল এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশক নামাযও বটে। দুটোই মুহাদ্দিসগণের কথা।হযরত সা'দ বিন আবি ওক্কাস (রাঃ) ইরান দেশ বিজয়ের পর যখন কিসরার শাহী প্রাসাদে পৌছেন, তখন তিনিও সেই সুন্নাত অনুযায়ী আট রাকআত নামায আদায় করেন। এক সালামে দুই রাকআত করে পড়া কারও কারও মাযহাবে আছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, একই সালামে আট রাকআত পড়তে হবে। আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।সহীহ বুখারী শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বানী ইসরাঈলকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তারা যেন সিজদা করা অবস্থায় ও (আরবি) বলতে বলতে দরজায় প্রবেশ করে। কিন্তু তারা তা পরিবর্তন করে ফেলে এবং জানু ভরে ও (আরবি)বলতে বলতে চলতে থাকে। সুনান-ই-নাসাঈ, মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাক, সুনান-ই-আবি দাউদ, সহীহ মুসলিম এবং জামেউত ক্রিমিযীর মধ্যেও শব্দের বিভিন্নতার সঙ্গে এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। এর সনদ বিশুদ্ধ। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। যাতল হানযাল' নামক ঘাঁটির নিকটবর্তী হলে রাসুলুল্লাহ বলেনঃ “এ ঘাঁটির দৃষ্টান্ত বানী ইসরাঈলের সেই দরজার মত যেখান দিয়ে তাদেরকে নতশিরে এবং (আরবি) বলতে বলতে প্রবেশ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল ও তাদেরকে তাদের পাপ ক্ষমা করে দেয়ার ওয়াদা দেয়া হয়েছিল।” হযরত বারআ’ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) (২:১৪২) নির্বোধ ইয়াহুদীগণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর কথা পরিবর্তন করেছিল। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর পরিবর্তে তারা (আরবি) বলেছিল। তাদের নিজের ভাষায় ওটা ছিল (আরবি) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তাদের এ পরিবর্তনকে বর্ণনা করেন যে, নতশিরে চলার পরিবর্তে তারা জানুর ভরে এবং (আরবি)এর পরিবর্তে (আরবি) (গম) বলতে বলতে চলছিল। হযরত আতা' (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), যহহাক (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), রাবী' বিন আনাস (রঃ), কাতাদাহ (রঃ) এবং ইয়াহইয়াও (রঃ) এটাই বর্ণনা করেছেন। ভাবার্থ এই যে, তাদেরকে যে কথা ও কাজের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তারা তা উপহাস করে উড়িয়ে দিয়েছিল, যা ছিল প্রকাশ্য বিরুদ্ধাচরণ। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি শাস্তি অবতীর্ণ করেন। তিনি বলেনঃ “আমি অত্যাচারীদের উপর তাদের পাপের কারণে আসমানী শাস্তি অবতীর্ণ করেছি।" কেউ বলেছেন অভিশাপ, আবার কেউ বলেছেন মহামারী।একটি মারফু হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মহামারী একটি শান্তি। ওটা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা শুনবে যে, অমুক জায়গায় মহামারী আছে তখন তোমরা তথায় যেয়ো না।” তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এটা দুঃখ, রোগ এবং শাস্তি, যা দ্বারা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল।”
আল-বাকারা 2:60
আর একটি পুরস্কারঃএখানে বানী ইসরাঈলকে আর একটি নিয়ামতের কথা স্মরণ করানো হচ্ছে যে, যখন তাদের নবী হযরত মূসা (আঃ) তাদের জন্যে মহান আল্লাহ নিকট পানির প্রার্থনা জানালেন, তখন আল্লাহ তা'আলা বারটি প্রস্রবণ সেই পাথর হতে বের করলেন যা তাদের সাথে থাকতো এবং তাদের প্রত্যেক গোত্রের জন্য তিনি এক একটি ঝর্ণা প্রবাহিত করে দেন যা প্রত্যেক গোত্র জেনে নেয়। অতঃপর আল্লাহ পাক তাদেরকে বলেন যে, তারা যেন মান্না ও সালওয়া' খেতে থাকে এবং ঐ ঝর্ণার পানি পান করতে থাকে, আর বিনা পরিশ্রমে প্রাপ্ত ঐ আহার্য ও পানীয় খেয়ে ও পান করে যেন তারা তাঁর ইবাদত করতে থাকে, কিন্তু তারা যেন তাঁর অবাধ্য হয়ে দুনিয়ার বুকে ফাসাদ সৃষ্টি না করে, নচেৎ সেই নিয়ামত তাদের নিকট হতে কেড়ে নেয়া হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা একটা চার কোণ বিশিষ্ট পাথর ছিল যা তাদের সাথেই থাকতো। আল্লাহর নির্দেশক্রমে হযরত মূসা (আঃ) ওর উপর লাঠি দ্বারা আঘাত করলে চার কোণা হতে তিনটি করে বারোটি ঝর্ণা বেরিয়ে আসে। পাথরটি বলদের মাথার মত ছিল যা বলদের উপর চাপিয়ে দেয়া হতো। তারা যেখানে যেখানে অবতরণ করতো, ওটা নামিয়ে রাখতে এবং লাঠির আঘাত করতেই ওটা হতে ঝর্ণা বেরিয়ে আসতো। আবার যখন যাত্রা আরম্ভ করতো তখন ঝর্ণা বন্ধ হয়ে যেতো। এবং তারা তা উঠিয়ে নিতো। ঐ পাথরটি ছিল তূর পাহাড়ের। ওটা ছিল এক হাত লম্বা ও এক হাত চওড়া। কেউ কেউ বলেন যে, ওটা ছিল বেহেশতী পাথর, যা দশ হাত লম্বা ও দশ হাত চওড়া ছিল। ওর দু’টি শাখা ছিল যা ঝলমল করতো। অন্য একটি মত এই যে, ঐ পাথরটি হযরত আদম (আঃ)-এর সাথে বেহেশত হতে এসেছিল এবং এভাবে হস্তান্তর হতে হতে হযরত শুআইব (আঃ) ওটা প্রাপ্ত হন এবং তিনি লাঠি ও পাথরটি হযরত মূসা (আঃ) কে প্রদান করেন।কেউ কেউ বলেন যে, ওটা ছিল সেই পাথর যার উপর হযরত মূসা (আঃ) তার কাপড় রেখে গোসল করছিলেন এবং আল্লাহর নির্দেশক্রমে পাথরটি তার কাপড় নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর পরামর্শক্রমে তিনি পাথরটি উঠিয়ে নিয়েছিলেন এবং ওটা হতেই তার মুজিযা প্রকাশ পায়। ইমাম যামাখশারী (রঃ) বলেন যে, ওটা কোন নির্দিষ্ট পাথর ছিল না, বরং তাকে যে কোন একটি পাথরে আঘাত করতে বলা হয়েছিল। হযরত হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে এবং এর দ্বারাই মুজিযার পূর্ণতা প্রকাশ পায়। তার লাঠিটা দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হলেই তা বইতে থাকতো, অন্য লাঠি দ্বারা আঘাত করলেই তা শুকিয়ে যেতো। বানী ইসরাঈল পরস্পর বলাবলি করতে থাকে যে, ঐ পাথরটি হারিয়ে গেলেই তারা পিপাসায় মরে যাবে। তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ) কে বলেনঃ “তুমি লাঠি দ্বারা আঘাত করো না, শুধু মুখেই উচ্চারণ কর, তাহলে তাদের বিশ্বাস হবে।” আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রত্যেক গোত্র আপন আপন ঝরণা এভাবে চিনতো যে, প্রত্যেক গোত্রের এক একটি লোক পাথরের পার্শ্বে দাড়িয়ে যেতো এবং লাঠির আঘাত দেয়া মাত্রই ওটা হতে ঝরণা বেরিয়ে আসত। যে ব্যক্তির দিকে যে ঝরণা বয়ে আসতো সে, তখন তার গোত্রকে ডেকে বলতোঃ “এই ঝরণা তোমাদের।” এটা তীহ' প্রান্তরের ঘটনা। সূরা-ই-আ'রাফের মধ্যেও এ ঘটনা বর্ণিত আছে। কিন্তু ঐ সূরাটি মাক্কী’ বলে তথায় ওটার বর্ণনা নাম পুরুষের সর্বনাম দ্বারা করা হয়েছে এবং আল্লাহ তা'আলা যেসব অনুগ্রহ তাদের উপর করেছিলেন, স্বীয় রাসূলের (সঃ) সামনে তিনি তার পুনরাবৃত্তি করেছেন।আর এই সূরাটি ‘মাদানী' বলে এখানে স্বয়ং তাদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে। সূরা-ই-আ'রাফের মধ্যে (আরবি) বলেছেন এবং এখানে (আরবি) বলেছেন। কেননা, সেখানে প্রথম প্রথম জারী হওয়ার অর্থ এবং এখানে শেষ অবস্থার বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। এই দু’জায়গায় দশটি যুক্তিতে পার্থক্য রয়েছে এবং এ পার্থক্য শব্দ ও অর্থ উভয় হিসেবেই। ইমাম যামাখশারী (রঃ) এসব যুক্তি বর্ণনা করেছেন,এবং প্রকৃতভাব প্রায় একই।
আল-বাকারা 2:61
এখানে বানী ইসরাঈলের অধৈর্য এবং আল্লাহ্ তা'আলার নিয়ামতের অমর্যাদা করার কথা বর্ণিত হচ্ছে। তারা মান্না ও সালওয়া'র মত পবিত্র আহার্যের উপরেও ধৈর্য ধারণ করতে পারেনি এবং তার পরিবর্তে নিকৃষ্ট বস্তুর জন্যে প্রার্থনা জানায়। একই খাদ্যের ভাবার্থ হচ্ছে এক প্রকারের খাদ্য, অর্থাৎ মান্না ও সালওয়া'। (আরবি)-এর অর্থে মতভেদ আছে। ইবনে মাসউদের (রাঃ) পঠনে (আরবি) আছে। মুজাহিদ (রঃ) (আরবি)-এর তাফসীর (আরবি) করেছেন, অর্থাৎ রসুন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এই তাফসীর বর্ণিত আছে। পরবর্তী অভিধানের পুস্তকগুলোতে (আরবি) র অর্থ হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ আমাদের জন্যে রুটি তৈরী কর। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, যদি এটা সঠিক হয় তবে এটা (আরবি) -এর অন্তর্ভুক্ত হবে। যেমন, (আরবি) ও (আরবি) এবং (আরবি) ও (আরবি) ইত্যাদি যাতে (আরবি) অক্ষরটি (আরবি) দ্বারা এবং (আরবি) অক্ষরটি (আরবি) অক্ষর দ্বারা পরিবর্তিত হয়েছে। কেননা, এ দু'টি অক্ষরের বের হওয়ার স্থান খুব কাছাকাছি। আল্লাহ্ই সবচেয়ে বেশী জানেন।কেউ কেউ বলেন যে, (আরবি) -এর অর্থ হচ্ছে গম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ তাফসীর নকল করা হয়েছে। আহীহার কবিতাতেও (আরবি) শব্দটি গমের - অর্থে ব্যবহৃত হতো (আরবি) এর অর্থ রুটিও বলা হয়। কেউ কেউ শীষের অর্থও নিয়েছেন। হযরত কাতাদাহ (রঃ) এবং হযরত আতা (রঃ) বলেন যে, যে শস্যে রুটি তৈরী হয় তাকে (আরবি) বলে। কেউ কেউ বলেন যে, প্রত্যেক প্রকারের শস্যকেই (আরবি) বলা হয়। হযরত মূসা (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে ধমক দিয়ে বলেনঃ ‘উৎকৃষ্ট বস্তুর পরিবর্তে নিকৃষ্ট বস্তু তোমরা কেন চাচ্ছ? অতঃপর বলেনঃ ‘তোমরা শহরে এসব জিনিস পাবে।' জমহুরের পঠনে (আরবি) (মিসরান)ই আছে এবং সব পঠনেই এটাই লিখিত আছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে বলেনঃ 'তোমরা কোন এক শহরে চলে যাও। হযরত উবাই বিন কা'ব (রাঃ) এবং হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) (মিসরা)ও আছে এবং এর তাফসীরে মিসর শহর বুঝানো হয়েছে। (আরবি) শব্দটি দ্বারাও নির্দিষ্ট ‘মিসর শহর ভাবার্থ নেয়া যেতে পারে (আরবি) -এর অর্থ সাধারণ শহর নেয়াই উত্তম। তাহলে ভাবার্থ দাঁড়াবে এইঃ “তবে তোমরা যা চাচ্ছো তা খুব সহজ জিনিস। যে কোন শহরে গেলেই ওটা পেয়ে যাবে। দু'আরই বা প্রয়োজন। কি? তাদের একথা শুধুমাত্র অহংকার ও অবাধ্যতা হিসেবে ছিল বলে তাদেরকে কোন উত্তর দেয়া হয়নি। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।ভাবার্থ এই যে, তাদের উপর লাঞ্ছনা ও দারিদ্র চিরস্থায়ী করে দেয়া হয়। অপমান ও হীনতা তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়। তাদের নিকট হতে জিযিয়া কর আদায় করা হয়। তারা মুসলমানদের পদানত হয়। তাদেরকে উপবাস করতে হয় এবং ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিতে হয়। তাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ ও অভিশাপ বর্ষিত হয় (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে তারা ফিরে গেল। কখনও ভালো অবস্থা এবং কখনও কখনও মন্দের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এখানে মন্দ বুঝানোর জন্য এসেছে। তাদের অহংকার, অবাধ্যতা, সত্য গ্রহণে অস্বীকৃতি, আল্লাহর আয়াতসমূহের প্রতি অবিশ্বাস এবং নবীগণ ও তাদের অনুসারীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা ইত্যাদির কারণেই তাদের প্রতি এসব শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছিল। আল্লাহর আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করা এবং তাঁর নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার চেয়ে বড় অপরাধ আর কী হতে পারে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে, তাকাব্বরের অর্থ হচ্ছে সত্য গোপন করা এবং জনগণকে ঘৃণার চোখে দেখা। হযরত মালিক বিন মারারাহ্ রাহভী (রাঃ) একদা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট আরজ করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি একজন সুশ্রী লোক। আমি চাই না, কারও জুতার শুকতলাও আমার চেয়ে সুন্দর হয়, তবে কি এটাও অবাধ্যতা ও অহংকার হবে?” তিনি বলেনঃ “না, বরং অহংকার ও অবাধ্যতা হচ্ছে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং জনগণকে ঘৃণা করা।”বানী ইসরাঈলের অহংকার, কুফরী এবং হত্যার কাজ নবীগণ পর্যন্তও পৌছে গিয়েছিল বলেই তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ অবধারিত হয়েছে। তারা ইহকালেও অভিশপ্ত এবং পরকালেও অভিশপ্ত। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, বানী ইসরাঈল প্রত্যহ তিনশ' করে নবীকে হত্যা করতো। তারপরে বাজারে গিয়ে তাদের লেনদেনের কাজে লেগে যেত (সুনান-ই-আবি দাউদ ও তায়ালেসী)।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন যাদের সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে তারা হচ্ছে ওরাই যাদেরকে নবী হত্যা করেছেন অথবা তারা নবীকে হত্যা করেছে, পথভ্রষ্ট ইমাম এবং চিত্র শিল্পী।” এগুলো তাদের অবাধ্যতা, যুলুম এবং সীমা অতিক্রমের প্রতিফল ছিল।
আল-বাকারা 2:62
সৎ লোকেদের প্রতিদানউপরে অবাধ্যদের শাস্তির বর্ণনা ছিল। এখানে তাদের মধ্যে যারা ভাল লোক ছিল তাদের প্রতিদানের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। নবীর অনুসারীদের জন্যে এ সু-সংবাদ কিয়ামত পর্যন্ত রয়েছে যে, তারা ভবিষ্যতের ভয় হতে নির্ভয় এবং অতীতের হাত ছাড়া জিনিসের জন্যে আফসোস করা হতে পবিত্র।অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘মনে রেখো, আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।" যে ফেরেশতাগণ মুসলমানদের রুহ্ বের হবার সময় আগমন করে থাকেন। তাঁদের কথা উদ্ধৃত করে কুরআন মাজীদে বলা হয়েছেঃ “তোমরা ভয় করো না এবং চিন্তিত হয়ো না, আর তোমরা ঐ বেহেশতের সুসংবাদ গ্রহণ কর, তোমাদেরকে যার ওয়াদা দেয়া হয়েছিল।”হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাজির হওয়ার পূর্বে যেসব ধর্মপ্রাণ লোকের সাথে সাক্ষাৎ করি, তাদের নামায, রোযা ইত্যাদির বর্ণনা দেই। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় (মুসনাদ-ই- ইবনে আবি হাতিম)।" আর একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত সালমান (রাঃ) তাদের আলোচনা করতে গিয়ে বলেনঃ “তারা নামায, রোযাদার ও ঈমানদার ছিল এবং আপনি যে প্রেরিত পুরুষ এর উপরও তাদের বিশ্বাস ছিল।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তারা জাহান্নামী।” এতে হযরত সালমান (রাঃ) দুঃখিত হলে সেখানেই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এটা স্পষ্ট কথা যে, ইয়াহূদীদের মধ্যে ঈমানদার ঐ ব্যক্তি যে তাওরাতের উপর ঈমান আনে এবং তা অনুযায়ী কাজ করে, কিন্তু যখন হযরত ঈসা (আঃ) আগমন। করেন তখন তারও অনুসরণ করে এবং তার নবুওয়াতকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু তখনও যদি তাওরাতের উপর অটল থাকে এবং হযরত ঈসা (আঃ) কে অস্বীকার করতঃ তাঁর অনুসরণ না করে, তবে সে বে-দ্বীন হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে, খ্রীষ্টানদের মধ্যে ঈমানদার ঐ ব্যক্তি যে ইঞ্জীলকে আল্লাহর কিতাব বলে বিশ্বাস করে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর শরীয়ত অনুযায়ী আমল করে এবং তার যুগে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কে পেলে তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে ও তার নবুওয়াতকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু তখনও যদি ইঞ্জীল ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর আনুগত্যের উপর স্থির থাকে এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর সুন্নাতের অনুসরণ না করে তবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)। সুদ্দীও (রঃ) এটাই বর্ণনা করেছেন। সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) এটাই বলেছেন। ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেক নবীর অনুসারী, তাঁকে মান্যকারী হচ্ছে ঈমানদার ও সৎলোক। সুতরাং সে আল্লাহ তা'আলার নিকট মুক্তি পেয়ে যাবে। কিন্তু তার যুগেই যদি অন্য নবী এসে যান এবং নবীকে সে অস্বীকার করে তবে সে কাফির হয়ে যাবে। কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম অনুসন্ধান করে, তা কবুল করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এই দু'টি আয়াতের মধ্যে আনুকূল্য এটাই। কোন ব্যক্তির কোন কাজও কোন পন্থা গ্রহণীয় নয় যে পর্যন্ত না শরীয়তে মুহাম্মদীর (সঃ) অনুরূপ হয়। কিন্তু এটা সে সময় যে সময় তিনি প্রেরিতরূপে দুনিয়ায় এসে গেছেন। তার পূর্বে যে নবীর যুগ ছিল এবং যেসব লোক সে যুগে ছিল তাদের জন্যে সে নবীর অনুসরণ ও তার শরীয়তের অনুসরণ করা শর্ত।‘ইয়াহুদ' এর ইতিহাস(আরবি) শব্দ (আরবি) হতে নেয়া হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে বন্ধুত্ব'। কিংবা এটা (আরবি)শব্দ হতে নেয়া হয়েছে, এর অর্থ হচ্ছে ‘তাওবা। যেমন কুরআন মাজীদে আছে (আরবি) “অর্থাৎ (হযরত মূসা আঃ) বলেন হে আল্লাহ!) নিশ্চয় আমরা আপনার নিকট তাওবা করেছি (৭:১৫৬)।” সুতরাং তাদেরকে শব্দটি এ কারণেই ইয়াহুদী বলা হয়েছে অর্থাৎ তাওবার কারণে এবং পরস্পর বন্ধুত্বের কারণে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা ইয়াহুদের সন্তান ছিল বলে তাদেরকে ইয়াহুদী বলা হয়েছে। হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর বড় ছেলে নাম ছিল ইয়াহূদ। একটি মত এও আছে যে তারা তাওরাত পড়ার সময় নড়াচড়া করতো বলে তাদেরকে ইয়াহূদ অর্থাৎ হরকতকারী বলা হয়েছে। ‘নাসারা’ এর ইতিহাস হযরত ঈসার (আঃ) নবুওয়াতের যুগ আসলে বানী ইসরাঈলের উপর তার নবুওয়াতকে বিশ্বাস করা এবং তাঁর অনুসারী হওয়া ওয়াজিব হয়ে যায় এবং তাদের নাম হয় নাসারা' অর্থাৎ সাহায্যকারী। কেননা, তারা একে অপররের সাহায্য করেছিল। তাদেরকে আনসারও বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে হযরত ঈসার (আঃ) কথা উদ্ধৃত করে বলা হয়েছেঃ “আল্লাহর দ্বীনে আমার সাহায্যকারী কে আছে? হাওয়ারীগণ বলে-আমরা আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্যকারী। কেউ কেউ বলেন যে, এসব লোক যেখানে অবতরণ করে ঐ জায়গার নাম ছিল নাসেরাহ', এ জন্যে তাদেরকে নাসারা' বলা হয়েছে। কাতাদাহ (রঃ) এবং ইবনে জুরাইজের এটাই মত (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহুবচন। যেমন (আরবি) শব্দের বহুবচন (আরবি) শব্দের বহুবচন , (আরবি) এর স্ত্রীলিঙ্গ (আরবি) এসে থাকে। অতঃপর যখন শেষ নবীর (সঃ) যুগ এসে গেল এবং তিনি সারা দুনিয়ার জন্যে রাসূলরূপে প্রেরিত হলেন তখন তাদের সবারই উপর তার সত্যতা স্বীকার ও তার অনুসরণ ওয়াজিব হয়ে গেল। আর তাঁর উম্মতের ঈমান বা বিশ্বাসের পরিপক্কতার কারণে তাদের নাম রাখা হয় মুমিন এবং এ জন্যেও যে, পূর্বের নবীগণের প্রতি ও ভবিষ্যতের সমস্ত কথার প্রতিও তাদের ঈমান রয়েছে। সাবেঈ দল(আরবি)-এর একটি অর্থ তো হচ্ছে বে-দ্বীন ও ধর্মহীন। এটা আলে কিতাবের একটি দলেরও নাম ছিল যারা যাকূর' পড়তো। এর উপর ভিত্তি করেই ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এবং ইসহাক (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, তাদের হাতে যবাহকৃত প্রাণী আমাদের জন্যে হালাল এবং তাদের নারীদেরকে বিয়ে করাও বৈধ। হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত হাকাম (রঃ) বলেন যে, এ দলটি মাজুসদের মত। এটাও বর্ণিত আছে যে, তারা ফেরেশতাদের পূজা করতো। জিয়াদ যখন শুনেন যে, তারা কেবলামুখী হয়ে পাচ ওয়াক্ত নামায পড়ে থাকে, তখন তিনি তাদের জিযিয়া কর মাফ করতে চাইলেন, কিন্তু সাথে সাথেই জানতে পারেন যে,তারা মুশরিক। তখন তিনি তার ঐ ইচ্ছা হতে বিরত হন। আবৃজ্জিনাদ (রঃ) বলেন যে, সাবেঈরা ইরাকের কাওসা’র অধিবাসী। তারা সব নবীকেই মানে। প্রতি বছর ত্রিশটি রোযা রাখে। এবং ইয়ামনের দিকে মুখ করে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে। অহাব বিন মামবাহ্ (রঃ) বলেন যে, তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে। কিন্তু তারা কোন শরীয়তের অনুসারী নয় এবং কাফিরও নয়। আবদুর রহমান বিন যায়েদের কথা এই যে, এটাও একটি মাযহাব। তারা মুসিলদ্বীপে ছিল। তারা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়তো। কিন্তু কোন কিতাব বা কোন নবীকে মানতো না। এবং নির্দিষ্ট কোন শরীয়তেরও তারা অনুসারী ছিল না। এর উপর ভিত্তি করেই মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কেও তার সাহাবীবর্গকে (রাঃ) ‘সাবী’ বলতো, অর্থাৎ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার কারণে। তাদের ধর্ম খৃষ্টানদের ধর্মের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তাদের কিবলাহ ছিল দক্ষিণ দিক। তারা নিজেদেরকে হযরত নূহের (আঃ) ধর্মাবলম্বী বলতো। একটি মত এও আছে যে, ইয়াহূদ ও মাজুস ধর্মের মিশ্রণই ছিল এ মাযহাবটি। তাদের যবাহকৃত প্রাণী খাওয়া এবং তাদের নারীদেরকে বিয়ে করা অবৈধ। মুজাহিদ (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং ইবনে আবি নাজীহের এটাই ফওয়া। কুরতুবী (রঃ) বলেনঃ “আমি যেটুকু জেনেছি তাতে বুঝেছি যে, সাবেঈরা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিল, কিন্তু তারকার ফলাফলের প্রতি এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাসী ছিল। আবূ সাঈদ ইসতাখরী (রঃ) তাদের উপর কুফরীর ফওয়া দিয়েছেন। ইমাম রাযী বলেন যে, তারা ছিল তারকা পূজক। তারা কাসরানীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল যাদের নিকট হযরত ইব্রাহীম (আঃ) প্রেরিত হয়েছিলেন। প্রকৃত অবস্থা তো আল্লাহ তা'য়ালাই জানেন, তবে বাহ্যতঃ এ মতটিই সঠিক বলে মনে হচ্ছে যে, এসব লোকে ইয়াহুদী, খৃষ্টান, মাজুসী বা মুশরিক ছিল না। বরং তারা স্বভাব ধর্মের উপর ছিল। তারা কোন বিশেষ মাযহাবের অনুসারী ছিল না। এই অর্থেই মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীবর্গকে (রাঃ) সাবী’ বলতো, অর্থাৎ তারা সমস্ত ধর্ম পরিত্যাগ করেছেন। কোন কোন আলেমের মত এই যে, সাবী’ তারাই যাদের কাছে কোন নবীর দাওয়াত পৌছেনি। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।
আল-বাকারা 2:63
৬৩-৬৪ নং আয়াতের তাফসীরএ আয়াত দু'টোতে আল্লাহ্ তা'আলা বানী ইসরাঈলকে আহাদ ও অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেনঃ ‘আমার ইবাদত ও আমার নবী (আঃ)-এর অনুসরণের অঙ্গীকার আমি তোমাদের কাছে নিয়েছিলাম এবং সেই অঙ্গীকার পুরো করার জন্যে আমি তূর পাহাড়কে তোমাদের মাথার উপর সমুচ্চ করেছিলাম।" যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ যখন আমি পাহাড়কে সামিয়ানার মত তাদের মাথার উপর সমুচ্চ করেছিলাম এবং তারা এই বিশ্বাস করে ফেলেছিল যে, তা তাদের প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়ে তাদেরকে দলিত করবে, সে সময় আমি বলেছিলাম যে, আমার প্রদত্ত জিনিসকে শক্ত করে ধর এবং ওর মধ্যে যা কিছু আছে তা স্মরণ কর-তা হলে রক্ষা পেয়ে যাবে।'‘তূর-এর ভাবার্থ পাহাড়-যেমন সূরা-ই- আ'রাফের আয়াতে আছে এবং সাহাবীগণ (রাঃ) ও তাবেঈগণ এর তাফসীর করেছেন। আর এটাই স্পষ্ট। প্র’ ঐ পাহাড়কে বলা হয় যার উপর গাছ পালা জন্মে। ফিৎনার হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তারা আনুগত্য স্বীকারে অসম্মত হলে পাহাড়টি তাদের মাথার উপর উঠিয়ে দেয়া হয় যেন তারা আনুগত্য স্বীকারে সম্মত হতে বাধ্য হয়। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তারা সিজদা করতে অস্বীকতি জ্ঞাপন করায় তাদের মাথার উপর পর্বত উঠে যায়। কিন্তু সাথে সাথেই তারা সিজদায় পড়ে যায় এবং ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে আড় চোখে উপরের দিকে দেখতে থাকে। এতে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সদয় হন এবং পাহাড় সরিয়ে নেন। এ জন্যেই তারা ঐ সিজদাই পছন্দ করে যে, অর্ধেক দেহ সিজদায় থাকে এবং অন্য দিক দিয়ে উপরের দিকে দেখতে থাকে। যা আমি দিয়েছি’ এর ভাবার্থ হচ্ছে তাওরাত'। -এর অর্থ হচ্ছে শক্তি। অর্থাৎ “তোমরা তাওরাতকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতঃ এর উপর আমল করার অঙ্গীকার কর, নতুবা তোমাদের উপর পাহাড় নিক্ষেপ করা হবে। আর এর মধ্যে যা আছে তা স্মরণ কর’ অর্থাৎ তাওরাত পড়তে থাক।” কিন্তু তারা এতো পাকা ও শক্ত অঙ্গীকারকেও গ্রাহ্য করলো না এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দিলো।এখন মহান আল্লাহ যদি দয়াপরবশ হয়ে তাদের তাওবা ককূল না করতেন এবং নবীদের (আঃ) ক্ৰম পরম্পরা চালু না রাখতেন তবে অবশ্যই তারা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এই ওয়াদা ভঙ্গের কারণে তারা দুনিয়া ও আখেরাতে ধ্বংস হয়ে যেতো।
আল-বাকারা 2:64
৬৩-৬৪ নং আয়াতের তাফসীরএ আয়াত দু'টোতে আল্লাহ্ তা'আলা বানী ইসরাঈলকে আহাদ ও অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেনঃ ‘আমার ইবাদত ও আমার নবী (আঃ)-এর অনুসরণের অঙ্গীকার আমি তোমাদের কাছে নিয়েছিলাম এবং সেই অঙ্গীকার পুরো করার জন্যে আমি তূর পাহাড়কে তোমাদের মাথার উপর সমুচ্চ করেছিলাম।" যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ যখন আমি পাহাড়কে সামিয়ানার মত তাদের মাথার উপর সমুচ্চ করেছিলাম এবং তারা এই বিশ্বাস করে ফেলেছিল যে, তা তাদের প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়ে তাদেরকে দলিত করবে, সে সময় আমি বলেছিলাম যে, আমার প্রদত্ত জিনিসকে শক্ত করে ধর এবং ওর মধ্যে যা কিছু আছে তা স্মরণ কর-তা হলে রক্ষা পেয়ে যাবে।'‘তূর-এর ভাবার্থ পাহাড়-যেমন সূরা-ই- আ'রাফের আয়াতে আছে এবং সাহাবীগণ (রাঃ) ও তাবেঈগণ এর তাফসীর করেছেন। আর এটাই স্পষ্ট। প্র’ ঐ পাহাড়কে বলা হয় যার উপর গাছ পালা জন্মে। ফিৎনার হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তারা আনুগত্য স্বীকারে অসম্মত হলে পাহাড়টি তাদের মাথার উপর উঠিয়ে দেয়া হয় যেন তারা আনুগত্য স্বীকারে সম্মত হতে বাধ্য হয়। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তারা সিজদা করতে অস্বীকতি জ্ঞাপন করায় তাদের মাথার উপর পর্বত উঠে যায়। কিন্তু সাথে সাথেই তারা সিজদায় পড়ে যায় এবং ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে আড় চোখে উপরের দিকে দেখতে থাকে। এতে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সদয় হন এবং পাহাড় সরিয়ে নেন। এ জন্যেই তারা ঐ সিজদাই পছন্দ করে যে, অর্ধেক দেহ সিজদায় থাকে এবং অন্য দিক দিয়ে উপরের দিকে দেখতে থাকে। যা আমি দিয়েছি’ এর ভাবার্থ হচ্ছে তাওরাত'। -এর অর্থ হচ্ছে শক্তি। অর্থাৎ “তোমরা তাওরাতকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতঃ এর উপর আমল করার অঙ্গীকার কর, নতুবা তোমাদের উপর পাহাড় নিক্ষেপ করা হবে। আর এর মধ্যে যা আছে তা স্মরণ কর’ অর্থাৎ তাওরাত পড়তে থাক।” কিন্তু তারা এতো পাকা ও শক্ত অঙ্গীকারকেও গ্রাহ্য করলো না এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দিলো।এখন মহান আল্লাহ যদি দয়াপরবশ হয়ে তাদের তাওবা ককূল না করতেন এবং নবীদের (আঃ) ক্ৰম পরম্পরা চালু না রাখতেন তবে অবশ্যই তারা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এই ওয়াদা ভঙ্গের কারণে তারা দুনিয়া ও আখেরাতে ধ্বংস হয়ে যেতো।
আল-বাকারা 2:65
৬৫-৬৬ নং আয়াতের তাফসীর চেহারা পরিবর্তনের ঘটনাসুরা-ই-আ'রাফের মধ্যে এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। তথায় এর তাফসীরও ইনশাআল্লাহ পূর্ণভাবে করা হবে। ঐলোকগুলো আইলা নামক গ্রামের অধিবাসী ছিল। শনিবার দিনের সম্মান করা তাদের উপর ফরয করা হয়েছিল। ঐদিনে শিকার করা তাদের জন্যে নিষিদ্ধ ছিল। আর মহান আল্লাহর হুকুমে সেই দিনেই নদীর ধারে মাছ খুব বেশী আসতো। তারা একটা কৌশল অবলম্বন করতো। একটা গর্ত খনন করে শনিবারে ওর মধ্যে রঞ্জু ও কাটা ফেলে দিতো। শনিবারে মাছসমূহ ঐ ফাদে পড়ে যেতো। রোববারের রাতে তারা ওগুলো ধরে নিতো। ঐ অপরাধের কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের রূপ বদলিয়ে দেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তাদের আকার পরিবর্তিত হয়নি, বরং অন্তর পরিবর্তিত হয়েছিল। এটা শুধুমাত্র দৃষ্টান্ত স্বরূপ আনা হয়েছে। যেমন আল্লাহ রাব্বল আলামীন আমলহীন আলেমের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন গাধার সঙ্গে। কিন্তু একথাটি দুর্বল। তা ছাড়া এটা কুরআন কারীমের প্রকাশ্য শব্দেরও বিপরীত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যুবকেরা বানর হয়েছিল এবং বুড়োরা শূকর হয়েছিল। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, নারী পুরুষ সবাই তারা লেজযুক্ত বানর হয়ে গিয়েছিল। আকাশবাণী হয়ঃ “তোমরা সব বানর হয়ে যাও।" আর তেমনই সব বানর হয়ে যায়। যেসব লোক তাদেরকে ঐ কৌশল অবলম্বন করতে নিষেধ করেছিল তারা তখন তাদের নিকট এসে বলতে থাকেঃ “আমরা কি তোমাদেরকে পূর্বেই নিষেধ করিনি?" তখন তারা মাথা নেডে সম্মতি জানায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অল্প সময়ের মধ্যে তারা সব ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এবং তাদের বংশ বৃদ্ধি হয়নি। দুনিয়ায় কোন আকার পরিবর্তিত গোত্র তিন দিনের বেশী বাঁচেনি। এরাও তিন দিনের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যায়। নাক ঘসটাতে ঘসটাতে তারা সব মরে যায়। পানাহার ও বংশ বৃদ্ধি সবই বিদায় নেয়। যে বানরগুলো এখন আছে এবং তখনও ছিল, এরা তো জন্তু এবং এরা এভাবেই সৃষ্ট হয়েছে। আল্লাহ পাক যা চান এবং যেভাবে চান, তাই সৃষ্টি করে থাকেন এবং সেভাবেই সৃষ্টি করে থাকেন। তিনি মহান ক্ষমতাবান। ঘটনার বিস্তারিত আলোচনাঃহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, শুক্রবারের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করা তাদের উপর ফরয করা হয়, কিন্তু তারা শুক্রবারের পরিবর্তে শুনিবারকে পছন্দ করে। ঐ দিনের সম্মানার্থে তাদের জন্যে ঐদিনে শিকার ইত্যাদি হারাম করে দেয়া হয়। ওদিকে আল্লাহর পরীক্ষা হিসেবে ঐদিনই সমস্ত মাছ নদীর ধারে চলে আসতো এবং লাফা ঝাপা দিতো। অন্য দিনে ও গুলো দেখাই যেত না। কিছু দিন পর্যন্ত তো ঐসব লোক নীরবই থাকে এবং শিকার করা হতে বিরত থাকে। একদিন ওদের মধ্যে একটি লোক এই ফন্দি বের করে যে,শনিবার মাছ ধরে জালের মধ্যে আটকিয়ে দেয়া এবং তীরের কোন জিনিসের সঙ্গে বেঁধে রাখে। তারপরে রোববার দিন গিয়ে ওগুলো বের করে নেয় এবং বাড়ীতে এনে রেধে খায়। মাছের সুগন্ধ পেয়ে লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে“আমি তো আজ রোববারে মাছ শিকার করেছি। অবশেষে এ রহস্য খুলে যায়। লোকেরাও এ কৌশল পছন্দ করে এবং ঐভাবে তারা মাছ শিকার করতে থাকে। কেউ কেউ নদীর তীরে গর্ত খনন করে। শনিবারে মাছগুলো ঐ গর্তের ভিতরে জমা হলে তারা ওর মুখ বন্ধ করে দিতে। রোববারে ধরে নিতো। তাদের মধ্যে যারা খাঁটি মুমিন ছিল তারা তাদেরকে এ কাজে বাধা দিতো এবং নিষেধ করতো। কিন্তু তাদের উত্তর এই হলো আমরা তো শনিবারে শিকারই করি না, শিকার করি আমরা রোববারে।শিকারকারী ও নিষেধকারীদের ছাড়া আরও একটি দল সৃষ্টি হয়ে যায়, যারা দুই দলকেই সন্তুষ্ট রাখতো। তারা নিজেরা শিকার করতো না বটে, কিন্তু যারা শিকার করতো তাদেরকে নিষেধও করতো না। বরং নিষেধকারীগণকে বলতোঃ “তোমরা এমন কওম'কে উপদেশ কেন দিচ্ছ যাদেরকে আল্লাহ তাআলা ধ্বংস করবেন কিংবা কঠিন শাস্তি দেবেন? তোমরা তো তোমাদের কত পালন করেছো যেহেতু তাদেরকে নিষেধ করেছে। তারা যখন মানছে না তখন তাদেরকে তাদের কাজের উপর ছেড়ে দাও"। তখন নিষেধকারীগণ উত্তর দিতোঃ “একেতো এ জন্যে যে, আমরা আল্লাহ পাকের নিকট ওজর পেশ করতে পারবো। দ্বিতীয়তঃ এজন্যেও যে, তারা হয়তো আজ না হলে কাল কিংবা কাল হলে পরশু আমাদের কথা মানতে পারে এবং আল্লাহর কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পেয়ে যেতে পারে। অবশেষে এই মুমিন দলটি সেই কৌশলীদল হতে সম্পূর্ণ রূপে সম্পর্ক ছিন্ন করলো এবং তাদের থেকে পৃথক হয়ে গেল। গ্রামের মধ্যস্থলে একটি প্রাচীর দিয়ে দিল। একটি দরজা দিয়ে এরা যাতায়াত করে এবং অপর দরজা দিয়ে ঐ ফাঁকিবাজেরা যাতায়াত করে। এভাবেই দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়। হঠাৎ এক বিস্ময়জনক ঘটনা ঘটে। একদা রাত্রি শেষে দিন হয়েছে। মুমিনরা সব জেগে উঠেছে। কিন্তু এ পর্যন্ত ঐ ফন্দিবাজেরা তাদের দরজা খুলেনি এবং কোন সাড়া শব্দও পাওয়া যায় না। মুমিনরা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি? শেষে অত্যাধিক বিলম্বের পরেও যখন তাদের কোন খোঁজ পাওয়া গেল না তখন তারা প্রাচীরের উপরে উঠে গেল। তথায় এক বিস্ময়কর দৃশ্য তারা অবলোকন করলো। তারা দেখলো যে, ঐ ফন্দিবাজেরা নারী ও শিশুসহ সবাই বানর হয়ে গেছে। তাদের ঘরগুলো রাত্রে যেমন বন্ধ ছিল ঐরূপ বন্ধই আছে। আর ভিতরে সমস্ত মানুষ বানরের আকার বিশিষ্ট হয়ে গেছে। এবং ওদের লেজও বেরিয়েছে। শিশুরা ছোট বানর, পুরুষেরা বড় বানর এবং নারীরা বানরীতে পরিণত হয়েছে। প্রত্যেককেই চেনা যাচ্ছে যে, এ অমুক তোক সে অমুক নারী। এবং এ অমুক শিশু ইত্যাদি।এতে যে শুধু মাছ শিকারকারীরাই ধ্বংস হয়েছিল তা নয়, বরং যারা তাদেরকে শুধু নিষেধ করেই চুপচাপ বসে থাকতো এবং তাদের সাথে মেলা মেশা বন্ধ করতো না তারাও ধ্বংস হয়েছিল। এ শাস্তি থেকে শুধুমাত্র তারাই মুক্তি পেয়েছিল যারা তাদেরকে নিষেধ করতঃ তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক হয়েছিল। এ সমুদয় কথা এবং কুরআন মাজীদের কয়েকটি আয়াত এটা প্রমাণ করে যে, তারা সত্য সত্যই বানর হয়েছিল, রূপক অর্থে নয়। অর্থাৎ তাদের অন্তর যে বানরের মত হয়েছিল তা নয়-যেমন মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ সঠিক তাফসীর এটাই যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শূকর ও বানর করেছিলেন এবং তাদের বাহ্যিক আকারও ঐ জন্তুদ্বয়ের মত হয়েছিল। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। (আরবি)-এর মধ্যে (আরবি) সর্বনামটির সম্বন্ধ হচ্ছে (আরবি) শব্দটির সঙ্গে অর্থাৎ ‘আমি ঐ বানরগুলোকে শিক্ষণীয় বিষয় করেছি।' কিংবা এর প্রত্যাবর্তন স্থল হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ মাছগুলোকে অথবা এর সম্বন্ধ হচ্ছে (আরবি)-এর সঙ্গে অথাৎ ঐ শাস্তিকে আমি শিক্ষণীয় বিষয় করেছি। আবার এও বলা হয়েছে যে, এর প্রত্যাবর্তন স্থল হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ ঐ গ্রামকে আমি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী লোকদের জন্যে উপদেশমূলক বিষয় করেছি (আরবি) ভাবার্থ হওয়াই সঠিক বলে মনে হচ্ছে। আর গ্রাম’ হতে ভাবার্থ হচ্ছে গ্রামবাসী। (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে 'শাস্তি'। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ তাকে পরকাল ও ইহকালের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেন (৭৯:২৫)।' এর ভাবার্থ এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ঐ সময়ে যারা বিদ্যমান ছিল তাদের জন্যে এবং পরে আগমনকারীদের জন্যে এটা শিক্ষনীয় বিষয় করেছেন। যদিও কেউ কেউ এটাও বলেছেন যে, এটা পূর্ববর্তী ও পরবতীদের জন্যে শিক্ষণীয় বিষয়, কিন্তু এটা স্পষ্ট কথা যে, পূর্বে অতীত লোকদের জন্যে এই ঘটনা দলীল হতে পারে না, এটা যত বড়ই শিক্ষণীয় বিষয় হোক না কেন। কেননা তারা তো অতীত হয়েছে। সুতরাং সঠিক কথা এই যে, এখানে ভাবার্থ হচ্ছে স্থান ও জায়গা-অর্থাৎ আশেপাশের গ্রামগুলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সাঈদ বিন যুবাইরের (রঃ) তাফসীর এটাই। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে বেশী জনেন। আবার এ অর্থও করা হয়েছে যে, তাদের পূর্ববর্তী পাপ এবং তাদের পরে আগমনকারীদের এরকমই পাপের জন্যে এ শাস্তিকে আমি শিক্ষণীয় বিষয় করেছি। কিন্তু সঠিক কথা ওটাই যার সঠিকতা আমরা বর্ণনা করেছি। অর্থাৎ আশেপাশের গ্রামগুলো। মোটকথা, এ শাস্তি সে যুগে বিদ্যমান লোকদের জন্যে এবং তাদের পরে আগমনকারীদের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ ‘ওতে পরে আগমনকারীদের জন্যে নসীহত ও উপদেশের মূলধন রয়েছে। এমনকি হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যেও বটে। এরা যেন ভয় করে যে, কৌশল ও ফন্দির কারণে এবং প্রতারণা করে হারামকে হালাল করার কারণে যে শাস্তি তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল, এখন যারা এরূপ করবে তাদের উপরও না জানি ঐ শাস্তি এসে যায়। ইমাম আবদুল্লাহ বিন বাত্তাহ (রঃ) একটি বিশুদ্ধ হাদীস উদ্ধৃত করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইয়াহূদীরা যা করেছিল তোমরা তা করো না। ফন্দি করে হারামকে হালালরূপে গ্রহণ করো না। অর্থাৎ শরীয়তের নির্দেশাবলীতে ফন্দি ও কৌশল হতে বেঁচে থাক।' এ হাদীসটি সম্পূর্ণরূপে সঠিক। এর সমস্ত বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।
আল-বাকারা 2:66
৬৫-৬৬ নং আয়াতের তাফসীর চেহারা পরিবর্তনের ঘটনাসুরা-ই-আ'রাফের মধ্যে এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। তথায় এর তাফসীরও ইনশাআল্লাহ পূর্ণভাবে করা হবে। ঐলোকগুলো আইলা নামক গ্রামের অধিবাসী ছিল। শনিবার দিনের সম্মান করা তাদের উপর ফরয করা হয়েছিল। ঐদিনে শিকার করা তাদের জন্যে নিষিদ্ধ ছিল। আর মহান আল্লাহর হুকুমে সেই দিনেই নদীর ধারে মাছ খুব বেশী আসতো। তারা একটা কৌশল অবলম্বন করতো। একটা গর্ত খনন করে শনিবারে ওর মধ্যে রঞ্জু ও কাটা ফেলে দিতো। শনিবারে মাছসমূহ ঐ ফাদে পড়ে যেতো। রোববারের রাতে তারা ওগুলো ধরে নিতো। ঐ অপরাধের কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের রূপ বদলিয়ে দেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তাদের আকার পরিবর্তিত হয়নি, বরং অন্তর পরিবর্তিত হয়েছিল। এটা শুধুমাত্র দৃষ্টান্ত স্বরূপ আনা হয়েছে। যেমন আল্লাহ রাব্বল আলামীন আমলহীন আলেমের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন গাধার সঙ্গে। কিন্তু একথাটি দুর্বল। তা ছাড়া এটা কুরআন কারীমের প্রকাশ্য শব্দেরও বিপরীত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যুবকেরা বানর হয়েছিল এবং বুড়োরা শূকর হয়েছিল। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, নারী পুরুষ সবাই তারা লেজযুক্ত বানর হয়ে গিয়েছিল। আকাশবাণী হয়ঃ “তোমরা সব বানর হয়ে যাও।" আর তেমনই সব বানর হয়ে যায়। যেসব লোক তাদেরকে ঐ কৌশল অবলম্বন করতে নিষেধ করেছিল তারা তখন তাদের নিকট এসে বলতে থাকেঃ “আমরা কি তোমাদেরকে পূর্বেই নিষেধ করিনি?" তখন তারা মাথা নেডে সম্মতি জানায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, অল্প সময়ের মধ্যে তারা সব ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এবং তাদের বংশ বৃদ্ধি হয়নি। দুনিয়ায় কোন আকার পরিবর্তিত গোত্র তিন দিনের বেশী বাঁচেনি। এরাও তিন দিনের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যায়। নাক ঘসটাতে ঘসটাতে তারা সব মরে যায়। পানাহার ও বংশ বৃদ্ধি সবই বিদায় নেয়। যে বানরগুলো এখন আছে এবং তখনও ছিল, এরা তো জন্তু এবং এরা এভাবেই সৃষ্ট হয়েছে। আল্লাহ পাক যা চান এবং যেভাবে চান, তাই সৃষ্টি করে থাকেন এবং সেভাবেই সৃষ্টি করে থাকেন। তিনি মহান ক্ষমতাবান। ঘটনার বিস্তারিত আলোচনাঃহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, শুক্রবারের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করা তাদের উপর ফরয করা হয়, কিন্তু তারা শুক্রবারের পরিবর্তে শুনিবারকে পছন্দ করে। ঐ দিনের সম্মানার্থে তাদের জন্যে ঐদিনে শিকার ইত্যাদি হারাম করে দেয়া হয়। ওদিকে আল্লাহর পরীক্ষা হিসেবে ঐদিনই সমস্ত মাছ নদীর ধারে চলে আসতো এবং লাফা ঝাপা দিতো। অন্য দিনে ও গুলো দেখাই যেত না। কিছু দিন পর্যন্ত তো ঐসব লোক নীরবই থাকে এবং শিকার করা হতে বিরত থাকে। একদিন ওদের মধ্যে একটি লোক এই ফন্দি বের করে যে,শনিবার মাছ ধরে জালের মধ্যে আটকিয়ে দেয়া এবং তীরের কোন জিনিসের সঙ্গে বেঁধে রাখে। তারপরে রোববার দিন গিয়ে ওগুলো বের করে নেয় এবং বাড়ীতে এনে রেধে খায়। মাছের সুগন্ধ পেয়ে লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে“আমি তো আজ রোববারে মাছ শিকার করেছি। অবশেষে এ রহস্য খুলে যায়। লোকেরাও এ কৌশল পছন্দ করে এবং ঐভাবে তারা মাছ শিকার করতে থাকে। কেউ কেউ নদীর তীরে গর্ত খনন করে। শনিবারে মাছগুলো ঐ গর্তের ভিতরে জমা হলে তারা ওর মুখ বন্ধ করে দিতে। রোববারে ধরে নিতো। তাদের মধ্যে যারা খাঁটি মুমিন ছিল তারা তাদেরকে এ কাজে বাধা দিতো এবং নিষেধ করতো। কিন্তু তাদের উত্তর এই হলো আমরা তো শনিবারে শিকারই করি না, শিকার করি আমরা রোববারে।শিকারকারী ও নিষেধকারীদের ছাড়া আরও একটি দল সৃষ্টি হয়ে যায়, যারা দুই দলকেই সন্তুষ্ট রাখতো। তারা নিজেরা শিকার করতো না বটে, কিন্তু যারা শিকার করতো তাদেরকে নিষেধও করতো না। বরং নিষেধকারীগণকে বলতোঃ “তোমরা এমন কওম'কে উপদেশ কেন দিচ্ছ যাদেরকে আল্লাহ তাআলা ধ্বংস করবেন কিংবা কঠিন শাস্তি দেবেন? তোমরা তো তোমাদের কত পালন করেছো যেহেতু তাদেরকে নিষেধ করেছে। তারা যখন মানছে না তখন তাদেরকে তাদের কাজের উপর ছেড়ে দাও"। তখন নিষেধকারীগণ উত্তর দিতোঃ “একেতো এ জন্যে যে, আমরা আল্লাহ পাকের নিকট ওজর পেশ করতে পারবো। দ্বিতীয়তঃ এজন্যেও যে, তারা হয়তো আজ না হলে কাল কিংবা কাল হলে পরশু আমাদের কথা মানতে পারে এবং আল্লাহর কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পেয়ে যেতে পারে। অবশেষে এই মুমিন দলটি সেই কৌশলীদল হতে সম্পূর্ণ রূপে সম্পর্ক ছিন্ন করলো এবং তাদের থেকে পৃথক হয়ে গেল। গ্রামের মধ্যস্থলে একটি প্রাচীর দিয়ে দিল। একটি দরজা দিয়ে এরা যাতায়াত করে এবং অপর দরজা দিয়ে ঐ ফাঁকিবাজেরা যাতায়াত করে। এভাবেই দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়। হঠাৎ এক বিস্ময়জনক ঘটনা ঘটে। একদা রাত্রি শেষে দিন হয়েছে। মুমিনরা সব জেগে উঠেছে। কিন্তু এ পর্যন্ত ঐ ফন্দিবাজেরা তাদের দরজা খুলেনি এবং কোন সাড়া শব্দও পাওয়া যায় না। মুমিনরা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি? শেষে অত্যাধিক বিলম্বের পরেও যখন তাদের কোন খোঁজ পাওয়া গেল না তখন তারা প্রাচীরের উপরে উঠে গেল। তথায় এক বিস্ময়কর দৃশ্য তারা অবলোকন করলো। তারা দেখলো যে, ঐ ফন্দিবাজেরা নারী ও শিশুসহ সবাই বানর হয়ে গেছে। তাদের ঘরগুলো রাত্রে যেমন বন্ধ ছিল ঐরূপ বন্ধই আছে। আর ভিতরে সমস্ত মানুষ বানরের আকার বিশিষ্ট হয়ে গেছে। এবং ওদের লেজও বেরিয়েছে। শিশুরা ছোট বানর, পুরুষেরা বড় বানর এবং নারীরা বানরীতে পরিণত হয়েছে। প্রত্যেককেই চেনা যাচ্ছে যে, এ অমুক তোক সে অমুক নারী। এবং এ অমুক শিশু ইত্যাদি।এতে যে শুধু মাছ শিকারকারীরাই ধ্বংস হয়েছিল তা নয়, বরং যারা তাদেরকে শুধু নিষেধ করেই চুপচাপ বসে থাকতো এবং তাদের সাথে মেলা মেশা বন্ধ করতো না তারাও ধ্বংস হয়েছিল। এ শাস্তি থেকে শুধুমাত্র তারাই মুক্তি পেয়েছিল যারা তাদেরকে নিষেধ করতঃ তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক হয়েছিল। এ সমুদয় কথা এবং কুরআন মাজীদের কয়েকটি আয়াত এটা প্রমাণ করে যে, তারা সত্য সত্যই বানর হয়েছিল, রূপক অর্থে নয়। অর্থাৎ তাদের অন্তর যে বানরের মত হয়েছিল তা নয়-যেমন মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ সঠিক তাফসীর এটাই যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শূকর ও বানর করেছিলেন এবং তাদের বাহ্যিক আকারও ঐ জন্তুদ্বয়ের মত হয়েছিল। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। (আরবি)-এর মধ্যে (আরবি) সর্বনামটির সম্বন্ধ হচ্ছে (আরবি) শব্দটির সঙ্গে অর্থাৎ ‘আমি ঐ বানরগুলোকে শিক্ষণীয় বিষয় করেছি।' কিংবা এর প্রত্যাবর্তন স্থল হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ মাছগুলোকে অথবা এর সম্বন্ধ হচ্ছে (আরবি)-এর সঙ্গে অথাৎ ঐ শাস্তিকে আমি শিক্ষণীয় বিষয় করেছি। আবার এও বলা হয়েছে যে, এর প্রত্যাবর্তন স্থল হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ ঐ গ্রামকে আমি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী লোকদের জন্যে উপদেশমূলক বিষয় করেছি (আরবি) ভাবার্থ হওয়াই সঠিক বলে মনে হচ্ছে। আর গ্রাম’ হতে ভাবার্থ হচ্ছে গ্রামবাসী। (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে 'শাস্তি'। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ তাকে পরকাল ও ইহকালের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেন (৭৯:২৫)।' এর ভাবার্থ এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ঐ সময়ে যারা বিদ্যমান ছিল তাদের জন্যে এবং পরে আগমনকারীদের জন্যে এটা শিক্ষনীয় বিষয় করেছেন। যদিও কেউ কেউ এটাও বলেছেন যে, এটা পূর্ববর্তী ও পরবতীদের জন্যে শিক্ষণীয় বিষয়, কিন্তু এটা স্পষ্ট কথা যে, পূর্বে অতীত লোকদের জন্যে এই ঘটনা দলীল হতে পারে না, এটা যত বড়ই শিক্ষণীয় বিষয় হোক না কেন। কেননা তারা তো অতীত হয়েছে। সুতরাং সঠিক কথা এই যে, এখানে ভাবার্থ হচ্ছে স্থান ও জায়গা-অর্থাৎ আশেপাশের গ্রামগুলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সাঈদ বিন যুবাইরের (রঃ) তাফসীর এটাই। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে বেশী জনেন। আবার এ অর্থও করা হয়েছে যে, তাদের পূর্ববর্তী পাপ এবং তাদের পরে আগমনকারীদের এরকমই পাপের জন্যে এ শাস্তিকে আমি শিক্ষণীয় বিষয় করেছি। কিন্তু সঠিক কথা ওটাই যার সঠিকতা আমরা বর্ণনা করেছি। অর্থাৎ আশেপাশের গ্রামগুলো। মোটকথা, এ শাস্তি সে যুগে বিদ্যমান লোকদের জন্যে এবং তাদের পরে আগমনকারীদের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ ‘ওতে পরে আগমনকারীদের জন্যে নসীহত ও উপদেশের মূলধন রয়েছে। এমনকি হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যেও বটে। এরা যেন ভয় করে যে, কৌশল ও ফন্দির কারণে এবং প্রতারণা করে হারামকে হালাল করার কারণে যে শাস্তি তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল, এখন যারা এরূপ করবে তাদের উপরও না জানি ঐ শাস্তি এসে যায়। ইমাম আবদুল্লাহ বিন বাত্তাহ (রঃ) একটি বিশুদ্ধ হাদীস উদ্ধৃত করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইয়াহূদীরা যা করেছিল তোমরা তা করো না। ফন্দি করে হারামকে হালালরূপে গ্রহণ করো না। অর্থাৎ শরীয়তের নির্দেশাবলীতে ফন্দি ও কৌশল হতে বেঁচে থাক।' এ হাদীসটি সম্পূর্ণরূপে সঠিক। এর সমস্ত বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।
আল-বাকারা 2:67
আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলকে আর একটি নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি একটি গরুর মাধ্যমে একটি নিহত লোককে জীবিত করেন এবং তার হত্যাকারীর পরিচয় দান করেন। এটা একটা অলৌকিক ঘটনাই বটে। গল্পের বিস্তারিত আলোচনা মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে একটি ধনী বন্ধ্যা লোক ছিল, তার কোন ছেলে মেয়ে ছিল না। তার উত্তরাধিকারী ছিল তার এক ভ্রাতুস্পুত্র। সত্বর উত্তরাধিকার প্রাপ্তির আশায় সে তার পিতৃব্যকে হত্যা করে ফেলে এবং রাত্রে তাদের গ্রামের একটি লোকের দরজার উপরে রেখে আসে। সকালে গিয়ে ঐ লোকটির উপর হত্যার অপবাদ দেয়। অবশেষে এর দলের ও ওর দলের লোকদের মধ্যে মারামারি ও খুনাখুনি হওয়ার উপক্রম হয়। এমন সময় তাদের জ্ঞানী লোকেরা তাদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসূল (হযরত মূসা আঃ)) বিদ্যমান থাকতে তোমরা একে অপরকে হত্যা করবে কেন?” সুতরাং তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট এসে ঘটনাটি বর্ণনা করে। তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গরু যবাহ্ করার নির্দেশ দিচ্ছেন।” একথা শুনে তারা বলেঃ “আপনি কি আমাদেরকে উপহাস করছেন?” তিনি বলেনঃ “মূর্খদের ন্যায় কাজ করা হতে আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।” এখন যদি তারা যে কোন একটি গরু ববাহ্ করতো তাহলেই যথেষ্ট হতো। কিন্তু তারা কাঠিন্য অবলম্বন করে, সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাদের উপর তা কঠিন করে দেন। অতঃপর তারা ঐরূপ গরু একটি লোকের নিকট প্রাপ্ত হয়। একমাত্র তার নিকট ছাড়া আর কারও কাছে ছিল না। লোকটি বলেঃ “আল্লাহর শপথ! এই গরুর চামড়া পূর্ণ স্বর্ণের কম মূল্যে আমি এটা বিক্রি করবো না।” সুতরাং তারা ঐ মূল্যেই তা কিনে নেয়। এবং যবাহ করে। তারপর তারা ওর এক খণ্ড মাংস দ্বারা নিহত ব্যক্তির উপর আঘাত করে। তখন মৃত লোকটি দাঁড়িয়ে যায়। লোকগুলো তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “তোমাকে কে হত্যা করেছে? সে বলেঃ “আমার এই ভ্রাতুস্পুত্র।” একথা বলেই সে পুনরায় মরে যায়। সুতরাং তাকে মৃত ব্যক্তির কোন মাল দেয়া হলো না। তাফসীর-ই-আবৃদ বিন হামীদে রয়েছে যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে একটি ধনী লোক ছিল যার কোন সন্তান ছিল না। তার শুধুমাত্র একটি নিকটতম আত্মীয় ছিল এবং সেই ছিল তার উত্তরাধিকারী। সে (নিকটাত্মীয়) লোকটিকে হত্যা করে ফেলে অতঃপর তার মৃত দেহ রাজপথে এনে রেখে দেয়। অতঃপর সে হযরত মূসার (আঃ) নিকট এসে বলেঃ আমার এক আত্মীয় নিহত হয়েছে। সুতরাং আমি কঠিন সমস্যায় পড়ে গেছি। আমি এমন কাউকে পাচ্ছি না যে আমাকে তার হত্যাকারীর কথা বলে দেয়। হে আল্লাহর নবী (আঃ)! এটা একমাত্র আপনিই বলতে পারেন। তখন হযরত মূসা (আঃ) জনগণকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “আল্লাহ পাক তোমাদেরকে এক নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমাদের মধ্যে যার এটা জানা রয়েছে সে যেন তা বলে দেয়। তাদের মধ্যে কেউই এটা বলতে পারলো না। তখন হত্যাকারী ব্যক্তি হযরত মূসা (আঃ)-এর দিকে। অগ্রসর হয়ে বলেঃ “আপনি আল্লাহর নবী। সুতরাং আপনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদেরকে এটা বলে দেন। হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানালে তিনি তাঁর নিকট ওয়াহী অবতীর্ণ করেনঃ “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গরু যবাহ করার নির্দেশ দিচ্ছেন।” তখন তারা বিস্মিত হয়ে বলেঃ আপনি কি আমাদেরকে উপহাস করছেন? তিনি বলেনঃ “আমি মূর্খ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ি এ থেকে আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তারা বলেঃ “আপনি আমাদের জন্যে আপনার প্রভুর নিকট প্রার্থনা করুন, যেন তিনি আমাদের কাছে ব্যক্ত করেন ওর কি কি গুণ থাকতে হবে?” তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, এটা এমন একটি গরু হবে যা পূর্ণ বৃদ্ধও নয়, একেবারে বাচ্চাও নয়, এতদুভয়ের মধ্যে বয়স্ক পূর্ণ যৌবন প্রাপ্ত।“তারা বলে “আমাদের জন্যে আপনার প্রভুর নিকট দরখাস্ত করুন, যেন তিনি আমাদেরকে বলে দেন ওর বর্ণ কিরূপ হবে?” তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, ওটা একটি হলদে রঙের গরু, উজ্জ্বল হলদে রঙের যা দর্শকদের জন্যে আনন্দদায়ক হয়। তারা বলেঃ আমাদের জন্যে আপনার প্রভুর নিকট আবেদন করুন, যেন তিনি আমাদেরকে বলেন দেন যে, ওর গুণাবলী কি কি হবে? কেননা, এই গরু সম্বন্ধে আমাদের সংশয় রয়েছে এবং নিশ্চয় আমরা ইনশাআল্লাহ ঠিক বুঝতে পারবো।” তখন মূসা (আঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা এরূপ বলেছেন যে, ওটা এমন হবে যা জমি কর্ষণের জন্যে হাল চাষেও ব্যবহৃত হয় না কিংবা ওটা কৃষির জন্যে পানিও সেচন করে না। তা হবে নিখুঁত, তাতে কোন দাগ থাকবে না। তারা বলেঃ “এখন আপনি পূর্ণ বর্ণনা দিলেন। তখন তারা ওটা যবাহ করল, কিন্তু তারা তা করবে বলে মনে হচ্ছিল। যদি তারা যেকোন একটি গরু যবাহ করতো তবে তাই তাদের জন্যে যথেষ্ট হতো। কিন্তু তারা নিজেদের উপর কাঠিন্য আনয়ন করে বলে আল্লাহও তাদের উপর কাঠিন্য আরোপ করে দেন। আর যদি তারা ইনশাআল্লাহ আমরা সুপথ প্রাপ্ত হবে। একথা না বলতো তবে তারা কখনও এর সমাধানে পৌঁছতে পারতো না। ঐ লোকগুলো এ সকলগুণ বিশিষ্ট গরুটি একজন বন্ধার নিকট ছাড়া আর কাছে প্রাপ্ত হয়নি। ঐ বৃদ্ধার কয়েকটি পিতৃহীন ছেলে মেয়ে ছিল। গরুটি ঐ লোকেদের নিকট খুবই দুর্মূল্য ছিল। যখন ঐ বদ্ধা জানতে পারে যে, সেই গরু ক্রয় করা ছাড়া তাদের কোন উপায় নেই, তখন সে তার মূল্য খুব বেশী চাইলো। তখন লোকগুলো হযরত মূসার (আঃ) নিকট আগমন করে তাকে বলে যে, এরূপ গুণবিশিষ্ট গরু অমুক বৃদ্ধা ছাড়া আর কারও কাছে নেই। এবং সে ওর মূল্য অত্যন্ত বেশী চাচ্ছে। হযরত মূসা (আঃ) তখন বললেনঃ “তোমাদের উপর আল্লাহ্ পাক হালকা করেছিলেন কিন্তু তোমরা নিজেদের জীবনের উপর তা ভারী করে নিয়েছে। সুতরাং সে যা চায় তাই দিয়ে গরুটি কিনে নাও।”অতঃপর তারা গরুটি কিনে নিয়ে যবাহ করে। হযরত মূসা (আঃ) তখন তাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তারা যেন, সেই গরুটির একখানা অস্থি নিয়ে মৃতের উপর আঘাত করে। তারা তাই করে। তখন লোকটি জীবিত হয়ে উঠে এবং হত্যাকারীর নাম বলে দিয়েই পুনরায় মরে যায়। অতঃপর হত্যাকারীকেও পাকড়াও করা হয় এবং সেছিল ঐ ব্যক্তি যে হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিল। তারপর তাকে তারা মন্দ কার্যের প্রতিশোধ রূপে আল্লাহ্ তা'আলা নির্দেশক্রমে হত্যা করে। সুদ্দী (রঃ) বর্ণনা করেন যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে একটি বিরাট ধনী লোক ছিল। তার কোন ছেলে ছিল না। তার ছিল শুধুমাত্র একটি মেয়ে ও একটি ভ্রাতুস্পুত্র। ভাতিজা তার চাচার মেয়েকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে চাচার নিকট প্রস্তাব দিলে চাচা তা প্রত্যাখ্যান করে। সুতরাং সে শপথ করে বলেঃ “নিশ্চয় আমি আমার চাচাকে হত্যা করে তার ধন-সম্পদ হস্তগত করবো এবং তার মেয়েকে বিয়ে করে নেবো।” অতঃপর সে কৌশল করে তার চাচাকে কোন এক জায়গায় নিয়ে গিয়ে হত্যা করে ফেলে। বানী ইসরাঈলের মধ্যে কয়েকজন ভাল লোক ছিল। তারা দুষ্ট লোকদের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ট হয়ে তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক হয়ে যায় এবং অন্য একটি শহরে গিয়ে বসবাস করতে থাকে। সন্ধ্যায় তারা তাদের দুর্গদ্বার বন্ধ করে দিতে এবং সকালে খুলতে। কোন। অপরাধীকে তারা তথায় প্রবেশ করতে দিতো না। সেই ভাতিজা তার চাচার মৃত দেহ নিয়ে গিয়ে সেই দুর্গের সদর দরজার সামনে রেখে দেয়। এখানে এসে ফাঁকি দিয়ে সে তার চাচাকে খুঁজতে থাকে। অতঃপর সে চেঁচিয়ে বলে যে, কে তার চাচাকে হত্যা করেছে। অবশেষে সে এ দুর্গবাসীদের উপর দোষ চাপিয়ে দেয় এবং তাদের কাছে রক্তপণ দাবী করে। কিন্তু দুর্গবাসীরা বলে যে, তারা তার হত্যার সম্বন্ধে কিছুই জানে না। কিন্তু সে কিছুই শুনতে চায় না। এমনকি সে তার সঙ্গীদেরকে নিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এরা তখন বাধ্য হয়ে হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট আসে এবং ঘটনা বর্ণনা করে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (আঃ)! এ লোকটি অযথা আমাদের উপর একটা হত্যার অপবাদ দিচ্ছে, অথচ আমরা সম্পূর্ণ নির্দোষ।" হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করেন। তখন তার উপর ওয়াহী অবতীর্ণ হয়। তিনি তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা একটি গরু যবাহ কর।” তারা তখন বলেঃ “হে আল্লাহর নবী (আঃ)! কোথায় হত্যাকারীর পরিচয় প্রদান আর কোথায় গরু যবাহ করার নির্দেশ? আপনি কি আমাদেরকে উপহাস করছেন?" হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ “আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি, (শরীয়তের জিজ্ঞাস্যের ব্যাপারে) উপহাস তো মূর্খদের কাজ। আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ এটাই।”এখন যদি এরা সব গিয়ে কোন একটি গরু যবাহ্ করতো তবেই যথেষ্ট হতো। কিন্তু তারা প্রশ্নাবলীর দরজা খুলে দেয়। তারা বলেঃ “গরুটি কেমন হতে হবে?” তখন নির্দেশ হয়, “এটা বুড়োও নয় বা একেবারে বাচ্চাও নয়, এতদুভয়ের মধ্যবর্তী জোয়ান। তারা বলেঃ “জনাব! এ রকম গরু তো অনেক আছে, এর রঙের বর্ণনা দিন।” ওয়াহী অবতীর্ণ হয় ও ‘এটা হলদে রঙের, উজ্জ্বল হলদে এর রং, দর্শকদেরকে যা আনন্দ দেয়। আবার তারা বলেঃ “এরূপ গরু ও তো অনেক আছে, অন্য কোন বিশিষ্ট গুণের বর্ণনা দিন, জনাব!” আবার ওয়াহী নাযিল হয়ঃ ওটা এমন গৰু যা না জমি কর্ষণে ব্যবহার হয় না ক্ষেতে পানি সেচনে, নিখুঁত, তার মধ্যে কোন দাগ থাকবে না।যেমন তারা প্রশ্ন বাড়াতে থাকে, নির্দেশও তেমনি কঠিন হতে থাকে। অতঃপর তারা এরূপ গরুর খোজে বের হয়। এরূপ গরু তারা একটি বালকের কাছে প্রাপ্ত হয়। ছেলেটি তার পিতা-মাতার খুবই বাধ্য ছিল। একদা তার পিতা ঘুমিয়ে ছিলেন এবং টাকার বাক্সের চাবি তার শিয়রে ছিল। এক বণিক একটি মূল্যবান হীরা বেচতে আসে এবং বলেঃ “আমি এটা বেচতে চাই।" ছেলেটি বলেঃ আমি ক্রয় করবো।” মূল্য সত্তর হাজার টাকা ঠিক হলো। ছেলেটি বলেঃ “একটু অপেক্ষা করুন, আমার পিতা জেগে উঠলেই তার নিকট হতে চাবি নিয়ে আপনাকে মূল্য দিয়ে দেবো।" বণিক বলেঃ “না, তা হবে না, টাকা এখনই দাও। এখনই টাকা দিলে দশ হাজার টাকা কমিয়ে দিচ্ছি।" ছেলেটি বলেঃ না জনাব পিতাকে জাগাবো না, যদি আপনি অপেক্ষা করেন তবে আমি আশি হাজার দেবো। এভাবেই এদিকে কম হতে ওদিকে বেশী হতে থাকে। অবশেষে বণিক ত্রিশ হাজারে নেমে আসে এবং বলেঃ “এখন যদি আমাকে টাকা দিয়ে দাও তবে ত্রিশ হাজারেই দিয়ে দেবো।" তখন ছেলেটি বলেঃ আমার পিতা জেগে ওঠা পর্যন্ত যদি আপনি অপেক্ষা করেন তবে আপনাকে এক লাখ টাকা দেবো।”অবশেষে বণিক অসন্তুষ্ট হয়ে হীরা ফিরিয়ে নিয়ে চলে যায়। ছেলেটি যে তার পিতার আরামের প্রতি লক্ষ্য রেখেছে এবং তাঁর সম্মান ও মর্যাদা বুঝেছে , এ জন্যে মহান আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং তাকে এ গরুটি দান করেন। বানী ইসরাঈল ঐ প্রকারের গরু খুঁজতে বেরিয়ে ঐ ছেলেটির নিকট ছাড়া আর কারও কাছে পায়নি। সুতরাং তারা তাকে বলে ? তোমার এ গরুটি আমাদেরকে দাও। এর পরিবর্তে আমরা তোমাকে দু'টি গরু দিচ্ছি। সে কিন্তু সাত হয় না। তিনটি ও চারটি দিতে চাইলেও সে রাযী হয় না। দশটি দিতে চাইলেও সে অসম্মতই থাকে। লোকগুলো তখন হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট অভিযোগ করে। হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ “সে যা চায় তাই দিয়ে গরুটি কিনে নাও।" শেষে তারা ছেলেটির নিকট এসে তাকে গরুর ওজনের সমান সোনা নিতে চাইলে সে সম্মত হয় এবং তার গরুটি বিক্রি করে। সে তার বাপ-মার খিদমত। করেছিল বলেই আল্লাহ তাআলা তাকে এরূপ বরকত দান করেন। সে তো খুব দরিদ্র হয়ে পড়েছিল। তার পিতা মারা গিয়েছিলেন এবং তার মা অত্যন্ত দারিদ্র ও সংকীর্ণতার মধ্যে কাল যাপন করছিলেন।যা হোক, গরুটি কেনা হলে সেটিকে যবাহ করা হয় এবং ওর এক গোশত খণ্ড দিয়ে নিহত ব্যক্তির শরীরে আঘাত করা হয়। তখন আল্লাহ তা'আলার ইকুমে সে জীবিত হয়ে ওঠে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ তোমাকে হত্যা করেছিল কে?" সে উত্তরে বলেঃ “আমার এই ভ্রাতুস্পুত্র আমার সম্পদ অধিকারের জন্যে ও আমার মেয়েকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে আমাকে হত্যা করেছিল।" এটুকু বলার পরই সে পুনরায় মরে যায়। এখন হত্যাকারীকে চেনা যায় এবং এ হত্যার ফলে বানী ইসরাঈলের মধ্যে ঝগড়া বিবাদের যে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল তা প্রশমিত হয়। অতঃপর জনগণ মৃত ব্যক্তির ভ্রাতুস্পুত্রকে ধরে কিসাস রূপে হত্যা করে দেয়।এ গল্পটি বিভিন্নভাবে বর্ণিত আছে। স্পষ্টভাবে জানা যাচ্ছে যে, এটা বানী ইসরাঈলের সে যুগের ঘটনা। আমরা একে সত্যও বলতে পারি না এবং মিথ্যাও। যা হোক, এ আয়াতে বানী ইসরাঈলকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে যে, তারা যেন আল্লাহ তা'আলার এ নিয়ামতকে ভুলে না যায় যে, তিনি এমন এক স্বভাব বিরুদ্ধ ঘটনা ঘটালেন যার ফলে গরুর এক খণ্ড গোশতের দ্বারা মৃত ব্যক্তির শরীরে আঘাত করায় সে জীবিত হয়ে যায় এবং সে তার হত্যাকারীর নাম বলে দেয় এবং যার ফলে একটা বড় বিবাদের নিষ্পত্তি হয়ে যায়।
আল-বাকারা 2:68
৬৮-৭১ নং আয়াতের তাফসীরএখানে আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের অবাধ্যতা, দুষ্টামি ও আল্লাহর নির্দেশের ব্যাপারে তাদের খুঁটি নাটি প্রশ্নের বর্ণনা দিচ্ছেন। তাদের উচিত ছিল হুকুম পাওয়া মাত্রই তার উপর আমল করা। কিন্তু তা না করে তারা বার বার প্রশ্ন করতে থাকে। ইবনে জুরাইয (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নির্দেশ পাওয়া মাত্রই যদি তারা যে কোন গৰু যবাহ করতো তবে তাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তারা ক্রমাগত প্রশ্ন করতে থাকে এবং তার ফলে কার্যে কাঠিন্য বৃদ্ধি পায়। এমন কি যদি তারা ইনশাআল্লাহ’ না বলতো তবে কখনও এ কাঠিন্য দূর হতো না এবং ওটা তাদের কাছে প্রকাশিত হতো না।”তাদের প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলা হয় যে, ওটা বৃদ্ধও নয় বা একেবারে কম বয়সেরও নয়, বরং মধ্যম বয়সের। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে ওর রং বর্ণনা করা হয় যে, ওটা হলদে রঙের সুদৃশ্য একটি গরু। হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) গরুটির রং হলদে বলেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে এখানে অর্থ হচ্ছে কালো রং। কিন্তু প্রথম মতটিই সঠিক। তবে রঙের তীব্রতা ও ঔজ্জ্বল্যের কারণে গরুটি যে কালো রঙের মত দেখাতো সেটা অন্য কথা। অহাব বিন মুনাব্বাহর (রঃ) বলেনঃ “ওর রং এতো গাঢ় ছিল যে, মনে হতো যেন ওটা থেকে সূর্যের কিরণ উথিত হচ্ছে।" তাওরাতে ওর রং লাল বর্ণনা করা হয়েছে। সম্ভবতঃ যিনি ওকে আরবীতে অনুবাদ করেছেন তিনিই ভুল করেছেন। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। ঐ রঙের ও ঐ বয়সের বহু গরু তাদের চোখে পড়তে বলে তারা হযরত মূসা (আঃ) কে বলেঃ “হে আল্লাহর নবী (আঃ)! আপনি আল্লাহকে অন্য কোন নিদর্শনের কথা জিজ্ঞেস করুন যেন আমাদের সন্দেহ কেটে যায়। ইনশাআল্লাহ আমরা এবারে রাস্তা পেয়ে যাবো।" যদি তারা ইনশাআল্লাহ না বলতো তবে কিয়ামত পর্যন্ত তারা ওরকম গরুর ঠিকানা পেত না। আর যদি তারা প্রশ্নই না করতো তবে তাদের প্রতি এত কঠোরতা অবলম্বন করা হতো না, বরং যে কোন গরু যবাহ্ করলেই যথেষ্ট হতো। এ বিষয়টি একটি মারফু হাদীসেও আছে। কিন্তু ওর সনদটি গরীব। সঠিক কথা এটাই যে, এটা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) নিজস্ব কথা। আল্লাহ্ই সবচেয়ে বেশী জানেন। এখন গরুটির বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, ওটা জমি কর্ষণ করে না বা পানি সেচের কাজেও ওটা ব্যবহৃত হয় না। ওর শরীরে কোন দাগ নেই। ওটা একই রঙের-অন্য কোন রঙের মিশ্রণ মোটেই নেই। ওটা সুস্থ ও সবল। কেউ কেউ বলেন যে, এটা কাজের গরু নয়। তবে ক্ষেতে কাজ করে থাকে বটে কিন্তু পানি সেচের কাজ করে না। কিন্তু একথাটি ভুল, কেননা (আরবি)-এর তাফসীর এটাই যে, ওটা জমি কর্ষণ করে না, পানি সেচন করে না এবং ওর শরীরে কোন দাগ নেই। এখন অনিচ্ছাকৃতভাবে তারা ওর কুরবানী দিতে এগিয়ে গেল। এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা ওটা যবাহ করবে বলে মনে হচ্ছিল না। বরং যবাহ না করার জন্যেই তারা টালবাহানা করছিল। কেউ কেউ বলেছেন যে, অপদস্থ হওয়ার ভয়েই তারা ঐরূপ করছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা ওর মূল্য শুনেই ঘাবড়িয়ে গিয়েছিল। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, ওর মূল্য লেগেছিল মোট তিনটি স্বর্ণ মুদ্রা। কিন্তু এ বর্ণনাটি এবং গরুর ওজন বরাবর সোনা দেয়ার বর্ণনাটি, এ দুটোই ইসরাঈলী কথা। সঠিক কথা এই যে, তাদের নির্দেশ পালনের ইচ্ছাই ছিল না। কিন্তু এভাবে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ফলে এবং হত্যার মামলার কারণে তাদেরকে ওটা মানতেই হয়েছিল। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।এ আয়াত দ্বারা এই মাসয়ালার উপরও দলীল নেয়া যেতে পারে যে, জন্তুকে না দেখেও ধার দেয়া জায়েয। কেননা, পূর্ণভাবে এর বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা ক্রেয়া হয়েছে। যেমন হযরত ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আওযায়ী , ইমামলায় (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) ও জমহুর উলামার এটাই মাযহাব। এর দলীলরূপে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের নিজের হাদীসটিও আনা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন স্ত্রীলোক যেন তার স্বামীর সামনে অপুর কোন স্ত্রীলোকের বৈশিষ্ট্য এমনভাবে বর্ণনা না করে যেন সে তাকে দেখছে। অন্য হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভুলবশতঃ হত্যার এবং স্বেচ্ছায় অনুরূপ হত্যার দিয়্যাতের উটসমূহের বিশেষত্বঃ ও বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম সাওরী (রঃ) এবং অন্যান্য কুফীগণ ‘বায়-ই-সালামকে সমর্থন করেন না। তারা বলেন যে, জন্তুসমূহের গুণাবলী ও অবস্থা পূর্ণভাবে বর্ণনা করা ছাড়া অবস্থা আয়ত্বে আসতে পারে না। এ ধরনের বর্ণনা হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হযরত হুজাইফা বিন ইয়ামান (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ হতেও বর্ণিত হয়েছে।
আল-বাকারা 2:69
৬৮-৭১ নং আয়াতের তাফসীরএখানে আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের অবাধ্যতা, দুষ্টামি ও আল্লাহর নির্দেশের ব্যাপারে তাদের খুঁটি নাটি প্রশ্নের বর্ণনা দিচ্ছেন। তাদের উচিত ছিল হুকুম পাওয়া মাত্রই তার উপর আমল করা। কিন্তু তা না করে তারা বার বার প্রশ্ন করতে থাকে। ইবনে জুরাইয (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নির্দেশ পাওয়া মাত্রই যদি তারা যে কোন গৰু যবাহ করতো তবে তাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তারা ক্রমাগত প্রশ্ন করতে থাকে এবং তার ফলে কার্যে কাঠিন্য বৃদ্ধি পায়। এমন কি যদি তারা ইনশাআল্লাহ’ না বলতো তবে কখনও এ কাঠিন্য দূর হতো না এবং ওটা তাদের কাছে প্রকাশিত হতো না।”তাদের প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলা হয় যে, ওটা বৃদ্ধও নয় বা একেবারে কম বয়সেরও নয়, বরং মধ্যম বয়সের। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে ওর রং বর্ণনা করা হয় যে, ওটা হলদে রঙের সুদৃশ্য একটি গরু। হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) গরুটির রং হলদে বলেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে এখানে অর্থ হচ্ছে কালো রং। কিন্তু প্রথম মতটিই সঠিক। তবে রঙের তীব্রতা ও ঔজ্জ্বল্যের কারণে গরুটি যে কালো রঙের মত দেখাতো সেটা অন্য কথা। অহাব বিন মুনাব্বাহর (রঃ) বলেনঃ “ওর রং এতো গাঢ় ছিল যে, মনে হতো যেন ওটা থেকে সূর্যের কিরণ উথিত হচ্ছে।" তাওরাতে ওর রং লাল বর্ণনা করা হয়েছে। সম্ভবতঃ যিনি ওকে আরবীতে অনুবাদ করেছেন তিনিই ভুল করেছেন। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। ঐ রঙের ও ঐ বয়সের বহু গরু তাদের চোখে পড়তে বলে তারা হযরত মূসা (আঃ) কে বলেঃ “হে আল্লাহর নবী (আঃ)! আপনি আল্লাহকে অন্য কোন নিদর্শনের কথা জিজ্ঞেস করুন যেন আমাদের সন্দেহ কেটে যায়। ইনশাআল্লাহ আমরা এবারে রাস্তা পেয়ে যাবো।" যদি তারা ইনশাআল্লাহ না বলতো তবে কিয়ামত পর্যন্ত তারা ওরকম গরুর ঠিকানা পেত না। আর যদি তারা প্রশ্নই না করতো তবে তাদের প্রতি এত কঠোরতা অবলম্বন করা হতো না, বরং যে কোন গরু যবাহ্ করলেই যথেষ্ট হতো। এ বিষয়টি একটি মারফু হাদীসেও আছে। কিন্তু ওর সনদটি গরীব। সঠিক কথা এটাই যে, এটা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) নিজস্ব কথা। আল্লাহ্ই সবচেয়ে বেশী জানেন। এখন গরুটির বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, ওটা জমি কর্ষণ করে না বা পানি সেচের কাজেও ওটা ব্যবহৃত হয় না। ওর শরীরে কোন দাগ নেই। ওটা একই রঙের-অন্য কোন রঙের মিশ্রণ মোটেই নেই। ওটা সুস্থ ও সবল। কেউ কেউ বলেন যে, এটা কাজের গরু নয়। তবে ক্ষেতে কাজ করে থাকে বটে কিন্তু পানি সেচের কাজ করে না। কিন্তু একথাটি ভুল, কেননা (আরবি)-এর তাফসীর এটাই যে, ওটা জমি কর্ষণ করে না, পানি সেচন করে না এবং ওর শরীরে কোন দাগ নেই। এখন অনিচ্ছাকৃতভাবে তারা ওর কুরবানী দিতে এগিয়ে গেল। এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা ওটা যবাহ করবে বলে মনে হচ্ছিল না। বরং যবাহ না করার জন্যেই তারা টালবাহানা করছিল। কেউ কেউ বলেছেন যে, অপদস্থ হওয়ার ভয়েই তারা ঐরূপ করছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা ওর মূল্য শুনেই ঘাবড়িয়ে গিয়েছিল। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, ওর মূল্য লেগেছিল মোট তিনটি স্বর্ণ মুদ্রা। কিন্তু এ বর্ণনাটি এবং গরুর ওজন বরাবর সোনা দেয়ার বর্ণনাটি, এ দুটোই ইসরাঈলী কথা। সঠিক কথা এই যে, তাদের নির্দেশ পালনের ইচ্ছাই ছিল না। কিন্তু এভাবে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ফলে এবং হত্যার মামলার কারণে তাদেরকে ওটা মানতেই হয়েছিল। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।এ আয়াত দ্বারা এই মাসয়ালার উপরও দলীল নেয়া যেতে পারে যে, জন্তুকে না দেখেও ধার দেয়া জায়েয। কেননা, পূর্ণভাবে এর বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা ক্রেয়া হয়েছে। যেমন হযরত ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আওযায়ী , ইমামলায় (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) ও জমহুর উলামার এটাই মাযহাব। এর দলীলরূপে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের নিজের হাদীসটিও আনা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন স্ত্রীলোক যেন তার স্বামীর সামনে অপুর কোন স্ত্রীলোকের বৈশিষ্ট্য এমনভাবে বর্ণনা না করে যেন সে তাকে দেখছে। অন্য হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভুলবশতঃ হত্যার এবং স্বেচ্ছায় অনুরূপ হত্যার দিয়্যাতের উটসমূহের বিশেষত্বঃ ও বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম সাওরী (রঃ) এবং অন্যান্য কুফীগণ ‘বায়-ই-সালামকে সমর্থন করেন না। তারা বলেন যে, জন্তুসমূহের গুণাবলী ও অবস্থা পূর্ণভাবে বর্ণনা করা ছাড়া অবস্থা আয়ত্বে আসতে পারে না। এ ধরনের বর্ণনা হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হযরত হুজাইফা বিন ইয়ামান (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ হতেও বর্ণিত হয়েছে।
আল-বাকারা 2:70
৬৮-৭১ নং আয়াতের তাফসীরএখানে আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের অবাধ্যতা, দুষ্টামি ও আল্লাহর নির্দেশের ব্যাপারে তাদের খুঁটি নাটি প্রশ্নের বর্ণনা দিচ্ছেন। তাদের উচিত ছিল হুকুম পাওয়া মাত্রই তার উপর আমল করা। কিন্তু তা না করে তারা বার বার প্রশ্ন করতে থাকে। ইবনে জুরাইয (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নির্দেশ পাওয়া মাত্রই যদি তারা যে কোন গৰু যবাহ করতো তবে তাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তারা ক্রমাগত প্রশ্ন করতে থাকে এবং তার ফলে কার্যে কাঠিন্য বৃদ্ধি পায়। এমন কি যদি তারা ইনশাআল্লাহ’ না বলতো তবে কখনও এ কাঠিন্য দূর হতো না এবং ওটা তাদের কাছে প্রকাশিত হতো না।”তাদের প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলা হয় যে, ওটা বৃদ্ধও নয় বা একেবারে কম বয়সেরও নয়, বরং মধ্যম বয়সের। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে ওর রং বর্ণনা করা হয় যে, ওটা হলদে রঙের সুদৃশ্য একটি গরু। হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) গরুটির রং হলদে বলেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে এখানে অর্থ হচ্ছে কালো রং। কিন্তু প্রথম মতটিই সঠিক। তবে রঙের তীব্রতা ও ঔজ্জ্বল্যের কারণে গরুটি যে কালো রঙের মত দেখাতো সেটা অন্য কথা। অহাব বিন মুনাব্বাহর (রঃ) বলেনঃ “ওর রং এতো গাঢ় ছিল যে, মনে হতো যেন ওটা থেকে সূর্যের কিরণ উথিত হচ্ছে।" তাওরাতে ওর রং লাল বর্ণনা করা হয়েছে। সম্ভবতঃ যিনি ওকে আরবীতে অনুবাদ করেছেন তিনিই ভুল করেছেন। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। ঐ রঙের ও ঐ বয়সের বহু গরু তাদের চোখে পড়তে বলে তারা হযরত মূসা (আঃ) কে বলেঃ “হে আল্লাহর নবী (আঃ)! আপনি আল্লাহকে অন্য কোন নিদর্শনের কথা জিজ্ঞেস করুন যেন আমাদের সন্দেহ কেটে যায়। ইনশাআল্লাহ আমরা এবারে রাস্তা পেয়ে যাবো।" যদি তারা ইনশাআল্লাহ না বলতো তবে কিয়ামত পর্যন্ত তারা ওরকম গরুর ঠিকানা পেত না। আর যদি তারা প্রশ্নই না করতো তবে তাদের প্রতি এত কঠোরতা অবলম্বন করা হতো না, বরং যে কোন গরু যবাহ্ করলেই যথেষ্ট হতো। এ বিষয়টি একটি মারফু হাদীসেও আছে। কিন্তু ওর সনদটি গরীব। সঠিক কথা এটাই যে, এটা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) নিজস্ব কথা। আল্লাহ্ই সবচেয়ে বেশী জানেন। এখন গরুটির বিশেষণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, ওটা জমি কর্ষণ করে না বা পানি সেচের কাজেও ওটা ব্যবহৃত হয় না। ওর শরীরে কোন দাগ নেই। ওটা একই রঙের-অন্য কোন রঙের মিশ্রণ মোটেই নেই। ওটা সুস্থ ও সবল। কেউ কেউ বলেন যে, এটা কাজের গরু নয়। তবে ক্ষেতে কাজ করে থাকে বটে কিন্তু পানি সেচের কাজ করে না। কিন্তু একথাটি ভুল, কেননা (আরবি)-এর তাফসীর এটাই যে, ওটা জমি কর্ষণ করে না, পানি সেচন করে না এবং ওর শরীরে কোন দাগ নেই। এখন অনিচ্ছাকৃতভাবে তারা ওর কুরবানী দিতে এগিয়ে গেল। এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেন যে, তারা ওটা যবাহ করবে বলে মনে হচ্ছিল না। বরং যবাহ না করার জন্যেই তারা টালবাহানা করছিল। কেউ কেউ বলেছেন যে, অপদস্থ হওয়ার ভয়েই তারা ঐরূপ করছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা ওর মূল্য শুনেই ঘাবড়িয়ে গিয়েছিল। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, ওর মূল্য লেগেছিল মোট তিনটি স্বর্ণ মুদ্রা। কিন্তু এ বর্ণনাটি এবং গরুর ওজন বরাবর সোনা দেয়ার বর্ণনাটি, এ দুটোই ইসরাঈলী কথা। সঠিক কথা এই যে, তাদের নির্দেশ পালনের ইচ্ছাই ছিল না। কিন্তু এভাবে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ফলে এবং হত্যার মামলার কারণে তাদেরকে ওটা মানতেই হয়েছিল। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।এ আয়াত দ্বারা এই মাসয়ালার উপরও দলীল নেয়া যেতে পারে যে, জন্তুকে না দেখেও ধার দেয়া জায়েয। কেননা, পূর্ণভাবে এর বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা ক্রেয়া হয়েছে। যেমন হযরত ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আওযায়ী , ইমামলায় (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) ও জমহুর উলামার এটাই মাযহাব। এর দলীলরূপে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের নিজের হাদীসটিও আনা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন স্ত্রীলোক যেন তার স্বামীর সামনে অপুর কোন স্ত্রীলোকের বৈশিষ্ট্য এমনভাবে বর্ণনা না করে যেন সে তাকে দেখছে। অন্য হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভুলবশতঃ হত্যার এবং স্বেচ্ছায় অনুরূপ হত্যার দিয়্যাতের উটসমূহের বিশেষত্বঃ ও বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম সাওরী (রঃ) এবং অন্যান্য কুফীগণ ‘বায়-ই-সালামকে সমর্থন করেন না। তারা বলেন যে, জন্তুসমূহের গুণাবলী ও অবস্থা পূর্ণভাবে বর্ণনা করা ছাড়া অবস্থা আয়ত্বে আসতে পারে না। এ ধরনের বর্ণনা হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হযরত হুজাইফা বিন ইয়ামান (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ হতেও বর্ণিত হয়েছে।