Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-মায়িদা 5:88 – আল-মায়িদা 5:120

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-মায়িদা 5:88
  2. আল-মায়িদা 5:89
  3. আল-মায়িদা 5:90
  4. আল-মায়িদা 5:91
  5. আল-মায়িদা 5:92
  6. আল-মায়িদা 5:93
  7. আল-মায়িদা 5:94
  8. আল-মায়িদা 5:95
  9. আল-মায়িদা 5:96
  10. আল-মায়িদা 5:97
  11. আল-মায়িদা 5:98
  12. আল-মায়িদা 5:99
  13. আল-মায়িদা 5:100
  14. আল-মায়িদা 5:101
  15. আল-মায়িদা 5:102
  16. আল-মায়িদা 5:103
  17. আল-মায়িদা 5:104
  18. আল-মায়িদা 5:105
  19. আল-মায়িদা 5:106
  20. আল-মায়িদা 5:107
  21. আল-মায়িদা 5:108
  22. আল-মায়িদা 5:109
  23. আল-মায়িদা 5:110
  24. আল-মায়িদা 5:111
  25. আল-মায়িদা 5:112
  26. আল-মায়িদা 5:113
  27. আল-মায়িদা 5:114
  28. আল-মায়িদা 5:115
  29. আল-মায়িদা 5:116
  30. আল-মায়িদা 5:117
  31. আল-মায়িদা 5:118
  32. আল-মায়িদা 5:119
  33. আল-মায়িদা 5:120

আল-মায়িদা 5:88

৮৭-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতটি নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের একটি দলের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা বলেছিলেন‘আমরা আমাদের পুংলিঙ্গ কর্তন করবো এবং দুনিয়ার কাম, লোভ-লালসা পরিত্যাগ করবো।' নবী (সঃ)-এর কাছে এ সংবাদ পৌছলে তিনি তাদেরকে ডেকে পাঠান এবং তাদেরকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তারা বলেনঃ হ্যা, আমরা এরূপই সংকল্প করেছি।' তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “কিন্তু জেনে রেখো যে, আমি তো রোযাও রাখি এবং (কোন কোন সময়) নাও রাখি, রাত্রে নামাযও পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আমি স্ত্রীদের সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধও হই। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার নীতি গ্রহণ করে সে আমারই অন্তর্ভুক্ত এবং যে ব্যক্তি আমার নীতি গ্রহণ করে না সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে মিরদুওয়াইও বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কয়েকজন সাহাবী তার পত্নীদেরকে তার গোপনীয় আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন! তখন (সম্ভবতঃ তার রাত দিনের আমল সম্পর্কে অবহিত হয়ে) তাঁদের মধ্যে কোন একজন বলেনঃ “আমি এখন থেকে আর কখনও গোশত খাবো না। আর একজন বলেনঃ “আমি কখনও স্ত্রীলোকদের সাথে বিবাহিত হবো না।' অন্য একজন বললেনঃ আমি কখনও বিছানায় শয়ন করবো। না (বরং মাটিতে শয়ন করববা)।” এসব কথা নবী (সঃ)-এর কানে পৌঁছলে তিনি বলেনঃ “ঐ লোকদের কি হয়েছে যে, তাদের কেউ একথা বলে এবং ও কথা বলে? কিন্তু আমি তো রোযাও রাখি এবং কোন কোন সময় নাও রাখি, আমি নিদ্রাও যাই এবং নামাযও পড়ি, আমি গোশতও খাই এবং নারীদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার নীতি থেকে সরে পড়ে সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি যখন গোশত ভক্ষণ করি তখন স্ত্রীলোকদের প্রতি আমার কামভাব খুবই বৃদ্ধি পায়। এ জন্যে আমি নিজের উপর গোশত হারাম করে ফেলেছি। তখন ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্যে যে পবিত্র জিনিসগুলো হালাল করেছেন সেগুলো তোমরা নিজেদের জন্যে হারাম করো না' -এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ আমরা এক যুদ্ধে দীর্ঘদিন পর্যন্ত নবী (সঃ)-এর সাথে অবস্থান করি এবং সে সময় আমাদের সাথে স্ত্রীলোক ছিল না। তখন আমরা তাকে জিজ্ঞেস করিঃ আমরা কি খাসী হবো না (অর্থাৎ আমাদের অণ্ডকোষ কর্তন করবো না)? তিনি তখন আমাদেরকে এটা করতে নিষেধ করেন এবং আম নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে কাপড়ের বিনিময়ে কোন স্ত্রীলোককে বিয়ে করার অনুমতি প্রদান করেন। অতঃপর হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। কিন্তু এটা নিকাহে মুআ হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত মাসরূক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা (একদা) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট হাযির ছিলাম, এমন সময় (রান্নাকৃত) পশুর স্তনের গোশত নিয়ে আসা হলো। তখন (আমরা সবাই তা খেতে শুরু করলাম, কিন্তু একটি লোক মজলিস থেকে সরে পড়লো। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ কাছে এসো (এবং খাওয়াতে অংশগ্রহণ কর)। সে তখন বললোঃ “আমি তো এটা না খাওয়ার শপথ গ্রহণ করেছি। তখন তিনি বললেনঃ তুমি এসে এটা খেয়ে নাও এবং শপথ ভেঙ্গে দেয়ার কাফফারা আদায় কর। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করলেন।ইমাম শাফিঈ (রঃ) প্রমুখ আলেমদের মাযহাব এই যে, যে ব্যক্তি নিজের উপর কোন খাদ্য অথবা স্ত্রীদের ছাড়া অন্য কোন জিনিস হারাম করে নেয় তা তার উপর হারাম হয়ে যায় না এবং তার উপর কোন কাফফারাও নেই। কেননা, আল্লাহ পাক বলেছেন- হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের উপর পবিত্র জিনিসগুলো হারাম করো না, যেগুলো তিনি তোমাদের জন্যে হালাল করেছেন। এ কারণেই যে ব্যক্তি নিজের উপর গোশত ভক্ষণ হারাম করে নিয়েছিল তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাফফারা আদায় করার নির্দেশ দেননি। কিন্তু আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) প্রমুখ ইমামগণ বলেন যে, যে ব্যক্তি নিজের উপর কোন খাদ্য বা পোশাক অথবা অন্য কোন জিনিস হারাম করে নেয়, তার উপর সেই কসম ভঙ্গের কাফফারা ওয়াজিব। কেননা, যখন কোন লোক নিজের উপর কোন জিনিস পরিত্যাগ করা অপরিহার্য করে নেয়, তখন কসমের কাফফারার মতই নিজের উপর শুধু হারাম করে নেয়ার ফলে ও অপরিহার্য না হওয়া জিনিসকে অপরিহার্য করে নেয়ার প্রতিশোধ হিসেবে তাকে জবাবদিহি করা উচিত এবং এটা কাফফারার মাধ্যমেই সম্ভব। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এরূপ ফতওয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, আল্লাহ পাকের কালাম দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হচ্ছে। ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী! আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেস, আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে খুশী করার জন্যে তা নিজের জন্যে হারাম করছেন কেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়। (৬৬:১) এখানে আল্লাহ তা'আলা উল্লিখিত আয়াত বর্ণনা করার পর কসমের কাফফারার বর্ণনা দিলেন। এর দ্বারা এটা সাব্যস্ত হচ্ছে যে, কসমের উল্লেখ না থাকলেও যদি কেউ নিজের উপর কোন জিনিস হারাম করে নেয় তবে কসমের কাফফারার মতই তার উপর কাফফারা ওয়াজিব হবে। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, কয়েকজন সাহাবী, যেমন হযরত উসমান ইবনে মাউন (রাঃ) এবং আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) দুনিয়া পরিত্যাগ করা, পুংলিঙ্গ কর্তন করা এবং চট পরিধান করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ইবনে জুরাইহ্ ইকরামা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ), আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ), ইবনে মাসউদ (রাঃ), মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ), আবু হুযাইফা (রাঃ)-এর ক্রীতদাস সালিম (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণ সংসার ত্যাগের ইচ্ছে করে বাড়ীর মধ্যে বসে পড়লেন, স্ত্রীদের সংসর্গ ত্যাগ করলেন, চট পরিধান করলেন এবং ভাল ভাল খাদ্য ও পোশাক নিজেদের উপর হারাম করে দিলেন। তারা বানী ইসরাঈলের সন্ন্যাসীদের মত জীবন যাপন করতে শুরু করলেন এবং খাসী হয়ে যাওয়ার সংকল্প করলেন। এ ঐক্যমতে তারা পৌঁছলেন যে, পর্যায়ক্রমে সারারাত সালাত আদায় করবেন এবং সারাদিন রোযা রাখবেন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল এবং তাদেরকে বলা হল ও আল্লাহর পবিত্র ও হালাল বস্তুগুলোকে নিজেদের উপর হারাম করে নিয়ো না ও সীমা অতিক্রম করনা, আমি এসব লোককে কখনই পছন্দ করি না। এগুলো মুসলিমদের নীতি নয় যে, তোমরা স্ত্রীদের থেকে পৃথক থাকবে, ভাল খাবার, পানীয় ও পোশাক পরিত্যাগ করবে, সদা সারারাত ধরে সালাত আদায় করবে ও সারাদিন রোযা রাখবে এবং খাসী হয়ে যাবে, অর্থাৎ পুংলিঙ্গ কর্তন করবে। এসব নীতি সম্পূর্ণ ভুল। অতঃপর যখন তাদের ব্যাপারে এ আয়াত অবতীর্ণ হল তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের কাছে লোক পাঠিয়ে তাদেরকে জানিয়ে দিলেন“তোমাদের উপর তোমাদের নফসের হক রয়েছে এবং তোমাদের চক্ষুর হক রয়েছে। তোমরা রোযা রাখবে ও (মাঝে মাঝে) রোযা ছেড়েও দিবে, (রাতে নফল) সালাত আদায় করবে এবং নিদ্রাও যাবে। আর জেনে রাখবে যে, যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত পরিত্যাগ করবে সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।” তখন তারা বললেন :হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এ সংকল্প হতে রক্ষা করুন এবং আপনার অবতারিত অহী অনুযায়ী চলার তাওফীক দিন।(আরবী) -এর অর্থ এটাও হতে পারে-তোমরা হালাল বস্তুকে নিজেদের উপর হারাম করে দিয়ে নফসের উপর সংকীর্ণতা আনয়ন করো না। আবার এও অর্থ হতে পারে-তোমরা হালালকে হারাম বানিয়ে নিয়ে না এবং হালাল দ্বারা উপকার লাভ করতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করো না। হালালকেও প্রয়োজন পরিমাণই গ্রহণ কর, প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রহণ করো না। (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা খাও, পান কর, কিন্তু অপব্যয় করো না।”(৭:৩১) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “মুমিন ওরাই যে, যখন তারা খরচ করে তখন তারা অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না, বরং তাদের খরচ করণ এর মাঝামাঝি পন্থায় হয়ে থাকে।” আল্লাহ তা'আলা না ‘ইফরাত’ বা বাহুল্যের অনুমতি দিয়েছেন, না তাফরীত বা অত্যল্পতার অনুমতি দিয়েছেন। এ জন্যেই তিনি বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ তোমরা সীমা অতিক্রম করো না।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা সর্বাবস্থায় হালাল ও পবিত্র জিনিস ভক্ষণ কর এবং সর্বকাজে আল্লাহকেই ভয় কর। তাঁর মর্জির অনুসরণ কর এবং বিরোধিতা ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাক।

আল-মায়িদা 5:89

অর্থহীন কসমের বর্ণনা সূরায়ে বাকারায় দেয়া হয়েছে, সুতরাং এখানে তার পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। এ ধরনের কসম মানুষ তার কথা বার্তার মধ্যে অনিচ্ছা সত্ত্বেও করে থাকে। যেমন সে বলে, আল্লাহর কসম ইত্যাদি। এটা ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর উক্তি। অন্যান্যদের উক্তি এই যে, এরূপ কসম উপহাস ও অবাধ্যতার স্থলেও হতে পারে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর উক্তি এই যে, দৃঢ় বিশ্বাসের সময় এরূপ করা হলেও তা অর্থহীন কসমের সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে যাবে। কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, এটা হচ্ছে ক্রোধের সময় বা ভুল বশতঃ কসম। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, কেউ যদি কোন খাদ্য, পানীয় বা পোষাক পরিত্যাগ করা সম্পর্কে কসম খায় তবে এ দলীল অনুযায়ী তাকে পাকড়াও করা হবে না। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, অনিচ্ছাকৃতভাবে যে কসম মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে ওটাই হচ্ছে অর্থহীন বা বাজে কসম। (আরবী) অর্থাৎ তোমরা যদি কসমকে দৃঢ় করে নাও তবে সেই কসমের জন্যে আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন।(আরবী) অর্থাৎ দৃঢ় কসম ভেঙ্গে দেয়ার কাফফারা হচ্ছে দশজন অভাবগ্রস্ত লোককে খেতে দেয়া। তাদেরকে তোমরা এমন মধ্যম ধরনের খাবার খেতে দেবে যা তোমরা তোমাদের পরিবারের লোকদেরকে খাওয়াইয়ে থাক। এ মধ্যম ধরনের খাদ্য হচ্ছে রুটি ও দুধ কিংবা রুটি ও তেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কোন কোন লোক নিজের পরিবারকে তার ক্ষমতার তুলনায় খারাপ খাদ্য ভক্ষণ করিয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ নিজের ক্ষমতার তুলনায় ভাল খাবার খাওয়াইয়ে থাকে। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেছেন যে, সেই খাদ্য মধ্যম ধরনের হওয়া উচিত। না খুবই ভাল, না খুবই মন্দ। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) ওটা হচ্ছে রুটি ও গোশত, রুটি ও দুধ, রাওগান’ তেল বা সিরকাহ ইত্যাদি। (এটা ইবনে সীরীন, হাসান ও যহাকের উক্তি) ইবনে জারীর (রাঃ) বলেন যে, দ্বারা খাদ্যের স্বল্পতা ও আধিক্য বুঝানো হয়েছে। খাদ্যের পরিমাণের ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, সকাল ও সন্ধ্যা এ দু’সময়ে দশজন মিসকীনকে খানা খাওয়াতে হবে। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, একবারই যথেষ্ট। অর্থাৎ রুটি ও গোশত। আর গোস্ত দিতে না পারলে রুটি ও রাওগান তেল বা সিরকাই যথেষ্ট হবে এবং তা পেট পুরে খাওয়াতে হবে। অন্যান্যগণ বলেন যে, দশজনের প্রত্যেককে অর্ধ সা’ (প্রায় সোয়া সের) গম বা খেজুর অথবা এ ধরনের কোন খাবার দিতে হবে। (এটা হযরত আয়েশা (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ), নাখঈ (রঃ) এবং যহহাকেরও (রঃ) উক্তি) ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) বলেন যে, গম হলে অর্ধ সা’ আর অন্য কিছু হলে এক সা' দেয়া উচিত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক সা' খেজুর কাফফারা হিসেবে আদায় করেছিলেন এবং লোকদেরকে তিনি এরই নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর খেজুর না হলে অর্ধ সা’ গম দিতে হবে।ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, কসমের কাফফারায় নবী (সঃ)-এর সেই মুদ পরিমাণ ওয়াজিব, যে মুদ তিনি মিসকীনের জন্যে ধার্য করেছিলেন, আর তা হচ্ছে ৫৬ তোলা গম। কিন্তু তিনি তরকারীর কথা বলেননি। এখানে ইমাম শাফিঈ (রঃ) দলীল হিসেবে নবী (সঃ)-এর ঐ হুকুমকে গ্রহণ করেছেন, যে হুকুম তিনি ঐ ব্যক্তিকে দিয়েছিলেন যে রমযানের রোযার অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস করে ফেলেছিল। সে হুকুম এই ছিল যে, সে যেন ৭০জন মিসকীনকে এমন পরিমাণ যন্ত্রে গম মেপে দেয় যাতে ১৫ সা’ গম ধরে, যেন প্রত্যেকে এক মুদ করে গম পেতে পারে। ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন যে, গম দেবে এক মুদ অথবা অন্য জিনিস দেবে দু’ মুদ। (৩. এটা ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আর ইবনে মাজা (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন এবং তাঁর সনদে দুর্বলতা রয়েছে) আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।(আরবী) ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, যদি ঐ দশজনের প্রত্যেককেই একই পরিমাণ কাপড় দেয় যার উপর পোশাকের প্রয়োগ হতে পারে তবে তা যথেষ্ট হবে। যেমন একটা জামা বা পায়জামা অথবা পাগড়ী কিংবা চাদর। ইমাম মালিক (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেককে এ পরিমাণ কাপড় দেয়া উচিত, যে পরিমাণ কাপড় নামাযে পরিধান করা জরুরী। পুরুষ ও স্ত্রীকে শরঈ প্রয়োজন হিসেবে দিতে হবে। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।হাসান (রঃ) বলেন যে, দু’টি কাপড় দিতে হবে। সাওরী (রঃ) বলেন যে, একটি পাগড়ী দেবে যা মাথাকে ঢেকে নেয় এবং একটি চাদর দেবে যা দেহকে ঢেকে দেয়।(আরবী) ইমাম আবু হানাফী (রঃ) এর দ্বারা সাধারণ গোলাম অর্থ নিয়েছেন। সুতরাং তাঁর মতে কাফির গোলাম আযাদ করতে পারে এবং মুমিন গোলাম আযাদ করতে পারে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও অন্যান্য ফকীহগণ বলেন। যে, হত্যার কাফফারায় যেমন মুমিন গোলামের শর্ত রয়েছে দ্রুপ কসমের কাফফারাতেও মুমিন গোলাম হওয়া জরুরী। কেননা, কারণ পৃথক হলেও ওয়াজিব তো একই। মুআবিয়া ইবনে হাকাম আস-সালমী (রাঃ)-এর হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, তার উপর একবার একটা গোলাম আযাদ করার দায়িত্ব পড়েছিল। তখন তিনি একটি হাবশি ক্রীতদাসী নিয়ে আসেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ক্রীতদাসীটিকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ কোথায়? সে উত্তরে বলে তিনি আকাশে রয়েছেন। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আমি কে?' উত্তরে দেয়, আপনি আল্লাহর রাসূল (সঃ)। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুআবিয়া ইবনে হাকাম আস-সালমী (রাঃ)-কে বললেনঃ “এ মুমিনা, সুতরাং তুমি তাকে আযাদ করতে পার। (এটা ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে, ইমাম মালিক (রঃ) তাঁর মুআত্তা গ্রন্থে এবং ইমাম শাফিঈ (রঃ) তার মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এখন এ তিন প্রকারের কাফফারার মধ্য হতে যে প্রকারের কাফফারা আদায় করা হবে তাই আদায় হয়ে যাবে। কুরআন কারীমে সর্বপ্রথম সহজটার কথা বলা হয়েছে। তারপর শ্রেণীগতভাবে বর্ণনা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ পোশাক দেয়ার তুলনায় খানা খাওয়ানো সহজ। অতঃপর গোলাম আযাদ করার তুলনায় পোশাক দেয়া সহজ। মোটকথা, নিম্নতম হতে উচ্চতমের দিকে পা বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষে বলা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি এ তিনটির মধ্যে একটির উপরেও সক্ষম হবে না, তাকে তিনটি রোযা রাখতে হবে। ইবনে জারীর (রঃ) সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁরা বলেছেনঃ যার নিকট তিনটি দিরহাম বা রৌপ্যমুদ্রাও থাকবে তাকে অবশ্যই খানা খাওয়াতে হবে, নচেৎ রোযা রাখতে হবে।' এখন এ তিনটি রোযা পর্যায়ক্রমে রাখা ওয়াজিব কি মুস্তাহাব বা বিচ্ছিন্নভাবে রাখাই যথেষ্ট কি-না এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর মতে পর্যায়ক্রমে রাখা ওয়াজিব নয়। ইমাম মালিকও (রঃ) এ কথাই বলেছেন। কেননা, (আরবী) কথাটি সাধারণ, পর্যায়ক্রমে তিনদিন রোযা রাখতে হবে- এভাবে একে বেঁধে দেয়া হয়নি। যেমন কারও যদি পর্যায়ক্রমে কয়েকটি রোযা কাযা হয় তবে পর্যায়ক্রমে ওগুলোও আদায় করা জরুরী নয়। কেননা (আরবী) (২:১৮৪) কথাটি সাধারণ। এক জায়গায় ইমাম শাফিঈ (রঃ) পর্যায়ক্রমে তিনটি রোযা ওয়াজিব হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে বলেছেন। হানাফী ও হানাবেল সম্প্রদায়েরও এটাই উক্তি। তাদের দলীল এই যে, হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ)-এর একটি কিরআতে (আরবী)-এরূপও রয়েছে। (হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও শাবী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) -এর কিরআত এটাই ছিল) এ কিরআতটি মুতাওয়াতিরভাবে বর্ণিত না থাকলেও কমপক্ষে খবরে ওয়াহিদ তো বটে। তাছাড়া সাহাবীদের তাফসীর দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় এবং এটা হাদীসে মারফু'র হুকুমেই পড়ে।(আরবী) এটা হচ্ছে কসমের শরঈ কাফফারা ।(আরবী) ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে তোমরা কাফফারা আদায় না করে ছেড়ে দিয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় নিদর্শনাবলী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে থাকেন, যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।

আল-মায়িদা 5:90

৯০-৯৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ পাক স্বীয় মুমিন বান্দাহদেরকে মদ্য পান জুয়া খেলা ইত্যাদি থেকে নিষেধ করছেন। আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেন যে, শতরঞ্জ এক প্রকারের জুয়া। মুজাহিদ (রঃ) এবং আতা’ (রঃ) বলেন যে, বাজি রেখে যে খেলা করা হয় সেটাই জুয়া। এমনকি ছেলেরা বাজি রেখে যে কড়ি খেলে সেটাও জুয়া। রাশিদ ইবনে সা'দ ও যমরা' ইবনে হাবীব অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। অজ্ঞতার যুগে ইসলাম আগমনের পূর্ব পর্যন্ত এই জুয়া বিশেষভাবে খেলা হতো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে এই জঘন্য খেলা খেলতে নিষেধ করেছেন। মালিক (রঃ) বলেন যে, অজ্ঞতার যুগে সাধারণভাবে এই জুয়া খেলা হতো। একটি দু'টি ছাগলের গোশত শর্ত হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হতো। যুহরী (রঃ) বলেন, জুয়া এভাবে হতো যে, মাল এবং ফলের উপর পাশা নিক্ষেপ করা হতো এবং এভাবে জুয়ার মাধ্যমে ওগুলোর উপর অধিকার লাভ করা হতো। কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) বলেন যে, যা কিছু। আল্লাহ ও নামাযের স্মরণ থেকে ভুলিয়ে রাখে তার সবই জুয়া। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, পাশার মাধ্যমে যে খেলা করা হয় তা-ই জুয়া। অনুরূপভাবে খেলার সময় যে জিনিসকে মেরে জয়লাভ করা হয় সেটাও জুয়া। এর ভাবার্থ যেন এটাই যে, শতরঞ্জ খেলা হারাম।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি চওসর’ খেলা করলো সে যেন শূকরের মাংস ও রক্ত দ্বারা স্বীয় হাত রঙ্গিয়ে দিলো।” (এটা ইমাম মুসলিম (রঃ) বুরাইদাহ ইবনে খাসীব আসলামী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) মুআত্তায়ে ইমাম মালিকের মধ্যে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি চওসর’ খেললো সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর নাফরমানী করলো। (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আর শতরঞ্জ সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, ওটা চওসর থেকেও খারাপ এবং তিনি ওটাকে পাশা ও জুয়ার মধ্যে গণ্য করেন। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) একে মাকরূহ বলেছেন।(আরবী) সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) ঐ পাথরগুলোকে বলা হতো যেগুলোর উপর পশু যবাই করে মুশরিকরা তাদের মূর্তিগুলোর নামে উৎসর্গ করতো। (আরবী) ঐ পাশাগুলোকেও বলা হতো যেগুলোকে বণ্টন করে শুভাশুভ লক্ষণ বের করা হতো। (আরবী)- অর্থাৎ এগুলো গহিত বিষয়, আর এগুলো শয়তানী কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। এমনকি এগুলো হচ্ছে নিকৃষ্টতম শয়তানী কাজ। (আরবী) -এর সর্বনামটি শব্দের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা এগুলো পরিত্যাগ কর।(আরবী) - এ কথা দ্বারা আল্লাহ পাক স্বীয় বান্দাদেরকে এসব কাজ পরিত্যাগ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ শয়তান তো ওটাই চায় যে, মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখে, সুতরাং এখনও কি তোমরা (এসব কাজ থেকে) বিরত থাকবে না? এ কথাগুলো আল্লাহ তা'আলার বান্দাদের প্রতি ভয় প্রদর্শন ও সতর্কবাণী। মদ্য হারাম হওয়া সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, মদ্য তিনবার হারাম করা হয়। যখন নবী (সঃ) মদীনায় আগমন করেন সেই সময় মদীনার লোকেরা মদ্য পান করতো এবং জুয়ার মাধ্যমে উপার্জিত মাল ভক্ষণ করতো। ঐ সম্পর্কে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আল্লাহ তা'আলা নিম্নলিখিত আয়াত অবতীর্ণ করেন। তুমি বল- এই দু’জিনিসে মানুষের জন্যে সামান্য উপকার আছে বটে; কিন্তু এই উপকারের তুলনায় ক্ষতি খুবই বেশী। তখন লোকেরা বলাবলি করতে লাগলোঃ আল্লাহ তাআলা এ দুটো জিনিস আমাদের উপর হারাম তো করলেন। না। তিনি শুধু বললেন যে, এ দুটো জিনিসে আমাদের উপকার কম এবং ক্ষতি বেশী। সুতরাং তারা মদ্যপান করতেই থাকলো। কিন্তু একদিন এমন আসলো যে, এক মুহাজির সাহাবী নেশার অবস্থায় নামাযে কুরআন মাজীদ পাঠ করতে গিয়ে ভুল ও গড়বড় করে দেন। তখন নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।“হে মুমিনগণ! তোমরা নেশার অবস্থায় নামাযের কাছেও যেয়ো না, যে পর্যন্ত না জানতে পার যে, তোমরা কি বলছো। সুতরাং লোকেরা নামাযের সময় মদ্যপান পরিত্যাগ করলো বটে; কিন্তু অন্য সময় পান করতেই থাকলো। কেননা, তখন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। অবশেষে একদিন মদ্যপান করে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কোন একজন লোক নামায পড়ছিল, এমন সময় পরিষ্কারভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে (আরবী) -এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। তখন লোকেরা বলেঃ হে আমাদের প্রভু! আমরা বিরত থাকলাম। অতঃপর লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মদ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পূর্বে যারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে নিহত হয়েছে কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে; কিন্তু তারা মদ্যপান করতো এবং জুয়া খেলতো- তাদের কি হবে? কেননা, আল্লাহ তা'আলা তো এটাকে শয়তানী কাজ বলে আখ্যায়িত করলেন এবং নিষিদ্ধ করলেন। তখন নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ হলো-যারা ঈমান এনেছিল এবং ভাল কাজ করেছিল তারা নিষিদ্ধ ঘোষণা হওয়ার পূর্বে যা কিছু ভক্ষণ করেছিল সে জন্যে তাদের উপর কোন দোষারোপ করা হবে না। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যদি তাদের জীবদ্দশায় এটা হারাম করা হতো তবে তোমরা যেমন তা ছেড়ে দিলে, তারাও দ্রুপ ছেড়ে দিতো।”ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, মদ হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে হযরত উমার (রাঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বললেনঃ হে আল্লাহ! আমাদের জন্যে মদ্য সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা দিন!' তখন সূরায়ে বাকারার (আরবী) (৪:৪৩)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অতঃপর যখন হযরত উমার (রাঃ)-কে এ আয়াত শুনানো হয় তখন তিনি পুনরায় প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! আমাদের জন্যে মদ্যের ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা দান করুন! তখন সূরায়ে নিসার। (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন নবী (সঃ)-এর মুআযযিন (আরবী) বলার পর উচ্চৈঃস্বরে বলে দেন যে, নেশার অবস্থায় নামায পড়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ)-কে এ আয়াতটিও পড়ে শুনানো হয়। তিনি এবারেও বলেন, হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্যে আরও সুস্পষ্ট ও খোলাখুলিভাবে বর্ণনা করে দিন! তখন সূরায়ে মায়িদাহ্র উল্লিখিত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এবারও হযরত উমার (রাঃ)-কে আয়াতটি পাঠ করে শুনানো হয়। যখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, (আরবী) (সুতরাং তোমরা বিরত থাকবে কি?) তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমরা বিরত থাকলাম, আমরা বিরত থাকলাম।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) নবী (সঃ)-এর মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, হে লোক সকল! মদ হারাম ঘোষিত হয়েছে। আর পাঁচটি জিনিসের মধ্যে যেটা দিয়েই মদ তৈরী করা হবে সেটাই হারাম। সেই পাঁচটি জিনিস হচ্ছেঃ আঙ্গুর, খেজুর, মধু, গম ও যব। (আরবী) বা মদ শব্দটি সাধারণ। সুতরাং যে নেশার জিনিস পান করলে জ্ঞান লোপ পায় সেটাই মদ। সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন, যে সময় মদ হারাম করা হয় সে সময় মদীনায় আঙ্গুরের মদ চালু ছিল না। অপর একটি হাদীসে রয়েছে যে, আব্দুর রহমান ইবনে আ’লা বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে মদ্য বিক্রয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তখন তিনি বলেন, সাকীফ অথবা দাউদ গোত্রের একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বন্ধু ছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলিত হন এবং মদের একটি বড় কলস উপঢৌকন হিসেবে তাকে প্রদান করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মদ হারাম করে দিয়েছেন, তা কি তুমি জান না? তখন লোকটি স্বীয় গোলামকে বলেনঃ “এটা নিয়ে গিয়ে বাজারে বেচে দাও।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “যিনি মদ হারাম করেছেন তিনি ওর ক্রয়-বিক্রয়ও হারাম করেছেন। তখন লোকটি তার গোলামকে বললো, তুমি এই কলসটি শহরে নিয়ে গিয়ে উলটিয়ে ফেলে দাও।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)আর একটি হাদীসে তামীম দারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একটি মদের মটকা (মৃৎপাত্র) উপঢৌকন স্বরূপ পাঠাতেন। অতঃপর মদ হারাম হয়ে যাওয়ার পর পূর্বের অভ্যাস মত তিনি মদের মটকা নিয়ে আসেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠে বলেনঃ “ইতিমধ্যে মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে।” তিনি তখন বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমি ওটা বিক্রি করে দেবো এবং ওর মূল্য দ্বারা উপকৃত হবো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ ইয়াহুদীদের উপর লা'নত বর্ষণ করুন। তাদের উপর গরু ও ছাগলের চর্বি হারাম করে দিয়েছিলেন, তখন তারা তা গলিয়ে ‘রাওগান’ (তৈল) তৈরী করতঃ বিক্রি করতো। আল্লাহ তা'আলা মদ ও ওর মূল্য সব কিছুই হারাম করেছেন।” মুসনাদে আহমাদে হযরত নাফে ইবনে কাইসান হতে বর্ণিত আছে যে, তাঁর পিতা (কাইসান) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে মদের ব্যবসা করতেন। একবার তিনি ব্যবসার জন্যে সিরিয়া হতে কতগুলো মদের মটকা নিয়ে আসেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তিনি একটি মটকা নিয়ে এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার জন্য খুবই উত্তম মদ নিয়ে এসেছি। তখন তিনি বলেনঃ ‘হে কাইসান। ইতিমধ্যে মদ তো হারাম করে দেয়া হয়েছে।' কাইসান (রাঃ) তখন জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কি এটা বিক্রি করে দেববা? তিনি উত্তরে বলেনঃ “এটা হারাম করা হয়েছে এবং এর মূল্যও হারাম করে দেয়া হয়েছে।” তখন কাইসান (রাঃ) মটকাগুলো নিয়ে গিয়ে পা দিয়ে উলটিয়ে ফেলে দেন এবং সমস্ত মদ বইয়ে দেন।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আমি আবূ তালহা (রাঃ)-এর বাড়ীতে হযরত আবু উবাইদাহ্ ইবনে জাররাহ (রাঃ), হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ), হযরত সুহাইল ইবনে বাইযা (রাঃ) এবং তার অন্যান্য সাথীদেরকে মদ পান করাচ্ছিলাম। এমনকি তাদের মাতাল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এমতাবস্থায় মুসলমানদের এক আগমনকারী এসে বলেনঃ “মদকে হারাম করে দেয়া হয়েছে এ খবর কি আপনারা জানেন?” তখন তারা বলেন, এখনও আমরা অপেক্ষা করবো এবং এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবো। অন্যান্য সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আনাস (রাঃ)! তোমার মটকায় যা কিছু মদ অবশিষ্ট রয়েছে তা উলটিয়ে,ফেলে দাও। আল্লাহর কসম! এখন আমরা আর মদ পান করবো না।” এটা ছিল খেজুর ও যবের মদ। আর সে সময় ঐ মদই চালু ছিল। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) হযরত আনাস (রাঃ) হতে আর একটি বর্ণনা রয়েছে, তিনি বলেন, যেদিন মদ হারাম করা হয় সেদিন আমি আবূ তালহা (রাঃ)-এর বাড়িতে লোকদেরকে মদ পান করাচ্ছিলাম। ঐ মদ ছিল যব ও খেজুরের তৈরী। হঠাৎ একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেন। তখন কেউ বলে ওঠেন, ‘বেরিয়ে দেখ তো। কি ঘোষণা করা হচ্ছে?' তখন জানা গেল যে, ঘোষণাকারী ঘোষণা করছেন“জেনে রেখো যে, মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে।” ঐ সময় মদীনার অলিতে গলিতে মদ বয়ে যাচ্ছিল। বর্ণনাকারী আনাস (রাঃ) বলেন, আবু তালহা (রাঃ) আমাকে বললেন, ‘বেরিয়ে গিয়ে মদ বইয়ে দাও।' তখন আমি তা বইয়ে দিলাম। তখন কেউ কেউ বললেন, অমুক ও অমুক যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, অথচ এই মদ তাঁদের পেটের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। বর্ণনাকারী বলেন, তখন আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করেন- (আরবী) অর্থাৎ যারা ঈমান রাখে ও ভাল কাজ করে, এরূপ লোকদের উপর তাতে কোন গুনাহ নেই যা তারা (পূর্বে) পানাহার করেছে। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, আমি আবূ তালহা (রাঃ), আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ), আবু দাজানা (রাঃ), মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ), সুহাইল ইবনে বাহযা (রাঃ) প্রমুখ ব্যক্তি মহোদয়ের কাছে মদ পরিবেশন করছিলাম এবং নেশার কারণে তাঁদের মাথাগুলো ঢলে পড়ছিল, এমন সময় আমি ঘোষণাকারীকে ঘোষণা করতে শুনলাম, জেনে রেখো যে, মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে। এ কথা শোনা মাত্রই যারা আমাদের কাছে আসছিলেন এবং যারা আমাদের নিকট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, সবাই নিজ নিজ মদ বইয়ে দেন। আমরা সবাই মদের কলসগুলো ভেঙ্গে ফেলি। আমাদের কেউ কেউ অযু করেন এবং কেউ কেউ গোসলও করেন। আমরা উম্মে সুলাইমের নিকট থেকে সুগন্ধি নিয়ে ব্যবহার করি। অতঃপর আমরা মসজিদে গমন করি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করে শুনিয়ে দেন। একটি লোক তখন বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যারা এটা পান করা অবস্থায় মারা গেছে তাদের কি হবে? সেই সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। একটি লোক হযরত কাতাদা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি আপনি এটা হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে শুনেছেন? তিনি উত্তরে বলেন, হ্যা। একটি লোক হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে শুনেছেন? তিনি উত্তর দেন, হ্যা, আমরা কখনও মিথ্যা বলি না এবং মিথ্যা কি তা আমরা জানি না। (এটা ইবনে জারীর (রঃ) ইবাদ ইবনে রাশিদ (রঃ)-এর হাদীস হতে তাখরীজ করেছেন, তিনি কাতাদাহ (রাঃ) হতে এবং তিনি আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “নিশ্চয় আল্লাহ মদ, জুয়া, শতরঞ্জ এবং গাবীরা গাছ হতে নিংড়ানো মদ হারাম করেছেন, আর প্রত্যেক নেশাযুক্ত জিনিসই। হারাম।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বেড়ার দিকে গমন করেন। আমি তাঁর ডান দিকে ছিলাম। এমন সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) সামনের দিক থেকে আগমন করলেন। আমি তখন পিছনে চলে গেলাম এবং হযরত আবূ বকর (রাঃ) তাঁর ডান দিকে হয়ে গেলেন। আর আমি তার বাম দিকে গেলাম। ইতিমধ্যে হযরত উমার (রাঃ)-কে আসতে দেখা গেল। আমি তখন সরে গেলাম এবং তিনি তাঁর বাম দিকে চলে গেলেন। এখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ বেড়ার মধ্যে আসলেন যা বাড়ীর পিছনে উট বাঁধার জায়গা ছিল। সেখানে মদের একটি মশক দেখা গেল। ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডাকলেন এবং ছুরি দিয়ে ওটা কেটে ফেলতে বললেন। আমি তখন ওটা ফেড়ে ফেললাম। তারপর তিনি বললেনঃ ‘মদ, মদ্যপানকারী, পরিবেশনকারী, বহনকারী, নিংড়িয়ে রস বেরকারী, তৈরিকারী এবং ওর মূল্য গ্রহণকারী সকলের উপর আল্লাহর লানত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন।)হযরত সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মদের ব্যাপারে চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর তিনি হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একজন আনসারী আমাদেরকে দাওয়াত করেন। আমরা সেখানে প্রচুর মদ পান করি। এটা ছিল মদ হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা। আমরা যখন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি তখন আমরা পরস্পর ফখর বা গৌরব প্রকাশ করতে শুরু করি। আনসারগণ বলেন, আমরাই উত্তম।' আবার কুরাইশরা বলেন, “আমরাই উত্তম।' অতঃপর এক আনসারী উটের একটা বড় হাড় নিয়ে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নাকের উপর মেরে দেন। ফলে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নাকের হাড় ভেঙ্গে যায়। তখন (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারদের দু'টি দলকে কেন্দ্র করে মদ্য হারাম হওয়ার আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তারা প্রচুর পরিমাণে মদ পান করার ফলে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। কারও চেহারায় আঘাত লাগে, কারও মাথা ক্ষত-বিক্ষত হয় এবং কারও দাড়ি উঠিয়ে ফেলা হয়। কেউ বলেন, “আমার অমুক সঙ্গী আমাকে আহত করেছে। এভাবে তারা একে অপরের শক্ত হয়ে পড়েন। অথচ ইতিপূর্বে তাদের মধ্যে প্রেম-প্রীতি বিদ্যমান ছিল। কারও প্রতি কারও কোন হিংসা বিদ্বেষ ছিল না। তারা বলতে শুরু করেন, যদি সে আমার প্রতি সহানুভূতিশীল হতো তবে আমাকে এভাবে আহত করতো না। এভাবে তাদের মধ্যে শক্রতা বেড়ে যায়। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। এরপর কতক লোক বলেনঃ কতগুলো লোক উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, অথচ তাদের পেটে মদ বিদ্যমান ছিল, তাদের কি হবে? তখন আল্লাহ পাক (আরবী) -এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। (এই হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইবনে জারীর (রঃ) আবু বুরাইদাহ (রঃ) হতে এবং তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি (তার পিতা) বলেন, আমরা একটা ছোট পাহাড়ের উপর বসে মদ পান করছিলাম। আমরা তিনজন বা চারজন ছিলাম। আমাদের সামনে মদের কলস ছিল এবং মদের চক্র চলছিল। আমি উঠে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে গেলাম এবং তাঁকে সালাম দিলাম। তখনই মদ হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হলো। আমি তৎক্ষণাৎ আমার সঙ্গীদের নিকট আসলাম এবং তাদের কাছে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করলাম। কেউ মদ পান করে ফেলেছিলেন। আবার কেউ কেউ আংশিক পান করেছিলেন এবং আংশিক পাত্রে অবশিষ্ট ছিল। পাত্র তার হাতেই ছিল। কারও মুখে মদ লেগেও ছিল। এমতাবস্থায় সবাই নিজ নিজ মদ মাটিতে বইয়ে দিলেন এবং আয়াতের শেষাংশ (আরবী) শোনামাত্রই তারা বলে উঠলেন, “হে আমাদের প্রভু! আমরা বিরত থাকলাম।সহীহ বুখারীতে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, উহুদ যুদ্ধের দিন সকালে লোকেরা মদ পান করেছিলেন এবং সেই দিনই তাঁদের অধিকাংশ শহীদ হয়েছিলেন। এটা ছিল মদ হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা।আবু দাঊদ তায়ালিসী (রঃ) হযরত বারা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যে, যখন মদ হারাম হওয়া সম্পর্কিত আয়াত অবতীর্ণ হয়। তখন জনগণ বলেন, এটা হারাম হওয়ার পূর্বে যারা এটা পান করেছিলেন (এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গিয়েছেন। তাঁদের কি হবে?” তখন (আরবী) –এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।মুসনাদে আহমাদ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু তালহা (রাঃ) তাঁর কাছে প্রতিপালিত ইয়াতীমদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ফতওয়া জিজ্ঞেস করেন যারা উত্তরাধিকার সূত্রে মদ প্রাপ্ত হয়েছিল। রাসলল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “ওটা বইয়ে দাও।' আবু তালহা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘ওর সিরকাহ বানিয়ে নিলে হয় না? তিনি জবাবে বলেনঃ না।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“যে ব্যক্তি দুনিয়ার মদ পান করলো এবং তা থেকে তাওবা করলো না, পরকালে তার জন্যে তা হারাম হয়ে গেল।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) মালিক (রাঃ)-এর হাদীস হতে তাখরীজ করেছেন)হযরত নাফে' (রাঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- ‘নেশাযুক্ত প্রত্যেক জিনিসই হারাম। যে ব্যক্তি সারা জীবন ধরে মদ পান করে মারা গেলো এবং তা হতে তাওবা করলো না, সে পরকালে তা পান করতে পাবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ অনুগ্রহের খোটাদানকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য এবং সদা মদ্যপানকারী জান্নাতে যাবে না। (এ হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম যুহরী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) একবার জনগণকে সম্বোধন করে বলেন, তোমরা মদ্য পান থেকে বিরত থাক, কেননা, এটাই হচ্ছে সমস্ত দুস্কার্য ও অশ্লীলতার মূল। তোমাদের পূর্ব যুগে একজন বড় ‘আবেদ লোক ছিল। সে জনগণের সাহচর্যে থাকতো না। একটি পতিতা মহিলার তার প্রতি দৃষ্টি পড়ে যায়। সে সাক্ষ্য নেয়ার বাহানায় তার চাকরাণীর মাধ্যমে তাকে ডেকে পাঠায়। সে তার সাথে চলে আসে। অতঃপর সে যে দরজা দিয়ে প্রবেশ করে, পিছন থেকে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। অবশেষে সে মহিলাটির নিকট হাযির হয়ে দেখতে পায় যে, সেখানে একটি শিশু ও মদের একটি কলস রয়েছে। সে তখন তাকে বলে, “আল্লাহ্র কসম! আমি আপনাকে সাক্ষ্য নেয়ার উদ্দেশ্যে ডাকিনি। বরং ডেকেছি এই উদ্দেশ্যে যে, আপনি আমার কাছে থেকে রাত কাটাবেন, অথবা এই শিশুটিকে হত্যা করবেন কিংবা মদ পান করবেন।” তখন সে (হত্যা ও ব্যভিচার অপেক্ষা মদ্যপানের পাপকে ছোট মনে করে) এক পেয়ালা মদ পান করে ফেলে। তারপর বলেঃ আমাকে আরও দাও।' শেষ পর্যন্ত সে নেশাগ্রস্ত হয়ে শিশুটিকে হত্যা করে বসে এবং মহিলাটির সাথে ব্যভিচার করে ফেলে। তাই তোমরা মদ্যপান থেকে বিরত থাক। মদ ও ঈমান কখনও এক জায়গায় জমা হতে পারে না। মদ থাকলে ঈমান নেই এবং ঈমান থাকলে মদ নেই। তাঁর এ উক্তির প্রমাণ হিসেবে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের ঐ হাদীসটি উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ব্যভিচারী যে সময় ব্যভিচার করে সে সময় সে মুমিন থাকে না, চোর যখন চুরি করে তখন সে মুমিন থাকে না এবং মদ্যপানকারী যখন মদ্যপান করে তখন সে মুমিন থাকে না। মুসনাদ আহমাদে আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “যে ব্যক্তি মদ্য পান করে, আল্লাহ তার উপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত অসন্তুষ্ট থাকেন। ঐ অবস্থায় যদি সে মারা যায় তবে সে কাফির হয়ে মারা যাবে। আর যদি সে তাওবা করে তবে আল্লাহ সেই তাওবা কবুল করবেন। কিন্তু যদি সে পুনরায় এতে ফিরে যায় (অর্থাৎ পুনরায় পান করতে শুরু করে। তবে তাকে (আরবী) পান করাবার অধিকার আল্লাহর আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) (আরবী) কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ তা হচ্ছে জাহান্নামীদের পূজ।

আল-মায়িদা 5:91

৯০-৯৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ পাক স্বীয় মুমিন বান্দাহদেরকে মদ্য পান জুয়া খেলা ইত্যাদি থেকে নিষেধ করছেন। আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেন যে, শতরঞ্জ এক প্রকারের জুয়া। মুজাহিদ (রঃ) এবং আতা’ (রঃ) বলেন যে, বাজি রেখে যে খেলা করা হয় সেটাই জুয়া। এমনকি ছেলেরা বাজি রেখে যে কড়ি খেলে সেটাও জুয়া। রাশিদ ইবনে সা'দ ও যমরা' ইবনে হাবীব অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। অজ্ঞতার যুগে ইসলাম আগমনের পূর্ব পর্যন্ত এই জুয়া বিশেষভাবে খেলা হতো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে এই জঘন্য খেলা খেলতে নিষেধ করেছেন। মালিক (রঃ) বলেন যে, অজ্ঞতার যুগে সাধারণভাবে এই জুয়া খেলা হতো। একটি দু'টি ছাগলের গোশত শর্ত হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হতো। যুহরী (রঃ) বলেন, জুয়া এভাবে হতো যে, মাল এবং ফলের উপর পাশা নিক্ষেপ করা হতো এবং এভাবে জুয়ার মাধ্যমে ওগুলোর উপর অধিকার লাভ করা হতো। কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) বলেন যে, যা কিছু। আল্লাহ ও নামাযের স্মরণ থেকে ভুলিয়ে রাখে তার সবই জুয়া। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, পাশার মাধ্যমে যে খেলা করা হয় তা-ই জুয়া। অনুরূপভাবে খেলার সময় যে জিনিসকে মেরে জয়লাভ করা হয় সেটাও জুয়া। এর ভাবার্থ যেন এটাই যে, শতরঞ্জ খেলা হারাম।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি চওসর’ খেলা করলো সে যেন শূকরের মাংস ও রক্ত দ্বারা স্বীয় হাত রঙ্গিয়ে দিলো।” (এটা ইমাম মুসলিম (রঃ) বুরাইদাহ ইবনে খাসীব আসলামী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) মুআত্তায়ে ইমাম মালিকের মধ্যে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি চওসর’ খেললো সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর নাফরমানী করলো। (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আর শতরঞ্জ সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, ওটা চওসর থেকেও খারাপ এবং তিনি ওটাকে পাশা ও জুয়ার মধ্যে গণ্য করেন। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) একে মাকরূহ বলেছেন।(আরবী) সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) ঐ পাথরগুলোকে বলা হতো যেগুলোর উপর পশু যবাই করে মুশরিকরা তাদের মূর্তিগুলোর নামে উৎসর্গ করতো। (আরবী) ঐ পাশাগুলোকেও বলা হতো যেগুলোকে বণ্টন করে শুভাশুভ লক্ষণ বের করা হতো। (আরবী)- অর্থাৎ এগুলো গহিত বিষয়, আর এগুলো শয়তানী কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। এমনকি এগুলো হচ্ছে নিকৃষ্টতম শয়তানী কাজ। (আরবী) -এর সর্বনামটি শব্দের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা এগুলো পরিত্যাগ কর।(আরবী) - এ কথা দ্বারা আল্লাহ পাক স্বীয় বান্দাদেরকে এসব কাজ পরিত্যাগ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ শয়তান তো ওটাই চায় যে, মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখে, সুতরাং এখনও কি তোমরা (এসব কাজ থেকে) বিরত থাকবে না? এ কথাগুলো আল্লাহ তা'আলার বান্দাদের প্রতি ভয় প্রদর্শন ও সতর্কবাণী। মদ্য হারাম হওয়া সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, মদ্য তিনবার হারাম করা হয়। যখন নবী (সঃ) মদীনায় আগমন করেন সেই সময় মদীনার লোকেরা মদ্য পান করতো এবং জুয়ার মাধ্যমে উপার্জিত মাল ভক্ষণ করতো। ঐ সম্পর্কে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আল্লাহ তা'আলা নিম্নলিখিত আয়াত অবতীর্ণ করেন। তুমি বল- এই দু’জিনিসে মানুষের জন্যে সামান্য উপকার আছে বটে; কিন্তু এই উপকারের তুলনায় ক্ষতি খুবই বেশী। তখন লোকেরা বলাবলি করতে লাগলোঃ আল্লাহ তাআলা এ দুটো জিনিস আমাদের উপর হারাম তো করলেন। না। তিনি শুধু বললেন যে, এ দুটো জিনিসে আমাদের উপকার কম এবং ক্ষতি বেশী। সুতরাং তারা মদ্যপান করতেই থাকলো। কিন্তু একদিন এমন আসলো যে, এক মুহাজির সাহাবী নেশার অবস্থায় নামাযে কুরআন মাজীদ পাঠ করতে গিয়ে ভুল ও গড়বড় করে দেন। তখন নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।“হে মুমিনগণ! তোমরা নেশার অবস্থায় নামাযের কাছেও যেয়ো না, যে পর্যন্ত না জানতে পার যে, তোমরা কি বলছো। সুতরাং লোকেরা নামাযের সময় মদ্যপান পরিত্যাগ করলো বটে; কিন্তু অন্য সময় পান করতেই থাকলো। কেননা, তখন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। অবশেষে একদিন মদ্যপান করে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কোন একজন লোক নামায পড়ছিল, এমন সময় পরিষ্কারভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে (আরবী) -এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। তখন লোকেরা বলেঃ হে আমাদের প্রভু! আমরা বিরত থাকলাম। অতঃপর লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মদ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পূর্বে যারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে নিহত হয়েছে কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে; কিন্তু তারা মদ্যপান করতো এবং জুয়া খেলতো- তাদের কি হবে? কেননা, আল্লাহ তা'আলা তো এটাকে শয়তানী কাজ বলে আখ্যায়িত করলেন এবং নিষিদ্ধ করলেন। তখন নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ হলো-যারা ঈমান এনেছিল এবং ভাল কাজ করেছিল তারা নিষিদ্ধ ঘোষণা হওয়ার পূর্বে যা কিছু ভক্ষণ করেছিল সে জন্যে তাদের উপর কোন দোষারোপ করা হবে না। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যদি তাদের জীবদ্দশায় এটা হারাম করা হতো তবে তোমরা যেমন তা ছেড়ে দিলে, তারাও দ্রুপ ছেড়ে দিতো।”ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, মদ হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে হযরত উমার (রাঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বললেনঃ হে আল্লাহ! আমাদের জন্যে মদ্য সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা দিন!' তখন সূরায়ে বাকারার (আরবী) (৪:৪৩)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অতঃপর যখন হযরত উমার (রাঃ)-কে এ আয়াত শুনানো হয় তখন তিনি পুনরায় প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! আমাদের জন্যে মদ্যের ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা দান করুন! তখন সূরায়ে নিসার। (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন নবী (সঃ)-এর মুআযযিন (আরবী) বলার পর উচ্চৈঃস্বরে বলে দেন যে, নেশার অবস্থায় নামায পড়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ)-কে এ আয়াতটিও পড়ে শুনানো হয়। তিনি এবারেও বলেন, হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্যে আরও সুস্পষ্ট ও খোলাখুলিভাবে বর্ণনা করে দিন! তখন সূরায়ে মায়িদাহ্র উল্লিখিত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এবারও হযরত উমার (রাঃ)-কে আয়াতটি পাঠ করে শুনানো হয়। যখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, (আরবী) (সুতরাং তোমরা বিরত থাকবে কি?) তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমরা বিরত থাকলাম, আমরা বিরত থাকলাম।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) নবী (সঃ)-এর মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, হে লোক সকল! মদ হারাম ঘোষিত হয়েছে। আর পাঁচটি জিনিসের মধ্যে যেটা দিয়েই মদ তৈরী করা হবে সেটাই হারাম। সেই পাঁচটি জিনিস হচ্ছেঃ আঙ্গুর, খেজুর, মধু, গম ও যব। (আরবী) বা মদ শব্দটি সাধারণ। সুতরাং যে নেশার জিনিস পান করলে জ্ঞান লোপ পায় সেটাই মদ। সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন, যে সময় মদ হারাম করা হয় সে সময় মদীনায় আঙ্গুরের মদ চালু ছিল না। অপর একটি হাদীসে রয়েছে যে, আব্দুর রহমান ইবনে আ’লা বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে মদ্য বিক্রয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তখন তিনি বলেন, সাকীফ অথবা দাউদ গোত্রের একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বন্ধু ছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলিত হন এবং মদের একটি বড় কলস উপঢৌকন হিসেবে তাকে প্রদান করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মদ হারাম করে দিয়েছেন, তা কি তুমি জান না? তখন লোকটি স্বীয় গোলামকে বলেনঃ “এটা নিয়ে গিয়ে বাজারে বেচে দাও।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “যিনি মদ হারাম করেছেন তিনি ওর ক্রয়-বিক্রয়ও হারাম করেছেন। তখন লোকটি তার গোলামকে বললো, তুমি এই কলসটি শহরে নিয়ে গিয়ে উলটিয়ে ফেলে দাও।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)আর একটি হাদীসে তামীম দারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একটি মদের মটকা (মৃৎপাত্র) উপঢৌকন স্বরূপ পাঠাতেন। অতঃপর মদ হারাম হয়ে যাওয়ার পর পূর্বের অভ্যাস মত তিনি মদের মটকা নিয়ে আসেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠে বলেনঃ “ইতিমধ্যে মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে।” তিনি তখন বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমি ওটা বিক্রি করে দেবো এবং ওর মূল্য দ্বারা উপকৃত হবো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ ইয়াহুদীদের উপর লা'নত বর্ষণ করুন। তাদের উপর গরু ও ছাগলের চর্বি হারাম করে দিয়েছিলেন, তখন তারা তা গলিয়ে ‘রাওগান’ (তৈল) তৈরী করতঃ বিক্রি করতো। আল্লাহ তা'আলা মদ ও ওর মূল্য সব কিছুই হারাম করেছেন।” মুসনাদে আহমাদে হযরত নাফে ইবনে কাইসান হতে বর্ণিত আছে যে, তাঁর পিতা (কাইসান) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে মদের ব্যবসা করতেন। একবার তিনি ব্যবসার জন্যে সিরিয়া হতে কতগুলো মদের মটকা নিয়ে আসেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তিনি একটি মটকা নিয়ে এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার জন্য খুবই উত্তম মদ নিয়ে এসেছি। তখন তিনি বলেনঃ ‘হে কাইসান। ইতিমধ্যে মদ তো হারাম করে দেয়া হয়েছে।' কাইসান (রাঃ) তখন জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কি এটা বিক্রি করে দেববা? তিনি উত্তরে বলেনঃ “এটা হারাম করা হয়েছে এবং এর মূল্যও হারাম করে দেয়া হয়েছে।” তখন কাইসান (রাঃ) মটকাগুলো নিয়ে গিয়ে পা দিয়ে উলটিয়ে ফেলে দেন এবং সমস্ত মদ বইয়ে দেন।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আমি আবূ তালহা (রাঃ)-এর বাড়ীতে হযরত আবু উবাইদাহ্ ইবনে জাররাহ (রাঃ), হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ), হযরত সুহাইল ইবনে বাইযা (রাঃ) এবং তার অন্যান্য সাথীদেরকে মদ পান করাচ্ছিলাম। এমনকি তাদের মাতাল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এমতাবস্থায় মুসলমানদের এক আগমনকারী এসে বলেনঃ “মদকে হারাম করে দেয়া হয়েছে এ খবর কি আপনারা জানেন?” তখন তারা বলেন, এখনও আমরা অপেক্ষা করবো এবং এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবো। অন্যান্য সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আনাস (রাঃ)! তোমার মটকায় যা কিছু মদ অবশিষ্ট রয়েছে তা উলটিয়ে,ফেলে দাও। আল্লাহর কসম! এখন আমরা আর মদ পান করবো না।” এটা ছিল খেজুর ও যবের মদ। আর সে সময় ঐ মদই চালু ছিল। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) হযরত আনাস (রাঃ) হতে আর একটি বর্ণনা রয়েছে, তিনি বলেন, যেদিন মদ হারাম করা হয় সেদিন আমি আবূ তালহা (রাঃ)-এর বাড়িতে লোকদেরকে মদ পান করাচ্ছিলাম। ঐ মদ ছিল যব ও খেজুরের তৈরী। হঠাৎ একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেন। তখন কেউ বলে ওঠেন, ‘বেরিয়ে দেখ তো। কি ঘোষণা করা হচ্ছে?' তখন জানা গেল যে, ঘোষণাকারী ঘোষণা করছেন“জেনে রেখো যে, মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে।” ঐ সময় মদীনার অলিতে গলিতে মদ বয়ে যাচ্ছিল। বর্ণনাকারী আনাস (রাঃ) বলেন, আবু তালহা (রাঃ) আমাকে বললেন, ‘বেরিয়ে গিয়ে মদ বইয়ে দাও।' তখন আমি তা বইয়ে দিলাম। তখন কেউ কেউ বললেন, অমুক ও অমুক যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, অথচ এই মদ তাঁদের পেটের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। বর্ণনাকারী বলেন, তখন আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করেন- (আরবী) অর্থাৎ যারা ঈমান রাখে ও ভাল কাজ করে, এরূপ লোকদের উপর তাতে কোন গুনাহ নেই যা তারা (পূর্বে) পানাহার করেছে। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, আমি আবূ তালহা (রাঃ), আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ), আবু দাজানা (রাঃ), মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ), সুহাইল ইবনে বাহযা (রাঃ) প্রমুখ ব্যক্তি মহোদয়ের কাছে মদ পরিবেশন করছিলাম এবং নেশার কারণে তাঁদের মাথাগুলো ঢলে পড়ছিল, এমন সময় আমি ঘোষণাকারীকে ঘোষণা করতে শুনলাম, জেনে রেখো যে, মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে। এ কথা শোনা মাত্রই যারা আমাদের কাছে আসছিলেন এবং যারা আমাদের নিকট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, সবাই নিজ নিজ মদ বইয়ে দেন। আমরা সবাই মদের কলসগুলো ভেঙ্গে ফেলি। আমাদের কেউ কেউ অযু করেন এবং কেউ কেউ গোসলও করেন। আমরা উম্মে সুলাইমের নিকট থেকে সুগন্ধি নিয়ে ব্যবহার করি। অতঃপর আমরা মসজিদে গমন করি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করে শুনিয়ে দেন। একটি লোক তখন বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যারা এটা পান করা অবস্থায় মারা গেছে তাদের কি হবে? সেই সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। একটি লোক হযরত কাতাদা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি আপনি এটা হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে শুনেছেন? তিনি উত্তরে বলেন, হ্যা। একটি লোক হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে শুনেছেন? তিনি উত্তর দেন, হ্যা, আমরা কখনও মিথ্যা বলি না এবং মিথ্যা কি তা আমরা জানি না। (এটা ইবনে জারীর (রঃ) ইবাদ ইবনে রাশিদ (রঃ)-এর হাদীস হতে তাখরীজ করেছেন, তিনি কাতাদাহ (রাঃ) হতে এবং তিনি আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “নিশ্চয় আল্লাহ মদ, জুয়া, শতরঞ্জ এবং গাবীরা গাছ হতে নিংড়ানো মদ হারাম করেছেন, আর প্রত্যেক নেশাযুক্ত জিনিসই। হারাম।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বেড়ার দিকে গমন করেন। আমি তাঁর ডান দিকে ছিলাম। এমন সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) সামনের দিক থেকে আগমন করলেন। আমি তখন পিছনে চলে গেলাম এবং হযরত আবূ বকর (রাঃ) তাঁর ডান দিকে হয়ে গেলেন। আর আমি তার বাম দিকে গেলাম। ইতিমধ্যে হযরত উমার (রাঃ)-কে আসতে দেখা গেল। আমি তখন সরে গেলাম এবং তিনি তাঁর বাম দিকে চলে গেলেন। এখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ বেড়ার মধ্যে আসলেন যা বাড়ীর পিছনে উট বাঁধার জায়গা ছিল। সেখানে মদের একটি মশক দেখা গেল। ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডাকলেন এবং ছুরি দিয়ে ওটা কেটে ফেলতে বললেন। আমি তখন ওটা ফেড়ে ফেললাম। তারপর তিনি বললেনঃ ‘মদ, মদ্যপানকারী, পরিবেশনকারী, বহনকারী, নিংড়িয়ে রস বেরকারী, তৈরিকারী এবং ওর মূল্য গ্রহণকারী সকলের উপর আল্লাহর লানত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন।)হযরত সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মদের ব্যাপারে চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর তিনি হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একজন আনসারী আমাদেরকে দাওয়াত করেন। আমরা সেখানে প্রচুর মদ পান করি। এটা ছিল মদ হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা। আমরা যখন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি তখন আমরা পরস্পর ফখর বা গৌরব প্রকাশ করতে শুরু করি। আনসারগণ বলেন, আমরাই উত্তম।' আবার কুরাইশরা বলেন, “আমরাই উত্তম।' অতঃপর এক আনসারী উটের একটা বড় হাড় নিয়ে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নাকের উপর মেরে দেন। ফলে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নাকের হাড় ভেঙ্গে যায়। তখন (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারদের দু'টি দলকে কেন্দ্র করে মদ্য হারাম হওয়ার আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তারা প্রচুর পরিমাণে মদ পান করার ফলে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। কারও চেহারায় আঘাত লাগে, কারও মাথা ক্ষত-বিক্ষত হয় এবং কারও দাড়ি উঠিয়ে ফেলা হয়। কেউ বলেন, “আমার অমুক সঙ্গী আমাকে আহত করেছে। এভাবে তারা একে অপরের শক্ত হয়ে পড়েন। অথচ ইতিপূর্বে তাদের মধ্যে প্রেম-প্রীতি বিদ্যমান ছিল। কারও প্রতি কারও কোন হিংসা বিদ্বেষ ছিল না। তারা বলতে শুরু করেন, যদি সে আমার প্রতি সহানুভূতিশীল হতো তবে আমাকে এভাবে আহত করতো না। এভাবে তাদের মধ্যে শক্রতা বেড়ে যায়। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। এরপর কতক লোক বলেনঃ কতগুলো লোক উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, অথচ তাদের পেটে মদ বিদ্যমান ছিল, তাদের কি হবে? তখন আল্লাহ পাক (আরবী) -এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। (এই হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইবনে জারীর (রঃ) আবু বুরাইদাহ (রঃ) হতে এবং তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি (তার পিতা) বলেন, আমরা একটা ছোট পাহাড়ের উপর বসে মদ পান করছিলাম। আমরা তিনজন বা চারজন ছিলাম। আমাদের সামনে মদের কলস ছিল এবং মদের চক্র চলছিল। আমি উঠে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে গেলাম এবং তাঁকে সালাম দিলাম। তখনই মদ হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হলো। আমি তৎক্ষণাৎ আমার সঙ্গীদের নিকট আসলাম এবং তাদের কাছে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করলাম। কেউ মদ পান করে ফেলেছিলেন। আবার কেউ কেউ আংশিক পান করেছিলেন এবং আংশিক পাত্রে অবশিষ্ট ছিল। পাত্র তার হাতেই ছিল। কারও মুখে মদ লেগেও ছিল। এমতাবস্থায় সবাই নিজ নিজ মদ মাটিতে বইয়ে দিলেন এবং আয়াতের শেষাংশ (আরবী) শোনামাত্রই তারা বলে উঠলেন, “হে আমাদের প্রভু! আমরা বিরত থাকলাম।সহীহ বুখারীতে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, উহুদ যুদ্ধের দিন সকালে লোকেরা মদ পান করেছিলেন এবং সেই দিনই তাঁদের অধিকাংশ শহীদ হয়েছিলেন। এটা ছিল মদ হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা।আবু দাঊদ তায়ালিসী (রঃ) হযরত বারা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যে, যখন মদ হারাম হওয়া সম্পর্কিত আয়াত অবতীর্ণ হয়। তখন জনগণ বলেন, এটা হারাম হওয়ার পূর্বে যারা এটা পান করেছিলেন (এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গিয়েছেন। তাঁদের কি হবে?” তখন (আরবী) –এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।মুসনাদে আহমাদ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু তালহা (রাঃ) তাঁর কাছে প্রতিপালিত ইয়াতীমদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ফতওয়া জিজ্ঞেস করেন যারা উত্তরাধিকার সূত্রে মদ প্রাপ্ত হয়েছিল। রাসলল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “ওটা বইয়ে দাও।' আবু তালহা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘ওর সিরকাহ বানিয়ে নিলে হয় না? তিনি জবাবে বলেনঃ না।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“যে ব্যক্তি দুনিয়ার মদ পান করলো এবং তা থেকে তাওবা করলো না, পরকালে তার জন্যে তা হারাম হয়ে গেল।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) মালিক (রাঃ)-এর হাদীস হতে তাখরীজ করেছেন)হযরত নাফে' (রাঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- ‘নেশাযুক্ত প্রত্যেক জিনিসই হারাম। যে ব্যক্তি সারা জীবন ধরে মদ পান করে মারা গেলো এবং তা হতে তাওবা করলো না, সে পরকালে তা পান করতে পাবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ অনুগ্রহের খোটাদানকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য এবং সদা মদ্যপানকারী জান্নাতে যাবে না। (এ হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম যুহরী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) একবার জনগণকে সম্বোধন করে বলেন, তোমরা মদ্য পান থেকে বিরত থাক, কেননা, এটাই হচ্ছে সমস্ত দুস্কার্য ও অশ্লীলতার মূল। তোমাদের পূর্ব যুগে একজন বড় ‘আবেদ লোক ছিল। সে জনগণের সাহচর্যে থাকতো না। একটি পতিতা মহিলার তার প্রতি দৃষ্টি পড়ে যায়। সে সাক্ষ্য নেয়ার বাহানায় তার চাকরাণীর মাধ্যমে তাকে ডেকে পাঠায়। সে তার সাথে চলে আসে। অতঃপর সে যে দরজা দিয়ে প্রবেশ করে, পিছন থেকে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। অবশেষে সে মহিলাটির নিকট হাযির হয়ে দেখতে পায় যে, সেখানে একটি শিশু ও মদের একটি কলস রয়েছে। সে তখন তাকে বলে, “আল্লাহ্র কসম! আমি আপনাকে সাক্ষ্য নেয়ার উদ্দেশ্যে ডাকিনি। বরং ডেকেছি এই উদ্দেশ্যে যে, আপনি আমার কাছে থেকে রাত কাটাবেন, অথবা এই শিশুটিকে হত্যা করবেন কিংবা মদ পান করবেন।” তখন সে (হত্যা ও ব্যভিচার অপেক্ষা মদ্যপানের পাপকে ছোট মনে করে) এক পেয়ালা মদ পান করে ফেলে। তারপর বলেঃ আমাকে আরও দাও।' শেষ পর্যন্ত সে নেশাগ্রস্ত হয়ে শিশুটিকে হত্যা করে বসে এবং মহিলাটির সাথে ব্যভিচার করে ফেলে। তাই তোমরা মদ্যপান থেকে বিরত থাক। মদ ও ঈমান কখনও এক জায়গায় জমা হতে পারে না। মদ থাকলে ঈমান নেই এবং ঈমান থাকলে মদ নেই। তাঁর এ উক্তির প্রমাণ হিসেবে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের ঐ হাদীসটি উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ব্যভিচারী যে সময় ব্যভিচার করে সে সময় সে মুমিন থাকে না, চোর যখন চুরি করে তখন সে মুমিন থাকে না এবং মদ্যপানকারী যখন মদ্যপান করে তখন সে মুমিন থাকে না। মুসনাদ আহমাদে আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “যে ব্যক্তি মদ্য পান করে, আল্লাহ তার উপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত অসন্তুষ্ট থাকেন। ঐ অবস্থায় যদি সে মারা যায় তবে সে কাফির হয়ে মারা যাবে। আর যদি সে তাওবা করে তবে আল্লাহ সেই তাওবা কবুল করবেন। কিন্তু যদি সে পুনরায় এতে ফিরে যায় (অর্থাৎ পুনরায় পান করতে শুরু করে। তবে তাকে (আরবী) পান করাবার অধিকার আল্লাহর আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) (আরবী) কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ তা হচ্ছে জাহান্নামীদের পূজ।

আল-মায়িদা 5:92

৯০-৯৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ পাক স্বীয় মুমিন বান্দাহদেরকে মদ্য পান জুয়া খেলা ইত্যাদি থেকে নিষেধ করছেন। আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেন যে, শতরঞ্জ এক প্রকারের জুয়া। মুজাহিদ (রঃ) এবং আতা’ (রঃ) বলেন যে, বাজি রেখে যে খেলা করা হয় সেটাই জুয়া। এমনকি ছেলেরা বাজি রেখে যে কড়ি খেলে সেটাও জুয়া। রাশিদ ইবনে সা'দ ও যমরা' ইবনে হাবীব অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। অজ্ঞতার যুগে ইসলাম আগমনের পূর্ব পর্যন্ত এই জুয়া বিশেষভাবে খেলা হতো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে এই জঘন্য খেলা খেলতে নিষেধ করেছেন। মালিক (রঃ) বলেন যে, অজ্ঞতার যুগে সাধারণভাবে এই জুয়া খেলা হতো। একটি দু'টি ছাগলের গোশত শর্ত হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হতো। যুহরী (রঃ) বলেন, জুয়া এভাবে হতো যে, মাল এবং ফলের উপর পাশা নিক্ষেপ করা হতো এবং এভাবে জুয়ার মাধ্যমে ওগুলোর উপর অধিকার লাভ করা হতো। কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) বলেন যে, যা কিছু। আল্লাহ ও নামাযের স্মরণ থেকে ভুলিয়ে রাখে তার সবই জুয়া। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, পাশার মাধ্যমে যে খেলা করা হয় তা-ই জুয়া। অনুরূপভাবে খেলার সময় যে জিনিসকে মেরে জয়লাভ করা হয় সেটাও জুয়া। এর ভাবার্থ যেন এটাই যে, শতরঞ্জ খেলা হারাম।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি চওসর’ খেলা করলো সে যেন শূকরের মাংস ও রক্ত দ্বারা স্বীয় হাত রঙ্গিয়ে দিলো।” (এটা ইমাম মুসলিম (রঃ) বুরাইদাহ ইবনে খাসীব আসলামী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) মুআত্তায়ে ইমাম মালিকের মধ্যে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি চওসর’ খেললো সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর নাফরমানী করলো। (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আর শতরঞ্জ সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, ওটা চওসর থেকেও খারাপ এবং তিনি ওটাকে পাশা ও জুয়ার মধ্যে গণ্য করেন। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) একে মাকরূহ বলেছেন।(আরবী) সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) ঐ পাথরগুলোকে বলা হতো যেগুলোর উপর পশু যবাই করে মুশরিকরা তাদের মূর্তিগুলোর নামে উৎসর্গ করতো। (আরবী) ঐ পাশাগুলোকেও বলা হতো যেগুলোকে বণ্টন করে শুভাশুভ লক্ষণ বের করা হতো। (আরবী)- অর্থাৎ এগুলো গহিত বিষয়, আর এগুলো শয়তানী কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। এমনকি এগুলো হচ্ছে নিকৃষ্টতম শয়তানী কাজ। (আরবী) -এর সর্বনামটি শব্দের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা এগুলো পরিত্যাগ কর।(আরবী) - এ কথা দ্বারা আল্লাহ পাক স্বীয় বান্দাদেরকে এসব কাজ পরিত্যাগ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ শয়তান তো ওটাই চায় যে, মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখে, সুতরাং এখনও কি তোমরা (এসব কাজ থেকে) বিরত থাকবে না? এ কথাগুলো আল্লাহ তা'আলার বান্দাদের প্রতি ভয় প্রদর্শন ও সতর্কবাণী। মদ্য হারাম হওয়া সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, মদ্য তিনবার হারাম করা হয়। যখন নবী (সঃ) মদীনায় আগমন করেন সেই সময় মদীনার লোকেরা মদ্য পান করতো এবং জুয়ার মাধ্যমে উপার্জিত মাল ভক্ষণ করতো। ঐ সম্পর্কে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আল্লাহ তা'আলা নিম্নলিখিত আয়াত অবতীর্ণ করেন। তুমি বল- এই দু’জিনিসে মানুষের জন্যে সামান্য উপকার আছে বটে; কিন্তু এই উপকারের তুলনায় ক্ষতি খুবই বেশী। তখন লোকেরা বলাবলি করতে লাগলোঃ আল্লাহ তাআলা এ দুটো জিনিস আমাদের উপর হারাম তো করলেন। না। তিনি শুধু বললেন যে, এ দুটো জিনিসে আমাদের উপকার কম এবং ক্ষতি বেশী। সুতরাং তারা মদ্যপান করতেই থাকলো। কিন্তু একদিন এমন আসলো যে, এক মুহাজির সাহাবী নেশার অবস্থায় নামাযে কুরআন মাজীদ পাঠ করতে গিয়ে ভুল ও গড়বড় করে দেন। তখন নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।“হে মুমিনগণ! তোমরা নেশার অবস্থায় নামাযের কাছেও যেয়ো না, যে পর্যন্ত না জানতে পার যে, তোমরা কি বলছো। সুতরাং লোকেরা নামাযের সময় মদ্যপান পরিত্যাগ করলো বটে; কিন্তু অন্য সময় পান করতেই থাকলো। কেননা, তখন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। অবশেষে একদিন মদ্যপান করে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কোন একজন লোক নামায পড়ছিল, এমন সময় পরিষ্কারভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে (আরবী) -এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। তখন লোকেরা বলেঃ হে আমাদের প্রভু! আমরা বিরত থাকলাম। অতঃপর লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মদ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পূর্বে যারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে নিহত হয়েছে কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে; কিন্তু তারা মদ্যপান করতো এবং জুয়া খেলতো- তাদের কি হবে? কেননা, আল্লাহ তা'আলা তো এটাকে শয়তানী কাজ বলে আখ্যায়িত করলেন এবং নিষিদ্ধ করলেন। তখন নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ হলো-যারা ঈমান এনেছিল এবং ভাল কাজ করেছিল তারা নিষিদ্ধ ঘোষণা হওয়ার পূর্বে যা কিছু ভক্ষণ করেছিল সে জন্যে তাদের উপর কোন দোষারোপ করা হবে না। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যদি তাদের জীবদ্দশায় এটা হারাম করা হতো তবে তোমরা যেমন তা ছেড়ে দিলে, তারাও দ্রুপ ছেড়ে দিতো।”ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, মদ হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে হযরত উমার (রাঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বললেনঃ হে আল্লাহ! আমাদের জন্যে মদ্য সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা দিন!' তখন সূরায়ে বাকারার (আরবী) (৪:৪৩)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অতঃপর যখন হযরত উমার (রাঃ)-কে এ আয়াত শুনানো হয় তখন তিনি পুনরায় প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! আমাদের জন্যে মদ্যের ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা দান করুন! তখন সূরায়ে নিসার। (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন নবী (সঃ)-এর মুআযযিন (আরবী) বলার পর উচ্চৈঃস্বরে বলে দেন যে, নেশার অবস্থায় নামায পড়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ)-কে এ আয়াতটিও পড়ে শুনানো হয়। তিনি এবারেও বলেন, হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্যে আরও সুস্পষ্ট ও খোলাখুলিভাবে বর্ণনা করে দিন! তখন সূরায়ে মায়িদাহ্র উল্লিখিত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এবারও হযরত উমার (রাঃ)-কে আয়াতটি পাঠ করে শুনানো হয়। যখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, (আরবী) (সুতরাং তোমরা বিরত থাকবে কি?) তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমরা বিরত থাকলাম, আমরা বিরত থাকলাম।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) নবী (সঃ)-এর মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, হে লোক সকল! মদ হারাম ঘোষিত হয়েছে। আর পাঁচটি জিনিসের মধ্যে যেটা দিয়েই মদ তৈরী করা হবে সেটাই হারাম। সেই পাঁচটি জিনিস হচ্ছেঃ আঙ্গুর, খেজুর, মধু, গম ও যব। (আরবী) বা মদ শব্দটি সাধারণ। সুতরাং যে নেশার জিনিস পান করলে জ্ঞান লোপ পায় সেটাই মদ। সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন, যে সময় মদ হারাম করা হয় সে সময় মদীনায় আঙ্গুরের মদ চালু ছিল না। অপর একটি হাদীসে রয়েছে যে, আব্দুর রহমান ইবনে আ’লা বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে মদ্য বিক্রয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তখন তিনি বলেন, সাকীফ অথবা দাউদ গোত্রের একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বন্ধু ছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলিত হন এবং মদের একটি বড় কলস উপঢৌকন হিসেবে তাকে প্রদান করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মদ হারাম করে দিয়েছেন, তা কি তুমি জান না? তখন লোকটি স্বীয় গোলামকে বলেনঃ “এটা নিয়ে গিয়ে বাজারে বেচে দাও।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “যিনি মদ হারাম করেছেন তিনি ওর ক্রয়-বিক্রয়ও হারাম করেছেন। তখন লোকটি তার গোলামকে বললো, তুমি এই কলসটি শহরে নিয়ে গিয়ে উলটিয়ে ফেলে দাও।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)আর একটি হাদীসে তামীম দারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একটি মদের মটকা (মৃৎপাত্র) উপঢৌকন স্বরূপ পাঠাতেন। অতঃপর মদ হারাম হয়ে যাওয়ার পর পূর্বের অভ্যাস মত তিনি মদের মটকা নিয়ে আসেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠে বলেনঃ “ইতিমধ্যে মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে।” তিনি তখন বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমি ওটা বিক্রি করে দেবো এবং ওর মূল্য দ্বারা উপকৃত হবো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ ইয়াহুদীদের উপর লা'নত বর্ষণ করুন। তাদের উপর গরু ও ছাগলের চর্বি হারাম করে দিয়েছিলেন, তখন তারা তা গলিয়ে ‘রাওগান’ (তৈল) তৈরী করতঃ বিক্রি করতো। আল্লাহ তা'আলা মদ ও ওর মূল্য সব কিছুই হারাম করেছেন।” মুসনাদে আহমাদে হযরত নাফে ইবনে কাইসান হতে বর্ণিত আছে যে, তাঁর পিতা (কাইসান) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে মদের ব্যবসা করতেন। একবার তিনি ব্যবসার জন্যে সিরিয়া হতে কতগুলো মদের মটকা নিয়ে আসেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তিনি একটি মটকা নিয়ে এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার জন্য খুবই উত্তম মদ নিয়ে এসেছি। তখন তিনি বলেনঃ ‘হে কাইসান। ইতিমধ্যে মদ তো হারাম করে দেয়া হয়েছে।' কাইসান (রাঃ) তখন জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কি এটা বিক্রি করে দেববা? তিনি উত্তরে বলেনঃ “এটা হারাম করা হয়েছে এবং এর মূল্যও হারাম করে দেয়া হয়েছে।” তখন কাইসান (রাঃ) মটকাগুলো নিয়ে গিয়ে পা দিয়ে উলটিয়ে ফেলে দেন এবং সমস্ত মদ বইয়ে দেন।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আমি আবূ তালহা (রাঃ)-এর বাড়ীতে হযরত আবু উবাইদাহ্ ইবনে জাররাহ (রাঃ), হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ), হযরত সুহাইল ইবনে বাইযা (রাঃ) এবং তার অন্যান্য সাথীদেরকে মদ পান করাচ্ছিলাম। এমনকি তাদের মাতাল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এমতাবস্থায় মুসলমানদের এক আগমনকারী এসে বলেনঃ “মদকে হারাম করে দেয়া হয়েছে এ খবর কি আপনারা জানেন?” তখন তারা বলেন, এখনও আমরা অপেক্ষা করবো এবং এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবো। অন্যান্য সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আনাস (রাঃ)! তোমার মটকায় যা কিছু মদ অবশিষ্ট রয়েছে তা উলটিয়ে,ফেলে দাও। আল্লাহর কসম! এখন আমরা আর মদ পান করবো না।” এটা ছিল খেজুর ও যবের মদ। আর সে সময় ঐ মদই চালু ছিল। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) হযরত আনাস (রাঃ) হতে আর একটি বর্ণনা রয়েছে, তিনি বলেন, যেদিন মদ হারাম করা হয় সেদিন আমি আবূ তালহা (রাঃ)-এর বাড়িতে লোকদেরকে মদ পান করাচ্ছিলাম। ঐ মদ ছিল যব ও খেজুরের তৈরী। হঠাৎ একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেন। তখন কেউ বলে ওঠেন, ‘বেরিয়ে দেখ তো। কি ঘোষণা করা হচ্ছে?' তখন জানা গেল যে, ঘোষণাকারী ঘোষণা করছেন“জেনে রেখো যে, মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে।” ঐ সময় মদীনার অলিতে গলিতে মদ বয়ে যাচ্ছিল। বর্ণনাকারী আনাস (রাঃ) বলেন, আবু তালহা (রাঃ) আমাকে বললেন, ‘বেরিয়ে গিয়ে মদ বইয়ে দাও।' তখন আমি তা বইয়ে দিলাম। তখন কেউ কেউ বললেন, অমুক ও অমুক যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, অথচ এই মদ তাঁদের পেটের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। বর্ণনাকারী বলেন, তখন আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করেন- (আরবী) অর্থাৎ যারা ঈমান রাখে ও ভাল কাজ করে, এরূপ লোকদের উপর তাতে কোন গুনাহ নেই যা তারা (পূর্বে) পানাহার করেছে। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, আমি আবূ তালহা (রাঃ), আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ), আবু দাজানা (রাঃ), মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ), সুহাইল ইবনে বাহযা (রাঃ) প্রমুখ ব্যক্তি মহোদয়ের কাছে মদ পরিবেশন করছিলাম এবং নেশার কারণে তাঁদের মাথাগুলো ঢলে পড়ছিল, এমন সময় আমি ঘোষণাকারীকে ঘোষণা করতে শুনলাম, জেনে রেখো যে, মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে। এ কথা শোনা মাত্রই যারা আমাদের কাছে আসছিলেন এবং যারা আমাদের নিকট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, সবাই নিজ নিজ মদ বইয়ে দেন। আমরা সবাই মদের কলসগুলো ভেঙ্গে ফেলি। আমাদের কেউ কেউ অযু করেন এবং কেউ কেউ গোসলও করেন। আমরা উম্মে সুলাইমের নিকট থেকে সুগন্ধি নিয়ে ব্যবহার করি। অতঃপর আমরা মসজিদে গমন করি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করে শুনিয়ে দেন। একটি লোক তখন বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যারা এটা পান করা অবস্থায় মারা গেছে তাদের কি হবে? সেই সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। একটি লোক হযরত কাতাদা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি আপনি এটা হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে শুনেছেন? তিনি উত্তরে বলেন, হ্যা। একটি লোক হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে শুনেছেন? তিনি উত্তর দেন, হ্যা, আমরা কখনও মিথ্যা বলি না এবং মিথ্যা কি তা আমরা জানি না। (এটা ইবনে জারীর (রঃ) ইবাদ ইবনে রাশিদ (রঃ)-এর হাদীস হতে তাখরীজ করেছেন, তিনি কাতাদাহ (রাঃ) হতে এবং তিনি আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “নিশ্চয় আল্লাহ মদ, জুয়া, শতরঞ্জ এবং গাবীরা গাছ হতে নিংড়ানো মদ হারাম করেছেন, আর প্রত্যেক নেশাযুক্ত জিনিসই। হারাম।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বেড়ার দিকে গমন করেন। আমি তাঁর ডান দিকে ছিলাম। এমন সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) সামনের দিক থেকে আগমন করলেন। আমি তখন পিছনে চলে গেলাম এবং হযরত আবূ বকর (রাঃ) তাঁর ডান দিকে হয়ে গেলেন। আর আমি তার বাম দিকে গেলাম। ইতিমধ্যে হযরত উমার (রাঃ)-কে আসতে দেখা গেল। আমি তখন সরে গেলাম এবং তিনি তাঁর বাম দিকে চলে গেলেন। এখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ বেড়ার মধ্যে আসলেন যা বাড়ীর পিছনে উট বাঁধার জায়গা ছিল। সেখানে মদের একটি মশক দেখা গেল। ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডাকলেন এবং ছুরি দিয়ে ওটা কেটে ফেলতে বললেন। আমি তখন ওটা ফেড়ে ফেললাম। তারপর তিনি বললেনঃ ‘মদ, মদ্যপানকারী, পরিবেশনকারী, বহনকারী, নিংড়িয়ে রস বেরকারী, তৈরিকারী এবং ওর মূল্য গ্রহণকারী সকলের উপর আল্লাহর লানত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন।)হযরত সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মদের ব্যাপারে চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর তিনি হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একজন আনসারী আমাদেরকে দাওয়াত করেন। আমরা সেখানে প্রচুর মদ পান করি। এটা ছিল মদ হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা। আমরা যখন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি তখন আমরা পরস্পর ফখর বা গৌরব প্রকাশ করতে শুরু করি। আনসারগণ বলেন, আমরাই উত্তম।' আবার কুরাইশরা বলেন, “আমরাই উত্তম।' অতঃপর এক আনসারী উটের একটা বড় হাড় নিয়ে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নাকের উপর মেরে দেন। ফলে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নাকের হাড় ভেঙ্গে যায়। তখন (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারদের দু'টি দলকে কেন্দ্র করে মদ্য হারাম হওয়ার আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তারা প্রচুর পরিমাণে মদ পান করার ফলে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। কারও চেহারায় আঘাত লাগে, কারও মাথা ক্ষত-বিক্ষত হয় এবং কারও দাড়ি উঠিয়ে ফেলা হয়। কেউ বলেন, “আমার অমুক সঙ্গী আমাকে আহত করেছে। এভাবে তারা একে অপরের শক্ত হয়ে পড়েন। অথচ ইতিপূর্বে তাদের মধ্যে প্রেম-প্রীতি বিদ্যমান ছিল। কারও প্রতি কারও কোন হিংসা বিদ্বেষ ছিল না। তারা বলতে শুরু করেন, যদি সে আমার প্রতি সহানুভূতিশীল হতো তবে আমাকে এভাবে আহত করতো না। এভাবে তাদের মধ্যে শক্রতা বেড়ে যায়। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। এরপর কতক লোক বলেনঃ কতগুলো লোক উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, অথচ তাদের পেটে মদ বিদ্যমান ছিল, তাদের কি হবে? তখন আল্লাহ পাক (আরবী) -এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। (এই হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইবনে জারীর (রঃ) আবু বুরাইদাহ (রঃ) হতে এবং তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি (তার পিতা) বলেন, আমরা একটা ছোট পাহাড়ের উপর বসে মদ পান করছিলাম। আমরা তিনজন বা চারজন ছিলাম। আমাদের সামনে মদের কলস ছিল এবং মদের চক্র চলছিল। আমি উঠে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে গেলাম এবং তাঁকে সালাম দিলাম। তখনই মদ হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হলো। আমি তৎক্ষণাৎ আমার সঙ্গীদের নিকট আসলাম এবং তাদের কাছে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করলাম। কেউ মদ পান করে ফেলেছিলেন। আবার কেউ কেউ আংশিক পান করেছিলেন এবং আংশিক পাত্রে অবশিষ্ট ছিল। পাত্র তার হাতেই ছিল। কারও মুখে মদ লেগেও ছিল। এমতাবস্থায় সবাই নিজ নিজ মদ মাটিতে বইয়ে দিলেন এবং আয়াতের শেষাংশ (আরবী) শোনামাত্রই তারা বলে উঠলেন, “হে আমাদের প্রভু! আমরা বিরত থাকলাম।সহীহ বুখারীতে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, উহুদ যুদ্ধের দিন সকালে লোকেরা মদ পান করেছিলেন এবং সেই দিনই তাঁদের অধিকাংশ শহীদ হয়েছিলেন। এটা ছিল মদ হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা।আবু দাঊদ তায়ালিসী (রঃ) হযরত বারা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যে, যখন মদ হারাম হওয়া সম্পর্কিত আয়াত অবতীর্ণ হয়। তখন জনগণ বলেন, এটা হারাম হওয়ার পূর্বে যারা এটা পান করেছিলেন (এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গিয়েছেন। তাঁদের কি হবে?” তখন (আরবী) –এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।মুসনাদে আহমাদ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু তালহা (রাঃ) তাঁর কাছে প্রতিপালিত ইয়াতীমদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ফতওয়া জিজ্ঞেস করেন যারা উত্তরাধিকার সূত্রে মদ প্রাপ্ত হয়েছিল। রাসলল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “ওটা বইয়ে দাও।' আবু তালহা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘ওর সিরকাহ বানিয়ে নিলে হয় না? তিনি জবাবে বলেনঃ না।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“যে ব্যক্তি দুনিয়ার মদ পান করলো এবং তা থেকে তাওবা করলো না, পরকালে তার জন্যে তা হারাম হয়ে গেল।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) মালিক (রাঃ)-এর হাদীস হতে তাখরীজ করেছেন)হযরত নাফে' (রাঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- ‘নেশাযুক্ত প্রত্যেক জিনিসই হারাম। যে ব্যক্তি সারা জীবন ধরে মদ পান করে মারা গেলো এবং তা হতে তাওবা করলো না, সে পরকালে তা পান করতে পাবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ অনুগ্রহের খোটাদানকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য এবং সদা মদ্যপানকারী জান্নাতে যাবে না। (এ হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম যুহরী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) একবার জনগণকে সম্বোধন করে বলেন, তোমরা মদ্য পান থেকে বিরত থাক, কেননা, এটাই হচ্ছে সমস্ত দুস্কার্য ও অশ্লীলতার মূল। তোমাদের পূর্ব যুগে একজন বড় ‘আবেদ লোক ছিল। সে জনগণের সাহচর্যে থাকতো না। একটি পতিতা মহিলার তার প্রতি দৃষ্টি পড়ে যায়। সে সাক্ষ্য নেয়ার বাহানায় তার চাকরাণীর মাধ্যমে তাকে ডেকে পাঠায়। সে তার সাথে চলে আসে। অতঃপর সে যে দরজা দিয়ে প্রবেশ করে, পিছন থেকে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। অবশেষে সে মহিলাটির নিকট হাযির হয়ে দেখতে পায় যে, সেখানে একটি শিশু ও মদের একটি কলস রয়েছে। সে তখন তাকে বলে, “আল্লাহ্র কসম! আমি আপনাকে সাক্ষ্য নেয়ার উদ্দেশ্যে ডাকিনি। বরং ডেকেছি এই উদ্দেশ্যে যে, আপনি আমার কাছে থেকে রাত কাটাবেন, অথবা এই শিশুটিকে হত্যা করবেন কিংবা মদ পান করবেন।” তখন সে (হত্যা ও ব্যভিচার অপেক্ষা মদ্যপানের পাপকে ছোট মনে করে) এক পেয়ালা মদ পান করে ফেলে। তারপর বলেঃ আমাকে আরও দাও।' শেষ পর্যন্ত সে নেশাগ্রস্ত হয়ে শিশুটিকে হত্যা করে বসে এবং মহিলাটির সাথে ব্যভিচার করে ফেলে। তাই তোমরা মদ্যপান থেকে বিরত থাক। মদ ও ঈমান কখনও এক জায়গায় জমা হতে পারে না। মদ থাকলে ঈমান নেই এবং ঈমান থাকলে মদ নেই। তাঁর এ উক্তির প্রমাণ হিসেবে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের ঐ হাদীসটি উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ব্যভিচারী যে সময় ব্যভিচার করে সে সময় সে মুমিন থাকে না, চোর যখন চুরি করে তখন সে মুমিন থাকে না এবং মদ্যপানকারী যখন মদ্যপান করে তখন সে মুমিন থাকে না। মুসনাদ আহমাদে আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “যে ব্যক্তি মদ্য পান করে, আল্লাহ তার উপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত অসন্তুষ্ট থাকেন। ঐ অবস্থায় যদি সে মারা যায় তবে সে কাফির হয়ে মারা যাবে। আর যদি সে তাওবা করে তবে আল্লাহ সেই তাওবা কবুল করবেন। কিন্তু যদি সে পুনরায় এতে ফিরে যায় (অর্থাৎ পুনরায় পান করতে শুরু করে। তবে তাকে (আরবী) পান করাবার অধিকার আল্লাহর আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) (আরবী) কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ তা হচ্ছে জাহান্নামীদের পূজ।

আল-মায়িদা 5:93

৯০-৯৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ পাক স্বীয় মুমিন বান্দাহদেরকে মদ্য পান জুয়া খেলা ইত্যাদি থেকে নিষেধ করছেন। আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেন যে, শতরঞ্জ এক প্রকারের জুয়া। মুজাহিদ (রঃ) এবং আতা’ (রঃ) বলেন যে, বাজি রেখে যে খেলা করা হয় সেটাই জুয়া। এমনকি ছেলেরা বাজি রেখে যে কড়ি খেলে সেটাও জুয়া। রাশিদ ইবনে সা'দ ও যমরা' ইবনে হাবীব অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। অজ্ঞতার যুগে ইসলাম আগমনের পূর্ব পর্যন্ত এই জুয়া বিশেষভাবে খেলা হতো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে এই জঘন্য খেলা খেলতে নিষেধ করেছেন। মালিক (রঃ) বলেন যে, অজ্ঞতার যুগে সাধারণভাবে এই জুয়া খেলা হতো। একটি দু'টি ছাগলের গোশত শর্ত হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হতো। যুহরী (রঃ) বলেন, জুয়া এভাবে হতো যে, মাল এবং ফলের উপর পাশা নিক্ষেপ করা হতো এবং এভাবে জুয়ার মাধ্যমে ওগুলোর উপর অধিকার লাভ করা হতো। কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) বলেন যে, যা কিছু। আল্লাহ ও নামাযের স্মরণ থেকে ভুলিয়ে রাখে তার সবই জুয়া। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, পাশার মাধ্যমে যে খেলা করা হয় তা-ই জুয়া। অনুরূপভাবে খেলার সময় যে জিনিসকে মেরে জয়লাভ করা হয় সেটাও জুয়া। এর ভাবার্থ যেন এটাই যে, শতরঞ্জ খেলা হারাম।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি চওসর’ খেলা করলো সে যেন শূকরের মাংস ও রক্ত দ্বারা স্বীয় হাত রঙ্গিয়ে দিলো।” (এটা ইমাম মুসলিম (রঃ) বুরাইদাহ ইবনে খাসীব আসলামী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) মুআত্তায়ে ইমাম মালিকের মধ্যে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি চওসর’ খেললো সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর নাফরমানী করলো। (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আর শতরঞ্জ সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, ওটা চওসর থেকেও খারাপ এবং তিনি ওটাকে পাশা ও জুয়ার মধ্যে গণ্য করেন। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) একে মাকরূহ বলেছেন।(আরবী) সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) ঐ পাথরগুলোকে বলা হতো যেগুলোর উপর পশু যবাই করে মুশরিকরা তাদের মূর্তিগুলোর নামে উৎসর্গ করতো। (আরবী) ঐ পাশাগুলোকেও বলা হতো যেগুলোকে বণ্টন করে শুভাশুভ লক্ষণ বের করা হতো। (আরবী)- অর্থাৎ এগুলো গহিত বিষয়, আর এগুলো শয়তানী কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। এমনকি এগুলো হচ্ছে নিকৃষ্টতম শয়তানী কাজ। (আরবী) -এর সর্বনামটি শব্দের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা এগুলো পরিত্যাগ কর।(আরবী) - এ কথা দ্বারা আল্লাহ পাক স্বীয় বান্দাদেরকে এসব কাজ পরিত্যাগ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ শয়তান তো ওটাই চায় যে, মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখে, সুতরাং এখনও কি তোমরা (এসব কাজ থেকে) বিরত থাকবে না? এ কথাগুলো আল্লাহ তা'আলার বান্দাদের প্রতি ভয় প্রদর্শন ও সতর্কবাণী। মদ্য হারাম হওয়া সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, মদ্য তিনবার হারাম করা হয়। যখন নবী (সঃ) মদীনায় আগমন করেন সেই সময় মদীনার লোকেরা মদ্য পান করতো এবং জুয়ার মাধ্যমে উপার্জিত মাল ভক্ষণ করতো। ঐ সম্পর্কে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আল্লাহ তা'আলা নিম্নলিখিত আয়াত অবতীর্ণ করেন। তুমি বল- এই দু’জিনিসে মানুষের জন্যে সামান্য উপকার আছে বটে; কিন্তু এই উপকারের তুলনায় ক্ষতি খুবই বেশী। তখন লোকেরা বলাবলি করতে লাগলোঃ আল্লাহ তাআলা এ দুটো জিনিস আমাদের উপর হারাম তো করলেন। না। তিনি শুধু বললেন যে, এ দুটো জিনিসে আমাদের উপকার কম এবং ক্ষতি বেশী। সুতরাং তারা মদ্যপান করতেই থাকলো। কিন্তু একদিন এমন আসলো যে, এক মুহাজির সাহাবী নেশার অবস্থায় নামাযে কুরআন মাজীদ পাঠ করতে গিয়ে ভুল ও গড়বড় করে দেন। তখন নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।“হে মুমিনগণ! তোমরা নেশার অবস্থায় নামাযের কাছেও যেয়ো না, যে পর্যন্ত না জানতে পার যে, তোমরা কি বলছো। সুতরাং লোকেরা নামাযের সময় মদ্যপান পরিত্যাগ করলো বটে; কিন্তু অন্য সময় পান করতেই থাকলো। কেননা, তখন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। অবশেষে একদিন মদ্যপান করে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কোন একজন লোক নামায পড়ছিল, এমন সময় পরিষ্কারভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে (আরবী) -এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। তখন লোকেরা বলেঃ হে আমাদের প্রভু! আমরা বিরত থাকলাম। অতঃপর লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মদ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পূর্বে যারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে নিহত হয়েছে কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে; কিন্তু তারা মদ্যপান করতো এবং জুয়া খেলতো- তাদের কি হবে? কেননা, আল্লাহ তা'আলা তো এটাকে শয়তানী কাজ বলে আখ্যায়িত করলেন এবং নিষিদ্ধ করলেন। তখন নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ হলো-যারা ঈমান এনেছিল এবং ভাল কাজ করেছিল তারা নিষিদ্ধ ঘোষণা হওয়ার পূর্বে যা কিছু ভক্ষণ করেছিল সে জন্যে তাদের উপর কোন দোষারোপ করা হবে না। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যদি তাদের জীবদ্দশায় এটা হারাম করা হতো তবে তোমরা যেমন তা ছেড়ে দিলে, তারাও দ্রুপ ছেড়ে দিতো।”ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, মদ হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে হযরত উমার (রাঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বললেনঃ হে আল্লাহ! আমাদের জন্যে মদ্য সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা দিন!' তখন সূরায়ে বাকারার (আরবী) (৪:৪৩)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অতঃপর যখন হযরত উমার (রাঃ)-কে এ আয়াত শুনানো হয় তখন তিনি পুনরায় প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! আমাদের জন্যে মদ্যের ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা দান করুন! তখন সূরায়ে নিসার। (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন নবী (সঃ)-এর মুআযযিন (আরবী) বলার পর উচ্চৈঃস্বরে বলে দেন যে, নেশার অবস্থায় নামায পড়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ)-কে এ আয়াতটিও পড়ে শুনানো হয়। তিনি এবারেও বলেন, হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্যে আরও সুস্পষ্ট ও খোলাখুলিভাবে বর্ণনা করে দিন! তখন সূরায়ে মায়িদাহ্র উল্লিখিত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এবারও হযরত উমার (রাঃ)-কে আয়াতটি পাঠ করে শুনানো হয়। যখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, (আরবী) (সুতরাং তোমরা বিরত থাকবে কি?) তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমরা বিরত থাকলাম, আমরা বিরত থাকলাম।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) নবী (সঃ)-এর মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, হে লোক সকল! মদ হারাম ঘোষিত হয়েছে। আর পাঁচটি জিনিসের মধ্যে যেটা দিয়েই মদ তৈরী করা হবে সেটাই হারাম। সেই পাঁচটি জিনিস হচ্ছেঃ আঙ্গুর, খেজুর, মধু, গম ও যব। (আরবী) বা মদ শব্দটি সাধারণ। সুতরাং যে নেশার জিনিস পান করলে জ্ঞান লোপ পায় সেটাই মদ। সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন, যে সময় মদ হারাম করা হয় সে সময় মদীনায় আঙ্গুরের মদ চালু ছিল না। অপর একটি হাদীসে রয়েছে যে, আব্দুর রহমান ইবনে আ’লা বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে মদ্য বিক্রয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তখন তিনি বলেন, সাকীফ অথবা দাউদ গোত্রের একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বন্ধু ছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলিত হন এবং মদের একটি বড় কলস উপঢৌকন হিসেবে তাকে প্রদান করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা মদ হারাম করে দিয়েছেন, তা কি তুমি জান না? তখন লোকটি স্বীয় গোলামকে বলেনঃ “এটা নিয়ে গিয়ে বাজারে বেচে দাও।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “যিনি মদ হারাম করেছেন তিনি ওর ক্রয়-বিক্রয়ও হারাম করেছেন। তখন লোকটি তার গোলামকে বললো, তুমি এই কলসটি শহরে নিয়ে গিয়ে উলটিয়ে ফেলে দাও।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)আর একটি হাদীসে তামীম দারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একটি মদের মটকা (মৃৎপাত্র) উপঢৌকন স্বরূপ পাঠাতেন। অতঃপর মদ হারাম হয়ে যাওয়ার পর পূর্বের অভ্যাস মত তিনি মদের মটকা নিয়ে আসেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠে বলেনঃ “ইতিমধ্যে মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে।” তিনি তখন বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমি ওটা বিক্রি করে দেবো এবং ওর মূল্য দ্বারা উপকৃত হবো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ ইয়াহুদীদের উপর লা'নত বর্ষণ করুন। তাদের উপর গরু ও ছাগলের চর্বি হারাম করে দিয়েছিলেন, তখন তারা তা গলিয়ে ‘রাওগান’ (তৈল) তৈরী করতঃ বিক্রি করতো। আল্লাহ তা'আলা মদ ও ওর মূল্য সব কিছুই হারাম করেছেন।” মুসনাদে আহমাদে হযরত নাফে ইবনে কাইসান হতে বর্ণিত আছে যে, তাঁর পিতা (কাইসান) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে মদের ব্যবসা করতেন। একবার তিনি ব্যবসার জন্যে সিরিয়া হতে কতগুলো মদের মটকা নিয়ে আসেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তিনি একটি মটকা নিয়ে এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার জন্য খুবই উত্তম মদ নিয়ে এসেছি। তখন তিনি বলেনঃ ‘হে কাইসান। ইতিমধ্যে মদ তো হারাম করে দেয়া হয়েছে।' কাইসান (রাঃ) তখন জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কি এটা বিক্রি করে দেববা? তিনি উত্তরে বলেনঃ “এটা হারাম করা হয়েছে এবং এর মূল্যও হারাম করে দেয়া হয়েছে।” তখন কাইসান (রাঃ) মটকাগুলো নিয়ে গিয়ে পা দিয়ে উলটিয়ে ফেলে দেন এবং সমস্ত মদ বইয়ে দেন।মুসনাদে আহমাদে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আমি আবূ তালহা (রাঃ)-এর বাড়ীতে হযরত আবু উবাইদাহ্ ইবনে জাররাহ (রাঃ), হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ), হযরত সুহাইল ইবনে বাইযা (রাঃ) এবং তার অন্যান্য সাথীদেরকে মদ পান করাচ্ছিলাম। এমনকি তাদের মাতাল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এমতাবস্থায় মুসলমানদের এক আগমনকারী এসে বলেনঃ “মদকে হারাম করে দেয়া হয়েছে এ খবর কি আপনারা জানেন?” তখন তারা বলেন, এখনও আমরা অপেক্ষা করবো এবং এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবো। অন্যান্য সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আনাস (রাঃ)! তোমার মটকায় যা কিছু মদ অবশিষ্ট রয়েছে তা উলটিয়ে,ফেলে দাও। আল্লাহর কসম! এখন আমরা আর মদ পান করবো না।” এটা ছিল খেজুর ও যবের মদ। আর সে সময় ঐ মদই চালু ছিল। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) হযরত আনাস (রাঃ) হতে আর একটি বর্ণনা রয়েছে, তিনি বলেন, যেদিন মদ হারাম করা হয় সেদিন আমি আবূ তালহা (রাঃ)-এর বাড়িতে লোকদেরকে মদ পান করাচ্ছিলাম। ঐ মদ ছিল যব ও খেজুরের তৈরী। হঠাৎ একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেন। তখন কেউ বলে ওঠেন, ‘বেরিয়ে দেখ তো। কি ঘোষণা করা হচ্ছে?' তখন জানা গেল যে, ঘোষণাকারী ঘোষণা করছেন“জেনে রেখো যে, মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে।” ঐ সময় মদীনার অলিতে গলিতে মদ বয়ে যাচ্ছিল। বর্ণনাকারী আনাস (রাঃ) বলেন, আবু তালহা (রাঃ) আমাকে বললেন, ‘বেরিয়ে গিয়ে মদ বইয়ে দাও।' তখন আমি তা বইয়ে দিলাম। তখন কেউ কেউ বললেন, অমুক ও অমুক যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, অথচ এই মদ তাঁদের পেটের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। বর্ণনাকারী বলেন, তখন আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করেন- (আরবী) অর্থাৎ যারা ঈমান রাখে ও ভাল কাজ করে, এরূপ লোকদের উপর তাতে কোন গুনাহ নেই যা তারা (পূর্বে) পানাহার করেছে। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, আমি আবূ তালহা (রাঃ), আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাঃ), আবু দাজানা (রাঃ), মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ), সুহাইল ইবনে বাহযা (রাঃ) প্রমুখ ব্যক্তি মহোদয়ের কাছে মদ পরিবেশন করছিলাম এবং নেশার কারণে তাঁদের মাথাগুলো ঢলে পড়ছিল, এমন সময় আমি ঘোষণাকারীকে ঘোষণা করতে শুনলাম, জেনে রেখো যে, মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে। এ কথা শোনা মাত্রই যারা আমাদের কাছে আসছিলেন এবং যারা আমাদের নিকট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, সবাই নিজ নিজ মদ বইয়ে দেন। আমরা সবাই মদের কলসগুলো ভেঙ্গে ফেলি। আমাদের কেউ কেউ অযু করেন এবং কেউ কেউ গোসলও করেন। আমরা উম্মে সুলাইমের নিকট থেকে সুগন্ধি নিয়ে ব্যবহার করি। অতঃপর আমরা মসজিদে গমন করি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করে শুনিয়ে দেন। একটি লোক তখন বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যারা এটা পান করা অবস্থায় মারা গেছে তাদের কি হবে? সেই সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। একটি লোক হযরত কাতাদা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি আপনি এটা হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে শুনেছেন? তিনি উত্তরে বলেন, হ্যা। একটি লোক হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে শুনেছেন? তিনি উত্তর দেন, হ্যা, আমরা কখনও মিথ্যা বলি না এবং মিথ্যা কি তা আমরা জানি না। (এটা ইবনে জারীর (রঃ) ইবাদ ইবনে রাশিদ (রঃ)-এর হাদীস হতে তাখরীজ করেছেন, তিনি কাতাদাহ (রাঃ) হতে এবং তিনি আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “নিশ্চয় আল্লাহ মদ, জুয়া, শতরঞ্জ এবং গাবীরা গাছ হতে নিংড়ানো মদ হারাম করেছেন, আর প্রত্যেক নেশাযুক্ত জিনিসই। হারাম।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বেড়ার দিকে গমন করেন। আমি তাঁর ডান দিকে ছিলাম। এমন সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) সামনের দিক থেকে আগমন করলেন। আমি তখন পিছনে চলে গেলাম এবং হযরত আবূ বকর (রাঃ) তাঁর ডান দিকে হয়ে গেলেন। আর আমি তার বাম দিকে গেলাম। ইতিমধ্যে হযরত উমার (রাঃ)-কে আসতে দেখা গেল। আমি তখন সরে গেলাম এবং তিনি তাঁর বাম দিকে চলে গেলেন। এখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ বেড়ার মধ্যে আসলেন যা বাড়ীর পিছনে উট বাঁধার জায়গা ছিল। সেখানে মদের একটি মশক দেখা গেল। ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডাকলেন এবং ছুরি দিয়ে ওটা কেটে ফেলতে বললেন। আমি তখন ওটা ফেড়ে ফেললাম। তারপর তিনি বললেনঃ ‘মদ, মদ্যপানকারী, পরিবেশনকারী, বহনকারী, নিংড়িয়ে রস বেরকারী, তৈরিকারী এবং ওর মূল্য গ্রহণকারী সকলের উপর আল্লাহর লানত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন।)হযরত সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মদের ব্যাপারে চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর তিনি হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একজন আনসারী আমাদেরকে দাওয়াত করেন। আমরা সেখানে প্রচুর মদ পান করি। এটা ছিল মদ হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা। আমরা যখন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি তখন আমরা পরস্পর ফখর বা গৌরব প্রকাশ করতে শুরু করি। আনসারগণ বলেন, আমরাই উত্তম।' আবার কুরাইশরা বলেন, “আমরাই উত্তম।' অতঃপর এক আনসারী উটের একটা বড় হাড় নিয়ে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নাকের উপর মেরে দেন। ফলে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নাকের হাড় ভেঙ্গে যায়। তখন (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারদের দু'টি দলকে কেন্দ্র করে মদ্য হারাম হওয়ার আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। তারা প্রচুর পরিমাণে মদ পান করার ফলে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। কারও চেহারায় আঘাত লাগে, কারও মাথা ক্ষত-বিক্ষত হয় এবং কারও দাড়ি উঠিয়ে ফেলা হয়। কেউ বলেন, “আমার অমুক সঙ্গী আমাকে আহত করেছে। এভাবে তারা একে অপরের শক্ত হয়ে পড়েন। অথচ ইতিপূর্বে তাদের মধ্যে প্রেম-প্রীতি বিদ্যমান ছিল। কারও প্রতি কারও কোন হিংসা বিদ্বেষ ছিল না। তারা বলতে শুরু করেন, যদি সে আমার প্রতি সহানুভূতিশীল হতো তবে আমাকে এভাবে আহত করতো না। এভাবে তাদের মধ্যে শক্রতা বেড়ে যায়। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। এরপর কতক লোক বলেনঃ কতগুলো লোক উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, অথচ তাদের পেটে মদ বিদ্যমান ছিল, তাদের কি হবে? তখন আল্লাহ পাক (আরবী) -এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। (এই হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইবনে জারীর (রঃ) আবু বুরাইদাহ (রঃ) হতে এবং তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি (তার পিতা) বলেন, আমরা একটা ছোট পাহাড়ের উপর বসে মদ পান করছিলাম। আমরা তিনজন বা চারজন ছিলাম। আমাদের সামনে মদের কলস ছিল এবং মদের চক্র চলছিল। আমি উঠে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে গেলাম এবং তাঁকে সালাম দিলাম। তখনই মদ হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হলো। আমি তৎক্ষণাৎ আমার সঙ্গীদের নিকট আসলাম এবং তাদের কাছে (আরবী) পর্যন্ত পাঠ করলাম। কেউ মদ পান করে ফেলেছিলেন। আবার কেউ কেউ আংশিক পান করেছিলেন এবং আংশিক পাত্রে অবশিষ্ট ছিল। পাত্র তার হাতেই ছিল। কারও মুখে মদ লেগেও ছিল। এমতাবস্থায় সবাই নিজ নিজ মদ মাটিতে বইয়ে দিলেন এবং আয়াতের শেষাংশ (আরবী) শোনামাত্রই তারা বলে উঠলেন, “হে আমাদের প্রভু! আমরা বিরত থাকলাম।সহীহ বুখারীতে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, উহুদ যুদ্ধের দিন সকালে লোকেরা মদ পান করেছিলেন এবং সেই দিনই তাঁদের অধিকাংশ শহীদ হয়েছিলেন। এটা ছিল মদ হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা।আবু দাঊদ তায়ালিসী (রঃ) হযরত বারা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যে, যখন মদ হারাম হওয়া সম্পর্কিত আয়াত অবতীর্ণ হয়। তখন জনগণ বলেন, এটা হারাম হওয়ার পূর্বে যারা এটা পান করেছিলেন (এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গিয়েছেন। তাঁদের কি হবে?” তখন (আরবী) –এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।মুসনাদে আহমাদ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু তালহা (রাঃ) তাঁর কাছে প্রতিপালিত ইয়াতীমদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ফতওয়া জিজ্ঞেস করেন যারা উত্তরাধিকার সূত্রে মদ প্রাপ্ত হয়েছিল। রাসলল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “ওটা বইয়ে দাও।' আবু তালহা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘ওর সিরকাহ বানিয়ে নিলে হয় না? তিনি জবাবে বলেনঃ না।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“যে ব্যক্তি দুনিয়ার মদ পান করলো এবং তা থেকে তাওবা করলো না, পরকালে তার জন্যে তা হারাম হয়ে গেল।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) মালিক (রাঃ)-এর হাদীস হতে তাখরীজ করেছেন)হযরত নাফে' (রাঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- ‘নেশাযুক্ত প্রত্যেক জিনিসই হারাম। যে ব্যক্তি সারা জীবন ধরে মদ পান করে মারা গেলো এবং তা হতে তাওবা করলো না, সে পরকালে তা পান করতে পাবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ অনুগ্রহের খোটাদানকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য এবং সদা মদ্যপানকারী জান্নাতে যাবে না। (এ হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম যুহরী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) একবার জনগণকে সম্বোধন করে বলেন, তোমরা মদ্য পান থেকে বিরত থাক, কেননা, এটাই হচ্ছে সমস্ত দুস্কার্য ও অশ্লীলতার মূল। তোমাদের পূর্ব যুগে একজন বড় ‘আবেদ লোক ছিল। সে জনগণের সাহচর্যে থাকতো না। একটি পতিতা মহিলার তার প্রতি দৃষ্টি পড়ে যায়। সে সাক্ষ্য নেয়ার বাহানায় তার চাকরাণীর মাধ্যমে তাকে ডেকে পাঠায়। সে তার সাথে চলে আসে। অতঃপর সে যে দরজা দিয়ে প্রবেশ করে, পিছন থেকে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। অবশেষে সে মহিলাটির নিকট হাযির হয়ে দেখতে পায় যে, সেখানে একটি শিশু ও মদের একটি কলস রয়েছে। সে তখন তাকে বলে, “আল্লাহ্র কসম! আমি আপনাকে সাক্ষ্য নেয়ার উদ্দেশ্যে ডাকিনি। বরং ডেকেছি এই উদ্দেশ্যে যে, আপনি আমার কাছে থেকে রাত কাটাবেন, অথবা এই শিশুটিকে হত্যা করবেন কিংবা মদ পান করবেন।” তখন সে (হত্যা ও ব্যভিচার অপেক্ষা মদ্যপানের পাপকে ছোট মনে করে) এক পেয়ালা মদ পান করে ফেলে। তারপর বলেঃ আমাকে আরও দাও।' শেষ পর্যন্ত সে নেশাগ্রস্ত হয়ে শিশুটিকে হত্যা করে বসে এবং মহিলাটির সাথে ব্যভিচার করে ফেলে। তাই তোমরা মদ্যপান থেকে বিরত থাক। মদ ও ঈমান কখনও এক জায়গায় জমা হতে পারে না। মদ থাকলে ঈমান নেই এবং ঈমান থাকলে মদ নেই। তাঁর এ উক্তির প্রমাণ হিসেবে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের ঐ হাদীসটি উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ব্যভিচারী যে সময় ব্যভিচার করে সে সময় সে মুমিন থাকে না, চোর যখন চুরি করে তখন সে মুমিন থাকে না এবং মদ্যপানকারী যখন মদ্যপান করে তখন সে মুমিন থাকে না। মুসনাদ আহমাদে আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “যে ব্যক্তি মদ্য পান করে, আল্লাহ তার উপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত অসন্তুষ্ট থাকেন। ঐ অবস্থায় যদি সে মারা যায় তবে সে কাফির হয়ে মারা যাবে। আর যদি সে তাওবা করে তবে আল্লাহ সেই তাওবা কবুল করবেন। কিন্তু যদি সে পুনরায় এতে ফিরে যায় (অর্থাৎ পুনরায় পান করতে শুরু করে। তবে তাকে (আরবী) পান করাবার অধিকার আল্লাহর আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) (আরবী) কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ তা হচ্ছে জাহান্নামীদের পূজ।

আল-মায়িদা 5:94

৯৪-৯৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে- আল্লাহ তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান যে, শিকার দুর্বল হোক বা ছোট হোক, তোমরা ইহরামের অবস্থায় শিকার করা থেকে বিরত থাকছে কি-না। এমনকি যদি লোকেরা চায় তবে সেই শিকারকে হাতে ধরে নিতে পারে, তাই তাদেরকে তার নিকটবর্তী হতেও আল্লাহ পাক নিষেধ করলেন। মুজাহিদ বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ছোট ও বাচ্চা শিকারকে বুঝানো হয়েছে। (আরবী) দ্বারা বুঝানো হয়েছে বড় শিকার। মূকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) বলেন যে, মুসলমানরা যখন উমরা পালনের উদ্দেশ্যে হুদায়বিয়ায় অবস্থান করছিলেন সে সময় এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। সেখানে বন্য চতুষ্পদ জন্তু, পাখী এবং অন্যান্য শিকার তাদের অবস্থান স্থলে জমা হয়ে গিয়েছিল। এরূপ দৃশ্য তাঁরা ইতিপূর্বে দেখেননি। সুতরাং ইহরামের অবস্থায় তাদেরকে শিকার করতে নিষেধ করা হয়, যাতে আল্লাহ তা'আলা জানতে পারেন যে, কে তাঁর আনুগত্য স্বীকার করছে এবং কে করছে না। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই যারা তাদের প্রতিপালককে না দেখেই ভয় করে, তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও বড় পুরস্কার।'(৬৭:১২) এখন আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এরপরে যারা নাফরমানী করবে তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। কেননা, সে মহান আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করলো।(আরবী) -এ নিষেধাজ্ঞা অর্থের দিক দিয়ে ধরা হলে হালাল জন্তু, ওর বাচ্চা এবং হারাম প্রাণীগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর মতে যেসব শিকারের মাংস হালাল নয় সেগুলো শিকার করা ইহরামের অবস্থায় জায়েয। তবে জমহুর উলামার মতে এ ধরনের শিকারও ইহরামের অবস্থায় জায়েয নয়। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীস দ্বারা যে প্রাণীগুলোকে সর্বাবস্থায় হত্যা করার বৈধতা সাব্যস্ত আছে, সেগুলো ছাড়া জমহুর উলামা কোন প্রাণীকেই ইহরামের অবস্থায় শিকার করা হারামকৃত প্রাণীগুলোর বহির্ভূত মনে করেন না। হাদীসটি নিম্নরূপঃউম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পাঁচটি ফাসিক (প্রাণী)-কে হালাল ও হারাম সর্বাবস্থায় হত্যা করা যায়। ঐ পাঁচটি হচ্ছে-- কাক, চিল, বিচ্ছু, ইদুর এবং কামড়িয়ে নেয় এমন কুকুর।” ইমাম মালিক (রঃ) হযরত নাফে’ (রাঃ) ও হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পাঁচটি বিচরণকারীকে হত্যা করা মুহরিমের জন্যে কোন অপরাধমূলক কাজ নয়। সেগুলো হচ্ছে- কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর এবং কামড়িয়ে নেয় এ ধরনের কুকুর।” আইউব (রঃ) বলেন, আমি নাফে' (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, সাপের হুকুম কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ সাপকে হত্যা করার ব্যাপারে তো কোন সন্দেহই নেই এবং আলেমদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন মতভেদও সৃষ্টি হয়নি।' ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) প্রমুখ আলেমগণ কামড়িয়ে নেয় এরূপ কুকুরের সাথে নেকড়ে বাঘ, হিংস্র জন্তু এবং চিতা বাঘকেও সামিল করেছেন। কেননা, এগুলো তো কুকুর অপেক্ষাও ক্ষতিকারক। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) এবং হযরত সুফইয়ান সওরী (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক হামলাকারী হিংস্র জন্তুর হুকুম কুকুরের হুকুমেরই অন্তর্ভুক্ত। এর সমর্থন এই হাদীসে পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উৎবা ইবনে আবি লাহাবের উপর দু'আ করতে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ! সিরিয়ায় তার উপর আপনি আপনার এক কুকুরকে কর্তৃত্ব দান করুন!” তখন যারকা’ নামক স্থানে একটি নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলে।(আরবী) জমহুরের উক্তি এই যে, কাফফারা আদায় করার ব্যাপারে ইচ্ছাপূর্বক ও ভুলবশতঃ হত্যাকারী উভয়েই সমান। ইমাম যুহরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম দ্বারা শুধু ইচ্ছাপূর্বক হত্যাকারীর উপর কাফফারা ওয়াজিব হওয়া প্রমাণিত হয় বটে, কিন্তু হাদীস দ্বারা ভুলবশতঃ হত্যাকারীর উপরও কাফফারা ওয়াজিব হওয়া প্রমাণিত হয়ে যায়। ভাবার্থ হলো এই যে, কুরআন কারীম দ্বারা ইচ্ছাপূর্বক হত্যাকারীর উপর যেমন কাফফারা ওয়াজিব হওয়া সাব্যস্ত হলো, তেমনিভাবে তার গুনাহগার হওয়াও সাব্যস্ত হলো। যেমন আল্লাহ্ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেন সে তার পাপের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করে, তবে যা অতীত হয়েছে তা আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন, আর যে ব্যক্তি পুনরায় সেই কাজ করবে, আল্লাহ তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন।” আহকামে নবভী (সঃ) এবং আহকামে আসহাব দ্বারাও এর সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে যে, ভুলবশতঃ হত্যা করার অবস্থাতেও কাফফারা দিতে হবে, যেমন ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করলে কুরআন কারীমের নির্দেশ অনুযায়ী কাফফারা দিতে হয়। কেননা, যদি শিকারকে হত্যা করা হয় তবে তাকে নষ্ট করা হলো। আর যখন ইচ্ছাপূর্বক নষ্ট করবে তখন তাকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হয়, দ্রুপ ভুলবশতঃ নষ্ট করলেও এটাই হুকুম। পার্থক্য শুধু এইটুকু যে, ইচ্ছাপূর্বক শিকারকারী কাফফারার সাথে গুনাহগারও হয়, কিন্তু ভুলবশতঃ শিকারকারী গুনাহগার হয় না।(আরবী) কেউ কেউ (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) পড়েছেন, আবার কেউ কেউ -এর সাথে পড়েছেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) (আরবী) পড়েছেন। কিন্তু যেভাবেই পড়া হোক না কেন, ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং জমহুরের দলীল সর্বাবস্থাতেই কায়েম থাকছে যে, শিকারকৃত জন্তুর অনুরূপ বিনিময় ওয়াজিব হবে। যদি ওরই অনুরূপ বা প্রায় অনুরূপ কোন গৃহপালিত পশু পাওয়া যায় তবে ওটাই দিতে হবে, অন্যথায় ওর মূল্য দিতে হবে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর এতে মতানৈক্য রয়েছে। তাঁর মতে শিকারকৃত জন্তুর গৃহপালিত জন্তুর সাথে সাদৃশ্য থাক বা না-ই থাক, সর্বাবস্থাতেই ওর মূল্য দিতে হবে।(আরবী) অর্থাৎ এ কাফফারার ফায়সালা করবেন মুসলমানদের মধ্য হতে দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি, যারা এ ফায়সালা করবেন যে, সাদৃশ্যযুক্ত জন্তু শিকারের বেলায় সাদৃশ্যযুক্ত জন্তু দিতে হবে কিংবা সাদৃশ্যহীন জন্তু শিকারের বেলায় মূল্য দিতে হবে। আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য শুধু এ ব্যাপারে রয়েছে যে, ঐ দুই মীমাংসাকারীর মধ্যে একজন স্বয়ং শিকারী হতে পারেন কি না? এই ব্যাপারে দু'টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তি এই যে, স্বয়ং শিকারী মীমাংসাকারী হতে পারেন না। এটাই হচ্ছে ইমাম মালিকের মাযহাব। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, স্বয়ং শিকারী মীমাংসাকারী হতে পারেন। কেননা আয়াতটি আম বা সাধারণ। আর এটা হচ্ছে ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর মাযহাব। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) মায়মুন ইবনে মাহরান (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এক বেদুঈন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “আমি ইহরামের অবস্থায় একটি শিকারকে হত্যা করেছি। সুতরাং আপনার মতে আমাকে এর কি বিনিময় দিতে হবে?” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর পাশে উপবিষ্ট হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ)-কে বললেন, “তোমার নিকট এর ফায়সালা কি?” বর্ণনাকারী বলেন যে, তখন "ঐ বেদুঈন বললোঃ “আমি এসেছি আপনার নিকট। আর আপনি হচ্ছেন মুসলমানদের খলীফা। আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম, আর আপনি জিজ্ঞেস করছেন অন্যকে?” তখন আবূ বকর (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি আপত্তি করছো কেন? আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মধ্যে দুজন। ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি যেন এর ফায়সালা করে।” সুতরাং আমি আমার সঙ্গীর সাথে পরামর্শ করলাম। আমরা দুজন যে ফায়সালার উপর একমত হবো, তোমাকে আমি সেই ফায়সালা শুনিয়ে দেবো।” (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এটা খুবই উত্তম ইসনাদ। কিন্তু মায়মূন (রাঃ) ও আবু বকর (রাঃ)-এর মধ্যে (আরবী) রয়েছে) এখানে এটারই সম্ভাবনা ছিল। যেহেতু, হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাঃ) যখন দেখলেন যে, বেদুঈন মূখ এবং দুই ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির মাসআলা অবহিত নয়, তাই নম্রতার সাথে তাকে বুঝিয়ে দিলেন। কেননা মূর্খতার ওষুধ হচ্ছে শিক্ষাদান।ইবনে জারীর বাজলী (রঃ) বলেন, ইহরামের অবস্থায় আমি একটি হরিণ শিকার করি। হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট আমি তা বর্ণনা করলে তিনি বলেন, “তুমি দু’জন সঙ্গীকে নিয়ে আস যারা তোমার এ কাজের ফায়সালা করবেন।” আমি তখন আব্দুর রহমান (রাঃ) ও সা’দ (রাঃ)-কে নিয়ে আসলাম। তারা দু'জন ফায়সালা করলেন যে, আমাকে একটা হৃষ্টপুষ্ট ছাগ ফিদ্ইয়া স্বরূপ দিতে হবে। এ ব্যাপারেও আলেমদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে যে, যদি পরবর্তী যুগেও কোন অপরাধীর মধ্যে এই অপরাধ প্রকাশ পায় তবে কি সেই সময়েরই দু'জন ফায়সালাকারীর প্রয়োজন হয়, না এরূপ মাসআলায় সাহাবীদের যে ফায়সালা ছিল ওরই আলোকে ফতওয়া দেয়া যেতে পারে? এতে দু’টি উক্তি রয়েছে। ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ এ ব্যাপারে যে ফায়সালা দিয়েছিলেন তারই অনুসরণ করতে হবে, ফায়সালাকারী দু’জন সাহাবীর ফায়সালার বৈপরীত্ব করা চলবে না। আর যেখানে সাহাবীদের কোন ফায়সালা বিদ্যমান নেই, সেখানে সেই যুগেরই দু’জন ন্যায়পরায়ণ ফায়সালাকারীর ফায়সালা কার্যকরী হবে। কিন্তু ইমাম মালিক (রঃ) ও ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক যুগের ফায়সালা পৃথক পৃথক হবে এবং প্রত্যেক যামানায় সেই যামানারই দু’জন ন্যায়পরায়ণ ফায়সালাকারী নির্ধারণ করতে হবে, সেখানে সাহাবীদের ফায়সালা বিদ্যমান থাক আর নই থাক। কেননা, আল্লাহ তাআলা (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মধ্য হতে’ শব্দ ব্যবহার করেছেন।(আরবী) অর্থাৎ এ কুরবানী কা'বা পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। সেখানেই ওটা জবেহ করতে হবে এবং হারাম শরীফের মিসকীনদের মধ্যে ওর গোশত বন্টন করতে হবে। এ ব্যাপারে কোনই মতভেদ নেই, বরং সবাই এতে একমত।(আরবী) অর্থাৎ মুহরিম ব্যক্তি যদি নিহত শিকারের অনুরূপ জিনিস না পায় অথবা নিহত জন্তু এমন শ্রেণীর জন্তুই না হয় যে, গৃহপালিত জন্তুর মধ্যে ওর সাদৃশ্য থাকতে পারে, তবে বিনিময়, খাদ্য খাওয়ানো এবং রোযা রাখার ব্যাপারে যে কোন একটি পালন করার ইখতিয়ার বা স্বাধীনতা রয়েছে। কুরআনে কারীমে (আরবী) শব্দটি ইখতিয়ারের অর্থেই এসেছে। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ) এবং ইমাম মুহাম্মাদ (রঃ)-এর এটাই উক্তি। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এরও একটি উক্তি এটাই আছে। ইমাম আহমাদ (রঃ)-এরও প্রসিদ্ধ উক্তি এটাই যে, (আরবী) শব্দটি ইখতিয়ারের উদ্দেশ্যেই আনা হয়েছে। অন্য একটি উক্তি এই যে, (আরবী) শব্দটি ইখতিয়ারের উদ্দেশ্যে আনা হয়নি, বরং ক্রমিক হিসেবে আনা হয়েছে। আর এর রূপ এই যে, মূল্যের সমান হলেই থেমে যেতে হবে এবং এতেই নিহত শিকারের ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে। এটাই ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ), হাম্মাদ (রঃ) এবং ইমরাহীম (রঃ)-এর মত। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, এ মূল্য ঐ জানোয়ারের বিনিময় রূপ হবে যে, যদি ওটা বিদ্যমান থাকতো ।তবে এটাই ওর মূল্য হতো। অতঃপর এ অর্থ দ্বারা খাদ্য ক্রয় করে সাদকা করে দিতে হবে এবং প্রত্যেক মিসকীনকে এক মুদ' অর্থাৎ ৫৬ তোলা খাবার দিতে হবে। এটা হচ্ছে ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম মালিক (রঃ) এবং হেজাযবাসী আলেমদের মাসআলা। আর ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ), ইমাম মুহাম্মাদ (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ বলেন যে, প্রত্যেক মিসকীনকে দুই মুদ' করে আহার্য দিতে হবে। ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন যে, গম হলে এক ‘মুদ' এবং অন্য কোন জিনিস হলে দুই ‘মুদ’ দিতে হবে। যদি এটা দিতে অপারগ হয় তবে রোযা রাখতে হবে। অর্থাৎ মিসকীনকে যে কয়েকদিন খানা খাওয়াতে হয়, ততদিন রোযা রাখতে হবে।এখন এ খানা কোথায় খাওয়াতে হবে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন, এ খানা হারাম শরীফে খাওয়াতে হবে। আতা’রও এটাই উক্তি। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন, যে স্থানে শিকারকে হত্যা করা হয়েছে। সেখানেই বা ওরই নিকটবর্তী কোন এক স্থানে এ খানা খাওয়াতে হবে। ইমাম। আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, এ খানা খাওয়াবার জন্যে কোন স্থান নির্দিষ্ট নেই। সেটা হারাম শরীফেই হোক বা অন্য কোন জায়গাই হোক, সব জায়গাতেই খাওয়ানো চলবে।(আরবী) যেন সে তার দুষ্কর্মের শাস্তি গ্রহণ করে। অর্থাৎ আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি তার উপর কাফফারা এ জন্যেই ওয়াজিব করেছি যে, যেন সে আমার হুকুমের বিরোধিতার শাস্তি ভোগ করে। কিন্তু অজ্ঞতার যুগে তার দ্বারা যা কিছু সাধিত হয়েছিল তা আমি ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবো। কেননা, সে ইসলাম গ্রহণের পর ভাল কাজ করেছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণের পর এর নিষিদ্ধতা সত্ত্বেও যে আল্লাহর নাফরমানী করতঃ ওটা করে বসবে, আল্লাহ তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। তিনি বিরুদ্ধচারীদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী। তবে অজ্ঞতার যুগে যা কিছু হয়েছে তা তিনি ক্ষমা করবেন। আবার এ প্রশ্নের উত্তর না বাচক হবে যে, ইসলামের ইমাম কি এর কোন শাস্তি দিতে পারেন? অর্থাৎ ইমামের শাস্তি প্রদানের কোন অধিকার নেই। এ গুনাহ হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের মধ্যকার ব্যাপার। হ্যা, তবে ইমামের তাকে শাস্তি দেয়ার অধিকার না থাকা সত্ত্বেও ফিদইয়া তাকে অবশ্যই আদায় করতে হবে। এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা কাফফারার মাধ্যমেই প্রতিশোধ নিয়ে নেবেন এবং প্রতিশোধ গ্রহণের রূপ এটাই হবে।পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুরুজনবৃন্দ এর উপর একমত যে, মুহরিম যখন শিকারকে হত্যা করে ফেললো তখন তার উপর ফিদইয়া ওয়াজিব হয়ে গেল। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভুলের মধ্যে কোন পর্থক্য নেই, ভুল যতবারই হোক না কেন। ভুলবশতঃ কাজ এবং ইচ্ছাপূর্বক কাজ হুকুমের দিক দিয়ে সব সমান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুহরিমের দ্বারা যদি ভুলবশতঃ শিকারের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় তবে তার উপর প্রতিবারের হত্যার সময়েই এ হুকুম প্রযোজ্য হবে। কিন্তু যদি ইচ্ছাপূর্বক সে এই কাজ করে তবে প্রথমবারে তো তার উপর এ হুকুম প্রযোজ্য হবে, কিন্তু দ্বিতীয়বার তার দ্বারা এ কার্য সংঘটিত হলে তাকে বলা হবে- “আল্লাহ স্বয়ং তোমার এ কাজের প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন।” (শুরাইহ্ (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) এবং হাসান বসরীও (রঃ) এ উক্তিই করেছেন। ইবনে জারীর (রঃ) প্রথম উক্তিটি পছন্দ করেছেন)(আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর সাম্রাজ্যে প্রবল পরাক্রান্ত, মহা বিজয়ী। কেউ তাঁকে তাঁর কাজে বাধা দিতে পারে না। তিনি প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চাইলে কে এমন আছে যে, তার এ কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে? সারা জগত তাঁরই সৃষ্ট। সুতরাং এখানে হুকুম শুধু তারই চলবে। বিরুদ্ধাচারীদেরকে তিনি শাস্তি অবশ্যই দেবেন।

আল-মায়িদা 5:95

৯৪-৯৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে- আল্লাহ তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান যে, শিকার দুর্বল হোক বা ছোট হোক, তোমরা ইহরামের অবস্থায় শিকার করা থেকে বিরত থাকছে কি-না। এমনকি যদি লোকেরা চায় তবে সেই শিকারকে হাতে ধরে নিতে পারে, তাই তাদেরকে তার নিকটবর্তী হতেও আল্লাহ পাক নিষেধ করলেন। মুজাহিদ বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ছোট ও বাচ্চা শিকারকে বুঝানো হয়েছে। (আরবী) দ্বারা বুঝানো হয়েছে বড় শিকার। মূকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) বলেন যে, মুসলমানরা যখন উমরা পালনের উদ্দেশ্যে হুদায়বিয়ায় অবস্থান করছিলেন সে সময় এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। সেখানে বন্য চতুষ্পদ জন্তু, পাখী এবং অন্যান্য শিকার তাদের অবস্থান স্থলে জমা হয়ে গিয়েছিল। এরূপ দৃশ্য তাঁরা ইতিপূর্বে দেখেননি। সুতরাং ইহরামের অবস্থায় তাদেরকে শিকার করতে নিষেধ করা হয়, যাতে আল্লাহ তা'আলা জানতে পারেন যে, কে তাঁর আনুগত্য স্বীকার করছে এবং কে করছে না। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই যারা তাদের প্রতিপালককে না দেখেই ভয় করে, তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও বড় পুরস্কার।'(৬৭:১২) এখন আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এরপরে যারা নাফরমানী করবে তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। কেননা, সে মহান আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করলো।(আরবী) -এ নিষেধাজ্ঞা অর্থের দিক দিয়ে ধরা হলে হালাল জন্তু, ওর বাচ্চা এবং হারাম প্রাণীগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর মতে যেসব শিকারের মাংস হালাল নয় সেগুলো শিকার করা ইহরামের অবস্থায় জায়েয। তবে জমহুর উলামার মতে এ ধরনের শিকারও ইহরামের অবস্থায় জায়েয নয়। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীস দ্বারা যে প্রাণীগুলোকে সর্বাবস্থায় হত্যা করার বৈধতা সাব্যস্ত আছে, সেগুলো ছাড়া জমহুর উলামা কোন প্রাণীকেই ইহরামের অবস্থায় শিকার করা হারামকৃত প্রাণীগুলোর বহির্ভূত মনে করেন না। হাদীসটি নিম্নরূপঃউম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পাঁচটি ফাসিক (প্রাণী)-কে হালাল ও হারাম সর্বাবস্থায় হত্যা করা যায়। ঐ পাঁচটি হচ্ছে-- কাক, চিল, বিচ্ছু, ইদুর এবং কামড়িয়ে নেয় এমন কুকুর।” ইমাম মালিক (রঃ) হযরত নাফে’ (রাঃ) ও হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পাঁচটি বিচরণকারীকে হত্যা করা মুহরিমের জন্যে কোন অপরাধমূলক কাজ নয়। সেগুলো হচ্ছে- কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর এবং কামড়িয়ে নেয় এ ধরনের কুকুর।” আইউব (রঃ) বলেন, আমি নাফে' (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, সাপের হুকুম কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ সাপকে হত্যা করার ব্যাপারে তো কোন সন্দেহই নেই এবং আলেমদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন মতভেদও সৃষ্টি হয়নি।' ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) প্রমুখ আলেমগণ কামড়িয়ে নেয় এরূপ কুকুরের সাথে নেকড়ে বাঘ, হিংস্র জন্তু এবং চিতা বাঘকেও সামিল করেছেন। কেননা, এগুলো তো কুকুর অপেক্ষাও ক্ষতিকারক। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) এবং হযরত সুফইয়ান সওরী (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক হামলাকারী হিংস্র জন্তুর হুকুম কুকুরের হুকুমেরই অন্তর্ভুক্ত। এর সমর্থন এই হাদীসে পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উৎবা ইবনে আবি লাহাবের উপর দু'আ করতে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ! সিরিয়ায় তার উপর আপনি আপনার এক কুকুরকে কর্তৃত্ব দান করুন!” তখন যারকা’ নামক স্থানে একটি নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলে।(আরবী) জমহুরের উক্তি এই যে, কাফফারা আদায় করার ব্যাপারে ইচ্ছাপূর্বক ও ভুলবশতঃ হত্যাকারী উভয়েই সমান। ইমাম যুহরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম দ্বারা শুধু ইচ্ছাপূর্বক হত্যাকারীর উপর কাফফারা ওয়াজিব হওয়া প্রমাণিত হয় বটে, কিন্তু হাদীস দ্বারা ভুলবশতঃ হত্যাকারীর উপরও কাফফারা ওয়াজিব হওয়া প্রমাণিত হয়ে যায়। ভাবার্থ হলো এই যে, কুরআন কারীম দ্বারা ইচ্ছাপূর্বক হত্যাকারীর উপর যেমন কাফফারা ওয়াজিব হওয়া সাব্যস্ত হলো, তেমনিভাবে তার গুনাহগার হওয়াও সাব্যস্ত হলো। যেমন আল্লাহ্ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেন সে তার পাপের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করে, তবে যা অতীত হয়েছে তা আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন, আর যে ব্যক্তি পুনরায় সেই কাজ করবে, আল্লাহ তার উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন।” আহকামে নবভী (সঃ) এবং আহকামে আসহাব দ্বারাও এর সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে যে, ভুলবশতঃ হত্যা করার অবস্থাতেও কাফফারা দিতে হবে, যেমন ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করলে কুরআন কারীমের নির্দেশ অনুযায়ী কাফফারা দিতে হয়। কেননা, যদি শিকারকে হত্যা করা হয় তবে তাকে নষ্ট করা হলো। আর যখন ইচ্ছাপূর্বক নষ্ট করবে তখন তাকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হয়, দ্রুপ ভুলবশতঃ নষ্ট করলেও এটাই হুকুম। পার্থক্য শুধু এইটুকু যে, ইচ্ছাপূর্বক শিকারকারী কাফফারার সাথে গুনাহগারও হয়, কিন্তু ভুলবশতঃ শিকারকারী গুনাহগার হয় না।(আরবী) কেউ কেউ (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) পড়েছেন, আবার কেউ কেউ -এর সাথে পড়েছেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) (আরবী) পড়েছেন। কিন্তু যেভাবেই পড়া হোক না কেন, ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং জমহুরের দলীল সর্বাবস্থাতেই কায়েম থাকছে যে, শিকারকৃত জন্তুর অনুরূপ বিনিময় ওয়াজিব হবে। যদি ওরই অনুরূপ বা প্রায় অনুরূপ কোন গৃহপালিত পশু পাওয়া যায় তবে ওটাই দিতে হবে, অন্যথায় ওর মূল্য দিতে হবে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর এতে মতানৈক্য রয়েছে। তাঁর মতে শিকারকৃত জন্তুর গৃহপালিত জন্তুর সাথে সাদৃশ্য থাক বা না-ই থাক, সর্বাবস্থাতেই ওর মূল্য দিতে হবে।(আরবী) অর্থাৎ এ কাফফারার ফায়সালা করবেন মুসলমানদের মধ্য হতে দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি, যারা এ ফায়সালা করবেন যে, সাদৃশ্যযুক্ত জন্তু শিকারের বেলায় সাদৃশ্যযুক্ত জন্তু দিতে হবে কিংবা সাদৃশ্যহীন জন্তু শিকারের বেলায় মূল্য দিতে হবে। আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য শুধু এ ব্যাপারে রয়েছে যে, ঐ দুই মীমাংসাকারীর মধ্যে একজন স্বয়ং শিকারী হতে পারেন কি না? এই ব্যাপারে দু'টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তি এই যে, স্বয়ং শিকারী মীমাংসাকারী হতে পারেন না। এটাই হচ্ছে ইমাম মালিকের মাযহাব। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, স্বয়ং শিকারী মীমাংসাকারী হতে পারেন। কেননা আয়াতটি আম বা সাধারণ। আর এটা হচ্ছে ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর মাযহাব। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) মায়মুন ইবনে মাহরান (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এক বেদুঈন হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “আমি ইহরামের অবস্থায় একটি শিকারকে হত্যা করেছি। সুতরাং আপনার মতে আমাকে এর কি বিনিময় দিতে হবে?” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর পাশে উপবিষ্ট হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ)-কে বললেন, “তোমার নিকট এর ফায়সালা কি?” বর্ণনাকারী বলেন যে, তখন "ঐ বেদুঈন বললোঃ “আমি এসেছি আপনার নিকট। আর আপনি হচ্ছেন মুসলমানদের খলীফা। আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম, আর আপনি জিজ্ঞেস করছেন অন্যকে?” তখন আবূ বকর (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি আপত্তি করছো কেন? আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মধ্যে দুজন। ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি যেন এর ফায়সালা করে।” সুতরাং আমি আমার সঙ্গীর সাথে পরামর্শ করলাম। আমরা দুজন যে ফায়সালার উপর একমত হবো, তোমাকে আমি সেই ফায়সালা শুনিয়ে দেবো।” (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এটা খুবই উত্তম ইসনাদ। কিন্তু মায়মূন (রাঃ) ও আবু বকর (রাঃ)-এর মধ্যে (আরবী) রয়েছে) এখানে এটারই সম্ভাবনা ছিল। যেহেতু, হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাঃ) যখন দেখলেন যে, বেদুঈন মূখ এবং দুই ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির মাসআলা অবহিত নয়, তাই নম্রতার সাথে তাকে বুঝিয়ে দিলেন। কেননা মূর্খতার ওষুধ হচ্ছে শিক্ষাদান।ইবনে জারীর বাজলী (রঃ) বলেন, ইহরামের অবস্থায় আমি একটি হরিণ শিকার করি। হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট আমি তা বর্ণনা করলে তিনি বলেন, “তুমি দু’জন সঙ্গীকে নিয়ে আস যারা তোমার এ কাজের ফায়সালা করবেন।” আমি তখন আব্দুর রহমান (রাঃ) ও সা’দ (রাঃ)-কে নিয়ে আসলাম। তারা দু'জন ফায়সালা করলেন যে, আমাকে একটা হৃষ্টপুষ্ট ছাগ ফিদ্ইয়া স্বরূপ দিতে হবে। এ ব্যাপারেও আলেমদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে যে, যদি পরবর্তী যুগেও কোন অপরাধীর মধ্যে এই অপরাধ প্রকাশ পায় তবে কি সেই সময়েরই দু'জন ফায়সালাকারীর প্রয়োজন হয়, না এরূপ মাসআলায় সাহাবীদের যে ফায়সালা ছিল ওরই আলোকে ফতওয়া দেয়া যেতে পারে? এতে দু’টি উক্তি রয়েছে। ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ এ ব্যাপারে যে ফায়সালা দিয়েছিলেন তারই অনুসরণ করতে হবে, ফায়সালাকারী দু’জন সাহাবীর ফায়সালার বৈপরীত্ব করা চলবে না। আর যেখানে সাহাবীদের কোন ফায়সালা বিদ্যমান নেই, সেখানে সেই যুগেরই দু’জন ন্যায়পরায়ণ ফায়সালাকারীর ফায়সালা কার্যকরী হবে। কিন্তু ইমাম মালিক (রঃ) ও ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক যুগের ফায়সালা পৃথক পৃথক হবে এবং প্রত্যেক যামানায় সেই যামানারই দু’জন ন্যায়পরায়ণ ফায়সালাকারী নির্ধারণ করতে হবে, সেখানে সাহাবীদের ফায়সালা বিদ্যমান থাক আর নই থাক। কেননা, আল্লাহ তাআলা (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মধ্য হতে’ শব্দ ব্যবহার করেছেন।(আরবী) অর্থাৎ এ কুরবানী কা'বা পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। সেখানেই ওটা জবেহ করতে হবে এবং হারাম শরীফের মিসকীনদের মধ্যে ওর গোশত বন্টন করতে হবে। এ ব্যাপারে কোনই মতভেদ নেই, বরং সবাই এতে একমত।(আরবী) অর্থাৎ মুহরিম ব্যক্তি যদি নিহত শিকারের অনুরূপ জিনিস না পায় অথবা নিহত জন্তু এমন শ্রেণীর জন্তুই না হয় যে, গৃহপালিত জন্তুর মধ্যে ওর সাদৃশ্য থাকতে পারে, তবে বিনিময়, খাদ্য খাওয়ানো এবং রোযা রাখার ব্যাপারে যে কোন একটি পালন করার ইখতিয়ার বা স্বাধীনতা রয়েছে। কুরআনে কারীমে (আরবী) শব্দটি ইখতিয়ারের অর্থেই এসেছে। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ) এবং ইমাম মুহাম্মাদ (রঃ)-এর এটাই উক্তি। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এরও একটি উক্তি এটাই আছে। ইমাম আহমাদ (রঃ)-এরও প্রসিদ্ধ উক্তি এটাই যে, (আরবী) শব্দটি ইখতিয়ারের উদ্দেশ্যেই আনা হয়েছে। অন্য একটি উক্তি এই যে, (আরবী) শব্দটি ইখতিয়ারের উদ্দেশ্যে আনা হয়নি, বরং ক্রমিক হিসেবে আনা হয়েছে। আর এর রূপ এই যে, মূল্যের সমান হলেই থেমে যেতে হবে এবং এতেই নিহত শিকারের ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে। এটাই ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ), হাম্মাদ (রঃ) এবং ইমরাহীম (রঃ)-এর মত। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, এ মূল্য ঐ জানোয়ারের বিনিময় রূপ হবে যে, যদি ওটা বিদ্যমান থাকতো ।তবে এটাই ওর মূল্য হতো। অতঃপর এ অর্থ দ্বারা খাদ্য ক্রয় করে সাদকা করে দিতে হবে এবং প্রত্যেক মিসকীনকে এক মুদ' অর্থাৎ ৫৬ তোলা খাবার দিতে হবে। এটা হচ্ছে ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম মালিক (রঃ) এবং হেজাযবাসী আলেমদের মাসআলা। আর ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ), ইমাম মুহাম্মাদ (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ বলেন যে, প্রত্যেক মিসকীনকে দুই মুদ' করে আহার্য দিতে হবে। ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন যে, গম হলে এক ‘মুদ' এবং অন্য কোন জিনিস হলে দুই ‘মুদ’ দিতে হবে। যদি এটা দিতে অপারগ হয় তবে রোযা রাখতে হবে। অর্থাৎ মিসকীনকে যে কয়েকদিন খানা খাওয়াতে হয়, ততদিন রোযা রাখতে হবে।এখন এ খানা কোথায় খাওয়াতে হবে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন, এ খানা হারাম শরীফে খাওয়াতে হবে। আতা’রও এটাই উক্তি। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন, যে স্থানে শিকারকে হত্যা করা হয়েছে। সেখানেই বা ওরই নিকটবর্তী কোন এক স্থানে এ খানা খাওয়াতে হবে। ইমাম। আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, এ খানা খাওয়াবার জন্যে কোন স্থান নির্দিষ্ট নেই। সেটা হারাম শরীফেই হোক বা অন্য কোন জায়গাই হোক, সব জায়গাতেই খাওয়ানো চলবে।(আরবী) যেন সে তার দুষ্কর্মের শাস্তি গ্রহণ করে। অর্থাৎ আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি তার উপর কাফফারা এ জন্যেই ওয়াজিব করেছি যে, যেন সে আমার হুকুমের বিরোধিতার শাস্তি ভোগ করে। কিন্তু অজ্ঞতার যুগে তার দ্বারা যা কিছু সাধিত হয়েছিল তা আমি ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবো। কেননা, সে ইসলাম গ্রহণের পর ভাল কাজ করেছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণের পর এর নিষিদ্ধতা সত্ত্বেও যে আল্লাহর নাফরমানী করতঃ ওটা করে বসবে, আল্লাহ তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। তিনি বিরুদ্ধচারীদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী। তবে অজ্ঞতার যুগে যা কিছু হয়েছে তা তিনি ক্ষমা করবেন। আবার এ প্রশ্নের উত্তর না বাচক হবে যে, ইসলামের ইমাম কি এর কোন শাস্তি দিতে পারেন? অর্থাৎ ইমামের শাস্তি প্রদানের কোন অধিকার নেই। এ গুনাহ হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের মধ্যকার ব্যাপার। হ্যা, তবে ইমামের তাকে শাস্তি দেয়ার অধিকার না থাকা সত্ত্বেও ফিদইয়া তাকে অবশ্যই আদায় করতে হবে। এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা কাফফারার মাধ্যমেই প্রতিশোধ নিয়ে নেবেন এবং প্রতিশোধ গ্রহণের রূপ এটাই হবে।পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুরুজনবৃন্দ এর উপর একমত যে, মুহরিম যখন শিকারকে হত্যা করে ফেললো তখন তার উপর ফিদইয়া ওয়াজিব হয়ে গেল। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভুলের মধ্যে কোন পর্থক্য নেই, ভুল যতবারই হোক না কেন। ভুলবশতঃ কাজ এবং ইচ্ছাপূর্বক কাজ হুকুমের দিক দিয়ে সব সমান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুহরিমের দ্বারা যদি ভুলবশতঃ শিকারের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় তবে তার উপর প্রতিবারের হত্যার সময়েই এ হুকুম প্রযোজ্য হবে। কিন্তু যদি ইচ্ছাপূর্বক সে এই কাজ করে তবে প্রথমবারে তো তার উপর এ হুকুম প্রযোজ্য হবে, কিন্তু দ্বিতীয়বার তার দ্বারা এ কার্য সংঘটিত হলে তাকে বলা হবে- “আল্লাহ স্বয়ং তোমার এ কাজের প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন।” (শুরাইহ্ (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) এবং হাসান বসরীও (রঃ) এ উক্তিই করেছেন। ইবনে জারীর (রঃ) প্রথম উক্তিটি পছন্দ করেছেন)(আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর সাম্রাজ্যে প্রবল পরাক্রান্ত, মহা বিজয়ী। কেউ তাঁকে তাঁর কাজে বাধা দিতে পারে না। তিনি প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চাইলে কে এমন আছে যে, তার এ কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে? সারা জগত তাঁরই সৃষ্ট। সুতরাং এখানে হুকুম শুধু তারই চলবে। বিরুদ্ধাচারীদেরকে তিনি শাস্তি অবশ্যই দেবেন।

আল-মায়িদা 5:96

৯৬-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) আল্লাহ তা'আলার এ উক্তির ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) বলেন, এর ভাবার্থ হচ্ছে তোমাদের জন্যে সমুদ্রের তাজা বা সজীব শিকার হালাল। আর (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে- যে মাছ শুকিয়ে পাথেয় তৈরী করা হয় সেটাও তোমাদের জন্যে হালাল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আর একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা এই যে, (আরবী) দ্বারা ঐ শিকারকে বুঝানো হয়েছে যা সমুদ্র হতে জীবিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। আর (আরবী) দ্বারা সমুদ্রের ঐ মৃত শিকারকে বুঝানো হয়েছে যা মৃত অবস্থায় সমুদ্রের তীরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। (এরূপই হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে) হযরত আবু বকর (রাঃ) জনগণের সামনে খুতবা দান অবস্থায় বলেনঃ “শুধু সমুদ্রের শিকারই যে তোমাদের জন্যে হালাল তা নয়, বরং সমুদ্র হতে যা নিক্ষিপ্ত হয়, সেটাও তোমাদের উপকার লাভ ও পাথেয় হিসেবে হালাল।" ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আবদুর রহমান ইবনে আবূ হুরাইরা (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ সমুদ্র বহু মাছকে তীরে নিক্ষেপ করে থাকে, আমরা ওগুলো খেতে পারি কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ “তোমারা ওগুলো খেয়ো না।" অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বাড়ী ফিরে এসে কুরআন মাজীদ হাতে নেন এবং সূরা মায়িদাহ্ পাঠ করতে থাকেন (আরবী) -এ আয়াতে এসে তিনি বলেনঃ যাও, বলে দাও তোমরা ওটা খাও, কেননা সমুদ্রের জিনিসকে আল্লাহ পাক (আরবী) বলেছেন। ইবনে জারীরও (রঃ) একথাই বলেছেন যে, (আরবী) দ্বারা সমুদ্রের মৃত মৎস্যকেই বুঝানো হয়েছে।(আরবী) এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহু বচন। ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, সমুদ্রের তীরবর্তী লোকেরা তো সামুদ্রিক টাকা প্রাণী শিকার করে থাকে। আর যা মরে যায় তা শুকিয়ে জমা করে রাখে। কিংবা তার শিকার করে রেখে দেয় এবং ওটা মুসাফির ও সমুদ্রের দূরবর্তী লোকদের জন্যে পাথেয়র কাজ দেয়। জমহুর মত মাছ হালাল হওয়ার দলীল হিসেবে এ আয়াতটিকে গ্রহণ করেছেন। ইমাম মালিক (রঃ) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় একদল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং হযরত উবাইদাহ্ ইবনে জাররাহ (রাঃ)-কে ঐ দলের আমীর নিযুক্ত করা হয়। তাঁদের সংখ্যা ছিল তিনশ’। আমিও তাঁদের একজন ছিলাম। আমরা পথে থাকতেই আমাদের পাথেয় নিঃশেষ হয়ে আসে। তখন হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) সকলের পাথেয় একত্রিত করার নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশক্রমে সমস্ত পাথেয় জমা করা হয়। আমাদের পাথেয় ছিল খেজুর। আমরা প্রতিদিন তা থেকে অল্প অল্প করে খেয়ে থাকি। অবশেষে ওগুলোও শেষ হয়ে আসে এবং রসদ হিসেবে আমরা শুধুমাত্র একটি করে খেজুর পেয়ে থাকি। অবশেষে আমরা মৃত প্রায় অবস্থায় সমুদ্র তীরে উপনীত হই এবং দেখি যে, টিলার মত একটি বিরাট মাছ পড়ে রয়েছে। সেনাবাহিনীর সমস্ত লোক আঠার দিন পর্যন্ত ওটা ভক্ষণ করে। হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) ওর পাজরের হাড় দু’টিকে কামানের মত দাঁড় করে রাখার নির্দেশ দেন। অতঃপর ওর নীচ দিয়ে একজন উষ্ট্রারোহী গমন করে, তথাপি ওর উপরিভাগ স্পর্শ করতে পারেনি। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাখরীজ করা হয়েছে।সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ সমুদ্র তীরে উঁচু টিলার মত কি একটা দেখা গেল। আমরা তখন সেখানে গিয়ে দেখি যে, একটি সামুদ্রিক জন্তু মৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ওকে আমবার বলা হয়। হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) বললেনঃ “এটা তো মৃত।” তারপর তিনি বললেনঃ “মৃত হোক! আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত! আমরা ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছি। সুতরাং তোমরা এর গোশত ভক্ষণ কর।” আমরা তথায় একমাস কাল অবস্থান করি। আমরা ছিলাম তিনশ’জন লোক। আমরা খেয়ে মোটা হয়ে গিয়েছিলাম। ওর চোখের মণি হতে রাওগান' তেল বের করে আমরা আমাদের কলসগুলো ভর্তি করেছিলাম। এতো বড় বড় টুকরা আমরা কেটেছিলাম যে, ঐগুলোকে গরু বলে মনে হচ্ছিল। ওর পাজরের একটি হাড় নিয়ে কামানের আকারে মাটিতে গেড়ে রেখেছিলাম। বড় বড় উট ওর মধ্য দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। আমরা ওর অবশিষ্ট গোশত শুকিয়ে পাথেয় বানিয়েছিলাম। আমরা মদীনা পৌছে যখন ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করি তখন তিনি বলেনঃ “এটা ছিল ঐ আহার্য যা আল্লাহ তোমাদের জন্যেই বের করেছিলেন। তোমাদের কাছে ওর কিছু গোশত আছে কি, যা আমাকে খাওয়াতে পার?” আমরা তখন তার কাছে তুহফা পাঠালাম এবং তিনি তা ভক্ষণ করলেন।ইমাম মালিক (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা সমুদ্রে সফর করে থাকি এবং অল্প পানি সঙ্গে রাখতে পারি। যদি আমরা ঐ পানিতে অযু করি তবে পিপাসার্ত থেকে যাই। সুতরাং আমরা সমুদ্রের পানিতে অযু করতে পারি কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং মৃত (মাছও) হালাল।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) ও আসহাবুস সুনান বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন।)কোন কোন ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদ এ আয়াত হতে দলীল গ্রহণ করেছেন যে, সমস্ত সামুদ্রিক জীব খাওয়া যেতে পারে। কোন জীবই এর বহির্ভূত নয়। তবে কেউ কেউ ব্যাঙকে এর ব্যতিক্রম বলেছেন এবং এটা ছাড়া সবগুলোকেই হালাল বলেছেন। কেননা, ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) আবু আবদির রহমান ইবনে উসমান তাইমী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ব্যাঙকে মেরে ফেলতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেনঃ “তার ডাক বা শব্দ হচ্ছে আল্লাহর তাসবীহ।” অন্যান্যগণ বলেন যে, মাছ খাওয়া যাবে, কিন্তু ব্যাঙ খাওয়া যাবে না। এই দু'টো ছাড়া অন্যান্যগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। স্থলভাগের যেসব জন্তুর গোশত হালাল ঐগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত সামুদ্রিক জন্তুও হালাল। পক্ষান্তরে স্থলভাগের যেসব জন্তুর গোশত হালাল নয় ঐগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত সামুদ্রিক জন্তুও হালাল নয়। এসব মতভেদ হচ্ছে ইমাম শাফিই (রঃ)-এর মাযহাবের উপর ভিত্তি করে। আর ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, সমুদ্রের যে মাছ মরে যাবে সেটা খাওয়া হালাল নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা (আরবী) বলেছেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“তোমরা সমুদ্রে যা শিকার কর এবং তা জীবিত থাকার পর মারা যায় ওটা খাও। আর যে মৃত মাছকে ঢেউ বয়ে এনে তীরে ফেলে দেয় তা খেয়ো না।” আসহাবে মালিক (রঃ), শাফিঈ (রঃ) এবং আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতে হাদীসে আমবারের মাধ্যমে এবং “সমুদ্রের পানি পবিত্র ও তার মৃতও হালাল” -এ হাদীসের মাধ্যমে জমহুর দলীল গ্রহণ করেছেন। এ জন্যে তারা এরূপ মাছকেও খাওয়া জায়েয বলে থাকেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের জন্যে দুটি মৃত জন্তু ও দু'টি রক্ত হালাল। মৃত জন্তু দু’টি হচ্ছে মাছ ও ফড়িং এবং দুটি রক্ত হচ্ছে কলিজা ও প্লীহা।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), দারেকুতনী (রঃ) এবং বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবী) অর্থাৎ ইহরামের অবস্থায় তোমাদের জন্যে স্থলচর শিকার ধরা হারাম। যদি তোমরা ইচ্ছাপূর্বক এ কাজ কর তবে তোমরা গুনাহগারও হবে এবং তোমাদেরকে ক্ষতিপূরণও দিতে হবে। আর যদি ভুলবশতঃ কর তবে ক্ষতিপূরণ দেয়ার পর তোমরা গুনাহ থেকে মুক্তি পাবে বটে, কিন্তু ঐ শিকার খাওয়া তোমাদের জন্যে হারাম হবে। কেননা, ওটা মৃতেরই অনুরূপ। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম মালিক (রঃ)-এর একটা উক্তিও এটাই যে, মুহরিম ও গায়ের মুহরিম সবারই জন্যে ওটা খাওয়া হারাম। সুতরাং যদি শিকারী ওর থেকে কিছু অংশ খেয়ে নেয় তবে কি তার উপর দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হবে? এ ব্যাপারে আলেমদের দু’টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তি এই যে, হ্যা, তার উপর দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হবে। আলেমদের একটি দলের মাযহাব এটাই। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, তার উপর দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হবে না। মালিক ইবনে আনাস (রঃ)-এর এটাই মাযহাব। আবূ উমার ইবনে আবদুল বার (রঃ) বলেন যে, ব্যভিচারীর উপর হদ লাগাবার পূর্বে সে বারবার ব্যভিচার করে থাকলেও তো তার উপর একটি হদই ওয়াজিব হয়ে থাকে। জমহুরের মাযহাবও এটাই। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, স্বীয় শিকারের গোশত খেয়ে নিয়ে তাকে মূল্য প্রদান করতে হবে, এর চেয়ে বেশী কিছু দিতে হবে না। যদি গায়ের মুহরিম শিকার করার পর মুহরিমের নিকট হাদীয়া পাঠায় তবে কারও কারও মতে ওটা মুহরিমের জন্যে সাধারণভাবেই জায়েয। সে তারই জন্যে শিকার করে থাক আর না থাক এ দুয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয় যে, গায়ের মুহরিম ব্যক্তি যে শিকার করে থাকে, মুহরিম ব্যক্তি ওর গোশত খেতে পারে কি? তখন তিনি ফতওয়া দেন যে, হঁ্যা, খেতে পারে। তারপর তিনি হযরত উমার (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁকে ওটা অবহিত করেন। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “যদি তুমি এর বিপরীত ফতওয়া দিতে তবে আমি তোমাকে শাস্তি দিতাম।” কিন্তু অন্যান্য আলেমগণ এ গোশত ভক্ষণ করা মুহরিমের জন্যে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ বলেন। কেননা (আরবী) -এ আয়াতটি (আরবী) বা সাধারণ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি মুহরিমের জন্যে শিকারের গোশত ভক্ষণ পছন্দ করতেন এবং বলতেন যে, ওটা (আরবী) বা সন্দেহযুক্ত। কেননা, আল্লাহ তা'আলা (আরবী) -এ কথা বলেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সর্বাবস্থায় মুহরিমের জন্যে শিকারের গোশত ভক্ষণ মাকরূহ বা অপছন্দনীয় মনে করতেন। (তাউস (রঃ) ও জাবির ইবনে যায়েদও (রঃ) এরূপই মনে করতেন এবং সাওরীও ঐদিকেই গিয়েছেন) হযরত আলী (রাঃ) সর্বাবস্থায় মুহরিমের জন্যে শিকারের গোশত ভক্ষণ মাকরূহ জানতেন। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং জমহুর বলেন যে, গায়ের মুহরিম যদি মুহরিমের উদ্দেশ্যে শিকার করে তবে মুহরিমের জন্যে তা খাওয়া জায়েয নয়। কেননা, সা'ব ইবনে জাসামাহ (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী (সঃ)-কে একটি বন্য গাধা হাদিয়া দেন, কিন্তু তিনি তা ফিরিয়ে দেন। অতঃপর তিনি তার চেহারায় অসন্তুষ্টির ভাব লক্ষ্য করে বলেন : “আমি ওটা ফিরিয়ে দিয়েছি একমাত্র এই কারণে যে, আমি ইহরামের অবস্থায় রয়েছি। (এ হাদীসটি বহু শব্দে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে) এর কারণ ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ধারণায় ঐ শিকার তার উদ্দেশ্যে ছিল। সেই জন্যেই তিনি তা ফেরত দিয়েছিলেন। সুতরাং যদি কোন শিকার মুহরিমের উদ্দেশ্যে করা না হয় তবে মুহরিমের জন্যে ওটা খাওয়া জায়েয হবে। কেননা, আবু কাতাদা (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে যে, তিনি একটি বন্য গাধা শিকার করেছিলেন। সেই সময় তিনি মুহরিম ছিলেন না। কিন্তু তাঁর সঙ্গীরা মুহরিম ছিলেন। তাই তাঁরা ওটা ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকলেন। ঐ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “তোমাদের কেউ কি শিকারীকে শিকার দেখিয়ে দিয়েছিল বা শিকারকে হত্যা করার ব্যাপারে তাকে সাহায্য করেছিল?” সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “না।” তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে তোমরা খাও।" আর স্বয়ং তিনিও খেলেন। এই ঘটনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও বহু শব্দে বর্ণিত আছে।

আল-মায়িদা 5:97

৯৬-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) আল্লাহ তা'আলার এ উক্তির ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) বলেন, এর ভাবার্থ হচ্ছে তোমাদের জন্যে সমুদ্রের তাজা বা সজীব শিকার হালাল। আর (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে- যে মাছ শুকিয়ে পাথেয় তৈরী করা হয় সেটাও তোমাদের জন্যে হালাল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আর একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা এই যে, (আরবী) দ্বারা ঐ শিকারকে বুঝানো হয়েছে যা সমুদ্র হতে জীবিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। আর (আরবী) দ্বারা সমুদ্রের ঐ মৃত শিকারকে বুঝানো হয়েছে যা মৃত অবস্থায় সমুদ্রের তীরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। (এরূপই হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে) হযরত আবু বকর (রাঃ) জনগণের সামনে খুতবা দান অবস্থায় বলেনঃ “শুধু সমুদ্রের শিকারই যে তোমাদের জন্যে হালাল তা নয়, বরং সমুদ্র হতে যা নিক্ষিপ্ত হয়, সেটাও তোমাদের উপকার লাভ ও পাথেয় হিসেবে হালাল।" ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আবদুর রহমান ইবনে আবূ হুরাইরা (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ সমুদ্র বহু মাছকে তীরে নিক্ষেপ করে থাকে, আমরা ওগুলো খেতে পারি কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ “তোমারা ওগুলো খেয়ো না।" অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বাড়ী ফিরে এসে কুরআন মাজীদ হাতে নেন এবং সূরা মায়িদাহ্ পাঠ করতে থাকেন (আরবী) -এ আয়াতে এসে তিনি বলেনঃ যাও, বলে দাও তোমরা ওটা খাও, কেননা সমুদ্রের জিনিসকে আল্লাহ পাক (আরবী) বলেছেন। ইবনে জারীরও (রঃ) একথাই বলেছেন যে, (আরবী) দ্বারা সমুদ্রের মৃত মৎস্যকেই বুঝানো হয়েছে।(আরবী) এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহু বচন। ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, সমুদ্রের তীরবর্তী লোকেরা তো সামুদ্রিক টাকা প্রাণী শিকার করে থাকে। আর যা মরে যায় তা শুকিয়ে জমা করে রাখে। কিংবা তার শিকার করে রেখে দেয় এবং ওটা মুসাফির ও সমুদ্রের দূরবর্তী লোকদের জন্যে পাথেয়র কাজ দেয়। জমহুর মত মাছ হালাল হওয়ার দলীল হিসেবে এ আয়াতটিকে গ্রহণ করেছেন। ইমাম মালিক (রঃ) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় একদল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং হযরত উবাইদাহ্ ইবনে জাররাহ (রাঃ)-কে ঐ দলের আমীর নিযুক্ত করা হয়। তাঁদের সংখ্যা ছিল তিনশ’। আমিও তাঁদের একজন ছিলাম। আমরা পথে থাকতেই আমাদের পাথেয় নিঃশেষ হয়ে আসে। তখন হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) সকলের পাথেয় একত্রিত করার নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশক্রমে সমস্ত পাথেয় জমা করা হয়। আমাদের পাথেয় ছিল খেজুর। আমরা প্রতিদিন তা থেকে অল্প অল্প করে খেয়ে থাকি। অবশেষে ওগুলোও শেষ হয়ে আসে এবং রসদ হিসেবে আমরা শুধুমাত্র একটি করে খেজুর পেয়ে থাকি। অবশেষে আমরা মৃত প্রায় অবস্থায় সমুদ্র তীরে উপনীত হই এবং দেখি যে, টিলার মত একটি বিরাট মাছ পড়ে রয়েছে। সেনাবাহিনীর সমস্ত লোক আঠার দিন পর্যন্ত ওটা ভক্ষণ করে। হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) ওর পাজরের হাড় দু’টিকে কামানের মত দাঁড় করে রাখার নির্দেশ দেন। অতঃপর ওর নীচ দিয়ে একজন উষ্ট্রারোহী গমন করে, তথাপি ওর উপরিভাগ স্পর্শ করতে পারেনি। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাখরীজ করা হয়েছে।সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ সমুদ্র তীরে উঁচু টিলার মত কি একটা দেখা গেল। আমরা তখন সেখানে গিয়ে দেখি যে, একটি সামুদ্রিক জন্তু মৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ওকে আমবার বলা হয়। হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) বললেনঃ “এটা তো মৃত।” তারপর তিনি বললেনঃ “মৃত হোক! আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত! আমরা ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছি। সুতরাং তোমরা এর গোশত ভক্ষণ কর।” আমরা তথায় একমাস কাল অবস্থান করি। আমরা ছিলাম তিনশ’জন লোক। আমরা খেয়ে মোটা হয়ে গিয়েছিলাম। ওর চোখের মণি হতে রাওগান' তেল বের করে আমরা আমাদের কলসগুলো ভর্তি করেছিলাম। এতো বড় বড় টুকরা আমরা কেটেছিলাম যে, ঐগুলোকে গরু বলে মনে হচ্ছিল। ওর পাজরের একটি হাড় নিয়ে কামানের আকারে মাটিতে গেড়ে রেখেছিলাম। বড় বড় উট ওর মধ্য দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। আমরা ওর অবশিষ্ট গোশত শুকিয়ে পাথেয় বানিয়েছিলাম। আমরা মদীনা পৌছে যখন ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করি তখন তিনি বলেনঃ “এটা ছিল ঐ আহার্য যা আল্লাহ তোমাদের জন্যেই বের করেছিলেন। তোমাদের কাছে ওর কিছু গোশত আছে কি, যা আমাকে খাওয়াতে পার?” আমরা তখন তার কাছে তুহফা পাঠালাম এবং তিনি তা ভক্ষণ করলেন।ইমাম মালিক (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা সমুদ্রে সফর করে থাকি এবং অল্প পানি সঙ্গে রাখতে পারি। যদি আমরা ঐ পানিতে অযু করি তবে পিপাসার্ত থেকে যাই। সুতরাং আমরা সমুদ্রের পানিতে অযু করতে পারি কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং মৃত (মাছও) হালাল।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) ও আসহাবুস সুনান বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন।)কোন কোন ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদ এ আয়াত হতে দলীল গ্রহণ করেছেন যে, সমস্ত সামুদ্রিক জীব খাওয়া যেতে পারে। কোন জীবই এর বহির্ভূত নয়। তবে কেউ কেউ ব্যাঙকে এর ব্যতিক্রম বলেছেন এবং এটা ছাড়া সবগুলোকেই হালাল বলেছেন। কেননা, ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) আবু আবদির রহমান ইবনে উসমান তাইমী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ব্যাঙকে মেরে ফেলতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেনঃ “তার ডাক বা শব্দ হচ্ছে আল্লাহর তাসবীহ।” অন্যান্যগণ বলেন যে, মাছ খাওয়া যাবে, কিন্তু ব্যাঙ খাওয়া যাবে না। এই দু'টো ছাড়া অন্যান্যগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। স্থলভাগের যেসব জন্তুর গোশত হালাল ঐগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত সামুদ্রিক জন্তুও হালাল। পক্ষান্তরে স্থলভাগের যেসব জন্তুর গোশত হালাল নয় ঐগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত সামুদ্রিক জন্তুও হালাল নয়। এসব মতভেদ হচ্ছে ইমাম শাফিই (রঃ)-এর মাযহাবের উপর ভিত্তি করে। আর ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, সমুদ্রের যে মাছ মরে যাবে সেটা খাওয়া হালাল নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা (আরবী) বলেছেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“তোমরা সমুদ্রে যা শিকার কর এবং তা জীবিত থাকার পর মারা যায় ওটা খাও। আর যে মৃত মাছকে ঢেউ বয়ে এনে তীরে ফেলে দেয় তা খেয়ো না।” আসহাবে মালিক (রঃ), শাফিঈ (রঃ) এবং আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতে হাদীসে আমবারের মাধ্যমে এবং “সমুদ্রের পানি পবিত্র ও তার মৃতও হালাল” -এ হাদীসের মাধ্যমে জমহুর দলীল গ্রহণ করেছেন। এ জন্যে তারা এরূপ মাছকেও খাওয়া জায়েয বলে থাকেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের জন্যে দুটি মৃত জন্তু ও দু'টি রক্ত হালাল। মৃত জন্তু দু’টি হচ্ছে মাছ ও ফড়িং এবং দুটি রক্ত হচ্ছে কলিজা ও প্লীহা।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), দারেকুতনী (রঃ) এবং বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবী) অর্থাৎ ইহরামের অবস্থায় তোমাদের জন্যে স্থলচর শিকার ধরা হারাম। যদি তোমরা ইচ্ছাপূর্বক এ কাজ কর তবে তোমরা গুনাহগারও হবে এবং তোমাদেরকে ক্ষতিপূরণও দিতে হবে। আর যদি ভুলবশতঃ কর তবে ক্ষতিপূরণ দেয়ার পর তোমরা গুনাহ থেকে মুক্তি পাবে বটে, কিন্তু ঐ শিকার খাওয়া তোমাদের জন্যে হারাম হবে। কেননা, ওটা মৃতেরই অনুরূপ। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম মালিক (রঃ)-এর একটা উক্তিও এটাই যে, মুহরিম ও গায়ের মুহরিম সবারই জন্যে ওটা খাওয়া হারাম। সুতরাং যদি শিকারী ওর থেকে কিছু অংশ খেয়ে নেয় তবে কি তার উপর দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হবে? এ ব্যাপারে আলেমদের দু’টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তি এই যে, হ্যা, তার উপর দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হবে। আলেমদের একটি দলের মাযহাব এটাই। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, তার উপর দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হবে না। মালিক ইবনে আনাস (রঃ)-এর এটাই মাযহাব। আবূ উমার ইবনে আবদুল বার (রঃ) বলেন যে, ব্যভিচারীর উপর হদ লাগাবার পূর্বে সে বারবার ব্যভিচার করে থাকলেও তো তার উপর একটি হদই ওয়াজিব হয়ে থাকে। জমহুরের মাযহাবও এটাই। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, স্বীয় শিকারের গোশত খেয়ে নিয়ে তাকে মূল্য প্রদান করতে হবে, এর চেয়ে বেশী কিছু দিতে হবে না। যদি গায়ের মুহরিম শিকার করার পর মুহরিমের নিকট হাদীয়া পাঠায় তবে কারও কারও মতে ওটা মুহরিমের জন্যে সাধারণভাবেই জায়েয। সে তারই জন্যে শিকার করে থাক আর না থাক এ দুয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয় যে, গায়ের মুহরিম ব্যক্তি যে শিকার করে থাকে, মুহরিম ব্যক্তি ওর গোশত খেতে পারে কি? তখন তিনি ফতওয়া দেন যে, হঁ্যা, খেতে পারে। তারপর তিনি হযরত উমার (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁকে ওটা অবহিত করেন। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “যদি তুমি এর বিপরীত ফতওয়া দিতে তবে আমি তোমাকে শাস্তি দিতাম।” কিন্তু অন্যান্য আলেমগণ এ গোশত ভক্ষণ করা মুহরিমের জন্যে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ বলেন। কেননা (আরবী) -এ আয়াতটি (আরবী) বা সাধারণ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি মুহরিমের জন্যে শিকারের গোশত ভক্ষণ পছন্দ করতেন এবং বলতেন যে, ওটা (আরবী) বা সন্দেহযুক্ত। কেননা, আল্লাহ তা'আলা (আরবী) -এ কথা বলেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সর্বাবস্থায় মুহরিমের জন্যে শিকারের গোশত ভক্ষণ মাকরূহ বা অপছন্দনীয় মনে করতেন। (তাউস (রঃ) ও জাবির ইবনে যায়েদও (রঃ) এরূপই মনে করতেন এবং সাওরীও ঐদিকেই গিয়েছেন) হযরত আলী (রাঃ) সর্বাবস্থায় মুহরিমের জন্যে শিকারের গোশত ভক্ষণ মাকরূহ জানতেন। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং জমহুর বলেন যে, গায়ের মুহরিম যদি মুহরিমের উদ্দেশ্যে শিকার করে তবে মুহরিমের জন্যে তা খাওয়া জায়েয নয়। কেননা, সা'ব ইবনে জাসামাহ (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী (সঃ)-কে একটি বন্য গাধা হাদিয়া দেন, কিন্তু তিনি তা ফিরিয়ে দেন। অতঃপর তিনি তার চেহারায় অসন্তুষ্টির ভাব লক্ষ্য করে বলেন : “আমি ওটা ফিরিয়ে দিয়েছি একমাত্র এই কারণে যে, আমি ইহরামের অবস্থায় রয়েছি। (এ হাদীসটি বহু শব্দে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে) এর কারণ ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ধারণায় ঐ শিকার তার উদ্দেশ্যে ছিল। সেই জন্যেই তিনি তা ফেরত দিয়েছিলেন। সুতরাং যদি কোন শিকার মুহরিমের উদ্দেশ্যে করা না হয় তবে মুহরিমের জন্যে ওটা খাওয়া জায়েয হবে। কেননা, আবু কাতাদা (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে যে, তিনি একটি বন্য গাধা শিকার করেছিলেন। সেই সময় তিনি মুহরিম ছিলেন না। কিন্তু তাঁর সঙ্গীরা মুহরিম ছিলেন। তাই তাঁরা ওটা ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকলেন। ঐ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “তোমাদের কেউ কি শিকারীকে শিকার দেখিয়ে দিয়েছিল বা শিকারকে হত্যা করার ব্যাপারে তাকে সাহায্য করেছিল?” সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “না।” তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে তোমরা খাও।" আর স্বয়ং তিনিও খেলেন। এই ঘটনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও বহু শব্দে বর্ণিত আছে।

আল-মায়িদা 5:98

৯৬-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) আল্লাহ তা'আলার এ উক্তির ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) বলেন, এর ভাবার্থ হচ্ছে তোমাদের জন্যে সমুদ্রের তাজা বা সজীব শিকার হালাল। আর (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে- যে মাছ শুকিয়ে পাথেয় তৈরী করা হয় সেটাও তোমাদের জন্যে হালাল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আর একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা এই যে, (আরবী) দ্বারা ঐ শিকারকে বুঝানো হয়েছে যা সমুদ্র হতে জীবিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। আর (আরবী) দ্বারা সমুদ্রের ঐ মৃত শিকারকে বুঝানো হয়েছে যা মৃত অবস্থায় সমুদ্রের তীরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। (এরূপই হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে) হযরত আবু বকর (রাঃ) জনগণের সামনে খুতবা দান অবস্থায় বলেনঃ “শুধু সমুদ্রের শিকারই যে তোমাদের জন্যে হালাল তা নয়, বরং সমুদ্র হতে যা নিক্ষিপ্ত হয়, সেটাও তোমাদের উপকার লাভ ও পাথেয় হিসেবে হালাল।" ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আবদুর রহমান ইবনে আবূ হুরাইরা (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ সমুদ্র বহু মাছকে তীরে নিক্ষেপ করে থাকে, আমরা ওগুলো খেতে পারি কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ “তোমারা ওগুলো খেয়ো না।" অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বাড়ী ফিরে এসে কুরআন মাজীদ হাতে নেন এবং সূরা মায়িদাহ্ পাঠ করতে থাকেন (আরবী) -এ আয়াতে এসে তিনি বলেনঃ যাও, বলে দাও তোমরা ওটা খাও, কেননা সমুদ্রের জিনিসকে আল্লাহ পাক (আরবী) বলেছেন। ইবনে জারীরও (রঃ) একথাই বলেছেন যে, (আরবী) দ্বারা সমুদ্রের মৃত মৎস্যকেই বুঝানো হয়েছে।(আরবী) এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহু বচন। ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, সমুদ্রের তীরবর্তী লোকেরা তো সামুদ্রিক টাকা প্রাণী শিকার করে থাকে। আর যা মরে যায় তা শুকিয়ে জমা করে রাখে। কিংবা তার শিকার করে রেখে দেয় এবং ওটা মুসাফির ও সমুদ্রের দূরবর্তী লোকদের জন্যে পাথেয়র কাজ দেয়। জমহুর মত মাছ হালাল হওয়ার দলীল হিসেবে এ আয়াতটিকে গ্রহণ করেছেন। ইমাম মালিক (রঃ) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় একদল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং হযরত উবাইদাহ্ ইবনে জাররাহ (রাঃ)-কে ঐ দলের আমীর নিযুক্ত করা হয়। তাঁদের সংখ্যা ছিল তিনশ’। আমিও তাঁদের একজন ছিলাম। আমরা পথে থাকতেই আমাদের পাথেয় নিঃশেষ হয়ে আসে। তখন হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) সকলের পাথেয় একত্রিত করার নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশক্রমে সমস্ত পাথেয় জমা করা হয়। আমাদের পাথেয় ছিল খেজুর। আমরা প্রতিদিন তা থেকে অল্প অল্প করে খেয়ে থাকি। অবশেষে ওগুলোও শেষ হয়ে আসে এবং রসদ হিসেবে আমরা শুধুমাত্র একটি করে খেজুর পেয়ে থাকি। অবশেষে আমরা মৃত প্রায় অবস্থায় সমুদ্র তীরে উপনীত হই এবং দেখি যে, টিলার মত একটি বিরাট মাছ পড়ে রয়েছে। সেনাবাহিনীর সমস্ত লোক আঠার দিন পর্যন্ত ওটা ভক্ষণ করে। হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) ওর পাজরের হাড় দু’টিকে কামানের মত দাঁড় করে রাখার নির্দেশ দেন। অতঃপর ওর নীচ দিয়ে একজন উষ্ট্রারোহী গমন করে, তথাপি ওর উপরিভাগ স্পর্শ করতে পারেনি। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাখরীজ করা হয়েছে।সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ সমুদ্র তীরে উঁচু টিলার মত কি একটা দেখা গেল। আমরা তখন সেখানে গিয়ে দেখি যে, একটি সামুদ্রিক জন্তু মৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ওকে আমবার বলা হয়। হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) বললেনঃ “এটা তো মৃত।” তারপর তিনি বললেনঃ “মৃত হোক! আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত! আমরা ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছি। সুতরাং তোমরা এর গোশত ভক্ষণ কর।” আমরা তথায় একমাস কাল অবস্থান করি। আমরা ছিলাম তিনশ’জন লোক। আমরা খেয়ে মোটা হয়ে গিয়েছিলাম। ওর চোখের মণি হতে রাওগান' তেল বের করে আমরা আমাদের কলসগুলো ভর্তি করেছিলাম। এতো বড় বড় টুকরা আমরা কেটেছিলাম যে, ঐগুলোকে গরু বলে মনে হচ্ছিল। ওর পাজরের একটি হাড় নিয়ে কামানের আকারে মাটিতে গেড়ে রেখেছিলাম। বড় বড় উট ওর মধ্য দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। আমরা ওর অবশিষ্ট গোশত শুকিয়ে পাথেয় বানিয়েছিলাম। আমরা মদীনা পৌছে যখন ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করি তখন তিনি বলেনঃ “এটা ছিল ঐ আহার্য যা আল্লাহ তোমাদের জন্যেই বের করেছিলেন। তোমাদের কাছে ওর কিছু গোশত আছে কি, যা আমাকে খাওয়াতে পার?” আমরা তখন তার কাছে তুহফা পাঠালাম এবং তিনি তা ভক্ষণ করলেন।ইমাম মালিক (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা সমুদ্রে সফর করে থাকি এবং অল্প পানি সঙ্গে রাখতে পারি। যদি আমরা ঐ পানিতে অযু করি তবে পিপাসার্ত থেকে যাই। সুতরাং আমরা সমুদ্রের পানিতে অযু করতে পারি কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং মৃত (মাছও) হালাল।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) ও আসহাবুস সুনান বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন।)কোন কোন ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদ এ আয়াত হতে দলীল গ্রহণ করেছেন যে, সমস্ত সামুদ্রিক জীব খাওয়া যেতে পারে। কোন জীবই এর বহির্ভূত নয়। তবে কেউ কেউ ব্যাঙকে এর ব্যতিক্রম বলেছেন এবং এটা ছাড়া সবগুলোকেই হালাল বলেছেন। কেননা, ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) আবু আবদির রহমান ইবনে উসমান তাইমী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ব্যাঙকে মেরে ফেলতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেনঃ “তার ডাক বা শব্দ হচ্ছে আল্লাহর তাসবীহ।” অন্যান্যগণ বলেন যে, মাছ খাওয়া যাবে, কিন্তু ব্যাঙ খাওয়া যাবে না। এই দু'টো ছাড়া অন্যান্যগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। স্থলভাগের যেসব জন্তুর গোশত হালাল ঐগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত সামুদ্রিক জন্তুও হালাল। পক্ষান্তরে স্থলভাগের যেসব জন্তুর গোশত হালাল নয় ঐগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত সামুদ্রিক জন্তুও হালাল নয়। এসব মতভেদ হচ্ছে ইমাম শাফিই (রঃ)-এর মাযহাবের উপর ভিত্তি করে। আর ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, সমুদ্রের যে মাছ মরে যাবে সেটা খাওয়া হালাল নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা (আরবী) বলেছেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“তোমরা সমুদ্রে যা শিকার কর এবং তা জীবিত থাকার পর মারা যায় ওটা খাও। আর যে মৃত মাছকে ঢেউ বয়ে এনে তীরে ফেলে দেয় তা খেয়ো না।” আসহাবে মালিক (রঃ), শাফিঈ (রঃ) এবং আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতে হাদীসে আমবারের মাধ্যমে এবং “সমুদ্রের পানি পবিত্র ও তার মৃতও হালাল” -এ হাদীসের মাধ্যমে জমহুর দলীল গ্রহণ করেছেন। এ জন্যে তারা এরূপ মাছকেও খাওয়া জায়েয বলে থাকেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের জন্যে দুটি মৃত জন্তু ও দু'টি রক্ত হালাল। মৃত জন্তু দু’টি হচ্ছে মাছ ও ফড়িং এবং দুটি রক্ত হচ্ছে কলিজা ও প্লীহা।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), দারেকুতনী (রঃ) এবং বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবী) অর্থাৎ ইহরামের অবস্থায় তোমাদের জন্যে স্থলচর শিকার ধরা হারাম। যদি তোমরা ইচ্ছাপূর্বক এ কাজ কর তবে তোমরা গুনাহগারও হবে এবং তোমাদেরকে ক্ষতিপূরণও দিতে হবে। আর যদি ভুলবশতঃ কর তবে ক্ষতিপূরণ দেয়ার পর তোমরা গুনাহ থেকে মুক্তি পাবে বটে, কিন্তু ঐ শিকার খাওয়া তোমাদের জন্যে হারাম হবে। কেননা, ওটা মৃতেরই অনুরূপ। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম মালিক (রঃ)-এর একটা উক্তিও এটাই যে, মুহরিম ও গায়ের মুহরিম সবারই জন্যে ওটা খাওয়া হারাম। সুতরাং যদি শিকারী ওর থেকে কিছু অংশ খেয়ে নেয় তবে কি তার উপর দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হবে? এ ব্যাপারে আলেমদের দু’টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তি এই যে, হ্যা, তার উপর দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হবে। আলেমদের একটি দলের মাযহাব এটাই। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, তার উপর দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হবে না। মালিক ইবনে আনাস (রঃ)-এর এটাই মাযহাব। আবূ উমার ইবনে আবদুল বার (রঃ) বলেন যে, ব্যভিচারীর উপর হদ লাগাবার পূর্বে সে বারবার ব্যভিচার করে থাকলেও তো তার উপর একটি হদই ওয়াজিব হয়ে থাকে। জমহুরের মাযহাবও এটাই। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, স্বীয় শিকারের গোশত খেয়ে নিয়ে তাকে মূল্য প্রদান করতে হবে, এর চেয়ে বেশী কিছু দিতে হবে না। যদি গায়ের মুহরিম শিকার করার পর মুহরিমের নিকট হাদীয়া পাঠায় তবে কারও কারও মতে ওটা মুহরিমের জন্যে সাধারণভাবেই জায়েয। সে তারই জন্যে শিকার করে থাক আর না থাক এ দুয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয় যে, গায়ের মুহরিম ব্যক্তি যে শিকার করে থাকে, মুহরিম ব্যক্তি ওর গোশত খেতে পারে কি? তখন তিনি ফতওয়া দেন যে, হঁ্যা, খেতে পারে। তারপর তিনি হযরত উমার (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁকে ওটা অবহিত করেন। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “যদি তুমি এর বিপরীত ফতওয়া দিতে তবে আমি তোমাকে শাস্তি দিতাম।” কিন্তু অন্যান্য আলেমগণ এ গোশত ভক্ষণ করা মুহরিমের জন্যে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ বলেন। কেননা (আরবী) -এ আয়াতটি (আরবী) বা সাধারণ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি মুহরিমের জন্যে শিকারের গোশত ভক্ষণ পছন্দ করতেন এবং বলতেন যে, ওটা (আরবী) বা সন্দেহযুক্ত। কেননা, আল্লাহ তা'আলা (আরবী) -এ কথা বলেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সর্বাবস্থায় মুহরিমের জন্যে শিকারের গোশত ভক্ষণ মাকরূহ বা অপছন্দনীয় মনে করতেন। (তাউস (রঃ) ও জাবির ইবনে যায়েদও (রঃ) এরূপই মনে করতেন এবং সাওরীও ঐদিকেই গিয়েছেন) হযরত আলী (রাঃ) সর্বাবস্থায় মুহরিমের জন্যে শিকারের গোশত ভক্ষণ মাকরূহ জানতেন। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং জমহুর বলেন যে, গায়ের মুহরিম যদি মুহরিমের উদ্দেশ্যে শিকার করে তবে মুহরিমের জন্যে তা খাওয়া জায়েয নয়। কেননা, সা'ব ইবনে জাসামাহ (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী (সঃ)-কে একটি বন্য গাধা হাদিয়া দেন, কিন্তু তিনি তা ফিরিয়ে দেন। অতঃপর তিনি তার চেহারায় অসন্তুষ্টির ভাব লক্ষ্য করে বলেন : “আমি ওটা ফিরিয়ে দিয়েছি একমাত্র এই কারণে যে, আমি ইহরামের অবস্থায় রয়েছি। (এ হাদীসটি বহু শব্দে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে) এর কারণ ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ধারণায় ঐ শিকার তার উদ্দেশ্যে ছিল। সেই জন্যেই তিনি তা ফেরত দিয়েছিলেন। সুতরাং যদি কোন শিকার মুহরিমের উদ্দেশ্যে করা না হয় তবে মুহরিমের জন্যে ওটা খাওয়া জায়েয হবে। কেননা, আবু কাতাদা (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে যে, তিনি একটি বন্য গাধা শিকার করেছিলেন। সেই সময় তিনি মুহরিম ছিলেন না। কিন্তু তাঁর সঙ্গীরা মুহরিম ছিলেন। তাই তাঁরা ওটা ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকলেন। ঐ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “তোমাদের কেউ কি শিকারীকে শিকার দেখিয়ে দিয়েছিল বা শিকারকে হত্যা করার ব্যাপারে তাকে সাহায্য করেছিল?” সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “না।” তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে তোমরা খাও।" আর স্বয়ং তিনিও খেলেন। এই ঘটনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও বহু শব্দে বর্ণিত আছে।

আল-মায়িদা 5:99

৯৬-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) আল্লাহ তা'আলার এ উক্তির ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) বলেন, এর ভাবার্থ হচ্ছে তোমাদের জন্যে সমুদ্রের তাজা বা সজীব শিকার হালাল। আর (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে- যে মাছ শুকিয়ে পাথেয় তৈরী করা হয় সেটাও তোমাদের জন্যে হালাল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আর একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা এই যে, (আরবী) দ্বারা ঐ শিকারকে বুঝানো হয়েছে যা সমুদ্র হতে জীবিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। আর (আরবী) দ্বারা সমুদ্রের ঐ মৃত শিকারকে বুঝানো হয়েছে যা মৃত অবস্থায় সমুদ্রের তীরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। (এরূপই হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে) হযরত আবু বকর (রাঃ) জনগণের সামনে খুতবা দান অবস্থায় বলেনঃ “শুধু সমুদ্রের শিকারই যে তোমাদের জন্যে হালাল তা নয়, বরং সমুদ্র হতে যা নিক্ষিপ্ত হয়, সেটাও তোমাদের উপকার লাভ ও পাথেয় হিসেবে হালাল।" ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আবদুর রহমান ইবনে আবূ হুরাইরা (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ সমুদ্র বহু মাছকে তীরে নিক্ষেপ করে থাকে, আমরা ওগুলো খেতে পারি কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ “তোমারা ওগুলো খেয়ো না।" অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বাড়ী ফিরে এসে কুরআন মাজীদ হাতে নেন এবং সূরা মায়িদাহ্ পাঠ করতে থাকেন (আরবী) -এ আয়াতে এসে তিনি বলেনঃ যাও, বলে দাও তোমরা ওটা খাও, কেননা সমুদ্রের জিনিসকে আল্লাহ পাক (আরবী) বলেছেন। ইবনে জারীরও (রঃ) একথাই বলেছেন যে, (আরবী) দ্বারা সমুদ্রের মৃত মৎস্যকেই বুঝানো হয়েছে।(আরবী) এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহু বচন। ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, সমুদ্রের তীরবর্তী লোকেরা তো সামুদ্রিক টাকা প্রাণী শিকার করে থাকে। আর যা মরে যায় তা শুকিয়ে জমা করে রাখে। কিংবা তার শিকার করে রেখে দেয় এবং ওটা মুসাফির ও সমুদ্রের দূরবর্তী লোকদের জন্যে পাথেয়র কাজ দেয়। জমহুর মত মাছ হালাল হওয়ার দলীল হিসেবে এ আয়াতটিকে গ্রহণ করেছেন। ইমাম মালিক (রঃ) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় একদল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং হযরত উবাইদাহ্ ইবনে জাররাহ (রাঃ)-কে ঐ দলের আমীর নিযুক্ত করা হয়। তাঁদের সংখ্যা ছিল তিনশ’। আমিও তাঁদের একজন ছিলাম। আমরা পথে থাকতেই আমাদের পাথেয় নিঃশেষ হয়ে আসে। তখন হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) সকলের পাথেয় একত্রিত করার নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশক্রমে সমস্ত পাথেয় জমা করা হয়। আমাদের পাথেয় ছিল খেজুর। আমরা প্রতিদিন তা থেকে অল্প অল্প করে খেয়ে থাকি। অবশেষে ওগুলোও শেষ হয়ে আসে এবং রসদ হিসেবে আমরা শুধুমাত্র একটি করে খেজুর পেয়ে থাকি। অবশেষে আমরা মৃত প্রায় অবস্থায় সমুদ্র তীরে উপনীত হই এবং দেখি যে, টিলার মত একটি বিরাট মাছ পড়ে রয়েছে। সেনাবাহিনীর সমস্ত লোক আঠার দিন পর্যন্ত ওটা ভক্ষণ করে। হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) ওর পাজরের হাড় দু’টিকে কামানের মত দাঁড় করে রাখার নির্দেশ দেন। অতঃপর ওর নীচ দিয়ে একজন উষ্ট্রারোহী গমন করে, তথাপি ওর উপরিভাগ স্পর্শ করতে পারেনি। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাখরীজ করা হয়েছে।সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ সমুদ্র তীরে উঁচু টিলার মত কি একটা দেখা গেল। আমরা তখন সেখানে গিয়ে দেখি যে, একটি সামুদ্রিক জন্তু মৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ওকে আমবার বলা হয়। হযরত আবু উবাইদাহ (রাঃ) বললেনঃ “এটা তো মৃত।” তারপর তিনি বললেনঃ “মৃত হোক! আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত! আমরা ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছি। সুতরাং তোমরা এর গোশত ভক্ষণ কর।” আমরা তথায় একমাস কাল অবস্থান করি। আমরা ছিলাম তিনশ’জন লোক। আমরা খেয়ে মোটা হয়ে গিয়েছিলাম। ওর চোখের মণি হতে রাওগান' তেল বের করে আমরা আমাদের কলসগুলো ভর্তি করেছিলাম। এতো বড় বড় টুকরা আমরা কেটেছিলাম যে, ঐগুলোকে গরু বলে মনে হচ্ছিল। ওর পাজরের একটি হাড় নিয়ে কামানের আকারে মাটিতে গেড়ে রেখেছিলাম। বড় বড় উট ওর মধ্য দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। আমরা ওর অবশিষ্ট গোশত শুকিয়ে পাথেয় বানিয়েছিলাম। আমরা মদীনা পৌছে যখন ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করি তখন তিনি বলেনঃ “এটা ছিল ঐ আহার্য যা আল্লাহ তোমাদের জন্যেই বের করেছিলেন। তোমাদের কাছে ওর কিছু গোশত আছে কি, যা আমাকে খাওয়াতে পার?” আমরা তখন তার কাছে তুহফা পাঠালাম এবং তিনি তা ভক্ষণ করলেন।ইমাম মালিক (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা সমুদ্রে সফর করে থাকি এবং অল্প পানি সঙ্গে রাখতে পারি। যদি আমরা ঐ পানিতে অযু করি তবে পিপাসার্ত থেকে যাই। সুতরাং আমরা সমুদ্রের পানিতে অযু করতে পারি কি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং মৃত (মাছও) হালাল।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) ও আসহাবুস সুনান বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন।)কোন কোন ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদ এ আয়াত হতে দলীল গ্রহণ করেছেন যে, সমস্ত সামুদ্রিক জীব খাওয়া যেতে পারে। কোন জীবই এর বহির্ভূত নয়। তবে কেউ কেউ ব্যাঙকে এর ব্যতিক্রম বলেছেন এবং এটা ছাড়া সবগুলোকেই হালাল বলেছেন। কেননা, ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) আবু আবদির রহমান ইবনে উসমান তাইমী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ব্যাঙকে মেরে ফেলতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেনঃ “তার ডাক বা শব্দ হচ্ছে আল্লাহর তাসবীহ।” অন্যান্যগণ বলেন যে, মাছ খাওয়া যাবে, কিন্তু ব্যাঙ খাওয়া যাবে না। এই দু'টো ছাড়া অন্যান্যগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। স্থলভাগের যেসব জন্তুর গোশত হালাল ঐগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত সামুদ্রিক জন্তুও হালাল। পক্ষান্তরে স্থলভাগের যেসব জন্তুর গোশত হালাল নয় ঐগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত সামুদ্রিক জন্তুও হালাল নয়। এসব মতভেদ হচ্ছে ইমাম শাফিই (রঃ)-এর মাযহাবের উপর ভিত্তি করে। আর ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, সমুদ্রের যে মাছ মরে যাবে সেটা খাওয়া হালাল নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা (আরবী) বলেছেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“তোমরা সমুদ্রে যা শিকার কর এবং তা জীবিত থাকার পর মারা যায় ওটা খাও। আর যে মৃত মাছকে ঢেউ বয়ে এনে তীরে ফেলে দেয় তা খেয়ো না।” আসহাবে মালিক (রঃ), শাফিঈ (রঃ) এবং আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতে হাদীসে আমবারের মাধ্যমে এবং “সমুদ্রের পানি পবিত্র ও তার মৃতও হালাল” -এ হাদীসের মাধ্যমে জমহুর দলীল গ্রহণ করেছেন। এ জন্যে তারা এরূপ মাছকেও খাওয়া জায়েয বলে থাকেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের জন্যে দুটি মৃত জন্তু ও দু'টি রক্ত হালাল। মৃত জন্তু দু’টি হচ্ছে মাছ ও ফড়িং এবং দুটি রক্ত হচ্ছে কলিজা ও প্লীহা।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), দারেকুতনী (রঃ) এবং বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবী) অর্থাৎ ইহরামের অবস্থায় তোমাদের জন্যে স্থলচর শিকার ধরা হারাম। যদি তোমরা ইচ্ছাপূর্বক এ কাজ কর তবে তোমরা গুনাহগারও হবে এবং তোমাদেরকে ক্ষতিপূরণও দিতে হবে। আর যদি ভুলবশতঃ কর তবে ক্ষতিপূরণ দেয়ার পর তোমরা গুনাহ থেকে মুক্তি পাবে বটে, কিন্তু ঐ শিকার খাওয়া তোমাদের জন্যে হারাম হবে। কেননা, ওটা মৃতেরই অনুরূপ। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম মালিক (রঃ)-এর একটা উক্তিও এটাই যে, মুহরিম ও গায়ের মুহরিম সবারই জন্যে ওটা খাওয়া হারাম। সুতরাং যদি শিকারী ওর থেকে কিছু অংশ খেয়ে নেয় তবে কি তার উপর দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হবে? এ ব্যাপারে আলেমদের দু’টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তি এই যে, হ্যা, তার উপর দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হবে। আলেমদের একটি দলের মাযহাব এটাই। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, তার উপর দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হবে না। মালিক ইবনে আনাস (রঃ)-এর এটাই মাযহাব। আবূ উমার ইবনে আবদুল বার (রঃ) বলেন যে, ব্যভিচারীর উপর হদ লাগাবার পূর্বে সে বারবার ব্যভিচার করে থাকলেও তো তার উপর একটি হদই ওয়াজিব হয়ে থাকে। জমহুরের মাযহাবও এটাই। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, স্বীয় শিকারের গোশত খেয়ে নিয়ে তাকে মূল্য প্রদান করতে হবে, এর চেয়ে বেশী কিছু দিতে হবে না। যদি গায়ের মুহরিম শিকার করার পর মুহরিমের নিকট হাদীয়া পাঠায় তবে কারও কারও মতে ওটা মুহরিমের জন্যে সাধারণভাবেই জায়েয। সে তারই জন্যে শিকার করে থাক আর না থাক এ দুয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয় যে, গায়ের মুহরিম ব্যক্তি যে শিকার করে থাকে, মুহরিম ব্যক্তি ওর গোশত খেতে পারে কি? তখন তিনি ফতওয়া দেন যে, হঁ্যা, খেতে পারে। তারপর তিনি হযরত উমার (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁকে ওটা অবহিত করেন। তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “যদি তুমি এর বিপরীত ফতওয়া দিতে তবে আমি তোমাকে শাস্তি দিতাম।” কিন্তু অন্যান্য আলেমগণ এ গোশত ভক্ষণ করা মুহরিমের জন্যে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ বলেন। কেননা (আরবী) -এ আয়াতটি (আরবী) বা সাধারণ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি মুহরিমের জন্যে শিকারের গোশত ভক্ষণ পছন্দ করতেন এবং বলতেন যে, ওটা (আরবী) বা সন্দেহযুক্ত। কেননা, আল্লাহ তা'আলা (আরবী) -এ কথা বলেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি সর্বাবস্থায় মুহরিমের জন্যে শিকারের গোশত ভক্ষণ মাকরূহ বা অপছন্দনীয় মনে করতেন। (তাউস (রঃ) ও জাবির ইবনে যায়েদও (রঃ) এরূপই মনে করতেন এবং সাওরীও ঐদিকেই গিয়েছেন) হযরত আলী (রাঃ) সর্বাবস্থায় মুহরিমের জন্যে শিকারের গোশত ভক্ষণ মাকরূহ জানতেন। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং জমহুর বলেন যে, গায়ের মুহরিম যদি মুহরিমের উদ্দেশ্যে শিকার করে তবে মুহরিমের জন্যে তা খাওয়া জায়েয নয়। কেননা, সা'ব ইবনে জাসামাহ (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী (সঃ)-কে একটি বন্য গাধা হাদিয়া দেন, কিন্তু তিনি তা ফিরিয়ে দেন। অতঃপর তিনি তার চেহারায় অসন্তুষ্টির ভাব লক্ষ্য করে বলেন : “আমি ওটা ফিরিয়ে দিয়েছি একমাত্র এই কারণে যে, আমি ইহরামের অবস্থায় রয়েছি। (এ হাদীসটি বহু শব্দে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে) এর কারণ ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ধারণায় ঐ শিকার তার উদ্দেশ্যে ছিল। সেই জন্যেই তিনি তা ফেরত দিয়েছিলেন। সুতরাং যদি কোন শিকার মুহরিমের উদ্দেশ্যে করা না হয় তবে মুহরিমের জন্যে ওটা খাওয়া জায়েয হবে। কেননা, আবু কাতাদা (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে যে, তিনি একটি বন্য গাধা শিকার করেছিলেন। সেই সময় তিনি মুহরিম ছিলেন না। কিন্তু তাঁর সঙ্গীরা মুহরিম ছিলেন। তাই তাঁরা ওটা ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকলেন। ঐ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “তোমাদের কেউ কি শিকারীকে শিকার দেখিয়ে দিয়েছিল বা শিকারকে হত্যা করার ব্যাপারে তাকে সাহায্য করেছিল?” সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “না।” তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে তোমরা খাও।" আর স্বয়ং তিনিও খেলেন। এই ঘটনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও বহু শব্দে বর্ণিত আছে।

আল-মায়িদা 5:100

১০০-১০২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি মানুষকে বলে দাও-হে মানবমণ্ডলী! অপবিত্র বস্তু বাহ্যিক দৃষ্টিতে ভাল মনে হলেও পবিত্র ও অপবিত্র বস্তু সমান নয়। তোমরা জেনে রেখো যে, উপকারী পবিত্র জিনিস অল্প হলেও তা সেই অধিক হারাম বস্তু হতে উত্তম যা তোমাদের ক্ষতি সাধন করে থাকে। (ওয়াহেদী তাখরীজ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদ হারাম হওয়ার বর্ণনা দিলেন তখন একজন বেদুঈন বললোঃ “আমি মদের ব্যবসা করতাম। তা থেকে আমি কিছু পৃথক করে রেখেছি। সেটা যদি আমি আল্লাহর আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করি তবে তাতে কোন উপকার হবে কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ পবিত্র ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না।” তারই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন, যেমন লুবাব’ গ্রন্থে রয়েছে) যেমন হাদীসে রয়েছেঃ “অল্প ও প্রয়োজনের পক্ষে যথেষ্ট জিনিস সেই অধিক জিনিস হতে উত্তম যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ হতে গাফেল ও উদাসীন রাখে।" হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সা'লাবা ইবনে হাতিব আনসারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাকে প্রচুর মাল দান করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “যে অল্প মালের তুমি শুকরিয়া আদায় করে থাক তা ঐ প্রচুর মাল হতে উত্তম যার উপর তুমি শুকরিয়া আদায় কর না।” তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে জ্ঞানী লোকেরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, হারাম থেকে দূরে থাক এবং হালালের উপরেই তুষ্ট থাক, তাহলে, তোমরা দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম হতে পারবে।”মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ হে মুমিনগণ! তোমরা এমন সব বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না যে, যদি তা তোমাদের নিকট প্রকাশ করে দেয়া হয় তবে তোমাদের বিরক্তির কারণ হবে। এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে দ্রতা শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং তাদেরকে অপকারী ও ক্ষতিকর প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কেননা, যদি ঐ বিষয়গুলো প্রকাশ করে দেয়া হয় তবে তারা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হবে। যেমন হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কেউ যেন আমার কাছে কারও কোন সংবাদ নিয়ে না আসে। আমি চাই যে, আমি তোমাদের সামনে বেরিয়ে আসি এবং তোমাদের সম্পর্কে আমার অন্তর সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার থাকে।” সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা এমন এক খুতবা দেন যা আমি ওর পূর্বে কখনও শুনিনি। ঐ খুতবায় তিনি বলেনঃ “আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে তোমরা হাসতে খুব কম এবং কাঁদতে খুব বেশী ।" একথা শুনে সাহাবীগণ মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করেন। একটি লোক জিজ্ঞেস করেঃ “আমার পিতা কে ছিলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ অমুক। তখন (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (একদা) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাইরে বের হন। সে সময় ক্রোধে তার চেহারা মোবারক রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল। ঐ অবস্থায় তিনি মিম্বরে উপবেশন করেন। একটি লোক দাঁড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন- আমার (মৃত) পিতা কোথায় আছে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “জাহান্নামে।” আর একটি লোক দাড়িয়ে গিয়ে বলে- আমার পিতা কে? তিনি বলেনঃ “তোমার পিতা হচ্ছে আবূ হুযাফাহ্।” তখন হযরত উমার (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “আমরা এতেই সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ আমাদের প্রভু, ইসলাম আমাদের ধর্ম, মুহাম্মাদ (সঃ) আমাদের নবী এবং কুরআন আমাদের ইমাম। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবেমাত্র আমরা অজ্ঞতা ও শিরকের যুগ অতিক্রম করেছি। আমাদের মৃত বাপ-দাদারা কোথায় আছে তা আল্লাহ পাকই ভাল। জানেন।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্রোধ প্রশমিত হয় এবং সেই সময় (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (মাঝে মাঝে) কৌতুক করেও এসব কথা জিজ্ঞেস করতো। কেউ বলতোঃ “আমার পিতা কে?” আবার কেউ বলতোঃ “আমার হারানো উটনিটি কোথায় আছে?” তখন তাদেরকে এসব প্রশ্ন করা থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তা কতই না উত্তম! তা হচ্ছে এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে বলেনঃ “তোমাদের কেউ যেন কারও কোন কথা আমার নিকট না পৌছায়। কারণ আমি তোমাদের সামনে সরলমনা রূপে বের হওয়া পছন্দ করি (অর্থাৎ তোমাদের কোন দোষ আমার কাছে ধরা না পড়ুক এটাই আমি ভালবাসি)।”(আরবী) অর্থাৎ কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় যদি তোমরা এমন কিছু জিজ্ঞেস কর যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, তবে আল্লাহ ওটা তোমাদের জন্যে বর্ণনা করে দেবেন, তখন তোমরা কি করবে? আর ওটা আল্লাহর নিকট খুবই সহজ। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন (আরবী) অর্থাৎ পূর্বে তোমাদের দ্বারা যা কিছু সংঘটিত হয়েছে তা তিনি ক্ষমা করে দেবেন। কেননা, আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও সহিষ্ণু। কাজেই তোমরা নতুনভাবে কোন কিছু প্রশ্ন করো না। নতুবা ঐ প্রশ্নের উত্তরে তোমাদের উপর কাঠিন্য ও সংকীর্ণতা নেমে আসবে। আবার ওটা হবে নিজের হাতে বিপদ ডেকে আনা। হাদীসে এসেছে যে, মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যার প্রশ্ন করার ফলে একটা হালাল জিনিস হারাম হয়ে গেছে এবং জনগণের উপর সংকীর্ণতা নেমে এসেছে। হ্যাঁ, তবে যদি কুরআনের কোন কথা সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে তোমাদের বোধগম্য না হয় এবং তোমরা তা বুঝবার প্রয়োজনীতা অনুভব কর তাহলে জিজ্ঞেস কর, আমি বর্ণনা করে দেবো। কেননা, হুকুম পালনের জন্যে তোমাদের ওটা জানবার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু যদি তার কিতাবে কোনটার উল্লেখ না থাকে তবে সেটা আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা ঐ সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ না করে নীরব থাক, যেমন তিনি (আল্লাহ) ওটা বর্ণনা না করে নীরব রয়েছেন। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি যা বর্ণনা করিনি তা অবতীর্ণ অবস্থাতেই থাকতে দাও। কেননা, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতেরা অধিক প্রশ্ন করা ও তাদের নবীদের হুকুমের ব্যাপারে মতানৈক্য সৃষ্টি করার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে।” সহীহ হাদীসে আরও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ যেগুলো নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সেগুলো অতিক্রম করো না, কতগুলো জিনিস তিনি হারাম করেছেন, সেগুলো হালাল মনে করো না এবং তোমাদের উপর দয়াপরবশ হয়ে কতগুলো বিষয়ে ইচ্ছাপূর্বক তিনি নীরবতা অবলম্বন করেছেন, সুতরাং সেসব বিষয়ে তোমরা প্রশ্ন উত্থাপন করো না।”এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ নিষেধকৃত মাসআলাগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, তখন তাদেরকে জবাব দেয়া হলে তারা ওগুলোর উপর ঈমান আনেনি, বরং প্রত্যাখ্যান করেছিল। কারণ, তারা হিদায়াত লাভের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেনি, বরং বিদ্রুপ ও হঠকারিতা করেই প্রশ্ন করেছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের মধ্যে ঘোষণা করেন- “হে আমার কওম! তোমাদের উপর হজ্ব ফরয করা হয়েছে। তখন বানী আসাদ গোত্রের একটি লোক দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! প্রত্যেক বছরেই কি (হজ্ব করা ফরয করা হয়েছে)। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভীষণ রাগান্বিত হন এবং বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! আমি যদি হ্যা বলি তবে অবশ্যই তা (প্রতি বছরেই) ফরয হয়ে যাবে। আর তা যদি (প্রত্যেক বছরের জন্যেই) ওয়াজিব হয়ে যায় তবে তোমরা তা পালন করতে সক্ষম হবে না এবং কুফরী করবে। সুতরাং আমি তোমাদের জন্যে যা বর্ণনা করতে ছেড়ে দেই তা তোমরা ছেড়ে দাও। যখন আমি তোমাদেরকে কোন কিছু করার আদেশ করি তোমরা তা পালন কর এবং যা করতে নিষেধ করি তা থেকে বিরত থাক।” তখন আল্লাহ তাআলা এ কথার সমর্থনে এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “খ্রীষ্টানরা যেমন সওয়াল করেছিল তোমরা ঐ রূপ সওয়াল করা থেকে বিরত থাক। তারা খাদ্য যা করেছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা কুফরী করেছিল, মায়িদাহ বা আকাশ থেকে অবতীর্ণ খাদ্যের মর্যাদা দেয়নি। তোমরা নিজেরা প্রশ্ন না করে স্বয়ং আমার বলে দেয়ার অপেক্ষা কর। তোমাদের প্রশ্ন ছাড়াই প্রশ্নের ব্যাখ্যায় কুরআনে আয়াত নাযিল হয়ে যাবে।” হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, তারা মু'জিযার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতো যা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে বাগ-বাগিচা ও নদ-নদী যা করতো এবং বলতোঃ “সাফা মারওয়া পাহাড়দ্বয়কে আমাদের জন্যে সোনা বানিয়ে দিন।” যেমন ইয়াহুদীরা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেছিল- “হে মূসা (আঃ)! আমাদের উপর আকাশ হতে কিতাব অবতীর্ণ করুন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখনই আমি তাদের চাওয়া অনুযায়ী মু'জিযা পাঠিয়েছি তখন পূর্ববর্তী লোকেরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।" (১৭:৫৯) আল্লাহ পাক আরও বলেনঃ “তারা কসম খেয়ে খেয়ে বলে যে, যদি তাদের কাছে মুজিযা এসে যায় তবে অবশ্যই তারা ঈমান আনবে। (হে নবী সঃ) তুমি বলে দাও যে, মু'জিযাসমূহ আল্লাহর কাছেই রয়েছে, তোমরা বুঝছনা যে, মু'জিযা তাদের কাছে আসলেও তারা ঈমান আনবে না।”

আল-মায়িদা 5:101

১০০-১০২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি মানুষকে বলে দাও-হে মানবমণ্ডলী! অপবিত্র বস্তু বাহ্যিক দৃষ্টিতে ভাল মনে হলেও পবিত্র ও অপবিত্র বস্তু সমান নয়। তোমরা জেনে রেখো যে, উপকারী পবিত্র জিনিস অল্প হলেও তা সেই অধিক হারাম বস্তু হতে উত্তম যা তোমাদের ক্ষতি সাধন করে থাকে। (ওয়াহেদী তাখরীজ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদ হারাম হওয়ার বর্ণনা দিলেন তখন একজন বেদুঈন বললোঃ “আমি মদের ব্যবসা করতাম। তা থেকে আমি কিছু পৃথক করে রেখেছি। সেটা যদি আমি আল্লাহর আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করি তবে তাতে কোন উপকার হবে কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ পবিত্র ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না।” তারই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন, যেমন লুবাব’ গ্রন্থে রয়েছে) যেমন হাদীসে রয়েছেঃ “অল্প ও প্রয়োজনের পক্ষে যথেষ্ট জিনিস সেই অধিক জিনিস হতে উত্তম যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ হতে গাফেল ও উদাসীন রাখে।" হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সা'লাবা ইবনে হাতিব আনসারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাকে প্রচুর মাল দান করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “যে অল্প মালের তুমি শুকরিয়া আদায় করে থাক তা ঐ প্রচুর মাল হতে উত্তম যার উপর তুমি শুকরিয়া আদায় কর না।” তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে জ্ঞানী লোকেরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, হারাম থেকে দূরে থাক এবং হালালের উপরেই তুষ্ট থাক, তাহলে, তোমরা দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম হতে পারবে।”মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ হে মুমিনগণ! তোমরা এমন সব বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না যে, যদি তা তোমাদের নিকট প্রকাশ করে দেয়া হয় তবে তোমাদের বিরক্তির কারণ হবে। এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে দ্রতা শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং তাদেরকে অপকারী ও ক্ষতিকর প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কেননা, যদি ঐ বিষয়গুলো প্রকাশ করে দেয়া হয় তবে তারা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হবে। যেমন হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কেউ যেন আমার কাছে কারও কোন সংবাদ নিয়ে না আসে। আমি চাই যে, আমি তোমাদের সামনে বেরিয়ে আসি এবং তোমাদের সম্পর্কে আমার অন্তর সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার থাকে।” সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা এমন এক খুতবা দেন যা আমি ওর পূর্বে কখনও শুনিনি। ঐ খুতবায় তিনি বলেনঃ “আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে তোমরা হাসতে খুব কম এবং কাঁদতে খুব বেশী ।" একথা শুনে সাহাবীগণ মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করেন। একটি লোক জিজ্ঞেস করেঃ “আমার পিতা কে ছিলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ অমুক। তখন (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (একদা) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাইরে বের হন। সে সময় ক্রোধে তার চেহারা মোবারক রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল। ঐ অবস্থায় তিনি মিম্বরে উপবেশন করেন। একটি লোক দাঁড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন- আমার (মৃত) পিতা কোথায় আছে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “জাহান্নামে।” আর একটি লোক দাড়িয়ে গিয়ে বলে- আমার পিতা কে? তিনি বলেনঃ “তোমার পিতা হচ্ছে আবূ হুযাফাহ্।” তখন হযরত উমার (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “আমরা এতেই সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ আমাদের প্রভু, ইসলাম আমাদের ধর্ম, মুহাম্মাদ (সঃ) আমাদের নবী এবং কুরআন আমাদের ইমাম। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবেমাত্র আমরা অজ্ঞতা ও শিরকের যুগ অতিক্রম করেছি। আমাদের মৃত বাপ-দাদারা কোথায় আছে তা আল্লাহ পাকই ভাল। জানেন।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্রোধ প্রশমিত হয় এবং সেই সময় (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (মাঝে মাঝে) কৌতুক করেও এসব কথা জিজ্ঞেস করতো। কেউ বলতোঃ “আমার পিতা কে?” আবার কেউ বলতোঃ “আমার হারানো উটনিটি কোথায় আছে?” তখন তাদেরকে এসব প্রশ্ন করা থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তা কতই না উত্তম! তা হচ্ছে এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে বলেনঃ “তোমাদের কেউ যেন কারও কোন কথা আমার নিকট না পৌছায়। কারণ আমি তোমাদের সামনে সরলমনা রূপে বের হওয়া পছন্দ করি (অর্থাৎ তোমাদের কোন দোষ আমার কাছে ধরা না পড়ুক এটাই আমি ভালবাসি)।”(আরবী) অর্থাৎ কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় যদি তোমরা এমন কিছু জিজ্ঞেস কর যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, তবে আল্লাহ ওটা তোমাদের জন্যে বর্ণনা করে দেবেন, তখন তোমরা কি করবে? আর ওটা আল্লাহর নিকট খুবই সহজ। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন (আরবী) অর্থাৎ পূর্বে তোমাদের দ্বারা যা কিছু সংঘটিত হয়েছে তা তিনি ক্ষমা করে দেবেন। কেননা, আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও সহিষ্ণু। কাজেই তোমরা নতুনভাবে কোন কিছু প্রশ্ন করো না। নতুবা ঐ প্রশ্নের উত্তরে তোমাদের উপর কাঠিন্য ও সংকীর্ণতা নেমে আসবে। আবার ওটা হবে নিজের হাতে বিপদ ডেকে আনা। হাদীসে এসেছে যে, মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যার প্রশ্ন করার ফলে একটা হালাল জিনিস হারাম হয়ে গেছে এবং জনগণের উপর সংকীর্ণতা নেমে এসেছে। হ্যাঁ, তবে যদি কুরআনের কোন কথা সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে তোমাদের বোধগম্য না হয় এবং তোমরা তা বুঝবার প্রয়োজনীতা অনুভব কর তাহলে জিজ্ঞেস কর, আমি বর্ণনা করে দেবো। কেননা, হুকুম পালনের জন্যে তোমাদের ওটা জানবার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু যদি তার কিতাবে কোনটার উল্লেখ না থাকে তবে সেটা আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা ঐ সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ না করে নীরব থাক, যেমন তিনি (আল্লাহ) ওটা বর্ণনা না করে নীরব রয়েছেন। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি যা বর্ণনা করিনি তা অবতীর্ণ অবস্থাতেই থাকতে দাও। কেননা, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতেরা অধিক প্রশ্ন করা ও তাদের নবীদের হুকুমের ব্যাপারে মতানৈক্য সৃষ্টি করার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে।” সহীহ হাদীসে আরও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ যেগুলো নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সেগুলো অতিক্রম করো না, কতগুলো জিনিস তিনি হারাম করেছেন, সেগুলো হালাল মনে করো না এবং তোমাদের উপর দয়াপরবশ হয়ে কতগুলো বিষয়ে ইচ্ছাপূর্বক তিনি নীরবতা অবলম্বন করেছেন, সুতরাং সেসব বিষয়ে তোমরা প্রশ্ন উত্থাপন করো না।”এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ নিষেধকৃত মাসআলাগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, তখন তাদেরকে জবাব দেয়া হলে তারা ওগুলোর উপর ঈমান আনেনি, বরং প্রত্যাখ্যান করেছিল। কারণ, তারা হিদায়াত লাভের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেনি, বরং বিদ্রুপ ও হঠকারিতা করেই প্রশ্ন করেছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের মধ্যে ঘোষণা করেন- “হে আমার কওম! তোমাদের উপর হজ্ব ফরয করা হয়েছে। তখন বানী আসাদ গোত্রের একটি লোক দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! প্রত্যেক বছরেই কি (হজ্ব করা ফরয করা হয়েছে)। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভীষণ রাগান্বিত হন এবং বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! আমি যদি হ্যা বলি তবে অবশ্যই তা (প্রতি বছরেই) ফরয হয়ে যাবে। আর তা যদি (প্রত্যেক বছরের জন্যেই) ওয়াজিব হয়ে যায় তবে তোমরা তা পালন করতে সক্ষম হবে না এবং কুফরী করবে। সুতরাং আমি তোমাদের জন্যে যা বর্ণনা করতে ছেড়ে দেই তা তোমরা ছেড়ে দাও। যখন আমি তোমাদেরকে কোন কিছু করার আদেশ করি তোমরা তা পালন কর এবং যা করতে নিষেধ করি তা থেকে বিরত থাক।” তখন আল্লাহ তাআলা এ কথার সমর্থনে এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “খ্রীষ্টানরা যেমন সওয়াল করেছিল তোমরা ঐ রূপ সওয়াল করা থেকে বিরত থাক। তারা খাদ্য যা করেছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা কুফরী করেছিল, মায়িদাহ বা আকাশ থেকে অবতীর্ণ খাদ্যের মর্যাদা দেয়নি। তোমরা নিজেরা প্রশ্ন না করে স্বয়ং আমার বলে দেয়ার অপেক্ষা কর। তোমাদের প্রশ্ন ছাড়াই প্রশ্নের ব্যাখ্যায় কুরআনে আয়াত নাযিল হয়ে যাবে।” হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, তারা মু'জিযার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতো যা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে বাগ-বাগিচা ও নদ-নদী যা করতো এবং বলতোঃ “সাফা মারওয়া পাহাড়দ্বয়কে আমাদের জন্যে সোনা বানিয়ে দিন।” যেমন ইয়াহুদীরা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেছিল- “হে মূসা (আঃ)! আমাদের উপর আকাশ হতে কিতাব অবতীর্ণ করুন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখনই আমি তাদের চাওয়া অনুযায়ী মু'জিযা পাঠিয়েছি তখন পূর্ববর্তী লোকেরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।" (১৭:৫৯) আল্লাহ পাক আরও বলেনঃ “তারা কসম খেয়ে খেয়ে বলে যে, যদি তাদের কাছে মুজিযা এসে যায় তবে অবশ্যই তারা ঈমান আনবে। (হে নবী সঃ) তুমি বলে দাও যে, মু'জিযাসমূহ আল্লাহর কাছেই রয়েছে, তোমরা বুঝছনা যে, মু'জিযা তাদের কাছে আসলেও তারা ঈমান আনবে না।”

আল-মায়িদা 5:102

১০০-১০২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি মানুষকে বলে দাও-হে মানবমণ্ডলী! অপবিত্র বস্তু বাহ্যিক দৃষ্টিতে ভাল মনে হলেও পবিত্র ও অপবিত্র বস্তু সমান নয়। তোমরা জেনে রেখো যে, উপকারী পবিত্র জিনিস অল্প হলেও তা সেই অধিক হারাম বস্তু হতে উত্তম যা তোমাদের ক্ষতি সাধন করে থাকে। (ওয়াহেদী তাখরীজ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদ হারাম হওয়ার বর্ণনা দিলেন তখন একজন বেদুঈন বললোঃ “আমি মদের ব্যবসা করতাম। তা থেকে আমি কিছু পৃথক করে রেখেছি। সেটা যদি আমি আল্লাহর আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করি তবে তাতে কোন উপকার হবে কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ পবিত্র ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না।” তারই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন, যেমন লুবাব’ গ্রন্থে রয়েছে) যেমন হাদীসে রয়েছেঃ “অল্প ও প্রয়োজনের পক্ষে যথেষ্ট জিনিস সেই অধিক জিনিস হতে উত্তম যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ হতে গাফেল ও উদাসীন রাখে।" হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সা'লাবা ইবনে হাতিব আনসারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাকে প্রচুর মাল দান করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “যে অল্প মালের তুমি শুকরিয়া আদায় করে থাক তা ঐ প্রচুর মাল হতে উত্তম যার উপর তুমি শুকরিয়া আদায় কর না।” তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে জ্ঞানী লোকেরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, হারাম থেকে দূরে থাক এবং হালালের উপরেই তুষ্ট থাক, তাহলে, তোমরা দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম হতে পারবে।”মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ হে মুমিনগণ! তোমরা এমন সব বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না যে, যদি তা তোমাদের নিকট প্রকাশ করে দেয়া হয় তবে তোমাদের বিরক্তির কারণ হবে। এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে দ্রতা শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং তাদেরকে অপকারী ও ক্ষতিকর প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কেননা, যদি ঐ বিষয়গুলো প্রকাশ করে দেয়া হয় তবে তারা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হবে। যেমন হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কেউ যেন আমার কাছে কারও কোন সংবাদ নিয়ে না আসে। আমি চাই যে, আমি তোমাদের সামনে বেরিয়ে আসি এবং তোমাদের সম্পর্কে আমার অন্তর সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার থাকে।” সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা এমন এক খুতবা দেন যা আমি ওর পূর্বে কখনও শুনিনি। ঐ খুতবায় তিনি বলেনঃ “আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে তোমরা হাসতে খুব কম এবং কাঁদতে খুব বেশী ।" একথা শুনে সাহাবীগণ মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করেন। একটি লোক জিজ্ঞেস করেঃ “আমার পিতা কে ছিলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ অমুক। তখন (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (একদা) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাইরে বের হন। সে সময় ক্রোধে তার চেহারা মোবারক রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল। ঐ অবস্থায় তিনি মিম্বরে উপবেশন করেন। একটি লোক দাঁড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন- আমার (মৃত) পিতা কোথায় আছে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “জাহান্নামে।” আর একটি লোক দাড়িয়ে গিয়ে বলে- আমার পিতা কে? তিনি বলেনঃ “তোমার পিতা হচ্ছে আবূ হুযাফাহ্।” তখন হযরত উমার (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “আমরা এতেই সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ আমাদের প্রভু, ইসলাম আমাদের ধর্ম, মুহাম্মাদ (সঃ) আমাদের নবী এবং কুরআন আমাদের ইমাম। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবেমাত্র আমরা অজ্ঞতা ও শিরকের যুগ অতিক্রম করেছি। আমাদের মৃত বাপ-দাদারা কোথায় আছে তা আল্লাহ পাকই ভাল। জানেন।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ক্রোধ প্রশমিত হয় এবং সেই সময় (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (মাঝে মাঝে) কৌতুক করেও এসব কথা জিজ্ঞেস করতো। কেউ বলতোঃ “আমার পিতা কে?” আবার কেউ বলতোঃ “আমার হারানো উটনিটি কোথায় আছে?” তখন তাদেরকে এসব প্রশ্ন করা থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তা কতই না উত্তম! তা হচ্ছে এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে বলেনঃ “তোমাদের কেউ যেন কারও কোন কথা আমার নিকট না পৌছায়। কারণ আমি তোমাদের সামনে সরলমনা রূপে বের হওয়া পছন্দ করি (অর্থাৎ তোমাদের কোন দোষ আমার কাছে ধরা না পড়ুক এটাই আমি ভালবাসি)।”(আরবী) অর্থাৎ কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় যদি তোমরা এমন কিছু জিজ্ঞেস কর যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, তবে আল্লাহ ওটা তোমাদের জন্যে বর্ণনা করে দেবেন, তখন তোমরা কি করবে? আর ওটা আল্লাহর নিকট খুবই সহজ। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন (আরবী) অর্থাৎ পূর্বে তোমাদের দ্বারা যা কিছু সংঘটিত হয়েছে তা তিনি ক্ষমা করে দেবেন। কেননা, আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও সহিষ্ণু। কাজেই তোমরা নতুনভাবে কোন কিছু প্রশ্ন করো না। নতুবা ঐ প্রশ্নের উত্তরে তোমাদের উপর কাঠিন্য ও সংকীর্ণতা নেমে আসবে। আবার ওটা হবে নিজের হাতে বিপদ ডেকে আনা। হাদীসে এসেছে যে, মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যার প্রশ্ন করার ফলে একটা হালাল জিনিস হারাম হয়ে গেছে এবং জনগণের উপর সংকীর্ণতা নেমে এসেছে। হ্যাঁ, তবে যদি কুরআনের কোন কথা সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে তোমাদের বোধগম্য না হয় এবং তোমরা তা বুঝবার প্রয়োজনীতা অনুভব কর তাহলে জিজ্ঞেস কর, আমি বর্ণনা করে দেবো। কেননা, হুকুম পালনের জন্যে তোমাদের ওটা জানবার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু যদি তার কিতাবে কোনটার উল্লেখ না থাকে তবে সেটা আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা ঐ সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ না করে নীরব থাক, যেমন তিনি (আল্লাহ) ওটা বর্ণনা না করে নীরব রয়েছেন। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি যা বর্ণনা করিনি তা অবতীর্ণ অবস্থাতেই থাকতে দাও। কেননা, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতেরা অধিক প্রশ্ন করা ও তাদের নবীদের হুকুমের ব্যাপারে মতানৈক্য সৃষ্টি করার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে।” সহীহ হাদীসে আরও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ যেগুলো নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সেগুলো অতিক্রম করো না, কতগুলো জিনিস তিনি হারাম করেছেন, সেগুলো হালাল মনে করো না এবং তোমাদের উপর দয়াপরবশ হয়ে কতগুলো বিষয়ে ইচ্ছাপূর্বক তিনি নীরবতা অবলম্বন করেছেন, সুতরাং সেসব বিষয়ে তোমরা প্রশ্ন উত্থাপন করো না।”এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ নিষেধকৃত মাসআলাগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, তখন তাদেরকে জবাব দেয়া হলে তারা ওগুলোর উপর ঈমান আনেনি, বরং প্রত্যাখ্যান করেছিল। কারণ, তারা হিদায়াত লাভের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেনি, বরং বিদ্রুপ ও হঠকারিতা করেই প্রশ্ন করেছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের মধ্যে ঘোষণা করেন- “হে আমার কওম! তোমাদের উপর হজ্ব ফরয করা হয়েছে। তখন বানী আসাদ গোত্রের একটি লোক দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! প্রত্যেক বছরেই কি (হজ্ব করা ফরয করা হয়েছে)। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভীষণ রাগান্বিত হন এবং বলেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! আমি যদি হ্যা বলি তবে অবশ্যই তা (প্রতি বছরেই) ফরয হয়ে যাবে। আর তা যদি (প্রত্যেক বছরের জন্যেই) ওয়াজিব হয়ে যায় তবে তোমরা তা পালন করতে সক্ষম হবে না এবং কুফরী করবে। সুতরাং আমি তোমাদের জন্যে যা বর্ণনা করতে ছেড়ে দেই তা তোমরা ছেড়ে দাও। যখন আমি তোমাদেরকে কোন কিছু করার আদেশ করি তোমরা তা পালন কর এবং যা করতে নিষেধ করি তা থেকে বিরত থাক।” তখন আল্লাহ তাআলা এ কথার সমর্থনে এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “খ্রীষ্টানরা যেমন সওয়াল করেছিল তোমরা ঐ রূপ সওয়াল করা থেকে বিরত থাক। তারা খাদ্য যা করেছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা কুফরী করেছিল, মায়িদাহ বা আকাশ থেকে অবতীর্ণ খাদ্যের মর্যাদা দেয়নি। তোমরা নিজেরা প্রশ্ন না করে স্বয়ং আমার বলে দেয়ার অপেক্ষা কর। তোমাদের প্রশ্ন ছাড়াই প্রশ্নের ব্যাখ্যায় কুরআনে আয়াত নাযিল হয়ে যাবে।” হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, তারা মু'জিযার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতো যা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে বাগ-বাগিচা ও নদ-নদী যা করতো এবং বলতোঃ “সাফা মারওয়া পাহাড়দ্বয়কে আমাদের জন্যে সোনা বানিয়ে দিন।” যেমন ইয়াহুদীরা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেছিল- “হে মূসা (আঃ)! আমাদের উপর আকাশ হতে কিতাব অবতীর্ণ করুন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখনই আমি তাদের চাওয়া অনুযায়ী মু'জিযা পাঠিয়েছি তখন পূর্ববর্তী লোকেরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।" (১৭:৫৯) আল্লাহ পাক আরও বলেনঃ “তারা কসম খেয়ে খেয়ে বলে যে, যদি তাদের কাছে মুজিযা এসে যায় তবে অবশ্যই তারা ঈমান আনবে। (হে নবী সঃ) তুমি বলে দাও যে, মু'জিযাসমূহ আল্লাহর কাছেই রয়েছে, তোমরা বুঝছনা যে, মু'জিযা তাদের কাছে আসলেও তারা ঈমান আনবে না।”

আল-মায়িদা 5:103

১০৩-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর: ইমাম বুখারী (রঃ) ইবনে শিহাব (রঃ) ও সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ)-এর মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন যে, বাহীরা ঐ জন্তুকে বলা হতো যার দুধ মানুষ দোহন করতো না এবং বলতো যে, এটা প্রতিমার নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। ওর দুধ কেউ পানও করতো না। সায়েবা ঐ জন্তুকে বলা হতো যাকে মূর্তির নামে ছেড়ে দেয়া হতো। না ওর উপর কোন বোঝা চাপানো হতো, না ওকে সোয়ারী রূপে ব্যবহার করা হতো। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “আমি আমর ইবনে খুযাঈকে দেখেছি যে, তাকে পেটের ভরে টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। সেই সর্বপ্রথম জন্তুকে মূর্তির নামে ছেড়ে দেয়ার প্রথা চালু করেছিল।” “ওয়াসিলা ঐ উস্ত্রীকে বলা হতো যা প্রথমবার একটা নর বাচ্চা প্রসব করতো, তারপর পর্যায়ক্রমে দু'টো মাদী বাচ্চা প্রসব করতো। ঐ ধরনের উন্ত্রীকে প্রতিমার নামে ছেড়ে দেয়া হতো। আর হামী' ঐ বঁড় উটকে বলা হতো যার নসলে কয়েকটা বাচ্চা জন্মলাভ করার পর যখন ওর নসল খুব বৃদ্ধি পেতো তখন ওর দ্বারা বোঝা বহনের কাজ করা হতো না এবং ওকে সওয়ারী হিসেবেও ব্যবহার করা হতো না, বরং মূর্তির নামে ছেড়ে দেয়া হতো। আর ওর নাম তারা হামী’ রাখতো।ইমাম বুখারী (রঃ) যুহরী (রঃ), উরওয়া (রঃ) এবং হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর মাধ্যম দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “আমি জাহান্নামকে দেখেছি যে, এক আগুন অন্য আগুনকে খেতে আছে, আর আমরকে ওর মধ্যে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেই সর্বপ্রথম সায়েবা’র প্রথা চালু করেছিল।” ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম সায়েবার প্রথা চালু করেছিল এবং প্রতিমা পূজায় লিপ্ত হয়েছিল। সে হচ্ছে আবু খুযাআ আমর ইবনে আমির। আমি তাকে পেটের ভরে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়ার অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে দেখেছি।” আবদুর রাযযাক (রঃ) যায়েদ ইবনে আসলাম (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম সায়েবার প্রথা কে চালু করেছিল এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মকে পরিবর্তন করেছিল তা আমি জানি।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কে? তিনি উত্তরে বললেন :“সে ছিল বান্ কাব গোত্রের আমর ইবনে লুহাই। আমি দেখেছি যে, তাকে টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং তার দুর্গন্ধ অনান্য জাহান্নামবাসীদেরকে কষ্ট দিচ্ছে।” ‘বাহীরা বিদআতের আবিষ্কারক কে তাও আমি জানি।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কে?” তিনি জবাব দিলেনঃ সে ছিল বান্ মুদলাজ গোত্রের একটি লোক। তার দু’টি উষ্ট্রী ছিল। সে ঐ উষ্ট্রী দু'টির কান কেটে দিয়েছিল। প্রথমে সে ঐ উন্ত্রী দু'টির দুগ্ধ পান নিজের উপর হারাম করেছিল। কিন্তু কিছুদিন পর দুধ পান করতে শুরু করে। আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি। উস্ত্রী দু’টি তাকে তাদের মুখ দ্বারা কর্তন করতে রয়েছে এবং খুর দ্বারা দলিত করতে আছে। সেই হচ্ছে লুহাই ইবনে কামআর পুত্র। সে খুযাআর নেতৃস্থানীয় লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। জুরহুম গোত্রের পরে কা'বার মুতাওয়াল্লী তারাই হয়েছিল। তারাই সর্বপ্রথম দ্বীনে ইবরাহীম (আঃ)-এর পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। হেজাযে তারাই প্রতিমাপূজার সূচনা করেছিল। জনগণকে প্রতিমাপূজার দিকে ও ওদের নৈকট্য লাভের দিকে আহ্বানকারী তারাই ছিল। জন্তুসমূহের ব্যাপারে অজ্ঞতার যুগে সর্বপ্রথম হেজাযে বিদআতের প্রচলনকারী ছিল তারাই। যেমন মহান আল্লাহ সূরায়ে আনআমে এর বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ “ক্ষেতে উৎপাদিত শস্যের বা চতুষ্পদ জন্তুর মাত্র একটা অংশ তারা আল্লাহর নামে মনে করতো এবং অবশিষ্টগুলো প্রতিমার নামে মনে করতো।” (৬:১৩৭)। ‘বাহীরা সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা ঐ উষ্ট্ৰী যে পাচবার বাচ্চা প্রসব করেছে। পঞ্চমবার সে নর বাচ্চা প্রসব করলে তারা তাকে যবেহ করতো। অতঃপর পুরুষ লোকেরা ওর গোশত ভক্ষণ করতো, কিন্তু স্ত্রীলোকেরা ওর গোশত খেতো না। আর ওটা মাদী বাচ্চা প্রসব করলে তারা ওর কান কেটে নিতে এবং বলতো, “এটা হচ্ছে বাহীরা।” সুদ্দী (রঃ) এবং অন্যান্যগণ প্রায় এরূপই বর্ণনা করেছেন। সায়েবা’ সম্পর্কে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওটা ঐ প্রকারের বকরী যে প্রকারের সংজ্ঞা বাহীরা” সম্পর্কে দেয়া হয়েছে। পার্থক্য শুধু এই যে, যখন ওটা ছ’বার বাচ্চা প্রসব করতো তখন পর্যন্ত ওর অবস্থা একইরূপ থাকতো। অতঃপর ওটা একটি বা দুটি নর বাচ্চা প্রসব করতো তখন তারা ওকে যবেহ করতো এবং পুরুষ লোকেরাই শুধু ওর গোশত ভক্ষণ করতো, স্ত্রীলোকেরা ভক্ষণ করতো না। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, ‘সায়েবা’ ঐ উস্ত্রীকে বলা হতো যে, যখন সে পর্যায়ক্রমে দশটি মাদী বাচ্চা প্রসব করতো তখন তাকে মূর্তির নামে ছেড়ে দেয়া হতো। তাকে সওয়ারী রূপে ব্যবহার করা হতো না, তার নোম কাটা হতো না এবং তার দুধও দোহন করা হতো না। কিন্তু অতিথি আসলে তাকে ঐ উষ্ট্রীর দুগ্ধ পান করানো যেতো। আবু রাওক (রঃ) বলেন যে, ‘সায়েবা ঐ উষ্ট্র বা ছাগল ইত্যাদিকে বলা হতো যে, মানুষ যখন কোন কাজে বের হতো এবং ঐ কাজ সমাধা হয়ে যেতো তখন ঐ জন্তুকে সায়েবা' বানানো হতো এবং মূর্তির নামে উৎসর্গ করা হতো, ওর বাচ্চাগুলোকে মূর্তির নামে উৎসর্গীকৃত মনে করা হতো। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, কোন লোক যখন কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে বের হতো, কিংবা রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করতো, অথবা তার মালধন অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পেতো, তখন সে নিজের কিছু মাল প্রতিমার নামে উৎসর্গ করতো। এই মালে বা জন্তুতে কেউ কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তাকে কঠিন শাস্তি দেয়া হতো।‘ওয়াসীলা সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা ছিল ঐ ছাগী, যে সাতবার বাচ্চা প্রসব করতো এবং সপ্তমবারে সে মৃত নর বাচ্চা প্রসব করলে ঐ বকরীর গোশতে শুধু পুরুষেরাই শরীক হতে পারতো, স্ত্রীলোকেরা শরীক হতে পারতো না। কিন্তু সপ্তমবারে ঐ বকরীটি মাদী বাচ্চা প্রসব করলে ওকে তারা জীবিতাবস্থাতেই রাখতো। আর একই সাথে নর ও মাদী বাচ্চা প্রসব করলে দু'টোকেই জীবিতাবস্থায় ছেড়ে দেয়া হতো এবং তারা বলতো-মাদীটি নরটিকেও ওয়াসীলা বানিয়ে দিয়েছে। এখন এটাও আমাদের জন্যে হারাম। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, ‘ওয়াসীলা’ ঐ বকরীকে বলা হতো যা পাঁচবারে দশটি মাদী বাচ্চা প্রসব করতে অর্থাৎ প্রতিবার দু’টি করে মাদী বাচ্চা প্রসব করতো। প্রতিবারের বাচ্চাদ্বয়কে ‘ওয়াসীলা' রূপে ছেড়ে দেয়া হতো। এরপর নর অথবা মাদী যে বাচ্চাই প্রসব করুক না কেন, শুধু পুরুষদেরকেই ওর হকদার মনে করা হতো, স্ত্রীদেরকে নয়। কিন্তু মৃত বাচ্চা প্রসব করলে পুরুষলোক ও স্ত্রীলোক সবাই অংশীদার হতো।‘হামী’ সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কোন নরের মাধ্যমে দশটি বাচ্চা জন্মগ্রহণ করলে তাকেও প্রতিমার নামে ছেড়ে দেয়া হতো এবং ওটাকেই ‘হামী' বলা হতো। ওর উপর বোঝা চাপানো হতো না এবং ওর লোম কাটা হতো না। যে কোন লোকের ক্ষেতের ফসল সে খেতে পারতো এবং যে কোন প্রস্রবণ থেকে ঐ জন্তুটি পানি পান করতে পারতো। কেউই ওকে বাধা দিতো না। এ আয়াতের তাফসীরে এগুলো ছাড়া অন্য কিছুও বলা হয়েছে। মহান আল্লাহর- (আরবী) এ কথার ভাবার্থ এই যে, কাফিররা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে থাকে। আল্লাহ এগুলোকে শরীয়তের কাজরূপে নির্ধারণ করেননি এবং এগুলো তার নৈকট্য লাভের উপায়ও নয়। এটা মুশরিকদের আল্লাহ পাকের উপর মিথ্যারোপ ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা নিজেরাই ঐগুলোকে শরীয়তের পালনীয় কাজ বলে বরণ করে নিয়েছে। আর ওটাকেই তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করেছে। অথচ ওটা কখনও তার নৈকট্য লাভের মাধ্যম হতে পারে। বরং তাদেরকে তাদের এ কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করতে হবে।(আরবী) অর্থাৎ যখন তাদেরকে বলা হয়-তোমরা আল্লাহর অহীর দিকে ও তাঁর রাসূলের দিকে এসো, তখন তারা বলে-আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের রীতি নীতির উপরই প্রতিষ্ঠিত রয়েছি, এটাই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। তারা কি এটা বুঝে না যে, তাদের পূর্বপুরুষরাও বাতিল ও মিথ্যা রীতিনীতির উপর থাকতে পারে? তারাও হক ও সত্য থেকে দূরে ও হিদায়াত থেকে বঞ্চিত থাকতে পারে? সুতরাং কিরূপে তোমরা তাদের অনুসরণ করতে পার? সত্য ব্যাপার এটাই যে, একমাত্র ভ্রান্ত ও মূর্খ লোকেরাই এরূপ মন্তব্য করতে পারে।

আল-মায়িদা 5:104

১০৩-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর: ইমাম বুখারী (রঃ) ইবনে শিহাব (রঃ) ও সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ)-এর মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন যে, বাহীরা ঐ জন্তুকে বলা হতো যার দুধ মানুষ দোহন করতো না এবং বলতো যে, এটা প্রতিমার নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। ওর দুধ কেউ পানও করতো না। সায়েবা ঐ জন্তুকে বলা হতো যাকে মূর্তির নামে ছেড়ে দেয়া হতো। না ওর উপর কোন বোঝা চাপানো হতো, না ওকে সোয়ারী রূপে ব্যবহার করা হতো। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “আমি আমর ইবনে খুযাঈকে দেখেছি যে, তাকে পেটের ভরে টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। সেই সর্বপ্রথম জন্তুকে মূর্তির নামে ছেড়ে দেয়ার প্রথা চালু করেছিল।” “ওয়াসিলা ঐ উস্ত্রীকে বলা হতো যা প্রথমবার একটা নর বাচ্চা প্রসব করতো, তারপর পর্যায়ক্রমে দু'টো মাদী বাচ্চা প্রসব করতো। ঐ ধরনের উন্ত্রীকে প্রতিমার নামে ছেড়ে দেয়া হতো। আর হামী' ঐ বঁড় উটকে বলা হতো যার নসলে কয়েকটা বাচ্চা জন্মলাভ করার পর যখন ওর নসল খুব বৃদ্ধি পেতো তখন ওর দ্বারা বোঝা বহনের কাজ করা হতো না এবং ওকে সওয়ারী হিসেবেও ব্যবহার করা হতো না, বরং মূর্তির নামে ছেড়ে দেয়া হতো। আর ওর নাম তারা হামী’ রাখতো।ইমাম বুখারী (রঃ) যুহরী (রঃ), উরওয়া (রঃ) এবং হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর মাধ্যম দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “আমি জাহান্নামকে দেখেছি যে, এক আগুন অন্য আগুনকে খেতে আছে, আর আমরকে ওর মধ্যে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেই সর্বপ্রথম সায়েবা’র প্রথা চালু করেছিল।” ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম সায়েবার প্রথা চালু করেছিল এবং প্রতিমা পূজায় লিপ্ত হয়েছিল। সে হচ্ছে আবু খুযাআ আমর ইবনে আমির। আমি তাকে পেটের ভরে হেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়ার অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে দেখেছি।” আবদুর রাযযাক (রঃ) যায়েদ ইবনে আসলাম (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম সায়েবার প্রথা কে চালু করেছিল এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মকে পরিবর্তন করেছিল তা আমি জানি।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কে? তিনি উত্তরে বললেন :“সে ছিল বান্ কাব গোত্রের আমর ইবনে লুহাই। আমি দেখেছি যে, তাকে টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং তার দুর্গন্ধ অনান্য জাহান্নামবাসীদেরকে কষ্ট দিচ্ছে।” ‘বাহীরা বিদআতের আবিষ্কারক কে তাও আমি জানি।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে কে?” তিনি জবাব দিলেনঃ সে ছিল বান্ মুদলাজ গোত্রের একটি লোক। তার দু’টি উষ্ট্রী ছিল। সে ঐ উষ্ট্রী দু'টির কান কেটে দিয়েছিল। প্রথমে সে ঐ উন্ত্রী দু'টির দুগ্ধ পান নিজের উপর হারাম করেছিল। কিন্তু কিছুদিন পর দুধ পান করতে শুরু করে। আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি। উস্ত্রী দু’টি তাকে তাদের মুখ দ্বারা কর্তন করতে রয়েছে এবং খুর দ্বারা দলিত করতে আছে। সেই হচ্ছে লুহাই ইবনে কামআর পুত্র। সে খুযাআর নেতৃস্থানীয় লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। জুরহুম গোত্রের পরে কা'বার মুতাওয়াল্লী তারাই হয়েছিল। তারাই সর্বপ্রথম দ্বীনে ইবরাহীম (আঃ)-এর পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। হেজাযে তারাই প্রতিমাপূজার সূচনা করেছিল। জনগণকে প্রতিমাপূজার দিকে ও ওদের নৈকট্য লাভের দিকে আহ্বানকারী তারাই ছিল। জন্তুসমূহের ব্যাপারে অজ্ঞতার যুগে সর্বপ্রথম হেজাযে বিদআতের প্রচলনকারী ছিল তারাই। যেমন মহান আল্লাহ সূরায়ে আনআমে এর বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ “ক্ষেতে উৎপাদিত শস্যের বা চতুষ্পদ জন্তুর মাত্র একটা অংশ তারা আল্লাহর নামে মনে করতো এবং অবশিষ্টগুলো প্রতিমার নামে মনে করতো।” (৬:১৩৭)। ‘বাহীরা সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা ঐ উষ্ট্ৰী যে পাচবার বাচ্চা প্রসব করেছে। পঞ্চমবার সে নর বাচ্চা প্রসব করলে তারা তাকে যবেহ করতো। অতঃপর পুরুষ লোকেরা ওর গোশত ভক্ষণ করতো, কিন্তু স্ত্রীলোকেরা ওর গোশত খেতো না। আর ওটা মাদী বাচ্চা প্রসব করলে তারা ওর কান কেটে নিতে এবং বলতো, “এটা হচ্ছে বাহীরা।” সুদ্দী (রঃ) এবং অন্যান্যগণ প্রায় এরূপই বর্ণনা করেছেন। সায়েবা’ সম্পর্কে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওটা ঐ প্রকারের বকরী যে প্রকারের সংজ্ঞা বাহীরা” সম্পর্কে দেয়া হয়েছে। পার্থক্য শুধু এই যে, যখন ওটা ছ’বার বাচ্চা প্রসব করতো তখন পর্যন্ত ওর অবস্থা একইরূপ থাকতো। অতঃপর ওটা একটি বা দুটি নর বাচ্চা প্রসব করতো তখন তারা ওকে যবেহ করতো এবং পুরুষ লোকেরাই শুধু ওর গোশত ভক্ষণ করতো, স্ত্রীলোকেরা ভক্ষণ করতো না। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, ‘সায়েবা’ ঐ উস্ত্রীকে বলা হতো যে, যখন সে পর্যায়ক্রমে দশটি মাদী বাচ্চা প্রসব করতো তখন তাকে মূর্তির নামে ছেড়ে দেয়া হতো। তাকে সওয়ারী রূপে ব্যবহার করা হতো না, তার নোম কাটা হতো না এবং তার দুধও দোহন করা হতো না। কিন্তু অতিথি আসলে তাকে ঐ উষ্ট্রীর দুগ্ধ পান করানো যেতো। আবু রাওক (রঃ) বলেন যে, ‘সায়েবা ঐ উষ্ট্র বা ছাগল ইত্যাদিকে বলা হতো যে, মানুষ যখন কোন কাজে বের হতো এবং ঐ কাজ সমাধা হয়ে যেতো তখন ঐ জন্তুকে সায়েবা' বানানো হতো এবং মূর্তির নামে উৎসর্গ করা হতো, ওর বাচ্চাগুলোকে মূর্তির নামে উৎসর্গীকৃত মনে করা হতো। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, কোন লোক যখন কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে বের হতো, কিংবা রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করতো, অথবা তার মালধন অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পেতো, তখন সে নিজের কিছু মাল প্রতিমার নামে উৎসর্গ করতো। এই মালে বা জন্তুতে কেউ কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তাকে কঠিন শাস্তি দেয়া হতো।‘ওয়াসীলা সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা ছিল ঐ ছাগী, যে সাতবার বাচ্চা প্রসব করতো এবং সপ্তমবারে সে মৃত নর বাচ্চা প্রসব করলে ঐ বকরীর গোশতে শুধু পুরুষেরাই শরীক হতে পারতো, স্ত্রীলোকেরা শরীক হতে পারতো না। কিন্তু সপ্তমবারে ঐ বকরীটি মাদী বাচ্চা প্রসব করলে ওকে তারা জীবিতাবস্থাতেই রাখতো। আর একই সাথে নর ও মাদী বাচ্চা প্রসব করলে দু'টোকেই জীবিতাবস্থায় ছেড়ে দেয়া হতো এবং তারা বলতো-মাদীটি নরটিকেও ওয়াসীলা বানিয়ে দিয়েছে। এখন এটাও আমাদের জন্যে হারাম। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, ‘ওয়াসীলা’ ঐ বকরীকে বলা হতো যা পাঁচবারে দশটি মাদী বাচ্চা প্রসব করতে অর্থাৎ প্রতিবার দু’টি করে মাদী বাচ্চা প্রসব করতো। প্রতিবারের বাচ্চাদ্বয়কে ‘ওয়াসীলা' রূপে ছেড়ে দেয়া হতো। এরপর নর অথবা মাদী যে বাচ্চাই প্রসব করুক না কেন, শুধু পুরুষদেরকেই ওর হকদার মনে করা হতো, স্ত্রীদেরকে নয়। কিন্তু মৃত বাচ্চা প্রসব করলে পুরুষলোক ও স্ত্রীলোক সবাই অংশীদার হতো।‘হামী’ সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কোন নরের মাধ্যমে দশটি বাচ্চা জন্মগ্রহণ করলে তাকেও প্রতিমার নামে ছেড়ে দেয়া হতো এবং ওটাকেই ‘হামী' বলা হতো। ওর উপর বোঝা চাপানো হতো না এবং ওর লোম কাটা হতো না। যে কোন লোকের ক্ষেতের ফসল সে খেতে পারতো এবং যে কোন প্রস্রবণ থেকে ঐ জন্তুটি পানি পান করতে পারতো। কেউই ওকে বাধা দিতো না। এ আয়াতের তাফসীরে এগুলো ছাড়া অন্য কিছুও বলা হয়েছে। মহান আল্লাহর- (আরবী) এ কথার ভাবার্থ এই যে, কাফিররা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে থাকে। আল্লাহ এগুলোকে শরীয়তের কাজরূপে নির্ধারণ করেননি এবং এগুলো তার নৈকট্য লাভের উপায়ও নয়। এটা মুশরিকদের আল্লাহ পাকের উপর মিথ্যারোপ ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা নিজেরাই ঐগুলোকে শরীয়তের পালনীয় কাজ বলে বরণ করে নিয়েছে। আর ওটাকেই তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করেছে। অথচ ওটা কখনও তার নৈকট্য লাভের মাধ্যম হতে পারে। বরং তাদেরকে তাদের এ কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করতে হবে।(আরবী) অর্থাৎ যখন তাদেরকে বলা হয়-তোমরা আল্লাহর অহীর দিকে ও তাঁর রাসূলের দিকে এসো, তখন তারা বলে-আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের রীতি নীতির উপরই প্রতিষ্ঠিত রয়েছি, এটাই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। তারা কি এটা বুঝে না যে, তাদের পূর্বপুরুষরাও বাতিল ও মিথ্যা রীতিনীতির উপর থাকতে পারে? তারাও হক ও সত্য থেকে দূরে ও হিদায়াত থেকে বঞ্চিত থাকতে পারে? সুতরাং কিরূপে তোমরা তাদের অনুসরণ করতে পার? সত্য ব্যাপার এটাই যে, একমাত্র ভ্রান্ত ও মূর্খ লোকেরাই এরূপ মন্তব্য করতে পারে।

আল-মায়িদা 5:105

(আরবী) আল্লাহ পাক স্বীয় বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন নিজেদেরকে সংশোধন করে নেয় এবং সকার্য সম্পাদনে যথাসাধ্য চেষ্টা করে। আর তিনি তাদেরকে এ সংবাদও দিচ্ছেন যে, যারা নিজেদেরকে সংশোধন করে নেয়, দুনিয়ার নিকটবর্তী ও দূরবর্তী সবাই ঝগড়া ফাসাদে লিপ্ত হলেও তাদের কোনই ক্ষতি হবে না। এ আয়াতের তাফসীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যখন বান্দা হারাম ও হালালের ব্যাপারে আমার নির্দেশ মেনে চলবে তখন যে যতই পথভ্রষ্ট হয়ে যাক না কেন তার কোনই ক্ষতি হবে না। তোমাদের সকলকেই আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে, তখন তিনি তোমাদেরকে তোমাদের কৃত ভাল ও মন্দ সম্পর্কে অবহিত করবেন। যার কাজ ভাল হবে তাকে ভাল বিনিময় প্রদান করা হবে এবং যার কাজ মন্দ হবে তাকে মন্দ বিনিময় দেয়া হবে। এ আয়াত দ্বারা এ দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে না যে, ভাল কাজের আদেশ প্রদান ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করণ জরুরী নয়। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) একদা দাঁড়িয়ে আল্লাহর হামদ ও সানা বর্ণনা করার পর বলেনঃ হে লোক সকল! তোমরা এ আয়াতটি পাঠ কর বটে, কিন্তু ওটাকে ওর নিজ স্থানে রাখছে না। আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে বলতে শুনেছি-'মানুষ যখন কোন পাপের কাজ দেখে, অতঃপর ওর প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করতঃ তার মধ্যে ক্রোধের সঞ্চার না হয়, তখন হতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ সাধারণভাবে শাস্তি আনয়ন করবেন (সবাই সেই শাস্তির শিকার হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), আসহাবুস সুনান এবং ইবনে মাজা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইমাম তিরমিযী (রঃ) আবূ উমাইয়া শাবানী (রঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেনঃ আমি আবু সা'লাবা খুশানী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এ আয়াতের কি ভাবার্থ গ্রহণ করে থাকেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ কোন আয়াত? আমি বললাম, (আরবী) এ আয়াতটি। তিনি বললেনঃ আল্লাহর শপথ! এ সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিকেই আপনি জিজ্ঞেস করেছেন। আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “তোমরা নিজ নিজ পাগড়ি সামলিয়ে নেয়ার পর নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থেকো না। তোমরা ভাল কাজের আদেশ দান ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করণের কাজ অব্যাহত রাখো। তোমাদেরকে এ কাজ ঐ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে যে পর্যন্ত মানুষ সংকীর্ণমনা ও নিরুৎসাহী থাকে, যাকাত প্রদান না করে, কু-প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, দুনিয়াকে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয়, প্রত্যেকে নিজ নিজ মতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং কোন উপদেষ্টার উপদেশবাণী শ্রবণ না করে। যখন অবস্থা এরূপ হবে, এ সময় তাদের থেকে পৃথক থাকবে। তাদেরকে তাদের নিজেদের অবস্থার উপর ছেড়ে দেবে। তোমাদের পরেই এমন এক যুগ আসবে যে, তাতে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা ব্যক্তি হাতে আগুন ধরে রাখার মত বিপদে পতিত হবে। ঐ সময় যে ব্যক্তি শুধু নিজেই ভাল কাজ করবে সে পঞ্চাশজন লোকের নেক আমলের সমান পুণ্য লাভ করবে। জিজ্ঞেস করা। হলোঃ আমাদের পঞ্চাশজন লোকের, না সেই দলের পঞ্চাশজন লোকের? তিনি উত্তরে বললেনঃ “না, না বরং তোমাদের মধ্যকার পঞ্চাশজন লোকের পুণ্যের সমান (সে পুণ্য লাভ করবে)। ইমাম রাযী (রঃ) আবুল আলিয়া (রঃ) ও হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর মাধ্যমে (আরবী) -এ আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে বলেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট লোকেরা বসেছিল, এমন সময় কোন দুটি লোকের মধ্যে ঝগড়া বাধে। তখন উপস্থিত জনতার মধ্য হতে একটি লোক বলেঃ আমি উঠে গিয়ে এদের দুজনের মধ্যে (একটা সমঝোতা করে দেয়ার মানসে) ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করার ব্রত পালন করবো। তার এ কথা শুনে তার পার্শ্ববর্তী একটি লোক বললোঃ তুমি স্ব-স্থানে বসে থাক। কেননা, আল্লাহ তা'আলা (আরবী) বলেছেন। তার একথা শুনে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “তাকে বাধা দিয়ো না। এ আয়াতের উপর আমল করার স্থান এটা নয়। কুরআন যখন অবতীর্ণ হওয়ার প্রয়োজন ছিল তখন অবতীর্ণ হয়েছে। কুরআনের কতগুলো আয়াত এমন রয়েছে, যেগুলোর তাবীল আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর যুগে হয়ে গেছে। আর কতগুলো আয়াতের তাবীল কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দিন কার্যকরী হবে। যতদিন পর্যন্ত তোমাদের মন ও অনুভূতি এক থাকবে, তোমাদের মধ্যে ভাঙ্গন না ধরবে, তোমরা একে অপরের ক্ষতি সাধন করা থেকে বিরত থাকবে, ততদিন পর্যন্ত ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতে হবে। কিন্তু যখন তোমাদের মন বিগড়ে যাবে, তোমাদের একতায় ভাঙ্গন ধরবে এবং তোমরা একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়ে যাবে, তখন তোমরা জনগণ থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক থাকবে।” এ আয়াতের এ তাফসীরই বর্ণনা করা হয়েছে। ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। ইবনে জারীর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হাসান (রঃ) এ আয়াতটি পাঠ করার পর বলেনঃ ‘আল্লাহর জন্যে সমুদয় প্রশংসা যে, অতীত যুগেও মুনাফিক ছিল এবং বর্তমান যুগেও মুনাফিক রয়েছে, কিন্তু মুসলমানরা মুনাফিকদের কাজকে সদা খারাপ মনে করে থাকে।' হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেনঃ “যখন তুমি ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে তখন তুমি হিদায়াতের পথে রয়েছে বলে পথভ্রষ্ট লোকদের পথভ্রষ্টতা তোমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না।”

আল-মায়িদা 5:106

১০৬-১০৮ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে কারীমা স্বাভাবিক হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতটি মানসূখ’ বা রহিত হয়ে গেছে। তারকীবে নাহবীর দিক দিয়ে (আরবী) শব্দটি বা বিধেয়। আর (আরবী) বাক্যের মধ্যে (আরবী) বা উদ্দেশ্য হবে। অর্থাৎ বাক্যটি (আরবী) এরূপ ছিল। দ্বিতীয় (আরবী) শব্দটি (আরবী) রূপে ছিল যা লোপ করা হয়েছে এবং (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) শব্দটিকেই ওর স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, এরূপ মনে করতে হবে। এ অবস্থায় (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের (আরবী) বা বিশেষণ হবে। (আরবী) দ্বারা (আরবী) বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, দ্বারা অসিয়ত কারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। আর (আরবী) দ্বারা (আরবী) বা আহলে কিতাবদেরকে বুঝানো হয়েছে। (এটা বলেছেন ইবনে জারীর (রঃ)) অর্থাৎ অসিয়তকারীর গোত্রের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী এবং আর দু’জন সাক্ষী হবে অন্য গোত্রের মধ্য হতে। (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে-যখন তোমরা সফরে থাকবে এবং ঐ অবস্থায় তোমাদের মৃত্যু এসে যাবে তখন তোমরা মুসলমানদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখবে। আর মুসলমান পাওয়া না গেলে অমুসলিম হলেও চলবে। এখানে এ কথা বের হচ্ছে যে, সফরে অসিয়তের সময় মুসলমান বিদ্যমান না থাকলে যিম্মীদেরকে সাক্ষী বানানো যেতে পারে। শুরাইহ্ (রঃ) বলেন যে, সফর ও অসিয়তের সময় ছাড়া অন্য কোন সময় ইয়াহুদী ও নাসারাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। আইম্মায়ে সালাসা বা ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) ছাড়া বাকী তিনজন ইমাম এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তারা বলেন যে, কোন অবস্থাতেই মুসলিমের উপর অমুসলিমের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) যিম্মীর উপর যিম্মীর সাক্ষ্য বৈধ বলেছেন।ইমাম যুহরী (রঃ)-এর উক্তি নকল করে ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, বাসস্থানে বা সফরে কাফিরের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য না হওয়াই সুন্নাত তরীকা। সাক্ষ্য প্রদানের অধিকার শুধু মুসলমানেরই রয়েছে। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন একটি লোক মারা গিয়েছিল এবং সেখানে সে সময় কোন মুসলমান বিদ্যমান ছিল না। ওটা ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগের ঘটনা। ঐ সময় সমস্ত শহর ছিল অমসলিমদের দখলে এবং সব লোকই ছিল কাফির। উত্তরাধিকারের কোন নিয়ম-কানুনও তখন চালু ছিল না। ওটা অসিয়ত হিসেবে বন্টিত হতো। তারপর অসিয়ত মানসূখ হয়ে যায় এবং ফারায়েয (উত্তরাধিকারীদের অংশ) ফরয করা হয়। অতঃপর লোকেরা উত্তরাধিকারের নিয়ম-কানুনের উপর আমল করতে শুরু করে। এ বিষয়ে চিন্তাভাবনার অবকাশ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা দু’জন ওসীকে বুঝানো হয়েছে, কি দু’জন সাক্ষীকে বুঝানো হয়েছে এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, যদি লোক সফরে থাকে এবং তার সাথে মালধন থাকে, এমতাবস্থায় তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে, তবে মুসলমানদের মধ্যে দুটি লোককে পেলে সে স্বীয় পরিত্যক্ত সম্পদ তাদের কাছে সমর্পণ করবে এবং দু’জন মুসলমানকে ওর উপর সাক্ষীও রাখবে। এটা ছিল ওসী নিযুক্ত করার অবস্থা। (আরবী) -এর ভাবার্থ এই যে, এ দু’জন মুসলমান সাক্ষী নিযুক্ত হবে। আয়াতে কারীমার পূর্ব সম্পর্ক দ্বারা এটাই প্রকাশ পাচ্ছে। সুতরাং যদি এ দু’জন মুসলমানের সাথে তৃতীয় কোন মুসলমান উপস্থিত না থাকে তবে অসিয়ত ও সাক্ষ্য এ বিশেষণও এ দু'জনের মধ্যেই একত্রিত হয়ে যাবে। যেমন তামীমুদ্দারী ও আদী ইবনে বিদার কাহিনীতে সত্বরই এর বর্ণনা আসছে ইনশাআল্লাহ।(আরবী) ‘তোমরা ঐ দু'জনকে নামাযের পর রুখে নাও। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসর নামায বুঝানো হয়েছে। ইমাম যুহরী (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে ঐ দু’জন মুসলমানের মাযহাবী নামায। ভাবার্থ এই যে, এ দু’জন সাক্ষী নামাযের পর একত্রিত হবে যাতে বেশী লোকের সমাবেশে এ সাক্ষ্যদান কার্য সম্পন্ন হতে পারে। (আরবী) অর্থাৎ সাক্ষীদ্বয় সাক্ষ্যদানের সময় আল্লাহর নামে শপথ করবে। (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমাদের সন্দেহ হয় যে, তারা দু'জন ভুল বর্ণনা দেবে বা খিয়ানত করবে, তবে ঐ সাক্ষীদ্বয়কে সেই সময় আল্লাহর নামে শপথ করে বলতে হবেঃ আমরা মিথ্যা শপথের বিনিময়ে এই নশ্বর জগতের সামান্য অর্থ উপার্জন করবো না, যদিও আমাদের এ শপথের কারণে আমাদের নিকট আত্মীয়েরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (আরবী) অর্থাৎ আমরা আল্লাহর (আদিষ্ট) সাক্ষ্যকে গোপন করবো না। সাক্ষ্যদান কার্যের গুরুত্ব বুঝাবার জন্যেই সাক্ষ্যের সম্বন্ধ আল্লাহর সঙ্গে লাগানো হয়েছে।(আরবী) অর্থাৎ যদি আমরা সাক্ষ্যে কোন প্রকার পরিবর্তন করি অথবা সম্পূর্ণরূপে তা গোপন করি তবে আমরা পাপীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।(আরবী) অর্থাৎ যদি ঐ দু’জন সাক্ষী ও ওসীর ব্যাপারে এটা প্রমাণিত হয় যে, তারা খিয়ানত করেছে এবং মৃত ব্যক্তির মাল উত্তরাধিকারীদের নিকট পৌছাতে গিয়ে কিছু আত্মসাৎ করেছে তবে যাদের প্রাপ্য নষ্ট হয়েছে তাদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী পূর্ববর্তী স্বাক্ষীদ্বয়ের স্থানে দাঁড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ যখন সঠিক সংবাদ দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, পূর্ববর্তী দু’জন সাক্ষী খিয়ানত করেছে, তবে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের মধ্য হতে দ’জন অতি নিকটবর্তী উত্তরাধিকারী দাড়িয়ে যাবে এবং আল্লাহর নামে শপথ করে বলবেঃ “আমাদের সাক্ষ্য তাদের (পূর্ববর্তী সাক্ষীদ্বয়ের) সাক্ষ্যের তুলনায় বিশুদ্ধতর। তারা দুজন বাস্তবিকই খিয়ানত করেছে এবং এ দোষারোপ করাতে আমরা মোটেই বাড়াবাড়ি করছি না। যদি আমরা মিথ্যা অপবাদ দেই তবে অবশ্যই আমরা পাপীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।" এটা যেন উত্তরাধিকারীদের পক্ষ হতে শপথ। যেমন হত্যাকারীদের পক্ষ হতে বেঈমানী সাব্যস্ত হলে নিহত ব্যক্তির অভিভাবকরা শপথ করে থাকে। এটা আহকামের বাবুল কাসামাতে স্থিরীকৃত হয়েছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বানী সাহম গোত্রের একটি লোক তামীমুদ্দারী ও আদী ইবনে বিদার সঙ্গে সফরে বেরিয়েছিল। অতঃপর সাহমী লোকটি এমন এক জায়গায় মৃত্যুবরণ করে যেখানে কোন মুসলমান ছিল না। যখন তারা দু'জন তার পরিত্যক্ত সম্পদ নিয়ে স্বদেশে ফিরে আসে তখন সাহমীর পরিবারের লোকেরা রৌপ্য নির্মিত একটি পেয়ালা অনুপস্থিত দেখে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের দুজনের শপথ গ্রহণ করেন। এরপর পেয়ালাটি মক্কায় পাওয়া যায়। তাদেরকে ঐ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা বলেঃ “আমরা এটা তামীম ও আদীর নিকট হতে ক্রয় করে নিয়েছি। তারপর সাহমীর অভিভাবকদের মধ্য হতে দু’জন লোক দাঁড়িয়ে যায় এবং শপথ করে বলেঃ “নিশ্চয়ই আমাদের দুজনের শপথ এদের দু'জনের শপথ অপেক্ষা বেশী সত্য। নিশ্চয়ই পেয়ালাটি আমাদের সঙ্গীরই বটে।" তাদের ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) তাখরীজ করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন) আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) শাবী (রঃ) হতে যে ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন তা এ ঘটনাটির সত্যতা প্রমাণ করে। ঘটনাটি এই যে, বিদেশে একজন মুসলমানের মৃত্যু ঘটে। ওসী নিযুক্ত করার মত কোন মুসলমান সেখানে ছিল না। তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত লোকটি আহলে কিতাবের মধ্য হতে দু’জন লোককে ওসী নিযুক্ত করে। ঐ লোক দুটি কুফায় হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হাযির হয় এবং মৃত লোকটির পরিত্যক্ত সম্পদ তাঁর নিকট পেশ করে। এ দেখে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “এরূপই একটি ঘটনা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সময় ঘটেছিল। এখন এটা হচ্ছে দ্বিতীয় ঘটনা।” সুতরাং আসরের নামাযের পর লোক দু'টিকে শপথ করানো হয়। তারা শপথ করে বলেঃ “আমরা না খিয়ানত করেছি, না মিথ্যা বলছি, না কিছু আত্মসাৎ করেছি, বরং এটাই হচ্ছে মৃত ব্যক্তির সম্পদ।” তখন তাদের শপথকে সত্য বলে মেনে নেয়া হয় এবং তাদের সাক্ষ্য অনুযায়ীই হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) ফায়সালা করেন। নবী (সঃ)-এর যুগে এরূপই ঘটনা দ্বারা তামীম ও আদীর ঘটনাকে বুঝানো হয়েছে। বলা হয়েছে, তামীমুদ্দারী (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা হচ্ছে নবম হিজরীর। আর আশআরী (রাঃ) সম্পৰ্কীয় ঘটনাটি হচ্ছে অন্য ঘটনা। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এ আয়াতে নির্দেশ রয়েছে যে, মরণশয্যায় শায়িত ব্যক্তি দু’জন ওসী নিযুক্ত করবে এবং দু’জন মুসলমানকে সাক্ষী রাখবে। এটা হচ্ছে বাড়ীতে অবস্থানরত সময়ের মাসআলা। (আরবী) এ আয়াতের উপর ভিত্তি করেই একথা বলা হচ্ছে। আর সফরের ব্যাপারে বলা হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা সফরে থাক এবং সেই সময় তোমাদের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়, আর কোন মুসলমান সেখানে উপস্থিত না থাকে তবে সে যেন ইয়াহূদী, নাসারা যা মাজুসীদের মধ্যে হতে দু’জন লোককে ওসী নিযুক্ত করে এবং পরিত্যক্ত সম্পদ তাদের নিকট সমর্পণ করে। এখন যদি মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসরা ঐ ওসীদ্বয়কে স্বীকার করে নেয় তবে তো ভালোই। নচেৎ বাদশাহর কাছে মোকাদ্দমা পেশ করতে হবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ যদি তাদের সাক্ষ্যের সত্যতায় তোমাদের সন্দেহ হয় তবে নামাযের পর তাদেরকে শপথ করিয়ে নাও। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন খ্রীষ্টান সাক্ষীদ্বয়কে অস্বীকার করেছিল এবং তাদেরকে ভয় দেখিয়েছিল ও ধমকিয়ে ছিল। তখন আবু মূসা (রাঃ) ঐ। স্বাক্ষীদ্বয়কে আসরের নামাযের পর শপথ করিয়েছিলেন। তখন আমি বলেছিলাম- তাদের কাছে আমাদের নামাযের মর্যাদা কি আছে? তাদেরকে তো তাদের নামাযের শপথ করানো উচিত। সুতরাং তারা দু'জন তাদের মাযহাবের নিময় অনুযায়ী নামায পড়ার পর শপথ করে বললোঃ “আমরা সামান্য শপথের জন্য আমাদের কসমকে বিক্রি করবো না, নতুবা আমরা পাপী হয়ে যাবো। তোমাদের সঙ্গী এ অসিয়তই করেছিল এবং এটাই তার পরিত্যক্ত সম্পদ। শপথ করার পর্বে ইমাম তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন- “যদি তোমরা গোপন করে রাখো বা খিয়ানত কর তবে স্বীয় কওমের নিকট তোমরা অপদস্ত হবে এবং এরপর আর কখনও তোমাদের সাক্ষ্য কবুল করা হবে না। আর তোমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে।”(আরবী) অর্থাৎ এটাই এমন এক পন্থা যে, এতে সাক্ষী ঘটনা অনুযায়ী তার সাক্ষ্য প্রদান করবে এবং তার এ ভয় থাকবে যে, যদি সে ঘটনা অনুযায়ী সাক্ষ্য প্রদান না করে তবে মুসলমানদের সাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে তাদের শপথকে বাতিল করে দেয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যদি জানতে পারা যায় যে, তারা অবৈধ পন্থায় সত্যকে গোপন করেছে। তবে তাদের স্থলে যাদের হক নষ্ট হয়েছে তাদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী দাড়িয়ে যাবে এবং তারা শপথ করে বলবে যে, কাফিরদের শপথ বাতিল এবং তারা বাড়াবাড়ি করছে না। এখন কাফিরদের সাক্ষ্য বাতিল করে দিয়ে মৃত ব্যক্তির অলীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। অধিকাংশ আইম্মায়ে তাবেঈন, পূর্ববর্তী গুরুজন এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) প্রমুখের এটাই মাযহাব।(আরবী) অর্থাৎ এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা আল্লাহর শপথের সম্মানার্থে এবং অপদস্ত হওয়ার ভয়ে যে মতের ওয়ারিসরা তাদের কসমের মাধ্যমে তাদের কসমকে রদ করে দেবে এবং তাদেরকে শাস্তিও প্রদান করা হবে। তারা সত্য কথাই বলবে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা তোমাদের সমস্ত কাজে আল্লাহকে ভয় কর এবং (আরবী) অর্থাৎ তার আনুগত্য স্বীকার করে চল।(আরবী) অর্থাৎ যারা আল্লাহর আনুগত্য ও শরীয়তের অনুসরণ হতে বেরিয়ে যায় তিনি তাদেরকে সুপথ লাভের তাওফীক দেন না।

আল-মায়িদা 5:107

১০৬-১০৮ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে কারীমা স্বাভাবিক হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতটি মানসূখ’ বা রহিত হয়ে গেছে। তারকীবে নাহবীর দিক দিয়ে (আরবী) শব্দটি বা বিধেয়। আর (আরবী) বাক্যের মধ্যে (আরবী) বা উদ্দেশ্য হবে। অর্থাৎ বাক্যটি (আরবী) এরূপ ছিল। দ্বিতীয় (আরবী) শব্দটি (আরবী) রূপে ছিল যা লোপ করা হয়েছে এবং (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) শব্দটিকেই ওর স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, এরূপ মনে করতে হবে। এ অবস্থায় (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের (আরবী) বা বিশেষণ হবে। (আরবী) দ্বারা (আরবী) বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, দ্বারা অসিয়ত কারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। আর (আরবী) দ্বারা (আরবী) বা আহলে কিতাবদেরকে বুঝানো হয়েছে। (এটা বলেছেন ইবনে জারীর (রঃ)) অর্থাৎ অসিয়তকারীর গোত্রের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী এবং আর দু’জন সাক্ষী হবে অন্য গোত্রের মধ্য হতে। (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে-যখন তোমরা সফরে থাকবে এবং ঐ অবস্থায় তোমাদের মৃত্যু এসে যাবে তখন তোমরা মুসলমানদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখবে। আর মুসলমান পাওয়া না গেলে অমুসলিম হলেও চলবে। এখানে এ কথা বের হচ্ছে যে, সফরে অসিয়তের সময় মুসলমান বিদ্যমান না থাকলে যিম্মীদেরকে সাক্ষী বানানো যেতে পারে। শুরাইহ্ (রঃ) বলেন যে, সফর ও অসিয়তের সময় ছাড়া অন্য কোন সময় ইয়াহুদী ও নাসারাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। আইম্মায়ে সালাসা বা ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) ছাড়া বাকী তিনজন ইমাম এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তারা বলেন যে, কোন অবস্থাতেই মুসলিমের উপর অমুসলিমের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) যিম্মীর উপর যিম্মীর সাক্ষ্য বৈধ বলেছেন।ইমাম যুহরী (রঃ)-এর উক্তি নকল করে ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, বাসস্থানে বা সফরে কাফিরের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য না হওয়াই সুন্নাত তরীকা। সাক্ষ্য প্রদানের অধিকার শুধু মুসলমানেরই রয়েছে। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন একটি লোক মারা গিয়েছিল এবং সেখানে সে সময় কোন মুসলমান বিদ্যমান ছিল না। ওটা ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগের ঘটনা। ঐ সময় সমস্ত শহর ছিল অমসলিমদের দখলে এবং সব লোকই ছিল কাফির। উত্তরাধিকারের কোন নিয়ম-কানুনও তখন চালু ছিল না। ওটা অসিয়ত হিসেবে বন্টিত হতো। তারপর অসিয়ত মানসূখ হয়ে যায় এবং ফারায়েয (উত্তরাধিকারীদের অংশ) ফরয করা হয়। অতঃপর লোকেরা উত্তরাধিকারের নিয়ম-কানুনের উপর আমল করতে শুরু করে। এ বিষয়ে চিন্তাভাবনার অবকাশ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা দু’জন ওসীকে বুঝানো হয়েছে, কি দু’জন সাক্ষীকে বুঝানো হয়েছে এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, যদি লোক সফরে থাকে এবং তার সাথে মালধন থাকে, এমতাবস্থায় তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে, তবে মুসলমানদের মধ্যে দুটি লোককে পেলে সে স্বীয় পরিত্যক্ত সম্পদ তাদের কাছে সমর্পণ করবে এবং দু’জন মুসলমানকে ওর উপর সাক্ষীও রাখবে। এটা ছিল ওসী নিযুক্ত করার অবস্থা। (আরবী) -এর ভাবার্থ এই যে, এ দু’জন মুসলমান সাক্ষী নিযুক্ত হবে। আয়াতে কারীমার পূর্ব সম্পর্ক দ্বারা এটাই প্রকাশ পাচ্ছে। সুতরাং যদি এ দু’জন মুসলমানের সাথে তৃতীয় কোন মুসলমান উপস্থিত না থাকে তবে অসিয়ত ও সাক্ষ্য এ বিশেষণও এ দু'জনের মধ্যেই একত্রিত হয়ে যাবে। যেমন তামীমুদ্দারী ও আদী ইবনে বিদার কাহিনীতে সত্বরই এর বর্ণনা আসছে ইনশাআল্লাহ।(আরবী) ‘তোমরা ঐ দু'জনকে নামাযের পর রুখে নাও। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসর নামায বুঝানো হয়েছে। ইমাম যুহরী (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে ঐ দু’জন মুসলমানের মাযহাবী নামায। ভাবার্থ এই যে, এ দু’জন সাক্ষী নামাযের পর একত্রিত হবে যাতে বেশী লোকের সমাবেশে এ সাক্ষ্যদান কার্য সম্পন্ন হতে পারে। (আরবী) অর্থাৎ সাক্ষীদ্বয় সাক্ষ্যদানের সময় আল্লাহর নামে শপথ করবে। (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমাদের সন্দেহ হয় যে, তারা দু'জন ভুল বর্ণনা দেবে বা খিয়ানত করবে, তবে ঐ সাক্ষীদ্বয়কে সেই সময় আল্লাহর নামে শপথ করে বলতে হবেঃ আমরা মিথ্যা শপথের বিনিময়ে এই নশ্বর জগতের সামান্য অর্থ উপার্জন করবো না, যদিও আমাদের এ শপথের কারণে আমাদের নিকট আত্মীয়েরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (আরবী) অর্থাৎ আমরা আল্লাহর (আদিষ্ট) সাক্ষ্যকে গোপন করবো না। সাক্ষ্যদান কার্যের গুরুত্ব বুঝাবার জন্যেই সাক্ষ্যের সম্বন্ধ আল্লাহর সঙ্গে লাগানো হয়েছে।(আরবী) অর্থাৎ যদি আমরা সাক্ষ্যে কোন প্রকার পরিবর্তন করি অথবা সম্পূর্ণরূপে তা গোপন করি তবে আমরা পাপীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।(আরবী) অর্থাৎ যদি ঐ দু’জন সাক্ষী ও ওসীর ব্যাপারে এটা প্রমাণিত হয় যে, তারা খিয়ানত করেছে এবং মৃত ব্যক্তির মাল উত্তরাধিকারীদের নিকট পৌছাতে গিয়ে কিছু আত্মসাৎ করেছে তবে যাদের প্রাপ্য নষ্ট হয়েছে তাদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী পূর্ববর্তী স্বাক্ষীদ্বয়ের স্থানে দাঁড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ যখন সঠিক সংবাদ দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, পূর্ববর্তী দু’জন সাক্ষী খিয়ানত করেছে, তবে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের মধ্য হতে দ’জন অতি নিকটবর্তী উত্তরাধিকারী দাড়িয়ে যাবে এবং আল্লাহর নামে শপথ করে বলবেঃ “আমাদের সাক্ষ্য তাদের (পূর্ববর্তী সাক্ষীদ্বয়ের) সাক্ষ্যের তুলনায় বিশুদ্ধতর। তারা দুজন বাস্তবিকই খিয়ানত করেছে এবং এ দোষারোপ করাতে আমরা মোটেই বাড়াবাড়ি করছি না। যদি আমরা মিথ্যা অপবাদ দেই তবে অবশ্যই আমরা পাপীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।" এটা যেন উত্তরাধিকারীদের পক্ষ হতে শপথ। যেমন হত্যাকারীদের পক্ষ হতে বেঈমানী সাব্যস্ত হলে নিহত ব্যক্তির অভিভাবকরা শপথ করে থাকে। এটা আহকামের বাবুল কাসামাতে স্থিরীকৃত হয়েছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বানী সাহম গোত্রের একটি লোক তামীমুদ্দারী ও আদী ইবনে বিদার সঙ্গে সফরে বেরিয়েছিল। অতঃপর সাহমী লোকটি এমন এক জায়গায় মৃত্যুবরণ করে যেখানে কোন মুসলমান ছিল না। যখন তারা দু'জন তার পরিত্যক্ত সম্পদ নিয়ে স্বদেশে ফিরে আসে তখন সাহমীর পরিবারের লোকেরা রৌপ্য নির্মিত একটি পেয়ালা অনুপস্থিত দেখে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের দুজনের শপথ গ্রহণ করেন। এরপর পেয়ালাটি মক্কায় পাওয়া যায়। তাদেরকে ঐ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা বলেঃ “আমরা এটা তামীম ও আদীর নিকট হতে ক্রয় করে নিয়েছি। তারপর সাহমীর অভিভাবকদের মধ্য হতে দু’জন লোক দাঁড়িয়ে যায় এবং শপথ করে বলেঃ “নিশ্চয়ই আমাদের দুজনের শপথ এদের দু'জনের শপথ অপেক্ষা বেশী সত্য। নিশ্চয়ই পেয়ালাটি আমাদের সঙ্গীরই বটে।" তাদের ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) তাখরীজ করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন) আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) শাবী (রঃ) হতে যে ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন তা এ ঘটনাটির সত্যতা প্রমাণ করে। ঘটনাটি এই যে, বিদেশে একজন মুসলমানের মৃত্যু ঘটে। ওসী নিযুক্ত করার মত কোন মুসলমান সেখানে ছিল না। তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত লোকটি আহলে কিতাবের মধ্য হতে দু’জন লোককে ওসী নিযুক্ত করে। ঐ লোক দুটি কুফায় হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হাযির হয় এবং মৃত লোকটির পরিত্যক্ত সম্পদ তাঁর নিকট পেশ করে। এ দেখে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “এরূপই একটি ঘটনা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সময় ঘটেছিল। এখন এটা হচ্ছে দ্বিতীয় ঘটনা।” সুতরাং আসরের নামাযের পর লোক দু'টিকে শপথ করানো হয়। তারা শপথ করে বলেঃ “আমরা না খিয়ানত করেছি, না মিথ্যা বলছি, না কিছু আত্মসাৎ করেছি, বরং এটাই হচ্ছে মৃত ব্যক্তির সম্পদ।” তখন তাদের শপথকে সত্য বলে মেনে নেয়া হয় এবং তাদের সাক্ষ্য অনুযায়ীই হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) ফায়সালা করেন। নবী (সঃ)-এর যুগে এরূপই ঘটনা দ্বারা তামীম ও আদীর ঘটনাকে বুঝানো হয়েছে। বলা হয়েছে, তামীমুদ্দারী (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা হচ্ছে নবম হিজরীর। আর আশআরী (রাঃ) সম্পৰ্কীয় ঘটনাটি হচ্ছে অন্য ঘটনা। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এ আয়াতে নির্দেশ রয়েছে যে, মরণশয্যায় শায়িত ব্যক্তি দু’জন ওসী নিযুক্ত করবে এবং দু’জন মুসলমানকে সাক্ষী রাখবে। এটা হচ্ছে বাড়ীতে অবস্থানরত সময়ের মাসআলা। (আরবী) এ আয়াতের উপর ভিত্তি করেই একথা বলা হচ্ছে। আর সফরের ব্যাপারে বলা হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা সফরে থাক এবং সেই সময় তোমাদের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়, আর কোন মুসলমান সেখানে উপস্থিত না থাকে তবে সে যেন ইয়াহূদী, নাসারা যা মাজুসীদের মধ্যে হতে দু’জন লোককে ওসী নিযুক্ত করে এবং পরিত্যক্ত সম্পদ তাদের নিকট সমর্পণ করে। এখন যদি মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসরা ঐ ওসীদ্বয়কে স্বীকার করে নেয় তবে তো ভালোই। নচেৎ বাদশাহর কাছে মোকাদ্দমা পেশ করতে হবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ যদি তাদের সাক্ষ্যের সত্যতায় তোমাদের সন্দেহ হয় তবে নামাযের পর তাদেরকে শপথ করিয়ে নাও। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন খ্রীষ্টান সাক্ষীদ্বয়কে অস্বীকার করেছিল এবং তাদেরকে ভয় দেখিয়েছিল ও ধমকিয়ে ছিল। তখন আবু মূসা (রাঃ) ঐ। স্বাক্ষীদ্বয়কে আসরের নামাযের পর শপথ করিয়েছিলেন। তখন আমি বলেছিলাম- তাদের কাছে আমাদের নামাযের মর্যাদা কি আছে? তাদেরকে তো তাদের নামাযের শপথ করানো উচিত। সুতরাং তারা দু'জন তাদের মাযহাবের নিময় অনুযায়ী নামায পড়ার পর শপথ করে বললোঃ “আমরা সামান্য শপথের জন্য আমাদের কসমকে বিক্রি করবো না, নতুবা আমরা পাপী হয়ে যাবো। তোমাদের সঙ্গী এ অসিয়তই করেছিল এবং এটাই তার পরিত্যক্ত সম্পদ। শপথ করার পর্বে ইমাম তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন- “যদি তোমরা গোপন করে রাখো বা খিয়ানত কর তবে স্বীয় কওমের নিকট তোমরা অপদস্ত হবে এবং এরপর আর কখনও তোমাদের সাক্ষ্য কবুল করা হবে না। আর তোমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে।”(আরবী) অর্থাৎ এটাই এমন এক পন্থা যে, এতে সাক্ষী ঘটনা অনুযায়ী তার সাক্ষ্য প্রদান করবে এবং তার এ ভয় থাকবে যে, যদি সে ঘটনা অনুযায়ী সাক্ষ্য প্রদান না করে তবে মুসলমানদের সাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে তাদের শপথকে বাতিল করে দেয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যদি জানতে পারা যায় যে, তারা অবৈধ পন্থায় সত্যকে গোপন করেছে। তবে তাদের স্থলে যাদের হক নষ্ট হয়েছে তাদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী দাড়িয়ে যাবে এবং তারা শপথ করে বলবে যে, কাফিরদের শপথ বাতিল এবং তারা বাড়াবাড়ি করছে না। এখন কাফিরদের সাক্ষ্য বাতিল করে দিয়ে মৃত ব্যক্তির অলীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। অধিকাংশ আইম্মায়ে তাবেঈন, পূর্ববর্তী গুরুজন এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) প্রমুখের এটাই মাযহাব।(আরবী) অর্থাৎ এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা আল্লাহর শপথের সম্মানার্থে এবং অপদস্ত হওয়ার ভয়ে যে মতের ওয়ারিসরা তাদের কসমের মাধ্যমে তাদের কসমকে রদ করে দেবে এবং তাদেরকে শাস্তিও প্রদান করা হবে। তারা সত্য কথাই বলবে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা তোমাদের সমস্ত কাজে আল্লাহকে ভয় কর এবং (আরবী) অর্থাৎ তার আনুগত্য স্বীকার করে চল।(আরবী) অর্থাৎ যারা আল্লাহর আনুগত্য ও শরীয়তের অনুসরণ হতে বেরিয়ে যায় তিনি তাদেরকে সুপথ লাভের তাওফীক দেন না।

আল-মায়িদা 5:108

১০৬-১০৮ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতে কারীমা স্বাভাবিক হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এ আয়াতটি মানসূখ’ বা রহিত হয়ে গেছে। তারকীবে নাহবীর দিক দিয়ে (আরবী) শব্দটি বা বিধেয়। আর (আরবী) বাক্যের মধ্যে (আরবী) বা উদ্দেশ্য হবে। অর্থাৎ বাক্যটি (আরবী) এরূপ ছিল। দ্বিতীয় (আরবী) শব্দটি (আরবী) রূপে ছিল যা লোপ করা হয়েছে এবং (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) শব্দটিকেই ওর স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, এরূপ মনে করতে হবে। এ অবস্থায় (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের (আরবী) বা বিশেষণ হবে। (আরবী) দ্বারা (আরবী) বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, দ্বারা অসিয়ত কারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। আর (আরবী) দ্বারা (আরবী) বা আহলে কিতাবদেরকে বুঝানো হয়েছে। (এটা বলেছেন ইবনে জারীর (রঃ)) অর্থাৎ অসিয়তকারীর গোত্রের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী এবং আর দু’জন সাক্ষী হবে অন্য গোত্রের মধ্য হতে। (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে-যখন তোমরা সফরে থাকবে এবং ঐ অবস্থায় তোমাদের মৃত্যু এসে যাবে তখন তোমরা মুসলমানদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখবে। আর মুসলমান পাওয়া না গেলে অমুসলিম হলেও চলবে। এখানে এ কথা বের হচ্ছে যে, সফরে অসিয়তের সময় মুসলমান বিদ্যমান না থাকলে যিম্মীদেরকে সাক্ষী বানানো যেতে পারে। শুরাইহ্ (রঃ) বলেন যে, সফর ও অসিয়তের সময় ছাড়া অন্য কোন সময় ইয়াহুদী ও নাসারাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। আইম্মায়ে সালাসা বা ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) ছাড়া বাকী তিনজন ইমাম এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তারা বলেন যে, কোন অবস্থাতেই মুসলিমের উপর অমুসলিমের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) যিম্মীর উপর যিম্মীর সাক্ষ্য বৈধ বলেছেন।ইমাম যুহরী (রঃ)-এর উক্তি নকল করে ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, বাসস্থানে বা সফরে কাফিরের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য না হওয়াই সুন্নাত তরীকা। সাক্ষ্য প্রদানের অধিকার শুধু মুসলমানেরই রয়েছে। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন একটি লোক মারা গিয়েছিল এবং সেখানে সে সময় কোন মুসলমান বিদ্যমান ছিল না। ওটা ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগের ঘটনা। ঐ সময় সমস্ত শহর ছিল অমসলিমদের দখলে এবং সব লোকই ছিল কাফির। উত্তরাধিকারের কোন নিয়ম-কানুনও তখন চালু ছিল না। ওটা অসিয়ত হিসেবে বন্টিত হতো। তারপর অসিয়ত মানসূখ হয়ে যায় এবং ফারায়েয (উত্তরাধিকারীদের অংশ) ফরয করা হয়। অতঃপর লোকেরা উত্তরাধিকারের নিয়ম-কানুনের উপর আমল করতে শুরু করে। এ বিষয়ে চিন্তাভাবনার অবকাশ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা দু’জন ওসীকে বুঝানো হয়েছে, কি দু’জন সাক্ষীকে বুঝানো হয়েছে এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, যদি লোক সফরে থাকে এবং তার সাথে মালধন থাকে, এমতাবস্থায় তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে, তবে মুসলমানদের মধ্যে দুটি লোককে পেলে সে স্বীয় পরিত্যক্ত সম্পদ তাদের কাছে সমর্পণ করবে এবং দু’জন মুসলমানকে ওর উপর সাক্ষীও রাখবে। এটা ছিল ওসী নিযুক্ত করার অবস্থা। (আরবী) -এর ভাবার্থ এই যে, এ দু’জন মুসলমান সাক্ষী নিযুক্ত হবে। আয়াতে কারীমার পূর্ব সম্পর্ক দ্বারা এটাই প্রকাশ পাচ্ছে। সুতরাং যদি এ দু’জন মুসলমানের সাথে তৃতীয় কোন মুসলমান উপস্থিত না থাকে তবে অসিয়ত ও সাক্ষ্য এ বিশেষণও এ দু'জনের মধ্যেই একত্রিত হয়ে যাবে। যেমন তামীমুদ্দারী ও আদী ইবনে বিদার কাহিনীতে সত্বরই এর বর্ণনা আসছে ইনশাআল্লাহ।(আরবী) ‘তোমরা ঐ দু'জনকে নামাযের পর রুখে নাও। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আসর নামায বুঝানো হয়েছে। ইমাম যুহরী (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে ঐ দু’জন মুসলমানের মাযহাবী নামায। ভাবার্থ এই যে, এ দু’জন সাক্ষী নামাযের পর একত্রিত হবে যাতে বেশী লোকের সমাবেশে এ সাক্ষ্যদান কার্য সম্পন্ন হতে পারে। (আরবী) অর্থাৎ সাক্ষীদ্বয় সাক্ষ্যদানের সময় আল্লাহর নামে শপথ করবে। (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমাদের সন্দেহ হয় যে, তারা দু'জন ভুল বর্ণনা দেবে বা খিয়ানত করবে, তবে ঐ সাক্ষীদ্বয়কে সেই সময় আল্লাহর নামে শপথ করে বলতে হবেঃ আমরা মিথ্যা শপথের বিনিময়ে এই নশ্বর জগতের সামান্য অর্থ উপার্জন করবো না, যদিও আমাদের এ শপথের কারণে আমাদের নিকট আত্মীয়েরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (আরবী) অর্থাৎ আমরা আল্লাহর (আদিষ্ট) সাক্ষ্যকে গোপন করবো না। সাক্ষ্যদান কার্যের গুরুত্ব বুঝাবার জন্যেই সাক্ষ্যের সম্বন্ধ আল্লাহর সঙ্গে লাগানো হয়েছে।(আরবী) অর্থাৎ যদি আমরা সাক্ষ্যে কোন প্রকার পরিবর্তন করি অথবা সম্পূর্ণরূপে তা গোপন করি তবে আমরা পাপীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।(আরবী) অর্থাৎ যদি ঐ দু’জন সাক্ষী ও ওসীর ব্যাপারে এটা প্রমাণিত হয় যে, তারা খিয়ানত করেছে এবং মৃত ব্যক্তির মাল উত্তরাধিকারীদের নিকট পৌছাতে গিয়ে কিছু আত্মসাৎ করেছে তবে যাদের প্রাপ্য নষ্ট হয়েছে তাদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী পূর্ববর্তী স্বাক্ষীদ্বয়ের স্থানে দাঁড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ যখন সঠিক সংবাদ দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, পূর্ববর্তী দু’জন সাক্ষী খিয়ানত করেছে, তবে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের মধ্য হতে দ’জন অতি নিকটবর্তী উত্তরাধিকারী দাড়িয়ে যাবে এবং আল্লাহর নামে শপথ করে বলবেঃ “আমাদের সাক্ষ্য তাদের (পূর্ববর্তী সাক্ষীদ্বয়ের) সাক্ষ্যের তুলনায় বিশুদ্ধতর। তারা দুজন বাস্তবিকই খিয়ানত করেছে এবং এ দোষারোপ করাতে আমরা মোটেই বাড়াবাড়ি করছি না। যদি আমরা মিথ্যা অপবাদ দেই তবে অবশ্যই আমরা পাপীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।" এটা যেন উত্তরাধিকারীদের পক্ষ হতে শপথ। যেমন হত্যাকারীদের পক্ষ হতে বেঈমানী সাব্যস্ত হলে নিহত ব্যক্তির অভিভাবকরা শপথ করে থাকে। এটা আহকামের বাবুল কাসামাতে স্থিরীকৃত হয়েছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বানী সাহম গোত্রের একটি লোক তামীমুদ্দারী ও আদী ইবনে বিদার সঙ্গে সফরে বেরিয়েছিল। অতঃপর সাহমী লোকটি এমন এক জায়গায় মৃত্যুবরণ করে যেখানে কোন মুসলমান ছিল না। যখন তারা দু'জন তার পরিত্যক্ত সম্পদ নিয়ে স্বদেশে ফিরে আসে তখন সাহমীর পরিবারের লোকেরা রৌপ্য নির্মিত একটি পেয়ালা অনুপস্থিত দেখে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের দুজনের শপথ গ্রহণ করেন। এরপর পেয়ালাটি মক্কায় পাওয়া যায়। তাদেরকে ঐ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা বলেঃ “আমরা এটা তামীম ও আদীর নিকট হতে ক্রয় করে নিয়েছি। তারপর সাহমীর অভিভাবকদের মধ্য হতে দু’জন লোক দাঁড়িয়ে যায় এবং শপথ করে বলেঃ “নিশ্চয়ই আমাদের দুজনের শপথ এদের দু'জনের শপথ অপেক্ষা বেশী সত্য। নিশ্চয়ই পেয়ালাটি আমাদের সঙ্গীরই বটে।" তাদের ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) তাখরীজ করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন) আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) শাবী (রঃ) হতে যে ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন তা এ ঘটনাটির সত্যতা প্রমাণ করে। ঘটনাটি এই যে, বিদেশে একজন মুসলমানের মৃত্যু ঘটে। ওসী নিযুক্ত করার মত কোন মুসলমান সেখানে ছিল না। তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত লোকটি আহলে কিতাবের মধ্য হতে দু’জন লোককে ওসী নিযুক্ত করে। ঐ লোক দুটি কুফায় হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হাযির হয় এবং মৃত লোকটির পরিত্যক্ত সম্পদ তাঁর নিকট পেশ করে। এ দেখে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “এরূপই একটি ঘটনা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সময় ঘটেছিল। এখন এটা হচ্ছে দ্বিতীয় ঘটনা।” সুতরাং আসরের নামাযের পর লোক দু'টিকে শপথ করানো হয়। তারা শপথ করে বলেঃ “আমরা না খিয়ানত করেছি, না মিথ্যা বলছি, না কিছু আত্মসাৎ করেছি, বরং এটাই হচ্ছে মৃত ব্যক্তির সম্পদ।” তখন তাদের শপথকে সত্য বলে মেনে নেয়া হয় এবং তাদের সাক্ষ্য অনুযায়ীই হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) ফায়সালা করেন। নবী (সঃ)-এর যুগে এরূপই ঘটনা দ্বারা তামীম ও আদীর ঘটনাকে বুঝানো হয়েছে। বলা হয়েছে, তামীমুদ্দারী (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা হচ্ছে নবম হিজরীর। আর আশআরী (রাঃ) সম্পৰ্কীয় ঘটনাটি হচ্ছে অন্য ঘটনা। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এ আয়াতে নির্দেশ রয়েছে যে, মরণশয্যায় শায়িত ব্যক্তি দু’জন ওসী নিযুক্ত করবে এবং দু’জন মুসলমানকে সাক্ষী রাখবে। এটা হচ্ছে বাড়ীতে অবস্থানরত সময়ের মাসআলা। (আরবী) এ আয়াতের উপর ভিত্তি করেই একথা বলা হচ্ছে। আর সফরের ব্যাপারে বলা হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ যদি তোমরা সফরে থাক এবং সেই সময় তোমাদের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়, আর কোন মুসলমান সেখানে উপস্থিত না থাকে তবে সে যেন ইয়াহূদী, নাসারা যা মাজুসীদের মধ্যে হতে দু’জন লোককে ওসী নিযুক্ত করে এবং পরিত্যক্ত সম্পদ তাদের নিকট সমর্পণ করে। এখন যদি মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসরা ঐ ওসীদ্বয়কে স্বীকার করে নেয় তবে তো ভালোই। নচেৎ বাদশাহর কাছে মোকাদ্দমা পেশ করতে হবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ যদি তাদের সাক্ষ্যের সত্যতায় তোমাদের সন্দেহ হয় তবে নামাযের পর তাদেরকে শপথ করিয়ে নাও। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন খ্রীষ্টান সাক্ষীদ্বয়কে অস্বীকার করেছিল এবং তাদেরকে ভয় দেখিয়েছিল ও ধমকিয়ে ছিল। তখন আবু মূসা (রাঃ) ঐ। স্বাক্ষীদ্বয়কে আসরের নামাযের পর শপথ করিয়েছিলেন। তখন আমি বলেছিলাম- তাদের কাছে আমাদের নামাযের মর্যাদা কি আছে? তাদেরকে তো তাদের নামাযের শপথ করানো উচিত। সুতরাং তারা দু'জন তাদের মাযহাবের নিময় অনুযায়ী নামায পড়ার পর শপথ করে বললোঃ “আমরা সামান্য শপথের জন্য আমাদের কসমকে বিক্রি করবো না, নতুবা আমরা পাপী হয়ে যাবো। তোমাদের সঙ্গী এ অসিয়তই করেছিল এবং এটাই তার পরিত্যক্ত সম্পদ। শপথ করার পর্বে ইমাম তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন- “যদি তোমরা গোপন করে রাখো বা খিয়ানত কর তবে স্বীয় কওমের নিকট তোমরা অপদস্ত হবে এবং এরপর আর কখনও তোমাদের সাক্ষ্য কবুল করা হবে না। আর তোমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে।”(আরবী) অর্থাৎ এটাই এমন এক পন্থা যে, এতে সাক্ষী ঘটনা অনুযায়ী তার সাক্ষ্য প্রদান করবে এবং তার এ ভয় থাকবে যে, যদি সে ঘটনা অনুযায়ী সাক্ষ্য প্রদান না করে তবে মুসলমানদের সাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে তাদের শপথকে বাতিল করে দেয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যদি জানতে পারা যায় যে, তারা অবৈধ পন্থায় সত্যকে গোপন করেছে। তবে তাদের স্থলে যাদের হক নষ্ট হয়েছে তাদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী দাড়িয়ে যাবে এবং তারা শপথ করে বলবে যে, কাফিরদের শপথ বাতিল এবং তারা বাড়াবাড়ি করছে না। এখন কাফিরদের সাক্ষ্য বাতিল করে দিয়ে মৃত ব্যক্তির অলীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। অধিকাংশ আইম্মায়ে তাবেঈন, পূর্ববর্তী গুরুজন এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) প্রমুখের এটাই মাযহাব।(আরবী) অর্থাৎ এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা আল্লাহর শপথের সম্মানার্থে এবং অপদস্ত হওয়ার ভয়ে যে মতের ওয়ারিসরা তাদের কসমের মাধ্যমে তাদের কসমকে রদ করে দেবে এবং তাদেরকে শাস্তিও প্রদান করা হবে। তারা সত্য কথাই বলবে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা তোমাদের সমস্ত কাজে আল্লাহকে ভয় কর এবং (আরবী) অর্থাৎ তার আনুগত্য স্বীকার করে চল।(আরবী) অর্থাৎ যারা আল্লাহর আনুগত্য ও শরীয়তের অনুসরণ হতে বেরিয়ে যায় তিনি তাদেরকে সুপথ লাভের তাওফীক দেন না।

আল-মায়িদা 5:109

নবী রাসূলদেরকে যেসব কওমের নিকট পাঠানো হয়েছিল তারা তাঁদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছিল কি দেয়নি সে সম্পর্কে আল্লাহ তাদেরকে কিয়ামতের দিন কিভাবে সম্বোধন করবেন তাই এ আয়াতে বলা হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ “যাদের কাছে রাসূলদের পাঠানো হয়েছিলো তাদেরকেও আমি জিজ্ঞেস করবো এবং রাসূলদেরকেও জিজ্ঞেস করবো।” অন্যত্র বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রভুর শপথ! আমি তাদের সকলকেই তাদের আমল সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞেস করবো।”(১৫:৯২) রাসূলগণ উত্তরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের কিছুই জানা নেই।” সেদিনের ভয়াবহ অবস্থা দেখেই তাঁদের এ উত্তর হবে। তারা সেদিন ভীত-সন্ত্রস্ত হবেন বলেই তাদের মুখ দিয়ে কোন উত্তর বের হবে না। বরং বলে ফেলবেন- “আমাদের কিছুই জানা নেই।” অতঃপর যখন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন, তখন নিজের কওম সম্পর্কে সঠিক সাক্ষ্য প্রদান করবেন। কিন্তু তাদের প্রথম উক্তি এরূপই হবে- “হে আল্লাহ! আমরা তো এ সম্পর্কে কিছুই বলতে পারবো না। আপনি তো আলেমুল গায়েব। আপনার মোকাবিলায় আমাদের জ্ঞান থাকতে পারে? এতে কোনই সন্দেহ নেই যে, ভদ্রতা হিসেবে এটা অতি উত্তম জবাবই বটে- “আপনার ব্যাপক জ্ঞানের কাছে আমাদের জ্ঞান অতি তুচ্ছ ও নগণ্য। আমাদের জ্ঞানের ভিত্তি হচ্ছে শুধুমাত্র বাহিকের উপর। পক্ষান্তরে আপনার জ্ঞান আভ্যন্তরীণ সংবাদও রাখে। কেননা, আপনি হচ্ছেন ‘আল্লামুল গুয়ূব বা অদৃশ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত। সুতরাং আমাদের উম্মতবর্গ কি জবাব দিয়েছিল তা আপনি ভাল জানেন। কে যে কপটতামূলক আমল করেছে এবং কে বিশ্বাসমূলক কাজ করেছে এই জ্ঞান তো আমাদের নেই, বরং আপনারই আছে।”

আল-মায়িদা 5:110

১১০-১১১ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা ঐ সমুদয় মুজিযারূপ নিয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন, যেগুলো ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর উপর তিনি অবতীর্ণ করেছিলেন। তিনি হযরত ঈসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলেন, হে ঈসা (আঃ)! আমি যে তোমাকে নিয়ামতগুলো প্রদান করেছি সেগুলো তুমি স্মরণ কর। আমি তোমাকে পিতা ব্যতিরেকেই সৃষ্টি করেছি এবং তোমার সত্তাকে আমার ক্ষমতার পরিপূর্ণতার একটা নিদর্শন করেছি। আর তোমার মায়ের উপরও ইহসান করেছি এইভাবে যে, তোমাকে তার পবিত্রতার দলীল বানিয়েছি এবং মূর্খ ও অত্যাচারী লোকেরা তার উপর যে নির্লজ্জতার অপবাদ দিয়েছিল তা থেকে তাকে রক্ষা করেছি। তোমাকে আমি রূহুল কুদুস অর্থাৎ জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে সাহায্য করেছি। আমি তোমাকে তোমার শৈশবে ও যৌবনে এমনিভাবে নবী ও আল্লাহর পথে আহ্বানকারী বানিয়েছি যে, তুমি দোলনা থেকেই কথা বলতে শুরু করে দিয়েছে এবং তোমার মাতার পবিত্রতার সাক্ষ্য প্রদান করেছে, আর নিজেকে আল্লাহর দাস বলে স্বীকার করে নিয়েছো। শৈশব ও যৌবনেও মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দিয়েছো। পৌঢ় বয়সে কথা বলা বিস্ময়কর নয় বটে কিন্তু দোলনা থেকে কথা কতইনা বিস্ময়কর ব্যাপার। আল্লাহ পাক তোমাকে কিতাবের তা'লীম দিয়েছেন এবং মূসা (আঃ)-এর উপর অবতারিত তাওরাতের লিখা ও পড়া শিক্ষা দিয়েছেন।(আরবী) অর্থাৎ তুমি আমার আদেশে মাটি দ্বারা পাখীর আকৃতি সদৃশ একটি আকৃতি তৈরী করতে এবং ফুৎকার দিতে। তখন তা আমারই আদেশে জীবিত পাখী হয়ে উড়তে শুরু করতো।(আরবী) সূরায়ে আলে ইমরানে এর উপর আলোচনা হয়ে গেছে। সুতরাং এখানে আর পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই।(আরবী) অর্থাৎ তুমি মৃতদেরকে ডাকতে তখন তারা আল্লাহর হুকুমে জীবিত হয়ে কবর হতে বেরিয়ে আসতো। (আরবী) অর্থাৎ হে ঈসা (আঃ)! আমার ঐ নিয়ামতের কথা স্মরণ কর যে, যখন তুমি বানী ইসরাঈলের নিকট নবুওয়াতের দলীলসহ পৌছলে এবং তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, তোমার উপর অপবাদ দিলো, তোমাকে যাদুকর বললো এবং তোমাকে হত্যা করার ও শূলি দেয়ার চেষ্টা করলো, তখন আমি তোমাকে তাদের থেকে বাঁচিয়ে নিলাম, এরপর তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে নিলাম। এটা এ কথাই প্রমাণ করে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর আল্লাহর এ অনুগ্রহ তাঁকে তাঁর নিকট উঠিয়ে নেয়ার পরের ঘটনা, কিংবা এটা কিয়ামতের দিন সংঘটিত হবে। কিন্তু ভবিষ্যতকালকে অতীত কালের রূপ দ্বারা তা'বীর করা হয়েছে। কেননা, আল্লাহ তাআলার কাছে অতীত কালের ন্যায় ভবিষ্যত কালও নিশ্চিতরূপে অনুষ্ঠিতব্য। এসব হচ্ছে অদৃশ্যের ঘটনা, যেগুলো সম্পর্কে মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল মুহাম্মাদ (সঃ)-কে অবহিত করেছেন।(আরবী) এটাও হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রতি আল্লাহ পাকের একটা অনুগ্রহ যে, তিনি তার জন্যে সঙ্গী-সাথী ও সাহায্যকারী ঠিক করে দিয়েছেন। এখানে অহীর অর্থ হচ্ছে অন্তরের মধ্যে কিছু ভরে দেয়া। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি মূসা (আঃ)-এর মায়ের কাছে অহী পাঠিয়েছিলাম-মূসা (আঃ)-কে দুধ পান করাও।' (২৮৪৭) এরূপ ইলহামকে সর্বসম্মতভাবে অহী বলা হয়েছে। আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি মৌমাছির নিকট অহী পাঠিয়েছিলাম-পাহাড়সমূহে তোমাদের ঘর তৈরী কর। (১৬:৬৮) এভাবে হাওয়ারীদের উপর আল্লাহ ইলহাম করেছিলেন, তখন তারা ইলহামকৃত হুকুম মান্য করেছিল! হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মহা মহিমান্বিত আল্লাহ তাদের উপর ইলহাম করেছিলেন। সুদী (রঃ) বলেন যে, তিনি তাদের অন্তরে ওটা নিক্ষেপ করেছিলেন। এর ভাবার্থ এও হতে পারে-আমি তোমার মাধ্যমে তাদের কাছে অহী করেছিলাম এবং তাদেরকে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের আহ্বান জানিয়েছিলাম। তখন তারা তা কবুল করে নিয়েছিল এবং বলেছিল (আরবী) (হে ঈসা আঃ!) আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা আত্মসমর্পণকারী হয়ে গেলাম।

আল-মায়িদা 5:111

১১০-১১১ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা ঐ সমুদয় মুজিযারূপ নিয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন, যেগুলো ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর উপর তিনি অবতীর্ণ করেছিলেন। তিনি হযরত ঈসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলেন, হে ঈসা (আঃ)! আমি যে তোমাকে নিয়ামতগুলো প্রদান করেছি সেগুলো তুমি স্মরণ কর। আমি তোমাকে পিতা ব্যতিরেকেই সৃষ্টি করেছি এবং তোমার সত্তাকে আমার ক্ষমতার পরিপূর্ণতার একটা নিদর্শন করেছি। আর তোমার মায়ের উপরও ইহসান করেছি এইভাবে যে, তোমাকে তার পবিত্রতার দলীল বানিয়েছি এবং মূর্খ ও অত্যাচারী লোকেরা তার উপর যে নির্লজ্জতার অপবাদ দিয়েছিল তা থেকে তাকে রক্ষা করেছি। তোমাকে আমি রূহুল কুদুস অর্থাৎ জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে সাহায্য করেছি। আমি তোমাকে তোমার শৈশবে ও যৌবনে এমনিভাবে নবী ও আল্লাহর পথে আহ্বানকারী বানিয়েছি যে, তুমি দোলনা থেকেই কথা বলতে শুরু করে দিয়েছে এবং তোমার মাতার পবিত্রতার সাক্ষ্য প্রদান করেছে, আর নিজেকে আল্লাহর দাস বলে স্বীকার করে নিয়েছো। শৈশব ও যৌবনেও মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দিয়েছো। পৌঢ় বয়সে কথা বলা বিস্ময়কর নয় বটে কিন্তু দোলনা থেকে কথা কতইনা বিস্ময়কর ব্যাপার। আল্লাহ পাক তোমাকে কিতাবের তা'লীম দিয়েছেন এবং মূসা (আঃ)-এর উপর অবতারিত তাওরাতের লিখা ও পড়া শিক্ষা দিয়েছেন।(আরবী) অর্থাৎ তুমি আমার আদেশে মাটি দ্বারা পাখীর আকৃতি সদৃশ একটি আকৃতি তৈরী করতে এবং ফুৎকার দিতে। তখন তা আমারই আদেশে জীবিত পাখী হয়ে উড়তে শুরু করতো।(আরবী) সূরায়ে আলে ইমরানে এর উপর আলোচনা হয়ে গেছে। সুতরাং এখানে আর পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই।(আরবী) অর্থাৎ তুমি মৃতদেরকে ডাকতে তখন তারা আল্লাহর হুকুমে জীবিত হয়ে কবর হতে বেরিয়ে আসতো। (আরবী) অর্থাৎ হে ঈসা (আঃ)! আমার ঐ নিয়ামতের কথা স্মরণ কর যে, যখন তুমি বানী ইসরাঈলের নিকট নবুওয়াতের দলীলসহ পৌছলে এবং তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, তোমার উপর অপবাদ দিলো, তোমাকে যাদুকর বললো এবং তোমাকে হত্যা করার ও শূলি দেয়ার চেষ্টা করলো, তখন আমি তোমাকে তাদের থেকে বাঁচিয়ে নিলাম, এরপর তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে নিলাম। এটা এ কথাই প্রমাণ করে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর আল্লাহর এ অনুগ্রহ তাঁকে তাঁর নিকট উঠিয়ে নেয়ার পরের ঘটনা, কিংবা এটা কিয়ামতের দিন সংঘটিত হবে। কিন্তু ভবিষ্যতকালকে অতীত কালের রূপ দ্বারা তা'বীর করা হয়েছে। কেননা, আল্লাহ তাআলার কাছে অতীত কালের ন্যায় ভবিষ্যত কালও নিশ্চিতরূপে অনুষ্ঠিতব্য। এসব হচ্ছে অদৃশ্যের ঘটনা, যেগুলো সম্পর্কে মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল মুহাম্মাদ (সঃ)-কে অবহিত করেছেন।(আরবী) এটাও হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রতি আল্লাহ পাকের একটা অনুগ্রহ যে, তিনি তার জন্যে সঙ্গী-সাথী ও সাহায্যকারী ঠিক করে দিয়েছেন। এখানে অহীর অর্থ হচ্ছে অন্তরের মধ্যে কিছু ভরে দেয়া। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি মূসা (আঃ)-এর মায়ের কাছে অহী পাঠিয়েছিলাম-মূসা (আঃ)-কে দুধ পান করাও।' (২৮৪৭) এরূপ ইলহামকে সর্বসম্মতভাবে অহী বলা হয়েছে। আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি মৌমাছির নিকট অহী পাঠিয়েছিলাম-পাহাড়সমূহে তোমাদের ঘর তৈরী কর। (১৬:৬৮) এভাবে হাওয়ারীদের উপর আল্লাহ ইলহাম করেছিলেন, তখন তারা ইলহামকৃত হুকুম মান্য করেছিল! হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মহা মহিমান্বিত আল্লাহ তাদের উপর ইলহাম করেছিলেন। সুদী (রঃ) বলেন যে, তিনি তাদের অন্তরে ওটা নিক্ষেপ করেছিলেন। এর ভাবার্থ এও হতে পারে-আমি তোমার মাধ্যমে তাদের কাছে অহী করেছিলাম এবং তাদেরকে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের আহ্বান জানিয়েছিলাম। তখন তারা তা কবুল করে নিয়েছিল এবং বলেছিল (আরবী) (হে ঈসা আঃ!) আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা আত্মসমর্পণকারী হয়ে গেলাম।

আল-মায়িদা 5:112

১১২-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ‘মায়িদাহ বা খাবারের খাঞ্চার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। এ জন্যই এ সূরার নাম ‘মায়িদাহ' রাখা হয়েছে। এখানেও আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর তার ইহসানের কথা প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ তিনি খাবারের খাঞ্চা অবতরণের জন্যে দুআ করেছিলেন, সেই দুআ মহান আল্লাহ কবুল করেছিলেন। এটাও ছিল হযরত ঈসা (আঃ)-এর একটা মুজিযা এবং তাঁর নবুওয়াতের অকাট্য প্রমাণ। কোন কোন ইমাম বর্ণনা করেছেন যে, এ ঘটনা ই শীলে বর্ণিত হয়নি এবং একমাত্র মুসলমান ছাড়া খ্রীষ্টানেরাও এ সম্পর্কে অবহিত ছিল না, মুসলমানদের মাধ্যমেই তারা অবগত হয়েছে। আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ যখন হযরত ঈসা (আঃ)-এর অনুসারী হওয়ারীরা বলেছিল- “হে ঈসা (আঃ)! আপনার প্রভু কি আমাদের উপর আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করতে পারেন?” এখানে অধিকাংশ কারী (আরবী) পড়েছেন (অর্থাৎ আপনার প্রভু কি এতে সক্ষম?) অন্যান্য কারীরা (আরবী) পড়েছেন (অর্থাৎ আপনি কি এতে সক্ষম?) (আরবী) খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চাকে বলা হয়। কেউ কেউ বলেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গীরা তাদের অভাব ও দারিদ্রের তাড়নায় এ কথা বলেছিল যে, আল্লাহ তাআলা যেন প্রত্যহ তাদের উপর আকাশ থেকে খানাভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন, যা খেয়ে তারা ইবাদতের শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। তখন হযরত ঈসা (আঃ) তাদেরকে বলেছিলেনতোমরা যদি প্রকৃত মুমিন হয়ে থাক তবে আল্লাহকে ভয় কর এবং এরূপ প্রার্থনা করা থেকে বিরত হও। আহার্য চাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ পাকের উপর ভরসা। কর। হতে পারে যে, এ জিনিসই তোমাদের জন্যে ফিৎনা ফাসাদের কারণ হয়ে যাবে। তার এ কথা শুনে হাওয়ারীরা বলেছিল- “আমরা মহান আল্লাহর মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছি। আমাদের খাওয়ার প্রয়োজন। আর আমরা যখন আকাশ হতে অবতারিত খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা দেখতে পাবো তখন আমাদের মনে পূর্ণ প্রশান্তি নেমে আসবে। ফলে আপনার প্রতি আমাদের ঈমান দৃঢ় হবে এবং আপনি যে আল্লাহর রাসূল এ ব্যাপারে আমাদের আর কোন সন্দেহই থাকবে না। আর আমরা নিজেরাই সাক্ষী হয়ে যাবো যে, এটা আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে একটা বড় নিদর্শন এবং আপনার নবুওয়াত ও সত্যতার স্পষ্ট দলীল।” তখন হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা জানালেন- “হে আল্লাহ! আমাদের উপর আকাশ হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করুন! যেন ওটা আমাদের জন্যে অর্থাৎ যারা বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে এবং যারা পরে আসবে, সকলের জন্যেই আনন্দের বিষয় হয়।” সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- যেদিন ওটা অবতীর্ণ হবে সে দিনকে আমরা খুশীর দিন হিসাবে মর্যাদা দেবো এবং আমাদের পরবর্তী লোকেরাও ঐ দিনকে সম্মানিত দিন মনে করবে।' হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আমরা ঐ দিনে। নামায পড়বো।' কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে আমাদের পরবর্তীদের জন্যে এ দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।' হযরত সালমান ফারসী (রঃ) বলেন যে, এ কথা দ্বারা হযরত ঈসা (আঃ) বুঝাতে চেয়েছিলেন- “যেন ওটা আমাদের সবারই জন্যে একটা শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে যায় এবং রিসালাতের সত্যতার জন্যে সুস্পষ্ট দলীল হতে পারে। আর হে আল্লাহ! যেন ওটা আপনার পূর্ণ ক্ষমতার এবং আমার প্রার্থনা ককূল হওয়ার দলীল হিসাবে প্রকাশ পায়, যাতে জনগণ আমার রিসালাতের সত্যতা স্বীকার করে নিতে পারে।” “হে আল্লাহ! আপনার পক্ষ হতে আমাদের নিকট আমাদের কষ্ট ও পরিশ্রম ছাড়াই উত্তম খাদ্য প্রেরণ করুন, যেহেতু আপনি হচ্ছেন সর্বোত্তম আহার্য প্রদানকারী।”তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “ঠিক আছে, আমি তোমাদের কাছে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করছি। কিন্তু সাবধান! এর পরও যদি তোমার কওম কুফরী করে এবং অবাধ্যই থেকে যায় তবে আমি তাদেরকে এমন শাস্তি প্রদান করবো, যে শাস্তির স্বাদ বিশ্ববাসীর কেউই কখনও গ্রহণ করেনি বা করবেও না।”মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ কিয়ামতের দিন (ফেরেশতাদেরকে বলা হবে) ফিরআউনের দলবলকে কঠিনতম শাস্তির মধ্যে প্রবিষ্ট কর।' (৪০৪ ৪৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের নিম্নতম গহ্বরে অবস্থান করবে। (৪:১৪৫) ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেছেন- “কিয়ামতের দিন তিন প্রকারের লোককে কঠিনতম শাস্তি প্রদান করা হবে। (১) মুনাফিক, (২) খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়ার পরও যারা কুফরী। করেছিল এবং (৩) ফিরআউনের দলবল।” হাওয়ারীদের উপর খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে সেগুলো উল্লেখ করা হলোঃ আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে বললেনঃ “তোমরা কি ত্রিশদিন রোযা রাখতে পার? অতঃপর তোমরা আল্লাহ তাআলার নিকট খাঞ্চার জন্যে প্রার্থনা করবে এবং তিনি তোমাদেরকে তা প্রদান করবেন। কেননা, আমলকারীকে মহান আল্লাহ তার আমলের প্রতিদান দিয়ে থাকেন। তারা তখন তাই করলো। অতঃপর তারা বললোঃ “হে মঙ্গলের শিক্ষাদানকারী ঈসা (আঃ)! আপনি বলে থাকেন যে, আমলকারীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের আমলের প্রতিদান অবশ্যই প্রদান করে থাকেন। আপনি আমাদেরকে ত্রিশটি রোযা রাখতে বলেছিলেন, আমরা তা রেখেছি। ত্রিশদিন আমরা কারও চাকরী করলে সে আমাদেরকে খেতে দেয় বা বেতন দেয়। তাহলে এখন কি আপনার প্রভু আমাদের উপর খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করবেন?” তখন হযরত ঈসা (আঃ) বললেনঃ “তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক তবে আল্লাহকে ভয় কর।' হাওয়ারীরা তখন বললোঃ ‘আমরা তো শুধু আমাদের মনের প্রশান্তি চাচ্ছি এবং নিজেরা বিশ্বাস করে অন্যদের সামনেও সাক্ষী হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছি।' মোটকথা, শেষ পর্যন্ত আকাশ থেকে খাদ্যের খাঞ্চা অবতীর্ণ হলো, যাতে সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি ছিল। খাঞ্চাটি তাদের সামনে এসে থেমে গেলো। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত লোকই তা খেলো। ইবনে জারীর (রঃ) এরূপ বর্ণনা করেছেন। অনুরূপ বর্ণনা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) থেকেও বর্ণিত আছে। তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হাওয়ারীরা হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-কে বললোঃ আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের উপর আকাশ থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তখন ফেরেশতাগণ মায়িদাহ্ বা খাঞ্চা নিয়ে অবতীর্ণ হন। ঐ খাঞ্চায় সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি ছিল। খাঞ্চাটি তারা তাদের সামনে রেখে দেন। তা থেকে তাদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত লোকই ভক্ষণ করে।ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেন- “যে মায়েদাহ বা খাঞ্চাটি আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয়েছিল তাতে রুটি ও গোশত ছিল। তাদের উপর নির্দেশ ছিল যে, তারা যেন খিয়ানত না করে এবং পরবর্তী দিনের জন্যে উঠিয়ে না রাখে। কিন্তু তারা খিয়ানত করেছিল এবং জমা করে রেখেছিল। ফলে তাদের আকৃতি বিকৃত করে দিয়ে তাদেরকে বানর ও শূকরে পরিণত করা হয়েছিল।” মায়িদাহ্ সম্পৰ্কীয় যতগুলো হাদীস বর্ণিত রয়েছে, সবগুলো দ্বারাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, উক্ত মায়িদাহ বা খানাভর্তি খাঞ্চা হযরত ঈসা (আঃ)-এর যুগের বানী ইসরাঈলের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং ওটা ছিল আল্লাহর নিকট তাঁর প্রার্থনার ফল। আর এটা আল্লাহ তাআলার (আরবী) -এ আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে।কোন কোন উক্তিকারী এটাও উক্তি করেছেন যে, খাঞ্চা অবতীর্ণ হয়নি। হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হাসান (রঃ) বলতেন- যখন তাদেরকে (আরবী) -এ কথা বলা হলো তখন তারা বললোঃ “আমাদের এর প্রয়োজন নেই। ফলে তা আর অবতীর্ণ হলো না। কিন্তু জমহর উলামার মতে মায়িদাহ্ অবতীর্ণ হয়েছিল। ইবনে জারীরও (রঃ) এই মত পোষণ করেছেন। কেননা, মহান আল্লাহর (আরবী) –এ উক্তি দ্বারা এটাই প্রমাণিত হচ্ছে। তার ওয়াদা এবং ওয়াঈদ সত্য। আর এটা সত্য বলে অনুমিতও হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। পূর্ববর্তী গুরুজন থেকে যেসব খবর’ ও ‘আসার’ বর্ণিত হয়েছে সেগুলো দ্বারাও এটাই প্রমাণিত হয়। ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, কুরাইশরা নবী (সঃ)-কে বললোঃ আপনি আপনার প্রভুর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্যে সাফা পর্বতকে সোনা বানিয়ে দেন, তাহলে আমরা আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবো। তিনি বললেনঃ ‘সত্যি তোমরা ঈমান। আনবে তো?' তারা উত্তরে বললোঃ হঁ্যা। বর্ণনাকারী বলেন যে, নবী (সঃ) তখন আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানালেন। ইতিমধ্যে তাঁর নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়লেন- “তুমি যদি চাও তবে সকালেই সাফা পর্বত সোনায় পরিণত হয়ে যাবে। কিন্তু এর পরও তারা ঈমান না আনলে আমি তাদেরকে এমন শাস্তি প্রদান করবো যে শাস্তি আমি বিশ্ববাসীর আর কাউকে প্রদান করবো না। আর যদি তুমি চাও যে, আমি তাদের তাওবা কবুল করতঃ তাদের উপর করুণা বর্ষণ করি, তবে আমি তাই করবো।” তখন নবী (সঃ) বললেনঃ হে আমার প্রভু! আমি আপনার নিকট তাওবার কবুলিয়ত ও করুণাই কামনা করি।

আল-মায়িদা 5:113

১১২-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ‘মায়িদাহ বা খাবারের খাঞ্চার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। এ জন্যই এ সূরার নাম ‘মায়িদাহ' রাখা হয়েছে। এখানেও আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর তার ইহসানের কথা প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ তিনি খাবারের খাঞ্চা অবতরণের জন্যে দুআ করেছিলেন, সেই দুআ মহান আল্লাহ কবুল করেছিলেন। এটাও ছিল হযরত ঈসা (আঃ)-এর একটা মুজিযা এবং তাঁর নবুওয়াতের অকাট্য প্রমাণ। কোন কোন ইমাম বর্ণনা করেছেন যে, এ ঘটনা ই শীলে বর্ণিত হয়নি এবং একমাত্র মুসলমান ছাড়া খ্রীষ্টানেরাও এ সম্পর্কে অবহিত ছিল না, মুসলমানদের মাধ্যমেই তারা অবগত হয়েছে। আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ যখন হযরত ঈসা (আঃ)-এর অনুসারী হওয়ারীরা বলেছিল- “হে ঈসা (আঃ)! আপনার প্রভু কি আমাদের উপর আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করতে পারেন?” এখানে অধিকাংশ কারী (আরবী) পড়েছেন (অর্থাৎ আপনার প্রভু কি এতে সক্ষম?) অন্যান্য কারীরা (আরবী) পড়েছেন (অর্থাৎ আপনি কি এতে সক্ষম?) (আরবী) খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চাকে বলা হয়। কেউ কেউ বলেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গীরা তাদের অভাব ও দারিদ্রের তাড়নায় এ কথা বলেছিল যে, আল্লাহ তাআলা যেন প্রত্যহ তাদের উপর আকাশ থেকে খানাভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন, যা খেয়ে তারা ইবাদতের শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। তখন হযরত ঈসা (আঃ) তাদেরকে বলেছিলেনতোমরা যদি প্রকৃত মুমিন হয়ে থাক তবে আল্লাহকে ভয় কর এবং এরূপ প্রার্থনা করা থেকে বিরত হও। আহার্য চাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ পাকের উপর ভরসা। কর। হতে পারে যে, এ জিনিসই তোমাদের জন্যে ফিৎনা ফাসাদের কারণ হয়ে যাবে। তার এ কথা শুনে হাওয়ারীরা বলেছিল- “আমরা মহান আল্লাহর মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছি। আমাদের খাওয়ার প্রয়োজন। আর আমরা যখন আকাশ হতে অবতারিত খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা দেখতে পাবো তখন আমাদের মনে পূর্ণ প্রশান্তি নেমে আসবে। ফলে আপনার প্রতি আমাদের ঈমান দৃঢ় হবে এবং আপনি যে আল্লাহর রাসূল এ ব্যাপারে আমাদের আর কোন সন্দেহই থাকবে না। আর আমরা নিজেরাই সাক্ষী হয়ে যাবো যে, এটা আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে একটা বড় নিদর্শন এবং আপনার নবুওয়াত ও সত্যতার স্পষ্ট দলীল।” তখন হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা জানালেন- “হে আল্লাহ! আমাদের উপর আকাশ হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করুন! যেন ওটা আমাদের জন্যে অর্থাৎ যারা বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে এবং যারা পরে আসবে, সকলের জন্যেই আনন্দের বিষয় হয়।” সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- যেদিন ওটা অবতীর্ণ হবে সে দিনকে আমরা খুশীর দিন হিসাবে মর্যাদা দেবো এবং আমাদের পরবর্তী লোকেরাও ঐ দিনকে সম্মানিত দিন মনে করবে।' হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আমরা ঐ দিনে। নামায পড়বো।' কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে আমাদের পরবর্তীদের জন্যে এ দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।' হযরত সালমান ফারসী (রঃ) বলেন যে, এ কথা দ্বারা হযরত ঈসা (আঃ) বুঝাতে চেয়েছিলেন- “যেন ওটা আমাদের সবারই জন্যে একটা শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে যায় এবং রিসালাতের সত্যতার জন্যে সুস্পষ্ট দলীল হতে পারে। আর হে আল্লাহ! যেন ওটা আপনার পূর্ণ ক্ষমতার এবং আমার প্রার্থনা ককূল হওয়ার দলীল হিসাবে প্রকাশ পায়, যাতে জনগণ আমার রিসালাতের সত্যতা স্বীকার করে নিতে পারে।” “হে আল্লাহ! আপনার পক্ষ হতে আমাদের নিকট আমাদের কষ্ট ও পরিশ্রম ছাড়াই উত্তম খাদ্য প্রেরণ করুন, যেহেতু আপনি হচ্ছেন সর্বোত্তম আহার্য প্রদানকারী।”তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “ঠিক আছে, আমি তোমাদের কাছে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করছি। কিন্তু সাবধান! এর পরও যদি তোমার কওম কুফরী করে এবং অবাধ্যই থেকে যায় তবে আমি তাদেরকে এমন শাস্তি প্রদান করবো, যে শাস্তির স্বাদ বিশ্ববাসীর কেউই কখনও গ্রহণ করেনি বা করবেও না।”মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ কিয়ামতের দিন (ফেরেশতাদেরকে বলা হবে) ফিরআউনের দলবলকে কঠিনতম শাস্তির মধ্যে প্রবিষ্ট কর।' (৪০৪ ৪৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের নিম্নতম গহ্বরে অবস্থান করবে। (৪:১৪৫) ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেছেন- “কিয়ামতের দিন তিন প্রকারের লোককে কঠিনতম শাস্তি প্রদান করা হবে। (১) মুনাফিক, (২) খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়ার পরও যারা কুফরী। করেছিল এবং (৩) ফিরআউনের দলবল।” হাওয়ারীদের উপর খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে সেগুলো উল্লেখ করা হলোঃ আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে বললেনঃ “তোমরা কি ত্রিশদিন রোযা রাখতে পার? অতঃপর তোমরা আল্লাহ তাআলার নিকট খাঞ্চার জন্যে প্রার্থনা করবে এবং তিনি তোমাদেরকে তা প্রদান করবেন। কেননা, আমলকারীকে মহান আল্লাহ তার আমলের প্রতিদান দিয়ে থাকেন। তারা তখন তাই করলো। অতঃপর তারা বললোঃ “হে মঙ্গলের শিক্ষাদানকারী ঈসা (আঃ)! আপনি বলে থাকেন যে, আমলকারীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের আমলের প্রতিদান অবশ্যই প্রদান করে থাকেন। আপনি আমাদেরকে ত্রিশটি রোযা রাখতে বলেছিলেন, আমরা তা রেখেছি। ত্রিশদিন আমরা কারও চাকরী করলে সে আমাদেরকে খেতে দেয় বা বেতন দেয়। তাহলে এখন কি আপনার প্রভু আমাদের উপর খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করবেন?” তখন হযরত ঈসা (আঃ) বললেনঃ “তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক তবে আল্লাহকে ভয় কর।' হাওয়ারীরা তখন বললোঃ ‘আমরা তো শুধু আমাদের মনের প্রশান্তি চাচ্ছি এবং নিজেরা বিশ্বাস করে অন্যদের সামনেও সাক্ষী হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছি।' মোটকথা, শেষ পর্যন্ত আকাশ থেকে খাদ্যের খাঞ্চা অবতীর্ণ হলো, যাতে সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি ছিল। খাঞ্চাটি তাদের সামনে এসে থেমে গেলো। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত লোকই তা খেলো। ইবনে জারীর (রঃ) এরূপ বর্ণনা করেছেন। অনুরূপ বর্ণনা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) থেকেও বর্ণিত আছে। তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হাওয়ারীরা হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-কে বললোঃ আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের উপর আকাশ থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তখন ফেরেশতাগণ মায়িদাহ্ বা খাঞ্চা নিয়ে অবতীর্ণ হন। ঐ খাঞ্চায় সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি ছিল। খাঞ্চাটি তারা তাদের সামনে রেখে দেন। তা থেকে তাদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত লোকই ভক্ষণ করে।ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেন- “যে মায়েদাহ বা খাঞ্চাটি আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয়েছিল তাতে রুটি ও গোশত ছিল। তাদের উপর নির্দেশ ছিল যে, তারা যেন খিয়ানত না করে এবং পরবর্তী দিনের জন্যে উঠিয়ে না রাখে। কিন্তু তারা খিয়ানত করেছিল এবং জমা করে রেখেছিল। ফলে তাদের আকৃতি বিকৃত করে দিয়ে তাদেরকে বানর ও শূকরে পরিণত করা হয়েছিল।” মায়িদাহ্ সম্পৰ্কীয় যতগুলো হাদীস বর্ণিত রয়েছে, সবগুলো দ্বারাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, উক্ত মায়িদাহ বা খানাভর্তি খাঞ্চা হযরত ঈসা (আঃ)-এর যুগের বানী ইসরাঈলের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং ওটা ছিল আল্লাহর নিকট তাঁর প্রার্থনার ফল। আর এটা আল্লাহ তাআলার (আরবী) -এ আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে।কোন কোন উক্তিকারী এটাও উক্তি করেছেন যে, খাঞ্চা অবতীর্ণ হয়নি। হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হাসান (রঃ) বলতেন- যখন তাদেরকে (আরবী) -এ কথা বলা হলো তখন তারা বললোঃ “আমাদের এর প্রয়োজন নেই। ফলে তা আর অবতীর্ণ হলো না। কিন্তু জমহর উলামার মতে মায়িদাহ্ অবতীর্ণ হয়েছিল। ইবনে জারীরও (রঃ) এই মত পোষণ করেছেন। কেননা, মহান আল্লাহর (আরবী) –এ উক্তি দ্বারা এটাই প্রমাণিত হচ্ছে। তার ওয়াদা এবং ওয়াঈদ সত্য। আর এটা সত্য বলে অনুমিতও হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। পূর্ববর্তী গুরুজন থেকে যেসব খবর’ ও ‘আসার’ বর্ণিত হয়েছে সেগুলো দ্বারাও এটাই প্রমাণিত হয়। ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, কুরাইশরা নবী (সঃ)-কে বললোঃ আপনি আপনার প্রভুর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্যে সাফা পর্বতকে সোনা বানিয়ে দেন, তাহলে আমরা আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবো। তিনি বললেনঃ ‘সত্যি তোমরা ঈমান। আনবে তো?' তারা উত্তরে বললোঃ হঁ্যা। বর্ণনাকারী বলেন যে, নবী (সঃ) তখন আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানালেন। ইতিমধ্যে তাঁর নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়লেন- “তুমি যদি চাও তবে সকালেই সাফা পর্বত সোনায় পরিণত হয়ে যাবে। কিন্তু এর পরও তারা ঈমান না আনলে আমি তাদেরকে এমন শাস্তি প্রদান করবো যে শাস্তি আমি বিশ্ববাসীর আর কাউকে প্রদান করবো না। আর যদি তুমি চাও যে, আমি তাদের তাওবা কবুল করতঃ তাদের উপর করুণা বর্ষণ করি, তবে আমি তাই করবো।” তখন নবী (সঃ) বললেনঃ হে আমার প্রভু! আমি আপনার নিকট তাওবার কবুলিয়ত ও করুণাই কামনা করি।

আল-মায়িদা 5:114

১১২-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ‘মায়িদাহ বা খাবারের খাঞ্চার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। এ জন্যই এ সূরার নাম ‘মায়িদাহ' রাখা হয়েছে। এখানেও আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর তার ইহসানের কথা প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ তিনি খাবারের খাঞ্চা অবতরণের জন্যে দুআ করেছিলেন, সেই দুআ মহান আল্লাহ কবুল করেছিলেন। এটাও ছিল হযরত ঈসা (আঃ)-এর একটা মুজিযা এবং তাঁর নবুওয়াতের অকাট্য প্রমাণ। কোন কোন ইমাম বর্ণনা করেছেন যে, এ ঘটনা ই শীলে বর্ণিত হয়নি এবং একমাত্র মুসলমান ছাড়া খ্রীষ্টানেরাও এ সম্পর্কে অবহিত ছিল না, মুসলমানদের মাধ্যমেই তারা অবগত হয়েছে। আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ যখন হযরত ঈসা (আঃ)-এর অনুসারী হওয়ারীরা বলেছিল- “হে ঈসা (আঃ)! আপনার প্রভু কি আমাদের উপর আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করতে পারেন?” এখানে অধিকাংশ কারী (আরবী) পড়েছেন (অর্থাৎ আপনার প্রভু কি এতে সক্ষম?) অন্যান্য কারীরা (আরবী) পড়েছেন (অর্থাৎ আপনি কি এতে সক্ষম?) (আরবী) খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চাকে বলা হয়। কেউ কেউ বলেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গীরা তাদের অভাব ও দারিদ্রের তাড়নায় এ কথা বলেছিল যে, আল্লাহ তাআলা যেন প্রত্যহ তাদের উপর আকাশ থেকে খানাভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন, যা খেয়ে তারা ইবাদতের শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। তখন হযরত ঈসা (আঃ) তাদেরকে বলেছিলেনতোমরা যদি প্রকৃত মুমিন হয়ে থাক তবে আল্লাহকে ভয় কর এবং এরূপ প্রার্থনা করা থেকে বিরত হও। আহার্য চাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ পাকের উপর ভরসা। কর। হতে পারে যে, এ জিনিসই তোমাদের জন্যে ফিৎনা ফাসাদের কারণ হয়ে যাবে। তার এ কথা শুনে হাওয়ারীরা বলেছিল- “আমরা মহান আল্লাহর মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছি। আমাদের খাওয়ার প্রয়োজন। আর আমরা যখন আকাশ হতে অবতারিত খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা দেখতে পাবো তখন আমাদের মনে পূর্ণ প্রশান্তি নেমে আসবে। ফলে আপনার প্রতি আমাদের ঈমান দৃঢ় হবে এবং আপনি যে আল্লাহর রাসূল এ ব্যাপারে আমাদের আর কোন সন্দেহই থাকবে না। আর আমরা নিজেরাই সাক্ষী হয়ে যাবো যে, এটা আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে একটা বড় নিদর্শন এবং আপনার নবুওয়াত ও সত্যতার স্পষ্ট দলীল।” তখন হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা জানালেন- “হে আল্লাহ! আমাদের উপর আকাশ হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করুন! যেন ওটা আমাদের জন্যে অর্থাৎ যারা বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে এবং যারা পরে আসবে, সকলের জন্যেই আনন্দের বিষয় হয়।” সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- যেদিন ওটা অবতীর্ণ হবে সে দিনকে আমরা খুশীর দিন হিসাবে মর্যাদা দেবো এবং আমাদের পরবর্তী লোকেরাও ঐ দিনকে সম্মানিত দিন মনে করবে।' হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আমরা ঐ দিনে। নামায পড়বো।' কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে আমাদের পরবর্তীদের জন্যে এ দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।' হযরত সালমান ফারসী (রঃ) বলেন যে, এ কথা দ্বারা হযরত ঈসা (আঃ) বুঝাতে চেয়েছিলেন- “যেন ওটা আমাদের সবারই জন্যে একটা শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে যায় এবং রিসালাতের সত্যতার জন্যে সুস্পষ্ট দলীল হতে পারে। আর হে আল্লাহ! যেন ওটা আপনার পূর্ণ ক্ষমতার এবং আমার প্রার্থনা ককূল হওয়ার দলীল হিসাবে প্রকাশ পায়, যাতে জনগণ আমার রিসালাতের সত্যতা স্বীকার করে নিতে পারে।” “হে আল্লাহ! আপনার পক্ষ হতে আমাদের নিকট আমাদের কষ্ট ও পরিশ্রম ছাড়াই উত্তম খাদ্য প্রেরণ করুন, যেহেতু আপনি হচ্ছেন সর্বোত্তম আহার্য প্রদানকারী।”তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “ঠিক আছে, আমি তোমাদের কাছে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করছি। কিন্তু সাবধান! এর পরও যদি তোমার কওম কুফরী করে এবং অবাধ্যই থেকে যায় তবে আমি তাদেরকে এমন শাস্তি প্রদান করবো, যে শাস্তির স্বাদ বিশ্ববাসীর কেউই কখনও গ্রহণ করেনি বা করবেও না।”মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ কিয়ামতের দিন (ফেরেশতাদেরকে বলা হবে) ফিরআউনের দলবলকে কঠিনতম শাস্তির মধ্যে প্রবিষ্ট কর।' (৪০৪ ৪৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের নিম্নতম গহ্বরে অবস্থান করবে। (৪:১৪৫) ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেছেন- “কিয়ামতের দিন তিন প্রকারের লোককে কঠিনতম শাস্তি প্রদান করা হবে। (১) মুনাফিক, (২) খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়ার পরও যারা কুফরী। করেছিল এবং (৩) ফিরআউনের দলবল।” হাওয়ারীদের উপর খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে সেগুলো উল্লেখ করা হলোঃ আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে বললেনঃ “তোমরা কি ত্রিশদিন রোযা রাখতে পার? অতঃপর তোমরা আল্লাহ তাআলার নিকট খাঞ্চার জন্যে প্রার্থনা করবে এবং তিনি তোমাদেরকে তা প্রদান করবেন। কেননা, আমলকারীকে মহান আল্লাহ তার আমলের প্রতিদান দিয়ে থাকেন। তারা তখন তাই করলো। অতঃপর তারা বললোঃ “হে মঙ্গলের শিক্ষাদানকারী ঈসা (আঃ)! আপনি বলে থাকেন যে, আমলকারীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের আমলের প্রতিদান অবশ্যই প্রদান করে থাকেন। আপনি আমাদেরকে ত্রিশটি রোযা রাখতে বলেছিলেন, আমরা তা রেখেছি। ত্রিশদিন আমরা কারও চাকরী করলে সে আমাদেরকে খেতে দেয় বা বেতন দেয়। তাহলে এখন কি আপনার প্রভু আমাদের উপর খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করবেন?” তখন হযরত ঈসা (আঃ) বললেনঃ “তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক তবে আল্লাহকে ভয় কর।' হাওয়ারীরা তখন বললোঃ ‘আমরা তো শুধু আমাদের মনের প্রশান্তি চাচ্ছি এবং নিজেরা বিশ্বাস করে অন্যদের সামনেও সাক্ষী হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছি।' মোটকথা, শেষ পর্যন্ত আকাশ থেকে খাদ্যের খাঞ্চা অবতীর্ণ হলো, যাতে সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি ছিল। খাঞ্চাটি তাদের সামনে এসে থেমে গেলো। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত লোকই তা খেলো। ইবনে জারীর (রঃ) এরূপ বর্ণনা করেছেন। অনুরূপ বর্ণনা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) থেকেও বর্ণিত আছে। তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হাওয়ারীরা হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-কে বললোঃ আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের উপর আকাশ থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তখন ফেরেশতাগণ মায়িদাহ্ বা খাঞ্চা নিয়ে অবতীর্ণ হন। ঐ খাঞ্চায় সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি ছিল। খাঞ্চাটি তারা তাদের সামনে রেখে দেন। তা থেকে তাদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত লোকই ভক্ষণ করে।ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেন- “যে মায়েদাহ বা খাঞ্চাটি আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয়েছিল তাতে রুটি ও গোশত ছিল। তাদের উপর নির্দেশ ছিল যে, তারা যেন খিয়ানত না করে এবং পরবর্তী দিনের জন্যে উঠিয়ে না রাখে। কিন্তু তারা খিয়ানত করেছিল এবং জমা করে রেখেছিল। ফলে তাদের আকৃতি বিকৃত করে দিয়ে তাদেরকে বানর ও শূকরে পরিণত করা হয়েছিল।” মায়িদাহ্ সম্পৰ্কীয় যতগুলো হাদীস বর্ণিত রয়েছে, সবগুলো দ্বারাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, উক্ত মায়িদাহ বা খানাভর্তি খাঞ্চা হযরত ঈসা (আঃ)-এর যুগের বানী ইসরাঈলের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং ওটা ছিল আল্লাহর নিকট তাঁর প্রার্থনার ফল। আর এটা আল্লাহ তাআলার (আরবী) -এ আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে।কোন কোন উক্তিকারী এটাও উক্তি করেছেন যে, খাঞ্চা অবতীর্ণ হয়নি। হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হাসান (রঃ) বলতেন- যখন তাদেরকে (আরবী) -এ কথা বলা হলো তখন তারা বললোঃ “আমাদের এর প্রয়োজন নেই। ফলে তা আর অবতীর্ণ হলো না। কিন্তু জমহর উলামার মতে মায়িদাহ্ অবতীর্ণ হয়েছিল। ইবনে জারীরও (রঃ) এই মত পোষণ করেছেন। কেননা, মহান আল্লাহর (আরবী) –এ উক্তি দ্বারা এটাই প্রমাণিত হচ্ছে। তার ওয়াদা এবং ওয়াঈদ সত্য। আর এটা সত্য বলে অনুমিতও হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। পূর্ববর্তী গুরুজন থেকে যেসব খবর’ ও ‘আসার’ বর্ণিত হয়েছে সেগুলো দ্বারাও এটাই প্রমাণিত হয়। ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, কুরাইশরা নবী (সঃ)-কে বললোঃ আপনি আপনার প্রভুর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্যে সাফা পর্বতকে সোনা বানিয়ে দেন, তাহলে আমরা আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবো। তিনি বললেনঃ ‘সত্যি তোমরা ঈমান। আনবে তো?' তারা উত্তরে বললোঃ হঁ্যা। বর্ণনাকারী বলেন যে, নবী (সঃ) তখন আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানালেন। ইতিমধ্যে তাঁর নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়লেন- “তুমি যদি চাও তবে সকালেই সাফা পর্বত সোনায় পরিণত হয়ে যাবে। কিন্তু এর পরও তারা ঈমান না আনলে আমি তাদেরকে এমন শাস্তি প্রদান করবো যে শাস্তি আমি বিশ্ববাসীর আর কাউকে প্রদান করবো না। আর যদি তুমি চাও যে, আমি তাদের তাওবা কবুল করতঃ তাদের উপর করুণা বর্ষণ করি, তবে আমি তাই করবো।” তখন নবী (সঃ) বললেনঃ হে আমার প্রভু! আমি আপনার নিকট তাওবার কবুলিয়ত ও করুণাই কামনা করি।

আল-মায়িদা 5:115

১১২-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ‘মায়িদাহ বা খাবারের খাঞ্চার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। এ জন্যই এ সূরার নাম ‘মায়িদাহ' রাখা হয়েছে। এখানেও আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর তার ইহসানের কথা প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ তিনি খাবারের খাঞ্চা অবতরণের জন্যে দুআ করেছিলেন, সেই দুআ মহান আল্লাহ কবুল করেছিলেন। এটাও ছিল হযরত ঈসা (আঃ)-এর একটা মুজিযা এবং তাঁর নবুওয়াতের অকাট্য প্রমাণ। কোন কোন ইমাম বর্ণনা করেছেন যে, এ ঘটনা ই শীলে বর্ণিত হয়নি এবং একমাত্র মুসলমান ছাড়া খ্রীষ্টানেরাও এ সম্পর্কে অবহিত ছিল না, মুসলমানদের মাধ্যমেই তারা অবগত হয়েছে। আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ যখন হযরত ঈসা (আঃ)-এর অনুসারী হওয়ারীরা বলেছিল- “হে ঈসা (আঃ)! আপনার প্রভু কি আমাদের উপর আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করতে পারেন?” এখানে অধিকাংশ কারী (আরবী) পড়েছেন (অর্থাৎ আপনার প্রভু কি এতে সক্ষম?) অন্যান্য কারীরা (আরবী) পড়েছেন (অর্থাৎ আপনি কি এতে সক্ষম?) (আরবী) খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চাকে বলা হয়। কেউ কেউ বলেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গীরা তাদের অভাব ও দারিদ্রের তাড়নায় এ কথা বলেছিল যে, আল্লাহ তাআলা যেন প্রত্যহ তাদের উপর আকাশ থেকে খানাভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন, যা খেয়ে তারা ইবাদতের শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। তখন হযরত ঈসা (আঃ) তাদেরকে বলেছিলেনতোমরা যদি প্রকৃত মুমিন হয়ে থাক তবে আল্লাহকে ভয় কর এবং এরূপ প্রার্থনা করা থেকে বিরত হও। আহার্য চাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ পাকের উপর ভরসা। কর। হতে পারে যে, এ জিনিসই তোমাদের জন্যে ফিৎনা ফাসাদের কারণ হয়ে যাবে। তার এ কথা শুনে হাওয়ারীরা বলেছিল- “আমরা মহান আল্লাহর মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছি। আমাদের খাওয়ার প্রয়োজন। আর আমরা যখন আকাশ হতে অবতারিত খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা দেখতে পাবো তখন আমাদের মনে পূর্ণ প্রশান্তি নেমে আসবে। ফলে আপনার প্রতি আমাদের ঈমান দৃঢ় হবে এবং আপনি যে আল্লাহর রাসূল এ ব্যাপারে আমাদের আর কোন সন্দেহই থাকবে না। আর আমরা নিজেরাই সাক্ষী হয়ে যাবো যে, এটা আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে একটা বড় নিদর্শন এবং আপনার নবুওয়াত ও সত্যতার স্পষ্ট দলীল।” তখন হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা জানালেন- “হে আল্লাহ! আমাদের উপর আকাশ হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করুন! যেন ওটা আমাদের জন্যে অর্থাৎ যারা বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে এবং যারা পরে আসবে, সকলের জন্যেই আনন্দের বিষয় হয়।” সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- যেদিন ওটা অবতীর্ণ হবে সে দিনকে আমরা খুশীর দিন হিসাবে মর্যাদা দেবো এবং আমাদের পরবর্তী লোকেরাও ঐ দিনকে সম্মানিত দিন মনে করবে।' হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে- ‘আমরা ঐ দিনে। নামায পড়বো।' কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে আমাদের পরবর্তীদের জন্যে এ দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।' হযরত সালমান ফারসী (রঃ) বলেন যে, এ কথা দ্বারা হযরত ঈসা (আঃ) বুঝাতে চেয়েছিলেন- “যেন ওটা আমাদের সবারই জন্যে একটা শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে যায় এবং রিসালাতের সত্যতার জন্যে সুস্পষ্ট দলীল হতে পারে। আর হে আল্লাহ! যেন ওটা আপনার পূর্ণ ক্ষমতার এবং আমার প্রার্থনা ককূল হওয়ার দলীল হিসাবে প্রকাশ পায়, যাতে জনগণ আমার রিসালাতের সত্যতা স্বীকার করে নিতে পারে।” “হে আল্লাহ! আপনার পক্ষ হতে আমাদের নিকট আমাদের কষ্ট ও পরিশ্রম ছাড়াই উত্তম খাদ্য প্রেরণ করুন, যেহেতু আপনি হচ্ছেন সর্বোত্তম আহার্য প্রদানকারী।”তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “ঠিক আছে, আমি তোমাদের কাছে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করছি। কিন্তু সাবধান! এর পরও যদি তোমার কওম কুফরী করে এবং অবাধ্যই থেকে যায় তবে আমি তাদেরকে এমন শাস্তি প্রদান করবো, যে শাস্তির স্বাদ বিশ্ববাসীর কেউই কখনও গ্রহণ করেনি বা করবেও না।”মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ কিয়ামতের দিন (ফেরেশতাদেরকে বলা হবে) ফিরআউনের দলবলকে কঠিনতম শাস্তির মধ্যে প্রবিষ্ট কর।' (৪০৪ ৪৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের নিম্নতম গহ্বরে অবস্থান করবে। (৪:১৪৫) ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেছেন- “কিয়ামতের দিন তিন প্রকারের লোককে কঠিনতম শাস্তি প্রদান করা হবে। (১) মুনাফিক, (২) খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়ার পরও যারা কুফরী। করেছিল এবং (৩) ফিরআউনের দলবল।” হাওয়ারীদের উপর খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে সেগুলো উল্লেখ করা হলোঃ আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে বললেনঃ “তোমরা কি ত্রিশদিন রোযা রাখতে পার? অতঃপর তোমরা আল্লাহ তাআলার নিকট খাঞ্চার জন্যে প্রার্থনা করবে এবং তিনি তোমাদেরকে তা প্রদান করবেন। কেননা, আমলকারীকে মহান আল্লাহ তার আমলের প্রতিদান দিয়ে থাকেন। তারা তখন তাই করলো। অতঃপর তারা বললোঃ “হে মঙ্গলের শিক্ষাদানকারী ঈসা (আঃ)! আপনি বলে থাকেন যে, আমলকারীদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের আমলের প্রতিদান অবশ্যই প্রদান করে থাকেন। আপনি আমাদেরকে ত্রিশটি রোযা রাখতে বলেছিলেন, আমরা তা রেখেছি। ত্রিশদিন আমরা কারও চাকরী করলে সে আমাদেরকে খেতে দেয় বা বেতন দেয়। তাহলে এখন কি আপনার প্রভু আমাদের উপর খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করবেন?” তখন হযরত ঈসা (আঃ) বললেনঃ “তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক তবে আল্লাহকে ভয় কর।' হাওয়ারীরা তখন বললোঃ ‘আমরা তো শুধু আমাদের মনের প্রশান্তি চাচ্ছি এবং নিজেরা বিশ্বাস করে অন্যদের সামনেও সাক্ষী হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছি।' মোটকথা, শেষ পর্যন্ত আকাশ থেকে খাদ্যের খাঞ্চা অবতীর্ণ হলো, যাতে সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি ছিল। খাঞ্চাটি তাদের সামনে এসে থেমে গেলো। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত লোকই তা খেলো। ইবনে জারীর (রঃ) এরূপ বর্ণনা করেছেন। অনুরূপ বর্ণনা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) থেকেও বর্ণিত আছে। তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হাওয়ারীরা হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-কে বললোঃ আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের উপর আকাশ থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তখন ফেরেশতাগণ মায়িদাহ্ বা খাঞ্চা নিয়ে অবতীর্ণ হন। ঐ খাঞ্চায় সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি ছিল। খাঞ্চাটি তারা তাদের সামনে রেখে দেন। তা থেকে তাদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত লোকই ভক্ষণ করে।ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেন- “যে মায়েদাহ বা খাঞ্চাটি আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয়েছিল তাতে রুটি ও গোশত ছিল। তাদের উপর নির্দেশ ছিল যে, তারা যেন খিয়ানত না করে এবং পরবর্তী দিনের জন্যে উঠিয়ে না রাখে। কিন্তু তারা খিয়ানত করেছিল এবং জমা করে রেখেছিল। ফলে তাদের আকৃতি বিকৃত করে দিয়ে তাদেরকে বানর ও শূকরে পরিণত করা হয়েছিল।” মায়িদাহ্ সম্পৰ্কীয় যতগুলো হাদীস বর্ণিত রয়েছে, সবগুলো দ্বারাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, উক্ত মায়িদাহ বা খানাভর্তি খাঞ্চা হযরত ঈসা (আঃ)-এর যুগের বানী ইসরাঈলের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং ওটা ছিল আল্লাহর নিকট তাঁর প্রার্থনার ফল। আর এটা আল্লাহ তাআলার (আরবী) -এ আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে।কোন কোন উক্তিকারী এটাও উক্তি করেছেন যে, খাঞ্চা অবতীর্ণ হয়নি। হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হাসান (রঃ) বলতেন- যখন তাদেরকে (আরবী) -এ কথা বলা হলো তখন তারা বললোঃ “আমাদের এর প্রয়োজন নেই। ফলে তা আর অবতীর্ণ হলো না। কিন্তু জমহর উলামার মতে মায়িদাহ্ অবতীর্ণ হয়েছিল। ইবনে জারীরও (রঃ) এই মত পোষণ করেছেন। কেননা, মহান আল্লাহর (আরবী) –এ উক্তি দ্বারা এটাই প্রমাণিত হচ্ছে। তার ওয়াদা এবং ওয়াঈদ সত্য। আর এটা সত্য বলে অনুমিতও হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। পূর্ববর্তী গুরুজন থেকে যেসব খবর’ ও ‘আসার’ বর্ণিত হয়েছে সেগুলো দ্বারাও এটাই প্রমাণিত হয়। ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, কুরাইশরা নবী (সঃ)-কে বললোঃ আপনি আপনার প্রভুর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্যে সাফা পর্বতকে সোনা বানিয়ে দেন, তাহলে আমরা আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবো। তিনি বললেনঃ ‘সত্যি তোমরা ঈমান। আনবে তো?' তারা উত্তরে বললোঃ হঁ্যা। বর্ণনাকারী বলেন যে, নবী (সঃ) তখন আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানালেন। ইতিমধ্যে তাঁর নিকট হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়লেন- “তুমি যদি চাও তবে সকালেই সাফা পর্বত সোনায় পরিণত হয়ে যাবে। কিন্তু এর পরও তারা ঈমান না আনলে আমি তাদেরকে এমন শাস্তি প্রদান করবো যে শাস্তি আমি বিশ্ববাসীর আর কাউকে প্রদান করবো না। আর যদি তুমি চাও যে, আমি তাদের তাওবা কবুল করতঃ তাদের উপর করুণা বর্ষণ করি, তবে আমি তাই করবো।” তখন নবী (সঃ) বললেনঃ হে আমার প্রভু! আমি আপনার নিকট তাওবার কবুলিয়ত ও করুণাই কামনা করি।

আল-মায়িদা 5:116

১১৬-১১৮ নং আয়াতের তাফসীর: কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে এই কথাগুলো ঐসব লোকের সামনে সম্বোধন করে বলবেন যারা তাকে ও তার মাতাকে মা'বুদ বানিয়ে নিয়েছিল। এ কথাগুলোর মাধ্যমে মহান আল্লাহ খ্রীষ্টানদেরকে ধমক দিয়েছেন ও ভয় প্রদর্শন করেছেন। কাতাদা (রঃ) ও অন্যান্যগণ এরূপই বলেছেন। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উপর আল্লাহ পাকের (আরবী) (অর্থাৎ এটা ঐ দিন যেদিন সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদীতার পুরস্কার দেয়া হবে) এ উক্তিটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এ সম্বোধন ও উত্তর দুনিয়াতেই ছিল। ইবনে জারীর (রঃ) এ কথাকে সমর্থন করে বলেন যে, যখন হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল এটা ঐ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) দু'প্রকারে-এর উপর দলীল গ্রহণ করেছেন। প্রথম প্রকার এই যে, এ কথাটি (আরবী) বা অতীতকালের ক্রিয়া দ্বারা বলা হয়েছে, (আরবী) অর্থাৎ বলা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার এই যে, (আরবী) এবং (আরবী)- এটা হচ্ছে শর্তযুক্ত উক্তি এবং এই উক্তি দুনিয়াতেই করা হয়েছিল। আর শাস্তি প্রদান ও ক্ষমা করণের শর্ত আখিরাতের জন্যে উঠিয়ে রাখা হয়েছে। এ দু'টি দলীলের ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ আছে। কেননা, অতীতকালের ক্রিয়া আসলো তো কি হলো? কিয়ামতের অধিকাংশ ঘটনাকেই অতীতকালের ক্রিয়া দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে, যাতে ওটা সংঘটিত হওয়ার উপর যথেষ্ট দলীল হতে পারে। এখন বাকী থাকলো (আরবী) শব্দটির কালামে শরতিয়া হওয়ার কথা। এ সম্পর্কে বলা যাবে যে, এর দ্বারা পাপীদের প্রতি হযরত ঈসা (আঃ)-এর অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেয়েছে এবং তাদের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আর শর্তের উপর কোন কিছু সম্পর্কিত হওয়া ওটা সংঘটিত হওয়ার দাবিদার হতে পারে না। কুরআন কারীমের আয়াতসমূহে এর বহু নযীর বিদ্যমান রয়েছে। এই ব্যাপারে হযরত কাতাদা (রঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে তা খুবই স্পষ্ট। তা হচ্ছে এই যে, এটা হবে কিয়ামতের দিনের কথোপকথন, যাতে সেদিন সকলের সামনে খ্রীষ্টানদের সব কিছু খুলে যায় এবং তাদের মনে ভয় ও সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়। হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- কিয়ামতের দিন নবীগণ ও তাদের উম্মতদেরকে ডাক দেয়া হবে। অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ)-কে আহ্বান করা হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাঁকে স্বীয় নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। তিনি তা স্বীকার করে নেবেন। তারপর আল্লাহ পাক তাঁকে জিজ্ঞেস করবেনঃ তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে- তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাকে ও আমার মাতাকে মা'বুদ বানিয়ে নাও? তখন তিনি তা অস্বীকার করবেন। অতঃপর নাসারাদেরকে আনয়ন করা হবে এবং তাদেরকে ঐ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। তারা তখন বলবেঃ ‘হ্যা, তিনি আমাদেরকে এ আদেশই করেছিলেন। এই কথা শুনে হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাথা ও দেহের লোম ভয়ে খাড়া হয়ে যাবে। ফেরেশতাগণ তখন তার চুলগুলো ধরে রাখবেন। আর এই নাসারাদেরকে আল্লাহর সামনে এক হাজার বছর পর্যন্ত জোড় পায়ে বসিয়ে রাখা হবে। অবশেষে তাদের উপর হুজ্জত কায়েম হয়ে যাবে এবং সত্য তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়বে। আর তাদের জন্যে ক্রুশ উঠানো হবে। অতঃপর তাদেরকে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। (হাফিয ইবনে আসাকির এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে কাসীর একে গারীব ও আযীয বলেছেন)(আরবী) এ জবাবে হযরত ঈসা (আঃ)-কে উত্তম ভদ্রতার কতইনা তাওফীক দান করা হয়েছিল এবং তার অন্তরে কতইনা সুন্দর দলীল ভরে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন-হে আল্লাহ! যে কথা বলার আমার কোন অধিকার নেই সে কথা আমি কিরূপে বলতে পারি? যদি আমি এ কথা বলেও থাকি তবে অবশ্যই সেটা আপনি ভাল রূপেই জানেন। কেননা, আপনার কাছে তো কোন কিছুই গোপন থাকে না। আপনি আমার অন্তরের কথা অবগত আছেন, কিন্তু আমি আপনার ইচ্ছা সম্পর্কে মোটেই অবগত নই। আপনি আমাকে যা নির্দেশ দিয়েছিলেন আমি তার একটি অক্ষরও বেশী করিনি। আমি তো শুধু এ কথাই বলেছিলাম- তোমরা আল্লাহরই ইবাদত করবে যিনি আমারও প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। আমি যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন তাদের কার্যাবলী তদারক করেছি। অতঃপর যখন থেকে আপনি আমাকে উঠিয়ে নিয়েছেন তখন থেকে আপনিই তাদের কার্যাবলী তদারক করেছেন। আর আপনি প্রত্যেক কাজ সম্বন্ধেই পূর্ণ অবগত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের মধ্যে খুত্ব দিতে গিয়ে বলেনঃ হে লোক সকল! কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে উলঙ্গ মাথা, উলঙ্গ দেহ এবং উলঙ্গ পা অবস্থায় উঠানো হবে, যেমন তোমরা তোমাদের জন্মের দিন ছিলে। সর্বপ্রথম হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে পোশাক পরানো হবে। এরপর আমার উম্মতের মধ্য হতে কতক লোককে আনয়ন করা হবে যাদেরকে জাহান্নামের নিদর্শন হিসেবে বাম দিকে রাখা হবে। তখন আমি বলবো- এরা তো আমারই উম্মত। সেই সময় বলা হবে- তুমি জান না যে, এরা তোমার (ইন্তেকালের) পরে তোমার সুন্নাতকে পরিত্যাগ করেছিল এবং বিদআত চালু করে দিয়েছিল। আমি একজন সৎ বান্দার মত ঐ কথাই বলবো যে কথা হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেন। (এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম বুখারী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন) তাহলে (আরবী) আল্লাহ পাকের এই কালাম তাঁরই ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। তিনি যা চাইবেন তাই করবেন। তিনি সবারই কৈফিয়ত তলব করতে পারেন, কিন্তু তার কাছে কেউই কোন কৈফিয়ত তলব করতে পারে না। তা ছাড়া এই কালাম নাসারাদের উপর তার অসন্তুষ্টি প্রকাশকারী, যারা হযরত ঈসা (আঃ) -কে তাঁর শরীক ও পুত্র এবং মারইয়াম (আঃ)-কে তাঁর স্ত্রী (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) সাব্যস্ত করেছিল। এ আয়াতের বড়ই মাহাত্ম্য রয়েছে। হদীসে আছে যে, নবী (সঃ) এক রাত্রে সকাল পর্যন্ত নামাযে এ আয়াতটিই পড়তে থাকেন।ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেন, একদা রাত্রে নবী (সঃ) (আরবী) এ আয়াতটি নামাযে পাঠ করতে থাকেন এবং এর মাধ্যমেই তিনি রুকূ ও সিজদা করেন। আর এভাবেই সকাল হয়ে যায়। সকালে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রাত্রে নামাযে আপনি এ আয়াতটিই পড়তে থাকলেন এবং এর মাধ্যমেই রুকু ও সিজদা করতে রইলেন, শেষ পর্যন্ত সকাল হয়ে গেল, এর কারণ কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমি মহিমান্বিত আল্লাহর কাছে আমার উম্মতের জন্যে সুপারিশের প্রার্থনা করছিলাম। তখন তিনি তার সাথে অংশী স্থাপন করেছে এরূপ লোক ছাড়া সকলকেই ক্ষমা করে দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন।” ইবনে আবি হাতিম (রঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে। আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) হযরত ঈসা (আঃ)-এর (আরবী) -এ উক্তিটি পাঠ করেন। অতঃপর তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করেন এবং বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমার উম্মত (অর্থাৎ আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন)।' এ বলে তিনি কাঁদতে শুরু করেন। আল্লাহ তা'আলা তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে তাঁর নিকট পাঠিয়ে দেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি তাঁকে যা উত্তর দেয়ার ছিল তাই দেন। তখন মহান আল্লাহ হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে বলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! তুমি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে গিয়ে বল যে, আল্লাহ তাঁকে তাঁর উম্মতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করবেন, দুঃখিত করবেন না।” ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট অনুপস্থিত থাকলেন, বের হলেন না, এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি কখনই বের হবেন না। অতঃপর তিনি বের হলেন এবং এমনভাবে সিজদায় পড়ে গেলেন যে, তাঁর প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেছে বলে আমাদের ধারণা হলো। তারপর তিনি মাথা উঠিয়ে বললেনঃ আমার প্রতিপালক আমার নিকট আমার উম্মতের ব্যাপারে কি করা যায় সেই পরামর্শ চেয়েছিলেন। আমি বললাম, হে আমার প্রভু! এরা তো আপনারই মাখলুক ও আপনারই বান্দা! দ্বিতীয় বার তিনি আমার নিকট পরামর্শ চাইলে আমি ঐ কথাই বললাম। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমার উম্মতের ব্যাপারে আমি তোমাকে অপদস্থ করবো না। আর তিনি আমাকে এই সুসংবাদ দিলেন যে, আমার সঙ্গে আমার উম্মতের যে প্রথম দলটি জান্নাতে যাবে তাদের সংখ্যা হবে সত্তর হাজার এবং এরূপ প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজার করে থাকবে। এরা সবাই বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারপর আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে আমাকে বললেনঃ তুমি প্রার্থনা কর, তা কবুল করা হবে এবং চাও, তা দেয়া হবে। আমি জিবরাঈল (আঃ)-কে বললাম, আল্লাহ কি আমার প্রার্থনা মঞ্জুর করার ইচ্ছা করেছেন? জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ হ্যা, আল্লাহ আমাকে আপনার নিকট এই উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছেন। আল্লাহ আমাকে সব কিছুই প্রদান করেছেন। আমি এ জন্যে অহংকার করছি না। আর আমার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে এবং আমি ভূ-পৃষ্ঠে সুস্থ শরীরে বিচরণ করছি। আমাকে এই বিশেষত্ব দেয়া হয়েছে যে, আমার উম্মত দুর্ভিক্ষে মারা যাবে না এবং তারা পরাজিত হবে না। আল্লাহ আমাকে কাওসার দান করেছেন। এটা হচ্ছে জান্নাতের একটি নহরের নাম যা আমার হাওযে বয়ে আসবে। আর আমাকে মর্যাদা, সাহায্য এবং রুউব বা ভক্তি প্রযুক্ত ভীতি প্রদান করা হয়েছে, যা আমার উম্মতের সামনে জনগণের উপর এক মাসের পথের ব্যবধান হতে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। আমি সকল নবীর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবো। আমার উম্মতের জন্যে গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ মাল হালাল করা হয়েছে এবং আরও এমন কতক জিনিস আমার উম্মতের জন্যে হালাল করা হয়েছে যেগুলো আমার পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতের উপর হালাল ছিল না। আর মাযহাব হিসেবে আমার ধর্মে কোন কাঠিন্য রাখা হয়নি। (সনদের দিক দিয়ে এই হাদীসটি দুর্বল হলেও সাফাআতের হাদীসগুলো এর দুর্বলতা দূর করে দিয়েছে)

আল-মায়িদা 5:117

১১৬-১১৮ নং আয়াতের তাফসীর: কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে এই কথাগুলো ঐসব লোকের সামনে সম্বোধন করে বলবেন যারা তাকে ও তার মাতাকে মা'বুদ বানিয়ে নিয়েছিল। এ কথাগুলোর মাধ্যমে মহান আল্লাহ খ্রীষ্টানদেরকে ধমক দিয়েছেন ও ভয় প্রদর্শন করেছেন। কাতাদা (রঃ) ও অন্যান্যগণ এরূপই বলেছেন। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উপর আল্লাহ পাকের (আরবী) (অর্থাৎ এটা ঐ দিন যেদিন সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদীতার পুরস্কার দেয়া হবে) এ উক্তিটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এ সম্বোধন ও উত্তর দুনিয়াতেই ছিল। ইবনে জারীর (রঃ) এ কথাকে সমর্থন করে বলেন যে, যখন হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল এটা ঐ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) দু'প্রকারে-এর উপর দলীল গ্রহণ করেছেন। প্রথম প্রকার এই যে, এ কথাটি (আরবী) বা অতীতকালের ক্রিয়া দ্বারা বলা হয়েছে, (আরবী) অর্থাৎ বলা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার এই যে, (আরবী) এবং (আরবী)- এটা হচ্ছে শর্তযুক্ত উক্তি এবং এই উক্তি দুনিয়াতেই করা হয়েছিল। আর শাস্তি প্রদান ও ক্ষমা করণের শর্ত আখিরাতের জন্যে উঠিয়ে রাখা হয়েছে। এ দু'টি দলীলের ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ আছে। কেননা, অতীতকালের ক্রিয়া আসলো তো কি হলো? কিয়ামতের অধিকাংশ ঘটনাকেই অতীতকালের ক্রিয়া দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে, যাতে ওটা সংঘটিত হওয়ার উপর যথেষ্ট দলীল হতে পারে। এখন বাকী থাকলো (আরবী) শব্দটির কালামে শরতিয়া হওয়ার কথা। এ সম্পর্কে বলা যাবে যে, এর দ্বারা পাপীদের প্রতি হযরত ঈসা (আঃ)-এর অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেয়েছে এবং তাদের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আর শর্তের উপর কোন কিছু সম্পর্কিত হওয়া ওটা সংঘটিত হওয়ার দাবিদার হতে পারে না। কুরআন কারীমের আয়াতসমূহে এর বহু নযীর বিদ্যমান রয়েছে। এই ব্যাপারে হযরত কাতাদা (রঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে তা খুবই স্পষ্ট। তা হচ্ছে এই যে, এটা হবে কিয়ামতের দিনের কথোপকথন, যাতে সেদিন সকলের সামনে খ্রীষ্টানদের সব কিছু খুলে যায় এবং তাদের মনে ভয় ও সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়। হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- কিয়ামতের দিন নবীগণ ও তাদের উম্মতদেরকে ডাক দেয়া হবে। অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ)-কে আহ্বান করা হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাঁকে স্বীয় নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। তিনি তা স্বীকার করে নেবেন। তারপর আল্লাহ পাক তাঁকে জিজ্ঞেস করবেনঃ তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে- তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাকে ও আমার মাতাকে মা'বুদ বানিয়ে নাও? তখন তিনি তা অস্বীকার করবেন। অতঃপর নাসারাদেরকে আনয়ন করা হবে এবং তাদেরকে ঐ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। তারা তখন বলবেঃ ‘হ্যা, তিনি আমাদেরকে এ আদেশই করেছিলেন। এই কথা শুনে হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাথা ও দেহের লোম ভয়ে খাড়া হয়ে যাবে। ফেরেশতাগণ তখন তার চুলগুলো ধরে রাখবেন। আর এই নাসারাদেরকে আল্লাহর সামনে এক হাজার বছর পর্যন্ত জোড় পায়ে বসিয়ে রাখা হবে। অবশেষে তাদের উপর হুজ্জত কায়েম হয়ে যাবে এবং সত্য তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়বে। আর তাদের জন্যে ক্রুশ উঠানো হবে। অতঃপর তাদেরকে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। (হাফিয ইবনে আসাকির এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে কাসীর একে গারীব ও আযীয বলেছেন)(আরবী) এ জবাবে হযরত ঈসা (আঃ)-কে উত্তম ভদ্রতার কতইনা তাওফীক দান করা হয়েছিল এবং তার অন্তরে কতইনা সুন্দর দলীল ভরে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন-হে আল্লাহ! যে কথা বলার আমার কোন অধিকার নেই সে কথা আমি কিরূপে বলতে পারি? যদি আমি এ কথা বলেও থাকি তবে অবশ্যই সেটা আপনি ভাল রূপেই জানেন। কেননা, আপনার কাছে তো কোন কিছুই গোপন থাকে না। আপনি আমার অন্তরের কথা অবগত আছেন, কিন্তু আমি আপনার ইচ্ছা সম্পর্কে মোটেই অবগত নই। আপনি আমাকে যা নির্দেশ দিয়েছিলেন আমি তার একটি অক্ষরও বেশী করিনি। আমি তো শুধু এ কথাই বলেছিলাম- তোমরা আল্লাহরই ইবাদত করবে যিনি আমারও প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। আমি যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন তাদের কার্যাবলী তদারক করেছি। অতঃপর যখন থেকে আপনি আমাকে উঠিয়ে নিয়েছেন তখন থেকে আপনিই তাদের কার্যাবলী তদারক করেছেন। আর আপনি প্রত্যেক কাজ সম্বন্ধেই পূর্ণ অবগত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের মধ্যে খুত্ব দিতে গিয়ে বলেনঃ হে লোক সকল! কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে উলঙ্গ মাথা, উলঙ্গ দেহ এবং উলঙ্গ পা অবস্থায় উঠানো হবে, যেমন তোমরা তোমাদের জন্মের দিন ছিলে। সর্বপ্রথম হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে পোশাক পরানো হবে। এরপর আমার উম্মতের মধ্য হতে কতক লোককে আনয়ন করা হবে যাদেরকে জাহান্নামের নিদর্শন হিসেবে বাম দিকে রাখা হবে। তখন আমি বলবো- এরা তো আমারই উম্মত। সেই সময় বলা হবে- তুমি জান না যে, এরা তোমার (ইন্তেকালের) পরে তোমার সুন্নাতকে পরিত্যাগ করেছিল এবং বিদআত চালু করে দিয়েছিল। আমি একজন সৎ বান্দার মত ঐ কথাই বলবো যে কথা হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেন। (এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম বুখারী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন) তাহলে (আরবী) আল্লাহ পাকের এই কালাম তাঁরই ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। তিনি যা চাইবেন তাই করবেন। তিনি সবারই কৈফিয়ত তলব করতে পারেন, কিন্তু তার কাছে কেউই কোন কৈফিয়ত তলব করতে পারে না। তা ছাড়া এই কালাম নাসারাদের উপর তার অসন্তুষ্টি প্রকাশকারী, যারা হযরত ঈসা (আঃ) -কে তাঁর শরীক ও পুত্র এবং মারইয়াম (আঃ)-কে তাঁর স্ত্রী (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) সাব্যস্ত করেছিল। এ আয়াতের বড়ই মাহাত্ম্য রয়েছে। হদীসে আছে যে, নবী (সঃ) এক রাত্রে সকাল পর্যন্ত নামাযে এ আয়াতটিই পড়তে থাকেন।ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেন, একদা রাত্রে নবী (সঃ) (আরবী) এ আয়াতটি নামাযে পাঠ করতে থাকেন এবং এর মাধ্যমেই তিনি রুকূ ও সিজদা করেন। আর এভাবেই সকাল হয়ে যায়। সকালে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রাত্রে নামাযে আপনি এ আয়াতটিই পড়তে থাকলেন এবং এর মাধ্যমেই রুকু ও সিজদা করতে রইলেন, শেষ পর্যন্ত সকাল হয়ে গেল, এর কারণ কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমি মহিমান্বিত আল্লাহর কাছে আমার উম্মতের জন্যে সুপারিশের প্রার্থনা করছিলাম। তখন তিনি তার সাথে অংশী স্থাপন করেছে এরূপ লোক ছাড়া সকলকেই ক্ষমা করে দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন।” ইবনে আবি হাতিম (রঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে। আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) হযরত ঈসা (আঃ)-এর (আরবী) -এ উক্তিটি পাঠ করেন। অতঃপর তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করেন এবং বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমার উম্মত (অর্থাৎ আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন)।' এ বলে তিনি কাঁদতে শুরু করেন। আল্লাহ তা'আলা তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে তাঁর নিকট পাঠিয়ে দেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি তাঁকে যা উত্তর দেয়ার ছিল তাই দেন। তখন মহান আল্লাহ হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে বলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! তুমি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে গিয়ে বল যে, আল্লাহ তাঁকে তাঁর উম্মতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করবেন, দুঃখিত করবেন না।” ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট অনুপস্থিত থাকলেন, বের হলেন না, এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি কখনই বের হবেন না। অতঃপর তিনি বের হলেন এবং এমনভাবে সিজদায় পড়ে গেলেন যে, তাঁর প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেছে বলে আমাদের ধারণা হলো। তারপর তিনি মাথা উঠিয়ে বললেনঃ আমার প্রতিপালক আমার নিকট আমার উম্মতের ব্যাপারে কি করা যায় সেই পরামর্শ চেয়েছিলেন। আমি বললাম, হে আমার প্রভু! এরা তো আপনারই মাখলুক ও আপনারই বান্দা! দ্বিতীয় বার তিনি আমার নিকট পরামর্শ চাইলে আমি ঐ কথাই বললাম। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমার উম্মতের ব্যাপারে আমি তোমাকে অপদস্থ করবো না। আর তিনি আমাকে এই সুসংবাদ দিলেন যে, আমার সঙ্গে আমার উম্মতের যে প্রথম দলটি জান্নাতে যাবে তাদের সংখ্যা হবে সত্তর হাজার এবং এরূপ প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজার করে থাকবে। এরা সবাই বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারপর আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে আমাকে বললেনঃ তুমি প্রার্থনা কর, তা কবুল করা হবে এবং চাও, তা দেয়া হবে। আমি জিবরাঈল (আঃ)-কে বললাম, আল্লাহ কি আমার প্রার্থনা মঞ্জুর করার ইচ্ছা করেছেন? জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ হ্যা, আল্লাহ আমাকে আপনার নিকট এই উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছেন। আল্লাহ আমাকে সব কিছুই প্রদান করেছেন। আমি এ জন্যে অহংকার করছি না। আর আমার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে এবং আমি ভূ-পৃষ্ঠে সুস্থ শরীরে বিচরণ করছি। আমাকে এই বিশেষত্ব দেয়া হয়েছে যে, আমার উম্মত দুর্ভিক্ষে মারা যাবে না এবং তারা পরাজিত হবে না। আল্লাহ আমাকে কাওসার দান করেছেন। এটা হচ্ছে জান্নাতের একটি নহরের নাম যা আমার হাওযে বয়ে আসবে। আর আমাকে মর্যাদা, সাহায্য এবং রুউব বা ভক্তি প্রযুক্ত ভীতি প্রদান করা হয়েছে, যা আমার উম্মতের সামনে জনগণের উপর এক মাসের পথের ব্যবধান হতে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। আমি সকল নবীর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবো। আমার উম্মতের জন্যে গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ মাল হালাল করা হয়েছে এবং আরও এমন কতক জিনিস আমার উম্মতের জন্যে হালাল করা হয়েছে যেগুলো আমার পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতের উপর হালাল ছিল না। আর মাযহাব হিসেবে আমার ধর্মে কোন কাঠিন্য রাখা হয়নি। (সনদের দিক দিয়ে এই হাদীসটি দুর্বল হলেও সাফাআতের হাদীসগুলো এর দুর্বলতা দূর করে দিয়েছে)

আল-মায়িদা 5:118

১১৬-১১৮ নং আয়াতের তাফসীর: কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে এই কথাগুলো ঐসব লোকের সামনে সম্বোধন করে বলবেন যারা তাকে ও তার মাতাকে মা'বুদ বানিয়ে নিয়েছিল। এ কথাগুলোর মাধ্যমে মহান আল্লাহ খ্রীষ্টানদেরকে ধমক দিয়েছেন ও ভয় প্রদর্শন করেছেন। কাতাদা (রঃ) ও অন্যান্যগণ এরূপই বলেছেন। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উপর আল্লাহ পাকের (আরবী) (অর্থাৎ এটা ঐ দিন যেদিন সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদীতার পুরস্কার দেয়া হবে) এ উক্তিটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এ সম্বোধন ও উত্তর দুনিয়াতেই ছিল। ইবনে জারীর (রঃ) এ কথাকে সমর্থন করে বলেন যে, যখন হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল এটা ঐ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) দু'প্রকারে-এর উপর দলীল গ্রহণ করেছেন। প্রথম প্রকার এই যে, এ কথাটি (আরবী) বা অতীতকালের ক্রিয়া দ্বারা বলা হয়েছে, (আরবী) অর্থাৎ বলা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার এই যে, (আরবী) এবং (আরবী)- এটা হচ্ছে শর্তযুক্ত উক্তি এবং এই উক্তি দুনিয়াতেই করা হয়েছিল। আর শাস্তি প্রদান ও ক্ষমা করণের শর্ত আখিরাতের জন্যে উঠিয়ে রাখা হয়েছে। এ দু'টি দলীলের ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ আছে। কেননা, অতীতকালের ক্রিয়া আসলো তো কি হলো? কিয়ামতের অধিকাংশ ঘটনাকেই অতীতকালের ক্রিয়া দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে, যাতে ওটা সংঘটিত হওয়ার উপর যথেষ্ট দলীল হতে পারে। এখন বাকী থাকলো (আরবী) শব্দটির কালামে শরতিয়া হওয়ার কথা। এ সম্পর্কে বলা যাবে যে, এর দ্বারা পাপীদের প্রতি হযরত ঈসা (আঃ)-এর অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেয়েছে এবং তাদের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আর শর্তের উপর কোন কিছু সম্পর্কিত হওয়া ওটা সংঘটিত হওয়ার দাবিদার হতে পারে না। কুরআন কারীমের আয়াতসমূহে এর বহু নযীর বিদ্যমান রয়েছে। এই ব্যাপারে হযরত কাতাদা (রঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে তা খুবই স্পষ্ট। তা হচ্ছে এই যে, এটা হবে কিয়ামতের দিনের কথোপকথন, যাতে সেদিন সকলের সামনে খ্রীষ্টানদের সব কিছু খুলে যায় এবং তাদের মনে ভয় ও সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়। হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- কিয়ামতের দিন নবীগণ ও তাদের উম্মতদেরকে ডাক দেয়া হবে। অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ)-কে আহ্বান করা হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাঁকে স্বীয় নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। তিনি তা স্বীকার করে নেবেন। তারপর আল্লাহ পাক তাঁকে জিজ্ঞেস করবেনঃ তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে- তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাকে ও আমার মাতাকে মা'বুদ বানিয়ে নাও? তখন তিনি তা অস্বীকার করবেন। অতঃপর নাসারাদেরকে আনয়ন করা হবে এবং তাদেরকে ঐ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। তারা তখন বলবেঃ ‘হ্যা, তিনি আমাদেরকে এ আদেশই করেছিলেন। এই কথা শুনে হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাথা ও দেহের লোম ভয়ে খাড়া হয়ে যাবে। ফেরেশতাগণ তখন তার চুলগুলো ধরে রাখবেন। আর এই নাসারাদেরকে আল্লাহর সামনে এক হাজার বছর পর্যন্ত জোড় পায়ে বসিয়ে রাখা হবে। অবশেষে তাদের উপর হুজ্জত কায়েম হয়ে যাবে এবং সত্য তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়বে। আর তাদের জন্যে ক্রুশ উঠানো হবে। অতঃপর তাদেরকে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। (হাফিয ইবনে আসাকির এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে কাসীর একে গারীব ও আযীয বলেছেন)(আরবী) এ জবাবে হযরত ঈসা (আঃ)-কে উত্তম ভদ্রতার কতইনা তাওফীক দান করা হয়েছিল এবং তার অন্তরে কতইনা সুন্দর দলীল ভরে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন-হে আল্লাহ! যে কথা বলার আমার কোন অধিকার নেই সে কথা আমি কিরূপে বলতে পারি? যদি আমি এ কথা বলেও থাকি তবে অবশ্যই সেটা আপনি ভাল রূপেই জানেন। কেননা, আপনার কাছে তো কোন কিছুই গোপন থাকে না। আপনি আমার অন্তরের কথা অবগত আছেন, কিন্তু আমি আপনার ইচ্ছা সম্পর্কে মোটেই অবগত নই। আপনি আমাকে যা নির্দেশ দিয়েছিলেন আমি তার একটি অক্ষরও বেশী করিনি। আমি তো শুধু এ কথাই বলেছিলাম- তোমরা আল্লাহরই ইবাদত করবে যিনি আমারও প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। আমি যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন তাদের কার্যাবলী তদারক করেছি। অতঃপর যখন থেকে আপনি আমাকে উঠিয়ে নিয়েছেন তখন থেকে আপনিই তাদের কার্যাবলী তদারক করেছেন। আর আপনি প্রত্যেক কাজ সম্বন্ধেই পূর্ণ অবগত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের মধ্যে খুত্ব দিতে গিয়ে বলেনঃ হে লোক সকল! কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে উলঙ্গ মাথা, উলঙ্গ দেহ এবং উলঙ্গ পা অবস্থায় উঠানো হবে, যেমন তোমরা তোমাদের জন্মের দিন ছিলে। সর্বপ্রথম হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে পোশাক পরানো হবে। এরপর আমার উম্মতের মধ্য হতে কতক লোককে আনয়ন করা হবে যাদেরকে জাহান্নামের নিদর্শন হিসেবে বাম দিকে রাখা হবে। তখন আমি বলবো- এরা তো আমারই উম্মত। সেই সময় বলা হবে- তুমি জান না যে, এরা তোমার (ইন্তেকালের) পরে তোমার সুন্নাতকে পরিত্যাগ করেছিল এবং বিদআত চালু করে দিয়েছিল। আমি একজন সৎ বান্দার মত ঐ কথাই বলবো যে কথা হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেন। (এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম বুখারী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন) তাহলে (আরবী) আল্লাহ পাকের এই কালাম তাঁরই ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। তিনি যা চাইবেন তাই করবেন। তিনি সবারই কৈফিয়ত তলব করতে পারেন, কিন্তু তার কাছে কেউই কোন কৈফিয়ত তলব করতে পারে না। তা ছাড়া এই কালাম নাসারাদের উপর তার অসন্তুষ্টি প্রকাশকারী, যারা হযরত ঈসা (আঃ) -কে তাঁর শরীক ও পুত্র এবং মারইয়াম (আঃ)-কে তাঁর স্ত্রী (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) সাব্যস্ত করেছিল। এ আয়াতের বড়ই মাহাত্ম্য রয়েছে। হদীসে আছে যে, নবী (সঃ) এক রাত্রে সকাল পর্যন্ত নামাযে এ আয়াতটিই পড়তে থাকেন।ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেন, একদা রাত্রে নবী (সঃ) (আরবী) এ আয়াতটি নামাযে পাঠ করতে থাকেন এবং এর মাধ্যমেই তিনি রুকূ ও সিজদা করেন। আর এভাবেই সকাল হয়ে যায়। সকালে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রাত্রে নামাযে আপনি এ আয়াতটিই পড়তে থাকলেন এবং এর মাধ্যমেই রুকু ও সিজদা করতে রইলেন, শেষ পর্যন্ত সকাল হয়ে গেল, এর কারণ কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমি মহিমান্বিত আল্লাহর কাছে আমার উম্মতের জন্যে সুপারিশের প্রার্থনা করছিলাম। তখন তিনি তার সাথে অংশী স্থাপন করেছে এরূপ লোক ছাড়া সকলকেই ক্ষমা করে দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন।” ইবনে আবি হাতিম (রঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে। আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) হযরত ঈসা (আঃ)-এর (আরবী) -এ উক্তিটি পাঠ করেন। অতঃপর তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করেন এবং বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমার উম্মত (অর্থাৎ আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন)।' এ বলে তিনি কাঁদতে শুরু করেন। আল্লাহ তা'আলা তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে তাঁর নিকট পাঠিয়ে দেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি তাঁকে যা উত্তর দেয়ার ছিল তাই দেন। তখন মহান আল্লাহ হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে বলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! তুমি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে গিয়ে বল যে, আল্লাহ তাঁকে তাঁর উম্মতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করবেন, দুঃখিত করবেন না।” ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট অনুপস্থিত থাকলেন, বের হলেন না, এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি কখনই বের হবেন না। অতঃপর তিনি বের হলেন এবং এমনভাবে সিজদায় পড়ে গেলেন যে, তাঁর প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেছে বলে আমাদের ধারণা হলো। তারপর তিনি মাথা উঠিয়ে বললেনঃ আমার প্রতিপালক আমার নিকট আমার উম্মতের ব্যাপারে কি করা যায় সেই পরামর্শ চেয়েছিলেন। আমি বললাম, হে আমার প্রভু! এরা তো আপনারই মাখলুক ও আপনারই বান্দা! দ্বিতীয় বার তিনি আমার নিকট পরামর্শ চাইলে আমি ঐ কথাই বললাম। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমার উম্মতের ব্যাপারে আমি তোমাকে অপদস্থ করবো না। আর তিনি আমাকে এই সুসংবাদ দিলেন যে, আমার সঙ্গে আমার উম্মতের যে প্রথম দলটি জান্নাতে যাবে তাদের সংখ্যা হবে সত্তর হাজার এবং এরূপ প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজার করে থাকবে। এরা সবাই বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারপর আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে আমাকে বললেনঃ তুমি প্রার্থনা কর, তা কবুল করা হবে এবং চাও, তা দেয়া হবে। আমি জিবরাঈল (আঃ)-কে বললাম, আল্লাহ কি আমার প্রার্থনা মঞ্জুর করার ইচ্ছা করেছেন? জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ হ্যা, আল্লাহ আমাকে আপনার নিকট এই উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছেন। আল্লাহ আমাকে সব কিছুই প্রদান করেছেন। আমি এ জন্যে অহংকার করছি না। আর আমার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে এবং আমি ভূ-পৃষ্ঠে সুস্থ শরীরে বিচরণ করছি। আমাকে এই বিশেষত্ব দেয়া হয়েছে যে, আমার উম্মত দুর্ভিক্ষে মারা যাবে না এবং তারা পরাজিত হবে না। আল্লাহ আমাকে কাওসার দান করেছেন। এটা হচ্ছে জান্নাতের একটি নহরের নাম যা আমার হাওযে বয়ে আসবে। আর আমাকে মর্যাদা, সাহায্য এবং রুউব বা ভক্তি প্রযুক্ত ভীতি প্রদান করা হয়েছে, যা আমার উম্মতের সামনে জনগণের উপর এক মাসের পথের ব্যবধান হতে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। আমি সকল নবীর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবো। আমার উম্মতের জন্যে গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ মাল হালাল করা হয়েছে এবং আরও এমন কতক জিনিস আমার উম্মতের জন্যে হালাল করা হয়েছে যেগুলো আমার পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতের উপর হালাল ছিল না। আর মাযহাব হিসেবে আমার ধর্মে কোন কাঠিন্য রাখা হয়নি। (সনদের দিক দিয়ে এই হাদীসটি দুর্বল হলেও সাফাআতের হাদীসগুলো এর দুর্বলতা দূর করে দিয়েছে)

আল-মায়িদা 5:119

১১৯-১২০ নং আয়াতের তাফসীর: ঈসা (আঃ) যে বিপথগামী ও মিথ্যাবাদী খ্রীষ্টানদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন সে কথারই জবাব দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, (আরবী) অর্থাৎ আজকের দিনে একত্ববাদীদের একত্ববাদ এবং সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা উপকার দেবে। তারা প্রবাহিত নহর বিশিষ্ট জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। সেখান থেকে না তাদেরকে বের করা হবে, না তারা মুহূর্তের জন্যে জান্নাত পরিত্যাগ করবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টিই সবচেয়ে বড় কথা।' (৯:৭২) এ আয়াতের সঙ্গে যে হাদীস সম্পর্কযুক্ত রয়েছে তা সত্বরই আসছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আনাস (রাঃ) হতে মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যে, এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- সেই দিন মহা মহিমান্বিত আল্লাহ উজ্জ্বল দীপ্তিমান অবস্থায় প্রকাশিত হবেন এবং বলবেনঃ ‘তোমরা চাও, আমি তোমাদেরকে প্রদান করবো।' তিনি বলেন যে, তখন তারা তাঁর সন্তুষ্টি প্রার্থনা করবে। তিনি তখন কলবেনঃ ‘আমার সন্তুষ্টিই তো তোমাদেরকে আমার ঘরে নিয়ে এসেছে। জনগণ পুনরায় তাঁর সন্তুষ্টি প্রার্থনা করবে। তখন তিনি বলবেনঃ “তোমরা সাক্ষী থাক যে, মহান আল্লাহ তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট রয়েছেন। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এটাই হচ্ছে বড় সফলতা (৯:৭২) (এরূপ সফলতা আমি আর কাউকেও প্রদান করি না) মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমলকারীদের এরূপ আমলই করা উচিত (৩৭:৬১) আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এ কাজেই প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত। (৮৩:২৬) (আরবী) অর্থাৎ তিনিই সমস্ত জিনিসের সৃষ্টিকর্তা। তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান। সব কিছুরই উপর তাঁর পূর্ণ আধিপত্য রয়েছে। তার সাথে কেউই তুলনীয় নয় এবং তার কোন সাহায্যকারীর প্রয়োজন নেই। তাঁর পিতাও নেই, পুত্রও নেই এবং স্ত্রীও নেই। তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই।

আল-মায়িদা 5:120

১১৯-১২০ নং আয়াতের তাফসীর: ঈসা (আঃ) যে বিপথগামী ও মিথ্যাবাদী খ্রীষ্টানদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন সে কথারই জবাব দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, (আরবী) অর্থাৎ আজকের দিনে একত্ববাদীদের একত্ববাদ এবং সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা উপকার দেবে। তারা প্রবাহিত নহর বিশিষ্ট জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। সেখান থেকে না তাদেরকে বের করা হবে, না তারা মুহূর্তের জন্যে জান্নাত পরিত্যাগ করবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টিই সবচেয়ে বড় কথা।' (৯:৭২) এ আয়াতের সঙ্গে যে হাদীস সম্পর্কযুক্ত রয়েছে তা সত্বরই আসছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আনাস (রাঃ) হতে মারফু’রূপে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যে, এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- সেই দিন মহা মহিমান্বিত আল্লাহ উজ্জ্বল দীপ্তিমান অবস্থায় প্রকাশিত হবেন এবং বলবেনঃ ‘তোমরা চাও, আমি তোমাদেরকে প্রদান করবো।' তিনি বলেন যে, তখন তারা তাঁর সন্তুষ্টি প্রার্থনা করবে। তিনি তখন কলবেনঃ ‘আমার সন্তুষ্টিই তো তোমাদেরকে আমার ঘরে নিয়ে এসেছে। জনগণ পুনরায় তাঁর সন্তুষ্টি প্রার্থনা করবে। তখন তিনি বলবেনঃ “তোমরা সাক্ষী থাক যে, মহান আল্লাহ তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট রয়েছেন। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এটাই হচ্ছে বড় সফলতা (৯:৭২) (এরূপ সফলতা আমি আর কাউকেও প্রদান করি না) মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমলকারীদের এরূপ আমলই করা উচিত (৩৭:৬১) আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এ কাজেই প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত। (৮৩:২৬) (আরবী) অর্থাৎ তিনিই সমস্ত জিনিসের সৃষ্টিকর্তা। তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান। সব কিছুরই উপর তাঁর পূর্ণ আধিপত্য রয়েছে। তার সাথে কেউই তুলনীয় নয় এবং তার কোন সাহায্যকারীর প্রয়োজন নেই। তাঁর পিতাও নেই, পুত্রও নেই এবং স্ত্রীও নেই। তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই।