Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-মায়িদা 5:40 – আল-মায়িদা 5:87

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-মায়িদা 5:40
  2. আল-মায়িদা 5:41
  3. আল-মায়িদা 5:42
  4. আল-মায়িদা 5:43
  5. আল-মায়িদা 5:44
  6. আল-মায়িদা 5:45
  7. আল-মায়িদা 5:46
  8. আল-মায়িদা 5:47
  9. আল-মায়িদা 5:48
  10. আল-মায়িদা 5:49
  11. আল-মায়িদা 5:50
  12. আল-মায়িদা 5:51
  13. আল-মায়িদা 5:52
  14. আল-মায়িদা 5:53
  15. আল-মায়িদা 5:54
  16. আল-মায়িদা 5:55
  17. আল-মায়িদা 5:56
  18. আল-মায়িদা 5:57
  19. আল-মায়িদা 5:58
  20. আল-মায়িদা 5:59
  21. আল-মায়িদা 5:60
  22. আল-মায়িদা 5:61
  23. আল-মায়িদা 5:62
  24. আল-মায়িদা 5:63
  25. আল-মায়িদা 5:64
  26. আল-মায়িদা 5:65
  27. আল-মায়িদা 5:66
  28. আল-মায়িদা 5:67
  29. আল-মায়িদা 5:68
  30. আল-মায়িদা 5:69
  31. আল-মায়িদা 5:70
  32. আল-মায়িদা 5:71
  33. আল-মায়িদা 5:72
  34. আল-মায়িদা 5:73
  35. আল-মায়িদা 5:74
  36. আল-মায়িদা 5:75
  37. আল-মায়িদা 5:76
  38. আল-মায়িদা 5:77
  39. আল-মায়িদা 5:78
  40. আল-মায়িদা 5:79
  41. আল-মায়িদা 5:80
  42. আল-মায়িদা 5:81
  43. আল-মায়িদা 5:82
  44. আল-মায়িদা 5:83
  45. আল-মায়িদা 5:84
  46. আল-মায়িদা 5:85
  47. আল-মায়িদা 5:86
  48. আল-মায়িদা 5:87

আল-মায়িদা 5:40

৩৮-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। এ কিরআতটি খুবই বিরল হলেও আমল কিন্তু এর উপরই। তবে আমল এই কিরআতের কারণে নয়, বরং অন্যান্য দলীল প্রমাণের উপর ভিত্তি করে। চোরের হাত কাটার নিয়ম ইসলামপূর্ব যুগেও ছিল। ইসলাম একে বিস্তারিত এবং শৃংখলিত করেছে। অনুরূপভাবে কাসামাত, দিয়াত, ফারায়েয প্রভৃতি মাসআলাও পূর্ব থেকেই ছিল। কিন্তু সেগুলো ছিল বিশৃংখল ও অসম্পূর্ণভাবে। ইসলাম ঐগুলোকে ঠিকঠাক করে দিয়েছে। একটা উক্তি এটাও আছে যে, কুরাইশরা সর্বপ্রথম চুরির অপরাধে খুযাআ গোত্রের দুওয়াইক নামক একটি লোকের হাত কেটে নিয়েছিল। সে কাবা ঘরের গেলাফ বা আবরণ চুরি করেছিল। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, চোরেরা ওটা তার নিকট রেখে দিয়েছিল। কতক ধর্মশাস্ত্রবিদের অভিমত এই যে, চুরির বস্তুর কোন সীমা নেই। তা অল্পই হোক আর বেশীই হোক এবং সুরক্ষিত জায়গা থেকে চুরি করে থাক বা অরক্ষিত জায়গা থেকে চুরি করে থাক, সর্বাবস্থাতেই চোরের হাত কাটা যাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি সাধারণ। তাহলে এ উক্তিটির ভাবার্থ এটাও হতে পারে এবং অন্যটাও হতে পারে। যারা উপরোক্ত মত পোষণ করেন তাঁদের একটি দলীল হচ্ছে এ হাদীসটি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ চোরের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন যে, সে সামান্য ডিম চুরি করে হাত কাটিয়ে নেয়, সে দড়ি বা রঞ্জু চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা হয়।” জমহুর উলামার অভিমত এই যে, চোরাই মালের সীমা নির্দিষ্ট আছে, যদিও সেই নির্দিষ্ট সীমার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, তিনটি খাঁটি রৌপ্যমুদ্রা বা এ পরিমাণ মূল্যের কোন জিনিস চুরি করলে হাত কাটা হবে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একটি চোরের হাত একটা ঢাল চুরি করার অপরাধে কেটে নেয়ার কথা বর্ণিত আছে। আর ওর মূল্য এ পরিমাণই ছিল। একটি চোর দরজা বা জানালার উপরিস্থিত কাঠ চুরি করেছিল। এ অপরাধে হযরত উসমান (রাঃ) তার হাত কেটে নিয়েছিলেন। ঐ কাঠটির মূল্য তিন দিরহামই ছিল। হযরত উসমান (রাঃ)-এর এ কাজটি যেন সাহাবায়ে কিরামের নীরব ইজমা’ই ছিল এবং এর দ্বারা এটাও সাব্যস্ত হচ্ছে যে, ফল চোরের হাত কেটে নেয়া হবে। হানাফীগণ এটা স্বীকার করেন না। তাঁদের মতে চোরাই মাল দশ দিরহাম মূল্যের হওয়া জরুরী। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তিনি চোরাই মালের জন্যে কমপক্ষে এক চতুর্থাংশ স্বর্ণমুদ্রা পরিমাণ মূল্য বা তার চেয়ে বেশী নির্দিষ্ট করেছেন। তাঁর দলীল হচ্ছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসটি। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক চতুর্থাংশ স্বর্ণমুদ্রা বা তার চেয়ে বেশীতে চোরের হাত কেটে নেয়া হবে।” সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক চতুর্থাংশ স্বর্ণমুদ্রা বা তার চেয়ে বেশী না হলে চোরের হাত কাটা যাবে না। সুতরাং এ হাদীস স্পষ্টভাবে এ মাসআলার মীমাংসা করে দেয়। আর যে হাদীসে তিন দিরহামে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চোরের হাত কেটে নেয়ার নির্দেশ বর্ণিত আছে, ওটা এর বিপরীত নয়। কেননা, ঐ সময় দীনার বা স্বর্ণমুদ্রা বারোটি দিরহাম বা রৌপ্যমুদ্রা পরিমাণ মূল্যের ছিল। অতএব, মূল হচ্ছে এক চতুর্থাংশ দীনার, তিন দিরহাম নয়। হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ), হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) এবং হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) এ কথাই বলেন। হযরত উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ), লায়েস ইবনে সা'দ আওযায়ী (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইসহাক ইবনে রাহওয়াই (রঃ) এবং আবু সাউর দাউদ ইবনে আলী যাহেরীরও (রঃ) এটাই উক্তি। এক রিওয়ায়াতে ইমাম ইসহাক ইবনে রাওয়াই (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, চতুর্থাংশ দীনারই হোক বা তিন দিরহামই হোক, দু'টোই হচ্ছে চোরের হাত কেটে ফেলার নেসাব। মুসনাদে আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক চতুর্থাংশ দীনার মূল্যের বস্তু চুরিতে তোমরা চোরের হাত কেটে নাও, তার কম পরিমাণ মূল্যের জিনিস চুরিতে হাত কেটো না।” ঐ সময় দীনার ছিল বারো দিরহামের। সুতরাং এক চতুর্থাংশ দীনার তিন দিরহামই হয়। সুনানে নাসাঈর শব্দ হচ্ছে নিম্নরূপঃ “চোরের হাত ঢালের মূল্যের কমে কাটা হবে না।” হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ ঢালের মূল্য কত? তিনি উত্তরে বলেনঃ “এক চতুর্থাংশ দীনার।” সুতরাং এ সমুদয় হাদীস দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে সাব্যস্ত হচ্ছে যে, হাত কাটার জন্যে দশ দিরহামের শর্ত করা ভুল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীগণ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে যে ঢাল চুরির অপরাধে চোরের হাত কেটে নেয়া হয়েছিল ওর * মূল্য ছিল দশ দিরহাম। যেমন আবু বকর ইবনে আবি শায়বা (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ)-এর যুগে ঢালের মূল্য ছিল দশ দিরহাম। আমর ইবনে শুআইব তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঢালের মূল্যের কমে চোরের হাত কাটা হবে না।” আর ঢালের মূল্য ছিল দশ দিরহাম। হানাফীগণ বলেনঃ “ঢালের মূল্যের ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-এর বিরোধিতা করেছেন। আর হুদূদের ব্যাপারে সাবধানতার উপর আমল করা উচিত এবং বেশীতেই সাবধানতা আছে। এ কারণেই আমরা চোরের হাত কাটার ব্যাপারে নেসাব নির্ধারণ করেছি দশ দিরহাম।” পূর্ববর্তী কোন কোন মনীষী বলেন যে, এর হদ হচ্ছে দশ দিরহাম বা এক দীনার। আলী ইবনে মাসউদ (রঃ), ইবরাহীম নখঈ (রঃ) এবং আবু জাফর (রঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, পাঁচ দীনার বা পঞ্চাশ দিরহামের সমান মূল্যের দ্রব্য চুরি ছাড়া পঞ্চমাংশ কেটে নেয়া হবে না। যাহেরিয়ার মাযহাব এই যে, চুরির মাল অল্পই হোক আর বেশীই হোক, তাতে হাত কেটে নেয়া হবে। তাদেরকে জমহুর এ উত্তর দিয়েছেন যে, প্রথমতঃ তো এ প্রয়োগই মানসূখ বা রহিত। কিন্তু এ উত্তর ঠিক নয়। কেননা, রহিত করণের ইতিহাসের কোন নিশ্চয়তা নেই। দ্বিতীয় উত্তর এই যে, ডিমের ভাবার্থ হচ্ছে লোহার ডিম এবং রজ্জ্বর ভাবার্থ হচ্ছে নৌকার মূল্যবান রঞ্জু। তৃতীয় উত্তর এই যে, পরিণামের দিকে লক্ষ্য রেখে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ চোর এ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাধারণ জিনিসগুলো চুরি করতে করতে শেষ পর্যন্ত মূল্যবান জিনিস চুরি করতে শুরু করে এবং এর ফলে তার হাত কেটে নেয়া হয়। আবার এও হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ নির্দেশ ঘটনার বর্ণনা হিসেবে ছিল। অজ্ঞতার যুগে ছোট ছোট জিনিস চুরি করলেও হাত কেটে নেয়া হতো। সুতরাং তিনি হয়তো আফসোস করে এবং চোরকে লজ্জা দিতে গিয়ে বলেছিলেনঃ সে কতই না লাঞ্ছিত ও বেওকুফ যে, সাধারণ জিনিসের কারণে হাতের মত এমন একটি নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্ণিত আছে যে, আবুল আলা মাআরবী যখন বাগদাদে আসে তখন সে এ ব্যাপারে বড় রকম আপত্তি করে বসে এবং তার মনে এ খেয়াল জাগে যে, তার এ আপত্তির কেউ কোন জবাব দিতে পারবে না। তাই সে এ ব্যাপারে একটি কবিতা রচনা করে। কবিতাটির অনুবাদ নিম্নরূপ-“যদি হাত কেটে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয় তবে এর দিয়্যাত হিসাবে পাঁচশ’ দেয়া হবে, আবার এই হাতকে মাত্র এক চতুর্থাংশ দীনার চুরির কারণে কেটে নেয়া হবে। এটা এমন একটি পরস্পর বিরোধী কথা যা আমার বোধগম্য হয় না, কাজেই আমাকে নীবর থাকতে হয়, আর আমি আমার মাওলার নিকট জাহান্নামের আগুন থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” যখন তার এ উক্তির প্রসিদ্ধি লাভ ঘটলো তখন উলামায়ে কিরাম তার জবাব দিতে চাইলেন। এ দেখে সে পালিয়ে গেলো। কাযী আবদুল অহ্হাব তার এ উক্তির জবাবে বলেছিলেনঃ “যতক্ষণ পর্যন্ত হাত বিশ্বস্ত ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত তা মূল্যবান ছিল এবং যখন সে বিশ্বাসঘাতকতা করলো অর্থাৎ চুরি করলো তখন তার মূল্য কমে গেল।” কোন কোন মনীষী কিছু বিস্তারিতভাবে এর উত্তর দিয়েছেন। তারা বলেছেনঃ এর দ্বারা শরীয়তের পূর্ণ হিকমত প্রকাশ পাচ্ছে এবং দুনিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তবে কেউ যদি কারও হাত বিনা কারণে কেটে দেয় তাহলে সে জন্যে বড় রকমের ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে তোক এ জঘন্য কাজ থেকে বিরত থাকে। সেখানে এ হুকুমই উপযুক্ত ছিল। সামান্য জিনিস চুরি করার কারণে হাত কেটে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে এ ভয়ে চুরির দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং এটাই তো হচ্ছে প্রকৃত হিকমতের পরিচয়। যদি চুরিতেও একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের শর্ত লাগানো হতো তবে চুরির পথ বন্ধ হতো না। এটা কৃতকর্মেরই প্রতিফল। উচিত পন্থা এটাই যে, যে অঙ্গ দ্বারা সে অপরের ক্ষতিসাধন করেছে ঐ অঙ্গের উপরই শাস্তি হবে, যাতে তার যথেষ্ট শিক্ষা লাভ হয় এবং অন্যেরাও সতর্ক হয়। আল্লাহ প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে প্রবল পরাক্রান্ত এবং স্বীয় আদেশ ও নিষেধের ব্যাপারে পূর্ণ বিজ্ঞানময়।(আরবী) যে ব্যক্তি সীমালংঘন করার পর অর্থাৎ চুরি করার পর তাওবা করে নেয় এবং আমলকে সংশোধন করে নেয়, তার প্রতি আল্লাহ (রহমতের) দৃষ্টি করবেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু। তবে হ্যাঁ, কেউ যদি কারও মাল চুরি করার পর তা নিজের কাছেই রেখে দেয় তাহলে শুধুমাত্র তাওবা করলেই গুনাহ মাফ হবে না। যে পর্যন্ত না সেই মাল মালিককে ফিরিয়ে না দেবে অথবা ওর পূর্ণ মূল্য প্রদান করবে। জমহুর ইমামদের এটাই অভিমত। শুধুমাত্র ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, যদি চুরির অপরাধে হাত কেটে নেয়া হয় এবং চোরাই মাল নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকে তবে দুনিয়ায় ওর বদলা প্রদান করা তার উপর জরুরী নয়। ইমাম দারেকুনীর হাদীস গ্রন্থের একটি মুরসাল হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে একটি চোরকে হাযির করা হয়। লোকটি একটি চাদর চুরি করেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আমার মনে হয় তুমি চুরি করনি।”সে বলে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি চুরি করেছি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকদেরকে বলেনঃ “তোমরা একে নিয়ে গিয়ে হাত কেটে দাও।” তার হাত কেটে নেয়া হলে সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তিনি তাকে বলেনঃ তাওবা কর। সে তখন তওবা করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আল্লাহ তোমার তাওবা কবূল করেছেন।সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, হযরত উমার ইবনে সুমরা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি চুরি করে ফেলেছি। সুতরাং আপনি আমাকে পবিত্র করে নিন। আমি অমুক কাবীলার উট চুরি করেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন সেই কাবীলার লোকদের নিকট সংবাদ পাঠিয়ে জানতে চান যে, ওটা সত্য কি-না। তারা বলেঃ “আমাদের একটি উট অবশ্যই চুরি হয়েছে। তখন তাঁর নির্দেশক্রমে হযরত উমার ইবনে সুমরা (রাঃ)-এর হাত কেটে নেয়া হয়। তিনি তখন হাতকে সম্বোধন করে বলেনঃ “আমি সেই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যিনি আমার দেহ হতে তোমাকে পৃথক করে দিয়েছেন। তুমি আমার সমস্ত দেহকে জাহান্নামে নিয়ে যেতে চেয়েছিলে।”ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর যুগে একটি স্ত্রীলোক চুরি করেছিল। তখন যে লোকদের সে চুরি করেছিল তারা তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। অতঃপর তারা বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ স্ত্রীলোকটি আমাদের চুরি করেছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “তোমরা তার হাত কেটে নাও।” তার গোত্রীয় লোকেরা পুনরায় বলেঃ “আমরা তার মুক্তিপণ হিসেবে পাঁচশ’ স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখনও বললেনঃ “তোমরা তার হাত কেটে নাও।” ফলে তার ডান হাত কেটে নেয়া হলো। স্ত্রীলোকটি তখন বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এতে আমার তাওবাও কি হয়ে গেল?” তিনি বললেনঃ “হ্যা, তুমি পাপ থেকে এমন পাকসাফ হয়ে গেলে যে, যেন তুমি আজকেই জন্মগ্রহণ করলে।”তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ঐ স্ত্রীলোকটি ছিল মাখযুম গোত্রের। এ ঘটনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও আছে। স্ত্রীলোকটি ভ্রান্ত বংশের ছিল বলে তার ব্যাপারে লোকদের মধ্যে খুবই দুশ্চিন্তা দেখা দেয় এবং তারা ইচ্ছা করে যে, রাসূলুল্লাহ(সঃ)-কে তার সম্পর্কে কিছু সুপারিশ করা হোক। এ ঘটনাটি মক্কা বিজয়ের সময় ঘটেছিল। অবশেষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ)-এর মাধ্যমে সুপারিশ করা হোক। কারণ, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। সুতরাং হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ) যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে তার জন্যে সুপারিশ করেন তখন তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন এবং রাগতঃস্বরে বলেনঃ “উসামা (রাঃ)! তুমি আল্লাহর হদসমূহের মধ্যে একটি হদের ব্যাপারে সুপারিশ করছো?” একথা শুনে হযরত উসামা (রাঃ) অত্যন্ত ঘাবড়িয়ে যান এবং বলেনঃ “আমি বড়ই অপরাধ করে ফেলেছি, দয়া করে আমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।” সন্ধ্যার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ভাষণ প্রদান করেন। তাতে তিনি আল্লাহর পূর্ণ প্রশংসা ও স্তুতিবাদের পর বলেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ স্বভাবের কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে যখন কোন সম্ভান্ত লোক চুরি করতো তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। পক্ষান্তরে কোন সাধারণ লোক চুরি করলে তার উপর হদ জারি করতো। যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! যদি ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ (সঃ) চুরি করে তবে তারও হাত কেটে নেবো।" অতঃপর তাঁর নির্দেশক্রমে মহিলাটির হাত কেটে নেয়া হয়। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এরপর ঐ মহিলাটি বিশুদ্ধ অন্তরে তাওবা করে এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তারপর থেকে সে কোন কাজে কামে আমার কাছে আসতো এবং তার প্রয়োজনের কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে তুলে ধরতাম।”সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, একটি মহিলা লোকদের কাছ থেকে আসবাবপত্র ধার করতো, তারপর তা অস্বীকার করে বসতো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার হাত কেটে নেয়ার নির্দেশ দেন। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, মহিলাটি এভাবে অলংকার গ্রহণ করতে এবং হযরত বিলাল (রাঃ)-কে তার হাত কেটে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আহকামের কিতাবগুলোর মধ্যে এ ধরনের বহু হাদীস রয়েছে যেগুলো চুরির সাথে সম্পর্কযুক্ত। আল্লাহ পাকের জন্যই সমুদয় প্রশংসা। সমস্ত বাদশাহর বাদশাহ, সারা বিশ্বের প্রকৃত বাদশাহ এবং সঠিক শাসনকর্তা একমাত্র আল্লাহ, যার কোন নির্দেশকে কেউ বাধা দিতে পারে না এবং যার কোন ইচ্ছাকে কেউ বদলিয়ে দিতে সক্ষম নয়। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। তিনি সব কিছুর উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান।

আল-মায়িদা 5:41

৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতসমূহে ঐ লোকদের নিন্দে করা হচ্ছে যারা স্বীয় অভিমত, কিয়াস এবং প্রবৃত্তিকে আল্লাহর শরীয়তের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য পরিত্যাগ করে কুফরীর দিকে দৌড়ে যায়। তারা মুখে শুধু ঈমানের দাবী করে বটে, কিন্তু তাদের অন্তর ঈমান শূন্য। মুনাফিকদের অবস্থা তো এটাই যে, তারা মুখে খুব সাধুতা প্রকাশ করে, কিন্তু অন্তর তাদের সম্পূর্ণ কপট। ইয়াহূদীদের স্বভাবও তদ্রুপ। তারা ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রু। তারা মিথ্যা ও বাজে কথা খুব মজা করে শুনে তাকে এবং অন্তরের সাথে ককূল করে থাকে। পক্ষান্তরে সত্য কথা থেকে তারা দূরে সরে থাকে, এমনকি ঘুণাও করে। তারা নবী (সঃ)-এর মজলিসে উপস্থিত হয় বটে, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য থাকে মুসলমানদের গোপনীয় কথা নিজেদের মধ্যে নিয়ে যাওয়া, তাদের পক্ষ থেকে তারা গুপ্তচরের কাজ করে। সবচেয়ে বড় দুষ্টুমি তাদের এই যে, তারা কথাকে বদলিয়ে দেয়। ভাবার্থ হবে একরূপ, কিন্তু তারা অন্য অর্থ করে জনগণের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেয়। উদ্দেশ্য এই যে, সেটা যদি তাদের মর্জি মোতাবেক হয় তবে তো মানবে, আর উল্টো হলে তা থেকে দূরে থাকবে। কথিত আছে যে, এ আয়াত ঐ সব ইয়াহূদীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা একে অপরকে হত্যা করেছিল। অতঃপর তারা পরস্পর বলাবলি করে-“চল, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করি। যদি তিনি রক্তপণ ও জরিমানার নির্দেশ দেন তবে তো মনে নেবো। আর যদি কিসাস বা হত্যার বদলে হত্যার নির্দেশ দেন তবে মানবো না।” কিন্তু সর্বাধিক সঠিক কথা এই যে, তারা এক ব্যভিচারিণী মহিলাকে নিয়ে এসেছিল। তাদের কিতাব তাওরাতে তো এ হুকুমই ছিল যে, ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিণী বিবাহিত বা বিবাহিতা হলে তাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করে দিতে হবে। কিন্তু তারা এটাকে বদলিয়ে দিয়েছিল এবং একশ চাবুক মেরে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং গাধায় উল্টো করে সওয়ার করিয়ে লাঞ্ছিত করতো। আর এরূপ শাস্তি দিয়েই ছেড়ে দিতে। নবী (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের পর তাদের কোন একজন ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী হয়ে গ্রেফতার হয়। তখন তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “চল, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করি। যদি তিনি আমাদের শাস্তি দানের মতই শাস্তির নির্দেশ দেন তবে আমরা তা মেনে নেবো এবং আল্লাহর কাছেও এটা আমাদের জন্যে সনদ হয়ে যাবে। আর যদি রজম বা পাথর নিক্ষেপে হত্যার নির্দেশ দেন তবে তা মানবো না।” সুতরাং তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে বললোঃ “আমাদের এক মহিলা ব্যভিচার করেছে। তার ব্যাপারে আপনি কি নির্দেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেনঃ ‘তোমাদের তাওরাতে কি নির্দেশ রয়েছে? তারা বললোঃ “আমরা তাকে লাঞ্ছিত করি এবং চাবুক মেরে ছেড়ে দেই।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “তোমরা মিথ্যা কথা বলছে। তাওরাতে পাথর নিক্ষেপে হত্যার নির্দেশ রয়েছে, তাওরাত নিয়ে এসে দেখি।” তারা তাওরাত খুলে দিল বটে, কিন্তু রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে দিয়ে পূর্বাপর সমস্ত পড়ে শুনালো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) সব কিছু বুঝে ফেললেন এবং তাদেরকে বললেন, হাত সরিয়ে নাও। হাত সরালে দেখা গেল যে, সেখানে রজমের আয়াত বিদ্যমান রয়েছে। তখন তাদেরকেও স্বীকার করতে হলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে ব্যভিচারীদ্বয়কে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করে দেয়া হলো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, আমি দেখলাম যে, ব্যভিচারী পুরুষ লোকটি ব্যভিচারিণী মহিলাটিকে পাথর থেকে বাঁচাবার জন্যে আড়াল হয়ে দাড়িয়েছিল।অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা বলেছিল, আমরা তো তাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং কিছু মারপিট করে ছেড়ে দেই।' অতঃপর রজমের আয়াত প্রকাশ হওয়ার পর তারা বলে, রয়েছে তো এ হুকুমই কিন্তু আমরা তা গোপন করে রেখেছিলাম।' যে পাঠ করেছিল সে-ই রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে দিয়েছিল। যখন তার হাত সরিয়ে ফেলা হলো তখন রজমের আয়াত প্রকাশ হয়ে পড়লো। এ দু’জনকে রজমকারীদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমারও (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ইয়াহূদীরা লোক পাঠিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ডেকে নিয়েছিল। তারা তাকে তাদের শিক্ষাগারে গদির উপর বসিয়েছিল। তাদের যে লোকটি তাওরাত পাঠ করেছিল সে তাওরাতের বড় পণ্ডিত ছিল। আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কসম দিয়ে বলেছিলেনঃ ‘তোমরা তাওরাতে বিবাহিত ব্যভিচারীর কি শাস্তি দেখেছ?' তারা উপরোক্ত উত্তরই দিয়েছিল। কিন্তু একটি যুবক কিছুই না বলে নীরবে দাঁড়িয়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সঃ) তার প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করে পুনরায় কসম দিয়ে তাকে প্রশ্ন করলেন এবং উত্তর চাইলেন। সে বললো, “আপনি যখন এমন কসমই দিলেন তখন আমি মিথ্যা কথা বলবো না। বাস্তবিক তাওরাতে এ প্রকারের অপরাধীর শাস্তি প্রস্তরাঘাতে হত্যাই রয়েছে।” তিনি বললেনঃ “আচ্ছা তাহলে এটাও সত্যি করে বল যে, তোমরা সর্বপ্রথম এ রজমকে কার উপর থেকে উঠিয়ে দিয়েছ?” সে উত্তরে বললো, জনাব! আমাদের বাদশাহর কোন এক সম্ভ্রান্ত্র বংশীয় আত্মীয় ব্যভিচার করে। তার পদমর্যাদা এবং বাদশাহী প্রভাবের ফলে তাকে রজম করা হয়নি। তারপর এক সাধারণ লোক ব্যভিচার করে। তাকে রজম করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তার গোত্রের সমস্ত লোক প্রতিবাদ করে বলে, পূর্ববর্তী লোকটিকেও রজম করতে হবে, না হলে একেও ছেড়ে দিতে হবে। তখন আমরা সবাই মিলে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, এ ধরনের কোন শাস্তি নির্ধারণ করা হোক। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাওরাতের হুকুমকেই জারী করেন। এ ব্যাপারেই (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহও (সঃ) ঐ আহকাম জারীকারীদের অন্তর্ভুক্ত। (মুসনাদে আহমাদ ও সুনানে আবি দাউদ)মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, ইয়াহূদীরা একটি লোককে চুনকালি মাখাবার জন্যে নিয়ে যাচ্ছিল এবং তারা তাকে চাবুকও মারছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ডেকে এর কারণ জিজ্ঞেস করেন। তারা উত্তরে বলে, “এ লোকটি ব্যভিচার করেছে।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন-“তোমাদের বিধানে কি ব্যভিচারের শাস্তি এটাই?" তারা উত্তর দিলো, হ্যা। তিনি তখন তাদের এক আলেমকে ডাকলেন এবং তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। তখন সে বললো, “আপনি যদি আমাকে এরূপ কসম না দিতেন তবে আমি কখনও বলতাম না। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমাদের বিধানে বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি প্রস্তরাঘাতে হত্যাই বটে। কিন্তু আমীরুল উমারা ও সম্ভ্রান্ত লোকদের মধ্যে এ পাপকার্য খুব বেশী ছড়িয়ে পড়লে তাদেরকে এ ধরনের শাস্তি দেয়া আমরা সমীচীন মনে করলাম না। তাই তাদেরকে তো ছেড়ে দিতাম। আর আল্লাহর নির্দেশও যাতে বৃথা না যায় তজ্জন্য দরিদ ও কম মর্যাদা সম্পন লোকদেরকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করে দিতাম। তারপর আমরা পরামর্শ করলাম যে, এমন এক শাস্তি নির্ধারণ করা যাক যা ধনী-গরীব, ইতর-ভদ্র নির্বিশেষে সকলের উপর সমানভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। অবশেষে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে চাবুক মারা হবে।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নির্দেশ দিয়ে বলেনঃ “তাদের উভয়কে পাথর মেরে হত্যা করে ফেল।' সুতরাং তাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করে ফেলা হয়। সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি প্রথম ঐ ব্যক্তি যে আপনার একটি মৃত হুকুমকে জীবিত করলো।” তখন (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ ইয়াহূদীদেরই সম্পর্কে অন্য আয়াতে রয়েছে- ‘আল্লাহর নাযিলকৃত হুকুম অনুযায়ী যারা মীমাংসা করে না তারা অত্যাচারী।' অন্য আয়াতে ফাসিক শব্দ রয়েছে। (সহীহ মুসলিম ইত্যাদি) অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ব্যভিচারের ঘটনাটি ফিদকে ঘটেছিল। সেখানকার ইয়াহূদীরা মদীনার ইয়াহূদীদের নিকট একজন আলেমকে পাঠিয়ে ব্যভিচারের শাস্তি জানতে চেয়েছিল। তথাকার যে আলেমটি মদীনায় এসেছিল তার নাম ছিল ইবনে সূরিয়া। তার চক্ষু টেরা ছিল। তার সাথে আর একজন আলেমও ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কসম দিলে তারা দুজনই তা কবূল করেছিল। তিনি তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদেরকে ঐ আল্লাহর কসম দিচ্ছি যিনি বানী ইসরাঈলের জন্যে পানিতে রাস্তা করে দিয়েছিলেন, তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া। করেছিলেন, তাদেরকে ফিরাউন থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং তাদের উপর মান’ ও সালওয়া’ অবতীর্ণ করেছিলেন।” এ কসমে তারা চমকে ওঠে এবং পরস্পর বলাবলি করে, এটাতো বড়ই কঠিন কসম। এরূপ স্থলে মিথ্যে বলা মোটেই ঠিক হবে না। তাই তারা বললো, জনাব! তাওরাতে রয়েছে যে, খারাপ নযরে দেখাও যেনাতুল্য, গলায় গলায় মিলনও যেনার মত এবং চুম্বন দেয়াও যেনাতুল্য। যদি এর উপর চারজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেয় যে, তারা পুংঙ্গিলকে স্ত্রীলিঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করতে ও বের হতে দেখেছে, যেমন শলাকা সুরমাদানীর ভেতর যাতায়াত করে, তবে রজম বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা ওয়াজিব হয়ে যাবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ মাসআলা তো এটাই। অতঃপর তিনি উক্ত যেনাকার পুরুষ ও নারীকে রজম করে দেয়ার নির্দেশ দেন। সেই সময় (আরবী) -এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সুনানে আবি দাউদ ইত্যাদি) আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, যে দু’জন আলেমকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে আনয়ন করা হয়েছিল, তারা ছিল সূরিয়ার দুইপুত্র। এ বর্ণনায় ইয়াহুদীদের হদ পরিত্যাগ করার কারণ তাদের পক্ষ থেকে নিম্নরূপ বর্ণনা করা হয়েছে- আমাদের মধ্যে যখন সালতানাত বা রাজত্ব রইলো না তখন আমরা আমাদের লোকদেরকে হত্যা করা সমীচীন মনে করলাম না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাক্ষীদেরকে ডাকিয়ে নিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। তারা বলে, আমরা তাদের দু'জনকে এ কু-কাজ করতে স্পষ্টভাবে দেখেছি, যেমনভাবে শলাকা সুরমাদানীর ভেতর প্রবেশ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তাওরাত ইত্যাদি চেয়ে পাঠানো এবং তাদের আলেমদেরকে ডেকে পাঠাননা তাদেরকে দোষারোপ করার উদ্দেশ্যে ছিল না এবং উদ্দেশ্য এটাও ছিল না যে, তারা ওটা মানবার মুকাল্লাফই নয়, বরং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশই অবশ্য পালনীয়। এটা দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল প্রথমতঃ তাঁর সত্যতা প্রকাশ। তা এই যে, তাওরাতেও যে এ নির্দেশই রয়েছে তা তিনি অহীর মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন। আর প্রকাশ পেলও তা-ই। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে লজ্জিত করা যে, তারা প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে তাদেরকে স্বীকার করতেই হলো এবং দুনিয়ায় এটা প্রকাশ পেয়ে গেলো যে, তারা আল্লাহর বিধানকে গোপনকারী এবং নিজেদের মত ও কিয়াসের উপর আমলকারী। তাছাড়া উদ্দেশ্য এও ছিল যে, ঐ ইয়াহূদীরা সরল মনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসেনি যে, তাঁর নির্দেশ মোতাবেক কাজ করবে। বরং তাদের আগমনের উদ্দেশ্য শুধু এই ছিল যে, যদি তিনিও তাদের ইজমা’ মোতাবেক নির্দেশ দেন তবে তারা মেনে নেবে, নচেৎ কিছুতেই মানবে না। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন যে, তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান তার সুপথ প্রাপ্তি কোনক্রমেই সম্ভব নয়। তাদের অপবিত্র অন্তরকে পবিত্র করার আল্লাহর ইচ্ছাই নেই। তারা দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে এবং পরকালেও তাদের জন্যে রয়েছে ভীষণ শাস্তি।বলা হচ্ছে-তারা মিথ্যা কথা কান লাগিয়ে শুনতে এবং হারাম বস্তু অর্থাৎ সুদ খেতে অভ্যস্ত। সুতরাং কিরূপে তাদের অপবিত্র অন্তর পবিত্র হবে? আর তাদের দুআই বা আল্লাহ কি করে শুনবেন? হে নবী (সঃ)! যদি তারা তোমার কাছে মীমাংসার জন্যে আসে তবে তাদের ফায়সালা করা না করার তোমার অধিকার রয়েছে। তুমি যদি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তথাপি তারা তোমার কোনই ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। কেননা, তাদের উদ্দেশ্য সত্যের অনুসরণ নয়, বরং নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ। কোন গুরুজন বলেন যে, এ আয়াতটি (আরবী) (৫:৪৯)-এ আয়াতটি দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। এরপর ইরশাদ হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! যদি তুমি তাদের মধ্যে মীমাংসা কর তবে ন্যায়ের সাথে মীমাংসা করো, যদিও এরা নিজেরা অত্যাচারী এবং আদল ও ইনসাফ থেকে বহু দূরে রয়েছে। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা ন্যায় বিচারকদেরকে ভালবাসেন। অতঃপর ইয়াহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতা, অন্তরের কলুষতা এবং বিরুদ্ধাচরণের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, একদিকে তো তারা আল্লাহ পাকের এ কিতাবকে ছেড়ে দিয়েছে যার আনুগত্য স্বীকার ও সত্যতার কথা তারা নিজেরাও স্বীকার করেছে। দ্বিতীয়তঃ তারা ঐ দিকে ঝুঁকে পড়েছে যাকে তারা নিজেরাও মানে না এবং ওটাকে মিথ্যা বলে ছড়িয়ে দিয়েছে। আবার সেখানেও তাদের নিয়ত ভাল নয়। কারণ তাদের উদ্দেশ্য এই যে, যদি সেখানে গিয়ে তাদের ইচ্ছা মোতাবেক হুকুম পায় তবে তো তা মেনে নেবে, নতুবা ছেড়ে দেবে। তাই, আল্লাহ তা'আলা নবী (সঃ)-কে বলেনঃ তারা কি করে তোমার হুকুম মানতে পারে? তারা তো তাওরাতকেও ছেড়ে দিয়েছে। তাতে আল্লাহর হুকুম রয়েছে, এটা তো তারাও স্বীকার করেছে, অথচ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।তারপর এ তাওরাতের প্রশংসা করা হচ্ছে যা তিনি স্বীয় মনোনীত রাসূল হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছিলেন। এর মধ্যে হিদায়াত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর হুকুমবাহী নবীগণ ওর মাধ্যমেই ফায়সালা করে থাকেন এবং ইয়াহূদীদের মধ্যে ওরই আহকাম জারী করেন। তারা ওর পরিবর্তন ও পরিবর্ধন থেকে বেঁচে থাকেন এবং আল্লাহওয়ালা লোকেরাও এ নীতির উপর থাকেন। কেননা, এ পবিত্র গ্রন্থ তাঁদেরকে সমর্পণ করা হয়েছিল এবং ওটা প্রকাশ করে দেয়া ও ওর উপর আমল করার তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তারা ওর উপর সাক্ষী ছিলেন। ঘঘাষিত হচ্ছে-এখন তোমাদের উচিত যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও ভয় করবে না। তোমরা প্রতি মূহূর্তে এবং পদে পদে আল্লাহকে ভয় করতে থাকবে এবং তাঁর আয়াতগুলোকে সামান্য মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করবে না। জেনে রেখো যে, আল্লাহর নাযিলকৃত অহী মোতাবেক যারা ফায়সালা করে না তারা কাফির। এতে দু'টি উক্তি রয়েছে, যা ইনশাআল্লাহ এখনই বর্ণিত হচ্ছে। এ আয়াতগুলোর আরও একটি শানে নমূল নিম্নরূপঃহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতে এ লোকদেরকে কাফির, দ্বিতীয় আয়াতে যালিম এবং তৃতীয় আয়াতে ফাসিক বলা হয়েছে। ব্যাপার এই যে, ইয়াহূদীদের দু'টি দল ছিল। একটি বানূ নাযীর এবং অপরটি বানূ কুরাইযা। প্রথমটি ছিল সবল এবং দ্বিতীটি ছিল দুর্বল। তাদের পরস্পরের মধ্যে এ কথার উপর সন্ধি হয়েছিল যে, সবল দলটির কোন লোক যদি দুর্বল দলটির কোন লোককে হত্যা করে তবে তাকে পঞ্চাশ ওয়াসাক রক্তপণ দিতে হবে। পক্ষান্তরে যদি দুর্বল দলটির কোন লোক সবল দলটির কোন লোককে হত্যা করে তবে তাকে একশ ওয়াসাক রক্তপণ আদায় করতে হবে। এ প্রথাই তাদের মধ্যে চলে আসছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় আগমনের পর এরূপ এক ঘটনা ঘটে যে, দুর্বল ইয়াহূদীদের এক ব্যক্তি সবল ইয়াহুদীদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। তখন এদের পক্ষ থেকে এক লোক ওদের কাছে গিয়ে বলে, এখন একশ’ ওয়াসাক আদায় কর।' তারা উত্তরে বলে, “এটা তো প্রকাশ্যভাবে অন্যায় আচরণ। আমরা তো সবাই একই গোত্রের, একই ধর্মের, একই বংশের এবং একই শহরের লোক। অথচ আমরা রক্তপণ পাবো কম আর তোমরা পাবে বেশী! এতদিন পর্যন্ত তোমরা আমাদেরকে দাবিয়ে রেখেছিলে। আমরা বাধ্য ও অপরাগ হয়ে তোমাদের এ অন্যায় সহ্য করে আসছিলাম। কিন্তু এখন যেহেতু এখানে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ন্যায় একজন ন্যায়পরায়ণ লোক এসে গেছেন সেহেতু আমরা তোমাদেরকে সেই পরিমাণ রক্তপণই প্রদান করবো। যে পরিমাণ তোমরা আমাদেকে প্রদান করে থাক।” এ নিয়ে চতুর্দিকে গোলমান শুরু হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত পরস্পরের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এর মীমাংসাকারী নিযুক্ত করা হোক। কিন্তু সবল লোকেরা যখন নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলো তখন তাদের কয়েকজন বুদ্ধিমান লোক তাদেরকে বললো, তোমরা এ আশা করো না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অন্যায়ের আদেশ প্রদান করবেন। এটাতো স্পষ্ট বাড়াবাড়ি যে, আমরা দেবো অর্ধেক এবং নেবো পুরোপুরি! আর বাস্তবিকই এ লোকগুলো অপারগ হয়েই এটা মেনে নিয়েছিল। এক্ষণে যখন তোমরা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে মীমাংসাকারী নির্বাচন করলে তখন অবশ্যই তোমাদের হক মারা যাবে। কেউ কেউ পরামর্শ দিলো, গোপনে কোন লোককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দাও। তিনি কি ফায়সালার করবেন তা সে জেনে আসুক। সেটা যদি আমাদের অনুকূলে হয় তবে তো ভাল কথা। আমরা তাদের নিকট থেকে আমাদের হক আদায় করে নেবো। আর যদি ওটা আমাদের প্রতিকূলে হয় তবে আমাদের পৃথক থাকাই বাঞ্ছণীয় হবে। এ পরামর্শ অনুযায়ী তারা মদীনার কয়েকজন মুনাফিককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করলো। তারা তাঁর নিকট পৌছার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করে স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে তাদের কু-মতলব সম্পর্কে অবহিত করলেন। (সুনানে আবি দাউদ)আর একটি বর্ণনায় আছে যে, বানূ নাযীর গোত্র পুরোপুরি রক্তপণ গ্রহণ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উভয় গোত্রকে রক্তপণ সমান সমান দেয়ার ফায়সালা করলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, বানু কুরাইযার কোন লোক বানু নাযীরের কোন লোককে হত্যা করলে তার কিসাস নেয়া হতো। পক্ষান্তরে বান্ নাযীরের কোন লোক বানূ কুরাইযার কোন লোককে হত্যা করলে কিসাসের কোন ব্যবস্থাই ছিল না, বরং রক্তপণ ছিল একশ ওয়াসাক। এটা খুবই সম্ভব যে, এদিকে এ ঘটনা ঘটে এবং ঐদিকে ব্যভিচারের ঘটনা ঘটে যায়। আর দু'টো ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হ্যাঁ, তবে আরও একটি কথা রয়েছে, যদ্দ্বারা এ দ্বিতীয় শানে নফুলটির প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এরপরেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।(আরবী) (অর্থাৎ আর আমি তাদের প্রতি তাতে (তাওরাতে) এটা ফরয করেছিলাম যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিমযে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাতের বিনিময়ে দাঁত এবং (জ্রপ অন্যান্য) বিশেষ যখমেরও বিনিময় রয়েছে; অনন্তর যে ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে দেয় তবে এটা তার জন্যে (পাপের) কাফফারা হয়ে যাবে; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবতারিত বিধান অনুযায়ী হুকুম না করে তবে তো এমন ব্যক্তি পূর্ণ যালিম।) আল্লাহ পাকই সবচেয়ে বেশী জানেন।অতঃপর যারা আল্লাহর শরীয়ত এবং তাঁর অবতারিত অহী অনুযায়ী ফায়সালা করে না তাদেরকে কাফির বলা হয়েছে। এ আয়াতটি মুফাসসিরদের উক্তি অনুযায়ী শানে নকূল হিসেবে আহলে কিতাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও হুকুমের দিক দিয়ে এটা সমস্ত লোকের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। এটা বানূ ইসরাঈলের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল বটে; কিন্তু এ উম্মতেরও এটাই হুকুম। ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, ঘুষ খেয়ে কোন শরঈ মাসআলার ব্যাপারে উল্টো ফতওয়া দেয়া কুফরী। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যদি ইচ্ছাপূর্বক আল্লাহর অহীর বিপরীত ফতওয়া দেয়, জানা সত্ত্বেও তার উল্টো করে তবে সে কাফির। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ফরমানকে অস্বীকার করবে তার হুকুম এটাই। আর যে ব্যক্তি অস্বীকার করলো না বটে, কিন্তু তা মোতাবেক বললো না, সে যালিম ও ফাসিক। সে আহলে কিতাবই হোক বা আর কেউ হোক। শাবী (রঃ) বলেন যে, মুসলমানদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের বিপরীত ফতওয়া দেবে সে কাফির, ইয়াহূদীদের মধ্যে দেবে সে যালিম এবং খ্রীষ্টানদের মধ্যে দেবে সে ফাসিক। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তার কুফরী হচ্ছে এ আয়াতের সঙ্গে। তাউস (রাঃ) বলেন যে, তার কুফরী ঐ ব্যক্তির কুফরীর মত নয় যে আল্লাহ, রাসূল (সঃ), কুরআন এবং ফেরেশতাদেরকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। আতা’ (রঃ) বলেন যে, কুফরীর মধ্যে যেমন কম বেশী আছে তেমনই যুলম ও ফিসকের মধ্যেও কম বেশী আছে। এ কুফরীর কারণে সে মিল্লাতে ইসলাম হতে বের হয়ে যাবে না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা যে দিকে যাচ্ছ এর দ্বারা ঐ কুফরী উদ্দেশ্য নয়।”

আল-মায়িদা 5:42

৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতসমূহে ঐ লোকদের নিন্দে করা হচ্ছে যারা স্বীয় অভিমত, কিয়াস এবং প্রবৃত্তিকে আল্লাহর শরীয়তের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য পরিত্যাগ করে কুফরীর দিকে দৌড়ে যায়। তারা মুখে শুধু ঈমানের দাবী করে বটে, কিন্তু তাদের অন্তর ঈমান শূন্য। মুনাফিকদের অবস্থা তো এটাই যে, তারা মুখে খুব সাধুতা প্রকাশ করে, কিন্তু অন্তর তাদের সম্পূর্ণ কপট। ইয়াহূদীদের স্বভাবও তদ্রুপ। তারা ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রু। তারা মিথ্যা ও বাজে কথা খুব মজা করে শুনে তাকে এবং অন্তরের সাথে ককূল করে থাকে। পক্ষান্তরে সত্য কথা থেকে তারা দূরে সরে থাকে, এমনকি ঘুণাও করে। তারা নবী (সঃ)-এর মজলিসে উপস্থিত হয় বটে, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য থাকে মুসলমানদের গোপনীয় কথা নিজেদের মধ্যে নিয়ে যাওয়া, তাদের পক্ষ থেকে তারা গুপ্তচরের কাজ করে। সবচেয়ে বড় দুষ্টুমি তাদের এই যে, তারা কথাকে বদলিয়ে দেয়। ভাবার্থ হবে একরূপ, কিন্তু তারা অন্য অর্থ করে জনগণের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেয়। উদ্দেশ্য এই যে, সেটা যদি তাদের মর্জি মোতাবেক হয় তবে তো মানবে, আর উল্টো হলে তা থেকে দূরে থাকবে। কথিত আছে যে, এ আয়াত ঐ সব ইয়াহূদীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা একে অপরকে হত্যা করেছিল। অতঃপর তারা পরস্পর বলাবলি করে-“চল, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করি। যদি তিনি রক্তপণ ও জরিমানার নির্দেশ দেন তবে তো মনে নেবো। আর যদি কিসাস বা হত্যার বদলে হত্যার নির্দেশ দেন তবে মানবো না।” কিন্তু সর্বাধিক সঠিক কথা এই যে, তারা এক ব্যভিচারিণী মহিলাকে নিয়ে এসেছিল। তাদের কিতাব তাওরাতে তো এ হুকুমই ছিল যে, ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিণী বিবাহিত বা বিবাহিতা হলে তাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করে দিতে হবে। কিন্তু তারা এটাকে বদলিয়ে দিয়েছিল এবং একশ চাবুক মেরে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং গাধায় উল্টো করে সওয়ার করিয়ে লাঞ্ছিত করতো। আর এরূপ শাস্তি দিয়েই ছেড়ে দিতে। নবী (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের পর তাদের কোন একজন ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী হয়ে গ্রেফতার হয়। তখন তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “চল, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করি। যদি তিনি আমাদের শাস্তি দানের মতই শাস্তির নির্দেশ দেন তবে আমরা তা মেনে নেবো এবং আল্লাহর কাছেও এটা আমাদের জন্যে সনদ হয়ে যাবে। আর যদি রজম বা পাথর নিক্ষেপে হত্যার নির্দেশ দেন তবে তা মানবো না।” সুতরাং তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে বললোঃ “আমাদের এক মহিলা ব্যভিচার করেছে। তার ব্যাপারে আপনি কি নির্দেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেনঃ ‘তোমাদের তাওরাতে কি নির্দেশ রয়েছে? তারা বললোঃ “আমরা তাকে লাঞ্ছিত করি এবং চাবুক মেরে ছেড়ে দেই।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “তোমরা মিথ্যা কথা বলছে। তাওরাতে পাথর নিক্ষেপে হত্যার নির্দেশ রয়েছে, তাওরাত নিয়ে এসে দেখি।” তারা তাওরাত খুলে দিল বটে, কিন্তু রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে দিয়ে পূর্বাপর সমস্ত পড়ে শুনালো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) সব কিছু বুঝে ফেললেন এবং তাদেরকে বললেন, হাত সরিয়ে নাও। হাত সরালে দেখা গেল যে, সেখানে রজমের আয়াত বিদ্যমান রয়েছে। তখন তাদেরকেও স্বীকার করতে হলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে ব্যভিচারীদ্বয়কে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করে দেয়া হলো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, আমি দেখলাম যে, ব্যভিচারী পুরুষ লোকটি ব্যভিচারিণী মহিলাটিকে পাথর থেকে বাঁচাবার জন্যে আড়াল হয়ে দাড়িয়েছিল।অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা বলেছিল, আমরা তো তাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং কিছু মারপিট করে ছেড়ে দেই।' অতঃপর রজমের আয়াত প্রকাশ হওয়ার পর তারা বলে, রয়েছে তো এ হুকুমই কিন্তু আমরা তা গোপন করে রেখেছিলাম।' যে পাঠ করেছিল সে-ই রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে দিয়েছিল। যখন তার হাত সরিয়ে ফেলা হলো তখন রজমের আয়াত প্রকাশ হয়ে পড়লো। এ দু’জনকে রজমকারীদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমারও (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ইয়াহূদীরা লোক পাঠিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ডেকে নিয়েছিল। তারা তাকে তাদের শিক্ষাগারে গদির উপর বসিয়েছিল। তাদের যে লোকটি তাওরাত পাঠ করেছিল সে তাওরাতের বড় পণ্ডিত ছিল। আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কসম দিয়ে বলেছিলেনঃ ‘তোমরা তাওরাতে বিবাহিত ব্যভিচারীর কি শাস্তি দেখেছ?' তারা উপরোক্ত উত্তরই দিয়েছিল। কিন্তু একটি যুবক কিছুই না বলে নীরবে দাঁড়িয়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সঃ) তার প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করে পুনরায় কসম দিয়ে তাকে প্রশ্ন করলেন এবং উত্তর চাইলেন। সে বললো, “আপনি যখন এমন কসমই দিলেন তখন আমি মিথ্যা কথা বলবো না। বাস্তবিক তাওরাতে এ প্রকারের অপরাধীর শাস্তি প্রস্তরাঘাতে হত্যাই রয়েছে।” তিনি বললেনঃ “আচ্ছা তাহলে এটাও সত্যি করে বল যে, তোমরা সর্বপ্রথম এ রজমকে কার উপর থেকে উঠিয়ে দিয়েছ?” সে উত্তরে বললো, জনাব! আমাদের বাদশাহর কোন এক সম্ভ্রান্ত্র বংশীয় আত্মীয় ব্যভিচার করে। তার পদমর্যাদা এবং বাদশাহী প্রভাবের ফলে তাকে রজম করা হয়নি। তারপর এক সাধারণ লোক ব্যভিচার করে। তাকে রজম করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তার গোত্রের সমস্ত লোক প্রতিবাদ করে বলে, পূর্ববর্তী লোকটিকেও রজম করতে হবে, না হলে একেও ছেড়ে দিতে হবে। তখন আমরা সবাই মিলে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, এ ধরনের কোন শাস্তি নির্ধারণ করা হোক। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাওরাতের হুকুমকেই জারী করেন। এ ব্যাপারেই (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহও (সঃ) ঐ আহকাম জারীকারীদের অন্তর্ভুক্ত। (মুসনাদে আহমাদ ও সুনানে আবি দাউদ)মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, ইয়াহূদীরা একটি লোককে চুনকালি মাখাবার জন্যে নিয়ে যাচ্ছিল এবং তারা তাকে চাবুকও মারছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ডেকে এর কারণ জিজ্ঞেস করেন। তারা উত্তরে বলে, “এ লোকটি ব্যভিচার করেছে।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন-“তোমাদের বিধানে কি ব্যভিচারের শাস্তি এটাই?" তারা উত্তর দিলো, হ্যা। তিনি তখন তাদের এক আলেমকে ডাকলেন এবং তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। তখন সে বললো, “আপনি যদি আমাকে এরূপ কসম না দিতেন তবে আমি কখনও বলতাম না। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমাদের বিধানে বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি প্রস্তরাঘাতে হত্যাই বটে। কিন্তু আমীরুল উমারা ও সম্ভ্রান্ত লোকদের মধ্যে এ পাপকার্য খুব বেশী ছড়িয়ে পড়লে তাদেরকে এ ধরনের শাস্তি দেয়া আমরা সমীচীন মনে করলাম না। তাই তাদেরকে তো ছেড়ে দিতাম। আর আল্লাহর নির্দেশও যাতে বৃথা না যায় তজ্জন্য দরিদ ও কম মর্যাদা সম্পন লোকদেরকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করে দিতাম। তারপর আমরা পরামর্শ করলাম যে, এমন এক শাস্তি নির্ধারণ করা যাক যা ধনী-গরীব, ইতর-ভদ্র নির্বিশেষে সকলের উপর সমানভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। অবশেষে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে চাবুক মারা হবে।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নির্দেশ দিয়ে বলেনঃ “তাদের উভয়কে পাথর মেরে হত্যা করে ফেল।' সুতরাং তাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করে ফেলা হয়। সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি প্রথম ঐ ব্যক্তি যে আপনার একটি মৃত হুকুমকে জীবিত করলো।” তখন (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ ইয়াহূদীদেরই সম্পর্কে অন্য আয়াতে রয়েছে- ‘আল্লাহর নাযিলকৃত হুকুম অনুযায়ী যারা মীমাংসা করে না তারা অত্যাচারী।' অন্য আয়াতে ফাসিক শব্দ রয়েছে। (সহীহ মুসলিম ইত্যাদি) অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ব্যভিচারের ঘটনাটি ফিদকে ঘটেছিল। সেখানকার ইয়াহূদীরা মদীনার ইয়াহূদীদের নিকট একজন আলেমকে পাঠিয়ে ব্যভিচারের শাস্তি জানতে চেয়েছিল। তথাকার যে আলেমটি মদীনায় এসেছিল তার নাম ছিল ইবনে সূরিয়া। তার চক্ষু টেরা ছিল। তার সাথে আর একজন আলেমও ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কসম দিলে তারা দুজনই তা কবূল করেছিল। তিনি তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদেরকে ঐ আল্লাহর কসম দিচ্ছি যিনি বানী ইসরাঈলের জন্যে পানিতে রাস্তা করে দিয়েছিলেন, তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া। করেছিলেন, তাদেরকে ফিরাউন থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং তাদের উপর মান’ ও সালওয়া’ অবতীর্ণ করেছিলেন।” এ কসমে তারা চমকে ওঠে এবং পরস্পর বলাবলি করে, এটাতো বড়ই কঠিন কসম। এরূপ স্থলে মিথ্যে বলা মোটেই ঠিক হবে না। তাই তারা বললো, জনাব! তাওরাতে রয়েছে যে, খারাপ নযরে দেখাও যেনাতুল্য, গলায় গলায় মিলনও যেনার মত এবং চুম্বন দেয়াও যেনাতুল্য। যদি এর উপর চারজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেয় যে, তারা পুংঙ্গিলকে স্ত্রীলিঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করতে ও বের হতে দেখেছে, যেমন শলাকা সুরমাদানীর ভেতর যাতায়াত করে, তবে রজম বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা ওয়াজিব হয়ে যাবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ মাসআলা তো এটাই। অতঃপর তিনি উক্ত যেনাকার পুরুষ ও নারীকে রজম করে দেয়ার নির্দেশ দেন। সেই সময় (আরবী) -এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সুনানে আবি দাউদ ইত্যাদি) আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, যে দু’জন আলেমকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে আনয়ন করা হয়েছিল, তারা ছিল সূরিয়ার দুইপুত্র। এ বর্ণনায় ইয়াহুদীদের হদ পরিত্যাগ করার কারণ তাদের পক্ষ থেকে নিম্নরূপ বর্ণনা করা হয়েছে- আমাদের মধ্যে যখন সালতানাত বা রাজত্ব রইলো না তখন আমরা আমাদের লোকদেরকে হত্যা করা সমীচীন মনে করলাম না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাক্ষীদেরকে ডাকিয়ে নিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। তারা বলে, আমরা তাদের দু'জনকে এ কু-কাজ করতে স্পষ্টভাবে দেখেছি, যেমনভাবে শলাকা সুরমাদানীর ভেতর প্রবেশ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তাওরাত ইত্যাদি চেয়ে পাঠানো এবং তাদের আলেমদেরকে ডেকে পাঠাননা তাদেরকে দোষারোপ করার উদ্দেশ্যে ছিল না এবং উদ্দেশ্য এটাও ছিল না যে, তারা ওটা মানবার মুকাল্লাফই নয়, বরং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশই অবশ্য পালনীয়। এটা দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল প্রথমতঃ তাঁর সত্যতা প্রকাশ। তা এই যে, তাওরাতেও যে এ নির্দেশই রয়েছে তা তিনি অহীর মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন। আর প্রকাশ পেলও তা-ই। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে লজ্জিত করা যে, তারা প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে তাদেরকে স্বীকার করতেই হলো এবং দুনিয়ায় এটা প্রকাশ পেয়ে গেলো যে, তারা আল্লাহর বিধানকে গোপনকারী এবং নিজেদের মত ও কিয়াসের উপর আমলকারী। তাছাড়া উদ্দেশ্য এও ছিল যে, ঐ ইয়াহূদীরা সরল মনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসেনি যে, তাঁর নির্দেশ মোতাবেক কাজ করবে। বরং তাদের আগমনের উদ্দেশ্য শুধু এই ছিল যে, যদি তিনিও তাদের ইজমা’ মোতাবেক নির্দেশ দেন তবে তারা মেনে নেবে, নচেৎ কিছুতেই মানবে না। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন যে, তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান তার সুপথ প্রাপ্তি কোনক্রমেই সম্ভব নয়। তাদের অপবিত্র অন্তরকে পবিত্র করার আল্লাহর ইচ্ছাই নেই। তারা দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে এবং পরকালেও তাদের জন্যে রয়েছে ভীষণ শাস্তি।বলা হচ্ছে-তারা মিথ্যা কথা কান লাগিয়ে শুনতে এবং হারাম বস্তু অর্থাৎ সুদ খেতে অভ্যস্ত। সুতরাং কিরূপে তাদের অপবিত্র অন্তর পবিত্র হবে? আর তাদের দুআই বা আল্লাহ কি করে শুনবেন? হে নবী (সঃ)! যদি তারা তোমার কাছে মীমাংসার জন্যে আসে তবে তাদের ফায়সালা করা না করার তোমার অধিকার রয়েছে। তুমি যদি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তথাপি তারা তোমার কোনই ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। কেননা, তাদের উদ্দেশ্য সত্যের অনুসরণ নয়, বরং নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ। কোন গুরুজন বলেন যে, এ আয়াতটি (আরবী) (৫:৪৯)-এ আয়াতটি দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। এরপর ইরশাদ হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! যদি তুমি তাদের মধ্যে মীমাংসা কর তবে ন্যায়ের সাথে মীমাংসা করো, যদিও এরা নিজেরা অত্যাচারী এবং আদল ও ইনসাফ থেকে বহু দূরে রয়েছে। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা ন্যায় বিচারকদেরকে ভালবাসেন। অতঃপর ইয়াহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতা, অন্তরের কলুষতা এবং বিরুদ্ধাচরণের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, একদিকে তো তারা আল্লাহ পাকের এ কিতাবকে ছেড়ে দিয়েছে যার আনুগত্য স্বীকার ও সত্যতার কথা তারা নিজেরাও স্বীকার করেছে। দ্বিতীয়তঃ তারা ঐ দিকে ঝুঁকে পড়েছে যাকে তারা নিজেরাও মানে না এবং ওটাকে মিথ্যা বলে ছড়িয়ে দিয়েছে। আবার সেখানেও তাদের নিয়ত ভাল নয়। কারণ তাদের উদ্দেশ্য এই যে, যদি সেখানে গিয়ে তাদের ইচ্ছা মোতাবেক হুকুম পায় তবে তো তা মেনে নেবে, নতুবা ছেড়ে দেবে। তাই, আল্লাহ তা'আলা নবী (সঃ)-কে বলেনঃ তারা কি করে তোমার হুকুম মানতে পারে? তারা তো তাওরাতকেও ছেড়ে দিয়েছে। তাতে আল্লাহর হুকুম রয়েছে, এটা তো তারাও স্বীকার করেছে, অথচ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।তারপর এ তাওরাতের প্রশংসা করা হচ্ছে যা তিনি স্বীয় মনোনীত রাসূল হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছিলেন। এর মধ্যে হিদায়াত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর হুকুমবাহী নবীগণ ওর মাধ্যমেই ফায়সালা করে থাকেন এবং ইয়াহূদীদের মধ্যে ওরই আহকাম জারী করেন। তারা ওর পরিবর্তন ও পরিবর্ধন থেকে বেঁচে থাকেন এবং আল্লাহওয়ালা লোকেরাও এ নীতির উপর থাকেন। কেননা, এ পবিত্র গ্রন্থ তাঁদেরকে সমর্পণ করা হয়েছিল এবং ওটা প্রকাশ করে দেয়া ও ওর উপর আমল করার তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তারা ওর উপর সাক্ষী ছিলেন। ঘঘাষিত হচ্ছে-এখন তোমাদের উচিত যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও ভয় করবে না। তোমরা প্রতি মূহূর্তে এবং পদে পদে আল্লাহকে ভয় করতে থাকবে এবং তাঁর আয়াতগুলোকে সামান্য মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করবে না। জেনে রেখো যে, আল্লাহর নাযিলকৃত অহী মোতাবেক যারা ফায়সালা করে না তারা কাফির। এতে দু'টি উক্তি রয়েছে, যা ইনশাআল্লাহ এখনই বর্ণিত হচ্ছে। এ আয়াতগুলোর আরও একটি শানে নমূল নিম্নরূপঃহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতে এ লোকদেরকে কাফির, দ্বিতীয় আয়াতে যালিম এবং তৃতীয় আয়াতে ফাসিক বলা হয়েছে। ব্যাপার এই যে, ইয়াহূদীদের দু'টি দল ছিল। একটি বানূ নাযীর এবং অপরটি বানূ কুরাইযা। প্রথমটি ছিল সবল এবং দ্বিতীটি ছিল দুর্বল। তাদের পরস্পরের মধ্যে এ কথার উপর সন্ধি হয়েছিল যে, সবল দলটির কোন লোক যদি দুর্বল দলটির কোন লোককে হত্যা করে তবে তাকে পঞ্চাশ ওয়াসাক রক্তপণ দিতে হবে। পক্ষান্তরে যদি দুর্বল দলটির কোন লোক সবল দলটির কোন লোককে হত্যা করে তবে তাকে একশ ওয়াসাক রক্তপণ আদায় করতে হবে। এ প্রথাই তাদের মধ্যে চলে আসছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় আগমনের পর এরূপ এক ঘটনা ঘটে যে, দুর্বল ইয়াহূদীদের এক ব্যক্তি সবল ইয়াহুদীদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। তখন এদের পক্ষ থেকে এক লোক ওদের কাছে গিয়ে বলে, এখন একশ’ ওয়াসাক আদায় কর।' তারা উত্তরে বলে, “এটা তো প্রকাশ্যভাবে অন্যায় আচরণ। আমরা তো সবাই একই গোত্রের, একই ধর্মের, একই বংশের এবং একই শহরের লোক। অথচ আমরা রক্তপণ পাবো কম আর তোমরা পাবে বেশী! এতদিন পর্যন্ত তোমরা আমাদেরকে দাবিয়ে রেখেছিলে। আমরা বাধ্য ও অপরাগ হয়ে তোমাদের এ অন্যায় সহ্য করে আসছিলাম। কিন্তু এখন যেহেতু এখানে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ন্যায় একজন ন্যায়পরায়ণ লোক এসে গেছেন সেহেতু আমরা তোমাদেরকে সেই পরিমাণ রক্তপণই প্রদান করবো। যে পরিমাণ তোমরা আমাদেকে প্রদান করে থাক।” এ নিয়ে চতুর্দিকে গোলমান শুরু হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত পরস্পরের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এর মীমাংসাকারী নিযুক্ত করা হোক। কিন্তু সবল লোকেরা যখন নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলো তখন তাদের কয়েকজন বুদ্ধিমান লোক তাদেরকে বললো, তোমরা এ আশা করো না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অন্যায়ের আদেশ প্রদান করবেন। এটাতো স্পষ্ট বাড়াবাড়ি যে, আমরা দেবো অর্ধেক এবং নেবো পুরোপুরি! আর বাস্তবিকই এ লোকগুলো অপারগ হয়েই এটা মেনে নিয়েছিল। এক্ষণে যখন তোমরা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে মীমাংসাকারী নির্বাচন করলে তখন অবশ্যই তোমাদের হক মারা যাবে। কেউ কেউ পরামর্শ দিলো, গোপনে কোন লোককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দাও। তিনি কি ফায়সালার করবেন তা সে জেনে আসুক। সেটা যদি আমাদের অনুকূলে হয় তবে তো ভাল কথা। আমরা তাদের নিকট থেকে আমাদের হক আদায় করে নেবো। আর যদি ওটা আমাদের প্রতিকূলে হয় তবে আমাদের পৃথক থাকাই বাঞ্ছণীয় হবে। এ পরামর্শ অনুযায়ী তারা মদীনার কয়েকজন মুনাফিককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করলো। তারা তাঁর নিকট পৌছার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করে স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে তাদের কু-মতলব সম্পর্কে অবহিত করলেন। (সুনানে আবি দাউদ)আর একটি বর্ণনায় আছে যে, বানূ নাযীর গোত্র পুরোপুরি রক্তপণ গ্রহণ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উভয় গোত্রকে রক্তপণ সমান সমান দেয়ার ফায়সালা করলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, বানু কুরাইযার কোন লোক বানু নাযীরের কোন লোককে হত্যা করলে তার কিসাস নেয়া হতো। পক্ষান্তরে বান্ নাযীরের কোন লোক বানূ কুরাইযার কোন লোককে হত্যা করলে কিসাসের কোন ব্যবস্থাই ছিল না, বরং রক্তপণ ছিল একশ ওয়াসাক। এটা খুবই সম্ভব যে, এদিকে এ ঘটনা ঘটে এবং ঐদিকে ব্যভিচারের ঘটনা ঘটে যায়। আর দু'টো ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হ্যাঁ, তবে আরও একটি কথা রয়েছে, যদ্দ্বারা এ দ্বিতীয় শানে নফুলটির প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এরপরেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।(আরবী) (অর্থাৎ আর আমি তাদের প্রতি তাতে (তাওরাতে) এটা ফরয করেছিলাম যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিমযে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাতের বিনিময়ে দাঁত এবং (জ্রপ অন্যান্য) বিশেষ যখমেরও বিনিময় রয়েছে; অনন্তর যে ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে দেয় তবে এটা তার জন্যে (পাপের) কাফফারা হয়ে যাবে; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবতারিত বিধান অনুযায়ী হুকুম না করে তবে তো এমন ব্যক্তি পূর্ণ যালিম।) আল্লাহ পাকই সবচেয়ে বেশী জানেন।অতঃপর যারা আল্লাহর শরীয়ত এবং তাঁর অবতারিত অহী অনুযায়ী ফায়সালা করে না তাদেরকে কাফির বলা হয়েছে। এ আয়াতটি মুফাসসিরদের উক্তি অনুযায়ী শানে নকূল হিসেবে আহলে কিতাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও হুকুমের দিক দিয়ে এটা সমস্ত লোকের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। এটা বানূ ইসরাঈলের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল বটে; কিন্তু এ উম্মতেরও এটাই হুকুম। ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, ঘুষ খেয়ে কোন শরঈ মাসআলার ব্যাপারে উল্টো ফতওয়া দেয়া কুফরী। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যদি ইচ্ছাপূর্বক আল্লাহর অহীর বিপরীত ফতওয়া দেয়, জানা সত্ত্বেও তার উল্টো করে তবে সে কাফির। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ফরমানকে অস্বীকার করবে তার হুকুম এটাই। আর যে ব্যক্তি অস্বীকার করলো না বটে, কিন্তু তা মোতাবেক বললো না, সে যালিম ও ফাসিক। সে আহলে কিতাবই হোক বা আর কেউ হোক। শাবী (রঃ) বলেন যে, মুসলমানদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের বিপরীত ফতওয়া দেবে সে কাফির, ইয়াহূদীদের মধ্যে দেবে সে যালিম এবং খ্রীষ্টানদের মধ্যে দেবে সে ফাসিক। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তার কুফরী হচ্ছে এ আয়াতের সঙ্গে। তাউস (রাঃ) বলেন যে, তার কুফরী ঐ ব্যক্তির কুফরীর মত নয় যে আল্লাহ, রাসূল (সঃ), কুরআন এবং ফেরেশতাদেরকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। আতা’ (রঃ) বলেন যে, কুফরীর মধ্যে যেমন কম বেশী আছে তেমনই যুলম ও ফিসকের মধ্যেও কম বেশী আছে। এ কুফরীর কারণে সে মিল্লাতে ইসলাম হতে বের হয়ে যাবে না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা যে দিকে যাচ্ছ এর দ্বারা ঐ কুফরী উদ্দেশ্য নয়।”

আল-মায়িদা 5:43

৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতসমূহে ঐ লোকদের নিন্দে করা হচ্ছে যারা স্বীয় অভিমত, কিয়াস এবং প্রবৃত্তিকে আল্লাহর শরীয়তের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য পরিত্যাগ করে কুফরীর দিকে দৌড়ে যায়। তারা মুখে শুধু ঈমানের দাবী করে বটে, কিন্তু তাদের অন্তর ঈমান শূন্য। মুনাফিকদের অবস্থা তো এটাই যে, তারা মুখে খুব সাধুতা প্রকাশ করে, কিন্তু অন্তর তাদের সম্পূর্ণ কপট। ইয়াহূদীদের স্বভাবও তদ্রুপ। তারা ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রু। তারা মিথ্যা ও বাজে কথা খুব মজা করে শুনে তাকে এবং অন্তরের সাথে ককূল করে থাকে। পক্ষান্তরে সত্য কথা থেকে তারা দূরে সরে থাকে, এমনকি ঘুণাও করে। তারা নবী (সঃ)-এর মজলিসে উপস্থিত হয় বটে, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য থাকে মুসলমানদের গোপনীয় কথা নিজেদের মধ্যে নিয়ে যাওয়া, তাদের পক্ষ থেকে তারা গুপ্তচরের কাজ করে। সবচেয়ে বড় দুষ্টুমি তাদের এই যে, তারা কথাকে বদলিয়ে দেয়। ভাবার্থ হবে একরূপ, কিন্তু তারা অন্য অর্থ করে জনগণের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেয়। উদ্দেশ্য এই যে, সেটা যদি তাদের মর্জি মোতাবেক হয় তবে তো মানবে, আর উল্টো হলে তা থেকে দূরে থাকবে। কথিত আছে যে, এ আয়াত ঐ সব ইয়াহূদীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা একে অপরকে হত্যা করেছিল। অতঃপর তারা পরস্পর বলাবলি করে-“চল, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করি। যদি তিনি রক্তপণ ও জরিমানার নির্দেশ দেন তবে তো মনে নেবো। আর যদি কিসাস বা হত্যার বদলে হত্যার নির্দেশ দেন তবে মানবো না।” কিন্তু সর্বাধিক সঠিক কথা এই যে, তারা এক ব্যভিচারিণী মহিলাকে নিয়ে এসেছিল। তাদের কিতাব তাওরাতে তো এ হুকুমই ছিল যে, ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিণী বিবাহিত বা বিবাহিতা হলে তাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করে দিতে হবে। কিন্তু তারা এটাকে বদলিয়ে দিয়েছিল এবং একশ চাবুক মেরে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং গাধায় উল্টো করে সওয়ার করিয়ে লাঞ্ছিত করতো। আর এরূপ শাস্তি দিয়েই ছেড়ে দিতে। নবী (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের পর তাদের কোন একজন ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী হয়ে গ্রেফতার হয়। তখন তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “চল, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করি। যদি তিনি আমাদের শাস্তি দানের মতই শাস্তির নির্দেশ দেন তবে আমরা তা মেনে নেবো এবং আল্লাহর কাছেও এটা আমাদের জন্যে সনদ হয়ে যাবে। আর যদি রজম বা পাথর নিক্ষেপে হত্যার নির্দেশ দেন তবে তা মানবো না।” সুতরাং তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে বললোঃ “আমাদের এক মহিলা ব্যভিচার করেছে। তার ব্যাপারে আপনি কি নির্দেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেনঃ ‘তোমাদের তাওরাতে কি নির্দেশ রয়েছে? তারা বললোঃ “আমরা তাকে লাঞ্ছিত করি এবং চাবুক মেরে ছেড়ে দেই।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “তোমরা মিথ্যা কথা বলছে। তাওরাতে পাথর নিক্ষেপে হত্যার নির্দেশ রয়েছে, তাওরাত নিয়ে এসে দেখি।” তারা তাওরাত খুলে দিল বটে, কিন্তু রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে দিয়ে পূর্বাপর সমস্ত পড়ে শুনালো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) সব কিছু বুঝে ফেললেন এবং তাদেরকে বললেন, হাত সরিয়ে নাও। হাত সরালে দেখা গেল যে, সেখানে রজমের আয়াত বিদ্যমান রয়েছে। তখন তাদেরকেও স্বীকার করতে হলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে ব্যভিচারীদ্বয়কে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করে দেয়া হলো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, আমি দেখলাম যে, ব্যভিচারী পুরুষ লোকটি ব্যভিচারিণী মহিলাটিকে পাথর থেকে বাঁচাবার জন্যে আড়াল হয়ে দাড়িয়েছিল।অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা বলেছিল, আমরা তো তাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং কিছু মারপিট করে ছেড়ে দেই।' অতঃপর রজমের আয়াত প্রকাশ হওয়ার পর তারা বলে, রয়েছে তো এ হুকুমই কিন্তু আমরা তা গোপন করে রেখেছিলাম।' যে পাঠ করেছিল সে-ই রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে দিয়েছিল। যখন তার হাত সরিয়ে ফেলা হলো তখন রজমের আয়াত প্রকাশ হয়ে পড়লো। এ দু’জনকে রজমকারীদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমারও (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ইয়াহূদীরা লোক পাঠিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ডেকে নিয়েছিল। তারা তাকে তাদের শিক্ষাগারে গদির উপর বসিয়েছিল। তাদের যে লোকটি তাওরাত পাঠ করেছিল সে তাওরাতের বড় পণ্ডিত ছিল। আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কসম দিয়ে বলেছিলেনঃ ‘তোমরা তাওরাতে বিবাহিত ব্যভিচারীর কি শাস্তি দেখেছ?' তারা উপরোক্ত উত্তরই দিয়েছিল। কিন্তু একটি যুবক কিছুই না বলে নীরবে দাঁড়িয়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সঃ) তার প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করে পুনরায় কসম দিয়ে তাকে প্রশ্ন করলেন এবং উত্তর চাইলেন। সে বললো, “আপনি যখন এমন কসমই দিলেন তখন আমি মিথ্যা কথা বলবো না। বাস্তবিক তাওরাতে এ প্রকারের অপরাধীর শাস্তি প্রস্তরাঘাতে হত্যাই রয়েছে।” তিনি বললেনঃ “আচ্ছা তাহলে এটাও সত্যি করে বল যে, তোমরা সর্বপ্রথম এ রজমকে কার উপর থেকে উঠিয়ে দিয়েছ?” সে উত্তরে বললো, জনাব! আমাদের বাদশাহর কোন এক সম্ভ্রান্ত্র বংশীয় আত্মীয় ব্যভিচার করে। তার পদমর্যাদা এবং বাদশাহী প্রভাবের ফলে তাকে রজম করা হয়নি। তারপর এক সাধারণ লোক ব্যভিচার করে। তাকে রজম করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তার গোত্রের সমস্ত লোক প্রতিবাদ করে বলে, পূর্ববর্তী লোকটিকেও রজম করতে হবে, না হলে একেও ছেড়ে দিতে হবে। তখন আমরা সবাই মিলে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, এ ধরনের কোন শাস্তি নির্ধারণ করা হোক। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাওরাতের হুকুমকেই জারী করেন। এ ব্যাপারেই (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহও (সঃ) ঐ আহকাম জারীকারীদের অন্তর্ভুক্ত। (মুসনাদে আহমাদ ও সুনানে আবি দাউদ)মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, ইয়াহূদীরা একটি লোককে চুনকালি মাখাবার জন্যে নিয়ে যাচ্ছিল এবং তারা তাকে চাবুকও মারছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ডেকে এর কারণ জিজ্ঞেস করেন। তারা উত্তরে বলে, “এ লোকটি ব্যভিচার করেছে।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন-“তোমাদের বিধানে কি ব্যভিচারের শাস্তি এটাই?" তারা উত্তর দিলো, হ্যা। তিনি তখন তাদের এক আলেমকে ডাকলেন এবং তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। তখন সে বললো, “আপনি যদি আমাকে এরূপ কসম না দিতেন তবে আমি কখনও বলতাম না। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমাদের বিধানে বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি প্রস্তরাঘাতে হত্যাই বটে। কিন্তু আমীরুল উমারা ও সম্ভ্রান্ত লোকদের মধ্যে এ পাপকার্য খুব বেশী ছড়িয়ে পড়লে তাদেরকে এ ধরনের শাস্তি দেয়া আমরা সমীচীন মনে করলাম না। তাই তাদেরকে তো ছেড়ে দিতাম। আর আল্লাহর নির্দেশও যাতে বৃথা না যায় তজ্জন্য দরিদ ও কম মর্যাদা সম্পন লোকদেরকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করে দিতাম। তারপর আমরা পরামর্শ করলাম যে, এমন এক শাস্তি নির্ধারণ করা যাক যা ধনী-গরীব, ইতর-ভদ্র নির্বিশেষে সকলের উপর সমানভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। অবশেষে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে চাবুক মারা হবে।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নির্দেশ দিয়ে বলেনঃ “তাদের উভয়কে পাথর মেরে হত্যা করে ফেল।' সুতরাং তাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করে ফেলা হয়। সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি প্রথম ঐ ব্যক্তি যে আপনার একটি মৃত হুকুমকে জীবিত করলো।” তখন (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ ইয়াহূদীদেরই সম্পর্কে অন্য আয়াতে রয়েছে- ‘আল্লাহর নাযিলকৃত হুকুম অনুযায়ী যারা মীমাংসা করে না তারা অত্যাচারী।' অন্য আয়াতে ফাসিক শব্দ রয়েছে। (সহীহ মুসলিম ইত্যাদি) অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ব্যভিচারের ঘটনাটি ফিদকে ঘটেছিল। সেখানকার ইয়াহূদীরা মদীনার ইয়াহূদীদের নিকট একজন আলেমকে পাঠিয়ে ব্যভিচারের শাস্তি জানতে চেয়েছিল। তথাকার যে আলেমটি মদীনায় এসেছিল তার নাম ছিল ইবনে সূরিয়া। তার চক্ষু টেরা ছিল। তার সাথে আর একজন আলেমও ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কসম দিলে তারা দুজনই তা কবূল করেছিল। তিনি তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদেরকে ঐ আল্লাহর কসম দিচ্ছি যিনি বানী ইসরাঈলের জন্যে পানিতে রাস্তা করে দিয়েছিলেন, তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া। করেছিলেন, তাদেরকে ফিরাউন থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং তাদের উপর মান’ ও সালওয়া’ অবতীর্ণ করেছিলেন।” এ কসমে তারা চমকে ওঠে এবং পরস্পর বলাবলি করে, এটাতো বড়ই কঠিন কসম। এরূপ স্থলে মিথ্যে বলা মোটেই ঠিক হবে না। তাই তারা বললো, জনাব! তাওরাতে রয়েছে যে, খারাপ নযরে দেখাও যেনাতুল্য, গলায় গলায় মিলনও যেনার মত এবং চুম্বন দেয়াও যেনাতুল্য। যদি এর উপর চারজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেয় যে, তারা পুংঙ্গিলকে স্ত্রীলিঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করতে ও বের হতে দেখেছে, যেমন শলাকা সুরমাদানীর ভেতর যাতায়াত করে, তবে রজম বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা ওয়াজিব হয়ে যাবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ মাসআলা তো এটাই। অতঃপর তিনি উক্ত যেনাকার পুরুষ ও নারীকে রজম করে দেয়ার নির্দেশ দেন। সেই সময় (আরবী) -এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সুনানে আবি দাউদ ইত্যাদি) আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, যে দু’জন আলেমকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে আনয়ন করা হয়েছিল, তারা ছিল সূরিয়ার দুইপুত্র। এ বর্ণনায় ইয়াহুদীদের হদ পরিত্যাগ করার কারণ তাদের পক্ষ থেকে নিম্নরূপ বর্ণনা করা হয়েছে- আমাদের মধ্যে যখন সালতানাত বা রাজত্ব রইলো না তখন আমরা আমাদের লোকদেরকে হত্যা করা সমীচীন মনে করলাম না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাক্ষীদেরকে ডাকিয়ে নিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। তারা বলে, আমরা তাদের দু'জনকে এ কু-কাজ করতে স্পষ্টভাবে দেখেছি, যেমনভাবে শলাকা সুরমাদানীর ভেতর প্রবেশ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তাওরাত ইত্যাদি চেয়ে পাঠানো এবং তাদের আলেমদেরকে ডেকে পাঠাননা তাদেরকে দোষারোপ করার উদ্দেশ্যে ছিল না এবং উদ্দেশ্য এটাও ছিল না যে, তারা ওটা মানবার মুকাল্লাফই নয়, বরং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশই অবশ্য পালনীয়। এটা দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল প্রথমতঃ তাঁর সত্যতা প্রকাশ। তা এই যে, তাওরাতেও যে এ নির্দেশই রয়েছে তা তিনি অহীর মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন। আর প্রকাশ পেলও তা-ই। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে লজ্জিত করা যে, তারা প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে তাদেরকে স্বীকার করতেই হলো এবং দুনিয়ায় এটা প্রকাশ পেয়ে গেলো যে, তারা আল্লাহর বিধানকে গোপনকারী এবং নিজেদের মত ও কিয়াসের উপর আমলকারী। তাছাড়া উদ্দেশ্য এও ছিল যে, ঐ ইয়াহূদীরা সরল মনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসেনি যে, তাঁর নির্দেশ মোতাবেক কাজ করবে। বরং তাদের আগমনের উদ্দেশ্য শুধু এই ছিল যে, যদি তিনিও তাদের ইজমা’ মোতাবেক নির্দেশ দেন তবে তারা মেনে নেবে, নচেৎ কিছুতেই মানবে না। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন যে, তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান তার সুপথ প্রাপ্তি কোনক্রমেই সম্ভব নয়। তাদের অপবিত্র অন্তরকে পবিত্র করার আল্লাহর ইচ্ছাই নেই। তারা দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে এবং পরকালেও তাদের জন্যে রয়েছে ভীষণ শাস্তি।বলা হচ্ছে-তারা মিথ্যা কথা কান লাগিয়ে শুনতে এবং হারাম বস্তু অর্থাৎ সুদ খেতে অভ্যস্ত। সুতরাং কিরূপে তাদের অপবিত্র অন্তর পবিত্র হবে? আর তাদের দুআই বা আল্লাহ কি করে শুনবেন? হে নবী (সঃ)! যদি তারা তোমার কাছে মীমাংসার জন্যে আসে তবে তাদের ফায়সালা করা না করার তোমার অধিকার রয়েছে। তুমি যদি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তথাপি তারা তোমার কোনই ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। কেননা, তাদের উদ্দেশ্য সত্যের অনুসরণ নয়, বরং নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ। কোন গুরুজন বলেন যে, এ আয়াতটি (আরবী) (৫:৪৯)-এ আয়াতটি দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। এরপর ইরশাদ হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! যদি তুমি তাদের মধ্যে মীমাংসা কর তবে ন্যায়ের সাথে মীমাংসা করো, যদিও এরা নিজেরা অত্যাচারী এবং আদল ও ইনসাফ থেকে বহু দূরে রয়েছে। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা ন্যায় বিচারকদেরকে ভালবাসেন। অতঃপর ইয়াহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতা, অন্তরের কলুষতা এবং বিরুদ্ধাচরণের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, একদিকে তো তারা আল্লাহ পাকের এ কিতাবকে ছেড়ে দিয়েছে যার আনুগত্য স্বীকার ও সত্যতার কথা তারা নিজেরাও স্বীকার করেছে। দ্বিতীয়তঃ তারা ঐ দিকে ঝুঁকে পড়েছে যাকে তারা নিজেরাও মানে না এবং ওটাকে মিথ্যা বলে ছড়িয়ে দিয়েছে। আবার সেখানেও তাদের নিয়ত ভাল নয়। কারণ তাদের উদ্দেশ্য এই যে, যদি সেখানে গিয়ে তাদের ইচ্ছা মোতাবেক হুকুম পায় তবে তো তা মেনে নেবে, নতুবা ছেড়ে দেবে। তাই, আল্লাহ তা'আলা নবী (সঃ)-কে বলেনঃ তারা কি করে তোমার হুকুম মানতে পারে? তারা তো তাওরাতকেও ছেড়ে দিয়েছে। তাতে আল্লাহর হুকুম রয়েছে, এটা তো তারাও স্বীকার করেছে, অথচ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।তারপর এ তাওরাতের প্রশংসা করা হচ্ছে যা তিনি স্বীয় মনোনীত রাসূল হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছিলেন। এর মধ্যে হিদায়াত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর হুকুমবাহী নবীগণ ওর মাধ্যমেই ফায়সালা করে থাকেন এবং ইয়াহূদীদের মধ্যে ওরই আহকাম জারী করেন। তারা ওর পরিবর্তন ও পরিবর্ধন থেকে বেঁচে থাকেন এবং আল্লাহওয়ালা লোকেরাও এ নীতির উপর থাকেন। কেননা, এ পবিত্র গ্রন্থ তাঁদেরকে সমর্পণ করা হয়েছিল এবং ওটা প্রকাশ করে দেয়া ও ওর উপর আমল করার তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তারা ওর উপর সাক্ষী ছিলেন। ঘঘাষিত হচ্ছে-এখন তোমাদের উচিত যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও ভয় করবে না। তোমরা প্রতি মূহূর্তে এবং পদে পদে আল্লাহকে ভয় করতে থাকবে এবং তাঁর আয়াতগুলোকে সামান্য মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করবে না। জেনে রেখো যে, আল্লাহর নাযিলকৃত অহী মোতাবেক যারা ফায়সালা করে না তারা কাফির। এতে দু'টি উক্তি রয়েছে, যা ইনশাআল্লাহ এখনই বর্ণিত হচ্ছে। এ আয়াতগুলোর আরও একটি শানে নমূল নিম্নরূপঃহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতে এ লোকদেরকে কাফির, দ্বিতীয় আয়াতে যালিম এবং তৃতীয় আয়াতে ফাসিক বলা হয়েছে। ব্যাপার এই যে, ইয়াহূদীদের দু'টি দল ছিল। একটি বানূ নাযীর এবং অপরটি বানূ কুরাইযা। প্রথমটি ছিল সবল এবং দ্বিতীটি ছিল দুর্বল। তাদের পরস্পরের মধ্যে এ কথার উপর সন্ধি হয়েছিল যে, সবল দলটির কোন লোক যদি দুর্বল দলটির কোন লোককে হত্যা করে তবে তাকে পঞ্চাশ ওয়াসাক রক্তপণ দিতে হবে। পক্ষান্তরে যদি দুর্বল দলটির কোন লোক সবল দলটির কোন লোককে হত্যা করে তবে তাকে একশ ওয়াসাক রক্তপণ আদায় করতে হবে। এ প্রথাই তাদের মধ্যে চলে আসছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় আগমনের পর এরূপ এক ঘটনা ঘটে যে, দুর্বল ইয়াহূদীদের এক ব্যক্তি সবল ইয়াহুদীদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। তখন এদের পক্ষ থেকে এক লোক ওদের কাছে গিয়ে বলে, এখন একশ’ ওয়াসাক আদায় কর।' তারা উত্তরে বলে, “এটা তো প্রকাশ্যভাবে অন্যায় আচরণ। আমরা তো সবাই একই গোত্রের, একই ধর্মের, একই বংশের এবং একই শহরের লোক। অথচ আমরা রক্তপণ পাবো কম আর তোমরা পাবে বেশী! এতদিন পর্যন্ত তোমরা আমাদেরকে দাবিয়ে রেখেছিলে। আমরা বাধ্য ও অপরাগ হয়ে তোমাদের এ অন্যায় সহ্য করে আসছিলাম। কিন্তু এখন যেহেতু এখানে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ন্যায় একজন ন্যায়পরায়ণ লোক এসে গেছেন সেহেতু আমরা তোমাদেরকে সেই পরিমাণ রক্তপণই প্রদান করবো। যে পরিমাণ তোমরা আমাদেকে প্রদান করে থাক।” এ নিয়ে চতুর্দিকে গোলমান শুরু হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত পরস্পরের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এর মীমাংসাকারী নিযুক্ত করা হোক। কিন্তু সবল লোকেরা যখন নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলো তখন তাদের কয়েকজন বুদ্ধিমান লোক তাদেরকে বললো, তোমরা এ আশা করো না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অন্যায়ের আদেশ প্রদান করবেন। এটাতো স্পষ্ট বাড়াবাড়ি যে, আমরা দেবো অর্ধেক এবং নেবো পুরোপুরি! আর বাস্তবিকই এ লোকগুলো অপারগ হয়েই এটা মেনে নিয়েছিল। এক্ষণে যখন তোমরা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে মীমাংসাকারী নির্বাচন করলে তখন অবশ্যই তোমাদের হক মারা যাবে। কেউ কেউ পরামর্শ দিলো, গোপনে কোন লোককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দাও। তিনি কি ফায়সালার করবেন তা সে জেনে আসুক। সেটা যদি আমাদের অনুকূলে হয় তবে তো ভাল কথা। আমরা তাদের নিকট থেকে আমাদের হক আদায় করে নেবো। আর যদি ওটা আমাদের প্রতিকূলে হয় তবে আমাদের পৃথক থাকাই বাঞ্ছণীয় হবে। এ পরামর্শ অনুযায়ী তারা মদীনার কয়েকজন মুনাফিককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করলো। তারা তাঁর নিকট পৌছার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করে স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে তাদের কু-মতলব সম্পর্কে অবহিত করলেন। (সুনানে আবি দাউদ)আর একটি বর্ণনায় আছে যে, বানূ নাযীর গোত্র পুরোপুরি রক্তপণ গ্রহণ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উভয় গোত্রকে রক্তপণ সমান সমান দেয়ার ফায়সালা করলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, বানু কুরাইযার কোন লোক বানু নাযীরের কোন লোককে হত্যা করলে তার কিসাস নেয়া হতো। পক্ষান্তরে বান্ নাযীরের কোন লোক বানূ কুরাইযার কোন লোককে হত্যা করলে কিসাসের কোন ব্যবস্থাই ছিল না, বরং রক্তপণ ছিল একশ ওয়াসাক। এটা খুবই সম্ভব যে, এদিকে এ ঘটনা ঘটে এবং ঐদিকে ব্যভিচারের ঘটনা ঘটে যায়। আর দু'টো ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হ্যাঁ, তবে আরও একটি কথা রয়েছে, যদ্দ্বারা এ দ্বিতীয় শানে নফুলটির প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এরপরেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।(আরবী) (অর্থাৎ আর আমি তাদের প্রতি তাতে (তাওরাতে) এটা ফরয করেছিলাম যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিমযে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাতের বিনিময়ে দাঁত এবং (জ্রপ অন্যান্য) বিশেষ যখমেরও বিনিময় রয়েছে; অনন্তর যে ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে দেয় তবে এটা তার জন্যে (পাপের) কাফফারা হয়ে যাবে; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবতারিত বিধান অনুযায়ী হুকুম না করে তবে তো এমন ব্যক্তি পূর্ণ যালিম।) আল্লাহ পাকই সবচেয়ে বেশী জানেন।অতঃপর যারা আল্লাহর শরীয়ত এবং তাঁর অবতারিত অহী অনুযায়ী ফায়সালা করে না তাদেরকে কাফির বলা হয়েছে। এ আয়াতটি মুফাসসিরদের উক্তি অনুযায়ী শানে নকূল হিসেবে আহলে কিতাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও হুকুমের দিক দিয়ে এটা সমস্ত লোকের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। এটা বানূ ইসরাঈলের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল বটে; কিন্তু এ উম্মতেরও এটাই হুকুম। ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, ঘুষ খেয়ে কোন শরঈ মাসআলার ব্যাপারে উল্টো ফতওয়া দেয়া কুফরী। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যদি ইচ্ছাপূর্বক আল্লাহর অহীর বিপরীত ফতওয়া দেয়, জানা সত্ত্বেও তার উল্টো করে তবে সে কাফির। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ফরমানকে অস্বীকার করবে তার হুকুম এটাই। আর যে ব্যক্তি অস্বীকার করলো না বটে, কিন্তু তা মোতাবেক বললো না, সে যালিম ও ফাসিক। সে আহলে কিতাবই হোক বা আর কেউ হোক। শাবী (রঃ) বলেন যে, মুসলমানদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের বিপরীত ফতওয়া দেবে সে কাফির, ইয়াহূদীদের মধ্যে দেবে সে যালিম এবং খ্রীষ্টানদের মধ্যে দেবে সে ফাসিক। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তার কুফরী হচ্ছে এ আয়াতের সঙ্গে। তাউস (রাঃ) বলেন যে, তার কুফরী ঐ ব্যক্তির কুফরীর মত নয় যে আল্লাহ, রাসূল (সঃ), কুরআন এবং ফেরেশতাদেরকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। আতা’ (রঃ) বলেন যে, কুফরীর মধ্যে যেমন কম বেশী আছে তেমনই যুলম ও ফিসকের মধ্যেও কম বেশী আছে। এ কুফরীর কারণে সে মিল্লাতে ইসলাম হতে বের হয়ে যাবে না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা যে দিকে যাচ্ছ এর দ্বারা ঐ কুফরী উদ্দেশ্য নয়।”

আল-মায়িদা 5:44

৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতসমূহে ঐ লোকদের নিন্দে করা হচ্ছে যারা স্বীয় অভিমত, কিয়াস এবং প্রবৃত্তিকে আল্লাহর শরীয়তের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য পরিত্যাগ করে কুফরীর দিকে দৌড়ে যায়। তারা মুখে শুধু ঈমানের দাবী করে বটে, কিন্তু তাদের অন্তর ঈমান শূন্য। মুনাফিকদের অবস্থা তো এটাই যে, তারা মুখে খুব সাধুতা প্রকাশ করে, কিন্তু অন্তর তাদের সম্পূর্ণ কপট। ইয়াহূদীদের স্বভাবও তদ্রুপ। তারা ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রু। তারা মিথ্যা ও বাজে কথা খুব মজা করে শুনে তাকে এবং অন্তরের সাথে ককূল করে থাকে। পক্ষান্তরে সত্য কথা থেকে তারা দূরে সরে থাকে, এমনকি ঘুণাও করে। তারা নবী (সঃ)-এর মজলিসে উপস্থিত হয় বটে, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য থাকে মুসলমানদের গোপনীয় কথা নিজেদের মধ্যে নিয়ে যাওয়া, তাদের পক্ষ থেকে তারা গুপ্তচরের কাজ করে। সবচেয়ে বড় দুষ্টুমি তাদের এই যে, তারা কথাকে বদলিয়ে দেয়। ভাবার্থ হবে একরূপ, কিন্তু তারা অন্য অর্থ করে জনগণের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেয়। উদ্দেশ্য এই যে, সেটা যদি তাদের মর্জি মোতাবেক হয় তবে তো মানবে, আর উল্টো হলে তা থেকে দূরে থাকবে। কথিত আছে যে, এ আয়াত ঐ সব ইয়াহূদীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা একে অপরকে হত্যা করেছিল। অতঃপর তারা পরস্পর বলাবলি করে-“চল, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করি। যদি তিনি রক্তপণ ও জরিমানার নির্দেশ দেন তবে তো মনে নেবো। আর যদি কিসাস বা হত্যার বদলে হত্যার নির্দেশ দেন তবে মানবো না।” কিন্তু সর্বাধিক সঠিক কথা এই যে, তারা এক ব্যভিচারিণী মহিলাকে নিয়ে এসেছিল। তাদের কিতাব তাওরাতে তো এ হুকুমই ছিল যে, ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিণী বিবাহিত বা বিবাহিতা হলে তাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করে দিতে হবে। কিন্তু তারা এটাকে বদলিয়ে দিয়েছিল এবং একশ চাবুক মেরে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং গাধায় উল্টো করে সওয়ার করিয়ে লাঞ্ছিত করতো। আর এরূপ শাস্তি দিয়েই ছেড়ে দিতে। নবী (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের পর তাদের কোন একজন ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী হয়ে গ্রেফতার হয়। তখন তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ “চল, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করি। যদি তিনি আমাদের শাস্তি দানের মতই শাস্তির নির্দেশ দেন তবে আমরা তা মেনে নেবো এবং আল্লাহর কাছেও এটা আমাদের জন্যে সনদ হয়ে যাবে। আর যদি রজম বা পাথর নিক্ষেপে হত্যার নির্দেশ দেন তবে তা মানবো না।” সুতরাং তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে বললোঃ “আমাদের এক মহিলা ব্যভিচার করেছে। তার ব্যাপারে আপনি কি নির্দেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেনঃ ‘তোমাদের তাওরাতে কি নির্দেশ রয়েছে? তারা বললোঃ “আমরা তাকে লাঞ্ছিত করি এবং চাবুক মেরে ছেড়ে দেই।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বললেনঃ “তোমরা মিথ্যা কথা বলছে। তাওরাতে পাথর নিক্ষেপে হত্যার নির্দেশ রয়েছে, তাওরাত নিয়ে এসে দেখি।” তারা তাওরাত খুলে দিল বটে, কিন্তু রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে দিয়ে পূর্বাপর সমস্ত পড়ে শুনালো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) সব কিছু বুঝে ফেললেন এবং তাদেরকে বললেন, হাত সরিয়ে নাও। হাত সরালে দেখা গেল যে, সেখানে রজমের আয়াত বিদ্যমান রয়েছে। তখন তাদেরকেও স্বীকার করতে হলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে ব্যভিচারীদ্বয়কে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করে দেয়া হলো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, আমি দেখলাম যে, ব্যভিচারী পুরুষ লোকটি ব্যভিচারিণী মহিলাটিকে পাথর থেকে বাঁচাবার জন্যে আড়াল হয়ে দাড়িয়েছিল।অন্য সনদে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা বলেছিল, আমরা তো তাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং কিছু মারপিট করে ছেড়ে দেই।' অতঃপর রজমের আয়াত প্রকাশ হওয়ার পর তারা বলে, রয়েছে তো এ হুকুমই কিন্তু আমরা তা গোপন করে রেখেছিলাম।' যে পাঠ করেছিল সে-ই রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে দিয়েছিল। যখন তার হাত সরিয়ে ফেলা হলো তখন রজমের আয়াত প্রকাশ হয়ে পড়লো। এ দু’জনকে রজমকারীদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমারও (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ইয়াহূদীরা লোক পাঠিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ডেকে নিয়েছিল। তারা তাকে তাদের শিক্ষাগারে গদির উপর বসিয়েছিল। তাদের যে লোকটি তাওরাত পাঠ করেছিল সে তাওরাতের বড় পণ্ডিত ছিল। আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কসম দিয়ে বলেছিলেনঃ ‘তোমরা তাওরাতে বিবাহিত ব্যভিচারীর কি শাস্তি দেখেছ?' তারা উপরোক্ত উত্তরই দিয়েছিল। কিন্তু একটি যুবক কিছুই না বলে নীরবে দাঁড়িয়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সঃ) তার প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করে পুনরায় কসম দিয়ে তাকে প্রশ্ন করলেন এবং উত্তর চাইলেন। সে বললো, “আপনি যখন এমন কসমই দিলেন তখন আমি মিথ্যা কথা বলবো না। বাস্তবিক তাওরাতে এ প্রকারের অপরাধীর শাস্তি প্রস্তরাঘাতে হত্যাই রয়েছে।” তিনি বললেনঃ “আচ্ছা তাহলে এটাও সত্যি করে বল যে, তোমরা সর্বপ্রথম এ রজমকে কার উপর থেকে উঠিয়ে দিয়েছ?” সে উত্তরে বললো, জনাব! আমাদের বাদশাহর কোন এক সম্ভ্রান্ত্র বংশীয় আত্মীয় ব্যভিচার করে। তার পদমর্যাদা এবং বাদশাহী প্রভাবের ফলে তাকে রজম করা হয়নি। তারপর এক সাধারণ লোক ব্যভিচার করে। তাকে রজম করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তার গোত্রের সমস্ত লোক প্রতিবাদ করে বলে, পূর্ববর্তী লোকটিকেও রজম করতে হবে, না হলে একেও ছেড়ে দিতে হবে। তখন আমরা সবাই মিলে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, এ ধরনের কোন শাস্তি নির্ধারণ করা হোক। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাওরাতের হুকুমকেই জারী করেন। এ ব্যাপারেই (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহও (সঃ) ঐ আহকাম জারীকারীদের অন্তর্ভুক্ত। (মুসনাদে আহমাদ ও সুনানে আবি দাউদ)মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, ইয়াহূদীরা একটি লোককে চুনকালি মাখাবার জন্যে নিয়ে যাচ্ছিল এবং তারা তাকে চাবুকও মারছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ডেকে এর কারণ জিজ্ঞেস করেন। তারা উত্তরে বলে, “এ লোকটি ব্যভিচার করেছে।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন-“তোমাদের বিধানে কি ব্যভিচারের শাস্তি এটাই?" তারা উত্তর দিলো, হ্যা। তিনি তখন তাদের এক আলেমকে ডাকলেন এবং তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। তখন সে বললো, “আপনি যদি আমাকে এরূপ কসম না দিতেন তবে আমি কখনও বলতাম না। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমাদের বিধানে বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি প্রস্তরাঘাতে হত্যাই বটে। কিন্তু আমীরুল উমারা ও সম্ভ্রান্ত লোকদের মধ্যে এ পাপকার্য খুব বেশী ছড়িয়ে পড়লে তাদেরকে এ ধরনের শাস্তি দেয়া আমরা সমীচীন মনে করলাম না। তাই তাদেরকে তো ছেড়ে দিতাম। আর আল্লাহর নির্দেশও যাতে বৃথা না যায় তজ্জন্য দরিদ ও কম মর্যাদা সম্পন লোকদেরকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করে দিতাম। তারপর আমরা পরামর্শ করলাম যে, এমন এক শাস্তি নির্ধারণ করা যাক যা ধনী-গরীব, ইতর-ভদ্র নির্বিশেষে সকলের উপর সমানভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। অবশেষে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে চাবুক মারা হবে।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নির্দেশ দিয়ে বলেনঃ “তাদের উভয়কে পাথর মেরে হত্যা করে ফেল।' সুতরাং তাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করে ফেলা হয়। সেই সময় তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি প্রথম ঐ ব্যক্তি যে আপনার একটি মৃত হুকুমকে জীবিত করলো।” তখন (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এ ইয়াহূদীদেরই সম্পর্কে অন্য আয়াতে রয়েছে- ‘আল্লাহর নাযিলকৃত হুকুম অনুযায়ী যারা মীমাংসা করে না তারা অত্যাচারী।' অন্য আয়াতে ফাসিক শব্দ রয়েছে। (সহীহ মুসলিম ইত্যাদি) অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ব্যভিচারের ঘটনাটি ফিদকে ঘটেছিল। সেখানকার ইয়াহূদীরা মদীনার ইয়াহূদীদের নিকট একজন আলেমকে পাঠিয়ে ব্যভিচারের শাস্তি জানতে চেয়েছিল। তথাকার যে আলেমটি মদীনায় এসেছিল তার নাম ছিল ইবনে সূরিয়া। তার চক্ষু টেরা ছিল। তার সাথে আর একজন আলেমও ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে কসম দিলে তারা দুজনই তা কবূল করেছিল। তিনি তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদেরকে ঐ আল্লাহর কসম দিচ্ছি যিনি বানী ইসরাঈলের জন্যে পানিতে রাস্তা করে দিয়েছিলেন, তাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া। করেছিলেন, তাদেরকে ফিরাউন থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং তাদের উপর মান’ ও সালওয়া’ অবতীর্ণ করেছিলেন।” এ কসমে তারা চমকে ওঠে এবং পরস্পর বলাবলি করে, এটাতো বড়ই কঠিন কসম। এরূপ স্থলে মিথ্যে বলা মোটেই ঠিক হবে না। তাই তারা বললো, জনাব! তাওরাতে রয়েছে যে, খারাপ নযরে দেখাও যেনাতুল্য, গলায় গলায় মিলনও যেনার মত এবং চুম্বন দেয়াও যেনাতুল্য। যদি এর উপর চারজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেয় যে, তারা পুংঙ্গিলকে স্ত্রীলিঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করতে ও বের হতে দেখেছে, যেমন শলাকা সুরমাদানীর ভেতর যাতায়াত করে, তবে রজম বা প্রস্তরাঘাতে হত্যা ওয়াজিব হয়ে যাবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ মাসআলা তো এটাই। অতঃপর তিনি উক্ত যেনাকার পুরুষ ও নারীকে রজম করে দেয়ার নির্দেশ দেন। সেই সময় (আরবী) -এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সুনানে আবি দাউদ ইত্যাদি) আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, যে দু’জন আলেমকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে আনয়ন করা হয়েছিল, তারা ছিল সূরিয়ার দুইপুত্র। এ বর্ণনায় ইয়াহুদীদের হদ পরিত্যাগ করার কারণ তাদের পক্ষ থেকে নিম্নরূপ বর্ণনা করা হয়েছে- আমাদের মধ্যে যখন সালতানাত বা রাজত্ব রইলো না তখন আমরা আমাদের লোকদেরকে হত্যা করা সমীচীন মনে করলাম না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাক্ষীদেরকে ডাকিয়ে নিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। তারা বলে, আমরা তাদের দু'জনকে এ কু-কাজ করতে স্পষ্টভাবে দেখেছি, যেমনভাবে শলাকা সুরমাদানীর ভেতর প্রবেশ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তাওরাত ইত্যাদি চেয়ে পাঠানো এবং তাদের আলেমদেরকে ডেকে পাঠাননা তাদেরকে দোষারোপ করার উদ্দেশ্যে ছিল না এবং উদ্দেশ্য এটাও ছিল না যে, তারা ওটা মানবার মুকাল্লাফই নয়, বরং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশই অবশ্য পালনীয়। এটা দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল প্রথমতঃ তাঁর সত্যতা প্রকাশ। তা এই যে, তাওরাতেও যে এ নির্দেশই রয়েছে তা তিনি অহীর মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন। আর প্রকাশ পেলও তা-ই। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে লজ্জিত করা যে, তারা প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে তাদেরকে স্বীকার করতেই হলো এবং দুনিয়ায় এটা প্রকাশ পেয়ে গেলো যে, তারা আল্লাহর বিধানকে গোপনকারী এবং নিজেদের মত ও কিয়াসের উপর আমলকারী। তাছাড়া উদ্দেশ্য এও ছিল যে, ঐ ইয়াহূদীরা সরল মনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসেনি যে, তাঁর নির্দেশ মোতাবেক কাজ করবে। বরং তাদের আগমনের উদ্দেশ্য শুধু এই ছিল যে, যদি তিনিও তাদের ইজমা’ মোতাবেক নির্দেশ দেন তবে তারা মেনে নেবে, নচেৎ কিছুতেই মানবে না। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন যে, তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান তার সুপথ প্রাপ্তি কোনক্রমেই সম্ভব নয়। তাদের অপবিত্র অন্তরকে পবিত্র করার আল্লাহর ইচ্ছাই নেই। তারা দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে এবং পরকালেও তাদের জন্যে রয়েছে ভীষণ শাস্তি।বলা হচ্ছে-তারা মিথ্যা কথা কান লাগিয়ে শুনতে এবং হারাম বস্তু অর্থাৎ সুদ খেতে অভ্যস্ত। সুতরাং কিরূপে তাদের অপবিত্র অন্তর পবিত্র হবে? আর তাদের দুআই বা আল্লাহ কি করে শুনবেন? হে নবী (সঃ)! যদি তারা তোমার কাছে মীমাংসার জন্যে আসে তবে তাদের ফায়সালা করা না করার তোমার অধিকার রয়েছে। তুমি যদি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তথাপি তারা তোমার কোনই ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। কেননা, তাদের উদ্দেশ্য সত্যের অনুসরণ নয়, বরং নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ। কোন গুরুজন বলেন যে, এ আয়াতটি (আরবী) (৫:৪৯)-এ আয়াতটি দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। এরপর ইরশাদ হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! যদি তুমি তাদের মধ্যে মীমাংসা কর তবে ন্যায়ের সাথে মীমাংসা করো, যদিও এরা নিজেরা অত্যাচারী এবং আদল ও ইনসাফ থেকে বহু দূরে রয়েছে। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা ন্যায় বিচারকদেরকে ভালবাসেন। অতঃপর ইয়াহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতা, অন্তরের কলুষতা এবং বিরুদ্ধাচরণের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, একদিকে তো তারা আল্লাহ পাকের এ কিতাবকে ছেড়ে দিয়েছে যার আনুগত্য স্বীকার ও সত্যতার কথা তারা নিজেরাও স্বীকার করেছে। দ্বিতীয়তঃ তারা ঐ দিকে ঝুঁকে পড়েছে যাকে তারা নিজেরাও মানে না এবং ওটাকে মিথ্যা বলে ছড়িয়ে দিয়েছে। আবার সেখানেও তাদের নিয়ত ভাল নয়। কারণ তাদের উদ্দেশ্য এই যে, যদি সেখানে গিয়ে তাদের ইচ্ছা মোতাবেক হুকুম পায় তবে তো তা মেনে নেবে, নতুবা ছেড়ে দেবে। তাই, আল্লাহ তা'আলা নবী (সঃ)-কে বলেনঃ তারা কি করে তোমার হুকুম মানতে পারে? তারা তো তাওরাতকেও ছেড়ে দিয়েছে। তাতে আল্লাহর হুকুম রয়েছে, এটা তো তারাও স্বীকার করেছে, অথচ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।তারপর এ তাওরাতের প্রশংসা করা হচ্ছে যা তিনি স্বীয় মনোনীত রাসূল হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছিলেন। এর মধ্যে হিদায়াত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর হুকুমবাহী নবীগণ ওর মাধ্যমেই ফায়সালা করে থাকেন এবং ইয়াহূদীদের মধ্যে ওরই আহকাম জারী করেন। তারা ওর পরিবর্তন ও পরিবর্ধন থেকে বেঁচে থাকেন এবং আল্লাহওয়ালা লোকেরাও এ নীতির উপর থাকেন। কেননা, এ পবিত্র গ্রন্থ তাঁদেরকে সমর্পণ করা হয়েছিল এবং ওটা প্রকাশ করে দেয়া ও ওর উপর আমল করার তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তারা ওর উপর সাক্ষী ছিলেন। ঘঘাষিত হচ্ছে-এখন তোমাদের উচিত যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও ভয় করবে না। তোমরা প্রতি মূহূর্তে এবং পদে পদে আল্লাহকে ভয় করতে থাকবে এবং তাঁর আয়াতগুলোকে সামান্য মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করবে না। জেনে রেখো যে, আল্লাহর নাযিলকৃত অহী মোতাবেক যারা ফায়সালা করে না তারা কাফির। এতে দু'টি উক্তি রয়েছে, যা ইনশাআল্লাহ এখনই বর্ণিত হচ্ছে। এ আয়াতগুলোর আরও একটি শানে নমূল নিম্নরূপঃহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতে এ লোকদেরকে কাফির, দ্বিতীয় আয়াতে যালিম এবং তৃতীয় আয়াতে ফাসিক বলা হয়েছে। ব্যাপার এই যে, ইয়াহূদীদের দু'টি দল ছিল। একটি বানূ নাযীর এবং অপরটি বানূ কুরাইযা। প্রথমটি ছিল সবল এবং দ্বিতীটি ছিল দুর্বল। তাদের পরস্পরের মধ্যে এ কথার উপর সন্ধি হয়েছিল যে, সবল দলটির কোন লোক যদি দুর্বল দলটির কোন লোককে হত্যা করে তবে তাকে পঞ্চাশ ওয়াসাক রক্তপণ দিতে হবে। পক্ষান্তরে যদি দুর্বল দলটির কোন লোক সবল দলটির কোন লোককে হত্যা করে তবে তাকে একশ ওয়াসাক রক্তপণ আদায় করতে হবে। এ প্রথাই তাদের মধ্যে চলে আসছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় আগমনের পর এরূপ এক ঘটনা ঘটে যে, দুর্বল ইয়াহূদীদের এক ব্যক্তি সবল ইয়াহুদীদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। তখন এদের পক্ষ থেকে এক লোক ওদের কাছে গিয়ে বলে, এখন একশ’ ওয়াসাক আদায় কর।' তারা উত্তরে বলে, “এটা তো প্রকাশ্যভাবে অন্যায় আচরণ। আমরা তো সবাই একই গোত্রের, একই ধর্মের, একই বংশের এবং একই শহরের লোক। অথচ আমরা রক্তপণ পাবো কম আর তোমরা পাবে বেশী! এতদিন পর্যন্ত তোমরা আমাদেরকে দাবিয়ে রেখেছিলে। আমরা বাধ্য ও অপরাগ হয়ে তোমাদের এ অন্যায় সহ্য করে আসছিলাম। কিন্তু এখন যেহেতু এখানে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ন্যায় একজন ন্যায়পরায়ণ লোক এসে গেছেন সেহেতু আমরা তোমাদেরকে সেই পরিমাণ রক্তপণই প্রদান করবো। যে পরিমাণ তোমরা আমাদেকে প্রদান করে থাক।” এ নিয়ে চতুর্দিকে গোলমান শুরু হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত পরস্পরের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এর মীমাংসাকারী নিযুক্ত করা হোক। কিন্তু সবল লোকেরা যখন নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলো তখন তাদের কয়েকজন বুদ্ধিমান লোক তাদেরকে বললো, তোমরা এ আশা করো না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অন্যায়ের আদেশ প্রদান করবেন। এটাতো স্পষ্ট বাড়াবাড়ি যে, আমরা দেবো অর্ধেক এবং নেবো পুরোপুরি! আর বাস্তবিকই এ লোকগুলো অপারগ হয়েই এটা মেনে নিয়েছিল। এক্ষণে যখন তোমরা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে মীমাংসাকারী নির্বাচন করলে তখন অবশ্যই তোমাদের হক মারা যাবে। কেউ কেউ পরামর্শ দিলো, গোপনে কোন লোককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দাও। তিনি কি ফায়সালার করবেন তা সে জেনে আসুক। সেটা যদি আমাদের অনুকূলে হয় তবে তো ভাল কথা। আমরা তাদের নিকট থেকে আমাদের হক আদায় করে নেবো। আর যদি ওটা আমাদের প্রতিকূলে হয় তবে আমাদের পৃথক থাকাই বাঞ্ছণীয় হবে। এ পরামর্শ অনুযায়ী তারা মদীনার কয়েকজন মুনাফিককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করলো। তারা তাঁর নিকট পৌছার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করে স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে তাদের কু-মতলব সম্পর্কে অবহিত করলেন। (সুনানে আবি দাউদ)আর একটি বর্ণনায় আছে যে, বানূ নাযীর গোত্র পুরোপুরি রক্তপণ গ্রহণ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উভয় গোত্রকে রক্তপণ সমান সমান দেয়ার ফায়সালা করলেন। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, বানু কুরাইযার কোন লোক বানু নাযীরের কোন লোককে হত্যা করলে তার কিসাস নেয়া হতো। পক্ষান্তরে বান্ নাযীরের কোন লোক বানূ কুরাইযার কোন লোককে হত্যা করলে কিসাসের কোন ব্যবস্থাই ছিল না, বরং রক্তপণ ছিল একশ ওয়াসাক। এটা খুবই সম্ভব যে, এদিকে এ ঘটনা ঘটে এবং ঐদিকে ব্যভিচারের ঘটনা ঘটে যায়। আর দু'টো ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হ্যাঁ, তবে আরও একটি কথা রয়েছে, যদ্দ্বারা এ দ্বিতীয় শানে নফুলটির প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এরপরেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।(আরবী) (অর্থাৎ আর আমি তাদের প্রতি তাতে (তাওরাতে) এটা ফরয করেছিলাম যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিমযে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাতের বিনিময়ে দাঁত এবং (জ্রপ অন্যান্য) বিশেষ যখমেরও বিনিময় রয়েছে; অনন্তর যে ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে দেয় তবে এটা তার জন্যে (পাপের) কাফফারা হয়ে যাবে; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবতারিত বিধান অনুযায়ী হুকুম না করে তবে তো এমন ব্যক্তি পূর্ণ যালিম।) আল্লাহ পাকই সবচেয়ে বেশী জানেন।অতঃপর যারা আল্লাহর শরীয়ত এবং তাঁর অবতারিত অহী অনুযায়ী ফায়সালা করে না তাদেরকে কাফির বলা হয়েছে। এ আয়াতটি মুফাসসিরদের উক্তি অনুযায়ী শানে নকূল হিসেবে আহলে কিতাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও হুকুমের দিক দিয়ে এটা সমস্ত লোকের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। এটা বানূ ইসরাঈলের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল বটে; কিন্তু এ উম্মতেরও এটাই হুকুম। ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, ঘুষ খেয়ে কোন শরঈ মাসআলার ব্যাপারে উল্টো ফতওয়া দেয়া কুফরী। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যদি ইচ্ছাপূর্বক আল্লাহর অহীর বিপরীত ফতওয়া দেয়, জানা সত্ত্বেও তার উল্টো করে তবে সে কাফির। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ফরমানকে অস্বীকার করবে তার হুকুম এটাই। আর যে ব্যক্তি অস্বীকার করলো না বটে, কিন্তু তা মোতাবেক বললো না, সে যালিম ও ফাসিক। সে আহলে কিতাবই হোক বা আর কেউ হোক। শাবী (রঃ) বলেন যে, মুসলমানদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের বিপরীত ফতওয়া দেবে সে কাফির, ইয়াহূদীদের মধ্যে দেবে সে যালিম এবং খ্রীষ্টানদের মধ্যে দেবে সে ফাসিক। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তার কুফরী হচ্ছে এ আয়াতের সঙ্গে। তাউস (রাঃ) বলেন যে, তার কুফরী ঐ ব্যক্তির কুফরীর মত নয় যে আল্লাহ, রাসূল (সঃ), কুরআন এবং ফেরেশতাদেরকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। আতা’ (রঃ) বলেন যে, কুফরীর মধ্যে যেমন কম বেশী আছে তেমনই যুলম ও ফিসকের মধ্যেও কম বেশী আছে। এ কুফরীর কারণে সে মিল্লাতে ইসলাম হতে বের হয়ে যাবে না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা যে দিকে যাচ্ছ এর দ্বারা ঐ কুফরী উদ্দেশ্য নয়।”

আল-মায়িদা 5:45

ইয়াহুদীদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তাদের কিতাবে পরিষ্কার ভাষায় যে হুকুমগুলো ছিল তারা তো খোলাখুলিভাবে তারও বিরোধিতা করছে এবং দুষ্টামি করে ও বেপরওয়া ভাব দেখিয়ে সেগুলোও পরিত্যাগ করছে। ইয়াহূদ বানু নাযীরকে ইয়াহূদ বানূ কুরাইযার বিনিময়ে হত্যা করছে, কিন্তু ইয়াহূদ বানু কুরাইযাকে ইয়াহূদ বানূ নাযীরের বিনিময়ে হত্যা করছে না। অনুরূপভাবে তারা বিবাহিত ব্যভিচারীর রজমের হুকুমকে বদলিয়ে দিয়েছে এবং মারপিট করে ছেড়ে দিচ্ছে। এজন্যই সেখানে তাদেরকে কাফির বলা হয়েছে। আর এখানে ইনসাফ না করার কারণে তাদেরকে যালিম বলা হয়েছে। সুনানে আবি দাউদ ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর (আরবী) পড়াও বর্ণিত আছে। উলামায়ে কিরাম বলেনঃ “পূর্ববর্তী যে শরীয়তকে আমাদের সামনে আলোচনা পর্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তা মানসূখ বা রহিত করা হয়নি ওটা আমাদের জন্যও শরীয়ত। যেমন উপরোক্ত এ সমস্ত হুকুম আহকাম আমাদের শরীয়তেও একইভাবে প্রযোজ্য।” ইমাম নববী (রঃ) বলেন যে, মাসআলায় তিনটি পন্থা বা নীতি বর্ণিত রয়েছে। প্রথম তো ওটাই যা বর্ণনা করা হলো। দ্বিতীয়টি হচ্ছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তৃতীয়টি হচ্ছে এই যে, শুধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর শরীয়ত জারী ও বাকী রয়েছে। অন্য কোন শরীয়ত অবশিষ্ট নেই।এ আয়াতটি সাধারণ বলে এর দ্বারা এ দলীলও গ্রহণ করা হয়েছে যে, স্ত্রীলোকের হত্যার বিনিময়েও পুরুষ লোককে হত্যা করা হবে। কেননা, এখানে (আরবী) শব্দ রয়েছে, যদ্দ্বারা নারী পুরুষ উভয়কেই বুঝাচ্ছে। তাছাড়া সুনানে নাসাঈ ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমর ইবনে হাযাম (রাঃ)-কে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, স্ত্রীলোকের হত্যার বিনিময়ে পুরুষ লোককে হত্য করা হবে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, মুসলমানদের রক্ত পরস্পরের মধ্যে সমান। কোন কোন মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, কোন পুরুষ লোক যদি কোন স্ত্রীলোককে হত্যা করে তবে তার বিনিময়ে পুরুষ লোকটিকে হত্যা করা হবে না, (আরবী) বরং তার নিকট থেকে রক্তপণ আদায় করতে হবে। এটা কিন্তু জমহুর উলামার বিপরীত কথা। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) তো এতদূর পর্যন্ত বলেছেন যে, যিম্মী কাফিরের হত্যার বিনিময়েও মুসলমানকে হত্যা করা হবে এবং গোলামের হত্যার বিনিময়ে আযাদ ব্যক্তিকেও হত্যা করা হবে। কিন্তু এ মাযহাব জমহূরের বিপরীত। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কাফিরের হত্যার বিনিময়ে মুলমানকে হত্যা করা হবে না। আর পূর্ববর্তী মনীষীদের বহু নমুনা এ ব্যাপারে বিদ্যমান রয়েছে যে, তারা আযাদ ব্যক্তি হতে গোলাম হত্যার কিসাস গ্রহণ করতেন না। আর গোলামের হত্যার বিনিময়ে আযাদ ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে না। এ ব্যাপারে কতগুলো হাদীসও বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু সেগুলো বিশুদ্ধতায় পৌছেনি। ইমাম শাফিঈ (রঃ) তো বলেছেন যে, এ মাসআলা ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর উক্তির বাতিল হওয়া সাব্যস্ত হয় না যে পর্যন্ত না এ আয়াতের সাধারণত্বকে নির্দিষ্ট করণের কোন যবরদস্ত ও স্পষ্ট দলীল সাব্যস্ত হয়।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত আনাস ইবনে ন্যর (রাঃ)-এর ফুফু হযরত রাবী (রঃ) একটি দাসীর একটি দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। তখন জনগণ তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। কিন্তু সে ক্ষমা করতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘কিসাস নেয়া হবে। তখন হযরত আনাস ইবনে নযর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার কি সামনের দাঁত ভেঙ্গে দেয়া হবে?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা! হে আনাস! আল্লাহর কিতাবে কিসাসের হুকুম বিদ্যমান রয়েছে।” তখন হযরত আনাস (রাঃ) বললেনঃ না, না, যে আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তার শপথ! তার দাঁত কখনও ভেঙ্গে ফেলা হবে না। বস্তুতঃ হলোও তাই। দাসীটির কওম সম্মত হয়ে গেল এবং কিসাস ছেড়ে দিলো, এমন কি সম্পূর্ণরূপে ক্ষমাই করে দিলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “অবশ্যই আল্লাহর কতক বান্দা এমন রয়েছে যে, তারা আল্লাহর উপর কোন কিছুর কসম করলে তিনি তা পুরো করেই ছাড়েন।” দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে যে, প্রথমে তারা ক্ষমাও করেনি এবং দিয়্যাতও মঞ্জুর করেনি। সুনানে নাসাঈ ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, একটি গরীব। জামাআতের গোলাম কোন এক ধনী জামাআতের গোলামের কান কেটে দেয়। ঐ লোকগুলো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে আরয করেঃ আমরা দরিদ্র লোক, আমাদের কাছে মালধন নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের উপর কোন জরিমানা করেননি। হতে পারে যে, গোলামটি হয়তো প্রাপ্ত বয়স্ক হয়নি, কিংবা। হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের পক্ষ থেকে দিয়্যাত প্রদান করেছিলেন। আবার এটাও হতে পারে যে, তিনি তাদেরকে সুপারিশ করে তাদের নিকট থেকে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রাণের বদলে প্রাণ হত্যা করা হবে, কেউ কারও চক্ষু উঠিয়ে নিলে তারও চক্ষু উঠিয়ে নেয়া হবে, কেউ কারও নাক কেটে নিলে তারও নাক কেটে নেয়া হবে, কেউ কারও দাঁত ভেঙ্গে দিলে তারও দাত ভেঙ্গে দেয়া হবে এবং যখমেরও বদলা নেয়া হবে। এ ব্যাপারে আযাদ মুসলমান সবাই সমান। নারী ও পুরুষের একই হুকুম, যখন তারা ইচ্ছাপূর্বক এ কাজ করবে। তাতে গোলামেরাও পরস্পরের মধ্যে সমান। তাদের পুরুষ লোকেরাও সমান এবং স্ত্রীলোকেরাও সমান। নীতিমালাঃ অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো কর্তন কখনও জোড়ার উপর হয়ে থাকে। এতে কিসাস ওয়াজিব হয়। যেমন হাত, পা, হাতের তালু ইত্যাদি। কিন্তু যে ক্ষত জোড়ের উপর হয় না, বরং অস্থির উপর হয়, সে সম্পর্কে ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, উরু এবং উরুর ন্যায় অন্য অঙ্গ ছাড়া অস্থিতেও ওয়াজিব। কেননা, ওটা ভয় ও বিপদের জায়গা। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের মাযহাব এই যে, দাঁত ছাড়া কোন অস্থিতে কিসাস ওয়াজিব নয়। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর নিকট কোন অস্থির উপর সাধারণভাবে কিসাস ওয়াজিব নয়। হযরত উমার ফারূক (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। আতা (রঃ), শাবী (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), যুহরী (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) এ কথাই বলেছেন। সুফিয়ান সাওরী (রঃ) এবং লায়েস ইবনে সাদও (রঃ) এদিকেই গিয়েছেন। ইমাম আহমাদ (রঃ) হতেও এ উক্তিটিই বেশী প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর দলীল হচ্ছে হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রাবী (রাঃ) হতে দাঁতের কিসাস গ্রহণের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ রিওয়ায়াত দ্বারা এ মাযহাব সাব্যস্ত হচ্ছে না। কেননা, তাতে এ শব্দগুলো রয়েছে যে, তিনি তার সামনের দাঁত ভেঙ্গে ছিলেন। আর হতে পারে যে, দাঁত না ভেঙ্গেই ঝরে পড়েছিল। এ অবস্থায় কিসাস ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে সবাই একমত। তাঁর দলীলের পূর্ণ অংশ ওটাই যা সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে। তা এই যে, একটি লোক অপর একটি লোকের বাহুতে কনুইর নীচে তালোয়ার মেরেছিল, যার ফলে তার হাতের কজি কেটে গিয়েছিল। এ মুকদ্দমা নবী (সঃ)-এর সামনে পেশ করা হয়। তিনি দিয়্যাত আদায়ের নির্দেশ দেন। তখন লোকটি বলেঃহে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কিসাস চাই। তিনি বললেনঃ “তুমি দিয়্যাত গ্রহণ কর। আল্লাহ তোমাকে তাতে বরকত দান করবেন। তিনি কিসাসের নির্দেশ দিলেন না। কিন্তু এ হাদীসটি খুবই দুর্বল। এর একজন বর্ণনাকারী হাশাম ইবনে উকলী আবারী দুর্বল। তার হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করা হয় না। আর একজন বর্ণনাকারী হচ্ছে গেরান ইবনে জারিয়া আরাবী, সেও দুর্বল। অতঃপর তারা বলেন যে, যখম ভাল ও ঠিক হয়ে যাওয়ার পূর্বে ওর কিসাস নেয়া জায়েয নয়। আর যদি ভাল হওয়ার পূর্বেই কিসাস নিয়ে নেয়, তারপর যখম বেড়ে যায় তবে আবার বদলা নেয়া যাবে না। এর দলীল হচ্ছে মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হাদীসটি। তা হচ্ছে নিম্নরূপঃ আমর ইবনে শুআইব তাঁর পিতা এবং তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, একটি লোক অন্য একটি লোকের জানুতে আঘাত করে। সে তখন নবী (সঃ) এর নিকট হাযির হয়ে বলেঃ আমাকে কিসাস নিয়ে দিন।' তিনি বললেনঃ যখম ভাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর।' সে আবার এসে বললোঃ আমাকে কিসাস নিয়ে দিন। তিনি তখন কিসাস নিয়ে দিলেন। এরপর লোকটি আবার নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো খোড়া হয়ে গেছি। তখন তিনি বললেনঃ “আমি তো তোমাকে (যখম ভাল হওয়ার পূর্বে কিসাস নিতে) নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু তুমি তা মেনে নাওনি। এখন তোমার এ খোঁড়ামির কোন বদলা নেই।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখম ভাল হওয়ার পূর্বে কাউকে তার প্রতিপক্ষের নিকট হতে কিসাস গ্রহণ করতে নিষেধ করেন।মাসআলাঃ কেউ যদি অন্যকে যখম করে এবং তার থেকে প্রতিশোধ নিয়ে নেয়া হয়, অতঃপর সে ঐ যখমেই মারা যায় তবে বিবাদীর উপর আর কিছুই ওয়াজিব হবে না। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং জমহুর সাহাবা এবং তাবেঈনের এটাই উক্তি। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এর উক্তি এই যে, তার মাল থেকেই তার উপর দিয়্যাত ওয়াজিব হবে। আতা’ (রঃ) বলেন যে, তার পিতা-মাতার পক্ষীয় আত্মীয়-স্বজনদের উপর দিয়্যাত ওয়াজিব হবে। ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং নাখঈ (রঃ) বলেন যে, বিবাদীর উপর হতে ঐ যখম পরিমাণ তো উঠে যাবে, আর বাকীটা তারই মাল থেকে ওয়াজিব হবে।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ অনন্তর যে ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে দেবে, ওটা ঐ যখমকারীর জন্যে কাফফারা হয়ে যাবে এবং যাকে যখম করা হয়েছে তার জন্যে সওয়াব বা পুণ্যের কারণ হবে, যা আল্লাহরই দায়িত্বে রয়েছে। কেউ কেউ এটাও বলেছেন যে, ঐ কাফফারা হবে যখমকৃত ব্যক্তির জন্যে অর্থাৎ তার ঐ যখম পরিমাণ গুনাহ্ আল্লাহ মাফ করে দেবেন। একটি মারফু হাদীসে এসেছে যে, ওটা যদি দিয়্যাতের এক চতুর্থাংশ বরাবর জিনিস হয় এবং তা সে ক্ষমা করে দেয় তবে তার গুনাহ্র এক চতুর্থাংশ মাফ হয়ে যাবে। যদি এক তৃতীয়াংশের সমান হয় তবে এক তৃতীয়াংশ গুনাহ মাফ হবে। যদি অর্ধাংশের সমান হয় তবে অর্ধাংশ গুনাহ্ মাফ হবে। আর যদি পুরো দিয়্যাতের সমান হয় তবে তার সমস্ত গুনাহ্ মাফ হয়ে যাবে।ইমাম আহমাদ (রঃ) আবূ সফর (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, একজন কুরাইশী একজন আনসারীকে সজোরে ধাক্কা দেন। ফলে তাঁর সামনের দাঁত ভেঙ্গে যায়। হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট এ মুকদ্দমা নিয়ে যাওয়া হয়। তখন মুআবিয়া (রাঃ) ঐ বাদীকে বলেন, বিবাদীর ব্যাপারে তোমাকে অধিকার দেয়া হলো, তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পার। ঐ সময় হযরত আবু দারদা (রাঃ) সেখানে উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি বললেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি-কেউ যদি কোন মুসলমানের দেহের উপর কোন কষ্ট দেয়, অতঃপর সে ধৈর্য ধারণ করে এবং প্রতিশোধ গ্রহণ না করে তবে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন এবং তার পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন।” একথা শুনে ঐ আনসারী বললেনঃ “আপনি কি সত্যি সত্যিই আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর মুখে এ কথা শুনেছেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমার কান শুনেছে এবং আমার অন্তর তা স্মরণ রেখেছে।” তখন আনসারী বললেনঃ “আমি আমার বিবাদীকে মাফ করে দিলাম।” হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এ কথা শুনে খুবই খুশী হলেন এবং তাঁকে পুরস্কৃত করলেন। (তাফসীরে ইবনে জারীর) জামেউত তিরমিযীতেও এ হাদীসটি রয়েছে। কিন্তু ইমাম তিরমিযী একে গারীব বলেছেন। বর্ণনাকারী আবু সফরের হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে শ্রবণ সাব্যস্ত নয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, বিবাদী তিনগুণ দিয়াত দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাতেও সম্মত হচ্ছিলেন না। তাতে হাদীসের শব্দগুলো নিম্নরূপ রয়েছে-“যে ব্যক্তি রক্ত বা তদপেক্ষা কমকে মাফ করে দেবে, ওটা তার জন্যে তার জীবন থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের কাফফারা হয়ে যাবে।” মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন ব্যক্তির দেহে যদি কারও দ্বারা কোন যখম হয় এবং সে তাকে মাফ করে দেয় তবে আল্লাহ তার সেই পরিমাণ গুনাহ মাফ করে দেন।” মুসনাদে আহমাদে নিম্নের হাদীসটিও রয়েছে-“যারা আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী ফায়সালা করে না তারা যালিম।” পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, কুফরীর মধ্যে কম বেশী আছে, যুলুমেরও কম বেশী আছে এবং ফিসকের মধ্যেও শ্রেণীভেদ রয়েছে।

আল-মায়িদা 5:46

৪৬-৪৭ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি ঈসা (আঃ)-কে বানী ইসরাঈলের শেষ নবী করে পাঠিয়েছিলাম। সে তাওরাতকে বিশ্বাস করতো এবং ওর নির্দেশ অনুযায়ী লোকদের মধ্যে ফায়সালা করতো। আমি তাকে স্বীয় কিতাব ইঞ্জীল প্রদান করেছিলাম। তাতে সত্যের হিদায়াত ছিল, আর ছিল কাঠিন্য ও জটিলতার ব্যাখ্যা এবং পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর অনুকরণ। তবে কতগুলো মাসআলার তাতে স্পষ্ট ফায়সালা ছিল, যেগুলোতে ইয়াহূদীরা মতভেদ সৃষ্টি করেছিল। যেমন কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “আমি এমন কতগুলো জিনিস তোমাদের জন্য হালাল করবো যেগুলোতোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছিল। এ জন্যেই আলেমদের প্রসিদ্ধ উক্তি রয়েছে যে, ইঞ্জীল তাওরাতের কতক হুকুম মানসূখ করে দিয়েছে। ইঞ্জীল দ্বারা পুণ্যবান লোকেরা হেদায়াত, ওয়ায ও উপদেশ লাভ করতো এবং এর ফলে তারা পুণ্য লাভের প্রতি আগ্রহী হতো অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকতো। অল য়্যাহকুম আহলুল ইঞ্জীলে’ এখানে ‘আহলাল ইঞ্জীলে’ও পড়া হয়েছে। এ অবস্থায় (আরবী) শব্দটি ' (আরবী) -এর অর্থে হবে। তখন ভাবার্থ হবে-আমি ঈসা (আঃ)-কে ইঞ্জীল এ জন্যেই প্রদান করেছি যে, যেন সে তার যুগের তার অনুসারীদেরকে ওটা অনুযায়ীই পরিচালিত করে। আর যদি মাশহর কিরআত (আরবী) অনুযায়ী - (আরবী) কে আমরের (আরবী) মনে করা হয় তবে তখন অর্থ হবে- তাদের উচিত যে, তারা ইঞ্জীলের সমস্ত আহকামের উপর ঈমান আনে এবং ওটা অনুযায়ী ফায়সালা করে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “ বল হে আহলে কিতাব! যে পর্যন্ত তোমরা তাওরাত, ইঞ্জীল এবং যা আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ করা হয়েছে এগুলোর উপর প্রতিষ্ঠিত না হবে সে পর্যন্ত তোমরা কিছুরই উপর নও। (৫:৬৮) আর এক জায়গায় আছে (আরবী) অর্থাৎ “যারা এ রাসূল, নবী উম্মী (সঃ)-এর অনুসরণ করে যার গুণাবলী তারা তাদেরই নিকট গচ্ছিত কিতাব তাওরাতে পেয়ে থাকে তারাই সফলকাম।" (৭:১৫৭) যারা আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবী (সঃ)-এর নির্দেশমত ফায়সালা করে। তারা আল্লাহর আনুগত্য হতে বেরিয়ে পড়েছে, সত্যকে পরিত্যাগ করেছে, বাতিলের উপর আমল করেছে। আয়াতটির গতি দ্বারা প্রকাশ পাচ্ছে যে, এটা খ্রষ্টানদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। আর পূর্বে এ বর্ণনা দেয়াও হয়েছে।

আল-মায়িদা 5:47

৪৬-৪৭ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি ঈসা (আঃ)-কে বানী ইসরাঈলের শেষ নবী করে পাঠিয়েছিলাম। সে তাওরাতকে বিশ্বাস করতো এবং ওর নির্দেশ অনুযায়ী লোকদের মধ্যে ফায়সালা করতো। আমি তাকে স্বীয় কিতাব ইঞ্জীল প্রদান করেছিলাম। তাতে সত্যের হিদায়াত ছিল, আর ছিল কাঠিন্য ও জটিলতার ব্যাখ্যা এবং পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর অনুকরণ। তবে কতগুলো মাসআলার তাতে স্পষ্ট ফায়সালা ছিল, যেগুলোতে ইয়াহূদীরা মতভেদ সৃষ্টি করেছিল। যেমন কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “আমি এমন কতগুলো জিনিস তোমাদের জন্য হালাল করবো যেগুলোতোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছিল। এ জন্যেই আলেমদের প্রসিদ্ধ উক্তি রয়েছে যে, ইঞ্জীল তাওরাতের কতক হুকুম মানসূখ করে দিয়েছে। ইঞ্জীল দ্বারা পুণ্যবান লোকেরা হেদায়াত, ওয়ায ও উপদেশ লাভ করতো এবং এর ফলে তারা পুণ্য লাভের প্রতি আগ্রহী হতো অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকতো। অল য়্যাহকুম আহলুল ইঞ্জীলে’ এখানে ‘আহলাল ইঞ্জীলে’ও পড়া হয়েছে। এ অবস্থায় (আরবী) শব্দটি ' (আরবী) -এর অর্থে হবে। তখন ভাবার্থ হবে-আমি ঈসা (আঃ)-কে ইঞ্জীল এ জন্যেই প্রদান করেছি যে, যেন সে তার যুগের তার অনুসারীদেরকে ওটা অনুযায়ীই পরিচালিত করে। আর যদি মাশহর কিরআত (আরবী) অনুযায়ী - (আরবী) কে আমরের (আরবী) মনে করা হয় তবে তখন অর্থ হবে- তাদের উচিত যে, তারা ইঞ্জীলের সমস্ত আহকামের উপর ঈমান আনে এবং ওটা অনুযায়ী ফায়সালা করে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “ বল হে আহলে কিতাব! যে পর্যন্ত তোমরা তাওরাত, ইঞ্জীল এবং যা আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ করা হয়েছে এগুলোর উপর প্রতিষ্ঠিত না হবে সে পর্যন্ত তোমরা কিছুরই উপর নও। (৫:৬৮) আর এক জায়গায় আছে (আরবী) অর্থাৎ “যারা এ রাসূল, নবী উম্মী (সঃ)-এর অনুসরণ করে যার গুণাবলী তারা তাদেরই নিকট গচ্ছিত কিতাব তাওরাতে পেয়ে থাকে তারাই সফলকাম।" (৭:১৫৭) যারা আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবী (সঃ)-এর নির্দেশমত ফায়সালা করে। তারা আল্লাহর আনুগত্য হতে বেরিয়ে পড়েছে, সত্যকে পরিত্যাগ করেছে, বাতিলের উপর আমল করেছে। আয়াতটির গতি দ্বারা প্রকাশ পাচ্ছে যে, এটা খ্রষ্টানদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। আর পূর্বে এ বর্ণনা দেয়াও হয়েছে।

আল-মায়িদা 5:48

৪৮-৫০ নং আয়াতের তাফসীর: তাওরাত ও ইঞ্জীলের প্রশংসা ও গুণাবলী বর্ণনা করার পর এখন কুরআন কারীমের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা হচ্ছে। আল্লাহ পাক বলছেন-আমি এ কুরআনকে হক ও সত্যতার সাথে নাযিল করেছি। নিশ্চিতরূপে এটা এক আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে এবং এটা তাঁরই কালাম বা কথা। এটা পূর্ববর্তী সমুদয় কিতাবের সত্যতা স্বীকার করছে এবং ঐসব কিতাবেও এর প্রশংসা ও গুণাবলী বিদ্যমান রয়েছে। আর ঐ কিতাবগুলোর মধ্যে এ বর্ণনাও রয়েছে যে, এ পবিত্র ও সর্বশেষ কিতাবটি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হবে। সুতরাং প্রত্যেক জ্ঞানী লোক এর প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং একে মেনে চলে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ইতিপূর্বে যাদেরকে ইলম বা জ্ঞান দান করা হয়েছিল তাদের সামনে যখন এটা পাঠ করা হয় তখন থুতনির ভরে তারা সিজদায় পড়ে যায় এবং মুখে স্বীকারোক্তি করে আমাদের প্রভু মহান ও পবিত্র, আমাদের প্রভুর ওয়াদা সত্য এবং তা সত্যরূপে সাব্যস্ত হয়েই গেছে।” (১৭:১০৭-১০৮)অর্থাৎ তিনি পূর্ববর্তী রাসূলদের মাধ্যমে যেসব সংবাদ দিয়েছিলেন, সবগুলোই সত্যে পরিণত হয়েছে এবং সমস্ত নবীর মাথার মুকুট সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এসেই গেছেন। আর এ কিতাব অর্থাৎ কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর আমানতদার। অর্থাৎ এতে যা কিছু রয়েছে পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে সেগুলোই ছিল। এখন যদি কেউ বিপরীত বলে যে, পূর্ববর্তী অমুক কিতাবে এটা ছিল, তবে সেটা ভুল। এ কুরআন ঐসব কিতাবের সত্যসাক্ষী এবং ঐগুলোকে আবেষ্টনকারী। যেসব মঙ্গলময় ও কল্যাণকর বিষয় ঐ সব কিতাবে মিলিতভাবে ছিল ঐ সমুদয়ই এককভাবে এ সর্বশেষ কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। এ জন্যেই এটা সবগুলোর উপর হাকিম ও অগ্রগণ্য। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার উপর রয়েছে। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এ উপদেশপূর্ণ কিতাব আমিই অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী।” (১৫৪৯) কেউ কেউ বলেছেন যে, এর ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হচ্ছেন এ কিতাবের উপর আমানতদার। বাস্তবিকপক্ষেতো এ উক্তিটি সঠিক, কিন্তু এ তাফসীর করা ঠিক হয়নি। বরং আরবী ভাষার দিক দিয়ে এটা চিন্তা ও গবেষণার বিষয়। সঠিক তাফসীর প্রথমটিই বটে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে এ উক্তিটি নকল করে বলেছেন যে, এটা বহু দূরের কথা, বরং এটা মোটেই ঠিক নয়। কেননা (আরবী) শব্দের (আরবী) বা সংযোগ (আরবী) শব্দের উপর রয়েছে। সুতরাং (আরবী) শব্দটি যার (আরবী) ছিল এটাও ঐ জিনিসেরই (আরবী) বা বিশেষণ হবে। যদি হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর অর্থ সঠিক বলে মেনে নেয়া হয় তবে (আরবী) সংযোগ ছাড়াই হওয়া উচিত ছিল।(আরবী) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! সুতরাং তুমি এ সবের মধ্যে আল্লাহর নির্দেশাবলী ছড়িয়ে দাও, আরব হোক বা আযম হোক, শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত হোক। আল্লাহর নাযিলকৃত’-এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর অহী। হয় সেটা এ কিতাবের আকারেই হোক, না হয় আল্লাহ তা'আলা যে পূর্ববর্তীআহকাম তার জন্যে নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন সেটাই হোক। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতের পূর্বে তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা তাদের মধ্যে ফায়সালা করা ও না করার অধিকার দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এ আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহর অহী মোতাবেক ফায়সালা করা জরুরী। তাঁকে বলা হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! এ দুর্ভাগা অজ্ঞরা নিজেদের পক্ষ থেকে যে আহকাম তৈরী করে নিয়েছে এবং এর কারণে আল্লাহর কিতাবকে যে পরিবর্তন করে ফেলেছে, কোনক্রমেই তুমি তাদের প্রবৃত্তির পেছনে পড়ে সত্যকে ছেড়ে বসোনা। তাদের প্রত্যেকের জন্যে আমি রাস্তা এবং পন্থা তৈরী করে দিয়েছি। কোন কিছুর সূচনা করাকে (আরবী) বলা হয়। আভিধানিক অর্থে প্রকাশ্য ও সহজ পথকে (আরবী) বলে। সুতরাং এ দু'টি শব্দের এ তাফসীরই বেশী যুক্তিসঙ্গত হবে যে, পূর্ববর্তী সমস্ত শরীয়ত যা আল্লাহর পক্ষ থেকে ছিল তার সবগুলোই তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। অবশ্য ছোট খাটো হুকুমের ব্যাপারে কিছুটা পার্থক্য ছিল। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা সব নবীর দল পরস্পরের বৈমাত্রেয় ভাই। আমাদের সবারই দ্বীন এক।” প্রত্যেক নবীকে তাওহীদসহ পাঠানো হতো এবং প্রত্যেক আসমানী কিতাবে তাওহীদের বর্ণনা, ওটাকেই সাব্যস্ত করণ এবং ওরই দিকে আহ্বান থাকতো। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছে- “তোমার পূর্বে আমি যত রাসূলই পাঠিয়েছিলাম তাদের এ অহী করেছিলাম-আমি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।”অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে রাসূল পাঠিয়ে এ নির্দেশই দিয়েছিলাম-তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাগুত বা শয়তানের ইবাদত থেকে বিরত থাকবে।” হ্যা, তবে আহকামের বিভিন্নতা অবশ্যই ছিল। কোন একটি জিনিস কোন এক যুগে হারাম ছিল, পরে তা হালাল হয়ে যায়। কিংবা এর বিপরীত, অর্থাৎ কোন যুগে হালাল ছিল, পরে তা হারাম হয়ে যায়। অথবা, কোন এক হুকুম কোন সময় হালাকা ছিল, পরে তা ভারী হয়ে যায়। কিংবা এর বিপরীত। আর এটাও আবার ছিল হিকমত, মুসলিহাত এবং আল্লাহর দলীল প্রমাণের সাথে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যেতে পারে, যেমন তাওরাত একটি শরীয়ত, ইঞ্জীল একটি শরীয়ত এবং কুরআন একটি পৃথক শরীয়ত। এটার কারণ হচ্ছে এই যে, যেন প্রত্যেক যুগের বাধ্য ও অবাধ্য বান্দাদের মধ্যে পরীক্ষা হয়ে যায়। অবশ্য সর্বযুগে তাওহীদ একই রূপ ছিল। আর এই বাক্যের অর্থ হচ্ছে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মত। আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্যে আমার এ কিতাবকে (কুরআনকে) শরীয়ত ও তরীকা বানিয়েছি। তোমাদের সবারই এর অনুকরণ করা উচিত। এ অবস্থায় (আরবী) -এর পরে সর্বনাম উহ্য মেনে নিতে হবে। সুতরাং উত্তম উদ্দেশ্য লাভের মাধ্যম ও পন্থা একমাত্র কুরআন, আর কিছুই নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি প্রথমটিই বটে। এর এটাও একটা দলীল যে, এর পরে রয়েছে- “যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তোমাদের সকলকে একই উম্মত করে দিতেন।” অতএব জানা গেল যে, পূর্ব সম্বোধন শুধু এ উম্মতকেই নয়, বরং এর সম্বোধন হচ্ছে সকল উম্মতের প্রতিই। আর এতে আল্লাহ তা'আলার খুব বড় ও পূর্ণ ক্ষমতার বর্ণনা রয়েছে যে, যদি তিনি চাইতেন তবে সমস্ত লোককে একই শরীয়ত ও একই দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত করতেন, কোন সময়ও কোন প্রকার পরিবর্তন আসতো না। কিন্তু মহান প্রভুর পরিপূর্ণ হিকমত ও কলাকৌশলের চাহিদা এই যে, তিনি পৃথক শরীয়ত নির্ধারণ করবেন, একের পর অন্য নবী প্রেরণ করবেন, কোন নবীর হুকুমকে পরবর্তী নবীর মাধ্যমে বদলিয়ে দেবেন। শেষ পর্যন্ত হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ)-এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী সমস্ত দ্বীন মানসূখ বা রহিত হয়ে যায়। তাকে সারা বিশ্বের জন্যে সর্বশেষ নবী করে পাঠানো হয়। ঘোষিত হচ্ছে-এ বিভিন্ন শরীয়ত দেয়া হয়েছে শুধু তোমাদের পরীক্ষার জন্যে, যেন তিনি তোমাদের বাধ্য ও অনুগত লোকদেরকে পুরস্কার এবং অবাধ্য লোকদেরকে শাস্তি দেন। এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি যেন ঐ জিনিস দ্বারা তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন যা তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ কিতাব। অতএব, তোমাদের উচিত মঙ্গল ও পুণ্যের দিকে দৌড়িয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করা, তাঁর শরীয়ত মেনে চলতে আগ্রহী হওয়া এবং সর্বশেষ কিতাব এবং সর্বশেষ নবী (সঃ)-এর মনে প্রাণে আনুগত্য করা। হে লোক সকল! তোমাদের সকলেরই প্রত্যাবর্তন ও আশ্রয়স্থল আল্লাহরই কাছে। সেখানে তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মতভেদের মধ্যে প্রকৃত মত সম্পর্কে অবহিত করবেন। সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিতদের তিনি পুরস্কৃত করবেন এবং মিথ্যা ও বাতিলের উপর প্রতিষ্ঠিত, বিরুদ্ধবাদী ও প্রবৃত্তিপূজারীদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। যারা হককে মানা তো দূরের কথা, বরং হকের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। যহহাক (রঃ) বলেন। যে, এর দ্বারা উম্মতে মুহাম্মাদিয়াকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রথমটিই উত্তম। অতঃপর প্রথম কথার প্রতি আরও গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে এবং ওর বিপরীত থেকে বিরত থাকতে বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি যেন এ বিশ্বাসঘাতক, চক্রান্তকারী, মিথ্যাবাদী, কাফির ইয়াহূদীর কথার ফাঁদে পড়ে আল্লাহর কোন হুকুম থেকে এদিক ওদিক চলে না যাও। যদি তারা তোমার হুকুম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে জেনে রেখো যে, তাদের কলংকময় কার্যাবলীর কারণে তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি অবশ্যই নেমে আসবে। এজন্যই ভাল কাজের তাওফীক তাদের থেকে , ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। অধিকাংশ লোকই হচ্ছে ফাসেক অর্থাৎ হকের আনুগত্য হতে বাইরে, আল্লাহর দ্বীনের বিরোধী এবং হিদায়াত হতে দূরে। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “তুমি লোভ করে চাইলেও অধিকাংশ লোক মুমিন নয়।”(১২:১০৩) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যদি পৃথিবীবাসীর অধিকাংশের কথা মেনে চল তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করবে।” (৬:১১৭)ইয়াহূদীদের কয়েকজন বড় বড় নেতা এবং আলেম আপোষে এক মিটিং করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয় এবং বলেঃ “আপনি জানেন যে, আমরা যদি আপনাকে মেনে নেই তবে সমস্ত ইয়াহূদী আপনার নবুওয়াতকে স্বীকার করে নেবে। আর আমরা আপনাকে মেনে নিতে প্রস্তুত আছি। আপনি শুধু এটুকু করেন যে, আমাদের মধ্যে এবং আমাদের কওমের মধ্যে একটা বিবাদ আছে, আপনি আমাদের মতানুযায়ী এর মীমাংসা করে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওটা অস্বীকার করলেন। ঐ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এরপর মহান আল্লাহ ঐ লোকগুলো কথার প্রতি অস্বীকৃতি জানিয়ে বলছেনঃ যারা আল্লাহর এমন হুকুম থেকে দূরে সরে থাকে যার মধ্যে সমস্ত মঙ্গল বিদ্যমান রয়েছে এবং সমস্ত অমঙ্গল দূরে আছে, এরূপ পবিত্র হুকুম থেকে সরে গিয়ে কিয়াসের দিকে, কু-প্রবৃত্তির দিকে এবং ঐসব হুকুমের দিকে ঝুঁকে পড়ে যা লোকেরা কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই নিজেদের পক্ষ থেকে বানিয়ে নিয়েছে। যেমন আহলে জাহেলিয়াত ও আহলে দলালাত (গুমরাহ সম্প্রদায়) নিজেদের মত ও মর্জি মোতাবেক হুকুম আহকাম জারী করতে এবং যেমন তাতারীগণ রাষ্ট্রীয়। কাজ কারবারে চেঙ্গিজ খানি হুকুমের অনুসরণ করতো, যা আল-ইয়াসিক তৈরী করে দিয়েছিল। ওটা ছিল বহু সম্মিলিত আহকামের দফতর, যা বিভিন্ন শ্রীয়ত ও মাযহাব হতে হেঁটে নেয়া হয়েছিল। ওটা ছিল ইয়াহূদিয়াত, নাসরানিয়াত, ইসলামিয়াত ইত্যাদি সমস্ত আহকামের সমষ্টি, আবার তাতে এমনও কতক আহকাম ছিল যা শুধুমাত্র জ্ঞান, মত ও সূক্ষ্ম চিন্তা দ্বারা আবিষ্কার করা হয়েছিল এবং যার মধ্যে প্রবৃত্তিরও সংযোগ ছিল। সুতরাং ঐ সমষ্টিই তাদের সন্তানদের নিকট আমলের যোগ্য বিবেচিত হতো এবং ওকেই তারা কিতাব ও সুন্নাতের উপর প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার দিয়ে দিলো। প্রকৃতপক্ষে এরূপ কার্য সম্পাদনকারীরা কাফির এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ওয়াজিব। যে পর্যন্ত তারা ঐসব ছেড়ে দিয়ে আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তন না করে এবং যে কোন ছোট, বড়, গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণ ব্যাপারে কিতাব ও সুন্নাত ছাড়া অন্য কোন হুকুম গ্রহণ না করে। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ তবে কি তারা অজ্ঞানতার যুগের মীমাংসা কামনা করে? দৃঢ় বিশ্বাসীদের কাছে মীমাংসা কার্যে আল্লাহর চেয়ে উত্তম কে হবে? আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর কারও হুকুম বেশী ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক হতে পারে না। ঈমানদার ও পূর্ণ বিশ্বাসীগণ খুব ভাল করেই জানে যে, এ আহকামুল হাকিমীন, আরহামুর রাহিমীনের চেয়ে বেশী উত্তম, স্বচ্ছ, সহজ ও পবিত্র আহকাম, মাসায়েল এবং কাওয়ায়েদ আর কারও হতে পারে না। মা তার ছেলের প্রতি যতটা পরবশ হতে পারে তার চেয়েও বেশী তিনি তাঁর সৃষ্টজীবের উপর মেহেরবান ও দয়ালু। তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞান, বিরাট শক্তি এবং ন্যায় ও ইনসাফের অধিকারী। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ফায়সালা ছাড়া কোন ফতওয়া দেয় ওটাকে জাহেলিয়াতের হুকুম বলা হবে। হযরত তাউস (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আমি কি আমার সন্তানদের কাউকে বেশী এবং কাউকে কম দিতে পারি?” তখন তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। তিবরানী (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি আল্লাহর সবেচেয়ে বড় শত্রু যে ইসলামে অজ্ঞতা যুগের নিয়ম-কানুন ও চাল-চলন অনুসন্ধান করে এবং বিনা কারণে কাউকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতেও রয়েছে এবং তাতে কিছুটা বেশী আছে।

আল-মায়িদা 5:49

৪৮-৫০ নং আয়াতের তাফসীর: তাওরাত ও ইঞ্জীলের প্রশংসা ও গুণাবলী বর্ণনা করার পর এখন কুরআন কারীমের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা হচ্ছে। আল্লাহ পাক বলছেন-আমি এ কুরআনকে হক ও সত্যতার সাথে নাযিল করেছি। নিশ্চিতরূপে এটা এক আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে এবং এটা তাঁরই কালাম বা কথা। এটা পূর্ববর্তী সমুদয় কিতাবের সত্যতা স্বীকার করছে এবং ঐসব কিতাবেও এর প্রশংসা ও গুণাবলী বিদ্যমান রয়েছে। আর ঐ কিতাবগুলোর মধ্যে এ বর্ণনাও রয়েছে যে, এ পবিত্র ও সর্বশেষ কিতাবটি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হবে। সুতরাং প্রত্যেক জ্ঞানী লোক এর প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং একে মেনে চলে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ইতিপূর্বে যাদেরকে ইলম বা জ্ঞান দান করা হয়েছিল তাদের সামনে যখন এটা পাঠ করা হয় তখন থুতনির ভরে তারা সিজদায় পড়ে যায় এবং মুখে স্বীকারোক্তি করে আমাদের প্রভু মহান ও পবিত্র, আমাদের প্রভুর ওয়াদা সত্য এবং তা সত্যরূপে সাব্যস্ত হয়েই গেছে।” (১৭:১০৭-১০৮)অর্থাৎ তিনি পূর্ববর্তী রাসূলদের মাধ্যমে যেসব সংবাদ দিয়েছিলেন, সবগুলোই সত্যে পরিণত হয়েছে এবং সমস্ত নবীর মাথার মুকুট সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এসেই গেছেন। আর এ কিতাব অর্থাৎ কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর আমানতদার। অর্থাৎ এতে যা কিছু রয়েছে পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে সেগুলোই ছিল। এখন যদি কেউ বিপরীত বলে যে, পূর্ববর্তী অমুক কিতাবে এটা ছিল, তবে সেটা ভুল। এ কুরআন ঐসব কিতাবের সত্যসাক্ষী এবং ঐগুলোকে আবেষ্টনকারী। যেসব মঙ্গলময় ও কল্যাণকর বিষয় ঐ সব কিতাবে মিলিতভাবে ছিল ঐ সমুদয়ই এককভাবে এ সর্বশেষ কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। এ জন্যেই এটা সবগুলোর উপর হাকিম ও অগ্রগণ্য। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার উপর রয়েছে। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এ উপদেশপূর্ণ কিতাব আমিই অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী।” (১৫৪৯) কেউ কেউ বলেছেন যে, এর ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হচ্ছেন এ কিতাবের উপর আমানতদার। বাস্তবিকপক্ষেতো এ উক্তিটি সঠিক, কিন্তু এ তাফসীর করা ঠিক হয়নি। বরং আরবী ভাষার দিক দিয়ে এটা চিন্তা ও গবেষণার বিষয়। সঠিক তাফসীর প্রথমটিই বটে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে এ উক্তিটি নকল করে বলেছেন যে, এটা বহু দূরের কথা, বরং এটা মোটেই ঠিক নয়। কেননা (আরবী) শব্দের (আরবী) বা সংযোগ (আরবী) শব্দের উপর রয়েছে। সুতরাং (আরবী) শব্দটি যার (আরবী) ছিল এটাও ঐ জিনিসেরই (আরবী) বা বিশেষণ হবে। যদি হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর অর্থ সঠিক বলে মেনে নেয়া হয় তবে (আরবী) সংযোগ ছাড়াই হওয়া উচিত ছিল।(আরবী) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! সুতরাং তুমি এ সবের মধ্যে আল্লাহর নির্দেশাবলী ছড়িয়ে দাও, আরব হোক বা আযম হোক, শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত হোক। আল্লাহর নাযিলকৃত’-এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর অহী। হয় সেটা এ কিতাবের আকারেই হোক, না হয় আল্লাহ তা'আলা যে পূর্ববর্তীআহকাম তার জন্যে নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন সেটাই হোক। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতের পূর্বে তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা তাদের মধ্যে ফায়সালা করা ও না করার অধিকার দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এ আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহর অহী মোতাবেক ফায়সালা করা জরুরী। তাঁকে বলা হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! এ দুর্ভাগা অজ্ঞরা নিজেদের পক্ষ থেকে যে আহকাম তৈরী করে নিয়েছে এবং এর কারণে আল্লাহর কিতাবকে যে পরিবর্তন করে ফেলেছে, কোনক্রমেই তুমি তাদের প্রবৃত্তির পেছনে পড়ে সত্যকে ছেড়ে বসোনা। তাদের প্রত্যেকের জন্যে আমি রাস্তা এবং পন্থা তৈরী করে দিয়েছি। কোন কিছুর সূচনা করাকে (আরবী) বলা হয়। আভিধানিক অর্থে প্রকাশ্য ও সহজ পথকে (আরবী) বলে। সুতরাং এ দু'টি শব্দের এ তাফসীরই বেশী যুক্তিসঙ্গত হবে যে, পূর্ববর্তী সমস্ত শরীয়ত যা আল্লাহর পক্ষ থেকে ছিল তার সবগুলোই তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। অবশ্য ছোট খাটো হুকুমের ব্যাপারে কিছুটা পার্থক্য ছিল। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা সব নবীর দল পরস্পরের বৈমাত্রেয় ভাই। আমাদের সবারই দ্বীন এক।” প্রত্যেক নবীকে তাওহীদসহ পাঠানো হতো এবং প্রত্যেক আসমানী কিতাবে তাওহীদের বর্ণনা, ওটাকেই সাব্যস্ত করণ এবং ওরই দিকে আহ্বান থাকতো। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছে- “তোমার পূর্বে আমি যত রাসূলই পাঠিয়েছিলাম তাদের এ অহী করেছিলাম-আমি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।”অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে রাসূল পাঠিয়ে এ নির্দেশই দিয়েছিলাম-তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাগুত বা শয়তানের ইবাদত থেকে বিরত থাকবে।” হ্যা, তবে আহকামের বিভিন্নতা অবশ্যই ছিল। কোন একটি জিনিস কোন এক যুগে হারাম ছিল, পরে তা হালাল হয়ে যায়। কিংবা এর বিপরীত, অর্থাৎ কোন যুগে হালাল ছিল, পরে তা হারাম হয়ে যায়। অথবা, কোন এক হুকুম কোন সময় হালাকা ছিল, পরে তা ভারী হয়ে যায়। কিংবা এর বিপরীত। আর এটাও আবার ছিল হিকমত, মুসলিহাত এবং আল্লাহর দলীল প্রমাণের সাথে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যেতে পারে, যেমন তাওরাত একটি শরীয়ত, ইঞ্জীল একটি শরীয়ত এবং কুরআন একটি পৃথক শরীয়ত। এটার কারণ হচ্ছে এই যে, যেন প্রত্যেক যুগের বাধ্য ও অবাধ্য বান্দাদের মধ্যে পরীক্ষা হয়ে যায়। অবশ্য সর্বযুগে তাওহীদ একই রূপ ছিল। আর এই বাক্যের অর্থ হচ্ছে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মত। আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্যে আমার এ কিতাবকে (কুরআনকে) শরীয়ত ও তরীকা বানিয়েছি। তোমাদের সবারই এর অনুকরণ করা উচিত। এ অবস্থায় (আরবী) -এর পরে সর্বনাম উহ্য মেনে নিতে হবে। সুতরাং উত্তম উদ্দেশ্য লাভের মাধ্যম ও পন্থা একমাত্র কুরআন, আর কিছুই নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি প্রথমটিই বটে। এর এটাও একটা দলীল যে, এর পরে রয়েছে- “যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তোমাদের সকলকে একই উম্মত করে দিতেন।” অতএব জানা গেল যে, পূর্ব সম্বোধন শুধু এ উম্মতকেই নয়, বরং এর সম্বোধন হচ্ছে সকল উম্মতের প্রতিই। আর এতে আল্লাহ তা'আলার খুব বড় ও পূর্ণ ক্ষমতার বর্ণনা রয়েছে যে, যদি তিনি চাইতেন তবে সমস্ত লোককে একই শরীয়ত ও একই দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত করতেন, কোন সময়ও কোন প্রকার পরিবর্তন আসতো না। কিন্তু মহান প্রভুর পরিপূর্ণ হিকমত ও কলাকৌশলের চাহিদা এই যে, তিনি পৃথক শরীয়ত নির্ধারণ করবেন, একের পর অন্য নবী প্রেরণ করবেন, কোন নবীর হুকুমকে পরবর্তী নবীর মাধ্যমে বদলিয়ে দেবেন। শেষ পর্যন্ত হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ)-এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী সমস্ত দ্বীন মানসূখ বা রহিত হয়ে যায়। তাকে সারা বিশ্বের জন্যে সর্বশেষ নবী করে পাঠানো হয়। ঘোষিত হচ্ছে-এ বিভিন্ন শরীয়ত দেয়া হয়েছে শুধু তোমাদের পরীক্ষার জন্যে, যেন তিনি তোমাদের বাধ্য ও অনুগত লোকদেরকে পুরস্কার এবং অবাধ্য লোকদেরকে শাস্তি দেন। এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি যেন ঐ জিনিস দ্বারা তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন যা তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ কিতাব। অতএব, তোমাদের উচিত মঙ্গল ও পুণ্যের দিকে দৌড়িয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করা, তাঁর শরীয়ত মেনে চলতে আগ্রহী হওয়া এবং সর্বশেষ কিতাব এবং সর্বশেষ নবী (সঃ)-এর মনে প্রাণে আনুগত্য করা। হে লোক সকল! তোমাদের সকলেরই প্রত্যাবর্তন ও আশ্রয়স্থল আল্লাহরই কাছে। সেখানে তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মতভেদের মধ্যে প্রকৃত মত সম্পর্কে অবহিত করবেন। সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিতদের তিনি পুরস্কৃত করবেন এবং মিথ্যা ও বাতিলের উপর প্রতিষ্ঠিত, বিরুদ্ধবাদী ও প্রবৃত্তিপূজারীদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। যারা হককে মানা তো দূরের কথা, বরং হকের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। যহহাক (রঃ) বলেন। যে, এর দ্বারা উম্মতে মুহাম্মাদিয়াকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রথমটিই উত্তম। অতঃপর প্রথম কথার প্রতি আরও গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে এবং ওর বিপরীত থেকে বিরত থাকতে বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি যেন এ বিশ্বাসঘাতক, চক্রান্তকারী, মিথ্যাবাদী, কাফির ইয়াহূদীর কথার ফাঁদে পড়ে আল্লাহর কোন হুকুম থেকে এদিক ওদিক চলে না যাও। যদি তারা তোমার হুকুম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে জেনে রেখো যে, তাদের কলংকময় কার্যাবলীর কারণে তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি অবশ্যই নেমে আসবে। এজন্যই ভাল কাজের তাওফীক তাদের থেকে , ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। অধিকাংশ লোকই হচ্ছে ফাসেক অর্থাৎ হকের আনুগত্য হতে বাইরে, আল্লাহর দ্বীনের বিরোধী এবং হিদায়াত হতে দূরে। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “তুমি লোভ করে চাইলেও অধিকাংশ লোক মুমিন নয়।”(১২:১০৩) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যদি পৃথিবীবাসীর অধিকাংশের কথা মেনে চল তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করবে।” (৬:১১৭)ইয়াহূদীদের কয়েকজন বড় বড় নেতা এবং আলেম আপোষে এক মিটিং করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয় এবং বলেঃ “আপনি জানেন যে, আমরা যদি আপনাকে মেনে নেই তবে সমস্ত ইয়াহূদী আপনার নবুওয়াতকে স্বীকার করে নেবে। আর আমরা আপনাকে মেনে নিতে প্রস্তুত আছি। আপনি শুধু এটুকু করেন যে, আমাদের মধ্যে এবং আমাদের কওমের মধ্যে একটা বিবাদ আছে, আপনি আমাদের মতানুযায়ী এর মীমাংসা করে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওটা অস্বীকার করলেন। ঐ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এরপর মহান আল্লাহ ঐ লোকগুলো কথার প্রতি অস্বীকৃতি জানিয়ে বলছেনঃ যারা আল্লাহর এমন হুকুম থেকে দূরে সরে থাকে যার মধ্যে সমস্ত মঙ্গল বিদ্যমান রয়েছে এবং সমস্ত অমঙ্গল দূরে আছে, এরূপ পবিত্র হুকুম থেকে সরে গিয়ে কিয়াসের দিকে, কু-প্রবৃত্তির দিকে এবং ঐসব হুকুমের দিকে ঝুঁকে পড়ে যা লোকেরা কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই নিজেদের পক্ষ থেকে বানিয়ে নিয়েছে। যেমন আহলে জাহেলিয়াত ও আহলে দলালাত (গুমরাহ সম্প্রদায়) নিজেদের মত ও মর্জি মোতাবেক হুকুম আহকাম জারী করতে এবং যেমন তাতারীগণ রাষ্ট্রীয়। কাজ কারবারে চেঙ্গিজ খানি হুকুমের অনুসরণ করতো, যা আল-ইয়াসিক তৈরী করে দিয়েছিল। ওটা ছিল বহু সম্মিলিত আহকামের দফতর, যা বিভিন্ন শ্রীয়ত ও মাযহাব হতে হেঁটে নেয়া হয়েছিল। ওটা ছিল ইয়াহূদিয়াত, নাসরানিয়াত, ইসলামিয়াত ইত্যাদি সমস্ত আহকামের সমষ্টি, আবার তাতে এমনও কতক আহকাম ছিল যা শুধুমাত্র জ্ঞান, মত ও সূক্ষ্ম চিন্তা দ্বারা আবিষ্কার করা হয়েছিল এবং যার মধ্যে প্রবৃত্তিরও সংযোগ ছিল। সুতরাং ঐ সমষ্টিই তাদের সন্তানদের নিকট আমলের যোগ্য বিবেচিত হতো এবং ওকেই তারা কিতাব ও সুন্নাতের উপর প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার দিয়ে দিলো। প্রকৃতপক্ষে এরূপ কার্য সম্পাদনকারীরা কাফির এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ওয়াজিব। যে পর্যন্ত তারা ঐসব ছেড়ে দিয়ে আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তন না করে এবং যে কোন ছোট, বড়, গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণ ব্যাপারে কিতাব ও সুন্নাত ছাড়া অন্য কোন হুকুম গ্রহণ না করে। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ তবে কি তারা অজ্ঞানতার যুগের মীমাংসা কামনা করে? দৃঢ় বিশ্বাসীদের কাছে মীমাংসা কার্যে আল্লাহর চেয়ে উত্তম কে হবে? আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর কারও হুকুম বেশী ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক হতে পারে না। ঈমানদার ও পূর্ণ বিশ্বাসীগণ খুব ভাল করেই জানে যে, এ আহকামুল হাকিমীন, আরহামুর রাহিমীনের চেয়ে বেশী উত্তম, স্বচ্ছ, সহজ ও পবিত্র আহকাম, মাসায়েল এবং কাওয়ায়েদ আর কারও হতে পারে না। মা তার ছেলের প্রতি যতটা পরবশ হতে পারে তার চেয়েও বেশী তিনি তাঁর সৃষ্টজীবের উপর মেহেরবান ও দয়ালু। তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞান, বিরাট শক্তি এবং ন্যায় ও ইনসাফের অধিকারী। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ফায়সালা ছাড়া কোন ফতওয়া দেয় ওটাকে জাহেলিয়াতের হুকুম বলা হবে। হযরত তাউস (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আমি কি আমার সন্তানদের কাউকে বেশী এবং কাউকে কম দিতে পারি?” তখন তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। তিবরানী (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি আল্লাহর সবেচেয়ে বড় শত্রু যে ইসলামে অজ্ঞতা যুগের নিয়ম-কানুন ও চাল-চলন অনুসন্ধান করে এবং বিনা কারণে কাউকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতেও রয়েছে এবং তাতে কিছুটা বেশী আছে।

আল-মায়িদা 5:50

৪৮-৫০ নং আয়াতের তাফসীর: তাওরাত ও ইঞ্জীলের প্রশংসা ও গুণাবলী বর্ণনা করার পর এখন কুরআন কারীমের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা হচ্ছে। আল্লাহ পাক বলছেন-আমি এ কুরআনকে হক ও সত্যতার সাথে নাযিল করেছি। নিশ্চিতরূপে এটা এক আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে এবং এটা তাঁরই কালাম বা কথা। এটা পূর্ববর্তী সমুদয় কিতাবের সত্যতা স্বীকার করছে এবং ঐসব কিতাবেও এর প্রশংসা ও গুণাবলী বিদ্যমান রয়েছে। আর ঐ কিতাবগুলোর মধ্যে এ বর্ণনাও রয়েছে যে, এ পবিত্র ও সর্বশেষ কিতাবটি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হবে। সুতরাং প্রত্যেক জ্ঞানী লোক এর প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং একে মেনে চলে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ইতিপূর্বে যাদেরকে ইলম বা জ্ঞান দান করা হয়েছিল তাদের সামনে যখন এটা পাঠ করা হয় তখন থুতনির ভরে তারা সিজদায় পড়ে যায় এবং মুখে স্বীকারোক্তি করে আমাদের প্রভু মহান ও পবিত্র, আমাদের প্রভুর ওয়াদা সত্য এবং তা সত্যরূপে সাব্যস্ত হয়েই গেছে।” (১৭:১০৭-১০৮)অর্থাৎ তিনি পূর্ববর্তী রাসূলদের মাধ্যমে যেসব সংবাদ দিয়েছিলেন, সবগুলোই সত্যে পরিণত হয়েছে এবং সমস্ত নবীর মাথার মুকুট সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এসেই গেছেন। আর এ কিতাব অর্থাৎ কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর আমানতদার। অর্থাৎ এতে যা কিছু রয়েছে পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে সেগুলোই ছিল। এখন যদি কেউ বিপরীত বলে যে, পূর্ববর্তী অমুক কিতাবে এটা ছিল, তবে সেটা ভুল। এ কুরআন ঐসব কিতাবের সত্যসাক্ষী এবং ঐগুলোকে আবেষ্টনকারী। যেসব মঙ্গলময় ও কল্যাণকর বিষয় ঐ সব কিতাবে মিলিতভাবে ছিল ঐ সমুদয়ই এককভাবে এ সর্বশেষ কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। এ জন্যেই এটা সবগুলোর উপর হাকিম ও অগ্রগণ্য। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার উপর রয়েছে। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এ উপদেশপূর্ণ কিতাব আমিই অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী।” (১৫৪৯) কেউ কেউ বলেছেন যে, এর ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হচ্ছেন এ কিতাবের উপর আমানতদার। বাস্তবিকপক্ষেতো এ উক্তিটি সঠিক, কিন্তু এ তাফসীর করা ঠিক হয়নি। বরং আরবী ভাষার দিক দিয়ে এটা চিন্তা ও গবেষণার বিষয়। সঠিক তাফসীর প্রথমটিই বটে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে এ উক্তিটি নকল করে বলেছেন যে, এটা বহু দূরের কথা, বরং এটা মোটেই ঠিক নয়। কেননা (আরবী) শব্দের (আরবী) বা সংযোগ (আরবী) শব্দের উপর রয়েছে। সুতরাং (আরবী) শব্দটি যার (আরবী) ছিল এটাও ঐ জিনিসেরই (আরবী) বা বিশেষণ হবে। যদি হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর অর্থ সঠিক বলে মেনে নেয়া হয় তবে (আরবী) সংযোগ ছাড়াই হওয়া উচিত ছিল।(আরবী) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! সুতরাং তুমি এ সবের মধ্যে আল্লাহর নির্দেশাবলী ছড়িয়ে দাও, আরব হোক বা আযম হোক, শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত হোক। আল্লাহর নাযিলকৃত’-এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর অহী। হয় সেটা এ কিতাবের আকারেই হোক, না হয় আল্লাহ তা'আলা যে পূর্ববর্তীআহকাম তার জন্যে নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন সেটাই হোক। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতের পূর্বে তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা তাদের মধ্যে ফায়সালা করা ও না করার অধিকার দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এ আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহর অহী মোতাবেক ফায়সালা করা জরুরী। তাঁকে বলা হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! এ দুর্ভাগা অজ্ঞরা নিজেদের পক্ষ থেকে যে আহকাম তৈরী করে নিয়েছে এবং এর কারণে আল্লাহর কিতাবকে যে পরিবর্তন করে ফেলেছে, কোনক্রমেই তুমি তাদের প্রবৃত্তির পেছনে পড়ে সত্যকে ছেড়ে বসোনা। তাদের প্রত্যেকের জন্যে আমি রাস্তা এবং পন্থা তৈরী করে দিয়েছি। কোন কিছুর সূচনা করাকে (আরবী) বলা হয়। আভিধানিক অর্থে প্রকাশ্য ও সহজ পথকে (আরবী) বলে। সুতরাং এ দু'টি শব্দের এ তাফসীরই বেশী যুক্তিসঙ্গত হবে যে, পূর্ববর্তী সমস্ত শরীয়ত যা আল্লাহর পক্ষ থেকে ছিল তার সবগুলোই তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। অবশ্য ছোট খাটো হুকুমের ব্যাপারে কিছুটা পার্থক্য ছিল। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা সব নবীর দল পরস্পরের বৈমাত্রেয় ভাই। আমাদের সবারই দ্বীন এক।” প্রত্যেক নবীকে তাওহীদসহ পাঠানো হতো এবং প্রত্যেক আসমানী কিতাবে তাওহীদের বর্ণনা, ওটাকেই সাব্যস্ত করণ এবং ওরই দিকে আহ্বান থাকতো। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছে- “তোমার পূর্বে আমি যত রাসূলই পাঠিয়েছিলাম তাদের এ অহী করেছিলাম-আমি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।”অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে রাসূল পাঠিয়ে এ নির্দেশই দিয়েছিলাম-তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাগুত বা শয়তানের ইবাদত থেকে বিরত থাকবে।” হ্যা, তবে আহকামের বিভিন্নতা অবশ্যই ছিল। কোন একটি জিনিস কোন এক যুগে হারাম ছিল, পরে তা হালাল হয়ে যায়। কিংবা এর বিপরীত, অর্থাৎ কোন যুগে হালাল ছিল, পরে তা হারাম হয়ে যায়। অথবা, কোন এক হুকুম কোন সময় হালাকা ছিল, পরে তা ভারী হয়ে যায়। কিংবা এর বিপরীত। আর এটাও আবার ছিল হিকমত, মুসলিহাত এবং আল্লাহর দলীল প্রমাণের সাথে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যেতে পারে, যেমন তাওরাত একটি শরীয়ত, ইঞ্জীল একটি শরীয়ত এবং কুরআন একটি পৃথক শরীয়ত। এটার কারণ হচ্ছে এই যে, যেন প্রত্যেক যুগের বাধ্য ও অবাধ্য বান্দাদের মধ্যে পরীক্ষা হয়ে যায়। অবশ্য সর্বযুগে তাওহীদ একই রূপ ছিল। আর এই বাক্যের অর্থ হচ্ছে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মত। আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্যে আমার এ কিতাবকে (কুরআনকে) শরীয়ত ও তরীকা বানিয়েছি। তোমাদের সবারই এর অনুকরণ করা উচিত। এ অবস্থায় (আরবী) -এর পরে সর্বনাম উহ্য মেনে নিতে হবে। সুতরাং উত্তম উদ্দেশ্য লাভের মাধ্যম ও পন্থা একমাত্র কুরআন, আর কিছুই নয়। কিন্তু সঠিক উক্তি প্রথমটিই বটে। এর এটাও একটা দলীল যে, এর পরে রয়েছে- “যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তোমাদের সকলকে একই উম্মত করে দিতেন।” অতএব জানা গেল যে, পূর্ব সম্বোধন শুধু এ উম্মতকেই নয়, বরং এর সম্বোধন হচ্ছে সকল উম্মতের প্রতিই। আর এতে আল্লাহ তা'আলার খুব বড় ও পূর্ণ ক্ষমতার বর্ণনা রয়েছে যে, যদি তিনি চাইতেন তবে সমস্ত লোককে একই শরীয়ত ও একই দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত করতেন, কোন সময়ও কোন প্রকার পরিবর্তন আসতো না। কিন্তু মহান প্রভুর পরিপূর্ণ হিকমত ও কলাকৌশলের চাহিদা এই যে, তিনি পৃথক শরীয়ত নির্ধারণ করবেন, একের পর অন্য নবী প্রেরণ করবেন, কোন নবীর হুকুমকে পরবর্তী নবীর মাধ্যমে বদলিয়ে দেবেন। শেষ পর্যন্ত হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ)-এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী সমস্ত দ্বীন মানসূখ বা রহিত হয়ে যায়। তাকে সারা বিশ্বের জন্যে সর্বশেষ নবী করে পাঠানো হয়। ঘোষিত হচ্ছে-এ বিভিন্ন শরীয়ত দেয়া হয়েছে শুধু তোমাদের পরীক্ষার জন্যে, যেন তিনি তোমাদের বাধ্য ও অনুগত লোকদেরকে পুরস্কার এবং অবাধ্য লোকদেরকে শাস্তি দেন। এটাও বলা হয়েছে যে, তিনি যেন ঐ জিনিস দ্বারা তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন যা তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ কিতাব। অতএব, তোমাদের উচিত মঙ্গল ও পুণ্যের দিকে দৌড়িয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করা, তাঁর শরীয়ত মেনে চলতে আগ্রহী হওয়া এবং সর্বশেষ কিতাব এবং সর্বশেষ নবী (সঃ)-এর মনে প্রাণে আনুগত্য করা। হে লোক সকল! তোমাদের সকলেরই প্রত্যাবর্তন ও আশ্রয়স্থল আল্লাহরই কাছে। সেখানে তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মতভেদের মধ্যে প্রকৃত মত সম্পর্কে অবহিত করবেন। সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিতদের তিনি পুরস্কৃত করবেন এবং মিথ্যা ও বাতিলের উপর প্রতিষ্ঠিত, বিরুদ্ধবাদী ও প্রবৃত্তিপূজারীদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। যারা হককে মানা তো দূরের কথা, বরং হকের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। যহহাক (রঃ) বলেন। যে, এর দ্বারা উম্মতে মুহাম্মাদিয়াকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রথমটিই উত্তম। অতঃপর প্রথম কথার প্রতি আরও গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে এবং ওর বিপরীত থেকে বিরত থাকতে বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি যেন এ বিশ্বাসঘাতক, চক্রান্তকারী, মিথ্যাবাদী, কাফির ইয়াহূদীর কথার ফাঁদে পড়ে আল্লাহর কোন হুকুম থেকে এদিক ওদিক চলে না যাও। যদি তারা তোমার হুকুম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে জেনে রেখো যে, তাদের কলংকময় কার্যাবলীর কারণে তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি অবশ্যই নেমে আসবে। এজন্যই ভাল কাজের তাওফীক তাদের থেকে , ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। অধিকাংশ লোকই হচ্ছে ফাসেক অর্থাৎ হকের আনুগত্য হতে বাইরে, আল্লাহর দ্বীনের বিরোধী এবং হিদায়াত হতে দূরে। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “তুমি লোভ করে চাইলেও অধিকাংশ লোক মুমিন নয়।”(১২:১০৩) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যদি পৃথিবীবাসীর অধিকাংশের কথা মেনে চল তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করবে।” (৬:১১৭)ইয়াহূদীদের কয়েকজন বড় বড় নেতা এবং আলেম আপোষে এক মিটিং করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয় এবং বলেঃ “আপনি জানেন যে, আমরা যদি আপনাকে মেনে নেই তবে সমস্ত ইয়াহূদী আপনার নবুওয়াতকে স্বীকার করে নেবে। আর আমরা আপনাকে মেনে নিতে প্রস্তুত আছি। আপনি শুধু এটুকু করেন যে, আমাদের মধ্যে এবং আমাদের কওমের মধ্যে একটা বিবাদ আছে, আপনি আমাদের মতানুযায়ী এর মীমাংসা করে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওটা অস্বীকার করলেন। ঐ সম্পর্কেই এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এরপর মহান আল্লাহ ঐ লোকগুলো কথার প্রতি অস্বীকৃতি জানিয়ে বলছেনঃ যারা আল্লাহর এমন হুকুম থেকে দূরে সরে থাকে যার মধ্যে সমস্ত মঙ্গল বিদ্যমান রয়েছে এবং সমস্ত অমঙ্গল দূরে আছে, এরূপ পবিত্র হুকুম থেকে সরে গিয়ে কিয়াসের দিকে, কু-প্রবৃত্তির দিকে এবং ঐসব হুকুমের দিকে ঝুঁকে পড়ে যা লোকেরা কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই নিজেদের পক্ষ থেকে বানিয়ে নিয়েছে। যেমন আহলে জাহেলিয়াত ও আহলে দলালাত (গুমরাহ সম্প্রদায়) নিজেদের মত ও মর্জি মোতাবেক হুকুম আহকাম জারী করতে এবং যেমন তাতারীগণ রাষ্ট্রীয়। কাজ কারবারে চেঙ্গিজ খানি হুকুমের অনুসরণ করতো, যা আল-ইয়াসিক তৈরী করে দিয়েছিল। ওটা ছিল বহু সম্মিলিত আহকামের দফতর, যা বিভিন্ন শ্রীয়ত ও মাযহাব হতে হেঁটে নেয়া হয়েছিল। ওটা ছিল ইয়াহূদিয়াত, নাসরানিয়াত, ইসলামিয়াত ইত্যাদি সমস্ত আহকামের সমষ্টি, আবার তাতে এমনও কতক আহকাম ছিল যা শুধুমাত্র জ্ঞান, মত ও সূক্ষ্ম চিন্তা দ্বারা আবিষ্কার করা হয়েছিল এবং যার মধ্যে প্রবৃত্তিরও সংযোগ ছিল। সুতরাং ঐ সমষ্টিই তাদের সন্তানদের নিকট আমলের যোগ্য বিবেচিত হতো এবং ওকেই তারা কিতাব ও সুন্নাতের উপর প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার দিয়ে দিলো। প্রকৃতপক্ষে এরূপ কার্য সম্পাদনকারীরা কাফির এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ওয়াজিব। যে পর্যন্ত তারা ঐসব ছেড়ে দিয়ে আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর দিকে প্রত্যাবর্তন না করে এবং যে কোন ছোট, বড়, গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণ ব্যাপারে কিতাব ও সুন্নাত ছাড়া অন্য কোন হুকুম গ্রহণ না করে। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ তবে কি তারা অজ্ঞানতার যুগের মীমাংসা কামনা করে? দৃঢ় বিশ্বাসীদের কাছে মীমাংসা কার্যে আল্লাহর চেয়ে উত্তম কে হবে? আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর কারও হুকুম বেশী ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক হতে পারে না। ঈমানদার ও পূর্ণ বিশ্বাসীগণ খুব ভাল করেই জানে যে, এ আহকামুল হাকিমীন, আরহামুর রাহিমীনের চেয়ে বেশী উত্তম, স্বচ্ছ, সহজ ও পবিত্র আহকাম, মাসায়েল এবং কাওয়ায়েদ আর কারও হতে পারে না। মা তার ছেলের প্রতি যতটা পরবশ হতে পারে তার চেয়েও বেশী তিনি তাঁর সৃষ্টজীবের উপর মেহেরবান ও দয়ালু। তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞান, বিরাট শক্তি এবং ন্যায় ও ইনসাফের অধিকারী। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ফায়সালা ছাড়া কোন ফতওয়া দেয় ওটাকে জাহেলিয়াতের হুকুম বলা হবে। হযরত তাউস (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আমি কি আমার সন্তানদের কাউকে বেশী এবং কাউকে কম দিতে পারি?” তখন তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। তিবরানী (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি আল্লাহর সবেচেয়ে বড় শত্রু যে ইসলামে অজ্ঞতা যুগের নিয়ম-কানুন ও চাল-চলন অনুসন্ধান করে এবং বিনা কারণে কাউকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতেও রয়েছে এবং তাতে কিছুটা বেশী আছে।

আল-মায়িদা 5:51

৫১-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা ইসলামের শত্রু ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে মুমিনদেরকে নিষেধ করছেন। তিনি বলছেন- তারা কখনও তোমাদের বন্ধু হতে পারে না। কেননা, তোমাদের ধর্মের প্রতি তাদের হিংসা ও শক্রতা রয়েছে। হ্যাঁ, তারা নিজেরা একে অপরের বন্ধু বটে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব কায়েম করবে তারা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবু মূসা (রাঃ)-কে এ ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন করেছিলেন এবং এ আয়াতটি পড়ে শুনিয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উবা বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা এ থেকে বেঁচে থাকো যে, তোমরা নিজেরা জানতেই পারবে না, অথচ আল্লাহর কাছে ইয়াহুদী ও নাসারা বলে পরিগণিত হয়ে যাবে।" বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বুঝে গেলাম যে, এ আয়াতের ভাবার্থই তার উদ্দেশ্য।যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা গোপনীয়ভাবে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে যোগাযোগ ও ভালবাসা স্থাপন করে থাকে এবং অজুহাত পেশ করে বলে-এরা যদি মুসলমানদের উপর জয়যুক্ত হয়ে যায় তবে না জানি আমরা বিপদে পড়ে যাই। এ জন্যই তাদের সাথে মিল রাখছি। কারও মন চটিয়ে আমাদের লাভ কি? আল্লাহ পাক বলেন-খুব সম্ভব, আল্লাহ মুসলমানদেরকে স্পষ্ট বিজয় দান করবেন। মক্কাও তাদের হাতে বিজিত হবে এবং শাসনকর্তা তারাই হবে। আল্লাহ তাদেরই পায়ের নীচে হুকুমত নিক্ষেপ করবেন অথবা ইয়াহূদী নাসারাদেরকে পরাজিত করে তাদেরকে লাঞ্ছিত করতঃ তাদের নিকট থেকে জিযিয়া কর আদায় করার নির্দেশ তিনি মুসলমানদেরকে প্রদান করবেন। সুতরাং আজ যেসব মুনাফিক গোপনীয়ভাবে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে সংযোগ স্থাপন করছে এবং নেচে কুদে বেড়াচ্ছে, সেদিন এ চালাকির জন্যে তাদেরকে রক্তাশ্রু বহাতে হবে। তাদের পর্দা সেদিন খুলে যাবে। ঐ সময় মুসলমানরা তাদের এ চক্রান্তের উপর বিস্ময়বোধ করবে এবং বলবেঃ আরে! এরা কি ওরাই, যারা আমাদেরকে শপথ করে করে বলতো যে, তারা অমাদের সাথেই আছে! তারা যা কিছু করেছিল সব বিনষ্ট হয়ে গেল। (আরবী) তো হচ্ছে জমহরের কিরআত। (আরবী) ছাড়াও একটি কিরআত রয়েছে। মদীনাবাসীর কিরআত এটাই। ইয়াকুলু হচ্ছে মুবতাদা এবং এর অন্য কিরআত ইয়াকুলা আছে। তাহলে এটা ফাআসা এর উপর আতফ হবে। এটা যেন ওয়া আঁইয়াকুলা ছিল। মদীনাবাসীর মতে এই আয়াতগুলোর শানে নকূল এই যে, উহুদ যুদ্ধের পর একটি লোক বলে- “আমি এ ইয়াহূদীর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছি, যাতে সুযোগ আসলে আমি এর দ্বারা উপকৃত হতে পারি।” অপর একটি লোক বললোঃ “আমি অমুক খ্রীষ্টানের নিকট গমনাগমন করে থাকি এবং তার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে আমি তাকে সাহায্য করবো।” তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, লুবাবাহ ইবনে মুনযিরের ব্যাপারে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। যখন নবী (সঃ) তাঁকে বানু কুরাইযার নিকট প্রেরণ করেন তখন তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করবেন? তখন তিনি স্বীয় গলদেশের প্রতি ইঙ্গিত করেন অর্থাৎ তিনি ইঙ্গিতে বলেনঃ “তিনি তোমাদের সকলকে হত্যা করবেন।”একটি বর্ণনায় আছে যে, এ আয়াতগুলো আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত উবাদাহ্ ইবনে সামিত (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ বহু ইয়াহদীর সাথে আমার বন্ধুত্ব আছে, কিন্তু তাদের সবারই বন্ধুত্ব ভেঙ্গে দিলাম। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বন্ধুত্বই আমার জন্যে যথেষ্ট। তখন ঐ মুনাফিক (আবদুল্লাহ ইবনে উবাই) বললোঃ আগা-পিছা চিন্তা করা আমার অভ্যাস। আমার দ্বারা এটা হতে পারে না। বলা যায় না কোন সময় কি হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবদুল্লাহ! তুমি উবাদা। (রাঃ) হতে খুবই নিম্নস্তরে নেমে গেছ।” ঐ সময় এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, বদর যুদ্ধে যখন মুশকিরদের পরাজয় ঘটে তখন কতক মুসলমান তাদের সাথে বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ ইয়াহূদীদেরকে বললেনঃ “তোমাদের পরিণামও এরূপই হবে। সুতরাং এর পূর্বেই তোমরা সত্য ধর্ম (ইসলাম) কবুল করে নাও।” উত্তরে তারা বললোঃ “যুদ্ধবিদ্যায় অনভিজ্ঞ কতক কুরাইশের উপর জয়লাভ করে অহংকারে মেতে ওঠো না। যদি আমাদের সাথে যুদ্ধের পালা পড়ে তবে যুদ্ধ কাকে বলে তা জেনে নেবে। সেই সময় হযরত উবাদা (রাঃ) ও আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-এর মধ্যে ঐ কথোপকথন হয় যা উপরে বর্ণিত হলো।যখন ইয়াহুদীদের এ গোত্রের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ বাঁধে এবং আল্লাহ পাকের অনুগ্রহে মুসলমানরা জয়।ভ করেন তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে থাকেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বন্ধুদের ব্যাপারে আমার উপর অনুগ্রহ করুন। এ লোকগুলো খাযরা গোত্রের সঙ্গী ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে কোন উত্তর দিলেন না। সে আবার বললো। তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সে তখন তাঁর অঞ্চল ধরে লটকে গেল। তিনি রাগতঃ স্বরে বললেনঃ “ছেড়ে দাও।" সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! না, আমি ছাড়বো না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। তাদের দল খুবই বড় এবং আজ পর্যন্ত তারা আমার পক্ষ অবলম্বন করে আসছে। আর একদিনেই তারা ধ্বংসের ঘাটে অবতরণ করছে! আমার তো খুব ভয় হচ্ছে যে, ভবিষ্যতে হয় তো আমাদেরকে কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।” অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যাও, ঐ সব কিছু তোমারই জন্যে অবধারিত।” অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন বান্ কাইনুকার ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে যুদ্ধ করে এবং আল্লাহ তাদেরকে পরাজয়ের গ্লানি ভোগ করান, তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। কিন্তু হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) তাদের বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও তাদের পক্ষে সুপারিশ করতে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন। তখন ‘হুমুল গালেবুনা পর্যন্ত আয়াতগুলো। অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে দেখতে যান এবং বলেনঃ “আমি তো তোমাকে বারবার ঐ ইয়াহূদীদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে নিষেধ করেছিলাম। তখন সে বললোঃ “সা’দ ইবনে যারারা’ (রাঃ) তো তাদের সাথে শত্রুতা করতেন, তথাপি তিনি তো মারা গেছেন।”

আল-মায়িদা 5:52

৫১-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা ইসলামের শত্রু ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে মুমিনদেরকে নিষেধ করছেন। তিনি বলছেন- তারা কখনও তোমাদের বন্ধু হতে পারে না। কেননা, তোমাদের ধর্মের প্রতি তাদের হিংসা ও শক্রতা রয়েছে। হ্যাঁ, তারা নিজেরা একে অপরের বন্ধু বটে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব কায়েম করবে তারা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবু মূসা (রাঃ)-কে এ ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন করেছিলেন এবং এ আয়াতটি পড়ে শুনিয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উবা বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা এ থেকে বেঁচে থাকো যে, তোমরা নিজেরা জানতেই পারবে না, অথচ আল্লাহর কাছে ইয়াহুদী ও নাসারা বলে পরিগণিত হয়ে যাবে।" বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বুঝে গেলাম যে, এ আয়াতের ভাবার্থই তার উদ্দেশ্য।যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা গোপনীয়ভাবে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে যোগাযোগ ও ভালবাসা স্থাপন করে থাকে এবং অজুহাত পেশ করে বলে-এরা যদি মুসলমানদের উপর জয়যুক্ত হয়ে যায় তবে না জানি আমরা বিপদে পড়ে যাই। এ জন্যই তাদের সাথে মিল রাখছি। কারও মন চটিয়ে আমাদের লাভ কি? আল্লাহ পাক বলেন-খুব সম্ভব, আল্লাহ মুসলমানদেরকে স্পষ্ট বিজয় দান করবেন। মক্কাও তাদের হাতে বিজিত হবে এবং শাসনকর্তা তারাই হবে। আল্লাহ তাদেরই পায়ের নীচে হুকুমত নিক্ষেপ করবেন অথবা ইয়াহূদী নাসারাদেরকে পরাজিত করে তাদেরকে লাঞ্ছিত করতঃ তাদের নিকট থেকে জিযিয়া কর আদায় করার নির্দেশ তিনি মুসলমানদেরকে প্রদান করবেন। সুতরাং আজ যেসব মুনাফিক গোপনীয়ভাবে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে সংযোগ স্থাপন করছে এবং নেচে কুদে বেড়াচ্ছে, সেদিন এ চালাকির জন্যে তাদেরকে রক্তাশ্রু বহাতে হবে। তাদের পর্দা সেদিন খুলে যাবে। ঐ সময় মুসলমানরা তাদের এ চক্রান্তের উপর বিস্ময়বোধ করবে এবং বলবেঃ আরে! এরা কি ওরাই, যারা আমাদেরকে শপথ করে করে বলতো যে, তারা অমাদের সাথেই আছে! তারা যা কিছু করেছিল সব বিনষ্ট হয়ে গেল। (আরবী) তো হচ্ছে জমহরের কিরআত। (আরবী) ছাড়াও একটি কিরআত রয়েছে। মদীনাবাসীর কিরআত এটাই। ইয়াকুলু হচ্ছে মুবতাদা এবং এর অন্য কিরআত ইয়াকুলা আছে। তাহলে এটা ফাআসা এর উপর আতফ হবে। এটা যেন ওয়া আঁইয়াকুলা ছিল। মদীনাবাসীর মতে এই আয়াতগুলোর শানে নকূল এই যে, উহুদ যুদ্ধের পর একটি লোক বলে- “আমি এ ইয়াহূদীর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছি, যাতে সুযোগ আসলে আমি এর দ্বারা উপকৃত হতে পারি।” অপর একটি লোক বললোঃ “আমি অমুক খ্রীষ্টানের নিকট গমনাগমন করে থাকি এবং তার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে আমি তাকে সাহায্য করবো।” তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, লুবাবাহ ইবনে মুনযিরের ব্যাপারে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। যখন নবী (সঃ) তাঁকে বানু কুরাইযার নিকট প্রেরণ করেন তখন তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করবেন? তখন তিনি স্বীয় গলদেশের প্রতি ইঙ্গিত করেন অর্থাৎ তিনি ইঙ্গিতে বলেনঃ “তিনি তোমাদের সকলকে হত্যা করবেন।”একটি বর্ণনায় আছে যে, এ আয়াতগুলো আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত উবাদাহ্ ইবনে সামিত (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ বহু ইয়াহদীর সাথে আমার বন্ধুত্ব আছে, কিন্তু তাদের সবারই বন্ধুত্ব ভেঙ্গে দিলাম। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বন্ধুত্বই আমার জন্যে যথেষ্ট। তখন ঐ মুনাফিক (আবদুল্লাহ ইবনে উবাই) বললোঃ আগা-পিছা চিন্তা করা আমার অভ্যাস। আমার দ্বারা এটা হতে পারে না। বলা যায় না কোন সময় কি হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবদুল্লাহ! তুমি উবাদা। (রাঃ) হতে খুবই নিম্নস্তরে নেমে গেছ।” ঐ সময় এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, বদর যুদ্ধে যখন মুশকিরদের পরাজয় ঘটে তখন কতক মুসলমান তাদের সাথে বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ ইয়াহূদীদেরকে বললেনঃ “তোমাদের পরিণামও এরূপই হবে। সুতরাং এর পূর্বেই তোমরা সত্য ধর্ম (ইসলাম) কবুল করে নাও।” উত্তরে তারা বললোঃ “যুদ্ধবিদ্যায় অনভিজ্ঞ কতক কুরাইশের উপর জয়লাভ করে অহংকারে মেতে ওঠো না। যদি আমাদের সাথে যুদ্ধের পালা পড়ে তবে যুদ্ধ কাকে বলে তা জেনে নেবে। সেই সময় হযরত উবাদা (রাঃ) ও আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-এর মধ্যে ঐ কথোপকথন হয় যা উপরে বর্ণিত হলো।যখন ইয়াহুদীদের এ গোত্রের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ বাঁধে এবং আল্লাহ পাকের অনুগ্রহে মুসলমানরা জয়।ভ করেন তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে থাকেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বন্ধুদের ব্যাপারে আমার উপর অনুগ্রহ করুন। এ লোকগুলো খাযরা গোত্রের সঙ্গী ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে কোন উত্তর দিলেন না। সে আবার বললো। তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সে তখন তাঁর অঞ্চল ধরে লটকে গেল। তিনি রাগতঃ স্বরে বললেনঃ “ছেড়ে দাও।" সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! না, আমি ছাড়বো না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। তাদের দল খুবই বড় এবং আজ পর্যন্ত তারা আমার পক্ষ অবলম্বন করে আসছে। আর একদিনেই তারা ধ্বংসের ঘাটে অবতরণ করছে! আমার তো খুব ভয় হচ্ছে যে, ভবিষ্যতে হয় তো আমাদেরকে কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।” অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যাও, ঐ সব কিছু তোমারই জন্যে অবধারিত।” অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন বান্ কাইনুকার ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে যুদ্ধ করে এবং আল্লাহ তাদেরকে পরাজয়ের গ্লানি ভোগ করান, তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। কিন্তু হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) তাদের বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও তাদের পক্ষে সুপারিশ করতে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন। তখন ‘হুমুল গালেবুনা পর্যন্ত আয়াতগুলো। অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে দেখতে যান এবং বলেনঃ “আমি তো তোমাকে বারবার ঐ ইয়াহূদীদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে নিষেধ করেছিলাম। তখন সে বললোঃ “সা’দ ইবনে যারারা’ (রাঃ) তো তাদের সাথে শত্রুতা করতেন, তথাপি তিনি তো মারা গেছেন।”

আল-মায়িদা 5:53

৫১-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা ইসলামের শত্রু ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে মুমিনদেরকে নিষেধ করছেন। তিনি বলছেন- তারা কখনও তোমাদের বন্ধু হতে পারে না। কেননা, তোমাদের ধর্মের প্রতি তাদের হিংসা ও শক্রতা রয়েছে। হ্যাঁ, তারা নিজেরা একে অপরের বন্ধু বটে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব কায়েম করবে তারা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবু মূসা (রাঃ)-কে এ ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন করেছিলেন এবং এ আয়াতটি পড়ে শুনিয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উবা বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা এ থেকে বেঁচে থাকো যে, তোমরা নিজেরা জানতেই পারবে না, অথচ আল্লাহর কাছে ইয়াহুদী ও নাসারা বলে পরিগণিত হয়ে যাবে।" বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বুঝে গেলাম যে, এ আয়াতের ভাবার্থই তার উদ্দেশ্য।যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা গোপনীয়ভাবে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে যোগাযোগ ও ভালবাসা স্থাপন করে থাকে এবং অজুহাত পেশ করে বলে-এরা যদি মুসলমানদের উপর জয়যুক্ত হয়ে যায় তবে না জানি আমরা বিপদে পড়ে যাই। এ জন্যই তাদের সাথে মিল রাখছি। কারও মন চটিয়ে আমাদের লাভ কি? আল্লাহ পাক বলেন-খুব সম্ভব, আল্লাহ মুসলমানদেরকে স্পষ্ট বিজয় দান করবেন। মক্কাও তাদের হাতে বিজিত হবে এবং শাসনকর্তা তারাই হবে। আল্লাহ তাদেরই পায়ের নীচে হুকুমত নিক্ষেপ করবেন অথবা ইয়াহূদী নাসারাদেরকে পরাজিত করে তাদেরকে লাঞ্ছিত করতঃ তাদের নিকট থেকে জিযিয়া কর আদায় করার নির্দেশ তিনি মুসলমানদেরকে প্রদান করবেন। সুতরাং আজ যেসব মুনাফিক গোপনীয়ভাবে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে সংযোগ স্থাপন করছে এবং নেচে কুদে বেড়াচ্ছে, সেদিন এ চালাকির জন্যে তাদেরকে রক্তাশ্রু বহাতে হবে। তাদের পর্দা সেদিন খুলে যাবে। ঐ সময় মুসলমানরা তাদের এ চক্রান্তের উপর বিস্ময়বোধ করবে এবং বলবেঃ আরে! এরা কি ওরাই, যারা আমাদেরকে শপথ করে করে বলতো যে, তারা অমাদের সাথেই আছে! তারা যা কিছু করেছিল সব বিনষ্ট হয়ে গেল। (আরবী) তো হচ্ছে জমহরের কিরআত। (আরবী) ছাড়াও একটি কিরআত রয়েছে। মদীনাবাসীর কিরআত এটাই। ইয়াকুলু হচ্ছে মুবতাদা এবং এর অন্য কিরআত ইয়াকুলা আছে। তাহলে এটা ফাআসা এর উপর আতফ হবে। এটা যেন ওয়া আঁইয়াকুলা ছিল। মদীনাবাসীর মতে এই আয়াতগুলোর শানে নকূল এই যে, উহুদ যুদ্ধের পর একটি লোক বলে- “আমি এ ইয়াহূদীর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছি, যাতে সুযোগ আসলে আমি এর দ্বারা উপকৃত হতে পারি।” অপর একটি লোক বললোঃ “আমি অমুক খ্রীষ্টানের নিকট গমনাগমন করে থাকি এবং তার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে আমি তাকে সাহায্য করবো।” তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, লুবাবাহ ইবনে মুনযিরের ব্যাপারে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। যখন নবী (সঃ) তাঁকে বানু কুরাইযার নিকট প্রেরণ করেন তখন তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করবেন? তখন তিনি স্বীয় গলদেশের প্রতি ইঙ্গিত করেন অর্থাৎ তিনি ইঙ্গিতে বলেনঃ “তিনি তোমাদের সকলকে হত্যা করবেন।”একটি বর্ণনায় আছে যে, এ আয়াতগুলো আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত উবাদাহ্ ইবনে সামিত (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ বহু ইয়াহদীর সাথে আমার বন্ধুত্ব আছে, কিন্তু তাদের সবারই বন্ধুত্ব ভেঙ্গে দিলাম। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বন্ধুত্বই আমার জন্যে যথেষ্ট। তখন ঐ মুনাফিক (আবদুল্লাহ ইবনে উবাই) বললোঃ আগা-পিছা চিন্তা করা আমার অভ্যাস। আমার দ্বারা এটা হতে পারে না। বলা যায় না কোন সময় কি হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হে আবদুল্লাহ! তুমি উবাদা। (রাঃ) হতে খুবই নিম্নস্তরে নেমে গেছ।” ঐ সময় এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, বদর যুদ্ধে যখন মুশকিরদের পরাজয় ঘটে তখন কতক মুসলমান তাদের সাথে বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ ইয়াহূদীদেরকে বললেনঃ “তোমাদের পরিণামও এরূপই হবে। সুতরাং এর পূর্বেই তোমরা সত্য ধর্ম (ইসলাম) কবুল করে নাও।” উত্তরে তারা বললোঃ “যুদ্ধবিদ্যায় অনভিজ্ঞ কতক কুরাইশের উপর জয়লাভ করে অহংকারে মেতে ওঠো না। যদি আমাদের সাথে যুদ্ধের পালা পড়ে তবে যুদ্ধ কাকে বলে তা জেনে নেবে। সেই সময় হযরত উবাদা (রাঃ) ও আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-এর মধ্যে ঐ কথোপকথন হয় যা উপরে বর্ণিত হলো।যখন ইয়াহুদীদের এ গোত্রের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ বাঁধে এবং আল্লাহ পাকের অনুগ্রহে মুসলমানরা জয়।ভ করেন তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে থাকেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বন্ধুদের ব্যাপারে আমার উপর অনুগ্রহ করুন। এ লোকগুলো খাযরা গোত্রের সঙ্গী ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে কোন উত্তর দিলেন না। সে আবার বললো। তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সে তখন তাঁর অঞ্চল ধরে লটকে গেল। তিনি রাগতঃ স্বরে বললেনঃ “ছেড়ে দাও।" সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! না, আমি ছাড়বো না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। তাদের দল খুবই বড় এবং আজ পর্যন্ত তারা আমার পক্ষ অবলম্বন করে আসছে। আর একদিনেই তারা ধ্বংসের ঘাটে অবতরণ করছে! আমার তো খুব ভয় হচ্ছে যে, ভবিষ্যতে হয় তো আমাদেরকে কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।” অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যাও, ঐ সব কিছু তোমারই জন্যে অবধারিত।” অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন বান্ কাইনুকার ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে যুদ্ধ করে এবং আল্লাহ তাদেরকে পরাজয়ের গ্লানি ভোগ করান, তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। কিন্তু হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) তাদের বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও তাদের পক্ষে সুপারিশ করতে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন। তখন ‘হুমুল গালেবুনা পর্যন্ত আয়াতগুলো। অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে দেখতে যান এবং বলেনঃ “আমি তো তোমাকে বারবার ঐ ইয়াহূদীদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে নিষেধ করেছিলাম। তখন সে বললোঃ “সা’দ ইবনে যারারা’ (রাঃ) তো তাদের সাথে শত্রুতা করতেন, তথাপি তিনি তো মারা গেছেন।”

আল-মায়িদা 5:54

৫৪-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ সংবাদ দিচ্ছেন যে, যদি কেউ এ পবিত্র দ্বীন ত্যাগ করে, তবে সে ইসলামের একটুও ক্ষতি করতে পারবে না। কেননা, আল্লাহ তাদের পরিবর্তে এমন লোকদেরকে এ সত্য ধর্মের খিদমতে লাগিয়ে দেবেন যারা সবদিক দিয়েই এদের চেয়ে উত্তম হবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) (৪:১৩৩) অন্য এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) (১৪:১৯) এসব আয়াতের ভাবার্থ ওটাই যা বর্ণনা করা হলো। হককে ছেড়ে দিয়ে বাতিলের দিকে ফিরে যাওয়াকে (আরবী) বলা হয়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি কুরাইশ নেতৃবর্গের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর খিলাফতকালে যেসব লোক ইসলাম থেকে ফিরে গিয়েছিল তাদের হুকুম এ আয়াতে রয়েছে। তাদের পরিবর্তে যে কওমকে আনয়নের ওয়াদা করা হচ্ছে, তার হচ্ছে আহলে কাদেসিয়া বা কওমে সাবা অথবা আহলে ইয়ামান, যারা কিনদাহ ও সুকূ গোত্রের লোক। একটি খুবই গরীব মারফু হাদীসেও শেষোক্ত কথাটি বর্ণিত আছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেনঃ “তারা এ লোকটির কওমের লোক।”ঐ পূর্ণ ঈমানদারদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা তাদের বন্ধুদের প্রতি (অর্থাৎ মুসলমানদের প্রতি খুবই কোমল ও নম্র হবে, কিন্তু কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে।' (আরবী) অর্থাৎ “তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর আর পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত কোমল ও দয়ালু।” (৪৯:২৯) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি(আরবী) ছিলেন। অর্থাৎ তিনি বন্ধুদের সামনে ছিলেন।হাসিমুখ ও প্রফুল্ল চেহারা বিশিষ্ট, আর শত্রুদের সামনে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও সংগ্রামী বীর পুরুষ। মুসলমানরা জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না, পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে না, ক্লান্ত হয়ে পড়ে না, ভীরুতা প্রকাশ করে না এবং বিলাসপ্রিয় হয় না। তারা আল্লাহর ওয়াস্তে কাজ করতে গিয়ে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় করে না। আল্লাহর আনুগত্য করা, তার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, ভাল কাজের হুকুম করা এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখা ইত্যাদি কাজে তারা সদা নিমগ্ন থাকে।ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সামিত (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমার বন্ধু (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) আমাকে সাতটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। (১) মিসকীনদের ভালবাসা এবং তাদের সাথে উঠাবসা করা। (২) (পার্থিব বিষয়ে) নিজের চেয়ে নিম্নস্তরের লোকের প্রতি দৃষ্টিপাত করা এবং উচ্চ পর্যায়ের লোকের দিকে নযর না দেয়া। (৩) আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখা যদিও ঐ আত্মীয় তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। (৪) কারও কাছে কিছু না চাওয়া। (৫) তিক্ত হলেও সত্য কথা বলা। (৬) আল্লাহর ব্যাপার (ধর্মীয় কাজে) কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় না করা। (৭) অধিকাংশ সময় (আরবী)- এ কালেমাটি পাঠ করা, কেননা এটা আরশের কোষাগার।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি পাঁচবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে দীক্ষা গ্রহণ করেছি এবং তিনি আমাকে সাতটি কাজ পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে বলেছেন। আর আমি সাতবার নিজের উপর আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলেছি যে, আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে কোন ভৎসনাকারীর ভৎসনাকে মোটেই গ্রাহ্য করবো না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার আমাকে ডেকে বলেনঃ “জান্নাতের বিনিময়ে তুমি আমার হাতে দীক্ষা গ্রহণ করবে কি?" আমি তা স্বীকার করে আমার হাতখানা বাড়িয়ে দিলাম। তখন তিনি শর্ত দিলেনঃ “তুমি কারও কাছে কিছুই চাইবে না।" আমি বললামঃ বেশ, ঠিক আছে। তিনি বললেনঃ “যদি চাবুকও হয়, অর্থাৎ ওটাও যদি পড়ে যায় তবে স্বয়ং সওয়ারী থেকে নেমে তা উঠিয়ে নেবে।”মুসনাদে আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “লোকের ভয়ে তোমাদের কেউ যেন সত্য ও ন্যায্য কথা বলা থেকে বিরত না থাকে। জেনে রেখো যে, না কেউ মৃত্যুকে এগিয়ে আনতে পারে, না কেউ রিককে দূর করতে পারে।” ইমাম আহমাদ (রঃ) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে আরও বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ দেখার পর নিজেকে দুর্বল মনে করে নীরব থেকো না, নতুবা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে এর জন্যে জবাবদিহি করতে হবে। সেই সময় মানুষ উত্তর দিতে গিয়ে বলবেঃ আমি মানুষের ভয়ে নীরব ছিলাম। তখন মহান আল্লাহ বলবেনঃ “আমি এরই বেশী হকদার ছিলাম যে, তুমি আমাকেই ভয় করতে।” এটাও বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাকে এ প্রশ্নও করবেন :“তুমি শরীয়ত বিরোধী কাজ দেখে বাধা দাওনি কেন? অতঃপর আল্লাহ পাক নিজেই এর উত্তর চাইবেন। তখন সে বলবেঃ “হে আমার প্রভু! আমি আপনার উপর ভরসা করেছিলাম এবং মানুষকে ভয় করেছিলাম।" (সুনানে ইবনে মাজাহ) অন্য একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে-“মুমিনের জন্যে এটা উচিত নয় যে, সে নিজেকে লাঞ্ছিত করবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিভাবে সে নিজেকে লাঞ্ছিত করতে পারে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “ঐ বিপদ সে নিজের উপর উঠিয়ে নেবে যা বহন করার শক্তি তার নেই।”ইরশাদ হচ্ছে-এটা হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ পূর্ণ ঈমানের এ গুণাবলী আল্লাহ পাকের বিশেষ দান। এর তাওফীক তাঁরই পক্ষ থেকে এসে থাকে। তাঁর অনুগ্রহ খুবই প্রশস্ত এবং তিনি মহাজ্ঞানী। এ বড় নিয়ামতের হকদার কে তা তিনিই খুব ভাল জানেন।ঘোষিত হচ্ছে- তোমাদের বন্ধু কাফেররা নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে তোমাদের বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত আল্লাহর সাথে, তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে এবং মুমিনদের সাথে। মুমিন তো তারাই যাদের মধ্যে এ গুণাবলী রয়েছে যে, তারা নিয়মিতভাবে নামায আদায় করে যা ইসলামের একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রুকন এবং যাকাত প্রদান করে যা আল্লাহর দুর্বল ও মিসকীন বান্দাদের হক। শেষ বাক্যটি সম্পর্কে কতক লোকের মনে সন্দেহ জেগেছে যে, ওটা (আরবী) (২:৩) থেকে (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তারা রুকুর অবস্থায় যাকাত প্রদান করে। এটা সম্পূর্ণরূপে ভুল ধারণা। কেননা, যদি এটা মেনে নেয়া হয় তবে এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, রুকুর অবস্থায় যাকাত দেয়া উত্তম। অথচ কোন আলেমই একথা বলেন না। সন্দেহ পোষণকারীরা এখানে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) নামাযে রুকুর অবস্থায় ছিলেন, এমন সময় এক ভিক্ষুক এসে যায়। তখন তিনি ঐ অবস্থাতেই তাঁর আংটিটি খুলে তাকে দিয়ে দেন। হযরত সুদ্দী (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সমস্ত মুসলমানের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। হযরত উত্বার উক্তি অনুযায়ী। (আরবী) দ্বারা সমস্ত মুসলমান ও হযরত আলী (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। একটি মার’ হাদীসেও আংটির ঘটনাটি রয়েছে এবং কোন কোন তাফসীরকারকও এ তাফসীর করেছেন। সনদ কিন্তু একটিরও সঠিক নয়। একটিরও বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য নয়। সুতরাং বুঝা গেল যে, ঘটনাটি মোটেই সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা ইতিপূর্বে বর্ণনা করেছি যে, এ আয়াতগুলো হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন তিনি পরিষ্কার ভাষায় ইয়াহুদীদের বন্ধুত্বকে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের বন্ধুত্বে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এ কারণেই আয়াতগুলোর শেষে ঘোষণা করা হয়েছে-যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে সে আল্লাহর সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত এবং আল্লাহর সেনাবাহিনীই জয়যুক্ত হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ এটা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন- আমি ও আমার রাসূলগণই জয়যুক্ত থাকবো, নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। যারা আল্লাহর উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে তাদেরকে তুমি এরূপ পাবে না যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে, যদিও তারা তাদের পিতা, ভাই এবং আত্মীয়-স্বজন হয়, এরা তো ওরাই যাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিপিবদ্ধ করেছেন এবং স্বীয় রূহ জিবরাঈল (আঃ) দ্বারা তাদেরকে সাহায্য করেছেন, তাদেরকে আল্লাহ এমন জান্নাতসমূহে প্রবিষ্ট করবেন। যেগুলোর নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে, তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তারাই আল্লাহর সেনাবাহিনী, আল্লাহর সেনাবাহিনীই সফলকাম হবে।” (৫৮:২১-২২) অতএব, যে কেউ আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের বন্ধুত্বে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে, তাকে দুনিয়াতেও সাহায্য করা হবে এবং পরকালেও সে সফলকাম হবে। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতকে এ বাক্য দ্বারাই শেষ করেছেন।

আল-মায়িদা 5:55

৫৪-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ সংবাদ দিচ্ছেন যে, যদি কেউ এ পবিত্র দ্বীন ত্যাগ করে, তবে সে ইসলামের একটুও ক্ষতি করতে পারবে না। কেননা, আল্লাহ তাদের পরিবর্তে এমন লোকদেরকে এ সত্য ধর্মের খিদমতে লাগিয়ে দেবেন যারা সবদিক দিয়েই এদের চেয়ে উত্তম হবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) (৪:১৩৩) অন্য এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) (১৪:১৯) এসব আয়াতের ভাবার্থ ওটাই যা বর্ণনা করা হলো। হককে ছেড়ে দিয়ে বাতিলের দিকে ফিরে যাওয়াকে (আরবী) বলা হয়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি কুরাইশ নেতৃবর্গের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর খিলাফতকালে যেসব লোক ইসলাম থেকে ফিরে গিয়েছিল তাদের হুকুম এ আয়াতে রয়েছে। তাদের পরিবর্তে যে কওমকে আনয়নের ওয়াদা করা হচ্ছে, তার হচ্ছে আহলে কাদেসিয়া বা কওমে সাবা অথবা আহলে ইয়ামান, যারা কিনদাহ ও সুকূ গোত্রের লোক। একটি খুবই গরীব মারফু হাদীসেও শেষোক্ত কথাটি বর্ণিত আছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেনঃ “তারা এ লোকটির কওমের লোক।”ঐ পূর্ণ ঈমানদারদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা তাদের বন্ধুদের প্রতি (অর্থাৎ মুসলমানদের প্রতি খুবই কোমল ও নম্র হবে, কিন্তু কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে।' (আরবী) অর্থাৎ “তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর আর পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত কোমল ও দয়ালু।” (৪৯:২৯) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি(আরবী) ছিলেন। অর্থাৎ তিনি বন্ধুদের সামনে ছিলেন।হাসিমুখ ও প্রফুল্ল চেহারা বিশিষ্ট, আর শত্রুদের সামনে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও সংগ্রামী বীর পুরুষ। মুসলমানরা জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না, পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে না, ক্লান্ত হয়ে পড়ে না, ভীরুতা প্রকাশ করে না এবং বিলাসপ্রিয় হয় না। তারা আল্লাহর ওয়াস্তে কাজ করতে গিয়ে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় করে না। আল্লাহর আনুগত্য করা, তার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, ভাল কাজের হুকুম করা এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখা ইত্যাদি কাজে তারা সদা নিমগ্ন থাকে।ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সামিত (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমার বন্ধু (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) আমাকে সাতটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। (১) মিসকীনদের ভালবাসা এবং তাদের সাথে উঠাবসা করা। (২) (পার্থিব বিষয়ে) নিজের চেয়ে নিম্নস্তরের লোকের প্রতি দৃষ্টিপাত করা এবং উচ্চ পর্যায়ের লোকের দিকে নযর না দেয়া। (৩) আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখা যদিও ঐ আত্মীয় তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। (৪) কারও কাছে কিছু না চাওয়া। (৫) তিক্ত হলেও সত্য কথা বলা। (৬) আল্লাহর ব্যাপার (ধর্মীয় কাজে) কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় না করা। (৭) অধিকাংশ সময় (আরবী)- এ কালেমাটি পাঠ করা, কেননা এটা আরশের কোষাগার।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি পাঁচবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে দীক্ষা গ্রহণ করেছি এবং তিনি আমাকে সাতটি কাজ পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে বলেছেন। আর আমি সাতবার নিজের উপর আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলেছি যে, আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে কোন ভৎসনাকারীর ভৎসনাকে মোটেই গ্রাহ্য করবো না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার আমাকে ডেকে বলেনঃ “জান্নাতের বিনিময়ে তুমি আমার হাতে দীক্ষা গ্রহণ করবে কি?" আমি তা স্বীকার করে আমার হাতখানা বাড়িয়ে দিলাম। তখন তিনি শর্ত দিলেনঃ “তুমি কারও কাছে কিছুই চাইবে না।" আমি বললামঃ বেশ, ঠিক আছে। তিনি বললেনঃ “যদি চাবুকও হয়, অর্থাৎ ওটাও যদি পড়ে যায় তবে স্বয়ং সওয়ারী থেকে নেমে তা উঠিয়ে নেবে।”মুসনাদে আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “লোকের ভয়ে তোমাদের কেউ যেন সত্য ও ন্যায্য কথা বলা থেকে বিরত না থাকে। জেনে রেখো যে, না কেউ মৃত্যুকে এগিয়ে আনতে পারে, না কেউ রিককে দূর করতে পারে।” ইমাম আহমাদ (রঃ) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে আরও বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ দেখার পর নিজেকে দুর্বল মনে করে নীরব থেকো না, নতুবা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে এর জন্যে জবাবদিহি করতে হবে। সেই সময় মানুষ উত্তর দিতে গিয়ে বলবেঃ আমি মানুষের ভয়ে নীরব ছিলাম। তখন মহান আল্লাহ বলবেনঃ “আমি এরই বেশী হকদার ছিলাম যে, তুমি আমাকেই ভয় করতে।” এটাও বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাকে এ প্রশ্নও করবেন :“তুমি শরীয়ত বিরোধী কাজ দেখে বাধা দাওনি কেন? অতঃপর আল্লাহ পাক নিজেই এর উত্তর চাইবেন। তখন সে বলবেঃ “হে আমার প্রভু! আমি আপনার উপর ভরসা করেছিলাম এবং মানুষকে ভয় করেছিলাম।" (সুনানে ইবনে মাজাহ) অন্য একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে-“মুমিনের জন্যে এটা উচিত নয় যে, সে নিজেকে লাঞ্ছিত করবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিভাবে সে নিজেকে লাঞ্ছিত করতে পারে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “ঐ বিপদ সে নিজের উপর উঠিয়ে নেবে যা বহন করার শক্তি তার নেই।”ইরশাদ হচ্ছে-এটা হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ পূর্ণ ঈমানের এ গুণাবলী আল্লাহ পাকের বিশেষ দান। এর তাওফীক তাঁরই পক্ষ থেকে এসে থাকে। তাঁর অনুগ্রহ খুবই প্রশস্ত এবং তিনি মহাজ্ঞানী। এ বড় নিয়ামতের হকদার কে তা তিনিই খুব ভাল জানেন।ঘোষিত হচ্ছে- তোমাদের বন্ধু কাফেররা নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে তোমাদের বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত আল্লাহর সাথে, তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে এবং মুমিনদের সাথে। মুমিন তো তারাই যাদের মধ্যে এ গুণাবলী রয়েছে যে, তারা নিয়মিতভাবে নামায আদায় করে যা ইসলামের একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রুকন এবং যাকাত প্রদান করে যা আল্লাহর দুর্বল ও মিসকীন বান্দাদের হক। শেষ বাক্যটি সম্পর্কে কতক লোকের মনে সন্দেহ জেগেছে যে, ওটা (আরবী) (২:৩) থেকে (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তারা রুকুর অবস্থায় যাকাত প্রদান করে। এটা সম্পূর্ণরূপে ভুল ধারণা। কেননা, যদি এটা মেনে নেয়া হয় তবে এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, রুকুর অবস্থায় যাকাত দেয়া উত্তম। অথচ কোন আলেমই একথা বলেন না। সন্দেহ পোষণকারীরা এখানে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) নামাযে রুকুর অবস্থায় ছিলেন, এমন সময় এক ভিক্ষুক এসে যায়। তখন তিনি ঐ অবস্থাতেই তাঁর আংটিটি খুলে তাকে দিয়ে দেন। হযরত সুদ্দী (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সমস্ত মুসলমানের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। হযরত উত্বার উক্তি অনুযায়ী। (আরবী) দ্বারা সমস্ত মুসলমান ও হযরত আলী (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। একটি মার’ হাদীসেও আংটির ঘটনাটি রয়েছে এবং কোন কোন তাফসীরকারকও এ তাফসীর করেছেন। সনদ কিন্তু একটিরও সঠিক নয়। একটিরও বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য নয়। সুতরাং বুঝা গেল যে, ঘটনাটি মোটেই সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা ইতিপূর্বে বর্ণনা করেছি যে, এ আয়াতগুলো হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন তিনি পরিষ্কার ভাষায় ইয়াহুদীদের বন্ধুত্বকে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের বন্ধুত্বে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এ কারণেই আয়াতগুলোর শেষে ঘোষণা করা হয়েছে-যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে সে আল্লাহর সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত এবং আল্লাহর সেনাবাহিনীই জয়যুক্ত হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ এটা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন- আমি ও আমার রাসূলগণই জয়যুক্ত থাকবো, নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। যারা আল্লাহর উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে তাদেরকে তুমি এরূপ পাবে না যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে, যদিও তারা তাদের পিতা, ভাই এবং আত্মীয়-স্বজন হয়, এরা তো ওরাই যাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিপিবদ্ধ করেছেন এবং স্বীয় রূহ জিবরাঈল (আঃ) দ্বারা তাদেরকে সাহায্য করেছেন, তাদেরকে আল্লাহ এমন জান্নাতসমূহে প্রবিষ্ট করবেন। যেগুলোর নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে, তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তারাই আল্লাহর সেনাবাহিনী, আল্লাহর সেনাবাহিনীই সফলকাম হবে।” (৫৮:২১-২২) অতএব, যে কেউ আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের বন্ধুত্বে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে, তাকে দুনিয়াতেও সাহায্য করা হবে এবং পরকালেও সে সফলকাম হবে। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতকে এ বাক্য দ্বারাই শেষ করেছেন।

আল-মায়িদা 5:56

৫৪-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ সংবাদ দিচ্ছেন যে, যদি কেউ এ পবিত্র দ্বীন ত্যাগ করে, তবে সে ইসলামের একটুও ক্ষতি করতে পারবে না। কেননা, আল্লাহ তাদের পরিবর্তে এমন লোকদেরকে এ সত্য ধর্মের খিদমতে লাগিয়ে দেবেন যারা সবদিক দিয়েই এদের চেয়ে উত্তম হবে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) (৪:১৩৩) অন্য এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) (১৪:১৯) এসব আয়াতের ভাবার্থ ওটাই যা বর্ণনা করা হলো। হককে ছেড়ে দিয়ে বাতিলের দিকে ফিরে যাওয়াকে (আরবী) বলা হয়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি কুরাইশ নেতৃবর্গের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর খিলাফতকালে যেসব লোক ইসলাম থেকে ফিরে গিয়েছিল তাদের হুকুম এ আয়াতে রয়েছে। তাদের পরিবর্তে যে কওমকে আনয়নের ওয়াদা করা হচ্ছে, তার হচ্ছে আহলে কাদেসিয়া বা কওমে সাবা অথবা আহলে ইয়ামান, যারা কিনদাহ ও সুকূ গোত্রের লোক। একটি খুবই গরীব মারফু হাদীসেও শেষোক্ত কথাটি বর্ণিত আছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেনঃ “তারা এ লোকটির কওমের লোক।”ঐ পূর্ণ ঈমানদারদের গুণাবলী বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা তাদের বন্ধুদের প্রতি (অর্থাৎ মুসলমানদের প্রতি খুবই কোমল ও নম্র হবে, কিন্তু কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে।' (আরবী) অর্থাৎ “তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর আর পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত কোমল ও দয়ালু।” (৪৯:২৯) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি(আরবী) ছিলেন। অর্থাৎ তিনি বন্ধুদের সামনে ছিলেন।হাসিমুখ ও প্রফুল্ল চেহারা বিশিষ্ট, আর শত্রুদের সামনে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও সংগ্রামী বীর পুরুষ। মুসলমানরা জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না, পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে না, ক্লান্ত হয়ে পড়ে না, ভীরুতা প্রকাশ করে না এবং বিলাসপ্রিয় হয় না। তারা আল্লাহর ওয়াস্তে কাজ করতে গিয়ে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় করে না। আল্লাহর আনুগত্য করা, তার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, ভাল কাজের হুকুম করা এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখা ইত্যাদি কাজে তারা সদা নিমগ্ন থাকে।ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সামিত (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমার বন্ধু (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) আমাকে সাতটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। (১) মিসকীনদের ভালবাসা এবং তাদের সাথে উঠাবসা করা। (২) (পার্থিব বিষয়ে) নিজের চেয়ে নিম্নস্তরের লোকের প্রতি দৃষ্টিপাত করা এবং উচ্চ পর্যায়ের লোকের দিকে নযর না দেয়া। (৩) আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখা যদিও ঐ আত্মীয় তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। (৪) কারও কাছে কিছু না চাওয়া। (৫) তিক্ত হলেও সত্য কথা বলা। (৬) আল্লাহর ব্যাপার (ধর্মীয় কাজে) কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় না করা। (৭) অধিকাংশ সময় (আরবী)- এ কালেমাটি পাঠ করা, কেননা এটা আরশের কোষাগার।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আমি পাঁচবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে দীক্ষা গ্রহণ করেছি এবং তিনি আমাকে সাতটি কাজ পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে বলেছেন। আর আমি সাতবার নিজের উপর আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলেছি যে, আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে কোন ভৎসনাকারীর ভৎসনাকে মোটেই গ্রাহ্য করবো না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার আমাকে ডেকে বলেনঃ “জান্নাতের বিনিময়ে তুমি আমার হাতে দীক্ষা গ্রহণ করবে কি?" আমি তা স্বীকার করে আমার হাতখানা বাড়িয়ে দিলাম। তখন তিনি শর্ত দিলেনঃ “তুমি কারও কাছে কিছুই চাইবে না।" আমি বললামঃ বেশ, ঠিক আছে। তিনি বললেনঃ “যদি চাবুকও হয়, অর্থাৎ ওটাও যদি পড়ে যায় তবে স্বয়ং সওয়ারী থেকে নেমে তা উঠিয়ে নেবে।”মুসনাদে আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “লোকের ভয়ে তোমাদের কেউ যেন সত্য ও ন্যায্য কথা বলা থেকে বিরত না থাকে। জেনে রেখো যে, না কেউ মৃত্যুকে এগিয়ে আনতে পারে, না কেউ রিককে দূর করতে পারে।” ইমাম আহমাদ (রঃ) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে আরও বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ দেখার পর নিজেকে দুর্বল মনে করে নীরব থেকো না, নতুবা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে এর জন্যে জবাবদিহি করতে হবে। সেই সময় মানুষ উত্তর দিতে গিয়ে বলবেঃ আমি মানুষের ভয়ে নীরব ছিলাম। তখন মহান আল্লাহ বলবেনঃ “আমি এরই বেশী হকদার ছিলাম যে, তুমি আমাকেই ভয় করতে।” এটাও বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাকে এ প্রশ্নও করবেন :“তুমি শরীয়ত বিরোধী কাজ দেখে বাধা দাওনি কেন? অতঃপর আল্লাহ পাক নিজেই এর উত্তর চাইবেন। তখন সে বলবেঃ “হে আমার প্রভু! আমি আপনার উপর ভরসা করেছিলাম এবং মানুষকে ভয় করেছিলাম।" (সুনানে ইবনে মাজাহ) অন্য একটি বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে-“মুমিনের জন্যে এটা উচিত নয় যে, সে নিজেকে লাঞ্ছিত করবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিভাবে সে নিজেকে লাঞ্ছিত করতে পারে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “ঐ বিপদ সে নিজের উপর উঠিয়ে নেবে যা বহন করার শক্তি তার নেই।”ইরশাদ হচ্ছে-এটা হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ পূর্ণ ঈমানের এ গুণাবলী আল্লাহ পাকের বিশেষ দান। এর তাওফীক তাঁরই পক্ষ থেকে এসে থাকে। তাঁর অনুগ্রহ খুবই প্রশস্ত এবং তিনি মহাজ্ঞানী। এ বড় নিয়ামতের হকদার কে তা তিনিই খুব ভাল জানেন।ঘোষিত হচ্ছে- তোমাদের বন্ধু কাফেররা নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে তোমাদের বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত আল্লাহর সাথে, তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে এবং মুমিনদের সাথে। মুমিন তো তারাই যাদের মধ্যে এ গুণাবলী রয়েছে যে, তারা নিয়মিতভাবে নামায আদায় করে যা ইসলামের একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রুকন এবং যাকাত প্রদান করে যা আল্লাহর দুর্বল ও মিসকীন বান্দাদের হক। শেষ বাক্যটি সম্পর্কে কতক লোকের মনে সন্দেহ জেগেছে যে, ওটা (আরবী) (২:৩) থেকে (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তারা রুকুর অবস্থায় যাকাত প্রদান করে। এটা সম্পূর্ণরূপে ভুল ধারণা। কেননা, যদি এটা মেনে নেয়া হয় তবে এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, রুকুর অবস্থায় যাকাত দেয়া উত্তম। অথচ কোন আলেমই একথা বলেন না। সন্দেহ পোষণকারীরা এখানে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) নামাযে রুকুর অবস্থায় ছিলেন, এমন সময় এক ভিক্ষুক এসে যায়। তখন তিনি ঐ অবস্থাতেই তাঁর আংটিটি খুলে তাকে দিয়ে দেন। হযরত সুদ্দী (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সমস্ত মুসলমানের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। হযরত উত্বার উক্তি অনুযায়ী। (আরবী) দ্বারা সমস্ত মুসলমান ও হযরত আলী (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। একটি মার’ হাদীসেও আংটির ঘটনাটি রয়েছে এবং কোন কোন তাফসীরকারকও এ তাফসীর করেছেন। সনদ কিন্তু একটিরও সঠিক নয়। একটিরও বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য নয়। সুতরাং বুঝা গেল যে, ঘটনাটি মোটেই সঠিক নয়। সঠিক ওটাই যা আমরা ইতিপূর্বে বর্ণনা করেছি যে, এ আয়াতগুলো হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন তিনি পরিষ্কার ভাষায় ইয়াহুদীদের বন্ধুত্বকে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের বন্ধুত্বে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এ কারণেই আয়াতগুলোর শেষে ঘোষণা করা হয়েছে-যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে সে আল্লাহর সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত এবং আল্লাহর সেনাবাহিনীই জয়যুক্ত হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ এটা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন- আমি ও আমার রাসূলগণই জয়যুক্ত থাকবো, নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। যারা আল্লাহর উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে তাদেরকে তুমি এরূপ পাবে না যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে, যদিও তারা তাদের পিতা, ভাই এবং আত্মীয়-স্বজন হয়, এরা তো ওরাই যাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিপিবদ্ধ করেছেন এবং স্বীয় রূহ জিবরাঈল (আঃ) দ্বারা তাদেরকে সাহায্য করেছেন, তাদেরকে আল্লাহ এমন জান্নাতসমূহে প্রবিষ্ট করবেন। যেগুলোর নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে, তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তারাই আল্লাহর সেনাবাহিনী, আল্লাহর সেনাবাহিনীই সফলকাম হবে।” (৫৮:২১-২২) অতএব, যে কেউ আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদের বন্ধুত্বে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে, তাকে দুনিয়াতেও সাহায্য করা হবে এবং পরকালেও সে সফলকাম হবে। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতকে এ বাক্য দ্বারাই শেষ করেছেন।

আল-মায়িদা 5:57

৫৭-৫৮ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের মনে অমুসলিমদের বন্ধুত্ব ও ভালবাসার প্রতি ঘৃণা জন্মিয়ে দিয়ে বলছেন- তোমরা কি এমন লোকদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, যারা তোমাদের পবিত্র ধর্মের সাথে হাসি তামাশা করছে? (আরবী) শব্দটি (আরবী) -এর জন্যে এসেছে, যেমন (আরবী) -এর মধ্যে। কেউ কেউ অল কুফফারে পড়েছেন এবং (আরবী) করেছেন। আবার কেউ কেউ অল কুফফারা পড়েছেন এবং (আরবী) -এর। বানিয়েছেন। তখন (আরবী) হবে অলাল কুফফারা আউলিয়ায়া এরূপ। এখানে দ্বারা মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে ওয়া মিনাল্লাযিনা আশরাকু এরূপ রয়েছে।ঘোষিত হচ্ছে-যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে আল্লাহকে ভয় কর। এরা তো তোমাদের দ্বীনের সাথে, আল্লাহর সাথে এবং শরীয়তের সাথে শত্রুতা করছে। যেমন অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ “মুসলমানদের উচিত কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করা মুসলমানদের (বন্ধুত্ব) অতিক্রম করে, আর যে ব্যক্তি এরূপ করবে, সে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব রাখার কোন হিসেবে নয়, অবশ্য এমন অবস্থায় (বাহ্যিক বন্ধুত্বের অনুমতি আছে) যখন তোমরা তাদের থেকে কোন প্রকার আংশকা কর, আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর সত্তার ভয় দেখাচ্ছেন, আর আল্লাহরই কাছে ফিরে যেতে হবে।” (৩:২৮) অনুরূপভাবে আহলে কিতাবের এ কাফিররাও এবং মুশরিকরাও এ সময়েও ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে থাকে যখন তোমরা নামাযের জন্যে আযান দাও। অথচ এটাই আল্লাহ তা'আলার সবচেয়ে প্রিয় ইবাদত। কিন্তু এ নির্বোধরা এটুকুও জানে না। তাই তারা শয়তানের অনুসারী। আর শয়তানের অবস্থা এই যে, আযান শোনামাত্রই সে গুহ্যদ্বার দিয়ে বায়ু বের করতঃ লেজ গুটিয়ে পলায়ন করে এবং সেখানে গিয়ে থেমে যায় যেখানে আযানের শব্দ পৌছে না। তারপর আবার আসে এবং তাকবীর শুনে পালিয়ে যায়। তাকবীর দেয়া শেষ হলেই সে পুনরায় এসে পড়ে এবং নামাযীকে বিভ্রান্ত করার কাজে লেগে যায়। তাকে সে এদিক ওদিকের বিস্মরণ হয়ে যাওয়া কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, এমনকি কত রাকআত নামায় হয়েছে তাও তার আর স্মরণ থাকে না। যখন এরূপ অবস্থা ঘটবে দু'টো সহু সিজদা করতে হবে। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) ইমাম যুহরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীমে আযানের উল্লেখ রয়েছে। অতঃপর তিনি এ আয়াতটিই পাঠ করেন।মদীনায় একজন খ্রীষ্টান ছিল। আযানে যখন “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ” শুনতো তখন সে বলতোঃ “এই মিথ্যাবাদী জ্বলে পুড়ে যাক।” একদা রাত্রে তার চাকরাণী ঘরে আগুন নিয়ে আসে। কোন পতঙ্গ উড়ে আসে, ফলে তার ঘরে আগুন লেগে যায় এবং ঐ ব্যক্তি ও তার ঘরবাড়ী পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। মক্কা বিজয়ের বছর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত বিলাল (রাঃ)-কে কা'বা ঘরে আযান দেয়ার নির্দেশ দেন। নিকটেই আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, আত্তাব ইবনে উসায়েদ এবং হারিস ইবনে হিশাম বসে ছিল। আত্তাব তো আযান শুনে বলেই ফেললোঃ “আমার পিতার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হয়েছে যে, তিনি এ ক্রোধ উদ্রেককারী শব্দ শোনার পূর্বেই দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করেছেন।” হারিস বললোঃ “আমি যদি একে সত্য জানতাম তবে তো মেনেই নিতাম।” আবু সুফিয়ান বললোঃ “ভয়ে তো আমার মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হচ্ছে না, না জানি এ কংকরগুলো তাঁকে এ খবর জানিয়ে দেয়। তাদের কথাগুলো বলা শেষ হওয়া মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের কাছে এসে পড়েন এবং তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা এই সময় এই এই কথা বলেছে। তার এ কথা শোনামাত্রই আত্তাব এবং হারিস তো বলেই ফেলেঃ “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল! এখানে তো চতুর্থ কেউ ছিল না। তাহলে আমরা ধারণা করতে পারতাম যে, সেই হয়তো গিয়ে আপনকে এসব কথা বলে দিয়েছে।” (সীরাতে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক)।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাজরী যখন সিরিয়ার সফরে বের হন তখন যাত্রার প্রাক্কালে হযরত আবু মাহযুরাকে বলেন, যার ক্রোড়ে তিনি পিতৃহীন হিসেবে লালিত পালিত হয়েছিলেন-“তথাকার লোকেরা অবশ্যই আমাকে আপনার আযানের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। সুতরাং আপনি আপনার আযান সম্পর্কীয় ঘটনাগুলো আমার নিকট বর্ণনা করুর।” তখন আবু মাহযুরা (রাঃ) বলেনঃ তাহলে শুন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হুনায়েনের যুদ্ধক্ষেত্র হতে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। সেই সময় আমরা পথে এক জায়গায় অবস্থান করছিলাম। নামাযের। সময় হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুআযযিন আযান দেন। আমরা তখন আযানের সাথে সাথে হাসি তামাসা শুরু করি (অর্থাৎ বিদ্রুপ করে আযানের শব্দগুলো উচ্চারণ করতে থাকি)। কেমন করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কর্ণকুহরে আমাদের শব্দগুলো পৌছে যায়। তখন একজন সৈনিক এসে আমাদেরকে তার কাছে নিয়ে যান। তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে কার শব্দ সবচেয়ে উচ্চ ছিল?” সবাই তখন আমার দিকে ইশারা করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সবকে ছেড়ে দিয়ে শুধুমাত্র আমাকেই ধরে রাখেন এবং বলেনঃ “দাড়িয়ে আযান বল।” আল্লাহর কসম! সেই সময় আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর আদেশ মান্য করা অপেক্ষা অপ্রীতিকর বিষয় আমার কাছে আর কিছুই ছিল না। কিন্তু কি করি? আমি নিরুপায় ছিলাম। সুতরাং দাড়িয়ে গেলাম। তিনি স্বয়ং আমাকে আযান শিখাতে থাকেন এবং আমি তা বলতে থাকি। (অতঃপর তিনি পূর্ণভাবে আযানের বাক্যগুলো বলেন) আযান দেয়া শেষ হলে তিনি আমাকে একটি থলে দেন, যার মধ্যে কিছু চাদি বা রৌপ্য ছিল। অতঃপর তিনি তাঁর পবিত্র হাতখানা আমার মাথায় রাখেন এবং তা পিঠ পর্যন্ত নিয়ে যান। তারপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তোমার ভেতরে ও তোমার উপরে বরকত দান করুন। আল্লাহর কসম! তখন তো আমার অন্তর হতে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর শত্রুতা সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হয় এবং ওর স্থলে অন্তরে ঐরূপই মুহব্বত সৃষ্টি হয়। আমি অনুরোধ জানিয়ে বলিঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। আমাকে মক্কার মুআযযিন বানিয়ে দিন। তিনি বললেনঃ “আমি তোমার আবেদন মঞ্জুর করলাম।" আমি মক্কা চলে গেলাম এবং তথাকার শাসনকর্তা হযরত আত্তাব ইবনে উসাইদ (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাত করে তাঁর নির্দেশক্রমে মুআযযিন পদে নিযুক্ত হয়ে গেলাম। হযরত আবু মাহযুরা (রাঃ)-এর নাম ছিল সুমরা ইবনে মুগীরা ইবনে লাওযান। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চারজন মুআযযিনের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। তিনি বহুদিন পর্যন্ত মক্কাবাসীদের মুআযযিন ছিলেন। (ইমাম আহমাদ (রঃ) এরূপই বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এবং সুনানে আরবাআর সংকলকগণ এটা তাখরীজ করেছেন)

আল-মায়িদা 5:58

৫৭-৫৮ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের মনে অমুসলিমদের বন্ধুত্ব ও ভালবাসার প্রতি ঘৃণা জন্মিয়ে দিয়ে বলছেন- তোমরা কি এমন লোকদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, যারা তোমাদের পবিত্র ধর্মের সাথে হাসি তামাশা করছে? (আরবী) শব্দটি (আরবী) -এর জন্যে এসেছে, যেমন (আরবী) -এর মধ্যে। কেউ কেউ অল কুফফারে পড়েছেন এবং (আরবী) করেছেন। আবার কেউ কেউ অল কুফফারা পড়েছেন এবং (আরবী) -এর। বানিয়েছেন। তখন (আরবী) হবে অলাল কুফফারা আউলিয়ায়া এরূপ। এখানে দ্বারা মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে ওয়া মিনাল্লাযিনা আশরাকু এরূপ রয়েছে।ঘোষিত হচ্ছে-যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে আল্লাহকে ভয় কর। এরা তো তোমাদের দ্বীনের সাথে, আল্লাহর সাথে এবং শরীয়তের সাথে শত্রুতা করছে। যেমন অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ “মুসলমানদের উচিত কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করা মুসলমানদের (বন্ধুত্ব) অতিক্রম করে, আর যে ব্যক্তি এরূপ করবে, সে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব রাখার কোন হিসেবে নয়, অবশ্য এমন অবস্থায় (বাহ্যিক বন্ধুত্বের অনুমতি আছে) যখন তোমরা তাদের থেকে কোন প্রকার আংশকা কর, আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর সত্তার ভয় দেখাচ্ছেন, আর আল্লাহরই কাছে ফিরে যেতে হবে।” (৩:২৮) অনুরূপভাবে আহলে কিতাবের এ কাফিররাও এবং মুশরিকরাও এ সময়েও ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে থাকে যখন তোমরা নামাযের জন্যে আযান দাও। অথচ এটাই আল্লাহ তা'আলার সবচেয়ে প্রিয় ইবাদত। কিন্তু এ নির্বোধরা এটুকুও জানে না। তাই তারা শয়তানের অনুসারী। আর শয়তানের অবস্থা এই যে, আযান শোনামাত্রই সে গুহ্যদ্বার দিয়ে বায়ু বের করতঃ লেজ গুটিয়ে পলায়ন করে এবং সেখানে গিয়ে থেমে যায় যেখানে আযানের শব্দ পৌছে না। তারপর আবার আসে এবং তাকবীর শুনে পালিয়ে যায়। তাকবীর দেয়া শেষ হলেই সে পুনরায় এসে পড়ে এবং নামাযীকে বিভ্রান্ত করার কাজে লেগে যায়। তাকে সে এদিক ওদিকের বিস্মরণ হয়ে যাওয়া কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, এমনকি কত রাকআত নামায় হয়েছে তাও তার আর স্মরণ থাকে না। যখন এরূপ অবস্থা ঘটবে দু'টো সহু সিজদা করতে হবে। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) ইমাম যুহরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীমে আযানের উল্লেখ রয়েছে। অতঃপর তিনি এ আয়াতটিই পাঠ করেন।মদীনায় একজন খ্রীষ্টান ছিল। আযানে যখন “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ” শুনতো তখন সে বলতোঃ “এই মিথ্যাবাদী জ্বলে পুড়ে যাক।” একদা রাত্রে তার চাকরাণী ঘরে আগুন নিয়ে আসে। কোন পতঙ্গ উড়ে আসে, ফলে তার ঘরে আগুন লেগে যায় এবং ঐ ব্যক্তি ও তার ঘরবাড়ী পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। মক্কা বিজয়ের বছর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত বিলাল (রাঃ)-কে কা'বা ঘরে আযান দেয়ার নির্দেশ দেন। নিকটেই আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, আত্তাব ইবনে উসায়েদ এবং হারিস ইবনে হিশাম বসে ছিল। আত্তাব তো আযান শুনে বলেই ফেললোঃ “আমার পিতার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হয়েছে যে, তিনি এ ক্রোধ উদ্রেককারী শব্দ শোনার পূর্বেই দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করেছেন।” হারিস বললোঃ “আমি যদি একে সত্য জানতাম তবে তো মেনেই নিতাম।” আবু সুফিয়ান বললোঃ “ভয়ে তো আমার মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হচ্ছে না, না জানি এ কংকরগুলো তাঁকে এ খবর জানিয়ে দেয়। তাদের কথাগুলো বলা শেষ হওয়া মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের কাছে এসে পড়েন এবং তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা এই সময় এই এই কথা বলেছে। তার এ কথা শোনামাত্রই আত্তাব এবং হারিস তো বলেই ফেলেঃ “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল! এখানে তো চতুর্থ কেউ ছিল না। তাহলে আমরা ধারণা করতে পারতাম যে, সেই হয়তো গিয়ে আপনকে এসব কথা বলে দিয়েছে।” (সীরাতে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক)।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাজরী যখন সিরিয়ার সফরে বের হন তখন যাত্রার প্রাক্কালে হযরত আবু মাহযুরাকে বলেন, যার ক্রোড়ে তিনি পিতৃহীন হিসেবে লালিত পালিত হয়েছিলেন-“তথাকার লোকেরা অবশ্যই আমাকে আপনার আযানের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। সুতরাং আপনি আপনার আযান সম্পর্কীয় ঘটনাগুলো আমার নিকট বর্ণনা করুর।” তখন আবু মাহযুরা (রাঃ) বলেনঃ তাহলে শুন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হুনায়েনের যুদ্ধক্ষেত্র হতে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। সেই সময় আমরা পথে এক জায়গায় অবস্থান করছিলাম। নামাযের। সময় হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুআযযিন আযান দেন। আমরা তখন আযানের সাথে সাথে হাসি তামাসা শুরু করি (অর্থাৎ বিদ্রুপ করে আযানের শব্দগুলো উচ্চারণ করতে থাকি)। কেমন করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কর্ণকুহরে আমাদের শব্দগুলো পৌছে যায়। তখন একজন সৈনিক এসে আমাদেরকে তার কাছে নিয়ে যান। তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে কার শব্দ সবচেয়ে উচ্চ ছিল?” সবাই তখন আমার দিকে ইশারা করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সবকে ছেড়ে দিয়ে শুধুমাত্র আমাকেই ধরে রাখেন এবং বলেনঃ “দাড়িয়ে আযান বল।” আল্লাহর কসম! সেই সময় আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর আদেশ মান্য করা অপেক্ষা অপ্রীতিকর বিষয় আমার কাছে আর কিছুই ছিল না। কিন্তু কি করি? আমি নিরুপায় ছিলাম। সুতরাং দাড়িয়ে গেলাম। তিনি স্বয়ং আমাকে আযান শিখাতে থাকেন এবং আমি তা বলতে থাকি। (অতঃপর তিনি পূর্ণভাবে আযানের বাক্যগুলো বলেন) আযান দেয়া শেষ হলে তিনি আমাকে একটি থলে দেন, যার মধ্যে কিছু চাদি বা রৌপ্য ছিল। অতঃপর তিনি তাঁর পবিত্র হাতখানা আমার মাথায় রাখেন এবং তা পিঠ পর্যন্ত নিয়ে যান। তারপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তোমার ভেতরে ও তোমার উপরে বরকত দান করুন। আল্লাহর কসম! তখন তো আমার অন্তর হতে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর শত্রুতা সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হয় এবং ওর স্থলে অন্তরে ঐরূপই মুহব্বত সৃষ্টি হয়। আমি অনুরোধ জানিয়ে বলিঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। আমাকে মক্কার মুআযযিন বানিয়ে দিন। তিনি বললেনঃ “আমি তোমার আবেদন মঞ্জুর করলাম।" আমি মক্কা চলে গেলাম এবং তথাকার শাসনকর্তা হযরত আত্তাব ইবনে উসাইদ (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাত করে তাঁর নির্দেশক্রমে মুআযযিন পদে নিযুক্ত হয়ে গেলাম। হযরত আবু মাহযুরা (রাঃ)-এর নাম ছিল সুমরা ইবনে মুগীরা ইবনে লাওযান। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চারজন মুআযযিনের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। তিনি বহুদিন পর্যন্ত মক্কাবাসীদের মুআযযিন ছিলেন। (ইমাম আহমাদ (রঃ) এরূপই বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এবং সুনানে আরবাআর সংকলকগণ এটা তাখরীজ করেছেন)

আল-মায়িদা 5:59

৫৯-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: নির্দেশ হচ্ছে-হে মুমিনগণ! যেসব আহূলে কিতাব তোমাদের দ্বীনকে বিদ্রুপ ও উপহাস করছে তাদেরকে বল-তোমরা আমাদের প্রতি যে বৈরীভাব পোষণ করছে তার কারণ তো এটা ছাড়া আর কিছু নয় যে, আমরা আল্লাহর উপর এবং তার সমুদয় কিতাবের উপর ঈমান এনেছি। সুতরাং এটা কোন ঈর্ষার কারণ নয় এবং কোন নিন্দারও কারণ নয়। এটা (আরবী) হয়েছে। অন্য আয়াতের আছে (আরবী) অর্থাৎ তারা শুধু এ কারণে প্রতিশোধ নিয়েছে যে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে মাল দিয়ে ধনী করে দিয়েছেন।” (৯:৭৪)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আছে-“ইবনে জামীল ওরই বদলা নিচ্ছে যে, সে দরিদ্র ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাকে ধনী করে দিয়েছেন।'তোমাদের অধিকাংশই ফাসিক, অর্থাৎ, সোজা-সরল পথ থেকে তোমরা সরে পড়েছে। (লুবাব গ্রন্থে রয়েছে যে, একদল ইয়াহুদী নবী (সঃ)-এর কাছে এসে তাকে জিজ্ঞেস করে-আপনি কোন কোন রাসূলের উপর ঈমান এনেছেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ করা হয়েছিল ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর, ইসমাঈল (আঃ)-এর উপর, ইয়াকূব (আঃ)-এর উপর, তাঁর সন্তানদের উপর এবং যা দেয়া হয়েছিল, মূসা (আঃ)-কে ও ঈসা (আঃ)-কে এবং যা দেয়া হয়েছিল অন্যান্য নবীদেরকে তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে।” যখন তিনি ঈসা (আঃ)-এর উল্লেখ করলেন তখন তারা নবুওয়াতকে অস্বীকার করলো এবং বললো :“আমরা ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনি না এবং যে তাঁর উপর ঈমান এনেছে তার উপরও না।' তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়) তোমরা আমাদের সম্পর্কে যে ধারণা করছো, তাহলে এসো, তোমাদেরকে বলি যে, আল্লাহর নিকট প্রতিফল প্রাপক হিসেবে কে অধিক নিকৃষ্ট! আর এরূপ তোমরাই বটে। কেননা, এরূপ অভ্যাস তোমাদের মধ্যেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যাদেরকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে নিক্ষেপ করেছেন, যাদের উপর তিনি এতো রাগান্বিত হয়েছেন যে, এরপর আর সন্তুষ্ট হওয়ার নয় এবং যাদের কোন কোন দলের আকার বিকৃত করতঃ তাদেরকে তিনি বানর ও শূকরে পরিণত করেছেন। তারা তো তোমরাই। সূরায়ে বাকারায় এর পূর্ণ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- এখন যেসব বানর ও শূকর রয়েছে এগুলো কি ওরাই? তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “যে কওমের উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হয় তাদের বংশুধর কেউ থাকে না। (অর্থাৎ তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেন)। তাদের পূর্বেও শূকর ও বানর ছিল।” এ রিওয়ায়াতটি বিভিন্ন শব্দে সহীহ মুসলিম ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, জিনদের একটি কওমকে সর্প বানিয়ে দেয়া হয়েছিল, যেমন (ইয়াহূদীদের একটি কওমকে) বানর ও শূকর বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব। তাদের মধ্য হতেই কোন কোন দলকে গায়রুল্লাহর পূজারী বানিয়ে দেয়া হয়। এক কিরআতে -এর সাথে তাগুতে যেরও রয়েছে। অর্থাৎ তাদেরকে প্রতিমার গোলাম বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। হযরত বুরাইদাহ আসলামী (রাঃ) এটাকে আবেদুত্ তাগুতে পড়তেন। আবূ জাফর কারী হতে আবেদাত্ ত্বাগুতু -এ পঠনও বর্ণিত আছে। এতে অর্থের দূরত্ব এসে যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দূরত্বও নয়। ভাবার্থ এই যে, তোমরা ওরাই যাদের মধ্যে তাগুতের পূজা করা হয়েছে। মোটকথা, আহলে কিতাবকে দোষারোপ করে বলা হচ্ছে- তোমরা তো আমাদেরকে দোষারূপ করছো, অথচ আমরা একতুবাদী। আমরা শুধু এক আল্লাহকে মেনে থাকি। আর তোমরা তো হচ্ছ ওরাই যে, তোমাদের মধ্যে সব কিছুই পাওয়া যায়। এ কারণেই শেষে বলা হয়েছে-এ লোকেরাই সম্মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে খুবই নিকৃষ্ট পর্যায়ের। তারা সীরাতে মুসতাকীম থেকে বহুদূরে। তারা ভুল ও বিভ্রান্তির পথে রয়েছে। এখানে (আরবী) ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ এতো অধিক পথভ্রষ্ট আর কেউই হতে পারে না। যেমনঃ (আরবী) (২৫:২৪)-এ আয়াতে রয়েছে। অতঃপর মুনাফিকদের একটি বদ অভ্যাসের কথা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে জানিয়ে দিয়ে বলেছেনঃ বাহ্যিকভাবে তো মুমিনদের সামনে তারা ঈমান প্রকাশ করে থাকে, কিন্তু তাদের ভেতর কুফরীতে পরিপূর্ণ। তারা তোমার কাছে কুফরীর অবস্থাতেই আগমন করে এবং যখন ফিরে যায় তখন কুফরীর অবস্থাতেই ফিরে যায়। তোমার কথা ও উপদেশ তাদের উপর মোটেই ক্রিয়াশীল হয় না। ভেতরের এ কলুষতা দ্বারা কি উপকার তারা লাভ করবে? যার কাছে তাদের কাজ, তিনি আলেমুল গায়েব। অদৃশ্যের সমস্ত খবরই তো তিনি জানেন। তাদের অন্তরের গোপন কথা তার কাছে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সেখানে গিয়ে তাদেরকে এর পূর্ণ ফল ভোগ করতে হবে। হে নবী (সঃ)! তুমি তো স্বচক্ষে দেখছো যে, তারা দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে কিভাবে পাপ, যুলুম ও হারাম ভক্ষণে নিপতিত হচ্ছে! তাদের কৃতকর্মগুলো অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে। তাদের অলী উল্লাহরা অর্থাৎ আবেদ ও আলেমরা তাদেরকে এসব কাজ থেকে বিরত রাখছে না কেন? প্রকৃতপক্ষে ঐসব আলেম ও পীরের কাজগুলোও খারাপ হয়ে গেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আলেম ও ফকীর দরবেশদের ধমকের জন্যে এর চেয়ে বেশী কঠিন আয়াত কুরআন কারীমে আর একটিও নেই। হযরত যহহাক (রঃ) হতেও এরকমই বর্ণিত আছে। একদা হযরত আলী (রাঃ) এক খুৎবায় আল্লাহ পাকের হামদ ও সানা বর্ণনা করার পর বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তারা অসৎ কাজে লিপ্ত থাকতো এবং তাদের আলেমরা ও আল্লাহওয়ালারা সম্পূর্ণরূপে নীরব থাকতো। যখন এটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হলো তখন আল্লাহ তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি অবতীর্ণ করলেন। সুতরাং তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যে শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছিল সেই শাস্তিই তোমাদের উপর অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তোমাদের উচিত মানুষকে ভাল কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। বিশ্বাস রেখো যে, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা প্রদান না তোমাদের রিস্ক বা খাদ্য কমাবে, না তোমাদের মৃত্যু নিকটবর্তী করবে। সুনানে আবি দাউদে হযরত জাবীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি-“যে কওমের মধ্যে কোন লোক অবাধ্যতার কাজ করে এবং ঐ কওমের লোকগুলো বাধা দেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাকে ঐ কাজ থেকে বিরত রাখে না, তাহলে আল্লাহ সবারই উপর তাদের মৃত্যুর পূর্বেই স্বীয় শাস্তি নাযিল করবেন।” সুনানে ইবনে মাজাতেও এ বর্ণনাটি রয়েছে।

আল-মায়িদা 5:60

৫৯-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: নির্দেশ হচ্ছে-হে মুমিনগণ! যেসব আহূলে কিতাব তোমাদের দ্বীনকে বিদ্রুপ ও উপহাস করছে তাদেরকে বল-তোমরা আমাদের প্রতি যে বৈরীভাব পোষণ করছে তার কারণ তো এটা ছাড়া আর কিছু নয় যে, আমরা আল্লাহর উপর এবং তার সমুদয় কিতাবের উপর ঈমান এনেছি। সুতরাং এটা কোন ঈর্ষার কারণ নয় এবং কোন নিন্দারও কারণ নয়। এটা (আরবী) হয়েছে। অন্য আয়াতের আছে (আরবী) অর্থাৎ তারা শুধু এ কারণে প্রতিশোধ নিয়েছে যে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে মাল দিয়ে ধনী করে দিয়েছেন।” (৯:৭৪)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আছে-“ইবনে জামীল ওরই বদলা নিচ্ছে যে, সে দরিদ্র ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাকে ধনী করে দিয়েছেন।'তোমাদের অধিকাংশই ফাসিক, অর্থাৎ, সোজা-সরল পথ থেকে তোমরা সরে পড়েছে। (লুবাব গ্রন্থে রয়েছে যে, একদল ইয়াহুদী নবী (সঃ)-এর কাছে এসে তাকে জিজ্ঞেস করে-আপনি কোন কোন রাসূলের উপর ঈমান এনেছেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ করা হয়েছিল ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর, ইসমাঈল (আঃ)-এর উপর, ইয়াকূব (আঃ)-এর উপর, তাঁর সন্তানদের উপর এবং যা দেয়া হয়েছিল, মূসা (আঃ)-কে ও ঈসা (আঃ)-কে এবং যা দেয়া হয়েছিল অন্যান্য নবীদেরকে তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে।” যখন তিনি ঈসা (আঃ)-এর উল্লেখ করলেন তখন তারা নবুওয়াতকে অস্বীকার করলো এবং বললো :“আমরা ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনি না এবং যে তাঁর উপর ঈমান এনেছে তার উপরও না।' তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়) তোমরা আমাদের সম্পর্কে যে ধারণা করছো, তাহলে এসো, তোমাদেরকে বলি যে, আল্লাহর নিকট প্রতিফল প্রাপক হিসেবে কে অধিক নিকৃষ্ট! আর এরূপ তোমরাই বটে। কেননা, এরূপ অভ্যাস তোমাদের মধ্যেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যাদেরকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে নিক্ষেপ করেছেন, যাদের উপর তিনি এতো রাগান্বিত হয়েছেন যে, এরপর আর সন্তুষ্ট হওয়ার নয় এবং যাদের কোন কোন দলের আকার বিকৃত করতঃ তাদেরকে তিনি বানর ও শূকরে পরিণত করেছেন। তারা তো তোমরাই। সূরায়ে বাকারায় এর পূর্ণ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- এখন যেসব বানর ও শূকর রয়েছে এগুলো কি ওরাই? তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “যে কওমের উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হয় তাদের বংশুধর কেউ থাকে না। (অর্থাৎ তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেন)। তাদের পূর্বেও শূকর ও বানর ছিল।” এ রিওয়ায়াতটি বিভিন্ন শব্দে সহীহ মুসলিম ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, জিনদের একটি কওমকে সর্প বানিয়ে দেয়া হয়েছিল, যেমন (ইয়াহূদীদের একটি কওমকে) বানর ও শূকর বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব। তাদের মধ্য হতেই কোন কোন দলকে গায়রুল্লাহর পূজারী বানিয়ে দেয়া হয়। এক কিরআতে -এর সাথে তাগুতে যেরও রয়েছে। অর্থাৎ তাদেরকে প্রতিমার গোলাম বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। হযরত বুরাইদাহ আসলামী (রাঃ) এটাকে আবেদুত্ তাগুতে পড়তেন। আবূ জাফর কারী হতে আবেদাত্ ত্বাগুতু -এ পঠনও বর্ণিত আছে। এতে অর্থের দূরত্ব এসে যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দূরত্বও নয়। ভাবার্থ এই যে, তোমরা ওরাই যাদের মধ্যে তাগুতের পূজা করা হয়েছে। মোটকথা, আহলে কিতাবকে দোষারোপ করে বলা হচ্ছে- তোমরা তো আমাদেরকে দোষারূপ করছো, অথচ আমরা একতুবাদী। আমরা শুধু এক আল্লাহকে মেনে থাকি। আর তোমরা তো হচ্ছ ওরাই যে, তোমাদের মধ্যে সব কিছুই পাওয়া যায়। এ কারণেই শেষে বলা হয়েছে-এ লোকেরাই সম্মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে খুবই নিকৃষ্ট পর্যায়ের। তারা সীরাতে মুসতাকীম থেকে বহুদূরে। তারা ভুল ও বিভ্রান্তির পথে রয়েছে। এখানে (আরবী) ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ এতো অধিক পথভ্রষ্ট আর কেউই হতে পারে না। যেমনঃ (আরবী) (২৫:২৪)-এ আয়াতে রয়েছে। অতঃপর মুনাফিকদের একটি বদ অভ্যাসের কথা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে জানিয়ে দিয়ে বলেছেনঃ বাহ্যিকভাবে তো মুমিনদের সামনে তারা ঈমান প্রকাশ করে থাকে, কিন্তু তাদের ভেতর কুফরীতে পরিপূর্ণ। তারা তোমার কাছে কুফরীর অবস্থাতেই আগমন করে এবং যখন ফিরে যায় তখন কুফরীর অবস্থাতেই ফিরে যায়। তোমার কথা ও উপদেশ তাদের উপর মোটেই ক্রিয়াশীল হয় না। ভেতরের এ কলুষতা দ্বারা কি উপকার তারা লাভ করবে? যার কাছে তাদের কাজ, তিনি আলেমুল গায়েব। অদৃশ্যের সমস্ত খবরই তো তিনি জানেন। তাদের অন্তরের গোপন কথা তার কাছে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সেখানে গিয়ে তাদেরকে এর পূর্ণ ফল ভোগ করতে হবে। হে নবী (সঃ)! তুমি তো স্বচক্ষে দেখছো যে, তারা দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে কিভাবে পাপ, যুলুম ও হারাম ভক্ষণে নিপতিত হচ্ছে! তাদের কৃতকর্মগুলো অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে। তাদের অলী উল্লাহরা অর্থাৎ আবেদ ও আলেমরা তাদেরকে এসব কাজ থেকে বিরত রাখছে না কেন? প্রকৃতপক্ষে ঐসব আলেম ও পীরের কাজগুলোও খারাপ হয়ে গেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আলেম ও ফকীর দরবেশদের ধমকের জন্যে এর চেয়ে বেশী কঠিন আয়াত কুরআন কারীমে আর একটিও নেই। হযরত যহহাক (রঃ) হতেও এরকমই বর্ণিত আছে। একদা হযরত আলী (রাঃ) এক খুৎবায় আল্লাহ পাকের হামদ ও সানা বর্ণনা করার পর বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তারা অসৎ কাজে লিপ্ত থাকতো এবং তাদের আলেমরা ও আল্লাহওয়ালারা সম্পূর্ণরূপে নীরব থাকতো। যখন এটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হলো তখন আল্লাহ তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি অবতীর্ণ করলেন। সুতরাং তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যে শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছিল সেই শাস্তিই তোমাদের উপর অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তোমাদের উচিত মানুষকে ভাল কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। বিশ্বাস রেখো যে, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা প্রদান না তোমাদের রিস্ক বা খাদ্য কমাবে, না তোমাদের মৃত্যু নিকটবর্তী করবে। সুনানে আবি দাউদে হযরত জাবীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি-“যে কওমের মধ্যে কোন লোক অবাধ্যতার কাজ করে এবং ঐ কওমের লোকগুলো বাধা দেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাকে ঐ কাজ থেকে বিরত রাখে না, তাহলে আল্লাহ সবারই উপর তাদের মৃত্যুর পূর্বেই স্বীয় শাস্তি নাযিল করবেন।” সুনানে ইবনে মাজাতেও এ বর্ণনাটি রয়েছে।

আল-মায়িদা 5:61

৫৯-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: নির্দেশ হচ্ছে-হে মুমিনগণ! যেসব আহূলে কিতাব তোমাদের দ্বীনকে বিদ্রুপ ও উপহাস করছে তাদেরকে বল-তোমরা আমাদের প্রতি যে বৈরীভাব পোষণ করছে তার কারণ তো এটা ছাড়া আর কিছু নয় যে, আমরা আল্লাহর উপর এবং তার সমুদয় কিতাবের উপর ঈমান এনেছি। সুতরাং এটা কোন ঈর্ষার কারণ নয় এবং কোন নিন্দারও কারণ নয়। এটা (আরবী) হয়েছে। অন্য আয়াতের আছে (আরবী) অর্থাৎ তারা শুধু এ কারণে প্রতিশোধ নিয়েছে যে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে মাল দিয়ে ধনী করে দিয়েছেন।” (৯:৭৪)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আছে-“ইবনে জামীল ওরই বদলা নিচ্ছে যে, সে দরিদ্র ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাকে ধনী করে দিয়েছেন।'তোমাদের অধিকাংশই ফাসিক, অর্থাৎ, সোজা-সরল পথ থেকে তোমরা সরে পড়েছে। (লুবাব গ্রন্থে রয়েছে যে, একদল ইয়াহুদী নবী (সঃ)-এর কাছে এসে তাকে জিজ্ঞেস করে-আপনি কোন কোন রাসূলের উপর ঈমান এনেছেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ করা হয়েছিল ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর, ইসমাঈল (আঃ)-এর উপর, ইয়াকূব (আঃ)-এর উপর, তাঁর সন্তানদের উপর এবং যা দেয়া হয়েছিল, মূসা (আঃ)-কে ও ঈসা (আঃ)-কে এবং যা দেয়া হয়েছিল অন্যান্য নবীদেরকে তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে।” যখন তিনি ঈসা (আঃ)-এর উল্লেখ করলেন তখন তারা নবুওয়াতকে অস্বীকার করলো এবং বললো :“আমরা ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনি না এবং যে তাঁর উপর ঈমান এনেছে তার উপরও না।' তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়) তোমরা আমাদের সম্পর্কে যে ধারণা করছো, তাহলে এসো, তোমাদেরকে বলি যে, আল্লাহর নিকট প্রতিফল প্রাপক হিসেবে কে অধিক নিকৃষ্ট! আর এরূপ তোমরাই বটে। কেননা, এরূপ অভ্যাস তোমাদের মধ্যেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যাদেরকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে নিক্ষেপ করেছেন, যাদের উপর তিনি এতো রাগান্বিত হয়েছেন যে, এরপর আর সন্তুষ্ট হওয়ার নয় এবং যাদের কোন কোন দলের আকার বিকৃত করতঃ তাদেরকে তিনি বানর ও শূকরে পরিণত করেছেন। তারা তো তোমরাই। সূরায়ে বাকারায় এর পূর্ণ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- এখন যেসব বানর ও শূকর রয়েছে এগুলো কি ওরাই? তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “যে কওমের উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হয় তাদের বংশুধর কেউ থাকে না। (অর্থাৎ তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেন)। তাদের পূর্বেও শূকর ও বানর ছিল।” এ রিওয়ায়াতটি বিভিন্ন শব্দে সহীহ মুসলিম ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, জিনদের একটি কওমকে সর্প বানিয়ে দেয়া হয়েছিল, যেমন (ইয়াহূদীদের একটি কওমকে) বানর ও শূকর বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব। তাদের মধ্য হতেই কোন কোন দলকে গায়রুল্লাহর পূজারী বানিয়ে দেয়া হয়। এক কিরআতে -এর সাথে তাগুতে যেরও রয়েছে। অর্থাৎ তাদেরকে প্রতিমার গোলাম বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। হযরত বুরাইদাহ আসলামী (রাঃ) এটাকে আবেদুত্ তাগুতে পড়তেন। আবূ জাফর কারী হতে আবেদাত্ ত্বাগুতু -এ পঠনও বর্ণিত আছে। এতে অর্থের দূরত্ব এসে যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দূরত্বও নয়। ভাবার্থ এই যে, তোমরা ওরাই যাদের মধ্যে তাগুতের পূজা করা হয়েছে। মোটকথা, আহলে কিতাবকে দোষারোপ করে বলা হচ্ছে- তোমরা তো আমাদেরকে দোষারূপ করছো, অথচ আমরা একতুবাদী। আমরা শুধু এক আল্লাহকে মেনে থাকি। আর তোমরা তো হচ্ছ ওরাই যে, তোমাদের মধ্যে সব কিছুই পাওয়া যায়। এ কারণেই শেষে বলা হয়েছে-এ লোকেরাই সম্মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে খুবই নিকৃষ্ট পর্যায়ের। তারা সীরাতে মুসতাকীম থেকে বহুদূরে। তারা ভুল ও বিভ্রান্তির পথে রয়েছে। এখানে (আরবী) ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ এতো অধিক পথভ্রষ্ট আর কেউই হতে পারে না। যেমনঃ (আরবী) (২৫:২৪)-এ আয়াতে রয়েছে। অতঃপর মুনাফিকদের একটি বদ অভ্যাসের কথা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে জানিয়ে দিয়ে বলেছেনঃ বাহ্যিকভাবে তো মুমিনদের সামনে তারা ঈমান প্রকাশ করে থাকে, কিন্তু তাদের ভেতর কুফরীতে পরিপূর্ণ। তারা তোমার কাছে কুফরীর অবস্থাতেই আগমন করে এবং যখন ফিরে যায় তখন কুফরীর অবস্থাতেই ফিরে যায়। তোমার কথা ও উপদেশ তাদের উপর মোটেই ক্রিয়াশীল হয় না। ভেতরের এ কলুষতা দ্বারা কি উপকার তারা লাভ করবে? যার কাছে তাদের কাজ, তিনি আলেমুল গায়েব। অদৃশ্যের সমস্ত খবরই তো তিনি জানেন। তাদের অন্তরের গোপন কথা তার কাছে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সেখানে গিয়ে তাদেরকে এর পূর্ণ ফল ভোগ করতে হবে। হে নবী (সঃ)! তুমি তো স্বচক্ষে দেখছো যে, তারা দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে কিভাবে পাপ, যুলুম ও হারাম ভক্ষণে নিপতিত হচ্ছে! তাদের কৃতকর্মগুলো অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে। তাদের অলী উল্লাহরা অর্থাৎ আবেদ ও আলেমরা তাদেরকে এসব কাজ থেকে বিরত রাখছে না কেন? প্রকৃতপক্ষে ঐসব আলেম ও পীরের কাজগুলোও খারাপ হয়ে গেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আলেম ও ফকীর দরবেশদের ধমকের জন্যে এর চেয়ে বেশী কঠিন আয়াত কুরআন কারীমে আর একটিও নেই। হযরত যহহাক (রঃ) হতেও এরকমই বর্ণিত আছে। একদা হযরত আলী (রাঃ) এক খুৎবায় আল্লাহ পাকের হামদ ও সানা বর্ণনা করার পর বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তারা অসৎ কাজে লিপ্ত থাকতো এবং তাদের আলেমরা ও আল্লাহওয়ালারা সম্পূর্ণরূপে নীরব থাকতো। যখন এটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হলো তখন আল্লাহ তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি অবতীর্ণ করলেন। সুতরাং তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যে শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছিল সেই শাস্তিই তোমাদের উপর অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তোমাদের উচিত মানুষকে ভাল কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। বিশ্বাস রেখো যে, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা প্রদান না তোমাদের রিস্ক বা খাদ্য কমাবে, না তোমাদের মৃত্যু নিকটবর্তী করবে। সুনানে আবি দাউদে হযরত জাবীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি-“যে কওমের মধ্যে কোন লোক অবাধ্যতার কাজ করে এবং ঐ কওমের লোকগুলো বাধা দেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাকে ঐ কাজ থেকে বিরত রাখে না, তাহলে আল্লাহ সবারই উপর তাদের মৃত্যুর পূর্বেই স্বীয় শাস্তি নাযিল করবেন।” সুনানে ইবনে মাজাতেও এ বর্ণনাটি রয়েছে।

আল-মায়িদা 5:62

৫৯-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: নির্দেশ হচ্ছে-হে মুমিনগণ! যেসব আহূলে কিতাব তোমাদের দ্বীনকে বিদ্রুপ ও উপহাস করছে তাদেরকে বল-তোমরা আমাদের প্রতি যে বৈরীভাব পোষণ করছে তার কারণ তো এটা ছাড়া আর কিছু নয় যে, আমরা আল্লাহর উপর এবং তার সমুদয় কিতাবের উপর ঈমান এনেছি। সুতরাং এটা কোন ঈর্ষার কারণ নয় এবং কোন নিন্দারও কারণ নয়। এটা (আরবী) হয়েছে। অন্য আয়াতের আছে (আরবী) অর্থাৎ তারা শুধু এ কারণে প্রতিশোধ নিয়েছে যে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে মাল দিয়ে ধনী করে দিয়েছেন।” (৯:৭৪)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আছে-“ইবনে জামীল ওরই বদলা নিচ্ছে যে, সে দরিদ্র ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাকে ধনী করে দিয়েছেন।'তোমাদের অধিকাংশই ফাসিক, অর্থাৎ, সোজা-সরল পথ থেকে তোমরা সরে পড়েছে। (লুবাব গ্রন্থে রয়েছে যে, একদল ইয়াহুদী নবী (সঃ)-এর কাছে এসে তাকে জিজ্ঞেস করে-আপনি কোন কোন রাসূলের উপর ঈমান এনেছেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ করা হয়েছিল ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর, ইসমাঈল (আঃ)-এর উপর, ইয়াকূব (আঃ)-এর উপর, তাঁর সন্তানদের উপর এবং যা দেয়া হয়েছিল, মূসা (আঃ)-কে ও ঈসা (আঃ)-কে এবং যা দেয়া হয়েছিল অন্যান্য নবীদেরকে তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে।” যখন তিনি ঈসা (আঃ)-এর উল্লেখ করলেন তখন তারা নবুওয়াতকে অস্বীকার করলো এবং বললো :“আমরা ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনি না এবং যে তাঁর উপর ঈমান এনেছে তার উপরও না।' তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়) তোমরা আমাদের সম্পর্কে যে ধারণা করছো, তাহলে এসো, তোমাদেরকে বলি যে, আল্লাহর নিকট প্রতিফল প্রাপক হিসেবে কে অধিক নিকৃষ্ট! আর এরূপ তোমরাই বটে। কেননা, এরূপ অভ্যাস তোমাদের মধ্যেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যাদেরকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে নিক্ষেপ করেছেন, যাদের উপর তিনি এতো রাগান্বিত হয়েছেন যে, এরপর আর সন্তুষ্ট হওয়ার নয় এবং যাদের কোন কোন দলের আকার বিকৃত করতঃ তাদেরকে তিনি বানর ও শূকরে পরিণত করেছেন। তারা তো তোমরাই। সূরায়ে বাকারায় এর পূর্ণ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- এখন যেসব বানর ও শূকর রয়েছে এগুলো কি ওরাই? তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “যে কওমের উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হয় তাদের বংশুধর কেউ থাকে না। (অর্থাৎ তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেন)। তাদের পূর্বেও শূকর ও বানর ছিল।” এ রিওয়ায়াতটি বিভিন্ন শব্দে সহীহ মুসলিম ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, জিনদের একটি কওমকে সর্প বানিয়ে দেয়া হয়েছিল, যেমন (ইয়াহূদীদের একটি কওমকে) বানর ও শূকর বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব। তাদের মধ্য হতেই কোন কোন দলকে গায়রুল্লাহর পূজারী বানিয়ে দেয়া হয়। এক কিরআতে -এর সাথে তাগুতে যেরও রয়েছে। অর্থাৎ তাদেরকে প্রতিমার গোলাম বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। হযরত বুরাইদাহ আসলামী (রাঃ) এটাকে আবেদুত্ তাগুতে পড়তেন। আবূ জাফর কারী হতে আবেদাত্ ত্বাগুতু -এ পঠনও বর্ণিত আছে। এতে অর্থের দূরত্ব এসে যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দূরত্বও নয়। ভাবার্থ এই যে, তোমরা ওরাই যাদের মধ্যে তাগুতের পূজা করা হয়েছে। মোটকথা, আহলে কিতাবকে দোষারোপ করে বলা হচ্ছে- তোমরা তো আমাদেরকে দোষারূপ করছো, অথচ আমরা একতুবাদী। আমরা শুধু এক আল্লাহকে মেনে থাকি। আর তোমরা তো হচ্ছ ওরাই যে, তোমাদের মধ্যে সব কিছুই পাওয়া যায়। এ কারণেই শেষে বলা হয়েছে-এ লোকেরাই সম্মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে খুবই নিকৃষ্ট পর্যায়ের। তারা সীরাতে মুসতাকীম থেকে বহুদূরে। তারা ভুল ও বিভ্রান্তির পথে রয়েছে। এখানে (আরবী) ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ এতো অধিক পথভ্রষ্ট আর কেউই হতে পারে না। যেমনঃ (আরবী) (২৫:২৪)-এ আয়াতে রয়েছে। অতঃপর মুনাফিকদের একটি বদ অভ্যাসের কথা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে জানিয়ে দিয়ে বলেছেনঃ বাহ্যিকভাবে তো মুমিনদের সামনে তারা ঈমান প্রকাশ করে থাকে, কিন্তু তাদের ভেতর কুফরীতে পরিপূর্ণ। তারা তোমার কাছে কুফরীর অবস্থাতেই আগমন করে এবং যখন ফিরে যায় তখন কুফরীর অবস্থাতেই ফিরে যায়। তোমার কথা ও উপদেশ তাদের উপর মোটেই ক্রিয়াশীল হয় না। ভেতরের এ কলুষতা দ্বারা কি উপকার তারা লাভ করবে? যার কাছে তাদের কাজ, তিনি আলেমুল গায়েব। অদৃশ্যের সমস্ত খবরই তো তিনি জানেন। তাদের অন্তরের গোপন কথা তার কাছে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সেখানে গিয়ে তাদেরকে এর পূর্ণ ফল ভোগ করতে হবে। হে নবী (সঃ)! তুমি তো স্বচক্ষে দেখছো যে, তারা দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে কিভাবে পাপ, যুলুম ও হারাম ভক্ষণে নিপতিত হচ্ছে! তাদের কৃতকর্মগুলো অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে। তাদের অলী উল্লাহরা অর্থাৎ আবেদ ও আলেমরা তাদেরকে এসব কাজ থেকে বিরত রাখছে না কেন? প্রকৃতপক্ষে ঐসব আলেম ও পীরের কাজগুলোও খারাপ হয়ে গেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আলেম ও ফকীর দরবেশদের ধমকের জন্যে এর চেয়ে বেশী কঠিন আয়াত কুরআন কারীমে আর একটিও নেই। হযরত যহহাক (রঃ) হতেও এরকমই বর্ণিত আছে। একদা হযরত আলী (রাঃ) এক খুৎবায় আল্লাহ পাকের হামদ ও সানা বর্ণনা করার পর বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তারা অসৎ কাজে লিপ্ত থাকতো এবং তাদের আলেমরা ও আল্লাহওয়ালারা সম্পূর্ণরূপে নীরব থাকতো। যখন এটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হলো তখন আল্লাহ তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি অবতীর্ণ করলেন। সুতরাং তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যে শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছিল সেই শাস্তিই তোমাদের উপর অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তোমাদের উচিত মানুষকে ভাল কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। বিশ্বাস রেখো যে, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা প্রদান না তোমাদের রিস্ক বা খাদ্য কমাবে, না তোমাদের মৃত্যু নিকটবর্তী করবে। সুনানে আবি দাউদে হযরত জাবীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি-“যে কওমের মধ্যে কোন লোক অবাধ্যতার কাজ করে এবং ঐ কওমের লোকগুলো বাধা দেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাকে ঐ কাজ থেকে বিরত রাখে না, তাহলে আল্লাহ সবারই উপর তাদের মৃত্যুর পূর্বেই স্বীয় শাস্তি নাযিল করবেন।” সুনানে ইবনে মাজাতেও এ বর্ণনাটি রয়েছে।

আল-মায়িদা 5:63

৫৯-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: নির্দেশ হচ্ছে-হে মুমিনগণ! যেসব আহূলে কিতাব তোমাদের দ্বীনকে বিদ্রুপ ও উপহাস করছে তাদেরকে বল-তোমরা আমাদের প্রতি যে বৈরীভাব পোষণ করছে তার কারণ তো এটা ছাড়া আর কিছু নয় যে, আমরা আল্লাহর উপর এবং তার সমুদয় কিতাবের উপর ঈমান এনেছি। সুতরাং এটা কোন ঈর্ষার কারণ নয় এবং কোন নিন্দারও কারণ নয়। এটা (আরবী) হয়েছে। অন্য আয়াতের আছে (আরবী) অর্থাৎ তারা শুধু এ কারণে প্রতিশোধ নিয়েছে যে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে মাল দিয়ে ধনী করে দিয়েছেন।” (৯:৭৪)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আছে-“ইবনে জামীল ওরই বদলা নিচ্ছে যে, সে দরিদ্র ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাকে ধনী করে দিয়েছেন।'তোমাদের অধিকাংশই ফাসিক, অর্থাৎ, সোজা-সরল পথ থেকে তোমরা সরে পড়েছে। (লুবাব গ্রন্থে রয়েছে যে, একদল ইয়াহুদী নবী (সঃ)-এর কাছে এসে তাকে জিজ্ঞেস করে-আপনি কোন কোন রাসূলের উপর ঈমান এনেছেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ করা হয়েছিল ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর, ইসমাঈল (আঃ)-এর উপর, ইয়াকূব (আঃ)-এর উপর, তাঁর সন্তানদের উপর এবং যা দেয়া হয়েছিল, মূসা (আঃ)-কে ও ঈসা (আঃ)-কে এবং যা দেয়া হয়েছিল অন্যান্য নবীদেরকে তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে।” যখন তিনি ঈসা (আঃ)-এর উল্লেখ করলেন তখন তারা নবুওয়াতকে অস্বীকার করলো এবং বললো :“আমরা ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনি না এবং যে তাঁর উপর ঈমান এনেছে তার উপরও না।' তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়) তোমরা আমাদের সম্পর্কে যে ধারণা করছো, তাহলে এসো, তোমাদেরকে বলি যে, আল্লাহর নিকট প্রতিফল প্রাপক হিসেবে কে অধিক নিকৃষ্ট! আর এরূপ তোমরাই বটে। কেননা, এরূপ অভ্যাস তোমাদের মধ্যেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যাদেরকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে নিক্ষেপ করেছেন, যাদের উপর তিনি এতো রাগান্বিত হয়েছেন যে, এরপর আর সন্তুষ্ট হওয়ার নয় এবং যাদের কোন কোন দলের আকার বিকৃত করতঃ তাদেরকে তিনি বানর ও শূকরে পরিণত করেছেন। তারা তো তোমরাই। সূরায়ে বাকারায় এর পূর্ণ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- এখন যেসব বানর ও শূকর রয়েছে এগুলো কি ওরাই? তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “যে কওমের উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হয় তাদের বংশুধর কেউ থাকে না। (অর্থাৎ তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেন)। তাদের পূর্বেও শূকর ও বানর ছিল।” এ রিওয়ায়াতটি বিভিন্ন শব্দে সহীহ মুসলিম ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, জিনদের একটি কওমকে সর্প বানিয়ে দেয়া হয়েছিল, যেমন (ইয়াহূদীদের একটি কওমকে) বানর ও শূকর বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব। তাদের মধ্য হতেই কোন কোন দলকে গায়রুল্লাহর পূজারী বানিয়ে দেয়া হয়। এক কিরআতে -এর সাথে তাগুতে যেরও রয়েছে। অর্থাৎ তাদেরকে প্রতিমার গোলাম বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। হযরত বুরাইদাহ আসলামী (রাঃ) এটাকে আবেদুত্ তাগুতে পড়তেন। আবূ জাফর কারী হতে আবেদাত্ ত্বাগুতু -এ পঠনও বর্ণিত আছে। এতে অর্থের দূরত্ব এসে যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দূরত্বও নয়। ভাবার্থ এই যে, তোমরা ওরাই যাদের মধ্যে তাগুতের পূজা করা হয়েছে। মোটকথা, আহলে কিতাবকে দোষারোপ করে বলা হচ্ছে- তোমরা তো আমাদেরকে দোষারূপ করছো, অথচ আমরা একতুবাদী। আমরা শুধু এক আল্লাহকে মেনে থাকি। আর তোমরা তো হচ্ছ ওরাই যে, তোমাদের মধ্যে সব কিছুই পাওয়া যায়। এ কারণেই শেষে বলা হয়েছে-এ লোকেরাই সম্মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে খুবই নিকৃষ্ট পর্যায়ের। তারা সীরাতে মুসতাকীম থেকে বহুদূরে। তারা ভুল ও বিভ্রান্তির পথে রয়েছে। এখানে (আরবী) ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ এতো অধিক পথভ্রষ্ট আর কেউই হতে পারে না। যেমনঃ (আরবী) (২৫:২৪)-এ আয়াতে রয়েছে। অতঃপর মুনাফিকদের একটি বদ অভ্যাসের কথা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে জানিয়ে দিয়ে বলেছেনঃ বাহ্যিকভাবে তো মুমিনদের সামনে তারা ঈমান প্রকাশ করে থাকে, কিন্তু তাদের ভেতর কুফরীতে পরিপূর্ণ। তারা তোমার কাছে কুফরীর অবস্থাতেই আগমন করে এবং যখন ফিরে যায় তখন কুফরীর অবস্থাতেই ফিরে যায়। তোমার কথা ও উপদেশ তাদের উপর মোটেই ক্রিয়াশীল হয় না। ভেতরের এ কলুষতা দ্বারা কি উপকার তারা লাভ করবে? যার কাছে তাদের কাজ, তিনি আলেমুল গায়েব। অদৃশ্যের সমস্ত খবরই তো তিনি জানেন। তাদের অন্তরের গোপন কথা তার কাছে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সেখানে গিয়ে তাদেরকে এর পূর্ণ ফল ভোগ করতে হবে। হে নবী (সঃ)! তুমি তো স্বচক্ষে দেখছো যে, তারা দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে কিভাবে পাপ, যুলুম ও হারাম ভক্ষণে নিপতিত হচ্ছে! তাদের কৃতকর্মগুলো অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে। তাদের অলী উল্লাহরা অর্থাৎ আবেদ ও আলেমরা তাদেরকে এসব কাজ থেকে বিরত রাখছে না কেন? প্রকৃতপক্ষে ঐসব আলেম ও পীরের কাজগুলোও খারাপ হয়ে গেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আলেম ও ফকীর দরবেশদের ধমকের জন্যে এর চেয়ে বেশী কঠিন আয়াত কুরআন কারীমে আর একটিও নেই। হযরত যহহাক (রঃ) হতেও এরকমই বর্ণিত আছে। একদা হযরত আলী (রাঃ) এক খুৎবায় আল্লাহ পাকের হামদ ও সানা বর্ণনা করার পর বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তারা অসৎ কাজে লিপ্ত থাকতো এবং তাদের আলেমরা ও আল্লাহওয়ালারা সম্পূর্ণরূপে নীরব থাকতো। যখন এটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হলো তখন আল্লাহ তাদের উপর বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি অবতীর্ণ করলেন। সুতরাং তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যে শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছিল সেই শাস্তিই তোমাদের উপর অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তোমাদের উচিত মানুষকে ভাল কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। বিশ্বাস রেখো যে, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা প্রদান না তোমাদের রিস্ক বা খাদ্য কমাবে, না তোমাদের মৃত্যু নিকটবর্তী করবে। সুনানে আবি দাউদে হযরত জাবীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি-“যে কওমের মধ্যে কোন লোক অবাধ্যতার কাজ করে এবং ঐ কওমের লোকগুলো বাধা দেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাকে ঐ কাজ থেকে বিরত রাখে না, তাহলে আল্লাহ সবারই উপর তাদের মৃত্যুর পূর্বেই স্বীয় শাস্তি নাযিল করবেন।” সুনানে ইবনে মাজাতেও এ বর্ণনাটি রয়েছে।

আল-মায়িদা 5:64

৬৪-৬৬ নং আয়াতের তাফসীর: অভিশপ্ত ইয়াহূদীদের একটি জঘন্য উক্তির বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা মহান আল্লাহকে কৃপণ বলতো। তারাই আল্লাহ পাককে দরিদ্রও বলতো। আল্লাহ তা'আলার পবিত্র সত্তা সেই অপবিত্র উক্তির বহু ঊর্ধ্বে। সুতরাং “আল্লাহর হাত বন্ধ হয়ে আছে”- এটার ভাবার্থ তাদের নিকট এই ছিল না যে, তাঁর হাত বন্ধন মুক্ত রয়েছে। বরং এর দ্বারা তারা তাঁর কৃপণতা বুঝাতে চেয়েছিল। এ বাকরীতিই কুরআন কারীমের অন্য জায়গাতেও রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “স্বীয় হাতকে নিজের গর্দানের সাথে বেঁধে রেখো না এবং সীমা থেকে বেশীও বিস্তার করো না, নচেৎ লজ্জিত হয়ে বসে পড়তে হবে।" (১৭:২৯) সুতরাং এ আয়াতে আল্লাহ কৃপণতা থেকে এবং অযথা ও অতিরিক্ত খরচ করা থেকে বিরত থাকতে বললেন। অতএব, ইয়াহূদীদেরও “হাত বন্ধন মুক্ত রয়েছে”-এ কথার উদ্দেশ্য এটাই ছিল। ফাখাস নামক ইয়াহুদী এ কথা বলেছিল। ঐ অভিশপ্ত ইয়াহূদীদেরই “আল্লাহ দরিদ্র এবং আমরা ধনী”-এ উক্তিও ছিল। ফলে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে প্রহার করেছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, ইয়াহূদীদের শাস ইবনে কায়েস নামক একটি লোক বলেছিলঃ “নিশ্চয়ই তোমার প্রভু কৃপণ, তিনি খরচ বা দান করেন না। (তিবরানী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন যে, এ উক্তিকারী ছিল শাস ইবনে কায়েস। আর আবুশ শায়েখ তাখরীজ করেছেন যে, এ উক্তিকারীর নাম হচ্ছে ফানহাস)” তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং বলা হয় যে, কৃপণ, লাঞ্ছিত এবং কাপুরুষ হচ্ছে তারা নিজেরাই। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে-“তারা যদি বাদশাহ হয়ে যায় তবে কাউকেও কিছুই দেবে না। বরং তারা তো অন্যদের নিয়ামত দেখে জ্বলে পুড়ে মরে। তারা লাঞ্ছিত লোক, বরং আল্লাহর হাত খোলা রয়েছে, তিনি অনেক কিছু খরচ করতে রয়েছেন, তাঁর ফসলও অনুগ্রহ প্রশস্ত, তাঁর দান সাধারণ। সব জিনিসের ভাণ্ডার তাঁরই হাতে রয়েছে। সমস্ত সৃষ্টজীব দিনরাত সব জায়গায় তারই মুখাপেক্ষী। যেমন আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যা চেয়েছো তাই তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন, যদি তোমরা আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও তবে তা গুণে শেষ করতে পারবে না, নিশ্চয়ই মানুষ অত্যাচারী ও অকৃতজ্ঞ।" (১৪:৩৪) মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহর দক্ষিণ হস্ত পরিপূর্ণ। রাত দিনের খরচ তাঁর ধনভাণ্ডারকে কমায় না। শুরু হতে আজ পর্যন্ত যত কিছু তিনি স্বীয় মাখলুককে দান করেছেন তা তাঁর ধনভাণ্ডারকে একটুও হ্রাস করেনি। প্রথমে তার আরশ পানির উপর ছিল। তার অপর হাতে ‘দান' অথবা অধিকার রয়েছে। ওটাই উঁচু করে এবং নীচু করে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আমার পথে খরচ কর, আমিও তোমাদেরকে দান করবো। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ হাদীসটি রয়েছে। ঘোষণা করা হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তোমার কাছে আল্লাহর নিয়ামত যত বৃদ্ধি পাবে, এ শয়তানদের কুফর ও হিংসা-বিদ্বেষ ততো বেড়ে যাবে। অনুরূপভাবে যেমন মুমিনদের ঈমান, আত্মসমর্পণ এবং আনুগত্য বৃদ্ধি পাবে তেমনই এসব ইয়াহুদী ও মুশরিকদের অবাধ্যতা, হঠকারিতা এবং হিংসা-বিদ্বেষ বাড়তে থাকবে। যেমন অন্য এক আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ “মুমিনদের জন্যে এটা তো হিদায়াত ও প্রতিষেধক এবং বেঈমানরা এর থেকে অন্ধ ও বধির, এদেরই দূর দূরান্ত থেকে ডাক দেয়া হচ্ছে।”(৪১৪ ৪৪) আর একটি আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ “আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি যা মুমিনদের জন্যে প্রতিষেধক ও করুণা এবং এর দ্বারা অত্যাচারীদের ক্ষতিই বেড়ে যায়।” (১৭:৮২) ইরশাদ হচ্ছে- তাদের পরস্পরের অন্তরের হিংসা-বিদ্বেষ ও বৈরীভাব কিয়ামত পর্যন্ত মিটবে না। তারা একে অপরের রক্ত পিপাসু। হক ও সত্যের উপর তাদের একতাবদ্ধ হওয়া অসম্ভব। তারা নিজেদেরই ধর্মের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছে। তাদের পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতা চলে আসছে এবং চলতে থাকবে। তারা মাঝে মাঝে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু প্রতিবারেই তাদেরকে পরাজয় বরণ করতে হয়। তাদের চক্রান্ত তাদেরই উপর প্রত্যাবর্তিত হয়। তারা অশান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী এবং আল্লাহর শত্রু। কোন বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীকে আল্লাহ ভালবাসেন না।মহান আল্লাহ বলছেন-যদি এ আহলে কিতাব অর্থাৎ ইয়াহুদী ও নাসারারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনতো এবং তাকওয়া অবলম্বন করতো, আর হারাম ও হালাল মেনে চলতো, তবে আমি তাদের কৃত সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিতাম ও তাদেরকে সুখের উদ্যানে প্রবিষ্ট করতাম এবং তাদের উদ্দেশ্য সফল করতাম।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জীল এবং কুরআনকে মেনে নিতো, কেননা তাওরাত ও ইঞ্জীলকে মেনে নিলে কুরআনকে মেনে নেয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে; কারণ ঐ দুটি কিতাবের সঠিক শিক্ষা এটাই যে, কুরআন সত্য। কুরআনের ও শেষ নবী (সঃ)-এর সত্যতার স্বীকারোক্তি পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে রয়েছে, সুতরাং যদি তারা এ কিতাবাগুলোকে কোন পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ছাড়াই মেনে নিতো, তবে ওগুলো তাদেরকে ইসলামের পথ দেখাতো, যে ইসলামের প্রচার নবী (সঃ) করেছেন, এমতাবস্থায় আল্লাহ পাক তাদেরকে দুনিয়ার সুখ শান্তিও প্রদান করতেন। আকাশ থেকে তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করতেন। ফলে যমীন হতে সফল উৎপাদিত হতো। তখন উপর ও নীচের অর্থাৎ আসমান ও যমীনের বরকত তাদেরকে দান করা হতো। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “গ্রামবাসীরা যদি ঈমান আনতো ও তাকওয়া অবলম্বন করতো, তবে আমি অবশ্যই তাদের উপর আসমান ও যমীনের বরকত নাযিল করতাম” (৭৪৯৬) আর এক জায়গায় আছে- (আরবী) অর্থাৎ “মানুষের অসৎ কর্মের কারণে স্থলে ও পানিতে অশান্তি ও বিশৃংখলা প্রকাশিত হয়েছে।” (৩০:৪১) অর্থ এটাও হতে পারে, বিনা কষ্টে ও পরিশ্রমে আমি তাদেরকে প্রচুর ও বরকতপূর্ণ রিক বা খাদ্য দান করতাম। কেউ কেউ এ বাক্যের ভাবার্থ এও বর্ণনা করেছেন যে, ঐ লোকগুলো এরূপ করলে ভাল হয়ে যেতো। কিন্তু এ উক্তিটি পূর্ববর্তী গুরুজনদের উক্তির বিপরীত। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ জায়গায় একটি হাদীস এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এটা খুবই নিকটে যে, ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে।' একথা শুনে হযরত যিয়াদ ইবনে লাবীদ (রাঃ) আরয করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কিরূপে হতে পারে যে, ইলম উঠে যাবে? অথচ আমরা নিজেরা কুরআন পড়েছি এবং আমাদের সন্তানদেরকে তা শিখিয়েছি। তিনি তখন বলেনঃ “আফসোস! আমি তো তোমাকে মদীনাবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী মনে করতাম! তুমি কি দেখছো না যে, ইয়াহুদী ও নাসারাদের হাতেও তো তাওরাত ও ইঞ্জীল রয়েছে। কিন্তু এর দ্বারা তাদের কি উপকার হয়েছে? তারা তো আল্লাহর আহকাম পরিত্যাগ করেছে।” অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন একটি বিষয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “এটা ইলম উঠে যাওয়ার সময় ঘটবে। তখন হযরত ইবনে লাবীদ (রাঃ) বলেনঃ ইলম কিরূপে উঠে যাবে? অথচ আমরা কুরআন পড়েছি এবং আমাদের সন্তানদেরকে তা শিখিয়েছি। তারা আবার তাদের সন্তানদেরকে শিখাবে। এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত এটা চালু থাকবে। এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা বলেছিলেন তা উপরে বর্ণিত হলো।ইরশাদ হচ্ছে-তাদের মধ্যে একটি দল সরল-সঠিক পথের পথিকও রয়েছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই কার্যকলাপ অতি জঘন্য। যেমন এক স্থানে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মূসার কওমের মধ্যে একটি দল হকের হিদায়াত গ্রহণকারী এবং ওর মাধ্যমই আদল ও ইনসাফকারীও ছিল।" (৭:১৫৯) হযরত ঈসা (আঃ)-এর কওমের ব্যাপারে বলা হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মধ্যকার ঈমানদার লোকদেরকে আমি তাদের পুণ্যের পুরস্কার দান করেছিলাম।” (৫৭:২৭) এটা মনে রাখার বিষয় যে, আহলে কিতাবের জন্যে মধ্যম শ্রেণীকে উত্তম শ্রেণী বলা হলো। আর উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার মধ্যে এ মর্যাদা হচ্ছে দ্বিতীয় একটি মর্যাদা, যার উপর তৃতীয় একটি মর্যাদার স্তরও রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের উত্তরাধিকারী আমার কতক বান্দাকে বানিয়েছি, যাদের মধ্যে কতিপয় বান্দা তো নিজেদের নফসের উপর যুলুমকারী, কতিপয় বান্দা মধ্যমপন্থী এবং কতক বান্দা আল্লাহর হুকুমে পুণ্য অর্জনে অগ্রগামী। এটাই বড় অনুগ্রহ।” (৩৫:৩২) সুতরাং এ উম্মতের তিন প্রকারের লোকই জান্নাতে প্রবেশ করবে। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীদের সামনে বলেনঃ “মূসা (আঃ)-এর উম্মতের একাত্তরটি দল হয়েছে, তন্মধ্যে একটি হবে জান্নাতী, বাকী সত্তরটি দল হবে জাহান্নামী। ঈসা (আঃ)-এর উম্মতের বাহাত্তরটি দল হয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি হবে জান্নাতী এবং বাকী একাত্তরটি হবে জাহান্নামী। আমার উম্মত এ দু’জনের চেয়ে বেড়ে যাবে। তাদেরও একটি দল জান্নাতী হবে এবং বাকী বাহাত্তরটি দল জাহান্নামী হবে।” জনগণ জিজ্ঞেস করলোঃ “ঐ দলটি কারা?তিনি উত্তরে বললেনঃ ‘জামাআত, জামাআত।' ইয়াকূব ইবনে ইয়াযীদ বলেন যে, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) যখন এ হাদীসটি বর্ণনা করতেন তখন কুরআন কারীমের। (আরবী) এবং (আরবী) (৭:১৮১) -এ আয়াতগুলোও পাঠ করতেন এবং বলতেন যে, এর দ্বারা উম্মতে মুহাম্মাদিয়াকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু এ শব্দে এবং এ সনদে হাদীসটি অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল। সত্তরের উপর দলগুলোর হাদীসটি বহু সনদে বর্ণিত আছে, যা আমরা অন্য জায়গায় বর্ণনা করেছি।

আল-মায়িদা 5:65

৬৪-৬৬ নং আয়াতের তাফসীর: অভিশপ্ত ইয়াহূদীদের একটি জঘন্য উক্তির বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা মহান আল্লাহকে কৃপণ বলতো। তারাই আল্লাহ পাককে দরিদ্রও বলতো। আল্লাহ তা'আলার পবিত্র সত্তা সেই অপবিত্র উক্তির বহু ঊর্ধ্বে। সুতরাং “আল্লাহর হাত বন্ধ হয়ে আছে”- এটার ভাবার্থ তাদের নিকট এই ছিল না যে, তাঁর হাত বন্ধন মুক্ত রয়েছে। বরং এর দ্বারা তারা তাঁর কৃপণতা বুঝাতে চেয়েছিল। এ বাকরীতিই কুরআন কারীমের অন্য জায়গাতেও রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “স্বীয় হাতকে নিজের গর্দানের সাথে বেঁধে রেখো না এবং সীমা থেকে বেশীও বিস্তার করো না, নচেৎ লজ্জিত হয়ে বসে পড়তে হবে।" (১৭:২৯) সুতরাং এ আয়াতে আল্লাহ কৃপণতা থেকে এবং অযথা ও অতিরিক্ত খরচ করা থেকে বিরত থাকতে বললেন। অতএব, ইয়াহূদীদেরও “হাত বন্ধন মুক্ত রয়েছে”-এ কথার উদ্দেশ্য এটাই ছিল। ফাখাস নামক ইয়াহুদী এ কথা বলেছিল। ঐ অভিশপ্ত ইয়াহূদীদেরই “আল্লাহ দরিদ্র এবং আমরা ধনী”-এ উক্তিও ছিল। ফলে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে প্রহার করেছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, ইয়াহূদীদের শাস ইবনে কায়েস নামক একটি লোক বলেছিলঃ “নিশ্চয়ই তোমার প্রভু কৃপণ, তিনি খরচ বা দান করেন না। (তিবরানী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন যে, এ উক্তিকারী ছিল শাস ইবনে কায়েস। আর আবুশ শায়েখ তাখরীজ করেছেন যে, এ উক্তিকারীর নাম হচ্ছে ফানহাস)” তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং বলা হয় যে, কৃপণ, লাঞ্ছিত এবং কাপুরুষ হচ্ছে তারা নিজেরাই। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে-“তারা যদি বাদশাহ হয়ে যায় তবে কাউকেও কিছুই দেবে না। বরং তারা তো অন্যদের নিয়ামত দেখে জ্বলে পুড়ে মরে। তারা লাঞ্ছিত লোক, বরং আল্লাহর হাত খোলা রয়েছে, তিনি অনেক কিছু খরচ করতে রয়েছেন, তাঁর ফসলও অনুগ্রহ প্রশস্ত, তাঁর দান সাধারণ। সব জিনিসের ভাণ্ডার তাঁরই হাতে রয়েছে। সমস্ত সৃষ্টজীব দিনরাত সব জায়গায় তারই মুখাপেক্ষী। যেমন আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যা চেয়েছো তাই তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন, যদি তোমরা আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও তবে তা গুণে শেষ করতে পারবে না, নিশ্চয়ই মানুষ অত্যাচারী ও অকৃতজ্ঞ।" (১৪:৩৪) মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহর দক্ষিণ হস্ত পরিপূর্ণ। রাত দিনের খরচ তাঁর ধনভাণ্ডারকে কমায় না। শুরু হতে আজ পর্যন্ত যত কিছু তিনি স্বীয় মাখলুককে দান করেছেন তা তাঁর ধনভাণ্ডারকে একটুও হ্রাস করেনি। প্রথমে তার আরশ পানির উপর ছিল। তার অপর হাতে ‘দান' অথবা অধিকার রয়েছে। ওটাই উঁচু করে এবং নীচু করে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আমার পথে খরচ কর, আমিও তোমাদেরকে দান করবো। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ হাদীসটি রয়েছে। ঘোষণা করা হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তোমার কাছে আল্লাহর নিয়ামত যত বৃদ্ধি পাবে, এ শয়তানদের কুফর ও হিংসা-বিদ্বেষ ততো বেড়ে যাবে। অনুরূপভাবে যেমন মুমিনদের ঈমান, আত্মসমর্পণ এবং আনুগত্য বৃদ্ধি পাবে তেমনই এসব ইয়াহুদী ও মুশরিকদের অবাধ্যতা, হঠকারিতা এবং হিংসা-বিদ্বেষ বাড়তে থাকবে। যেমন অন্য এক আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ “মুমিনদের জন্যে এটা তো হিদায়াত ও প্রতিষেধক এবং বেঈমানরা এর থেকে অন্ধ ও বধির, এদেরই দূর দূরান্ত থেকে ডাক দেয়া হচ্ছে।”(৪১৪ ৪৪) আর একটি আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ “আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি যা মুমিনদের জন্যে প্রতিষেধক ও করুণা এবং এর দ্বারা অত্যাচারীদের ক্ষতিই বেড়ে যায়।” (১৭:৮২) ইরশাদ হচ্ছে- তাদের পরস্পরের অন্তরের হিংসা-বিদ্বেষ ও বৈরীভাব কিয়ামত পর্যন্ত মিটবে না। তারা একে অপরের রক্ত পিপাসু। হক ও সত্যের উপর তাদের একতাবদ্ধ হওয়া অসম্ভব। তারা নিজেদেরই ধর্মের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছে। তাদের পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতা চলে আসছে এবং চলতে থাকবে। তারা মাঝে মাঝে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু প্রতিবারেই তাদেরকে পরাজয় বরণ করতে হয়। তাদের চক্রান্ত তাদেরই উপর প্রত্যাবর্তিত হয়। তারা অশান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী এবং আল্লাহর শত্রু। কোন বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীকে আল্লাহ ভালবাসেন না।মহান আল্লাহ বলছেন-যদি এ আহলে কিতাব অর্থাৎ ইয়াহুদী ও নাসারারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনতো এবং তাকওয়া অবলম্বন করতো, আর হারাম ও হালাল মেনে চলতো, তবে আমি তাদের কৃত সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিতাম ও তাদেরকে সুখের উদ্যানে প্রবিষ্ট করতাম এবং তাদের উদ্দেশ্য সফল করতাম।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জীল এবং কুরআনকে মেনে নিতো, কেননা তাওরাত ও ইঞ্জীলকে মেনে নিলে কুরআনকে মেনে নেয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে; কারণ ঐ দুটি কিতাবের সঠিক শিক্ষা এটাই যে, কুরআন সত্য। কুরআনের ও শেষ নবী (সঃ)-এর সত্যতার স্বীকারোক্তি পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে রয়েছে, সুতরাং যদি তারা এ কিতাবাগুলোকে কোন পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ছাড়াই মেনে নিতো, তবে ওগুলো তাদেরকে ইসলামের পথ দেখাতো, যে ইসলামের প্রচার নবী (সঃ) করেছেন, এমতাবস্থায় আল্লাহ পাক তাদেরকে দুনিয়ার সুখ শান্তিও প্রদান করতেন। আকাশ থেকে তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করতেন। ফলে যমীন হতে সফল উৎপাদিত হতো। তখন উপর ও নীচের অর্থাৎ আসমান ও যমীনের বরকত তাদেরকে দান করা হতো। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “গ্রামবাসীরা যদি ঈমান আনতো ও তাকওয়া অবলম্বন করতো, তবে আমি অবশ্যই তাদের উপর আসমান ও যমীনের বরকত নাযিল করতাম” (৭৪৯৬) আর এক জায়গায় আছে- (আরবী) অর্থাৎ “মানুষের অসৎ কর্মের কারণে স্থলে ও পানিতে অশান্তি ও বিশৃংখলা প্রকাশিত হয়েছে।” (৩০:৪১) অর্থ এটাও হতে পারে, বিনা কষ্টে ও পরিশ্রমে আমি তাদেরকে প্রচুর ও বরকতপূর্ণ রিক বা খাদ্য দান করতাম। কেউ কেউ এ বাক্যের ভাবার্থ এও বর্ণনা করেছেন যে, ঐ লোকগুলো এরূপ করলে ভাল হয়ে যেতো। কিন্তু এ উক্তিটি পূর্ববর্তী গুরুজনদের উক্তির বিপরীত। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ জায়গায় একটি হাদীস এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এটা খুবই নিকটে যে, ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে।' একথা শুনে হযরত যিয়াদ ইবনে লাবীদ (রাঃ) আরয করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কিরূপে হতে পারে যে, ইলম উঠে যাবে? অথচ আমরা নিজেরা কুরআন পড়েছি এবং আমাদের সন্তানদেরকে তা শিখিয়েছি। তিনি তখন বলেনঃ “আফসোস! আমি তো তোমাকে মদীনাবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী মনে করতাম! তুমি কি দেখছো না যে, ইয়াহুদী ও নাসারাদের হাতেও তো তাওরাত ও ইঞ্জীল রয়েছে। কিন্তু এর দ্বারা তাদের কি উপকার হয়েছে? তারা তো আল্লাহর আহকাম পরিত্যাগ করেছে।” অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন একটি বিষয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “এটা ইলম উঠে যাওয়ার সময় ঘটবে। তখন হযরত ইবনে লাবীদ (রাঃ) বলেনঃ ইলম কিরূপে উঠে যাবে? অথচ আমরা কুরআন পড়েছি এবং আমাদের সন্তানদেরকে তা শিখিয়েছি। তারা আবার তাদের সন্তানদেরকে শিখাবে। এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত এটা চালু থাকবে। এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা বলেছিলেন তা উপরে বর্ণিত হলো।ইরশাদ হচ্ছে-তাদের মধ্যে একটি দল সরল-সঠিক পথের পথিকও রয়েছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই কার্যকলাপ অতি জঘন্য। যেমন এক স্থানে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মূসার কওমের মধ্যে একটি দল হকের হিদায়াত গ্রহণকারী এবং ওর মাধ্যমই আদল ও ইনসাফকারীও ছিল।" (৭:১৫৯) হযরত ঈসা (আঃ)-এর কওমের ব্যাপারে বলা হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মধ্যকার ঈমানদার লোকদেরকে আমি তাদের পুণ্যের পুরস্কার দান করেছিলাম।” (৫৭:২৭) এটা মনে রাখার বিষয় যে, আহলে কিতাবের জন্যে মধ্যম শ্রেণীকে উত্তম শ্রেণী বলা হলো। আর উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার মধ্যে এ মর্যাদা হচ্ছে দ্বিতীয় একটি মর্যাদা, যার উপর তৃতীয় একটি মর্যাদার স্তরও রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের উত্তরাধিকারী আমার কতক বান্দাকে বানিয়েছি, যাদের মধ্যে কতিপয় বান্দা তো নিজেদের নফসের উপর যুলুমকারী, কতিপয় বান্দা মধ্যমপন্থী এবং কতক বান্দা আল্লাহর হুকুমে পুণ্য অর্জনে অগ্রগামী। এটাই বড় অনুগ্রহ।” (৩৫:৩২) সুতরাং এ উম্মতের তিন প্রকারের লোকই জান্নাতে প্রবেশ করবে। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীদের সামনে বলেনঃ “মূসা (আঃ)-এর উম্মতের একাত্তরটি দল হয়েছে, তন্মধ্যে একটি হবে জান্নাতী, বাকী সত্তরটি দল হবে জাহান্নামী। ঈসা (আঃ)-এর উম্মতের বাহাত্তরটি দল হয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি হবে জান্নাতী এবং বাকী একাত্তরটি হবে জাহান্নামী। আমার উম্মত এ দু’জনের চেয়ে বেড়ে যাবে। তাদেরও একটি দল জান্নাতী হবে এবং বাকী বাহাত্তরটি দল জাহান্নামী হবে।” জনগণ জিজ্ঞেস করলোঃ “ঐ দলটি কারা?তিনি উত্তরে বললেনঃ ‘জামাআত, জামাআত।' ইয়াকূব ইবনে ইয়াযীদ বলেন যে, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) যখন এ হাদীসটি বর্ণনা করতেন তখন কুরআন কারীমের। (আরবী) এবং (আরবী) (৭:১৮১) -এ আয়াতগুলোও পাঠ করতেন এবং বলতেন যে, এর দ্বারা উম্মতে মুহাম্মাদিয়াকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু এ শব্দে এবং এ সনদে হাদীসটি অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল। সত্তরের উপর দলগুলোর হাদীসটি বহু সনদে বর্ণিত আছে, যা আমরা অন্য জায়গায় বর্ণনা করেছি।

আল-মায়িদা 5:66

৬৪-৬৬ নং আয়াতের তাফসীর: অভিশপ্ত ইয়াহূদীদের একটি জঘন্য উক্তির বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা মহান আল্লাহকে কৃপণ বলতো। তারাই আল্লাহ পাককে দরিদ্রও বলতো। আল্লাহ তা'আলার পবিত্র সত্তা সেই অপবিত্র উক্তির বহু ঊর্ধ্বে। সুতরাং “আল্লাহর হাত বন্ধ হয়ে আছে”- এটার ভাবার্থ তাদের নিকট এই ছিল না যে, তাঁর হাত বন্ধন মুক্ত রয়েছে। বরং এর দ্বারা তারা তাঁর কৃপণতা বুঝাতে চেয়েছিল। এ বাকরীতিই কুরআন কারীমের অন্য জায়গাতেও রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “স্বীয় হাতকে নিজের গর্দানের সাথে বেঁধে রেখো না এবং সীমা থেকে বেশীও বিস্তার করো না, নচেৎ লজ্জিত হয়ে বসে পড়তে হবে।" (১৭:২৯) সুতরাং এ আয়াতে আল্লাহ কৃপণতা থেকে এবং অযথা ও অতিরিক্ত খরচ করা থেকে বিরত থাকতে বললেন। অতএব, ইয়াহূদীদেরও “হাত বন্ধন মুক্ত রয়েছে”-এ কথার উদ্দেশ্য এটাই ছিল। ফাখাস নামক ইয়াহুদী এ কথা বলেছিল। ঐ অভিশপ্ত ইয়াহূদীদেরই “আল্লাহ দরিদ্র এবং আমরা ধনী”-এ উক্তিও ছিল। ফলে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে প্রহার করেছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, ইয়াহূদীদের শাস ইবনে কায়েস নামক একটি লোক বলেছিলঃ “নিশ্চয়ই তোমার প্রভু কৃপণ, তিনি খরচ বা দান করেন না। (তিবরানী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন যে, এ উক্তিকারী ছিল শাস ইবনে কায়েস। আর আবুশ শায়েখ তাখরীজ করেছেন যে, এ উক্তিকারীর নাম হচ্ছে ফানহাস)” তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং বলা হয় যে, কৃপণ, লাঞ্ছিত এবং কাপুরুষ হচ্ছে তারা নিজেরাই। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে-“তারা যদি বাদশাহ হয়ে যায় তবে কাউকেও কিছুই দেবে না। বরং তারা তো অন্যদের নিয়ামত দেখে জ্বলে পুড়ে মরে। তারা লাঞ্ছিত লোক, বরং আল্লাহর হাত খোলা রয়েছে, তিনি অনেক কিছু খরচ করতে রয়েছেন, তাঁর ফসলও অনুগ্রহ প্রশস্ত, তাঁর দান সাধারণ। সব জিনিসের ভাণ্ডার তাঁরই হাতে রয়েছে। সমস্ত সৃষ্টজীব দিনরাত সব জায়গায় তারই মুখাপেক্ষী। যেমন আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যা চেয়েছো তাই তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন, যদি তোমরা আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও তবে তা গুণে শেষ করতে পারবে না, নিশ্চয়ই মানুষ অত্যাচারী ও অকৃতজ্ঞ।" (১৪:৩৪) মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহর দক্ষিণ হস্ত পরিপূর্ণ। রাত দিনের খরচ তাঁর ধনভাণ্ডারকে কমায় না। শুরু হতে আজ পর্যন্ত যত কিছু তিনি স্বীয় মাখলুককে দান করেছেন তা তাঁর ধনভাণ্ডারকে একটুও হ্রাস করেনি। প্রথমে তার আরশ পানির উপর ছিল। তার অপর হাতে ‘দান' অথবা অধিকার রয়েছে। ওটাই উঁচু করে এবং নীচু করে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আমার পথে খরচ কর, আমিও তোমাদেরকে দান করবো। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এ হাদীসটি রয়েছে। ঘোষণা করা হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তোমার কাছে আল্লাহর নিয়ামত যত বৃদ্ধি পাবে, এ শয়তানদের কুফর ও হিংসা-বিদ্বেষ ততো বেড়ে যাবে। অনুরূপভাবে যেমন মুমিনদের ঈমান, আত্মসমর্পণ এবং আনুগত্য বৃদ্ধি পাবে তেমনই এসব ইয়াহুদী ও মুশরিকদের অবাধ্যতা, হঠকারিতা এবং হিংসা-বিদ্বেষ বাড়তে থাকবে। যেমন অন্য এক আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ “মুমিনদের জন্যে এটা তো হিদায়াত ও প্রতিষেধক এবং বেঈমানরা এর থেকে অন্ধ ও বধির, এদেরই দূর দূরান্ত থেকে ডাক দেয়া হচ্ছে।”(৪১৪ ৪৪) আর একটি আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ “আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি যা মুমিনদের জন্যে প্রতিষেধক ও করুণা এবং এর দ্বারা অত্যাচারীদের ক্ষতিই বেড়ে যায়।” (১৭:৮২) ইরশাদ হচ্ছে- তাদের পরস্পরের অন্তরের হিংসা-বিদ্বেষ ও বৈরীভাব কিয়ামত পর্যন্ত মিটবে না। তারা একে অপরের রক্ত পিপাসু। হক ও সত্যের উপর তাদের একতাবদ্ধ হওয়া অসম্ভব। তারা নিজেদেরই ধর্মের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছে। তাদের পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতা চলে আসছে এবং চলতে থাকবে। তারা মাঝে মাঝে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু প্রতিবারেই তাদেরকে পরাজয় বরণ করতে হয়। তাদের চক্রান্ত তাদেরই উপর প্রত্যাবর্তিত হয়। তারা অশান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী এবং আল্লাহর শত্রু। কোন বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীকে আল্লাহ ভালবাসেন না।মহান আল্লাহ বলছেন-যদি এ আহলে কিতাব অর্থাৎ ইয়াহুদী ও নাসারারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনতো এবং তাকওয়া অবলম্বন করতো, আর হারাম ও হালাল মেনে চলতো, তবে আমি তাদের কৃত সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিতাম ও তাদেরকে সুখের উদ্যানে প্রবিষ্ট করতাম এবং তাদের উদ্দেশ্য সফল করতাম।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জীল এবং কুরআনকে মেনে নিতো, কেননা তাওরাত ও ইঞ্জীলকে মেনে নিলে কুরআনকে মেনে নেয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে; কারণ ঐ দুটি কিতাবের সঠিক শিক্ষা এটাই যে, কুরআন সত্য। কুরআনের ও শেষ নবী (সঃ)-এর সত্যতার স্বীকারোক্তি পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে রয়েছে, সুতরাং যদি তারা এ কিতাবাগুলোকে কোন পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ছাড়াই মেনে নিতো, তবে ওগুলো তাদেরকে ইসলামের পথ দেখাতো, যে ইসলামের প্রচার নবী (সঃ) করেছেন, এমতাবস্থায় আল্লাহ পাক তাদেরকে দুনিয়ার সুখ শান্তিও প্রদান করতেন। আকাশ থেকে তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করতেন। ফলে যমীন হতে সফল উৎপাদিত হতো। তখন উপর ও নীচের অর্থাৎ আসমান ও যমীনের বরকত তাদেরকে দান করা হতো। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “গ্রামবাসীরা যদি ঈমান আনতো ও তাকওয়া অবলম্বন করতো, তবে আমি অবশ্যই তাদের উপর আসমান ও যমীনের বরকত নাযিল করতাম” (৭৪৯৬) আর এক জায়গায় আছে- (আরবী) অর্থাৎ “মানুষের অসৎ কর্মের কারণে স্থলে ও পানিতে অশান্তি ও বিশৃংখলা প্রকাশিত হয়েছে।” (৩০:৪১) অর্থ এটাও হতে পারে, বিনা কষ্টে ও পরিশ্রমে আমি তাদেরকে প্রচুর ও বরকতপূর্ণ রিক বা খাদ্য দান করতাম। কেউ কেউ এ বাক্যের ভাবার্থ এও বর্ণনা করেছেন যে, ঐ লোকগুলো এরূপ করলে ভাল হয়ে যেতো। কিন্তু এ উক্তিটি পূর্ববর্তী গুরুজনদের উক্তির বিপরীত। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ জায়গায় একটি হাদীস এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এটা খুবই নিকটে যে, ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে।' একথা শুনে হযরত যিয়াদ ইবনে লাবীদ (রাঃ) আরয করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কিরূপে হতে পারে যে, ইলম উঠে যাবে? অথচ আমরা নিজেরা কুরআন পড়েছি এবং আমাদের সন্তানদেরকে তা শিখিয়েছি। তিনি তখন বলেনঃ “আফসোস! আমি তো তোমাকে মদীনাবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী মনে করতাম! তুমি কি দেখছো না যে, ইয়াহুদী ও নাসারাদের হাতেও তো তাওরাত ও ইঞ্জীল রয়েছে। কিন্তু এর দ্বারা তাদের কি উপকার হয়েছে? তারা তো আল্লাহর আহকাম পরিত্যাগ করেছে।” অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন একটি বিষয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “এটা ইলম উঠে যাওয়ার সময় ঘটবে। তখন হযরত ইবনে লাবীদ (রাঃ) বলেনঃ ইলম কিরূপে উঠে যাবে? অথচ আমরা কুরআন পড়েছি এবং আমাদের সন্তানদেরকে তা শিখিয়েছি। তারা আবার তাদের সন্তানদেরকে শিখাবে। এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত এটা চালু থাকবে। এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা বলেছিলেন তা উপরে বর্ণিত হলো।ইরশাদ হচ্ছে-তাদের মধ্যে একটি দল সরল-সঠিক পথের পথিকও রয়েছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই কার্যকলাপ অতি জঘন্য। যেমন এক স্থানে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মূসার কওমের মধ্যে একটি দল হকের হিদায়াত গ্রহণকারী এবং ওর মাধ্যমই আদল ও ইনসাফকারীও ছিল।" (৭:১৫৯) হযরত ঈসা (আঃ)-এর কওমের ব্যাপারে বলা হয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মধ্যকার ঈমানদার লোকদেরকে আমি তাদের পুণ্যের পুরস্কার দান করেছিলাম।” (৫৭:২৭) এটা মনে রাখার বিষয় যে, আহলে কিতাবের জন্যে মধ্যম শ্রেণীকে উত্তম শ্রেণী বলা হলো। আর উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার মধ্যে এ মর্যাদা হচ্ছে দ্বিতীয় একটি মর্যাদা, যার উপর তৃতীয় একটি মর্যাদার স্তরও রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর আমি কিতাবের উত্তরাধিকারী আমার কতক বান্দাকে বানিয়েছি, যাদের মধ্যে কতিপয় বান্দা তো নিজেদের নফসের উপর যুলুমকারী, কতিপয় বান্দা মধ্যমপন্থী এবং কতক বান্দা আল্লাহর হুকুমে পুণ্য অর্জনে অগ্রগামী। এটাই বড় অনুগ্রহ।” (৩৫:৩২) সুতরাং এ উম্মতের তিন প্রকারের লোকই জান্নাতে প্রবেশ করবে। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীদের সামনে বলেনঃ “মূসা (আঃ)-এর উম্মতের একাত্তরটি দল হয়েছে, তন্মধ্যে একটি হবে জান্নাতী, বাকী সত্তরটি দল হবে জাহান্নামী। ঈসা (আঃ)-এর উম্মতের বাহাত্তরটি দল হয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি হবে জান্নাতী এবং বাকী একাত্তরটি হবে জাহান্নামী। আমার উম্মত এ দু’জনের চেয়ে বেড়ে যাবে। তাদেরও একটি দল জান্নাতী হবে এবং বাকী বাহাত্তরটি দল জাহান্নামী হবে।” জনগণ জিজ্ঞেস করলোঃ “ঐ দলটি কারা?তিনি উত্তরে বললেনঃ ‘জামাআত, জামাআত।' ইয়াকূব ইবনে ইয়াযীদ বলেন যে, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) যখন এ হাদীসটি বর্ণনা করতেন তখন কুরআন কারীমের। (আরবী) এবং (আরবী) (৭:১৮১) -এ আয়াতগুলোও পাঠ করতেন এবং বলতেন যে, এর দ্বারা উম্মতে মুহাম্মাদিয়াকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু এ শব্দে এবং এ সনদে হাদীসটি অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল। সত্তরের উপর দলগুলোর হাদীসটি বহু সনদে বর্ণিত আছে, যা আমরা অন্য জায়গায় বর্ণনা করেছি।

আল-মায়িদা 5:67

মহান আল্লাহ এখানে স্বীয় নবী (সঃ)-কে রাসূল’ -এ প্রিয় শব্দ দ্বারা সম্বোধন করে বলছেন-তুমি মানুষের কাছে আমার সমস্ত আহকাম পৌছিয়ে দাও। রাসূলুল্লাহ (সঃ) করলেনও তাই। সহীহ বুখারীতে রয়েছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “যে ব্যক্তি তোমাকে বলে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর নাযিলকৃত কোন কিছু গোপন করেছেন, সে মিথ্যা বলেছে। এখানে হাদীসটি সংক্ষিপ্তভাবে আছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতেই বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ যদি মুহাম্মাদ (সঃ) কুরআনের কোন অংশ গোপন করতেন তবে তিনি অবশ্যই (আরবী) (৩৩:৩৭)-এ আয়াতটিই গোপন করতেন। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, একটি লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেঃ “লোকদের মধ্যে এ আলোচনা চলছে যে, আপনাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন কতগুলো কথা বলেছেন যা তিনি অন্য লোকদের নিকট প্রকাশ করেননি?” তখন তিনি এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে এরূপ কোন বিশিষ্ট জিনিসের উত্তরাধিকারী করেননি। এ হাদীসের ইসনাদ খুবই উত্তম। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একটি লোক হযরত আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাদের কাছে কি কুরআন ছাড়া অন্য অহীও আছে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “যে আল্লাহ শস্য উৎপন্ন করেছেন এবং জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন তাঁর শপথ! না, শুধু এ বুদ্ধি ও বিবেক, যা তিনি কোন লোককে কুরআনের ব্যাপারে দিয়েছেন এবং যা কিছু এই সহীফায় রয়েছে (এছাড়া আর কিছুই নেই)।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করেনঃ সহীফায় কি আছে? উত্তরে তিনি বলেনঃ “এর মধ্যে দিয়্যাতের মাসআলা ও বন্দীদেরকে ছেড়ে দেয়ার আহকাম রয়েছে এবং এ বিধান রয়েছে যে, কাফিরকে হত্যা করার কারণে কিসাস হিসেবে কোন মুসলমানকে হত্যা করা হবে না।”সহীহ বুখারীতে হযরত যুহরী (রাঃ)-এর উক্তি রয়েছে, তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হচ্ছে রিসালাত, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দায়িত্ব হচ্ছে প্রচার করা এবং আমাদের কর্তব্য হচ্ছে মেনে নেয়া।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তাআলার সমস্ত কথা পৌছিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সমস্ত উম্মতই এর সাক্ষী। প্রকৃতপক্ষে তিনি আমানত পূর্ণভাবে আদায় করেছেন এবং যেটা সবচেয়ে বড় সম্মেলন ছিল তাতে সবাই এটা স্বীকার করে নিয়েছেন। অর্থাৎ হাজ্বাতুল বিদা' বা বিদায় হজ্বের খুৎবায় সমস্ত সাহাবী এ কথা স্বীকার করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করেছেন এবং আল্লাহর বাণী সকলের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূল্লাহ (সঃ) তার এ ভাষণে জনগণকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “তোমরা আল্লাহর কাছে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। তাহলে বল তো তোমরা কি উত্তর দেবে?” সবাই সমস্বরে বললেনঃ “আমরা সাক্ষ্য দান করছি যে, আপনি প্রচার করেছেন, রিসালাতের হক পুরোপুরি আদায় করেছেন এবং পূর্ণভাবে আমাদের মঙ্গল কামনা করেছেন। তিনি তখন স্বীয় হস্ত ও মস্তক আকাশ পানে উত্তোলন করতঃ জনগণের দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহ! আমি কি পৌছিয়ে দিয়েছি, হে আল্লাহ! আমি কি পৌছিয়ে দিয়েছি?” মুসনাদে আহমাদে এটাও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ ভাষণে জনগণকে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “হে লোক সকল! এটা কোন্ দিন? সবাই উত্তরে বললেনঃ ‘মর্যাদা সম্পন্ন দিন।' তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ ‘এটা কোন্ শহর? সবাই জবাবে বললেনঃ ‘সম্মানিত শহর।' পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “এটা কোন্ মাস?' সবাই বললেনঃ ‘মর্যাদা সম্পন্ন মাস। তখন তিনি বললেনঃ “সুতরাং তোমাদের মাল, তোমাদের রক্ত এবং তোমাদের ইজ্জত ও আবরুর একে অপরের কাছে এ রকমই মর্যাদা রয়েছে যেমন এ দিনের, এ শহরের এবং এ মাসের সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। বারবার তিনি এর পুনরাবৃত্তি করলেন। তারপর তিনি স্বীয় অঙ্গুলি আকাশের দিকে উঠিয়ে বললেনঃ হে আল্লাহ! আমি কি পৌছিয়ে দিয়েছি?' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! এটা তার প্রভুর পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি অসিয়ত ছিল।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “দেখো! তোমাদের প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তি যেন প্রত্যেক অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট এটা পৌঁছে দেয়। দেখো! তোমরা আমার পরে যেন কাফের হয়ে যেয়ো না এবং একে অপরকে হত্যা করো না।” ইমাম বুখারীও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-হে নবী (সঃ)! তুমি যদি আমার হুকুম আমার বান্দা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে না দাও তবে তুমি রিসালাতের হক আদায় করলে না। তারপর এর যা শাস্তি তা তো স্পষ্ট। যদি তুমি একটি আয়াতও গোপন কর তবে তুমি রিসালাত ভেঙ্গে দিলে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যখন “যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে তা পৌঁছিয়ে দাও”-এ হুকুম নাযিল হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি তো একা, আর এই সব কিছু মিলে আমার উপর ভারী হয়ে যাচ্ছে, সুতরাং আমি কিভাবে এটা পালন করতে পারি!” তখন এ দ্বিতীয় বাক্যটি অবতীর্ণ হয়ঃ তুমি যদি এটা পালন না কর তবে তুমি রিসালাতের দায়িত্বই পালন করলে না।তারপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমাকে লোকদের থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমার, তোমার রক্ষক ও সাহায্যকারী আমি। তুমি নির্ভয় থাক, কেউই তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের প্রহরী রাখতেন। সাহাবীগণ তাকে রক্ষা করার কাজে নিযুক্ত থাকতেন। যেমন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ একদা রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জেগেই ছিলেন। তার ঘুম হচ্ছিল না। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ব্যাপার কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ যদি আজ রাত্রে আমার কোন হৃদয়বান সাহাবী আমাকে পাহারা দিতো!' তিনি একথা বলতেই আছেন, হঠাৎ আমার কানে অস্ত্রের শব্দ আসলো, তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কে? উত্তর আসলোঃ “আমি সা’দ ইবনে মালিক (রাঃ)। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “কেন আসলে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে পাহারা দেয়ার জন্য এসেছি।”এরপর তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লেন। এমনকি আমি তাঁর নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলাম। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, এটা দ্বিতীয় হিজরীর ঘটনা। এ আয়াতটি নাযিল হওয়া মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁবু হতে মাথা বের করে দিয়ে প্রহরীদেরকে বললেনঃ “তোমরা চলে যাও, আমি আমার প্রভুর আশ্রয়ে এসে গেছি। সুতরাং এখন তোমাদের পাহারা দেয়ার কোনই প্রয়োজন নেই।” আর একটি বর্ণনায় আছে যে, অবু তালিব সদা রাসূলুল্লাহর সাথে কোন না কোন লোক রাখতেনই। যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলো তখন তিনি তাকে বললেনঃ “চাচাজান! এখন আর আমার সাথে কোন লোক পাঠাবার প্রয়োজন নেই। আমি মহান আল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণে এসে গেছি।” কিন্তু এ রিওয়ায়াতটি গারীব ও মুনকার। এটাতো মক্কার ঘটনা, আর এ আয়াতটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এতে কোনই সন্দেহ নেই, মহান আল্লাহ মক্কাতেই স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে পূর্ণভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন। চুতর্দিকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকা সত্ত্বেও মক্কার নেতৃস্থানীয় লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চুল পরিমাণ ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হয়নি। রিসালাতের প্রথম ভাগে তার চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে তার রক্ষণাবেক্ষণ হতে থাকে। কেননা, আবু তালিব ছিলেন কুরাইশদের এক প্রভাবশালী নেতা। আল্লাহ তার অন্তরে স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর প্রতি ভালবাসা স্থাপন করেছিলেন। এ ভালবাসা ছিল প্রকৃতিগত ও স্বাভাবিক ভালবাসা, শরীয়তগত ভালবাসা নয়। আবু তালিবের এ ভালবাসা যদি শরীয়তগত হতো তবে কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাথে তাকেও হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতো। আবূ তালিবের মৃত্যুর পর আল্লাহ তা'আলা মদীনার আনসাদের অন্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি শরীয়তগত মুহব্বত পয়দা করে দেন এবং তিনি তাঁদের কাছেই চলে যান। তখন মুশরিকরা ও ইয়াহূদীরা অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে ওঠে ও ভারী ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনী নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। করার মানসে দ্রুত এগিয়ে আসে। কিন্তু বারবার অকৃতকার্য হওয়ার ফলে তাদের আশার গুড়ে বালি পড়ে যায়। অনুরূপভাবে তাদের গোপন ষড়যন্ত্রও আল্লাহর ফযল ও করমে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এক দিকে তারা তার উপর যাদু করে, অপরদিকে সূরা নাস’ ও ‘ফালাক’ অবতীর্ণ হয় এবং যাদুক্রিয়া নষ্ট করে দেয়া হয়। একদিকে তারা শত চেষ্টা করে ছাগীর কাঁধে বিষ মিশিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দাওয়াত করতঃ তার সামনে পেশ করে, অন্য দিকে আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (সঃ)-কে ঐ ব্যাপারে সতর্ক করে দেন এবং তারা বিফল মনোরথ হয়। এ ধরনের আরও বহু ঘটনা তার জীবনে পরিলক্ষিত হয়।তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, এক সফরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি ছায়াদার বৃক্ষের নীচে দুপুরে দ্রিা গিয়েছিলেন। এরূপ ছায়াদার বৃক্ষ সাহাবীগণ অভ্যাসগতভাবে প্রতি মনযিলে খুঁজে খুঁজে তার জন্যে নির্দিষ্ট করে রাখতেন। হঠাৎ এক বেদুঈন তথায় এসে যায়। বৃক্ষের শাখায় ঝুলন্ত তার তরবারীখানা নামিয়ে সে তা খাপ থেকে বের করলো এবং বললোঃ বলতো কে এখন তোমাকে রক্ষা করবে?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “আল্লাহ আমাকে রক্ষা করবেন।' তখনই বেদুঈনের হাত কেঁপে উঠলো এবং তরবারীখানা তার হাত থেকে পড়ে গেল। আর তার মাথাটি গাছে সজোরে আঘাত প্রাপ্ত হলো। ফলে তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। সেই সময় আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করলেন। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বান্ আনমার গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন, সে সময় তিনি যাতুর রিকা নামক খেজুরের বাগানে একটি কূপে পা লটকিয়ে বসেছিলেন। এমন সময় বানূ নাজ্জার গোত্রের ওয়ারিস নামক একটি লোক বলে ওঠেঃ “দেখ, আমি এখনই মুহাম্মাদকে হত্যা করছি।' লোকেরা জিজ্ঞেস করলো :কিরূপে? সে উত্তরে বললোঃ “আমি কোন বাহানা করে তাঁর তরবারীখানা নিয়ে নেবো। তারপর ঐ তরবারী দ্বারাই তাঁর জীবন শেষ করবো।' একথা বলে সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আসলো এবং এ কথা সে কথা বলার পর তার তরবারীটা দেখতে চাইলো। তিনি তো তাকে দিয়ে দিলেন। কিন্তু ওটা হাতে নেয়া মাত্রই সে এতো কাঁপতে শুরু করলো যে, শেষ পর্যন্ত তরবারী হাতে রাখতে পারলো না, তার হাত থেকে পড়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তোমার ও তোমার কুমতলবের মাঝে আল্লাহ প্রতিবন্ধক হয়েছিলেন। ঐ সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হুয়াইরিস ইবনে হারিসেরও ঐরূপই একটি ঘটনা প্রসিদ্ধি লাভ করে আছে। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেছেনঃ সাহাবায়ে কিরামের অভ্যাস এই ছিল যে, সফরে তারা যেখানে বিশ্রামের জন্যে থামতেন সেখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে ঘন ছায়াযুক্ত একটি বড় গাছ রেখে দিতেন। তিনি সেই গাছের ছায়ায় বিশ্রাম করতেন। একদা তিনি এ ধরনের একটি গাছের নীচে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন এবং তার তরবারীখানা ঐ গাছেই লটকান ছিল। এমন সময় একটি লোক এসে পড়ে এবং তরবারীখানা হাতে নিয়ে বলেঃ ‘এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ বাঁচাবেন। তুমি তরবারী রেখে দাও।তখন সে এতো আতংকিত হয়ে পড়ে যে, তাকে হুকুম পালন করতেই হয়। সে তরবারী তাঁর সামনে রেখে দেয়। সে সময় মহান আল্লাহ (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।সাহাবায়ে কিরাম একটি লোককে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ধরে নিয়ে আসেন এবং তাকে বলেনঃ “এ লোকটি আপনাকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিল। তখন লোকটি কাঁপতে শুরু করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ তুমি আমাকে হত্যা করতে চাইলেও আল্লাহ তোমার ইচ্ছা পূর্ণ করবেন না।'ইরশাদ হচ্ছে-তোমার দায়িত্ব হচ্ছে শুধু প্রচার করে দেয়া। হিদায়াত করার হাত আল্লাহর। তিনি কাফিরদেরকে হিদায়াত করবেন না। তুমি পৌছিয়ে দাও। হিসাব গ্রহণকারী হচ্ছেন আল্লাহ।

আল-মায়িদা 5:68

৬৮-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলছেন-ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানরা কোন ধর্মের উপরই নেই যে পর্যন্ত তারা নিজ নিজ কিতাবের উপর এবং আল্লাহ পাকের এ কিতাব অর্থাৎ কুরআনের উপর ঈমান না আনবে। কিন্তু তাদের অবস্থাতো এই যে, যখন কুরআন অবতীর্ণ হয় তখন তাদের বিরোধিতা ও কুফর বাড়তে থাকে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি এ কাফিরদের প্রতি দুঃখ ও আফসোস করে তোমার জীবনকে কষ্টের মধ্যে নিক্ষেপ করো না। খ্রীষ্টান ও মাজুসীদের বেদ্বীন দলকে সাবেঈ বলা হয়। আর শুধুমাত্র মাজুসীদেরকেও সাবেঈ বলা হয়। এটা মাজুসীদের মত ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের মধ্যকার একটি দল ছিল। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তারা যরূর পাঠ করতো। তারা গায়ের কিবলার দিকে মুখ করে নামায পড়তো এবং ফেরেশতাদের পূজা করতো। অহাব (রঃ) বলেন যে, সাবেরা আল্লাহকে চিনতো। নিজেদের শরীয়ত অনুযায়ী তারা আমল করতো। তাদের মধ্যে কুফরের উৎপত্তি হয়নি। তারা ইরাক সংলগ্ন ভূমিতে বসবাস করতো। তাদেরকে ইয়াসা বলা হতো। তারা নবীদেরকে মানতো। প্রতি বছর তারা ত্রিশটি রোযা রাখতে এবং ইয়ামনের দিকে মুখ করে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তো। এছাড়া আরও উক্তি রয়েছে। পূর্ববর্তী দুটি বাক্যের পরে তাদেরকে উল্লেখ করা হয়েছে বলে (আরবী) -এর সাথে (আরবী) করা হয়েছে। এদের সবারই সম্পর্কে আল্লাহর পাক বলেন যে, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভকারী এবং নির্ভয় হবে ওরাই যারা আল্লাহ উপর এবং কিয়ামতের উপর সত্য ঈমান রাখে এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে। আর এটা সম্ভব নয়, যে পর্যন্ত এই শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা না হবে, যাকে সমস্ত দানব ও মানবের নিকট আল্লাহর রাসূল করে পাঠানো হয়েছে। সুতরাং যারা এ সর্বশেষ নবী (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে তারাই পরবর্তী জীবনের বিপদ আপদ থেকে নির্ভয় ও নিরাপদ থাকবে। আর দুনিয়ায় ছেড়ে যাওয়া লোভনীয় জিনিসের জন্যে তাদের কোনই দুঃখ ও আফসোস থাকবে না। সূরায়ে বাকারার তাফসীরে এ বাক্যের বিস্তারিত অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং এখানে তার পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।

আল-মায়িদা 5:69

৬৮-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বলছেন-ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানরা কোন ধর্মের উপরই নেই যে পর্যন্ত তারা নিজ নিজ কিতাবের উপর এবং আল্লাহ পাকের এ কিতাব অর্থাৎ কুরআনের উপর ঈমান না আনবে। কিন্তু তাদের অবস্থাতো এই যে, যখন কুরআন অবতীর্ণ হয় তখন তাদের বিরোধিতা ও কুফর বাড়তে থাকে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি এ কাফিরদের প্রতি দুঃখ ও আফসোস করে তোমার জীবনকে কষ্টের মধ্যে নিক্ষেপ করো না। খ্রীষ্টান ও মাজুসীদের বেদ্বীন দলকে সাবেঈ বলা হয়। আর শুধুমাত্র মাজুসীদেরকেও সাবেঈ বলা হয়। এটা মাজুসীদের মত ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের মধ্যকার একটি দল ছিল। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তারা যরূর পাঠ করতো। তারা গায়ের কিবলার দিকে মুখ করে নামায পড়তো এবং ফেরেশতাদের পূজা করতো। অহাব (রঃ) বলেন যে, সাবেরা আল্লাহকে চিনতো। নিজেদের শরীয়ত অনুযায়ী তারা আমল করতো। তাদের মধ্যে কুফরের উৎপত্তি হয়নি। তারা ইরাক সংলগ্ন ভূমিতে বসবাস করতো। তাদেরকে ইয়াসা বলা হতো। তারা নবীদেরকে মানতো। প্রতি বছর তারা ত্রিশটি রোযা রাখতে এবং ইয়ামনের দিকে মুখ করে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তো। এছাড়া আরও উক্তি রয়েছে। পূর্ববর্তী দুটি বাক্যের পরে তাদেরকে উল্লেখ করা হয়েছে বলে (আরবী) -এর সাথে (আরবী) করা হয়েছে। এদের সবারই সম্পর্কে আল্লাহর পাক বলেন যে, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভকারী এবং নির্ভয় হবে ওরাই যারা আল্লাহ উপর এবং কিয়ামতের উপর সত্য ঈমান রাখে এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে। আর এটা সম্ভব নয়, যে পর্যন্ত এই শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা না হবে, যাকে সমস্ত দানব ও মানবের নিকট আল্লাহর রাসূল করে পাঠানো হয়েছে। সুতরাং যারা এ সর্বশেষ নবী (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে তারাই পরবর্তী জীবনের বিপদ আপদ থেকে নির্ভয় ও নিরাপদ থাকবে। আর দুনিয়ায় ছেড়ে যাওয়া লোভনীয় জিনিসের জন্যে তাদের কোনই দুঃখ ও আফসোস থাকবে না। সূরায়ে বাকারার তাফসীরে এ বাক্যের বিস্তারিত অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং এখানে তার পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।

আল-মায়িদা 5:70

৭০-৭১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা ইয়াহুদী ও নাসারাদের নিকট ওয়াদা নিয়েছিলেন যে, তারা আল্লাহর আহকামের উপর আমল করবে এবং অহীর অনুসরণ করবে। কিন্তু তারা ঐ ওয়াদা ভেঙ্গে দেয় এবং নিজেদের প্রবৃত্তির চাহিদার পেছনে লেগে পড়ে! আল্লাহর কিতাবের যে কথা তারা নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে পায় তা মেনে নেয় এবং যা তাদের স্বার্থের প্রতিকূলে হয় তা পরিত্যাগ করে। শুধু এটুকুই নয়, বরং তারা রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলে এবং বহু রাসূলকে হত্যা করে ফেলে। কেননা, তারা তাদের কাছে যে আহকাম নিয়ে এসেছিলেন তা তাদের মতের বিপরীত ছিল।এতবড় পাপ করার পরেও তারা নিশ্চিন্ত থাকে এবং মনে করে নেয় যে, তাদের কোনই শাস্তি হবে না। কিন্তু তাদের ভীষণ আধ্যাত্মিক শাস্তি হয়। অর্থাৎ তাদেরকে হক অনুধাবন করা থেকে দূরে নিক্ষেপ করা হয় এবং অন্ধ ও বধির বানিয়ে দেয়া হয়। না তারা হককে শুনতে পায়, না ‘হিদায়াত’কে দেখতে পায়। কিন্তু তবুও আল্লাহ তাদের উপর দয়া করেন। আর এর পরেও তাদের অধিকাংশই ঐ রূপই থেকে যায়, অর্থাৎ তারা হক দর্শন থেকে অন্ধ এবং হক শ্রবণ থেকে বধির। আল্লাহ তাদের আমল সম্পর্কে অবহিত রয়েছেন। কাজেই কে কিসের যোগ্য তা তিনি ভালই জানেন।

আল-মায়িদা 5:71

৭০-৭১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা ইয়াহুদী ও নাসারাদের নিকট ওয়াদা নিয়েছিলেন যে, তারা আল্লাহর আহকামের উপর আমল করবে এবং অহীর অনুসরণ করবে। কিন্তু তারা ঐ ওয়াদা ভেঙ্গে দেয় এবং নিজেদের প্রবৃত্তির চাহিদার পেছনে লেগে পড়ে! আল্লাহর কিতাবের যে কথা তারা নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে পায় তা মেনে নেয় এবং যা তাদের স্বার্থের প্রতিকূলে হয় তা পরিত্যাগ করে। শুধু এটুকুই নয়, বরং তারা রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলে এবং বহু রাসূলকে হত্যা করে ফেলে। কেননা, তারা তাদের কাছে যে আহকাম নিয়ে এসেছিলেন তা তাদের মতের বিপরীত ছিল।এতবড় পাপ করার পরেও তারা নিশ্চিন্ত থাকে এবং মনে করে নেয় যে, তাদের কোনই শাস্তি হবে না। কিন্তু তাদের ভীষণ আধ্যাত্মিক শাস্তি হয়। অর্থাৎ তাদেরকে হক অনুধাবন করা থেকে দূরে নিক্ষেপ করা হয় এবং অন্ধ ও বধির বানিয়ে দেয়া হয়। না তারা হককে শুনতে পায়, না ‘হিদায়াত’কে দেখতে পায়। কিন্তু তবুও আল্লাহ তাদের উপর দয়া করেন। আর এর পরেও তাদের অধিকাংশই ঐ রূপই থেকে যায়, অর্থাৎ তারা হক দর্শন থেকে অন্ধ এবং হক শ্রবণ থেকে বধির। আল্লাহ তাদের আমল সম্পর্কে অবহিত রয়েছেন। কাজেই কে কিসের যোগ্য তা তিনি ভালই জানেন।

আল-মায়িদা 5:72

৭২-৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে খ্রীষ্টানদের দলগুলোর অর্থাৎ মালেকিয়্যাহ, ইয়াকুবিয়্যাহ এবং নাসতুরিয়্যাহদের কুফরের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা মাসীহকেই (আঃ) প্রভু বলে মেনে থাকে। আল্লাহ তাদের এ উক্তি থেকে সম্পূর্ণরূপে পাক ও পবিত্র। মাসীহ (আঃ) তো আল্লাহর গোলাম ছিলেন। পার্থিব জগতে পা রেখে দোলনাতেই তাঁর মুখের প্রথম কথা ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর গোলাম বা দাস। (১৯:৩০) “আমি আল্লাহ বা আল্লাহর পুত্র”-এ কথা তো তিনি বলেননি! বরং তিনি স্বীয় দাসত্বের কথা অকপটে স্বীকার করেছিলেন। সাথে সাথে তিনি বলেছিলেনঃ “আমার এবং তোমাদের সকলের প্রভু একমাত্র আল্লাহ। তাঁরই ইবাদত কর। সরল ও সঠিক পথ এটাই।' যৌবনের পরবর্তী বয়সেও বলেছিলেনঃ “তোমরা আল্লাহরই ইবাদত কর। যারা তাঁর সাথে অন্য কারও ইবাদত করে তাদের জন্যে জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম ওয়াজিব।” যেমন কুরআন পাকের অন্য আয়াতে রয়েছে- “আল্লাহ শিরকের গুনাহ কখনও মাফ করেন না।” জাহান্নামবাসীরা যখন জান্নাতবাসীদের কাছে খাদ্য ও পানি চাইবে তখন তারা এ উত্তরই দেবে যে, এ দুটি জিনিস আল্লাহ কাফিরদের উপর হারাম করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষকদের দ্বারা মুসলমানদের মধ্যে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, শুধু মুমিন ও মুসলমানরাই জান্নাতে যাবে। সূরায়ে নিসার (আরবী) (৪:১১৬)-এ আয়াতের তাফসীরে এ হাদীসটিও বর্ণনা করা হয়েছে যাতে রয়েছে যে, পাপের তিনটি শ্রেণী রয়েছে। এ তিন শ্রেণীর মধ্যে এক শ্রেণী হচ্ছে ওটা যা আল্লাহ তা'আলা কখনও ক্ষমা করবেন না। সেই পাপটি হচ্ছে আল্লাহর সাথে শিরক করা! হযরত মাসীহ্ (আঃ) স্বীয় কওমের মধ্যে এ ওয়ায করেছিলেন যে, এরূপ অন্যায়কারী মুশরিকদের কোন সাহায্যাকারী হবে না। এখন ঐ লোকদের কুফরীর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা আল্লাহকে তিন মা'বুদের মধ্যে এক মা’রূদ মনে করতো। ইয়াহুদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-কে এবং খ্রীষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলতো। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) এবং আল্লাহকে তিন মা’ৰূদে মধ্যে এক মা'বুদ মনে করতো। কিন্তু এ আয়াতটি শুধু খ্রীষ্টানদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। তারা পিতা, পুত্র এবং তাঁর। সেই কালিমাকে মা'বুদ মানতো যা পিতার পক্ষ থেকে পুত্রের দিকে ছিল। অতঃপর এ তিনকে নির্ধারিত করার ব্যাপারেও খুব বড় রকমের মতানৈক্য ছিল এবং প্রত্যেক দল একে অপরকে কাফির বলতো। সত্য কথা এই যে, তারা সবাই কাফির ছিল। তারা হযরত মাসীহ (আঃ)-কে, তার মাকে এবং আল্লাহকে মিলিয়ে দিয়ে আল্লাহ মানতো। এ সূরার শেষে এরই ব কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলবেনতুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে-তোমরা আল্লাহকে ছাড়াও আমাকে ও আমার মাকে আল্লাহ বলে স্বীকার কর?' তিনি তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করবেন এবং নিজের না জানার কথা ও নিরপরাধ হওয়ার কথা প্রকাশ করবেন। সবচেয়ে বেশী প্রকাশ্য উক্তি হচ্ছে এটাই। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রকৃতপক্ষে ইবাদতের যোগ্য মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউই নয়। সমস্ত সৃষ্টিজগতের প্রকৃত মা'বূদ তিনিই। যদি এরা কুফরীপূর্ণ উক্তি থেকে বিরত না থাকে তবে নিশ্চিতরূপে এরা ধ্বংসাত্মক শাস্তির শিকারে পরিণত হবে।অতঃপর আল্লাহ স্বীয় দয়া, অনুকম্পা, স্নেহ ও ভালবাসার বর্ণনা দিচ্ছেন এবং তাদের এতো কঠিন অপরাধ ও এতো ভীষণ নির্লজ্জতা ও মিথ্যারোপ সত্ত্বেও তাদেরকে স্বীয় রহমতের দাওয়াত দিচ্ছেন এবং বলছেনঃ এখনও যদি তোমরা আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হও তবে তোমাদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দেবো। এবং তোমাদেরকে আমার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দেবো।হযরত মাসীহ (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূলই ছিলেন। তাঁর মত রাসূল তাঁর পূর্বেও অতীত হয়েছেন। যেমন তিনি বলেন, (আরবী) অর্থাৎ সে একজন, গোলামই ছিল। (৪৩:৫৯) তবে তিনি তাঁর উপর স্বীয় রহমত নাযিল করেছিলেন এবং বানী ইসরাঈলের জন্যে তাঁর একটি নির্দেশ বানিয়েছিলেন। তাঁর মা মুমিন ও সত্যবাদিনী ছিলেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তিনি নবী ছিলেন না। কেননা, এটা হচ্ছে বিশেষণ বা গুণ বর্ণনার স্থান। সুতরাং তিনি যে গুণের অধিকারিণী ছিলেন তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যদি তিনি নবুওয়াতের অধিকারিণী হতেন তবে এ স্থলে ওটার বর্ণনা দেয়া খুবই জরুরী ছিল। ইবনে হাম (রঃ) প্রমুখ মনীষীর ধারণা এই যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর মা হযরত মূসা (আঃ)-এর মা এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর মা নবী ছিলেন এবং তারা এর দলীল দিতে গিয়ে বলেন, ফেরেশতাগণ হযরত সারা (আঃ) এবং হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে সম্বোধন করেন এবং তাদের সাথে কথা বলেছেন। আর হযরত মূসা (আঃ)-এর মাতী সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন- (আরবী) অর্থাৎ “আমি মূসার মায়ের কাছে অহী পাঠিয়েছিলাম-তুমি তাকে দুধ পান করাও। (২৮:৭) কিন্তু জমহুরের মাযহাব এর উল্টো। তারা বলেন যে, নবুওয়াত পুরুষ লোকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যেমন কুরআন পাকে আছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমার পূর্বে আমি গ্রামবাসীদের মধ্য হতে পুরুষ লোকদেরকেই রিসালাত দান করেছিলাম।'(২১:৭) আবুল হাসান আশআরী (রঃ) তো এর উপর ইজমা হওয়ার কথা নকল করেছেন। এরপর ইরশাদ হচ্ছে-মাতা ও পুত্র উভয়ে পানাহারের মুখাপেক্ষী ছিল। আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, যা ভেতরে যাবে তা বেরিয়ে আসবে। অর্থাৎ তাদের প্রস্রাব পায়খানাও হতো। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, তাঁরা অন্যদের মত বান্দাই ছিলেন। খোদায়ী গুণ তাদের মধ্যে ছিল না। দেখো তো! আমি কিভাবে খোলাখুলি তাদের সামনে আমার দলীল প্রমাণাদি পেশ করছি! আবার লক্ষ্য কর যে, এতো দলীল প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কিভাবে তারা বিভ্রান্ত হয়ে এদিক ওদিক ফিরছে! কেমন ভ্রষ্ট মাযহাবের উপর তারা রয়েছে! কেমন জঘন্য ও দলীল প্রমাণহীন উক্তি তারা করছে!

আল-মায়িদা 5:73

৭২-৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে খ্রীষ্টানদের দলগুলোর অর্থাৎ মালেকিয়্যাহ, ইয়াকুবিয়্যাহ এবং নাসতুরিয়্যাহদের কুফরের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা মাসীহকেই (আঃ) প্রভু বলে মেনে থাকে। আল্লাহ তাদের এ উক্তি থেকে সম্পূর্ণরূপে পাক ও পবিত্র। মাসীহ (আঃ) তো আল্লাহর গোলাম ছিলেন। পার্থিব জগতে পা রেখে দোলনাতেই তাঁর মুখের প্রথম কথা ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর গোলাম বা দাস। (১৯:৩০) “আমি আল্লাহ বা আল্লাহর পুত্র”-এ কথা তো তিনি বলেননি! বরং তিনি স্বীয় দাসত্বের কথা অকপটে স্বীকার করেছিলেন। সাথে সাথে তিনি বলেছিলেনঃ “আমার এবং তোমাদের সকলের প্রভু একমাত্র আল্লাহ। তাঁরই ইবাদত কর। সরল ও সঠিক পথ এটাই।' যৌবনের পরবর্তী বয়সেও বলেছিলেনঃ “তোমরা আল্লাহরই ইবাদত কর। যারা তাঁর সাথে অন্য কারও ইবাদত করে তাদের জন্যে জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম ওয়াজিব।” যেমন কুরআন পাকের অন্য আয়াতে রয়েছে- “আল্লাহ শিরকের গুনাহ কখনও মাফ করেন না।” জাহান্নামবাসীরা যখন জান্নাতবাসীদের কাছে খাদ্য ও পানি চাইবে তখন তারা এ উত্তরই দেবে যে, এ দুটি জিনিস আল্লাহ কাফিরদের উপর হারাম করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষকদের দ্বারা মুসলমানদের মধ্যে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, শুধু মুমিন ও মুসলমানরাই জান্নাতে যাবে। সূরায়ে নিসার (আরবী) (৪:১১৬)-এ আয়াতের তাফসীরে এ হাদীসটিও বর্ণনা করা হয়েছে যাতে রয়েছে যে, পাপের তিনটি শ্রেণী রয়েছে। এ তিন শ্রেণীর মধ্যে এক শ্রেণী হচ্ছে ওটা যা আল্লাহ তা'আলা কখনও ক্ষমা করবেন না। সেই পাপটি হচ্ছে আল্লাহর সাথে শিরক করা! হযরত মাসীহ্ (আঃ) স্বীয় কওমের মধ্যে এ ওয়ায করেছিলেন যে, এরূপ অন্যায়কারী মুশরিকদের কোন সাহায্যাকারী হবে না। এখন ঐ লোকদের কুফরীর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা আল্লাহকে তিন মা'বুদের মধ্যে এক মা’রূদ মনে করতো। ইয়াহুদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-কে এবং খ্রীষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলতো। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) এবং আল্লাহকে তিন মা’ৰূদে মধ্যে এক মা'বুদ মনে করতো। কিন্তু এ আয়াতটি শুধু খ্রীষ্টানদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। তারা পিতা, পুত্র এবং তাঁর। সেই কালিমাকে মা'বুদ মানতো যা পিতার পক্ষ থেকে পুত্রের দিকে ছিল। অতঃপর এ তিনকে নির্ধারিত করার ব্যাপারেও খুব বড় রকমের মতানৈক্য ছিল এবং প্রত্যেক দল একে অপরকে কাফির বলতো। সত্য কথা এই যে, তারা সবাই কাফির ছিল। তারা হযরত মাসীহ (আঃ)-কে, তার মাকে এবং আল্লাহকে মিলিয়ে দিয়ে আল্লাহ মানতো। এ সূরার শেষে এরই ব কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলবেনতুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে-তোমরা আল্লাহকে ছাড়াও আমাকে ও আমার মাকে আল্লাহ বলে স্বীকার কর?' তিনি তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করবেন এবং নিজের না জানার কথা ও নিরপরাধ হওয়ার কথা প্রকাশ করবেন। সবচেয়ে বেশী প্রকাশ্য উক্তি হচ্ছে এটাই। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রকৃতপক্ষে ইবাদতের যোগ্য মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউই নয়। সমস্ত সৃষ্টিজগতের প্রকৃত মা'বূদ তিনিই। যদি এরা কুফরীপূর্ণ উক্তি থেকে বিরত না থাকে তবে নিশ্চিতরূপে এরা ধ্বংসাত্মক শাস্তির শিকারে পরিণত হবে।অতঃপর আল্লাহ স্বীয় দয়া, অনুকম্পা, স্নেহ ও ভালবাসার বর্ণনা দিচ্ছেন এবং তাদের এতো কঠিন অপরাধ ও এতো ভীষণ নির্লজ্জতা ও মিথ্যারোপ সত্ত্বেও তাদেরকে স্বীয় রহমতের দাওয়াত দিচ্ছেন এবং বলছেনঃ এখনও যদি তোমরা আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হও তবে তোমাদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দেবো। এবং তোমাদেরকে আমার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দেবো।হযরত মাসীহ (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূলই ছিলেন। তাঁর মত রাসূল তাঁর পূর্বেও অতীত হয়েছেন। যেমন তিনি বলেন, (আরবী) অর্থাৎ সে একজন, গোলামই ছিল। (৪৩:৫৯) তবে তিনি তাঁর উপর স্বীয় রহমত নাযিল করেছিলেন এবং বানী ইসরাঈলের জন্যে তাঁর একটি নির্দেশ বানিয়েছিলেন। তাঁর মা মুমিন ও সত্যবাদিনী ছিলেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তিনি নবী ছিলেন না। কেননা, এটা হচ্ছে বিশেষণ বা গুণ বর্ণনার স্থান। সুতরাং তিনি যে গুণের অধিকারিণী ছিলেন তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যদি তিনি নবুওয়াতের অধিকারিণী হতেন তবে এ স্থলে ওটার বর্ণনা দেয়া খুবই জরুরী ছিল। ইবনে হাম (রঃ) প্রমুখ মনীষীর ধারণা এই যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর মা হযরত মূসা (আঃ)-এর মা এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর মা নবী ছিলেন এবং তারা এর দলীল দিতে গিয়ে বলেন, ফেরেশতাগণ হযরত সারা (আঃ) এবং হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে সম্বোধন করেন এবং তাদের সাথে কথা বলেছেন। আর হযরত মূসা (আঃ)-এর মাতী সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন- (আরবী) অর্থাৎ “আমি মূসার মায়ের কাছে অহী পাঠিয়েছিলাম-তুমি তাকে দুধ পান করাও। (২৮:৭) কিন্তু জমহুরের মাযহাব এর উল্টো। তারা বলেন যে, নবুওয়াত পুরুষ লোকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যেমন কুরআন পাকে আছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমার পূর্বে আমি গ্রামবাসীদের মধ্য হতে পুরুষ লোকদেরকেই রিসালাত দান করেছিলাম।'(২১:৭) আবুল হাসান আশআরী (রঃ) তো এর উপর ইজমা হওয়ার কথা নকল করেছেন। এরপর ইরশাদ হচ্ছে-মাতা ও পুত্র উভয়ে পানাহারের মুখাপেক্ষী ছিল। আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, যা ভেতরে যাবে তা বেরিয়ে আসবে। অর্থাৎ তাদের প্রস্রাব পায়খানাও হতো। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, তাঁরা অন্যদের মত বান্দাই ছিলেন। খোদায়ী গুণ তাদের মধ্যে ছিল না। দেখো তো! আমি কিভাবে খোলাখুলি তাদের সামনে আমার দলীল প্রমাণাদি পেশ করছি! আবার লক্ষ্য কর যে, এতো দলীল প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কিভাবে তারা বিভ্রান্ত হয়ে এদিক ওদিক ফিরছে! কেমন ভ্রষ্ট মাযহাবের উপর তারা রয়েছে! কেমন জঘন্য ও দলীল প্রমাণহীন উক্তি তারা করছে!

আল-মায়িদা 5:74

৭২-৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে খ্রীষ্টানদের দলগুলোর অর্থাৎ মালেকিয়্যাহ, ইয়াকুবিয়্যাহ এবং নাসতুরিয়্যাহদের কুফরের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা মাসীহকেই (আঃ) প্রভু বলে মেনে থাকে। আল্লাহ তাদের এ উক্তি থেকে সম্পূর্ণরূপে পাক ও পবিত্র। মাসীহ (আঃ) তো আল্লাহর গোলাম ছিলেন। পার্থিব জগতে পা রেখে দোলনাতেই তাঁর মুখের প্রথম কথা ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর গোলাম বা দাস। (১৯:৩০) “আমি আল্লাহ বা আল্লাহর পুত্র”-এ কথা তো তিনি বলেননি! বরং তিনি স্বীয় দাসত্বের কথা অকপটে স্বীকার করেছিলেন। সাথে সাথে তিনি বলেছিলেনঃ “আমার এবং তোমাদের সকলের প্রভু একমাত্র আল্লাহ। তাঁরই ইবাদত কর। সরল ও সঠিক পথ এটাই।' যৌবনের পরবর্তী বয়সেও বলেছিলেনঃ “তোমরা আল্লাহরই ইবাদত কর। যারা তাঁর সাথে অন্য কারও ইবাদত করে তাদের জন্যে জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম ওয়াজিব।” যেমন কুরআন পাকের অন্য আয়াতে রয়েছে- “আল্লাহ শিরকের গুনাহ কখনও মাফ করেন না।” জাহান্নামবাসীরা যখন জান্নাতবাসীদের কাছে খাদ্য ও পানি চাইবে তখন তারা এ উত্তরই দেবে যে, এ দুটি জিনিস আল্লাহ কাফিরদের উপর হারাম করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষকদের দ্বারা মুসলমানদের মধ্যে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, শুধু মুমিন ও মুসলমানরাই জান্নাতে যাবে। সূরায়ে নিসার (আরবী) (৪:১১৬)-এ আয়াতের তাফসীরে এ হাদীসটিও বর্ণনা করা হয়েছে যাতে রয়েছে যে, পাপের তিনটি শ্রেণী রয়েছে। এ তিন শ্রেণীর মধ্যে এক শ্রেণী হচ্ছে ওটা যা আল্লাহ তা'আলা কখনও ক্ষমা করবেন না। সেই পাপটি হচ্ছে আল্লাহর সাথে শিরক করা! হযরত মাসীহ্ (আঃ) স্বীয় কওমের মধ্যে এ ওয়ায করেছিলেন যে, এরূপ অন্যায়কারী মুশরিকদের কোন সাহায্যাকারী হবে না। এখন ঐ লোকদের কুফরীর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা আল্লাহকে তিন মা'বুদের মধ্যে এক মা’রূদ মনে করতো। ইয়াহুদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-কে এবং খ্রীষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলতো। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) এবং আল্লাহকে তিন মা’ৰূদে মধ্যে এক মা'বুদ মনে করতো। কিন্তু এ আয়াতটি শুধু খ্রীষ্টানদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। তারা পিতা, পুত্র এবং তাঁর। সেই কালিমাকে মা'বুদ মানতো যা পিতার পক্ষ থেকে পুত্রের দিকে ছিল। অতঃপর এ তিনকে নির্ধারিত করার ব্যাপারেও খুব বড় রকমের মতানৈক্য ছিল এবং প্রত্যেক দল একে অপরকে কাফির বলতো। সত্য কথা এই যে, তারা সবাই কাফির ছিল। তারা হযরত মাসীহ (আঃ)-কে, তার মাকে এবং আল্লাহকে মিলিয়ে দিয়ে আল্লাহ মানতো। এ সূরার শেষে এরই ব কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলবেনতুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে-তোমরা আল্লাহকে ছাড়াও আমাকে ও আমার মাকে আল্লাহ বলে স্বীকার কর?' তিনি তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করবেন এবং নিজের না জানার কথা ও নিরপরাধ হওয়ার কথা প্রকাশ করবেন। সবচেয়ে বেশী প্রকাশ্য উক্তি হচ্ছে এটাই। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রকৃতপক্ষে ইবাদতের যোগ্য মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউই নয়। সমস্ত সৃষ্টিজগতের প্রকৃত মা'বূদ তিনিই। যদি এরা কুফরীপূর্ণ উক্তি থেকে বিরত না থাকে তবে নিশ্চিতরূপে এরা ধ্বংসাত্মক শাস্তির শিকারে পরিণত হবে।অতঃপর আল্লাহ স্বীয় দয়া, অনুকম্পা, স্নেহ ও ভালবাসার বর্ণনা দিচ্ছেন এবং তাদের এতো কঠিন অপরাধ ও এতো ভীষণ নির্লজ্জতা ও মিথ্যারোপ সত্ত্বেও তাদেরকে স্বীয় রহমতের দাওয়াত দিচ্ছেন এবং বলছেনঃ এখনও যদি তোমরা আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হও তবে তোমাদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দেবো। এবং তোমাদেরকে আমার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দেবো।হযরত মাসীহ (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূলই ছিলেন। তাঁর মত রাসূল তাঁর পূর্বেও অতীত হয়েছেন। যেমন তিনি বলেন, (আরবী) অর্থাৎ সে একজন, গোলামই ছিল। (৪৩:৫৯) তবে তিনি তাঁর উপর স্বীয় রহমত নাযিল করেছিলেন এবং বানী ইসরাঈলের জন্যে তাঁর একটি নির্দেশ বানিয়েছিলেন। তাঁর মা মুমিন ও সত্যবাদিনী ছিলেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তিনি নবী ছিলেন না। কেননা, এটা হচ্ছে বিশেষণ বা গুণ বর্ণনার স্থান। সুতরাং তিনি যে গুণের অধিকারিণী ছিলেন তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যদি তিনি নবুওয়াতের অধিকারিণী হতেন তবে এ স্থলে ওটার বর্ণনা দেয়া খুবই জরুরী ছিল। ইবনে হাম (রঃ) প্রমুখ মনীষীর ধারণা এই যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর মা হযরত মূসা (আঃ)-এর মা এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর মা নবী ছিলেন এবং তারা এর দলীল দিতে গিয়ে বলেন, ফেরেশতাগণ হযরত সারা (আঃ) এবং হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে সম্বোধন করেন এবং তাদের সাথে কথা বলেছেন। আর হযরত মূসা (আঃ)-এর মাতী সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন- (আরবী) অর্থাৎ “আমি মূসার মায়ের কাছে অহী পাঠিয়েছিলাম-তুমি তাকে দুধ পান করাও। (২৮:৭) কিন্তু জমহুরের মাযহাব এর উল্টো। তারা বলেন যে, নবুওয়াত পুরুষ লোকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যেমন কুরআন পাকে আছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমার পূর্বে আমি গ্রামবাসীদের মধ্য হতে পুরুষ লোকদেরকেই রিসালাত দান করেছিলাম।'(২১:৭) আবুল হাসান আশআরী (রঃ) তো এর উপর ইজমা হওয়ার কথা নকল করেছেন। এরপর ইরশাদ হচ্ছে-মাতা ও পুত্র উভয়ে পানাহারের মুখাপেক্ষী ছিল। আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, যা ভেতরে যাবে তা বেরিয়ে আসবে। অর্থাৎ তাদের প্রস্রাব পায়খানাও হতো। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, তাঁরা অন্যদের মত বান্দাই ছিলেন। খোদায়ী গুণ তাদের মধ্যে ছিল না। দেখো তো! আমি কিভাবে খোলাখুলি তাদের সামনে আমার দলীল প্রমাণাদি পেশ করছি! আবার লক্ষ্য কর যে, এতো দলীল প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কিভাবে তারা বিভ্রান্ত হয়ে এদিক ওদিক ফিরছে! কেমন ভ্রষ্ট মাযহাবের উপর তারা রয়েছে! কেমন জঘন্য ও দলীল প্রমাণহীন উক্তি তারা করছে!

আল-মায়িদা 5:75

৭২-৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে খ্রীষ্টানদের দলগুলোর অর্থাৎ মালেকিয়্যাহ, ইয়াকুবিয়্যাহ এবং নাসতুরিয়্যাহদের কুফরের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা মাসীহকেই (আঃ) প্রভু বলে মেনে থাকে। আল্লাহ তাদের এ উক্তি থেকে সম্পূর্ণরূপে পাক ও পবিত্র। মাসীহ (আঃ) তো আল্লাহর গোলাম ছিলেন। পার্থিব জগতে পা রেখে দোলনাতেই তাঁর মুখের প্রথম কথা ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর গোলাম বা দাস। (১৯:৩০) “আমি আল্লাহ বা আল্লাহর পুত্র”-এ কথা তো তিনি বলেননি! বরং তিনি স্বীয় দাসত্বের কথা অকপটে স্বীকার করেছিলেন। সাথে সাথে তিনি বলেছিলেনঃ “আমার এবং তোমাদের সকলের প্রভু একমাত্র আল্লাহ। তাঁরই ইবাদত কর। সরল ও সঠিক পথ এটাই।' যৌবনের পরবর্তী বয়সেও বলেছিলেনঃ “তোমরা আল্লাহরই ইবাদত কর। যারা তাঁর সাথে অন্য কারও ইবাদত করে তাদের জন্যে জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম ওয়াজিব।” যেমন কুরআন পাকের অন্য আয়াতে রয়েছে- “আল্লাহ শিরকের গুনাহ কখনও মাফ করেন না।” জাহান্নামবাসীরা যখন জান্নাতবাসীদের কাছে খাদ্য ও পানি চাইবে তখন তারা এ উত্তরই দেবে যে, এ দুটি জিনিস আল্লাহ কাফিরদের উপর হারাম করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষকদের দ্বারা মুসলমানদের মধ্যে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, শুধু মুমিন ও মুসলমানরাই জান্নাতে যাবে। সূরায়ে নিসার (আরবী) (৪:১১৬)-এ আয়াতের তাফসীরে এ হাদীসটিও বর্ণনা করা হয়েছে যাতে রয়েছে যে, পাপের তিনটি শ্রেণী রয়েছে। এ তিন শ্রেণীর মধ্যে এক শ্রেণী হচ্ছে ওটা যা আল্লাহ তা'আলা কখনও ক্ষমা করবেন না। সেই পাপটি হচ্ছে আল্লাহর সাথে শিরক করা! হযরত মাসীহ্ (আঃ) স্বীয় কওমের মধ্যে এ ওয়ায করেছিলেন যে, এরূপ অন্যায়কারী মুশরিকদের কোন সাহায্যাকারী হবে না। এখন ঐ লোকদের কুফরীর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা আল্লাহকে তিন মা'বুদের মধ্যে এক মা’রূদ মনে করতো। ইয়াহুদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-কে এবং খ্রীষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলতো। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) এবং আল্লাহকে তিন মা’ৰূদে মধ্যে এক মা'বুদ মনে করতো। কিন্তু এ আয়াতটি শুধু খ্রীষ্টানদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। তারা পিতা, পুত্র এবং তাঁর। সেই কালিমাকে মা'বুদ মানতো যা পিতার পক্ষ থেকে পুত্রের দিকে ছিল। অতঃপর এ তিনকে নির্ধারিত করার ব্যাপারেও খুব বড় রকমের মতানৈক্য ছিল এবং প্রত্যেক দল একে অপরকে কাফির বলতো। সত্য কথা এই যে, তারা সবাই কাফির ছিল। তারা হযরত মাসীহ (আঃ)-কে, তার মাকে এবং আল্লাহকে মিলিয়ে দিয়ে আল্লাহ মানতো। এ সূরার শেষে এরই ব কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলবেনতুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে-তোমরা আল্লাহকে ছাড়াও আমাকে ও আমার মাকে আল্লাহ বলে স্বীকার কর?' তিনি তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করবেন এবং নিজের না জানার কথা ও নিরপরাধ হওয়ার কথা প্রকাশ করবেন। সবচেয়ে বেশী প্রকাশ্য উক্তি হচ্ছে এটাই। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রকৃতপক্ষে ইবাদতের যোগ্য মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউই নয়। সমস্ত সৃষ্টিজগতের প্রকৃত মা'বূদ তিনিই। যদি এরা কুফরীপূর্ণ উক্তি থেকে বিরত না থাকে তবে নিশ্চিতরূপে এরা ধ্বংসাত্মক শাস্তির শিকারে পরিণত হবে।অতঃপর আল্লাহ স্বীয় দয়া, অনুকম্পা, স্নেহ ও ভালবাসার বর্ণনা দিচ্ছেন এবং তাদের এতো কঠিন অপরাধ ও এতো ভীষণ নির্লজ্জতা ও মিথ্যারোপ সত্ত্বেও তাদেরকে স্বীয় রহমতের দাওয়াত দিচ্ছেন এবং বলছেনঃ এখনও যদি তোমরা আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হও তবে তোমাদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দেবো। এবং তোমাদেরকে আমার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দেবো।হযরত মাসীহ (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূলই ছিলেন। তাঁর মত রাসূল তাঁর পূর্বেও অতীত হয়েছেন। যেমন তিনি বলেন, (আরবী) অর্থাৎ সে একজন, গোলামই ছিল। (৪৩:৫৯) তবে তিনি তাঁর উপর স্বীয় রহমত নাযিল করেছিলেন এবং বানী ইসরাঈলের জন্যে তাঁর একটি নির্দেশ বানিয়েছিলেন। তাঁর মা মুমিন ও সত্যবাদিনী ছিলেন। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তিনি নবী ছিলেন না। কেননা, এটা হচ্ছে বিশেষণ বা গুণ বর্ণনার স্থান। সুতরাং তিনি যে গুণের অধিকারিণী ছিলেন তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যদি তিনি নবুওয়াতের অধিকারিণী হতেন তবে এ স্থলে ওটার বর্ণনা দেয়া খুবই জরুরী ছিল। ইবনে হাম (রঃ) প্রমুখ মনীষীর ধারণা এই যে, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর মা হযরত মূসা (আঃ)-এর মা এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর মা নবী ছিলেন এবং তারা এর দলীল দিতে গিয়ে বলেন, ফেরেশতাগণ হযরত সারা (আঃ) এবং হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে সম্বোধন করেন এবং তাদের সাথে কথা বলেছেন। আর হযরত মূসা (আঃ)-এর মাতী সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন- (আরবী) অর্থাৎ “আমি মূসার মায়ের কাছে অহী পাঠিয়েছিলাম-তুমি তাকে দুধ পান করাও। (২৮:৭) কিন্তু জমহুরের মাযহাব এর উল্টো। তারা বলেন যে, নবুওয়াত পুরুষ লোকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যেমন কুরআন পাকে আছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘তোমার পূর্বে আমি গ্রামবাসীদের মধ্য হতে পুরুষ লোকদেরকেই রিসালাত দান করেছিলাম।'(২১:৭) আবুল হাসান আশআরী (রঃ) তো এর উপর ইজমা হওয়ার কথা নকল করেছেন। এরপর ইরশাদ হচ্ছে-মাতা ও পুত্র উভয়ে পানাহারের মুখাপেক্ষী ছিল। আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, যা ভেতরে যাবে তা বেরিয়ে আসবে। অর্থাৎ তাদের প্রস্রাব পায়খানাও হতো। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, তাঁরা অন্যদের মত বান্দাই ছিলেন। খোদায়ী গুণ তাদের মধ্যে ছিল না। দেখো তো! আমি কিভাবে খোলাখুলি তাদের সামনে আমার দলীল প্রমাণাদি পেশ করছি! আবার লক্ষ্য কর যে, এতো দলীল প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কিভাবে তারা বিভ্রান্ত হয়ে এদিক ওদিক ফিরছে! কেমন ভ্রষ্ট মাযহাবের উপর তারা রয়েছে! কেমন জঘন্য ও দলীল প্রমাণহীন উক্তি তারা করছে!

আল-মায়িদা 5:76

৭৬-৭৭ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহকে ছেড়ে বাতিল মা’রূদগুলোর ইবাদত করতে নিষেধ করা হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা নবী (সঃ)-কে বলছেন- এসব লোককে বলে দাও–যারা তোমাদের কোন ক্ষতি করার এবং উপকার করার কোনই ক্ষমতা রাখে না, তাদের তোমরা কেন পূজা করছো? যিনি সবকিছু শুনেন ও সবকিছুর খবর রাখেন, সেই আল্লাহকে ছেড়ে দিয়ে যাদের শুনবার, দেখবার এবং উপকার ও অপকার করবার কোনই ক্ষমতা নেই, তাদের অনুসরণ করা কতই না নির্বুদ্ধিতার কাজ! হে আহলে কিতাব! তোমরা হক ও সত্যের সীমা ছাড়িয়ে যেয়ো না। যার যতটুকু সম্মান করার নির্দেশ রয়েছে তার ততটুকুই সম্মান কর। মানুষের মধ্যে যাদেরকে আল্লাহ নবুওয়াত দান করেছেন তাদেরকে নবুওয়াতের মর্যাদা থেকে বাড়িয়ে আল্লাহর মর্যাদায় পৌছিয়ে দিয়ো না। যেমন তোমরা মাসীহ (আঃ)-এর ব্যাপার ভুল করছে। এর একমাত্র কারণ এটাই যে, তোমরা তোমাদের পীর, মুরশিদ, উস্তাদ এবং ইমামদের পিছনে লেগে পড়েছে। তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট এবং অনুসারীদেরকেও করেছে পথভ্রষ্ট। বহু দিন হতে সরল ও ন্যায়ের পথকে ছেড়ে দিয়েছে এবং ভ্রান্তি ও বিদআতের মধ্যে জড়িত হয়ে পড়েছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, তাদের মধ্যে একটি লোক ধর্মের খুবই পাবন্দ ছিল। কিছুদিন পর শয়তান তাকে পথভ্রষ্ট করে দেয়। সে তাকে বলে, “আগের লোকেরা যা করে গেছে তুমিও তো তাই করছে। এতে কি হবে? এর দ্বারা না জনগণের মধ্যে তোমার কোন মর্যাদা লাভ হবে, না তোমার কোন খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। বরং একটা নতুন কিছু আবিষ্কার কর এবং জনগণের মধ্যে তা ছড়িয়ে দাও। তাহলে দেখতে পাবে যে, তোমার খ্যাতি কিরূপে ছড়িয়ে পড়ছে এবং কিভাবে স্থানে স্থানে তোমার সম্পর্কে আলোচনা চলছে।” সুতরাং সে তার কথা মত তা-ই করলো। তার ঐ বিদআতগুলো জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো এবং বহু যুগ পর্যন্ত লোকেরা তার অন্ধ অনুকরণ করতে থাকলো। এখন হতে সে খুবই লজ্জিত হলো এবং সালতানাত ও রাজত্ব পরিত্যাগ করলো। তারপর নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হয়ে পড়লো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে জানিয়ে দিলেন-“তুমি যদি শুধু আমারই ব্যাপারে ভুল ও অপরাধ করতে তবে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিতাম। কিন্তু তুমি সাধারণ লোকের আমল নষ্ট করে দিয়েছে এবং তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে ভ্রান্তির পথে লাগিয়ে দিয়েছে। সেই পথে চলতে চলতে তারা মৃত্যুবরণ করেছে। তাদের পাপের বোঝা তোমার উপর থেকে কিরূপে সরতে পারে? সুতরাং তোমার তাওবা কবুল করা হবে না।” এ ধরনের লোকদের ব্যাপারে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।

আল-মায়িদা 5:77

৭৬-৭৭ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহকে ছেড়ে বাতিল মা’রূদগুলোর ইবাদত করতে নিষেধ করা হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা নবী (সঃ)-কে বলছেন- এসব লোককে বলে দাও–যারা তোমাদের কোন ক্ষতি করার এবং উপকার করার কোনই ক্ষমতা রাখে না, তাদের তোমরা কেন পূজা করছো? যিনি সবকিছু শুনেন ও সবকিছুর খবর রাখেন, সেই আল্লাহকে ছেড়ে দিয়ে যাদের শুনবার, দেখবার এবং উপকার ও অপকার করবার কোনই ক্ষমতা নেই, তাদের অনুসরণ করা কতই না নির্বুদ্ধিতার কাজ! হে আহলে কিতাব! তোমরা হক ও সত্যের সীমা ছাড়িয়ে যেয়ো না। যার যতটুকু সম্মান করার নির্দেশ রয়েছে তার ততটুকুই সম্মান কর। মানুষের মধ্যে যাদেরকে আল্লাহ নবুওয়াত দান করেছেন তাদেরকে নবুওয়াতের মর্যাদা থেকে বাড়িয়ে আল্লাহর মর্যাদায় পৌছিয়ে দিয়ো না। যেমন তোমরা মাসীহ (আঃ)-এর ব্যাপার ভুল করছে। এর একমাত্র কারণ এটাই যে, তোমরা তোমাদের পীর, মুরশিদ, উস্তাদ এবং ইমামদের পিছনে লেগে পড়েছে। তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট এবং অনুসারীদেরকেও করেছে পথভ্রষ্ট। বহু দিন হতে সরল ও ন্যায়ের পথকে ছেড়ে দিয়েছে এবং ভ্রান্তি ও বিদআতের মধ্যে জড়িত হয়ে পড়েছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, তাদের মধ্যে একটি লোক ধর্মের খুবই পাবন্দ ছিল। কিছুদিন পর শয়তান তাকে পথভ্রষ্ট করে দেয়। সে তাকে বলে, “আগের লোকেরা যা করে গেছে তুমিও তো তাই করছে। এতে কি হবে? এর দ্বারা না জনগণের মধ্যে তোমার কোন মর্যাদা লাভ হবে, না তোমার কোন খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। বরং একটা নতুন কিছু আবিষ্কার কর এবং জনগণের মধ্যে তা ছড়িয়ে দাও। তাহলে দেখতে পাবে যে, তোমার খ্যাতি কিরূপে ছড়িয়ে পড়ছে এবং কিভাবে স্থানে স্থানে তোমার সম্পর্কে আলোচনা চলছে।” সুতরাং সে তার কথা মত তা-ই করলো। তার ঐ বিদআতগুলো জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো এবং বহু যুগ পর্যন্ত লোকেরা তার অন্ধ অনুকরণ করতে থাকলো। এখন হতে সে খুবই লজ্জিত হলো এবং সালতানাত ও রাজত্ব পরিত্যাগ করলো। তারপর নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হয়ে পড়লো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে জানিয়ে দিলেন-“তুমি যদি শুধু আমারই ব্যাপারে ভুল ও অপরাধ করতে তবে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিতাম। কিন্তু তুমি সাধারণ লোকের আমল নষ্ট করে দিয়েছে এবং তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে ভ্রান্তির পথে লাগিয়ে দিয়েছে। সেই পথে চলতে চলতে তারা মৃত্যুবরণ করেছে। তাদের পাপের বোঝা তোমার উপর থেকে কিরূপে সরতে পারে? সুতরাং তোমার তাওবা কবুল করা হবে না।” এ ধরনের লোকদের ব্যাপারে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।

আল-মায়িদা 5:78

৭৮-৮১ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে যে, বানী ইসরাঈলের কাফিররা প্রাচীন অভিশপ্ত। হযরত দাউদ (আঃ) ও ঈসা (আঃ)-এর যুগে তারা অভিশপ্তরূপে সাব্যস্ত হয়েছিল। কেননা, তারা ছিল আল্লাহর অবাধ্য এবং তারা আল্লাহর সৃষ্টজীবের প্রতি অত্যাচারী ছিল। তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবুর, কুরআন প্রভৃতি সমস্ত কিতাবই তাদের উপর লা'নত বর্ষণ করে আসছে। তারা নিজেদের যুগেও একে অপরকে খারাপ কাজ করতে দেখেছে, কিন্তু নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। হারাম কাজগুলো তাদের মধ্যে খোলাখুলিভাবে চলতো এবং কেউ কাউকেও নিষেধ করতো না। এ ছিল তাদের জঘন্য কাজ।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “বানী ইসরাঈলের মধ্যে প্রথম যখন পাপ কাজ শুরু হয় তখন তাদের আলেমরা তাদেরকে বাধা দেয়। কিন্তু যখন দেখে যে, তারা মানলো না তখন তারা তাদেরকে পৃথক না। করে তাদের সাথেই উঠাবসা করতে থাকে। আল্লাহ তখন একে অপরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দেন এবং হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর বদ দু'আর মাধ্যমে তাদের উপর লা'নত বর্ষণ করেন। কেননা, তারা অবাধ্য ও অত্যাচারী ছিল।” এটা বর্ণনা করার সময় নবী (সঃ) বালিশে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। কিন্তু এ কথা বলার পর সোজা হয়ে বসে গিয়ে বলেনঃ “না, না। আল্লাহর কসম! তোমাদের অবশ্যই কর্তব্য হচ্ছে এই যে, তোমরা জনগণকে শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ থেকে বাধা প্রদান করবে এবং তাদেরকে শরীয়তের পাবন্দ বানিয়ে নেবে।”সুনানে আবি দাউদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বানী ইসরাঈলের মধ্যে সর্বপ্রথম বদভ্যাস। এই ঢুকেছিল যে, কোন লোক অপর কোন লোককে শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ করতে দেখলে তাকে বাধা প্রদান করতো। তাকে সে বলতেঃ আল্লাহকে ভয় কর এবং এ খারাপ কাজ পরিত্যাগ কর, এটা হারাম। কিন্তু পরদিন যখন সে তা ছাড়তো না তখন সে তার থেকে পৃথক হয়ে যেতো না। বরং একই সাথে পানাহার করতো এবং একই সাথে উঠাবাস করতো। এ কারণে সবারই অন্তরে সংকীর্ণতা এসে যায়। তারপর তিনি পূর্ণ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! তোমাদের উপর ফরয হচ্ছে এই যে, তোমরা একে অপরকে ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। অত্যাচারীকে তার অত্যাচার থেকে বিরত রাখবে এবং তাকে হকের উপর আসতে বাধ্য করবে।” জামেউত তিরমিযী এবং সুনানে ইবনে মাজার মধ্যে এ হাদীসটি রয়েছে। সুনানে আবি দাউদ ইত্যাদির মধ্যে এ হাদীসের শেষাংশে এ কথাও আছে-তোমরা যদি এটা না কর তবে আল্লাহ তোমাদের অন্তরও একে অপরের সাথে মেরে দেবেন এবং তোমাদের উপরও তার শাস্তি অবতীর্ণ করবেন, যেমন এদের উপর অবতীর্ণ করেছেন। এ সম্পর্কীয় আরও হাদীস রয়েছে। হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি তো (আরবী) (৫:৬৩)-এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করা হয়েছে। (আরবী) (৫:১০৫)-এ আয়াতের তাফসীরে হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত আবু সা'লাবা (রাঃ)-এর হাদীসগুলো আসবে ইনশাআল্লাহ। মুসনাদে আহমাদ ও জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হয় তোমরা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করতে থাকবে, না হয় আল্লাহ তোমাদের উপর স্বীয় পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠিয়ে দেবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর নিকট প্রার্থনা করতে থাকবে, কিন্তু তোমাদের প্রার্থনা তিনি ককূল করবেন না।” সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “তোমরা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করতে থাক এমন সময় আসার পূর্বে যে, তোমরা দুআ করবে, কিন্তু তা কবূল করা হবে না।" সহীহ হাদীসে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “তোমাদের কেউ কাউকে শরীয়ত গর্হিত কাজ করতে দেখলে তাকে হাত দ্বারা বাধা প্রদান করা তার উপর ফরয। যদি এটার ক্ষমতা তার না থাকে তবে তার উচিত যে, সে যেন তাকে কথা দ্বারা বাধা দেয়। যদি ওটারও ক্ষমতা তার না থাকে তবে তার উচিত তাকে অন্তরে ঘৃণা করা, এবং এটা হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “বিশিষ্ট লোকদের পাপের কারণে আল্লাহ সাধারণ লোকদেরকে শান্তি দেন না, কিন্তু ঐ সময় দিয়ে থাকেন যখন তাদের মধ্যে কু-কাজ ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা তাদেরকে বাধা প্রদান করে না। ঐ সময় আল্লাহ বিশিষ্ট ও সাধারণ সমস্ত লোককেই স্বীয় শাস্তি দ্বারা ঘিরে নেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)নবী (সঃ) বলেছেন- “যে জায়গায় পাপ ছড়িয়ে পড়েছে সেখানে যারা উপস্থিত আছে তারা যদি ঐ শরীয়ত বিরোধী কাজে অসন্তষ্ট হয় (আর একটি বর্ণনায় আছে যে, যদি ঐ কাজে বাধা দেয়) তবে তারা যেন ঐ লোকদের মতই যারা সেখানে উপস্থিত নেই। পক্ষান্তরে যারা সেখানে উপস্থিত নেই, কিন্তু ঐ শরীয়ত বিরোধী কার্যে তারা সন্তুষ্ট হয়, তবে তারা যেন ঐ লোকদের মতই যারা সেখানে উপস্থিত আছে।” (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সুনানে আবি দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “লোকদের ওযর যে পর্যন্ত লুপ্ত না হবে সে পর্যন্ত তারা ধ্বংস হবে না।" হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুৎবা দিতে গিয়ে বলেনঃ “সাবধান! কাউকে যেন লোকদের ভয় সত্য কথা বলা থেকে বিরত না রাখে।” এ হাদীসটি বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেনঃ আল্লাহর কসম! আমরা তো এরূপ স্থলে মানুষের ভয়কে স্বীকার করে থাকি। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- ‘অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্য কথা বলা হচ্ছে উত্তম জিহাদ। (হাদীসগুলো ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, জামরায়ে সানিয়ার নিকট রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে একটি লোক এসে জিজ্ঞেস করলো- ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! উত্তম জিহাদ কি? তিনি নীরব থাকলেন, তারপর তিনি জামরায়ে উকবাকে কংকর মারার পর যখন সওয়ারীর উপর আরোহণের উদ্দেশ্যে রেকাবে পা রাখলেন তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন- প্রশ্নকারী কোথায়? লোকটি বললো, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমি হাযির আছি। তিনি তখন বললেনঃ “অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্য কথা বলে দেয়া (হচ্ছে উত্তম জিহাদ)।” সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “তোমাদের কারও নিজের অসম্মান কর উচিত নয়।' সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কিরূপে? তিনি উত্তরে বললেনঃ তা এরূপে যে, সে শরীয়ত বিরোধী কাজ দেখবে এবং কিছুই বলবে না। কিয়ামতের দিন তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ ‘অমুক স্থলে তুমি নীরব ছিলে কেন? সে উত্তর বলবেঃ মানুষের ভয়ে। তখন আল্লাহর তা'আলা বলবেন- ‘আমি এর সবচেয়ে বড় হকদার ছিলাম যে, তুমি আমাকেই ভয় করতে। অন্য বর্ণনায় আছে যে, তালকীনে হুজ্জতের উপর সে বলবেঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার উপর আশা ভরসা রেখেছিলাম এবং মানুষকে ভয় করেছিলাম। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনমুসলমানদের নিজেকে লাঞ্ছিত করা উচিত নয়।' সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনহে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিরূপে? তিনি উত্তরে বললেনঃ ‘ঐ বিপদ আপদকে মাথা পেতে নেয়া যা বরদাশত করার ক্ষমতা তার নেই।' সুনানে ইবনে মাজায় হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ভাল কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করা কখন ছেড়ে দেয়া হবে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “ঐ সময় ছেড়ে দিতে হবে যখন তোমাদের মধ্যে ঐ জিনিসই প্রকাশ পেয়ে যাবে যা পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছিল। আবার জিজ্ঞেস করা হলোঃ “ওটা কি জিনিস? তিনি উত্তর দিলেনঃ রাজত্ব ইতর লোকদের মধ্যে চলে যাওয়া, বড় লোকদের মধ্যে ব্যভিচারী এসে পড়া, ছোট লোকদের মধ্যে ইলম এসে যাওয়া।' হযরত যায়েদ (রাঃ) বলেন যে, ইতর ও ছোট লোকদের মধ্যে এসে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে ফাসেক ও পাপাচারদের মধ্যে ইলমের আগমন ঘটা। এ হাদীসের সাক্ষী আবু সা'লাবা (রাঃ)-এর হাদীস দ্বারা (আরবী) (৫:১০৫)-এ আয়াতের তাফসীরে আসবে ইনশাআল্লাহ।ইরশাদ হচ্ছে-অধিকাংশ মুনাফিককে তুমি দেখবে যে, তারা কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে। তাদের এ কার্যের কারণে অর্থাৎ মুসলমানদের বন্ধুত্ব ছেড়ে দিয়ে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করার কারণে তারা তাদের জন্যে বড় যখীরা জমা করে রেখেছে। এরই প্রতিশোধ হিসেবে তাদের অন্তরে নেফাক বা। কপটতা সৃষ্টি হয়েছে এবং এরই উপর ভিত্তি করেই তাদের উপর আল্লাহর গযব নাযিল হয়েছে। আর কিয়ামতের দিন তাদের জন্যে চিরস্থায়ী শাস্তি অপেক্ষা করছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“হে মুসলমানগণ! তোমরা ব্যভিচার থেকে বেঁচে থাক। কেননা, এতে ছয়টি অকল্যাণ রয়েছে। তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখিরাতে। দুনিয়ার তিনটি অকল্যাণ হচ্ছে- (১) এর ফলে ইযযত, সম্মান ও সৌন্দর্য লোপ পায়, (২) এর ফলে দারিদ্র এসে পড়ে এবং (৩) এর কারণে আয়ু কমে যায়। আর আখিরাতের তিনটি অকল্যাণ হচ্ছে- (১) আল্লাহর গযব, (২) হিসাবে কাঠিন্য এবং (৩) জাহান্নামে চিরস্থায়ী অবস্থান।” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতের শেষ বাক্যটি পাঠ করেন। এ হাদীসটি দুর্বল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি এ লোকগুলো আল্লাহ ও তাঁর (সঃ)-এর উপর এবং কুরআনের উপর পূর্ণ ঈমান আনতো তবে কখনও কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতো না ও খাটি মুসলমানের সাথে শত্রুতা করতো না। প্রকৃত ব্যাপারে এই যে, তাদের অধিকাংশ লোকই ফাসেক'। অর্থাৎ তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য হতে সরে পড়েছে এবং তার অহী ও পাক কালামের আয়াতগুলোর বিরোধী হয়ে গেছে।

আল-মায়িদা 5:79

৭৮-৮১ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে যে, বানী ইসরাঈলের কাফিররা প্রাচীন অভিশপ্ত। হযরত দাউদ (আঃ) ও ঈসা (আঃ)-এর যুগে তারা অভিশপ্তরূপে সাব্যস্ত হয়েছিল। কেননা, তারা ছিল আল্লাহর অবাধ্য এবং তারা আল্লাহর সৃষ্টজীবের প্রতি অত্যাচারী ছিল। তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবুর, কুরআন প্রভৃতি সমস্ত কিতাবই তাদের উপর লা'নত বর্ষণ করে আসছে। তারা নিজেদের যুগেও একে অপরকে খারাপ কাজ করতে দেখেছে, কিন্তু নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। হারাম কাজগুলো তাদের মধ্যে খোলাখুলিভাবে চলতো এবং কেউ কাউকেও নিষেধ করতো না। এ ছিল তাদের জঘন্য কাজ।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “বানী ইসরাঈলের মধ্যে প্রথম যখন পাপ কাজ শুরু হয় তখন তাদের আলেমরা তাদেরকে বাধা দেয়। কিন্তু যখন দেখে যে, তারা মানলো না তখন তারা তাদেরকে পৃথক না। করে তাদের সাথেই উঠাবসা করতে থাকে। আল্লাহ তখন একে অপরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দেন এবং হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর বদ দু'আর মাধ্যমে তাদের উপর লা'নত বর্ষণ করেন। কেননা, তারা অবাধ্য ও অত্যাচারী ছিল।” এটা বর্ণনা করার সময় নবী (সঃ) বালিশে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। কিন্তু এ কথা বলার পর সোজা হয়ে বসে গিয়ে বলেনঃ “না, না। আল্লাহর কসম! তোমাদের অবশ্যই কর্তব্য হচ্ছে এই যে, তোমরা জনগণকে শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ থেকে বাধা প্রদান করবে এবং তাদেরকে শরীয়তের পাবন্দ বানিয়ে নেবে।”সুনানে আবি দাউদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বানী ইসরাঈলের মধ্যে সর্বপ্রথম বদভ্যাস। এই ঢুকেছিল যে, কোন লোক অপর কোন লোককে শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ করতে দেখলে তাকে বাধা প্রদান করতো। তাকে সে বলতেঃ আল্লাহকে ভয় কর এবং এ খারাপ কাজ পরিত্যাগ কর, এটা হারাম। কিন্তু পরদিন যখন সে তা ছাড়তো না তখন সে তার থেকে পৃথক হয়ে যেতো না। বরং একই সাথে পানাহার করতো এবং একই সাথে উঠাবাস করতো। এ কারণে সবারই অন্তরে সংকীর্ণতা এসে যায়। তারপর তিনি পূর্ণ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! তোমাদের উপর ফরয হচ্ছে এই যে, তোমরা একে অপরকে ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। অত্যাচারীকে তার অত্যাচার থেকে বিরত রাখবে এবং তাকে হকের উপর আসতে বাধ্য করবে।” জামেউত তিরমিযী এবং সুনানে ইবনে মাজার মধ্যে এ হাদীসটি রয়েছে। সুনানে আবি দাউদ ইত্যাদির মধ্যে এ হাদীসের শেষাংশে এ কথাও আছে-তোমরা যদি এটা না কর তবে আল্লাহ তোমাদের অন্তরও একে অপরের সাথে মেরে দেবেন এবং তোমাদের উপরও তার শাস্তি অবতীর্ণ করবেন, যেমন এদের উপর অবতীর্ণ করেছেন। এ সম্পর্কীয় আরও হাদীস রয়েছে। হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি তো (আরবী) (৫:৬৩)-এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করা হয়েছে। (আরবী) (৫:১০৫)-এ আয়াতের তাফসীরে হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত আবু সা'লাবা (রাঃ)-এর হাদীসগুলো আসবে ইনশাআল্লাহ। মুসনাদে আহমাদ ও জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হয় তোমরা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করতে থাকবে, না হয় আল্লাহ তোমাদের উপর স্বীয় পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠিয়ে দেবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর নিকট প্রার্থনা করতে থাকবে, কিন্তু তোমাদের প্রার্থনা তিনি ককূল করবেন না।” সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “তোমরা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করতে থাক এমন সময় আসার পূর্বে যে, তোমরা দুআ করবে, কিন্তু তা কবূল করা হবে না।" সহীহ হাদীসে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “তোমাদের কেউ কাউকে শরীয়ত গর্হিত কাজ করতে দেখলে তাকে হাত দ্বারা বাধা প্রদান করা তার উপর ফরয। যদি এটার ক্ষমতা তার না থাকে তবে তার উচিত যে, সে যেন তাকে কথা দ্বারা বাধা দেয়। যদি ওটারও ক্ষমতা তার না থাকে তবে তার উচিত তাকে অন্তরে ঘৃণা করা, এবং এটা হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “বিশিষ্ট লোকদের পাপের কারণে আল্লাহ সাধারণ লোকদেরকে শান্তি দেন না, কিন্তু ঐ সময় দিয়ে থাকেন যখন তাদের মধ্যে কু-কাজ ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা তাদেরকে বাধা প্রদান করে না। ঐ সময় আল্লাহ বিশিষ্ট ও সাধারণ সমস্ত লোককেই স্বীয় শাস্তি দ্বারা ঘিরে নেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)নবী (সঃ) বলেছেন- “যে জায়গায় পাপ ছড়িয়ে পড়েছে সেখানে যারা উপস্থিত আছে তারা যদি ঐ শরীয়ত বিরোধী কাজে অসন্তষ্ট হয় (আর একটি বর্ণনায় আছে যে, যদি ঐ কাজে বাধা দেয়) তবে তারা যেন ঐ লোকদের মতই যারা সেখানে উপস্থিত নেই। পক্ষান্তরে যারা সেখানে উপস্থিত নেই, কিন্তু ঐ শরীয়ত বিরোধী কার্যে তারা সন্তুষ্ট হয়, তবে তারা যেন ঐ লোকদের মতই যারা সেখানে উপস্থিত আছে।” (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সুনানে আবি দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “লোকদের ওযর যে পর্যন্ত লুপ্ত না হবে সে পর্যন্ত তারা ধ্বংস হবে না।" হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুৎবা দিতে গিয়ে বলেনঃ “সাবধান! কাউকে যেন লোকদের ভয় সত্য কথা বলা থেকে বিরত না রাখে।” এ হাদীসটি বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেনঃ আল্লাহর কসম! আমরা তো এরূপ স্থলে মানুষের ভয়কে স্বীকার করে থাকি। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- ‘অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্য কথা বলা হচ্ছে উত্তম জিহাদ। (হাদীসগুলো ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, জামরায়ে সানিয়ার নিকট রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে একটি লোক এসে জিজ্ঞেস করলো- ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! উত্তম জিহাদ কি? তিনি নীরব থাকলেন, তারপর তিনি জামরায়ে উকবাকে কংকর মারার পর যখন সওয়ারীর উপর আরোহণের উদ্দেশ্যে রেকাবে পা রাখলেন তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন- প্রশ্নকারী কোথায়? লোকটি বললো, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমি হাযির আছি। তিনি তখন বললেনঃ “অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্য কথা বলে দেয়া (হচ্ছে উত্তম জিহাদ)।” সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “তোমাদের কারও নিজের অসম্মান কর উচিত নয়।' সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কিরূপে? তিনি উত্তরে বললেনঃ তা এরূপে যে, সে শরীয়ত বিরোধী কাজ দেখবে এবং কিছুই বলবে না। কিয়ামতের দিন তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ ‘অমুক স্থলে তুমি নীরব ছিলে কেন? সে উত্তর বলবেঃ মানুষের ভয়ে। তখন আল্লাহর তা'আলা বলবেন- ‘আমি এর সবচেয়ে বড় হকদার ছিলাম যে, তুমি আমাকেই ভয় করতে। অন্য বর্ণনায় আছে যে, তালকীনে হুজ্জতের উপর সে বলবেঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার উপর আশা ভরসা রেখেছিলাম এবং মানুষকে ভয় করেছিলাম। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনমুসলমানদের নিজেকে লাঞ্ছিত করা উচিত নয়।' সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনহে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিরূপে? তিনি উত্তরে বললেনঃ ‘ঐ বিপদ আপদকে মাথা পেতে নেয়া যা বরদাশত করার ক্ষমতা তার নেই।' সুনানে ইবনে মাজায় হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ভাল কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করা কখন ছেড়ে দেয়া হবে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “ঐ সময় ছেড়ে দিতে হবে যখন তোমাদের মধ্যে ঐ জিনিসই প্রকাশ পেয়ে যাবে যা পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছিল। আবার জিজ্ঞেস করা হলোঃ “ওটা কি জিনিস? তিনি উত্তর দিলেনঃ রাজত্ব ইতর লোকদের মধ্যে চলে যাওয়া, বড় লোকদের মধ্যে ব্যভিচারী এসে পড়া, ছোট লোকদের মধ্যে ইলম এসে যাওয়া।' হযরত যায়েদ (রাঃ) বলেন যে, ইতর ও ছোট লোকদের মধ্যে এসে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে ফাসেক ও পাপাচারদের মধ্যে ইলমের আগমন ঘটা। এ হাদীসের সাক্ষী আবু সা'লাবা (রাঃ)-এর হাদীস দ্বারা (আরবী) (৫:১০৫)-এ আয়াতের তাফসীরে আসবে ইনশাআল্লাহ।ইরশাদ হচ্ছে-অধিকাংশ মুনাফিককে তুমি দেখবে যে, তারা কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে। তাদের এ কার্যের কারণে অর্থাৎ মুসলমানদের বন্ধুত্ব ছেড়ে দিয়ে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করার কারণে তারা তাদের জন্যে বড় যখীরা জমা করে রেখেছে। এরই প্রতিশোধ হিসেবে তাদের অন্তরে নেফাক বা। কপটতা সৃষ্টি হয়েছে এবং এরই উপর ভিত্তি করেই তাদের উপর আল্লাহর গযব নাযিল হয়েছে। আর কিয়ামতের দিন তাদের জন্যে চিরস্থায়ী শাস্তি অপেক্ষা করছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“হে মুসলমানগণ! তোমরা ব্যভিচার থেকে বেঁচে থাক। কেননা, এতে ছয়টি অকল্যাণ রয়েছে। তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখিরাতে। দুনিয়ার তিনটি অকল্যাণ হচ্ছে- (১) এর ফলে ইযযত, সম্মান ও সৌন্দর্য লোপ পায়, (২) এর ফলে দারিদ্র এসে পড়ে এবং (৩) এর কারণে আয়ু কমে যায়। আর আখিরাতের তিনটি অকল্যাণ হচ্ছে- (১) আল্লাহর গযব, (২) হিসাবে কাঠিন্য এবং (৩) জাহান্নামে চিরস্থায়ী অবস্থান।” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতের শেষ বাক্যটি পাঠ করেন। এ হাদীসটি দুর্বল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি এ লোকগুলো আল্লাহ ও তাঁর (সঃ)-এর উপর এবং কুরআনের উপর পূর্ণ ঈমান আনতো তবে কখনও কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতো না ও খাটি মুসলমানের সাথে শত্রুতা করতো না। প্রকৃত ব্যাপারে এই যে, তাদের অধিকাংশ লোকই ফাসেক'। অর্থাৎ তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য হতে সরে পড়েছে এবং তার অহী ও পাক কালামের আয়াতগুলোর বিরোধী হয়ে গেছে।

আল-মায়িদা 5:80

৭৮-৮১ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে যে, বানী ইসরাঈলের কাফিররা প্রাচীন অভিশপ্ত। হযরত দাউদ (আঃ) ও ঈসা (আঃ)-এর যুগে তারা অভিশপ্তরূপে সাব্যস্ত হয়েছিল। কেননা, তারা ছিল আল্লাহর অবাধ্য এবং তারা আল্লাহর সৃষ্টজীবের প্রতি অত্যাচারী ছিল। তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবুর, কুরআন প্রভৃতি সমস্ত কিতাবই তাদের উপর লা'নত বর্ষণ করে আসছে। তারা নিজেদের যুগেও একে অপরকে খারাপ কাজ করতে দেখেছে, কিন্তু নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। হারাম কাজগুলো তাদের মধ্যে খোলাখুলিভাবে চলতো এবং কেউ কাউকেও নিষেধ করতো না। এ ছিল তাদের জঘন্য কাজ।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “বানী ইসরাঈলের মধ্যে প্রথম যখন পাপ কাজ শুরু হয় তখন তাদের আলেমরা তাদেরকে বাধা দেয়। কিন্তু যখন দেখে যে, তারা মানলো না তখন তারা তাদেরকে পৃথক না। করে তাদের সাথেই উঠাবসা করতে থাকে। আল্লাহ তখন একে অপরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দেন এবং হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর বদ দু'আর মাধ্যমে তাদের উপর লা'নত বর্ষণ করেন। কেননা, তারা অবাধ্য ও অত্যাচারী ছিল।” এটা বর্ণনা করার সময় নবী (সঃ) বালিশে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। কিন্তু এ কথা বলার পর সোজা হয়ে বসে গিয়ে বলেনঃ “না, না। আল্লাহর কসম! তোমাদের অবশ্যই কর্তব্য হচ্ছে এই যে, তোমরা জনগণকে শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ থেকে বাধা প্রদান করবে এবং তাদেরকে শরীয়তের পাবন্দ বানিয়ে নেবে।”সুনানে আবি দাউদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বানী ইসরাঈলের মধ্যে সর্বপ্রথম বদভ্যাস। এই ঢুকেছিল যে, কোন লোক অপর কোন লোককে শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ করতে দেখলে তাকে বাধা প্রদান করতো। তাকে সে বলতেঃ আল্লাহকে ভয় কর এবং এ খারাপ কাজ পরিত্যাগ কর, এটা হারাম। কিন্তু পরদিন যখন সে তা ছাড়তো না তখন সে তার থেকে পৃথক হয়ে যেতো না। বরং একই সাথে পানাহার করতো এবং একই সাথে উঠাবাস করতো। এ কারণে সবারই অন্তরে সংকীর্ণতা এসে যায়। তারপর তিনি পূর্ণ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! তোমাদের উপর ফরয হচ্ছে এই যে, তোমরা একে অপরকে ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। অত্যাচারীকে তার অত্যাচার থেকে বিরত রাখবে এবং তাকে হকের উপর আসতে বাধ্য করবে।” জামেউত তিরমিযী এবং সুনানে ইবনে মাজার মধ্যে এ হাদীসটি রয়েছে। সুনানে আবি দাউদ ইত্যাদির মধ্যে এ হাদীসের শেষাংশে এ কথাও আছে-তোমরা যদি এটা না কর তবে আল্লাহ তোমাদের অন্তরও একে অপরের সাথে মেরে দেবেন এবং তোমাদের উপরও তার শাস্তি অবতীর্ণ করবেন, যেমন এদের উপর অবতীর্ণ করেছেন। এ সম্পর্কীয় আরও হাদীস রয়েছে। হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি তো (আরবী) (৫:৬৩)-এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করা হয়েছে। (আরবী) (৫:১০৫)-এ আয়াতের তাফসীরে হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত আবু সা'লাবা (রাঃ)-এর হাদীসগুলো আসবে ইনশাআল্লাহ। মুসনাদে আহমাদ ও জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হয় তোমরা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করতে থাকবে, না হয় আল্লাহ তোমাদের উপর স্বীয় পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠিয়ে দেবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর নিকট প্রার্থনা করতে থাকবে, কিন্তু তোমাদের প্রার্থনা তিনি ককূল করবেন না।” সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “তোমরা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করতে থাক এমন সময় আসার পূর্বে যে, তোমরা দুআ করবে, কিন্তু তা কবূল করা হবে না।" সহীহ হাদীসে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “তোমাদের কেউ কাউকে শরীয়ত গর্হিত কাজ করতে দেখলে তাকে হাত দ্বারা বাধা প্রদান করা তার উপর ফরয। যদি এটার ক্ষমতা তার না থাকে তবে তার উচিত যে, সে যেন তাকে কথা দ্বারা বাধা দেয়। যদি ওটারও ক্ষমতা তার না থাকে তবে তার উচিত তাকে অন্তরে ঘৃণা করা, এবং এটা হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “বিশিষ্ট লোকদের পাপের কারণে আল্লাহ সাধারণ লোকদেরকে শান্তি দেন না, কিন্তু ঐ সময় দিয়ে থাকেন যখন তাদের মধ্যে কু-কাজ ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা তাদেরকে বাধা প্রদান করে না। ঐ সময় আল্লাহ বিশিষ্ট ও সাধারণ সমস্ত লোককেই স্বীয় শাস্তি দ্বারা ঘিরে নেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)নবী (সঃ) বলেছেন- “যে জায়গায় পাপ ছড়িয়ে পড়েছে সেখানে যারা উপস্থিত আছে তারা যদি ঐ শরীয়ত বিরোধী কাজে অসন্তষ্ট হয় (আর একটি বর্ণনায় আছে যে, যদি ঐ কাজে বাধা দেয়) তবে তারা যেন ঐ লোকদের মতই যারা সেখানে উপস্থিত নেই। পক্ষান্তরে যারা সেখানে উপস্থিত নেই, কিন্তু ঐ শরীয়ত বিরোধী কার্যে তারা সন্তুষ্ট হয়, তবে তারা যেন ঐ লোকদের মতই যারা সেখানে উপস্থিত আছে।” (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সুনানে আবি দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “লোকদের ওযর যে পর্যন্ত লুপ্ত না হবে সে পর্যন্ত তারা ধ্বংস হবে না।" হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুৎবা দিতে গিয়ে বলেনঃ “সাবধান! কাউকে যেন লোকদের ভয় সত্য কথা বলা থেকে বিরত না রাখে।” এ হাদীসটি বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেনঃ আল্লাহর কসম! আমরা তো এরূপ স্থলে মানুষের ভয়কে স্বীকার করে থাকি। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- ‘অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্য কথা বলা হচ্ছে উত্তম জিহাদ। (হাদীসগুলো ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, জামরায়ে সানিয়ার নিকট রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে একটি লোক এসে জিজ্ঞেস করলো- ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! উত্তম জিহাদ কি? তিনি নীরব থাকলেন, তারপর তিনি জামরায়ে উকবাকে কংকর মারার পর যখন সওয়ারীর উপর আরোহণের উদ্দেশ্যে রেকাবে পা রাখলেন তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন- প্রশ্নকারী কোথায়? লোকটি বললো, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমি হাযির আছি। তিনি তখন বললেনঃ “অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্য কথা বলে দেয়া (হচ্ছে উত্তম জিহাদ)।” সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “তোমাদের কারও নিজের অসম্মান কর উচিত নয়।' সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কিরূপে? তিনি উত্তরে বললেনঃ তা এরূপে যে, সে শরীয়ত বিরোধী কাজ দেখবে এবং কিছুই বলবে না। কিয়ামতের দিন তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ ‘অমুক স্থলে তুমি নীরব ছিলে কেন? সে উত্তর বলবেঃ মানুষের ভয়ে। তখন আল্লাহর তা'আলা বলবেন- ‘আমি এর সবচেয়ে বড় হকদার ছিলাম যে, তুমি আমাকেই ভয় করতে। অন্য বর্ণনায় আছে যে, তালকীনে হুজ্জতের উপর সে বলবেঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার উপর আশা ভরসা রেখেছিলাম এবং মানুষকে ভয় করেছিলাম। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনমুসলমানদের নিজেকে লাঞ্ছিত করা উচিত নয়।' সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনহে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিরূপে? তিনি উত্তরে বললেনঃ ‘ঐ বিপদ আপদকে মাথা পেতে নেয়া যা বরদাশত করার ক্ষমতা তার নেই।' সুনানে ইবনে মাজায় হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ভাল কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করা কখন ছেড়ে দেয়া হবে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “ঐ সময় ছেড়ে দিতে হবে যখন তোমাদের মধ্যে ঐ জিনিসই প্রকাশ পেয়ে যাবে যা পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছিল। আবার জিজ্ঞেস করা হলোঃ “ওটা কি জিনিস? তিনি উত্তর দিলেনঃ রাজত্ব ইতর লোকদের মধ্যে চলে যাওয়া, বড় লোকদের মধ্যে ব্যভিচারী এসে পড়া, ছোট লোকদের মধ্যে ইলম এসে যাওয়া।' হযরত যায়েদ (রাঃ) বলেন যে, ইতর ও ছোট লোকদের মধ্যে এসে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে ফাসেক ও পাপাচারদের মধ্যে ইলমের আগমন ঘটা। এ হাদীসের সাক্ষী আবু সা'লাবা (রাঃ)-এর হাদীস দ্বারা (আরবী) (৫:১০৫)-এ আয়াতের তাফসীরে আসবে ইনশাআল্লাহ।ইরশাদ হচ্ছে-অধিকাংশ মুনাফিককে তুমি দেখবে যে, তারা কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে। তাদের এ কার্যের কারণে অর্থাৎ মুসলমানদের বন্ধুত্ব ছেড়ে দিয়ে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করার কারণে তারা তাদের জন্যে বড় যখীরা জমা করে রেখেছে। এরই প্রতিশোধ হিসেবে তাদের অন্তরে নেফাক বা। কপটতা সৃষ্টি হয়েছে এবং এরই উপর ভিত্তি করেই তাদের উপর আল্লাহর গযব নাযিল হয়েছে। আর কিয়ামতের দিন তাদের জন্যে চিরস্থায়ী শাস্তি অপেক্ষা করছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“হে মুসলমানগণ! তোমরা ব্যভিচার থেকে বেঁচে থাক। কেননা, এতে ছয়টি অকল্যাণ রয়েছে। তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখিরাতে। দুনিয়ার তিনটি অকল্যাণ হচ্ছে- (১) এর ফলে ইযযত, সম্মান ও সৌন্দর্য লোপ পায়, (২) এর ফলে দারিদ্র এসে পড়ে এবং (৩) এর কারণে আয়ু কমে যায়। আর আখিরাতের তিনটি অকল্যাণ হচ্ছে- (১) আল্লাহর গযব, (২) হিসাবে কাঠিন্য এবং (৩) জাহান্নামে চিরস্থায়ী অবস্থান।” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতের শেষ বাক্যটি পাঠ করেন। এ হাদীসটি দুর্বল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি এ লোকগুলো আল্লাহ ও তাঁর (সঃ)-এর উপর এবং কুরআনের উপর পূর্ণ ঈমান আনতো তবে কখনও কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতো না ও খাটি মুসলমানের সাথে শত্রুতা করতো না। প্রকৃত ব্যাপারে এই যে, তাদের অধিকাংশ লোকই ফাসেক'। অর্থাৎ তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য হতে সরে পড়েছে এবং তার অহী ও পাক কালামের আয়াতগুলোর বিরোধী হয়ে গেছে।

আল-মায়িদা 5:81

৭৮-৮১ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে যে, বানী ইসরাঈলের কাফিররা প্রাচীন অভিশপ্ত। হযরত দাউদ (আঃ) ও ঈসা (আঃ)-এর যুগে তারা অভিশপ্তরূপে সাব্যস্ত হয়েছিল। কেননা, তারা ছিল আল্লাহর অবাধ্য এবং তারা আল্লাহর সৃষ্টজীবের প্রতি অত্যাচারী ছিল। তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবুর, কুরআন প্রভৃতি সমস্ত কিতাবই তাদের উপর লা'নত বর্ষণ করে আসছে। তারা নিজেদের যুগেও একে অপরকে খারাপ কাজ করতে দেখেছে, কিন্তু নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। হারাম কাজগুলো তাদের মধ্যে খোলাখুলিভাবে চলতো এবং কেউ কাউকেও নিষেধ করতো না। এ ছিল তাদের জঘন্য কাজ।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “বানী ইসরাঈলের মধ্যে প্রথম যখন পাপ কাজ শুরু হয় তখন তাদের আলেমরা তাদেরকে বাধা দেয়। কিন্তু যখন দেখে যে, তারা মানলো না তখন তারা তাদেরকে পৃথক না। করে তাদের সাথেই উঠাবসা করতে থাকে। আল্লাহ তখন একে অপরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দেন এবং হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর বদ দু'আর মাধ্যমে তাদের উপর লা'নত বর্ষণ করেন। কেননা, তারা অবাধ্য ও অত্যাচারী ছিল।” এটা বর্ণনা করার সময় নবী (সঃ) বালিশে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। কিন্তু এ কথা বলার পর সোজা হয়ে বসে গিয়ে বলেনঃ “না, না। আল্লাহর কসম! তোমাদের অবশ্যই কর্তব্য হচ্ছে এই যে, তোমরা জনগণকে শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ থেকে বাধা প্রদান করবে এবং তাদেরকে শরীয়তের পাবন্দ বানিয়ে নেবে।”সুনানে আবি দাউদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বানী ইসরাঈলের মধ্যে সর্বপ্রথম বদভ্যাস। এই ঢুকেছিল যে, কোন লোক অপর কোন লোককে শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ করতে দেখলে তাকে বাধা প্রদান করতো। তাকে সে বলতেঃ আল্লাহকে ভয় কর এবং এ খারাপ কাজ পরিত্যাগ কর, এটা হারাম। কিন্তু পরদিন যখন সে তা ছাড়তো না তখন সে তার থেকে পৃথক হয়ে যেতো না। বরং একই সাথে পানাহার করতো এবং একই সাথে উঠাবাস করতো। এ কারণে সবারই অন্তরে সংকীর্ণতা এসে যায়। তারপর তিনি পূর্ণ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! তোমাদের উপর ফরয হচ্ছে এই যে, তোমরা একে অপরকে ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। অত্যাচারীকে তার অত্যাচার থেকে বিরত রাখবে এবং তাকে হকের উপর আসতে বাধ্য করবে।” জামেউত তিরমিযী এবং সুনানে ইবনে মাজার মধ্যে এ হাদীসটি রয়েছে। সুনানে আবি দাউদ ইত্যাদির মধ্যে এ হাদীসের শেষাংশে এ কথাও আছে-তোমরা যদি এটা না কর তবে আল্লাহ তোমাদের অন্তরও একে অপরের সাথে মেরে দেবেন এবং তোমাদের উপরও তার শাস্তি অবতীর্ণ করবেন, যেমন এদের উপর অবতীর্ণ করেছেন। এ সম্পর্কীয় আরও হাদীস রয়েছে। হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি তো (আরবী) (৫:৬৩)-এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করা হয়েছে। (আরবী) (৫:১০৫)-এ আয়াতের তাফসীরে হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত আবু সা'লাবা (রাঃ)-এর হাদীসগুলো আসবে ইনশাআল্লাহ। মুসনাদে আহমাদ ও জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হয় তোমরা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করতে থাকবে, না হয় আল্লাহ তোমাদের উপর স্বীয় পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠিয়ে দেবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর নিকট প্রার্থনা করতে থাকবে, কিন্তু তোমাদের প্রার্থনা তিনি ককূল করবেন না।” সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “তোমরা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করতে থাক এমন সময় আসার পূর্বে যে, তোমরা দুআ করবে, কিন্তু তা কবূল করা হবে না।" সহীহ হাদীসে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “তোমাদের কেউ কাউকে শরীয়ত গর্হিত কাজ করতে দেখলে তাকে হাত দ্বারা বাধা প্রদান করা তার উপর ফরয। যদি এটার ক্ষমতা তার না থাকে তবে তার উচিত যে, সে যেন তাকে কথা দ্বারা বাধা দেয়। যদি ওটারও ক্ষমতা তার না থাকে তবে তার উচিত তাকে অন্তরে ঘৃণা করা, এবং এটা হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচয়। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “বিশিষ্ট লোকদের পাপের কারণে আল্লাহ সাধারণ লোকদেরকে শান্তি দেন না, কিন্তু ঐ সময় দিয়ে থাকেন যখন তাদের মধ্যে কু-কাজ ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা তাদেরকে বাধা প্রদান করে না। ঐ সময় আল্লাহ বিশিষ্ট ও সাধারণ সমস্ত লোককেই স্বীয় শাস্তি দ্বারা ঘিরে নেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)নবী (সঃ) বলেছেন- “যে জায়গায় পাপ ছড়িয়ে পড়েছে সেখানে যারা উপস্থিত আছে তারা যদি ঐ শরীয়ত বিরোধী কাজে অসন্তষ্ট হয় (আর একটি বর্ণনায় আছে যে, যদি ঐ কাজে বাধা দেয়) তবে তারা যেন ঐ লোকদের মতই যারা সেখানে উপস্থিত নেই। পক্ষান্তরে যারা সেখানে উপস্থিত নেই, কিন্তু ঐ শরীয়ত বিরোধী কার্যে তারা সন্তুষ্ট হয়, তবে তারা যেন ঐ লোকদের মতই যারা সেখানে উপস্থিত আছে।” (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সুনানে আবি দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “লোকদের ওযর যে পর্যন্ত লুপ্ত না হবে সে পর্যন্ত তারা ধ্বংস হবে না।" হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুৎবা দিতে গিয়ে বলেনঃ “সাবধান! কাউকে যেন লোকদের ভয় সত্য কথা বলা থেকে বিরত না রাখে।” এ হাদীসটি বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেনঃ আল্লাহর কসম! আমরা তো এরূপ স্থলে মানুষের ভয়কে স্বীকার করে থাকি। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- ‘অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্য কথা বলা হচ্ছে উত্তম জিহাদ। (হাদীসগুলো ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, জামরায়ে সানিয়ার নিকট রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে একটি লোক এসে জিজ্ঞেস করলো- ‘হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! উত্তম জিহাদ কি? তিনি নীরব থাকলেন, তারপর তিনি জামরায়ে উকবাকে কংকর মারার পর যখন সওয়ারীর উপর আরোহণের উদ্দেশ্যে রেকাবে পা রাখলেন তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন- প্রশ্নকারী কোথায়? লোকটি বললো, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমি হাযির আছি। তিনি তখন বললেনঃ “অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্য কথা বলে দেয়া (হচ্ছে উত্তম জিহাদ)।” সুনানে ইবনে মাজায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “তোমাদের কারও নিজের অসম্মান কর উচিত নয়।' সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কিরূপে? তিনি উত্তরে বললেনঃ তা এরূপে যে, সে শরীয়ত বিরোধী কাজ দেখবে এবং কিছুই বলবে না। কিয়ামতের দিন তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ ‘অমুক স্থলে তুমি নীরব ছিলে কেন? সে উত্তর বলবেঃ মানুষের ভয়ে। তখন আল্লাহর তা'আলা বলবেন- ‘আমি এর সবচেয়ে বড় হকদার ছিলাম যে, তুমি আমাকেই ভয় করতে। অন্য বর্ণনায় আছে যে, তালকীনে হুজ্জতের উপর সে বলবেঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার উপর আশা ভরসা রেখেছিলাম এবং মানুষকে ভয় করেছিলাম। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনমুসলমানদের নিজেকে লাঞ্ছিত করা উচিত নয়।' সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনহে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিরূপে? তিনি উত্তরে বললেনঃ ‘ঐ বিপদ আপদকে মাথা পেতে নেয়া যা বরদাশত করার ক্ষমতা তার নেই।' সুনানে ইবনে মাজায় হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ভাল কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করা কখন ছেড়ে দেয়া হবে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “ঐ সময় ছেড়ে দিতে হবে যখন তোমাদের মধ্যে ঐ জিনিসই প্রকাশ পেয়ে যাবে যা পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছিল। আবার জিজ্ঞেস করা হলোঃ “ওটা কি জিনিস? তিনি উত্তর দিলেনঃ রাজত্ব ইতর লোকদের মধ্যে চলে যাওয়া, বড় লোকদের মধ্যে ব্যভিচারী এসে পড়া, ছোট লোকদের মধ্যে ইলম এসে যাওয়া।' হযরত যায়েদ (রাঃ) বলেন যে, ইতর ও ছোট লোকদের মধ্যে এসে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে ফাসেক ও পাপাচারদের মধ্যে ইলমের আগমন ঘটা। এ হাদীসের সাক্ষী আবু সা'লাবা (রাঃ)-এর হাদীস দ্বারা (আরবী) (৫:১০৫)-এ আয়াতের তাফসীরে আসবে ইনশাআল্লাহ।ইরশাদ হচ্ছে-অধিকাংশ মুনাফিককে তুমি দেখবে যে, তারা কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে। তাদের এ কার্যের কারণে অর্থাৎ মুসলমানদের বন্ধুত্ব ছেড়ে দিয়ে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করার কারণে তারা তাদের জন্যে বড় যখীরা জমা করে রেখেছে। এরই প্রতিশোধ হিসেবে তাদের অন্তরে নেফাক বা। কপটতা সৃষ্টি হয়েছে এবং এরই উপর ভিত্তি করেই তাদের উপর আল্লাহর গযব নাযিল হয়েছে। আর কিয়ামতের দিন তাদের জন্যে চিরস্থায়ী শাস্তি অপেক্ষা করছে। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“হে মুসলমানগণ! তোমরা ব্যভিচার থেকে বেঁচে থাক। কেননা, এতে ছয়টি অকল্যাণ রয়েছে। তিনটি দুনিয়াতে ও তিনটি আখিরাতে। দুনিয়ার তিনটি অকল্যাণ হচ্ছে- (১) এর ফলে ইযযত, সম্মান ও সৌন্দর্য লোপ পায়, (২) এর ফলে দারিদ্র এসে পড়ে এবং (৩) এর কারণে আয়ু কমে যায়। আর আখিরাতের তিনটি অকল্যাণ হচ্ছে- (১) আল্লাহর গযব, (২) হিসাবে কাঠিন্য এবং (৩) জাহান্নামে চিরস্থায়ী অবস্থান।” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতের শেষ বাক্যটি পাঠ করেন। এ হাদীসটি দুর্বল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি এ লোকগুলো আল্লাহ ও তাঁর (সঃ)-এর উপর এবং কুরআনের উপর পূর্ণ ঈমান আনতো তবে কখনও কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতো না ও খাটি মুসলমানের সাথে শত্রুতা করতো না। প্রকৃত ব্যাপারে এই যে, তাদের অধিকাংশ লোকই ফাসেক'। অর্থাৎ তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য হতে সরে পড়েছে এবং তার অহী ও পাক কালামের আয়াতগুলোর বিরোধী হয়ে গেছে।

আল-মায়িদা 5:82

এ আয়াতটি এবং পরবর্তী চারটি আয়াত নাজ্জাসী এবং তাঁর সঙ্গী সাথীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। যখন তাঁদের সামনে হাবসা বা আবিসিনিয়া রাজ্যে হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) কুরআন মাজীদ পাঠ করেন তখন তাদের চক্ষু দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে থাকে, এমন কি তাঁদের দাড়ি ভিজে যায়। কিন্তু এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, এ আয়াতগুলো মদীনায় অবতীর্ণ হয়। আর হযরত জাফর (রাঃ)-এর এ ঘটনাটি হিজরতের পূর্বের ঘটনা। এটাও বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতগুলো ঐ প্রতিনিধির ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যাকে বাদশাহ নাজ্জাসী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে প্রেরণ করেছিলেন। উদ্দেশ্যে এই যে, যেন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে তার অবস্থান ও গুণাবলী পর্যবেক্ষণ করেন এবং তাঁর কথাগুলো শ্রবণ করেন। যখন তিনি নবী (সঃ)-এর সাথে। মিলিত হন এবং তার মুখ থেকে কুরআন কারীম শ্রবণ করেন তখন তাঁর অন্তর গলে যায়। তিনি খুবই ক্রন্দন করেন এবং ইসলাম কবুল করেন। ফিরে গিয়ে তিনি নাজ্জাসীর কাছে সমস্ত অবস্থা বর্ণনা করেন। নাজ্জাসী তখন রাজ্য ত্যাগ করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু সঠিক বর্ণনায় সাব্যস্ত হয় যে, তিনি আবিসিনিয়ায় রাজত্ব করতে করতেই মত্যবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর দিনই নবী (সঃ) সাহাবায়ে কিরামকে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ প্রদান করেন এবং তাঁর গায়েবানা জানাযার নামায আদায় করেন। কেউ কেউ তো বলেন যে, এ প্রতিনিধি দলে সাতজন আলেম ও পাঁচজন দরবেশ ছিলেন অথবা পাঁচজন আলেম ও সাতজন দরবেশ ছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা মোট পাচশ জন ছিলেন। আবার বলা হয়েছে যে, তাদের সংখ্যা ষাটের কিছু বেশী ছিল। একটি উক্তি এও আছে যে, তাঁরা সত্তরজন ছিলেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত আতা’ (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতে যাদের গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে। তারা হচ্ছেন হাবশের অধিবাসী। হাবশের মুহাজির মুসলমানগণ যখন তাঁদের কাছে আগমন করেন তখন তাঁরা সবাই মুসলমান হয়ে যান। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রথমে তারা ঈসায়ী ধর্মের অনুসারী ছিলেন। যখন তারা মুসলমানদেরকে দেখতে পান ও কুরআন শ্রবণ করেন তখনই তারা মুসলমান হয়ে যান। ইবনে জারীর (রঃ)-এর ফায়সালা এসব উক্তিকে সত্য বলে সাব্যস্ত করছে। তিনি বলেন যে, এ আয়াতগুলো ঐসব লোকের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যাদের মধ্যে এ গুণাবলী রয়েছে। তারা হাবশারই হোন বা অন্য কোন জায়গারই হোন। ইয়াহুদীদের মুসলমানদের সাথে যে ভীষণ শত্রুতা রয়েছে তার কারণ এই যে, তাদের মধ্যে দুষ্টামি, বিরোধিতা ও অস্বীকার করার মাদাহ বা মূল খুব বেশী আছে। তারা জেনে শুনে কুফরী করে থাকে এবং জেদের বশবর্তী হয়ে অন্যায় আচরণ করে থাকে। তারা হকের মোকাবিলায় বিগড়ে যায়। হক পন্থীদের উপর তারা ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকায়। তাদের প্রতি হিংসা পোষণ করে। আলেমের সংখ্যা তাদের মধ্যে খুবই কম। আলেমদের কোন প্রভাব তাদের উপর পড়ে না। এ কারণে তারা বহু নবীকে হত্যা করেছিল। স্বয়ং শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদকেও (সঃ) তারা হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। একবার নয়, বার বার। তারা তার খাদ্যে বিষ মিশ্রিত করে, তার উপর যাদু করে এবং তাদের ন্যায় দুষ্ট প্রকৃতির লোকদেরকে সঙ্গে নিয়ে তার উপর আক্রমণ চালায়। কিন্তু প্রত্যেকবারই মহান আল্লাহ তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “যখন কোন ইয়াহুদী কোন মুসলমানকে একাকী পায় তখন তার অন্তরে তাকে হত্যা করার ইচ্ছা পয়দা হয়ে যায়। অন্য এক সনদেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। কিন্তু তা অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল। তবে হ্যাঁ, মুসলমানদের বন্ধুত্বের ব্যাপারে সবচেয়ে নিকটবর্তী ঐসব লোক, যারা নিজেদেরকে নাসারা বলে। যারা হযরত ঈসা (আঃ) -এর সত্য অনুসারী এবং ইঞ্জীলের আসল ও সঠিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। তাদের মনে মোটের উপর মুসলমান ও ইসলামের প্রতি মহব্বত আছে। এর কারণ এই যে, তাদের মধ্যে নম্রতা রয়েছে। যেমন ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর অনুসারীদের অন্তরে আমি নম্রতা ও দয়া সৃষ্টি করেছি।' (৫৭:২৭) তাদের কিতাবে নির্দেশ আছে-যে তোমার ডান গালে থাপ্পড় মারে, তুমি তার সামনে তোমার বাম গালটিও এগিয়ে দাও। তাদের শরীয়তে যুদ্ধই নেই। এখানে তাদের বন্ধুত্বের কারণ এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাদের মধ্যে খতীব ও উপদেষ্টা রয়েছে। (আরবী) -এর বহু বচন হচ্ছে (আরবী) এর বহু বচন (আরবী) ও আসে (আরবী) শব্দটি 'শব্দের (আরবী) বহু বচন। এটা (আরবী) শব্দ থেকে বের হয়েছে। রাহেব বলা হয় আবেদকে। এ শব্দের অর্থ হচ্ছে ভয়। যেমন (আরবী) -এর বহু বচন (আরবী) 'এবং - (আরবী) এর বহু বচন (আরবী) এসে থাকে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, কখনও কখনও শব্দটি এক বচনের জন্যেও এসে থাকে। এর বহু বচন এসে থাকে। যেমন (আরবী) ও (আরবী) এবং (আরবী) ও (আরবী)। আবার কোন কোন সময় এর বহু বচন এসে থাকে। আরবীদের কবিতাতেও (আরবী) শব্দটি এক বচনে ব্যবহৃত হয়েছে। একটি লোক (আরবী) ও (আরবী) পড়ে, একটি লোক হযরত সালমান ফারসী (রাঃ)-কে এর অর্থ জিজ্ঞেস করেন। তখন তিনি উত্তরে বলেনঃ (আরবী) কে খানকান ও জনহীন স্থানে ছেড়ে এসো। আমাকে তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) ও (আরবী) পড়িয়েছেন। (বাযায ও ইবনে মিরদুওয়াই)মোটকথা এখানে তাদের তিনটি গুণের কথা বলা হয়েছে। (১) তাদের মধ্যে আলেম বেশী থাকা, (২) তাদের মধ্যে আবেদের সংখ্যা বেশী হওয়া এবং (৩) তাদের মধ্যে নম্রতা ও ভদ্রতা থাকা।

আল-মায়িদা 5:83

৮৩-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলছেন-যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতারিত অহী শ্রবণ করে তখন হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি তাদেরকে দেখতে পাও যে, তাদের চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়েছে। কেননা, তারা সেই ভবিষ্যত সুসংবাদ সম্পর্কে অবহিত হয়ে গেছে যা (তারা মুহাম্মাদ সঃ -এর প্রেরিতত্ব সম্পর্কীয় সংবাদ) তাদের কিতাব তাওরাত ও ইঞ্জীলে দেখেছিল। তাই তারা বলতে শুরু করে- হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছি। সুতরাং আপনি আমাদের ঐ দলের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা সাক্ষ্য দান করেছে ও ঈমান এনেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) ও তাঁর উম্মতকে বুঝানো হয়েছে, যারা তাদের নবী (সঃ)-এর জন্যে সাক্ষ্য দান করেছিলেন যে, নবী (সঃ) প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং অন্যান্য রাসূলদের জন্যেও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাঁরাও তাবলীগের দায়িত্ব পালন করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আরও বলেন যে, লোকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, যারা কৃষক শ্রেণীর লোক ছিলেন এবং হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে আবিসিনিয়া হতে এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাদেরকে কুরআন মাজীদ পাঠ করে শুনান তখন তারা ঈমান আনেন। ঐ সময় তাঁদের চোখে অশ্রু দেখা দেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “যখন তোমরা স্বদেশে ফিরে যাবে তখন তোমাদের পূর্ব মাযহাবে ফিরে যাবে না তো?” তাঁরা উত্তরে বলেনঃ ‘আমরা আমাদের এ দ্বীন হতে কখনও ফিরে যাবো না। মহান আল্লাহ তাঁদের উক্তিকে এভাবে নকল করেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের এমন কি ওযর আছে যে, আমরা ঈমান আনবো না আল্লাহর প্রতি এবং সেই সত্যের প্রতি যা আমাদের কাছে এসেছে? অথচ আমরা এ আশা রাখবো যে, আমাদের প্রভু সৎ লোকদের সাথে আমাদেরকে শামিল করবেন।” ঐ লোকগুলো ছিলেন নাসারা যাদের সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেনঃ “আহলে কিতাবের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে এবং বিশ্বাস রাখে ঐ কিতাবের উপর যা তোমাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা তাদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল, আর আল্লাহর সামনে তারা বিনয় প্রকাশ করে।” অন্য জায়গায় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন তাদের সামনে (কুরআন) পাঠ করা হয় তখন তারা বলে-আমরা এর উপর ঈমান এনেছি, এটা আমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে সত্য, আমরা তো ইতিপূর্বেই মুসলমান ছিলাম।” এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা এখানে বলেনঃ “এ স্বীকারোক্তির কারণে আল্লাহ তাদেরকে এমন জান্নাতসমূহ প্রদান করবেন যেগুলোর নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে, তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। এক মুহূর্তের জন্যেও তাদেরকে সেখান থেকে সরানো হবে না, সৎকর্মশীলদের প্রতিদান এটাই।” অতঃপর তিনি দুষ্ট লোকদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ যারা কুফরী করলো এবং আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, তারা জাহান্নামের অধিবাসী।

আল-মায়িদা 5:84

৮৩-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলছেন-যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতারিত অহী শ্রবণ করে তখন হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি তাদেরকে দেখতে পাও যে, তাদের চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়েছে। কেননা, তারা সেই ভবিষ্যত সুসংবাদ সম্পর্কে অবহিত হয়ে গেছে যা (তারা মুহাম্মাদ সঃ -এর প্রেরিতত্ব সম্পর্কীয় সংবাদ) তাদের কিতাব তাওরাত ও ইঞ্জীলে দেখেছিল। তাই তারা বলতে শুরু করে- হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছি। সুতরাং আপনি আমাদের ঐ দলের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা সাক্ষ্য দান করেছে ও ঈমান এনেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) ও তাঁর উম্মতকে বুঝানো হয়েছে, যারা তাদের নবী (সঃ)-এর জন্যে সাক্ষ্য দান করেছিলেন যে, নবী (সঃ) প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং অন্যান্য রাসূলদের জন্যেও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাঁরাও তাবলীগের দায়িত্ব পালন করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আরও বলেন যে, লোকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, যারা কৃষক শ্রেণীর লোক ছিলেন এবং হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে আবিসিনিয়া হতে এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাদেরকে কুরআন মাজীদ পাঠ করে শুনান তখন তারা ঈমান আনেন। ঐ সময় তাঁদের চোখে অশ্রু দেখা দেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “যখন তোমরা স্বদেশে ফিরে যাবে তখন তোমাদের পূর্ব মাযহাবে ফিরে যাবে না তো?” তাঁরা উত্তরে বলেনঃ ‘আমরা আমাদের এ দ্বীন হতে কখনও ফিরে যাবো না। মহান আল্লাহ তাঁদের উক্তিকে এভাবে নকল করেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের এমন কি ওযর আছে যে, আমরা ঈমান আনবো না আল্লাহর প্রতি এবং সেই সত্যের প্রতি যা আমাদের কাছে এসেছে? অথচ আমরা এ আশা রাখবো যে, আমাদের প্রভু সৎ লোকদের সাথে আমাদেরকে শামিল করবেন।” ঐ লোকগুলো ছিলেন নাসারা যাদের সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেনঃ “আহলে কিতাবের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে এবং বিশ্বাস রাখে ঐ কিতাবের উপর যা তোমাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা তাদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল, আর আল্লাহর সামনে তারা বিনয় প্রকাশ করে।” অন্য জায়গায় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন তাদের সামনে (কুরআন) পাঠ করা হয় তখন তারা বলে-আমরা এর উপর ঈমান এনেছি, এটা আমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে সত্য, আমরা তো ইতিপূর্বেই মুসলমান ছিলাম।” এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা এখানে বলেনঃ “এ স্বীকারোক্তির কারণে আল্লাহ তাদেরকে এমন জান্নাতসমূহ প্রদান করবেন যেগুলোর নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে, তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। এক মুহূর্তের জন্যেও তাদেরকে সেখান থেকে সরানো হবে না, সৎকর্মশীলদের প্রতিদান এটাই।” অতঃপর তিনি দুষ্ট লোকদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ যারা কুফরী করলো এবং আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, তারা জাহান্নামের অধিবাসী।

আল-মায়িদা 5:85

৮৩-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলছেন-যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতারিত অহী শ্রবণ করে তখন হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি তাদেরকে দেখতে পাও যে, তাদের চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়েছে। কেননা, তারা সেই ভবিষ্যত সুসংবাদ সম্পর্কে অবহিত হয়ে গেছে যা (তারা মুহাম্মাদ সঃ -এর প্রেরিতত্ব সম্পর্কীয় সংবাদ) তাদের কিতাব তাওরাত ও ইঞ্জীলে দেখেছিল। তাই তারা বলতে শুরু করে- হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছি। সুতরাং আপনি আমাদের ঐ দলের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা সাক্ষ্য দান করেছে ও ঈমান এনেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) ও তাঁর উম্মতকে বুঝানো হয়েছে, যারা তাদের নবী (সঃ)-এর জন্যে সাক্ষ্য দান করেছিলেন যে, নবী (সঃ) প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং অন্যান্য রাসূলদের জন্যেও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাঁরাও তাবলীগের দায়িত্ব পালন করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আরও বলেন যে, লোকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, যারা কৃষক শ্রেণীর লোক ছিলেন এবং হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে আবিসিনিয়া হতে এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাদেরকে কুরআন মাজীদ পাঠ করে শুনান তখন তারা ঈমান আনেন। ঐ সময় তাঁদের চোখে অশ্রু দেখা দেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “যখন তোমরা স্বদেশে ফিরে যাবে তখন তোমাদের পূর্ব মাযহাবে ফিরে যাবে না তো?” তাঁরা উত্তরে বলেনঃ ‘আমরা আমাদের এ দ্বীন হতে কখনও ফিরে যাবো না। মহান আল্লাহ তাঁদের উক্তিকে এভাবে নকল করেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের এমন কি ওযর আছে যে, আমরা ঈমান আনবো না আল্লাহর প্রতি এবং সেই সত্যের প্রতি যা আমাদের কাছে এসেছে? অথচ আমরা এ আশা রাখবো যে, আমাদের প্রভু সৎ লোকদের সাথে আমাদেরকে শামিল করবেন।” ঐ লোকগুলো ছিলেন নাসারা যাদের সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেনঃ “আহলে কিতাবের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে এবং বিশ্বাস রাখে ঐ কিতাবের উপর যা তোমাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা তাদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল, আর আল্লাহর সামনে তারা বিনয় প্রকাশ করে।” অন্য জায়গায় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন তাদের সামনে (কুরআন) পাঠ করা হয় তখন তারা বলে-আমরা এর উপর ঈমান এনেছি, এটা আমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে সত্য, আমরা তো ইতিপূর্বেই মুসলমান ছিলাম।” এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা এখানে বলেনঃ “এ স্বীকারোক্তির কারণে আল্লাহ তাদেরকে এমন জান্নাতসমূহ প্রদান করবেন যেগুলোর নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে, তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। এক মুহূর্তের জন্যেও তাদেরকে সেখান থেকে সরানো হবে না, সৎকর্মশীলদের প্রতিদান এটাই।” অতঃপর তিনি দুষ্ট লোকদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ যারা কুফরী করলো এবং আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, তারা জাহান্নামের অধিবাসী।

আল-মায়িদা 5:86

৮৩-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলছেন-যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতারিত অহী শ্রবণ করে তখন হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি তাদেরকে দেখতে পাও যে, তাদের চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়েছে। কেননা, তারা সেই ভবিষ্যত সুসংবাদ সম্পর্কে অবহিত হয়ে গেছে যা (তারা মুহাম্মাদ সঃ -এর প্রেরিতত্ব সম্পর্কীয় সংবাদ) তাদের কিতাব তাওরাত ও ইঞ্জীলে দেখেছিল। তাই তারা বলতে শুরু করে- হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছি। সুতরাং আপনি আমাদের ঐ দলের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা সাক্ষ্য দান করেছে ও ঈমান এনেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) ও তাঁর উম্মতকে বুঝানো হয়েছে, যারা তাদের নবী (সঃ)-এর জন্যে সাক্ষ্য দান করেছিলেন যে, নবী (সঃ) প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং অন্যান্য রাসূলদের জন্যেও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাঁরাও তাবলীগের দায়িত্ব পালন করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আরও বলেন যে, লোকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, যারা কৃষক শ্রেণীর লোক ছিলেন এবং হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর সাথে আবিসিনিয়া হতে এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাদেরকে কুরআন মাজীদ পাঠ করে শুনান তখন তারা ঈমান আনেন। ঐ সময় তাঁদের চোখে অশ্রু দেখা দেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “যখন তোমরা স্বদেশে ফিরে যাবে তখন তোমাদের পূর্ব মাযহাবে ফিরে যাবে না তো?” তাঁরা উত্তরে বলেনঃ ‘আমরা আমাদের এ দ্বীন হতে কখনও ফিরে যাবো না। মহান আল্লাহ তাঁদের উক্তিকে এভাবে নকল করেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের এমন কি ওযর আছে যে, আমরা ঈমান আনবো না আল্লাহর প্রতি এবং সেই সত্যের প্রতি যা আমাদের কাছে এসেছে? অথচ আমরা এ আশা রাখবো যে, আমাদের প্রভু সৎ লোকদের সাথে আমাদেরকে শামিল করবেন।” ঐ লোকগুলো ছিলেন নাসারা যাদের সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেনঃ “আহলে কিতাবের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে এবং বিশ্বাস রাখে ঐ কিতাবের উপর যা তোমাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা তাদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল, আর আল্লাহর সামনে তারা বিনয় প্রকাশ করে।” অন্য জায়গায় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন তাদের সামনে (কুরআন) পাঠ করা হয় তখন তারা বলে-আমরা এর উপর ঈমান এনেছি, এটা আমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে সত্য, আমরা তো ইতিপূর্বেই মুসলমান ছিলাম।” এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা এখানে বলেনঃ “এ স্বীকারোক্তির কারণে আল্লাহ তাদেরকে এমন জান্নাতসমূহ প্রদান করবেন যেগুলোর নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে, তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। এক মুহূর্তের জন্যেও তাদেরকে সেখান থেকে সরানো হবে না, সৎকর্মশীলদের প্রতিদান এটাই।” অতঃপর তিনি দুষ্ট লোকদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ যারা কুফরী করলো এবং আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, তারা জাহান্নামের অধিবাসী।

আল-মায়িদা 5:87

৮৭-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতটি নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের একটি দলের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা বলেছিলেন‘আমরা আমাদের পুংলিঙ্গ কর্তন করবো এবং দুনিয়ার কাম, লোভ-লালসা পরিত্যাগ করবো।' নবী (সঃ)-এর কাছে এ সংবাদ পৌছলে তিনি তাদেরকে ডেকে পাঠান এবং তাদেরকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তারা বলেনঃ হ্যা, আমরা এরূপই সংকল্প করেছি।' তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “কিন্তু জেনে রেখো যে, আমি তো রোযাও রাখি এবং (কোন কোন সময়) নাও রাখি, রাত্রে নামাযও পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আমি স্ত্রীদের সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধও হই। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার নীতি গ্রহণ করে সে আমারই অন্তর্ভুক্ত এবং যে ব্যক্তি আমার নীতি গ্রহণ করে না সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে মিরদুওয়াইও বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কয়েকজন সাহাবী তার পত্নীদেরকে তার গোপনীয় আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন! তখন (সম্ভবতঃ তার রাত দিনের আমল সম্পর্কে অবহিত হয়ে) তাঁদের মধ্যে কোন একজন বলেনঃ “আমি এখন থেকে আর কখনও গোশত খাবো না। আর একজন বলেনঃ “আমি কখনও স্ত্রীলোকদের সাথে বিবাহিত হবো না।' অন্য একজন বললেনঃ আমি কখনও বিছানায় শয়ন করবো। না (বরং মাটিতে শয়ন করববা)।” এসব কথা নবী (সঃ)-এর কানে পৌঁছলে তিনি বলেনঃ “ঐ লোকদের কি হয়েছে যে, তাদের কেউ একথা বলে এবং ও কথা বলে? কিন্তু আমি তো রোযাও রাখি এবং কোন কোন সময় নাও রাখি, আমি নিদ্রাও যাই এবং নামাযও পড়ি, আমি গোশতও খাই এবং নারীদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার নীতি থেকে সরে পড়ে সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি যখন গোশত ভক্ষণ করি তখন স্ত্রীলোকদের প্রতি আমার কামভাব খুবই বৃদ্ধি পায়। এ জন্যে আমি নিজের উপর গোশত হারাম করে ফেলেছি। তখন ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্যে যে পবিত্র জিনিসগুলো হালাল করেছেন সেগুলো তোমরা নিজেদের জন্যে হারাম করো না' -এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ আমরা এক যুদ্ধে দীর্ঘদিন পর্যন্ত নবী (সঃ)-এর সাথে অবস্থান করি এবং সে সময় আমাদের সাথে স্ত্রীলোক ছিল না। তখন আমরা তাকে জিজ্ঞেস করিঃ আমরা কি খাসী হবো না (অর্থাৎ আমাদের অণ্ডকোষ কর্তন করবো না)? তিনি তখন আমাদেরকে এটা করতে নিষেধ করেন এবং আম নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে কাপড়ের বিনিময়ে কোন স্ত্রীলোককে বিয়ে করার অনুমতি প্রদান করেন। অতঃপর হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। কিন্তু এটা নিকাহে মুআ হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত মাসরূক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা (একদা) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট হাযির ছিলাম, এমন সময় (রান্নাকৃত) পশুর স্তনের গোশত নিয়ে আসা হলো। তখন (আমরা সবাই তা খেতে শুরু করলাম, কিন্তু একটি লোক মজলিস থেকে সরে পড়লো। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ কাছে এসো (এবং খাওয়াতে অংশগ্রহণ কর)। সে তখন বললোঃ “আমি তো এটা না খাওয়ার শপথ গ্রহণ করেছি। তখন তিনি বললেনঃ তুমি এসে এটা খেয়ে নাও এবং শপথ ভেঙ্গে দেয়ার কাফফারা আদায় কর। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করলেন।ইমাম শাফিঈ (রঃ) প্রমুখ আলেমদের মাযহাব এই যে, যে ব্যক্তি নিজের উপর কোন খাদ্য অথবা স্ত্রীদের ছাড়া অন্য কোন জিনিস হারাম করে নেয় তা তার উপর হারাম হয়ে যায় না এবং তার উপর কোন কাফফারাও নেই। কেননা, আল্লাহ পাক বলেছেন- হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের উপর পবিত্র জিনিসগুলো হারাম করো না, যেগুলো তিনি তোমাদের জন্যে হালাল করেছেন। এ কারণেই যে ব্যক্তি নিজের উপর গোশত ভক্ষণ হারাম করে নিয়েছিল তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাফফারা আদায় করার নির্দেশ দেননি। কিন্তু আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) প্রমুখ ইমামগণ বলেন যে, যে ব্যক্তি নিজের উপর কোন খাদ্য বা পোশাক অথবা অন্য কোন জিনিস হারাম করে নেয়, তার উপর সেই কসম ভঙ্গের কাফফারা ওয়াজিব। কেননা, যখন কোন লোক নিজের উপর কোন জিনিস পরিত্যাগ করা অপরিহার্য করে নেয়, তখন কসমের কাফফারার মতই নিজের উপর শুধু হারাম করে নেয়ার ফলে ও অপরিহার্য না হওয়া জিনিসকে অপরিহার্য করে নেয়ার প্রতিশোধ হিসেবে তাকে জবাবদিহি করা উচিত এবং এটা কাফফারার মাধ্যমেই সম্ভব। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এরূপ ফতওয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, আল্লাহ পাকের কালাম দ্বারাও এটা সাব্যস্ত হচ্ছে। ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী! আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেস, আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে খুশী করার জন্যে তা নিজের জন্যে হারাম করছেন কেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়। (৬৬:১) এখানে আল্লাহ তা'আলা উল্লিখিত আয়াত বর্ণনা করার পর কসমের কাফফারার বর্ণনা দিলেন। এর দ্বারা এটা সাব্যস্ত হচ্ছে যে, কসমের উল্লেখ না থাকলেও যদি কেউ নিজের উপর কোন জিনিস হারাম করে নেয় তবে কসমের কাফফারার মতই তার উপর কাফফারা ওয়াজিব হবে। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, কয়েকজন সাহাবী, যেমন হযরত উসমান ইবনে মাউন (রাঃ) এবং আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) দুনিয়া পরিত্যাগ করা, পুংলিঙ্গ কর্তন করা এবং চট পরিধান করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ইবনে জুরাইহ্ ইকরামা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ), আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ), ইবনে মাসউদ (রাঃ), মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ), আবু হুযাইফা (রাঃ)-এর ক্রীতদাস সালিম (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণ সংসার ত্যাগের ইচ্ছে করে বাড়ীর মধ্যে বসে পড়লেন, স্ত্রীদের সংসর্গ ত্যাগ করলেন, চট পরিধান করলেন এবং ভাল ভাল খাদ্য ও পোশাক নিজেদের উপর হারাম করে দিলেন। তারা বানী ইসরাঈলের সন্ন্যাসীদের মত জীবন যাপন করতে শুরু করলেন এবং খাসী হয়ে যাওয়ার সংকল্প করলেন। এ ঐক্যমতে তারা পৌঁছলেন যে, পর্যায়ক্রমে সারারাত সালাত আদায় করবেন এবং সারাদিন রোযা রাখবেন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল এবং তাদেরকে বলা হল ও আল্লাহর পবিত্র ও হালাল বস্তুগুলোকে নিজেদের উপর হারাম করে নিয়ো না ও সীমা অতিক্রম করনা, আমি এসব লোককে কখনই পছন্দ করি না। এগুলো মুসলিমদের নীতি নয় যে, তোমরা স্ত্রীদের থেকে পৃথক থাকবে, ভাল খাবার, পানীয় ও পোশাক পরিত্যাগ করবে, সদা সারারাত ধরে সালাত আদায় করবে ও সারাদিন রোযা রাখবে এবং খাসী হয়ে যাবে, অর্থাৎ পুংলিঙ্গ কর্তন করবে। এসব নীতি সম্পূর্ণ ভুল। অতঃপর যখন তাদের ব্যাপারে এ আয়াত অবতীর্ণ হল তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের কাছে লোক পাঠিয়ে তাদেরকে জানিয়ে দিলেন“তোমাদের উপর তোমাদের নফসের হক রয়েছে এবং তোমাদের চক্ষুর হক রয়েছে। তোমরা রোযা রাখবে ও (মাঝে মাঝে) রোযা ছেড়েও দিবে, (রাতে নফল) সালাত আদায় করবে এবং নিদ্রাও যাবে। আর জেনে রাখবে যে, যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত পরিত্যাগ করবে সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।” তখন তারা বললেন :হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এ সংকল্প হতে রক্ষা করুন এবং আপনার অবতারিত অহী অনুযায়ী চলার তাওফীক দিন।(আরবী) -এর অর্থ এটাও হতে পারে-তোমরা হালাল বস্তুকে নিজেদের উপর হারাম করে দিয়ে নফসের উপর সংকীর্ণতা আনয়ন করো না। আবার এও অর্থ হতে পারে-তোমরা হালালকে হারাম বানিয়ে নিয়ে না এবং হালাল দ্বারা উপকার লাভ করতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করো না। হালালকেও প্রয়োজন পরিমাণই গ্রহণ কর, প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রহণ করো না। (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা খাও, পান কর, কিন্তু অপব্যয় করো না।”(৭:৩১) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “মুমিন ওরাই যে, যখন তারা খরচ করে তখন তারা অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না, বরং তাদের খরচ করণ এর মাঝামাঝি পন্থায় হয়ে থাকে।” আল্লাহ তা'আলা না ‘ইফরাত’ বা বাহুল্যের অনুমতি দিয়েছেন, না তাফরীত বা অত্যল্পতার অনুমতি দিয়েছেন। এ জন্যেই তিনি বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ তোমরা সীমা অতিক্রম করো না।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা সর্বাবস্থায় হালাল ও পবিত্র জিনিস ভক্ষণ কর এবং সর্বকাজে আল্লাহকেই ভয় কর। তাঁর মর্জির অনুসরণ কর এবং বিরোধিতা ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাক।