Tafseer ibn Kathir — আল-আনআম 6:64 – আল-আনআম 6:88
Contents
- আল-আনআম 6:64
- আল-আনআম 6:65
- আল-আনআম 6:66
- আল-আনআম 6:67
- আল-আনআম 6:68
- আল-আনআম 6:69
- আল-আনআম 6:70
- আল-আনআম 6:71
- আল-আনআম 6:72
- আল-আনআম 6:73
- আল-আনআম 6:74
- আল-আনআম 6:75
- আল-আনআম 6:76
- আল-আনআম 6:77
- আল-আনআম 6:78
- আল-আনআম 6:79
- আল-আনআম 6:80
- আল-আনআম 6:81
- আল-আনআম 6:82
- আল-আনআম 6:83
- আল-আনআম 6:84
- আল-আনআম 6:85
- আল-আনআম 6:86
- আল-আনআম 6:87
- আল-আনআম 6:88
আল-আনআম 6:64
৬৩-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেনযখন বান্দা স্থলভাগ ও জলভাগের অন্ধকারের মধ্যে অর্থাৎ কঠিন বিপদ-আপদের মধ্যে পতিত হয় তখন আমি তাদেরকে কি প্রকারে মুক্তি দিয়ে থাকি। যখন বান্দা সমুদ্রের ঘূর্ণির মধ্যে পড়ে গিয়েছিল এবং সেখানে বিচ্ছিন্ন বায়ু প্রবাহিত হচ্ছিল তখন তারা প্রার্থনার জন্যে এক আল্লাহকেই নির্দিষ্ট করে নিয়েছিল। যেমন এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন সমুদ্রে তোমাদের উপর কোন বিপদ পৌঁছে তখন সমস্ত অংশীদারকে ভুলে গিয়ে একমাত্র আল্লাহকেই ডেকে থাক।” (১৭:৬৭) আল্লাহ পাক এক স্থানে বলেনঃ “তিনি সেই আল্লাহ যিনি জলে ও স্থলে তোমাদেরকে ভ্রমণ করিয়ে থাকেন। যখন জাহাজ উত্তম ও অনুকূল বাতাসে চলতে থাকে তখন তোমরা খুবই খুশী হও। আর যখন বিচ্ছিন্ন ও প্রতিকূল বাতাস প্রবাহিত হয় এবং সব দিক থেকে ঢেউ এসে পড়ে আর তোমাদের মনে এই বিশ্বাস জন্মে যে, মৃত্যু তোমাদেরকে ঘিরে ফেলেছে, তখন তোমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আল্লাহকেই ডাকতে থাক এবং বল-হে আল্লাহ! যদি আপনি আমাদেরকে এই বিপদ থেকে মুক্তি দান করেন তবে অবশ্যই আমরা কৃতজ্ঞ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।"ইরশাদ হচ্ছে- চিন্তা কর তো, জল ও স্থলের অন্ধকারের মধ্যে তোমাদেরকে সোজা পথে কে পরিচালিত করে? আর স্বীয় অনুগ্রহে নির্মল বাতাস কে প্রবাহিত করে? আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ আছে কি যাদেরকে তোমরা শরীক বানিয়ে নিয়েছো?মহান আল্লাহ বলেনঃ স্থলভাগের ও জলভাগের অন্ধকার থেকে কে তোমাদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকেন? যাঁকে তোমরা প্রকাশ্যে ও গোপনে ডেকে ডেকে বল- যদি আপনি আমাদেরকে বিপদ থেকে মুক্তি দান করেন তবে আমরা আপনার কৃতজ্ঞ বান্দা হয়ে যাবো। হে রাসূল (সাঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাওআল্লাহই তোমাদেরকে এই সমুদয় বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি দান করে থাকেন। অথচ তোমরা খুশী মনে প্রতিমাগুলোকে তাঁর শরীক বানিয়ে নিচ্ছ! আল্লাহ তোমাদের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করতে পূর্ণ ক্ষমতাবান। যেমন সূরায়ে সুবহানে রয়েছে, তোমাদের প্রতিপালকই জাহাজসমূহ সমুদ্রে চালিয়ে থাকেন যেন তোমরা সম্পদ উপার্জন করতে পার। তিনি তোমাদের প্রতি দাতা ও দয়ালু। যখন তোমাদের উপর কোন বিপদ এসে পড়ে তখন তোমরা তোমাদের সমুদয় মূর্তিকে ভুলে গিয়ে আল্লাহকেই স্মরণ করে থাকো। আর যখন তিনি তোমাদেরকে সমুদ্রের বিপদ থেকে বাঁচিয়ে স্থলভাগে আনয়ন করেন তখন তোমরা আল্লাহকে এড়িয়ে চল, মানুষ খুবই অকৃতজ্ঞ। তোমরা কি মনে করেছে যে, স্থলভাগে এসেই রক্ষা পেয়ে গেছো? তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে পানিতে ডুবিয়ে দেয়ার মত যমীনেও ঢুকিয়ে দিতে পারেন কিংবা আকাশ থেকে তোমাদের উপর পাথর বর্ষণ করতে পারেন, অতঃপর তোমাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না। পুনরায় তিনি তোমাদেরকে সমুদ্রে ভ্রমণ করিয়ে প্রতিকূল বায়ু প্রবাহিত করতঃ পানিতে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম বা তোমাদের পায়ের নীচে থেকেই তোমাদের প্রতি শাস্তি প্রেরণে পূর্ণ ক্ষমতাবান। হাসান বলেন যে, এর দ্বারা মুশরিকদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। আল্লাহ পাক ক্ষমা করুন। আমরা তারই উপর ভরসা করি। এখানে আমরা উপরোক্ত আয়াতের সাথে সম্পর্কযুক্ত কতগুলো হাদীস বর্ণনা করবোঃ ইমাম বুখারী (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) এর অর্থ হচ্ছে- তোমরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গিয়ে পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে এই ধরনের শাস্তিতে জড়িত করতে পারেন। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ অর্থাৎ আমি আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।' আর -এর সময়ও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি আপনারই কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। আবার যখন তিনি। শুনেন তখন বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে এটা অনেকটা সহজ।' হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) -এই আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এর থেকে আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।' অতঃপর (আরবী) -এটুকু শুনে বলেনঃ অর্থাৎ আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। তারপর (আরবী) -এটুকু শুনে বলেনঃ “এটা সহজতর বটে।' তিনি ওটা থেকে আশ্রয় চাইলেও চাইতে পারতেন। হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াত শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এটা অবশ্যই হবে, এখন পর্যন্ত হয়নি।'হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন ? ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমরা বানী মুআবিয়া (রাঃ)-এর মসজিদে আগমন করি। তিনি মসজিদে প্রবেশ করে দু'রাকআত নামায পড়েন। অতঃপর দীর্ঘক্ষণ ধরে তিনি মহা মহিমান্বিত আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করতে থাকেন। তারপর তিনি বলেনঃ “আমি আমার প্রতিপালকের কাছে তিনটি জিনিসের আবেদন জানিয়েছিলাম- (১) আমার উম্মত যেন পানিতে ডুবে যাওয়ার মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে না যায়। তিনি তা কবুল করেছেন। (২) আমার উম্মত যেন (আরবী) বা দুর্ভিক্ষে ধ্বংস হয়ে না যায়। তিনি ওটাও ককূল করেছেন। (৩) তাদের পরস্পরের মধ্যে যেন যুদ্ধ-বিগ্রহের সৃষ্টি না হয়। তিনি ওটা না মঞ্জুর করেন।” (এই হাদীসটি ইমাম মুসলিম (মঃ) কিতাবুল ফিতানের মধ্যে তাখরীজ করেছেন। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে দুর্ভিক্ষ)ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্দিল্লাহ ইবনে জাবির ইবনে উতাইক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ বানু মু'আবিয়া পল্লীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) আমাদের নিকট আগমন করেন, ওটা হচ্ছে আনসারদের একটা গ্রাম। এসে তিনি বলেন- “তোমাদের এই মসজিদে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোথায় নামায পড়েছিলেন তা তুমি জান কি?' আমি বললাম, হ্যা, এবং একটি কোণের দিকে ইশারা করলাম। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ “তিনি তিনটি কি কি জিনিসের জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন তা কি তুমি জান? আমি উত্তরে বললাম, হ্যা। তিনি বললেনঃ ‘ঐগুলোর সংবাদ আমাকে দাও। আমি তখন বললাম, তিনি প্রার্থনা করেছিলেন যে, তাঁর উম্মতের উপর যেন কোন শত্রু জয়যুক্ত না হয় এবং তারা যেন দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে না যায়। ঐ দুটি মঞ্জুর করে নেয়া হয়। আর তিনি এই প্রার্থনাও করেন যে, তারা যেন। পরস্পরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে না পড়ে। এটা গৃহীত হয়নি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) তখন বলেনঃ তুমি ঠিকই বলেছো। কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের স্পরের মধ্যে যুদ্ধ হতেই থাকবে। (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এই হাদীসটির ইসনাদ খুবই উত্তম ও মযবুত বটে, কিন্তু ছ'টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থের মধ্যে এটি বর্ণিত হয়নি)ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ ‘সফরে একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখেছি যে, তিনি চাশতের আট রাকআত নামায পড়লেন। অতঃপর নামায শেষ করে তিনি বললেনঃ আমি রগবত’ ও ‘রহবতের’ (আগ্রহ ও ভীতির) নামায পড়লাম। আমার প্রভুর কাছে আমি তিনটি জিনিসের জন্যে প্রার্থনা করলাম। তিনি দু'টি ককূল করলেন কিন্তু একটি ককূল করলেন না। আমি প্রার্থনা করলাম যে, আমার উম্মত যেন দুর্ভিক্ষের কবলে না পড়ে। এটা তিনি মঞ্জুর করলেন। আমি আবেদন জানালাম যে, আমার উম্মতের উপর যেন তাদের শত্রুরা জয়যুক্ত হতে না পারে। এটাও তিনি ককূল করলেন। আমি দরখাস্ত করলাম যে, আমার উম্মত যেন দলে দলে বিভক্ত হয়ে না পড়ে। এটা তিনি মঞ্জুর করলেন না।হযরত মুআহ্ ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে গেলাম। বলা হলো যে, তিনি এখনই বেরিয়ে গেলেন। যেখানেই যাই সেখানেই বলা হয় যে, তিনি এখনই চলে গেলেন। অবশেষে আমি তাঁকে এক জায়গায় নামাযের অবস্থায় দেখতে পেলাম। আমি তাঁর সাথে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনি দীর্ঘক্ষণ ধরে নামায পড়লেন। নামাযের পরে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি এতো দীর্ঘক্ষণ ধরে নামায পড়লেন কেন? তিনি উত্তরে বললেন ঃ “আমি ভয় ও আগ্রহের নামায পড়ছিলাম। অতঃপর তিনি উপরোক্ত তিনটি প্রার্থনার বর্ণনা দেন।ইমাম আহমাদ (রঃ) বানী যাহরার গোলাম খাব্বাব ইবনে আরত (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তিনি বলেনঃ একদা আমি সারা রাত ধরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায পড়ছিলাম। তিনি নামাযের সালাম ফিরালে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আজ এতো দীর্ঘ সময় ধরে নামায পড়লেন যে, এর পূর্বে কোন দিন আমি আপনাকে এত লম্বা সময় ধরে নামায পড়তে দেখিনি (এর কারণ কি?)! তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, এটা ছিল রগবত ও ভীতির নামায । এই নামাযে আমি আমার মহা মহিমান্বিত প্রভুর নিকট তিনটি জিনিসের জন্যে প্রার্থনা করেছিলাম। দু’টি তিনি মঞ্জুর করেছেন এবং একটি মঞ্জুর করেননি। আমার মহান প্রভুর কাছে প্রার্থনা করলাম যে, আমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদেরকে যে জিনিসে ধ্বংস করে দিয়েছিল তা যেন আমাদেরকে ধ্বংস না করে। এটা তিনি কবুল করেছেন। আমার সম্মানিত প্রভুর নিকট আমি আবেদন জানালাম যে, আমাদের উপর আমাদের শত্রুরা যেন জয়যুক্ত হতে না পারে। এটাও গৃহীত হয়েছে। আমার মহা মর্যাদাবান প্রতিপালকের কাছে আমি দরখাস্ত করলাম যে, আমরা যেন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে না পড়ি। এটা তিনি কবুল করলেন না। (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং ইমাম তিমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান ও সহীহ বলেছেন) আবু মালিক (রঃ) বলেনঃ “আমি বর্ণনাকারী নাফে ইবনে খালিদকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি এই হাদীসটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ হ্যা, আমি ঐ লোকদের মুখে শুনেছি যারা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছিলেন। হযরত শাদ্দাদ ইবনে আউস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার জন্যে যমীনকে নিকটবর্তী করে দিয়েছেন, এমন কি আমি ওর মাশরিক ও মাগরিবকে দেখতে পাই এবং আমার উম্মত এই সবের মালিক হয়ে যাবে। আমাকে দুটি ধন-ভাণ্ডার দেয়া হয়েছে। একটি সাদা ও অপরটি লাল। (সাদা ও লাল ধন-ভাণ্ডার দ্বারা স্বর্ণ ও রৌপ্য বুঝানো হয়েছে) আমি আমার মহা মহিমান্বিত প্রভুর নিকট প্রার্থনা করেছিলাম যে, আমার উম্মত যেন সাধারণ দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত না হয়। আরও প্রার্থনা জানিয়েছিলাম যে, তাদের উপর শক্ররা যেন এমনভাবে জয়যুক্ত না হয় যার ফলে তারা সাধারণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। আমার প্রার্থনা এটাও ছিল যে, আমার উম্মত যেন দলে দলে বিভক্ত না হয়। তখন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আমি যে ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছি তা রদ হবে না। আমি তোমার এই প্রার্থনা মঞ্জুর করলাম যে, তোমার উম্মত সাধারণ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়বে না। আর আমি তোমার এই প্রার্থনাও কবুল করলাম যে, তোমার উম্মতের উপর তাদের শত্রুরা এমনভাবে জয়যুক্ত হবে না যে, তাদেরকে ধ্বংস করবে, হত্যা করবে এবং বন্দী করবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি শুধুমাত্র আমার উম্মতের পথভ্রষ্ট ইমাম ও নেতৃবর্গকে ভয় করি। যদি একবার আমার উম্মতের উপর তরবারী চড়ে যায় তবে তা আর নামবার নয়। বরং কিয়ামত পর্যন্ত তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ চলতে থাকবে।” (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এই হাদীসটি ছ’টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়নি। তবে এর ইসনাদ খুবই উত্তম ও মযবুত)তিবরানী (রঃ) হযরত জাবির ইবনে সুমরাতুস সুওয়ারী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তিনটি জিনিসের জন্যে আবেদন জানিয়েছিলাম। তিনি দুটি মঞ্জুর করেছেন এবং একটি না মঞ্জুর করেছেন। আমি প্রার্থনা করেছিলাম, হে আমার প্রভু! আমার উম্মতকে আপনি ক্ষুধায় ধ্বংস করবেন না। তিনি বললেনঃ “এটা তোমার জন্যে কবুল করা হলো।” আমি বললাম, হে আমার প্রভু! আপনি তাদের উপর তাদের ছাড়া অন্যদেরকে অর্থাৎ মুশরিকদেরকে এমনভাবে জয়যুক্ত করবেন না যে, তারা তাদেরকে ধ্বংস করে দেবে। তিনি বললেনঃ “এটাও তোমার জন্যে মঞ্জুর করলাম।” আমি প্রার্থনায় বললাম, হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার উম্মতের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ সৃষ্টি করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন। আমার প্রভু এটা মঞ্জুর করলেন না।হযরত নাফে' ইবনে খালিদ খুযায়ী (রঃ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের মধ্যে একজন এবং বৃক্ষের নীচে অনুষ্ঠিত বায়আতুর রিযওয়ানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়েন। জনগণ তাকে ঘিরে রয়েছিলেন। তিনি হালকাভাবে নামায আদায় করেন, তবে রুকূ ও সিজদা পূর্ণভাবেই করেন। কিন্তু তাঁর নামাযের বৈঠক খুবই দীর্ঘ হয়। এমন কি আমরা একে অপরকে ইঙ্গিতে বলি যে, সম্ভবতঃ তার উপর অহী অবতীর্ণ হচ্ছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “না, রগবত ও ভীতির নামায পড়ছিলাম।” এই পূর্ণ হাদীসটি শোনার পর নাফে' ইবনে খালিদ খুযায়ীকে বলি, আপনার পিতা কি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখ থেকে শুনেছেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, আমার পিতা বলেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তার দশটি অঙ্গুলির মত দশবার শুনেছেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আমি আমার মহা মহিমান্বিত প্রভুর নিকট প্রার্থনা করেছি যে, তিনি যেন তাদেরকে চারটি জিনিস থেকে দূরে রাখেন। তখন আল্লাহ তাদেরকে দুটি জিনিস থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমি আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম যে, তিনি যেন আমার উম্মতের উপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ না করেন, তারা যেন ফিরাউন ও তার লোকজনদের মত ডুবে না মরে, তারা যেন দলে দলে বিভক্ত হয়ে না পড়ে এবং তারা যেন পরস্পরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে না পড়ে। মহান আল্লাহ তখন পাথর বর্ষণ না করা এবং ডুবে না মরার প্রার্থনা কবুল করেছেন বটে, কিন্তু তারা দলে দলে বিভক্ত না হওয়া এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘটিত না হওয়া এই প্রার্থনা দু’টি তিনি ককূল করেননি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবী) তখন নবী (সঃ) উঠে অযু করেন এবং দুআ করতে থাকেনঃ “হে আল্লাহ! উপর ও নীচ হতে আমার উম্মতের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করবেন না এবং তাদের মধ্যে যেন দলাদলি সৃষ্টি না হয়, তারা যেন পরস্পরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে না পড়ে।” তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে বলেন, “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা আপনার উম্মতকে আকাশ থেকে শাস্তি অবতীর্ণ হওয়া থেকে এবং পায়ের নীচ হতে আযাব নাযিল হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। এর পরে এই শ্ৰেণীরও এই বিষয়ের আরও কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর পুনরাবৃত্তি তরজমা ও তাফসীর পাঠকদের জন্যে নিষ্প্রয়োজন। আসমানী আযাব দ্বারা পাথর বর্ষণ এবং পায়ের নীচের শাস্তি দ্বারা যমীন ধ্বসে যাওয়া বুঝানো হয়েছে। উল্লিখিত চারটি জিনিসের মধ্যে দু'টি নবী (সঃ)-এর ইন্তেকালের পঁচিশ বছর পর থেকেই প্রকাশ পেতে থাকে। অর্থাৎ মুসলমানদের মধ্যে মতভেদ ও দলাদলি সৃষ্টি এবং তাদের দু'দলের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ শুরু। আর আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ ও যমীন ধ্বসে যাওয়া থেকে উম্মতে মুহাম্মদিয়াকে মাহফুয ও নিরাপদ রাখা হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), সুদ্দী (রঃ), ইবনে যায়েদ (রঃ) এবং ইবনে জারীর (রঃ) ভাবার্থ এটাই গ্রহণ করেছেন।এই আয়াতের ব্যাপারে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) মসজিদে অথবা মিম্বরের উপরে অবস্থানরত অবস্থায় চীৎকার করে বলেছিলেন, “হে লোক সকল! তোমাদের উপর আল্লাহর আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। যদি আকাশ থেকে শাস্তি এসে যায় তবে কারও রক্ষা নেই। আর যদি পায়ের নীচ থেকে আযাব এসে পড়ে তবে তোমাদেরকে নিয়ে যমীন ধ্বসে যাবে এবং তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। যদি তোমরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড় এবং পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হয়ে যাও তবে এটা সবচেয়ে জঘন্য ব্যাপার হবে।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতেন যে, উপরোক্ত আয়াতের (আরবী) দ্বারা দুষ্ট নেতাদেরকে বুঝানো হয়েছে এবং (আরবী) দ্বারা বুঝানো হয়েছে দুষ্ট খাদেম এবং খারাপ অনুসারীদেরকে। অথবা এর দ্বারা আমীর ও গরীবদেরকে বুঝানো হয়েছে। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এই উক্তিটি যুক্তিপূর্ণ হলেও প্রথম উক্তিটিই বেশী স্পষ্ট ও মযবুত। তিনি বলেন যে, এর সঠিকতার সাক্ষ্য স্বয়ং মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তিটি বহন করছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি এর থেকে নিরাপদ হয়ে গেছ যে, আল্লাহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দিয়ে তোমাদেরকে ওর ভিতরে ঢুকিয়ে দিবেন এবং ওটা গরম হয়ে গিয়ে টগবগ করে ফুটতে থাকবে? অথবা তোমরা কি এর থেকে নিরাপত্তা লাভ করেছ যে, তিনি তোমাদের উপর পূর্ববর্তী কওমের মত আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করবেন? সত্বরই তোমরা জানতে পারবে যে, আমার ভীতি প্রদর্শন কিরূপ সঠিক ছিল।” (৬৭:১৬-১৭)হাদীসে রয়েছে যে, আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত হওয়া, যমীন ধ্বসে পড়া, আকৃতি পরিবর্তিত হওয়া, এইগুলো এই উম্মতের মধ্যে সংঘটিত হবে এবং এইগুলো হচ্ছে কিয়ামতের নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত। কিয়ামতের পূর্বে এই নিদর্শনগুলো প্রকাশিত হবে এবং ইনশাআল্লাহ এইগুলোর বর্ণনা ওর স্থানে দেয়া হবে। (আরবী) দ্বারা বিভিন্ন ফিরকা বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আমার উম্মত তেহাত্তর ফিরকায় বিভক্ত হয়ে যাবে। এক ফিরকা ছাড়া বাকী সবগুলোই জাহান্নামী হবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, শাস্তি ও হত্যার মাধ্যমে এক দলকে অন্য দলের উপর বিজয়ী করে দেয়া হবে।(আরবী) অর্থাৎ লক্ষ্য কর? আমি বারে বারে বিভিন্ন উপায়ে আমার নিদর্শন ও যুক্তি প্রমাণ বর্ণনা করছি, উদ্দেশ্য এই যে, যেন বিষয়টিকে তারা পূর্ণরূপে জ্ঞানায়ত্ব ও হৃদয়ঙ্গম করে নিতে পারে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রাঃ) বলেন যে, যখন (আরবী) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার পরে তোমরা কাফির হয়ে যেয়ো না যে, তরবারী দ্বারা একে অপরের গর্দান উড়িয়ে দেবে।” তখন জনগণ বলেন, আমরা তো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল (এর পরেও কি আমরা এরূপ কাজ করবো?) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা।” তখন তাদের কেউ একজন বলেন, আমরা যখন মুসলমান তখন এটা হতে পারে না যে, আমাদের একে অপরকে হত্যা করবে। সেই সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) হে নবী (সঃ)! তোমার সম্প্রদায় একে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে অথচ এটা প্রমাণিত সত্য, তুমি বলে দাওআমি তোমাদের উকিল হয়ে আসিনি। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ প্রত্যেকটি সংবাদ প্রকাশের একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। অতি শীঘ্রই তোমরা নিজেদের পরিণতি সম্পর্কে অবহিত হতে পারবে। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-আনআম 6:65
৬৩-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেনযখন বান্দা স্থলভাগ ও জলভাগের অন্ধকারের মধ্যে অর্থাৎ কঠিন বিপদ-আপদের মধ্যে পতিত হয় তখন আমি তাদেরকে কি প্রকারে মুক্তি দিয়ে থাকি। যখন বান্দা সমুদ্রের ঘূর্ণির মধ্যে পড়ে গিয়েছিল এবং সেখানে বিচ্ছিন্ন বায়ু প্রবাহিত হচ্ছিল তখন তারা প্রার্থনার জন্যে এক আল্লাহকেই নির্দিষ্ট করে নিয়েছিল। যেমন এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন সমুদ্রে তোমাদের উপর কোন বিপদ পৌঁছে তখন সমস্ত অংশীদারকে ভুলে গিয়ে একমাত্র আল্লাহকেই ডেকে থাক।” (১৭:৬৭) আল্লাহ পাক এক স্থানে বলেনঃ “তিনি সেই আল্লাহ যিনি জলে ও স্থলে তোমাদেরকে ভ্রমণ করিয়ে থাকেন। যখন জাহাজ উত্তম ও অনুকূল বাতাসে চলতে থাকে তখন তোমরা খুবই খুশী হও। আর যখন বিচ্ছিন্ন ও প্রতিকূল বাতাস প্রবাহিত হয় এবং সব দিক থেকে ঢেউ এসে পড়ে আর তোমাদের মনে এই বিশ্বাস জন্মে যে, মৃত্যু তোমাদেরকে ঘিরে ফেলেছে, তখন তোমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আল্লাহকেই ডাকতে থাক এবং বল-হে আল্লাহ! যদি আপনি আমাদেরকে এই বিপদ থেকে মুক্তি দান করেন তবে অবশ্যই আমরা কৃতজ্ঞ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।"ইরশাদ হচ্ছে- চিন্তা কর তো, জল ও স্থলের অন্ধকারের মধ্যে তোমাদেরকে সোজা পথে কে পরিচালিত করে? আর স্বীয় অনুগ্রহে নির্মল বাতাস কে প্রবাহিত করে? আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ আছে কি যাদেরকে তোমরা শরীক বানিয়ে নিয়েছো?মহান আল্লাহ বলেনঃ স্থলভাগের ও জলভাগের অন্ধকার থেকে কে তোমাদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকেন? যাঁকে তোমরা প্রকাশ্যে ও গোপনে ডেকে ডেকে বল- যদি আপনি আমাদেরকে বিপদ থেকে মুক্তি দান করেন তবে আমরা আপনার কৃতজ্ঞ বান্দা হয়ে যাবো। হে রাসূল (সাঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাওআল্লাহই তোমাদেরকে এই সমুদয় বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি দান করে থাকেন। অথচ তোমরা খুশী মনে প্রতিমাগুলোকে তাঁর শরীক বানিয়ে নিচ্ছ! আল্লাহ তোমাদের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করতে পূর্ণ ক্ষমতাবান। যেমন সূরায়ে সুবহানে রয়েছে, তোমাদের প্রতিপালকই জাহাজসমূহ সমুদ্রে চালিয়ে থাকেন যেন তোমরা সম্পদ উপার্জন করতে পার। তিনি তোমাদের প্রতি দাতা ও দয়ালু। যখন তোমাদের উপর কোন বিপদ এসে পড়ে তখন তোমরা তোমাদের সমুদয় মূর্তিকে ভুলে গিয়ে আল্লাহকেই স্মরণ করে থাকো। আর যখন তিনি তোমাদেরকে সমুদ্রের বিপদ থেকে বাঁচিয়ে স্থলভাগে আনয়ন করেন তখন তোমরা আল্লাহকে এড়িয়ে চল, মানুষ খুবই অকৃতজ্ঞ। তোমরা কি মনে করেছে যে, স্থলভাগে এসেই রক্ষা পেয়ে গেছো? তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে পানিতে ডুবিয়ে দেয়ার মত যমীনেও ঢুকিয়ে দিতে পারেন কিংবা আকাশ থেকে তোমাদের উপর পাথর বর্ষণ করতে পারেন, অতঃপর তোমাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না। পুনরায় তিনি তোমাদেরকে সমুদ্রে ভ্রমণ করিয়ে প্রতিকূল বায়ু প্রবাহিত করতঃ পানিতে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম বা তোমাদের পায়ের নীচে থেকেই তোমাদের প্রতি শাস্তি প্রেরণে পূর্ণ ক্ষমতাবান। হাসান বলেন যে, এর দ্বারা মুশরিকদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। আল্লাহ পাক ক্ষমা করুন। আমরা তারই উপর ভরসা করি। এখানে আমরা উপরোক্ত আয়াতের সাথে সম্পর্কযুক্ত কতগুলো হাদীস বর্ণনা করবোঃ ইমাম বুখারী (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) এর অর্থ হচ্ছে- তোমরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গিয়ে পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে এই ধরনের শাস্তিতে জড়িত করতে পারেন। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ অর্থাৎ আমি আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।' আর -এর সময়ও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আমি আপনারই কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। আবার যখন তিনি। শুনেন তখন বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে এটা অনেকটা সহজ।' হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) -এই আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এর থেকে আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।' অতঃপর (আরবী) -এটুকু শুনে বলেনঃ অর্থাৎ আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। তারপর (আরবী) -এটুকু শুনে বলেনঃ “এটা সহজতর বটে।' তিনি ওটা থেকে আশ্রয় চাইলেও চাইতে পারতেন। হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াত শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এটা অবশ্যই হবে, এখন পর্যন্ত হয়নি।'হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন ? ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমরা বানী মুআবিয়া (রাঃ)-এর মসজিদে আগমন করি। তিনি মসজিদে প্রবেশ করে দু'রাকআত নামায পড়েন। অতঃপর দীর্ঘক্ষণ ধরে তিনি মহা মহিমান্বিত আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করতে থাকেন। তারপর তিনি বলেনঃ “আমি আমার প্রতিপালকের কাছে তিনটি জিনিসের আবেদন জানিয়েছিলাম- (১) আমার উম্মত যেন পানিতে ডুবে যাওয়ার মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে না যায়। তিনি তা কবুল করেছেন। (২) আমার উম্মত যেন (আরবী) বা দুর্ভিক্ষে ধ্বংস হয়ে না যায়। তিনি ওটাও ককূল করেছেন। (৩) তাদের পরস্পরের মধ্যে যেন যুদ্ধ-বিগ্রহের সৃষ্টি না হয়। তিনি ওটা না মঞ্জুর করেন।” (এই হাদীসটি ইমাম মুসলিম (মঃ) কিতাবুল ফিতানের মধ্যে তাখরীজ করেছেন। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে দুর্ভিক্ষ)ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্দিল্লাহ ইবনে জাবির ইবনে উতাইক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ বানু মু'আবিয়া পল্লীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) আমাদের নিকট আগমন করেন, ওটা হচ্ছে আনসারদের একটা গ্রাম। এসে তিনি বলেন- “তোমাদের এই মসজিদে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোথায় নামায পড়েছিলেন তা তুমি জান কি?' আমি বললাম, হ্যা, এবং একটি কোণের দিকে ইশারা করলাম। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ “তিনি তিনটি কি কি জিনিসের জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন তা কি তুমি জান? আমি উত্তরে বললাম, হ্যা। তিনি বললেনঃ ‘ঐগুলোর সংবাদ আমাকে দাও। আমি তখন বললাম, তিনি প্রার্থনা করেছিলেন যে, তাঁর উম্মতের উপর যেন কোন শত্রু জয়যুক্ত না হয় এবং তারা যেন দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে না যায়। ঐ দুটি মঞ্জুর করে নেয়া হয়। আর তিনি এই প্রার্থনাও করেন যে, তারা যেন। পরস্পরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে না পড়ে। এটা গৃহীত হয়নি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) তখন বলেনঃ তুমি ঠিকই বলেছো। কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের স্পরের মধ্যে যুদ্ধ হতেই থাকবে। (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এই হাদীসটির ইসনাদ খুবই উত্তম ও মযবুত বটে, কিন্তু ছ'টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থের মধ্যে এটি বর্ণিত হয়নি)ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ ‘সফরে একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখেছি যে, তিনি চাশতের আট রাকআত নামায পড়লেন। অতঃপর নামায শেষ করে তিনি বললেনঃ আমি রগবত’ ও ‘রহবতের’ (আগ্রহ ও ভীতির) নামায পড়লাম। আমার প্রভুর কাছে আমি তিনটি জিনিসের জন্যে প্রার্থনা করলাম। তিনি দু'টি ককূল করলেন কিন্তু একটি ককূল করলেন না। আমি প্রার্থনা করলাম যে, আমার উম্মত যেন দুর্ভিক্ষের কবলে না পড়ে। এটা তিনি মঞ্জুর করলেন। আমি আবেদন জানালাম যে, আমার উম্মতের উপর যেন তাদের শত্রুরা জয়যুক্ত হতে না পারে। এটাও তিনি ককূল করলেন। আমি দরখাস্ত করলাম যে, আমার উম্মত যেন দলে দলে বিভক্ত হয়ে না পড়ে। এটা তিনি মঞ্জুর করলেন না।হযরত মুআহ্ ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে গেলাম। বলা হলো যে, তিনি এখনই বেরিয়ে গেলেন। যেখানেই যাই সেখানেই বলা হয় যে, তিনি এখনই চলে গেলেন। অবশেষে আমি তাঁকে এক জায়গায় নামাযের অবস্থায় দেখতে পেলাম। আমি তাঁর সাথে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনি দীর্ঘক্ষণ ধরে নামায পড়লেন। নামাযের পরে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি এতো দীর্ঘক্ষণ ধরে নামায পড়লেন কেন? তিনি উত্তরে বললেন ঃ “আমি ভয় ও আগ্রহের নামায পড়ছিলাম। অতঃপর তিনি উপরোক্ত তিনটি প্রার্থনার বর্ণনা দেন।ইমাম আহমাদ (রঃ) বানী যাহরার গোলাম খাব্বাব ইবনে আরত (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তিনি বলেনঃ একদা আমি সারা রাত ধরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায পড়ছিলাম। তিনি নামাযের সালাম ফিরালে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আজ এতো দীর্ঘ সময় ধরে নামায পড়লেন যে, এর পূর্বে কোন দিন আমি আপনাকে এত লম্বা সময় ধরে নামায পড়তে দেখিনি (এর কারণ কি?)! তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, এটা ছিল রগবত ও ভীতির নামায । এই নামাযে আমি আমার মহা মহিমান্বিত প্রভুর নিকট তিনটি জিনিসের জন্যে প্রার্থনা করেছিলাম। দু’টি তিনি মঞ্জুর করেছেন এবং একটি মঞ্জুর করেননি। আমার মহান প্রভুর কাছে প্রার্থনা করলাম যে, আমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদেরকে যে জিনিসে ধ্বংস করে দিয়েছিল তা যেন আমাদেরকে ধ্বংস না করে। এটা তিনি কবুল করেছেন। আমার সম্মানিত প্রভুর নিকট আমি আবেদন জানালাম যে, আমাদের উপর আমাদের শত্রুরা যেন জয়যুক্ত হতে না পারে। এটাও গৃহীত হয়েছে। আমার মহা মর্যাদাবান প্রতিপালকের কাছে আমি দরখাস্ত করলাম যে, আমরা যেন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে না পড়ি। এটা তিনি কবুল করলেন না। (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং ইমাম তিমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান ও সহীহ বলেছেন) আবু মালিক (রঃ) বলেনঃ “আমি বর্ণনাকারী নাফে ইবনে খালিদকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি এই হাদীসটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ হ্যা, আমি ঐ লোকদের মুখে শুনেছি যারা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছিলেন। হযরত শাদ্দাদ ইবনে আউস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার জন্যে যমীনকে নিকটবর্তী করে দিয়েছেন, এমন কি আমি ওর মাশরিক ও মাগরিবকে দেখতে পাই এবং আমার উম্মত এই সবের মালিক হয়ে যাবে। আমাকে দুটি ধন-ভাণ্ডার দেয়া হয়েছে। একটি সাদা ও অপরটি লাল। (সাদা ও লাল ধন-ভাণ্ডার দ্বারা স্বর্ণ ও রৌপ্য বুঝানো হয়েছে) আমি আমার মহা মহিমান্বিত প্রভুর নিকট প্রার্থনা করেছিলাম যে, আমার উম্মত যেন সাধারণ দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত না হয়। আরও প্রার্থনা জানিয়েছিলাম যে, তাদের উপর শক্ররা যেন এমনভাবে জয়যুক্ত না হয় যার ফলে তারা সাধারণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। আমার প্রার্থনা এটাও ছিল যে, আমার উম্মত যেন দলে দলে বিভক্ত না হয়। তখন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আমি যে ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছি তা রদ হবে না। আমি তোমার এই প্রার্থনা মঞ্জুর করলাম যে, তোমার উম্মত সাধারণ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়বে না। আর আমি তোমার এই প্রার্থনাও কবুল করলাম যে, তোমার উম্মতের উপর তাদের শত্রুরা এমনভাবে জয়যুক্ত হবে না যে, তাদেরকে ধ্বংস করবে, হত্যা করবে এবং বন্দী করবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি শুধুমাত্র আমার উম্মতের পথভ্রষ্ট ইমাম ও নেতৃবর্গকে ভয় করি। যদি একবার আমার উম্মতের উপর তরবারী চড়ে যায় তবে তা আর নামবার নয়। বরং কিয়ামত পর্যন্ত তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ চলতে থাকবে।” (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এই হাদীসটি ছ’টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়নি। তবে এর ইসনাদ খুবই উত্তম ও মযবুত)তিবরানী (রঃ) হযরত জাবির ইবনে সুমরাতুস সুওয়ারী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তিনটি জিনিসের জন্যে আবেদন জানিয়েছিলাম। তিনি দুটি মঞ্জুর করেছেন এবং একটি না মঞ্জুর করেছেন। আমি প্রার্থনা করেছিলাম, হে আমার প্রভু! আমার উম্মতকে আপনি ক্ষুধায় ধ্বংস করবেন না। তিনি বললেনঃ “এটা তোমার জন্যে কবুল করা হলো।” আমি বললাম, হে আমার প্রভু! আপনি তাদের উপর তাদের ছাড়া অন্যদেরকে অর্থাৎ মুশরিকদেরকে এমনভাবে জয়যুক্ত করবেন না যে, তারা তাদেরকে ধ্বংস করে দেবে। তিনি বললেনঃ “এটাও তোমার জন্যে মঞ্জুর করলাম।” আমি প্রার্থনায় বললাম, হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার উম্মতের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ সৃষ্টি করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন। আমার প্রভু এটা মঞ্জুর করলেন না।হযরত নাফে' ইবনে খালিদ খুযায়ী (রঃ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের মধ্যে একজন এবং বৃক্ষের নীচে অনুষ্ঠিত বায়আতুর রিযওয়ানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়েন। জনগণ তাকে ঘিরে রয়েছিলেন। তিনি হালকাভাবে নামায আদায় করেন, তবে রুকূ ও সিজদা পূর্ণভাবেই করেন। কিন্তু তাঁর নামাযের বৈঠক খুবই দীর্ঘ হয়। এমন কি আমরা একে অপরকে ইঙ্গিতে বলি যে, সম্ভবতঃ তার উপর অহী অবতীর্ণ হচ্ছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “না, রগবত ও ভীতির নামায পড়ছিলাম।” এই পূর্ণ হাদীসটি শোনার পর নাফে' ইবনে খালিদ খুযায়ীকে বলি, আপনার পিতা কি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখ থেকে শুনেছেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, আমার পিতা বলেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তার দশটি অঙ্গুলির মত দশবার শুনেছেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আমি আমার মহা মহিমান্বিত প্রভুর নিকট প্রার্থনা করেছি যে, তিনি যেন তাদেরকে চারটি জিনিস থেকে দূরে রাখেন। তখন আল্লাহ তাদেরকে দুটি জিনিস থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমি আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম যে, তিনি যেন আমার উম্মতের উপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ না করেন, তারা যেন ফিরাউন ও তার লোকজনদের মত ডুবে না মরে, তারা যেন দলে দলে বিভক্ত হয়ে না পড়ে এবং তারা যেন পরস্পরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে না পড়ে। মহান আল্লাহ তখন পাথর বর্ষণ না করা এবং ডুবে না মরার প্রার্থনা কবুল করেছেন বটে, কিন্তু তারা দলে দলে বিভক্ত না হওয়া এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘটিত না হওয়া এই প্রার্থনা দু’টি তিনি ককূল করেননি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবী) তখন নবী (সঃ) উঠে অযু করেন এবং দুআ করতে থাকেনঃ “হে আল্লাহ! উপর ও নীচ হতে আমার উম্মতের উপর শাস্তি অবতীর্ণ করবেন না এবং তাদের মধ্যে যেন দলাদলি সৃষ্টি না হয়, তারা যেন পরস্পরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে না পড়ে।” তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে বলেন, “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা আপনার উম্মতকে আকাশ থেকে শাস্তি অবতীর্ণ হওয়া থেকে এবং পায়ের নীচ হতে আযাব নাযিল হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। এর পরে এই শ্ৰেণীরও এই বিষয়ের আরও কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর পুনরাবৃত্তি তরজমা ও তাফসীর পাঠকদের জন্যে নিষ্প্রয়োজন। আসমানী আযাব দ্বারা পাথর বর্ষণ এবং পায়ের নীচের শাস্তি দ্বারা যমীন ধ্বসে যাওয়া বুঝানো হয়েছে। উল্লিখিত চারটি জিনিসের মধ্যে দু'টি নবী (সঃ)-এর ইন্তেকালের পঁচিশ বছর পর থেকেই প্রকাশ পেতে থাকে। অর্থাৎ মুসলমানদের মধ্যে মতভেদ ও দলাদলি সৃষ্টি এবং তাদের দু'দলের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ শুরু। আর আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ ও যমীন ধ্বসে যাওয়া থেকে উম্মতে মুহাম্মদিয়াকে মাহফুয ও নিরাপদ রাখা হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), সুদ্দী (রঃ), ইবনে যায়েদ (রঃ) এবং ইবনে জারীর (রঃ) ভাবার্থ এটাই গ্রহণ করেছেন।এই আয়াতের ব্যাপারে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) মসজিদে অথবা মিম্বরের উপরে অবস্থানরত অবস্থায় চীৎকার করে বলেছিলেন, “হে লোক সকল! তোমাদের উপর আল্লাহর আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। যদি আকাশ থেকে শাস্তি এসে যায় তবে কারও রক্ষা নেই। আর যদি পায়ের নীচ থেকে আযাব এসে পড়ে তবে তোমাদেরকে নিয়ে যমীন ধ্বসে যাবে এবং তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। যদি তোমরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড় এবং পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হয়ে যাও তবে এটা সবচেয়ে জঘন্য ব্যাপার হবে।" হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতেন যে, উপরোক্ত আয়াতের (আরবী) দ্বারা দুষ্ট নেতাদেরকে বুঝানো হয়েছে এবং (আরবী) দ্বারা বুঝানো হয়েছে দুষ্ট খাদেম এবং খারাপ অনুসারীদেরকে। অথবা এর দ্বারা আমীর ও গরীবদেরকে বুঝানো হয়েছে। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এই উক্তিটি যুক্তিপূর্ণ হলেও প্রথম উক্তিটিই বেশী স্পষ্ট ও মযবুত। তিনি বলেন যে, এর সঠিকতার সাক্ষ্য স্বয়ং মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তিটি বহন করছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি এর থেকে নিরাপদ হয়ে গেছ যে, আল্লাহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দিয়ে তোমাদেরকে ওর ভিতরে ঢুকিয়ে দিবেন এবং ওটা গরম হয়ে গিয়ে টগবগ করে ফুটতে থাকবে? অথবা তোমরা কি এর থেকে নিরাপত্তা লাভ করেছ যে, তিনি তোমাদের উপর পূর্ববর্তী কওমের মত আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করবেন? সত্বরই তোমরা জানতে পারবে যে, আমার ভীতি প্রদর্শন কিরূপ সঠিক ছিল।” (৬৭:১৬-১৭)হাদীসে রয়েছে যে, আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত হওয়া, যমীন ধ্বসে পড়া, আকৃতি পরিবর্তিত হওয়া, এইগুলো এই উম্মতের মধ্যে সংঘটিত হবে এবং এইগুলো হচ্ছে কিয়ামতের নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত। কিয়ামতের পূর্বে এই নিদর্শনগুলো প্রকাশিত হবে এবং ইনশাআল্লাহ এইগুলোর বর্ণনা ওর স্থানে দেয়া হবে। (আরবী) দ্বারা বিভিন্ন ফিরকা বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আমার উম্মত তেহাত্তর ফিরকায় বিভক্ত হয়ে যাবে। এক ফিরকা ছাড়া বাকী সবগুলোই জাহান্নামী হবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, শাস্তি ও হত্যার মাধ্যমে এক দলকে অন্য দলের উপর বিজয়ী করে দেয়া হবে।(আরবী) অর্থাৎ লক্ষ্য কর? আমি বারে বারে বিভিন্ন উপায়ে আমার নিদর্শন ও যুক্তি প্রমাণ বর্ণনা করছি, উদ্দেশ্য এই যে, যেন বিষয়টিকে তারা পূর্ণরূপে জ্ঞানায়ত্ব ও হৃদয়ঙ্গম করে নিতে পারে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রাঃ) বলেন যে, যখন (আরবী) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার পরে তোমরা কাফির হয়ে যেয়ো না যে, তরবারী দ্বারা একে অপরের গর্দান উড়িয়ে দেবে।” তখন জনগণ বলেন, আমরা তো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল (এর পরেও কি আমরা এরূপ কাজ করবো?) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা।” তখন তাদের কেউ একজন বলেন, আমরা যখন মুসলমান তখন এটা হতে পারে না যে, আমাদের একে অপরকে হত্যা করবে। সেই সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবী) হে নবী (সঃ)! তোমার সম্প্রদায় একে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে অথচ এটা প্রমাণিত সত্য, তুমি বলে দাওআমি তোমাদের উকিল হয়ে আসিনি। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ প্রত্যেকটি সংবাদ প্রকাশের একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। অতি শীঘ্রই তোমরা নিজেদের পরিণতি সম্পর্কে অবহিত হতে পারবে। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-আনআম 6:66
৬৬-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেন, তোমার কওম অর্থাৎ কুরায়েশরা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে, অথচ এটা ছাড়া সত্য আর কিছুই নেই।তুমি তাদেরকে বল-আমি তোমাদের রক্ষক ও জিম্মাদার নই। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! তুমি বল-এটা তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে সত্য, সুতরাং যার ইচ্ছা হবে সে ঈমান আনবে এবং যে ইচ্ছা করবে সে অমান্য করবে।” অর্থাৎ আমার দায়িত্ব তো হচ্ছে শুধু প্রচার করে দেয়া, আর তোমাদের কাজ হচ্ছে শ্রবণ করা ও মেনে নেয়া । যে আমার কথা মান্য করবে সে দুনিয়া ও আখিরাতে উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট হবে এবং যে বিরুদ্ধাচরণ করবে সে উভয় জায়গাতেই হতভাগ্য হবে। এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে - প্রত্যেক সংবাদের জন্যেই একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে, যদিও সেটা বিলম্বে হয়। যেমন অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই তোমরা ওর সংবাদ কিছুদিন পরে জানতে পারবে।” (৩৮:৮৮) তিনি আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক মৃত্যুর জন্যেই একটা নির্ধারিত সময় রয়েছে।” (১৩:৩৮) এটা হচ্ছে ধমক ও ভীতি প্রদর্শন। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ “সত্বরই তোমরা জানতে পারবে।”(আরবী) -অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যখন তুমি কাফিরদেরকে দেখবে যে, তারা মিথ্যা প্রতিপন্নতা ও বিদ্রুপের সঙ্গে আমার আয়াতসমূহ সম্পর্কে সমালোচনা করছে, তখন তুমি তাদের নিকট থেকে দূরে সরে যাবে যে পর্যন্ত না তারা অন্য কোন প্রসঙ্গে লিপ্ত হয়। আর যদি শয়তান তোমাকে এটা ভুলিয়ে দেয় তবে স্মরণ হওয়া মাত্রই তুমি এই অত্যাচারীদের সাথে আর বসবে না। ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের কোন লোকই যেন ঐ সব অবিশ্বাসকারী ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারীর সাথে উঠা-বসা না করে যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে পরিবর্তন করে ফেলে এবং ওগুলোকে সঠিক ও প্রকাশমান ভাবার্থের উপর কায়েম রাখে না। এ জন্যেই হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মত ভুল বশতঃ বা বাধ্য হয়ে কোন কাজ করে বসলে তা ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে।” (হাদীসটি ইবনে মাজাহ (রঃ) তাখরীজ করেছেন এবং তাঁর হাদীস গ্রন্থের ভাষা হচ্ছে নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন) কুরআন কারীমের “যখন তোমরা শুনতে পাও যে, আল্লাহর আয়াতসমূহের সাথে কুফরী করা হচ্ছে এবং ওগুলোকে বিদ্রুপ করা হচ্ছে তখন তোমরা তাদের নিকট থেকে উঠে যাও যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গে নিমগ্ন হয়, নতুবা তোমরা তাদেরই সমতুল্য হয়ে যাবে” -এই আয়াতে ঐ দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যালিম লোকদের হিসাব নিকাশের দায়-দায়িত্ব মুত্তাকী লোকদের উপর কিছুমাত্র অর্পিত নয়। অর্থাৎ মুত্তাকী লোকেরা যখন ঐ সব কাফির ও যালিমের সাথে উঠাবসা করবে না, বরং তাদের নিকট থেকে উঠে যাবে তখন তারা তাদের দায়িত্ব পালন করলো। ফলে তারা তাদের সাথে পাপে জড়িত হবে না। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) এর ভাবার্থ বলেনঃ যদি ঐ যালিম ও কাফিররা আল্লাহর আয়াতসমূহকে ত্রুটিযুক্ত করার চেষ্টায় লেগে থাকে তবে এখন মুসলমানদের উপর কোন দায়িত্ব অর্পিত হবে না যদি তারা তাদের থেকে দূরে সরে থাকে। কিন্তু অন্যান্য আলেমগণ এর ভাবার্থ বর্ণনায় বলেছেনঃ মুসলমানরা ঐ যালিমদের সাথে উঠাবসা করলেও তাদের বিদ্রুপ করণের যিম্মাদারী তাদের উপর পড়বে না। তাঁদের ধারণায় এই আয়াতটি (আরবী)-এর আয়াত দ্বারা মানসূখ হয়ে গেছে। আয়াতটি হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ ঐ অবস্থায় তোমরাও তাদের সমতুল্য হয়ে যাবে। (৪:১৪০) আয়াতের এই ব্যাখ্যা (আরবী) -এই আয়াতের সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিল। এটা ছিল মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), ইবনে জুরাইজ (রঃ) প্রমুখ মনীষীর উক্তি। তাঁদের এই কথার ভিত্তিতে আল্লাহ পাকের (আরবী)-এই উক্তির ভাবার্থ হবে নিম্নরূপঃ “কিন্তু আমি তোমাদেরকে এরূপ অবস্থায় তাদের থেকে পরানুখ থাকার নির্দেশ দিয়েছি, যাতে ওটা তাদের জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ হয়, হয়তো তারা এর ফলে সতর্ক হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে আর এর পুনরাবৃত্তি করবে না।
আল-আনআম 6:67
৬৬-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেন, তোমার কওম অর্থাৎ কুরায়েশরা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে, অথচ এটা ছাড়া সত্য আর কিছুই নেই।তুমি তাদেরকে বল-আমি তোমাদের রক্ষক ও জিম্মাদার নই। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! তুমি বল-এটা তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে সত্য, সুতরাং যার ইচ্ছা হবে সে ঈমান আনবে এবং যে ইচ্ছা করবে সে অমান্য করবে।” অর্থাৎ আমার দায়িত্ব তো হচ্ছে শুধু প্রচার করে দেয়া, আর তোমাদের কাজ হচ্ছে শ্রবণ করা ও মেনে নেয়া । যে আমার কথা মান্য করবে সে দুনিয়া ও আখিরাতে উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট হবে এবং যে বিরুদ্ধাচরণ করবে সে উভয় জায়গাতেই হতভাগ্য হবে। এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে - প্রত্যেক সংবাদের জন্যেই একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে, যদিও সেটা বিলম্বে হয়। যেমন অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই তোমরা ওর সংবাদ কিছুদিন পরে জানতে পারবে।” (৩৮:৮৮) তিনি আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক মৃত্যুর জন্যেই একটা নির্ধারিত সময় রয়েছে।” (১৩:৩৮) এটা হচ্ছে ধমক ও ভীতি প্রদর্শন। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ “সত্বরই তোমরা জানতে পারবে।”(আরবী) -অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যখন তুমি কাফিরদেরকে দেখবে যে, তারা মিথ্যা প্রতিপন্নতা ও বিদ্রুপের সঙ্গে আমার আয়াতসমূহ সম্পর্কে সমালোচনা করছে, তখন তুমি তাদের নিকট থেকে দূরে সরে যাবে যে পর্যন্ত না তারা অন্য কোন প্রসঙ্গে লিপ্ত হয়। আর যদি শয়তান তোমাকে এটা ভুলিয়ে দেয় তবে স্মরণ হওয়া মাত্রই তুমি এই অত্যাচারীদের সাথে আর বসবে না। ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের কোন লোকই যেন ঐ সব অবিশ্বাসকারী ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারীর সাথে উঠা-বসা না করে যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে পরিবর্তন করে ফেলে এবং ওগুলোকে সঠিক ও প্রকাশমান ভাবার্থের উপর কায়েম রাখে না। এ জন্যেই হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মত ভুল বশতঃ বা বাধ্য হয়ে কোন কাজ করে বসলে তা ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে।” (হাদীসটি ইবনে মাজাহ (রঃ) তাখরীজ করেছেন এবং তাঁর হাদীস গ্রন্থের ভাষা হচ্ছে নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন) কুরআন কারীমের “যখন তোমরা শুনতে পাও যে, আল্লাহর আয়াতসমূহের সাথে কুফরী করা হচ্ছে এবং ওগুলোকে বিদ্রুপ করা হচ্ছে তখন তোমরা তাদের নিকট থেকে উঠে যাও যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গে নিমগ্ন হয়, নতুবা তোমরা তাদেরই সমতুল্য হয়ে যাবে” -এই আয়াতে ঐ দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যালিম লোকদের হিসাব নিকাশের দায়-দায়িত্ব মুত্তাকী লোকদের উপর কিছুমাত্র অর্পিত নয়। অর্থাৎ মুত্তাকী লোকেরা যখন ঐ সব কাফির ও যালিমের সাথে উঠাবসা করবে না, বরং তাদের নিকট থেকে উঠে যাবে তখন তারা তাদের দায়িত্ব পালন করলো। ফলে তারা তাদের সাথে পাপে জড়িত হবে না। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) এর ভাবার্থ বলেনঃ যদি ঐ যালিম ও কাফিররা আল্লাহর আয়াতসমূহকে ত্রুটিযুক্ত করার চেষ্টায় লেগে থাকে তবে এখন মুসলমানদের উপর কোন দায়িত্ব অর্পিত হবে না যদি তারা তাদের থেকে দূরে সরে থাকে। কিন্তু অন্যান্য আলেমগণ এর ভাবার্থ বর্ণনায় বলেছেনঃ মুসলমানরা ঐ যালিমদের সাথে উঠাবসা করলেও তাদের বিদ্রুপ করণের যিম্মাদারী তাদের উপর পড়বে না। তাঁদের ধারণায় এই আয়াতটি (আরবী)-এর আয়াত দ্বারা মানসূখ হয়ে গেছে। আয়াতটি হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ ঐ অবস্থায় তোমরাও তাদের সমতুল্য হয়ে যাবে। (৪:১৪০) আয়াতের এই ব্যাখ্যা (আরবী) -এই আয়াতের সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিল। এটা ছিল মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), ইবনে জুরাইজ (রঃ) প্রমুখ মনীষীর উক্তি। তাঁদের এই কথার ভিত্তিতে আল্লাহ পাকের (আরবী)-এই উক্তির ভাবার্থ হবে নিম্নরূপঃ “কিন্তু আমি তোমাদেরকে এরূপ অবস্থায় তাদের থেকে পরানুখ থাকার নির্দেশ দিয়েছি, যাতে ওটা তাদের জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ হয়, হয়তো তারা এর ফলে সতর্ক হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে আর এর পুনরাবৃত্তি করবে না।
আল-আনআম 6:68
৬৬-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেন, তোমার কওম অর্থাৎ কুরায়েশরা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে, অথচ এটা ছাড়া সত্য আর কিছুই নেই।তুমি তাদেরকে বল-আমি তোমাদের রক্ষক ও জিম্মাদার নই। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! তুমি বল-এটা তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে সত্য, সুতরাং যার ইচ্ছা হবে সে ঈমান আনবে এবং যে ইচ্ছা করবে সে অমান্য করবে।” অর্থাৎ আমার দায়িত্ব তো হচ্ছে শুধু প্রচার করে দেয়া, আর তোমাদের কাজ হচ্ছে শ্রবণ করা ও মেনে নেয়া । যে আমার কথা মান্য করবে সে দুনিয়া ও আখিরাতে উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট হবে এবং যে বিরুদ্ধাচরণ করবে সে উভয় জায়গাতেই হতভাগ্য হবে। এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে - প্রত্যেক সংবাদের জন্যেই একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে, যদিও সেটা বিলম্বে হয়। যেমন অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই তোমরা ওর সংবাদ কিছুদিন পরে জানতে পারবে।” (৩৮:৮৮) তিনি আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক মৃত্যুর জন্যেই একটা নির্ধারিত সময় রয়েছে।” (১৩:৩৮) এটা হচ্ছে ধমক ও ভীতি প্রদর্শন। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ “সত্বরই তোমরা জানতে পারবে।”(আরবী) -অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যখন তুমি কাফিরদেরকে দেখবে যে, তারা মিথ্যা প্রতিপন্নতা ও বিদ্রুপের সঙ্গে আমার আয়াতসমূহ সম্পর্কে সমালোচনা করছে, তখন তুমি তাদের নিকট থেকে দূরে সরে যাবে যে পর্যন্ত না তারা অন্য কোন প্রসঙ্গে লিপ্ত হয়। আর যদি শয়তান তোমাকে এটা ভুলিয়ে দেয় তবে স্মরণ হওয়া মাত্রই তুমি এই অত্যাচারীদের সাথে আর বসবে না। ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের কোন লোকই যেন ঐ সব অবিশ্বাসকারী ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারীর সাথে উঠা-বসা না করে যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে পরিবর্তন করে ফেলে এবং ওগুলোকে সঠিক ও প্রকাশমান ভাবার্থের উপর কায়েম রাখে না। এ জন্যেই হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মত ভুল বশতঃ বা বাধ্য হয়ে কোন কাজ করে বসলে তা ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে।” (হাদীসটি ইবনে মাজাহ (রঃ) তাখরীজ করেছেন এবং তাঁর হাদীস গ্রন্থের ভাষা হচ্ছে নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন) কুরআন কারীমের “যখন তোমরা শুনতে পাও যে, আল্লাহর আয়াতসমূহের সাথে কুফরী করা হচ্ছে এবং ওগুলোকে বিদ্রুপ করা হচ্ছে তখন তোমরা তাদের নিকট থেকে উঠে যাও যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গে নিমগ্ন হয়, নতুবা তোমরা তাদেরই সমতুল্য হয়ে যাবে” -এই আয়াতে ঐ দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যালিম লোকদের হিসাব নিকাশের দায়-দায়িত্ব মুত্তাকী লোকদের উপর কিছুমাত্র অর্পিত নয়। অর্থাৎ মুত্তাকী লোকেরা যখন ঐ সব কাফির ও যালিমের সাথে উঠাবসা করবে না, বরং তাদের নিকট থেকে উঠে যাবে তখন তারা তাদের দায়িত্ব পালন করলো। ফলে তারা তাদের সাথে পাপে জড়িত হবে না। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) এর ভাবার্থ বলেনঃ যদি ঐ যালিম ও কাফিররা আল্লাহর আয়াতসমূহকে ত্রুটিযুক্ত করার চেষ্টায় লেগে থাকে তবে এখন মুসলমানদের উপর কোন দায়িত্ব অর্পিত হবে না যদি তারা তাদের থেকে দূরে সরে থাকে। কিন্তু অন্যান্য আলেমগণ এর ভাবার্থ বর্ণনায় বলেছেনঃ মুসলমানরা ঐ যালিমদের সাথে উঠাবসা করলেও তাদের বিদ্রুপ করণের যিম্মাদারী তাদের উপর পড়বে না। তাঁদের ধারণায় এই আয়াতটি (আরবী)-এর আয়াত দ্বারা মানসূখ হয়ে গেছে। আয়াতটি হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ ঐ অবস্থায় তোমরাও তাদের সমতুল্য হয়ে যাবে। (৪:১৪০) আয়াতের এই ব্যাখ্যা (আরবী) -এই আয়াতের সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিল। এটা ছিল মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), ইবনে জুরাইজ (রঃ) প্রমুখ মনীষীর উক্তি। তাঁদের এই কথার ভিত্তিতে আল্লাহ পাকের (আরবী)-এই উক্তির ভাবার্থ হবে নিম্নরূপঃ “কিন্তু আমি তোমাদেরকে এরূপ অবস্থায় তাদের থেকে পরানুখ থাকার নির্দেশ দিয়েছি, যাতে ওটা তাদের জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ হয়, হয়তো তারা এর ফলে সতর্ক হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে আর এর পুনরাবৃত্তি করবে না।
আল-আনআম 6:69
৬৬-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেন, তোমার কওম অর্থাৎ কুরায়েশরা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে, অথচ এটা ছাড়া সত্য আর কিছুই নেই।তুমি তাদেরকে বল-আমি তোমাদের রক্ষক ও জিম্মাদার নই। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! তুমি বল-এটা তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে সত্য, সুতরাং যার ইচ্ছা হবে সে ঈমান আনবে এবং যে ইচ্ছা করবে সে অমান্য করবে।” অর্থাৎ আমার দায়িত্ব তো হচ্ছে শুধু প্রচার করে দেয়া, আর তোমাদের কাজ হচ্ছে শ্রবণ করা ও মেনে নেয়া । যে আমার কথা মান্য করবে সে দুনিয়া ও আখিরাতে উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট হবে এবং যে বিরুদ্ধাচরণ করবে সে উভয় জায়গাতেই হতভাগ্য হবে। এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে - প্রত্যেক সংবাদের জন্যেই একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে, যদিও সেটা বিলম্বে হয়। যেমন অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই তোমরা ওর সংবাদ কিছুদিন পরে জানতে পারবে।” (৩৮:৮৮) তিনি আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক মৃত্যুর জন্যেই একটা নির্ধারিত সময় রয়েছে।” (১৩:৩৮) এটা হচ্ছে ধমক ও ভীতি প্রদর্শন। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ “সত্বরই তোমরা জানতে পারবে।”(আরবী) -অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যখন তুমি কাফিরদেরকে দেখবে যে, তারা মিথ্যা প্রতিপন্নতা ও বিদ্রুপের সঙ্গে আমার আয়াতসমূহ সম্পর্কে সমালোচনা করছে, তখন তুমি তাদের নিকট থেকে দূরে সরে যাবে যে পর্যন্ত না তারা অন্য কোন প্রসঙ্গে লিপ্ত হয়। আর যদি শয়তান তোমাকে এটা ভুলিয়ে দেয় তবে স্মরণ হওয়া মাত্রই তুমি এই অত্যাচারীদের সাথে আর বসবে না। ভাবার্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের কোন লোকই যেন ঐ সব অবিশ্বাসকারী ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারীর সাথে উঠা-বসা না করে যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে পরিবর্তন করে ফেলে এবং ওগুলোকে সঠিক ও প্রকাশমান ভাবার্থের উপর কায়েম রাখে না। এ জন্যেই হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মত ভুল বশতঃ বা বাধ্য হয়ে কোন কাজ করে বসলে তা ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে।” (হাদীসটি ইবনে মাজাহ (রঃ) তাখরীজ করেছেন এবং তাঁর হাদীস গ্রন্থের ভাষা হচ্ছে নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন) কুরআন কারীমের “যখন তোমরা শুনতে পাও যে, আল্লাহর আয়াতসমূহের সাথে কুফরী করা হচ্ছে এবং ওগুলোকে বিদ্রুপ করা হচ্ছে তখন তোমরা তাদের নিকট থেকে উঠে যাও যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গে নিমগ্ন হয়, নতুবা তোমরা তাদেরই সমতুল্য হয়ে যাবে” -এই আয়াতে ঐ দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যালিম লোকদের হিসাব নিকাশের দায়-দায়িত্ব মুত্তাকী লোকদের উপর কিছুমাত্র অর্পিত নয়। অর্থাৎ মুত্তাকী লোকেরা যখন ঐ সব কাফির ও যালিমের সাথে উঠাবসা করবে না, বরং তাদের নিকট থেকে উঠে যাবে তখন তারা তাদের দায়িত্ব পালন করলো। ফলে তারা তাদের সাথে পাপে জড়িত হবে না। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) এর ভাবার্থ বলেনঃ যদি ঐ যালিম ও কাফিররা আল্লাহর আয়াতসমূহকে ত্রুটিযুক্ত করার চেষ্টায় লেগে থাকে তবে এখন মুসলমানদের উপর কোন দায়িত্ব অর্পিত হবে না যদি তারা তাদের থেকে দূরে সরে থাকে। কিন্তু অন্যান্য আলেমগণ এর ভাবার্থ বর্ণনায় বলেছেনঃ মুসলমানরা ঐ যালিমদের সাথে উঠাবসা করলেও তাদের বিদ্রুপ করণের যিম্মাদারী তাদের উপর পড়বে না। তাঁদের ধারণায় এই আয়াতটি (আরবী)-এর আয়াত দ্বারা মানসূখ হয়ে গেছে। আয়াতটি হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ ঐ অবস্থায় তোমরাও তাদের সমতুল্য হয়ে যাবে। (৪:১৪০) আয়াতের এই ব্যাখ্যা (আরবী) -এই আয়াতের সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিল। এটা ছিল মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), ইবনে জুরাইজ (রঃ) প্রমুখ মনীষীর উক্তি। তাঁদের এই কথার ভিত্তিতে আল্লাহ পাকের (আরবী)-এই উক্তির ভাবার্থ হবে নিম্নরূপঃ “কিন্তু আমি তোমাদেরকে এরূপ অবস্থায় তাদের থেকে পরানুখ থাকার নির্দেশ দিয়েছি, যাতে ওটা তাদের জন্যে শিক্ষা ও উপদেশ হয়, হয়তো তারা এর ফলে সতর্ক হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে আর এর পুনরাবৃত্তি করবে না।
আল-আনআম 6:70
আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ যারা দ্বীনকে খেল-তামাশার বস্তু বানিয়ে নিয়েছে তুমি তাদেরকে ছেড়ে দাও। কেননা, তারা ভয়াবহ শাস্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ তুমি কুরআন কারীমের মাধ্যমে তাদেরকে উপদেশ দিতে থাক, আল্লাহর আযাব থেকে ভয় প্রদর্শন কর, যাতে তাদেরকে তাদের দুষ্কার্যের কারণে ধ্বংস করে দেয়া না হয়। যহ্হাক (রঃ) (আরবী) শব্দকে (আরবী) অর্থে ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ যেন সঁপে দেয়া না হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে- যেন তাকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত না করা হয়। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে- যেন তাকে আটকিয়ে দেয়া না হয়। আর মুররা (রঃ) ও ইবনে যায়েদ (রঃ) এর অর্থ নিয়েছেন ‘পাকড়াও করা'। এই সমুদয় উক্তির ভাবার্থ প্রায় একই। মোটকথা এই যে, ধ্বংসের জন্যে ছেড়ে দেয়া, কল্যাণ থেকে বিমুখ করা, উদ্দেশ্য সফল না করা ইত্যাদির প্রায় একই অর্থ। যেমন মহান আল্লাহ এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক ব্যক্তি স্বীয় কৃতকর্মের জন্যে আটককৃত, শুধু যার ডান হাতে আমল নামা দেয়া হবে সে নয়।” (৭৪:৩৮) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া তার কোন বন্ধু ও সুপারিশকারী থাকবে না। যেমন মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “(মানুষের সাবধান হওয়া উচিত) এমন দিন আসার পূর্বে যেই দিন না ক্রয়-বিক্রয় চলবে, না বন্ধুত্ব থাকবে, না সুপারিশ চলবে, কাফিররা পূর্ণরূপে অত্যাচারী।” আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে যদি সে দুনিয়াভর বিনিময় বস্তুও দিতে চায় তথাপি তা গ্রহণ করা হবে না। যেমন তিনি অন্যত্র বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যারা কাফির হয়ে থাকা অবস্থাতেই মারা গেল, যদি তারা (বিনিময় হিসাবে) দুনিয়াভর সোনাও প্রদান করে তথাপি তা কখনও গ্রহণ করা হবে না।” (৩:৯১)এরপর ঘোষিত হচ্ছে। তারা এমনই লোক যে, তারা নিজেদের কর্মদোষে আটকা পড়ে গেছে, তাদের জন্যে রয়েছে ফুটন্ত গরম পানীয় এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
আল-আনআম 6:71
৭১-৭৩ নং আয়াতের তাফসীর: মুশরিকরা মুসলমানদেরকে বলেছিল-তোমরা মুহাম্মাদের দ্বীনকে পরিত্যাগ কর। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। তিনি বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি মুশরিকদেরকে বলে দাও-আমরা কি আল্লাহকে ছেড়ে ঐ সব মূর্তির পূজা করবো যারা আমাদের কোন উপকারও করতে পারবে না এবং কোন ক্ষতি করারও শক্তি তাদের নেই? কুফরী অবলম্বন করে কি আমরা উল্টো পথে ফিরে যাবো? অথচ আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে আলো দান করেছেন? তাহলে তো শয়তান যাকে পথভ্রষ্ট করেছে আমাদের দৃষ্টান্ত তার মতই হবে। অর্থাৎ ঈমান আনয়নের পর কুফরী অবলম্বন করা এরূপই যেমন একটি লোক সফররত অবস্থায় পথ ভুলে গেল এবং শয়তানরা তাকে পথভ্রষ্ট করলো। আর তার সঙ্গী সরল পথে রইলো এবং তাকে ডেকে বললোঃ আমাদের কাছে এসো। আমরা সরল সোজা পথে রয়েছি। সে কিন্তু যেতে অস্বীকার করলো। এটা ঐ ব্যক্তি যে নবী (সঃ)-কে ভালভাবে জানা সত্ত্বেও পথভ্রষ্টদের অনুসরণ করে কাফের হয়ে যাচ্ছে এবং নবী (সঃ) তাকে সোজা পথে আসার জন্যে ডাক দিচ্ছেন। এই পথ হচ্ছে ইসলামের পথ।(আরবী) এতে মূর্তি ও মূর্তিপূজকদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে এবং ঐ লোকদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে যারা তাদেরকে আল্লাহর হিদায়াতের দিকে ডাকতে রয়েছে। যেমন কেউ পথ ভুলে গেছে। অতঃপর কোন আহ্বানকারী তাকে ডাক দিয়ে বলছে- হে অমুক! তুমি পথের দিকে এসো। আর তার অন্য সাথী বলছে- তুমি বিভ্রান্ত হয়ো না, আমাদের সোজা পথের দিকে এসো। এখন সে যদি পূর্ববর্তী আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিয়ে দেয় তবে সে তাকে নিয়ে গিয়ে ধ্বংসের গর্তে ফেলে দেবে। কিন্তু যদি অন্য সঙ্গীর কথা মেনে নেয় তবে সে তাকে সোজা ও হিদায়াতের পথে নিয়ে আসবে। প্রথম আহ্বানকারী হচ্ছে জঙ্গলের শয়তানের অন্তর্ভুক্ত। এটা হচ্ছে ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত, যে আল্লাহর নিকট থেকে সরে গিয়ে মূর্তিপূজা করতে শুরু করে দেয় এবং ওর মধ্যেই মঙ্গল নিহিত আছে বলে মনে করে। আর যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসবে তখন লজ্জিত হতে হবে। এটা হচ্ছে পথভ্রষ্টকারী শয়তান যে তাকে তার বাপ-দাদার নাম নিয়ে এবং তার নাম নিয়ে ডাক দেয়। তখন সে তার অনুসরণ করতে শুরু করে দেয় এবং ওটাকেই কল্যাণকর বলে মনে করে। তখন শয়তান তাকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করে। তাকে সে ক্ষুধা পিপাসায় কাতর করে জংগলে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায়, যাতে সে ধ্বংস হয়ে যায়।(আরবী) শব্দ দ্বারা হতবুদ্ধি লোককে বুঝানো হয়েছে। যেমন কোন লোক পথ ভুলে হতবুদ্ধি হয়ে ঘুরে বেড়ায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে ব্যক্তি আল্লাহর হিদায়াত কবুল না করে শয়তানের অনুসরণ ও পাপের কাজ করে থাকে। অথচ তার সাথী তাকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান করতে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন যে, সে শয়তান কর্তৃক পথভ্রষ্ট ব্যক্তি যার ওলী হচ্ছে মানুষ। আল্লাহর হিদায়াতই হচ্ছে প্রকৃত হিদায়াত এবং পথভ্রষ্টতা হচ্ছে ওটাই যার দিকে শয়তান ডেকে থাকে। এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ সে এরই উপযোগী। যে, তার সাথী তাকে পথভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান করছে। আর সে ধারণা করছে। যে ওটাই হচ্ছে সঠিক পথ । হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা প্রকাশ্য আয়াতের উল্টো। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তার সফরের সঙ্গী তাকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান করছে। সুতরাং এটা জায়েয নয় যে, ওটাকে পথভ্রষ্টতা বলা হবে, অথচ আল্লাহ তো ওটাকে হিদায়াত বলে খবর দিয়েছেন। আর ইবনে জারীর (রঃ) যা বলেছেন রচনাভঙ্গী ওরই দাবীদার। তা এই যে, (আরবী) এটা (আরবী) হওয়ার কারণে (আরবী) -এর স্থানে রয়েছে। অর্থাৎ কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা, পথভ্রষ্টতা এবং অজ্ঞতা ও মূর্খতার অবস্থায়, আর তার সঙ্গী সাথীরা ঐ পথেই চলছে এবং ঐ পথেই তাদেরকে আসতে বলছে, যেটাকে আল্লাহ পাক দৃষ্টান্তস্বরূপ বর্ণনা করেছেন। তখন এই বাক্যের অর্থ হবে-সে তাকে আহ্বানকৃত পথে যেতে অস্বীকার করছে এবং ওর দিকে মনোনিবেশ করছে না। যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন তবে তাকে হিদায়াত করতেন এবং সোজা-সঠিক পথে পরিচালিত করতেন। এই জন্যেই তিনি বলেছেন-আল্লাহর হিদায়াতই হচ্ছে সঠিক হিদায়াত। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “যাকে আল্লাহ হিদায়াত করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না।” তিনি আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে হিদায়াতের উপর আনবার লোভ করলেও আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে কে হিদায়াতের উপর আনতে পারে? এবং তাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী নেই।” (১৬:৩৭) ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ আমাদেরকে সারা জাহানের প্রতিপালকের সামনে মাথা নত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর ভাবার্থ হচ্ছে-আমাদের প্রতি এই নির্দেশ রয়েছে যে, আমরা যেন আন্তরিকতার সাথে তাঁর ইবাদত করি, নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করি, আল্লাহকে ভয় করি এবং সর্বাবস্থায় তাকওয়া অবলম্বন করি। কিয়ামতের দিন তাঁরই কাছে সকলকে সমবেত করা হবে। তিনিই আকাশ ও যমীনকে ভারসাম্য রক্ষা করে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই এ দু’টির মালিক। কিয়ামতের দিন তিনি শুধু বা হও' বলবেন আর তখনি চোখের পলকে সমস্ত কিছুর অস্তিত্ব পুনরায় এসে যাবে। এখানে (আরবী) এই বাক্যে (আরবী) শব্দকে হয়তো বা (আরবী)-এর উপর বা সংযোগের কারণে (আরবী) দেয়া হয়েছে। সেই সময় বাক্যের রূপ হবে (আরবী)।(আরবী) এইরূপ। অথবা (আরবী) শব্দকে এর উপর ভিত্তি করে (আরবী) দেয়া হয়েছে যে, ওর সংযোগ হয়েছে (আরবী) -এর উপর। যেহেতু সৃষ্টির সূচনা ও সৃষ্টির পুনরাবৃত্তির উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটাই বেশী যুক্তিসঙ্গতও বটে। কিংবা এখানে উহ্য রাখা হয়েছে এর উপর ভিত্তি করেই শব্দকে দেয়া হয়েছে। তখন বাক্যের রূপ হবে (আরবী) এইরূপ। ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) এখানে রয়েছে দুটি বাক্য। এই উভয় বাক্যের (আরবী) হচ্ছে (আরবী) এটা এর উপর ভিত্তি করে হয়েছে যে, এ দু'টোই (আরবী)-এর বা বিশেষণ হয়েছে। আর আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) এটা (আরবী)-এর (আরবী) হতে পারে। আবার এরও সম্ভাবনা রয়েছে যে, (আরবী) -এর ওটা (আরবী) হবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আজ রাজত্ব কার? আজ প্রবল পরাক্রমশালী একক আল্লাহরই রাজত্ব সত্য।” (৪০:১৬) যেমন মহান আল্লাহ এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন পরম দাতা ও দয়ালুর রাজত্ব সত্য এবং ঐ দিন কাফিরদের উপর অত্যন্ত কঠিন হবে।” (২৫:২৬) মুফাসসিরগণ (আরবী) এই ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবী) শব্দটি হচ্ছে (আরবী) শব্দের বহুবচন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন, যেমন বলা হয় প্রাচীর বেষ্টিত শহরকে এবং এটা হচ্ছে (আরবী)-এর বহুবচন, দ্রুপ এটাও। সঠিক কথা হচ্ছে এটাই যে, (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে সেই শিঙ্গা যার মধ্যে হযরত ইসরাফীল (আঃ) ফু দেবেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, সঠিক ওটাই যার উপর হাদীসে রাসূল (সঃ) দ্বারা আলোকপাত করা হয়েছে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইসরাফীল (আঃ) শিঙ্গা মুখে লাগিয়ে রয়েছেন। তিনি মাথা নীচু করে অপেক্ষমান রয়েছেন যে, কখন শিঙ্গায় ফুঙ্কার দেয়ার হুকুম হয়!” একজন গ্রাম্য লোকও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সিজ্ঞেস করেছিলঃ (আরবী) কি জিনিস? তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “এটা হচ্ছে শিঙ্গা, যাতে ফুৎকার দিয়ে বাজানো হয়।”একদা নবী (সঃ) সাহাবীদের সাথে বসেছিলেন। সেই সময় তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার পর (আরবী) বা শিঙ্গাকে সৃষ্টি করেন। এবং তা তিনি হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে প্রদান করেন। ওটাতে তিনি মুখ লাগিয়ে রয়েছেন। তিনি আরশের দিকে তাকিয়ে আছেন। কখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার হুকুম হয় তার তিনি অপেক্ষায় রয়েছেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (আরবী) কি জিনিস? তিনি উত্তরে বললেনঃ “ওটা হচ্ছে শিঙ্গা।" তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ “ওটা কিরূপ?” তিনি জবাব দিলেন, ওটা খুবই বড়। যে আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ! ওর প্রস্থ হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবীর প্রস্থের সমান। ওতে তিনবার ফুস্কার দেয়া হবে। প্রথম ফুকার হবে ভয় ও সন্ত্রাস সৃষ্টির ফুকার। দ্বিতীয় ফুঙ্কার সবাইকে বেহুঁশ করে ফেলবে এবং তৃতীয় ফুঙ্কারের সময় সবাই আল্লাহর সামনে এসে হাযির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা যখন প্রথম ফুকারের নির্দেশ দিবেন তখন সারা দুনিয়ার লোক হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে, তবে তিনি যাকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখবেন তার অবস্থা ঠিকই থাকবে। দ্বিতীয় ফুকারের হুকুম হওয়া পর্যন্ত প্রথম ফুকার চলতেই থাকবে, থামবে না। যেমন আল্লাহ তাআলা এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর এরা শুধু একটি ভীষণ ধ্বনির প্রতিক্ষায় রয়েছে, যাতে শ্বাস গ্রহণেরও অবকাশ হবে না।” (৩৮:১৫) ওটা একটা ভীষণ ও উচ্চ শব্দ হবে, যার ফলে পাহাড় মেঘের মত উড়তে থাকবে এবং যমীন হেলতে দুলতে থাকবে। যেমন নড়বড়ে নৌকাকে সমুদ্রের তরঙ্গ চারদিকে হেলাতে দুলাতে থাকে এবং যেমন ছাদে লটকান লণ্ঠনকে বাতাস দোল দিতে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) (৭৯:৬) অর্থাৎ “যেই দিন কম্পনকারী বস্তু প্রকম্পিত করবে। যার পর আর এক পশ্চাদগামী বস্তু এসে পড়বে। সেই দিন সবাই ভীষণ আতংকিত হবে। লোকেরা পড়ে যাবে। মায়েরা দুগ্ধপোষ্য শিশুদেরকে ভুলে যাবে। গর্ভবতী স্ত্রীলোকদের গর্ভপাত হয়ে যাবে। ভয়ে ছেলেদের উপর বার্ধক্য এসে পড়বে। শয়তানরা প্রাণ বাঁচানোর উদ্দেশ্যে যমীনের প্রান্তে প্রান্তে পালিয়ে যাবে। কিন্তু ফেরেশতাগণ তাদেরকে মেরে মেরে ফিরিয়ে আনবেন। একে অপরকে ডাকতে থাকবে, কিন্তু আল্লাহ ছাড়া কেউ কাউকেও আশ্রয় দিতে পারবে না। মানুষ এরূপ ভয় ও সন্ত্রাসের মধ্যে থাকবে এমন সময় যমীন প্রত্যেক কোণ থেকে ফাটতে শুরু করবে। সেই সময় এমন ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে যা পূর্বে কখনও দেখা যায়নি। এমন ব্যাকুলতা ও সন্ত্রাস দেখা দেবে যা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তারপর মানুষ আকাশের দিকে তাকাতে থাকবে। তখন তারা দেখতে পাবে যে, ওর টুকরাগুলো উড়তে রয়েছে। তারকাগুলো নিক্ষিপ্ত হবে। চন্দ্র ও সূর্য কৃষ্ণ বর্ণ ধারণ করবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, মৃত লোকেরা এর কোন সংবাদই রাখবেন না। হযরত আবু হুরাইরী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যাদেরকে চাইবেন তারা ছাড়া আকাশ ও পৃথিবীতে যারা রয়েছে তারা সবাই হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে।” (২৭:৮৭) তাহলে তিনি সেই দিন কাদেরকে হতবুদ্ধি হওয়া থেকে মুক্ত রাখবেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ তারা হচ্ছে শহীদ। হতবুদ্ধি এবং ভীত সন্ত্রস্ত তো হয় জীবিত লোকেরা। আর শীদেরা জীবিত বটে, কিন্তু তারা অবস্থান করছে আল্লাহ তা'আলার নিকট, আল্লাহ তাদেরকে জীবিকা দান করছেন। তিনি সেই দিনের সন্ত্রাস থেকে তাদেরকে রক্ষা করবেন। কেননা, ওটা তো হচ্ছে আল্লাহর আযাব। আর তাঁর আযাব তো বর্ষিত হবে অসৎ লোকদের উপর। এটাকেই আল্লাহ (আরবী) (২২:২) -এই আয়াতে বর্ণনা করেছেন যে, সেই দিন প্রত্যেক দুগ্ধবতী স্ত্রী লোক তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতীর গর্ভপাত হয়ে যাবে। আল্লাহ যতদিন চাইবেন ততদিন তারা এই আযাবে ডুবে থাকবে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত এই অবস্থা থাকবে। তারপর আল্লাহ পাক হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে জ্ঞান লোপকারী ফুকার দেয়ার নির্দেশ দিবেন। ফলে সমস্ত আকাশবাসী ও যমীনবাসী অজ্ঞান হয়ে পড়বে। তবে আল্লাহ যাকে চাইবেন তার জ্ঞান ঠিকই থাকবে। মৃত্যুর ফেরেশতা আল্লাহ তা'আলার নিকট এসে বলবেনঃ “হে আল্লাহ! সবাই মরে গেছে।” আল্লাহ তো জানেনই।তবু তিনি জিজ্ঞেস করবেনঃ “অবশিষ্ট কে আছে?” তিনি বলবেনঃ “অবশিষ্ট একমাত্র আপনি আছেন। আপনার তো কখনও মৃত্যু হবে না। তা ছাড়া আরশ। বহনকারী ফেরেশতাগণও বাকী রয়েছেন। আর বাকী রয়েছেন জিবরাঈল এবং মিকাঈলও। বাকী আমিও রয়েছি।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “জিবরাঈল ও মীকাঈলের তো মৃত্যু হওয়া উচিত।” তখন আরশ বলে উঠবেঃ “হে আমার প্রভু! জিবরাঈল এবং মীকাঈলও মরে যাবেন?” আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলবেনঃ “কথা বলো না। আরশের নীচে যত কিছু আছে সবাইকেই মরতে হবে।” মৃত্যুর ফেরেস্তা পুনরায় আরয করবেন- “হে প্রভু! জিবরাঈল এবং মীকাঈলও মরে গেছেন।” আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেনঃ “এখন আর কে বাকী আছে?” তিনি উত্তরে বলবেনঃ “বাকী আছেন আপনি, আপনার তো মৃত্যু নেই। এখন আমি বাকী আছি এবং বাকী আছেন আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আরশ বহনকারীদেরকেও তো মরতে হবে।” তারাও মরে যাবে। আল্লাহ পাক জিজ্ঞেস করবেনঃ “এখন বাকী আছে কে?” আরাঈল (মৃত্যুর ফেরেশতা) তখন বলবেনঃ “মৃত্যুবরণ না কারী আপনি বাকী আছেন, আর বাকী আছি আমি।” আল্লাহ তা'আলা তখন ইসরাফীলের নিকট থেকে শিঙ্গা নিয়ে নেয়ার জন্যে আরশকে হুকুম করবেন এবং ইসরাফীল (আঃ)-কে তিনি বলবেনঃ “তুমিও আমার মাখলূক, সুতরাং তুমিও মরে যাও।” তিনি তৎক্ষণাৎ মরে যাবেন এবং একমাত্র আল্লাহই অবশিষ্ট থাকবেন যিনি এক, অমুখাপেক্ষী, তার কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন। তারপর আসমান ও যমীনকে জড়িয়ে নেয়া হবে যেমনভাবে মার’কে জড়িয়ে নেয়া হয়। ও দু’টোকে তিনবার খুলে দেয়া হবে এবং তিনবার জড়িয়ে নেয়া হবে। তারপর মহান আল্লাহ বলবেনঃ “আমি জাব্বার (সর্ব শক্তিমান ও বিজয়ী), আমি জাব্বার, আমি জাব্বার।” এরপর তিনবার তিনি উচ্চস্বরে বলবেনঃ “আজকের দিন রাজত্ব কার?” উত্তর দেবে কে? সুতরাং স্বয়ং তিনিই বলবেনঃ “আজকের দিন আল্লাহরই রাজত্ব যিনি একক ও প্রবল পরাক্রান্ত।”অতঃপর তিনি দ্বিতীয় যমীন ও আসমান সৃষ্টি করবেন, ও দু’টো ছড়িয়ে দিবেন এবং দীর্ঘ করবেন। ও দু’টোর মধ্যে কোন বক্রতা ও ত্রুটি থাকবে না। তারপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মাখলুকের প্রতি এক ভীষণ শব্দ হবে। তখন নতুনভাবে সৃষ্ট যমীনে সবাই পূর্বের মত হয়ে যাবে। যারা যমীনের মধ্যে ছিল তারা যমীনের মধ্যেই হবে এবং যারা বাইরে ছিল তারা বাইরেই হবে। অতঃপর আরশের নীচ থেকে আল্লাহ পানি বর্ষণ করবেন। আকাশকে তিনি পানি বর্ষণের নির্দেশ দিবেন। চল্লিশ দিন পর্যন্ত বৃষ্টি বর্ষিত হতে থাকবে। তারপর তিনি দেহগুলোকে নির্দেশ দিবেন যে, ওগুলো যেন যমীন থেকে এমনভাবে প্রকাশিত হয় যেমনভাবে ঘাসপাতা ও শাক-শজী অঙ্কুরিত হয়। যখন দেহগুলো পূর্বের ন্যায় পরিপূর্ণ হয়ে যাবে তখন সর্বপ্রথম আরশের ফেরেশতাদেরকে জীবিত করা হবে। আল্লাহ ইসরাফীল (আঃ)-কে শিঙ্গা গ্রহণ করতে বলবেন। তিনি তা গ্রহণ করবেন। তারপর মহান আল্লাহ জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈল (আ)-কে জীবিত করবেন। এরপর আত্মাগুলোকে ডাক দেয়া হবে। মুসলমানদের আত্মা আলোর মত চমকিতে থাকবে। আর কাফিরদের আত্মা অন্ধকারের ন্যায় থাকবে। এই সবকে নিয়ে শিঙ্গার মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে হুকুম করবেন যে, পুনর্জীবনের জন্যে যেন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হয়। সুতরাং শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে, ফলে রূহগুলো মৌমাছির মত তীব্র বেগে বেরিয়ে আসবে। তাদের দ্বারা যমীন ও আসমান ভরে যাবে। এরপর আল্লাহ তাআলা রূহগুলোকে দেহের ভিতর প্রবেশ করার নির্দেশ দিবেন। তখন দুনিয়ার সমস্ত রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে প্রবেশ করতে শুরু করবে এবং দেহগুলোর মধ্যে নাকের ছিদ্রের পথ হয়ে যাবে, যেমন কোন সর্পদষ্ট ব্যক্তির দেহের মধ্যে বিষ অনুপ্রবেশ করে থাকে। তারপর যমীন ফাটতে শুরু করবে এবং মানুষেরা উঠে উঠে নিজেদের প্রতিপালকের দিকে মুখ করবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, সর্বপ্রথম আমার কবর খুলে যাবে। মহান আল্লাহর দিকে চলে যাব। কাফিররা বলবেঃ ‘এদিন তো বড় কঠিন বলে মনে হচ্ছে।' লোকেরা সব উলঙ্গ হয়ে থাকবে। তারা সবাই একই জায়গায় দণ্ডায়মান হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত এই অবস্থাই থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তাদের দিকে দেখবেনও না এবং কোন ফায়সালাও করবেন না। লোকেরা ক্রন্দন এবং বিলাপ করতে থাকবে। তাদের অশ্রু শেষ হয়ে যাবে। তখন তাদের চক্ষু দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে। নিজেদের শরীরের ঘামে তারা ভিজে যাবে। ঘাম এতো বেশী ঝরবে যে, সেই ঘামের পানিতে তাদের গুতনী পর্যন্ত ডুবে যাবে । ললাকেরা পরস্পর বলাবলি করবে যে, আল্লাহর নিকট সুপারিশের জন্যে কাউকে পাঠানো হাক, যেন তিনি কোন মীমাংসা করে দেন। তারা তখন পরস্পর মন্তব্য করবে যে, পিতা আদম (আঃ) ছাড়া কে এমন আছেন যিনি আল্লাহর সামনে কথা বলার সাহস রাখেন? আল্লাহ তা'আলা তাঁকে নিজের হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর মধ্যে রূহ ফুকেছেন। আর সর্বপ্রথম তিনি তাঁর সাথে কথা বলেছেন। অতঃপর তারা হযরত আদম (আঃ)-এর কাছে যাবে এবং নিজেদের উদ্দেশ্য পেশ করবে। তিনি সুপারিশ করতে অস্বীকৃতি জানাবেন এবং বলবেনঃ “আমি এর যোগ্য নই।” অতঃপর তারা পৃথক পৃথকভাবে এক একজন নবীর কাছে যাবে। যার কাছেই যাবে তিনিই অস্বীকার করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, এরপর তারা আমার কাছে আসবে। আমি তখন যাবো এবং ফাহস' -এর উপর সিজদায় পড়ে যাবো। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ফাহস’ কি জিনিস?” তিনি উত্তরে বলেন, ওটা হচ্ছে আরশের সামনের অংশ। তখন আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতা পাঠাবেন। তিনি আমাকে আমার বাহু ধরে উঠাবেন। মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “তুমি কি বলতে চাও?” আমি আরয করবো- হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে সুপারিশ করার অধিকার দানের ওয়াদা করেছেন। অতএব এই অধিকার আমাকে দান করুন এবং লোকদের মধ্যে ফায়সালা করুন। আল্লাহ পাক তখন বলবেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি সুপারিশ করতে পার এবং আমি লোকদের মধ্যে ফায়সালা করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমি তখন ফিরে এসে লোকদের সাথে দাড়িয়ে যাবো। আমরা সব দাঁড়িয়েই থাকবো এমন সময় হঠাৎ আকাশ থেকে এক ভীষণ শব্দ আসবে। আমরা চিন্তান্বিত হয়ে পড়বো। পৃথিবীবাসী দানব ও মানবের দ্বিগুণ সংখ্যক ফেরেশতা আকাশ থেকে অবতরণ করবেন। তারা যমীনের নিকটবর্তী হবেন। যমীন তাঁদের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবেন। আমরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবোআপনাদের মধ্যে কি মহান আল্লাহ রয়েছেন? তারা উত্তরে বলবেনঃ “না, তবে তিনি অবশ্যই আসবেন।” দ্বিতীয়বার আকাশ থেকে ফেরেশতাগণ অবতরণ করবেন। তাদের সংখ্যা পূর্বের অবতারিত ফেরেশতাদের সংখ্যার দ্বিগুণ এবং দানব ও মানবের সংখ্যার দ্বিগুণ হবে। যমীন তাঁদের আলোকে চমকিত হয়ে উঠবে। তারা দাঁড়িয়ে যাবেন। আমরা জিজ্ঞেস করবো- আল্লাহ কি আপনাদের মধ্যে রয়েছেন? তাঁরা জবাবে বলবেনঃ ‘না, তবে তিনি অবশ্যই এসে পড়বেন!” তারপর তৃতীয়বার ওর চেয়েও দ্বিগুণ সংখ্যক ফেরেশতা অবতরণ করবেন। তখন মহাপ্রতাপান্বিত ও মহামহিমান্বিত আল্লাহ মেঘের ছত্র লাগিয়ে আটজন ফেরেশতা দ্বারা স্বীয় তখৃত বহন করিয়ে নিয়ে তাশরিফ আনবেন, অথচ এখন তো তাঁর তখৃত চারজন ফেরেশতা বহন করতে রয়েছেন। তাঁদের পা যমীনের সর্বশেষ স্তরের তলায় রয়েছে। আসমান ও যমীন হচ্ছে তাদের দেহের অর্ধাংশের সমান। আল্লাহ তা'আলার আরশ তাঁদের স্কন্ধের উপর রয়েছে। তাদের মুখে তাসবীহ ও তাহমীদ উচ্চারিত হতে থাকবে। তারা বলতে থাকবেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমরা তাঁরই পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি আশ ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আমরা পবিত্রতা বর্ণনা করছি তারই যিনি রাজ্য, রাজত্ব ও আধ্যাত্মিক জগতের মালিক। আমরা তাঁরই পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি মৃত্যুবরণ করেন না। আমরা তাঁরই পবিত্রতা ঘোষণা করছি যিনি সমস্ত মাখলুকের মৃত্যু ঘটিয়ে থাকেন কিন্তু নিজে মৃত্যুবরণ করেন না। আমরা তারই তসবীহ পাঠ করছি। তিনি পবিত্র, তিনি পবিত্র, তিনি পবিত্র। আমরা আমাদের মহান প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি ফেরেশতামণ্ডলী ও রূহের (জিবরাঈল আঃ-এর) প্রভু। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি সারা মাখলুকের মৃত্যু ঘটিয়ে থাকেন কিন্তু নিজে মৃত্যুবরণ করবেন না। তারপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় কুরসীর উপর উপবেশন করবেন। একটা শব্দ হবে- “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদেরকে সৃষ্টি করার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমি নীরব ছিলাম। তোমাদের কথা শুনে এসেছি এবং তোমাদের কাজকর্ম দেখে এসেছি। এখন তোমরা নীরব থাক। তোমাদের আমলের সহীফা তোমাদেরকে পাঠ করে শুনানো হবে। যদি ওটা ভাল সাব্যস্ত হয় তবে আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। আর যদি মন্দ হয় তবে নিজেদেরকেই তিরস্কার করবে।” অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে নির্দেশ দিবেন, তখন ওর মধ্যে ভীষণ কৃষ্ণকায় এক আকৃতি দেখা দেবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, তোমরা শয়তানের উপাসনা করবে না। কারণ, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? এটা সেই জাহান্নাম যার ওয়াদা তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল এবং যাকে তোমরা অবিশ্বাস করতে। সুতরাং হে পাপীর দল! সৎ লোকদের থেকে এখন তোমরা পৃথক হয়ে যাও।” একথা বলে আল্লাহ তা'আলা উম্মতদেরকে পৃথক করে দিবেন। এরশাদ হচ্ছে- “হে নবী (সঃ)! তুমি প্রত্যেক উম্মতকে জানুর ভরে পতিত দেখতে পাবে। প্রত্যেক উম্মতের পাশে তার আমলনামা থাকবে এবং স্বীয় কৃতকর্মের প্রতিফল পাবে। এরপর আল্লাহ স্বীয় মাখলুকের মধ্যে ফায়সালার কাজ শুরু করবেন। কিন্তু জ্বীন ও মানুষের বিচার তখনও শুরু হবে না।প্রথমে আল্লাহ হিংস্র ও চতুষ্পদ জন্তুর বিচার শুরু করবেন। এমন কি এক অত্যাচারী শিং বিশিষ্ট ছাগলের অত্যাচারের প্রতিশোধও অন্য ছাগলের দ্বারা গ্রহণ করাবেন। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি জন্তুগুলোকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তোমরা মাটি হয়ে যাও।" এ দেখে কাফিররা বলবেঃ “হায়! আমরাও যদি মাটি হয়ে যেতাম তবে এই শাস্তি থেকে বাঁচতে পারতাম। অতঃপর বান্দাদের বিচারকার্য শুরু হবে। সর্বপ্রথম হত্যা ও খুনের মাকদ্দমা পেশ করা হবে। তখন এমন। প্রত্যেক নিহত ব্যক্তি আসবে যাকে আল্লাহর পথে হত্যাকারী হত্যা করেছিল; আল্লাহ তাআলা হত্যাকারীকে হুকুম করবেন তখন সে ঐ নিহত ব্যক্তির মাথা উঠিয়ে নেবে। ঐ মাথা তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! একে জিজ্ঞেস করুন, কেন সে আমাকে হত্যা করেছিল?" আল্লাহ তখন তাকে জিজ্ঞেস করবেন (অথচ আল্লাহ নিজেই জানেন)ঃ “কেন তাকে হত্যা করেছিলে?" সেই গাযী তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! আপনার মর্যাদা ও আপনারই নামের জন্যে।” তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “তুমি সত্য বলেছো।” সেই সময় তার মুখমণ্ডল সূর্যের আলোকের মত চমকাতে থাকবে। ফেরেশতাগণ তাকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবেন। অনুরূপভাবে অন্যান্য নিহতগণ নিজ নিজ নাড়ি ভূড়ি মাথায় নিয়ে আসবে। আল্লাহ পাক ওদের হত্যাকারীদের জিজ্ঞেস করবেন- “কেন হত্যা করেছিলে?” তারা উত্তরে বলতে বাধ্য হবে যে, নিজের নাম ও খ্যাতির উদ্দেশ্যে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “ধ্বংস হয়ে যাও।” মোটকথা, প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির মাকদ্দমা পেশ করা হবে এবং বিচার হবে। প্রত্যেক অত্যাচারের প্রতিশোধ অত্যাচারী থেকে নেয়া হবে। যে অত্যাচারীকে আল্লাহ ইচ্ছা করবেন শাস্তি দেবেন এবং যার উপর ইচ্ছা রহমত বর্ষণ করবেন। তারপর সারা মাখলুকের বিচার করা হবে এবং এমন কোন অত্যাচারী অবশিষ্ট থাকবে না যে, সে অত্যাচারী থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেনি। এমন কি যে ব্যক্তি দুধে পানি মিশিয়ে বিক্রি করতো এবং বলতো যে, দুধ খাটি, তাকেও শাস্তি দেয়া হবে। আর ক্রেতাকে তার পুণ্য দেয়া হবে। এই কার্য সমাপ্তির পর এক আহ্বানকারী আহ্বান করবে যা সারা মাখলুক শুনতে পাবে। সেই আহ্বান হবে নিম্নরূপঃ “প্রত্যেক দল যেন নিজ নিজ মা’রূদের কাছে চলে যায় এবং তার অঞ্চল চেপে ধরে।” তখন এমন কোন মূর্তিপূজক থাকবে না যার সামনে তার মূর্তি লাঞ্ছিত অবস্থায় পড়ে না থাকবে। ঐদিন একজন ফেরেশতা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর রূপ ধরে আসবেন এবং আর একজন ফেরেশতা হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর রূপ ধরে আগমন করবেন। তখন ইয়াহূদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর পিছনে চলে আসবে এবং খ্রীষ্টানেরা আসবে হযরত ঈসা (আঃ)-এর পিছনে। অতঃপর তাদের এই কল্পিত মা’বৃদ তাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে। তখন তারা বলবে যে, যদি ওরা তাদের প্রকৃত মা’রূদ হতো তবে তাদেরকে কখনও জাহান্নামে নিয়ে যেতো না। তারা জাহান্নামে চিরকাল অবস্থান করবে। এখন শুধু মুমিনরাই বাকী থাকবে এবং তাদের মধ্যে মুনাফিকরাও থাকবে। আল্লাহ তা'আলা নিজের ইচ্ছামত পরিবর্তিত আকৃতিতে তাদের কাছে আসবেন এবং বলবেনঃ “হে লোক সকল! সবাই নিজ নিজ মাবুদের সাথে মিলিত হয়েছে। সুতরাং তোমরাও যাদের ইবাদত করতে তাদের সাথে মিলিত হও।” তখন মুনাফিক মিশ্রিত মুমিনরা বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! আমাদের মাবুদ তো আপনিই ছিলেন। আপনাকে ছাড়া আমরা আর কাউকেও মানতাম না।” এরপর আল্লাহ তাআলা তাদের নিকট থেকে সরে যাবেন। অতঃপর তিনি নিজেই প্রকৃত দীপ্তি ও আঁকজমকের সাথে আসবেন এবং যতক্ষণ চাইবেন ততক্ষণ তাদের থেকে সরে থাকবেন। তারপর তিনি তাদের সামনে আসবেন এবং পুনরায় বলবেনঃ “হে লোকেরা! সবাই নিজ নিজ মাবুদের সাথে মিলিত হয়েছে। সুতরাং তোমাদের মা’ৰূদের সাথে মিলিত হও।” তারা বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! আপনি ছাড়া আমাদের অন্য কোন মা'বুদ নেই। আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করতাম। তখন আল্লাহ পাক তাদের পায়ের গোছা খুলে দেবেন। এবং মর্যাদা গুণে তাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, তার মা'বুদ তিনিই। তারপর সবাই মাথার ভরে সিজদায় পড়ে যাবে। কিন্তু মুনাফিকরা পিঠের ভরে পড়বে। সিজদার জন্যে তারা ঝুঁকে পড়তে পারবে না। তাদের পিঠ গাভীর পিঠের মত সোজা হয়ে থাকবে। যখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুকুম করবেন। তখন তাদের সামনে পুলসিরাত এসে পড়বে। ওটা তরবারীর ধারের চেয়ে তীক্ষ্ণ হবে। ওর স্থানে স্থানে আঁকড়া ও কাঁটা থাকবে এবং অত্যন্ত পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক হবে। ওর নীচে আরও একটি পিচ্ছিল সেতু থাকবে। ভাল লোকেরা চক্ষের পলকে দ্রুত গতিতে ওটা পার হয়ে যাবে। যেমন বিদ্যুৎ চমকিত হয় বা প্রবল বেগে বায়ু প্রবাহিত হয় অথবা দ্রুতগামী ঘোড়া কিংবা দ্রুত দৌড়ালু মানুষ চলে থাকে। কতগুলো লোক তো সম্পূর্ণরূপে অক্ষত থাকবে ও পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। কতগুলো লোক আহত হবে এবং বহু লোক কেটে জাহান্নামে পড়ে যাবে। অতঃপর জান্নাতীদেরকে যখন জান্নাতে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে তখন তারা বলবেঃ “আমাদের জন্যে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে কে?” তারা হযরত আদম (আঃ)-এর নিকট গিয়ে সুপারিশের আবেদন জানাবে। তখন তিনি নিজের পাপের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ “আমার এর যোগ্যতা নেই। তোমরা হযরত নূহ (আঃ)-এর নিকট যাও। তাঁকে আল্লাহর প্রথম রাসূল বলা হয়। লোকেরা তখন হযরত নূহ (আঃ)-এর কাছে যাবে। তিনিও নিজের অপরাধের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ “আমার তো এই কাজের যোগ্যতা নেই। তোমরা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে যাও। আল্লাহ তা'আলা তাকে নিজের বন্ধু বলেছেন। তারা তাঁর কাছে যাবে। তিনিও নিজের দোষের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ “তোমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও। আল্লাহ তাআলা তার সাথে কথা বলেছেন এবং তাঁর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছেন। তারা তখন হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে যাবে এবং সুপারিশের জন্যে আবেদন করবে। তিনি নিজের হত্যার পাপের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ “আমি এই কাজের যোগ্য নই। তোমরা বরং হযরত ঈসা রূহুল্লার (আঃ) কাছে যাও। তিনি আল্লাহর রূহ ও তাঁর কালেমা।” হযরত ঈসাও (আঃ) বলবেনঃ “না, আমি এ কাজের যোগ্য নই। তোমরা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাও।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন- তখন লোকেরা আমার কাছে আসবে। আল্লাহ তা'আলা আমাকে শাফাআতের অধিকার দিয়েছেন এবং ওয়াদা করেছেন। আমি জান্নাতের দিকে যাবো এবং জান্নাতের দরজায় করাঘাত করবো। জান্নাতের দরজা খুলে যাবে এবং আমাকে অভ্যর্থনা জানানো হবে। জান্নাতে প্রবেশ করে আমি আল্লাহ পাকের দিকে দৃষ্টিপাত করবো এবং সিজদায় পড়ে যাবো। আল্লাহ তা'আলা আমাকে এমন তাহমীদ ও তামজীদের অধিকার দান করবেন যা তিনি অন্য কাউকেও শিখিয়ে দেননি। অতঃপর তিনি বলবেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! মাথা উঠাও। সুপারিশ করতে হয় কর। তোমার সুপারিশ কবুল করা হবে এবং তোমার আবেদন মঞ্জুর করা হবে।" আমি তখন আমার মাথা উঠাবো। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেনঃ “কি বলতে চাও?” আমি বলবো, হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে সুপারিশ করার অধিকার দিয়েছেন। জান্নাতীদের ব্যাপারে আমার শাফাআত কক্ল করুন! তারা যেন জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। তখন তিনি বলবেনঃ “ঠিক আছে, আমি অনুমতি দিলাম। এই লোকগুলো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে।" নবী (সঃ) বলেনঃ আল্লাহর শপথ! দুনিয়ায় তোমরা তোমাদের বাসস্থান ও স্ত্রীদেরকে যেমন চিনতে পার তার চেয়ে তাড়াতাড়ি তোমরা তোমাদের জান্নাতের বাসস্থান ও স্ত্রীদেরকে চিনতে পারবে। প্রত্যেক লোককে বাহাত্তরটি স্ত্রী দেয়া হবে। তারা আদম সন্তানদের মধ্য থেকে হবে দু’জন এবং হ্রদের থেকে হবে সত্তরজন। ঐ সত্তরজনের উপর এই দু’জনের মর্যাদা, দান করা হবে। কেননা, এই সতী সাধ্বী মহিলারা দুনিয়ায় খুব বেশী বেশী করে আল্লাহর ইবাদত করতো। জান্নাতবাসী যখন একজনের কাছে যাবে তখন দেখতে পাবে যে, সে ইয়াকূতের ঘরে মণিমুক্তা দ্বারা সজ্জিতা হয়ে সোনার সিংহাসনে বসে আছে। সে মিহীন সবুজ রেশমের সত্তরটি জান্নাতী হুল্লা পরিধান করে রয়েছে। সে যখন তার কাঁধের উপর হাত দেবে তখন তার বক্ষের উপর কাপড়, দেহ, মাংস ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও ওগুলো ভেদ করে বক্ষের অপর দিকে তার হাতের প্রতিবিম্ব দেখা যাবে। তার দেহ এত স্বচ্ছ হবে যে, তার পায়ের গোছার মজ্জা পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যাবে। মনে হবে যে, তোমরা যেন ইয়াকৃতের ছুরি দেখতে রয়েছে। তার অন্তর এর জন্যে এবং এর অন্তর তার জন্যে আয়না বানানো হবে। না এ ওর থেকে ক্লান্ত হবে এবং না ও এর থেকে ক্লান্ত হবে। সে যখন কখনো কোন মহিলার কাছে আসবে তখন সে তাকে কুমারী রূপেই পাবে। না স্বামী স্ত্রীর ক্লান্তির অভিযোগ করবে এবং না স্ত্রী স্বামীর ক্লান্তির অভিযোগ করবে। এমনই অবস্থায় শব্দ শোনা যাবেঃ “তোমাদের কারো প্রাণ ভরবে না এটা তো আমার জানা আছে। কিন্তু অন্যান্য স্ত্রীরাও তো রয়েছে।” সুতরাং সে পালাক্রমে তাদের কাছে যাবে। যার কাছেই সে যাবে সে-ই বলবেঃ “আল্লাহর কসম! জান্নাতে তোমার চেয়ে সুন্দর আর কেউ নেই এবং আমার কাছে তোমার চেয়ে প্রিয়তম কেউই নেই। কিন্তু জাহান্নামীদেরকে যখন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তখন আগুন কারও পা পর্যন্ত পৌঁছবে কারও পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছবে, কারও পৌছবে জানু পর্যন্ত, কারও কোমর পর্যন্ত এবং কারও শুধু মুখমণ্ডল বাদ দিয়ে সমস্ত দেহ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। কেননা, মুখমণ্ডলের উপর আগুনকে হারাম করে দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমি আল্লাহ তাআলাকে বলবো- হে আমার প্রভু! আমার উম্মতের জাহান্নামবাসীদের ব্যাপারে আমার শাফা'আত কবুল করুন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “তুমি তোমার উম্মতের যাদেরকে চিননা তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নাও।” সুতরাং কোন উম্মতই অবশিষ্ট থাকবে না। তারপর সাধারণ শাফাআতের অনুমতি দেয়া হবে। তখন প্রত্যেক নবী ও প্রত্যেক শহীদ নিজ নিজ শাফা'আত পেশ করবে। আল্লাহ পাক তখন বলবেনঃ “যার অন্তরে এক দীনারের ওজন পরিমাণও ঈমান রয়েছে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে নাও।” তারপর বলবেনঃ “এক দীনারের এক তৃতীয়াংশ ঈমান থাকলেও তাকে বের কর।” এরপর বলবেনঃ “এক দীনারের দুই তৃতীয়াংশ ঈমান থাকলেও তাকে বের কর। এক চতুর্থাংশ হলেও বের কর। এক কীরাত বরাবর হলেও বের করে নাও। এমন কি কারও অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকলে তাকেও বের করে নাও। তারপর যারা আল্লাহর জন্যে কোন একটি ভাল কাজও করেছে তাকেও বের কর।” তখন আর এমন কেউই বাকী থাকবে না যে শাফাআতের যোগ্য। এমন কি আল্লাহ তা'আলার এই সাধারণ রহমত দেখে শয়তানের লোভ হবে যে, যদি কেউ তার জন্যেও সুপারিশ করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমি তো হচ্ছি সবচেয়ে বড় দয়ালু।” অতঃপর তিনি জাহান্নামে স্বীয় হাতটি রাখবেন এবং এতো অসংখ্য জাহান্নামীকে বের করবেন যারা পুড়ে কয়লার মত হয়ে যাবে। তাদেরকে জান্নাতের নাহরে হায়ওয়ান’ নামক একটি নদীতে নিক্ষেপ করা হবে। তারা এমনভাবে নব জীবন লাভ করবে যেমনভাবে কোন জলাশয়ের ধারে উদ্ভিদ অংকুরিত হয় এবং রোদের আলোতে সবুজ আকার ধারণ করে। আবার ছায়ায় থাকলে ফ্যাকাশে হয়ে থাকে। ঐ জাহান্নামীরা জান্নাতের ঐ নদীতে গোসল করার পর শ্যামল সবুজ উদ্ভিদের মত সুন্দর আকার ধারণ করবে। তাদের কপালে লিখা থাকবে ‘আল্লাহর আযাদকৃত জাহান্নামী। তাদের এই চিহ্ন দেখে জান্নাতবাসীরা তাদেরকে চিনতে পারবে যে, তারা কিছু ভাল কাজ করেছিল। কিছুকাল তারা এইভাবেই জান্নাতে অবস্থান করবে। তারপর তারা মহান আল্লাহর নিকট আবেদন করবে যে, তাদের ঐ কপালের লিখাটা যেন মিটিয়ে দেয়া হয়। তখন তা মিটিয়ে দেয়া হবে।”এটি একটি মাশহুর ও দীর্ঘ হাদীস। হাদীসটি অত্যন্ত গারীব এবং বিভিন্ন হাদীসের বিভিন্ন অংশ বিশেষ। এর কতগুলো কথা তো একেবারে অস্বীকারযোগ্য। মদীনার কাযী ইসমাঈল ইবনে রাফে একাই এর বর্ণনাকারী। এর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ এটাকে বিশ্বাসযোগ্য বলেছেন এবং কেউ কেউ একে দুর্বল বলেছেন। আবার কেউ কেউ সম্পূর্ণরূপেই অস্বীকার করেছেন। যেমন আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ), আবু হাতিম রাযী (রঃ) এবং উমার ইবনে ফালাস (রঃ)। কেউ কেউ বলেছেন যে, এই হাদীসটি সম্পূর্ণরূপে বর্জনীয়। ইবনে আদী (রঃ) বলেন যে, এই হাদীসটির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এর বর্ণনাকারীরা সবাই দুর্বল। আমি বলি যে, কয়েকটি কারণে এর ইসনাদে মতভেদ রয়েছে। আমি এটাকে পৃথক একটি খণ্ডে বর্ণনা করেছি। এর বর্ণনাভঙ্গীও বিস্ময়কর। বহু হাদীস মিলিয়ে একটি হাদীস বানিয়ে নেয়া হয়েছে। এজন্যেই এটা অস্বীকারযোগ্য হয়ে গেছে। আমি আমার শিক্ষক হাফিয আবুল হাজ্জাজ আল মুযী (রঃ)-এর কাছে শুনেছি যে, এটা ওয়ালীদ ইবনে মুসলিমের একটি রচনা, যা তিনি জমা করেছেন। এটা যেন। কতগুলো পৃথক পৃথক হাদীসের সাক্ষ্য বহনকারী। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-আনআম 6:72
৭১-৭৩ নং আয়াতের তাফসীর: মুশরিকরা মুসলমানদেরকে বলেছিল-তোমরা মুহাম্মাদের দ্বীনকে পরিত্যাগ কর। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। তিনি বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি মুশরিকদেরকে বলে দাও-আমরা কি আল্লাহকে ছেড়ে ঐ সব মূর্তির পূজা করবো যারা আমাদের কোন উপকারও করতে পারবে না এবং কোন ক্ষতি করারও শক্তি তাদের নেই? কুফরী অবলম্বন করে কি আমরা উল্টো পথে ফিরে যাবো? অথচ আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে আলো দান করেছেন? তাহলে তো শয়তান যাকে পথভ্রষ্ট করেছে আমাদের দৃষ্টান্ত তার মতই হবে। অর্থাৎ ঈমান আনয়নের পর কুফরী অবলম্বন করা এরূপই যেমন একটি লোক সফররত অবস্থায় পথ ভুলে গেল এবং শয়তানরা তাকে পথভ্রষ্ট করলো। আর তার সঙ্গী সরল পথে রইলো এবং তাকে ডেকে বললোঃ আমাদের কাছে এসো। আমরা সরল সোজা পথে রয়েছি। সে কিন্তু যেতে অস্বীকার করলো। এটা ঐ ব্যক্তি যে নবী (সঃ)-কে ভালভাবে জানা সত্ত্বেও পথভ্রষ্টদের অনুসরণ করে কাফের হয়ে যাচ্ছে এবং নবী (সঃ) তাকে সোজা পথে আসার জন্যে ডাক দিচ্ছেন। এই পথ হচ্ছে ইসলামের পথ।(আরবী) এতে মূর্তি ও মূর্তিপূজকদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে এবং ঐ লোকদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে যারা তাদেরকে আল্লাহর হিদায়াতের দিকে ডাকতে রয়েছে। যেমন কেউ পথ ভুলে গেছে। অতঃপর কোন আহ্বানকারী তাকে ডাক দিয়ে বলছে- হে অমুক! তুমি পথের দিকে এসো। আর তার অন্য সাথী বলছে- তুমি বিভ্রান্ত হয়ো না, আমাদের সোজা পথের দিকে এসো। এখন সে যদি পূর্ববর্তী আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিয়ে দেয় তবে সে তাকে নিয়ে গিয়ে ধ্বংসের গর্তে ফেলে দেবে। কিন্তু যদি অন্য সঙ্গীর কথা মেনে নেয় তবে সে তাকে সোজা ও হিদায়াতের পথে নিয়ে আসবে। প্রথম আহ্বানকারী হচ্ছে জঙ্গলের শয়তানের অন্তর্ভুক্ত। এটা হচ্ছে ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত, যে আল্লাহর নিকট থেকে সরে গিয়ে মূর্তিপূজা করতে শুরু করে দেয় এবং ওর মধ্যেই মঙ্গল নিহিত আছে বলে মনে করে। আর যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসবে তখন লজ্জিত হতে হবে। এটা হচ্ছে পথভ্রষ্টকারী শয়তান যে তাকে তার বাপ-দাদার নাম নিয়ে এবং তার নাম নিয়ে ডাক দেয়। তখন সে তার অনুসরণ করতে শুরু করে দেয় এবং ওটাকেই কল্যাণকর বলে মনে করে। তখন শয়তান তাকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করে। তাকে সে ক্ষুধা পিপাসায় কাতর করে জংগলে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায়, যাতে সে ধ্বংস হয়ে যায়।(আরবী) শব্দ দ্বারা হতবুদ্ধি লোককে বুঝানো হয়েছে। যেমন কোন লোক পথ ভুলে হতবুদ্ধি হয়ে ঘুরে বেড়ায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে ব্যক্তি আল্লাহর হিদায়াত কবুল না করে শয়তানের অনুসরণ ও পাপের কাজ করে থাকে। অথচ তার সাথী তাকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান করতে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন যে, সে শয়তান কর্তৃক পথভ্রষ্ট ব্যক্তি যার ওলী হচ্ছে মানুষ। আল্লাহর হিদায়াতই হচ্ছে প্রকৃত হিদায়াত এবং পথভ্রষ্টতা হচ্ছে ওটাই যার দিকে শয়তান ডেকে থাকে। এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ সে এরই উপযোগী। যে, তার সাথী তাকে পথভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান করছে। আর সে ধারণা করছে। যে ওটাই হচ্ছে সঠিক পথ । হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা প্রকাশ্য আয়াতের উল্টো। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তার সফরের সঙ্গী তাকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান করছে। সুতরাং এটা জায়েয নয় যে, ওটাকে পথভ্রষ্টতা বলা হবে, অথচ আল্লাহ তো ওটাকে হিদায়াত বলে খবর দিয়েছেন। আর ইবনে জারীর (রঃ) যা বলেছেন রচনাভঙ্গী ওরই দাবীদার। তা এই যে, (আরবী) এটা (আরবী) হওয়ার কারণে (আরবী) -এর স্থানে রয়েছে। অর্থাৎ কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা, পথভ্রষ্টতা এবং অজ্ঞতা ও মূর্খতার অবস্থায়, আর তার সঙ্গী সাথীরা ঐ পথেই চলছে এবং ঐ পথেই তাদেরকে আসতে বলছে, যেটাকে আল্লাহ পাক দৃষ্টান্তস্বরূপ বর্ণনা করেছেন। তখন এই বাক্যের অর্থ হবে-সে তাকে আহ্বানকৃত পথে যেতে অস্বীকার করছে এবং ওর দিকে মনোনিবেশ করছে না। যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন তবে তাকে হিদায়াত করতেন এবং সোজা-সঠিক পথে পরিচালিত করতেন। এই জন্যেই তিনি বলেছেন-আল্লাহর হিদায়াতই হচ্ছে সঠিক হিদায়াত। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “যাকে আল্লাহ হিদায়াত করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না।” তিনি আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে হিদায়াতের উপর আনবার লোভ করলেও আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে কে হিদায়াতের উপর আনতে পারে? এবং তাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী নেই।” (১৬:৩৭) ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ আমাদেরকে সারা জাহানের প্রতিপালকের সামনে মাথা নত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর ভাবার্থ হচ্ছে-আমাদের প্রতি এই নির্দেশ রয়েছে যে, আমরা যেন আন্তরিকতার সাথে তাঁর ইবাদত করি, নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করি, আল্লাহকে ভয় করি এবং সর্বাবস্থায় তাকওয়া অবলম্বন করি। কিয়ামতের দিন তাঁরই কাছে সকলকে সমবেত করা হবে। তিনিই আকাশ ও যমীনকে ভারসাম্য রক্ষা করে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই এ দু’টির মালিক। কিয়ামতের দিন তিনি শুধু বা হও' বলবেন আর তখনি চোখের পলকে সমস্ত কিছুর অস্তিত্ব পুনরায় এসে যাবে। এখানে (আরবী) এই বাক্যে (আরবী) শব্দকে হয়তো বা (আরবী)-এর উপর বা সংযোগের কারণে (আরবী) দেয়া হয়েছে। সেই সময় বাক্যের রূপ হবে (আরবী)।(আরবী) এইরূপ। অথবা (আরবী) শব্দকে এর উপর ভিত্তি করে (আরবী) দেয়া হয়েছে যে, ওর সংযোগ হয়েছে (আরবী) -এর উপর। যেহেতু সৃষ্টির সূচনা ও সৃষ্টির পুনরাবৃত্তির উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটাই বেশী যুক্তিসঙ্গতও বটে। কিংবা এখানে উহ্য রাখা হয়েছে এর উপর ভিত্তি করেই শব্দকে দেয়া হয়েছে। তখন বাক্যের রূপ হবে (আরবী) এইরূপ। ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) এখানে রয়েছে দুটি বাক্য। এই উভয় বাক্যের (আরবী) হচ্ছে (আরবী) এটা এর উপর ভিত্তি করে হয়েছে যে, এ দু'টোই (আরবী)-এর বা বিশেষণ হয়েছে। আর আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) এটা (আরবী)-এর (আরবী) হতে পারে। আবার এরও সম্ভাবনা রয়েছে যে, (আরবী) -এর ওটা (আরবী) হবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আজ রাজত্ব কার? আজ প্রবল পরাক্রমশালী একক আল্লাহরই রাজত্ব সত্য।” (৪০:১৬) যেমন মহান আল্লাহ এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন পরম দাতা ও দয়ালুর রাজত্ব সত্য এবং ঐ দিন কাফিরদের উপর অত্যন্ত কঠিন হবে।” (২৫:২৬) মুফাসসিরগণ (আরবী) এই ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবী) শব্দটি হচ্ছে (আরবী) শব্দের বহুবচন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন, যেমন বলা হয় প্রাচীর বেষ্টিত শহরকে এবং এটা হচ্ছে (আরবী)-এর বহুবচন, দ্রুপ এটাও। সঠিক কথা হচ্ছে এটাই যে, (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে সেই শিঙ্গা যার মধ্যে হযরত ইসরাফীল (আঃ) ফু দেবেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, সঠিক ওটাই যার উপর হাদীসে রাসূল (সঃ) দ্বারা আলোকপাত করা হয়েছে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইসরাফীল (আঃ) শিঙ্গা মুখে লাগিয়ে রয়েছেন। তিনি মাথা নীচু করে অপেক্ষমান রয়েছেন যে, কখন শিঙ্গায় ফুঙ্কার দেয়ার হুকুম হয়!” একজন গ্রাম্য লোকও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সিজ্ঞেস করেছিলঃ (আরবী) কি জিনিস? তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “এটা হচ্ছে শিঙ্গা, যাতে ফুৎকার দিয়ে বাজানো হয়।”একদা নবী (সঃ) সাহাবীদের সাথে বসেছিলেন। সেই সময় তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার পর (আরবী) বা শিঙ্গাকে সৃষ্টি করেন। এবং তা তিনি হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে প্রদান করেন। ওটাতে তিনি মুখ লাগিয়ে রয়েছেন। তিনি আরশের দিকে তাকিয়ে আছেন। কখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার হুকুম হয় তার তিনি অপেক্ষায় রয়েছেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (আরবী) কি জিনিস? তিনি উত্তরে বললেনঃ “ওটা হচ্ছে শিঙ্গা।" তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ “ওটা কিরূপ?” তিনি জবাব দিলেন, ওটা খুবই বড়। যে আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ! ওর প্রস্থ হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবীর প্রস্থের সমান। ওতে তিনবার ফুস্কার দেয়া হবে। প্রথম ফুকার হবে ভয় ও সন্ত্রাস সৃষ্টির ফুকার। দ্বিতীয় ফুঙ্কার সবাইকে বেহুঁশ করে ফেলবে এবং তৃতীয় ফুঙ্কারের সময় সবাই আল্লাহর সামনে এসে হাযির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা যখন প্রথম ফুকারের নির্দেশ দিবেন তখন সারা দুনিয়ার লোক হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে, তবে তিনি যাকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখবেন তার অবস্থা ঠিকই থাকবে। দ্বিতীয় ফুকারের হুকুম হওয়া পর্যন্ত প্রথম ফুকার চলতেই থাকবে, থামবে না। যেমন আল্লাহ তাআলা এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর এরা শুধু একটি ভীষণ ধ্বনির প্রতিক্ষায় রয়েছে, যাতে শ্বাস গ্রহণেরও অবকাশ হবে না।” (৩৮:১৫) ওটা একটা ভীষণ ও উচ্চ শব্দ হবে, যার ফলে পাহাড় মেঘের মত উড়তে থাকবে এবং যমীন হেলতে দুলতে থাকবে। যেমন নড়বড়ে নৌকাকে সমুদ্রের তরঙ্গ চারদিকে হেলাতে দুলাতে থাকে এবং যেমন ছাদে লটকান লণ্ঠনকে বাতাস দোল দিতে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) (৭৯:৬) অর্থাৎ “যেই দিন কম্পনকারী বস্তু প্রকম্পিত করবে। যার পর আর এক পশ্চাদগামী বস্তু এসে পড়বে। সেই দিন সবাই ভীষণ আতংকিত হবে। লোকেরা পড়ে যাবে। মায়েরা দুগ্ধপোষ্য শিশুদেরকে ভুলে যাবে। গর্ভবতী স্ত্রীলোকদের গর্ভপাত হয়ে যাবে। ভয়ে ছেলেদের উপর বার্ধক্য এসে পড়বে। শয়তানরা প্রাণ বাঁচানোর উদ্দেশ্যে যমীনের প্রান্তে প্রান্তে পালিয়ে যাবে। কিন্তু ফেরেশতাগণ তাদেরকে মেরে মেরে ফিরিয়ে আনবেন। একে অপরকে ডাকতে থাকবে, কিন্তু আল্লাহ ছাড়া কেউ কাউকেও আশ্রয় দিতে পারবে না। মানুষ এরূপ ভয় ও সন্ত্রাসের মধ্যে থাকবে এমন সময় যমীন প্রত্যেক কোণ থেকে ফাটতে শুরু করবে। সেই সময় এমন ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে যা পূর্বে কখনও দেখা যায়নি। এমন ব্যাকুলতা ও সন্ত্রাস দেখা দেবে যা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তারপর মানুষ আকাশের দিকে তাকাতে থাকবে। তখন তারা দেখতে পাবে যে, ওর টুকরাগুলো উড়তে রয়েছে। তারকাগুলো নিক্ষিপ্ত হবে। চন্দ্র ও সূর্য কৃষ্ণ বর্ণ ধারণ করবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, মৃত লোকেরা এর কোন সংবাদই রাখবেন না। হযরত আবু হুরাইরী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যাদেরকে চাইবেন তারা ছাড়া আকাশ ও পৃথিবীতে যারা রয়েছে তারা সবাই হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে।” (২৭:৮৭) তাহলে তিনি সেই দিন কাদেরকে হতবুদ্ধি হওয়া থেকে মুক্ত রাখবেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ তারা হচ্ছে শহীদ। হতবুদ্ধি এবং ভীত সন্ত্রস্ত তো হয় জীবিত লোকেরা। আর শীদেরা জীবিত বটে, কিন্তু তারা অবস্থান করছে আল্লাহ তা'আলার নিকট, আল্লাহ তাদেরকে জীবিকা দান করছেন। তিনি সেই দিনের সন্ত্রাস থেকে তাদেরকে রক্ষা করবেন। কেননা, ওটা তো হচ্ছে আল্লাহর আযাব। আর তাঁর আযাব তো বর্ষিত হবে অসৎ লোকদের উপর। এটাকেই আল্লাহ (আরবী) (২২:২) -এই আয়াতে বর্ণনা করেছেন যে, সেই দিন প্রত্যেক দুগ্ধবতী স্ত্রী লোক তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতীর গর্ভপাত হয়ে যাবে। আল্লাহ যতদিন চাইবেন ততদিন তারা এই আযাবে ডুবে থাকবে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত এই অবস্থা থাকবে। তারপর আল্লাহ পাক হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে জ্ঞান লোপকারী ফুকার দেয়ার নির্দেশ দিবেন। ফলে সমস্ত আকাশবাসী ও যমীনবাসী অজ্ঞান হয়ে পড়বে। তবে আল্লাহ যাকে চাইবেন তার জ্ঞান ঠিকই থাকবে। মৃত্যুর ফেরেশতা আল্লাহ তা'আলার নিকট এসে বলবেনঃ “হে আল্লাহ! সবাই মরে গেছে।” আল্লাহ তো জানেনই।তবু তিনি জিজ্ঞেস করবেনঃ “অবশিষ্ট কে আছে?” তিনি বলবেনঃ “অবশিষ্ট একমাত্র আপনি আছেন। আপনার তো কখনও মৃত্যু হবে না। তা ছাড়া আরশ। বহনকারী ফেরেশতাগণও বাকী রয়েছেন। আর বাকী রয়েছেন জিবরাঈল এবং মিকাঈলও। বাকী আমিও রয়েছি।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “জিবরাঈল ও মীকাঈলের তো মৃত্যু হওয়া উচিত।” তখন আরশ বলে উঠবেঃ “হে আমার প্রভু! জিবরাঈল এবং মীকাঈলও মরে যাবেন?” আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলবেনঃ “কথা বলো না। আরশের নীচে যত কিছু আছে সবাইকেই মরতে হবে।” মৃত্যুর ফেরেস্তা পুনরায় আরয করবেন- “হে প্রভু! জিবরাঈল এবং মীকাঈলও মরে গেছেন।” আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেনঃ “এখন আর কে বাকী আছে?” তিনি উত্তরে বলবেনঃ “বাকী আছেন আপনি, আপনার তো মৃত্যু নেই। এখন আমি বাকী আছি এবং বাকী আছেন আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আরশ বহনকারীদেরকেও তো মরতে হবে।” তারাও মরে যাবে। আল্লাহ পাক জিজ্ঞেস করবেনঃ “এখন বাকী আছে কে?” আরাঈল (মৃত্যুর ফেরেশতা) তখন বলবেনঃ “মৃত্যুবরণ না কারী আপনি বাকী আছেন, আর বাকী আছি আমি।” আল্লাহ তা'আলা তখন ইসরাফীলের নিকট থেকে শিঙ্গা নিয়ে নেয়ার জন্যে আরশকে হুকুম করবেন এবং ইসরাফীল (আঃ)-কে তিনি বলবেনঃ “তুমিও আমার মাখলূক, সুতরাং তুমিও মরে যাও।” তিনি তৎক্ষণাৎ মরে যাবেন এবং একমাত্র আল্লাহই অবশিষ্ট থাকবেন যিনি এক, অমুখাপেক্ষী, তার কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন। তারপর আসমান ও যমীনকে জড়িয়ে নেয়া হবে যেমনভাবে মার’কে জড়িয়ে নেয়া হয়। ও দু’টোকে তিনবার খুলে দেয়া হবে এবং তিনবার জড়িয়ে নেয়া হবে। তারপর মহান আল্লাহ বলবেনঃ “আমি জাব্বার (সর্ব শক্তিমান ও বিজয়ী), আমি জাব্বার, আমি জাব্বার।” এরপর তিনবার তিনি উচ্চস্বরে বলবেনঃ “আজকের দিন রাজত্ব কার?” উত্তর দেবে কে? সুতরাং স্বয়ং তিনিই বলবেনঃ “আজকের দিন আল্লাহরই রাজত্ব যিনি একক ও প্রবল পরাক্রান্ত।”অতঃপর তিনি দ্বিতীয় যমীন ও আসমান সৃষ্টি করবেন, ও দু’টো ছড়িয়ে দিবেন এবং দীর্ঘ করবেন। ও দু’টোর মধ্যে কোন বক্রতা ও ত্রুটি থাকবে না। তারপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মাখলুকের প্রতি এক ভীষণ শব্দ হবে। তখন নতুনভাবে সৃষ্ট যমীনে সবাই পূর্বের মত হয়ে যাবে। যারা যমীনের মধ্যে ছিল তারা যমীনের মধ্যেই হবে এবং যারা বাইরে ছিল তারা বাইরেই হবে। অতঃপর আরশের নীচ থেকে আল্লাহ পানি বর্ষণ করবেন। আকাশকে তিনি পানি বর্ষণের নির্দেশ দিবেন। চল্লিশ দিন পর্যন্ত বৃষ্টি বর্ষিত হতে থাকবে। তারপর তিনি দেহগুলোকে নির্দেশ দিবেন যে, ওগুলো যেন যমীন থেকে এমনভাবে প্রকাশিত হয় যেমনভাবে ঘাসপাতা ও শাক-শজী অঙ্কুরিত হয়। যখন দেহগুলো পূর্বের ন্যায় পরিপূর্ণ হয়ে যাবে তখন সর্বপ্রথম আরশের ফেরেশতাদেরকে জীবিত করা হবে। আল্লাহ ইসরাফীল (আঃ)-কে শিঙ্গা গ্রহণ করতে বলবেন। তিনি তা গ্রহণ করবেন। তারপর মহান আল্লাহ জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈল (আ)-কে জীবিত করবেন। এরপর আত্মাগুলোকে ডাক দেয়া হবে। মুসলমানদের আত্মা আলোর মত চমকিতে থাকবে। আর কাফিরদের আত্মা অন্ধকারের ন্যায় থাকবে। এই সবকে নিয়ে শিঙ্গার মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে হুকুম করবেন যে, পুনর্জীবনের জন্যে যেন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হয়। সুতরাং শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে, ফলে রূহগুলো মৌমাছির মত তীব্র বেগে বেরিয়ে আসবে। তাদের দ্বারা যমীন ও আসমান ভরে যাবে। এরপর আল্লাহ তাআলা রূহগুলোকে দেহের ভিতর প্রবেশ করার নির্দেশ দিবেন। তখন দুনিয়ার সমস্ত রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে প্রবেশ করতে শুরু করবে এবং দেহগুলোর মধ্যে নাকের ছিদ্রের পথ হয়ে যাবে, যেমন কোন সর্পদষ্ট ব্যক্তির দেহের মধ্যে বিষ অনুপ্রবেশ করে থাকে। তারপর যমীন ফাটতে শুরু করবে এবং মানুষেরা উঠে উঠে নিজেদের প্রতিপালকের দিকে মুখ করবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, সর্বপ্রথম আমার কবর খুলে যাবে। মহান আল্লাহর দিকে চলে যাব। কাফিররা বলবেঃ ‘এদিন তো বড় কঠিন বলে মনে হচ্ছে।' লোকেরা সব উলঙ্গ হয়ে থাকবে। তারা সবাই একই জায়গায় দণ্ডায়মান হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত এই অবস্থাই থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তাদের দিকে দেখবেনও না এবং কোন ফায়সালাও করবেন না। লোকেরা ক্রন্দন এবং বিলাপ করতে থাকবে। তাদের অশ্রু শেষ হয়ে যাবে। তখন তাদের চক্ষু দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে। নিজেদের শরীরের ঘামে তারা ভিজে যাবে। ঘাম এতো বেশী ঝরবে যে, সেই ঘামের পানিতে তাদের গুতনী পর্যন্ত ডুবে যাবে । ললাকেরা পরস্পর বলাবলি করবে যে, আল্লাহর নিকট সুপারিশের জন্যে কাউকে পাঠানো হাক, যেন তিনি কোন মীমাংসা করে দেন। তারা তখন পরস্পর মন্তব্য করবে যে, পিতা আদম (আঃ) ছাড়া কে এমন আছেন যিনি আল্লাহর সামনে কথা বলার সাহস রাখেন? আল্লাহ তা'আলা তাঁকে নিজের হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর মধ্যে রূহ ফুকেছেন। আর সর্বপ্রথম তিনি তাঁর সাথে কথা বলেছেন। অতঃপর তারা হযরত আদম (আঃ)-এর কাছে যাবে এবং নিজেদের উদ্দেশ্য পেশ করবে। তিনি সুপারিশ করতে অস্বীকৃতি জানাবেন এবং বলবেনঃ “আমি এর যোগ্য নই।” অতঃপর তারা পৃথক পৃথকভাবে এক একজন নবীর কাছে যাবে। যার কাছেই যাবে তিনিই অস্বীকার করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, এরপর তারা আমার কাছে আসবে। আমি তখন যাবো এবং ফাহস' -এর উপর সিজদায় পড়ে যাবো। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ফাহস’ কি জিনিস?” তিনি উত্তরে বলেন, ওটা হচ্ছে আরশের সামনের অংশ। তখন আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতা পাঠাবেন। তিনি আমাকে আমার বাহু ধরে উঠাবেন। মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “তুমি কি বলতে চাও?” আমি আরয করবো- হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে সুপারিশ করার অধিকার দানের ওয়াদা করেছেন। অতএব এই অধিকার আমাকে দান করুন এবং লোকদের মধ্যে ফায়সালা করুন। আল্লাহ পাক তখন বলবেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি সুপারিশ করতে পার এবং আমি লোকদের মধ্যে ফায়সালা করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমি তখন ফিরে এসে লোকদের সাথে দাড়িয়ে যাবো। আমরা সব দাঁড়িয়েই থাকবো এমন সময় হঠাৎ আকাশ থেকে এক ভীষণ শব্দ আসবে। আমরা চিন্তান্বিত হয়ে পড়বো। পৃথিবীবাসী দানব ও মানবের দ্বিগুণ সংখ্যক ফেরেশতা আকাশ থেকে অবতরণ করবেন। তারা যমীনের নিকটবর্তী হবেন। যমীন তাঁদের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবেন। আমরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবোআপনাদের মধ্যে কি মহান আল্লাহ রয়েছেন? তারা উত্তরে বলবেনঃ “না, তবে তিনি অবশ্যই আসবেন।” দ্বিতীয়বার আকাশ থেকে ফেরেশতাগণ অবতরণ করবেন। তাদের সংখ্যা পূর্বের অবতারিত ফেরেশতাদের সংখ্যার দ্বিগুণ এবং দানব ও মানবের সংখ্যার দ্বিগুণ হবে। যমীন তাঁদের আলোকে চমকিত হয়ে উঠবে। তারা দাঁড়িয়ে যাবেন। আমরা জিজ্ঞেস করবো- আল্লাহ কি আপনাদের মধ্যে রয়েছেন? তাঁরা জবাবে বলবেনঃ ‘না, তবে তিনি অবশ্যই এসে পড়বেন!” তারপর তৃতীয়বার ওর চেয়েও দ্বিগুণ সংখ্যক ফেরেশতা অবতরণ করবেন। তখন মহাপ্রতাপান্বিত ও মহামহিমান্বিত আল্লাহ মেঘের ছত্র লাগিয়ে আটজন ফেরেশতা দ্বারা স্বীয় তখৃত বহন করিয়ে নিয়ে তাশরিফ আনবেন, অথচ এখন তো তাঁর তখৃত চারজন ফেরেশতা বহন করতে রয়েছেন। তাঁদের পা যমীনের সর্বশেষ স্তরের তলায় রয়েছে। আসমান ও যমীন হচ্ছে তাদের দেহের অর্ধাংশের সমান। আল্লাহ তা'আলার আরশ তাঁদের স্কন্ধের উপর রয়েছে। তাদের মুখে তাসবীহ ও তাহমীদ উচ্চারিত হতে থাকবে। তারা বলতে থাকবেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমরা তাঁরই পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি আশ ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আমরা পবিত্রতা বর্ণনা করছি তারই যিনি রাজ্য, রাজত্ব ও আধ্যাত্মিক জগতের মালিক। আমরা তাঁরই পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি মৃত্যুবরণ করেন না। আমরা তাঁরই পবিত্রতা ঘোষণা করছি যিনি সমস্ত মাখলুকের মৃত্যু ঘটিয়ে থাকেন কিন্তু নিজে মৃত্যুবরণ করেন না। আমরা তারই তসবীহ পাঠ করছি। তিনি পবিত্র, তিনি পবিত্র, তিনি পবিত্র। আমরা আমাদের মহান প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি ফেরেশতামণ্ডলী ও রূহের (জিবরাঈল আঃ-এর) প্রভু। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি সারা মাখলুকের মৃত্যু ঘটিয়ে থাকেন কিন্তু নিজে মৃত্যুবরণ করবেন না। তারপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় কুরসীর উপর উপবেশন করবেন। একটা শব্দ হবে- “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদেরকে সৃষ্টি করার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমি নীরব ছিলাম। তোমাদের কথা শুনে এসেছি এবং তোমাদের কাজকর্ম দেখে এসেছি। এখন তোমরা নীরব থাক। তোমাদের আমলের সহীফা তোমাদেরকে পাঠ করে শুনানো হবে। যদি ওটা ভাল সাব্যস্ত হয় তবে আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। আর যদি মন্দ হয় তবে নিজেদেরকেই তিরস্কার করবে।” অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে নির্দেশ দিবেন, তখন ওর মধ্যে ভীষণ কৃষ্ণকায় এক আকৃতি দেখা দেবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, তোমরা শয়তানের উপাসনা করবে না। কারণ, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? এটা সেই জাহান্নাম যার ওয়াদা তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল এবং যাকে তোমরা অবিশ্বাস করতে। সুতরাং হে পাপীর দল! সৎ লোকদের থেকে এখন তোমরা পৃথক হয়ে যাও।” একথা বলে আল্লাহ তা'আলা উম্মতদেরকে পৃথক করে দিবেন। এরশাদ হচ্ছে- “হে নবী (সঃ)! তুমি প্রত্যেক উম্মতকে জানুর ভরে পতিত দেখতে পাবে। প্রত্যেক উম্মতের পাশে তার আমলনামা থাকবে এবং স্বীয় কৃতকর্মের প্রতিফল পাবে। এরপর আল্লাহ স্বীয় মাখলুকের মধ্যে ফায়সালার কাজ শুরু করবেন। কিন্তু জ্বীন ও মানুষের বিচার তখনও শুরু হবে না।প্রথমে আল্লাহ হিংস্র ও চতুষ্পদ জন্তুর বিচার শুরু করবেন। এমন কি এক অত্যাচারী শিং বিশিষ্ট ছাগলের অত্যাচারের প্রতিশোধও অন্য ছাগলের দ্বারা গ্রহণ করাবেন। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি জন্তুগুলোকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তোমরা মাটি হয়ে যাও।" এ দেখে কাফিররা বলবেঃ “হায়! আমরাও যদি মাটি হয়ে যেতাম তবে এই শাস্তি থেকে বাঁচতে পারতাম। অতঃপর বান্দাদের বিচারকার্য শুরু হবে। সর্বপ্রথম হত্যা ও খুনের মাকদ্দমা পেশ করা হবে। তখন এমন। প্রত্যেক নিহত ব্যক্তি আসবে যাকে আল্লাহর পথে হত্যাকারী হত্যা করেছিল; আল্লাহ তাআলা হত্যাকারীকে হুকুম করবেন তখন সে ঐ নিহত ব্যক্তির মাথা উঠিয়ে নেবে। ঐ মাথা তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! একে জিজ্ঞেস করুন, কেন সে আমাকে হত্যা করেছিল?" আল্লাহ তখন তাকে জিজ্ঞেস করবেন (অথচ আল্লাহ নিজেই জানেন)ঃ “কেন তাকে হত্যা করেছিলে?" সেই গাযী তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! আপনার মর্যাদা ও আপনারই নামের জন্যে।” তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “তুমি সত্য বলেছো।” সেই সময় তার মুখমণ্ডল সূর্যের আলোকের মত চমকাতে থাকবে। ফেরেশতাগণ তাকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবেন। অনুরূপভাবে অন্যান্য নিহতগণ নিজ নিজ নাড়ি ভূড়ি মাথায় নিয়ে আসবে। আল্লাহ পাক ওদের হত্যাকারীদের জিজ্ঞেস করবেন- “কেন হত্যা করেছিলে?” তারা উত্তরে বলতে বাধ্য হবে যে, নিজের নাম ও খ্যাতির উদ্দেশ্যে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “ধ্বংস হয়ে যাও।” মোটকথা, প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির মাকদ্দমা পেশ করা হবে এবং বিচার হবে। প্রত্যেক অত্যাচারের প্রতিশোধ অত্যাচারী থেকে নেয়া হবে। যে অত্যাচারীকে আল্লাহ ইচ্ছা করবেন শাস্তি দেবেন এবং যার উপর ইচ্ছা রহমত বর্ষণ করবেন। তারপর সারা মাখলুকের বিচার করা হবে এবং এমন কোন অত্যাচারী অবশিষ্ট থাকবে না যে, সে অত্যাচারী থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেনি। এমন কি যে ব্যক্তি দুধে পানি মিশিয়ে বিক্রি করতো এবং বলতো যে, দুধ খাটি, তাকেও শাস্তি দেয়া হবে। আর ক্রেতাকে তার পুণ্য দেয়া হবে। এই কার্য সমাপ্তির পর এক আহ্বানকারী আহ্বান করবে যা সারা মাখলুক শুনতে পাবে। সেই আহ্বান হবে নিম্নরূপঃ “প্রত্যেক দল যেন নিজ নিজ মা’রূদের কাছে চলে যায় এবং তার অঞ্চল চেপে ধরে।” তখন এমন কোন মূর্তিপূজক থাকবে না যার সামনে তার মূর্তি লাঞ্ছিত অবস্থায় পড়ে না থাকবে। ঐদিন একজন ফেরেশতা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর রূপ ধরে আসবেন এবং আর একজন ফেরেশতা হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর রূপ ধরে আগমন করবেন। তখন ইয়াহূদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর পিছনে চলে আসবে এবং খ্রীষ্টানেরা আসবে হযরত ঈসা (আঃ)-এর পিছনে। অতঃপর তাদের এই কল্পিত মা’বৃদ তাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে। তখন তারা বলবে যে, যদি ওরা তাদের প্রকৃত মা’রূদ হতো তবে তাদেরকে কখনও জাহান্নামে নিয়ে যেতো না। তারা জাহান্নামে চিরকাল অবস্থান করবে। এখন শুধু মুমিনরাই বাকী থাকবে এবং তাদের মধ্যে মুনাফিকরাও থাকবে। আল্লাহ তা'আলা নিজের ইচ্ছামত পরিবর্তিত আকৃতিতে তাদের কাছে আসবেন এবং বলবেনঃ “হে লোক সকল! সবাই নিজ নিজ মাবুদের সাথে মিলিত হয়েছে। সুতরাং তোমরাও যাদের ইবাদত করতে তাদের সাথে মিলিত হও।” তখন মুনাফিক মিশ্রিত মুমিনরা বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! আমাদের মাবুদ তো আপনিই ছিলেন। আপনাকে ছাড়া আমরা আর কাউকেও মানতাম না।” এরপর আল্লাহ তাআলা তাদের নিকট থেকে সরে যাবেন। অতঃপর তিনি নিজেই প্রকৃত দীপ্তি ও আঁকজমকের সাথে আসবেন এবং যতক্ষণ চাইবেন ততক্ষণ তাদের থেকে সরে থাকবেন। তারপর তিনি তাদের সামনে আসবেন এবং পুনরায় বলবেনঃ “হে লোকেরা! সবাই নিজ নিজ মাবুদের সাথে মিলিত হয়েছে। সুতরাং তোমাদের মা’ৰূদের সাথে মিলিত হও।” তারা বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! আপনি ছাড়া আমাদের অন্য কোন মা'বুদ নেই। আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করতাম। তখন আল্লাহ পাক তাদের পায়ের গোছা খুলে দেবেন। এবং মর্যাদা গুণে তাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, তার মা'বুদ তিনিই। তারপর সবাই মাথার ভরে সিজদায় পড়ে যাবে। কিন্তু মুনাফিকরা পিঠের ভরে পড়বে। সিজদার জন্যে তারা ঝুঁকে পড়তে পারবে না। তাদের পিঠ গাভীর পিঠের মত সোজা হয়ে থাকবে। যখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুকুম করবেন। তখন তাদের সামনে পুলসিরাত এসে পড়বে। ওটা তরবারীর ধারের চেয়ে তীক্ষ্ণ হবে। ওর স্থানে স্থানে আঁকড়া ও কাঁটা থাকবে এবং অত্যন্ত পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক হবে। ওর নীচে আরও একটি পিচ্ছিল সেতু থাকবে। ভাল লোকেরা চক্ষের পলকে দ্রুত গতিতে ওটা পার হয়ে যাবে। যেমন বিদ্যুৎ চমকিত হয় বা প্রবল বেগে বায়ু প্রবাহিত হয় অথবা দ্রুতগামী ঘোড়া কিংবা দ্রুত দৌড়ালু মানুষ চলে থাকে। কতগুলো লোক তো সম্পূর্ণরূপে অক্ষত থাকবে ও পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। কতগুলো লোক আহত হবে এবং বহু লোক কেটে জাহান্নামে পড়ে যাবে। অতঃপর জান্নাতীদেরকে যখন জান্নাতে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে তখন তারা বলবেঃ “আমাদের জন্যে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে কে?” তারা হযরত আদম (আঃ)-এর নিকট গিয়ে সুপারিশের আবেদন জানাবে। তখন তিনি নিজের পাপের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ “আমার এর যোগ্যতা নেই। তোমরা হযরত নূহ (আঃ)-এর নিকট যাও। তাঁকে আল্লাহর প্রথম রাসূল বলা হয়। লোকেরা তখন হযরত নূহ (আঃ)-এর কাছে যাবে। তিনিও নিজের অপরাধের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ “আমার তো এই কাজের যোগ্যতা নেই। তোমরা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে যাও। আল্লাহ তা'আলা তাকে নিজের বন্ধু বলেছেন। তারা তাঁর কাছে যাবে। তিনিও নিজের দোষের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ “তোমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও। আল্লাহ তাআলা তার সাথে কথা বলেছেন এবং তাঁর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছেন। তারা তখন হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে যাবে এবং সুপারিশের জন্যে আবেদন করবে। তিনি নিজের হত্যার পাপের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ “আমি এই কাজের যোগ্য নই। তোমরা বরং হযরত ঈসা রূহুল্লার (আঃ) কাছে যাও। তিনি আল্লাহর রূহ ও তাঁর কালেমা।” হযরত ঈসাও (আঃ) বলবেনঃ “না, আমি এ কাজের যোগ্য নই। তোমরা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাও।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন- তখন লোকেরা আমার কাছে আসবে। আল্লাহ তা'আলা আমাকে শাফাআতের অধিকার দিয়েছেন এবং ওয়াদা করেছেন। আমি জান্নাতের দিকে যাবো এবং জান্নাতের দরজায় করাঘাত করবো। জান্নাতের দরজা খুলে যাবে এবং আমাকে অভ্যর্থনা জানানো হবে। জান্নাতে প্রবেশ করে আমি আল্লাহ পাকের দিকে দৃষ্টিপাত করবো এবং সিজদায় পড়ে যাবো। আল্লাহ তা'আলা আমাকে এমন তাহমীদ ও তামজীদের অধিকার দান করবেন যা তিনি অন্য কাউকেও শিখিয়ে দেননি। অতঃপর তিনি বলবেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! মাথা উঠাও। সুপারিশ করতে হয় কর। তোমার সুপারিশ কবুল করা হবে এবং তোমার আবেদন মঞ্জুর করা হবে।" আমি তখন আমার মাথা উঠাবো। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেনঃ “কি বলতে চাও?” আমি বলবো, হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে সুপারিশ করার অধিকার দিয়েছেন। জান্নাতীদের ব্যাপারে আমার শাফাআত কক্ল করুন! তারা যেন জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। তখন তিনি বলবেনঃ “ঠিক আছে, আমি অনুমতি দিলাম। এই লোকগুলো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে।" নবী (সঃ) বলেনঃ আল্লাহর শপথ! দুনিয়ায় তোমরা তোমাদের বাসস্থান ও স্ত্রীদেরকে যেমন চিনতে পার তার চেয়ে তাড়াতাড়ি তোমরা তোমাদের জান্নাতের বাসস্থান ও স্ত্রীদেরকে চিনতে পারবে। প্রত্যেক লোককে বাহাত্তরটি স্ত্রী দেয়া হবে। তারা আদম সন্তানদের মধ্য থেকে হবে দু’জন এবং হ্রদের থেকে হবে সত্তরজন। ঐ সত্তরজনের উপর এই দু’জনের মর্যাদা, দান করা হবে। কেননা, এই সতী সাধ্বী মহিলারা দুনিয়ায় খুব বেশী বেশী করে আল্লাহর ইবাদত করতো। জান্নাতবাসী যখন একজনের কাছে যাবে তখন দেখতে পাবে যে, সে ইয়াকূতের ঘরে মণিমুক্তা দ্বারা সজ্জিতা হয়ে সোনার সিংহাসনে বসে আছে। সে মিহীন সবুজ রেশমের সত্তরটি জান্নাতী হুল্লা পরিধান করে রয়েছে। সে যখন তার কাঁধের উপর হাত দেবে তখন তার বক্ষের উপর কাপড়, দেহ, মাংস ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও ওগুলো ভেদ করে বক্ষের অপর দিকে তার হাতের প্রতিবিম্ব দেখা যাবে। তার দেহ এত স্বচ্ছ হবে যে, তার পায়ের গোছার মজ্জা পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যাবে। মনে হবে যে, তোমরা যেন ইয়াকৃতের ছুরি দেখতে রয়েছে। তার অন্তর এর জন্যে এবং এর অন্তর তার জন্যে আয়না বানানো হবে। না এ ওর থেকে ক্লান্ত হবে এবং না ও এর থেকে ক্লান্ত হবে। সে যখন কখনো কোন মহিলার কাছে আসবে তখন সে তাকে কুমারী রূপেই পাবে। না স্বামী স্ত্রীর ক্লান্তির অভিযোগ করবে এবং না স্ত্রী স্বামীর ক্লান্তির অভিযোগ করবে। এমনই অবস্থায় শব্দ শোনা যাবেঃ “তোমাদের কারো প্রাণ ভরবে না এটা তো আমার জানা আছে। কিন্তু অন্যান্য স্ত্রীরাও তো রয়েছে।” সুতরাং সে পালাক্রমে তাদের কাছে যাবে। যার কাছেই সে যাবে সে-ই বলবেঃ “আল্লাহর কসম! জান্নাতে তোমার চেয়ে সুন্দর আর কেউ নেই এবং আমার কাছে তোমার চেয়ে প্রিয়তম কেউই নেই। কিন্তু জাহান্নামীদেরকে যখন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তখন আগুন কারও পা পর্যন্ত পৌঁছবে কারও পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছবে, কারও পৌছবে জানু পর্যন্ত, কারও কোমর পর্যন্ত এবং কারও শুধু মুখমণ্ডল বাদ দিয়ে সমস্ত দেহ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। কেননা, মুখমণ্ডলের উপর আগুনকে হারাম করে দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমি আল্লাহ তাআলাকে বলবো- হে আমার প্রভু! আমার উম্মতের জাহান্নামবাসীদের ব্যাপারে আমার শাফা'আত কবুল করুন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “তুমি তোমার উম্মতের যাদেরকে চিননা তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নাও।” সুতরাং কোন উম্মতই অবশিষ্ট থাকবে না। তারপর সাধারণ শাফাআতের অনুমতি দেয়া হবে। তখন প্রত্যেক নবী ও প্রত্যেক শহীদ নিজ নিজ শাফা'আত পেশ করবে। আল্লাহ পাক তখন বলবেনঃ “যার অন্তরে এক দীনারের ওজন পরিমাণও ঈমান রয়েছে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে নাও।” তারপর বলবেনঃ “এক দীনারের এক তৃতীয়াংশ ঈমান থাকলেও তাকে বের কর।” এরপর বলবেনঃ “এক দীনারের দুই তৃতীয়াংশ ঈমান থাকলেও তাকে বের কর। এক চতুর্থাংশ হলেও বের কর। এক কীরাত বরাবর হলেও বের করে নাও। এমন কি কারও অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকলে তাকেও বের করে নাও। তারপর যারা আল্লাহর জন্যে কোন একটি ভাল কাজও করেছে তাকেও বের কর।” তখন আর এমন কেউই বাকী থাকবে না যে শাফাআতের যোগ্য। এমন কি আল্লাহ তা'আলার এই সাধারণ রহমত দেখে শয়তানের লোভ হবে যে, যদি কেউ তার জন্যেও সুপারিশ করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমি তো হচ্ছি সবচেয়ে বড় দয়ালু।” অতঃপর তিনি জাহান্নামে স্বীয় হাতটি রাখবেন এবং এতো অসংখ্য জাহান্নামীকে বের করবেন যারা পুড়ে কয়লার মত হয়ে যাবে। তাদেরকে জান্নাতের নাহরে হায়ওয়ান’ নামক একটি নদীতে নিক্ষেপ করা হবে। তারা এমনভাবে নব জীবন লাভ করবে যেমনভাবে কোন জলাশয়ের ধারে উদ্ভিদ অংকুরিত হয় এবং রোদের আলোতে সবুজ আকার ধারণ করে। আবার ছায়ায় থাকলে ফ্যাকাশে হয়ে থাকে। ঐ জাহান্নামীরা জান্নাতের ঐ নদীতে গোসল করার পর শ্যামল সবুজ উদ্ভিদের মত সুন্দর আকার ধারণ করবে। তাদের কপালে লিখা থাকবে ‘আল্লাহর আযাদকৃত জাহান্নামী। তাদের এই চিহ্ন দেখে জান্নাতবাসীরা তাদেরকে চিনতে পারবে যে, তারা কিছু ভাল কাজ করেছিল। কিছুকাল তারা এইভাবেই জান্নাতে অবস্থান করবে। তারপর তারা মহান আল্লাহর নিকট আবেদন করবে যে, তাদের ঐ কপালের লিখাটা যেন মিটিয়ে দেয়া হয়। তখন তা মিটিয়ে দেয়া হবে।”এটি একটি মাশহুর ও দীর্ঘ হাদীস। হাদীসটি অত্যন্ত গারীব এবং বিভিন্ন হাদীসের বিভিন্ন অংশ বিশেষ। এর কতগুলো কথা তো একেবারে অস্বীকারযোগ্য। মদীনার কাযী ইসমাঈল ইবনে রাফে একাই এর বর্ণনাকারী। এর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ এটাকে বিশ্বাসযোগ্য বলেছেন এবং কেউ কেউ একে দুর্বল বলেছেন। আবার কেউ কেউ সম্পূর্ণরূপেই অস্বীকার করেছেন। যেমন আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ), আবু হাতিম রাযী (রঃ) এবং উমার ইবনে ফালাস (রঃ)। কেউ কেউ বলেছেন যে, এই হাদীসটি সম্পূর্ণরূপে বর্জনীয়। ইবনে আদী (রঃ) বলেন যে, এই হাদীসটির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এর বর্ণনাকারীরা সবাই দুর্বল। আমি বলি যে, কয়েকটি কারণে এর ইসনাদে মতভেদ রয়েছে। আমি এটাকে পৃথক একটি খণ্ডে বর্ণনা করেছি। এর বর্ণনাভঙ্গীও বিস্ময়কর। বহু হাদীস মিলিয়ে একটি হাদীস বানিয়ে নেয়া হয়েছে। এজন্যেই এটা অস্বীকারযোগ্য হয়ে গেছে। আমি আমার শিক্ষক হাফিয আবুল হাজ্জাজ আল মুযী (রঃ)-এর কাছে শুনেছি যে, এটা ওয়ালীদ ইবনে মুসলিমের একটি রচনা, যা তিনি জমা করেছেন। এটা যেন। কতগুলো পৃথক পৃথক হাদীসের সাক্ষ্য বহনকারী। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-আনআম 6:73
৭১-৭৩ নং আয়াতের তাফসীর: মুশরিকরা মুসলমানদেরকে বলেছিল-তোমরা মুহাম্মাদের দ্বীনকে পরিত্যাগ কর। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। তিনি বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি মুশরিকদেরকে বলে দাও-আমরা কি আল্লাহকে ছেড়ে ঐ সব মূর্তির পূজা করবো যারা আমাদের কোন উপকারও করতে পারবে না এবং কোন ক্ষতি করারও শক্তি তাদের নেই? কুফরী অবলম্বন করে কি আমরা উল্টো পথে ফিরে যাবো? অথচ আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে আলো দান করেছেন? তাহলে তো শয়তান যাকে পথভ্রষ্ট করেছে আমাদের দৃষ্টান্ত তার মতই হবে। অর্থাৎ ঈমান আনয়নের পর কুফরী অবলম্বন করা এরূপই যেমন একটি লোক সফররত অবস্থায় পথ ভুলে গেল এবং শয়তানরা তাকে পথভ্রষ্ট করলো। আর তার সঙ্গী সরল পথে রইলো এবং তাকে ডেকে বললোঃ আমাদের কাছে এসো। আমরা সরল সোজা পথে রয়েছি। সে কিন্তু যেতে অস্বীকার করলো। এটা ঐ ব্যক্তি যে নবী (সঃ)-কে ভালভাবে জানা সত্ত্বেও পথভ্রষ্টদের অনুসরণ করে কাফের হয়ে যাচ্ছে এবং নবী (সঃ) তাকে সোজা পথে আসার জন্যে ডাক দিচ্ছেন। এই পথ হচ্ছে ইসলামের পথ।(আরবী) এতে মূর্তি ও মূর্তিপূজকদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে এবং ঐ লোকদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে যারা তাদেরকে আল্লাহর হিদায়াতের দিকে ডাকতে রয়েছে। যেমন কেউ পথ ভুলে গেছে। অতঃপর কোন আহ্বানকারী তাকে ডাক দিয়ে বলছে- হে অমুক! তুমি পথের দিকে এসো। আর তার অন্য সাথী বলছে- তুমি বিভ্রান্ত হয়ো না, আমাদের সোজা পথের দিকে এসো। এখন সে যদি পূর্ববর্তী আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিয়ে দেয় তবে সে তাকে নিয়ে গিয়ে ধ্বংসের গর্তে ফেলে দেবে। কিন্তু যদি অন্য সঙ্গীর কথা মেনে নেয় তবে সে তাকে সোজা ও হিদায়াতের পথে নিয়ে আসবে। প্রথম আহ্বানকারী হচ্ছে জঙ্গলের শয়তানের অন্তর্ভুক্ত। এটা হচ্ছে ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত, যে আল্লাহর নিকট থেকে সরে গিয়ে মূর্তিপূজা করতে শুরু করে দেয় এবং ওর মধ্যেই মঙ্গল নিহিত আছে বলে মনে করে। আর যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসবে তখন লজ্জিত হতে হবে। এটা হচ্ছে পথভ্রষ্টকারী শয়তান যে তাকে তার বাপ-দাদার নাম নিয়ে এবং তার নাম নিয়ে ডাক দেয়। তখন সে তার অনুসরণ করতে শুরু করে দেয় এবং ওটাকেই কল্যাণকর বলে মনে করে। তখন শয়তান তাকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করে। তাকে সে ক্ষুধা পিপাসায় কাতর করে জংগলে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায়, যাতে সে ধ্বংস হয়ে যায়।(আরবী) শব্দ দ্বারা হতবুদ্ধি লোককে বুঝানো হয়েছে। যেমন কোন লোক পথ ভুলে হতবুদ্ধি হয়ে ঘুরে বেড়ায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে ব্যক্তি আল্লাহর হিদায়াত কবুল না করে শয়তানের অনুসরণ ও পাপের কাজ করে থাকে। অথচ তার সাথী তাকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান করতে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন যে, সে শয়তান কর্তৃক পথভ্রষ্ট ব্যক্তি যার ওলী হচ্ছে মানুষ। আল্লাহর হিদায়াতই হচ্ছে প্রকৃত হিদায়াত এবং পথভ্রষ্টতা হচ্ছে ওটাই যার দিকে শয়তান ডেকে থাকে। এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ সে এরই উপযোগী। যে, তার সাথী তাকে পথভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান করছে। আর সে ধারণা করছে। যে ওটাই হচ্ছে সঠিক পথ । হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা প্রকাশ্য আয়াতের উল্টো। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তার সফরের সঙ্গী তাকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান করছে। সুতরাং এটা জায়েয নয় যে, ওটাকে পথভ্রষ্টতা বলা হবে, অথচ আল্লাহ তো ওটাকে হিদায়াত বলে খবর দিয়েছেন। আর ইবনে জারীর (রঃ) যা বলেছেন রচনাভঙ্গী ওরই দাবীদার। তা এই যে, (আরবী) এটা (আরবী) হওয়ার কারণে (আরবী) -এর স্থানে রয়েছে। অর্থাৎ কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা, পথভ্রষ্টতা এবং অজ্ঞতা ও মূর্খতার অবস্থায়, আর তার সঙ্গী সাথীরা ঐ পথেই চলছে এবং ঐ পথেই তাদেরকে আসতে বলছে, যেটাকে আল্লাহ পাক দৃষ্টান্তস্বরূপ বর্ণনা করেছেন। তখন এই বাক্যের অর্থ হবে-সে তাকে আহ্বানকৃত পথে যেতে অস্বীকার করছে এবং ওর দিকে মনোনিবেশ করছে না। যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন তবে তাকে হিদায়াত করতেন এবং সোজা-সঠিক পথে পরিচালিত করতেন। এই জন্যেই তিনি বলেছেন-আল্লাহর হিদায়াতই হচ্ছে সঠিক হিদায়াত। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “যাকে আল্লাহ হিদায়াত করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না।” তিনি আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে হিদায়াতের উপর আনবার লোভ করলেও আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে কে হিদায়াতের উপর আনতে পারে? এবং তাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী নেই।” (১৬:৩৭) ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ আমাদেরকে সারা জাহানের প্রতিপালকের সামনে মাথা নত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর ভাবার্থ হচ্ছে-আমাদের প্রতি এই নির্দেশ রয়েছে যে, আমরা যেন আন্তরিকতার সাথে তাঁর ইবাদত করি, নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করি, আল্লাহকে ভয় করি এবং সর্বাবস্থায় তাকওয়া অবলম্বন করি। কিয়ামতের দিন তাঁরই কাছে সকলকে সমবেত করা হবে। তিনিই আকাশ ও যমীনকে ভারসাম্য রক্ষা করে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই এ দু’টির মালিক। কিয়ামতের দিন তিনি শুধু বা হও' বলবেন আর তখনি চোখের পলকে সমস্ত কিছুর অস্তিত্ব পুনরায় এসে যাবে। এখানে (আরবী) এই বাক্যে (আরবী) শব্দকে হয়তো বা (আরবী)-এর উপর বা সংযোগের কারণে (আরবী) দেয়া হয়েছে। সেই সময় বাক্যের রূপ হবে (আরবী)।(আরবী) এইরূপ। অথবা (আরবী) শব্দকে এর উপর ভিত্তি করে (আরবী) দেয়া হয়েছে যে, ওর সংযোগ হয়েছে (আরবী) -এর উপর। যেহেতু সৃষ্টির সূচনা ও সৃষ্টির পুনরাবৃত্তির উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটাই বেশী যুক্তিসঙ্গতও বটে। কিংবা এখানে উহ্য রাখা হয়েছে এর উপর ভিত্তি করেই শব্দকে দেয়া হয়েছে। তখন বাক্যের রূপ হবে (আরবী) এইরূপ। ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) এখানে রয়েছে দুটি বাক্য। এই উভয় বাক্যের (আরবী) হচ্ছে (আরবী) এটা এর উপর ভিত্তি করে হয়েছে যে, এ দু'টোই (আরবী)-এর বা বিশেষণ হয়েছে। আর আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) এটা (আরবী)-এর (আরবী) হতে পারে। আবার এরও সম্ভাবনা রয়েছে যে, (আরবী) -এর ওটা (আরবী) হবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আজ রাজত্ব কার? আজ প্রবল পরাক্রমশালী একক আল্লাহরই রাজত্ব সত্য।” (৪০:১৬) যেমন মহান আল্লাহ এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন পরম দাতা ও দয়ালুর রাজত্ব সত্য এবং ঐ দিন কাফিরদের উপর অত্যন্ত কঠিন হবে।” (২৫:২৬) মুফাসসিরগণ (আরবী) এই ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবী) শব্দটি হচ্ছে (আরবী) শব্দের বহুবচন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন, যেমন বলা হয় প্রাচীর বেষ্টিত শহরকে এবং এটা হচ্ছে (আরবী)-এর বহুবচন, দ্রুপ এটাও। সঠিক কথা হচ্ছে এটাই যে, (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে সেই শিঙ্গা যার মধ্যে হযরত ইসরাফীল (আঃ) ফু দেবেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, সঠিক ওটাই যার উপর হাদীসে রাসূল (সঃ) দ্বারা আলোকপাত করা হয়েছে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইসরাফীল (আঃ) শিঙ্গা মুখে লাগিয়ে রয়েছেন। তিনি মাথা নীচু করে অপেক্ষমান রয়েছেন যে, কখন শিঙ্গায় ফুঙ্কার দেয়ার হুকুম হয়!” একজন গ্রাম্য লোকও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সিজ্ঞেস করেছিলঃ (আরবী) কি জিনিস? তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “এটা হচ্ছে শিঙ্গা, যাতে ফুৎকার দিয়ে বাজানো হয়।”একদা নবী (সঃ) সাহাবীদের সাথে বসেছিলেন। সেই সময় তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার পর (আরবী) বা শিঙ্গাকে সৃষ্টি করেন। এবং তা তিনি হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে প্রদান করেন। ওটাতে তিনি মুখ লাগিয়ে রয়েছেন। তিনি আরশের দিকে তাকিয়ে আছেন। কখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার হুকুম হয় তার তিনি অপেক্ষায় রয়েছেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (আরবী) কি জিনিস? তিনি উত্তরে বললেনঃ “ওটা হচ্ছে শিঙ্গা।" তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ “ওটা কিরূপ?” তিনি জবাব দিলেন, ওটা খুবই বড়। যে আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ! ওর প্রস্থ হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবীর প্রস্থের সমান। ওতে তিনবার ফুস্কার দেয়া হবে। প্রথম ফুকার হবে ভয় ও সন্ত্রাস সৃষ্টির ফুকার। দ্বিতীয় ফুঙ্কার সবাইকে বেহুঁশ করে ফেলবে এবং তৃতীয় ফুঙ্কারের সময় সবাই আল্লাহর সামনে এসে হাযির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা যখন প্রথম ফুকারের নির্দেশ দিবেন তখন সারা দুনিয়ার লোক হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে, তবে তিনি যাকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখবেন তার অবস্থা ঠিকই থাকবে। দ্বিতীয় ফুকারের হুকুম হওয়া পর্যন্ত প্রথম ফুকার চলতেই থাকবে, থামবে না। যেমন আল্লাহ তাআলা এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর এরা শুধু একটি ভীষণ ধ্বনির প্রতিক্ষায় রয়েছে, যাতে শ্বাস গ্রহণেরও অবকাশ হবে না।” (৩৮:১৫) ওটা একটা ভীষণ ও উচ্চ শব্দ হবে, যার ফলে পাহাড় মেঘের মত উড়তে থাকবে এবং যমীন হেলতে দুলতে থাকবে। যেমন নড়বড়ে নৌকাকে সমুদ্রের তরঙ্গ চারদিকে হেলাতে দুলাতে থাকে এবং যেমন ছাদে লটকান লণ্ঠনকে বাতাস দোল দিতে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) (৭৯:৬) অর্থাৎ “যেই দিন কম্পনকারী বস্তু প্রকম্পিত করবে। যার পর আর এক পশ্চাদগামী বস্তু এসে পড়বে। সেই দিন সবাই ভীষণ আতংকিত হবে। লোকেরা পড়ে যাবে। মায়েরা দুগ্ধপোষ্য শিশুদেরকে ভুলে যাবে। গর্ভবতী স্ত্রীলোকদের গর্ভপাত হয়ে যাবে। ভয়ে ছেলেদের উপর বার্ধক্য এসে পড়বে। শয়তানরা প্রাণ বাঁচানোর উদ্দেশ্যে যমীনের প্রান্তে প্রান্তে পালিয়ে যাবে। কিন্তু ফেরেশতাগণ তাদেরকে মেরে মেরে ফিরিয়ে আনবেন। একে অপরকে ডাকতে থাকবে, কিন্তু আল্লাহ ছাড়া কেউ কাউকেও আশ্রয় দিতে পারবে না। মানুষ এরূপ ভয় ও সন্ত্রাসের মধ্যে থাকবে এমন সময় যমীন প্রত্যেক কোণ থেকে ফাটতে শুরু করবে। সেই সময় এমন ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে যা পূর্বে কখনও দেখা যায়নি। এমন ব্যাকুলতা ও সন্ত্রাস দেখা দেবে যা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তারপর মানুষ আকাশের দিকে তাকাতে থাকবে। তখন তারা দেখতে পাবে যে, ওর টুকরাগুলো উড়তে রয়েছে। তারকাগুলো নিক্ষিপ্ত হবে। চন্দ্র ও সূর্য কৃষ্ণ বর্ণ ধারণ করবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, মৃত লোকেরা এর কোন সংবাদই রাখবেন না। হযরত আবু হুরাইরী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যাদেরকে চাইবেন তারা ছাড়া আকাশ ও পৃথিবীতে যারা রয়েছে তারা সবাই হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে।” (২৭:৮৭) তাহলে তিনি সেই দিন কাদেরকে হতবুদ্ধি হওয়া থেকে মুক্ত রাখবেন? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ তারা হচ্ছে শহীদ। হতবুদ্ধি এবং ভীত সন্ত্রস্ত তো হয় জীবিত লোকেরা। আর শীদেরা জীবিত বটে, কিন্তু তারা অবস্থান করছে আল্লাহ তা'আলার নিকট, আল্লাহ তাদেরকে জীবিকা দান করছেন। তিনি সেই দিনের সন্ত্রাস থেকে তাদেরকে রক্ষা করবেন। কেননা, ওটা তো হচ্ছে আল্লাহর আযাব। আর তাঁর আযাব তো বর্ষিত হবে অসৎ লোকদের উপর। এটাকেই আল্লাহ (আরবী) (২২:২) -এই আয়াতে বর্ণনা করেছেন যে, সেই দিন প্রত্যেক দুগ্ধবতী স্ত্রী লোক তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতীর গর্ভপাত হয়ে যাবে। আল্লাহ যতদিন চাইবেন ততদিন তারা এই আযাবে ডুবে থাকবে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত এই অবস্থা থাকবে। তারপর আল্লাহ পাক হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে জ্ঞান লোপকারী ফুকার দেয়ার নির্দেশ দিবেন। ফলে সমস্ত আকাশবাসী ও যমীনবাসী অজ্ঞান হয়ে পড়বে। তবে আল্লাহ যাকে চাইবেন তার জ্ঞান ঠিকই থাকবে। মৃত্যুর ফেরেশতা আল্লাহ তা'আলার নিকট এসে বলবেনঃ “হে আল্লাহ! সবাই মরে গেছে।” আল্লাহ তো জানেনই।তবু তিনি জিজ্ঞেস করবেনঃ “অবশিষ্ট কে আছে?” তিনি বলবেনঃ “অবশিষ্ট একমাত্র আপনি আছেন। আপনার তো কখনও মৃত্যু হবে না। তা ছাড়া আরশ। বহনকারী ফেরেশতাগণও বাকী রয়েছেন। আর বাকী রয়েছেন জিবরাঈল এবং মিকাঈলও। বাকী আমিও রয়েছি।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “জিবরাঈল ও মীকাঈলের তো মৃত্যু হওয়া উচিত।” তখন আরশ বলে উঠবেঃ “হে আমার প্রভু! জিবরাঈল এবং মীকাঈলও মরে যাবেন?” আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলবেনঃ “কথা বলো না। আরশের নীচে যত কিছু আছে সবাইকেই মরতে হবে।” মৃত্যুর ফেরেস্তা পুনরায় আরয করবেন- “হে প্রভু! জিবরাঈল এবং মীকাঈলও মরে গেছেন।” আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেনঃ “এখন আর কে বাকী আছে?” তিনি উত্তরে বলবেনঃ “বাকী আছেন আপনি, আপনার তো মৃত্যু নেই। এখন আমি বাকী আছি এবং বাকী আছেন আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আরশ বহনকারীদেরকেও তো মরতে হবে।” তারাও মরে যাবে। আল্লাহ পাক জিজ্ঞেস করবেনঃ “এখন বাকী আছে কে?” আরাঈল (মৃত্যুর ফেরেশতা) তখন বলবেনঃ “মৃত্যুবরণ না কারী আপনি বাকী আছেন, আর বাকী আছি আমি।” আল্লাহ তা'আলা তখন ইসরাফীলের নিকট থেকে শিঙ্গা নিয়ে নেয়ার জন্যে আরশকে হুকুম করবেন এবং ইসরাফীল (আঃ)-কে তিনি বলবেনঃ “তুমিও আমার মাখলূক, সুতরাং তুমিও মরে যাও।” তিনি তৎক্ষণাৎ মরে যাবেন এবং একমাত্র আল্লাহই অবশিষ্ট থাকবেন যিনি এক, অমুখাপেক্ষী, তার কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন। তারপর আসমান ও যমীনকে জড়িয়ে নেয়া হবে যেমনভাবে মার’কে জড়িয়ে নেয়া হয়। ও দু’টোকে তিনবার খুলে দেয়া হবে এবং তিনবার জড়িয়ে নেয়া হবে। তারপর মহান আল্লাহ বলবেনঃ “আমি জাব্বার (সর্ব শক্তিমান ও বিজয়ী), আমি জাব্বার, আমি জাব্বার।” এরপর তিনবার তিনি উচ্চস্বরে বলবেনঃ “আজকের দিন রাজত্ব কার?” উত্তর দেবে কে? সুতরাং স্বয়ং তিনিই বলবেনঃ “আজকের দিন আল্লাহরই রাজত্ব যিনি একক ও প্রবল পরাক্রান্ত।”অতঃপর তিনি দ্বিতীয় যমীন ও আসমান সৃষ্টি করবেন, ও দু’টো ছড়িয়ে দিবেন এবং দীর্ঘ করবেন। ও দু’টোর মধ্যে কোন বক্রতা ও ত্রুটি থাকবে না। তারপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মাখলুকের প্রতি এক ভীষণ শব্দ হবে। তখন নতুনভাবে সৃষ্ট যমীনে সবাই পূর্বের মত হয়ে যাবে। যারা যমীনের মধ্যে ছিল তারা যমীনের মধ্যেই হবে এবং যারা বাইরে ছিল তারা বাইরেই হবে। অতঃপর আরশের নীচ থেকে আল্লাহ পানি বর্ষণ করবেন। আকাশকে তিনি পানি বর্ষণের নির্দেশ দিবেন। চল্লিশ দিন পর্যন্ত বৃষ্টি বর্ষিত হতে থাকবে। তারপর তিনি দেহগুলোকে নির্দেশ দিবেন যে, ওগুলো যেন যমীন থেকে এমনভাবে প্রকাশিত হয় যেমনভাবে ঘাসপাতা ও শাক-শজী অঙ্কুরিত হয়। যখন দেহগুলো পূর্বের ন্যায় পরিপূর্ণ হয়ে যাবে তখন সর্বপ্রথম আরশের ফেরেশতাদেরকে জীবিত করা হবে। আল্লাহ ইসরাফীল (আঃ)-কে শিঙ্গা গ্রহণ করতে বলবেন। তিনি তা গ্রহণ করবেন। তারপর মহান আল্লাহ জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈল (আ)-কে জীবিত করবেন। এরপর আত্মাগুলোকে ডাক দেয়া হবে। মুসলমানদের আত্মা আলোর মত চমকিতে থাকবে। আর কাফিরদের আত্মা অন্ধকারের ন্যায় থাকবে। এই সবকে নিয়ে শিঙ্গার মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে হুকুম করবেন যে, পুনর্জীবনের জন্যে যেন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হয়। সুতরাং শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে, ফলে রূহগুলো মৌমাছির মত তীব্র বেগে বেরিয়ে আসবে। তাদের দ্বারা যমীন ও আসমান ভরে যাবে। এরপর আল্লাহ তাআলা রূহগুলোকে দেহের ভিতর প্রবেশ করার নির্দেশ দিবেন। তখন দুনিয়ার সমস্ত রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে প্রবেশ করতে শুরু করবে এবং দেহগুলোর মধ্যে নাকের ছিদ্রের পথ হয়ে যাবে, যেমন কোন সর্পদষ্ট ব্যক্তির দেহের মধ্যে বিষ অনুপ্রবেশ করে থাকে। তারপর যমীন ফাটতে শুরু করবে এবং মানুষেরা উঠে উঠে নিজেদের প্রতিপালকের দিকে মুখ করবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, সর্বপ্রথম আমার কবর খুলে যাবে। মহান আল্লাহর দিকে চলে যাব। কাফিররা বলবেঃ ‘এদিন তো বড় কঠিন বলে মনে হচ্ছে।' লোকেরা সব উলঙ্গ হয়ে থাকবে। তারা সবাই একই জায়গায় দণ্ডায়মান হবে। সত্তর বছর পর্যন্ত এই অবস্থাই থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তাদের দিকে দেখবেনও না এবং কোন ফায়সালাও করবেন না। লোকেরা ক্রন্দন এবং বিলাপ করতে থাকবে। তাদের অশ্রু শেষ হয়ে যাবে। তখন তাদের চক্ষু দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে। নিজেদের শরীরের ঘামে তারা ভিজে যাবে। ঘাম এতো বেশী ঝরবে যে, সেই ঘামের পানিতে তাদের গুতনী পর্যন্ত ডুবে যাবে । ললাকেরা পরস্পর বলাবলি করবে যে, আল্লাহর নিকট সুপারিশের জন্যে কাউকে পাঠানো হাক, যেন তিনি কোন মীমাংসা করে দেন। তারা তখন পরস্পর মন্তব্য করবে যে, পিতা আদম (আঃ) ছাড়া কে এমন আছেন যিনি আল্লাহর সামনে কথা বলার সাহস রাখেন? আল্লাহ তা'আলা তাঁকে নিজের হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর মধ্যে রূহ ফুকেছেন। আর সর্বপ্রথম তিনি তাঁর সাথে কথা বলেছেন। অতঃপর তারা হযরত আদম (আঃ)-এর কাছে যাবে এবং নিজেদের উদ্দেশ্য পেশ করবে। তিনি সুপারিশ করতে অস্বীকৃতি জানাবেন এবং বলবেনঃ “আমি এর যোগ্য নই।” অতঃপর তারা পৃথক পৃথকভাবে এক একজন নবীর কাছে যাবে। যার কাছেই যাবে তিনিই অস্বীকার করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, এরপর তারা আমার কাছে আসবে। আমি তখন যাবো এবং ফাহস' -এর উপর সিজদায় পড়ে যাবো। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ফাহস’ কি জিনিস?” তিনি উত্তরে বলেন, ওটা হচ্ছে আরশের সামনের অংশ। তখন আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতা পাঠাবেন। তিনি আমাকে আমার বাহু ধরে উঠাবেন। মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “তুমি কি বলতে চাও?” আমি আরয করবো- হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে সুপারিশ করার অধিকার দানের ওয়াদা করেছেন। অতএব এই অধিকার আমাকে দান করুন এবং লোকদের মধ্যে ফায়সালা করুন। আল্লাহ পাক তখন বলবেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি সুপারিশ করতে পার এবং আমি লোকদের মধ্যে ফায়সালা করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমি তখন ফিরে এসে লোকদের সাথে দাড়িয়ে যাবো। আমরা সব দাঁড়িয়েই থাকবো এমন সময় হঠাৎ আকাশ থেকে এক ভীষণ শব্দ আসবে। আমরা চিন্তান্বিত হয়ে পড়বো। পৃথিবীবাসী দানব ও মানবের দ্বিগুণ সংখ্যক ফেরেশতা আকাশ থেকে অবতরণ করবেন। তারা যমীনের নিকটবর্তী হবেন। যমীন তাঁদের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবেন। আমরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবোআপনাদের মধ্যে কি মহান আল্লাহ রয়েছেন? তারা উত্তরে বলবেনঃ “না, তবে তিনি অবশ্যই আসবেন।” দ্বিতীয়বার আকাশ থেকে ফেরেশতাগণ অবতরণ করবেন। তাদের সংখ্যা পূর্বের অবতারিত ফেরেশতাদের সংখ্যার দ্বিগুণ এবং দানব ও মানবের সংখ্যার দ্বিগুণ হবে। যমীন তাঁদের আলোকে চমকিত হয়ে উঠবে। তারা দাঁড়িয়ে যাবেন। আমরা জিজ্ঞেস করবো- আল্লাহ কি আপনাদের মধ্যে রয়েছেন? তাঁরা জবাবে বলবেনঃ ‘না, তবে তিনি অবশ্যই এসে পড়বেন!” তারপর তৃতীয়বার ওর চেয়েও দ্বিগুণ সংখ্যক ফেরেশতা অবতরণ করবেন। তখন মহাপ্রতাপান্বিত ও মহামহিমান্বিত আল্লাহ মেঘের ছত্র লাগিয়ে আটজন ফেরেশতা দ্বারা স্বীয় তখৃত বহন করিয়ে নিয়ে তাশরিফ আনবেন, অথচ এখন তো তাঁর তখৃত চারজন ফেরেশতা বহন করতে রয়েছেন। তাঁদের পা যমীনের সর্বশেষ স্তরের তলায় রয়েছে। আসমান ও যমীন হচ্ছে তাদের দেহের অর্ধাংশের সমান। আল্লাহ তা'আলার আরশ তাঁদের স্কন্ধের উপর রয়েছে। তাদের মুখে তাসবীহ ও তাহমীদ উচ্চারিত হতে থাকবে। তারা বলতে থাকবেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমরা তাঁরই পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি আশ ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আমরা পবিত্রতা বর্ণনা করছি তারই যিনি রাজ্য, রাজত্ব ও আধ্যাত্মিক জগতের মালিক। আমরা তাঁরই পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি মৃত্যুবরণ করেন না। আমরা তাঁরই পবিত্রতা ঘোষণা করছি যিনি সমস্ত মাখলুকের মৃত্যু ঘটিয়ে থাকেন কিন্তু নিজে মৃত্যুবরণ করেন না। আমরা তারই তসবীহ পাঠ করছি। তিনি পবিত্র, তিনি পবিত্র, তিনি পবিত্র। আমরা আমাদের মহান প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি ফেরেশতামণ্ডলী ও রূহের (জিবরাঈল আঃ-এর) প্রভু। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করছি যিনি সারা মাখলুকের মৃত্যু ঘটিয়ে থাকেন কিন্তু নিজে মৃত্যুবরণ করবেন না। তারপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় কুরসীর উপর উপবেশন করবেন। একটা শব্দ হবে- “হে দানব ও মানবের দল! তোমাদেরকে সৃষ্টি করার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমি নীরব ছিলাম। তোমাদের কথা শুনে এসেছি এবং তোমাদের কাজকর্ম দেখে এসেছি। এখন তোমরা নীরব থাক। তোমাদের আমলের সহীফা তোমাদেরকে পাঠ করে শুনানো হবে। যদি ওটা ভাল সাব্যস্ত হয় তবে আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। আর যদি মন্দ হয় তবে নিজেদেরকেই তিরস্কার করবে।” অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে নির্দেশ দিবেন, তখন ওর মধ্যে ভীষণ কৃষ্ণকায় এক আকৃতি দেখা দেবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, তোমরা শয়তানের উপাসনা করবে না। কারণ, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? এটা সেই জাহান্নাম যার ওয়াদা তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল এবং যাকে তোমরা অবিশ্বাস করতে। সুতরাং হে পাপীর দল! সৎ লোকদের থেকে এখন তোমরা পৃথক হয়ে যাও।” একথা বলে আল্লাহ তা'আলা উম্মতদেরকে পৃথক করে দিবেন। এরশাদ হচ্ছে- “হে নবী (সঃ)! তুমি প্রত্যেক উম্মতকে জানুর ভরে পতিত দেখতে পাবে। প্রত্যেক উম্মতের পাশে তার আমলনামা থাকবে এবং স্বীয় কৃতকর্মের প্রতিফল পাবে। এরপর আল্লাহ স্বীয় মাখলুকের মধ্যে ফায়সালার কাজ শুরু করবেন। কিন্তু জ্বীন ও মানুষের বিচার তখনও শুরু হবে না।প্রথমে আল্লাহ হিংস্র ও চতুষ্পদ জন্তুর বিচার শুরু করবেন। এমন কি এক অত্যাচারী শিং বিশিষ্ট ছাগলের অত্যাচারের প্রতিশোধও অন্য ছাগলের দ্বারা গ্রহণ করাবেন। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি জন্তুগুলোকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তোমরা মাটি হয়ে যাও।" এ দেখে কাফিররা বলবেঃ “হায়! আমরাও যদি মাটি হয়ে যেতাম তবে এই শাস্তি থেকে বাঁচতে পারতাম। অতঃপর বান্দাদের বিচারকার্য শুরু হবে। সর্বপ্রথম হত্যা ও খুনের মাকদ্দমা পেশ করা হবে। তখন এমন। প্রত্যেক নিহত ব্যক্তি আসবে যাকে আল্লাহর পথে হত্যাকারী হত্যা করেছিল; আল্লাহ তাআলা হত্যাকারীকে হুকুম করবেন তখন সে ঐ নিহত ব্যক্তির মাথা উঠিয়ে নেবে। ঐ মাথা তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! একে জিজ্ঞেস করুন, কেন সে আমাকে হত্যা করেছিল?" আল্লাহ তখন তাকে জিজ্ঞেস করবেন (অথচ আল্লাহ নিজেই জানেন)ঃ “কেন তাকে হত্যা করেছিলে?" সেই গাযী তখন বলবেঃ “হে আল্লাহ! আপনার মর্যাদা ও আপনারই নামের জন্যে।” তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “তুমি সত্য বলেছো।” সেই সময় তার মুখমণ্ডল সূর্যের আলোকের মত চমকাতে থাকবে। ফেরেশতাগণ তাকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবেন। অনুরূপভাবে অন্যান্য নিহতগণ নিজ নিজ নাড়ি ভূড়ি মাথায় নিয়ে আসবে। আল্লাহ পাক ওদের হত্যাকারীদের জিজ্ঞেস করবেন- “কেন হত্যা করেছিলে?” তারা উত্তরে বলতে বাধ্য হবে যে, নিজের নাম ও খ্যাতির উদ্দেশ্যে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “ধ্বংস হয়ে যাও।” মোটকথা, প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির মাকদ্দমা পেশ করা হবে এবং বিচার হবে। প্রত্যেক অত্যাচারের প্রতিশোধ অত্যাচারী থেকে নেয়া হবে। যে অত্যাচারীকে আল্লাহ ইচ্ছা করবেন শাস্তি দেবেন এবং যার উপর ইচ্ছা রহমত বর্ষণ করবেন। তারপর সারা মাখলুকের বিচার করা হবে এবং এমন কোন অত্যাচারী অবশিষ্ট থাকবে না যে, সে অত্যাচারী থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেনি। এমন কি যে ব্যক্তি দুধে পানি মিশিয়ে বিক্রি করতো এবং বলতো যে, দুধ খাটি, তাকেও শাস্তি দেয়া হবে। আর ক্রেতাকে তার পুণ্য দেয়া হবে। এই কার্য সমাপ্তির পর এক আহ্বানকারী আহ্বান করবে যা সারা মাখলুক শুনতে পাবে। সেই আহ্বান হবে নিম্নরূপঃ “প্রত্যেক দল যেন নিজ নিজ মা’রূদের কাছে চলে যায় এবং তার অঞ্চল চেপে ধরে।” তখন এমন কোন মূর্তিপূজক থাকবে না যার সামনে তার মূর্তি লাঞ্ছিত অবস্থায় পড়ে না থাকবে। ঐদিন একজন ফেরেশতা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর রূপ ধরে আসবেন এবং আর একজন ফেরেশতা হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর রূপ ধরে আগমন করবেন। তখন ইয়াহূদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)-এর পিছনে চলে আসবে এবং খ্রীষ্টানেরা আসবে হযরত ঈসা (আঃ)-এর পিছনে। অতঃপর তাদের এই কল্পিত মা’বৃদ তাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে। তখন তারা বলবে যে, যদি ওরা তাদের প্রকৃত মা’রূদ হতো তবে তাদেরকে কখনও জাহান্নামে নিয়ে যেতো না। তারা জাহান্নামে চিরকাল অবস্থান করবে। এখন শুধু মুমিনরাই বাকী থাকবে এবং তাদের মধ্যে মুনাফিকরাও থাকবে। আল্লাহ তা'আলা নিজের ইচ্ছামত পরিবর্তিত আকৃতিতে তাদের কাছে আসবেন এবং বলবেনঃ “হে লোক সকল! সবাই নিজ নিজ মাবুদের সাথে মিলিত হয়েছে। সুতরাং তোমরাও যাদের ইবাদত করতে তাদের সাথে মিলিত হও।” তখন মুনাফিক মিশ্রিত মুমিনরা বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! আমাদের মাবুদ তো আপনিই ছিলেন। আপনাকে ছাড়া আমরা আর কাউকেও মানতাম না।” এরপর আল্লাহ তাআলা তাদের নিকট থেকে সরে যাবেন। অতঃপর তিনি নিজেই প্রকৃত দীপ্তি ও আঁকজমকের সাথে আসবেন এবং যতক্ষণ চাইবেন ততক্ষণ তাদের থেকে সরে থাকবেন। তারপর তিনি তাদের সামনে আসবেন এবং পুনরায় বলবেনঃ “হে লোকেরা! সবাই নিজ নিজ মাবুদের সাথে মিলিত হয়েছে। সুতরাং তোমাদের মা’ৰূদের সাথে মিলিত হও।” তারা বলবেঃ “আল্লাহর শপথ! আপনি ছাড়া আমাদের অন্য কোন মা'বুদ নেই। আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করতাম। তখন আল্লাহ পাক তাদের পায়ের গোছা খুলে দেবেন। এবং মর্যাদা গুণে তাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, তার মা'বুদ তিনিই। তারপর সবাই মাথার ভরে সিজদায় পড়ে যাবে। কিন্তু মুনাফিকরা পিঠের ভরে পড়বে। সিজদার জন্যে তারা ঝুঁকে পড়তে পারবে না। তাদের পিঠ গাভীর পিঠের মত সোজা হয়ে থাকবে। যখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুকুম করবেন। তখন তাদের সামনে পুলসিরাত এসে পড়বে। ওটা তরবারীর ধারের চেয়ে তীক্ষ্ণ হবে। ওর স্থানে স্থানে আঁকড়া ও কাঁটা থাকবে এবং অত্যন্ত পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক হবে। ওর নীচে আরও একটি পিচ্ছিল সেতু থাকবে। ভাল লোকেরা চক্ষের পলকে দ্রুত গতিতে ওটা পার হয়ে যাবে। যেমন বিদ্যুৎ চমকিত হয় বা প্রবল বেগে বায়ু প্রবাহিত হয় অথবা দ্রুতগামী ঘোড়া কিংবা দ্রুত দৌড়ালু মানুষ চলে থাকে। কতগুলো লোক তো সম্পূর্ণরূপে অক্ষত থাকবে ও পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। কতগুলো লোক আহত হবে এবং বহু লোক কেটে জাহান্নামে পড়ে যাবে। অতঃপর জান্নাতীদেরকে যখন জান্নাতে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে তখন তারা বলবেঃ “আমাদের জন্যে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে কে?” তারা হযরত আদম (আঃ)-এর নিকট গিয়ে সুপারিশের আবেদন জানাবে। তখন তিনি নিজের পাপের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ “আমার এর যোগ্যতা নেই। তোমরা হযরত নূহ (আঃ)-এর নিকট যাও। তাঁকে আল্লাহর প্রথম রাসূল বলা হয়। লোকেরা তখন হযরত নূহ (আঃ)-এর কাছে যাবে। তিনিও নিজের অপরাধের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ “আমার তো এই কাজের যোগ্যতা নেই। তোমরা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে যাও। আল্লাহ তা'আলা তাকে নিজের বন্ধু বলেছেন। তারা তাঁর কাছে যাবে। তিনিও নিজের দোষের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ “তোমরা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও। আল্লাহ তাআলা তার সাথে কথা বলেছেন এবং তাঁর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছেন। তারা তখন হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে যাবে এবং সুপারিশের জন্যে আবেদন করবে। তিনি নিজের হত্যার পাপের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ “আমি এই কাজের যোগ্য নই। তোমরা বরং হযরত ঈসা রূহুল্লার (আঃ) কাছে যাও। তিনি আল্লাহর রূহ ও তাঁর কালেমা।” হযরত ঈসাও (আঃ) বলবেনঃ “না, আমি এ কাজের যোগ্য নই। তোমরা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে যাও।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন- তখন লোকেরা আমার কাছে আসবে। আল্লাহ তা'আলা আমাকে শাফাআতের অধিকার দিয়েছেন এবং ওয়াদা করেছেন। আমি জান্নাতের দিকে যাবো এবং জান্নাতের দরজায় করাঘাত করবো। জান্নাতের দরজা খুলে যাবে এবং আমাকে অভ্যর্থনা জানানো হবে। জান্নাতে প্রবেশ করে আমি আল্লাহ পাকের দিকে দৃষ্টিপাত করবো এবং সিজদায় পড়ে যাবো। আল্লাহ তা'আলা আমাকে এমন তাহমীদ ও তামজীদের অধিকার দান করবেন যা তিনি অন্য কাউকেও শিখিয়ে দেননি। অতঃপর তিনি বলবেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! মাথা উঠাও। সুপারিশ করতে হয় কর। তোমার সুপারিশ কবুল করা হবে এবং তোমার আবেদন মঞ্জুর করা হবে।" আমি তখন আমার মাথা উঠাবো। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেনঃ “কি বলতে চাও?” আমি বলবো, হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে সুপারিশ করার অধিকার দিয়েছেন। জান্নাতীদের ব্যাপারে আমার শাফাআত কক্ল করুন! তারা যেন জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। তখন তিনি বলবেনঃ “ঠিক আছে, আমি অনুমতি দিলাম। এই লোকগুলো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে।" নবী (সঃ) বলেনঃ আল্লাহর শপথ! দুনিয়ায় তোমরা তোমাদের বাসস্থান ও স্ত্রীদেরকে যেমন চিনতে পার তার চেয়ে তাড়াতাড়ি তোমরা তোমাদের জান্নাতের বাসস্থান ও স্ত্রীদেরকে চিনতে পারবে। প্রত্যেক লোককে বাহাত্তরটি স্ত্রী দেয়া হবে। তারা আদম সন্তানদের মধ্য থেকে হবে দু’জন এবং হ্রদের থেকে হবে সত্তরজন। ঐ সত্তরজনের উপর এই দু’জনের মর্যাদা, দান করা হবে। কেননা, এই সতী সাধ্বী মহিলারা দুনিয়ায় খুব বেশী বেশী করে আল্লাহর ইবাদত করতো। জান্নাতবাসী যখন একজনের কাছে যাবে তখন দেখতে পাবে যে, সে ইয়াকূতের ঘরে মণিমুক্তা দ্বারা সজ্জিতা হয়ে সোনার সিংহাসনে বসে আছে। সে মিহীন সবুজ রেশমের সত্তরটি জান্নাতী হুল্লা পরিধান করে রয়েছে। সে যখন তার কাঁধের উপর হাত দেবে তখন তার বক্ষের উপর কাপড়, দেহ, মাংস ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও ওগুলো ভেদ করে বক্ষের অপর দিকে তার হাতের প্রতিবিম্ব দেখা যাবে। তার দেহ এত স্বচ্ছ হবে যে, তার পায়ের গোছার মজ্জা পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যাবে। মনে হবে যে, তোমরা যেন ইয়াকৃতের ছুরি দেখতে রয়েছে। তার অন্তর এর জন্যে এবং এর অন্তর তার জন্যে আয়না বানানো হবে। না এ ওর থেকে ক্লান্ত হবে এবং না ও এর থেকে ক্লান্ত হবে। সে যখন কখনো কোন মহিলার কাছে আসবে তখন সে তাকে কুমারী রূপেই পাবে। না স্বামী স্ত্রীর ক্লান্তির অভিযোগ করবে এবং না স্ত্রী স্বামীর ক্লান্তির অভিযোগ করবে। এমনই অবস্থায় শব্দ শোনা যাবেঃ “তোমাদের কারো প্রাণ ভরবে না এটা তো আমার জানা আছে। কিন্তু অন্যান্য স্ত্রীরাও তো রয়েছে।” সুতরাং সে পালাক্রমে তাদের কাছে যাবে। যার কাছেই সে যাবে সে-ই বলবেঃ “আল্লাহর কসম! জান্নাতে তোমার চেয়ে সুন্দর আর কেউ নেই এবং আমার কাছে তোমার চেয়ে প্রিয়তম কেউই নেই। কিন্তু জাহান্নামীদেরকে যখন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তখন আগুন কারও পা পর্যন্ত পৌঁছবে কারও পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছবে, কারও পৌছবে জানু পর্যন্ত, কারও কোমর পর্যন্ত এবং কারও শুধু মুখমণ্ডল বাদ দিয়ে সমস্ত দেহ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। কেননা, মুখমণ্ডলের উপর আগুনকে হারাম করে দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমি আল্লাহ তাআলাকে বলবো- হে আমার প্রভু! আমার উম্মতের জাহান্নামবাসীদের ব্যাপারে আমার শাফা'আত কবুল করুন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “তুমি তোমার উম্মতের যাদেরকে চিননা তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নাও।” সুতরাং কোন উম্মতই অবশিষ্ট থাকবে না। তারপর সাধারণ শাফাআতের অনুমতি দেয়া হবে। তখন প্রত্যেক নবী ও প্রত্যেক শহীদ নিজ নিজ শাফা'আত পেশ করবে। আল্লাহ পাক তখন বলবেনঃ “যার অন্তরে এক দীনারের ওজন পরিমাণও ঈমান রয়েছে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে নাও।” তারপর বলবেনঃ “এক দীনারের এক তৃতীয়াংশ ঈমান থাকলেও তাকে বের কর।” এরপর বলবেনঃ “এক দীনারের দুই তৃতীয়াংশ ঈমান থাকলেও তাকে বের কর। এক চতুর্থাংশ হলেও বের কর। এক কীরাত বরাবর হলেও বের করে নাও। এমন কি কারও অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকলে তাকেও বের করে নাও। তারপর যারা আল্লাহর জন্যে কোন একটি ভাল কাজও করেছে তাকেও বের কর।” তখন আর এমন কেউই বাকী থাকবে না যে শাফাআতের যোগ্য। এমন কি আল্লাহ তা'আলার এই সাধারণ রহমত দেখে শয়তানের লোভ হবে যে, যদি কেউ তার জন্যেও সুপারিশ করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমি তো হচ্ছি সবচেয়ে বড় দয়ালু।” অতঃপর তিনি জাহান্নামে স্বীয় হাতটি রাখবেন এবং এতো অসংখ্য জাহান্নামীকে বের করবেন যারা পুড়ে কয়লার মত হয়ে যাবে। তাদেরকে জান্নাতের নাহরে হায়ওয়ান’ নামক একটি নদীতে নিক্ষেপ করা হবে। তারা এমনভাবে নব জীবন লাভ করবে যেমনভাবে কোন জলাশয়ের ধারে উদ্ভিদ অংকুরিত হয় এবং রোদের আলোতে সবুজ আকার ধারণ করে। আবার ছায়ায় থাকলে ফ্যাকাশে হয়ে থাকে। ঐ জাহান্নামীরা জান্নাতের ঐ নদীতে গোসল করার পর শ্যামল সবুজ উদ্ভিদের মত সুন্দর আকার ধারণ করবে। তাদের কপালে লিখা থাকবে ‘আল্লাহর আযাদকৃত জাহান্নামী। তাদের এই চিহ্ন দেখে জান্নাতবাসীরা তাদেরকে চিনতে পারবে যে, তারা কিছু ভাল কাজ করেছিল। কিছুকাল তারা এইভাবেই জান্নাতে অবস্থান করবে। তারপর তারা মহান আল্লাহর নিকট আবেদন করবে যে, তাদের ঐ কপালের লিখাটা যেন মিটিয়ে দেয়া হয়। তখন তা মিটিয়ে দেয়া হবে।”এটি একটি মাশহুর ও দীর্ঘ হাদীস। হাদীসটি অত্যন্ত গারীব এবং বিভিন্ন হাদীসের বিভিন্ন অংশ বিশেষ। এর কতগুলো কথা তো একেবারে অস্বীকারযোগ্য। মদীনার কাযী ইসমাঈল ইবনে রাফে একাই এর বর্ণনাকারী। এর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ এটাকে বিশ্বাসযোগ্য বলেছেন এবং কেউ কেউ একে দুর্বল বলেছেন। আবার কেউ কেউ সম্পূর্ণরূপেই অস্বীকার করেছেন। যেমন আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ), আবু হাতিম রাযী (রঃ) এবং উমার ইবনে ফালাস (রঃ)। কেউ কেউ বলেছেন যে, এই হাদীসটি সম্পূর্ণরূপে বর্জনীয়। ইবনে আদী (রঃ) বলেন যে, এই হাদীসটির ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এর বর্ণনাকারীরা সবাই দুর্বল। আমি বলি যে, কয়েকটি কারণে এর ইসনাদে মতভেদ রয়েছে। আমি এটাকে পৃথক একটি খণ্ডে বর্ণনা করেছি। এর বর্ণনাভঙ্গীও বিস্ময়কর। বহু হাদীস মিলিয়ে একটি হাদীস বানিয়ে নেয়া হয়েছে। এজন্যেই এটা অস্বীকারযোগ্য হয়ে গেছে। আমি আমার শিক্ষক হাফিয আবুল হাজ্জাজ আল মুযী (রঃ)-এর কাছে শুনেছি যে, এটা ওয়ালীদ ইবনে মুসলিমের একটি রচনা, যা তিনি জমা করেছেন। এটা যেন। কতগুলো পৃথক পৃথক হাদীসের সাক্ষ্য বহনকারী। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-আনআম 6:74
৭৪-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম আযর ছিল না। বরং তার নাম ছিল তারেখ । আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী)-এই সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে আযর দ্বারা মূর্তিকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবরাহিম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ, মাতার নাম ছিল শানী এবং স্ত্রীর নাম ছিল সারা। আর হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাতার নাম ছিল হাজেরা। তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ক্রীতদাসী। উলামায়ে নাসাবের (বংশ তালিকা যাদের জানা আছে) অধিকাংশের এটাই উক্তি। আর ছিল একটা মূর্তির নাম। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতা এই মূর্তির খাদেম ছিল বলে সে এই নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবেচেয়ে ভাল জানেন।ইবনে জারীর প্রমুখ গুরুজনেরা বলেন যে, ঐ যুগের লোকদের পরিভাষায় ‘আযর' শব্দটি গালি ও দূষণীয় কথা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে বক্রতা। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বলেন যে, মু'তামির ইবনে সুলাইমান বর্ণনা করেছেন, আমি আমার পিতা থেকে শুনেছি যে, তিনি আযর’ শব্দের অর্থ বক্তৃতা বলতেন এবং এটা হচ্ছে একটা শক্ত কথা যা হযরত ইবরাহীম (আঃ) মুখে উচ্চারণ করেছিলেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “সঠিক কথা হচ্ছে এটাই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ । তারপর তিনি বলেন যে, তার দুটো নাম ছিল, যেমন অধিকাংশ লোকের দু'টো নাম থাকে। অথবা হতে পারে যে, একটি ছিল প্রকৃত নাম এবং আর একটি ছিল উপাধি ও পরিচিতি হিসাবে নাম। এটাই একটা উত্তম কারণ হতে পারে। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ) ও হযরত আবু ইয়াযীদ মাদানী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে-হে আযর! তুমি কি প্রতিমাগুলোকে মা'বুদ রূপে সাব্যস্ত করছো? এখানে যেন আযরকে সম্বোধন করা হয়েছে। জমহুর উলামা (আরবী) শব্দকে (আরবী) বা যবর দিয়ে পড়েছেন। হাসান বসরী (রঃ)-এর মতে একে পেশ দিয়ে পড়া হয়নি। এর ভাবার্থ এই হল যে, এই শব্দটি হচ্ছে মা'রেফা ও আ’লাম। এই হিসেবে একে (আরবী) মনে করা হবে এবং এটা যেন (আরবী) হতে (আরবী) হয়েছে এবং এর উপর ভিত্তি করেই এতে যবর দেয়া হয়েছে। অথবা একে (আরবী) মনে করা হবে। আর এটাই বেশী সঠিক হতে পারে। কতক লোক একে (আরবী) বলে থাকেন, যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দগুলো (আরবী) রূপে ব্যবহৃত। কিন্তু কতক লোকের ধারণা এই যে, ওটা (আরবী) হওয়ার ভিত্তিতে (আরবী) হয়েছে। কেননা (আরবী)-এর প্রকৃত রূপ (আরবী)-এই রকম হবে। অর্থাৎ হে পিতঃ! আযর মূর্তিগুলোকে কি আপনি মা'বূদ বানিয়ে নিচ্ছেন?' কিন্তু (আরবী)-এর দিক দিয়ে এই উক্তিটি বহু দূরের। কেননা, যে অক্ষরটি (আরবী)-এর পরে হয় সেটি ওর পূর্ববর্তী অক্ষরের উপর আমল করে না। কারণ এই (আরবী)-এর জন্যে তো (আরবী) হওয়া চাই। ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ এর সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং আরবী ব্যাকরণে এটাই প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। উদ্দেশ্য এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতাকে উপদেশ দেন। মূর্তিপূজায় তার বিরুদ্ধাচরণ করেন। তাকে তার থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার পিতা ফিরে আসলেন না। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে বললেনঃ “আপনি কি প্রতিমাগুলোকে মাবুদ বানিয়ে নিয়েছেন? আমি তো আপনার এবং আপনার অনুসারীদেরকে বড়ই বিভ্রান্তির মধ্যে পাচ্ছি?” তাদেরকে মূর্খ ও বিভ্রান্ত বলে ঘোষণা করা প্রত্যেক স্থিরবুদ্ধির অধিকারীর জন্যে একটা স্পষ্ট দলীল।মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেন- কুরআন হাকীমে ইবরাহীম (আঃ)-এর বর্ণনার প্রতি লক্ষ্য কর। তিনি ছিলেন সত্যের সাধক ও নবী। তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেন- “হে পিতঃ! এমন বস্তুর উপাসনা করো না যে শুনেও না, দেখেও না এবং তোমাদের কোন কাজেও আসে না। হে পিতঃ, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন জ্ঞান লাভ করেছি, যে জ্ঞান আপনার নেই। কাজেই আপনি আমার কথা শুনুন। আমি আপনাকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করবো। আব্বা! শয়তানের উপাসনা করবেন না। শয়তান আল্লাহর শত্রু। হে পিতঃ, আমার ভয় হচ্ছে যে, আপনার উপর আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং আপনি শয়তানের বন্ধুতে পরিণত হয়ে যাবেন।” তখন আযর উত্তরে বললোঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি কি আমার মা'বুদগুলো থেকে বিমুখ? তুমি যদি এই কাজ থেকে বিরত না হও তবে আমি তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করবো এবং তোমাকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করবো।” ইবরাহীম (আঃ) বললেনঃ “আমি আপনাকে সালাম জানাচ্ছি। আপনার জন্যে আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো! আমার প্রভু অত্যন্ত দয়ালু। কিন্তু আমিও আপনাকে ছেড়ে দিলাম এবং ছেড়ে দিলাম আপনার কপোল কল্পিত মা'বুদগুলোকেও। আমার প্রভুর সঙ্গেই আমি সংযোগ স্থাপন করবো। আমি আশা রাখি যে, আমার প্রভু আমাকে বিমুখ করবেন না।” তখন থেকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। অতঃপর তার পিতা যখন শিরকের উপরই মারা গেল এবং তিনি জানতে পারলেন যে, মুশরিকের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কোন কাজে আসে না তখন তিনি তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা ছেড়ে দিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ইবরাহীম (আঃ)-এর তার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা শুধু এই কারণেই ছিল যে, সে তার পিতার সাথে ওয়াদা করেছিল। কিন্তু যখন সে জানতে পারলো যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো, নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিল আবিদ ও সহনশীল।” বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার সাথে মিলিত হবেন। তখন আযর তাকে বলবেঃ “হে আমার প্রিয় পুত্র! আজ আমি তোমার অবাধ্যাচরণ করবো না।” তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় প্রভুর নিকট আরয করবেন- “হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে কিয়ামতের দিন লজ্জিত করবেন না। এই ওয়াদা কি আপনি আমার সাথে করেননি? আজ আমার পিতা যে অবস্থায় আছে এর চেয়ে লজ্জাজনক অবস্থা আমার জন্যে আর কি হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা তখন ইবরাহীম (আঃ)-কে বলবেনঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তোমার পিছন দিকে ফিরে তাকাও।” তখন তিনি স্বীয় পিতাকে দেখার পরিবর্তে একটা বেজীকে দেখতে পাবেন, যার সারা দেহ কাদাময় হয়ে থাকবে। আর দেখা যাবে যে, তার পা ধরে টেনে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাই মহান আল্লাহ বলেন-আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের সৃষ্টি অবলোকন করিয়েছি এবং তার দৃষ্টিতে এই দলীল কায়েম করেছি যে, কিভাবে মহামহিমান্বিত আল্লাহর একত্ববাদের উপর যমীন ও আসমান সৃষ্টির ভিত্তি স্থাপিত রয়েছে। এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন প্রতিপালক নেই। এরূপ দৃষ্টির প্রমাণকেই ‘মালাক্ত’ বলা হয়। দৃষ্টির প্রমাণ সর্বপ্রথম লাভ করেছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্যের প্রতি লক্ষ্য করে না (অর্থাৎ এই বিষয়ে গবেষণা করে না)?" (৭:১৮৫) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি যমীনের মধ্যকার সৃষ্টির প্রতি (শিক্ষা গ্রহণের) দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না? তাদের সামনের, পিছনের, আকাশের ও যমীনের প্রতি চিন্তাযুক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করা উচিত (তাহলে তারা বুঝতে পারবে) আমি যদি ইচ্ছা করি তবে তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিতে পারি এবং ইচ্ছা করলে তাদের উপর আকাশের খণ্ড নিক্ষেপ করতে পারি, অবশ্যই আগ্রহশীল ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের জন্যে এতে নিদর্শনসমূহ রয়েছে।” (৩৪:৯) কিন্তু (আরবী) সম্পর্কে ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দৃষ্টির সামনে আকাশ ফেটে গিয়েছিল এবং তিনি আকাশের সমুদয় জিনিসই দেখতে পাচ্ছিলেন। এমন কি তাঁর দৃষ্টি আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং সাতটি যমীনও তাঁর সামনে খুলে যায়, আর তিনি যমীনের ভিতরের জিনিসগুলো দেখতে থাকেন। কেউ কেউ এই বিষয়টিকে আরও একটু বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাঁরা বলেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) লোকদের পাপগুলোকেও দেখতে পাচ্ছিলেন এবং ঐ পাপীদের জন্যে তিনি বদ দু'আ করতে শুরু করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বলেছিলেন- “হে ইবরাহীম (আঃ)! আমি তাদের উপর তোমার চেয়ে বহুগুণে বেশী দয়ালু। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা হয়তো তাওবা করে আমার দিকে ফিরে আসবে।”এই আয়াতের ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় ক্ষমতাবলে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত জিনিস দেখিয়ে দেন। কোন কিছুই তার কাছে গোপন ছিল না। যখন তিনি পাপীদের প্রতি লা'নত বর্ষণ করতে শুরু করেন তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলেনঃ না, এরূপ করা চলবে না।' এভাবে মহান আল্লাহ তাঁকে বদ দু'আ করা থেকে বিরত রাখেন। সুতরাং হতে পারে যে, তাঁর চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে গিয়েছিল এবং সব কিছুই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আবার এও হতে পারে যে, তার অন্তর্চক্ষু খুলে গিয়েছিল এবং ওর দ্বারাই তিনি সবকিছু অবলোকন করেছিলেন। আর তিনি আল্লাহ তাআলার প্রকাশিত হিকমত এবং অকাট্য প্রমাণ সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন।যেমন ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তিরমিযী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- স্বপ্নে আল্লাহ তা'আলা অতি সুন্দর আকৃতিতে আমার কাছে হাযির হন এবং আমাকে বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! মালায়ে আ’লাতে কি নিয়ে আলোচনা চলছে?” আমি বললাম, হে আমার প্রভু! আমি তো জানি না। তিনি তখন তাঁর হাতখানা আমার দু'কাঁধের মধ্যভাগে রাখলেন, আমি তার অঙ্গুলিগুলোর শীতলতা আমার বক্ষে অনুভব করলাম । তখন সমস্ত জিনিস আমার সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়লো এবং আমি সবকিছু দেখতে লাগলাম। আল্লাহ পাকের (আরবী) এই উক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এখানে (আরবী) টি অতিরিক্ত। আয়াতের প্রকৃতরূপ হবে (আরবী)-এই মত। অর্থাৎ অক্ষরটি বাদ দিতে হবে। যেমন (আরবী) (৬:৫৫)-এই আয়াতে -এর পরেও অক্ষরটি অতিরিক্ত রয়েছে। এখানে শুধু পরবর্তী কথার ভিত্তির উপর কথা উঠানো হয়েছে। অর্থাৎ “আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর প্রকাশ করে দিয়েছি, যেন সে দেখে নেয় এবং বিশ্বাসও করে নেয়।আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ যখন অন্ধকার রাত এসে গেল এবং (আঃ) তারকা দেখতে পেলো তখন বললো- এটা আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটা যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- যা অস্তমিত হয় তাকে তো আমি পছন্দ করি না এবং যা অদৃশ্য হয়ে যায় সে তো প্রতিপালক হতে পারে না। |কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রভু যিনি হবেন তিনি যে ধ্বংস ও নষ্ট হতে পারেন না এটা হযরত ইবরাহীম (আঃ) জানতে পারলেন। আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর যখন ইবরাহীম (আঃ) চন্দ্রকে উজ্জ্বল দেখলো তখন বলল- এটাই আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটাও যখন ডুবে গেল তখন সে বললো- এটাও আমার প্রভু নয়। যদি সত্য প্রভু আমাকে পথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবো।মহান আল্লাহ বলেনঃ তারপর ইবরাহীম (আঃ) যখন সূর্যকে উদিত হতে দেখলো তখন বললোঃ এটা উজ্জ্বল ও বৃহত্তম। সুতরাং এটাই আমার প্রভু। কিন্তু ওটাও যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের শিরকীর সাথে আমার আদৌ কোন সম্পর্কে নেই, আমি মুক্ত। আমি তো আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে ফিরাচ্ছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। আমি এখন সম্পূর্ণরূপে তাঁরই হয়ে গেলাম এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি না। আমি আমার ইবাদত তারই জন্যে নির্দিষ্ট করছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, অথচ ও দু’টো সৃষ্টি করার সময় তাঁর সামনে কোন নমুনা ছিল না। এভাবে আমি শিরক থেকে তাওহীদের দিকে ফিরে আসছি।এই স্থানে মুফাসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে যে, এটা কি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর গভীর চিন্তা ও গবেষণার স্থান, কিংবা কওমের সাথে বচসার স্থান? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিম্নের উক্তি দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন- “যদি আমার প্রভু আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট কওমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।” মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এই কথা হযরত ইবরাহীম (আঃ) ঐ সময় বলেছিলেন যেই সময় তিনি প্রথমবার ঐ গুহা হতে বাইরে এসেছিলেন যেখানে তার মা তাকে প্রসব করেছিলেন। কেননা নমরূদ ইবনে কিআনের ভয়ে প্রসবের সময় তাঁর মা ঐ গুহার মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন। জ্যোতির্বিদরা নমরূদকে বলেছিলঃ “এমন এক শিশু জন্মগ্রহণ করবে যার হাতে আপনার রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।' তখন সে ঘোষণা করেছিল যে, ঐ বছর যত পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সবাইকে যেন হত্যা করে দেয়া হয়। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মা যখন গর্ভবতী হন এবং তার প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসে তখন তিনি শহরের বাইরে এক গুহার ভিতরে প্রবেশ করেন। সেখানেই তিনি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রসব করেন এবং ওখানেই তাকে একাকী রেখে চলে আসেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক এখানে এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন এবং এর উপর ভিত্তি করেই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাস্সিরগণও ওগুলো বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সত্য কথা এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর তাঁর কওমের কাছে এটা বর্ণনা করা তর্কের খাতিরেই ছিল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তাদের বিশ্বাসকে বাতিল সাব্যস্ত করা যে, তারা যেসব প্রতিমার পূজা করছে সেগুলো বাজে ও ভিত্তিহীন। সূচনাতেই তিনি প্রতিমাপূজা সম্পর্কে স্বীয় পিতার ভুল প্রকাশ করছেন। প্রতিমাগুলোকে তারা মালাইকাদের আকারে বানিয়ে রেখেছিল। ওদের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, ঐ প্রতিমাগুলো মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার সামনে তাদের জন্যে সুপারিশ করবে। অথচ ঐ মূর্তিগুলো স্বয়ং তাদের দৃষ্টিতেও ছিল ঘৃণ্য ও তুচ্ছ । কিন্তু তারা যেন মালাইকাদের ইবাদত করে এই চাচ্ছিল যে, তারা জীবিকা এবং অন্যান্য প্রয়োজনের ব্যাপারে তাদের জন্যে আল্লাহ তাআলার কাছে সুপারিশ করবে। এই স্থলে তাদের ভুল ও পথভ্রষ্টতা প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রতিমাগুলো সাতটি নক্ষত্রের নামে ছিল। সেগুলো হচ্ছে কামার’, ‘আতারিদ’, ‘যুহরা’, ‘শামস', ‘মিররীখ’, ‘মুশতারী এবং যাহল'। সবচেয়ে বেশী উজ্জ্বল নক্ষত্র হচ্ছে শামস। তারপর কামার'। সমস্ত তারকার মধ্যে উজ্জ্বলতম হচ্ছে ‘যুহরা'। হযরত ইবরাহীম (আঃ) সর্বপ্রথম এই যুহরা' তারকা থেকেই শুরু করলেন। তিনি তার কওমের লোকদেরকে বললেন যে, এই তারকাগুলোর মধ্যে মাবুদ হওয়ার যোগ্যতা নেই। এরা তো দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। তাদের গতি সীমিত। তাদের স্বেচ্ছায় ডানে-বামে যাবার কোন অধিকার নেই। এগুলো তো হচ্ছে আকাশের নক্ষত্র যেগুলোকে আল্লাহ পাক আলো দানকারী রূপে সৃষ্টি করেছেন এবং এতে তার বিশেষ নৈপুণ্য নিহিত রয়েছে। এরা তো পূর্ব দিক থেকে বের হয় এবং পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে পথ অতিক্রম করে চক্ষু হতে অদৃশ্য হয়ে যায়। পরবর্তী রাত্রে পুনরায় প্রকাশিত হয়। সুতরাং এই বস্তুগুলো তো হচ্ছে বাঁধা ধরা অভ্যাসের দাস। কাজেই এদের মা'বুদ হওয়া কিরূপে সম্ভব? এরপর তিনি কামার’ -এর দিকে আসলেন এবং যুহরা’ সম্পর্কে যা বলেছিলেন এর সম্পর্কেও সেই কথাই বললেন। তারপর তিনি শামস' -এর বর্ণনা দিলেন। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি এটাই প্রমাণ করলেন যে, এই উজ্জ্বলতম নক্ষত্রগুলোর মধ্যে মা’বৃদ বনবার যোগ্যতা মোটেই নেই। অতঃপর তিনি কওমের লোককে সম্বোধন করে বললেনঃ হে আমার কওম! তোমরা যাদেরকে মাবুদ রূপে কল্পনা করছো আমি এর থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। যদি এরা মাবুদ হয় তবে তোমরা এদেরকে সাহায্যকারী বানিয়ে নিয়ে আমার বিরুদ্ধাচরণ কর এবং আমার প্রতি মোটেই অনুগ্রহ প্রদর্শন করো না। আমি তো আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তার একজন দাসে পরিণত হয়েছি। আমি তোমাদের মত শিরকের পাপে লিপ্ত হবো না। আমি এই বস্তগুলোর সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করবো যিনি এইগুলোর পরিচালক ও নিয়ন্ত্রণকারী । প্রত্যেক বস্তুর আনুগত্যের সম্পর্ক তাঁরই হাতে রয়েছে। যেমন তিনি বলেন“তোমাদের প্রভু তো একমাত্র তিনিই যিনি ছয় দিনে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তিনি রাতকে দিন দ্বারা এবং দিনকে রাত দ্বারা ঢেকে দেন, একে অপরের পিছনে আসা যাওয়া করছে, সূর্য, চন্দ্র এবং তারকারাজি সবই তার অনুগত ও বাধ্য, সবই তাঁর হুকুমের দাস, তিনি বিশ্বপ্রভু ও বড় কল্যাণময়।” এটা কিরূপে সম্ভব হতে পারে যে, এই ব্যাপারে ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা ভাবনা করবেন এবং প্রথমে শিরকের কল্পনা তাঁর মনে বদ্ধমূল থাকবে! অথচ আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্পর্কে বলে দিচ্ছেন- “আমি প্রথম থেকেই ইবরাহীম (আঃ)-কে হিদায়াত দান করেছিলাম। আমি তাকে খুব ভালরূপেই জানি। সে স্বয়ং নিজের পিতা ও কওমের লোককে বলেছিলঃ এগুলো কেমন মূর্তি যেগুলোর তোমরা উপাসনা করছো?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ “সে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতকারী এবং সে হচ্ছে আল্লাহর বিশিষ্ট ও মনোনীত বান্দা। সে কখনও শিরক করেনি। সে আল্লাহর নিয়ামতের উপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছেন এবং সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। দুনিয়াতেও আল্লাহ তাকে পুণ্য ও কল্যাণ দান করেছেন এবং পরকালেও সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে অহী করছি যে, তুমি মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ করবে। সে ছিল একনিষ্ঠ, সে মুশরিক ছিল না। মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও—আমার প্রতিপালক আমাকে সরল সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন, যার উপর ইবরাহীম প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।”সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু ফিতরাত বা প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে।” নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ বীয় বান্দাকে হানীফ’ বা একনিষ্ঠরূপে সৃষ্টি করেছেন, অর্থাৎ তারা তাঁরই হয়ে থাকবে।” তিনি আরও বলেছেনঃ “আল্লাহর ফিতরাত হচ্ছে ওটাই যার উপর মানুষের সৃষ্টিকার্য সম্পন্ন হয়েছে এবং যে জিনিসকে যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে ওর উপর কোন পরিবর্তন আসতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) (৭:১৭২)। একটি উক্তির রীতি হিসেবে যার অর্থ এটাই। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) (৩০:৩০) যার বর্ণনা পরে আসবে। অর্থাৎ “মানুষকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর ফিতরাতের উপর সৃষ্টি করেছেন, তাঁর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই।” যখন আল্লাহর আনুগত্যের ফিতরাত ও দাসত্বের স্বীকারোক্তি সব কিছুই মাখলকের ব্যাপারে প্রযোজ্য তখন ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ)-এর ব্যাপারে এটা প্রযোজ্য হবে না কেন? আর তিনি মহান আল্লাহর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণকারী হতে পারেন কিরূপে? তিনি তো ভদ্র প্রকৃতির দিক দিয়ে উত্তম অস্তিত্ব ছিলেন! বরং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ঐ স্থলে তিনি স্বীয় কওমের সাথে। তর্ক ও বচসা করছিলেন এবং যে শিরকে তারা জড়িত ছিল, তাদের সেই ধারণা ও কল্পনাকে দলীল প্রমাণের সাহায্যে দূর করে দিচ্ছিলেন। এ কথা নয় যে, তিনি স্বয়ং সন্দেহে পতিত ছিলেন।
আল-আনআম 6:75
৭৪-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম আযর ছিল না। বরং তার নাম ছিল তারেখ । আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী)-এই সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে আযর দ্বারা মূর্তিকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবরাহিম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ, মাতার নাম ছিল শানী এবং স্ত্রীর নাম ছিল সারা। আর হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাতার নাম ছিল হাজেরা। তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ক্রীতদাসী। উলামায়ে নাসাবের (বংশ তালিকা যাদের জানা আছে) অধিকাংশের এটাই উক্তি। আর ছিল একটা মূর্তির নাম। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতা এই মূর্তির খাদেম ছিল বলে সে এই নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবেচেয়ে ভাল জানেন।ইবনে জারীর প্রমুখ গুরুজনেরা বলেন যে, ঐ যুগের লোকদের পরিভাষায় ‘আযর' শব্দটি গালি ও দূষণীয় কথা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে বক্রতা। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বলেন যে, মু'তামির ইবনে সুলাইমান বর্ণনা করেছেন, আমি আমার পিতা থেকে শুনেছি যে, তিনি আযর’ শব্দের অর্থ বক্তৃতা বলতেন এবং এটা হচ্ছে একটা শক্ত কথা যা হযরত ইবরাহীম (আঃ) মুখে উচ্চারণ করেছিলেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “সঠিক কথা হচ্ছে এটাই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ । তারপর তিনি বলেন যে, তার দুটো নাম ছিল, যেমন অধিকাংশ লোকের দু'টো নাম থাকে। অথবা হতে পারে যে, একটি ছিল প্রকৃত নাম এবং আর একটি ছিল উপাধি ও পরিচিতি হিসাবে নাম। এটাই একটা উত্তম কারণ হতে পারে। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ) ও হযরত আবু ইয়াযীদ মাদানী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে-হে আযর! তুমি কি প্রতিমাগুলোকে মা'বুদ রূপে সাব্যস্ত করছো? এখানে যেন আযরকে সম্বোধন করা হয়েছে। জমহুর উলামা (আরবী) শব্দকে (আরবী) বা যবর দিয়ে পড়েছেন। হাসান বসরী (রঃ)-এর মতে একে পেশ দিয়ে পড়া হয়নি। এর ভাবার্থ এই হল যে, এই শব্দটি হচ্ছে মা'রেফা ও আ’লাম। এই হিসেবে একে (আরবী) মনে করা হবে এবং এটা যেন (আরবী) হতে (আরবী) হয়েছে এবং এর উপর ভিত্তি করেই এতে যবর দেয়া হয়েছে। অথবা একে (আরবী) মনে করা হবে। আর এটাই বেশী সঠিক হতে পারে। কতক লোক একে (আরবী) বলে থাকেন, যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দগুলো (আরবী) রূপে ব্যবহৃত। কিন্তু কতক লোকের ধারণা এই যে, ওটা (আরবী) হওয়ার ভিত্তিতে (আরবী) হয়েছে। কেননা (আরবী)-এর প্রকৃত রূপ (আরবী)-এই রকম হবে। অর্থাৎ হে পিতঃ! আযর মূর্তিগুলোকে কি আপনি মা'বূদ বানিয়ে নিচ্ছেন?' কিন্তু (আরবী)-এর দিক দিয়ে এই উক্তিটি বহু দূরের। কেননা, যে অক্ষরটি (আরবী)-এর পরে হয় সেটি ওর পূর্ববর্তী অক্ষরের উপর আমল করে না। কারণ এই (আরবী)-এর জন্যে তো (আরবী) হওয়া চাই। ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ এর সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং আরবী ব্যাকরণে এটাই প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। উদ্দেশ্য এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতাকে উপদেশ দেন। মূর্তিপূজায় তার বিরুদ্ধাচরণ করেন। তাকে তার থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার পিতা ফিরে আসলেন না। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে বললেনঃ “আপনি কি প্রতিমাগুলোকে মাবুদ বানিয়ে নিয়েছেন? আমি তো আপনার এবং আপনার অনুসারীদেরকে বড়ই বিভ্রান্তির মধ্যে পাচ্ছি?” তাদেরকে মূর্খ ও বিভ্রান্ত বলে ঘোষণা করা প্রত্যেক স্থিরবুদ্ধির অধিকারীর জন্যে একটা স্পষ্ট দলীল।মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেন- কুরআন হাকীমে ইবরাহীম (আঃ)-এর বর্ণনার প্রতি লক্ষ্য কর। তিনি ছিলেন সত্যের সাধক ও নবী। তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেন- “হে পিতঃ! এমন বস্তুর উপাসনা করো না যে শুনেও না, দেখেও না এবং তোমাদের কোন কাজেও আসে না। হে পিতঃ, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন জ্ঞান লাভ করেছি, যে জ্ঞান আপনার নেই। কাজেই আপনি আমার কথা শুনুন। আমি আপনাকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করবো। আব্বা! শয়তানের উপাসনা করবেন না। শয়তান আল্লাহর শত্রু। হে পিতঃ, আমার ভয় হচ্ছে যে, আপনার উপর আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং আপনি শয়তানের বন্ধুতে পরিণত হয়ে যাবেন।” তখন আযর উত্তরে বললোঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি কি আমার মা'বুদগুলো থেকে বিমুখ? তুমি যদি এই কাজ থেকে বিরত না হও তবে আমি তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করবো এবং তোমাকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করবো।” ইবরাহীম (আঃ) বললেনঃ “আমি আপনাকে সালাম জানাচ্ছি। আপনার জন্যে আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো! আমার প্রভু অত্যন্ত দয়ালু। কিন্তু আমিও আপনাকে ছেড়ে দিলাম এবং ছেড়ে দিলাম আপনার কপোল কল্পিত মা'বুদগুলোকেও। আমার প্রভুর সঙ্গেই আমি সংযোগ স্থাপন করবো। আমি আশা রাখি যে, আমার প্রভু আমাকে বিমুখ করবেন না।” তখন থেকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। অতঃপর তার পিতা যখন শিরকের উপরই মারা গেল এবং তিনি জানতে পারলেন যে, মুশরিকের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কোন কাজে আসে না তখন তিনি তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা ছেড়ে দিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ইবরাহীম (আঃ)-এর তার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা শুধু এই কারণেই ছিল যে, সে তার পিতার সাথে ওয়াদা করেছিল। কিন্তু যখন সে জানতে পারলো যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো, নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিল আবিদ ও সহনশীল।” বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার সাথে মিলিত হবেন। তখন আযর তাকে বলবেঃ “হে আমার প্রিয় পুত্র! আজ আমি তোমার অবাধ্যাচরণ করবো না।” তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় প্রভুর নিকট আরয করবেন- “হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে কিয়ামতের দিন লজ্জিত করবেন না। এই ওয়াদা কি আপনি আমার সাথে করেননি? আজ আমার পিতা যে অবস্থায় আছে এর চেয়ে লজ্জাজনক অবস্থা আমার জন্যে আর কি হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা তখন ইবরাহীম (আঃ)-কে বলবেনঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তোমার পিছন দিকে ফিরে তাকাও।” তখন তিনি স্বীয় পিতাকে দেখার পরিবর্তে একটা বেজীকে দেখতে পাবেন, যার সারা দেহ কাদাময় হয়ে থাকবে। আর দেখা যাবে যে, তার পা ধরে টেনে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাই মহান আল্লাহ বলেন-আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের সৃষ্টি অবলোকন করিয়েছি এবং তার দৃষ্টিতে এই দলীল কায়েম করেছি যে, কিভাবে মহামহিমান্বিত আল্লাহর একত্ববাদের উপর যমীন ও আসমান সৃষ্টির ভিত্তি স্থাপিত রয়েছে। এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন প্রতিপালক নেই। এরূপ দৃষ্টির প্রমাণকেই ‘মালাক্ত’ বলা হয়। দৃষ্টির প্রমাণ সর্বপ্রথম লাভ করেছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্যের প্রতি লক্ষ্য করে না (অর্থাৎ এই বিষয়ে গবেষণা করে না)?" (৭:১৮৫) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি যমীনের মধ্যকার সৃষ্টির প্রতি (শিক্ষা গ্রহণের) দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না? তাদের সামনের, পিছনের, আকাশের ও যমীনের প্রতি চিন্তাযুক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করা উচিত (তাহলে তারা বুঝতে পারবে) আমি যদি ইচ্ছা করি তবে তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিতে পারি এবং ইচ্ছা করলে তাদের উপর আকাশের খণ্ড নিক্ষেপ করতে পারি, অবশ্যই আগ্রহশীল ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের জন্যে এতে নিদর্শনসমূহ রয়েছে।” (৩৪:৯) কিন্তু (আরবী) সম্পর্কে ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দৃষ্টির সামনে আকাশ ফেটে গিয়েছিল এবং তিনি আকাশের সমুদয় জিনিসই দেখতে পাচ্ছিলেন। এমন কি তাঁর দৃষ্টি আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং সাতটি যমীনও তাঁর সামনে খুলে যায়, আর তিনি যমীনের ভিতরের জিনিসগুলো দেখতে থাকেন। কেউ কেউ এই বিষয়টিকে আরও একটু বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাঁরা বলেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) লোকদের পাপগুলোকেও দেখতে পাচ্ছিলেন এবং ঐ পাপীদের জন্যে তিনি বদ দু'আ করতে শুরু করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বলেছিলেন- “হে ইবরাহীম (আঃ)! আমি তাদের উপর তোমার চেয়ে বহুগুণে বেশী দয়ালু। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা হয়তো তাওবা করে আমার দিকে ফিরে আসবে।”এই আয়াতের ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় ক্ষমতাবলে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত জিনিস দেখিয়ে দেন। কোন কিছুই তার কাছে গোপন ছিল না। যখন তিনি পাপীদের প্রতি লা'নত বর্ষণ করতে শুরু করেন তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলেনঃ না, এরূপ করা চলবে না।' এভাবে মহান আল্লাহ তাঁকে বদ দু'আ করা থেকে বিরত রাখেন। সুতরাং হতে পারে যে, তাঁর চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে গিয়েছিল এবং সব কিছুই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আবার এও হতে পারে যে, তার অন্তর্চক্ষু খুলে গিয়েছিল এবং ওর দ্বারাই তিনি সবকিছু অবলোকন করেছিলেন। আর তিনি আল্লাহ তাআলার প্রকাশিত হিকমত এবং অকাট্য প্রমাণ সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন।যেমন ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তিরমিযী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- স্বপ্নে আল্লাহ তা'আলা অতি সুন্দর আকৃতিতে আমার কাছে হাযির হন এবং আমাকে বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! মালায়ে আ’লাতে কি নিয়ে আলোচনা চলছে?” আমি বললাম, হে আমার প্রভু! আমি তো জানি না। তিনি তখন তাঁর হাতখানা আমার দু'কাঁধের মধ্যভাগে রাখলেন, আমি তার অঙ্গুলিগুলোর শীতলতা আমার বক্ষে অনুভব করলাম । তখন সমস্ত জিনিস আমার সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়লো এবং আমি সবকিছু দেখতে লাগলাম। আল্লাহ পাকের (আরবী) এই উক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এখানে (আরবী) টি অতিরিক্ত। আয়াতের প্রকৃতরূপ হবে (আরবী)-এই মত। অর্থাৎ অক্ষরটি বাদ দিতে হবে। যেমন (আরবী) (৬:৫৫)-এই আয়াতে -এর পরেও অক্ষরটি অতিরিক্ত রয়েছে। এখানে শুধু পরবর্তী কথার ভিত্তির উপর কথা উঠানো হয়েছে। অর্থাৎ “আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর প্রকাশ করে দিয়েছি, যেন সে দেখে নেয় এবং বিশ্বাসও করে নেয়।আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ যখন অন্ধকার রাত এসে গেল এবং (আঃ) তারকা দেখতে পেলো তখন বললো- এটা আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটা যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- যা অস্তমিত হয় তাকে তো আমি পছন্দ করি না এবং যা অদৃশ্য হয়ে যায় সে তো প্রতিপালক হতে পারে না। |কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রভু যিনি হবেন তিনি যে ধ্বংস ও নষ্ট হতে পারেন না এটা হযরত ইবরাহীম (আঃ) জানতে পারলেন। আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর যখন ইবরাহীম (আঃ) চন্দ্রকে উজ্জ্বল দেখলো তখন বলল- এটাই আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটাও যখন ডুবে গেল তখন সে বললো- এটাও আমার প্রভু নয়। যদি সত্য প্রভু আমাকে পথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবো।মহান আল্লাহ বলেনঃ তারপর ইবরাহীম (আঃ) যখন সূর্যকে উদিত হতে দেখলো তখন বললোঃ এটা উজ্জ্বল ও বৃহত্তম। সুতরাং এটাই আমার প্রভু। কিন্তু ওটাও যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের শিরকীর সাথে আমার আদৌ কোন সম্পর্কে নেই, আমি মুক্ত। আমি তো আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে ফিরাচ্ছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। আমি এখন সম্পূর্ণরূপে তাঁরই হয়ে গেলাম এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি না। আমি আমার ইবাদত তারই জন্যে নির্দিষ্ট করছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, অথচ ও দু’টো সৃষ্টি করার সময় তাঁর সামনে কোন নমুনা ছিল না। এভাবে আমি শিরক থেকে তাওহীদের দিকে ফিরে আসছি।এই স্থানে মুফাসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে যে, এটা কি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর গভীর চিন্তা ও গবেষণার স্থান, কিংবা কওমের সাথে বচসার স্থান? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিম্নের উক্তি দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন- “যদি আমার প্রভু আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট কওমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।” মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এই কথা হযরত ইবরাহীম (আঃ) ঐ সময় বলেছিলেন যেই সময় তিনি প্রথমবার ঐ গুহা হতে বাইরে এসেছিলেন যেখানে তার মা তাকে প্রসব করেছিলেন। কেননা নমরূদ ইবনে কিআনের ভয়ে প্রসবের সময় তাঁর মা ঐ গুহার মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন। জ্যোতির্বিদরা নমরূদকে বলেছিলঃ “এমন এক শিশু জন্মগ্রহণ করবে যার হাতে আপনার রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।' তখন সে ঘোষণা করেছিল যে, ঐ বছর যত পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সবাইকে যেন হত্যা করে দেয়া হয়। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মা যখন গর্ভবতী হন এবং তার প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসে তখন তিনি শহরের বাইরে এক গুহার ভিতরে প্রবেশ করেন। সেখানেই তিনি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রসব করেন এবং ওখানেই তাকে একাকী রেখে চলে আসেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক এখানে এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন এবং এর উপর ভিত্তি করেই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাস্সিরগণও ওগুলো বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সত্য কথা এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর তাঁর কওমের কাছে এটা বর্ণনা করা তর্কের খাতিরেই ছিল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তাদের বিশ্বাসকে বাতিল সাব্যস্ত করা যে, তারা যেসব প্রতিমার পূজা করছে সেগুলো বাজে ও ভিত্তিহীন। সূচনাতেই তিনি প্রতিমাপূজা সম্পর্কে স্বীয় পিতার ভুল প্রকাশ করছেন। প্রতিমাগুলোকে তারা মালাইকাদের আকারে বানিয়ে রেখেছিল। ওদের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, ঐ প্রতিমাগুলো মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার সামনে তাদের জন্যে সুপারিশ করবে। অথচ ঐ মূর্তিগুলো স্বয়ং তাদের দৃষ্টিতেও ছিল ঘৃণ্য ও তুচ্ছ । কিন্তু তারা যেন মালাইকাদের ইবাদত করে এই চাচ্ছিল যে, তারা জীবিকা এবং অন্যান্য প্রয়োজনের ব্যাপারে তাদের জন্যে আল্লাহ তাআলার কাছে সুপারিশ করবে। এই স্থলে তাদের ভুল ও পথভ্রষ্টতা প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রতিমাগুলো সাতটি নক্ষত্রের নামে ছিল। সেগুলো হচ্ছে কামার’, ‘আতারিদ’, ‘যুহরা’, ‘শামস', ‘মিররীখ’, ‘মুশতারী এবং যাহল'। সবচেয়ে বেশী উজ্জ্বল নক্ষত্র হচ্ছে শামস। তারপর কামার'। সমস্ত তারকার মধ্যে উজ্জ্বলতম হচ্ছে ‘যুহরা'। হযরত ইবরাহীম (আঃ) সর্বপ্রথম এই যুহরা' তারকা থেকেই শুরু করলেন। তিনি তার কওমের লোকদেরকে বললেন যে, এই তারকাগুলোর মধ্যে মাবুদ হওয়ার যোগ্যতা নেই। এরা তো দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। তাদের গতি সীমিত। তাদের স্বেচ্ছায় ডানে-বামে যাবার কোন অধিকার নেই। এগুলো তো হচ্ছে আকাশের নক্ষত্র যেগুলোকে আল্লাহ পাক আলো দানকারী রূপে সৃষ্টি করেছেন এবং এতে তার বিশেষ নৈপুণ্য নিহিত রয়েছে। এরা তো পূর্ব দিক থেকে বের হয় এবং পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে পথ অতিক্রম করে চক্ষু হতে অদৃশ্য হয়ে যায়। পরবর্তী রাত্রে পুনরায় প্রকাশিত হয়। সুতরাং এই বস্তুগুলো তো হচ্ছে বাঁধা ধরা অভ্যাসের দাস। কাজেই এদের মা'বুদ হওয়া কিরূপে সম্ভব? এরপর তিনি কামার’ -এর দিকে আসলেন এবং যুহরা’ সম্পর্কে যা বলেছিলেন এর সম্পর্কেও সেই কথাই বললেন। তারপর তিনি শামস' -এর বর্ণনা দিলেন। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি এটাই প্রমাণ করলেন যে, এই উজ্জ্বলতম নক্ষত্রগুলোর মধ্যে মা’বৃদ বনবার যোগ্যতা মোটেই নেই। অতঃপর তিনি কওমের লোককে সম্বোধন করে বললেনঃ হে আমার কওম! তোমরা যাদেরকে মাবুদ রূপে কল্পনা করছো আমি এর থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। যদি এরা মাবুদ হয় তবে তোমরা এদেরকে সাহায্যকারী বানিয়ে নিয়ে আমার বিরুদ্ধাচরণ কর এবং আমার প্রতি মোটেই অনুগ্রহ প্রদর্শন করো না। আমি তো আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তার একজন দাসে পরিণত হয়েছি। আমি তোমাদের মত শিরকের পাপে লিপ্ত হবো না। আমি এই বস্তগুলোর সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করবো যিনি এইগুলোর পরিচালক ও নিয়ন্ত্রণকারী । প্রত্যেক বস্তুর আনুগত্যের সম্পর্ক তাঁরই হাতে রয়েছে। যেমন তিনি বলেন“তোমাদের প্রভু তো একমাত্র তিনিই যিনি ছয় দিনে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তিনি রাতকে দিন দ্বারা এবং দিনকে রাত দ্বারা ঢেকে দেন, একে অপরের পিছনে আসা যাওয়া করছে, সূর্য, চন্দ্র এবং তারকারাজি সবই তার অনুগত ও বাধ্য, সবই তাঁর হুকুমের দাস, তিনি বিশ্বপ্রভু ও বড় কল্যাণময়।” এটা কিরূপে সম্ভব হতে পারে যে, এই ব্যাপারে ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা ভাবনা করবেন এবং প্রথমে শিরকের কল্পনা তাঁর মনে বদ্ধমূল থাকবে! অথচ আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্পর্কে বলে দিচ্ছেন- “আমি প্রথম থেকেই ইবরাহীম (আঃ)-কে হিদায়াত দান করেছিলাম। আমি তাকে খুব ভালরূপেই জানি। সে স্বয়ং নিজের পিতা ও কওমের লোককে বলেছিলঃ এগুলো কেমন মূর্তি যেগুলোর তোমরা উপাসনা করছো?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ “সে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতকারী এবং সে হচ্ছে আল্লাহর বিশিষ্ট ও মনোনীত বান্দা। সে কখনও শিরক করেনি। সে আল্লাহর নিয়ামতের উপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছেন এবং সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। দুনিয়াতেও আল্লাহ তাকে পুণ্য ও কল্যাণ দান করেছেন এবং পরকালেও সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে অহী করছি যে, তুমি মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ করবে। সে ছিল একনিষ্ঠ, সে মুশরিক ছিল না। মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও—আমার প্রতিপালক আমাকে সরল সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন, যার উপর ইবরাহীম প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।”সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু ফিতরাত বা প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে।” নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ বীয় বান্দাকে হানীফ’ বা একনিষ্ঠরূপে সৃষ্টি করেছেন, অর্থাৎ তারা তাঁরই হয়ে থাকবে।” তিনি আরও বলেছেনঃ “আল্লাহর ফিতরাত হচ্ছে ওটাই যার উপর মানুষের সৃষ্টিকার্য সম্পন্ন হয়েছে এবং যে জিনিসকে যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে ওর উপর কোন পরিবর্তন আসতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) (৭:১৭২)। একটি উক্তির রীতি হিসেবে যার অর্থ এটাই। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) (৩০:৩০) যার বর্ণনা পরে আসবে। অর্থাৎ “মানুষকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর ফিতরাতের উপর সৃষ্টি করেছেন, তাঁর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই।” যখন আল্লাহর আনুগত্যের ফিতরাত ও দাসত্বের স্বীকারোক্তি সব কিছুই মাখলকের ব্যাপারে প্রযোজ্য তখন ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ)-এর ব্যাপারে এটা প্রযোজ্য হবে না কেন? আর তিনি মহান আল্লাহর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণকারী হতে পারেন কিরূপে? তিনি তো ভদ্র প্রকৃতির দিক দিয়ে উত্তম অস্তিত্ব ছিলেন! বরং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ঐ স্থলে তিনি স্বীয় কওমের সাথে। তর্ক ও বচসা করছিলেন এবং যে শিরকে তারা জড়িত ছিল, তাদের সেই ধারণা ও কল্পনাকে দলীল প্রমাণের সাহায্যে দূর করে দিচ্ছিলেন। এ কথা নয় যে, তিনি স্বয়ং সন্দেহে পতিত ছিলেন।
আল-আনআম 6:76
৭৪-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম আযর ছিল না। বরং তার নাম ছিল তারেখ । আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী)-এই সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে আযর দ্বারা মূর্তিকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবরাহিম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ, মাতার নাম ছিল শানী এবং স্ত্রীর নাম ছিল সারা। আর হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাতার নাম ছিল হাজেরা। তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ক্রীতদাসী। উলামায়ে নাসাবের (বংশ তালিকা যাদের জানা আছে) অধিকাংশের এটাই উক্তি। আর ছিল একটা মূর্তির নাম। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতা এই মূর্তির খাদেম ছিল বলে সে এই নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবেচেয়ে ভাল জানেন।ইবনে জারীর প্রমুখ গুরুজনেরা বলেন যে, ঐ যুগের লোকদের পরিভাষায় ‘আযর' শব্দটি গালি ও দূষণীয় কথা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে বক্রতা। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বলেন যে, মু'তামির ইবনে সুলাইমান বর্ণনা করেছেন, আমি আমার পিতা থেকে শুনেছি যে, তিনি আযর’ শব্দের অর্থ বক্তৃতা বলতেন এবং এটা হচ্ছে একটা শক্ত কথা যা হযরত ইবরাহীম (আঃ) মুখে উচ্চারণ করেছিলেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “সঠিক কথা হচ্ছে এটাই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ । তারপর তিনি বলেন যে, তার দুটো নাম ছিল, যেমন অধিকাংশ লোকের দু'টো নাম থাকে। অথবা হতে পারে যে, একটি ছিল প্রকৃত নাম এবং আর একটি ছিল উপাধি ও পরিচিতি হিসাবে নাম। এটাই একটা উত্তম কারণ হতে পারে। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ) ও হযরত আবু ইয়াযীদ মাদানী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে-হে আযর! তুমি কি প্রতিমাগুলোকে মা'বুদ রূপে সাব্যস্ত করছো? এখানে যেন আযরকে সম্বোধন করা হয়েছে। জমহুর উলামা (আরবী) শব্দকে (আরবী) বা যবর দিয়ে পড়েছেন। হাসান বসরী (রঃ)-এর মতে একে পেশ দিয়ে পড়া হয়নি। এর ভাবার্থ এই হল যে, এই শব্দটি হচ্ছে মা'রেফা ও আ’লাম। এই হিসেবে একে (আরবী) মনে করা হবে এবং এটা যেন (আরবী) হতে (আরবী) হয়েছে এবং এর উপর ভিত্তি করেই এতে যবর দেয়া হয়েছে। অথবা একে (আরবী) মনে করা হবে। আর এটাই বেশী সঠিক হতে পারে। কতক লোক একে (আরবী) বলে থাকেন, যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দগুলো (আরবী) রূপে ব্যবহৃত। কিন্তু কতক লোকের ধারণা এই যে, ওটা (আরবী) হওয়ার ভিত্তিতে (আরবী) হয়েছে। কেননা (আরবী)-এর প্রকৃত রূপ (আরবী)-এই রকম হবে। অর্থাৎ হে পিতঃ! আযর মূর্তিগুলোকে কি আপনি মা'বূদ বানিয়ে নিচ্ছেন?' কিন্তু (আরবী)-এর দিক দিয়ে এই উক্তিটি বহু দূরের। কেননা, যে অক্ষরটি (আরবী)-এর পরে হয় সেটি ওর পূর্ববর্তী অক্ষরের উপর আমল করে না। কারণ এই (আরবী)-এর জন্যে তো (আরবী) হওয়া চাই। ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ এর সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং আরবী ব্যাকরণে এটাই প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। উদ্দেশ্য এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতাকে উপদেশ দেন। মূর্তিপূজায় তার বিরুদ্ধাচরণ করেন। তাকে তার থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার পিতা ফিরে আসলেন না। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে বললেনঃ “আপনি কি প্রতিমাগুলোকে মাবুদ বানিয়ে নিয়েছেন? আমি তো আপনার এবং আপনার অনুসারীদেরকে বড়ই বিভ্রান্তির মধ্যে পাচ্ছি?” তাদেরকে মূর্খ ও বিভ্রান্ত বলে ঘোষণা করা প্রত্যেক স্থিরবুদ্ধির অধিকারীর জন্যে একটা স্পষ্ট দলীল।মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেন- কুরআন হাকীমে ইবরাহীম (আঃ)-এর বর্ণনার প্রতি লক্ষ্য কর। তিনি ছিলেন সত্যের সাধক ও নবী। তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেন- “হে পিতঃ! এমন বস্তুর উপাসনা করো না যে শুনেও না, দেখেও না এবং তোমাদের কোন কাজেও আসে না। হে পিতঃ, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন জ্ঞান লাভ করেছি, যে জ্ঞান আপনার নেই। কাজেই আপনি আমার কথা শুনুন। আমি আপনাকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করবো। আব্বা! শয়তানের উপাসনা করবেন না। শয়তান আল্লাহর শত্রু। হে পিতঃ, আমার ভয় হচ্ছে যে, আপনার উপর আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং আপনি শয়তানের বন্ধুতে পরিণত হয়ে যাবেন।” তখন আযর উত্তরে বললোঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি কি আমার মা'বুদগুলো থেকে বিমুখ? তুমি যদি এই কাজ থেকে বিরত না হও তবে আমি তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করবো এবং তোমাকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করবো।” ইবরাহীম (আঃ) বললেনঃ “আমি আপনাকে সালাম জানাচ্ছি। আপনার জন্যে আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো! আমার প্রভু অত্যন্ত দয়ালু। কিন্তু আমিও আপনাকে ছেড়ে দিলাম এবং ছেড়ে দিলাম আপনার কপোল কল্পিত মা'বুদগুলোকেও। আমার প্রভুর সঙ্গেই আমি সংযোগ স্থাপন করবো। আমি আশা রাখি যে, আমার প্রভু আমাকে বিমুখ করবেন না।” তখন থেকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। অতঃপর তার পিতা যখন শিরকের উপরই মারা গেল এবং তিনি জানতে পারলেন যে, মুশরিকের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কোন কাজে আসে না তখন তিনি তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা ছেড়ে দিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ইবরাহীম (আঃ)-এর তার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা শুধু এই কারণেই ছিল যে, সে তার পিতার সাথে ওয়াদা করেছিল। কিন্তু যখন সে জানতে পারলো যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো, নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিল আবিদ ও সহনশীল।” বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার সাথে মিলিত হবেন। তখন আযর তাকে বলবেঃ “হে আমার প্রিয় পুত্র! আজ আমি তোমার অবাধ্যাচরণ করবো না।” তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় প্রভুর নিকট আরয করবেন- “হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে কিয়ামতের দিন লজ্জিত করবেন না। এই ওয়াদা কি আপনি আমার সাথে করেননি? আজ আমার পিতা যে অবস্থায় আছে এর চেয়ে লজ্জাজনক অবস্থা আমার জন্যে আর কি হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা তখন ইবরাহীম (আঃ)-কে বলবেনঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তোমার পিছন দিকে ফিরে তাকাও।” তখন তিনি স্বীয় পিতাকে দেখার পরিবর্তে একটা বেজীকে দেখতে পাবেন, যার সারা দেহ কাদাময় হয়ে থাকবে। আর দেখা যাবে যে, তার পা ধরে টেনে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাই মহান আল্লাহ বলেন-আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের সৃষ্টি অবলোকন করিয়েছি এবং তার দৃষ্টিতে এই দলীল কায়েম করেছি যে, কিভাবে মহামহিমান্বিত আল্লাহর একত্ববাদের উপর যমীন ও আসমান সৃষ্টির ভিত্তি স্থাপিত রয়েছে। এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন প্রতিপালক নেই। এরূপ দৃষ্টির প্রমাণকেই ‘মালাক্ত’ বলা হয়। দৃষ্টির প্রমাণ সর্বপ্রথম লাভ করেছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্যের প্রতি লক্ষ্য করে না (অর্থাৎ এই বিষয়ে গবেষণা করে না)?" (৭:১৮৫) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি যমীনের মধ্যকার সৃষ্টির প্রতি (শিক্ষা গ্রহণের) দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না? তাদের সামনের, পিছনের, আকাশের ও যমীনের প্রতি চিন্তাযুক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করা উচিত (তাহলে তারা বুঝতে পারবে) আমি যদি ইচ্ছা করি তবে তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিতে পারি এবং ইচ্ছা করলে তাদের উপর আকাশের খণ্ড নিক্ষেপ করতে পারি, অবশ্যই আগ্রহশীল ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের জন্যে এতে নিদর্শনসমূহ রয়েছে।” (৩৪:৯) কিন্তু (আরবী) সম্পর্কে ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দৃষ্টির সামনে আকাশ ফেটে গিয়েছিল এবং তিনি আকাশের সমুদয় জিনিসই দেখতে পাচ্ছিলেন। এমন কি তাঁর দৃষ্টি আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং সাতটি যমীনও তাঁর সামনে খুলে যায়, আর তিনি যমীনের ভিতরের জিনিসগুলো দেখতে থাকেন। কেউ কেউ এই বিষয়টিকে আরও একটু বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাঁরা বলেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) লোকদের পাপগুলোকেও দেখতে পাচ্ছিলেন এবং ঐ পাপীদের জন্যে তিনি বদ দু'আ করতে শুরু করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বলেছিলেন- “হে ইবরাহীম (আঃ)! আমি তাদের উপর তোমার চেয়ে বহুগুণে বেশী দয়ালু। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা হয়তো তাওবা করে আমার দিকে ফিরে আসবে।”এই আয়াতের ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় ক্ষমতাবলে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত জিনিস দেখিয়ে দেন। কোন কিছুই তার কাছে গোপন ছিল না। যখন তিনি পাপীদের প্রতি লা'নত বর্ষণ করতে শুরু করেন তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলেনঃ না, এরূপ করা চলবে না।' এভাবে মহান আল্লাহ তাঁকে বদ দু'আ করা থেকে বিরত রাখেন। সুতরাং হতে পারে যে, তাঁর চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে গিয়েছিল এবং সব কিছুই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আবার এও হতে পারে যে, তার অন্তর্চক্ষু খুলে গিয়েছিল এবং ওর দ্বারাই তিনি সবকিছু অবলোকন করেছিলেন। আর তিনি আল্লাহ তাআলার প্রকাশিত হিকমত এবং অকাট্য প্রমাণ সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন।যেমন ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তিরমিযী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- স্বপ্নে আল্লাহ তা'আলা অতি সুন্দর আকৃতিতে আমার কাছে হাযির হন এবং আমাকে বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! মালায়ে আ’লাতে কি নিয়ে আলোচনা চলছে?” আমি বললাম, হে আমার প্রভু! আমি তো জানি না। তিনি তখন তাঁর হাতখানা আমার দু'কাঁধের মধ্যভাগে রাখলেন, আমি তার অঙ্গুলিগুলোর শীতলতা আমার বক্ষে অনুভব করলাম । তখন সমস্ত জিনিস আমার সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়লো এবং আমি সবকিছু দেখতে লাগলাম। আল্লাহ পাকের (আরবী) এই উক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এখানে (আরবী) টি অতিরিক্ত। আয়াতের প্রকৃতরূপ হবে (আরবী)-এই মত। অর্থাৎ অক্ষরটি বাদ দিতে হবে। যেমন (আরবী) (৬:৫৫)-এই আয়াতে -এর পরেও অক্ষরটি অতিরিক্ত রয়েছে। এখানে শুধু পরবর্তী কথার ভিত্তির উপর কথা উঠানো হয়েছে। অর্থাৎ “আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর প্রকাশ করে দিয়েছি, যেন সে দেখে নেয় এবং বিশ্বাসও করে নেয়।আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ যখন অন্ধকার রাত এসে গেল এবং (আঃ) তারকা দেখতে পেলো তখন বললো- এটা আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটা যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- যা অস্তমিত হয় তাকে তো আমি পছন্দ করি না এবং যা অদৃশ্য হয়ে যায় সে তো প্রতিপালক হতে পারে না। |কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রভু যিনি হবেন তিনি যে ধ্বংস ও নষ্ট হতে পারেন না এটা হযরত ইবরাহীম (আঃ) জানতে পারলেন। আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর যখন ইবরাহীম (আঃ) চন্দ্রকে উজ্জ্বল দেখলো তখন বলল- এটাই আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটাও যখন ডুবে গেল তখন সে বললো- এটাও আমার প্রভু নয়। যদি সত্য প্রভু আমাকে পথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবো।মহান আল্লাহ বলেনঃ তারপর ইবরাহীম (আঃ) যখন সূর্যকে উদিত হতে দেখলো তখন বললোঃ এটা উজ্জ্বল ও বৃহত্তম। সুতরাং এটাই আমার প্রভু। কিন্তু ওটাও যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের শিরকীর সাথে আমার আদৌ কোন সম্পর্কে নেই, আমি মুক্ত। আমি তো আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে ফিরাচ্ছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। আমি এখন সম্পূর্ণরূপে তাঁরই হয়ে গেলাম এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি না। আমি আমার ইবাদত তারই জন্যে নির্দিষ্ট করছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, অথচ ও দু’টো সৃষ্টি করার সময় তাঁর সামনে কোন নমুনা ছিল না। এভাবে আমি শিরক থেকে তাওহীদের দিকে ফিরে আসছি।এই স্থানে মুফাসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে যে, এটা কি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর গভীর চিন্তা ও গবেষণার স্থান, কিংবা কওমের সাথে বচসার স্থান? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিম্নের উক্তি দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন- “যদি আমার প্রভু আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট কওমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।” মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এই কথা হযরত ইবরাহীম (আঃ) ঐ সময় বলেছিলেন যেই সময় তিনি প্রথমবার ঐ গুহা হতে বাইরে এসেছিলেন যেখানে তার মা তাকে প্রসব করেছিলেন। কেননা নমরূদ ইবনে কিআনের ভয়ে প্রসবের সময় তাঁর মা ঐ গুহার মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন। জ্যোতির্বিদরা নমরূদকে বলেছিলঃ “এমন এক শিশু জন্মগ্রহণ করবে যার হাতে আপনার রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।' তখন সে ঘোষণা করেছিল যে, ঐ বছর যত পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সবাইকে যেন হত্যা করে দেয়া হয়। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মা যখন গর্ভবতী হন এবং তার প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসে তখন তিনি শহরের বাইরে এক গুহার ভিতরে প্রবেশ করেন। সেখানেই তিনি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রসব করেন এবং ওখানেই তাকে একাকী রেখে চলে আসেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক এখানে এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন এবং এর উপর ভিত্তি করেই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাস্সিরগণও ওগুলো বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সত্য কথা এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর তাঁর কওমের কাছে এটা বর্ণনা করা তর্কের খাতিরেই ছিল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তাদের বিশ্বাসকে বাতিল সাব্যস্ত করা যে, তারা যেসব প্রতিমার পূজা করছে সেগুলো বাজে ও ভিত্তিহীন। সূচনাতেই তিনি প্রতিমাপূজা সম্পর্কে স্বীয় পিতার ভুল প্রকাশ করছেন। প্রতিমাগুলোকে তারা মালাইকাদের আকারে বানিয়ে রেখেছিল। ওদের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, ঐ প্রতিমাগুলো মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার সামনে তাদের জন্যে সুপারিশ করবে। অথচ ঐ মূর্তিগুলো স্বয়ং তাদের দৃষ্টিতেও ছিল ঘৃণ্য ও তুচ্ছ । কিন্তু তারা যেন মালাইকাদের ইবাদত করে এই চাচ্ছিল যে, তারা জীবিকা এবং অন্যান্য প্রয়োজনের ব্যাপারে তাদের জন্যে আল্লাহ তাআলার কাছে সুপারিশ করবে। এই স্থলে তাদের ভুল ও পথভ্রষ্টতা প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রতিমাগুলো সাতটি নক্ষত্রের নামে ছিল। সেগুলো হচ্ছে কামার’, ‘আতারিদ’, ‘যুহরা’, ‘শামস', ‘মিররীখ’, ‘মুশতারী এবং যাহল'। সবচেয়ে বেশী উজ্জ্বল নক্ষত্র হচ্ছে শামস। তারপর কামার'। সমস্ত তারকার মধ্যে উজ্জ্বলতম হচ্ছে ‘যুহরা'। হযরত ইবরাহীম (আঃ) সর্বপ্রথম এই যুহরা' তারকা থেকেই শুরু করলেন। তিনি তার কওমের লোকদেরকে বললেন যে, এই তারকাগুলোর মধ্যে মাবুদ হওয়ার যোগ্যতা নেই। এরা তো দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। তাদের গতি সীমিত। তাদের স্বেচ্ছায় ডানে-বামে যাবার কোন অধিকার নেই। এগুলো তো হচ্ছে আকাশের নক্ষত্র যেগুলোকে আল্লাহ পাক আলো দানকারী রূপে সৃষ্টি করেছেন এবং এতে তার বিশেষ নৈপুণ্য নিহিত রয়েছে। এরা তো পূর্ব দিক থেকে বের হয় এবং পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে পথ অতিক্রম করে চক্ষু হতে অদৃশ্য হয়ে যায়। পরবর্তী রাত্রে পুনরায় প্রকাশিত হয়। সুতরাং এই বস্তুগুলো তো হচ্ছে বাঁধা ধরা অভ্যাসের দাস। কাজেই এদের মা'বুদ হওয়া কিরূপে সম্ভব? এরপর তিনি কামার’ -এর দিকে আসলেন এবং যুহরা’ সম্পর্কে যা বলেছিলেন এর সম্পর্কেও সেই কথাই বললেন। তারপর তিনি শামস' -এর বর্ণনা দিলেন। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি এটাই প্রমাণ করলেন যে, এই উজ্জ্বলতম নক্ষত্রগুলোর মধ্যে মা’বৃদ বনবার যোগ্যতা মোটেই নেই। অতঃপর তিনি কওমের লোককে সম্বোধন করে বললেনঃ হে আমার কওম! তোমরা যাদেরকে মাবুদ রূপে কল্পনা করছো আমি এর থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। যদি এরা মাবুদ হয় তবে তোমরা এদেরকে সাহায্যকারী বানিয়ে নিয়ে আমার বিরুদ্ধাচরণ কর এবং আমার প্রতি মোটেই অনুগ্রহ প্রদর্শন করো না। আমি তো আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তার একজন দাসে পরিণত হয়েছি। আমি তোমাদের মত শিরকের পাপে লিপ্ত হবো না। আমি এই বস্তগুলোর সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করবো যিনি এইগুলোর পরিচালক ও নিয়ন্ত্রণকারী । প্রত্যেক বস্তুর আনুগত্যের সম্পর্ক তাঁরই হাতে রয়েছে। যেমন তিনি বলেন“তোমাদের প্রভু তো একমাত্র তিনিই যিনি ছয় দিনে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তিনি রাতকে দিন দ্বারা এবং দিনকে রাত দ্বারা ঢেকে দেন, একে অপরের পিছনে আসা যাওয়া করছে, সূর্য, চন্দ্র এবং তারকারাজি সবই তার অনুগত ও বাধ্য, সবই তাঁর হুকুমের দাস, তিনি বিশ্বপ্রভু ও বড় কল্যাণময়।” এটা কিরূপে সম্ভব হতে পারে যে, এই ব্যাপারে ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা ভাবনা করবেন এবং প্রথমে শিরকের কল্পনা তাঁর মনে বদ্ধমূল থাকবে! অথচ আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্পর্কে বলে দিচ্ছেন- “আমি প্রথম থেকেই ইবরাহীম (আঃ)-কে হিদায়াত দান করেছিলাম। আমি তাকে খুব ভালরূপেই জানি। সে স্বয়ং নিজের পিতা ও কওমের লোককে বলেছিলঃ এগুলো কেমন মূর্তি যেগুলোর তোমরা উপাসনা করছো?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ “সে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতকারী এবং সে হচ্ছে আল্লাহর বিশিষ্ট ও মনোনীত বান্দা। সে কখনও শিরক করেনি। সে আল্লাহর নিয়ামতের উপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছেন এবং সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। দুনিয়াতেও আল্লাহ তাকে পুণ্য ও কল্যাণ দান করেছেন এবং পরকালেও সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে অহী করছি যে, তুমি মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ করবে। সে ছিল একনিষ্ঠ, সে মুশরিক ছিল না। মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও—আমার প্রতিপালক আমাকে সরল সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন, যার উপর ইবরাহীম প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।”সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু ফিতরাত বা প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে।” নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ বীয় বান্দাকে হানীফ’ বা একনিষ্ঠরূপে সৃষ্টি করেছেন, অর্থাৎ তারা তাঁরই হয়ে থাকবে।” তিনি আরও বলেছেনঃ “আল্লাহর ফিতরাত হচ্ছে ওটাই যার উপর মানুষের সৃষ্টিকার্য সম্পন্ন হয়েছে এবং যে জিনিসকে যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে ওর উপর কোন পরিবর্তন আসতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) (৭:১৭২)। একটি উক্তির রীতি হিসেবে যার অর্থ এটাই। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) (৩০:৩০) যার বর্ণনা পরে আসবে। অর্থাৎ “মানুষকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর ফিতরাতের উপর সৃষ্টি করেছেন, তাঁর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই।” যখন আল্লাহর আনুগত্যের ফিতরাত ও দাসত্বের স্বীকারোক্তি সব কিছুই মাখলকের ব্যাপারে প্রযোজ্য তখন ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ)-এর ব্যাপারে এটা প্রযোজ্য হবে না কেন? আর তিনি মহান আল্লাহর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণকারী হতে পারেন কিরূপে? তিনি তো ভদ্র প্রকৃতির দিক দিয়ে উত্তম অস্তিত্ব ছিলেন! বরং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ঐ স্থলে তিনি স্বীয় কওমের সাথে। তর্ক ও বচসা করছিলেন এবং যে শিরকে তারা জড়িত ছিল, তাদের সেই ধারণা ও কল্পনাকে দলীল প্রমাণের সাহায্যে দূর করে দিচ্ছিলেন। এ কথা নয় যে, তিনি স্বয়ং সন্দেহে পতিত ছিলেন।
আল-আনআম 6:77
৭৪-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম আযর ছিল না। বরং তার নাম ছিল তারেখ । আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী)-এই সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে আযর দ্বারা মূর্তিকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবরাহিম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ, মাতার নাম ছিল শানী এবং স্ত্রীর নাম ছিল সারা। আর হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাতার নাম ছিল হাজেরা। তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ক্রীতদাসী। উলামায়ে নাসাবের (বংশ তালিকা যাদের জানা আছে) অধিকাংশের এটাই উক্তি। আর ছিল একটা মূর্তির নাম। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতা এই মূর্তির খাদেম ছিল বলে সে এই নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবেচেয়ে ভাল জানেন।ইবনে জারীর প্রমুখ গুরুজনেরা বলেন যে, ঐ যুগের লোকদের পরিভাষায় ‘আযর' শব্দটি গালি ও দূষণীয় কথা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে বক্রতা। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বলেন যে, মু'তামির ইবনে সুলাইমান বর্ণনা করেছেন, আমি আমার পিতা থেকে শুনেছি যে, তিনি আযর’ শব্দের অর্থ বক্তৃতা বলতেন এবং এটা হচ্ছে একটা শক্ত কথা যা হযরত ইবরাহীম (আঃ) মুখে উচ্চারণ করেছিলেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “সঠিক কথা হচ্ছে এটাই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ । তারপর তিনি বলেন যে, তার দুটো নাম ছিল, যেমন অধিকাংশ লোকের দু'টো নাম থাকে। অথবা হতে পারে যে, একটি ছিল প্রকৃত নাম এবং আর একটি ছিল উপাধি ও পরিচিতি হিসাবে নাম। এটাই একটা উত্তম কারণ হতে পারে। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ) ও হযরত আবু ইয়াযীদ মাদানী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে-হে আযর! তুমি কি প্রতিমাগুলোকে মা'বুদ রূপে সাব্যস্ত করছো? এখানে যেন আযরকে সম্বোধন করা হয়েছে। জমহুর উলামা (আরবী) শব্দকে (আরবী) বা যবর দিয়ে পড়েছেন। হাসান বসরী (রঃ)-এর মতে একে পেশ দিয়ে পড়া হয়নি। এর ভাবার্থ এই হল যে, এই শব্দটি হচ্ছে মা'রেফা ও আ’লাম। এই হিসেবে একে (আরবী) মনে করা হবে এবং এটা যেন (আরবী) হতে (আরবী) হয়েছে এবং এর উপর ভিত্তি করেই এতে যবর দেয়া হয়েছে। অথবা একে (আরবী) মনে করা হবে। আর এটাই বেশী সঠিক হতে পারে। কতক লোক একে (আরবী) বলে থাকেন, যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দগুলো (আরবী) রূপে ব্যবহৃত। কিন্তু কতক লোকের ধারণা এই যে, ওটা (আরবী) হওয়ার ভিত্তিতে (আরবী) হয়েছে। কেননা (আরবী)-এর প্রকৃত রূপ (আরবী)-এই রকম হবে। অর্থাৎ হে পিতঃ! আযর মূর্তিগুলোকে কি আপনি মা'বূদ বানিয়ে নিচ্ছেন?' কিন্তু (আরবী)-এর দিক দিয়ে এই উক্তিটি বহু দূরের। কেননা, যে অক্ষরটি (আরবী)-এর পরে হয় সেটি ওর পূর্ববর্তী অক্ষরের উপর আমল করে না। কারণ এই (আরবী)-এর জন্যে তো (আরবী) হওয়া চাই। ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ এর সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং আরবী ব্যাকরণে এটাই প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। উদ্দেশ্য এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতাকে উপদেশ দেন। মূর্তিপূজায় তার বিরুদ্ধাচরণ করেন। তাকে তার থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার পিতা ফিরে আসলেন না। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে বললেনঃ “আপনি কি প্রতিমাগুলোকে মাবুদ বানিয়ে নিয়েছেন? আমি তো আপনার এবং আপনার অনুসারীদেরকে বড়ই বিভ্রান্তির মধ্যে পাচ্ছি?” তাদেরকে মূর্খ ও বিভ্রান্ত বলে ঘোষণা করা প্রত্যেক স্থিরবুদ্ধির অধিকারীর জন্যে একটা স্পষ্ট দলীল।মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেন- কুরআন হাকীমে ইবরাহীম (আঃ)-এর বর্ণনার প্রতি লক্ষ্য কর। তিনি ছিলেন সত্যের সাধক ও নবী। তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেন- “হে পিতঃ! এমন বস্তুর উপাসনা করো না যে শুনেও না, দেখেও না এবং তোমাদের কোন কাজেও আসে না। হে পিতঃ, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন জ্ঞান লাভ করেছি, যে জ্ঞান আপনার নেই। কাজেই আপনি আমার কথা শুনুন। আমি আপনাকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করবো। আব্বা! শয়তানের উপাসনা করবেন না। শয়তান আল্লাহর শত্রু। হে পিতঃ, আমার ভয় হচ্ছে যে, আপনার উপর আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং আপনি শয়তানের বন্ধুতে পরিণত হয়ে যাবেন।” তখন আযর উত্তরে বললোঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি কি আমার মা'বুদগুলো থেকে বিমুখ? তুমি যদি এই কাজ থেকে বিরত না হও তবে আমি তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করবো এবং তোমাকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করবো।” ইবরাহীম (আঃ) বললেনঃ “আমি আপনাকে সালাম জানাচ্ছি। আপনার জন্যে আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো! আমার প্রভু অত্যন্ত দয়ালু। কিন্তু আমিও আপনাকে ছেড়ে দিলাম এবং ছেড়ে দিলাম আপনার কপোল কল্পিত মা'বুদগুলোকেও। আমার প্রভুর সঙ্গেই আমি সংযোগ স্থাপন করবো। আমি আশা রাখি যে, আমার প্রভু আমাকে বিমুখ করবেন না।” তখন থেকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। অতঃপর তার পিতা যখন শিরকের উপরই মারা গেল এবং তিনি জানতে পারলেন যে, মুশরিকের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কোন কাজে আসে না তখন তিনি তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা ছেড়ে দিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ইবরাহীম (আঃ)-এর তার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা শুধু এই কারণেই ছিল যে, সে তার পিতার সাথে ওয়াদা করেছিল। কিন্তু যখন সে জানতে পারলো যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো, নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিল আবিদ ও সহনশীল।” বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার সাথে মিলিত হবেন। তখন আযর তাকে বলবেঃ “হে আমার প্রিয় পুত্র! আজ আমি তোমার অবাধ্যাচরণ করবো না।” তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় প্রভুর নিকট আরয করবেন- “হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে কিয়ামতের দিন লজ্জিত করবেন না। এই ওয়াদা কি আপনি আমার সাথে করেননি? আজ আমার পিতা যে অবস্থায় আছে এর চেয়ে লজ্জাজনক অবস্থা আমার জন্যে আর কি হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা তখন ইবরাহীম (আঃ)-কে বলবেনঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তোমার পিছন দিকে ফিরে তাকাও।” তখন তিনি স্বীয় পিতাকে দেখার পরিবর্তে একটা বেজীকে দেখতে পাবেন, যার সারা দেহ কাদাময় হয়ে থাকবে। আর দেখা যাবে যে, তার পা ধরে টেনে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাই মহান আল্লাহ বলেন-আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের সৃষ্টি অবলোকন করিয়েছি এবং তার দৃষ্টিতে এই দলীল কায়েম করেছি যে, কিভাবে মহামহিমান্বিত আল্লাহর একত্ববাদের উপর যমীন ও আসমান সৃষ্টির ভিত্তি স্থাপিত রয়েছে। এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন প্রতিপালক নেই। এরূপ দৃষ্টির প্রমাণকেই ‘মালাক্ত’ বলা হয়। দৃষ্টির প্রমাণ সর্বপ্রথম লাভ করেছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্যের প্রতি লক্ষ্য করে না (অর্থাৎ এই বিষয়ে গবেষণা করে না)?" (৭:১৮৫) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি যমীনের মধ্যকার সৃষ্টির প্রতি (শিক্ষা গ্রহণের) দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না? তাদের সামনের, পিছনের, আকাশের ও যমীনের প্রতি চিন্তাযুক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করা উচিত (তাহলে তারা বুঝতে পারবে) আমি যদি ইচ্ছা করি তবে তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিতে পারি এবং ইচ্ছা করলে তাদের উপর আকাশের খণ্ড নিক্ষেপ করতে পারি, অবশ্যই আগ্রহশীল ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের জন্যে এতে নিদর্শনসমূহ রয়েছে।” (৩৪:৯) কিন্তু (আরবী) সম্পর্কে ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দৃষ্টির সামনে আকাশ ফেটে গিয়েছিল এবং তিনি আকাশের সমুদয় জিনিসই দেখতে পাচ্ছিলেন। এমন কি তাঁর দৃষ্টি আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং সাতটি যমীনও তাঁর সামনে খুলে যায়, আর তিনি যমীনের ভিতরের জিনিসগুলো দেখতে থাকেন। কেউ কেউ এই বিষয়টিকে আরও একটু বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাঁরা বলেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) লোকদের পাপগুলোকেও দেখতে পাচ্ছিলেন এবং ঐ পাপীদের জন্যে তিনি বদ দু'আ করতে শুরু করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বলেছিলেন- “হে ইবরাহীম (আঃ)! আমি তাদের উপর তোমার চেয়ে বহুগুণে বেশী দয়ালু। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা হয়তো তাওবা করে আমার দিকে ফিরে আসবে।”এই আয়াতের ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় ক্ষমতাবলে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত জিনিস দেখিয়ে দেন। কোন কিছুই তার কাছে গোপন ছিল না। যখন তিনি পাপীদের প্রতি লা'নত বর্ষণ করতে শুরু করেন তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলেনঃ না, এরূপ করা চলবে না।' এভাবে মহান আল্লাহ তাঁকে বদ দু'আ করা থেকে বিরত রাখেন। সুতরাং হতে পারে যে, তাঁর চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে গিয়েছিল এবং সব কিছুই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আবার এও হতে পারে যে, তার অন্তর্চক্ষু খুলে গিয়েছিল এবং ওর দ্বারাই তিনি সবকিছু অবলোকন করেছিলেন। আর তিনি আল্লাহ তাআলার প্রকাশিত হিকমত এবং অকাট্য প্রমাণ সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন।যেমন ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তিরমিযী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- স্বপ্নে আল্লাহ তা'আলা অতি সুন্দর আকৃতিতে আমার কাছে হাযির হন এবং আমাকে বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! মালায়ে আ’লাতে কি নিয়ে আলোচনা চলছে?” আমি বললাম, হে আমার প্রভু! আমি তো জানি না। তিনি তখন তাঁর হাতখানা আমার দু'কাঁধের মধ্যভাগে রাখলেন, আমি তার অঙ্গুলিগুলোর শীতলতা আমার বক্ষে অনুভব করলাম । তখন সমস্ত জিনিস আমার সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়লো এবং আমি সবকিছু দেখতে লাগলাম। আল্লাহ পাকের (আরবী) এই উক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এখানে (আরবী) টি অতিরিক্ত। আয়াতের প্রকৃতরূপ হবে (আরবী)-এই মত। অর্থাৎ অক্ষরটি বাদ দিতে হবে। যেমন (আরবী) (৬:৫৫)-এই আয়াতে -এর পরেও অক্ষরটি অতিরিক্ত রয়েছে। এখানে শুধু পরবর্তী কথার ভিত্তির উপর কথা উঠানো হয়েছে। অর্থাৎ “আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর প্রকাশ করে দিয়েছি, যেন সে দেখে নেয় এবং বিশ্বাসও করে নেয়।আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ যখন অন্ধকার রাত এসে গেল এবং (আঃ) তারকা দেখতে পেলো তখন বললো- এটা আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটা যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- যা অস্তমিত হয় তাকে তো আমি পছন্দ করি না এবং যা অদৃশ্য হয়ে যায় সে তো প্রতিপালক হতে পারে না। |কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রভু যিনি হবেন তিনি যে ধ্বংস ও নষ্ট হতে পারেন না এটা হযরত ইবরাহীম (আঃ) জানতে পারলেন। আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর যখন ইবরাহীম (আঃ) চন্দ্রকে উজ্জ্বল দেখলো তখন বলল- এটাই আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটাও যখন ডুবে গেল তখন সে বললো- এটাও আমার প্রভু নয়। যদি সত্য প্রভু আমাকে পথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবো।মহান আল্লাহ বলেনঃ তারপর ইবরাহীম (আঃ) যখন সূর্যকে উদিত হতে দেখলো তখন বললোঃ এটা উজ্জ্বল ও বৃহত্তম। সুতরাং এটাই আমার প্রভু। কিন্তু ওটাও যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের শিরকীর সাথে আমার আদৌ কোন সম্পর্কে নেই, আমি মুক্ত। আমি তো আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে ফিরাচ্ছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। আমি এখন সম্পূর্ণরূপে তাঁরই হয়ে গেলাম এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি না। আমি আমার ইবাদত তারই জন্যে নির্দিষ্ট করছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, অথচ ও দু’টো সৃষ্টি করার সময় তাঁর সামনে কোন নমুনা ছিল না। এভাবে আমি শিরক থেকে তাওহীদের দিকে ফিরে আসছি।এই স্থানে মুফাসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে যে, এটা কি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর গভীর চিন্তা ও গবেষণার স্থান, কিংবা কওমের সাথে বচসার স্থান? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিম্নের উক্তি দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন- “যদি আমার প্রভু আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট কওমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।” মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এই কথা হযরত ইবরাহীম (আঃ) ঐ সময় বলেছিলেন যেই সময় তিনি প্রথমবার ঐ গুহা হতে বাইরে এসেছিলেন যেখানে তার মা তাকে প্রসব করেছিলেন। কেননা নমরূদ ইবনে কিআনের ভয়ে প্রসবের সময় তাঁর মা ঐ গুহার মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন। জ্যোতির্বিদরা নমরূদকে বলেছিলঃ “এমন এক শিশু জন্মগ্রহণ করবে যার হাতে আপনার রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।' তখন সে ঘোষণা করেছিল যে, ঐ বছর যত পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সবাইকে যেন হত্যা করে দেয়া হয়। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মা যখন গর্ভবতী হন এবং তার প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসে তখন তিনি শহরের বাইরে এক গুহার ভিতরে প্রবেশ করেন। সেখানেই তিনি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রসব করেন এবং ওখানেই তাকে একাকী রেখে চলে আসেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক এখানে এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন এবং এর উপর ভিত্তি করেই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাস্সিরগণও ওগুলো বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সত্য কথা এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর তাঁর কওমের কাছে এটা বর্ণনা করা তর্কের খাতিরেই ছিল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তাদের বিশ্বাসকে বাতিল সাব্যস্ত করা যে, তারা যেসব প্রতিমার পূজা করছে সেগুলো বাজে ও ভিত্তিহীন। সূচনাতেই তিনি প্রতিমাপূজা সম্পর্কে স্বীয় পিতার ভুল প্রকাশ করছেন। প্রতিমাগুলোকে তারা মালাইকাদের আকারে বানিয়ে রেখেছিল। ওদের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, ঐ প্রতিমাগুলো মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার সামনে তাদের জন্যে সুপারিশ করবে। অথচ ঐ মূর্তিগুলো স্বয়ং তাদের দৃষ্টিতেও ছিল ঘৃণ্য ও তুচ্ছ । কিন্তু তারা যেন মালাইকাদের ইবাদত করে এই চাচ্ছিল যে, তারা জীবিকা এবং অন্যান্য প্রয়োজনের ব্যাপারে তাদের জন্যে আল্লাহ তাআলার কাছে সুপারিশ করবে। এই স্থলে তাদের ভুল ও পথভ্রষ্টতা প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রতিমাগুলো সাতটি নক্ষত্রের নামে ছিল। সেগুলো হচ্ছে কামার’, ‘আতারিদ’, ‘যুহরা’, ‘শামস', ‘মিররীখ’, ‘মুশতারী এবং যাহল'। সবচেয়ে বেশী উজ্জ্বল নক্ষত্র হচ্ছে শামস। তারপর কামার'। সমস্ত তারকার মধ্যে উজ্জ্বলতম হচ্ছে ‘যুহরা'। হযরত ইবরাহীম (আঃ) সর্বপ্রথম এই যুহরা' তারকা থেকেই শুরু করলেন। তিনি তার কওমের লোকদেরকে বললেন যে, এই তারকাগুলোর মধ্যে মাবুদ হওয়ার যোগ্যতা নেই। এরা তো দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। তাদের গতি সীমিত। তাদের স্বেচ্ছায় ডানে-বামে যাবার কোন অধিকার নেই। এগুলো তো হচ্ছে আকাশের নক্ষত্র যেগুলোকে আল্লাহ পাক আলো দানকারী রূপে সৃষ্টি করেছেন এবং এতে তার বিশেষ নৈপুণ্য নিহিত রয়েছে। এরা তো পূর্ব দিক থেকে বের হয় এবং পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে পথ অতিক্রম করে চক্ষু হতে অদৃশ্য হয়ে যায়। পরবর্তী রাত্রে পুনরায় প্রকাশিত হয়। সুতরাং এই বস্তুগুলো তো হচ্ছে বাঁধা ধরা অভ্যাসের দাস। কাজেই এদের মা'বুদ হওয়া কিরূপে সম্ভব? এরপর তিনি কামার’ -এর দিকে আসলেন এবং যুহরা’ সম্পর্কে যা বলেছিলেন এর সম্পর্কেও সেই কথাই বললেন। তারপর তিনি শামস' -এর বর্ণনা দিলেন। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি এটাই প্রমাণ করলেন যে, এই উজ্জ্বলতম নক্ষত্রগুলোর মধ্যে মা’বৃদ বনবার যোগ্যতা মোটেই নেই। অতঃপর তিনি কওমের লোককে সম্বোধন করে বললেনঃ হে আমার কওম! তোমরা যাদেরকে মাবুদ রূপে কল্পনা করছো আমি এর থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। যদি এরা মাবুদ হয় তবে তোমরা এদেরকে সাহায্যকারী বানিয়ে নিয়ে আমার বিরুদ্ধাচরণ কর এবং আমার প্রতি মোটেই অনুগ্রহ প্রদর্শন করো না। আমি তো আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তার একজন দাসে পরিণত হয়েছি। আমি তোমাদের মত শিরকের পাপে লিপ্ত হবো না। আমি এই বস্তগুলোর সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করবো যিনি এইগুলোর পরিচালক ও নিয়ন্ত্রণকারী । প্রত্যেক বস্তুর আনুগত্যের সম্পর্ক তাঁরই হাতে রয়েছে। যেমন তিনি বলেন“তোমাদের প্রভু তো একমাত্র তিনিই যিনি ছয় দিনে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তিনি রাতকে দিন দ্বারা এবং দিনকে রাত দ্বারা ঢেকে দেন, একে অপরের পিছনে আসা যাওয়া করছে, সূর্য, চন্দ্র এবং তারকারাজি সবই তার অনুগত ও বাধ্য, সবই তাঁর হুকুমের দাস, তিনি বিশ্বপ্রভু ও বড় কল্যাণময়।” এটা কিরূপে সম্ভব হতে পারে যে, এই ব্যাপারে ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা ভাবনা করবেন এবং প্রথমে শিরকের কল্পনা তাঁর মনে বদ্ধমূল থাকবে! অথচ আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্পর্কে বলে দিচ্ছেন- “আমি প্রথম থেকেই ইবরাহীম (আঃ)-কে হিদায়াত দান করেছিলাম। আমি তাকে খুব ভালরূপেই জানি। সে স্বয়ং নিজের পিতা ও কওমের লোককে বলেছিলঃ এগুলো কেমন মূর্তি যেগুলোর তোমরা উপাসনা করছো?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ “সে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতকারী এবং সে হচ্ছে আল্লাহর বিশিষ্ট ও মনোনীত বান্দা। সে কখনও শিরক করেনি। সে আল্লাহর নিয়ামতের উপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছেন এবং সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। দুনিয়াতেও আল্লাহ তাকে পুণ্য ও কল্যাণ দান করেছেন এবং পরকালেও সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে অহী করছি যে, তুমি মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ করবে। সে ছিল একনিষ্ঠ, সে মুশরিক ছিল না। মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও—আমার প্রতিপালক আমাকে সরল সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন, যার উপর ইবরাহীম প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।”সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু ফিতরাত বা প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে।” নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ বীয় বান্দাকে হানীফ’ বা একনিষ্ঠরূপে সৃষ্টি করেছেন, অর্থাৎ তারা তাঁরই হয়ে থাকবে।” তিনি আরও বলেছেনঃ “আল্লাহর ফিতরাত হচ্ছে ওটাই যার উপর মানুষের সৃষ্টিকার্য সম্পন্ন হয়েছে এবং যে জিনিসকে যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে ওর উপর কোন পরিবর্তন আসতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) (৭:১৭২)। একটি উক্তির রীতি হিসেবে যার অর্থ এটাই। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) (৩০:৩০) যার বর্ণনা পরে আসবে। অর্থাৎ “মানুষকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর ফিতরাতের উপর সৃষ্টি করেছেন, তাঁর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই।” যখন আল্লাহর আনুগত্যের ফিতরাত ও দাসত্বের স্বীকারোক্তি সব কিছুই মাখলকের ব্যাপারে প্রযোজ্য তখন ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ)-এর ব্যাপারে এটা প্রযোজ্য হবে না কেন? আর তিনি মহান আল্লাহর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণকারী হতে পারেন কিরূপে? তিনি তো ভদ্র প্রকৃতির দিক দিয়ে উত্তম অস্তিত্ব ছিলেন! বরং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ঐ স্থলে তিনি স্বীয় কওমের সাথে। তর্ক ও বচসা করছিলেন এবং যে শিরকে তারা জড়িত ছিল, তাদের সেই ধারণা ও কল্পনাকে দলীল প্রমাণের সাহায্যে দূর করে দিচ্ছিলেন। এ কথা নয় যে, তিনি স্বয়ং সন্দেহে পতিত ছিলেন।
আল-আনআম 6:78
৭৪-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম আযর ছিল না। বরং তার নাম ছিল তারেখ । আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী)-এই সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে আযর দ্বারা মূর্তিকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবরাহিম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ, মাতার নাম ছিল শানী এবং স্ত্রীর নাম ছিল সারা। আর হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাতার নাম ছিল হাজেরা। তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ক্রীতদাসী। উলামায়ে নাসাবের (বংশ তালিকা যাদের জানা আছে) অধিকাংশের এটাই উক্তি। আর ছিল একটা মূর্তির নাম। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতা এই মূর্তির খাদেম ছিল বলে সে এই নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবেচেয়ে ভাল জানেন।ইবনে জারীর প্রমুখ গুরুজনেরা বলেন যে, ঐ যুগের লোকদের পরিভাষায় ‘আযর' শব্দটি গালি ও দূষণীয় কথা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে বক্রতা। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বলেন যে, মু'তামির ইবনে সুলাইমান বর্ণনা করেছেন, আমি আমার পিতা থেকে শুনেছি যে, তিনি আযর’ শব্দের অর্থ বক্তৃতা বলতেন এবং এটা হচ্ছে একটা শক্ত কথা যা হযরত ইবরাহীম (আঃ) মুখে উচ্চারণ করেছিলেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “সঠিক কথা হচ্ছে এটাই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ । তারপর তিনি বলেন যে, তার দুটো নাম ছিল, যেমন অধিকাংশ লোকের দু'টো নাম থাকে। অথবা হতে পারে যে, একটি ছিল প্রকৃত নাম এবং আর একটি ছিল উপাধি ও পরিচিতি হিসাবে নাম। এটাই একটা উত্তম কারণ হতে পারে। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ) ও হযরত আবু ইয়াযীদ মাদানী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে-হে আযর! তুমি কি প্রতিমাগুলোকে মা'বুদ রূপে সাব্যস্ত করছো? এখানে যেন আযরকে সম্বোধন করা হয়েছে। জমহুর উলামা (আরবী) শব্দকে (আরবী) বা যবর দিয়ে পড়েছেন। হাসান বসরী (রঃ)-এর মতে একে পেশ দিয়ে পড়া হয়নি। এর ভাবার্থ এই হল যে, এই শব্দটি হচ্ছে মা'রেফা ও আ’লাম। এই হিসেবে একে (আরবী) মনে করা হবে এবং এটা যেন (আরবী) হতে (আরবী) হয়েছে এবং এর উপর ভিত্তি করেই এতে যবর দেয়া হয়েছে। অথবা একে (আরবী) মনে করা হবে। আর এটাই বেশী সঠিক হতে পারে। কতক লোক একে (আরবী) বলে থাকেন, যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দগুলো (আরবী) রূপে ব্যবহৃত। কিন্তু কতক লোকের ধারণা এই যে, ওটা (আরবী) হওয়ার ভিত্তিতে (আরবী) হয়েছে। কেননা (আরবী)-এর প্রকৃত রূপ (আরবী)-এই রকম হবে। অর্থাৎ হে পিতঃ! আযর মূর্তিগুলোকে কি আপনি মা'বূদ বানিয়ে নিচ্ছেন?' কিন্তু (আরবী)-এর দিক দিয়ে এই উক্তিটি বহু দূরের। কেননা, যে অক্ষরটি (আরবী)-এর পরে হয় সেটি ওর পূর্ববর্তী অক্ষরের উপর আমল করে না। কারণ এই (আরবী)-এর জন্যে তো (আরবী) হওয়া চাই। ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ এর সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং আরবী ব্যাকরণে এটাই প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। উদ্দেশ্য এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতাকে উপদেশ দেন। মূর্তিপূজায় তার বিরুদ্ধাচরণ করেন। তাকে তার থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার পিতা ফিরে আসলেন না। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে বললেনঃ “আপনি কি প্রতিমাগুলোকে মাবুদ বানিয়ে নিয়েছেন? আমি তো আপনার এবং আপনার অনুসারীদেরকে বড়ই বিভ্রান্তির মধ্যে পাচ্ছি?” তাদেরকে মূর্খ ও বিভ্রান্ত বলে ঘোষণা করা প্রত্যেক স্থিরবুদ্ধির অধিকারীর জন্যে একটা স্পষ্ট দলীল।মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেন- কুরআন হাকীমে ইবরাহীম (আঃ)-এর বর্ণনার প্রতি লক্ষ্য কর। তিনি ছিলেন সত্যের সাধক ও নবী। তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেন- “হে পিতঃ! এমন বস্তুর উপাসনা করো না যে শুনেও না, দেখেও না এবং তোমাদের কোন কাজেও আসে না। হে পিতঃ, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন জ্ঞান লাভ করেছি, যে জ্ঞান আপনার নেই। কাজেই আপনি আমার কথা শুনুন। আমি আপনাকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করবো। আব্বা! শয়তানের উপাসনা করবেন না। শয়তান আল্লাহর শত্রু। হে পিতঃ, আমার ভয় হচ্ছে যে, আপনার উপর আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং আপনি শয়তানের বন্ধুতে পরিণত হয়ে যাবেন।” তখন আযর উত্তরে বললোঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি কি আমার মা'বুদগুলো থেকে বিমুখ? তুমি যদি এই কাজ থেকে বিরত না হও তবে আমি তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করবো এবং তোমাকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করবো।” ইবরাহীম (আঃ) বললেনঃ “আমি আপনাকে সালাম জানাচ্ছি। আপনার জন্যে আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো! আমার প্রভু অত্যন্ত দয়ালু। কিন্তু আমিও আপনাকে ছেড়ে দিলাম এবং ছেড়ে দিলাম আপনার কপোল কল্পিত মা'বুদগুলোকেও। আমার প্রভুর সঙ্গেই আমি সংযোগ স্থাপন করবো। আমি আশা রাখি যে, আমার প্রভু আমাকে বিমুখ করবেন না।” তখন থেকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। অতঃপর তার পিতা যখন শিরকের উপরই মারা গেল এবং তিনি জানতে পারলেন যে, মুশরিকের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কোন কাজে আসে না তখন তিনি তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা ছেড়ে দিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ইবরাহীম (আঃ)-এর তার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা শুধু এই কারণেই ছিল যে, সে তার পিতার সাথে ওয়াদা করেছিল। কিন্তু যখন সে জানতে পারলো যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো, নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিল আবিদ ও সহনশীল।” বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার সাথে মিলিত হবেন। তখন আযর তাকে বলবেঃ “হে আমার প্রিয় পুত্র! আজ আমি তোমার অবাধ্যাচরণ করবো না।” তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় প্রভুর নিকট আরয করবেন- “হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে কিয়ামতের দিন লজ্জিত করবেন না। এই ওয়াদা কি আপনি আমার সাথে করেননি? আজ আমার পিতা যে অবস্থায় আছে এর চেয়ে লজ্জাজনক অবস্থা আমার জন্যে আর কি হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা তখন ইবরাহীম (আঃ)-কে বলবেনঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তোমার পিছন দিকে ফিরে তাকাও।” তখন তিনি স্বীয় পিতাকে দেখার পরিবর্তে একটা বেজীকে দেখতে পাবেন, যার সারা দেহ কাদাময় হয়ে থাকবে। আর দেখা যাবে যে, তার পা ধরে টেনে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাই মহান আল্লাহ বলেন-আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের সৃষ্টি অবলোকন করিয়েছি এবং তার দৃষ্টিতে এই দলীল কায়েম করেছি যে, কিভাবে মহামহিমান্বিত আল্লাহর একত্ববাদের উপর যমীন ও আসমান সৃষ্টির ভিত্তি স্থাপিত রয়েছে। এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন প্রতিপালক নেই। এরূপ দৃষ্টির প্রমাণকেই ‘মালাক্ত’ বলা হয়। দৃষ্টির প্রমাণ সর্বপ্রথম লাভ করেছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্যের প্রতি লক্ষ্য করে না (অর্থাৎ এই বিষয়ে গবেষণা করে না)?" (৭:১৮৫) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি যমীনের মধ্যকার সৃষ্টির প্রতি (শিক্ষা গ্রহণের) দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না? তাদের সামনের, পিছনের, আকাশের ও যমীনের প্রতি চিন্তাযুক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করা উচিত (তাহলে তারা বুঝতে পারবে) আমি যদি ইচ্ছা করি তবে তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিতে পারি এবং ইচ্ছা করলে তাদের উপর আকাশের খণ্ড নিক্ষেপ করতে পারি, অবশ্যই আগ্রহশীল ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের জন্যে এতে নিদর্শনসমূহ রয়েছে।” (৩৪:৯) কিন্তু (আরবী) সম্পর্কে ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দৃষ্টির সামনে আকাশ ফেটে গিয়েছিল এবং তিনি আকাশের সমুদয় জিনিসই দেখতে পাচ্ছিলেন। এমন কি তাঁর দৃষ্টি আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং সাতটি যমীনও তাঁর সামনে খুলে যায়, আর তিনি যমীনের ভিতরের জিনিসগুলো দেখতে থাকেন। কেউ কেউ এই বিষয়টিকে আরও একটু বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাঁরা বলেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) লোকদের পাপগুলোকেও দেখতে পাচ্ছিলেন এবং ঐ পাপীদের জন্যে তিনি বদ দু'আ করতে শুরু করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বলেছিলেন- “হে ইবরাহীম (আঃ)! আমি তাদের উপর তোমার চেয়ে বহুগুণে বেশী দয়ালু। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা হয়তো তাওবা করে আমার দিকে ফিরে আসবে।”এই আয়াতের ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় ক্ষমতাবলে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত জিনিস দেখিয়ে দেন। কোন কিছুই তার কাছে গোপন ছিল না। যখন তিনি পাপীদের প্রতি লা'নত বর্ষণ করতে শুরু করেন তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলেনঃ না, এরূপ করা চলবে না।' এভাবে মহান আল্লাহ তাঁকে বদ দু'আ করা থেকে বিরত রাখেন। সুতরাং হতে পারে যে, তাঁর চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে গিয়েছিল এবং সব কিছুই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আবার এও হতে পারে যে, তার অন্তর্চক্ষু খুলে গিয়েছিল এবং ওর দ্বারাই তিনি সবকিছু অবলোকন করেছিলেন। আর তিনি আল্লাহ তাআলার প্রকাশিত হিকমত এবং অকাট্য প্রমাণ সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন।যেমন ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তিরমিযী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- স্বপ্নে আল্লাহ তা'আলা অতি সুন্দর আকৃতিতে আমার কাছে হাযির হন এবং আমাকে বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! মালায়ে আ’লাতে কি নিয়ে আলোচনা চলছে?” আমি বললাম, হে আমার প্রভু! আমি তো জানি না। তিনি তখন তাঁর হাতখানা আমার দু'কাঁধের মধ্যভাগে রাখলেন, আমি তার অঙ্গুলিগুলোর শীতলতা আমার বক্ষে অনুভব করলাম । তখন সমস্ত জিনিস আমার সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়লো এবং আমি সবকিছু দেখতে লাগলাম। আল্লাহ পাকের (আরবী) এই উক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এখানে (আরবী) টি অতিরিক্ত। আয়াতের প্রকৃতরূপ হবে (আরবী)-এই মত। অর্থাৎ অক্ষরটি বাদ দিতে হবে। যেমন (আরবী) (৬:৫৫)-এই আয়াতে -এর পরেও অক্ষরটি অতিরিক্ত রয়েছে। এখানে শুধু পরবর্তী কথার ভিত্তির উপর কথা উঠানো হয়েছে। অর্থাৎ “আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর প্রকাশ করে দিয়েছি, যেন সে দেখে নেয় এবং বিশ্বাসও করে নেয়।আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ যখন অন্ধকার রাত এসে গেল এবং (আঃ) তারকা দেখতে পেলো তখন বললো- এটা আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটা যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- যা অস্তমিত হয় তাকে তো আমি পছন্দ করি না এবং যা অদৃশ্য হয়ে যায় সে তো প্রতিপালক হতে পারে না। |কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রভু যিনি হবেন তিনি যে ধ্বংস ও নষ্ট হতে পারেন না এটা হযরত ইবরাহীম (আঃ) জানতে পারলেন। আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর যখন ইবরাহীম (আঃ) চন্দ্রকে উজ্জ্বল দেখলো তখন বলল- এটাই আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটাও যখন ডুবে গেল তখন সে বললো- এটাও আমার প্রভু নয়। যদি সত্য প্রভু আমাকে পথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবো।মহান আল্লাহ বলেনঃ তারপর ইবরাহীম (আঃ) যখন সূর্যকে উদিত হতে দেখলো তখন বললোঃ এটা উজ্জ্বল ও বৃহত্তম। সুতরাং এটাই আমার প্রভু। কিন্তু ওটাও যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের শিরকীর সাথে আমার আদৌ কোন সম্পর্কে নেই, আমি মুক্ত। আমি তো আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে ফিরাচ্ছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। আমি এখন সম্পূর্ণরূপে তাঁরই হয়ে গেলাম এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি না। আমি আমার ইবাদত তারই জন্যে নির্দিষ্ট করছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, অথচ ও দু’টো সৃষ্টি করার সময় তাঁর সামনে কোন নমুনা ছিল না। এভাবে আমি শিরক থেকে তাওহীদের দিকে ফিরে আসছি।এই স্থানে মুফাসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে যে, এটা কি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর গভীর চিন্তা ও গবেষণার স্থান, কিংবা কওমের সাথে বচসার স্থান? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিম্নের উক্তি দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন- “যদি আমার প্রভু আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট কওমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।” মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এই কথা হযরত ইবরাহীম (আঃ) ঐ সময় বলেছিলেন যেই সময় তিনি প্রথমবার ঐ গুহা হতে বাইরে এসেছিলেন যেখানে তার মা তাকে প্রসব করেছিলেন। কেননা নমরূদ ইবনে কিআনের ভয়ে প্রসবের সময় তাঁর মা ঐ গুহার মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন। জ্যোতির্বিদরা নমরূদকে বলেছিলঃ “এমন এক শিশু জন্মগ্রহণ করবে যার হাতে আপনার রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।' তখন সে ঘোষণা করেছিল যে, ঐ বছর যত পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সবাইকে যেন হত্যা করে দেয়া হয়। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মা যখন গর্ভবতী হন এবং তার প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসে তখন তিনি শহরের বাইরে এক গুহার ভিতরে প্রবেশ করেন। সেখানেই তিনি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রসব করেন এবং ওখানেই তাকে একাকী রেখে চলে আসেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক এখানে এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন এবং এর উপর ভিত্তি করেই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাস্সিরগণও ওগুলো বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সত্য কথা এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর তাঁর কওমের কাছে এটা বর্ণনা করা তর্কের খাতিরেই ছিল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তাদের বিশ্বাসকে বাতিল সাব্যস্ত করা যে, তারা যেসব প্রতিমার পূজা করছে সেগুলো বাজে ও ভিত্তিহীন। সূচনাতেই তিনি প্রতিমাপূজা সম্পর্কে স্বীয় পিতার ভুল প্রকাশ করছেন। প্রতিমাগুলোকে তারা মালাইকাদের আকারে বানিয়ে রেখেছিল। ওদের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, ঐ প্রতিমাগুলো মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার সামনে তাদের জন্যে সুপারিশ করবে। অথচ ঐ মূর্তিগুলো স্বয়ং তাদের দৃষ্টিতেও ছিল ঘৃণ্য ও তুচ্ছ । কিন্তু তারা যেন মালাইকাদের ইবাদত করে এই চাচ্ছিল যে, তারা জীবিকা এবং অন্যান্য প্রয়োজনের ব্যাপারে তাদের জন্যে আল্লাহ তাআলার কাছে সুপারিশ করবে। এই স্থলে তাদের ভুল ও পথভ্রষ্টতা প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রতিমাগুলো সাতটি নক্ষত্রের নামে ছিল। সেগুলো হচ্ছে কামার’, ‘আতারিদ’, ‘যুহরা’, ‘শামস', ‘মিররীখ’, ‘মুশতারী এবং যাহল'। সবচেয়ে বেশী উজ্জ্বল নক্ষত্র হচ্ছে শামস। তারপর কামার'। সমস্ত তারকার মধ্যে উজ্জ্বলতম হচ্ছে ‘যুহরা'। হযরত ইবরাহীম (আঃ) সর্বপ্রথম এই যুহরা' তারকা থেকেই শুরু করলেন। তিনি তার কওমের লোকদেরকে বললেন যে, এই তারকাগুলোর মধ্যে মাবুদ হওয়ার যোগ্যতা নেই। এরা তো দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। তাদের গতি সীমিত। তাদের স্বেচ্ছায় ডানে-বামে যাবার কোন অধিকার নেই। এগুলো তো হচ্ছে আকাশের নক্ষত্র যেগুলোকে আল্লাহ পাক আলো দানকারী রূপে সৃষ্টি করেছেন এবং এতে তার বিশেষ নৈপুণ্য নিহিত রয়েছে। এরা তো পূর্ব দিক থেকে বের হয় এবং পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে পথ অতিক্রম করে চক্ষু হতে অদৃশ্য হয়ে যায়। পরবর্তী রাত্রে পুনরায় প্রকাশিত হয়। সুতরাং এই বস্তুগুলো তো হচ্ছে বাঁধা ধরা অভ্যাসের দাস। কাজেই এদের মা'বুদ হওয়া কিরূপে সম্ভব? এরপর তিনি কামার’ -এর দিকে আসলেন এবং যুহরা’ সম্পর্কে যা বলেছিলেন এর সম্পর্কেও সেই কথাই বললেন। তারপর তিনি শামস' -এর বর্ণনা দিলেন। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি এটাই প্রমাণ করলেন যে, এই উজ্জ্বলতম নক্ষত্রগুলোর মধ্যে মা’বৃদ বনবার যোগ্যতা মোটেই নেই। অতঃপর তিনি কওমের লোককে সম্বোধন করে বললেনঃ হে আমার কওম! তোমরা যাদেরকে মাবুদ রূপে কল্পনা করছো আমি এর থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। যদি এরা মাবুদ হয় তবে তোমরা এদেরকে সাহায্যকারী বানিয়ে নিয়ে আমার বিরুদ্ধাচরণ কর এবং আমার প্রতি মোটেই অনুগ্রহ প্রদর্শন করো না। আমি তো আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তার একজন দাসে পরিণত হয়েছি। আমি তোমাদের মত শিরকের পাপে লিপ্ত হবো না। আমি এই বস্তগুলোর সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করবো যিনি এইগুলোর পরিচালক ও নিয়ন্ত্রণকারী । প্রত্যেক বস্তুর আনুগত্যের সম্পর্ক তাঁরই হাতে রয়েছে। যেমন তিনি বলেন“তোমাদের প্রভু তো একমাত্র তিনিই যিনি ছয় দিনে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তিনি রাতকে দিন দ্বারা এবং দিনকে রাত দ্বারা ঢেকে দেন, একে অপরের পিছনে আসা যাওয়া করছে, সূর্য, চন্দ্র এবং তারকারাজি সবই তার অনুগত ও বাধ্য, সবই তাঁর হুকুমের দাস, তিনি বিশ্বপ্রভু ও বড় কল্যাণময়।” এটা কিরূপে সম্ভব হতে পারে যে, এই ব্যাপারে ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা ভাবনা করবেন এবং প্রথমে শিরকের কল্পনা তাঁর মনে বদ্ধমূল থাকবে! অথচ আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্পর্কে বলে দিচ্ছেন- “আমি প্রথম থেকেই ইবরাহীম (আঃ)-কে হিদায়াত দান করেছিলাম। আমি তাকে খুব ভালরূপেই জানি। সে স্বয়ং নিজের পিতা ও কওমের লোককে বলেছিলঃ এগুলো কেমন মূর্তি যেগুলোর তোমরা উপাসনা করছো?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ “সে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতকারী এবং সে হচ্ছে আল্লাহর বিশিষ্ট ও মনোনীত বান্দা। সে কখনও শিরক করেনি। সে আল্লাহর নিয়ামতের উপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছেন এবং সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। দুনিয়াতেও আল্লাহ তাকে পুণ্য ও কল্যাণ দান করেছেন এবং পরকালেও সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে অহী করছি যে, তুমি মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ করবে। সে ছিল একনিষ্ঠ, সে মুশরিক ছিল না। মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও—আমার প্রতিপালক আমাকে সরল সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন, যার উপর ইবরাহীম প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।”সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু ফিতরাত বা প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে।” নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ বীয় বান্দাকে হানীফ’ বা একনিষ্ঠরূপে সৃষ্টি করেছেন, অর্থাৎ তারা তাঁরই হয়ে থাকবে।” তিনি আরও বলেছেনঃ “আল্লাহর ফিতরাত হচ্ছে ওটাই যার উপর মানুষের সৃষ্টিকার্য সম্পন্ন হয়েছে এবং যে জিনিসকে যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে ওর উপর কোন পরিবর্তন আসতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) (৭:১৭২)। একটি উক্তির রীতি হিসেবে যার অর্থ এটাই। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) (৩০:৩০) যার বর্ণনা পরে আসবে। অর্থাৎ “মানুষকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর ফিতরাতের উপর সৃষ্টি করেছেন, তাঁর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই।” যখন আল্লাহর আনুগত্যের ফিতরাত ও দাসত্বের স্বীকারোক্তি সব কিছুই মাখলকের ব্যাপারে প্রযোজ্য তখন ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ)-এর ব্যাপারে এটা প্রযোজ্য হবে না কেন? আর তিনি মহান আল্লাহর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণকারী হতে পারেন কিরূপে? তিনি তো ভদ্র প্রকৃতির দিক দিয়ে উত্তম অস্তিত্ব ছিলেন! বরং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ঐ স্থলে তিনি স্বীয় কওমের সাথে। তর্ক ও বচসা করছিলেন এবং যে শিরকে তারা জড়িত ছিল, তাদের সেই ধারণা ও কল্পনাকে দলীল প্রমাণের সাহায্যে দূর করে দিচ্ছিলেন। এ কথা নয় যে, তিনি স্বয়ং সন্দেহে পতিত ছিলেন।
আল-আনআম 6:79
৭৪-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম আযর ছিল না। বরং তার নাম ছিল তারেখ । আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী)-এই সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে আযর দ্বারা মূর্তিকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবরাহিম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ, মাতার নাম ছিল শানী এবং স্ত্রীর নাম ছিল সারা। আর হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাতার নাম ছিল হাজেরা। তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ক্রীতদাসী। উলামায়ে নাসাবের (বংশ তালিকা যাদের জানা আছে) অধিকাংশের এটাই উক্তি। আর ছিল একটা মূর্তির নাম। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতা এই মূর্তির খাদেম ছিল বলে সে এই নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবেচেয়ে ভাল জানেন।ইবনে জারীর প্রমুখ গুরুজনেরা বলেন যে, ঐ যুগের লোকদের পরিভাষায় ‘আযর' শব্দটি গালি ও দূষণীয় কথা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে বক্রতা। ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বলেন যে, মু'তামির ইবনে সুলাইমান বর্ণনা করেছেন, আমি আমার পিতা থেকে শুনেছি যে, তিনি আযর’ শব্দের অর্থ বক্তৃতা বলতেন এবং এটা হচ্ছে একটা শক্ত কথা যা হযরত ইবরাহীম (আঃ) মুখে উচ্চারণ করেছিলেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “সঠিক কথা হচ্ছে এটাই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল তারেখ । তারপর তিনি বলেন যে, তার দুটো নাম ছিল, যেমন অধিকাংশ লোকের দু'টো নাম থাকে। অথবা হতে পারে যে, একটি ছিল প্রকৃত নাম এবং আর একটি ছিল উপাধি ও পরিচিতি হিসাবে নাম। এটাই একটা উত্তম কারণ হতে পারে। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত হাসান বসরী (রঃ) ও হযরত আবু ইয়াযীদ মাদানী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে-হে আযর! তুমি কি প্রতিমাগুলোকে মা'বুদ রূপে সাব্যস্ত করছো? এখানে যেন আযরকে সম্বোধন করা হয়েছে। জমহুর উলামা (আরবী) শব্দকে (আরবী) বা যবর দিয়ে পড়েছেন। হাসান বসরী (রঃ)-এর মতে একে পেশ দিয়ে পড়া হয়নি। এর ভাবার্থ এই হল যে, এই শব্দটি হচ্ছে মা'রেফা ও আ’লাম। এই হিসেবে একে (আরবী) মনে করা হবে এবং এটা যেন (আরবী) হতে (আরবী) হয়েছে এবং এর উপর ভিত্তি করেই এতে যবর দেয়া হয়েছে। অথবা একে (আরবী) মনে করা হবে। আর এটাই বেশী সঠিক হতে পারে। কতক লোক একে (আরবী) বলে থাকেন, যেমন (আরবী) ও (আরবী) শব্দগুলো (আরবী) রূপে ব্যবহৃত। কিন্তু কতক লোকের ধারণা এই যে, ওটা (আরবী) হওয়ার ভিত্তিতে (আরবী) হয়েছে। কেননা (আরবী)-এর প্রকৃত রূপ (আরবী)-এই রকম হবে। অর্থাৎ হে পিতঃ! আযর মূর্তিগুলোকে কি আপনি মা'বূদ বানিয়ে নিচ্ছেন?' কিন্তু (আরবী)-এর দিক দিয়ে এই উক্তিটি বহু দূরের। কেননা, যে অক্ষরটি (আরবী)-এর পরে হয় সেটি ওর পূর্ববর্তী অক্ষরের উপর আমল করে না। কারণ এই (আরবী)-এর জন্যে তো (আরবী) হওয়া চাই। ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ এর সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং আরবী ব্যাকরণে এটাই প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। উদ্দেশ্য এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতাকে উপদেশ দেন। মূর্তিপূজায় তার বিরুদ্ধাচরণ করেন। তাকে তার থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার পিতা ফিরে আসলেন না। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে বললেনঃ “আপনি কি প্রতিমাগুলোকে মাবুদ বানিয়ে নিয়েছেন? আমি তো আপনার এবং আপনার অনুসারীদেরকে বড়ই বিভ্রান্তির মধ্যে পাচ্ছি?” তাদেরকে মূর্খ ও বিভ্রান্ত বলে ঘোষণা করা প্রত্যেক স্থিরবুদ্ধির অধিকারীর জন্যে একটা স্পষ্ট দলীল।মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেন- কুরআন হাকীমে ইবরাহীম (আঃ)-এর বর্ণনার প্রতি লক্ষ্য কর। তিনি ছিলেন সত্যের সাধক ও নবী। তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেন- “হে পিতঃ! এমন বস্তুর উপাসনা করো না যে শুনেও না, দেখেও না এবং তোমাদের কোন কাজেও আসে না। হে পিতঃ, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন জ্ঞান লাভ করেছি, যে জ্ঞান আপনার নেই। কাজেই আপনি আমার কথা শুনুন। আমি আপনাকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করবো। আব্বা! শয়তানের উপাসনা করবেন না। শয়তান আল্লাহর শত্রু। হে পিতঃ, আমার ভয় হচ্ছে যে, আপনার উপর আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং আপনি শয়তানের বন্ধুতে পরিণত হয়ে যাবেন।” তখন আযর উত্তরে বললোঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি কি আমার মা'বুদগুলো থেকে বিমুখ? তুমি যদি এই কাজ থেকে বিরত না হও তবে আমি তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করবো এবং তোমাকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করবো।” ইবরাহীম (আঃ) বললেনঃ “আমি আপনাকে সালাম জানাচ্ছি। আপনার জন্যে আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো! আমার প্রভু অত্যন্ত দয়ালু। কিন্তু আমিও আপনাকে ছেড়ে দিলাম এবং ছেড়ে দিলাম আপনার কপোল কল্পিত মা'বুদগুলোকেও। আমার প্রভুর সঙ্গেই আমি সংযোগ স্থাপন করবো। আমি আশা রাখি যে, আমার প্রভু আমাকে বিমুখ করবেন না।” তখন থেকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। অতঃপর তার পিতা যখন শিরকের উপরই মারা গেল এবং তিনি জানতে পারলেন যে, মুশরিকের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কোন কাজে আসে না তখন তিনি তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা ছেড়ে দিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ইবরাহীম (আঃ)-এর তার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা শুধু এই কারণেই ছিল যে, সে তার পিতার সাথে ওয়াদা করেছিল। কিন্তু যখন সে জানতে পারলো যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো, নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিল আবিদ ও সহনশীল।” বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার সাথে মিলিত হবেন। তখন আযর তাকে বলবেঃ “হে আমার প্রিয় পুত্র! আজ আমি তোমার অবাধ্যাচরণ করবো না।” তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় প্রভুর নিকট আরয করবেন- “হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে কিয়ামতের দিন লজ্জিত করবেন না। এই ওয়াদা কি আপনি আমার সাথে করেননি? আজ আমার পিতা যে অবস্থায় আছে এর চেয়ে লজ্জাজনক অবস্থা আমার জন্যে আর কি হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা তখন ইবরাহীম (আঃ)-কে বলবেনঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! তুমি তোমার পিছন দিকে ফিরে তাকাও।” তখন তিনি স্বীয় পিতাকে দেখার পরিবর্তে একটা বেজীকে দেখতে পাবেন, যার সারা দেহ কাদাময় হয়ে থাকবে। আর দেখা যাবে যে, তার পা ধরে টেনে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাই মহান আল্লাহ বলেন-আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের সৃষ্টি অবলোকন করিয়েছি এবং তার দৃষ্টিতে এই দলীল কায়েম করেছি যে, কিভাবে মহামহিমান্বিত আল্লাহর একত্ববাদের উপর যমীন ও আসমান সৃষ্টির ভিত্তি স্থাপিত রয়েছে। এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন প্রতিপালক নেই। এরূপ দৃষ্টির প্রমাণকেই ‘মালাক্ত’ বলা হয়। দৃষ্টির প্রমাণ সর্বপ্রথম লাভ করেছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্যের প্রতি লক্ষ্য করে না (অর্থাৎ এই বিষয়ে গবেষণা করে না)?" (৭:১৮৫) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি যমীনের মধ্যকার সৃষ্টির প্রতি (শিক্ষা গ্রহণের) দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না? তাদের সামনের, পিছনের, আকাশের ও যমীনের প্রতি চিন্তাযুক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করা উচিত (তাহলে তারা বুঝতে পারবে) আমি যদি ইচ্ছা করি তবে তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিতে পারি এবং ইচ্ছা করলে তাদের উপর আকাশের খণ্ড নিক্ষেপ করতে পারি, অবশ্যই আগ্রহশীল ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের জন্যে এতে নিদর্শনসমূহ রয়েছে।” (৩৪:৯) কিন্তু (আরবী) সম্পর্কে ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দৃষ্টির সামনে আকাশ ফেটে গিয়েছিল এবং তিনি আকাশের সমুদয় জিনিসই দেখতে পাচ্ছিলেন। এমন কি তাঁর দৃষ্টি আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং সাতটি যমীনও তাঁর সামনে খুলে যায়, আর তিনি যমীনের ভিতরের জিনিসগুলো দেখতে থাকেন। কেউ কেউ এই বিষয়টিকে আরও একটু বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাঁরা বলেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) লোকদের পাপগুলোকেও দেখতে পাচ্ছিলেন এবং ঐ পাপীদের জন্যে তিনি বদ দু'আ করতে শুরু করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বলেছিলেন- “হে ইবরাহীম (আঃ)! আমি তাদের উপর তোমার চেয়ে বহুগুণে বেশী দয়ালু। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা হয়তো তাওবা করে আমার দিকে ফিরে আসবে।”এই আয়াতের ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় ক্ষমতাবলে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে আসমান ও যমীনের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত জিনিস দেখিয়ে দেন। কোন কিছুই তার কাছে গোপন ছিল না। যখন তিনি পাপীদের প্রতি লা'নত বর্ষণ করতে শুরু করেন তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলেনঃ না, এরূপ করা চলবে না।' এভাবে মহান আল্লাহ তাঁকে বদ দু'আ করা থেকে বিরত রাখেন। সুতরাং হতে পারে যে, তাঁর চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে গিয়েছিল এবং সব কিছুই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আবার এও হতে পারে যে, তার অন্তর্চক্ষু খুলে গিয়েছিল এবং ওর দ্বারাই তিনি সবকিছু অবলোকন করেছিলেন। আর তিনি আল্লাহ তাআলার প্রকাশিত হিকমত এবং অকাট্য প্রমাণ সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন।যেমন ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং তিরমিযী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- স্বপ্নে আল্লাহ তা'আলা অতি সুন্দর আকৃতিতে আমার কাছে হাযির হন এবং আমাকে বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! মালায়ে আ’লাতে কি নিয়ে আলোচনা চলছে?” আমি বললাম, হে আমার প্রভু! আমি তো জানি না। তিনি তখন তাঁর হাতখানা আমার দু'কাঁধের মধ্যভাগে রাখলেন, আমি তার অঙ্গুলিগুলোর শীতলতা আমার বক্ষে অনুভব করলাম । তখন সমস্ত জিনিস আমার সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়লো এবং আমি সবকিছু দেখতে লাগলাম। আল্লাহ পাকের (আরবী) এই উক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এখানে (আরবী) টি অতিরিক্ত। আয়াতের প্রকৃতরূপ হবে (আরবী)-এই মত। অর্থাৎ অক্ষরটি বাদ দিতে হবে। যেমন (আরবী) (৬:৫৫)-এই আয়াতে -এর পরেও অক্ষরটি অতিরিক্ত রয়েছে। এখানে শুধু পরবর্তী কথার ভিত্তির উপর কথা উঠানো হয়েছে। অর্থাৎ “আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর প্রকাশ করে দিয়েছি, যেন সে দেখে নেয় এবং বিশ্বাসও করে নেয়।আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ যখন অন্ধকার রাত এসে গেল এবং (আঃ) তারকা দেখতে পেলো তখন বললো- এটা আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটা যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- যা অস্তমিত হয় তাকে তো আমি পছন্দ করি না এবং যা অদৃশ্য হয়ে যায় সে তো প্রতিপালক হতে পারে না। |কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রভু যিনি হবেন তিনি যে ধ্বংস ও নষ্ট হতে পারেন না এটা হযরত ইবরাহীম (আঃ) জানতে পারলেন। আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর যখন ইবরাহীম (আঃ) চন্দ্রকে উজ্জ্বল দেখলো তখন বলল- এটাই আমার প্রতিপালক। কিন্তু ওটাও যখন ডুবে গেল তখন সে বললো- এটাও আমার প্রভু নয়। যদি সত্য প্রভু আমাকে পথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবো।মহান আল্লাহ বলেনঃ তারপর ইবরাহীম (আঃ) যখন সূর্যকে উদিত হতে দেখলো তখন বললোঃ এটা উজ্জ্বল ও বৃহত্তম। সুতরাং এটাই আমার প্রভু। কিন্তু ওটাও যখন অস্তমিত হয়ে গেল তখন সে বললো- হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের শিরকীর সাথে আমার আদৌ কোন সম্পর্কে নেই, আমি মুক্ত। আমি তো আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে ফিরাচ্ছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। আমি এখন সম্পূর্ণরূপে তাঁরই হয়ে গেলাম এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি না। আমি আমার ইবাদত তারই জন্যে নির্দিষ্ট করছি যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, অথচ ও দু’টো সৃষ্টি করার সময় তাঁর সামনে কোন নমুনা ছিল না। এভাবে আমি শিরক থেকে তাওহীদের দিকে ফিরে আসছি।এই স্থানে মুফাসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে যে, এটা কি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর গভীর চিন্তা ও গবেষণার স্থান, কিংবা কওমের সাথে বচসার স্থান? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিম্নের উক্তি দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন- “যদি আমার প্রভু আমাকে সুপথ প্রদর্শন না করেন তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট কওমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।” মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, এই কথা হযরত ইবরাহীম (আঃ) ঐ সময় বলেছিলেন যেই সময় তিনি প্রথমবার ঐ গুহা হতে বাইরে এসেছিলেন যেখানে তার মা তাকে প্রসব করেছিলেন। কেননা নমরূদ ইবনে কিআনের ভয়ে প্রসবের সময় তাঁর মা ঐ গুহার মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন। জ্যোতির্বিদরা নমরূদকে বলেছিলঃ “এমন এক শিশু জন্মগ্রহণ করবে যার হাতে আপনার রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।' তখন সে ঘোষণা করেছিল যে, ঐ বছর যত পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সবাইকে যেন হত্যা করে দেয়া হয়। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মা যখন গর্ভবতী হন এবং তার প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসে তখন তিনি শহরের বাইরে এক গুহার ভিতরে প্রবেশ করেন। সেখানেই তিনি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রসব করেন এবং ওখানেই তাকে একাকী রেখে চলে আসেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক এখানে এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন এবং এর উপর ভিত্তি করেই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাস্সিরগণও ওগুলো বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সত্য কথা এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর তাঁর কওমের কাছে এটা বর্ণনা করা তর্কের খাতিরেই ছিল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তাদের বিশ্বাসকে বাতিল সাব্যস্ত করা যে, তারা যেসব প্রতিমার পূজা করছে সেগুলো বাজে ও ভিত্তিহীন। সূচনাতেই তিনি প্রতিমাপূজা সম্পর্কে স্বীয় পিতার ভুল প্রকাশ করছেন। প্রতিমাগুলোকে তারা মালাইকাদের আকারে বানিয়ে রেখেছিল। ওদের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, ঐ প্রতিমাগুলো মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার সামনে তাদের জন্যে সুপারিশ করবে। অথচ ঐ মূর্তিগুলো স্বয়ং তাদের দৃষ্টিতেও ছিল ঘৃণ্য ও তুচ্ছ । কিন্তু তারা যেন মালাইকাদের ইবাদত করে এই চাচ্ছিল যে, তারা জীবিকা এবং অন্যান্য প্রয়োজনের ব্যাপারে তাদের জন্যে আল্লাহ তাআলার কাছে সুপারিশ করবে। এই স্থলে তাদের ভুল ও পথভ্রষ্টতা প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রতিমাগুলো সাতটি নক্ষত্রের নামে ছিল। সেগুলো হচ্ছে কামার’, ‘আতারিদ’, ‘যুহরা’, ‘শামস', ‘মিররীখ’, ‘মুশতারী এবং যাহল'। সবচেয়ে বেশী উজ্জ্বল নক্ষত্র হচ্ছে শামস। তারপর কামার'। সমস্ত তারকার মধ্যে উজ্জ্বলতম হচ্ছে ‘যুহরা'। হযরত ইবরাহীম (আঃ) সর্বপ্রথম এই যুহরা' তারকা থেকেই শুরু করলেন। তিনি তার কওমের লোকদেরকে বললেন যে, এই তারকাগুলোর মধ্যে মাবুদ হওয়ার যোগ্যতা নেই। এরা তো দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। তাদের গতি সীমিত। তাদের স্বেচ্ছায় ডানে-বামে যাবার কোন অধিকার নেই। এগুলো তো হচ্ছে আকাশের নক্ষত্র যেগুলোকে আল্লাহ পাক আলো দানকারী রূপে সৃষ্টি করেছেন এবং এতে তার বিশেষ নৈপুণ্য নিহিত রয়েছে। এরা তো পূর্ব দিক থেকে বের হয় এবং পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে পথ অতিক্রম করে চক্ষু হতে অদৃশ্য হয়ে যায়। পরবর্তী রাত্রে পুনরায় প্রকাশিত হয়। সুতরাং এই বস্তুগুলো তো হচ্ছে বাঁধা ধরা অভ্যাসের দাস। কাজেই এদের মা'বুদ হওয়া কিরূপে সম্ভব? এরপর তিনি কামার’ -এর দিকে আসলেন এবং যুহরা’ সম্পর্কে যা বলেছিলেন এর সম্পর্কেও সেই কথাই বললেন। তারপর তিনি শামস' -এর বর্ণনা দিলেন। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি এটাই প্রমাণ করলেন যে, এই উজ্জ্বলতম নক্ষত্রগুলোর মধ্যে মা’বৃদ বনবার যোগ্যতা মোটেই নেই। অতঃপর তিনি কওমের লোককে সম্বোধন করে বললেনঃ হে আমার কওম! তোমরা যাদেরকে মাবুদ রূপে কল্পনা করছো আমি এর থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। যদি এরা মাবুদ হয় তবে তোমরা এদেরকে সাহায্যকারী বানিয়ে নিয়ে আমার বিরুদ্ধাচরণ কর এবং আমার প্রতি মোটেই অনুগ্রহ প্রদর্শন করো না। আমি তো আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তার একজন দাসে পরিণত হয়েছি। আমি তোমাদের মত শিরকের পাপে লিপ্ত হবো না। আমি এই বস্তগুলোর সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করবো যিনি এইগুলোর পরিচালক ও নিয়ন্ত্রণকারী । প্রত্যেক বস্তুর আনুগত্যের সম্পর্ক তাঁরই হাতে রয়েছে। যেমন তিনি বলেন“তোমাদের প্রভু তো একমাত্র তিনিই যিনি ছয় দিনে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তিনি রাতকে দিন দ্বারা এবং দিনকে রাত দ্বারা ঢেকে দেন, একে অপরের পিছনে আসা যাওয়া করছে, সূর্য, চন্দ্র এবং তারকারাজি সবই তার অনুগত ও বাধ্য, সবই তাঁর হুকুমের দাস, তিনি বিশ্বপ্রভু ও বড় কল্যাণময়।” এটা কিরূপে সম্ভব হতে পারে যে, এই ব্যাপারে ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা ভাবনা করবেন এবং প্রথমে শিরকের কল্পনা তাঁর মনে বদ্ধমূল থাকবে! অথচ আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্পর্কে বলে দিচ্ছেন- “আমি প্রথম থেকেই ইবরাহীম (আঃ)-কে হিদায়াত দান করেছিলাম। আমি তাকে খুব ভালরূপেই জানি। সে স্বয়ং নিজের পিতা ও কওমের লোককে বলেছিলঃ এগুলো কেমন মূর্তি যেগুলোর তোমরা উপাসনা করছো?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ “সে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতকারী এবং সে হচ্ছে আল্লাহর বিশিষ্ট ও মনোনীত বান্দা। সে কখনও শিরক করেনি। সে আল্লাহর নিয়ামতের উপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছেন এবং সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। দুনিয়াতেও আল্লাহ তাকে পুণ্য ও কল্যাণ দান করেছেন এবং পরকালেও সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে অহী করছি যে, তুমি মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ করবে। সে ছিল একনিষ্ঠ, সে মুশরিক ছিল না। মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও—আমার প্রতিপালক আমাকে সরল সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন, যার উপর ইবরাহীম প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।”সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক শিশু ফিতরাত বা প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে।” নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ বীয় বান্দাকে হানীফ’ বা একনিষ্ঠরূপে সৃষ্টি করেছেন, অর্থাৎ তারা তাঁরই হয়ে থাকবে।” তিনি আরও বলেছেনঃ “আল্লাহর ফিতরাত হচ্ছে ওটাই যার উপর মানুষের সৃষ্টিকার্য সম্পন্ন হয়েছে এবং যে জিনিসকে যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে ওর উপর কোন পরিবর্তন আসতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেন- (আরবী) (৭:১৭২)। একটি উক্তির রীতি হিসেবে যার অর্থ এটাই। যেমন তিনি বলেছেন- (আরবী) (৩০:৩০) যার বর্ণনা পরে আসবে। অর্থাৎ “মানুষকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর ফিতরাতের উপর সৃষ্টি করেছেন, তাঁর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই।” যখন আল্লাহর আনুগত্যের ফিতরাত ও দাসত্বের স্বীকারোক্তি সব কিছুই মাখলকের ব্যাপারে প্রযোজ্য তখন ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ)-এর ব্যাপারে এটা প্রযোজ্য হবে না কেন? আর তিনি মহান আল্লাহর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণকারী হতে পারেন কিরূপে? তিনি তো ভদ্র প্রকৃতির দিক দিয়ে উত্তম অস্তিত্ব ছিলেন! বরং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ঐ স্থলে তিনি স্বীয় কওমের সাথে। তর্ক ও বচসা করছিলেন এবং যে শিরকে তারা জড়িত ছিল, তাদের সেই ধারণা ও কল্পনাকে দলীল প্রমাণের সাহায্যে দূর করে দিচ্ছিলেন। এ কথা নয় যে, তিনি স্বয়ং সন্দেহে পতিত ছিলেন।
আল-আনআম 6:80
৮০-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর সম্পর্কে বলছেন-যখন তিনি একত্ববাদ নিয়ে স্বীয় কওমের সাথে তর্ক বিতর্ক করছিলেন এবং তাদেরকে বলছিলেনঃ আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে কি তোমরা আমার সাথে ঝগড়া করছো? তিনি তো এক ও অদ্বিতীয়। তিনি আমাকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন এবং তিনি যে এক ওর দলীল প্রমাণ আমি তোমাদের সামনে পেশ করছি। এর পরেও কিভাবে আমি তোমাদের বাজে কথা এবং অহেতুক সন্দেহের প্রতি মনোযোগ দিতে পারি? তোমাদের কথা যে বাজে ও ভিত্তিহীন এর দলীল আমার কাছে বিদ্যমান রয়েছে। তোমাদের নিজেদের তৈরী এই মূর্তিগুলোর তো কোন কিছুই করার ক্ষমতা নেই। আমি ওদেরকে ভয় করি না এবং তিল পরিমাণও পরওয়া করি না। যদি এই মূর্তিগুলো আমার কোন ক্ষতি সাধনে সক্ষম হয় তবে ক্ষতি করুক দেখি? তবে হ্যাঁ, আমার মহান প্রভু আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমার ক্ষতি সাধন করতে পারেন। সমস্ত বস্তু সম্পর্কে তাঁর ব্যাপক জ্ঞান রয়েছে। কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন নেই। আমি যা কিছু বর্ণনা করছি তোমরা কি এর থেকে একটুও শিক্ষা এবং উপদেশ গ্রহণ করবে না? উপদেশ গ্রহণ করলে অবশ্যই তোমরা এদের পূজা-অর্চনা থেকে বিরত থাকতে। তাদের সামনে এইসব দলীল প্রমাণ পেশ করার ফল ঠিক হযরত হূদ (আঃ)-এর তাঁর কওমের সামনে এইসব দলীল পেশ করার ফলের মতই। এই আ’দ সম্প্রদায়ের ঘটনা কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ পাক তাদের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবী) (১১:৫৩-৫৬) অর্থাৎ হযরত হূদ (আঃ)-এর কওমের লোকেরা তাকে বলেছিল, হে হূদ (আঃ)! আপনি তো আমাদের সামনে কোন মুজিযা পেশ করেননি, শুধু আপনার কথার উপর বিশ্বাস করেই কি আমরা আমাদের মা’বৃদগুলোকে পরিত্যাগ করবো? আমরা তো আপনার উপর ঈমান আনয়ন করবো না। আমরা তো মনে করছি যে, আমাদের মাবুদগুলোর পক্ষ থেকে আপনার উপর কোন লা'নত বর্ষিত হয়েছে। তখন হূদ (আঃ) বললেনঃ আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাকো, আমি ঐ সমস্ত বস্তুর প্রতি অসন্তুষ্ট যাদেরকে তোমরা আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করছো, অনন্তর তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাও, অতঃপর আমাকে সামান্য অবকাশও দিয়ো না। আমি আল্লাহর উপর ভরসা করেছি যিনি আমারও রব এবং তোমাদেরও রব; ভূ-পৃষ্ঠে যত বিচরণকারী আছে সবারই ঝুটি তাঁরই মুষ্টিতে আবদ্ধ; নিশ্চয়ই আমার রব সরল পথে অবস্থিত।”পরবর্তী আয়াতে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উক্তি তুলে ধরা হয়েছে- আমি তোমাদের বাতিল মূর্তিগুলোকে ভয় করবো কেন? অথচ তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে প্রতিমাগুলোকে নিজেদের মা’রূদ বানিয়ে নিতে ভয় করছো না এবং তোমাদের কাছে এর কোন দলীল প্রমাণও নেই। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) (৪২:২১) তিনি আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) (৫৩:২৩) অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে- তোমরাই বল তো যে, তোমাদের এবং আমার দলের মধ্যে কোন্ দলটি সত্যের উপর রয়েছে? সেই মা’রূদ কি সত্যের উপর রয়েছেন যিনি সবকিছু করতে সক্ষম, না ঐ মা'বুদগুলো সত্যের উপর রয়েছে যেগুলো লাভ ও ক্ষতি কোনটারই মালিক নয়?এরপর ঘোষিত হচ্ছে যারা ঈমান এনেছে এবং ঈমানের উপর যুলুম অর্থাৎ শিককে সংমিশ্রিত করেনি, শান্তি ও নিরাপত্তার অধিকারী তো তারাই এবং তারাই সঠিক পথে পরিচালিত। তারা ইবাদতকে একমাত্র আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট করেছিল এবং সেই ইবাদতকে শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত রেখেছিল। তাই দুনিয়া ও আখিরাত তাদেরই অধিকারে রয়েছে।সহীহ বুখারীতে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী)-এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখন সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কে এমন আছে যে নিজের নফসের উপর যুলুম করেনি?” তখন (আরবী) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “নিশ্চয়ই শিকই হচ্ছে সবচেয়ে বড় অত্যাচার।” (৩১:১৩)।যখন উপরোল্লিখিত আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং লোকেরা ভুল বুঝে নেয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেন, তোমরা যা বুঝেছো তা নয়। সৎ বান্দা অর্থাৎ লোকমান হাকীম কি বলেছিলেন তা কি তোমরা শুননি? তিনি স্বীয় পুত্রকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রিয় পুত্র! আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করো না, নিশ্চয়ই তার সাথে শরীক স্থাপন করা হচ্ছে বড় অত্যাচার।” (৩১:১৩) এখানে যুলুম দ্বারা শিরুককে বুঝানো হয়েছে। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে (আরবী) এই শব্দ দ্বারা তাখরীজ করেছেন)হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমাকে বলা হয়েছে যে, তুমি ঐ ঈমানদার লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত।” হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। আমরা যখন মদীনা হতে বাইরে চলে যাই তখন একজন উষ্ট্রারোহীকে আমাদের দিকে আসতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এই উষ্ট্রারোহী তোমাদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যেই আসছে।” যখন সে আমাদের কাছে পৌছে যায় তখন নবী (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কোথা থেকে আসছো?” সে উত্তরে বললোঃ “আমার পরিবারবর্গ ও গোত্রের নিকট থেকে আসছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোথায় যাবে?” সে জবাবে বললোঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, কি বলতে চাও বল, আমিই আল্লাহর রাসুল।” সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে ঈমান সম্পর্কে শিক্ষা দান করুন।” তিনি বললেনঃ “তুমি সাক্ষ্য দান করবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা’রূদ নেই এবং আরও সাক্ষ্য দেবে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল। আর তুমি নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করবে, যাকাত দেবে, রমযানের রোযা রাখবে এবং বায়তুল্লাহর হজ্ব করবে।” সে বললোঃ “আমি এগুলো স্বীকার করলাম।” বর্ণনাকারী বলেন যে, (সে ফিরে যেতে উদ্যত হলে) তার উটের সামনের পা জংলী ইঁদুরের গর্তে ঢুকে যায়। ফলে উটটি পড়ে যায় এবং সাথে সাথে লোকটিও পড়ে যায়। এই কারণে তার মাথা ফেটে যায় এবং গর্দান ভেঙ্গে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “লোকটির রক্ষণাবেক্ষণ করা আমার দায়িত্ব।” সাথে সাথে হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) ও হযরত হুযাইফা (রাঃ) দৌড়ে গিয়ে উঠালেন। তারপর তারা বলে উঠলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকটির তো প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে!” একথা শুনে তিনি তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তারপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আমি লোকটির দিক থেকে কেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম তা কি তোমরা জান? (এর কারণ এই যে,) আমি দেখতে পাচ্ছিলাম যে, দু’জন ফেরেশতা তার মুখে জান্নাতের ফল দিতে রয়েছেন। এর দ্বারা আমি বুঝতে পারলাম যে, লোকটি ক্ষুধার্ত অবস্থায় মারা গেছে। এরপর রসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ এ লোকটি ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- “তারা তাদের ঈমানের সাথে যুলুম অর্থাৎ শিরিককে সংমিশ্রিত করে না। তারপর তিনি বললেনঃ “তোমাদের ভাইয়ের কাফন দাফনের ব্যবস্থা কর।” আমরা তখন তাকে গোসল দিলাম, কাফন পরালাম ও সুগন্ধি লাগালাম। অতঃপর তাকে কবরের দিকে বহন করে নিয়ে গেলাম। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসলেন এবং কবরের ধারে বসে পড়লেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “বগলী কবর খনন কর, খোলা কবর করো না। আমাদের কবর বগলীই হয়ে থাকে এবং অন্যদের জন্যে হয় ভোলা কবর। এই লোকটি ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল যারা অল্প আমল করে অধিক পুণ্য লাভ করে থাকে।”ইবনে আব্বাস (রাঃ) হাদীসটি আরো একটু বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে পথ চলছিলাম। এমন সময় একজন গ্রাম্য লোক আমাদের সামনে এসে পড়ে এবং বলতে শুরু করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ করে আমি বলছি যে, আমি আমার দেশ, ছেলেমেয়ে এবং মালধন ছেড়ে আপনার নিকট এসেছি। উদ্দেশ্য এই যে, আপনার মাধ্যমে আমি হিদায়াত লাভ করবো। আমার অবস্থা এই যে, পথে শুধু ঘাস-পাতা খেয়ে আপনার কাছে পৌছেছি। এখন আপনি আমাকে দ্বীনের শিক্ষা দান করুন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে দ্বীন শিক্ষা দিলেন এবং সে তা কবুল করল। আমরা তার চারদিকে ভীড় জমালাম। সে ফিরে যেতে উদ্যত হলো। এমন সময় তার উটের পা জংলী ইঁদুরের গর্তে ঢুকে গেল। তখন উটটি পড়ে গেল এবং ধাক্কা খেয়ে লোকটির ঘাড় ভেঙ্গে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহর কসম! লোকটি ঠিকই বলেছিল যে, দেশ ও ছেলেমেয়ে ছেড়ে শুধুমাত্র হিদায়াত ও দ্বীন লাভের উদ্দেশ্যে আমার নিকট আগমন করেছিল। সে দ্বীনী শিক্ষা লাভ করেছে। আমি জানতে পারলাম যে, এই সফরে সে শুধু যমীনের ঘাস পাতা খেয়ে দিন কাটিয়েছে। সে আমল করেছে অল্প কিন্তু পুণ্য লাভ করেছে অধিক। যারা তাদের ঈমানের সাথে যুলুম অর্থাৎ শিরককে মিশ্রিত করেনি তারাই শান্তি ও নিরাপত্তা লাভের অধিকারী। তারাই প্রকৃত হিদায়াত প্রাপ্ত।' এই কথা যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে এ লোকটি তাদেরই একজন।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সাখীরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যাকে দেয়া হলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, না দেয়া হলে ধৈর্যধারণ করে, কারও উপর যুলুম করলে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তার উপর যুলুম করা হলে যুলুমকারীকে ক্ষমা করে দেয়” -এ পর্যন্ত বলে তিনি নীরব হয়ে গেলেন। তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার জন্যে কি রয়েছে?” তখন তিনি পাঠ করলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এই লোকদের জন্যে রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা এবং এরাই হচ্ছে সুপথ প্রাপ্ত। (লুবাব গ্রন্থে ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, একজন মুসলিম-শত্রু মুসলমানদের উপর আক্রমণ চলিয়ে পর পর তিনজনকে শহীদ করে দেয়। তারপর সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ এখন আমার ইসলাম গ্রহণে কোন উপকার হবে কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ হ্যা।' তখন সে ঘোড়া চালিয়ে মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করে। অতঃপর তার সঙ্গীদের উপর আক্রমণ চালিয়ে পর পর তিনজনকে হত্যা করে। কয়েকজন মনীষী মনে করেন যে, (আরবী) এই আয়াতটি তারই ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়)(আরবী) অর্থাৎ “এটাই ছিল আমার যুক্তি-প্রমাণ যা আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে তার স্বজাতির মুকাবিলায় দান করেছিলাম।” আল্লাহ পাকের এই উক্তির মধ্যে যে যুক্তি-প্রমাণের কথা রয়েছে তা এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়ের লোককে বলেছিলেনঃ “তোমরা যখন কোন দলীল প্রমাণ ছাড়াই আল্লাহর সঙ্গে শরীক স্থাপন করতে ভয় কর না, তখন আমি তোমাদের এই সব শক্তিহীন মাবুদকে ভয় করবো কেন? এখন তোমরা নিজেরাই দেখে নেবে যে, আমাদের দুই দলের মধ্যে কারা বেশী নিজেদের রক্ষার ব্যবস্থা করেছে।” মহান আল্লাহ এটারই নাম দিয়েছেন শান্তি, নিরাপত্তা এবং হিদায়াত। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) এবং এর পরে বলেছেনঃ (আরবী)এখানে শব্দটিকে (আরবী)-এর সঙ্গেও পড়া হয়েছে এবং ছাড়াও পড়া হয়েছে। দু’টোর অর্থ প্রায় একই। যেমন সূরায়ে (আরবী)-এ রয়েছে।(আরবী) অর্থাৎ “তিনি নিজের কথায় হাকীম বা প্রজ্ঞাময় এবং নিজের কাজে আলীম বা বিজ্ঞ।” (১২:৬) অর্থাৎ তিনি যাকে চান হিদায়াত দান করেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! নিশ্চয়ই যাদের উপর তোমার প্রভুর কথা ও ফায়সালা সাব্যস্ত হয়ে গেছে তারা সমস্ত নিদর্শন দেখলেও ঈমান আনবে না, যে পর্যন্ত না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” (১০:৯৬-৯৭)।
আল-আনআম 6:81
৮০-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর সম্পর্কে বলছেন-যখন তিনি একত্ববাদ নিয়ে স্বীয় কওমের সাথে তর্ক বিতর্ক করছিলেন এবং তাদেরকে বলছিলেনঃ আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে কি তোমরা আমার সাথে ঝগড়া করছো? তিনি তো এক ও অদ্বিতীয়। তিনি আমাকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন এবং তিনি যে এক ওর দলীল প্রমাণ আমি তোমাদের সামনে পেশ করছি। এর পরেও কিভাবে আমি তোমাদের বাজে কথা এবং অহেতুক সন্দেহের প্রতি মনোযোগ দিতে পারি? তোমাদের কথা যে বাজে ও ভিত্তিহীন এর দলীল আমার কাছে বিদ্যমান রয়েছে। তোমাদের নিজেদের তৈরী এই মূর্তিগুলোর তো কোন কিছুই করার ক্ষমতা নেই। আমি ওদেরকে ভয় করি না এবং তিল পরিমাণও পরওয়া করি না। যদি এই মূর্তিগুলো আমার কোন ক্ষতি সাধনে সক্ষম হয় তবে ক্ষতি করুক দেখি? তবে হ্যাঁ, আমার মহান প্রভু আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমার ক্ষতি সাধন করতে পারেন। সমস্ত বস্তু সম্পর্কে তাঁর ব্যাপক জ্ঞান রয়েছে। কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন নেই। আমি যা কিছু বর্ণনা করছি তোমরা কি এর থেকে একটুও শিক্ষা এবং উপদেশ গ্রহণ করবে না? উপদেশ গ্রহণ করলে অবশ্যই তোমরা এদের পূজা-অর্চনা থেকে বিরত থাকতে। তাদের সামনে এইসব দলীল প্রমাণ পেশ করার ফল ঠিক হযরত হূদ (আঃ)-এর তাঁর কওমের সামনে এইসব দলীল পেশ করার ফলের মতই। এই আ’দ সম্প্রদায়ের ঘটনা কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ পাক তাদের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবী) (১১:৫৩-৫৬) অর্থাৎ হযরত হূদ (আঃ)-এর কওমের লোকেরা তাকে বলেছিল, হে হূদ (আঃ)! আপনি তো আমাদের সামনে কোন মুজিযা পেশ করেননি, শুধু আপনার কথার উপর বিশ্বাস করেই কি আমরা আমাদের মা’বৃদগুলোকে পরিত্যাগ করবো? আমরা তো আপনার উপর ঈমান আনয়ন করবো না। আমরা তো মনে করছি যে, আমাদের মাবুদগুলোর পক্ষ থেকে আপনার উপর কোন লা'নত বর্ষিত হয়েছে। তখন হূদ (আঃ) বললেনঃ আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাকো, আমি ঐ সমস্ত বস্তুর প্রতি অসন্তুষ্ট যাদেরকে তোমরা আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করছো, অনন্তর তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাও, অতঃপর আমাকে সামান্য অবকাশও দিয়ো না। আমি আল্লাহর উপর ভরসা করেছি যিনি আমারও রব এবং তোমাদেরও রব; ভূ-পৃষ্ঠে যত বিচরণকারী আছে সবারই ঝুটি তাঁরই মুষ্টিতে আবদ্ধ; নিশ্চয়ই আমার রব সরল পথে অবস্থিত।”পরবর্তী আয়াতে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উক্তি তুলে ধরা হয়েছে- আমি তোমাদের বাতিল মূর্তিগুলোকে ভয় করবো কেন? অথচ তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে প্রতিমাগুলোকে নিজেদের মা’রূদ বানিয়ে নিতে ভয় করছো না এবং তোমাদের কাছে এর কোন দলীল প্রমাণও নেই। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) (৪২:২১) তিনি আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) (৫৩:২৩) অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে- তোমরাই বল তো যে, তোমাদের এবং আমার দলের মধ্যে কোন্ দলটি সত্যের উপর রয়েছে? সেই মা’রূদ কি সত্যের উপর রয়েছেন যিনি সবকিছু করতে সক্ষম, না ঐ মা'বুদগুলো সত্যের উপর রয়েছে যেগুলো লাভ ও ক্ষতি কোনটারই মালিক নয়?এরপর ঘোষিত হচ্ছে যারা ঈমান এনেছে এবং ঈমানের উপর যুলুম অর্থাৎ শিককে সংমিশ্রিত করেনি, শান্তি ও নিরাপত্তার অধিকারী তো তারাই এবং তারাই সঠিক পথে পরিচালিত। তারা ইবাদতকে একমাত্র আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট করেছিল এবং সেই ইবাদতকে শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত রেখেছিল। তাই দুনিয়া ও আখিরাত তাদেরই অধিকারে রয়েছে।সহীহ বুখারীতে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী)-এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখন সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কে এমন আছে যে নিজের নফসের উপর যুলুম করেনি?” তখন (আরবী) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “নিশ্চয়ই শিকই হচ্ছে সবচেয়ে বড় অত্যাচার।” (৩১:১৩)।যখন উপরোল্লিখিত আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং লোকেরা ভুল বুঝে নেয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেন, তোমরা যা বুঝেছো তা নয়। সৎ বান্দা অর্থাৎ লোকমান হাকীম কি বলেছিলেন তা কি তোমরা শুননি? তিনি স্বীয় পুত্রকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রিয় পুত্র! আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করো না, নিশ্চয়ই তার সাথে শরীক স্থাপন করা হচ্ছে বড় অত্যাচার।” (৩১:১৩) এখানে যুলুম দ্বারা শিরুককে বুঝানো হয়েছে। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে (আরবী) এই শব্দ দ্বারা তাখরীজ করেছেন)হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমাকে বলা হয়েছে যে, তুমি ঐ ঈমানদার লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত।” হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। আমরা যখন মদীনা হতে বাইরে চলে যাই তখন একজন উষ্ট্রারোহীকে আমাদের দিকে আসতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এই উষ্ট্রারোহী তোমাদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যেই আসছে।” যখন সে আমাদের কাছে পৌছে যায় তখন নবী (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কোথা থেকে আসছো?” সে উত্তরে বললোঃ “আমার পরিবারবর্গ ও গোত্রের নিকট থেকে আসছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোথায় যাবে?” সে জবাবে বললোঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, কি বলতে চাও বল, আমিই আল্লাহর রাসুল।” সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে ঈমান সম্পর্কে শিক্ষা দান করুন।” তিনি বললেনঃ “তুমি সাক্ষ্য দান করবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা’রূদ নেই এবং আরও সাক্ষ্য দেবে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল। আর তুমি নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করবে, যাকাত দেবে, রমযানের রোযা রাখবে এবং বায়তুল্লাহর হজ্ব করবে।” সে বললোঃ “আমি এগুলো স্বীকার করলাম।” বর্ণনাকারী বলেন যে, (সে ফিরে যেতে উদ্যত হলে) তার উটের সামনের পা জংলী ইঁদুরের গর্তে ঢুকে যায়। ফলে উটটি পড়ে যায় এবং সাথে সাথে লোকটিও পড়ে যায়। এই কারণে তার মাথা ফেটে যায় এবং গর্দান ভেঙ্গে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “লোকটির রক্ষণাবেক্ষণ করা আমার দায়িত্ব।” সাথে সাথে হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) ও হযরত হুযাইফা (রাঃ) দৌড়ে গিয়ে উঠালেন। তারপর তারা বলে উঠলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকটির তো প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে!” একথা শুনে তিনি তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তারপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আমি লোকটির দিক থেকে কেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম তা কি তোমরা জান? (এর কারণ এই যে,) আমি দেখতে পাচ্ছিলাম যে, দু’জন ফেরেশতা তার মুখে জান্নাতের ফল দিতে রয়েছেন। এর দ্বারা আমি বুঝতে পারলাম যে, লোকটি ক্ষুধার্ত অবস্থায় মারা গেছে। এরপর রসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ এ লোকটি ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- “তারা তাদের ঈমানের সাথে যুলুম অর্থাৎ শিরিককে সংমিশ্রিত করে না। তারপর তিনি বললেনঃ “তোমাদের ভাইয়ের কাফন দাফনের ব্যবস্থা কর।” আমরা তখন তাকে গোসল দিলাম, কাফন পরালাম ও সুগন্ধি লাগালাম। অতঃপর তাকে কবরের দিকে বহন করে নিয়ে গেলাম। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসলেন এবং কবরের ধারে বসে পড়লেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “বগলী কবর খনন কর, খোলা কবর করো না। আমাদের কবর বগলীই হয়ে থাকে এবং অন্যদের জন্যে হয় ভোলা কবর। এই লোকটি ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল যারা অল্প আমল করে অধিক পুণ্য লাভ করে থাকে।”ইবনে আব্বাস (রাঃ) হাদীসটি আরো একটু বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে পথ চলছিলাম। এমন সময় একজন গ্রাম্য লোক আমাদের সামনে এসে পড়ে এবং বলতে শুরু করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ করে আমি বলছি যে, আমি আমার দেশ, ছেলেমেয়ে এবং মালধন ছেড়ে আপনার নিকট এসেছি। উদ্দেশ্য এই যে, আপনার মাধ্যমে আমি হিদায়াত লাভ করবো। আমার অবস্থা এই যে, পথে শুধু ঘাস-পাতা খেয়ে আপনার কাছে পৌছেছি। এখন আপনি আমাকে দ্বীনের শিক্ষা দান করুন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে দ্বীন শিক্ষা দিলেন এবং সে তা কবুল করল। আমরা তার চারদিকে ভীড় জমালাম। সে ফিরে যেতে উদ্যত হলো। এমন সময় তার উটের পা জংলী ইঁদুরের গর্তে ঢুকে গেল। তখন উটটি পড়ে গেল এবং ধাক্কা খেয়ে লোকটির ঘাড় ভেঙ্গে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহর কসম! লোকটি ঠিকই বলেছিল যে, দেশ ও ছেলেমেয়ে ছেড়ে শুধুমাত্র হিদায়াত ও দ্বীন লাভের উদ্দেশ্যে আমার নিকট আগমন করেছিল। সে দ্বীনী শিক্ষা লাভ করেছে। আমি জানতে পারলাম যে, এই সফরে সে শুধু যমীনের ঘাস পাতা খেয়ে দিন কাটিয়েছে। সে আমল করেছে অল্প কিন্তু পুণ্য লাভ করেছে অধিক। যারা তাদের ঈমানের সাথে যুলুম অর্থাৎ শিরককে মিশ্রিত করেনি তারাই শান্তি ও নিরাপত্তা লাভের অধিকারী। তারাই প্রকৃত হিদায়াত প্রাপ্ত।' এই কথা যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে এ লোকটি তাদেরই একজন।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সাখীরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যাকে দেয়া হলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, না দেয়া হলে ধৈর্যধারণ করে, কারও উপর যুলুম করলে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তার উপর যুলুম করা হলে যুলুমকারীকে ক্ষমা করে দেয়” -এ পর্যন্ত বলে তিনি নীরব হয়ে গেলেন। তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার জন্যে কি রয়েছে?” তখন তিনি পাঠ করলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এই লোকদের জন্যে রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা এবং এরাই হচ্ছে সুপথ প্রাপ্ত। (লুবাব গ্রন্থে ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, একজন মুসলিম-শত্রু মুসলমানদের উপর আক্রমণ চলিয়ে পর পর তিনজনকে শহীদ করে দেয়। তারপর সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ এখন আমার ইসলাম গ্রহণে কোন উপকার হবে কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ হ্যা।' তখন সে ঘোড়া চালিয়ে মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করে। অতঃপর তার সঙ্গীদের উপর আক্রমণ চালিয়ে পর পর তিনজনকে হত্যা করে। কয়েকজন মনীষী মনে করেন যে, (আরবী) এই আয়াতটি তারই ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়)(আরবী) অর্থাৎ “এটাই ছিল আমার যুক্তি-প্রমাণ যা আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে তার স্বজাতির মুকাবিলায় দান করেছিলাম।” আল্লাহ পাকের এই উক্তির মধ্যে যে যুক্তি-প্রমাণের কথা রয়েছে তা এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়ের লোককে বলেছিলেনঃ “তোমরা যখন কোন দলীল প্রমাণ ছাড়াই আল্লাহর সঙ্গে শরীক স্থাপন করতে ভয় কর না, তখন আমি তোমাদের এই সব শক্তিহীন মাবুদকে ভয় করবো কেন? এখন তোমরা নিজেরাই দেখে নেবে যে, আমাদের দুই দলের মধ্যে কারা বেশী নিজেদের রক্ষার ব্যবস্থা করেছে।” মহান আল্লাহ এটারই নাম দিয়েছেন শান্তি, নিরাপত্তা এবং হিদায়াত। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) এবং এর পরে বলেছেনঃ (আরবী)এখানে শব্দটিকে (আরবী)-এর সঙ্গেও পড়া হয়েছে এবং ছাড়াও পড়া হয়েছে। দু’টোর অর্থ প্রায় একই। যেমন সূরায়ে (আরবী)-এ রয়েছে।(আরবী) অর্থাৎ “তিনি নিজের কথায় হাকীম বা প্রজ্ঞাময় এবং নিজের কাজে আলীম বা বিজ্ঞ।” (১২:৬) অর্থাৎ তিনি যাকে চান হিদায়াত দান করেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! নিশ্চয়ই যাদের উপর তোমার প্রভুর কথা ও ফায়সালা সাব্যস্ত হয়ে গেছে তারা সমস্ত নিদর্শন দেখলেও ঈমান আনবে না, যে পর্যন্ত না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” (১০:৯৬-৯৭)।
আল-আনআম 6:82
৮০-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর সম্পর্কে বলছেন-যখন তিনি একত্ববাদ নিয়ে স্বীয় কওমের সাথে তর্ক বিতর্ক করছিলেন এবং তাদেরকে বলছিলেনঃ আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে কি তোমরা আমার সাথে ঝগড়া করছো? তিনি তো এক ও অদ্বিতীয়। তিনি আমাকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন এবং তিনি যে এক ওর দলীল প্রমাণ আমি তোমাদের সামনে পেশ করছি। এর পরেও কিভাবে আমি তোমাদের বাজে কথা এবং অহেতুক সন্দেহের প্রতি মনোযোগ দিতে পারি? তোমাদের কথা যে বাজে ও ভিত্তিহীন এর দলীল আমার কাছে বিদ্যমান রয়েছে। তোমাদের নিজেদের তৈরী এই মূর্তিগুলোর তো কোন কিছুই করার ক্ষমতা নেই। আমি ওদেরকে ভয় করি না এবং তিল পরিমাণও পরওয়া করি না। যদি এই মূর্তিগুলো আমার কোন ক্ষতি সাধনে সক্ষম হয় তবে ক্ষতি করুক দেখি? তবে হ্যাঁ, আমার মহান প্রভু আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমার ক্ষতি সাধন করতে পারেন। সমস্ত বস্তু সম্পর্কে তাঁর ব্যাপক জ্ঞান রয়েছে। কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন নেই। আমি যা কিছু বর্ণনা করছি তোমরা কি এর থেকে একটুও শিক্ষা এবং উপদেশ গ্রহণ করবে না? উপদেশ গ্রহণ করলে অবশ্যই তোমরা এদের পূজা-অর্চনা থেকে বিরত থাকতে। তাদের সামনে এইসব দলীল প্রমাণ পেশ করার ফল ঠিক হযরত হূদ (আঃ)-এর তাঁর কওমের সামনে এইসব দলীল পেশ করার ফলের মতই। এই আ’দ সম্প্রদায়ের ঘটনা কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ পাক তাদের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবী) (১১:৫৩-৫৬) অর্থাৎ হযরত হূদ (আঃ)-এর কওমের লোকেরা তাকে বলেছিল, হে হূদ (আঃ)! আপনি তো আমাদের সামনে কোন মুজিযা পেশ করেননি, শুধু আপনার কথার উপর বিশ্বাস করেই কি আমরা আমাদের মা’বৃদগুলোকে পরিত্যাগ করবো? আমরা তো আপনার উপর ঈমান আনয়ন করবো না। আমরা তো মনে করছি যে, আমাদের মাবুদগুলোর পক্ষ থেকে আপনার উপর কোন লা'নত বর্ষিত হয়েছে। তখন হূদ (আঃ) বললেনঃ আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাকো, আমি ঐ সমস্ত বস্তুর প্রতি অসন্তুষ্ট যাদেরকে তোমরা আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করছো, অনন্তর তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাও, অতঃপর আমাকে সামান্য অবকাশও দিয়ো না। আমি আল্লাহর উপর ভরসা করেছি যিনি আমারও রব এবং তোমাদেরও রব; ভূ-পৃষ্ঠে যত বিচরণকারী আছে সবারই ঝুটি তাঁরই মুষ্টিতে আবদ্ধ; নিশ্চয়ই আমার রব সরল পথে অবস্থিত।”পরবর্তী আয়াতে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উক্তি তুলে ধরা হয়েছে- আমি তোমাদের বাতিল মূর্তিগুলোকে ভয় করবো কেন? অথচ তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে প্রতিমাগুলোকে নিজেদের মা’রূদ বানিয়ে নিতে ভয় করছো না এবং তোমাদের কাছে এর কোন দলীল প্রমাণও নেই। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) (৪২:২১) তিনি আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) (৫৩:২৩) অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে- তোমরাই বল তো যে, তোমাদের এবং আমার দলের মধ্যে কোন্ দলটি সত্যের উপর রয়েছে? সেই মা’রূদ কি সত্যের উপর রয়েছেন যিনি সবকিছু করতে সক্ষম, না ঐ মা'বুদগুলো সত্যের উপর রয়েছে যেগুলো লাভ ও ক্ষতি কোনটারই মালিক নয়?এরপর ঘোষিত হচ্ছে যারা ঈমান এনেছে এবং ঈমানের উপর যুলুম অর্থাৎ শিককে সংমিশ্রিত করেনি, শান্তি ও নিরাপত্তার অধিকারী তো তারাই এবং তারাই সঠিক পথে পরিচালিত। তারা ইবাদতকে একমাত্র আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট করেছিল এবং সেই ইবাদতকে শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত রেখেছিল। তাই দুনিয়া ও আখিরাত তাদেরই অধিকারে রয়েছে।সহীহ বুখারীতে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী)-এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখন সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কে এমন আছে যে নিজের নফসের উপর যুলুম করেনি?” তখন (আরবী) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “নিশ্চয়ই শিকই হচ্ছে সবচেয়ে বড় অত্যাচার।” (৩১:১৩)।যখন উপরোল্লিখিত আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং লোকেরা ভুল বুঝে নেয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেন, তোমরা যা বুঝেছো তা নয়। সৎ বান্দা অর্থাৎ লোকমান হাকীম কি বলেছিলেন তা কি তোমরা শুননি? তিনি স্বীয় পুত্রকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রিয় পুত্র! আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করো না, নিশ্চয়ই তার সাথে শরীক স্থাপন করা হচ্ছে বড় অত্যাচার।” (৩১:১৩) এখানে যুলুম দ্বারা শিরুককে বুঝানো হয়েছে। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে (আরবী) এই শব্দ দ্বারা তাখরীজ করেছেন)হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমাকে বলা হয়েছে যে, তুমি ঐ ঈমানদার লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত।” হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। আমরা যখন মদীনা হতে বাইরে চলে যাই তখন একজন উষ্ট্রারোহীকে আমাদের দিকে আসতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এই উষ্ট্রারোহী তোমাদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যেই আসছে।” যখন সে আমাদের কাছে পৌছে যায় তখন নবী (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কোথা থেকে আসছো?” সে উত্তরে বললোঃ “আমার পরিবারবর্গ ও গোত্রের নিকট থেকে আসছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোথায় যাবে?” সে জবাবে বললোঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, কি বলতে চাও বল, আমিই আল্লাহর রাসুল।” সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে ঈমান সম্পর্কে শিক্ষা দান করুন।” তিনি বললেনঃ “তুমি সাক্ষ্য দান করবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা’রূদ নেই এবং আরও সাক্ষ্য দেবে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল। আর তুমি নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করবে, যাকাত দেবে, রমযানের রোযা রাখবে এবং বায়তুল্লাহর হজ্ব করবে।” সে বললোঃ “আমি এগুলো স্বীকার করলাম।” বর্ণনাকারী বলেন যে, (সে ফিরে যেতে উদ্যত হলে) তার উটের সামনের পা জংলী ইঁদুরের গর্তে ঢুকে যায়। ফলে উটটি পড়ে যায় এবং সাথে সাথে লোকটিও পড়ে যায়। এই কারণে তার মাথা ফেটে যায় এবং গর্দান ভেঙ্গে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “লোকটির রক্ষণাবেক্ষণ করা আমার দায়িত্ব।” সাথে সাথে হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) ও হযরত হুযাইফা (রাঃ) দৌড়ে গিয়ে উঠালেন। তারপর তারা বলে উঠলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকটির তো প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে!” একথা শুনে তিনি তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তারপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আমি লোকটির দিক থেকে কেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম তা কি তোমরা জান? (এর কারণ এই যে,) আমি দেখতে পাচ্ছিলাম যে, দু’জন ফেরেশতা তার মুখে জান্নাতের ফল দিতে রয়েছেন। এর দ্বারা আমি বুঝতে পারলাম যে, লোকটি ক্ষুধার্ত অবস্থায় মারা গেছে। এরপর রসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ এ লোকটি ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- “তারা তাদের ঈমানের সাথে যুলুম অর্থাৎ শিরিককে সংমিশ্রিত করে না। তারপর তিনি বললেনঃ “তোমাদের ভাইয়ের কাফন দাফনের ব্যবস্থা কর।” আমরা তখন তাকে গোসল দিলাম, কাফন পরালাম ও সুগন্ধি লাগালাম। অতঃপর তাকে কবরের দিকে বহন করে নিয়ে গেলাম। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসলেন এবং কবরের ধারে বসে পড়লেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “বগলী কবর খনন কর, খোলা কবর করো না। আমাদের কবর বগলীই হয়ে থাকে এবং অন্যদের জন্যে হয় ভোলা কবর। এই লোকটি ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল যারা অল্প আমল করে অধিক পুণ্য লাভ করে থাকে।”ইবনে আব্বাস (রাঃ) হাদীসটি আরো একটু বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে পথ চলছিলাম। এমন সময় একজন গ্রাম্য লোক আমাদের সামনে এসে পড়ে এবং বলতে শুরু করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ করে আমি বলছি যে, আমি আমার দেশ, ছেলেমেয়ে এবং মালধন ছেড়ে আপনার নিকট এসেছি। উদ্দেশ্য এই যে, আপনার মাধ্যমে আমি হিদায়াত লাভ করবো। আমার অবস্থা এই যে, পথে শুধু ঘাস-পাতা খেয়ে আপনার কাছে পৌছেছি। এখন আপনি আমাকে দ্বীনের শিক্ষা দান করুন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে দ্বীন শিক্ষা দিলেন এবং সে তা কবুল করল। আমরা তার চারদিকে ভীড় জমালাম। সে ফিরে যেতে উদ্যত হলো। এমন সময় তার উটের পা জংলী ইঁদুরের গর্তে ঢুকে গেল। তখন উটটি পড়ে গেল এবং ধাক্কা খেয়ে লোকটির ঘাড় ভেঙ্গে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহর কসম! লোকটি ঠিকই বলেছিল যে, দেশ ও ছেলেমেয়ে ছেড়ে শুধুমাত্র হিদায়াত ও দ্বীন লাভের উদ্দেশ্যে আমার নিকট আগমন করেছিল। সে দ্বীনী শিক্ষা লাভ করেছে। আমি জানতে পারলাম যে, এই সফরে সে শুধু যমীনের ঘাস পাতা খেয়ে দিন কাটিয়েছে। সে আমল করেছে অল্প কিন্তু পুণ্য লাভ করেছে অধিক। যারা তাদের ঈমানের সাথে যুলুম অর্থাৎ শিরককে মিশ্রিত করেনি তারাই শান্তি ও নিরাপত্তা লাভের অধিকারী। তারাই প্রকৃত হিদায়াত প্রাপ্ত।' এই কথা যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে এ লোকটি তাদেরই একজন।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সাখীরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যাকে দেয়া হলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, না দেয়া হলে ধৈর্যধারণ করে, কারও উপর যুলুম করলে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তার উপর যুলুম করা হলে যুলুমকারীকে ক্ষমা করে দেয়” -এ পর্যন্ত বলে তিনি নীরব হয়ে গেলেন। তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার জন্যে কি রয়েছে?” তখন তিনি পাঠ করলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এই লোকদের জন্যে রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা এবং এরাই হচ্ছে সুপথ প্রাপ্ত। (লুবাব গ্রন্থে ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, একজন মুসলিম-শত্রু মুসলমানদের উপর আক্রমণ চলিয়ে পর পর তিনজনকে শহীদ করে দেয়। তারপর সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ এখন আমার ইসলাম গ্রহণে কোন উপকার হবে কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ হ্যা।' তখন সে ঘোড়া চালিয়ে মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করে। অতঃপর তার সঙ্গীদের উপর আক্রমণ চালিয়ে পর পর তিনজনকে হত্যা করে। কয়েকজন মনীষী মনে করেন যে, (আরবী) এই আয়াতটি তারই ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়)(আরবী) অর্থাৎ “এটাই ছিল আমার যুক্তি-প্রমাণ যা আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে তার স্বজাতির মুকাবিলায় দান করেছিলাম।” আল্লাহ পাকের এই উক্তির মধ্যে যে যুক্তি-প্রমাণের কথা রয়েছে তা এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়ের লোককে বলেছিলেনঃ “তোমরা যখন কোন দলীল প্রমাণ ছাড়াই আল্লাহর সঙ্গে শরীক স্থাপন করতে ভয় কর না, তখন আমি তোমাদের এই সব শক্তিহীন মাবুদকে ভয় করবো কেন? এখন তোমরা নিজেরাই দেখে নেবে যে, আমাদের দুই দলের মধ্যে কারা বেশী নিজেদের রক্ষার ব্যবস্থা করেছে।” মহান আল্লাহ এটারই নাম দিয়েছেন শান্তি, নিরাপত্তা এবং হিদায়াত। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) এবং এর পরে বলেছেনঃ (আরবী)এখানে শব্দটিকে (আরবী)-এর সঙ্গেও পড়া হয়েছে এবং ছাড়াও পড়া হয়েছে। দু’টোর অর্থ প্রায় একই। যেমন সূরায়ে (আরবী)-এ রয়েছে।(আরবী) অর্থাৎ “তিনি নিজের কথায় হাকীম বা প্রজ্ঞাময় এবং নিজের কাজে আলীম বা বিজ্ঞ।” (১২:৬) অর্থাৎ তিনি যাকে চান হিদায়াত দান করেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! নিশ্চয়ই যাদের উপর তোমার প্রভুর কথা ও ফায়সালা সাব্যস্ত হয়ে গেছে তারা সমস্ত নিদর্শন দেখলেও ঈমান আনবে না, যে পর্যন্ত না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” (১০:৯৬-৯৭)।
আল-আনআম 6:83
৮০-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর সম্পর্কে বলছেন-যখন তিনি একত্ববাদ নিয়ে স্বীয় কওমের সাথে তর্ক বিতর্ক করছিলেন এবং তাদেরকে বলছিলেনঃ আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে কি তোমরা আমার সাথে ঝগড়া করছো? তিনি তো এক ও অদ্বিতীয়। তিনি আমাকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন এবং তিনি যে এক ওর দলীল প্রমাণ আমি তোমাদের সামনে পেশ করছি। এর পরেও কিভাবে আমি তোমাদের বাজে কথা এবং অহেতুক সন্দেহের প্রতি মনোযোগ দিতে পারি? তোমাদের কথা যে বাজে ও ভিত্তিহীন এর দলীল আমার কাছে বিদ্যমান রয়েছে। তোমাদের নিজেদের তৈরী এই মূর্তিগুলোর তো কোন কিছুই করার ক্ষমতা নেই। আমি ওদেরকে ভয় করি না এবং তিল পরিমাণও পরওয়া করি না। যদি এই মূর্তিগুলো আমার কোন ক্ষতি সাধনে সক্ষম হয় তবে ক্ষতি করুক দেখি? তবে হ্যাঁ, আমার মহান প্রভু আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমার ক্ষতি সাধন করতে পারেন। সমস্ত বস্তু সম্পর্কে তাঁর ব্যাপক জ্ঞান রয়েছে। কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন নেই। আমি যা কিছু বর্ণনা করছি তোমরা কি এর থেকে একটুও শিক্ষা এবং উপদেশ গ্রহণ করবে না? উপদেশ গ্রহণ করলে অবশ্যই তোমরা এদের পূজা-অর্চনা থেকে বিরত থাকতে। তাদের সামনে এইসব দলীল প্রমাণ পেশ করার ফল ঠিক হযরত হূদ (আঃ)-এর তাঁর কওমের সামনে এইসব দলীল পেশ করার ফলের মতই। এই আ’দ সম্প্রদায়ের ঘটনা কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ পাক তাদের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবী) (১১:৫৩-৫৬) অর্থাৎ হযরত হূদ (আঃ)-এর কওমের লোকেরা তাকে বলেছিল, হে হূদ (আঃ)! আপনি তো আমাদের সামনে কোন মুজিযা পেশ করেননি, শুধু আপনার কথার উপর বিশ্বাস করেই কি আমরা আমাদের মা’বৃদগুলোকে পরিত্যাগ করবো? আমরা তো আপনার উপর ঈমান আনয়ন করবো না। আমরা তো মনে করছি যে, আমাদের মাবুদগুলোর পক্ষ থেকে আপনার উপর কোন লা'নত বর্ষিত হয়েছে। তখন হূদ (আঃ) বললেনঃ আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাকো, আমি ঐ সমস্ত বস্তুর প্রতি অসন্তুষ্ট যাদেরকে তোমরা আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করছো, অনন্তর তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাও, অতঃপর আমাকে সামান্য অবকাশও দিয়ো না। আমি আল্লাহর উপর ভরসা করেছি যিনি আমারও রব এবং তোমাদেরও রব; ভূ-পৃষ্ঠে যত বিচরণকারী আছে সবারই ঝুটি তাঁরই মুষ্টিতে আবদ্ধ; নিশ্চয়ই আমার রব সরল পথে অবস্থিত।”পরবর্তী আয়াতে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উক্তি তুলে ধরা হয়েছে- আমি তোমাদের বাতিল মূর্তিগুলোকে ভয় করবো কেন? অথচ তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে প্রতিমাগুলোকে নিজেদের মা’রূদ বানিয়ে নিতে ভয় করছো না এবং তোমাদের কাছে এর কোন দলীল প্রমাণও নেই। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) (৪২:২১) তিনি আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) (৫৩:২৩) অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে- তোমরাই বল তো যে, তোমাদের এবং আমার দলের মধ্যে কোন্ দলটি সত্যের উপর রয়েছে? সেই মা’রূদ কি সত্যের উপর রয়েছেন যিনি সবকিছু করতে সক্ষম, না ঐ মা'বুদগুলো সত্যের উপর রয়েছে যেগুলো লাভ ও ক্ষতি কোনটারই মালিক নয়?এরপর ঘোষিত হচ্ছে যারা ঈমান এনেছে এবং ঈমানের উপর যুলুম অর্থাৎ শিককে সংমিশ্রিত করেনি, শান্তি ও নিরাপত্তার অধিকারী তো তারাই এবং তারাই সঠিক পথে পরিচালিত। তারা ইবাদতকে একমাত্র আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট করেছিল এবং সেই ইবাদতকে শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত রেখেছিল। তাই দুনিয়া ও আখিরাত তাদেরই অধিকারে রয়েছে।সহীহ বুখারীতে হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী)-এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখন সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কে এমন আছে যে নিজের নফসের উপর যুলুম করেনি?” তখন (আরবী) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “নিশ্চয়ই শিকই হচ্ছে সবচেয়ে বড় অত্যাচার।” (৩১:১৩)।যখন উপরোল্লিখিত আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং লোকেরা ভুল বুঝে নেয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেন, তোমরা যা বুঝেছো তা নয়। সৎ বান্দা অর্থাৎ লোকমান হাকীম কি বলেছিলেন তা কি তোমরা শুননি? তিনি স্বীয় পুত্রকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার প্রিয় পুত্র! আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করো না, নিশ্চয়ই তার সাথে শরীক স্থাপন করা হচ্ছে বড় অত্যাচার।” (৩১:১৩) এখানে যুলুম দ্বারা শিরুককে বুঝানো হয়েছে। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে (আরবী) এই শব্দ দ্বারা তাখরীজ করেছেন)হযরত আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমাকে বলা হয়েছে যে, তুমি ঐ ঈমানদার লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত।” হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। আমরা যখন মদীনা হতে বাইরে চলে যাই তখন একজন উষ্ট্রারোহীকে আমাদের দিকে আসতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এই উষ্ট্রারোহী তোমাদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যেই আসছে।” যখন সে আমাদের কাছে পৌছে যায় তখন নবী (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কোথা থেকে আসছো?” সে উত্তরে বললোঃ “আমার পরিবারবর্গ ও গোত্রের নিকট থেকে আসছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোথায় যাবে?” সে জবাবে বললোঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, কি বলতে চাও বল, আমিই আল্লাহর রাসুল।” সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে ঈমান সম্পর্কে শিক্ষা দান করুন।” তিনি বললেনঃ “তুমি সাক্ষ্য দান করবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা’রূদ নেই এবং আরও সাক্ষ্য দেবে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল। আর তুমি নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করবে, যাকাত দেবে, রমযানের রোযা রাখবে এবং বায়তুল্লাহর হজ্ব করবে।” সে বললোঃ “আমি এগুলো স্বীকার করলাম।” বর্ণনাকারী বলেন যে, (সে ফিরে যেতে উদ্যত হলে) তার উটের সামনের পা জংলী ইঁদুরের গর্তে ঢুকে যায়। ফলে উটটি পড়ে যায় এবং সাথে সাথে লোকটিও পড়ে যায়। এই কারণে তার মাথা ফেটে যায় এবং গর্দান ভেঙ্গে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “লোকটির রক্ষণাবেক্ষণ করা আমার দায়িত্ব।” সাথে সাথে হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) ও হযরত হুযাইফা (রাঃ) দৌড়ে গিয়ে উঠালেন। তারপর তারা বলে উঠলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকটির তো প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে!” একথা শুনে তিনি তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তারপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আমি লোকটির দিক থেকে কেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম তা কি তোমরা জান? (এর কারণ এই যে,) আমি দেখতে পাচ্ছিলাম যে, দু’জন ফেরেশতা তার মুখে জান্নাতের ফল দিতে রয়েছেন। এর দ্বারা আমি বুঝতে পারলাম যে, লোকটি ক্ষুধার্ত অবস্থায় মারা গেছে। এরপর রসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ এ লোকটি ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- “তারা তাদের ঈমানের সাথে যুলুম অর্থাৎ শিরিককে সংমিশ্রিত করে না। তারপর তিনি বললেনঃ “তোমাদের ভাইয়ের কাফন দাফনের ব্যবস্থা কর।” আমরা তখন তাকে গোসল দিলাম, কাফন পরালাম ও সুগন্ধি লাগালাম। অতঃপর তাকে কবরের দিকে বহন করে নিয়ে গেলাম। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসলেন এবং কবরের ধারে বসে পড়লেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “বগলী কবর খনন কর, খোলা কবর করো না। আমাদের কবর বগলীই হয়ে থাকে এবং অন্যদের জন্যে হয় ভোলা কবর। এই লোকটি ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল যারা অল্প আমল করে অধিক পুণ্য লাভ করে থাকে।”ইবনে আব্বাস (রাঃ) হাদীসটি আরো একটু বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে পথ চলছিলাম। এমন সময় একজন গ্রাম্য লোক আমাদের সামনে এসে পড়ে এবং বলতে শুরু করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে আল্লাহ আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ করে আমি বলছি যে, আমি আমার দেশ, ছেলেমেয়ে এবং মালধন ছেড়ে আপনার নিকট এসেছি। উদ্দেশ্য এই যে, আপনার মাধ্যমে আমি হিদায়াত লাভ করবো। আমার অবস্থা এই যে, পথে শুধু ঘাস-পাতা খেয়ে আপনার কাছে পৌছেছি। এখন আপনি আমাকে দ্বীনের শিক্ষা দান করুন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে দ্বীন শিক্ষা দিলেন এবং সে তা কবুল করল। আমরা তার চারদিকে ভীড় জমালাম। সে ফিরে যেতে উদ্যত হলো। এমন সময় তার উটের পা জংলী ইঁদুরের গর্তে ঢুকে গেল। তখন উটটি পড়ে গেল এবং ধাক্কা খেয়ে লোকটির ঘাড় ভেঙ্গে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহর কসম! লোকটি ঠিকই বলেছিল যে, দেশ ও ছেলেমেয়ে ছেড়ে শুধুমাত্র হিদায়াত ও দ্বীন লাভের উদ্দেশ্যে আমার নিকট আগমন করেছিল। সে দ্বীনী শিক্ষা লাভ করেছে। আমি জানতে পারলাম যে, এই সফরে সে শুধু যমীনের ঘাস পাতা খেয়ে দিন কাটিয়েছে। সে আমল করেছে অল্প কিন্তু পুণ্য লাভ করেছে অধিক। যারা তাদের ঈমানের সাথে যুলুম অর্থাৎ শিরককে মিশ্রিত করেনি তারাই শান্তি ও নিরাপত্তা লাভের অধিকারী। তারাই প্রকৃত হিদায়াত প্রাপ্ত।' এই কথা যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে এ লোকটি তাদেরই একজন।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সাখীরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যাকে দেয়া হলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, না দেয়া হলে ধৈর্যধারণ করে, কারও উপর যুলুম করলে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তার উপর যুলুম করা হলে যুলুমকারীকে ক্ষমা করে দেয়” -এ পর্যন্ত বলে তিনি নীরব হয়ে গেলেন। তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার জন্যে কি রয়েছে?” তখন তিনি পাঠ করলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এই লোকদের জন্যে রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা এবং এরাই হচ্ছে সুপথ প্রাপ্ত। (লুবাব গ্রন্থে ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, একজন মুসলিম-শত্রু মুসলমানদের উপর আক্রমণ চলিয়ে পর পর তিনজনকে শহীদ করে দেয়। তারপর সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ এখন আমার ইসলাম গ্রহণে কোন উপকার হবে কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ হ্যা।' তখন সে ঘোড়া চালিয়ে মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করে। অতঃপর তার সঙ্গীদের উপর আক্রমণ চালিয়ে পর পর তিনজনকে হত্যা করে। কয়েকজন মনীষী মনে করেন যে, (আরবী) এই আয়াতটি তারই ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়)(আরবী) অর্থাৎ “এটাই ছিল আমার যুক্তি-প্রমাণ যা আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে তার স্বজাতির মুকাবিলায় দান করেছিলাম।” আল্লাহ পাকের এই উক্তির মধ্যে যে যুক্তি-প্রমাণের কথা রয়েছে তা এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়ের লোককে বলেছিলেনঃ “তোমরা যখন কোন দলীল প্রমাণ ছাড়াই আল্লাহর সঙ্গে শরীক স্থাপন করতে ভয় কর না, তখন আমি তোমাদের এই সব শক্তিহীন মাবুদকে ভয় করবো কেন? এখন তোমরা নিজেরাই দেখে নেবে যে, আমাদের দুই দলের মধ্যে কারা বেশী নিজেদের রক্ষার ব্যবস্থা করেছে।” মহান আল্লাহ এটারই নাম দিয়েছেন শান্তি, নিরাপত্তা এবং হিদায়াত। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) এবং এর পরে বলেছেনঃ (আরবী)এখানে শব্দটিকে (আরবী)-এর সঙ্গেও পড়া হয়েছে এবং ছাড়াও পড়া হয়েছে। দু’টোর অর্থ প্রায় একই। যেমন সূরায়ে (আরবী)-এ রয়েছে।(আরবী) অর্থাৎ “তিনি নিজের কথায় হাকীম বা প্রজ্ঞাময় এবং নিজের কাজে আলীম বা বিজ্ঞ।” (১২:৬) অর্থাৎ তিনি যাকে চান হিদায়াত দান করেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! নিশ্চয়ই যাদের উপর তোমার প্রভুর কথা ও ফায়সালা সাব্যস্ত হয়ে গেছে তারা সমস্ত নিদর্শন দেখলেও ঈমান আনবে না, যে পর্যন্ত না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” (১০:৯৬-৯৭)।
আল-আনআম 6:84
৮৪-৯০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেন-ইবরাহীম (আঃ)-কে আমি ইসহাকের ন্যায় সুসন্তান দান করেছি, অথচ বার্ধক্যের কারণে সে এবং তার স্ত্রী সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে গিয়েছিল। ফেরেশতা তাদের কাছে আসেন এবং তারা হযরত লূত (আঃ)-এর কাছেও যাচ্ছিলেন। ফেরেশতাগণ স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ দেন। তখন স্ত্রী হতবুদ্ধি হয়ে বলেনঃ “হায়! হায়! কি করে আমাদের সন্তান হবে! আমি তো বন্ধ্যা ও বৃদ্ধা এবং আমার স্বামী (ইবরাহীম আঃ) অতি বৃদ্ধ! সুতরাং এটা কতই বিস্ময়কর কথা!” তখন ফেরেশতাগণ বলেনঃ “আপনি কি আল্লাহর কাজে বিস্ময় বোধ করছেন? হে বাড়ীর মালিকগণ! আপনাদের উপর আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হাক।” ফেরেশতাগণ তাদেরকে এ সুসংবাদও দেন যে, ইসহাক (আঃ) নবীও হবেন এবং তার বংশ বৃদ্ধিও হবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর সুসংবাদ দিলাম, যে নবী হবে ও সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (৩৭:১১২) এটা বড় সুসংবাদ এবং বড় নিয়ামতও বটে। আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর শুভ সংবাদ দিলাম এবং এ সুসংবাদও দিলাম যে, ইসহাক (আঃ) -এর ঔরষে ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবে।” (১১:৭১) মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর স্ত্রীকে এ সংবাদ দেন যে, তাঁদের জীবদ্দশাতেই ইসহাকের আঃ ঔরষে হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবেন। সুতরাং পুত্র ইসহাকের জন্মগ্রহণের ফলে যেমন তাঁদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে, অনুরূপভাবে পৌত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মগ্রহণের ফলেও তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে। কেননা, বংশ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পৌত্রের জন্মলাভ খুবই খুশীর ব্যাপার। বদ্ধ ও বদ্ধা যখন সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে যাচ্ছেন যে, তাদের সন্তান লাভ সম্ভব নয়, এমতাবস্থায় পুত্র ইসহাক (আঃ) -এর জন্মলাভ এবং ইসহাক (আঃ) -এর পুত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মলাভ এটা কি কম খুশীর কথা! এতে কে না খুশী হয়? এটা ছিল হযরত ইবরাহীমের নেক আমলেরই প্রতিদান, যিনি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিজের দেশ ও জাতিকে ছেড়ে দিয়ে দূর দূরান্তের পথে পাড়ি জমালেন। এর প্রতিদানই ছিল তার ঔরষজাত নেককার সন্তানগণ, যাদের কারণে তাঁর চক্ষু ঠাণ্ডা হয়েছিল । যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যখন ইবরাহীম স্বীয় কওম ও তাদের মা’বৃদদেরকে পরিত্যাগ করলো তখন আমি তাকে প্রতিদান হিসাবে ইসহাক ও ইয়বকে দানলাম।” আর এখানে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক ও ইয়াকূবকে দান করেছি এবং উভয়কেই সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছি।” এরপর বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তার পূর্বে এমনিভাবে নূহ (আঃ)-কেও সঠিক পথ প্রদর্শন করেছি।” মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে ভাল বংশ দান করেছি। ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকূব (আঃ) বিরাট বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত নূহ (আঃ)-এর সময় সমস্ত দুনিয়াবাসীকে ধ্বংস করেছিলেন। সেই সময় শুধুমাত্র ঐ লোকগুলো রক্ষা পেয়েছিল যারা হযরত নূহ (আঃ) -এর উপর ঈমান এনে তাঁর নৌকায় আরোহণ করেছিল! এই পরিত্রাণ প্রাপ্ত লোকগুলোই ছিল হযরত নূহের সন্তান এবং সারা দুনিয়ার লোক হচ্ছে এদের সন্তান। আর ইবরাহীম (আঃ) -এর পরে তার সন্তানদের মধ্য থেকেই আল্লাহ নবী প্রেরণ করেন। যেমন তিনি বলেনঃ অর্থাৎ “আমি তার সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (২৯৪২৭) তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আমি নূহ (আঃ) ও ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রেরণ করেছি এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (৫৭:২৬) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেনঃ “নবীদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করেছেন, তারা আদম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, আর ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে আমি নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠিয়েছিলাম এবং তারা ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে আমি সুপথ প্রদর্শন করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম, যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা ক্রন্দনরত অবস্থায় সিজদায় পড়ে যায়।”এই আয়াতে কারীমায় (আরবী) শব্দ রয়েছে। এর অর্থ হবেঃ আমি তার সন্তানদেরকেও সুপথ দেখিয়েছি । অর্থাৎ দাউদ (আঃ) ও সুলাইমান (আঃ)-কেও হিদায়াত দান করেছি। কিন্তু যদি (আরবী) -এর সর্বনামটিকে(আরবী) -এর দিকে ফিরানো হয়, কেননা ওটা (আরবী) শব্দের নিকটতর, তবে এটা তো একেবারে পরিষ্কার কথা, এতে কোন জটিলতা নেই। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু যদি সর্বনামটিকে (আরবী) শব্দের দিকে ফিরানো হয়, কেননা বাকরীতি এরূপই বটে, তবে তো খুবই ভাল কথা। কিন্তু এতে একটু জটিলতা এই রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় ‘নূত' শব্দটিও এসে গেছে। অথচ হযরত লূত (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত নন। বরং তিনি হচ্ছেন তার ভাই হারূন ইবনে আযরের ছেলে। তবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের সংখ্যাধিক্যের কারণেই হয়তো হযরত লূত (আঃ)-কেও তার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহর নিম্নের উক্তিতেও রয়েছেঃ (আরবী) (২৪ ১৩৩) এখানে ইয়াকূব (আঃ)-এর পূর্বপুরুষদের ক্রমপরম্পরায় হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নামও চলে এসেছে, অথচ হযরত ইসমাঈল (আঃ) তো তাঁর চাচা ছিলেন। এটাও আধিক্য হিসাবেই হয়েছে। অনুরূপভাবে নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ (আরবী) (৩৮:৭৩-৭৪) এখানে ইবলীসকে ফেরেশতাদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। কেননা, ফেরেশতাদের সাথে তার সাদৃশ্য ছিল। প্রকৃতপক্ষে সে ফেরেশতা ছিল না। বরং সে ছিল জ্বিন, তার প্রকৃতি হচ্ছে আগুন এবং ফেরেশতাদের প্রকৃতি হচ্ছে আলো। তা ছাড়া এই কারণেও যে, হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ) বা হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় আনা হয়েছে। তাকেও যেন ইবরাহীম (আঃ)-এরই বংশধর বলা হয়েছে। এরূপ করা হয়েছে এই দলীলের উপর ভিত্তি করেই যে, কন্যার সন্তানদেরকেও তার পিতার বংশধর মনে করা হয়। এখন যদি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কোন সম্পর্ক থাকে তা শুধু এর উপর ভিত্তি করেই যে, তাঁর মা মারইয়াম (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর ছিলেন। নতুবা হযরত ঈসা (আঃ)-এর তো পিতাই ছিল না। বর্ণিত আছে যে, হাজ্জাজ ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াসারকে বলেনঃ “আমার নিকট সংবাদ পৌছেছে যে, আপনি নাকি হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবী (সঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলে থাকেন? অথচ তারা তো হযরত আলী (রাঃ) ও আবূ তালীবের বংশধর, আবার এও নাকি দাবী করেন যে, কুরআন কারীম দ্বারাই এটা প্রমাণিত? আমি তো কুরআন কারীম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেছি, কিন্তু কোন জায়গাতেই এটা পাইনি তো!” তখন ইবনে ইয়াসার তাঁকে বলেনঃ “আপনি কি সূরায়ে আনআমের ((আরবী) এবং (আরবী) পর্যন্ত পড়েন) -এই আয়াতগুলো পাঠ করেননি?” হাজ্জাজ উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, পড়েছি তো।” তিনি তখন বলেনঃ “এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে, অথচ তাঁর তো পিতাই ছিল না। শুধুমাত্র কন্যার সম্পর্কের কারণেই তাঁকে সন্তান ধরা হয়েছে। তাহলে কন্যার সম্পর্কের কারণে হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবীর সন্তান বলা হবে না কেন?” হাজ্জাজ তখন বলেনঃ “আপনি ঠিক কথাই বলেছেন।” এ কারণেই যখন কোন লোক স্বীয় মীরাস নিজের সন্তানের নামে অসিয়ত করে কিংবা ওয়াকফ বা হিবা করে, তখন ঐ সন্তানদের মধ্যে কন্যার সন্তানদেরও ধরে নেয়া হয়। কিন্তু যখন সে পুত্রদের নামে অসিয়ত বা ওয়াফ করে তখন নির্দিষ্টভাবে ঔরষজাত পুত্র বা পুত্রের পুত্ররাই হকদার হয়ে থাকে। অন্যান্যরা বলে থাকেন যে, এতে কন্যার সন্তানেরাও শামিল থাকবে। কেননা, সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ) সম্পর্কে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমার এই পুত্র সাইয়েদ বা নেতা এবং আল্লাহ এর মাধ্যমে মুসলমানদের দু’টি বড় দলের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দিবেন এবং যুদ্ধের ফিত্না প্রশমিত করবেন।” এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে পুত্র বলেছেন, যা এটাই প্রমাণ। করে যে, তাকে তার পুত্ররূপে গণ্য করা যেতে পারে। (আরবী) আল্লাহ তাআলার এই উক্তির মধ্যে নসল’ ও ‘নসব' এই দুটিরই উল্লেখ রয়েছে এবং হিদায়াত ও মনোনয়ন সবারই উপর প্রযোজ্য হয়েছে। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে মনোনীত করেছি এবং সরল সোজা পথে পরিচালিত করেছি।”(আরবী) অর্থাৎ এটাই আল্লাহর হিদায়াত; তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে চান এই পথে পরিচালিত করেন। (আরবী) অর্থাৎ যদি তারা শিরক করতো তবে তারা যা কিছুই করতো, সবই পণ্ড হয়ে যেতো। এখানে এটা বলাই উদ্দেশ্য যে, শিরকটা কতই কঠিন ব্যাপার এবং এর পরিণাম কতই না জঘন্য। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে ও তোমার পূর্ববর্তী নবীদের কাছে এই অহী করেছি যে, যদি তুমি শিরক কর তবে অবশ্যই তোমার আমল পণ্ড হয়ে যাবে।” (৩৯৪ ৬৫) এই বাক্যটি শর্তের স্থানে রয়েছে, আর শর্তের জন্যে এটা জরুরী নয় যে, ওটা সংঘটিত হবেই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- যদি রহমানের অর্থাৎ আল্লাহর সন্তান হয় তবে আমি প্রথম উপাসনাকারী হয়ে যাবো। (৪৩:৮১) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আমি খেল-তামাসা বানাতে চাইতাম তবে নিজের নিকট থেকেই বানিয়ে নিতাম।" (২১:১৭) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আল্লাহ সন্তান বানিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করতেন তবে স্বীয় মাখলুকের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করে নিতেন, কিন্তু এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং তিনি এক ও মহাপরাক্রমশালী।” (৩৯:৪)। (আরবী) এরা সেই লোক যাদেরকে আমি কিতাব, শাসনভার ও নবুওয়াত দান করেছি। আর এদের কারণেই আমি আমার বান্দাদেরকে নিয়ামত ও দ্বীনের অধিকারী করেছি। সুতরাং যদি এই লোকেরা অর্থাৎ মক্কাবাসী (এটা ইবনে আব্বাস (রাঃ), যহহাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ মনীষীদের উক্তি) নবুওয়াতকে অস্বীকার করে তবে আমি তাদের স্থলে এমন লোকদেরকে নিয়োগ করবো যারা ওটা অস্বীকার করবে না, বরং তারা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। এখন ঐ অস্বীকারকারীরা কুরায়েশই হাক বা অন্যেরাই হাক, আরবী হাক বা আজমীই হাক অথবা আহলে কিতাবই হাক, ওদের স্থলে অন্য জাতিকে অর্থাৎ মুহাজির ও আনসারদেরকে নিয়োগ করবো। তারা আমার কোন কথাকেই অস্বীকার করে না এবং প্রত্যাখ্যানও করে না। বরং তারা কুরআন কারীমের সমস্ত আয়াতের উপরই বিশ্বাস রাখে । আয়াতগুলো স্পষ্ট মর্ম বিশিষ্টই হাক অথবা অস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট হোক। এখন আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ “উল্লিখিত নবীরা এবং তাদের বাপ-দাদা, সন্তান-সন্ততি ও ভাই বেরাদর এমনই লোক, যাদেরকে আল্লাহ সুপথ প্রদর্শন করেছিলেন, সুতরাং তুমি তাদের অনুসরণ কর।”রাসূল (সঃ)-এর জন্যে যখন এই আদেশ, তখন তাঁর উম্মত তো তাঁরই অনুসারী, সুতরাং তাদের উপরও যে এই আদেশই প্রযোজ্য এটা বলাই বাহুল্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- সূরায়ে এ কি সিজদা রয়েছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলা পাঠ করে বলেনঃ তিনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। ইয়াযিদ ইবনে হারূন, মুহাম্মাদ ইবনে উবাইদ ও সুহাইল ইবনে ইউসুফ আওয়াম হতে, তিনি মুজাহিদ হতে নিম্নের কথাটুকু বেশী বর্ণনা করেনঃমুজাহিদ বলেনঃ আমি ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন- “তোমাদের নবী (সঃ) তাঁদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে তাদের অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (আরবী) হে নবী (সঃ)! তুমি লোকদেরকে বলে দাও-আমি তোমাদের কাছে এই কুরআন প্রচারের বিনিময়ে কোন কিছুই যাজ্ঞা করি না।(আরবী) এটা তো হচ্ছে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যে উপদেশের ভাণ্ডার, যেন তারা এর মাধ্যমে গুমরাহী থেকে হিদায়াতের দিকে আসতে পারে এবং কুফরী ছেড়ে ঈমান আনয়ন করতে পারে।
আল-আনআম 6:85
৮৪-৯০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেন-ইবরাহীম (আঃ)-কে আমি ইসহাকের ন্যায় সুসন্তান দান করেছি, অথচ বার্ধক্যের কারণে সে এবং তার স্ত্রী সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে গিয়েছিল। ফেরেশতা তাদের কাছে আসেন এবং তারা হযরত লূত (আঃ)-এর কাছেও যাচ্ছিলেন। ফেরেশতাগণ স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ দেন। তখন স্ত্রী হতবুদ্ধি হয়ে বলেনঃ “হায়! হায়! কি করে আমাদের সন্তান হবে! আমি তো বন্ধ্যা ও বৃদ্ধা এবং আমার স্বামী (ইবরাহীম আঃ) অতি বৃদ্ধ! সুতরাং এটা কতই বিস্ময়কর কথা!” তখন ফেরেশতাগণ বলেনঃ “আপনি কি আল্লাহর কাজে বিস্ময় বোধ করছেন? হে বাড়ীর মালিকগণ! আপনাদের উপর আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হাক।” ফেরেশতাগণ তাদেরকে এ সুসংবাদও দেন যে, ইসহাক (আঃ) নবীও হবেন এবং তার বংশ বৃদ্ধিও হবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর সুসংবাদ দিলাম, যে নবী হবে ও সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (৩৭:১১২) এটা বড় সুসংবাদ এবং বড় নিয়ামতও বটে। আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর শুভ সংবাদ দিলাম এবং এ সুসংবাদও দিলাম যে, ইসহাক (আঃ) -এর ঔরষে ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবে।” (১১:৭১) মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর স্ত্রীকে এ সংবাদ দেন যে, তাঁদের জীবদ্দশাতেই ইসহাকের আঃ ঔরষে হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবেন। সুতরাং পুত্র ইসহাকের জন্মগ্রহণের ফলে যেমন তাঁদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে, অনুরূপভাবে পৌত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মগ্রহণের ফলেও তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে। কেননা, বংশ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পৌত্রের জন্মলাভ খুবই খুশীর ব্যাপার। বদ্ধ ও বদ্ধা যখন সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে যাচ্ছেন যে, তাদের সন্তান লাভ সম্ভব নয়, এমতাবস্থায় পুত্র ইসহাক (আঃ) -এর জন্মলাভ এবং ইসহাক (আঃ) -এর পুত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মলাভ এটা কি কম খুশীর কথা! এতে কে না খুশী হয়? এটা ছিল হযরত ইবরাহীমের নেক আমলেরই প্রতিদান, যিনি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিজের দেশ ও জাতিকে ছেড়ে দিয়ে দূর দূরান্তের পথে পাড়ি জমালেন। এর প্রতিদানই ছিল তার ঔরষজাত নেককার সন্তানগণ, যাদের কারণে তাঁর চক্ষু ঠাণ্ডা হয়েছিল । যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যখন ইবরাহীম স্বীয় কওম ও তাদের মা’বৃদদেরকে পরিত্যাগ করলো তখন আমি তাকে প্রতিদান হিসাবে ইসহাক ও ইয়বকে দানলাম।” আর এখানে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক ও ইয়াকূবকে দান করেছি এবং উভয়কেই সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছি।” এরপর বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তার পূর্বে এমনিভাবে নূহ (আঃ)-কেও সঠিক পথ প্রদর্শন করেছি।” মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে ভাল বংশ দান করেছি। ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকূব (আঃ) বিরাট বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত নূহ (আঃ)-এর সময় সমস্ত দুনিয়াবাসীকে ধ্বংস করেছিলেন। সেই সময় শুধুমাত্র ঐ লোকগুলো রক্ষা পেয়েছিল যারা হযরত নূহ (আঃ) -এর উপর ঈমান এনে তাঁর নৌকায় আরোহণ করেছিল! এই পরিত্রাণ প্রাপ্ত লোকগুলোই ছিল হযরত নূহের সন্তান এবং সারা দুনিয়ার লোক হচ্ছে এদের সন্তান। আর ইবরাহীম (আঃ) -এর পরে তার সন্তানদের মধ্য থেকেই আল্লাহ নবী প্রেরণ করেন। যেমন তিনি বলেনঃ অর্থাৎ “আমি তার সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (২৯৪২৭) তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আমি নূহ (আঃ) ও ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রেরণ করেছি এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (৫৭:২৬) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেনঃ “নবীদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করেছেন, তারা আদম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, আর ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে আমি নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠিয়েছিলাম এবং তারা ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে আমি সুপথ প্রদর্শন করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম, যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা ক্রন্দনরত অবস্থায় সিজদায় পড়ে যায়।”এই আয়াতে কারীমায় (আরবী) শব্দ রয়েছে। এর অর্থ হবেঃ আমি তার সন্তানদেরকেও সুপথ দেখিয়েছি । অর্থাৎ দাউদ (আঃ) ও সুলাইমান (আঃ)-কেও হিদায়াত দান করেছি। কিন্তু যদি (আরবী) -এর সর্বনামটিকে(আরবী) -এর দিকে ফিরানো হয়, কেননা ওটা (আরবী) শব্দের নিকটতর, তবে এটা তো একেবারে পরিষ্কার কথা, এতে কোন জটিলতা নেই। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু যদি সর্বনামটিকে (আরবী) শব্দের দিকে ফিরানো হয়, কেননা বাকরীতি এরূপই বটে, তবে তো খুবই ভাল কথা। কিন্তু এতে একটু জটিলতা এই রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় ‘নূত' শব্দটিও এসে গেছে। অথচ হযরত লূত (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত নন। বরং তিনি হচ্ছেন তার ভাই হারূন ইবনে আযরের ছেলে। তবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের সংখ্যাধিক্যের কারণেই হয়তো হযরত লূত (আঃ)-কেও তার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহর নিম্নের উক্তিতেও রয়েছেঃ (আরবী) (২৪ ১৩৩) এখানে ইয়াকূব (আঃ)-এর পূর্বপুরুষদের ক্রমপরম্পরায় হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নামও চলে এসেছে, অথচ হযরত ইসমাঈল (আঃ) তো তাঁর চাচা ছিলেন। এটাও আধিক্য হিসাবেই হয়েছে। অনুরূপভাবে নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ (আরবী) (৩৮:৭৩-৭৪) এখানে ইবলীসকে ফেরেশতাদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। কেননা, ফেরেশতাদের সাথে তার সাদৃশ্য ছিল। প্রকৃতপক্ষে সে ফেরেশতা ছিল না। বরং সে ছিল জ্বিন, তার প্রকৃতি হচ্ছে আগুন এবং ফেরেশতাদের প্রকৃতি হচ্ছে আলো। তা ছাড়া এই কারণেও যে, হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ) বা হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় আনা হয়েছে। তাকেও যেন ইবরাহীম (আঃ)-এরই বংশধর বলা হয়েছে। এরূপ করা হয়েছে এই দলীলের উপর ভিত্তি করেই যে, কন্যার সন্তানদেরকেও তার পিতার বংশধর মনে করা হয়। এখন যদি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কোন সম্পর্ক থাকে তা শুধু এর উপর ভিত্তি করেই যে, তাঁর মা মারইয়াম (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর ছিলেন। নতুবা হযরত ঈসা (আঃ)-এর তো পিতাই ছিল না। বর্ণিত আছে যে, হাজ্জাজ ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াসারকে বলেনঃ “আমার নিকট সংবাদ পৌছেছে যে, আপনি নাকি হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবী (সঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলে থাকেন? অথচ তারা তো হযরত আলী (রাঃ) ও আবূ তালীবের বংশধর, আবার এও নাকি দাবী করেন যে, কুরআন কারীম দ্বারাই এটা প্রমাণিত? আমি তো কুরআন কারীম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেছি, কিন্তু কোন জায়গাতেই এটা পাইনি তো!” তখন ইবনে ইয়াসার তাঁকে বলেনঃ “আপনি কি সূরায়ে আনআমের ((আরবী) এবং (আরবী) পর্যন্ত পড়েন) -এই আয়াতগুলো পাঠ করেননি?” হাজ্জাজ উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, পড়েছি তো।” তিনি তখন বলেনঃ “এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে, অথচ তাঁর তো পিতাই ছিল না। শুধুমাত্র কন্যার সম্পর্কের কারণেই তাঁকে সন্তান ধরা হয়েছে। তাহলে কন্যার সম্পর্কের কারণে হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবীর সন্তান বলা হবে না কেন?” হাজ্জাজ তখন বলেনঃ “আপনি ঠিক কথাই বলেছেন।” এ কারণেই যখন কোন লোক স্বীয় মীরাস নিজের সন্তানের নামে অসিয়ত করে কিংবা ওয়াকফ বা হিবা করে, তখন ঐ সন্তানদের মধ্যে কন্যার সন্তানদেরও ধরে নেয়া হয়। কিন্তু যখন সে পুত্রদের নামে অসিয়ত বা ওয়াফ করে তখন নির্দিষ্টভাবে ঔরষজাত পুত্র বা পুত্রের পুত্ররাই হকদার হয়ে থাকে। অন্যান্যরা বলে থাকেন যে, এতে কন্যার সন্তানেরাও শামিল থাকবে। কেননা, সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ) সম্পর্কে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমার এই পুত্র সাইয়েদ বা নেতা এবং আল্লাহ এর মাধ্যমে মুসলমানদের দু’টি বড় দলের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দিবেন এবং যুদ্ধের ফিত্না প্রশমিত করবেন।” এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে পুত্র বলেছেন, যা এটাই প্রমাণ। করে যে, তাকে তার পুত্ররূপে গণ্য করা যেতে পারে। (আরবী) আল্লাহ তাআলার এই উক্তির মধ্যে নসল’ ও ‘নসব' এই দুটিরই উল্লেখ রয়েছে এবং হিদায়াত ও মনোনয়ন সবারই উপর প্রযোজ্য হয়েছে। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে মনোনীত করেছি এবং সরল সোজা পথে পরিচালিত করেছি।”(আরবী) অর্থাৎ এটাই আল্লাহর হিদায়াত; তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে চান এই পথে পরিচালিত করেন। (আরবী) অর্থাৎ যদি তারা শিরক করতো তবে তারা যা কিছুই করতো, সবই পণ্ড হয়ে যেতো। এখানে এটা বলাই উদ্দেশ্য যে, শিরকটা কতই কঠিন ব্যাপার এবং এর পরিণাম কতই না জঘন্য। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে ও তোমার পূর্ববর্তী নবীদের কাছে এই অহী করেছি যে, যদি তুমি শিরক কর তবে অবশ্যই তোমার আমল পণ্ড হয়ে যাবে।” (৩৯৪ ৬৫) এই বাক্যটি শর্তের স্থানে রয়েছে, আর শর্তের জন্যে এটা জরুরী নয় যে, ওটা সংঘটিত হবেই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- যদি রহমানের অর্থাৎ আল্লাহর সন্তান হয় তবে আমি প্রথম উপাসনাকারী হয়ে যাবো। (৪৩:৮১) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আমি খেল-তামাসা বানাতে চাইতাম তবে নিজের নিকট থেকেই বানিয়ে নিতাম।" (২১:১৭) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আল্লাহ সন্তান বানিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করতেন তবে স্বীয় মাখলুকের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করে নিতেন, কিন্তু এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং তিনি এক ও মহাপরাক্রমশালী।” (৩৯:৪)। (আরবী) এরা সেই লোক যাদেরকে আমি কিতাব, শাসনভার ও নবুওয়াত দান করেছি। আর এদের কারণেই আমি আমার বান্দাদেরকে নিয়ামত ও দ্বীনের অধিকারী করেছি। সুতরাং যদি এই লোকেরা অর্থাৎ মক্কাবাসী (এটা ইবনে আব্বাস (রাঃ), যহহাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ মনীষীদের উক্তি) নবুওয়াতকে অস্বীকার করে তবে আমি তাদের স্থলে এমন লোকদেরকে নিয়োগ করবো যারা ওটা অস্বীকার করবে না, বরং তারা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। এখন ঐ অস্বীকারকারীরা কুরায়েশই হাক বা অন্যেরাই হাক, আরবী হাক বা আজমীই হাক অথবা আহলে কিতাবই হাক, ওদের স্থলে অন্য জাতিকে অর্থাৎ মুহাজির ও আনসারদেরকে নিয়োগ করবো। তারা আমার কোন কথাকেই অস্বীকার করে না এবং প্রত্যাখ্যানও করে না। বরং তারা কুরআন কারীমের সমস্ত আয়াতের উপরই বিশ্বাস রাখে । আয়াতগুলো স্পষ্ট মর্ম বিশিষ্টই হাক অথবা অস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট হোক। এখন আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ “উল্লিখিত নবীরা এবং তাদের বাপ-দাদা, সন্তান-সন্ততি ও ভাই বেরাদর এমনই লোক, যাদেরকে আল্লাহ সুপথ প্রদর্শন করেছিলেন, সুতরাং তুমি তাদের অনুসরণ কর।”রাসূল (সঃ)-এর জন্যে যখন এই আদেশ, তখন তাঁর উম্মত তো তাঁরই অনুসারী, সুতরাং তাদের উপরও যে এই আদেশই প্রযোজ্য এটা বলাই বাহুল্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- সূরায়ে এ কি সিজদা রয়েছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলা পাঠ করে বলেনঃ তিনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। ইয়াযিদ ইবনে হারূন, মুহাম্মাদ ইবনে উবাইদ ও সুহাইল ইবনে ইউসুফ আওয়াম হতে, তিনি মুজাহিদ হতে নিম্নের কথাটুকু বেশী বর্ণনা করেনঃমুজাহিদ বলেনঃ আমি ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন- “তোমাদের নবী (সঃ) তাঁদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে তাদের অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (আরবী) হে নবী (সঃ)! তুমি লোকদেরকে বলে দাও-আমি তোমাদের কাছে এই কুরআন প্রচারের বিনিময়ে কোন কিছুই যাজ্ঞা করি না।(আরবী) এটা তো হচ্ছে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যে উপদেশের ভাণ্ডার, যেন তারা এর মাধ্যমে গুমরাহী থেকে হিদায়াতের দিকে আসতে পারে এবং কুফরী ছেড়ে ঈমান আনয়ন করতে পারে।
আল-আনআম 6:86
৮৪-৯০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেন-ইবরাহীম (আঃ)-কে আমি ইসহাকের ন্যায় সুসন্তান দান করেছি, অথচ বার্ধক্যের কারণে সে এবং তার স্ত্রী সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে গিয়েছিল। ফেরেশতা তাদের কাছে আসেন এবং তারা হযরত লূত (আঃ)-এর কাছেও যাচ্ছিলেন। ফেরেশতাগণ স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ দেন। তখন স্ত্রী হতবুদ্ধি হয়ে বলেনঃ “হায়! হায়! কি করে আমাদের সন্তান হবে! আমি তো বন্ধ্যা ও বৃদ্ধা এবং আমার স্বামী (ইবরাহীম আঃ) অতি বৃদ্ধ! সুতরাং এটা কতই বিস্ময়কর কথা!” তখন ফেরেশতাগণ বলেনঃ “আপনি কি আল্লাহর কাজে বিস্ময় বোধ করছেন? হে বাড়ীর মালিকগণ! আপনাদের উপর আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হাক।” ফেরেশতাগণ তাদেরকে এ সুসংবাদও দেন যে, ইসহাক (আঃ) নবীও হবেন এবং তার বংশ বৃদ্ধিও হবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর সুসংবাদ দিলাম, যে নবী হবে ও সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (৩৭:১১২) এটা বড় সুসংবাদ এবং বড় নিয়ামতও বটে। আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর শুভ সংবাদ দিলাম এবং এ সুসংবাদও দিলাম যে, ইসহাক (আঃ) -এর ঔরষে ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবে।” (১১:৭১) মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর স্ত্রীকে এ সংবাদ দেন যে, তাঁদের জীবদ্দশাতেই ইসহাকের আঃ ঔরষে হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবেন। সুতরাং পুত্র ইসহাকের জন্মগ্রহণের ফলে যেমন তাঁদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে, অনুরূপভাবে পৌত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মগ্রহণের ফলেও তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে। কেননা, বংশ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পৌত্রের জন্মলাভ খুবই খুশীর ব্যাপার। বদ্ধ ও বদ্ধা যখন সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে যাচ্ছেন যে, তাদের সন্তান লাভ সম্ভব নয়, এমতাবস্থায় পুত্র ইসহাক (আঃ) -এর জন্মলাভ এবং ইসহাক (আঃ) -এর পুত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মলাভ এটা কি কম খুশীর কথা! এতে কে না খুশী হয়? এটা ছিল হযরত ইবরাহীমের নেক আমলেরই প্রতিদান, যিনি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিজের দেশ ও জাতিকে ছেড়ে দিয়ে দূর দূরান্তের পথে পাড়ি জমালেন। এর প্রতিদানই ছিল তার ঔরষজাত নেককার সন্তানগণ, যাদের কারণে তাঁর চক্ষু ঠাণ্ডা হয়েছিল । যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যখন ইবরাহীম স্বীয় কওম ও তাদের মা’বৃদদেরকে পরিত্যাগ করলো তখন আমি তাকে প্রতিদান হিসাবে ইসহাক ও ইয়বকে দানলাম।” আর এখানে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক ও ইয়াকূবকে দান করেছি এবং উভয়কেই সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছি।” এরপর বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তার পূর্বে এমনিভাবে নূহ (আঃ)-কেও সঠিক পথ প্রদর্শন করেছি।” মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে ভাল বংশ দান করেছি। ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকূব (আঃ) বিরাট বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত নূহ (আঃ)-এর সময় সমস্ত দুনিয়াবাসীকে ধ্বংস করেছিলেন। সেই সময় শুধুমাত্র ঐ লোকগুলো রক্ষা পেয়েছিল যারা হযরত নূহ (আঃ) -এর উপর ঈমান এনে তাঁর নৌকায় আরোহণ করেছিল! এই পরিত্রাণ প্রাপ্ত লোকগুলোই ছিল হযরত নূহের সন্তান এবং সারা দুনিয়ার লোক হচ্ছে এদের সন্তান। আর ইবরাহীম (আঃ) -এর পরে তার সন্তানদের মধ্য থেকেই আল্লাহ নবী প্রেরণ করেন। যেমন তিনি বলেনঃ অর্থাৎ “আমি তার সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (২৯৪২৭) তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আমি নূহ (আঃ) ও ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রেরণ করেছি এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (৫৭:২৬) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেনঃ “নবীদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করেছেন, তারা আদম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, আর ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে আমি নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠিয়েছিলাম এবং তারা ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে আমি সুপথ প্রদর্শন করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম, যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা ক্রন্দনরত অবস্থায় সিজদায় পড়ে যায়।”এই আয়াতে কারীমায় (আরবী) শব্দ রয়েছে। এর অর্থ হবেঃ আমি তার সন্তানদেরকেও সুপথ দেখিয়েছি । অর্থাৎ দাউদ (আঃ) ও সুলাইমান (আঃ)-কেও হিদায়াত দান করেছি। কিন্তু যদি (আরবী) -এর সর্বনামটিকে(আরবী) -এর দিকে ফিরানো হয়, কেননা ওটা (আরবী) শব্দের নিকটতর, তবে এটা তো একেবারে পরিষ্কার কথা, এতে কোন জটিলতা নেই। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু যদি সর্বনামটিকে (আরবী) শব্দের দিকে ফিরানো হয়, কেননা বাকরীতি এরূপই বটে, তবে তো খুবই ভাল কথা। কিন্তু এতে একটু জটিলতা এই রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় ‘নূত' শব্দটিও এসে গেছে। অথচ হযরত লূত (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত নন। বরং তিনি হচ্ছেন তার ভাই হারূন ইবনে আযরের ছেলে। তবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের সংখ্যাধিক্যের কারণেই হয়তো হযরত লূত (আঃ)-কেও তার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহর নিম্নের উক্তিতেও রয়েছেঃ (আরবী) (২৪ ১৩৩) এখানে ইয়াকূব (আঃ)-এর পূর্বপুরুষদের ক্রমপরম্পরায় হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নামও চলে এসেছে, অথচ হযরত ইসমাঈল (আঃ) তো তাঁর চাচা ছিলেন। এটাও আধিক্য হিসাবেই হয়েছে। অনুরূপভাবে নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ (আরবী) (৩৮:৭৩-৭৪) এখানে ইবলীসকে ফেরেশতাদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। কেননা, ফেরেশতাদের সাথে তার সাদৃশ্য ছিল। প্রকৃতপক্ষে সে ফেরেশতা ছিল না। বরং সে ছিল জ্বিন, তার প্রকৃতি হচ্ছে আগুন এবং ফেরেশতাদের প্রকৃতি হচ্ছে আলো। তা ছাড়া এই কারণেও যে, হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ) বা হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় আনা হয়েছে। তাকেও যেন ইবরাহীম (আঃ)-এরই বংশধর বলা হয়েছে। এরূপ করা হয়েছে এই দলীলের উপর ভিত্তি করেই যে, কন্যার সন্তানদেরকেও তার পিতার বংশধর মনে করা হয়। এখন যদি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কোন সম্পর্ক থাকে তা শুধু এর উপর ভিত্তি করেই যে, তাঁর মা মারইয়াম (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর ছিলেন। নতুবা হযরত ঈসা (আঃ)-এর তো পিতাই ছিল না। বর্ণিত আছে যে, হাজ্জাজ ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াসারকে বলেনঃ “আমার নিকট সংবাদ পৌছেছে যে, আপনি নাকি হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবী (সঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলে থাকেন? অথচ তারা তো হযরত আলী (রাঃ) ও আবূ তালীবের বংশধর, আবার এও নাকি দাবী করেন যে, কুরআন কারীম দ্বারাই এটা প্রমাণিত? আমি তো কুরআন কারীম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেছি, কিন্তু কোন জায়গাতেই এটা পাইনি তো!” তখন ইবনে ইয়াসার তাঁকে বলেনঃ “আপনি কি সূরায়ে আনআমের ((আরবী) এবং (আরবী) পর্যন্ত পড়েন) -এই আয়াতগুলো পাঠ করেননি?” হাজ্জাজ উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, পড়েছি তো।” তিনি তখন বলেনঃ “এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে, অথচ তাঁর তো পিতাই ছিল না। শুধুমাত্র কন্যার সম্পর্কের কারণেই তাঁকে সন্তান ধরা হয়েছে। তাহলে কন্যার সম্পর্কের কারণে হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবীর সন্তান বলা হবে না কেন?” হাজ্জাজ তখন বলেনঃ “আপনি ঠিক কথাই বলেছেন।” এ কারণেই যখন কোন লোক স্বীয় মীরাস নিজের সন্তানের নামে অসিয়ত করে কিংবা ওয়াকফ বা হিবা করে, তখন ঐ সন্তানদের মধ্যে কন্যার সন্তানদেরও ধরে নেয়া হয়। কিন্তু যখন সে পুত্রদের নামে অসিয়ত বা ওয়াফ করে তখন নির্দিষ্টভাবে ঔরষজাত পুত্র বা পুত্রের পুত্ররাই হকদার হয়ে থাকে। অন্যান্যরা বলে থাকেন যে, এতে কন্যার সন্তানেরাও শামিল থাকবে। কেননা, সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ) সম্পর্কে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমার এই পুত্র সাইয়েদ বা নেতা এবং আল্লাহ এর মাধ্যমে মুসলমানদের দু’টি বড় দলের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দিবেন এবং যুদ্ধের ফিত্না প্রশমিত করবেন।” এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে পুত্র বলেছেন, যা এটাই প্রমাণ। করে যে, তাকে তার পুত্ররূপে গণ্য করা যেতে পারে। (আরবী) আল্লাহ তাআলার এই উক্তির মধ্যে নসল’ ও ‘নসব' এই দুটিরই উল্লেখ রয়েছে এবং হিদায়াত ও মনোনয়ন সবারই উপর প্রযোজ্য হয়েছে। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে মনোনীত করেছি এবং সরল সোজা পথে পরিচালিত করেছি।”(আরবী) অর্থাৎ এটাই আল্লাহর হিদায়াত; তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে চান এই পথে পরিচালিত করেন। (আরবী) অর্থাৎ যদি তারা শিরক করতো তবে তারা যা কিছুই করতো, সবই পণ্ড হয়ে যেতো। এখানে এটা বলাই উদ্দেশ্য যে, শিরকটা কতই কঠিন ব্যাপার এবং এর পরিণাম কতই না জঘন্য। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে ও তোমার পূর্ববর্তী নবীদের কাছে এই অহী করেছি যে, যদি তুমি শিরক কর তবে অবশ্যই তোমার আমল পণ্ড হয়ে যাবে।” (৩৯৪ ৬৫) এই বাক্যটি শর্তের স্থানে রয়েছে, আর শর্তের জন্যে এটা জরুরী নয় যে, ওটা সংঘটিত হবেই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- যদি রহমানের অর্থাৎ আল্লাহর সন্তান হয় তবে আমি প্রথম উপাসনাকারী হয়ে যাবো। (৪৩:৮১) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আমি খেল-তামাসা বানাতে চাইতাম তবে নিজের নিকট থেকেই বানিয়ে নিতাম।" (২১:১৭) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আল্লাহ সন্তান বানিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করতেন তবে স্বীয় মাখলুকের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করে নিতেন, কিন্তু এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং তিনি এক ও মহাপরাক্রমশালী।” (৩৯:৪)। (আরবী) এরা সেই লোক যাদেরকে আমি কিতাব, শাসনভার ও নবুওয়াত দান করেছি। আর এদের কারণেই আমি আমার বান্দাদেরকে নিয়ামত ও দ্বীনের অধিকারী করেছি। সুতরাং যদি এই লোকেরা অর্থাৎ মক্কাবাসী (এটা ইবনে আব্বাস (রাঃ), যহহাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ মনীষীদের উক্তি) নবুওয়াতকে অস্বীকার করে তবে আমি তাদের স্থলে এমন লোকদেরকে নিয়োগ করবো যারা ওটা অস্বীকার করবে না, বরং তারা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। এখন ঐ অস্বীকারকারীরা কুরায়েশই হাক বা অন্যেরাই হাক, আরবী হাক বা আজমীই হাক অথবা আহলে কিতাবই হাক, ওদের স্থলে অন্য জাতিকে অর্থাৎ মুহাজির ও আনসারদেরকে নিয়োগ করবো। তারা আমার কোন কথাকেই অস্বীকার করে না এবং প্রত্যাখ্যানও করে না। বরং তারা কুরআন কারীমের সমস্ত আয়াতের উপরই বিশ্বাস রাখে । আয়াতগুলো স্পষ্ট মর্ম বিশিষ্টই হাক অথবা অস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট হোক। এখন আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ “উল্লিখিত নবীরা এবং তাদের বাপ-দাদা, সন্তান-সন্ততি ও ভাই বেরাদর এমনই লোক, যাদেরকে আল্লাহ সুপথ প্রদর্শন করেছিলেন, সুতরাং তুমি তাদের অনুসরণ কর।”রাসূল (সঃ)-এর জন্যে যখন এই আদেশ, তখন তাঁর উম্মত তো তাঁরই অনুসারী, সুতরাং তাদের উপরও যে এই আদেশই প্রযোজ্য এটা বলাই বাহুল্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- সূরায়ে এ কি সিজদা রয়েছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলা পাঠ করে বলেনঃ তিনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। ইয়াযিদ ইবনে হারূন, মুহাম্মাদ ইবনে উবাইদ ও সুহাইল ইবনে ইউসুফ আওয়াম হতে, তিনি মুজাহিদ হতে নিম্নের কথাটুকু বেশী বর্ণনা করেনঃমুজাহিদ বলেনঃ আমি ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন- “তোমাদের নবী (সঃ) তাঁদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে তাদের অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (আরবী) হে নবী (সঃ)! তুমি লোকদেরকে বলে দাও-আমি তোমাদের কাছে এই কুরআন প্রচারের বিনিময়ে কোন কিছুই যাজ্ঞা করি না।(আরবী) এটা তো হচ্ছে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যে উপদেশের ভাণ্ডার, যেন তারা এর মাধ্যমে গুমরাহী থেকে হিদায়াতের দিকে আসতে পারে এবং কুফরী ছেড়ে ঈমান আনয়ন করতে পারে।
আল-আনআম 6:87
৮৪-৯০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেন-ইবরাহীম (আঃ)-কে আমি ইসহাকের ন্যায় সুসন্তান দান করেছি, অথচ বার্ধক্যের কারণে সে এবং তার স্ত্রী সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে গিয়েছিল। ফেরেশতা তাদের কাছে আসেন এবং তারা হযরত লূত (আঃ)-এর কাছেও যাচ্ছিলেন। ফেরেশতাগণ স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ দেন। তখন স্ত্রী হতবুদ্ধি হয়ে বলেনঃ “হায়! হায়! কি করে আমাদের সন্তান হবে! আমি তো বন্ধ্যা ও বৃদ্ধা এবং আমার স্বামী (ইবরাহীম আঃ) অতি বৃদ্ধ! সুতরাং এটা কতই বিস্ময়কর কথা!” তখন ফেরেশতাগণ বলেনঃ “আপনি কি আল্লাহর কাজে বিস্ময় বোধ করছেন? হে বাড়ীর মালিকগণ! আপনাদের উপর আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হাক।” ফেরেশতাগণ তাদেরকে এ সুসংবাদও দেন যে, ইসহাক (আঃ) নবীও হবেন এবং তার বংশ বৃদ্ধিও হবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর সুসংবাদ দিলাম, যে নবী হবে ও সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (৩৭:১১২) এটা বড় সুসংবাদ এবং বড় নিয়ামতও বটে। আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর শুভ সংবাদ দিলাম এবং এ সুসংবাদও দিলাম যে, ইসহাক (আঃ) -এর ঔরষে ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবে।” (১১:৭১) মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর স্ত্রীকে এ সংবাদ দেন যে, তাঁদের জীবদ্দশাতেই ইসহাকের আঃ ঔরষে হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবেন। সুতরাং পুত্র ইসহাকের জন্মগ্রহণের ফলে যেমন তাঁদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে, অনুরূপভাবে পৌত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মগ্রহণের ফলেও তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে। কেননা, বংশ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পৌত্রের জন্মলাভ খুবই খুশীর ব্যাপার। বদ্ধ ও বদ্ধা যখন সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে যাচ্ছেন যে, তাদের সন্তান লাভ সম্ভব নয়, এমতাবস্থায় পুত্র ইসহাক (আঃ) -এর জন্মলাভ এবং ইসহাক (আঃ) -এর পুত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মলাভ এটা কি কম খুশীর কথা! এতে কে না খুশী হয়? এটা ছিল হযরত ইবরাহীমের নেক আমলেরই প্রতিদান, যিনি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিজের দেশ ও জাতিকে ছেড়ে দিয়ে দূর দূরান্তের পথে পাড়ি জমালেন। এর প্রতিদানই ছিল তার ঔরষজাত নেককার সন্তানগণ, যাদের কারণে তাঁর চক্ষু ঠাণ্ডা হয়েছিল । যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যখন ইবরাহীম স্বীয় কওম ও তাদের মা’বৃদদেরকে পরিত্যাগ করলো তখন আমি তাকে প্রতিদান হিসাবে ইসহাক ও ইয়বকে দানলাম।” আর এখানে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক ও ইয়াকূবকে দান করেছি এবং উভয়কেই সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছি।” এরপর বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তার পূর্বে এমনিভাবে নূহ (আঃ)-কেও সঠিক পথ প্রদর্শন করেছি।” মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে ভাল বংশ দান করেছি। ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকূব (আঃ) বিরাট বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত নূহ (আঃ)-এর সময় সমস্ত দুনিয়াবাসীকে ধ্বংস করেছিলেন। সেই সময় শুধুমাত্র ঐ লোকগুলো রক্ষা পেয়েছিল যারা হযরত নূহ (আঃ) -এর উপর ঈমান এনে তাঁর নৌকায় আরোহণ করেছিল! এই পরিত্রাণ প্রাপ্ত লোকগুলোই ছিল হযরত নূহের সন্তান এবং সারা দুনিয়ার লোক হচ্ছে এদের সন্তান। আর ইবরাহীম (আঃ) -এর পরে তার সন্তানদের মধ্য থেকেই আল্লাহ নবী প্রেরণ করেন। যেমন তিনি বলেনঃ অর্থাৎ “আমি তার সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (২৯৪২৭) তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আমি নূহ (আঃ) ও ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রেরণ করেছি এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (৫৭:২৬) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেনঃ “নবীদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করেছেন, তারা আদম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, আর ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে আমি নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠিয়েছিলাম এবং তারা ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে আমি সুপথ প্রদর্শন করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম, যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা ক্রন্দনরত অবস্থায় সিজদায় পড়ে যায়।”এই আয়াতে কারীমায় (আরবী) শব্দ রয়েছে। এর অর্থ হবেঃ আমি তার সন্তানদেরকেও সুপথ দেখিয়েছি । অর্থাৎ দাউদ (আঃ) ও সুলাইমান (আঃ)-কেও হিদায়াত দান করেছি। কিন্তু যদি (আরবী) -এর সর্বনামটিকে(আরবী) -এর দিকে ফিরানো হয়, কেননা ওটা (আরবী) শব্দের নিকটতর, তবে এটা তো একেবারে পরিষ্কার কথা, এতে কোন জটিলতা নেই। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু যদি সর্বনামটিকে (আরবী) শব্দের দিকে ফিরানো হয়, কেননা বাকরীতি এরূপই বটে, তবে তো খুবই ভাল কথা। কিন্তু এতে একটু জটিলতা এই রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় ‘নূত' শব্দটিও এসে গেছে। অথচ হযরত লূত (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত নন। বরং তিনি হচ্ছেন তার ভাই হারূন ইবনে আযরের ছেলে। তবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের সংখ্যাধিক্যের কারণেই হয়তো হযরত লূত (আঃ)-কেও তার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহর নিম্নের উক্তিতেও রয়েছেঃ (আরবী) (২৪ ১৩৩) এখানে ইয়াকূব (আঃ)-এর পূর্বপুরুষদের ক্রমপরম্পরায় হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নামও চলে এসেছে, অথচ হযরত ইসমাঈল (আঃ) তো তাঁর চাচা ছিলেন। এটাও আধিক্য হিসাবেই হয়েছে। অনুরূপভাবে নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ (আরবী) (৩৮:৭৩-৭৪) এখানে ইবলীসকে ফেরেশতাদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। কেননা, ফেরেশতাদের সাথে তার সাদৃশ্য ছিল। প্রকৃতপক্ষে সে ফেরেশতা ছিল না। বরং সে ছিল জ্বিন, তার প্রকৃতি হচ্ছে আগুন এবং ফেরেশতাদের প্রকৃতি হচ্ছে আলো। তা ছাড়া এই কারণেও যে, হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ) বা হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় আনা হয়েছে। তাকেও যেন ইবরাহীম (আঃ)-এরই বংশধর বলা হয়েছে। এরূপ করা হয়েছে এই দলীলের উপর ভিত্তি করেই যে, কন্যার সন্তানদেরকেও তার পিতার বংশধর মনে করা হয়। এখন যদি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কোন সম্পর্ক থাকে তা শুধু এর উপর ভিত্তি করেই যে, তাঁর মা মারইয়াম (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর ছিলেন। নতুবা হযরত ঈসা (আঃ)-এর তো পিতাই ছিল না। বর্ণিত আছে যে, হাজ্জাজ ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াসারকে বলেনঃ “আমার নিকট সংবাদ পৌছেছে যে, আপনি নাকি হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবী (সঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলে থাকেন? অথচ তারা তো হযরত আলী (রাঃ) ও আবূ তালীবের বংশধর, আবার এও নাকি দাবী করেন যে, কুরআন কারীম দ্বারাই এটা প্রমাণিত? আমি তো কুরআন কারীম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেছি, কিন্তু কোন জায়গাতেই এটা পাইনি তো!” তখন ইবনে ইয়াসার তাঁকে বলেনঃ “আপনি কি সূরায়ে আনআমের ((আরবী) এবং (আরবী) পর্যন্ত পড়েন) -এই আয়াতগুলো পাঠ করেননি?” হাজ্জাজ উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, পড়েছি তো।” তিনি তখন বলেনঃ “এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে, অথচ তাঁর তো পিতাই ছিল না। শুধুমাত্র কন্যার সম্পর্কের কারণেই তাঁকে সন্তান ধরা হয়েছে। তাহলে কন্যার সম্পর্কের কারণে হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবীর সন্তান বলা হবে না কেন?” হাজ্জাজ তখন বলেনঃ “আপনি ঠিক কথাই বলেছেন।” এ কারণেই যখন কোন লোক স্বীয় মীরাস নিজের সন্তানের নামে অসিয়ত করে কিংবা ওয়াকফ বা হিবা করে, তখন ঐ সন্তানদের মধ্যে কন্যার সন্তানদেরও ধরে নেয়া হয়। কিন্তু যখন সে পুত্রদের নামে অসিয়ত বা ওয়াফ করে তখন নির্দিষ্টভাবে ঔরষজাত পুত্র বা পুত্রের পুত্ররাই হকদার হয়ে থাকে। অন্যান্যরা বলে থাকেন যে, এতে কন্যার সন্তানেরাও শামিল থাকবে। কেননা, সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ) সম্পর্কে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমার এই পুত্র সাইয়েদ বা নেতা এবং আল্লাহ এর মাধ্যমে মুসলমানদের দু’টি বড় দলের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দিবেন এবং যুদ্ধের ফিত্না প্রশমিত করবেন।” এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে পুত্র বলেছেন, যা এটাই প্রমাণ। করে যে, তাকে তার পুত্ররূপে গণ্য করা যেতে পারে। (আরবী) আল্লাহ তাআলার এই উক্তির মধ্যে নসল’ ও ‘নসব' এই দুটিরই উল্লেখ রয়েছে এবং হিদায়াত ও মনোনয়ন সবারই উপর প্রযোজ্য হয়েছে। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে মনোনীত করেছি এবং সরল সোজা পথে পরিচালিত করেছি।”(আরবী) অর্থাৎ এটাই আল্লাহর হিদায়াত; তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে চান এই পথে পরিচালিত করেন। (আরবী) অর্থাৎ যদি তারা শিরক করতো তবে তারা যা কিছুই করতো, সবই পণ্ড হয়ে যেতো। এখানে এটা বলাই উদ্দেশ্য যে, শিরকটা কতই কঠিন ব্যাপার এবং এর পরিণাম কতই না জঘন্য। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে ও তোমার পূর্ববর্তী নবীদের কাছে এই অহী করেছি যে, যদি তুমি শিরক কর তবে অবশ্যই তোমার আমল পণ্ড হয়ে যাবে।” (৩৯৪ ৬৫) এই বাক্যটি শর্তের স্থানে রয়েছে, আর শর্তের জন্যে এটা জরুরী নয় যে, ওটা সংঘটিত হবেই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- যদি রহমানের অর্থাৎ আল্লাহর সন্তান হয় তবে আমি প্রথম উপাসনাকারী হয়ে যাবো। (৪৩:৮১) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আমি খেল-তামাসা বানাতে চাইতাম তবে নিজের নিকট থেকেই বানিয়ে নিতাম।" (২১:১৭) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আল্লাহ সন্তান বানিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করতেন তবে স্বীয় মাখলুকের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করে নিতেন, কিন্তু এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং তিনি এক ও মহাপরাক্রমশালী।” (৩৯:৪)। (আরবী) এরা সেই লোক যাদেরকে আমি কিতাব, শাসনভার ও নবুওয়াত দান করেছি। আর এদের কারণেই আমি আমার বান্দাদেরকে নিয়ামত ও দ্বীনের অধিকারী করেছি। সুতরাং যদি এই লোকেরা অর্থাৎ মক্কাবাসী (এটা ইবনে আব্বাস (রাঃ), যহহাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ মনীষীদের উক্তি) নবুওয়াতকে অস্বীকার করে তবে আমি তাদের স্থলে এমন লোকদেরকে নিয়োগ করবো যারা ওটা অস্বীকার করবে না, বরং তারা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। এখন ঐ অস্বীকারকারীরা কুরায়েশই হাক বা অন্যেরাই হাক, আরবী হাক বা আজমীই হাক অথবা আহলে কিতাবই হাক, ওদের স্থলে অন্য জাতিকে অর্থাৎ মুহাজির ও আনসারদেরকে নিয়োগ করবো। তারা আমার কোন কথাকেই অস্বীকার করে না এবং প্রত্যাখ্যানও করে না। বরং তারা কুরআন কারীমের সমস্ত আয়াতের উপরই বিশ্বাস রাখে । আয়াতগুলো স্পষ্ট মর্ম বিশিষ্টই হাক অথবা অস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট হোক। এখন আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ “উল্লিখিত নবীরা এবং তাদের বাপ-দাদা, সন্তান-সন্ততি ও ভাই বেরাদর এমনই লোক, যাদেরকে আল্লাহ সুপথ প্রদর্শন করেছিলেন, সুতরাং তুমি তাদের অনুসরণ কর।”রাসূল (সঃ)-এর জন্যে যখন এই আদেশ, তখন তাঁর উম্মত তো তাঁরই অনুসারী, সুতরাং তাদের উপরও যে এই আদেশই প্রযোজ্য এটা বলাই বাহুল্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- সূরায়ে এ কি সিজদা রয়েছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলা পাঠ করে বলেনঃ তিনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। ইয়াযিদ ইবনে হারূন, মুহাম্মাদ ইবনে উবাইদ ও সুহাইল ইবনে ইউসুফ আওয়াম হতে, তিনি মুজাহিদ হতে নিম্নের কথাটুকু বেশী বর্ণনা করেনঃমুজাহিদ বলেনঃ আমি ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন- “তোমাদের নবী (সঃ) তাঁদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে তাদের অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (আরবী) হে নবী (সঃ)! তুমি লোকদেরকে বলে দাও-আমি তোমাদের কাছে এই কুরআন প্রচারের বিনিময়ে কোন কিছুই যাজ্ঞা করি না।(আরবী) এটা তো হচ্ছে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যে উপদেশের ভাণ্ডার, যেন তারা এর মাধ্যমে গুমরাহী থেকে হিদায়াতের দিকে আসতে পারে এবং কুফরী ছেড়ে ঈমান আনয়ন করতে পারে।
আল-আনআম 6:88
৮৪-৯০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেন-ইবরাহীম (আঃ)-কে আমি ইসহাকের ন্যায় সুসন্তান দান করেছি, অথচ বার্ধক্যের কারণে সে এবং তার স্ত্রী সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে গিয়েছিল। ফেরেশতা তাদের কাছে আসেন এবং তারা হযরত লূত (আঃ)-এর কাছেও যাচ্ছিলেন। ফেরেশতাগণ স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ দেন। তখন স্ত্রী হতবুদ্ধি হয়ে বলেনঃ “হায়! হায়! কি করে আমাদের সন্তান হবে! আমি তো বন্ধ্যা ও বৃদ্ধা এবং আমার স্বামী (ইবরাহীম আঃ) অতি বৃদ্ধ! সুতরাং এটা কতই বিস্ময়কর কথা!” তখন ফেরেশতাগণ বলেনঃ “আপনি কি আল্লাহর কাজে বিস্ময় বোধ করছেন? হে বাড়ীর মালিকগণ! আপনাদের উপর আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হাক।” ফেরেশতাগণ তাদেরকে এ সুসংবাদও দেন যে, ইসহাক (আঃ) নবীও হবেন এবং তার বংশ বৃদ্ধিও হবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর সুসংবাদ দিলাম, যে নবী হবে ও সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (৩৭:১১২) এটা বড় সুসংবাদ এবং বড় নিয়ামতও বটে। আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর শুভ সংবাদ দিলাম এবং এ সুসংবাদও দিলাম যে, ইসহাক (আঃ) -এর ঔরষে ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবে।” (১১:৭১) মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর স্ত্রীকে এ সংবাদ দেন যে, তাঁদের জীবদ্দশাতেই ইসহাকের আঃ ঔরষে হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবেন। সুতরাং পুত্র ইসহাকের জন্মগ্রহণের ফলে যেমন তাঁদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে, অনুরূপভাবে পৌত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মগ্রহণের ফলেও তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে। কেননা, বংশ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পৌত্রের জন্মলাভ খুবই খুশীর ব্যাপার। বদ্ধ ও বদ্ধা যখন সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে যাচ্ছেন যে, তাদের সন্তান লাভ সম্ভব নয়, এমতাবস্থায় পুত্র ইসহাক (আঃ) -এর জন্মলাভ এবং ইসহাক (আঃ) -এর পুত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মলাভ এটা কি কম খুশীর কথা! এতে কে না খুশী হয়? এটা ছিল হযরত ইবরাহীমের নেক আমলেরই প্রতিদান, যিনি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিজের দেশ ও জাতিকে ছেড়ে দিয়ে দূর দূরান্তের পথে পাড়ি জমালেন। এর প্রতিদানই ছিল তার ঔরষজাত নেককার সন্তানগণ, যাদের কারণে তাঁর চক্ষু ঠাণ্ডা হয়েছিল । যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যখন ইবরাহীম স্বীয় কওম ও তাদের মা’বৃদদেরকে পরিত্যাগ করলো তখন আমি তাকে প্রতিদান হিসাবে ইসহাক ও ইয়বকে দানলাম।” আর এখানে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক ও ইয়াকূবকে দান করেছি এবং উভয়কেই সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছি।” এরপর বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তার পূর্বে এমনিভাবে নূহ (আঃ)-কেও সঠিক পথ প্রদর্শন করেছি।” মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে ভাল বংশ দান করেছি। ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকূব (আঃ) বিরাট বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত নূহ (আঃ)-এর সময় সমস্ত দুনিয়াবাসীকে ধ্বংস করেছিলেন। সেই সময় শুধুমাত্র ঐ লোকগুলো রক্ষা পেয়েছিল যারা হযরত নূহ (আঃ) -এর উপর ঈমান এনে তাঁর নৌকায় আরোহণ করেছিল! এই পরিত্রাণ প্রাপ্ত লোকগুলোই ছিল হযরত নূহের সন্তান এবং সারা দুনিয়ার লোক হচ্ছে এদের সন্তান। আর ইবরাহীম (আঃ) -এর পরে তার সন্তানদের মধ্য থেকেই আল্লাহ নবী প্রেরণ করেন। যেমন তিনি বলেনঃ অর্থাৎ “আমি তার সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (২৯৪২৭) তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আমি নূহ (আঃ) ও ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রেরণ করেছি এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (৫৭:২৬) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেনঃ “নবীদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করেছেন, তারা আদম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, আর ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে আমি নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠিয়েছিলাম এবং তারা ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে আমি সুপথ প্রদর্শন করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম, যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা ক্রন্দনরত অবস্থায় সিজদায় পড়ে যায়।”এই আয়াতে কারীমায় (আরবী) শব্দ রয়েছে। এর অর্থ হবেঃ আমি তার সন্তানদেরকেও সুপথ দেখিয়েছি । অর্থাৎ দাউদ (আঃ) ও সুলাইমান (আঃ)-কেও হিদায়াত দান করেছি। কিন্তু যদি (আরবী) -এর সর্বনামটিকে(আরবী) -এর দিকে ফিরানো হয়, কেননা ওটা (আরবী) শব্দের নিকটতর, তবে এটা তো একেবারে পরিষ্কার কথা, এতে কোন জটিলতা নেই। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু যদি সর্বনামটিকে (আরবী) শব্দের দিকে ফিরানো হয়, কেননা বাকরীতি এরূপই বটে, তবে তো খুবই ভাল কথা। কিন্তু এতে একটু জটিলতা এই রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় ‘নূত' শব্দটিও এসে গেছে। অথচ হযরত লূত (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত নন। বরং তিনি হচ্ছেন তার ভাই হারূন ইবনে আযরের ছেলে। তবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের সংখ্যাধিক্যের কারণেই হয়তো হযরত লূত (আঃ)-কেও তার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহর নিম্নের উক্তিতেও রয়েছেঃ (আরবী) (২৪ ১৩৩) এখানে ইয়াকূব (আঃ)-এর পূর্বপুরুষদের ক্রমপরম্পরায় হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নামও চলে এসেছে, অথচ হযরত ইসমাঈল (আঃ) তো তাঁর চাচা ছিলেন। এটাও আধিক্য হিসাবেই হয়েছে। অনুরূপভাবে নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ (আরবী) (৩৮:৭৩-৭৪) এখানে ইবলীসকে ফেরেশতাদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। কেননা, ফেরেশতাদের সাথে তার সাদৃশ্য ছিল। প্রকৃতপক্ষে সে ফেরেশতা ছিল না। বরং সে ছিল জ্বিন, তার প্রকৃতি হচ্ছে আগুন এবং ফেরেশতাদের প্রকৃতি হচ্ছে আলো। তা ছাড়া এই কারণেও যে, হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ) বা হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় আনা হয়েছে। তাকেও যেন ইবরাহীম (আঃ)-এরই বংশধর বলা হয়েছে। এরূপ করা হয়েছে এই দলীলের উপর ভিত্তি করেই যে, কন্যার সন্তানদেরকেও তার পিতার বংশধর মনে করা হয়। এখন যদি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কোন সম্পর্ক থাকে তা শুধু এর উপর ভিত্তি করেই যে, তাঁর মা মারইয়াম (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর ছিলেন। নতুবা হযরত ঈসা (আঃ)-এর তো পিতাই ছিল না। বর্ণিত আছে যে, হাজ্জাজ ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াসারকে বলেনঃ “আমার নিকট সংবাদ পৌছেছে যে, আপনি নাকি হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবী (সঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলে থাকেন? অথচ তারা তো হযরত আলী (রাঃ) ও আবূ তালীবের বংশধর, আবার এও নাকি দাবী করেন যে, কুরআন কারীম দ্বারাই এটা প্রমাণিত? আমি তো কুরআন কারীম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেছি, কিন্তু কোন জায়গাতেই এটা পাইনি তো!” তখন ইবনে ইয়াসার তাঁকে বলেনঃ “আপনি কি সূরায়ে আনআমের ((আরবী) এবং (আরবী) পর্যন্ত পড়েন) -এই আয়াতগুলো পাঠ করেননি?” হাজ্জাজ উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, পড়েছি তো।” তিনি তখন বলেনঃ “এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে, অথচ তাঁর তো পিতাই ছিল না। শুধুমাত্র কন্যার সম্পর্কের কারণেই তাঁকে সন্তান ধরা হয়েছে। তাহলে কন্যার সম্পর্কের কারণে হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবীর সন্তান বলা হবে না কেন?” হাজ্জাজ তখন বলেনঃ “আপনি ঠিক কথাই বলেছেন।” এ কারণেই যখন কোন লোক স্বীয় মীরাস নিজের সন্তানের নামে অসিয়ত করে কিংবা ওয়াকফ বা হিবা করে, তখন ঐ সন্তানদের মধ্যে কন্যার সন্তানদেরও ধরে নেয়া হয়। কিন্তু যখন সে পুত্রদের নামে অসিয়ত বা ওয়াফ করে তখন নির্দিষ্টভাবে ঔরষজাত পুত্র বা পুত্রের পুত্ররাই হকদার হয়ে থাকে। অন্যান্যরা বলে থাকেন যে, এতে কন্যার সন্তানেরাও শামিল থাকবে। কেননা, সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ) সম্পর্কে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমার এই পুত্র সাইয়েদ বা নেতা এবং আল্লাহ এর মাধ্যমে মুসলমানদের দু’টি বড় দলের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দিবেন এবং যুদ্ধের ফিত্না প্রশমিত করবেন।” এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে পুত্র বলেছেন, যা এটাই প্রমাণ। করে যে, তাকে তার পুত্ররূপে গণ্য করা যেতে পারে। (আরবী) আল্লাহ তাআলার এই উক্তির মধ্যে নসল’ ও ‘নসব' এই দুটিরই উল্লেখ রয়েছে এবং হিদায়াত ও মনোনয়ন সবারই উপর প্রযোজ্য হয়েছে। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে মনোনীত করেছি এবং সরল সোজা পথে পরিচালিত করেছি।”(আরবী) অর্থাৎ এটাই আল্লাহর হিদায়াত; তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে চান এই পথে পরিচালিত করেন। (আরবী) অর্থাৎ যদি তারা শিরক করতো তবে তারা যা কিছুই করতো, সবই পণ্ড হয়ে যেতো। এখানে এটা বলাই উদ্দেশ্য যে, শিরকটা কতই কঠিন ব্যাপার এবং এর পরিণাম কতই না জঘন্য। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে ও তোমার পূর্ববর্তী নবীদের কাছে এই অহী করেছি যে, যদি তুমি শিরক কর তবে অবশ্যই তোমার আমল পণ্ড হয়ে যাবে।” (৩৯৪ ৬৫) এই বাক্যটি শর্তের স্থানে রয়েছে, আর শর্তের জন্যে এটা জরুরী নয় যে, ওটা সংঘটিত হবেই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- যদি রহমানের অর্থাৎ আল্লাহর সন্তান হয় তবে আমি প্রথম উপাসনাকারী হয়ে যাবো। (৪৩:৮১) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আমি খেল-তামাসা বানাতে চাইতাম তবে নিজের নিকট থেকেই বানিয়ে নিতাম।" (২১:১৭) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আল্লাহ সন্তান বানিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করতেন তবে স্বীয় মাখলুকের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করে নিতেন, কিন্তু এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং তিনি এক ও মহাপরাক্রমশালী।” (৩৯:৪)। (আরবী) এরা সেই লোক যাদেরকে আমি কিতাব, শাসনভার ও নবুওয়াত দান করেছি। আর এদের কারণেই আমি আমার বান্দাদেরকে নিয়ামত ও দ্বীনের অধিকারী করেছি। সুতরাং যদি এই লোকেরা অর্থাৎ মক্কাবাসী (এটা ইবনে আব্বাস (রাঃ), যহহাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ মনীষীদের উক্তি) নবুওয়াতকে অস্বীকার করে তবে আমি তাদের স্থলে এমন লোকদেরকে নিয়োগ করবো যারা ওটা অস্বীকার করবে না, বরং তারা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। এখন ঐ অস্বীকারকারীরা কুরায়েশই হাক বা অন্যেরাই হাক, আরবী হাক বা আজমীই হাক অথবা আহলে কিতাবই হাক, ওদের স্থলে অন্য জাতিকে অর্থাৎ মুহাজির ও আনসারদেরকে নিয়োগ করবো। তারা আমার কোন কথাকেই অস্বীকার করে না এবং প্রত্যাখ্যানও করে না। বরং তারা কুরআন কারীমের সমস্ত আয়াতের উপরই বিশ্বাস রাখে । আয়াতগুলো স্পষ্ট মর্ম বিশিষ্টই হাক অথবা অস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট হোক। এখন আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ “উল্লিখিত নবীরা এবং তাদের বাপ-দাদা, সন্তান-সন্ততি ও ভাই বেরাদর এমনই লোক, যাদেরকে আল্লাহ সুপথ প্রদর্শন করেছিলেন, সুতরাং তুমি তাদের অনুসরণ কর।”রাসূল (সঃ)-এর জন্যে যখন এই আদেশ, তখন তাঁর উম্মত তো তাঁরই অনুসারী, সুতরাং তাদের উপরও যে এই আদেশই প্রযোজ্য এটা বলাই বাহুল্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- সূরায়ে এ কি সিজদা রয়েছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলা পাঠ করে বলেনঃ তিনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। ইয়াযিদ ইবনে হারূন, মুহাম্মাদ ইবনে উবাইদ ও সুহাইল ইবনে ইউসুফ আওয়াম হতে, তিনি মুজাহিদ হতে নিম্নের কথাটুকু বেশী বর্ণনা করেনঃমুজাহিদ বলেনঃ আমি ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন- “তোমাদের নবী (সঃ) তাঁদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে তাদের অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (আরবী) হে নবী (সঃ)! তুমি লোকদেরকে বলে দাও-আমি তোমাদের কাছে এই কুরআন প্রচারের বিনিময়ে কোন কিছুই যাজ্ঞা করি না।(আরবী) এটা তো হচ্ছে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যে উপদেশের ভাণ্ডার, যেন তারা এর মাধ্যমে গুমরাহী থেকে হিদায়াতের দিকে আসতে পারে এবং কুফরী ছেড়ে ঈমান আনয়ন করতে পারে।