Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-আনআম 6:89 – আল-আনআম 6:160

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-আনআম 6:89
  2. আল-আনআম 6:90
  3. আল-আনআম 6:91
  4. আল-আনআম 6:92
  5. আল-আনআম 6:93
  6. আল-আনআম 6:94
  7. আল-আনআম 6:95
  8. আল-আনআম 6:96
  9. আল-আনআম 6:97
  10. আল-আনআম 6:98
  11. আল-আনআম 6:99
  12. আল-আনআম 6:100
  13. আল-আনআম 6:101
  14. আল-আনআম 6:102
  15. আল-আনআম 6:103
  16. আল-আনআম 6:104
  17. আল-আনআম 6:105
  18. আল-আনআম 6:106
  19. আল-আনআম 6:107
  20. আল-আনআম 6:108
  21. আল-আনআম 6:109
  22. আল-আনআম 6:110
  23. আল-আনআম 6:111
  24. আল-আনআম 6:112
  25. আল-আনআম 6:113
  26. আল-আনআম 6:114
  27. আল-আনআম 6:115
  28. আল-আনআম 6:116
  29. আল-আনআম 6:117
  30. আল-আনআম 6:118
  31. আল-আনআম 6:119
  32. আল-আনআম 6:120
  33. আল-আনআম 6:121
  34. আল-আনআম 6:122
  35. আল-আনআম 6:123
  36. আল-আনআম 6:124
  37. আল-আনআম 6:125
  38. আল-আনআম 6:126
  39. আল-আনআম 6:127
  40. আল-আনআম 6:128
  41. আল-আনআম 6:129
  42. আল-আনআম 6:130
  43. আল-আনআম 6:131
  44. আল-আনআম 6:132
  45. আল-আনআম 6:133
  46. আল-আনআম 6:134
  47. আল-আনআম 6:135
  48. আল-আনআম 6:136
  49. আল-আনআম 6:137
  50. আল-আনআম 6:138
  51. আল-আনআম 6:139
  52. আল-আনআম 6:140
  53. আল-আনআম 6:141
  54. আল-আনআম 6:142
  55. আল-আনআম 6:143
  56. আল-আনআম 6:144
  57. আল-আনআম 6:145
  58. আল-আনআম 6:146
  59. আল-আনআম 6:147
  60. আল-আনআম 6:148
  61. আল-আনআম 6:149
  62. আল-আনআম 6:150
  63. আল-আনআম 6:151
  64. আল-আনআম 6:152
  65. আল-আনআম 6:153
  66. আল-আনআম 6:154
  67. আল-আনআম 6:155
  68. আল-আনআম 6:156
  69. আল-আনআম 6:157
  70. আল-আনআম 6:158
  71. আল-আনআম 6:159
  72. আল-আনআম 6:160

আল-আনআম 6:89

৮৪-৯০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেন-ইবরাহীম (আঃ)-কে আমি ইসহাকের ন্যায় সুসন্তান দান করেছি, অথচ বার্ধক্যের কারণে সে এবং তার স্ত্রী সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে গিয়েছিল। ফেরেশতা তাদের কাছে আসেন এবং তারা হযরত লূত (আঃ)-এর কাছেও যাচ্ছিলেন। ফেরেশতাগণ স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ দেন। তখন স্ত্রী হতবুদ্ধি হয়ে বলেনঃ “হায়! হায়! কি করে আমাদের সন্তান হবে! আমি তো বন্ধ্যা ও বৃদ্ধা এবং আমার স্বামী (ইবরাহীম আঃ) অতি বৃদ্ধ! সুতরাং এটা কতই বিস্ময়কর কথা!” তখন ফেরেশতাগণ বলেনঃ “আপনি কি আল্লাহর কাজে বিস্ময় বোধ করছেন? হে বাড়ীর মালিকগণ! আপনাদের উপর আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হাক।” ফেরেশতাগণ তাদেরকে এ সুসংবাদও দেন যে, ইসহাক (আঃ) নবীও হবেন এবং তার বংশ বৃদ্ধিও হবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর সুসংবাদ দিলাম, যে নবী হবে ও সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (৩৭:১১২) এটা বড় সুসংবাদ এবং বড় নিয়ামতও বটে। আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর শুভ সংবাদ দিলাম এবং এ সুসংবাদও দিলাম যে, ইসহাক (আঃ) -এর ঔরষে ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবে।” (১১:৭১) মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর স্ত্রীকে এ সংবাদ দেন যে, তাঁদের জীবদ্দশাতেই ইসহাকের আঃ ঔরষে হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবেন। সুতরাং পুত্র ইসহাকের জন্মগ্রহণের ফলে যেমন তাঁদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে, অনুরূপভাবে পৌত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মগ্রহণের ফলেও তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে। কেননা, বংশ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পৌত্রের জন্মলাভ খুবই খুশীর ব্যাপার। বদ্ধ ও বদ্ধা যখন সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে যাচ্ছেন যে, তাদের সন্তান লাভ সম্ভব নয়, এমতাবস্থায় পুত্র ইসহাক (আঃ) -এর জন্মলাভ এবং ইসহাক (আঃ) -এর পুত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মলাভ এটা কি কম খুশীর কথা! এতে কে না খুশী হয়? এটা ছিল হযরত ইবরাহীমের নেক আমলেরই প্রতিদান, যিনি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিজের দেশ ও জাতিকে ছেড়ে দিয়ে দূর দূরান্তের পথে পাড়ি জমালেন। এর প্রতিদানই ছিল তার ঔরষজাত নেককার সন্তানগণ, যাদের কারণে তাঁর চক্ষু ঠাণ্ডা হয়েছিল । যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যখন ইবরাহীম স্বীয় কওম ও তাদের মা’বৃদদেরকে পরিত্যাগ করলো তখন আমি তাকে প্রতিদান হিসাবে ইসহাক ও ইয়বকে দানলাম।” আর এখানে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক ও ইয়াকূবকে দান করেছি এবং উভয়কেই সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছি।” এরপর বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তার পূর্বে এমনিভাবে নূহ (আঃ)-কেও সঠিক পথ প্রদর্শন করেছি।” মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে ভাল বংশ দান করেছি। ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকূব (আঃ) বিরাট বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত নূহ (আঃ)-এর সময় সমস্ত দুনিয়াবাসীকে ধ্বংস করেছিলেন। সেই সময় শুধুমাত্র ঐ লোকগুলো রক্ষা পেয়েছিল যারা হযরত নূহ (আঃ) -এর উপর ঈমান এনে তাঁর নৌকায় আরোহণ করেছিল! এই পরিত্রাণ প্রাপ্ত লোকগুলোই ছিল হযরত নূহের সন্তান এবং সারা দুনিয়ার লোক হচ্ছে এদের সন্তান। আর ইবরাহীম (আঃ) -এর পরে তার সন্তানদের মধ্য থেকেই আল্লাহ নবী প্রেরণ করেন। যেমন তিনি বলেনঃ অর্থাৎ “আমি তার সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (২৯৪২৭) তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আমি নূহ (আঃ) ও ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রেরণ করেছি এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (৫৭:২৬) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেনঃ “নবীদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করেছেন, তারা আদম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, আর ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে আমি নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠিয়েছিলাম এবং তারা ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে আমি সুপথ প্রদর্শন করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম, যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা ক্রন্দনরত অবস্থায় সিজদায় পড়ে যায়।”এই আয়াতে কারীমায় (আরবী) শব্দ রয়েছে। এর অর্থ হবেঃ আমি তার সন্তানদেরকেও সুপথ দেখিয়েছি । অর্থাৎ দাউদ (আঃ) ও সুলাইমান (আঃ)-কেও হিদায়াত দান করেছি। কিন্তু যদি (আরবী) -এর সর্বনামটিকে(আরবী) -এর দিকে ফিরানো হয়, কেননা ওটা (আরবী) শব্দের নিকটতর, তবে এটা তো একেবারে পরিষ্কার কথা, এতে কোন জটিলতা নেই। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু যদি সর্বনামটিকে (আরবী) শব্দের দিকে ফিরানো হয়, কেননা বাকরীতি এরূপই বটে, তবে তো খুবই ভাল কথা। কিন্তু এতে একটু জটিলতা এই রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় ‘নূত' শব্দটিও এসে গেছে। অথচ হযরত লূত (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত নন। বরং তিনি হচ্ছেন তার ভাই হারূন ইবনে আযরের ছেলে। তবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের সংখ্যাধিক্যের কারণেই হয়তো হযরত লূত (আঃ)-কেও তার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহর নিম্নের উক্তিতেও রয়েছেঃ (আরবী) (২৪ ১৩৩) এখানে ইয়াকূব (আঃ)-এর পূর্বপুরুষদের ক্রমপরম্পরায় হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নামও চলে এসেছে, অথচ হযরত ইসমাঈল (আঃ) তো তাঁর চাচা ছিলেন। এটাও আধিক্য হিসাবেই হয়েছে। অনুরূপভাবে নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ (আরবী) (৩৮:৭৩-৭৪) এখানে ইবলীসকে ফেরেশতাদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। কেননা, ফেরেশতাদের সাথে তার সাদৃশ্য ছিল। প্রকৃতপক্ষে সে ফেরেশতা ছিল না। বরং সে ছিল জ্বিন, তার প্রকৃতি হচ্ছে আগুন এবং ফেরেশতাদের প্রকৃতি হচ্ছে আলো। তা ছাড়া এই কারণেও যে, হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ) বা হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় আনা হয়েছে। তাকেও যেন ইবরাহীম (আঃ)-এরই বংশধর বলা হয়েছে। এরূপ করা হয়েছে এই দলীলের উপর ভিত্তি করেই যে, কন্যার সন্তানদেরকেও তার পিতার বংশধর মনে করা হয়। এখন যদি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কোন সম্পর্ক থাকে তা শুধু এর উপর ভিত্তি করেই যে, তাঁর মা মারইয়াম (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর ছিলেন। নতুবা হযরত ঈসা (আঃ)-এর তো পিতাই ছিল না। বর্ণিত আছে যে, হাজ্জাজ ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াসারকে বলেনঃ “আমার নিকট সংবাদ পৌছেছে যে, আপনি নাকি হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবী (সঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলে থাকেন? অথচ তারা তো হযরত আলী (রাঃ) ও আবূ তালীবের বংশধর, আবার এও নাকি দাবী করেন যে, কুরআন কারীম দ্বারাই এটা প্রমাণিত? আমি তো কুরআন কারীম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেছি, কিন্তু কোন জায়গাতেই এটা পাইনি তো!” তখন ইবনে ইয়াসার তাঁকে বলেনঃ “আপনি কি সূরায়ে আনআমের ((আরবী) এবং (আরবী) পর্যন্ত পড়েন) -এই আয়াতগুলো পাঠ করেননি?” হাজ্জাজ উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, পড়েছি তো।” তিনি তখন বলেনঃ “এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে, অথচ তাঁর তো পিতাই ছিল না। শুধুমাত্র কন্যার সম্পর্কের কারণেই তাঁকে সন্তান ধরা হয়েছে। তাহলে কন্যার সম্পর্কের কারণে হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবীর সন্তান বলা হবে না কেন?” হাজ্জাজ তখন বলেনঃ “আপনি ঠিক কথাই বলেছেন।” এ কারণেই যখন কোন লোক স্বীয় মীরাস নিজের সন্তানের নামে অসিয়ত করে কিংবা ওয়াকফ বা হিবা করে, তখন ঐ সন্তানদের মধ্যে কন্যার সন্তানদেরও ধরে নেয়া হয়। কিন্তু যখন সে পুত্রদের নামে অসিয়ত বা ওয়াফ করে তখন নির্দিষ্টভাবে ঔরষজাত পুত্র বা পুত্রের পুত্ররাই হকদার হয়ে থাকে। অন্যান্যরা বলে থাকেন যে, এতে কন্যার সন্তানেরাও শামিল থাকবে। কেননা, সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ) সম্পর্কে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমার এই পুত্র সাইয়েদ বা নেতা এবং আল্লাহ এর মাধ্যমে মুসলমানদের দু’টি বড় দলের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দিবেন এবং যুদ্ধের ফিত্না প্রশমিত করবেন।” এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে পুত্র বলেছেন, যা এটাই প্রমাণ। করে যে, তাকে তার পুত্ররূপে গণ্য করা যেতে পারে। (আরবী) আল্লাহ তাআলার এই উক্তির মধ্যে নসল’ ও ‘নসব' এই দুটিরই উল্লেখ রয়েছে এবং হিদায়াত ও মনোনয়ন সবারই উপর প্রযোজ্য হয়েছে। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে মনোনীত করেছি এবং সরল সোজা পথে পরিচালিত করেছি।”(আরবী) অর্থাৎ এটাই আল্লাহর হিদায়াত; তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে চান এই পথে পরিচালিত করেন। (আরবী) অর্থাৎ যদি তারা শিরক করতো তবে তারা যা কিছুই করতো, সবই পণ্ড হয়ে যেতো। এখানে এটা বলাই উদ্দেশ্য যে, শিরকটা কতই কঠিন ব্যাপার এবং এর পরিণাম কতই না জঘন্য। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে ও তোমার পূর্ববর্তী নবীদের কাছে এই অহী করেছি যে, যদি তুমি শিরক কর তবে অবশ্যই তোমার আমল পণ্ড হয়ে যাবে।” (৩৯৪ ৬৫) এই বাক্যটি শর্তের স্থানে রয়েছে, আর শর্তের জন্যে এটা জরুরী নয় যে, ওটা সংঘটিত হবেই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- যদি রহমানের অর্থাৎ আল্লাহর সন্তান হয় তবে আমি প্রথম উপাসনাকারী হয়ে যাবো। (৪৩:৮১) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আমি খেল-তামাসা বানাতে চাইতাম তবে নিজের নিকট থেকেই বানিয়ে নিতাম।" (২১:১৭) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আল্লাহ সন্তান বানিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করতেন তবে স্বীয় মাখলুকের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করে নিতেন, কিন্তু এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং তিনি এক ও মহাপরাক্রমশালী।” (৩৯:৪)। (আরবী) এরা সেই লোক যাদেরকে আমি কিতাব, শাসনভার ও নবুওয়াত দান করেছি। আর এদের কারণেই আমি আমার বান্দাদেরকে নিয়ামত ও দ্বীনের অধিকারী করেছি। সুতরাং যদি এই লোকেরা অর্থাৎ মক্কাবাসী (এটা ইবনে আব্বাস (রাঃ), যহহাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ মনীষীদের উক্তি) নবুওয়াতকে অস্বীকার করে তবে আমি তাদের স্থলে এমন লোকদেরকে নিয়োগ করবো যারা ওটা অস্বীকার করবে না, বরং তারা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। এখন ঐ অস্বীকারকারীরা কুরায়েশই হাক বা অন্যেরাই হাক, আরবী হাক বা আজমীই হাক অথবা আহলে কিতাবই হাক, ওদের স্থলে অন্য জাতিকে অর্থাৎ মুহাজির ও আনসারদেরকে নিয়োগ করবো। তারা আমার কোন কথাকেই অস্বীকার করে না এবং প্রত্যাখ্যানও করে না। বরং তারা কুরআন কারীমের সমস্ত আয়াতের উপরই বিশ্বাস রাখে । আয়াতগুলো স্পষ্ট মর্ম বিশিষ্টই হাক অথবা অস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট হোক। এখন আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ “উল্লিখিত নবীরা এবং তাদের বাপ-দাদা, সন্তান-সন্ততি ও ভাই বেরাদর এমনই লোক, যাদেরকে আল্লাহ সুপথ প্রদর্শন করেছিলেন, সুতরাং তুমি তাদের অনুসরণ কর।”রাসূল (সঃ)-এর জন্যে যখন এই আদেশ, তখন তাঁর উম্মত তো তাঁরই অনুসারী, সুতরাং তাদের উপরও যে এই আদেশই প্রযোজ্য এটা বলাই বাহুল্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- সূরায়ে এ কি সিজদা রয়েছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলা পাঠ করে বলেনঃ তিনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। ইয়াযিদ ইবনে হারূন, মুহাম্মাদ ইবনে উবাইদ ও সুহাইল ইবনে ইউসুফ আওয়াম হতে, তিনি মুজাহিদ হতে নিম্নের কথাটুকু বেশী বর্ণনা করেনঃমুজাহিদ বলেনঃ আমি ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন- “তোমাদের নবী (সঃ) তাঁদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে তাদের অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (আরবী) হে নবী (সঃ)! তুমি লোকদেরকে বলে দাও-আমি তোমাদের কাছে এই কুরআন প্রচারের বিনিময়ে কোন কিছুই যাজ্ঞা করি না।(আরবী) এটা তো হচ্ছে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যে উপদেশের ভাণ্ডার, যেন তারা এর মাধ্যমে গুমরাহী থেকে হিদায়াতের দিকে আসতে পারে এবং কুফরী ছেড়ে ঈমান আনয়ন করতে পারে।

আল-আনআম 6:90

৮৪-৯০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেন-ইবরাহীম (আঃ)-কে আমি ইসহাকের ন্যায় সুসন্তান দান করেছি, অথচ বার্ধক্যের কারণে সে এবং তার স্ত্রী সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে গিয়েছিল। ফেরেশতা তাদের কাছে আসেন এবং তারা হযরত লূত (আঃ)-এর কাছেও যাচ্ছিলেন। ফেরেশতাগণ স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই হযরত ইসহাক (আঃ)-এর জন্মের সুসংবাদ দেন। তখন স্ত্রী হতবুদ্ধি হয়ে বলেনঃ “হায়! হায়! কি করে আমাদের সন্তান হবে! আমি তো বন্ধ্যা ও বৃদ্ধা এবং আমার স্বামী (ইবরাহীম আঃ) অতি বৃদ্ধ! সুতরাং এটা কতই বিস্ময়কর কথা!” তখন ফেরেশতাগণ বলেনঃ “আপনি কি আল্লাহর কাজে বিস্ময় বোধ করছেন? হে বাড়ীর মালিকগণ! আপনাদের উপর আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হাক।” ফেরেশতাগণ তাদেরকে এ সুসংবাদও দেন যে, ইসহাক (আঃ) নবীও হবেন এবং তার বংশ বৃদ্ধিও হবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর সুসংবাদ দিলাম, যে নবী হবে ও সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (৩৭:১১২) এটা বড় সুসংবাদ এবং বড় নিয়ামতও বটে। আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক (আঃ) -এর শুভ সংবাদ দিলাম এবং এ সুসংবাদও দিলাম যে, ইসহাক (আঃ) -এর ঔরষে ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবে।” (১১:৭১) মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর স্ত্রীকে এ সংবাদ দেন যে, তাঁদের জীবদ্দশাতেই ইসহাকের আঃ ঔরষে হযরত ইয়াকূব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবেন। সুতরাং পুত্র ইসহাকের জন্মগ্রহণের ফলে যেমন তাঁদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে, অনুরূপভাবে পৌত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মগ্রহণের ফলেও তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা হবে। কেননা, বংশ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পৌত্রের জন্মলাভ খুবই খুশীর ব্যাপার। বদ্ধ ও বদ্ধা যখন সন্তান থেকে নিরাশ হয়ে যাচ্ছেন যে, তাদের সন্তান লাভ সম্ভব নয়, এমতাবস্থায় পুত্র ইসহাক (আঃ) -এর জন্মলাভ এবং ইসহাক (আঃ) -এর পুত্র ইয়াকূব (আঃ) -এর জন্মলাভ এটা কি কম খুশীর কথা! এতে কে না খুশী হয়? এটা ছিল হযরত ইবরাহীমের নেক আমলেরই প্রতিদান, যিনি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিজের দেশ ও জাতিকে ছেড়ে দিয়ে দূর দূরান্তের পথে পাড়ি জমালেন। এর প্রতিদানই ছিল তার ঔরষজাত নেককার সন্তানগণ, যাদের কারণে তাঁর চক্ষু ঠাণ্ডা হয়েছিল । যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যখন ইবরাহীম স্বীয় কওম ও তাদের মা’বৃদদেরকে পরিত্যাগ করলো তখন আমি তাকে প্রতিদান হিসাবে ইসহাক ও ইয়বকে দানলাম।” আর এখানে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে ইসহাক ও ইয়াকূবকে দান করেছি এবং উভয়কেই সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছি।” এরপর বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তার পূর্বে এমনিভাবে নূহ (আঃ)-কেও সঠিক পথ প্রদর্শন করেছি।” মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে ভাল বংশ দান করেছি। ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকূব (আঃ) বিরাট বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত নূহ (আঃ)-এর সময় সমস্ত দুনিয়াবাসীকে ধ্বংস করেছিলেন। সেই সময় শুধুমাত্র ঐ লোকগুলো রক্ষা পেয়েছিল যারা হযরত নূহ (আঃ) -এর উপর ঈমান এনে তাঁর নৌকায় আরোহণ করেছিল! এই পরিত্রাণ প্রাপ্ত লোকগুলোই ছিল হযরত নূহের সন্তান এবং সারা দুনিয়ার লোক হচ্ছে এদের সন্তান। আর ইবরাহীম (আঃ) -এর পরে তার সন্তানদের মধ্য থেকেই আল্লাহ নবী প্রেরণ করেন। যেমন তিনি বলেনঃ অর্থাৎ “আমি তার সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (২৯৪২৭) তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আমি নূহ (আঃ) ও ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রেরণ করেছি এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (৫৭:২৬) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেনঃ “নবীদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করেছেন, তারা আদম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, আর ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে আমি নূহ (আঃ)-এর সাথে নৌকায় উঠিয়েছিলাম এবং তারা ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে আমি সুপথ প্রদর্শন করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম, যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা ক্রন্দনরত অবস্থায় সিজদায় পড়ে যায়।”এই আয়াতে কারীমায় (আরবী) শব্দ রয়েছে। এর অর্থ হবেঃ আমি তার সন্তানদেরকেও সুপথ দেখিয়েছি । অর্থাৎ দাউদ (আঃ) ও সুলাইমান (আঃ)-কেও হিদায়াত দান করেছি। কিন্তু যদি (আরবী) -এর সর্বনামটিকে(আরবী) -এর দিকে ফিরানো হয়, কেননা ওটা (আরবী) শব্দের নিকটতর, তবে এটা তো একেবারে পরিষ্কার কথা, এতে কোন জটিলতা নেই। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু যদি সর্বনামটিকে (আরবী) শব্দের দিকে ফিরানো হয়, কেননা বাকরীতি এরূপই বটে, তবে তো খুবই ভাল কথা। কিন্তু এতে একটু জটিলতা এই রয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় ‘নূত' শব্দটিও এসে গেছে। অথচ হযরত লূত (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত নন। বরং তিনি হচ্ছেন তার ভাই হারূন ইবনে আযরের ছেলে। তবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের সংখ্যাধিক্যের কারণেই হয়তো হযরত লূত (আঃ)-কেও তার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহর নিম্নের উক্তিতেও রয়েছেঃ (আরবী) (২৪ ১৩৩) এখানে ইয়াকূব (আঃ)-এর পূর্বপুরুষদের ক্রমপরম্পরায় হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর নামও চলে এসেছে, অথচ হযরত ইসমাঈল (আঃ) তো তাঁর চাচা ছিলেন। এটাও আধিক্য হিসাবেই হয়েছে। অনুরূপভাবে নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ (আরবী) (৩৮:৭৩-৭৪) এখানে ইবলীসকে ফেরেশতাদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। কেননা, ফেরেশতাদের সাথে তার সাদৃশ্য ছিল। প্রকৃতপক্ষে সে ফেরেশতা ছিল না। বরং সে ছিল জ্বিন, তার প্রকৃতি হচ্ছে আগুন এবং ফেরেশতাদের প্রকৃতি হচ্ছে আলো। তা ছাড়া এই কারণেও যে, হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ) বা হযরত নূহ (আঃ)-এর সন্তানদের ক্রমপরম্পরায় আনা হয়েছে। তাকেও যেন ইবরাহীম (আঃ)-এরই বংশধর বলা হয়েছে। এরূপ করা হয়েছে এই দলীলের উপর ভিত্তি করেই যে, কন্যার সন্তানদেরকেও তার পিতার বংশধর মনে করা হয়। এখন যদি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে হযরত ঈসা (আঃ)-এর কোন সম্পর্ক থাকে তা শুধু এর উপর ভিত্তি করেই যে, তাঁর মা মারইয়াম (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর ছিলেন। নতুবা হযরত ঈসা (আঃ)-এর তো পিতাই ছিল না। বর্ণিত আছে যে, হাজ্জাজ ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াসারকে বলেনঃ “আমার নিকট সংবাদ পৌছেছে যে, আপনি নাকি হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবী (সঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলে থাকেন? অথচ তারা তো হযরত আলী (রাঃ) ও আবূ তালীবের বংশধর, আবার এও নাকি দাবী করেন যে, কুরআন কারীম দ্বারাই এটা প্রমাণিত? আমি তো কুরআন কারীম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেছি, কিন্তু কোন জায়গাতেই এটা পাইনি তো!” তখন ইবনে ইয়াসার তাঁকে বলেনঃ “আপনি কি সূরায়ে আনআমের ((আরবী) এবং (আরবী) পর্যন্ত পড়েন) -এই আয়াতগুলো পাঠ করেননি?” হাজ্জাজ উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, পড়েছি তো।” তিনি তখন বলেনঃ “এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-কে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে, অথচ তাঁর তো পিতাই ছিল না। শুধুমাত্র কন্যার সম্পর্কের কারণেই তাঁকে সন্তান ধরা হয়েছে। তাহলে কন্যার সম্পর্কের কারণে হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে নবীর সন্তান বলা হবে না কেন?” হাজ্জাজ তখন বলেনঃ “আপনি ঠিক কথাই বলেছেন।” এ কারণেই যখন কোন লোক স্বীয় মীরাস নিজের সন্তানের নামে অসিয়ত করে কিংবা ওয়াকফ বা হিবা করে, তখন ঐ সন্তানদের মধ্যে কন্যার সন্তানদেরও ধরে নেয়া হয়। কিন্তু যখন সে পুত্রদের নামে অসিয়ত বা ওয়াফ করে তখন নির্দিষ্টভাবে ঔরষজাত পুত্র বা পুত্রের পুত্ররাই হকদার হয়ে থাকে। অন্যান্যরা বলে থাকেন যে, এতে কন্যার সন্তানেরাও শামিল থাকবে। কেননা, সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ) সম্পর্কে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমার এই পুত্র সাইয়েদ বা নেতা এবং আল্লাহ এর মাধ্যমে মুসলমানদের দু’টি বড় দলের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দিবেন এবং যুদ্ধের ফিত্না প্রশমিত করবেন।” এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-কে পুত্র বলেছেন, যা এটাই প্রমাণ। করে যে, তাকে তার পুত্ররূপে গণ্য করা যেতে পারে। (আরবী) আল্লাহ তাআলার এই উক্তির মধ্যে নসল’ ও ‘নসব' এই দুটিরই উল্লেখ রয়েছে এবং হিদায়াত ও মনোনয়ন সবারই উপর প্রযোজ্য হয়েছে। এ জন্যেই মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে মনোনীত করেছি এবং সরল সোজা পথে পরিচালিত করেছি।”(আরবী) অর্থাৎ এটাই আল্লাহর হিদায়াত; তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে চান এই পথে পরিচালিত করেন। (আরবী) অর্থাৎ যদি তারা শিরক করতো তবে তারা যা কিছুই করতো, সবই পণ্ড হয়ে যেতো। এখানে এটা বলাই উদ্দেশ্য যে, শিরকটা কতই কঠিন ব্যাপার এবং এর পরিণাম কতই না জঘন্য। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমার কাছে ও তোমার পূর্ববর্তী নবীদের কাছে এই অহী করেছি যে, যদি তুমি শিরক কর তবে অবশ্যই তোমার আমল পণ্ড হয়ে যাবে।” (৩৯৪ ৬৫) এই বাক্যটি শর্তের স্থানে রয়েছে, আর শর্তের জন্যে এটা জরুরী নয় যে, ওটা সংঘটিত হবেই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- যদি রহমানের অর্থাৎ আল্লাহর সন্তান হয় তবে আমি প্রথম উপাসনাকারী হয়ে যাবো। (৪৩:৮১) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আমি খেল-তামাসা বানাতে চাইতাম তবে নিজের নিকট থেকেই বানিয়ে নিতাম।" (২১:১৭) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আল্লাহ সন্তান বানিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করতেন তবে স্বীয় মাখলুকের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করে নিতেন, কিন্তু এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং তিনি এক ও মহাপরাক্রমশালী।” (৩৯:৪)। (আরবী) এরা সেই লোক যাদেরকে আমি কিতাব, শাসনভার ও নবুওয়াত দান করেছি। আর এদের কারণেই আমি আমার বান্দাদেরকে নিয়ামত ও দ্বীনের অধিকারী করেছি। সুতরাং যদি এই লোকেরা অর্থাৎ মক্কাবাসী (এটা ইবনে আব্বাস (রাঃ), যহহাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ মনীষীদের উক্তি) নবুওয়াতকে অস্বীকার করে তবে আমি তাদের স্থলে এমন লোকদেরকে নিয়োগ করবো যারা ওটা অস্বীকার করবে না, বরং তারা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। এখন ঐ অস্বীকারকারীরা কুরায়েশই হাক বা অন্যেরাই হাক, আরবী হাক বা আজমীই হাক অথবা আহলে কিতাবই হাক, ওদের স্থলে অন্য জাতিকে অর্থাৎ মুহাজির ও আনসারদেরকে নিয়োগ করবো। তারা আমার কোন কথাকেই অস্বীকার করে না এবং প্রত্যাখ্যানও করে না। বরং তারা কুরআন কারীমের সমস্ত আয়াতের উপরই বিশ্বাস রাখে । আয়াতগুলো স্পষ্ট মর্ম বিশিষ্টই হাক অথবা অস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট হোক। এখন আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ “উল্লিখিত নবীরা এবং তাদের বাপ-দাদা, সন্তান-সন্ততি ও ভাই বেরাদর এমনই লোক, যাদেরকে আল্লাহ সুপথ প্রদর্শন করেছিলেন, সুতরাং তুমি তাদের অনুসরণ কর।”রাসূল (সঃ)-এর জন্যে যখন এই আদেশ, তখন তাঁর উম্মত তো তাঁরই অনুসারী, সুতরাং তাদের উপরও যে এই আদেশই প্রযোজ্য এটা বলাই বাহুল্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- সূরায়ে এ কি সিজদা রয়েছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলা পাঠ করে বলেনঃ তিনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। ইয়াযিদ ইবনে হারূন, মুহাম্মাদ ইবনে উবাইদ ও সুহাইল ইবনে ইউসুফ আওয়াম হতে, তিনি মুজাহিদ হতে নিম্নের কথাটুকু বেশী বর্ণনা করেনঃমুজাহিদ বলেনঃ আমি ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন- “তোমাদের নবী (সঃ) তাঁদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে তাদের অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (আরবী) হে নবী (সঃ)! তুমি লোকদেরকে বলে দাও-আমি তোমাদের কাছে এই কুরআন প্রচারের বিনিময়ে কোন কিছুই যাজ্ঞা করি না।(আরবী) এটা তো হচ্ছে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যে উপদেশের ভাণ্ডার, যেন তারা এর মাধ্যমে গুমরাহী থেকে হিদায়াতের দিকে আসতে পারে এবং কুফরী ছেড়ে ঈমান আনয়ন করতে পারে।

আল-আনআম 6:91

৯১-৯২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেন-তারা যখন আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে অবিশ্বাস করলো তখন বুঝা গেল যে, তারা আল্লাহ তা'আলার মর্যাদার হক আদায় করলো না। আবদুল্লাহ ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি কুরায়েশদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এটা ইয়াহুদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। অথবা এটা অবতীর্ণ হয় মালিক ইবনে সায়েফের ব্যাপারে। এই নির্বোধদের উক্তি এই যে, আল্লাহ তাআলা কোন মানুষের উপর কিতাব অবতীর্ণ করেননি। শানে নুযূল হিসেবে প্রথম উক্তিটিই সঠিকতম। কেননা, এ আয়াতটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়। আর ইয়াহূদীরা তো এ কথা বলতো না যে, মানুষের উপর কোন কিতাব অবতীর্ণ হয়নি। কেননা, তারা তো এটা স্বীকার করে যে, তাওরাত হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। মক্কার অধিবাসী কুরায়েশ ও আরবরাই মুহাম্মাদ (সঃ)-কে অস্বীকার করতো। তাদের দলীল ছিল এই যে, মুহাম্মাদ (সঃ) একজন মানুষ এবং মানুষের উপর কিতাব অবতীর্ণ হয় না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি মানুষের মধ্য হতে কারও উপর অহী পাঠাই- তুমি তাদেরকে (কুফরী থেকে) ভয় প্রদর্শন কর, এতে কি মানুষেরা বিস্ময় বোধ করে?” (১০:২) আরও ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ “যখন তাদের কাছে হিদায়াত পৌঁছে তখন যে জিনিস তাদেরকে ঈমান আনয়নে বাধা দেয় তা হচ্ছে এই যে, তাদের কথা ছিল- আল্লাহ কি কোন মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন? হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বল, ফেরেশতারা যদি ভূ-পৃষ্ঠে চলাফেরা করার প্রাণী হতো তবে কোন ফেরেশতাকেই আমি রাসূল করে পাঠাতাম।” (১৮:৫৫) এখন আল্লাহ পাক এখানে বলেনঃ আল্লাহর যেরূপ মর্যাদা দেয়া উচিত তা তারা দেয়নি। অর্থাৎ তারা বলে দিলো যে, আল্লাহ কোন মানুষের উপর কিছু অবতীর্ণ করেননি। হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও- আল্লাহ মূসা (আঃ)-এর উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছিলেন। যে কিতাব লোকদের উপর নূর ও হিদায়াত রূপে প্রমাণিত হয়েছে। হযরত মূসা (আঃ) কর্তৃক পেশকৃত কিতাব তাওরাত' কার দ্বারা অবতীর্ণ করা হয়েছে? তোমরা এবং সবাই একথা অবগত যে, মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর কিতাব আল্লাহ কর্তৃকই অবতারিত ছিল। যদ্দ্বারা মানুষ হিদায়াতের আলো লাভ করতো এবং সন্দেহের অন্ধকারে সোজা সরল পথ খুঁজে পেতো।মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা তাওরাতকে খণ্ড খণ্ড করে বিভিন্ন পত্রে রেখেছো, কিন্তু তাতে লিখতে গিয়ে নিজেদের পক্ষ থেকে পরিবর্ধনও করতে রয়েছে। আর বলতে রয়েছে, এটাও আল্লাহরই আয়াত। এজন্যে আল্লাহ পাক বলেন, কিছু কিছু প্রকৃত আয়াত প্রকাশ করছো বটে, কিন্তু অধিকাংশ আয়াতকেই তোমরা গোপন করছে।আল্লাহ তা'আলার উক্তি- এই কিতাবের মাধ্যমে তোমরা এমন কিছু জেনেছো যা তোমরাও জানতে না এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা। অর্থাৎ হে কুরায়েশের দল! কে এই কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, যাতে অতীতের সংবাদ রয়েছে এবং ভবিষ্যত বাণীও বিদ্যমান আছে যেগুলো না তোমরা জানতে, না তোমাদের বাপ-দাদারা জানত। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এই সম্বোধন আরবের মুশরিকদেরকে করা হয়েছে। আর মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই সম্বোধন মুসলমানদেরকেই করা হয়েছে। যখন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ এই প্রশ্নের উত্তর তুমি নিজেই প্রদান কর যে, এই কুরআন আল্লাহই অবতীর্ণ করেছেন। এটা হচ্ছে ওটাই যা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন এবং এই শব্দের তাফসীরে এটাই নির্দিষ্ট। তাফসীর এই রূপ নয় যা পরবর্তী গুরুজনরা বলেছেন। তা এই যে, (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে- হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তাদের প্রতি তোমার সম্বোধন এটা ছাড়া নয় যে, এই শব্দ শুধু একক শব্দ, অর্থাৎ শব্দটি হচ্ছে ‘আল্লাহ'। এতে এটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে যে, একটা একক শব্দ বাক্যও হতে পারে যা (আরবী) বা অমিশ্রিত শব্দ। কিন্তু একক শব্দকে আরবী অভিধানে (আরবী) মনে। করা হয় এবং ওর উপর (আরবী) বা নীরবতা চলতে পারে না। আল্লাহ পাকের উক্তি- হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বাতিল ধারণার উপর ছেড়ে দাও, তারা খেলা করতে থাকুক । অবশেষে মৃত্যুর পর তাদের বিশ্বাসের চক্ষু খুলে যাবে এবং পরিশেষে তারা আল্লাহ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করবে।মহান আল্লাহর উক্তি- এই কুরআন হচ্ছে অত্যন্ত বরকতময় এবং এই কিতাব পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবকে সত্যায়িত করে থাকে। এ কিতাব তিনি এই জন্যেই অবতীর্ণ করেছেন যেন তুমি এর মাধ্যমে মক্কা ও তার চতুষ্পর্শ্বে বসবাসকারী আরব গোত্রগুলোকে এবং আরব ও আজমের আদম সন্তানদেরকে কুফর ও শিরকের ভয়াবহ পরিনাম থেকে ভীতি প্রদর্শন করতে পার। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “হে রাসূল (সঃ)! তুমি বলে দাও- হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সকলের প্রতি রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি, যেন আমি তোমাদেরকে সতর্ক করি এবং তাদেরকেও, যাদের কাছে আমার পয়গাম পৌঁছে যাবে।” (৭:১৫৮) মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দলসমূহের মধ্য থেকে যারা এর সাথে কুফরী করবে, তাদের জন্যে জাহান্নামের অঙ্গীকার রয়েছে।”(১১৪ ১৭) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ সত্তা কল্যাণময় যিনি স্বীয় বান্দার উপর (মুহাম্মাদ সঃ -এর উপর) ফুরকান (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন, যেন সে সারা বিশ্ববাসীর জন্যে ভয় প্রদর্শক হয়ে যায়।” (২৫:১) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি আহলে কিতাব ও মূর্খদেরকে (মুশরিকদেরকে) বলে দাও- তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করলে? যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে তবে সুপথ লাভ করবে, আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে (তুমি সে জন্যে দায়ী নও) তোমার দায়িত্ব শুধু পৌঁছিয়ে দেয়া। আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (৩:২০) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যেগুলো আমার পূর্ববর্তী নবীদের কাউকেই দেয়া হয়নি। ওগুলোর মধ্যে একটি এই যে, প্রত্যেক নবী নির্দিষ্টভাবে নিজের কওমের নিকটেই প্রেরিত হয়েছিলেন, আর আমি সারা বিশ্ববাসীর কাছেই প্রেরিত হয়েছি।” এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তারা এই কিতাবের (কুরআনের) উপরও বিশ্বাস রাখে যা আমি (হে মুহাম্মাদ সঃ) তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি।” মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা এমনই মুমিন যে, তারা স্বীয় নামাযসমূহের পাবন্দী করে।” অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা যেমনভাবে সময়মত নামায আদায় করা তাদের উপর ফরয করে দিয়েছেন তারা সেভাবেই নামায আদায় করে থাকে।

আল-আনআম 6:92

৯১-৯২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেন-তারা যখন আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে অবিশ্বাস করলো তখন বুঝা গেল যে, তারা আল্লাহ তা'আলার মর্যাদার হক আদায় করলো না। আবদুল্লাহ ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি কুরায়েশদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এটা ইয়াহুদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। অথবা এটা অবতীর্ণ হয় মালিক ইবনে সায়েফের ব্যাপারে। এই নির্বোধদের উক্তি এই যে, আল্লাহ তাআলা কোন মানুষের উপর কিতাব অবতীর্ণ করেননি। শানে নুযূল হিসেবে প্রথম উক্তিটিই সঠিকতম। কেননা, এ আয়াতটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়। আর ইয়াহূদীরা তো এ কথা বলতো না যে, মানুষের উপর কোন কিতাব অবতীর্ণ হয়নি। কেননা, তারা তো এটা স্বীকার করে যে, তাওরাত হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। মক্কার অধিবাসী কুরায়েশ ও আরবরাই মুহাম্মাদ (সঃ)-কে অস্বীকার করতো। তাদের দলীল ছিল এই যে, মুহাম্মাদ (সঃ) একজন মানুষ এবং মানুষের উপর কিতাব অবতীর্ণ হয় না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি মানুষের মধ্য হতে কারও উপর অহী পাঠাই- তুমি তাদেরকে (কুফরী থেকে) ভয় প্রদর্শন কর, এতে কি মানুষেরা বিস্ময় বোধ করে?” (১০:২) আরও ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ “যখন তাদের কাছে হিদায়াত পৌঁছে তখন যে জিনিস তাদেরকে ঈমান আনয়নে বাধা দেয় তা হচ্ছে এই যে, তাদের কথা ছিল- আল্লাহ কি কোন মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন? হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বল, ফেরেশতারা যদি ভূ-পৃষ্ঠে চলাফেরা করার প্রাণী হতো তবে কোন ফেরেশতাকেই আমি রাসূল করে পাঠাতাম।” (১৮:৫৫) এখন আল্লাহ পাক এখানে বলেনঃ আল্লাহর যেরূপ মর্যাদা দেয়া উচিত তা তারা দেয়নি। অর্থাৎ তারা বলে দিলো যে, আল্লাহ কোন মানুষের উপর কিছু অবতীর্ণ করেননি। হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও- আল্লাহ মূসা (আঃ)-এর উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছিলেন। যে কিতাব লোকদের উপর নূর ও হিদায়াত রূপে প্রমাণিত হয়েছে। হযরত মূসা (আঃ) কর্তৃক পেশকৃত কিতাব তাওরাত' কার দ্বারা অবতীর্ণ করা হয়েছে? তোমরা এবং সবাই একথা অবগত যে, মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর কিতাব আল্লাহ কর্তৃকই অবতারিত ছিল। যদ্দ্বারা মানুষ হিদায়াতের আলো লাভ করতো এবং সন্দেহের অন্ধকারে সোজা সরল পথ খুঁজে পেতো।মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা তাওরাতকে খণ্ড খণ্ড করে বিভিন্ন পত্রে রেখেছো, কিন্তু তাতে লিখতে গিয়ে নিজেদের পক্ষ থেকে পরিবর্ধনও করতে রয়েছে। আর বলতে রয়েছে, এটাও আল্লাহরই আয়াত। এজন্যে আল্লাহ পাক বলেন, কিছু কিছু প্রকৃত আয়াত প্রকাশ করছো বটে, কিন্তু অধিকাংশ আয়াতকেই তোমরা গোপন করছে।আল্লাহ তা'আলার উক্তি- এই কিতাবের মাধ্যমে তোমরা এমন কিছু জেনেছো যা তোমরাও জানতে না এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা। অর্থাৎ হে কুরায়েশের দল! কে এই কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, যাতে অতীতের সংবাদ রয়েছে এবং ভবিষ্যত বাণীও বিদ্যমান আছে যেগুলো না তোমরা জানতে, না তোমাদের বাপ-দাদারা জানত। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এই সম্বোধন আরবের মুশরিকদেরকে করা হয়েছে। আর মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই সম্বোধন মুসলমানদেরকেই করা হয়েছে। যখন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ এই প্রশ্নের উত্তর তুমি নিজেই প্রদান কর যে, এই কুরআন আল্লাহই অবতীর্ণ করেছেন। এটা হচ্ছে ওটাই যা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন এবং এই শব্দের তাফসীরে এটাই নির্দিষ্ট। তাফসীর এই রূপ নয় যা পরবর্তী গুরুজনরা বলেছেন। তা এই যে, (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে- হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তাদের প্রতি তোমার সম্বোধন এটা ছাড়া নয় যে, এই শব্দ শুধু একক শব্দ, অর্থাৎ শব্দটি হচ্ছে ‘আল্লাহ'। এতে এটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে যে, একটা একক শব্দ বাক্যও হতে পারে যা (আরবী) বা অমিশ্রিত শব্দ। কিন্তু একক শব্দকে আরবী অভিধানে (আরবী) মনে। করা হয় এবং ওর উপর (আরবী) বা নীরবতা চলতে পারে না। আল্লাহ পাকের উক্তি- হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বাতিল ধারণার উপর ছেড়ে দাও, তারা খেলা করতে থাকুক । অবশেষে মৃত্যুর পর তাদের বিশ্বাসের চক্ষু খুলে যাবে এবং পরিশেষে তারা আল্লাহ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করবে।মহান আল্লাহর উক্তি- এই কুরআন হচ্ছে অত্যন্ত বরকতময় এবং এই কিতাব পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবকে সত্যায়িত করে থাকে। এ কিতাব তিনি এই জন্যেই অবতীর্ণ করেছেন যেন তুমি এর মাধ্যমে মক্কা ও তার চতুষ্পর্শ্বে বসবাসকারী আরব গোত্রগুলোকে এবং আরব ও আজমের আদম সন্তানদেরকে কুফর ও শিরকের ভয়াবহ পরিনাম থেকে ভীতি প্রদর্শন করতে পার। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “হে রাসূল (সঃ)! তুমি বলে দাও- হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সকলের প্রতি রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি, যেন আমি তোমাদেরকে সতর্ক করি এবং তাদেরকেও, যাদের কাছে আমার পয়গাম পৌঁছে যাবে।” (৭:১৫৮) মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দলসমূহের মধ্য থেকে যারা এর সাথে কুফরী করবে, তাদের জন্যে জাহান্নামের অঙ্গীকার রয়েছে।”(১১৪ ১৭) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ সত্তা কল্যাণময় যিনি স্বীয় বান্দার উপর (মুহাম্মাদ সঃ -এর উপর) ফুরকান (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন, যেন সে সারা বিশ্ববাসীর জন্যে ভয় প্রদর্শক হয়ে যায়।” (২৫:১) আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি আহলে কিতাব ও মূর্খদেরকে (মুশরিকদেরকে) বলে দাও- তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করলে? যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে তবে সুপথ লাভ করবে, আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে (তুমি সে জন্যে দায়ী নও) তোমার দায়িত্ব শুধু পৌঁছিয়ে দেয়া। আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (৩:২০) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যেগুলো আমার পূর্ববর্তী নবীদের কাউকেই দেয়া হয়নি। ওগুলোর মধ্যে একটি এই যে, প্রত্যেক নবী নির্দিষ্টভাবে নিজের কওমের নিকটেই প্রেরিত হয়েছিলেন, আর আমি সারা বিশ্ববাসীর কাছেই প্রেরিত হয়েছি।” এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তারা এই কিতাবের (কুরআনের) উপরও বিশ্বাস রাখে যা আমি (হে মুহাম্মাদ সঃ) তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি।” মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা এমনই মুমিন যে, তারা স্বীয় নামাযসমূহের পাবন্দী করে।” অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা যেমনভাবে সময়মত নামায আদায় করা তাদের উপর ফরয করে দিয়েছেন তারা সেভাবেই নামায আদায় করে থাকে।

আল-আনআম 6:93

৯৩-৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপকারীদের চেয়ে বড় অত্যাচারী আর কে আছে? সে তাঁর শরীক স্থাপন করছে বা বলছে যে, তাঁর সন্তান রয়েছে, কিংবা দাবী করছে যে, আল্লাহ তাকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, অথচ তাকে পাঠানো হয়নি। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন, সে বলছে যে, তার কাছেও অহী পাঠানো হয়েছে, অথচ তার কাছে তা পাঠানো হয়নি। ইকরামা ও কাতাদা বলেন যে, এই আয়াতটি মুসাইলামা কাযযাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়।আর তার চেয়ে বড় যালিম আর কে আছে যে বলে, আল্লাহ যেমন কুরআন অবতীর্ণ করেছেন আমিও দ্রুপ অবতীর্ণ করতে পারি। অর্থাৎ সে দাবী করছে যে, আল্লাহর মত অহী সেও অবতীর্ণ করতে পারে। (লুবাব গ্রন্থে রয়েছে- ইবনে জারীর হতে তাখরীজ করা হয়েছে যে, (আরবী) -এই আয়াতটি মুসাইলামার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। আর (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় আব্দুল্লাহ ইবনে সা'দের ব্যাপারে। সুদ্দী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে সা’দ বলতোযদি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে অহী করা হয়ে থাকে তবে আমার কাছেও অহী করা হয়ে থাকে। আর যদি আল্লাহ তাঁর কাছে (কুরআন) অবতীর্ণ করে থাকেন তবে আমিও তদ্রুপ অবতীর্ণ করতে পারি। মুহাম্মাদ (সঃ) বলেনঃ (আরবী) আর আমি (আরবী) বলি) যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা বলে- আমরা শুনলাম এবং ইচ্ছা করলে আমরাও এরূপ বলতে পারি।” (৮:৩১) (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! যদি তুমি ঐ সময়ের অবস্থা দেখতে, যে সময় যালিমেরা মৃত্যু যন্ত্রণায় পরিবেষ্টিত হবে! (আরবী) অর্থাৎ ফেরেশতারা মারবার জন্যে হাত উঠাবে। যেমন মহান আল্লাহ এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে কাবীল। আমাকে হত্যা করার জন্যে) যদি তুমি আমার দিকে হাত উঠাও। (৫:২৮) আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ) তারা তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে ও ভালমন্দ বলার জন্যে তোমার দিকে হাত ও জিহ্বা প্রসারিত করে।” (৬০:২) যহ্হাক (রঃ) ও আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, এখানে ভাবার্থ হচ্ছে শাস্তির জন্যে হাত উঠানো। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! যদি তুমি দেখতে যখন মৃত্যুমুখী কাফিরদেরকে ফেরেশতারা তাদের চেহারায় ও পিঠে মারতে রয়েছে!" এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ঐ ফেরেশতারা তাদের দেহ থেকে প্রাণ বের করার জন্যে তাদের দিকে তাদের হস্ত প্রসারিত করবেন। তারা তাদেরকে বলবেন, তোমরা তোমাদের প্রাণগুলো বের করে দাও। যখন কাফিরদের মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হবে তখন ফেরেশতারা তাদেরকে শাস্তি, শৃংখল, জাহান্নাম, গরম পানি এবং আল্লাহর গযবের সংবাদ প্রদান করবেন। তখন তাদের আত্মাগুলো বেরিয়ে আসতে অস্বীকার করবে এবং তাদের দেহের মধ্যে ফিরতে থাকবে। সেই সময় ফেরেশতারা তাদেরকে প্রহার করতে থাকবেন যে পর্যন্ত না তাদের আত্মাগুলো বেরিয়ে আসে। আর তারা বলবেন, নিজেদের প্রাণগুলো বের করে দাও। তোমরা যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করতে তারই শাস্তি স্বরূপ আজকে তোমাদেরকে অপমানজনক আযাব প্রদান করা হবে। মুমিন ও কাফিরদের মৃত্যু সম্পকীয় বহু হাদীস এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “মুমিনদেরকে আল্লাহ পার্থিব জগতে ও পরকালে সঠিক কথার উপর অটল রাখবেন।” ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) এখানে গারীব সনদে একটি সুদীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে বলে কথিত আছে। ইরশাদ হচ্ছে - (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আমার কাছে এককভাবে এসেছো, যেভাবে আমি প্রথমবার তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলাম।” একথা তাদেরকে কিয়ামতের দিন বলা হবে। যেমন আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তাদেরকে তোমার প্রভুর সামনে সারিবদ্ধভাবে পেশ করা হবে, (তাদেরকে আল্লাহ বলবেন) তোমরা আমার কাছে এককভাবে এসেছো, যেভাবে আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম। আর তোমরা এটা অস্বীকার করতে এবং এই কিয়ামতের দিনকে বহু দূরের ব্যাপার মনে করতে। এটাই হচ্ছে পুনরুত্থানের দিন।” (১৮:৪৮) তিনি আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে দুনিয়ায় যে নিয়ামত ও মালধন দান করেছিলাম তা তোমরা শুধু জমা করেই রেখেছিলে, ওগুলো দুনিয়ায় তোমাদের পিছনে ছেড়ে এসেছো।" সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইবনে আদম (আদম সন্তান) বলে- আমার মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল তো এতটুকুই যা তুমি খেয়ে শেষ করছো, যা পরিধান করে পুরানা করেছে এবং যা দান-খয়রাত করে বাকী রেখেছো, এ ছাড়া তোমার সমস্ত সম্পদ অন্যের জন্যে। (তুমি রেখে গেলে)।” আল্লাহ পাক আদম সন্তানকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তুমি যা জমা করেছিলে তা আজ কোথায়? সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রভু! আমি দুনিয়াতে জমা করেছিলাম, বাড়িয়ে ছিলাম এবং তা সেখানেই ছেড়ে এসেছি।” অতঃপর তিনি বলবেনঃ “তোমরা যাদেরকে আমার শরীক মনে করতে তোমাদের সেই সব সুপারিশকারী কোথায়? এখন তারা সুপারিশ করছে না কেন?” এর দ্বারা তাদেরকে ভৎসনা ও তিরস্কার করা হচ্ছে। কেননা, তারা দুনিয়ায় মূর্তির পূজা করতো এবং মনে করতো যে, ওগুলো পার্থিব জীবনে ও পারলৌকিক জীবনে তাদের জন্যে উপকারী হবে। কিন্তু কিয়ামতের দিন সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। পথভ্রষ্টতা শেষ হয়ে যাবে, মূর্তিগুলোর রাজত্বের অবসান ঘটবে এবং আল্লাহ পাক লোকদেরকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “যেসব মূর্তিকে তোমরা আমার শরীক মনে করতে সেগুলো আজ কোথায়?” তাদেরকে আরও বলা হবে- “এখন তোমাদের মিথ্যা মা'বুদগুলো কোথায়? তারা কি এখন তোমাদের কোন সাহায্য করতে পারবে, বা তোমরাই তাদেরকে কোন সাহায্য করতে পারবে কি?” এজন্যেই তিনি বলেনঃ “আমি তো তোমাদের সাথে তোমাদের সেই সুপারিশকারীদেরকে দেখছি না যাদের সম্বন্ধে তোমরা দাবী করতে যে, তারা তোমাদের কাজেকর্মে আমার শরীক। বাস্তবিকই তোমাদের পরস্পরের সম্পর্ক তো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে!" বায়নাকুম শব্দটিকে যদি (আরবী) দিয়ে অর্থাৎ বায়নুকুম পড়া যায় তবে অর্থ হবে- তোমাদের দলগুলো ভেঙ্গে দেয়া হবে। আর যদি (আরবী) দিয়ে পড়া হয় তবে ভাবার্থ হবে- তোমাদের পরস্পরের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে এবং মূর্তিগুলোর নিকট থেকে তোমরা যা কিছু পাওয়ার আশা করতে সে আশা গুড়ে বালি। যেমন তিনি বলেনঃ “যখন মাতব্বরগণ তাবেদারগণ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যাবে এবং সবাই শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে, আর তাদের যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আর এই তাবেদারগণ বলবে-যদি আমরা একটু (দুনিয়ায়) ফিরে যেতে পারতাম, তবে আমরাও তাদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হতাম যেমন (আজ) তারা আমাদের থেকে পরিষ্কারভাবে পৃথক হয়ে পড়েছে। আল্লাহ এরূপই তাদেরকে তাদের কুকর্মগুলো নিষ্ফল আকাংখারূপে দেখিয়ে দিবেন, আর তাদের জাহান্নাম থেকে বের হওয়া কখনও নসীবে ঘটবে না।” মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ “যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে তখন তাদের পারস্পরিক বংশ সম্পর্ক কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না এবং তারা একে অপরের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদও করবে না। তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ “তোমরা দুনিয়ায় যে তাদের পূজা-অর্চনা করতে তা শুধুমাত্র পাথিব জীবনে মহব্বত ও ভালবাসার খাতিরে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করে বসবে এবং একে অপরকে তিরস্কার করতে থাকবে, সেদিন তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কেউ সাহায্যকারী হবে না।” আর এক স্থানে আল্লাহ পাক বলেনঃ “তাদেরকে বলা হবে-তোমাদের শরীকদেরকে (যাদেরকে তোমরা আল্লাহর সাথে শরীক বানিয়ে নিয়েছিলে তাদেরকে) ডাক, তারা তখন তাদেরকে ডাকতে থাকবে, কিন্তু তারা তাদেরকে কোন উত্তর দেবে না।” কুরআন কারীমে এ সম্পর্কীয় বহু সংখ্যক আয়াত বিদ্যমান রয়েছে।

আল-আনআম 6:94

৯৩-৯৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপকারীদের চেয়ে বড় অত্যাচারী আর কে আছে? সে তাঁর শরীক স্থাপন করছে বা বলছে যে, তাঁর সন্তান রয়েছে, কিংবা দাবী করছে যে, আল্লাহ তাকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, অথচ তাকে পাঠানো হয়নি। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন, সে বলছে যে, তার কাছেও অহী পাঠানো হয়েছে, অথচ তার কাছে তা পাঠানো হয়নি। ইকরামা ও কাতাদা বলেন যে, এই আয়াতটি মুসাইলামা কাযযাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়।আর তার চেয়ে বড় যালিম আর কে আছে যে বলে, আল্লাহ যেমন কুরআন অবতীর্ণ করেছেন আমিও দ্রুপ অবতীর্ণ করতে পারি। অর্থাৎ সে দাবী করছে যে, আল্লাহর মত অহী সেও অবতীর্ণ করতে পারে। (লুবাব গ্রন্থে রয়েছে- ইবনে জারীর হতে তাখরীজ করা হয়েছে যে, (আরবী) -এই আয়াতটি মুসাইলামার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। আর (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় আব্দুল্লাহ ইবনে সা'দের ব্যাপারে। সুদ্দী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে সা’দ বলতোযদি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে অহী করা হয়ে থাকে তবে আমার কাছেও অহী করা হয়ে থাকে। আর যদি আল্লাহ তাঁর কাছে (কুরআন) অবতীর্ণ করে থাকেন তবে আমিও তদ্রুপ অবতীর্ণ করতে পারি। মুহাম্মাদ (সঃ) বলেনঃ (আরবী) আর আমি (আরবী) বলি) যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা বলে- আমরা শুনলাম এবং ইচ্ছা করলে আমরাও এরূপ বলতে পারি।” (৮:৩১) (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! যদি তুমি ঐ সময়ের অবস্থা দেখতে, যে সময় যালিমেরা মৃত্যু যন্ত্রণায় পরিবেষ্টিত হবে! (আরবী) অর্থাৎ ফেরেশতারা মারবার জন্যে হাত উঠাবে। যেমন মহান আল্লাহ এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে কাবীল। আমাকে হত্যা করার জন্যে) যদি তুমি আমার দিকে হাত উঠাও। (৫:২৮) আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ) তারা তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে ও ভালমন্দ বলার জন্যে তোমার দিকে হাত ও জিহ্বা প্রসারিত করে।” (৬০:২) যহ্হাক (রঃ) ও আবু সালিহ (রঃ) বলেন যে, এখানে ভাবার্থ হচ্ছে শাস্তির জন্যে হাত উঠানো। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! যদি তুমি দেখতে যখন মৃত্যুমুখী কাফিরদেরকে ফেরেশতারা তাদের চেহারায় ও পিঠে মারতে রয়েছে!" এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ঐ ফেরেশতারা তাদের দেহ থেকে প্রাণ বের করার জন্যে তাদের দিকে তাদের হস্ত প্রসারিত করবেন। তারা তাদেরকে বলবেন, তোমরা তোমাদের প্রাণগুলো বের করে দাও। যখন কাফিরদের মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হবে তখন ফেরেশতারা তাদেরকে শাস্তি, শৃংখল, জাহান্নাম, গরম পানি এবং আল্লাহর গযবের সংবাদ প্রদান করবেন। তখন তাদের আত্মাগুলো বেরিয়ে আসতে অস্বীকার করবে এবং তাদের দেহের মধ্যে ফিরতে থাকবে। সেই সময় ফেরেশতারা তাদেরকে প্রহার করতে থাকবেন যে পর্যন্ত না তাদের আত্মাগুলো বেরিয়ে আসে। আর তারা বলবেন, নিজেদের প্রাণগুলো বের করে দাও। তোমরা যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করতে তারই শাস্তি স্বরূপ আজকে তোমাদেরকে অপমানজনক আযাব প্রদান করা হবে। মুমিন ও কাফিরদের মৃত্যু সম্পকীয় বহু হাদীস এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “মুমিনদেরকে আল্লাহ পার্থিব জগতে ও পরকালে সঠিক কথার উপর অটল রাখবেন।” ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) এখানে গারীব সনদে একটি সুদীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে বলে কথিত আছে। ইরশাদ হচ্ছে - (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আমার কাছে এককভাবে এসেছো, যেভাবে আমি প্রথমবার তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলাম।” একথা তাদেরকে কিয়ামতের দিন বলা হবে। যেমন আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তাদেরকে তোমার প্রভুর সামনে সারিবদ্ধভাবে পেশ করা হবে, (তাদেরকে আল্লাহ বলবেন) তোমরা আমার কাছে এককভাবে এসেছো, যেভাবে আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম। আর তোমরা এটা অস্বীকার করতে এবং এই কিয়ামতের দিনকে বহু দূরের ব্যাপার মনে করতে। এটাই হচ্ছে পুনরুত্থানের দিন।” (১৮:৪৮) তিনি আরও বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে দুনিয়ায় যে নিয়ামত ও মালধন দান করেছিলাম তা তোমরা শুধু জমা করেই রেখেছিলে, ওগুলো দুনিয়ায় তোমাদের পিছনে ছেড়ে এসেছো।" সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইবনে আদম (আদম সন্তান) বলে- আমার মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল তো এতটুকুই যা তুমি খেয়ে শেষ করছো, যা পরিধান করে পুরানা করেছে এবং যা দান-খয়রাত করে বাকী রেখেছো, এ ছাড়া তোমার সমস্ত সম্পদ অন্যের জন্যে। (তুমি রেখে গেলে)।” আল্লাহ পাক আদম সন্তানকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তুমি যা জমা করেছিলে তা আজ কোথায়? সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রভু! আমি দুনিয়াতে জমা করেছিলাম, বাড়িয়ে ছিলাম এবং তা সেখানেই ছেড়ে এসেছি।” অতঃপর তিনি বলবেনঃ “তোমরা যাদেরকে আমার শরীক মনে করতে তোমাদের সেই সব সুপারিশকারী কোথায়? এখন তারা সুপারিশ করছে না কেন?” এর দ্বারা তাদেরকে ভৎসনা ও তিরস্কার করা হচ্ছে। কেননা, তারা দুনিয়ায় মূর্তির পূজা করতো এবং মনে করতো যে, ওগুলো পার্থিব জীবনে ও পারলৌকিক জীবনে তাদের জন্যে উপকারী হবে। কিন্তু কিয়ামতের দিন সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। পথভ্রষ্টতা শেষ হয়ে যাবে, মূর্তিগুলোর রাজত্বের অবসান ঘটবে এবং আল্লাহ পাক লোকদেরকে সম্বোধন করে বলবেনঃ “যেসব মূর্তিকে তোমরা আমার শরীক মনে করতে সেগুলো আজ কোথায়?” তাদেরকে আরও বলা হবে- “এখন তোমাদের মিথ্যা মা'বুদগুলো কোথায়? তারা কি এখন তোমাদের কোন সাহায্য করতে পারবে, বা তোমরাই তাদেরকে কোন সাহায্য করতে পারবে কি?” এজন্যেই তিনি বলেনঃ “আমি তো তোমাদের সাথে তোমাদের সেই সুপারিশকারীদেরকে দেখছি না যাদের সম্বন্ধে তোমরা দাবী করতে যে, তারা তোমাদের কাজেকর্মে আমার শরীক। বাস্তবিকই তোমাদের পরস্পরের সম্পর্ক তো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে!" বায়নাকুম শব্দটিকে যদি (আরবী) দিয়ে অর্থাৎ বায়নুকুম পড়া যায় তবে অর্থ হবে- তোমাদের দলগুলো ভেঙ্গে দেয়া হবে। আর যদি (আরবী) দিয়ে পড়া হয় তবে ভাবার্থ হবে- তোমাদের পরস্পরের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে এবং মূর্তিগুলোর নিকট থেকে তোমরা যা কিছু পাওয়ার আশা করতে সে আশা গুড়ে বালি। যেমন তিনি বলেনঃ “যখন মাতব্বরগণ তাবেদারগণ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যাবে এবং সবাই শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে, আর তাদের যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আর এই তাবেদারগণ বলবে-যদি আমরা একটু (দুনিয়ায়) ফিরে যেতে পারতাম, তবে আমরাও তাদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হতাম যেমন (আজ) তারা আমাদের থেকে পরিষ্কারভাবে পৃথক হয়ে পড়েছে। আল্লাহ এরূপই তাদেরকে তাদের কুকর্মগুলো নিষ্ফল আকাংখারূপে দেখিয়ে দিবেন, আর তাদের জাহান্নাম থেকে বের হওয়া কখনও নসীবে ঘটবে না।” মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ “যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে তখন তাদের পারস্পরিক বংশ সম্পর্ক কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না এবং তারা একে অপরের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদও করবে না। তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ “তোমরা দুনিয়ায় যে তাদের পূজা-অর্চনা করতে তা শুধুমাত্র পাথিব জীবনে মহব্বত ও ভালবাসার খাতিরে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করে বসবে এবং একে অপরকে তিরস্কার করতে থাকবে, সেদিন তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কেউ সাহায্যকারী হবে না।” আর এক স্থানে আল্লাহ পাক বলেনঃ “তাদেরকে বলা হবে-তোমাদের শরীকদেরকে (যাদেরকে তোমরা আল্লাহর সাথে শরীক বানিয়ে নিয়েছিলে তাদেরকে) ডাক, তারা তখন তাদেরকে ডাকতে থাকবে, কিন্তু তারা তাদেরকে কোন উত্তর দেবে না।” কুরআন কারীমে এ সম্পর্কীয় বহু সংখ্যক আয়াত বিদ্যমান রয়েছে।

আল-আনআম 6:95

৯৫-৯৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি যমীনের বপনকৃত দানাকে উপরে এনে চৌচির করে দেন এবং তার থেকে বিভিন্ন প্রকারের সজি ও বর্ধনশীল উদ্ভিদ পয়দা করেন। ওগুলোর রং পৃথক, আকৃতি এবং ডাটা পৃথক। (আরবী)-এর তাফসীরে বলা হয়েছে যে, তিনি একটা প্রাণহীন জিনিসের মধ্য থেকে একটা প্রাণযুক্ত জিনিস অর্থাৎ উদ্ভিদ সৃষ্টি করে থাকেন এবং জীবন্ত জিনিস থেকে নির্জীব জিনিস পয়দা করেন। যেমন বীজ ও দানা যা হচ্ছে নির্জীব জিনিস, এটা তিনি জীবন্ত উদ্ভিদ থেকে পয়দা করে থাকেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের জন্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে নির্জীব যমীন, আমি ওকে সঞ্জীবিত করেছি এবং তা থেকে শস্য উৎপন্ন করেছি, ফলে তারা তা থেকে আহার করে থাকে।” (৩৬৪ ৩৩)।(আরবী) -এটা -এর উপর সংযুক্ত। তারপর এর তাফসীর করা হয়েছে। অতঃপর (আরবী)-কে এর উপর সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এই সবগুলোরই অর্থ প্রায় একই। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা প্রাণহীন ডিম হতে জীবন্ত মুরগী পয়দা করা বুঝানো হয়েছে। কিংবা এর বিপরীত। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে পাপাচারের ঔরষে সৎ সন্তানের জন্মলাভ এবং সৎ ব্যক্তির ঔরষে পাপাচার ছেলের জন্মলাভ। কেননা, সৎ ব্যক্তি জীবিতের সাথে তুলনীয় এবং পাপী লোক মৃতের সাথে তুলনীয়। এ ছাড়া আরও বহু অর্থ হতে পারে। আল্লাহ পাক বলেনঃ এ সবকিছু আল্লাহই করে থাকেন যিনি হচ্ছেন এক, যার কোন অংশীদার নেই। তাহলে তোমরা বিভ্রান্ত হয়ে কোন দিকে যাচ্ছ? সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ কেন? আল্লাহ ছাড়া তোমাদের অন্য কারও ইবাদত করার কারণ কি? আলো ও অন্ধকারের সৃষ্টিকর্তা তো তিনিই। যেমন তিনি অত্র সূরার শুরুতেই বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই অন্ধকার ও আললা বানিয়েছেন।” (৬:১) অর্থাৎ তিনি দিনের আলোকের মধ্য থেকে রাতের অন্ধকারকেও বের করেছেন, আবার তিনি রাতের মধ্য থেকে দিনের আলোকে বের করেছেন যা সারা প্রান্তকে উজ্জ্বলময় করে দিয়েছে। রাত্রি শেষে অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং উজ্জ্বল দিন প্রকাশিত হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাত্রি দিনকে ঢেকে ফেলে।” (৭:৫৪) এইভাবে মহান আল্লাহ পরস্পর বিপরীতমুখী জিনিসগুলো সৃষ্টি করে স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। এজন্যেই তিনি বলেন যে, তিনি রাতের মধ্য থেকে দিনকে ফেড়ে বের করে থাকেন। রাতকে তিনি বিশ্রামকাল করেছেন যেন সমুদয় জিনিস অতে শান্তি ও আরাম লাভ করতে পারে। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কসম দিনের আলোকের এবং রাত্রির, বন তা প্রশান্ত হয়।” (৯৩:১-২) তিনি আরও বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “শপথ রাত্রির যখন ওটা (সূর্যকে) আচ্ছন্ন করে ফেলে, আর দিবসের যখন ওটা আলোকিত হয়ে পড়ে।” (৯২:১-২) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘কসম দিবসের যখন ওটা ওকে ভালরূপে আলোকিত করে এবং কসম রাত্রির যখন ওটা ওকে সমাচ্ছন্ন করে।" (৯১:৩-৪)।হযরত সুহাইব রূমী (রাঃ)-এর স্ত্রী তাঁর অধিক রাত্রি জাগরণের অভিযোগ করে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সবারই জন্যে রাত্রিকে বিশ্রামকাল ও আরামের সময় বানিয়েছেন বটে, কিন্তু সুহাইব (রাঃ)-এর জন্যে নয়। কেননা, যখন তার জান্নাতের কথা স্মরণ হয় তখন তিনি ওর আগ্রহাতিশয্যে সারা রাত শয়নই করেন না। বরং সারা রাত্রি ধরে ইবাদতে মগ্ন থাকেন। আবার যখন তার জাহান্নামের কথা স্মরণ হয় তখন তার দ্রিাই উড়ে যায়।” (এই হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ বলেনঃ “সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ রীতিনীতি ও নিয়ম শৃংখলার উপর চলতে রয়েছে। ওদের গতির নিয়মের মধ্যে অণু পরিমাণও পরিবর্তন ঘটে না, ওগুলো এদিক ওদিক চলে যায় না, বরং প্রত্যেকটির কক্ষপথ নির্ধারিত রয়েছে। গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে ওরা নিজ নিজ কক্ষপথে চলতে রয়েছে। এই শৃংখলিত নিয়মের ফলেই দিন রাত্রি কমতে ও বাড়তে রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তিনিই সেই আল্লাহ যিনি সূর্যকে দীপ্তিময় বানিয়েছেন এবং চন্দ্রকে কোমল আলো দান করেছেন এবং হ্রাস বৃদ্ধির মনযিল নির্ধারণ করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “সূর্যের সাধ্য নেই যে চন্দ্রকে ধরে নিবে, আর না রাত্রি দিবসের পূর্বে আসতে পারবে এবং প্রত্যেকেই এক একটি চক্রের মধ্যে সন্তরণ করতে রয়েছে। তিনি আরও বলেনঃ “সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি তাঁর আদেশ পালনে সদা নিয়োজিত রয়েছে। আল্লাহ পাক আরও বলেছেনঃ “এটা তারই নির্ধারিত পরিমাণ, যিনি মহা পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়। কেউ তার বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে না। কেউই তাঁর অগোচরে থাকতে সক্ষম নয়, সেটা যমীন আসমানের অণু পরিমাণই জিনিস হোক না কেন।আল্লাহ তা'আলা যেখানেই রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্রের সৃষ্টির কথা বর্ণনা করেছেন সেখানেই তিনি বাক্যকে (আরবী) শব্দ দ্বারাই শেষ করেছেন। যেমন এখানেও ঐ নিয়মের ব্যক্তিক্রম ঘটেনি। মহান আল্লাহ বলেনঃ “তাদের জানবার পক্ষে রাত্রিও একটা নিদর্শন যে, ওর মধ্য থেকে আমি দিনকে অপসারণ করি, তৎক্ষণাৎ তারা অন্ধকারের মধ্যে থেকে যায়। আর সূর্যও স্বীয় গতিপথে চলতে রয়েছে এবং স্বীয় নির্ধারিত কক্ষের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটা সেই মহা পরাক্রান্ত ও জ্ঞানময়েরই নির্ধারিত পরিমাপ এবং মাপকাঠি।” মহান আল্লাহ (আরবী) সূরার প্রথমভাগে যমীন, আসমান এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী বস্তুসমূহের সৃষ্টি সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি এই নিকটবর্তী আসমানকে নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং ওকে সুরক্ষিত করেছি, এটা মহাপরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানীর নিয়ন্ত্রণ।” (৪১৪১২)।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তিনি তোমাদের জন্যে নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করেছেন-যেন তোমরা ওগুলোর সাহায্যে অন্ধকারে পথের সন্ধান পেতে পার, স্থলভাগেও এবং সমুদ্রেও। আল্লাহ তাআলা বলেন যে, এই তারকাগুলো এক তো হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্য, দ্বিতীয়তঃ এগুলো দ্বারা শয়তানদেরকে প্রহার করা হয় এবং তৃতীয়তঃ এগুলোর মাধ্যমে স্থলভাগ ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথ চেনা যায়। পূর্ববর্তী গুরুজনদের কেউ কেউ বলেছেন যে, তারকারাজি সৃষ্টির মধ্যে শুধুমাত্র তিনটি উদ্দেশ্যই নিহিত রয়েছে। এছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। যদি কেউ মনে করেন যে, এই তিনটি উদ্দেশ্য ছাড়া আরো উদ্দেশ্য রয়েছে তবে তিনি ভুল বুঝেছেন এবং কুরআনের আয়াতের উপর বাড়াবাড়ি করেছেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি প্রমাণসমূহ খুব বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি, যাতে লোকেরা কিছু জ্ঞান লাভ করতে পারে এবং সত্য ও ন্যায়কে চিনে নিয়ে অসত্য ও অন্যায়কে পরিহার করে।

আল-আনআম 6:96

৯৫-৯৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি যমীনের বপনকৃত দানাকে উপরে এনে চৌচির করে দেন এবং তার থেকে বিভিন্ন প্রকারের সজি ও বর্ধনশীল উদ্ভিদ পয়দা করেন। ওগুলোর রং পৃথক, আকৃতি এবং ডাটা পৃথক। (আরবী)-এর তাফসীরে বলা হয়েছে যে, তিনি একটা প্রাণহীন জিনিসের মধ্য থেকে একটা প্রাণযুক্ত জিনিস অর্থাৎ উদ্ভিদ সৃষ্টি করে থাকেন এবং জীবন্ত জিনিস থেকে নির্জীব জিনিস পয়দা করেন। যেমন বীজ ও দানা যা হচ্ছে নির্জীব জিনিস, এটা তিনি জীবন্ত উদ্ভিদ থেকে পয়দা করে থাকেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের জন্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে নির্জীব যমীন, আমি ওকে সঞ্জীবিত করেছি এবং তা থেকে শস্য উৎপন্ন করেছি, ফলে তারা তা থেকে আহার করে থাকে।” (৩৬৪ ৩৩)।(আরবী) -এটা -এর উপর সংযুক্ত। তারপর এর তাফসীর করা হয়েছে। অতঃপর (আরবী)-কে এর উপর সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এই সবগুলোরই অর্থ প্রায় একই। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা প্রাণহীন ডিম হতে জীবন্ত মুরগী পয়দা করা বুঝানো হয়েছে। কিংবা এর বিপরীত। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে পাপাচারের ঔরষে সৎ সন্তানের জন্মলাভ এবং সৎ ব্যক্তির ঔরষে পাপাচার ছেলের জন্মলাভ। কেননা, সৎ ব্যক্তি জীবিতের সাথে তুলনীয় এবং পাপী লোক মৃতের সাথে তুলনীয়। এ ছাড়া আরও বহু অর্থ হতে পারে। আল্লাহ পাক বলেনঃ এ সবকিছু আল্লাহই করে থাকেন যিনি হচ্ছেন এক, যার কোন অংশীদার নেই। তাহলে তোমরা বিভ্রান্ত হয়ে কোন দিকে যাচ্ছ? সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ কেন? আল্লাহ ছাড়া তোমাদের অন্য কারও ইবাদত করার কারণ কি? আলো ও অন্ধকারের সৃষ্টিকর্তা তো তিনিই। যেমন তিনি অত্র সূরার শুরুতেই বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই অন্ধকার ও আললা বানিয়েছেন।” (৬:১) অর্থাৎ তিনি দিনের আলোকের মধ্য থেকে রাতের অন্ধকারকেও বের করেছেন, আবার তিনি রাতের মধ্য থেকে দিনের আলোকে বের করেছেন যা সারা প্রান্তকে উজ্জ্বলময় করে দিয়েছে। রাত্রি শেষে অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং উজ্জ্বল দিন প্রকাশিত হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাত্রি দিনকে ঢেকে ফেলে।” (৭:৫৪) এইভাবে মহান আল্লাহ পরস্পর বিপরীতমুখী জিনিসগুলো সৃষ্টি করে স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। এজন্যেই তিনি বলেন যে, তিনি রাতের মধ্য থেকে দিনকে ফেড়ে বের করে থাকেন। রাতকে তিনি বিশ্রামকাল করেছেন যেন সমুদয় জিনিস অতে শান্তি ও আরাম লাভ করতে পারে। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কসম দিনের আলোকের এবং রাত্রির, বন তা প্রশান্ত হয়।” (৯৩:১-২) তিনি আরও বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “শপথ রাত্রির যখন ওটা (সূর্যকে) আচ্ছন্ন করে ফেলে, আর দিবসের যখন ওটা আলোকিত হয়ে পড়ে।” (৯২:১-২) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘কসম দিবসের যখন ওটা ওকে ভালরূপে আলোকিত করে এবং কসম রাত্রির যখন ওটা ওকে সমাচ্ছন্ন করে।" (৯১:৩-৪)।হযরত সুহাইব রূমী (রাঃ)-এর স্ত্রী তাঁর অধিক রাত্রি জাগরণের অভিযোগ করে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সবারই জন্যে রাত্রিকে বিশ্রামকাল ও আরামের সময় বানিয়েছেন বটে, কিন্তু সুহাইব (রাঃ)-এর জন্যে নয়। কেননা, যখন তার জান্নাতের কথা স্মরণ হয় তখন তিনি ওর আগ্রহাতিশয্যে সারা রাত শয়নই করেন না। বরং সারা রাত্রি ধরে ইবাদতে মগ্ন থাকেন। আবার যখন তার জাহান্নামের কথা স্মরণ হয় তখন তার দ্রিাই উড়ে যায়।” (এই হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ বলেনঃ “সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ রীতিনীতি ও নিয়ম শৃংখলার উপর চলতে রয়েছে। ওদের গতির নিয়মের মধ্যে অণু পরিমাণও পরিবর্তন ঘটে না, ওগুলো এদিক ওদিক চলে যায় না, বরং প্রত্যেকটির কক্ষপথ নির্ধারিত রয়েছে। গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে ওরা নিজ নিজ কক্ষপথে চলতে রয়েছে। এই শৃংখলিত নিয়মের ফলেই দিন রাত্রি কমতে ও বাড়তে রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তিনিই সেই আল্লাহ যিনি সূর্যকে দীপ্তিময় বানিয়েছেন এবং চন্দ্রকে কোমল আলো দান করেছেন এবং হ্রাস বৃদ্ধির মনযিল নির্ধারণ করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “সূর্যের সাধ্য নেই যে চন্দ্রকে ধরে নিবে, আর না রাত্রি দিবসের পূর্বে আসতে পারবে এবং প্রত্যেকেই এক একটি চক্রের মধ্যে সন্তরণ করতে রয়েছে। তিনি আরও বলেনঃ “সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি তাঁর আদেশ পালনে সদা নিয়োজিত রয়েছে। আল্লাহ পাক আরও বলেছেনঃ “এটা তারই নির্ধারিত পরিমাণ, যিনি মহা পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়। কেউ তার বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে না। কেউই তাঁর অগোচরে থাকতে সক্ষম নয়, সেটা যমীন আসমানের অণু পরিমাণই জিনিস হোক না কেন।আল্লাহ তা'আলা যেখানেই রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্রের সৃষ্টির কথা বর্ণনা করেছেন সেখানেই তিনি বাক্যকে (আরবী) শব্দ দ্বারাই শেষ করেছেন। যেমন এখানেও ঐ নিয়মের ব্যক্তিক্রম ঘটেনি। মহান আল্লাহ বলেনঃ “তাদের জানবার পক্ষে রাত্রিও একটা নিদর্শন যে, ওর মধ্য থেকে আমি দিনকে অপসারণ করি, তৎক্ষণাৎ তারা অন্ধকারের মধ্যে থেকে যায়। আর সূর্যও স্বীয় গতিপথে চলতে রয়েছে এবং স্বীয় নির্ধারিত কক্ষের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটা সেই মহা পরাক্রান্ত ও জ্ঞানময়েরই নির্ধারিত পরিমাপ এবং মাপকাঠি।” মহান আল্লাহ (আরবী) সূরার প্রথমভাগে যমীন, আসমান এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী বস্তুসমূহের সৃষ্টি সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি এই নিকটবর্তী আসমানকে নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং ওকে সুরক্ষিত করেছি, এটা মহাপরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানীর নিয়ন্ত্রণ।” (৪১৪১২)।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তিনি তোমাদের জন্যে নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করেছেন-যেন তোমরা ওগুলোর সাহায্যে অন্ধকারে পথের সন্ধান পেতে পার, স্থলভাগেও এবং সমুদ্রেও। আল্লাহ তাআলা বলেন যে, এই তারকাগুলো এক তো হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্য, দ্বিতীয়তঃ এগুলো দ্বারা শয়তানদেরকে প্রহার করা হয় এবং তৃতীয়তঃ এগুলোর মাধ্যমে স্থলভাগ ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথ চেনা যায়। পূর্ববর্তী গুরুজনদের কেউ কেউ বলেছেন যে, তারকারাজি সৃষ্টির মধ্যে শুধুমাত্র তিনটি উদ্দেশ্যই নিহিত রয়েছে। এছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। যদি কেউ মনে করেন যে, এই তিনটি উদ্দেশ্য ছাড়া আরো উদ্দেশ্য রয়েছে তবে তিনি ভুল বুঝেছেন এবং কুরআনের আয়াতের উপর বাড়াবাড়ি করেছেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি প্রমাণসমূহ খুব বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি, যাতে লোকেরা কিছু জ্ঞান লাভ করতে পারে এবং সত্য ও ন্যায়কে চিনে নিয়ে অসত্য ও অন্যায়কে পরিহার করে।

আল-আনআম 6:97

৯৫-৯৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি যমীনের বপনকৃত দানাকে উপরে এনে চৌচির করে দেন এবং তার থেকে বিভিন্ন প্রকারের সজি ও বর্ধনশীল উদ্ভিদ পয়দা করেন। ওগুলোর রং পৃথক, আকৃতি এবং ডাটা পৃথক। (আরবী)-এর তাফসীরে বলা হয়েছে যে, তিনি একটা প্রাণহীন জিনিসের মধ্য থেকে একটা প্রাণযুক্ত জিনিস অর্থাৎ উদ্ভিদ সৃষ্টি করে থাকেন এবং জীবন্ত জিনিস থেকে নির্জীব জিনিস পয়দা করেন। যেমন বীজ ও দানা যা হচ্ছে নির্জীব জিনিস, এটা তিনি জীবন্ত উদ্ভিদ থেকে পয়দা করে থাকেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের জন্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে নির্জীব যমীন, আমি ওকে সঞ্জীবিত করেছি এবং তা থেকে শস্য উৎপন্ন করেছি, ফলে তারা তা থেকে আহার করে থাকে।” (৩৬৪ ৩৩)।(আরবী) -এটা -এর উপর সংযুক্ত। তারপর এর তাফসীর করা হয়েছে। অতঃপর (আরবী)-কে এর উপর সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এই সবগুলোরই অর্থ প্রায় একই। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা প্রাণহীন ডিম হতে জীবন্ত মুরগী পয়দা করা বুঝানো হয়েছে। কিংবা এর বিপরীত। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে পাপাচারের ঔরষে সৎ সন্তানের জন্মলাভ এবং সৎ ব্যক্তির ঔরষে পাপাচার ছেলের জন্মলাভ। কেননা, সৎ ব্যক্তি জীবিতের সাথে তুলনীয় এবং পাপী লোক মৃতের সাথে তুলনীয়। এ ছাড়া আরও বহু অর্থ হতে পারে। আল্লাহ পাক বলেনঃ এ সবকিছু আল্লাহই করে থাকেন যিনি হচ্ছেন এক, যার কোন অংশীদার নেই। তাহলে তোমরা বিভ্রান্ত হয়ে কোন দিকে যাচ্ছ? সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ কেন? আল্লাহ ছাড়া তোমাদের অন্য কারও ইবাদত করার কারণ কি? আলো ও অন্ধকারের সৃষ্টিকর্তা তো তিনিই। যেমন তিনি অত্র সূরার শুরুতেই বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই অন্ধকার ও আললা বানিয়েছেন।” (৬:১) অর্থাৎ তিনি দিনের আলোকের মধ্য থেকে রাতের অন্ধকারকেও বের করেছেন, আবার তিনি রাতের মধ্য থেকে দিনের আলোকে বের করেছেন যা সারা প্রান্তকে উজ্জ্বলময় করে দিয়েছে। রাত্রি শেষে অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং উজ্জ্বল দিন প্রকাশিত হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “রাত্রি দিনকে ঢেকে ফেলে।” (৭:৫৪) এইভাবে মহান আল্লাহ পরস্পর বিপরীতমুখী জিনিসগুলো সৃষ্টি করে স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। এজন্যেই তিনি বলেন যে, তিনি রাতের মধ্য থেকে দিনকে ফেড়ে বের করে থাকেন। রাতকে তিনি বিশ্রামকাল করেছেন যেন সমুদয় জিনিস অতে শান্তি ও আরাম লাভ করতে পারে। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কসম দিনের আলোকের এবং রাত্রির, বন তা প্রশান্ত হয়।” (৯৩:১-২) তিনি আরও বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “শপথ রাত্রির যখন ওটা (সূর্যকে) আচ্ছন্ন করে ফেলে, আর দিবসের যখন ওটা আলোকিত হয়ে পড়ে।” (৯২:১-২) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘কসম দিবসের যখন ওটা ওকে ভালরূপে আলোকিত করে এবং কসম রাত্রির যখন ওটা ওকে সমাচ্ছন্ন করে।" (৯১:৩-৪)।হযরত সুহাইব রূমী (রাঃ)-এর স্ত্রী তাঁর অধিক রাত্রি জাগরণের অভিযোগ করে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সবারই জন্যে রাত্রিকে বিশ্রামকাল ও আরামের সময় বানিয়েছেন বটে, কিন্তু সুহাইব (রাঃ)-এর জন্যে নয়। কেননা, যখন তার জান্নাতের কথা স্মরণ হয় তখন তিনি ওর আগ্রহাতিশয্যে সারা রাত শয়নই করেন না। বরং সারা রাত্রি ধরে ইবাদতে মগ্ন থাকেন। আবার যখন তার জাহান্নামের কথা স্মরণ হয় তখন তার দ্রিাই উড়ে যায়।” (এই হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মহান আল্লাহ বলেনঃ “সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ রীতিনীতি ও নিয়ম শৃংখলার উপর চলতে রয়েছে। ওদের গতির নিয়মের মধ্যে অণু পরিমাণও পরিবর্তন ঘটে না, ওগুলো এদিক ওদিক চলে যায় না, বরং প্রত্যেকটির কক্ষপথ নির্ধারিত রয়েছে। গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে ওরা নিজ নিজ কক্ষপথে চলতে রয়েছে। এই শৃংখলিত নিয়মের ফলেই দিন রাত্রি কমতে ও বাড়তে রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তিনিই সেই আল্লাহ যিনি সূর্যকে দীপ্তিময় বানিয়েছেন এবং চন্দ্রকে কোমল আলো দান করেছেন এবং হ্রাস বৃদ্ধির মনযিল নির্ধারণ করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “সূর্যের সাধ্য নেই যে চন্দ্রকে ধরে নিবে, আর না রাত্রি দিবসের পূর্বে আসতে পারবে এবং প্রত্যেকেই এক একটি চক্রের মধ্যে সন্তরণ করতে রয়েছে। তিনি আরও বলেনঃ “সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি তাঁর আদেশ পালনে সদা নিয়োজিত রয়েছে। আল্লাহ পাক আরও বলেছেনঃ “এটা তারই নির্ধারিত পরিমাণ, যিনি মহা পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়। কেউ তার বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে না। কেউই তাঁর অগোচরে থাকতে সক্ষম নয়, সেটা যমীন আসমানের অণু পরিমাণই জিনিস হোক না কেন।আল্লাহ তা'আলা যেখানেই রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্রের সৃষ্টির কথা বর্ণনা করেছেন সেখানেই তিনি বাক্যকে (আরবী) শব্দ দ্বারাই শেষ করেছেন। যেমন এখানেও ঐ নিয়মের ব্যক্তিক্রম ঘটেনি। মহান আল্লাহ বলেনঃ “তাদের জানবার পক্ষে রাত্রিও একটা নিদর্শন যে, ওর মধ্য থেকে আমি দিনকে অপসারণ করি, তৎক্ষণাৎ তারা অন্ধকারের মধ্যে থেকে যায়। আর সূর্যও স্বীয় গতিপথে চলতে রয়েছে এবং স্বীয় নির্ধারিত কক্ষের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটা সেই মহা পরাক্রান্ত ও জ্ঞানময়েরই নির্ধারিত পরিমাপ এবং মাপকাঠি।” মহান আল্লাহ (আরবী) সূরার প্রথমভাগে যমীন, আসমান এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী বস্তুসমূহের সৃষ্টি সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি এই নিকটবর্তী আসমানকে নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং ওকে সুরক্ষিত করেছি, এটা মহাপরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানীর নিয়ন্ত্রণ।” (৪১৪১২)।আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তিনি তোমাদের জন্যে নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করেছেন-যেন তোমরা ওগুলোর সাহায্যে অন্ধকারে পথের সন্ধান পেতে পার, স্থলভাগেও এবং সমুদ্রেও। আল্লাহ তাআলা বলেন যে, এই তারকাগুলো এক তো হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্য, দ্বিতীয়তঃ এগুলো দ্বারা শয়তানদেরকে প্রহার করা হয় এবং তৃতীয়তঃ এগুলোর মাধ্যমে স্থলভাগ ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথ চেনা যায়। পূর্ববর্তী গুরুজনদের কেউ কেউ বলেছেন যে, তারকারাজি সৃষ্টির মধ্যে শুধুমাত্র তিনটি উদ্দেশ্যই নিহিত রয়েছে। এছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। যদি কেউ মনে করেন যে, এই তিনটি উদ্দেশ্য ছাড়া আরো উদ্দেশ্য রয়েছে তবে তিনি ভুল বুঝেছেন এবং কুরআনের আয়াতের উপর বাড়াবাড়ি করেছেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি প্রমাণসমূহ খুব বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি, যাতে লোকেরা কিছু জ্ঞান লাভ করতে পারে এবং সত্য ও ন্যায়কে চিনে নিয়ে অসত্য ও অন্যায়কে পরিহার করে।

আল-আনআম 6:98

৯৮-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ তিনিই তোমাদেরকে একটা আত্মা হযরত আদম (আঃ) থেকে সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা স্বীয় প্রতিপালক (এর বিরোধিতা)কে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে একই প্রাণী (আদম আঃ) হতে সৃষ্টি করেছেন এবং ঐ প্রাণী হতে তার জোড়া (বিবি হাওয়াকে) সৃষ্টি করেছেন, আর এতদুভয় হতে বহু নর ও নারী বিস্তার করেছেন।(আরবী) -এ দুটি শব্দের ব্যাপারে মুফাসসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষীগণ বলেন যে, (আরবী) শব্দ দ্বারা মায়ের গর্ভকে বুঝানো হয়েছে। আর (আরবী) শব্দ দ্বারা পিতার পিঠকে বুঝানো হয়েছে। আবার কারো মতে (আরবী) হচ্ছে দুনিয়ার অবস্থান এবং (আরবী) হচ্ছে মৃত্যুর পর পরকালের অবস্থান।হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, এ দু'টো হচ্ছে দুনিয়ার মাতৃগর্ভে ও ভূ-পৃষ্ঠে অবস্থান এবং মৃত্যুর পরের অবস্থান। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মৃত্যুর পর আমল বন্ধ হয়ে যাওয়া হচ্ছে (আরবী) এবং দারে আখিরাত হচ্ছে (আরবী)। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সঠিকতম।(আরবী) আমি নিদর্শনসমূহ ঐসব লোকের জন্যে সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করে দিয়েছি যারা বুঝে অর্থাৎ আল্লাহর কালাম ও ওর অর্থ সম্পর্কে যারা সম্যক জ্ঞান রাখে।মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনিই সেই আল্লাহ যিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, ওর সাহায্যে তিনি সব রকমের উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছেন। তারপর তা থেকে সবুজ শাখা বের করেছেন অর্থাৎ চারাগাছ পয়দা করেছেন। অতঃপর তাতে তিনি দানা ও ফল সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ পানি দ্বারাই সমস্ত জিনিস জীবন লাভ করে থাকে। এর ফলেই ভূমির শস্য ও সবুজ উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়ে থাকে। ঐসব গাছে আবার দানা ও ফল পয়দা হয়। ওগুলোর মধ্য থেকে আমি এমন দানা বের করে থাকি যা একে অপরের সাথে জড়িয়ে থাকে। একে গুচ্ছ লা হয়। খুরমা গাছে গুচ্ছযুক্ত শাখা হয়। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহু বচন। এর অর্থ হচ্ছে তাজা খেজুরের গুচ্ছ যা কাছাকাছি একে অপরের সাথে জড়িত থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ঐ ছোট ছোট খেজুর গাছ বুঝানো হয়েছে যেগুলোর গুচ্ছ মাটির সাথে লেগে থাকে। হেজাযবাসী তো একে (আরবী) পড়ে থাকে, কিন্তু বানু তামীম গোত্র একে (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) -এর সঙ্গে পড়ে। এটা (আরবী) -এর বহু বচন। যেমন (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর বহু বচন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘আঙ্গুরের বাগানসমূহ' অর্থাৎ আমি যমীনে আঙ্গুরের বাগান পয়দা করেছি। মহান আল্লাহ খুরমা ও আঙ্গুরের বর্ণনা দিয়েছেন। কেননা, হেজযবাসীদের কাছে এ দু'টো ফলই সর্বোত্তম ফল বলে গণ্য হয়। শুধু হেজাযবাসী নয়, বরং সারা দুনিয়ার লোক এ দু'টো ফলকে সর্বোত্তম ফল মনে করে থাকে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইহসানের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, এই সব খুরমা ও আঙ্গুর ফল দ্বারা তোমরা মদ তৈরী করে থাক এবং নিজেদের জন্যে উত্তম খাদ্য প্রস্তুত কর। এটা হচ্ছে মদ হারাম হওয়ার পূর্বেকার আয়াত। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যমীনে আমি খুরমা ও আঙ্গুরের বাগান বানিয়েছি। তিনি আরও বলেনঃ আমি যায়তুন ও আনারেরও বাগান করে দিয়েছি যা পাতা ও আকৃতির দিক দিয়ে একে অপরের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত বটে, কিন্তু ফল, গঠন, স্বাদ এবং স্বভাব ও প্রকৃতির দিক দিয়ে সম্পূর্ণ পৃথক! আল্লাহ পাক বলেনঃ যখন ফল পেকে যায় তখন ঐগুলোর প্রতি লক্ষ্য করে দেখো! অর্থাৎ হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে চিন্তা করে দেখো যে, তিনি কিভাবে ওগুলোকে অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বে আনয়ন করেছেন। ফল ধরার পূর্বে গাছগুলো তো জ্বালানী কাষ্ঠ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এই কাঠের মধ্য থেকেই মহান আল্লাহ এসব সুমিষ্ট খুরমা, আঙ্গুর এবং অন্যান্য ফল বের করেছেন! যেমন তিনি বলেনঃ যমীনে ঘন বৃক্ষ, আঙ্গুর এবং শস্যের বাগানসমূহ রয়েছে, ওগুলোর মধ্যে কিছু কিছু গুচ্ছ বিশিষ্ট এবং কিছু কিছু গুচ্ছবিহীন। সবগুলো একই পানি পেয়ে থাকে অথচ খেতে একটি অপরটি হতে বহুগুণে উত্তম। এ জন্যেই আল্লাহ পাক এখানে বলেনঃ “হে লোকেরা! এগুলো আল্লাহর ব্যাপক ক্ষমতা ও পূর্ণ নৈপুণ্যের পরিচয় বহন করছে। ঈমানদার লোকেরাই এগুলো বুঝতে পারে এবং তারাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করে থাকে!”

আল-আনআম 6:99

৯৮-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ তিনিই তোমাদেরকে একটা আত্মা হযরত আদম (আঃ) থেকে সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা স্বীয় প্রতিপালক (এর বিরোধিতা)কে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে একই প্রাণী (আদম আঃ) হতে সৃষ্টি করেছেন এবং ঐ প্রাণী হতে তার জোড়া (বিবি হাওয়াকে) সৃষ্টি করেছেন, আর এতদুভয় হতে বহু নর ও নারী বিস্তার করেছেন।(আরবী) -এ দুটি শব্দের ব্যাপারে মুফাসসিরদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষীগণ বলেন যে, (আরবী) শব্দ দ্বারা মায়ের গর্ভকে বুঝানো হয়েছে। আর (আরবী) শব্দ দ্বারা পিতার পিঠকে বুঝানো হয়েছে। আবার কারো মতে (আরবী) হচ্ছে দুনিয়ার অবস্থান এবং (আরবী) হচ্ছে মৃত্যুর পর পরকালের অবস্থান।হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, এ দু'টো হচ্ছে দুনিয়ার মাতৃগর্ভে ও ভূ-পৃষ্ঠে অবস্থান এবং মৃত্যুর পরের অবস্থান। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, মৃত্যুর পর আমল বন্ধ হয়ে যাওয়া হচ্ছে (আরবী) এবং দারে আখিরাত হচ্ছে (আরবী)। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সঠিকতম।(আরবী) আমি নিদর্শনসমূহ ঐসব লোকের জন্যে সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করে দিয়েছি যারা বুঝে অর্থাৎ আল্লাহর কালাম ও ওর অর্থ সম্পর্কে যারা সম্যক জ্ঞান রাখে।মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনিই সেই আল্লাহ যিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, ওর সাহায্যে তিনি সব রকমের উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছেন। তারপর তা থেকে সবুজ শাখা বের করেছেন অর্থাৎ চারাগাছ পয়দা করেছেন। অতঃপর তাতে তিনি দানা ও ফল সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ পানি দ্বারাই সমস্ত জিনিস জীবন লাভ করে থাকে। এর ফলেই ভূমির শস্য ও সবুজ উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়ে থাকে। ঐসব গাছে আবার দানা ও ফল পয়দা হয়। ওগুলোর মধ্য থেকে আমি এমন দানা বের করে থাকি যা একে অপরের সাথে জড়িয়ে থাকে। একে গুচ্ছ লা হয়। খুরমা গাছে গুচ্ছযুক্ত শাখা হয়। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহু বচন। এর অর্থ হচ্ছে তাজা খেজুরের গুচ্ছ যা কাছাকাছি একে অপরের সাথে জড়িত থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ঐ ছোট ছোট খেজুর গাছ বুঝানো হয়েছে যেগুলোর গুচ্ছ মাটির সাথে লেগে থাকে। হেজাযবাসী তো একে (আরবী) পড়ে থাকে, কিন্তু বানু তামীম গোত্র একে (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) -এর সঙ্গে পড়ে। এটা (আরবী) -এর বহু বচন। যেমন (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর বহু বচন।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘আঙ্গুরের বাগানসমূহ' অর্থাৎ আমি যমীনে আঙ্গুরের বাগান পয়দা করেছি। মহান আল্লাহ খুরমা ও আঙ্গুরের বর্ণনা দিয়েছেন। কেননা, হেজযবাসীদের কাছে এ দু'টো ফলই সর্বোত্তম ফল বলে গণ্য হয়। শুধু হেজাযবাসী নয়, বরং সারা দুনিয়ার লোক এ দু'টো ফলকে সর্বোত্তম ফল মনে করে থাকে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইহসানের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, এই সব খুরমা ও আঙ্গুর ফল দ্বারা তোমরা মদ তৈরী করে থাক এবং নিজেদের জন্যে উত্তম খাদ্য প্রস্তুত কর। এটা হচ্ছে মদ হারাম হওয়ার পূর্বেকার আয়াত। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যমীনে আমি খুরমা ও আঙ্গুরের বাগান বানিয়েছি। তিনি আরও বলেনঃ আমি যায়তুন ও আনারেরও বাগান করে দিয়েছি যা পাতা ও আকৃতির দিক দিয়ে একে অপরের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত বটে, কিন্তু ফল, গঠন, স্বাদ এবং স্বভাব ও প্রকৃতির দিক দিয়ে সম্পূর্ণ পৃথক! আল্লাহ পাক বলেনঃ যখন ফল পেকে যায় তখন ঐগুলোর প্রতি লক্ষ্য করে দেখো! অর্থাৎ হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে চিন্তা করে দেখো যে, তিনি কিভাবে ওগুলোকে অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বে আনয়ন করেছেন। ফল ধরার পূর্বে গাছগুলো তো জ্বালানী কাষ্ঠ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এই কাঠের মধ্য থেকেই মহান আল্লাহ এসব সুমিষ্ট খুরমা, আঙ্গুর এবং অন্যান্য ফল বের করেছেন! যেমন তিনি বলেনঃ যমীনে ঘন বৃক্ষ, আঙ্গুর এবং শস্যের বাগানসমূহ রয়েছে, ওগুলোর মধ্যে কিছু কিছু গুচ্ছ বিশিষ্ট এবং কিছু কিছু গুচ্ছবিহীন। সবগুলো একই পানি পেয়ে থাকে অথচ খেতে একটি অপরটি হতে বহুগুণে উত্তম। এ জন্যেই আল্লাহ পাক এখানে বলেনঃ “হে লোকেরা! এগুলো আল্লাহর ব্যাপক ক্ষমতা ও পূর্ণ নৈপুণ্যের পরিচয় বহন করছে। ঈমানদার লোকেরাই এগুলো বুঝতে পারে এবং তারাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করে থাকে!”

আল-আনআম 6:100

এখানে মুশরিকদের কথাকে অগ্রাহ্য করা হচ্ছে যারা আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক বানিয়ে নেয় এবং শয়তানের উপাসনায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। যদি প্রশ্ন করা হয় যে, তারা তো মূর্তিগুলোর পূজা করতো, তাহলে শয়তানের পূজা করার ভাবার্থ কি? উত্তরে বলা যাবে যে, তারা তো শয়তান কর্তৃক পথভ্রষ্ট হয়ে এবং তার অনুগত হয়েই মূর্তিপূজা করতো। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা আল্লাহকে পরিত্যাগ করে শুধুমাত্র কয়েকটি নারী জাতীয় বস্তুর পূজা করে (অর্থাৎ ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা মনে করে ঐ মেয়ে ফেরেশতাদের পূজা করতে শুরু করে। নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক), আর শুধু শয়তানের পূজা করে, যে (আল্লাহর) নির্দেশ লংঘনকারী। যাকে আল্লাহ স্বীয় (বিশেষ) করুণা হতে দূরে নিক্ষেপ করেছেন এবং যে (আল্লাহকে) বলেছিল- আমি অবশ্যই আপনার বান্দাগণ হতে স্বীয় নির্ধারিত অংশ নিয়ে নেবো, (আনুগত্যের দ্বারা) আমি ওদেরকে পথভ্রষ্ট করবো এবং তাদেরকে বৃথা আশ্বাস প্রদান করবো আর আমি তাদেরকে শিক্ষা দেবো যেন তারা (প্রতিমার নামে) চতুষ্পদ জন্তুর কান কর্তন করে এবং তাদেরকে (আরও) শিক্ষা দেবো যেন তারা আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতিকে বিকৃত করে দেয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ত্যাগ করে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সে নিশ্চয়ই প্রকাশ্য ক্ষতিতে নিপতিত হবে । শয়তান তাদের সাথে অঙ্গীকার করে ও বৃথা আশ্বাস দেয়; আর শয়তান এদের সাথে শুধু মিথ্যে (প্রবঞ্চনা মূলক) অঙ্গীকার করে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ “তোমরা কি আমাকে ছেড়ে শয়তান ও তার সন্তানদেরকে বন্ধু বানিয়ে নিয়েছো? অথচ তোমাদের উচিত ছিল আমারই অঞ্চল চেপে ধরা।” ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে বলেছিলেনঃ “হে পিতা! আপনি শয়তানের ইবাদত করবেন না, শয়তান তো হচ্ছে রহমানের (আল্লাহর) অবাধ্য।” যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম সন্তানগণ! (এবং হে জ্বীনগণ) আমি কি তোমাদেরকে সতর্ক করে দেইনি যে, তোমরা শয়তানের পূজা করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। আর এও যে, তোমরা শুধু আমারই ইবাদত করো; এটাই সরল পথ।” কিয়ামতের দিন ফেরেশতাগণ বলবেনঃ “আপনি পবিত্র। আপনি আমাদের অলী। এই মুশরিকরা যদিও আমাদেরকে আল্লাহর কন্যা' -এ কথা বলে পূজা করেছে, কিন্তু আমাদের তাদের সাথে কোনই সম্পর্ক নেই। এরা তো প্রকৃতপক্ষে শয়তানেরই পূজা করেছে!” যেমন আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ “এই মুশরিকরা শয়তানদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে নিয়েছে, অথচ তাদেরকেও এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তারা আল্লাহর সাথে তাঁরই মাখলুক বা সৃষ্টকে কি করে পূজা করছে!” যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ “তোমরা কি এমন জিনিসের পূজা করছো যাদেরকে তোমরা স্বয়ং নিজ হস্তে বানিয়েছ? অথচ তোমাদেরকেও এবং তোমাদের এইসব বানানো জিনিসকেও আল্লাহই সষ্টি করেছেন। এ জন্যে তোমাদের উচিত যে, তোমরা একমাত্র এক-অদ্বিতীয় আল্লাহরই ইবাদত করে তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা না জেনে না বুঝে আল্লাহর জন্যে পুত্র-কন্যা রচনা করে। এখানে আল্লাহ তাআলার গুণাবলীর মধ্যে বিভ্রান্তের বিভ্রান্তির উপর সাবধান বাণী উচ্চারণ করা হচ্ছে। যেমন ইয়াহূদীরা বলে যে, উযায়ের (আঃ) আল্লাহর পুত্র, অথচ তিনি একজন পয়গম্বর। আর খ্রীষ্টানরা বলে যে, ঈসা (আঃ) আল্লাহর পুত্র এবং আরবের মুশরিকরা ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলতো। এই অত্যাচারীরা যে উক্তি করছে, আল্লাহ তা থেকে বহু ঊর্ধ্বে। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে- তারা মন দ্বারা গড়িয়ে নিয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে- তারা অনুমান করে নিয়েছে। আওফী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে-তারা মীমাংসা করে নিয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে তারা মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়েছে। ভাবার্থ হলো এই যে, যাদেরকে তারা ইবাদতে শরীক করে নিচ্ছে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলাই সৃষ্টি করেছেন। তারা প্রকৃত ব্যাপার সম্পর্কে ওয়াকিফহাল না হয়েই এইসব কথা বলছে। তারা আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গী সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। যিনি আল্লাহ, তাঁর পুত্র, কন্যা, স্ত্রী কি করে হতে পারে! এ জন্যেই তিনি বলেনঃ তিনি মহিমান্বিত, তাদের আরোপিত বিশেষণগুলো হতে বহু ঊর্ধ্বে।

আল-আনআম 6:101

আল্লাহ তাআলাই হচ্ছেন আসমান ও যমীনের উদ্ভাবক ও সৃষ্টিকর্তা। এ দু’টো সৃষ্টি করার সময় কোন নমুনা তাঁর সামনে ছিল না। বিদ্আতকে বিদ্আত বলার কারণ এই যে, প্রাচীন যুগে এর কোন নবীর থাকে না। মানুষ কোন আমলকে নিজের পক্ষ থেকে আবিষ্কার করে নিয়ে ওকে পুণ্যের কাজ মনে করে থাকে। আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহর সন্তান হবে কিরূপে? তার তো জীবন সঙ্গিনী নেই। সন্তান তো দু'টি অনুরূপ জিনিসের মাধ্যমে জন্মলাভ করে থাকে। আর আল্লাহর অনুরূপ তো কেউই নেই। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলে যে, রহমান (আল্লাহ) সন্তান বানিয়ে নিয়েছেন, এটা তোমরা বড়ই মিথ্যা কথা বলছো!” (১৯:৮৮-৮৯)।তিনিই তো সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। অতএব, তাঁরই সৃষ্ট কিরূপে তাঁর স্ত্রী হতে পারে? তার কোন নযীর নেই। এতদসত্ত্বেও তার নীর হয়ে সন্তান কিরূপে আসতে পারে? আল্লাহর সত্তা এসব থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।

আল-আনআম 6:102

১০২-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনিই তোমাদের প্রভু যিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন। তিনিই প্রত্যেক জিনিসের সৃষ্টিকর্তা। সুতরাং তোমরা তাঁরই ইবাদত কর এবং তার একত্ববাদ স্বীকার করে নাও। তাঁর কোন সন্তান নেই, পিতা নেই, জীবন সঙ্গিনী নেই এবং সমতুল্যও কেউ নেই। প্রত্যেক বস্তুর উপর তিনি রক্ষক। প্রত্যেক জিনিসের তিনি তদবীরকারী। তিনিই জীবিকা দান করে থাকেন। রাত-দিন তিনিই বানিয়েছেন। কারও দৃষ্টি তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না। এই মাসআলায় পূর্ববর্তী গুরুজনদের কয়েকটি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তি এই যে, পরকালে চক্ষু দ্বারা তাকে দেখা যাবে বটে, কিন্তু দুনিয়াতে তাকে দেখা যাবে না। নবী (সঃ)-এর হাদীসের মাধ্যমে ক্রমাগতভাবে এটাই প্রমাণিত আছে। যেমন হযরত মাসরূক (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি এই ধারণা করে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) স্বীয় প্রতিপালককে দেখেছেন সে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করেছে। কেননা, আল্লাহ তাআলা ততা বলেছেনঃ “তাঁকে কারও দৃষ্টি পরিবেষ্টন করতে পারে না, আর তিনি সকল দৃষ্টি পরিবেষ্টনকারী।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর বিপরীত মত পোষণ করেছেন। তিনি আল্লাহ-দর্শনকে মুক’ বা অনির্দিষ্ট রেখেছেন এবং তাঁর থেকে এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অন্তদৃষ্টিতে আল্লাহ তা'আলাকে দু’বার দেখেছেন। এই মাসআলাটি সূরায়ে নাজমে ইনশাআল্লাহ বর্ণিত হবে । ইবনে উয়াইনা বলেন যে, দুনিয়াতে চক্ষুগুলো তাঁকে দেখতে পাবে না। অন্যান্যদের মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, চোখ ভরে কেউ তাঁকে দেখতে পাবে না। এর থেকে ঐ দর্শনের স্বাতন্ত্র রয়েছে যা আখিরাতে মুমিনরা লাভ করবে। মুতাযিলারা নিজেদের বিবেকের চাহিদার ভিত্তিতে এর ভাবার্থ এই বুঝেছে যে, চক্ষু দ্বারা আল্লাহকে ইহজগতেও দেখা যাবে না এবং পরজগতেও না। তাদের এই বিশ্বাস আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিপরীত। এটা মুতাযিলাদের অজ্ঞতারই পরিচায়ক। কেননা, আল্লাহ তা'আলাকে যে দেখা যাবে এটাতো তার উক্তি দ্বারাই প্রমাণিত হয়। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন বহু মুখমণ্ডল উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময় হবে। (এবং) স্বীয় প্রতিপালকের দিকে তাকাতে থাকবে।” (৭৫:২২-২৩) আবার কাফিরদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(তারা যেরূপ ধারণা করছে সেরূপ) কখনও নয়, এসব লোক সেই দিন তাদের প্রতিপালক (এর দর্শন লাভ) হতে প্রতিরুদ্ধ থাকবে।” (৮৩:১৫) অর্থাৎ তারা মহান আল্লাহকে দেখতে পাবে না । এর দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, মুমিনদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভের ব্যাপারে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না। মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারাও এটা প্রমাণিত হয় যে, দারুল আখিরাতে মুমিনরা জান্নাতে স্পষ্টভাবে আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাবে। মহান আল্লাহর অনুগ্রহের ফলেই তারা এই মর্যাদার অধিকারী হবে। তিনি আমাদেরকে স্বীয় ফল ও করমে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করুন! আমীন!আর ভাবার্থ সম্পর্কে এও বলা হয়েছে যে, জ্ঞান তাঁকে পরিবেষ্টন করতে পারবে না। এরূপ ধারণা খুবই বিস্ময়কর বটে। এটা প্রকাশ্য আয়াতের উল্টো। এর ভাবার্থ হলো এই যে, ইরাক’ -এর অর্থ হচ্ছে দর্শন। আল্লাহ তাআলাই। সবচেয়ে ভাল জানেন। তাছাড়া অন্যান্যদের এই ধারণা রয়েছে যে, দর্শন প্রমাণিত হওয়াকে মেনে নেয়া ‘ইদরাক’কে অস্বীকার করার বিপরীত নয়। কেননা ইরাক’ দর্শন হতে বিশিষ্টতর। আর বিশিষ্টের অস্বীকৃতিতে সাধারণের অস্বীকৃতি হয় না। যে ইদরাক’কে এখানে অস্বীকার করা হয়েছে সেটা কোন প্রকারের সে ব্যাপারে কয়েকটি উক্তি রয়েছে। যেমন হাকীকতকে জানা। আর হাকীকতের জ্ঞান তো আল্লাহ ছাড়া আর কারও থাকতে পারে না। যদিও মুমিনদের দর্শন লাভ হবে তথাপি হাকীকত অন্য জিনিস । চন্দ্রকে তো সবাই দেখে থাকে। কিন্তু ওর হাকীকত, মূলতত্ত্ব ও রহস্য সম্পর্কে কারও জ্ঞান থাকতে পারে না। সুতরাং আল্লাহর সমতুল্য তো কেউই নেই। ইবনে আলিয়্যাহ্ বলেন যে, আল্লাহকে দেখতে না পাওয়া দুনিয়ার মধ্যে নির্দিষ্ট। অর্থাৎ দুনিয়ায় আল্লাহ তা'আলাকে চক্ষু দ্বারা দেখা যাবে না। কেউ কেউ বলেন যে, ইরাক’ ‘রূইয়াত' হতে বিশিষ্টতর। কেননা, পরিবেষ্টন করাকে ইদরাক বলা হয়। আর পবিবেষ্টন না করা দর্শন না করাকে অপরিহার্য করে না। যেমন সমুদয় জ্ঞানকে পরিবেষ্টন করতে না পারা এটা অপরিহার্য করে না যে, সাধারণ জ্ঞানও লাভ করা যাবে না। মানুষ যে ইলমকে স্বীয় আবেষ্টনীর মধ্যে আনতে পারবে না তা নিম্নের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা ইলমকে পরিবেষ্টন করতে পারে না।” (২০৪ ১১০)।সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসাকে পরিবেষ্টন করতে পারি না।” এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি। আল্লাহর সাধারণ প্রশংসাও করতে পারবেন না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, কারও দৃষ্টি আল্লাহকে পরিবেষ্টন করতে পারে না। ইকরামা (রঃ)-কে বলা হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “চোখগুলো তাকে পরিবেষ্টন করে না।” তখন তিনি বলেনঃ “তোমরা কি আকাশ দেখতে পাও না?” উত্তরে বলা হয়ঃ “হ্যা, পাই তো।” পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “এক দৃষ্টিতেই কি সম্পূর্ণ আকাশটা দেখতে পাও?” মোটকথা, আল্লাহ পাকের উপর যে দৃষ্টিগুলো পড়বে তা থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মুমিনদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময় হবে এবং তারা তাদের প্রতিপালককে দেখতে থাকবে। কিন্তু তার শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গীর কারণে তাঁকে পরিবেষ্টন করতে সক্ষম হবে না। এই আয়াতের তাফসীরে যে হাদীসটি এসেছে যে, “যদি সমস্ত দানব, মানব, শয়তান এবং ফেরেশতার একটি সারি বানানো হয় তথাপিও তাঁকে পরিবেষ্টন করা যাবে না।” সেই হাদীসটি খুবই গরীব বা দুর্বল এবং ছয়খানা বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থের কোনটার মধ্যেই বর্ণিত হয়নি।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নবী (সঃ) আল্লাহ তাআলাকে দেখেছিলেন। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়। (আরবী) (দৃষ্টিসমূহ তাঁকে পরিবেষ্টন করতে পারে না) একথা কি আল্লাহ তা'আলা বলেননি? তিনি উত্তরে বলেনঃ ওটা তো হল আল্লাহর নূর বা জ্যোতি । কিন্তু এই আয়াতের ভাবার্থ এই যে, যদি আল্লাহ পাক স্বীয় সমস্ত নূরসহ প্রকাশিত হন তবে চক্ষুসমূহ তাঁকে দেখতে সক্ষম হবে না। আবার কেউ কেউ এই ভাবার্থ বর্ণনা করেন যে, কোন জিনিস তাঁর সামনে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা নিদ্রা যান না এবং নিদ্রা যাওয়া তার পক্ষে শোভনীয় নয়। তিনি দাঁড়িপাল্লা দাড় করে রেখেছেন। দিনের আমলগুলো রাত্রির পূর্বে এবং রাত্রির আমলগুলো দিনের পূর্বে তার সামনে পেশ করা হয়। তার পর্দা আলো বা আগুন। যদি তিনি উঠে পড়েন তবে তার জ্যোতি সারা দুনিয়াকে জ্বালিয়ে দেবে।পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হে মূসা (আঃ)! কোন প্রাণী আমার ঔজ্জ্বল্য পেয়ে জীবিত থাকতে পারে না এবং কোন শুষ্ক জিনিস ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই থাকতে পারে না ।” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন আল্লাহ পাহাড়ের উপর স্বীয় জ্যোতি বিচ্ছুরিত করলেন তখন পাহাড় বিদীর্ণ হয়ে গেল এবং মূসা (আঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল । যখন তার জ্ঞান ফিরলো তখন বললো- আমি আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি, আর আপনার দিকে প্রত্যাবর্তন করছি এবং আমিই হলাম বিশ্বাস স্থাপনকারীদের প্রথম ব্যক্তি।” ইদরাকে খাস বা বিশেষ পরিবেষ্টন কিয়ামতের দিনের রূইয়াত বা দর্শনকে অস্বীকার করে না। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদের উপর নিজের জ্যোতি প্রকাশ করবেন। তাঁর জ্যোতি এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গী তার অভিপ্রায় অনুযায়ী হবে। দৃষ্টিসমূহ তা পুরোপুরিভাবে পরিবেষ্টন করতে পারবে না। এ কারণেই হযরত আয়েশা (রাঃ) আখিরাতের দর্শনের প্রতি স্বীকৃতি দান করেন এবং দুনিয়ার দর্শনকে অস্বীকার করেন। তিনিও এই আয়াতকেই দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সুতরাং ‘ইদরাক’ যা অস্বীকার করছে তা হচ্ছে ঐ শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গীর দর্শন। এটা কোন মানব বা ফেরেশতার পক্ষে সম্ভবপর নয়। ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ তিনি সকল দৃষ্টি পরিবেষ্টনকারী। কেননা তিনিই মানুষের চক্ষু সৃষ্টি করেছেন। কাজেই তিনি তা পরিবেষ্টন করতে পারবেন না কেন? তিনি বলেনঃ তিনি কি স্বীয় সৃষ্ট বস্তুকে জানবেন না? তিনি তো অতীব সূক্ষ্মদর্শী ও সব বিষয় ওয়াকিফহাল। কখনও কখনও (আরবী) শব্দ দ্বারা (আরবী) বুঝানো হয়ে থাকে। অর্থাৎ দর্শকরা তাঁকে দেখতে পারে না। তিনি হচ্ছেন অর্থাৎ কোন কিছু বের করার ব্যাপারে খুবই সূক্ষ্মদর্শী এবং তিনি হচ্ছেন (আরবী) অর্থাৎ প্রত্যেক বস্তুর ঠিকানা সম্বন্ধে তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। যেমন মহান আল্লাহ হযরত লোকমানের উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(লোকমান আঃ স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন) হে বৎস! যদি কোন কার্য (অতি গুপ্তও হয়, যেমন) সরিষা বীজের পরিমাণ হয়, অতঃপর তা পাথরের অভ্যন্তরে থাকে অথবা আসমান সমূহের ভিতরে কিংবা যমীনের অভ্যন্তরে থাকে, তথাপি আল্লাহ তা এনে উপস্থিত করবেন; নিঃসন্দেহে আল্লাহ বড়ই সূক্ষ্মদর্শী সর্ব বিষয়ে খবরদার।” (৩১:১৬)

আল-আনআম 6:103

১০২-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তিনিই তোমাদের প্রভু যিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন। তিনিই প্রত্যেক জিনিসের সৃষ্টিকর্তা। সুতরাং তোমরা তাঁরই ইবাদত কর এবং তার একত্ববাদ স্বীকার করে নাও। তাঁর কোন সন্তান নেই, পিতা নেই, জীবন সঙ্গিনী নেই এবং সমতুল্যও কেউ নেই। প্রত্যেক বস্তুর উপর তিনি রক্ষক। প্রত্যেক জিনিসের তিনি তদবীরকারী। তিনিই জীবিকা দান করে থাকেন। রাত-দিন তিনিই বানিয়েছেন। কারও দৃষ্টি তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না। এই মাসআলায় পূর্ববর্তী গুরুজনদের কয়েকটি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তি এই যে, পরকালে চক্ষু দ্বারা তাকে দেখা যাবে বটে, কিন্তু দুনিয়াতে তাকে দেখা যাবে না। নবী (সঃ)-এর হাদীসের মাধ্যমে ক্রমাগতভাবে এটাই প্রমাণিত আছে। যেমন হযরত মাসরূক (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি এই ধারণা করে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) স্বীয় প্রতিপালককে দেখেছেন সে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করেছে। কেননা, আল্লাহ তাআলা ততা বলেছেনঃ “তাঁকে কারও দৃষ্টি পরিবেষ্টন করতে পারে না, আর তিনি সকল দৃষ্টি পরিবেষ্টনকারী।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর বিপরীত মত পোষণ করেছেন। তিনি আল্লাহ-দর্শনকে মুক’ বা অনির্দিষ্ট রেখেছেন এবং তাঁর থেকে এটাও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) অন্তদৃষ্টিতে আল্লাহ তা'আলাকে দু’বার দেখেছেন। এই মাসআলাটি সূরায়ে নাজমে ইনশাআল্লাহ বর্ণিত হবে । ইবনে উয়াইনা বলেন যে, দুনিয়াতে চক্ষুগুলো তাঁকে দেখতে পাবে না। অন্যান্যদের মতে এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, চোখ ভরে কেউ তাঁকে দেখতে পাবে না। এর থেকে ঐ দর্শনের স্বাতন্ত্র রয়েছে যা আখিরাতে মুমিনরা লাভ করবে। মুতাযিলারা নিজেদের বিবেকের চাহিদার ভিত্তিতে এর ভাবার্থ এই বুঝেছে যে, চক্ষু দ্বারা আল্লাহকে ইহজগতেও দেখা যাবে না এবং পরজগতেও না। তাদের এই বিশ্বাস আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিপরীত। এটা মুতাযিলাদের অজ্ঞতারই পরিচায়ক। কেননা, আল্লাহ তা'আলাকে যে দেখা যাবে এটাতো তার উক্তি দ্বারাই প্রমাণিত হয়। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন বহু মুখমণ্ডল উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময় হবে। (এবং) স্বীয় প্রতিপালকের দিকে তাকাতে থাকবে।” (৭৫:২২-২৩) আবার কাফিরদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(তারা যেরূপ ধারণা করছে সেরূপ) কখনও নয়, এসব লোক সেই দিন তাদের প্রতিপালক (এর দর্শন লাভ) হতে প্রতিরুদ্ধ থাকবে।” (৮৩:১৫) অর্থাৎ তারা মহান আল্লাহকে দেখতে পাবে না । এর দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, মুমিনদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভের ব্যাপারে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না। মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারাও এটা প্রমাণিত হয় যে, দারুল আখিরাতে মুমিনরা জান্নাতে স্পষ্টভাবে আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাবে। মহান আল্লাহর অনুগ্রহের ফলেই তারা এই মর্যাদার অধিকারী হবে। তিনি আমাদেরকে স্বীয় ফল ও করমে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করুন! আমীন!আর ভাবার্থ সম্পর্কে এও বলা হয়েছে যে, জ্ঞান তাঁকে পরিবেষ্টন করতে পারবে না। এরূপ ধারণা খুবই বিস্ময়কর বটে। এটা প্রকাশ্য আয়াতের উল্টো। এর ভাবার্থ হলো এই যে, ইরাক’ -এর অর্থ হচ্ছে দর্শন। আল্লাহ তাআলাই। সবচেয়ে ভাল জানেন। তাছাড়া অন্যান্যদের এই ধারণা রয়েছে যে, দর্শন প্রমাণিত হওয়াকে মেনে নেয়া ‘ইদরাক’কে অস্বীকার করার বিপরীত নয়। কেননা ইরাক’ দর্শন হতে বিশিষ্টতর। আর বিশিষ্টের অস্বীকৃতিতে সাধারণের অস্বীকৃতি হয় না। যে ইদরাক’কে এখানে অস্বীকার করা হয়েছে সেটা কোন প্রকারের সে ব্যাপারে কয়েকটি উক্তি রয়েছে। যেমন হাকীকতকে জানা। আর হাকীকতের জ্ঞান তো আল্লাহ ছাড়া আর কারও থাকতে পারে না। যদিও মুমিনদের দর্শন লাভ হবে তথাপি হাকীকত অন্য জিনিস । চন্দ্রকে তো সবাই দেখে থাকে। কিন্তু ওর হাকীকত, মূলতত্ত্ব ও রহস্য সম্পর্কে কারও জ্ঞান থাকতে পারে না। সুতরাং আল্লাহর সমতুল্য তো কেউই নেই। ইবনে আলিয়্যাহ্ বলেন যে, আল্লাহকে দেখতে না পাওয়া দুনিয়ার মধ্যে নির্দিষ্ট। অর্থাৎ দুনিয়ায় আল্লাহ তা'আলাকে চক্ষু দ্বারা দেখা যাবে না। কেউ কেউ বলেন যে, ইরাক’ ‘রূইয়াত' হতে বিশিষ্টতর। কেননা, পরিবেষ্টন করাকে ইদরাক বলা হয়। আর পবিবেষ্টন না করা দর্শন না করাকে অপরিহার্য করে না। যেমন সমুদয় জ্ঞানকে পরিবেষ্টন করতে না পারা এটা অপরিহার্য করে না যে, সাধারণ জ্ঞানও লাভ করা যাবে না। মানুষ যে ইলমকে স্বীয় আবেষ্টনীর মধ্যে আনতে পারবে না তা নিম্নের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা ইলমকে পরিবেষ্টন করতে পারে না।” (২০৪ ১১০)।সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসাকে পরিবেষ্টন করতে পারি না।” এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি। আল্লাহর সাধারণ প্রশংসাও করতে পারবেন না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, কারও দৃষ্টি আল্লাহকে পরিবেষ্টন করতে পারে না। ইকরামা (রঃ)-কে বলা হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “চোখগুলো তাকে পরিবেষ্টন করে না।” তখন তিনি বলেনঃ “তোমরা কি আকাশ দেখতে পাও না?” উত্তরে বলা হয়ঃ “হ্যা, পাই তো।” পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “এক দৃষ্টিতেই কি সম্পূর্ণ আকাশটা দেখতে পাও?” মোটকথা, আল্লাহ পাকের উপর যে দৃষ্টিগুলো পড়বে তা থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মুমিনদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময় হবে এবং তারা তাদের প্রতিপালককে দেখতে থাকবে। কিন্তু তার শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গীর কারণে তাঁকে পরিবেষ্টন করতে সক্ষম হবে না। এই আয়াতের তাফসীরে যে হাদীসটি এসেছে যে, “যদি সমস্ত দানব, মানব, শয়তান এবং ফেরেশতার একটি সারি বানানো হয় তথাপিও তাঁকে পরিবেষ্টন করা যাবে না।” সেই হাদীসটি খুবই গরীব বা দুর্বল এবং ছয়খানা বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থের কোনটার মধ্যেই বর্ণিত হয়নি।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নবী (সঃ) আল্লাহ তাআলাকে দেখেছিলেন। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়। (আরবী) (দৃষ্টিসমূহ তাঁকে পরিবেষ্টন করতে পারে না) একথা কি আল্লাহ তা'আলা বলেননি? তিনি উত্তরে বলেনঃ ওটা তো হল আল্লাহর নূর বা জ্যোতি । কিন্তু এই আয়াতের ভাবার্থ এই যে, যদি আল্লাহ পাক স্বীয় সমস্ত নূরসহ প্রকাশিত হন তবে চক্ষুসমূহ তাঁকে দেখতে সক্ষম হবে না। আবার কেউ কেউ এই ভাবার্থ বর্ণনা করেন যে, কোন জিনিস তাঁর সামনে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা নিদ্রা যান না এবং নিদ্রা যাওয়া তার পক্ষে শোভনীয় নয়। তিনি দাঁড়িপাল্লা দাড় করে রেখেছেন। দিনের আমলগুলো রাত্রির পূর্বে এবং রাত্রির আমলগুলো দিনের পূর্বে তার সামনে পেশ করা হয়। তার পর্দা আলো বা আগুন। যদি তিনি উঠে পড়েন তবে তার জ্যোতি সারা দুনিয়াকে জ্বালিয়ে দেবে।পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হে মূসা (আঃ)! কোন প্রাণী আমার ঔজ্জ্বল্য পেয়ে জীবিত থাকতে পারে না এবং কোন শুষ্ক জিনিস ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই থাকতে পারে না ।” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন আল্লাহ পাহাড়ের উপর স্বীয় জ্যোতি বিচ্ছুরিত করলেন তখন পাহাড় বিদীর্ণ হয়ে গেল এবং মূসা (আঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল । যখন তার জ্ঞান ফিরলো তখন বললো- আমি আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি, আর আপনার দিকে প্রত্যাবর্তন করছি এবং আমিই হলাম বিশ্বাস স্থাপনকারীদের প্রথম ব্যক্তি।” ইদরাকে খাস বা বিশেষ পরিবেষ্টন কিয়ামতের দিনের রূইয়াত বা দর্শনকে অস্বীকার করে না। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদের উপর নিজের জ্যোতি প্রকাশ করবেন। তাঁর জ্যোতি এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গী তার অভিপ্রায় অনুযায়ী হবে। দৃষ্টিসমূহ তা পুরোপুরিভাবে পরিবেষ্টন করতে পারবে না। এ কারণেই হযরত আয়েশা (রাঃ) আখিরাতের দর্শনের প্রতি স্বীকৃতি দান করেন এবং দুনিয়ার দর্শনকে অস্বীকার করেন। তিনিও এই আয়াতকেই দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সুতরাং ‘ইদরাক’ যা অস্বীকার করছে তা হচ্ছে ঐ শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গীর দর্শন। এটা কোন মানব বা ফেরেশতার পক্ষে সম্ভবপর নয়। ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ তিনি সকল দৃষ্টি পরিবেষ্টনকারী। কেননা তিনিই মানুষের চক্ষু সৃষ্টি করেছেন। কাজেই তিনি তা পরিবেষ্টন করতে পারবেন না কেন? তিনি বলেনঃ তিনি কি স্বীয় সৃষ্ট বস্তুকে জানবেন না? তিনি তো অতীব সূক্ষ্মদর্শী ও সব বিষয় ওয়াকিফহাল। কখনও কখনও (আরবী) শব্দ দ্বারা (আরবী) বুঝানো হয়ে থাকে। অর্থাৎ দর্শকরা তাঁকে দেখতে পারে না। তিনি হচ্ছেন অর্থাৎ কোন কিছু বের করার ব্যাপারে খুবই সূক্ষ্মদর্শী এবং তিনি হচ্ছেন (আরবী) অর্থাৎ প্রত্যেক বস্তুর ঠিকানা সম্বন্ধে তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। যেমন মহান আল্লাহ হযরত লোকমানের উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(লোকমান আঃ স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন) হে বৎস! যদি কোন কার্য (অতি গুপ্তও হয়, যেমন) সরিষা বীজের পরিমাণ হয়, অতঃপর তা পাথরের অভ্যন্তরে থাকে অথবা আসমান সমূহের ভিতরে কিংবা যমীনের অভ্যন্তরে থাকে, তথাপি আল্লাহ তা এনে উপস্থিত করবেন; নিঃসন্দেহে আল্লাহ বড়ই সূক্ষ্মদর্শী সর্ব বিষয়ে খবরদার।” (৩১:১৬)

আল-আনআম 6:104

১০৪-১০৫ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে দলীল প্রমাণাদি এবং নিদর্শনাবলী যা কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছে এবং যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) পেশ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি এগুলো অনুযায়ী কাজ করলো সে নিজেরই উপকার সাধন করলো। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যে ব্যক্তি হিদায়াত গ্রহণ করবে সে তার নিজের উপকারের জন্যে করবে, আর যে পথভ্রষ্ট হবে তার পথভ্রষ্টতার শাস্তি তার নিজের উপরই বর্তিত হবে।” এজন্যেই এখানে মহান আল্লাহ বলেন, যে অন্ধ থাকবে সে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ “তাদের চক্ষু অন্ধ হয় না, বরং তাদের অন্তরগুলো অন্ধ হয়ে থাকে।” আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে রাসূল (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও-আমি তো তোমাদের প্রহরী নই। আমি শুধুমাত্র একজন প্রচারক। হিদায়াতের মালিক তো আল্লাহ। তিনি যাকে চান হিদায়াত করেন এবং যাকে ইচ্ছা করেন পথভ্রষ্ট করেন। ইরশাদ হচ্ছে- এরূপেই আমি নিদর্শনসমূহ বিভিন্ন ধারায় বর্ণনা করে থাকি। যেমন তিনি এই সূরায় একত্ববাদের বর্ণনা করেছেন এবং এর উপর ভিত্তি করেও যে, মুশরিক ও কাফিররা বলে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনি এইসব কথা পূর্ববর্তী কিতাবগুলো হতে নকল করেছেন এবং ওগুলো শিখে নিয়েই আমাদেরকে শুনাচ্ছেন। (এটা ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং অন্যান্যদের উক্তি)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ (আরবী) অর্থাৎ ‘আপনি পাঠ করেছেন। তাদের এ কথাগুলো তর্ক বিতর্ক ও ঝগড়ার স্থলে ছিল। যেমন আল্লাহ তা'আলা ঐ কাফিরদের মিথ্যা অপবাদ ও বিরোধিতার সংবাদ দিয়ে বলেনঃ “কাফিররা বলে-এটা তো বানানো মিথ্যা কথা এবং অন্যান্যরাও এই কুরআন তৈরী করতে সাহায্য করেছে। এটাই বড়ই অত্যাচার ও মিথ্যা প্রতিপন্ন। করার কথা। তারা বলে- এটা তো পূর্ববর্তী লোকদের কথিত ও লিখিত কথা যা তিনিও (নবী সঃ) লিখে নিয়েছেন।” কাফিরদের মিথ্যা ধারণা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “সে চিন্তা করলো, তৎপর একটা মন্তব্য স্থির করলো? সুতরাং সে ধ্বংস হাক, কেমন মন্তব্য সে স্থির করল? অতঃপর সে দৃষ্টিপাত করলো। তৎপর মুখ বিকৃত করলো, আরও অধিক বিকৃত করলো। তৎপর সে মুখ ফিরিয়ে নিলো এবং গর্ব করলো। অনন্তর বললো- এটা তো নকল করা যাদু। এটা তো মানুষের উক্তি।”আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি একে জ্ঞানবান লোকদের জন্যে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে থাকি যারা সত্যকে জেনে নেয়ার পর ওর অনুসরণ করে থাকে এবং মিথ্যা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকে। কাফিরদের পথভ্রষ্টতা এবং মুমিনদের সত্যকে স্বীকার করে নেয়ার মধ্যে আল্লাহ তাআলার কৌশল ও যৌক্তিকতা রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তিনি এর দ্বারা অনেককে বিপথগামী করে থাকেন এবং অনেককে সুপথগামী করে থাকেন।” অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “যাদের অন্তরে রোগ আছে এবং যাদের অন্তর পাথরের মত) শক্ত, শয়তান তাদের অন্তরে ফিন্যা নিক্ষেপ করে থাকে এবং এই জিনিসগুলো তাদের জন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা বনে যায়, আর আল্লাহ মুমিনদেরকে সরল সোজা পথ প্রদর্শন করে থাকেন।" আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ “আমি জাহান্নামে ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করে রেখেছি এবং তাদের নির্ধারিত সংখ্যা (১৯) কাফিরদের জন্যে একটা ফিত্রার কারণ, কিন্তু এর মাধ্যমেই আহলে কিতাব ও মুমিনদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পেয়ে থাকে, আহলে কিতাব ও মুমিনরা এতে সন্দেহ পোষণ করে না (কেননা, আহলে কিতাব নিজেদের কিতাবেও এই নির্ধারিত সংখ্যার উল্লেখ পেয়ে থাকে, কিন্তু কাফির ও রোগাক্রান্ত অন্তর বিশিষ্ট লোকেরা বলে থাকে এসব কথা বলার আল্লাহর কি প্রয়োজন ছিল? এভাবেই বহু লোক পথভ্রষ্ট হয়ে যায় এবং বহু লোক সুপথ প্রাপ্ত হয়, আল্লাহ ছাড়া তার সেনাবাহিনী সম্পর্কে কার জ্ঞান রয়েছে?" আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি এমন বস্তু অর্থাৎ কুরআন নাযিল করেছি যে, ওটা ঈমানদারদের জন্যে শেফা ও রহমত এবং ওর দ্বারা যালিমদের শুধু অনিষ্টই বর্ধিত হয়।” তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “ (হে মুহাম্মাদ সঃ!) তুমি বলে দাও-এই কুরআন মুমিনদের জন্যে হিদায়াত ও শেফা আর কাফিরদের কানে কর্ক বা ছিপি লাগা আছে এবং তারা অন্ধ।” কুরআন মুমিনদের জন্যে যে হিদায়াত স্বরূপ এবং হিদায়াত ও পথভ্রষ্টতা যে তারই ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল এ সম্পর্কে বহু আয়াত রয়েছে। এ জন্যেই এখানে তিনি বলেনঃ “এরূপেই আমি নিদর্শনসমূহ বিভিন্ন ধারায় প্রকাশ করে থাকি, কিন্তু কাফিররা একথাই বলছে যে, তুমি কারও নিকট থেকে লিখিয়ে নিয়েছে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী) শব্দের অর্থ (আরবী) এবং (আরবী) বর্ণনা করেছেন। (মুজাহিদ (রহঃ), সুদ্দী (রহঃ) এবং যহহকি (রহঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে) হাসান (রঃ) এটার অর্থ (আরবী) বলেছেন। ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেনঃ “ছেলেরা এখানে (আরবী) পড়ে থাকে, অথচ (আরবী) রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে দারাসতা রয়েছে এবং এর অর্থ (আরবী)-ই বটে। এর ভাবার্থ হচ্ছে- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যেসব কথা আপনি আমাদেরকে শুনাচ্ছেন সেগুলো আমরা পূর্ববর্তীদের মাধ্যমে অবগত রয়েছি।” হযরত ইবনে মাসউদের কিরআতে (আরবী) রয়েছে। অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সঃ) ওটা শিখে রেখেছেন। এই মতভেদ বিস্ময়করই বটে। হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ‘ওয়া লিয়াকুলু দারাস্তা’এইরূপ শুনিয়েছেন।

আল-আনআম 6:105

১০৪-১০৫ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে দলীল প্রমাণাদি এবং নিদর্শনাবলী যা কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছে এবং যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) পেশ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি এগুলো অনুযায়ী কাজ করলো সে নিজেরই উপকার সাধন করলো। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যে ব্যক্তি হিদায়াত গ্রহণ করবে সে তার নিজের উপকারের জন্যে করবে, আর যে পথভ্রষ্ট হবে তার পথভ্রষ্টতার শাস্তি তার নিজের উপরই বর্তিত হবে।” এজন্যেই এখানে মহান আল্লাহ বলেন, যে অন্ধ থাকবে সে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ “তাদের চক্ষু অন্ধ হয় না, বরং তাদের অন্তরগুলো অন্ধ হয়ে থাকে।” আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে রাসূল (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও-আমি তো তোমাদের প্রহরী নই। আমি শুধুমাত্র একজন প্রচারক। হিদায়াতের মালিক তো আল্লাহ। তিনি যাকে চান হিদায়াত করেন এবং যাকে ইচ্ছা করেন পথভ্রষ্ট করেন। ইরশাদ হচ্ছে- এরূপেই আমি নিদর্শনসমূহ বিভিন্ন ধারায় বর্ণনা করে থাকি। যেমন তিনি এই সূরায় একত্ববাদের বর্ণনা করেছেন এবং এর উপর ভিত্তি করেও যে, মুশরিক ও কাফিররা বলে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনি এইসব কথা পূর্ববর্তী কিতাবগুলো হতে নকল করেছেন এবং ওগুলো শিখে নিয়েই আমাদেরকে শুনাচ্ছেন। (এটা ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং অন্যান্যদের উক্তি)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ (আরবী) অর্থাৎ ‘আপনি পাঠ করেছেন। তাদের এ কথাগুলো তর্ক বিতর্ক ও ঝগড়ার স্থলে ছিল। যেমন আল্লাহ তা'আলা ঐ কাফিরদের মিথ্যা অপবাদ ও বিরোধিতার সংবাদ দিয়ে বলেনঃ “কাফিররা বলে-এটা তো বানানো মিথ্যা কথা এবং অন্যান্যরাও এই কুরআন তৈরী করতে সাহায্য করেছে। এটাই বড়ই অত্যাচার ও মিথ্যা প্রতিপন্ন। করার কথা। তারা বলে- এটা তো পূর্ববর্তী লোকদের কথিত ও লিখিত কথা যা তিনিও (নবী সঃ) লিখে নিয়েছেন।” কাফিরদের মিথ্যা ধারণা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “সে চিন্তা করলো, তৎপর একটা মন্তব্য স্থির করলো? সুতরাং সে ধ্বংস হাক, কেমন মন্তব্য সে স্থির করল? অতঃপর সে দৃষ্টিপাত করলো। তৎপর মুখ বিকৃত করলো, আরও অধিক বিকৃত করলো। তৎপর সে মুখ ফিরিয়ে নিলো এবং গর্ব করলো। অনন্তর বললো- এটা তো নকল করা যাদু। এটা তো মানুষের উক্তি।”আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি একে জ্ঞানবান লোকদের জন্যে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে থাকি যারা সত্যকে জেনে নেয়ার পর ওর অনুসরণ করে থাকে এবং মিথ্যা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকে। কাফিরদের পথভ্রষ্টতা এবং মুমিনদের সত্যকে স্বীকার করে নেয়ার মধ্যে আল্লাহ তাআলার কৌশল ও যৌক্তিকতা রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তিনি এর দ্বারা অনেককে বিপথগামী করে থাকেন এবং অনেককে সুপথগামী করে থাকেন।” অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “যাদের অন্তরে রোগ আছে এবং যাদের অন্তর পাথরের মত) শক্ত, শয়তান তাদের অন্তরে ফিন্যা নিক্ষেপ করে থাকে এবং এই জিনিসগুলো তাদের জন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা বনে যায়, আর আল্লাহ মুমিনদেরকে সরল সোজা পথ প্রদর্শন করে থাকেন।" আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ “আমি জাহান্নামে ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করে রেখেছি এবং তাদের নির্ধারিত সংখ্যা (১৯) কাফিরদের জন্যে একটা ফিত্রার কারণ, কিন্তু এর মাধ্যমেই আহলে কিতাব ও মুমিনদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পেয়ে থাকে, আহলে কিতাব ও মুমিনরা এতে সন্দেহ পোষণ করে না (কেননা, আহলে কিতাব নিজেদের কিতাবেও এই নির্ধারিত সংখ্যার উল্লেখ পেয়ে থাকে, কিন্তু কাফির ও রোগাক্রান্ত অন্তর বিশিষ্ট লোকেরা বলে থাকে এসব কথা বলার আল্লাহর কি প্রয়োজন ছিল? এভাবেই বহু লোক পথভ্রষ্ট হয়ে যায় এবং বহু লোক সুপথ প্রাপ্ত হয়, আল্লাহ ছাড়া তার সেনাবাহিনী সম্পর্কে কার জ্ঞান রয়েছে?" আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি এমন বস্তু অর্থাৎ কুরআন নাযিল করেছি যে, ওটা ঈমানদারদের জন্যে শেফা ও রহমত এবং ওর দ্বারা যালিমদের শুধু অনিষ্টই বর্ধিত হয়।” তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “ (হে মুহাম্মাদ সঃ!) তুমি বলে দাও-এই কুরআন মুমিনদের জন্যে হিদায়াত ও শেফা আর কাফিরদের কানে কর্ক বা ছিপি লাগা আছে এবং তারা অন্ধ।” কুরআন মুমিনদের জন্যে যে হিদায়াত স্বরূপ এবং হিদায়াত ও পথভ্রষ্টতা যে তারই ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল এ সম্পর্কে বহু আয়াত রয়েছে। এ জন্যেই এখানে তিনি বলেনঃ “এরূপেই আমি নিদর্শনসমূহ বিভিন্ন ধারায় প্রকাশ করে থাকি, কিন্তু কাফিররা একথাই বলছে যে, তুমি কারও নিকট থেকে লিখিয়ে নিয়েছে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী) শব্দের অর্থ (আরবী) এবং (আরবী) বর্ণনা করেছেন। (মুজাহিদ (রহঃ), সুদ্দী (রহঃ) এবং যহহকি (রহঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে) হাসান (রঃ) এটার অর্থ (আরবী) বলেছেন। ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেনঃ “ছেলেরা এখানে (আরবী) পড়ে থাকে, অথচ (আরবী) রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে দারাসতা রয়েছে এবং এর অর্থ (আরবী)-ই বটে। এর ভাবার্থ হচ্ছে- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যেসব কথা আপনি আমাদেরকে শুনাচ্ছেন সেগুলো আমরা পূর্ববর্তীদের মাধ্যমে অবগত রয়েছি।” হযরত ইবনে মাসউদের কিরআতে (আরবী) রয়েছে। অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সঃ) ওটা শিখে রেখেছেন। এই মতভেদ বিস্ময়করই বটে। হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ‘ওয়া লিয়াকুলু দারাস্তা’এইরূপ শুনিয়েছেন।

আল-আনআম 6:106

১০৬-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর উম্মতকে নির্দেশ দিচ্ছেন- তোমরা অহীরই অনুসরণ কর এবং ওর উপরই আমল কর। কেননা, এটাই সত্য এবং এতে কোন ভেজাল বা মিশ্রণ নেই। আর তোমরা এই মুশরিকদেরকে এড়িয়ে চল, তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তারা যে কষ্ট দিচ্ছে তা সহ্য করে নাও যে পর্যন্ত তোমাদেরকে আল্লাহ তাদের উপর জয়যুক্ত ও সফলকাম করেন। জেনে রেখো যে, তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার মধ্যে আল্লাহর নৈপুণ্য নিহিত রয়েছে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তো সারা দুনিয়াবাসীই হিদায়াত লাভ করতো এবং মুশরিকরা শিরকই করতো না। এর মধ্যে মহান আল্লাহর বিশেষ নিপুণতা রয়েছে। তিনি যা কিছু করেন তাতে কোন প্রতিবাদ করো না। তবে হ্যাঁ, তিনি সবারই পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিচার করতে সক্ষম। হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে তাদের পর্যবেক্ষক নিযুক্ত করিনি। তাদের মনে যা আসে তাই তাদেরকে বলতে ও করতে দাও। আমি তোমার উপর দেখা শোনার ভার অর্পণ করিনি। তুমি তাদেরকে আহার্যও প্রদান কর না। তোমার কাজ তো শুধু প্রচার করা। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তুমি শুধুমাত্র উপদেশ দিতে থাক, তুমি তো একজন উপদেষ্টা মাত্র। তুমি তাদের উপর দায়গ্রস্ত অধিকারী নও।” অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “তোমার কাজ শুধু পৌছিয়ে দেয়া, আর হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।"

আল-আনআম 6:107

১০৬-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর উম্মতকে নির্দেশ দিচ্ছেন- তোমরা অহীরই অনুসরণ কর এবং ওর উপরই আমল কর। কেননা, এটাই সত্য এবং এতে কোন ভেজাল বা মিশ্রণ নেই। আর তোমরা এই মুশরিকদেরকে এড়িয়ে চল, তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তারা যে কষ্ট দিচ্ছে তা সহ্য করে নাও যে পর্যন্ত তোমাদেরকে আল্লাহ তাদের উপর জয়যুক্ত ও সফলকাম করেন। জেনে রেখো যে, তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার মধ্যে আল্লাহর নৈপুণ্য নিহিত রয়েছে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তো সারা দুনিয়াবাসীই হিদায়াত লাভ করতো এবং মুশরিকরা শিরকই করতো না। এর মধ্যে মহান আল্লাহর বিশেষ নিপুণতা রয়েছে। তিনি যা কিছু করেন তাতে কোন প্রতিবাদ করো না। তবে হ্যাঁ, তিনি সবারই পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিচার করতে সক্ষম। হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে তাদের পর্যবেক্ষক নিযুক্ত করিনি। তাদের মনে যা আসে তাই তাদেরকে বলতে ও করতে দাও। আমি তোমার উপর দেখা শোনার ভার অর্পণ করিনি। তুমি তাদেরকে আহার্যও প্রদান কর না। তোমার কাজ তো শুধু প্রচার করা। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তুমি শুধুমাত্র উপদেশ দিতে থাক, তুমি তো একজন উপদেষ্টা মাত্র। তুমি তাদের উপর দায়গ্রস্ত অধিকারী নও।” অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “তোমার কাজ শুধু পৌছিয়ে দেয়া, আর হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।"

আল-আনআম 6:108

আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদেরকে সম্বোধন করে বলছেন যে, তারা যেন মুশরিকদের দেবতাগুলোকে গালাগালি না করে এবং ভালমন্দ না বলে। এতে কিছুটা যৌক্তিকতা থাকলেও এর ফলে ঝগড়া ফাসাদ ও বিবাদ বিসম্বাদ বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ তাদের দেবতাদেরকে গালি দিলে তারাও মুসলমানদের প্রভু আল্লাহকে গালি দেবে। মুশরিকরা বলতোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনারা আমাদের দেবতাদের গালি দেয়া হতে বিরত থাকুন, নতুবা আমরাও আপনাদের প্রভুর নিন্দে করবো।” তাই আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের দেবতাদেরকে গালি দিতে মুসলমানদেরকে নিষেধ করলেন। হযরত কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুসলমানরা কাফিরদের মূর্তিগুলোকে গালি দিতেন। তখন কাফিররাও হকীকত না বুঝে বৈরীভাব নিয়ে আল্লাহ তা'আলাকে ভালমন্দ বলতো। যখন আবূ তালিব মৃত্যু শয্যায় শায়িত হন তখন কুরায়েশরা পরামর্শ করে- “চল, আমরা আবু তালিবের কাছে যাই এবং তাঁকে অনুরোধ করি যে, তিনি যেন স্বীয় ভ্রাতুপুত্রকে আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করতে নিষেধ করে দেন। কেননা, এটা আমাদের জন্যে লজ্জাজনক ব্যাপার হবে যে, আবু তালিবের মৃত্যুর পর আমরা মুহাম্মাদ (সঃ)-কে হত্যা করে ফেলবো। কারণ, এরূপ করলে আরববাসী বলবে যে, আবু তালিবের জীবদ্দশায় তো কাপুরুষরা কিছুই করতে পারলো না, আর যেমনই তিনি মারা গেলেন তেমনই তারা তাকে হত্যা করে ফেললো।” সুতরাং আবু জাহেল, আবু সুফিয়ান, আমর ইবনুল আস এবং আরও কয়েকজন লোক প্রতিনিধি হিসেবে আগমন করে। তারা মুত্তালিব নামক একটি লোককে অনুমতি লাভের জন্যে প্রেরণ করে। আবূ তালিব তাদেরকে ডেকে নেন। তারা তখন। তাকে বলেঃ “হে আবু তালিব! আপনি আমাদের বড় এবং আমাদের নেতা। মুহাম্মাদ (সঃ) আমাদেরকে কষ্ট দিচ্ছেন এবং আমাদের দেবতাদেরকে কষ্ট দিচ্ছেন এবং আমাদের দেবতাদেরকে গালি দিচ্ছেন। আমরা চাই যে, আপনি তাকে ডেকে নিয়ে নিষেধ করে দেন। তিনি যেন আমাদের দেবতাদের নাম পর্যন্ত না নেন! নতুবা আমরাও তাকে ও তার আল্লাহকে ছেড়ে দেব না।” এ কথা শুনে আবু তালিব মুহাম্মাদ (সঃ)-কে ডেকে পাঠান এবং তাঁকে বলেনঃ “এরা তোমারই কওম এবং তোমারই চাচার সন্তান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ চাচা! খবর কি? এবং এরা চায় কি?' তখন তারা বলেঃ “আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, আপনি আমাদের উপর এবং আমাদের দেবতাদের উপর কোন হস্তক্ষেপ করবেন না। তাহলে আমরাও আপনার উপর এবং আপনার আল্লাহর উপর কোন হস্তক্ষেপ করবো না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের কথার উত্তরে বলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি কথা বলে দেবে যে, যদি তোমরা ওটা মেনে নাও তবে তোমরা আরব ও আজমের মালিক হয়ে যাবে এবং সমস্ত দেশ থেকে তোমাদের কাছে রাজস্বের সম্পদ আসতে থাকবে?” উত্তরে আবু জাহেল বললোঃ ‘আপনার একটা কথা কেন, দশটা কথা মানতে রাজি আছি। বলুন সেটা কি?' তিনি বললেনঃ বল - (আরবী) (আল্লাহ ছাড়া আর কেউ মা'বুদ নেই)। তারা সেটা অস্বীকার করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিলো। আবু তালিব তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে ভাতিজা! এটা ছাড়া অন্য কথা বল। তোমার কওম তো একথাতে আরও অগ্নিশর্মা হয়ে উঠছে।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “চাচাজান! এটা ছাড়া অন্য কিছু বলার আমার কি অধিকার আছে? এরা যদি আমার হাতে সূর্যও এনে দেয় তথাপি আমি এটা ছাড়া অন্য কিছুই বলতে পারি না।” একথা দ্বারা তাদেরকে নিরাশ করাই তার উদ্দেশ্য ছিল। সুতরাং তারা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে তাকে বললোঃ “আমাদের দেবতাদেরকে ভালমন্দ বলা থেকে বিরত থাকুন, নতুবা আমরাও আপনাকে ও আপনার আল্লাহকে গালি দিব।” এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ তারা অজ্ঞানতা বশতঃ বৈরীভাবে আল্লাহকেই গালি দিতে শুরু করবে। সুতরাং তাদের দেবতাদেরকে গালি দিবার। যৌক্তিকতা থাকলেও এই অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে তা থেকে বিরত থাকা উচিত। কেননা, এতে বিবাদ বিসম্বাদ আরও বেড়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ যে তার পিতা-মাতাকে গালি দেয় সে অভিশপ্ত!' সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন লোক কি তার পিতা-মাতাকে গালি দিতে পারে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “যে কোন লোকের পিতাকে গালি দেয়, তখন লোকটি এর পিতাকে গালি দেয় এবং যে কোন লোকের মাকে গালি দেয়, সে তখন এর মাকে গালি দেয়, সুতরাং প্রথম লোকটি যেন নিজের পিতা-মাতাকেই গালি দিলো। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এভাবেই আমি প্রতিটি জনগোষ্ঠির জন্যে তাদের আমলকে চাকচিক্যময় করে দিয়েছি।” অর্থাৎ যেমন এই কওম মূর্তির প্রতি আসক্তিকেই পছন্দ করেছে, দ্রুপ পূর্ববর্তী উম্মতও পথভ্রষ্ট ছিল এবং তারাও নিজেদের আমলকেই পছন্দ করতো। আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা তাই করে থাকেন এবং তাতেই নিপুণতা নিহিত থাকে। শেষ পর্যন্ত মানুষকে আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে। সেইদিন তারা তাদের দুনিয়ার কৃত কার্যগুলো ভাল কি মন্দ তা জানতে পারবে। যদি সেগুলো ভাল হয় তবে তারা ভাল বিনিময় পাবে এবং যদি মন্দ হয় তবে মন্দ বিনিময়ই প্রাপ্ত হবে।

আল-আনআম 6:109

১০৯-১১০ নং আয়াতের তাফসীর: মুশরিকরা আল্লাহর নামে কসম করে বলে-যদি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে কোন মু'জিযা দেয়া হয় এবং তার দ্বারা অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয় তবে ঈমান আনবো। তাদের এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেন, হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও, মু'জিযা তো আল্লাহ্ তা'আলার কাছে রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে আমাকে মুজিযা প্রদান করবেন, ইচ্ছা না করলে না করবেন। কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিল- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনি তো আমাদেরকে বলেছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) তাঁর লাঠিখানা পাথরের উপর মারা মাত্রই তাতে বারোটি ঝরণা বের হয়েছিল। হযরত ঈসা (আঃ) মৃতকে জীবিত করতেন। সামুদ জাতিও (হযরত সালিহ আঃ -এর কাছে) উন্ত্রীর মু'জিযা দেখেছিল। সুতরাং আপনিও যদি এ ধরনের কোন মুজিযা আমাদের সামনে পেশ করতে পারেন তবে আমরা আপনাকে সত্য নবী বলে মেনে নেবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেছিলেনঃ “তোমরা কি মুজিযা দেখতে চাও?” তারা উত্তরে বলেছিলঃ “এই সাফা পাহাড়কে আমাদের জন্যে সোনা বানিয়ে দিন। তিনি তাদেরকে বলেনঃ “যদি এরূপ হয়ে যায় তবে তোমরা একত্ববাদে বিশ্বাস করবে তো?” তারা উত্তরে বলেঃ “হ্যা, আমরা সবাই ঈমান আনবো।” তিনি তখন উঠেন এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে শুরু করেন। তখন জিবরাঈল (আঃ) আগমন করেন এবং বলেনঃ “আপনি চাইলে সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করা হবে। কিন্তু তারপরেও যদি তারা ঈমান না আনে তবে তৎক্ষণাৎ তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসবে। আর আপনি ইচ্ছা করলে এদেরকে এভাবেই ছেড়ে দেয়া হাক। কেননা, হয়তো পরবর্তীকালে এদের মধ্যে কেউ কেউ ঈমান আনবে এবং তাওবা করবে। তাই, আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা কঠিন অঙ্গীকার সহকারে আল্লাহর নামে কসম করে বলে ... তারা ঈমান আনবে না। কিন্তু কথা এই যে, তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ ও মূর্খ । আল্লাহ পাক বলেনঃ মু'জিযা প্রেরণে আমার কাছে শুধু এটাই প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে, তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা মু'জিযা দেখার পরেও ঈমান আনেনি। সুতরাং এরাও যদি মু'জিযা দেখার পরেও ঈমান আনয়ন না করে তবে সাথে সাথেই তাদের উপর শাস্তি এসে পড়বে এবং যে অবকাশ তাদেরকে দেয়া হয়েছে তা আর থাকবে না। তোমাদেরকে কি করে বুঝানো যাবে যে, তাদের কাছে মুজিযা আসলেও তারা ঈমান আনবে না। কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবী) দ্বারা মুশরিকদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। আল্লাহ পাক যেন তাদেরকে বলছেন- যে ঈমান যুক্ত কথাগুলো কসম করে করে লা হচ্ছে সেগুলো কি তোমরা প্রকৃতই সত্য মনে করছো?(আরবী) এখানেও (আরবী) -এর (আরবী) -কে যের দিয়ে পড়া হয়েছে এই ভিত্তিতে যে, মু'জিযা দেখার পর ঈমান না আনার সংবাদ শুরু করা হয়েছে। কাজেই ‘ইন্না পড়তে হচ্ছে। কেউ কেউ (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) দ্বারা পড়েছেন এবং বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা মুমিনদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা কি জান যে, এই নিদর্শনগুলো প্রকাশিত হওয়ার পরেও এরা ঈমান আনবে না?” এই অবস্থায় (আরবী) এর (আরবী) কে যবরের সাথেও পড়া যেতে পারে এবং যেরের সাথেও পড়া যেতে পারে। অর্থাৎ এটা (আরবী)-এর (আরবী) হয়ে এবং এই অবস্থায় (আরবী) এর (আরবী) হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) (৭:১২), এখানেও (আরবী) এ (আরবী) শব্দটি (আরবী) হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) (২১:৯৫) এখানেও অনুরূপ অবস্থা। ... (আরবী)-এই আয়াতের লুক্কায়িত ভাবার্থ হচ্ছে - হে মুমিনগণ! তোমাদের কাছে এর কি প্রমাণ আছে যে, এরা এদের চাওয়া নিদর্শন ও মু'জিযা দেখে অবশ্যই ঈমান আনবে? কেউ কেউ একথাও বলেছেন যে, (আরবী) এখানে (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এ কথা শোনা গেছে যে, আরববাসী বলে থাকেঃ (আরবী) অর্থাৎ তুমি বাজারে যাও এবং আমাদের জন্যে কিছু খরিদ করে আনবে। অর্থাৎ (আরবী) সম্ভবতঃ তুমি খরিদ করবে। অনুরূপভাবে এই দাবীর অনুকূলে আরবদের কবিতা পেশ করা হয়েছে।আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেহেতু তারা প্রথমবার ঈমান আনেনি, এর ফলে আমি তাদের মনোভাবের ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে দেবো।” অর্থাৎ তাদের অস্বীকার ও কুফরীর কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তর এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। তারা এখন কিছুই মানতে রাজী নয়। তাদের মধ্যে ও ঈমানের মধ্যে বিচ্ছেদ এসে গেছে। তারা সারা দুনিয়ার নিদর্শন ও মু'জিযা দেখলেও ঈমান আনবে না। যেমন প্রথমবার তাদের মধ্যে ও তাদের ঈমানের মধ্যে প্রতিবন্ধকতার সষ্টি হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তারা যা বলবে তা বলার পূর্বেই আল্লাহ ওর সংবাদ দিয়েছেন এবং তারা যে আমল করবে, পূর্বেই তিনি সেই খবর দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(মহা মহিমান্বিত) খবরদাতার মত কেউ তোমাকে খবর দিতে পারে না।" (৩৫:১৪) “মানুষ বলবে, হায়, আফসোস! যে বাড়াবাড়ি ও পাপ কার্য আমি করেছি ...... যদি আমাকে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়া হতো, তবে আমি সৎকর্মশীল লোকদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যদি তাদেরকে দুনিয়ায় পুনরায় ফিরিয়ে দেয়াও হয় তথাপি আবারও তারা হিদায়াতের উপর থাকবে না।” তিনি আরও বলেনঃ “যদি তাদেরকে (দুনিয়ায়) ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবুও তারা নিষিদ্ধ কাজগুলোতেই পুনরায় লিপ্ত হয়ে পড়বে, নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।” অর্থাৎ দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার পরেও তারা পূর্বের মতই ঈমান আনবে না। কেননা, এই সময়ের ন্যায় ঐ সময়েও আল্লাহ তাদের অন্তর ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাবেন এবং আবারও তাদের মধ্যে ঈমানের প্রতিবন্ধতার সৃষ্টি হয়ে যাবে। আর আল্লাহ পাক তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার মধ্যেই বিভ্রান্ত থাকতে দেবেন।

আল-আনআম 6:110

১০৯-১১০ নং আয়াতের তাফসীর: মুশরিকরা আল্লাহর নামে কসম করে বলে-যদি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে কোন মু'জিযা দেয়া হয় এবং তার দ্বারা অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয় তবে ঈমান আনবো। তাদের এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেন, হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও, মু'জিযা তো আল্লাহ্ তা'আলার কাছে রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে আমাকে মুজিযা প্রদান করবেন, ইচ্ছা না করলে না করবেন। কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিল- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আপনি তো আমাদেরকে বলেছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) তাঁর লাঠিখানা পাথরের উপর মারা মাত্রই তাতে বারোটি ঝরণা বের হয়েছিল। হযরত ঈসা (আঃ) মৃতকে জীবিত করতেন। সামুদ জাতিও (হযরত সালিহ আঃ -এর কাছে) উন্ত্রীর মু'জিযা দেখেছিল। সুতরাং আপনিও যদি এ ধরনের কোন মুজিযা আমাদের সামনে পেশ করতে পারেন তবে আমরা আপনাকে সত্য নবী বলে মেনে নেবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেছিলেনঃ “তোমরা কি মুজিযা দেখতে চাও?” তারা উত্তরে বলেছিলঃ “এই সাফা পাহাড়কে আমাদের জন্যে সোনা বানিয়ে দিন। তিনি তাদেরকে বলেনঃ “যদি এরূপ হয়ে যায় তবে তোমরা একত্ববাদে বিশ্বাস করবে তো?” তারা উত্তরে বলেঃ “হ্যা, আমরা সবাই ঈমান আনবো।” তিনি তখন উঠেন এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে শুরু করেন। তখন জিবরাঈল (আঃ) আগমন করেন এবং বলেনঃ “আপনি চাইলে সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করা হবে। কিন্তু তারপরেও যদি তারা ঈমান না আনে তবে তৎক্ষণাৎ তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসবে। আর আপনি ইচ্ছা করলে এদেরকে এভাবেই ছেড়ে দেয়া হাক। কেননা, হয়তো পরবর্তীকালে এদের মধ্যে কেউ কেউ ঈমান আনবে এবং তাওবা করবে। তাই, আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা কঠিন অঙ্গীকার সহকারে আল্লাহর নামে কসম করে বলে ... তারা ঈমান আনবে না। কিন্তু কথা এই যে, তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ ও মূর্খ । আল্লাহ পাক বলেনঃ মু'জিযা প্রেরণে আমার কাছে শুধু এটাই প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে, তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা মু'জিযা দেখার পরেও ঈমান আনেনি। সুতরাং এরাও যদি মু'জিযা দেখার পরেও ঈমান আনয়ন না করে তবে সাথে সাথেই তাদের উপর শাস্তি এসে পড়বে এবং যে অবকাশ তাদেরকে দেয়া হয়েছে তা আর থাকবে না। তোমাদেরকে কি করে বুঝানো যাবে যে, তাদের কাছে মুজিযা আসলেও তারা ঈমান আনবে না। কেউ কেউ বলেছেন যে, (আরবী) দ্বারা মুশরিকদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। আল্লাহ পাক যেন তাদেরকে বলছেন- যে ঈমান যুক্ত কথাগুলো কসম করে করে লা হচ্ছে সেগুলো কি তোমরা প্রকৃতই সত্য মনে করছো?(আরবী) এখানেও (আরবী) -এর (আরবী) -কে যের দিয়ে পড়া হয়েছে এই ভিত্তিতে যে, মু'জিযা দেখার পর ঈমান না আনার সংবাদ শুরু করা হয়েছে। কাজেই ‘ইন্না পড়তে হচ্ছে। কেউ কেউ (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) দ্বারা পড়েছেন এবং বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা মুমিনদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা কি জান যে, এই নিদর্শনগুলো প্রকাশিত হওয়ার পরেও এরা ঈমান আনবে না?” এই অবস্থায় (আরবী) এর (আরবী) কে যবরের সাথেও পড়া যেতে পারে এবং যেরের সাথেও পড়া যেতে পারে। অর্থাৎ এটা (আরবী)-এর (আরবী) হয়ে এবং এই অবস্থায় (আরবী) এর (আরবী) হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) (৭:১২), এখানেও (আরবী) এ (আরবী) শব্দটি (আরবী) হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) (২১:৯৫) এখানেও অনুরূপ অবস্থা। ... (আরবী)-এই আয়াতের লুক্কায়িত ভাবার্থ হচ্ছে - হে মুমিনগণ! তোমাদের কাছে এর কি প্রমাণ আছে যে, এরা এদের চাওয়া নিদর্শন ও মু'জিযা দেখে অবশ্যই ঈমান আনবে? কেউ কেউ একথাও বলেছেন যে, (আরবী) এখানে (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এ কথা শোনা গেছে যে, আরববাসী বলে থাকেঃ (আরবী) অর্থাৎ তুমি বাজারে যাও এবং আমাদের জন্যে কিছু খরিদ করে আনবে। অর্থাৎ (আরবী) সম্ভবতঃ তুমি খরিদ করবে। অনুরূপভাবে এই দাবীর অনুকূলে আরবদের কবিতা পেশ করা হয়েছে।আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেহেতু তারা প্রথমবার ঈমান আনেনি, এর ফলে আমি তাদের মনোভাবের ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে দেবো।” অর্থাৎ তাদের অস্বীকার ও কুফরীর কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তর এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। তারা এখন কিছুই মানতে রাজী নয়। তাদের মধ্যে ও ঈমানের মধ্যে বিচ্ছেদ এসে গেছে। তারা সারা দুনিয়ার নিদর্শন ও মু'জিযা দেখলেও ঈমান আনবে না। যেমন প্রথমবার তাদের মধ্যে ও তাদের ঈমানের মধ্যে প্রতিবন্ধকতার সষ্টি হয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তারা যা বলবে তা বলার পূর্বেই আল্লাহ ওর সংবাদ দিয়েছেন এবং তারা যে আমল করবে, পূর্বেই তিনি সেই খবর দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(মহা মহিমান্বিত) খবরদাতার মত কেউ তোমাকে খবর দিতে পারে না।" (৩৫:১৪) “মানুষ বলবে, হায়, আফসোস! যে বাড়াবাড়ি ও পাপ কার্য আমি করেছি ...... যদি আমাকে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়া হতো, তবে আমি সৎকর্মশীল লোকদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যদি তাদেরকে দুনিয়ায় পুনরায় ফিরিয়ে দেয়াও হয় তথাপি আবারও তারা হিদায়াতের উপর থাকবে না।” তিনি আরও বলেনঃ “যদি তাদেরকে (দুনিয়ায়) ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবুও তারা নিষিদ্ধ কাজগুলোতেই পুনরায় লিপ্ত হয়ে পড়বে, নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।” অর্থাৎ দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার পরেও তারা পূর্বের মতই ঈমান আনবে না। কেননা, এই সময়ের ন্যায় ঐ সময়েও আল্লাহ তাদের অন্তর ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাবেন এবং আবারও তাদের মধ্যে ঈমানের প্রতিবন্ধতার সৃষ্টি হয়ে যাবে। আর আল্লাহ পাক তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার মধ্যেই বিভ্রান্ত থাকতে দেবেন।

আল-আনআম 6:111

আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা কসম করে করে বলে যে, তারা কোন নিদর্শনও মু'জিযা দেখতে পেলে অবশ্যই ঈমান আনবে, তাদের প্রার্থনা যদি আমি ককূল করি এবং তাদের উপর ফেরেশতাও অবতীর্ণ করি যারা রাসূলদেরকে সত্যায়িত করবে এবং তোমার (মুহাম্মাদ সঃ-এর) রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করবে, তথাপিও তারা ঈমান আনবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা তাদের উক্তি উদ্ধৃত করে বলেনঃ “আপনি আল্লাহ এবং ফেরেশতাদেরকে এনে হাজির করুন। আর আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান আনবো না যতক্ষণ পর্যন্ত অন্যান্য রাসূলদের মত আপনিও নিদর্শনসমূহ পেশ না করবেন।” “যারা আমার সাথে সাক্ষাতের বিশ্বাস রাখে না তারা বলে- আমাদের উপর কেন ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হয় না, কেন আমরা আমাদের প্রভুকে দেখতে পাই না? এরা বড়ই একগুয়েমি ও অবাধ্যতার মধ্যে রয়েছে।” “আর যদি ফেরেশতাও তাদের কাছে এসে কথা বলে এবং রাসূলদেরকে সত্যায়িত করে ও সমস্ত জিনিসের ভান্ডার তাদের কাছে এনে জমা করে দেয়, তথাপি তারা ঈমান আনবে না।" (আরবী) শব্দটিকে কেউ কেউ (আরবী) -এ যের দিয়ে এবং -কে যবর দিয়ে পড়েছেন, যার অর্থ হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আবার কেউ কেউ দু'টোকেই পেশ দিয়ে পড়েছেন, যার কারণে অর্থ দাঁড়িয়েছে-“দলে দলে লোক এসেও যদি রাসূলদেরকে সত্যায়িত করে তথাপিও তারা ঈমান আনবে না। হিদায়াত দান তো একমাত্র আল্লাহর হাতে। যতই লোক হাক না লে তাদেরকে হিদায়াত করতে পারবে না। তিনি যা চান তা-ই করেন। তিনি সলকেই প্রশ্ন করবেন, কিন্তু তাকে প্রশ্ন করা যেতে পারে না। যেমন তিনি বলেনঃ “(হে নবী সঃ!) যাদের উপর তোমার প্রভুর কথা সত্য ও পূর্ণ হয়ে গেছে। তারা সমস্ত নিদর্শন দেখলেও ঈমান আনবে না, যে পর্যন্ত না তারা বেদনাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে।”

আল-আনআম 6:112

১১২-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমার যেমন বিরোধিতাকারী ও শত্রু রয়েছে, অনুরূপভাবে তোমার পূর্ববর্তী নবীদেরও বিরোধিতাকারী ও শত্রুতাকারী ছিল। সুতরাং তুমি তাদের বিরোধিতার কারণে দুঃখিত হয়ো না। মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে আরও বলেনঃ তোমার পূর্ববর্তী নবীরা এমনই ছিল যে, লোকেরা তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন ও অবিশ্বাস করতো এবং বিভিন্ন প্রকারের কষ্ট দিতো, তথাপি তার ধৈর্যধারণ করতো। হে রাসূল (সঃ)! এই লোকগুলো তোমাকে যা কিছু বলছে, তোমার পূর্ববর্তী রাসূলদেরকেও এসব কথাই বলা হয়েছিল। জেনে রেখো যে, আল্লাহ যেমন ক্ষমতাশীল তেমনই কঠিন শাস্তিদাতাও বটে। আল্লাহ পাক বলেনঃ এভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর জন্যে মানুষ ও জ্বিনের শয়তানদেরকে শত্রুরূপে সৃষ্টি করেছি। ওয়ারাকা ইবনে নওফল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এই কুরায়েশরা আপনার সাথে শত্রুতা করবে এবং যে কোন নবীই আপনার মত কথা স্বীয় উম্মতকে বলেছেন তাঁর সাথেই শত্রুতা করা হয়েছে।” (এটি একটি দীর্ঘ হাদীসের অংশ বিশেষ, যে হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় 'সহীহ' গ্রন্থে (আরবী) অনুচ্ছেদে তাখরীজ করেছেন) (আরবী) হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী) হচ্ছে অর্থাৎ তাদের শত্রুরা হচ্ছে মানুষ ও জ্বিনদের মধ্যকার শয়তানগণ। আর শয়তান এমন সবকেই বলা হয় যাদের দুষ্টামির কোন নযীর থাকে না। ঐ রাসূলদের শত্রুতা ঐ শয়তানরা ছাড়া আর কে-ই বা করতে পারে যারা তাদেরই জাতি ও শ্রেণীভুক্ত? কাতাদা (রঃ) বলেন যে, জ্বিনদের মধ্যেও শয়তান আছে এবং মানুষের মধ্যেও শয়তান রয়েছে। তারা নিজ নিজ দলভুক্তদেরকে পাপকার্য শিক্ষা দিয়ে থাকে। কাতাদা (রঃ) বলেনঃ আমার কাছে এ সংবাদ পৌঁছেছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) একদা নামায পড়ছিলেন। সে সময় নবী (সঃ) তাকে বলেছিলেন- “হে আবু যার (রাঃ)! মানুষ ও জ্বিনের শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর।” তখন তিনি বলেন, মানুষের মধ্যেও কি শয়তান রয়েছে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “হ্যা”। (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এটা তো কাতাদা ও আবু যর (রাঃ)-এর মধ্যে (আরবী) হচ্ছে) ইবনে জারীর (রঃ) হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, আমি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করি। মজলিস বড় হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি কি নামায পড়েছ?” আমি উত্তরে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! না (আমি নামায পড়িনি) । তিনি বললেন, উঠ, দু'রাকআত নামায পড়। তিনি (আবূ যার রাঃ) বলেনঃ (আমি দু'রাকআত নামায পড়লাম। অতঃপর তাঁর কাছে এসে বসে পড়লাম। তখন তিনি বললেন, “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি কি জ্বিন ও মানুষের শয়তানদের থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছো?” আমি বললাম, না, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান রয়েছে? তিনি উত্তরে বললেন, “হ্যা, তারা জ্বিনের শয়তানদের চেয়েও দুষ্টতম।” (এতেও (আরবী) হয়েছে। আহমাদ ও ইবনে মিরদুওয়াই থেকে (আরবী) রূপে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে)ইবনে আবি হাতিম (রঃ) আবূ উমামা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হে আবু যার (রাঃ)! তুমি জ্বিন ও মানুষের শয়তানদের থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছো?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান রয়েছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হ্যা।ইকরামা (রঃ) বলেন যে, জ্বিনের শয়তানরা মানবরূপী শয়তানদের কাছে অহী নিয়ে আসে এবং মানবরূপী শয়তানরা জ্বিনের শয়তানদের কাছে অহী নিয়ে । আসে (আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে ইকরামা (রঃ) বলেন যে, মানুষের মধ্যেও শয়তান আছে এবং জ্বিনদের মধ্যেও আছে। এখন মানবরূপী শয়তানরা জ্বিন-শয়তানদের কাছে তাদের মনের সংকল্পের কথা প্রকাশ করে থাকে। তারা একে অপরের কাছে খারাপ কথার অহী করে। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, মানবীয় শয়তান হচ্ছে তারাই যারা মানুষকে পাপকার্যের পরামর্শ দান করে এবং জ্বিনদের মধ্যকার শয়তানরা জ্বিনদেরকে পথভ্রষ্ট করে থাকে। সুতরাং প্রত্যেকেই নিজ নিজ সাথীকে বলে- “আমি তো আমার সঙ্গীকে পথভ্রষ্ট করেছি, তুমিও এভাবে তোমার সঙ্গীকে পথভ্রষ্ট কর।” এইভাবে তারা একে অপরকে পাপকার্যের শিক্ষা দান করতে থাকে। মোটকথা, ইবনে জারীর (রঃ) এটাই মনে করেছেন যে, ইকরামা ও সুদ্দীর মতে মানবীয় শয়তান দ্বারা দানবীয় ঐ শয়তানদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা মানুষকে বিভ্রান্ত করে থাকে। অর্থ এটা নয় যে, মানুষের মধ্যে মানবীয় জ্বিনও রয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ইকরামার কথা দ্বারা এটাই প্রকাশ পাচ্ছে, কিন্তু সুদ্দীর কথা দ্বারা এ অর্থ বুঝায় না, যদিও এর সম্ভাবনা রয়েছে। যহ্হাক (রঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, জ্বিনদের মধ্যেও শয়তান আছে যারা তাদেরকে বিভ্রান্ত করে থাকে, যেমন মানবীয় শয়তান মানুষের বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখন মানবীয় শয়তান দানবীয় শয়তানদের সাথে মিলিত হয়ে বলে- তাকে এর দ্বারা বিভ্রান্ত কর এবং এভাবে বিভ্রান্ত কর । যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা একে অপরকে কতগুলো মনোমুগ্ধকর ধোকাপূর্ণ ও প্রতারণাময় কথা দ্বারা প্ররোচিত করে থাকে। মোটকথা, সঠিক কথা হচ্ছে ওটাই যা হযরত আবু যার (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে। তা হচ্ছে এই যে, মানুষের মধ্যেও মানবীয় শয়তান রয়েছে এবং প্রত্যেক জিনিসের শয়তান হচ্ছে ওরই শ্রেণীভুক্ত অবাধ্য ও উদ্ধত জিনিসটা। সহীহ মুসলিমে হযরত আবু যার (রাঃ)। হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “কালো কুকুর শয়তান হয়ে থাকে।” এর অর্থ এটাই দাঁড়ায় যে, ওটা কুকুরের মধ্যে শয়তান। মুজাহিদ (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন যে, জ্বিন জাতির কাফিররা হচ্ছে দানবীয় শয়তান এবং ঐ শয়তানরা মানবীয় শয়তানদের কাছে অহী পাঠিয়ে থাকে। আর মানব জাতির কাফিররা হচ্ছে মানবীয় শয়তান।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি একদা মুখতারের কাছে গমন করি। সে আমাকে অতিথি হিসেবে গ্রহণ করে এবং রাতেও আমাকে তার কাছে অবস্থান করায়। অতঃপর সে আমাকে বলে, “আমার কওমের কাছে যাও এবং তাদেরকে হাদীস শুনাও।” আমি তখন তার কথামত তাদের কাছে গমন করি। একটি লোক আমার সামনে এসে বলে- “অহী সম্পর্কে আপনার মতামত কি?” আমি উত্তরে বলি- অহী দু’ প্রকারের হয়ে থাকে। আল্লাহ পাক বলেন, (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ!) আমি এই কুরআন তোমার কাছে অহী করেছি।” (১২:৩) আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানবী শয়তান ও দানবীয় শয়তানরা একে অপরের কাছে কতগুলো মনোমুগ্ধকর ধোকাপূর্ণ ও প্রতারণাময় কথার অহী করে থাকে।” এ কথা শোনামাত্র তারা আমার উপর আক্রমণ করে বসে এবং আমাকে মারপিট করতে উদ্যত হয়। আমি তাদেরকে বলি, এটা তোমাদের কি ধরনের আচরণ? আমি তো তোমাদের একজন মেহমান! শেষ পর্যন্ত তারা আমাকে ছেড়ে দেয়। ইকরামা (রঃ) মুখতারের কাছে এ কথাটা পেশ করেছিলেন। সে ছিল আবু উবাইদের পুত্র। আল্লাহ তার মঙ্গল না করুন! সে ধারণা করতো যে, তার কাছেও অহী এসে থাকে। তার বোন সুফিয়া হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর স্ত্রী ছিলেন। তিনি একজন সতী সাধ্বী মহিলা ছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) যখন খবর দেন যে, মুখতার তার উপর অহী আসার দাবী করে থাকে, তখন ইকরামা (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সত্য বলেছেন যে, শয়তানেরা তাদের বন্ধুদের কাছে অহী করতে থাকে এবং একে অপরের কাছে মিথ্যে কথা পৌছিয়ে বেড়ায়, যা শোনার ফলে শ্রবণকারী তার উপর প্রভাবিত হয়ে পড়ে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তারা এরূপ করতো না। অর্থাৎ এ সবকিছু আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও মর্জিতেই হচ্ছে যে, প্রত্যেক নবীরই শত্রু লোকদের মধ্য থেকেই হয়ে থাকে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে ক্ষমা করে দাও এবং তাদের মিথ্যা অপবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। তাদের শত্রুতার ব্যাপারে তুমি আল্লাহর উপরই ভরসা কর। তিনিই তোমার জন্যে যথেষ্ট।(আরবী) আল্লাহ পাকের এ উক্তির অর্থ এই যে, যারা পরকালের উপর বিশ্বাস করে না তারা এসব শয়তানের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তাদের বন্ধু ও সহায়ক হয়ে যায়। তারা একে অপরকে খুশী করতে থাকে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা এবং তোমাদের উপাস্যগণ (সমবেত হয়ে) আল্লাহ হতে কাউকেও ফিরাতে পারবে না। ঐ ব্যক্তি ছাড়া, যে জাহান্নামে প্রবেশকারী হবে।” (৩৭:১৬১-১৬৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই তোমরা কিয়ামত সম্বন্ধে বিভিন্ন মত পোষণ করে থাক। ওটা হতে ঐ ব্যক্তিই নিরস্ত থাকে, যে (সম্পূর্ণরূপে মঙ্গল হতে) বিরত থাকতে চায়।” (৫১:৮-৯) মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! যদি তারা শয়তান হয়ে বিভ্রান্ত করতে থাকে এবং লোকেরা তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তারা যা উপার্জন করতে রয়েছে তা তাদেরকে উপার্জন করতে দাও।

আল-আনআম 6:113

১১২-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমার যেমন বিরোধিতাকারী ও শত্রু রয়েছে, অনুরূপভাবে তোমার পূর্ববর্তী নবীদেরও বিরোধিতাকারী ও শত্রুতাকারী ছিল। সুতরাং তুমি তাদের বিরোধিতার কারণে দুঃখিত হয়ো না। মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে আরও বলেনঃ তোমার পূর্ববর্তী নবীরা এমনই ছিল যে, লোকেরা তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন ও অবিশ্বাস করতো এবং বিভিন্ন প্রকারের কষ্ট দিতো, তথাপি তার ধৈর্যধারণ করতো। হে রাসূল (সঃ)! এই লোকগুলো তোমাকে যা কিছু বলছে, তোমার পূর্ববর্তী রাসূলদেরকেও এসব কথাই বলা হয়েছিল। জেনে রেখো যে, আল্লাহ যেমন ক্ষমতাশীল তেমনই কঠিন শাস্তিদাতাও বটে। আল্লাহ পাক বলেনঃ এভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর জন্যে মানুষ ও জ্বিনের শয়তানদেরকে শত্রুরূপে সৃষ্টি করেছি। ওয়ারাকা ইবনে নওফল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এই কুরায়েশরা আপনার সাথে শত্রুতা করবে এবং যে কোন নবীই আপনার মত কথা স্বীয় উম্মতকে বলেছেন তাঁর সাথেই শত্রুতা করা হয়েছে।” (এটি একটি দীর্ঘ হাদীসের অংশ বিশেষ, যে হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় 'সহীহ' গ্রন্থে (আরবী) অনুচ্ছেদে তাখরীজ করেছেন) (আরবী) হচ্ছে (আরবী) এবং (আরবী) হচ্ছে অর্থাৎ তাদের শত্রুরা হচ্ছে মানুষ ও জ্বিনদের মধ্যকার শয়তানগণ। আর শয়তান এমন সবকেই বলা হয় যাদের দুষ্টামির কোন নযীর থাকে না। ঐ রাসূলদের শত্রুতা ঐ শয়তানরা ছাড়া আর কে-ই বা করতে পারে যারা তাদেরই জাতি ও শ্রেণীভুক্ত? কাতাদা (রঃ) বলেন যে, জ্বিনদের মধ্যেও শয়তান আছে এবং মানুষের মধ্যেও শয়তান রয়েছে। তারা নিজ নিজ দলভুক্তদেরকে পাপকার্য শিক্ষা দিয়ে থাকে। কাতাদা (রঃ) বলেনঃ আমার কাছে এ সংবাদ পৌঁছেছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) একদা নামায পড়ছিলেন। সে সময় নবী (সঃ) তাকে বলেছিলেন- “হে আবু যার (রাঃ)! মানুষ ও জ্বিনের শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর।” তখন তিনি বলেন, মানুষের মধ্যেও কি শয়তান রয়েছে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “হ্যা”। (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এটা তো কাতাদা ও আবু যর (রাঃ)-এর মধ্যে (আরবী) হচ্ছে) ইবনে জারীর (রঃ) হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, আমি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করি। মজলিস বড় হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি কি নামায পড়েছ?” আমি উত্তরে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! না (আমি নামায পড়িনি) । তিনি বললেন, উঠ, দু'রাকআত নামায পড়। তিনি (আবূ যার রাঃ) বলেনঃ (আমি দু'রাকআত নামায পড়লাম। অতঃপর তাঁর কাছে এসে বসে পড়লাম। তখন তিনি বললেন, “হে আবু যার (রাঃ)! তুমি কি জ্বিন ও মানুষের শয়তানদের থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছো?” আমি বললাম, না, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান রয়েছে? তিনি উত্তরে বললেন, “হ্যা, তারা জ্বিনের শয়তানদের চেয়েও দুষ্টতম।” (এতেও (আরবী) হয়েছে। আহমাদ ও ইবনে মিরদুওয়াই থেকে (আরবী) রূপে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে)ইবনে আবি হাতিম (রঃ) আবূ উমামা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হে আবু যার (রাঃ)! তুমি জ্বিন ও মানুষের শয়তানদের থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছো?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান রয়েছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হ্যা।ইকরামা (রঃ) বলেন যে, জ্বিনের শয়তানরা মানবরূপী শয়তানদের কাছে অহী নিয়ে আসে এবং মানবরূপী শয়তানরা জ্বিনের শয়তানদের কাছে অহী নিয়ে । আসে (আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে ইকরামা (রঃ) বলেন যে, মানুষের মধ্যেও শয়তান আছে এবং জ্বিনদের মধ্যেও আছে। এখন মানবরূপী শয়তানরা জ্বিন-শয়তানদের কাছে তাদের মনের সংকল্পের কথা প্রকাশ করে থাকে। তারা একে অপরের কাছে খারাপ কথার অহী করে। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, মানবীয় শয়তান হচ্ছে তারাই যারা মানুষকে পাপকার্যের পরামর্শ দান করে এবং জ্বিনদের মধ্যকার শয়তানরা জ্বিনদেরকে পথভ্রষ্ট করে থাকে। সুতরাং প্রত্যেকেই নিজ নিজ সাথীকে বলে- “আমি তো আমার সঙ্গীকে পথভ্রষ্ট করেছি, তুমিও এভাবে তোমার সঙ্গীকে পথভ্রষ্ট কর।” এইভাবে তারা একে অপরকে পাপকার্যের শিক্ষা দান করতে থাকে। মোটকথা, ইবনে জারীর (রঃ) এটাই মনে করেছেন যে, ইকরামা ও সুদ্দীর মতে মানবীয় শয়তান দ্বারা দানবীয় ঐ শয়তানদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা মানুষকে বিভ্রান্ত করে থাকে। অর্থ এটা নয় যে, মানুষের মধ্যে মানবীয় জ্বিনও রয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ইকরামার কথা দ্বারা এটাই প্রকাশ পাচ্ছে, কিন্তু সুদ্দীর কথা দ্বারা এ অর্থ বুঝায় না, যদিও এর সম্ভাবনা রয়েছে। যহ্হাক (রঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, জ্বিনদের মধ্যেও শয়তান আছে যারা তাদেরকে বিভ্রান্ত করে থাকে, যেমন মানবীয় শয়তান মানুষের বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখন মানবীয় শয়তান দানবীয় শয়তানদের সাথে মিলিত হয়ে বলে- তাকে এর দ্বারা বিভ্রান্ত কর এবং এভাবে বিভ্রান্ত কর । যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা একে অপরকে কতগুলো মনোমুগ্ধকর ধোকাপূর্ণ ও প্রতারণাময় কথা দ্বারা প্ররোচিত করে থাকে। মোটকথা, সঠিক কথা হচ্ছে ওটাই যা হযরত আবু যার (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে। তা হচ্ছে এই যে, মানুষের মধ্যেও মানবীয় শয়তান রয়েছে এবং প্রত্যেক জিনিসের শয়তান হচ্ছে ওরই শ্রেণীভুক্ত অবাধ্য ও উদ্ধত জিনিসটা। সহীহ মুসলিমে হযরত আবু যার (রাঃ)। হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “কালো কুকুর শয়তান হয়ে থাকে।” এর অর্থ এটাই দাঁড়ায় যে, ওটা কুকুরের মধ্যে শয়তান। মুজাহিদ (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন যে, জ্বিন জাতির কাফিররা হচ্ছে দানবীয় শয়তান এবং ঐ শয়তানরা মানবীয় শয়তানদের কাছে অহী পাঠিয়ে থাকে। আর মানব জাতির কাফিররা হচ্ছে মানবীয় শয়তান।ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি একদা মুখতারের কাছে গমন করি। সে আমাকে অতিথি হিসেবে গ্রহণ করে এবং রাতেও আমাকে তার কাছে অবস্থান করায়। অতঃপর সে আমাকে বলে, “আমার কওমের কাছে যাও এবং তাদেরকে হাদীস শুনাও।” আমি তখন তার কথামত তাদের কাছে গমন করি। একটি লোক আমার সামনে এসে বলে- “অহী সম্পর্কে আপনার মতামত কি?” আমি উত্তরে বলি- অহী দু’ প্রকারের হয়ে থাকে। আল্লাহ পাক বলেন, (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ!) আমি এই কুরআন তোমার কাছে অহী করেছি।” (১২:৩) আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানবী শয়তান ও দানবীয় শয়তানরা একে অপরের কাছে কতগুলো মনোমুগ্ধকর ধোকাপূর্ণ ও প্রতারণাময় কথার অহী করে থাকে।” এ কথা শোনামাত্র তারা আমার উপর আক্রমণ করে বসে এবং আমাকে মারপিট করতে উদ্যত হয়। আমি তাদেরকে বলি, এটা তোমাদের কি ধরনের আচরণ? আমি তো তোমাদের একজন মেহমান! শেষ পর্যন্ত তারা আমাকে ছেড়ে দেয়। ইকরামা (রঃ) মুখতারের কাছে এ কথাটা পেশ করেছিলেন। সে ছিল আবু উবাইদের পুত্র। আল্লাহ তার মঙ্গল না করুন! সে ধারণা করতো যে, তার কাছেও অহী এসে থাকে। তার বোন সুফিয়া হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর স্ত্রী ছিলেন। তিনি একজন সতী সাধ্বী মহিলা ছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) যখন খবর দেন যে, মুখতার তার উপর অহী আসার দাবী করে থাকে, তখন ইকরামা (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সত্য বলেছেন যে, শয়তানেরা তাদের বন্ধুদের কাছে অহী করতে থাকে এবং একে অপরের কাছে মিথ্যে কথা পৌছিয়ে বেড়ায়, যা শোনার ফলে শ্রবণকারী তার উপর প্রভাবিত হয়ে পড়ে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তারা এরূপ করতো না। অর্থাৎ এ সবকিছু আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও মর্জিতেই হচ্ছে যে, প্রত্যেক নবীরই শত্রু লোকদের মধ্য থেকেই হয়ে থাকে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে ক্ষমা করে দাও এবং তাদের মিথ্যা অপবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। তাদের শত্রুতার ব্যাপারে তুমি আল্লাহর উপরই ভরসা কর। তিনিই তোমার জন্যে যথেষ্ট।(আরবী) আল্লাহ পাকের এ উক্তির অর্থ এই যে, যারা পরকালের উপর বিশ্বাস করে না তারা এসব শয়তানের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তাদের বন্ধু ও সহায়ক হয়ে যায়। তারা একে অপরকে খুশী করতে থাকে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা এবং তোমাদের উপাস্যগণ (সমবেত হয়ে) আল্লাহ হতে কাউকেও ফিরাতে পারবে না। ঐ ব্যক্তি ছাড়া, যে জাহান্নামে প্রবেশকারী হবে।” (৩৭:১৬১-১৬৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই তোমরা কিয়ামত সম্বন্ধে বিভিন্ন মত পোষণ করে থাক। ওটা হতে ঐ ব্যক্তিই নিরস্ত থাকে, যে (সম্পূর্ণরূপে মঙ্গল হতে) বিরত থাকতে চায়।” (৫১:৮-৯) মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! যদি তারা শয়তান হয়ে বিভ্রান্ত করতে থাকে এবং লোকেরা তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তারা যা উপার্জন করতে রয়েছে তা তাদেরকে উপার্জন করতে দাও।

আল-আনআম 6:114

১১৪-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ্ স্বীয় নবীকে সম্বোধন করে বলেছেন, হে নবী (সঃ)! তুমি এই মুশরিকদেরকে বলে দাও- আমি কি আমার ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকেও বিচারক ও মীমাংসাকারী রূপে অনুসন্ধান করবো? অথচ তিনি তোমাদের কাছে একটি বিস্তারিতভাবে লিখিত কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। শুধু তোমাদের জন্যে নয়, বরং এই কিতাব তিনি আহলে কিতাবদের জন্যেও অবতীর্ণ করেছেন। ইয়াহুদী ও নাসারা সবাই এটা জানে যে, এই কিতাব সত্য সত্যই আল্লাহ তা'আলার নিকট থেকেই অবতীর্ণ হয়েছে। কেননা, তোমাদের ব্যাপারে তাদের কিতাবে পূর্ববর্তী নবীদের শুভ সংবাদ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং তোমরা সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়ো না। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তোমার উপর যা অবতীর্ণ করেছি তাতে যদি তোমার কোন সন্দেহ হয় তবে তোমার পূর্ববর্তী কিতাবের যারা পাঠক তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, তোমার কাছে আমার পক্ষ থেকে সত্য জিনিসই এসেছে, সুতরাং তুমি সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” এই আয়াতটি শর্তরূপে এসেছে, আর শর্ত প্রকাশিত হওয়া জরুরী নয়। এ জন্যেই নবী (সঃ) বলেনঃ “আমি সন্দেহও করি না এবং জিজ্ঞেস করারও আমার প্রয়োজন নেই।”(আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তোমার প্রভুর বাণী সত্যতা ও ইনসাফের দিক দিয়ে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। যা কিছু তিনি বলেন তার সবই সত্য। তা যে সত্য এতে কোন সন্দেহই থাকতে পারে না। আর যা কিছু তিনি হুকুম করেন তা ইনসাফ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। তিনি যা থেকে বিরত থাকতে বলেন তা বাতিল ও ভিত্তিহীনই হয়ে থাকে। তিনি খারাপ ও অন্যায় থেকেই বিরত থাকতে বলেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি তাদেরকে ভাল কাজের আদেশ করেন এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করেন।” (৭:১৫৭)। (আরবী) অর্থাৎ দুনিয়া ও আখিরাতে তার হুকুম পরিবর্তনকারী কেউই নেই। তিনি স্বীয় বান্দাদের কথা শুনে থাকেন এবং তাদের সমুদয় কাজ সম্পর্কে তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। প্রত্যেক আমলকারীর আমলের বিনিময় তিনি আমল অনুযায়ীই দিয়ে থাকেন।

আল-আনআম 6:115

১১৪-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ্ স্বীয় নবীকে সম্বোধন করে বলেছেন, হে নবী (সঃ)! তুমি এই মুশরিকদেরকে বলে দাও- আমি কি আমার ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকেও বিচারক ও মীমাংসাকারী রূপে অনুসন্ধান করবো? অথচ তিনি তোমাদের কাছে একটি বিস্তারিতভাবে লিখিত কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। শুধু তোমাদের জন্যে নয়, বরং এই কিতাব তিনি আহলে কিতাবদের জন্যেও অবতীর্ণ করেছেন। ইয়াহুদী ও নাসারা সবাই এটা জানে যে, এই কিতাব সত্য সত্যই আল্লাহ তা'আলার নিকট থেকেই অবতীর্ণ হয়েছে। কেননা, তোমাদের ব্যাপারে তাদের কিতাবে পূর্ববর্তী নবীদের শুভ সংবাদ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং তোমরা সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়ো না। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তোমার উপর যা অবতীর্ণ করেছি তাতে যদি তোমার কোন সন্দেহ হয় তবে তোমার পূর্ববর্তী কিতাবের যারা পাঠক তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, তোমার কাছে আমার পক্ষ থেকে সত্য জিনিসই এসেছে, সুতরাং তুমি সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” এই আয়াতটি শর্তরূপে এসেছে, আর শর্ত প্রকাশিত হওয়া জরুরী নয়। এ জন্যেই নবী (সঃ) বলেনঃ “আমি সন্দেহও করি না এবং জিজ্ঞেস করারও আমার প্রয়োজন নেই।”(আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তোমার প্রভুর বাণী সত্যতা ও ইনসাফের দিক দিয়ে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। যা কিছু তিনি বলেন তার সবই সত্য। তা যে সত্য এতে কোন সন্দেহই থাকতে পারে না। আর যা কিছু তিনি হুকুম করেন তা ইনসাফ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। তিনি যা থেকে বিরত থাকতে বলেন তা বাতিল ও ভিত্তিহীনই হয়ে থাকে। তিনি খারাপ ও অন্যায় থেকেই বিরত থাকতে বলেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি তাদেরকে ভাল কাজের আদেশ করেন এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করেন।” (৭:১৫৭)। (আরবী) অর্থাৎ দুনিয়া ও আখিরাতে তার হুকুম পরিবর্তনকারী কেউই নেই। তিনি স্বীয় বান্দাদের কথা শুনে থাকেন এবং তাদের সমুদয় কাজ সম্পর্কে তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। প্রত্যেক আমলকারীর আমলের বিনিময় তিনি আমল অনুযায়ীই দিয়ে থাকেন।

আল-আনআম 6:116

১১৬-১১৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ বানী আদমের অধিকাংশের অবস্থা বিভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) “তাদের পূর্ববর্তী লোকদের অধিকাংশই ভ্রান্তির পথ অবলম্বন করেছিল।” (৩৭:৭১) আর এক জায়গায় তিনি বলেন, (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তুমি আকাক্ষা করলেও লোকদের অধিকাংশই মুমিন নয়।” (১২:১০৩) তারা ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। মজার কথা এই যে, তাদের আমলের উপর তাদের নিজেদেরই বিশ্বাস নেই। তারা মিথ্যা ধারণার উপর বিভ্রান্ত হয়ে ফিরতে রয়েছে। তারা অনুমানে কথা বলছে এবং সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়েছে।(আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে আন্দাজ ও অনুমান করা। বৃক্ষ ও চারা গাছের অনুমান করাকে বলা হয় (আরবী) বা খেজুর গাছের অনুমান করণ। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও অনুমান এই যে, তিনি স্বীয় পথ হতে বিভ্রান্ত পথিককে ভালভাবেই জানেন। এ জন্যেই তিনি তার পক্ষে বিভ্রান্ত হওয়াকে সহজ করে দেন। আর যারা সুপথ প্রাপ্ত, তিনি তাদের সম্পর্কেও পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তিনি তাদের জন্যেও হিদায়াতকে সহজ করে দেন। যে জিনিস যার জন্যে সমীচীন তাই তিনি তার জন্যে সহজ করে থাকেন।

আল-আনআম 6:117

১১৬-১১৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ বানী আদমের অধিকাংশের অবস্থা বিভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) “তাদের পূর্ববর্তী লোকদের অধিকাংশই ভ্রান্তির পথ অবলম্বন করেছিল।” (৩৭:৭১) আর এক জায়গায় তিনি বলেন, (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তুমি আকাক্ষা করলেও লোকদের অধিকাংশই মুমিন নয়।” (১২:১০৩) তারা ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। মজার কথা এই যে, তাদের আমলের উপর তাদের নিজেদেরই বিশ্বাস নেই। তারা মিথ্যা ধারণার উপর বিভ্রান্ত হয়ে ফিরতে রয়েছে। তারা অনুমানে কথা বলছে এবং সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়েছে।(আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে আন্দাজ ও অনুমান করা। বৃক্ষ ও চারা গাছের অনুমান করাকে বলা হয় (আরবী) বা খেজুর গাছের অনুমান করণ। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও অনুমান এই যে, তিনি স্বীয় পথ হতে বিভ্রান্ত পথিককে ভালভাবেই জানেন। এ জন্যেই তিনি তার পক্ষে বিভ্রান্ত হওয়াকে সহজ করে দেন। আর যারা সুপথ প্রাপ্ত, তিনি তাদের সম্পর্কেও পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তিনি তাদের জন্যেও হিদায়াতকে সহজ করে দেন। যে জিনিস যার জন্যে সমীচীন তাই তিনি তার জন্যে সহজ করে থাকেন।

আল-আনআম 6:118

১১৮-১১৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দারদেরকে অনুমতি দিচ্ছেন যে, কোন জীবকে যবাই করার সময় বিসমিল্লাহ বলা হলে তারা সেই জীবের গোশত খেতে পারে। অর্থাৎ যে জন্তুকে আল্লাহর নাম না নিয়ে যবাই করা হয় তা হারাম। যেমন কাফির কুরায়শরা মৃত জন্তুকে ভক্ষণ করতো এবং যে জন্তুগুলোকে মূর্তি ইত্যাদির নামে যবাই করা হতো সেগুলোকেও খেতো। মহান আল্লাহ বলেন, যে জন্তুর উপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তা তোমরা খাবে না কেন? তিনি তো হারাম জিনিসগুলো তোমাদের জন্যে বর্ণনা করে দিয়েছেন এবং স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ ফাস্সালা অর্থাৎ তাশদীদসহ পড়েছেন এবং কেউ কেউ ফাসালা অর্থাৎ তাখফীফসহ পড়েছেন। দু'টোরই অর্থ হচ্ছে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা। আল্লাহ পাক বলেনঃ তবে হ্যা, অত্যন্ত নিরুপায় অবস্থায় পতিত হলে সবকিছুই তোমাদের জন্যে হালাল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মতবাদের উল্লেখ করে বলেনঃ তারা কিভাবে নিজেদের জন্যে এবং গায়রুল্লাহর নামে যবাইকৃত জন্তুকে হালাল করে নিয়েছে! তাদের অধিকাংশই অজ্ঞতার কারণে স্বীয় কুপ্রবৃত্তির পিছনে পড়ে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। আল্লাহ ঐ সব সীমা অতিক্রমকারীকে ভালরূপেই অবগত আছেন।

আল-আনআম 6:119

১১৮-১১৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দারদেরকে অনুমতি দিচ্ছেন যে, কোন জীবকে যবাই করার সময় বিসমিল্লাহ বলা হলে তারা সেই জীবের গোশত খেতে পারে। অর্থাৎ যে জন্তুকে আল্লাহর নাম না নিয়ে যবাই করা হয় তা হারাম। যেমন কাফির কুরায়শরা মৃত জন্তুকে ভক্ষণ করতো এবং যে জন্তুগুলোকে মূর্তি ইত্যাদির নামে যবাই করা হতো সেগুলোকেও খেতো। মহান আল্লাহ বলেন, যে জন্তুর উপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তা তোমরা খাবে না কেন? তিনি তো হারাম জিনিসগুলো তোমাদের জন্যে বর্ণনা করে দিয়েছেন এবং স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ ফাস্সালা অর্থাৎ তাশদীদসহ পড়েছেন এবং কেউ কেউ ফাসালা অর্থাৎ তাখফীফসহ পড়েছেন। দু'টোরই অর্থ হচ্ছে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা। আল্লাহ পাক বলেনঃ তবে হ্যা, অত্যন্ত নিরুপায় অবস্থায় পতিত হলে সবকিছুই তোমাদের জন্যে হালাল।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মতবাদের উল্লেখ করে বলেনঃ তারা কিভাবে নিজেদের জন্যে এবং গায়রুল্লাহর নামে যবাইকৃত জন্তুকে হালাল করে নিয়েছে! তাদের অধিকাংশই অজ্ঞতার কারণে স্বীয় কুপ্রবৃত্তির পিছনে পড়ে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। আল্লাহ ঐ সব সীমা অতিক্রমকারীকে ভালরূপেই অবগত আছেন।

আল-আনআম 6:120

ইরশাদ হচ্ছে- তোমরা প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত পাপকার্য পরিত্যাগ কর। মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা ঐ পাপকার্যকে বুঝানো হয়েছে যা কার্যে পরিণত করার নিয়ত কোন আমলকারী করেছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা গোপনীয় ও প্রকাশ্য এবং কম বেশী গুনাহের কাজ বঝানো হয়েছে । সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, প্রকাশ্য পাপ হচ্ছে লজ্জাহীনা নারীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা, আর গোপনীয় পাপকার্য হচ্ছে গুপ্তভাবে অসতী নারীদের সাথে কুকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়া। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, প্রকাশ্য পাপকার্য হচ্ছে বিবাহ-নিষিদ্ধ নারীদেরকে বিয়ে করা। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, আয়াতটি আম বা সাধারণ । এটা কোন পাপকার্যকেই নির্দিষ্ট করে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আমার প্রতিপালক সর্ব প্রকারের নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজকে হারাম করে দিয়েছেন, সেগুলো প্রকাশ্যভাবেই হাক বা গোপনীয়ভাবেই হাক। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন, যারা পাপের কাজ করে, তাদেরকে সত্বরই তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল দেয়া হবে, সেই কাজ প্রকাশ্যভাবেই হাক বা গোপনীয়ভাবেই হাক। নুওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবী) এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “যাতে তোমার অন্তরে খটকা লাগে এবং তুমি এটা পছন্দ কর না যে, লোকের কাছে তা প্রকাশ হয়ে পড়ুক তাই (আরবী) বা গুনাহ।” (এই হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) নুওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)

আল-আনআম 6:121

এই আয়াতে এটাই বলা হয়েছে যে, যখন কোন জন্তুকে যবাই করার সময় আল্লাহর নাম নেয়া হবে না তখন সেটা হালাল নয়, যদিও যবাইকারী মুসলমান হয়। ফিকাহ্ শাস্ত্রের ইমামগণ এই মাসআলায় তিনটি উক্তির উপর মতভেদ করেছেন। কেউ বলেছেন যে, যে যবাইকৃত জন্তুর উপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি সেটা হালাল নয়, নাম না নেয়া ইচ্ছাপূর্বকই হাক বা ভুল বশতঃই হোক।” (এটা ইবনে উমার (রাঃ), শাবী (রাঃ), নাফি’ (রঃ) এবং মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে) আসহাবে মুতাকাদ্দেমীন ও মুতাআখখেরীনের একটি দল এ উক্তিকেই সমর্থন করেছেন। পরবর্তী শাফিঈ মাযহাবের লোকেরা তাঁদের ‘আরবাঈন’ নামক গ্রন্থে এই মতটাই গ্রহণ করেছেন। দলীল হিসেবে তারা এ আয়াতটিই পেশ করেছেন। আরও পেশ করেছেন শিকার সম্পর্কীয় নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের শিকারীজন্তু তোমাদের জন্যে যা আবদ্ধ রাখে তা তোমরা খাও এবং ওর উপর আল্লাহর নাম নিয়ে নাও।” (৫:৪) মহান আল্লাহ (আরবী) দ্বারা আরও গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং বলা হয়েছে যে, (আরবী)-এর (আরবী) সর্বনামটি (আরবী)-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছে। অর্থাৎ এরূপ যবাইকত জন্তু খাওয়া গর্হিত কাজ। আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, (আরবী) -এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ গায়রুল্লাহর নামে যবাই করা গর্হিত কাজ। আর যবাই করা ও শিকার করার সময় আল্লাহর নাম নেয়ার যে হাদীসগুলো এসেছে। সেগুলো হচ্ছে আদী ইবনে হাতিম ও আবু সা'লাবা বর্ণিত হাদীসের মতই। তা হচ্ছে নিম্নরূপঃ“যখন তোমরা তোমাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরকে শিকারের উদ্দেশ্যে পাঠাবে এবং পাঠাবার সময় বিসমিল্লাহ বলবে তখন যদি কুকুর তোমাদের জন্যে শিকারকে ধরে রাখে এবং তা থেকে কিছুই না খায় তবে তা তোমরা খেতে পার, যদিও তা যখমী হয়ে মারা যায়।” হাদীসটি সহীহ বুখারী ও মুসলিমেও রয়েছে। রাফি’ ইবনে খাদীজ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন“যা রক্ত প্রবাহিত করে এবং আল্লাহর নাম নেয়া হয় তা তোমরা খাও।” এই হাদীসটিও সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জ্বিনদেরকে বলেনঃ “তোমাদের জন্যে প্রত্যেক সেই অস্থি বা হাড্ডি হালাল যার উপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে।” (হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত জুনদুব ইবনে সুফিয়ান (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- ঈদ-উল-আযহার দিনে যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের পূর্বে কুরবানী করলো, তার উচিত যে, সে যেন ঈদের নামাযের পর পুনরায় কুরবানীর পশু যবাই করে। আর যে ব্যক্তি নামাযের পূর্বে কুরবানী করেনি সে যেন নামাযের পর আল্লাহর নাম নিয়ে কুরবানীর পশু যবাই করে।”হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকেরা আমাদের কাছে গোশতের উপঢৌকন পাঠিয়ে থাকে, তারা যে ওর উপর আল্লাহর নাম নিয়েছে কি নেয়নি তা আমাদের জানা নেই (সুতরাং তা খাওয়া আমাদের জন্যে বৈধ হবে কি?)।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেন, “যদি তোমাদের সন্দেহ হয় তবে তোমরা নিজেরাই আল্লাহর নাম নিয়ে তা খেয়ে নাও।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, ঐ লোকগুলো নওমুসলিম ছিল। (এই হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) জনগণের জিজ্ঞেস করার কারণ এই যে, তাদের ধারণায় বিসমিল্লাহ বলা তো জরুরী, কিন্তু লোকগুলো নওমুসলিম হওয়ার কারণে বিসমিল্লাহ নাও বলে থাকতে পারে। তাই তারা জিজ্ঞেস করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সতর্কতামূলকভাবে খাওয়ার সময় তাদেরকে বিসমিল্লাহ বলার উপদেশ দেন, যাতে ওর উপর বিসমিল্লাহ বলা না হয়ে থাকলেও খাওয়ার সময় বিসমিল্লাহ বলে নেয়া ওর বিনিময় হয়ে যায়। আর তিনি জনগণকে নির্দেশ দেন যে, ঠিকভাবে যেন ইসলামের আহকাম জারী হয়ে যায়। দ্বিতীয় মাযহাব এই যে, যবাই করার সময় বিসমিল্লাহ বলা মোটেই শর্ত নয়, বরং মুস্তাহাব। যদি ইচ্ছাপূর্বক বা ভুলবশতঃ আল্লাহর নাম না নেয়াও হয় তবুও কোন ক্ষতি নেই। এটাই ইমাম শাফিঈর মাযহাব। ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম মালিকও (রঃ) এ কথাই বলেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ) (আরবী) -এই আয়াতকে (আরবী)-এর উপর করেছেন। যেমন আল্লাহ পাকের (আরবী) এই উক্তি রয়েছে। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেছেন যে, এখানে খেতে নিষেধ করণ দ্বারা ঐ যবাইকৃত জন্তু উদ্দেশ্য যাকে কুরায়েশরা মূর্তির জন্যে যবাই করে। অনুরূপভাবে মাজুসদের যবাইকৃত জীবও হালাল নয়। এটাই ঐ মাযহাব যার উপর ইমাম শাফিঈ (রঃ) চলেছেন এবং এটাই মজবুতও বটে । পরবর্তী কোন কোন মনীষী এই উক্তিটিকে এভাবে মজবুত বানাবার চেষ্টা করেছেন যে, (আরবী)-এর (আরবী) টি (আরবী) রূপে এসেছে। অর্থাৎ আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি এরূপ যবাইকৃত জীব তোমরা খেয়ো না, অবস্থা এই যে, এটা হচ্ছে গর্হিত কাজ। আর গর্হিত বস্তু হচ্ছে ওটাই যাকে গায়রুল্লাহর নামে যবাই করা হয়। তারপর এই দাবী করা হয়েছে যে, এটা নির্দিষ্ট (আরবী) এবং (আরবী) টি সংযোগকারী (আরবী) হওয়া বৈধ নয়। কেননা এই অবস্থায়। (আরবী) -এর বা সংযোগ -এর উপর অবশ্যম্ভাবী হয়ে যাবে। আর এটা ভুল । কেননা এই দলীল এর পরের বাক্য (আরবী) দ্বারা ভেঙ্গে যাচ্ছে। কারণ এখানে তো নিশ্চিত রূপেই বা সংযোগ আছে। তাহলে যেভাবে পূর্ববর্তী (আরবী) কে (আরবী) বলা হয়েছে সেভাবেই যদি একেও (আরবী) মেনে নেয়া হয় তবে এর উপর এই বাক্যের সংযোগ অবৈধ হবে। আর যদি এর পূর্বের (আরবী)এর উপর (আরবী) বা সংযোগ স্থাপন করা হয় তবে যে প্রতিবাদ এরা অন্যদের উপর আনয়ন করেছেন সেই প্রতিবাদ তাদের নিজেদের উপরই প্রত্যাবর্তিত হবে। তবে হ্যা, যদি এই (আরবী) কে (আরবী) না মানা হয় তবে এ প্রতিবাদ মিটে যেতে পারে। কিন্তু যে দাবী করা হচ্ছিল তা সম্পূর্ণরূপে বাতিল হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, এর দ্বারা ঐ মৃতজন্তুকে বুঝানো হয়েছে যে আপনা আপনিই মারা গেছে। এই মাযহাবের সমর্থনে ইমাম আবু দাউদ (রঃ)-এর একটি মুরসাল হাদীসও রয়েছে যাতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“মুসলমান কর্তৃক যবাইকৃত জন্তু হালাল, সে ওর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করুক বা না-ই করুক তা সে খেতে পারে। কেননা, সে নাম নিলে আল্লাহরই নাম নিতো।” এ হাদীসটি মুরসাল। তবে এর পৃষ্ঠপোষকতায় দারে কুতনীর একটি হাদীস রয়েছে যা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“যদি মুসলমান যবাই করে এবং সে আল্লাহর নাম নাও নেয় তবুও সে তা খেতে পারে। কেননা, সেই মুসলমান স্বয়ং যেন আল্লাহরই একটা নাম।” সে যখন যবাই করে তখন তার নিয়ত এটাই থাকে যে, সে আল্লাহর নামে যবাই করছে। ইমাম বায়হাকী (রঃ)-ও পূর্ব বর্ণিত হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হাদীস থেকেই দলীল গ্রহণ করেছেন যে, জনগণ জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নওমুসলিম লোকেরা আমাদের কাছে গোশতের উপঢৌকন নিয়ে আসে। তারা (যবাই করার সময়) ওর উপর আল্লাহর নাম নেয় কি নেয় না তা আমরা জানি না (সুতরাং তা আমরা খেতে পারি কি-না?)।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে তাদেরকে বলেন,“তোমরা (খাওয়ার সময়) আল্লাহর নাম নিয়ে খেয়ে নাও।” কাজেই বুঝা গেল যে, যদি আল্লাহর নাম নিয়ে নেয়া জরুরীই হতো তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রকৃত তত্ত্ব অনুসন্ধান করা ছাড়া ঐ গোত খাওয়ার অনুমতি দিতেন না। আল্লাহ পাকই সবচেয়ে বেশী জানেন। এই মাসআলায় তৃতীয় উক্তি এই যে, যবাইকৃত জীবের উপর যদি বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে যায় তবে তা ভক্ষণে কোন দোষ নেই। আর যদি ইচ্ছাপূর্বক বিসমিল্লাহ ছেড়ে দেয় তবে তা খাওয়া বৈধ হবে না। ইমাম মালিক (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর প্রসিদ্ধ মাযহাব এটাই। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তার সহচরবৃন্দেরও এটাই উক্তি। ইমাম আবুল হাসান তাঁর হিদায়া’ নামক গ্রন্থে লিখেছেনঃ “ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর পূর্বে এর উপর ইজমা ছিল যে, ইচ্ছাপূর্বক বিসমিল্লাহ ছেড়ে দেয়া হলে তা হারাম। এ জন্যে ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ) ও অন্যান্য গুরুজন বলেছেন যে, যদি কোন শাসনকর্তা এরূপ যবাইকৃত জন্তুর গোশত বেচা কেনার অনুমতি দেয় তবে তা মান্য করা চলবে না। কেননা, এতে ইজমায়ে উম্মতের বিরোধিতা করা হবে। আর ইজমায়ে উম্মতের বিরোধিতার সাথে কোন কিছুই বৈধ হতে পারে না। হিদায়া গ্রন্থকারের এ কথা বিস্ময়করই বটে। কেননা, ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর পূর্বেও এরূপ মতভেদ হওয়া প্রমাণিত আছে। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।ইমাম জাফর ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেছে এমন ব্যক্তির যবাইকৃত গোশত খাওয়াকে যে হারাম বলে সে হুজ্জতের সমস্ত উক্তি হতে বেরিয়ে পড়লো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে যে হাদীসটি বর্ণিত আছে তার বিরোধিতা করলো। হাদীসটি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনমুসলমানের জন্যে স্বয়ং তার মুসলমান হওয়াটাই যথেষ্ট, সুতরাং যদিও সে ভুলবশতঃ যবাই করার সময় বিসমিল্লাহ না বলে তবুও তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে তা খেতে পার।” এই হাদীসটিকে (আরবী) বলা হয়েছে এবং অন্যেরা একে দৃঢ় করেছেন। এর দ্বারা এটা সাব্যস্ত হচ্ছে যে, এ হাদীসটিকে মারফু বলে তুল করেছেন মাকাল ইবনে উবাইদুল্লাহ আল জাযারী। ইমাম বায়হাকী (রঃ)-এর উক্তি অনুসারে এই বর্ণনাটিই বিশুদ্ধতম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর নীতি এই যে, তিনি এমন দু’একটি উক্তির প্রতি মোটেই সম্মান প্রদর্শন করেন না যা জমহুরের উক্তির বিপরীত হয় এবং ঐ ইজমাকেই তিনি আমলের যোগ্য মনে করে থাকেন। একটি লোক হাসান বসরী (রঃ)-কে নিম্নের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করেঃ “একটি লোকের কাছে জবাইকৃত অনেক পাখী নিয়ে আসা হয়। ও গুলির মধ্যে কতকগুলোর উপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছিল এবং কতকগুলোর উপর ভুলবশতঃ নাম নেয়া হয়নি। আর এই পাখীগুলো পরস্পর মিশ্রিত হয়ে গিয়েছিল (এখন ওগুলোর মাংস হালাল হবে কি?)” হযরত হাসান বসরী (রঃ) উত্তরে বলেন, “তোমরা সবগুলোই খেতে পার।”মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ)-কে এই প্রশ্নই করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “যেগুলোর উপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি সেগুলো তোমরা খেয়ো না। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন (আরবী) অর্থাৎ “যার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি তা তোমরা খেয়ো না।” আর ইবনে মাজায় যে হাদীসটি রয়েছে ওকে তিনি স্বীয় ফতওয়ার দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ এই তৃতীয় মাযহাবের দলীলরূপে নিম্নের হাদীসটিকেও পেশ করা হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “আল্লাহ আমার উম্মতের উপর থেকে ভুল ও বিস্মৃতিকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং বাধ্য হয়ে কৃত ভুল ও অপরাধকেও মাফ করেছেন।” কিন্তু এটা চিন্তাযযাগ্য বিষয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আমাদের মধ্যকার কোন লোক যবাই করে এবং বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে যায় তবে হুকুম কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “মুসলমানদের মুসলমান হওয়াটাই যথেষ্ট। সে স্বয়ং তো আল্লাহর নাম বা প্রত্যেক মুসলমানের উপর আল্লাহর নাম রয়েছে। কিন্তু এই হাদীসটির ইসনাদ দুর্বল। এর বর্ণনাকারী হচ্ছে মারওয়ান ইবনে সালিম ও আবু আবদিল্লাহ শামী। এদের সম্পর্কে বহু ইমাম সমালোচনা করেছেন। এই মাসআলার উপর আমি একটি পৃথক রিসালা লিখেছি এবং তাতে ইমামদের মাযহাব, ওর উৎস, তাদের দলীল ইত্যাদি সবকিছুর উপরই আলোকপাত করেছি। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।ইবনে জারীর (রঃ) বলেন, আহলুল ইলম এ ব্যাপারে মতভেদ করেছেন যে, এই আয়াতের হুকুম কি মানসূখ বা রহিত কি-না? কেউ কেউ বলেন যে, হুকুম মানসূখ নয় বরং এর হুকুম বাকী আছে এবং তা আমলের যোগ্য। মুজাহিদ (রঃ) ও সাধারণ আহলুল ইলমের এটাই উক্তি । যদি হুকুম মানসূখ হতো তবে মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখের উক্তি এটা হতো না। ইকরামা (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন-যার উপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তা তোমরা খাও যদি তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহের উপর ঈমান এনে থাক। এই জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ যার উপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি তা তোমরা খেয়ো না, কেননা এটা গর্হিত বস্তু। অতএব, এই আয়াতটি মানসূখ, কিন্তু নিম্নের আয়াতটি এর থেকে স্বতন্ত্র।(আরবী) অর্থাৎ “আহলে কিতাবের খাদ্য তোমাদের জন্যে হালাল এবং তোমাদের খাদ্য তাদের জন্যে হালাল।” (৫:৫) ইবনে আবি হাতিমের উক্তি এই যে, আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে বলেছেন- যার উপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি তা তোমরা খেয়ো না। অতঃপর এটা তিনি মানসূখ করতঃ মুসলমানদের উপর দয়া করেছেন এবং এর পর তিনি বলেছেন, এখন সমস্ত পবিত্র জিনিস তোমাদের জন্যে বৈধ করা হলো। এবং আহলে কিতাবের যবাইকৃত জীবও তোমাদের জন্যে হালাল। সুতরাং প্রথম হুকুমকে তিনি এই আয়াত দ্বারা মানসূখ করলেন এবং আহলে কিতাবের যবাইকৃত জীবও হালাল ঘোষণা করলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন-সঠিক কথা তো এটাই যে, আহলে কিতাবের খাদ্য হালাল হওয়া এবং আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি এমন যবাইকৃত জীব হারাম হওয়ার মধ্যে পরস্পর কোন বৈপরীত্য নেই। এই বর্ণনাটিই বিশুদ্ধ হওয়ার দাবীদার। আর যিনি একে মানসূখ বলেছেন তিনি এটাকে খাস বা নির্দিষ্ট করে নিয়েছেন মাত্র, এ ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “শয়তানরা তাদের বন্ধুদের কাছে তাদের কথাগুলো অহী করে থাকে, উদ্দেশ্য এই যে, তারা (তাদের বন্ধুরা) যেন তোমাদের (মুসলমানদের) সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে পারে। একটি লোক হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-কে বললোঃ মুখতারের এই দাবী যে, তার কাছে না কি অহী আসে? হযরত ইবনে উমার (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ ‘সে সত্য কথাই বলেছে। অতঃপর তিনি (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। আবু যামীল হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি একদা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে বসেছিলাম। সেই সময় মুখতার হজ্ব করতে এসেছিল। তখন একটি লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে এসে বলে- “হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! আবু ইসহাক (অর্থাৎ মুখতার) ধারণা করছে যে, আজ রত্রে নাকি তার কাছে অহী এসেছে।” এ কথা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস (ৰাঃ) বলেন, “সে সত্য কথাই বলেছে।” আমি তখন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম এবং মনে মনে ভাবলাম যে, ইবনে আব্বাস (রাঃ) তাকে সত্যায়িত করছেন! অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, “অহী দু’ প্রকার। একটি হচ্ছে আল্লাহর অহী এবং অপরটি হচ্ছে শয়তানের অহী । আল্লাহর অহী আসে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট এবং শয়তানের অহী এসে থাকে তার বন্ধুদের নিকট ।” তারপর উপরোক্ত আয়াতটিই পাঠ করেন। ইকরামা (রঃ) হতে অনুরূপ উক্তিও পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলার (আরবী) -এ উক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে। নবী (সঃ)-এর সাথে ঝগড়া করতো এবং বলতোঃ “এটা কি বিস্ময়কর ব্যাপার যে, যে জীবকে আমরা হত্যা করবো সেটা আমরা খেতে পারবো, আর আল্লাহ যেটা হত্যা করবেন সেটা আমরা খেতে পারবো না।” তখন (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এটাকে 'মুরসাল’ রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) মুত্তাসিল' রূপেই বর্ণনা করেছেন। কয়েকটি কারণে এটা চিন্তার ব্যাপার। প্রথমতঃ ইয়াহূদীরা মৃত প্রাণীকে তো খাওয়া বৈধই মনে করতো না। তাহলে এই ব্যাপারে তারা কেনই বা মতবিরোধ করতে যাবে। দ্বিতীয়তঃ এই আয়াতটি সূরায়ে আনআমে রয়েছে আর সূরায়ে আনআম হচ্ছে মক্কী সূরা। অথচ ইয়াহুদীরা বাস করতো মদীনায়। তৃতীয়তঃ এই হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, লোকেরা অর্থাৎ ইয়াহূদীরা নবী (সঃ)-এর কাছে এসেছিল। তারপর তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেন। আর এটা বিস্ময়কর কথাই বটে! হাসান (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি ‘গারীব'। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা একটা মুরসাল হাদীস। তিবরানী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন-“যে যবাইকৃত জীবের উপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি তা তোমরা খেয়ো না।' যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন পারস্যবাসী মক্কায় কুরায়েশদেরকে লিখে পাঠায়ঃ “মুহাম্মাদের সাথে তোমরা এ বিষয়ে তর্ক বিতর্ক কর এবং তাকে বল- যে জীবকে তোমরা ছুরি দিয়ে হত্যা করলে তা হালাল হলো, আর যেটাকে আল্লাহ স্বীয় সোনালী তরবারী দিয়ে হত্যা করলেন সেটা হারাম হয়ে গেল, এটা কি ধরনের কথা?” সেই সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলো- শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে শিখিয়ে থাকে যে, তারা যেন মুসলমানদের সাথে সদা সর্বদা ঝগড়া-বিবাদ ও তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত থাকে। সুতরাং হে মুসলমানরা! যদি তোমরা তাদের কথা মত মৃতকেও হালাল মনে করতে থাক তবে তোমরাও মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। ভাবার্থ এই যে, পারস্যের শয়তানরা কুরায়েশদের কাছে অহী পাঠাতো। ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীসে ইয়াহুদীদের উল্লেখ নেই এবং প্রতিবাদ থেকে বাঁচবার একমাত্র রূপ এটাই। কেননা, আয়াতটি মক্কী এবং এটাও যে, ইয়াহূদীরা তো মৃতকে পছন্দ করতো না। আবার কোন কোন শব্দে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে- “তোমরা যে জীবকে নিজেরা হত্যা কর তার উপর আল্লাহর নাম থাকে এবং যা নিজে নিজেই মরে যায় ওর উপর আল্লাহর নাম থাকে না (এটা কেমন কথা)!” পারস্যবাসীর শিকানোর ফলে মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের কাছে যখন এই প্রতিবাদ করলো তখন মুসলমানদের অন্তরে একটা সন্দেহ জেগে উঠলো, সেই সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হলো। সুদ্দী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, মুশরিকরা মুসলমানদেরকে বলেছিল-“তোমরা এই দাবী তো করছো যে, তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টিই কামনা কর, অথচ আল্লাহর হত্যাকৃত জীব তোমরা খাও না, কিন্তু নিজের হত্যাকৃত জীব খাচ্ছ।” তাই আল্লাহ বলছেনঃ তোমরা যদি তাদের দলীলের প্রতারণায় পড়ে যাও তবে তোমরাও মুশরিক হয়ে যাবে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের নেতা ও পুরোহিতদেরকে নিজেদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে (এবং তাদেরই ইবাদত করতে শুরু করেছে)।” (৯:৩১) তখন আদী ইবনে হাতিম (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা ঐ পুরোহিত নেতাদের তো ইবাদত করে না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ঐ নেতা ও পুরোহিতরা হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করে দিয়েছে, আর ঐ লোকগুলো এদের কথা মেনে নিয়েছে। এটাই হচ্ছে তাদের ইবাদত করা।”

আল-আনআম 6:122

এটা আল্লাহ তাআলা দৃষ্টান্ত হিসাবে বর্ণনা করেছেন যে, মুমিন ব্যক্তি, যে প্রথমে মৃত ছিল অর্থাৎ পথভ্রষ্টতায় ধ্বংসপ্রাপ্ত ও হয়রান-পেরেশান ছিল, তাকে তিনি জীবিত করলেন, অর্থাৎ তার অন্তরে ঈমানরূপ সম্পদ দান করলেন এবং রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণ করার তাওফীক প্রদান করলেন। তার জন্যে তিনি একটা নূর বা আলোকের ব্যবস্থা করলেন, যার সাহায্যে সে পথ চলতে পারছে। এই কুরআন নূর বা আলোকই বটে। এই মুমিন কি ঐ ব্যক্তির মত হতে পারে যে স্বীয় অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির অন্ধকারে নিমজ্জিত রয়েছে? সে সেই অন্ধকার। থেকে কোনক্রমেই বের হতে পারছে না বা সেখান থেকে বের হওয়া তার জন্যে কখনও সম্ভবই নয়? যেমন নবী (সঃ) বলেছেন- “আল্লাহ তাআলা স্বীয় মাখলুককে অন্ধকারের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি ওর উপর আলো বর্ষণ করেছেন। যে ব্যক্তি ঐ নূর বা আলো পেয়ে গেলো সে হিদায়াত লাভ করলো। আর যে ওটা পেলো না সে দুনিয়াতে পথভ্রষ্টই থেকে গেলো। (এটা তিবরানী (রঃ) হাকাম ইবনে আবান (রঃ)-এর হাদীস হতে বর্ণনা করেছেন) যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “আল্লাহ ঐ লোকদের ওলী বা অভিভাবক, যারা ঈমান এনেছে, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোকের দিকে নিয়ে আনেন, আর যারা কাফির হয়েছে, তাদের ওলী হচ্ছে শয়তানের দল, তারা তাদেরকে আলো হতে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়, এই প্রকারের লোকই জাহান্নামবাসী, তারা ওর মধ্যে অনন্তকাল অবস্থান করবে।” আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “যে ব্যক্তি (হোঁচট খেয়ে) উপুড় হয়ে পড়তে পড়তে (পথ) চলছে, সে কি গন্তব্যস্থানে তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারে, না সেই ব্যক্তি, যে সোজা এক সমতল পথে গমন করছে?” মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ “দু' প্রকারের লোকদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এইরূপ যে, একজন অন্ধ ও বধির এবং অন্যজন চক্ষু ও কর্ণ বিশিষ্ট, এ দু’জন কি সমান হতে পারে? তোমরা কি এটা মোটেই বুঝছো না?” তিনি আর এক জায়গায় বলেনঃ “অন্ধ ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি সমান হতে পারে না এবং সমান হতে পারে না অন্ধকার ও আলো, ছায়া ও (রৌদ্রের) প্রখরতা, আর সমান হতে পারে না জীবিত ও মৃত, আল্লাহ যাকে চান তাকে শুনিয়ে থাকেন এবং যে ব্যক্তি কবরে রয়েছে তাকে তুমি শুনাতে পার না। তুমি তো শুধুমাত্র ভয় প্রদর্শক।” এই বিষয়ের উপর কুরআন কারীমের বহু আয়াত রয়েছে। এই দৃষ্টান্তগুলোতে হচ্ছে আলো ও অন্ধকার, সূরার প্রথমে এই দৃষ্টান্ত দ্বারাই সূচনা করা হয়েছে অর্থাৎ দ্বারা শুরু করা হয়েছে।কারও কারও ধারণা এই যে, এই দৃষ্টান্ত দ্বারা দু’টি নির্দিষ্ট লোককে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং বলা হয়েছে যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) যিনি প্রথমে মৃত (পথভ্রষ্ট) ছিলেন, অতঃপর আল্লাহ তাকে জীবিত করেছেন (সুপথ দেখিয়েছেন) এবং তাঁকে নূর বা আলো দান করেছেন। তিনি সেই আলো নিয়ে লোকদের মধ্যে চলাফেরা করেছেন। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু যে ব্যক্তি অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে সে তা থেকে বের হতে পারে না। সে হচ্ছে আবু জেহেল (আমর ইবনে হিশাম)। সঠিক কথা এই যে, এই আয়াতটি আম বা সাধারণ। সমস্ত মুমিন ও কাফিরই এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ এরূপেই কাফিরদের জন্যে তাদের কার্যকলাপ চাকচিক্যময় বানিয়ে দেয়া হয়েছে। আর এটা হচ্ছে তাদের অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতারই কারণ।

আল-আনআম 6:123

১২৩-১২৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহপাক বলেন- হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যেমন তোমার দেশের বড় বড় লোকেরা পাপী ও কাফির রূপে প্রমাণিত হয়েছে, যারা নিজেরাও আল্লাহর পথ থেকে বিমুখ হয়ে আছে এবং অন্যদেরকেও কুফরীর দিকে আহ্বান করতে রয়েছে, আর তোমার বিরোধিতায় ও শত্রুতায় অগ্রগামী হয়েছে, দ্রুপ তোমার পূর্বের রাসূলদের সাথেও ধনী ও প্রভাবশালী লোকেরা শত্রুতা করে এসেছিল। অতঃপর তারা যে শাস্তি প্রাপ্ত হয়েছিল তা তো অজানা নয়। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ এভাবেই আমি প্রত্যেক জনপদে ওর প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় লোকদেরকে পাপাচারী করেছিলাম এবং নবীদের শত্রু বানিয়ে রেখেছিলাম। অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি যখন কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি তখন তথাকার ধনী ও প্রভাবশালীদের ঐ জনপদে অশান্তি সৃষ্টি করার ও পাপকার্যে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ ঘটে যায়।” ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তার আনুগত্য করার নির্দেশ দেন, কিন্তু তারা আনুগত্য স্বীকারের পরিবর্তে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করতে শুরু করে দেয়। ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ধ্বংস করে দেন। মহান আল্লাহ এক স্থানে বলেনঃ “যখনই আমি কোন জনপদে কোন ভয় প্রদর্শক পাঠাই তখনই সেখানকার সম্পদশালীরা বলেআমরা তো তোমাকে মানি না। তারা বলে-আমরা ধন মালে ও সন্তান সন্ততিতে তোমাদের উপরে রয়েছি, সুতরাং আমাদের শাস্তি দেয়া হবে না। মহান আল্লাহ কাফিরদের উক্তি দিয়ে বলেনঃ “জনপদে সম্পদশালী ও প্রভাবশালী লোকেরা বলে-আমরা আমাদের বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষদেরকে এর উপরই পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করবো।" (আরবী) শব্দের এখানে ভাবার্থ হচ্ছে-তারা নিজেদের বাজে ও অসৎ কথা দ্বারা লোকদেরকে বিভ্রান্তির পথে ডেকে থাকে। যেমন হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা খুব বড় রকমের প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছিল।” (৭১:২২) আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! যদি তুমি ঐ অত্যাচারীদেরকে দেখতে! যখন তারা তাদের প্রভুর সামনে দাঁড়িয়ে পরস্পর কথা বলাবলি করবে এবং শিষ্য গুরুকে ও অনুসারীরা অনুসৃতদেরকে বলবে যদি আমরা তোমাদের পদাংক অনুসরণ না করতাম তবে অবশ্যই আমরা মুমিন হতাম। তখন নেতারা অধীনস্থদেরকে বলবে-আমরা তোমাদেরকে হিদায়াত থেকে বাধা তো কমই দিয়েছিলাম, তোমরা নিজেরাই তো পাপী ও অপরাধী ছিলে, আর আমরা কুফরী অবলম্বন করি এবং আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করি এটা তোমাদেরই পরামর্শ ছিল, সুতরাং তোমরা নিজেদের সাথে আমাদেরকেও জড়িয়ে ফেলেছো।সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীমে উল্লিখিত (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে অমিল বা কাজ।আল্লাহ পাক বলেন- তারা শুধু নিজেদেরকে নিজেরা প্রবঞ্চিত করছে, অথচ তারা এই সত্যটাকে উপলব্ধি করতে পারছে না। অর্থাৎ এই প্রতারণা এবং অন্যদেরকে পথভ্রষ্ট করার শাস্তি তাদের নিজেদেরই উপর পতিত হবে এটা তারা মোটেই বুঝে উঠছে না। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “এই নেতারা নিজেদের পাপের বোঝার সাথে অন্যদের পাপের বোঝা বহন করবে।” তিনি আরও বলেনঃ “পথভ্রষ্টকারীরা কতই নিকৃষ্ট বোঝা বহন করছে, অথচ তারা বুঝছে না তারা অন্যদের বোঝাও বহন করতে আছে!” আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ লোকদের কাছে যখন আমার কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলে-আমরা কখনও ঈমান আনবো না যে পর্যন্ত না আমাদের কাছে ঐ সমস্ত নিদর্শন পেশ করা হয় যেগুলো আল্লাহর (পূর্ববর্তী) রাসূলদের প্রদান করা হয়েছিল। তারা বলতো- দলীল হিসেবে রাসূল (সঃ)-এর সাথে ফেরেশতাগণও কেন আগমন করেন না, যেমন তাঁরা রাসূলদের কাছে অহী পৌছিয়ে থাকেন? যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যারা আমার সাথে সাক্ষাৎ করাকে বিশ্বাস করে না তারা বলে-আমাদের কাছে ফেরেশতাদেরকে কেন অবতীর্ণ করা হয় না অথবা কেন আমরা আমাদের প্রভুকে দেখতে পাই না?(আরবী) অর্থাৎ নবুওয়াতের দায়িত্ব কার উপর অর্পণ করতে হয় এবং প্রকৃতপক্ষে রাসূল হওয়ার যোগ্য কে তা আল্লাহ ভালরূপেই জানেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “তারা বলে-এই কুরআন দুটি বড় শহরের কোন এক ব্যক্তির উপর কেন অবতীর্ণ করা হয়নি? তারা কি আল্লাহর রহমত নিজেদের হাতেই বণ্টন করে নেবে?" এখানে দু’টি শহর বা গ্রাম বলতে মক্কা ও তায়েফকে বুঝানো হয়েছে। ঐ দুষ্ট লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর প্রতি শত্রুতা ও হিংসার বশবর্তী হয়ে এবং তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করেই একথা বলতো। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! যখন কাফিররা তোমাকে দেখে তখন তারা তোমাকে বিদ্রুপ ও উপহাসের পাত্র বানিয়ে নেয় (এবং বলে) এই লোকটিই কি তোমাদের মা'বৃদদের সম্পর্কে সমালোচনা করে থাকে? অথচ তারা রহমানের (আল্লাহর) যিকিরকে ভুলে বসেছে। আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “যখন তারা তোমাকে দেখে তখন তোমাকে (মুহাম্মাদ সঃ -কে) উপহাসের পাত্র বানিয়ে নেয় এবং বলে এটাই কি সেই লোক যাকে আল্লাহ রাসূল করে পাঠিয়েছেন?” আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তোমার পূর্বেও রাসূলদের সাথে এরূপ বিদ্রুপ ও উপহাস করা হয়েছিল, কিন্তু তাদের সেই উপহাসের জন্যে তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।” অথচ ঐ দুর্ভাগারা নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ফযীলত, বংশ মর্যাদা, গোত্রীয় সম্মান এবং তাঁর জন্মভূমি মক্কার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল ছিল। আল্লাহ, সমস্ত ফেরেশতা এবং মুমিনদের পক্ষ থেকে তাঁর উপর দরূদ বর্ষিত হাক। এমন কি ঐ লোকগুলো তাঁর নবুওয়াত লাভের পূর্বেও তার মধুর ও নির্মল চরিত্রের এমনভাবে স্বীকারোক্তি করেছিল যে, তাঁকে আল- আমীন (বিশ্বস্ত, সত্যবাদী ও আমানতদার) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। কাফিরদের নেতা আবু সুফিয়ান পর্যন্ত তার সত্যবাদিতায় এতো প্রভাবান্বিত ছিলেন যে, যখন রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাঁর সম্পর্কে এবং তাঁর বংশ সম্পর্কে তাঁকে (আবু সুফিয়ানকে) জিজ্ঞাসাবাদ করেন তখন তিনি নিঃসংকোচে উত্তর দেন-“আমাদের মধ্যে তিনি অতি সম্ভ্রান্ত বংশীয় লোক।” তারপর হিরাক্লিয়াস জিজ্ঞেস করেনঃ “এর পূর্বে কখনও তিনি মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়েছিলেন কি?” আবু সুফিয়ান উত্তরে বলেছিলেনঃ “না।” যাহাক, এটা খুবই দীর্ঘ হাদীস। এর দ্বারা রোম সম্রাট প্রমাণ লাভ করেছিলেন যে, মুহাম্মাদ (সঃ) উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, এসব হচ্ছে তাঁর নবুওয়াত ও সত্যবাদিতার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্য হতে ইসমাঈল (আঃ)-কে মনোনীত করেছেন, বানী ইসমাঈলের মধ্য হতে বানী কিনানাকে মনোনীত করেছেন, বানী কিনানার মধ্য হতে কুরায়েশকে বেছে নিয়েছেন, কুরায়েশের মধ্য হতে বানী হাশিমকে পছন্দ করেছেন এবং বানী হাশিমের মধ্য হতে আমাকে মনোনীত করেছেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সহীহ বুখারীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বানী আদমের উত্তম যুগ একের পর এক আসতে রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ঐ উত্তম যুগও এসে গেছে যার মধ্যে আমি রয়েছি।” হযরত আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর আরোহণ করে বলেনঃ “আমি কে?” জনগণ উত্তরে বলেনঃ “আপনি আল্লাহর রাসূল।” তখন তিনি বলেনঃ “হ্যা, আমি হচ্ছি মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব (সঃ)! আল্লাহ মাখলুকাত সৃষ্টি করেন এবং স্বীয় মাখলুকাতের মধ্যে আমাকে সবচেয়ে উত্তম করে সৃষ্টি করেন। লোকদেরকে তিনি দু' দলে ভাগ করেন এবং আমাকে উত্তম দলের অন্তর্ভুক্ত করেন। যখন তিনি গোত্রগুলো সৃষ্টি করেন তখন তিনি আমার গোত্রকেই উত্তম গোত্র বলে ঘোষণা করেন। তিনি বংশ সৃষ্টি করলে আমাকে তিনি সর্বোত্তম বংশের মধ্যেই সৃষ্টি করেন। আমি বংশের দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং ব্যক্তি হিসেবেও আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) সত্য কথাই বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জিবরাঈল (আঃ) আমাকে বলেছেন- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আমি ভূ-পৃষ্ঠের পূর্ব ও পশ্চিমে সব দিকেই ঘুরেছি, কিন্তু মুহাম্মাদ (সঃ)-এর চেয়ে উত্তম আর কাউকেও পাইনি। আমি সমস্ত পূর্ব ও পশ্চিমে অনুসন্ধান করেছি কিন্তু বানু হাশিমের বংশ অপেক্ষা মর্যাদা সম্পন্ন বংশ কোথাও পাইনি।" (হাদীসটি হাকিম (রঃ) ও বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের অন্তরের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন, তখন তিনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অন্তরকে সমস্ত বান্দার অন্তর অপেক্ষা উত্তম পান। সুতরাং তিনি তাঁকে নিজের জন্যে মনোনীত করেন। অতঃপর তিনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অন্তর দেখার পর অন্যান্য বান্দাদের অন্তরের প্রতি পুনরায় লক্ষ্য করেন। তখন তিনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাহাবীদের অন্তরকে সর্বাপেক্ষা উত্তম পান। সুতরাং তিনি তাদেরকে তাঁর রাসূলের উযীর মনোনীত করেন। তারা তাঁর দ্বীনের উপর সংগ্রাম চালিয়ে যান। অতএব, মুসলমানরা যাকে ভাল মনে করে সে আল্লাহর কাছেও ভাল এবং মুসলমানরা যাকে মন্দ মনে করে সে আল্লাহর কাছেও মন্দ। (হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে মাওকুফ রূপে তাখরীজ করেছেন)হযরত সালমান (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ “হে সালমান (রাঃ)! তুমি আমার প্রতি হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করো না এবং আমার প্রতি অসন্তুষ্ট থেকো না। নতুবা তুমি স্বীয় দ্বীন থেকে সরে পড়বে।” তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিরূপে আমি আপনার প্রতি হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করতে পারি? আপনার মাধ্যমেই তো আল্লাহ আমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন! তখন তিনি বলেনঃ “তুমি যদি আরব সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা পোষণ কর তবে আমার প্রতিই শত্রুতা পোষণ করা হবে।”বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে মসজিদে প্রবেশ করতে দেখে। যখন তাঁর প্রতি তার দৃষ্টি পড়ে তখন সে ভয় পেয়ে যায় এবং লোকদেরকে জিজ্ঞেস করেঃ ইনি কে?' উত্তরে বলা হয়ঃ ইনি হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচাতো ভাই হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)। লোকটি তখন বলেঃ “নবুওয়াতের দায়িত্ব কার উপর অর্পণ করা উচিত এবং এর যোগ্য ব্যক্তি কে তা আল্লাহ ভালরূপেই অবগত আছেন।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন)(আরবী) -এটা রিসালাতের অনুসরণ করা থেকে অহংকারকারী এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করা হতে গর্বকারীর জন্যে কঠিন ধমক। আল্লাহর কাছে তাকে চিরকালের জন্যে ঘৃণিত, অপমানিত ও লাঞ্ছিত হতে হবে। অনুরূপভাবে যেসব লোক অহংকার করবে, কিয়ামতের দিন তাদের ভাগ্যে লাঞ্ছনাই রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা আমার ইবাদত করার ব্যাপারে অহংকার করে এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদেরকে উলুটো মুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের মন্দ কার্যের কারণে তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। কেননা, প্রতারণা সাধারণতঃ গোপনীয়ই হয়ে থাকে। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ঠকবাজী ও প্রতারণা করাকে বলা হয়। এর প্রতিশোধ হিসেবেই মকরকারীকে কিয়ামতের দিন পূর্ণ শাস্তি প্রদান করা হবে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের এই ষড়যন্ত্র ও প্রতারণার কারণেই আল্লাহর নিকট হতে তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। কিন্তু তাই বলে শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ কারও উপর মোটেই অত্যাচার করেন না। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন সমস্ত গোপনীয় কথা প্রকাশিত হয়ে পড়বে।” (৮৬:৯) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতকের জন্যে কিয়ামতের দিন একটা পতাকা থাকবে এবং ওটা তার নিতম্বের সাথে লেগে থাকবে। বলা হবে- এটা হচ্ছে অমুকের পুত্র অমুক গাদ্দার বা বিশ্বাসঘাতক। এতে হিকমত এই রয়েছে যে, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা যেহেতু গোপনীয়ভাবে থাকে সেহেতু জনগণ তার থেকে সতর্ক থাকার সুযোগ পায় না এবং সে যে প্রতারক এটা তারা জানতেই পারে না। এই কারণেই কিয়ামতের দিন ওটা একটা পতাকা হয়ে যাবে এবং সেটা প্রতারকের প্রতারণার কথা ঘোষণা করতে থাকবে।

আল-আনআম 6:124

১২৩-১২৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহপাক বলেন- হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যেমন তোমার দেশের বড় বড় লোকেরা পাপী ও কাফির রূপে প্রমাণিত হয়েছে, যারা নিজেরাও আল্লাহর পথ থেকে বিমুখ হয়ে আছে এবং অন্যদেরকেও কুফরীর দিকে আহ্বান করতে রয়েছে, আর তোমার বিরোধিতায় ও শত্রুতায় অগ্রগামী হয়েছে, দ্রুপ তোমার পূর্বের রাসূলদের সাথেও ধনী ও প্রভাবশালী লোকেরা শত্রুতা করে এসেছিল। অতঃপর তারা যে শাস্তি প্রাপ্ত হয়েছিল তা তো অজানা নয়। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ এভাবেই আমি প্রত্যেক জনপদে ওর প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় লোকদেরকে পাপাচারী করেছিলাম এবং নবীদের শত্রু বানিয়ে রেখেছিলাম। অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি যখন কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি তখন তথাকার ধনী ও প্রভাবশালীদের ঐ জনপদে অশান্তি সৃষ্টি করার ও পাপকার্যে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ ঘটে যায়।” ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তার আনুগত্য করার নির্দেশ দেন, কিন্তু তারা আনুগত্য স্বীকারের পরিবর্তে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করতে শুরু করে দেয়। ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ধ্বংস করে দেন। মহান আল্লাহ এক স্থানে বলেনঃ “যখনই আমি কোন জনপদে কোন ভয় প্রদর্শক পাঠাই তখনই সেখানকার সম্পদশালীরা বলেআমরা তো তোমাকে মানি না। তারা বলে-আমরা ধন মালে ও সন্তান সন্ততিতে তোমাদের উপরে রয়েছি, সুতরাং আমাদের শাস্তি দেয়া হবে না। মহান আল্লাহ কাফিরদের উক্তি দিয়ে বলেনঃ “জনপদে সম্পদশালী ও প্রভাবশালী লোকেরা বলে-আমরা আমাদের বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষদেরকে এর উপরই পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করবো।" (আরবী) শব্দের এখানে ভাবার্থ হচ্ছে-তারা নিজেদের বাজে ও অসৎ কথা দ্বারা লোকদেরকে বিভ্রান্তির পথে ডেকে থাকে। যেমন হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা খুব বড় রকমের প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছিল।” (৭১:২২) আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! যদি তুমি ঐ অত্যাচারীদেরকে দেখতে! যখন তারা তাদের প্রভুর সামনে দাঁড়িয়ে পরস্পর কথা বলাবলি করবে এবং শিষ্য গুরুকে ও অনুসারীরা অনুসৃতদেরকে বলবে যদি আমরা তোমাদের পদাংক অনুসরণ না করতাম তবে অবশ্যই আমরা মুমিন হতাম। তখন নেতারা অধীনস্থদেরকে বলবে-আমরা তোমাদেরকে হিদায়াত থেকে বাধা তো কমই দিয়েছিলাম, তোমরা নিজেরাই তো পাপী ও অপরাধী ছিলে, আর আমরা কুফরী অবলম্বন করি এবং আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করি এটা তোমাদেরই পরামর্শ ছিল, সুতরাং তোমরা নিজেদের সাথে আমাদেরকেও জড়িয়ে ফেলেছো।সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীমে উল্লিখিত (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে অমিল বা কাজ।আল্লাহ পাক বলেন- তারা শুধু নিজেদেরকে নিজেরা প্রবঞ্চিত করছে, অথচ তারা এই সত্যটাকে উপলব্ধি করতে পারছে না। অর্থাৎ এই প্রতারণা এবং অন্যদেরকে পথভ্রষ্ট করার শাস্তি তাদের নিজেদেরই উপর পতিত হবে এটা তারা মোটেই বুঝে উঠছে না। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “এই নেতারা নিজেদের পাপের বোঝার সাথে অন্যদের পাপের বোঝা বহন করবে।” তিনি আরও বলেনঃ “পথভ্রষ্টকারীরা কতই নিকৃষ্ট বোঝা বহন করছে, অথচ তারা বুঝছে না তারা অন্যদের বোঝাও বহন করতে আছে!” আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ লোকদের কাছে যখন আমার কোন নিদর্শন আসে তখন তারা বলে-আমরা কখনও ঈমান আনবো না যে পর্যন্ত না আমাদের কাছে ঐ সমস্ত নিদর্শন পেশ করা হয় যেগুলো আল্লাহর (পূর্ববর্তী) রাসূলদের প্রদান করা হয়েছিল। তারা বলতো- দলীল হিসেবে রাসূল (সঃ)-এর সাথে ফেরেশতাগণও কেন আগমন করেন না, যেমন তাঁরা রাসূলদের কাছে অহী পৌছিয়ে থাকেন? যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যারা আমার সাথে সাক্ষাৎ করাকে বিশ্বাস করে না তারা বলে-আমাদের কাছে ফেরেশতাদেরকে কেন অবতীর্ণ করা হয় না অথবা কেন আমরা আমাদের প্রভুকে দেখতে পাই না?(আরবী) অর্থাৎ নবুওয়াতের দায়িত্ব কার উপর অর্পণ করতে হয় এবং প্রকৃতপক্ষে রাসূল হওয়ার যোগ্য কে তা আল্লাহ ভালরূপেই জানেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “তারা বলে-এই কুরআন দুটি বড় শহরের কোন এক ব্যক্তির উপর কেন অবতীর্ণ করা হয়নি? তারা কি আল্লাহর রহমত নিজেদের হাতেই বণ্টন করে নেবে?" এখানে দু’টি শহর বা গ্রাম বলতে মক্কা ও তায়েফকে বুঝানো হয়েছে। ঐ দুষ্ট লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর প্রতি শত্রুতা ও হিংসার বশবর্তী হয়ে এবং তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করেই একথা বলতো। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! যখন কাফিররা তোমাকে দেখে তখন তারা তোমাকে বিদ্রুপ ও উপহাসের পাত্র বানিয়ে নেয় (এবং বলে) এই লোকটিই কি তোমাদের মা'বৃদদের সম্পর্কে সমালোচনা করে থাকে? অথচ তারা রহমানের (আল্লাহর) যিকিরকে ভুলে বসেছে। আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “যখন তারা তোমাকে দেখে তখন তোমাকে (মুহাম্মাদ সঃ -কে) উপহাসের পাত্র বানিয়ে নেয় এবং বলে এটাই কি সেই লোক যাকে আল্লাহ রাসূল করে পাঠিয়েছেন?” আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তোমার পূর্বেও রাসূলদের সাথে এরূপ বিদ্রুপ ও উপহাস করা হয়েছিল, কিন্তু তাদের সেই উপহাসের জন্যে তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।” অথচ ঐ দুর্ভাগারা নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ফযীলত, বংশ মর্যাদা, গোত্রীয় সম্মান এবং তাঁর জন্মভূমি মক্কার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল ছিল। আল্লাহ, সমস্ত ফেরেশতা এবং মুমিনদের পক্ষ থেকে তাঁর উপর দরূদ বর্ষিত হাক। এমন কি ঐ লোকগুলো তাঁর নবুওয়াত লাভের পূর্বেও তার মধুর ও নির্মল চরিত্রের এমনভাবে স্বীকারোক্তি করেছিল যে, তাঁকে আল- আমীন (বিশ্বস্ত, সত্যবাদী ও আমানতদার) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। কাফিরদের নেতা আবু সুফিয়ান পর্যন্ত তার সত্যবাদিতায় এতো প্রভাবান্বিত ছিলেন যে, যখন রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাঁর সম্পর্কে এবং তাঁর বংশ সম্পর্কে তাঁকে (আবু সুফিয়ানকে) জিজ্ঞাসাবাদ করেন তখন তিনি নিঃসংকোচে উত্তর দেন-“আমাদের মধ্যে তিনি অতি সম্ভ্রান্ত বংশীয় লোক।” তারপর হিরাক্লিয়াস জিজ্ঞেস করেনঃ “এর পূর্বে কখনও তিনি মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়েছিলেন কি?” আবু সুফিয়ান উত্তরে বলেছিলেনঃ “না।” যাহাক, এটা খুবই দীর্ঘ হাদীস। এর দ্বারা রোম সম্রাট প্রমাণ লাভ করেছিলেন যে, মুহাম্মাদ (সঃ) উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, এসব হচ্ছে তাঁর নবুওয়াত ও সত্যবাদিতার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্য হতে ইসমাঈল (আঃ)-কে মনোনীত করেছেন, বানী ইসমাঈলের মধ্য হতে বানী কিনানাকে মনোনীত করেছেন, বানী কিনানার মধ্য হতে কুরায়েশকে বেছে নিয়েছেন, কুরায়েশের মধ্য হতে বানী হাশিমকে পছন্দ করেছেন এবং বানী হাশিমের মধ্য হতে আমাকে মনোনীত করেছেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সহীহ বুখারীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বানী আদমের উত্তম যুগ একের পর এক আসতে রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ঐ উত্তম যুগও এসে গেছে যার মধ্যে আমি রয়েছি।” হযরত আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর আরোহণ করে বলেনঃ “আমি কে?” জনগণ উত্তরে বলেনঃ “আপনি আল্লাহর রাসূল।” তখন তিনি বলেনঃ “হ্যা, আমি হচ্ছি মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব (সঃ)! আল্লাহ মাখলুকাত সৃষ্টি করেন এবং স্বীয় মাখলুকাতের মধ্যে আমাকে সবচেয়ে উত্তম করে সৃষ্টি করেন। লোকদেরকে তিনি দু' দলে ভাগ করেন এবং আমাকে উত্তম দলের অন্তর্ভুক্ত করেন। যখন তিনি গোত্রগুলো সৃষ্টি করেন তখন তিনি আমার গোত্রকেই উত্তম গোত্র বলে ঘোষণা করেন। তিনি বংশ সৃষ্টি করলে আমাকে তিনি সর্বোত্তম বংশের মধ্যেই সৃষ্টি করেন। আমি বংশের দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং ব্যক্তি হিসেবেও আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) সত্য কথাই বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ জিবরাঈল (আঃ) আমাকে বলেছেন- “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আমি ভূ-পৃষ্ঠের পূর্ব ও পশ্চিমে সব দিকেই ঘুরেছি, কিন্তু মুহাম্মাদ (সঃ)-এর চেয়ে উত্তম আর কাউকেও পাইনি। আমি সমস্ত পূর্ব ও পশ্চিমে অনুসন্ধান করেছি কিন্তু বানু হাশিমের বংশ অপেক্ষা মর্যাদা সম্পন্ন বংশ কোথাও পাইনি।" (হাদীসটি হাকিম (রঃ) ও বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের অন্তরের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন, তখন তিনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অন্তরকে সমস্ত বান্দার অন্তর অপেক্ষা উত্তম পান। সুতরাং তিনি তাঁকে নিজের জন্যে মনোনীত করেন। অতঃপর তিনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অন্তর দেখার পর অন্যান্য বান্দাদের অন্তরের প্রতি পুনরায় লক্ষ্য করেন। তখন তিনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাহাবীদের অন্তরকে সর্বাপেক্ষা উত্তম পান। সুতরাং তিনি তাদেরকে তাঁর রাসূলের উযীর মনোনীত করেন। তারা তাঁর দ্বীনের উপর সংগ্রাম চালিয়ে যান। অতএব, মুসলমানরা যাকে ভাল মনে করে সে আল্লাহর কাছেও ভাল এবং মুসলমানরা যাকে মন্দ মনে করে সে আল্লাহর কাছেও মন্দ। (হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে মাওকুফ রূপে তাখরীজ করেছেন)হযরত সালমান (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ “হে সালমান (রাঃ)! তুমি আমার প্রতি হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করো না এবং আমার প্রতি অসন্তুষ্ট থেকো না। নতুবা তুমি স্বীয় দ্বীন থেকে সরে পড়বে।” তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিরূপে আমি আপনার প্রতি হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করতে পারি? আপনার মাধ্যমেই তো আল্লাহ আমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন! তখন তিনি বলেনঃ “তুমি যদি আরব সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা পোষণ কর তবে আমার প্রতিই শত্রুতা পোষণ করা হবে।”বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে মসজিদে প্রবেশ করতে দেখে। যখন তাঁর প্রতি তার দৃষ্টি পড়ে তখন সে ভয় পেয়ে যায় এবং লোকদেরকে জিজ্ঞেস করেঃ ইনি কে?' উত্তরে বলা হয়ঃ ইনি হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচাতো ভাই হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)। লোকটি তখন বলেঃ “নবুওয়াতের দায়িত্ব কার উপর অর্পণ করা উচিত এবং এর যোগ্য ব্যক্তি কে তা আল্লাহ ভালরূপেই অবগত আছেন।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন)(আরবী) -এটা রিসালাতের অনুসরণ করা থেকে অহংকারকারী এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করা হতে গর্বকারীর জন্যে কঠিন ধমক। আল্লাহর কাছে তাকে চিরকালের জন্যে ঘৃণিত, অপমানিত ও লাঞ্ছিত হতে হবে। অনুরূপভাবে যেসব লোক অহংকার করবে, কিয়ামতের দিন তাদের ভাগ্যে লাঞ্ছনাই রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা আমার ইবাদত করার ব্যাপারে অহংকার করে এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদেরকে উলুটো মুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের মন্দ কার্যের কারণে তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। কেননা, প্রতারণা সাধারণতঃ গোপনীয়ই হয়ে থাকে। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ঠকবাজী ও প্রতারণা করাকে বলা হয়। এর প্রতিশোধ হিসেবেই মকরকারীকে কিয়ামতের দিন পূর্ণ শাস্তি প্রদান করা হবে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের এই ষড়যন্ত্র ও প্রতারণার কারণেই আল্লাহর নিকট হতে তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। কিন্তু তাই বলে শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ কারও উপর মোটেই অত্যাচার করেন না। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন সমস্ত গোপনীয় কথা প্রকাশিত হয়ে পড়বে।” (৮৬:৯) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতকের জন্যে কিয়ামতের দিন একটা পতাকা থাকবে এবং ওটা তার নিতম্বের সাথে লেগে থাকবে। বলা হবে- এটা হচ্ছে অমুকের পুত্র অমুক গাদ্দার বা বিশ্বাসঘাতক। এতে হিকমত এই রয়েছে যে, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা যেহেতু গোপনীয়ভাবে থাকে সেহেতু জনগণ তার থেকে সতর্ক থাকার সুযোগ পায় না এবং সে যে প্রতারক এটা তারা জানতেই পারে না। এই কারণেই কিয়ামতের দিন ওটা একটা পতাকা হয়ে যাবে এবং সেটা প্রতারকের প্রতারণার কথা ঘোষণা করতে থাকবে।

আল-আনআম 6:125

এখানে আল্লাহ তাআলা বলেন যে, আল্লাহ যাকে হিদায়াত করার ইচ্ছা করেন অর অন্তরকে তিনি ইসলামের জন্যে খুলে দেন অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা তার জন্যে সহজ করে দেন। এটা ওরই নিদর্শন যে, তার ভাগ্যে মঙ্গল লিখিত আছে। যেমন তিনি বলেনঃ “ইসলামের জন্যে আল্লাহ যার অন্তর খুলে দেন, তার জন্যে তার প্রভুর পক্ষ থেকে নূর বা আলো নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ “কিন্তু আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ঈমানের ভালবাসা স্থাপন করেছেন এবং ওটা তোমাদের অন্তরে শোভনীয় করেছেন, আর কুফর, পাপ ও অন্যায়াচরণের প্রতি তোমাদের অন্তরে ঘৃণার উদ্রেক করেছেন, এসব লোকই সুপথ প্রাপ্ত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতের ব্যাপারে বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাওহীদ ও ঈমান কবূল করার মত প্রশস্ততা তার অন্তরে আনয়ন করেন। আবু মালিক ও অন্যান্যদের মতে এ ভাবার্থই বেশী প্রকাশমান। আবু জাফর হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ মুমিনদের মধ্যে কোন ব্যক্তি অধিক বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী?' তিনি উত্তরে বলেনঃ “যে ব্যক্তি খুব বেশী মৃত্যুকে স্মরণ করে এবং যে ব্যক্তি মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের জন্যে সবেচেয়ে বেশী প্রস্তুতি গ্রহণ করে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবী)-এই আয়াত সম্পর্কেই জিজ্ঞেস করা হয়। জনগণ তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিভাবে অন্তরকে খুলে দেয়া হয়?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “একটা নূর অন্তরে নিক্ষেপ করা হয় যার ফলে অন্তর খুলে যায় ও প্রশস্ত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে সংকীর্ণতা অবশিষ্ট থাকে না।” জনগণ পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “কারো অন্তর যে খুলে গেছে এটা কি করে জানা যায়? তিনি জবাবে বলেনঃ “এর পরিচয় এইভাবে পাওয়া যায় যে, সে পরকালের দিকে ঝুঁকে পড়ে, দুনিয়ার প্রতি তার আসক্তি থাকে না এবং মৃত্যু আসার পূর্বেই ওর জন্যে সে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে।”(আরবী) অর্থাৎ যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করার ইচ্ছা করেন তার অন্তরকে তিনি খুবই সংকীর্ণ করে দেন। (আরবী) শব্দটির (আরবী) অক্ষরের উপর (আরবী) হবে, (আরবী) অক্ষরের উপর (আরবী) হবে। কিন্তু অধিকাংশ লোক (আরবী) অক্ষরে (আরবী) ও (আরবী) দিয়ে পড়ে থাকেন। এ দু'টোর দৃষ্টান্ত হচ্ছে হাইয়ীনুন ও হাইনুন শব্দ (আরবী) শব্দটিকে কেউ কেউ (আরবী) ও (আরবী) সহ পড়েছেন। আবার অন্য কিরআতে (আরবী) এবং (আরবী) সহ রয়েছে। অর্থাৎ সে এতদূর পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে যে, তার অন্তর হিদায়াতের জন্যে মোটেই প্রশস্ত থাকে না। ঈমান সেখানে পথ পায় না । হযরত উমার (রাঃ) একজন বেদুইনকে জিজ্ঞেস করেনঃ কি জিনিস?” সে উত্তরে বলেঃ “ওটা একটা গাছ, গাছের ভিতরেই থাকে। কোন রাখাল ওটা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না, কোন জীবজন্তু এবং অন্য কোন জিনিসও ওর পাত্তা পায় না।” তখন হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “মুনাফিকদের অন্তরও ঠিক এরূপই হয়ে থাকে। কোন ভাল কথা সেখানে প্রবেশই করতে পারে না।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরের উপর ইসলামকে সংকীর্ণ করে দেন। কেননা, ইসলাম তো একটা প্রশস্ত জিনিস। আর কাফিরের অন্তর সংকীর্ণ হয়ে থাকে। সুতরাং সেখানে ইসলামের জায়গা হবে কিরূপে? যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দ্বীন কবূল করে নেয়ার পর তোমাদের অন্তরে কোন সংকীর্ণতা থাকতে পারে না। আর আল্লাহ তোমাদের দ্বীনের মধ্যে কোন সংকীর্ণতা রাখেননি।” (২২:৭৮) কিন্তু মুনাফিকের অন্তর সন্দেহের মধ্যে জড়িত থাকে এবং অন্তরের সংকীর্ণতার কারণে (আরবী)-এর স্বীকারোক্তি সে করতেই পারে না। ঈমান আনয়ন করা তার উপর এমন কঠিন হয়ে পড়ে যেমন কারও উপর আকাশে আরোহণ কঠিন হয়ে থাকে। অর্থাৎ যেরূপ আদম সন্তান আকাশে আরোহণ করতে পারে না, দ্রুপ তাওহীদের বিশ্বাস মুনাফিকের অন্তরে ঘর করতে পারে না। আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যার অন্তরকে সংকীর্ণ করে দিয়েছেন সে কিভাবে ঈমান আনতে পারে? কাফিরের অন্তর সম্পর্কে এটা দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা হয়েছে যে, তার অন্তরে ঈমানের আরোহণ এমনই কঠিন যেমন কারও আকাশে আরোহণ করা কঠিন অর্থাৎ যেমন আকাশে চড়া কারো পক্ষে সম্ভব নয় তদ্রূপ কাফিরের ঈমান আনয়নও সম্ভব নয়।অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-যেমন তার অন্তরকে সংকীর্ণ করে দেয়া হয়েছে তরূপ আল্লাহ শয়তানকে তার উপর বিজয়ী করে দিয়েছেন, যে তাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে শয়তান। আর মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে প্রত্যেক ঐ জিনিস যাতে কোন মঙ্গল নিহিত নেই।

আল-আনআম 6:126

১২৬-১২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা পথভ্রষ্টদের বর্ণনা দেয়ার পর এখন দ্বীন ও হিদায়াতের মর্যাদার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ তোমাদের প্রতিপালকের এটাই সরল সহজ পথ। (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর ভিত্তিতে হয়েছে। অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এই দ্বীন, যা আমি তোমাকে প্রদান করেছি, সেই অহীর মাধ্যমে, যাকে কুরআন বলে, এটাই হচ্ছে সরল সঠিক পথ। যেমন হযরত আলী (রাঃ) কুরআনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন যে, ওটা হচ্ছে সিরাতে মুসতাকীম, আল্লাহর দৃঢ় রঞ্জু এবং বিজ্ঞানময় বর্ণনা।(আরবী) অর্থাৎ আমি কুরআনের আয়াতগুলোকে বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি। এর দ্বারা ঐ লোকেরাই উপকৃত হবে যাদের জ্ঞান ও বিবেক রয়েছে। যারা আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথাগুলোকে গভীর মনোযোগের সাথে চিন্তা করে দেখে এবং ওগুলো বুঝবার চেষ্টা করে, তাদের জন্যে কিয়ামতের দিন জান্নাত ও শান্তির ঘর রয়েছে। জান্নাতকে দারুস সালাম বা শান্তির ঘর বলার কারণ এই যে, যেমন তারা দুনিয়ায় শান্তির পথে চলছে, তেমনই কিয়ামতের দিনেও তারা শান্তির ঘর লাভ করবে। আল্লাহ তাদের রক্ষক, সাহয্যকারী ও শক্তিদানকারী। কেননা, তারা ভাল আমল করে থাকে।

আল-আনআম 6:127

১২৬-১২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা পথভ্রষ্টদের বর্ণনা দেয়ার পর এখন দ্বীন ও হিদায়াতের মর্যাদার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ তোমাদের প্রতিপালকের এটাই সরল সহজ পথ। (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর ভিত্তিতে হয়েছে। অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এই দ্বীন, যা আমি তোমাকে প্রদান করেছি, সেই অহীর মাধ্যমে, যাকে কুরআন বলে, এটাই হচ্ছে সরল সঠিক পথ। যেমন হযরত আলী (রাঃ) কুরআনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন যে, ওটা হচ্ছে সিরাতে মুসতাকীম, আল্লাহর দৃঢ় রঞ্জু এবং বিজ্ঞানময় বর্ণনা।(আরবী) অর্থাৎ আমি কুরআনের আয়াতগুলোকে বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি। এর দ্বারা ঐ লোকেরাই উপকৃত হবে যাদের জ্ঞান ও বিবেক রয়েছে। যারা আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথাগুলোকে গভীর মনোযোগের সাথে চিন্তা করে দেখে এবং ওগুলো বুঝবার চেষ্টা করে, তাদের জন্যে কিয়ামতের দিন জান্নাত ও শান্তির ঘর রয়েছে। জান্নাতকে দারুস সালাম বা শান্তির ঘর বলার কারণ এই যে, যেমন তারা দুনিয়ায় শান্তির পথে চলছে, তেমনই কিয়ামতের দিনেও তারা শান্তির ঘর লাভ করবে। আল্লাহ তাদের রক্ষক, সাহয্যকারী ও শক্তিদানকারী। কেননা, তারা ভাল আমল করে থাকে।

আল-আনআম 6:128

ইরশাদ হচ্ছে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! ঐ দিনকে স্মরণ কর, যখন আল্লাহ ঐ জ্বিন ও শয়তানদেরকে এবং তাদের মানব বন্ধুদেরকে, তারা দুনিয়ায় যাদের ইবাদত করতো এবং যাদের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করতো, আর দুনিয়ার মজা উপভোগের ব্যাপারে একে অপরের কাছে অহী পাঠাতো, তাদের সকলকে সমবেত করবেন এবং বলবেনঃ হে জ্বিন ও শয়তানের দল! তোমরা মানব গোষ্ঠীকে বহু প্রকারে বিভ্রান্ত করেছিলে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদের কাছে এ অঙ্গীকার গ্রহণ করিনি যে, তোমরা শয়তানের উপাসনা করবে না, কেননা সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? আর তোমরা আমারই ইবাদত করবে, এটাই হচ্ছে সিরাতে মুসতাকীম বা সরল সহজ পথ? তোমাদের বড় বড় লকে এই শয়তানরাই পথভ্রষ্ট করেছে, তাহলে এখনও কি তোমাদের জ্ঞান লাভ হবে না?” আর তাদের মানব বন্ধুরা বলবেঃ “হে আমাদের প্রভু! নিশ্চয়ই আপনার কথা সত্য। আমরা প্রত্যেকেই একে অপরের দ্বারা উপকার লাভ করেছি।” হাসান (রঃ) বলেন, এই প্রকার লাভ করা ছিল এই যে, ঐ শয়তানরা আদেশ করতো আর এই মূখ ও অজ্ঞ মানুষেরা ওর উপর আমল করতো। ইবনে জুরায়েজ (রাঃ) বলেন, অজ্ঞতার যুগে কোন লোক সফররত অবস্থায় কোন উত্যকায় পথভ্রষ্ট হয়ে গেলে বলতোঃ ‘আমি এই উপত্যকায় সবচেয়ে বড় জ্বিনের আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এটাই হতো ঐ সব মানুষের উপকার লাভ। কিয়ামতের দিন তারা এরই ওযর পেশ করবে। আর জ্বিনদের মানুষদের নিকট থেকে উপকার লাভ করা এই যে, মানুষ তাদের সম্মান করতো এবং তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতো। ফলে মানুষদের নিকট থেকে তাদের মর্যাদা লাভ হতো। তাই তারা বলতোঃ “আমরা জ্বিন ও মানুষের নেতা। আর আপনি আমাদের জন্যে যে সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন ঐ ওয়াদা পর্যন্ত আমরা পৌছে গেছি।” এর দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “এখন জাহান্নামই হচ্ছে তোমাদের ও তোমাদের বন্ধুদের বাসস্থান, যার মধ্যে তোমরা চিরকাল অবস্থান করবে। তারপর আল্লাহ যা চাইবেন তাই করবেন।” কেউ কেউ বলেন যে, এই ব্যতিক্রমের অর্থ হচ্ছে বারযাখের দিকে প্রত্যাবর্তন। কেউ কেউ এই মত পোষণ করেন যে, এই সময়কাল দুনিয়ার দিকে প্রত্যাবর্তন। আবার কেউ কেউ এমন কথা বলেছেন যার বর্ণনা সূরায়ে হৃদে আসবে। সেখানে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “তারা জাহান্নামে ততকাল থাকবে যতকাল যমীন ও আসমান থাকবে। হ্যা, তবে এ ছাড়া আল্লাহ যা চাইবেন তা তার মর্জি। তিনি তো যা ইচ্ছা করেন তা কার্যে পরিণত করার অধিকার তার রয়েছে। এই আয়াতের তাফসীর ঐ আয়াত দ্বারা হচ্ছে-জাহান্নাম তোমাদের বাসস্থান, যার মধ্যে তোমরা চিরকাল অবস্থান করবে, হ্যা, তবে আল্লাহ যা চান। এটা এমন একটি আয়াত যে, আল্লাহর মাখলুকের ব্যাপারে আল্লাহর উপর কোন হুকুম লাগানো এবং কাউকে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলা কারো মোটেই উচিত নয়।

আল-আনআম 6:129

আল্লাহ তা'আলা এমন লোকদেরকে একে অপরের বন্ধু বানিয়ে দেন যাদের আমল একই রূপ হয়ে থাকে। সুতরাং এক মুমিন অপর মুমিনের বন্ধু হয়ে থাকে, সে যেমনই হাক এবং যেখানেই থাক না কেন। পক্ষান্তরে এক কাফির অন্য এক কাফিরের বন্ধু হয়ে থাকে সে যেখানেই থাক এবং যেমনই হাক না কেন। ঈমান আশা আকাঙ্ক্ষা ও বাহ্যাড়ম্বরের নাম নয়। এ মত ইবনে জারীর (রঃ) পোষণ করেন। মালিক ইবনে দীনার (রঃ) বলেন, আমি যাবৃরে পড়েছি, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- “আমি মুনাফিকদের প্রতিশোধ মুনাফিকদের দ্বারাই গ্রহণ করবো, তারপর সমস্ত মুনাফিকের প্রতিশোধ গ্রহণ করবো।” এটা কুরআন কারীমেও রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “এভাবেই আমি এক যালিমকে অপর যালিমের বন্ধু বানিয়ে দেই।” অর্থাৎ জুিনের যালিমদেরকে মানব যালিমের বন্ধু বানিয়ে দেই। “আর যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকির থেকে উদাসীন থাকে, আমি তার উপর শয়তানকে বিজয়ী করে দেই এবং সদা সর্বদা সে তারই সাথে অবস্থান করতে থাকে।” হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে একটি মারফু হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি যালিমের সাহায্য করে, আল্লাহ তাকে তার উপর বিজয়ী করে দেন।” (এই হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির বর্ণনা করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি গারীব) কোন কবি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এমন কোন হাত নেই যার পরে আল্লাহর হাত থাকে না এবং এমন কোন যালিম নেই যাকে অন্য যালিমের সাথে লেনদেন বা আদান প্রদান করতে হয় না।” আয়াতে কারীমার অর্থ এই দাঁড়ালোঃ যেভাবে আমি ঐ ক্ষতিগ্রস্ত মানবদের বন্ধু তাদেরকে পথভ্রষ্টকারী জ্বিন ও শয়তানদেরকে বানিয়েছি, তেমনিভাবে যালিমদের মধ্য হতে এককে অপরের বন্ধু বানিয়ে দেই এবং একে অপরের দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায়। আর আমি তাদের অত্যাচার, দুষ্টামি এবং বিদ্রোহের প্রতিফল একে অপরের দ্বারা প্রদান করিয়ে থাকি।

আল-আনআম 6:130

এখানে আল্লাহ পাক কাফির দানব ও মানবকে সতর্ক করে বলছেন-হে জ্বিন ও মানব গোষ্ঠী! আমি কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করবো, তোমাদের কাছে আমার নবীরা এসে কি তাদের নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করেনি? এটাকে (আরবী) বলা হয়। অর্থাৎ অবশ্যই তোমাদের কাছে আমার নবীরা এসে তোমাদেরকে কিয়ামতের দিন সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করেছিল। রাসূল শুধুমাত্র মানুষের মধ্যেই ছিলেন, জ্বিনদের মধ্যে কোন রাসূল হননি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, রাসূল শুধু বানী আদমের মধ্যেই হয়ে থাকেন এবং জ্বিনদের মধ্যে থাকে ভয় প্রদর্শক, যারা তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে ভয় প্রদর্শন করে থাকে। ইবনে মাযাহিমের ধারণা এই যে, জ্বিনদের মধ্যেও রাসুল আছে এবং স্বীয় দাবীর অনুকূলে এই আয়াতে কারীমা দলীল রূপে পেশ করেছেন। কিন্তু এটা বিশেষ চিন্তা করার বিষয়। কেননা এটা কোন নিশ্চিত কথা নয়। কারণ, কোন আয়াতেই এ বিষয়ের ব্যাখ্যা নেই। খুব বেশী বললে একথা বলা যেতে পারে যে, জ্বিনদের মধ্যে নবী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে মাত্র। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন। এটা আল্লাহ পাকের নিম্নের আয়াতের মত। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি দুটি সমুদ্রকে সম্মিলিত করেছেন, ফলে পরস্পরে মিলিত হয়ে আছে। এতদুভয়ের মধ্যে একটি অনতিক্রমনীয় অন্তরায় রয়েছে।” (৫৫:১৯-২০) এরপর তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এতদুভয়ের মধ্য হতে মুক্তা ও প্রবাল-রত্নসমূহ বের হয়ে থাকে।” (৫৫:২২) এখন এটা স্পষ্ট কথা যে, মুক্তা ও প্রবাল-রত্ন লবণাক্ত সমুদ্রের মধ্যেই থাকে, মিষ্ট পানির সমুদ্রের মধ্যে থাকে না। তাহলে যেমন মুক্তা ও প্রবাল-রত্নকে মিষ্ট ও লবণাক্ত উভয় সমুদ্রের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়েছে, ঠিক অদ্রুপই রাসূলদেরকে দানব ও মানব উভয়ের মধ্যেই গণনা করা হয়েছে। ইবনে জারীর (রঃ)-ও এই উত্তরই দিয়েছেন। রাসূলগণ যে শুধু মানুষের মধ্য থেকেই হয়েছেন এটা আল্লাহ পাকের উক্তিতেই রয়েছে। তিনি বলেনঃ (আরবী) পর্যন্ত (৪:১৬৩-১৬৫)। আর ইবরাহীম (আঃ)-এর যিক্র সম্পর্কিত আল্লাহ তা'আলার (আরবী) (২৯:২৭) এই উক্তিতেও রয়েছে। এর দ্বারা জানা গেল যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পরে নবুওয়াত ও কিতাবকে তার সন্তানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। আর কোন লোকেরই এই উক্তি নেই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পূর্বে নবুওয়াত জ্বিনদের মধ্যে ছিল এবং তাঁকে প্রেরণ করার পরে তাদের নবুওয়াত শেষ হয়ে গেছে। মোটকথা জ্বিনদের মধ্যে নবুওয়াত থাকা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পূর্বেও প্রমাণিত হচ্ছে না এবং তার পরেও না। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে রাসূল (সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যেসব রাসূল পাঠিয়েছিলাম তারাও খাদ্য খেতো এবং বাজারে চলাফেরা করতো।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যাদেরকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছিলাম তারা তাদের গ্রামবাসীদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর এটা জানা কথা যে, রিসালাতের ব্যাপারে জ্বিনেরা মানুষের অনুসারী। এ জন্যেই জ্বিনদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক বলেন-“হে নবী (সঃ)! জ্বিনদের একটি দলকে আমি তোমার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছি। তারা কুরআন শুনতে থাকে। যখন তারা কুরআনের মজলিসে হাযির হয় তখন পরস্পর বলাবলি করে-তোমরা নীরবতা অবলম্বন করে কুরআন শুনতে থাক। যখন কুরআন পাঠ শেষ হয় তখন তারা তাদের কওমের কাছে গিয়ে তাদেরকে আল্লাহ থেকে ভয় প্রদর্শন করে এবং বলে- হে আমার সঙ্গীরা, আমরা একটা কিতাব শুনেছি যা হযরত মূসা (আঃ)-এর পরে অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা তাওরাতের সত্যতা প্রতিপাদনকারী, আর সত্য কথা ও সোজা সরল পথের দিশা দিয়ে থাকে। হে বন্ধুরা! আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দাও এবং তার উপর ঈমান আন। তাহলে আল্লাহ তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দিবেন এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে তোমাদেরকে মুক্তি দান করবেন। আর যদি কেউ আল্লাহর আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া না দেয় এবং কাফির থেকে যায় তবে সে আল্লাহকে অপারগ করতে পারে না এবং আল্লাহ তার ওলী হতে পারেন না। এসব লোক বড়ই বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যাবে।” জামিউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, নবী (সঃ) সূরায়ে আর রাহমান পাঠ করেন এবং তাতে নিম্নের আয়াত পড়েনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে জ্বিন ও মানব! আমি তোমাদের (হিসাব গ্রহণের নিমিত্ত শীঘ্রই অবসর গ্রহণ করবো।” (৫৫:৩১)।মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে আমার মানব ও দানবের দল! তোমাদের কাছে কি আল্লাহর রাসূলগণ এসেছিল না, যারা আমার আয়াতগুলো তোমাদেরকে পড়ে শুনাতো এবং আজকের দিনের সাক্ষাৎ সম্পর্কে তোমাদেরকে সতর্ক করতো? তারা উত্তরে বলবে- হে আল্লাহ! আমরা স্বীকার করছি যে, আপনার রাসূলগণ আমাদের কাছে আপনার বাণী প্রচার করেছিলেন এবং আমাদেরকে আপনার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া সম্পর্কে ভয়ও দেখিয়েছিলেন, আর তারা আমাদেরকে এ কথাও বলেছিলেন যে, আজকের এ দিনটা (অর্থাৎ কিয়ামত) অবশ্যই সংঘটিত হবে।”(আরবী) অর্থাৎ পার্থিব জীবনই তাদেরকে ধোকায় নিপতিত রেখেছিল। পার্থিব জীবনে তারা ইফরাত’ ও ‘তাফরীত' অর্থাৎ অত্যধিক ও অত্যল্পের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিল এবং রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে ও মু'জিযাগুলোর বিরুদ্ধাচরণ করে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কেননা, তারা পার্থিব জীবনের সুখ সম্ভোগে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণে গ্রেপ্তার হয়ে পড়েছিল। আর কিয়ামতের দিন তারা নিজেদেরই বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে, তারা কাফির ছিল।

আল-আনআম 6:131

১৩১-১৩২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ হে রাসূল (সঃ)! এরূপ কখনও হতে পারে না যে, তোমার প্রভু আল্লাহ কোন গ্রাম বা শহরকে অন্যায়ভাবে এমন অবস্থায় ধ্বংস করবেন যখন ওর অধিবাসীবৃন্দ সত্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকে। তিনি বলেনঃ আমি এরূপভাবে ধ্বংস করি না, বরং তাদের কাছে রাসূল প্রেরণ করি এবং কিতাব অবতীর্ণ করি। এভাবে আমি তাদের ওযর পেশ করার সুযোগে হারিয়ে দেই, যাতে কাউকেও অন্যায়ভাবে পাকড়াও করা না হয় এবং তার কাছে তাওহীদের দাওয়াত না পৌঁছে থাকে। আমি লোকদের জন্যে কোন ওযর পেশ করার সুযোগ বাকী রাখিনি। আমি যদি কোন কওমের উপর শাস্তি পাঠিয়ে থাকি তবে তা তাদের কাছে রাসূল পাঠানোর পর। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “কোন জনপদ এমন নেই যেখানে আমি আমার পক্ষ থেকে কোন ভয় প্রদর্শক রাসূল প্রেরণ করিনি।” তিনি আরও বলেনঃ “আমি প্রত্যেক কওমের মধ্যে রাসূল পাঠিয়ে বলেছি-তোমরা আল্লাহরই ইবাদত কর এবং শয়তান থেকে বেঁচে থাক।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “আমি শাস্তি প্রদানকারী নই যে পর্যন্ত না রাসূল প্রেরণ করি।” আল্লাহ পাক অন্য স্থানে বলেনঃ “যখন কাফিরদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তখন সেই জাহান্নামের রক্ষকগণ তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে- তোমাদের কাছে কি কোন ভয় প্রদর্শনকারী (নবী) আগমন করেননি? তারা উত্তরে বলবে-নিশ্চয়ই আমাদের কাছে ভয় প্রদর্শনকারী এসেছিলেন, কিন্তু আমরা অবিশ্বাস করেছিলাম।এ বিষয় সম্পর্কীয় বহু আয়াত রয়েছে।ইমাম আবু জাফর (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলার (আরবী) এই উক্তির দু'টি যুক্তি বা কারণের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম কারণ হচ্ছে-আল্লাহর এটা নীতি নয়, তিনি কোন কওমকে তাদের শিরকের কারণে এমন অবস্থায় তাদের ধ্বংস করবেন যে অবস্থায় তাদের নিজেদের শিরকের কোন সংবাদই থাকে না। অর্থাৎ তিনি শাস্তি প্রদানে তাড়াতাড়ি করেন না, যে পর্যন্ত না তাদের কাছে কোন রাসূল পাঠিয়ে তাদেরকে শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং সেই রাসূল আল্লাহর হুজ্জত পূর্ণ করেন, আর আখিরাতের শাস্তি থেকে তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। তিনি যদি কাউকে তার অজ্ঞাত অবস্থায় পাকড়াও করতেন তবে সে বলতোঃ আমার কাছে তো কোন সুসংবাদদাতা এবং ভয় প্রদর্শনকারী আসেননি। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে-আল্লাহ পাক বলছেন যে, তিনি তাদেরকে সতর্ক করা ছাড়া এবং রাসূল ও আয়াতের মাধ্যমে উপদেশ দান ব্যতীত ধ্বংস করেন না। নতুবা তাদের উপর এটা অত্যাচার হয়ে যেতো। আর আল্লাহ তো স্বীয় বান্দাদের উপর যুলুম করেন না। এর পরে আবু জাফর (রঃ) প্রথম কারণকে প্রাধান্য দেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এ কারণটিই বেশী প্রবল ও উত্তম। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবী) অর্থাৎ প্রত্যেক সৎ ও অসৎ আমলকারীর জন্যে আমল হিসেবে মরতবা ও মর্যাদা রয়েছে। যার যেরূপ আমল সেই অনুপাতে সে প্রতিফল পাবে। যদি আমল ভাল হয় তবে পরিণাম ভাল হবে, আর যদি আমল খারাপ হয় তবে পরিণামও খারাপ হবে। আবার এ অর্থও হতে পারে যে, ঐ কাফির দানব ও মানবের কয়েকটি শ্রেণী বিভাগ রয়েছে। প্রত্যেক কাফিরের জন্যে জাহান্নামে তার পাপের পরিণাম অনুযায়ী শ্রেণীভেদ রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেকের জন্যে দ্বিগুণ (শাস্তি) আছে।” (৭:৩৮) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যারা কুফরী করেছে এবং লোকদেরকে সরল সহজ পথ থেকে সরিয়ে রেখেছে, আমি তাদেরকে শাস্তির উপর শাস্তি বেশী বেশী করে প্রদান করবো, কেননা তারা নিজেরাও কুফরী করেছে এবং অন্যদেরকেও কুফরীর পথে পরিচালিত করেছে আর তারা বিশৃংখলা ও অশান্তি সৃষ্টি করেছে। তোমার প্রভু তো তাদের আমল থেকে উদাসীন নন।”এই লোকগুলো আল্লাহর ইলমের মধ্যে রয়েছে। যখন তারা তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন করবে তখন তিনি তাদেরকে শাস্তি দ্বারা জর্জরিত করবেন।

আল-আনআম 6:132

১৩১-১৩২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ হে রাসূল (সঃ)! এরূপ কখনও হতে পারে না যে, তোমার প্রভু আল্লাহ কোন গ্রাম বা শহরকে অন্যায়ভাবে এমন অবস্থায় ধ্বংস করবেন যখন ওর অধিবাসীবৃন্দ সত্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকে। তিনি বলেনঃ আমি এরূপভাবে ধ্বংস করি না, বরং তাদের কাছে রাসূল প্রেরণ করি এবং কিতাব অবতীর্ণ করি। এভাবে আমি তাদের ওযর পেশ করার সুযোগে হারিয়ে দেই, যাতে কাউকেও অন্যায়ভাবে পাকড়াও করা না হয় এবং তার কাছে তাওহীদের দাওয়াত না পৌঁছে থাকে। আমি লোকদের জন্যে কোন ওযর পেশ করার সুযোগ বাকী রাখিনি। আমি যদি কোন কওমের উপর শাস্তি পাঠিয়ে থাকি তবে তা তাদের কাছে রাসূল পাঠানোর পর। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “কোন জনপদ এমন নেই যেখানে আমি আমার পক্ষ থেকে কোন ভয় প্রদর্শক রাসূল প্রেরণ করিনি।” তিনি আরও বলেনঃ “আমি প্রত্যেক কওমের মধ্যে রাসূল পাঠিয়ে বলেছি-তোমরা আল্লাহরই ইবাদত কর এবং শয়তান থেকে বেঁচে থাক।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “আমি শাস্তি প্রদানকারী নই যে পর্যন্ত না রাসূল প্রেরণ করি।” আল্লাহ পাক অন্য স্থানে বলেনঃ “যখন কাফিরদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তখন সেই জাহান্নামের রক্ষকগণ তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে- তোমাদের কাছে কি কোন ভয় প্রদর্শনকারী (নবী) আগমন করেননি? তারা উত্তরে বলবে-নিশ্চয়ই আমাদের কাছে ভয় প্রদর্শনকারী এসেছিলেন, কিন্তু আমরা অবিশ্বাস করেছিলাম।এ বিষয় সম্পর্কীয় বহু আয়াত রয়েছে।ইমাম আবু জাফর (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলার (আরবী) এই উক্তির দু'টি যুক্তি বা কারণের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম কারণ হচ্ছে-আল্লাহর এটা নীতি নয়, তিনি কোন কওমকে তাদের শিরকের কারণে এমন অবস্থায় তাদের ধ্বংস করবেন যে অবস্থায় তাদের নিজেদের শিরকের কোন সংবাদই থাকে না। অর্থাৎ তিনি শাস্তি প্রদানে তাড়াতাড়ি করেন না, যে পর্যন্ত না তাদের কাছে কোন রাসূল পাঠিয়ে তাদেরকে শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং সেই রাসূল আল্লাহর হুজ্জত পূর্ণ করেন, আর আখিরাতের শাস্তি থেকে তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। তিনি যদি কাউকে তার অজ্ঞাত অবস্থায় পাকড়াও করতেন তবে সে বলতোঃ আমার কাছে তো কোন সুসংবাদদাতা এবং ভয় প্রদর্শনকারী আসেননি। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে-আল্লাহ পাক বলছেন যে, তিনি তাদেরকে সতর্ক করা ছাড়া এবং রাসূল ও আয়াতের মাধ্যমে উপদেশ দান ব্যতীত ধ্বংস করেন না। নতুবা তাদের উপর এটা অত্যাচার হয়ে যেতো। আর আল্লাহ তো স্বীয় বান্দাদের উপর যুলুম করেন না। এর পরে আবু জাফর (রঃ) প্রথম কারণকে প্রাধান্য দেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এ কারণটিই বেশী প্রবল ও উত্তম। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবী) অর্থাৎ প্রত্যেক সৎ ও অসৎ আমলকারীর জন্যে আমল হিসেবে মরতবা ও মর্যাদা রয়েছে। যার যেরূপ আমল সেই অনুপাতে সে প্রতিফল পাবে। যদি আমল ভাল হয় তবে পরিণাম ভাল হবে, আর যদি আমল খারাপ হয় তবে পরিণামও খারাপ হবে। আবার এ অর্থও হতে পারে যে, ঐ কাফির দানব ও মানবের কয়েকটি শ্রেণী বিভাগ রয়েছে। প্রত্যেক কাফিরের জন্যে জাহান্নামে তার পাপের পরিণাম অনুযায়ী শ্রেণীভেদ রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেকের জন্যে দ্বিগুণ (শাস্তি) আছে।” (৭:৩৮) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যারা কুফরী করেছে এবং লোকদেরকে সরল সহজ পথ থেকে সরিয়ে রেখেছে, আমি তাদেরকে শাস্তির উপর শাস্তি বেশী বেশী করে প্রদান করবো, কেননা তারা নিজেরাও কুফরী করেছে এবং অন্যদেরকেও কুফরীর পথে পরিচালিত করেছে আর তারা বিশৃংখলা ও অশান্তি সৃষ্টি করেছে। তোমার প্রভু তো তাদের আমল থেকে উদাসীন নন।”এই লোকগুলো আল্লাহর ইলমের মধ্যে রয়েছে। যখন তারা তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন করবে তখন তিনি তাদেরকে শাস্তি দ্বারা জর্জরিত করবেন।

আল-আনআম 6:133

১৩৩-১৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেন-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমার প্রতিপালক সমস্ত মাখলুকাত হতে সর্ব দিক দিয়েই অমুখাপেক্ষী। সমস্ত ব্যাপারে সবাই তারই মুখাপেক্ষী। তাছাড়া তিনি মহান ও দয়ালুও বটে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহ লোকদের প্রতি অত্যন্ত করুণাময় ও দয়ালু।” (২:১৪৩)ইরশাদ হচ্ছে-যদি তোমরা তাঁর আদেশ নিষেধ অমান্য কর তবে তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিবেন, অতঃপর যে কওমকে চাইবেন তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন, যাতে এই অন্য কওম তাঁর বাধ্য ও অনুগত হয়ে। যায়।(আরবী) যেমন তিনি তোমাদেরকে অন্য এক জাতির বংশধর হতে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ এই কাজের উপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান, তাঁর কাছে এটা খুবই সহজ। যেমন তিনি পূর্ব যুগকে ধ্বংস করে ওদের স্থলে অন্য কওমকে আনয়ন করতে সক্ষম। তিনি বলেনঃ হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী এবং তার ফকীর। আর অমুখাপেক্ষী ও প্রশংসিত হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ধ্বংস করে অন্য মাখলুক সৃষ্টি করবেন। এটা তাঁর কাছে মোটেই কঠিন কাজ নয়। তিনি বলেনঃ “যদি তোমরা তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে তোমাদের পরিবর্তে তিনি অন্য কওমকে আনয়ন করবেন, অতঃপর তারা তোমাদের মত হবে না।” আবান ইবনে উসমান এই আয়াত সম্পর্কে বলেন যে, (আরবী) মূলকেও বলা হয় এবং বংশকেও বলা হয়।আল্লাহ পাকের উক্তি-(আরবী) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তাদেরকে তুমি জানিয়ে দাও যে, কিয়ামত সম্পর্কে তাদেরকে যে কথার ওয়াদা দেয়া হয়েছে তা অবশ্য অবশ্যই পালিত হবে। তোমরা আল্লাহকে অপারগ করতে পারবে না। তিনি তো এ কাজের উপর ক্ষমতাবান যে, তোমরা মাটি হয়ে যাওয়ার পর এবং তোমাদের হাড়গুলো পচে গলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও তোমাদেরকে তিনি পুনর্জীবিত করবেন। এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “হে আদম সন্তান! যদি তোমরা জ্ঞানবান হও তবে নিজেদেরকে মৃতদের মধ্যে গণনা কর। কেননা, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদেরকে যে বিষয় সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা অবশ্যম্ভাবী এবং তোমরা আল্লাহকে অক্ষম ও দুর্বল করতে পারবে না।”ইরশাদ হচ্ছে- হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও, তোমরা নিজ নিজ অবস্থায় আমল করতে থাক, আমিও আমল করছি। কার পরিণাম কল্যাণকর তা তোমরা শীঘই জানতে পারবে। এটা ভয়ানক ধমক ও ভীতি প্রদর্শন। অর্থাৎ যদি তোমরা ধারণা করে থাক যে, তোমরা সঠিক পথেই রয়েছে তবে ঐ পথেই চল এবং আমিও আমার পথে চলছি। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না তাদেরকে বলে দাও-তোমরা তোমাদের স্থানে আমল করে যাও এবং আমরাও আমল করে যাচ্ছি, তোমরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করতে থাক, আমরাও তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করতে রয়েছি। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে যে কার পরিণাম কল্যাণকর। জেনে রেখো যে, যালিমরা কখনও মুক্তি ও সাফল্য লাভ করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, তার জন্যে বহু শহর জয় করিয়েছেন, দেশসমূহের উপর তাকে ক্ষমতা প্রদান করেছেন, বিরুদ্ধবাদীদের মাথা নীচু করিয়েছেন, মক্কার উপর তাঁকে বিজয়ী করেছেন, সারা মক্কাবাসীর উপর তাকে বিজয় দান করেছেন এবং সমস্ত আরব উপদ্বীপের উপর তার শাসন কায়েম করেছেন। অনুরূপভাবে ইয়ামন ও বাহরাইনের উপরও তার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ সবকিছু তাঁর জীবদ্দশাতেই সংঘটিত হয়েছে। তাঁর ইন্তেকালের পর খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে শহরসমূহ এবং বিভিন্ন ভূখণ্ডগুলো বিজিত হতে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন- আমি এবং আমার রাসূল (সঃ) অবশ্যই জয়যুক্ত হবে, আল্লাহ ক্ষমতাবান ও প্রতাপশালী ।”আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি অবশ্যই স্বীয় রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদেরকে পার্থিব জীবনেও সাহায্য করবো এবং আখেরাতেও সাহায্য করবো, যেই দিন অত্যাচারীদের ওযর তাদের কোনই উপকার করবে না, তাদের জন্যে রয়েছে অভিসম্পাত ও জঘন্য বাসস্থান।" আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “যিকরের পর যায়ূরে আমি লিখে দিয়েছিলাম যে, আমার সৎ বান্দারা যমীনের উত্তরাধিকারী হবে।” আর তিনি স্বীয় রাসূলদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ “আমি রাসূলদের কাছে অহী পাঠিয়েছিলাম যে, যালিমদেরকে আমি অবশ্যই ধ্বংস করে দেবো, অতঃপর তাদের পরে আমি তোমাদেরকে (মুমিনদেরকে) ভূ-পৃষ্ঠে রাজত্ব দান করবো, এটা ঐ লোকদের জন্যে যারা আমাকে ভয় করে।” অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে তাদের সাথে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাদেরকে যমীনে তাঁর খলিফা বানাবেন যেমন তাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে স্বীয় খলিফা বানিয়েছিলেন, আর যে দ্বীনকে তিনি পছন্দ করেছেন সেই দ্বীনের উপর তাদেরকে পরিচালিত করবেন এবং ভয়ের পরে তাদের জীবনকে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে পরিবর্তন করবেন, কেননা তারা আমার ইবাদত করে এবং শির্ক করে না।” আল্লাহ তা'আলা উম্মতে মুহাম্মাদিয়াকে এই বিশেষত্ব দান করেছেন। সুতরাং প্রথম ও শেষ এবং প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত প্রশংসা ও শুকরিয়া আল্লাহর জন্যে।

আল-আনআম 6:134

১৩৩-১৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেন-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমার প্রতিপালক সমস্ত মাখলুকাত হতে সর্ব দিক দিয়েই অমুখাপেক্ষী। সমস্ত ব্যাপারে সবাই তারই মুখাপেক্ষী। তাছাড়া তিনি মহান ও দয়ালুও বটে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহ লোকদের প্রতি অত্যন্ত করুণাময় ও দয়ালু।” (২:১৪৩)ইরশাদ হচ্ছে-যদি তোমরা তাঁর আদেশ নিষেধ অমান্য কর তবে তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিবেন, অতঃপর যে কওমকে চাইবেন তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন, যাতে এই অন্য কওম তাঁর বাধ্য ও অনুগত হয়ে। যায়।(আরবী) যেমন তিনি তোমাদেরকে অন্য এক জাতির বংশধর হতে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ এই কাজের উপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান, তাঁর কাছে এটা খুবই সহজ। যেমন তিনি পূর্ব যুগকে ধ্বংস করে ওদের স্থলে অন্য কওমকে আনয়ন করতে সক্ষম। তিনি বলেনঃ হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী এবং তার ফকীর। আর অমুখাপেক্ষী ও প্রশংসিত হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ধ্বংস করে অন্য মাখলুক সৃষ্টি করবেন। এটা তাঁর কাছে মোটেই কঠিন কাজ নয়। তিনি বলেনঃ “যদি তোমরা তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে তোমাদের পরিবর্তে তিনি অন্য কওমকে আনয়ন করবেন, অতঃপর তারা তোমাদের মত হবে না।” আবান ইবনে উসমান এই আয়াত সম্পর্কে বলেন যে, (আরবী) মূলকেও বলা হয় এবং বংশকেও বলা হয়।আল্লাহ পাকের উক্তি-(আরবী) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তাদেরকে তুমি জানিয়ে দাও যে, কিয়ামত সম্পর্কে তাদেরকে যে কথার ওয়াদা দেয়া হয়েছে তা অবশ্য অবশ্যই পালিত হবে। তোমরা আল্লাহকে অপারগ করতে পারবে না। তিনি তো এ কাজের উপর ক্ষমতাবান যে, তোমরা মাটি হয়ে যাওয়ার পর এবং তোমাদের হাড়গুলো পচে গলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও তোমাদেরকে তিনি পুনর্জীবিত করবেন। এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “হে আদম সন্তান! যদি তোমরা জ্ঞানবান হও তবে নিজেদেরকে মৃতদের মধ্যে গণনা কর। কেননা, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদেরকে যে বিষয় সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা অবশ্যম্ভাবী এবং তোমরা আল্লাহকে অক্ষম ও দুর্বল করতে পারবে না।”ইরশাদ হচ্ছে- হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও, তোমরা নিজ নিজ অবস্থায় আমল করতে থাক, আমিও আমল করছি। কার পরিণাম কল্যাণকর তা তোমরা শীঘই জানতে পারবে। এটা ভয়ানক ধমক ও ভীতি প্রদর্শন। অর্থাৎ যদি তোমরা ধারণা করে থাক যে, তোমরা সঠিক পথেই রয়েছে তবে ঐ পথেই চল এবং আমিও আমার পথে চলছি। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না তাদেরকে বলে দাও-তোমরা তোমাদের স্থানে আমল করে যাও এবং আমরাও আমল করে যাচ্ছি, তোমরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করতে থাক, আমরাও তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করতে রয়েছি। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে যে কার পরিণাম কল্যাণকর। জেনে রেখো যে, যালিমরা কখনও মুক্তি ও সাফল্য লাভ করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, তার জন্যে বহু শহর জয় করিয়েছেন, দেশসমূহের উপর তাকে ক্ষমতা প্রদান করেছেন, বিরুদ্ধবাদীদের মাথা নীচু করিয়েছেন, মক্কার উপর তাঁকে বিজয়ী করেছেন, সারা মক্কাবাসীর উপর তাকে বিজয় দান করেছেন এবং সমস্ত আরব উপদ্বীপের উপর তার শাসন কায়েম করেছেন। অনুরূপভাবে ইয়ামন ও বাহরাইনের উপরও তার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ সবকিছু তাঁর জীবদ্দশাতেই সংঘটিত হয়েছে। তাঁর ইন্তেকালের পর খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে শহরসমূহ এবং বিভিন্ন ভূখণ্ডগুলো বিজিত হতে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন- আমি এবং আমার রাসূল (সঃ) অবশ্যই জয়যুক্ত হবে, আল্লাহ ক্ষমতাবান ও প্রতাপশালী ।”আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি অবশ্যই স্বীয় রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদেরকে পার্থিব জীবনেও সাহায্য করবো এবং আখেরাতেও সাহায্য করবো, যেই দিন অত্যাচারীদের ওযর তাদের কোনই উপকার করবে না, তাদের জন্যে রয়েছে অভিসম্পাত ও জঘন্য বাসস্থান।" আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “যিকরের পর যায়ূরে আমি লিখে দিয়েছিলাম যে, আমার সৎ বান্দারা যমীনের উত্তরাধিকারী হবে।” আর তিনি স্বীয় রাসূলদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ “আমি রাসূলদের কাছে অহী পাঠিয়েছিলাম যে, যালিমদেরকে আমি অবশ্যই ধ্বংস করে দেবো, অতঃপর তাদের পরে আমি তোমাদেরকে (মুমিনদেরকে) ভূ-পৃষ্ঠে রাজত্ব দান করবো, এটা ঐ লোকদের জন্যে যারা আমাকে ভয় করে।” অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে তাদের সাথে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাদেরকে যমীনে তাঁর খলিফা বানাবেন যেমন তাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে স্বীয় খলিফা বানিয়েছিলেন, আর যে দ্বীনকে তিনি পছন্দ করেছেন সেই দ্বীনের উপর তাদেরকে পরিচালিত করবেন এবং ভয়ের পরে তাদের জীবনকে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে পরিবর্তন করবেন, কেননা তারা আমার ইবাদত করে এবং শির্ক করে না।” আল্লাহ তা'আলা উম্মতে মুহাম্মাদিয়াকে এই বিশেষত্ব দান করেছেন। সুতরাং প্রথম ও শেষ এবং প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত প্রশংসা ও শুকরিয়া আল্লাহর জন্যে।

আল-আনআম 6:135

১৩৩-১৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেন-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমার প্রতিপালক সমস্ত মাখলুকাত হতে সর্ব দিক দিয়েই অমুখাপেক্ষী। সমস্ত ব্যাপারে সবাই তারই মুখাপেক্ষী। তাছাড়া তিনি মহান ও দয়ালুও বটে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহ লোকদের প্রতি অত্যন্ত করুণাময় ও দয়ালু।” (২:১৪৩)ইরশাদ হচ্ছে-যদি তোমরা তাঁর আদেশ নিষেধ অমান্য কর তবে তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিবেন, অতঃপর যে কওমকে চাইবেন তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন, যাতে এই অন্য কওম তাঁর বাধ্য ও অনুগত হয়ে। যায়।(আরবী) যেমন তিনি তোমাদেরকে অন্য এক জাতির বংশধর হতে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ এই কাজের উপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান, তাঁর কাছে এটা খুবই সহজ। যেমন তিনি পূর্ব যুগকে ধ্বংস করে ওদের স্থলে অন্য কওমকে আনয়ন করতে সক্ষম। তিনি বলেনঃ হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী এবং তার ফকীর। আর অমুখাপেক্ষী ও প্রশংসিত হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ধ্বংস করে অন্য মাখলুক সৃষ্টি করবেন। এটা তাঁর কাছে মোটেই কঠিন কাজ নয়। তিনি বলেনঃ “যদি তোমরা তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে তোমাদের পরিবর্তে তিনি অন্য কওমকে আনয়ন করবেন, অতঃপর তারা তোমাদের মত হবে না।” আবান ইবনে উসমান এই আয়াত সম্পর্কে বলেন যে, (আরবী) মূলকেও বলা হয় এবং বংশকেও বলা হয়।আল্লাহ পাকের উক্তি-(আরবী) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তাদেরকে তুমি জানিয়ে দাও যে, কিয়ামত সম্পর্কে তাদেরকে যে কথার ওয়াদা দেয়া হয়েছে তা অবশ্য অবশ্যই পালিত হবে। তোমরা আল্লাহকে অপারগ করতে পারবে না। তিনি তো এ কাজের উপর ক্ষমতাবান যে, তোমরা মাটি হয়ে যাওয়ার পর এবং তোমাদের হাড়গুলো পচে গলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও তোমাদেরকে তিনি পুনর্জীবিত করবেন। এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “হে আদম সন্তান! যদি তোমরা জ্ঞানবান হও তবে নিজেদেরকে মৃতদের মধ্যে গণনা কর। কেননা, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদেরকে যে বিষয় সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা অবশ্যম্ভাবী এবং তোমরা আল্লাহকে অক্ষম ও দুর্বল করতে পারবে না।”ইরশাদ হচ্ছে- হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও, তোমরা নিজ নিজ অবস্থায় আমল করতে থাক, আমিও আমল করছি। কার পরিণাম কল্যাণকর তা তোমরা শীঘই জানতে পারবে। এটা ভয়ানক ধমক ও ভীতি প্রদর্শন। অর্থাৎ যদি তোমরা ধারণা করে থাক যে, তোমরা সঠিক পথেই রয়েছে তবে ঐ পথেই চল এবং আমিও আমার পথে চলছি। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না তাদেরকে বলে দাও-তোমরা তোমাদের স্থানে আমল করে যাও এবং আমরাও আমল করে যাচ্ছি, তোমরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করতে থাক, আমরাও তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করতে রয়েছি। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে যে কার পরিণাম কল্যাণকর। জেনে রেখো যে, যালিমরা কখনও মুক্তি ও সাফল্য লাভ করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, তার জন্যে বহু শহর জয় করিয়েছেন, দেশসমূহের উপর তাকে ক্ষমতা প্রদান করেছেন, বিরুদ্ধবাদীদের মাথা নীচু করিয়েছেন, মক্কার উপর তাঁকে বিজয়ী করেছেন, সারা মক্কাবাসীর উপর তাকে বিজয় দান করেছেন এবং সমস্ত আরব উপদ্বীপের উপর তার শাসন কায়েম করেছেন। অনুরূপভাবে ইয়ামন ও বাহরাইনের উপরও তার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ সবকিছু তাঁর জীবদ্দশাতেই সংঘটিত হয়েছে। তাঁর ইন্তেকালের পর খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে শহরসমূহ এবং বিভিন্ন ভূখণ্ডগুলো বিজিত হতে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন- আমি এবং আমার রাসূল (সঃ) অবশ্যই জয়যুক্ত হবে, আল্লাহ ক্ষমতাবান ও প্রতাপশালী ।”আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি অবশ্যই স্বীয় রাসূল (সঃ) এবং মুমিনদেরকে পার্থিব জীবনেও সাহায্য করবো এবং আখেরাতেও সাহায্য করবো, যেই দিন অত্যাচারীদের ওযর তাদের কোনই উপকার করবে না, তাদের জন্যে রয়েছে অভিসম্পাত ও জঘন্য বাসস্থান।" আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “যিকরের পর যায়ূরে আমি লিখে দিয়েছিলাম যে, আমার সৎ বান্দারা যমীনের উত্তরাধিকারী হবে।” আর তিনি স্বীয় রাসূলদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ “আমি রাসূলদের কাছে অহী পাঠিয়েছিলাম যে, যালিমদেরকে আমি অবশ্যই ধ্বংস করে দেবো, অতঃপর তাদের পরে আমি তোমাদেরকে (মুমিনদেরকে) ভূ-পৃষ্ঠে রাজত্ব দান করবো, এটা ঐ লোকদের জন্যে যারা আমাকে ভয় করে।” অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে তাদের সাথে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাদেরকে যমীনে তাঁর খলিফা বানাবেন যেমন তাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে স্বীয় খলিফা বানিয়েছিলেন, আর যে দ্বীনকে তিনি পছন্দ করেছেন সেই দ্বীনের উপর তাদেরকে পরিচালিত করবেন এবং ভয়ের পরে তাদের জীবনকে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে পরিবর্তন করবেন, কেননা তারা আমার ইবাদত করে এবং শির্ক করে না।” আল্লাহ তা'আলা উম্মতে মুহাম্মাদিয়াকে এই বিশেষত্ব দান করেছেন। সুতরাং প্রথম ও শেষ এবং প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত প্রশংসা ও শুকরিয়া আল্লাহর জন্যে।

আল-আনআম 6:136

এখানে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মুশরিকদেরকে তিরস্কার করা হচ্ছে যারা বিদআত, শিরক ও কুফরী ছড়িয়ে দিয়েছিল এবং মাখলুকাতকে তার শরীক বানিয়ে ছিল । অথচ প্রত্যেক জিনিসেরই সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন সেই পাক পরওয়ারদিগার। এজন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন-এ লোকগুলো জমির উৎপাদন এবং পশুর বংশ থেকে যা কিছু পাচ্ছে তার একটা অংশ আল্লাহর নামে নির্ধারণ করছে এবং নিজেদের ভিত্তিহীন ধারণামতে বলছে; এই অংশ আল্লাহর জন্যে এবং এই অংশ আমাদের শরীকদের জন্যে। কিন্তু শরীকদের নামে যেগুলো রয়েছে সেগুলো তো আল্লাহর জন্যে খরচ করা হয় না, পক্ষান্তরে যেগুলো আল্লাহর নামে রয়েছে সেগুলো তাদের শরীকদের প্রয়োজনে ব্যয় করা হচ্ছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, আল্লাহ তাআলার এই শত্রুরা যখন শস্যক্ষেত্র হতে শস্য উৎপাদন করতো কিংবা খেজুর। বৃক্ষ হতে খেজুর লাভ করতো তখন তারা ওগুলোর কতক অংশ আল্লাহর বলে নির্ধারণ করতো এবং কতক অংশ মূর্তির নামে নির্ধারণ করতো। অতঃপর যেগুলো মর্তির নামে নির্দিষ্ট করতে সেগুলো রক্ষিত রাখতো। অতঃপর আল্লাহর জন্যে নির্ধারিত অংশ হতে যদি কোন কিছু মূর্তির জন্যে নির্ধারিত অংশে পড়ে যেতো তবে তা ঐ ভাবেই রেখে দিতে এবং বলতো-আল্লাহ সম্পদশালী, তিনি মূর্তির মুখাপেক্ষী নন। পক্ষান্তরে মূর্তির জন্যে নির্ধারিত অংশ হতে কোন কিছু আল্লাহর জন্যে নির্ধারিত অংশে পড়ে গেলে আল্লাহর অংশ হতে ওটা নিয়ে মূর্তির অংশ পূরণ করতো এবং বলতো-এটা আমাদের দেবদেবীরই হক এবং এরা দরিদ্র ও মুখাপেক্ষী। আল্লাহর জন্যে নির্ধারিত জমির পানি বেড়ে গিয়ে মূর্তির জন্যে নির্ধারিত কর্ষণকৃত জমিকে ভিজিয়ে দিলে তারা এরূপ হতে দিতে এবং ওটাকে মূর্তির জন্যেই নির্দিষ্ট করে দিতো। তারা বাহিরা’, সায়েবা’, ‘হাম’ এবং ‘ওয়াসীলা পশুগুলোকে মূর্তির জন্যে নির্দিষ্ট করতো এবং দাবী করতো যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই তারা ঐ পশুগুলো দ্বারা উপকার লাভ করা হারাম মনে করে থাকে। এই আয়াতে এই বিষয়ের উপরই আলোকপাত করা হয়েছে। (খাওলান গোত্রের ‘আম্মে আনাস' নামক একটি প্রতিমা ছিল। তারা ওর জন্যে অংশ নির্ধারণ করতো এবং আল্লাহর জন্যেও অংশ নির্ধারণ করতো। অতঃপর আল্লাহর জন্যে নির্ধারিত অংশের মধ্যে ওর অংশের কিছুটা পড়ে গেলে তারা ওকে ওটা ফিরিয়ে দিত এবং বলতোঃ এটা দুর্বল মা'বৃদ।এভাবেই সুহাইলী ইবনে ইসহাক হতে এটা বর্ণনা করেছেন। এই খাগুলান গোত্রের লোকেরা হচ্ছে আমর ইবনুল হারিস ইবনে কুযাআর বংশধর)ইবনে আসলাম বলেন যে, তারা আল্লাহর জন্যে নির্ধারিত কোন জন্তু যবাই করলে আল্লাহর নামের সাথে প্রতিমার নামও উচ্চারণ করতো। ঘটনাক্রমে যদি শুধু আল্লাহর নামই নেয়া হতো এবং প্রতিমার নাম না নেয়া হতো তবে তারা ঐ জবাইকৃত জন্তুর গোশত খেতো না। পক্ষান্তরে প্রতিমার জন্যে নির্ধারিত জন্তু যবাই করার সময় তারা আল্লাহর নাম নিতো না, শুধু প্রতিমার নাম নিতো। অতঃপর তিনি (আরবী) (অর্থাৎ তাদের ফায়সালা ও বণ্টননীতি কতইনা জঘন্য!) এই আয়াতটি পাঠ করেন।প্রথমে তো তারা বণ্টনেই ভুল করেছে। কেননা, আল্লাহ তা'আলাই প্রত্যেক জিনিসের প্রতিপালক ও সৃষ্টিকর্তা। তিনিই রাজাধিপতি। সবকিছুই তার ক্ষমতার মধ্যে। তিনি ছাড়া অন্য কেউ মা'বূদ নেই। সবকিছু তাঁর ইচ্ছাধীন। এরপর যে বিকৃত বণ্টন তারা করলো সেখানেও তারা সঠিক পন্থা অবলম্বন করলো না, বরং তাতেও যুলুম ও অন্যায় করলো। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা আল্লাহর জন্যে নির্ধারণ করলো কন্যা, আর নিজেদের জন্যে নির্ধারণ করলো পুত্র!” আল্লাহ পাক আরও বলেনঃ “তারা আল্লাহর বান্দাদেরকেই তাঁর পুত্র বানিয়ে দিলো! মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “তোমাদের জন্যে ছেলে আর আল্লাহর জন্যে মেয়ে, এটা অত্যন্ত অপ্রীতিকর ও বেটংগা বন্টনই বটে!”

আল-আনআম 6:137

আল্লাহ পাক বলেনঃ শয়তানরা যেমন তাদেরকে বলেছে যে, আল্লাহর জন্যে প্রতিমাদের থেকে পৃথক একটা অংশ নির্ধারণ করা একটা পছন্দনীয় কাজ দ্রুপ দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ভয়ে সন্তানদেরকে হত্যা করা এবং লজ্জার ভয়ে কন্যাদেরকে জীবিত প্রোথিত করা তাদের কাছে শোভনীয় করেছে। তাদের শরীক শয়তানরাই তাদেরকে পরামর্শ দিতো যে, তারা যেন দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাদের সন্তানদেরকে জীবিত প্রোথিত করে। হয় তাদের ধ্বংস করার নিয়তই থাকতো অথবা ওটাকে তারা একটা ধর্মীয় কাজ মনে করতো। আর তাদের কাছে দ্বীন সন্দেহপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন তাদেরকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন অসন্তুষ্টির কারণে তাদের মুখ কালো হয়ে যায়। লজ্জার কারণে লোকদের থেকে আত্মগোপন করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “যখন জীবিত প্রোথিতা মেয়েদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে-কোন্ পাপের কারণে তোমাদেরকে হত্যা করা হয়েছিল। (তখন তোমরা কি জবাব দেবে)?" তাছাড়া তারা এজন্যেও সন্তানদেরকে হত্যা করতো যে, দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ভয় তাদেরকে ধরে বসততা এবং তাদেরকে প্রতিপালন করতে মাল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার তারা ভয় করতো। এসব ছিল শয়তানেরই কারসাজী।এরপর আল্লাহ পাক বলেন ? যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তারা এইরূপ করতো না। অর্থাৎ যা কিছু হচ্ছে সবই তাঁর ইচ্ছাতেই হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পূর্ণ নৈপুণ্য। তার কাজে কেউ প্রতিবাদ করতে পারে না । অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকেও ছেড়ে দাও এবং তাদের মিথ্যা মা’রূদদেরকেও ছেড়ে দাও। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ও তাদের ফায়সালা করবেন।

আল-আনআম 6:138

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে হারাম বা নিষিদ্ধ অর্থাৎ যাকে তারা ‘ওয়াসীলা' রূপে হারাম করে নিয়েছিল। (এটা হচ্ছে মুজাহিদ (রঃ), যহহাক (রঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), ইবনে যায়েদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি) তারা বলতোঃ এই পশু, এই ক্ষেত্রের ফসল হারাম, আমাদের অনুমতি ছাড়া এটা কেউ খেতে পারে না। তারা যে নিজেদের উপর এভাবে হারাম করে নিতে এবং কাঠিন্য আনয়ন করতো এটা শয়তানের পক্ষ থেকে ছিল, আল্লাহর পক্ষ থেকে ছিল না। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, তারা তাদের দেবতাদের খাতিরেই ওগুলো নিজেদের উপর হারাম করে নিয়েছিল। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমাদের কি হয়েছে যে, যেটাকে আল্লাহ তোমাদের জীবিকা বানিয়েছিলেন সেটাকে তোমরা হারাম করে নিয়েছে এবং হারামকে হালাল করে নিয়েছো? হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর-আল্লাহ কি তোমাদেরকে এই নির্দেশ দিয়েছেন, না তোমরা তাঁর উপর মিথ্যারোপ করছো?" অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কাছে বাহীরা’, ‘সায়েবা,' ‘ওয়াসীলা' এবং ‘হাম’-এর কোন সনদ নেই, কিন্তু এই কাফিররা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করেছে এবং তাদের অধিকাংশই কিছুই বুঝে না।” সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ঐ পশুগুলোকে বাহীরা, সায়েবা, ওয়াসীলা এবং হাম বলা হতো যেগুলোর পিঠে সওয়ার হওয়াকে তারা নিজেদের উপর হারাম করেছিল, কিংবা ঐ পশুগুলোকে বলা হতো যেগুলোর উপর তারা আল্লাহর নাম নিতো না, ভূমিষ্ট হওয়ার সময়েও নয় এবং যবাই করার সময়েও নয়। আবূ ওয়াইল বলেনঃ “কতগুলো পশুর উপর সওয়ার হওয়া হারাম ছিল এবং কতগুলো পশুর উপর আল্লাহর নাম নেয়া হতো না।” এই আয়াতে কোন পশু হারাম হওয়ার কথা বলা হয়েছে তা কি আপনারা জানেন? এর দ্বারা বাহীরা পশুগুলোকে বুঝানো হয়েছে, যেগুলোর উপর সওয়ার হয়ে তারা হজ্বে যেতো না, ওগুলোর উপর সওয়ার হতো না, বোঝা উঠাতো না, ওগুলোর দুধ পান করতো না এবং ওগুলোর দ্বারা বংশ বৃদ্ধিও করতো না। এ সবই হচ্ছে আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ। আল্লাহর এটা হুকুমও নয় এবং এটা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমও নয়। অতএব আল্লাহ তাদেরকে এই মিথ্যা অপবাদের শাস্তি প্রদান করবেন।

আল-আনআম 6:139

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কাফিররা যে বলতো, এই পশুগুলোর গর্ভে যা কিছু রয়েছে তা আমাদের পুরুষদের জন্যে নির্দিষ্ট।' এর দ্বারা পশুর দুধ উদ্দেশ্য। তারা কোন কোন পশুর দুধ স্ত্রী লোকদের উপর হারাম করে দিতো এবং পুরুষেরা পান করতো। যদি বকরীর নর বাচ্চা পয়দা হতো তবে তা যবাই করে শুধু পুরুষ লোকেরাই খেতো, নারীদেরকে দিতো না। তাদেরকে বলতোঃ “তোমাদের জন্যে এটা হারাম।” মাদী বাচ্চা হলে ওটাকে যবাই করতো না, বরং পালন করতো। আর যদি মৃত বাচ্চা পয়দা হতো তবে পুরুষ নারী সবাই মিলিতভাবে খেতো। আল্লাহ এরূপ করতে নিষেধ করলেন।শাবী (রঃ) বলেন যে, বাহীরা পশুর দুধ শুধুমাত্র পুরুষেরাই খেতো। কোন পশু মরে গেলে পুরুষদের সাথে নারীদেরকেও অংশ দেয়া হতো। তাই ইরশাদ হচ্ছে যে, তাদের কৃত এইসব বিশেষণের প্রতিদান অতিসত্বরই তাদেরকে প্রদান করা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ- (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের রসনা যে মিথ্যা বলছে তা তোমরা বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম, এই উদ্দেশ্যে যে, তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেবে, নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেবে তারা কখনও সফলকাম হবে না।” (১৬:১১৬)।আল্লাহ পাক স্বীয় কাজে ও কথায় বড় বিজ্ঞানময় এবং তিনি স্বীয় বান্দাদের ভাল ও মন্দ কাজ সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। সুতরাং তিনি তাদেরকে তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে প্রদান করবেন।

আল-আনআম 6:140

আল্লাহ পাক বলছেন যে, যারা এসব কাজ করে তারা ইহকালেও ক্ষতিগ্রস্ত এবং পরকালেও ক্ষতিগ্রস্ত। দুনিয়ার ক্ষতি এই যে, সন্তানদেরকে হত্যা করে তারা ধ্বংসের মুখে নিপতিত হলো, তাদের ধন-সম্পদে সংকীর্ণতা এসে গেল, আর নিজেদের পক্ষ থেকে তারা যে নতুন প্রথা চালু করলো তার ফলে ঐ উপকারী বস্তুগুলো হতে তারা বঞ্চিত হয়ে গেল। পরকালে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার স্বরূপ এই যে, তারা সবচেয়ে জঘন্য বাসস্থানের অধিকারী হলো। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেয়, তারা কখনও সফলকাম হবে না, অল্প কয়েকদিন তারা দুনিয়ায় মজা উপভোগ করবে, অতঃপর তাঁরই কাছে তাদেরকে ফিরে যেতে হবে, তারপর তাদের কুফরীর কারণে তাদেরকে কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “যদি তোমরা আরবদের মূখ ও অজ্ঞতার পরিচয় লাভ করতে আগ্রহী হও তবে সূরায়ে আনআমের একশ’ ত্রিশ আয়াতের পরে পাঠ কর (আরবী)-এই আয়াত।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) মানাকিব বা রাসূলুলাহ (সঃ)-এর পরিবারবর্গ ও সাহাবীগণের প্রশংসায় বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে এটা তাখরীজ করেছেন)

আল-আনআম 6:141

১৪১-১৪২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জিনিসেরই সৃষ্টিকর্তা। শস্য, ফল-ফলাদি এবং চতুষ্পদ জন্ত, যেগুলো মুশরিকরা ব্যবহার করতো এবং বিকৃতভাবে ওগুলো বন্টন করতঃ কোনটাকে হালাল, আর কোনটাকে হারাম বানিয়ে নিতো। এ সবই আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন। এসব ফলের কতগুলো স্বীয় কাণ্ডের উপর সন্নিবিষ্ট হয় এবং কতগুলো কাণ্ডের উপর সন্নিবিষ্ট হয় না, এ সবগুলোরই তিনি সৃষ্টিকর্তা। (আরবী) হচ্ছে ঐসব গুল্মলতা যেগুলো পর্দার উপর চড়ানো অবস্থায় থাকে, যেমন আঙ্গুর ইত্যাদি। আর (আরবী) ঐ সব ফলদার বৃক্ষ যেগুলো জংগলে ও পাহাড়ে জন্মে। ওগুলো এক রকমও এবং বিভিন্ন রকমও হয়। অর্থাৎ দেখতে একরূপ কিন্তু স্বাদে পৃথক। আল্লাহ পাক বলেনঃ যখন গাছগুলোতে ফল ধরে তখন তোমরা সেই ফলগুলো ভক্ষণ কর । আর ফসল কাটার সময় গরীব মিসকীনদেরকে দেয়ার যে হক আছে তা আদায় কর। কেউ কেউ এর দ্বারা ফরয। যাকাত অর্থ নিয়েছেন। যখন সেই উৎপাদিত শস্য বা ফল ওযন বা পরিমাপ করা হবে সেই দিনই এই হক আদায় করতে হবে। পূর্বে লোকেরা এটা প্রদান করতো না। অতঃপর শরীয়ত এক দশমাংশ নির্ধারণ করে। আর যেটা শীষ বা গুচ্ছ থেকে খসে পড়বে সেটাও মিসকীনদের হক।হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন-যার (উৎপাদিত) খেজুরের পরিমাণ দশ ওয়াসাকের (ষাট সা’-এ এক ওয়াসাক। আর এক সা’-এ হয় পাকি দু’সের এগারো ছটাক বা মতান্তরে তিন সের ছ ছটাক) বেশী হবে সে যেন একটা গুচ্ছ মিসকীনদের জন্যে মসজিদে লটকিয়ে দেয়। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ উত্তম ও মজবুত)হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে শস্য বা ফলের সদকাহ অথবা যাকাত। আর যাকাত ছাড়াও গরীবদের জন্যে অতিরিক্ত হক রয়েছে। শস্য কাটার সময় যাকাত ছাড়াও এই অতিরিক্ত হক প্রদান করা হতো। সেই দিন যদি মিসকীন এসে যায় তবে অবশ্য অবশ্যই তাকে কিছু না কিছু দিতে হবে। তিনি বলেন যে, কমপক্ষে এক মুষ্টি করে দেয়া উচিত। আর যা শীষ থেকে বা গুচ্ছ থেকে পড়ে যাবে সেটাও মিসকীনেরই হক। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে যাকাত ফরয হওয়ার পূর্বের হুকুম যে, মিসকীনদের জন্যে ছিল এক মুষ্টি পরিমাণ এবং জীব-জন্তুর জন্যে ছিল চারা-ভুষি, আর পতিতগুলোও ছিল মিসকীনদের হক। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বলেন যে, এগুলো ওয়াজিব ছিল। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এটা মানসূখ করে দেন এবং ওশর বা অর্ধ এশরকে ওর স্থানে নির্ধারণ করেন। ইবনে জারীর (রঃ)-ও এটাকেই পছন্দ করেছেন। আমি বলি যে, এটাকে মানসূখ বলা চিন্তা ভাবনার বিষয়ই বটে। কেননা, এটা এমনই একটা জিনিস যা মূলেই ওয়াজিব ছিল। তারপর বিস্তারিতভাবে ওর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আর কত দিতে হবে সেই পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, এই যাকাত হিজরী দ্বিতীয় সনে ফরয হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদের নিন্দে করেছেন যারা ফসল কাটতে কিন্তু তা থেকে গরীব মিসকীনদেরকে কিছুই দান করতো না। যেমন ‘সূরায়ে নূন' -এ এক বাগানের মালিকের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন তারা শপথ করলো যে, নিশ্চয়ই প্রত্যষেই ওর ফল পেড়ে নেবে। কিন্তু ইনশাআল্লাহ (আল্লাহ যদি চান) বললো না। অতএব, তোমার প্রভুর পক্ষ হতে এক পরিভ্রমণকারী (আপদ) ওতে বয়ে গেল, আর তারা ঘুমন্ত ছিল। অতঃপর প্রভাতে বাগানটি এমন হয়ে রইলো, যেমন শস্য কাটা ক্ষেত। অনন্তর প্রাতে একে অন্যকে ডাকতে লাগলো । নিজ নিজ ক্ষেতের দিকে প্রত্যুষেই চল, যদি ফল পাড়তে হয়। অনন্তর চুপি চুপি বলতে বলতে চলল, আজ কোন দরিদ্র তোমাদের কাছে আসতে পারবে না এবং নিজেদেরকে ওটা না দিতে সক্ষম মনে করে চললো। অতঃপর যখন বাগান দেখলো তখন তারা বলতে লাগলো-নিশ্চয়ই আমরা পথ ভুলে গেছি। বরং আমাদের ভাগ্যই বিরূপ হয়ে গেছে। তাদের মধ্যকার ভাল লোকটি বললো, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি? এখন কেন। (তাওবা ও) তাসবীহ্ (পাঠ) করছো না? সবাই বললো, আমাদের প্রভু পবিত্র, নিশ্চয়ই আমরা অপরাধী। অতঃপর একে অপরকে সম্বোধন করে পরস্পর দোষারোপ করতে লাগলো। বলতে লাগলো, নিশ্চয়ই আমরা সীমালংঘনকারী ছিলাম। সম্ভবতঃ আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে প্রতিদানে এতদপেক্ষা উত্তম বাগান দান করতে পারেন, আমরা আমাদের প্রতিপালকের দিকে ফিরে যাচ্ছি এভাবেই শাস্তি হয়ে থাকে, আর পরকালের শাস্তি এটা অপেক্ষা গুরুতর, কি ভালো হতো, যদি তারা জানতো!” আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ তোমরা অপব্যয় করে সীমালংঘন করো না, নিশ্চয়ই তিনি অধ্যয়কারী ও সীমালংঘনকারীকে ভালবাসেন না। অর্থাৎ দেয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনের অতিরিক্ত দিতে শুরু করো না। কোন কোন লোক ফসল কাটার সময় এতো বেশী দান করতো যে, সেটা অপব্যয়ের মধ্যে পড়ে যেতো। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ অপব্যয় করো না।সাবিত ইবনে কায়েস স্বীয় খুরমা গাছের ফল পেড়ে ঘোষণা করে দেনঃ “আজ যে কেউই আমার কাছে আসবে আমি তাকেই প্রদান করবো। শেষ পর্যন্ত এতো বেশী লোক এসে নিয়ে গেল যে, একটা ফলও তাঁর কাছে অবশিষ্ট রইলো না। সেই সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয় যে, আল্লাহ তা'আলা অপব্যয়কারী ও সীমালংঘনকারীকে ভালবাসেন না। ইবনে জুরাইজ বলেন, এর ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেক কাজেই অপব্যয় ও সীমালংঘন নিষিদ্ধ। আয়াস ইবনে মুয়াবিয়া (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার আদেশ পালনের ব্যাপারে সীমা ছাড়িয়ে গেলেই সেটা ইসরাফ’ হয়ে যাবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন, এর ভাবার্থ হচ্ছে-এতো বেশী দান করো না যে, নিজে সবকিছু থেকে বঞ্চিত হয়ে যাও এবং দরিদ্র হয়ে পড়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন, যাকাত দেয়া বন্ধ করো না, নতুবা আল্লাহর অবাধ্যতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে। সঠিক কথা এটাই যে, প্রত্যেক ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন দূষণীয়। তবে এখানে যে বাড়াবাড়ি না করার কথা বলা হয়েছে তা খাওয়ার দিকে প্রত্যাবর্তিত, যা আয়াতের ধরনে অনুমিত হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ যখন ফল পেকে যাবে তখন সেই ফল ভক্ষণ কর এবং ফসল কাটার সময় গরীবদেরকে তাদের হক প্রদান কর, আর সীমালংঘন করো না অর্থাৎ তোমরা খাওয়ার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। কেননা, খুব বেশী খাওয়া বুদ্ধি-বিবেক ও দেহের পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ “তোমরা খাও,পান কর, কিন্তু বাড়াবাড়ি করো না।” সহীহ বুখারীতে রয়েছে- “তোমরা বাড়াবাড়ি ও অহংকার প্রদর্শন বাদ দিয়ে খাও, পান কর এবং পরিধান কর।” মহামহিমান্বিত আল্লাহর উক্তি (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যা তোমাদের বোঝা বহন ও সওয়ারীর কাজে লাগে, যেমন উট। (আরবী) দ্বারা ছোট ছোট গৃহপালিত জন্তু অথবা ছোট শ্রেণীর উট বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দ দ্বারা উট, ঘোড়া, খচ্চর, গাধা এবং সর্ব প্রকারের ভারবাহী পশু বুঝানোনা হয়েছে এবং (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ছাগল। মুজাহিদও (রঃ) এরূপই বলেছেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন: “আমার মনে হয় (আরবী) বলার কারণ এই যে, ওটা নিম্ন দেহ বিশিষ্ট হওয়ার ফলে যেন যমীনের ‘ফারশ’ বা বিছানা হয়ে গেছে। যহহাক (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে উট এবং গরু, আর(আরবী) হচ্ছে ছাগল। আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ (রঃ)-এর ধারণা এই যে, (আরবী) হচ্ছে সওয়ারীর জন্তু এবং (আরবী) হচ্ছে ঐ পশু যাকে যবাই করে গোশত ভক্ষণ করা হয় বা ওর দুধ পান করা হয়। ছাগল বোঝা বহন করে না, বরং ওর গোশত খাওয়া হয় এবং ওর পশম দিয়ে কম্বল ও বিছানা বানানো হয়। আব্দুর রহমান এই আয়াতের যে তাফসীর করেছেন সেটাই সঠিক বটে, আল্লাহ পাকের উক্তিও এর সাক্ষ্য বহন করে । তিনি বলেন- (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি লক্ষ্য করেনি যে, আমি তাদের জন্যে আমার (কুদরতের) হাতে বস্তুসমূহের মধ্যে চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তারাই এসবের মালিক হয়ে যাচ্ছে। আর আমি এই চতুষ্পদ জন্তুগুলোকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছি, অনন্তর ওর কতক তো তাদের বাহন এবং কতিপয়কে তারা ভক্ষণ করে থাকে।” (৩৬:৭১-৭২) আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “এই পশুগুলোর মধ্যে তোমাদের জন্যে বড়ই শিক্ষণীয় বিষয় ও উপদেশ রয়েছে। ওদের রক্ত দ্বারা তৈরীকৃত দুধ আমি তোমাদেরকে পান করিয়ে থাকি। এটা খাঁটি দুধ, পানকারীদের জন্যে এটা কতই না সুস্বাদু। ওদের লোম ও পশম তোমাদের জন্যে পোষাকের কাজ দেয় এবং তোমাদের অন্যান্য প্রয়োজনে তোমরা তা ব্যবহার করে থাক।” মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ “তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তুগুলো সৃষ্টি করেছেন যে তোমরা কতগুলোর উপর আরোহণ কর, কতগুলোর গোশত ভক্ষণ কর।” তোমাদের জন্যে অন্যান্য আরও উপকার রয়েছে। তোমরা ওদের দ্বারা তোমাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে থাক। তোমরা ওগুলোর উপর আরোহণ কর। আর তোমরা জাহাজে ও নৌকায় তোমাদের বোঝা চাপিয়ে থাক এবং সওয়ার হয়ে থাক। আল্লাহ তোমাদের কাছে নিজের কতই না নিদর্শন পেশ করছেন! তোমরা তাঁর কোন্ নিদর্শনকে অস্বীকার করবে? আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে যে ফল ফলাদি, ফসল, চতুষ্পদ জন্তু ইত্যাদি প্রদান করেছেন সেগুলো তোমরা খাও, এগুলো আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জীবিকা বানিয়েছেন। তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না যেমন এই মুশরিকরা তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। তারা কোন কোন আহার্যকে নিজেদের উপর হারাম করে নিয়েছে। হে লোক সকল! শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। অর্থাৎ তোমরা একটু চিন্তা করলেই তার শত্রুতা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সুতরাং তোমরাও শয়তানকে নিজেদের শত্রু বানিয়ে নাও। সে নিজের শয়তানী সেনাবাহিনী নিয়ে তোমাদের উপর আক্রমণ চালাচ্ছে, যেন তোমরা জাহান্নামের অধিবাসী হয়ে যাও। হে বানী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে ফিত্রায় না ফেলে, যেমন সে তোমাদের পিতা-মাতাকে (আদম ও হাওয়াকে) জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিল এবং তাদের দেহ থেকে পোশাক সরিয়ে দিয়েছিল। ফলে তারা উলঙ্গ হয়ে পড়েছিল। আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা কি আমাকে ছেড়ে শয়তানকে ও তার সন্তানদেরকে বন্ধু বানিয়ে নেবে? অথচ তারাতো তোমাদের শত্রু। অত্যাচারীদের জন্যে বড়ই জঘন্য বিনিময় রয়েছে।” কুরআন পাকে এই বিষয়ের বহু আয়াত রয়েছে।

আল-আনআম 6:142

১৪১-১৪২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জিনিসেরই সৃষ্টিকর্তা। শস্য, ফল-ফলাদি এবং চতুষ্পদ জন্ত, যেগুলো মুশরিকরা ব্যবহার করতো এবং বিকৃতভাবে ওগুলো বন্টন করতঃ কোনটাকে হালাল, আর কোনটাকে হারাম বানিয়ে নিতো। এ সবই আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন। এসব ফলের কতগুলো স্বীয় কাণ্ডের উপর সন্নিবিষ্ট হয় এবং কতগুলো কাণ্ডের উপর সন্নিবিষ্ট হয় না, এ সবগুলোরই তিনি সৃষ্টিকর্তা। (আরবী) হচ্ছে ঐসব গুল্মলতা যেগুলো পর্দার উপর চড়ানো অবস্থায় থাকে, যেমন আঙ্গুর ইত্যাদি। আর (আরবী) ঐ সব ফলদার বৃক্ষ যেগুলো জংগলে ও পাহাড়ে জন্মে। ওগুলো এক রকমও এবং বিভিন্ন রকমও হয়। অর্থাৎ দেখতে একরূপ কিন্তু স্বাদে পৃথক। আল্লাহ পাক বলেনঃ যখন গাছগুলোতে ফল ধরে তখন তোমরা সেই ফলগুলো ভক্ষণ কর । আর ফসল কাটার সময় গরীব মিসকীনদেরকে দেয়ার যে হক আছে তা আদায় কর। কেউ কেউ এর দ্বারা ফরয। যাকাত অর্থ নিয়েছেন। যখন সেই উৎপাদিত শস্য বা ফল ওযন বা পরিমাপ করা হবে সেই দিনই এই হক আদায় করতে হবে। পূর্বে লোকেরা এটা প্রদান করতো না। অতঃপর শরীয়ত এক দশমাংশ নির্ধারণ করে। আর যেটা শীষ বা গুচ্ছ থেকে খসে পড়বে সেটাও মিসকীনদের হক।হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন-যার (উৎপাদিত) খেজুরের পরিমাণ দশ ওয়াসাকের (ষাট সা’-এ এক ওয়াসাক। আর এক সা’-এ হয় পাকি দু’সের এগারো ছটাক বা মতান্তরে তিন সের ছ ছটাক) বেশী হবে সে যেন একটা গুচ্ছ মিসকীনদের জন্যে মসজিদে লটকিয়ে দেয়। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ উত্তম ও মজবুত)হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে শস্য বা ফলের সদকাহ অথবা যাকাত। আর যাকাত ছাড়াও গরীবদের জন্যে অতিরিক্ত হক রয়েছে। শস্য কাটার সময় যাকাত ছাড়াও এই অতিরিক্ত হক প্রদান করা হতো। সেই দিন যদি মিসকীন এসে যায় তবে অবশ্য অবশ্যই তাকে কিছু না কিছু দিতে হবে। তিনি বলেন যে, কমপক্ষে এক মুষ্টি করে দেয়া উচিত। আর যা শীষ থেকে বা গুচ্ছ থেকে পড়ে যাবে সেটাও মিসকীনেরই হক। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে যাকাত ফরয হওয়ার পূর্বের হুকুম যে, মিসকীনদের জন্যে ছিল এক মুষ্টি পরিমাণ এবং জীব-জন্তুর জন্যে ছিল চারা-ভুষি, আর পতিতগুলোও ছিল মিসকীনদের হক। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বলেন যে, এগুলো ওয়াজিব ছিল। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এটা মানসূখ করে দেন এবং ওশর বা অর্ধ এশরকে ওর স্থানে নির্ধারণ করেন। ইবনে জারীর (রঃ)-ও এটাকেই পছন্দ করেছেন। আমি বলি যে, এটাকে মানসূখ বলা চিন্তা ভাবনার বিষয়ই বটে। কেননা, এটা এমনই একটা জিনিস যা মূলেই ওয়াজিব ছিল। তারপর বিস্তারিতভাবে ওর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আর কত দিতে হবে সেই পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, এই যাকাত হিজরী দ্বিতীয় সনে ফরয হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদের নিন্দে করেছেন যারা ফসল কাটতে কিন্তু তা থেকে গরীব মিসকীনদেরকে কিছুই দান করতো না। যেমন ‘সূরায়ে নূন' -এ এক বাগানের মালিকের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন তারা শপথ করলো যে, নিশ্চয়ই প্রত্যষেই ওর ফল পেড়ে নেবে। কিন্তু ইনশাআল্লাহ (আল্লাহ যদি চান) বললো না। অতএব, তোমার প্রভুর পক্ষ হতে এক পরিভ্রমণকারী (আপদ) ওতে বয়ে গেল, আর তারা ঘুমন্ত ছিল। অতঃপর প্রভাতে বাগানটি এমন হয়ে রইলো, যেমন শস্য কাটা ক্ষেত। অনন্তর প্রাতে একে অন্যকে ডাকতে লাগলো । নিজ নিজ ক্ষেতের দিকে প্রত্যুষেই চল, যদি ফল পাড়তে হয়। অনন্তর চুপি চুপি বলতে বলতে চলল, আজ কোন দরিদ্র তোমাদের কাছে আসতে পারবে না এবং নিজেদেরকে ওটা না দিতে সক্ষম মনে করে চললো। অতঃপর যখন বাগান দেখলো তখন তারা বলতে লাগলো-নিশ্চয়ই আমরা পথ ভুলে গেছি। বরং আমাদের ভাগ্যই বিরূপ হয়ে গেছে। তাদের মধ্যকার ভাল লোকটি বললো, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি? এখন কেন। (তাওবা ও) তাসবীহ্ (পাঠ) করছো না? সবাই বললো, আমাদের প্রভু পবিত্র, নিশ্চয়ই আমরা অপরাধী। অতঃপর একে অপরকে সম্বোধন করে পরস্পর দোষারোপ করতে লাগলো। বলতে লাগলো, নিশ্চয়ই আমরা সীমালংঘনকারী ছিলাম। সম্ভবতঃ আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে প্রতিদানে এতদপেক্ষা উত্তম বাগান দান করতে পারেন, আমরা আমাদের প্রতিপালকের দিকে ফিরে যাচ্ছি এভাবেই শাস্তি হয়ে থাকে, আর পরকালের শাস্তি এটা অপেক্ষা গুরুতর, কি ভালো হতো, যদি তারা জানতো!” আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ তোমরা অপব্যয় করে সীমালংঘন করো না, নিশ্চয়ই তিনি অধ্যয়কারী ও সীমালংঘনকারীকে ভালবাসেন না। অর্থাৎ দেয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনের অতিরিক্ত দিতে শুরু করো না। কোন কোন লোক ফসল কাটার সময় এতো বেশী দান করতো যে, সেটা অপব্যয়ের মধ্যে পড়ে যেতো। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ অপব্যয় করো না।সাবিত ইবনে কায়েস স্বীয় খুরমা গাছের ফল পেড়ে ঘোষণা করে দেনঃ “আজ যে কেউই আমার কাছে আসবে আমি তাকেই প্রদান করবো। শেষ পর্যন্ত এতো বেশী লোক এসে নিয়ে গেল যে, একটা ফলও তাঁর কাছে অবশিষ্ট রইলো না। সেই সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয় যে, আল্লাহ তা'আলা অপব্যয়কারী ও সীমালংঘনকারীকে ভালবাসেন না। ইবনে জুরাইজ বলেন, এর ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেক কাজেই অপব্যয় ও সীমালংঘন নিষিদ্ধ। আয়াস ইবনে মুয়াবিয়া (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার আদেশ পালনের ব্যাপারে সীমা ছাড়িয়ে গেলেই সেটা ইসরাফ’ হয়ে যাবে। সুদ্দী (রঃ) বলেন, এর ভাবার্থ হচ্ছে-এতো বেশী দান করো না যে, নিজে সবকিছু থেকে বঞ্চিত হয়ে যাও এবং দরিদ্র হয়ে পড়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন, যাকাত দেয়া বন্ধ করো না, নতুবা আল্লাহর অবাধ্যতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে। সঠিক কথা এটাই যে, প্রত্যেক ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন দূষণীয়। তবে এখানে যে বাড়াবাড়ি না করার কথা বলা হয়েছে তা খাওয়ার দিকে প্রত্যাবর্তিত, যা আয়াতের ধরনে অনুমিত হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ যখন ফল পেকে যাবে তখন সেই ফল ভক্ষণ কর এবং ফসল কাটার সময় গরীবদেরকে তাদের হক প্রদান কর, আর সীমালংঘন করো না অর্থাৎ তোমরা খাওয়ার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। কেননা, খুব বেশী খাওয়া বুদ্ধি-বিবেক ও দেহের পক্ষে ক্ষতিকর। যেমন মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ “তোমরা খাও,পান কর, কিন্তু বাড়াবাড়ি করো না।” সহীহ বুখারীতে রয়েছে- “তোমরা বাড়াবাড়ি ও অহংকার প্রদর্শন বাদ দিয়ে খাও, পান কর এবং পরিধান কর।” মহামহিমান্বিত আল্লাহর উক্তি (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যা তোমাদের বোঝা বহন ও সওয়ারীর কাজে লাগে, যেমন উট। (আরবী) দ্বারা ছোট ছোট গৃহপালিত জন্তু অথবা ছোট শ্রেণীর উট বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দ দ্বারা উট, ঘোড়া, খচ্চর, গাধা এবং সর্ব প্রকারের ভারবাহী পশু বুঝানোনা হয়েছে এবং (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ছাগল। মুজাহিদও (রঃ) এরূপই বলেছেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন: “আমার মনে হয় (আরবী) বলার কারণ এই যে, ওটা নিম্ন দেহ বিশিষ্ট হওয়ার ফলে যেন যমীনের ‘ফারশ’ বা বিছানা হয়ে গেছে। যহহাক (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে উট এবং গরু, আর(আরবী) হচ্ছে ছাগল। আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ (রঃ)-এর ধারণা এই যে, (আরবী) হচ্ছে সওয়ারীর জন্তু এবং (আরবী) হচ্ছে ঐ পশু যাকে যবাই করে গোশত ভক্ষণ করা হয় বা ওর দুধ পান করা হয়। ছাগল বোঝা বহন করে না, বরং ওর গোশত খাওয়া হয় এবং ওর পশম দিয়ে কম্বল ও বিছানা বানানো হয়। আব্দুর রহমান এই আয়াতের যে তাফসীর করেছেন সেটাই সঠিক বটে, আল্লাহ পাকের উক্তিও এর সাক্ষ্য বহন করে । তিনি বলেন- (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি লক্ষ্য করেনি যে, আমি তাদের জন্যে আমার (কুদরতের) হাতে বস্তুসমূহের মধ্যে চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তারাই এসবের মালিক হয়ে যাচ্ছে। আর আমি এই চতুষ্পদ জন্তুগুলোকে তাদের বশীভূত করে দিয়েছি, অনন্তর ওর কতক তো তাদের বাহন এবং কতিপয়কে তারা ভক্ষণ করে থাকে।” (৩৬:৭১-৭২) আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “এই পশুগুলোর মধ্যে তোমাদের জন্যে বড়ই শিক্ষণীয় বিষয় ও উপদেশ রয়েছে। ওদের রক্ত দ্বারা তৈরীকৃত দুধ আমি তোমাদেরকে পান করিয়ে থাকি। এটা খাঁটি দুধ, পানকারীদের জন্যে এটা কতই না সুস্বাদু। ওদের লোম ও পশম তোমাদের জন্যে পোষাকের কাজ দেয় এবং তোমাদের অন্যান্য প্রয়োজনে তোমরা তা ব্যবহার করে থাক।” মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ “তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তুগুলো সৃষ্টি করেছেন যে তোমরা কতগুলোর উপর আরোহণ কর, কতগুলোর গোশত ভক্ষণ কর।” তোমাদের জন্যে অন্যান্য আরও উপকার রয়েছে। তোমরা ওদের দ্বারা তোমাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে থাক। তোমরা ওগুলোর উপর আরোহণ কর। আর তোমরা জাহাজে ও নৌকায় তোমাদের বোঝা চাপিয়ে থাক এবং সওয়ার হয়ে থাক। আল্লাহ তোমাদের কাছে নিজের কতই না নিদর্শন পেশ করছেন! তোমরা তাঁর কোন্ নিদর্শনকে অস্বীকার করবে? আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে যে ফল ফলাদি, ফসল, চতুষ্পদ জন্তু ইত্যাদি প্রদান করেছেন সেগুলো তোমরা খাও, এগুলো আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জীবিকা বানিয়েছেন। তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না যেমন এই মুশরিকরা তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। তারা কোন কোন আহার্যকে নিজেদের উপর হারাম করে নিয়েছে। হে লোক সকল! শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। অর্থাৎ তোমরা একটু চিন্তা করলেই তার শত্রুতা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সুতরাং তোমরাও শয়তানকে নিজেদের শত্রু বানিয়ে নাও। সে নিজের শয়তানী সেনাবাহিনী নিয়ে তোমাদের উপর আক্রমণ চালাচ্ছে, যেন তোমরা জাহান্নামের অধিবাসী হয়ে যাও। হে বানী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে ফিত্রায় না ফেলে, যেমন সে তোমাদের পিতা-মাতাকে (আদম ও হাওয়াকে) জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিল এবং তাদের দেহ থেকে পোশাক সরিয়ে দিয়েছিল। ফলে তারা উলঙ্গ হয়ে পড়েছিল। আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা কি আমাকে ছেড়ে শয়তানকে ও তার সন্তানদেরকে বন্ধু বানিয়ে নেবে? অথচ তারাতো তোমাদের শত্রু। অত্যাচারীদের জন্যে বড়ই জঘন্য বিনিময় রয়েছে।” কুরআন পাকে এই বিষয়ের বহু আয়াত রয়েছে।

আল-আনআম 6:143

১৪৩-১৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: ইসলামের পূর্বে অজ্ঞ আরবরা কতগুলো পশু নিজেদের উপর হারাম করে নিয়েছিল এবং ওগুলোর শ্রেণী বিভাগ নির্ধারণ করেছিল। অর্থাৎ 'বাহীরা, ‘সায়েবা’, ‘ওয়াসীলা’, ‘হাম’ ইত্যাদি পশুগুলো। তারা এরূপ হারাম করে নিয়েছিল পশুগুলোর মধ্যেও এবং ফসল ফলাদির মধ্যেও। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের এসব বাগান, শস্যক্ষেত্র, ভারবাহী পশু, আরোহণযোগ্য পশু ইত্যাদি সবকিছু আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর মহান আল্লাহ চতুষ্পদ জন্তুগুলোর প্রকার বর্ণনা করলেন এবং বকরিরও বর্ণনা দিলেন যা সাদা রং এর হয়ে থাকে, মেষের বর্ণনা দিলেন যা কাল রং এর হয়। ওগুলোর নর ও মাদীরও বর্ণনা করলেন। তারপর উট নর ও মাদী এবং গরু নর ও মাদীর বর্ণনা দিলেন। তিনি এ সমুদয়, জন্তুর কোনটাই হারাম করেননি এবং এগুলোর বাচ্চাগুলোকেও না। কেননা, তিনি এগুলোকে বানী আদমের খাদ্য, সওয়ারী, বোঝা বহন, দুগ্ধপান ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকারের উপকার লাভের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ এই পশুগুলোর মধ্য হতে আট জোড়া তোমাদের জন্যে অবতীর্ণ করেছি।(আরবী) -এটা দ্বারা কাফিরদের নিম্নের উক্তিকে খণ্ডন করা হয়েছেঃ “এই জন্তুগুলোর পেটে যা রয়েছে তা শুধু আমাদের পুরুষদের জন্যে, আমাদের স্ত্রীলোকদের জন্যে এটা হারাম।” এখন আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে আমাকে নিশ্চিত রূপে বল যে, যে জিনিসগুলো হারাম হওয়ার তোমরা ধারণা করছো, আল্লাহ কিরূপে ওগুলো তোমাদের উপর হারাম করলেন? তোমরা ‘বাহীরা’, ‘সায়েবা ইত্যাদিকে কেন হারাম করে নিচ্ছ?হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আট জোড়ার মধ্যে দু'টি মেষ এবং দু’টি বকরির চার জোড়া হলো। আল্লাহ পাক বলেন-এগুলোর কোনটিকেই আমি হারাম করিনি। এদের বাচ্চা, তা নরই হাক অথবা মাদীই হাক, কোনটাকে হালাল এবং কোনটাকে হারাম কিরূপে বানিয়ে নিচ্ছ? যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে নিশ্চিত রূপে বল। এগুলো তো সবই হালাল। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) এর দ্বারা কাফির ও মুশরিকদেরকে ভৎসনা করা হচ্ছে যে, কিভাবে তারা মনগড়া নতুন নতুন কথা বলছে এবং নিজেরাই হারাম বানিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলার দিকে সম্বন্ধ লাগিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করতঃ জনগণকে বিভ্রান্ত করে, তাদের মত অত্যাচারী আর কে হতে পারে? এটা আমর ইবনে লুহাই ইবনে কামআ' সম্পর্কে বলা হয়েছে। কেননা, সে-ই সর্বপ্রথম নবীদের দ্বীনকে পরিবর্তন করে দিয়েছিল এবং সায়েবা’, ‘ওয়াসীলা’, ‘হাম’ ইত্যাদির ই'তেকাদ বা বিশ্বাস সৃষ্টি করেছিল। হাদীস দ্বারাও এটা প্রমাণিত।

আল-আনআম 6:144

১৪৩-১৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: ইসলামের পূর্বে অজ্ঞ আরবরা কতগুলো পশু নিজেদের উপর হারাম করে নিয়েছিল এবং ওগুলোর শ্রেণী বিভাগ নির্ধারণ করেছিল। অর্থাৎ 'বাহীরা, ‘সায়েবা’, ‘ওয়াসীলা’, ‘হাম’ ইত্যাদি পশুগুলো। তারা এরূপ হারাম করে নিয়েছিল পশুগুলোর মধ্যেও এবং ফসল ফলাদির মধ্যেও। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের এসব বাগান, শস্যক্ষেত্র, ভারবাহী পশু, আরোহণযোগ্য পশু ইত্যাদি সবকিছু আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর মহান আল্লাহ চতুষ্পদ জন্তুগুলোর প্রকার বর্ণনা করলেন এবং বকরিরও বর্ণনা দিলেন যা সাদা রং এর হয়ে থাকে, মেষের বর্ণনা দিলেন যা কাল রং এর হয়। ওগুলোর নর ও মাদীরও বর্ণনা করলেন। তারপর উট নর ও মাদী এবং গরু নর ও মাদীর বর্ণনা দিলেন। তিনি এ সমুদয়, জন্তুর কোনটাই হারাম করেননি এবং এগুলোর বাচ্চাগুলোকেও না। কেননা, তিনি এগুলোকে বানী আদমের খাদ্য, সওয়ারী, বোঝা বহন, দুগ্ধপান ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকারের উপকার লাভের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ এই পশুগুলোর মধ্য হতে আট জোড়া তোমাদের জন্যে অবতীর্ণ করেছি।(আরবী) -এটা দ্বারা কাফিরদের নিম্নের উক্তিকে খণ্ডন করা হয়েছেঃ “এই জন্তুগুলোর পেটে যা রয়েছে তা শুধু আমাদের পুরুষদের জন্যে, আমাদের স্ত্রীলোকদের জন্যে এটা হারাম।” এখন আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে আমাকে নিশ্চিত রূপে বল যে, যে জিনিসগুলো হারাম হওয়ার তোমরা ধারণা করছো, আল্লাহ কিরূপে ওগুলো তোমাদের উপর হারাম করলেন? তোমরা ‘বাহীরা’, ‘সায়েবা ইত্যাদিকে কেন হারাম করে নিচ্ছ?হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আট জোড়ার মধ্যে দু'টি মেষ এবং দু’টি বকরির চার জোড়া হলো। আল্লাহ পাক বলেন-এগুলোর কোনটিকেই আমি হারাম করিনি। এদের বাচ্চা, তা নরই হাক অথবা মাদীই হাক, কোনটাকে হালাল এবং কোনটাকে হারাম কিরূপে বানিয়ে নিচ্ছ? যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে নিশ্চিত রূপে বল। এগুলো তো সবই হালাল। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) এর দ্বারা কাফির ও মুশরিকদেরকে ভৎসনা করা হচ্ছে যে, কিভাবে তারা মনগড়া নতুন নতুন কথা বলছে এবং নিজেরাই হারাম বানিয়ে নিয়ে আল্লাহ তা'আলার দিকে সম্বন্ধ লাগিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করতঃ জনগণকে বিভ্রান্ত করে, তাদের মত অত্যাচারী আর কে হতে পারে? এটা আমর ইবনে লুহাই ইবনে কামআ' সম্পর্কে বলা হয়েছে। কেননা, সে-ই সর্বপ্রথম নবীদের দ্বীনকে পরিবর্তন করে দিয়েছিল এবং সায়েবা’, ‘ওয়াসীলা’, ‘হাম’ ইত্যাদির ই'তেকাদ বা বিশ্বাস সৃষ্টি করেছিল। হাদীস দ্বারাও এটা প্রমাণিত।

আল-আনআম 6:145

মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে তাঁর প্রদত্ত রিককে হারাম করে নিয়েছে তাদেরকে তুমি বলে দাও-আমার উপর যে অহী অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে আমি এমন কিছুই হারাম পাইনি যা তোমরা হারাম করে নিয়েছো, ঐগুলো ছাড়া যেগুলো হারাম হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। আবার এ কথাও বলা হয়েছে, এর অর্থ হচ্ছে জীবজন্তুগুলোর কোনটিই আমি হারাম পাচ্ছি না, ঐগুলো ব্যতীত যেগুলোর হারাম হওয়ার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সূরায়ে মায়েদায় এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং হাদীসেও ওগুলোর হারাম হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। কেউ কেউ ওটাকেও মানসূখ বলেছেন। কিন্তু পরবর্তী অধিকাংশ মনীষীর মতে এটা মানসূখ নয়। কেননা, এতে তো মূলের বৈধতাকেও উঠিয়ে দেয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে। আর (আরবী) রক্তকে বলা হয়। যদি এই আয়াতটি না থাকতো তবে লোকেরা ঐ রক্তও নিয়ে নিতো যা শিরাগুলোতে চলাচল করছে। যেমন ইয়াহূদীরা সেই রক্তও নিয়ে থাকে। ইমরান ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “আমি আবু মুজলি (রঃ)-কে রক্ত সস্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম অর্থাৎ ঐ রক্ত সম্পর্কে যা মাথা, কণ্ঠ ইত্যাদির সাথে লেগে থাকে এবং রান্না করার সময় হাঁড়ির মধ্যে রক্তের যে লালিমা প্রকাশ পায়। তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ তো শুধু প্রবাহিত রক্ত খেতে নিষেধ করেছেন। যদি গোশতের সাথে রক্ত লেগে থাকে তবে তাতে কোন দোষ নেই।” হযরত কাসিম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বন্য পশুর গোশত এবং হাঁড়ির ভিতরের রক্তকে দূষণীয় মনে করতেন না এবং এই আয়াতটি পাঠ করতেন। (এটা ইবনে জারীর (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে কাসীর (রঃ) এটাকে সহীহ ও গারীব বলেছেন)হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “জনগণ ধারণা করছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) খায়বারের যুদ্ধের সময় পালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছিলেন (এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?)।” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হাকাম ইবনে আমর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে এরূপ বর্ণনা করে থাকেন বটে, কিন্তু তাফসীরের সমুদ্র অর্থাৎ হযরত আব্বাস (রাঃ) এটা অস্বীকার করেন। এবং (আরবী) -এই আয়াতটি শুনিয়ে থাকেন।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম হাকিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, অজ্ঞতার যুগের লোকেরা কোন জিনিস খেত এবং কোন জিনিসকে মাকরূহ ও অপবিত্র মনে করে। পরিত্যাগ করত। তাই মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর আহকাম অবতীর্ণ করলেন। তিনি হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম বলে দিলেন। আর যেগুলো সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করলেন সেগুলো খাওয়া মুবাহ। অতঃপর তিনি উক্ত আয়াতটিই পাঠ করলেন। (এটা ইবনে মিরদুওয়াই-এর ভাষা । ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম হাকিম (রঃ) বলেছেন যে, এর ইসনাদ বিশুদ্ধ কিন্তু তারা দুজন এটাকে তাখরীজ করেননি)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত সাওদা বিন্তে যামআ (রাঃ)-এর একটি বকরি মারা যায় । তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বকরিটি মারা গেছে।” তখন তিনি বললেনঃ “তুমি এর চামড়া দ্বারা মশক বানিয়ে নিলে না কেন?” হযরত সাওদা (রাঃ) বলেনঃ “বকরি মারা গেলে আমরা ওর চামড়া দ্বারা মশক বানিয়ে নিতাম।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই আয়াতটি পড়ে হযরত সাওদা (রাঃ)-কে বলেনঃ “মৃতজতু, প্রবাহিত রক্ত এবং শূকরের মাংস খাওয়া হারাম। কিন্তু যদি তুমি মৃতজন্তুর চামড়া দাবাগাত বা সংস্কার করে নাও তবে তা ব্যবহার করতে পার।” হযরত সাওদা (রাঃ) তখন ঐ মৃত বকরিটির চামড়া দ্বারা মশক বানিয়ে নেন, যা বহুদিন পর্যন্ত তাঁর কাছে ছিল। (হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) তাখরীজ করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) অনুরূপ বর্ণনা করেছেন)সাঈদ ইবনে মানসূর (রঃ) নামীলা ফাযারী (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ “আমি (একদা) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) -এর নিকটে ছিলাম, এমন সময় একটি লোক তাঁকে সজারুর গোশত খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তিনি তখন উপরোক্ত আয়াতটিই পাঠ করেন (অর্থাৎ এ আয়াতে সজারু হারাম হওয়ার কোন উল্লেখ নেই।) তখন তাঁর পাশে উপবিষ্ট একজন বৃদ্ধ বললেনঃ “আমি হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, সজারু হচ্ছে খারাপ ও অশ্লীল জন্তুসমূহের মধ্যে একটি জন্তু।” তখন হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “নবী (সঃ) যদি এরূপ বলে থাকেন তবে সেরূপই হবে। (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) সাঈদ ইবনে মানসূর (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) আল্লাহ পাকের উক্তি- (আরবী) অর্থাৎ কেউ যদি হারাম বস্তু খেতে বাধ্য হয় এবং একেবারে নিরুপায় হয়ে পড়ে, সে যে প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে এটা করছে তা নয় এবং প্রয়োজনের অতিরিক্তও খাচ্ছে না, তবে তার জন্যে এটা খাওয়া বৈধ। কেননা, আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। এই আয়াতের তাফসীর সূরায়ে বাকারায় হয়ে গেছে এবং সেখানে পূর্ণ আলোকপাত করা হয়েছে। এই আয়াতের ধরনে বুঝা যায় যে, এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে মুশরিকদের মতবাদ খণ্ডন করা। তারা নিজেদের উপর কতগুলো বস্তু হারাম করে নেয়ার বিদআত চালু করেছিল। যেমন ‘বাহীরা’, ‘সায়েবা' ইত্যাদি পশুকে হারাম করণ। তাই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে সংবাদ দিয়ে দেন যে, এসব পশু হারাম হওয়ার কথা কোন জায়গাতেই উল্লেখ নেই। সুতরাং মুসলমানদের এগুলো খাওয়া থেকে বিরত থাকার কোনই প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র মৃত্যু, প্রবাহিত রক্ত ও শূকরের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। আর যে পশুকে গায়রুল্লাহর নামে জবাই করা হয়েছে। সেটাও হারাম। এ কয়টি ছাড়া আল্লাহ আর কোনকিছুই হারাম করেননি। যা থেকে নীরবতা অবলম্বন করা হয়েছে সেটাও ক্ষমাই। তাহলে আল্লাহ যা হারাম করেননি ওটা তোমরা কোথা থেকে হারাম বানিয়ে নিচ্ছ? এরই ভিত্তিতে অন্যান্য জিনিসের অবৈধতা অবশিষ্ট থাকছে না, যেমন আলেমদের মশহুর মাযহাবে পালিত গাধা বা বন্য জন্তুর গোশত কিংবা থাবা বিশিষ্ট পাখীর গোশত বৈধ নয়, এ সবগুলোর অবৈধতা বাকী থাকছে না।

আল-আনআম 6:146

ইরশাদ হচ্ছে-আমি ইয়াহূদীদের উপর সর্বপ্রকার নখ বিশিষ্ট জন্তু হারাম করে দিয়েছিলাম এবং গরু ও ছাগলের চর্বিও তাদের উপর হারাম করেছিলাম। কিন্তু পিঠের চর্বি, নাড়িভুড়ির চর্বি এবং হাড়ের সাথে মিশ্রিত চর্বি এই হারামের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই নখ বিশিষ্ট জীব হচ্ছে সেই পশু এবং পাখী যেগুলোর অঙ্গুলি কাটা কাটা এবং পৃথক পৃথক নয়। যেমন উট, উট পাখী, রাজ হাঁস এবং পাতি হাঁস। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ জন্তুগুলো উদ্দেশ্য যেগুলোর অঙ্গুলি চিরা ও ফাটা হয় না। আবার অন্য এক বর্ণনায় সাঈদ (রঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা ঐ জন্তুগুলোকে বুঝানো হয়েছে যেগুলোর অঙ্গুলি বিচ্ছিন্ন ও পৃথক পৃথক। যেমন মোরগ । কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উট, উট পাখী, পাখী এবং মাছ উদ্দেশ্য। তাঁর থেকে আর একটি বর্ণনা আছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে পাখী ও পাতি হাঁস এবং অনুরূপভাবে ঐ জন্তুগুলো যেগুলো উম্মুক্ত অঙ্গুলি বিশিষ্ট নয়। সুতরাং ইয়াহূদীরা ঐসব জন্তু এবং পাখী খেত যেগুলো উন্মুক্ত থাবা বিশিষ্ট। তারা বন্য গাধাও খেত না। কেননা, ওর থাবাও উটের মতই উন্মুক্ত নয়।গরু এবং ছাগলের চর্বি দ্বারা ঐ চর্বি বুঝানো হয়েছে যা পাছার উপর পৃথকভাবে জমা হয়ে থাকে। ইয়াহূদীরা বলত-হযরত ইয়াকুব (আঃ) এগুলো হারাম মনে করতেন বলে আমরাও হারাম মনে করে থাকি। পিঠের চর্বি হারাম ছিল না। ইমাম আবু জাফর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দটি বহুবচন। একবচন হচ্ছে (আরবী) শব্দ। পেটের মধ্যকার জিনিসগুলোকে (আরবী) বলা হয়, যেমন নাড়িভুড়ি ইত্যাদি। হাড়ের সঙ্গে যে চর্বি মিশ্রিত থাকে সেটাও হালাল ছিল। অনুরূপভাবে , বক্ষ, মাথা এবং চোখের চর্বিও হালাল ছিল। আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি যে তাদের উপর এই সংকীর্ণতা আনয়ন করেছিলাম তার একমাত্র কারণ ছিল তাদের বিদ্রোহ ও বিরুদ্ধাচরণ। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী)| -অর্থাৎ “যে বস্তুগুলো তাদের উপর পূর্বে হালাল ও পবিত্র ছিল সেগুলো তাদের উপর হারাম করে দিয়েছিলাম, কারণ ছিল এই যে, তারা বিদ্রোহ ও বিরুদ্ধাচরণ করেছিল এবং অন্যদেরকে আল্লাহর পথে যেতে বাধা দিয়েছিল। সুতরাং এটা ছিল তাদের উপর আমার শাস্তি । আর এই শাস্তি প্রদানে আমি সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ।” (৪:১৬০) ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এর অবৈধতা সম্পর্কে তোমাকে আমি যা বললাম এটাই সত্য ও সঠিক। আর ইয়াহূদীরা যে বলছে হযরত ইয়াকুব (আঃ) ওগুলো হারাম মনে করতেন বলেই তারা হারাম মনে করছে এটা মোটেই সত্য নয়। হযরত উমার (রাঃ) যখন সংবাদ পান যে, সুমরা মদ বিক্রী করেছে তখন তিনি বলেনঃ আল্লাহ সুমরাকে ধ্বংস করুন! সে কি জানে না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ ইয়াহুদীদের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন, কেননা তাদের উপর চর্বি হারাম করে দেয়া হয়েছিল, তখন তারা তা বের করে পরিষ্কার করতঃ বিক্রী করে দিতো। ”হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মক্কা বিজয়ের বছরে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) মদ্য, মৃত, শূকর এবং মূর্তির বিক্রয়ও হারাম করে দিয়েছেন।” তখন জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মৃতজন্তুর চর্বি দ্বারা চামড়ায় তেল লাগানো, নৌকায় ঐ চর্বি মাখানো এবং ওটা জ্বালিয়ে আলো লাভ করণ সম্পর্কে আপনার মত কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “না, ওটা হারাম।” তারপর তিনি বললেনঃ “আল্লাহ ইয়াহূদীদেরকে ধ্বংস করুন! কেননা, যখন তাদের জন্যে চর্বি হারাম করে দেয়া হয় তখন তারা ওটা পরিষ্কার করে বিক্রী করতে শুরু করে এবং ওর মূল্য খেতে লাগে।” (একটি দল কয়েক পন্থায় এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“আল্লাহ ইয়াহূদীদেরকে ধ্বংস করুন, তাদের উপর চর্বি হারাম করা হয়, তখন তারা ওটা বিক্রী করে এবং ওর মূল্য খেতে লাগে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (একদা) রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাকামে ইবরাহীমের পিছনে বসেছিলেন। এমন সময় তিনি স্বীয় চক্ষু আকাশের দিকে উঠিয়ে বলেনঃ “আল্লাহ ইয়াহুদীদের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন।” একথা তিনি তিনবার বলেন। তার পর তিনি বলেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের উপর চর্বি হারাম করেছিলেন, তখন তারা ওটা বিক্রী করতঃ ওর মূল্য ভক্ষণ করে। অথচ আল্লাহ যখন কোন সম্প্রদায়ের উপর কোন জিনিস হারাম করেন তখন ওর মূল্যও তাদের উপর হারাম হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) ইবনে আব্বাস (রঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণনা করেছেন)ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে হারামে হাজরে আসওয়াদের দিকে মুখ করে বসেছিলেন। এমন সময় তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠেন। অতঃপর বলেনঃ “আল্লাহ ইয়াহুদীদের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুন! তাদের উপর চর্বি হারাম করা হলে তারা ওটা বিক্রী করে এবং ওর মূল্য ভক্ষণ করে। অথচ, নিশ্চয়ই আল্লাহ যখন কোন কওমের উপর কোন কিছু হারাম করেন তখন ওর মূল্যও তাদের উপর হারাম হয়ে যায়।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নিকট আগমন করি। সে সময় তিনি রুগ্ন ছিলেন। আমরা তাঁর ইয়াদত (রোগী পরিদর্শন) করছিলাম। তিনি শায়িত ছিলেন এবং আপন চাদর দ্বারা স্বীয় মুখমণ্ডল ঢেকে ছিলেন। অতঃপর তিনি চাদর খানা সরিয়ে দিয়ে বলেনঃ “ইয়াহূদীদের উপর চর্বি হারাম করা হলে তারা ওটা বিক্রী করে ওর মূল্য খেতে শুরু করে, সুতরাং আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! যা খাওয়া হারাম তা বিক্রী করাও হারাম।”

আল-আনআম 6:147

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমার বিরুদ্ধবাদী দল ইয়াহূদী এবং মুশরিকরা যদি তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে তাদেরকে বলে দাও তোমাদের প্রভু বড়ই করুণাময়! একথা বলে তাদেরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে যে, তারাও যেন তার সুপ্রশস্ত ও ব্যাপক করুণা যা করে, তাহলে রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণের তাদেরকে তাওফীক প্রদান করা হবে। কেননা, যদি তিনি অনুগ্রহ না করেন তবে পাপী ও অপরাধীদের থেকে আল্লাহর শাস্তি কেউই টলাতে পারবে না। এখানে আগ্রহ উৎপাদন ও ভয় প্রদর্শন উভয়ই হচ্ছে। ভাবার্থ হচ্ছে-তোমরা রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ কর না, নতুবা তার শাস্তিতে পাকড়াও হয়ে যাবে। সব জায়গাতেই আল্লাহ তা'আলা আগ্রহ উৎপাদন ও ভয় প্রদর্শন এক সাথেই এনেছেন। যেমন এই সূরার শেষে রয়েছে- “আল্লাহ সত্বর শাস্তি প্রদানকারী এবং ক্ষমাশীল।” অর্থাৎ তিনি লোকদের পাপরাশি ক্ষমাকারী আবার তাদেরকে কঠোর শাস্তি প্রদানকারীও বটে। অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! আমার বান্দাদেরকে তুমি জানিয়ে দাও-আমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু আর আমার শাস্তিও হচ্ছে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।” অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “তিনি পাপ মার্জনাকারী, তাওবা কবুলকারী এবং কঠোর শাস্তি প্রদানকারী।” আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ “নিশ্চয়ই তোমার প্রভুর পাকড়াও অত্যন্ত কঠোর। তিনিই প্রথমবার সৃষ্টি করেন এবং পুনর্বারও সৃষ্টি করবেন। আর তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল, অত্যন্ত স্নেহ পরায়ণ।" এ সম্পর্কীয় বহু আয়াত রয়েছে।

আল-আনআম 6:148

১৪৮-১৫০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে একটা বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে এবং মুশরিকরা নিজেদের শিরক ও হালালকে হারাম করে নেয়া সম্পর্কে যে সন্দেহ পোষণ করতে, আল্লাহ পাক তার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি তাদের শিক ও হারাম করে নেয়া সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করছেন। সেই সন্দেহ ছিল এই যে, তারা বলতো-আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমাদের মনকে পরিবর্তন করতে পারতেন, তিনি আমাদেরকে ঈমানের তাওফীক প্রদানে সক্ষম ছিলেন এবং আমাদের প্রতিবন্ধক হয়ে তিনি আমাদেরকে কুফরী থেকে বিরত রাখতে পারতেন। কিন্তু এরূপ যখন তিনি করেননি তখন এটা প্রমাণিত হলো যে, তিনি এটাই চান এবং আমাদের এই কাজে তিনি সম্মত। তাই মহান আল্লাহ তাদের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ চাইলে আমরা শিক করতাম এবং আমাদের বাপ-দাদারাও না, না আমরা কোন জিনিসকে হারাম করে নিতাম। অনুরূপভাবে তারা বলতোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যদি চাইতেন তবে আমরা তাদের ইবাদত করতাম না।” (৪৩:২০) সুতরাং আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এরূপই তাদের পূর্ববর্তী লোকেরাও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল।” ভাবার্থ এই যে, এভাবেই পূর্ববর্তী লোকেরাও পথভ্রষ্ট হয়েছিল। আর এটা হচ্ছে খুবই নিম্নমানের, ভিত্তিহীন ও ছেলেমি যুক্তি। যদি এটা সঠিক হতো তবে তাদের পূর্ববর্তীদের উপর কখনও আল্লাহর শাস্তি আসতো না এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হতো না। আর মুশরিকদেরকে প্রতিশোধের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করতে হতো না। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ঐ কাফির ও মুশরিকদেরকে বলে দাও-তোমরা কি করে জানতে পারলে যে, আল্লাহ তোমাদের কাজে সন্তুষ্ট? যদি তোমাদের এ দাবীর পিছনে কোন দলীল থাকে তবে তা পেশ কর। তোমরা কখনও এটা প্রমাণ করতে পারবে না। তোমরা শুধু অনুমান ও মিথ্যা ধারণার পিছনে পড়ে রয়েছ। ধারণা দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে বাজে বিশ্বাস। তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করছে। এই মুশরিকরা বলে- “আমরা শুধু এই উদ্দেশ্যে মূর্তির উপাসনা করছি যে, তাদের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবো।” আল্লাহ বলেন যে, তারা তাদের মাধ্যমে কখনও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারবে না ।(আরবী) আল্লাহ যদি চাইতেন তবে তারা শিরক করতো না। (৬:১০৭) ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে সবাই যে হিদায়াত লাভ করতে এতে কোন সন্দেহ নেই। সত্যভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ দলীল প্রমাণ তো একমাত্র আল্লাহরই রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে সবাই সুপথ প্রাপ্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি বলে দাও যে, আল্লাহর হুজ্জত বা দলীল হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ দলীল এবং তাঁর হিকমত হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ হিকমত। কে যে হিদায়াত লাভের অধিকারী এবং কে পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য তা তিনিই ভাল জানেন। সবকিছুই তার ক্ষমতা ও ইচ্ছার মধ্যে রয়েছে। তিনি মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং কাফিরদের প্রতি অসন্তুষ্ট। তিনি ইচ্ছা করলে ভূ-পৃষ্ঠের সমস্ত লোকই ঈমান আনতে। তিনি চাইলে সবকে একই কওম ও একই জাতি বানিয়ে দিতেন। তিনি যে ওয়াদা করেছেন যে, জাহান্নামকে তিনি দানব ও মানব দ্বারা পূর্ণ করবেন। তার এ ওয়াদা পূর্ণ হবেই। বিদ্রোহী ও বিরুদ্ধবাদীদের কোনই দলীল নেই। তাই আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ তুমি তাদেরকে বলে দাও-যদি তোমাদের দাবীর অনুকূলে সাক্ষী থাকে তবে তাদেরকে হাযির কর, যারা সাক্ষ্য দেবে যে হ্যাঁ, আল্লাহ এসব জিনিস হারাম করেছিলেন। আর যদি তারা এ ধরনের মিথ্যাবাদী সাক্ষী হাযির করেও দেয় তবে হে নবী (সঃ)! তুমি কিন্তু এরূপ সাক্ষ্য দেবে না। কেননা তাদের এ সাক্ষ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও প্রতারণামূলক। তুমি ঐ লোকদের সঙ্গী হয়ো না যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে না এবং স্বীয় প্রভুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্যদেরকে তাঁর শরীক ও সমকক্ষ বানিয়ে নেয়।

আল-আনআম 6:149

১৪৮-১৫০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে একটা বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে এবং মুশরিকরা নিজেদের শিরক ও হালালকে হারাম করে নেয়া সম্পর্কে যে সন্দেহ পোষণ করতে, আল্লাহ পাক তার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি তাদের শিক ও হারাম করে নেয়া সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করছেন। সেই সন্দেহ ছিল এই যে, তারা বলতো-আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমাদের মনকে পরিবর্তন করতে পারতেন, তিনি আমাদেরকে ঈমানের তাওফীক প্রদানে সক্ষম ছিলেন এবং আমাদের প্রতিবন্ধক হয়ে তিনি আমাদেরকে কুফরী থেকে বিরত রাখতে পারতেন। কিন্তু এরূপ যখন তিনি করেননি তখন এটা প্রমাণিত হলো যে, তিনি এটাই চান এবং আমাদের এই কাজে তিনি সম্মত। তাই মহান আল্লাহ তাদের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ চাইলে আমরা শিক করতাম এবং আমাদের বাপ-দাদারাও না, না আমরা কোন জিনিসকে হারাম করে নিতাম। অনুরূপভাবে তারা বলতোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যদি চাইতেন তবে আমরা তাদের ইবাদত করতাম না।” (৪৩:২০) সুতরাং আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এরূপই তাদের পূর্ববর্তী লোকেরাও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল।” ভাবার্থ এই যে, এভাবেই পূর্ববর্তী লোকেরাও পথভ্রষ্ট হয়েছিল। আর এটা হচ্ছে খুবই নিম্নমানের, ভিত্তিহীন ও ছেলেমি যুক্তি। যদি এটা সঠিক হতো তবে তাদের পূর্ববর্তীদের উপর কখনও আল্লাহর শাস্তি আসতো না এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হতো না। আর মুশরিকদেরকে প্রতিশোধের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করতে হতো না। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ঐ কাফির ও মুশরিকদেরকে বলে দাও-তোমরা কি করে জানতে পারলে যে, আল্লাহ তোমাদের কাজে সন্তুষ্ট? যদি তোমাদের এ দাবীর পিছনে কোন দলীল থাকে তবে তা পেশ কর। তোমরা কখনও এটা প্রমাণ করতে পারবে না। তোমরা শুধু অনুমান ও মিথ্যা ধারণার পিছনে পড়ে রয়েছ। ধারণা দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে বাজে বিশ্বাস। তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করছে। এই মুশরিকরা বলে- “আমরা শুধু এই উদ্দেশ্যে মূর্তির উপাসনা করছি যে, তাদের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবো।” আল্লাহ বলেন যে, তারা তাদের মাধ্যমে কখনও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারবে না ।(আরবী) আল্লাহ যদি চাইতেন তবে তারা শিরক করতো না। (৬:১০৭) ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে সবাই যে হিদায়াত লাভ করতে এতে কোন সন্দেহ নেই। সত্যভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ দলীল প্রমাণ তো একমাত্র আল্লাহরই রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে সবাই সুপথ প্রাপ্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি বলে দাও যে, আল্লাহর হুজ্জত বা দলীল হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ দলীল এবং তাঁর হিকমত হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ হিকমত। কে যে হিদায়াত লাভের অধিকারী এবং কে পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য তা তিনিই ভাল জানেন। সবকিছুই তার ক্ষমতা ও ইচ্ছার মধ্যে রয়েছে। তিনি মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং কাফিরদের প্রতি অসন্তুষ্ট। তিনি ইচ্ছা করলে ভূ-পৃষ্ঠের সমস্ত লোকই ঈমান আনতে। তিনি চাইলে সবকে একই কওম ও একই জাতি বানিয়ে দিতেন। তিনি যে ওয়াদা করেছেন যে, জাহান্নামকে তিনি দানব ও মানব দ্বারা পূর্ণ করবেন। তার এ ওয়াদা পূর্ণ হবেই। বিদ্রোহী ও বিরুদ্ধবাদীদের কোনই দলীল নেই। তাই আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ তুমি তাদেরকে বলে দাও-যদি তোমাদের দাবীর অনুকূলে সাক্ষী থাকে তবে তাদেরকে হাযির কর, যারা সাক্ষ্য দেবে যে হ্যাঁ, আল্লাহ এসব জিনিস হারাম করেছিলেন। আর যদি তারা এ ধরনের মিথ্যাবাদী সাক্ষী হাযির করেও দেয় তবে হে নবী (সঃ)! তুমি কিন্তু এরূপ সাক্ষ্য দেবে না। কেননা তাদের এ সাক্ষ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও প্রতারণামূলক। তুমি ঐ লোকদের সঙ্গী হয়ো না যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে না এবং স্বীয় প্রভুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্যদেরকে তাঁর শরীক ও সমকক্ষ বানিয়ে নেয়।

আল-আনআম 6:150

১৪৮-১৫০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে একটা বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে এবং মুশরিকরা নিজেদের শিরক ও হালালকে হারাম করে নেয়া সম্পর্কে যে সন্দেহ পোষণ করতে, আল্লাহ পাক তার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি তাদের শিক ও হারাম করে নেয়া সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করছেন। সেই সন্দেহ ছিল এই যে, তারা বলতো-আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমাদের মনকে পরিবর্তন করতে পারতেন, তিনি আমাদেরকে ঈমানের তাওফীক প্রদানে সক্ষম ছিলেন এবং আমাদের প্রতিবন্ধক হয়ে তিনি আমাদেরকে কুফরী থেকে বিরত রাখতে পারতেন। কিন্তু এরূপ যখন তিনি করেননি তখন এটা প্রমাণিত হলো যে, তিনি এটাই চান এবং আমাদের এই কাজে তিনি সম্মত। তাই মহান আল্লাহ তাদের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ চাইলে আমরা শিক করতাম এবং আমাদের বাপ-দাদারাও না, না আমরা কোন জিনিসকে হারাম করে নিতাম। অনুরূপভাবে তারা বলতোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যদি চাইতেন তবে আমরা তাদের ইবাদত করতাম না।” (৪৩:২০) সুতরাং আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এরূপই তাদের পূর্ববর্তী লোকেরাও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল।” ভাবার্থ এই যে, এভাবেই পূর্ববর্তী লোকেরাও পথভ্রষ্ট হয়েছিল। আর এটা হচ্ছে খুবই নিম্নমানের, ভিত্তিহীন ও ছেলেমি যুক্তি। যদি এটা সঠিক হতো তবে তাদের পূর্ববর্তীদের উপর কখনও আল্লাহর শাস্তি আসতো না এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হতো না। আর মুশরিকদেরকে প্রতিশোধের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করতে হতো না। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি ঐ কাফির ও মুশরিকদেরকে বলে দাও-তোমরা কি করে জানতে পারলে যে, আল্লাহ তোমাদের কাজে সন্তুষ্ট? যদি তোমাদের এ দাবীর পিছনে কোন দলীল থাকে তবে তা পেশ কর। তোমরা কখনও এটা প্রমাণ করতে পারবে না। তোমরা শুধু অনুমান ও মিথ্যা ধারণার পিছনে পড়ে রয়েছ। ধারণা দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে বাজে বিশ্বাস। তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করছে। এই মুশরিকরা বলে- “আমরা শুধু এই উদ্দেশ্যে মূর্তির উপাসনা করছি যে, তাদের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবো।” আল্লাহ বলেন যে, তারা তাদের মাধ্যমে কখনও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারবে না ।(আরবী) আল্লাহ যদি চাইতেন তবে তারা শিরক করতো না। (৬:১০৭) ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে সবাই যে হিদায়াত লাভ করতে এতে কোন সন্দেহ নেই। সত্যভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ দলীল প্রমাণ তো একমাত্র আল্লাহরই রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে সবাই সুপথ প্রাপ্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি বলে দাও যে, আল্লাহর হুজ্জত বা দলীল হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ দলীল এবং তাঁর হিকমত হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ হিকমত। কে যে হিদায়াত লাভের অধিকারী এবং কে পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য তা তিনিই ভাল জানেন। সবকিছুই তার ক্ষমতা ও ইচ্ছার মধ্যে রয়েছে। তিনি মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং কাফিরদের প্রতি অসন্তুষ্ট। তিনি ইচ্ছা করলে ভূ-পৃষ্ঠের সমস্ত লোকই ঈমান আনতে। তিনি চাইলে সবকে একই কওম ও একই জাতি বানিয়ে দিতেন। তিনি যে ওয়াদা করেছেন যে, জাহান্নামকে তিনি দানব ও মানব দ্বারা পূর্ণ করবেন। তার এ ওয়াদা পূর্ণ হবেই। বিদ্রোহী ও বিরুদ্ধবাদীদের কোনই দলীল নেই। তাই আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ তুমি তাদেরকে বলে দাও-যদি তোমাদের দাবীর অনুকূলে সাক্ষী থাকে তবে তাদেরকে হাযির কর, যারা সাক্ষ্য দেবে যে হ্যাঁ, আল্লাহ এসব জিনিস হারাম করেছিলেন। আর যদি তারা এ ধরনের মিথ্যাবাদী সাক্ষী হাযির করেও দেয় তবে হে নবী (সঃ)! তুমি কিন্তু এরূপ সাক্ষ্য দেবে না। কেননা তাদের এ সাক্ষ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও প্রতারণামূলক। তুমি ঐ লোকদের সঙ্গী হয়ো না যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে না এবং স্বীয় প্রভুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্যদেরকে তাঁর শরীক ও সমকক্ষ বানিয়ে নেয়।

আল-আনআম 6:151

হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শেষ অসিয়তের প্রতি লক্ষ্য করতে চায় সে যেন উল্লিখিত আয়াতগুলো পাঠ করে । হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সূরায়ে আন'আমে কতগুলো আয়াত রয়েছে স্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট এবং ঐগুলোই হচ্ছে কিতাবের মূল। অতঃপর তিনি (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে আমাদের কাছে তিনটি কাজের দীক্ষা গ্রহণ করবে?' অতঃপর তিনি উক্ত আয়াত পাঠ করলেন। পাঠ শেষ করে তিনি বললেনঃ “যে ব্যক্তি এই কথাগুলো যথাযথভাবে পালন করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে রয়েছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এগুলো পালনে অবহেলা করবে, খুব সম্ভব আল্লাহ তাকে দুনিয়াতেই শাস্তি প্রদান করবেন। আর যদি তিনি শাস্তিটাকে পরকাল পর্যন্ত উঠিয়ে রাখেন তবে তখন তাঁর মর্জির উপর নির্ভর করবে। ইচ্ছা করলে তিনি তাকে শাস্তি দিবেন, অথবা ক্ষমা করে দিবেন।” এর তাফসীর নিম্নরূপঃ আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেছেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ) ! এই মুশরিকদেরকে বলে দাও, যারা গায়রুল্লাহর উপাসনা করছে এবং আল্লাহর হালাল জিনিসকে হারাম করে নিচ্ছে, আর নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করছে। তাদেরকে শয়তান বিভ্রান্ত করেছে এবং তারা মনগড়া কথা বলছে, (তাদেরকে বলঃ) এসো, আমি তোমাদেরকে বলে দেই যে, আল্লাহ কোন্ জিনিসগুলোকে হারাম করেছেন। আমি এসব কথা ধারণা ও অনুমান করে বলছি না, বরং আল্লাহ আমার কাছে যে অহী করেছেন সেই অনুযায়ীই বলছি যে, তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও শরীক বানিয়ে নিও না। আয়াতের ভাষার ধরনে বুঝা যাচ্ছে যে, এখানে (আরবী) শব্দটি উহ্য রয়েছে, অর্থাৎ (আরবী) এইরূপ রয়েছে। এজন্যেই আয়াতের শেষে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ এসব বিষয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা অনুধাবন করতে পার।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার কাছে এসে এ সংবাদ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি শিরক না করা অবস্থায় মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” আমি বললামঃ যদিও সে ব্যভিচার করে অথবা চুরি করে তবুও কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ 'হ্যা, যদিও সে ব্যভিচার করে অথবা চুরি করে। আমি তিনবার এই প্রশ্ন করি। প্রতিবারেই তিনি এই উত্তরই দেন এবং তৃতীয়বারে বলেনঃ “যদিও সে ব্যভিচার করে, অথবা চুরি করে এবং মদ্যপান করে (তবুও সে জান্নাতে প্রবেশ করবে)। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তিনবার প্রশ্নকারী ছিলেন স্বয়ং হযরত আবু যার (রাঃ)।তৃতীয়বারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু যার (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হ্যাঁ, আবু যার (রাঃ)-এর নাক ধূলায় ধূসরিত হাক, যদিও সে ব্যভিচার করে থাকে বা চুরি করে থাকে (তবুও জান্নাতে যাবে)।” হযরত আবু যার (রাঃ) যখনই এ হাদীসটি শুনাতেন তখনই হাদীসটি পূর্ণরূপে বর্ণনা করার পর “আবু যার (রাঃ)-এর নাক ধূলায় ধূসরিত হাক” এ কথাটিও অবশ্যই বলতেন।হযরত আবু যার (রাঃ) হতে আরও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন- “হে আদম সন্তান! যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমার কাছে দুআ করবে এবং আমার কাছে আশা করতে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাকে ক্ষমা করতে থাকবো যা কিছু গুনাহ তোমার দ্বারা হবে। আর আমি তোমার পাপরাশিকে মোটেই গ্রাহ্য করবো না। তুমি যদি আমার কাছে পৃথিবীপূর্ণ পাপরাশি নিয়ে আসো তবে আমি তোমাকে পৃথিবীপূর্ণ ক্ষমা প্রদান করবো, যদি তুমি আমার সাথে কাউকেও শরীক না করে থাক। যদি তোমার পাপরাশি আকাশ ভর্তিও হয় এবং তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর তবে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো।” কুরআন কারীমে এর সাক্ষ্য মিলে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ শিবৃকের পাপ ক্ষমা করবেন না, অন্যসব পাপ তিনি ইচ্ছা করলে ক্ষমা করবেন।” সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকেও শরীক না করে মারা গেল সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ সম্পৰ্কীয় কুরআনের আয়াত এবং হাদীস বহু রয়েছে। হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “তোমরা শিরক করো না যদিও তোমাদেরকে কেটে টুকরো টুকরো করা হয় বা শূলে চড়ানো হয় অথবা আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়।” হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে সাতটি খাসলাতের বা অভ্যাসের অসিয়ত করেছিলেন। (তন্মধ্যে একটি এই যে,) তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকেও শরীক করবে না, যদিও তোমাদেরকে জ্বালিয়ে দেয়া হয়, কেটে টুকরো টুকরো করে দেয়া হয় এবং শূলে চড়ানো হয়।” (হাদীসটি ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) ও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। ভাবার্থ হচ্ছে-আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা তোমাদের পিতা-মাতার সাথে সৎ ও উত্তম ব্যবহার করবে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের প্রভু তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সাথে ভাল ব্যবহার করবে।” (১৭:২৩) আল্লাহ পাক সাধারণ ভাবে নিজের আনুগত্যের সাথে সাথে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করাকে মিলিয়ে দিয়েছেন। যেমন বলেছেনঃ “আমার এবং স্বীয় পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তোমাদেরকে আমারই কাছে ফিরে আসতে হবে। আর যদি তারা উভয়ে তোমাকে এ কথার চাপ দেয় যে, তুমি আমার সাথে কোন বস্তুকে শরীক সাব্যস্ত কর, যার (উপাস্য হওয়ার) পক্ষে তোমার কাছে কোন প্রমাণ নেই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং পার্থিব বিষয়ে সদ্ভাবে সাহচর্য করে যাবে, আর ঐ ব্যক্তির পথে চলবে যেই ব্যক্তি আমার দিকে রুজু হয় (ফিরে আসে), অনন্তর আমার দিকে তোমাদের ফিরে আসতে হবে । অতঃপর পিতা-মাতার মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের অবস্থা হিসেবে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ আল্লাহ প্রদান করলেন। আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ “আমি বানী ইসরাঈলের কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম-তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।” এ বিষয় সম্পৰ্কীয় বহু আয়াত রয়েছে।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, ইবনে মাসউদ (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন আমলটি উত্তম?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “নামায সময় মত আদায় করা।” ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি জবাব দিলেনঃ “পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা।” আমি বললাম, তারপর কোন্টি? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি যদি প্রশ্ন আরও বাড়াতাম তবে তিনি উত্তরও বাড়িয়ে দিতেন। হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে ইবনে সামিত (রাঃ)! তুমি তোমার পিতা-মাতার অনুগত হয়ে যাও। যদি তারা আমাদেরকে সারা দুনিয়া দিয়ে দাও’ একথাও বলে তবে সেটাও পালন কর।” এ হাদীসটির ইসনাদ দুর্বল। আল্লাহ তা'আলা সবচেয়ে ভাল জানেন।(আরবী) দারিদ্রতার ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না, কেননা আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে আহার্য দান করে থাকি।পিতা-মাতাকে নির্দেশ দিচ্ছেন-তোমরা দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের ছেলে মেয়েদেরকে হত্যা করো না। শয়তানরা মুশরিকদেরকে বিভ্রান্ত করেছিল বলে তারা নিজেদের সন্তানদেরকে জীবন্ত প্রোথিত করতো। তারা লজ্জার ভয়ে কন্যা সন্তানদেরকে জীবন্ত গেড়ে ফেলতো। আবার দারিদ্রতার ভয়ে কোন কোন পুত্র সন্তানকেও হত্যা করতো। এ জন্যেই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন পাপটি সবচেয়ে বড়?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তা হচ্ছে এই যে, তুমি আল্লাহর জন্যে শরীক স্থাপন করবে, অথচ তিনিই তোমাকে (এবং ঐ শরীককে) সৃষ্টি করেছেন!" ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বলেনঃ “তুমি তোমার সন্তানকে হত্যা করবে এই ভয়ে যে, সে তোমার সাথে আহার করবে।” আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ “তা এই যে, তুমি তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়বে। অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন মা'বুদের উপাসনা করে না এবং আল্লাহ যাকে (হত্যা করা) হারাম করে দিয়েছেন, তাকে হত্যা করে না শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতীত, এবং ব্যভিচার করে না।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন) (২৫:৬৮) উপরে বর্ণিত ‘ফাকর' বা দারিদ্রকে ‘ইমলোক’ বলা হয়। এ জন্যেই আল্লাহ পাক সূরায়ে বানী ইসরাঈলে বলেনঃ “জীবিকা তো আমিই তাদেরকে এবং তোমাদেরকে দিয়ে থাকি।” ওখানে জীবিকার শুরুতে শিশুদের নাম নেয়া হয়েছে। কেননা, সেখানে ব্যবস্থাপনায় তারাই উদ্দেশ্য ছিল অর্থাৎ তাদেরকে জীবিকা পৌছানোর কারণে তোমরা দরিদ্র হয়ে যাবে এই ভয়ে তাদেরকে হত্যা করো না। কারণ সকলেরই জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর উপর রয়েছে। কিন্তু এখানে যেহেতু দারিদ্র বিদ্যমান রয়েছে এ জন্যে এখানে বলেছেন, আমি তোমাদেরকে ও তাদেরকে জীবিকা দান করে থাকি। কারণ, এখানে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে তোমাদেরকে জীবিকা আমিই দান করেছি, সুতরাং নিজেদের জীবিকার ভয় করো না। আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমরা অশ্লীল কাজ ও কথার নিকটেও যেয়ো না, তা প্রকাশ্যেই হাক বা গোপনীয়ই থাক। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “হে নবী (সঃ) ! তুমি বলে দাও-আমার প্রতিপালক প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত অশ্লীলতাই নিষিদ্ধ। করেছেন, আর তোমরা অন্যায়, পাপ ও বিদ্রোহ থেকে বেঁচে থাক। আর বিরত থাক শিরক থেকে যার কোন সনদ নেই এবং এমন কিছু আল্লাহর দিকে সম্বন্ধ করা থেকে দূরে থাক যা তোমরা জান না।” এর তাফসীর আল্লাহ পাকের (আরবী) -এই উক্তির মধ্যে করা হয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ অপেক্ষা লজ্জাশীল আর কেউ হতে পারে না। এ জন্যেই তিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সমস্ত নির্লজ্জতাকে হারাম করে দিয়েছেন।” (ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, হযরত সা'দ ইবনে উবাদা (রাঃ) বলেছেনঃ “আমি যদি আমার স্ত্রীর। সাথে কোন পর পুরুষকে (ব্যভিচারে লিপ্ত) দেখতে পাই তবে অবশ্যই তাকে তরবারী দ্বারা হত্যা করে ফেলবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানে এ সংবাদ পৌছলে তিনি বলেন, তোমরা কি সা’দ (রাঃ)-এর লজ্জাশীলতায় বিস্ময় বোধ করছো! আল্লাহর শপথ! আমি সা’দ (রাঃ) অপেক্ষা অধিক লজ্জাশীল এবং আল্লাহ আমার চেয়ে বেশী লজ্জাশীল। এ জন্যেই তিনি সমস্ত নির্লজ্জতাকে হারাম করে দিয়েছেন।(আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না। গুরুত্ব বুঝাবার জন্যেই আল্লাহ তাআলা পৃথকভাবে এর নিষেধাজ্ঞা আনয়ন করেছেন। নতুবা এটা প্রকাশ্য ও গোপনীয় নির্লজ্জতার নিষিদ্ধতারই অন্তর্ভুক্ত। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন মুসলমানের রক্ত হালাল নয় যে সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। তবে তিনটির যে কোন একটি কারণে হত্যা করা যায়। (১) বিবাহিত ব্যভিচারী, (২) প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ (অর্থাৎ হত্যার বিনিময়ে হত্যা) এবং (৩) দ্বীন পরিত্যাগকারী ও দলের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আনয়নকারী।” সহীহ মুসলিমের শব্দ নিম্নরূপ রয়েছে “যিনি ছাড়া কেউ উপাস্য নেই তাঁর শপথ! কোন মুসলমান ব্যক্তির রক্ত হালাল নয়” পরবর্তী ভাষা একইরূপ। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের শব্দের মধ্যে পার্থক্য এই যে, সহীহ বুখারীতে রয়েছেঃ (আরবী) সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ (আরবী) পরবর্তী কথাগুলো একইরূপ) আর ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন মুসলমান লোকের রক্ত হালাল নয় তিনটির কোন একটি কারণ ছাড়া। (১) যদি কোন বিবাহিত পুরুষ বা স্ত্রী) লোক ব্যভিচার করে তবে তাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা হবে। (২) যদি কোন লোক কোন লোককে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে তবে সেই হত্যার বিনিময়ে তাকে হত্যা করা হবে। (৩) যদি কোন লোক ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায় এবং আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ) -এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তবে তাকে হত্যা করা হবে অথবা শূলী দেয়া হবে কিংবা দেশান্তর করা হবে।”আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) যখন বিদ্রোহীগণ কর্তৃক পরিবেষ্টিত হন তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনটির কোন একটি কারণ ছাড়া কোন মুসলমান লোকের রক্ত হালাল নয়। (১) যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণের পর পুনরায় কাফির হয়ে গেল, (২) যে ব্যক্তি বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়লো এবং (৩) যে ব্যক্তি কাউকে অন্যায় ভাবে হত্যা করলো। তাহলে আল্লাহর শপথ! আমি কখনও ব্যভিচার করিনি, অজ্ঞতার যুগেও না এবং ইসলামের যুগেও না। আমি কখনও এ ইচ্ছা পোষণ করিনি যে, ইসলাম গ্রহণের পর এ দ্বীনের পরিবর্তে অন্য দ্বীন গ্রহণ করবো। আর আমি কখনও কাউকে হত্যাও করিনি। সুতরাং তোমরা আমাকে কিসের উপর ভিত্তি করে হত্যা করতে চাচ্ছ ?” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমীযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমীযী (রঃ) বলেন যে, হাদীসটি হাসান) যে অমুসলিমের সাথে চুক্তি হয়ে যাবে এবং যে হারবীকে (অমুসলিম দেশের অমুসলিম) ইসলামী রাষ্ট্রে বাস করার জন্যে নিরাপত্তা দেয়া হবে, তাদেরকে হত্যা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এমন কি এ ব্যাপারে ধমক ও ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি চুক্তিকৃত কোন লোককে হত্যা করবে সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না, অথচ জান্নাতের সুগন্ধ চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি এমন কোন চুক্তিকৃত ব্যক্তিকে হত্যা করবে যার নিরাপত্তার যিম্মাদার স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল হয়ে গেছেন, সে ব্যক্তি জান্নাতের খোশবু পর্যন্ত পাবে না। (হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) ও ইমাম তিরমীযী বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমীযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন) (আরবী) অর্থাৎ এসব বিষয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা অনুধাবন করতে পার।

আল-আনআম 6:152

যখন ইয়াতীমের মাল খেয়ো না’ -এ আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন যার বাড়ীতে কোন ইয়াতীম ছিল সে সেই ইয়াতীমের খাদ্য ও পানীয়কে নিজের খাদ্য ও পানীয় হতে পৃথক করে দেয় এই ভয়ে যে, না জানি ইয়াতীমের খাদ্য তার খাদ্যের সাথে মিশ্রিত হয়ে যাবে। এমন কি ইয়াতীমের আহার করার পর যা অবশিষ্ট থাকতো তা তারা তারই জন্যে উঠিয়ে রেখে দিতো, যেন সে আবার তা আহার করে। এর ফলে খাবার নষ্ট হয়ে যেতো। এটা ছিল উভয়ের জন্যেই অমঙ্গল। তারা তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এ সম্পর্কে আলোচনা করে। সেই সময় মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর কাছে অহী পাঠানঃ “লোকেরা তোমাকে ইয়াতীমদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তুমি তাদেরকে বলে দাও-তাদের মঙ্গল কামনাই হচ্ছে ভাল কাজ। সুতরাং যদি তোমরা তাদের সাথে একত্রিতভাবে খাও তবে তাতে কোন দোষ নেই, তারা তো তোমাদেরই ভাই, এটা ঐ পর্যন্ত চলবে যে পর্যন্ত তারা বালেগ বা বয়োঃপ্রাপ্ত না হয়।” সুদ্দী (রঃ) এর সময়কাল ত্রিশ বছর, চল্লিশ বছর এমন কি ষাট বছর পর্যন্তও নির্ধারণ করেছেন। এটা এখানকার আলোচ্য বিষয় নয় ।(আরবী) অর্থাৎ আদান প্রদানে পরিমাণ ও ওযন তোমরা সঠিকভাবে করবে। মাপ ও ওযনে ইনসাফ করার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা খুবই গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং কঠোরভাবে শাস্তির ভয় দেখিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “নিরতিশয় সর্বনাশ রয়েছে মাপে কমদাতাদের। যখন তারা মানুষের নিকট থেকে মেপে নেয়, তখন পুরোপুরিই নেয়। আর যখন তাদেরকে মেপে কিংবা ওযন করে দেয়, তখন কম দেয়। তাদের কি এ বিশ্বাস নেই যে, তাদেরকে এক অত্যন্ত কঠোর দিবসে উঠান হবে?” পূর্বে এক জাতি মাপে ও ওযনে বেঈমানী করার কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।(আরবী) আমি কারো উপর তার সাধ্যাতীত ভার (দায়িত্ব-কর্তব্য) অৰ্পণ করি না। যে ব্যক্তি হক আদায়ে পুরোপুরি চেষ্টা করলো, তথাপি পূর্ণ মাত্রায় আদায় করতে পারলো না, তার কোন দোষ নেই এবং এজন্যে তাকে জবাবদিহি করতে হবে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতের ব্যাপারে বলেন ঃ “যে ব্যক্তি বিশুদ্ধ নিয়তে মাপলো বা ওযন করলো, আর আল্লাহ তো তার নিয়ত সম্পর্কে জানেনই, তাহলে তাকে পাকড়াও করা হবে না।” (আরবী) শব্দের ব্যাখ্যা এটাই।(আরবী) যখন কথা বলবে তখন স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায়ানুগ বলবে । যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মুমিনগণ! আল্লাহর জন্যে আদল ও ইনসাফের সাথে সাক্ষ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক।” অনুরূপভাবে সূরা নিসায় আল্লাহ তা'আলা কথায় ও কাজে ইনসাফের নির্দেশ দিয়েছেন, নিকটবর্তীদের জন্যেই হাক বা দূরবর্তীদের জন্যেই হাক। আল্লাহ পাক প্রত্যেকের জন্যে, প্রত্যেক সময়ে এবং সর্বাবস্থায় ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।ইরশাদ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করো। এটা পূরণ করার স্বরূপ হচ্ছে- তোমরা তাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চল। এবং তাঁর কিতাব ও সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর উপর আমল করো। এটাই হচ্ছে আল্লাহর সাথে কত অঙ্গীকার পূরণ করা।(আরবী) আল্লাহ তোমাদেরকে এসব বিষয় নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা তাঁর এ নির্দেশ ও উপদেশ গ্রহণ কর এবং পূর্বের অন্যায় ও খারাপ কাজ থেকে বিরত থাক। কেউ কেউ শব্দের -কে দিয়ে পড়েছেন এবং কেউ কেউ করে পড়েছেন।

আল-আনআম 6:153

ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা এদিক ওদিক অন্যান্য পথগুলোর উপর চলো না, নতুবা আল্লাহর পথ হতে সরে পড়বে। তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত রাখ এবং তাতে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করো না। এই প্রকারের আয়াতসমূহে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন দল ছেড়ে না দেয় এবং দলে বিভেদ সৃষ্টি করা থেকে তারা যেন বেঁচে থাকে। পূর্ববর্তী লোকেরা দ্বীনের ব্যাপারে ঝগড়া-ফাসাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল এবং মতানৈক্য সৃষ্টি করেছিল। ফলে তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাটিতে স্বহস্তে একটি রেখা টানেন। তারপর বলেনঃ “এটা হচ্ছে আল্লাহর সরল সোজা পথ।” অতঃপর তিনি ডানে ও বামে আরও কতগুলো রেখা টানেন এবং বলেনঃ “এগুলো হচ্ছে ঐসব রাস্তা যেগুলোর প্রত্যেকটির উপর একজন করে শয়তান বসে রয়েছে এবং ঐ দিকে (মানুষকে) আহ্বান করছে।” অতঃপর তিনিএই আয়াতটি পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম হাকিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম হাকিম (রঃ) এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন। তারা দু'জন এটাকে তাখরীজ করেননি)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী (সঃ)-এর কাছে উপবিষ্ট ছিলাম, এমন সময় তিনি এভাবে তাঁর সামনে একটা রেখা টানেন এবং বলেনঃ “এটা হচ্ছে আল্লাহর পথ।” অতঃপর ডানে ও বামে দু'টি করে রেখা টানেন এবং বলেনঃ “এগুলো হচ্ছে শয়তানের পথ।” তারপর মধ্যভাগের রেখার উপর স্বীয় হাতটি রাখেন এবং (আরবী) এই আয়াতটিই পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির (রাঃ) হতেই বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি রেখা টানেন। তারপর ডান দিকে একটি রেখা টানেন এবং বামদিকে একটি রেখা টানেন। অতঃপর স্বীয় হস্ত মুবারক মধ্যবর্তী রেখাটির উপর রেখে (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবান ইবনে উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “সিরাতে মুস্তাকীম কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে তাঁর নিকটে স্থান দিয়েছিলেন এবং তার চক্ষু যেন জান্নাতের দিকে ছিল। তাঁর ডান দিকে একটা পথ ছিল এবং বাম দিকে একটা পথ ছিল। পথগুলোর উপর কতগুলো লোক অবস্থান করছিল এবং যারা তাদের পার্শ্ব দিয়ে গমন করছিল তাদেরকে তারা নিজেদের দিকে আহ্বান করছিল। সুতরাং যারা তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তাদের পথ ধরলো তারা জাহান্নামে প্রবেশ করলো। আর যারা সরল সোজা পথ ধরলো তারা জান্নাতে প্রবেশ করলো।” অতঃপর (আরবী) –এই আয়াতটি পাঠ করলেন। নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা সিরাতে মুস্তাকিমের দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। এর দু'দিকে দু'টি প্রাচীর রয়েছে এবং তাতে খোলা দরজা রয়েছে। দরজাগুলোর উপর পর্দা লটকান। রয়েছে। সোজা রাস্তাটির দরজার উপর আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী একটি লোক বসে আছে এবং বলছেঃ “হে লোক সকল! তোমরা সবাই এই সরল সোজা পথে চলে এসো। এদিক ওদিক যেয়ো না।” আর একটি নাক রাস্তার উপর থেকে ডাক দিতে রয়েছে। যখনই কোন লোক ঐ দরজাগুলোর কোন একটি দরজা খোলার ইচ্ছা করছে তখনই সে তাকে বলছে- “সর্বনাশ! ওটা খোলো না। কারণ যদি তুমি দরজাটি খুলে দাও তবে তুমি ওর মধ্যে প্রবেশই করে যাবে।”এখন এই সরল সোজা পথটি হচ্ছে ইসলাম। আর প্রাচীরগুলো হচ্ছে আল্লাহর হুদূদ। এই খোলা দরজাগুলো হচ্ছে আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ। রাস্তার মাথায় যে বসে আছে ওটা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। আর রাস্তার উপর থেকে যে ডাক দিচ্ছে সে হচ্ছে আল্লাহর উপদেশদাতা যা প্রত্যেক মুসলমানের অন্তরে রয়েছে। অন্তর যেন তাকে খারাপ কাজ থেকে বাধা দিচ্ছে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), তিরমীযী (রঃ) এবং নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে আমার কাছে এই তিনটি আয়াতের উপর দীক্ষা গ্রহণ করতে পার?” অতঃপর তিনি (আরবী) এখান থেকে শুরু করে তিনটি আয়াত পাঠ করলেন। আয়াত তিনটির পাঠ শেষ করে বললেনঃ “যে ব্যক্তি এগুলোর হক আদায় করলো, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে নির্ধারিত হয়ে গেল। আর যে ব্যক্তি এগুলোর আমলে অবহেলা করলো, তাকে হয়তো আল্লাহ দুনিয়াতেই শাস্তি দিয়ে দিবেন। আর যদি আল্লাহ তাকে শাস্তি প্রদানে বিলম্ব করেন তবে তিনি পরকালে ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দিবেন অথবা ক্ষমা করে দিবেন।”

আল-আনআম 6:154

১৫৪-১৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) এর অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আমার সম্পর্কে আবার বলে দাও, আমি মূসা (আঃ)-কে কিতাব দিয়েছিলাম। এটা (আরবী) -এই উক্তি দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু এটা চিন্তা ভাবনার বিষয় বটে (আরবী) শব্দটি এখানে শুধুমাত্র একটি (আরবী) -এর পর আর একটি (আরবী) –এর (আরবী) বা সংযোগের জন্যে এসেছে। (আরবী) বুঝাবার জন্যে নয়। (আরবী) শব্দটি সাধারণতঃ বুঝাবার জন্যেই এসে থাকে) এখানে আল্লাহ তা'আলা যখন স্বীয় উক্তি (আরবী) -এর মাধ্যমে কুরআন সম্পর্কে খবর দিলেন, তখন তিনি (আরবী) -এর প্রশংসায় দ্বারা (আরবী) করে বললেনঃ এখন আমি তোমাকে এ সংবাদও দিচ্ছি যে, আমি মূসা (আঃ)-কেও কিতাব দিয়েছিলাম। অধিকাংশ স্থানে আল্লাহ পাক মিলিতভাবে কুরআন ও তাওরাতের বর্ণনা দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “এর পূর্বে মূসা (আঃ)-এর কিতাব ইমাম ও রহমত স্বরূপ ছিল, আর এই কিতাব (কুরআন) আরবী ভাষায় এর সত্যতা প্রতিপাদন করছে।” এই সূরার প্রথম দিকে তিনি বলেছেনঃ “হে নবী (সঃ) তুমি জিজ্ঞেস কর-যে কিতাব আমি মূসা (আঃ)-কে দিয়েছিলাম, যেটাকে আমি লোকদের জন্যে নূর ও হিদায়াত করে পেশ করেছিলাম সেটা কে অবতীর্ণ করেছিলেন ? যেটাকে তোমরা কাগজে লিখছো, যার মধ্য থেকে তোমরা কিছু গোপন করছে এবং কিছু ঠিক প্রকাশ করছো?”এর পরেই তিনি বলেনঃ “এই কুরআনকে আমি কল্যাণময় রূপে পেশ করেছি।” এখন মুশরিকদের ব্যাপারে বলছেনঃ “যখন আমার পক্ষ থেকে সত্য অর্থাৎ কুরআন তাদের কাছে পেশ করা হলো তখন তারা বলতে লাগলো -যেরূপ কিতাব মূসা (আঃ)-কে দেয়া হয়েছিল সেরূপ কিতাব আমাদেরকে কেন দেয়া হয়নি?” তাই আল্লাহ তা'আলা এখন বলছেনঃ “মূসা (আঃ)-এর কিতাবের সাথে কি কুফরী করা হয়নি এবং এ কথা কি বলা হয়নি যে, এ দু’জন (মূসা আঃ ও হারূন আঃ) তো যাদুকর, আমরা তো তাদেরকে মানবো না?” এরপর মহান আল্লাহ জ্বিনদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন, তারা তাদের কওমকে বলেছিলঃ “হে আমাদের কওম! আমরা একটা কিতাব শুনেছি যা মূসা (আঃ)-এর পরে অবতীর্ণ হয়েছে এবং তাওরাতের বিষয়বস্তুর সত্যতা প্রতিপাদন করছে; আর হকের পথ প্রদর্শন করছে।” অতঃপর কুরআন সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ “এতে সমস্ত কথা সুন্দর ও বিস্তারিতভাবে লিখিত আছে এবং শরীয়তের সব কিছুরই উল্লেখ আছে। যেমন তিনি বলেছেনঃ “তাওরাতে আমি সমস্ত কথা বর্ণনা করে দিয়েছিলাম।” অনুরূপভাবে কুরআনকে (আরবী) বলেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন ইবরাহীম (আঃ)-কে তার প্রভু কতগুলো কথা দ্বারা পরীক্ষা করলেন তখন তিনি তা পূর্ণ করলেন, আল্লাহ বললেন-আমি তোমাকে লোকদের ইমাম নিযুক্তকারী।” (২:১২৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের মধ্যে বহু ধর্মীয় নেতা করেছিলাম-যারা আমার নির্দেশক্রমে হিদায়াত করতো, যখন তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল, আর তারা আমার আয়াতসমূহকে বিশ্বাস করতো।”(আরবী) অর্থাৎ আমি মূসা (আঃ)কে এমন কিতাব দিয়েছিলাম যা দানসমূহের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম দান ছিল, যা দুনিয়াতেও উত্তম এবং পরকালেও কামিল বা পূর্ণ। ইবনে জারীর (রঃ) এর অন্তর্নিহিত ভাষা (আরবী) বলেছেন। তিনি যেন (আরবী) -কে (আরবী) ধরেছেন। অর্থাৎ ঐ কিতাবটি কামিল বা পূর্ণ ছিল বা উত্তম হওয়ার দিক দিয়ে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) এখন এখানে (আরবী) এর (আরবী) হয়ে গেল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) (আরবী) এরূপ কিরআত করতেন। মুজাহিদ (রঃ) (আরবী) দ্বারা (আরবী) ও (আরবী) উদ্দেশ্য গ্রহণ করতেন। বাগাভী (রঃ) (আরবী) এবং (আরবী) উদ্দেশ্য নিতেন। অর্থাৎ আমি মুমিন ও মুহসিনদের উপর তাওরাতের ফযীলত প্রকাশ করে দিয়েছিলাম। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মূসা (আঃ)! আমি তোমাকে স্বীয় রিসালাত ও কালামের মাধ্যমে সমস্ত লোকের উপর মনোনীত করেছি।” (৭:১৪৪) আল্লাহ তা'আলার এ উক্তি দ্বারা এটা অবশ্যম্ভাবী হচ্ছে না যে, হযরত মূসার এই ফযীলত হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এবং হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর উপরও রয়েছে। ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার (রঃ) (আরবী) -কে (আরবী) -এর পরিবর্তে (আরবী) দিয়ে আহসানু পড়তেন এবং বলতেন যে, এটা (আরবী) এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং (আরবী) কে (আরবী) দিয়ে পড়াই যুক্তিযুক্ত। আবার কেউ এ কথাও বলেন যে, আরবী ভাষা হিসেবে এটা একটা বিশুদ্ধ রূপ হলেও এভাবে দিয়ে পড়া উচিত নয়। কেউ কেউ একথাও বলেছেন যে, এটা (আরবী)-এই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে-এতে প্রত্যেকটি বস্তুর বিশদ বিবরণ রয়েছে। আর একটা হচ্ছে হিদায়াত ও রহমত । আশা যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ হওয়া সম্বন্ধে পূর্ণ বিশ্বাস লাভ করবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি যে কিতাব অবতীর্ণ করেছি তা হচ্ছে বরকতময় ও কল্যাণময়, সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ করে চল এবং আল্লাহকে ভয় কর। তাহলে তোমাদের প্রতি দয়া করা হবে। এতে কুরআনের অনুসরণ করার প্রতি আহ্বান করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে স্বীয় কিতাবের দিকে ধাবিত হওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন এবং এতে চিন্তা ও গবেষণা করার নির্দেশ দিচ্ছেন।

আল-আনআম 6:155

১৫৪-১৫৫ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) এর অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আমার সম্পর্কে আবার বলে দাও, আমি মূসা (আঃ)-কে কিতাব দিয়েছিলাম। এটা (আরবী) -এই উক্তি দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু এটা চিন্তা ভাবনার বিষয় বটে (আরবী) শব্দটি এখানে শুধুমাত্র একটি (আরবী) -এর পর আর একটি (আরবী) –এর (আরবী) বা সংযোগের জন্যে এসেছে। (আরবী) বুঝাবার জন্যে নয়। (আরবী) শব্দটি সাধারণতঃ বুঝাবার জন্যেই এসে থাকে) এখানে আল্লাহ তা'আলা যখন স্বীয় উক্তি (আরবী) -এর মাধ্যমে কুরআন সম্পর্কে খবর দিলেন, তখন তিনি (আরবী) -এর প্রশংসায় দ্বারা (আরবী) করে বললেনঃ এখন আমি তোমাকে এ সংবাদও দিচ্ছি যে, আমি মূসা (আঃ)-কেও কিতাব দিয়েছিলাম। অধিকাংশ স্থানে আল্লাহ পাক মিলিতভাবে কুরআন ও তাওরাতের বর্ণনা দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “এর পূর্বে মূসা (আঃ)-এর কিতাব ইমাম ও রহমত স্বরূপ ছিল, আর এই কিতাব (কুরআন) আরবী ভাষায় এর সত্যতা প্রতিপাদন করছে।” এই সূরার প্রথম দিকে তিনি বলেছেনঃ “হে নবী (সঃ) তুমি জিজ্ঞেস কর-যে কিতাব আমি মূসা (আঃ)-কে দিয়েছিলাম, যেটাকে আমি লোকদের জন্যে নূর ও হিদায়াত করে পেশ করেছিলাম সেটা কে অবতীর্ণ করেছিলেন ? যেটাকে তোমরা কাগজে লিখছো, যার মধ্য থেকে তোমরা কিছু গোপন করছে এবং কিছু ঠিক প্রকাশ করছো?”এর পরেই তিনি বলেনঃ “এই কুরআনকে আমি কল্যাণময় রূপে পেশ করেছি।” এখন মুশরিকদের ব্যাপারে বলছেনঃ “যখন আমার পক্ষ থেকে সত্য অর্থাৎ কুরআন তাদের কাছে পেশ করা হলো তখন তারা বলতে লাগলো -যেরূপ কিতাব মূসা (আঃ)-কে দেয়া হয়েছিল সেরূপ কিতাব আমাদেরকে কেন দেয়া হয়নি?” তাই আল্লাহ তা'আলা এখন বলছেনঃ “মূসা (আঃ)-এর কিতাবের সাথে কি কুফরী করা হয়নি এবং এ কথা কি বলা হয়নি যে, এ দু’জন (মূসা আঃ ও হারূন আঃ) তো যাদুকর, আমরা তো তাদেরকে মানবো না?” এরপর মহান আল্লাহ জ্বিনদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন, তারা তাদের কওমকে বলেছিলঃ “হে আমাদের কওম! আমরা একটা কিতাব শুনেছি যা মূসা (আঃ)-এর পরে অবতীর্ণ হয়েছে এবং তাওরাতের বিষয়বস্তুর সত্যতা প্রতিপাদন করছে; আর হকের পথ প্রদর্শন করছে।” অতঃপর কুরআন সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ “এতে সমস্ত কথা সুন্দর ও বিস্তারিতভাবে লিখিত আছে এবং শরীয়তের সব কিছুরই উল্লেখ আছে। যেমন তিনি বলেছেনঃ “তাওরাতে আমি সমস্ত কথা বর্ণনা করে দিয়েছিলাম।” অনুরূপভাবে কুরআনকে (আরবী) বলেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন ইবরাহীম (আঃ)-কে তার প্রভু কতগুলো কথা দ্বারা পরীক্ষা করলেন তখন তিনি তা পূর্ণ করলেন, আল্লাহ বললেন-আমি তোমাকে লোকদের ইমাম নিযুক্তকারী।” (২:১২৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের মধ্যে বহু ধর্মীয় নেতা করেছিলাম-যারা আমার নির্দেশক্রমে হিদায়াত করতো, যখন তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল, আর তারা আমার আয়াতসমূহকে বিশ্বাস করতো।”(আরবী) অর্থাৎ আমি মূসা (আঃ)কে এমন কিতাব দিয়েছিলাম যা দানসমূহের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম দান ছিল, যা দুনিয়াতেও উত্তম এবং পরকালেও কামিল বা পূর্ণ। ইবনে জারীর (রঃ) এর অন্তর্নিহিত ভাষা (আরবী) বলেছেন। তিনি যেন (আরবী) -কে (আরবী) ধরেছেন। অর্থাৎ ঐ কিতাবটি কামিল বা পূর্ণ ছিল বা উত্তম হওয়ার দিক দিয়ে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) এখন এখানে (আরবী) এর (আরবী) হয়ে গেল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) (আরবী) এরূপ কিরআত করতেন। মুজাহিদ (রঃ) (আরবী) দ্বারা (আরবী) ও (আরবী) উদ্দেশ্য গ্রহণ করতেন। বাগাভী (রঃ) (আরবী) এবং (আরবী) উদ্দেশ্য নিতেন। অর্থাৎ আমি মুমিন ও মুহসিনদের উপর তাওরাতের ফযীলত প্রকাশ করে দিয়েছিলাম। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মূসা (আঃ)! আমি তোমাকে স্বীয় রিসালাত ও কালামের মাধ্যমে সমস্ত লোকের উপর মনোনীত করেছি।” (৭:১৪৪) আল্লাহ তা'আলার এ উক্তি দ্বারা এটা অবশ্যম্ভাবী হচ্ছে না যে, হযরত মূসার এই ফযীলত হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এবং হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর উপরও রয়েছে। ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার (রঃ) (আরবী) -কে (আরবী) -এর পরিবর্তে (আরবী) দিয়ে আহসানু পড়তেন এবং বলতেন যে, এটা (আরবী) এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং (আরবী) কে (আরবী) দিয়ে পড়াই যুক্তিযুক্ত। আবার কেউ এ কথাও বলেন যে, আরবী ভাষা হিসেবে এটা একটা বিশুদ্ধ রূপ হলেও এভাবে দিয়ে পড়া উচিত নয়। কেউ কেউ একথাও বলেছেন যে, এটা (আরবী)-এই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে-এতে প্রত্যেকটি বস্তুর বিশদ বিবরণ রয়েছে। আর একটা হচ্ছে হিদায়াত ও রহমত । আশা যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ হওয়া সম্বন্ধে পূর্ণ বিশ্বাস লাভ করবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি যে কিতাব অবতীর্ণ করেছি তা হচ্ছে বরকতময় ও কল্যাণময়, সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ করে চল এবং আল্লাহকে ভয় কর। তাহলে তোমাদের প্রতি দয়া করা হবে। এতে কুরআনের অনুসরণ করার প্রতি আহ্বান করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে স্বীয় কিতাবের দিকে ধাবিত হওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন এবং এতে চিন্তা ও গবেষণা করার নির্দেশ দিচ্ছেন।

আল-আনআম 6:156

১৫৬-১৫৭ নং আয়াতের তাফসীর: ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে, আমি এ কিতাব অবতীর্ণ করেছি এই কারণে যে, যেন তোমরা বলতে না পার আমাদের পূর্বে তো ইয়াহূদী ও নাসারাদের উপর কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছিল এবং আমাদের উপর অবতীর্ণ করা হয়নি। তাদের ওযর আপত্তি শেষ করে দেয়ার জন্যেই এ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যদি ব্যাপার এটা না হতো যে, তাদের প্রতি আপতিত বিপদ তাদেরই কর্মের ফল তবে তারা বলতো-হে আমাদের প্রভু! যদি আপনি কোন রাসূল আমাদের কাছে পাঠাতেন তবে আমরাও আপনার নির্দেশ পালন করতাম।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) বা। দু’টি দল হচ্ছে ইয়াহুদী ও নাসারা। (এটা হচ্ছে মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ পূর্ববতী গুরুজনেরও উক্তি)(আরবী) অর্থাৎ আমরা এই ইয়াহুদী ও নাসারাদের ভাষা তো বুঝি না, কাজেই আমরা গাফেল ছিলাম এবং তাদের মত সঠিক আমল করতে পারিনি। আর তোমরা যেন এ কথাও বলতে না পার-যদি আমাদের উপরও আমাদের ভাষায় কোন আসমানী কিতাব অবতীর্ণ হতো তবে আমরা এই ইয়াহদী ও নাসারাদের চেয়ে বেশী হিদায়াত প্রাপ্ত হতাম। তাই আমি তাদের এই ওযর আপত্তি খতম করে দিলাম। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “তারা শপথ করে করে বলে যে, যদি তাদের কাছে কোন রাসূল আসতেন তবে তারা সবচেয়ে বেশী ভাল আমল করতো এবং হিদায়াত প্রাপ্ত হতো। তাই তিনি বলেনঃ “এখন তোমাদের কাছে তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে হিদায়াত ও রহমতযুক্ত কিতাব এসে গেছে।” এই কুরআনে আযীম তোমাদের ভাষাতেই অবতারিত, এতে হালাল ও হারাম সবকিছুরই বর্ণনা রয়েছে। এটা ঐ লোকদের জন্যে রহমত, যারা এর অনুসরণ করে এবং সদা আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত থাকে।(আরবী) সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং তার থেকে এড়িয়ে চলে তার চেয়ে বড় অত্যাচারী আর কে হতে পারে? সে নিজেও তো কুরআন থেকে উপকার লাভ করলো না বা আহকাম মেনে চললই না, এমন কি অন্যান্য লোকদেরকেও আল্লাহর আয়াতের অনুসরণ থেকে ফিরিয়ে দিলো এবং হিদায়াতের পথ প্রাপ্তি থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করলো। যেমন সূরার শুরুতে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “তারা নিজেরাও ঈমান আনয়ন থেকে বিরত থাকছে এবং অন্যদেরকেও বিরত রাখছে। তারা নিজেদের জীবনকে নিজেদের হাতেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।”ইরশাদ হচ্ছে-যারা কুফরী করে এবং আল্লাহর পথ থেকে অন্যান্য লোকদেরকেও বাধা প্রদান করে তাদের দ্বিগুণ শাস্তি হবে। আর এই আয়াতে। কারীমায় বলেনঃ “আমি ঐ লোকদেরকে ভীষণ শাস্তি প্রদান করবো যারা আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা প্রদান করে। যেমন তিনি বলেছেনঃ “সে বিশ্বাসও করেনি, নামাযও পড়েনি বরং মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।মোটকথা, বহু আয়াত এটা প্রমাণ করে যে, এই কাফিররা অন্তরে মিথ্যা প্রতিপন্ন ও অবিশ্বাস করে এবং বাহ্যিকও ভাল কাজ করে না।

আল-আনআম 6:157

১৫৬-১৫৭ নং আয়াতের তাফসীর: ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে, আমি এ কিতাব অবতীর্ণ করেছি এই কারণে যে, যেন তোমরা বলতে না পার আমাদের পূর্বে তো ইয়াহূদী ও নাসারাদের উপর কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছিল এবং আমাদের উপর অবতীর্ণ করা হয়নি। তাদের ওযর আপত্তি শেষ করে দেয়ার জন্যেই এ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যদি ব্যাপার এটা না হতো যে, তাদের প্রতি আপতিত বিপদ তাদেরই কর্মের ফল তবে তারা বলতো-হে আমাদের প্রভু! যদি আপনি কোন রাসূল আমাদের কাছে পাঠাতেন তবে আমরাও আপনার নির্দেশ পালন করতাম।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) বা। দু’টি দল হচ্ছে ইয়াহুদী ও নাসারা। (এটা হচ্ছে মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ পূর্ববতী গুরুজনেরও উক্তি)(আরবী) অর্থাৎ আমরা এই ইয়াহুদী ও নাসারাদের ভাষা তো বুঝি না, কাজেই আমরা গাফেল ছিলাম এবং তাদের মত সঠিক আমল করতে পারিনি। আর তোমরা যেন এ কথাও বলতে না পার-যদি আমাদের উপরও আমাদের ভাষায় কোন আসমানী কিতাব অবতীর্ণ হতো তবে আমরা এই ইয়াহদী ও নাসারাদের চেয়ে বেশী হিদায়াত প্রাপ্ত হতাম। তাই আমি তাদের এই ওযর আপত্তি খতম করে দিলাম। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “তারা শপথ করে করে বলে যে, যদি তাদের কাছে কোন রাসূল আসতেন তবে তারা সবচেয়ে বেশী ভাল আমল করতো এবং হিদায়াত প্রাপ্ত হতো। তাই তিনি বলেনঃ “এখন তোমাদের কাছে তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে হিদায়াত ও রহমতযুক্ত কিতাব এসে গেছে।” এই কুরআনে আযীম তোমাদের ভাষাতেই অবতারিত, এতে হালাল ও হারাম সবকিছুরই বর্ণনা রয়েছে। এটা ঐ লোকদের জন্যে রহমত, যারা এর অনুসরণ করে এবং সদা আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত থাকে।(আরবী) সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং তার থেকে এড়িয়ে চলে তার চেয়ে বড় অত্যাচারী আর কে হতে পারে? সে নিজেও তো কুরআন থেকে উপকার লাভ করলো না বা আহকাম মেনে চললই না, এমন কি অন্যান্য লোকদেরকেও আল্লাহর আয়াতের অনুসরণ থেকে ফিরিয়ে দিলো এবং হিদায়াতের পথ প্রাপ্তি থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করলো। যেমন সূরার শুরুতে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “তারা নিজেরাও ঈমান আনয়ন থেকে বিরত থাকছে এবং অন্যদেরকেও বিরত রাখছে। তারা নিজেদের জীবনকে নিজেদের হাতেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।”ইরশাদ হচ্ছে-যারা কুফরী করে এবং আল্লাহর পথ থেকে অন্যান্য লোকদেরকেও বাধা প্রদান করে তাদের দ্বিগুণ শাস্তি হবে। আর এই আয়াতে। কারীমায় বলেনঃ “আমি ঐ লোকদেরকে ভীষণ শাস্তি প্রদান করবো যারা আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা প্রদান করে। যেমন তিনি বলেছেনঃ “সে বিশ্বাসও করেনি, নামাযও পড়েনি বরং মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।মোটকথা, বহু আয়াত এটা প্রমাণ করে যে, এই কাফিররা অন্তরে মিথ্যা প্রতিপন্ন ও অবিশ্বাস করে এবং বাহ্যিকও ভাল কাজ করে না।

আল-আনআম 6:158

রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ কারীদেরকে ও কাফিরদেরকে হুমকি দেয়া হচ্ছে- তোমরা তো শুধু এরই অপেক্ষা করছো যে, তোমাদের কাছে ফেরেশতারা এসে যাবে কিংবা স্বয়ং তোমাদের প্রতিপালক এসে যাবেন, এটা কিয়ামতের দিন অবশ্যই হবে, অথবা আল্লাহর কোন কোন নিদর্শন তোমাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়বে! তাহলে যখন ঐ নিদর্শনগুলো প্রকাশ হয়ে পড়বে তখন কারো ঈমান আনয়ন তার কোন উপকারে আসবে না। আর এটা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে কিয়ামতের আলামত হিসেবে অবশ্যই প্রকাশ পাবে। যেমন ইমাম বুখারী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত না পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হবে। আর যখন লোকেরা এ অবস্থা অবলোকন করবে তখন সারা দুনিয়াবাসীর এটার প্রতি বিশ্বাস হয়ে যাবে এবং তারা ঈমান আনয়ন করবে। আর যদি পূর্বে ঈমান না এনে থাকে তবে তখনকার ঈমান আনয়নে কোনই ফল হবে না।” অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে কয়েকটি পন্থায় তাখরীজ করেছেন)আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যদি তিনটি জিনিস প্রকাশ হয়ে পড়ে তবে ওগুলো প্রকাশ পাওয়ার পূর্বে কেউ ঈমান এনে না থাকলে তখন ঈমান আনয়ন বিফল হবে এবং পূর্বে ভাল কাজ করে না থাকলে তখন ভাল কাজ করে কোনই লাভ হবে না। প্রথম নিদর্শন হচ্ছে পূর্ব দিকের স্থলে পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হওয়া। দ্বিতীয় নিদর্শন হচ্ছে দাজ্জালের আবির্ভাব এবং তৃতীয় নিদর্শন হচ্ছে দাব্বাতুল আরদের প্রকাশ।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত না সূর্য পশ্চিম দিক হতে উদিত হবে। অতঃপর যখন সূর্য পশ্চিম দিক হতে উদিত হবে তখন সমস্ত লোক ঈমান আনবে। ওটা এমন এক সময় যখন এমন ব্যক্তির ঈমান আনয়ন কোন উপকারে আসবে না যে ব্যক্তি ওর পূর্বে ঈমান আনেনি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত হওয়ার পূর্বেই তাওবা করবে তার তাওবা কবুল হবে, এর পরে আর তাওবা কবুল হবে না।” (বিশুদ্ধ ছ’খানা হাদীস গ্রন্থের একখানা ছাড়া সবগুলোর মধ্যেই এ হাদীসটি রয়েছে)হযরত আবু যার আল গিফারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বললেনঃ “সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর কোথায় যায় তা তুমি জান কি?” আমি বললাম, না, আমি জানি না। তিনি বললেনঃ “ওটা আরশের সামনে পৌছে এবং সিজদায় পড়ে যায়। তারপর উঠে পড়ে, শেষ পর্যন্ত ওকে বলা হয়-ফিরে যাও। হে আবু যার (রাঃ)! ঐদিন নিকটবর্তী যেই দিন ওকে বলা হবে-তুমি যেখান থেকে এসেছে সেখানেই ফিরে যাও। ওটা এমনই এক দিন, যেই দিন ঐ ব্যক্তির ঈমান আনয়নে কোনই উপকার হবে না যে ব্যক্তি ওর পূর্বে ঈমান আনেনি।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) আবু যর গিফারী (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন)অপর একটি হাদীস- হুযাইফা ইবনে উসায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কক্ষ থেকে বের হয়ে আমাদের কাছে আসলেন, সেই সময় আমরা কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। অতঃপর তিনি বললেনঃ “কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত না তোমরা দশটি নিদর্শন অবলোকন করবে। (সেগুলো হচ্ছে) পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হওয়া, ধোয়া ওঠা, দাব্বাতুল আরদের আবির্ভাব হওয়া, ইয়াজু মাজুযের আত্মপ্রকাশ ঘটা, ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর আগমন হওয়া, দাজ্জাল বের হওয়া, তিনটি ভূমিকম্প হওয়া বা যমীন ধ্বসে যাওয়া, একটি পূর্ব দিকে, একটি পশ্চিম দিকে এবং একটি আরব উপদ্বীপে, আদনে এক আগুন প্রকাশিত হওয়া যার কারণে মানুষ দৌড়িয়ে পালাতে থাকবে, তারা রাত্রে কোন জায়গায় ঘুমাতে চাইলে সেখানেও ঐ আগুন বিদ্যমান, আবার দিনে কোন স্থানে শুইতে চাইলে সেখানেও ঐ আগুন হাজির।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) ও আসহাবুস সুনানিল আরবা' এটাকে তাখরীজ করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামহে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়ার নিদর্শন কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “সেই দিন রাত্রি এতো দীর্ঘ হবে যে, দুটি রাত্রির সমান অনুভূত হবে। রাত্রে যারা নামায পড়ে তারা জেগে উঠবে এবং যেভাবে তাহাজ্জুদের নামায পড়ে থাকে সেভাবেই পড়বে। তারকাগুলোকে স্ব স্ব স্থানে প্রতিষ্ঠিত দেখা যাবে, অস্ত যাবে না। এ লোকগুলো নামায শেষ করে ঘুমিয়ে পড়বে। পুনরায় জেগে উঠবে এবং নামায পড়বে। আবার শুয়ে যাবে এবং পুনরায় জেগে উঠবে ও নামায পড়বে। শুয়ে শুয়ে তাদের পার্শ্বদেশ অনড় হয়ে যাবে। রাত্রি এতো দীর্ঘ হয়ে যাবে যে, মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়বে, সকাল হবে না। তারা অপেক্ষমান থাকবে যে, সূর্য পূর্ব দিক থেকেই উদিত হবে। অকস্মাৎ ওটাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত হতে দেখা যাবে। তখন ঈমান আনয়নে কোনই উপকার হবে না।" (ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই ঢঙ্গে ছ'খানা সহীহ হাদীস গ্রন্থের কোন একটাতেও বিদ্যমান নেই)অপর একটি হাদীস সাফওয়ান ইবনে উসসাল (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “আল্লাহ তা'আলা পশ্চিম দিকে একটি দরযা খুলে রেখেছেন যার প্রস্থ সত্তর বছরের পথ। এটা তাওবার দর। সূর্য বিপরীত দিক থেকে উদিত হওয়ার পূর্বে এটা বন্ধ করা হবে না।” (ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং নাসাঈ (রঃ) ও ইবনে মাজাহ (রঃ) এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন)অপর একটি হাদীসঃ “একটি রাত্রি লোকদের উপর এমন আসবে যা তিন রাত্রির সমান হবে। যখন এরূপ ঘটবে তখন যারা তাহাজ্জুদের নামায পড়ে থাকে তারা এর পরিচয় পেয়ে যাবে। সুতরাং তারা নফল নামায পড়বে, তারপর শুয়ে যাবে, আবার উঠবে, আবার নামায পড়বে। তারা এরূপ বারবার করতে থাকবে এমন সময় হঠাৎ শোরগোল উঠবে। লোকেরা চীৎকার করতে থাকবে এবং ভয়ে মসজিদের দিকে দৌড়িয়ে যাবে। কেননা সূর্য সে সময় পশ্চিম দিক হতে উদিত অবস্থায় রইবে । এখন ওটা আকাশের মধ্যস্থলে এসে আবার পশ্চিম দিকে ফিরে যাবে। এরপরে যথা নিয়মে পূর্ব দিক থেকেই উদিত হতে থাকেবে। ঐ সময় ঈমান আনয়ন বিফল হবে।” (এ হাদীসটি গারীব এবং ছ’খানা সহীহ হাদীস গ্রন্থের কোনটাতেই নেই)অপর একটি হাদীসঃ তিনজন মুসলমান মদীনায় মারওয়ানের নিকট উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি কিয়ামতের নিদর্শনাবলীর আলোচনা করতে গিয়ে বলছিলেন যে, দাজ্জাল বের হওয়া কিয়ামতের একটি আলামত। অতঃপর লোকগুলো হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর কাছে আগমন করেন এবং মারওয়ানের কাছে যা শুনেছিলেন তা তার কাছে বর্ণনা করেন। তিনি তখন বললেনঃ “মারওয়ান তো কিছুই বলেননি। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট থেকে যা শুনে স্মরণ করে রেখেছি তাই তোমাদেরকে শুনাচ্ছি। প্রথম নিদর্শন এই যে, সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে। তারপর দাব্বাতুল আরদের আবির্ভাব অথবা কোন একটি প্রথমে এবং অন্যটি এরপরে প্রকাশ পাবে।”অপর একটি হাদীসঃ আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যখন সূর্য পশ্চিম দিক হতে উদিত হবে তখন ইবলীস শয়তান সিজদায় পড়ে যাবে এবং চীৎকার করে বলবে-“হে আমার প্রভু! এখন আপনি আমাকে যাকে সিজদা করার হুকুম করতেন তাকেই আমি সিজদা করতাম।” তখন তার দেহরক্ষীরা তাকে বলবে, এসব অনুনয় বিনয় কেন? সে উত্তরে বলবে, আমি আল্লাহর কাছে আবেদন করেছিলাম, “আমাকে ওয়াক্তে মা’ম পর্যন্ত অবসর দিন। আর আজকের দিনটিই হচ্ছে ওয়াক্তে মালুম।” তারপর দাব্বাতুল আরদ বের হবে। তার প্রথম পা রাখার স্থান হবে ইতাকিয়া। ইবলীস এসে তাকে চপেটাঘাত করবে। (এ হাদীসটি গারীব। এর সনদ দুর্বল। সম্ভবতঃ ইবনুল আস (রাঃ) ঐ যখীরা থেকে হাদীসটি গ্রহণ করে থাকবেন যা আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) ইয়ারমুকের যুদ্ধে পড়ে পেয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ইবনু সা'দী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হিজরত লুপ্ত হবে না (বরং অব্যাহত থাকবে) যে পর্যন্ত শত্রু যুদ্ধ করতে থাকবে।” মুআবিয়া (রাঃ), আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এবং আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হিজরত দু’প্রকারের রয়েছে। একটি হচ্ছে খারাপ কাজ থেকে হিজরত করে ভাল কাজের দিকে ধাবিত হওয়া এবং অপরটি হচ্ছে আল্লাহ ও রাসূল (সঃ)-এর দিকে হিজরত করা। আর এটা বাকী থাকবে যে পর্যন্ত না তাওবার দরযা বন্ধ হবে। সূর্য যখন পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে তখন প্রত্যেক লোকের অন্তরে মোহর লেগে যাবে। যা কিছু তার মধ্যে রয়েছে সেটাই থাকবে এবং যা কিছু আমল মানুষ করেছে ওটাই যথেষ্ট হয়েছে (অর্থাৎ এর পরে কোন আমল করলে তা কোনই কাজে আসবে না)।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, এ হদীসটির ইসনাদ উত্তম)হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের নিদর্শনগুলো সবই ঘটে গেছে, শুধুমাত্র চারটি নিদর্শন আসতে বাকী আছে। (১) পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া, (২) দাজ্জালের আবির্ভাব, (৩) দাব্বাতুল আরদ বের হওয়া এবং (৪) ইয়াজুজ মাজুজের আগমন । হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে একটি হাদীস মার’রূপে বর্ণিত আছে। হাদীসটি দীর্ঘ এবং গারীব। তা এই যে, ঐ দিন সূর্য ও চন্দ্র মিলিতভাবে পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে এবং অর্ধ আকাশ পর্যন্ত এসে পুনরায় ঐ দিকেই ফিরে যাবে। এ হাদীসটি মুনকার ও মাওযু'। কিন্তু এর মারফু হওয়ার দাবী করা হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) পর্যন্ত এসে বর্ণনাকারীদের বিরতি হয়েছে। সুতরাং এটাকে সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, প্রথম আলামত প্রকাশ পাওয়া মাত্রই কিরামান কাতেবীনের কাজ শেষ হয়ে যাবে এবং দেহের আমলের উপর সাক্ষ্য প্রদানের সময় এসে যাবে। ওর পূর্বেই যারা ঈমানদার ছিল এবং ভাল কাজ করতো তারা বড়ই উপকৃত হবে। পক্ষান্তরে যার পূর্বে ভাল ছিল না, তারা তখন তাওবাহ করতে শুরু করবে। কিন্তু তখন তাওবাহ্ করে কি লাভ? (আরবী) এর ভাবার্থ এটাই। অর্থাৎ তখন আর ভাল কাজ কবুল করা হবে না যদি পূর্বে ভাল কাজ করে না থাকে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও-তোমরা ঐ দিনের অপেক্ষা কর, আমিও অপেক্ষা করছি।” এটা কাফিরদের প্রতি কঠিন ভৎসনা, যারা ঈমান ও তাওবাহ থেকে উদাসীন রয়েছে, শেষ পর্যন্ত ঐ সময় এসে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “এরা শুধু কিয়ামতের সময়ের অপেক্ষা করছে, যেন তা তাদের কাছে হঠাৎ এসে পড়ে, অবশ্যই এর নিদর্শনগুলো তো এসেই পড়েছে, সুতরাং যখন তা সংঘটিত হয়েই যাবে তখন তাদের বুঝবার সুযোগ থাকবে কোথায়?” ইরশাদ হচ্ছে-যখন তারা আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন বলবে আমরা একক আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম এবং শরীকদেরকে অস্বীকার করলাম, কিন্তু শাস্তি দেখার পর ঈমানের এসব কথা বাজে ও ভিত্তিহীন।

আল-আনআম 6:159

এ আয়াতটি ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নবুওয়াতের পূর্বে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানেরা পরস্পর মতানৈক্য সৃষ্টি করতে এবং নিজ নিজ ধর্ম পৃথক সাব্যস্ত করতো। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রেরিত হন তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। বলা হয়, হে নবী (সঃ)! যারা নিজেদের ধর্মের মধ্যে নানা মতবাদ সৃষ্টি করতঃ ওকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই এবং তোমার সাথে তাদেরও কোন সম্পর্ক নেই। এরা হচ্ছে বিদআতী, সন্দেহ পোষণকারী পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়। কিন্তু এই হাদীসে একটি সনদ ঠিক নয়।আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, এটা এই উম্মতের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। আর (আরবী) দ্বারা খারেজীদেরকে বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে বলেছিলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে বিদআতীরা। এ হাদীসটিও গারীব এবং মারফু' রূপেও বিশুদ্ধ নয়। (এটা হচ্ছে মুজাহিদ (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ)-এর উক্তি) তবে প্রকাশ্য কথা এই যে, এ আয়াতটি সাধারণ । এমন প্রত্যেক ব্যক্তির উপরই এটা প্রযোজ্য হতে পারে যে আল্লাহর দ্বীনে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে এবং দ্বীনের বিরোধী হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সত্য ধর্মের হিদায়াতসহ প্রেরণ করেছেন যেন তিনি সমস্ত দ্বীনের উপর দ্বীনে ইসলামকে জয়যুক্ত করেন। ইসলামের পথ একটাই। তাতে কোন মতভেদ ও বিচ্ছিন্নতা নেই। যারা পথক দল অবলম্বন করেছে, যেমন বাহাত্তর দল বিশিষ্ট লোকেরা, আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। এ আয়াতটি ঐ আয়াতের মতই, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “হে নবী (সঃ)! তোমাদের জন্যে আমি ঐ দ্বীনকেই পছন্দ করেছি যা নূহ (আঃ) -এর জন্যে ছিল।” হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা নবীরা বৈমাত্রেয় সন্তানদের মত। যেমন বৈমাত্রেয় সন্তানদের পিতা একজনই হয় তেমনই আমাদের সকলেরই দ্বীন বা ধর্ম একটাই। এটাই হচ্ছে সিরাতে মুসতাকীম এবং এটাই হচ্ছে ঐ হিদায়াত যা রাসূলগণ এক আল্লাহর। ইবাদত সম্পর্কে পেশ করেছেন এবং সর্বশেষ রাসূল (সঃ)-এর শরীয়তকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করাকে সিরাতে মুসতাকীম বানিয়েছেন। এটা ছাড়া সমস্ত কিছুই পথভ্রষ্টতা ও মূর্খতা। রাসূলগণ ওগুলো থেকে মুক্ত । যেমন আল্লাহ পাক এখানে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তাদের সাথে কোন ব্যাপারে তোমার কোন সম্পর্ক নেই। এরপর ইরশাদ হচ্ছে-তাদের বিষয়টি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দাও। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত করবেন। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেনঃ “যারা ঈমান এনেছে, আর যারা ইয়াহূদী রয়েছে বা তারকাপূজক, খ্রীষ্টান, মাজুস কিংবা মুশরিক রয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন।” এখন এরপর আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন স্বীয় হুকুম এবং বিচারের মধ্যেও নিজের স্নেহ ও দয়ার বর্ণনা পরবর্তী আয়াতে দিচ্ছেন।

আল-আনআম 6:160

এ আয়াতে কারীমায় বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করা হয়েছে এবং এর পরবর্তী আয়াত সংক্ষিপ্ত। এ আয়াতের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত বহু হাদীস রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মহাকল্যাণময় আল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেনঃ “তোমাদের মহামহিমান্বিত আল্লাহ বড় করুণাময়। কেউ যদি কোন ভাল কাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু ঐ কাজ সাধন করতে না পারে তবুও তার জন্যে একটা পুণ্য লিখে নেয়া হয়। আর যদি সে ঐ কাজটি সাধন করে তবে তার জন্যে দশটা পুণ্য লিখা হয় এবং তার ভাল নিয়তের কারণে এটা বৃদ্ধি হতে হতে সাতশ’ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পক্ষান্তরে কেউ যদি কোন খারাপ কাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু তা করে না বসে তবে ওর জন্যেও একটা পুণ্য লিখা হয়। আর যদি তা করে ফেলে তবে একটা মাত্র পাপ লিখা হয় এবং সেটাও ইচ্ছা করলে মহামহিমান্বিত আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেন-যে ব্যক্তি একটি ভাল কাজ করবে তার জন্যে অনুরূপ দশটি পুণ্য রয়েছে এবং আমি তার চেয়েও বেশী প্রদান করবো। আর যে ব্যক্তি একটি খারাপ কাজ করবে, তার অনুরূপ একটি মাত্র পাপ তার জন্যে লিখা হবে অথবা আমি ওটাও ক্ষমা করে দেবো। যে ব্যক্তি ভূ-পৃষ্ঠ বরাবর পাপ করে আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে, কিন্তু আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না, আমি সেই পরিমাণই ক্ষমা তার উপর নাযিল করবো। যে ব্যক্তি আমার দিকে অর্ধহাত অগ্রসর হবে, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হবো। যে ব্যক্তি আমার দিকে একহাত অগ্রসর হবে, আমি তার দিকে দু'হাত অগ্রসর হবো। যে ব্যক্তি আমার দিকে হেঁটে আসবে, আমি তার দিকে দৌড়িয়ে যাবো।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন ভাল কাজের ইচ্ছা করলো কিন্তু কাজটা করলো না তবে তার জন্যে একটা পুণ্য লিখা হবে। আর যদি কাজটি করে নেয় তবে তার জন্যে দশটি পুণ্য লিপিবদ্ধ করা হবে। পক্ষান্তরে কেউ যদি কোন খারাপ কাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু করে না বসে তবে তার জন্যে কিছুই লিখা হবে না। আর যদি কাজটি করে ফেলে তবে তার জন্যে একটা পাপ লিখা হবে।” (হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা আল মুসিলী বর্ণনা করেছেন)এখানে এটা জেনে নেয়া জরুরী যে, যে ব্যক্তি কোন পাপকার্যের ইচ্ছা করে তা করে বসলো না ওটা তিন প্রকার। (১) কখনও এরূপ হয় যে, সে আল্লাহর ভয়ে পাপের ইচ্ছা পরিত্যাগ করলো। এ প্রকারের লোককেও পাপকার্য থেকে বিরত থাকার কারণে একটি পুণ্য দেয়া হবে এবং এটা আমল ও নিয়তের উপর নির্ভরশীল। একারণেই তার জন্যে একটা পুণ্য লিখা হয়। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে, সে আমারই কারণে পাপকার্য পরিত্যাগ করেছে। (২) কখনও এমন হয়। যে, ঐ ব্যক্তি পাপকার্যের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভুলে গিয়ে তা ছেড়ে দেয়। এ অবস্থায় তার জন্যে শাস্তিও নেই, প্রতিদানও নেই। কেননা, সে ভাল কাজেরও নিয়ত করেনি এবং খারাপ কাজও করে বসেনি। (৩) আবার কখনও এমনও হয় যে, কোন ব্যক্তি পাপকার্য করে ফেলার চেষ্টা করে থাকে, ওর উপকরণ সংগ্রহ করে, কিন্তু ওকে কার্যে পরিণত করতে সে অপারগ হয়ে যায় এবং বাধ্য হয়ে তাকে ওটা ছেড়ে দিতে হয়। এরূপ ব্যক্তি যদিও পাপকার্য করে বসলো না তবুও তাকে কার্যে পরিণত কারীরূপেই গণ্য করা হবে এবং শাস্তি দেয়া হবে। যেমন সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন দু’জন মুসলমান তরবারী নিয়ে যুদ্ধ করতে শুরু করে তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়ই জাহান্নামী।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা হত্যাকারীর ব্যাপারে প্রযোজ্য, কিন্তু নিহত ব্যক্তি জাহান্নামী হবে কেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “নিশ্চয়ই সে তার সাথীকে হত্যা করতে উদ্যত ছিল (কিন্তু পারেনি)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন সকার্যের ইচ্ছা করে, সেই কাজ সাধনের পূর্বেই তার জন্যে একটি পুণ্য লিখে নেয়া হয়। আর যদি সেই কার্য সাধন করে ফেলে তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার আমলনামায় দশটি পুণ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। কিন্তু কেউ যদি কোন খারাপ কাজের ইচ্ছা করে তবে শুধু তার ইচ্ছার উপর ভিত্তি করে তার নামে কোন পাপ লিখা হয় না যে পর্যন্ত না। সে তা কার্যে পরিণত করে। আর যদি সে ঐ কাজটি করে বসে তবে দশটি পাপের পরিবর্তে একটি মাত্র পাপ লিখা হয়। যদি সে ইচ্ছা সত্ত্বেও সেই পাপ কার্য থেকে বিরত থাকে তবে কোন আমল ছাড়াই তার জন্যে একটা পুণ্য লিখা হয়। কেননা, আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমাকে ভয় করার করণেই সে পাপকার্য থেকে বিরত রয়েছে।”খুরায়েম ইবনে ফাতিক আসাদী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষ চার প্রকার এবং আমল ছয় প্রকার। (চার প্রকার মানুষ হচ্ছে) (১) কোন কোন লোক দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থলেই সৌভাগ্যবান হয়ে থাকে। (২) কেউ কেউ দুনিয়ায় ভাগ্যবান কিন্তু পরকালে হতভাগ্য হয়। (৩) কোন ব্যক্তি দুনিয়ায় হতভাগ্য কিন্তু পরকালে ভাগ্যবান হয়। (৪) আবার কেউ কেউ দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থলেই হতভাগ্য হয়ে থাকে। (ছয় প্রকারের। আমল হচ্ছে) দু’প্রকারের আমল ওয়াজিবকারী অর্থাৎ আমলের সমান পুণ্য দান। করা হবে বা দশগুণ বেশী অথবা সাতশ’গুণ বেশী পুণ্য দেয়া হবে। যে দু'টি কাজ ওয়াজিবকারী তা হচ্ছে এই যে, যদি কোন মুমিন লোক মারা যায় এবং সে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে থাকে, তবে এর ফলে তার জন্যে জান্নাত রয়েছে। পক্ষান্তরে যদি কোন কাফির মারা যায় তবে এর ফল স্বরূপ তার জন্যে জাহানাম রয়েছে। আর যে ব্যক্তি ভাল কাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু কার্য সাধনে সক্ষম না হয় তবে আল্লাহ তো জানেন যে তার অন্তরে এটা ছিল এবং কার্য সাধনে সে উদ্যতও ছিল, তাই তার জন্যে একটি পুণ্য লিখা হয়। আর কেউ যদি কোন খারাপ কাজের ইচ্ছা করে তবে তার জন্যে কোন পাপ লিখা হয় না । কিন্তু সে যদি ওটা করে বসে তবে একটিমাত্র পাপ লিখা হয়, ওটা বৃদ্ধি করা হয় না। কেউ যদি কোন ভাল কাজ করে তবে তাকে দশগুণ পুণ্য দেয়া হয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে কিছু খরচ করে তখন কখনও তো তাকে দশগুণ পুণ্য দান করা হয়, আবার কোন কোন সময় তার সৎ নিয়ত অনুসারে তাকে তার পুণ্য বৃদ্ধি করতে করতে সাতশ’গুণ পর্যন্ত প্রদান করা হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), তিরমীযী (রঃ) এবং নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আমর ইবনে শু'আয়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তিন ব্যক্তি জুমআ'র নামাযে হাযির হয়। একজন তো হাযির হয় প্রথা হিসেবে। তার আগমন বৃথা। সুতরাং তার জন্যে কোন অংশও নেই। দ্বিতীয় এমন ব্যক্তি মসজিদে হাযির হয়, যে হাযির হয়ে দু'আ করে থাকে। সুতরাং আল্লাহ ইচ্ছা করলে তার দু'আ ককূল করে থাকেন এবং ইচ্ছা করলে কবুল করেন না। তৃতীয় এমন ব্যক্তি নামাযে হাযির হয়, যে হাযির হয়ে সম্পূর্ণ নীরব থাকে। সে নামাযীদেরকে ভেদ করে সামনে অগ্রসর হয় না, কাউকেও ধাক্কাও দেয় না এবং কাউকেও কষ্টও দেয় না। তাহলে এখন এই ব্যক্তির নামায আগামী জুমআ পর্যন্ত এবং এর পরে আরও তিন দিন পর্যন্তও পাপের কাফফারা হয়ে থাকে। এর কারণ এই যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “কেউ কোন ভাল কাজ করলে সে ওর দশগুণ প্রতিদান পাবে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি প্রতি মাসে তিনদিন রোযা রাখলো সে যেন সারা বছর রোযা রাখলো।” এই প্রতিদানও দেয়া হবে এই মূলনীতির উপর ভিত্তি করেই। কেননা, আল্লাহ তা'আলা এর সত্যতা স্বীয় কিতাবে বলে দিয়েছেন। তাই এক দিনের রোযা হবে দশ দিনের রোযার সমান। তাহলে এক বছরে ছত্রিশ দিনের রোযার প্রতিদান তিনশ ষাট দিনের রোযার প্রতিদানের সমান হয়ে যায়। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে এবং পূর্ববর্তী গুরুজনের একটি দল থেকে নকল করা হয়েছে যে, (আরবী)-এই আয়াতে (আরবী) শব্দ দ্বারা কালেমায়ে তাওহীদ অর্থাৎ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু বুঝানো হয়েছে এবং (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক। এই আয়াতের তাফসীরে আরও বহু হাদীস এসেছে। কিন্তু আমি যে কয়টি বর্ণনা করলাম এটাই যথেষ্ট।