Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-আরাফ 7:168 – আল-আরাফ 7:206

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-আরাফ 7:168
  2. আল-আরাফ 7:169
  3. আল-আরাফ 7:170
  4. আল-আরাফ 7:171
  5. আল-আরাফ 7:172
  6. আল-আরাফ 7:173
  7. আল-আরাফ 7:174
  8. আল-আরাফ 7:175
  9. আল-আরাফ 7:176
  10. আল-আরাফ 7:177
  11. আল-আরাফ 7:178
  12. আল-আরাফ 7:179
  13. আল-আরাফ 7:180
  14. আল-আরাফ 7:181
  15. আল-আরাফ 7:182
  16. আল-আরাফ 7:183
  17. আল-আরাফ 7:184
  18. আল-আরাফ 7:185
  19. আল-আরাফ 7:186
  20. আল-আরাফ 7:187
  21. আল-আরাফ 7:188
  22. আল-আরাফ 7:189
  23. আল-আরাফ 7:190
  24. আল-আরাফ 7:191
  25. আল-আরাফ 7:192
  26. আল-আরাফ 7:193
  27. আল-আরাফ 7:194
  28. আল-আরাফ 7:195
  29. আল-আরাফ 7:196
  30. আল-আরাফ 7:197
  31. আল-আরাফ 7:198
  32. আল-আরাফ 7:199
  33. আল-আরাফ 7:200
  34. আল-আরাফ 7:201
  35. আল-আরাফ 7:202
  36. আল-আরাফ 7:203
  37. আল-আরাফ 7:204
  38. আল-আরাফ 7:205
  39. আল-আরাফ 7:206

আল-আরাফ 7:168

১৬৮-১৭০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলকে দলে দলে বিভক্ত করে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “এরপর আমি বানী ইসরাঈলকে বলেছিলাম- ভু-পৃষ্ঠে অবস্থান করতে থাক, যখন পরকালের দিন আসবে তখন আমি তোমাদের সকলকেই একত্রিত করবো।" এই বানী ইসরাঈলের মধ্যে ভাল লোকও রয়েছে এবং মন্দ লোকও রয়েছে। যেমন জ্বীনেরা বলতো- “আমাদের মধ্যে ভাল জ্বীনও রয়েছে এবং মন্দ জ্বীনও রয়েছে। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন দল রয়েছে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তাদেরকে শান্তি ও আরামের যুগ দিয়ে এবং ভয় ও বিপদের যুগ দিয়ে দু'প্রকারেই পরীক্ষা করেছি, যেন তারা শিক্ষা গ্রহণ করে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ এরপর তাদের অযোগ্য উত্তরসুরীরা একের পর এক তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় এবং তারা কিতাবেরও উত্তরাধিকারী হয়ে এই নিকৃষ্ট দুনিয়ার স্বার্থাবলী করায়ত্ত করে। এই স্থলাভিষিক্ত লোকদের মধ্যে কোনই মঙ্গল। নিহিত নেই। তারা শুধু নিজেরাই তাওরাত পাঠ করার ওয়ারিস হয়। অপরকে তারা পাঠ করায়নি। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা খ্রীষ্টানদেরকে বুঝানো হয়েছে। বরং এ আয়াতটিতে আরো সাধারণ । খ্রীষ্টান ও অখ্রীষ্টান সবাই সত্য কথা বিক্রী করে এবং এর দ্বারা পার্থিব সম্পদ উপার্জন করে। আর নিজেকে এইভাবে প্রতারিত করে যে, পরে তাওবা করে নেবে। কিন্তু আবার এরূপ কোন সুযোগ পেয়ে গেলে তখনও তারা পূর্বের ন্যায় দুনিয়ার বিনিময়ে দ্বীনকে বিক্রী করে ফেলে। কিতাবের আয়াতগুলোর পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয় এবং ভুল ফতওয়া দিয়ে বসে। পার্থিব সম্পদ লাভ করার যখনই তারা সুযোগ পায় তখনই সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। হারাম ও হালালের মোটেই পরওয়া করে না। দুনিয়ার হারাম বস্তু তারা গ্রহণ করে এবং পরে তাওবার কাজে বসে পড়ে। এভাবে তারা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। কিন্তু আবার যখন দুনিয়ার কোন সম্পদ তাদের সামনে আসে তখন তারা ঐদিকে পা বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহর কসম! এরা অতি নিকৃষ্ট উত্তরসুরী। নবীদের পরে এরাইতো ছিল তাওরাত ও ইঞ্জীলের উত্তরাধিকারী । আর আল্লাহ তা'আলা কিতাবে তাদের কাছে অঙ্গীকারও নিয়েছিলেন। অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে- “ঐ ভাল লোকদের পর এমন খারাপ লোকেরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় যারা নামাযকে নষ্ট করে দেয়, আল্লাহর কাছে বহু দূরের আশা রাখে এবং নিজেকে প্রতারিত করে। দুনিয়া কামাবার কোন সুযোগ এসে গেলে তখন তারা (হারাম-হালাল) কিছুই দেখে না। কোন জিনিসই তাদেরকে পাপকার্য থেকে বিরত রাখতে পারে না। যা পায় তা-ই খায়। না হালালের কোন পরওয়া করে, না হারামের প্রতি কোন লক্ষ্য রাখে।”বানী ইসরাঈলের মধ্যে যে কাযী হতে সে ঘুষখোর হতো। তাদের ভাল লোকেরা ঐ ঘুষখোর কাযীকে সরিয়ে অন্য কাযী নিযুক্ত করতো। তার উপর চাপ দেয়া হতো যে, ঘুষ নিয়ে যেন মুকদ্দমার ফায়সালা না করা হয়। সে ওয়াদা অঙ্গীকার করে যখন কাযী নিযুক্ত হয়ে যেতো তখন দু'হাতে ঘুষ লুটতে শুরু করে দিতো এবং বলতোঃ “চিন্তার কোন কারণ নেই, আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন।” অন্যেরা তাতে আপত্তি করতো এবং তাকে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও ভৎসনা করতো। কিন্তু যখন এই ঘুষখোর মারা যেতো এবং ভৎসনাকারীদের কাযী নিযুক্ত করে দেয়া হতো তখন তারাও ঘুষ খেতে শুরু করে দিতো। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, দুনিয়া তাদের কাছে আসলো, আর তারা ওকে একত্রিত করতে শুরু করে দিলো । আল্লাহ পাক বলেনঃ “তাদের নিকট হতে কি কিতাবের ওয়াদা নেয়া হয়নি যে, আল্লাহর নামে সত্য ছাড়া কিছুই বলবে না?” তাদের কাছে ওয়াদা নেয়া হয়েছিল যে, তারা মানুষকে সত্য বলার উপদেশ দেবে এবং সত্য কথাকে গোপন করবে না। কিন্তু তারা সেই হুকুমকে পৃষ্ঠের পিছনে ছুঁড়ে ফেলে এবং অল্প মূল্যের বিনিময়ে আয়াতগুলোকে বদলিয়ে দেয় বা ওগুলোর ভুল অর্থ করে । তাদের এই উপার্জন কতই না নিকৃষ্ট উপার্জন। তারা আল্লাহর কাছে পাপমোচনের আশা রাখে বটে, কিন্তু পাপকার্য ছাড়তে চায় না এবং তাওবার উপর কায়েম থাকে না।ইরশাদ হচ্ছে- “যদি আল্লাহকে ভয় কর তবে আখিরাতের ঘর তোমাদের জন্যে উত্তম। দুনিয়ার উপর তোমরা জীবন দিচ্ছ কেন? তোমরা কি এতটুকু কথাও অনুধাবন করতে পার না?” আল্লাহ তা'আলা বড় ও উত্তম পুরস্কারের প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন এবং পাপের মন্দ পরিণাম থেকে ভয় দেখাচ্ছেন। তিনি বলছেন যে, এই দ্বীন বিক্ৰীকারীরা কি এতটুকুও জ্ঞান রাখে না? অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের প্রশংসা করছেন যারা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছে, যে কিতাব তাদেরকে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অনুসরণের দিকে আহ্বান করছে। এ সবকিছু তাদের কিতাব তাওরাত এবং ইঞ্জীলে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং নামায কায়েম করে, তার আদেশ নিষেধকে পূর্ণভাবে মেনে চলে, আর পাপকার্য থেকে বিরত থাকে, তাদের জেনে রাখা উচিত যে, এরূপ সঙ্কৰ্মশীলদের কর্মফল আমি কখনও বিনষ্ট করি না।”

আল-আরাফ 7:169

১৬৮-১৭০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলকে দলে দলে বিভক্ত করে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “এরপর আমি বানী ইসরাঈলকে বলেছিলাম- ভু-পৃষ্ঠে অবস্থান করতে থাক, যখন পরকালের দিন আসবে তখন আমি তোমাদের সকলকেই একত্রিত করবো।" এই বানী ইসরাঈলের মধ্যে ভাল লোকও রয়েছে এবং মন্দ লোকও রয়েছে। যেমন জ্বীনেরা বলতো- “আমাদের মধ্যে ভাল জ্বীনও রয়েছে এবং মন্দ জ্বীনও রয়েছে। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন দল রয়েছে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তাদেরকে শান্তি ও আরামের যুগ দিয়ে এবং ভয় ও বিপদের যুগ দিয়ে দু'প্রকারেই পরীক্ষা করেছি, যেন তারা শিক্ষা গ্রহণ করে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ এরপর তাদের অযোগ্য উত্তরসুরীরা একের পর এক তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় এবং তারা কিতাবেরও উত্তরাধিকারী হয়ে এই নিকৃষ্ট দুনিয়ার স্বার্থাবলী করায়ত্ত করে। এই স্থলাভিষিক্ত লোকদের মধ্যে কোনই মঙ্গল। নিহিত নেই। তারা শুধু নিজেরাই তাওরাত পাঠ করার ওয়ারিস হয়। অপরকে তারা পাঠ করায়নি। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা খ্রীষ্টানদেরকে বুঝানো হয়েছে। বরং এ আয়াতটিতে আরো সাধারণ । খ্রীষ্টান ও অখ্রীষ্টান সবাই সত্য কথা বিক্রী করে এবং এর দ্বারা পার্থিব সম্পদ উপার্জন করে। আর নিজেকে এইভাবে প্রতারিত করে যে, পরে তাওবা করে নেবে। কিন্তু আবার এরূপ কোন সুযোগ পেয়ে গেলে তখনও তারা পূর্বের ন্যায় দুনিয়ার বিনিময়ে দ্বীনকে বিক্রী করে ফেলে। কিতাবের আয়াতগুলোর পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয় এবং ভুল ফতওয়া দিয়ে বসে। পার্থিব সম্পদ লাভ করার যখনই তারা সুযোগ পায় তখনই সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। হারাম ও হালালের মোটেই পরওয়া করে না। দুনিয়ার হারাম বস্তু তারা গ্রহণ করে এবং পরে তাওবার কাজে বসে পড়ে। এভাবে তারা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। কিন্তু আবার যখন দুনিয়ার কোন সম্পদ তাদের সামনে আসে তখন তারা ঐদিকে পা বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহর কসম! এরা অতি নিকৃষ্ট উত্তরসুরী। নবীদের পরে এরাইতো ছিল তাওরাত ও ইঞ্জীলের উত্তরাধিকারী । আর আল্লাহ তা'আলা কিতাবে তাদের কাছে অঙ্গীকারও নিয়েছিলেন। অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে- “ঐ ভাল লোকদের পর এমন খারাপ লোকেরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় যারা নামাযকে নষ্ট করে দেয়, আল্লাহর কাছে বহু দূরের আশা রাখে এবং নিজেকে প্রতারিত করে। দুনিয়া কামাবার কোন সুযোগ এসে গেলে তখন তারা (হারাম-হালাল) কিছুই দেখে না। কোন জিনিসই তাদেরকে পাপকার্য থেকে বিরত রাখতে পারে না। যা পায় তা-ই খায়। না হালালের কোন পরওয়া করে, না হারামের প্রতি কোন লক্ষ্য রাখে।”বানী ইসরাঈলের মধ্যে যে কাযী হতে সে ঘুষখোর হতো। তাদের ভাল লোকেরা ঐ ঘুষখোর কাযীকে সরিয়ে অন্য কাযী নিযুক্ত করতো। তার উপর চাপ দেয়া হতো যে, ঘুষ নিয়ে যেন মুকদ্দমার ফায়সালা না করা হয়। সে ওয়াদা অঙ্গীকার করে যখন কাযী নিযুক্ত হয়ে যেতো তখন দু'হাতে ঘুষ লুটতে শুরু করে দিতো এবং বলতোঃ “চিন্তার কোন কারণ নেই, আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন।” অন্যেরা তাতে আপত্তি করতো এবং তাকে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও ভৎসনা করতো। কিন্তু যখন এই ঘুষখোর মারা যেতো এবং ভৎসনাকারীদের কাযী নিযুক্ত করে দেয়া হতো তখন তারাও ঘুষ খেতে শুরু করে দিতো। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, দুনিয়া তাদের কাছে আসলো, আর তারা ওকে একত্রিত করতে শুরু করে দিলো । আল্লাহ পাক বলেনঃ “তাদের নিকট হতে কি কিতাবের ওয়াদা নেয়া হয়নি যে, আল্লাহর নামে সত্য ছাড়া কিছুই বলবে না?” তাদের কাছে ওয়াদা নেয়া হয়েছিল যে, তারা মানুষকে সত্য বলার উপদেশ দেবে এবং সত্য কথাকে গোপন করবে না। কিন্তু তারা সেই হুকুমকে পৃষ্ঠের পিছনে ছুঁড়ে ফেলে এবং অল্প মূল্যের বিনিময়ে আয়াতগুলোকে বদলিয়ে দেয় বা ওগুলোর ভুল অর্থ করে । তাদের এই উপার্জন কতই না নিকৃষ্ট উপার্জন। তারা আল্লাহর কাছে পাপমোচনের আশা রাখে বটে, কিন্তু পাপকার্য ছাড়তে চায় না এবং তাওবার উপর কায়েম থাকে না।ইরশাদ হচ্ছে- “যদি আল্লাহকে ভয় কর তবে আখিরাতের ঘর তোমাদের জন্যে উত্তম। দুনিয়ার উপর তোমরা জীবন দিচ্ছ কেন? তোমরা কি এতটুকু কথাও অনুধাবন করতে পার না?” আল্লাহ তা'আলা বড় ও উত্তম পুরস্কারের প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন এবং পাপের মন্দ পরিণাম থেকে ভয় দেখাচ্ছেন। তিনি বলছেন যে, এই দ্বীন বিক্ৰীকারীরা কি এতটুকুও জ্ঞান রাখে না? অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের প্রশংসা করছেন যারা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছে, যে কিতাব তাদেরকে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অনুসরণের দিকে আহ্বান করছে। এ সবকিছু তাদের কিতাব তাওরাত এবং ইঞ্জীলে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং নামায কায়েম করে, তার আদেশ নিষেধকে পূর্ণভাবে মেনে চলে, আর পাপকার্য থেকে বিরত থাকে, তাদের জেনে রাখা উচিত যে, এরূপ সঙ্কৰ্মশীলদের কর্মফল আমি কখনও বিনষ্ট করি না।”

আল-আরাফ 7:170

১৬৮-১৭০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলকে দলে দলে বিভক্ত করে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “এরপর আমি বানী ইসরাঈলকে বলেছিলাম- ভু-পৃষ্ঠে অবস্থান করতে থাক, যখন পরকালের দিন আসবে তখন আমি তোমাদের সকলকেই একত্রিত করবো।" এই বানী ইসরাঈলের মধ্যে ভাল লোকও রয়েছে এবং মন্দ লোকও রয়েছে। যেমন জ্বীনেরা বলতো- “আমাদের মধ্যে ভাল জ্বীনও রয়েছে এবং মন্দ জ্বীনও রয়েছে। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন দল রয়েছে। আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তাদেরকে শান্তি ও আরামের যুগ দিয়ে এবং ভয় ও বিপদের যুগ দিয়ে দু'প্রকারেই পরীক্ষা করেছি, যেন তারা শিক্ষা গ্রহণ করে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ এরপর তাদের অযোগ্য উত্তরসুরীরা একের পর এক তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় এবং তারা কিতাবেরও উত্তরাধিকারী হয়ে এই নিকৃষ্ট দুনিয়ার স্বার্থাবলী করায়ত্ত করে। এই স্থলাভিষিক্ত লোকদের মধ্যে কোনই মঙ্গল। নিহিত নেই। তারা শুধু নিজেরাই তাওরাত পাঠ করার ওয়ারিস হয়। অপরকে তারা পাঠ করায়নি। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা খ্রীষ্টানদেরকে বুঝানো হয়েছে। বরং এ আয়াতটিতে আরো সাধারণ । খ্রীষ্টান ও অখ্রীষ্টান সবাই সত্য কথা বিক্রী করে এবং এর দ্বারা পার্থিব সম্পদ উপার্জন করে। আর নিজেকে এইভাবে প্রতারিত করে যে, পরে তাওবা করে নেবে। কিন্তু আবার এরূপ কোন সুযোগ পেয়ে গেলে তখনও তারা পূর্বের ন্যায় দুনিয়ার বিনিময়ে দ্বীনকে বিক্রী করে ফেলে। কিতাবের আয়াতগুলোর পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয় এবং ভুল ফতওয়া দিয়ে বসে। পার্থিব সম্পদ লাভ করার যখনই তারা সুযোগ পায় তখনই সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। হারাম ও হালালের মোটেই পরওয়া করে না। দুনিয়ার হারাম বস্তু তারা গ্রহণ করে এবং পরে তাওবার কাজে বসে পড়ে। এভাবে তারা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। কিন্তু আবার যখন দুনিয়ার কোন সম্পদ তাদের সামনে আসে তখন তারা ঐদিকে পা বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহর কসম! এরা অতি নিকৃষ্ট উত্তরসুরী। নবীদের পরে এরাইতো ছিল তাওরাত ও ইঞ্জীলের উত্তরাধিকারী । আর আল্লাহ তা'আলা কিতাবে তাদের কাছে অঙ্গীকারও নিয়েছিলেন। অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে- “ঐ ভাল লোকদের পর এমন খারাপ লোকেরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় যারা নামাযকে নষ্ট করে দেয়, আল্লাহর কাছে বহু দূরের আশা রাখে এবং নিজেকে প্রতারিত করে। দুনিয়া কামাবার কোন সুযোগ এসে গেলে তখন তারা (হারাম-হালাল) কিছুই দেখে না। কোন জিনিসই তাদেরকে পাপকার্য থেকে বিরত রাখতে পারে না। যা পায় তা-ই খায়। না হালালের কোন পরওয়া করে, না হারামের প্রতি কোন লক্ষ্য রাখে।”বানী ইসরাঈলের মধ্যে যে কাযী হতে সে ঘুষখোর হতো। তাদের ভাল লোকেরা ঐ ঘুষখোর কাযীকে সরিয়ে অন্য কাযী নিযুক্ত করতো। তার উপর চাপ দেয়া হতো যে, ঘুষ নিয়ে যেন মুকদ্দমার ফায়সালা না করা হয়। সে ওয়াদা অঙ্গীকার করে যখন কাযী নিযুক্ত হয়ে যেতো তখন দু'হাতে ঘুষ লুটতে শুরু করে দিতো এবং বলতোঃ “চিন্তার কোন কারণ নেই, আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন।” অন্যেরা তাতে আপত্তি করতো এবং তাকে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও ভৎসনা করতো। কিন্তু যখন এই ঘুষখোর মারা যেতো এবং ভৎসনাকারীদের কাযী নিযুক্ত করে দেয়া হতো তখন তারাও ঘুষ খেতে শুরু করে দিতো। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, দুনিয়া তাদের কাছে আসলো, আর তারা ওকে একত্রিত করতে শুরু করে দিলো । আল্লাহ পাক বলেনঃ “তাদের নিকট হতে কি কিতাবের ওয়াদা নেয়া হয়নি যে, আল্লাহর নামে সত্য ছাড়া কিছুই বলবে না?” তাদের কাছে ওয়াদা নেয়া হয়েছিল যে, তারা মানুষকে সত্য বলার উপদেশ দেবে এবং সত্য কথাকে গোপন করবে না। কিন্তু তারা সেই হুকুমকে পৃষ্ঠের পিছনে ছুঁড়ে ফেলে এবং অল্প মূল্যের বিনিময়ে আয়াতগুলোকে বদলিয়ে দেয় বা ওগুলোর ভুল অর্থ করে । তাদের এই উপার্জন কতই না নিকৃষ্ট উপার্জন। তারা আল্লাহর কাছে পাপমোচনের আশা রাখে বটে, কিন্তু পাপকার্য ছাড়তে চায় না এবং তাওবার উপর কায়েম থাকে না।ইরশাদ হচ্ছে- “যদি আল্লাহকে ভয় কর তবে আখিরাতের ঘর তোমাদের জন্যে উত্তম। দুনিয়ার উপর তোমরা জীবন দিচ্ছ কেন? তোমরা কি এতটুকু কথাও অনুধাবন করতে পার না?” আল্লাহ তা'আলা বড় ও উত্তম পুরস্কারের প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন এবং পাপের মন্দ পরিণাম থেকে ভয় দেখাচ্ছেন। তিনি বলছেন যে, এই দ্বীন বিক্ৰীকারীরা কি এতটুকুও জ্ঞান রাখে না? অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের প্রশংসা করছেন যারা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছে, যে কিতাব তাদেরকে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর অনুসরণের দিকে আহ্বান করছে। এ সবকিছু তাদের কিতাব তাওরাত এবং ইঞ্জীলে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং নামায কায়েম করে, তার আদেশ নিষেধকে পূর্ণভাবে মেনে চলে, আর পাপকার্য থেকে বিরত থাকে, তাদের জেনে রাখা উচিত যে, এরূপ সঙ্কৰ্মশীলদের কর্মফল আমি কখনও বিনষ্ট করি না।”

আল-আরাফ 7:171

আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি যখন বানী ইসরাঈলের মাথার উপর (তৃর) পাহাড়কে ছাদের মত লটকিয়ে দিলাম। যেমন আল্লাহ তা'আলার (আরবী) (অর্থাৎ “আমি তুর পাহাড়কে তাদের উপর উঠালাম") (২:৯৩) এই উক্তি দ্বারা এটা প্রকাশিত হয়েছে। ফেরেশতারা এই পাহাড়টিকে উঠিয়ে তাদের মাথার উপর খাড়া করে রেখেছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মূসা (আঃ) যখন বানী ইসরাঈলকে নিয়ে পবিত্র ভূমির দিকে যাচ্ছিলেন এবং ক্রোধ প্রশমিত হওয়ার পর ফলকগুলো উঠিয়ে নিয়েছিলেন, আর তাবলীগের কর্তব্য সম্পর্কিত আল্লাহর নির্দেশ তাদেরকে শুনিয়েছিলেন তখন তাদের কাছে। কঠিন ঠেকেছিল বলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা তাদের মাথার উপর পাহাড়কে এনে খাড়া করে রেখেছিলেন, যেমন মাথার উপর ছাদ থাকে। ফেরেশতারা ঐ পাহাড়টিকে ধরে রয়েছিলেন এবং মূসা (আঃ) তাদেরকে বলেছিলেনঃ “দেখ, এটা হচ্ছে আল্লাহর অহী ও তার নির্দেশাবলী। এতে হালাল, হারাম, আদেশ ও নিষেধের উল্লেখ রয়েছে। তোমরা কবূল করছে কি না?” (এটা ইমাম নাসাঈ (রঃ) সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতে এবং তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) তারা তাকে উত্তরে বলেছিলঃ “তাতে কি নির্দেশাবলী রয়েছে তা আমাদেরকে শুনিয়ে দিন। যদি এর বিধানগুলো সহজ হয় তবে অবশ্যই আমরা সেগুলো ককূর্ল করবো।" হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “যা আছে তা-ই তোমাদেরকে কবুল করতে হবে। তারা বললোঃ “না, যে পর্যন্ত আমরা অবহিত না হবো সেই পর্যন্ত কবুল করবো না।” কয়েকবার এই প্রশ্ন ও উত্তর চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পাহাড়কে আল্লাহ নির্দেশ দিলেন যে, ওটা যেন স্বীয় জায়গা হতে উঠে গিয়ে আকাশে উড়তে উড়তে তাদের মাথার উপর ছেয়ে যায়। পাহাড় তাই করলো । মূসা (আঃ) তাদেরকে বললেনঃ “মহা মহিমান্বিত আল্লাহ যা কিছু বলছেন তা মানছো কি না? যদি তোমরা তাওরাতের বিধানসমূহ না মানে তবে এই পাহাড় তোমাদের উপর পড়ে যাবে। যখন তারা দেখলো যে, পাহাড় তাদের উপর পড়তেই চায় তখন মাথার বাম দিকের ভরে সিজদায় পড়ে গেল। আর ডান চক্ষু দিয়ে পাহাড়টির দিকে তাকাতে থাকলো যে, সত্যিই ওটা তাদের উপর পড়ে যায় না কি! এ কারণেই ইয়াহুদীরা যখনই সিজদা করে তখন বাম দিকের ভরেই করে এবং বলেঃ “শাস্তি উঠে যাওয়ার স্মারক হিসেবে আমরা এই সিজদা করলাম।” আৰূ বকর (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ) ফলকগুলো ছুঁড়ে ফেলেছিলেন যা ছিল আল্লাহর কিতাব এবং যা তাঁর কাছেই লিখিত হয়েছিল, তখন যমীনের প্রত্যেক পাহাড়, প্রতিটি গাছ এবং সমস্ত পাথর কেঁপে উঠেছিল! এ কারণেই প্রত্যেক ইয়াহুদী তাওরাত পাঠের সময় স্বীয় মস্তক আন্দোলিত করে থাকে। (এটা সানীদ ইবনে দাঊদ (রঃ) স্বীয় তাফসীরে হাজ্জাজ ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) হতে তাখরীজ করেছেন এবং তিনি আবু বকর ইবনে আবদুল্লাহ (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।

আল-আরাফ 7:172

১৭২-১৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- আল্লাহ তা'আলা আদম (আঃ)-এর সন্তানদেরকে তারই পৃষ্ঠদেশ হতে রোযে আযলে বাইরে বের করেন। তারা নিজেরাই নিজেদের উপর সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ তাদের প্রতিপালক ও মালিক। তিনি ছাড়া অন্য কেউ উপাস্য নেই। এটাই হচ্ছে মানব প্রকৃতির স্বীকারোক্তি এবং এটাই তাদের স্বভাব । যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা তোমাদের পূর্ণ মনোযোগ সত্য দ্বীনের প্রতি প্রতিষ্ঠিত রাখ । আল্লাহ এই প্রকৃতির উপরই মানুষের স্বভাব বানিয়েছেন। আল্লাহ যে জিনিসকে যেভাবে সৃষ্টি করেছেন ওটা ঐভাবেই প্রতিষ্ঠিত থাকবে, এতে কোন পরিবর্তন ঘটবে না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক সন্তান স্বীয় প্রকৃতির উপর সৃষ্ট হয়। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি আমার বান্দাদেরকে শিরক থেকে দূরে সরিয়ে সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তানরা এসে তাদেরকে দ্বীনে হক থেকে সরিয়ে দেয় এবং আমি যা হালাল রেখেছি তা তারা হারাম করিয়ে দেয়। অন্য বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক সন্তান স্বীয় ইসলামী মাযহাবের উপর সৃষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান এবং মাজুসী বানিয়ে দেয়। যেমন চতুষ্পদ জন্তু ভাল ও নিখুঁত ভাবেই সৃষ্ট হয়, কোনটি কি কানকাটা রূপে সৃষ্ট হয়? কিন্তু পরে তার কান কেটে নিয়ে তাকে বিগড়িয়ে দেয়া হয়।” আসওয়াদ ইবনে সারী (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমি চারটি জিহাদে শরীক ছিলাম। মুজাহিদরা কাফিরদেরকে হত্যা করে তাদের শিশু সন্তানদের ধরে নেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সংবাদ পেয়ে খুবই অসন্তুষ্ট হন। তিনি বলেনঃ লোকদের কি হয়েছে যে, তারা শিশুদেরকে ধরতে রয়েছে? কোন একজন জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা কি মুশরিকদের শিশু নয়? উত্তরে তিনি বললেনঃ তোমাদের মধ্যকার ভাল ভাল লোকেরাও তো মুশরিকদেরই সন্তান। কোন প্রাণ এমন নেই যা ইসলামের ভিত্তির উপর সৃষ্ট হয় না। যে পর্যন্ত না সে পিতা মাতার ভাষা শিখে নেয় সে পর্যন্ত মুসলমানই থাকে। অতঃপর তার পিতামাতাই তাকে খ্রীষ্টান বা ইয়াহূদী বানিয়ে দেয়। (এটা ইবনে জারীর বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন) হাদীসসমূহে বর্ণিত আছে যে, আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে তার সন্তানদেরকে বের করা হয় এবং তাদেরকে ডানদিক ওয়ালা ও বামদিক ওয়ালা বানানো হয়। আর তাদের নিকট থেকে সাক্ষ্য নেয়া হয় যে, আল্লাহই তাদের প্রতিপালক।হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন একজন জাহান্নামীকে জিজ্ঞেস করা হবে- যদি তুমি যমীনের সবকিছুর মালিক হয়ে যাও, তবে এ সবকিছু মুক্তিপণ হিসেবে দিয়েও কি তুমি জাহানাম থেকে মুক্তি লাভ করতে চাবে? সে উত্তরে বলবেঃ হ্যা। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমি তো তোমার কাছে এর চেয়ে বহু কম চেয়েছিলাম! আমি আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকেই তোমার কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তুমি আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। কিন্তু তুমি শরীক করে বসেছিলে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনআরাফার দিন (৯ই যিলহজ্ব) নু'মান নামক স্থানে রূহসমূহের নিকট ওয়াদা নেয়া হয়েছিল। আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে ওগুলোকে বের করে পিঁপড়ার মত ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল এবং ওগুলোকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?” সবগুলোই সমস্বরে উত্তর দিয়েছিলঃ “হ্যা. অবশ্যই।” ((এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম হাকিমও (রঃ) এটা স্বীয় গ্রন্থ মুসতাদরিকে বর্ণনা করেছেন)জাবির (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যহহাক ইবনে মাযাহিম (রঃ)-এর একটি ছেলে মারা যায় যে মাত্র ছ'দিনের শিশু ছিল। তখন যহ্হাক (রঃ) বলেনঃ “হে জাবির? যখন তুমি একে কবরে রাখবে তখন তার চেহারাটি ভোলা অবস্থায় রাখবে। কেননা, শিশুটিকে বসানো হবে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হবে।” (জাবির বলেনঃ) আমি তখন তাই করলাম। অতঃপর আমি যহ্হাক (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার ছেলেকে কি জিজ্ঞেস করা হবে এবং কে জিজ্ঞেস করবেন? উত্তরে তিনি বললেনঃ “তাকে রোযে আযলের অঙ্গীকারের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, যখন আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশে রূহসমূহের নিকট থেকে দাসত্বের স্বীকারোক্তি নেয়া হয়েছিল।” আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, ঐ অঙ্গীকার কি ছিল? তিনি উত্তর দিলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, “আল্লাহ তাআলা যখন আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করলেন তখন ওর মধ্য থেকে ঐ রূহগুলো বেরিয়ে পড়লো যেগুলো কিয়ামত পর্যন্ত আদম (আঃ)-এর বংশ থেকে পৃথিবীতে আসবে। তারপর ওদের নিকট থেকে ওয়াদা নেয়া হয় যে, তারা ইবাদত শুধু আল্লাহরই করবে, অন্য কাউকেও তাঁর শরীক বানাবে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের জীবিকার জিম্মাদার হন। এরপর ঐ আত্মািগুলোকে আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশে ফিরিয়ে দেয়া হয়। যে পর্যন্ত এই অঙ্গীকারাবদ্ধরা সৃষ্ট হতে থাকবে সে পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। এখন যে ব্যক্তি পরবর্তী অঙ্গীকার গ্রহণের সুযোগ পাবে এবং ওটাকে সুন্দরভাবে আদায় করবে, পূর্ববর্তী অঙ্গীকারও তার পক্ষে লাভজনক হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পরবর্তী অঙ্গীকার পালনে ব্যর্থ হবে, পূর্ববর্তী অঙ্গীকার তার জন্যে মোটেই লাভজনক হবে না। আর যে ব্যক্তি পরবর্তী অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার ও ভাল ভাল কাজ করার সুযোগে লাভের পূর্বেই মারা যাবে, তার ব্যাপারে বুঝতে হবে যে, পূর্ববর্তী অঙ্গীকার অনুযায়ী ইসলামী ফিতরাতের উপরই সে মারা গিয়েছে।” এ দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ সবকিছু ভালভাবে অবগত ছিলেন। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত আদম (আঃ) হতে তাঁর সন্তানদেরকে বের করেন তখন তারা এমনিভাবে বেরিয়ে পড়ে যেমনিভাবে চুলে চিরুণী করার সময় চুলগুলো চিরুণীর মধ্য চলে আসে। তখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ আমি কি তোমাদের প্রভু নই? তারা সমস্বরে উত্তর দিলো- হ্যাঁ, অবশ্যই আপনি আমাদের প্রভু।” ফেরেশতারা বললেনঃ “কিয়ামতের দিন তোমরা যেন বলতে না পার যে, এটা তোমরা অবগত ছিলে না এ জন্যে আমরা সাক্ষী থাকলাম।”এই আয়াতের ব্যাপারে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ এ সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞাসিত হতে শুনেছি। উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তা'আলা তাঁর পৃষ্ঠদেশে হাত ফিরালে তাঁর সন্তানরা বের হতে শুরু করে। তখন তিনি বলেন, “এরা সব জান্নাতবাসী। কেননা, এরা জান্নাতবাসীরই আমল করবে।” আবার তিনি তাঁর পৃষ্ঠে হাত বুলালেন। এবারও অনেকগুলো সন্তান বেরিয়ে আসলো। তিনি বললেনঃ “এরা হচ্ছে জাহান্নামী। কেননা, এরা জাহান্নামীদেরই আমল করবে।” তখন একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমল করে লাভ কি”? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ বান্দাকেই জান্নাতের জন্যে সৃষ্টি করেছেন যার আমল হবে জান্নাতবাসীর আমল এবং ওর উপরই সে মৃত্যুবরণ করবে। সুতরাং সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। পক্ষান্তরে তিনি তাঁর ঐ বান্দাকেই জাহান্নামের জন্যে সষ্টি করেছেন যার আমল হবে জাহান্নামবাসীর আমল এবং ওর উপরই সে মৃত্যুবরণ করবে। ফলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে তাঁর সন্তানগুলো বেরিয়ে আসে তখন প্রত্যেক মানুষের কপালে একটা আলোক চমকাচ্ছিল। সমস্ত সন্তানকে হযরত আদম (আঃ)-এর সামনে পেশ করা হয়। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ হে আমার প্রভু! এরা কারা? তিনি উত্তরে বলেনঃ এরা তোমারই বংশধর। একটি লোকের চেহারায় ঔজ্জ্বল্য খুবই বেশী ছিল। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার প্রতিপালক! এটা কে? আল্লাহ উত্তর দিলেন, বহু যুগ পরে এটা তোমারই বংশের একটা লোক হবে যার নাম হবে দাউদ (আঃ)। আদম (আঃ) জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহ! এর বয়স কত হবে? উত্তর হয়, ষাট বছর। তখন আদম (আঃ) বলেনঃ হে আমার প্রভু! আমি আমার বয়স থেকে চল্লিশ বছর একে দান করলাম। কিন্তু হযরত আদম (আঃ)-এর বয়স যখন শেষ হয়ে গেল তখন মালাকুল মাউত এসে তার কাছে হাজির হলেন। তিনি ফেরেশতাকে বললেনঃ “এখনই কেন আসলেন? এখনও তো আমার বয়সের চল্লিশ বছর বাকী রয়েছে?” তখন তাঁকে বলা হয়, এই চল্লিশ বছর কি আপনি আপনার সন্তান দাউদ (আঃ)-কে দান করেননি? তখন আদম (আঃ) তা অস্বীকার করলেন। এজন্যে তাঁর সান্তানদেরও অস্বীকার করার স্বভাব হয়ে গেছে। আদম (আঃ) ভুলে গিয়েছিলেন বলে তাঁর সন্তানরাও ভুলে যায়। আদম (আঃ) অপরাধ করেছিলেন বলে তাঁর সন্তানরাও অপরাধ করে। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন) আদম (আঃ) যখন তাঁর সন্তানদেরকে দেখেছিলেন তখন তাদের মধ্যে রুগ্ন, কুষ্ঠরোগী অন্ধ ইত্যাদি সবই ছিল। আদম (আঃ) বলেছিলেন- “হে আমার প্রতিপালক! এদেরকে এরূপ কেন করা হয়েছে?” আল্লাহ তাআলা উত্তরে বলেছিলেন- “এর কারণ এই যে, যেন মানুষ সর্বাবস্থায় আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।” আদম (আঃ) পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, “হে আমার প্রভু! আপাদমস্তক নূর বিশিষ্ট এই লোকগুলো কে? উত্তর হয়েছিলএরা হচ্ছে নবী। কোন একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! আমলগুলো নতুনভাবে কি ফলদায়ক, না যা হবার তা হয়েই গেছে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আদম (আঃ) থেকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর সন্তানদেরকে বের করেন। তারপর তিনি তাদের মুখ থেকেই তাঁর একত্ববাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে স্বীয় দু' মুষ্টিতে ভরে নেন এবং বলেনঃ “এই মুষ্টির লোকগুলো জান্নাতী এবং ঐ মুষ্টির লোকগুলো জাহান্নামী। জান্নাত ও জাহান্নাম আমলের উপর নির্ভরশীল বটে, কিন্তু জান্নাতবাসীর আমল কার জন্যে সহজ হবে এবং জাহান্নামবাসীর আমল কার জন্যে সহজ হবে এটা আমার জানা আছে। এখন এর উপর ভিত্তি করেই কেউ জান্নাতী হবে এবং কেউ জাহান্নামী হবে। আযলের দিন আমি তাদেরকে জান্নাতী বা জাহান্নামী বানাইনি। তাদের আমলগুলোই তাদের যিম্মাদার । কিন্তু তখন থেকেই আমি তাদের আমল সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত।” (এটা হিশাম ইবনে হাকীম (রঃ)-এর নীতিতে ইবনে জারীর (রঃ) ও ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনাকরেছেন)এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ অমুক জান্নাতী হবে এবং অমুক জাহান্নামী হবে। এই ভাগ বন্টন আমার বলার উপর ভিত্তি করে নয়, বরং আমলের উপর ভিত্তি করে। আমরা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর হাদীসটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করলাম।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “যখন আল্লাহ তা'আলা মাখলুককে সৃষ্টি করে ভাগ করে দিলেন, তখন আত্মগুলো ডানদিকে ও বামদিকে অবস্থান করছিল। আল্লাহ তা'আলা উভয় দিকের আত্মাগুলোকেই জিজ্ঞেস করলেনঃ “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?” সবাই স্বীকারোক্তি করলোঃ “হ্যা! আপনিই আমাদের প্রতিপালক।” তারপর মহান আল্লাহ ডানদিকের ও বামদিকের আত্মাগুলোকে মিশ্রিত করে দিলেন। কেউ জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহ! এরা তো দু'ভাগে বিভক্ত ছিল, এদেরকে মিশ্রিত করলেন কেন?” আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বললেনঃ তাতে কোন ক্ষতি নেই। নিজ নিজ আমলের কারণে এরা এখনও পথকই থাকবে। মিশ্রত করলেও ভাল ও মন্দের কখনও মিশ্রণ হতে পারে না। আমি এরূপ না করলে কিয়ামতের দিন পাপীরা বলতোঃ “আমরা তো এটা অবগত ছিলাম না। তবে ভাল লোকেরা কোন অবস্থাতেই এটা বলবে না। এখন ব্যাপার থাকলো শুধু আমলের উপর। তাহলে পাপীদের কোন আপত্তি করার বা অজানা থাকার ওযরের কোন সুযোগ থাকলো না। এটা আমরা আবু উমামা (রাঃ)-এর হাদীসের ব্যাখ্যা দিলাম। কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্ট হতে থাকবে সেই সব আত্মার আকৃতি দান করলেন, কথা বলার শক্তি দিলেন, তাদের কাছে অঙ্গীকার নিলেন এবং ঐ অঙ্গীকারের উপর আসমান ও যমীনকে সাক্ষী বানানো হলো। আদম (আঃ) সাক্ষী থাকলেন। নতুবা তারা তো কিয়ামতের দিন পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করতো। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ মা'বুদ নেই। কাউকেই তোমরা আমার শরীক বানাবে না। আমি তোমাদের কাছে নবী-রাসূল প্রেরণ করবে। তারা তোমাদেরকে এই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করাবে। আমি কিতাবসমূহ প্রেরণ করবো। তখন আত্মাগুলো সমস্বরে বলবেঃ “আপনি ছাড়া আমাদের অন্য কোন মা'বুদ নেই।” তারা আল্লাহর আনুগত্যের স্বীকারোক্তি করলো। আদম (আঃ)-কে তাদের সামনে আনা হলো। আদম (আঃ) দেখলেন যে, তাদের মধ্যে ধনী, গরীব, সুন্দর ও বিশ্রী সবই রয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার প্রভু! সমস্ত লোককে সমান করে সৃষ্টি করেননি কেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল কে তা জানবার আমার খুবই আগ্রহ ছিল। সবাই এক হলে এ পরীক্ষা কিভাবে হতো।” তাদের মধ্যে নবীরা উজ্জ্বল প্রদীপের মত বিরাজ করছিলেন। এই রিসালাত ও নবুওয়াত ছিল দ্বিতীয় অঙ্গীকার যে, আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকারোক্তির পর রিসালাতের স্বীকারোক্তিও হাক। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি নবীদের কাছেও অঙ্গীকার নিয়েছিলাম। তা ছিল-দ্বীনে হানীফকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে তোমরা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হও, যা হচ্ছে একটা স্বাভাবিক ধর্ম।”এই সাক্ষ্য নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, মানুষ তাওহীদের প্রকৃতির উপর সৃষ্টি হয়েছে। এজন্যেই (আরবী) না বলে (আরবী) বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু আদম (আঃ) নয়, বরং আদম (আঃ)-এর সমস্ত সন্তানই তাওহীদের ফিতরাত বা প্রকৃতির উপর সৃষ্টি হয়েছে। আর এ জন্যেই (আরবী) না বলে (আরবী) বলা হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “তিনি তোমাদের সকলকে এককভাবে যমীনের প্রতিনিধি বানিয়েছেন।” অন্য জায়গায় তিনি বলেছেন- “যেমন আমি তোমাদেরকে অন্য সম্প্রদায়ের সন্তানদের হতে সৃষ্টি করেছি।”আর তাদেরকেই তাদের উপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?” তারা সমস্বরে উত্তর করলোঃ “হ্যা! আমরা সাক্ষী থাকলাম।” অর্থাৎ অবস্থা ও উক্তি উভয় রূপেই তারা স্বীকারোক্তি করলো। কেননা, সাক্ষ্য কোন সময় উক্তির মাধ্যমে হয়। যেমনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বললো- আমরা নিজেদের উপর সাক্ষ্য দান করলাম।” (৬:১৩০) আবার কোন সময় অবস্থার মাধ্যমেও হয়ে থাকে। যেমনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মুশরিকদের এই অধিকার নেই যে, তারা আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে এমন অবস্থায় যে, তারা নিজেদের উপর কুফরীর সাক্ষ্য দানকারী।” (৯ ১৭) অর্থাৎ তাদের অবস্থাই তাদের কুফরীর সাক্ষ্য বহনকারী। এই সাক্ষ্য মুখের সাক্ষ্য নয়, বরং অবস্থার সাক্ষ্য। আর যা কখনো -এর মাধ্যমে হয়, আবার কখনো অবস্থার মাধ্যমে হয়। যেমন বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যা কিছু চেয়েছে আল্লাহ তোমাদেরকে তাই প্রদান করেছেন।” (১৪:৩৪) এই কথার উপর এই দলীলও হচ্ছে যে, তাদের শিরক করার উপর এই হুজ্জত তাদের বিপক্ষে পেশ করা হয়েছে। যদি এটা সত্যই হয়, যেমন একটা উক্তি রয়েছে, তবে সবারই এটা স্মরণ থাকা উচিত ছিল, যাতে ওটা তার উপর হুজ্জত হতে পারে। যদি এর উত্তর এই হয় যে, রাসূলদের ফরমান দ্বারা খবর পেয়ে যাওয়াই যথেষ্ট। তাহলে এর উত্তর হবে এই যে, যারা রাসূলদেরকে মানেই না তারা তাদের দেয়া খবরকে কিভাবে সত্য বলে মেনে নেবে? অথচ কুরআন কারীম রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা ছাড়া স্বয়ং ঐ সাক্ষ্যকেই একটি পৃথক দলীল বলে ঘোষণা করেছে। সুতরাং এর দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার ফিতরাতকেই বুঝানো হয়েছে যার উপর তিনি সমস্ত মাখলুককে সৃষ্টি করেছেন। আর ওটাই হচ্ছে আল্লাহর তাওহীদের ফিতরাত। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “যেন তোমরা কিয়ামতের দিন একথা বলতে না পার- আমাদের পূর্বপুরুষরাই তো আমাদের পূর্বে শিরক করেছিল, আমরা ছিলাম তাদের পরবর্তী বংশধর। সুতরাং আপনি কি আমাদেরকে সেই ভ্রান্ত ও বাতিলদের কৃতকর্মের দরুন ধ্বংস করবেন?”

আল-আরাফ 7:173

১৭২-১৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- আল্লাহ তা'আলা আদম (আঃ)-এর সন্তানদেরকে তারই পৃষ্ঠদেশ হতে রোযে আযলে বাইরে বের করেন। তারা নিজেরাই নিজেদের উপর সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ তাদের প্রতিপালক ও মালিক। তিনি ছাড়া অন্য কেউ উপাস্য নেই। এটাই হচ্ছে মানব প্রকৃতির স্বীকারোক্তি এবং এটাই তাদের স্বভাব । যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা তোমাদের পূর্ণ মনোযোগ সত্য দ্বীনের প্রতি প্রতিষ্ঠিত রাখ । আল্লাহ এই প্রকৃতির উপরই মানুষের স্বভাব বানিয়েছেন। আল্লাহ যে জিনিসকে যেভাবে সৃষ্টি করেছেন ওটা ঐভাবেই প্রতিষ্ঠিত থাকবে, এতে কোন পরিবর্তন ঘটবে না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক সন্তান স্বীয় প্রকৃতির উপর সৃষ্ট হয়। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি আমার বান্দাদেরকে শিরক থেকে দূরে সরিয়ে সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তানরা এসে তাদেরকে দ্বীনে হক থেকে সরিয়ে দেয় এবং আমি যা হালাল রেখেছি তা তারা হারাম করিয়ে দেয়। অন্য বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক সন্তান স্বীয় ইসলামী মাযহাবের উপর সৃষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান এবং মাজুসী বানিয়ে দেয়। যেমন চতুষ্পদ জন্তু ভাল ও নিখুঁত ভাবেই সৃষ্ট হয়, কোনটি কি কানকাটা রূপে সৃষ্ট হয়? কিন্তু পরে তার কান কেটে নিয়ে তাকে বিগড়িয়ে দেয়া হয়।” আসওয়াদ ইবনে সারী (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমি চারটি জিহাদে শরীক ছিলাম। মুজাহিদরা কাফিরদেরকে হত্যা করে তাদের শিশু সন্তানদের ধরে নেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সংবাদ পেয়ে খুবই অসন্তুষ্ট হন। তিনি বলেনঃ লোকদের কি হয়েছে যে, তারা শিশুদেরকে ধরতে রয়েছে? কোন একজন জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা কি মুশরিকদের শিশু নয়? উত্তরে তিনি বললেনঃ তোমাদের মধ্যকার ভাল ভাল লোকেরাও তো মুশরিকদেরই সন্তান। কোন প্রাণ এমন নেই যা ইসলামের ভিত্তির উপর সৃষ্ট হয় না। যে পর্যন্ত না সে পিতা মাতার ভাষা শিখে নেয় সে পর্যন্ত মুসলমানই থাকে। অতঃপর তার পিতামাতাই তাকে খ্রীষ্টান বা ইয়াহূদী বানিয়ে দেয়। (এটা ইবনে জারীর বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন) হাদীসসমূহে বর্ণিত আছে যে, আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে তার সন্তানদেরকে বের করা হয় এবং তাদেরকে ডানদিক ওয়ালা ও বামদিক ওয়ালা বানানো হয়। আর তাদের নিকট থেকে সাক্ষ্য নেয়া হয় যে, আল্লাহই তাদের প্রতিপালক।হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন একজন জাহান্নামীকে জিজ্ঞেস করা হবে- যদি তুমি যমীনের সবকিছুর মালিক হয়ে যাও, তবে এ সবকিছু মুক্তিপণ হিসেবে দিয়েও কি তুমি জাহানাম থেকে মুক্তি লাভ করতে চাবে? সে উত্তরে বলবেঃ হ্যা। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমি তো তোমার কাছে এর চেয়ে বহু কম চেয়েছিলাম! আমি আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকেই তোমার কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তুমি আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। কিন্তু তুমি শরীক করে বসেছিলে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনআরাফার দিন (৯ই যিলহজ্ব) নু'মান নামক স্থানে রূহসমূহের নিকট ওয়াদা নেয়া হয়েছিল। আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে ওগুলোকে বের করে পিঁপড়ার মত ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল এবং ওগুলোকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?” সবগুলোই সমস্বরে উত্তর দিয়েছিলঃ “হ্যা. অবশ্যই।” ((এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম হাকিমও (রঃ) এটা স্বীয় গ্রন্থ মুসতাদরিকে বর্ণনা করেছেন)জাবির (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যহহাক ইবনে মাযাহিম (রঃ)-এর একটি ছেলে মারা যায় যে মাত্র ছ'দিনের শিশু ছিল। তখন যহ্হাক (রঃ) বলেনঃ “হে জাবির? যখন তুমি একে কবরে রাখবে তখন তার চেহারাটি ভোলা অবস্থায় রাখবে। কেননা, শিশুটিকে বসানো হবে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হবে।” (জাবির বলেনঃ) আমি তখন তাই করলাম। অতঃপর আমি যহ্হাক (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার ছেলেকে কি জিজ্ঞেস করা হবে এবং কে জিজ্ঞেস করবেন? উত্তরে তিনি বললেনঃ “তাকে রোযে আযলের অঙ্গীকারের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, যখন আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশে রূহসমূহের নিকট থেকে দাসত্বের স্বীকারোক্তি নেয়া হয়েছিল।” আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, ঐ অঙ্গীকার কি ছিল? তিনি উত্তর দিলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, “আল্লাহ তাআলা যখন আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করলেন তখন ওর মধ্য থেকে ঐ রূহগুলো বেরিয়ে পড়লো যেগুলো কিয়ামত পর্যন্ত আদম (আঃ)-এর বংশ থেকে পৃথিবীতে আসবে। তারপর ওদের নিকট থেকে ওয়াদা নেয়া হয় যে, তারা ইবাদত শুধু আল্লাহরই করবে, অন্য কাউকেও তাঁর শরীক বানাবে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের জীবিকার জিম্মাদার হন। এরপর ঐ আত্মািগুলোকে আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশে ফিরিয়ে দেয়া হয়। যে পর্যন্ত এই অঙ্গীকারাবদ্ধরা সৃষ্ট হতে থাকবে সে পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। এখন যে ব্যক্তি পরবর্তী অঙ্গীকার গ্রহণের সুযোগ পাবে এবং ওটাকে সুন্দরভাবে আদায় করবে, পূর্ববর্তী অঙ্গীকারও তার পক্ষে লাভজনক হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পরবর্তী অঙ্গীকার পালনে ব্যর্থ হবে, পূর্ববর্তী অঙ্গীকার তার জন্যে মোটেই লাভজনক হবে না। আর যে ব্যক্তি পরবর্তী অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার ও ভাল ভাল কাজ করার সুযোগে লাভের পূর্বেই মারা যাবে, তার ব্যাপারে বুঝতে হবে যে, পূর্ববর্তী অঙ্গীকার অনুযায়ী ইসলামী ফিতরাতের উপরই সে মারা গিয়েছে।” এ দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ সবকিছু ভালভাবে অবগত ছিলেন। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত আদম (আঃ) হতে তাঁর সন্তানদেরকে বের করেন তখন তারা এমনিভাবে বেরিয়ে পড়ে যেমনিভাবে চুলে চিরুণী করার সময় চুলগুলো চিরুণীর মধ্য চলে আসে। তখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ আমি কি তোমাদের প্রভু নই? তারা সমস্বরে উত্তর দিলো- হ্যাঁ, অবশ্যই আপনি আমাদের প্রভু।” ফেরেশতারা বললেনঃ “কিয়ামতের দিন তোমরা যেন বলতে না পার যে, এটা তোমরা অবগত ছিলে না এ জন্যে আমরা সাক্ষী থাকলাম।”এই আয়াতের ব্যাপারে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ এ সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞাসিত হতে শুনেছি। উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তা'আলা তাঁর পৃষ্ঠদেশে হাত ফিরালে তাঁর সন্তানরা বের হতে শুরু করে। তখন তিনি বলেন, “এরা সব জান্নাতবাসী। কেননা, এরা জান্নাতবাসীরই আমল করবে।” আবার তিনি তাঁর পৃষ্ঠে হাত বুলালেন। এবারও অনেকগুলো সন্তান বেরিয়ে আসলো। তিনি বললেনঃ “এরা হচ্ছে জাহান্নামী। কেননা, এরা জাহান্নামীদেরই আমল করবে।” তখন একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমল করে লাভ কি”? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ বান্দাকেই জান্নাতের জন্যে সৃষ্টি করেছেন যার আমল হবে জান্নাতবাসীর আমল এবং ওর উপরই সে মৃত্যুবরণ করবে। সুতরাং সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। পক্ষান্তরে তিনি তাঁর ঐ বান্দাকেই জাহান্নামের জন্যে সষ্টি করেছেন যার আমল হবে জাহান্নামবাসীর আমল এবং ওর উপরই সে মৃত্যুবরণ করবে। ফলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে তাঁর সন্তানগুলো বেরিয়ে আসে তখন প্রত্যেক মানুষের কপালে একটা আলোক চমকাচ্ছিল। সমস্ত সন্তানকে হযরত আদম (আঃ)-এর সামনে পেশ করা হয়। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ হে আমার প্রভু! এরা কারা? তিনি উত্তরে বলেনঃ এরা তোমারই বংশধর। একটি লোকের চেহারায় ঔজ্জ্বল্য খুবই বেশী ছিল। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার প্রতিপালক! এটা কে? আল্লাহ উত্তর দিলেন, বহু যুগ পরে এটা তোমারই বংশের একটা লোক হবে যার নাম হবে দাউদ (আঃ)। আদম (আঃ) জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহ! এর বয়স কত হবে? উত্তর হয়, ষাট বছর। তখন আদম (আঃ) বলেনঃ হে আমার প্রভু! আমি আমার বয়স থেকে চল্লিশ বছর একে দান করলাম। কিন্তু হযরত আদম (আঃ)-এর বয়স যখন শেষ হয়ে গেল তখন মালাকুল মাউত এসে তার কাছে হাজির হলেন। তিনি ফেরেশতাকে বললেনঃ “এখনই কেন আসলেন? এখনও তো আমার বয়সের চল্লিশ বছর বাকী রয়েছে?” তখন তাঁকে বলা হয়, এই চল্লিশ বছর কি আপনি আপনার সন্তান দাউদ (আঃ)-কে দান করেননি? তখন আদম (আঃ) তা অস্বীকার করলেন। এজন্যে তাঁর সান্তানদেরও অস্বীকার করার স্বভাব হয়ে গেছে। আদম (আঃ) ভুলে গিয়েছিলেন বলে তাঁর সন্তানরাও ভুলে যায়। আদম (আঃ) অপরাধ করেছিলেন বলে তাঁর সন্তানরাও অপরাধ করে। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন) আদম (আঃ) যখন তাঁর সন্তানদেরকে দেখেছিলেন তখন তাদের মধ্যে রুগ্ন, কুষ্ঠরোগী অন্ধ ইত্যাদি সবই ছিল। আদম (আঃ) বলেছিলেন- “হে আমার প্রতিপালক! এদেরকে এরূপ কেন করা হয়েছে?” আল্লাহ তাআলা উত্তরে বলেছিলেন- “এর কারণ এই যে, যেন মানুষ সর্বাবস্থায় আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।” আদম (আঃ) পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, “হে আমার প্রভু! আপাদমস্তক নূর বিশিষ্ট এই লোকগুলো কে? উত্তর হয়েছিলএরা হচ্ছে নবী। কোন একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! আমলগুলো নতুনভাবে কি ফলদায়ক, না যা হবার তা হয়েই গেছে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আদম (আঃ) থেকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর সন্তানদেরকে বের করেন। তারপর তিনি তাদের মুখ থেকেই তাঁর একত্ববাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে স্বীয় দু' মুষ্টিতে ভরে নেন এবং বলেনঃ “এই মুষ্টির লোকগুলো জান্নাতী এবং ঐ মুষ্টির লোকগুলো জাহান্নামী। জান্নাত ও জাহান্নাম আমলের উপর নির্ভরশীল বটে, কিন্তু জান্নাতবাসীর আমল কার জন্যে সহজ হবে এবং জাহান্নামবাসীর আমল কার জন্যে সহজ হবে এটা আমার জানা আছে। এখন এর উপর ভিত্তি করেই কেউ জান্নাতী হবে এবং কেউ জাহান্নামী হবে। আযলের দিন আমি তাদেরকে জান্নাতী বা জাহান্নামী বানাইনি। তাদের আমলগুলোই তাদের যিম্মাদার । কিন্তু তখন থেকেই আমি তাদের আমল সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত।” (এটা হিশাম ইবনে হাকীম (রঃ)-এর নীতিতে ইবনে জারীর (রঃ) ও ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনাকরেছেন)এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ অমুক জান্নাতী হবে এবং অমুক জাহান্নামী হবে। এই ভাগ বন্টন আমার বলার উপর ভিত্তি করে নয়, বরং আমলের উপর ভিত্তি করে। আমরা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর হাদীসটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করলাম।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “যখন আল্লাহ তা'আলা মাখলুককে সৃষ্টি করে ভাগ করে দিলেন, তখন আত্মগুলো ডানদিকে ও বামদিকে অবস্থান করছিল। আল্লাহ তা'আলা উভয় দিকের আত্মাগুলোকেই জিজ্ঞেস করলেনঃ “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?” সবাই স্বীকারোক্তি করলোঃ “হ্যা! আপনিই আমাদের প্রতিপালক।” তারপর মহান আল্লাহ ডানদিকের ও বামদিকের আত্মাগুলোকে মিশ্রিত করে দিলেন। কেউ জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহ! এরা তো দু'ভাগে বিভক্ত ছিল, এদেরকে মিশ্রিত করলেন কেন?” আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বললেনঃ তাতে কোন ক্ষতি নেই। নিজ নিজ আমলের কারণে এরা এখনও পথকই থাকবে। মিশ্রত করলেও ভাল ও মন্দের কখনও মিশ্রণ হতে পারে না। আমি এরূপ না করলে কিয়ামতের দিন পাপীরা বলতোঃ “আমরা তো এটা অবগত ছিলাম না। তবে ভাল লোকেরা কোন অবস্থাতেই এটা বলবে না। এখন ব্যাপার থাকলো শুধু আমলের উপর। তাহলে পাপীদের কোন আপত্তি করার বা অজানা থাকার ওযরের কোন সুযোগ থাকলো না। এটা আমরা আবু উমামা (রাঃ)-এর হাদীসের ব্যাখ্যা দিলাম। কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্ট হতে থাকবে সেই সব আত্মার আকৃতি দান করলেন, কথা বলার শক্তি দিলেন, তাদের কাছে অঙ্গীকার নিলেন এবং ঐ অঙ্গীকারের উপর আসমান ও যমীনকে সাক্ষী বানানো হলো। আদম (আঃ) সাক্ষী থাকলেন। নতুবা তারা তো কিয়ামতের দিন পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করতো। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ মা'বুদ নেই। কাউকেই তোমরা আমার শরীক বানাবে না। আমি তোমাদের কাছে নবী-রাসূল প্রেরণ করবে। তারা তোমাদেরকে এই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করাবে। আমি কিতাবসমূহ প্রেরণ করবো। তখন আত্মাগুলো সমস্বরে বলবেঃ “আপনি ছাড়া আমাদের অন্য কোন মা'বুদ নেই।” তারা আল্লাহর আনুগত্যের স্বীকারোক্তি করলো। আদম (আঃ)-কে তাদের সামনে আনা হলো। আদম (আঃ) দেখলেন যে, তাদের মধ্যে ধনী, গরীব, সুন্দর ও বিশ্রী সবই রয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার প্রভু! সমস্ত লোককে সমান করে সৃষ্টি করেননি কেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল কে তা জানবার আমার খুবই আগ্রহ ছিল। সবাই এক হলে এ পরীক্ষা কিভাবে হতো।” তাদের মধ্যে নবীরা উজ্জ্বল প্রদীপের মত বিরাজ করছিলেন। এই রিসালাত ও নবুওয়াত ছিল দ্বিতীয় অঙ্গীকার যে, আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকারোক্তির পর রিসালাতের স্বীকারোক্তিও হাক। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি নবীদের কাছেও অঙ্গীকার নিয়েছিলাম। তা ছিল-দ্বীনে হানীফকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে তোমরা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হও, যা হচ্ছে একটা স্বাভাবিক ধর্ম।”এই সাক্ষ্য নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, মানুষ তাওহীদের প্রকৃতির উপর সৃষ্টি হয়েছে। এজন্যেই (আরবী) না বলে (আরবী) বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু আদম (আঃ) নয়, বরং আদম (আঃ)-এর সমস্ত সন্তানই তাওহীদের ফিতরাত বা প্রকৃতির উপর সৃষ্টি হয়েছে। আর এ জন্যেই (আরবী) না বলে (আরবী) বলা হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “তিনি তোমাদের সকলকে এককভাবে যমীনের প্রতিনিধি বানিয়েছেন।” অন্য জায়গায় তিনি বলেছেন- “যেমন আমি তোমাদেরকে অন্য সম্প্রদায়ের সন্তানদের হতে সৃষ্টি করেছি।”আর তাদেরকেই তাদের উপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?” তারা সমস্বরে উত্তর করলোঃ “হ্যা! আমরা সাক্ষী থাকলাম।” অর্থাৎ অবস্থা ও উক্তি উভয় রূপেই তারা স্বীকারোক্তি করলো। কেননা, সাক্ষ্য কোন সময় উক্তির মাধ্যমে হয়। যেমনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বললো- আমরা নিজেদের উপর সাক্ষ্য দান করলাম।” (৬:১৩০) আবার কোন সময় অবস্থার মাধ্যমেও হয়ে থাকে। যেমনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মুশরিকদের এই অধিকার নেই যে, তারা আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে এমন অবস্থায় যে, তারা নিজেদের উপর কুফরীর সাক্ষ্য দানকারী।” (৯ ১৭) অর্থাৎ তাদের অবস্থাই তাদের কুফরীর সাক্ষ্য বহনকারী। এই সাক্ষ্য মুখের সাক্ষ্য নয়, বরং অবস্থার সাক্ষ্য। আর যা কখনো -এর মাধ্যমে হয়, আবার কখনো অবস্থার মাধ্যমে হয়। যেমন বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যা কিছু চেয়েছে আল্লাহ তোমাদেরকে তাই প্রদান করেছেন।” (১৪:৩৪) এই কথার উপর এই দলীলও হচ্ছে যে, তাদের শিরক করার উপর এই হুজ্জত তাদের বিপক্ষে পেশ করা হয়েছে। যদি এটা সত্যই হয়, যেমন একটা উক্তি রয়েছে, তবে সবারই এটা স্মরণ থাকা উচিত ছিল, যাতে ওটা তার উপর হুজ্জত হতে পারে। যদি এর উত্তর এই হয় যে, রাসূলদের ফরমান দ্বারা খবর পেয়ে যাওয়াই যথেষ্ট। তাহলে এর উত্তর হবে এই যে, যারা রাসূলদেরকে মানেই না তারা তাদের দেয়া খবরকে কিভাবে সত্য বলে মেনে নেবে? অথচ কুরআন কারীম রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা ছাড়া স্বয়ং ঐ সাক্ষ্যকেই একটি পৃথক দলীল বলে ঘোষণা করেছে। সুতরাং এর দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার ফিতরাতকেই বুঝানো হয়েছে যার উপর তিনি সমস্ত মাখলুককে সৃষ্টি করেছেন। আর ওটাই হচ্ছে আল্লাহর তাওহীদের ফিতরাত। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “যেন তোমরা কিয়ামতের দিন একথা বলতে না পার- আমাদের পূর্বপুরুষরাই তো আমাদের পূর্বে শিরক করেছিল, আমরা ছিলাম তাদের পরবর্তী বংশধর। সুতরাং আপনি কি আমাদেরকে সেই ভ্রান্ত ও বাতিলদের কৃতকর্মের দরুন ধ্বংস করবেন?”

আল-আরাফ 7:174

১৭২-১৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে- আল্লাহ তা'আলা আদম (আঃ)-এর সন্তানদেরকে তারই পৃষ্ঠদেশ হতে রোযে আযলে বাইরে বের করেন। তারা নিজেরাই নিজেদের উপর সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ তাদের প্রতিপালক ও মালিক। তিনি ছাড়া অন্য কেউ উপাস্য নেই। এটাই হচ্ছে মানব প্রকৃতির স্বীকারোক্তি এবং এটাই তাদের স্বভাব । যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা তোমাদের পূর্ণ মনোযোগ সত্য দ্বীনের প্রতি প্রতিষ্ঠিত রাখ । আল্লাহ এই প্রকৃতির উপরই মানুষের স্বভাব বানিয়েছেন। আল্লাহ যে জিনিসকে যেভাবে সৃষ্টি করেছেন ওটা ঐভাবেই প্রতিষ্ঠিত থাকবে, এতে কোন পরিবর্তন ঘটবে না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক সন্তান স্বীয় প্রকৃতির উপর সৃষ্ট হয়। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি আমার বান্দাদেরকে শিরক থেকে দূরে সরিয়ে সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তানরা এসে তাদেরকে দ্বীনে হক থেকে সরিয়ে দেয় এবং আমি যা হালাল রেখেছি তা তারা হারাম করিয়ে দেয়। অন্য বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক সন্তান স্বীয় ইসলামী মাযহাবের উপর সৃষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রীষ্টান এবং মাজুসী বানিয়ে দেয়। যেমন চতুষ্পদ জন্তু ভাল ও নিখুঁত ভাবেই সৃষ্ট হয়, কোনটি কি কানকাটা রূপে সৃষ্ট হয়? কিন্তু পরে তার কান কেটে নিয়ে তাকে বিগড়িয়ে দেয়া হয়।” আসওয়াদ ইবনে সারী (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমি চারটি জিহাদে শরীক ছিলাম। মুজাহিদরা কাফিরদেরকে হত্যা করে তাদের শিশু সন্তানদের ধরে নেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সংবাদ পেয়ে খুবই অসন্তুষ্ট হন। তিনি বলেনঃ লোকদের কি হয়েছে যে, তারা শিশুদেরকে ধরতে রয়েছে? কোন একজন জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা কি মুশরিকদের শিশু নয়? উত্তরে তিনি বললেনঃ তোমাদের মধ্যকার ভাল ভাল লোকেরাও তো মুশরিকদেরই সন্তান। কোন প্রাণ এমন নেই যা ইসলামের ভিত্তির উপর সৃষ্ট হয় না। যে পর্যন্ত না সে পিতা মাতার ভাষা শিখে নেয় সে পর্যন্ত মুসলমানই থাকে। অতঃপর তার পিতামাতাই তাকে খ্রীষ্টান বা ইয়াহূদী বানিয়ে দেয়। (এটা ইবনে জারীর বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন) হাদীসসমূহে বর্ণিত আছে যে, আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে তার সন্তানদেরকে বের করা হয় এবং তাদেরকে ডানদিক ওয়ালা ও বামদিক ওয়ালা বানানো হয়। আর তাদের নিকট থেকে সাক্ষ্য নেয়া হয় যে, আল্লাহই তাদের প্রতিপালক।হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন একজন জাহান্নামীকে জিজ্ঞেস করা হবে- যদি তুমি যমীনের সবকিছুর মালিক হয়ে যাও, তবে এ সবকিছু মুক্তিপণ হিসেবে দিয়েও কি তুমি জাহানাম থেকে মুক্তি লাভ করতে চাবে? সে উত্তরে বলবেঃ হ্যা। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমি তো তোমার কাছে এর চেয়ে বহু কম চেয়েছিলাম! আমি আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকেই তোমার কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তুমি আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। কিন্তু তুমি শরীক করে বসেছিলে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনআরাফার দিন (৯ই যিলহজ্ব) নু'মান নামক স্থানে রূহসমূহের নিকট ওয়াদা নেয়া হয়েছিল। আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে ওগুলোকে বের করে পিঁপড়ার মত ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল এবং ওগুলোকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?” সবগুলোই সমস্বরে উত্তর দিয়েছিলঃ “হ্যা. অবশ্যই।” ((এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম হাকিমও (রঃ) এটা স্বীয় গ্রন্থ মুসতাদরিকে বর্ণনা করেছেন)জাবির (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যহহাক ইবনে মাযাহিম (রঃ)-এর একটি ছেলে মারা যায় যে মাত্র ছ'দিনের শিশু ছিল। তখন যহ্হাক (রঃ) বলেনঃ “হে জাবির? যখন তুমি একে কবরে রাখবে তখন তার চেহারাটি ভোলা অবস্থায় রাখবে। কেননা, শিশুটিকে বসানো হবে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হবে।” (জাবির বলেনঃ) আমি তখন তাই করলাম। অতঃপর আমি যহ্হাক (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার ছেলেকে কি জিজ্ঞেস করা হবে এবং কে জিজ্ঞেস করবেন? উত্তরে তিনি বললেনঃ “তাকে রোযে আযলের অঙ্গীকারের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, যখন আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশে রূহসমূহের নিকট থেকে দাসত্বের স্বীকারোক্তি নেয়া হয়েছিল।” আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, ঐ অঙ্গীকার কি ছিল? তিনি উত্তর দিলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, “আল্লাহ তাআলা যখন আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করলেন তখন ওর মধ্য থেকে ঐ রূহগুলো বেরিয়ে পড়লো যেগুলো কিয়ামত পর্যন্ত আদম (আঃ)-এর বংশ থেকে পৃথিবীতে আসবে। তারপর ওদের নিকট থেকে ওয়াদা নেয়া হয় যে, তারা ইবাদত শুধু আল্লাহরই করবে, অন্য কাউকেও তাঁর শরীক বানাবে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের জীবিকার জিম্মাদার হন। এরপর ঐ আত্মািগুলোকে আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশে ফিরিয়ে দেয়া হয়। যে পর্যন্ত এই অঙ্গীকারাবদ্ধরা সৃষ্ট হতে থাকবে সে পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। এখন যে ব্যক্তি পরবর্তী অঙ্গীকার গ্রহণের সুযোগ পাবে এবং ওটাকে সুন্দরভাবে আদায় করবে, পূর্ববর্তী অঙ্গীকারও তার পক্ষে লাভজনক হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পরবর্তী অঙ্গীকার পালনে ব্যর্থ হবে, পূর্ববর্তী অঙ্গীকার তার জন্যে মোটেই লাভজনক হবে না। আর যে ব্যক্তি পরবর্তী অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার ও ভাল ভাল কাজ করার সুযোগে লাভের পূর্বেই মারা যাবে, তার ব্যাপারে বুঝতে হবে যে, পূর্ববর্তী অঙ্গীকার অনুযায়ী ইসলামী ফিতরাতের উপরই সে মারা গিয়েছে।” এ দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ সবকিছু ভালভাবে অবগত ছিলেন। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত আদম (আঃ) হতে তাঁর সন্তানদেরকে বের করেন তখন তারা এমনিভাবে বেরিয়ে পড়ে যেমনিভাবে চুলে চিরুণী করার সময় চুলগুলো চিরুণীর মধ্য চলে আসে। তখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ আমি কি তোমাদের প্রভু নই? তারা সমস্বরে উত্তর দিলো- হ্যাঁ, অবশ্যই আপনি আমাদের প্রভু।” ফেরেশতারা বললেনঃ “কিয়ামতের দিন তোমরা যেন বলতে না পার যে, এটা তোমরা অবগত ছিলে না এ জন্যে আমরা সাক্ষী থাকলাম।”এই আয়াতের ব্যাপারে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ এ সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞাসিত হতে শুনেছি। উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তা'আলা তাঁর পৃষ্ঠদেশে হাত ফিরালে তাঁর সন্তানরা বের হতে শুরু করে। তখন তিনি বলেন, “এরা সব জান্নাতবাসী। কেননা, এরা জান্নাতবাসীরই আমল করবে।” আবার তিনি তাঁর পৃষ্ঠে হাত বুলালেন। এবারও অনেকগুলো সন্তান বেরিয়ে আসলো। তিনি বললেনঃ “এরা হচ্ছে জাহান্নামী। কেননা, এরা জাহান্নামীদেরই আমল করবে।” তখন একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমল করে লাভ কি”? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ বান্দাকেই জান্নাতের জন্যে সৃষ্টি করেছেন যার আমল হবে জান্নাতবাসীর আমল এবং ওর উপরই সে মৃত্যুবরণ করবে। সুতরাং সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। পক্ষান্তরে তিনি তাঁর ঐ বান্দাকেই জাহান্নামের জন্যে সষ্টি করেছেন যার আমল হবে জাহান্নামবাসীর আমল এবং ওর উপরই সে মৃত্যুবরণ করবে। ফলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে তাঁর সন্তানগুলো বেরিয়ে আসে তখন প্রত্যেক মানুষের কপালে একটা আলোক চমকাচ্ছিল। সমস্ত সন্তানকে হযরত আদম (আঃ)-এর সামনে পেশ করা হয়। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ হে আমার প্রভু! এরা কারা? তিনি উত্তরে বলেনঃ এরা তোমারই বংশধর। একটি লোকের চেহারায় ঔজ্জ্বল্য খুবই বেশী ছিল। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার প্রতিপালক! এটা কে? আল্লাহ উত্তর দিলেন, বহু যুগ পরে এটা তোমারই বংশের একটা লোক হবে যার নাম হবে দাউদ (আঃ)। আদম (আঃ) জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহ! এর বয়স কত হবে? উত্তর হয়, ষাট বছর। তখন আদম (আঃ) বলেনঃ হে আমার প্রভু! আমি আমার বয়স থেকে চল্লিশ বছর একে দান করলাম। কিন্তু হযরত আদম (আঃ)-এর বয়স যখন শেষ হয়ে গেল তখন মালাকুল মাউত এসে তার কাছে হাজির হলেন। তিনি ফেরেশতাকে বললেনঃ “এখনই কেন আসলেন? এখনও তো আমার বয়সের চল্লিশ বছর বাকী রয়েছে?” তখন তাঁকে বলা হয়, এই চল্লিশ বছর কি আপনি আপনার সন্তান দাউদ (আঃ)-কে দান করেননি? তখন আদম (আঃ) তা অস্বীকার করলেন। এজন্যে তাঁর সান্তানদেরও অস্বীকার করার স্বভাব হয়ে গেছে। আদম (আঃ) ভুলে গিয়েছিলেন বলে তাঁর সন্তানরাও ভুলে যায়। আদম (আঃ) অপরাধ করেছিলেন বলে তাঁর সন্তানরাও অপরাধ করে। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন) আদম (আঃ) যখন তাঁর সন্তানদেরকে দেখেছিলেন তখন তাদের মধ্যে রুগ্ন, কুষ্ঠরোগী অন্ধ ইত্যাদি সবই ছিল। আদম (আঃ) বলেছিলেন- “হে আমার প্রতিপালক! এদেরকে এরূপ কেন করা হয়েছে?” আল্লাহ তাআলা উত্তরে বলেছিলেন- “এর কারণ এই যে, যেন মানুষ সর্বাবস্থায় আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।” আদম (আঃ) পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, “হে আমার প্রভু! আপাদমস্তক নূর বিশিষ্ট এই লোকগুলো কে? উত্তর হয়েছিলএরা হচ্ছে নবী। কোন একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! আমলগুলো নতুনভাবে কি ফলদায়ক, না যা হবার তা হয়েই গেছে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আদম (আঃ) থেকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর সন্তানদেরকে বের করেন। তারপর তিনি তাদের মুখ থেকেই তাঁর একত্ববাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে স্বীয় দু' মুষ্টিতে ভরে নেন এবং বলেনঃ “এই মুষ্টির লোকগুলো জান্নাতী এবং ঐ মুষ্টির লোকগুলো জাহান্নামী। জান্নাত ও জাহান্নাম আমলের উপর নির্ভরশীল বটে, কিন্তু জান্নাতবাসীর আমল কার জন্যে সহজ হবে এবং জাহান্নামবাসীর আমল কার জন্যে সহজ হবে এটা আমার জানা আছে। এখন এর উপর ভিত্তি করেই কেউ জান্নাতী হবে এবং কেউ জাহান্নামী হবে। আযলের দিন আমি তাদেরকে জান্নাতী বা জাহান্নামী বানাইনি। তাদের আমলগুলোই তাদের যিম্মাদার । কিন্তু তখন থেকেই আমি তাদের আমল সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত।” (এটা হিশাম ইবনে হাকীম (রঃ)-এর নীতিতে ইবনে জারীর (রঃ) ও ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনাকরেছেন)এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ অমুক জান্নাতী হবে এবং অমুক জাহান্নামী হবে। এই ভাগ বন্টন আমার বলার উপর ভিত্তি করে নয়, বরং আমলের উপর ভিত্তি করে। আমরা হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর হাদীসটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করলাম।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- “যখন আল্লাহ তা'আলা মাখলুককে সৃষ্টি করে ভাগ করে দিলেন, তখন আত্মগুলো ডানদিকে ও বামদিকে অবস্থান করছিল। আল্লাহ তা'আলা উভয় দিকের আত্মাগুলোকেই জিজ্ঞেস করলেনঃ “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?” সবাই স্বীকারোক্তি করলোঃ “হ্যা! আপনিই আমাদের প্রতিপালক।” তারপর মহান আল্লাহ ডানদিকের ও বামদিকের আত্মাগুলোকে মিশ্রিত করে দিলেন। কেউ জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহ! এরা তো দু'ভাগে বিভক্ত ছিল, এদেরকে মিশ্রিত করলেন কেন?” আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বললেনঃ তাতে কোন ক্ষতি নেই। নিজ নিজ আমলের কারণে এরা এখনও পথকই থাকবে। মিশ্রত করলেও ভাল ও মন্দের কখনও মিশ্রণ হতে পারে না। আমি এরূপ না করলে কিয়ামতের দিন পাপীরা বলতোঃ “আমরা তো এটা অবগত ছিলাম না। তবে ভাল লোকেরা কোন অবস্থাতেই এটা বলবে না। এখন ব্যাপার থাকলো শুধু আমলের উপর। তাহলে পাপীদের কোন আপত্তি করার বা অজানা থাকার ওযরের কোন সুযোগ থাকলো না। এটা আমরা আবু উমামা (রাঃ)-এর হাদীসের ব্যাখ্যা দিলাম। কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্ট হতে থাকবে সেই সব আত্মার আকৃতি দান করলেন, কথা বলার শক্তি দিলেন, তাদের কাছে অঙ্গীকার নিলেন এবং ঐ অঙ্গীকারের উপর আসমান ও যমীনকে সাক্ষী বানানো হলো। আদম (আঃ) সাক্ষী থাকলেন। নতুবা তারা তো কিয়ামতের দিন পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করতো। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ মা'বুদ নেই। কাউকেই তোমরা আমার শরীক বানাবে না। আমি তোমাদের কাছে নবী-রাসূল প্রেরণ করবে। তারা তোমাদেরকে এই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করাবে। আমি কিতাবসমূহ প্রেরণ করবো। তখন আত্মাগুলো সমস্বরে বলবেঃ “আপনি ছাড়া আমাদের অন্য কোন মা'বুদ নেই।” তারা আল্লাহর আনুগত্যের স্বীকারোক্তি করলো। আদম (আঃ)-কে তাদের সামনে আনা হলো। আদম (আঃ) দেখলেন যে, তাদের মধ্যে ধনী, গরীব, সুন্দর ও বিশ্রী সবই রয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার প্রভু! সমস্ত লোককে সমান করে সৃষ্টি করেননি কেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল কে তা জানবার আমার খুবই আগ্রহ ছিল। সবাই এক হলে এ পরীক্ষা কিভাবে হতো।” তাদের মধ্যে নবীরা উজ্জ্বল প্রদীপের মত বিরাজ করছিলেন। এই রিসালাত ও নবুওয়াত ছিল দ্বিতীয় অঙ্গীকার যে, আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকারোক্তির পর রিসালাতের স্বীকারোক্তিও হাক। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি নবীদের কাছেও অঙ্গীকার নিয়েছিলাম। তা ছিল-দ্বীনে হানীফকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে তোমরা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হও, যা হচ্ছে একটা স্বাভাবিক ধর্ম।”এই সাক্ষ্য নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, মানুষ তাওহীদের প্রকৃতির উপর সৃষ্টি হয়েছে। এজন্যেই (আরবী) না বলে (আরবী) বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু আদম (আঃ) নয়, বরং আদম (আঃ)-এর সমস্ত সন্তানই তাওহীদের ফিতরাত বা প্রকৃতির উপর সৃষ্টি হয়েছে। আর এ জন্যেই (আরবী) না বলে (আরবী) বলা হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “তিনি তোমাদের সকলকে এককভাবে যমীনের প্রতিনিধি বানিয়েছেন।” অন্য জায়গায় তিনি বলেছেন- “যেমন আমি তোমাদেরকে অন্য সম্প্রদায়ের সন্তানদের হতে সৃষ্টি করেছি।”আর তাদেরকেই তাদের উপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?” তারা সমস্বরে উত্তর করলোঃ “হ্যা! আমরা সাক্ষী থাকলাম।” অর্থাৎ অবস্থা ও উক্তি উভয় রূপেই তারা স্বীকারোক্তি করলো। কেননা, সাক্ষ্য কোন সময় উক্তির মাধ্যমে হয়। যেমনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বললো- আমরা নিজেদের উপর সাক্ষ্য দান করলাম।” (৬:১৩০) আবার কোন সময় অবস্থার মাধ্যমেও হয়ে থাকে। যেমনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মুশরিকদের এই অধিকার নেই যে, তারা আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে এমন অবস্থায় যে, তারা নিজেদের উপর কুফরীর সাক্ষ্য দানকারী।” (৯ ১৭) অর্থাৎ তাদের অবস্থাই তাদের কুফরীর সাক্ষ্য বহনকারী। এই সাক্ষ্য মুখের সাক্ষ্য নয়, বরং অবস্থার সাক্ষ্য। আর যা কখনো -এর মাধ্যমে হয়, আবার কখনো অবস্থার মাধ্যমে হয়। যেমন বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যা কিছু চেয়েছে আল্লাহ তোমাদেরকে তাই প্রদান করেছেন।” (১৪:৩৪) এই কথার উপর এই দলীলও হচ্ছে যে, তাদের শিরক করার উপর এই হুজ্জত তাদের বিপক্ষে পেশ করা হয়েছে। যদি এটা সত্যই হয়, যেমন একটা উক্তি রয়েছে, তবে সবারই এটা স্মরণ থাকা উচিত ছিল, যাতে ওটা তার উপর হুজ্জত হতে পারে। যদি এর উত্তর এই হয় যে, রাসূলদের ফরমান দ্বারা খবর পেয়ে যাওয়াই যথেষ্ট। তাহলে এর উত্তর হবে এই যে, যারা রাসূলদেরকে মানেই না তারা তাদের দেয়া খবরকে কিভাবে সত্য বলে মেনে নেবে? অথচ কুরআন কারীম রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা ছাড়া স্বয়ং ঐ সাক্ষ্যকেই একটি পৃথক দলীল বলে ঘোষণা করেছে। সুতরাং এর দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার ফিতরাতকেই বুঝানো হয়েছে যার উপর তিনি সমস্ত মাখলুককে সৃষ্টি করেছেন। আর ওটাই হচ্ছে আল্লাহর তাওহীদের ফিতরাত। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “যেন তোমরা কিয়ামতের দিন একথা বলতে না পার- আমাদের পূর্বপুরুষরাই তো আমাদের পূর্বে শিরক করেছিল, আমরা ছিলাম তাদের পরবর্তী বংশধর। সুতরাং আপনি কি আমাদেরকে সেই ভ্রান্ত ও বাতিলদের কৃতকর্মের দরুন ধ্বংস করবেন?”

আল-আরাফ 7:175

১৭৫-১৭৭ নং আয়াতের তাফসীর: এটা ছিল বানী ইসরাঈলের মধ্যকার একটি লোক। তার নাম ছিল বালআম ইবনে বাউর। (এটা আব্দুর রাযযাক (রঃ) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) কাতাদা (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তার নাম ছিল সায়ফী ইবনে রাহিব। কা'ব (রঃ) বলেন যে, সে ছিল বালকাবাসী এক লোক। সে ইসমে আ'যম জানতো। সে ইয়াহূদী আলিমদের সাথে বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থান করতো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন। যে, সে ছিল ইয়ামনের অধিবাসী। আল্লাহ তা'আলা তাকে স্বীয় নিদর্শনাবলী ও কারামাত দান করেছিলেন। কিন্তু সে ঐগুলোর মর্যাদা দেয়নি। তার প্রার্থনা কবুল করা হতো। জনগণ বিপদ-আপদের সময় আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনার জন্যে তাকেই আগে বাড়িয়ে দিতো। আল্লাহর নবী হযরত মূসা (আঃ) দ্বীনের তাবলীগের জন্যে তাকে মাদইয়ান দেশে প্রেরণ করেন। সেখানকার বাদশাহ্ তাকে নিজের পক্ষে করে নেয় এবং বহু উপঢৌকন প্রদান করে। সে বাদশাহর দ্বীন কবুল করে নেয় এবং হযরত মূসা (আঃ)-এর দ্বীন পরিত্যাগ করে। তার নাম ছিল বালআ’ম। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, সে হচ্ছে উমাইয়া ইবনে আবি সালাত। খুব সম্ভব এটা বলার উদ্দেশ্য এই হবে যে, এই উমাইয়াও ঐ লোকটির সাথে সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। এই লোকটিও পূর্ববর্তী শরীয়তের জ্ঞান রাখতো। কিন্তু ওটা থেকে সে উপকার গ্রহণ করেনি। সে নবী (সঃ)-এর যুগও পেয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (রঃ)-এর নিদর্শনগুলো সে স্বচক্ষে দেখেছিল এবং তার মু'জিযাগুলো অবলোকন করেছিল। সে হাজার হাজার লোককে আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করতে দেখেছে। কিন্তু মুশরিকদের সাথে মেলামেশা, তাদের মধ্যে তার সম্মান ও মর্যাদা এবং নেতৃত্ব লাভ তাকে ইসলাম ও সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। বদর যুদ্ধে নিহত কাফিরদের জন্যে বড় বড় শাক গাঁথা সে রচনা করেছিল। তার মুখ তো ঈমান এনেছিল, কিন্তু তার অন্তর মুমিন হয়নি। খুব সম্ভব এই সমুদয় ঘটনা উমাইয়া ইবনে আবি সালাতের সাথেই সম্পর্কযুক্ত, বালআ’মের সাথে নয়।বালআমের বর্ণনা কুরআন কারীমের মধ্যে এইভাবে হচ্ছে- ‘আমি তাকে আমার নিদর্শনসমূহ অর্থাৎ কারামাত দান করেছিলাম। কিন্তু সে তা থেকে সরে পড়ে অর্থাৎ বঞ্চিত হয়। আল্লাহ তা'আলা তাকে তিনটি দুআর অধিকার দিয়েছিলেন যে, সেগুলো কবুল হবে। তার একটি স্ত্রী ও একটি পুত্র ছিল। তার স্ত্রী তাকে বললোঃ “তুমি আমার জন্যে একটি দু'আ নির্দিষ্ট করে নাও”। সে বললো, “আচ্ছা, কি দুআ বল।” স্ত্রী বললোঃ “আল্লাহর নিকট দু'আ কর যে, আল্লাহ তা'আলা যেন আমাকে বানী ইসরাঈলের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী করে দেন।” সে তখন আল্লাহ তা'আলার নিকট ঐ দু'আই করলো। ফলে তার স্ত্রী সর্বাপেক্ষা সুন্দরী নারীতে পরিণত হয়ে গেল। তার স্ত্রী যখন অনুভব করলো যে, তার মত সুন্দরী নারী আর নেই তখন সে তার স্বামীকে অগ্রাহ্য করে বসলো এবং তার প্রতি অনীহা প্রকাশ করলো। আর তার ধারণা ও কার্যাবলী অন্যরূপ হয়ে গেল। তখন বালআম দুআ করলো যে, যেন তার স্ত্রী কুকুরী হয়ে যায় । সুতরাং সে কুকুরী হয়ে গেল। এভাবে দু’টি দুআ শেষ হয়ে গেল। তার ছেলেটি তখন তাকে বললোঃ “আব্বা! আমার মা কুকুরী হয়ে থাকবে এটাতো আমাদের জন্যে মোটেই শোভনীয় নয়। জনগণ আমাদের নিন্দে করছে। সুতরাং আপনি দুআ করুন যেন আমার মা পূর্বাবস্থায় চলে আসে। সে তখন দুআ করলো। ফলে তার স্ত্রী পূর্বে যেমন ছিল তেমনি হয়ে গেল। এখন তিনটি দুআ’ই শেষ হয়ে গেল। এই বর্ণনাটি গারীব।এই আয়াতটির প্রসিদ্ধ শানে নুযূল এই যে, বানী ইসরাঈলের যুগে একটি লোক ছিল। সে জাব্বারীন ইয়াহূদীদের শহরে বাস করতো। সে ইসমে আযম জানতো। কথিত আছে যে, তার দুআ আল্লাহর পক্ষ থেকে গৃহীত হতো। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর কথা, যা কোন কোন লোক বলে থাকে তা এই যে, সে নবী ছিল, কিন্তু নবুওয়াত তার থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। ইবনে জারীর (রঃ)-এর এরূপ উক্তি রয়েছে। কিন্তু এটা মোটেই সঠিক নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হযরত মূসা (আঃ) যখন জাব্বারীনদের শহরে আগমন করেন তখন বালআ’মের কাছে তার লোকেরা এসে বলেঃ “মূসা (আঃ) একজন লৌহমানব। তার সাথে বিরাট সেনাবাহিনী রয়েছে। যদি তিনি আমাদের উপর জয়যুক্ত হন তবে আমরা সবাই ধ্বংস হয়ে যাবো। সুতরাং আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করুন যেন মূসা (আঃ) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের বিপদ আমাদের থেকে দূরীভূত হয়।” সে বললোঃ “যদি আমি এই দুআ করি তবে আমার দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ই নষ্ট হয়ে যাবে।” কিন্তু জনগণ পীড়াপীড়ি করায় সে ঐরূপ দুআ করলো। ফলে আল্লাহ তা'আলা তার বুযুগী ও কারামাত ছিনিয়ে নেন। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ সে কারামাত থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল এবং শয়তান তার পিছনে লেগে পড়লো। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যখন মূসা (আঃ)-এর জন্যে তীহের ময়দানে চল্লিশ বছরের চক্র শেষ হয়ে গেল তখন আল্লাহ তা'আলা ইউশা ইবনে নূন (আঃ)-কে নবী করে পাঠালেন। তিনি বানী ইসরাঈলকে নিজের নবী হওয়ার সংবাদ দিলেন এবং এ খবরও দিলেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে জাব্বারীনদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। জাব্বারীনরা হযরত ইউশা (আঃ)-এর বায়আত গ্রহণ করে এবং তার সত্যতা স্বীকার করে নেয়। কিন্তু বানী ইসরাঈলের বালআম নামক একটি লোক অবাধ্যাচরণ করতঃ জাব্বারীনদের কাছে গমন করে এবং তাদেরকে বলেঃ “ভয় করো না। যখন তোমরা যুদ্ধের জন্যে বের হবে তখন আমি বদ দুআ’র হাতিয়ার কাজে লাগাবো এবং তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে।” জাব্বারীনদের কাছে বালআমের পার্থিব সুখ-সম্ভোগের সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু তাদের স্ত্রীদের নিকট থেকে কোনই উপকার লাভ করতে পারতো না। কেননা, ঐ স্ত্রীলোকদের শ্রেষ্ঠত্ব তার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। সে শুধুমাত্র নিজের গর্দভী অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক রাখতো। এখন শয়তান তার পিছনে লেগে গেল। অর্থাৎ সে শয়তানের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পড়লো। সুতরাং সে শয়তানের আদেশ পালন করতে শুরু করলো।(আরবী) অর্থাৎ “সে পথভ্রষ্টদের বা ধ্বংসপ্রাপ্তদের অথবা উড্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” ভাল লোকও কোন সময় মন্দ লোকে পরিণত হয়। এই আয়াতের অর্থের ব্যাপারে হাদীস এসেছে। হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের ব্যাপারে আমি এই প্রকারের কিছুটা আশংকা করে থাকি। যেমন ঐ ব্যক্তি, যার কুরআনের জ্ঞান ছিল। কুরআনের বরকত ও সৌন্দর্য তার চেহারায় প্রকাশমান ছিল এবং তার ইসলামী শান-শওকতও ছিল। কিন্তু আল্লাহর দেয়া দুর্ভাগ্য তাকে ঘিরে ফেলে। ইসলামের নির্দেশাবলী সে পৃষ্ঠ-পিছনে ছুঁড়ে ফেলে। সে তার প্রতিবেশীর উপর তরবারী দ্বারা আক্রমণ চালায় এবং তাকে শিরকের অপবাদ দেয়।” বর্ণনাকারী বলেনঃ আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী (সঃ)! অপবাদদাতা অপরাধী ছিল, না যার উপর অপবাদ দেয়া হয়েছিল সেই অপরাধী ছিল? তিনি উত্তরে বললেনঃ “অপবাদদাতাই অপরাধী ছিল।” (এটা হাফিয আবু ইয়ালা আল মূসিলী (রঃ) তাখরীজ করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেনযে, এর ইসনাদ খুবই উত্তম)ইরশাদ হচ্ছে- আমি ইচ্ছা করলে তাকে এই আয়াতসমূহের সাহায্যে উন্নত করতাম। কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়ে এবং স্বীয় কামনা বাসনার অনুসরণ করতে থাকে। সে এমনভাবে দুনিয়ার ফাঁদে পড়ে যায় যেমনভাবে কোন অজ্ঞান লোক পড়ে থাকে। সে শয়তানের সহকর্মী হয়ে যায় এবং নীচতা ও হীনতা অবলম্বন করে। তার সওয়ারী আল্লাহকে সিজদা করে, কিন্তু সে সিজদা করে শয়তানকে। এই আয়াতের ব্যাপারে ইবনে সিয়ার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে নিয়ে ঐ ভূ-খণ্ডের অভিমুখে রওয়ানা হন যেখানে বালআম বাস করতো অথবা তিনি সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। হযরত মূসা (আঃ) ও তার সেনাবাহিনীর আগমন বার্তায় তথাকার লোক ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা বালআমের কাছে এসে বলেঃ “মূসা (আঃ) ও তাঁর সেনাবাহিনীর জন্যে বদ দুআ করুন।” তখন সে বলেঃ “তোমরা অপেক্ষা কর, আমি আমার প্রতিপালকের সাথে পরামর্শ করে নেই।” অতঃপর সে পরামর্শ করলে তাকে বলা হয়ঃ “না বদ দুআ করো না। কেননা, তারা আমার বান্দা। তাছাড়া তাদের মধ্যে আমার নবীও বিদ্যমান রয়েছে। তখন সে তার সম্প্রদায়ের লোকদেরকে বললোঃ “আমি আমার প্রভুর সাথে পরামর্শ করেছি। তিনি আমাকে বদ দুআ করতে নিষেধ করেছেন। এরপর জনগণ তার কাছে বহু উপঢৌকন পাঠিয়ে দেয়। তার উচিত ছিল ঐগুলো গ্রহণ না করা। কিন্তু সে ওগুলো গ্রহণ করে নেয়। তারপর লোকেরা আবার তাকে বদ দুআ করার জন্যে পীড়াপীড়ি শুরু করে দেয়। সে বলেঃ “আচ্ছা, পুনরায় আমি পরামর্শ করে দেখি।” এবার কিন্তু তাকে কোনই পরামর্শ দেয়া হলো না। সে জনগণকে বললোঃ “এবার তো আমাকে কোনই পরামর্শ দেয়া হয়নি। কাজেই আমি বদ দুআ করতে পারি না।” কিন্তু জনগণ তাকে বিভ্রান্ত করে ফেললো। তারা তাকে বললোঃ “যদি এতে আল্লাহর সম্মতি না থাকতো তবে পূর্বের ন্যায় এবারও বদ দুআ করতে আপনাকে নিষেধ করে দিতেন। আল্লাহ তা'আলা যখন নীরব রয়েছেন তখন বুঝা যাচ্ছে যে, এতে তাঁর সম্মতি আছে। তাদের এ কথায় বালআম প্রতারিত হয়ে পড়লো। সুতরাং সে মূসা (আঃ) ও তার সেনাবাহিনীর উপর বদ দুআ করতে শুরু করলো। যখনই সে বদ দুআ’র শব্দ মূসা (আঃ)-এর জন্যে বের করতে চাইতো তখনই তার মুখ দিয়ে তার নিজের কওমের জন্যে বদদুআ’র শব্দ বেরিয়ে পড়তো। নিজের কওমের জন্যে বিজয়ের শব্দ বের করতে চাইলে হযরত মূসা (আঃ)-এর বিজয়ের শব্দ তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতো। অথবা দুআ’র শেষে। ইনশাআল্লাহ শব্দটি বেরিয়ে পড়তো। কাজেই বদ দুআ শর্তযুক্ত হওয়ার কারণে ব্যর্থ হয়ে যেতো। লোকেরা তখন তাকে বললোঃ “আপনি যে মূসা (আঃ)-এর পরিবর্তে আমাদের উপরই বদ দুআ করছেন।” সে বললোঃ “আমি করবো কি? অনিচ্ছাকৃত ভাবেই আমার মুখ দিয়ে এগুলো বেরিয়ে পড়ছে। আমার এখন পূর্ণ বিশ্বাস হয়ে গেছে যে, আমি বদ দুআ করলেও তা কবুল হবে না। এখন আমি তোমাদেরকে একটি তদবীর শিখিয়ে দিচ্ছি। এটা করলে এ লোকগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। দেখো! আল্লাহ তা'আলা ব্যভিচারকে হারাম করেছেন। তিনি ব্যভিচার কার্যে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। যদি এই লোকগুলোকে কোন রকমে ব্যভিচারে জড়িত করে দেয়া যায় তবে অবশ্যই তাদের ধ্বংসের আশা রয়েছে। অতএব তোমরা এই কাজ কর যে, তোমাদের স্ত্রীদেরকে মূসা (আঃ)-এর সেনাবাহিনীর মধ্যে পাঠিয়ে দাও। এরা তো স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে ছেড়ে বিদেশে পড়ে আছে, সুতরাং তারা যে ব্যভিচারে জড়িত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই।” তার কথামত লোকগুলো ঐ কাজই করলো। তারা তাদের স্ত্রীদেরকে হযরত মূসা (আঃ)-এর সেনাবাহিনীর নিকট পাঠিয়ে দিলো। এমন কি তাদের বাদশাহর কন্যাও ছাড়া পড়লো না। শাহজাদীকে তার পিতা অথবা বালআম বলে দিলো যে, সে যেন হযরত মূসা (আঃ) ছাড়া আর কারো ব্যবহারে না আসে। কথিত আছে যে, সত্যিই লোকগুলো ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। শাহজাদীর কাছে বানী ইসরাঈলের একজন সর্দার এসে গেল এবং তার থেকে কাম বাসনা পূর্ণ করতে চাইলো। বাদশাহর কন্যা তাকে বললো যে, সে মূসা (আঃ) ছাড়া আর কাউকেও তার সাথে জড়িত হতে দেবে না। সর্দার বললোঃ “আমি উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত রয়েছি এবং আমার এই শান-শওকত রয়েছে।” কন্যা তখন তার পিতাকে চিঠি লিখে এ ব্যাপারে পরামর্শ চাইলো । পিতা তাকে অনুমতি দিলো । তারা দু’জন তখন ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়লো। এমতাবস্থায় হযরত হারূন (আঃ)-এর এক ছেলে তথায় উপস্থিত হলেন। তাঁর হাতে একটি বর্শা ছিল । তিনি তাদের উপর এমন জোরে বর্শা মেরে দিলেন যে তারা দু'জনই একই বর্শায় গেঁথে গেল। তিনি সেই বর্শাকে উচু করে ধরে জনগণের সামনে আসলেন এবং তারা ঐ দু’জনকে ঐ অবস্থায় স্বচক্ষে দেখে নিলো । আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের উপর মহামারীর শাস্তি নাযিল করলেন। ফলে সত্তর হাজার লোক মারা গেল। ইবনে সিয়ার (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, বালআম স্বীয় গর্দভীর ওপর সওয়ার হয়ে মা’লী নামক জায়গা পর্যন্ত আসলো। এখান থেকে তার সওয়ারী আর আগে বাড়ে না। সে ওকে মারতে শুরু করলো, কিন্তু ওটা বসেই যাচ্ছিল। আল্লাহ তা'আলা ওকে বাকশক্তি দান করলেন। গর্দভীটি তখন বালআমকে বললোঃ “তুমি আমাকে মারছো কেন? সামনে দেখো কে আছে?” সে দেখলো যে শয়তান দাড়িয়ে আছে। সে নেমে গিয়ে শয়তানকে সিজদা করলো। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবী)সালিম (রঃ) আবূ নযর (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) যখন সিরিয়া হতে বানী কিনআ’নে আসেন তখন বালআমকে তার কওমের লোকেরা বলেঃ “মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়সই আমাদের দেশে আসছেন। তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদেরকে হত্যা করে আমাদের এখানে তার লোকদেরকে বসিয়ে দেয়া। আমরা আপনার কওমেরই লোক। আমাদের অন্য কোন বাসস্থান নেই। আল্লাহ তা'আলা আপনার দুআ কবুল করে থাকেন। সুতরাং আপনি তাদের জন্যে মহান আল্লাহর নিকট বদ দুআ করুন।” সে বললোঃ “তোমরা নিপাত যাও! মূসা (আঃ) হচ্ছেন আল্লাহর নবী। তার সাহায্যার্থে ফেরেশতারাও রয়েছেন। এবং মুমিনরাও রয়েছেন। সুতরাং আমি তাঁদের উপর কিরূপে বদ দুআ করতে পারি? আমি যা জানি তা জানিই।” তার ললাকেরা তখন বললোঃ “তাহলে আমরা থাকবো কোথায়?” এভাবে সব সময় তারা তার উপর চাপ দিতে থাকে এবং বিনীতভাবে বদ দুআ করার জন্যে তার কাছে আবেদন জানাতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সে পরীক্ষায় নিক্ষিপ্ত হয়। সে স্বীয় গর্দভীর উপর সওয়ার হয়ে একটি পাহাড় অভিমুখে গমন করে, যে পাহাড়ের উপর চড়ে সে বানী ইসরাঈলের সেনাবাহিনীকে দেখতে পাবে। ঐ পাহাড়টিকে হাসান পাহাড় বলা হয়। কিছু দূর গিয়ে তার গর্দভীটি বসে পড়ে। সে তখন নেমে গর্দভীকে মারতে শুরু করে। কিছুদূর গিয়ে আবার সে বসে পড়ে। বার বার যখন তাকে মারতে থাকে তখন আল্লাহ তাকে বাশক্তি দান করেন। সে বলে ওঠে- “হে বালআ'ম! তুমি আমাকে কোন্ দিকে নিয়ে যাচ্ছ? তুমি কি দেখছো না যে, ফেরেশতা আমার সামনে রয়েছেন? তিনি আমাকে ধাক্কা দিয়ে পিছনে সরিয়ে দিচ্ছেন। তুমি আল্লাহর নবী ও মুমিনদের উপর বদ দুআ করতে যাচ্ছ!” সে কিন্তু তবুও বিরত হলো না। পুনরায় সে গর্দভীকে মারতে শুরু করলো। এবার আল্লাহর নির্দেশক্রমে সে হাসবান নামক পাহাড়ের উপর উঠে গেল। ওখানে পৌছে বালআম হযরত মূসা (আঃ) ও মুমিনদের উপর বদ দুআ করতে শুরু করে দিলো। কিন্তু তার জিহ্বা উল্টে যাচ্ছিল। তার মুখ দিয়ে তার কওমের জন্যে বদ দুআ' এবং মূসা (আঃ)-এর জন্যে ভাল দুআ বের হচ্ছিল। কথিত আছে যে, বদ দুআ করার সময় তার জিহ্বা বাইরে বেরিয়ে পড়েছিল এবং তার বক্ষের উপর লম্বা হয়ে লটকে গিয়েছিল। তখন সে বলে উঠেছিলঃ “আমার দুনিয়াও গেল, দ্বীনও গেল।” কওমের লোককে সে বললোঃ “এখন শুধু প্রতারণা ও কৌশল দ্বারা কাজ নেয়া যেতে পারে। তোমরা নিজেদের মেয়েদেরকে সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিত করে বানী ইসরাঈলের সৈন্যদের মধ্যে পাঠিয়ে দাও। তাদেরকে বলে দাও যে, তারা যেন ঐ পুরুষ লোকদেরকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করে নেয়। যদি একটি লোকও ব্যভিচারে জড়িয়ে পড়ে তবে জেনে রেখো যে, তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।” তার কথামত নারীদেরকে বানী ইসরাঈলের সেনাবাহিনীর মধ্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়।কিনআ'নবাসীর একটি স্ত্রীলোকের নাম ছিল কাসবতী। সুর নামক একটি লোক ছিল কওমের সর্দার ও বাদশাহ্। কাসবতী ছিল তারই কন্যা। এই কাসবতীর মিলন ঘটে যামরী ইবনে শালুম নামক বানী ইসরাঈলের এক সর্দারের সাথে। এই যামরী ছিল শামউন ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইসহাক ইবনে। ইবরাহীমের পৌত্র। সে ছিল কওমের সর্দার। সে কাসবতীকে দেখে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। সে তার হাত ধরে হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট নিয়ে গেল এবং তাকে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আপনি হয়তো এ কথাই বলবেন যে, এ মেয়েটি তোমার জন্যে হারাম। সুতরাং তুমি তার কাছে যেয়ো না।” হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “হ্যা! এ নারী তোমার জন্যে হারাম।” সে তখন বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আল্লাহর কসম! এখানে তো আমি আপনার কথা মানবো না।” অতঃপর সে মেয়েটিকে তার তাঁবুতে নিয়ে গেল এবং তাকে নিয়ে একই বিছানায় রাত্রি কাটালো। আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের মধ্যে মহামারী ছড়িয়ে দিলেন। ফানহাস ইবনে আনীরার ইবনে হারূন নামক কওমের সর্দার যামরী ইবনে শালুমের এই কাজের সময় সেখানে উপস্থিত ছিল না। যামরীর এই দুষ্কার্যের ফলে বানী ইসরাঈলের সমস্ত কওমের মধ্যে মহামারী ছড়িয়ে পড়ে। পরে ফানহাস এই সমুদয় ঘটনা অবগত হয়। সে স্বীয় লৌহ-বর্শাটি উঠিয়ে নিয়ে যামরীর তাঁবুতে প্রবেশ করে। ঐ সময় তারা দু'জন শায়িত অবস্থায় ছিল। দু’জনকেই সে একই বর্শায় গেঁথে নেয় এবং ঐ অবস্থাতেই বর্শাটিকে মাথায় উঠিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ফানহাস ছিল যুবক ও শক্তিশালী লোক। সে বলতে বলতে যাচ্ছিলঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনার নাফরমান বান্দার সাথে এই ব্যবহার করলাম। সুতরাং আপনি মহামারী দূর করে দিন!” আল্লাহ পাক মহামারী দুর করলেন। ঐ মহামারীতে বানী ইসরাঈলের সত্তর হাজার লোক অথবা কমপক্ষে বিশ হাজার লোক মারা যায়। (এটা মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) সালিম (রঃ) ও আবু নযর (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। ইবনে জারীর (রঃ) অনুরূপভাবে এটা তাখরীজ করেছেন এবং তাতে রয়েছে যে, কিছু সংখ্যক সৈন্য কর্তৃক ব্যভিচার কার্য সংঘটিত হয় যারা হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে ছিল। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে মহামারী দ্বারা আক্রান্ত করেন। তাতে সত্তর হাজার লোক মারা যায়) ফানহাসের এই কার্যের কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে বানী ইসরাঈল যখনই কিছু যবেহ করতো তখন ওর মাথা ও সামনের পা এবং নিজেদের ফলমূলের প্রথম জিনিস তার (ফানহাসের) সন্তানদেরকে নানা স্বরূপ প্রদান করতো।(আরবী)-এই আয়াতের তাফসীরে মুফাসসিরদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, বালআ’মের জিহ্বা লটকে তার বক্ষে গিয়ে পড়েছিল। তাই, তার দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে কুকুরের সঙ্গে যে, যদি তাকে কষ্ট দেয়া হয় তবে সে হাঁপাবে এবং কষ্ট না দিলেও হাঁপাবে। তদ্রপ বালআ’মেরও অবস্থা যে, তার উপর কারামাত নাযিল হাক অথবা দুঃখ-বেদনা নাযিল হাক, একই কথা। অথবা এই দৃষ্টান্ত তার পথভ্রষ্টতা এবং তাকে ঈমানের দিকে ডাকা বা না ডাকা উভয় অবস্থাতেই তার দ্বারা উপকৃত না হওয়ার ব্যাপারে কুকুরের সাথে দেয়া হয়েছে যে, তাকে তাড়ালেও সে জিহ্বা লটকিয়ে হাঁপাবে এবং না তাড়ালেও হাঁপাবে। তদ্রুপ বালআমকেও যদি ঈমানের দিকে আহ্বান করা যায় তবে তার দ্বারা সে উপকার গ্রহণ করবে না এবং আহ্বান না করলেও উপকার লাভ করবে না। এই ধরনেরই একটি কথা আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “তুমি তাদেরকে ভয় প্রদর্শন কর বা না কর, তারা ঈমান আনবে না।” এইরূপ আর একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তুমি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর বা না কর, আল্লাহ কখনও তাদেরকে ক্ষমা করবেন না।” অথবা এর অর্থ এও হতে পারে যে, কাফির মুনাফিক এবং পথভ্রষ্ট লোকের অন্তর দুর্বল হয় এবং তা হিদায়াত শূন্য থাকে। যতই চেষ্টা করা যাক না কেন তারা হিদায়াত প্রাপ্ত হবে না।' (অনুরূপ বর্ণনা হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে নকল করা হয়েছে)আল্লাহ পাক স্বীয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে রাসূল (সঃ)! তুমি জনগণকে এ ঘটনাগুলো শুনিয়ে দাও, যাতে তারা বানী ইসরাঈলের অবস্থা অবহিত হওয়ার পর চিন্তা-ভাবনা করতঃ আল্লাহর পথে এসে যায় এবং চিন্তা করে যে, বালআ’মের অবস্থা কি হয়েছিল। আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান রূপ মহামূল্যবান সম্পদকে সে দুনিয়ার নগণ্য আরাম ও বিলাসিতার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়। শেষে সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই হারিয়ে ফেলে । অনুরূপভাবে এই ইয়াহূদী আলেমরা যারা তাদের কিতাবসমূহে আল্লাহর হিদায়াত পাঠ করছে এবং তোমার গুণাবলী তাতে লিপিবদ্ধ দেখছে, তাদের উচিত হবে দুনিয়ার মোহে নিমজ্জিত হয়ে শিষ্যদেরকে ভুল পথে চালিত না করা। নতুবা তারাও ইহকাল ও পরকাল দু-ই হারাবে। তাদের কর্তব্য হবে যে, তারা যেন তাদের জ্ঞান দ্বারা উপকার লাভ করে এবং তোমার আনুগত্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর অন্যদের কাছেও যেন সত্য কথা প্রকাশ করে দেয়। দেখো! কাফিরদের দৃষ্টান্ত কতই না জঘন্য যে, তারা কুকুরের মত শুধু খাদ্য ভক্ষণ ও কুপ্রবৃত্তির মধ্যে পড়ে রয়েছে! সুতরাং যে কেউই ইলম ও হিদায়াতকে ছেড়ে দিয়ে কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার কাজে লেগে পড়বে সে-ই হবে কুকুরের মত । যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জঘন্য দৃষ্টান্ত যেন আমাদের উপর প্রয়োগ করা না হয়। অর্থাৎ কাউকে দেয়ার পর তা যে ব্যক্তি পুনরায় ফিরিয়ে নেয় তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ কুকুরের মত যে বমি করার পর পুনরায় তা খেয়ে নেয়।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে) ইরশাদ হচ্ছে। তারা নিজেরা নিজেদের উপর অত্যাচার করেছে। কেননা, তারা হিদায়াতের অনুসরণ করেনি। তারা দুনিয়া ও দুনিয়ার ভোগ বিলাসের মধ্যে পতিত হয়েছে। এটা আল্লাহর অত্যাচার নয়।

আল-আরাফ 7:176

১৭৫-১৭৭ নং আয়াতের তাফসীর: এটা ছিল বানী ইসরাঈলের মধ্যকার একটি লোক। তার নাম ছিল বালআম ইবনে বাউর। (এটা আব্দুর রাযযাক (রঃ) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) কাতাদা (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তার নাম ছিল সায়ফী ইবনে রাহিব। কা'ব (রঃ) বলেন যে, সে ছিল বালকাবাসী এক লোক। সে ইসমে আ'যম জানতো। সে ইয়াহূদী আলিমদের সাথে বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থান করতো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন। যে, সে ছিল ইয়ামনের অধিবাসী। আল্লাহ তা'আলা তাকে স্বীয় নিদর্শনাবলী ও কারামাত দান করেছিলেন। কিন্তু সে ঐগুলোর মর্যাদা দেয়নি। তার প্রার্থনা কবুল করা হতো। জনগণ বিপদ-আপদের সময় আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনার জন্যে তাকেই আগে বাড়িয়ে দিতো। আল্লাহর নবী হযরত মূসা (আঃ) দ্বীনের তাবলীগের জন্যে তাকে মাদইয়ান দেশে প্রেরণ করেন। সেখানকার বাদশাহ্ তাকে নিজের পক্ষে করে নেয় এবং বহু উপঢৌকন প্রদান করে। সে বাদশাহর দ্বীন কবুল করে নেয় এবং হযরত মূসা (আঃ)-এর দ্বীন পরিত্যাগ করে। তার নাম ছিল বালআ’ম। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, সে হচ্ছে উমাইয়া ইবনে আবি সালাত। খুব সম্ভব এটা বলার উদ্দেশ্য এই হবে যে, এই উমাইয়াও ঐ লোকটির সাথে সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। এই লোকটিও পূর্ববর্তী শরীয়তের জ্ঞান রাখতো। কিন্তু ওটা থেকে সে উপকার গ্রহণ করেনি। সে নবী (সঃ)-এর যুগও পেয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (রঃ)-এর নিদর্শনগুলো সে স্বচক্ষে দেখেছিল এবং তার মু'জিযাগুলো অবলোকন করেছিল। সে হাজার হাজার লোককে আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করতে দেখেছে। কিন্তু মুশরিকদের সাথে মেলামেশা, তাদের মধ্যে তার সম্মান ও মর্যাদা এবং নেতৃত্ব লাভ তাকে ইসলাম ও সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। বদর যুদ্ধে নিহত কাফিরদের জন্যে বড় বড় শাক গাঁথা সে রচনা করেছিল। তার মুখ তো ঈমান এনেছিল, কিন্তু তার অন্তর মুমিন হয়নি। খুব সম্ভব এই সমুদয় ঘটনা উমাইয়া ইবনে আবি সালাতের সাথেই সম্পর্কযুক্ত, বালআ’মের সাথে নয়।বালআমের বর্ণনা কুরআন কারীমের মধ্যে এইভাবে হচ্ছে- ‘আমি তাকে আমার নিদর্শনসমূহ অর্থাৎ কারামাত দান করেছিলাম। কিন্তু সে তা থেকে সরে পড়ে অর্থাৎ বঞ্চিত হয়। আল্লাহ তা'আলা তাকে তিনটি দুআর অধিকার দিয়েছিলেন যে, সেগুলো কবুল হবে। তার একটি স্ত্রী ও একটি পুত্র ছিল। তার স্ত্রী তাকে বললোঃ “তুমি আমার জন্যে একটি দু'আ নির্দিষ্ট করে নাও”। সে বললো, “আচ্ছা, কি দুআ বল।” স্ত্রী বললোঃ “আল্লাহর নিকট দু'আ কর যে, আল্লাহ তা'আলা যেন আমাকে বানী ইসরাঈলের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী করে দেন।” সে তখন আল্লাহ তা'আলার নিকট ঐ দু'আই করলো। ফলে তার স্ত্রী সর্বাপেক্ষা সুন্দরী নারীতে পরিণত হয়ে গেল। তার স্ত্রী যখন অনুভব করলো যে, তার মত সুন্দরী নারী আর নেই তখন সে তার স্বামীকে অগ্রাহ্য করে বসলো এবং তার প্রতি অনীহা প্রকাশ করলো। আর তার ধারণা ও কার্যাবলী অন্যরূপ হয়ে গেল। তখন বালআম দুআ করলো যে, যেন তার স্ত্রী কুকুরী হয়ে যায় । সুতরাং সে কুকুরী হয়ে গেল। এভাবে দু’টি দুআ শেষ হয়ে গেল। তার ছেলেটি তখন তাকে বললোঃ “আব্বা! আমার মা কুকুরী হয়ে থাকবে এটাতো আমাদের জন্যে মোটেই শোভনীয় নয়। জনগণ আমাদের নিন্দে করছে। সুতরাং আপনি দুআ করুন যেন আমার মা পূর্বাবস্থায় চলে আসে। সে তখন দুআ করলো। ফলে তার স্ত্রী পূর্বে যেমন ছিল তেমনি হয়ে গেল। এখন তিনটি দুআ’ই শেষ হয়ে গেল। এই বর্ণনাটি গারীব।এই আয়াতটির প্রসিদ্ধ শানে নুযূল এই যে, বানী ইসরাঈলের যুগে একটি লোক ছিল। সে জাব্বারীন ইয়াহূদীদের শহরে বাস করতো। সে ইসমে আযম জানতো। কথিত আছে যে, তার দুআ আল্লাহর পক্ষ থেকে গৃহীত হতো। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর কথা, যা কোন কোন লোক বলে থাকে তা এই যে, সে নবী ছিল, কিন্তু নবুওয়াত তার থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। ইবনে জারীর (রঃ)-এর এরূপ উক্তি রয়েছে। কিন্তু এটা মোটেই সঠিক নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হযরত মূসা (আঃ) যখন জাব্বারীনদের শহরে আগমন করেন তখন বালআ’মের কাছে তার লোকেরা এসে বলেঃ “মূসা (আঃ) একজন লৌহমানব। তার সাথে বিরাট সেনাবাহিনী রয়েছে। যদি তিনি আমাদের উপর জয়যুক্ত হন তবে আমরা সবাই ধ্বংস হয়ে যাবো। সুতরাং আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করুন যেন মূসা (আঃ) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের বিপদ আমাদের থেকে দূরীভূত হয়।” সে বললোঃ “যদি আমি এই দুআ করি তবে আমার দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ই নষ্ট হয়ে যাবে।” কিন্তু জনগণ পীড়াপীড়ি করায় সে ঐরূপ দুআ করলো। ফলে আল্লাহ তা'আলা তার বুযুগী ও কারামাত ছিনিয়ে নেন। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ সে কারামাত থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল এবং শয়তান তার পিছনে লেগে পড়লো। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যখন মূসা (আঃ)-এর জন্যে তীহের ময়দানে চল্লিশ বছরের চক্র শেষ হয়ে গেল তখন আল্লাহ তা'আলা ইউশা ইবনে নূন (আঃ)-কে নবী করে পাঠালেন। তিনি বানী ইসরাঈলকে নিজের নবী হওয়ার সংবাদ দিলেন এবং এ খবরও দিলেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে জাব্বারীনদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। জাব্বারীনরা হযরত ইউশা (আঃ)-এর বায়আত গ্রহণ করে এবং তার সত্যতা স্বীকার করে নেয়। কিন্তু বানী ইসরাঈলের বালআম নামক একটি লোক অবাধ্যাচরণ করতঃ জাব্বারীনদের কাছে গমন করে এবং তাদেরকে বলেঃ “ভয় করো না। যখন তোমরা যুদ্ধের জন্যে বের হবে তখন আমি বদ দুআ’র হাতিয়ার কাজে লাগাবো এবং তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে।” জাব্বারীনদের কাছে বালআমের পার্থিব সুখ-সম্ভোগের সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু তাদের স্ত্রীদের নিকট থেকে কোনই উপকার লাভ করতে পারতো না। কেননা, ঐ স্ত্রীলোকদের শ্রেষ্ঠত্ব তার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। সে শুধুমাত্র নিজের গর্দভী অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক রাখতো। এখন শয়তান তার পিছনে লেগে গেল। অর্থাৎ সে শয়তানের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পড়লো। সুতরাং সে শয়তানের আদেশ পালন করতে শুরু করলো।(আরবী) অর্থাৎ “সে পথভ্রষ্টদের বা ধ্বংসপ্রাপ্তদের অথবা উড্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” ভাল লোকও কোন সময় মন্দ লোকে পরিণত হয়। এই আয়াতের অর্থের ব্যাপারে হাদীস এসেছে। হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের ব্যাপারে আমি এই প্রকারের কিছুটা আশংকা করে থাকি। যেমন ঐ ব্যক্তি, যার কুরআনের জ্ঞান ছিল। কুরআনের বরকত ও সৌন্দর্য তার চেহারায় প্রকাশমান ছিল এবং তার ইসলামী শান-শওকতও ছিল। কিন্তু আল্লাহর দেয়া দুর্ভাগ্য তাকে ঘিরে ফেলে। ইসলামের নির্দেশাবলী সে পৃষ্ঠ-পিছনে ছুঁড়ে ফেলে। সে তার প্রতিবেশীর উপর তরবারী দ্বারা আক্রমণ চালায় এবং তাকে শিরকের অপবাদ দেয়।” বর্ণনাকারী বলেনঃ আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী (সঃ)! অপবাদদাতা অপরাধী ছিল, না যার উপর অপবাদ দেয়া হয়েছিল সেই অপরাধী ছিল? তিনি উত্তরে বললেনঃ “অপবাদদাতাই অপরাধী ছিল।” (এটা হাফিয আবু ইয়ালা আল মূসিলী (রঃ) তাখরীজ করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেনযে, এর ইসনাদ খুবই উত্তম)ইরশাদ হচ্ছে- আমি ইচ্ছা করলে তাকে এই আয়াতসমূহের সাহায্যে উন্নত করতাম। কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়ে এবং স্বীয় কামনা বাসনার অনুসরণ করতে থাকে। সে এমনভাবে দুনিয়ার ফাঁদে পড়ে যায় যেমনভাবে কোন অজ্ঞান লোক পড়ে থাকে। সে শয়তানের সহকর্মী হয়ে যায় এবং নীচতা ও হীনতা অবলম্বন করে। তার সওয়ারী আল্লাহকে সিজদা করে, কিন্তু সে সিজদা করে শয়তানকে। এই আয়াতের ব্যাপারে ইবনে সিয়ার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে নিয়ে ঐ ভূ-খণ্ডের অভিমুখে রওয়ানা হন যেখানে বালআম বাস করতো অথবা তিনি সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। হযরত মূসা (আঃ) ও তার সেনাবাহিনীর আগমন বার্তায় তথাকার লোক ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা বালআমের কাছে এসে বলেঃ “মূসা (আঃ) ও তাঁর সেনাবাহিনীর জন্যে বদ দুআ করুন।” তখন সে বলেঃ “তোমরা অপেক্ষা কর, আমি আমার প্রতিপালকের সাথে পরামর্শ করে নেই।” অতঃপর সে পরামর্শ করলে তাকে বলা হয়ঃ “না বদ দুআ করো না। কেননা, তারা আমার বান্দা। তাছাড়া তাদের মধ্যে আমার নবীও বিদ্যমান রয়েছে। তখন সে তার সম্প্রদায়ের লোকদেরকে বললোঃ “আমি আমার প্রভুর সাথে পরামর্শ করেছি। তিনি আমাকে বদ দুআ করতে নিষেধ করেছেন। এরপর জনগণ তার কাছে বহু উপঢৌকন পাঠিয়ে দেয়। তার উচিত ছিল ঐগুলো গ্রহণ না করা। কিন্তু সে ওগুলো গ্রহণ করে নেয়। তারপর লোকেরা আবার তাকে বদ দুআ করার জন্যে পীড়াপীড়ি শুরু করে দেয়। সে বলেঃ “আচ্ছা, পুনরায় আমি পরামর্শ করে দেখি।” এবার কিন্তু তাকে কোনই পরামর্শ দেয়া হলো না। সে জনগণকে বললোঃ “এবার তো আমাকে কোনই পরামর্শ দেয়া হয়নি। কাজেই আমি বদ দুআ করতে পারি না।” কিন্তু জনগণ তাকে বিভ্রান্ত করে ফেললো। তারা তাকে বললোঃ “যদি এতে আল্লাহর সম্মতি না থাকতো তবে পূর্বের ন্যায় এবারও বদ দুআ করতে আপনাকে নিষেধ করে দিতেন। আল্লাহ তা'আলা যখন নীরব রয়েছেন তখন বুঝা যাচ্ছে যে, এতে তাঁর সম্মতি আছে। তাদের এ কথায় বালআম প্রতারিত হয়ে পড়লো। সুতরাং সে মূসা (আঃ) ও তার সেনাবাহিনীর উপর বদ দুআ করতে শুরু করলো। যখনই সে বদ দুআ’র শব্দ মূসা (আঃ)-এর জন্যে বের করতে চাইতো তখনই তার মুখ দিয়ে তার নিজের কওমের জন্যে বদদুআ’র শব্দ বেরিয়ে পড়তো। নিজের কওমের জন্যে বিজয়ের শব্দ বের করতে চাইলে হযরত মূসা (আঃ)-এর বিজয়ের শব্দ তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতো। অথবা দুআ’র শেষে। ইনশাআল্লাহ শব্দটি বেরিয়ে পড়তো। কাজেই বদ দুআ শর্তযুক্ত হওয়ার কারণে ব্যর্থ হয়ে যেতো। লোকেরা তখন তাকে বললোঃ “আপনি যে মূসা (আঃ)-এর পরিবর্তে আমাদের উপরই বদ দুআ করছেন।” সে বললোঃ “আমি করবো কি? অনিচ্ছাকৃত ভাবেই আমার মুখ দিয়ে এগুলো বেরিয়ে পড়ছে। আমার এখন পূর্ণ বিশ্বাস হয়ে গেছে যে, আমি বদ দুআ করলেও তা কবুল হবে না। এখন আমি তোমাদেরকে একটি তদবীর শিখিয়ে দিচ্ছি। এটা করলে এ লোকগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। দেখো! আল্লাহ তা'আলা ব্যভিচারকে হারাম করেছেন। তিনি ব্যভিচার কার্যে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। যদি এই লোকগুলোকে কোন রকমে ব্যভিচারে জড়িত করে দেয়া যায় তবে অবশ্যই তাদের ধ্বংসের আশা রয়েছে। অতএব তোমরা এই কাজ কর যে, তোমাদের স্ত্রীদেরকে মূসা (আঃ)-এর সেনাবাহিনীর মধ্যে পাঠিয়ে দাও। এরা তো স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে ছেড়ে বিদেশে পড়ে আছে, সুতরাং তারা যে ব্যভিচারে জড়িত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই।” তার কথামত লোকগুলো ঐ কাজই করলো। তারা তাদের স্ত্রীদেরকে হযরত মূসা (আঃ)-এর সেনাবাহিনীর নিকট পাঠিয়ে দিলো। এমন কি তাদের বাদশাহর কন্যাও ছাড়া পড়লো না। শাহজাদীকে তার পিতা অথবা বালআম বলে দিলো যে, সে যেন হযরত মূসা (আঃ) ছাড়া আর কারো ব্যবহারে না আসে। কথিত আছে যে, সত্যিই লোকগুলো ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। শাহজাদীর কাছে বানী ইসরাঈলের একজন সর্দার এসে গেল এবং তার থেকে কাম বাসনা পূর্ণ করতে চাইলো। বাদশাহর কন্যা তাকে বললো যে, সে মূসা (আঃ) ছাড়া আর কাউকেও তার সাথে জড়িত হতে দেবে না। সর্দার বললোঃ “আমি উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত রয়েছি এবং আমার এই শান-শওকত রয়েছে।” কন্যা তখন তার পিতাকে চিঠি লিখে এ ব্যাপারে পরামর্শ চাইলো । পিতা তাকে অনুমতি দিলো । তারা দু’জন তখন ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়লো। এমতাবস্থায় হযরত হারূন (আঃ)-এর এক ছেলে তথায় উপস্থিত হলেন। তাঁর হাতে একটি বর্শা ছিল । তিনি তাদের উপর এমন জোরে বর্শা মেরে দিলেন যে তারা দু'জনই একই বর্শায় গেঁথে গেল। তিনি সেই বর্শাকে উচু করে ধরে জনগণের সামনে আসলেন এবং তারা ঐ দু’জনকে ঐ অবস্থায় স্বচক্ষে দেখে নিলো । আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের উপর মহামারীর শাস্তি নাযিল করলেন। ফলে সত্তর হাজার লোক মারা গেল। ইবনে সিয়ার (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, বালআম স্বীয় গর্দভীর ওপর সওয়ার হয়ে মা’লী নামক জায়গা পর্যন্ত আসলো। এখান থেকে তার সওয়ারী আর আগে বাড়ে না। সে ওকে মারতে শুরু করলো, কিন্তু ওটা বসেই যাচ্ছিল। আল্লাহ তা'আলা ওকে বাকশক্তি দান করলেন। গর্দভীটি তখন বালআমকে বললোঃ “তুমি আমাকে মারছো কেন? সামনে দেখো কে আছে?” সে দেখলো যে শয়তান দাড়িয়ে আছে। সে নেমে গিয়ে শয়তানকে সিজদা করলো। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবী)সালিম (রঃ) আবূ নযর (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) যখন সিরিয়া হতে বানী কিনআ’নে আসেন তখন বালআমকে তার কওমের লোকেরা বলেঃ “মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়সই আমাদের দেশে আসছেন। তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদেরকে হত্যা করে আমাদের এখানে তার লোকদেরকে বসিয়ে দেয়া। আমরা আপনার কওমেরই লোক। আমাদের অন্য কোন বাসস্থান নেই। আল্লাহ তা'আলা আপনার দুআ কবুল করে থাকেন। সুতরাং আপনি তাদের জন্যে মহান আল্লাহর নিকট বদ দুআ করুন।” সে বললোঃ “তোমরা নিপাত যাও! মূসা (আঃ) হচ্ছেন আল্লাহর নবী। তার সাহায্যার্থে ফেরেশতারাও রয়েছেন। এবং মুমিনরাও রয়েছেন। সুতরাং আমি তাঁদের উপর কিরূপে বদ দুআ করতে পারি? আমি যা জানি তা জানিই।” তার ললাকেরা তখন বললোঃ “তাহলে আমরা থাকবো কোথায়?” এভাবে সব সময় তারা তার উপর চাপ দিতে থাকে এবং বিনীতভাবে বদ দুআ করার জন্যে তার কাছে আবেদন জানাতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সে পরীক্ষায় নিক্ষিপ্ত হয়। সে স্বীয় গর্দভীর উপর সওয়ার হয়ে একটি পাহাড় অভিমুখে গমন করে, যে পাহাড়ের উপর চড়ে সে বানী ইসরাঈলের সেনাবাহিনীকে দেখতে পাবে। ঐ পাহাড়টিকে হাসান পাহাড় বলা হয়। কিছু দূর গিয়ে তার গর্দভীটি বসে পড়ে। সে তখন নেমে গর্দভীকে মারতে শুরু করে। কিছুদূর গিয়ে আবার সে বসে পড়ে। বার বার যখন তাকে মারতে থাকে তখন আল্লাহ তাকে বাশক্তি দান করেন। সে বলে ওঠে- “হে বালআ'ম! তুমি আমাকে কোন্ দিকে নিয়ে যাচ্ছ? তুমি কি দেখছো না যে, ফেরেশতা আমার সামনে রয়েছেন? তিনি আমাকে ধাক্কা দিয়ে পিছনে সরিয়ে দিচ্ছেন। তুমি আল্লাহর নবী ও মুমিনদের উপর বদ দুআ করতে যাচ্ছ!” সে কিন্তু তবুও বিরত হলো না। পুনরায় সে গর্দভীকে মারতে শুরু করলো। এবার আল্লাহর নির্দেশক্রমে সে হাসবান নামক পাহাড়ের উপর উঠে গেল। ওখানে পৌছে বালআম হযরত মূসা (আঃ) ও মুমিনদের উপর বদ দুআ করতে শুরু করে দিলো। কিন্তু তার জিহ্বা উল্টে যাচ্ছিল। তার মুখ দিয়ে তার কওমের জন্যে বদ দুআ' এবং মূসা (আঃ)-এর জন্যে ভাল দুআ বের হচ্ছিল। কথিত আছে যে, বদ দুআ করার সময় তার জিহ্বা বাইরে বেরিয়ে পড়েছিল এবং তার বক্ষের উপর লম্বা হয়ে লটকে গিয়েছিল। তখন সে বলে উঠেছিলঃ “আমার দুনিয়াও গেল, দ্বীনও গেল।” কওমের লোককে সে বললোঃ “এখন শুধু প্রতারণা ও কৌশল দ্বারা কাজ নেয়া যেতে পারে। তোমরা নিজেদের মেয়েদেরকে সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিত করে বানী ইসরাঈলের সৈন্যদের মধ্যে পাঠিয়ে দাও। তাদেরকে বলে দাও যে, তারা যেন ঐ পুরুষ লোকদেরকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করে নেয়। যদি একটি লোকও ব্যভিচারে জড়িয়ে পড়ে তবে জেনে রেখো যে, তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।” তার কথামত নারীদেরকে বানী ইসরাঈলের সেনাবাহিনীর মধ্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়।কিনআ'নবাসীর একটি স্ত্রীলোকের নাম ছিল কাসবতী। সুর নামক একটি লোক ছিল কওমের সর্দার ও বাদশাহ্। কাসবতী ছিল তারই কন্যা। এই কাসবতীর মিলন ঘটে যামরী ইবনে শালুম নামক বানী ইসরাঈলের এক সর্দারের সাথে। এই যামরী ছিল শামউন ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইসহাক ইবনে। ইবরাহীমের পৌত্র। সে ছিল কওমের সর্দার। সে কাসবতীকে দেখে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। সে তার হাত ধরে হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট নিয়ে গেল এবং তাকে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আপনি হয়তো এ কথাই বলবেন যে, এ মেয়েটি তোমার জন্যে হারাম। সুতরাং তুমি তার কাছে যেয়ো না।” হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “হ্যা! এ নারী তোমার জন্যে হারাম।” সে তখন বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আল্লাহর কসম! এখানে তো আমি আপনার কথা মানবো না।” অতঃপর সে মেয়েটিকে তার তাঁবুতে নিয়ে গেল এবং তাকে নিয়ে একই বিছানায় রাত্রি কাটালো। আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের মধ্যে মহামারী ছড়িয়ে দিলেন। ফানহাস ইবনে আনীরার ইবনে হারূন নামক কওমের সর্দার যামরী ইবনে শালুমের এই কাজের সময় সেখানে উপস্থিত ছিল না। যামরীর এই দুষ্কার্যের ফলে বানী ইসরাঈলের সমস্ত কওমের মধ্যে মহামারী ছড়িয়ে পড়ে। পরে ফানহাস এই সমুদয় ঘটনা অবগত হয়। সে স্বীয় লৌহ-বর্শাটি উঠিয়ে নিয়ে যামরীর তাঁবুতে প্রবেশ করে। ঐ সময় তারা দু'জন শায়িত অবস্থায় ছিল। দু’জনকেই সে একই বর্শায় গেঁথে নেয় এবং ঐ অবস্থাতেই বর্শাটিকে মাথায় উঠিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ফানহাস ছিল যুবক ও শক্তিশালী লোক। সে বলতে বলতে যাচ্ছিলঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনার নাফরমান বান্দার সাথে এই ব্যবহার করলাম। সুতরাং আপনি মহামারী দূর করে দিন!” আল্লাহ পাক মহামারী দুর করলেন। ঐ মহামারীতে বানী ইসরাঈলের সত্তর হাজার লোক অথবা কমপক্ষে বিশ হাজার লোক মারা যায়। (এটা মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) সালিম (রঃ) ও আবু নযর (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। ইবনে জারীর (রঃ) অনুরূপভাবে এটা তাখরীজ করেছেন এবং তাতে রয়েছে যে, কিছু সংখ্যক সৈন্য কর্তৃক ব্যভিচার কার্য সংঘটিত হয় যারা হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে ছিল। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে মহামারী দ্বারা আক্রান্ত করেন। তাতে সত্তর হাজার লোক মারা যায়) ফানহাসের এই কার্যের কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে বানী ইসরাঈল যখনই কিছু যবেহ করতো তখন ওর মাথা ও সামনের পা এবং নিজেদের ফলমূলের প্রথম জিনিস তার (ফানহাসের) সন্তানদেরকে নানা স্বরূপ প্রদান করতো।(আরবী)-এই আয়াতের তাফসীরে মুফাসসিরদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, বালআ’মের জিহ্বা লটকে তার বক্ষে গিয়ে পড়েছিল। তাই, তার দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে কুকুরের সঙ্গে যে, যদি তাকে কষ্ট দেয়া হয় তবে সে হাঁপাবে এবং কষ্ট না দিলেও হাঁপাবে। তদ্রপ বালআ’মেরও অবস্থা যে, তার উপর কারামাত নাযিল হাক অথবা দুঃখ-বেদনা নাযিল হাক, একই কথা। অথবা এই দৃষ্টান্ত তার পথভ্রষ্টতা এবং তাকে ঈমানের দিকে ডাকা বা না ডাকা উভয় অবস্থাতেই তার দ্বারা উপকৃত না হওয়ার ব্যাপারে কুকুরের সাথে দেয়া হয়েছে যে, তাকে তাড়ালেও সে জিহ্বা লটকিয়ে হাঁপাবে এবং না তাড়ালেও হাঁপাবে। তদ্রুপ বালআমকেও যদি ঈমানের দিকে আহ্বান করা যায় তবে তার দ্বারা সে উপকার গ্রহণ করবে না এবং আহ্বান না করলেও উপকার লাভ করবে না। এই ধরনেরই একটি কথা আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “তুমি তাদেরকে ভয় প্রদর্শন কর বা না কর, তারা ঈমান আনবে না।” এইরূপ আর একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তুমি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর বা না কর, আল্লাহ কখনও তাদেরকে ক্ষমা করবেন না।” অথবা এর অর্থ এও হতে পারে যে, কাফির মুনাফিক এবং পথভ্রষ্ট লোকের অন্তর দুর্বল হয় এবং তা হিদায়াত শূন্য থাকে। যতই চেষ্টা করা যাক না কেন তারা হিদায়াত প্রাপ্ত হবে না।' (অনুরূপ বর্ণনা হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে নকল করা হয়েছে)আল্লাহ পাক স্বীয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে রাসূল (সঃ)! তুমি জনগণকে এ ঘটনাগুলো শুনিয়ে দাও, যাতে তারা বানী ইসরাঈলের অবস্থা অবহিত হওয়ার পর চিন্তা-ভাবনা করতঃ আল্লাহর পথে এসে যায় এবং চিন্তা করে যে, বালআ’মের অবস্থা কি হয়েছিল। আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান রূপ মহামূল্যবান সম্পদকে সে দুনিয়ার নগণ্য আরাম ও বিলাসিতার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়। শেষে সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই হারিয়ে ফেলে । অনুরূপভাবে এই ইয়াহূদী আলেমরা যারা তাদের কিতাবসমূহে আল্লাহর হিদায়াত পাঠ করছে এবং তোমার গুণাবলী তাতে লিপিবদ্ধ দেখছে, তাদের উচিত হবে দুনিয়ার মোহে নিমজ্জিত হয়ে শিষ্যদেরকে ভুল পথে চালিত না করা। নতুবা তারাও ইহকাল ও পরকাল দু-ই হারাবে। তাদের কর্তব্য হবে যে, তারা যেন তাদের জ্ঞান দ্বারা উপকার লাভ করে এবং তোমার আনুগত্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর অন্যদের কাছেও যেন সত্য কথা প্রকাশ করে দেয়। দেখো! কাফিরদের দৃষ্টান্ত কতই না জঘন্য যে, তারা কুকুরের মত শুধু খাদ্য ভক্ষণ ও কুপ্রবৃত্তির মধ্যে পড়ে রয়েছে! সুতরাং যে কেউই ইলম ও হিদায়াতকে ছেড়ে দিয়ে কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার কাজে লেগে পড়বে সে-ই হবে কুকুরের মত । যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জঘন্য দৃষ্টান্ত যেন আমাদের উপর প্রয়োগ করা না হয়। অর্থাৎ কাউকে দেয়ার পর তা যে ব্যক্তি পুনরায় ফিরিয়ে নেয় তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ কুকুরের মত যে বমি করার পর পুনরায় তা খেয়ে নেয়।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে) ইরশাদ হচ্ছে। তারা নিজেরা নিজেদের উপর অত্যাচার করেছে। কেননা, তারা হিদায়াতের অনুসরণ করেনি। তারা দুনিয়া ও দুনিয়ার ভোগ বিলাসের মধ্যে পতিত হয়েছে। এটা আল্লাহর অত্যাচার নয়।

আল-আরাফ 7:177

১৭৫-১৭৭ নং আয়াতের তাফসীর: এটা ছিল বানী ইসরাঈলের মধ্যকার একটি লোক। তার নাম ছিল বালআম ইবনে বাউর। (এটা আব্দুর রাযযাক (রঃ) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন) কাতাদা (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তার নাম ছিল সায়ফী ইবনে রাহিব। কা'ব (রঃ) বলেন যে, সে ছিল বালকাবাসী এক লোক। সে ইসমে আ'যম জানতো। সে ইয়াহূদী আলিমদের সাথে বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থান করতো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন। যে, সে ছিল ইয়ামনের অধিবাসী। আল্লাহ তা'আলা তাকে স্বীয় নিদর্শনাবলী ও কারামাত দান করেছিলেন। কিন্তু সে ঐগুলোর মর্যাদা দেয়নি। তার প্রার্থনা কবুল করা হতো। জনগণ বিপদ-আপদের সময় আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনার জন্যে তাকেই আগে বাড়িয়ে দিতো। আল্লাহর নবী হযরত মূসা (আঃ) দ্বীনের তাবলীগের জন্যে তাকে মাদইয়ান দেশে প্রেরণ করেন। সেখানকার বাদশাহ্ তাকে নিজের পক্ষে করে নেয় এবং বহু উপঢৌকন প্রদান করে। সে বাদশাহর দ্বীন কবুল করে নেয় এবং হযরত মূসা (আঃ)-এর দ্বীন পরিত্যাগ করে। তার নাম ছিল বালআ’ম। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, সে হচ্ছে উমাইয়া ইবনে আবি সালাত। খুব সম্ভব এটা বলার উদ্দেশ্য এই হবে যে, এই উমাইয়াও ঐ লোকটির সাথে সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। এই লোকটিও পূর্ববর্তী শরীয়তের জ্ঞান রাখতো। কিন্তু ওটা থেকে সে উপকার গ্রহণ করেনি। সে নবী (সঃ)-এর যুগও পেয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (রঃ)-এর নিদর্শনগুলো সে স্বচক্ষে দেখেছিল এবং তার মু'জিযাগুলো অবলোকন করেছিল। সে হাজার হাজার লোককে আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করতে দেখেছে। কিন্তু মুশরিকদের সাথে মেলামেশা, তাদের মধ্যে তার সম্মান ও মর্যাদা এবং নেতৃত্ব লাভ তাকে ইসলাম ও সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। বদর যুদ্ধে নিহত কাফিরদের জন্যে বড় বড় শাক গাঁথা সে রচনা করেছিল। তার মুখ তো ঈমান এনেছিল, কিন্তু তার অন্তর মুমিন হয়নি। খুব সম্ভব এই সমুদয় ঘটনা উমাইয়া ইবনে আবি সালাতের সাথেই সম্পর্কযুক্ত, বালআ’মের সাথে নয়।বালআমের বর্ণনা কুরআন কারীমের মধ্যে এইভাবে হচ্ছে- ‘আমি তাকে আমার নিদর্শনসমূহ অর্থাৎ কারামাত দান করেছিলাম। কিন্তু সে তা থেকে সরে পড়ে অর্থাৎ বঞ্চিত হয়। আল্লাহ তা'আলা তাকে তিনটি দুআর অধিকার দিয়েছিলেন যে, সেগুলো কবুল হবে। তার একটি স্ত্রী ও একটি পুত্র ছিল। তার স্ত্রী তাকে বললোঃ “তুমি আমার জন্যে একটি দু'আ নির্দিষ্ট করে নাও”। সে বললো, “আচ্ছা, কি দুআ বল।” স্ত্রী বললোঃ “আল্লাহর নিকট দু'আ কর যে, আল্লাহ তা'আলা যেন আমাকে বানী ইসরাঈলের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী করে দেন।” সে তখন আল্লাহ তা'আলার নিকট ঐ দু'আই করলো। ফলে তার স্ত্রী সর্বাপেক্ষা সুন্দরী নারীতে পরিণত হয়ে গেল। তার স্ত্রী যখন অনুভব করলো যে, তার মত সুন্দরী নারী আর নেই তখন সে তার স্বামীকে অগ্রাহ্য করে বসলো এবং তার প্রতি অনীহা প্রকাশ করলো। আর তার ধারণা ও কার্যাবলী অন্যরূপ হয়ে গেল। তখন বালআম দুআ করলো যে, যেন তার স্ত্রী কুকুরী হয়ে যায় । সুতরাং সে কুকুরী হয়ে গেল। এভাবে দু’টি দুআ শেষ হয়ে গেল। তার ছেলেটি তখন তাকে বললোঃ “আব্বা! আমার মা কুকুরী হয়ে থাকবে এটাতো আমাদের জন্যে মোটেই শোভনীয় নয়। জনগণ আমাদের নিন্দে করছে। সুতরাং আপনি দুআ করুন যেন আমার মা পূর্বাবস্থায় চলে আসে। সে তখন দুআ করলো। ফলে তার স্ত্রী পূর্বে যেমন ছিল তেমনি হয়ে গেল। এখন তিনটি দুআ’ই শেষ হয়ে গেল। এই বর্ণনাটি গারীব।এই আয়াতটির প্রসিদ্ধ শানে নুযূল এই যে, বানী ইসরাঈলের যুগে একটি লোক ছিল। সে জাব্বারীন ইয়াহূদীদের শহরে বাস করতো। সে ইসমে আযম জানতো। কথিত আছে যে, তার দুআ আল্লাহর পক্ষ থেকে গৃহীত হতো। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর কথা, যা কোন কোন লোক বলে থাকে তা এই যে, সে নবী ছিল, কিন্তু নবুওয়াত তার থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। ইবনে জারীর (রঃ)-এর এরূপ উক্তি রয়েছে। কিন্তু এটা মোটেই সঠিক নয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হযরত মূসা (আঃ) যখন জাব্বারীনদের শহরে আগমন করেন তখন বালআ’মের কাছে তার লোকেরা এসে বলেঃ “মূসা (আঃ) একজন লৌহমানব। তার সাথে বিরাট সেনাবাহিনী রয়েছে। যদি তিনি আমাদের উপর জয়যুক্ত হন তবে আমরা সবাই ধ্বংস হয়ে যাবো। সুতরাং আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করুন যেন মূসা (আঃ) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের বিপদ আমাদের থেকে দূরীভূত হয়।” সে বললোঃ “যদি আমি এই দুআ করি তবে আমার দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ই নষ্ট হয়ে যাবে।” কিন্তু জনগণ পীড়াপীড়ি করায় সে ঐরূপ দুআ করলো। ফলে আল্লাহ তা'আলা তার বুযুগী ও কারামাত ছিনিয়ে নেন। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ সে কারামাত থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল এবং শয়তান তার পিছনে লেগে পড়লো। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যখন মূসা (আঃ)-এর জন্যে তীহের ময়দানে চল্লিশ বছরের চক্র শেষ হয়ে গেল তখন আল্লাহ তা'আলা ইউশা ইবনে নূন (আঃ)-কে নবী করে পাঠালেন। তিনি বানী ইসরাঈলকে নিজের নবী হওয়ার সংবাদ দিলেন এবং এ খবরও দিলেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে জাব্বারীনদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। জাব্বারীনরা হযরত ইউশা (আঃ)-এর বায়আত গ্রহণ করে এবং তার সত্যতা স্বীকার করে নেয়। কিন্তু বানী ইসরাঈলের বালআম নামক একটি লোক অবাধ্যাচরণ করতঃ জাব্বারীনদের কাছে গমন করে এবং তাদেরকে বলেঃ “ভয় করো না। যখন তোমরা যুদ্ধের জন্যে বের হবে তখন আমি বদ দুআ’র হাতিয়ার কাজে লাগাবো এবং তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে।” জাব্বারীনদের কাছে বালআমের পার্থিব সুখ-সম্ভোগের সব কিছুই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু তাদের স্ত্রীদের নিকট থেকে কোনই উপকার লাভ করতে পারতো না। কেননা, ঐ স্ত্রীলোকদের শ্রেষ্ঠত্ব তার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। সে শুধুমাত্র নিজের গর্দভী অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক রাখতো। এখন শয়তান তার পিছনে লেগে গেল। অর্থাৎ সে শয়তানের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পড়লো। সুতরাং সে শয়তানের আদেশ পালন করতে শুরু করলো।(আরবী) অর্থাৎ “সে পথভ্রষ্টদের বা ধ্বংসপ্রাপ্তদের অথবা উড্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” ভাল লোকও কোন সময় মন্দ লোকে পরিণত হয়। এই আয়াতের অর্থের ব্যাপারে হাদীস এসেছে। হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের ব্যাপারে আমি এই প্রকারের কিছুটা আশংকা করে থাকি। যেমন ঐ ব্যক্তি, যার কুরআনের জ্ঞান ছিল। কুরআনের বরকত ও সৌন্দর্য তার চেহারায় প্রকাশমান ছিল এবং তার ইসলামী শান-শওকতও ছিল। কিন্তু আল্লাহর দেয়া দুর্ভাগ্য তাকে ঘিরে ফেলে। ইসলামের নির্দেশাবলী সে পৃষ্ঠ-পিছনে ছুঁড়ে ফেলে। সে তার প্রতিবেশীর উপর তরবারী দ্বারা আক্রমণ চালায় এবং তাকে শিরকের অপবাদ দেয়।” বর্ণনাকারী বলেনঃ আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী (সঃ)! অপবাদদাতা অপরাধী ছিল, না যার উপর অপবাদ দেয়া হয়েছিল সেই অপরাধী ছিল? তিনি উত্তরে বললেনঃ “অপবাদদাতাই অপরাধী ছিল।” (এটা হাফিয আবু ইয়ালা আল মূসিলী (রঃ) তাখরীজ করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেনযে, এর ইসনাদ খুবই উত্তম)ইরশাদ হচ্ছে- আমি ইচ্ছা করলে তাকে এই আয়াতসমূহের সাহায্যে উন্নত করতাম। কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়ে এবং স্বীয় কামনা বাসনার অনুসরণ করতে থাকে। সে এমনভাবে দুনিয়ার ফাঁদে পড়ে যায় যেমনভাবে কোন অজ্ঞান লোক পড়ে থাকে। সে শয়তানের সহকর্মী হয়ে যায় এবং নীচতা ও হীনতা অবলম্বন করে। তার সওয়ারী আল্লাহকে সিজদা করে, কিন্তু সে সিজদা করে শয়তানকে। এই আয়াতের ব্যাপারে ইবনে সিয়ার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে নিয়ে ঐ ভূ-খণ্ডের অভিমুখে রওয়ানা হন যেখানে বালআম বাস করতো অথবা তিনি সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। হযরত মূসা (আঃ) ও তার সেনাবাহিনীর আগমন বার্তায় তথাকার লোক ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা বালআমের কাছে এসে বলেঃ “মূসা (আঃ) ও তাঁর সেনাবাহিনীর জন্যে বদ দুআ করুন।” তখন সে বলেঃ “তোমরা অপেক্ষা কর, আমি আমার প্রতিপালকের সাথে পরামর্শ করে নেই।” অতঃপর সে পরামর্শ করলে তাকে বলা হয়ঃ “না বদ দুআ করো না। কেননা, তারা আমার বান্দা। তাছাড়া তাদের মধ্যে আমার নবীও বিদ্যমান রয়েছে। তখন সে তার সম্প্রদায়ের লোকদেরকে বললোঃ “আমি আমার প্রভুর সাথে পরামর্শ করেছি। তিনি আমাকে বদ দুআ করতে নিষেধ করেছেন। এরপর জনগণ তার কাছে বহু উপঢৌকন পাঠিয়ে দেয়। তার উচিত ছিল ঐগুলো গ্রহণ না করা। কিন্তু সে ওগুলো গ্রহণ করে নেয়। তারপর লোকেরা আবার তাকে বদ দুআ করার জন্যে পীড়াপীড়ি শুরু করে দেয়। সে বলেঃ “আচ্ছা, পুনরায় আমি পরামর্শ করে দেখি।” এবার কিন্তু তাকে কোনই পরামর্শ দেয়া হলো না। সে জনগণকে বললোঃ “এবার তো আমাকে কোনই পরামর্শ দেয়া হয়নি। কাজেই আমি বদ দুআ করতে পারি না।” কিন্তু জনগণ তাকে বিভ্রান্ত করে ফেললো। তারা তাকে বললোঃ “যদি এতে আল্লাহর সম্মতি না থাকতো তবে পূর্বের ন্যায় এবারও বদ দুআ করতে আপনাকে নিষেধ করে দিতেন। আল্লাহ তা'আলা যখন নীরব রয়েছেন তখন বুঝা যাচ্ছে যে, এতে তাঁর সম্মতি আছে। তাদের এ কথায় বালআম প্রতারিত হয়ে পড়লো। সুতরাং সে মূসা (আঃ) ও তার সেনাবাহিনীর উপর বদ দুআ করতে শুরু করলো। যখনই সে বদ দুআ’র শব্দ মূসা (আঃ)-এর জন্যে বের করতে চাইতো তখনই তার মুখ দিয়ে তার নিজের কওমের জন্যে বদদুআ’র শব্দ বেরিয়ে পড়তো। নিজের কওমের জন্যে বিজয়ের শব্দ বের করতে চাইলে হযরত মূসা (আঃ)-এর বিজয়ের শব্দ তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতো। অথবা দুআ’র শেষে। ইনশাআল্লাহ শব্দটি বেরিয়ে পড়তো। কাজেই বদ দুআ শর্তযুক্ত হওয়ার কারণে ব্যর্থ হয়ে যেতো। লোকেরা তখন তাকে বললোঃ “আপনি যে মূসা (আঃ)-এর পরিবর্তে আমাদের উপরই বদ দুআ করছেন।” সে বললোঃ “আমি করবো কি? অনিচ্ছাকৃত ভাবেই আমার মুখ দিয়ে এগুলো বেরিয়ে পড়ছে। আমার এখন পূর্ণ বিশ্বাস হয়ে গেছে যে, আমি বদ দুআ করলেও তা কবুল হবে না। এখন আমি তোমাদেরকে একটি তদবীর শিখিয়ে দিচ্ছি। এটা করলে এ লোকগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। দেখো! আল্লাহ তা'আলা ব্যভিচারকে হারাম করেছেন। তিনি ব্যভিচার কার্যে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। যদি এই লোকগুলোকে কোন রকমে ব্যভিচারে জড়িত করে দেয়া যায় তবে অবশ্যই তাদের ধ্বংসের আশা রয়েছে। অতএব তোমরা এই কাজ কর যে, তোমাদের স্ত্রীদেরকে মূসা (আঃ)-এর সেনাবাহিনীর মধ্যে পাঠিয়ে দাও। এরা তো স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে ছেড়ে বিদেশে পড়ে আছে, সুতরাং তারা যে ব্যভিচারে জড়িত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই।” তার কথামত লোকগুলো ঐ কাজই করলো। তারা তাদের স্ত্রীদেরকে হযরত মূসা (আঃ)-এর সেনাবাহিনীর নিকট পাঠিয়ে দিলো। এমন কি তাদের বাদশাহর কন্যাও ছাড়া পড়লো না। শাহজাদীকে তার পিতা অথবা বালআম বলে দিলো যে, সে যেন হযরত মূসা (আঃ) ছাড়া আর কারো ব্যবহারে না আসে। কথিত আছে যে, সত্যিই লোকগুলো ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। শাহজাদীর কাছে বানী ইসরাঈলের একজন সর্দার এসে গেল এবং তার থেকে কাম বাসনা পূর্ণ করতে চাইলো। বাদশাহর কন্যা তাকে বললো যে, সে মূসা (আঃ) ছাড়া আর কাউকেও তার সাথে জড়িত হতে দেবে না। সর্দার বললোঃ “আমি উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত রয়েছি এবং আমার এই শান-শওকত রয়েছে।” কন্যা তখন তার পিতাকে চিঠি লিখে এ ব্যাপারে পরামর্শ চাইলো । পিতা তাকে অনুমতি দিলো । তারা দু’জন তখন ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়লো। এমতাবস্থায় হযরত হারূন (আঃ)-এর এক ছেলে তথায় উপস্থিত হলেন। তাঁর হাতে একটি বর্শা ছিল । তিনি তাদের উপর এমন জোরে বর্শা মেরে দিলেন যে তারা দু'জনই একই বর্শায় গেঁথে গেল। তিনি সেই বর্শাকে উচু করে ধরে জনগণের সামনে আসলেন এবং তারা ঐ দু’জনকে ঐ অবস্থায় স্বচক্ষে দেখে নিলো । আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের উপর মহামারীর শাস্তি নাযিল করলেন। ফলে সত্তর হাজার লোক মারা গেল। ইবনে সিয়ার (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, বালআম স্বীয় গর্দভীর ওপর সওয়ার হয়ে মা’লী নামক জায়গা পর্যন্ত আসলো। এখান থেকে তার সওয়ারী আর আগে বাড়ে না। সে ওকে মারতে শুরু করলো, কিন্তু ওটা বসেই যাচ্ছিল। আল্লাহ তা'আলা ওকে বাকশক্তি দান করলেন। গর্দভীটি তখন বালআমকে বললোঃ “তুমি আমাকে মারছো কেন? সামনে দেখো কে আছে?” সে দেখলো যে শয়তান দাড়িয়ে আছে। সে নেমে গিয়ে শয়তানকে সিজদা করলো। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবী)সালিম (রঃ) আবূ নযর (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) যখন সিরিয়া হতে বানী কিনআ’নে আসেন তখন বালআমকে তার কওমের লোকেরা বলেঃ “মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়সই আমাদের দেশে আসছেন। তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদেরকে হত্যা করে আমাদের এখানে তার লোকদেরকে বসিয়ে দেয়া। আমরা আপনার কওমেরই লোক। আমাদের অন্য কোন বাসস্থান নেই। আল্লাহ তা'আলা আপনার দুআ কবুল করে থাকেন। সুতরাং আপনি তাদের জন্যে মহান আল্লাহর নিকট বদ দুআ করুন।” সে বললোঃ “তোমরা নিপাত যাও! মূসা (আঃ) হচ্ছেন আল্লাহর নবী। তার সাহায্যার্থে ফেরেশতারাও রয়েছেন। এবং মুমিনরাও রয়েছেন। সুতরাং আমি তাঁদের উপর কিরূপে বদ দুআ করতে পারি? আমি যা জানি তা জানিই।” তার ললাকেরা তখন বললোঃ “তাহলে আমরা থাকবো কোথায়?” এভাবে সব সময় তারা তার উপর চাপ দিতে থাকে এবং বিনীতভাবে বদ দুআ করার জন্যে তার কাছে আবেদন জানাতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সে পরীক্ষায় নিক্ষিপ্ত হয়। সে স্বীয় গর্দভীর উপর সওয়ার হয়ে একটি পাহাড় অভিমুখে গমন করে, যে পাহাড়ের উপর চড়ে সে বানী ইসরাঈলের সেনাবাহিনীকে দেখতে পাবে। ঐ পাহাড়টিকে হাসান পাহাড় বলা হয়। কিছু দূর গিয়ে তার গর্দভীটি বসে পড়ে। সে তখন নেমে গর্দভীকে মারতে শুরু করে। কিছুদূর গিয়ে আবার সে বসে পড়ে। বার বার যখন তাকে মারতে থাকে তখন আল্লাহ তাকে বাশক্তি দান করেন। সে বলে ওঠে- “হে বালআ'ম! তুমি আমাকে কোন্ দিকে নিয়ে যাচ্ছ? তুমি কি দেখছো না যে, ফেরেশতা আমার সামনে রয়েছেন? তিনি আমাকে ধাক্কা দিয়ে পিছনে সরিয়ে দিচ্ছেন। তুমি আল্লাহর নবী ও মুমিনদের উপর বদ দুআ করতে যাচ্ছ!” সে কিন্তু তবুও বিরত হলো না। পুনরায় সে গর্দভীকে মারতে শুরু করলো। এবার আল্লাহর নির্দেশক্রমে সে হাসবান নামক পাহাড়ের উপর উঠে গেল। ওখানে পৌছে বালআম হযরত মূসা (আঃ) ও মুমিনদের উপর বদ দুআ করতে শুরু করে দিলো। কিন্তু তার জিহ্বা উল্টে যাচ্ছিল। তার মুখ দিয়ে তার কওমের জন্যে বদ দুআ' এবং মূসা (আঃ)-এর জন্যে ভাল দুআ বের হচ্ছিল। কথিত আছে যে, বদ দুআ করার সময় তার জিহ্বা বাইরে বেরিয়ে পড়েছিল এবং তার বক্ষের উপর লম্বা হয়ে লটকে গিয়েছিল। তখন সে বলে উঠেছিলঃ “আমার দুনিয়াও গেল, দ্বীনও গেল।” কওমের লোককে সে বললোঃ “এখন শুধু প্রতারণা ও কৌশল দ্বারা কাজ নেয়া যেতে পারে। তোমরা নিজেদের মেয়েদেরকে সুন্দর সুন্দর সাজে সজ্জিত করে বানী ইসরাঈলের সৈন্যদের মধ্যে পাঠিয়ে দাও। তাদেরকে বলে দাও যে, তারা যেন ঐ পুরুষ লোকদেরকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করে নেয়। যদি একটি লোকও ব্যভিচারে জড়িয়ে পড়ে তবে জেনে রেখো যে, তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।” তার কথামত নারীদেরকে বানী ইসরাঈলের সেনাবাহিনীর মধ্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়।কিনআ'নবাসীর একটি স্ত্রীলোকের নাম ছিল কাসবতী। সুর নামক একটি লোক ছিল কওমের সর্দার ও বাদশাহ্। কাসবতী ছিল তারই কন্যা। এই কাসবতীর মিলন ঘটে যামরী ইবনে শালুম নামক বানী ইসরাঈলের এক সর্দারের সাথে। এই যামরী ছিল শামউন ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইসহাক ইবনে। ইবরাহীমের পৌত্র। সে ছিল কওমের সর্দার। সে কাসবতীকে দেখে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। সে তার হাত ধরে হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট নিয়ে গেল এবং তাকে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আপনি হয়তো এ কথাই বলবেন যে, এ মেয়েটি তোমার জন্যে হারাম। সুতরাং তুমি তার কাছে যেয়ো না।” হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “হ্যা! এ নারী তোমার জন্যে হারাম।” সে তখন বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আল্লাহর কসম! এখানে তো আমি আপনার কথা মানবো না।” অতঃপর সে মেয়েটিকে তার তাঁবুতে নিয়ে গেল এবং তাকে নিয়ে একই বিছানায় রাত্রি কাটালো। আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের মধ্যে মহামারী ছড়িয়ে দিলেন। ফানহাস ইবনে আনীরার ইবনে হারূন নামক কওমের সর্দার যামরী ইবনে শালুমের এই কাজের সময় সেখানে উপস্থিত ছিল না। যামরীর এই দুষ্কার্যের ফলে বানী ইসরাঈলের সমস্ত কওমের মধ্যে মহামারী ছড়িয়ে পড়ে। পরে ফানহাস এই সমুদয় ঘটনা অবগত হয়। সে স্বীয় লৌহ-বর্শাটি উঠিয়ে নিয়ে যামরীর তাঁবুতে প্রবেশ করে। ঐ সময় তারা দু'জন শায়িত অবস্থায় ছিল। দু’জনকেই সে একই বর্শায় গেঁথে নেয় এবং ঐ অবস্থাতেই বর্শাটিকে মাথায় উঠিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ফানহাস ছিল যুবক ও শক্তিশালী লোক। সে বলতে বলতে যাচ্ছিলঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনার নাফরমান বান্দার সাথে এই ব্যবহার করলাম। সুতরাং আপনি মহামারী দূর করে দিন!” আল্লাহ পাক মহামারী দুর করলেন। ঐ মহামারীতে বানী ইসরাঈলের সত্তর হাজার লোক অথবা কমপক্ষে বিশ হাজার লোক মারা যায়। (এটা মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) সালিম (রঃ) ও আবু নযর (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। ইবনে জারীর (রঃ) অনুরূপভাবে এটা তাখরীজ করেছেন এবং তাতে রয়েছে যে, কিছু সংখ্যক সৈন্য কর্তৃক ব্যভিচার কার্য সংঘটিত হয় যারা হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে ছিল। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে মহামারী দ্বারা আক্রান্ত করেন। তাতে সত্তর হাজার লোক মারা যায়) ফানহাসের এই কার্যের কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে বানী ইসরাঈল যখনই কিছু যবেহ করতো তখন ওর মাথা ও সামনের পা এবং নিজেদের ফলমূলের প্রথম জিনিস তার (ফানহাসের) সন্তানদেরকে নানা স্বরূপ প্রদান করতো।(আরবী)-এই আয়াতের তাফসীরে মুফাসসিরদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, বালআ’মের জিহ্বা লটকে তার বক্ষে গিয়ে পড়েছিল। তাই, তার দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে কুকুরের সঙ্গে যে, যদি তাকে কষ্ট দেয়া হয় তবে সে হাঁপাবে এবং কষ্ট না দিলেও হাঁপাবে। তদ্রপ বালআ’মেরও অবস্থা যে, তার উপর কারামাত নাযিল হাক অথবা দুঃখ-বেদনা নাযিল হাক, একই কথা। অথবা এই দৃষ্টান্ত তার পথভ্রষ্টতা এবং তাকে ঈমানের দিকে ডাকা বা না ডাকা উভয় অবস্থাতেই তার দ্বারা উপকৃত না হওয়ার ব্যাপারে কুকুরের সাথে দেয়া হয়েছে যে, তাকে তাড়ালেও সে জিহ্বা লটকিয়ে হাঁপাবে এবং না তাড়ালেও হাঁপাবে। তদ্রুপ বালআমকেও যদি ঈমানের দিকে আহ্বান করা যায় তবে তার দ্বারা সে উপকার গ্রহণ করবে না এবং আহ্বান না করলেও উপকার লাভ করবে না। এই ধরনেরই একটি কথা আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “তুমি তাদেরকে ভয় প্রদর্শন কর বা না কর, তারা ঈমান আনবে না।” এইরূপ আর একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তুমি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর বা না কর, আল্লাহ কখনও তাদেরকে ক্ষমা করবেন না।” অথবা এর অর্থ এও হতে পারে যে, কাফির মুনাফিক এবং পথভ্রষ্ট লোকের অন্তর দুর্বল হয় এবং তা হিদায়াত শূন্য থাকে। যতই চেষ্টা করা যাক না কেন তারা হিদায়াত প্রাপ্ত হবে না।' (অনুরূপ বর্ণনা হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে নকল করা হয়েছে)আল্লাহ পাক স্বীয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে রাসূল (সঃ)! তুমি জনগণকে এ ঘটনাগুলো শুনিয়ে দাও, যাতে তারা বানী ইসরাঈলের অবস্থা অবহিত হওয়ার পর চিন্তা-ভাবনা করতঃ আল্লাহর পথে এসে যায় এবং চিন্তা করে যে, বালআ’মের অবস্থা কি হয়েছিল। আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান রূপ মহামূল্যবান সম্পদকে সে দুনিয়ার নগণ্য আরাম ও বিলাসিতার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়। শেষে সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই হারিয়ে ফেলে । অনুরূপভাবে এই ইয়াহূদী আলেমরা যারা তাদের কিতাবসমূহে আল্লাহর হিদায়াত পাঠ করছে এবং তোমার গুণাবলী তাতে লিপিবদ্ধ দেখছে, তাদের উচিত হবে দুনিয়ার মোহে নিমজ্জিত হয়ে শিষ্যদেরকে ভুল পথে চালিত না করা। নতুবা তারাও ইহকাল ও পরকাল দু-ই হারাবে। তাদের কর্তব্য হবে যে, তারা যেন তাদের জ্ঞান দ্বারা উপকার লাভ করে এবং তোমার আনুগত্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর অন্যদের কাছেও যেন সত্য কথা প্রকাশ করে দেয়। দেখো! কাফিরদের দৃষ্টান্ত কতই না জঘন্য যে, তারা কুকুরের মত শুধু খাদ্য ভক্ষণ ও কুপ্রবৃত্তির মধ্যে পড়ে রয়েছে! সুতরাং যে কেউই ইলম ও হিদায়াতকে ছেড়ে দিয়ে কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার কাজে লেগে পড়বে সে-ই হবে কুকুরের মত । যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জঘন্য দৃষ্টান্ত যেন আমাদের উপর প্রয়োগ করা না হয়। অর্থাৎ কাউকে দেয়ার পর তা যে ব্যক্তি পুনরায় ফিরিয়ে নেয় তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ কুকুরের মত যে বমি করার পর পুনরায় তা খেয়ে নেয়।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে) ইরশাদ হচ্ছে। তারা নিজেরা নিজেদের উপর অত্যাচার করেছে। কেননা, তারা হিদায়াতের অনুসরণ করেনি। তারা দুনিয়া ও দুনিয়ার ভোগ বিলাসের মধ্যে পতিত হয়েছে। এটা আল্লাহর অত্যাচার নয়।

আল-আরাফ 7:178

আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেন যে, যাকে তিনি সুপথ প্রদর্শন করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, কার এমন শক্তি আছে যে, তাকে পথ দেখাতে পারে? আল্লাহ যা চান তাই হয় এবং তিনি যা চান না তা হয় না। এ জন্যেই ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। আমরা তার প্রশংসা করছি; তাঁরই কাছে সাহায্য চাচ্ছি, তারই নিকট হিদায়াত কামনা করছি এবং তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমরা আমাদের নফসের অকল্যাণ হতে তাঁর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি এবং মন্দ আমল হতেও আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। তিনি এক । তাঁর কোন অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও আহলুস্ সুনান (রঃ) সম্পূর্ণরূপে বর্ণনা করেছেন)

আল-আরাফ 7:179

একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন এক আনসারীর ছেলের জানাযায় হাযির হওয়ার সুযোগ ঘটে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ ছেলেটি তো জান্নাতের একটি পাখী! সে কোন খারাপ কাজও করেনি এবং জাহান্নাম তার ঠিকানাও নয়।” তিনি তখন বলেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! তা হলে শুননা। আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাত সৃষ্টি করেছেন এবং যারা জান্নাতবাসী হবে তাদেরকেও সৃষ্টি করেছেন। আর এই জান্নাতবাসীদের জান্নাতের অধিকারী হওয়ার ফায়সালা ঐ দিনই করা হয়েছে যেই দিন তারা আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠে ছিল। আবার তিনি জাহান্নাম ও জাহান্নামবাসীকে সৃষ্টি করেছেন যখন তারা আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠেই ছিল।” হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা মায়ের গর্ভাশয়ে একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে থাকেন যিনি ঐ গর্ভাশয়ের সন্তান সম্পর্কে চারটি বিষয় লিপিবদ্ধ করে নেন। (১) জীবিকা, (২) বয়স, (৩) ভাল আমল এবং (৪) মন্দ আমল। আর এ কথা তো পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে আল্লাহ তা'আলা যখন তাঁর সন্তানদেরকে বের করেন। তখন তাদেরকে ডানদিক বিশিষ্ট এবং বামদিক বিশিষ্ট এই দু’টি দলে বিভক্ত করেন। একদল জান্নাতবাসী এবং অন্য দল জাহান্নামবাসী। তিনি বলেনঃ আমি কোনই পরওয়া করি না যে, কে নিজেকে জান্নাতবাসী রূপে গড়ে তুলছে এবং আমি এরও কোন পরওয়া করি না যে, কে নিজেকে জাহান্নামবাসী রূপে গড়ে তুলছে। এ ব্যাপারে বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আর তাকদীরের মাসআলাটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা। এখানে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়ার তেমন কোন সুযোগ নেই।ইরশাদ হচ্ছে- তাদের অন্তর তো রয়েছে কিন্তু তারা অনুধাবন করে না । চক্ষু রয়েছে কিন্তু দেখে না। কান রয়েছে কিন্তু শ্রবণ করে না। এ জিনিসগুলোকে হিদায়াত লাভ করার জন্যে কারণ বানানো হয়েছিল। কিন্তু ওগুলো দ্বারা তারা মোটেই উপকৃত হয়নি। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “তাদেরকে কর্ণ, চক্ষু ও অস্তকরণ দেয়া হয়েছে, কিন্তু ওগুলো দ্বারা তাদের কোনই উপকার করেনি। কেননা, তারা ওগুলো দ্বারা কাজ নেয়নি এবং আল্লাহর আয়াতগুলোকে অস্বীকার করে বসে। মুনাফিকদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তারা বধির, মূক এবং অন্ধ। সুতরাং তারা ফিরবে না।” আর কাফিরদের ব্যাপারে বলা হয়েছেঃ “তারা বধির, মূক ও অন্ধ। সুতরাং তারা বুঝবে না।”আল্লাহ পাক ঘোষণা করছেনঃ “যদি আল্লাহ মন্দ লোকদের মধ্যে কোন মঙ্গল জানতেন তবে অবশ্যই তাদেরকে শুনবার যোগ্য বানাতেন। তখন তারা নিশ্চিতরূপে হিদায়াত লাভ করতো।” অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “চক্ষুগুলো অন্ধ নয়, বরং বক্ষের মধ্যস্থিত অন্তকরণগুলোই অন্ধ।” আরও বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি রহমানের (আল্লাহর) যি হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়, শয়তান তার উপর আধিপত্য বিস্তার করে থাকে এবং সব সময় তার সঙ্গী হয়ে থাকে। এই লোকগুলো লোকদেরকে আল্লাহর পথ হতে সরিয়ে রাখে এবং ধারণা করে যে, তারা ঠিক পথেই রয়েছে।”এখন এখানে ইরশাদ হচ্ছে—তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত। তারা সত্য কথা শুনেও না এবং সত্যের পথে সাহায্যও করে না। তারা হিদায়াতও লাভ করে না। পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা তারা কোন উপকার লাভ করে না। শুধুমাত্র পার্থিব জীবনে এর দ্বারা উপকার লভি করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “কাফিরদের দৃষ্টান্ত ঐ জন্তুর মত যে রাখালের ডাক ও শব্দ শুনে থাকে মাত্র, কিন্তু কিছুই বুঝে না।” তদ্রুপ এই লোকগুলোকেও ঈমানের দিকে ডাকা হলে তারা এর উপকারিতা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, শুধু শব্দই শুনে থাকে। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “এই লোকগুলো জন্তুর চাইতেও অধিক পথভ্রষ্ট। কেননা, জন্তু রাখালের কথা না বুঝলেও কমপক্ষে তার দিকে মুখ তো করে। তাছাড়া ঐ জন্তুগুলো দ্বারা অনুধাবন করতে না পারার যে কাজ প্রকাশ পায় তা হচ্ছে তাদের প্রকৃতিগত ও সৃষ্টিগত ব্যাপার। পক্ষান্তরে কাফিরদেরকে তো কোন অংশী স্থাপন করা ছাড়াই আল্লাহর ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা কুফরী ও শির্ক করে বসেছে। আর এ জন্যেই তো যারা আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করেছে তারা কিয়ামতের দিন ফেতোদের চাইতেও শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হবে। কিন্তু যারা কুফরী করেছে তারা পশুর মত তার চেয়েও নিকৃষ্ট বলে গণ্য হবে।

আল-আরাফ 7:180

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলার নিরানব্বইটি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি এগুলোকে বিশেষ সময়ে পাঠ করবে বা গণনা করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং বেজোড় (এক)। তাই তিনি বেজোড়কেই পছন্দ করেন।” ঐ পবিত্র নামগুলো নিম্নরূপ : (আরবী) এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। এভাবে এই নামগুলো সুনানে ইবনে মাজাহতেও এসেছে। কোন কোন বুযুর্গ ব্যক্তির ধারণা এই যে, এই নামগুলো বর্ণনাকারিগণ কুরআন মাজীদ থেকে ছাঁটাই করে এনেছেন। আল্লাহ তা'আলাই সর্বাপেক্ষা সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, আল্লাহ তা'আলার শুধু এই নিরানব্বইটি নাম রয়েছে, আর নেই, এটা নয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কাউকে যখন কোন দুঃখ-কষ্ট পৌছবে তখন সে যেন এ দুআটি পড়ে- (আরবী) তাহলে আল্লাহ তা'আলা তার দুঃখ-চিন্তা দূর করে দিবেন এবং ঐ স্থানে খুশী আনয়ন করবেন। তখন জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আমরা কি এটা মুখস্থ করবো না?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “ হ্যাঁ, বরং যেই এটা শুনবে তারই মুখস্থ করে নেয়া উচিত।” কোন কোন লোক তো কুরআন ও সুন্নাহ্ হতে আল্লাহ তা'আলার এক হাজার নাম বের করেছেন।ইরশাদ হচ্ছে- ‘যারা আল্লাহর নাম বিকৃত করে তাদেরকে বর্জন কর। কাফিররা আল্লাহর নামের সাথে (আরবী) শব্দটিকেও যোগ করে দেয়। তারা ‘লাত'-কে আল্লাহর স্ত্রীলিঙ্গ বলে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা)। (আরবী) শব্দটিকে তারা (আরবী) থেকে বের করে থাকে এবং এটাকেও স্ত্রী খোদা বলে। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা। আর আরবদের পরিভাষায় মধ্যম পন্থা থেকে সরে যাওয়াকে (আরবী) বলা হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে কবর ! কবরকে (আরবী) এজন্যেই বলা হয় যে, ওটাকে কিবলার দিকে ফিরিয়ে তৈরী করা হয়ে থাকে।

আল-আরাফ 7:181

আল্লাহ পাক বলেন- আমার সৃষ্ট কওমের মধ্যে কোন কোন কওম কথায় ও কাজে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। তারা সত্য কথা বলে, সত্যের দিকে মানুষকে আহ্বান করে এবং সত্যের হিসেবে ফায়সালাও করে। এই উম্মত দ্বারা উম্মতে মুহাম্মাদীয়াকে বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন এই আয়াতটি পাঠ করতেন তখন বলতেনঃ “এই লোক তোমরাই। আর ঐ কওমও, যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে। তারাও লোকদেরকে সত্যের দিকে আহ্বান করতো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেছেনঃ আমার উম্মতের মধ্যে একটি কওম সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, শেষ পর্যন্ত হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন। ঐ দলটি সত্যের উপর বিজয়ী থাকবে। তাদের কোন বিরুদ্ধবাদী দল কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। কিয়ামত আসা পর্যন্ত বা মৃত্যু পর্যন্ত তারা ওর উপরই প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

আল-আরাফ 7:182

১৮২-১৮৩ নং আয়াতের তাফসীর: এর ভাবার্থ এই যে, তাদের জীবিকার দরগুলো খুলে যাবে এবং পার্থিব সুখ-সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পাবে। শেষ পর্যন্ত তারা এর দ্বারা প্রতারিত হবে এবং ধারণা করবে যে, তাদের ঐ অবস্থা চিরকালই থাকবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তা যখন তারা ভুলে গেল, আমি তখন তাদের জন্যে সবকিছুর দরযা খুলে দিলাম। শেষ পর্যন্ত যখন তারা আনন্দে মেতে উঠলো তখন আমি তাদেরকে আকস্মিকভাবে পাকড়াও করলাম। সেই সময় তারা সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে গেল।” প্রশংসার যোগ্য তো একমাত্র আল্লাহ! এ জন্যেই তিনি বলেনঃ আমি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে রেখেছি। আমার কৌশলপূর্ণ ব্যবস্থাপনা খুবই বলিষ্ঠ ও অটুট।

আল-আরাফ 7:183

১৮২-১৮৩ নং আয়াতের তাফসীর: এর ভাবার্থ এই যে, তাদের জীবিকার দরগুলো খুলে যাবে এবং পার্থিব সুখ-সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পাবে। শেষ পর্যন্ত তারা এর দ্বারা প্রতারিত হবে এবং ধারণা করবে যে, তাদের ঐ অবস্থা চিরকালই থাকবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তা যখন তারা ভুলে গেল, আমি তখন তাদের জন্যে সবকিছুর দরযা খুলে দিলাম। শেষ পর্যন্ত যখন তারা আনন্দে মেতে উঠলো তখন আমি তাদেরকে আকস্মিকভাবে পাকড়াও করলাম। সেই সময় তারা সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে গেল।” প্রশংসার যোগ্য তো একমাত্র আল্লাহ! এ জন্যেই তিনি বলেনঃ আমি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে রেখেছি। আমার কৌশলপূর্ণ ব্যবস্থাপনা খুবই বলিষ্ঠ ও অটুট।

আল-আরাফ 7:184

এই মিথ্যা প্রতিপন্নকারীরা এটাও চিন্তা করেনি যে, তাদের বন্ধু ও সঙ্গী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) মোটেই পাগল নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসূল। যিনি মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করে থাকেন। যে ব্যক্তির স্থির বুদ্ধি রয়েছে এবং তা সে কাজে লাগিয়ে থাকে সেই পরিষ্কারভাবে এটা বুঝতে পারবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি তোমাদেরকে একটি কথার নসীহত করছি যে, তোমরা। আল্লাহরই ইবাদত করবে এবং এর তাবলীগের জন্যে এক একজন ও দুজন দু’জন মিলিত হয়ে দাড়িয়ে যাও। অতঃপর গভীরভাবে চিন্তা করে দেখো যে, তোমাদের সঙ্গী (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) পাগল নয়। বরং তিনি তো তোমাদেরকে আল্লাহর ভীষণ শাস্তি থেকে ভয় প্রদর্শনকারী।” খাটি অন্তরে আল্লাহকে ডাকতে থাকো। গোঁড়ামি ও একগুয়েমি পরিত্যাগ কর। যদি তোমরা এরূপ কর তবে হাকীকত তোমাদের কাছে খুলে যাবে যে, এই রাসূল (সঃ) সত্য এবং তোমাদের শুভাকাঙ্খী।রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ‘সাফা পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন। সেখানে তিনি কুরায়েশদেরকে একত্রিত করেন এবং এক এক গোত্রের নাম ধরে ডাকতে থাকেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি এবং আকস্মিক দুর্ঘটনা থেকে ভয় প্রদর্শন করেন। তখন কোন কোন নির্বোধ ব্যক্তি বলতে শুরু করে যে, তাঁকে তো পাগল বলে মনে হচ্ছে। সকাল পর্যন্ত তিনি বক্তৃতা করতে থাকেন। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।

আল-আরাফ 7:185

ইরশাদ হচ্ছে। আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারীরা একথা কি চিন্তা করে দেখে না যে, আকাশ, পৃথিবী এবং এ দুয়ের মধ্যস্থলে যা কিছু রয়েছে। সবগুলোর উপর আমার কিরূপ ক্ষমতা রয়েছে? তাদের উচিত ছিল এগুলো সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করা। তাহলেই তারা এ শিক্ষা লাভ করতো যে, এ সবকিছুই আল্লাহর আয়ত্ত্বাধীন। তাঁর সাথে কারো কোন তুলনা চলে না এবং তার সাথে কারো কোন সাদৃশ্যও নেই। তিনিই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য। তাদের আরো উচিত তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করা, তাঁর অনুসরণে ঝুঁকে পড়া, প্রতিমাগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করা এবং এই ভয় করা যে, মৃত্যু অতি নিকটবর্তী, সুতরাং যদি কুফরীর অবস্থাতেই মৃত্যু এসে পড়ে তবে বেদনাদায়ক শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আল্লাহ পাক বলেনঃ এর পরও তারা কোন্ কথায় ঈমান আনবে? অর্থাৎ যে ভীতি প্রদর্শন মূলক হুমকি দেয়া হয়েছে এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই এসেছে। তারা যদি এই অহী ও কুরআনের সত্যতা স্বীকার না করে যা মুহাম্মাদ (সঃ) পেশ করেছেন, তবে তারা আর কোন কথার সত্যতা স্বীকার করবে?হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ শবে মিরাজে গিয়ে যখন আমি সপ্তম আকাশ পর্যন্ত পৌছলাম তখন উপর দিকে তাকিয়ে বস্ত্র ও বিদ্যুৎ দেখতে পেলাম এবং এমন কতগুলো লোকের পার্শ্ব দিয়ে আমি গমন করলাম যাদের পেট মৃৎ পাত্রের মত ফুলে মোটা হয়েছিল। পেটের মধ্যে সাপ ভরা ছিল। বাইরে থেকেও সেই সাপ দেখা যাচ্ছিল। আমি জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “এরা হচ্ছে সুদখোর।” অতঃপর এই প্রথম আকাশে নেমে এসে নীচের দিকে তাকালে ধুয়ার মত দেখলাম এবং শোরগোল শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল (আঃ)! এটা কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “এরা হচ্ছে শয়তান, যারা মানুষের চোখের সামনে ঘুরতে থাকে এবং আড় হয়ে যায়, যেন মানুষ যমীন ও আসমানের আধ্যাত্মিক বস্তুর দিকে দৃষ্টিপাতই করতে না পারে। যদি এই প্রতিবন্ধকতা থাকতো তবে মানুষ আকাশের বহু বিস্ময়কর ব্যাপার দেখতে পেতো।” এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন আলী ইবনে যায়েদ। বহু মুনকার হাদীসের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে।

আল-আরাফ 7:186

আল্লাহ তা'আলা যাদের নাম পথভ্রষ্ট হিসেবে লিখে দিয়েছেন তাদেরকে কেউই পথপ্রদর্শন করতে পারে না। তারা যতই নিদর্শনসমূহ অবলোকন করুক না কেন, তাদের কোনই উপকার হবে না। আল্লাহ যাকে ফিত্নায় পতিত করেন তাকে কে সত্য পথে আনয়ন করবে? যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “(হে নবী সঃ!) তুমি বলে দাও- দেখো! আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে আমার কি নিদর্শনসমূহ রয়েছে। কিন্তু নিদর্শনসমূহ, মু’জিযাসমূহ এবং ভয় প্রদর্শন ঐ কওমের কোনই উপকার সাধন করবে না যারা ঈমান আনে না।”

আল-আরাফ 7:187

এই আয়াতটি কুরায়েশদের সম্পর্কে অথবা ইয়াহূদীদের একটি দলের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। প্রথমটিই সঠিকতর। কেননা, এটা মক্কী আয়াত। আর ইয়াহূদীরা তো মদীনার অধিবাসী ছিল। আল্লাহ পাক বলেনঃ এই লোকগুলো যে কিয়ামতের সময় সম্পর্কে তোমাকে (নবী মুহাম্মাদ সঃ -কে) জিজ্ঞেস করছে তা কিন্তু বিশ্বাস করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করার দৃষ্টিকোণ নিয়েই প্রশ্ন করছে। যেমন নিম্নের আয়াতে দেখা যাচ্ছে- এ লোকগুলো বলে, আপনি যদি সত্যবাদী হন তবে বলুন তো কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে এবং কোন্ তারিখে হবে? অন্য জায়গায় বলেনঃ “এই কাফির লোকেরা তাড়াতাড়ি কিয়ামত সংঘটন কামনা করছে। অথচ মুমিনরা তো কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে এবং বিশ্বাস রাখে যে, ওর আগমন সত্য। যারা কিয়ামতের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে তারা বড় ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে।”আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করছেকিয়ামত কোন্ তারিখে সংঘটিত হবে এবং দুনিয়া শেষ হবে কখন? আর ওর নির্ধারিত সময় কোষ্টা ? হে নবী (সঃ) ! তুমি তাদেরকে বলে দাও- এর জ্ঞান তো একমাত্র আমার প্রতিপালক আল্লাহরই রয়েছে! আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউই এর সময় সম্পর্কে অবহিত নয়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে পরামর্শ দিচ্ছেন- হে নবী (সঃ)! তারা তোমাকে কিয়ামতের সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করছে, তুমি এর উত্তর এটাই দাও যে, এর নির্দিষ্ট সময় আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ অবহিত নয়। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যমীন ও আসমানবাসী এর ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। হযরত হাসান (রঃ)-এর ভাবার্থ এই বর্ণনা করেছেন যে, যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন যমীন ও আসমানবাসীর ওটা অত্যন্ত ভারী ও কঠিন বোধ হবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর ভাবার্থ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, এমন কোন জিনিস। থাকবে না যার উপর কিয়ামতের কষ্ট পৌছবে না। আকাশ ফেটে যাবে, তারকারাজী খসে পড়বে, সূর্য অন্ধকার হয়ে যাবে, পাহাড় উড়তে থাকবে এবং আল্লাহ তা'আলা যা কিছু বলেছেন সবই হবে। আকাশবাসীদেরও এর জ্ঞান নেই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “ওটা এমনভাবে হঠাৎ এসে পড়বে যে, ওটার কোন ধারণাও করা হবে না।”সহীহ বুখারীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত না পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হবে। এক সময়ে যখন সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত হবে তখন কাফিররা এই আশ্চর্যজনক ঘটনা এবং ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা অবলোকন করে ঈমান আনয়ন করবে। কিন্তু ঐ সময়ে ঈমান আনয়ন কারো কোন উপকারে আসবে না। পাপীদের সেই সময়ের সৎ কাজ মোটেই ফলদায়ক হবে না। দু’ব্যক্তি কাপড় আদান প্রদান করতে থাকবে, এই উদ্দেশ্যে কাপড়ের থান খুলে দেয়া হবে, দুধ দোহন করে পান করাও হবে না , মানুষ পান করার পানির পাত্র পরিষ্কার করতেই থাকবে এবং তারা খাদ্য গ্রাস মুখে উঠাতে যাবে ইত্যবসরে কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে। "(আরবী) -এর অর্থের ব্যাপারে মুফাসসিরগণের মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, এর অর্থ হচ্ছে- হে নবী (সঃ)! তারা কিয়ামতের রহস্য তোমাকে এমনভাবে জিজ্ঞেস করছে যে, তুমি যেন তাদের বড় বন্ধু। আর তারা তোমাকে এটা এমন ভঙ্গীতে জিজ্ঞেস করছে যে, তুমি যেন কিয়ামত সংঘটনের তারিখ অবগত রয়েছে। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন যে, এর জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। আল্লাহ তা'আলা এই রহস্য তো নিজের নিকটতম কোন ফেরেশতা বা কোন রাসূলের উপরেও প্রকাশ করেননি। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, কুরাইশরা নবী (সঃ)-কে বলেছিলঃ “আপনার এবং আমাদের মধ্যে তো আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে, অতএব কিয়ামত কখন হবে তা আমাদেরকে বলে দিন।” তাই আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতটি অবতীর্ণ করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও-এর জ্ঞান শুধু আল্লাহ তা'আলারই আছে।ঐ লোকগুলো নবী (সঃ)-কে কিয়ামত সংঘটনের সময় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো, কিন্তু তারা জানতো না যে, ওর জ্ঞান তাঁর তো নেই। আল্লাহ ছাড়া কেউই ওর জ্ঞান রাখে না। একজন বেদুঈনের রূপ ধারণ করে একদা হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন, যেন জনগণ দ্বীনী শিক্ষা লাভ করতে পারে। অতঃপর তিনি হিদায়াত অনুসন্ধিৎসু একজন প্রশ্নকারীর ভঙ্গীতে তাঁর পার্শ্বে বসে পড়েন এবং তাকে ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। এরপর জিজ্ঞেস করেন ঈমান ও ইহসান সম্পর্কে। তার পর জিজ্ঞেস করেনঃ “কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?” এই চতুর্থ প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এই ব্যাপারে তো আপনার চেয়ে আমার জ্ঞান বেশী নেই। অর্থাৎ আপনি যেমন এটা জানেন না তেমনই আমিও জানি না। কোন লোকই এই ব্যাপারে কিছুই জানে না বা জানতে পারে না।” অতঃপর তিনি (আরবী) (৩১:৩৪) এই আয়াতটি পাঠ করেন। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) একজন বেদুঈনের রূপ ধরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাকে কিয়ামতের নিদর্শনাবলী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তখন তিনি নিদর্শনগুলো বলে দেন। তারপর তিনি বলেনঃ “পাঁচটি জিনিসের জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই।” তাঁর প্রতিটি উত্তরের উপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলে যাচ্ছিলেনঃ “আপনি সঠিক উত্তরই দিয়েছেন।” তাঁর কথার ধরনে বুঝা যাচ্ছিল যে, তিনি ওগুলো জানেন এবং জানেন বলেই তাঁর উত্তরের সত্যতার স্বীকারোক্তি করছেন। সুতরাং সাহাবাগণ এতে বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, ইনি কি ধরনের প্রশ্নকারী? তিনি নিজেই প্রশ্ন করছেন, আবার উত্তরের সঠিকতা স্বীকার করছেন! যখন সেই প্রশ্নকারী চলে গেলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবাগণকে বললেনঃ “ইনি ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ)। তিনি তোমাদেরকে দ্বীনী মাসআলাগুলো শিক্ষা দেয়ার জন্যে এসেছিলেন। এর পূর্বে যখন তিনি রূপ পরিবর্তন করে আসতেন তখন আমি তাকে চিনতে পারতাম। এবার কিন্তু আমিও তাকে চিনতে পারিনি।” (ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, আমি শরহে বুখারীর শুরুতে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছি) যখন এক বেদুঈন তাঁকে জিজ্ঞেস করে এবং উচ্চৈঃস্বরে ডাক দেয়, হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তখন তিনিও উচ্চৈঃস্বরেই উত্তর দেন, হা, কি বলতে চাও? তখন সে বলে, কিয়ামত কখন হবে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “ওরে মূখ! কিয়ামত তো আসবে এবং অবশ্যই আসবে। কিন্তু তুমি ওর জন্যে কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছো?” সে উত্তরে বলেঃ “আমি তো ভালরূপে নামায পড়তে এবং রোযা রাখতে পারিনি। তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর প্রতি আমার অত্যন্ত ভালবাসা রয়েছে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কিয়ামতের দিন মানুষ ঐ মানুষের সাথেই থাকবে যাকে সে বেশী ভালবাসে।” এই কথা শুনে সাহাবাগণ অত্যন্ত খুশী হলেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এ হাদীসটি বিভিন্ন পন্থায় অধিকাংশ সাহাবা হতে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন কোন লোক তাঁকে এমন প্রশ্ন করতো যা তার জন্যে অর্থহীন, তখন তিনি উত্তরে এমন বিষয়ের দিকে তার মোড় ফিরিয়ে দিতেন যা জেনে নেয়া তার জন্যে ঐ প্রশ্ন হতে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। যেন সে নিজেকে ওর সাথে জড়িয়ে ফেলে এবং পূর্ব থেকেই ওর জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করে, যদিও ওর নির্দিষ্ট সময় তার জানা না থাকে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আরবের বেদুঈনরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আসতো এবং প্রায়ই প্রশ্ন করতোঃ “কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার কোন এক শিশু সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করে বলতেনঃ “যদি আল্লাহ একে পূর্ণ বয়স দান করেন তবে এ বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বেই তোমার কিয়ামত এসে। যাবে।” এখানে যেন কিয়ামত দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে, যা মানুষকে এই দুনিয়া হতে সরিয়ে আলমে বারযাখে নিয়ে যাবে। শব্দের কম বেশী কিছু পরিবর্তনসহ এ বিষয়ের আরো বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। মোটকথা, এসব হাদীসের উদ্দেশ্য এই যে, কিয়ামত আসবে এবং অবশ্যই আসবে। কিন্তু সময়ের নির্ধারণ সম্ভব নয়।“এই শিশুর বার্ধক্য আসার পূর্বেই কিয়ামত এসে যাবে” এ বাক্যের প্রয়োগও এই আবদ্ধ করণের উপরই মাহমূল হয়েছে। অর্থাৎ এর দ্বারা মানুষের মৃত্যুর সময় বুঝানো হয়েছে।ইন্তেকালের এক মাস পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “তোমরা আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে রয়েছে, কিন্তু কিয়ামত আসতে আর কত দিন সময় আছে এর জ্ঞান তো একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে। তবে আমি কসম খেয়ে বর্ণনা করছি যে, বর্তমানে ভূ-পৃষ্ঠে যতগুলো প্রাণী রয়েছে, একশ’ বছর পরে এগুলোর একটিরও অস্তিত্ব বাকী থাকবে না। তা হলে ভাবার্থ যেন এই যে, কিয়ামতের দিন যেমন সমস্ত লোক মৃত্যুবরণ করবে, তদ্রুপ একশ’ বছর পরে বর্তমানের সমস্ত লোকের জন্যে কিয়ামত এসে যাবে। সুতরাং তার উদ্দেশ্য যেন এই যে, তোমরা যদি নির্ধারিত সময়ই জানতে চাও তবে এটাই হচ্ছে। নির্ধারিত সময়। এভাবে কিয়ামত দ্বারা ঐ এক শতাব্দীর সমাপ্তি বুঝানো হয়েছিল। তিনি এই ঢঙ্গেই বর্ণনা দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, শবে মিরাজে আমি হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর পার্শ্ব দিয়ে গমন করি। লোকেরা কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছিল। সবাই এসে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলো। তিনি উত্তরে বললেনঃ “এ ব্যাপারে আমার কোনই জ্ঞান নেই।” এর পর তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে গেল। তিনিও বললেন যে, এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। অতঃপর তারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর কাছে গেল। তিনিও বললেনঃ এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই আছে। তবে এর আলামত এই যে, দাজ্জাল বের হবে। আমার সাথে দু'একটি শাখা থাকবে। সে (দাজ্জাল) আমাকে দেখা মাত্রই সীসার মত গলে যাবে এবং আল্লাহ পাক তাকে ধ্বংস করে দিবেন। এমন কি গাছ ও পাথরও বলে উঠবে- হে মুসলমান! আমার আড়ালে একজন কাফির লুকিয়ে রয়েছে। সুতরাং তুমি এসে তাকে হত্যা কর। অতএব, আল্লাহ তাআলা ঐ সব কাফিরকে ধ্বংস করে দিবেন। অতঃপর লোকেরা নিজ নিজ শহরে ও দেশে ফিরে যাবে। ইতিমধ্যে ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রত্যেক প্রান্ত থেকে বেরিয়ে পড়বে। তারা শহর-পল্লী ধ্বংস করে চলবে। প্রতিটি জিনিস তাদের ঘোরা ফেরার কারণে ধ্বংস ও নষ্ট হতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তারা প্রস্রবণে পৌছবে এবং ওকে শূন্য করে ফেলবে। জনগণ তখন আমার কাছে তাদের অভিযোগ নিয়ে আসবে। আমি তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে বদ দুআ করবো। আল্লাহ তা'আলা ঐসব ইয়াজুজ ও মাজুজকে ধ্বংস করে দিবেন। অবশেষে প্রতিটি স্থান তাদের মৃতদেহে ভরে যাবে এবং ওগুলো সড়ে পচে দুর্গন্ধময় হয়ে পড়বে। তখন আল্লাহ তা'আলা বৃষ্টি বর্ষণ করে তাদের মৃতদেহগুলো বইয়ে নিয়ে সমুদ্রে ফেলে দিবেন। ঐ সময় পাহাড় স্থানচ্যুত হয়ে যাবে এবং যমীন বিস্তৃত হয়ে পড়বে। ঐ সময় কিয়ামত এমনই নিকটবর্তী হবে যেমন ন'মাসের গর্ভবতী মহিলা সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, সে দিন-রাত কোন এক সময়ের মধ্যেই সন্তান প্রসব করবে। বড় বড় নবীরাও কিয়ামতের সময় সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। না। হযরত ঈসা (আঃ)-ও শুধুমাত্র ওর আলামতগুলো বলে দিয়েছেন। কেননা, এই উম্মতের শেষ যুগে তিনি অবতরণ করবেন এবং নবী (সঃ)-এর আহকাম নাফি করবেন। তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন এবং আল্লাহ তা'আলা তারই বদ দুআ’য় ইয়াজুজ-মাজুজকে ধ্বংস করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তোমাদেরকে কিয়ামতের নিদর্শনগুলো বলছি। তা এই যে, ওর সামনে বড় বড় ফি ও ‘হারাজ সংঘটিত হবে।” সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা ফিৎনা তো বুঝলাম। কিন্তু ‘হারাজ’ কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “হাবশের আরবী ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে হত্যা।” অতঃপর তিনি বলেনঃ জনগণের মধ্যে অপরিচিতি ও বেপরওয়াঈ এতো বৃদ্ধি পাবে যে, এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে বলবেঃ “আমি তোমাকে চিনি না।' বিশুদ্ধ ছ’খানা হাদীস গ্রন্থে এ কথাটিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়নি।আমাদের উম্মী নবী (সঃ) সাইয়্যেদুল মুরসালীন, খাতিমুন নাবিঈন, যিনি রহমত ও তাওবার নবী, বলেছেনঃ “আমি ও কিয়ামত এই দুটি অঙ্গুলির মত।” ঐ সময় তিনি তাঁর শাহাদাত ও মধ্যমা অঙ্গুলি দুটি মিলিত দেখিয়েছিলেন। তিনি যেন বলতে চেয়েছেন যে, তার সাথে কিয়ামত লেগে রয়েছে। অর্থাৎ তার ও কিয়ামতের মধ্যভাগে কোন নবী আসবেন না। মোট কথা (আরবী) বা। কিয়ামতের ইলম শুধু আল্লাহ পাকেরই রয়েছে।

আল-আরাফ 7:188

এখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন- হে নবী (সঃ)! তুমি সমস্ত বিষয়ের সম্পর্ক আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দাও। নিজের সম্পর্কে তুমি বলে দাও-ভবিষ্যতের জ্ঞান আমারও নেই। হ্যা, তবে আল্লাহ যেটা বলে দেন একমাত্র সেটাই আমি বলতে পারি। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি (আল্লাহ) অদৃশ্যের সংবাদ জ্ঞাত, তাঁর অদৃশ্য বিষয় কারো উপর প্রকাশিত হয় না (তার অদৃশ্য বিষয় কেউ জানতে পারে না)।” (৭২:২৬)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আমি যদি অদৃশ্যের বিষয় জানতাম তবে আমি নিজের জন্যে অনেক কিছু কল্যাণ জমা করে নিতাম। অর্থাৎ যদি আমি আমার মত্যর সংবাদ অবগত হতাম যে, কোন তারিখে আমি মারা যাবো, তবে তাড়াহুড়া করে অনেক সকাজ করে ফেলার চেষ্টা করতাম। এটা হচ্ছে মুজাহিদ (রঃ)-এর উক্তি। ইবনে জুরাইহও এটাই বলেন। কিন্তু এ কথায় চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমস্ত কাজ ভালই ছিল এবং তিনি যে কাজই করতেন তা স্থায়ীভাবেই করতেন। তাঁর সমস্ত কাজ একই রকমের ছিল। প্রত্যেক আমলের সময় তার দৃষ্টি আল্লাহর দিকেই থাকতো। মোটকথা, তাঁর কোন আমলই ভাল ছাড়া মন্দ হতো না। হ্যাঁ, ভাবার্থ এরূপ হতে পারে- আমি যদি অদৃশ্যের সংবাদ জানতাম যে, জনগণের কোন্ ধরনের মঙ্গল কোন্ কাজে রয়েছে, তবে আমি তাদেরকে তা অবহিত করতাম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী) -এর অর্থ সম্পদ নিয়েছেন এবং এটাই উত্তমও বটে। অথবা ভাবার্থ হবে- যে জিনিস ক্রয়ে লাভ বা উপকার রয়েছে তা আমার জানা থাকলে ওটা অবশ্যই ক্রয় করতাম। আর কোন জিনিস বিক্রয় করতাম না যে পর্যন্ত না ওর লাভ জানতাম। মোটকথা, ব্যবসায়ে কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হতাম না বা কাউকেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে দিতাম না। অথবা দারিদ্র বা সংকীর্ণতা আমাকে কখনো স্পর্শ করতো না। কেউ কেউ এ অর্থও নিয়েছেন- দুর্ভিক্ষ আসার খবর জানলে পূর্বেই বহু খাদ্য জমা করে রাখতাম। সস্তার সময় কিনতাম এবং দুর্মূল্যের সময় বিক্রী করতাম। ফলে আমাকে দারিদ্র স্পর্শ করতে পারতো না। কেননা, আমার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোন সম্ভাবনাই থাকতো না।(আরবী) আমি শুধু (জাহান্নাম হতে) ভয় প্রদর্শনকারী এবং (জান্নাতের) সুসংবাদদাতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি কুরআনকে তোমার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যেন এর মাধ্যমে মুত্তাকীদেরকে (জান্নাতের) সুসংবাদ দাও এবং বিবাদী ও ঝগড়াটে লোকদেরকে (জাহান্নাম হতে) ভয় প্রদর্শন কর।”

আল-আরাফ 7:189

১৮৯-১৯০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে যে, দুনিয়া জাহানের সমস্ত মানুষই আদম (আঃ)-এর বংশের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে এবং স্বয়ং তাঁর স্ত্রী হাওয়া তাঁরই মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছেন। তাঁদের দুজনের মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি হতে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদেরকে এমনভাবে বাড়িয়েছি যে, তোমরা বংশে বংশে ও গোত্রে গোত্রে পরিণত হয়েছে। এখন তোমাদের একে অপরের হকের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত। নিশ্চয়ই আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই বেশী সম্মানিত যে বেশী মুত্তাকী।” (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে- যেন সে (পুরুষ) তার (স্ত্রীর কাছে প্রশান্তি লাভ করে। এ জন্যেই আল্লাহ পাক (আরবী) অর্থাৎ তিনি তোমাদের পরস্পরের মধ্যে প্রেম-প্রীতি ও মায়া-মহব্বত সৃষ্টি করেছেন। (৩০:২১) দু' আত্মার মধ্যে যে প্রেম-প্রীতি ও ভালবাসা জন্মে, এর চেয়ে অধিক ভালবাসা আর কোথায়ও হতে পারে না। তাই তো আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যাদুকর তার যাদুর মাধ্যমে সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় যে, কি করে সে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করতে পারে। মোটকথা, স্বামী যখন তার প্রকৃতিগত প্রেমের ভিত্তিতে স্বীয় স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করে তখন তার স্ত্রী প্রথমতঃ তার গর্ভাশয়ে একটা হালকা বোঝার অস্তিত্ব অনুভব করে। এটা হলো গর্ভের সূচনার সময়। এই সময় নারীর কোন কষ্ট হয় না। কেননা, এই গর্ভ তো এখন সবেমাত্র নুফা বা মাংসপিণ্ড। এখন ওটা হালকা পাতলা অবস্থায় রয়েছে। আইয়ুব (রঃ) বলেনঃ আমি হাসান (রঃ)-কে (আরবী)-এর অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “যদি আমি আরববাসী হতাম এবং তাদের ভাষা বুঝতাম তবে এর অর্থ জানতাম। এর অর্থ এই হতে পারে যে, সে এই গর্ভ নিয়ে আরামেই চলাফেরা করে।" কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে- এই গর্ভ প্রকাশিত হয়েছে। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ঐ গর্ভ নিয়ে সে সহজেই উঠাবসা করতে পারে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- এই প্রাথমিক সময় হচ্ছে এমন এক সময় যখন তার নিজেরই এই সন্দেহ থেকে যায় যে, তার গর্ভ আছে কি নেই। মোটকথা এর পরে নারী তার পেটের গর্ভ সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে যায়। তখন পিতা-মাতা দু’জনই আল্লাহর কাছে এই কামনা করে যে, যদি তিনি তাদেরকে নিখুঁত ও সুন্দর সন্তান দান করেন তবে এটা তাঁর বড়ই ইহসান হবে! হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “মা-বাপের এই ভয়ও থাকে যে, না জানি হয়তো কোন পশুর আকৃতি বিশিষ্ট বা কোন অঙ্গহানি যুক্ত সন্তান ভূমিষ্ট হয়ে যায় না কি! যেমন কোন কোন সময় এরূপ হয়েও থাকে।” হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- যদি আল্লাহ আমাকে পুত্র সন্তান দান করেন।' কেননা, সন্তানের মধ্যে পুত্র সন্তানই বেশী উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। মোটকথা, আল্লাহ তা'আলা যখন তাদেরকে সহীহ সালেম ও নিখুঁত সন্তান দান করেন তখন তারা ওটাকে প্রতিমাগুলোর অংশ বানিয়ে দেয়। আল্লাহর সত্তা এরূপ শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। মুফাসিরগণ এখানে বহু আসার ও হাদীস বর্ণনা করেছেন, সেগুলো আমরা ইনশাআল্লাহ বর্ণনা করবো। অতঃপর ইনশাআল্লাহ সঠিক কোনটি সেটাও বলে দেয়ার প্রয়াস পাবো। মহান আল্লাহর উপরই আমাদের ভরসা।ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে হাসান (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেন, হাওয়া (আঃ) যখন সন্তান প্রসব করেন তখন ইবলীস তাঁর কাছে আগমন করে। তাঁর সন্তান বেঁচে থাকতো না। শয়তান তাকে পরামর্শ দিলো- “তোমার শিশুর নাম আব্দুল হারিস রাখো, তাহলে সে জীবিত থাকবে।” তখন তার নাম আব্দুল হারিস রাখা হয় এবং সে জীবিত থাকে। এটা ছিল শয়তানের পক্ষ থেকে অহী। হারিস শয়তানের নাম। এ হাদীসে তিনটি ক্রটি পরিলক্ষিত হয়। (১) এই হাদীসের বর্ণনাকারী উমার ইবনে ইবরাহীম একজন বসরী লোক। ইবনে মুঈন (রঃ) তাকে বিশ্বাসযোগ্য বললেও আবু হাতিম (রঃ) বলেন যে, তার থেকে হুজ্জত গ্রহণ করা যেতে পারে না। (২) এই রিওয়াইয়াতই মওকুফ রূপে হযরত সামুরা (রাঃ)-এর উক্তিতেই বর্ণিত হয়েছে, যা মারফু নয়। তাফসীরে ইবনে জারীরে স্বয়ং হযরত সামুরা (রাঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, হযরত আদম (আঃ) তাঁর ছেলের নাম আব্দুল হারিস রেখেছিলেন। (৩) এ হাদীসের বর্ণনাকারী হাসান (রঃ) থেকেও এই আয়াতের তাফসীর এর বিপরীত বর্ণনা করা হয়েছে! তাহলে এটা স্পষ্ট কথা যে, যদি এ মারফু হাদীসটি তার দ্বারা বর্ণনাকৃত হতো তাহলে স্বয়ং তিনি এর উল্টো তাফসীর করতেন না । ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা হযরত আদম (আঃ)-এর ঘটনা নয়, বরং এটা অন্য ধর্মাবলম্বীদের ঘটনা। আবার এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, এর দ্বারা কোন মুশরিক ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে এরূপ করে থাকে। কথিত আছ যে, এটা হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানের কাজের বর্ণনা, যারা নিজেদের সন্তানদেরকে নিজেদের রীতিনীতির উপর পরিচালিত করে বা তাদেরকে ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টান বানিয়ে দেয়। এই আয়াতের যেসব তাফসীর বর্ণনা করা হয়েছে অনুধ্যে এটাই উত্তম তাফসীর। মোটকথা, এটা ছিল অতি বিস্ময়কর ব্যাপার যে, একজন মুত্তাকী ব্যক্তি একটি আয়াতের তাফসীরে একটি মার’ হাদীস বা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর উক্তিরূপে বর্ণনা করবেন, আবার নিজেই ওর বিপরীত তাফসীর করবেন! এর দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, এ হাদীসটি মার’ নয়, বরং এটা হ্যরত সামুরা (রাঃ)-এর নিজের উক্তি। এর পর এটা ধারণা করা যেতে পারে যে, সম্ভবতঃ সামুরা (রাঃ) এটা আহলে কিতাবের নিকট থেকে গ্রহণ করেছেন। যেমন কা'ব, অহাব প্রমুখ যাঁরা পরে মুসলমান হয়েছিলেন। ইনশাআল্লাহ এর বর্ণনা সত্বরই আসবে।মোটকথা, এ হাদীসটিকে মারফু হাদীস রূপে গ্রহণ করা যেতে পারে না। তবে এই ব্যাপারে অন্যান্য হাদীসও রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হাওয়া (আঃ)-এর যেসব সন্তান জন্মগ্রহণ করতে তাদেরকে আল্লাহর ইবাদতের জন্যে নির্দিষ্ট করে দেয়া হতো এবং তাদের নাম আব্দুল্লাহ, উবাইদুল্লাহ ইত্যাদি রাখা হতো। এ সন্তানগুলো মারা যেতো! একদা ইবলীস হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ যদি তোমরা তোমাদের সন্তানদের অন্য নাম রাখো তবে তারা জীবিত থাকবে । অতঃপর হযরত হাওয়া (আঃ)-এর এক সন্তান ভূমিষ্ট হলো। তখন পিতা-মাতা তার নাম রাখলেন আব্দুল হারিস। এ সম্পর্কেই আল্লাহ পাক .... (আরবী) -এ কথা বলেন।গর্ভ ছিল কি ছিল না এ ব্যাপারে হযরত হাওয়া (আঃ)-এর মনে সন্দেহ ছিল। মোটকথা, যখন গর্ভ ভারী হয়ে উঠলো তখন দু’জনই আল্লাহ তা'আলার নিকট দুআ করলেন যে, যদি তিনি সহীহ সালিম ও নিখুঁত সন্তান দান করেন তবে তারা তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবেন। তখন শয়তান তাদের উভয়ের কাছে এসে বললোঃ তোমাদের কিরূপ সন্তান ভূমিষ্ট হবে তার কোন খবর তোমরা রাখো কি? সেই সন্তান মানুষের আকার বিশিষ্টও হতে পারে, আবার জন্তুর আকৃতি বিশিষ্টও হতে পারে । ভুল কথা তাদের সামনে সে শুভ রূপে পেশ করলো। সে তো প্রতারকই বটে। ইতোপূর্বে তাদের দুটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেই মারা গিয়েছিল। শয়তান তাদেরকে বুঝিয়ে বললোঃ “তোমরা যদি আমার নামে সন্তানের নাম না রাখো তবে তোমাদের সন্তান বিকলাঙ্গ হবে এবং জীবিতও থাকবে না। সুতরাং তার কথামত তারা সন্তানের নাম আব্দুল হারিস রেখে দিলো। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের প্রার্থনা। অনুযায়ী সহীহ সালিম ও নিখুঁত সন্তান দান করলেন তখন তারা আল্লাহর সাথে শরীক করে বসলো।” এই আয়াতে এরই বর্ণনা রয়েছে। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, প্রথমবারের গর্ভের সময় সে (শয়তান) তাদের কাছে আগমন করে এবং তাদেরকে ভয় দেখিয়ে বলে- আমি তো সেই, যে তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করিয়েছিল। এখন যদি তোমরা আমার কথামত কাজ না কর তবে আমি এমনভাবে ভেল্কী লাগিয়ে দিবো যে, এই সন্তানের শিং বেরিয়ে যাবে এবং সে পেট ফেড়ে বেরিয়ে পড়বে এবং এই হবে ঐ হবে। এইভাবে সে তাদেরকে আতংকগ্রস্ত করলো। কিন্তু তারা তার কথা মানলেন না। আল্লাহর সদিচ্ছায় মৃত সন্তান ভূমিষ্ট হলো। দ্বিতীয়বার হযরত হাওয়া (আঃ) গর্ভধারণ করলেন। সেবার মৃত সন্তানই ভূমিষ্ট হলো। এবার শয়তান নিজেকে অত্যন্ত হিতাকাংখীরূপে তাদের সামনে পেশ করলো। তখন। সন্তানের ভালবাসা প্রাধান্য লাভ করলো এবং তারা সন্তানের নাম আব্দুল হারিস রেখে দিলেন। এর উপর ভিত্তি করেই আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর দেয়া এই দানে অংশী স্থাপন করে বসলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ হাদীসটি গ্রহণ করে তাঁর ছাত্রদের একটি দলও এ কথাই বলেছেন। যেমন মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), ইকরামা (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ)। অনুরূপভাবে পূর্ববর্তী থেকে নিয়ে পরবর্তী পর্যন্ত বহু মুফাসসির এই আয়াতের তাফসীরে এ কথাই বলেছেন। কিন্তু প্রকাশ্য ব্যাপার এই যে, এই ঘটনাটি আহলে কিতাব থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে। এর একটি বড় দলীল এই যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ওটা হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, যেমন তাফসীরে ইবনে আবূ হাতিমে রয়েছে। সুতরাং এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এ কথাটি আহলে কিতাব হতে নকল করা হয়েছে। যে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তাদের কথাকে সত্যও বলো না এবং মিথ্যাও বলো না।” এর বর্ণনা তিন প্রকারের হচ্ছে। (১) ঐসব কথা, যেগুলোর বিশুদ্ধতা কোন আয়াত বা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। (২) যেগুলোর অসত্যতা কোন আয়াত বা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়। (৩) ঐসব কথা, যেগুলোর ফায়সালা আমাদের ধর্মে মিলে না । হাদীসের নির্দেশ অনুযায়ী এগুলোর বর্ণনায় কোন দোষ নেই। কিন্তু এগুলো সত্য কি মিথ্যা এটা মন্তব্য করা চলবে না। আমার মতে এটা তো দ্বিতীয় প্রকারের হাদীস। অর্থাৎ মানবার যোগ্য নয়। আর যেসব সাহাবী ও তাবিঈ হতে এটা বর্ণিত আছে তারা এটাকে তৃতীয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত মনে করে বর্ণনা করে দিয়েছেন। কিন্তু আমরা তো ওটাই বলি যা ইমাম হাসান (রঃ) বলে থাকেন। তা হচ্ছে এই যে, মুশরিকদের তাদের সন্তানদের মধ্যে আল্লাহর শরীক করার বর্ণনা এই আয়াতগুলোতে রয়েছে। এটা হযরত আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-এর বর্ণনা নয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ তারা যাকে অংশী করে আল্লাহ তা অপেক্ষা অনেক উন্নত ও মহান। এই আয়াতগুলোতে এই বর্ণনা এবং ইতোপূর্বে হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর বর্ণনা ক্রমিক বর্ণনার মত। প্রথমে আসল মা-বাপের বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ অন্যান্য মা-বাপ ও তাদের শিরকের বর্ণনা দিয়েছেন।এখন ব্যক্তিগত বর্ণনা শেষ করে শ্রেণীগত বর্ণনার দিকে মোড় ফিরানো হচ্ছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি দুনিয়ার আকাশকে তারকারাজি দ্বারা সৌন্দর্য মণ্ডিত করেছি। আবার আমি ঐ তারকাগুলো দ্বারা শয়তানদেরকে মেরে তাড়াবার কাজ নিয়েছি।” আর এটা স্পষ্ট কথা যে, সৌন্দর্যের জন্যে যে তারকাগুলো নির্দিষ্ট রয়েছে সেগুলো ছিটকে পড়ে না। ঐগুলো দ্বারা শয়তানদেরকে মারা হয় না। এখানেও কথার মোড় ফিরানো হচ্ছে যে, তারকারাজির স্বাতন্ত্রের বর্ণনার পর শ্রেণীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এর আরও বহু দৃষ্টান্ত কুরআন কারীমের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তাআলাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জানেন।

আল-আরাফ 7:190

১৮৯-১৯০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে যে, দুনিয়া জাহানের সমস্ত মানুষই আদম (আঃ)-এর বংশের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে এবং স্বয়ং তাঁর স্ত্রী হাওয়া তাঁরই মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছেন। তাঁদের দুজনের মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি হতে থাকে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদেরকে এমনভাবে বাড়িয়েছি যে, তোমরা বংশে বংশে ও গোত্রে গোত্রে পরিণত হয়েছে। এখন তোমাদের একে অপরের হকের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত। নিশ্চয়ই আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই বেশী সম্মানিত যে বেশী মুত্তাকী।” (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে- যেন সে (পুরুষ) তার (স্ত্রীর কাছে প্রশান্তি লাভ করে। এ জন্যেই আল্লাহ পাক (আরবী) অর্থাৎ তিনি তোমাদের পরস্পরের মধ্যে প্রেম-প্রীতি ও মায়া-মহব্বত সৃষ্টি করেছেন। (৩০:২১) দু' আত্মার মধ্যে যে প্রেম-প্রীতি ও ভালবাসা জন্মে, এর চেয়ে অধিক ভালবাসা আর কোথায়ও হতে পারে না। তাই তো আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যাদুকর তার যাদুর মাধ্যমে সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় যে, কি করে সে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করতে পারে। মোটকথা, স্বামী যখন তার প্রকৃতিগত প্রেমের ভিত্তিতে স্বীয় স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করে তখন তার স্ত্রী প্রথমতঃ তার গর্ভাশয়ে একটা হালকা বোঝার অস্তিত্ব অনুভব করে। এটা হলো গর্ভের সূচনার সময়। এই সময় নারীর কোন কষ্ট হয় না। কেননা, এই গর্ভ তো এখন সবেমাত্র নুফা বা মাংসপিণ্ড। এখন ওটা হালকা পাতলা অবস্থায় রয়েছে। আইয়ুব (রঃ) বলেনঃ আমি হাসান (রঃ)-কে (আরবী)-এর অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “যদি আমি আরববাসী হতাম এবং তাদের ভাষা বুঝতাম তবে এর অর্থ জানতাম। এর অর্থ এই হতে পারে যে, সে এই গর্ভ নিয়ে আরামেই চলাফেরা করে।" কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে- এই গর্ভ প্রকাশিত হয়েছে। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, ঐ গর্ভ নিয়ে সে সহজেই উঠাবসা করতে পারে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- এই প্রাথমিক সময় হচ্ছে এমন এক সময় যখন তার নিজেরই এই সন্দেহ থেকে যায় যে, তার গর্ভ আছে কি নেই। মোটকথা এর পরে নারী তার পেটের গর্ভ সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে যায়। তখন পিতা-মাতা দু’জনই আল্লাহর কাছে এই কামনা করে যে, যদি তিনি তাদেরকে নিখুঁত ও সুন্দর সন্তান দান করেন তবে এটা তাঁর বড়ই ইহসান হবে! হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “মা-বাপের এই ভয়ও থাকে যে, না জানি হয়তো কোন পশুর আকৃতি বিশিষ্ট বা কোন অঙ্গহানি যুক্ত সন্তান ভূমিষ্ট হয়ে যায় না কি! যেমন কোন কোন সময় এরূপ হয়েও থাকে।” হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- যদি আল্লাহ আমাকে পুত্র সন্তান দান করেন।' কেননা, সন্তানের মধ্যে পুত্র সন্তানই বেশী উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। মোটকথা, আল্লাহ তা'আলা যখন তাদেরকে সহীহ সালেম ও নিখুঁত সন্তান দান করেন তখন তারা ওটাকে প্রতিমাগুলোর অংশ বানিয়ে দেয়। আল্লাহর সত্তা এরূপ শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। মুফাসিরগণ এখানে বহু আসার ও হাদীস বর্ণনা করেছেন, সেগুলো আমরা ইনশাআল্লাহ বর্ণনা করবো। অতঃপর ইনশাআল্লাহ সঠিক কোনটি সেটাও বলে দেয়ার প্রয়াস পাবো। মহান আল্লাহর উপরই আমাদের ভরসা।ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে হাসান (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেন, হাওয়া (আঃ) যখন সন্তান প্রসব করেন তখন ইবলীস তাঁর কাছে আগমন করে। তাঁর সন্তান বেঁচে থাকতো না। শয়তান তাকে পরামর্শ দিলো- “তোমার শিশুর নাম আব্দুল হারিস রাখো, তাহলে সে জীবিত থাকবে।” তখন তার নাম আব্দুল হারিস রাখা হয় এবং সে জীবিত থাকে। এটা ছিল শয়তানের পক্ষ থেকে অহী। হারিস শয়তানের নাম। এ হাদীসে তিনটি ক্রটি পরিলক্ষিত হয়। (১) এই হাদীসের বর্ণনাকারী উমার ইবনে ইবরাহীম একজন বসরী লোক। ইবনে মুঈন (রঃ) তাকে বিশ্বাসযোগ্য বললেও আবু হাতিম (রঃ) বলেন যে, তার থেকে হুজ্জত গ্রহণ করা যেতে পারে না। (২) এই রিওয়াইয়াতই মওকুফ রূপে হযরত সামুরা (রাঃ)-এর উক্তিতেই বর্ণিত হয়েছে, যা মারফু নয়। তাফসীরে ইবনে জারীরে স্বয়ং হযরত সামুরা (রাঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, হযরত আদম (আঃ) তাঁর ছেলের নাম আব্দুল হারিস রেখেছিলেন। (৩) এ হাদীসের বর্ণনাকারী হাসান (রঃ) থেকেও এই আয়াতের তাফসীর এর বিপরীত বর্ণনা করা হয়েছে! তাহলে এটা স্পষ্ট কথা যে, যদি এ মারফু হাদীসটি তার দ্বারা বর্ণনাকৃত হতো তাহলে স্বয়ং তিনি এর উল্টো তাফসীর করতেন না । ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা হযরত আদম (আঃ)-এর ঘটনা নয়, বরং এটা অন্য ধর্মাবলম্বীদের ঘটনা। আবার এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, এর দ্বারা কোন মুশরিক ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে এরূপ করে থাকে। কথিত আছ যে, এটা হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানের কাজের বর্ণনা, যারা নিজেদের সন্তানদেরকে নিজেদের রীতিনীতির উপর পরিচালিত করে বা তাদেরকে ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টান বানিয়ে দেয়। এই আয়াতের যেসব তাফসীর বর্ণনা করা হয়েছে অনুধ্যে এটাই উত্তম তাফসীর। মোটকথা, এটা ছিল অতি বিস্ময়কর ব্যাপার যে, একজন মুত্তাকী ব্যক্তি একটি আয়াতের তাফসীরে একটি মার’ হাদীস বা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর উক্তিরূপে বর্ণনা করবেন, আবার নিজেই ওর বিপরীত তাফসীর করবেন! এর দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, এ হাদীসটি মার’ নয়, বরং এটা হ্যরত সামুরা (রাঃ)-এর নিজের উক্তি। এর পর এটা ধারণা করা যেতে পারে যে, সম্ভবতঃ সামুরা (রাঃ) এটা আহলে কিতাবের নিকট থেকে গ্রহণ করেছেন। যেমন কা'ব, অহাব প্রমুখ যাঁরা পরে মুসলমান হয়েছিলেন। ইনশাআল্লাহ এর বর্ণনা সত্বরই আসবে।মোটকথা, এ হাদীসটিকে মারফু হাদীস রূপে গ্রহণ করা যেতে পারে না। তবে এই ব্যাপারে অন্যান্য হাদীসও রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হাওয়া (আঃ)-এর যেসব সন্তান জন্মগ্রহণ করতে তাদেরকে আল্লাহর ইবাদতের জন্যে নির্দিষ্ট করে দেয়া হতো এবং তাদের নাম আব্দুল্লাহ, উবাইদুল্লাহ ইত্যাদি রাখা হতো। এ সন্তানগুলো মারা যেতো! একদা ইবলীস হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ যদি তোমরা তোমাদের সন্তানদের অন্য নাম রাখো তবে তারা জীবিত থাকবে । অতঃপর হযরত হাওয়া (আঃ)-এর এক সন্তান ভূমিষ্ট হলো। তখন পিতা-মাতা তার নাম রাখলেন আব্দুল হারিস। এ সম্পর্কেই আল্লাহ পাক .... (আরবী) -এ কথা বলেন।গর্ভ ছিল কি ছিল না এ ব্যাপারে হযরত হাওয়া (আঃ)-এর মনে সন্দেহ ছিল। মোটকথা, যখন গর্ভ ভারী হয়ে উঠলো তখন দু’জনই আল্লাহ তা'আলার নিকট দুআ করলেন যে, যদি তিনি সহীহ সালিম ও নিখুঁত সন্তান দান করেন তবে তারা তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবেন। তখন শয়তান তাদের উভয়ের কাছে এসে বললোঃ তোমাদের কিরূপ সন্তান ভূমিষ্ট হবে তার কোন খবর তোমরা রাখো কি? সেই সন্তান মানুষের আকার বিশিষ্টও হতে পারে, আবার জন্তুর আকৃতি বিশিষ্টও হতে পারে । ভুল কথা তাদের সামনে সে শুভ রূপে পেশ করলো। সে তো প্রতারকই বটে। ইতোপূর্বে তাদের দুটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেই মারা গিয়েছিল। শয়তান তাদেরকে বুঝিয়ে বললোঃ “তোমরা যদি আমার নামে সন্তানের নাম না রাখো তবে তোমাদের সন্তান বিকলাঙ্গ হবে এবং জীবিতও থাকবে না। সুতরাং তার কথামত তারা সন্তানের নাম আব্দুল হারিস রেখে দিলো। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের প্রার্থনা। অনুযায়ী সহীহ সালিম ও নিখুঁত সন্তান দান করলেন তখন তারা আল্লাহর সাথে শরীক করে বসলো।” এই আয়াতে এরই বর্ণনা রয়েছে। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, প্রথমবারের গর্ভের সময় সে (শয়তান) তাদের কাছে আগমন করে এবং তাদেরকে ভয় দেখিয়ে বলে- আমি তো সেই, যে তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করিয়েছিল। এখন যদি তোমরা আমার কথামত কাজ না কর তবে আমি এমনভাবে ভেল্কী লাগিয়ে দিবো যে, এই সন্তানের শিং বেরিয়ে যাবে এবং সে পেট ফেড়ে বেরিয়ে পড়বে এবং এই হবে ঐ হবে। এইভাবে সে তাদেরকে আতংকগ্রস্ত করলো। কিন্তু তারা তার কথা মানলেন না। আল্লাহর সদিচ্ছায় মৃত সন্তান ভূমিষ্ট হলো। দ্বিতীয়বার হযরত হাওয়া (আঃ) গর্ভধারণ করলেন। সেবার মৃত সন্তানই ভূমিষ্ট হলো। এবার শয়তান নিজেকে অত্যন্ত হিতাকাংখীরূপে তাদের সামনে পেশ করলো। তখন। সন্তানের ভালবাসা প্রাধান্য লাভ করলো এবং তারা সন্তানের নাম আব্দুল হারিস রেখে দিলেন। এর উপর ভিত্তি করেই আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর দেয়া এই দানে অংশী স্থাপন করে বসলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ হাদীসটি গ্রহণ করে তাঁর ছাত্রদের একটি দলও এ কথাই বলেছেন। যেমন মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), ইকরামা (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ)। অনুরূপভাবে পূর্ববর্তী থেকে নিয়ে পরবর্তী পর্যন্ত বহু মুফাসসির এই আয়াতের তাফসীরে এ কথাই বলেছেন। কিন্তু প্রকাশ্য ব্যাপার এই যে, এই ঘটনাটি আহলে কিতাব থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে। এর একটি বড় দলীল এই যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ওটা হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, যেমন তাফসীরে ইবনে আবূ হাতিমে রয়েছে। সুতরাং এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এ কথাটি আহলে কিতাব হতে নকল করা হয়েছে। যে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তাদের কথাকে সত্যও বলো না এবং মিথ্যাও বলো না।” এর বর্ণনা তিন প্রকারের হচ্ছে। (১) ঐসব কথা, যেগুলোর বিশুদ্ধতা কোন আয়াত বা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। (২) যেগুলোর অসত্যতা কোন আয়াত বা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়। (৩) ঐসব কথা, যেগুলোর ফায়সালা আমাদের ধর্মে মিলে না । হাদীসের নির্দেশ অনুযায়ী এগুলোর বর্ণনায় কোন দোষ নেই। কিন্তু এগুলো সত্য কি মিথ্যা এটা মন্তব্য করা চলবে না। আমার মতে এটা তো দ্বিতীয় প্রকারের হাদীস। অর্থাৎ মানবার যোগ্য নয়। আর যেসব সাহাবী ও তাবিঈ হতে এটা বর্ণিত আছে তারা এটাকে তৃতীয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত মনে করে বর্ণনা করে দিয়েছেন। কিন্তু আমরা তো ওটাই বলি যা ইমাম হাসান (রঃ) বলে থাকেন। তা হচ্ছে এই যে, মুশরিকদের তাদের সন্তানদের মধ্যে আল্লাহর শরীক করার বর্ণনা এই আয়াতগুলোতে রয়েছে। এটা হযরত আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-এর বর্ণনা নয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ তারা যাকে অংশী করে আল্লাহ তা অপেক্ষা অনেক উন্নত ও মহান। এই আয়াতগুলোতে এই বর্ণনা এবং ইতোপূর্বে হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-এর বর্ণনা ক্রমিক বর্ণনার মত। প্রথমে আসল মা-বাপের বর্ণনা দেয়ার পর মহান আল্লাহ অন্যান্য মা-বাপ ও তাদের শিরকের বর্ণনা দিয়েছেন।এখন ব্যক্তিগত বর্ণনা শেষ করে শ্রেণীগত বর্ণনার দিকে মোড় ফিরানো হচ্ছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি দুনিয়ার আকাশকে তারকারাজি দ্বারা সৌন্দর্য মণ্ডিত করেছি। আবার আমি ঐ তারকাগুলো দ্বারা শয়তানদেরকে মেরে তাড়াবার কাজ নিয়েছি।” আর এটা স্পষ্ট কথা যে, সৌন্দর্যের জন্যে যে তারকাগুলো নির্দিষ্ট রয়েছে সেগুলো ছিটকে পড়ে না। ঐগুলো দ্বারা শয়তানদেরকে মারা হয় না। এখানেও কথার মোড় ফিরানো হচ্ছে যে, তারকারাজির স্বাতন্ত্রের বর্ণনার পর শ্রেণীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এর আরও বহু দৃষ্টান্ত কুরআন কারীমের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তাআলাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জানেন।

আল-আরাফ 7:191

১৯১-১৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: যে মুশরিকরা আল্লাহকে ছেড়ে প্রতিমা-পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়ে তাদেরকে এখানে ভৎসনা করা হচ্ছে যে, এই প্রতিমাগুলোও আল্লাহর সৃষ্ট এবং মানুষই এগুলো নির্মাণ করেছে। এদের কোনই ক্ষমতা নেই। এগুলো কারও কোন ক্ষতিও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না। এদের দেখারও শক্তি নেই এবং যারা এদের ইবাদত করে তাদের এরা কোন সাহায্যও করতে পারে না। বরং এ মূর্তিগুলো তো জড় পদার্থের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারে না। এমন কি যারা এদের ইবাদত করে তারাও এদের চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায়, স্পর্শ করতে পারে এবং ধরতে পারে । এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা কি ঐ পাথরের মূর্তিগুলোকে আল্লাহর অংশীদার বানিয়ে নিচ্ছে যারা কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? বরং তারা নিজেরাই তো সৃষ্ট। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে লোক সকল! একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে দেখো! যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যান্যের উপাসনা করছে ঐ উপাস্যগুলো তো একটি মাছি পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারে না যদিও তারা সবাই একত্রিত হয়ে চেষ্টা করে, এমন কি মাছিও যদি তাদের খাবারের কোন জিনিস ছিনিয়ে নেয় তবে তারা তার নিকট থেকে তা ফিরিয়ে নিতেও পারে না। আকাংখী ও আকাংখিত উভয়েই কতই না দুর্বল ও শক্তিহীন!” তারা আল্লাহর মর্যাদা বুঝেনি। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড়ই শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। তাদের উপাস্যরা এতই দুর্বল ও শক্তিহীন যে, মাছি একটা নিকৃষ্ট খাবারও যদি তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে উড়ে যায় তবে তার নিকট থেকে তা কেড়ে নেয়ারও শক্তি এদের নেই। যাদের বিশেষণ এইরূপ তারা কি করে জীবিকা দান করতে পারে বা সাহায্য করতে পারে? যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি এমন জিনিসের ইবাদত করছো যাকে তোমরা নিজেরাই নির্মাণ করছো?” (৩৭:৯৫)।ইরশাদ হচ্ছে- তারা তাদের উপাসনাকারীদের সামান্য পরিমাণও সাহায্য করতে পারে না। এমন কি কেউ যদি তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে তবে তা থেকে তারা নিজেদেরকে রক্ষা করতেও পারে না। যেমন হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) স্বীয় কওমের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন এবং এভাবে পূর্ণমাত্রায় ওদেরকে লাঞ্ছিত করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মূর্তিগুলোকে ইবরাহীম (আঃ) মেরে মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। কিন্তু ভুতখানার সবচেয়ে বড় মূর্তিকে ছেড়ে দিলেন, যেন জনগণ এসে ঐ বড় মূর্তিটিকে জিজ্ঞেস করে যে, এটা কি হয়েছে এবং কে করেছে?হযরত মুআহ্ ইবনে আমর ইবনুল জামূহ (রাঃ) এবং হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) দু’জন যুবক লোক ছিলেন। তাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন। রাত্রিকালে তারা মদীনায় মুশরিকদের মূর্তিগুলোর নিকটে যেতেন এবং ওগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন। ওগুলো কাঠ দ্বারা নির্মিত হয়ে থাকলে ওগুলো ভেঙ্গে দিয়ে জ্বালানী কাষ্ঠ রূপে ব্যবহারের জন্যে গরীব বিধবা নারীদেরকে ওগুলো দিয়ে দিতেন।উদ্দেশ্য এই যে, যেন মুশরিকরা এর থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং নিজেদের আমল ও আকীদার উপর চিন্তা ভাবনা করে। আমর ইবনে জামূহ (রাঃ) ছিলেন স্বীয় গোত্রের নেতা! তাঁর একটা প্রতিমা ছিল। তিনি ঐ প্রতিমার পূজা করতেন। ওর গায়ে তিনি সুগন্ধি মাখাতেন। রাত্রিকালে ঐ দু'যুবক তার ভুতখানায় যেতেন এবং ঐ প্রতিমার মাথার উপর ময়লা-আবর্জনা রেখে দিতেন। আমর ইবনে জামূহ মূর্তিটিকে ঐ অবস্থায় দেখতেন এবং আবর্জনা ধুয়ে মুছে পুনরায় সুগন্ধি মাখাতেন। অতঃপর ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিয়ে বলতেনঃ “এর দ্বারা তুমি নিজেকে রক্ষা করবে।” দ্বিতীয় রাতে যুবকদ্বয় আবার ঐ কাজই করতেন এবং ইবনে জামৃহ ওটা ধুয়ে মুছে সাফ করতেন এবং পুনরায় ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিতেন। অবশেষে একদিন যুবকদ্বয় ঐ মূর্তিটিকে বের করে আনেন এবং একটি কুকুরের মৃত দেহের সাথে ওকে বেঁধে একটি রজ্জ্বর মাধ্যমে একটি কুয়ায় লটকিয়ে দেন। আমর ইবনে জামূহ এসে মূর্তিটিকে এ অবস্থায় যখন দেখলেন তখন তার জ্ঞান আসলো যে, তিনি প্রতিমা পূজায় লিপ্ত থেকে এতোদিন বাতিল আকীদার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তাই তিনি মূর্তিটিকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তুমি যদি সত্যিই উপাস্য হতে তবে এই কুয়ার মধ্যে কুকুরটির সাথে পড়ে থাকতে না।” অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন ভাল মুসলিম রূপে জীবন অতিবাহিত করেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।ইরশাদ হচ্ছে- তুমি যদি ওদেরকে সৎপথে ডাকো তবে ওরা তোমার অনুসরণ করবে না। অর্থাৎ লো কারো ডাক শুনতে পায় না। ওদেরকে। ডাকা এবং না ডাকা সমান কথা। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে পিতা! এমন মূর্তির উপাসনা করবেন না যা না শুনতে পায়, না দেখতে পায়, না আপনার কোন কাজ করে দেয়।” আল্লাহ পাক বলেনঃ মূর্তিপূজকের মত এই মূর্তিগুলোও আল্লাহরই সৃষ্ট। এমন কি এই মূর্তিপূজকরাই বরং মূর্তিগুলোর চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায় এবং স্পর্শ করতে তো পারে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আল্লাহর সাথে তোমরা যাদেরকে অংশী করছে তাদেরকে ডাকো, তারপর সকলে সমবেত হয়ে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে থাকো এবং আমাকে আদৌ কোন অবকাশ দিয়ো না। আর আমার বিরুদ্ধে মন খুলে চেষ্টা চালিয়ে দেখো। আমার সাহায্যকারী হচ্ছেন ঐ আল্লাহ যিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তিনি সঙ্কর্মশীলদের অভিভাবক। ঐ আল্লাহই আমার জন্যে যথেষ্ট। তিনিই আমাকে সাহায্য করবেন। তাঁরই উপর আমি ভরসা করছি। আমি যদি বাধ্য হই তবে তাঁরই বাধ্য হবো। তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে শুধু আমার নয় বরং আমার পরেও সকল সৎকর্মশীল লোকেরই অভিভাবক ও বন্ধু । যেমন হূদ (আঃ) স্বীয় কওমের কথার প্রতি উত্তরে বলেছিলেন, যখন তারা তাকে অপবাদ দিয়ে বলেছিলঃ “তোমার উপর আমাদের দেবতাদের মার পড়েছে, এ জন্যেই তুমি এসব বিভ্রান্তি মূলক কথা বলছো।” তিনি উত্তরে তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তো আল্লাহরই সাক্ষ্য দান করছি এবং পরিষ্কারভাবে তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি যে, আমি তোমাদের শরীকদের প্রতি ঘৃণা ও অসন্তোষ প্রকাশ করছি। আচ্ছা, তোমরা সমবেতভাবে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে দেখো এবং আমাকে আত্মরক্ষার সুযোগে পর্যন্ত দিয়ো না। তোমরা আমার কি ক্ষতি করবে? আমার ভরসাস্থল একমাত্র আল্লাহ। তিনি আমার তোমাদের সবারই প্রতিপালক। দুনিয়ায় এমন কোন প্রাণী নেই যার বাগডোর তার হাতে নেই। আমার প্রতিপালক সরল ও সঠিক পথে রয়েছেন।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ “যে প্রতিমাগুলোর পূজা তোমরা করছো এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা করতো সেগুলো সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? এরা তো আমার শত্রু, আর আমার বন্ধু হচ্ছেন স্বয়ং আমার প্রতিপালক। তিনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।” আরো যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতা এবং কওমের লোককে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদের দেবতাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আমি আমার আল্লাহরই ইবাদতকারী যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আমাকে হিদায়াতের পথে চালিয়েছেন, আর এর পেছনে তিনি এটাকে একটা স্মারক হিসাবে রেখে দিয়েছেন, আশা এই যে, হয়তো এরা নিজেদের কার্যকলাপ থেকে ফিরে আসবে।” এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে- এরা না তোমাদের সাহায্য করতে পারে, না পারে নিজেদেরকে সাহায্য করতে। যদি তুমি তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান কর তবে তারা তোমার ডাক শুনতে পাবে না। তুমি মনে করছে যে, ওরা (মূর্তিগুলো) তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কিন্তু আসলে কিছুই দেখে না। ওরা ছবির চক্ষু দ্বারা তোমাকে দেখছে। মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতই তোমার প্রতি দৃষ্টিপাত করছে। কিন্তু বাস্তবে তো ওরা নিজীব। এ জন্যেই ওদের সম্পর্কে এমন ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে যেমন জ্ঞান বুদ্ধির অধিকারীর ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়। কেননা, ওগুলো হচ্ছে মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট এবং মানুষের মতই মনে হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ তুমি দেখছো যে, তারা যেন মনোযোগের সাথে তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এ কারণেই ওদের ব্যাপারে সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানুষের বেলায় প্রয়োগ করা হয়। অথচ ওগুলো তো জড় পদার্থ ও নিজীব। আর নির্জীব ও জড় পদার্থের ব্যাপারে (আরবী) সর্বনাম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুদ্দী (রঃ) এর দ্বারা প্রতিমার পরিবর্তে মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রথম মতটিই সঠিকতর।

আল-আরাফ 7:192

১৯১-১৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: যে মুশরিকরা আল্লাহকে ছেড়ে প্রতিমা-পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়ে তাদেরকে এখানে ভৎসনা করা হচ্ছে যে, এই প্রতিমাগুলোও আল্লাহর সৃষ্ট এবং মানুষই এগুলো নির্মাণ করেছে। এদের কোনই ক্ষমতা নেই। এগুলো কারও কোন ক্ষতিও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না। এদের দেখারও শক্তি নেই এবং যারা এদের ইবাদত করে তাদের এরা কোন সাহায্যও করতে পারে না। বরং এ মূর্তিগুলো তো জড় পদার্থের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারে না। এমন কি যারা এদের ইবাদত করে তারাও এদের চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায়, স্পর্শ করতে পারে এবং ধরতে পারে । এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা কি ঐ পাথরের মূর্তিগুলোকে আল্লাহর অংশীদার বানিয়ে নিচ্ছে যারা কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? বরং তারা নিজেরাই তো সৃষ্ট। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে লোক সকল! একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে দেখো! যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যান্যের উপাসনা করছে ঐ উপাস্যগুলো তো একটি মাছি পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারে না যদিও তারা সবাই একত্রিত হয়ে চেষ্টা করে, এমন কি মাছিও যদি তাদের খাবারের কোন জিনিস ছিনিয়ে নেয় তবে তারা তার নিকট থেকে তা ফিরিয়ে নিতেও পারে না। আকাংখী ও আকাংখিত উভয়েই কতই না দুর্বল ও শক্তিহীন!” তারা আল্লাহর মর্যাদা বুঝেনি। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড়ই শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। তাদের উপাস্যরা এতই দুর্বল ও শক্তিহীন যে, মাছি একটা নিকৃষ্ট খাবারও যদি তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে উড়ে যায় তবে তার নিকট থেকে তা কেড়ে নেয়ারও শক্তি এদের নেই। যাদের বিশেষণ এইরূপ তারা কি করে জীবিকা দান করতে পারে বা সাহায্য করতে পারে? যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি এমন জিনিসের ইবাদত করছো যাকে তোমরা নিজেরাই নির্মাণ করছো?” (৩৭:৯৫)।ইরশাদ হচ্ছে- তারা তাদের উপাসনাকারীদের সামান্য পরিমাণও সাহায্য করতে পারে না। এমন কি কেউ যদি তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে তবে তা থেকে তারা নিজেদেরকে রক্ষা করতেও পারে না। যেমন হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) স্বীয় কওমের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন এবং এভাবে পূর্ণমাত্রায় ওদেরকে লাঞ্ছিত করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মূর্তিগুলোকে ইবরাহীম (আঃ) মেরে মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। কিন্তু ভুতখানার সবচেয়ে বড় মূর্তিকে ছেড়ে দিলেন, যেন জনগণ এসে ঐ বড় মূর্তিটিকে জিজ্ঞেস করে যে, এটা কি হয়েছে এবং কে করেছে?হযরত মুআহ্ ইবনে আমর ইবনুল জামূহ (রাঃ) এবং হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) দু’জন যুবক লোক ছিলেন। তাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন। রাত্রিকালে তারা মদীনায় মুশরিকদের মূর্তিগুলোর নিকটে যেতেন এবং ওগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন। ওগুলো কাঠ দ্বারা নির্মিত হয়ে থাকলে ওগুলো ভেঙ্গে দিয়ে জ্বালানী কাষ্ঠ রূপে ব্যবহারের জন্যে গরীব বিধবা নারীদেরকে ওগুলো দিয়ে দিতেন।উদ্দেশ্য এই যে, যেন মুশরিকরা এর থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং নিজেদের আমল ও আকীদার উপর চিন্তা ভাবনা করে। আমর ইবনে জামূহ (রাঃ) ছিলেন স্বীয় গোত্রের নেতা! তাঁর একটা প্রতিমা ছিল। তিনি ঐ প্রতিমার পূজা করতেন। ওর গায়ে তিনি সুগন্ধি মাখাতেন। রাত্রিকালে ঐ দু'যুবক তার ভুতখানায় যেতেন এবং ঐ প্রতিমার মাথার উপর ময়লা-আবর্জনা রেখে দিতেন। আমর ইবনে জামূহ মূর্তিটিকে ঐ অবস্থায় দেখতেন এবং আবর্জনা ধুয়ে মুছে পুনরায় সুগন্ধি মাখাতেন। অতঃপর ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিয়ে বলতেনঃ “এর দ্বারা তুমি নিজেকে রক্ষা করবে।” দ্বিতীয় রাতে যুবকদ্বয় আবার ঐ কাজই করতেন এবং ইবনে জামৃহ ওটা ধুয়ে মুছে সাফ করতেন এবং পুনরায় ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিতেন। অবশেষে একদিন যুবকদ্বয় ঐ মূর্তিটিকে বের করে আনেন এবং একটি কুকুরের মৃত দেহের সাথে ওকে বেঁধে একটি রজ্জ্বর মাধ্যমে একটি কুয়ায় লটকিয়ে দেন। আমর ইবনে জামূহ এসে মূর্তিটিকে এ অবস্থায় যখন দেখলেন তখন তার জ্ঞান আসলো যে, তিনি প্রতিমা পূজায় লিপ্ত থেকে এতোদিন বাতিল আকীদার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তাই তিনি মূর্তিটিকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তুমি যদি সত্যিই উপাস্য হতে তবে এই কুয়ার মধ্যে কুকুরটির সাথে পড়ে থাকতে না।” অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন ভাল মুসলিম রূপে জীবন অতিবাহিত করেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।ইরশাদ হচ্ছে- তুমি যদি ওদেরকে সৎপথে ডাকো তবে ওরা তোমার অনুসরণ করবে না। অর্থাৎ লো কারো ডাক শুনতে পায় না। ওদেরকে। ডাকা এবং না ডাকা সমান কথা। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে পিতা! এমন মূর্তির উপাসনা করবেন না যা না শুনতে পায়, না দেখতে পায়, না আপনার কোন কাজ করে দেয়।” আল্লাহ পাক বলেনঃ মূর্তিপূজকের মত এই মূর্তিগুলোও আল্লাহরই সৃষ্ট। এমন কি এই মূর্তিপূজকরাই বরং মূর্তিগুলোর চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায় এবং স্পর্শ করতে তো পারে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আল্লাহর সাথে তোমরা যাদেরকে অংশী করছে তাদেরকে ডাকো, তারপর সকলে সমবেত হয়ে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে থাকো এবং আমাকে আদৌ কোন অবকাশ দিয়ো না। আর আমার বিরুদ্ধে মন খুলে চেষ্টা চালিয়ে দেখো। আমার সাহায্যকারী হচ্ছেন ঐ আল্লাহ যিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তিনি সঙ্কর্মশীলদের অভিভাবক। ঐ আল্লাহই আমার জন্যে যথেষ্ট। তিনিই আমাকে সাহায্য করবেন। তাঁরই উপর আমি ভরসা করছি। আমি যদি বাধ্য হই তবে তাঁরই বাধ্য হবো। তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে শুধু আমার নয় বরং আমার পরেও সকল সৎকর্মশীল লোকেরই অভিভাবক ও বন্ধু । যেমন হূদ (আঃ) স্বীয় কওমের কথার প্রতি উত্তরে বলেছিলেন, যখন তারা তাকে অপবাদ দিয়ে বলেছিলঃ “তোমার উপর আমাদের দেবতাদের মার পড়েছে, এ জন্যেই তুমি এসব বিভ্রান্তি মূলক কথা বলছো।” তিনি উত্তরে তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তো আল্লাহরই সাক্ষ্য দান করছি এবং পরিষ্কারভাবে তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি যে, আমি তোমাদের শরীকদের প্রতি ঘৃণা ও অসন্তোষ প্রকাশ করছি। আচ্ছা, তোমরা সমবেতভাবে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে দেখো এবং আমাকে আত্মরক্ষার সুযোগে পর্যন্ত দিয়ো না। তোমরা আমার কি ক্ষতি করবে? আমার ভরসাস্থল একমাত্র আল্লাহ। তিনি আমার তোমাদের সবারই প্রতিপালক। দুনিয়ায় এমন কোন প্রাণী নেই যার বাগডোর তার হাতে নেই। আমার প্রতিপালক সরল ও সঠিক পথে রয়েছেন।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ “যে প্রতিমাগুলোর পূজা তোমরা করছো এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা করতো সেগুলো সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? এরা তো আমার শত্রু, আর আমার বন্ধু হচ্ছেন স্বয়ং আমার প্রতিপালক। তিনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।” আরো যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতা এবং কওমের লোককে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদের দেবতাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আমি আমার আল্লাহরই ইবাদতকারী যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আমাকে হিদায়াতের পথে চালিয়েছেন, আর এর পেছনে তিনি এটাকে একটা স্মারক হিসাবে রেখে দিয়েছেন, আশা এই যে, হয়তো এরা নিজেদের কার্যকলাপ থেকে ফিরে আসবে।” এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে- এরা না তোমাদের সাহায্য করতে পারে, না পারে নিজেদেরকে সাহায্য করতে। যদি তুমি তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান কর তবে তারা তোমার ডাক শুনতে পাবে না। তুমি মনে করছে যে, ওরা (মূর্তিগুলো) তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কিন্তু আসলে কিছুই দেখে না। ওরা ছবির চক্ষু দ্বারা তোমাকে দেখছে। মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতই তোমার প্রতি দৃষ্টিপাত করছে। কিন্তু বাস্তবে তো ওরা নিজীব। এ জন্যেই ওদের সম্পর্কে এমন ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে যেমন জ্ঞান বুদ্ধির অধিকারীর ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়। কেননা, ওগুলো হচ্ছে মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট এবং মানুষের মতই মনে হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ তুমি দেখছো যে, তারা যেন মনোযোগের সাথে তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এ কারণেই ওদের ব্যাপারে সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানুষের বেলায় প্রয়োগ করা হয়। অথচ ওগুলো তো জড় পদার্থ ও নিজীব। আর নির্জীব ও জড় পদার্থের ব্যাপারে (আরবী) সর্বনাম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুদ্দী (রঃ) এর দ্বারা প্রতিমার পরিবর্তে মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রথম মতটিই সঠিকতর।

আল-আরাফ 7:193

১৯১-১৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: যে মুশরিকরা আল্লাহকে ছেড়ে প্রতিমা-পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়ে তাদেরকে এখানে ভৎসনা করা হচ্ছে যে, এই প্রতিমাগুলোও আল্লাহর সৃষ্ট এবং মানুষই এগুলো নির্মাণ করেছে। এদের কোনই ক্ষমতা নেই। এগুলো কারও কোন ক্ষতিও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না। এদের দেখারও শক্তি নেই এবং যারা এদের ইবাদত করে তাদের এরা কোন সাহায্যও করতে পারে না। বরং এ মূর্তিগুলো তো জড় পদার্থের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারে না। এমন কি যারা এদের ইবাদত করে তারাও এদের চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায়, স্পর্শ করতে পারে এবং ধরতে পারে । এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা কি ঐ পাথরের মূর্তিগুলোকে আল্লাহর অংশীদার বানিয়ে নিচ্ছে যারা কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? বরং তারা নিজেরাই তো সৃষ্ট। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে লোক সকল! একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে দেখো! যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যান্যের উপাসনা করছে ঐ উপাস্যগুলো তো একটি মাছি পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারে না যদিও তারা সবাই একত্রিত হয়ে চেষ্টা করে, এমন কি মাছিও যদি তাদের খাবারের কোন জিনিস ছিনিয়ে নেয় তবে তারা তার নিকট থেকে তা ফিরিয়ে নিতেও পারে না। আকাংখী ও আকাংখিত উভয়েই কতই না দুর্বল ও শক্তিহীন!” তারা আল্লাহর মর্যাদা বুঝেনি। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড়ই শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। তাদের উপাস্যরা এতই দুর্বল ও শক্তিহীন যে, মাছি একটা নিকৃষ্ট খাবারও যদি তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে উড়ে যায় তবে তার নিকট থেকে তা কেড়ে নেয়ারও শক্তি এদের নেই। যাদের বিশেষণ এইরূপ তারা কি করে জীবিকা দান করতে পারে বা সাহায্য করতে পারে? যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি এমন জিনিসের ইবাদত করছো যাকে তোমরা নিজেরাই নির্মাণ করছো?” (৩৭:৯৫)।ইরশাদ হচ্ছে- তারা তাদের উপাসনাকারীদের সামান্য পরিমাণও সাহায্য করতে পারে না। এমন কি কেউ যদি তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে তবে তা থেকে তারা নিজেদেরকে রক্ষা করতেও পারে না। যেমন হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) স্বীয় কওমের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন এবং এভাবে পূর্ণমাত্রায় ওদেরকে লাঞ্ছিত করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মূর্তিগুলোকে ইবরাহীম (আঃ) মেরে মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। কিন্তু ভুতখানার সবচেয়ে বড় মূর্তিকে ছেড়ে দিলেন, যেন জনগণ এসে ঐ বড় মূর্তিটিকে জিজ্ঞেস করে যে, এটা কি হয়েছে এবং কে করেছে?হযরত মুআহ্ ইবনে আমর ইবনুল জামূহ (রাঃ) এবং হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) দু’জন যুবক লোক ছিলেন। তাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন। রাত্রিকালে তারা মদীনায় মুশরিকদের মূর্তিগুলোর নিকটে যেতেন এবং ওগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন। ওগুলো কাঠ দ্বারা নির্মিত হয়ে থাকলে ওগুলো ভেঙ্গে দিয়ে জ্বালানী কাষ্ঠ রূপে ব্যবহারের জন্যে গরীব বিধবা নারীদেরকে ওগুলো দিয়ে দিতেন।উদ্দেশ্য এই যে, যেন মুশরিকরা এর থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং নিজেদের আমল ও আকীদার উপর চিন্তা ভাবনা করে। আমর ইবনে জামূহ (রাঃ) ছিলেন স্বীয় গোত্রের নেতা! তাঁর একটা প্রতিমা ছিল। তিনি ঐ প্রতিমার পূজা করতেন। ওর গায়ে তিনি সুগন্ধি মাখাতেন। রাত্রিকালে ঐ দু'যুবক তার ভুতখানায় যেতেন এবং ঐ প্রতিমার মাথার উপর ময়লা-আবর্জনা রেখে দিতেন। আমর ইবনে জামূহ মূর্তিটিকে ঐ অবস্থায় দেখতেন এবং আবর্জনা ধুয়ে মুছে পুনরায় সুগন্ধি মাখাতেন। অতঃপর ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিয়ে বলতেনঃ “এর দ্বারা তুমি নিজেকে রক্ষা করবে।” দ্বিতীয় রাতে যুবকদ্বয় আবার ঐ কাজই করতেন এবং ইবনে জামৃহ ওটা ধুয়ে মুছে সাফ করতেন এবং পুনরায় ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিতেন। অবশেষে একদিন যুবকদ্বয় ঐ মূর্তিটিকে বের করে আনেন এবং একটি কুকুরের মৃত দেহের সাথে ওকে বেঁধে একটি রজ্জ্বর মাধ্যমে একটি কুয়ায় লটকিয়ে দেন। আমর ইবনে জামূহ এসে মূর্তিটিকে এ অবস্থায় যখন দেখলেন তখন তার জ্ঞান আসলো যে, তিনি প্রতিমা পূজায় লিপ্ত থেকে এতোদিন বাতিল আকীদার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তাই তিনি মূর্তিটিকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তুমি যদি সত্যিই উপাস্য হতে তবে এই কুয়ার মধ্যে কুকুরটির সাথে পড়ে থাকতে না।” অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন ভাল মুসলিম রূপে জীবন অতিবাহিত করেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।ইরশাদ হচ্ছে- তুমি যদি ওদেরকে সৎপথে ডাকো তবে ওরা তোমার অনুসরণ করবে না। অর্থাৎ লো কারো ডাক শুনতে পায় না। ওদেরকে। ডাকা এবং না ডাকা সমান কথা। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে পিতা! এমন মূর্তির উপাসনা করবেন না যা না শুনতে পায়, না দেখতে পায়, না আপনার কোন কাজ করে দেয়।” আল্লাহ পাক বলেনঃ মূর্তিপূজকের মত এই মূর্তিগুলোও আল্লাহরই সৃষ্ট। এমন কি এই মূর্তিপূজকরাই বরং মূর্তিগুলোর চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায় এবং স্পর্শ করতে তো পারে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আল্লাহর সাথে তোমরা যাদেরকে অংশী করছে তাদেরকে ডাকো, তারপর সকলে সমবেত হয়ে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে থাকো এবং আমাকে আদৌ কোন অবকাশ দিয়ো না। আর আমার বিরুদ্ধে মন খুলে চেষ্টা চালিয়ে দেখো। আমার সাহায্যকারী হচ্ছেন ঐ আল্লাহ যিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তিনি সঙ্কর্মশীলদের অভিভাবক। ঐ আল্লাহই আমার জন্যে যথেষ্ট। তিনিই আমাকে সাহায্য করবেন। তাঁরই উপর আমি ভরসা করছি। আমি যদি বাধ্য হই তবে তাঁরই বাধ্য হবো। তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে শুধু আমার নয় বরং আমার পরেও সকল সৎকর্মশীল লোকেরই অভিভাবক ও বন্ধু । যেমন হূদ (আঃ) স্বীয় কওমের কথার প্রতি উত্তরে বলেছিলেন, যখন তারা তাকে অপবাদ দিয়ে বলেছিলঃ “তোমার উপর আমাদের দেবতাদের মার পড়েছে, এ জন্যেই তুমি এসব বিভ্রান্তি মূলক কথা বলছো।” তিনি উত্তরে তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তো আল্লাহরই সাক্ষ্য দান করছি এবং পরিষ্কারভাবে তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি যে, আমি তোমাদের শরীকদের প্রতি ঘৃণা ও অসন্তোষ প্রকাশ করছি। আচ্ছা, তোমরা সমবেতভাবে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে দেখো এবং আমাকে আত্মরক্ষার সুযোগে পর্যন্ত দিয়ো না। তোমরা আমার কি ক্ষতি করবে? আমার ভরসাস্থল একমাত্র আল্লাহ। তিনি আমার তোমাদের সবারই প্রতিপালক। দুনিয়ায় এমন কোন প্রাণী নেই যার বাগডোর তার হাতে নেই। আমার প্রতিপালক সরল ও সঠিক পথে রয়েছেন।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ “যে প্রতিমাগুলোর পূজা তোমরা করছো এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা করতো সেগুলো সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? এরা তো আমার শত্রু, আর আমার বন্ধু হচ্ছেন স্বয়ং আমার প্রতিপালক। তিনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।” আরো যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতা এবং কওমের লোককে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদের দেবতাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আমি আমার আল্লাহরই ইবাদতকারী যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আমাকে হিদায়াতের পথে চালিয়েছেন, আর এর পেছনে তিনি এটাকে একটা স্মারক হিসাবে রেখে দিয়েছেন, আশা এই যে, হয়তো এরা নিজেদের কার্যকলাপ থেকে ফিরে আসবে।” এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে- এরা না তোমাদের সাহায্য করতে পারে, না পারে নিজেদেরকে সাহায্য করতে। যদি তুমি তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান কর তবে তারা তোমার ডাক শুনতে পাবে না। তুমি মনে করছে যে, ওরা (মূর্তিগুলো) তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কিন্তু আসলে কিছুই দেখে না। ওরা ছবির চক্ষু দ্বারা তোমাকে দেখছে। মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতই তোমার প্রতি দৃষ্টিপাত করছে। কিন্তু বাস্তবে তো ওরা নিজীব। এ জন্যেই ওদের সম্পর্কে এমন ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে যেমন জ্ঞান বুদ্ধির অধিকারীর ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়। কেননা, ওগুলো হচ্ছে মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট এবং মানুষের মতই মনে হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ তুমি দেখছো যে, তারা যেন মনোযোগের সাথে তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এ কারণেই ওদের ব্যাপারে সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানুষের বেলায় প্রয়োগ করা হয়। অথচ ওগুলো তো জড় পদার্থ ও নিজীব। আর নির্জীব ও জড় পদার্থের ব্যাপারে (আরবী) সর্বনাম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুদ্দী (রঃ) এর দ্বারা প্রতিমার পরিবর্তে মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রথম মতটিই সঠিকতর।

আল-আরাফ 7:194

১৯১-১৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: যে মুশরিকরা আল্লাহকে ছেড়ে প্রতিমা-পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়ে তাদেরকে এখানে ভৎসনা করা হচ্ছে যে, এই প্রতিমাগুলোও আল্লাহর সৃষ্ট এবং মানুষই এগুলো নির্মাণ করেছে। এদের কোনই ক্ষমতা নেই। এগুলো কারও কোন ক্ষতিও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না। এদের দেখারও শক্তি নেই এবং যারা এদের ইবাদত করে তাদের এরা কোন সাহায্যও করতে পারে না। বরং এ মূর্তিগুলো তো জড় পদার্থের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারে না। এমন কি যারা এদের ইবাদত করে তারাও এদের চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায়, স্পর্শ করতে পারে এবং ধরতে পারে । এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা কি ঐ পাথরের মূর্তিগুলোকে আল্লাহর অংশীদার বানিয়ে নিচ্ছে যারা কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? বরং তারা নিজেরাই তো সৃষ্ট। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে লোক সকল! একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে দেখো! যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যান্যের উপাসনা করছে ঐ উপাস্যগুলো তো একটি মাছি পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারে না যদিও তারা সবাই একত্রিত হয়ে চেষ্টা করে, এমন কি মাছিও যদি তাদের খাবারের কোন জিনিস ছিনিয়ে নেয় তবে তারা তার নিকট থেকে তা ফিরিয়ে নিতেও পারে না। আকাংখী ও আকাংখিত উভয়েই কতই না দুর্বল ও শক্তিহীন!” তারা আল্লাহর মর্যাদা বুঝেনি। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড়ই শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। তাদের উপাস্যরা এতই দুর্বল ও শক্তিহীন যে, মাছি একটা নিকৃষ্ট খাবারও যদি তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে উড়ে যায় তবে তার নিকট থেকে তা কেড়ে নেয়ারও শক্তি এদের নেই। যাদের বিশেষণ এইরূপ তারা কি করে জীবিকা দান করতে পারে বা সাহায্য করতে পারে? যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি এমন জিনিসের ইবাদত করছো যাকে তোমরা নিজেরাই নির্মাণ করছো?” (৩৭:৯৫)।ইরশাদ হচ্ছে- তারা তাদের উপাসনাকারীদের সামান্য পরিমাণও সাহায্য করতে পারে না। এমন কি কেউ যদি তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে তবে তা থেকে তারা নিজেদেরকে রক্ষা করতেও পারে না। যেমন হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) স্বীয় কওমের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন এবং এভাবে পূর্ণমাত্রায় ওদেরকে লাঞ্ছিত করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মূর্তিগুলোকে ইবরাহীম (আঃ) মেরে মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। কিন্তু ভুতখানার সবচেয়ে বড় মূর্তিকে ছেড়ে দিলেন, যেন জনগণ এসে ঐ বড় মূর্তিটিকে জিজ্ঞেস করে যে, এটা কি হয়েছে এবং কে করেছে?হযরত মুআহ্ ইবনে আমর ইবনুল জামূহ (রাঃ) এবং হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) দু’জন যুবক লোক ছিলেন। তাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন। রাত্রিকালে তারা মদীনায় মুশরিকদের মূর্তিগুলোর নিকটে যেতেন এবং ওগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন। ওগুলো কাঠ দ্বারা নির্মিত হয়ে থাকলে ওগুলো ভেঙ্গে দিয়ে জ্বালানী কাষ্ঠ রূপে ব্যবহারের জন্যে গরীব বিধবা নারীদেরকে ওগুলো দিয়ে দিতেন।উদ্দেশ্য এই যে, যেন মুশরিকরা এর থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং নিজেদের আমল ও আকীদার উপর চিন্তা ভাবনা করে। আমর ইবনে জামূহ (রাঃ) ছিলেন স্বীয় গোত্রের নেতা! তাঁর একটা প্রতিমা ছিল। তিনি ঐ প্রতিমার পূজা করতেন। ওর গায়ে তিনি সুগন্ধি মাখাতেন। রাত্রিকালে ঐ দু'যুবক তার ভুতখানায় যেতেন এবং ঐ প্রতিমার মাথার উপর ময়লা-আবর্জনা রেখে দিতেন। আমর ইবনে জামূহ মূর্তিটিকে ঐ অবস্থায় দেখতেন এবং আবর্জনা ধুয়ে মুছে পুনরায় সুগন্ধি মাখাতেন। অতঃপর ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিয়ে বলতেনঃ “এর দ্বারা তুমি নিজেকে রক্ষা করবে।” দ্বিতীয় রাতে যুবকদ্বয় আবার ঐ কাজই করতেন এবং ইবনে জামৃহ ওটা ধুয়ে মুছে সাফ করতেন এবং পুনরায় ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিতেন। অবশেষে একদিন যুবকদ্বয় ঐ মূর্তিটিকে বের করে আনেন এবং একটি কুকুরের মৃত দেহের সাথে ওকে বেঁধে একটি রজ্জ্বর মাধ্যমে একটি কুয়ায় লটকিয়ে দেন। আমর ইবনে জামূহ এসে মূর্তিটিকে এ অবস্থায় যখন দেখলেন তখন তার জ্ঞান আসলো যে, তিনি প্রতিমা পূজায় লিপ্ত থেকে এতোদিন বাতিল আকীদার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তাই তিনি মূর্তিটিকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তুমি যদি সত্যিই উপাস্য হতে তবে এই কুয়ার মধ্যে কুকুরটির সাথে পড়ে থাকতে না।” অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন ভাল মুসলিম রূপে জীবন অতিবাহিত করেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।ইরশাদ হচ্ছে- তুমি যদি ওদেরকে সৎপথে ডাকো তবে ওরা তোমার অনুসরণ করবে না। অর্থাৎ লো কারো ডাক শুনতে পায় না। ওদেরকে। ডাকা এবং না ডাকা সমান কথা। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে পিতা! এমন মূর্তির উপাসনা করবেন না যা না শুনতে পায়, না দেখতে পায়, না আপনার কোন কাজ করে দেয়।” আল্লাহ পাক বলেনঃ মূর্তিপূজকের মত এই মূর্তিগুলোও আল্লাহরই সৃষ্ট। এমন কি এই মূর্তিপূজকরাই বরং মূর্তিগুলোর চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায় এবং স্পর্শ করতে তো পারে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আল্লাহর সাথে তোমরা যাদেরকে অংশী করছে তাদেরকে ডাকো, তারপর সকলে সমবেত হয়ে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে থাকো এবং আমাকে আদৌ কোন অবকাশ দিয়ো না। আর আমার বিরুদ্ধে মন খুলে চেষ্টা চালিয়ে দেখো। আমার সাহায্যকারী হচ্ছেন ঐ আল্লাহ যিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তিনি সঙ্কর্মশীলদের অভিভাবক। ঐ আল্লাহই আমার জন্যে যথেষ্ট। তিনিই আমাকে সাহায্য করবেন। তাঁরই উপর আমি ভরসা করছি। আমি যদি বাধ্য হই তবে তাঁরই বাধ্য হবো। তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে শুধু আমার নয় বরং আমার পরেও সকল সৎকর্মশীল লোকেরই অভিভাবক ও বন্ধু । যেমন হূদ (আঃ) স্বীয় কওমের কথার প্রতি উত্তরে বলেছিলেন, যখন তারা তাকে অপবাদ দিয়ে বলেছিলঃ “তোমার উপর আমাদের দেবতাদের মার পড়েছে, এ জন্যেই তুমি এসব বিভ্রান্তি মূলক কথা বলছো।” তিনি উত্তরে তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তো আল্লাহরই সাক্ষ্য দান করছি এবং পরিষ্কারভাবে তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি যে, আমি তোমাদের শরীকদের প্রতি ঘৃণা ও অসন্তোষ প্রকাশ করছি। আচ্ছা, তোমরা সমবেতভাবে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে দেখো এবং আমাকে আত্মরক্ষার সুযোগে পর্যন্ত দিয়ো না। তোমরা আমার কি ক্ষতি করবে? আমার ভরসাস্থল একমাত্র আল্লাহ। তিনি আমার তোমাদের সবারই প্রতিপালক। দুনিয়ায় এমন কোন প্রাণী নেই যার বাগডোর তার হাতে নেই। আমার প্রতিপালক সরল ও সঠিক পথে রয়েছেন।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ “যে প্রতিমাগুলোর পূজা তোমরা করছো এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা করতো সেগুলো সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? এরা তো আমার শত্রু, আর আমার বন্ধু হচ্ছেন স্বয়ং আমার প্রতিপালক। তিনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।” আরো যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতা এবং কওমের লোককে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদের দেবতাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আমি আমার আল্লাহরই ইবাদতকারী যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আমাকে হিদায়াতের পথে চালিয়েছেন, আর এর পেছনে তিনি এটাকে একটা স্মারক হিসাবে রেখে দিয়েছেন, আশা এই যে, হয়তো এরা নিজেদের কার্যকলাপ থেকে ফিরে আসবে।” এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে- এরা না তোমাদের সাহায্য করতে পারে, না পারে নিজেদেরকে সাহায্য করতে। যদি তুমি তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান কর তবে তারা তোমার ডাক শুনতে পাবে না। তুমি মনে করছে যে, ওরা (মূর্তিগুলো) তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কিন্তু আসলে কিছুই দেখে না। ওরা ছবির চক্ষু দ্বারা তোমাকে দেখছে। মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতই তোমার প্রতি দৃষ্টিপাত করছে। কিন্তু বাস্তবে তো ওরা নিজীব। এ জন্যেই ওদের সম্পর্কে এমন ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে যেমন জ্ঞান বুদ্ধির অধিকারীর ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়। কেননা, ওগুলো হচ্ছে মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট এবং মানুষের মতই মনে হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ তুমি দেখছো যে, তারা যেন মনোযোগের সাথে তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এ কারণেই ওদের ব্যাপারে সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানুষের বেলায় প্রয়োগ করা হয়। অথচ ওগুলো তো জড় পদার্থ ও নিজীব। আর নির্জীব ও জড় পদার্থের ব্যাপারে (আরবী) সর্বনাম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুদ্দী (রঃ) এর দ্বারা প্রতিমার পরিবর্তে মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রথম মতটিই সঠিকতর।

আল-আরাফ 7:195

১৯১-১৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: যে মুশরিকরা আল্লাহকে ছেড়ে প্রতিমা-পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়ে তাদেরকে এখানে ভৎসনা করা হচ্ছে যে, এই প্রতিমাগুলোও আল্লাহর সৃষ্ট এবং মানুষই এগুলো নির্মাণ করেছে। এদের কোনই ক্ষমতা নেই। এগুলো কারও কোন ক্ষতিও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না। এদের দেখারও শক্তি নেই এবং যারা এদের ইবাদত করে তাদের এরা কোন সাহায্যও করতে পারে না। বরং এ মূর্তিগুলো তো জড় পদার্থের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারে না। এমন কি যারা এদের ইবাদত করে তারাও এদের চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায়, স্পর্শ করতে পারে এবং ধরতে পারে । এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা কি ঐ পাথরের মূর্তিগুলোকে আল্লাহর অংশীদার বানিয়ে নিচ্ছে যারা কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? বরং তারা নিজেরাই তো সৃষ্ট। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে লোক সকল! একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে দেখো! যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যান্যের উপাসনা করছে ঐ উপাস্যগুলো তো একটি মাছি পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারে না যদিও তারা সবাই একত্রিত হয়ে চেষ্টা করে, এমন কি মাছিও যদি তাদের খাবারের কোন জিনিস ছিনিয়ে নেয় তবে তারা তার নিকট থেকে তা ফিরিয়ে নিতেও পারে না। আকাংখী ও আকাংখিত উভয়েই কতই না দুর্বল ও শক্তিহীন!” তারা আল্লাহর মর্যাদা বুঝেনি। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড়ই শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। তাদের উপাস্যরা এতই দুর্বল ও শক্তিহীন যে, মাছি একটা নিকৃষ্ট খাবারও যদি তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে উড়ে যায় তবে তার নিকট থেকে তা কেড়ে নেয়ারও শক্তি এদের নেই। যাদের বিশেষণ এইরূপ তারা কি করে জীবিকা দান করতে পারে বা সাহায্য করতে পারে? যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি এমন জিনিসের ইবাদত করছো যাকে তোমরা নিজেরাই নির্মাণ করছো?” (৩৭:৯৫)।ইরশাদ হচ্ছে- তারা তাদের উপাসনাকারীদের সামান্য পরিমাণও সাহায্য করতে পারে না। এমন কি কেউ যদি তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে তবে তা থেকে তারা নিজেদেরকে রক্ষা করতেও পারে না। যেমন হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) স্বীয় কওমের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন এবং এভাবে পূর্ণমাত্রায় ওদেরকে লাঞ্ছিত করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মূর্তিগুলোকে ইবরাহীম (আঃ) মেরে মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। কিন্তু ভুতখানার সবচেয়ে বড় মূর্তিকে ছেড়ে দিলেন, যেন জনগণ এসে ঐ বড় মূর্তিটিকে জিজ্ঞেস করে যে, এটা কি হয়েছে এবং কে করেছে?হযরত মুআহ্ ইবনে আমর ইবনুল জামূহ (রাঃ) এবং হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) দু’জন যুবক লোক ছিলেন। তাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন। রাত্রিকালে তারা মদীনায় মুশরিকদের মূর্তিগুলোর নিকটে যেতেন এবং ওগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন। ওগুলো কাঠ দ্বারা নির্মিত হয়ে থাকলে ওগুলো ভেঙ্গে দিয়ে জ্বালানী কাষ্ঠ রূপে ব্যবহারের জন্যে গরীব বিধবা নারীদেরকে ওগুলো দিয়ে দিতেন।উদ্দেশ্য এই যে, যেন মুশরিকরা এর থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং নিজেদের আমল ও আকীদার উপর চিন্তা ভাবনা করে। আমর ইবনে জামূহ (রাঃ) ছিলেন স্বীয় গোত্রের নেতা! তাঁর একটা প্রতিমা ছিল। তিনি ঐ প্রতিমার পূজা করতেন। ওর গায়ে তিনি সুগন্ধি মাখাতেন। রাত্রিকালে ঐ দু'যুবক তার ভুতখানায় যেতেন এবং ঐ প্রতিমার মাথার উপর ময়লা-আবর্জনা রেখে দিতেন। আমর ইবনে জামূহ মূর্তিটিকে ঐ অবস্থায় দেখতেন এবং আবর্জনা ধুয়ে মুছে পুনরায় সুগন্ধি মাখাতেন। অতঃপর ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিয়ে বলতেনঃ “এর দ্বারা তুমি নিজেকে রক্ষা করবে।” দ্বিতীয় রাতে যুবকদ্বয় আবার ঐ কাজই করতেন এবং ইবনে জামৃহ ওটা ধুয়ে মুছে সাফ করতেন এবং পুনরায় ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিতেন। অবশেষে একদিন যুবকদ্বয় ঐ মূর্তিটিকে বের করে আনেন এবং একটি কুকুরের মৃত দেহের সাথে ওকে বেঁধে একটি রজ্জ্বর মাধ্যমে একটি কুয়ায় লটকিয়ে দেন। আমর ইবনে জামূহ এসে মূর্তিটিকে এ অবস্থায় যখন দেখলেন তখন তার জ্ঞান আসলো যে, তিনি প্রতিমা পূজায় লিপ্ত থেকে এতোদিন বাতিল আকীদার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তাই তিনি মূর্তিটিকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তুমি যদি সত্যিই উপাস্য হতে তবে এই কুয়ার মধ্যে কুকুরটির সাথে পড়ে থাকতে না।” অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন ভাল মুসলিম রূপে জীবন অতিবাহিত করেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।ইরশাদ হচ্ছে- তুমি যদি ওদেরকে সৎপথে ডাকো তবে ওরা তোমার অনুসরণ করবে না। অর্থাৎ লো কারো ডাক শুনতে পায় না। ওদেরকে। ডাকা এবং না ডাকা সমান কথা। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে পিতা! এমন মূর্তির উপাসনা করবেন না যা না শুনতে পায়, না দেখতে পায়, না আপনার কোন কাজ করে দেয়।” আল্লাহ পাক বলেনঃ মূর্তিপূজকের মত এই মূর্তিগুলোও আল্লাহরই সৃষ্ট। এমন কি এই মূর্তিপূজকরাই বরং মূর্তিগুলোর চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায় এবং স্পর্শ করতে তো পারে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আল্লাহর সাথে তোমরা যাদেরকে অংশী করছে তাদেরকে ডাকো, তারপর সকলে সমবেত হয়ে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে থাকো এবং আমাকে আদৌ কোন অবকাশ দিয়ো না। আর আমার বিরুদ্ধে মন খুলে চেষ্টা চালিয়ে দেখো। আমার সাহায্যকারী হচ্ছেন ঐ আল্লাহ যিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তিনি সঙ্কর্মশীলদের অভিভাবক। ঐ আল্লাহই আমার জন্যে যথেষ্ট। তিনিই আমাকে সাহায্য করবেন। তাঁরই উপর আমি ভরসা করছি। আমি যদি বাধ্য হই তবে তাঁরই বাধ্য হবো। তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে শুধু আমার নয় বরং আমার পরেও সকল সৎকর্মশীল লোকেরই অভিভাবক ও বন্ধু । যেমন হূদ (আঃ) স্বীয় কওমের কথার প্রতি উত্তরে বলেছিলেন, যখন তারা তাকে অপবাদ দিয়ে বলেছিলঃ “তোমার উপর আমাদের দেবতাদের মার পড়েছে, এ জন্যেই তুমি এসব বিভ্রান্তি মূলক কথা বলছো।” তিনি উত্তরে তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তো আল্লাহরই সাক্ষ্য দান করছি এবং পরিষ্কারভাবে তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি যে, আমি তোমাদের শরীকদের প্রতি ঘৃণা ও অসন্তোষ প্রকাশ করছি। আচ্ছা, তোমরা সমবেতভাবে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে দেখো এবং আমাকে আত্মরক্ষার সুযোগে পর্যন্ত দিয়ো না। তোমরা আমার কি ক্ষতি করবে? আমার ভরসাস্থল একমাত্র আল্লাহ। তিনি আমার তোমাদের সবারই প্রতিপালক। দুনিয়ায় এমন কোন প্রাণী নেই যার বাগডোর তার হাতে নেই। আমার প্রতিপালক সরল ও সঠিক পথে রয়েছেন।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ “যে প্রতিমাগুলোর পূজা তোমরা করছো এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা করতো সেগুলো সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? এরা তো আমার শত্রু, আর আমার বন্ধু হচ্ছেন স্বয়ং আমার প্রতিপালক। তিনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।” আরো যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতা এবং কওমের লোককে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদের দেবতাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আমি আমার আল্লাহরই ইবাদতকারী যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আমাকে হিদায়াতের পথে চালিয়েছেন, আর এর পেছনে তিনি এটাকে একটা স্মারক হিসাবে রেখে দিয়েছেন, আশা এই যে, হয়তো এরা নিজেদের কার্যকলাপ থেকে ফিরে আসবে।” এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে- এরা না তোমাদের সাহায্য করতে পারে, না পারে নিজেদেরকে সাহায্য করতে। যদি তুমি তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান কর তবে তারা তোমার ডাক শুনতে পাবে না। তুমি মনে করছে যে, ওরা (মূর্তিগুলো) তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কিন্তু আসলে কিছুই দেখে না। ওরা ছবির চক্ষু দ্বারা তোমাকে দেখছে। মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতই তোমার প্রতি দৃষ্টিপাত করছে। কিন্তু বাস্তবে তো ওরা নিজীব। এ জন্যেই ওদের সম্পর্কে এমন ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে যেমন জ্ঞান বুদ্ধির অধিকারীর ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়। কেননা, ওগুলো হচ্ছে মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট এবং মানুষের মতই মনে হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ তুমি দেখছো যে, তারা যেন মনোযোগের সাথে তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এ কারণেই ওদের ব্যাপারে সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানুষের বেলায় প্রয়োগ করা হয়। অথচ ওগুলো তো জড় পদার্থ ও নিজীব। আর নির্জীব ও জড় পদার্থের ব্যাপারে (আরবী) সর্বনাম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুদ্দী (রঃ) এর দ্বারা প্রতিমার পরিবর্তে মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রথম মতটিই সঠিকতর।

আল-আরাফ 7:196

১৯১-১৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: যে মুশরিকরা আল্লাহকে ছেড়ে প্রতিমা-পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়ে তাদেরকে এখানে ভৎসনা করা হচ্ছে যে, এই প্রতিমাগুলোও আল্লাহর সৃষ্ট এবং মানুষই এগুলো নির্মাণ করেছে। এদের কোনই ক্ষমতা নেই। এগুলো কারও কোন ক্ষতিও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না। এদের দেখারও শক্তি নেই এবং যারা এদের ইবাদত করে তাদের এরা কোন সাহায্যও করতে পারে না। বরং এ মূর্তিগুলো তো জড় পদার্থের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারে না। এমন কি যারা এদের ইবাদত করে তারাও এদের চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায়, স্পর্শ করতে পারে এবং ধরতে পারে । এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা কি ঐ পাথরের মূর্তিগুলোকে আল্লাহর অংশীদার বানিয়ে নিচ্ছে যারা কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? বরং তারা নিজেরাই তো সৃষ্ট। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে লোক সকল! একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে দেখো! যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যান্যের উপাসনা করছে ঐ উপাস্যগুলো তো একটি মাছি পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারে না যদিও তারা সবাই একত্রিত হয়ে চেষ্টা করে, এমন কি মাছিও যদি তাদের খাবারের কোন জিনিস ছিনিয়ে নেয় তবে তারা তার নিকট থেকে তা ফিরিয়ে নিতেও পারে না। আকাংখী ও আকাংখিত উভয়েই কতই না দুর্বল ও শক্তিহীন!” তারা আল্লাহর মর্যাদা বুঝেনি। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড়ই শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। তাদের উপাস্যরা এতই দুর্বল ও শক্তিহীন যে, মাছি একটা নিকৃষ্ট খাবারও যদি তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে উড়ে যায় তবে তার নিকট থেকে তা কেড়ে নেয়ারও শক্তি এদের নেই। যাদের বিশেষণ এইরূপ তারা কি করে জীবিকা দান করতে পারে বা সাহায্য করতে পারে? যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি এমন জিনিসের ইবাদত করছো যাকে তোমরা নিজেরাই নির্মাণ করছো?” (৩৭:৯৫)।ইরশাদ হচ্ছে- তারা তাদের উপাসনাকারীদের সামান্য পরিমাণও সাহায্য করতে পারে না। এমন কি কেউ যদি তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে তবে তা থেকে তারা নিজেদেরকে রক্ষা করতেও পারে না। যেমন হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) স্বীয় কওমের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন এবং এভাবে পূর্ণমাত্রায় ওদেরকে লাঞ্ছিত করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মূর্তিগুলোকে ইবরাহীম (আঃ) মেরে মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। কিন্তু ভুতখানার সবচেয়ে বড় মূর্তিকে ছেড়ে দিলেন, যেন জনগণ এসে ঐ বড় মূর্তিটিকে জিজ্ঞেস করে যে, এটা কি হয়েছে এবং কে করেছে?হযরত মুআহ্ ইবনে আমর ইবনুল জামূহ (রাঃ) এবং হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) দু’জন যুবক লোক ছিলেন। তাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন। রাত্রিকালে তারা মদীনায় মুশরিকদের মূর্তিগুলোর নিকটে যেতেন এবং ওগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন। ওগুলো কাঠ দ্বারা নির্মিত হয়ে থাকলে ওগুলো ভেঙ্গে দিয়ে জ্বালানী কাষ্ঠ রূপে ব্যবহারের জন্যে গরীব বিধবা নারীদেরকে ওগুলো দিয়ে দিতেন।উদ্দেশ্য এই যে, যেন মুশরিকরা এর থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং নিজেদের আমল ও আকীদার উপর চিন্তা ভাবনা করে। আমর ইবনে জামূহ (রাঃ) ছিলেন স্বীয় গোত্রের নেতা! তাঁর একটা প্রতিমা ছিল। তিনি ঐ প্রতিমার পূজা করতেন। ওর গায়ে তিনি সুগন্ধি মাখাতেন। রাত্রিকালে ঐ দু'যুবক তার ভুতখানায় যেতেন এবং ঐ প্রতিমার মাথার উপর ময়লা-আবর্জনা রেখে দিতেন। আমর ইবনে জামূহ মূর্তিটিকে ঐ অবস্থায় দেখতেন এবং আবর্জনা ধুয়ে মুছে পুনরায় সুগন্ধি মাখাতেন। অতঃপর ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিয়ে বলতেনঃ “এর দ্বারা তুমি নিজেকে রক্ষা করবে।” দ্বিতীয় রাতে যুবকদ্বয় আবার ঐ কাজই করতেন এবং ইবনে জামৃহ ওটা ধুয়ে মুছে সাফ করতেন এবং পুনরায় ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিতেন। অবশেষে একদিন যুবকদ্বয় ঐ মূর্তিটিকে বের করে আনেন এবং একটি কুকুরের মৃত দেহের সাথে ওকে বেঁধে একটি রজ্জ্বর মাধ্যমে একটি কুয়ায় লটকিয়ে দেন। আমর ইবনে জামূহ এসে মূর্তিটিকে এ অবস্থায় যখন দেখলেন তখন তার জ্ঞান আসলো যে, তিনি প্রতিমা পূজায় লিপ্ত থেকে এতোদিন বাতিল আকীদার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তাই তিনি মূর্তিটিকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তুমি যদি সত্যিই উপাস্য হতে তবে এই কুয়ার মধ্যে কুকুরটির সাথে পড়ে থাকতে না।” অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন ভাল মুসলিম রূপে জীবন অতিবাহিত করেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।ইরশাদ হচ্ছে- তুমি যদি ওদেরকে সৎপথে ডাকো তবে ওরা তোমার অনুসরণ করবে না। অর্থাৎ লো কারো ডাক শুনতে পায় না। ওদেরকে। ডাকা এবং না ডাকা সমান কথা। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে পিতা! এমন মূর্তির উপাসনা করবেন না যা না শুনতে পায়, না দেখতে পায়, না আপনার কোন কাজ করে দেয়।” আল্লাহ পাক বলেনঃ মূর্তিপূজকের মত এই মূর্তিগুলোও আল্লাহরই সৃষ্ট। এমন কি এই মূর্তিপূজকরাই বরং মূর্তিগুলোর চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায় এবং স্পর্শ করতে তো পারে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আল্লাহর সাথে তোমরা যাদেরকে অংশী করছে তাদেরকে ডাকো, তারপর সকলে সমবেত হয়ে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে থাকো এবং আমাকে আদৌ কোন অবকাশ দিয়ো না। আর আমার বিরুদ্ধে মন খুলে চেষ্টা চালিয়ে দেখো। আমার সাহায্যকারী হচ্ছেন ঐ আল্লাহ যিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তিনি সঙ্কর্মশীলদের অভিভাবক। ঐ আল্লাহই আমার জন্যে যথেষ্ট। তিনিই আমাকে সাহায্য করবেন। তাঁরই উপর আমি ভরসা করছি। আমি যদি বাধ্য হই তবে তাঁরই বাধ্য হবো। তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে শুধু আমার নয় বরং আমার পরেও সকল সৎকর্মশীল লোকেরই অভিভাবক ও বন্ধু । যেমন হূদ (আঃ) স্বীয় কওমের কথার প্রতি উত্তরে বলেছিলেন, যখন তারা তাকে অপবাদ দিয়ে বলেছিলঃ “তোমার উপর আমাদের দেবতাদের মার পড়েছে, এ জন্যেই তুমি এসব বিভ্রান্তি মূলক কথা বলছো।” তিনি উত্তরে তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তো আল্লাহরই সাক্ষ্য দান করছি এবং পরিষ্কারভাবে তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি যে, আমি তোমাদের শরীকদের প্রতি ঘৃণা ও অসন্তোষ প্রকাশ করছি। আচ্ছা, তোমরা সমবেতভাবে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে দেখো এবং আমাকে আত্মরক্ষার সুযোগে পর্যন্ত দিয়ো না। তোমরা আমার কি ক্ষতি করবে? আমার ভরসাস্থল একমাত্র আল্লাহ। তিনি আমার তোমাদের সবারই প্রতিপালক। দুনিয়ায় এমন কোন প্রাণী নেই যার বাগডোর তার হাতে নেই। আমার প্রতিপালক সরল ও সঠিক পথে রয়েছেন।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ “যে প্রতিমাগুলোর পূজা তোমরা করছো এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা করতো সেগুলো সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? এরা তো আমার শত্রু, আর আমার বন্ধু হচ্ছেন স্বয়ং আমার প্রতিপালক। তিনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।” আরো যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতা এবং কওমের লোককে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদের দেবতাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আমি আমার আল্লাহরই ইবাদতকারী যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আমাকে হিদায়াতের পথে চালিয়েছেন, আর এর পেছনে তিনি এটাকে একটা স্মারক হিসাবে রেখে দিয়েছেন, আশা এই যে, হয়তো এরা নিজেদের কার্যকলাপ থেকে ফিরে আসবে।” এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে- এরা না তোমাদের সাহায্য করতে পারে, না পারে নিজেদেরকে সাহায্য করতে। যদি তুমি তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান কর তবে তারা তোমার ডাক শুনতে পাবে না। তুমি মনে করছে যে, ওরা (মূর্তিগুলো) তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কিন্তু আসলে কিছুই দেখে না। ওরা ছবির চক্ষু দ্বারা তোমাকে দেখছে। মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতই তোমার প্রতি দৃষ্টিপাত করছে। কিন্তু বাস্তবে তো ওরা নিজীব। এ জন্যেই ওদের সম্পর্কে এমন ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে যেমন জ্ঞান বুদ্ধির অধিকারীর ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়। কেননা, ওগুলো হচ্ছে মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট এবং মানুষের মতই মনে হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ তুমি দেখছো যে, তারা যেন মনোযোগের সাথে তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এ কারণেই ওদের ব্যাপারে সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানুষের বেলায় প্রয়োগ করা হয়। অথচ ওগুলো তো জড় পদার্থ ও নিজীব। আর নির্জীব ও জড় পদার্থের ব্যাপারে (আরবী) সর্বনাম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুদ্দী (রঃ) এর দ্বারা প্রতিমার পরিবর্তে মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রথম মতটিই সঠিকতর।

আল-আরাফ 7:197

১৯১-১৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: যে মুশরিকরা আল্লাহকে ছেড়ে প্রতিমা-পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়ে তাদেরকে এখানে ভৎসনা করা হচ্ছে যে, এই প্রতিমাগুলোও আল্লাহর সৃষ্ট এবং মানুষই এগুলো নির্মাণ করেছে। এদের কোনই ক্ষমতা নেই। এগুলো কারও কোন ক্ষতিও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না। এদের দেখারও শক্তি নেই এবং যারা এদের ইবাদত করে তাদের এরা কোন সাহায্যও করতে পারে না। বরং এ মূর্তিগুলো তো জড় পদার্থের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারে না। এমন কি যারা এদের ইবাদত করে তারাও এদের চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায়, স্পর্শ করতে পারে এবং ধরতে পারে । এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা কি ঐ পাথরের মূর্তিগুলোকে আল্লাহর অংশীদার বানিয়ে নিচ্ছে যারা কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? বরং তারা নিজেরাই তো সৃষ্ট। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে লোক সকল! একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে দেখো! যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যান্যের উপাসনা করছে ঐ উপাস্যগুলো তো একটি মাছি পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারে না যদিও তারা সবাই একত্রিত হয়ে চেষ্টা করে, এমন কি মাছিও যদি তাদের খাবারের কোন জিনিস ছিনিয়ে নেয় তবে তারা তার নিকট থেকে তা ফিরিয়ে নিতেও পারে না। আকাংখী ও আকাংখিত উভয়েই কতই না দুর্বল ও শক্তিহীন!” তারা আল্লাহর মর্যাদা বুঝেনি। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড়ই শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। তাদের উপাস্যরা এতই দুর্বল ও শক্তিহীন যে, মাছি একটা নিকৃষ্ট খাবারও যদি তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে উড়ে যায় তবে তার নিকট থেকে তা কেড়ে নেয়ারও শক্তি এদের নেই। যাদের বিশেষণ এইরূপ তারা কি করে জীবিকা দান করতে পারে বা সাহায্য করতে পারে? যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি এমন জিনিসের ইবাদত করছো যাকে তোমরা নিজেরাই নির্মাণ করছো?” (৩৭:৯৫)।ইরশাদ হচ্ছে- তারা তাদের উপাসনাকারীদের সামান্য পরিমাণও সাহায্য করতে পারে না। এমন কি কেউ যদি তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে তবে তা থেকে তারা নিজেদেরকে রক্ষা করতেও পারে না। যেমন হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) স্বীয় কওমের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন এবং এভাবে পূর্ণমাত্রায় ওদেরকে লাঞ্ছিত করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মূর্তিগুলোকে ইবরাহীম (আঃ) মেরে মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। কিন্তু ভুতখানার সবচেয়ে বড় মূর্তিকে ছেড়ে দিলেন, যেন জনগণ এসে ঐ বড় মূর্তিটিকে জিজ্ঞেস করে যে, এটা কি হয়েছে এবং কে করেছে?হযরত মুআহ্ ইবনে আমর ইবনুল জামূহ (রাঃ) এবং হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) দু’জন যুবক লোক ছিলেন। তাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন। রাত্রিকালে তারা মদীনায় মুশরিকদের মূর্তিগুলোর নিকটে যেতেন এবং ওগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন। ওগুলো কাঠ দ্বারা নির্মিত হয়ে থাকলে ওগুলো ভেঙ্গে দিয়ে জ্বালানী কাষ্ঠ রূপে ব্যবহারের জন্যে গরীব বিধবা নারীদেরকে ওগুলো দিয়ে দিতেন।উদ্দেশ্য এই যে, যেন মুশরিকরা এর থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং নিজেদের আমল ও আকীদার উপর চিন্তা ভাবনা করে। আমর ইবনে জামূহ (রাঃ) ছিলেন স্বীয় গোত্রের নেতা! তাঁর একটা প্রতিমা ছিল। তিনি ঐ প্রতিমার পূজা করতেন। ওর গায়ে তিনি সুগন্ধি মাখাতেন। রাত্রিকালে ঐ দু'যুবক তার ভুতখানায় যেতেন এবং ঐ প্রতিমার মাথার উপর ময়লা-আবর্জনা রেখে দিতেন। আমর ইবনে জামূহ মূর্তিটিকে ঐ অবস্থায় দেখতেন এবং আবর্জনা ধুয়ে মুছে পুনরায় সুগন্ধি মাখাতেন। অতঃপর ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিয়ে বলতেনঃ “এর দ্বারা তুমি নিজেকে রক্ষা করবে।” দ্বিতীয় রাতে যুবকদ্বয় আবার ঐ কাজই করতেন এবং ইবনে জামৃহ ওটা ধুয়ে মুছে সাফ করতেন এবং পুনরায় ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিতেন। অবশেষে একদিন যুবকদ্বয় ঐ মূর্তিটিকে বের করে আনেন এবং একটি কুকুরের মৃত দেহের সাথে ওকে বেঁধে একটি রজ্জ্বর মাধ্যমে একটি কুয়ায় লটকিয়ে দেন। আমর ইবনে জামূহ এসে মূর্তিটিকে এ অবস্থায় যখন দেখলেন তখন তার জ্ঞান আসলো যে, তিনি প্রতিমা পূজায় লিপ্ত থেকে এতোদিন বাতিল আকীদার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তাই তিনি মূর্তিটিকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তুমি যদি সত্যিই উপাস্য হতে তবে এই কুয়ার মধ্যে কুকুরটির সাথে পড়ে থাকতে না।” অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন ভাল মুসলিম রূপে জীবন অতিবাহিত করেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।ইরশাদ হচ্ছে- তুমি যদি ওদেরকে সৎপথে ডাকো তবে ওরা তোমার অনুসরণ করবে না। অর্থাৎ লো কারো ডাক শুনতে পায় না। ওদেরকে। ডাকা এবং না ডাকা সমান কথা। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে পিতা! এমন মূর্তির উপাসনা করবেন না যা না শুনতে পায়, না দেখতে পায়, না আপনার কোন কাজ করে দেয়।” আল্লাহ পাক বলেনঃ মূর্তিপূজকের মত এই মূর্তিগুলোও আল্লাহরই সৃষ্ট। এমন কি এই মূর্তিপূজকরাই বরং মূর্তিগুলোর চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায় এবং স্পর্শ করতে তো পারে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আল্লাহর সাথে তোমরা যাদেরকে অংশী করছে তাদেরকে ডাকো, তারপর সকলে সমবেত হয়ে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে থাকো এবং আমাকে আদৌ কোন অবকাশ দিয়ো না। আর আমার বিরুদ্ধে মন খুলে চেষ্টা চালিয়ে দেখো। আমার সাহায্যকারী হচ্ছেন ঐ আল্লাহ যিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তিনি সঙ্কর্মশীলদের অভিভাবক। ঐ আল্লাহই আমার জন্যে যথেষ্ট। তিনিই আমাকে সাহায্য করবেন। তাঁরই উপর আমি ভরসা করছি। আমি যদি বাধ্য হই তবে তাঁরই বাধ্য হবো। তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে শুধু আমার নয় বরং আমার পরেও সকল সৎকর্মশীল লোকেরই অভিভাবক ও বন্ধু । যেমন হূদ (আঃ) স্বীয় কওমের কথার প্রতি উত্তরে বলেছিলেন, যখন তারা তাকে অপবাদ দিয়ে বলেছিলঃ “তোমার উপর আমাদের দেবতাদের মার পড়েছে, এ জন্যেই তুমি এসব বিভ্রান্তি মূলক কথা বলছো।” তিনি উত্তরে তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তো আল্লাহরই সাক্ষ্য দান করছি এবং পরিষ্কারভাবে তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি যে, আমি তোমাদের শরীকদের প্রতি ঘৃণা ও অসন্তোষ প্রকাশ করছি। আচ্ছা, তোমরা সমবেতভাবে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে দেখো এবং আমাকে আত্মরক্ষার সুযোগে পর্যন্ত দিয়ো না। তোমরা আমার কি ক্ষতি করবে? আমার ভরসাস্থল একমাত্র আল্লাহ। তিনি আমার তোমাদের সবারই প্রতিপালক। দুনিয়ায় এমন কোন প্রাণী নেই যার বাগডোর তার হাতে নেই। আমার প্রতিপালক সরল ও সঠিক পথে রয়েছেন।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ “যে প্রতিমাগুলোর পূজা তোমরা করছো এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা করতো সেগুলো সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? এরা তো আমার শত্রু, আর আমার বন্ধু হচ্ছেন স্বয়ং আমার প্রতিপালক। তিনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।” আরো যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতা এবং কওমের লোককে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদের দেবতাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আমি আমার আল্লাহরই ইবাদতকারী যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আমাকে হিদায়াতের পথে চালিয়েছেন, আর এর পেছনে তিনি এটাকে একটা স্মারক হিসাবে রেখে দিয়েছেন, আশা এই যে, হয়তো এরা নিজেদের কার্যকলাপ থেকে ফিরে আসবে।” এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে- এরা না তোমাদের সাহায্য করতে পারে, না পারে নিজেদেরকে সাহায্য করতে। যদি তুমি তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান কর তবে তারা তোমার ডাক শুনতে পাবে না। তুমি মনে করছে যে, ওরা (মূর্তিগুলো) তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কিন্তু আসলে কিছুই দেখে না। ওরা ছবির চক্ষু দ্বারা তোমাকে দেখছে। মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতই তোমার প্রতি দৃষ্টিপাত করছে। কিন্তু বাস্তবে তো ওরা নিজীব। এ জন্যেই ওদের সম্পর্কে এমন ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে যেমন জ্ঞান বুদ্ধির অধিকারীর ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়। কেননা, ওগুলো হচ্ছে মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট এবং মানুষের মতই মনে হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ তুমি দেখছো যে, তারা যেন মনোযোগের সাথে তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এ কারণেই ওদের ব্যাপারে সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানুষের বেলায় প্রয়োগ করা হয়। অথচ ওগুলো তো জড় পদার্থ ও নিজীব। আর নির্জীব ও জড় পদার্থের ব্যাপারে (আরবী) সর্বনাম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুদ্দী (রঃ) এর দ্বারা প্রতিমার পরিবর্তে মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রথম মতটিই সঠিকতর।

আল-আরাফ 7:198

১৯১-১৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: যে মুশরিকরা আল্লাহকে ছেড়ে প্রতিমা-পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়ে তাদেরকে এখানে ভৎসনা করা হচ্ছে যে, এই প্রতিমাগুলোও আল্লাহর সৃষ্ট এবং মানুষই এগুলো নির্মাণ করেছে। এদের কোনই ক্ষমতা নেই। এগুলো কারও কোন ক্ষতিও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না। এদের দেখারও শক্তি নেই এবং যারা এদের ইবাদত করে তাদের এরা কোন সাহায্যও করতে পারে না। বরং এ মূর্তিগুলো তো জড় পদার্থের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারে না। এমন কি যারা এদের ইবাদত করে তারাও এদের চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায়, স্পর্শ করতে পারে এবং ধরতে পারে । এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা কি ঐ পাথরের মূর্তিগুলোকে আল্লাহর অংশীদার বানিয়ে নিচ্ছে যারা কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? বরং তারা নিজেরাই তো সৃষ্ট। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে লোক সকল! একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে দেখো! যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যান্যের উপাসনা করছে ঐ উপাস্যগুলো তো একটি মাছি পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারে না যদিও তারা সবাই একত্রিত হয়ে চেষ্টা করে, এমন কি মাছিও যদি তাদের খাবারের কোন জিনিস ছিনিয়ে নেয় তবে তারা তার নিকট থেকে তা ফিরিয়ে নিতেও পারে না। আকাংখী ও আকাংখিত উভয়েই কতই না দুর্বল ও শক্তিহীন!” তারা আল্লাহর মর্যাদা বুঝেনি। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড়ই শক্তিশালী ও প্রবল পরাক্রান্ত। তাদের উপাস্যরা এতই দুর্বল ও শক্তিহীন যে, মাছি একটা নিকৃষ্ট খাবারও যদি তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে উড়ে যায় তবে তার নিকট থেকে তা কেড়ে নেয়ারও শক্তি এদের নেই। যাদের বিশেষণ এইরূপ তারা কি করে জীবিকা দান করতে পারে বা সাহায্য করতে পারে? যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি এমন জিনিসের ইবাদত করছো যাকে তোমরা নিজেরাই নির্মাণ করছো?” (৩৭:৯৫)।ইরশাদ হচ্ছে- তারা তাদের উপাসনাকারীদের সামান্য পরিমাণও সাহায্য করতে পারে না। এমন কি কেউ যদি তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে তবে তা থেকে তারা নিজেদেরকে রক্ষা করতেও পারে না। যেমন হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) স্বীয় কওমের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন এবং এভাবে পূর্ণমাত্রায় ওদেরকে লাঞ্ছিত করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মূর্তিগুলোকে ইবরাহীম (আঃ) মেরে মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। কিন্তু ভুতখানার সবচেয়ে বড় মূর্তিকে ছেড়ে দিলেন, যেন জনগণ এসে ঐ বড় মূর্তিটিকে জিজ্ঞেস করে যে, এটা কি হয়েছে এবং কে করেছে?হযরত মুআহ্ ইবনে আমর ইবনুল জামূহ (রাঃ) এবং হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) দু’জন যুবক লোক ছিলেন। তাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন। রাত্রিকালে তারা মদীনায় মুশরিকদের মূর্তিগুলোর নিকটে যেতেন এবং ওগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন। ওগুলো কাঠ দ্বারা নির্মিত হয়ে থাকলে ওগুলো ভেঙ্গে দিয়ে জ্বালানী কাষ্ঠ রূপে ব্যবহারের জন্যে গরীব বিধবা নারীদেরকে ওগুলো দিয়ে দিতেন।উদ্দেশ্য এই যে, যেন মুশরিকরা এর থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং নিজেদের আমল ও আকীদার উপর চিন্তা ভাবনা করে। আমর ইবনে জামূহ (রাঃ) ছিলেন স্বীয় গোত্রের নেতা! তাঁর একটা প্রতিমা ছিল। তিনি ঐ প্রতিমার পূজা করতেন। ওর গায়ে তিনি সুগন্ধি মাখাতেন। রাত্রিকালে ঐ দু'যুবক তার ভুতখানায় যেতেন এবং ঐ প্রতিমার মাথার উপর ময়লা-আবর্জনা রেখে দিতেন। আমর ইবনে জামূহ মূর্তিটিকে ঐ অবস্থায় দেখতেন এবং আবর্জনা ধুয়ে মুছে পুনরায় সুগন্ধি মাখাতেন। অতঃপর ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিয়ে বলতেনঃ “এর দ্বারা তুমি নিজেকে রক্ষা করবে।” দ্বিতীয় রাতে যুবকদ্বয় আবার ঐ কাজই করতেন এবং ইবনে জামৃহ ওটা ধুয়ে মুছে সাফ করতেন এবং পুনরায় ওর পার্শ্বে তরবারী রেখে দিতেন। অবশেষে একদিন যুবকদ্বয় ঐ মূর্তিটিকে বের করে আনেন এবং একটি কুকুরের মৃত দেহের সাথে ওকে বেঁধে একটি রজ্জ্বর মাধ্যমে একটি কুয়ায় লটকিয়ে দেন। আমর ইবনে জামূহ এসে মূর্তিটিকে এ অবস্থায় যখন দেখলেন তখন তার জ্ঞান আসলো যে, তিনি প্রতিমা পূজায় লিপ্ত থেকে এতোদিন বাতিল আকীদার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তাই তিনি মূর্তিটিকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তুমি যদি সত্যিই উপাস্য হতে তবে এই কুয়ার মধ্যে কুকুরটির সাথে পড়ে থাকতে না।” অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন ভাল মুসলিম রূপে জীবন অতিবাহিত করেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।ইরশাদ হচ্ছে- তুমি যদি ওদেরকে সৎপথে ডাকো তবে ওরা তোমার অনুসরণ করবে না। অর্থাৎ লো কারো ডাক শুনতে পায় না। ওদেরকে। ডাকা এবং না ডাকা সমান কথা। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে পিতা! এমন মূর্তির উপাসনা করবেন না যা না শুনতে পায়, না দেখতে পায়, না আপনার কোন কাজ করে দেয়।” আল্লাহ পাক বলেনঃ মূর্তিপূজকের মত এই মূর্তিগুলোও আল্লাহরই সৃষ্ট। এমন কি এই মূর্তিপূজকরাই বরং মূর্তিগুলোর চেয়ে উত্তম। কেননা, তারা শুনতে পায়, দেখতে পায় এবং স্পর্শ করতে তো পারে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আল্লাহর সাথে তোমরা যাদেরকে অংশী করছে তাদেরকে ডাকো, তারপর সকলে সমবেত হয়ে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে থাকো এবং আমাকে আদৌ কোন অবকাশ দিয়ো না। আর আমার বিরুদ্ধে মন খুলে চেষ্টা চালিয়ে দেখো। আমার সাহায্যকারী হচ্ছেন ঐ আল্লাহ যিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তিনি সঙ্কর্মশীলদের অভিভাবক। ঐ আল্লাহই আমার জন্যে যথেষ্ট। তিনিই আমাকে সাহায্য করবেন। তাঁরই উপর আমি ভরসা করছি। আমি যদি বাধ্য হই তবে তাঁরই বাধ্য হবো। তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে শুধু আমার নয় বরং আমার পরেও সকল সৎকর্মশীল লোকেরই অভিভাবক ও বন্ধু । যেমন হূদ (আঃ) স্বীয় কওমের কথার প্রতি উত্তরে বলেছিলেন, যখন তারা তাকে অপবাদ দিয়ে বলেছিলঃ “তোমার উপর আমাদের দেবতাদের মার পড়েছে, এ জন্যেই তুমি এসব বিভ্রান্তি মূলক কথা বলছো।” তিনি উত্তরে তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি তো আল্লাহরই সাক্ষ্য দান করছি এবং পরিষ্কারভাবে তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি যে, আমি তোমাদের শরীকদের প্রতি ঘৃণা ও অসন্তোষ প্রকাশ করছি। আচ্ছা, তোমরা সমবেতভাবে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে দেখো এবং আমাকে আত্মরক্ষার সুযোগে পর্যন্ত দিয়ো না। তোমরা আমার কি ক্ষতি করবে? আমার ভরসাস্থল একমাত্র আল্লাহ। তিনি আমার তোমাদের সবারই প্রতিপালক। দুনিয়ায় এমন কোন প্রাণী নেই যার বাগডোর তার হাতে নেই। আমার প্রতিপালক সরল ও সঠিক পথে রয়েছেন।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে বলেছিলেনঃ “যে প্রতিমাগুলোর পূজা তোমরা করছো এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা করতো সেগুলো সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? এরা তো আমার শত্রু, আর আমার বন্ধু হচ্ছেন স্বয়ং আমার প্রতিপালক। তিনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।” আরো যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পিতা এবং কওমের লোককে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদের দেবতাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আমি আমার আল্লাহরই ইবাদতকারী যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আমাকে হিদায়াতের পথে চালিয়েছেন, আর এর পেছনে তিনি এটাকে একটা স্মারক হিসাবে রেখে দিয়েছেন, আশা এই যে, হয়তো এরা নিজেদের কার্যকলাপ থেকে ফিরে আসবে।” এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে- এরা না তোমাদের সাহায্য করতে পারে, না পারে নিজেদেরকে সাহায্য করতে। যদি তুমি তাদেরকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান কর তবে তারা তোমার ডাক শুনতে পাবে না। তুমি মনে করছে যে, ওরা (মূর্তিগুলো) তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কিন্তু আসলে কিছুই দেখে না। ওরা ছবির চক্ষু দ্বারা তোমাকে দেখছে। মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতই তোমার প্রতি দৃষ্টিপাত করছে। কিন্তু বাস্তবে তো ওরা নিজীব। এ জন্যেই ওদের সম্পর্কে এমন ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে যেমন জ্ঞান বুদ্ধির অধিকারীর ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়। কেননা, ওগুলো হচ্ছে মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট এবং মানুষের মতই মনে হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ তুমি দেখছো যে, তারা যেন মনোযোগের সাথে তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এ কারণেই ওদের ব্যাপারে সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানুষের বেলায় প্রয়োগ করা হয়। অথচ ওগুলো তো জড় পদার্থ ও নিজীব। আর নির্জীব ও জড় পদার্থের ব্যাপারে (আরবী) সর্বনাম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুদ্দী (রঃ) এর দ্বারা প্রতিমার পরিবর্তে মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রথম মতটিই সঠিকতর।

আল-আরাফ 7:199

১৯৯-২০০ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছেজনগণের যে মাল তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত এবং যে মাল তারা নিজেরাই নিয়ে আসে, (হে মুহাম্মাদ সঃ!) তুমি তা গ্রহণ কর। সূরায়ে বারাআতে ফরয দানের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, এ নির্দেশ ছিল তার পূর্বেকার। সেই সময় সাদকা তাঁর কাছে পেশ করা হতো। যহহাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছেযা অতিরিক্ত হয় তা খরচ করে দাও। (আরবী) শব্দের অর্থ করা হয়েছে ‘অতিরিক্ত। যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এতে মুশরিকদেরকে ক্ষমা করে দেয়ার হুকুম হয়েছে। দশ বছর পর্যন্ত এই ক্ষমার নীতি কার্যকরী থাকে। এরপর তাদের প্রতি কঠোরতা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়। এটা হচ্ছে হযরত ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে- লোকদেরকে তাদের চরিত্র ও কাজের ব্যাপারে ক্ষমার চোখে দেখ । অর্থাৎ তাদের স্বভাব চরিত্র ও কাজ কারবারের খোঁজ খবর নিয়ো না। ভাবার্থ হচ্ছে- লোকদেরকে ক্ষমা করে দাও এবং খারাপ সাহচর্য অবলম্বন করা থেকে বিরত থাক। আল্লাহর শপথ! আমি যার সাহচর্য অবলম্বন করবে, তার সুন্দর চরিত্র অবশ্যই গ্রহণ করবো। সকল উক্তির মধ্যে এই উক্তিটিই সর্বোত্তম।হযরত উয়াইনা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন তখন নবী (সঃ) হযরত জিবরাঈল (আ)-কে জিজ্ঞেস করলেন- “হে জিবরাঈল (আঃ)! এর উদ্দেশ্য কি?” জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ আল্লাহ আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, কেউ আপনার উপর অত্যাচার করলে আপনি তাকে ক্ষমা করে দিবেন, যে আপনাকে দান থেকে বঞ্চিত করে তাকে আপনি দান করবেন এবং যে আপনার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে আপনি তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখবেন।” (এ হাদীসটি ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এই বিষয় সম্পর্কীয় আর একটি হাদীস হযরত উকবা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করি। আমি তার হাত ধারণ করে বলি- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বোত্তম আমল আমাকে বাতলিয়ে দিন। তিনি তখন আমাকে বললেনঃ “হে উকবা ইবনে আমির (রাঃ)! যে তোমার প্রতি সহানুভূতি দেখায় না তুমি তার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন কর, যে তোমাকে দান থেকে বঞ্চিত রাখে তুমি তাকে দান থেকে বঞ্চিত করো না, যে তোমার প্রতি যুলুম করে তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও।” (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বিনয় ও ক্ষমা পরায়ণতার নীতি গ্রহণ কর এবং লোকদেরকে সকাজের নির্দেশ দাও, আর জাহিল ও মূর্খদের সাথে জড়িয়ে পড়ো না বরং তাদেরকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখো৷” (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে বা সত্ত্বাজ। [বুখারীর (রঃ) উক্তি হচ্ছে (আরবী)-এর অর্থ (আরবী) এবং এর থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন উরওয়া (রঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং ইবনে জারীর (রঃ)]হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উয়াইনা ইবনে হসন ইবনে হুযাইফা স্বীয় ভ্রাতুস্পুত্র হুর ইবনে কয়েস (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন। হুর ইবনে কয়েস (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর একজন দরবারী লোক ছিলেন। কুরআন কারীমে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। তিনি হযরত উমার (রাঃ)-এর মজলিসের কারী ও আলিমদের অন্যতম কারী ও আলিম ছিলেন এবং তার পরামর্শ সভার একজন সদস্য ছিলেন। হযরত উমার (রাঃ)-এর দরবারের আলিমগণ যুবকও ছিলেন, বৃদ্ধও ছিলেন। উয়াইনা স্বীয় ভ্রাতুস্পুত্রকে বললেনঃ “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! আমীরুল মুমিনীনের কাছে তোমার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। সুতরাং তুমি তার সাথে আমার সাক্ষাতের অনুমতি নিয়ে এসো।” তখন হুর (রাঃ) উয়াইনার জন্যে অনুমতি নিয়ে আসলেন এবং হযরত উমার (রাঃ) উয়াইনাকে হাযির হওয়ার অনুমতি দিলেন। উয়াইনা যখন আমীরুল মুমিনীন। হযরত উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন তখন তিনি তাকে বললেনঃ “হে। খাত্তাবের পুত্র! আপনি আমাকে যথেষ্ট টাকাও দেননি এবং আমার প্রতি আদল বা ন্যায় বিচারও করেনি।" আদলের কথা শোনা মাত্রই হযরত উমার তেলে বেগুনে। জ্বলে উঠলেন এবং উয়াইনাকে মারতে উদ্যত হলেন। তখন হুর (রাঃ) বলে উঠলেনঃ হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেছেনঃ “তুমি বিনয় ও ক্ষমাপরায়ণতার নীতি অবলম্বন কর, জনগণকে সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খদের সাথে জড়িয়ে পড়ো না (বরং তাদেরকে ক্ষমা করে দাও)। ইনি তো মূর্খদেরই অন্তর্ভুক্ত! আল্লাহর শপথ । যখন হযরত উমার (রাঃ)-এর সামনে এ আয়াতটি পাঠ করা হলো তখন তিনি থেমে গেলেন এবং উয়াইনাকে কোন শাস্তি দিলেন না। মহা মহিমান্বিত আল্লাহর কিতাবে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল। (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে তাখরীজ করেছেন)ইবনে আবি হাতিম (রঃ) আবদুল্লাহ ইবনে নাফি (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, একদা সালিম ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে উমার (রঃ) সিরিয়াবাসী এক যাত্রী দলের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন। যাত্রী দলের মধ্যে ঘন্টা বাজছিল। তিনি বললেনঃ “ঘন্টা বাজানো নিষিদ্ধ। কাফিররা তাদের মন্দিরে ঘন্টা বাজিয়ে থাকে।” তখন সেই কাফেলার লোকেরা বললোঃ “এ ব্যাপারে আমাদের জ্ঞান আপনার চেয়ে বেশী আছে। বড় বড় ঘন্টা বাজানো নিষিদ্ধ বটে, কিন্তু ছোট ছোট ঘন্টায় কোন দোষ নেই। তাদের একথা শুনে হযরত সালিম (রঃ) নীরব হয়ে যান। শুধু এতোটুকু তিনি বললেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মূর্খদের সাথে বকাবকি না করাই উত্তম। বলা হয় যে, (আরবী) এ সবগুলোরই অর্থ একই। অর্থাৎ সৎ কাজ। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন আল্লাহর বান্দাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেন। (আরবী) শব্দের মধ্যে সমস্ত আনুগত্য নিহিত রয়েছে। আর তিনি তাকে মূর্খদের সাথে জড়িয়ে না পড়ারও নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশ বাহ্যতঃ নবী (সঃ)-এর প্রতি হলেও সমস্ত বান্দাই এর অন্তর্ভুক্ত। এর মাধ্যমে বান্দাদেরকে আদব বা ভদ্রতা শিক্ষা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের প্রতি কেউ যদি জুলুম করে তবে তাদেরকে তা সহ্য করতে হবে, এর অর্থ এটা নয় যে, কেউ যদি আল্লাহর ওয়াজেবী হকের ব্যাপারে অবহেলা প্রদর্শন করে বা তার সাথে কুফরী করে অথবা তার একত্ববাদ থেকে অজ্ঞ থেকে যায় তবুও তাকে ক্ষমা করে দিতে হবে। এর অর্থ এটাও নয় যে, মূর্খরা যদি মূখতা বশতঃ মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয় তবুও নীরব থাকতে হবে। মোটকথা, এটা হচ্ছে ঐ চরিত্র যা আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে শিক্ষা দিয়েছেন। এই বিষয়টিকে একজন জ্ঞানী কবি কবিতার মধ্যে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ক্ষমা করে দেয়ার নীতি অবলম্বন কর এবং সৎকাজের নির্দেশ দাও যেমন তোমাকে আদেশ করা হয়েছে। আর মূর্খদেরকে এড়িয়ে চল, তাদের সাথে জড়িয়ে পড়ো না। প্রত্যেক লোকের সাথে নরমভাবে কথা বল । আর উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন লোকের প্রতি নরম ভাষা প্রয়োগ করা খুবই প্রশংসাৰ্হ।”কোন কোন আলিমের উক্তি রয়েছে যে, মানুষ দু' প্রকারের রয়েছে। প্রথম হচ্ছে উপকারী মানুষ। সে তোমাকে খুশী মনে যা কিছু দান করে তা তুমি কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ কর এবং সাধ্যের অতিরিক্ত ভার তার উপর চাপিয়ে দিয়ো না যার ফলে নিজেই সে পিষ্ট হয়ে যায়। দ্বিতীয় হচ্ছে হতভাগ্য ব্যক্তি। তুমি তাকে ভাল কাজের পরামর্শ দাও। কিন্তু যদি তার বিভ্রান্তি বেড়েই চলে এবং সে তার অজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে যায় তবে তাকে এড়িয়ে চল। সম্ভবতঃ এই ক্ষমাই তাকে তার দুষ্কার্য থেকে বিরত রাখবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “উত্তম পন্থায় খারাপকে দূরীভূত কর, এভাবে তোমার শত্রুও তোমার মিত্রতে পরিণত হবে। তারা যে খেয়াল প্রকাশ করছে তা আমি খুব ভালই জানি।” আল্লাহ পাক বলেনঃ “শয়তানের কুমন্ত্রণা যদি তোমাকে প্ররোচিত করে তবে তুমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।” অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নেকী ও বদী, সৎ ও অসৎ এবং ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না।” ভাল পন্থায় খারাপকে দূর কর।' এই আমল ঐ লোকেরাই অবলম্বন করতে পারে যারা প্রকৃতিগতভাবে ধৈর্যশীল। ভাগ্যবান লোকেরাই এর উপর আমল করতে পারে। পরিণামে তারা বড়ই সফলতা লাভ করবে। যদি শয়তান তোমাদের অন্তরে কোন কুমন্ত্রণা দেয় এবং বিভ্রান্ত করতে শুরু করে অথবা শত্রুর সাথে ঝগড়ার সময় তোমাকে রাগান্বিত করে এবং ঐ মূখ হতে এড়িয়ে চলা থেকে তোমাকে বিরত রাখে এবং তাকে দুঃখ দিতে তোমাকে উত্তেজিত করে, তাহলে তুমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর। মূর্খ যে তোমার উপর বাড়াবাড়ি করছে তা আল্লাহ দেখছেন এবং তোমার আশ্রয় প্রার্থনাও তিনি শুনছেন। তাঁর কাছে কোন কথাই গোপন নেই। শয়তানের বিভ্রান্তি এবং ফাসাদ সৃষ্টি তোমাদের যে পরিমাণ ক্ষতি সাধন করতে পারে আল্লাহ তা সম্যক অবগত।যখন (আরবী) -এই আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন বান্দা বলেঃ “হে আমার মা’বৃদ! যদি ক্রোধ এসে পড়ে তবে কিভাবে ক্ষমা করার নীতি অবলম্বন করা যাবে?” তখন মহান আল্লাহ (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। ঐ দুই ব্যক্তির ঘটনা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, তারা উভয়ে নবী (সঃ)-এর সামনে লড়ে যায়। এমন কি একজনের নাসারন্ধ্র ক্রোধে ফুলে ওঠে। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ ‘আমি এমন একটি কালেমা জানি যে, যদি সে ওটা পাঠ করে তবে তার ক্রোধ প্রশমিত হয়ে যাবে! কালেমাটি হচ্ছে নিম্নরূপঃ(আরবী) অর্থাৎ “আমি বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। লোকটিকে কালেমাটি বলে দেয়া হলো। তখন সে বললোঃ আমার মধ্যে কোন পাগলামি নেই। (আরবী) -এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে ফাসাদ। এই ফাসাদ ক্রোধের কারণেই হাক বা অন্য কোন কারণেই হাক। আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী (সঃ) ! উত্তম রীতিতে কথা বল। শয়তান পরস্পরের মধ্যে বিশৃংখলা সৃষ্টির চেষ্টা করতে রয়েছে। (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে দুষ্টামি ও কুমন্ত্রণা থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর (আরবী) শব্দটি মঙ্গল বা কল্যাণ কামনায় ব্যবহৃত হয়। (আরবী)-এর হাদীসগুলো তাফসীরের শুরুতে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই।

আল-আরাফ 7:200

১৯৯-২০০ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছেজনগণের যে মাল তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত এবং যে মাল তারা নিজেরাই নিয়ে আসে, (হে মুহাম্মাদ সঃ!) তুমি তা গ্রহণ কর। সূরায়ে বারাআতে ফরয দানের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, এ নির্দেশ ছিল তার পূর্বেকার। সেই সময় সাদকা তাঁর কাছে পেশ করা হতো। যহহাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছেযা অতিরিক্ত হয় তা খরচ করে দাও। (আরবী) শব্দের অর্থ করা হয়েছে ‘অতিরিক্ত। যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এতে মুশরিকদেরকে ক্ষমা করে দেয়ার হুকুম হয়েছে। দশ বছর পর্যন্ত এই ক্ষমার নীতি কার্যকরী থাকে। এরপর তাদের প্রতি কঠোরতা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়। এটা হচ্ছে হযরত ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে- লোকদেরকে তাদের চরিত্র ও কাজের ব্যাপারে ক্ষমার চোখে দেখ । অর্থাৎ তাদের স্বভাব চরিত্র ও কাজ কারবারের খোঁজ খবর নিয়ো না। ভাবার্থ হচ্ছে- লোকদেরকে ক্ষমা করে দাও এবং খারাপ সাহচর্য অবলম্বন করা থেকে বিরত থাক। আল্লাহর শপথ! আমি যার সাহচর্য অবলম্বন করবে, তার সুন্দর চরিত্র অবশ্যই গ্রহণ করবো। সকল উক্তির মধ্যে এই উক্তিটিই সর্বোত্তম।হযরত উয়াইনা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন তখন নবী (সঃ) হযরত জিবরাঈল (আ)-কে জিজ্ঞেস করলেন- “হে জিবরাঈল (আঃ)! এর উদ্দেশ্য কি?” জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ আল্লাহ আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, কেউ আপনার উপর অত্যাচার করলে আপনি তাকে ক্ষমা করে দিবেন, যে আপনাকে দান থেকে বঞ্চিত করে তাকে আপনি দান করবেন এবং যে আপনার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে আপনি তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখবেন।” (এ হাদীসটি ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এই বিষয় সম্পর্কীয় আর একটি হাদীস হযরত উকবা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করি। আমি তার হাত ধারণ করে বলি- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সর্বোত্তম আমল আমাকে বাতলিয়ে দিন। তিনি তখন আমাকে বললেনঃ “হে উকবা ইবনে আমির (রাঃ)! যে তোমার প্রতি সহানুভূতি দেখায় না তুমি তার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন কর, যে তোমাকে দান থেকে বঞ্চিত রাখে তুমি তাকে দান থেকে বঞ্চিত করো না, যে তোমার প্রতি যুলুম করে তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও।” (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বিনয় ও ক্ষমা পরায়ণতার নীতি গ্রহণ কর এবং লোকদেরকে সকাজের নির্দেশ দাও, আর জাহিল ও মূর্খদের সাথে জড়িয়ে পড়ো না বরং তাদেরকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখো৷” (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে বা সত্ত্বাজ। [বুখারীর (রঃ) উক্তি হচ্ছে (আরবী)-এর অর্থ (আরবী) এবং এর থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন উরওয়া (রঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং ইবনে জারীর (রঃ)]হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উয়াইনা ইবনে হসন ইবনে হুযাইফা স্বীয় ভ্রাতুস্পুত্র হুর ইবনে কয়েস (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন। হুর ইবনে কয়েস (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর একজন দরবারী লোক ছিলেন। কুরআন কারীমে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। তিনি হযরত উমার (রাঃ)-এর মজলিসের কারী ও আলিমদের অন্যতম কারী ও আলিম ছিলেন এবং তার পরামর্শ সভার একজন সদস্য ছিলেন। হযরত উমার (রাঃ)-এর দরবারের আলিমগণ যুবকও ছিলেন, বৃদ্ধও ছিলেন। উয়াইনা স্বীয় ভ্রাতুস্পুত্রকে বললেনঃ “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! আমীরুল মুমিনীনের কাছে তোমার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। সুতরাং তুমি তার সাথে আমার সাক্ষাতের অনুমতি নিয়ে এসো।” তখন হুর (রাঃ) উয়াইনার জন্যে অনুমতি নিয়ে আসলেন এবং হযরত উমার (রাঃ) উয়াইনাকে হাযির হওয়ার অনুমতি দিলেন। উয়াইনা যখন আমীরুল মুমিনীন। হযরত উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন তখন তিনি তাকে বললেনঃ “হে। খাত্তাবের পুত্র! আপনি আমাকে যথেষ্ট টাকাও দেননি এবং আমার প্রতি আদল বা ন্যায় বিচারও করেনি।" আদলের কথা শোনা মাত্রই হযরত উমার তেলে বেগুনে। জ্বলে উঠলেন এবং উয়াইনাকে মারতে উদ্যত হলেন। তখন হুর (রাঃ) বলে উঠলেনঃ হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেছেনঃ “তুমি বিনয় ও ক্ষমাপরায়ণতার নীতি অবলম্বন কর, জনগণকে সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খদের সাথে জড়িয়ে পড়ো না (বরং তাদেরকে ক্ষমা করে দাও)। ইনি তো মূর্খদেরই অন্তর্ভুক্ত! আল্লাহর শপথ । যখন হযরত উমার (রাঃ)-এর সামনে এ আয়াতটি পাঠ করা হলো তখন তিনি থেমে গেলেন এবং উয়াইনাকে কোন শাস্তি দিলেন না। মহা মহিমান্বিত আল্লাহর কিতাবে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল। (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে তাখরীজ করেছেন)ইবনে আবি হাতিম (রঃ) আবদুল্লাহ ইবনে নাফি (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, একদা সালিম ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে উমার (রঃ) সিরিয়াবাসী এক যাত্রী দলের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন। যাত্রী দলের মধ্যে ঘন্টা বাজছিল। তিনি বললেনঃ “ঘন্টা বাজানো নিষিদ্ধ। কাফিররা তাদের মন্দিরে ঘন্টা বাজিয়ে থাকে।” তখন সেই কাফেলার লোকেরা বললোঃ “এ ব্যাপারে আমাদের জ্ঞান আপনার চেয়ে বেশী আছে। বড় বড় ঘন্টা বাজানো নিষিদ্ধ বটে, কিন্তু ছোট ছোট ঘন্টায় কোন দোষ নেই। তাদের একথা শুনে হযরত সালিম (রঃ) নীরব হয়ে যান। শুধু এতোটুকু তিনি বললেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মূর্খদের সাথে বকাবকি না করাই উত্তম। বলা হয় যে, (আরবী) এ সবগুলোরই অর্থ একই। অর্থাৎ সৎ কাজ। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন আল্লাহর বান্দাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেন। (আরবী) শব্দের মধ্যে সমস্ত আনুগত্য নিহিত রয়েছে। আর তিনি তাকে মূর্খদের সাথে জড়িয়ে না পড়ারও নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশ বাহ্যতঃ নবী (সঃ)-এর প্রতি হলেও সমস্ত বান্দাই এর অন্তর্ভুক্ত। এর মাধ্যমে বান্দাদেরকে আদব বা ভদ্রতা শিক্ষা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের প্রতি কেউ যদি জুলুম করে তবে তাদেরকে তা সহ্য করতে হবে, এর অর্থ এটা নয় যে, কেউ যদি আল্লাহর ওয়াজেবী হকের ব্যাপারে অবহেলা প্রদর্শন করে বা তার সাথে কুফরী করে অথবা তার একত্ববাদ থেকে অজ্ঞ থেকে যায় তবুও তাকে ক্ষমা করে দিতে হবে। এর অর্থ এটাও নয় যে, মূর্খরা যদি মূখতা বশতঃ মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয় তবুও নীরব থাকতে হবে। মোটকথা, এটা হচ্ছে ঐ চরিত্র যা আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে শিক্ষা দিয়েছেন। এই বিষয়টিকে একজন জ্ঞানী কবি কবিতার মধ্যে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ক্ষমা করে দেয়ার নীতি অবলম্বন কর এবং সৎকাজের নির্দেশ দাও যেমন তোমাকে আদেশ করা হয়েছে। আর মূর্খদেরকে এড়িয়ে চল, তাদের সাথে জড়িয়ে পড়ো না। প্রত্যেক লোকের সাথে নরমভাবে কথা বল । আর উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন লোকের প্রতি নরম ভাষা প্রয়োগ করা খুবই প্রশংসাৰ্হ।”কোন কোন আলিমের উক্তি রয়েছে যে, মানুষ দু' প্রকারের রয়েছে। প্রথম হচ্ছে উপকারী মানুষ। সে তোমাকে খুশী মনে যা কিছু দান করে তা তুমি কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ কর এবং সাধ্যের অতিরিক্ত ভার তার উপর চাপিয়ে দিয়ো না যার ফলে নিজেই সে পিষ্ট হয়ে যায়। দ্বিতীয় হচ্ছে হতভাগ্য ব্যক্তি। তুমি তাকে ভাল কাজের পরামর্শ দাও। কিন্তু যদি তার বিভ্রান্তি বেড়েই চলে এবং সে তার অজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে যায় তবে তাকে এড়িয়ে চল। সম্ভবতঃ এই ক্ষমাই তাকে তার দুষ্কার্য থেকে বিরত রাখবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “উত্তম পন্থায় খারাপকে দূরীভূত কর, এভাবে তোমার শত্রুও তোমার মিত্রতে পরিণত হবে। তারা যে খেয়াল প্রকাশ করছে তা আমি খুব ভালই জানি।” আল্লাহ পাক বলেনঃ “শয়তানের কুমন্ত্রণা যদি তোমাকে প্ররোচিত করে তবে তুমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।” অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নেকী ও বদী, সৎ ও অসৎ এবং ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না।” ভাল পন্থায় খারাপকে দূর কর।' এই আমল ঐ লোকেরাই অবলম্বন করতে পারে যারা প্রকৃতিগতভাবে ধৈর্যশীল। ভাগ্যবান লোকেরাই এর উপর আমল করতে পারে। পরিণামে তারা বড়ই সফলতা লাভ করবে। যদি শয়তান তোমাদের অন্তরে কোন কুমন্ত্রণা দেয় এবং বিভ্রান্ত করতে শুরু করে অথবা শত্রুর সাথে ঝগড়ার সময় তোমাকে রাগান্বিত করে এবং ঐ মূখ হতে এড়িয়ে চলা থেকে তোমাকে বিরত রাখে এবং তাকে দুঃখ দিতে তোমাকে উত্তেজিত করে, তাহলে তুমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর। মূর্খ যে তোমার উপর বাড়াবাড়ি করছে তা আল্লাহ দেখছেন এবং তোমার আশ্রয় প্রার্থনাও তিনি শুনছেন। তাঁর কাছে কোন কথাই গোপন নেই। শয়তানের বিভ্রান্তি এবং ফাসাদ সৃষ্টি তোমাদের যে পরিমাণ ক্ষতি সাধন করতে পারে আল্লাহ তা সম্যক অবগত।যখন (আরবী) -এই আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন বান্দা বলেঃ “হে আমার মা’বৃদ! যদি ক্রোধ এসে পড়ে তবে কিভাবে ক্ষমা করার নীতি অবলম্বন করা যাবে?” তখন মহান আল্লাহ (আরবী)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। ঐ দুই ব্যক্তির ঘটনা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, তারা উভয়ে নবী (সঃ)-এর সামনে লড়ে যায়। এমন কি একজনের নাসারন্ধ্র ক্রোধে ফুলে ওঠে। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ ‘আমি এমন একটি কালেমা জানি যে, যদি সে ওটা পাঠ করে তবে তার ক্রোধ প্রশমিত হয়ে যাবে! কালেমাটি হচ্ছে নিম্নরূপঃ(আরবী) অর্থাৎ “আমি বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। লোকটিকে কালেমাটি বলে দেয়া হলো। তখন সে বললোঃ আমার মধ্যে কোন পাগলামি নেই। (আরবী) -এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে ফাসাদ। এই ফাসাদ ক্রোধের কারণেই হাক বা অন্য কোন কারণেই হাক। আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী (সঃ) ! উত্তম রীতিতে কথা বল। শয়তান পরস্পরের মধ্যে বিশৃংখলা সৃষ্টির চেষ্টা করতে রয়েছে। (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে দুষ্টামি ও কুমন্ত্রণা থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর (আরবী) শব্দটি মঙ্গল বা কল্যাণ কামনায় ব্যবহৃত হয়। (আরবী)-এর হাদীসগুলো তাফসীরের শুরুতে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই।

আল-আরাফ 7:201

২০১-২০২ নং আয়াতের তাফসীর: যেসব বান্দা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলে এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকে, তাদেরকে যদি কোন সময় শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়ে খারাপ কাজে নিমগ্ন করে তবে সত্বরই তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। (আরবী) শব্দটিকে কেউ কেউ (আরবী) পড়েছেন। এই দু' কিরআতই প্রসিদ্ধ। এ দু'টোর অর্থও একই। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে, অর্থে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ ক্রোধ বলেছেন। অন্য কেউ বলেছেন যে, এর অর্থ হচ্ছে- ‘শয়তান যখন তাকে কোন দুর্ঘটনায় ফেলে। আবার এর অর্থ ‘পাপের কারণে লজ্জা ও দুঃখ’ এরূপও করা হয়েছে। কোন কোন লোক এর অর্থ ‘পাপ কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়া করেছেন। এই লোকদের আল্লাহর শাস্তি, দান, সওয়াব, তাঁর ওয়াদা, ভয় প্রদর্শন ইত্যাদি স্মরণ হয়ে যায়। ফলে তৎক্ষণাৎ তারা তাওবা করে ফেলে এবং আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর ঐ মুহূর্তেই তার দিকে প্রত্যাবর্তন করতঃ তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে শুরু করে। সাথে সাথেই তাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়। অজ্ঞান থাকলে তাদের জ্ঞান ফিরে আসে।কথিত আছে যে, একজন নারী নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তার। মৃগীর রোগ ছিল। সে আরয করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার আরোগ্যের জন্যে আল্লাহর নিকট দুআ করুন।” তিনি বললেনঃ “আমি যদি দুআ করি তবে আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন। কিন্তু তুমি যদি ধৈর্যধারণ কর তবে কিয়ামতের দিন তোমাকে হিসাব দিতে হবে না।” তখন ঐ মহিলাটি বললোঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি রোগের উপর ধৈর্য অবলম্বন করবো, কেননা এর বিনিময়ে আমি জান্নাত পাবো। তবে আমার মৃগী ও মুৰ্ছা রোগ রয়েছে বলে আমার জ্ঞান লোপ পেয়ে যায় এবং শরীর থেকে কাপড় খুলে পড়ে। তাই আপনি আমার জন্যে দুআ করুন যেন রোগ দূর না হলেও কমপক্ষে আমার দেহ থেকে কাপড় খুলে না যায়। তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জন্যে দুআ করেন এবং তখন থেকে আর কখনও ঐ রোগ উঠার সময় তার দেহ থেকে কাপড় খুলে যেতো না। (এ হাদীসটি ইবনে মিরদুওয়াই ও একাধিক আহলে সুনান বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম হাকিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর বিশুদ্ধ)বর্ণিত আছে যে, একজন যুবক মসজিদে বসে ইবাদত করতো। একটি মহিলা তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং তাকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সে একদা তার বাড়ীতে এসেই পড়ে। সাথে সাথে (আরবী) তার এ আয়াতটি স্মরণ হয়ে যায় এবং তৎক্ষণাৎ সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। জ্ঞান ফিরলে আবার সে এ আয়াতটি পাঠ করে এবং এবার সে মারাই যায়। হযরত উমার (রাঃ) এসে তার পিতার নিকট সমবেদনা প্রকাশ করেন। রাত্রিকালে তাকে দাফন করা হয়। হযরত উমার (রাঃ) তাঁর কয়েকজন সাথীকে নিয়ে তার কবরের কাছে গমন। করেন এবং তার জানাযার নামায আদায় করেন। অতঃপর তিনি তাকে সম্বোধন করে বলেনঃ হে যুবক!(আরবী) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করলো, তার জন্যে দু’টি জান্নাত রয়েছে।” (৫৫:৪৬) এ আয়াতটি শুনে যুবকটি কবরের মধ্য থেকেই উত্তর দিলোঃ “হে উমার (রাঃ)! মহা মহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে দু’টি জান্নাতই দান করেছেন!” (হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের সঙ্গী মানবরূপী শয়তানরা তাদেরকে বিভ্রান্তির পথে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যায়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অপব্যয়কারীরা হচ্ছে শয়তানদের ভাই।” (১৭:২৭) অর্থাৎ তাদের অনুসারীদেরকে ও তাদের কথা মান্যকারীদেরকে তারা গুমরাহীর দিকে নিয়ে যায়। পাপকাজ তাদের কাছে তারা সহজ করে দেয় এবং তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে তোলে। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বাড়াবাড়ি। অর্থাৎ অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তিতে তারা বাড়াবাড়ি করে।(আরবী) অর্থাৎ এই শয়তানরা তাদের চেষ্টায় মোটেই কোন ত্রুটি করে । হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- মানুষ অসৎ কাজ সম্পাদনে আদৌ অবহেলা প্রদর্শন করে না এবং শয়তানরাও তাদেরকে বিপথে চালিত করার কাজে মোটেই ক্রটি করে না। গুমরাহীর দিকে আকৃষ্টকারীরা হচ্ছে। জ্বিন ও শয়তান , যারা নিজেদের মানব বন্ধুদের কাছে অহী পাঠিয়ে থাকে এবং ঐ কাজে মোটেই ক্রটি করে না। কারণ তাদের প্রকৃতি ও স্বভাবই এই রূপ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ) ! তুমি কি দেখনি যে, আমি শয়তানদেরকে কাফিরদের নিকট পাঠিয়ে থাকি, যারা ঐ কাফিরদেরকে নাফরমানীর দিকে আকৃষ্ট করে। থাকে?” (১৯:৮৩)

আল-আরাফ 7:202

২০১-২০২ নং আয়াতের তাফসীর: যেসব বান্দা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলে এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকে, তাদেরকে যদি কোন সময় শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়ে খারাপ কাজে নিমগ্ন করে তবে সত্বরই তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। (আরবী) শব্দটিকে কেউ কেউ (আরবী) পড়েছেন। এই দু' কিরআতই প্রসিদ্ধ। এ দু'টোর অর্থও একই। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে, অর্থে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ এর অর্থ ক্রোধ বলেছেন। অন্য কেউ বলেছেন যে, এর অর্থ হচ্ছে- ‘শয়তান যখন তাকে কোন দুর্ঘটনায় ফেলে। আবার এর অর্থ ‘পাপের কারণে লজ্জা ও দুঃখ’ এরূপও করা হয়েছে। কোন কোন লোক এর অর্থ ‘পাপ কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়া করেছেন। এই লোকদের আল্লাহর শাস্তি, দান, সওয়াব, তাঁর ওয়াদা, ভয় প্রদর্শন ইত্যাদি স্মরণ হয়ে যায়। ফলে তৎক্ষণাৎ তারা তাওবা করে ফেলে এবং আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর ঐ মুহূর্তেই তার দিকে প্রত্যাবর্তন করতঃ তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে শুরু করে। সাথে সাথেই তাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়। অজ্ঞান থাকলে তাদের জ্ঞান ফিরে আসে।কথিত আছে যে, একজন নারী নবী (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তার। মৃগীর রোগ ছিল। সে আরয করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার আরোগ্যের জন্যে আল্লাহর নিকট দুআ করুন।” তিনি বললেনঃ “আমি যদি দুআ করি তবে আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন। কিন্তু তুমি যদি ধৈর্যধারণ কর তবে কিয়ামতের দিন তোমাকে হিসাব দিতে হবে না।” তখন ঐ মহিলাটি বললোঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি রোগের উপর ধৈর্য অবলম্বন করবো, কেননা এর বিনিময়ে আমি জান্নাত পাবো। তবে আমার মৃগী ও মুৰ্ছা রোগ রয়েছে বলে আমার জ্ঞান লোপ পেয়ে যায় এবং শরীর থেকে কাপড় খুলে পড়ে। তাই আপনি আমার জন্যে দুআ করুন যেন রোগ দূর না হলেও কমপক্ষে আমার দেহ থেকে কাপড় খুলে না যায়। তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জন্যে দুআ করেন এবং তখন থেকে আর কখনও ঐ রোগ উঠার সময় তার দেহ থেকে কাপড় খুলে যেতো না। (এ হাদীসটি ইবনে মিরদুওয়াই ও একাধিক আহলে সুনান বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম হাকিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর বিশুদ্ধ)বর্ণিত আছে যে, একজন যুবক মসজিদে বসে ইবাদত করতো। একটি মহিলা তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং তাকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সে একদা তার বাড়ীতে এসেই পড়ে। সাথে সাথে (আরবী) তার এ আয়াতটি স্মরণ হয়ে যায় এবং তৎক্ষণাৎ সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। জ্ঞান ফিরলে আবার সে এ আয়াতটি পাঠ করে এবং এবার সে মারাই যায়। হযরত উমার (রাঃ) এসে তার পিতার নিকট সমবেদনা প্রকাশ করেন। রাত্রিকালে তাকে দাফন করা হয়। হযরত উমার (রাঃ) তাঁর কয়েকজন সাথীকে নিয়ে তার কবরের কাছে গমন। করেন এবং তার জানাযার নামায আদায় করেন। অতঃপর তিনি তাকে সম্বোধন করে বলেনঃ হে যুবক!(আরবী) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করলো, তার জন্যে দু’টি জান্নাত রয়েছে।” (৫৫:৪৬) এ আয়াতটি শুনে যুবকটি কবরের মধ্য থেকেই উত্তর দিলোঃ “হে উমার (রাঃ)! মহা মহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে দু’টি জান্নাতই দান করেছেন!” (হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের সঙ্গী মানবরূপী শয়তানরা তাদেরকে বিভ্রান্তির পথে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যায়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অপব্যয়কারীরা হচ্ছে শয়তানদের ভাই।” (১৭:২৭) অর্থাৎ তাদের অনুসারীদেরকে ও তাদের কথা মান্যকারীদেরকে তারা গুমরাহীর দিকে নিয়ে যায়। পাপকাজ তাদের কাছে তারা সহজ করে দেয় এবং তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে তোলে। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বাড়াবাড়ি। অর্থাৎ অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তিতে তারা বাড়াবাড়ি করে।(আরবী) অর্থাৎ এই শয়তানরা তাদের চেষ্টায় মোটেই কোন ত্রুটি করে । হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- মানুষ অসৎ কাজ সম্পাদনে আদৌ অবহেলা প্রদর্শন করে না এবং শয়তানরাও তাদেরকে বিপথে চালিত করার কাজে মোটেই ক্রটি করে না। গুমরাহীর দিকে আকৃষ্টকারীরা হচ্ছে। জ্বিন ও শয়তান , যারা নিজেদের মানব বন্ধুদের কাছে অহী পাঠিয়ে থাকে এবং ঐ কাজে মোটেই ক্রটি করে না। কারণ তাদের প্রকৃতি ও স্বভাবই এই রূপ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ) ! তুমি কি দেখনি যে, আমি শয়তানদেরকে কাফিরদের নিকট পাঠিয়ে থাকি, যারা ঐ কাফিরদেরকে নাফরমানীর দিকে আকৃষ্ট করে। থাকে?” (১৯:৮৩)

আল-আরাফ 7:203

আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! যখন এই লোকগুলো কোন মুজিযা এবং নিদর্শন দেখতে চায় এবং তা তুমি তাদের সামনে পেশ কর না তখন তার বলে- ‘কোন নিদর্শন আপনি পেশ করছেন না কেন? নিজের পক্ষ থেকে তা বানিয়ে নিচ্ছেন না কেন? অথবা কেন আপনি আকাশ থেকে কোন নিদর্শন টেনে আনছেন না?' এই আয়াত দ্বারা মুজিযা বা অলৌকিক ব্যাপার বুঝানো হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি ইচ্ছে করলে আকাশ থেকে মুজিযা অবতীর্ণ করতে পারি যা দেখে তাদের গ্রীবা ঝুঁকে পড়বে। এই কাফিররাও আমার রাসূল (সঃ)-কে বলে- আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন লাভ করার চেষ্টা আপনি করেন না কেন? তাহলে আমরা তা দেখে ঈমান আনতাম! তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও আমি এই ব্যাপারে আমার কিছুই চেষ্টা করতে চাই না। আমি তো একজন আল্লাহর বান্দা মাত্র! আমার কাছে যে নির্দেশ পাঠানো হয়েছে আমি সেটাই পালনকারী। যদি তিনি স্বয়ং কোন মু'জিযা পাঠান তবে আমি তা পেশ করে দেবো। আর যদি তিনি তা প্রেরণ না করেন তবে আমি সেজন্যে জেদ বা হঠকারিতা করতে পারি না। তিনি আমাকে এ কথাই বলে দিয়েছেন যে, এই কুরআনই হচ্ছে সবচেয়ে বড় মু'জিযা। এর মধ্যে তাওহীদের দলীলগুলো এমন স্পষ্ট ও খোলাখখালিভাবে রয়েছে যে, তা স্বয়ং মু'জিযা হয়ে গেছে। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এই কুরআনই হচ্ছে তোমার প্রতিপালকের বিরাট দলীল ও নিদর্শন বিশেষ, আর এটা ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্যে হিদায়াত ও অনুগ্রহের প্রতীক বিশেষ।

আল-আরাফ 7:204

যখন এই বর্ণনা সমাপ্ত হলো যে, কুরআন হচ্ছে হিদায়াত ও রহমত এবং লোকদের জন্যে বুঝবার জিনিস, তখন ইরশাদ হচ্ছে- তোমরা এই কুরআন পাঠের সময় নীরব থাকবে, যেন এর মর্যাদা রক্ষিত হতে পারে। এমন হওয়া উচিত নয় যেমন কুরাইশরা বললো। অর্থাৎ তারা বলতোঃ “তোমরা শুনো না, শুনতে দিয়ো না, বরং কুরআন পাঠের সময় গণ্ডগোল ও হৈ চৈ করতে থাকো।” কিন্তু এই নীরবতা অবলম্বনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে ফরয নামাযের ব্যাপারে বা ঐ সময়, যখন ইমাম উচ্চৈঃস্বরে কিরআত পাঠ করেন। যেমন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অনুসরণের জন্যেই ইমাম নিযুক্ত করা হয়। সুতরাং যখন সে তাকবীর পাঠ করে, আর সে যখন কিরআত পাঠ করে তখন তোমরা নীরব হয়ে যাও।" (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) তার সহীহ গ্রন্থে তাখরীজ করেছেন এবং আহলে সুনান এটা বর্ণনা করেছেন) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে লোকেরা নামাযের সময় কথা বলতো। অতঃপর যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়“তোমরা নীরব থাকো ও কিরআত শ্রবণ কর তখন নামাযে নীরব থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আমরা নামাযের মধ্যে একে (আরবী) অপরকে বলতাম। এ জন্যে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।" হযরত বাশীর ইবনে জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা ইবনে মাসউদ (রাঃ) নামায পড়াচ্ছিলেন। লোকদেরকে তিনি দেখলেন যে, তারা ইমামের সাথে নিজেরাও কিরআত পাঠ করছে। তিনি নামায শেষে বললেনঃ “তোমাদের কি হয়েছে যে, তোমরা কুরআন শুনছে না এবং বুঝছো না? অথচ আল্লাহ তা'আলা নীরব থেকে শুনতে বলেছেন?” যুহরী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি আনসারের একটি লোকের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় (এই আয়াতটি মাক্কী এবং আনসারদের ইসলাম ককূলের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) পড়তেন তখন তিনিও তার পিছনে পিছনে পড়ে যেতেন।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সশব্দ নামায শেষ করে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ নিজেও কি আমার সাথে সাথে পড়ছিল?” তখন একটি লোক উত্তরে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)। হ্যা (আমি পড়ছিলাম বটে)।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার কি হয়েছে যে, আমি মানুষকে আমার সাথে সাথে কুরআন পড়তে দেখছি?” তখন থেকে মানুষ সশব্দ নামাযে ইমামের পিছনে কিরআত পড়া হতে বিরত থাকেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও আহলুস সুনান বর্ণনা করেছেন)যুহরী (রঃ) বলেন যে, উচ্চ শব্দ বিশিষ্ট নামাযে ইমামের পিছনে কিরআত না পড়া উচিত। ইমামের কিরআতই মুকতাদীর জন্যে যথেষ্ট, যদিও তার শব্দ শোনা না যায়। কিন্তু যদি উচ্চ শব্দ বিশিষ্ট নামায না হয় তবে পড়ে নেয়া যায় । কিন্তু এটা ঠিক নয় যে, কেউ সশব্দ নামাযে ইমামের পিছনে কিরআত পড়ে। না প্রকাশ্যে পড়ে, না গোপনে পড়ে। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “কুরআন পাঠের সময় তোমরা নীরবতা অবলম্বন কর।” আমি বলি- আলেমদের একটি দলের নীতি হচ্ছে, উচ্চ শব্দ বিশিষ্ট নামাযে মুকতাদীর উপর এটা ওয়াজিব নয় যে, নিজেও সে কিরআত পাঠ করবে। না ইমামের সূরায়ে ফাতেহা পাঠের সময়, না অন্য সরা পাঠের সময়। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর দু’টি উক্তি রয়েছে। এ দুটি উক্তির মধ্যে একটি উক্তি এটাও রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) বলেন যে, মুকতাদী যেন কোন সময়েই কিরআত পাঠ না করে, আস্তের নামাযেও নয় এবং জোরের নামাযেও নয়। কেননা হাদীসে এসেছে- “যার জন্যে ইমাম রয়েছে, ইমামের কিরআতই তার কিরআত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত জাবির (রাঃ) হতে মার’ রূপে বর্ণনা করেছেন। এটা মুআত্তায় হযরত জাবির (রাঃ) হতে মাওকুফরূপে বর্ণিত আছে। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এটাই বিশুদ্ধমত) এটা অত্যন্ত জটিল ও মতভেদী মাসআলা। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, ইমামের পিছনে কিরআত ওয়াজিব। নামায সিররী হাক অথবা জিহরী হাক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সমধিক জ্ঞাত।‘যখন কুরআন পাঠ করা হয় তখন নীরবে শ্রবণ কর' অর্থাৎ ফরয নামাযে যখন কিরআত পাঠ করা হয় তখন চুপচাপ হয়ে শ্রবণ কর। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ ইবনে কারীয (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা উবাইদুল্লাহ ইবনে উমাইর (রাঃ) এবং আতা’ ইবনে রাবাহ (রাঃ)-কে পরস্পর কথাবার্তা বলতে শুনি। অথচ সেই সময় অন্য দিকে ওয়ায হচ্ছিল। তখন আমি তাদেরকে বললামঃ আল্লাহর যিকির হচ্ছে অথচ আপনারা শুনছেন না কেন? আপনারা তো শাস্তির যোগ্য হয়ে গেছেন! তখন তারা আমার দিকে ঘুরে তাকালেন এবং পুনরায় কথা বলতে শুরু করলেন। আমি আবার তাদেরকে সতর্ক করলাম। তারা এবারও আমার দিকে তাকালেন এবং পরস্পর কথা বলতেই থাকলেন। আমি তৃতীয়বার আমার কথার পুনরাবৃত্তি করলাম। তখন তারা বললেনঃ “এটা হচ্ছে নামায সম্পৰ্কীয় নির্দেশ যে, নামাযে ইমাম যখন কুরআন পাঠ করেন তখন মুকতাদীকে নীরব হয়ে শুনতে হবে। তাদেরকে পড়তে হবে না।” মুজাহিদ (রঃ) এবং আরও কয়েকজন বর্ণনাকারীও কুরআনের এই হুকুমের ব্যাপারে এ কথাই বলেন। তারা বলেন যে, কেউ যদি নামাযের মধ্যে না থাকে এবং কুরআন পাঠ হয় তবে তার কথা বলায় কোন দোষ নেই। যায়েদ ইবনে আসলামও (রঃ) এই ভাবই নিয়েছেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই হুকুম নামায এবং জুমআর দিনের খাবার সাথে সম্পর্কযুক্ত। ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, এটা ঈদুল আযহা, ঈদুল ফিত্র, জুমআর দিনের খুৎবা এবং জিহরী নামাযের সাথে সম্পর্কযুক্ত। জিহরী ছাড়া অন্য নামাযের সাথে এটা সম্পর্কযুক্ত নয়। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই অবলম্বন করেছেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে নামাযে ও খুৎবায় চুপ থাকা। আর এ হুকুমই হচ্ছে- তোমরা খুৎবায় ও ইমামের পিছনে নীরব থকি। হাদীসে হুবহু এই হুকুমই এসেছে। মুজাহিদ (রঃ) এটা খুবই খারাপ মনে করতেন যে, ইমাম যখন কোন ভয়ের বা রহমতের আয়াত পাঠ করেন তখন মুকতাদীরা কিছু বলতে শুরু করে দেয়। এটা ঠিক নয়, বরং মুকতাদীর উচিত হবে নীরব থাকা। ভয় এবং আশার আবেগে মুখে কোন কথা উচ্চারণ করা উচিত নয়। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কুরআনের কোন আয়াত নীরব হয়ে শ্রবণ করে তার জন্যে দ্বিগুণ সওয়াব লিখা হয়। আর যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে, কিয়ামতের দিন এই কুরআন তার জন্যে নূর বা আলো হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)

আল-আরাফ 7:205

২০৫-২০৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন- দিনের প্রথমভাগে এবং শেষ ভাগে আল্লাহকে খুব বেশী বেশী করে স্মরণ কর। যেমন তিনি এই দু’ আয়াতের মাধ্যমে এই দু’সময়ে তার ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেছেনঃ সূর্যোদয়ের পূর্বে এবং অনুরূপভাবে সূর্যাস্তের পূর্বে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন কর। এটা শবে মিরাজে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়ার পূর্বের কথা। এটি মাক্কী আয়াত । গুদুল্লুন শব্দের অর্থ হচ্ছে দিনের প্রথম ভাগ। আর (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহুবচন। যেমন (আরবী) শব্দের বহুবচন।অতঃপর নির্দেশ দেয়া হচ্ছে- তোমার প্রতিপালককে অন্তরেও স্মরণ কর এবং মুখেও স্মরণ কর। তাঁকে ডাকো জান্নাতের আশা রেখেও এবং জাহান্নামের ভয় করেও। উচ্চশব্দে তাকে ডেকো না। মুসতাহাব এটাই যে, আল্লাহর যিকির হবে নিম্ন স্বরে, উচ্চৈঃস্বরে নয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জনগণ জিজ্ঞেস করেঃ “আল্লাহ আমাদের থেকে কাছে। রয়েছেন, না দূরে রয়েছেন? যদি তিনি নিকটে থাকেন তবে আমরা তাঁকে চুপে চুপে সম্বোধন করবো। আর যদি দূরে থাকেন তবে তাকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকবো।” তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেনঃ আমার বান্দারা তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করছে (আমি নিকটে আছি না দূরে আছি), তুমি তাদেরক বলে দাও আমি খুবই নিকটে রয়েছি। যখন তারা আমাকে ডাকে তখন আমি তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে থাকি।হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কোন এক সফরে জনগণ উচ্চশব্দে দুআ করতে শুরু করে। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “হে লোক সকল। নিজেদের জীবনের উপর দয়া প্রদর্শন কর। তোমরা কোন বধির বা অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছো না । যাকে ডাকছো তিনি শুনতে রয়েছেন এবং তিনি নিকটে রয়েছেন। তিনি তোমাদের গ্রীবার শাহ্ রগ থেকেও নিকটে রয়েছেন।” এই আয়াতের ভাবার্থ নিম্নের আয়াতের মতও হতে পারে- “তোমরা দুআ ও নামায খুব উচ্চ শব্দেও পড়ো না এবং খুব নিম্ন শব্দেও না, বরং এর মাঝামাঝি শব্দে পড়।” কেননা, মুশরিকরা যখন কুরআন শুনতো তখন তারা কুরআনকে, কুরআন অবতীর্ণকারীকে এবং কুরআন আনয়নকারীকে ভালমন্দ বলতো। তখন আল্লাহ পাক নির্দেশ দান করলেনঃ তোমরা খুব উচ্চ শব্দে কুরআন পড়ো না যাতে মুশরিকরা কষ্ট না পায়। আবার এতো নিম্ন স্বরেও পড়ো না যে, তোমার সঙ্গীও শুনতে পায় না। এই আয়াতে কারীমায় এই বিষয়ই রয়েছে- তোমরা তোমাদের সকাল-সন্ধ্যার ইবাদতে উচ্চ স্বরে পড়ো না এবং মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেয়ো না। উদ্দেশ্য হচ্ছে, কুরআনের শ্রোতাকে হুকুম দেয়া হবে যে, এই ঢঙ্গে নামায পড়া ও ইবাদত করা উচিত। এটা খুব দূরের কথা এবং এটা ধীরে পড়ার হুকুমের পরিপন্থী। আবার এর ভাবার্থ এটাও যে, এই হুকুম নামাযের সাথে সম্পর্কযুক্ত, যেমন পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। এটা নামায ও খুত্বার সাথে সম্পর্কযুক্ত। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, এরূপ সময়ে যিকির অপেক্ষা নীবর থাকাটাই উত্তম। এই যিকির উচ্চ স্বরেই হাক বা নিম্ন স্বরেই হাক। এ দু’জন যা বর্ণনা করেছেন তা অনুসৃত নয়। বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে বান্দাদেরকে সকাল-সন্ধ্যা সব সময় অধিক যিকিরের কাজে উৎসাহিত ও উত্তেজিত করা। যেন তারা কোন অবস্থাতেই আল্লাহর যিকির থেকে বিস্মরণ না হয় এবং উদাসীন না থাকে। এ জন্যেই ঐসব ফেরেশতার প্রশংসা করা হয়েছে যারা সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর যিকিরের কাজে ঔদাসীন্য প্রদর্শন করেন না। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা তোমার প্রভুর সান্নিধ্যে থাকে (অর্থাৎ ফেরেশতামণ্ডলী) তারা অহংকারে তার ইবাদত হতে বিমুখ হয় না। যেমন হাদীসে এসেছে“ফেরেশতারা যেমন আল্লাহর ইবাদতের জন্যে সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে যান, তদ্রুপ তোমরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াও না কেন। প্রথম সারিওয়ালাদের অন্যান্য সারিওয়ালাদের উপর প্রাধান্য ও মর্যাদা রয়েছে। তাঁরা সারি বা কাতারকে সোজা করার প্রতি খুবই খেয়াল রাখতেন।” এখানে যে সিজদায়ে তিলাওয়াত রয়েছে এটা হচ্ছে কুরআনের সর্বপ্রথম সিজদায়ে তিলাওয়াত। এটা আদায় করা পাঠক ও শ্রোতা সবারই জন্যে শরীয়তসম্মত কাজ। এতে সমস্ত আলিম একমত । সুনানে ইবনে মাজাহ্র হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই সিজদাহূকে কুরআন কারীমের সিজদাহ্ সমূহের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন।

আল-আরাফ 7:206

২০৫-২০৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন- দিনের প্রথমভাগে এবং শেষ ভাগে আল্লাহকে খুব বেশী বেশী করে স্মরণ কর। যেমন তিনি এই দু’ আয়াতের মাধ্যমে এই দু’সময়ে তার ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেছেনঃ সূর্যোদয়ের পূর্বে এবং অনুরূপভাবে সূর্যাস্তের পূর্বে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন কর। এটা শবে মিরাজে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়ার পূর্বের কথা। এটি মাক্কী আয়াত । গুদুল্লুন শব্দের অর্থ হচ্ছে দিনের প্রথম ভাগ। আর (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহুবচন। যেমন (আরবী) শব্দের বহুবচন।অতঃপর নির্দেশ দেয়া হচ্ছে- তোমার প্রতিপালককে অন্তরেও স্মরণ কর এবং মুখেও স্মরণ কর। তাঁকে ডাকো জান্নাতের আশা রেখেও এবং জাহান্নামের ভয় করেও। উচ্চশব্দে তাকে ডেকো না। মুসতাহাব এটাই যে, আল্লাহর যিকির হবে নিম্ন স্বরে, উচ্চৈঃস্বরে নয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জনগণ জিজ্ঞেস করেঃ “আল্লাহ আমাদের থেকে কাছে। রয়েছেন, না দূরে রয়েছেন? যদি তিনি নিকটে থাকেন তবে আমরা তাঁকে চুপে চুপে সম্বোধন করবো। আর যদি দূরে থাকেন তবে তাকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকবো।” তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেনঃ আমার বান্দারা তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করছে (আমি নিকটে আছি না দূরে আছি), তুমি তাদেরক বলে দাও আমি খুবই নিকটে রয়েছি। যখন তারা আমাকে ডাকে তখন আমি তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে থাকি।হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কোন এক সফরে জনগণ উচ্চশব্দে দুআ করতে শুরু করে। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “হে লোক সকল। নিজেদের জীবনের উপর দয়া প্রদর্শন কর। তোমরা কোন বধির বা অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছো না । যাকে ডাকছো তিনি শুনতে রয়েছেন এবং তিনি নিকটে রয়েছেন। তিনি তোমাদের গ্রীবার শাহ্ রগ থেকেও নিকটে রয়েছেন।” এই আয়াতের ভাবার্থ নিম্নের আয়াতের মতও হতে পারে- “তোমরা দুআ ও নামায খুব উচ্চ শব্দেও পড়ো না এবং খুব নিম্ন শব্দেও না, বরং এর মাঝামাঝি শব্দে পড়।” কেননা, মুশরিকরা যখন কুরআন শুনতো তখন তারা কুরআনকে, কুরআন অবতীর্ণকারীকে এবং কুরআন আনয়নকারীকে ভালমন্দ বলতো। তখন আল্লাহ পাক নির্দেশ দান করলেনঃ তোমরা খুব উচ্চ শব্দে কুরআন পড়ো না যাতে মুশরিকরা কষ্ট না পায়। আবার এতো নিম্ন স্বরেও পড়ো না যে, তোমার সঙ্গীও শুনতে পায় না। এই আয়াতে কারীমায় এই বিষয়ই রয়েছে- তোমরা তোমাদের সকাল-সন্ধ্যার ইবাদতে উচ্চ স্বরে পড়ো না এবং মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেয়ো না। উদ্দেশ্য হচ্ছে, কুরআনের শ্রোতাকে হুকুম দেয়া হবে যে, এই ঢঙ্গে নামায পড়া ও ইবাদত করা উচিত। এটা খুব দূরের কথা এবং এটা ধীরে পড়ার হুকুমের পরিপন্থী। আবার এর ভাবার্থ এটাও যে, এই হুকুম নামাযের সাথে সম্পর্কযুক্ত, যেমন পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। এটা নামায ও খুত্বার সাথে সম্পর্কযুক্ত। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, এরূপ সময়ে যিকির অপেক্ষা নীবর থাকাটাই উত্তম। এই যিকির উচ্চ স্বরেই হাক বা নিম্ন স্বরেই হাক। এ দু’জন যা বর্ণনা করেছেন তা অনুসৃত নয়। বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে বান্দাদেরকে সকাল-সন্ধ্যা সব সময় অধিক যিকিরের কাজে উৎসাহিত ও উত্তেজিত করা। যেন তারা কোন অবস্থাতেই আল্লাহর যিকির থেকে বিস্মরণ না হয় এবং উদাসীন না থাকে। এ জন্যেই ঐসব ফেরেশতার প্রশংসা করা হয়েছে যারা সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর যিকিরের কাজে ঔদাসীন্য প্রদর্শন করেন না। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা তোমার প্রভুর সান্নিধ্যে থাকে (অর্থাৎ ফেরেশতামণ্ডলী) তারা অহংকারে তার ইবাদত হতে বিমুখ হয় না। যেমন হাদীসে এসেছে“ফেরেশতারা যেমন আল্লাহর ইবাদতের জন্যে সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে যান, তদ্রুপ তোমরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াও না কেন। প্রথম সারিওয়ালাদের অন্যান্য সারিওয়ালাদের উপর প্রাধান্য ও মর্যাদা রয়েছে। তাঁরা সারি বা কাতারকে সোজা করার প্রতি খুবই খেয়াল রাখতেন।” এখানে যে সিজদায়ে তিলাওয়াত রয়েছে এটা হচ্ছে কুরআনের সর্বপ্রথম সিজদায়ে তিলাওয়াত। এটা আদায় করা পাঠক ও শ্রোতা সবারই জন্যে শরীয়তসম্মত কাজ। এতে সমস্ত আলিম একমত । সুনানে ইবনে মাজাহ্র হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই সিজদাহূকে কুরআন কারীমের সিজদাহ্ সমূহের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন।