Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-আরাফ 7:75 – আল-আরাফ 7:167

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-আরাফ 7:75
  2. আল-আরাফ 7:76
  3. আল-আরাফ 7:77
  4. আল-আরাফ 7:78
  5. আল-আরাফ 7:79
  6. আল-আরাফ 7:80
  7. আল-আরাফ 7:81
  8. আল-আরাফ 7:82
  9. আল-আরাফ 7:83
  10. আল-আরাফ 7:84
  11. আল-আরাফ 7:85
  12. আল-আরাফ 7:86
  13. আল-আরাফ 7:87
  14. আল-আরাফ 7:88
  15. আল-আরাফ 7:89
  16. আল-আরাফ 7:90
  17. আল-আরাফ 7:91
  18. আল-আরাফ 7:92
  19. আল-আরাফ 7:93
  20. আল-আরাফ 7:94
  21. আল-আরাফ 7:95
  22. আল-আরাফ 7:96
  23. আল-আরাফ 7:97
  24. আল-আরাফ 7:98
  25. আল-আরাফ 7:99
  26. আল-আরাফ 7:100
  27. আল-আরাফ 7:101
  28. আল-আরাফ 7:102
  29. আল-আরাফ 7:103
  30. আল-আরাফ 7:104
  31. আল-আরাফ 7:105
  32. আল-আরাফ 7:106
  33. আল-আরাফ 7:107
  34. আল-আরাফ 7:108
  35. আল-আরাফ 7:109
  36. আল-আরাফ 7:110
  37. আল-আরাফ 7:111
  38. আল-আরাফ 7:112
  39. আল-আরাফ 7:113
  40. আল-আরাফ 7:114
  41. আল-আরাফ 7:115
  42. আল-আরাফ 7:116
  43. আল-আরাফ 7:117
  44. আল-আরাফ 7:118
  45. আল-আরাফ 7:119
  46. আল-আরাফ 7:120
  47. আল-আরাফ 7:121
  48. আল-আরাফ 7:122
  49. আল-আরাফ 7:123
  50. আল-আরাফ 7:124
  51. আল-আরাফ 7:125
  52. আল-আরাফ 7:126
  53. আল-আরাফ 7:127
  54. আল-আরাফ 7:128
  55. আল-আরাফ 7:129
  56. আল-আরাফ 7:130
  57. আল-আরাফ 7:131
  58. আল-আরাফ 7:132
  59. আল-আরাফ 7:133
  60. আল-আরাফ 7:134
  61. আল-আরাফ 7:135
  62. আল-আরাফ 7:136
  63. আল-আরাফ 7:137
  64. আল-আরাফ 7:138
  65. আল-আরাফ 7:139
  66. আল-আরাফ 7:140
  67. আল-আরাফ 7:141
  68. আল-আরাফ 7:142
  69. আল-আরাফ 7:143
  70. আল-আরাফ 7:144
  71. আল-আরাফ 7:145
  72. আল-আরাফ 7:146
  73. আল-আরাফ 7:147
  74. আল-আরাফ 7:148
  75. আল-আরাফ 7:149
  76. আল-আরাফ 7:150
  77. আল-আরাফ 7:151
  78. আল-আরাফ 7:152
  79. আল-আরাফ 7:153
  80. আল-আরাফ 7:154
  81. আল-আরাফ 7:155
  82. আল-আরাফ 7:156
  83. আল-আরাফ 7:157
  84. আল-আরাফ 7:158
  85. আল-আরাফ 7:159
  86. আল-আরাফ 7:160
  87. আল-আরাফ 7:161
  88. আল-আরাফ 7:162
  89. আল-আরাফ 7:163
  90. আল-আরাফ 7:164
  91. আল-আরাফ 7:165
  92. আল-আরাফ 7:166
  93. আল-আরাফ 7:167

আল-আরাফ 7:75

৭৩-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর পূর্বে প্রাচীন আরবীয় যে গোত্রগুলো ছিল, সামুদও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা ছিল আ’দ সম্প্রদায়ের পরবর্তী কওম। হিজায ও শামের মধ্যবর্তী ‘ওয়াদী কুরা’ ও ওর চতুষ্পর্শ্বের এলাকা তাদের আবাসভূমি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল! হিজরী নবম সনে নবী (সঃ) তাবুকের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পথিমধ্যে তাদের আবাসভূমি ও ঘর-বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ তার সামনে পড়ে যায়। হাজর নামক একটি জায়গা ছিল তাদের আবাসভূমি। নবী (সঃ) সাহাবীগণসহ তথায় অবস্থান করলে তারা ঐসব ঝরণা হতে পানি নেন যেগুলো সামুদ সম্প্রদায় ব্যবহার করতো। সাহাবীগণ ঐ পানি দ্বারা আটা মর্পন করলেন এবং তা হাঁড়িতে রাখলেন। নবী (সঃ) তাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, হাঁড়িগুলো যেন উল্টিয়ে ফেলা হয় এবং আটাগুলো উটকে খাইয়ে দেয়া হয়। অতঃপর তারা সেখান হতে প্রস্থান করলেন এবং অন্য এক ঝরণার ধারে অবতরণ করলেন যা সামুদের পানি পানের ঝরণা ছিল না। বরং ওটা ছিল তাদের উটের পানি পানের ঝরণা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে শাস্তিপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের পার্শ্ব দিয়ে গমন করতে নিষেধ করেছিলেন এবং বলেছিলেনঃ “আমি ভয় করছি যে, না জানি তোমরাও ঐ শাস্তিতে পতিত হও যে শাস্তিতে সামুদ সম্প্রদায় পতিত হয়েছিল। সুতরাং তোমরা তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না।" ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হাজরে অবস্থানকালে বলেছিলেনঃ “তোমরা ক্রন্দনরত অবস্থা ছাড়া কোন অবস্থাতেই এসব শাস্তিপ্রাপ্ত কওমের পার্শ্ব দিয়ে গমন করো না। যদি তোমরা ক্রন্দনকারী না হও তবে তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না, নতুবা তাদের প্রতি যে শাস্তি পৌছেছিল তা তোমাদের উপরও পৌঁছে যাবে।” (এ হাদীসের মূলকে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাখরীজ করা হয়েছে)তাবুকের যুদ্ধে গমনকালে জনগণ আহলে হাজরের দিকে দ্রুতগতিতে চলছিলেন। তথায় অবতরণ করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা জানতে পেরে ঘোষণা করেনঃ “নামায হাজির।" হযরত আবু কাবশা (রাঃ) বলেন-আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসলাম। তাঁর হাতে একটা বর্শা ছিল। তিনি বলছিলেন- “তোমরা এমন কওমের দিকে যেয়ো না, যাদের উপর আল্লাহর শাস্তি পতিত হয়েছিল। তাঁদের একজন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা এ লোকদেরকে দেখে বিস্মিত হচ্ছি।” তিনি বললেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়ে বিস্ময়কর কথা বলবো না? তোমাদেরই একটি লোক অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে অদৃশ্যভাবে এমন লোকদের খবর শুনাচ্ছি যারা তোমাদের পূর্বে ছিল। আর অতীত ছাড়া আমি তোমাদের কাছে ভবিষ্যতের কথাও শুনাচ্ছি। সুতরাং সোজা হয়ে যাও এবং নিজেদেরকে সংশোধন করে নাও। কেননা, তোমাদের উপরও যদি শাস্তি নেমে আসে তবে আল্লাহ এতে কোনই পরওয়া করবেন না এবং এমন কওমও আসবে যারা নিজেরাও নিজেদের থেকে কোন কিছুই টলাতে পারবে না।” মোটকথা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হাজরের মধ্য দিয়ে গমন করলেন তখন তিনি বললেন- “তোমরা মু'জিযা ও নিদর্শনাবলী যাঞা করো না। সালেহ (আঃ)-এর কওমও এগুলো চেয়েছিল। মু'জিযা হিসেবে তাদেরকে একটি উষ্ট্রী দেয়া হয়েছিল। ওটা এক পথ দিয়ে আসতো এবং আর এক পথ দিয়ে যেতো। তারা আল্লাহর হুকুম অমান্য করে ঐ উষ্ট্রীটিকে মেরে ফেলে। ঐ উষ্ট্ৰীটি একদিন ঝরণা থেকে পানি পান করতো এবং পরের দিন তারা ওর দুধ পান করতো। যখন তারা ওকে মেরে ফেললো তখন আকাশ থেকে এমন ভীষণ বজ্রধ্বনি হলো, যাতে তারা সবাই মরে গেল। তাদের মধ্যকার মাত্র একটি লোক রক্ষা পেল। কেননা ঐ সময় কাবাঘরের মধ্যে সে অবস্থান করছিল।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ লোকটি কে ছিল?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “সে ছিল আবু রাগাল। কিন্তু যখন সে কা'বা ঘর থেকে বের হলো তখন সেও শাস্তিতে নিপতিত হয়ে মারা গেল।” (এ হাদীসটি বিশুদ্ধ ছয়টি হাদীসের কোনটির মধ্যেই বর্ণিত হয়নি)ইরশাদ হচ্ছে- আমি সামুদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা সালেহ (আঃ)-কে প্রেরণ করেছিলাম। অন্যান্য সমস্ত পয়গাম্বরের মত তিনিও জনগণকে আহ্বান জানিয়ে বললেন-হে আমার কওম! তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদই নেই। সমস্ত পয়গাম্বর তাঁরই ইবাদতের দাওয়াত দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যতজন নবী পাঠিয়েছি তাদের সবারই কাছে এই অহী করেছি- আমি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।” তিনি আরও বলেনঃ “তারা সবাই তাওহীদের শিক্ষা দিতো এবং শয়তানের অনুসরণ থেকে বিরত রাখতো।”আল্লাহ পাক বলেন- “আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে নিদর্শন এসে গেছে এবং সেই নিদর্শন হচ্ছে উষ্ট্ৰীটি।' লোকেরা স্বয়ং হযরত সালেহ (আঃ)-এর কাছে এই প্রার্থনা জানিয়েছিল যে, তিনি যেন তাদেরকে কোন মু'জিযা প্রদর্শন করেন এবং তারা তাঁর কাছে এই আবেদন পেশ করে যে, তিনি যেন তাদের বাতলানো বিশেষ একটা কংকরময় ভূমি হতে একটি উষ্ট্ৰী বের করে আনেন। ঐ কংকরময় ভূমি ছিল হাজর নামক স্থানের এক দিকে একটি নির্জন পাথুরে ভূমি । ওটার নাম ছিল কাতিবাহ'। উষ্ট্ৰীটি গর্ভবতীও হতে হবে এবং দুগ্ধবতীও হতে হবে। হযরত সালেহ্ (আঃ) তাদের কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাদের আবেদন কবুল করে নেন তবে অবশ্যই তাদেরকে ঈমান আনতে হবে এবং তার কথার উপর তারা অবশ্যই অমিল করবে। এই অঙ্গীকার গ্রহণ ও ভয় প্রদর্শনের পর্ব শেষ হলে হযরত সালেহ্ (আঃ) প্রার্থনার জন্যে দাঁড়ালেন। প্রার্থনা করা মাত্রই সেই কংকরময় ভূমি নড়ে উঠলো। তা ফেটে গেলে ওর মধ্য হতে এমন একটি উষ্ট্রী বেরিয়ে পড়লো যা গর্ভবতী হওয়ার কারণে চলার সময় এদিক ওদিক নড়াচড়া করতে লাগলো। এ দৃশ্য দেখে ঐ কাফিরদের নেতা জানদা ইবনে আমর এবং তার অধীনস্থ লোকেরা ঈমান আনলো। এরপর সামুদ সম্প্রদায়ের অন্যান্য সম্ভ্রান্ত লোকেরাও ঈমান আনয়নের ইচ্ছা করলে যাওয়াব ইবনে আমর, হাবাব পূজারী এবং রাবাব তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখলো । শিহাব নামক জানদার এক চাচাতো ভাই, যে সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশীয় ছিল, ঈমান আনয়নের সংকল্প গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ঐ লোকদের কথায় ঈমান আনয়ন থেকে বিরত থাকে। এ সম্পর্কেই সামুদ সম্প্রদায়ের মুমিনদের মধ্যকার মাহুশ নামক একটি লোক বলেন, যার ভাবার্থ হচ্ছে নিম্নরূপঃ জানদা নবীর দ্বীনের দিকে শিহাবকে আহ্বান করেছিল এবং তার ঈমান আনয়নের ইচ্ছাও হয়েছিল। কিন্তু হাজারবাসীর পথভ্রষ্ট লোকেরা হিদায়াতের পর তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। মোটকথা, উষ্ট্ৰীটির একটি বাচ্চা হলো এবং কিছুকাল ওটা ঐ কওমের মধ্যেই অবস্থান করলো। একটি ঝরণা হতে ওটা একদিন পানি পান করতো এবং একদিন পানি পান করা হতে বিরত থাকতো, যাতে অন্যান্য লোক এবং তাদের জীবজন্তুগুলো তা থেকে পানি পান করতে পারে। লোকগুলো উষ্ট্ৰীটির দুধ পান করতো এবং ইচ্ছামত ঐ দুধ দ্বারা তাদের পাত্রগুলো পরিপূর্ণ করতো। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ “পানি পান করার একটি নির্ধারিত দিন রয়েছে উষ্ট্রীর জন্যে এবং একদিন তোমাদের জন্যে।” ঐ উপত্যকায় উষ্ট্ৰীটি চরবার জন্যে এক পথ দিয়ে যেত এবং অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসতো। ওকে অত্যন্ত চাকচিক্যময় দেখাতো এবং ওকে দেখে মানুষের মনে সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়ে যেতো। ওটা অন্যান্য জন্তুগুলোর পার্শ্ব দিয়ে গমন করলে ওরা ভয়ে পালিয়ে যেতো। এভাবে কিছুকাল কেটে গেল এবং ঐ কওমের ঔদ্ধত্যপনা বৃদ্ধি পেল। এমন কি তারা উষ্ট্ৰীটিকে মেরে ফেলারই ইচ্ছা করলো, যেন তারা প্রতিদিনই পানি পান করতে পারে। সুতরাং ঐ কাফিরের দল সর্বসম্মতিক্রমে ওকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। হযরত কাদাতা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি ওকে হত্যা করেছিল তার কাছে সবাই গিয়েছিল, এমন কি স্ত্রীলোকেরাও এবং বালকেরাও। তাদের সবারই উদ্দেশ্য ছিল তার দ্বারা ওকে হত্যা করিয়ে নেয়া। তারা সমস্ত দলই যে এতে অংশ নিয়েছিল তা নিম্নের আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাকে (তাদের নবীকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, সুতরাং তারা ওকে (উন্ত্রীকে হত্যা করে ফেললো। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে তাদের পাপের কারণে ধ্বংস করে দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেন।” (৯১:১৪) আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ “সামুদ সম্প্রদায়কে আমি উস্ত্রীর মুজিযা প্রদান করেছিলাম এবং ওটাই তাদের চক্ষু খোলার জন্যে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ঐ অত্যাচারীরা অত্যাচারমূলক কাজ করলো। মোটকথা, এই উষ্ট্রী হত্যার সম্পর্ক সমস্ত দলের সাথেই লাগানো হয়েছে যে, তারা সবাই এই কাজে শরীক ছিল।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ তাফসীরকারক আলেমগণ বর্ণনা করেছেনঃ উষ্ট্ৰীটির হত্যার কারণ ছিল এই যে, সেই সময় উনাইযা নাম্নী একটি বৃদ্ধা মহিলা ছিল। সে হযরত সালেহ (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেনি, বরং তার সাথে তার কঠিন শত্রুতা ছিল। তার ছিল কয়েকটি সুন্দরী কন্যা। ধন-দৌলতেরও সে অধিকারিণী ছিল। তার স্বামীর নাম ছিল যাওয়াব ইবনে আমর । সে ছিল সামুদ সম্প্রদায়ের একজন নেতৃস্থানীয় লোক। সাদকা বিনতে মাহইয়া নাম্নী আর একজন মহিলা ছিল। সেও ছিল ধন-সম্পদ ও বংশগরিমার অধিকারিণী। সে একজন মুমিন ব্যক্তির স্ত্রী ছিল এবং স্বামীকে সে পরিত্যাগ করেছিল। উস্ত্রীর হত্যাকারীর সাথে তারা উভয়ে অঙ্গীকার করেছিল। সাদকা হাবাব নামক একটি লোককে উত্তেজিত করে বলেছিল যে, যদি সে উষ্ট্ৰীটিকে হত্যা করে দেয় তবে সে তারই হয়ে যাবে। হাবাব তা অস্বীকার করে। তখন সে তার চাচাতো ভাই মিসদা ইবনে মাহরাজকে বললে সে তা স্বীকার করে। উনাইযাহ্ বিনতে গানাম কাদার ইবনে সালিফকে আহ্বান করে। সে ছিল লাল নীল বর্ণের বেঁটে গঠনের লোক। জনগণ তাকে যারজ সন্তান বলে ধারণা করতো এবং তাকে তার পিতা সালিফের সন্তান মনে করতো না। সে প্রকৃতপক্ষে যার পুত্র ছিল তার নাম ছিল সাহইয়াদ। অথচ সেই সময় তার মা সালিফের স্ত্রী ছিল। এই স্ত্রীলোকটি উষ্ট্রীর হন্তাকে বলেছিল- “তুমি উষ্ট্রীটিকে হত্যা করে ফেল। এর বিনিময়ে তুমি তোমার ইচ্ছামত আমার যে কোন কন্যাকে বিয়ে করতে পার।” সুতরাং মিসদা ইবনে মাহরাজ ও কাদার ইবনে সালিফ উভয়ে মিলে সামুদ সম্প্রদায়ের গুদের সাথে ষড়যন্ত্র করলো এবং সাত ব্যক্তি তাদের সাথে যোগ দিলো। এভাবে তাদের মোট সংখ্যা হলো নয়জন। তাদের সম্পর্কেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “শহরের মধ্যে নয় ব্যক্তি ছিল, যারা সংশোধন মূলক কার্যের পরিবর্তে বিশৃংখলা মূলক কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।” আর ওরাই ছিল কওমের নেতৃস্থানীয় লোক। ঐ কাফিররা অন্যান্য কাফির গোত্রের লোকদেরকেও তাদের সাথে নিয়ে নিলো। তারা সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লো এবং উষ্ট্রীর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলো। যখন উষ্ট্ৰীটি পানি পান করে ফিরে আসলো তখন কাদার ওর পথে একটা কংকরময় ভূমির আড়ালে ওঁৎ পেতে বসে থাকলো। আর মিসদা বসলে অন্য একটি পাহাড়ের আড়ালে। উষ্ট্ৰীটি মিসদার পার্শ্ব দিয়ে গমন করা মাত্রই সে ওর পায়ের গোছায় একটা তীর মেরে দিলো । গানামের কন্যা বেরিয়ে পড়লো এবং তার সবচেয়ে সুন্দরী কন্যাকে ঐ দলের লোকদের সামনে হাযির করে দিলো। এভাবে সে তার পরমা সুন্দরী কন্যার সৌন্দর্য প্রকাশ করলো। কাদার তখন তার সাথে মিলনের নেশায় উত্তেজিত হয়ে উষ্ট্ৰীটিকে তলোয়ার মেরে দিলো। সাথে সাথে উল্লীটি মাটিতে পড়ে গেল। মাটিতে পড়ে গিয়ে সে স্বীয় বাচ্চাকে এক নযর দেখে নিলো এবং ভীষণ জোরে চীকার করে উঠলো। ঐ চিকার দ্বারা ও যেন স্বীয় বাচ্চাকে পালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করলো। তারপর ওর হন্তা ওর বক্ষের উপর বর্শা মেরে দিলো এবং এরপর ওর গলা কেটে ফেললো। ওর বাচ্চাটি একটি পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেল এবং চূড়ায় উঠে জোরে একটা চীৎকার ছাড়লো। সে যেন বললোঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার মা কোথায়?” কথিত আছে যে, বাচ্চাটি ঐভাবে তিনবার চীৎকার করেছিল। তারপর সে ঐ পাথুরে ভূমির মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। এটাও কথিত আছে যে, ললাকেরা ওর পশ্চাদ্ধাবন করে ওকেও হত্যা করে ফেলেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত সালেহ (আঃ) যখন এ সংবাদ পান তখন তিনি বধ্যভূমিতে গমন। করেন। জনগণের সমাগম ছিল। তিনি উষ্ট্ৰীটিকে দেখে কান্না শুরু করে দেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা আর তিন দিন তোমাদের বাড়ীতে বাস করে নাও।” (আল-আয়াত) উস্ত্রী হত্যার ঘটনাটি বুধবার সংঘটিত হয়েছিল। রাত্রি হলে ঐ নয় ব্যক্তি হযরত সালেহ (আঃ)-কেও হত্যা করার সংকল্প করে এবং পরামর্শক্রমে বলে- “যদি এ ব্যক্তি সত্যবাদী হয় এবং তিন দিন পর আমরা ধ্বংস হয়ে যাই তবে আমাদের পূর্বে একেই হত্যা করে দিই না কেন? আর যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে তাকে আমরা তার উস্ত্রীর কাছেই কেন পাঠিয়ে দেবো না?” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ লোকগুলো কসমের দ্বারা নিজেদের প্রতিজ্ঞার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়ে বলে- সালেহ (আঃ) ও তার স্ত্রীকে আমরা হত্যা করে ফেলবে এবং তার বন্ধুদেরকে বলবো, তাদের হত্যার খবর আমরা কি করে জানবো? অামরা তো তাদের হত্যার ঘটনার সময় হাজিরই ছিলাম না। সুতরাং তাদের হত্যাকারী কে তা আমরা কি করে বলতে পারি এবং আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।তারা চালবাজী করতে চাইল। কিন্তু আমি যে চালবাজীর উপর ছিলাম ওর খবর তাদের মোটেই ছিল না। লক্ষ্য কর, ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম কিরূপ হয়ে থাকে।” যখন তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করলো এবং একমত হয়ে রাত্রিকালে আল্লাহর নবীকে হত্যা করার জন্যে বেরিয়ে আসলো তখন আল্লাহ পাকের নির্দে পাথর বর্ষণ শুরু হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার ছিল অবকাশের প্রথম দিন। ঐ দিন আল্লাহর কুদরতে তাদের চেহারা হলদে বর্ণ ধারণ করলো, যেমন নবী (আঃ) তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার তাদের মুখমন্ডল লাল বর্ণের হয়ে গেল। তৃতীয় দিন শনিবার ছিল পার্থিব ফায়েদা লাভের শেষদিন। ঐ দিন সকলের চেহারা কালো হয়ে গেল। সেদিন ছিল রবিবার। ঐ লোকগুলো সুগন্ধি মেখে শাস্তির অপেক্ষা করছিল যে, তাদের উপর সেটা কি আকারে আসবে! সূর্য উদিত হলো এবং আকাশ থেকে এক ভীষণ শব্দ বেরিয়ে আসলো। পায়ের নীচ থেকে এক কঠিন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। সাথে সাথে সবারই প্রাণবায়ু বেরিয়ে পড়লো। সকলের লাশ নিজ নিজ ঘরে পড়ে থাকলো। ছোট, বড়, নারী, পুরুষ কেউই বাঁচলো না। শুধুমাত্র কালবা বিনতে সালোক নাম্নী একটি মহিলা বেঁচে গেল। সে বড়ই কাফিরা মেয়ে ছিল এবং নবী সালেহ (আঃ)-এর ভীষণতম শত্রু ছিল। সে শাস্তি অবলোকন করে দ্রুতবেগে পলায়নের শক্তি লাভ করলো। একটি গোত্রের নিকট পৌছে যা কিছু সে দেখেছিল তাদেরকে সংবাদ দিয়ে দিলো। সমস্ত কওম কিভাবে ধ্বংস হয়ে গেল তারও সে আলোচনা করলো। তারপর সে পান করার জন্যে পানি চাইলো। পানি পান করা মাত্রই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে হযরত সালেহ্ (আঃ) এবং তাঁর উম্মতগণ ছাড়া আর কেউই রক্ষা পায়নি। ঐ কওমের মধ্যে আবু রাগাল নামক একটি লোক ছিল। শাস্তির সময় সে মক্কায় অবস্থান করছিল বলে ঐ সময় সে নিরাপত্তা লাভ করেছিল। কিন্তু কোন এক প্রয়োজনে যখন সে মক্কার বাইরে বের হলো তখন আকাশ থেকে একটা পাথর তার উপর পতিত হলো এবং তাতেই সে মারা গেল । কথিত আছে যে, এই আবু রাগাল তায়েফে বসবাসকারী সাকীফ গোত্রের পূর্বপুরুষ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবূ রাগালের কবরের পার্শ্ব দিয়ে গমনের সময় বলেনঃ “এই কবরটি কার তা কি তোমরা জান? এটা হচ্ছে সামুদ সম্প্রদায়ের আবু রাগাল নামক এক ব্যক্তির কবর যে হারামে অবস্থান করছিল। হারাম তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করেছিল। হারাম থেকে বের হওয়া মাত্রই সে শাস্তির কবলে পতিত হয় এবং এখানে সমাধিস্থ হয়। তার সাথে তার সোনার ছড়িটিও এখানে প্রোথিত রয়েছে।” জনগণ তখন তরবারী দ্বারা তার কবরটি খনন করে ঐ ছড়িটি বের করে নেয়।

আল-আরাফ 7:76

৭৩-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর পূর্বে প্রাচীন আরবীয় যে গোত্রগুলো ছিল, সামুদও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা ছিল আ’দ সম্প্রদায়ের পরবর্তী কওম। হিজায ও শামের মধ্যবর্তী ‘ওয়াদী কুরা’ ও ওর চতুষ্পর্শ্বের এলাকা তাদের আবাসভূমি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল! হিজরী নবম সনে নবী (সঃ) তাবুকের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পথিমধ্যে তাদের আবাসভূমি ও ঘর-বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ তার সামনে পড়ে যায়। হাজর নামক একটি জায়গা ছিল তাদের আবাসভূমি। নবী (সঃ) সাহাবীগণসহ তথায় অবস্থান করলে তারা ঐসব ঝরণা হতে পানি নেন যেগুলো সামুদ সম্প্রদায় ব্যবহার করতো। সাহাবীগণ ঐ পানি দ্বারা আটা মর্পন করলেন এবং তা হাঁড়িতে রাখলেন। নবী (সঃ) তাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, হাঁড়িগুলো যেন উল্টিয়ে ফেলা হয় এবং আটাগুলো উটকে খাইয়ে দেয়া হয়। অতঃপর তারা সেখান হতে প্রস্থান করলেন এবং অন্য এক ঝরণার ধারে অবতরণ করলেন যা সামুদের পানি পানের ঝরণা ছিল না। বরং ওটা ছিল তাদের উটের পানি পানের ঝরণা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে শাস্তিপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের পার্শ্ব দিয়ে গমন করতে নিষেধ করেছিলেন এবং বলেছিলেনঃ “আমি ভয় করছি যে, না জানি তোমরাও ঐ শাস্তিতে পতিত হও যে শাস্তিতে সামুদ সম্প্রদায় পতিত হয়েছিল। সুতরাং তোমরা তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না।" ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হাজরে অবস্থানকালে বলেছিলেনঃ “তোমরা ক্রন্দনরত অবস্থা ছাড়া কোন অবস্থাতেই এসব শাস্তিপ্রাপ্ত কওমের পার্শ্ব দিয়ে গমন করো না। যদি তোমরা ক্রন্দনকারী না হও তবে তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না, নতুবা তাদের প্রতি যে শাস্তি পৌছেছিল তা তোমাদের উপরও পৌঁছে যাবে।” (এ হাদীসের মূলকে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাখরীজ করা হয়েছে)তাবুকের যুদ্ধে গমনকালে জনগণ আহলে হাজরের দিকে দ্রুতগতিতে চলছিলেন। তথায় অবতরণ করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা জানতে পেরে ঘোষণা করেনঃ “নামায হাজির।" হযরত আবু কাবশা (রাঃ) বলেন-আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসলাম। তাঁর হাতে একটা বর্শা ছিল। তিনি বলছিলেন- “তোমরা এমন কওমের দিকে যেয়ো না, যাদের উপর আল্লাহর শাস্তি পতিত হয়েছিল। তাঁদের একজন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা এ লোকদেরকে দেখে বিস্মিত হচ্ছি।” তিনি বললেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়ে বিস্ময়কর কথা বলবো না? তোমাদেরই একটি লোক অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে অদৃশ্যভাবে এমন লোকদের খবর শুনাচ্ছি যারা তোমাদের পূর্বে ছিল। আর অতীত ছাড়া আমি তোমাদের কাছে ভবিষ্যতের কথাও শুনাচ্ছি। সুতরাং সোজা হয়ে যাও এবং নিজেদেরকে সংশোধন করে নাও। কেননা, তোমাদের উপরও যদি শাস্তি নেমে আসে তবে আল্লাহ এতে কোনই পরওয়া করবেন না এবং এমন কওমও আসবে যারা নিজেরাও নিজেদের থেকে কোন কিছুই টলাতে পারবে না।” মোটকথা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হাজরের মধ্য দিয়ে গমন করলেন তখন তিনি বললেন- “তোমরা মু'জিযা ও নিদর্শনাবলী যাঞা করো না। সালেহ (আঃ)-এর কওমও এগুলো চেয়েছিল। মু'জিযা হিসেবে তাদেরকে একটি উষ্ট্রী দেয়া হয়েছিল। ওটা এক পথ দিয়ে আসতো এবং আর এক পথ দিয়ে যেতো। তারা আল্লাহর হুকুম অমান্য করে ঐ উষ্ট্রীটিকে মেরে ফেলে। ঐ উষ্ট্ৰীটি একদিন ঝরণা থেকে পানি পান করতো এবং পরের দিন তারা ওর দুধ পান করতো। যখন তারা ওকে মেরে ফেললো তখন আকাশ থেকে এমন ভীষণ বজ্রধ্বনি হলো, যাতে তারা সবাই মরে গেল। তাদের মধ্যকার মাত্র একটি লোক রক্ষা পেল। কেননা ঐ সময় কাবাঘরের মধ্যে সে অবস্থান করছিল।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ লোকটি কে ছিল?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “সে ছিল আবু রাগাল। কিন্তু যখন সে কা'বা ঘর থেকে বের হলো তখন সেও শাস্তিতে নিপতিত হয়ে মারা গেল।” (এ হাদীসটি বিশুদ্ধ ছয়টি হাদীসের কোনটির মধ্যেই বর্ণিত হয়নি)ইরশাদ হচ্ছে- আমি সামুদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা সালেহ (আঃ)-কে প্রেরণ করেছিলাম। অন্যান্য সমস্ত পয়গাম্বরের মত তিনিও জনগণকে আহ্বান জানিয়ে বললেন-হে আমার কওম! তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদই নেই। সমস্ত পয়গাম্বর তাঁরই ইবাদতের দাওয়াত দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যতজন নবী পাঠিয়েছি তাদের সবারই কাছে এই অহী করেছি- আমি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।” তিনি আরও বলেনঃ “তারা সবাই তাওহীদের শিক্ষা দিতো এবং শয়তানের অনুসরণ থেকে বিরত রাখতো।”আল্লাহ পাক বলেন- “আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে নিদর্শন এসে গেছে এবং সেই নিদর্শন হচ্ছে উষ্ট্ৰীটি।' লোকেরা স্বয়ং হযরত সালেহ (আঃ)-এর কাছে এই প্রার্থনা জানিয়েছিল যে, তিনি যেন তাদেরকে কোন মু'জিযা প্রদর্শন করেন এবং তারা তাঁর কাছে এই আবেদন পেশ করে যে, তিনি যেন তাদের বাতলানো বিশেষ একটা কংকরময় ভূমি হতে একটি উষ্ট্ৰী বের করে আনেন। ঐ কংকরময় ভূমি ছিল হাজর নামক স্থানের এক দিকে একটি নির্জন পাথুরে ভূমি । ওটার নাম ছিল কাতিবাহ'। উষ্ট্ৰীটি গর্ভবতীও হতে হবে এবং দুগ্ধবতীও হতে হবে। হযরত সালেহ্ (আঃ) তাদের কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাদের আবেদন কবুল করে নেন তবে অবশ্যই তাদেরকে ঈমান আনতে হবে এবং তার কথার উপর তারা অবশ্যই অমিল করবে। এই অঙ্গীকার গ্রহণ ও ভয় প্রদর্শনের পর্ব শেষ হলে হযরত সালেহ্ (আঃ) প্রার্থনার জন্যে দাঁড়ালেন। প্রার্থনা করা মাত্রই সেই কংকরময় ভূমি নড়ে উঠলো। তা ফেটে গেলে ওর মধ্য হতে এমন একটি উষ্ট্রী বেরিয়ে পড়লো যা গর্ভবতী হওয়ার কারণে চলার সময় এদিক ওদিক নড়াচড়া করতে লাগলো। এ দৃশ্য দেখে ঐ কাফিরদের নেতা জানদা ইবনে আমর এবং তার অধীনস্থ লোকেরা ঈমান আনলো। এরপর সামুদ সম্প্রদায়ের অন্যান্য সম্ভ্রান্ত লোকেরাও ঈমান আনয়নের ইচ্ছা করলে যাওয়াব ইবনে আমর, হাবাব পূজারী এবং রাবাব তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখলো । শিহাব নামক জানদার এক চাচাতো ভাই, যে সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশীয় ছিল, ঈমান আনয়নের সংকল্প গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ঐ লোকদের কথায় ঈমান আনয়ন থেকে বিরত থাকে। এ সম্পর্কেই সামুদ সম্প্রদায়ের মুমিনদের মধ্যকার মাহুশ নামক একটি লোক বলেন, যার ভাবার্থ হচ্ছে নিম্নরূপঃ জানদা নবীর দ্বীনের দিকে শিহাবকে আহ্বান করেছিল এবং তার ঈমান আনয়নের ইচ্ছাও হয়েছিল। কিন্তু হাজারবাসীর পথভ্রষ্ট লোকেরা হিদায়াতের পর তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। মোটকথা, উষ্ট্ৰীটির একটি বাচ্চা হলো এবং কিছুকাল ওটা ঐ কওমের মধ্যেই অবস্থান করলো। একটি ঝরণা হতে ওটা একদিন পানি পান করতো এবং একদিন পানি পান করা হতে বিরত থাকতো, যাতে অন্যান্য লোক এবং তাদের জীবজন্তুগুলো তা থেকে পানি পান করতে পারে। লোকগুলো উষ্ট্ৰীটির দুধ পান করতো এবং ইচ্ছামত ঐ দুধ দ্বারা তাদের পাত্রগুলো পরিপূর্ণ করতো। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ “পানি পান করার একটি নির্ধারিত দিন রয়েছে উষ্ট্রীর জন্যে এবং একদিন তোমাদের জন্যে।” ঐ উপত্যকায় উষ্ট্ৰীটি চরবার জন্যে এক পথ দিয়ে যেত এবং অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসতো। ওকে অত্যন্ত চাকচিক্যময় দেখাতো এবং ওকে দেখে মানুষের মনে সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়ে যেতো। ওটা অন্যান্য জন্তুগুলোর পার্শ্ব দিয়ে গমন করলে ওরা ভয়ে পালিয়ে যেতো। এভাবে কিছুকাল কেটে গেল এবং ঐ কওমের ঔদ্ধত্যপনা বৃদ্ধি পেল। এমন কি তারা উষ্ট্ৰীটিকে মেরে ফেলারই ইচ্ছা করলো, যেন তারা প্রতিদিনই পানি পান করতে পারে। সুতরাং ঐ কাফিরের দল সর্বসম্মতিক্রমে ওকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। হযরত কাদাতা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি ওকে হত্যা করেছিল তার কাছে সবাই গিয়েছিল, এমন কি স্ত্রীলোকেরাও এবং বালকেরাও। তাদের সবারই উদ্দেশ্য ছিল তার দ্বারা ওকে হত্যা করিয়ে নেয়া। তারা সমস্ত দলই যে এতে অংশ নিয়েছিল তা নিম্নের আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাকে (তাদের নবীকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, সুতরাং তারা ওকে (উন্ত্রীকে হত্যা করে ফেললো। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে তাদের পাপের কারণে ধ্বংস করে দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেন।” (৯১:১৪) আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ “সামুদ সম্প্রদায়কে আমি উস্ত্রীর মুজিযা প্রদান করেছিলাম এবং ওটাই তাদের চক্ষু খোলার জন্যে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ঐ অত্যাচারীরা অত্যাচারমূলক কাজ করলো। মোটকথা, এই উষ্ট্রী হত্যার সম্পর্ক সমস্ত দলের সাথেই লাগানো হয়েছে যে, তারা সবাই এই কাজে শরীক ছিল।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ তাফসীরকারক আলেমগণ বর্ণনা করেছেনঃ উষ্ট্ৰীটির হত্যার কারণ ছিল এই যে, সেই সময় উনাইযা নাম্নী একটি বৃদ্ধা মহিলা ছিল। সে হযরত সালেহ (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেনি, বরং তার সাথে তার কঠিন শত্রুতা ছিল। তার ছিল কয়েকটি সুন্দরী কন্যা। ধন-দৌলতেরও সে অধিকারিণী ছিল। তার স্বামীর নাম ছিল যাওয়াব ইবনে আমর । সে ছিল সামুদ সম্প্রদায়ের একজন নেতৃস্থানীয় লোক। সাদকা বিনতে মাহইয়া নাম্নী আর একজন মহিলা ছিল। সেও ছিল ধন-সম্পদ ও বংশগরিমার অধিকারিণী। সে একজন মুমিন ব্যক্তির স্ত্রী ছিল এবং স্বামীকে সে পরিত্যাগ করেছিল। উস্ত্রীর হত্যাকারীর সাথে তারা উভয়ে অঙ্গীকার করেছিল। সাদকা হাবাব নামক একটি লোককে উত্তেজিত করে বলেছিল যে, যদি সে উষ্ট্ৰীটিকে হত্যা করে দেয় তবে সে তারই হয়ে যাবে। হাবাব তা অস্বীকার করে। তখন সে তার চাচাতো ভাই মিসদা ইবনে মাহরাজকে বললে সে তা স্বীকার করে। উনাইযাহ্ বিনতে গানাম কাদার ইবনে সালিফকে আহ্বান করে। সে ছিল লাল নীল বর্ণের বেঁটে গঠনের লোক। জনগণ তাকে যারজ সন্তান বলে ধারণা করতো এবং তাকে তার পিতা সালিফের সন্তান মনে করতো না। সে প্রকৃতপক্ষে যার পুত্র ছিল তার নাম ছিল সাহইয়াদ। অথচ সেই সময় তার মা সালিফের স্ত্রী ছিল। এই স্ত্রীলোকটি উষ্ট্রীর হন্তাকে বলেছিল- “তুমি উষ্ট্রীটিকে হত্যা করে ফেল। এর বিনিময়ে তুমি তোমার ইচ্ছামত আমার যে কোন কন্যাকে বিয়ে করতে পার।” সুতরাং মিসদা ইবনে মাহরাজ ও কাদার ইবনে সালিফ উভয়ে মিলে সামুদ সম্প্রদায়ের গুদের সাথে ষড়যন্ত্র করলো এবং সাত ব্যক্তি তাদের সাথে যোগ দিলো। এভাবে তাদের মোট সংখ্যা হলো নয়জন। তাদের সম্পর্কেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “শহরের মধ্যে নয় ব্যক্তি ছিল, যারা সংশোধন মূলক কার্যের পরিবর্তে বিশৃংখলা মূলক কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।” আর ওরাই ছিল কওমের নেতৃস্থানীয় লোক। ঐ কাফিররা অন্যান্য কাফির গোত্রের লোকদেরকেও তাদের সাথে নিয়ে নিলো। তারা সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লো এবং উষ্ট্রীর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলো। যখন উষ্ট্ৰীটি পানি পান করে ফিরে আসলো তখন কাদার ওর পথে একটা কংকরময় ভূমির আড়ালে ওঁৎ পেতে বসে থাকলো। আর মিসদা বসলে অন্য একটি পাহাড়ের আড়ালে। উষ্ট্ৰীটি মিসদার পার্শ্ব দিয়ে গমন করা মাত্রই সে ওর পায়ের গোছায় একটা তীর মেরে দিলো । গানামের কন্যা বেরিয়ে পড়লো এবং তার সবচেয়ে সুন্দরী কন্যাকে ঐ দলের লোকদের সামনে হাযির করে দিলো। এভাবে সে তার পরমা সুন্দরী কন্যার সৌন্দর্য প্রকাশ করলো। কাদার তখন তার সাথে মিলনের নেশায় উত্তেজিত হয়ে উষ্ট্ৰীটিকে তলোয়ার মেরে দিলো। সাথে সাথে উল্লীটি মাটিতে পড়ে গেল। মাটিতে পড়ে গিয়ে সে স্বীয় বাচ্চাকে এক নযর দেখে নিলো এবং ভীষণ জোরে চীকার করে উঠলো। ঐ চিকার দ্বারা ও যেন স্বীয় বাচ্চাকে পালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করলো। তারপর ওর হন্তা ওর বক্ষের উপর বর্শা মেরে দিলো এবং এরপর ওর গলা কেটে ফেললো। ওর বাচ্চাটি একটি পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেল এবং চূড়ায় উঠে জোরে একটা চীৎকার ছাড়লো। সে যেন বললোঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার মা কোথায়?” কথিত আছে যে, বাচ্চাটি ঐভাবে তিনবার চীৎকার করেছিল। তারপর সে ঐ পাথুরে ভূমির মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। এটাও কথিত আছে যে, ললাকেরা ওর পশ্চাদ্ধাবন করে ওকেও হত্যা করে ফেলেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত সালেহ (আঃ) যখন এ সংবাদ পান তখন তিনি বধ্যভূমিতে গমন। করেন। জনগণের সমাগম ছিল। তিনি উষ্ট্ৰীটিকে দেখে কান্না শুরু করে দেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা আর তিন দিন তোমাদের বাড়ীতে বাস করে নাও।” (আল-আয়াত) উস্ত্রী হত্যার ঘটনাটি বুধবার সংঘটিত হয়েছিল। রাত্রি হলে ঐ নয় ব্যক্তি হযরত সালেহ (আঃ)-কেও হত্যা করার সংকল্প করে এবং পরামর্শক্রমে বলে- “যদি এ ব্যক্তি সত্যবাদী হয় এবং তিন দিন পর আমরা ধ্বংস হয়ে যাই তবে আমাদের পূর্বে একেই হত্যা করে দিই না কেন? আর যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে তাকে আমরা তার উস্ত্রীর কাছেই কেন পাঠিয়ে দেবো না?” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ লোকগুলো কসমের দ্বারা নিজেদের প্রতিজ্ঞার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়ে বলে- সালেহ (আঃ) ও তার স্ত্রীকে আমরা হত্যা করে ফেলবে এবং তার বন্ধুদেরকে বলবো, তাদের হত্যার খবর আমরা কি করে জানবো? অামরা তো তাদের হত্যার ঘটনার সময় হাজিরই ছিলাম না। সুতরাং তাদের হত্যাকারী কে তা আমরা কি করে বলতে পারি এবং আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।তারা চালবাজী করতে চাইল। কিন্তু আমি যে চালবাজীর উপর ছিলাম ওর খবর তাদের মোটেই ছিল না। লক্ষ্য কর, ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম কিরূপ হয়ে থাকে।” যখন তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করলো এবং একমত হয়ে রাত্রিকালে আল্লাহর নবীকে হত্যা করার জন্যে বেরিয়ে আসলো তখন আল্লাহ পাকের নির্দে পাথর বর্ষণ শুরু হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার ছিল অবকাশের প্রথম দিন। ঐ দিন আল্লাহর কুদরতে তাদের চেহারা হলদে বর্ণ ধারণ করলো, যেমন নবী (আঃ) তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার তাদের মুখমন্ডল লাল বর্ণের হয়ে গেল। তৃতীয় দিন শনিবার ছিল পার্থিব ফায়েদা লাভের শেষদিন। ঐ দিন সকলের চেহারা কালো হয়ে গেল। সেদিন ছিল রবিবার। ঐ লোকগুলো সুগন্ধি মেখে শাস্তির অপেক্ষা করছিল যে, তাদের উপর সেটা কি আকারে আসবে! সূর্য উদিত হলো এবং আকাশ থেকে এক ভীষণ শব্দ বেরিয়ে আসলো। পায়ের নীচ থেকে এক কঠিন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। সাথে সাথে সবারই প্রাণবায়ু বেরিয়ে পড়লো। সকলের লাশ নিজ নিজ ঘরে পড়ে থাকলো। ছোট, বড়, নারী, পুরুষ কেউই বাঁচলো না। শুধুমাত্র কালবা বিনতে সালোক নাম্নী একটি মহিলা বেঁচে গেল। সে বড়ই কাফিরা মেয়ে ছিল এবং নবী সালেহ (আঃ)-এর ভীষণতম শত্রু ছিল। সে শাস্তি অবলোকন করে দ্রুতবেগে পলায়নের শক্তি লাভ করলো। একটি গোত্রের নিকট পৌছে যা কিছু সে দেখেছিল তাদেরকে সংবাদ দিয়ে দিলো। সমস্ত কওম কিভাবে ধ্বংস হয়ে গেল তারও সে আলোচনা করলো। তারপর সে পান করার জন্যে পানি চাইলো। পানি পান করা মাত্রই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে হযরত সালেহ্ (আঃ) এবং তাঁর উম্মতগণ ছাড়া আর কেউই রক্ষা পায়নি। ঐ কওমের মধ্যে আবু রাগাল নামক একটি লোক ছিল। শাস্তির সময় সে মক্কায় অবস্থান করছিল বলে ঐ সময় সে নিরাপত্তা লাভ করেছিল। কিন্তু কোন এক প্রয়োজনে যখন সে মক্কার বাইরে বের হলো তখন আকাশ থেকে একটা পাথর তার উপর পতিত হলো এবং তাতেই সে মারা গেল । কথিত আছে যে, এই আবু রাগাল তায়েফে বসবাসকারী সাকীফ গোত্রের পূর্বপুরুষ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবূ রাগালের কবরের পার্শ্ব দিয়ে গমনের সময় বলেনঃ “এই কবরটি কার তা কি তোমরা জান? এটা হচ্ছে সামুদ সম্প্রদায়ের আবু রাগাল নামক এক ব্যক্তির কবর যে হারামে অবস্থান করছিল। হারাম তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করেছিল। হারাম থেকে বের হওয়া মাত্রই সে শাস্তির কবলে পতিত হয় এবং এখানে সমাধিস্থ হয়। তার সাথে তার সোনার ছড়িটিও এখানে প্রোথিত রয়েছে।” জনগণ তখন তরবারী দ্বারা তার কবরটি খনন করে ঐ ছড়িটি বের করে নেয়।

আল-আরাফ 7:77

৭৩-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর পূর্বে প্রাচীন আরবীয় যে গোত্রগুলো ছিল, সামুদও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা ছিল আ’দ সম্প্রদায়ের পরবর্তী কওম। হিজায ও শামের মধ্যবর্তী ‘ওয়াদী কুরা’ ও ওর চতুষ্পর্শ্বের এলাকা তাদের আবাসভূমি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল! হিজরী নবম সনে নবী (সঃ) তাবুকের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পথিমধ্যে তাদের আবাসভূমি ও ঘর-বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ তার সামনে পড়ে যায়। হাজর নামক একটি জায়গা ছিল তাদের আবাসভূমি। নবী (সঃ) সাহাবীগণসহ তথায় অবস্থান করলে তারা ঐসব ঝরণা হতে পানি নেন যেগুলো সামুদ সম্প্রদায় ব্যবহার করতো। সাহাবীগণ ঐ পানি দ্বারা আটা মর্পন করলেন এবং তা হাঁড়িতে রাখলেন। নবী (সঃ) তাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, হাঁড়িগুলো যেন উল্টিয়ে ফেলা হয় এবং আটাগুলো উটকে খাইয়ে দেয়া হয়। অতঃপর তারা সেখান হতে প্রস্থান করলেন এবং অন্য এক ঝরণার ধারে অবতরণ করলেন যা সামুদের পানি পানের ঝরণা ছিল না। বরং ওটা ছিল তাদের উটের পানি পানের ঝরণা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে শাস্তিপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের পার্শ্ব দিয়ে গমন করতে নিষেধ করেছিলেন এবং বলেছিলেনঃ “আমি ভয় করছি যে, না জানি তোমরাও ঐ শাস্তিতে পতিত হও যে শাস্তিতে সামুদ সম্প্রদায় পতিত হয়েছিল। সুতরাং তোমরা তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না।" ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হাজরে অবস্থানকালে বলেছিলেনঃ “তোমরা ক্রন্দনরত অবস্থা ছাড়া কোন অবস্থাতেই এসব শাস্তিপ্রাপ্ত কওমের পার্শ্ব দিয়ে গমন করো না। যদি তোমরা ক্রন্দনকারী না হও তবে তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না, নতুবা তাদের প্রতি যে শাস্তি পৌছেছিল তা তোমাদের উপরও পৌঁছে যাবে।” (এ হাদীসের মূলকে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাখরীজ করা হয়েছে)তাবুকের যুদ্ধে গমনকালে জনগণ আহলে হাজরের দিকে দ্রুতগতিতে চলছিলেন। তথায় অবতরণ করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা জানতে পেরে ঘোষণা করেনঃ “নামায হাজির।" হযরত আবু কাবশা (রাঃ) বলেন-আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসলাম। তাঁর হাতে একটা বর্শা ছিল। তিনি বলছিলেন- “তোমরা এমন কওমের দিকে যেয়ো না, যাদের উপর আল্লাহর শাস্তি পতিত হয়েছিল। তাঁদের একজন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা এ লোকদেরকে দেখে বিস্মিত হচ্ছি।” তিনি বললেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়ে বিস্ময়কর কথা বলবো না? তোমাদেরই একটি লোক অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে অদৃশ্যভাবে এমন লোকদের খবর শুনাচ্ছি যারা তোমাদের পূর্বে ছিল। আর অতীত ছাড়া আমি তোমাদের কাছে ভবিষ্যতের কথাও শুনাচ্ছি। সুতরাং সোজা হয়ে যাও এবং নিজেদেরকে সংশোধন করে নাও। কেননা, তোমাদের উপরও যদি শাস্তি নেমে আসে তবে আল্লাহ এতে কোনই পরওয়া করবেন না এবং এমন কওমও আসবে যারা নিজেরাও নিজেদের থেকে কোন কিছুই টলাতে পারবে না।” মোটকথা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হাজরের মধ্য দিয়ে গমন করলেন তখন তিনি বললেন- “তোমরা মু'জিযা ও নিদর্শনাবলী যাঞা করো না। সালেহ (আঃ)-এর কওমও এগুলো চেয়েছিল। মু'জিযা হিসেবে তাদেরকে একটি উষ্ট্রী দেয়া হয়েছিল। ওটা এক পথ দিয়ে আসতো এবং আর এক পথ দিয়ে যেতো। তারা আল্লাহর হুকুম অমান্য করে ঐ উষ্ট্রীটিকে মেরে ফেলে। ঐ উষ্ট্ৰীটি একদিন ঝরণা থেকে পানি পান করতো এবং পরের দিন তারা ওর দুধ পান করতো। যখন তারা ওকে মেরে ফেললো তখন আকাশ থেকে এমন ভীষণ বজ্রধ্বনি হলো, যাতে তারা সবাই মরে গেল। তাদের মধ্যকার মাত্র একটি লোক রক্ষা পেল। কেননা ঐ সময় কাবাঘরের মধ্যে সে অবস্থান করছিল।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ লোকটি কে ছিল?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “সে ছিল আবু রাগাল। কিন্তু যখন সে কা'বা ঘর থেকে বের হলো তখন সেও শাস্তিতে নিপতিত হয়ে মারা গেল।” (এ হাদীসটি বিশুদ্ধ ছয়টি হাদীসের কোনটির মধ্যেই বর্ণিত হয়নি)ইরশাদ হচ্ছে- আমি সামুদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা সালেহ (আঃ)-কে প্রেরণ করেছিলাম। অন্যান্য সমস্ত পয়গাম্বরের মত তিনিও জনগণকে আহ্বান জানিয়ে বললেন-হে আমার কওম! তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদই নেই। সমস্ত পয়গাম্বর তাঁরই ইবাদতের দাওয়াত দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যতজন নবী পাঠিয়েছি তাদের সবারই কাছে এই অহী করেছি- আমি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।” তিনি আরও বলেনঃ “তারা সবাই তাওহীদের শিক্ষা দিতো এবং শয়তানের অনুসরণ থেকে বিরত রাখতো।”আল্লাহ পাক বলেন- “আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে নিদর্শন এসে গেছে এবং সেই নিদর্শন হচ্ছে উষ্ট্ৰীটি।' লোকেরা স্বয়ং হযরত সালেহ (আঃ)-এর কাছে এই প্রার্থনা জানিয়েছিল যে, তিনি যেন তাদেরকে কোন মু'জিযা প্রদর্শন করেন এবং তারা তাঁর কাছে এই আবেদন পেশ করে যে, তিনি যেন তাদের বাতলানো বিশেষ একটা কংকরময় ভূমি হতে একটি উষ্ট্ৰী বের করে আনেন। ঐ কংকরময় ভূমি ছিল হাজর নামক স্থানের এক দিকে একটি নির্জন পাথুরে ভূমি । ওটার নাম ছিল কাতিবাহ'। উষ্ট্ৰীটি গর্ভবতীও হতে হবে এবং দুগ্ধবতীও হতে হবে। হযরত সালেহ্ (আঃ) তাদের কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাদের আবেদন কবুল করে নেন তবে অবশ্যই তাদেরকে ঈমান আনতে হবে এবং তার কথার উপর তারা অবশ্যই অমিল করবে। এই অঙ্গীকার গ্রহণ ও ভয় প্রদর্শনের পর্ব শেষ হলে হযরত সালেহ্ (আঃ) প্রার্থনার জন্যে দাঁড়ালেন। প্রার্থনা করা মাত্রই সেই কংকরময় ভূমি নড়ে উঠলো। তা ফেটে গেলে ওর মধ্য হতে এমন একটি উষ্ট্রী বেরিয়ে পড়লো যা গর্ভবতী হওয়ার কারণে চলার সময় এদিক ওদিক নড়াচড়া করতে লাগলো। এ দৃশ্য দেখে ঐ কাফিরদের নেতা জানদা ইবনে আমর এবং তার অধীনস্থ লোকেরা ঈমান আনলো। এরপর সামুদ সম্প্রদায়ের অন্যান্য সম্ভ্রান্ত লোকেরাও ঈমান আনয়নের ইচ্ছা করলে যাওয়াব ইবনে আমর, হাবাব পূজারী এবং রাবাব তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখলো । শিহাব নামক জানদার এক চাচাতো ভাই, যে সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশীয় ছিল, ঈমান আনয়নের সংকল্প গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ঐ লোকদের কথায় ঈমান আনয়ন থেকে বিরত থাকে। এ সম্পর্কেই সামুদ সম্প্রদায়ের মুমিনদের মধ্যকার মাহুশ নামক একটি লোক বলেন, যার ভাবার্থ হচ্ছে নিম্নরূপঃ জানদা নবীর দ্বীনের দিকে শিহাবকে আহ্বান করেছিল এবং তার ঈমান আনয়নের ইচ্ছাও হয়েছিল। কিন্তু হাজারবাসীর পথভ্রষ্ট লোকেরা হিদায়াতের পর তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। মোটকথা, উষ্ট্ৰীটির একটি বাচ্চা হলো এবং কিছুকাল ওটা ঐ কওমের মধ্যেই অবস্থান করলো। একটি ঝরণা হতে ওটা একদিন পানি পান করতো এবং একদিন পানি পান করা হতে বিরত থাকতো, যাতে অন্যান্য লোক এবং তাদের জীবজন্তুগুলো তা থেকে পানি পান করতে পারে। লোকগুলো উষ্ট্ৰীটির দুধ পান করতো এবং ইচ্ছামত ঐ দুধ দ্বারা তাদের পাত্রগুলো পরিপূর্ণ করতো। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ “পানি পান করার একটি নির্ধারিত দিন রয়েছে উষ্ট্রীর জন্যে এবং একদিন তোমাদের জন্যে।” ঐ উপত্যকায় উষ্ট্ৰীটি চরবার জন্যে এক পথ দিয়ে যেত এবং অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসতো। ওকে অত্যন্ত চাকচিক্যময় দেখাতো এবং ওকে দেখে মানুষের মনে সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়ে যেতো। ওটা অন্যান্য জন্তুগুলোর পার্শ্ব দিয়ে গমন করলে ওরা ভয়ে পালিয়ে যেতো। এভাবে কিছুকাল কেটে গেল এবং ঐ কওমের ঔদ্ধত্যপনা বৃদ্ধি পেল। এমন কি তারা উষ্ট্ৰীটিকে মেরে ফেলারই ইচ্ছা করলো, যেন তারা প্রতিদিনই পানি পান করতে পারে। সুতরাং ঐ কাফিরের দল সর্বসম্মতিক্রমে ওকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। হযরত কাদাতা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি ওকে হত্যা করেছিল তার কাছে সবাই গিয়েছিল, এমন কি স্ত্রীলোকেরাও এবং বালকেরাও। তাদের সবারই উদ্দেশ্য ছিল তার দ্বারা ওকে হত্যা করিয়ে নেয়া। তারা সমস্ত দলই যে এতে অংশ নিয়েছিল তা নিম্নের আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাকে (তাদের নবীকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, সুতরাং তারা ওকে (উন্ত্রীকে হত্যা করে ফেললো। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে তাদের পাপের কারণে ধ্বংস করে দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেন।” (৯১:১৪) আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ “সামুদ সম্প্রদায়কে আমি উস্ত্রীর মুজিযা প্রদান করেছিলাম এবং ওটাই তাদের চক্ষু খোলার জন্যে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ঐ অত্যাচারীরা অত্যাচারমূলক কাজ করলো। মোটকথা, এই উষ্ট্রী হত্যার সম্পর্ক সমস্ত দলের সাথেই লাগানো হয়েছে যে, তারা সবাই এই কাজে শরীক ছিল।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ তাফসীরকারক আলেমগণ বর্ণনা করেছেনঃ উষ্ট্ৰীটির হত্যার কারণ ছিল এই যে, সেই সময় উনাইযা নাম্নী একটি বৃদ্ধা মহিলা ছিল। সে হযরত সালেহ (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেনি, বরং তার সাথে তার কঠিন শত্রুতা ছিল। তার ছিল কয়েকটি সুন্দরী কন্যা। ধন-দৌলতেরও সে অধিকারিণী ছিল। তার স্বামীর নাম ছিল যাওয়াব ইবনে আমর । সে ছিল সামুদ সম্প্রদায়ের একজন নেতৃস্থানীয় লোক। সাদকা বিনতে মাহইয়া নাম্নী আর একজন মহিলা ছিল। সেও ছিল ধন-সম্পদ ও বংশগরিমার অধিকারিণী। সে একজন মুমিন ব্যক্তির স্ত্রী ছিল এবং স্বামীকে সে পরিত্যাগ করেছিল। উস্ত্রীর হত্যাকারীর সাথে তারা উভয়ে অঙ্গীকার করেছিল। সাদকা হাবাব নামক একটি লোককে উত্তেজিত করে বলেছিল যে, যদি সে উষ্ট্ৰীটিকে হত্যা করে দেয় তবে সে তারই হয়ে যাবে। হাবাব তা অস্বীকার করে। তখন সে তার চাচাতো ভাই মিসদা ইবনে মাহরাজকে বললে সে তা স্বীকার করে। উনাইযাহ্ বিনতে গানাম কাদার ইবনে সালিফকে আহ্বান করে। সে ছিল লাল নীল বর্ণের বেঁটে গঠনের লোক। জনগণ তাকে যারজ সন্তান বলে ধারণা করতো এবং তাকে তার পিতা সালিফের সন্তান মনে করতো না। সে প্রকৃতপক্ষে যার পুত্র ছিল তার নাম ছিল সাহইয়াদ। অথচ সেই সময় তার মা সালিফের স্ত্রী ছিল। এই স্ত্রীলোকটি উষ্ট্রীর হন্তাকে বলেছিল- “তুমি উষ্ট্রীটিকে হত্যা করে ফেল। এর বিনিময়ে তুমি তোমার ইচ্ছামত আমার যে কোন কন্যাকে বিয়ে করতে পার।” সুতরাং মিসদা ইবনে মাহরাজ ও কাদার ইবনে সালিফ উভয়ে মিলে সামুদ সম্প্রদায়ের গুদের সাথে ষড়যন্ত্র করলো এবং সাত ব্যক্তি তাদের সাথে যোগ দিলো। এভাবে তাদের মোট সংখ্যা হলো নয়জন। তাদের সম্পর্কেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “শহরের মধ্যে নয় ব্যক্তি ছিল, যারা সংশোধন মূলক কার্যের পরিবর্তে বিশৃংখলা মূলক কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।” আর ওরাই ছিল কওমের নেতৃস্থানীয় লোক। ঐ কাফিররা অন্যান্য কাফির গোত্রের লোকদেরকেও তাদের সাথে নিয়ে নিলো। তারা সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লো এবং উষ্ট্রীর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলো। যখন উষ্ট্ৰীটি পানি পান করে ফিরে আসলো তখন কাদার ওর পথে একটা কংকরময় ভূমির আড়ালে ওঁৎ পেতে বসে থাকলো। আর মিসদা বসলে অন্য একটি পাহাড়ের আড়ালে। উষ্ট্ৰীটি মিসদার পার্শ্ব দিয়ে গমন করা মাত্রই সে ওর পায়ের গোছায় একটা তীর মেরে দিলো । গানামের কন্যা বেরিয়ে পড়লো এবং তার সবচেয়ে সুন্দরী কন্যাকে ঐ দলের লোকদের সামনে হাযির করে দিলো। এভাবে সে তার পরমা সুন্দরী কন্যার সৌন্দর্য প্রকাশ করলো। কাদার তখন তার সাথে মিলনের নেশায় উত্তেজিত হয়ে উষ্ট্ৰীটিকে তলোয়ার মেরে দিলো। সাথে সাথে উল্লীটি মাটিতে পড়ে গেল। মাটিতে পড়ে গিয়ে সে স্বীয় বাচ্চাকে এক নযর দেখে নিলো এবং ভীষণ জোরে চীকার করে উঠলো। ঐ চিকার দ্বারা ও যেন স্বীয় বাচ্চাকে পালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করলো। তারপর ওর হন্তা ওর বক্ষের উপর বর্শা মেরে দিলো এবং এরপর ওর গলা কেটে ফেললো। ওর বাচ্চাটি একটি পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেল এবং চূড়ায় উঠে জোরে একটা চীৎকার ছাড়লো। সে যেন বললোঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার মা কোথায়?” কথিত আছে যে, বাচ্চাটি ঐভাবে তিনবার চীৎকার করেছিল। তারপর সে ঐ পাথুরে ভূমির মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। এটাও কথিত আছে যে, ললাকেরা ওর পশ্চাদ্ধাবন করে ওকেও হত্যা করে ফেলেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত সালেহ (আঃ) যখন এ সংবাদ পান তখন তিনি বধ্যভূমিতে গমন। করেন। জনগণের সমাগম ছিল। তিনি উষ্ট্ৰীটিকে দেখে কান্না শুরু করে দেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা আর তিন দিন তোমাদের বাড়ীতে বাস করে নাও।” (আল-আয়াত) উস্ত্রী হত্যার ঘটনাটি বুধবার সংঘটিত হয়েছিল। রাত্রি হলে ঐ নয় ব্যক্তি হযরত সালেহ (আঃ)-কেও হত্যা করার সংকল্প করে এবং পরামর্শক্রমে বলে- “যদি এ ব্যক্তি সত্যবাদী হয় এবং তিন দিন পর আমরা ধ্বংস হয়ে যাই তবে আমাদের পূর্বে একেই হত্যা করে দিই না কেন? আর যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে তাকে আমরা তার উস্ত্রীর কাছেই কেন পাঠিয়ে দেবো না?” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ লোকগুলো কসমের দ্বারা নিজেদের প্রতিজ্ঞার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়ে বলে- সালেহ (আঃ) ও তার স্ত্রীকে আমরা হত্যা করে ফেলবে এবং তার বন্ধুদেরকে বলবো, তাদের হত্যার খবর আমরা কি করে জানবো? অামরা তো তাদের হত্যার ঘটনার সময় হাজিরই ছিলাম না। সুতরাং তাদের হত্যাকারী কে তা আমরা কি করে বলতে পারি এবং আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।তারা চালবাজী করতে চাইল। কিন্তু আমি যে চালবাজীর উপর ছিলাম ওর খবর তাদের মোটেই ছিল না। লক্ষ্য কর, ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম কিরূপ হয়ে থাকে।” যখন তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করলো এবং একমত হয়ে রাত্রিকালে আল্লাহর নবীকে হত্যা করার জন্যে বেরিয়ে আসলো তখন আল্লাহ পাকের নির্দে পাথর বর্ষণ শুরু হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার ছিল অবকাশের প্রথম দিন। ঐ দিন আল্লাহর কুদরতে তাদের চেহারা হলদে বর্ণ ধারণ করলো, যেমন নবী (আঃ) তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার তাদের মুখমন্ডল লাল বর্ণের হয়ে গেল। তৃতীয় দিন শনিবার ছিল পার্থিব ফায়েদা লাভের শেষদিন। ঐ দিন সকলের চেহারা কালো হয়ে গেল। সেদিন ছিল রবিবার। ঐ লোকগুলো সুগন্ধি মেখে শাস্তির অপেক্ষা করছিল যে, তাদের উপর সেটা কি আকারে আসবে! সূর্য উদিত হলো এবং আকাশ থেকে এক ভীষণ শব্দ বেরিয়ে আসলো। পায়ের নীচ থেকে এক কঠিন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। সাথে সাথে সবারই প্রাণবায়ু বেরিয়ে পড়লো। সকলের লাশ নিজ নিজ ঘরে পড়ে থাকলো। ছোট, বড়, নারী, পুরুষ কেউই বাঁচলো না। শুধুমাত্র কালবা বিনতে সালোক নাম্নী একটি মহিলা বেঁচে গেল। সে বড়ই কাফিরা মেয়ে ছিল এবং নবী সালেহ (আঃ)-এর ভীষণতম শত্রু ছিল। সে শাস্তি অবলোকন করে দ্রুতবেগে পলায়নের শক্তি লাভ করলো। একটি গোত্রের নিকট পৌছে যা কিছু সে দেখেছিল তাদেরকে সংবাদ দিয়ে দিলো। সমস্ত কওম কিভাবে ধ্বংস হয়ে গেল তারও সে আলোচনা করলো। তারপর সে পান করার জন্যে পানি চাইলো। পানি পান করা মাত্রই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে হযরত সালেহ্ (আঃ) এবং তাঁর উম্মতগণ ছাড়া আর কেউই রক্ষা পায়নি। ঐ কওমের মধ্যে আবু রাগাল নামক একটি লোক ছিল। শাস্তির সময় সে মক্কায় অবস্থান করছিল বলে ঐ সময় সে নিরাপত্তা লাভ করেছিল। কিন্তু কোন এক প্রয়োজনে যখন সে মক্কার বাইরে বের হলো তখন আকাশ থেকে একটা পাথর তার উপর পতিত হলো এবং তাতেই সে মারা গেল । কথিত আছে যে, এই আবু রাগাল তায়েফে বসবাসকারী সাকীফ গোত্রের পূর্বপুরুষ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবূ রাগালের কবরের পার্শ্ব দিয়ে গমনের সময় বলেনঃ “এই কবরটি কার তা কি তোমরা জান? এটা হচ্ছে সামুদ সম্প্রদায়ের আবু রাগাল নামক এক ব্যক্তির কবর যে হারামে অবস্থান করছিল। হারাম তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করেছিল। হারাম থেকে বের হওয়া মাত্রই সে শাস্তির কবলে পতিত হয় এবং এখানে সমাধিস্থ হয়। তার সাথে তার সোনার ছড়িটিও এখানে প্রোথিত রয়েছে।” জনগণ তখন তরবারী দ্বারা তার কবরটি খনন করে ঐ ছড়িটি বের করে নেয়।

আল-আরাফ 7:78

৭৩-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর পূর্বে প্রাচীন আরবীয় যে গোত্রগুলো ছিল, সামুদও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা ছিল আ’দ সম্প্রদায়ের পরবর্তী কওম। হিজায ও শামের মধ্যবর্তী ‘ওয়াদী কুরা’ ও ওর চতুষ্পর্শ্বের এলাকা তাদের আবাসভূমি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল! হিজরী নবম সনে নবী (সঃ) তাবুকের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পথিমধ্যে তাদের আবাসভূমি ও ঘর-বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ তার সামনে পড়ে যায়। হাজর নামক একটি জায়গা ছিল তাদের আবাসভূমি। নবী (সঃ) সাহাবীগণসহ তথায় অবস্থান করলে তারা ঐসব ঝরণা হতে পানি নেন যেগুলো সামুদ সম্প্রদায় ব্যবহার করতো। সাহাবীগণ ঐ পানি দ্বারা আটা মর্পন করলেন এবং তা হাঁড়িতে রাখলেন। নবী (সঃ) তাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, হাঁড়িগুলো যেন উল্টিয়ে ফেলা হয় এবং আটাগুলো উটকে খাইয়ে দেয়া হয়। অতঃপর তারা সেখান হতে প্রস্থান করলেন এবং অন্য এক ঝরণার ধারে অবতরণ করলেন যা সামুদের পানি পানের ঝরণা ছিল না। বরং ওটা ছিল তাদের উটের পানি পানের ঝরণা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে শাস্তিপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের পার্শ্ব দিয়ে গমন করতে নিষেধ করেছিলেন এবং বলেছিলেনঃ “আমি ভয় করছি যে, না জানি তোমরাও ঐ শাস্তিতে পতিত হও যে শাস্তিতে সামুদ সম্প্রদায় পতিত হয়েছিল। সুতরাং তোমরা তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না।" ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হাজরে অবস্থানকালে বলেছিলেনঃ “তোমরা ক্রন্দনরত অবস্থা ছাড়া কোন অবস্থাতেই এসব শাস্তিপ্রাপ্ত কওমের পার্শ্ব দিয়ে গমন করো না। যদি তোমরা ক্রন্দনকারী না হও তবে তাদের মধ্যে প্রবেশ করো না, নতুবা তাদের প্রতি যে শাস্তি পৌছেছিল তা তোমাদের উপরও পৌঁছে যাবে।” (এ হাদীসের মূলকে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাখরীজ করা হয়েছে)তাবুকের যুদ্ধে গমনকালে জনগণ আহলে হাজরের দিকে দ্রুতগতিতে চলছিলেন। তথায় অবতরণ করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা জানতে পেরে ঘোষণা করেনঃ “নামায হাজির।" হযরত আবু কাবশা (রাঃ) বলেন-আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসলাম। তাঁর হাতে একটা বর্শা ছিল। তিনি বলছিলেন- “তোমরা এমন কওমের দিকে যেয়ো না, যাদের উপর আল্লাহর শাস্তি পতিত হয়েছিল। তাঁদের একজন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা এ লোকদেরকে দেখে বিস্মিত হচ্ছি।” তিনি বললেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়ে বিস্ময়কর কথা বলবো না? তোমাদেরই একটি লোক অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে অদৃশ্যভাবে এমন লোকদের খবর শুনাচ্ছি যারা তোমাদের পূর্বে ছিল। আর অতীত ছাড়া আমি তোমাদের কাছে ভবিষ্যতের কথাও শুনাচ্ছি। সুতরাং সোজা হয়ে যাও এবং নিজেদেরকে সংশোধন করে নাও। কেননা, তোমাদের উপরও যদি শাস্তি নেমে আসে তবে আল্লাহ এতে কোনই পরওয়া করবেন না এবং এমন কওমও আসবে যারা নিজেরাও নিজেদের থেকে কোন কিছুই টলাতে পারবে না।” মোটকথা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হাজরের মধ্য দিয়ে গমন করলেন তখন তিনি বললেন- “তোমরা মু'জিযা ও নিদর্শনাবলী যাঞা করো না। সালেহ (আঃ)-এর কওমও এগুলো চেয়েছিল। মু'জিযা হিসেবে তাদেরকে একটি উষ্ট্রী দেয়া হয়েছিল। ওটা এক পথ দিয়ে আসতো এবং আর এক পথ দিয়ে যেতো। তারা আল্লাহর হুকুম অমান্য করে ঐ উষ্ট্রীটিকে মেরে ফেলে। ঐ উষ্ট্ৰীটি একদিন ঝরণা থেকে পানি পান করতো এবং পরের দিন তারা ওর দুধ পান করতো। যখন তারা ওকে মেরে ফেললো তখন আকাশ থেকে এমন ভীষণ বজ্রধ্বনি হলো, যাতে তারা সবাই মরে গেল। তাদের মধ্যকার মাত্র একটি লোক রক্ষা পেল। কেননা ঐ সময় কাবাঘরের মধ্যে সে অবস্থান করছিল।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ লোকটি কে ছিল?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “সে ছিল আবু রাগাল। কিন্তু যখন সে কা'বা ঘর থেকে বের হলো তখন সেও শাস্তিতে নিপতিত হয়ে মারা গেল।” (এ হাদীসটি বিশুদ্ধ ছয়টি হাদীসের কোনটির মধ্যেই বর্ণিত হয়নি)ইরশাদ হচ্ছে- আমি সামুদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা সালেহ (আঃ)-কে প্রেরণ করেছিলাম। অন্যান্য সমস্ত পয়গাম্বরের মত তিনিও জনগণকে আহ্বান জানিয়ে বললেন-হে আমার কওম! তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদই নেই। সমস্ত পয়গাম্বর তাঁরই ইবাদতের দাওয়াত দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “(হে মুহাম্মাদ সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যতজন নবী পাঠিয়েছি তাদের সবারই কাছে এই অহী করেছি- আমি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।” তিনি আরও বলেনঃ “তারা সবাই তাওহীদের শিক্ষা দিতো এবং শয়তানের অনুসরণ থেকে বিরত রাখতো।”আল্লাহ পাক বলেন- “আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে নিদর্শন এসে গেছে এবং সেই নিদর্শন হচ্ছে উষ্ট্ৰীটি।' লোকেরা স্বয়ং হযরত সালেহ (আঃ)-এর কাছে এই প্রার্থনা জানিয়েছিল যে, তিনি যেন তাদেরকে কোন মু'জিযা প্রদর্শন করেন এবং তারা তাঁর কাছে এই আবেদন পেশ করে যে, তিনি যেন তাদের বাতলানো বিশেষ একটা কংকরময় ভূমি হতে একটি উষ্ট্ৰী বের করে আনেন। ঐ কংকরময় ভূমি ছিল হাজর নামক স্থানের এক দিকে একটি নির্জন পাথুরে ভূমি । ওটার নাম ছিল কাতিবাহ'। উষ্ট্ৰীটি গর্ভবতীও হতে হবে এবং দুগ্ধবতীও হতে হবে। হযরত সালেহ্ (আঃ) তাদের কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাদের আবেদন কবুল করে নেন তবে অবশ্যই তাদেরকে ঈমান আনতে হবে এবং তার কথার উপর তারা অবশ্যই অমিল করবে। এই অঙ্গীকার গ্রহণ ও ভয় প্রদর্শনের পর্ব শেষ হলে হযরত সালেহ্ (আঃ) প্রার্থনার জন্যে দাঁড়ালেন। প্রার্থনা করা মাত্রই সেই কংকরময় ভূমি নড়ে উঠলো। তা ফেটে গেলে ওর মধ্য হতে এমন একটি উষ্ট্রী বেরিয়ে পড়লো যা গর্ভবতী হওয়ার কারণে চলার সময় এদিক ওদিক নড়াচড়া করতে লাগলো। এ দৃশ্য দেখে ঐ কাফিরদের নেতা জানদা ইবনে আমর এবং তার অধীনস্থ লোকেরা ঈমান আনলো। এরপর সামুদ সম্প্রদায়ের অন্যান্য সম্ভ্রান্ত লোকেরাও ঈমান আনয়নের ইচ্ছা করলে যাওয়াব ইবনে আমর, হাবাব পূজারী এবং রাবাব তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখলো । শিহাব নামক জানদার এক চাচাতো ভাই, যে সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশীয় ছিল, ঈমান আনয়নের সংকল্প গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ঐ লোকদের কথায় ঈমান আনয়ন থেকে বিরত থাকে। এ সম্পর্কেই সামুদ সম্প্রদায়ের মুমিনদের মধ্যকার মাহুশ নামক একটি লোক বলেন, যার ভাবার্থ হচ্ছে নিম্নরূপঃ জানদা নবীর দ্বীনের দিকে শিহাবকে আহ্বান করেছিল এবং তার ঈমান আনয়নের ইচ্ছাও হয়েছিল। কিন্তু হাজারবাসীর পথভ্রষ্ট লোকেরা হিদায়াতের পর তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। মোটকথা, উষ্ট্ৰীটির একটি বাচ্চা হলো এবং কিছুকাল ওটা ঐ কওমের মধ্যেই অবস্থান করলো। একটি ঝরণা হতে ওটা একদিন পানি পান করতো এবং একদিন পানি পান করা হতে বিরত থাকতো, যাতে অন্যান্য লোক এবং তাদের জীবজন্তুগুলো তা থেকে পানি পান করতে পারে। লোকগুলো উষ্ট্ৰীটির দুধ পান করতো এবং ইচ্ছামত ঐ দুধ দ্বারা তাদের পাত্রগুলো পরিপূর্ণ করতো। যেমন অন্য একটি আয়াতে রয়েছেঃ “পানি পান করার একটি নির্ধারিত দিন রয়েছে উষ্ট্রীর জন্যে এবং একদিন তোমাদের জন্যে।” ঐ উপত্যকায় উষ্ট্ৰীটি চরবার জন্যে এক পথ দিয়ে যেত এবং অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসতো। ওকে অত্যন্ত চাকচিক্যময় দেখাতো এবং ওকে দেখে মানুষের মনে সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়ে যেতো। ওটা অন্যান্য জন্তুগুলোর পার্শ্ব দিয়ে গমন করলে ওরা ভয়ে পালিয়ে যেতো। এভাবে কিছুকাল কেটে গেল এবং ঐ কওমের ঔদ্ধত্যপনা বৃদ্ধি পেল। এমন কি তারা উষ্ট্ৰীটিকে মেরে ফেলারই ইচ্ছা করলো, যেন তারা প্রতিদিনই পানি পান করতে পারে। সুতরাং ঐ কাফিরের দল সর্বসম্মতিক্রমে ওকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। হযরত কাদাতা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি ওকে হত্যা করেছিল তার কাছে সবাই গিয়েছিল, এমন কি স্ত্রীলোকেরাও এবং বালকেরাও। তাদের সবারই উদ্দেশ্য ছিল তার দ্বারা ওকে হত্যা করিয়ে নেয়া। তারা সমস্ত দলই যে এতে অংশ নিয়েছিল তা নিম্নের আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাকে (তাদের নবীকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, সুতরাং তারা ওকে (উন্ত্রীকে হত্যা করে ফেললো। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে তাদের পাপের কারণে ধ্বংস করে দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেন।” (৯১:১৪) আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ “সামুদ সম্প্রদায়কে আমি উস্ত্রীর মুজিযা প্রদান করেছিলাম এবং ওটাই তাদের চক্ষু খোলার জন্যে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ঐ অত্যাচারীরা অত্যাচারমূলক কাজ করলো। মোটকথা, এই উষ্ট্রী হত্যার সম্পর্ক সমস্ত দলের সাথেই লাগানো হয়েছে যে, তারা সবাই এই কাজে শরীক ছিল।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রমুখ তাফসীরকারক আলেমগণ বর্ণনা করেছেনঃ উষ্ট্ৰীটির হত্যার কারণ ছিল এই যে, সেই সময় উনাইযা নাম্নী একটি বৃদ্ধা মহিলা ছিল। সে হযরত সালেহ (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেনি, বরং তার সাথে তার কঠিন শত্রুতা ছিল। তার ছিল কয়েকটি সুন্দরী কন্যা। ধন-দৌলতেরও সে অধিকারিণী ছিল। তার স্বামীর নাম ছিল যাওয়াব ইবনে আমর । সে ছিল সামুদ সম্প্রদায়ের একজন নেতৃস্থানীয় লোক। সাদকা বিনতে মাহইয়া নাম্নী আর একজন মহিলা ছিল। সেও ছিল ধন-সম্পদ ও বংশগরিমার অধিকারিণী। সে একজন মুমিন ব্যক্তির স্ত্রী ছিল এবং স্বামীকে সে পরিত্যাগ করেছিল। উস্ত্রীর হত্যাকারীর সাথে তারা উভয়ে অঙ্গীকার করেছিল। সাদকা হাবাব নামক একটি লোককে উত্তেজিত করে বলেছিল যে, যদি সে উষ্ট্ৰীটিকে হত্যা করে দেয় তবে সে তারই হয়ে যাবে। হাবাব তা অস্বীকার করে। তখন সে তার চাচাতো ভাই মিসদা ইবনে মাহরাজকে বললে সে তা স্বীকার করে। উনাইযাহ্ বিনতে গানাম কাদার ইবনে সালিফকে আহ্বান করে। সে ছিল লাল নীল বর্ণের বেঁটে গঠনের লোক। জনগণ তাকে যারজ সন্তান বলে ধারণা করতো এবং তাকে তার পিতা সালিফের সন্তান মনে করতো না। সে প্রকৃতপক্ষে যার পুত্র ছিল তার নাম ছিল সাহইয়াদ। অথচ সেই সময় তার মা সালিফের স্ত্রী ছিল। এই স্ত্রীলোকটি উষ্ট্রীর হন্তাকে বলেছিল- “তুমি উষ্ট্রীটিকে হত্যা করে ফেল। এর বিনিময়ে তুমি তোমার ইচ্ছামত আমার যে কোন কন্যাকে বিয়ে করতে পার।” সুতরাং মিসদা ইবনে মাহরাজ ও কাদার ইবনে সালিফ উভয়ে মিলে সামুদ সম্প্রদায়ের গুদের সাথে ষড়যন্ত্র করলো এবং সাত ব্যক্তি তাদের সাথে যোগ দিলো। এভাবে তাদের মোট সংখ্যা হলো নয়জন। তাদের সম্পর্কেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “শহরের মধ্যে নয় ব্যক্তি ছিল, যারা সংশোধন মূলক কার্যের পরিবর্তে বিশৃংখলা মূলক কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।” আর ওরাই ছিল কওমের নেতৃস্থানীয় লোক। ঐ কাফিররা অন্যান্য কাফির গোত্রের লোকদেরকেও তাদের সাথে নিয়ে নিলো। তারা সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লো এবং উষ্ট্রীর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলো। যখন উষ্ট্ৰীটি পানি পান করে ফিরে আসলো তখন কাদার ওর পথে একটা কংকরময় ভূমির আড়ালে ওঁৎ পেতে বসে থাকলো। আর মিসদা বসলে অন্য একটি পাহাড়ের আড়ালে। উষ্ট্ৰীটি মিসদার পার্শ্ব দিয়ে গমন করা মাত্রই সে ওর পায়ের গোছায় একটা তীর মেরে দিলো । গানামের কন্যা বেরিয়ে পড়লো এবং তার সবচেয়ে সুন্দরী কন্যাকে ঐ দলের লোকদের সামনে হাযির করে দিলো। এভাবে সে তার পরমা সুন্দরী কন্যার সৌন্দর্য প্রকাশ করলো। কাদার তখন তার সাথে মিলনের নেশায় উত্তেজিত হয়ে উষ্ট্ৰীটিকে তলোয়ার মেরে দিলো। সাথে সাথে উল্লীটি মাটিতে পড়ে গেল। মাটিতে পড়ে গিয়ে সে স্বীয় বাচ্চাকে এক নযর দেখে নিলো এবং ভীষণ জোরে চীকার করে উঠলো। ঐ চিকার দ্বারা ও যেন স্বীয় বাচ্চাকে পালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করলো। তারপর ওর হন্তা ওর বক্ষের উপর বর্শা মেরে দিলো এবং এরপর ওর গলা কেটে ফেললো। ওর বাচ্চাটি একটি পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেল এবং চূড়ায় উঠে জোরে একটা চীৎকার ছাড়লো। সে যেন বললোঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার মা কোথায়?” কথিত আছে যে, বাচ্চাটি ঐভাবে তিনবার চীৎকার করেছিল। তারপর সে ঐ পাথুরে ভূমির মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। এটাও কথিত আছে যে, ললাকেরা ওর পশ্চাদ্ধাবন করে ওকেও হত্যা করে ফেলেছিল। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।হযরত সালেহ (আঃ) যখন এ সংবাদ পান তখন তিনি বধ্যভূমিতে গমন। করেন। জনগণের সমাগম ছিল। তিনি উষ্ট্ৰীটিকে দেখে কান্না শুরু করে দেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা আর তিন দিন তোমাদের বাড়ীতে বাস করে নাও।” (আল-আয়াত) উস্ত্রী হত্যার ঘটনাটি বুধবার সংঘটিত হয়েছিল। রাত্রি হলে ঐ নয় ব্যক্তি হযরত সালেহ (আঃ)-কেও হত্যা করার সংকল্প করে এবং পরামর্শক্রমে বলে- “যদি এ ব্যক্তি সত্যবাদী হয় এবং তিন দিন পর আমরা ধ্বংস হয়ে যাই তবে আমাদের পূর্বে একেই হত্যা করে দিই না কেন? আর যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে তাকে আমরা তার উস্ত্রীর কাছেই কেন পাঠিয়ে দেবো না?” আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ লোকগুলো কসমের দ্বারা নিজেদের প্রতিজ্ঞার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়ে বলে- সালেহ (আঃ) ও তার স্ত্রীকে আমরা হত্যা করে ফেলবে এবং তার বন্ধুদেরকে বলবো, তাদের হত্যার খবর আমরা কি করে জানবো? অামরা তো তাদের হত্যার ঘটনার সময় হাজিরই ছিলাম না। সুতরাং তাদের হত্যাকারী কে তা আমরা কি করে বলতে পারি এবং আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।তারা চালবাজী করতে চাইল। কিন্তু আমি যে চালবাজীর উপর ছিলাম ওর খবর তাদের মোটেই ছিল না। লক্ষ্য কর, ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম কিরূপ হয়ে থাকে।” যখন তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করলো এবং একমত হয়ে রাত্রিকালে আল্লাহর নবীকে হত্যা করার জন্যে বেরিয়ে আসলো তখন আল্লাহ পাকের নির্দে পাথর বর্ষণ শুরু হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার ছিল অবকাশের প্রথম দিন। ঐ দিন আল্লাহর কুদরতে তাদের চেহারা হলদে বর্ণ ধারণ করলো, যেমন নবী (আঃ) তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার তাদের মুখমন্ডল লাল বর্ণের হয়ে গেল। তৃতীয় দিন শনিবার ছিল পার্থিব ফায়েদা লাভের শেষদিন। ঐ দিন সকলের চেহারা কালো হয়ে গেল। সেদিন ছিল রবিবার। ঐ লোকগুলো সুগন্ধি মেখে শাস্তির অপেক্ষা করছিল যে, তাদের উপর সেটা কি আকারে আসবে! সূর্য উদিত হলো এবং আকাশ থেকে এক ভীষণ শব্দ বেরিয়ে আসলো। পায়ের নীচ থেকে এক কঠিন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। সাথে সাথে সবারই প্রাণবায়ু বেরিয়ে পড়লো। সকলের লাশ নিজ নিজ ঘরে পড়ে থাকলো। ছোট, বড়, নারী, পুরুষ কেউই বাঁচলো না। শুধুমাত্র কালবা বিনতে সালোক নাম্নী একটি মহিলা বেঁচে গেল। সে বড়ই কাফিরা মেয়ে ছিল এবং নবী সালেহ (আঃ)-এর ভীষণতম শত্রু ছিল। সে শাস্তি অবলোকন করে দ্রুতবেগে পলায়নের শক্তি লাভ করলো। একটি গোত্রের নিকট পৌছে যা কিছু সে দেখেছিল তাদেরকে সংবাদ দিয়ে দিলো। সমস্ত কওম কিভাবে ধ্বংস হয়ে গেল তারও সে আলোচনা করলো। তারপর সে পান করার জন্যে পানি চাইলো। পানি পান করা মাত্রই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে হযরত সালেহ্ (আঃ) এবং তাঁর উম্মতগণ ছাড়া আর কেউই রক্ষা পায়নি। ঐ কওমের মধ্যে আবু রাগাল নামক একটি লোক ছিল। শাস্তির সময় সে মক্কায় অবস্থান করছিল বলে ঐ সময় সে নিরাপত্তা লাভ করেছিল। কিন্তু কোন এক প্রয়োজনে যখন সে মক্কার বাইরে বের হলো তখন আকাশ থেকে একটা পাথর তার উপর পতিত হলো এবং তাতেই সে মারা গেল । কথিত আছে যে, এই আবু রাগাল তায়েফে বসবাসকারী সাকীফ গোত্রের পূর্বপুরুষ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবূ রাগালের কবরের পার্শ্ব দিয়ে গমনের সময় বলেনঃ “এই কবরটি কার তা কি তোমরা জান? এটা হচ্ছে সামুদ সম্প্রদায়ের আবু রাগাল নামক এক ব্যক্তির কবর যে হারামে অবস্থান করছিল। হারাম তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করেছিল। হারাম থেকে বের হওয়া মাত্রই সে শাস্তির কবলে পতিত হয় এবং এখানে সমাধিস্থ হয়। তার সাথে তার সোনার ছড়িটিও এখানে প্রোথিত রয়েছে।” জনগণ তখন তরবারী দ্বারা তার কবরটি খনন করে ঐ ছড়িটি বের করে নেয়।

আল-আরাফ 7:79

সালেহ (আঃ)-এর কওম যে তার বিরোধিতা করার কারণে ধ্বংস হয়ে গেল, তাই তিনি সেই মৃত দেহকে সম্বোধন করে ধমকাচ্ছেন। তারা যেন শুনতে রয়েছে। কেননা, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, বদর যুদ্ধে নবী (সঃ) যখন কাফিরদের উপর জয়যুক্ত হলেন তখন তিনি তিন দিন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করলেন। অতঃপর শেষ দিন রাত্রে বিদায়ের প্রাক্কালে কালীবে বদরের (বদরের গর্তের) পার্শ্বে দাঁড়িয়ে যান। কুরায়েশ কাফিরদেরকে সেখানে দাফন করা হয়েছিল। তিনি দাফনকত ব্যক্তিদেরকে নাম ধরে ধরে ডাক দিয়ে বলেনঃ “হে আবু জেহেল ইবনে হিশাম! হে উবা! হে শায়বা! হে অমুক! হে অমুক! তোমরা প্রতিপালকের ওয়াদা পূরণকৃত অবস্থায় পেয়েছ কি? আমি আমার প্রতিপালকের ওয়াদা সদা পূরণকৃত অবস্থায় পেয়েছি।” এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি মৃতদের সাথে কথা বলছেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! তোমরা তাদের চেয়ে বেশী শুনতে পাও না। অবশ্যই তারা শুনে তবে উত্তর দিতে পারে না।” সীরাতের গ্রন্থে রয়েছে যে, নবী (সঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “নবী গোত্রীয় লোকদের মধ্যে তোমরা খুবই মন্দ লোক ছিলে। বাইরের লোক আমার সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছে, অথচ তোমরা আমার গোত্রের লোক হয়েও আমাকে অবিশ্বাস করেছিলে। মদীনাবাসী আমাকে আশ্রয় দিয়েছে, অথচ তোমরা আমাকে আমার দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলে। তোমরা আমাকে হত্যা করার সংকল্প করেছিলে, অথচ অন্যেরা আমাকে সাহায্য করেছে। নবীর জন্যে তোমরা অত্যন্ত মন্দ গোত্র হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।” অনুরূপভাবে হযরত সালেহ (আঃ) তাঁর কওমকে সম্বোধন করে বলেনঃ “আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু তোমরা সত্য কথাকে পছন্দই করতে না।” এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে- আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই উপদেশ তোমাদের কাছে মোটেই পছন্দনীয় হয়নি। কোন এক মুফাসৃসির বর্ণনা করেছেন যে, যে নবীর উম্মত ধ্বংস হয়ে যেতো সেই নবী মক্কার হারামে এসে আশ্রয় গ্রহণ করতেন। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জ্ঞানের অধিকারী।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হজ্ব মৌসুমে নবী (সঃ) যখন আসফান’ উপত্যকার পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন তখন তিনি হযরত আবূ বকর (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! এটা কোন্ জায়গা?” হযরত আবু বকর (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “এটা হচ্ছে আসফান উপত্যকা।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হযরত সালেহ (আঃ) ও হযরত হূদ (আঃ) উষ্ট্ৰীতে আরোহণ করে কোন এক সময় এখান দিয়ে গমন করেন। উস্ত্রীর লাগাম ছিল খেজুর গাছের রঞ্জু। তাঁদের পরনে ছিল কম্বলের লুঙ্গী এবং চাদর ছিল পালক বা চামড়ার তৈরী। তারা ‘লাব্বায়েক’ ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে বায়তে আতীক'-এর হজ্বের জন্যে যাচ্ছিলেন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) তাখরীজ করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এ পর্যায়ে এই হাদীসটি গারীব)

আল-আরাফ 7:80

৮০-৮১ নং আয়াতের তাফসীর: ‘ঐ সময়টিও স্মরণযোগ্য যখন আমি (আল্লাহ) লুত (আঃ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করেছিলাম । সে তার কওমকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিল। লুত (আঃ) ছিলেন নূত ইবনে হারূন ইবনে আযর। তিনি হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ)-এর ভ্রাতুস্পুত্র ছিলেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সাথে তিনিও ঈমান আনয়ন করেছিলেন এবং তাঁর সাথে সিরিয়ার দিকে হিজরত করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আহলে সুদূমের নিকট পাঠিয়েছিলেন। তিনি সুদূমবাসীকে আল্লাহর দিকে ডাকতেন এবং সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করতেন। তারা এমন নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজের আবিষ্কার করেছিল যা হযরত আদম (আঃ) থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত তাদের ছাড়া অন্য কোন জাতি সেই কাজে লিপ্ত হয়নি। তারা নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষদের কাছে কু-কাজের জন্যে আসতো। এ কাজের কল্পনা আজ পর্যন্ত কারো মনেও জাগ্রত হয় নি এবং আজ পর্যন্ত বানী আদম এ কাজে কখনও জড়িত হয়নি। জামে’ দামেশকের প্রতিষ্ঠাতা উমাইয়া খলীফা ওয়ালীদ ইবনে আব্দুল মালিক বলেছিলেনঃ “যদি আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে লূত সম্প্রদায়ের ঘটনা বর্ণনা না করতেন তবে আমার এ বিশ্বাসই হতো না যে, কোন পুরুষ তাক অন্য কোন পুরুষ লোকের সাথে এরূপ কাজ করতে পারে!” সুতরাং হযরত লুত (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বললেনঃ “তোমরা এমন অশ্লীল ও কুকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়েছে যে কাজ তোমাদের পূর্বে বিশ্বে আর কেউই করে নি। তোমরা নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষ লোকদের কাছে আসছে এবং তাদের দ্বারা নিজেদের যৌন ক্রিয়া নিবারণ করে নিচ্ছো? বাস্তবিকই এটা তোমাদের সীমালংঘন ও বড় রকমের অজ্ঞতাই বটে! যে জিনিসের যেটা স্থান নয় তোমরা ওকে ওরই স্থান বানিয়ে নিচ্ছো।” এরপর অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক (হযরত লুতের আঃ কথা নকল করে) বলেনঃ “এরা আমার কন্যা যার সাথে চাও সম্পর্ক স্থাপন কর।” তারা বললোঃ “(হে নূত আঃ)! তুমি তো জান যে, তোমার এই পার্থিব কন্যাদের কোনই প্রয়োজন আমাদের নেই। যাদের প্রয়োজন আমাদের রয়েছে তা তোমার জানা আছে।” মুফসিরগণ বর্ণনা করেছেন যে, পুরুষ নিজের প্রয়োজন পুরুষ দ্বারা পূর্ণ করে নিতো এবং নারীরাও তাদের প্রয়োজন নারীদের দ্বারাই পূর্ণ করে নিতো। আর ওটা ছাড়া তাদের কোন উপায়ও ছিল না।

আল-আরাফ 7:81

৮০-৮১ নং আয়াতের তাফসীর: ‘ঐ সময়টিও স্মরণযোগ্য যখন আমি (আল্লাহ) লুত (আঃ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করেছিলাম । সে তার কওমকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিল। লুত (আঃ) ছিলেন নূত ইবনে হারূন ইবনে আযর। তিনি হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ)-এর ভ্রাতুস্পুত্র ছিলেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সাথে তিনিও ঈমান আনয়ন করেছিলেন এবং তাঁর সাথে সিরিয়ার দিকে হিজরত করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আহলে সুদূমের নিকট পাঠিয়েছিলেন। তিনি সুদূমবাসীকে আল্লাহর দিকে ডাকতেন এবং সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করতেন। তারা এমন নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজের আবিষ্কার করেছিল যা হযরত আদম (আঃ) থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত তাদের ছাড়া অন্য কোন জাতি সেই কাজে লিপ্ত হয়নি। তারা নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষদের কাছে কু-কাজের জন্যে আসতো। এ কাজের কল্পনা আজ পর্যন্ত কারো মনেও জাগ্রত হয় নি এবং আজ পর্যন্ত বানী আদম এ কাজে কখনও জড়িত হয়নি। জামে’ দামেশকের প্রতিষ্ঠাতা উমাইয়া খলীফা ওয়ালীদ ইবনে আব্দুল মালিক বলেছিলেনঃ “যদি আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে লূত সম্প্রদায়ের ঘটনা বর্ণনা না করতেন তবে আমার এ বিশ্বাসই হতো না যে, কোন পুরুষ তাক অন্য কোন পুরুষ লোকের সাথে এরূপ কাজ করতে পারে!” সুতরাং হযরত লুত (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বললেনঃ “তোমরা এমন অশ্লীল ও কুকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়েছে যে কাজ তোমাদের পূর্বে বিশ্বে আর কেউই করে নি। তোমরা নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষ লোকদের কাছে আসছে এবং তাদের দ্বারা নিজেদের যৌন ক্রিয়া নিবারণ করে নিচ্ছো? বাস্তবিকই এটা তোমাদের সীমালংঘন ও বড় রকমের অজ্ঞতাই বটে! যে জিনিসের যেটা স্থান নয় তোমরা ওকে ওরই স্থান বানিয়ে নিচ্ছো।” এরপর অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক (হযরত লুতের আঃ কথা নকল করে) বলেনঃ “এরা আমার কন্যা যার সাথে চাও সম্পর্ক স্থাপন কর।” তারা বললোঃ “(হে নূত আঃ)! তুমি তো জান যে, তোমার এই পার্থিব কন্যাদের কোনই প্রয়োজন আমাদের নেই। যাদের প্রয়োজন আমাদের রয়েছে তা তোমার জানা আছে।” মুফসিরগণ বর্ণনা করেছেন যে, পুরুষ নিজের প্রয়োজন পুরুষ দ্বারা পূর্ণ করে নিতো এবং নারীরাও তাদের প্রয়োজন নারীদের দ্বারাই পূর্ণ করে নিতো। আর ওটা ছাড়া তাদের কোন উপায়ও ছিল না।

আল-আরাফ 7:82

হযরত লূত (আঃ)-এর কথার জবাবে তারা পরস্পর বলাবলি করে- তোমরা লুত (আঃ)-কে ও তার সঙ্গীদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে দাও। কিন্তু মহান আল্লাহ হযরত লূত (আঃ)-কে সেখান থেকে নিরাপদে বের করে আনেন এবং কাফিরদেরকে অপমানের মৃত্যু দান করেন। (আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, হযরত নূত (আঃ)-এর কওম তাঁদেরকে দোষ ছাড়াই দোষী করে। তারা হযরত নূত (আঃ)-এর ঐ ভাল কাজকেই দোষ বলে যে, তিনি বড়ই পবিত্র লোক হিসেবে চলা ফেরা করছেন। অথবা ভাবার্থ এই যে, পুরুষদের গুহ্যদ্বার ও নারীদের গুহ্যদ্বার হতে বেঁচে থাকার দোষ অবশ্যই হযরত লূত (আঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে রয়েছে। এটা হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি।

আল-আরাফ 7:83

৮৩-৮৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি লূত (আঃ)-কে এবং তার পরিবারবর্গকে বাঁচিয়ে নিয়েছিলাম। তার পরিবারের লোক ছাড়া আর কেউই ঈমান আনেনি। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যারা মুমিন ছিল তাদেরকে (শাস্তির স্থান হতে) বের করে এনেছিলাম। একটি বাড়ী ছাড়া তো আর কোন মুসলমান বাড়ীই ছিল না। কিন্তু তার স্ত্রীকে বাঁচানো হয়নি। কেননা, সে ঈমান আনেনি, বরং তার কওমের ধর্মের উপরই রয়ে গিয়েছিল। সে লূত (আঃ) -এর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে যোগাযোগ করতো। হযরত লূত (আঃ)-এর কাছে ফেরেশতাগণ যুবকদের রূপ ধরে যে আগমন করতেন এবং তাঁর কওমের লোকেরাও যে তা অবহিত হয়ে যেতো, এ সবকিছুই ঐ মহিলার গুপ্তচরগিরির কারণেই সম্ভব হতো। আল্লাহ তা'আলা হযরত লূত (আঃ)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তিনি যেন রাত্রে স্বীয় পরিবারের লোকদেরকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যান। কিন্তু তাঁর স্ত্রী যেন সেট জানতে না পারে। তাকে নিয়ে যেতে হবে না। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর সেই স্ত্রীও তাঁদের সাথে গিয়েছিল। গ্রাম থেকে বের হওয়া মাত্রই যখন তার কওমের উপর শাস্তি অবতীর্ণ হলো তখন ঐ মহিলাটি সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাদের। দিকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। শেষ পর্যন্ত সেও শাস্তিতে জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, সে গ্রাম থেকে বের হয়নি এবং হযরত লূত (আঃ) তাকে গ্রাম হতে বের হওয়ার সংবাদই দেননি। বরং সে কওমের সাথেই রয়ে গিয়েছিল। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আবার (আরবী) ও বলা হয়েছে এবং তাফসীর বিল লাযিম হচ্ছে এটাই।(আরবী) -এই আয়াতটি (১১৪ ৮২) এই উক্তিরই তাফসীর করছে। এই জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, পাপকার্য সম্পাদন ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করণের ফলে অপরাধীদের উপর কিরূপে শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছিল তা লক্ষ্য কর। ইমাম আবু হানিফা (রঃ) বলেন যে, সমমৈথুনকারীকে উপর থেকে নীচে নিক্ষেপ করতে হবে এবং তার উপর পাথর বর্ষণ করতে হবে। কেননা, লুত (আঃ)-এর কওমের সাথেও শাস্তির এ পন্থাই অবলম্বন করা হয়েছিল। কোন কোন আলেমের মতে তাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করে দিতে হবে, সে বিবাহিত হাক বা অবিবাহিতই হাক। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর একটি বর্ণনা এই রূপই রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যাকেই কওমে লূত (আঃ)-এর আমলের ন্যায় আমল করতে দেখতে পাবে, তাকেই তোমরা হত্যা করে ফেলবে, যে ঐ রূপ আমল করবে তাকেও এবং যার সাথে করবে তাকেও।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমীযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ বলেন যে, সমমৈথুনকারী ব্যভিচারীর মতই। সুতরাং সে বিবাহিত হলে তাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা হবে এবং অবিবাহিত হলে একশ’ কোড়া মারতে হবে। স্ত্রী লোকদের সাথে এ কাজ করলেও সেটা সমমৈথুনরূপে পরিগণিত হবে। ইজমায়ে উম্মত দ্বারা এটাকেও অবৈধ করা হয়েছে। এর বিপরীত একটি মাত্র অতি বিরল উক্তি রয়েছে। এরও নিষিদ্ধতায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে কয়েকটি হাদীস বর্ণিত আছে। সূরায়ে বাকারায় এর বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে।

আল-আরাফ 7:84

৮৩-৮৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি লূত (আঃ)-কে এবং তার পরিবারবর্গকে বাঁচিয়ে নিয়েছিলাম। তার পরিবারের লোক ছাড়া আর কেউই ঈমান আনেনি। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যারা মুমিন ছিল তাদেরকে (শাস্তির স্থান হতে) বের করে এনেছিলাম। একটি বাড়ী ছাড়া তো আর কোন মুসলমান বাড়ীই ছিল না। কিন্তু তার স্ত্রীকে বাঁচানো হয়নি। কেননা, সে ঈমান আনেনি, বরং তার কওমের ধর্মের উপরই রয়ে গিয়েছিল। সে লূত (আঃ) -এর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে যোগাযোগ করতো। হযরত লূত (আঃ)-এর কাছে ফেরেশতাগণ যুবকদের রূপ ধরে যে আগমন করতেন এবং তাঁর কওমের লোকেরাও যে তা অবহিত হয়ে যেতো, এ সবকিছুই ঐ মহিলার গুপ্তচরগিরির কারণেই সম্ভব হতো। আল্লাহ তা'আলা হযরত লূত (আঃ)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তিনি যেন রাত্রে স্বীয় পরিবারের লোকদেরকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যান। কিন্তু তাঁর স্ত্রী যেন সেট জানতে না পারে। তাকে নিয়ে যেতে হবে না। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর সেই স্ত্রীও তাঁদের সাথে গিয়েছিল। গ্রাম থেকে বের হওয়া মাত্রই যখন তার কওমের উপর শাস্তি অবতীর্ণ হলো তখন ঐ মহিলাটি সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাদের। দিকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। শেষ পর্যন্ত সেও শাস্তিতে জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, সে গ্রাম থেকে বের হয়নি এবং হযরত লূত (আঃ) তাকে গ্রাম হতে বের হওয়ার সংবাদই দেননি। বরং সে কওমের সাথেই রয়ে গিয়েছিল। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আবার (আরবী) ও বলা হয়েছে এবং তাফসীর বিল লাযিম হচ্ছে এটাই।(আরবী) -এই আয়াতটি (১১৪ ৮২) এই উক্তিরই তাফসীর করছে। এই জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, পাপকার্য সম্পাদন ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করণের ফলে অপরাধীদের উপর কিরূপে শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছিল তা লক্ষ্য কর। ইমাম আবু হানিফা (রঃ) বলেন যে, সমমৈথুনকারীকে উপর থেকে নীচে নিক্ষেপ করতে হবে এবং তার উপর পাথর বর্ষণ করতে হবে। কেননা, লুত (আঃ)-এর কওমের সাথেও শাস্তির এ পন্থাই অবলম্বন করা হয়েছিল। কোন কোন আলেমের মতে তাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করে দিতে হবে, সে বিবাহিত হাক বা অবিবাহিতই হাক। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর একটি বর্ণনা এই রূপই রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যাকেই কওমে লূত (আঃ)-এর আমলের ন্যায় আমল করতে দেখতে পাবে, তাকেই তোমরা হত্যা করে ফেলবে, যে ঐ রূপ আমল করবে তাকেও এবং যার সাথে করবে তাকেও।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমীযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ বলেন যে, সমমৈথুনকারী ব্যভিচারীর মতই। সুতরাং সে বিবাহিত হলে তাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা হবে এবং অবিবাহিত হলে একশ’ কোড়া মারতে হবে। স্ত্রী লোকদের সাথে এ কাজ করলেও সেটা সমমৈথুনরূপে পরিগণিত হবে। ইজমায়ে উম্মত দ্বারা এটাকেও অবৈধ করা হয়েছে। এর বিপরীত একটি মাত্র অতি বিরল উক্তি রয়েছে। এরও নিষিদ্ধতায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে কয়েকটি হাদীস বর্ণিত আছে। সূরায়ে বাকারায় এর বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে।

আল-আরাফ 7:85

সুরইয়ানী ভাষায় হযরত শুআইব (আ)-এর প্রকৃত নাম ছিল ইয়াসরূন। মাদিয়ান শব্দটি গোত্রের উপরেও প্রয়োগ করা হতো এবং শহরের অর্থেও ব্যবহৃত হতো। এটা মাআন’ নামক জায়গার নিকটে অবস্থিত, যা হিজাযের পথে রয়েছে। (বর্তমানে মাআন’ হচ্ছে জর্দানের পূর্বে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ শহর) যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন সে (হযরত মূসা আঃ মাদিয়ানের ঝর্ণার কাছে পৌছালো তখন সেখানে এমন কতক লোককে পেলো যারা ঐ ঝর্ণা হতে পানি নিচ্ছিল। তারা হচ্ছে আসহাবুল আয়কাত, যার বর্ণনা ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই দেয়া হবে। ইরশাদ হচ্ছে- সে (শুআইব আঃ) বললো- হে আমার কওম! তোমরা আল্লাহরই ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন মা'বুদ নেই। সমস্ত রাসূলেরই তাবলীগ ও দাওয়াত এটাই ছিল। তোমাদের কাছে তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে সুস্পষ্ট দলীল এসে গেছে। হযরত শুআইব (আঃ) লোকদেরকে তাদের ব্যবহারিক জীবনের লেনদেন সম্পর্কে উপদেশ দিয়ে বলেনঃ তোমরা নিজেদের ওজন ও পরিমাপ ঠিক রাখবে, লোকদের ক্ষতি করবে না। অন্যদের মালে তোমরা খিয়ানত করবে না। পরিমাপ ও ওজনে চুরি করে কম করতঃ কাউকেও প্রতারিত করবে না। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, “পরিমাপ ও ওজনে কমকারীদের জন্যে বড়ই ধ্বংস ও অকল্যাণ রয়েছে।” এটা হচ্ছে কঠিন ধমক ও হুমকি এবং ভীতি প্রদর্শন। এরপর আল্লাহ তা'আলা হযরত শুআইব (আঃ) সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি স্বীয় কওমকে উপদেশ দিতেন। তাঁকে ‘খতীবুল আম্বিয়া বা নবীদের ভাষণদাতা বলা হতো। কেননা, তিনি অত্যন্ত বাকপটুতার সাথে ভাষণ দিতে পারতেন এবং জনগণকে অতি চমৎকার ভাষায় উপদেশ দিতেন।

আল-আরাফ 7:86

৮৬-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত শুআইব (আঃ) জনগণকে ইন্দ্রিয়গতভাবে এবং মৌলিকভাবে ডাকাতি করতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ তিনি তাদেরকে বলেছেন-তোমরা পথের উপর বসে জনগণকে ভীতিপ্রদর্শন করতঃ কিছু কেড়ে ও লুটপাট করে নিয়ো না এবং তাদের মাল তোমাদেরকে দিতে অস্বীকার করলে তোমরা তাদেরকে হত্যা করে ফেলার হুমকি দিয়ো না। এটা লুণ্ঠনকারীরা শুল্ক আদায়ের নাম দিয়ে লুণ্ঠন করতো আর যারা হিদায়াত লাভের উদ্দেশ্যে হযরত শুআইব (আঃ)-এর কাছে আসতো তাদেরকে বাধা প্রদান করতো এবং আসতে দিতো না। এই দ্বিতীয়টি হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি । প্রথম উক্তিটিই হচ্ছে বেশী স্পষ্ট এবং রচনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা, সিরাতের অর্থ পথ। আর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) যা বুঝেছেন তা তো মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে স্বয়ং বলেছেনঃ “যারা ঈমান এনেছে, তোমরা তাদের পথে বসে যাচ্ছ এবং সৎলোকদেরকে আমার পথে আসতে বাধা প্রদান করতঃ ভুল পথে ফিরিয়ে দিচ্ছ।” (হযরত শুআইব আঃ স্বীয় কওমের লোকদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ) হে আমার কওমের লোকেরা! তোমরা সংখ্যায় কম ছিলে, এবং দুর্বল ছিলে অতঃপর আল্লাহ তোমাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতঃ তোমাদের শক্তিশালী করেছেন, এ জন্যে তোমাদের তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। কেননা, এটা তোমাদের প্রতি মহান আল্লাহর বড়ই অনুগ্রহ বটে। পূর্বযুগে পাপীদেরকে পাপের কারণে শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। তারা বেপরোয়াভাবে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করতো। এ কারণে তাদের পরিণাম এইরূপ হয়েছিল। এর থেকে তোমাদেরকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত যে, তোমরা এইরূপ কাজ করলে তোমাদের পরিণতিও ঐরূপই হবে। আমার প্রচারের মাধ্যমে যদি তোমাদের একটি দল ঈমান আনয়ন করে এবং অন্য দল ঈমান না আনে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর এবং ধৈর্যের সাথে কাজ কর যে পর্যন্ত না আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেন। তিনিই হচ্ছেন সর্বোত্তম ফায়সালাকারী। মুত্তাকীদেরই পরিণাম হবে ভাল এবং কাফিরদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য।

আল-আরাফ 7:87

৮৬-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত শুআইব (আঃ) জনগণকে ইন্দ্রিয়গতভাবে এবং মৌলিকভাবে ডাকাতি করতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ তিনি তাদেরকে বলেছেন-তোমরা পথের উপর বসে জনগণকে ভীতিপ্রদর্শন করতঃ কিছু কেড়ে ও লুটপাট করে নিয়ো না এবং তাদের মাল তোমাদেরকে দিতে অস্বীকার করলে তোমরা তাদেরকে হত্যা করে ফেলার হুমকি দিয়ো না। এটা লুণ্ঠনকারীরা শুল্ক আদায়ের নাম দিয়ে লুণ্ঠন করতো আর যারা হিদায়াত লাভের উদ্দেশ্যে হযরত শুআইব (আঃ)-এর কাছে আসতো তাদেরকে বাধা প্রদান করতো এবং আসতে দিতো না। এই দ্বিতীয়টি হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি । প্রথম উক্তিটিই হচ্ছে বেশী স্পষ্ট এবং রচনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা, সিরাতের অর্থ পথ। আর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) যা বুঝেছেন তা তো মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে স্বয়ং বলেছেনঃ “যারা ঈমান এনেছে, তোমরা তাদের পথে বসে যাচ্ছ এবং সৎলোকদেরকে আমার পথে আসতে বাধা প্রদান করতঃ ভুল পথে ফিরিয়ে দিচ্ছ।” (হযরত শুআইব আঃ স্বীয় কওমের লোকদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ) হে আমার কওমের লোকেরা! তোমরা সংখ্যায় কম ছিলে, এবং দুর্বল ছিলে অতঃপর আল্লাহ তোমাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতঃ তোমাদের শক্তিশালী করেছেন, এ জন্যে তোমাদের তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। কেননা, এটা তোমাদের প্রতি মহান আল্লাহর বড়ই অনুগ্রহ বটে। পূর্বযুগে পাপীদেরকে পাপের কারণে শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। তারা বেপরোয়াভাবে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করতো। এ কারণে তাদের পরিণাম এইরূপ হয়েছিল। এর থেকে তোমাদেরকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত যে, তোমরা এইরূপ কাজ করলে তোমাদের পরিণতিও ঐরূপই হবে। আমার প্রচারের মাধ্যমে যদি তোমাদের একটি দল ঈমান আনয়ন করে এবং অন্য দল ঈমান না আনে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর এবং ধৈর্যের সাথে কাজ কর যে পর্যন্ত না আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেন। তিনিই হচ্ছেন সর্বোত্তম ফায়সালাকারী। মুত্তাকীদেরই পরিণাম হবে ভাল এবং কাফিরদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য।

আল-আরাফ 7:88

৮৮-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: কাফিররা তাদের নবী হযরত শোআ'ইব (আঃ)-এর সাথে এবং তার সময়ের মুসলমানদের সাথে যে দুর্ব্যবহার করেছিল এবং যেভাবে তাঁদেরকে হুমকি দিয়ে বলেছিল যে, হয় তারা তাদের জনপদ ছেড়ে চলে যাবেন, না হয় তাদের ধর্মে দীক্ষিত হবেন, আল্লাহ পাক এখানে এসব সংবাদই দিচ্ছেন। বাহ্যতঃ এই সম্বোধন রাসূলের প্রতি হলেও প্রকৃতপক্ষে এটা তাঁর উম্মতের প্রতিই বটে। হযরত শশা'আইব (আঃ)-এর কওমের অহংকারী ও দাম্ভিক লোকেরা তাঁকে সম্বোধন করে বলেছিলঃ “হে শশাআ’ইব (আঃ)! আমরা তোমাকে ও তোমার সঙ্গীদেরকে জনপদ থেকে বের করে দেবো অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মে ফিরে আসতে হবে।” তখন হযরত শশাআ'ইব (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “যদিও আমরা তাতে সম্মত না হই তবুও কি? যদি আমরা তোমাদের ধর্মে ফিরে যাই এবং তোমাদের মতাদর্শকে গ্রহণ করি তবে নিশ্চিতরূপে আমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপকারী হব যে, মূর্তিগুলোকে আমরা আল্লাহর শরীক বানিয়ে নিচ্ছি!” এই রূপে কাফিরদের অনুসরণ করার প্রতি ঘৃণা জন্মানো হচ্ছে। হযরত শোআইব (আঃ) বললেনঃ “এ কাজ আমাদের দ্বারা সম্পাদিত হতে পারে না যে, আমরা পুনরায় মুশরিক হয়ে যাবে। তবে, আল্লাহ যদি আমাদেরকে ফিরিয়ে দেন তাহলে সেটা অন্য কথা। কেননা, ভবিষ্যতের সমস্ত জ্ঞান তিনি পরিবেষ্টন করে রয়েছেন। আমরা যা অবলম্বন করি এবং যা অবলম্বন করি না সবকিছুতেই আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করি। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মধ্যে ও আমাদের কওমের মধ্যে সত্যকে প্রকাশ করে দিন এবং আমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করুন। আপনি হচ্ছেন উত্তম ফায়সালাকারী।” (আরবী) এমন ন্যায়-বিচারককে বলা হয় যিনি অণু পরিমাণও অন্যায় ও যুলুম করেন না।

আল-আরাফ 7:89

৮৮-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: কাফিররা তাদের নবী হযরত শোআ'ইব (আঃ)-এর সাথে এবং তার সময়ের মুসলমানদের সাথে যে দুর্ব্যবহার করেছিল এবং যেভাবে তাঁদেরকে হুমকি দিয়ে বলেছিল যে, হয় তারা তাদের জনপদ ছেড়ে চলে যাবেন, না হয় তাদের ধর্মে দীক্ষিত হবেন, আল্লাহ পাক এখানে এসব সংবাদই দিচ্ছেন। বাহ্যতঃ এই সম্বোধন রাসূলের প্রতি হলেও প্রকৃতপক্ষে এটা তাঁর উম্মতের প্রতিই বটে। হযরত শশা'আইব (আঃ)-এর কওমের অহংকারী ও দাম্ভিক লোকেরা তাঁকে সম্বোধন করে বলেছিলঃ “হে শশাআ’ইব (আঃ)! আমরা তোমাকে ও তোমার সঙ্গীদেরকে জনপদ থেকে বের করে দেবো অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মে ফিরে আসতে হবে।” তখন হযরত শশাআ'ইব (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “যদিও আমরা তাতে সম্মত না হই তবুও কি? যদি আমরা তোমাদের ধর্মে ফিরে যাই এবং তোমাদের মতাদর্শকে গ্রহণ করি তবে নিশ্চিতরূপে আমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপকারী হব যে, মূর্তিগুলোকে আমরা আল্লাহর শরীক বানিয়ে নিচ্ছি!” এই রূপে কাফিরদের অনুসরণ করার প্রতি ঘৃণা জন্মানো হচ্ছে। হযরত শোআইব (আঃ) বললেনঃ “এ কাজ আমাদের দ্বারা সম্পাদিত হতে পারে না যে, আমরা পুনরায় মুশরিক হয়ে যাবে। তবে, আল্লাহ যদি আমাদেরকে ফিরিয়ে দেন তাহলে সেটা অন্য কথা। কেননা, ভবিষ্যতের সমস্ত জ্ঞান তিনি পরিবেষ্টন করে রয়েছেন। আমরা যা অবলম্বন করি এবং যা অবলম্বন করি না সবকিছুতেই আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করি। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মধ্যে ও আমাদের কওমের মধ্যে সত্যকে প্রকাশ করে দিন এবং আমাদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করুন। আপনি হচ্ছেন উত্তম ফায়সালাকারী।” (আরবী) এমন ন্যায়-বিচারককে বলা হয় যিনি অণু পরিমাণও অন্যায় ও যুলুম করেন না।

আল-আরাফ 7:90

৯০-৯২ নং আয়াতের তাফসীর: তাদের কুফরী, একগুয়েমী ও পথভ্রষ্টতা কত কঠিন হয়ে পড়েছিল এবং সত্যের বিরোধিতাকরণ তাদের অন্তরে কিরূপ প্রাকৃতিক রূপ ধারণ করেছিল, আল্লাহ তা'আলা এখানে সেই সংবাদই দিচ্ছেন। এ জন্যেই তারা পরস্পর শপথ করে করে বলেছিল-দেখ, যদি তোমরা শোআ’ইব (আঃ)-এর কথা মেনে নাও তাহলে বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। তাদের এই দৃঢ় সংকল্পের পর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এই সংকল্পের কারণে তাদের প্রতি এমন এক ভূমিকম্প প্রেরিত হয়েছিল যার ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছিল । আর এই শাস্তি ছিল তাদের সেই কর্মের প্রতিফল যে, তারা বিনা কারণে শশাআ’ইব (আঃ)-কে এবং তার সঙ্গী-সাথীদেরকে ভীতি প্রদর্শন করেছিল ও দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যেমন সূরায়ে হুদে বর্ণিত হয়েছে- “যখন আমার শাস্তি তাদের উপর এসে পড়লো তখন আমি শোআ’ইব (আঃ)-কে এবং তার সঙ্গী-সাথীদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে বাঁচিয়ে নিলাম, আর ঐ যালিমদেরকে এমন বজ্রধ্বনি পেয়ে বসলো যে, তারা নিজেদের গৃহে নতজানু অবস্থায় বিনাশ হয়ে গেল।” এই দুটি আয়াতের মধ্যে পারস্পরিক সম্বন্ধ এই যে, যখন ঐ কাফিররা (আরবী) (১১:৮৭) বলে বিদ্রুপ করলো তখন এক ভীষণ বজ্রধ্বনি তাদেরকে চিরতরে নীরব করে দিল। সূরায়ে শুআরার মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন-“তারা যখন নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, তখন মেঘাচ্ছন্ন দিবসের শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করলো, এটা ছিল এক ভয়ানক দিবসের শাস্তি।” এর একমাত্র কারণ ছিল এই যে, তারা শাস্তি চেয়ে বলেছিল-“তুমি যদি সত্যবাদী হও তবে আমাদের উপর আকাশের একটা খণ্ড ফেলে দাও।” তাই আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিলেন যে, তাদের উপর আসমানী আযাব পৌছে গেল। তাদের উপর তিনটি শাস্তি একত্রিত হলো। (১) আসমানী শাস্তি, তা এইভাবে যে, তাদের উপর মেঘ হতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও অগ্নিশিখা বর্ষিত হলো। (২) এক ভীষণ বজ্রধ্বনি হলো। (৩) এক ভীষণ ভূমিকম্প সৃষ্টি হলো, যার ফলে তাদের প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেল এবং তাদের আত্মবিহীন দেহ তাদের গৃহ-মধ্যে পড়ে রইলো। মনে হলো যেন তারা সেখানে কখনো বসবাসই করেনি। অথচ তারা তাদের নবীকে দেশ ছাড়া করেছিল। এখন আল্লাহ ঐ কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করছেন যে, যারা শশাআ'ইব (আঃ)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল শেষ পর্যন্ত তারাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

আল-আরাফ 7:91

৯০-৯২ নং আয়াতের তাফসীর: তাদের কুফরী, একগুয়েমী ও পথভ্রষ্টতা কত কঠিন হয়ে পড়েছিল এবং সত্যের বিরোধিতাকরণ তাদের অন্তরে কিরূপ প্রাকৃতিক রূপ ধারণ করেছিল, আল্লাহ তা'আলা এখানে সেই সংবাদই দিচ্ছেন। এ জন্যেই তারা পরস্পর শপথ করে করে বলেছিল-দেখ, যদি তোমরা শোআ’ইব (আঃ)-এর কথা মেনে নাও তাহলে বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। তাদের এই দৃঢ় সংকল্পের পর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এই সংকল্পের কারণে তাদের প্রতি এমন এক ভূমিকম্প প্রেরিত হয়েছিল যার ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছিল । আর এই শাস্তি ছিল তাদের সেই কর্মের প্রতিফল যে, তারা বিনা কারণে শশাআ’ইব (আঃ)-কে এবং তার সঙ্গী-সাথীদেরকে ভীতি প্রদর্শন করেছিল ও দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যেমন সূরায়ে হুদে বর্ণিত হয়েছে- “যখন আমার শাস্তি তাদের উপর এসে পড়লো তখন আমি শোআ’ইব (আঃ)-কে এবং তার সঙ্গী-সাথীদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে বাঁচিয়ে নিলাম, আর ঐ যালিমদেরকে এমন বজ্রধ্বনি পেয়ে বসলো যে, তারা নিজেদের গৃহে নতজানু অবস্থায় বিনাশ হয়ে গেল।” এই দুটি আয়াতের মধ্যে পারস্পরিক সম্বন্ধ এই যে, যখন ঐ কাফিররা (আরবী) (১১:৮৭) বলে বিদ্রুপ করলো তখন এক ভীষণ বজ্রধ্বনি তাদেরকে চিরতরে নীরব করে দিল। সূরায়ে শুআরার মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন-“তারা যখন নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, তখন মেঘাচ্ছন্ন দিবসের শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করলো, এটা ছিল এক ভয়ানক দিবসের শাস্তি।” এর একমাত্র কারণ ছিল এই যে, তারা শাস্তি চেয়ে বলেছিল-“তুমি যদি সত্যবাদী হও তবে আমাদের উপর আকাশের একটা খণ্ড ফেলে দাও।” তাই আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিলেন যে, তাদের উপর আসমানী আযাব পৌছে গেল। তাদের উপর তিনটি শাস্তি একত্রিত হলো। (১) আসমানী শাস্তি, তা এইভাবে যে, তাদের উপর মেঘ হতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও অগ্নিশিখা বর্ষিত হলো। (২) এক ভীষণ বজ্রধ্বনি হলো। (৩) এক ভীষণ ভূমিকম্প সৃষ্টি হলো, যার ফলে তাদের প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেল এবং তাদের আত্মবিহীন দেহ তাদের গৃহ-মধ্যে পড়ে রইলো। মনে হলো যেন তারা সেখানে কখনো বসবাসই করেনি। অথচ তারা তাদের নবীকে দেশ ছাড়া করেছিল। এখন আল্লাহ ঐ কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করছেন যে, যারা শশাআ'ইব (আঃ)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল শেষ পর্যন্ত তারাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

আল-আরাফ 7:92

৯০-৯২ নং আয়াতের তাফসীর: তাদের কুফরী, একগুয়েমী ও পথভ্রষ্টতা কত কঠিন হয়ে পড়েছিল এবং সত্যের বিরোধিতাকরণ তাদের অন্তরে কিরূপ প্রাকৃতিক রূপ ধারণ করেছিল, আল্লাহ তা'আলা এখানে সেই সংবাদই দিচ্ছেন। এ জন্যেই তারা পরস্পর শপথ করে করে বলেছিল-দেখ, যদি তোমরা শোআ’ইব (আঃ)-এর কথা মেনে নাও তাহলে বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। তাদের এই দৃঢ় সংকল্পের পর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এই সংকল্পের কারণে তাদের প্রতি এমন এক ভূমিকম্প প্রেরিত হয়েছিল যার ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছিল । আর এই শাস্তি ছিল তাদের সেই কর্মের প্রতিফল যে, তারা বিনা কারণে শশাআ’ইব (আঃ)-কে এবং তার সঙ্গী-সাথীদেরকে ভীতি প্রদর্শন করেছিল ও দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যেমন সূরায়ে হুদে বর্ণিত হয়েছে- “যখন আমার শাস্তি তাদের উপর এসে পড়লো তখন আমি শোআ’ইব (আঃ)-কে এবং তার সঙ্গী-সাথীদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে বাঁচিয়ে নিলাম, আর ঐ যালিমদেরকে এমন বজ্রধ্বনি পেয়ে বসলো যে, তারা নিজেদের গৃহে নতজানু অবস্থায় বিনাশ হয়ে গেল।” এই দুটি আয়াতের মধ্যে পারস্পরিক সম্বন্ধ এই যে, যখন ঐ কাফিররা (আরবী) (১১:৮৭) বলে বিদ্রুপ করলো তখন এক ভীষণ বজ্রধ্বনি তাদেরকে চিরতরে নীরব করে দিল। সূরায়ে শুআরার মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন-“তারা যখন নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, তখন মেঘাচ্ছন্ন দিবসের শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করলো, এটা ছিল এক ভয়ানক দিবসের শাস্তি।” এর একমাত্র কারণ ছিল এই যে, তারা শাস্তি চেয়ে বলেছিল-“তুমি যদি সত্যবাদী হও তবে আমাদের উপর আকাশের একটা খণ্ড ফেলে দাও।” তাই আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিলেন যে, তাদের উপর আসমানী আযাব পৌছে গেল। তাদের উপর তিনটি শাস্তি একত্রিত হলো। (১) আসমানী শাস্তি, তা এইভাবে যে, তাদের উপর মেঘ হতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও অগ্নিশিখা বর্ষিত হলো। (২) এক ভীষণ বজ্রধ্বনি হলো। (৩) এক ভীষণ ভূমিকম্প সৃষ্টি হলো, যার ফলে তাদের প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেল এবং তাদের আত্মবিহীন দেহ তাদের গৃহ-মধ্যে পড়ে রইলো। মনে হলো যেন তারা সেখানে কখনো বসবাসই করেনি। অথচ তারা তাদের নবীকে দেশ ছাড়া করেছিল। এখন আল্লাহ ঐ কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করছেন যে, যারা শশাআ'ইব (আঃ)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল শেষ পর্যন্ত তারাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

আল-আরাফ 7:93

কাফিররা যখন কোনক্রমেই মানল না তখন হযরত শোআ’ইব (আঃ) সেখান হতে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় তিনি তাদেরকে বললেনঃ “হে আমার কওমের লোকেরা! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহ তা'আলার পয়গাম পৌছিয়ে দিয়েছি। আমি আমার দায়িত্ব পূর্ণরূপে পালন করেছি। আমি সদা তোমাদের মঙ্গল কামনা করেছি। এতদসত্ত্বেও তোমরা আমার দ্বারা উপকার লাভ করলে না। সুতরাং তোমাদের মন্দ পরিণতি দেখে দুঃখ করতঃ আমি নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবো কেন? তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করে আর লাভ কি!”

আল-আরাফ 7:94

৯৪-৯৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, পূর্ববর্তী যেসব উম্মতের কাছে নবীদেরকে প্রেরণ করা হয়েছিল তাদেরকে বিপদ-আপদ দিয়ে এবং সুখ-শান্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়েছিল। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে শারীরিক কষ্ট এবং দৈহিক রোগ অসুস্থতা। আর (আরবী) হচ্ছে ঐ কষ্ট যা দারিদ্রের কারণে হয়ে থাকে। মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য এই যে, তারা হয়তো তার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে, তাঁকে ভয় করবে এবং সেই বিপদ ও কষ্ট দূর হওয়ার জন্যে তার কাছে আবেদন ও প্রার্থনা করবে। মূল বক্তব্য হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাদেরকে কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্যে নিপতিত করেছিলেন, যেন তারা তাঁর সামনে বিনয় প্রকাশ করে। কিন্তু তারা তা করেনি। আল্লাহ পাক বলেনঃ এর পরেও আমি তাদের আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল করে দিলাম। এর দ্বারাও তাদেরকে পরীক্ষা করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। এজন্যেই তিনি বলেনঃ “অতঃপর আমি তাদের দুরবস্থাকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দিলাম। রোগের স্থলে সুস্থতা দান করলাম। দারিদ্রের স্থলে ধন-সম্পদ প্রদান করলাম। এর দ্বারা আমার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, হয়তো তারা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। কিন্তু তারা তা করলো না।” (আরবী) অর্থাৎ তারা ধনে-মালে ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্যের অধিকারী হয়ে গেল। ইরশাদ হচ্ছে-আমি তাদেরকে আনন্দ ও নিরানন্দ উভয় দ্বারাই পরীক্ষা করেছি, যেন তারা আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু না তারা আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো এবং না ধৈর্য ও নম্রতা অবলম্বন করলো। বরং বলতে শুরু করলো আমরা কষ্ট ও বিপদে-আপদে পতিত হয়ে গেলাম। এর পরে আমি তাদেরকে শান্তি ও আনন্দ দান করলাম। এখন তারা বলে উঠলো- “এই সুখ-শান্তি ও বিপদ-আপদ তো আমাদের পূর্বপুরুষদের যুগ থেকে চলে আসছে এবং সদা-সর্বদা এরূপ চক্রই হতে থাকবে। যুগ কখনও এরূপ হয় এবং কখনও ঐরূপ হয়। অনুরূপভাবে আমরাও কখনো শান্তি লাভ করবে এবং কখনো বিপদ-আপদে পতিত হবো। এটা কোন নতুন কথা নয়। তাদের উচিত ছিল এই ইংগিতেই আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে চিন্তা করা এবং তাঁর পরীক্ষার দিকে নিজেদের চিন্তার মোড় ফিরিয়ে নেয়া। কিন্তু মুমিনদের অবস্থা ছিল তাদের বিপরীত। তারা সুখ-শান্তির সময় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় এবং বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিনের জন্যে বিস্মিত হতে হয় যে, আল্লাহ তার জন্যে যা কিছুরই ফায়সালা করেন তা তার জন্যে কল্যাণকরই হয়ে থাকে। যদি তার প্রতি বিপদ আপতিত হয় এবং সে ধৈর্যধারণ করে তবে সেটা তার জন্যে। মঙ্গলজনক হয়। আর যদি তার উপর সুখ-শান্তি নেমে আসে এবং তখন সে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে তবে সেটাও তার জন্যে কল্যাণকর।” সুতরাং মুমিন তো ঐ ব্যক্তি যে সুখ ও দুঃখ উভয় অবস্থাতেই মনে করে যে, তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ জন্যেই হাদীসে এসেছে-“বিপদ-আপদ মুমিনকে সদা পাপ থেকে পবিত্র করতে থাকে। (ইমাম তিরমীযীর (রঃ) বর্ণনায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “শেষ পর্যন্ত সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করে যে, তার কোনই পাপ থাকে না।") আর মুনাফিকের দৃষ্টান্ত হচ্ছে গাধার ন্যায়। তার উপর কি চাপানো হয়েছে তা সে জানে না এবং এটাও জানে না যে, কি উদ্দেশ্যে তাকে কাজে লাগানো হয়েছে, আর কেনই বা তাকে বাধা হয়েছে। এবং কেনই বা খুলে দেয়া হয়েছে।” এজন্যেই এর পরে আল্লাহ পাক বলেনঃ আকস্মিকভাবে আমি তাকে শাস্তিতে নিপতিত করেছি, যে শাস্তি সম্পর্কে তার কোন ধারণাও ছিল না। যেমন হাদীসে রয়েছে-“আকস্মিক মৃত্যু মুমিনের জন্যে রহমত এবং কাফিরের জন্যে দুঃখ ও আফসোসের কারণ।”

আল-আরাফ 7:95

৯৪-৯৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, পূর্ববর্তী যেসব উম্মতের কাছে নবীদেরকে প্রেরণ করা হয়েছিল তাদেরকে বিপদ-আপদ দিয়ে এবং সুখ-শান্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়েছিল। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে শারীরিক কষ্ট এবং দৈহিক রোগ অসুস্থতা। আর (আরবী) হচ্ছে ঐ কষ্ট যা দারিদ্রের কারণে হয়ে থাকে। মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য এই যে, তারা হয়তো তার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে, তাঁকে ভয় করবে এবং সেই বিপদ ও কষ্ট দূর হওয়ার জন্যে তার কাছে আবেদন ও প্রার্থনা করবে। মূল বক্তব্য হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাদেরকে কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্যে নিপতিত করেছিলেন, যেন তারা তাঁর সামনে বিনয় প্রকাশ করে। কিন্তু তারা তা করেনি। আল্লাহ পাক বলেনঃ এর পরেও আমি তাদের আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল করে দিলাম। এর দ্বারাও তাদেরকে পরীক্ষা করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। এজন্যেই তিনি বলেনঃ “অতঃপর আমি তাদের দুরবস্থাকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দিলাম। রোগের স্থলে সুস্থতা দান করলাম। দারিদ্রের স্থলে ধন-সম্পদ প্রদান করলাম। এর দ্বারা আমার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, হয়তো তারা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। কিন্তু তারা তা করলো না।” (আরবী) অর্থাৎ তারা ধনে-মালে ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্যের অধিকারী হয়ে গেল। ইরশাদ হচ্ছে-আমি তাদেরকে আনন্দ ও নিরানন্দ উভয় দ্বারাই পরীক্ষা করেছি, যেন তারা আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু না তারা আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো এবং না ধৈর্য ও নম্রতা অবলম্বন করলো। বরং বলতে শুরু করলো আমরা কষ্ট ও বিপদে-আপদে পতিত হয়ে গেলাম। এর পরে আমি তাদেরকে শান্তি ও আনন্দ দান করলাম। এখন তারা বলে উঠলো- “এই সুখ-শান্তি ও বিপদ-আপদ তো আমাদের পূর্বপুরুষদের যুগ থেকে চলে আসছে এবং সদা-সর্বদা এরূপ চক্রই হতে থাকবে। যুগ কখনও এরূপ হয় এবং কখনও ঐরূপ হয়। অনুরূপভাবে আমরাও কখনো শান্তি লাভ করবে এবং কখনো বিপদ-আপদে পতিত হবো। এটা কোন নতুন কথা নয়। তাদের উচিত ছিল এই ইংগিতেই আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে চিন্তা করা এবং তাঁর পরীক্ষার দিকে নিজেদের চিন্তার মোড় ফিরিয়ে নেয়া। কিন্তু মুমিনদের অবস্থা ছিল তাদের বিপরীত। তারা সুখ-শান্তির সময় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় এবং বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিনের জন্যে বিস্মিত হতে হয় যে, আল্লাহ তার জন্যে যা কিছুরই ফায়সালা করেন তা তার জন্যে কল্যাণকরই হয়ে থাকে। যদি তার প্রতি বিপদ আপতিত হয় এবং সে ধৈর্যধারণ করে তবে সেটা তার জন্যে। মঙ্গলজনক হয়। আর যদি তার উপর সুখ-শান্তি নেমে আসে এবং তখন সে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে তবে সেটাও তার জন্যে কল্যাণকর।” সুতরাং মুমিন তো ঐ ব্যক্তি যে সুখ ও দুঃখ উভয় অবস্থাতেই মনে করে যে, তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ জন্যেই হাদীসে এসেছে-“বিপদ-আপদ মুমিনকে সদা পাপ থেকে পবিত্র করতে থাকে। (ইমাম তিরমীযীর (রঃ) বর্ণনায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “শেষ পর্যন্ত সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করে যে, তার কোনই পাপ থাকে না।") আর মুনাফিকের দৃষ্টান্ত হচ্ছে গাধার ন্যায়। তার উপর কি চাপানো হয়েছে তা সে জানে না এবং এটাও জানে না যে, কি উদ্দেশ্যে তাকে কাজে লাগানো হয়েছে, আর কেনই বা তাকে বাধা হয়েছে। এবং কেনই বা খুলে দেয়া হয়েছে।” এজন্যেই এর পরে আল্লাহ পাক বলেনঃ আকস্মিকভাবে আমি তাকে শাস্তিতে নিপতিত করেছি, যে শাস্তি সম্পর্কে তার কোন ধারণাও ছিল না। যেমন হাদীসে রয়েছে-“আকস্মিক মৃত্যু মুমিনের জন্যে রহমত এবং কাফিরের জন্যে দুঃখ ও আফসোসের কারণ।”

আল-আরাফ 7:96

৯৬-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে জনপদবাসীদের ঈমানের স্বল্পতার বর্ণনা দিচ্ছেন যাদের কাছে রাসূলদেরকে প্রেরণ করা হয়েছিল। যেমন আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ “জনপদবাসী কেন ঈমান আনলো না যে, তাদের ঈমান দ্বারা তারা উপকৃত হতো? ইউনুসের কওম এর ব্যতিক্রম ছিল।” অর্থাৎ ইউনুস (আঃ)-এর কওম ছাড়া অন্য কোন জনপদের সমস্ত লোক ঈমান আনেনি। হযরত ইউনুস (আঃ)-এর কওমের সমস্ত লোকই ঈমান এনেছিল এবং ওটা ছিল তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করার পর। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তারা ঈমান আনলো, তখন আমি তাদেরকে সাময়িকভাবে পার্থিব সুখ শান্তি দান করলাম।” যেমন তিনি বলেনঃ “আমি তাকে এক লক্ষ বা তারও বেশী লোকের কাছে নবীরূপে প্রেরণ করেছিলাম।” ইরশাদ হচ্ছে-যদি এই জনপদবাসী ঈমান আনতে এবং তাকওয়া অবলম্বন করতো তবে আমি তাদের উপর আকাশ ও যমীনের বরকত নাযিল করতাম । অর্থাৎ আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করতাম এবং যমীন হতে ফসল উৎপাদন করতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। এর শাস্তি স্বরূপ আমি তাদেরকে আযাবের স্বাদ গ্রহণ করিয়েছি। অর্থাৎ তারা রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল, তখন আমি তাদের দুষ্কার্যের কারণে তাদেরকে শাস্তির যাঁতাকলে পিষ্ট করেছি। এর পর আল্লাহ পাক স্বীয় আদেশের বিরোধিতা এবং পাপকার্যে সাহসিকতা প্রদর্শন করা হতে ভীতি প্রদর্শন করছেন। তিনি বলেনঃ “এই জনপদবাসী কাফিররা কি আমার শাস্তি হতে নিরাপত্তা লাভ করেছে? তারা শুয়েই থাকবে এমতাবস্থায় রাত্রিকালেই আমি তাদের উপর আমার শাস্তি আপতিত করবো। অথবা তারা কি এ থেকে নির্ভয় হয়ে গেছে যে, দিবাভাগের কোন এক সময় শাস্তি তাদেরকে পরিবেষ্টন করবে এবং সেই সময় তারা নিজেদের কাজ কারবারে লিপ্ত থাকবে ও সম্পূর্ণ উদাসীন থাকবে? তারা কি এতটুকুও ভয় করে না যে, আমার প্রতিশোধ তাদেরকে যে কোন সময় পাকড়াও করবে এবং সেই সময় তারা খেল তামাশায় মগ্ন থাকবে? মনে রাখবে যে, হতভাগ্য সম্প্রদায় ছাড়া কেউই আল্লাহর শাস্তি থেকে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। এ জন্যেই হাসান বসরী (রঃ) বলেছেনঃ “মুমিন বান্দা আল্লাহর আনুগত্য করে এবং ভাল কাজ করতে থাকে, এর পরেও সে সদা আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকে। পক্ষান্তরে পাপী ব্যক্তি পাপকার্যে লিপ্ত থাকে আবার এর পরেও সে নিজেকে মাহফুয ও নিরাপদ মনে করে।

আল-আরাফ 7:97

৯৬-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে জনপদবাসীদের ঈমানের স্বল্পতার বর্ণনা দিচ্ছেন যাদের কাছে রাসূলদেরকে প্রেরণ করা হয়েছিল। যেমন আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ “জনপদবাসী কেন ঈমান আনলো না যে, তাদের ঈমান দ্বারা তারা উপকৃত হতো? ইউনুসের কওম এর ব্যতিক্রম ছিল।” অর্থাৎ ইউনুস (আঃ)-এর কওম ছাড়া অন্য কোন জনপদের সমস্ত লোক ঈমান আনেনি। হযরত ইউনুস (আঃ)-এর কওমের সমস্ত লোকই ঈমান এনেছিল এবং ওটা ছিল তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করার পর। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তারা ঈমান আনলো, তখন আমি তাদেরকে সাময়িকভাবে পার্থিব সুখ শান্তি দান করলাম।” যেমন তিনি বলেনঃ “আমি তাকে এক লক্ষ বা তারও বেশী লোকের কাছে নবীরূপে প্রেরণ করেছিলাম।” ইরশাদ হচ্ছে-যদি এই জনপদবাসী ঈমান আনতে এবং তাকওয়া অবলম্বন করতো তবে আমি তাদের উপর আকাশ ও যমীনের বরকত নাযিল করতাম । অর্থাৎ আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করতাম এবং যমীন হতে ফসল উৎপাদন করতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। এর শাস্তি স্বরূপ আমি তাদেরকে আযাবের স্বাদ গ্রহণ করিয়েছি। অর্থাৎ তারা রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল, তখন আমি তাদের দুষ্কার্যের কারণে তাদেরকে শাস্তির যাঁতাকলে পিষ্ট করেছি। এর পর আল্লাহ পাক স্বীয় আদেশের বিরোধিতা এবং পাপকার্যে সাহসিকতা প্রদর্শন করা হতে ভীতি প্রদর্শন করছেন। তিনি বলেনঃ “এই জনপদবাসী কাফিররা কি আমার শাস্তি হতে নিরাপত্তা লাভ করেছে? তারা শুয়েই থাকবে এমতাবস্থায় রাত্রিকালেই আমি তাদের উপর আমার শাস্তি আপতিত করবো। অথবা তারা কি এ থেকে নির্ভয় হয়ে গেছে যে, দিবাভাগের কোন এক সময় শাস্তি তাদেরকে পরিবেষ্টন করবে এবং সেই সময় তারা নিজেদের কাজ কারবারে লিপ্ত থাকবে ও সম্পূর্ণ উদাসীন থাকবে? তারা কি এতটুকুও ভয় করে না যে, আমার প্রতিশোধ তাদেরকে যে কোন সময় পাকড়াও করবে এবং সেই সময় তারা খেল তামাশায় মগ্ন থাকবে? মনে রাখবে যে, হতভাগ্য সম্প্রদায় ছাড়া কেউই আল্লাহর শাস্তি থেকে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। এ জন্যেই হাসান বসরী (রঃ) বলেছেনঃ “মুমিন বান্দা আল্লাহর আনুগত্য করে এবং ভাল কাজ করতে থাকে, এর পরেও সে সদা আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকে। পক্ষান্তরে পাপী ব্যক্তি পাপকার্যে লিপ্ত থাকে আবার এর পরেও সে নিজেকে মাহফুয ও নিরাপদ মনে করে।

আল-আরাফ 7:98

৯৬-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে জনপদবাসীদের ঈমানের স্বল্পতার বর্ণনা দিচ্ছেন যাদের কাছে রাসূলদেরকে প্রেরণ করা হয়েছিল। যেমন আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ “জনপদবাসী কেন ঈমান আনলো না যে, তাদের ঈমান দ্বারা তারা উপকৃত হতো? ইউনুসের কওম এর ব্যতিক্রম ছিল।” অর্থাৎ ইউনুস (আঃ)-এর কওম ছাড়া অন্য কোন জনপদের সমস্ত লোক ঈমান আনেনি। হযরত ইউনুস (আঃ)-এর কওমের সমস্ত লোকই ঈমান এনেছিল এবং ওটা ছিল তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করার পর। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তারা ঈমান আনলো, তখন আমি তাদেরকে সাময়িকভাবে পার্থিব সুখ শান্তি দান করলাম।” যেমন তিনি বলেনঃ “আমি তাকে এক লক্ষ বা তারও বেশী লোকের কাছে নবীরূপে প্রেরণ করেছিলাম।” ইরশাদ হচ্ছে-যদি এই জনপদবাসী ঈমান আনতে এবং তাকওয়া অবলম্বন করতো তবে আমি তাদের উপর আকাশ ও যমীনের বরকত নাযিল করতাম । অর্থাৎ আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করতাম এবং যমীন হতে ফসল উৎপাদন করতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। এর শাস্তি স্বরূপ আমি তাদেরকে আযাবের স্বাদ গ্রহণ করিয়েছি। অর্থাৎ তারা রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল, তখন আমি তাদের দুষ্কার্যের কারণে তাদেরকে শাস্তির যাঁতাকলে পিষ্ট করেছি। এর পর আল্লাহ পাক স্বীয় আদেশের বিরোধিতা এবং পাপকার্যে সাহসিকতা প্রদর্শন করা হতে ভীতি প্রদর্শন করছেন। তিনি বলেনঃ “এই জনপদবাসী কাফিররা কি আমার শাস্তি হতে নিরাপত্তা লাভ করেছে? তারা শুয়েই থাকবে এমতাবস্থায় রাত্রিকালেই আমি তাদের উপর আমার শাস্তি আপতিত করবো। অথবা তারা কি এ থেকে নির্ভয় হয়ে গেছে যে, দিবাভাগের কোন এক সময় শাস্তি তাদেরকে পরিবেষ্টন করবে এবং সেই সময় তারা নিজেদের কাজ কারবারে লিপ্ত থাকবে ও সম্পূর্ণ উদাসীন থাকবে? তারা কি এতটুকুও ভয় করে না যে, আমার প্রতিশোধ তাদেরকে যে কোন সময় পাকড়াও করবে এবং সেই সময় তারা খেল তামাশায় মগ্ন থাকবে? মনে রাখবে যে, হতভাগ্য সম্প্রদায় ছাড়া কেউই আল্লাহর শাস্তি থেকে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। এ জন্যেই হাসান বসরী (রঃ) বলেছেনঃ “মুমিন বান্দা আল্লাহর আনুগত্য করে এবং ভাল কাজ করতে থাকে, এর পরেও সে সদা আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকে। পক্ষান্তরে পাপী ব্যক্তি পাপকার্যে লিপ্ত থাকে আবার এর পরেও সে নিজেকে মাহফুয ও নিরাপদ মনে করে।

আল-আরাফ 7:99

৯৬-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে জনপদবাসীদের ঈমানের স্বল্পতার বর্ণনা দিচ্ছেন যাদের কাছে রাসূলদেরকে প্রেরণ করা হয়েছিল। যেমন আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ “জনপদবাসী কেন ঈমান আনলো না যে, তাদের ঈমান দ্বারা তারা উপকৃত হতো? ইউনুসের কওম এর ব্যতিক্রম ছিল।” অর্থাৎ ইউনুস (আঃ)-এর কওম ছাড়া অন্য কোন জনপদের সমস্ত লোক ঈমান আনেনি। হযরত ইউনুস (আঃ)-এর কওমের সমস্ত লোকই ঈমান এনেছিল এবং ওটা ছিল তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করার পর। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তারা ঈমান আনলো, তখন আমি তাদেরকে সাময়িকভাবে পার্থিব সুখ শান্তি দান করলাম।” যেমন তিনি বলেনঃ “আমি তাকে এক লক্ষ বা তারও বেশী লোকের কাছে নবীরূপে প্রেরণ করেছিলাম।” ইরশাদ হচ্ছে-যদি এই জনপদবাসী ঈমান আনতে এবং তাকওয়া অবলম্বন করতো তবে আমি তাদের উপর আকাশ ও যমীনের বরকত নাযিল করতাম । অর্থাৎ আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করতাম এবং যমীন হতে ফসল উৎপাদন করতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। এর শাস্তি স্বরূপ আমি তাদেরকে আযাবের স্বাদ গ্রহণ করিয়েছি। অর্থাৎ তারা রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল, তখন আমি তাদের দুষ্কার্যের কারণে তাদেরকে শাস্তির যাঁতাকলে পিষ্ট করেছি। এর পর আল্লাহ পাক স্বীয় আদেশের বিরোধিতা এবং পাপকার্যে সাহসিকতা প্রদর্শন করা হতে ভীতি প্রদর্শন করছেন। তিনি বলেনঃ “এই জনপদবাসী কাফিররা কি আমার শাস্তি হতে নিরাপত্তা লাভ করেছে? তারা শুয়েই থাকবে এমতাবস্থায় রাত্রিকালেই আমি তাদের উপর আমার শাস্তি আপতিত করবো। অথবা তারা কি এ থেকে নির্ভয় হয়ে গেছে যে, দিবাভাগের কোন এক সময় শাস্তি তাদেরকে পরিবেষ্টন করবে এবং সেই সময় তারা নিজেদের কাজ কারবারে লিপ্ত থাকবে ও সম্পূর্ণ উদাসীন থাকবে? তারা কি এতটুকুও ভয় করে না যে, আমার প্রতিশোধ তাদেরকে যে কোন সময় পাকড়াও করবে এবং সেই সময় তারা খেল তামাশায় মগ্ন থাকবে? মনে রাখবে যে, হতভাগ্য সম্প্রদায় ছাড়া কেউই আল্লাহর শাস্তি থেকে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। এ জন্যেই হাসান বসরী (রঃ) বলেছেনঃ “মুমিন বান্দা আল্লাহর আনুগত্য করে এবং ভাল কাজ করতে থাকে, এর পরেও সে সদা আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকে। পক্ষান্তরে পাপী ব্যক্তি পাপকার্যে লিপ্ত থাকে আবার এর পরেও সে নিজেকে মাহফুয ও নিরাপদ মনে করে।

আল-আরাফ 7:100

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে-তাদের কাছে কি এটা প্রতীয়মান হয় না যে, আমি (আল্লাহ) ইচ্ছা করলে তাদের পাপের কারণে তাদেরকে শাস্তি দিতে পারি? ইবনে জারীর (রঃ) এর তাফসীরে বলেনঃ কোন এলাকার অধিবাসীকে ধ্বংস করে দেয়ার পর ভূ-পৃষ্ঠে যাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে, যারা তাদেরই স্বভাব গ্রহণ করেছে, তাদেরই মত আমল করেছে এবং তাদেরই মত আল্লাহর অবাধ্য হয়েছে, তাদের কাছে কি এটা প্রতীয়মান হয় না যে, আমি ইচ্ছা করলে তাদেরকেও তাদের পাপের কারণে শাস্তি প্রদান করতে পারি? তাদের এই অবাধ্যতার শাস্তি স্বরূপ আমি তাদের অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেবো। সুতরাং তারা কোন ভাল কথা শুনতেও পাবে না এবং বুঝতেও সক্ষম হবে না। অনুরূপভাবে অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “এ ঘটনা থেকে কি তারা শিক্ষা গ্রহণ করে না যে, তাদের পূর্বে আমি এমন বহু কওমকে ধ্বংস করে দিয়েছি যারা তাদের ঘরবাড়ীতে বসবাস ও চলাফেরা করত? এটা কি বিবেকবানদের জন্যে নিদর্শন নয়?” আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “ইতিপূর্বে কি তোমরা দৃঢ় শপথ করে বলেছিলে না যে, তোমরা ধ্বংস হবেই না? অথচ তারা ধ্বংস হয়েই গেছে। আজ তোমরা ঐসব অত্যাচারীর জায়গা গ্রহণ করছো!” তিনি আরো বলেনঃ “এদের পূর্বে কতই না কওম ধ্বংস হয়ে গেছে, আজ তাদের কোন নাম-নিশানাও নেই, না তাদের কোন শব্দ আজ শোনা যাচ্ছে!” অন্য এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “এরা কি দেখছে না যে, এদের পূর্বে বহু কওম এখানে রাজত্ব করেছে, যে রাজত্ব করার সৌভাগ্য তোমাদের হয়নি, অতঃপর আকাশ থেকে বৃষ্টির শাস্তি নেমে আসলো এবং ভূমির নিম্নদেশ থেকে প্লাবন এসে গেল এবং এর মাধ্যমে তাদের সকলকেই ধ্বংস করে দেয়া হলো। এর পর অন্য কওমকে আমি তাদের জায়গায় বসালাম। আদ সম্প্রদায়ের ধ্বংসের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এখন শুধুমাত্র তাদের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। পাপী ও অপরাধীদের পরিণাম এরূপই হয়ে থাকে। আজ আমি তোমাদেরকে যেখানে বসিয়েছি, একদিন তাদেরকে সেখানে বসিয়েছিলাম। তাদেরকে আমি শ্রবণকারী কান, দর্শনকারী চক্ষু এবং অনুধাবনকারী অন্তর দিয়েছিলাম। কিন্তু তাদের কান, তাদের চক্ষু এবং তাদের অন্তঃকরণ তাদের কোনই উপকার করেনি। কেননা, তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে বসে এবং যে উপহাস তারা করে তার শাস্তি তারা পেয়ে যায়। তোমাদের সরযমীনের চতুষ্পর্শ্বের কতইনা বসতি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং কতইনা নিদর্শনের হেরফের হয়েছে! তোমরা চিন্তা করে দেখো, হয়তো কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে।” আল্লাহ পাক আরো বলেনঃ “এদের পূর্ববর্তী লোকেরা রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল, সুতরাং তাদেরকে কেমন পরিণতি দেখতে হয়েছিল! তোমরা তো তাদের দশ ভাগের এক ভাগ শক্তিরও অধিকারী নও।” অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ “কতইনা লোকালয়কে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি, ওগুলোর অধিবাসীরা ছিল অত্যাচারী, তাদের ঘরের ছাদগুলো পড়ে গিয়েছিলো, কূপগুলো অকেজো হয়ে পড়েছিল, বড় বড় অট্টালিকাগুলো বিরান হয়ে গিয়েছিল।” আরো বলেনঃ “তারা ভূ-পৃষ্ঠে ঘুরেফিরে দেখে না কেন? তাহলে তারা অনুধাবনকারী অন্তর এবং শ্রবণকারী কান লাভ করতো, কেননা, তাদের চক্ষুগুলো অন্ধ নয়। বরং তাদের সেই অন্তর অন্ধ যা বক্ষের মধ্যে রয়েছে। আর এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “রাসূলদের সাথে উপহাস করা হয়েছিল, তখন তাদের সেই উপহাসের শাস্তি তাদের প্রতি নাযিল হয়েছিল। মোটকথা, এই ধরনের বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো আল্লাহর শত্রুদের প্রতি প্রতিশোধ গ্রহণ এবং তাঁর বন্ধুদের প্রতি অনুগ্রহ করার উপর আলোকপাত করে।

আল-আরাফ 7:101

১০১-১০২ নং আয়াতের তাফসীর: নূহ (আঃ), হূদ (আঃ), সালিহ্ (আঃ), লূত (আঃ) ও শশাআ’ইব (আঃ)-এর কওমের ধ্বংস সাধন, মুমিনদেরকে রক্ষাকরণ, রাসূলদের মাধ্যমে মু'জিযা ও দলীল প্রমাণাদি পেশ করতঃ হুজ্জত পূর্ণকরণ ইত্যাদি বিষয়ের বর্ণনা দেয়ার পর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! ঐ বস্তিগুলোর অবস্থার কথা আমি তোমাকে শুনিয়ে দিচ্ছি। তাদের কাছে নবী রাসূলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী নিয়ে আগমন করেছিল। আমি তো রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে হুজ্জত পূর্ণ করা ছাড়া কখনও কাউকে শাস্তি প্রদান করি না। এটা হচ্ছে ঐ বস্তিগুলোর ঘটনা যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো এখনও বিদ্যমান রয়েছে এবং কতকগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি এটা করে তাদের উপর অত্যাচার করিনি, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের উপর অত্যাচার করেছিল। এজন্যে তারা নিজেরাই দায়ী।(আরবী) অর্থাৎ পূর্বে তারা যা প্রত্যাখ্যান করেছিল তার প্রতি তারা ঈমান আনবার ছিল না। (আরবী) -এর (আরবী) অক্ষরটি হচ্ছে কারণ প্রকাশক। অর্থাৎ অহীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কারণে তারা ঈমান আনয়ন করার হকদারই থাকলো না। যেমন অন্যত্র তিনি বলেনঃ “তোমরা তো জানই যে, মু'জিযা পেশ করলেও এরা ঈমান আনবে না।” এ জন্যেই এখানে তিনি বলেনঃ “এভাবেই আল্লাহ অবিশ্বাসীদের অন্তঃকরণের উপর মোহর লাগিয়ে দেন।আমি তাদের অধিকাংশকে অর্থাৎ পূর্ববর্তী উম্মতের অধিকাংশকে অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারীরূপে পাইনি, বরং অধিকাংশকে পাপাচারীরূপে পেয়েছি। তারা ছিল আনুগত্য স্বীকার ও হুকুম মেনে চলার বহির্ভূত। এটা ছিল ঐ অঙ্গীকার যা রোযে আযলে আল্লাহ তা'আলা তাদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলেন। ওরই উপর তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে এবং ঐ কথাটিই তাদের প্রকৃতি ও স্বভাবের মধ্যেও রাখা হয়েছে। সেই অঙ্গীকার ছিল এই-আল্লাহই হচ্ছেন তাদের প্রতিপালক ও মালিক। তিনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। এটা তারা স্বীকার করেও নিয়েছিল এবং সাক্ষ্য প্রদানও করেছিল। কিন্তু পরে তারা এর বিরুদ্ধাচরণ করতঃ ঐ অঙ্গীকারকে পৃষ্ঠ-পিছনে নিক্ষেপ করে এবং আল্লাহর সাথে অন্যদেরকেও শরীক করতে শুরু করে, যার না আছে কোন দলীল, না আছে। কোন ইজ্জত। এটা জ্ঞান ও শরীয়ত উভয়েরই পরিপন্থী । নিষ্কলুষ প্রতি তো এই প্রতিমা পূজাকে সমর্থন করে না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত নবী ও রাসূল এই প্রতিমা পূজা থেকে মানুষকে বিরত রেখেছেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে। যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি আমার বান্দাদেরকে মূর্তিপূজা থেকে পৃথক করে সৃষ্টি করেছিলাম। অতঃপর শয়তান এসে তাদেরকে সত্য দ্বীন থেকে সরিয়ে দেয় এবং আমি যা কিছু হালাল করেছিলাম তা তারা হারাম করে নেয়।" সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক সন্তান স্বীয় ইসলামী প্রকৃতির উপর সৃষ্ট হয় । কিন্তু তার (ইয়াহূদী বা খ্রীষ্টান) পিতামাতাই তাকে ইয়াহূদী বা খ্রীষ্টান অথবা মাজুসী বানিয়ে দেয়।” আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সম্মানিত গ্রন্থে বলেনঃ “আমি তোমাদের পূর্বে যতজন নবী পাঠিয়েছি তারা সবাই (আরবী)-এর তলকীন করতে থেকেছে।” ইরশাদ হচ্ছে- হে মুহাম্মাদ (সঃ!)। তোমার পূর্বে আমি যে রাসূলদেরকে পাঠিয়েছিলাম তাদেরকে আমি জিজ্ঞেস করবো- আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও কি উপাসনার যোগ্য বলা হয়েছিল? আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “প্রত্যেক কওমের কাছে রাসূল পাঠিয়ে আমি বলেছিলাম- তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করবে এবং তাগুত ও শয়তান থেকে দূরে থাকবে।”এই ধরনের বহু আয়াত রয়েছে। (আরবী) -এই আয়াত সম্পর্কে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, অঙ্গীকার গ্রহণের দিন বান্দাগণ আল্লাহর একত্ববাদকে যে স্বীকার করে নিয়েছিল তা আল্লাহর গোচরে রয়েছে। এজন্যে আল্লাহর ইলমের ভিত্তিতেই তারা ঈমান আনছে না এবং এটাই হতে রয়েছে যে, দলীল প্রমাণাদি সামনে থাকা সত্ত্বেও তারা ঈমান আনছে না, যদিও তারা অঙ্গীকার গ্রহণের দিন ঈমান কবুল করেছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা জানতেন যে, ওটা তাদের আন্তরিকতার সাথে ছিল না। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি তাদেরকে দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয় তবে পুনরায় তারা মূর্তিপূজা, শিরক ও পাপকার্য করতে থাকবে যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল।”

আল-আরাফ 7:102

১০১-১০২ নং আয়াতের তাফসীর: নূহ (আঃ), হূদ (আঃ), সালিহ্ (আঃ), লূত (আঃ) ও শশাআ’ইব (আঃ)-এর কওমের ধ্বংস সাধন, মুমিনদেরকে রক্ষাকরণ, রাসূলদের মাধ্যমে মু'জিযা ও দলীল প্রমাণাদি পেশ করতঃ হুজ্জত পূর্ণকরণ ইত্যাদি বিষয়ের বর্ণনা দেয়ার পর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! ঐ বস্তিগুলোর অবস্থার কথা আমি তোমাকে শুনিয়ে দিচ্ছি। তাদের কাছে নবী রাসূলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী নিয়ে আগমন করেছিল। আমি তো রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে হুজ্জত পূর্ণ করা ছাড়া কখনও কাউকে শাস্তি প্রদান করি না। এটা হচ্ছে ঐ বস্তিগুলোর ঘটনা যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো এখনও বিদ্যমান রয়েছে এবং কতকগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি এটা করে তাদের উপর অত্যাচার করিনি, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের উপর অত্যাচার করেছিল। এজন্যে তারা নিজেরাই দায়ী।(আরবী) অর্থাৎ পূর্বে তারা যা প্রত্যাখ্যান করেছিল তার প্রতি তারা ঈমান আনবার ছিল না। (আরবী) -এর (আরবী) অক্ষরটি হচ্ছে কারণ প্রকাশক। অর্থাৎ অহীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কারণে তারা ঈমান আনয়ন করার হকদারই থাকলো না। যেমন অন্যত্র তিনি বলেনঃ “তোমরা তো জানই যে, মু'জিযা পেশ করলেও এরা ঈমান আনবে না।” এ জন্যেই এখানে তিনি বলেনঃ “এভাবেই আল্লাহ অবিশ্বাসীদের অন্তঃকরণের উপর মোহর লাগিয়ে দেন।আমি তাদের অধিকাংশকে অর্থাৎ পূর্ববর্তী উম্মতের অধিকাংশকে অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারীরূপে পাইনি, বরং অধিকাংশকে পাপাচারীরূপে পেয়েছি। তারা ছিল আনুগত্য স্বীকার ও হুকুম মেনে চলার বহির্ভূত। এটা ছিল ঐ অঙ্গীকার যা রোযে আযলে আল্লাহ তা'আলা তাদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলেন। ওরই উপর তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে এবং ঐ কথাটিই তাদের প্রকৃতি ও স্বভাবের মধ্যেও রাখা হয়েছে। সেই অঙ্গীকার ছিল এই-আল্লাহই হচ্ছেন তাদের প্রতিপালক ও মালিক। তিনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। এটা তারা স্বীকার করেও নিয়েছিল এবং সাক্ষ্য প্রদানও করেছিল। কিন্তু পরে তারা এর বিরুদ্ধাচরণ করতঃ ঐ অঙ্গীকারকে পৃষ্ঠ-পিছনে নিক্ষেপ করে এবং আল্লাহর সাথে অন্যদেরকেও শরীক করতে শুরু করে, যার না আছে কোন দলীল, না আছে। কোন ইজ্জত। এটা জ্ঞান ও শরীয়ত উভয়েরই পরিপন্থী । নিষ্কলুষ প্রতি তো এই প্রতিমা পূজাকে সমর্থন করে না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত নবী ও রাসূল এই প্রতিমা পূজা থেকে মানুষকে বিরত রেখেছেন। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছে। যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি আমার বান্দাদেরকে মূর্তিপূজা থেকে পৃথক করে সৃষ্টি করেছিলাম। অতঃপর শয়তান এসে তাদেরকে সত্য দ্বীন থেকে সরিয়ে দেয় এবং আমি যা কিছু হালাল করেছিলাম তা তারা হারাম করে নেয়।" সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক সন্তান স্বীয় ইসলামী প্রকৃতির উপর সৃষ্ট হয় । কিন্তু তার (ইয়াহূদী বা খ্রীষ্টান) পিতামাতাই তাকে ইয়াহূদী বা খ্রীষ্টান অথবা মাজুসী বানিয়ে দেয়।” আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সম্মানিত গ্রন্থে বলেনঃ “আমি তোমাদের পূর্বে যতজন নবী পাঠিয়েছি তারা সবাই (আরবী)-এর তলকীন করতে থেকেছে।” ইরশাদ হচ্ছে- হে মুহাম্মাদ (সঃ!)। তোমার পূর্বে আমি যে রাসূলদেরকে পাঠিয়েছিলাম তাদেরকে আমি জিজ্ঞেস করবো- আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও কি উপাসনার যোগ্য বলা হয়েছিল? আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “প্রত্যেক কওমের কাছে রাসূল পাঠিয়ে আমি বলেছিলাম- তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করবে এবং তাগুত ও শয়তান থেকে দূরে থাকবে।”এই ধরনের বহু আয়াত রয়েছে। (আরবী) -এই আয়াত সম্পর্কে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, অঙ্গীকার গ্রহণের দিন বান্দাগণ আল্লাহর একত্ববাদকে যে স্বীকার করে নিয়েছিল তা আল্লাহর গোচরে রয়েছে। এজন্যে আল্লাহর ইলমের ভিত্তিতেই তারা ঈমান আনছে না এবং এটাই হতে রয়েছে যে, দলীল প্রমাণাদি সামনে থাকা সত্ত্বেও তারা ঈমান আনছে না, যদিও তারা অঙ্গীকার গ্রহণের দিন ঈমান কবুল করেছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা জানতেন যে, ওটা তাদের আন্তরিকতার সাথে ছিল না। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি তাদেরকে দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয় তবে পুনরায় তারা মূর্তিপূজা, শিরক ও পাপকার্য করতে থাকবে যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল।”

আল-আরাফ 7:103

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ পুর্ববর্তী রাসূল নূহ (আঃ), হূদ (আঃ), সালিহ (আঃ), লূত (আঃ) এবং শো'আইব (আঃ)-এর পরে আমি মূসা (আঃ)-কে আমার সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ ফিরাউনের নিকট পাঠিয়েছিলাম। ফিরাউন ছিল মিসরের বাদশাহ। সে এবং তার লোকজন অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তারা ঔদ্ধত্য ও অবাধ্যতার কারণে অস্বীকার করে, অথচ তাদের অন্তঃকরণ বিশ্বাস করে।” অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি লক্ষ্য কর যে, যারা আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে সরিয়ে দিয়েছে এবং রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, আমি তাদেরকে কেমন শাস্তিই না দিয়েছি! মূসা (আঃ)-এর চোখের সামনে আমি তাদেরকে ডুবিয়ে দিয়েছি। দেখ, সেই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণতি কি হয়েছিল! ফিরাউন ও তার লোকজনকে শাস্তি প্রদান এবং আল্লাহর বন্ধু মূসা (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীয় মুমিনদেরকে সান্ত্বনা দানের বর্ণনা কি সুন্দরভাবে দেয়া হয়েছে!

আল-আরাফ 7:104

১০৪-১০৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা মূসা (আঃ) ও ফিরাউনের মধ্যকার মুনাযারা বা তর্ক-বিতর্কের সংবাদ দিচ্ছেন। ফিরাউনের দরবারে ও তার সম্প্রদায়ের কিবতীদের সামনে স্পষ্ট নিদর্শনাবলী প্রকাশ করা হচ্ছে এবং দলীল ও হুজ্জত পেশ করা হচ্ছে। মূসা (আঃ) ফিরাউনকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে ফিরাউন! আমি সেই আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি যিনি সারা জাহানের সৃষ্টিকর্তা এবং সব কিছুরই মালিক। আমার অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে সত্য কথা পেশ করা। কেউ কেউ (আরবী) -এর অর্থ (আরবী) নিয়েছেন এবং বলেছেন যে, (আরবী) ও (আরবী) অক্ষর দু’টি একে অপরের পরিবর্তে এসে থাকে। যেমন (আরবী) অথবা (আরবী) এবং (আরবী) বা (আরবী) ব্যবহৃত হয়। আবার কোন কোন মুফাসসির (আরবী) দ্বারা (আরবী) উদ্দেশ্য বা ভাব নিয়েছেন। অর্থাৎ 'আমি সত্য কথা বলারই লোভী। কোন কোন মাদানী মুফাসসির বলেন যে, এ শব্দটি (আরবী) না হয়ে (আরবী) হবে। তখন অর্থ হবে- “আমার উপর ওয়াজিব ও হক যে, আমি সত্য কথা ছাড়া অন্য কিছুই বলবো না। আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে। অকাট্য দলীল প্রমাণাদি নিয়ে তোমাদের নিকট আগমন করেছি। বানী ইসরাঈলকে আমার সাথে দিয়ে দাও। তাদেরকে বন্দী জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে স্বাধীন জীবন দান কর। কেননা, তারা হচ্ছে ইসরাঈল (আঃ) অর্থাৎ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক (আঃ)-এর বংশধর।” তখন ফিরাউন বললো- “আমি তোমার রিসালাত ও নবুওয়াতের দাবী মানি না। যদি তুমি সত্য সত্যই নবী হও এবং কোন মু'জিযা এনে থাক তবে তা প্রদর্শন কর। তাহলে তোমার কথা ও দাবী সত্য বলে মেনে নেয়া যেতে পারে।”

আল-আরাফ 7:105

১০৪-১০৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা মূসা (আঃ) ও ফিরাউনের মধ্যকার মুনাযারা বা তর্ক-বিতর্কের সংবাদ দিচ্ছেন। ফিরাউনের দরবারে ও তার সম্প্রদায়ের কিবতীদের সামনে স্পষ্ট নিদর্শনাবলী প্রকাশ করা হচ্ছে এবং দলীল ও হুজ্জত পেশ করা হচ্ছে। মূসা (আঃ) ফিরাউনকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে ফিরাউন! আমি সেই আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি যিনি সারা জাহানের সৃষ্টিকর্তা এবং সব কিছুরই মালিক। আমার অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে সত্য কথা পেশ করা। কেউ কেউ (আরবী) -এর অর্থ (আরবী) নিয়েছেন এবং বলেছেন যে, (আরবী) ও (আরবী) অক্ষর দু’টি একে অপরের পরিবর্তে এসে থাকে। যেমন (আরবী) অথবা (আরবী) এবং (আরবী) বা (আরবী) ব্যবহৃত হয়। আবার কোন কোন মুফাসসির (আরবী) দ্বারা (আরবী) উদ্দেশ্য বা ভাব নিয়েছেন। অর্থাৎ 'আমি সত্য কথা বলারই লোভী। কোন কোন মাদানী মুফাসসির বলেন যে, এ শব্দটি (আরবী) না হয়ে (আরবী) হবে। তখন অর্থ হবে- “আমার উপর ওয়াজিব ও হক যে, আমি সত্য কথা ছাড়া অন্য কিছুই বলবো না। আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে। অকাট্য দলীল প্রমাণাদি নিয়ে তোমাদের নিকট আগমন করেছি। বানী ইসরাঈলকে আমার সাথে দিয়ে দাও। তাদেরকে বন্দী জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে স্বাধীন জীবন দান কর। কেননা, তারা হচ্ছে ইসরাঈল (আঃ) অর্থাৎ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক (আঃ)-এর বংশধর।” তখন ফিরাউন বললো- “আমি তোমার রিসালাত ও নবুওয়াতের দাবী মানি না। যদি তুমি সত্য সত্যই নবী হও এবং কোন মু'জিযা এনে থাক তবে তা প্রদর্শন কর। তাহলে তোমার কথা ও দাবী সত্য বলে মেনে নেয়া যেতে পারে।”

আল-আরাফ 7:106

১০৪-১০৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা মূসা (আঃ) ও ফিরাউনের মধ্যকার মুনাযারা বা তর্ক-বিতর্কের সংবাদ দিচ্ছেন। ফিরাউনের দরবারে ও তার সম্প্রদায়ের কিবতীদের সামনে স্পষ্ট নিদর্শনাবলী প্রকাশ করা হচ্ছে এবং দলীল ও হুজ্জত পেশ করা হচ্ছে। মূসা (আঃ) ফিরাউনকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে ফিরাউন! আমি সেই আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি যিনি সারা জাহানের সৃষ্টিকর্তা এবং সব কিছুরই মালিক। আমার অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে সত্য কথা পেশ করা। কেউ কেউ (আরবী) -এর অর্থ (আরবী) নিয়েছেন এবং বলেছেন যে, (আরবী) ও (আরবী) অক্ষর দু’টি একে অপরের পরিবর্তে এসে থাকে। যেমন (আরবী) অথবা (আরবী) এবং (আরবী) বা (আরবী) ব্যবহৃত হয়। আবার কোন কোন মুফাসসির (আরবী) দ্বারা (আরবী) উদ্দেশ্য বা ভাব নিয়েছেন। অর্থাৎ 'আমি সত্য কথা বলারই লোভী। কোন কোন মাদানী মুফাসসির বলেন যে, এ শব্দটি (আরবী) না হয়ে (আরবী) হবে। তখন অর্থ হবে- “আমার উপর ওয়াজিব ও হক যে, আমি সত্য কথা ছাড়া অন্য কিছুই বলবো না। আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে। অকাট্য দলীল প্রমাণাদি নিয়ে তোমাদের নিকট আগমন করেছি। বানী ইসরাঈলকে আমার সাথে দিয়ে দাও। তাদেরকে বন্দী জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে স্বাধীন জীবন দান কর। কেননা, তারা হচ্ছে ইসরাঈল (আঃ) অর্থাৎ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক (আঃ)-এর বংশধর।” তখন ফিরাউন বললো- “আমি তোমার রিসালাত ও নবুওয়াতের দাবী মানি না। যদি তুমি সত্য সত্যই নবী হও এবং কোন মু'জিযা এনে থাক তবে তা প্রদর্শন কর। তাহলে তোমার কথা ও দাবী সত্য বলে মেনে নেয়া যেতে পারে।”

আল-আরাফ 7:107

১০৭-১০৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় লাঠিখানা সামনে নিক্ষেপ করলেন। তখনই ওটা আল্লাহর কুদরতে একটা বিরাট অজগর সাপে পরিণত হলো এবং ফিরাউনের দিকে বেগে ধাবিত হলো। ফিরাউন তখন সিংহাসন থেকে লাফিয়ে পড়লো এবং চীকার করে হযরত মূসা (আঃ)-কে বলে উঠলোঃ “হে মূসা (আঃ)! ওকে টেনে নাও।' তিনি তখন ওকে টেনে ধরলেন। তৎক্ষণাৎ ওটা লাঠি হায়ে গেলো। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যখন ঐ সাপটি হা করলো তখন ওর নীচের চোয়াল ছিল মাটিতে এবং উপরের চোয়াল ছিল দালানের দেয়ালের উপর। যখন ওটা ফিরাউনের দিকে ধাবিত হলো তখন সে কেঁপে উঠলো ও লাফিয়ে পড়ে পালাতে লাগলো এবং চীকার করে বলে উঠলো- “হে মূসা (আঃ)! ওকে ধরে নাও। আমি তোমার উপর ঈমান আনছি এবং বানী ইসরাঈলকে তোমার সাথে পাঠিয়ে দিচ্ছি।” হযরত মূসা (আঃ) তখন ওটাকে ধরে নিলেন। তেমনই ওটা পুনরায় লাঠি হয়ে গেল। মূসা (আঃ) যখন ফিরাউনের কাছে এসেছিলেন তখন সে বলেছিলঃ “হে মূসা (আঃ)! তুমি কে তা আমি বলবো কি?” হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ হ্যাঁ, বল। সে বললোঃ “তুমি তো ঐ ব্যক্তিই যে আমার কাছেই লালিত পালিত হয়ে বড় হয়েছে” হযরত মূসা (আঃ) তার উত্তর দিয়ে দিলে সে তাঁকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়। মূসা (আঃ) তখন তার লাঠিখানা মাটিতে নিক্ষেপ করেন। তৎক্ষণাৎ ওটা বিরাট এক অজগরে পরিণত হয়ে চলতে শুরু করে এবং জনগণের উপর আক্রমণ করে বসে। জনগণের মধ্যে হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। ঐ হুড় হাঙ্গামার মধ্যে পঁচিশ হাজার লোক প্রাণ হারায়। ফিরাউন পালিয়ে গিয়ে স্বীয় প্রাসাদে প্রবেশ করে। এই বর্ণনাটি খুবই দুর্বল। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।এখন ইরশাদ হচ্ছে-মূসা (আঃ)-এর দ্বিতীয় মু'জিযা ছিল এই যে, যখন তিনি জামার মধ্যে হাত ভরে তা বের করতেন তখন ওটা সীমাহীন আলোকময় হয়ে উঠতো এবং এমন চাকচিক্যময় ও উজ্জ্বল হতো যে, ওর দিকে চোখ ধরা যেতো না। ওর আলোর মধ্যে কোনই ক্রটি ছিল না। যখন তিনি তাঁর সেই হাতকে আস্তিনের মধ্যে প্রবেশ করাতেন তখন ওটা পূর্বরূপ ধারণ করতো।

আল-আরাফ 7:108

১০৭-১০৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত মূসা (আঃ) স্বীয় লাঠিখানা সামনে নিক্ষেপ করলেন। তখনই ওটা আল্লাহর কুদরতে একটা বিরাট অজগর সাপে পরিণত হলো এবং ফিরাউনের দিকে বেগে ধাবিত হলো। ফিরাউন তখন সিংহাসন থেকে লাফিয়ে পড়লো এবং চীকার করে হযরত মূসা (আঃ)-কে বলে উঠলোঃ “হে মূসা (আঃ)! ওকে টেনে নাও।' তিনি তখন ওকে টেনে ধরলেন। তৎক্ষণাৎ ওটা লাঠি হায়ে গেলো। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যখন ঐ সাপটি হা করলো তখন ওর নীচের চোয়াল ছিল মাটিতে এবং উপরের চোয়াল ছিল দালানের দেয়ালের উপর। যখন ওটা ফিরাউনের দিকে ধাবিত হলো তখন সে কেঁপে উঠলো ও লাফিয়ে পড়ে পালাতে লাগলো এবং চীকার করে বলে উঠলো- “হে মূসা (আঃ)! ওকে ধরে নাও। আমি তোমার উপর ঈমান আনছি এবং বানী ইসরাঈলকে তোমার সাথে পাঠিয়ে দিচ্ছি।” হযরত মূসা (আঃ) তখন ওটাকে ধরে নিলেন। তেমনই ওটা পুনরায় লাঠি হয়ে গেল। মূসা (আঃ) যখন ফিরাউনের কাছে এসেছিলেন তখন সে বলেছিলঃ “হে মূসা (আঃ)! তুমি কে তা আমি বলবো কি?” হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ হ্যাঁ, বল। সে বললোঃ “তুমি তো ঐ ব্যক্তিই যে আমার কাছেই লালিত পালিত হয়ে বড় হয়েছে” হযরত মূসা (আঃ) তার উত্তর দিয়ে দিলে সে তাঁকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়। মূসা (আঃ) তখন তার লাঠিখানা মাটিতে নিক্ষেপ করেন। তৎক্ষণাৎ ওটা বিরাট এক অজগরে পরিণত হয়ে চলতে শুরু করে এবং জনগণের উপর আক্রমণ করে বসে। জনগণের মধ্যে হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। ঐ হুড় হাঙ্গামার মধ্যে পঁচিশ হাজার লোক প্রাণ হারায়। ফিরাউন পালিয়ে গিয়ে স্বীয় প্রাসাদে প্রবেশ করে। এই বর্ণনাটি খুবই দুর্বল। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।এখন ইরশাদ হচ্ছে-মূসা (আঃ)-এর দ্বিতীয় মু'জিযা ছিল এই যে, যখন তিনি জামার মধ্যে হাত ভরে তা বের করতেন তখন ওটা সীমাহীন আলোকময় হয়ে উঠতো এবং এমন চাকচিক্যময় ও উজ্জ্বল হতো যে, ওর দিকে চোখ ধরা যেতো না। ওর আলোর মধ্যে কোনই ক্রটি ছিল না। যখন তিনি তাঁর সেই হাতকে আস্তিনের মধ্যে প্রবেশ করাতেন তখন ওটা পূর্বরূপ ধারণ করতো।

আল-আরাফ 7:109

১০৯-১১০ নং আয়াতের তাফসীর: যখন ঐ লোকদের ভয় দূরীভূত হলো এবং স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসলো তখন ফিরাউন তার সভাষদবর্গকে একত্রিত করে বললোঃ মূসা তো একজন বড় সুদক্ষ যাদুকর। দরবারের লোকেরা সবাই তার কথা সমর্থন করলো এবং পরামর্শের জন্যে বসে পড়লো যে, এখন এই ব্যাপারে কি করা যায়? কিভাবে মূসা (আঃ)-এর আলো নিবিয়ে দেয়া যায়? কিরূপেই বা তাকে বশীভূত করা যায়? সে যে মিথ্যাবাদী এ কথা প্রমাণ করার তদবীর কি আছে? তারা আশঙ্কা করলো যে, জনগণ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার যাদুর দিকে ঝুঁকে পড়বে। ফলে তিনি জয়যুক্ত হবেন এবং তাদেরকে তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিবেন। কিন্তু যে বিষয়ে তারা আশঙ্কা করছিল সেটাই হয়ে পড়লো। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “ফিরাউন ও হামান ঐ ভয়েরই সম্মুখীন হলো যে ভয় তারা করছিল।” যখন ঐ লোকগুলো হযরত মূসা (আঃ)-এর ব্যাপারে পরামর্শের কাজ শেষ করলো তখন সর্বসম্মতিক্রমে তাদের একটা সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, যার বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতে দিচ্ছেন।

আল-আরাফ 7:110

১০৯-১১০ নং আয়াতের তাফসীর: যখন ঐ লোকদের ভয় দূরীভূত হলো এবং স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসলো তখন ফিরাউন তার সভাষদবর্গকে একত্রিত করে বললোঃ মূসা তো একজন বড় সুদক্ষ যাদুকর। দরবারের লোকেরা সবাই তার কথা সমর্থন করলো এবং পরামর্শের জন্যে বসে পড়লো যে, এখন এই ব্যাপারে কি করা যায়? কিভাবে মূসা (আঃ)-এর আলো নিবিয়ে দেয়া যায়? কিরূপেই বা তাকে বশীভূত করা যায়? সে যে মিথ্যাবাদী এ কথা প্রমাণ করার তদবীর কি আছে? তারা আশঙ্কা করলো যে, জনগণ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার যাদুর দিকে ঝুঁকে পড়বে। ফলে তিনি জয়যুক্ত হবেন এবং তাদেরকে তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিবেন। কিন্তু যে বিষয়ে তারা আশঙ্কা করছিল সেটাই হয়ে পড়লো। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “ফিরাউন ও হামান ঐ ভয়েরই সম্মুখীন হলো যে ভয় তারা করছিল।” যখন ঐ লোকগুলো হযরত মূসা (আঃ)-এর ব্যাপারে পরামর্শের কাজ শেষ করলো তখন সর্বসম্মতিক্রমে তাদের একটা সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, যার বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতে দিচ্ছেন।

আল-আরাফ 7:111

১১১-১১২ নং আয়াতের তাফসীর: সভাষদরা ফিরাউনকে পরামর্শ দিলো যে, মূসা (আঃ) এবং তাঁর ভাই হারূন (আঃ)-কে বন্দী রাখা হাক এবং রাজ্যের সমস্ত শহরে লোক পাঠিয়ে প্রসিদ্ধ যাদুকরদেরকে একত্রিত করা হাক। সেই যুগে যাদুর খুবই প্রচলন ছিল। সবারই এটা ধারণা হয়ে গেল যে, মূসা (আঃ)-এর এই মুজিযা ছিল যাদু ও প্রতারণা। সুতরাং সে (ফিরাউন) এ বিষয়ে মূসা (আঃ)-এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্যে সমস্ত যাদুকরকে একত্রিত করলো। যেমন আল্লাহ পাক ফিরাউনের কথা নকল করে বলেনঃ “হে মূসা (আঃ)! তুমি তোমার যাদুবলে আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বের করে দেয়ার ইচ্ছা করছে। আমরাও তোমারই মত যাদু দ্বারা তোমার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই। সুতরাং এখন যাদু পরীক্ষার একটা দিন ধার্য কর। তুমিও এর বাইরে যাবে না, আমরাও না।” তখন মূসা (আঃ) বললেনঃ “ঈদের দিন সকালে সমস্ত লোককে একত্রিত করা হাক।” তখন ফিরাউন প্রতারণামূলক তদবীর শুরু করে দিলো। শেষ পর্যন্ত সেই নির্ধারিত দিন এসে পড়লো। তাই আল্লাহ পাক নিম্নে ইরশাদ করছেন-

আল-আরাফ 7:112

১১১-১১২ নং আয়াতের তাফসীর: সভাষদরা ফিরাউনকে পরামর্শ দিলো যে, মূসা (আঃ) এবং তাঁর ভাই হারূন (আঃ)-কে বন্দী রাখা হাক এবং রাজ্যের সমস্ত শহরে লোক পাঠিয়ে প্রসিদ্ধ যাদুকরদেরকে একত্রিত করা হাক। সেই যুগে যাদুর খুবই প্রচলন ছিল। সবারই এটা ধারণা হয়ে গেল যে, মূসা (আঃ)-এর এই মুজিযা ছিল যাদু ও প্রতারণা। সুতরাং সে (ফিরাউন) এ বিষয়ে মূসা (আঃ)-এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্যে সমস্ত যাদুকরকে একত্রিত করলো। যেমন আল্লাহ পাক ফিরাউনের কথা নকল করে বলেনঃ “হে মূসা (আঃ)! তুমি তোমার যাদুবলে আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বের করে দেয়ার ইচ্ছা করছে। আমরাও তোমারই মত যাদু দ্বারা তোমার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই। সুতরাং এখন যাদু পরীক্ষার একটা দিন ধার্য কর। তুমিও এর বাইরে যাবে না, আমরাও না।” তখন মূসা (আঃ) বললেনঃ “ঈদের দিন সকালে সমস্ত লোককে একত্রিত করা হাক।” তখন ফিরাউন প্রতারণামূলক তদবীর শুরু করে দিলো। শেষ পর্যন্ত সেই নির্ধারিত দিন এসে পড়লো। তাই আল্লাহ পাক নিম্নে ইরশাদ করছেন-

আল-আরাফ 7:113

১১৩-১১৪ নং আয়াতের তাফসীর: যে যাদুকররা হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্যে হাযির হয়েছিল তাদের মধ্যে এবং ফিরাউনের মধ্যে যে শর্ত হয়েছিল, আল্লাহ তা'আলা এখানে ওরই সংবাদ দিচ্ছেন। ফিরাউন যাদুকরদের সাথে ওয়াদা করেছিল যে, যদি তারা মূসা (আঃ)-এর উপর জয়যুক্ত হতে পুরস্কার দেয়া হবে এবং তারা যা চাবে তাই পাবে। তাছাড়া তাদেরকে দরবারের নিকটতম ব্যক্তি রূপে গণ্য করা হবে। যখনই সেই যাদুকরগণ ফিরাউনের কাছে ওয়াদা নিয়ে নিলো তখন তারা হযরত মূসা (আঃ)-কে বললোঃ

আল-আরাফ 7:114

১১৩-১১৪ নং আয়াতের তাফসীর: যে যাদুকররা হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্যে হাযির হয়েছিল তাদের মধ্যে এবং ফিরাউনের মধ্যে যে শর্ত হয়েছিল, আল্লাহ তা'আলা এখানে ওরই সংবাদ দিচ্ছেন। ফিরাউন যাদুকরদের সাথে ওয়াদা করেছিল যে, যদি তারা মূসা (আঃ)-এর উপর জয়যুক্ত হতে পুরস্কার দেয়া হবে এবং তারা যা চাবে তাই পাবে। তাছাড়া তাদেরকে দরবারের নিকটতম ব্যক্তি রূপে গণ্য করা হবে। যখনই সেই যাদুকরগণ ফিরাউনের কাছে ওয়াদা নিয়ে নিলো তখন তারা হযরত মূসা (আঃ)-কে বললোঃ

আল-আরাফ 7:115

১১৫-১১৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে হযরত মূসা (আঃ) ও যাদুকরদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংগ্রাম সম্পর্কীয় কথোপকথনের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। যাদুকররা হযরত মূসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! তুমিই কি প্রথমে তোমার বিস্ময়কর বস্তু নিক্ষেপ করবে, না আমরাই প্রথমে নিক্ষেপ করবো?” হযরত মূসা (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “তোমরাই প্রথমে নিক্ষেপ কর।” এতে মূসা (আঃ)-এর নিপুণতা এই ছিল যে, প্রথমে জনগণ যাদুকরদের কলাকৌশল পর্যবেক্ষণ করবে এবং ঐ ব্যাপারে চিন্তা গবেষণা করবে। যখন তাদের এই প্রতারণামূলক কার্যকলাপের মহড়া শেষ হবে তখন তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর সত্য ও বাস্তব কার্যকলাপের দিকে মনোযোগ দেবে যার জন্যে তারা অপেক্ষমান ছিল এবং সেটা তখন স্পষ্টরূপে তাদের সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়বে। কেননা, সত্য ও বাস্তব জিনিস অনুসন্ধানের পর তা প্রাপ্ত হলে সেটা অন্তরের উপর বেশী দাগ কেটে থাকে। আর হলোও তাই। এখন আল্লাহ বলেনঃ “যখন যাদুকরগণ তাদের দড়ি ও লাঠিগুলো মাটিতে নিক্ষেপ করলো তখন তারা যাদুর মাধ্যমে দর্শকদের নযরবন্দী করে দিলো। তারা তখন এমনভাবে দেখতে থাকলো যে, যা কিছু তারা দেখতে আছে তা যেন সবই বাস্তব। অথচ ঐ লাঠিগুলো ও রজ্জ্বগুলো প্রকৃতপক্ষে লাঠি ও রজ্জ্বই ছিল। দর্শকদের শুধুমাত্র এটা ধারণা ও খেয়াল ছিল যে, ঐগুলো সাপ।” তাই ইরশাদ হচ্ছে- “তাদের যাদুর কারণে মনে হচ্ছিল যে, ওগুলো পিল পিল করে চলছে। এ দেখে মূসা (আঃ) আতংকিত হয়। তখন আমি (আল্লাহ) বললাম, ভয় করো না, জয়যুক্ত তুমিই হবে। তোমার লাঠিখানা তুমিও মাটিতে ফেলে দাও। এটা সাপ হয়ে গিয়ে ঐ সাপগুলোকে গিলে ফেলবে। এ যাদু তো প্রতারণা মাত্র। এই যাদুকরগণ কৃতকার্য হতে পারে না।” মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, পনেরো হাজার যাদুকর সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিল। প্রত্যেক যাদুকরের সাথেই দড়ি ও লাঠি ছিল। মূসা (আঃ) তার ভাই হারূন (আঃ)-কে নিয়ে লাঠি খাড়া করে বেরিয়ে পড়লেন এবং প্রতিযোগিতার মাঠে হাযির হলেন। ফিরাউন সভাষদবর্গসহ সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিল। যাদুকরগণ সর্বপ্রথম যাদু দ্বারা হযরত মূসা (আঃ)-এর ন্যরবন্দী করে। তারপর ফিরাউন ও জনগণের চোখে ভেলকি লাগিয়ে দেয়। তারপর প্রত্যেক যাদুকর স্বীয় রঞ্জু ও লাঠি নিক্ষেপ করে। ওগুলো সাপ হয়ে যায়। সারা ময়দান সাপে ভরে যায়। একের উপর এক পিল পিল করে চলতে থাকে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যাদুকরদের সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজারেও বেশী। সবারই সাথে ছিল লাঠি ও রঞ্জু। সর্ব সাধারণেরও ন্যরবন্দী হয়ে যায়। সুতরাং মাঠের এই দৃশ্য দেখে সবাই ভীত হয়ে পড়ে। ইবনে আবি বাররাহ (রাঃ) বলেন যে, ফিরাউন সত্তর হাজার যাদুকরকে আহ্বান করেছিল। সর হাজার রঞ্জু ও সত্তর হাজার লাঠি সর্পের আকার ধারণ করে পিল পিল করে চলছিল। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা খুব বড় রকমের যাদু দেখিয়েছিল।

আল-আরাফ 7:116

১১৫-১১৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে হযরত মূসা (আঃ) ও যাদুকরদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংগ্রাম সম্পর্কীয় কথোপকথনের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। যাদুকররা হযরত মূসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! তুমিই কি প্রথমে তোমার বিস্ময়কর বস্তু নিক্ষেপ করবে, না আমরাই প্রথমে নিক্ষেপ করবো?” হযরত মূসা (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “তোমরাই প্রথমে নিক্ষেপ কর।” এতে মূসা (আঃ)-এর নিপুণতা এই ছিল যে, প্রথমে জনগণ যাদুকরদের কলাকৌশল পর্যবেক্ষণ করবে এবং ঐ ব্যাপারে চিন্তা গবেষণা করবে। যখন তাদের এই প্রতারণামূলক কার্যকলাপের মহড়া শেষ হবে তখন তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর সত্য ও বাস্তব কার্যকলাপের দিকে মনোযোগ দেবে যার জন্যে তারা অপেক্ষমান ছিল এবং সেটা তখন স্পষ্টরূপে তাদের সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়বে। কেননা, সত্য ও বাস্তব জিনিস অনুসন্ধানের পর তা প্রাপ্ত হলে সেটা অন্তরের উপর বেশী দাগ কেটে থাকে। আর হলোও তাই। এখন আল্লাহ বলেনঃ “যখন যাদুকরগণ তাদের দড়ি ও লাঠিগুলো মাটিতে নিক্ষেপ করলো তখন তারা যাদুর মাধ্যমে দর্শকদের নযরবন্দী করে দিলো। তারা তখন এমনভাবে দেখতে থাকলো যে, যা কিছু তারা দেখতে আছে তা যেন সবই বাস্তব। অথচ ঐ লাঠিগুলো ও রজ্জ্বগুলো প্রকৃতপক্ষে লাঠি ও রজ্জ্বই ছিল। দর্শকদের শুধুমাত্র এটা ধারণা ও খেয়াল ছিল যে, ঐগুলো সাপ।” তাই ইরশাদ হচ্ছে- “তাদের যাদুর কারণে মনে হচ্ছিল যে, ওগুলো পিল পিল করে চলছে। এ দেখে মূসা (আঃ) আতংকিত হয়। তখন আমি (আল্লাহ) বললাম, ভয় করো না, জয়যুক্ত তুমিই হবে। তোমার লাঠিখানা তুমিও মাটিতে ফেলে দাও। এটা সাপ হয়ে গিয়ে ঐ সাপগুলোকে গিলে ফেলবে। এ যাদু তো প্রতারণা মাত্র। এই যাদুকরগণ কৃতকার্য হতে পারে না।” মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, পনেরো হাজার যাদুকর সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিল। প্রত্যেক যাদুকরের সাথেই দড়ি ও লাঠি ছিল। মূসা (আঃ) তার ভাই হারূন (আঃ)-কে নিয়ে লাঠি খাড়া করে বেরিয়ে পড়লেন এবং প্রতিযোগিতার মাঠে হাযির হলেন। ফিরাউন সভাষদবর্গসহ সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিল। যাদুকরগণ সর্বপ্রথম যাদু দ্বারা হযরত মূসা (আঃ)-এর ন্যরবন্দী করে। তারপর ফিরাউন ও জনগণের চোখে ভেলকি লাগিয়ে দেয়। তারপর প্রত্যেক যাদুকর স্বীয় রঞ্জু ও লাঠি নিক্ষেপ করে। ওগুলো সাপ হয়ে যায়। সারা ময়দান সাপে ভরে যায়। একের উপর এক পিল পিল করে চলতে থাকে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যাদুকরদের সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজারেও বেশী। সবারই সাথে ছিল লাঠি ও রঞ্জু। সর্ব সাধারণেরও ন্যরবন্দী হয়ে যায়। সুতরাং মাঠের এই দৃশ্য দেখে সবাই ভীত হয়ে পড়ে। ইবনে আবি বাররাহ (রাঃ) বলেন যে, ফিরাউন সত্তর হাজার যাদুকরকে আহ্বান করেছিল। সর হাজার রঞ্জু ও সত্তর হাজার লাঠি সর্পের আকার ধারণ করে পিল পিল করে চলছিল। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা খুব বড় রকমের যাদু দেখিয়েছিল।

আল-আরাফ 7:117

১১৭-১২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এই ভীষণ পরীক্ষাক্ষেত্রে হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট অহী পাঠালেন যা হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করলো। মূসা (আঃ) তাঁর লাঠিখানা নিক্ষেপ করলেন। ঐ দেখুন! ওটা ঐসব কাল্পনিক সাপকে গিলে ফেললো। ঐ খেয়ালী সাপগুলোর একটিও রক্ষা পেলো না। ঐ যাদুকরগণ জেনে ফেললো যে, এটা যাদু নয়, বরং কোন আসমানী সাহায্য ও আল্লাহ তা'আলারই কাজ। সুতরাং তারা সবাই আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে গেল এবং বললোঃ “আমরা মূসা (আঃ) ও হারূন (আঃ)-এর আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম।” হযরত মূসা (আঃ) যখন প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করলেন তখন তিনি লাঠির উপর হাত লাগানো মাত্রই ওটা পুনরায় লাঠি হয়ে গেল। যাদুকররা সিজদায় পড়ে গিয়ে বললোঃ “যদি তিনি নবী না হতেন, বরং যাদুকর হতেন তবে তিনি কখনই আমাদের উপর বিজয় লাভ করতে পারতেন না।” কাসিম ইবনে আবি বুররা (রঃ) বলেন যে, যাদুকরগণ সিজদা থেকে তাদের মাথা উঠাবার পূর্বেই জান্নাত ও জাহান্নাম দেখে নিয়েছিল।

আল-আরাফ 7:118

১১৭-১২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এই ভীষণ পরীক্ষাক্ষেত্রে হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট অহী পাঠালেন যা হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করলো। মূসা (আঃ) তাঁর লাঠিখানা নিক্ষেপ করলেন। ঐ দেখুন! ওটা ঐসব কাল্পনিক সাপকে গিলে ফেললো। ঐ খেয়ালী সাপগুলোর একটিও রক্ষা পেলো না। ঐ যাদুকরগণ জেনে ফেললো যে, এটা যাদু নয়, বরং কোন আসমানী সাহায্য ও আল্লাহ তা'আলারই কাজ। সুতরাং তারা সবাই আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে গেল এবং বললোঃ “আমরা মূসা (আঃ) ও হারূন (আঃ)-এর আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম।” হযরত মূসা (আঃ) যখন প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করলেন তখন তিনি লাঠির উপর হাত লাগানো মাত্রই ওটা পুনরায় লাঠি হয়ে গেল। যাদুকররা সিজদায় পড়ে গিয়ে বললোঃ “যদি তিনি নবী না হতেন, বরং যাদুকর হতেন তবে তিনি কখনই আমাদের উপর বিজয় লাভ করতে পারতেন না।” কাসিম ইবনে আবি বুররা (রঃ) বলেন যে, যাদুকরগণ সিজদা থেকে তাদের মাথা উঠাবার পূর্বেই জান্নাত ও জাহান্নাম দেখে নিয়েছিল।

আল-আরাফ 7:119

১১৭-১২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এই ভীষণ পরীক্ষাক্ষেত্রে হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট অহী পাঠালেন যা হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করলো। মূসা (আঃ) তাঁর লাঠিখানা নিক্ষেপ করলেন। ঐ দেখুন! ওটা ঐসব কাল্পনিক সাপকে গিলে ফেললো। ঐ খেয়ালী সাপগুলোর একটিও রক্ষা পেলো না। ঐ যাদুকরগণ জেনে ফেললো যে, এটা যাদু নয়, বরং কোন আসমানী সাহায্য ও আল্লাহ তা'আলারই কাজ। সুতরাং তারা সবাই আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে গেল এবং বললোঃ “আমরা মূসা (আঃ) ও হারূন (আঃ)-এর আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম।” হযরত মূসা (আঃ) যখন প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করলেন তখন তিনি লাঠির উপর হাত লাগানো মাত্রই ওটা পুনরায় লাঠি হয়ে গেল। যাদুকররা সিজদায় পড়ে গিয়ে বললোঃ “যদি তিনি নবী না হতেন, বরং যাদুকর হতেন তবে তিনি কখনই আমাদের উপর বিজয় লাভ করতে পারতেন না।” কাসিম ইবনে আবি বুররা (রঃ) বলেন যে, যাদুকরগণ সিজদা থেকে তাদের মাথা উঠাবার পূর্বেই জান্নাত ও জাহান্নাম দেখে নিয়েছিল।

আল-আরাফ 7:120

১১৭-১২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এই ভীষণ পরীক্ষাক্ষেত্রে হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট অহী পাঠালেন যা হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করলো। মূসা (আঃ) তাঁর লাঠিখানা নিক্ষেপ করলেন। ঐ দেখুন! ওটা ঐসব কাল্পনিক সাপকে গিলে ফেললো। ঐ খেয়ালী সাপগুলোর একটিও রক্ষা পেলো না। ঐ যাদুকরগণ জেনে ফেললো যে, এটা যাদু নয়, বরং কোন আসমানী সাহায্য ও আল্লাহ তা'আলারই কাজ। সুতরাং তারা সবাই আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে গেল এবং বললোঃ “আমরা মূসা (আঃ) ও হারূন (আঃ)-এর আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম।” হযরত মূসা (আঃ) যখন প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করলেন তখন তিনি লাঠির উপর হাত লাগানো মাত্রই ওটা পুনরায় লাঠি হয়ে গেল। যাদুকররা সিজদায় পড়ে গিয়ে বললোঃ “যদি তিনি নবী না হতেন, বরং যাদুকর হতেন তবে তিনি কখনই আমাদের উপর বিজয় লাভ করতে পারতেন না।” কাসিম ইবনে আবি বুররা (রঃ) বলেন যে, যাদুকরগণ সিজদা থেকে তাদের মাথা উঠাবার পূর্বেই জান্নাত ও জাহান্নাম দেখে নিয়েছিল।

আল-আরাফ 7:121

১১৭-১২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এই ভীষণ পরীক্ষাক্ষেত্রে হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট অহী পাঠালেন যা হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করলো। মূসা (আঃ) তাঁর লাঠিখানা নিক্ষেপ করলেন। ঐ দেখুন! ওটা ঐসব কাল্পনিক সাপকে গিলে ফেললো। ঐ খেয়ালী সাপগুলোর একটিও রক্ষা পেলো না। ঐ যাদুকরগণ জেনে ফেললো যে, এটা যাদু নয়, বরং কোন আসমানী সাহায্য ও আল্লাহ তা'আলারই কাজ। সুতরাং তারা সবাই আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে গেল এবং বললোঃ “আমরা মূসা (আঃ) ও হারূন (আঃ)-এর আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম।” হযরত মূসা (আঃ) যখন প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করলেন তখন তিনি লাঠির উপর হাত লাগানো মাত্রই ওটা পুনরায় লাঠি হয়ে গেল। যাদুকররা সিজদায় পড়ে গিয়ে বললোঃ “যদি তিনি নবী না হতেন, বরং যাদুকর হতেন তবে তিনি কখনই আমাদের উপর বিজয় লাভ করতে পারতেন না।” কাসিম ইবনে আবি বুররা (রঃ) বলেন যে, যাদুকরগণ সিজদা থেকে তাদের মাথা উঠাবার পূর্বেই জান্নাত ও জাহান্নাম দেখে নিয়েছিল।

আল-আরাফ 7:122

১১৭-১২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এই ভীষণ পরীক্ষাক্ষেত্রে হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট অহী পাঠালেন যা হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করলো। মূসা (আঃ) তাঁর লাঠিখানা নিক্ষেপ করলেন। ঐ দেখুন! ওটা ঐসব কাল্পনিক সাপকে গিলে ফেললো। ঐ খেয়ালী সাপগুলোর একটিও রক্ষা পেলো না। ঐ যাদুকরগণ জেনে ফেললো যে, এটা যাদু নয়, বরং কোন আসমানী সাহায্য ও আল্লাহ তা'আলারই কাজ। সুতরাং তারা সবাই আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে গেল এবং বললোঃ “আমরা মূসা (আঃ) ও হারূন (আঃ)-এর আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম।” হযরত মূসা (আঃ) যখন প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করলেন তখন তিনি লাঠির উপর হাত লাগানো মাত্রই ওটা পুনরায় লাঠি হয়ে গেল। যাদুকররা সিজদায় পড়ে গিয়ে বললোঃ “যদি তিনি নবী না হতেন, বরং যাদুকর হতেন তবে তিনি কখনই আমাদের উপর বিজয় লাভ করতে পারতেন না।” কাসিম ইবনে আবি বুররা (রঃ) বলেন যে, যাদুকরগণ সিজদা থেকে তাদের মাথা উঠাবার পূর্বেই জান্নাত ও জাহান্নাম দেখে নিয়েছিল।

আল-আরাফ 7:123

১২৩-১২৫ নং আয়াতের তাফসীর: বলা হয়েছে যে, তাদের নেতা ছিল চারজন। তারাই ছিল যাদুকরদের ইমাম, যেমন তাবারী ও দারে কুতনী বর্ণনা করেছেন, যাদুকরদের সংখ্যা ছিল সত্তর হাজার। আবার কেউ কেউ এর চেয়ে কমও বলেছেন।

আল-আরাফ 7:124

১২৩-১২৫ নং আয়াতের তাফসীর: বলা হয়েছে যে, তাদের নেতা ছিল চারজন। তারাই ছিল যাদুকরদের ইমাম, যেমন তাবারী ও দারে কুতনী বর্ণনা করেছেন, যাদুকরদের সংখ্যা ছিল সত্তর হাজার। আবার কেউ কেউ এর চেয়ে কমও বলেছেন।

আল-আরাফ 7:125

১২৩-১২৫ নং আয়াতের তাফসীর: বলা হয়েছে যে, তাদের নেতা ছিল চারজন। তারাই ছিল যাদুকরদের ইমাম, যেমন তাবারী ও দারে কুতনী বর্ণনা করেছেন, যাদুকরদের সংখ্যা ছিল সত্তর হাজার। আবার কেউ কেউ এর চেয়ে কমও বলেছেন।

আল-আরাফ 7:126

যাদুকরগণ যখন মুমিন হয়ে গেল এবং ফিরাউনের উদ্দেশ্য বিফল হলো তখন সে যাদুকরদেরকে হুমকি দিয়ে বললোঃ “আজ যে মূসা (আঃ) তোমাদের উপর জয়যুক্ত হয়েছে এটা প্রকৃতপক্ষে তোমাদের পারস্পরিক সমঝোতা ও চক্রান্তের কারণেই সম্ভব হয়েছে। তোমাদের উদ্দেশ্য ছিল যে, এইভাবে হুকুমতের উপর বিজয় লাভ করে দেশের মূল অধিবাসীকে তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া। নিঃসন্দেহে এই মূসা ছিল তোমাদের সকলেরই গুরু। সেই তোমাদেরকে যাদুবিদ্যা শিখিয়েছিল।” যার সামান্য বিবেকও রয়েছে সেও এটা বুঝে ফেলবে যে, হক্ক দ্বারা বাতিল প্রমাণিত হয়ে যায় দেখে ফিরাউন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়েই এই অপবাদমূলক কথা বলছিল। হযরত মূসা (আঃ) তো মাদায়েন থেকে এসেই সরাসরি ফিরাউনের নিকট পৌছে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং বাহ্যিক মু'জিযাগুলো প্রকাশ করতঃ নিজের রাসূল হওয়ার সত্যতা প্রমাণ করেছিলেন। এর পরে ফিরাউন স্বীয় সাম্রাজ্যের সমস্ত শহরে মনোনীত এলাকায় লোক প্রেরণ করে মিসরের বিভিন্ন যাদুকরদেরকে একত্রিত করেছিল, যাদেরকে সে এবং তার সম্প্রদায়ের লোকেরা নির্বাচন করেছিল, আর তাদের সাথে ভাল ভাল পুরস্কার ও মর্যাদা দানের অঙ্গীকার করেছিল। এ জন্যেই ঐ যাদুকরগণ। সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছিল যে, কি করে মূসা (আঃ)-এর উপর বিজয় লাভ করতঃ ফেরাউনের নৈকট্য লাভ করা যায়। মূসা (আঃ) কোন এক যাদুকরের সাথেও পরিচিত ছিলেন না। না তিনি তাদের কাউকেও কখনও দেখেছিলেন। না তাদের কারো সাথে তাঁর কখনও সাক্ষাৎ ঘটেছিল। ফিরাউন নিজেও এটা জানতো। কিন্তু না জানি সর্বসাধারণ হযরত মূসা (আঃ)-এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, এটাকে রোধ করার জন্যেই সে এ কথা বলেছিল। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ফিরাউনের কওম তার অনুগত ছিল এবং তার চিন্তাধারার সাথে একমত হয়েছিল। ঐ লোকগুলো সাংঘাতিক বিভ্রান্তির মধ্যে পতিত হয়েছিল যারা ফিরাউনের (আরবী) (৭৯:২৪) (আমিই তোমাদের বড় প্রভু) এই দাবী সমর্থন করেছিল।সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যাদুকরের প্রধানের সাথে হযরত মূসা (আঃ)-এর সাক্ষাৎ হলে তিনি তাকে বলেনঃ “আমি যদি বিজয়ী হই এবং তোমরা পরাজিত হও তবে তোমরা আমার উপর ঈমান আনবে কি? আর এটা স্বীকার করবে কি যে, আমার পেশকৃত জিনিস হবে আল্লাহর মু'জিযা?” সেই যাদুকর প্রধান উত্তরে বললোঃ “আগামীকাল তো আমি এমন যাদু পেশ করবো যে, কোন যাদুই ওর উপর জয়যুক্ত হতে পারে না। সুতরাং তুমি যদি জয়যুক্ত হও তবে আমি স্বীকার করে নেবো যে, তুমি আল্লাহর রাসূল।” ফিরাউন তাদের এই কথোপকথন শুনেছিল। এ জন্যেই সে পরে অপবাদ দিয়ে বলেছিলঃ “তোমরা এ জন্যেই একত্রিত হয়েছিলে যে, হুকুমতের উপর জয়লাভ করে তোমরা দেশের নেতৃস্থানীয় ও প্রধান প্রধান লোকদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে নিজেরাই সিংহাসন দখল করবে। আমি তোমাদেরকে কি শাস্তি দেবো তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। জেনে রেখো যে, আমি তোমাদের ডান হাত ও বাম পা কেটে নেবো অথবা এর বিপরীত। অতঃপর তোমাদের সকলকেই ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেবো। তোমাদের মৃতদেহগুলো গাছের ডালের সাথে বেঁধে লটকিয়ে দেয়া হবে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ফাঁসি এবং হাত পা কেটে নেয়ার শাস্তি-বিধান সর্ব প্রথম ফিরাউনই চালু করেছিল। যাদুকরগণ উত্তরে বলে“আমরা তো এখন আল্লাহরই হয়ে গেছি এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করছি। আজ তুমি আমাদেরকে যে শাস্তি প্রদানের হুমকি দিচ্ছ, আল্লাহর শাস্তি এর চেয়ে বহুগুণে কঠিন। আজ আমরা তোমার শাস্তির উপর ধৈর্য ধারণ করছি, যেন কাল কিয়ামতের মাঠে আল্লাহর শাস্তি হতে পরিত্রাণ পেতে পারি।” এ জন্যেই তারা বলে উঠলোঃ “হে আমাদের প্রভু! আমরা যেন দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারি এবং ফিরাউনের শাস্তির উপর ধৈর্যধারণ করতে পারি সে জন্যে আমাদেরকে ধৈর্য দান করুন। আর আপনার নবী হযরত মূসা (আঃ)-এর অনুসরণ করিয়ে আমাদেরকে মুসলমান অবস্থায় দুনিয়া হতে উঠিয়ে নিন।” অতএব, তারা ফিরাউনকে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলো- “তুমি যত পার আমাদের সর্বনাশ সাধন কর। এই অবস্থাতেই আমাদের পার্থিব জীবন শেষ হয়ে যাবে। আমরা তাঁরই উপর ঈমান আনছি যিনি আমাদের সত্য প্রভু। আমরা আশা করি যে, তিনি আমাদের পূর্ববর্তী সমস্ত পাপ মার্জনা করবেন এবং আমাদেরকে যাদু পেশ করতে বাধ্য হতে হয়েছে সেটাও তিনি ক্ষমা করে দিবেন। কেননা, যে ব্যক্তি কাফির অবস্থায় আল্লাহর নিকট হাযির হবে তার জন্যে জাহান্নাম অবধারিত। সে না জীবিতের মধ্যে গণ্য, না মৃতের মধ্যে গণ্য। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মুমিন ও সঙ্কৰ্মশীল রূপে হাযির হবে সে পরকালে বড় বড় মর্যাদার অধিকারী হবে। যা হাক, এইসব যাদুকর ছিল সকাল বেলায় কাফির যাদুকর, আর সন্ধ্যা বেলায় হয়ে গেল সকর্মশীল মুমিন ও শহীদ।

আল-আরাফ 7:127

১২৭-১২৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ফিরাউনও তার দলবলের পাস্পরিক পরামর্শের সংবাদ দেয়া হচ্ছে। ঐ লোকদের অন্তরে মূসা (আঃ)-এর প্রতি কত বেশী হিংসা ছিল তাদের এ পরামর্শের দ্বারা তা বুঝা যাচ্ছে। ফিরাউনকে তার পরিষদের লোকেরা বলছে-“আপনি কি মূসা (আঃ)-কে এমন মুক্ত অবস্থায় ছেড়ে দিবেন যে, সে পৃথিবীতে অশান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করে বেড়াবে এবং দেশবাসীকে ফিত্না ফাসাদের মধ্যে নিক্ষেপ করবে, আর তাদের মধ্যে আল্লাহর কথা প্রচার করবে? কি বিস্ময়কর ব্যাপার যে, এ লোকগুলো অন্যদেরকে মূসা (আঃ) ও মুমিনদের ফাসাদ থেকে সাবধান করছে, অথচ তারা নিজেরাই ফাসাদ ও বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী! তাদের নিজেদেরই খবর নেই! কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী)–এর (আরবী) অক্ষরটি এখানে ‘এবং’ -এর অর্থ প্রকাশক নয়, বরং (আরবী)-এর অর্থ প্রকাশ করছে। ভাবার্থ হচ্ছে - “হে ফিরাউন! আপনি কি মূসা (আঃ) -কে এই অনুমতি দিয়েছেন যে, সে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে বেড়াবে, অথচ সে আপনার আনুগত্য স্বীকার করে না এবং আপনার দেবতাদের উপাসনা পরিত্যাগ করেছে?” হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) এটাকে (আরবী) এভাবে পড়েছেন। এটা ইবনে জারীর (রাঃ)-এর বর্ণনা। কেউ কেউ আবার এই (আরবী) কে (আরবী) বলেছেন। তখন ভাবার্থ হবে- “হে ফিরাউন! আপনি কি মূসা (আঃ)-কে এমন মুক্তভাবে ছেড়ে দেবেন যে, সে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে বেড়াবে এবং আপনাকে ও আপনার দেবতাদেরকে পরিত্যাগ করবে?" কেউ কেউ এটাকে (আরবী) পড়েছেন। এর অর্থ নেয়া হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আপনার উপাসনা পরিত্যাগ করবে? (এটা ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ) এবং অন্যান্য হতে বর্ণিত হয়েছে) প্রথম কিরআতের উপর ভিত্তি করে কেউ কেউ এই ফলাফলে পৌছেছেন যে, ফিরাউনও। গোপনীয়ভাবে একটি মূর্তির পূজা করতো। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, তার গলায় একটি মূর্তি লটকানো থাকতো। ওকেই সে সিজদা করতো। এর উপর ভিত্তি করেই হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ লোকগুলো যখন কোন সুন্দর গাভী দেখতো তখন ফিরাউন তাদেরকে ওর পূজা করার নির্দেশ দিতো। এ জন্যেই সামেরী একটি গরু বানিয়েছিল যার মধ্য থেকে শব্দ বের হতো । মোটকথা, ফিরাউন তার দরবারের লোকদের কথা মেনে নিলো এবং বললোঃ “আমি তার বংশ কেটে ফেলার জন্যে তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করবো এবং মেয়েদেরকে জীবিত রাখবো।” এই প্রকারের এটা ছিল দ্বিতীয় অত্যাচার। ইতিপূর্বেও হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্মের পূর্বে সে এরূপই করেছিল, যেন দুনিয়াতে তার অস্তিত্বই না আসে। কিন্তু ঘটলো তার বিপরীত যা ফিরাউন কামনা করেছিল। শেষ পর্যন্ত মূসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন এবং বেঁচেও থাকেন। দ্বিতীয়বারও সে এরূপ করারই ইচ্ছা করলো । সে বানী ইসরাঈলকে লাঞ্ছিত করে তাদের উপর বিজয় লাভের ইচ্ছা করেছিল। কিন্তু এখানেও তার বাসনা পূর্ণ হয়নি। আল্লাহ তাআলা মূসা (আঃ)-কে সম্মান দেন এবং ফিরাউনকে লাঞ্ছিত করেন, আর তাকে ও তার দলবলকে নদীতে ডুবিয়ে দেন। ফিরাউন যখন বানী ইসরাঈলের ক্ষতিসাধন করার দৃঢ় সংকল্প করে বসে তখন মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়ের লোকদেরকে বলে- “তোমরা ধৈর্যধারণ কর এবং আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা কর।” হযরত মূসা (আঃ) তাদের সাথে শুভ পরিণামের ওয়াদা করলেন। তিনি বানী ইসরাঈলকে বললেনঃ “রাজ্য তোমাদেরই হয়ে যাবে। যমীন হচ্ছে আল্লাহর। তিনি যাকে চান তাকেই রাজ্যের শাসন ক্ষমতা অর্পণ করে থাকেন এবং ভাল পরিণাম মুত্তাকীদেরই বটে।” মূসা (আঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ তাঁকে সম্বোধন করে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আপনি আমাদের কাছে আগমনের পূর্বেও আমাদেরকে কঠিন দুঃখ দুর্দশার সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং আপনি আসার পরেও স্বচক্ষে দেখছেন যে, আমাদেরকে কতইনা লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হচ্ছে!" বানী ইসরাঈল যে তাদের বর্তমান অবস্থার উপর ধৈর্যধারণ করছে সেই জন্যে হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেনঃ “অতিসত্বরই আল্লাহ পাক তোমাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করে দিবেন। এই আয়াতের মাধ্যমে বানী ইসরাঈলকে আল্লাহর নিয়ামতের শাকরিয়া আদায় করার জন্যে উত্তেজিত ও উৎসাহিত করা হচ্ছে।

আল-আরাফ 7:128

১২৭-১২৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ফিরাউনও তার দলবলের পাস্পরিক পরামর্শের সংবাদ দেয়া হচ্ছে। ঐ লোকদের অন্তরে মূসা (আঃ)-এর প্রতি কত বেশী হিংসা ছিল তাদের এ পরামর্শের দ্বারা তা বুঝা যাচ্ছে। ফিরাউনকে তার পরিষদের লোকেরা বলছে-“আপনি কি মূসা (আঃ)-কে এমন মুক্ত অবস্থায় ছেড়ে দিবেন যে, সে পৃথিবীতে অশান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করে বেড়াবে এবং দেশবাসীকে ফিত্না ফাসাদের মধ্যে নিক্ষেপ করবে, আর তাদের মধ্যে আল্লাহর কথা প্রচার করবে? কি বিস্ময়কর ব্যাপার যে, এ লোকগুলো অন্যদেরকে মূসা (আঃ) ও মুমিনদের ফাসাদ থেকে সাবধান করছে, অথচ তারা নিজেরাই ফাসাদ ও বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী! তাদের নিজেদেরই খবর নেই! কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী)–এর (আরবী) অক্ষরটি এখানে ‘এবং’ -এর অর্থ প্রকাশক নয়, বরং (আরবী)-এর অর্থ প্রকাশ করছে। ভাবার্থ হচ্ছে - “হে ফিরাউন! আপনি কি মূসা (আঃ) -কে এই অনুমতি দিয়েছেন যে, সে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে বেড়াবে, অথচ সে আপনার আনুগত্য স্বীকার করে না এবং আপনার দেবতাদের উপাসনা পরিত্যাগ করেছে?” হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) এটাকে (আরবী) এভাবে পড়েছেন। এটা ইবনে জারীর (রাঃ)-এর বর্ণনা। কেউ কেউ আবার এই (আরবী) কে (আরবী) বলেছেন। তখন ভাবার্থ হবে- “হে ফিরাউন! আপনি কি মূসা (আঃ)-কে এমন মুক্তভাবে ছেড়ে দেবেন যে, সে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে বেড়াবে এবং আপনাকে ও আপনার দেবতাদেরকে পরিত্যাগ করবে?" কেউ কেউ এটাকে (আরবী) পড়েছেন। এর অর্থ নেয়া হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আপনার উপাসনা পরিত্যাগ করবে? (এটা ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ) এবং অন্যান্য হতে বর্ণিত হয়েছে) প্রথম কিরআতের উপর ভিত্তি করে কেউ কেউ এই ফলাফলে পৌছেছেন যে, ফিরাউনও। গোপনীয়ভাবে একটি মূর্তির পূজা করতো। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, তার গলায় একটি মূর্তি লটকানো থাকতো। ওকেই সে সিজদা করতো। এর উপর ভিত্তি করেই হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ লোকগুলো যখন কোন সুন্দর গাভী দেখতো তখন ফিরাউন তাদেরকে ওর পূজা করার নির্দেশ দিতো। এ জন্যেই সামেরী একটি গরু বানিয়েছিল যার মধ্য থেকে শব্দ বের হতো । মোটকথা, ফিরাউন তার দরবারের লোকদের কথা মেনে নিলো এবং বললোঃ “আমি তার বংশ কেটে ফেলার জন্যে তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করবো এবং মেয়েদেরকে জীবিত রাখবো।” এই প্রকারের এটা ছিল দ্বিতীয় অত্যাচার। ইতিপূর্বেও হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্মের পূর্বে সে এরূপই করেছিল, যেন দুনিয়াতে তার অস্তিত্বই না আসে। কিন্তু ঘটলো তার বিপরীত যা ফিরাউন কামনা করেছিল। শেষ পর্যন্ত মূসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন এবং বেঁচেও থাকেন। দ্বিতীয়বারও সে এরূপ করারই ইচ্ছা করলো । সে বানী ইসরাঈলকে লাঞ্ছিত করে তাদের উপর বিজয় লাভের ইচ্ছা করেছিল। কিন্তু এখানেও তার বাসনা পূর্ণ হয়নি। আল্লাহ তাআলা মূসা (আঃ)-কে সম্মান দেন এবং ফিরাউনকে লাঞ্ছিত করেন, আর তাকে ও তার দলবলকে নদীতে ডুবিয়ে দেন। ফিরাউন যখন বানী ইসরাঈলের ক্ষতিসাধন করার দৃঢ় সংকল্প করে বসে তখন মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়ের লোকদেরকে বলে- “তোমরা ধৈর্যধারণ কর এবং আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা কর।” হযরত মূসা (আঃ) তাদের সাথে শুভ পরিণামের ওয়াদা করলেন। তিনি বানী ইসরাঈলকে বললেনঃ “রাজ্য তোমাদেরই হয়ে যাবে। যমীন হচ্ছে আল্লাহর। তিনি যাকে চান তাকেই রাজ্যের শাসন ক্ষমতা অর্পণ করে থাকেন এবং ভাল পরিণাম মুত্তাকীদেরই বটে।” মূসা (আঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ তাঁকে সম্বোধন করে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আপনি আমাদের কাছে আগমনের পূর্বেও আমাদেরকে কঠিন দুঃখ দুর্দশার সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং আপনি আসার পরেও স্বচক্ষে দেখছেন যে, আমাদেরকে কতইনা লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হচ্ছে!" বানী ইসরাঈল যে তাদের বর্তমান অবস্থার উপর ধৈর্যধারণ করছে সেই জন্যে হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেনঃ “অতিসত্বরই আল্লাহ পাক তোমাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করে দিবেন। এই আয়াতের মাধ্যমে বানী ইসরাঈলকে আল্লাহর নিয়ামতের শাকরিয়া আদায় করার জন্যে উত্তেজিত ও উৎসাহিত করা হচ্ছে।

আল-আরাফ 7:129

১২৭-১২৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ফিরাউনও তার দলবলের পাস্পরিক পরামর্শের সংবাদ দেয়া হচ্ছে। ঐ লোকদের অন্তরে মূসা (আঃ)-এর প্রতি কত বেশী হিংসা ছিল তাদের এ পরামর্শের দ্বারা তা বুঝা যাচ্ছে। ফিরাউনকে তার পরিষদের লোকেরা বলছে-“আপনি কি মূসা (আঃ)-কে এমন মুক্ত অবস্থায় ছেড়ে দিবেন যে, সে পৃথিবীতে অশান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করে বেড়াবে এবং দেশবাসীকে ফিত্না ফাসাদের মধ্যে নিক্ষেপ করবে, আর তাদের মধ্যে আল্লাহর কথা প্রচার করবে? কি বিস্ময়কর ব্যাপার যে, এ লোকগুলো অন্যদেরকে মূসা (আঃ) ও মুমিনদের ফাসাদ থেকে সাবধান করছে, অথচ তারা নিজেরাই ফাসাদ ও বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী! তাদের নিজেদেরই খবর নেই! কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী)–এর (আরবী) অক্ষরটি এখানে ‘এবং’ -এর অর্থ প্রকাশক নয়, বরং (আরবী)-এর অর্থ প্রকাশ করছে। ভাবার্থ হচ্ছে - “হে ফিরাউন! আপনি কি মূসা (আঃ) -কে এই অনুমতি দিয়েছেন যে, সে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে বেড়াবে, অথচ সে আপনার আনুগত্য স্বীকার করে না এবং আপনার দেবতাদের উপাসনা পরিত্যাগ করেছে?” হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) এটাকে (আরবী) এভাবে পড়েছেন। এটা ইবনে জারীর (রাঃ)-এর বর্ণনা। কেউ কেউ আবার এই (আরবী) কে (আরবী) বলেছেন। তখন ভাবার্থ হবে- “হে ফিরাউন! আপনি কি মূসা (আঃ)-কে এমন মুক্তভাবে ছেড়ে দেবেন যে, সে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে বেড়াবে এবং আপনাকে ও আপনার দেবতাদেরকে পরিত্যাগ করবে?" কেউ কেউ এটাকে (আরবী) পড়েছেন। এর অর্থ নেয়া হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ আপনার উপাসনা পরিত্যাগ করবে? (এটা ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ) এবং অন্যান্য হতে বর্ণিত হয়েছে) প্রথম কিরআতের উপর ভিত্তি করে কেউ কেউ এই ফলাফলে পৌছেছেন যে, ফিরাউনও। গোপনীয়ভাবে একটি মূর্তির পূজা করতো। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, তার গলায় একটি মূর্তি লটকানো থাকতো। ওকেই সে সিজদা করতো। এর উপর ভিত্তি করেই হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ লোকগুলো যখন কোন সুন্দর গাভী দেখতো তখন ফিরাউন তাদেরকে ওর পূজা করার নির্দেশ দিতো। এ জন্যেই সামেরী একটি গরু বানিয়েছিল যার মধ্য থেকে শব্দ বের হতো । মোটকথা, ফিরাউন তার দরবারের লোকদের কথা মেনে নিলো এবং বললোঃ “আমি তার বংশ কেটে ফেলার জন্যে তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করবো এবং মেয়েদেরকে জীবিত রাখবো।” এই প্রকারের এটা ছিল দ্বিতীয় অত্যাচার। ইতিপূর্বেও হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্মের পূর্বে সে এরূপই করেছিল, যেন দুনিয়াতে তার অস্তিত্বই না আসে। কিন্তু ঘটলো তার বিপরীত যা ফিরাউন কামনা করেছিল। শেষ পর্যন্ত মূসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন এবং বেঁচেও থাকেন। দ্বিতীয়বারও সে এরূপ করারই ইচ্ছা করলো । সে বানী ইসরাঈলকে লাঞ্ছিত করে তাদের উপর বিজয় লাভের ইচ্ছা করেছিল। কিন্তু এখানেও তার বাসনা পূর্ণ হয়নি। আল্লাহ তাআলা মূসা (আঃ)-কে সম্মান দেন এবং ফিরাউনকে লাঞ্ছিত করেন, আর তাকে ও তার দলবলকে নদীতে ডুবিয়ে দেন। ফিরাউন যখন বানী ইসরাঈলের ক্ষতিসাধন করার দৃঢ় সংকল্প করে বসে তখন মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়ের লোকদেরকে বলে- “তোমরা ধৈর্যধারণ কর এবং আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা কর।” হযরত মূসা (আঃ) তাদের সাথে শুভ পরিণামের ওয়াদা করলেন। তিনি বানী ইসরাঈলকে বললেনঃ “রাজ্য তোমাদেরই হয়ে যাবে। যমীন হচ্ছে আল্লাহর। তিনি যাকে চান তাকেই রাজ্যের শাসন ক্ষমতা অর্পণ করে থাকেন এবং ভাল পরিণাম মুত্তাকীদেরই বটে।” মূসা (আঃ)-এর সঙ্গী-সাথীগণ তাঁকে সম্বোধন করে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আপনি আমাদের কাছে আগমনের পূর্বেও আমাদেরকে কঠিন দুঃখ দুর্দশার সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং আপনি আসার পরেও স্বচক্ষে দেখছেন যে, আমাদেরকে কতইনা লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হচ্ছে!" বানী ইসরাঈল যে তাদের বর্তমান অবস্থার উপর ধৈর্যধারণ করছে সেই জন্যে হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেনঃ “অতিসত্বরই আল্লাহ পাক তোমাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করে দিবেন। এই আয়াতের মাধ্যমে বানী ইসরাঈলকে আল্লাহর নিয়ামতের শাকরিয়া আদায় করার জন্যে উত্তেজিত ও উৎসাহিত করা হচ্ছে।

আল-আরাফ 7:130

১৩০-১৩১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ আমি ফিরাউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষের মধ্যে ফেলে দিয়ে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। তাদের ক্ষেতে ফসল হয়নি, গাছে ফল ধরেনি এবং খেজুর গাছে একটি মাত্র খেজুর ধরেছিল। এর দ্বারা আমার। উদ্দেশ্য ছিল যে, হয়তো তারা শিক্ষা গ্রহণ করবে। যখন তাদের ভূমি খুব সবুজ শ্যামল থাকতো এবং ফসল খুব বেশী হতো তখন তারা বলতোঃ “আমরা তো এরই অধিকারী ছিলাম। এটা তো আমাদেরই প্রাপ্য। আমাদেরকে এটা দেয়া না হলে আমাদের প্রতি অবিচার করা হতো। আর যদি দুর্ভিক্ষের কবলে তারা পতিত হতো এবং ক্ষুধার তাড়নায় প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো তখন তারা বলতো-এটা মূসা (আঃ) ও তার সঙ্গী-সাথীদের মন্দ ভাগ্যের কারণেই হয়েছে। জেনে রেখো, এটা স্বয়ং তাদের নিজেদেরই ভাগ্য বিড়ম্বনা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) শব্দ দ্বারা বিপদ-আপদ উদ্দেশ্য নিয়েছেন। মন্দভাগ্যের প্রকৃত কারণ জনগণ বুঝত না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী) থেকে (আরবী) উদ্দেশ্য নিয়েছেন। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর নিকট হতে।

আল-আরাফ 7:131

১৩০-১৩১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ আমি ফিরাউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষের মধ্যে ফেলে দিয়ে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। তাদের ক্ষেতে ফসল হয়নি, গাছে ফল ধরেনি এবং খেজুর গাছে একটি মাত্র খেজুর ধরেছিল। এর দ্বারা আমার। উদ্দেশ্য ছিল যে, হয়তো তারা শিক্ষা গ্রহণ করবে। যখন তাদের ভূমি খুব সবুজ শ্যামল থাকতো এবং ফসল খুব বেশী হতো তখন তারা বলতোঃ “আমরা তো এরই অধিকারী ছিলাম। এটা তো আমাদেরই প্রাপ্য। আমাদেরকে এটা দেয়া না হলে আমাদের প্রতি অবিচার করা হতো। আর যদি দুর্ভিক্ষের কবলে তারা পতিত হতো এবং ক্ষুধার তাড়নায় প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো তখন তারা বলতো-এটা মূসা (আঃ) ও তার সঙ্গী-সাথীদের মন্দ ভাগ্যের কারণেই হয়েছে। জেনে রেখো, এটা স্বয়ং তাদের নিজেদেরই ভাগ্য বিড়ম্বনা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) শব্দ দ্বারা বিপদ-আপদ উদ্দেশ্য নিয়েছেন। মন্দভাগ্যের প্রকৃত কারণ জনগণ বুঝত না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী) থেকে (আরবী) উদ্দেশ্য নিয়েছেন। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর নিকট হতে।

আল-আরাফ 7:132

১৩২-১৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে মহা মহিমান্বিত আল্লাহ ফিরাউন সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ ও বিরোধিতার সংবাদ দিচ্ছেন যে, কিভাবে তারা হক থেকে সরে গিয়ে একগুয়েমী ভাব দেখিয়েছিল এবং বাতিলের উপর থেকে হঠকারিতা করেছিল। তারা এ কথাও বলেছিল, “যদি মূসা (আঃ) এমন নিদর্শনও প্রদর্শন করেন যার মাধ্যমে তিনি আমাদের উপর যাদু করে দেন তবুও আমরা ঈমান আনবো না । না আমরা তাঁর কোন দলীল কবুল করবো, না তাঁর উপর ঈমান আনয়ন করবো, না তাঁর মু'জিযার উপর ঈমান আনবো।”তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তাদের উপর তুফান পাঠালাম।' (আরবী)-এর অর্থের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে অধিক বৃষ্টিপাত যা ডুবিয়ে দেয় বা ক্ষেত ও বাগানের ক্ষতি সাধন করে। (এটা যহহাক ইবনে মাযাহিমও (রঃ) বলেছেন। এটাই বেশী প্রকাশমান) তিনি এর দ্বারা সাধারণ মহামারীও বুঝিয়েছেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তুফান হচ্ছে প্লাবন ও প্লেগ। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তুফান অর্থ হচ্ছে মৃত্যু। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, ওটা হচ্ছে। আল্লাহর আকস্মিক ও আসমানী শাস্তি! যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওদের নিদ্রিত অবস্থায় সে উদ্যানে তোমার প্রভুর বিপর্যয় হানা দিলো।” (৬৮:১৯) (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে ফড়িং, যা একটা প্রসিদ্ধ পাখি, যা খাওয়া হালাল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাতটি যুদ্ধে শরীক ছিলাম। প্রত্যেক যুদ্ধেই আমরা ফড়িং খাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।” ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রাঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের জন্যে দু’টো মৃত ও দু’টো রক্ত হালাল করা হয়েছে। (মৃত দু’টো হচ্ছে) মাছ ও ফড়িং, আর (রক্ত দু'টো হচ্ছে) কলিজা ও প্লীহা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অধিকাংশ প্রাণী যেগুলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সেনাবাহিনী, সেগুলোকে আমি নিজে খাই না বটে, কিন্তু অন্যদের জন্যে হারাম বলি না, বরং ওগুলো হালাল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর না খাওয়ার কারণ ছিল এই যে, ওতে তাঁর রুচি হতো না। যেমন গোসাপ। ওটা খেতে তার নিজের রুচি হতো না। কিন্তু অন্যদেরকে তিনি ওটা খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) ফড়িং, গোসাপ এবং কোন প্রাণীর মূত্রস্থলী খেতেন না। কিন্তু ওগুলোকে হারামও বলতেন না। তাঁর ফড়িং খাওয়া থেকে বিরত থাকার কারণ ছিল এই যে, এটা আল্লাহর একটি আযাব । ফড়িং যে ফসলের জমির উপর দিয়ে গমন করে সেই জমির ফসল সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। মূত্রস্থলী থেকে বিরত থাকার কারণ এই যে, ওটা প্রস্রাবের নিকটবর্তী অংশ। আর গোসাপ না খাওয়ার কারণ এই যে, ওটা হচ্ছে এমন একটি জাতি যা সুন্দর আকৃতি থেকে কদাকৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এই বর্ণনাটিও দুর্বল বটে, তবে গোসাপ খাওয়া থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরত থাকার কারণের প্রতি আলোকপাতের উদ্দেশ্যেই আমি এটা নকল করেছি।” আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) অত্যন্ত আগ্রহের সাথে ফড়িং খেতেন। তাঁকে ফড়িং খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি দু'একটি ফড়িং পেলে অত্যন্ত মজা করে খেয়ে থাকি।” হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্নীগণ থালা ভর্তি ফড়িং তাঁর কাছে উপঢৌকন স্বরূপ প্রেরণ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ইমরানের কন্যা মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমাকে এমন মাংস খেতে দিন যাতে রক্ত নেই।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ফড়িং খেতে দেন। তখন মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! লালন পালন ছাড়াই তাকে জীবন দান করুন এবং শব্দ ও শোরগোল ছাড়াই ওদের এককে অপরের পিছনে রেখে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“ফড়িংকে মেরো না। এগুলো হচ্ছে আল্লাহ তাআলার এক বিরাট সেনাবাহিনী।” এ হাদীসটি খুবই গারীব ।(আরবী) যুক্ত আয়াত সম্পর্কে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই শাস্তি এই কারণে যে, অতীত যুগে এগুলো দরজার কীলকে খেয়ে ফেলতে এবং কাঠকে অবশিষ্ট রাখতো। আওযায়ী (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা জঙ্গলের দিকে রওয়ানা হলাম। হঠাৎ দেখি যে, এক ঝাক ফড়িং যমীন ও আসমানকে ছেয়ে আছে। আর একটি লোক ঐ ঝাঁকের মধ্যে বর্ম পরিহিত অবস্থায় রয়েছে। যেই দিকে সে ইশারা করছে সেই দিকে ঐ ফড়িংগুলো সরে যাচ্ছে। ঐ লোকটি বার বার বলতে রয়েছে- দুনিয়া ও ওর মধ্যস্থিত সবকিছুই বাতিল ও মিথ্যা।”কাযী শুরাইহ (রঃ)-কে ফড়িং সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ওকে ধ্বংস করুন! তার মধ্যে সাতটি শক্তিশালীর মাহাত্ম রয়েছে। ওর মাথা হচ্ছে ঘোড়ার, গর্দান হচ্ছে বলদের, বক্ষ সিংহের, বাহু গৃধিনীর, পা উটের, লেজ সাপের এবং পেট হচ্ছে বৃশ্চিকের।”(আরবী) (৫:৯৬) এই আয়াতটি সম্পর্কে আলোচনার সময় নিম্নের হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হজ্ব বা উমরার জন্যে যাচ্ছিলাম। এক দল ফড়িং-এর আমরা সম্মুখীন হই। আমরা খড়ি দিয়ে ওগুলোকে মারছিলাম, অথচ ঐ সময় আমরা ইহরামের অবস্থায় ছিলাম। আমরা এ কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করলে তিনি বলেনঃ “ইহরামের অবস্থায় সামুদ্রিক শিকারে কোন বাধা নেই।” হযরত আনাস (রাঃ) ও হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফড়িং-এর উপর বদদু'আ করে বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি ছোট বড় সমস্ত ফড়িংকে ধ্বংস করে দিন, ওদের ডিমগুলো বরবাদ করে দিন, ওদের বংশ-স র্কি ছিন্ন করুন এবং আমাদের থেকে কেড়ে নেয়া আহার্য ওদের মুখ থেকে ছিনিয়ে নিন! নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।” তখন হযরত জাবির (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এগুলো তো আল্লাহর সেনাবাহিনী। অথচ আপনি ওগুলোর বংশ সম্পর্ক কেটে দেয়ার প্রার্থনা করছেন!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলো সমুদ্রের মাছ থেকে সৃষ্ট হয়ে থাকে।” (এটা ইমাম ইবনে মাজাহ (রাঃ) তাঁর সুনানে তাখরীজ করেছেন) যিয়াদ সংবাদ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি ফড়িংকে মাছ থেকে সৃষ্ট হতে দেখেছে সে বর্ণনা করেছে, মাছ যখন সমুদ্রের তীরবর্তী স্থানে ডিম ছাড়ে এবং তীরের পানি শুকিয়ে যায় ও তথায় সূর্যের আলো পতিত হয়, তখন ঐ ডিমগুলো হতে এই ফড়িং বেরিয়ে পড়ে উড়তে শুরু করে।” (আরবী) -এর আলোচনায় আমরা নিমের হাদীসটি বর্ণনা করেছিঃ“আল্লাহ তা'আলা হাজার প্রকারের মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। ছয়শ' প্রকার হচ্ছে জলচর এবং চারশ’ হচ্ছে স্থলচর। আর তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে যাবে এরূপ মাখলুক হচ্ছে ফড়িং।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যুদ্ধে ধ্বংস প্রাপ্তদের সামনে প্লেগও কিছুই নয়। আর ফড়িং এর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাঠেরও কোন হাকীকত নেই।” এই হাদীসটি গারীব। (আরবী) সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা হচ্ছে গমের ভিতরের পোকা অথবা ওটা হচ্ছে ছোট ছোট ফড়িং যার পালক থাকে না এবং উড়ে না। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে কালো বর্ণের ক্ষুদ্র কীট বা মশা অথবা ওটা হচ্ছে এমন পোকা যা উটের গায়ে লেগে থাকা পোকা সদৃশ।বর্ণিত আছে যে, যখন মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ “হে ফিরাউন! বানী ইসরাঈলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও”। সেই সময় আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ঝড় তুফান শুরু হয়েছিল এবং মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছিল। ফিরাউন ও তার লোকেরা বুঝে নিয়েছিল যে, এটা আল্লাহর শাস্তি। তাই তারা বলেছিল“হে মূসা! আল্লাহর নিকট দু'আ করে এই ঝড়-তুফান বন্ধ করে দাও। আমরা তোমার উপর ঈমান আনবো এবং বানী ইসরাঈলকে তোমার সাথে পাঠিয়ে দেবো।” মূসা (আঃ) তখন দু'আ করলেন। কিন্তু না তারা ঈমান আনলো, না বানী ইসরাঈলকে তার সাথে পাঠালো। ঐ বছর বৃষ্টিপাতের ফলে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হলো। তারা তখন বলতে লাগলো- “বাঃ বাঃ! আমাদের আকাক্ষা তো এটাই ছিল। কিন্তু ঈমান না আনার কারণে ফড়িংকে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হলো। ওরা সমস্ত ক্ষেত খেয়ে ফেললো এবং শাক সবুজী নষ্ট করে দিলো। তারা বুঝে নিলো যে, এখন আর কোন ফসল অবশিষ্ট থাকবে না। সুতরাং তারা মূসা (আঃ)-এর শরণাপন্ন হয়ে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! এই শাস্তিকে সরিয়ে দাও। আমরা ঈমান আনবো।” মূসা (আঃ)-এর দু'আয় ফড়িং দূর হয়ে গেল। কিন্তু তথাপি তারা ঈমান আনলো না। বরং তারা ফসল ঘরে জমা করে রাখলো এবং বলতে শুরু করলো-“কি ভয়? শস্যের ঢেরি বাড়ীতে বিদ্যমান রয়েছে।” হঠাৎ গমের পোকার শাস্তি তাদের উপর পতিত হলো। এমন অবস্থা হলো যে, কেউ দশ সের গম পেষণের জন্যে নিয়ে গেলে তিন সেরও বাকী থাকতো না। আবার তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে আযাব রানোর দরখাস্ত করলো এবং ঈমান আনয়নের অঙ্গীকার করলো। কিন্তু সেই (আরবী)-এর শাস্তি দূর হওয়ার পরেও তারা বিরোধিতা করতেই থাকলো। কোন এক সময় হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনের সাথে মিলিত হয়েছিলেন এমন সময় ভেকের ডাক শোনা গেল। তিনি ফিরাউনকে বললেনঃ “তোমার উপর ও তোমার কওমের উপর একী শাস্তি!” সে বললোঃ “এতে তো ভয়ের কোনই কারণ নেই। ন্ধ্যা হতে না হতেই জনগণের সারা দেহে ভেক লাফালাফি শুরু করে দিলো। কেউ কথা বলার জন্যে মুখ খুললে ভেক তার মুখে প্রবেশ করতো। পুনরায় তারা ঐ শাস্তি অপসারণের জন্যে মূসা (আঃ)-এর নিকট আবেদন জানালো। কিন্তু সেই শাস্তি দূর হওয়ার পরেও তারা ঈমান আনলো না। এরপর নাযিল হলো রক্ত আযাব! তারা নদী থেকে বা কূপ থেকে পানি এনে রাখলে তা রক্তে পরিণত হয়ে যেতো। কোন পাত্রে রাখলেও সেই একই অবস্থা। ফিরাউনের কাছে লোকেরা এ অভিযোগ করলে সে তাদেরকে বললোঃ “তোমাদের উপর যাদু করা হয়েছে। তারা বললোঃ “আমাদের উপর কে যাদু করলো? আমাদের পাত্রে শুধু আমরা রক্তই পাচ্ছি!” অতএব, আবার তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আসলো এবং ঐ আযাব দূর হলে ঈমান আনবে ও বানী ইসরাঈলকে তার সাথে পাঠিয়ে দেবে এই ওয়াদা করলো। হযরত মূসা (আঃ)-এর দু'আয় তখন ঐ শাস্তি দূর হয়ে গেল। কিন্তু তবুও তারা ঈমান আনলো না এবং বানী ইসরাঈলকে তাঁর সাথে পাঠালোও না। (হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং পূর্ববর্তী আলেমদের আরো কয়েকজন হতে অনুরূপ বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন যাদুকরগণ ঈমান আনলো এবং ফিরাউন পরাজিত হলো ও বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে গেল, তখনও সে অবাধ্যতা ও কুফরী থেকে ফিরলো না। ফলে তাদের উপর পর্যায়ক্রমে কয়েকটি নিদর্শন প্রকাশিত হলো। দুর্ভিক্ষ, বৃষ্টিযুক্ত ঝড়-তুফান, ফড়িং, গমের পোকা, ব্যাঙ এবং রক্ত। এসব শাস্তি পর্যায়ক্রমে তাদের উপর নাযিল হতে থাকলো। ঝড়-তুফানের ফলে সমস্ত ভূমি দলদলে হয়ে গেল। না তারা তাতে লাঙ্গল চালাতে পারলো, না কোন ফসলের বীজ বপন করতে সক্ষম হলো। ক্ষুধার তাড়নায় তাদের প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আযাব সরানোর দরখাস্ত করলো এবং ঈমান আনয়নের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলো। মূসা (আঃ) আযাব সরানোর জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট আবেদন জানালেন। আযাব সরে গেল বটে, কিন্তু তারা ঈমান আনয়নের অঙ্গীকার পুরো করলো না। তারপরে আসলো ফড়িং-এর শাস্তি, যা সমস্ত ক্ষেতের ফসল খেয়ে ফেললো এবং তাদের ঘরের দরজাগুলোর পেরেক চাটতে থাকলো। ফলে তাদের ঘরগুলো পড়ে গেল। এরপরে আসলো কীটের শাস্তি। হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “এই টিলার দিকে এসো।” তারপর হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ। তা'আলার নির্দেশক্রমে একটি পাথরের উপর লাঠি মারলেন। তখন ওর মধ্য থেকে অসংখ্য কীট বেরিয়ে পড়লো। ওগুলো ঘরের সর্বস্থানে ছড়িয়ে পড়লো । খাদ্যদ্রব্যের গায়ে ওগুলো লেগে থাকলো। লোকগুলো না ঘুমোতে পারছিল, না একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছিল। তারপর তাদের উপর ব্যাঙ-এর শাস্তি নেমে আসলো। খাদ্যদ্রব্যে ব্যাঙ, ভাতের থালায় ব্যাঙ, কাপড়ে ব্যাঙ। এরপরে আসলো রক্তের শাস্তি। পানির প্রতিটি পাত্রে পানির পরিবর্তে রক্তই দেখা যায়। মোটকথা, তারা বিভিন্ন প্রকার শাস্তির শিকারে পরিণত হলো। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা বাঙকে মেরো না। কেননা, ফিরাউনের কওমের উপর যখন ব্যাঙ-এর শাস্তি প্রেরণ করা হয় তখন একটি ব্যাঙ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আগুনের এক চুল্লীর মধ্যে পড়ে যায়। তাই আল্লাহ তা'আলা ঠাণ্ডা জায়গা অর্থাৎ পানির স্থানকে ব্যাঙ-এর বাসস্থান বানিয়েছেন এবং তাদের ডাককে তসবীহ হিসেবে গণ্য করেছেন। যায়েদ ইবনে আসলাম (রাঃ) (আরবী)-এর শাস্তি দ্বারা নাকসীর (গরমের প্রকোপে নাক দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়) এর শাস্তি ভাব নিয়েছেন।

আল-আরাফ 7:133

১৩২-১৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে মহা মহিমান্বিত আল্লাহ ফিরাউন সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ ও বিরোধিতার সংবাদ দিচ্ছেন যে, কিভাবে তারা হক থেকে সরে গিয়ে একগুয়েমী ভাব দেখিয়েছিল এবং বাতিলের উপর থেকে হঠকারিতা করেছিল। তারা এ কথাও বলেছিল, “যদি মূসা (আঃ) এমন নিদর্শনও প্রদর্শন করেন যার মাধ্যমে তিনি আমাদের উপর যাদু করে দেন তবুও আমরা ঈমান আনবো না । না আমরা তাঁর কোন দলীল কবুল করবো, না তাঁর উপর ঈমান আনয়ন করবো, না তাঁর মু'জিযার উপর ঈমান আনবো।”তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তাদের উপর তুফান পাঠালাম।' (আরবী)-এর অর্থের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে অধিক বৃষ্টিপাত যা ডুবিয়ে দেয় বা ক্ষেত ও বাগানের ক্ষতি সাধন করে। (এটা যহহাক ইবনে মাযাহিমও (রঃ) বলেছেন। এটাই বেশী প্রকাশমান) তিনি এর দ্বারা সাধারণ মহামারীও বুঝিয়েছেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তুফান হচ্ছে প্লাবন ও প্লেগ। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তুফান অর্থ হচ্ছে মৃত্যু। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, ওটা হচ্ছে। আল্লাহর আকস্মিক ও আসমানী শাস্তি! যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওদের নিদ্রিত অবস্থায় সে উদ্যানে তোমার প্রভুর বিপর্যয় হানা দিলো।” (৬৮:১৯) (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে ফড়িং, যা একটা প্রসিদ্ধ পাখি, যা খাওয়া হালাল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাতটি যুদ্ধে শরীক ছিলাম। প্রত্যেক যুদ্ধেই আমরা ফড়িং খাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।” ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রাঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের জন্যে দু’টো মৃত ও দু’টো রক্ত হালাল করা হয়েছে। (মৃত দু’টো হচ্ছে) মাছ ও ফড়িং, আর (রক্ত দু'টো হচ্ছে) কলিজা ও প্লীহা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অধিকাংশ প্রাণী যেগুলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সেনাবাহিনী, সেগুলোকে আমি নিজে খাই না বটে, কিন্তু অন্যদের জন্যে হারাম বলি না, বরং ওগুলো হালাল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর না খাওয়ার কারণ ছিল এই যে, ওতে তাঁর রুচি হতো না। যেমন গোসাপ। ওটা খেতে তার নিজের রুচি হতো না। কিন্তু অন্যদেরকে তিনি ওটা খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) ফড়িং, গোসাপ এবং কোন প্রাণীর মূত্রস্থলী খেতেন না। কিন্তু ওগুলোকে হারামও বলতেন না। তাঁর ফড়িং খাওয়া থেকে বিরত থাকার কারণ ছিল এই যে, এটা আল্লাহর একটি আযাব । ফড়িং যে ফসলের জমির উপর দিয়ে গমন করে সেই জমির ফসল সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। মূত্রস্থলী থেকে বিরত থাকার কারণ এই যে, ওটা প্রস্রাবের নিকটবর্তী অংশ। আর গোসাপ না খাওয়ার কারণ এই যে, ওটা হচ্ছে এমন একটি জাতি যা সুন্দর আকৃতি থেকে কদাকৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এই বর্ণনাটিও দুর্বল বটে, তবে গোসাপ খাওয়া থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরত থাকার কারণের প্রতি আলোকপাতের উদ্দেশ্যেই আমি এটা নকল করেছি।” আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) অত্যন্ত আগ্রহের সাথে ফড়িং খেতেন। তাঁকে ফড়িং খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি দু'একটি ফড়িং পেলে অত্যন্ত মজা করে খেয়ে থাকি।” হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্নীগণ থালা ভর্তি ফড়িং তাঁর কাছে উপঢৌকন স্বরূপ প্রেরণ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ইমরানের কন্যা মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমাকে এমন মাংস খেতে দিন যাতে রক্ত নেই।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ফড়িং খেতে দেন। তখন মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! লালন পালন ছাড়াই তাকে জীবন দান করুন এবং শব্দ ও শোরগোল ছাড়াই ওদের এককে অপরের পিছনে রেখে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“ফড়িংকে মেরো না। এগুলো হচ্ছে আল্লাহ তাআলার এক বিরাট সেনাবাহিনী।” এ হাদীসটি খুবই গারীব ।(আরবী) যুক্ত আয়াত সম্পর্কে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই শাস্তি এই কারণে যে, অতীত যুগে এগুলো দরজার কীলকে খেয়ে ফেলতে এবং কাঠকে অবশিষ্ট রাখতো। আওযায়ী (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা জঙ্গলের দিকে রওয়ানা হলাম। হঠাৎ দেখি যে, এক ঝাক ফড়িং যমীন ও আসমানকে ছেয়ে আছে। আর একটি লোক ঐ ঝাঁকের মধ্যে বর্ম পরিহিত অবস্থায় রয়েছে। যেই দিকে সে ইশারা করছে সেই দিকে ঐ ফড়িংগুলো সরে যাচ্ছে। ঐ লোকটি বার বার বলতে রয়েছে- দুনিয়া ও ওর মধ্যস্থিত সবকিছুই বাতিল ও মিথ্যা।”কাযী শুরাইহ (রঃ)-কে ফড়িং সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ওকে ধ্বংস করুন! তার মধ্যে সাতটি শক্তিশালীর মাহাত্ম রয়েছে। ওর মাথা হচ্ছে ঘোড়ার, গর্দান হচ্ছে বলদের, বক্ষ সিংহের, বাহু গৃধিনীর, পা উটের, লেজ সাপের এবং পেট হচ্ছে বৃশ্চিকের।”(আরবী) (৫:৯৬) এই আয়াতটি সম্পর্কে আলোচনার সময় নিম্নের হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হজ্ব বা উমরার জন্যে যাচ্ছিলাম। এক দল ফড়িং-এর আমরা সম্মুখীন হই। আমরা খড়ি দিয়ে ওগুলোকে মারছিলাম, অথচ ঐ সময় আমরা ইহরামের অবস্থায় ছিলাম। আমরা এ কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করলে তিনি বলেনঃ “ইহরামের অবস্থায় সামুদ্রিক শিকারে কোন বাধা নেই।” হযরত আনাস (রাঃ) ও হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফড়িং-এর উপর বদদু'আ করে বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি ছোট বড় সমস্ত ফড়িংকে ধ্বংস করে দিন, ওদের ডিমগুলো বরবাদ করে দিন, ওদের বংশ-স র্কি ছিন্ন করুন এবং আমাদের থেকে কেড়ে নেয়া আহার্য ওদের মুখ থেকে ছিনিয়ে নিন! নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।” তখন হযরত জাবির (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এগুলো তো আল্লাহর সেনাবাহিনী। অথচ আপনি ওগুলোর বংশ সম্পর্ক কেটে দেয়ার প্রার্থনা করছেন!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলো সমুদ্রের মাছ থেকে সৃষ্ট হয়ে থাকে।” (এটা ইমাম ইবনে মাজাহ (রাঃ) তাঁর সুনানে তাখরীজ করেছেন) যিয়াদ সংবাদ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি ফড়িংকে মাছ থেকে সৃষ্ট হতে দেখেছে সে বর্ণনা করেছে, মাছ যখন সমুদ্রের তীরবর্তী স্থানে ডিম ছাড়ে এবং তীরের পানি শুকিয়ে যায় ও তথায় সূর্যের আলো পতিত হয়, তখন ঐ ডিমগুলো হতে এই ফড়িং বেরিয়ে পড়ে উড়তে শুরু করে।” (আরবী) -এর আলোচনায় আমরা নিমের হাদীসটি বর্ণনা করেছিঃ“আল্লাহ তা'আলা হাজার প্রকারের মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। ছয়শ' প্রকার হচ্ছে জলচর এবং চারশ’ হচ্ছে স্থলচর। আর তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে যাবে এরূপ মাখলুক হচ্ছে ফড়িং।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যুদ্ধে ধ্বংস প্রাপ্তদের সামনে প্লেগও কিছুই নয়। আর ফড়িং এর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাঠেরও কোন হাকীকত নেই।” এই হাদীসটি গারীব। (আরবী) সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা হচ্ছে গমের ভিতরের পোকা অথবা ওটা হচ্ছে ছোট ছোট ফড়িং যার পালক থাকে না এবং উড়ে না। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে কালো বর্ণের ক্ষুদ্র কীট বা মশা অথবা ওটা হচ্ছে এমন পোকা যা উটের গায়ে লেগে থাকা পোকা সদৃশ।বর্ণিত আছে যে, যখন মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ “হে ফিরাউন! বানী ইসরাঈলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও”। সেই সময় আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ঝড় তুফান শুরু হয়েছিল এবং মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছিল। ফিরাউন ও তার লোকেরা বুঝে নিয়েছিল যে, এটা আল্লাহর শাস্তি। তাই তারা বলেছিল“হে মূসা! আল্লাহর নিকট দু'আ করে এই ঝড়-তুফান বন্ধ করে দাও। আমরা তোমার উপর ঈমান আনবো এবং বানী ইসরাঈলকে তোমার সাথে পাঠিয়ে দেবো।” মূসা (আঃ) তখন দু'আ করলেন। কিন্তু না তারা ঈমান আনলো, না বানী ইসরাঈলকে তার সাথে পাঠালো। ঐ বছর বৃষ্টিপাতের ফলে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হলো। তারা তখন বলতে লাগলো- “বাঃ বাঃ! আমাদের আকাক্ষা তো এটাই ছিল। কিন্তু ঈমান না আনার কারণে ফড়িংকে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হলো। ওরা সমস্ত ক্ষেত খেয়ে ফেললো এবং শাক সবুজী নষ্ট করে দিলো। তারা বুঝে নিলো যে, এখন আর কোন ফসল অবশিষ্ট থাকবে না। সুতরাং তারা মূসা (আঃ)-এর শরণাপন্ন হয়ে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! এই শাস্তিকে সরিয়ে দাও। আমরা ঈমান আনবো।” মূসা (আঃ)-এর দু'আয় ফড়িং দূর হয়ে গেল। কিন্তু তথাপি তারা ঈমান আনলো না। বরং তারা ফসল ঘরে জমা করে রাখলো এবং বলতে শুরু করলো-“কি ভয়? শস্যের ঢেরি বাড়ীতে বিদ্যমান রয়েছে।” হঠাৎ গমের পোকার শাস্তি তাদের উপর পতিত হলো। এমন অবস্থা হলো যে, কেউ দশ সের গম পেষণের জন্যে নিয়ে গেলে তিন সেরও বাকী থাকতো না। আবার তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে আযাব রানোর দরখাস্ত করলো এবং ঈমান আনয়নের অঙ্গীকার করলো। কিন্তু সেই (আরবী)-এর শাস্তি দূর হওয়ার পরেও তারা বিরোধিতা করতেই থাকলো। কোন এক সময় হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনের সাথে মিলিত হয়েছিলেন এমন সময় ভেকের ডাক শোনা গেল। তিনি ফিরাউনকে বললেনঃ “তোমার উপর ও তোমার কওমের উপর একী শাস্তি!” সে বললোঃ “এতে তো ভয়ের কোনই কারণ নেই। ন্ধ্যা হতে না হতেই জনগণের সারা দেহে ভেক লাফালাফি শুরু করে দিলো। কেউ কথা বলার জন্যে মুখ খুললে ভেক তার মুখে প্রবেশ করতো। পুনরায় তারা ঐ শাস্তি অপসারণের জন্যে মূসা (আঃ)-এর নিকট আবেদন জানালো। কিন্তু সেই শাস্তি দূর হওয়ার পরেও তারা ঈমান আনলো না। এরপর নাযিল হলো রক্ত আযাব! তারা নদী থেকে বা কূপ থেকে পানি এনে রাখলে তা রক্তে পরিণত হয়ে যেতো। কোন পাত্রে রাখলেও সেই একই অবস্থা। ফিরাউনের কাছে লোকেরা এ অভিযোগ করলে সে তাদেরকে বললোঃ “তোমাদের উপর যাদু করা হয়েছে। তারা বললোঃ “আমাদের উপর কে যাদু করলো? আমাদের পাত্রে শুধু আমরা রক্তই পাচ্ছি!” অতএব, আবার তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আসলো এবং ঐ আযাব দূর হলে ঈমান আনবে ও বানী ইসরাঈলকে তার সাথে পাঠিয়ে দেবে এই ওয়াদা করলো। হযরত মূসা (আঃ)-এর দু'আয় তখন ঐ শাস্তি দূর হয়ে গেল। কিন্তু তবুও তারা ঈমান আনলো না এবং বানী ইসরাঈলকে তাঁর সাথে পাঠালোও না। (হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং পূর্ববর্তী আলেমদের আরো কয়েকজন হতে অনুরূপ বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন যাদুকরগণ ঈমান আনলো এবং ফিরাউন পরাজিত হলো ও বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে গেল, তখনও সে অবাধ্যতা ও কুফরী থেকে ফিরলো না। ফলে তাদের উপর পর্যায়ক্রমে কয়েকটি নিদর্শন প্রকাশিত হলো। দুর্ভিক্ষ, বৃষ্টিযুক্ত ঝড়-তুফান, ফড়িং, গমের পোকা, ব্যাঙ এবং রক্ত। এসব শাস্তি পর্যায়ক্রমে তাদের উপর নাযিল হতে থাকলো। ঝড়-তুফানের ফলে সমস্ত ভূমি দলদলে হয়ে গেল। না তারা তাতে লাঙ্গল চালাতে পারলো, না কোন ফসলের বীজ বপন করতে সক্ষম হলো। ক্ষুধার তাড়নায় তাদের প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আযাব সরানোর দরখাস্ত করলো এবং ঈমান আনয়নের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলো। মূসা (আঃ) আযাব সরানোর জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট আবেদন জানালেন। আযাব সরে গেল বটে, কিন্তু তারা ঈমান আনয়নের অঙ্গীকার পুরো করলো না। তারপরে আসলো ফড়িং-এর শাস্তি, যা সমস্ত ক্ষেতের ফসল খেয়ে ফেললো এবং তাদের ঘরের দরজাগুলোর পেরেক চাটতে থাকলো। ফলে তাদের ঘরগুলো পড়ে গেল। এরপরে আসলো কীটের শাস্তি। হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “এই টিলার দিকে এসো।” তারপর হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ। তা'আলার নির্দেশক্রমে একটি পাথরের উপর লাঠি মারলেন। তখন ওর মধ্য থেকে অসংখ্য কীট বেরিয়ে পড়লো। ওগুলো ঘরের সর্বস্থানে ছড়িয়ে পড়লো । খাদ্যদ্রব্যের গায়ে ওগুলো লেগে থাকলো। লোকগুলো না ঘুমোতে পারছিল, না একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছিল। তারপর তাদের উপর ব্যাঙ-এর শাস্তি নেমে আসলো। খাদ্যদ্রব্যে ব্যাঙ, ভাতের থালায় ব্যাঙ, কাপড়ে ব্যাঙ। এরপরে আসলো রক্তের শাস্তি। পানির প্রতিটি পাত্রে পানির পরিবর্তে রক্তই দেখা যায়। মোটকথা, তারা বিভিন্ন প্রকার শাস্তির শিকারে পরিণত হলো। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা বাঙকে মেরো না। কেননা, ফিরাউনের কওমের উপর যখন ব্যাঙ-এর শাস্তি প্রেরণ করা হয় তখন একটি ব্যাঙ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আগুনের এক চুল্লীর মধ্যে পড়ে যায়। তাই আল্লাহ তা'আলা ঠাণ্ডা জায়গা অর্থাৎ পানির স্থানকে ব্যাঙ-এর বাসস্থান বানিয়েছেন এবং তাদের ডাককে তসবীহ হিসেবে গণ্য করেছেন। যায়েদ ইবনে আসলাম (রাঃ) (আরবী)-এর শাস্তি দ্বারা নাকসীর (গরমের প্রকোপে নাক দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়) এর শাস্তি ভাব নিয়েছেন।

আল-আরাফ 7:134

১৩২-১৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে মহা মহিমান্বিত আল্লাহ ফিরাউন সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ ও বিরোধিতার সংবাদ দিচ্ছেন যে, কিভাবে তারা হক থেকে সরে গিয়ে একগুয়েমী ভাব দেখিয়েছিল এবং বাতিলের উপর থেকে হঠকারিতা করেছিল। তারা এ কথাও বলেছিল, “যদি মূসা (আঃ) এমন নিদর্শনও প্রদর্শন করেন যার মাধ্যমে তিনি আমাদের উপর যাদু করে দেন তবুও আমরা ঈমান আনবো না । না আমরা তাঁর কোন দলীল কবুল করবো, না তাঁর উপর ঈমান আনয়ন করবো, না তাঁর মু'জিযার উপর ঈমান আনবো।”তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তাদের উপর তুফান পাঠালাম।' (আরবী)-এর অর্থের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে অধিক বৃষ্টিপাত যা ডুবিয়ে দেয় বা ক্ষেত ও বাগানের ক্ষতি সাধন করে। (এটা যহহাক ইবনে মাযাহিমও (রঃ) বলেছেন। এটাই বেশী প্রকাশমান) তিনি এর দ্বারা সাধারণ মহামারীও বুঝিয়েছেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তুফান হচ্ছে প্লাবন ও প্লেগ। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তুফান অর্থ হচ্ছে মৃত্যু। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, ওটা হচ্ছে। আল্লাহর আকস্মিক ও আসমানী শাস্তি! যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওদের নিদ্রিত অবস্থায় সে উদ্যানে তোমার প্রভুর বিপর্যয় হানা দিলো।” (৬৮:১৯) (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে ফড়িং, যা একটা প্রসিদ্ধ পাখি, যা খাওয়া হালাল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাতটি যুদ্ধে শরীক ছিলাম। প্রত্যেক যুদ্ধেই আমরা ফড়িং খাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।” ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রাঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের জন্যে দু’টো মৃত ও দু’টো রক্ত হালাল করা হয়েছে। (মৃত দু’টো হচ্ছে) মাছ ও ফড়িং, আর (রক্ত দু'টো হচ্ছে) কলিজা ও প্লীহা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অধিকাংশ প্রাণী যেগুলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সেনাবাহিনী, সেগুলোকে আমি নিজে খাই না বটে, কিন্তু অন্যদের জন্যে হারাম বলি না, বরং ওগুলো হালাল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর না খাওয়ার কারণ ছিল এই যে, ওতে তাঁর রুচি হতো না। যেমন গোসাপ। ওটা খেতে তার নিজের রুচি হতো না। কিন্তু অন্যদেরকে তিনি ওটা খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) ফড়িং, গোসাপ এবং কোন প্রাণীর মূত্রস্থলী খেতেন না। কিন্তু ওগুলোকে হারামও বলতেন না। তাঁর ফড়িং খাওয়া থেকে বিরত থাকার কারণ ছিল এই যে, এটা আল্লাহর একটি আযাব । ফড়িং যে ফসলের জমির উপর দিয়ে গমন করে সেই জমির ফসল সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। মূত্রস্থলী থেকে বিরত থাকার কারণ এই যে, ওটা প্রস্রাবের নিকটবর্তী অংশ। আর গোসাপ না খাওয়ার কারণ এই যে, ওটা হচ্ছে এমন একটি জাতি যা সুন্দর আকৃতি থেকে কদাকৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এই বর্ণনাটিও দুর্বল বটে, তবে গোসাপ খাওয়া থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরত থাকার কারণের প্রতি আলোকপাতের উদ্দেশ্যেই আমি এটা নকল করেছি।” আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) অত্যন্ত আগ্রহের সাথে ফড়িং খেতেন। তাঁকে ফড়িং খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি দু'একটি ফড়িং পেলে অত্যন্ত মজা করে খেয়ে থাকি।” হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্নীগণ থালা ভর্তি ফড়িং তাঁর কাছে উপঢৌকন স্বরূপ প্রেরণ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ইমরানের কন্যা মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমাকে এমন মাংস খেতে দিন যাতে রক্ত নেই।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ফড়িং খেতে দেন। তখন মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! লালন পালন ছাড়াই তাকে জীবন দান করুন এবং শব্দ ও শোরগোল ছাড়াই ওদের এককে অপরের পিছনে রেখে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“ফড়িংকে মেরো না। এগুলো হচ্ছে আল্লাহ তাআলার এক বিরাট সেনাবাহিনী।” এ হাদীসটি খুবই গারীব ।(আরবী) যুক্ত আয়াত সম্পর্কে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই শাস্তি এই কারণে যে, অতীত যুগে এগুলো দরজার কীলকে খেয়ে ফেলতে এবং কাঠকে অবশিষ্ট রাখতো। আওযায়ী (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা জঙ্গলের দিকে রওয়ানা হলাম। হঠাৎ দেখি যে, এক ঝাক ফড়িং যমীন ও আসমানকে ছেয়ে আছে। আর একটি লোক ঐ ঝাঁকের মধ্যে বর্ম পরিহিত অবস্থায় রয়েছে। যেই দিকে সে ইশারা করছে সেই দিকে ঐ ফড়িংগুলো সরে যাচ্ছে। ঐ লোকটি বার বার বলতে রয়েছে- দুনিয়া ও ওর মধ্যস্থিত সবকিছুই বাতিল ও মিথ্যা।”কাযী শুরাইহ (রঃ)-কে ফড়িং সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ওকে ধ্বংস করুন! তার মধ্যে সাতটি শক্তিশালীর মাহাত্ম রয়েছে। ওর মাথা হচ্ছে ঘোড়ার, গর্দান হচ্ছে বলদের, বক্ষ সিংহের, বাহু গৃধিনীর, পা উটের, লেজ সাপের এবং পেট হচ্ছে বৃশ্চিকের।”(আরবী) (৫:৯৬) এই আয়াতটি সম্পর্কে আলোচনার সময় নিম্নের হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হজ্ব বা উমরার জন্যে যাচ্ছিলাম। এক দল ফড়িং-এর আমরা সম্মুখীন হই। আমরা খড়ি দিয়ে ওগুলোকে মারছিলাম, অথচ ঐ সময় আমরা ইহরামের অবস্থায় ছিলাম। আমরা এ কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করলে তিনি বলেনঃ “ইহরামের অবস্থায় সামুদ্রিক শিকারে কোন বাধা নেই।” হযরত আনাস (রাঃ) ও হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফড়িং-এর উপর বদদু'আ করে বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি ছোট বড় সমস্ত ফড়িংকে ধ্বংস করে দিন, ওদের ডিমগুলো বরবাদ করে দিন, ওদের বংশ-স র্কি ছিন্ন করুন এবং আমাদের থেকে কেড়ে নেয়া আহার্য ওদের মুখ থেকে ছিনিয়ে নিন! নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।” তখন হযরত জাবির (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এগুলো তো আল্লাহর সেনাবাহিনী। অথচ আপনি ওগুলোর বংশ সম্পর্ক কেটে দেয়ার প্রার্থনা করছেন!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলো সমুদ্রের মাছ থেকে সৃষ্ট হয়ে থাকে।” (এটা ইমাম ইবনে মাজাহ (রাঃ) তাঁর সুনানে তাখরীজ করেছেন) যিয়াদ সংবাদ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি ফড়িংকে মাছ থেকে সৃষ্ট হতে দেখেছে সে বর্ণনা করেছে, মাছ যখন সমুদ্রের তীরবর্তী স্থানে ডিম ছাড়ে এবং তীরের পানি শুকিয়ে যায় ও তথায় সূর্যের আলো পতিত হয়, তখন ঐ ডিমগুলো হতে এই ফড়িং বেরিয়ে পড়ে উড়তে শুরু করে।” (আরবী) -এর আলোচনায় আমরা নিমের হাদীসটি বর্ণনা করেছিঃ“আল্লাহ তা'আলা হাজার প্রকারের মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। ছয়শ' প্রকার হচ্ছে জলচর এবং চারশ’ হচ্ছে স্থলচর। আর তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে যাবে এরূপ মাখলুক হচ্ছে ফড়িং।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যুদ্ধে ধ্বংস প্রাপ্তদের সামনে প্লেগও কিছুই নয়। আর ফড়িং এর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাঠেরও কোন হাকীকত নেই।” এই হাদীসটি গারীব। (আরবী) সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা হচ্ছে গমের ভিতরের পোকা অথবা ওটা হচ্ছে ছোট ছোট ফড়িং যার পালক থাকে না এবং উড়ে না। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে কালো বর্ণের ক্ষুদ্র কীট বা মশা অথবা ওটা হচ্ছে এমন পোকা যা উটের গায়ে লেগে থাকা পোকা সদৃশ।বর্ণিত আছে যে, যখন মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ “হে ফিরাউন! বানী ইসরাঈলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও”। সেই সময় আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ঝড় তুফান শুরু হয়েছিল এবং মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছিল। ফিরাউন ও তার লোকেরা বুঝে নিয়েছিল যে, এটা আল্লাহর শাস্তি। তাই তারা বলেছিল“হে মূসা! আল্লাহর নিকট দু'আ করে এই ঝড়-তুফান বন্ধ করে দাও। আমরা তোমার উপর ঈমান আনবো এবং বানী ইসরাঈলকে তোমার সাথে পাঠিয়ে দেবো।” মূসা (আঃ) তখন দু'আ করলেন। কিন্তু না তারা ঈমান আনলো, না বানী ইসরাঈলকে তার সাথে পাঠালো। ঐ বছর বৃষ্টিপাতের ফলে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হলো। তারা তখন বলতে লাগলো- “বাঃ বাঃ! আমাদের আকাক্ষা তো এটাই ছিল। কিন্তু ঈমান না আনার কারণে ফড়িংকে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হলো। ওরা সমস্ত ক্ষেত খেয়ে ফেললো এবং শাক সবুজী নষ্ট করে দিলো। তারা বুঝে নিলো যে, এখন আর কোন ফসল অবশিষ্ট থাকবে না। সুতরাং তারা মূসা (আঃ)-এর শরণাপন্ন হয়ে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! এই শাস্তিকে সরিয়ে দাও। আমরা ঈমান আনবো।” মূসা (আঃ)-এর দু'আয় ফড়িং দূর হয়ে গেল। কিন্তু তথাপি তারা ঈমান আনলো না। বরং তারা ফসল ঘরে জমা করে রাখলো এবং বলতে শুরু করলো-“কি ভয়? শস্যের ঢেরি বাড়ীতে বিদ্যমান রয়েছে।” হঠাৎ গমের পোকার শাস্তি তাদের উপর পতিত হলো। এমন অবস্থা হলো যে, কেউ দশ সের গম পেষণের জন্যে নিয়ে গেলে তিন সেরও বাকী থাকতো না। আবার তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে আযাব রানোর দরখাস্ত করলো এবং ঈমান আনয়নের অঙ্গীকার করলো। কিন্তু সেই (আরবী)-এর শাস্তি দূর হওয়ার পরেও তারা বিরোধিতা করতেই থাকলো। কোন এক সময় হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনের সাথে মিলিত হয়েছিলেন এমন সময় ভেকের ডাক শোনা গেল। তিনি ফিরাউনকে বললেনঃ “তোমার উপর ও তোমার কওমের উপর একী শাস্তি!” সে বললোঃ “এতে তো ভয়ের কোনই কারণ নেই। ন্ধ্যা হতে না হতেই জনগণের সারা দেহে ভেক লাফালাফি শুরু করে দিলো। কেউ কথা বলার জন্যে মুখ খুললে ভেক তার মুখে প্রবেশ করতো। পুনরায় তারা ঐ শাস্তি অপসারণের জন্যে মূসা (আঃ)-এর নিকট আবেদন জানালো। কিন্তু সেই শাস্তি দূর হওয়ার পরেও তারা ঈমান আনলো না। এরপর নাযিল হলো রক্ত আযাব! তারা নদী থেকে বা কূপ থেকে পানি এনে রাখলে তা রক্তে পরিণত হয়ে যেতো। কোন পাত্রে রাখলেও সেই একই অবস্থা। ফিরাউনের কাছে লোকেরা এ অভিযোগ করলে সে তাদেরকে বললোঃ “তোমাদের উপর যাদু করা হয়েছে। তারা বললোঃ “আমাদের উপর কে যাদু করলো? আমাদের পাত্রে শুধু আমরা রক্তই পাচ্ছি!” অতএব, আবার তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আসলো এবং ঐ আযাব দূর হলে ঈমান আনবে ও বানী ইসরাঈলকে তার সাথে পাঠিয়ে দেবে এই ওয়াদা করলো। হযরত মূসা (আঃ)-এর দু'আয় তখন ঐ শাস্তি দূর হয়ে গেল। কিন্তু তবুও তারা ঈমান আনলো না এবং বানী ইসরাঈলকে তাঁর সাথে পাঠালোও না। (হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং পূর্ববর্তী আলেমদের আরো কয়েকজন হতে অনুরূপ বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন যাদুকরগণ ঈমান আনলো এবং ফিরাউন পরাজিত হলো ও বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে গেল, তখনও সে অবাধ্যতা ও কুফরী থেকে ফিরলো না। ফলে তাদের উপর পর্যায়ক্রমে কয়েকটি নিদর্শন প্রকাশিত হলো। দুর্ভিক্ষ, বৃষ্টিযুক্ত ঝড়-তুফান, ফড়িং, গমের পোকা, ব্যাঙ এবং রক্ত। এসব শাস্তি পর্যায়ক্রমে তাদের উপর নাযিল হতে থাকলো। ঝড়-তুফানের ফলে সমস্ত ভূমি দলদলে হয়ে গেল। না তারা তাতে লাঙ্গল চালাতে পারলো, না কোন ফসলের বীজ বপন করতে সক্ষম হলো। ক্ষুধার তাড়নায় তাদের প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আযাব সরানোর দরখাস্ত করলো এবং ঈমান আনয়নের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলো। মূসা (আঃ) আযাব সরানোর জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট আবেদন জানালেন। আযাব সরে গেল বটে, কিন্তু তারা ঈমান আনয়নের অঙ্গীকার পুরো করলো না। তারপরে আসলো ফড়িং-এর শাস্তি, যা সমস্ত ক্ষেতের ফসল খেয়ে ফেললো এবং তাদের ঘরের দরজাগুলোর পেরেক চাটতে থাকলো। ফলে তাদের ঘরগুলো পড়ে গেল। এরপরে আসলো কীটের শাস্তি। হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “এই টিলার দিকে এসো।” তারপর হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ। তা'আলার নির্দেশক্রমে একটি পাথরের উপর লাঠি মারলেন। তখন ওর মধ্য থেকে অসংখ্য কীট বেরিয়ে পড়লো। ওগুলো ঘরের সর্বস্থানে ছড়িয়ে পড়লো । খাদ্যদ্রব্যের গায়ে ওগুলো লেগে থাকলো। লোকগুলো না ঘুমোতে পারছিল, না একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছিল। তারপর তাদের উপর ব্যাঙ-এর শাস্তি নেমে আসলো। খাদ্যদ্রব্যে ব্যাঙ, ভাতের থালায় ব্যাঙ, কাপড়ে ব্যাঙ। এরপরে আসলো রক্তের শাস্তি। পানির প্রতিটি পাত্রে পানির পরিবর্তে রক্তই দেখা যায়। মোটকথা, তারা বিভিন্ন প্রকার শাস্তির শিকারে পরিণত হলো। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা বাঙকে মেরো না। কেননা, ফিরাউনের কওমের উপর যখন ব্যাঙ-এর শাস্তি প্রেরণ করা হয় তখন একটি ব্যাঙ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আগুনের এক চুল্লীর মধ্যে পড়ে যায়। তাই আল্লাহ তা'আলা ঠাণ্ডা জায়গা অর্থাৎ পানির স্থানকে ব্যাঙ-এর বাসস্থান বানিয়েছেন এবং তাদের ডাককে তসবীহ হিসেবে গণ্য করেছেন। যায়েদ ইবনে আসলাম (রাঃ) (আরবী)-এর শাস্তি দ্বারা নাকসীর (গরমের প্রকোপে নাক দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়) এর শাস্তি ভাব নিয়েছেন।

আল-আরাফ 7:135

১৩২-১৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে মহা মহিমান্বিত আল্লাহ ফিরাউন সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ ও বিরোধিতার সংবাদ দিচ্ছেন যে, কিভাবে তারা হক থেকে সরে গিয়ে একগুয়েমী ভাব দেখিয়েছিল এবং বাতিলের উপর থেকে হঠকারিতা করেছিল। তারা এ কথাও বলেছিল, “যদি মূসা (আঃ) এমন নিদর্শনও প্রদর্শন করেন যার মাধ্যমে তিনি আমাদের উপর যাদু করে দেন তবুও আমরা ঈমান আনবো না । না আমরা তাঁর কোন দলীল কবুল করবো, না তাঁর উপর ঈমান আনয়ন করবো, না তাঁর মু'জিযার উপর ঈমান আনবো।”তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি তাদের উপর তুফান পাঠালাম।' (আরবী)-এর অর্থের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে অধিক বৃষ্টিপাত যা ডুবিয়ে দেয় বা ক্ষেত ও বাগানের ক্ষতি সাধন করে। (এটা যহহাক ইবনে মাযাহিমও (রঃ) বলেছেন। এটাই বেশী প্রকাশমান) তিনি এর দ্বারা সাধারণ মহামারীও বুঝিয়েছেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তুফান হচ্ছে প্লাবন ও প্লেগ। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তুফান অর্থ হচ্ছে মৃত্যু। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, ওটা হচ্ছে। আল্লাহর আকস্মিক ও আসমানী শাস্তি! যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওদের নিদ্রিত অবস্থায় সে উদ্যানে তোমার প্রভুর বিপর্যয় হানা দিলো।” (৬৮:১৯) (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে ফড়িং, যা একটা প্রসিদ্ধ পাখি, যা খাওয়া হালাল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাতটি যুদ্ধে শরীক ছিলাম। প্রত্যেক যুদ্ধেই আমরা ফড়িং খাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।” ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রাঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের জন্যে দু’টো মৃত ও দু’টো রক্ত হালাল করা হয়েছে। (মৃত দু’টো হচ্ছে) মাছ ও ফড়িং, আর (রক্ত দু'টো হচ্ছে) কলিজা ও প্লীহা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অধিকাংশ প্রাণী যেগুলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সেনাবাহিনী, সেগুলোকে আমি নিজে খাই না বটে, কিন্তু অন্যদের জন্যে হারাম বলি না, বরং ওগুলো হালাল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর না খাওয়ার কারণ ছিল এই যে, ওতে তাঁর রুচি হতো না। যেমন গোসাপ। ওটা খেতে তার নিজের রুচি হতো না। কিন্তু অন্যদেরকে তিনি ওটা খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) ফড়িং, গোসাপ এবং কোন প্রাণীর মূত্রস্থলী খেতেন না। কিন্তু ওগুলোকে হারামও বলতেন না। তাঁর ফড়িং খাওয়া থেকে বিরত থাকার কারণ ছিল এই যে, এটা আল্লাহর একটি আযাব । ফড়িং যে ফসলের জমির উপর দিয়ে গমন করে সেই জমির ফসল সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। মূত্রস্থলী থেকে বিরত থাকার কারণ এই যে, ওটা প্রস্রাবের নিকটবর্তী অংশ। আর গোসাপ না খাওয়ার কারণ এই যে, ওটা হচ্ছে এমন একটি জাতি যা সুন্দর আকৃতি থেকে কদাকৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এই বর্ণনাটিও দুর্বল বটে, তবে গোসাপ খাওয়া থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরত থাকার কারণের প্রতি আলোকপাতের উদ্দেশ্যেই আমি এটা নকল করেছি।” আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) অত্যন্ত আগ্রহের সাথে ফড়িং খেতেন। তাঁকে ফড়িং খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি দু'একটি ফড়িং পেলে অত্যন্ত মজা করে খেয়ে থাকি।” হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্নীগণ থালা ভর্তি ফড়িং তাঁর কাছে উপঢৌকন স্বরূপ প্রেরণ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ইমরানের কন্যা মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমাকে এমন মাংস খেতে দিন যাতে রক্ত নেই।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ফড়িং খেতে দেন। তখন মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! লালন পালন ছাড়াই তাকে জীবন দান করুন এবং শব্দ ও শোরগোল ছাড়াই ওদের এককে অপরের পিছনে রেখে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“ফড়িংকে মেরো না। এগুলো হচ্ছে আল্লাহ তাআলার এক বিরাট সেনাবাহিনী।” এ হাদীসটি খুবই গারীব ।(আরবী) যুক্ত আয়াত সম্পর্কে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই শাস্তি এই কারণে যে, অতীত যুগে এগুলো দরজার কীলকে খেয়ে ফেলতে এবং কাঠকে অবশিষ্ট রাখতো। আওযায়ী (রঃ) বলেনঃ “আমি একদা জঙ্গলের দিকে রওয়ানা হলাম। হঠাৎ দেখি যে, এক ঝাক ফড়িং যমীন ও আসমানকে ছেয়ে আছে। আর একটি লোক ঐ ঝাঁকের মধ্যে বর্ম পরিহিত অবস্থায় রয়েছে। যেই দিকে সে ইশারা করছে সেই দিকে ঐ ফড়িংগুলো সরে যাচ্ছে। ঐ লোকটি বার বার বলতে রয়েছে- দুনিয়া ও ওর মধ্যস্থিত সবকিছুই বাতিল ও মিথ্যা।”কাযী শুরাইহ (রঃ)-কে ফড়িং সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ওকে ধ্বংস করুন! তার মধ্যে সাতটি শক্তিশালীর মাহাত্ম রয়েছে। ওর মাথা হচ্ছে ঘোড়ার, গর্দান হচ্ছে বলদের, বক্ষ সিংহের, বাহু গৃধিনীর, পা উটের, লেজ সাপের এবং পেট হচ্ছে বৃশ্চিকের।”(আরবী) (৫:৯৬) এই আয়াতটি সম্পর্কে আলোচনার সময় নিম্নের হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হজ্ব বা উমরার জন্যে যাচ্ছিলাম। এক দল ফড়িং-এর আমরা সম্মুখীন হই। আমরা খড়ি দিয়ে ওগুলোকে মারছিলাম, অথচ ঐ সময় আমরা ইহরামের অবস্থায় ছিলাম। আমরা এ কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করলে তিনি বলেনঃ “ইহরামের অবস্থায় সামুদ্রিক শিকারে কোন বাধা নেই।” হযরত আনাস (রাঃ) ও হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফড়িং-এর উপর বদদু'আ করে বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি ছোট বড় সমস্ত ফড়িংকে ধ্বংস করে দিন, ওদের ডিমগুলো বরবাদ করে দিন, ওদের বংশ-স র্কি ছিন্ন করুন এবং আমাদের থেকে কেড়ে নেয়া আহার্য ওদের মুখ থেকে ছিনিয়ে নিন! নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।” তখন হযরত জাবির (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এগুলো তো আল্লাহর সেনাবাহিনী। অথচ আপনি ওগুলোর বংশ সম্পর্ক কেটে দেয়ার প্রার্থনা করছেন!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এগুলো সমুদ্রের মাছ থেকে সৃষ্ট হয়ে থাকে।” (এটা ইমাম ইবনে মাজাহ (রাঃ) তাঁর সুনানে তাখরীজ করেছেন) যিয়াদ সংবাদ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি ফড়িংকে মাছ থেকে সৃষ্ট হতে দেখেছে সে বর্ণনা করেছে, মাছ যখন সমুদ্রের তীরবর্তী স্থানে ডিম ছাড়ে এবং তীরের পানি শুকিয়ে যায় ও তথায় সূর্যের আলো পতিত হয়, তখন ঐ ডিমগুলো হতে এই ফড়িং বেরিয়ে পড়ে উড়তে শুরু করে।” (আরবী) -এর আলোচনায় আমরা নিমের হাদীসটি বর্ণনা করেছিঃ“আল্লাহ তা'আলা হাজার প্রকারের মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। ছয়শ' প্রকার হচ্ছে জলচর এবং চারশ’ হচ্ছে স্থলচর। আর তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে যাবে এরূপ মাখলুক হচ্ছে ফড়িং।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যুদ্ধে ধ্বংস প্রাপ্তদের সামনে প্লেগও কিছুই নয়। আর ফড়িং এর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাঠেরও কোন হাকীকত নেই।” এই হাদীসটি গারীব। (আরবী) সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওটা হচ্ছে গমের ভিতরের পোকা অথবা ওটা হচ্ছে ছোট ছোট ফড়িং যার পালক থাকে না এবং উড়ে না। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হচ্ছে কালো বর্ণের ক্ষুদ্র কীট বা মশা অথবা ওটা হচ্ছে এমন পোকা যা উটের গায়ে লেগে থাকা পোকা সদৃশ।বর্ণিত আছে যে, যখন মূসা (আঃ) ফিরাউনকে বলেছিলেনঃ “হে ফিরাউন! বানী ইসরাঈলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও”। সেই সময় আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ঝড় তুফান শুরু হয়েছিল এবং মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছিল। ফিরাউন ও তার লোকেরা বুঝে নিয়েছিল যে, এটা আল্লাহর শাস্তি। তাই তারা বলেছিল“হে মূসা! আল্লাহর নিকট দু'আ করে এই ঝড়-তুফান বন্ধ করে দাও। আমরা তোমার উপর ঈমান আনবো এবং বানী ইসরাঈলকে তোমার সাথে পাঠিয়ে দেবো।” মূসা (আঃ) তখন দু'আ করলেন। কিন্তু না তারা ঈমান আনলো, না বানী ইসরাঈলকে তার সাথে পাঠালো। ঐ বছর বৃষ্টিপাতের ফলে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হলো। তারা তখন বলতে লাগলো- “বাঃ বাঃ! আমাদের আকাক্ষা তো এটাই ছিল। কিন্তু ঈমান না আনার কারণে ফড়িংকে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হলো। ওরা সমস্ত ক্ষেত খেয়ে ফেললো এবং শাক সবুজী নষ্ট করে দিলো। তারা বুঝে নিলো যে, এখন আর কোন ফসল অবশিষ্ট থাকবে না। সুতরাং তারা মূসা (আঃ)-এর শরণাপন্ন হয়ে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! এই শাস্তিকে সরিয়ে দাও। আমরা ঈমান আনবো।” মূসা (আঃ)-এর দু'আয় ফড়িং দূর হয়ে গেল। কিন্তু তথাপি তারা ঈমান আনলো না। বরং তারা ফসল ঘরে জমা করে রাখলো এবং বলতে শুরু করলো-“কি ভয়? শস্যের ঢেরি বাড়ীতে বিদ্যমান রয়েছে।” হঠাৎ গমের পোকার শাস্তি তাদের উপর পতিত হলো। এমন অবস্থা হলো যে, কেউ দশ সের গম পেষণের জন্যে নিয়ে গেলে তিন সেরও বাকী থাকতো না। আবার তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে আযাব রানোর দরখাস্ত করলো এবং ঈমান আনয়নের অঙ্গীকার করলো। কিন্তু সেই (আরবী)-এর শাস্তি দূর হওয়ার পরেও তারা বিরোধিতা করতেই থাকলো। কোন এক সময় হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনের সাথে মিলিত হয়েছিলেন এমন সময় ভেকের ডাক শোনা গেল। তিনি ফিরাউনকে বললেনঃ “তোমার উপর ও তোমার কওমের উপর একী শাস্তি!” সে বললোঃ “এতে তো ভয়ের কোনই কারণ নেই। ন্ধ্যা হতে না হতেই জনগণের সারা দেহে ভেক লাফালাফি শুরু করে দিলো। কেউ কথা বলার জন্যে মুখ খুললে ভেক তার মুখে প্রবেশ করতো। পুনরায় তারা ঐ শাস্তি অপসারণের জন্যে মূসা (আঃ)-এর নিকট আবেদন জানালো। কিন্তু সেই শাস্তি দূর হওয়ার পরেও তারা ঈমান আনলো না। এরপর নাযিল হলো রক্ত আযাব! তারা নদী থেকে বা কূপ থেকে পানি এনে রাখলে তা রক্তে পরিণত হয়ে যেতো। কোন পাত্রে রাখলেও সেই একই অবস্থা। ফিরাউনের কাছে লোকেরা এ অভিযোগ করলে সে তাদেরকে বললোঃ “তোমাদের উপর যাদু করা হয়েছে। তারা বললোঃ “আমাদের উপর কে যাদু করলো? আমাদের পাত্রে শুধু আমরা রক্তই পাচ্ছি!” অতএব, আবার তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আসলো এবং ঐ আযাব দূর হলে ঈমান আনবে ও বানী ইসরাঈলকে তার সাথে পাঠিয়ে দেবে এই ওয়াদা করলো। হযরত মূসা (আঃ)-এর দু'আয় তখন ঐ শাস্তি দূর হয়ে গেল। কিন্তু তবুও তারা ঈমান আনলো না এবং বানী ইসরাঈলকে তাঁর সাথে পাঠালোও না। (হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং পূর্ববর্তী আলেমদের আরো কয়েকজন হতে অনুরূপ বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন যাদুকরগণ ঈমান আনলো এবং ফিরাউন পরাজিত হলো ও বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে গেল, তখনও সে অবাধ্যতা ও কুফরী থেকে ফিরলো না। ফলে তাদের উপর পর্যায়ক্রমে কয়েকটি নিদর্শন প্রকাশিত হলো। দুর্ভিক্ষ, বৃষ্টিযুক্ত ঝড়-তুফান, ফড়িং, গমের পোকা, ব্যাঙ এবং রক্ত। এসব শাস্তি পর্যায়ক্রমে তাদের উপর নাযিল হতে থাকলো। ঝড়-তুফানের ফলে সমস্ত ভূমি দলদলে হয়ে গেল। না তারা তাতে লাঙ্গল চালাতে পারলো, না কোন ফসলের বীজ বপন করতে সক্ষম হলো। ক্ষুধার তাড়নায় তাদের প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আযাব সরানোর দরখাস্ত করলো এবং ঈমান আনয়নের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলো। মূসা (আঃ) আযাব সরানোর জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট আবেদন জানালেন। আযাব সরে গেল বটে, কিন্তু তারা ঈমান আনয়নের অঙ্গীকার পুরো করলো না। তারপরে আসলো ফড়িং-এর শাস্তি, যা সমস্ত ক্ষেতের ফসল খেয়ে ফেললো এবং তাদের ঘরের দরজাগুলোর পেরেক চাটতে থাকলো। ফলে তাদের ঘরগুলো পড়ে গেল। এরপরে আসলো কীটের শাস্তি। হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “এই টিলার দিকে এসো।” তারপর হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ। তা'আলার নির্দেশক্রমে একটি পাথরের উপর লাঠি মারলেন। তখন ওর মধ্য থেকে অসংখ্য কীট বেরিয়ে পড়লো। ওগুলো ঘরের সর্বস্থানে ছড়িয়ে পড়লো । খাদ্যদ্রব্যের গায়ে ওগুলো লেগে থাকলো। লোকগুলো না ঘুমোতে পারছিল, না একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছিল। তারপর তাদের উপর ব্যাঙ-এর শাস্তি নেমে আসলো। খাদ্যদ্রব্যে ব্যাঙ, ভাতের থালায় ব্যাঙ, কাপড়ে ব্যাঙ। এরপরে আসলো রক্তের শাস্তি। পানির প্রতিটি পাত্রে পানির পরিবর্তে রক্তই দেখা যায়। মোটকথা, তারা বিভিন্ন প্রকার শাস্তির শিকারে পরিণত হলো। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা বাঙকে মেরো না। কেননা, ফিরাউনের কওমের উপর যখন ব্যাঙ-এর শাস্তি প্রেরণ করা হয় তখন একটি ব্যাঙ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আগুনের এক চুল্লীর মধ্যে পড়ে যায়। তাই আল্লাহ তা'আলা ঠাণ্ডা জায়গা অর্থাৎ পানির স্থানকে ব্যাঙ-এর বাসস্থান বানিয়েছেন এবং তাদের ডাককে তসবীহ হিসেবে গণ্য করেছেন। যায়েদ ইবনে আসলাম (রাঃ) (আরবী)-এর শাস্তি দ্বারা নাকসীর (গরমের প্রকোপে নাক দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়) এর শাস্তি ভাব নিয়েছেন।

আল-আরাফ 7:136

১৩৬-১৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: ফিরাউনের কওমের উপর পর্যায়ক্রমে নিদর্শনাবলীর আগমন এবং একের পর এক শাস্তি অবতরণ সত্ত্বেও তারা অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যের উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাকলো। ফলে তাদেরকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়া হলো। সেখানে মূসা (আঃ)-এর জন্যে রাস্তা বানিয়ে দেয়া হলো। তিনি ঐ রাস্তায় নেমে পড়লেন। তাকে পার করিয়ে নেয়া হলো। তার সাথে বানী ইসরাঈলও ছিল। অতঃপর ফিরাউন এবং তার সেনাবহিনীও তাদের অনুসরণ করে ঐ পথে নেমে পড়লো। যখনই তারা মাঝ দরিয়ায় পৌঁছেছে তখনই দু’দিকের পানি মিলে গেল এবং তারা ডুবে মরলো। এটা ছিল আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এবং এগুলোর প্রতি উদাসীন থাকারই ফল। আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি বানী ইসরাঈলকে ফিরাউনের রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন, যাদেরকে অত্যন্ত দুর্বল মনে করা হতো এবং যারা দুর্বল হওয়ার কারণে ফিরাউনের গোলামী করতো। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি ঐ কওমের উপর ইহসান করতে চাই যাদেরকে দুর্বল মনে করা হয়। আমি তাদেরকে বাদশাহ্ ও সরদার বানাতে চাই। তাদেরকে আমি আমার যমীনের উত্তরাধিকারীরূপে গণ্য করবো। আর ফিরাউন ও তার কওম যে শাস্তির আশংকা করতো ঐ শাস্তিই আমি তাদের উপর নাযিল করবো।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “তারা ছেড়ে গিয়েছিল কতই না উদ্যান ও প্রস্রবণ! শস্যক্ষেত ও মনোরম আবাস! তারা সানন্দে উপভোগ করতে পার্থিব সম্পদ। আমি অপর গোত্রকে এর উত্তরাধিকারী বানিয়েছি।” হাসান বসরী (রঃ) ও কাতাদা (রঃ) দ্বারা শাম বা সিরিয়া দেশ বুঝিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার কল্যাণময় বাণী বানী ইসরাঈল জাতি সম্পর্কে পূর্ণ হলো, কেননা তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আল্লাহ তাআলার সেই কথা ও প্রতিশ্রুতি হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ “আমি ঐ সম্প্রদায়ের উপর অনুগ্রহ করতে চাই যাদেরকে দুর্বল মনে করা হয়। আমি তাদেরকে বাদশাহ্ ও নেতা বানাতে চাই। (এটাও ইবনে জারীর (রঃ) ও অন্যান্য হতে বর্ণিত হয়েছে এবং এটাই প্রকাশমান) তাদেরকে আমি আমার যমীনের উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবো। আর ফিরাউন ও তার কওম যে শাস্তির আশঙ্কা করতো ঐ শাস্তিই আমি তাদের উপর নাযিল করবো।” (২৮৫-৬) (আরবী) অর্থাৎ ফিরাউন ও তার কওম যে অট্টালিকা ও উদ্যানসমূহ তৈরী করেছিল এবং যেসব সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করেছিল, সবগুলোকেই আমি ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছি। (এটা ইবনে আব্বাস ও মুজাহিদ বলেছেন)

আল-আরাফ 7:137

১৩৬-১৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: ফিরাউনের কওমের উপর পর্যায়ক্রমে নিদর্শনাবলীর আগমন এবং একের পর এক শাস্তি অবতরণ সত্ত্বেও তারা অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যের উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাকলো। ফলে তাদেরকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়া হলো। সেখানে মূসা (আঃ)-এর জন্যে রাস্তা বানিয়ে দেয়া হলো। তিনি ঐ রাস্তায় নেমে পড়লেন। তাকে পার করিয়ে নেয়া হলো। তার সাথে বানী ইসরাঈলও ছিল। অতঃপর ফিরাউন এবং তার সেনাবহিনীও তাদের অনুসরণ করে ঐ পথে নেমে পড়লো। যখনই তারা মাঝ দরিয়ায় পৌঁছেছে তখনই দু’দিকের পানি মিলে গেল এবং তারা ডুবে মরলো। এটা ছিল আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এবং এগুলোর প্রতি উদাসীন থাকারই ফল। আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি বানী ইসরাঈলকে ফিরাউনের রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন, যাদেরকে অত্যন্ত দুর্বল মনে করা হতো এবং যারা দুর্বল হওয়ার কারণে ফিরাউনের গোলামী করতো। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি ঐ কওমের উপর ইহসান করতে চাই যাদেরকে দুর্বল মনে করা হয়। আমি তাদেরকে বাদশাহ্ ও সরদার বানাতে চাই। তাদেরকে আমি আমার যমীনের উত্তরাধিকারীরূপে গণ্য করবো। আর ফিরাউন ও তার কওম যে শাস্তির আশংকা করতো ঐ শাস্তিই আমি তাদের উপর নাযিল করবো।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “তারা ছেড়ে গিয়েছিল কতই না উদ্যান ও প্রস্রবণ! শস্যক্ষেত ও মনোরম আবাস! তারা সানন্দে উপভোগ করতে পার্থিব সম্পদ। আমি অপর গোত্রকে এর উত্তরাধিকারী বানিয়েছি।” হাসান বসরী (রঃ) ও কাতাদা (রঃ) দ্বারা শাম বা সিরিয়া দেশ বুঝিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার কল্যাণময় বাণী বানী ইসরাঈল জাতি সম্পর্কে পূর্ণ হলো, কেননা তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আল্লাহ তাআলার সেই কথা ও প্রতিশ্রুতি হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ “আমি ঐ সম্প্রদায়ের উপর অনুগ্রহ করতে চাই যাদেরকে দুর্বল মনে করা হয়। আমি তাদেরকে বাদশাহ্ ও নেতা বানাতে চাই। (এটাও ইবনে জারীর (রঃ) ও অন্যান্য হতে বর্ণিত হয়েছে এবং এটাই প্রকাশমান) তাদেরকে আমি আমার যমীনের উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবো। আর ফিরাউন ও তার কওম যে শাস্তির আশঙ্কা করতো ঐ শাস্তিই আমি তাদের উপর নাযিল করবো।” (২৮৫-৬) (আরবী) অর্থাৎ ফিরাউন ও তার কওম যে অট্টালিকা ও উদ্যানসমূহ তৈরী করেছিল এবং যেসব সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করেছিল, সবগুলোকেই আমি ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছি। (এটা ইবনে আব্বাস ও মুজাহিদ বলেছেন)

আল-আরাফ 7:138

১৩৮-১৩৯ নং আয়াতের তাফসীর: বানী ইসরাঈলের অজ্ঞ লোকদের বাসনার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, মূসা (আঃ) যখন তাদেরকে নিয়ে সমুদ্র পার হয়ে গেলেন এবং তারা আল্লাহ তা'আলার এই বিরাট নিদর্শন স্বচক্ষে দেখলো তখন তারা এমন এক সম্প্রদায়ের পার্শ্ব দিয়ে গমন করলো যারা মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়েছিল। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, তারা ছিল কিনআনী গোত্র বা লাখম গোত্র। তারা গাভীর ন্যায় জন্তুর মূর্তি বানিয়ে নিয়েছিল এবং ওরই উপাসনায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। এ জন্যেই পরবর্তীতে ওরই সাথে সাদৃশ্যযুক্ত একটি বাছুরের উপাসনায় তারা জড়িয়ে পড়েছিল এবং বলেছিল- “হে মূসা (আঃ)! আমাদের জন্যে একটি মা’রূদ বানিয়ে দিন, যেমন এই লোকগুলোর মা’রূদসমূহ রয়েছে।” মূসা (আঃ) বললেনঃ “তোমরা বড়ই মূর্খ। তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ভুলে বসেছে। তিনি এসব ব্যাপার থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র যে, তাঁর শরীক ও সমতুল্য কেউ হতে পারে। তাদের মাযহাবও ভিত্তিহীন এবং আমলও ভিত্তিহীন।”আবৃ ওয়াফিদিল লাইসী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মক্কা থেকে হুনাইনের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলাম। পথিমধ্যে কাফিরদের একটি কুল বৃক্ষ আমাদের সামনে পড়ে যার পার্শ্বে তারা আসর জমিয়ে বসেছিল। তারা তাদের অস্ত্রশস্ত্র ঐ গাছে বেঁধে রেখেছিল। এভাবে তারা ঐ গাছটির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছিল। ঐ গাছটিকে (আরবী) বলা হতো। আমরা যখন ঐ গাছের নিকট পৌঁছি তখন দেখি যে, ওটা খুবই সবুজ ও জাকজমকপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের জন্যেও একটা (আরবী)-এর ব্যবস্থা করে দিন, যেমন তাদের রয়েছে। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! তোমরা তো ঐ কথাই বলেছে যে কথা মূসা (আঃ)-এর কওম তাকে বলেছিল। তারা বলেছিলঃ “হে মূসা (আঃ)! আপনি আমাদের জন্যেও একটি মা'বুদ বানিয়ে দিন, যেমন ঐ লোকদের রয়েছে।” তখন মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “তোমরা তো বড়ই অজ্ঞ ও মূখ। তাদের পন্থা ও তাদের আমল সবই মিথ্যা ও বাতিল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরাও তাদেরই পদাংক অনুসরণ করতে চাচ্ছ।” (১. এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা পেশ করেছেন)

আল-আরাফ 7:139

১৩৮-১৩৯ নং আয়াতের তাফসীর: বানী ইসরাঈলের অজ্ঞ লোকদের বাসনার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, মূসা (আঃ) যখন তাদেরকে নিয়ে সমুদ্র পার হয়ে গেলেন এবং তারা আল্লাহ তা'আলার এই বিরাট নিদর্শন স্বচক্ষে দেখলো তখন তারা এমন এক সম্প্রদায়ের পার্শ্ব দিয়ে গমন করলো যারা মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়েছিল। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, তারা ছিল কিনআনী গোত্র বা লাখম গোত্র। তারা গাভীর ন্যায় জন্তুর মূর্তি বানিয়ে নিয়েছিল এবং ওরই উপাসনায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। এ জন্যেই পরবর্তীতে ওরই সাথে সাদৃশ্যযুক্ত একটি বাছুরের উপাসনায় তারা জড়িয়ে পড়েছিল এবং বলেছিল- “হে মূসা (আঃ)! আমাদের জন্যে একটি মা’রূদ বানিয়ে দিন, যেমন এই লোকগুলোর মা’রূদসমূহ রয়েছে।” মূসা (আঃ) বললেনঃ “তোমরা বড়ই মূর্খ। তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ভুলে বসেছে। তিনি এসব ব্যাপার থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র যে, তাঁর শরীক ও সমতুল্য কেউ হতে পারে। তাদের মাযহাবও ভিত্তিহীন এবং আমলও ভিত্তিহীন।”আবৃ ওয়াফিদিল লাইসী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মক্কা থেকে হুনাইনের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলাম। পথিমধ্যে কাফিরদের একটি কুল বৃক্ষ আমাদের সামনে পড়ে যার পার্শ্বে তারা আসর জমিয়ে বসেছিল। তারা তাদের অস্ত্রশস্ত্র ঐ গাছে বেঁধে রেখেছিল। এভাবে তারা ঐ গাছটির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছিল। ঐ গাছটিকে (আরবী) বলা হতো। আমরা যখন ঐ গাছের নিকট পৌঁছি তখন দেখি যে, ওটা খুবই সবুজ ও জাকজমকপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের জন্যেও একটা (আরবী)-এর ব্যবস্থা করে দিন, যেমন তাদের রয়েছে। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! তোমরা তো ঐ কথাই বলেছে যে কথা মূসা (আঃ)-এর কওম তাকে বলেছিল। তারা বলেছিলঃ “হে মূসা (আঃ)! আপনি আমাদের জন্যেও একটি মা'বুদ বানিয়ে দিন, যেমন ঐ লোকদের রয়েছে।” তখন মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “তোমরা তো বড়ই অজ্ঞ ও মূখ। তাদের পন্থা ও তাদের আমল সবই মিথ্যা ও বাতিল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরাও তাদেরই পদাংক অনুসরণ করতে চাচ্ছ।” (১. এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা পেশ করেছেন)

আল-আরাফ 7:140

১৪০-১৪১ নং আয়াতের তাফসীর: মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতসমূহ স্মরণ করাতে গিয়ে বলছেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে ফিরাউনের বন্দীত্ব ও প্রভুত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছেন এবং রেহাই দিয়েছেন অপমানজনক কাজ থেকে। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন মর্যাদা ও সম্মান। তোমাদের শত্রুদেরকে তিনি তোমাদের চোখের সামনে ধ্বংস করে দিয়েছেন। সুতরাং তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কে হতে পারে? এর বিস্তারিত বিবরণ সূরায়ে বাকারায় দেয়া হয়েছে।

আল-আরাফ 7:141

১৪০-১৪১ নং আয়াতের তাফসীর: মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতসমূহ স্মরণ করাতে গিয়ে বলছেনঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে ফিরাউনের বন্দীত্ব ও প্রভুত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছেন এবং রেহাই দিয়েছেন অপমানজনক কাজ থেকে। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন মর্যাদা ও সম্মান। তোমাদের শত্রুদেরকে তিনি তোমাদের চোখের সামনে ধ্বংস করে দিয়েছেন। সুতরাং তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কে হতে পারে? এর বিস্তারিত বিবরণ সূরায়ে বাকারায় দেয়া হয়েছে।

আল-আরাফ 7:142

আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের উপর যে ইহসান করেছেন তা তিনি তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেনঃ তোমাদেরকে আমি হিদায়াত দান করেছি। তোমাদের নবী মূসা (আঃ) আমার সাথে কথা বলেছেন। আমি তাকে তাওরাত (আসমানী কিতাব) প্রদান করেছি। এর মধ্যে নির্দেশাবলী ও শরীয়তের যাবতীয় কথা বিস্তারিতভাবে লিবিপদ্ধ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা মূসা (আঃ)-এর সাথে ত্রিশ রাত্রির ওয়াদা করেছিলেন। মুফাসসিরগণ বলেন যে, হযরত মূসা (আঃ) ঐদিনগুলোতে রোযা রেখেছিলেন। যখন এই ত্রিশ দিন পূর্ণ হলো তখন আল্লাহ তা'আলা চল্লিশ দিন পূর্ণ করার নির্দেশ দিলেন। অধিকাংশ মুফাসির বলেন যে, যিকাদা মাসের ছিল ত্রিশ দিন এবং যিলহাজ্ব মাসের ছিল দশ দিন। এভাবে ঈদের দিন পর্যন্ত চল্লিশ দিন পূর্ণ হয়। এরপর মূসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার সাথে কথা বলেন এবং ঐ দিনেই দ্বীনে মুহাম্মাদী পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্যে পূর্ণ করে দিয়েছি এবং আমার নিয়ামত তোমাদের জন্যে পরিপূর্ণ করেছি আর তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করেছি। মোটকথা, যখন মেয়াদ পূর্ণ হলো এবং মূসা (আঃ) ভূরের দিকে গেলেন, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে বানী ইসরাঈল! আমি তোমাদেরকে শত্রু থেকে মুক্তি দিয়েছি এবং তুরের সোজা পথের দিকে আহ্বান করেছি।” তখন তিনি স্বীয় ভ্রাতা হারূন (আঃ)-কে তার স্থলাভিষিক্ত বানিয়ে যান এবং অবস্থা ও পরিবেশ ভাল রাখার উপদেশ দেন, যেন ফাসাদ ও বিশৃংখলা সৃষ্টি না হয়। হারূন (আঃ)-কে তাঁর উপদেশ দান শুধু সতর্কতামূলক ছিল। নচেৎ, হারূনও (আঃ) স্বয়ং নবী ছিলেন এবং মহামর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী ছিলেন। তাঁর উপর এবং সমস্ত নবীর উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।

আল-আরাফ 7:143

আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, যখন মূসা (আঃ) ওয়াদার স্থানে আসলেন এবং আল্লাহ পাকের সাথে কথা বলার মর্যাদা তার লাভ হয় তখন তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট আবেদন জানিয়ে বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনাকে দেখতে চাই। আপনাকে দেখার সুযোগে আমাকে দান করুন।” তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বললেনঃ “তুমি কখনই আমাকে দেখতে পার না।” (আরবী)-এর মধ্যে যে (আরবী) শব্দটি রয়েছে, এটা আলিমদের মধ্যে জটিলতা সৃষ্টি করেছে। কেননা, (আরবী) শব্দটি চিরস্থায়ী অস্বীকৃতি বুঝাবার জন্যে এসে থাকে। এর উপর ভিত্তি করেই মু'তাযিলা সম্প্রদায় দলীল গ্রহণ করেছেন যে, দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থলেই আল্লাহ তাআলার দর্শন অসম্ভব। কিন্তু তাদের এই উক্তি খুবই দুর্বল। কেননা, এ ব্যাপারে ক্রমাগত হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, মুমিনরা আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “সেই দিন কতকগুলো মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের প্রতিপালকের পানে তাকাবে। এর দ্বারা মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে, তারা আল্লাহকে পরকালে দেখতে পাবে। অতঃপর কাফিরদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাবে না। যেমন তিনি বলেনঃ “কখনই না, ওরা সেদিন ওদের রব থেকে থাকবে অন্তরীণ।” এ কথাও বলা হয়েছে যে, এই (আরবী) বা অস্বীকৃতি দুনিয়ার জন্যে নির্দিষ্ট, আখিরাতের জন্যে নয়। এইভাবে এখন বাক্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আসছে যে, আখিরাতে আল্লাহর দৃর্শন সত্য ও সঠিক, দুনিয়ায় নয়। আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, এই স্থলে এই কথার অর্থ ঠিক এরূপই যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দৃষ্টিসমূহ তাকে দেখতে পায় না, কিন্তু তিনি দৃষ্টিসমূহকে দেখতে পান, তিনি সুক্ষ্মদর্শী ও সর্বজ্ঞাত।” (৬:১০৩) সূরায়ে আনআমে এর উপর যথেষ্ট আলোচনা করা হয়েছে।পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেনঃ “হে মূসা (আঃ)! কোন জীবিত মৃত্যুর পূর্বে আমাকে দেখতে পারে না। শুষ্ক জিনিসও আমার আলোক সম্পাৎ করণে ধ্বংস হয়ে যায়। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন যে, প্রতিপালক যখন পাহাড়ের উপর স্বীয় আলোকে সম্পাৎ করলেন তখন পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল এবং মূসা (আঃ) সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলেন। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা পাহাড়ের উপর স্বীয় আলোক সম্পাৎ করেন ( সেই সময় তিনি স্বীয় অঙ্গুলি দ্বারা ইশারাও করেন) তখন ওটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। বর্ণনাকারী বলেন- আবু ইসমাঈলও (রঃ) এটা বলার সময় আমাদের দিকে স্বীয় শাহাদাত অঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করেন। এই হাদীসের ইসনাদে একজন বর্ণনাকারীর নাম অজ্ঞাত আছে। নবী (সঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি পড়ার সময় স্বীয় বৃদ্ধাঙ্গুলিটি কনিষ্ঠাঙ্গুলির উপরের পোরের উপর রেখে বলেনঃ “এটুকু আলোক সম্পাতের কারণে পাহাড় চূর্ণ হয়ে যায়।” (এটা ইবনে জারীর (রঃ) তাখরীজ করেছেন এবং ইমাম তিরমীযী (রঃ), আহমদ (রঃ) এবং হাকিম (রঃ) এরই কাছাকাছি বর্ণনা করেছেন)হামীদ সার্বিতকে বলেনঃ “দেখ, এইভাবে। তখন সাবিত স্বীয় হাতখানা হামীদের বক্ষের উপর মেরে বলেনঃ “এ কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন এবং আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, তাহলে আমি কি এটা গোপন করবো?” ইমাম আহমাদও (রঃ) এরূপই বর্ণনা করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা শুধু কনিষ্ঠাঙ্গুলি বরাবর আলোক সম্পাৎ করেন, এর ফলেই পাহাড় জ্বলে উঠে এবং মাটি হয়ে যায়। সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, পাহাড় যমীনের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে যায় এবং নিমজ্জিত হতেই রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত ওটা আর প্রকাশিত হবে না। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন পাহাড়গুলোর উপর আলোক সম্পাৎ করা হয় তখনই ছয়টি পাহাড় উড়ে যায়। তিনটি মক্কায় এসে পড়ে এবং তিনটি পড়ে মদীনায় । মদীনায় পতিত পাহাড় তিনটি হচ্ছে-(১) উহুদ, (২) অরকান এবং রাওয়া। আর মক্কায় পতিত তিনটি পাহাড় হচ্ছে- (১) হেরা, (২) সাবীর এবং (৩) সাওর। এই হাদীসটি গারীব, এমন কি মুনকারও বটে।আলোক সম্পাতের পূর্বে তূর পাহাড়টি চর্চকে ও পরিষ্কার ছিল। আলোক সম্পাতের পর তাতে গুহা হয়ে গেছে এবং ফাটল ধরে গেছে। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ পাকের এ উক্তি- “হে মূসা (আঃ)! পাহাড়ের দিকে তাকাও, যদি ওটা প্রতিষ্ঠিত থাকে তবে বুঝবে যে, তুমি আমাকে দেখতে পারবে। নচেৎ, দেখতে পারবে না। এটা তিনি এ কারণেই বলেছেন যে, পাহাড়ের সৃষ্টি ও মজবুতি তো মানুষের চাইতে বহুগুণে বড় ও শক্ত! সুতরাং সেই পাহাড়ও আল্লাহর আলোক সম্পাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে দেখে তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর তাফসীর মতে (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে সংজ্ঞাহীনতা। (এটা ইবনে জারীর আত্ তাবারী (রঃ) তাখরীজ করেছেন এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে সুদ্দীরও (রঃ) এরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে) কাতাদা (রঃ) এর অর্থ নিয়েছেন মৃত্যু। আভিধানিক দিক দিয়ে এ অর্থটিও সঠিক। যেমন কুরআন মাজীদে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “যখন সিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে তখন যতকিছু আকাশে ও পৃথিবীতে রয়েছে, সবাই মরে যাবে বা ধ্বংস হয়ে যাবে।” মোটকথা, এখানে অর্থ মৃত্যুও হতে পারে এবং সংজ্ঞাহীনতাও হতে পারে। সংজ্ঞাহীনতা অর্থ এজন্যে হতে পারে যে, এরপরেই আল্লাহ পাক (আরবী) বলেছেন। আর চৈতন্য তো সংজ্ঞাহীনতার পরেই হয়ে থাকে, মৃত্যুর পরে নয়। সুতরাং এখানে সংজ্ঞাহীনতার অর্থ নেয়াই ঠিক হবে।চৈতন্য ফিরে আসলে হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র। আপনার প্রতি কেউই দৃষ্টি রাখতে পারে না। দৃষ্টিপাত করলেই সে জ্বলে পুড়ে মরে যাবে। আপনাকে দেখতে চেয়ে আমি যে ভুল করেছি তার জন্যে তাওবা করছি। এখন আমার বিশ্বাস হয়ে গেছে এবং আমিই সর্বপ্রথম বিশ্বাস স্থাপনকারী।” এখানে ঈমান দ্বারা ঈমান ও ইসলাম উদ্দেশ্য নয়। বরং এখানে বুঝানো হয়েছে- “আমার এই বিশ্বাস জন্মেছে যে, আপনার মাখলুক আপনাকে দেখতে পারে না।”ইবনে জারীর (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর বর্ণনায় একটি বিস্ময়কর হাদীস নকল করেছেন এবং প্রধানতঃ তিনি একথাগুলো ইসরাঈলিয়াতের দফতর হতে পেয়েছেন। আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।(আরবী) -এই আয়াত সম্পর্কীয় হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর একটি বর্ণনা রয়েছে, তিনি বলেন যে, একজন ইয়াহূদী এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অভিযোগ করলোঃ “আপনার একজন আনসারী সাহাবী আমার মুখের উপর এক থাপ্পড় মেরেছে।” ঐ সাহাবীকে ডেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি এই লোকটিকে বলতে শুনেছি - “আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে সমস্ত মানুষের উপর ফযীলত দান করেছেন। আমি তখন বললাম, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপরও কি? সে বললোঃ “হা।" এতে আমার ক্রোধ হয়ে যায়। তাই আমি তাকে এক থাপ্পড় মেরে দেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরা আমাকে নবীদের উপর মর্যাদা দিয়ো না। মানুষ কিয়ামতের দিন অজ্ঞান হয়ে যাবে। সর্বপ্রথম চৈতন্য লাভ আমারই হবে। কিন্তু আমি দেখবো যে, হযরত মূসা (আঃ) আরশের পায়া ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমি জানি না যে, আমার পূর্বে তাঁরই চৈতন্য লাভ হয়েছে, অথবা তিনি অজ্ঞানই হননি। কেননা, ভূরে আলোক সম্পাতের সময় তিনি একবার সংজ্ঞাহীন হয়েছিলেন। কাজেই মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন হয়তো তাঁকে সংজ্ঞাহীন হওয়া থেকে মুক্ত রাখবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবু বকর ইবনে আবি দীনার বলেন যে, এই বিবাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)। কিন্তু সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এটা আলোচিত হয়েছে যে, উনি ছিলেন আনসারদের একটি লোক। আর হযরত আবু বকর (রাঃ) তো আনসারদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন মুহাজির। রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এ উক্তি তাঁর এই উক্তির মতই যে, তিনি বলেছেন। (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আমাকে নবীদের উপর ও ইউনুস ইবনে মাত্তার উপর মর্যাদা প্রদান করো না।” বলা হয়েছে যে, এ কথা তিনি বিনয়, নম্রতা ও ভদ্রতার খাতিরে বলেছিলেন! অথবা আল্লাহ তাআলা যে তাকে অন্যান্য নবীদের উপর মর্যাদা দান করেছেন। এটা তা অবহিত হওয়ার পূর্বের কথা। অথবা তাঁর একথার উদ্দেশ্য ছিল“তোমরা ক্রোধে পতিত হয়ে গোঁড়ামি বা বদ্ধমূল ধারণার উপর ভিত্তি করে আমাকে মর্যাদা প্রদান করো না।” অথবা তার কথার ভাবার্থ ছিল- “তোমরা শুধুমাত্র স্বীয় মতানুসারে আমাকে ফযীলত প্রদান করো না।” আল্লাহ তা'আলাই সর্বাপেক্ষা অধিক জ্ঞানের অধিকারী।কিয়ামতের দিন লোকেরা অজ্ঞান হয়ে পড়বে। এটা স্পষ্ট কথা যে, মানুষের এভাবে চৈতন্য হারিয়ে ফেলা কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্যের কারণেই হবে। খুব সম্ভব যে, এটা ঐ সময়ের ঘটনা হবে যখন আল্লাহ তাআলা লোকদের মধ্যে ফায়সালা করার জন্যে আসবেন। সেই সময় তাঁর আলোক সম্পাতের ফলে লোকেরা বেহুশ হয়ে যাবে। যেমন হযরত মূসা (আঃ) তাজাল্লী সহ্য করতে পারেননি। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “না জানি হয়তো আমার চৈতন্য লাভের পূর্বেই মূসা (আঃ)-এর চৈতন্য লাভ হবে অথবা ভূরের অচৈতন্য হয়ে যাওয়ার বিনিময়ে তিনি এখানে চেতনাই হারাবেন না।”হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর আলোক সম্পাৎ হয় তখন তার দৃষ্টিশক্তি এত তীব্র হয় যে, দশ ক্রোশ দূর হতে রাত্রির অন্ধকারে কোন কঙ্করময় ভূমিতে চলমান পিপীলিকাকেও তিনি দেখতে পেতেন।" হযরত আবু বকর (রাঃ)। বলেনঃ “এদিক দিয়ে এটা তো কোন অসম্ভব কথা নয় যে, এই বৈশিষ্ট্য আমাদের নবীও (সঃ) লাভ করেছেন। কেননা মেরাজে তিনি আয়াতে কুবরা বা বড় সব নিদর্শন স্বচক্ষে দেখেছিলেন।” এই কথার মাধ্যমে তিনি যেন এই হাদীসের সত্যতা সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু হাদীসের সত্যতার ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এই হাদীসে অপরিচিত বর্ণনাকারী রয়েছেন। আর এসব কথা যে পর্যন্ত ন্যায়পরায়ণ ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর সাথে সম্পর্কযুক্ত না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আল-আরাফ 7:144

১৪৪-১৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলেছেনঃ “হে মূসা (আঃ)! আমি তোমাকে রিসালাতের জন্যে ও আমার সাথে বাক্যালাপের জন্যে সমস্ত লোকের মধ্য থেকে বেছে নিয়েছি।" এতে কোনই সন্দেহ নেই যে, মুহাম্মাদ (সঃ) হযরত আদম (আঃ)-এর সমস্ত সন্তানের সরদার বা নেতা। এজন্যেই তো আল্লাহ তা'আলা তাঁকে খাতেমুল আম্বিয়া বানিয়েছেন। তাঁর শরীয়ত কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে এবং তাঁর উম্মতের সংখ্যা সমস্ত নবীর উম্মতের সংখ্যা অপেক্ষা অধিক হবে। মর্যাদা ও ফযীলতের দিক দিয়ে তার পরে হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর স্থান। অতঃপর হযরত মূসা ইবনে ইমরান কালীমুল্লাহ (আঃ)-এর স্থান।আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ “আমি তোমাকে যে কালাম ও মুনাজাত দান করেছি তা তুমি গ্রহণ কর এবং সে জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আর যা সহ্য করার তোমার শক্তি নেই তা যাজ্ঞা করো না।” এরপর সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, এই তাখতী বা ফলকে প্রত্যেক বিষয়ের উপদেশ এবং প্রত্যেক হুকুমের ব্যাখ্যা বিদ্যমান রয়েছে। কথিত আছে যে, এই ফলক ছিল মণি-মানিক্যের তৈরী। আল্লাহ পাক তাতে উপদেশাবলী ও নির্দেশাবলী বিস্তারিতভাবে লিখে দিয়েছিলেন এবং সমস্ত হারাম এবং হালালও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এই ফলকের উপর তাওরাত লিখিত ছিল। আল্লাহ পাক বলেনঃ “কুরূনে উলাকে ধ্বংস করে দেয়ার পর আমি মূসা (আঃ)-কে কিতাব প্রদান করেছি ,যার মধ্যে লোকদের জন্যে অন্তদৃষ্টি রয়েছে।” এটাও কথিত আছে যে, এই ফলক তাওরাত লিখার পূর্বেই দেয়া হয়েছিল। মোটকথা, এটা ছিল দর্শনের প্রার্থনা না মঞ্জুর করার বিনিময় ।‘দৃঢ় হস্তে শক্তভাবে গ্রহণ কর' অর্থাৎ আনুগত্যের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ কর এবং স্বীয় সম্প্রদায়কেও নির্দেশ দাও যে, তারা যেন, উত্তমরূপে এর উপর আমল করে। মূসা (আঃ)-এর হুকুমের সাথে (আরবী) শব্দ রয়েছে, আর তাঁর কওমের সাথে (আরবী) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ মূসা (আঃ)-কে তাগিদ করা হচ্ছে যে, তিনি যেন সর্বপ্রথম দৃঢ়তার সাথে ওর উপর আমল করেন এবং এরপর যেন তাঁর কওম উত্তম পন্থায় আমল করে।(আরবী) অর্থাৎ হে মূসা (আঃ)! যারা আমার বিরুদ্ধাচরণ করবে ও আমার আনুগত্যের বাইরে চলে যাবে তাদের পরিণাম কি হবে অর্থাৎ কিভাবে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে তা আমি শীঘ্রই তোমাকে দেখাবো। একথাটি ঠিক ঐ কথার মত যেমন কেউ স্বীয় সম্বোধনকৃত ব্যক্তিকে বলে- যদি তুমি আমার হুকুম অমান্য কর তবে কাল আমি তোমাকে দেখে নেবো।' এখানে নির্দেশ অমান্যকারীদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। (এই অর্থ মুজাহিদ (রঃ) ও হাসান বসরী (রঃ) থেকে নকল করা হয়েছে) আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-আমি আমার অনুগতদেরকে ফাসেকদের রাজ্য অর্থাৎ সিরিয়া দান করবো। অথবা এর দ্বারা ফিরাউন সম্প্রদায়ের মনযিলকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রথম কথাটিই বেশী পছন্দনীয়। আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী। কেননা, এটা ছিল হযরত মূসা (আঃ)-এর মিসর ত্যাগ করার পরের ফরমান। আর এই দ্বিতীয় উক্তি দ্বারা তো বানী ইসরাঈলকে সম্বোধন করা হয়েছে এবং এটা হচ্ছে ‘তীহ ময়দানে প্রবেশ করার পূর্বের সম্বোধন।

আল-আরাফ 7:145

১৪৪-১৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলেছেনঃ “হে মূসা (আঃ)! আমি তোমাকে রিসালাতের জন্যে ও আমার সাথে বাক্যালাপের জন্যে সমস্ত লোকের মধ্য থেকে বেছে নিয়েছি।" এতে কোনই সন্দেহ নেই যে, মুহাম্মাদ (সঃ) হযরত আদম (আঃ)-এর সমস্ত সন্তানের সরদার বা নেতা। এজন্যেই তো আল্লাহ তা'আলা তাঁকে খাতেমুল আম্বিয়া বানিয়েছেন। তাঁর শরীয়ত কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে এবং তাঁর উম্মতের সংখ্যা সমস্ত নবীর উম্মতের সংখ্যা অপেক্ষা অধিক হবে। মর্যাদা ও ফযীলতের দিক দিয়ে তার পরে হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর স্থান। অতঃপর হযরত মূসা ইবনে ইমরান কালীমুল্লাহ (আঃ)-এর স্থান।আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ “আমি তোমাকে যে কালাম ও মুনাজাত দান করেছি তা তুমি গ্রহণ কর এবং সে জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আর যা সহ্য করার তোমার শক্তি নেই তা যাজ্ঞা করো না।” এরপর সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, এই তাখতী বা ফলকে প্রত্যেক বিষয়ের উপদেশ এবং প্রত্যেক হুকুমের ব্যাখ্যা বিদ্যমান রয়েছে। কথিত আছে যে, এই ফলক ছিল মণি-মানিক্যের তৈরী। আল্লাহ পাক তাতে উপদেশাবলী ও নির্দেশাবলী বিস্তারিতভাবে লিখে দিয়েছিলেন এবং সমস্ত হারাম এবং হালালও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এই ফলকের উপর তাওরাত লিখিত ছিল। আল্লাহ পাক বলেনঃ “কুরূনে উলাকে ধ্বংস করে দেয়ার পর আমি মূসা (আঃ)-কে কিতাব প্রদান করেছি ,যার মধ্যে লোকদের জন্যে অন্তদৃষ্টি রয়েছে।” এটাও কথিত আছে যে, এই ফলক তাওরাত লিখার পূর্বেই দেয়া হয়েছিল। মোটকথা, এটা ছিল দর্শনের প্রার্থনা না মঞ্জুর করার বিনিময় ।‘দৃঢ় হস্তে শক্তভাবে গ্রহণ কর' অর্থাৎ আনুগত্যের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ কর এবং স্বীয় সম্প্রদায়কেও নির্দেশ দাও যে, তারা যেন, উত্তমরূপে এর উপর আমল করে। মূসা (আঃ)-এর হুকুমের সাথে (আরবী) শব্দ রয়েছে, আর তাঁর কওমের সাথে (আরবী) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ মূসা (আঃ)-কে তাগিদ করা হচ্ছে যে, তিনি যেন সর্বপ্রথম দৃঢ়তার সাথে ওর উপর আমল করেন এবং এরপর যেন তাঁর কওম উত্তম পন্থায় আমল করে।(আরবী) অর্থাৎ হে মূসা (আঃ)! যারা আমার বিরুদ্ধাচরণ করবে ও আমার আনুগত্যের বাইরে চলে যাবে তাদের পরিণাম কি হবে অর্থাৎ কিভাবে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে তা আমি শীঘ্রই তোমাকে দেখাবো। একথাটি ঠিক ঐ কথার মত যেমন কেউ স্বীয় সম্বোধনকৃত ব্যক্তিকে বলে- যদি তুমি আমার হুকুম অমান্য কর তবে কাল আমি তোমাকে দেখে নেবো।' এখানে নির্দেশ অমান্যকারীদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। (এই অর্থ মুজাহিদ (রঃ) ও হাসান বসরী (রঃ) থেকে নকল করা হয়েছে) আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে-আমি আমার অনুগতদেরকে ফাসেকদের রাজ্য অর্থাৎ সিরিয়া দান করবো। অথবা এর দ্বারা ফিরাউন সম্প্রদায়ের মনযিলকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রথম কথাটিই বেশী পছন্দনীয়। আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী। কেননা, এটা ছিল হযরত মূসা (আঃ)-এর মিসর ত্যাগ করার পরের ফরমান। আর এই দ্বিতীয় উক্তি দ্বারা তো বানী ইসরাঈলকে সম্বোধন করা হয়েছে এবং এটা হচ্ছে ‘তীহ ময়দানে প্রবেশ করার পূর্বের সম্বোধন।

আল-আরাফ 7:146

১৪৬-১৪৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা আমার আনুগত্য অস্বীকার করে এবং বিনা কারণে মানুষের কাছে অহংকার প্রকাশ করে, তাদেরকে আমি শরীয়ত ও আহকাম অনুধাবন করা থেকে বঞ্চিত করে দেবো যা আমার শ্রেষ্ঠত্ব ও একত্বের উপর অকাট্য প্রমাণ। অজ্ঞতা ও মূখর্তা তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেছেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদের অন্তর ও চক্ষুকে পরিবর্তন করে দিয়েছি, কেননা তাদেরকে বুঝানো সত্ত্বেও তারা প্রথমবারই ঈমান আনয়ন করেনি। অন্য এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন তারা বেঁকে গেল তখন আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরকেও বাঁকা করে দিলেন, যেন যেমন তারা বুঝছে না তেমন কখনই না বুঝে।” কোন কোন পূর্ববর্তী গুরুজন বলেন যে, অহংকারী বিদ্যা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করতেই পারে না। সে তো গৌররেই ফেটে পড়ে। যে ব্যক্তি অল্প কিছুদিনের তরে জ্ঞান ও বিদ্যা শিক্ষার কষ্ট সহ্য করতে পারলো না, তাকে চিরদিনের জন্যে বিদ্যা থেকে বঞ্চিত থাকার লাঞ্ছনা সহ্য করতেই হবে।এ জন্যেই আল্লাহ পাক তাদের থেকে কুরআন বুঝবার মূল পদার্থ ছিনিয়ে নিয়েছেন এবং স্বীয় নিদর্শনাবলী থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করেছেন। এই আয়াতের ইঙ্গিত এই উম্মতের দিকেও রয়েছে। এটা হচ্ছে ইবনে উয়াইনার চিন্তাধারা। কিন্তু এটা অবশ্যম্ভাবী নয়। ইবনে উয়াইনা তো এটাকে প্রত্যেক উম্মতের ব্যাপারেই প্রযোজ্য বলে থাকেন এবং উম্মতদের মধ্যে কোন পার্থক্য দেখান না। আল্লাহ তা'আলা সর্বাপেক্ষা অধিক জ্ঞানের অধিকারী।ইরশাদ হচ্ছে- তারা যতই আয়াত শ্রবণ করুক না কেন, ঈমান আনবে না। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “যে লোকদের ব্যাপারে আল্লাহর কথা পূর্ণ হয়ে গেছে। যে, তারা সঠিক পথের উপর আসবে না, তাদের কাছে যতই আয়াত আসুক না কেন তারা কখনও ঈমান আনবে না, যে পর্যন্ত না তারা বেদনাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে।” আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি তারা সৎ পথ দেখতেও পায় তবুও সেই পথ গ্রহণ করবে না, কিন্তু তারা যদি ভ্রান্ত ও গুমরাহীর পথ দেখতে পায় তবে ওকেই জীবন পথরূপে গ্রহণ করবে। এর কারণ এই যে, আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং তা থেকে সম্পূর্ণরূপে অমনোযোগী থেকেছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার আয়াতসমূহকে যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং পরকালের সাক্ষাৎকে অবিশ্বাস করেছে, আর মৃত্যু পর্যন্ত ঐ ধারণার উপরই প্রতিষ্ঠিত থেকেছে, তাদের নেক আমলের সাথে ঈমান না থাকার কারণে তাদের সমস্ত নেক আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং এ সবগুলো ছিনিয়ে নেয়া হবে।” ইরশাদ হচ্ছে-“তাদের আমল অনুযায়ী আমি তাদেরকে প্রতিফল প্রদান করবো।” অর্থাৎ ঈমানের সাথে ভাল আমল করলে ভাল প্রতিফল দেয়া হবে এবং মন্দ আমল করলে মন্দ প্রতিফলই দেয়া হবে। যেমন কর্ম তেমনই ফল।

আল-আরাফ 7:147

১৪৬-১৪৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা আমার আনুগত্য অস্বীকার করে এবং বিনা কারণে মানুষের কাছে অহংকার প্রকাশ করে, তাদেরকে আমি শরীয়ত ও আহকাম অনুধাবন করা থেকে বঞ্চিত করে দেবো যা আমার শ্রেষ্ঠত্ব ও একত্বের উপর অকাট্য প্রমাণ। অজ্ঞতা ও মূখর্তা তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেছেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদের অন্তর ও চক্ষুকে পরিবর্তন করে দিয়েছি, কেননা তাদেরকে বুঝানো সত্ত্বেও তারা প্রথমবারই ঈমান আনয়ন করেনি। অন্য এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যখন তারা বেঁকে গেল তখন আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরকেও বাঁকা করে দিলেন, যেন যেমন তারা বুঝছে না তেমন কখনই না বুঝে।” কোন কোন পূর্ববর্তী গুরুজন বলেন যে, অহংকারী বিদ্যা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করতেই পারে না। সে তো গৌররেই ফেটে পড়ে। যে ব্যক্তি অল্প কিছুদিনের তরে জ্ঞান ও বিদ্যা শিক্ষার কষ্ট সহ্য করতে পারলো না, তাকে চিরদিনের জন্যে বিদ্যা থেকে বঞ্চিত থাকার লাঞ্ছনা সহ্য করতেই হবে।এ জন্যেই আল্লাহ পাক তাদের থেকে কুরআন বুঝবার মূল পদার্থ ছিনিয়ে নিয়েছেন এবং স্বীয় নিদর্শনাবলী থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করেছেন। এই আয়াতের ইঙ্গিত এই উম্মতের দিকেও রয়েছে। এটা হচ্ছে ইবনে উয়াইনার চিন্তাধারা। কিন্তু এটা অবশ্যম্ভাবী নয়। ইবনে উয়াইনা তো এটাকে প্রত্যেক উম্মতের ব্যাপারেই প্রযোজ্য বলে থাকেন এবং উম্মতদের মধ্যে কোন পার্থক্য দেখান না। আল্লাহ তা'আলা সর্বাপেক্ষা অধিক জ্ঞানের অধিকারী।ইরশাদ হচ্ছে- তারা যতই আয়াত শ্রবণ করুক না কেন, ঈমান আনবে না। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “যে লোকদের ব্যাপারে আল্লাহর কথা পূর্ণ হয়ে গেছে। যে, তারা সঠিক পথের উপর আসবে না, তাদের কাছে যতই আয়াত আসুক না কেন তারা কখনও ঈমান আনবে না, যে পর্যন্ত না তারা বেদনাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে।” আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি তারা সৎ পথ দেখতেও পায় তবুও সেই পথ গ্রহণ করবে না, কিন্তু তারা যদি ভ্রান্ত ও গুমরাহীর পথ দেখতে পায় তবে ওকেই জীবন পথরূপে গ্রহণ করবে। এর কারণ এই যে, আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং তা থেকে সম্পূর্ণরূপে অমনোযোগী থেকেছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার আয়াতসমূহকে যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং পরকালের সাক্ষাৎকে অবিশ্বাস করেছে, আর মৃত্যু পর্যন্ত ঐ ধারণার উপরই প্রতিষ্ঠিত থেকেছে, তাদের নেক আমলের সাথে ঈমান না থাকার কারণে তাদের সমস্ত নেক আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং এ সবগুলো ছিনিয়ে নেয়া হবে।” ইরশাদ হচ্ছে-“তাদের আমল অনুযায়ী আমি তাদেরকে প্রতিফল প্রদান করবো।” অর্থাৎ ঈমানের সাথে ভাল আমল করলে ভাল প্রতিফল দেয়া হবে এবং মন্দ আমল করলে মন্দ প্রতিফলই দেয়া হবে। যেমন কর্ম তেমনই ফল।

আল-আরাফ 7:148

১৪৮-১৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: বানী ইসরাঈলের বিভ্রান্ত লোকেরা বাছুর পূজা করেছিল। কিবতীদের নিকট থেকে যেসব অলংকার ধারে নেয়া হয়েছিল সেগুলো দ্বারা সামেরী একটি বাছুর তৈরী করেছিল। ওর পেটের মধ্যে ঐ মুষ্টির মাটি নিক্ষেপ করেছিল যা সে হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর ঘোড়ার পায়ের থেকে গ্রহণ করেছিল। সুতরাং ঐ বাছুরের মধ্য থেকে গাভীর মত শব্দ বের হতে লাগলো। এ সবকিছুই হযরত মূসা (আঃ)-এর অনুপস্থিতির সময় ঘটেছিল। ভূরে আল্লাহ তা'আলা তাকে এই ফিত্না সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। তাই মূসা (আঃ)-কে সম্বোধন করা হচ্ছে- হে মূসা! তোমার অনুপস্থিতির সুযোগে আমি তোমার কওমকে পরীক্ষায় ফেলেছি। অর্থাৎ সামেরী তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে! ঐ বাছুরটিকে রক্ত-মাংস দ্বারা তৈরী করা হয়েছিল এবং ওর মধ্য থেকে শব্দ বের হচ্ছিল, না কি ওটাকে সোনা দ্বারা তৈরী করা হয়েছিল এবং ওর মধ্যে বাতাস প্রবেশ করেছিল, ফলে ওর মধ্য থেকে গাভীর শব্দ বের হচ্ছিল, এ ব্যাপারে তাফসীরকারকদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কথিত আছে যে, ঐ বাছুরটিকে তৈরী করার পর যখন ওটা গাভীর মত শব্দ করতে শুরু করলো তখন জনগণ ওর চতুর্দিকে নাচতে নাচতে প্রদক্ষিণ করতে লাগলো এবং তারা বড় রকমের ফিত্রায় পতিত হলো। তারা পরস্পর বলাবলি করতে শুরু করলোঃ “এটাই আমাদের মা’রূদ এবং মূসারও (আঃ) মা’রূদ। মূসা (আঃ) ভুলের মধ্যে পতিত হয়েছেন। তাই ইরশাদ হচ্ছে- “তারা কি এটুকুও বুঝে না যে, ওটা শব্দ করছে তাতে কি হয়েছে? ওটাতো তাদের কোন কথার উত্তর দিতে পারে না! না তাদের কোন উপকার করতে পারে, না কোন ক্ষতি করতে পারে!” সুতরাং অত্র আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “তারা কি দেখেনি যে, ওটা তাদের সাথে কথা বলে না এবং তাদেরকে কোন পথও দেখায় না? তবুও তারা ওটাকে মা'বূদরূপে গ্রহণ করে নিলো, বস্তুতঃ তারা ছিল বড় অত্যাচারী।” তারা বাছুরকে মাবুদরূপে গ্রহণ করার ফলে পথভ্রষ্ট হয়ে গেল এবং আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তাকেও ভুলে বসলো। তাদের অন্তরে অজ্ঞতা ও মূখতার পর্দা পড়ে গেছে। যেমন ইতিপূর্বে হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কিছুর মহব্বত তোমাদেরকে অন্ধ ও বধির করে ফেলবে।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অতঃপর যখন তারা নিজেদের কর্মের উপর লজ্জিত হলো এবং বুঝতে পারলো যে, বাস্তবিকই তারা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে তখন বলতে লাগলোঃ “যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন তবে আমরা বড়ই ক্ষগ্রিস্ত হয়ে পড়বো ও ধ্বংস হয়ে যাবো। যাহাক তারা নিজেদের পাপকে স্বীকার করে নিলো এবং অনুশোচনা করলো। কেউ কেউ য়্যারহামনা এর (আরবী) স্থলে দ্বারা তারহামনা ও য়্যাগফিরলানা এর স্থলে তাগফিরলানা পড়েছেন। এইভাবে (আরবী) কর্তা হওয়ার পরিবর্তে (আরবী) বা সম্বোধন হয়ে যাচ্ছে।

আল-আরাফ 7:149

১৪৮-১৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: বানী ইসরাঈলের বিভ্রান্ত লোকেরা বাছুর পূজা করেছিল। কিবতীদের নিকট থেকে যেসব অলংকার ধারে নেয়া হয়েছিল সেগুলো দ্বারা সামেরী একটি বাছুর তৈরী করেছিল। ওর পেটের মধ্যে ঐ মুষ্টির মাটি নিক্ষেপ করেছিল যা সে হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর ঘোড়ার পায়ের থেকে গ্রহণ করেছিল। সুতরাং ঐ বাছুরের মধ্য থেকে গাভীর মত শব্দ বের হতে লাগলো। এ সবকিছুই হযরত মূসা (আঃ)-এর অনুপস্থিতির সময় ঘটেছিল। ভূরে আল্লাহ তা'আলা তাকে এই ফিত্না সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। তাই মূসা (আঃ)-কে সম্বোধন করা হচ্ছে- হে মূসা! তোমার অনুপস্থিতির সুযোগে আমি তোমার কওমকে পরীক্ষায় ফেলেছি। অর্থাৎ সামেরী তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে! ঐ বাছুরটিকে রক্ত-মাংস দ্বারা তৈরী করা হয়েছিল এবং ওর মধ্য থেকে শব্দ বের হচ্ছিল, না কি ওটাকে সোনা দ্বারা তৈরী করা হয়েছিল এবং ওর মধ্যে বাতাস প্রবেশ করেছিল, ফলে ওর মধ্য থেকে গাভীর শব্দ বের হচ্ছিল, এ ব্যাপারে তাফসীরকারকদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কথিত আছে যে, ঐ বাছুরটিকে তৈরী করার পর যখন ওটা গাভীর মত শব্দ করতে শুরু করলো তখন জনগণ ওর চতুর্দিকে নাচতে নাচতে প্রদক্ষিণ করতে লাগলো এবং তারা বড় রকমের ফিত্রায় পতিত হলো। তারা পরস্পর বলাবলি করতে শুরু করলোঃ “এটাই আমাদের মা’রূদ এবং মূসারও (আঃ) মা’রূদ। মূসা (আঃ) ভুলের মধ্যে পতিত হয়েছেন। তাই ইরশাদ হচ্ছে- “তারা কি এটুকুও বুঝে না যে, ওটা শব্দ করছে তাতে কি হয়েছে? ওটাতো তাদের কোন কথার উত্তর দিতে পারে না! না তাদের কোন উপকার করতে পারে, না কোন ক্ষতি করতে পারে!” সুতরাং অত্র আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “তারা কি দেখেনি যে, ওটা তাদের সাথে কথা বলে না এবং তাদেরকে কোন পথও দেখায় না? তবুও তারা ওটাকে মা'বূদরূপে গ্রহণ করে নিলো, বস্তুতঃ তারা ছিল বড় অত্যাচারী।” তারা বাছুরকে মাবুদরূপে গ্রহণ করার ফলে পথভ্রষ্ট হয়ে গেল এবং আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তাকেও ভুলে বসলো। তাদের অন্তরে অজ্ঞতা ও মূখতার পর্দা পড়ে গেছে। যেমন ইতিপূর্বে হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কিছুর মহব্বত তোমাদেরকে অন্ধ ও বধির করে ফেলবে।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অতঃপর যখন তারা নিজেদের কর্মের উপর লজ্জিত হলো এবং বুঝতে পারলো যে, বাস্তবিকই তারা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে তখন বলতে লাগলোঃ “যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন তবে আমরা বড়ই ক্ষগ্রিস্ত হয়ে পড়বো ও ধ্বংস হয়ে যাবো। যাহাক তারা নিজেদের পাপকে স্বীকার করে নিলো এবং অনুশোচনা করলো। কেউ কেউ য়্যারহামনা এর (আরবী) স্থলে দ্বারা তারহামনা ও য়্যাগফিরলানা এর স্থলে তাগফিরলানা পড়েছেন। এইভাবে (আরবী) কর্তা হওয়ার পরিবর্তে (আরবী) বা সম্বোধন হয়ে যাচ্ছে।

আল-আরাফ 7:150

১৫০-১৫১ নং আয়াতের তাফসীর: মূসা (আঃ) যখন আল্লাহ তা'আলার সাথে বাক্যালাপ করে স্বীয় কওমের নিকট ফিরে আসেন তখন তিনি ছিলেন অত্যন্ত রাগান্বিত ও ভারাক্রান্ত। অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তোমাদের নিকট থেকে আমার বিদায়ের পর বাছুর-পূজায় লিপ্ত হয়ে তোমরা বাস্তবিকই অত্যন্ত অন্যায় ও মন্দ কাজ করেছে। তোমরা কি অতি তাড়াতাড়ি আল্লাহর শাস্তি ডেকে আনার ইচ্ছা করেছিলে? আর আল্লাহর বাক্যালাপ থেকে সরিয়ে আমাকে সত্বর ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলে?” কিন্তু এটাই ছিল ভাগ্যের লিখন। কঠিন রাগের ভরে তিনি ফলকগুলো মাটিতে ছুঁড়ে ফেলেন এবং ভাই হারূন (আঃ)-এর মাথা ধরে নিজের দিকে সজোরে টেনে আনেন। কথিত আছে যে, এই ফলকগুলো মূল্যবান পাথর ও মণি-মানিক্য দ্বারা নির্মিত ছিল। এই ঘটনাটি নিম্নের হাদীসটিকে প্রমাণিত করছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “শ্রুত সংবাদ দৃশ্যের মত নয়।” আর প্রকাশ্য বচন হচ্ছে এই যে, হযরত মূসা (আঃ) ক্রোধান্বিত হয়ে ফলকগুলো কওমের সামনে নিক্ষেপ করেন। এটা হচ্ছে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুরুজনদের উক্তি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, এই উক্তিটি গারীব বা দুর্বল। এর ইসনাদ বিশুদ্ধ নয়। অধিকাংশ আলিম বলেছেন যে, এটা প্রত্যাখ্যান করার যোগ্য। সম্ভবতঃ কোন আহলে কিতাবের যখীরা হতে কাতাদা (রঃ) এটা নকল করেছেন। আর আহলে কিতাবের মধ্যে তো মিথ্যাবাদী, বানানো কথার কথক এবং যিন্দীক বহু রয়েছে। হযরত মূসা (আঃ) যে স্বীয় ভ্রাতা হারূন (আঃ)-কে তাঁর মাথা ধরে টেনেছিলেন তার কারণ ছিল এই যে, তার ধারণায় হারূন (আঃ) জনগণকে বাছুর পূজায় বাধা দেয়ার ব্যাপারে। অবহেলা করেছিলেন। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- “হে হারূন (আঃ)! তুমি যখন দেখলে যে, জনগণ এই গুমরাহী অবলম্বন করেছে তখন তোমাকে আমার নির্দেশের উপর চলতে কিসে বাধা দিয়েছে। আমার হুকুম অমান্য করার সাহস তুমি পেলে কোথায়?" তখন হারূন (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আমার মায়ের পুত্র! আমার দাড়ি বা মাথার চুল ধরে টেনে না, আমার এ ভয় তো ছিলই যে, তুমি না জানি বলবে-তুমি আমার জন্যে কেন অপেক্ষা করনি এবং বানী ইসরাঈলকে বিচ্ছিন্নতার মধ্যে কেন নিক্ষেপ করেছো? হে আমার ভাই! এ লোকগুলো আমার কোনই পরওয়া করেনি। তারা আমাকে দুর্বল মনে করেছিল। এমন কি তারা আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। শত্রুদের সামনে তুমি আমাকে হাস্যস্পদ করো না এবং আমাকে এই অত্যাচারীদের মধ্যে গণ্য করো না।” “হে আমার মায়ের পুত্র’ হারূন (আঃ)-এর এ ভাষা প্রয়োগের উদ্দেশ্য ছিল হযরত মূসা (আঃ)-এর মনকে আকর্ষণ করা। যেন তাঁর প্রতি দয়ার উদ্রেক হয়। নচেৎ, তিনি পিতা ও মাতা উভয়ের দিক থেকেই তো মূসা (আঃ)-এর ভাই ছিলেন। যখন মূসা (আঃ)-এর কাছে তাঁর ভাই হারুন নির্দোষ প্রমাণিত হলেন তখন তিনি হারুন (আঃ)-কে ছেড়েছিলেন। ইরশাদ হয়েছে যে, হারূন পূর্বেই লোকদেরকে বলে দিয়েছিলেনঃ “হে লোকেরা! তোমরা ফিন্যায় পড়তে যাচ্ছ। তোমাদের মা’রূদ গো-বৎস নয়, বরং মা'বুদ হচ্ছেন রহমান (আল্লাহ)। তোমরা আমাকেই অনুসরণ কর এবং আমার কথা মেনে চল।" এ জন্যেই মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা করে দিন। আমাদের উভয়কে আপনার রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় দান করুন। আপনি হচ্ছেন সবচেয়ে বড় দয়ালু।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা মূসা (আঃ)-এর উপর দয়া করেন। দর্শকের কথা ও শ্রোতার কথা পৃথক হয়ে থাকে। মহা মহিমান্বিত আল্লাহ মূসা (আঃ)-কে সংবাদ দিয়েছিলেন- “তোমার অনুপস্থিতির সুযোগে তোমার কওম শিকের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে।” একথা শুনে তিনি ফলকগুলো নিক্ষেপ করেননি। কিন্তু যখন তিনি স্বচক্ষে তাদেরকে শিরুকের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে দেখলেন তখন তিনি ক্রোধভরে ফলকগুলো ছুঁড়ে ফেললেন।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মরিফুরূপে বর্ণনা করেছেন)

আল-আরাফ 7:151

১৫০-১৫১ নং আয়াতের তাফসীর: মূসা (আঃ) যখন আল্লাহ তা'আলার সাথে বাক্যালাপ করে স্বীয় কওমের নিকট ফিরে আসেন তখন তিনি ছিলেন অত্যন্ত রাগান্বিত ও ভারাক্রান্ত। অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ “তোমাদের নিকট থেকে আমার বিদায়ের পর বাছুর-পূজায় লিপ্ত হয়ে তোমরা বাস্তবিকই অত্যন্ত অন্যায় ও মন্দ কাজ করেছে। তোমরা কি অতি তাড়াতাড়ি আল্লাহর শাস্তি ডেকে আনার ইচ্ছা করেছিলে? আর আল্লাহর বাক্যালাপ থেকে সরিয়ে আমাকে সত্বর ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলে?” কিন্তু এটাই ছিল ভাগ্যের লিখন। কঠিন রাগের ভরে তিনি ফলকগুলো মাটিতে ছুঁড়ে ফেলেন এবং ভাই হারূন (আঃ)-এর মাথা ধরে নিজের দিকে সজোরে টেনে আনেন। কথিত আছে যে, এই ফলকগুলো মূল্যবান পাথর ও মণি-মানিক্য দ্বারা নির্মিত ছিল। এই ঘটনাটি নিম্নের হাদীসটিকে প্রমাণিত করছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “শ্রুত সংবাদ দৃশ্যের মত নয়।” আর প্রকাশ্য বচন হচ্ছে এই যে, হযরত মূসা (আঃ) ক্রোধান্বিত হয়ে ফলকগুলো কওমের সামনে নিক্ষেপ করেন। এটা হচ্ছে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুরুজনদের উক্তি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, এই উক্তিটি গারীব বা দুর্বল। এর ইসনাদ বিশুদ্ধ নয়। অধিকাংশ আলিম বলেছেন যে, এটা প্রত্যাখ্যান করার যোগ্য। সম্ভবতঃ কোন আহলে কিতাবের যখীরা হতে কাতাদা (রঃ) এটা নকল করেছেন। আর আহলে কিতাবের মধ্যে তো মিথ্যাবাদী, বানানো কথার কথক এবং যিন্দীক বহু রয়েছে। হযরত মূসা (আঃ) যে স্বীয় ভ্রাতা হারূন (আঃ)-কে তাঁর মাথা ধরে টেনেছিলেন তার কারণ ছিল এই যে, তার ধারণায় হারূন (আঃ) জনগণকে বাছুর পূজায় বাধা দেয়ার ব্যাপারে। অবহেলা করেছিলেন। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- “হে হারূন (আঃ)! তুমি যখন দেখলে যে, জনগণ এই গুমরাহী অবলম্বন করেছে তখন তোমাকে আমার নির্দেশের উপর চলতে কিসে বাধা দিয়েছে। আমার হুকুম অমান্য করার সাহস তুমি পেলে কোথায়?" তখন হারূন (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আমার মায়ের পুত্র! আমার দাড়ি বা মাথার চুল ধরে টেনে না, আমার এ ভয় তো ছিলই যে, তুমি না জানি বলবে-তুমি আমার জন্যে কেন অপেক্ষা করনি এবং বানী ইসরাঈলকে বিচ্ছিন্নতার মধ্যে কেন নিক্ষেপ করেছো? হে আমার ভাই! এ লোকগুলো আমার কোনই পরওয়া করেনি। তারা আমাকে দুর্বল মনে করেছিল। এমন কি তারা আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। শত্রুদের সামনে তুমি আমাকে হাস্যস্পদ করো না এবং আমাকে এই অত্যাচারীদের মধ্যে গণ্য করো না।” “হে আমার মায়ের পুত্র’ হারূন (আঃ)-এর এ ভাষা প্রয়োগের উদ্দেশ্য ছিল হযরত মূসা (আঃ)-এর মনকে আকর্ষণ করা। যেন তাঁর প্রতি দয়ার উদ্রেক হয়। নচেৎ, তিনি পিতা ও মাতা উভয়ের দিক থেকেই তো মূসা (আঃ)-এর ভাই ছিলেন। যখন মূসা (আঃ)-এর কাছে তাঁর ভাই হারুন নির্দোষ প্রমাণিত হলেন তখন তিনি হারুন (আঃ)-কে ছেড়েছিলেন। ইরশাদ হয়েছে যে, হারূন পূর্বেই লোকদেরকে বলে দিয়েছিলেনঃ “হে লোকেরা! তোমরা ফিন্যায় পড়তে যাচ্ছ। তোমাদের মা’রূদ গো-বৎস নয়, বরং মা'বুদ হচ্ছেন রহমান (আল্লাহ)। তোমরা আমাকেই অনুসরণ কর এবং আমার কথা মেনে চল।" এ জন্যেই মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা করে দিন। আমাদের উভয়কে আপনার রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় দান করুন। আপনি হচ্ছেন সবচেয়ে বড় দয়ালু।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা মূসা (আঃ)-এর উপর দয়া করেন। দর্শকের কথা ও শ্রোতার কথা পৃথক হয়ে থাকে। মহা মহিমান্বিত আল্লাহ মূসা (আঃ)-কে সংবাদ দিয়েছিলেন- “তোমার অনুপস্থিতির সুযোগে তোমার কওম শিকের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে।” একথা শুনে তিনি ফলকগুলো নিক্ষেপ করেননি। কিন্তু যখন তিনি স্বচক্ষে তাদেরকে শিরুকের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে দেখলেন তখন তিনি ক্রোধভরে ফলকগুলো ছুঁড়ে ফেললেন।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মরিফুরূপে বর্ণনা করেছেন)

আল-আরাফ 7:152

১৫২-১৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: গো-বৎস পূজার শাস্তিস্বরূপ বানী ইসরাঈলের উপর যে গযব নাযিল হয়েছিল তা ছিল এই যে, তাদের তাওবা ঐ পর্যন্ত ককূল হবে না যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশক্রমে পরস্পর একে অপরকে হত্যা করে ফেলে। যেমন সূরায়ে বাকারায় বলা হয়েছে- “তোমরা আল্লাহর বারগাহে এই তাওবা পেশ কর যে, তোমরা পরস্পর একে অপরকে হত্যা করে ফেল। আল্লাহ জানেন যে, এতেই তোমাদের মঙ্গল নিহিত রয়েছে। যখন তারা এরূপ করলো তখন তাদের তাওবা ককূল করে নেয়া হলো। তিনি তো হচ্ছেন দয়ালু প্রভু। কিন্তু দুনিয়ায় তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে।” (আরবী) অর্থাৎ ‘মিথ্যা রচনাকারীদেরকে আমি এভাবেই প্রতিফল দিয়ে থাকি। এই অপমান ও লাঞ্ছনা প্রত্যেক মিথ্যা রচনাকারীর জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে । সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বিদআতপন্থী এভাবেই অপমানিত হবে। যে বিদআত বের করবে সে এই শাস্তিই পাবে। রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা এবং বিদআতের বোঝা তার অন্তর থেকে বের হয়ে তার স্কন্ধের উপর এসে পড়বে। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, সে পার্থিব জগতে জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থায় অবস্থান করলেও তার চেহারায় অপমানের ছাপ লেগে যাবে। মিথ্যা রচনাকারী কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এ শাস্তি পেতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন তাওবা কবুলকারী। যত বড়ই পাপী হাক না কেন, তাওবার পর আল্লাহ পাক সেই পাপীকে ক্ষমা করে দেবেন। যদি কেউ কুফরী, শিরক ও নিফাকের কাজ ও করে, অতঃপর আন্তরিকতার সাথে তাওবা করে তবে সেই পাপও আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন।ইরশাদ হচ্ছে-যে ব্যক্তি পাপ কার্যে লিপ্ত হওয়ার পর তাওবা করে এবং ঈমান আনয়ন করে, হে রহমতের রাসূল (সঃ)! জেনে রেখো যে, এর পরেও তোমার প্রতিপালককে তুমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু পাবে। হযরত হানে মাসউদ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, একটি লোক কোন একটি মহিলার সাথে ব্যভিচার করলো, অতঃপর তাকে সে বিয়ে করে নিলো, এর কি হবে? উত্তরে তিনি এ আয়াতটিই পাঠ করলেনঃ “যারা খারাপ কাজ করে, এরপর তাওবা করে ও ঈমান আনে (তাদের আশান্বিত হওয়া উচিত যে,) আল্লাহ এর পরেও ক্ষমাশীল ও দয়ালু (হতে পারেন)।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) দশবার এই আয়াতটি পাঠ করেন। তিনি তাদেরকে এর নির্দেশও দিলেন না এবং তা থেকে নিষেধও করলেন না। (এ হাদীসটিও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন)

আল-আরাফ 7:153

১৫২-১৫৩ নং আয়াতের তাফসীর: গো-বৎস পূজার শাস্তিস্বরূপ বানী ইসরাঈলের উপর যে গযব নাযিল হয়েছিল তা ছিল এই যে, তাদের তাওবা ঐ পর্যন্ত ককূল হবে না যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশক্রমে পরস্পর একে অপরকে হত্যা করে ফেলে। যেমন সূরায়ে বাকারায় বলা হয়েছে- “তোমরা আল্লাহর বারগাহে এই তাওবা পেশ কর যে, তোমরা পরস্পর একে অপরকে হত্যা করে ফেল। আল্লাহ জানেন যে, এতেই তোমাদের মঙ্গল নিহিত রয়েছে। যখন তারা এরূপ করলো তখন তাদের তাওবা ককূল করে নেয়া হলো। তিনি তো হচ্ছেন দয়ালু প্রভু। কিন্তু দুনিয়ায় তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে।” (আরবী) অর্থাৎ ‘মিথ্যা রচনাকারীদেরকে আমি এভাবেই প্রতিফল দিয়ে থাকি। এই অপমান ও লাঞ্ছনা প্রত্যেক মিথ্যা রচনাকারীর জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে । সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক বিদআতপন্থী এভাবেই অপমানিত হবে। যে বিদআত বের করবে সে এই শাস্তিই পাবে। রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা এবং বিদআতের বোঝা তার অন্তর থেকে বের হয়ে তার স্কন্ধের উপর এসে পড়বে। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, সে পার্থিব জগতে জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থায় অবস্থান করলেও তার চেহারায় অপমানের ছাপ লেগে যাবে। মিথ্যা রচনাকারী কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এ শাস্তি পেতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন তাওবা কবুলকারী। যত বড়ই পাপী হাক না কেন, তাওবার পর আল্লাহ পাক সেই পাপীকে ক্ষমা করে দেবেন। যদি কেউ কুফরী, শিরক ও নিফাকের কাজ ও করে, অতঃপর আন্তরিকতার সাথে তাওবা করে তবে সেই পাপও আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন।ইরশাদ হচ্ছে-যে ব্যক্তি পাপ কার্যে লিপ্ত হওয়ার পর তাওবা করে এবং ঈমান আনয়ন করে, হে রহমতের রাসূল (সঃ)! জেনে রেখো যে, এর পরেও তোমার প্রতিপালককে তুমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু পাবে। হযরত হানে মাসউদ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, একটি লোক কোন একটি মহিলার সাথে ব্যভিচার করলো, অতঃপর তাকে সে বিয়ে করে নিলো, এর কি হবে? উত্তরে তিনি এ আয়াতটিই পাঠ করলেনঃ “যারা খারাপ কাজ করে, এরপর তাওবা করে ও ঈমান আনে (তাদের আশান্বিত হওয়া উচিত যে,) আল্লাহ এর পরেও ক্ষমাশীল ও দয়ালু (হতে পারেন)।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) দশবার এই আয়াতটি পাঠ করেন। তিনি তাদেরকে এর নির্দেশও দিলেন না এবং তা থেকে নিষেধও করলেন না। (এ হাদীসটিও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন)

আল-আরাফ 7:154

আল্লাহ পাক বলেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ)-এর ক্রোধ প্রশমিত হলো তখন তিনি প্রস্তর ফলকগুলো উঠিয়ে নিলেন যেগুলো তিনি কঠিন ক্রোধের কারণে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন। তাঁর এ কাজটা ছিল মূর্তিপূজার প্রতি ঘৃণা ও ক্রোধের কারণে। ইরশাদ হচ্ছে। এর মধ্যে হিদায়াত ও রহমত ছিল ঐ লোকদের জন্যে যারা তাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে। অধিকাংশ মুফাসসির বলেন যে যখন তিনি ওগুলো নিক্ষেপ করেছিলেন তখন সেগুলো ভেঙ্গে গিয়েছিল। তারপর তিনি সেগুলো একত্রিত করেছিলেন। এর উপর ভিত্তি করেই পূর্ববর্তী কোন কোন গুরুজন বলেন যে, ঐ ভাঙ্গা ফলকগুলোতে হিদায়াত ও রহমতের আহকাম লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু তফসীল সম্পর্কিত আহকাম নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ধারণা করা হয় যে, ইসরাঈলী বাদশাহদের পুস্তকাগারে ইসলামী শাসনের যুগ পর্যন্ত এই খণ্ডগুলো বিদ্যমান ছিল। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী। কিন্তু এ কথার উপর স্পষ্ট দলীল রয়েছে যে, ছুঁড়ে ফেলার কারণে ঐ প্রস্তর ফলকগুলো ভেঙ্গে গিয়েছিল। এ ফলকগুলো জান্নাতের মূল্যবান পাথর দ্বারা নির্মিত ছিল। আল্লাহ পাক খবর দেন যে, যখন মূসা (আঃ) ওগুলো উঠিয়ে নেন তখন তিনি, ওতে হিদায়াত ও রহমত প্রাপ্ত হন। (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে বিনয় ও নম্রতা। (আরবী) -এর সম্পর্কে কাতাদা (রঃ) বলেন যে, হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি ফলকগুলোতে লিখিত পাচ্ছি যে, একটি সর্বোত্তম উম্মত হবে যারা সদা সর্বদা মানুষকে ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। হে আমার প্রভু! ওদেরকে আমার উম্মত করুন!" আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “হে মূসা (আঃ)! এটা তো আহমাদ (সঃ)-এর উম্মত হবে।” পুনরায় মূসা (আঃ) বললেনঃ “হে আমার প্রভু! এই ফলকগুলোর মধ্যে এমন এক উম্মতকে দেখতে পাচ্ছি যারা সর্বশেষে আসবে কিন্তু সকলের পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হে আমার প্রভু! ওদেরকে আমার উম্মত করুন। আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “ওরা হচ্ছে আহমাদ (সঃ)-এর উম্মত!" মূসা (আঃ) আবার বললেনঃ “হে আমার প্রভু! এই ফলকগুলোর মধ্যে এমন উম্মতকে দেখতে পাচ্ছি যাদের অন্তরে কুরআন থাকবে, অন্তৰ্চক্ষে তারা তা পাঠ করবে। অথচ তাদের পূর্ববর্তী সকল লোক তাদের কিতাব অন্তর্চক্ষে পাঠ করে না, এমন কি যদি তাদের কিতাবকে তাদের থেকে সরিয়ে নেয়া হয় তবে তাদের কিছুই স্মরণ থাকে না এবং কিছুই চিনতে পারে না। আল্লাহ এই উম্মতকে এমন স্মরণশক্তি দান করেছেন যা তিনি অন্য কোন উম্মতকে দান করেননি। হে আমার প্রতিপালক! এদেরকে আমারই উম্মত করুন। আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “হে মূসা (আঃ)!এটা তো আহমাদ (সঃ)-এর উম্মত হবে। মূসা (আঃ) পুনরায় বললেনঃ “হে আমার প্রভু! ঐ উম্মত আপনার প্রত্যেক কিতাবের উপর ঈমান আনবে, তারা পথভ্রষ্ট ও কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করবে। এমন কি তারা কানা দাজ্জালের সাথেও যুদ্ধ করবে। হে আমার মা'বুদ! এদেরকে আমার উম্মত করুন!” আল্লাহ বললেনঃ “এরা হবে আহমাদ (সঃ)-এর উম্মত।” মূসা (আঃ) আবার বললেনঃ “হে। আল্লাহ! এই ফলকগুলোতে এমন উম্মতের উল্লেখ রয়েছে যারা তাদের ন্যরানা ও সাদকা নিজেরাই খেতে পাবে। অথচ এই উম্মতের পূর্ববর্তী উম্মতবর্গের এই অবস্থা ছিল যে, তারা কোন সাদকা বা নয়র পেশ করলে তা যদি ককূল হতো তবে আল্লাহ প্রেরিত আগুনে তা খেয়ে ফেলতে । আর ককূল না হলেও তারা তা খেতে পারতো না, বরং পশু পাখী এসে তা খেয়ে ফেলতো। ফলকের মধ্যে উল্লিখিত উম্মতের ধনী লোকদের নিকট থেকে সাদকা আদায় করে তা গরীবদের মধ্যে বন্টিত হবে। হে আল্লাহ! এদেরকে আমারই উম্মত করুন!” আল্লাহ বললেনঃ “এরা হবে আহমাদ (সঃ)-এর উম্মত।” হযরত মূসা (আঃ) পুনরায় আরয করলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি এই ফলকগুলোর মধ্যে এমন উম্মত পাচ্ছি যে, তারা যদি কোন ভাল কাজের ইচ্ছা করে কিন্তু কার্যে পরিণত করতে না পারে তবুও তাদেরকে একটা পুণ্য দেয়া হবে। আর যদি কার্যে পরিণত করতে পারে তবে দশটি পুণ্য তাদেরকে প্রদান করা হবে, এমন কি তা বৃদ্ধি পেতে পেতে সাতশ’ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। হে আল্লাহ! এদেরকে আমার উম্মত করুন!” আল্লাহ বললেনঃ “তারা আহমাদ (সঃ)-এর উম্মত হবে। আবার হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “হে আমার প্রভু! ফলকগুলোর মধ্যে এমন উম্মত দেখা যাচ্ছে যারা অন্যদের জন্যে সুপারিশ করবে এবং অন্যদের পক্ষ থেকেও তাদের জন্যে সুপারিশ করা হবে। হে আল্লাহ! এদেরকে আমারই উম্মত করুন।” আল্লাহ বলেনঃ “না, বরং তারা হবে আহমাদ (সঃ)-এর উম্মত।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, মূসা (আঃ) তখন প্রস্তর ফলকগুলো রেখে দিলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহ! আমাকে আহমাদ (সঃ)-এর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।”

আল-আরাফ 7:155

১৫৫-১৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে সত্তরজন লোক নির্বাচন করার অধিকার দিয়েছিলেন। সুতরাং মূসা (আঃ) এরূপ সত্তরজন লোক নির্বাচন করে তাদেরকে নিয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করার জন্যে রওয়ানা হন। কিন্তু যখন তারা আল্লাহর কাছে দু'আ করলো তখন নিম্নরূপ কথা বললোঃ“হে আল্লাহ! আমাদেরকে এমন কিছু দান করুন যা আপনি ইতিপূর্বে কাউকে দান করেননি এবং না আমাদের পরে কাউকেও দান করবেন। তাদের এই প্রার্থনা আল্লাহ তা'আলার কাছে পছন্দনীয় হলো না। সুতরাং ভূমিকম্প তাদেরকে ঘিরে ফেললো। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে এমন ত্রিশজনসহ আসতে বলেছিলেন যারা গো-বৎস পূজার কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল এবং দুআর জন্যে একটা সময় ও স্থান নির্ধারণ করেছিল। মূসা (আঃ) সত্তরজন লোক নির্বাচন করলেন, যাদেরকে নিয়ে তিনি ক্ষমা প্রার্থনার জন্যে বের হলেন। কিন্তু যখন তিনি তাদেরকে নিয়ে অঙ্গীকার স্থলে পৌছলেন তখন তারা তাকে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আমরা যে পর্যন্ত না আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখবো সেই পর্যন্ত আমরা ঈমান আনবো না। আপনি আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন। এখন আমাদেরকে দেখিয়ে দিন। এই আস্পর্ধামূলক কথার শাস্তি হিসেবে তাদের উপর বিদ্যুত পতিত হলো এবং সবাই ওখানে মরে পড়ে থাকলো। হযরত মূসা (আঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় উঠে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বললেনঃ “হে আমার প্রভু! আমি এখন বানী ইসরাঈলের কাছে ফিরে গিয়ে তাদেরকে কি জবাব দেবো? এরা তো তাদের মধ্যে ভাল লোক ছিল, আপনি তাদেরকেও ধ্বংস করে দিলেন। হে আল্লাহ! যদি আপনি তাদের সাথে আমাকেও ধ্বংস করে দিতেন।”(হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও কোন কোন পূর্ববর্তী গুরুজন হতে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে)হযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলের মধ্য থেকে সত্তরজন খুবই ভাল লোককে বেছে নিয়েছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেনঃ “চল, আল্লাহর কাছে যাই। তোমরা কওমের অবশিষ্ট লোকদের পক্ষ থেকে তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। তোমরা তাওবা কর, রোযা রাখ এবং শরীর ও কাপড় পবিত্র করে নাও।” অতঃপর তিনি নির্ধারিত দিনে তাদেরকে নিয়ে দূরে সাইনার দিকে চললেন। এর সবকিছুই আল্লাহর অবগতি ও অনুমতিক্রমে হয়েছিল। এখন এই সত্তরজন লোক যারা মূসা (আঃ)-এর পরিচালনাধীনে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে এসেছিল তারা বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আল্লাহর সাথে আপনার বাক্যালাপ হয়ে থাকে, আমাদেরকে তা শুনতে দিন।” হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে।” অতঃপর যখন হযরত মূসা (আঃ) পাহাড়ের নিকটবর্তী হলেন তখন তিনি একটা অত্যন্ত ঘন মেঘখণ্ডের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। পাহাড়টিও মেঘের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। হযরত মূসা (আঃ) মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়লেন এবং তার লোকগুলোকে বললেনঃ “তোমরাও আমার নিকটবর্তী হয়ে যাও।” মূসা (আঃ) যখন আল্লাহ তা'আলার সাথে কথা বলতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডল এমন আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠতো যে, কেউই তার চেহারার প্রতি দৃষ্টি রাখতে পারতো । এজন্যে তিনি স্বীয় চেহারার উপর পর্দা ফেলে দিতেন। ঐলোকগুলো যখন মেঘখণ্ডের নিকটে এসে ওর মধ্যে প্রবেশ করলো তখন তারা সিজদায় পড়ে গেল । তারা মূসা (আঃ) ও আল্লাহর কথা শুনতে লাগলো। তিনি মূসা (আঃ)-কে আদেশ ও নিষেধ করে বলেছিলেনঃ “এটা কর এবং ওটা করো না।” যখন তিনি ওটা থেকে মুক্ত হলেন এবং মেঘ সরে গেল তখন তিনি ঐ লোকদের দিকে মনঃসংযোগ করলেন। তারা তাঁকে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! যে পর্যন্ত না আপনি আমাদেরকে প্রকাশ্যভাবে আল্লাহকে দেখাবেন সে পর্যন্ত আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনবো না। তাদের এই ঔদ্ধত্যের কারণে বিজলী তাদেরকে পাকড়াও করলো। তাদের প্রাণপাখী দেহ থেকে বেরিয়ে গেল। তারা মৃত অবস্থায় পড়ে রইলো। এ দেখে হযরত মূসা (আঃ) বিলাপের সুরে বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি যখন এদেরকে ধ্বংস করারই ইচ্ছে করেছিলেন তখন তাদের সাথে আমাকেও ধ্বংস করলেন না কেন? এরা বোকামীর কাজ করেছে। আমার পিছনে আপনি কি বানী ইসরাঈলকে ধ্বংস করে দিবেন?"হযরত আলী ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মূসা (আঃ), হারূন (আঃ), শাবর ও শাবীর প্রমুখ মিলে এক পাহাড়ের উপত্যকার দিকে গেলেন। হারূন (আঃ) একটি টিলার উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁকে মৃত্যু দান করেন। মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলের নিকট প্রত্যাবর্তন করলে তারা তাকে হারূন (আঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মূসা (আঃ) উত্তরে বলেন যে, তিনি মারা গেছেন। তারা তখন বলে- “না, বরং সম্ভবতঃ আপনিই তাকে মেরে ফেলেছেন। তিনি অত্যন্ত নরম প্রকৃতির লোক ছিলেন।” মূসা (আঃ) তখন তাদেরকে বললেনঃ “আচ্ছা, তোমরা তোমাদের মধ্য থেকে কিছু লোক বেছে নাও।” তারা সত্তরজন লোক নির্বাচন করলো। অতঃপর তারা হারূন (আঃ)-এর মৃতদেহের নিকট গেল এবং জিজ্ঞেস করলোঃ “আচ্ছা বলুন তো আপনাকে কে হত্যা করেছে?" হারূন (আঃ)-এর মৃতদেহ থেকে শব্দ আসলোঃ “আমাকে কেউই হত্যা করেনি। আমি স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করেছি।” লোকগুলো তখন বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! এরপরে আর কখননা আমরা আপনার অবাধ্য হবো না।” তারা শাস্তি এই পেলো যে, বিদ্যুৎ তাদেরকে ধ্বংস করে দিলো। হযরত মূসা (আঃ) বিনা কারণে ডানে বামে ঘুরতেন এবং বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি কি এই বোকা লোকদের কথায় আমাদেরকে ধ্বংস করে দিবেন? এটা তো আপনার পরীক্ষা ছিল। আপনি যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান হিদায়াত দান করেন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদের সকলকেই জীবিত করে দিলেন এবং সকলকেই নবী করলেন। এটা হচ্ছে অত্যন্ত গারীব ও অবিশ্বাসযোগ্য হাদীস। এই হাদীসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে আম্মারা ইবনে উবাইদ নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। তিনি হচ্ছেন সম্পূর্ণরূপে অপরিচিত ব্যক্তি। ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “ঐ লোকগুলোর উপর শাস্তি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল এই যে, তাদের সামনে গো-বৎসের পূজা চলছিল, অথচ তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। তাদের কওমকে তারা ঐ শিরকের কাজ থেকে নিষেধ পর্যন্ত করেনি।” এই জন্যেই হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে নির্বোধ নামে অভিহিত করেছেন। তাদের ব্যাপারে তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! এটা আপনার একটা পরীক্ষা।" নিম্নরূপে তিনি আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! এটাতো আপনার পক্ষ থেকে একটা পরীক্ষা। একমাত্র আপনারই হুকুম চলে থাকে। আপনি যা চান তাই হয়। হিদায়াত দান ও পথভ্রষ্টকরণ আপনারই হাতে। আপনি যাকে সুপথ প্রদর্শন করেন তাকে কেউ কুপথ দেখাতে পারে না। আপনি যাকে দান থেকে বিমুখ করেন তাকে কেউ দান করতে পারে না। পক্ষান্তরে আপনি যাকে দান করেন তা তার থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারে না। রাজ্যের মালিক আপনিই। হুকুম দেয়ার অধিকার একমাত্র আপনারই রয়েছে। খাক ও আমর আপনার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।” এরপর মূসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেনঃ “হে আল্লাহ! আপনিই আমাদের অলী বা অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন ও আমাদের উপর দয়া করুন। কেননা, আপনিই তো হচ্ছেন সর্বোত্তম ক্ষমাশীল।”(আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ঢেকে ফেলা, গোপন করা এবং পাপের কারণে পাকড়াও না করা। আর (আরবী) এর সঙ্গে যখন (আরবী) যুক্ত হয় তখন ভাবার্থ হয়। ক্ষমা করে দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলার তাকে আগামীতে পুনরায় পাপে জড়িত না করা।“হে আল্লাহ! আমাদের জন্যে এই দুনিয়াতেও কল্যাণ নির্ধারিত করে দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ নির্ধারিত করুন।” (আরবী) -এর তাফসীর সূরায়ে বাকারায় হয়ে গেছে। “আমরা তাওবা করেছি এবং আপনার নিকটই প্রত্যাবর্তন করেছি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, বানী ইসরাঈল (আরবী) বলেছিল বলেই তাদের নাম ইয়াহুদী হয়ে গেছে। (এটা ইবনে জারীর তাখরীজ করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এর জাবীর আলজাফী নামক বর্ণনাকারী দুর্বল)মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ হে আল্লাহ! এটা আপনার পরীক্ষা। তাই ইরশাদ হচ্ছে- শাস্তি সেই পায় যাকে শাস্তি দেয়ার আমি ইচ্ছা করি এবং মনে করি যে, তার শাস্তি হওয়াই উচিত। নচেৎ, আমার করুণা তো প্রতিটি জিনিসকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে। আমি যা চাই তাই করি। প্রতিটি কাজে নিপণতা ও ন্যায় পরায়ণতার অধিকার আমারই । রহমতযুক্ত আয়াত খুবই বিরাট ও ব্যাপক এবং সবই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের মুখে উচ্চারিত হয়“হে আমাদের প্রভু! আপনার করুণা ও জ্ঞান সব কিছুকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে।”জুনদুব ইবনে আবদিল্লাহ আল বাজালী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একজন বেদুইন আসলো। সে তার উটটি বসিয়ে বাধলো। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে নামায পড়লো। নামায শেষে উষ্ট্ৰীটিকে খুলে সে ওর উপর সওয়ার হলো এবং দুআ করতে লাগলোঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমার উপর ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর দয়া করুন। এই দয়ায় আপনি অন্য কাউকেও শরীক করবেন না। তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বললেনঃ “আচ্ছা বলতো, এই লোকটি বেশী পথভ্রষ্ট ও নির্বোধ, না তার উটটি ? সে যা বলছে তা তোমরা শুনেছো কি?” সাহাবীগণ বললেনঃ “হ্যা শুনেছি।' তিনি বললেনঃ “আল্লাহর রহমত অতি প্রশস্ত। তিনি স্বীয় রহমতকে একশ’ ভাগে ভাগ করেছেন। এক ভাগ তিনি সমস্ত মাখলুকের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন। দানব, মানব এবং চতুষ্পদ জন্তু সবাই এই অংশ থেকেই অংশ পেয়েছে। বাকী নিরানব্বই ভাগ তিনি নিজের জন্যে নির্দিষ্ট রেখেছেন। এখন বল তো, এই উভয়ের মধ্যে কে বেশী নির্বোধ?” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা স্বীয় রহমতকে একশ’ ভাগে ভাগ করেছেন। এই একশ’ ভাগের মধ্যে মাত্র এক ভাগ তিনি দুনিয়ায় অবতীর্ণ করেছেন। এই এক ভাগ দেয়ার কারণেই সৃষ্টজীব একে অপরের উপর করুণা ও মমতা দেখিয়ে থাকে। এ কারণেই সমস্ত প্রাণী নিজেদের সন্তান ও বাচ্চাদের উপর স্নেহ ও দয়া প্রদর্শন করে থাকে। বাকী নিরানব্বই ভাগ করুণা তার কাছেই রয়েছে। এগুলোর প্রকাশ কিয়ামতের দিন ঘটবে। কিয়ামতের দিন এই একভাগ করুণার সাথে সঞ্চিত নিরানব্বই ভাগ করুণা মিলিয়ে দেয়া হবে।”আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর একশ’ ভাগ রহমত রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র এক ভাগ মাখলুকের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন । এর দ্বারাই মানুষ, বন্য পশু এবং পাখী একে অপরের উপর দয়া দেখিয়ে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আল্লাহর শপথ! ধর্মের দিক দিয়ে যে ব্যক্তি পাপী এবং জীবিকা উপার্জনের দিক দিয়ে যে ব্যক্তি নির্বোধ সেও এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর কসম! ঐ ব্যক্তিও জান্নাতে প্রবেশ করবে যাকে পাপের কারণে আগুন পরিবেষ্টন করেছে। তাঁর রহমত কিয়ামতের দিন এমনভাবে ছেয়ে যাবে যে, ইবলীসও তার থেকে কিছু অংশ পাওয়ার আশা পোষণ করবে।” (এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব । সা’দ নামক এর একজন বর্ণনাকারী অপরিচিত ব্যক্তি)আল্লাহ পাক বলেনঃ ঐ ব্যক্তিই আমার রহমতের হকদার হবে, যে আমাকে ভয় করে ও পরহেজগারী অবলম্বন করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ “তোমার প্রভু নিজের জন্যে রহমতকে ফরয করে নিয়েছেন।”‘তারা তাকওয়া অবলম্বন করে অর্থাৎ শিক ও কাবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। আর তারা যাকাত প্রদান করে। বলা হয়েছে যে, এখানে যাকাত দ্বারা নসের যাকাত বুঝানো অথবা মালের যাকাত বুঝানো হয়েছে কিংবা দু'টোকেই বুঝানো হয়েছে। কেননা, এটা হচ্ছে মক্কী আয়াত।তারা আমার আয়াত সমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন করে অর্থাৎ ওগুলোর সত্যতা স্বীকার করে।

আল-আরাফ 7:156

১৫৫-১৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে সত্তরজন লোক নির্বাচন করার অধিকার দিয়েছিলেন। সুতরাং মূসা (আঃ) এরূপ সত্তরজন লোক নির্বাচন করে তাদেরকে নিয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করার জন্যে রওয়ানা হন। কিন্তু যখন তারা আল্লাহর কাছে দু'আ করলো তখন নিম্নরূপ কথা বললোঃ“হে আল্লাহ! আমাদেরকে এমন কিছু দান করুন যা আপনি ইতিপূর্বে কাউকে দান করেননি এবং না আমাদের পরে কাউকেও দান করবেন। তাদের এই প্রার্থনা আল্লাহ তা'আলার কাছে পছন্দনীয় হলো না। সুতরাং ভূমিকম্প তাদেরকে ঘিরে ফেললো। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে এমন ত্রিশজনসহ আসতে বলেছিলেন যারা গো-বৎস পূজার কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল এবং দুআর জন্যে একটা সময় ও স্থান নির্ধারণ করেছিল। মূসা (আঃ) সত্তরজন লোক নির্বাচন করলেন, যাদেরকে নিয়ে তিনি ক্ষমা প্রার্থনার জন্যে বের হলেন। কিন্তু যখন তিনি তাদেরকে নিয়ে অঙ্গীকার স্থলে পৌছলেন তখন তারা তাকে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আমরা যে পর্যন্ত না আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখবো সেই পর্যন্ত আমরা ঈমান আনবো না। আপনি আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন। এখন আমাদেরকে দেখিয়ে দিন। এই আস্পর্ধামূলক কথার শাস্তি হিসেবে তাদের উপর বিদ্যুত পতিত হলো এবং সবাই ওখানে মরে পড়ে থাকলো। হযরত মূসা (আঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় উঠে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বললেনঃ “হে আমার প্রভু! আমি এখন বানী ইসরাঈলের কাছে ফিরে গিয়ে তাদেরকে কি জবাব দেবো? এরা তো তাদের মধ্যে ভাল লোক ছিল, আপনি তাদেরকেও ধ্বংস করে দিলেন। হে আল্লাহ! যদি আপনি তাদের সাথে আমাকেও ধ্বংস করে দিতেন।”(হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও কোন কোন পূর্ববর্তী গুরুজন হতে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে)হযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলের মধ্য থেকে সত্তরজন খুবই ভাল লোককে বেছে নিয়েছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেনঃ “চল, আল্লাহর কাছে যাই। তোমরা কওমের অবশিষ্ট লোকদের পক্ষ থেকে তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। তোমরা তাওবা কর, রোযা রাখ এবং শরীর ও কাপড় পবিত্র করে নাও।” অতঃপর তিনি নির্ধারিত দিনে তাদেরকে নিয়ে দূরে সাইনার দিকে চললেন। এর সবকিছুই আল্লাহর অবগতি ও অনুমতিক্রমে হয়েছিল। এখন এই সত্তরজন লোক যারা মূসা (আঃ)-এর পরিচালনাধীনে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে এসেছিল তারা বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! আল্লাহর সাথে আপনার বাক্যালাপ হয়ে থাকে, আমাদেরকে তা শুনতে দিন।” হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে।” অতঃপর যখন হযরত মূসা (আঃ) পাহাড়ের নিকটবর্তী হলেন তখন তিনি একটা অত্যন্ত ঘন মেঘখণ্ডের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। পাহাড়টিও মেঘের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। হযরত মূসা (আঃ) মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়লেন এবং তার লোকগুলোকে বললেনঃ “তোমরাও আমার নিকটবর্তী হয়ে যাও।” মূসা (আঃ) যখন আল্লাহ তা'আলার সাথে কথা বলতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডল এমন আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠতো যে, কেউই তার চেহারার প্রতি দৃষ্টি রাখতে পারতো । এজন্যে তিনি স্বীয় চেহারার উপর পর্দা ফেলে দিতেন। ঐলোকগুলো যখন মেঘখণ্ডের নিকটে এসে ওর মধ্যে প্রবেশ করলো তখন তারা সিজদায় পড়ে গেল । তারা মূসা (আঃ) ও আল্লাহর কথা শুনতে লাগলো। তিনি মূসা (আঃ)-কে আদেশ ও নিষেধ করে বলেছিলেনঃ “এটা কর এবং ওটা করো না।” যখন তিনি ওটা থেকে মুক্ত হলেন এবং মেঘ সরে গেল তখন তিনি ঐ লোকদের দিকে মনঃসংযোগ করলেন। তারা তাঁকে বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! যে পর্যন্ত না আপনি আমাদেরকে প্রকাশ্যভাবে আল্লাহকে দেখাবেন সে পর্যন্ত আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনবো না। তাদের এই ঔদ্ধত্যের কারণে বিজলী তাদেরকে পাকড়াও করলো। তাদের প্রাণপাখী দেহ থেকে বেরিয়ে গেল। তারা মৃত অবস্থায় পড়ে রইলো। এ দেখে হযরত মূসা (আঃ) বিলাপের সুরে বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি যখন এদেরকে ধ্বংস করারই ইচ্ছে করেছিলেন তখন তাদের সাথে আমাকেও ধ্বংস করলেন না কেন? এরা বোকামীর কাজ করেছে। আমার পিছনে আপনি কি বানী ইসরাঈলকে ধ্বংস করে দিবেন?"হযরত আলী ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মূসা (আঃ), হারূন (আঃ), শাবর ও শাবীর প্রমুখ মিলে এক পাহাড়ের উপত্যকার দিকে গেলেন। হারূন (আঃ) একটি টিলার উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁকে মৃত্যু দান করেন। মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলের নিকট প্রত্যাবর্তন করলে তারা তাকে হারূন (আঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মূসা (আঃ) উত্তরে বলেন যে, তিনি মারা গেছেন। তারা তখন বলে- “না, বরং সম্ভবতঃ আপনিই তাকে মেরে ফেলেছেন। তিনি অত্যন্ত নরম প্রকৃতির লোক ছিলেন।” মূসা (আঃ) তখন তাদেরকে বললেনঃ “আচ্ছা, তোমরা তোমাদের মধ্য থেকে কিছু লোক বেছে নাও।” তারা সত্তরজন লোক নির্বাচন করলো। অতঃপর তারা হারূন (আঃ)-এর মৃতদেহের নিকট গেল এবং জিজ্ঞেস করলোঃ “আচ্ছা বলুন তো আপনাকে কে হত্যা করেছে?" হারূন (আঃ)-এর মৃতদেহ থেকে শব্দ আসলোঃ “আমাকে কেউই হত্যা করেনি। আমি স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করেছি।” লোকগুলো তখন বললোঃ “হে মূসা (আঃ)! এরপরে আর কখননা আমরা আপনার অবাধ্য হবো না।” তারা শাস্তি এই পেলো যে, বিদ্যুৎ তাদেরকে ধ্বংস করে দিলো। হযরত মূসা (আঃ) বিনা কারণে ডানে বামে ঘুরতেন এবং বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি কি এই বোকা লোকদের কথায় আমাদেরকে ধ্বংস করে দিবেন? এটা তো আপনার পরীক্ষা ছিল। আপনি যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান হিদায়াত দান করেন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদের সকলকেই জীবিত করে দিলেন এবং সকলকেই নবী করলেন। এটা হচ্ছে অত্যন্ত গারীব ও অবিশ্বাসযোগ্য হাদীস। এই হাদীসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে আম্মারা ইবনে উবাইদ নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। তিনি হচ্ছেন সম্পূর্ণরূপে অপরিচিত ব্যক্তি। ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “ঐ লোকগুলোর উপর শাস্তি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল এই যে, তাদের সামনে গো-বৎসের পূজা চলছিল, অথচ তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। তাদের কওমকে তারা ঐ শিরকের কাজ থেকে নিষেধ পর্যন্ত করেনি।” এই জন্যেই হযরত মূসা (আঃ) তাদেরকে নির্বোধ নামে অভিহিত করেছেন। তাদের ব্যাপারে তিনি বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! এটা আপনার একটা পরীক্ষা।" নিম্নরূপে তিনি আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! এটাতো আপনার পক্ষ থেকে একটা পরীক্ষা। একমাত্র আপনারই হুকুম চলে থাকে। আপনি যা চান তাই হয়। হিদায়াত দান ও পথভ্রষ্টকরণ আপনারই হাতে। আপনি যাকে সুপথ প্রদর্শন করেন তাকে কেউ কুপথ দেখাতে পারে না। আপনি যাকে দান থেকে বিমুখ করেন তাকে কেউ দান করতে পারে না। পক্ষান্তরে আপনি যাকে দান করেন তা তার থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারে না। রাজ্যের মালিক আপনিই। হুকুম দেয়ার অধিকার একমাত্র আপনারই রয়েছে। খাক ও আমর আপনার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।” এরপর মূসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেনঃ “হে আল্লাহ! আপনিই আমাদের অলী বা অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন ও আমাদের উপর দয়া করুন। কেননা, আপনিই তো হচ্ছেন সর্বোত্তম ক্ষমাশীল।”(আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ঢেকে ফেলা, গোপন করা এবং পাপের কারণে পাকড়াও না করা। আর (আরবী) এর সঙ্গে যখন (আরবী) যুক্ত হয় তখন ভাবার্থ হয়। ক্ষমা করে দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলার তাকে আগামীতে পুনরায় পাপে জড়িত না করা।“হে আল্লাহ! আমাদের জন্যে এই দুনিয়াতেও কল্যাণ নির্ধারিত করে দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ নির্ধারিত করুন।” (আরবী) -এর তাফসীর সূরায়ে বাকারায় হয়ে গেছে। “আমরা তাওবা করেছি এবং আপনার নিকটই প্রত্যাবর্তন করেছি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, বানী ইসরাঈল (আরবী) বলেছিল বলেই তাদের নাম ইয়াহুদী হয়ে গেছে। (এটা ইবনে জারীর তাখরীজ করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এর জাবীর আলজাফী নামক বর্ণনাকারী দুর্বল)মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ হে আল্লাহ! এটা আপনার পরীক্ষা। তাই ইরশাদ হচ্ছে- শাস্তি সেই পায় যাকে শাস্তি দেয়ার আমি ইচ্ছা করি এবং মনে করি যে, তার শাস্তি হওয়াই উচিত। নচেৎ, আমার করুণা তো প্রতিটি জিনিসকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে। আমি যা চাই তাই করি। প্রতিটি কাজে নিপণতা ও ন্যায় পরায়ণতার অধিকার আমারই । রহমতযুক্ত আয়াত খুবই বিরাট ও ব্যাপক এবং সবই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের মুখে উচ্চারিত হয়“হে আমাদের প্রভু! আপনার করুণা ও জ্ঞান সব কিছুকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে।”জুনদুব ইবনে আবদিল্লাহ আল বাজালী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একজন বেদুইন আসলো। সে তার উটটি বসিয়ে বাধলো। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে নামায পড়লো। নামায শেষে উষ্ট্ৰীটিকে খুলে সে ওর উপর সওয়ার হলো এবং দুআ করতে লাগলোঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমার উপর ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর দয়া করুন। এই দয়ায় আপনি অন্য কাউকেও শরীক করবেন না। তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে বললেনঃ “আচ্ছা বলতো, এই লোকটি বেশী পথভ্রষ্ট ও নির্বোধ, না তার উটটি ? সে যা বলছে তা তোমরা শুনেছো কি?” সাহাবীগণ বললেনঃ “হ্যা শুনেছি।' তিনি বললেনঃ “আল্লাহর রহমত অতি প্রশস্ত। তিনি স্বীয় রহমতকে একশ’ ভাগে ভাগ করেছেন। এক ভাগ তিনি সমস্ত মাখলুকের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন। দানব, মানব এবং চতুষ্পদ জন্তু সবাই এই অংশ থেকেই অংশ পেয়েছে। বাকী নিরানব্বই ভাগ তিনি নিজের জন্যে নির্দিষ্ট রেখেছেন। এখন বল তো, এই উভয়ের মধ্যে কে বেশী নির্বোধ?” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা স্বীয় রহমতকে একশ’ ভাগে ভাগ করেছেন। এই একশ’ ভাগের মধ্যে মাত্র এক ভাগ তিনি দুনিয়ায় অবতীর্ণ করেছেন। এই এক ভাগ দেয়ার কারণেই সৃষ্টজীব একে অপরের উপর করুণা ও মমতা দেখিয়ে থাকে। এ কারণেই সমস্ত প্রাণী নিজেদের সন্তান ও বাচ্চাদের উপর স্নেহ ও দয়া প্রদর্শন করে থাকে। বাকী নিরানব্বই ভাগ করুণা তার কাছেই রয়েছে। এগুলোর প্রকাশ কিয়ামতের দিন ঘটবে। কিয়ামতের দিন এই একভাগ করুণার সাথে সঞ্চিত নিরানব্বই ভাগ করুণা মিলিয়ে দেয়া হবে।”আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর একশ’ ভাগ রহমত রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র এক ভাগ মাখলুকের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন । এর দ্বারাই মানুষ, বন্য পশু এবং পাখী একে অপরের উপর দয়া দেখিয়ে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আল্লাহর শপথ! ধর্মের দিক দিয়ে যে ব্যক্তি পাপী এবং জীবিকা উপার্জনের দিক দিয়ে যে ব্যক্তি নির্বোধ সেও এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর কসম! ঐ ব্যক্তিও জান্নাতে প্রবেশ করবে যাকে পাপের কারণে আগুন পরিবেষ্টন করেছে। তাঁর রহমত কিয়ামতের দিন এমনভাবে ছেয়ে যাবে যে, ইবলীসও তার থেকে কিছু অংশ পাওয়ার আশা পোষণ করবে।” (এ হাদীসটি অত্যন্ত গারীব । সা’দ নামক এর একজন বর্ণনাকারী অপরিচিত ব্যক্তি)আল্লাহ পাক বলেনঃ ঐ ব্যক্তিই আমার রহমতের হকদার হবে, যে আমাকে ভয় করে ও পরহেজগারী অবলম্বন করে। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ “তোমার প্রভু নিজের জন্যে রহমতকে ফরয করে নিয়েছেন।”‘তারা তাকওয়া অবলম্বন করে অর্থাৎ শিক ও কাবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। আর তারা যাকাত প্রদান করে। বলা হয়েছে যে, এখানে যাকাত দ্বারা নসের যাকাত বুঝানো অথবা মালের যাকাত বুঝানো হয়েছে কিংবা দু'টোকেই বুঝানো হয়েছে। কেননা, এটা হচ্ছে মক্কী আয়াত।তারা আমার আয়াত সমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন করে অর্থাৎ ওগুলোর সত্যতা স্বীকার করে।

আল-আরাফ 7:157

যারা নিরক্ষর নবী (সঃ)-এর অনুসরণ করে এবং মুসলমান হয়, তারা সেই ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে সম্যক অবগত যে ভবিষ্যদ্বাণী তাদের কিতাব তাওরাত ও ইঞ্জীলে নবী উম্মী (সঃ) সম্পর্কে করা হয়েছে। নবীদের গ্রন্থসমূহে নবী (সঃ)-এর গুণাবলী উল্লিখিত আছে। ঐসব গ্রন্থে নবীগণ নিজ নিজ উম্মতকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন এবং তার মাযহাব গ্রহণ করার হিদায়াত করে গেছেন। তাঁদের আলেমগণ ও ধর্মযাজকগণ তা অবগত আছেন।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, একজন বেদুইন বর্ণনা করেছে, নবী (সঃ)-এর যুগে একবার আমি দুধ বিক্রি করার উদ্দেশ্যে মদীনায় গমন করি । বিক্রি শেষে আমি মনে মনে বলি, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেই নেই এবং তার মুখের কিছু বাণী শুনাই যাক। আমি দেখি যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) হযরত আবু বকর ও হযরত উমার (রাঃ)-এর সাথে কোথায় যেন যাচ্ছেন। আমিও তাঁদের পিছু পিছু চললাম। তারা তিনজন এমন এক ইয়াহূদীর বাড়ীতে পৌছলেন যে তাওরাতের জ্ঞান রাখতো। তার ছেলে মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিল। ছেলেটি ছিল নব যুবক এবং সৌন্দর্যের অধিকারী। ইয়াহূদীটি তার ছেলের পার্শ্বে বসে তাওরাত পাঠ করছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ ইয়াহূদীর সাথে বাক্যালাপ করতে শুরু করলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তাওরাত অবতীর্ণকারীর শপথ! সত্য করে বল তো, এতে আমার নবুওয়াতের কোন সংবাদ আছে কি নেই?” সে মাথা নেড়ে উত্তর দিলোঃ “না।” তখন তার মরণাপন্ন ছেলেটি বলে উঠলোঃ “তাওরাত অবতীর্ণকারীর শপথ! আমাদের কিতাবে আপনার গুণাবলী ও নবুওয়াতের সংবাদ বিদ্যমান রয়েছে এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল।” অতঃপর ছেলেটি মারা গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এ মুসলমান। সুতরাং ইয়াহূদীদেরকে এখান থেকে সরিয়ে দাও।” তারপর তিনি তার কাফন ও জানাযার নামাযের ব্যবস্থা করলেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) জারীরী হতে এবং তিনি আবু সখর আকীলী হতে তাখরীজ করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি অতি উত্তম ও মজবুত। এটা সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে)হিশাম ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট ইসলাম প্রচারের জন্যে আমি ও অন্য একটি লোক প্রেরিত হই। আমরা উভয়ে গমন করি এবং দামেস্কের উপকণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছি। জিবিল্লাহ ইবনে আইহাম গাস্সানীর প্রাসাদে আমরা উপস্থিত হই। তিনি সিংহাসনের অধিকারী ছিলেন। আমরা কি বলতে চাই তা জানবার জন্যে তিনি আমাদের কাছে একজন দূত পাঠালেন। আমরা দূতকে বললামঃ “আমরা তোমার সাথে কথা বলবো না। বাদশাহর সাথে কথা বলার জন্যে আমরা প্রেরিত হয়েছি। তিনি যদি আমাদেরকে তার কাছে ডেকে নেন তবে আমরা তার সাথে কথা বলবো। তোমার কাছে আমাদের বলার কিছুই নেই। সে তখন বাদশাহকে (প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে) খবর দিলো। বাদশাহ আমাদেরকে ডেকে নিলেন এবং বললেনঃ “কি বলতে চাও বল।" হিশাম ইবনুল আস তাঁর সাথে আলাপ শুরু করলেন এবং তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তিনি কালো রঙ্গের কাপড় পরিহিত ছিলেন। হিশাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার পরনে কালো কাপড় কেন?" জিবিল্লাহ উত্তরে বললেনঃ “আমি শপথ করেছি যে, যে পর্যন্ত তোমাদেরকে সিরিয়া থেকে বহিষ্কার না করবো সে পর্যন্ত এই কালো পোশাক ছাড়বো না। আমরা বললাম, আল্লাহর কসম! আমরা আপনার সিংহাসন দখল করে নেবো। শুধু তাই নয়, ইনশাআল্লাহ আপনাদের কেন্দ্রীয় সম্রাটের (হিরাক্লিাসের) রাজ্যও আমাদের অধিকারে এসে যাবে। আমাদের নবী (সঃ) এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তিনি বললেনঃ “তোমরা সেই লোক নও। ওরা হচ্ছে এমন লোক যে দিনে রোযা রাখে ও রাত্রে নামায পড়ে। বল তো, তোমাদের রোযা কিরূপ?” আমরা পূর্ণভাবে এর বর্ণনা দিলাম। তখন লক্ষ্য করলাম যে, তাঁর চেহারা মলিন হয়ে গেছে। তিনি বললেনঃ “আচ্ছা যাও, সম্রাটের (হিরাক্লিয়াসের) সাথে সাক্ষাৎ কর।” এই বলে তিনি আমাদের সাথে একজন পথ প্রদর্শক পাঠালেন। আমরা তার পথ প্রদর্শনায় চলতে লাগলাম। যখন আমরা শহরের নিকটবর্তী হলাম তখন ঐ পথ প্রদর্শক আমাদেরকে বললোঃ “তোমরা এই সওয়ারী ও উষ্ট্রীগুলো নিয়ে শহরে প্রবেশ করতে পারবে না। তোমরা ইচ্ছা করলে আমি তোমাদের জন্যে ঘোড়া ও খচ্চরের ব্যবস্থা করে দিতে পারি। আমরা বললাম, আল্লাহর শপথ! আমরা আমাদের এই উষ্ট্ৰীগুলোর উপরই সওয়ার হয়ে থাকবো। সে তখন বাদশাহকে লিখে পাঠালো যে, তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কোন সওয়ারীতে সওয়ার হতে সম্মত নয়। সম্রাট তখন আমাদের উন্ত্রীতেই আরোহণ করে আমাদেরকে শহরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। আমরা তরবারী লটকিয়ে সম্রাটের প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছে নিজেদের সওয়ারীগুলো সেখানে বসিয়ে দিলাম। সম্রাট স্বীয় প্রাসাদের কক্ষ থেকে আমাদেরকে দেখতে ছিলেন। আমরা নেমেই (আরবী) বললাম। আল্লাহ জানেন, আমাদের তাকবীরের শব্দে সারা প্রাসাদ কেঁপে উঠলো। মনে হলো যেন প্রবল ঝটিকা ওকে হেলিয়ে দিলো। বাদশাহ আমাদেরকে বলে পাঠালেনঃ “তোমাদের দ্বীনকে এভাবে প্রকাশ করা উচিত ছিল না। তারপর তিনি আমাদেরকে ডেকে পাঠালেন। আমরা যখন দরবারে প্রবেশ করি তখন তিনি সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন। আর তাঁর চারদিকে পোপ, ধর্মযাজক ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা বসেছিল। তার মজলিসের সমস্ত জিনিসই ছিল লাল বর্ণের। সারা পরিবেশ ছিল লাল এবং তাঁর পোশাকও ছিল লাল। আমরা তাঁর নিকটবর্তী হলে তিনি হেসে ওঠেন এবং বলেনঃ “তোমরা পরস্পর যেমন সালামের আদান প্রদান কর তেমন আমাকে সালাম করলে না কেন?” তার কাছে একজন আরবী ভাষায় পারদর্শী দো-ভাষী বিদ্যমান ছিলেন। আমরা তাঁর মাধ্যমে বললাম, আমরা পরস্পর যে সালাম আদান প্রদান করি তা আপনার জন্যে শোভনীয় নয় এবং আপনাদের পারস্পরিক আদব ও সালামের রীতিও আমাদের জন্যে উপযুক্ত নয় যে, সেই রীতিতে আমরা আপনাকে সম্মান প্রদর্শন করবো। তিনি বললেনঃ “তোমাদের পারস্পরিক সালাম কিরূপ?" আমরা উত্তরে বললামঃ (আরবী) অর্থাৎ আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হাক। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা তোমাদের বাদশাহকে কিভাবে সালাম জানিয়ে থাক?" আমরা জবাবে বললাম, এভাবেই। তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ “তিনি কিভাবে উত্তর দেন?” আমরা বললাম, তিনি এই শব্দগুলো দ্বারাই উত্তর দিয়ে থাকেন। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের সম্মানিত না’রা কি?” আমরা উত্তর দিলামঃ (আরবী) হচ্ছে আমাদের সম্মানিত ও প্রসিদ্ধ না’রা। যখন আমরা এটা উচ্চৈঃস্বরে বললাম তখন সারা প্রাসাদ কেঁপে উঠলো। শেষ পর্যন্ত তিনি মাথা উঠিয়ে দেখতে লাগলেন যে, না জানি ঘরের ছাদ ভেঙ্গেই পড়ে না কি! তিনি বললেনঃ “তোমরা যে এই কথাটি বললে যার ফলে ঘর নড়ে উঠলো, তাহলে যখন তোমরা নিজেদের বাড়ীতে এটা পড় তখন তোমাদের ঘরও কেপে উঠে না কি?” আমরা উত্তরে বললাম, না তো। আমরা আপনার প্রাসাদ ছাড়া এমনটি হতে তো আর কখনো দেখিনি। তিনি বললেনঃ “হায়! যদি তোমাদের সব জিনিসও কেঁপে উঠতো এবং এই না’রার জোরে আমার অর্ধেক রাজ্য হাত ছাড়া হয়ে যেতো এবং বাকী অর্ধেক টিকে থাকতো তবে কতইনা ভাল হতো।” আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তা কেন? তিনি জবাবে বললেনঃ “নবুওয়াতের বিষয়টি মজবুত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়া অপেক্ষা এটাই আমার কাছে সহজতর।” তারপর তিনি আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করলেন। আমরা তাবলীগের উদ্দেশ্যের কথা বলেদিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের নামায রোযা কেমন?” আমরা সবকিছুই জানিয়ে দিলাম। অতঃপর তিনি আমাদেরকে বিদায় দিলেন এবং অতিথিশালায় অবস্থান করতে বললেন। তিনি উত্তমরূপে আমাদের মেহমানদারী করলেন। তথায় আমরা তিন দিন অবস্থান করলাম। পুনরায় তিনি এক রাত্রে আমাদেরকে ডেকে পাঠালেন এবং আমাদের আগমনের কারণ জিজ্ঞেস করলেন। আমরা আমাদের আগমনের উদ্দেশ্যের কথা পুনরাবৃত্তি করলাম। অতঃপর তিনি স্বর্ণ-রৌপ্য জড়ানো একটা খুব বড় জিনিস চেয়ে পাঠালেন। তাতে ছোট ছোট প্রকোষ্ঠ নির্মিত ছিল এবং সবগুলো তালাবদ্ধ ছিল। তিনি একটি কক্ষের তালা খুললেন এবং ওর মধ্য থেকে একটি কালো রেশমী কাপড় বের করলেন। তাতে একটি লাল ছবি নির্মিত ছিল এবং সেটা ছিল একটি মানুষের ছবি। মানুষটির চোখগুলো ছিল বড় বড়, উরু ছিল মোটা, দাড়ি ছিল লম্বা ও ঘন। চুলগুলো ছিল দু'ভাগে বিভক্ত, অত্যন্ত সুন্দর ও দীর্ঘ। সম্রাট আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ইনি কে তা জান কি?” আমরা উত্তর দিলাম, না। তিনি বললেনঃ “ইনি হলেন হযরত আদম (আঃ)। তাঁর দেহে অনেকগুলো চুল ছিল। এরপর তিনি আর একটি বাক্সের তালা খুললেন। ওর মধ্য থেকে একটি কালো রেশমী কাপড় বের করলেন। তাতে একটি গৌর বর্ণের মানুষের ছবি বানানো ছিল। মানুষটির ছিল কুঞ্চিত কেশ, লাল চক্ষু, বড় মাথা এবং সুন্দর দাড়ি। বাদশাহ বললেনঃ “ইনি হচ্ছেন হযরত নূহ (আঃ)।" তারপর আর একটি বাক্স থেকে তিনি আর একটি ফটো বের করলেন। ওটার রং ছিল গৌর, চোখগুলো সুন্দর ছিল, কপাল ছিল চওড়া, চেহারা ছিল খাড়া, দাড়িগুলো ছিল সাদা এবং মুখটি ছিল হাস্যময়। সম্রাট জিজ্ঞেস করলেনঃ “জান ইনি কে? ইনি হলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)।” তিনি আর একটি বাক্স খুললেন। তাতে ছিল একটি উজ্জ্বল গৌর বর্ণের ছবি। ওটা ছিল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ফটো। বাদশাহ জিজ্ঞেস করলেনঃ “এই লোকটিকে চেনো কি?” আমরা বললামঃ হ্যা, ইনি হচ্ছেন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। তাঁর ছবিটি দেখে আমরা আবেগে অভিভূত হয়ে পড়লাম। বাদশাহ বললেনঃ “আল্লাহ জানেন যে, ইনিই হচ্ছেন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)!” তারপর তিনি দাড়িয়ে গেলেন এবং বলে উঠলেনঃ “আল্লাহর শপথ! ইনিই কি তিনি?” আমরা উত্তরে বললামঃ “হ্যা, ইনিই তিনি। এই ছবিটি দেখে আপনি মনে করে নেন যে তাঁকেই দেখেছেন। তারপর তিনি কিছুক্ষণ ধরে অত্যন্ত মনোযোগর সাথে ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেনঃ “এটা ছিল শেষ বাক্স। কিন্তু এটাকে সর্বশেষ দেখাবার পরিবর্তে মধ্যভাগে দেখালাম তোমাদের সত্যতা পরীক্ষা করার জন্যে।” এরপর তিনি আর একটি ছবি বের করলেন। ওটা ছিল গোধূম বর্ণের এবং নরম ও পাতলা আকৃতি বিশিষ্ট। কেশগুলো ছিল কুঞ্চিত, চোখগুলো ছিল বসা বসা, দৃষ্টি ছিল তীক্ষ এবং ওষ্ঠ ছিল মোটা। তিনি বললেনঃ “ইনি হলেন হযরত মূসা (আঃ)!” ওরই সাথে মিলিত আর একটি ছবি ছিল। এটা ছিল আকারে ওরই সাথে সাদৃশ্যযুক্ত। কিন্তু এটার চুলগুলো ছিল তৈলাক্ত ও চিরুনীকৃত । কপাল ছিল চওড়া এবং চোখগুলো বড় বড়। তিনি বললেনঃ “ইনি হলেন হযরত হারূন ইবনে ইমরান (আঃ)।” তারপর আর একটি বাক্স থেকে তিনি আর একটি ফটো বের করলেন। ওটার ছিল গোধূম বর্ণ, দেহের উচ্চতা মধ্যম, সোজা কেশ এবং চেহারায় দুঃখ ও ক্রোধের চিহ্ন প্রকাশমান। তিনি বললেনঃ “ইনি হলেন হযরত লূত (আঃ)।” তারপর তিনি একটা সাদা বর্ণের রেশমী কাপড় বের করলেন। তাতে যে মানুষের ফটো ছিল তা ছিল সেনালী বর্ণের। দেহ লম্বা ছিল না। গাল ছিল হালকা পাতলা এবং চেহারা ছিল সুন্দর। তিনি বললেনঃ “ইনি ইসহাক (আঃ)।” এরপর তিনি আর একটি দরজা খুললেন এবং এর মধ্য থেকে একটি সাদা রেশমী কাপড় বের করে আমাদেরকে দেখালেন। এর আকৃতি হযরত ইসহাক (আঃ)-এর আকৃতির সাথে খুবই সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। তিনি বললেনঃ “ইনি হযরত ইয়াকূব (আঃ)।” তারপর তিনি কালো রেশমী কাপড়ের আর একটি ফটো দেখালেন। ওটার ছিল গৌর বর্ণ, সুন্দর চেহারা, মুখমণ্ডলে ঔজ্জ্বল্য, আন্তরিকতা ও বিনয়ের লক্ষণ পরিস্ফুট এবং বর্ণ কতকটা লাল। বললেনঃ “ইনি হলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)।” এরপর আর একটি বাক্স হতে আর একটি সাদা রেশমী কাপড় বের করলেন যার মধ্যকার ছবিটি হযরত আদম (আঃ)-এর ছবির সাথে সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। চেহারায় যেন সূর্য চমকাচ্ছে। বললেনঃ “ইনি হযরত ইউসুফ (আঃ)।” তারপর আর একটি ছবি বের করলেন। ওটার ছিল লাল রং, পুরু পায়ের গোছা, বড় বড় চোখ, বড় পেট ও বেঁটে দেহ। বললেনঃ “ইনি হযরত দাউদ (আঃ)।” এরপর আরও একটি ছবি বের করলেন। ওটার ছিল মোটা উরু, লম্বা পা এবং তিনি ঘোড়ার উপর সওয়ার ছিলেন। বললেনঃ “ইনি হযরত সুলাইমান (আঃ)।” অতঃপর তিনি আরও একটি ছবি বের করলেন। ওটা ছিল বয়সে যুবক, দাড়ি ছিল কালো, চুলগুলো ছিল ঘন, চক্ষুগুলো সুন্দর এবং চেহারাতেও সৌন্দর্য বিরাজ করছিল। সম্রাট বললেনঃ “ইনি হলেন হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)।” আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এই ছবিগুলো পেলেন কোথায়? আমাদের বিশ্বাস যে, এগুলো অবশ্যই নবীদেরই ছবি। কেননা, আমরা আমাদের নবী (সঃ)-এর ছবি সঠিকভাবেই পেয়েছি। উত্তরে তিনি বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট আবেদন করেছিলেন- হে আল্লাহ! আমার নবী সন্তানদেরকে আমাকে দেখিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা তখন ঐ নবীদের ফটোগুলো হযরত আদম (আঃ)-কে প্রদান করেছিলেন। ঐগুলোকে হযরত আদম (আঃ) পাশ্চাত্য দেশে রক্ষিত রেখেছিলেন। যুলকারনাইন ওগুলোকে বের করেন এবং হযরত দানইয়াল (আঃ)-এর হাতে সমর্পণ করেন। অতঃপর সম্রাট বললেনঃ “আমি তো চাচ্ছিলাম যে, নিজের রাজ্য ছেড়ে দিয়ে তোমাদের কোন এক নগণ্য লোকের গোলাম হয়ে থাকি যে পর্যন্ত না আমার মৃত্যু হয়।”এরপর তিনি আমাদেরকে বিদায় দিলেন। বিদায়ের প্রাক্কালে তিনি আমাদেরকে বহু পুরস্কার ও উপঢৌকন প্রদান করলেন এবং গমনের সুব্যবস্থা করে দিলেন। যখন আমরা আবু বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলাম এবং ঘটনাটি বর্ণনা করলাম তখন তিনি আবেগে অভিভূত হয়ে পড়লেন এবং বললেনঃ “আল্লাহ তাকে তাওফীক দিলে এই রূপই করতো!” অতঃপর তিনি বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন যে, ইয়াহূদীরা তাদের কিতাবে নবী (সঃ)-এর গুণাবলী পেয়ে থাকে।”হযরত আতা ইবনে ইয়াসার (রাঃ) বলেনঃ “আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করি এবং তাওরাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে তা জিজ্ঞেস করি। তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, আল্লাহর শপথ! তাওরাতে তাঁর গুণাবলীর এরূপই বর্ণনা রয়েছে যেরূপ কুরআনে রয়েছে।” আল্লাহ পাক বলছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি তোমাকে সাক্ষী, শুভ সংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে পাঠিয়েছি।” (৪৮:৮) দ্রুপ তাওরাতেও রয়েছে- “তুমি আমার বান্দা ও রাসূল। তোমার নাম মুতাওয়াক্কিল, তুমি কঠোরও নও এবং সংকীর্ণমনাও নও। আল্লাহ তা'আলা তোমাকে ঐ পর্যন্ত নিজের কাছে আহ্বান করবেন না যে পর্যন্ত না তুমি ভুল পথে পরিচালিত কওমকে সোজা পথে পরিচালিত করতে পার। আর যে পর্যন্ত না তারা ঈমান আনে এবং তাদের অন্তর থেকে পর্দা উঠে যায়, কান শ্রবণকারী ও চক্ষু দর্শনকারী হয়। অতঃপর হযরত কা'ব (রঃ)-এর সাথে হযরত আতা’ (রাঃ)-এর সাক্ষাৎ হলে তাকেও তিনি এই প্রশ্ন করেন। তিনি যা বর্ণনা করেন তাতে একটি অক্ষরেরও গরমিল হয়নি। গরমিল শুধু একুটু হয় যে, তিনি নিজের ভাষায় - (আরবী) কে (আরবী) -কে (আরবী) এবং (আরবী)- কে (আরবী) বলতেন। কিন্তু তিনি নিম্নের বাক্যটুকু বাড়িয়ে দিয়েছেনঃ “তিনি বাজারে শোরগোল করেন না, মন্দের বদলা মন্দ দ্বারা দেন না, বরং ক্ষমা করে দেন।” এরপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর হাদীসটি বর্ণনা করলেন। তারপর বললেনঃ পূর্ববর্তী গুরুজনদের ভাষায়- তাওরাত' শব্দের প্রয়োগে সাধারণতঃ আহলে কিতাবের কিতাবগুলোর উপর হয়ে থাকে এবং হাদীসের কিতাবগুলোতেও এরূপই কিছু এসেছে। আল্লাহ তাআলাই সর্বাপেক্ষা অধিক জ্ঞানের অধিকারী।হযরত জুবাইর ইবনে মুতইম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা শুরু করি। যখন আমি সিরিয়ার নিকটবর্তী হই তখন একটি লোকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। সে আমাকে জিজ্ঞেস করে- “তোমাদের দেশে কোন একজন লোক নবী হয়ে এসেছেন কি?” আমি উত্তরে বলি, হ্যা। সে জিজ্ঞেস করে-“তুমি তার ছবি চিনতে পারবে কি?” আমি উত্তর দেই, হ্যা। তখন সে আমাকে এমন একটি ঘরে নিয়ে গেল যেখানে অনেকগুলো ছবি ছিল। কিন্তু আমি সেখানে আমাদের নবী (সঃ)-এর ছবি দেখতে পেলাম না। আমরা ঐ সম্পর্কেই আলাপ আলোচনা করছিলাম এমন সময় একটি লোক এসে বললোঃ “ব্যাপার কি?” আমরা ঐ সংবাদ দিলে সে আমাদেরকে তার বাড়ীতে নিয়ে গেল। তার ঘরে প্রবেশ করেই আমি নবী (সঃ)-এর ছবি দেখতে পেলাম। ছবিতে এও দেখলাম যে, নবী (সঃ)-এর পেছনে একটি লোক দাড়িয়ে রয়েছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তার পেছনে তাকে ধরে যে লোকটি দাঁড়িয়ে আছে সে কে? সে উত্তরে বললোঃ “ঐ লোকটি নবী নয়। কিন্তু যদি তার পরে অন্য কেউ নবী হতো তবে এই লোকটিই হতো। তার পরে অন্য কোন নবী আসবেন না। কিন্তু এই লোকটি তার স্থলাভিষিক্ত হবে।”হযরত উমার (রাঃ)-এর মুআযযিন হযরত আকরা (রাঃ) বলেন, একদা হযরত উমার (রাঃ) আমাকে একজন খ্রীষ্টান পাদ্রীকে ডেকে আনার জন্যে প্রেরণ করেন। আমি তাকে ডেকে আনলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা তোমাদের কিতাবে আমার বর্ণনাও পাও কি?" সে উত্তরে বলেঃ “হাঁ। কিতাবে আপনাকে কারণ বলা হয়েছে।” হযরত উমার (রাঃ) তখন স্বীয় ছড়িটি উঠিয়ে নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কারণ এর অর্থ কি?” সে উত্তর দেয়, “এর অর্থ হচ্ছে লৌহ মানব।” হ্যরত উমার (রাঃ) পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমার পরে কে হবে?” সে জবাবে বলেঃ “হ্যা, আপনার পরে আপনার স্থলাভিষিক্ত হবেন। একজন সৎ লোক। কিন্তু তিনি স্বীয় আত্মীয়-স্বজনকে প্রাধান্য দিবেন।” একথা । শুনে উমার (রাঃ) বলে উঠলেন, “আল্লাহ হযরত উসমান (রাঃ)-এর উপর দয়া করুন।” একথা তিনি তিনবার বললেন। তারপর তিনি ঐ পাদ্রীকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এরপর কে হবে?” সে উত্তর দিলোঃ “লৌহ খণ্ডের মতো এক ব্যক্তি।” হযরত উমার (রাঃ) বুঝে ফেললেন যে, এর দ্বারা হযরত আলীকে বুঝানো হয়েছে। তিনি স্বীয় মাথা ধরে আফসোস করতে লাগলেন। পাদ্রী বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! তিনি সৎ খলীফা হবেন। কিন্তু তিনি এমন এক সময় খলীফা হবেন যখন তরবারী কোষ থেকে বের করে নেয়া হবে এবং রক্ত প্রবাহিত হবে।”আল্লাহ পাকের উক্তিঃ “নবী (সঃ) মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দেন এবং অন্যায় কাজ করতে নিষেধ করেন।” এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিশেষণ যা পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে উল্লিখিত রয়েছে। বাস্তব ক্ষেত্রেও অবস্থা এই ছিল যে, তিনি কল্যাণকর কথা ছাড়া কিছুই বলতেন না এবং যা অকল্যাণকর ও ক্ষতিকর হতো তা থেকে তিনি মানুষকে বিরত রাখতেন। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “যখন তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে বলতে শুনঃ (আরবী) তখন কান খাড়া করে দাও। হয়তো কোন কল্যাণকর জিনিসের হুকুম করা হচ্ছে অথবা কোন মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা হচ্ছে। আর আল্লাহ সবচেয়ে বড় ও গুরুতপূর্ণ বিষয়ের যে নির্দেশ দিয়েছেন তা হচ্ছে এই যে, তোমরা অন্যকে অংশীদার করা ছাড়াই তার ইবাদত করবে। কাউকেই তাঁর অংশীদার স্থাপন করবে না। সমস্ত নবী এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই প্রেরিত হয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি প্রত্যেক কওমের মধ্যে স্বীয় রাসূল পাঠিয়েছি (যে, সে তাদেরকে বলবেঃ), তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করবে এবং প্রতিমা পূজা থেকে বিরত থাকবে।”আবু হুমাইদ (রাঃ) ও আবু উসাদই (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা আমা হতে বর্ণিত কোন হাদীস শুন, যেটাকে তোমাদের অন্তর মেনে নেয় এবং যার দ্বারা তোমাদের বুদ্ধি বিবেক নরম হয়ে যায় এবং তোমরা অনুভব কর যে, এটা তোমাদের মন-মগজের নিকটতর। তখন তোমরা নিশ্চিতরূপে জেনে নেবে যে, আমার মন-মস্তিষ্ক তোমাদের অপেক্ষা ওর বেশী নিকটতম হবে অর্থাৎ ওটা আমার হাদীস হবে। আর যদি স্বয়ং তোমাদের অন্তর ঐ হাদীসকে অস্বীকার করে এবং ওটা তোমাদের মন-মগজ ও বুদ্ধি বিবেক থেকে দূরে হয় তবে জেনে রাখবে যে, তোমাদের চেয়ে আমার মন-মস্তিষ্ক ওর থেকে বেশী দূরে হবে অর্থাৎ ওটা আমার হাদীস হবে না।” (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, ইমাম আহমাদ (রঃ) এটা উত্তম ইসনাদের সাথে বর্ণনা করেছেন। সুনান কিতাব লেখকদের কেউই এটা তাখরীজ করেননি) হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “যখন তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন হাদীস শুনতে পাবে তখন ওটার ব্যাপারে ঐ ধারণাই পোষণ করবে যা সঠিকতম ধারণা হয়, যা বেশী কল্যাণময় এবং পবিত্রময়।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইরশাদ হচ্ছে- “সে তাদের জন্যে পবিত্র বস্তুসমূহ বৈধ করে দেয় এবং অপবিত্র ও খারাপ বস্তুকে তাদের প্রতি অবৈধ করে।” অর্থাৎ তিনি তাদের এমন বস্তুসমূহ হালাল করেন যা তারা নিজেরাই নিজেদের উপর হারাম করে নিয়েছিল। যেমন ‘বাহীমা’, ‘সায়েবা’, ‘ওয়াসীলা' এবং 'হাম'। এসব জন্তু হালাল কিন্তু তারা জোরপূর্বক এগুলোকে হারাম করে নিয়েছিল। এর দ্বারা তারা নিজেদের উপর সংকীর্ণতা আনয়ন করেছে। আর যে অপবিত্র ও খারাপ বস্তুগুলো আল্লাহ তা'আলা হারাম করেছেন যেমন শূকরের মাংস, সুদ এবং খাদ্য জাতীয় জিনিস যা আল্লাহ হারাম করেছেন, সেগুলোকে তারা হালাল করে নিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যেসব জিনিস হালাল করেছেন ওগুলো খেলে শরীরের উপকার হয় এবং দ্বীনের সহায়ক হয়। পক্ষান্তরে যেগুলো তিনি হারাম করেছেন ওগুলো দেহ ও দ্বীন উভয়ের পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে থাকে। বিবেক বুদ্ধির মাধ্যমে যারা ভাল ও মন্দ যাচাই করে থাকেন তাঁরা এই আয়াতকেই দলীল হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। এই ধারণা ও অনুমানেরও উত্তর দেয়া হয়েছে কিন্তু এখানে এসবের ব্যাখ্যা দেয়ার তেমন সুযোগ নেই। এই আয়াতকে হুজ্জত রূপে কায়েম করেছেন ঐ আলেমগণও যারা বলে থাকেন যে, কোন জিনিসের বৈধতা ও অবৈধতা সম্পর্কে কোন হাদীস না থাকলে ওটা হালাল কি হারাম তা যাচাই করার মাপকাঠি হলো এই যে, আরববাসী উপকারের দিক দিয়ে কোন জিনিসকে উপকারী ও পবিত্র মনে করে এবং কোন জিনিসকে অপবিত্র ও ক্ষতিকর মনে করে (এটা দেখতে হবে)। এই অনুমান ও ধারণার ব্যাপারেও অনেক কিছু সমালোচনা হয়েছে। ঘোষিত হচ্ছে-“মানুষের অন্তরে যে বোঝা ছিল, রাসূল (সঃ) তা হাল্কা করে এবং প্রথার যে শিকলে তারা আবদ্ধ ছিল নবী (সঃ) তা দূর করে থাকে। তিনি সহজ পন্থা, দান ও ক্ষমা নিয়ে এসেছেন। যেমন হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি সহজ এবং ভেজালবিহীন দ্বীন নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।”নবী (সঃ) যখন হযরত মুআয (রাঃ) ও হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে আমির করে ইয়ামনে পাঠিয়েছিলেন তখন তিনি তাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেনঃ “তোমরা সদা প্রফুল্ল ও হাসিমাখা মুখে থাকবে। জনগণ যেন তোমাদেরকে দেখে ভয়ে পালিয়ে না যায়। তাদেরকে সহজ পন্থা বাতলিয়ে দিবে। সংকীর্ণতা আনয়ন করবে না। লোকদের যেন মেনে নেয়ার অভ্যাস হয়। তাদের মধ্যে যেন মতানৈক্য সৃষ্টির খেয়াল না জাগে।”রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবী হযরত আবু বারযা আসলামী (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে অবস্থান করেছি এবং তার সহজ পন্থা বাতলানোর চিত্র সুন্দরভাবে অবলোকন করেছি।" পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে বড়ই কাঠিন্য ছিল। এই উম্মতের উপর সবকিছু হালকা করে দেয়া হয়েছে। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ আমার উম্মতকে তাদের অন্তরের খেয়াল ও বাসনার জন্যে পাকড়াও করেন না যে পর্যন্ত না তারা মুখে তা প্রকাশ করে অথবা কার্যে পরিণত করে। তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের ভুলত্রুটি ও বিস্মরণকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তারা যদি ভুল বশতঃ কিছু করে বসে অথবা জোরপূর্বক তাদেরকে কোন অন্যায় কাজ করিয়ে নেয়া হয় তবে ক্ষমার্হ বলে গণ্য করা হবে। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতকে নিম্নরূপ কথা প্রার্থনা করতে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না, যদি আমরা বিস্মরণ হই কিংবা ভুল করে বসি, হে আমাদের প্রভু! আমাদের প্রতি কোন কঠোর ব্যবস্থা পাঠাবেন না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর পাঠিয়েছিলেন, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর এমন কোন গুরুভার চাপাবেন না যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই, আর ক্ষমা করে দিন আমাদেরকে এবং মার্জনা করে দিন, আর আমাদের প্রতি কৃপা করুন! আপনি আমাদের কর্মসম্পাদক, সুতরাং আমাদেরকে কাফির সম্প্রদায়ের উপর প্রাবল্য দান করুন।” (২:২৮৬)। সহীহ মুসলিম দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, এ দুআ’র মাধ্যমে আল্লাহর কাছে চাওয়া হলে তিনি প্রত্যেক যাজ্ঞার সময় বলেনঃ “আচ্ছা, আমি দিলাম, আমি কবুল করলাম।”আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা তাঁর প্রতি (রাসূল সঃ-এর প্রতি) ঈমান রাখে, তাকে সম্মান করে ও সাহায্য সহানুভূতি করে, আর সেই নূরকে অনুসরণ করে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, তারাই ইহকালে ও পরকালে সাফল্য লাভ করবে।”

আল-আরাফ 7:158

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! আরব, অনারব এবং দুনিয়া জাহানের লোকদেরকে বলে দাও, আমি সকলের জন্যে নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি। এটা তার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের দলীল যে, তার উপর নবুওয়াত শেষ হয়ে গেছে এবং তখন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত তিনি সারা দুনিয়ার পয়গাম্বর। তাকে আরো বলতে বলা হচ্ছে-তুমি বলে দাও, আমার ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহ সাক্ষী। তোমাদেরকে জ্ঞাত করাবার জন্যে আল্লাহ আমার উপর অহী নাযিল করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে- ‘যে সম্প্রদায় নবীকে মানে না তার ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম।' অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা আহলে কিতাব এবং যারা আহলে কিতাব নয় তাদের সকলকে বলে দাও- তোমরা ইসলাম গ্রহণ করছো কি করছো না? যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে তবে হিদায়াত পেয়ে যাবে, অন্যথায় তোমার কাজ হচ্ছে শুধু পৌঁছিয়ে দেয়া।” এই বিষয়ের এতো বেশী হাদীস বিদ্যমান রয়েছে যে, সেগুলো গণনা করা কঠিন।আর একথা তো সবাই জানে যে, নবী (সঃ) সারা দুনিয়ার জন্যে প্রেরিত হয়েছিলেন। ইমাম বুখারী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর মধ্যে কিছু বচসা হয়। আবু বকর (রাঃ) উমার (রাঃ)-কে অসন্তুষ্ট করেন। উমার (রাঃ) দুঃখিত হয়ে ফিরে যান। হযরত আবু বকর (রাঃ) এটা অনুভব করেন। সুতরাং তিনি তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্যে তাঁর পিছু পিছু গমন করেন। কিন্তু উমার (রাঃ) তাঁকে নিজ বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করেন। আবু দারদা (রাঃ) বলেন, আমিও সেই সময় তাঁর কাছে উপস্থিত ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বললেনঃ “তোমাদের এই সঙ্গী আজ রাগান্তি রয়েছে। অতঃপর উমার (রাঃ) আবূ বকর (রাঃ)-কে বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি না দেয়ার কারণে লজ্জিত হন। সুতরাং তিনিও নবী (সঃ)-এর কাছে এসে হাজির হন। তিনি সালাম দিয়ে বসে পড়েন এবং তাঁর সামনে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। আবু দারদা (রাঃ) বলেন, এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমার (রাঃ)-এর প্রতি রাগান্বিত হন। আর এদিকে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলতে থাকেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর কসম! বাড়াবাড়ি আমার পক্ষ থেকেই হয়েছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ তোমরা কি আমার বন্ধু ও সঙ্গীকে (আবূ বরক রাঃ কে) ছেড়ে দিতে চাও? আমি বলেছিলাম, হে লোক সকল! আমি তোমাদের সকলের নিকট রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি! তখন তোমরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিলে। অথচ আবু বকর (রাঃ) বলেছিল, আপনি সত্য কথাই বলছেন।রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাবুকের যুদ্ধে একদা রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাযের উদ্দেশ্যে গাত্রোত্থান করেন। তখন তার কয়েকজন সাহাবী তাঁর হিফাজত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে লেগে পড়েন। নামায শেষে তিনি তাঁদের মনঃসংযোগ করে বলেনঃ “আজ রাত্রে পাঁচটি জিনিস আমাকে বিশিষ্টভাবে দেয়া হয়েছে। ইতিপূর্বে এই বিশেষত্ব অন্য কোন নবীকে দেয়া হয়নি । (১) আমি সারা জাহানের লোকদের কাছে নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি। আমার পূর্বে প্রত্যেক নবীকে তার নিজের কওমের কাছেই পাঠানো হয়েছিল। (২) আমি শুধু প্রভাব ও ভক্তি প্রযুক্ত ভীতির মাধ্যমেই শত্রুর উপর সাহায্য লাভ করে থাকি, যদিও তার ও আমার মধ্যে এক মাসের পথের ব্যবধান হয়। (৩) যুদ্ধলব্ধ মাল আমার জন্যে ও আমার উম্মতের জন্যে হালাল করা হয়েছে। অথচ আমার পূর্বে আর কারো জন্যে যুদ্ধলব্ধ মাল হালাল ছিল না। সমস্ত যমীনই আমার জন্যে পবিত্র ও সিজদার স্থান। (৫) আমাকে শাফাআতের অধিকার দেয়া হয়েছে। আমি এটা কিয়ামতের দিনের জন্যে আমার উম্মতের উদ্দেশ্যে উঠিয়ে রেখেছি। এই শাফাআতের সেই দিন প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্যে হবে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এই উম্মতের মধ্য হতে কোন ইয়াহূদী অথবা খ্ৰীষ্টান আমার কথা শুনলো, অথচ আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি। তার উপর ঈমান না এনেই মারা গেল, নিঃসন্দেহে সে জাহান্নামী। (ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে ও ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসের শব্দগুলো ইমাম আহমাদেরই (রঃ) বটে)আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ “তিনিই আকাশ ও পৃথিবীর সার্বভৌম একচ্ছত্র মালিক, তিনি ছাড়া আর কোন মা'বূদ নেই, তিনিই জীবিত করেন এবং তিনিই মৃত্যু ঘটিয়ে থাকেন। তাই নির্দেশ হচ্ছে- তোমরা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর সেই বার্তাবাহক নিরক্ষর নবী (সঃ)-এর প্রতি ঈমান আনয়ন কর। আল্লাহ পাক খবর দিচ্ছেন- মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল। তাঁকে তোমাদের নিকট পাঠানো হয়েছে। তোমরা তাঁর অনুসরণ কর । তার উপর ঈমান আন। তোমাদের কাছে এরই ওয়াদা নেয়া হয়েছিল। পূর্ববর্তী কিবাতগুলোতে এরই শুভ সংবাদ রয়েছে। ঐ কিতাবগুলোতে নবী উম্মী' এই শব্দ দ্বারাই তার প্রশংসা হয়েছে।ইরশাদ হচ্ছে- যে (রাসূল সঃ) আল্লাহতে ও তাঁর কালামে বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে, তোমরা তারই অনুসরণ কর, আশা করা যায় তোমরা সরল সঠিক পথের সন্ধান পাবে।

আল-আরাফ 7:159

সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা সঠিক ও সত্য কাজের অনুসরণ করে, নির্ভুল পথ প্রদর্শন করে এবং বিচার-আচার সত্য ও ন্যায়কে সামনে রেখে করে থাকে। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ “আহলে কিতাবের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা রাত্রিকালে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে থাকে ও সেজদায় পতিত হয়। অন্যত্র বলেনঃ “আহলে কিতাবের মধ্যে এমনও লোক আছে যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে, আর তোমাদের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং তাদের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে সবগুলোর উপরই বিশ্বাস স্থাপন করে, আর তারা আল্লাহর সামনে বিনয় প্রকাশ করে থাকে। অন্যান্য আহলে কিতাবের মত তারা আল্লাহর আয়াতগুলোকে টাকা পয়সার লোভে বিক্রী করে না। আল্লাহর কাছে তাদের প্রতিদান রয়েছে। আল্লাহ শীঘ্রই হিসাব গ্রহণকারী।” আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ “যাদেরকে আমি ইতিপূর্বে কিতাব দিয়েছিলাম তারা ওর উপর ঈমান আনে, যখন তাদের সামনে আমার আয়াতগুলো পাঠ করা হয় তখন তারা বলেআমরা এখনও মুসলমান এবং এর পূর্বেও মুসলমান ছিলাম। তাদেরকে তাদের সবরের দু’বার প্রতিদান দেয়া হবে।” মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ “যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে, ওকে ওরা যথাযযাগ্য পাঠ করে, ওরাই হচ্ছে মুমিন।” আরও বলেনঃ “যাদেরকে ইতিপূর্বে ইলম অর্থাৎ কিতাব দেয়া হয়েছে, যখন এই কিতাব তাদেরকে পাঠ করে শুনানো হয় তখন তারা মাথার ভারে সিজদায় পড়ে যায় এবং সিজদায় তাদের বিনয় ও নম্রতা বহুগুণে বেড়ে যায়।” বানী ইসরাঈল যখন নবীদেরকে হত্যা করে ফেলে এবং কুফরী অবলম্বন করে তখন তাদের বারোটি দল ছিল। ওগুলোর মধ্যে একটি দল অবশিষ্ট এগারোটি দলের আকীদায় অসন্তুষ্ট ছিল এবং তারা তাদের প্রতি সম্পূর্ণরূপে বিমুখ ছিল। তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট আবেদন করেছিল, “হে আল্লাহ! আমাদের ও তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আনয়ন করুন।” তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে যমীনের মধ্যে একটি সুড়ঙ্গ করে দেন। তারা তার ভিতর চলা ফেরা করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তারা ঐ সুড়ঙ্গ পথে চীনে প্রবেশ করে, সেখানে একত্ববাদী মুসলমান বিদ্যমান ছিল, যারা আমাদেরই কিবলার দিকে মুখ করে নামায পড়তো। ইরশাদ হচ্ছে-এরপর আমি বানী ইসরাঈলকে বললামঃ “এখন যমীনে বসবাস কর। অতঃপর যখন আখিরাতের ওয়াদা এসে পড়বে তখন আমি তোমাদেরকে হাজির করবো। কথিত আছে যে, সুড়ঙ্গের মধ্যে তারা দেড় বছর ধরে বসবাস করেছিল।

আল-আরাফ 7:160

১৬০-১৬২ নং আয়াতের তাফসীর: এই সমুদয় আয়াতের তাফসীর সূরায়ে বাকারায় করা হয়ে গেছে। ঐ গুলো মাদানী আয়াত এবং এগুলো মক্কী আয়াত। ঐ আয়াতগুলো এবং এই আয়াতগুলোর পার্থক্যও আমরা বর্ণনা করে দিয়েছি। সুতরাং পুনর্বার বর্ণনা করার কোন আবশ্যকতা নেই।

আল-আরাফ 7:161

১৬০-১৬২ নং আয়াতের তাফসীর: এই সমুদয় আয়াতের তাফসীর সূরায়ে বাকারায় করা হয়ে গেছে। ঐ গুলো মাদানী আয়াত এবং এগুলো মক্কী আয়াত। ঐ আয়াতগুলো এবং এই আয়াতগুলোর পার্থক্যও আমরা বর্ণনা করে দিয়েছি। সুতরাং পুনর্বার বর্ণনা করার কোন আবশ্যকতা নেই।

আল-আরাফ 7:162

১৬০-১৬২ নং আয়াতের তাফসীর: এই সমুদয় আয়াতের তাফসীর সূরায়ে বাকারায় করা হয়ে গেছে। ঐ গুলো মাদানী আয়াত এবং এগুলো মক্কী আয়াত। ঐ আয়াতগুলো এবং এই আয়াতগুলোর পার্থক্যও আমরা বর্ণনা করে দিয়েছি। সুতরাং পুনর্বার বর্ণনা করার কোন আবশ্যকতা নেই।

আল-আরাফ 7:163

আল্লাহ পাকের উক্তি ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ লোকদের খবর তোমাদের জানা আছে যারা শনিবারের দিনের ব্যাপারে সীমালংঘন করেছিল।” (২:৬৫) এই আয়াতের আলোকেই এখানকার এই আয়াতটির ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে ইরশাদ করছেনঃ “হে নবী (সঃ)! যেসব ইয়াহূদী তোমাদের পার্শ্বে রয়েছে তাদেরকে ঐলোকদের ঘটনা জানিয়ে দাও যারা আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। ফলে তাদেরকে তাদের ঔদ্ধত্যপনার আকস্মিক শাস্তি প্রদান করা হয়েছিল। এসব ইয়াহূদীকে খারাপ পরিণাম থেকে ভয় প্রদর্শন কর যারা তোমার সেই গুণাবলীকে গোপন করছে যা তারা তাদের কিতাবে পাচ্ছে, না জানি তাদের উপরও ঐ শাস্তি এসে পড়ে যা তাদের পূর্ববর্তী ইয়াহূদীদের উপর এসে পড়েছিল।” ঐ বস্তি বা জনপদের নাম ছিল আয়লা। ওটা কুলযুম নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। আর এই আয়াতে সমুদ্রের তীরবর্তী যে জনপদের কথা বলা হয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনানুযায়ী ওর নাম হচ্ছে ‘আয়লা’ যা মাদইয়ান ও ভূরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ছিল। (এটাই ইকরামা (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং সুদ্দীরও (রঃ) উক্তি) আবার এ উক্তিও রয়েছে যে, ওর নাম ‘মাতনা' যা মাদইয়ান ও আয়নার মধ্যস্থলে অবস্থিত। (আরবী)-এর ভাবার্থ হচ্ছে-তারা শনিবারের দিনের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। ঐদিন মাছগুলো স্বাধীনভাবে পানির উপর ভেসে উঠতো এবং কিনারায় ছড়িয়ে পড়তো। কিন্তু শনিবার ছাড়া অন্য দিনে পানির ধারে কখনই আসতো না। আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি এরূপ কেন করেছিলাম? এর দ্বারা আমার উদ্দেশ্য ছিল শুধু তাদের আনুগত্যের পরীক্ষা করা যে, আমার আদেশ তারা মেনে চলছে কি-না! যেদিন মৎস্য শিকার হারাম ছিল সেদিন মাছগুলো আশাতীতভাবে নদীর ধারে এসে জমা হয়ে যেতো। আবার যেদিনগুলোতে মাছ ধরা হালাল ছিল ঐ সময় ঐগুলো লুকিয়ে যেতো। এটা ছিল একটা পরীক্ষা। কেননা, তারা আল্লাহর আনুগত্য স্বীকারের ব্যাপারে বিভিন্ন প্রকারের কৌশল অনুসন্ধান করেছিল এবং নিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে পড়ার জন্যে গোপন দরজা দিয়ে প্রবেশের ইচ্ছা করেছিল। তাই, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা এমন কাজে জড়িয়ে পড়ো না যে কাজে ইয়াহূদীরা জড়িয়ে পড়েছিল যে, তারা কৌশল খুঁজে খুঁজে হারামকে হালাল করে নিয়েছিল। (ইবনে কাসীর (সঃ) বলেন যে, এ হাদীসের ইসনাদ উত্তম এবং এর বর্ণনাকারীরা মাশহর ও নির্ভরযোগ্য)

আল-আরাফ 7:164

১৬৪-১৬৬ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে যে, এই জনপদবাসী তিন ভাগে ভাগ হয়েছিল। প্রথম প্রকার হচ্ছে ঐসব লোক যারা শনিবারের দিন মাছ ধরার কৌশল অবলম্বন করতঃ নিষিদ্ধ কাজ করে বসেছিল। যেমন সূরায়ে বাকারায় আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে ঐ লোকেরা যারা ঐ পাপী লোকদেরকে ঐ পাপ কার্য করতে নিষেধ করেছিল এবং নিজেরা ঐ কাজ থেকে দূরে রয়েছিল। আর তৃতীয় প্রকার হচ্ছে ঐ দল যারা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব ছিল। যারা নিজেরা ঐ কাজে লিপ্ত হয়নি বটে, কিন্তু যারা ঐ কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল তাদেরকে নিষেধও করেনি। বরং যারা নিষেধ করেছিল তাদেরকে তারা বলেছিলঃ “যে লোকদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করতে চান বা শাস্তি দিতে চান তাদেরকে উপদেশ দিয়ে লাভ কি? তোমরা তো জানছো যে এরা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে গেছে। সুতরাং এদের ব্যাপারে উপদেশ মোটেই ক্রিয়াশীল হবে না।” নিষেধকারীরা জবাবে বলেছিলঃ “আমরা তো কমপক্ষে আল্লাহর কাছে এ কৈফিয়ত দিতে পারবো যে, আমরা তাদেরকে নিষেধ করেছিলাম। কেননা, ভাল কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা কর্তব্য তো বটে। কেউ কেউ মায়ূজেরাতান শব্দকে মায়ূজেরাতুন পড়েছেন। অর্থাৎ এটা ওর । আর মায়ূজেরাতান পড়লে অর্থ হবে- “আমরা ওযরের খাতিরে নিষেধ করছি। আর এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা হয়তো এ কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা করবে।” আল্লাহ পাক বলেন-কিন্তু তারা যখন তাদের উপদেশ গ্রহণ করলো না, বরং ঐ পাপ কার্য করতেই থাকলো তখন ঐ কাজ করতে নিষেধকারীদেরকে তো আমি বাঁচিয়ে নিলাম, কিন্তু ঐ পাপ কার্যে লিপ্ত যালিমদেরকে আমি পাকড়াও করলাম এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করলাম।এখানে নিষেধকারীদের মুক্তি ও পাপীদের ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যারা ঐ পাপকার্যে জড়িতও হয়নি এবং নিষেধও করেনি তাদের ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করা হয়েছে। কেননা, কাজ যেমন হবে প্রতিদান তেমনই হবে। সুতরাং তারা প্রশংসার যোগ্য হলো না কারণ তারা প্রশংসার যোগ্য কাজ করেনি। আর তারা নিন্দারও পাত্র হলো না, কেননা, তারা ঐ পাপকার্যে জড়িত হয়নি। তবে তারা মুক্তি পেয়েছিল কি ধ্বংস হয়েছিল এ ব্যাপারে ইমামদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মাছ শনিবারে খুবই বেশী আসতো, কিন্তু অন্যান্য দিনে আসতো না। এভাবে কিছুদিন কেটে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে কতক লোক শনিবারও মাছ ধরতে শুরু করে। কতক লোক তাদেরকে বলেঃ “আজকের দিন তো মাছ ধরা হারাম।” কিন্তু তাদের অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যপনা ঠিকই থাকে। কিন্তু কতক লোক বরাবর নিষেধ করতেই থাকে। যখন এভাবেও কিছু দিন কেটে গেল তখন নিষেধকারীদেরকে তাদেরই মধ্যকার একটি দল বললোঃ এই দুষ্টদেরকে নিষেধ করে লাভ কি? আল্লাহর শাস্তি তাদের প্রাপ্য হয়ে গেছে! সুতরাং এখন আর তাদেরকে উপদেশ দিচ্ছ কেন? এই লোকগুলো নিষেধকারীদের তুলনায় আল্লাহর পথে বেশী কঠোর ও রাগান্বিত ছিল। তখন নিষেধকারীরা তাদেরকে বলেছিল, “আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন! আমরা ওযর পেশ করছি।” তাহলে এই দু’টি দলই যেন নিষেধকারী দল ছিল। সুতরাং যখন আল্লাহর শাস্তি নাযিল হয়ে গেল তখন এই দুটি দলই রক্ষা পেলো।ইকরামা (রাঃ) বলেন, আমি একদা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি। সেই সময় তাঁর চক্ষু দু'টি অশ্রুসিক্ত ছিল এবং দেখি যে, কুরআন কারীম তার ক্রোড়ে রয়েছে। আমি সময়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তার সামনে বসে পড়লাম এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “কুরআনের এ পৃষ্ঠা আমাকে কাঁদাচ্ছে।” তিনি সূরায়ে আরাফ পাঠ করছিলেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আয়লা কি জান কি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যা। এবার তিনি বলতে শুরু করলেনঃ আয়লায় ইয়াহূদীরা বাস করতো। শনিবার মৎস্য শিকার তাদের উপর নিষিদ্ধ ছিল। তাদের পরীক্ষার জন্যে মাছগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, ওরা যেন শুধু শনিবারেই বের হয়। শনিবারের দিন নদী মাছে পরিপূর্ণ হয়ে যেতো। মোটাতাজা ও ভাল ভাল অধিক সংখ্যক মাছ পানির উপর লাফালাফি করতো। শনিবার ছাড়া অন্যান্য দিন কঠিন চেষ্টার পর কিছু মাছ পাওয়া যেতো। কিছুদিন পর্যন্ত ঐ লোকগুলো আল্লাহর আদেশের মর্যাদা দিলো এবং ঐ দিনে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকলো। অতঃপর শয়তান তাদের অন্তরে এই অনুভূতি জাগিয়ে দিলো যে, শনিবার দিন মাছ খাওয়া নিষিদ্ধ বটে কিন্তু ধরা নিষিদ্ধ নয়। সেই দিনে ধরে অন্য দিনে খাওয়া যেতে পারে। একটি দলের অন্তরে এই খেয়াল জেগেই গেল। কিন্তু অন্য দল তাদেরকে বললোঃ “খাওয়া ও ধরা উভয়ই নিষিদ্ধ। মোটকথা, যখন জুমআর দিন আসলো তখন ঐ লোকগুলো নিজেদের স্ত্রী ও শিশু সন্তানদেরকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। তাদের ডান দিকে ছিল নিষেধকারী দলটি এবং বাম দিকে ছিল ঐ দলটি যারা নীরবতা অবলম্বন করেছিল। ডানদিকের দলটি বললোঃ “দেখো, আমরা তোমাদেরকে নিষেধ করছি, না জানি হয়তো এরূপ ঘটবে যে, তোমরা আল্লাহর শাস্তির কবলে পড়ে যাবে। তখন বাম দিকের দলটি নিষেধকারী দলটিকে বললো, তোমরা এমন লোকদেরকে কেন উপদেশ দান করছো যারা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আল্লাহর শাস্তির কবলে পতিত হবে? এরা কি তোমাদের কথা মানবে? ডান দিকের লোকেরা উত্তরে বললো, “আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমরা এ জন্যেই এদেরকে নিষেধ করছি যে, হয়তো তারা এ কাজ থেকে বিরত থাকবে। আমাদের তো আন্তরিক ইচ্ছা এটাই যে, তারা যেন আল্লাহর আযাবে পাকড়াও না হয়। যদি তারা এ কাজ থেকে বিরত না হয় তবে আল্লাহ আমাদেরকে তো ক্ষমা করবেন!” ঐলোকগুলো কিন্তু ঐ পাপ কাজের উপর কায়েম থাকলো। নিষেধকারীরা তখন তাদেরকে বললো, “হে আল্লাহর শক্ররা! শেষ পর্যন্ত তোমরা মানলেই না। আল্লাহর কসম! আমাদের ভয় হচ্ছে যে, এই দিনের মধ্যেই হয়তো তোমাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দেয়া হবে, বা তোমাদের উপর পাথর বর্ষিত হবে অথবা অন্য কোন শাস্তি তোমাদের উপর এসে পড়বে।” এখন এ নিষেধকারী দল এবং নীরবতা অবলম্বনকারী দল আল্লাহর শাস্তির ভয়ে শহরের বাইরে অবস্থান করতে থাকলো। আর পাপীরা শহরের মধ্যেই রয়ে গেল। তারা শহরের সদর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলো । অতঃপর বাইরে অবস্থানকারীরা সকালেই নগর প্রাচীরের দরজার কাছে পৌছে গেল। লোকগুলো বাইরে বের হয়নি বলে দরজা ভিতর থেকে বন্ধই ছিল। বহুক্ষণ ধরে তারা দরজায় করাঘাত করলো। বহু ডাকাডাকি করলো । কিন্তু কোন উত্তর আসলো না। তখন তারা নগর প্রাচীরের উপর সিঁড়ি লাগিয়ে উপরে উঠলো। উঠে দেখলো যে, তারা সব বানরে পরিণত হয়েছে। তাদের লম্বা লম্বা লেজ রয়েছে। এখন তারা সদর দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো । ঐ বানরগুলো তাদের বন্ধু বান্ধবদেরকে চিনে ফেললো। কিন্তু তারা তাদের বন্ধু বানরদেরকে চিনতে পারলো না। বানরগুলো তাদের কাছে এসে তাদের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়লো । মানুষগুলো। তাদেরকে বললোঃ “আমরা কি তোমাদেরকে নিষেধ করিনি?” তারা মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালো। অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতটি পাঠ করলেনঃ “যখন তারা উপদেশ কবূল করলো না তখন আমি নিষেধকারীদেরকে বাঁচিয়ে নিলাম এবং ঐ পাপী অত্যাচারীদেরকে শাস্তিতে জড়িয়ে ফেললাম।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি তো জানতে পারছি যে, নিষেধকারীরা মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু অন্যদের ব্যাপারে এটা বুঝছি না। বিপদ তো এটাই যে, আমরাও লোকদেরকে পাপ করতে দেখছি, অথচ কিছুই বলছি না।” ইকরামা (রঃ) বলেন- তখন আমি বললাম, আমি আপনার উপর উৎসর্গীকৃত হই। এই দ্বিতীয় দলটিও তো ঐ পাপীদের উপর খুবই অসন্তুষ্ট ছিল এবং তাদের বিরুদ্ধাচরণ করতো। তারা বলতঃ “ধ্বংসের সম্মুখীন এই দলটিকে উপদেশ দিয়ে লাভ কি?" এর দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এই দ্বিতীয় দলটিকে শাস্তিতে শরীক করা যেতে পারে না। আমার এ কথা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এতো খুশী হলেন যে, তিনি আমাকে দু'টি ভাল কাপড় পুরস্কার দিলেন।” (এটা আবদুর রাযযাক (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন) কথিত আছে যে, শনিবার দিন মাছগুলোকে নদীর ধারে ধারে বহু সংখ্যায় দেখা যেতো। আর যখন সন্ধ্যা হয়ে যেতো তখন পরবর্তী শনিবার না আসা পর্যন্ত মাছগুলোকে আর দেখা যেতো না। একদা একটি লোক জালের দড়ি ও পেরেক। নিয়ে নদীতে গেল এবং জাল পেতে আসলো। শনিবার দিন একটি বড় মাছ। জালে আটকা পড়ে গেল। শনিবার গত হয়ে যখন রবিবারের রাত আসলো তখন সে মাছটি ধরে এনে রান্না করলো এবং খেতে লাগলো। রান্না করা মাছের সুগন্ধ পেয়ে লোকেরা তার কাছে দৌড়িয়ে আসলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলে সে অস্বীকার করলো যে, সে একটি মাছ ধরে এনেছিল। পরবর্তী শনিবার আসলে সে পুনরায় ঐ কাজই করলো এবং রবিবারে ওটাকে ভূনা করে খেলো। মাছের গন্ধ পেয়ে লোকেরা পুনরায় তার কাছে দৌড়িয়ে আসলো এবং সে মাছ কোথায় পেলো তা জিজ্ঞেস করলো। সে উত্তরে বললোঃ “আমি যা করছি তোমরাও তা-ই কর।” তারা জিজ্ঞেস করলোঃ “তুমি কি কি করে থাক?” উত্তরে সে নিজের কৌশলের কথা বলে দিলো। অন্যান্য লোকেরাও তখন ঐ কৌশলের উপর কাজ করতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত কাজটি সাধারণভাবে হতে লাগলো । রব্য নামে তাদের একটি শহর ছিল। রাত্রিকালে তারা শহরটির দরজা বন্ধ করে রাখতো । রাতের মধ্যেই তাদের আকৃতির পরিবর্তন ঘটে। তাদের প্রতিবেশী গ্রামের লোকেরা, যারা জীবিকা অন্বেষণে সকালে ঐ শহরের মধ্যে প্রবেশ করতো, দরজা বন্ধ দেখলো। বহুক্ষণ ধরে ডাকলো, কিন্তু কোন উত্তর পেলো না। বাধ্য হয়ে তারা দেয়ালের উপর চড়লো। দেখে যে, তারা বানরে পরিণত হয়েছে। তারা লোকগুলোর নিকটে এসে তাদেরকে জড়িয়ে ধরলো। সূরায়ে বাকারায় আমরা এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি। ওখানে দেখে নেয়াই যথেষ্ট।অন্য একটি উক্তি এও রয়েছে যে, নীরবতা অবলম্বনকারী দলটিও শাস্তিতে পতিত হয়েছিল । কেননা, তারা পাপীদেরকে মাছ ভাজতে ও খেতে দেখেও নিষেধ করতো না। শুধু একটি দল নিষেধ করেছিল। শেষ পর্যন্ত পাপীদের কাজ সাধারণভাবে অনুসৃত হতে শুরু হয়েছিল। তখন নীরবতা অবলম্বনকারী দলটি নিষেধকারী দলটিকে বলেছিলোঃ “এই অত্যাচারী দলটিকে আর নিষেধ করছো কেন? তারা তো কঠিন শাস্তিতে জড়িত হয়ে পড়বেই। আমরা তো তাদের এই আমলের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই তিনটি দলের মধ্যে শুধুমাত্র নিষেধকারী দলটি মুক্তি পেয়েছিল। অবশিষ্ট দুটি দলই শাস্তিতে জড়িত হয়েছিল কিন্তু ইকরামা (রঃ)-এর উপরোক্ত কথা বলার পর মনে হয় তিনি তাঁর এই উক্তি হতে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। কেননা, তিনি ইকরামা (রঃ)-কে খুশী হয়ে দু’টি পোশাক পুরস্কার দিয়েছিলেন। তাঁর এ উক্তির চাইতে প্রত্যাবর্তনকৃত উক্তিটিই বেশী উত্তম যে, নীরবতা অবলম্বনকারী লোকেরাও মুক্তি পেয়েছিল। কেননা, আল্লাহ পাকের, (আরবী) -এ কথা দ্বারাও এটাই প্রমাণিত হয় যে, ঐ পাপীদের ছাড়া অবশিষ্ট দু'টি দলই মুক্তি পেয়েছিল। (আরবী) শব্দের অর্থ (আরবী) (কঠিন) বা (আরবী) (যন্ত্রণাদায়ক)। এ অর্থগুলোর ভাবার্থ প্রায় একই। আল্লাহ তাআলাই সর্বাপেক্ষা উত্তম জ্ঞানের অধিকারী। (আরবী) শব্দের অর্থ লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত।

আল-আরাফ 7:165

১৬৪-১৬৬ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে যে, এই জনপদবাসী তিন ভাগে ভাগ হয়েছিল। প্রথম প্রকার হচ্ছে ঐসব লোক যারা শনিবারের দিন মাছ ধরার কৌশল অবলম্বন করতঃ নিষিদ্ধ কাজ করে বসেছিল। যেমন সূরায়ে বাকারায় আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে ঐ লোকেরা যারা ঐ পাপী লোকদেরকে ঐ পাপ কার্য করতে নিষেধ করেছিল এবং নিজেরা ঐ কাজ থেকে দূরে রয়েছিল। আর তৃতীয় প্রকার হচ্ছে ঐ দল যারা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব ছিল। যারা নিজেরা ঐ কাজে লিপ্ত হয়নি বটে, কিন্তু যারা ঐ কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল তাদেরকে নিষেধও করেনি। বরং যারা নিষেধ করেছিল তাদেরকে তারা বলেছিলঃ “যে লোকদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করতে চান বা শাস্তি দিতে চান তাদেরকে উপদেশ দিয়ে লাভ কি? তোমরা তো জানছো যে এরা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে গেছে। সুতরাং এদের ব্যাপারে উপদেশ মোটেই ক্রিয়াশীল হবে না।” নিষেধকারীরা জবাবে বলেছিলঃ “আমরা তো কমপক্ষে আল্লাহর কাছে এ কৈফিয়ত দিতে পারবো যে, আমরা তাদেরকে নিষেধ করেছিলাম। কেননা, ভাল কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা কর্তব্য তো বটে। কেউ কেউ মায়ূজেরাতান শব্দকে মায়ূজেরাতুন পড়েছেন। অর্থাৎ এটা ওর । আর মায়ূজেরাতান পড়লে অর্থ হবে- “আমরা ওযরের খাতিরে নিষেধ করছি। আর এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা হয়তো এ কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা করবে।” আল্লাহ পাক বলেন-কিন্তু তারা যখন তাদের উপদেশ গ্রহণ করলো না, বরং ঐ পাপ কার্য করতেই থাকলো তখন ঐ কাজ করতে নিষেধকারীদেরকে তো আমি বাঁচিয়ে নিলাম, কিন্তু ঐ পাপ কার্যে লিপ্ত যালিমদেরকে আমি পাকড়াও করলাম এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করলাম।এখানে নিষেধকারীদের মুক্তি ও পাপীদের ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যারা ঐ পাপকার্যে জড়িতও হয়নি এবং নিষেধও করেনি তাদের ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করা হয়েছে। কেননা, কাজ যেমন হবে প্রতিদান তেমনই হবে। সুতরাং তারা প্রশংসার যোগ্য হলো না কারণ তারা প্রশংসার যোগ্য কাজ করেনি। আর তারা নিন্দারও পাত্র হলো না, কেননা, তারা ঐ পাপকার্যে জড়িত হয়নি। তবে তারা মুক্তি পেয়েছিল কি ধ্বংস হয়েছিল এ ব্যাপারে ইমামদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মাছ শনিবারে খুবই বেশী আসতো, কিন্তু অন্যান্য দিনে আসতো না। এভাবে কিছুদিন কেটে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে কতক লোক শনিবারও মাছ ধরতে শুরু করে। কতক লোক তাদেরকে বলেঃ “আজকের দিন তো মাছ ধরা হারাম।” কিন্তু তাদের অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যপনা ঠিকই থাকে। কিন্তু কতক লোক বরাবর নিষেধ করতেই থাকে। যখন এভাবেও কিছু দিন কেটে গেল তখন নিষেধকারীদেরকে তাদেরই মধ্যকার একটি দল বললোঃ এই দুষ্টদেরকে নিষেধ করে লাভ কি? আল্লাহর শাস্তি তাদের প্রাপ্য হয়ে গেছে! সুতরাং এখন আর তাদেরকে উপদেশ দিচ্ছ কেন? এই লোকগুলো নিষেধকারীদের তুলনায় আল্লাহর পথে বেশী কঠোর ও রাগান্বিত ছিল। তখন নিষেধকারীরা তাদেরকে বলেছিল, “আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন! আমরা ওযর পেশ করছি।” তাহলে এই দু’টি দলই যেন নিষেধকারী দল ছিল। সুতরাং যখন আল্লাহর শাস্তি নাযিল হয়ে গেল তখন এই দুটি দলই রক্ষা পেলো।ইকরামা (রাঃ) বলেন, আমি একদা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি। সেই সময় তাঁর চক্ষু দু'টি অশ্রুসিক্ত ছিল এবং দেখি যে, কুরআন কারীম তার ক্রোড়ে রয়েছে। আমি সময়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তার সামনে বসে পড়লাম এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “কুরআনের এ পৃষ্ঠা আমাকে কাঁদাচ্ছে।” তিনি সূরায়ে আরাফ পাঠ করছিলেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আয়লা কি জান কি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যা। এবার তিনি বলতে শুরু করলেনঃ আয়লায় ইয়াহূদীরা বাস করতো। শনিবার মৎস্য শিকার তাদের উপর নিষিদ্ধ ছিল। তাদের পরীক্ষার জন্যে মাছগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, ওরা যেন শুধু শনিবারেই বের হয়। শনিবারের দিন নদী মাছে পরিপূর্ণ হয়ে যেতো। মোটাতাজা ও ভাল ভাল অধিক সংখ্যক মাছ পানির উপর লাফালাফি করতো। শনিবার ছাড়া অন্যান্য দিন কঠিন চেষ্টার পর কিছু মাছ পাওয়া যেতো। কিছুদিন পর্যন্ত ঐ লোকগুলো আল্লাহর আদেশের মর্যাদা দিলো এবং ঐ দিনে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকলো। অতঃপর শয়তান তাদের অন্তরে এই অনুভূতি জাগিয়ে দিলো যে, শনিবার দিন মাছ খাওয়া নিষিদ্ধ বটে কিন্তু ধরা নিষিদ্ধ নয়। সেই দিনে ধরে অন্য দিনে খাওয়া যেতে পারে। একটি দলের অন্তরে এই খেয়াল জেগেই গেল। কিন্তু অন্য দল তাদেরকে বললোঃ “খাওয়া ও ধরা উভয়ই নিষিদ্ধ। মোটকথা, যখন জুমআর দিন আসলো তখন ঐ লোকগুলো নিজেদের স্ত্রী ও শিশু সন্তানদেরকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। তাদের ডান দিকে ছিল নিষেধকারী দলটি এবং বাম দিকে ছিল ঐ দলটি যারা নীরবতা অবলম্বন করেছিল। ডানদিকের দলটি বললোঃ “দেখো, আমরা তোমাদেরকে নিষেধ করছি, না জানি হয়তো এরূপ ঘটবে যে, তোমরা আল্লাহর শাস্তির কবলে পড়ে যাবে। তখন বাম দিকের দলটি নিষেধকারী দলটিকে বললো, তোমরা এমন লোকদেরকে কেন উপদেশ দান করছো যারা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আল্লাহর শাস্তির কবলে পতিত হবে? এরা কি তোমাদের কথা মানবে? ডান দিকের লোকেরা উত্তরে বললো, “আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমরা এ জন্যেই এদেরকে নিষেধ করছি যে, হয়তো তারা এ কাজ থেকে বিরত থাকবে। আমাদের তো আন্তরিক ইচ্ছা এটাই যে, তারা যেন আল্লাহর আযাবে পাকড়াও না হয়। যদি তারা এ কাজ থেকে বিরত না হয় তবে আল্লাহ আমাদেরকে তো ক্ষমা করবেন!” ঐলোকগুলো কিন্তু ঐ পাপ কাজের উপর কায়েম থাকলো। নিষেধকারীরা তখন তাদেরকে বললো, “হে আল্লাহর শক্ররা! শেষ পর্যন্ত তোমরা মানলেই না। আল্লাহর কসম! আমাদের ভয় হচ্ছে যে, এই দিনের মধ্যেই হয়তো তোমাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দেয়া হবে, বা তোমাদের উপর পাথর বর্ষিত হবে অথবা অন্য কোন শাস্তি তোমাদের উপর এসে পড়বে।” এখন এ নিষেধকারী দল এবং নীরবতা অবলম্বনকারী দল আল্লাহর শাস্তির ভয়ে শহরের বাইরে অবস্থান করতে থাকলো। আর পাপীরা শহরের মধ্যেই রয়ে গেল। তারা শহরের সদর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলো । অতঃপর বাইরে অবস্থানকারীরা সকালেই নগর প্রাচীরের দরজার কাছে পৌছে গেল। লোকগুলো বাইরে বের হয়নি বলে দরজা ভিতর থেকে বন্ধই ছিল। বহুক্ষণ ধরে তারা দরজায় করাঘাত করলো। বহু ডাকাডাকি করলো । কিন্তু কোন উত্তর আসলো না। তখন তারা নগর প্রাচীরের উপর সিঁড়ি লাগিয়ে উপরে উঠলো। উঠে দেখলো যে, তারা সব বানরে পরিণত হয়েছে। তাদের লম্বা লম্বা লেজ রয়েছে। এখন তারা সদর দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো । ঐ বানরগুলো তাদের বন্ধু বান্ধবদেরকে চিনে ফেললো। কিন্তু তারা তাদের বন্ধু বানরদেরকে চিনতে পারলো না। বানরগুলো তাদের কাছে এসে তাদের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়লো । মানুষগুলো। তাদেরকে বললোঃ “আমরা কি তোমাদেরকে নিষেধ করিনি?” তারা মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালো। অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতটি পাঠ করলেনঃ “যখন তারা উপদেশ কবূল করলো না তখন আমি নিষেধকারীদেরকে বাঁচিয়ে নিলাম এবং ঐ পাপী অত্যাচারীদেরকে শাস্তিতে জড়িয়ে ফেললাম।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি তো জানতে পারছি যে, নিষেধকারীরা মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু অন্যদের ব্যাপারে এটা বুঝছি না। বিপদ তো এটাই যে, আমরাও লোকদেরকে পাপ করতে দেখছি, অথচ কিছুই বলছি না।” ইকরামা (রঃ) বলেন- তখন আমি বললাম, আমি আপনার উপর উৎসর্গীকৃত হই। এই দ্বিতীয় দলটিও তো ঐ পাপীদের উপর খুবই অসন্তুষ্ট ছিল এবং তাদের বিরুদ্ধাচরণ করতো। তারা বলতঃ “ধ্বংসের সম্মুখীন এই দলটিকে উপদেশ দিয়ে লাভ কি?" এর দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এই দ্বিতীয় দলটিকে শাস্তিতে শরীক করা যেতে পারে না। আমার এ কথা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এতো খুশী হলেন যে, তিনি আমাকে দু'টি ভাল কাপড় পুরস্কার দিলেন।” (এটা আবদুর রাযযাক (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন) কথিত আছে যে, শনিবার দিন মাছগুলোকে নদীর ধারে ধারে বহু সংখ্যায় দেখা যেতো। আর যখন সন্ধ্যা হয়ে যেতো তখন পরবর্তী শনিবার না আসা পর্যন্ত মাছগুলোকে আর দেখা যেতো না। একদা একটি লোক জালের দড়ি ও পেরেক। নিয়ে নদীতে গেল এবং জাল পেতে আসলো। শনিবার দিন একটি বড় মাছ। জালে আটকা পড়ে গেল। শনিবার গত হয়ে যখন রবিবারের রাত আসলো তখন সে মাছটি ধরে এনে রান্না করলো এবং খেতে লাগলো। রান্না করা মাছের সুগন্ধ পেয়ে লোকেরা তার কাছে দৌড়িয়ে আসলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলে সে অস্বীকার করলো যে, সে একটি মাছ ধরে এনেছিল। পরবর্তী শনিবার আসলে সে পুনরায় ঐ কাজই করলো এবং রবিবারে ওটাকে ভূনা করে খেলো। মাছের গন্ধ পেয়ে লোকেরা পুনরায় তার কাছে দৌড়িয়ে আসলো এবং সে মাছ কোথায় পেলো তা জিজ্ঞেস করলো। সে উত্তরে বললোঃ “আমি যা করছি তোমরাও তা-ই কর।” তারা জিজ্ঞেস করলোঃ “তুমি কি কি করে থাক?” উত্তরে সে নিজের কৌশলের কথা বলে দিলো। অন্যান্য লোকেরাও তখন ঐ কৌশলের উপর কাজ করতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত কাজটি সাধারণভাবে হতে লাগলো । রব্য নামে তাদের একটি শহর ছিল। রাত্রিকালে তারা শহরটির দরজা বন্ধ করে রাখতো । রাতের মধ্যেই তাদের আকৃতির পরিবর্তন ঘটে। তাদের প্রতিবেশী গ্রামের লোকেরা, যারা জীবিকা অন্বেষণে সকালে ঐ শহরের মধ্যে প্রবেশ করতো, দরজা বন্ধ দেখলো। বহুক্ষণ ধরে ডাকলো, কিন্তু কোন উত্তর পেলো না। বাধ্য হয়ে তারা দেয়ালের উপর চড়লো। দেখে যে, তারা বানরে পরিণত হয়েছে। তারা লোকগুলোর নিকটে এসে তাদেরকে জড়িয়ে ধরলো। সূরায়ে বাকারায় আমরা এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি। ওখানে দেখে নেয়াই যথেষ্ট।অন্য একটি উক্তি এও রয়েছে যে, নীরবতা অবলম্বনকারী দলটিও শাস্তিতে পতিত হয়েছিল । কেননা, তারা পাপীদেরকে মাছ ভাজতে ও খেতে দেখেও নিষেধ করতো না। শুধু একটি দল নিষেধ করেছিল। শেষ পর্যন্ত পাপীদের কাজ সাধারণভাবে অনুসৃত হতে শুরু হয়েছিল। তখন নীরবতা অবলম্বনকারী দলটি নিষেধকারী দলটিকে বলেছিলোঃ “এই অত্যাচারী দলটিকে আর নিষেধ করছো কেন? তারা তো কঠিন শাস্তিতে জড়িত হয়ে পড়বেই। আমরা তো তাদের এই আমলের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই তিনটি দলের মধ্যে শুধুমাত্র নিষেধকারী দলটি মুক্তি পেয়েছিল। অবশিষ্ট দুটি দলই শাস্তিতে জড়িত হয়েছিল কিন্তু ইকরামা (রঃ)-এর উপরোক্ত কথা বলার পর মনে হয় তিনি তাঁর এই উক্তি হতে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। কেননা, তিনি ইকরামা (রঃ)-কে খুশী হয়ে দু’টি পোশাক পুরস্কার দিয়েছিলেন। তাঁর এ উক্তির চাইতে প্রত্যাবর্তনকৃত উক্তিটিই বেশী উত্তম যে, নীরবতা অবলম্বনকারী লোকেরাও মুক্তি পেয়েছিল। কেননা, আল্লাহ পাকের, (আরবী) -এ কথা দ্বারাও এটাই প্রমাণিত হয় যে, ঐ পাপীদের ছাড়া অবশিষ্ট দু'টি দলই মুক্তি পেয়েছিল। (আরবী) শব্দের অর্থ (আরবী) (কঠিন) বা (আরবী) (যন্ত্রণাদায়ক)। এ অর্থগুলোর ভাবার্থ প্রায় একই। আল্লাহ তাআলাই সর্বাপেক্ষা উত্তম জ্ঞানের অধিকারী। (আরবী) শব্দের অর্থ লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত।

আল-আরাফ 7:166

১৬৪-১৬৬ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে যে, এই জনপদবাসী তিন ভাগে ভাগ হয়েছিল। প্রথম প্রকার হচ্ছে ঐসব লোক যারা শনিবারের দিন মাছ ধরার কৌশল অবলম্বন করতঃ নিষিদ্ধ কাজ করে বসেছিল। যেমন সূরায়ে বাকারায় আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে ঐ লোকেরা যারা ঐ পাপী লোকদেরকে ঐ পাপ কার্য করতে নিষেধ করেছিল এবং নিজেরা ঐ কাজ থেকে দূরে রয়েছিল। আর তৃতীয় প্রকার হচ্ছে ঐ দল যারা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব ছিল। যারা নিজেরা ঐ কাজে লিপ্ত হয়নি বটে, কিন্তু যারা ঐ কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল তাদেরকে নিষেধও করেনি। বরং যারা নিষেধ করেছিল তাদেরকে তারা বলেছিলঃ “যে লোকদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করতে চান বা শাস্তি দিতে চান তাদেরকে উপদেশ দিয়ে লাভ কি? তোমরা তো জানছো যে এরা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে গেছে। সুতরাং এদের ব্যাপারে উপদেশ মোটেই ক্রিয়াশীল হবে না।” নিষেধকারীরা জবাবে বলেছিলঃ “আমরা তো কমপক্ষে আল্লাহর কাছে এ কৈফিয়ত দিতে পারবো যে, আমরা তাদেরকে নিষেধ করেছিলাম। কেননা, ভাল কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা কর্তব্য তো বটে। কেউ কেউ মায়ূজেরাতান শব্দকে মায়ূজেরাতুন পড়েছেন। অর্থাৎ এটা ওর । আর মায়ূজেরাতান পড়লে অর্থ হবে- “আমরা ওযরের খাতিরে নিষেধ করছি। আর এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, তারা হয়তো এ কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা করবে।” আল্লাহ পাক বলেন-কিন্তু তারা যখন তাদের উপদেশ গ্রহণ করলো না, বরং ঐ পাপ কার্য করতেই থাকলো তখন ঐ কাজ করতে নিষেধকারীদেরকে তো আমি বাঁচিয়ে নিলাম, কিন্তু ঐ পাপ কার্যে লিপ্ত যালিমদেরকে আমি পাকড়াও করলাম এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করলাম।এখানে নিষেধকারীদের মুক্তি ও পাপীদের ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যারা ঐ পাপকার্যে জড়িতও হয়নি এবং নিষেধও করেনি তাদের ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করা হয়েছে। কেননা, কাজ যেমন হবে প্রতিদান তেমনই হবে। সুতরাং তারা প্রশংসার যোগ্য হলো না কারণ তারা প্রশংসার যোগ্য কাজ করেনি। আর তারা নিন্দারও পাত্র হলো না, কেননা, তারা ঐ পাপকার্যে জড়িত হয়নি। তবে তারা মুক্তি পেয়েছিল কি ধ্বংস হয়েছিল এ ব্যাপারে ইমামদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মাছ শনিবারে খুবই বেশী আসতো, কিন্তু অন্যান্য দিনে আসতো না। এভাবে কিছুদিন কেটে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে কতক লোক শনিবারও মাছ ধরতে শুরু করে। কতক লোক তাদেরকে বলেঃ “আজকের দিন তো মাছ ধরা হারাম।” কিন্তু তাদের অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যপনা ঠিকই থাকে। কিন্তু কতক লোক বরাবর নিষেধ করতেই থাকে। যখন এভাবেও কিছু দিন কেটে গেল তখন নিষেধকারীদেরকে তাদেরই মধ্যকার একটি দল বললোঃ এই দুষ্টদেরকে নিষেধ করে লাভ কি? আল্লাহর শাস্তি তাদের প্রাপ্য হয়ে গেছে! সুতরাং এখন আর তাদেরকে উপদেশ দিচ্ছ কেন? এই লোকগুলো নিষেধকারীদের তুলনায় আল্লাহর পথে বেশী কঠোর ও রাগান্বিত ছিল। তখন নিষেধকারীরা তাদেরকে বলেছিল, “আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন! আমরা ওযর পেশ করছি।” তাহলে এই দু’টি দলই যেন নিষেধকারী দল ছিল। সুতরাং যখন আল্লাহর শাস্তি নাযিল হয়ে গেল তখন এই দুটি দলই রক্ষা পেলো।ইকরামা (রাঃ) বলেন, আমি একদা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি। সেই সময় তাঁর চক্ষু দু'টি অশ্রুসিক্ত ছিল এবং দেখি যে, কুরআন কারীম তার ক্রোড়ে রয়েছে। আমি সময়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তার সামনে বসে পড়লাম এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “কুরআনের এ পৃষ্ঠা আমাকে কাঁদাচ্ছে।” তিনি সূরায়ে আরাফ পাঠ করছিলেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আয়লা কি জান কি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যা। এবার তিনি বলতে শুরু করলেনঃ আয়লায় ইয়াহূদীরা বাস করতো। শনিবার মৎস্য শিকার তাদের উপর নিষিদ্ধ ছিল। তাদের পরীক্ষার জন্যে মাছগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, ওরা যেন শুধু শনিবারেই বের হয়। শনিবারের দিন নদী মাছে পরিপূর্ণ হয়ে যেতো। মোটাতাজা ও ভাল ভাল অধিক সংখ্যক মাছ পানির উপর লাফালাফি করতো। শনিবার ছাড়া অন্যান্য দিন কঠিন চেষ্টার পর কিছু মাছ পাওয়া যেতো। কিছুদিন পর্যন্ত ঐ লোকগুলো আল্লাহর আদেশের মর্যাদা দিলো এবং ঐ দিনে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকলো। অতঃপর শয়তান তাদের অন্তরে এই অনুভূতি জাগিয়ে দিলো যে, শনিবার দিন মাছ খাওয়া নিষিদ্ধ বটে কিন্তু ধরা নিষিদ্ধ নয়। সেই দিনে ধরে অন্য দিনে খাওয়া যেতে পারে। একটি দলের অন্তরে এই খেয়াল জেগেই গেল। কিন্তু অন্য দল তাদেরকে বললোঃ “খাওয়া ও ধরা উভয়ই নিষিদ্ধ। মোটকথা, যখন জুমআর দিন আসলো তখন ঐ লোকগুলো নিজেদের স্ত্রী ও শিশু সন্তানদেরকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। তাদের ডান দিকে ছিল নিষেধকারী দলটি এবং বাম দিকে ছিল ঐ দলটি যারা নীরবতা অবলম্বন করেছিল। ডানদিকের দলটি বললোঃ “দেখো, আমরা তোমাদেরকে নিষেধ করছি, না জানি হয়তো এরূপ ঘটবে যে, তোমরা আল্লাহর শাস্তির কবলে পড়ে যাবে। তখন বাম দিকের দলটি নিষেধকারী দলটিকে বললো, তোমরা এমন লোকদেরকে কেন উপদেশ দান করছো যারা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আল্লাহর শাস্তির কবলে পতিত হবে? এরা কি তোমাদের কথা মানবে? ডান দিকের লোকেরা উত্তরে বললো, “আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমরা এ জন্যেই এদেরকে নিষেধ করছি যে, হয়তো তারা এ কাজ থেকে বিরত থাকবে। আমাদের তো আন্তরিক ইচ্ছা এটাই যে, তারা যেন আল্লাহর আযাবে পাকড়াও না হয়। যদি তারা এ কাজ থেকে বিরত না হয় তবে আল্লাহ আমাদেরকে তো ক্ষমা করবেন!” ঐলোকগুলো কিন্তু ঐ পাপ কাজের উপর কায়েম থাকলো। নিষেধকারীরা তখন তাদেরকে বললো, “হে আল্লাহর শক্ররা! শেষ পর্যন্ত তোমরা মানলেই না। আল্লাহর কসম! আমাদের ভয় হচ্ছে যে, এই দিনের মধ্যেই হয়তো তোমাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দেয়া হবে, বা তোমাদের উপর পাথর বর্ষিত হবে অথবা অন্য কোন শাস্তি তোমাদের উপর এসে পড়বে।” এখন এ নিষেধকারী দল এবং নীরবতা অবলম্বনকারী দল আল্লাহর শাস্তির ভয়ে শহরের বাইরে অবস্থান করতে থাকলো। আর পাপীরা শহরের মধ্যেই রয়ে গেল। তারা শহরের সদর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলো । অতঃপর বাইরে অবস্থানকারীরা সকালেই নগর প্রাচীরের দরজার কাছে পৌছে গেল। লোকগুলো বাইরে বের হয়নি বলে দরজা ভিতর থেকে বন্ধই ছিল। বহুক্ষণ ধরে তারা দরজায় করাঘাত করলো। বহু ডাকাডাকি করলো । কিন্তু কোন উত্তর আসলো না। তখন তারা নগর প্রাচীরের উপর সিঁড়ি লাগিয়ে উপরে উঠলো। উঠে দেখলো যে, তারা সব বানরে পরিণত হয়েছে। তাদের লম্বা লম্বা লেজ রয়েছে। এখন তারা সদর দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো । ঐ বানরগুলো তাদের বন্ধু বান্ধবদেরকে চিনে ফেললো। কিন্তু তারা তাদের বন্ধু বানরদেরকে চিনতে পারলো না। বানরগুলো তাদের কাছে এসে তাদের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়লো । মানুষগুলো। তাদেরকে বললোঃ “আমরা কি তোমাদেরকে নিষেধ করিনি?” তারা মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালো। অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতটি পাঠ করলেনঃ “যখন তারা উপদেশ কবূল করলো না তখন আমি নিষেধকারীদেরকে বাঁচিয়ে নিলাম এবং ঐ পাপী অত্যাচারীদেরকে শাস্তিতে জড়িয়ে ফেললাম।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি তো জানতে পারছি যে, নিষেধকারীরা মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু অন্যদের ব্যাপারে এটা বুঝছি না। বিপদ তো এটাই যে, আমরাও লোকদেরকে পাপ করতে দেখছি, অথচ কিছুই বলছি না।” ইকরামা (রঃ) বলেন- তখন আমি বললাম, আমি আপনার উপর উৎসর্গীকৃত হই। এই দ্বিতীয় দলটিও তো ঐ পাপীদের উপর খুবই অসন্তুষ্ট ছিল এবং তাদের বিরুদ্ধাচরণ করতো। তারা বলতঃ “ধ্বংসের সম্মুখীন এই দলটিকে উপদেশ দিয়ে লাভ কি?" এর দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এই দ্বিতীয় দলটিকে শাস্তিতে শরীক করা যেতে পারে না। আমার এ কথা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এতো খুশী হলেন যে, তিনি আমাকে দু'টি ভাল কাপড় পুরস্কার দিলেন।” (এটা আবদুর রাযযাক (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন) কথিত আছে যে, শনিবার দিন মাছগুলোকে নদীর ধারে ধারে বহু সংখ্যায় দেখা যেতো। আর যখন সন্ধ্যা হয়ে যেতো তখন পরবর্তী শনিবার না আসা পর্যন্ত মাছগুলোকে আর দেখা যেতো না। একদা একটি লোক জালের দড়ি ও পেরেক। নিয়ে নদীতে গেল এবং জাল পেতে আসলো। শনিবার দিন একটি বড় মাছ। জালে আটকা পড়ে গেল। শনিবার গত হয়ে যখন রবিবারের রাত আসলো তখন সে মাছটি ধরে এনে রান্না করলো এবং খেতে লাগলো। রান্না করা মাছের সুগন্ধ পেয়ে লোকেরা তার কাছে দৌড়িয়ে আসলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলে সে অস্বীকার করলো যে, সে একটি মাছ ধরে এনেছিল। পরবর্তী শনিবার আসলে সে পুনরায় ঐ কাজই করলো এবং রবিবারে ওটাকে ভূনা করে খেলো। মাছের গন্ধ পেয়ে লোকেরা পুনরায় তার কাছে দৌড়িয়ে আসলো এবং সে মাছ কোথায় পেলো তা জিজ্ঞেস করলো। সে উত্তরে বললোঃ “আমি যা করছি তোমরাও তা-ই কর।” তারা জিজ্ঞেস করলোঃ “তুমি কি কি করে থাক?” উত্তরে সে নিজের কৌশলের কথা বলে দিলো। অন্যান্য লোকেরাও তখন ঐ কৌশলের উপর কাজ করতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত কাজটি সাধারণভাবে হতে লাগলো । রব্য নামে তাদের একটি শহর ছিল। রাত্রিকালে তারা শহরটির দরজা বন্ধ করে রাখতো । রাতের মধ্যেই তাদের আকৃতির পরিবর্তন ঘটে। তাদের প্রতিবেশী গ্রামের লোকেরা, যারা জীবিকা অন্বেষণে সকালে ঐ শহরের মধ্যে প্রবেশ করতো, দরজা বন্ধ দেখলো। বহুক্ষণ ধরে ডাকলো, কিন্তু কোন উত্তর পেলো না। বাধ্য হয়ে তারা দেয়ালের উপর চড়লো। দেখে যে, তারা বানরে পরিণত হয়েছে। তারা লোকগুলোর নিকটে এসে তাদেরকে জড়িয়ে ধরলো। সূরায়ে বাকারায় আমরা এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি। ওখানে দেখে নেয়াই যথেষ্ট।অন্য একটি উক্তি এও রয়েছে যে, নীরবতা অবলম্বনকারী দলটিও শাস্তিতে পতিত হয়েছিল । কেননা, তারা পাপীদেরকে মাছ ভাজতে ও খেতে দেখেও নিষেধ করতো না। শুধু একটি দল নিষেধ করেছিল। শেষ পর্যন্ত পাপীদের কাজ সাধারণভাবে অনুসৃত হতে শুরু হয়েছিল। তখন নীরবতা অবলম্বনকারী দলটি নিষেধকারী দলটিকে বলেছিলোঃ “এই অত্যাচারী দলটিকে আর নিষেধ করছো কেন? তারা তো কঠিন শাস্তিতে জড়িত হয়ে পড়বেই। আমরা তো তাদের এই আমলের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই তিনটি দলের মধ্যে শুধুমাত্র নিষেধকারী দলটি মুক্তি পেয়েছিল। অবশিষ্ট দুটি দলই শাস্তিতে জড়িত হয়েছিল কিন্তু ইকরামা (রঃ)-এর উপরোক্ত কথা বলার পর মনে হয় তিনি তাঁর এই উক্তি হতে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। কেননা, তিনি ইকরামা (রঃ)-কে খুশী হয়ে দু’টি পোশাক পুরস্কার দিয়েছিলেন। তাঁর এ উক্তির চাইতে প্রত্যাবর্তনকৃত উক্তিটিই বেশী উত্তম যে, নীরবতা অবলম্বনকারী লোকেরাও মুক্তি পেয়েছিল। কেননা, আল্লাহ পাকের, (আরবী) -এ কথা দ্বারাও এটাই প্রমাণিত হয় যে, ঐ পাপীদের ছাড়া অবশিষ্ট দু'টি দলই মুক্তি পেয়েছিল। (আরবী) শব্দের অর্থ (আরবী) (কঠিন) বা (আরবী) (যন্ত্রণাদায়ক)। এ অর্থগুলোর ভাবার্থ প্রায় একই। আল্লাহ তাআলাই সর্বাপেক্ষা উত্তম জ্ঞানের অধিকারী। (আরবী) শব্দের অর্থ লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত।

আল-আরাফ 7:167

(আরবী) শব্দটি (আরবী) ওযনে (আরবী) শব্দ হতে গৃহীত। অর্থাৎ হুকুম করেছেন বা জানিয়েছেন। আর যেহেতু এই আয়াতে কালামের শক্তির শান’ রয়েছে, সেহেতু (আরবী) শব্দের (আরবী) কসমের ফায়েদা দিচ্ছে। এজন্যে (আরবী)-এর পরেই (আরবী) আনা হয়েছে। (আরবী) সর্বনামটি ইয়াহূদীদের দিকে ফিরছে। অর্থাৎ আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন। বা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ঐ ইয়াহূদীদের উপর কিয়ামত পর্যন্ত কঠিন শাস্তি নাযিল হতে থাকবে। অর্থাৎ তাদের অবাধ্যতা, ঔদ্ধত্যপনা এবং প্রতিটি কাজে কর্মে প্রতারণার কারণে তারা লাঞ্ছনা ও অপমানজনক শাস্তি পেতে থাকবে। কথিত আছে যে, হযরত মূসা (আঃ) তাদের উপর সাত বছর বা তেরো বছর পর্যন্ত খেরাজ ধার্য করেছিলেন। আর তিনিই সর্বপ্রথম খেরাজ চালু করেছিলেন। অতঃপর ঐ ইয়াহূদীদের উপর ইউনানী, কশিদানী এবং কালদানীরা আধিপত্য লাভ করে। তারপর তারা খ্রীষ্টানদের ক্রোধের শিকার হয়। তারা তাদেরকে লাঞ্ছিত করতে থাকে। তাদের নিকট থেকে তারা জিযিয়া ও খেরাজ আদায় করতে থাকে। যখন ইসলামের আবির্ভাব ঘটে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের উপর প্রাধান্য লাভ করেন। তারা যিম্মী ছিল এবং জিযিয়া কর প্রদান করতো। (সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), ইবনে জুরাইজ (রঃ), সুদ্দী (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) এরূপই বলেছেন) সর্বশেষে তারা দাজ্জালের সাহায্যকারী রূপে বের হবে। কিন্তু মুসলমানরা তাদেরকে হত্যা করবে। এই উদ্দেশ্যে হযরত ঈসা (আঃ) মুসলমানদের সাথে সহযোগিতা করবেন। এসব কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ঘটবে। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা সত্বরই পাপীদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণকারী। (আরবী) কিন্তু তিনি অবশ্যই ক্ষমাশীল ও দয়ালুও বটে। যে তাওবা করে তাকে তিনি ক্ষমা করে থাকেন। এখানেও একই কথা যে, আযাব ও রহমতের বর্ণনা সাথে সাথেই হয়েছে। যেন শাস্তি থেকে ভয় প্রদর্শনের কারণে মানুষ নৈরাশ্যের মধ্যে হাবুডুবু না খায়। তিনি উৎসাহ প্রদান ও ভয় প্রদর্শন একই সাথে করেছেন, যাতে মানুষ ভয় ও আশার মধ্যে থাকতে পারে।