Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-আনফাল 8:41 – আল-আনফাল 8:75

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-আনফাল 8:41
  2. আল-আনফাল 8:42
  3. আল-আনফাল 8:43
  4. আল-আনফাল 8:44
  5. আল-আনফাল 8:45
  6. আল-আনফাল 8:46
  7. আল-আনফাল 8:47
  8. আল-আনফাল 8:48
  9. আল-আনফাল 8:49
  10. আল-আনফাল 8:50
  11. আল-আনফাল 8:51
  12. আল-আনফাল 8:52
  13. আল-আনফাল 8:53
  14. আল-আনফাল 8:54
  15. আল-আনফাল 8:55
  16. আল-আনফাল 8:56
  17. আল-আনফাল 8:57
  18. আল-আনফাল 8:58
  19. আল-আনফাল 8:59
  20. আল-আনফাল 8:60
  21. আল-আনফাল 8:61
  22. আল-আনফাল 8:62
  23. আল-আনফাল 8:63
  24. আল-আনফাল 8:64
  25. আল-আনফাল 8:65
  26. আল-আনফাল 8:66
  27. আল-আনফাল 8:67
  28. আল-আনফাল 8:68
  29. আল-আনফাল 8:69
  30. আল-আনফাল 8:70
  31. আল-আনফাল 8:71
  32. আল-আনফাল 8:72
  33. আল-আনফাল 8:73
  34. আল-আনফাল 8:74
  35. আল-আনফাল 8:75

আল-আনফাল 8:41

এখানে আল্লাহ তা'আলা গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ মালের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন যা তিনি বিশেষভাবে উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার জন্যেই হালাল করেছেন। পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্যে এটা হারাম ছিল। গনীমত ঐ মালকে বলা হয় যা কাফিরদের উপর আক্রমণ চালানোর পর লাভ করা হয়। আর ফাই' হচ্ছে ঐ মাল যা যুদ্ধ না করেই লাভ করা হয়। যেমন তাদের সাথে সন্ধি করে ক্ষতিপূরণ স্বরূপ কিছু আদায় করা হয় বা ঐ মাল যার কোন উত্তরাধিকারী নেই অথবা যে মাল জিযিয়া, খিরাজ ইত্যাদি হিসাবে পাওয়া যায়। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মাশায়েখদের একটি জামা'আতের অভিমত এটাই। কিন্তু কোন কোন আলেম গনীমতের প্রয়োগ ফাই-এর উপর এবং ফাই-এর প্রয়োগ গনীমতের উপর করে থাকেন। এ জন্যেই কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত দ্বারা সূরায়ে হাশরের (আরবী) (৫৯:৭)-এই আয়াতটিকে রহিত করা হয়েছে। আর এভাবে গনীমতের মালের পাঁচ অংশের মধ্য হতে চার অংশ তো মুজাহিদদের মধ্যে বন্টিত হবে এবং এক অংশ তাদেরকে দেয়া হবে যাদের বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে। কিন্তু এই উক্তিটি গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, এই আয়াতটি বদর যুদ্ধের পরে অবতীর্ণ হয়, আর ঐ আয়াতটি ইয়াহদ বানী নাযীরের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। আর জীবনী লেখক ও ইতিহাস লেখক আলেমদের কারো এ ব্যাপারে দ্বি-মত নেই যে, বানী নাযীরের ব্যাপারটি হচ্ছে বদর যুদ্ধের পরের ঘটনা। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু যারা গনীমত' ও ফাই’-এর মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করে থাকেন তাঁরা বলেন যে, ঐ আয়াতটি ফাই’ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয় এবং এই আয়াতটি গনীমত সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। আবার কতক লোক ‘ফাই’ ও ‘গনীমত'-এর ব্যাপারটিকে ইমামের মতের উপর নির্ভরশীল বলে মনে করেন । ইমাম ঐ ব্যাপারে নিজের মর্জি মোতাবেক কাজ করবেন। এভাবেই এই দু'টি আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্য এসে যায়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই আয়াতে বর্ণনা রয়েছে যে, গনীমতের মাল হতে এক পঞ্চমাংশ বের করে নিতে হবে, তা কমই হাক আর বেশীই হাক। তা সূচই হাক বা সূতাই হোক না কেন। বিশ্ব প্রতিপালক ঘোষণা করছেন যে, যে খিয়ানত করবে সে তা নিয়ে কিয়ামতের দিন হাযির হবে এবং প্রত্যেককেই তার আমলের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। কারো উপর কোন প্রকার অত্যাচার করা হবে না। বলা হয়েছে যে, এক পঞ্চমাংশ হতে আল্লাহ তাআলার অংশ কা'বা ঘরে দাখিল করা হবে। আবুল আলিয়া রাবাহী (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধলব্ধ মালকে পাঁচ ভাগ করতেন। চার ভাগ তিনি মুজাহিদদের মধ্যে বন্টন করে দিতেন। তারপর এক পঞ্চমাংশ হতে মুষ্টি ভরে বের করতেন এবং তা কা'বা ঘরে দাখিল করে দিতেন। অতঃপর অবশিষ্টাংশকে আবার পাঁচ ভাগে ভাগ করতেন। এক ভাগ তার, দ্বিতীয় ভাগ আত্মীয়দের, তৃতীয় ভাগ ইয়াতীমদের, চতুর্থ ভাগ মিসকীনদের এবং পঞ্চম ভাগ মুসাফিরদের। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এখানে আল্লাহর অংশের নাম শুধুমাত্র বরকতের জন্যে নেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অংশ থেকেই যেন। বর্ণনা শুরু হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কোন সৈন্যবাহিনী পাঠাতেন এবং গনীমতের মাল লাভ করতেন তখন তিনি ওটাকে প্রথমে পাঁচ ভাগে ভাগ করতেন। তারপর পঞ্চমাংশকে আবার পাঁচ অংশে বিভক্ত করতেন। অতঃপর তিনি এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। সুতরাং (আরবী) এটা শুধু বাক্যের শুরুর জন্যে বলা হয়েছে। আকাশসমূহে ও যমীনে যা কিছু রয়েছে সবই তো আল্লাহর। কাজেই এক পঞ্চমাংশ আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এরই প্রাপ্য। বহু মনীষী ও গুরুজনের এটাই উক্তি যে, আল্লাহ ও রাসূল (সঃ)-এর একটাই অংশ। (এটা নাখঈ (রঃ), হাসান বসরী (র), শাবী (রঃ), আতা (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) প্রমুখ মনীষীয়উক্তি) সহীহ সনদে বর্ণিত নিম্নের হাদীসটি এর পৃষ্ঠপোষকতা করছেঃ আব্দুল্লাহ ইবনে শাকীক (রঃ) একজন সাহাবী হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, ওয়াদীল কুরায় আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) গনীমতের ব্যাপারে আপনি কি বলেন? নবী (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “ওর এক পঞ্চমাংশ হচ্ছে আল্লাহর জন্যে এবং বাকী চার অংশ হচ্ছে মুজাহিদদের জন্যে।” আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, কারো উপর কারো কি অধিক হক নেই? তিনি জবাব দিলেন- “না, এমন কি তুমি তোমার বন্ধুর দেহ থেকে যে তীরটি বের করবে সেই তীরটিও তুমি তোমার সেই মুসলিম ভাই এর চেয়ে বেশী নেয়ার হকদার নও।” (এ হাদীসটি ইমাম হাফিয আবু বকর আল-বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হাসান (রাঃ) স্বীয় মাল হতে এক পঞ্চমাংশের অসিয়ত করেন এবং বলেনঃ “আমি কি নিজের জন্যে ঐ অংশের উপর সম্মত হবো না যা আল্লাহ স্বয়ং নিজের জন্যে নির্ধারণ করেছেন?”ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, গনীমতের মালকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হতো। চার ভাগ ঐ সৈন্যদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হতো যারা ঐ যুদ্ধে শরীক থাকতেন। আর পঞ্চম ভাগটি থাকতো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর জন্যে। এটাকে আবার চারভাগে ভাগ করা হতো। এর এক চতুর্থাংশের প্রাপক হতেন আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)। আল্লাহ ও তার র আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)। আল্লাহ ও তার রাসুল (সঃ)-এর প্রাপ্য এই অংশটি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর আত্মীয়দের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হতো। এক পঞ্চমাংশ থেকে নবী (সঃ) নিজে কিছুই গ্রহণ করতেন না। আব্দুল্লাহ ইবনে বুরাইদা (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহর অংশ হচ্ছে তাঁর নবী (সঃ)-এর অংশ এবং নবী (সঃ)-এর অংশ তাঁর স্ত্রীদের প্রাপ্য। আতা ইবনে আবি রাবাহ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর যেটা অংশ সেটা শুধু রাসূল (সঃ)-এরই অংশ। ওটা তার ইচ্ছাধীন, তিনি যে কোন কাজে তা ব্যয় করতে পারেন । মিকদাদ ইবনে মা’দীকারাব (রাঃ) একদা উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ), আবু দারদা (রাঃ) এবং হারিস ইবনে মুআবিয়া কান্দীর (রাঃ) সাথে বসেছিলেন। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসগুলোর আলোচনা করছিলেন। আবূ দারদা (রাঃ) উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “অমুক অমুক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক পঞ্চমাংশের ব্যাপারে কি কথা বলেছিলেন?” উত্তরে উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক যুদ্ধে গনীমতের এক পঞ্চমাংশের একটি উটের পিছনে সাহাবীদেরকে নামায পড়ান। সালাম ফিরাবার পর তিনি দাঁড়িয়ে যান এবং ঐ উটটির কিছু পশম হাতে নিয়ে বলেন- “গনীমতের এই উটটির এই পশমগুলোও গনীমতের মালেরই অন্তর্ভুক্ত। এ মাল আমার নয়। আমার অংশ তো তোমাদেরই সাথে এক পঞ্চমাংশ মাত্র। এটাও আবার তোমাদেরকেই ফিরিয়ে দেয়া হয়। সুতরাং সুঁচ, সূতা এবং ওর চেয়ে বড় ও ছোট প্রত্যেক জিনিসই পৌছিয়ে দাও। খিয়ানত করো না। খিয়ানত বড়ই দূষণীয় কাজ এবং খিয়ানতকারীর জন্যে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানেই আগুন রয়েছে। নিকটবর্তী ও দূরবর্তী লোকদের সাথে আল্লাহর পথে জিহাদ জারী রাখো । শরীয়তের কাজে ভৎসনাকারীর ভৎসনার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করো না। স্বদেশে এবং বিদেশে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হদ জারী করতে থাকো। আল্লাহর ব্যাপারে জিহাদ করতে থাকো। জিহাদ হচ্ছে জান্নাতের বড় বড় দরজাসমূহের মধ্যে একটি দরজা। এই জিহাদের মাধ্যমেই আল্লাহ তা'আলা দুঃখ ও চিন্তা হতে মুক্তি দিয়ে থাকেন।” (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, এটা হচ্ছে অতি উত্তম হাদীস। আমি এটা এভাবে ছয়টি গ্রন্থে দেখিনি। তবে এর পক্ষে বহু সাক্ষ্য প্রমাণ রয়েছে)আমর ইবনে আনবাসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে নিয়ে গনীমতের একটি উটের কাছে নামায পড়েন। সালাম ফিরানোর পর তিনি ঐ উটের কিছু পশম নিয়ে বলেনঃ “তোমাদের গনীমতের মালের মধ্য হতে আমার জন্যে এক পঞ্চমাংশ ছাড়া এই পশম পরিমাণও হালাল নয়। আর এই পঞ্চমাংশও তোমাদেরকেই ফিরিয়ে দেয়া হয়। (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এই অংশের মধ্য হতে কিছুটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের জন্যেও নির্দিষ্ট করতেন। যেমন দাস, দাসী, তরবারী, ঘোড়া ইত্যাদি। এটা মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ), আমির শা'বী (রঃ) এবং অধিকাংশ আলেম বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যুলফিকার’ তরবারীটি বদর যুদ্ধের গনীমতেরই অন্তর্ভুক্ত, যা নবী (সঃ)-এর কাছে ছিল এবং যার ব্যাপারে তিনি উহুদ যুদ্ধের দিন স্বপ্ন দেখেছিলেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, সাফিয়া (রাঃ) এভাবেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হস্তগত হয়েছিলেন। (ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এটা স্বীয় সুনানে বর্ণনা করেছেন)ইয়াযীদ ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একটা বেড়ার মধ্যে বসেছিলাম এমন সময় একটি লোক আমাদের কাছে আসলেন। তার হাতে এক খণ্ড চামড়া ছিল। তাতে যা লিখিত ছিল আমরা তা পড়তে লাগলাম। তাতে লিখিত ছিল- “এটা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (সঃ)-এর পক্ষ হতে যুহাইর ইবনে আকীশের নিকট প্রেরিত। যদি তোমরা আল্লাহর একত্র ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান কর, নামায সুপ্রতিষ্ঠিত কর, যাকাত দাও, যুদ্ধলব্ধ মালের এক পঞ্চমাংশ আদায় কর এবং নবী (সঃ)-এর অংশ ও উৎকৃষ্ট অংশ আদায় করতে থাকো তবে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর নিরাপত্তার মধ্যে থাকবে।” (বর্ণনাকারী বলেনঃ) আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ “এটা কে লিখেছেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “(এটা) রাসূলুল্লাহ (সঃ) (লিখেছেন)।” (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সুতরাং এসব বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা এটাই প্রমাণিত হচ্ছে এবং এ জন্যেই অধিকাংশ গুরুজন এটাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিশিষ্টতার মধ্যে গণ্য করেছেন।কেউ কেউ বলেন যে, এক পঞ্চমাংশ গনীমতের ব্যাপারে তৎকালীন সময়ের শাসনকর্তার স্বাধীনতা রয়েছে। তিনি মুসলমানদের কল্যাণার্থে তা ইচ্ছামত ব্যয় করতে পারেন। যেমন ফাই’-এর মালের ব্যাপারে তার সব কিছু করার অধিকার রয়েছে। শায়েখ আল্লামা ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রঃ) বলেন যে, ইমাম মালিক (রঃ)-এর এটাই উক্তি। অধিকাংশ গুরুজনেরও উক্তি এটাই এবং এটাই সর্বাধিক সঠিক উক্তি। এটা যখন প্রমাণিত হয়ে গেল এবং জানাও হলো তখন এও মনে রাখা দরকার যে, পঞ্চমাংশ যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অংশ ছিল, এখন তার পরে ওটা কি করতে হবে? এ ব্যাপারে কেউ কেউ বলেন যে, এখন এটা সমকালীন ইমাম অর্থাৎ খলীফাতুল মুসলিমীনের অধিকারে থাকবে। আবু বকর (রাঃ), আলী (রাঃ), কাতাদা (রঃ) এবং একটি জামা'আতের এটাই উক্তি। আর এ ব্যাপারে একটি মারফু হাদীসও এসেছে। অন্যান্যেরা বলেন যে, এটা মুসলমানদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। অন্য একটি উক্তি রয়েছে যে, এটাও অবশিষ্ট অন্যান্য শ্রেণীর মধ্যে খরচ করা হবে অর্থাৎ আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের মধ্যে বণ্টিত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। অন্যান্য বুযুর্গদের নির্দেশ এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অংশ ও তার আত্মীয়দের অংশ ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদেরকে দিয়ে দেয়া হবে। ইরাকবাসী একটি দলের এটাই উক্তি। আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, পঞ্চমাংশের এই পঞ্চমাংশ সবই আত্মীয়দের প্রাপ্য। যেমন ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, মিনহাল ইবনে আমর (রঃ) বলেন, আমি আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আলী (রঃ)-কে এবং আলী ইবনে হুসাইন (রঃ)-কে এক পঞ্চমাংশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেনঃ “এটা আমাদেরই প্রাপ্য।” আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, আয়াতে ইয়াতীম ও মিসকীনদের বর্ণনাও ততা রয়েছে? উত্তরে তাঁরা দু’জন বললেনঃ “এর দ্বারাও আমাদেরই ইয়াতীম ও মিসকীনদেরকে বুঝানো হয়েছে।” ইমাম হাসান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়্যাহ (রঃ)-কে (আরবী)-এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “বাক্যটি এভাবে শুরু করা হয়েছে মাত্র, নচেৎ দুনিয়া ও আখিরাতের সব কিছুই তো আল্লাহরই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরে এ দুটো অংশ কে পাবেন এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অংশ তাঁর খলীফাগণ পাবেন। কারো কারো মতে এটা তাঁর আত্মীয়েরা পাবেন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, ওটা খলীফার আত্মীয়েরা পাবেন। সম্মিলিতভাবে তাঁদের মত এই যে, এই অংশ দুটোকেই ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্রের কাজে লাগানো হবে। আবু বকর (রাঃ) ও উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে এরূপই করা হয়েছিল। ইবরাহীম (রঃ) বলেন যে, আবু বকর (রাঃ) এবং উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অংশটি জিহাদের কাজে খরচ করতেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আলী (রাঃ) এ ব্যাপারে কি করতেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “এ ব্যাপারে তিনি সর্বাপেক্ষা কঠিন ছিলেন।” অধিকাংশ আলেমের এটাই উক্তি। হ্যাঁ, তবে আত্মীয়দের অংশটির প্রাপক আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানরা । কেননা, তাঁরাই অজ্ঞতার যুগে এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগে হাশিমের সন্তানদের সাথে সহযোগিতা করেছিল এবং তাদের সাথে তারা ঘাঁটিতে বন্দী জীবন যাপনকেও স্বীকার করে নিয়েছিল। কারণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যাচারিত হচ্ছিলেন বলে এ লোকগুলো রাগান্বিত হয়েছিল এবং তার সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছিল। মুসলমানরা তাকে সাহায্য করেছিলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের কারণে। আর এই কাফিররা তাকে সাহায্য করেছিল বংশীয় পক্ষপাতিত্ব এবং আত্মীয়তার খাতিরে । কিন্তু বানু আবদে শামস্ ও বানু নাওফিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচাতো ভাই হলেও তার সাথে সহযোগিতা করেনি, বরং বিরুদ্ধাচরণ করেছিল এবং তাঁকে পৃথক করে দিয়েছিল। তারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং বলেছিল যে, কুরায়েশের অন্যান্য সমস্ত গোত্রই তাঁর বিরোধী। এ জন্যেই আবু তালিব তাঁর ভৎসনামূলক ও নিন্দাসূচক কবিতায় তাদেরকে বহু তিরস্কার ও নিন্দে করেছেন। কেননা, তারা ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটতম আত্মীয়। তিনি বলেছেনঃ “অতিসত্বরই তারা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদের অপকর্মের পূর্ণ বদলা পেয়ে যাবে। এই নির্বোধরা নিজের লোক হয়েও এবং একই বংশ ও রক্তের লোক হয়েও আমাদের দিক থেকে চক্ষু ফিরিয়ে নিচ্ছে!” ইত্যাদি। জুবাইর ইবনে মুতঈম ইবনে আদী ইবনে নওফেল (রাঃ) বলেন, আমি এবং উসমান ইবনে আফফান ইবনে আবিল আস ইবনে উমাইয়া ইবনে আবদে শামস্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে গেলাম এবং বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি খায়বারের যুদ্ধলব্ধ মালের এক পঞ্চমাংশ হতে বানু আবদিল মুত্তালিবকে দিলেন, কিন্তু আমাদেরকে ছেড়ে দিলেন। অথচ আপনার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কের দিক দিয়ে আমরা ও তারা সমান! তখন তিনি বললেনঃ “বানু হাশিম ও বানু মুত্তালিব তো একই জিনিস।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কয়েকটি বাবে বা অনুচ্ছেদে বর্ণনা করেছেন) কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, তাঁরা বলেনঃ “তারা তো অজ্ঞতার যুগেও আমাদের থেকে পৃথক হয়নি এবং ইসলামের যুগেও না।” এটা হচ্ছে জমহুর উলামার উক্তি যে, তারা হলো বানু হাশিম ও বানু মুত্তালিব। কেউ কেউ বলেন যে, এরা হচ্ছে শুধু বানু হাশিম। মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা জানতেন যে, বানু হাশিমের মধ্যে দরিদ্র লোক রয়েছে। তাই সাদকার স্থলে গনীমতের মালে তাদের অংশ নির্ধারিত করেছেন। এরা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ আত্মীয় যাদের জন্যে সাদকা হারাম।” আলী ইবনে হুসাইন (রঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। কেউ কেউ বলেন যে, এরা সবাই কুরায়েশ। ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “যাবীল কুরবা কারা?” তিনি উত্তরে বলেছিলেন- “আমরা তো বলতাম যে, আমরাই। কিন্তু আমাদের কওম তা স্বীকার করে না। তারা বলে যে, সমস্ত কুরায়েশই যাবিল কুরবা।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে রয়েছে) কোন কোন রিওয়াইয়াতে শুধু প্রথম বাক্যটিই রয়েছে। দ্বিতীয় বাক্যটির বর্ণনাকারী হচ্ছে আবু মাশার নাজীহ্ ইবনে আবদির রহমান মাদানী। তার বর্ণনাতেই এই বাক্যটি রয়েছে। তারা বলে যে, সমস্ত কুরায়েশই যাবীল কুরবা'। এতে দুর্বলতাও রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের জন্যে লোকদের ময়লা থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। তোমাদের জন্যে এক পঞ্চমাংশের পঞ্চমাংশই যথেষ্ট।” (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এটা বড়ই উত্তম হাদীস। এর বর্ণনাকারী ইবরাহীম ইবনে মাহদীকে ইমাম আবু হাতিম (রঃ) বিশ্বাসযোগ্য বলেছেন) এই আয়াতে ইয়াতীমদের উল্লেখ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, ইয়াতীমরা যদি দরিদ্র হয় তবে তারা হকদার হবে। আবার অন্য কেউ বলেন যে, ধনী দরিদ্র সব ইয়াতীমই এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত। মিসকীন শব্দ দ্বারা ঐ অভাবীদেরকে বুঝানো হয়েছে যাদের কাছে এই পরিমাণ মাল নেই যে, তা দ্বারা তাদের দারিদ্রতা ও অভাব দূর হতে পারে এবং তা তাদের জন্যে যথেষ্ট হয়। ইবনুস সাবীল দ্বারা ঐ মুসাফিরকে বুঝানো হয়েছে যে দেশ থেকে বের হয়ে এতো দূরে যাচ্ছে যেখানে পৌছলে তার জন্যে নামায কসর করা জায়েয হবে এবং সফরের যথেষ্ট খরচ তার কাছে নেই। এর তাফসীর সূরায়ে বারাআতের। (আরবী) (৯:৬০) এই আয়াতে ইনশাআল্লাহ আসবে। আল্লাহ তা'আলার উপরই আমাদের ভরসা এবং তাঁরই কাছে আমরা সাহায্য প্রার্থনা করছি। (আরবী) অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহর উপর এবং তাঁর বান্দার প্রতি নাযিলকৃত কিতাবের উপর ঈমান এনে থাকো তবে তিনি যা আদেশ করেছেন তা পালন কর। অর্থাৎ, যুদ্ধলব্ধ মাল হতে এক পঞ্চমাংশ পৃথক করে দাও। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবদে কায়েস গোত্রের প্রতিনিধিদলকে বলেছিলেনঃ “আমি তোমাদেরকে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের নির্দেশ দিচ্ছি। আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার অর্থ কি তা কি তোমরা জান? তা হচ্ছে সাক্ষ্য দান করা যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর রাসূল। আর নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করা, যাকাত দেয়া এবং গনীমতের মাল থেকে এক পঞ্চমাংশ আদায় করা”। সুতরাং এক পঞ্চমাংশ আদায় করাও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় কিতাব সহীহ বুখারীতে একটি বাব বা অনুচ্ছেদ বেঁধেছেন যে, ‘খুমুস বা এক পঞ্চমাংশ বের করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর তিনি ঐ হাদীস আনয়ন করেছেন। আমরা শারহে সহীহ বুখারীর মধ্যে এর পূর্ণ ভাবার্থ আলোচনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁর একটা ইহসান ও ইনআমের কথা বর্ণনা করছেন যে, তিনি হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য আনয়ন করেছেন। তিনি স্বীয় দ্বীনকে জয়যুক্ত করেছেন, স্বীয় নবী (সঃ) ও তার সেনাবাহিনীকে সাহায্য করেছেন এবং বদরের যুদ্ধে তাদেরকে জয়যুক্ত করেছেন। তিনি ঈমানের কালেমাকে কুফরীর কালেমার উপর উঠিয়ে দিয়েছেন অর্থাৎ কুফরীর কালেমা ঈমানের কালেমার নীচে পড়ে গেছে। সুতরাং (আরবী) দ্বারা বদরের দিনকে বুঝানো হয়েছে, যেই দিন হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়েছে। বহু গুরুজন হতে এর তাফসীর এরূপই বর্ণিত হয়েছে। এটাই ছিল প্রথম যুদ্ধ। মুশরিক সেনাদলের নেতা ছিল উবা ইবনে রাবীআ'। ঐ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ১৭ই বা ১৯শে রমযান, রোজ শুক্রবার। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীবর্গের সংখ্যা ছিল তিন শ'র কিছু বেশী। আর মুশরিকদের সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজার। এতদ্সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের পরাজয় ঘটিয়ে দেন। তাদের সত্তরজনেরও অধিক নিহত হয় এবং ততজনই বন্দী হয়।মুসতাদরিকে হাকিমে রয়েছে যে, ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা একাদশ রাত্রিতেই লায়লাতুল কদরকে নিশ্চিতরূপে অনুসন্ধান কর। কেননা, ওর সকালই ছিল বদরের যুদ্ধের দিন।” হাসান ইবনে আলী (রাঃ) বলেন যে, লায়লাতুল ফুরকান, যেইদিন উভয় দলে ভীষণ ও ঘোরতর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ওটা ছিল রমযান মাসের সতের তারিখ এবং রাত্রিটিও ছিল জুমআ’র রাত্রি। ধর্মযুদ্ধ ও জীবনী গ্রন্থের লেখকদের মতে এটাই সঠিক কথা। তবে ইয়াযীদ ইবনে জাআ'দ (রঃ), যিনি তার যুগের মিশরীয় এলাকার একজন ইমাম ছিলেন, তিনি বলেন যে, বদর যুদ্ধের দিনটি ছিল সোমবার। কিন্তু অন্য কেউই তাঁর অনুসরণ করেননি এবং জমহুরের উক্তিটিই নিশ্চিতরূপে তার এই উক্তির উপর প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।

আল-আনফাল 8:42

(আরবী) সম্পর্কে সংবাদ দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “ঐ দিন তোমরা ওয়াদী দুনিয়ায় ছিলে যা মদীনার নিকটবর্তী একটি জায়গা। আর মুশরিকরা মক্কার দিকে এবং মদীনার দূরবর্তী উপত্যকায় অবস্থান করছিল। এদিকে আবু সুফিয়ান ও তার বাণিজ্যিক কাফেলা ব্যবসার মাল সম্ভারসহ নীচের দিকে সমুদ্রের ধারে ছিল। হে মুমিনরা! যদি তোমরা ও কাফির কুরায়েশরা প্রথম থেকেই যুদ্ধ করার ইচ্ছা পোষণ করতে তবে যুদ্ধ কোথায় সংঘটিত হবে এ নিয়ে তোমাদের মধ্যে অবশ্যই মতানৈক্য সৃষ্টি হতো।” ভাবার্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা যদি পরস্পরের সিদ্ধান্তক্রমে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে তবে তোমরা মুশরিক সৈন্যদের আধিক্য ও তাদের রণ সম্ভারের আধিক্য সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর খুব সম্ভব হতোদ্যম হয়ে পড়তে। এ জন্যেই মহান আল্লাহ কোন পূর্ব সিদ্ধান্ত ছাড়াই দু’টি দলকে আকস্মিকভাবে একত্রে মিলিয়ে দিলেন যাতে আল্লাহর ইচ্ছা পূর্ণ হয়ে যায় এবং ইসলাম ও মুসলিমদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং মুশরিকদের হীনতা ও নীচতা প্রকাশ পায়। সুতরাং আল্লাহ পাক যা করতে চেয়েছিলেন তা তিনি করেই ফেললেন।” কাব ইবনে মালিক (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও মুসলমানরা একমাত্র কাফেলার উদ্দেশ্যেই বের হয়েছিলেন। কোন তারিখ নির্ধারণ ও কোন যুদ্ধ প্রস্তুতি ছাড়াই তিনি মুসলমানদেরকে কাফিরদের সাথে মিলিয়ে দিলেন। আবু সুফিয়ান (রাঃ) সিরিয়া হতে কাফেলাসহ ফিরছিলেন। এদিকে আবু জেহেল কাফেলাকে মুসলমানদের হাত থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। বাণিজ্যিক কাফেলা অন্য পথ ধরে আসছিল। অতঃপর মুসলমান ও কাফিরদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়ে গেল। এর পূর্বে উভয় দল একে অপর থেকে সম্পূর্ণরূপে বে-খবর ছিল । পানি নেয়ার জন্যে আগমনকারীদেরকে দেখে এক দল অপর দলের অবস্থা অবগত হয়। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর ‘সীরাত' গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে চলছিলেন। সাফরা নামক স্থানের নিকটবর্তী হয়ে বাসবাস ইবনে আমর (রাঃ) ও আদী ইবনে আবু যা’বা জুহনী (রাঃ)-কে আবু সুফিয়ান (রাঃ)-এর গতিবিধি লক্ষ্য করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তারা দু'জন বদর প্রান্তরে উপস্থিত হয়ে বাতহার একটি টিলার উপর নিজেদের সওয়ারীকে বসিয়ে দেন। অতঃপর তারা পানি নেয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। পথিমধ্যে তাঁরা দুটি মেয়েকে পরস্পর ঝগড়া করতে দেখতে পান। একজন অপরজনকে বলছিলঃ “তুমি আমার ঋণ পরিশোধ করছে না কেন?” অপর মেয়েটি উত্তরে বললোঃ “এতো তাড়াহুড়া করো না। আগামীকাল অথবা। পরশু এখানে বাণিজ্যিক কাফেলার আগমন ঘটবে। আমি তখন তোমাকে তোমার প্রাপ্য দিয়ে দেবো।” মাজদা ইবনে আমর নামক একটি লোক মধ্য থেকে বলে উঠলোঃ “এ মেয়েটি সঠিক কথাই বলেছে।” ঐ সাহাবী দু’জন তাদের কথাগুলো শুনে নেন এবং তৎক্ষণাৎ উটের উপর সওয়ার হয়ে নবী (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে যান ও তাঁর কাছে ঐ সংবাদ পরিবেশন করেন। ওদিকে আবু সুফিয়ান (রাঃ) কাফেলার পূর্বে একাকীই ঐ জায়গায় পৌঁছেন এবং মাজদা ইবনে আমরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এই কূপের কাছে তুমি কাউকে দেখেছিলে কি?” সে উত্তরে বললোঃ “অবশ্যই দু’জন উষ্ট্রারোহী এসেছিল। তারা তাদের উট দু'টি ঐ টিলার উপর বসিয়ে রেখে এখানে এসে মশকে পানি ভর্তি করে নিয়ে চলে গেছে। এ কথা শুনে আবু সুফিয়ান (রাঃ) ঐ পাহাড়ের উপর গমন করেন এবং উটের গোবর নিয়ে ভেঙ্গে দেখেন যে, ওর মধ্যে খেজুরের আঁটি রয়েছে। ঐ আঁটি দেখে তিনি বলে ওঠেনঃ “আল্লাহর শপথ! এরা মদীনারই লোক।” সেখান থেকে তিনি কাফেলার কাছে ফিরে যান এবং পথ পরিবর্তন করে সমুদ্রের তীর ধরে চলতে থাকেন। সুতরাং এদিক থেকে তিনি আস্বস্ত হলেন এবং তাদের রক্ষার্থে আগমনকারী কুরায়েশদেরকে দূত মারফত জানিয়ে দিলেনঃ “আল্লাহ তোমাদের বাণিজ্যিক কাফেলা ও মালধন রক্ষা করেছেন, সুতরাং তোমরা ফিরে যাও।” এ কথা শুনে আবূ জেহেল বলেঃ “না, এত দূর যখন এসেই গেছি তখন বদর পর্যন্ত অবশ্যই যাবো।” ওখানে একটি বাজার বসতো।তাই সে বললোঃ “ওখানে আমরা তিনদিন অবস্থান করবো এবং উট যবেহ করবো, মদ পান করবো এবং গোশতের কাবাব তৈরী করবো যাতে সারা আরবে আমাদের ধুমধামের কথা ছড়িয়ে পড়ে এবং আমাদের বীরত্বপনার সংবাদ সবারই কানে পৌছে যায়। ফলে যেন তারা সদা সর্বদা আমাদের নামে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে।” কিন্তু আখনাস ইবনে শুরাইক নামক একটি লোক বললোঃ “হে বানী যুহরা গোত্রের ললাকেরা! আল্লাহ তাআলা তোমাদের মাল রক্ষা করেছেন। সুতরাং তোমাদের ফিরে যাওয়াই উচিত।” ঐ গোত্রের লোকেরা তার কথা মেনে। নিলো এবং ফিরে গেল। তাদের সাথে বানু আদী গোত্রের লোকেরাও ফিরে গেল। এদিকে বদরের নিকটবর্তী হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ), সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) এবং যুবাইর ইবনে আওয়াম (রাঃ)-কে খবর নেয়ার জন্যে পাঠিয়ে দেন। আরো কয়েকজন সাহাবীকেও তাদের সঙ্গী করে দেন। তাঁরা বানু সাঈদ ইবনে আস ও বানু হাজ্জাজের গোলামদ্বয়কে কূয়ার ধারে পেয়ে যান। দু’জনকেই গ্রেফতার করে তাঁরা নবী (সঃ)-এর খিদমতে হাযির করেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়ছিলেন। তারা তাদেরকে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। তারা প্রশ্ন করলেনঃ “তোমরা কে?” তারা উত্তরে বললোঃ “আমরা কুরায়েশদের পানি বহনকারী। তারা আমাদেরকে পানি নিতে পাঠিয়েছিল।” সাহাবীদের ধারণা ছিল যে, তারা আবু সুফিয়ানের লোক। এ জন্যে তারা তাদের প্রতি কঠোর হয়ে উঠলেন। তারা ভয় পেয়ে বলে উঠলো যে, তারা আবূ সুফিয়ানের কাফেলার লোক। তখন তারা তাদেরকে ছেড়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক রাকাআত নামায পড়ে নিয়ে সালাম ফিরিয়ে দেন এবং সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তারা যখন সত্য কথা বললো তখন তোমরা তাদেরকে মারধর করলে, আর যখন তারা মিথ্যা কথা বললো তখন তোমরা তাদেরকে ছেড়ে দিলে? আল্লাহর কসম! এরা পূর্বে সত্য কথাই বলেছিল। এরা কুরায়েশেরই গোলাম।” অতঃপর তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আচ্ছা বলতো, কুরায়েশদের সেনাবাহিনী কোথায় রয়েছে?” তারা উত্তরে বললোঃ “কুসওয়া উপত্যকার ঐ দিকের ঐ পাহাড়ের পিছনে রয়েছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “সংখ্যায় তারা কত হতে পারে?” তারা জবাব দিলোঃ “সংখ্যায় তারা অনেক।” তিনি বললেনঃ “সংখ্যায় তারা কত হতে পারে?” তারা বললোঃ “সংখ্যা তো আমাদের জানা নেই।” তিনি বললেনঃ “আচ্ছা, দৈনিক তারা কয়টা উট যবেহ করে থাকে তা তোমরা বলতে পার কি?” উত্তরে তারা বললোঃ “কোনদিন নয়টি এবং কোন দিন দশটি।” তিনি তখন মন্তব্য করলেনঃ “তাহলে সংখ্যায় তারা নয় হাজার থেকে দশ হাজার হবে। তারপর তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তাদের মধ্যে কুরায়েশ নেতৃবর্গের কে কে আছে?” তারা উত্তর দিলোঃ “তারা হচ্ছে উত্যা ইবনে রাবীআ’, সায়বা ইবনে রাবীআ’, আবুল বাখতারী ইবনে হিশাম, হাকীম ইবনে হিশাম, নাওফেল ইবনে খুয়াইলিদ, হারিস ইবনে আমির ইবনে নাওফেল, তায়ীমা ইবনে আদী, নাযার ইবনে হারিস, যামআ ইবনে আসওয়াদ, আবূ জেহেল ইবনে হিশাম, উমাইয়া ইবনে খালফ, নাবীহ ইবনে হাজ্জাজ, মুনাব্বাহ্ ইবনে হাজ্জাজ, সালাহ ইবনে আমর এবং আমর ইবনে আবদূদ।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীবর্গকে বললেনঃ “জেনে রেখো যে, মক্কা নগরী ওর কলিজার টুকরোগুলোকে তোমাদের দিকে নিক্ষেপ করেছে।”বদরের দিন দু’ দলের মধ্যে যখন মুকাবিলা শুরু হয়ে গেল তখন সা’দ ইবনে মুআয (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি যদি অনুমতি দেন তবে আপনার জন্যে একটা কুটির নির্মাণ করে দেই। সেখানে আপনি অবস্থান করবেন। আর আমরা আমাদের জন্তুগুলো এখানে বসিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করবো। যদি আমরা জয়যুক্ত হই তবে তো আলহামদুলিল্লাহ, এটাই আমাদের কাম্য। আর যদি আল্লাহ না করুন, অন্য কিছু ঘটে যায় তবে আপনি আমাদের জানোয়ারগুলোর উপর সওয়ার হয়ে ওগুলোকে সাথে নিয়ে আমাদের কওমের ঐ মহান ব্যক্তিদের কাছে যাবেন যারা মদীনায় রয়েছেন। আপনার প্রতি তাদের ভালবাসা আমাদের চেয়ে বেশী রয়েছে। এখানে কোন যুদ্ধ সংঘটিত হবে এটা তাঁদের অজানা ছিল। তা না হলে তারা কখনো আপনার সঙ্গ ছাড়তেন না। আপনার সাহায্যার্থে অবশ্যই তারা বেরিয়ে আসতেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এ পরামর্শ মেনে নিলেন এবং তার জন্যে দুআ করলেন। অতঃপর তিনি ঐ তাঁবুর মধ্যে অবস্থান করলেন। তার সাথে আবু বকর (রাঃ) ছাড়া আর কেউই ছিলেন না। সকাল হতেই কুরায়েশ সেনাবাহিনীকে পাহাড়ের পিছন দিক থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। তাদেরকে দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহ! এ লোকগুলো গর্বের সাথে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ও আপনার রাসূল (সঃ)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন। করার মানসে এগিয়ে আসছে। হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে পরাজিত ও লাঞ্ছিত করুন।ইবনে ইসহাকের সীরাতের মধ্যে এই আয়াতের শেষ বাক্যটির তাফসীর নিম্নরূপ এসেছেঃ “এটা এ কারণে যে, যেন কাফিররা কুফরীর উপর থেকেও আল্লাহর দলীল প্রমাণ দেখে নেয় এবং মুমিনরাও দলীল দেখেই ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। অর্থাৎ কোন উত্তেজনা, শর্ত ও দিন নির্ধারণ ছাড়াই আকস্মিকভাবে আল্লাহ তা'আলা এখানে মুমিন ও কাফিরদেরকে মুকাবিলা করে দিলেন, উদ্দেশ্য এই যে, তিনি সত্যকে মিথ্যার উপর জয়যুক্ত করে সত্যকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করবেন, এভাবে যেন কারো মনে কোন সংশয় ও সন্দেহ অবশিষ্ট না থাকে। এখন যে কুফরীর উপর থাকবে সে কুফরীকে কুফরী মনে করেই থাকবে। আর যে মুমিন হবে সে দলীল প্রমাণ দেখেই ঈমানের উপর কায়েম থাকবে। ঈমানই হচ্ছে অন্তরের জীবন এবং কুফরীই হচ্ছে প্রকৃত ধ্বংস।" যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ ব্যক্তি, যে মৃত ছিল, অতঃপর আমি তাকে জীবিত করেছি এবং আমি তার জন্যে একটা নূর বানিয়েছি। সে ঐ নূরের মাধ্যমে লোকদের মধ্যে চলাফেরা করছে।" (৬:১২২) তুহমাত বা অপবাদের ঘটনায় আয়েশা (রাঃ)-এর কথাগুলো ছিলঃ “ যে ধ্বংস হওয়ার ছিল সে ধ্বংস হলো।” অর্থাৎ অপবাদ দেয়ার ব্যাপারে সে অংশ নিলো।(আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের বিনয়, প্রার্থনা, ইতিগফার, ফরিয়াদ, মুনাজাত ইত্যাদি সবই শ্রবণকারী। (আরবী) অর্থাৎ তোমরা যে আহলে হক, তোমরা যে সাহায্য পাওয়ার যোগ্য এবং তোমরা এরও যোগ্য যে, তোমাদেরকে কাফির ও মুশরিকদের উপর জয়যুক্ত করা উচিত, এসব বিষয় আল্লাহ ভালভাবে অবগত আছেন।

আল-আনফাল 8:43

৪৩-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে স্বপ্নে মুশরিকদের সংখ্যা খুবই কম দেখান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীবর্গের নিকট তা বর্ণনা করেন। এটা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের পাগুলো অটল থাকার কারণ হয়ে যায়। কোন কোন বুযুর্গ ব্যক্তি বলেন যে, মুশরিকদের সংখ্যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ চোখে কম দেখানো হয় যে চোখে তিনি দ্রিা যেতেন। কিন্তু এটা গারীব বা দুর্বল কথা। কেননা, কুরআন কারীমে যখন (আরবী) শব্দ রয়েছে তখন বিনা দলীলে ওর এরূপ ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন কি? সম্ভাবনা ছিল যে, মুশরিকদের সংখ্যাধিক্য মুসলমানদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করতো এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করবেন কি করবেন না এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হতো। আল্লাহ তা'আলা এটা থেকে তাদেরকে বাঁচিয়ে দিলেন এবং মুশরিকদের সংখ্যা কম দেখালেন। আল্লাহ পাক অন্তরের গুপ্ত কথা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত। তিনি চক্ষুর খিয়ানত ও অন্তরের গুপ্ত রহস্য জানেন। তিনি এই দয়াও দেখালেন যে, মুসলমানদের দৃষ্টিতে যুদ্ধের সময়েও মুশরিকদের সংখ্যা কম দেখালেন, যাতে তারা বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন। এবং তাদেরকে খুবই নগণ্য মনে করেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি আমার সঙ্গীকে মুশরিকদের আনুমানিক সংখ্যা বললাম যে, তারা প্রায় ৭০ (সত্তর) জন হবে। আমার সাথী তখন পূর্ণভাবে অনুমান করে বললেনঃ “না, তারা প্রায় ১০০ (একশ') জন হবে।” অতঃপর তাদের একজন লোক আমাদের হাতে বন্দী হয়। তাকে আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কতজন রয়েছে? সে উত্তরে বললোঃ “আমাদের সৈন্যসংখ্যা এক হাজার।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-আনফাল 8:44

৪৩-৪৪ নং আয়াতের তাফসীর: মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে স্বপ্নে মুশরিকদের সংখ্যা খুবই কম দেখান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীবর্গের নিকট তা বর্ণনা করেন। এটা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের পাগুলো অটল থাকার কারণ হয়ে যায়। কোন কোন বুযুর্গ ব্যক্তি বলেন যে, মুশরিকদের সংখ্যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ চোখে কম দেখানো হয় যে চোখে তিনি দ্রিা যেতেন। কিন্তু এটা গারীব বা দুর্বল কথা। কেননা, কুরআন কারীমে যখন (আরবী) শব্দ রয়েছে তখন বিনা দলীলে ওর এরূপ ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন কি? সম্ভাবনা ছিল যে, মুশরিকদের সংখ্যাধিক্য মুসলমানদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করতো এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করবেন কি করবেন না এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হতো। আল্লাহ তা'আলা এটা থেকে তাদেরকে বাঁচিয়ে দিলেন এবং মুশরিকদের সংখ্যা কম দেখালেন। আল্লাহ পাক অন্তরের গুপ্ত কথা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত। তিনি চক্ষুর খিয়ানত ও অন্তরের গুপ্ত রহস্য জানেন। তিনি এই দয়াও দেখালেন যে, মুসলমানদের দৃষ্টিতে যুদ্ধের সময়েও মুশরিকদের সংখ্যা কম দেখালেন, যাতে তারা বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন। এবং তাদেরকে খুবই নগণ্য মনে করেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি আমার সঙ্গীকে মুশরিকদের আনুমানিক সংখ্যা বললাম যে, তারা প্রায় ৭০ (সত্তর) জন হবে। আমার সাথী তখন পূর্ণভাবে অনুমান করে বললেনঃ “না, তারা প্রায় ১০০ (একশ') জন হবে।” অতঃপর তাদের একজন লোক আমাদের হাতে বন্দী হয়। তাকে আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কতজন রয়েছে? সে উত্তরে বললোঃ “আমাদের সৈন্যসংখ্যা এক হাজার।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-আনফাল 8:45

৪৫-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে যুদ্ধের কৌশল এবং শত্রুদের সাথে মুকাবিলার সময় বীরত্ব প্রকাশ করার কথা শিক্ষা দিচ্ছেন। এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূর্য পশ্চিম গগণে ঢলে পড়ার পর দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে লোকসকল! যুদ্ধে শত্রুদের সম্মুখীন হওয়ার আশা করো না। আল্লাহর নিকট নিরাপত্তার প্রার্থনা কর। কিন্তু যখন শত্রুদের সাথে মুকাবিলা হয়ে যাবে তখন যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকো এবং বিশ্বাস রাখো যে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে রয়েছে। তারপর তিনি দাঁড়িয়ে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেনঃ “হে কিতাব অবতীর্ণকারী আল্লাহ! হে মেঘমালাকে চালনাকারী আল্লাহ! হে সেনাবাহিনীকে পরাজিতকারী আল্লাহ! এই কাফিরদেরকে পরাজিত করুন এবং তাদের উপর আমাদেরকে সাহায্য করুন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) আবদুল্লাহ ইবনে আবি আউফা (রাঃ) হতে মারফুরূপে তাখরীজ করেছেন)আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা শত্রুদের সাথে মুকাবিলা করার আকাঙ্ক্ষা করো না এবং আল্লাহর নিকট নিরাপত্তার প্রার্থনা করো। আর তাদের সাথে মুকাবিলার সময় স্থির পদে থাকো ও বীরত্ব প্রদর্শন করো এবং আল্লাহকে স্মরণ করো। তারা যদিও হৈ হুল্লোড় ও চিৎকার করে তবে তোমরা নীরবতা অবলম্বন করো।” তিবরানীর (রঃ) হাদীস গ্রন্থে যায়েদ ইবনে আরকাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, “রাসূল(সঃ) বলেছেন, তিন সময় আল্লাহ তা'আলা নীরবতা পছন্দ করেন(১) কুরআন কারীম পাঠের সময়, (২) যুদ্ধের সময় এবং (৩) জানাযার সময়।” অন্য একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমার কামেল বান্দা হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে শত্রুর সাথে মুকাবিলার সময়েও আমার যিক্র করে অর্থাৎ ঐ অবস্থাতেও আমার যি করতে, আমার কাছে প্রার্থনা জানাতে এবং আমার নিকট ফরিয়াদ করতে অমনোযোগী হয় না।" কাতাদা (রঃ) বলেন যে, পূর্ণ ব্যস্ততার সময়েও অর্থাৎ যখন তরবারী চলতে থাকে তখনও আল্লাহ তা'আলা তাঁর যির ফরয করেছেন। আতা (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, যুদ্ধের সময়েও নীরবতা অবলম্বন করা এবং আল্লাহ তা'আলার যিক্র করা ওয়াজিব। অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন। তখন জুরাইজ (রঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ তা'আলার যি কি উচ্চ শব্দে করতে হবে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা।" কা'ব ইবনে আহবার (রঃ) বলেনঃ “কুরআন কারীমের তিলাওয়াত এবং আল্লাহ তা'আলার যিক্র হতে বেশী প্রিয় আল্লাহ পাকের নিকট আর কিছুই নেই। এর মধ্যে আবার ওটাই উত্তম যার হুকুম মানুষকে সালাতের মধ্যে ও জিহাদে দেয়া হয়েছে। তোমরা কি দেখছো না যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা জিহাদের সময়েও তাঁর যিক্র করার হুকুম করেছেন?” তারপর তিনি এই আয়াতটিই পাঠ করেন। কোন কবি বলেনঃ “ঠিক যুদ্ধ ও লড়াইয়ের সময়েও আমার অন্তরে আপনার (আল্লাহর) স্মরণ হয়ে থাকে।” আনতারা বলেনঃ “বর্শা ও তরবারীর কাজ চালু থাকা অবস্থাতেও আমি আপনাকে (আল্লাহকে) স্মরণ করতে থাকি। সুতরাং এই আয়াতে মহান আল্লাহ শত্রুদের সাথে মুকাবিলার সময় যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকার ও ধৈর্যধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তারা (মুমিনরা) যেন ভীরুতা প্রদর্শন না করে এবং ভয় না পায়। আল্লাহর উপরই যেন ভরসা করে এবং তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। তারা যেন সর্বদা আল্লাহকেই স্মরণ করে, কখনও যেন তাকে ভুলে না যায়। এটাই হচ্ছে সফলতার উপায় । আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য পরিত্যাগ না করে। তারা যা বলেন তা-ই যেন পালন করে এবং যা করতে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকে। পরস্পর যেন ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত না হয় এবং মতানৈক্য সৃষ্টি না করে। নতুবা তারা লাঞ্ছিত হয়ে যাবে, তাদেরকে কাপুরুষতায় ঘিরে ফেলবে এবং তারা শক্তিহীন হয়ে পড়বে। এর ফলে তাদের অগ্রযাত্রায় বাধা পড়বে। তারা ধৈর্যের অঞ্চল যেন ছেড়ে না দেয় এবং তারা যেন বিশ্বাস রাখে ধৈর্যশীলদের সাথে স্বয়ং আল্লাহ রয়েছেন। সাহাবায়ে কিরাম এই হুকুম এমন পুরোপুরিভাবে পালন করেছিলেন যে, তাদের তুলনা পূর্বেও ছিল না এবং পরবর্তীদের মধ্যে তো তুলনার কোন কথাই উঠতে পারে না। এই বীরত্ব, এই রাসূল (সঃ)-এর প্রতি আনুগত্য এবং এই ধৈর্য ও সহ্যই ছিল আল্লাহ তা'আলার সাহায্য লাভের কারণ। আর এর ফলেই অতি অল্প সময়ের মধ্যে সংখ্যার স্বল্পতা এবং যুদ্ধাস্ত্রের নগণ্যতা সত্ত্বেও মুসলিমরা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দেশগুলো জয় করে নেন। তারা শুধুমাত্র বিজিত দেশগুলোর অধিপতিই হননি। বরং অধিবাসীদের অন্তরও জয় করে ফেলেন এবং তাদেরকে আল্লাহর পথে নিয়ে আসেন। রোমক, পারসিক, তুর্কী, সাকালিয়া, বার্বারী, হাবশী, সুদানী এবং কিবতীদেরকে তথা দুনিয়ার সমস্ত গৌর ও কৃষ্ণ বর্ণের লোককে বশীভূত করে ফেলেন। এভাবে তারা আল্লাহর কালেমাকে সমুচ্চ করেন, সত্য দ্বীনকে ছড়িয়ে দেন এবং ইসলামী হুকুমত বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছিয়ে দেন। মহান আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন এবং তাঁদেরকেও সন্তুষ্ট রাখুন। দেখে বিস্মিত হতে হয় যে, তাঁরা ত্রিশ বছরের মধ্যে দুনিয়ার মানচিত্র পরিবর্তন করে দেন এবং ইতিহাসের পৃষ্ঠা পরিবর্তিত করেন। আল্লাহ আমাদেরকেও তাঁদেরই দলভুক্ত করুন। তিনি পরমদাতা ও করুণাময়।

আল-আনফাল 8:46

৪৫-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে যুদ্ধের কৌশল এবং শত্রুদের সাথে মুকাবিলার সময় বীরত্ব প্রকাশ করার কথা শিক্ষা দিচ্ছেন। এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূর্য পশ্চিম গগণে ঢলে পড়ার পর দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে লোকসকল! যুদ্ধে শত্রুদের সম্মুখীন হওয়ার আশা করো না। আল্লাহর নিকট নিরাপত্তার প্রার্থনা কর। কিন্তু যখন শত্রুদের সাথে মুকাবিলা হয়ে যাবে তখন যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকো এবং বিশ্বাস রাখো যে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে রয়েছে। তারপর তিনি দাঁড়িয়ে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেনঃ “হে কিতাব অবতীর্ণকারী আল্লাহ! হে মেঘমালাকে চালনাকারী আল্লাহ! হে সেনাবাহিনীকে পরাজিতকারী আল্লাহ! এই কাফিরদেরকে পরাজিত করুন এবং তাদের উপর আমাদেরকে সাহায্য করুন। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) আবদুল্লাহ ইবনে আবি আউফা (রাঃ) হতে মারফুরূপে তাখরীজ করেছেন)আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা শত্রুদের সাথে মুকাবিলা করার আকাঙ্ক্ষা করো না এবং আল্লাহর নিকট নিরাপত্তার প্রার্থনা করো। আর তাদের সাথে মুকাবিলার সময় স্থির পদে থাকো ও বীরত্ব প্রদর্শন করো এবং আল্লাহকে স্মরণ করো। তারা যদিও হৈ হুল্লোড় ও চিৎকার করে তবে তোমরা নীরবতা অবলম্বন করো।” তিবরানীর (রঃ) হাদীস গ্রন্থে যায়েদ ইবনে আরকাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, “রাসূল(সঃ) বলেছেন, তিন সময় আল্লাহ তা'আলা নীরবতা পছন্দ করেন(১) কুরআন কারীম পাঠের সময়, (২) যুদ্ধের সময় এবং (৩) জানাযার সময়।” অন্য একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমার কামেল বান্দা হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে শত্রুর সাথে মুকাবিলার সময়েও আমার যিক্র করে অর্থাৎ ঐ অবস্থাতেও আমার যি করতে, আমার কাছে প্রার্থনা জানাতে এবং আমার নিকট ফরিয়াদ করতে অমনোযোগী হয় না।" কাতাদা (রঃ) বলেন যে, পূর্ণ ব্যস্ততার সময়েও অর্থাৎ যখন তরবারী চলতে থাকে তখনও আল্লাহ তা'আলা তাঁর যির ফরয করেছেন। আতা (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, যুদ্ধের সময়েও নীরবতা অবলম্বন করা এবং আল্লাহ তা'আলার যিক্র করা ওয়াজিব। অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন। তখন জুরাইজ (রঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ তা'আলার যি কি উচ্চ শব্দে করতে হবে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা।" কা'ব ইবনে আহবার (রঃ) বলেনঃ “কুরআন কারীমের তিলাওয়াত এবং আল্লাহ তা'আলার যিক্র হতে বেশী প্রিয় আল্লাহ পাকের নিকট আর কিছুই নেই। এর মধ্যে আবার ওটাই উত্তম যার হুকুম মানুষকে সালাতের মধ্যে ও জিহাদে দেয়া হয়েছে। তোমরা কি দেখছো না যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা জিহাদের সময়েও তাঁর যিক্র করার হুকুম করেছেন?” তারপর তিনি এই আয়াতটিই পাঠ করেন। কোন কবি বলেনঃ “ঠিক যুদ্ধ ও লড়াইয়ের সময়েও আমার অন্তরে আপনার (আল্লাহর) স্মরণ হয়ে থাকে।” আনতারা বলেনঃ “বর্শা ও তরবারীর কাজ চালু থাকা অবস্থাতেও আমি আপনাকে (আল্লাহকে) স্মরণ করতে থাকি। সুতরাং এই আয়াতে মহান আল্লাহ শত্রুদের সাথে মুকাবিলার সময় যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকার ও ধৈর্যধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তারা (মুমিনরা) যেন ভীরুতা প্রদর্শন না করে এবং ভয় না পায়। আল্লাহর উপরই যেন ভরসা করে এবং তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। তারা যেন সর্বদা আল্লাহকেই স্মরণ করে, কখনও যেন তাকে ভুলে না যায়। এটাই হচ্ছে সফলতার উপায় । আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য পরিত্যাগ না করে। তারা যা বলেন তা-ই যেন পালন করে এবং যা করতে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকে। পরস্পর যেন ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত না হয় এবং মতানৈক্য সৃষ্টি না করে। নতুবা তারা লাঞ্ছিত হয়ে যাবে, তাদেরকে কাপুরুষতায় ঘিরে ফেলবে এবং তারা শক্তিহীন হয়ে পড়বে। এর ফলে তাদের অগ্রযাত্রায় বাধা পড়বে। তারা ধৈর্যের অঞ্চল যেন ছেড়ে না দেয় এবং তারা যেন বিশ্বাস রাখে ধৈর্যশীলদের সাথে স্বয়ং আল্লাহ রয়েছেন। সাহাবায়ে কিরাম এই হুকুম এমন পুরোপুরিভাবে পালন করেছিলেন যে, তাদের তুলনা পূর্বেও ছিল না এবং পরবর্তীদের মধ্যে তো তুলনার কোন কথাই উঠতে পারে না। এই বীরত্ব, এই রাসূল (সঃ)-এর প্রতি আনুগত্য এবং এই ধৈর্য ও সহ্যই ছিল আল্লাহ তা'আলার সাহায্য লাভের কারণ। আর এর ফলেই অতি অল্প সময়ের মধ্যে সংখ্যার স্বল্পতা এবং যুদ্ধাস্ত্রের নগণ্যতা সত্ত্বেও মুসলিমরা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দেশগুলো জয় করে নেন। তারা শুধুমাত্র বিজিত দেশগুলোর অধিপতিই হননি। বরং অধিবাসীদের অন্তরও জয় করে ফেলেন এবং তাদেরকে আল্লাহর পথে নিয়ে আসেন। রোমক, পারসিক, তুর্কী, সাকালিয়া, বার্বারী, হাবশী, সুদানী এবং কিবতীদেরকে তথা দুনিয়ার সমস্ত গৌর ও কৃষ্ণ বর্ণের লোককে বশীভূত করে ফেলেন। এভাবে তারা আল্লাহর কালেমাকে সমুচ্চ করেন, সত্য দ্বীনকে ছড়িয়ে দেন এবং ইসলামী হুকুমত বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছিয়ে দেন। মহান আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন এবং তাঁদেরকেও সন্তুষ্ট রাখুন। দেখে বিস্মিত হতে হয় যে, তাঁরা ত্রিশ বছরের মধ্যে দুনিয়ার মানচিত্র পরিবর্তন করে দেন এবং ইতিহাসের পৃষ্ঠা পরিবর্তিত করেন। আল্লাহ আমাদেরকেও তাঁদেরই দলভুক্ত করুন। তিনি পরমদাতা ও করুণাময়।

আল-আনফাল 8:47

৪৭-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: জিহাদে অটল থাকা, ভাল নিয়ত রাখা এবং খুব বেশী বেশী আল্লাহর যি করার উপদেশ দানের পর আল্লাহ তাআলা এখানে মুসলিমদেরকে মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত হতে নিষেধ করছেন। তিনি বলেন, মুশরিকরা যেমন সত্যকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া এবং জনগণের মধ্যে নিজেদের বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যে গর্বভরে চলছে, তোমরা তদ্রপ করো না। আবু জেহেলকে যখন বলা হয়েছিল“বাণিজ্যিক কাফেলাতো রক্ষা পেয়েছে, সুতরাং চলো, আমরা এখান থেকেই ফিরে যাই।” তখন সেই অভিশপ্ত লোকটি উত্তরে বলেছিলঃ “না, আল্লাহর কসম! আমরা ফিরে যাবো না। বরং আমরা বদরের পানির কাছে অবতরণ করবো, সেখানে মদ পান করবো, কাবাব খাবো এবং গান শুনবো, যেন জনগণের মাঝে আমাদের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের বাসনার উল্টো অবস্থা ঘটিয়ে দিলেন। ওখানেই তাদের মৃতদেহ পড়ে রইলো এবং সেখানেই লাঞ্ছনা ও অপমানের সাথে তাদের মৃতদেহগুলো গর্তের মধ্যে নিক্ষেপ করে দেয়া হলো। এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “আল্লাহ তাদের কার্যাবলী পরিবেষ্টনকারী।” তাদের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য তাঁর কাছে প্রকাশমান। এজন্যেই তিনি তাদেরকে জঘন্য প্রতিদান প্রদান করলেন। সুতরাং এখানে ঐ মুশরিকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও রাসূলদের মাথার মুকুটের সাথে বদর প্রান্তরে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। (এটা কাতাদা (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজনদের উক্তি) তাদের সাথে গায়িকা মেয়েরাও ছিল এবং তারা গানবাজনাও করেছিল। অভিশপ্ত শয়তান তাদের পৃষ্টপোষকতা করেছিল। সে তাদেরকে মিষ্টি কথা দিয়ে ভুলাচ্ছিল এবং তাদের কার্যাবলী তাদের দৃষ্টিতে খুব চাকচিক্যময় ও শোভনীয় করে দেখাচ্ছিল। তাদের কানে কানে সে বলছিলোঃ “তোমাদেরকে কে পরাজিত করতে পারে? আমি তোমাদের সাহায্যকারী হিসেবে রয়েছি। তাদের অন্তর থেকে সে বানু বকরের মক্কার উপর আক্রমণ করার ভয় দূর করছিল এবং সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জুলুমের রূপ ধারণ করে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলঃ “আমি তো ঐ এলাকার সরদার। বানু মুদলিজ গোত্রের লোকেরা সবাই আমার অনুগত। আমি তোমাদের সহায়তাকারী। সুতরাং তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো।” শয়তানের কাজই তো হলো এটা যে, মিথ্যা অঙ্গীকার সে করে থাকে। পূরণ হবে না এমন আশা সে প্রদান করে এবং মানুষকে সে প্রতারণার জালে আটকিয়ে দেয়। বদরের দিন সে স্বীয় পতাকা ও সেনাবাহিনী নিয়ে মুশরিকদের দলে যোগদান করেছিল এবং তাদের অন্তরে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল করে দিয়েছিল যে, কেউই তাদেরকে পরাজিত করতে পারবে না। সে তাদেরকে আরো বলেছিলঃ “তোমাদের কোনই ভয় নেই, আমি তোমাদের সাহায্যার্থে সর্বদা তোমাদের সাথেই থাকবো। কিন্তু যখন উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল এবং সেই পাপাচার শয়তান ফেরেশতাদেরকে মুসলিমদের সাহায্যার্থে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতে দেখলো তখন সে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালাতে শুরু করলো এবং বলতে লাগলোঃ “আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি যা তোমরা দেখতে পাও না।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বদরের দিন ইবলীস স্বীয় পতাকা উঁচু করে মুদলিজ গোত্রের একটি লোকের রূপ ধারণ করতঃ তার সেনাবাহিনীসহ উপস্থিত হয়। সে সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জুসুমের আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করে এবং মুশরিকদের অন্তরে সাহস ও উৎসাহ উদ্দীপনা যোগাতে থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন উভয় বাহিনী কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে যায় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক মুষ্টি মাটি নিয়ে মুশরিকদের চেহারায় নিক্ষেপ করেন। সাথে সাথে তাদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়। জিবরাঈল (আঃ) শয়তানের দিকে অগ্রসর হন। ঐ সময় সে একজন মুশরিকের হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিল। জিবরাঈল (আঃ)-কে দেখা মাত্রই সে লোকটির হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের সেনাবাহিনীসহ পালাতে শুরু করলো । ঐ লোকটি তখন তাকে বললোঃ “হে সুরাকা! তুমি তো বলেছিলে যে, আমাদের সাহায্যার্থে তুমি আমাদের সাথেই থাকবে, কিন্তু এখন এ করছে কি?” ঐ অভিশপ্ত যেহেতু ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাচ্ছিল তাই সে বললোঃ “আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ না। আমি তো আল্লাহকে ভয় করছি। আল্লাহর শাস্তি খুবই কঠোর।” অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে। যে, শয়তানকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে দেখে হারিস ইবনে হিশাম তাকে ধরে ফেললো । সে তখন তার গালে এমন জোরে একটা চড় মেরে দিলো যার ফলে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। তখন অন্যান্যেরা তাকে বললোঃ “হে সুরাকা! তুমি এই অবস্থায় আমাদেররকে অপদস্থ করছে এবং আমাদেরকে ধোকা দিচ্ছ?” সে উত্তরে বললোঃ “হ্যা, হ্যাঁ, তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমি তাদেরকে দেখছি যাদেরকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ না।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ক্ষণিকের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক প্রকারের আত্মভোলা হয়ে পড়েন। অতঃপর তিনি সতর্ক হয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আমার সাহাবীর দল! তোমরা আনন্দিত হয়ে যাও যে, তোমাদের ডানদিকে রয়েছেন জিবরাঈল (আঃ) এবং বামদিকে রয়েছেন মীকাঈল (আঃ), আর এই যে ইস্রাফীল (আঃ)। এঁরা তিনজনই নিজ নিজ সেনাবাহিনীসহ বিদ্যমান রয়েছেন।” ইবলীস সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জুসুম মুদলিজীর আকৃতিতে মুশরিকদের মধ্যে অবস্থান করছিল। তাদের অন্তরে সে সাহস দিচ্ছিল এবং ভবিষ্যদ্বাণী করছিল- “তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো, আজ তোমাদেরকে কেউই পরাজিত করতে পারবে না।" কিন্তু ফেরেশতাদের সেনাবাহিনীকে দেখা মাত্রই সে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং “তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই, আমি তাদেরকে দেখছি যাদেরকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ না” একথা বলতে বলতে পালিয়ে যায়। হারিস ইবনে হিশাম তাকে সুরাকা ভেবেই তার হাত ধরে ফেললো। তখন শয়তান তার বক্ষে এতো জোরে ঘুষি মারে যে, সে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। অতঃপর শয়তান পালিয়ে গিয়ে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়ে এবং নিজের কাপড় উঁচু করে ধরে বলতে থাকেঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনাকে আপনার ঐ ওয়াদার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যা আপনি আমার সাথে করেছিলেন। তিবরানীতে রিফাআহ ইবনে রাফি (রাঃ) হতেও এরই কাছাকাছি বর্ণিত আছে।উরওয়া ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরায়েশরা মক্কা থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করে তখন তাদের বানু বকরের যুদ্ধের কথা স্মরণ হয়ে যায় যে, হয়তো তাদের অনুপস্থিতির সুযোগে তারা মক্কার উপর আক্রমণ করে বসবে। কাজেই তারা তাদের ইচ্ছা ও পরিকল্পনা থেকে বিরত থাকতে উদ্যত হয়েছিল । ঐ সময়েই অভিশপ্ত ইবলীস সুরাকার রূপ ধারণ করে তাদের কাছে আসে। ঐ সুরাকা ছিল বানু কিনানা গোত্রের নেতৃস্থানীয় লোক। এই সুরাকার রূপ ধারণকারী শয়তান করায়েশদেরকে বলতে শুরু করলোঃ “আমার কওমের দায়িত আমি নিচ্ছি। তোমরা তাদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকে এবং মুসলমানদের সাথে মুকাবিলার জন্যে পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়ে যাও।” এ কথা বলে সেও তাদের সাথে চললো। প্রতিটি মনজিলেই কুরায়েশরা সুরাকারূপী শয়তানকে দেখতে পাচ্ছিল। তাদের সবারই মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে, সুরাকা স্বয়ং তাদের সাথে থাকবে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। তখন সেই বিতাড়িত শয়তান পলায়ন করলো। হারিস ইবনে হিশাম অথবা উমাইর ইবনে অহাব তাকে যেতে দেখে চেঁচিয়ে বললোঃ “হে সুরাকা! তুমি কোথায় পালিয়ে যাচ্ছ?” সুরাকারূপী শয়তান তাকে মৃত্যু ও জাহান্নামের মুখে ঠেলে দিয়ে পালিয়েই গেল। কেননা, সে আল্লাহর সৈনিক ফেরেশতাদেরকে মুসলমানদের সাহায্যার্থে আসতে দেখেছিল। পালাবার সময় সে স্পষ্টভাবে বলে গেলঃ “তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ না।” ঐ কথায় নিঃসন্দেহে সে সত্যবাদী ছিল। তারপর সে বললোঃ “আমি আল্লাহকে ভয় করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে অত্যন্ত কঠোর।" সে জিবরাঈল (আঃ)-কে ফেরেশতাদের সাথে অবতীর্ণ হতে দেখে বুঝতেই পেরেছিল যে, তাদের সাথে মুকাবিলা করার শক্তি তার নিজেরও নেই এবং মুশরিকদেরও নেই। সে যে আল্লাহকে ভয় করার কথা বলেছিল তাতে সে মিথ্যাবাদী ছিল। ওটা ছিল শুধু তার মুখের কথা। প্রকৃতপক্ষে তার মুকাবিলা করার শক্তিই ছিল না।এটাই হচ্ছে আল্লাহর এই শত্রুর অভ্যাস যে, সে মানুষকে উত্তেজিত ও বিভ্রান্ত করে এবং সত্যের মুকাবিলায় এনে দাঁড় করে দেয়। অতঃপর সে গা ঢাকা দেয়।কুরআন কারীম ঘোষণা করছে- “শয়তান মানুষকে বলে, তুমি কুফরী কর, অতঃপর যখন সে কুফরী করে বসে তখন সে বলে, তোমার সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই, আমি বিশ্বপ্রভু আল্লাহকে ভয় করি।” অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “যখন সমস্ত মুকদ্দমা মীমাংসা হয়ে যাবে তখন শয়তান বলবে-আল্লাহ তোমাদের সাথে সত্য ওয়াদা করেছিলেন, আর আমিও কিছু ওয়াদা করেছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদের সাথে ওয়াদা খেলাফ করেছিলাম, আর তোমাদের উপর আমার কোন আধিপত্যও ছিল না, শুধু এইটুকু যে, আমি তোমাদেরকে ডেকেছিলাম, তখন তোমরা আমার কথা মেনে নিয়েছিলে। অতএব তোমরা আমার উপর (সমস্ত) দোষ চাপিয়ে দিয়ো না, বরং দোষ নিজেদের উপরই আরোপ কর; আমি না তোমাদের সাহায্যকারী হতে পারি; না তোমরা আমার সাহায্যকারী হতে পার; আমি নিজেও তোমাদের এ কাজে অসন্তুষ্ট যে, তোমরা ইতিপূর্বে আমাকে (আল্লাহর) অংশ সাব্যস্ত করতে; নিশ্চয়ই যালিমদের জন্যে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।” আবু উসাইদ মালিক ইবনে রাবীআ (রাঃ) তার চক্ষু নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর বলেনঃ “এখনও যদি আমি তোমাদের সাথে বদর প্রান্তরে থাকতাম এবং আমার চক্ষু ঠিক থাকতো তবে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই ঐ ঘাটির খবর দিতে পারতাম যেখান দিয়ে ফেরেশতাগণ বের হয়ে এসেছিলেন। ঐ ঘাঁটি অবশ্যই আমার চেনা আছে। তাঁদেরকে ইবলীস দেখেছিল। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তাঁরা যেন মুসলমানদের যুদ্ধক্ষেত্রে স্থির ও অটল রাখেন। তারা মুসলমানদের পরিচিত লোকদের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেনঃ “তোমরা আনন্দিত হও। এ কাফিররা কিছুই নয়। তোমাদের সাথে আল্লাহর সাহায্য রয়েছে। নির্ভীকভাবে সিংহের ন্যায় আক্রমণ চালাও।” এ দেখে ইবলীস পগার পার হয়ে গেল। এতক্ষণ সে সুরাকার রূপ ধরে কাফিরদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। আবু জেহেল এ অবস্থা দেখে স্বীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে চক্কর দিতে শুরু করলো এবং তাদেরকে বলতে থাকলোঃ “তোমরা হতোদ্যম হয়ো না। সুরাকা পালিয়ে গেছে বলে মন খারাপ করো না। সে তো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট থেকে কুপরামর্শ শিখে এসেছিল যে, সুযোগ বুঝে তোমাদের মন ভেঙ্গে দেবে। ঘাবড়ানোর কোন কারণ নেই। লাত ও উযযার শপথ! আজ আমরা মুসলমানদেরকে এবং তাদের নবীকে গ্রেফতার করে ফেলবো। সুতরাং ভীরুতা প্রদর্শন করো না, বরং মনোবল বৃদ্ধি কর। কঠিন আক্রমণ চালাও। সাবধান! তাদেরকে হত্যা করো না, বরং জীবিত ধরে রাখো যেন তাদেরকে মন খুলে শাস্তি দেয়া যায়। এ লোকটাও (আবূ জেহেল) ছিল সে যুগের ফিরআউন। যাদুকরগণ ঈমান এনেছিল বলে সেও তাদেরকে বলেছিলঃ “এটা তো শুধু তোমাদের একটা চক্রান্ত ছিল যে, তোমরা আমাদেরকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেবে।” সেও যাদুকরদেরকে বলেছিলঃ “এই মূসা (আঃ) তোমাদের ওস্তাদ।" অথচ ওটা ছিল তার একটা প্রতারণা মাত্র। এই উম্মতের ফিরআউন আবূ জেহেলও এ ধরনের কথাই বলেছিল।আবদুল্লাহ ইবনে কুরায়েয (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আরাফার দিন ইবলীস যত লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও লজ্জিত হয়েছিল, আর কোন দিন এতটা হতে দেখা যায়নি। কেননা সে দেখছিল যে, আল্লাহ তা'আলার সাধারণ ক্ষমা ও সাধারণ রহমত বর্ষিত হচ্ছে। প্রত্যেকের গুনাহ প্রায়ই মাফ হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, তবে বদরের দিনে তার লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হওয়ার কথা জিজ্ঞেস করো না, যখন সে দেখলো যে, ফেরেশতাদের সেনাবাহিনী জিবরাঈল (আঃ)-এর নেতৃত্বে আসতে শুরু করেছেন সেইদিন সে সবচেয়ে বেশী লজ্জিত ও অপমানিত হয়েছিল।”(আরবী) এ আয়াত সম্পর্কে আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, উভয় সেনাবাহিনী যখন কাতারবন্দী হয়ে মুখোমুখী দাঁড়িয়ে যায় তখন আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে মুশরিকদের চক্ষে কম দেখান। তখন মুশরিকরা মুসলমানদের সম্পর্কে বিদ্রুপ করে বলেঃ “এদের দ্বীন এদেরকে প্রতারিত করেছে। তাদের একথা বলার কারণ ছিল এই যে, তারা মুসলমানদের সংখ্যা তাদের চোখে খুবই কম দেখছিল। তাই তারা ধারণা করছিল যে, নিঃসন্দেহে তারা মুসলমানদেরকে পরাজিত করবে। তারা পরস্পর বলাবলি করছিলঃ “দেখো, মুসলমানরা কত ধর্মের পাগল। মুষ্টিমেয় কয়েকটি লোক এক হাজার সৈন্যের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছে। প্রথম আক্রমণেই তারা দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাবে। আল্লাহ রাব্বল আলামীন বলেন যে, এরা হচ্ছে ভরসাকারী দল। তাদের ভরসা এমন সত্তার উপর রয়েছে যিনি বিজয়ের মালিক এবং হিকমতের মালিক। মুসলিমদের মধ্যে আল্লাহর দ্বীনের উপর দৃঢ়তা অনুভব করেই মুশরিকদের মুখে উচ্চারিত হয়েছিল যে, তারা দ্বীনের পাগল । আল্লাহর শত্রু অভিশপ্ত আবু জেহেল পাহাড়ের উপর থেকে অবজ্ঞাভরে মুসলিমদের সংখ্যার স্বল্পতা ও অস্ত্র-শস্ত্রের নগণ্যতা লক্ষ্য করতঃ গাধার মত ফুলে উঠলো এবং বলতে লাগলঃ “আল্লাহর কসম! আজ থেকে আল্লাহর ইবাদতকারী হতে জমিনকে শূন্য দেখা যাবে। এখনই আমরা তাদের এক একজনকে দু' টুকরো করে রেখে দিবো।” ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বলেন যে, মুসলিমদের ধর্মের প্রতি বিদ্রুপকারী ছিল মক্কার মুনাফেকরা। আমীর (রঃ) বলেন যে, এরা ছিল কতকগুলো লোক যারা শুধু মুখে মুসলিম হয়েছিল। কিন্তু বদরের প্রান্তরে তারা মুশরিকদের সাথে যোগ দিয়েছিল। মুসলিমদের সংখ্যার স্বল্পতা ও তাদের দুর্বলতা দেখে বিস্মিত হয়েছিল এবং বলেছিলঃ “এ লোকগুলো ধর্মের দ্বারা প্রতারিত হয়েছে।” মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা ছিল কুরায়েশদের একটি দল। তারা হচ্ছে কায়েস ইবনে অলীদ ইবনে মুগীরা, আবুল কায়েস ইবনে ফাকাহ্ ইবনে মুগীরা, হারিস ইবনে যামআ, আসওয়াদ ইবনে আবদিল মুত্তালিব, আলী ইবনে উমাইয়া ইবনে খাল্ফ এবং আস ইবনে মুনাব্বাহ ইবনে হাজ্জাজ। এ লোকগুলো কুরায়েশদের সাথে ছিল। কিন্তু তারা সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়েছিল এবং তাদের সন্দেহ তাদেরকে আবদ্ধ রেখেছিল। এখানে মুসলিমদের অবস্থা দেখে তারা বলতে শুরু করেঃ “এ লোকগুলো তো শুধু ধর্মীয় পাগল! নতুবা এই মুষ্টিমেয় রসদ ও হাতিয়ার বিহীন লোক এত শান-শওকতপূর্ণ বিরাট সেনাদলের সাথে কিভাবে যুদ্ধ করতে পারে? হাসান (রঃ) বলেন যে, এই লোকগুলো বদরের যুদ্ধে আগমন করেনি। তাদের নাম মুনাফিক রাখা হয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, তারা মুখে ইসলামের স্বীকারোক্তি করেছিল এবং তারা মক্কাতে ছিল। মুশরিকদের সাথে তারা বদর অভিমুখে রওয়ানা হয়েছিল। যখন তারা মুসলিমদের সংখ্যা খুবই কম দেখলো তখন বলতে লাগলো, এদের ধর্ম এদেরকে প্রতারিত করেছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেন যে, যারা এই মালিকুল মুলকের (আল্লাহর) উপর ভরসা করে তিনি তাদেরকে মর্যাদার অধিকারী বানিয়ে দেন। কেননা সম্মান ও মর্যাদা দানের মালিক একমাত্র তিনিই। বিজয় দান তাঁরই হাতে। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত এবং মহনি বাদশাহ। তিনি মহান বিজ্ঞানময়। তার সমস্ত কাজ হিকমতে পরিপূর্ণ। প্রত্যেক জিনিসকে তিনি যথাযোগ্য স্থানে রেখে থাকেন। যারা সাহায্য পাওয়ার যোগ্য তাদেরকেই তিনি সাহায্য করে থাকেন। আর যারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার যোগ্য তাদেরকে তিনি লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন।

আল-আনফাল 8:48

৪৭-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: জিহাদে অটল থাকা, ভাল নিয়ত রাখা এবং খুব বেশী বেশী আল্লাহর যি করার উপদেশ দানের পর আল্লাহ তাআলা এখানে মুসলিমদেরকে মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত হতে নিষেধ করছেন। তিনি বলেন, মুশরিকরা যেমন সত্যকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া এবং জনগণের মধ্যে নিজেদের বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যে গর্বভরে চলছে, তোমরা তদ্রপ করো না। আবু জেহেলকে যখন বলা হয়েছিল“বাণিজ্যিক কাফেলাতো রক্ষা পেয়েছে, সুতরাং চলো, আমরা এখান থেকেই ফিরে যাই।” তখন সেই অভিশপ্ত লোকটি উত্তরে বলেছিলঃ “না, আল্লাহর কসম! আমরা ফিরে যাবো না। বরং আমরা বদরের পানির কাছে অবতরণ করবো, সেখানে মদ পান করবো, কাবাব খাবো এবং গান শুনবো, যেন জনগণের মাঝে আমাদের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের বাসনার উল্টো অবস্থা ঘটিয়ে দিলেন। ওখানেই তাদের মৃতদেহ পড়ে রইলো এবং সেখানেই লাঞ্ছনা ও অপমানের সাথে তাদের মৃতদেহগুলো গর্তের মধ্যে নিক্ষেপ করে দেয়া হলো। এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “আল্লাহ তাদের কার্যাবলী পরিবেষ্টনকারী।” তাদের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য তাঁর কাছে প্রকাশমান। এজন্যেই তিনি তাদেরকে জঘন্য প্রতিদান প্রদান করলেন। সুতরাং এখানে ঐ মুশরিকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও রাসূলদের মাথার মুকুটের সাথে বদর প্রান্তরে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। (এটা কাতাদা (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজনদের উক্তি) তাদের সাথে গায়িকা মেয়েরাও ছিল এবং তারা গানবাজনাও করেছিল। অভিশপ্ত শয়তান তাদের পৃষ্টপোষকতা করেছিল। সে তাদেরকে মিষ্টি কথা দিয়ে ভুলাচ্ছিল এবং তাদের কার্যাবলী তাদের দৃষ্টিতে খুব চাকচিক্যময় ও শোভনীয় করে দেখাচ্ছিল। তাদের কানে কানে সে বলছিলোঃ “তোমাদেরকে কে পরাজিত করতে পারে? আমি তোমাদের সাহায্যকারী হিসেবে রয়েছি। তাদের অন্তর থেকে সে বানু বকরের মক্কার উপর আক্রমণ করার ভয় দূর করছিল এবং সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জুলুমের রূপ ধারণ করে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলঃ “আমি তো ঐ এলাকার সরদার। বানু মুদলিজ গোত্রের লোকেরা সবাই আমার অনুগত। আমি তোমাদের সহায়তাকারী। সুতরাং তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো।” শয়তানের কাজই তো হলো এটা যে, মিথ্যা অঙ্গীকার সে করে থাকে। পূরণ হবে না এমন আশা সে প্রদান করে এবং মানুষকে সে প্রতারণার জালে আটকিয়ে দেয়। বদরের দিন সে স্বীয় পতাকা ও সেনাবাহিনী নিয়ে মুশরিকদের দলে যোগদান করেছিল এবং তাদের অন্তরে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল করে দিয়েছিল যে, কেউই তাদেরকে পরাজিত করতে পারবে না। সে তাদেরকে আরো বলেছিলঃ “তোমাদের কোনই ভয় নেই, আমি তোমাদের সাহায্যার্থে সর্বদা তোমাদের সাথেই থাকবো। কিন্তু যখন উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল এবং সেই পাপাচার শয়তান ফেরেশতাদেরকে মুসলিমদের সাহায্যার্থে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতে দেখলো তখন সে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালাতে শুরু করলো এবং বলতে লাগলোঃ “আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি যা তোমরা দেখতে পাও না।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বদরের দিন ইবলীস স্বীয় পতাকা উঁচু করে মুদলিজ গোত্রের একটি লোকের রূপ ধারণ করতঃ তার সেনাবাহিনীসহ উপস্থিত হয়। সে সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জুসুমের আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করে এবং মুশরিকদের অন্তরে সাহস ও উৎসাহ উদ্দীপনা যোগাতে থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন উভয় বাহিনী কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে যায় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক মুষ্টি মাটি নিয়ে মুশরিকদের চেহারায় নিক্ষেপ করেন। সাথে সাথে তাদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়। জিবরাঈল (আঃ) শয়তানের দিকে অগ্রসর হন। ঐ সময় সে একজন মুশরিকের হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিল। জিবরাঈল (আঃ)-কে দেখা মাত্রই সে লোকটির হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের সেনাবাহিনীসহ পালাতে শুরু করলো । ঐ লোকটি তখন তাকে বললোঃ “হে সুরাকা! তুমি তো বলেছিলে যে, আমাদের সাহায্যার্থে তুমি আমাদের সাথেই থাকবে, কিন্তু এখন এ করছে কি?” ঐ অভিশপ্ত যেহেতু ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাচ্ছিল তাই সে বললোঃ “আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ না। আমি তো আল্লাহকে ভয় করছি। আল্লাহর শাস্তি খুবই কঠোর।” অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে। যে, শয়তানকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে দেখে হারিস ইবনে হিশাম তাকে ধরে ফেললো । সে তখন তার গালে এমন জোরে একটা চড় মেরে দিলো যার ফলে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। তখন অন্যান্যেরা তাকে বললোঃ “হে সুরাকা! তুমি এই অবস্থায় আমাদেররকে অপদস্থ করছে এবং আমাদেরকে ধোকা দিচ্ছ?” সে উত্তরে বললোঃ “হ্যা, হ্যাঁ, তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমি তাদেরকে দেখছি যাদেরকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ না।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ক্ষণিকের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক প্রকারের আত্মভোলা হয়ে পড়েন। অতঃপর তিনি সতর্ক হয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আমার সাহাবীর দল! তোমরা আনন্দিত হয়ে যাও যে, তোমাদের ডানদিকে রয়েছেন জিবরাঈল (আঃ) এবং বামদিকে রয়েছেন মীকাঈল (আঃ), আর এই যে ইস্রাফীল (আঃ)। এঁরা তিনজনই নিজ নিজ সেনাবাহিনীসহ বিদ্যমান রয়েছেন।” ইবলীস সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জুসুম মুদলিজীর আকৃতিতে মুশরিকদের মধ্যে অবস্থান করছিল। তাদের অন্তরে সে সাহস দিচ্ছিল এবং ভবিষ্যদ্বাণী করছিল- “তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো, আজ তোমাদেরকে কেউই পরাজিত করতে পারবে না।" কিন্তু ফেরেশতাদের সেনাবাহিনীকে দেখা মাত্রই সে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং “তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই, আমি তাদেরকে দেখছি যাদেরকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ না” একথা বলতে বলতে পালিয়ে যায়। হারিস ইবনে হিশাম তাকে সুরাকা ভেবেই তার হাত ধরে ফেললো। তখন শয়তান তার বক্ষে এতো জোরে ঘুষি মারে যে, সে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। অতঃপর শয়তান পালিয়ে গিয়ে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়ে এবং নিজের কাপড় উঁচু করে ধরে বলতে থাকেঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনাকে আপনার ঐ ওয়াদার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যা আপনি আমার সাথে করেছিলেন। তিবরানীতে রিফাআহ ইবনে রাফি (রাঃ) হতেও এরই কাছাকাছি বর্ণিত আছে।উরওয়া ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরায়েশরা মক্কা থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করে তখন তাদের বানু বকরের যুদ্ধের কথা স্মরণ হয়ে যায় যে, হয়তো তাদের অনুপস্থিতির সুযোগে তারা মক্কার উপর আক্রমণ করে বসবে। কাজেই তারা তাদের ইচ্ছা ও পরিকল্পনা থেকে বিরত থাকতে উদ্যত হয়েছিল । ঐ সময়েই অভিশপ্ত ইবলীস সুরাকার রূপ ধারণ করে তাদের কাছে আসে। ঐ সুরাকা ছিল বানু কিনানা গোত্রের নেতৃস্থানীয় লোক। এই সুরাকার রূপ ধারণকারী শয়তান করায়েশদেরকে বলতে শুরু করলোঃ “আমার কওমের দায়িত আমি নিচ্ছি। তোমরা তাদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকে এবং মুসলমানদের সাথে মুকাবিলার জন্যে পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়ে যাও।” এ কথা বলে সেও তাদের সাথে চললো। প্রতিটি মনজিলেই কুরায়েশরা সুরাকারূপী শয়তানকে দেখতে পাচ্ছিল। তাদের সবারই মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে, সুরাকা স্বয়ং তাদের সাথে থাকবে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। তখন সেই বিতাড়িত শয়তান পলায়ন করলো। হারিস ইবনে হিশাম অথবা উমাইর ইবনে অহাব তাকে যেতে দেখে চেঁচিয়ে বললোঃ “হে সুরাকা! তুমি কোথায় পালিয়ে যাচ্ছ?” সুরাকারূপী শয়তান তাকে মৃত্যু ও জাহান্নামের মুখে ঠেলে দিয়ে পালিয়েই গেল। কেননা, সে আল্লাহর সৈনিক ফেরেশতাদেরকে মুসলমানদের সাহায্যার্থে আসতে দেখেছিল। পালাবার সময় সে স্পষ্টভাবে বলে গেলঃ “তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ না।” ঐ কথায় নিঃসন্দেহে সে সত্যবাদী ছিল। তারপর সে বললোঃ “আমি আল্লাহকে ভয় করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে অত্যন্ত কঠোর।" সে জিবরাঈল (আঃ)-কে ফেরেশতাদের সাথে অবতীর্ণ হতে দেখে বুঝতেই পেরেছিল যে, তাদের সাথে মুকাবিলা করার শক্তি তার নিজেরও নেই এবং মুশরিকদেরও নেই। সে যে আল্লাহকে ভয় করার কথা বলেছিল তাতে সে মিথ্যাবাদী ছিল। ওটা ছিল শুধু তার মুখের কথা। প্রকৃতপক্ষে তার মুকাবিলা করার শক্তিই ছিল না।এটাই হচ্ছে আল্লাহর এই শত্রুর অভ্যাস যে, সে মানুষকে উত্তেজিত ও বিভ্রান্ত করে এবং সত্যের মুকাবিলায় এনে দাঁড় করে দেয়। অতঃপর সে গা ঢাকা দেয়।কুরআন কারীম ঘোষণা করছে- “শয়তান মানুষকে বলে, তুমি কুফরী কর, অতঃপর যখন সে কুফরী করে বসে তখন সে বলে, তোমার সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই, আমি বিশ্বপ্রভু আল্লাহকে ভয় করি।” অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “যখন সমস্ত মুকদ্দমা মীমাংসা হয়ে যাবে তখন শয়তান বলবে-আল্লাহ তোমাদের সাথে সত্য ওয়াদা করেছিলেন, আর আমিও কিছু ওয়াদা করেছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদের সাথে ওয়াদা খেলাফ করেছিলাম, আর তোমাদের উপর আমার কোন আধিপত্যও ছিল না, শুধু এইটুকু যে, আমি তোমাদেরকে ডেকেছিলাম, তখন তোমরা আমার কথা মেনে নিয়েছিলে। অতএব তোমরা আমার উপর (সমস্ত) দোষ চাপিয়ে দিয়ো না, বরং দোষ নিজেদের উপরই আরোপ কর; আমি না তোমাদের সাহায্যকারী হতে পারি; না তোমরা আমার সাহায্যকারী হতে পার; আমি নিজেও তোমাদের এ কাজে অসন্তুষ্ট যে, তোমরা ইতিপূর্বে আমাকে (আল্লাহর) অংশ সাব্যস্ত করতে; নিশ্চয়ই যালিমদের জন্যে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।” আবু উসাইদ মালিক ইবনে রাবীআ (রাঃ) তার চক্ষু নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর বলেনঃ “এখনও যদি আমি তোমাদের সাথে বদর প্রান্তরে থাকতাম এবং আমার চক্ষু ঠিক থাকতো তবে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই ঐ ঘাটির খবর দিতে পারতাম যেখান দিয়ে ফেরেশতাগণ বের হয়ে এসেছিলেন। ঐ ঘাঁটি অবশ্যই আমার চেনা আছে। তাঁদেরকে ইবলীস দেখেছিল। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তাঁরা যেন মুসলমানদের যুদ্ধক্ষেত্রে স্থির ও অটল রাখেন। তারা মুসলমানদের পরিচিত লোকদের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেনঃ “তোমরা আনন্দিত হও। এ কাফিররা কিছুই নয়। তোমাদের সাথে আল্লাহর সাহায্য রয়েছে। নির্ভীকভাবে সিংহের ন্যায় আক্রমণ চালাও।” এ দেখে ইবলীস পগার পার হয়ে গেল। এতক্ষণ সে সুরাকার রূপ ধরে কাফিরদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। আবু জেহেল এ অবস্থা দেখে স্বীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে চক্কর দিতে শুরু করলো এবং তাদেরকে বলতে থাকলোঃ “তোমরা হতোদ্যম হয়ো না। সুরাকা পালিয়ে গেছে বলে মন খারাপ করো না। সে তো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট থেকে কুপরামর্শ শিখে এসেছিল যে, সুযোগ বুঝে তোমাদের মন ভেঙ্গে দেবে। ঘাবড়ানোর কোন কারণ নেই। লাত ও উযযার শপথ! আজ আমরা মুসলমানদেরকে এবং তাদের নবীকে গ্রেফতার করে ফেলবো। সুতরাং ভীরুতা প্রদর্শন করো না, বরং মনোবল বৃদ্ধি কর। কঠিন আক্রমণ চালাও। সাবধান! তাদেরকে হত্যা করো না, বরং জীবিত ধরে রাখো যেন তাদেরকে মন খুলে শাস্তি দেয়া যায়। এ লোকটাও (আবূ জেহেল) ছিল সে যুগের ফিরআউন। যাদুকরগণ ঈমান এনেছিল বলে সেও তাদেরকে বলেছিলঃ “এটা তো শুধু তোমাদের একটা চক্রান্ত ছিল যে, তোমরা আমাদেরকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেবে।” সেও যাদুকরদেরকে বলেছিলঃ “এই মূসা (আঃ) তোমাদের ওস্তাদ।" অথচ ওটা ছিল তার একটা প্রতারণা মাত্র। এই উম্মতের ফিরআউন আবূ জেহেলও এ ধরনের কথাই বলেছিল।আবদুল্লাহ ইবনে কুরায়েয (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আরাফার দিন ইবলীস যত লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও লজ্জিত হয়েছিল, আর কোন দিন এতটা হতে দেখা যায়নি। কেননা সে দেখছিল যে, আল্লাহ তা'আলার সাধারণ ক্ষমা ও সাধারণ রহমত বর্ষিত হচ্ছে। প্রত্যেকের গুনাহ প্রায়ই মাফ হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, তবে বদরের দিনে তার লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হওয়ার কথা জিজ্ঞেস করো না, যখন সে দেখলো যে, ফেরেশতাদের সেনাবাহিনী জিবরাঈল (আঃ)-এর নেতৃত্বে আসতে শুরু করেছেন সেইদিন সে সবচেয়ে বেশী লজ্জিত ও অপমানিত হয়েছিল।”(আরবী) এ আয়াত সম্পর্কে আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, উভয় সেনাবাহিনী যখন কাতারবন্দী হয়ে মুখোমুখী দাঁড়িয়ে যায় তখন আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে মুশরিকদের চক্ষে কম দেখান। তখন মুশরিকরা মুসলমানদের সম্পর্কে বিদ্রুপ করে বলেঃ “এদের দ্বীন এদেরকে প্রতারিত করেছে। তাদের একথা বলার কারণ ছিল এই যে, তারা মুসলমানদের সংখ্যা তাদের চোখে খুবই কম দেখছিল। তাই তারা ধারণা করছিল যে, নিঃসন্দেহে তারা মুসলমানদেরকে পরাজিত করবে। তারা পরস্পর বলাবলি করছিলঃ “দেখো, মুসলমানরা কত ধর্মের পাগল। মুষ্টিমেয় কয়েকটি লোক এক হাজার সৈন্যের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছে। প্রথম আক্রমণেই তারা দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাবে। আল্লাহ রাব্বল আলামীন বলেন যে, এরা হচ্ছে ভরসাকারী দল। তাদের ভরসা এমন সত্তার উপর রয়েছে যিনি বিজয়ের মালিক এবং হিকমতের মালিক। মুসলিমদের মধ্যে আল্লাহর দ্বীনের উপর দৃঢ়তা অনুভব করেই মুশরিকদের মুখে উচ্চারিত হয়েছিল যে, তারা দ্বীনের পাগল । আল্লাহর শত্রু অভিশপ্ত আবু জেহেল পাহাড়ের উপর থেকে অবজ্ঞাভরে মুসলিমদের সংখ্যার স্বল্পতা ও অস্ত্র-শস্ত্রের নগণ্যতা লক্ষ্য করতঃ গাধার মত ফুলে উঠলো এবং বলতে লাগলঃ “আল্লাহর কসম! আজ থেকে আল্লাহর ইবাদতকারী হতে জমিনকে শূন্য দেখা যাবে। এখনই আমরা তাদের এক একজনকে দু' টুকরো করে রেখে দিবো।” ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বলেন যে, মুসলিমদের ধর্মের প্রতি বিদ্রুপকারী ছিল মক্কার মুনাফেকরা। আমীর (রঃ) বলেন যে, এরা ছিল কতকগুলো লোক যারা শুধু মুখে মুসলিম হয়েছিল। কিন্তু বদরের প্রান্তরে তারা মুশরিকদের সাথে যোগ দিয়েছিল। মুসলিমদের সংখ্যার স্বল্পতা ও তাদের দুর্বলতা দেখে বিস্মিত হয়েছিল এবং বলেছিলঃ “এ লোকগুলো ধর্মের দ্বারা প্রতারিত হয়েছে।” মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা ছিল কুরায়েশদের একটি দল। তারা হচ্ছে কায়েস ইবনে অলীদ ইবনে মুগীরা, আবুল কায়েস ইবনে ফাকাহ্ ইবনে মুগীরা, হারিস ইবনে যামআ, আসওয়াদ ইবনে আবদিল মুত্তালিব, আলী ইবনে উমাইয়া ইবনে খাল্ফ এবং আস ইবনে মুনাব্বাহ ইবনে হাজ্জাজ। এ লোকগুলো কুরায়েশদের সাথে ছিল। কিন্তু তারা সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়েছিল এবং তাদের সন্দেহ তাদেরকে আবদ্ধ রেখেছিল। এখানে মুসলিমদের অবস্থা দেখে তারা বলতে শুরু করেঃ “এ লোকগুলো তো শুধু ধর্মীয় পাগল! নতুবা এই মুষ্টিমেয় রসদ ও হাতিয়ার বিহীন লোক এত শান-শওকতপূর্ণ বিরাট সেনাদলের সাথে কিভাবে যুদ্ধ করতে পারে? হাসান (রঃ) বলেন যে, এই লোকগুলো বদরের যুদ্ধে আগমন করেনি। তাদের নাম মুনাফিক রাখা হয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, তারা মুখে ইসলামের স্বীকারোক্তি করেছিল এবং তারা মক্কাতে ছিল। মুশরিকদের সাথে তারা বদর অভিমুখে রওয়ানা হয়েছিল। যখন তারা মুসলিমদের সংখ্যা খুবই কম দেখলো তখন বলতে লাগলো, এদের ধর্ম এদেরকে প্রতারিত করেছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেন যে, যারা এই মালিকুল মুলকের (আল্লাহর) উপর ভরসা করে তিনি তাদেরকে মর্যাদার অধিকারী বানিয়ে দেন। কেননা সম্মান ও মর্যাদা দানের মালিক একমাত্র তিনিই। বিজয় দান তাঁরই হাতে। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত এবং মহনি বাদশাহ। তিনি মহান বিজ্ঞানময়। তার সমস্ত কাজ হিকমতে পরিপূর্ণ। প্রত্যেক জিনিসকে তিনি যথাযোগ্য স্থানে রেখে থাকেন। যারা সাহায্য পাওয়ার যোগ্য তাদেরকেই তিনি সাহায্য করে থাকেন। আর যারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার যোগ্য তাদেরকে তিনি লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন।

আল-আনফাল 8:49

৪৭-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর: জিহাদে অটল থাকা, ভাল নিয়ত রাখা এবং খুব বেশী বেশী আল্লাহর যি করার উপদেশ দানের পর আল্লাহ তাআলা এখানে মুসলিমদেরকে মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত হতে নিষেধ করছেন। তিনি বলেন, মুশরিকরা যেমন সত্যকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া এবং জনগণের মধ্যে নিজেদের বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যে গর্বভরে চলছে, তোমরা তদ্রপ করো না। আবু জেহেলকে যখন বলা হয়েছিল“বাণিজ্যিক কাফেলাতো রক্ষা পেয়েছে, সুতরাং চলো, আমরা এখান থেকেই ফিরে যাই।” তখন সেই অভিশপ্ত লোকটি উত্তরে বলেছিলঃ “না, আল্লাহর কসম! আমরা ফিরে যাবো না। বরং আমরা বদরের পানির কাছে অবতরণ করবো, সেখানে মদ পান করবো, কাবাব খাবো এবং গান শুনবো, যেন জনগণের মাঝে আমাদের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের বাসনার উল্টো অবস্থা ঘটিয়ে দিলেন। ওখানেই তাদের মৃতদেহ পড়ে রইলো এবং সেখানেই লাঞ্ছনা ও অপমানের সাথে তাদের মৃতদেহগুলো গর্তের মধ্যে নিক্ষেপ করে দেয়া হলো। এজন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “আল্লাহ তাদের কার্যাবলী পরিবেষ্টনকারী।” তাদের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য তাঁর কাছে প্রকাশমান। এজন্যেই তিনি তাদেরকে জঘন্য প্রতিদান প্রদান করলেন। সুতরাং এখানে ঐ মুশরিকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যারা আল্লাহর রাসূল (সঃ) ও রাসূলদের মাথার মুকুটের সাথে বদর প্রান্তরে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। (এটা কাতাদা (রঃ), যহহাক (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজনদের উক্তি) তাদের সাথে গায়িকা মেয়েরাও ছিল এবং তারা গানবাজনাও করেছিল। অভিশপ্ত শয়তান তাদের পৃষ্টপোষকতা করেছিল। সে তাদেরকে মিষ্টি কথা দিয়ে ভুলাচ্ছিল এবং তাদের কার্যাবলী তাদের দৃষ্টিতে খুব চাকচিক্যময় ও শোভনীয় করে দেখাচ্ছিল। তাদের কানে কানে সে বলছিলোঃ “তোমাদেরকে কে পরাজিত করতে পারে? আমি তোমাদের সাহায্যকারী হিসেবে রয়েছি। তাদের অন্তর থেকে সে বানু বকরের মক্কার উপর আক্রমণ করার ভয় দূর করছিল এবং সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জুলুমের রূপ ধারণ করে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলঃ “আমি তো ঐ এলাকার সরদার। বানু মুদলিজ গোত্রের লোকেরা সবাই আমার অনুগত। আমি তোমাদের সহায়তাকারী। সুতরাং তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো।” শয়তানের কাজই তো হলো এটা যে, মিথ্যা অঙ্গীকার সে করে থাকে। পূরণ হবে না এমন আশা সে প্রদান করে এবং মানুষকে সে প্রতারণার জালে আটকিয়ে দেয়। বদরের দিন সে স্বীয় পতাকা ও সেনাবাহিনী নিয়ে মুশরিকদের দলে যোগদান করেছিল এবং তাদের অন্তরে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল করে দিয়েছিল যে, কেউই তাদেরকে পরাজিত করতে পারবে না। সে তাদেরকে আরো বলেছিলঃ “তোমাদের কোনই ভয় নেই, আমি তোমাদের সাহায্যার্থে সর্বদা তোমাদের সাথেই থাকবো। কিন্তু যখন উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল এবং সেই পাপাচার শয়তান ফেরেশতাদেরকে মুসলিমদের সাহায্যার্থে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতে দেখলো তখন সে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালাতে শুরু করলো এবং বলতে লাগলোঃ “আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি যা তোমরা দেখতে পাও না।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বদরের দিন ইবলীস স্বীয় পতাকা উঁচু করে মুদলিজ গোত্রের একটি লোকের রূপ ধারণ করতঃ তার সেনাবাহিনীসহ উপস্থিত হয়। সে সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জুসুমের আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করে এবং মুশরিকদের অন্তরে সাহস ও উৎসাহ উদ্দীপনা যোগাতে থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন উভয় বাহিনী কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে যায় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক মুষ্টি মাটি নিয়ে মুশরিকদের চেহারায় নিক্ষেপ করেন। সাথে সাথে তাদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়। জিবরাঈল (আঃ) শয়তানের দিকে অগ্রসর হন। ঐ সময় সে একজন মুশরিকের হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিল। জিবরাঈল (আঃ)-কে দেখা মাত্রই সে লোকটির হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের সেনাবাহিনীসহ পালাতে শুরু করলো । ঐ লোকটি তখন তাকে বললোঃ “হে সুরাকা! তুমি তো বলেছিলে যে, আমাদের সাহায্যার্থে তুমি আমাদের সাথেই থাকবে, কিন্তু এখন এ করছে কি?” ঐ অভিশপ্ত যেহেতু ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাচ্ছিল তাই সে বললোঃ “আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ না। আমি তো আল্লাহকে ভয় করছি। আল্লাহর শাস্তি খুবই কঠোর।” অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে। যে, শয়তানকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে দেখে হারিস ইবনে হিশাম তাকে ধরে ফেললো । সে তখন তার গালে এমন জোরে একটা চড় মেরে দিলো যার ফলে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। তখন অন্যান্যেরা তাকে বললোঃ “হে সুরাকা! তুমি এই অবস্থায় আমাদেররকে অপদস্থ করছে এবং আমাদেরকে ধোকা দিচ্ছ?” সে উত্তরে বললোঃ “হ্যা, হ্যাঁ, তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমি তাদেরকে দেখছি যাদেরকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ না।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ক্ষণিকের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক প্রকারের আত্মভোলা হয়ে পড়েন। অতঃপর তিনি সতর্ক হয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আমার সাহাবীর দল! তোমরা আনন্দিত হয়ে যাও যে, তোমাদের ডানদিকে রয়েছেন জিবরাঈল (আঃ) এবং বামদিকে রয়েছেন মীকাঈল (আঃ), আর এই যে ইস্রাফীল (আঃ)। এঁরা তিনজনই নিজ নিজ সেনাবাহিনীসহ বিদ্যমান রয়েছেন।” ইবলীস সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জুসুম মুদলিজীর আকৃতিতে মুশরিকদের মধ্যে অবস্থান করছিল। তাদের অন্তরে সে সাহস দিচ্ছিল এবং ভবিষ্যদ্বাণী করছিল- “তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো, আজ তোমাদেরকে কেউই পরাজিত করতে পারবে না।" কিন্তু ফেরেশতাদের সেনাবাহিনীকে দেখা মাত্রই সে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং “তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই, আমি তাদেরকে দেখছি যাদেরকে তোমরা দেখতে পাচ্ছ না” একথা বলতে বলতে পালিয়ে যায়। হারিস ইবনে হিশাম তাকে সুরাকা ভেবেই তার হাত ধরে ফেললো। তখন শয়তান তার বক্ষে এতো জোরে ঘুষি মারে যে, সে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। অতঃপর শয়তান পালিয়ে গিয়ে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়ে এবং নিজের কাপড় উঁচু করে ধরে বলতে থাকেঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনাকে আপনার ঐ ওয়াদার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যা আপনি আমার সাথে করেছিলেন। তিবরানীতে রিফাআহ ইবনে রাফি (রাঃ) হতেও এরই কাছাকাছি বর্ণিত আছে।উরওয়া ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরায়েশরা মক্কা থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করে তখন তাদের বানু বকরের যুদ্ধের কথা স্মরণ হয়ে যায় যে, হয়তো তাদের অনুপস্থিতির সুযোগে তারা মক্কার উপর আক্রমণ করে বসবে। কাজেই তারা তাদের ইচ্ছা ও পরিকল্পনা থেকে বিরত থাকতে উদ্যত হয়েছিল । ঐ সময়েই অভিশপ্ত ইবলীস সুরাকার রূপ ধারণ করে তাদের কাছে আসে। ঐ সুরাকা ছিল বানু কিনানা গোত্রের নেতৃস্থানীয় লোক। এই সুরাকার রূপ ধারণকারী শয়তান করায়েশদেরকে বলতে শুরু করলোঃ “আমার কওমের দায়িত আমি নিচ্ছি। তোমরা তাদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকে এবং মুসলমানদের সাথে মুকাবিলার জন্যে পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়ে যাও।” এ কথা বলে সেও তাদের সাথে চললো। প্রতিটি মনজিলেই কুরায়েশরা সুরাকারূপী শয়তানকে দেখতে পাচ্ছিল। তাদের সবারই মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে, সুরাকা স্বয়ং তাদের সাথে থাকবে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। তখন সেই বিতাড়িত শয়তান পলায়ন করলো। হারিস ইবনে হিশাম অথবা উমাইর ইবনে অহাব তাকে যেতে দেখে চেঁচিয়ে বললোঃ “হে সুরাকা! তুমি কোথায় পালিয়ে যাচ্ছ?” সুরাকারূপী শয়তান তাকে মৃত্যু ও জাহান্নামের মুখে ঠেলে দিয়ে পালিয়েই গেল। কেননা, সে আল্লাহর সৈনিক ফেরেশতাদেরকে মুসলমানদের সাহায্যার্থে আসতে দেখেছিল। পালাবার সময় সে স্পষ্টভাবে বলে গেলঃ “তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ না।” ঐ কথায় নিঃসন্দেহে সে সত্যবাদী ছিল। তারপর সে বললোঃ “আমি আল্লাহকে ভয় করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে অত্যন্ত কঠোর।" সে জিবরাঈল (আঃ)-কে ফেরেশতাদের সাথে অবতীর্ণ হতে দেখে বুঝতেই পেরেছিল যে, তাদের সাথে মুকাবিলা করার শক্তি তার নিজেরও নেই এবং মুশরিকদেরও নেই। সে যে আল্লাহকে ভয় করার কথা বলেছিল তাতে সে মিথ্যাবাদী ছিল। ওটা ছিল শুধু তার মুখের কথা। প্রকৃতপক্ষে তার মুকাবিলা করার শক্তিই ছিল না।এটাই হচ্ছে আল্লাহর এই শত্রুর অভ্যাস যে, সে মানুষকে উত্তেজিত ও বিভ্রান্ত করে এবং সত্যের মুকাবিলায় এনে দাঁড় করে দেয়। অতঃপর সে গা ঢাকা দেয়।কুরআন কারীম ঘোষণা করছে- “শয়তান মানুষকে বলে, তুমি কুফরী কর, অতঃপর যখন সে কুফরী করে বসে তখন সে বলে, তোমার সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই, আমি বিশ্বপ্রভু আল্লাহকে ভয় করি।” অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “যখন সমস্ত মুকদ্দমা মীমাংসা হয়ে যাবে তখন শয়তান বলবে-আল্লাহ তোমাদের সাথে সত্য ওয়াদা করেছিলেন, আর আমিও কিছু ওয়াদা করেছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদের সাথে ওয়াদা খেলাফ করেছিলাম, আর তোমাদের উপর আমার কোন আধিপত্যও ছিল না, শুধু এইটুকু যে, আমি তোমাদেরকে ডেকেছিলাম, তখন তোমরা আমার কথা মেনে নিয়েছিলে। অতএব তোমরা আমার উপর (সমস্ত) দোষ চাপিয়ে দিয়ো না, বরং দোষ নিজেদের উপরই আরোপ কর; আমি না তোমাদের সাহায্যকারী হতে পারি; না তোমরা আমার সাহায্যকারী হতে পার; আমি নিজেও তোমাদের এ কাজে অসন্তুষ্ট যে, তোমরা ইতিপূর্বে আমাকে (আল্লাহর) অংশ সাব্যস্ত করতে; নিশ্চয়ই যালিমদের জন্যে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।” আবু উসাইদ মালিক ইবনে রাবীআ (রাঃ) তার চক্ষু নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর বলেনঃ “এখনও যদি আমি তোমাদের সাথে বদর প্রান্তরে থাকতাম এবং আমার চক্ষু ঠিক থাকতো তবে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই ঐ ঘাটির খবর দিতে পারতাম যেখান দিয়ে ফেরেশতাগণ বের হয়ে এসেছিলেন। ঐ ঘাঁটি অবশ্যই আমার চেনা আছে। তাঁদেরকে ইবলীস দেখেছিল। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তাঁরা যেন মুসলমানদের যুদ্ধক্ষেত্রে স্থির ও অটল রাখেন। তারা মুসলমানদের পরিচিত লোকদের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেনঃ “তোমরা আনন্দিত হও। এ কাফিররা কিছুই নয়। তোমাদের সাথে আল্লাহর সাহায্য রয়েছে। নির্ভীকভাবে সিংহের ন্যায় আক্রমণ চালাও।” এ দেখে ইবলীস পগার পার হয়ে গেল। এতক্ষণ সে সুরাকার রূপ ধরে কাফিরদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। আবু জেহেল এ অবস্থা দেখে স্বীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে চক্কর দিতে শুরু করলো এবং তাদেরকে বলতে থাকলোঃ “তোমরা হতোদ্যম হয়ো না। সুরাকা পালিয়ে গেছে বলে মন খারাপ করো না। সে তো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট থেকে কুপরামর্শ শিখে এসেছিল যে, সুযোগ বুঝে তোমাদের মন ভেঙ্গে দেবে। ঘাবড়ানোর কোন কারণ নেই। লাত ও উযযার শপথ! আজ আমরা মুসলমানদেরকে এবং তাদের নবীকে গ্রেফতার করে ফেলবো। সুতরাং ভীরুতা প্রদর্শন করো না, বরং মনোবল বৃদ্ধি কর। কঠিন আক্রমণ চালাও। সাবধান! তাদেরকে হত্যা করো না, বরং জীবিত ধরে রাখো যেন তাদেরকে মন খুলে শাস্তি দেয়া যায়। এ লোকটাও (আবূ জেহেল) ছিল সে যুগের ফিরআউন। যাদুকরগণ ঈমান এনেছিল বলে সেও তাদেরকে বলেছিলঃ “এটা তো শুধু তোমাদের একটা চক্রান্ত ছিল যে, তোমরা আমাদেরকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেবে।” সেও যাদুকরদেরকে বলেছিলঃ “এই মূসা (আঃ) তোমাদের ওস্তাদ।" অথচ ওটা ছিল তার একটা প্রতারণা মাত্র। এই উম্মতের ফিরআউন আবূ জেহেলও এ ধরনের কথাই বলেছিল।আবদুল্লাহ ইবনে কুরায়েয (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আরাফার দিন ইবলীস যত লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও লজ্জিত হয়েছিল, আর কোন দিন এতটা হতে দেখা যায়নি। কেননা সে দেখছিল যে, আল্লাহ তা'আলার সাধারণ ক্ষমা ও সাধারণ রহমত বর্ষিত হচ্ছে। প্রত্যেকের গুনাহ প্রায়ই মাফ হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, তবে বদরের দিনে তার লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হওয়ার কথা জিজ্ঞেস করো না, যখন সে দেখলো যে, ফেরেশতাদের সেনাবাহিনী জিবরাঈল (আঃ)-এর নেতৃত্বে আসতে শুরু করেছেন সেইদিন সে সবচেয়ে বেশী লজ্জিত ও অপমানিত হয়েছিল।”(আরবী) এ আয়াত সম্পর্কে আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, উভয় সেনাবাহিনী যখন কাতারবন্দী হয়ে মুখোমুখী দাঁড়িয়ে যায় তখন আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে মুশরিকদের চক্ষে কম দেখান। তখন মুশরিকরা মুসলমানদের সম্পর্কে বিদ্রুপ করে বলেঃ “এদের দ্বীন এদেরকে প্রতারিত করেছে। তাদের একথা বলার কারণ ছিল এই যে, তারা মুসলমানদের সংখ্যা তাদের চোখে খুবই কম দেখছিল। তাই তারা ধারণা করছিল যে, নিঃসন্দেহে তারা মুসলমানদেরকে পরাজিত করবে। তারা পরস্পর বলাবলি করছিলঃ “দেখো, মুসলমানরা কত ধর্মের পাগল। মুষ্টিমেয় কয়েকটি লোক এক হাজার সৈন্যের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছে। প্রথম আক্রমণেই তারা দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাবে। আল্লাহ রাব্বল আলামীন বলেন যে, এরা হচ্ছে ভরসাকারী দল। তাদের ভরসা এমন সত্তার উপর রয়েছে যিনি বিজয়ের মালিক এবং হিকমতের মালিক। মুসলিমদের মধ্যে আল্লাহর দ্বীনের উপর দৃঢ়তা অনুভব করেই মুশরিকদের মুখে উচ্চারিত হয়েছিল যে, তারা দ্বীনের পাগল । আল্লাহর শত্রু অভিশপ্ত আবু জেহেল পাহাড়ের উপর থেকে অবজ্ঞাভরে মুসলিমদের সংখ্যার স্বল্পতা ও অস্ত্র-শস্ত্রের নগণ্যতা লক্ষ্য করতঃ গাধার মত ফুলে উঠলো এবং বলতে লাগলঃ “আল্লাহর কসম! আজ থেকে আল্লাহর ইবাদতকারী হতে জমিনকে শূন্য দেখা যাবে। এখনই আমরা তাদের এক একজনকে দু' টুকরো করে রেখে দিবো।” ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বলেন যে, মুসলিমদের ধর্মের প্রতি বিদ্রুপকারী ছিল মক্কার মুনাফেকরা। আমীর (রঃ) বলেন যে, এরা ছিল কতকগুলো লোক যারা শুধু মুখে মুসলিম হয়েছিল। কিন্তু বদরের প্রান্তরে তারা মুশরিকদের সাথে যোগ দিয়েছিল। মুসলিমদের সংখ্যার স্বল্পতা ও তাদের দুর্বলতা দেখে বিস্মিত হয়েছিল এবং বলেছিলঃ “এ লোকগুলো ধর্মের দ্বারা প্রতারিত হয়েছে।” মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা ছিল কুরায়েশদের একটি দল। তারা হচ্ছে কায়েস ইবনে অলীদ ইবনে মুগীরা, আবুল কায়েস ইবনে ফাকাহ্ ইবনে মুগীরা, হারিস ইবনে যামআ, আসওয়াদ ইবনে আবদিল মুত্তালিব, আলী ইবনে উমাইয়া ইবনে খাল্ফ এবং আস ইবনে মুনাব্বাহ ইবনে হাজ্জাজ। এ লোকগুলো কুরায়েশদের সাথে ছিল। কিন্তু তারা সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়েছিল এবং তাদের সন্দেহ তাদেরকে আবদ্ধ রেখেছিল। এখানে মুসলিমদের অবস্থা দেখে তারা বলতে শুরু করেঃ “এ লোকগুলো তো শুধু ধর্মীয় পাগল! নতুবা এই মুষ্টিমেয় রসদ ও হাতিয়ার বিহীন লোক এত শান-শওকতপূর্ণ বিরাট সেনাদলের সাথে কিভাবে যুদ্ধ করতে পারে? হাসান (রঃ) বলেন যে, এই লোকগুলো বদরের যুদ্ধে আগমন করেনি। তাদের নাম মুনাফিক রাখা হয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, তারা মুখে ইসলামের স্বীকারোক্তি করেছিল এবং তারা মক্কাতে ছিল। মুশরিকদের সাথে তারা বদর অভিমুখে রওয়ানা হয়েছিল। যখন তারা মুসলিমদের সংখ্যা খুবই কম দেখলো তখন বলতে লাগলো, এদের ধর্ম এদেরকে প্রতারিত করেছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেন যে, যারা এই মালিকুল মুলকের (আল্লাহর) উপর ভরসা করে তিনি তাদেরকে মর্যাদার অধিকারী বানিয়ে দেন। কেননা সম্মান ও মর্যাদা দানের মালিক একমাত্র তিনিই। বিজয় দান তাঁরই হাতে। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত এবং মহনি বাদশাহ। তিনি মহান বিজ্ঞানময়। তার সমস্ত কাজ হিকমতে পরিপূর্ণ। প্রত্যেক জিনিসকে তিনি যথাযোগ্য স্থানে রেখে থাকেন। যারা সাহায্য পাওয়ার যোগ্য তাদেরকেই তিনি সাহায্য করে থাকেন। আর যারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার যোগ্য তাদেরকে তিনি লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন।

আল-আনফাল 8:50

৫০-৫১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! ফেরেশতারা কত জঘন্যভাবে কাফিরদের রূহ কবয করে থাকে তা যদি তুমি দেখতে! তারা ঐ সময় কাফিরদের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে মারতে থাকে এবং বলে-“নিজেদের দুষ্কার্যের প্রতিফল হিসেবে শাস্তির স্বাদ গ্রহণ কর।” এর এক ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, এটাও বদরের দিনেরই ঘটনা। সামনের দিক থেকেই সেইদিন ঐ কাফিরদের চেহারায় তরবারীর আঘাত লাগছিল এবং যখন তারা পলায়ন করছিল তখন তাদের পিঠের উপর তলোয়ার পড়ছিল।হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমি আবু জেহেলের পিঠে কাঁটাসমূহের চিহ্ন দেখেছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এটা ফেরেশতাদের মারের চিহ্ন।” আসল কথা এই যে, এই আয়াতটি বদরের সাথে নির্দিষ্ট নয়। শব্দগুলো সাধারণ। প্রত্যেক কাফিরেরই অবস্থা এরূপ হয়ে থাকে। সূরায়ে কিতালের মধ্যেও এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে এবং সূরায়ে আনআমের .... (আরবী) (৬:৯৩)-এই আয়াতের মধ্যেও এর বর্ণনা তাফসীরসহ বর্ণিত হয়েছে। যেহেতু তারা ছিল নাফরমান লোক, সেহেতু তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের দ্বারা তাদেরকে খুবই কষ্ট দেয়া হয়। তাদের দুঙ্কার্যের কারণে তাদের রূহসমূহ তাদের দেহের মধ্যে লুকিয়ে যায়। সুতরাং ফেরেশতাগণ ওগুলো জোরপূর্বক বের করেন এবং বলেনঃ “তোমার জন্যে আল্লাহর গজব রয়েছে। যেমন বারা’ (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে যে, মৃত্যুর যাতনার সময় ঐ অশুভ অবস্থায় মৃত্যুর ফেরেশতা কাফিরের কাছে এসে বলেনঃ “হে কলুষিত আত্মা! গরম বাতাস, গরম পানি এবং গরম ছায়ার দিকে চল।” তখন ঐ আত্মা দেহের মধ্যে লুকাতে থাকে। অবশেষে ফেরেশতা কোন জীবিত মানুষের গায়ের চামড়া খুলে নেয়ার মত ঐ আত্মাকে জোরপূর্বক টেনে বের করেন এবং সাথে সাথে শিরা উপশিরাও বেরিয়ে আসে। ফেরেশতা তাকে বলেনঃ “এখন দহনের স্বাদ গ্রহণ কর। এটা তোমার পার্থিব দুষ্ককার্যাবলীর শাস্তি। আল্লাহ তাআলা বান্দাদের উপর মোটেই অত্যাচার করেন না। তিনি তো ন্যায়পরায়ণ হাকিম। তিনি কল্যাণময়, সর্বোচ্চ, অমুখাপেক্ষী, পবিত্র, মহামর্যাদা সম্পন্ন এবং প্রশংসিত। এজন্যেই সহীহ মুসলিমে আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! আমি নিজের উপর অত্যাচার হারাম করে দিয়েছি এবং তোমাদের উপরও তা হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা পরস্পর একে অপরের উপর অত্যাচার করো না। হে আমার বান্দারা! আমি তো শুধু তোমাদের কত আমলগুলোকে পরিবেষ্টন করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি কল্যাণ প্রাপ্ত হবে সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে। আর যে ব্যক্তি অন্য কিছু প্রাপ্ত হবে সে যেন নিজেকেই ভৎসনা করে।”

আল-আনফাল 8:51

৫০-৫১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! ফেরেশতারা কত জঘন্যভাবে কাফিরদের রূহ কবয করে থাকে তা যদি তুমি দেখতে! তারা ঐ সময় কাফিরদের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে মারতে থাকে এবং বলে-“নিজেদের দুষ্কার্যের প্রতিফল হিসেবে শাস্তির স্বাদ গ্রহণ কর।” এর এক ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, এটাও বদরের দিনেরই ঘটনা। সামনের দিক থেকেই সেইদিন ঐ কাফিরদের চেহারায় তরবারীর আঘাত লাগছিল এবং যখন তারা পলায়ন করছিল তখন তাদের পিঠের উপর তলোয়ার পড়ছিল।হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমি আবু জেহেলের পিঠে কাঁটাসমূহের চিহ্ন দেখেছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এটা ফেরেশতাদের মারের চিহ্ন।” আসল কথা এই যে, এই আয়াতটি বদরের সাথে নির্দিষ্ট নয়। শব্দগুলো সাধারণ। প্রত্যেক কাফিরেরই অবস্থা এরূপ হয়ে থাকে। সূরায়ে কিতালের মধ্যেও এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে এবং সূরায়ে আনআমের .... (আরবী) (৬:৯৩)-এই আয়াতের মধ্যেও এর বর্ণনা তাফসীরসহ বর্ণিত হয়েছে। যেহেতু তারা ছিল নাফরমান লোক, সেহেতু তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের দ্বারা তাদেরকে খুবই কষ্ট দেয়া হয়। তাদের দুঙ্কার্যের কারণে তাদের রূহসমূহ তাদের দেহের মধ্যে লুকিয়ে যায়। সুতরাং ফেরেশতাগণ ওগুলো জোরপূর্বক বের করেন এবং বলেনঃ “তোমার জন্যে আল্লাহর গজব রয়েছে। যেমন বারা’ (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে যে, মৃত্যুর যাতনার সময় ঐ অশুভ অবস্থায় মৃত্যুর ফেরেশতা কাফিরের কাছে এসে বলেনঃ “হে কলুষিত আত্মা! গরম বাতাস, গরম পানি এবং গরম ছায়ার দিকে চল।” তখন ঐ আত্মা দেহের মধ্যে লুকাতে থাকে। অবশেষে ফেরেশতা কোন জীবিত মানুষের গায়ের চামড়া খুলে নেয়ার মত ঐ আত্মাকে জোরপূর্বক টেনে বের করেন এবং সাথে সাথে শিরা উপশিরাও বেরিয়ে আসে। ফেরেশতা তাকে বলেনঃ “এখন দহনের স্বাদ গ্রহণ কর। এটা তোমার পার্থিব দুষ্ককার্যাবলীর শাস্তি। আল্লাহ তাআলা বান্দাদের উপর মোটেই অত্যাচার করেন না। তিনি তো ন্যায়পরায়ণ হাকিম। তিনি কল্যাণময়, সর্বোচ্চ, অমুখাপেক্ষী, পবিত্র, মহামর্যাদা সম্পন্ন এবং প্রশংসিত। এজন্যেই সহীহ মুসলিমে আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! আমি নিজের উপর অত্যাচার হারাম করে দিয়েছি এবং তোমাদের উপরও তা হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা পরস্পর একে অপরের উপর অত্যাচার করো না। হে আমার বান্দারা! আমি তো শুধু তোমাদের কত আমলগুলোকে পরিবেষ্টন করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি কল্যাণ প্রাপ্ত হবে সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে। আর যে ব্যক্তি অন্য কিছু প্রাপ্ত হবে সে যেন নিজেকেই ভৎসনা করে।”

আল-আনফাল 8:52

আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এই মুশারিকরা তোমার সাথে ঐ ব্যবহারই করছে যে ব্যবহার তাদের পূর্ববর্তী কাফির ও মুশরিকরা তাদের নবীদের সাথে করেছিল। সুতরাং আমিও এদের সাথে ঐ ব্যবহারই করেছি যে ব্যবহার এদের পূর্ববর্তীদের সাথে করেছিলাম, যারা এদের মতই ছিল। যেমন ফিরআউনের বংশ ও তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল। এই কারণে আল্লাহ তাদেরকে পাকড়াও করেছিলেন। সমস্ত শক্তির মালিক আল্লাহ এবং তার শাস্তিও খুবই কঠিন। এমন কেউ নেই যে তাঁর উপর জয়যুক্ত হতে পারে এবং এমন কেউ নেই যে তার নিকট থেকে পলায়ন করতে পারে।

আল-আনফাল 8:53

৫৩-৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলার আদল ও ইনসাফের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি তার দেয়া নিয়ামতরাশি পাপকার্যের পূর্বে তাঁর বান্দাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নেন না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- “আল্লাহ কোন কওমের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যে পর্যন্ত না তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ যখন কোন কওমের প্রতি (তাদের পাপের কারণে) অমঙ্গল পৌছানোর ইচ্ছা করেন তখন কেউই তাঁর সেই ইচ্ছাকে রদ করতে পারে না এবং তিনি ছাড়া তাদের কোন সাহায্যকারী নেই।”আল্লাহ তা'আলা ফিরআউনের বংশধর এবং তাদের মত স্বভাব বিশিষ্ট তাদের পূর্ববর্তীদের সাথে এরূপ ব্যবহারই করেছিলেন। মহান আল্লাহ তাদেরকে নিয়ামতরাজি দান করেছিলেন। কিন্তু তারা দুঙ্কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে তিনি তাদেরকে প্রদত্ত বাগান, প্রস্রবণ, ক্ষেত-খামার, কোষাগার, অট্টালিকা এবং অন্যান্য নিয়ামত যা তারা উপভোগ করছিল সবই তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে তারা নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই করেছিল। আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি মোটেই অত্যাচার করেননি।

আল-আনফাল 8:54

৫৩-৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলার আদল ও ইনসাফের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি তার দেয়া নিয়ামতরাশি পাপকার্যের পূর্বে তাঁর বান্দাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নেন না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে- “আল্লাহ কোন কওমের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যে পর্যন্ত না তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ যখন কোন কওমের প্রতি (তাদের পাপের কারণে) অমঙ্গল পৌছানোর ইচ্ছা করেন তখন কেউই তাঁর সেই ইচ্ছাকে রদ করতে পারে না এবং তিনি ছাড়া তাদের কোন সাহায্যকারী নেই।”আল্লাহ তা'আলা ফিরআউনের বংশধর এবং তাদের মত স্বভাব বিশিষ্ট তাদের পূর্ববর্তীদের সাথে এরূপ ব্যবহারই করেছিলেন। মহান আল্লাহ তাদেরকে নিয়ামতরাজি দান করেছিলেন। কিন্তু তারা দুঙ্কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে তিনি তাদেরকে প্রদত্ত বাগান, প্রস্রবণ, ক্ষেত-খামার, কোষাগার, অট্টালিকা এবং অন্যান্য নিয়ামত যা তারা উপভোগ করছিল সবই তাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে তারা নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই করেছিল। আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি মোটেই অত্যাচার করেননি।

আল-আনফাল 8:55

৫৫-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন- ভূ-পৃষ্ঠে যত প্রাণী চলাফেরা করছে ওদের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট তারাই যারা বেঈমান ও কাফির, যারা চুক্তি করে তা ভঙ্গ করে দেয়। এদিকে একটি কথা দিলো, আর ওদিকে তা থেকে ফিরে গেল। এদিকে শপথ করলো, ওদিকে তা ভেঙ্গে দিলো। তাদের না আছে আল্লাহর কোন ভয় এবং না আছে কৃত পাপের কোন পরওয়া। সুতরাং হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যখন তুমি যুদ্ধে তাদের উপর জয়যুক্ত হবে তখন তাদেরকে এমন শাস্তি দিবে যে, যেন তাদের পরবর্তী লোকেরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তারাও যেন ভয় পেয়ে যায়। তাহলে হয়তো তারা তাদের পূর্ববর্তীদের কৃত দুষ্কার্য থেকে বিরত থাকবে। [এ কথা বলেছেন ইবনে আব্বাস (রাঃ), হাসান বসরী (রঃ), যহহাক (রঃ), সুদ্দী (রঃ), আতা খুরাসানী (রঃ) এবং ইবনে উয়াইনা (রঃ)]

আল-আনফাল 8:56

৫৫-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন- ভূ-পৃষ্ঠে যত প্রাণী চলাফেরা করছে ওদের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট তারাই যারা বেঈমান ও কাফির, যারা চুক্তি করে তা ভঙ্গ করে দেয়। এদিকে একটি কথা দিলো, আর ওদিকে তা থেকে ফিরে গেল। এদিকে শপথ করলো, ওদিকে তা ভেঙ্গে দিলো। তাদের না আছে আল্লাহর কোন ভয় এবং না আছে কৃত পাপের কোন পরওয়া। সুতরাং হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যখন তুমি যুদ্ধে তাদের উপর জয়যুক্ত হবে তখন তাদেরকে এমন শাস্তি দিবে যে, যেন তাদের পরবর্তী লোকেরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তারাও যেন ভয় পেয়ে যায়। তাহলে হয়তো তারা তাদের পূর্ববর্তীদের কৃত দুষ্কার্য থেকে বিরত থাকবে। [এ কথা বলেছেন ইবনে আব্বাস (রাঃ), হাসান বসরী (রঃ), যহহাক (রঃ), সুদ্দী (রঃ), আতা খুরাসানী (রঃ) এবং ইবনে উয়াইনা (রঃ)]

আল-আনফাল 8:57

৫৫-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন- ভূ-পৃষ্ঠে যত প্রাণী চলাফেরা করছে ওদের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট তারাই যারা বেঈমান ও কাফির, যারা চুক্তি করে তা ভঙ্গ করে দেয়। এদিকে একটি কথা দিলো, আর ওদিকে তা থেকে ফিরে গেল। এদিকে শপথ করলো, ওদিকে তা ভেঙ্গে দিলো। তাদের না আছে আল্লাহর কোন ভয় এবং না আছে কৃত পাপের কোন পরওয়া। সুতরাং হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যখন তুমি যুদ্ধে তাদের উপর জয়যুক্ত হবে তখন তাদেরকে এমন শাস্তি দিবে যে, যেন তাদের পরবর্তী লোকেরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তারাও যেন ভয় পেয়ে যায়। তাহলে হয়তো তারা তাদের পূর্ববর্তীদের কৃত দুষ্কার্য থেকে বিরত থাকবে। [এ কথা বলেছেন ইবনে আব্বাস (রাঃ), হাসান বসরী (রঃ), যহহাক (রঃ), সুদ্দী (রঃ), আতা খুরাসানী (রঃ) এবং ইবনে উয়াইনা (রঃ)]

আল-আনফাল 8:58

আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেন- হে নবী! যদি কারো সাথে তোমার চুক্তি হয় এবং তোমার ভয় হয় যে, তারা এই চুক্তি ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে তবে তোমাকে এ অধিকার দেয়া হচ্ছে যে, তুমি সমতা রক্ষা করে সেই চুক্তিনামা রদ করে দিবে। এ সংবাদ তাদের কানে পৌছিয়ে দিতে হবে, যেন তারাও সন্ধির ধারণা ত্যাগ করে। কিছুদিন পূর্বেই তাদেরকে এটা অবশ্যই জানাতে হবে। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা বিশ্বাস ভঙ্গ করা পছন্দ করেন না। সুতরাং কাফিরদের সাথেও তুমি খিয়ানত করো না।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আমীর মুআবিয়া (রাঃ) স্বীয় সেনাবাহিনী রোম সীমান্তে পাঠাতে শুরু করেন, যেন সন্ধিকাল শেষ হওয়া মাত্রই আকস্মিকভাবে তাদের উপর আক্রমণ চালানো যায়। তখন একজন বৃদ্ধ স্বীয় সওয়ারীতে আরোহিত অবস্থায় বলতে বলতে আসলেন-আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সবচেয়ে বড়। ওয়াদা-অঙ্গীকার পুরো করুন, বিশ্বাস ভঙ্গ করা ঠিক নয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন কওমের সাথে চুক্তি ও অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়ে যাবে তখন কোন গিরা খুলো না ও বেঁধো না যে পর্যন্ত না চুক্তিকাল শেষ হয় কিংবা তাদেরকে জানিয়ে দিয়ে অঙ্গীকার ও চুক্তিনামা ছিড়ে ফেলা হয়। এ খবর মুআবিয়া (রাঃ)-এর কানে পৌছা মাত্রই তিনি সেনাবাহিনীকে ফিরে আসার নির্দেশ দেন। এই বৃদ্ধ লোকটি ছিলেন আমর ইবনে আমবাসা (রাঃ)। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইবনে হিব্বান (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন)সালমান ফারসী (রাঃ) একটি শহরের দুর্গের নিকট পৌছে স্বীয় সঙ্গীদেরকে বলেনঃ “আপনারা আমাকে ছেড়ে দিন, আমি ওদেরকে (ইসলামের) দাওয়াত দেবো, যেমন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দাওয়াত দিতে দেখেছি। অতঃপর তিনি তাদেরকে বললেনঃ “দেখো, আমি তোমাদের মধ্যকারই একজন ছিলাম। অতঃপর মহা মহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে ইসলামের পথ প্রদর্শন করেছেন। যদি তোমরাও মুসলমান হয়ে যাও তবে আমাদের যে হক রয়েছে তোমাদেরও সেই হক হয়ে যাবে এবং আমাদের উপর যা রয়েছে তোমাদের উপরও তাই থাকবে । আর যদি তোমরা এটা স্বীকার না কর তবে লাঞ্ছনার সাথে তোমাদেরকে জিযিয়া কর প্রদান করতে হবে। যদি তোমরা এটাও না মান তবে আমরা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করবো এ কথা তোমাদেরকে এখন থেকেই জানিয়ে দিচ্ছি। এখন আমরা ও তোমরা সমান অবস্থায় রয়েছি। আল্লাহ তা'আলা খিয়ানতকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” তিন দিন পর্যন্ত তাদেরকে এভাবেই দাওয়াত দিতে থাকেন। অবশেষে চতুর্থ দিন সকাল হওয়া মাত্রই তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে দেন। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে স্বীয় সাহায্যের মাধ্যমে জয়যুক্ত করেন।

আল-আনফাল 8:59

৫৯-৬০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ কাফিররা আমার হাত ছাড়া হয়ে যাবে এবং আমি তাদেরকে ধরতে সক্ষম নই এরূপ ধারণা যেন তারা না করে। বরং তারা সব সময় আমার ক্ষমতা ও আয়ত্তের মধ্যে রয়েছে। তারা আমাকে হারাতে পারবে না। অন্য আয়াতে রয়েছে- “যারা দুস্কার্যে লিপ্ত রয়েছে তারা কি ধারণা করেছে যে, তারা আমাকে এড়িয়ে যাবে? তারা যা ধারণা করেছে তা কতই না জঘন্য!” আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “তুমি এ ধারণা করো না যে, কাফিররা ভূ-পৃষ্ঠে (লুকিয়ে থেকে) আমাকে পরাভূত করবে, তাদের ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম এবং এটা খুবই নিকৃষ্ট স্থান।” অন্য স্থানে আল্লাহ পাক বলেনঃ “কাফিরদের শহরে (জাকজমকের সাথে) ঘুরাফিরা যেন তোমাকে প্রতারিত না করে, এটা অল্প কয়েকদিনের উপভোগ মাত্র, অতঃপর তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম এবং ওটা অতি নিকৃষ্ট বিছানা।”এরপর আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন- “তোমরা তোমাদের শক্তি মোতাবেক সদা সর্বদা ঐ কাফিরদের মুকাবিলার জন্যে প্রস্তুত থাকো। যারা যুদ্ধের ঘোড়া সংগ্রহ করতে সক্ষম তারা তা মওজুদ রাখো।" মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরে আরোহিত অবস্থায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কাফিরদের মুকাবিলা করার জন্যে যথাসাধ্য শক্তি প্রস্তুত রাখো।” এরপর তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো যে, এই শক্তি হচ্ছে তীরন্দাজী, এই শক্তি হচ্ছে তীরন্দাজী।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম আবু দাউদ (রঃ) তাখরীজ করেছেন) অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তীরন্দাজী কর এবং ঘোড়ায় সওয়ার হও (ও যুদ্ধ কর), আর তীরন্দাজী করা ঘোড়ায় সওয়ার হওয়া অপেক্ষা উত্তম।”আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঘোড়া পালনকারী তিন প্রকারের। প্রথম হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে ঘোড়া পালন করার কারণে সওয়াবের অধিকারী হয়ে থাকে। দ্বিতীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে ওর কারণে পুণ্যও লাভ করে না এবং তার পাপও হয় না। তৃতীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে ঘোড়া পালন করার কারণে পাপের অধিকারী হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি জিহাদের উদ্দেশ্যে ঘোড়া পালন করে, তার ঘোড়াটি যে চরে ফিরে খায়, এর উপর তাকে সওয়াব দেয়া হয়। এমন কি যদি ঐ ঘোড়াটি রশি ছিড়ে পালিয়ে যায় তবে ওর পদ চিহ্নের বিনিময়ে এবং ওর লাদ বা মলের বিনিময়েও সে সওয়াব প্রাপ্ত হয়। যদি ঘোড়াটি কোন নদীর পার্শ্ব দিয়ে গমনের সময় পানি পান করে নেয় তবে এ কারণেও মুজাহিদ ব্যক্তি সওয়াব প্রাপ্ত হয়, যদিও সে ওকে পানি পান করাবার ইচ্ছাও না করে থাকে। সুতরাং এ ঘোড়াটি ঐ মুজাহিদের জন্যে সওয়াব বা পুণ্য লাভের কারণ। আর যে ব্যক্তি ঘোড়া পালন করে অন্যদের থেকে অমুখাপেক্ষী থাকার জন্যে, অতঃপর সে ওর ঘাড় ও সওয়ারীর ব্যাপারে আল্লাহর হকের কথা ভুলে না যায় তবে ওটা তার জন্যে পর্দা স্বরূপ। অর্থাৎ সে ওর কারণে নেকীও পাবে না। এবং তার গুনাহও হবে না। আর যে ব্যক্তি অহংকার ও রিয়া প্রকাশের উদ্দেশ্যে ঘোড়া পালন করে যে, সে মুসলমানদের সাথে মুকাবিলা করবে, ওটা তার জন্যে পাপের বোঝা স্বরূপ।”রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে গাধা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা এ সম্পর্কে নিম্নের আয়াতটি ছাড়া আর কিছুই অবতীর্ণ করেননি। আয়াতটি হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি (দুনিয়াতে) অণু পরিমাণ নেক কাজ করবে সে তা দেখতে পাবে, আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ বদ কাজ করবে সে তা তথায় দেখতে পাবে।” (৯৯:৭-৮) (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম মালিক (রঃ) তাখরীজ করেছেন) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঘোড়া তিন প্রকারের রয়েছে। (১) রাহমানের (আল্লাহর) ঘোড়া, (২) শয়তানের ঘোড়া এবং (৩) মানুষের ঘোড়া। রাহমানের ঘোড়া হচ্ছে ঐ ঘোড়া যাকে আল্লাহর পথে বেঁধে রাখা হয়। সুতরাং ওর খড়, ওর গোবর, ওর প্রস্রাব এবং আল্লাহ যা চাইলেন তা তিনি বর্ণনা করলেন (অর্থাৎ সবগুলো আল্লাহর পথে)। আর শয়তানের ঘোড়া হচ্ছে ঐ ঘোড়া যাকে ঘোড় দৌড় ও জুয়াবাজীর উদ্দেশ্যে রাখা হয়। মানুষের ঘোড়া হচ্ছে ঐ ঘোড়া যাকে মানুষ শুধুমাত্র ওর পেটের উদ্দেশ্যে বেঁধে রাখে। সুতরাং ওটা হচ্ছে তার পক্ষে দারিদ্রের মুকাবিলায় পর্দা স্বরূপ।” অধিকাংশ আলেমের উক্তি এই যে, তীরন্দাজ যোদ্ধা অশ্বারোহী সৈনিক হতে উত্তম। ইমাম মালিক (রঃ) এর বিপরীত মত পোষণ করেন। কিন্তু জমহুর উলামার উক্তিটিই দৃঢ়তম। কেননা, হাদীসেও এসেছে যে, মুআবিয়া ইবনে জুরাইজ (রাঃ) আবূ যার (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন। সেই সময় তিনি তাঁর ঘোড়ার খিদমত করছিলেন। মুআবিয়া (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এ ঘোড়ার দ্বারা কি কাজ করা হয়? উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমার ধারণা, আমার পক্ষে এই ঘোড়াটির দুআ কবুল হয়েছে।” মুআবিয়া (রাঃ) আবার জিজ্ঞেস করলেন, পশুর দুআ' আবার কি? তিনি জবাবে বললেন, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! প্রতিটি ঘোড়া প্রত্যহ সকালে দুআ করে থাকে। দুআ’য় সে বলে- “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার এক বান্দার হাতে সমর্পণ করেছেন। সুতরাং আমাকে তার কাছে তার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির চেয়ে প্রিয়তম করুন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামত পর্যন্ত ঘোড়ার কপালে কল্যাণ বাঁধা থাকবে। ঘোড়া পালনকারী আল্লাহ তা'আলার সাহায্য প্রাপ্ত হয়েছে। যে ব্যক্তি ভাল নিয়তে জিহাদের উদ্দেশ্যে ঘোড়া লালন। পালন করে সে ঐ ব্যক্তির মত যে সদা সর্বদা হাত বাড়িয়ে দান খয়রাত করে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) সাহল ইবনে হানলিয়্যাহ (রঃ) হতে তাখরীজ করেছেন) এ সম্পর্কে আরো বহু হাদীস রয়েছে। সহীহ বুখারীতে ঘোড়ার কল্যাণের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে যে, ওটা হচ্ছে সওয়াব ও গনীমত। (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে- তোমরা ভয় প্রদর্শন করবে। (আরবী) আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রু অর্থাৎ কাফিরগণ।(আরবী) মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ইয়াহুদী বানু কুরাইযাকে বুঝানো হয়েছে। সুদ্দী (রঃ) এর দ্বারা পারস্যবাসীকে বুঝিয়েছেন। আর সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, এরা হচ্ছে ঘরের মধ্যে অবস্থানকারী শয়তান। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, এর দ্বারা জ্বিনদেরকে বুঝানো হয়েছে। একটি মুনকার হাদীসে রয়েছে যে, যে ঘরে কোন আযাদ ঘোড়া রয়েছে সেই ঘর কখনো বদনসীব বা হতভাগ্য হয় না। কিন্তু এ হাদীসটির সনদও ঠিক নয় এবং এটা বিশুদ্ধও নয়। এর অর্থ মুনাফিকও নেয়া হয়েছে। আর এ উক্তিটি সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্যও বটে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের চতুর্দিকে গ্রাম্য ও শহুরে মুনাফিক রয়েছে এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও কেহ কেহ মুনাফেকীতে অনঢ়, যাদেরকে তোমরা জান না বটে, কিন্তু আমি তাদেরকে ভালরূপেই জানি।” (৯:১০১)ইরশাদ হচ্ছে- জিহাদে তোমরা যা কিছু খরচ করবে তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে দেয়া হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ খরচ করে, তাদের খরচ করা ধন-সম্পদের অবস্থা এইরূপ যে, যেমন একটি শস্য-বীজ, যা হতে সাতটি শীষ উৎপন্ন হয়, প্রতিটি শীষের মধ্যে একশ’টি দানা হয়, আর এই বৃদ্ধি আল্লাহ যাকে ইচ্ছা প্রদান করেন, আল্লাহ হচ্ছেন প্রশস্ততার মালিক, মহাজ্ঞানী।” (২:২৬১)।ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রথমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শুধুমাত্র মুসলমানদেরকেই সদকার মাল প্রদানের নির্দেশ দিতেন। কিন্তু যখন আল্লাহ তাআলা (আরবী)- এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন তখন তিনি বলেনঃ “যে কোন ধর্মের লোক হাক না কেন সে তোমার কাছে চাইলে তুমি তাকে প্রদান কর।” এ রিওয়াইয়াতটি গারীব । ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন।

আল-আনফাল 8:60

৫৯-৬০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ কাফিররা আমার হাত ছাড়া হয়ে যাবে এবং আমি তাদেরকে ধরতে সক্ষম নই এরূপ ধারণা যেন তারা না করে। বরং তারা সব সময় আমার ক্ষমতা ও আয়ত্তের মধ্যে রয়েছে। তারা আমাকে হারাতে পারবে না। অন্য আয়াতে রয়েছে- “যারা দুস্কার্যে লিপ্ত রয়েছে তারা কি ধারণা করেছে যে, তারা আমাকে এড়িয়ে যাবে? তারা যা ধারণা করেছে তা কতই না জঘন্য!” আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “তুমি এ ধারণা করো না যে, কাফিররা ভূ-পৃষ্ঠে (লুকিয়ে থেকে) আমাকে পরাভূত করবে, তাদের ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম এবং এটা খুবই নিকৃষ্ট স্থান।” অন্য স্থানে আল্লাহ পাক বলেনঃ “কাফিরদের শহরে (জাকজমকের সাথে) ঘুরাফিরা যেন তোমাকে প্রতারিত না করে, এটা অল্প কয়েকদিনের উপভোগ মাত্র, অতঃপর তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম এবং ওটা অতি নিকৃষ্ট বিছানা।”এরপর আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন- “তোমরা তোমাদের শক্তি মোতাবেক সদা সর্বদা ঐ কাফিরদের মুকাবিলার জন্যে প্রস্তুত থাকো। যারা যুদ্ধের ঘোড়া সংগ্রহ করতে সক্ষম তারা তা মওজুদ রাখো।" মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরে আরোহিত অবস্থায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কাফিরদের মুকাবিলা করার জন্যে যথাসাধ্য শক্তি প্রস্তুত রাখো।” এরপর তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো যে, এই শক্তি হচ্ছে তীরন্দাজী, এই শক্তি হচ্ছে তীরন্দাজী।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) এবং ইমাম আবু দাউদ (রঃ) তাখরীজ করেছেন) অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তীরন্দাজী কর এবং ঘোড়ায় সওয়ার হও (ও যুদ্ধ কর), আর তীরন্দাজী করা ঘোড়ায় সওয়ার হওয়া অপেক্ষা উত্তম।”আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঘোড়া পালনকারী তিন প্রকারের। প্রথম হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে ঘোড়া পালন করার কারণে সওয়াবের অধিকারী হয়ে থাকে। দ্বিতীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে ওর কারণে পুণ্যও লাভ করে না এবং তার পাপও হয় না। তৃতীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে ঘোড়া পালন করার কারণে পাপের অধিকারী হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি জিহাদের উদ্দেশ্যে ঘোড়া পালন করে, তার ঘোড়াটি যে চরে ফিরে খায়, এর উপর তাকে সওয়াব দেয়া হয়। এমন কি যদি ঐ ঘোড়াটি রশি ছিড়ে পালিয়ে যায় তবে ওর পদ চিহ্নের বিনিময়ে এবং ওর লাদ বা মলের বিনিময়েও সে সওয়াব প্রাপ্ত হয়। যদি ঘোড়াটি কোন নদীর পার্শ্ব দিয়ে গমনের সময় পানি পান করে নেয় তবে এ কারণেও মুজাহিদ ব্যক্তি সওয়াব প্রাপ্ত হয়, যদিও সে ওকে পানি পান করাবার ইচ্ছাও না করে থাকে। সুতরাং এ ঘোড়াটি ঐ মুজাহিদের জন্যে সওয়াব বা পুণ্য লাভের কারণ। আর যে ব্যক্তি ঘোড়া পালন করে অন্যদের থেকে অমুখাপেক্ষী থাকার জন্যে, অতঃপর সে ওর ঘাড় ও সওয়ারীর ব্যাপারে আল্লাহর হকের কথা ভুলে না যায় তবে ওটা তার জন্যে পর্দা স্বরূপ। অর্থাৎ সে ওর কারণে নেকীও পাবে না। এবং তার গুনাহও হবে না। আর যে ব্যক্তি অহংকার ও রিয়া প্রকাশের উদ্দেশ্যে ঘোড়া পালন করে যে, সে মুসলমানদের সাথে মুকাবিলা করবে, ওটা তার জন্যে পাপের বোঝা স্বরূপ।”রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে গাধা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা এ সম্পর্কে নিম্নের আয়াতটি ছাড়া আর কিছুই অবতীর্ণ করেননি। আয়াতটি হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি (দুনিয়াতে) অণু পরিমাণ নেক কাজ করবে সে তা দেখতে পাবে, আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ বদ কাজ করবে সে তা তথায় দেখতে পাবে।” (৯৯:৭-৮) (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম মালিক (রঃ) তাখরীজ করেছেন) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঘোড়া তিন প্রকারের রয়েছে। (১) রাহমানের (আল্লাহর) ঘোড়া, (২) শয়তানের ঘোড়া এবং (৩) মানুষের ঘোড়া। রাহমানের ঘোড়া হচ্ছে ঐ ঘোড়া যাকে আল্লাহর পথে বেঁধে রাখা হয়। সুতরাং ওর খড়, ওর গোবর, ওর প্রস্রাব এবং আল্লাহ যা চাইলেন তা তিনি বর্ণনা করলেন (অর্থাৎ সবগুলো আল্লাহর পথে)। আর শয়তানের ঘোড়া হচ্ছে ঐ ঘোড়া যাকে ঘোড় দৌড় ও জুয়াবাজীর উদ্দেশ্যে রাখা হয়। মানুষের ঘোড়া হচ্ছে ঐ ঘোড়া যাকে মানুষ শুধুমাত্র ওর পেটের উদ্দেশ্যে বেঁধে রাখে। সুতরাং ওটা হচ্ছে তার পক্ষে দারিদ্রের মুকাবিলায় পর্দা স্বরূপ।” অধিকাংশ আলেমের উক্তি এই যে, তীরন্দাজ যোদ্ধা অশ্বারোহী সৈনিক হতে উত্তম। ইমাম মালিক (রঃ) এর বিপরীত মত পোষণ করেন। কিন্তু জমহুর উলামার উক্তিটিই দৃঢ়তম। কেননা, হাদীসেও এসেছে যে, মুআবিয়া ইবনে জুরাইজ (রাঃ) আবূ যার (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন। সেই সময় তিনি তাঁর ঘোড়ার খিদমত করছিলেন। মুআবিয়া (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এ ঘোড়ার দ্বারা কি কাজ করা হয়? উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমার ধারণা, আমার পক্ষে এই ঘোড়াটির দুআ কবুল হয়েছে।” মুআবিয়া (রাঃ) আবার জিজ্ঞেস করলেন, পশুর দুআ' আবার কি? তিনি জবাবে বললেন, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! প্রতিটি ঘোড়া প্রত্যহ সকালে দুআ করে থাকে। দুআ’য় সে বলে- “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার এক বান্দার হাতে সমর্পণ করেছেন। সুতরাং আমাকে তার কাছে তার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির চেয়ে প্রিয়তম করুন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামত পর্যন্ত ঘোড়ার কপালে কল্যাণ বাঁধা থাকবে। ঘোড়া পালনকারী আল্লাহ তা'আলার সাহায্য প্রাপ্ত হয়েছে। যে ব্যক্তি ভাল নিয়তে জিহাদের উদ্দেশ্যে ঘোড়া লালন। পালন করে সে ঐ ব্যক্তির মত যে সদা সর্বদা হাত বাড়িয়ে দান খয়রাত করে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) সাহল ইবনে হানলিয়্যাহ (রঃ) হতে তাখরীজ করেছেন) এ সম্পর্কে আরো বহু হাদীস রয়েছে। সহীহ বুখারীতে ঘোড়ার কল্যাণের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে যে, ওটা হচ্ছে সওয়াব ও গনীমত। (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে- তোমরা ভয় প্রদর্শন করবে। (আরবী) আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রু অর্থাৎ কাফিরগণ।(আরবী) মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ইয়াহুদী বানু কুরাইযাকে বুঝানো হয়েছে। সুদ্দী (রঃ) এর দ্বারা পারস্যবাসীকে বুঝিয়েছেন। আর সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, এরা হচ্ছে ঘরের মধ্যে অবস্থানকারী শয়তান। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, এর দ্বারা জ্বিনদেরকে বুঝানো হয়েছে। একটি মুনকার হাদীসে রয়েছে যে, যে ঘরে কোন আযাদ ঘোড়া রয়েছে সেই ঘর কখনো বদনসীব বা হতভাগ্য হয় না। কিন্তু এ হাদীসটির সনদও ঠিক নয় এবং এটা বিশুদ্ধও নয়। এর অর্থ মুনাফিকও নেয়া হয়েছে। আর এ উক্তিটি সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্যও বটে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের চতুর্দিকে গ্রাম্য ও শহুরে মুনাফিক রয়েছে এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও কেহ কেহ মুনাফেকীতে অনঢ়, যাদেরকে তোমরা জান না বটে, কিন্তু আমি তাদেরকে ভালরূপেই জানি।” (৯:১০১)ইরশাদ হচ্ছে- জিহাদে তোমরা যা কিছু খরচ করবে তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে দেয়া হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ খরচ করে, তাদের খরচ করা ধন-সম্পদের অবস্থা এইরূপ যে, যেমন একটি শস্য-বীজ, যা হতে সাতটি শীষ উৎপন্ন হয়, প্রতিটি শীষের মধ্যে একশ’টি দানা হয়, আর এই বৃদ্ধি আল্লাহ যাকে ইচ্ছা প্রদান করেন, আল্লাহ হচ্ছেন প্রশস্ততার মালিক, মহাজ্ঞানী।” (২:২৬১)।ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রথমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) শুধুমাত্র মুসলমানদেরকেই সদকার মাল প্রদানের নির্দেশ দিতেন। কিন্তু যখন আল্লাহ তাআলা (আরবী)- এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন তখন তিনি বলেনঃ “যে কোন ধর্মের লোক হাক না কেন সে তোমার কাছে চাইলে তুমি তাকে প্রদান কর।” এ রিওয়াইয়াতটি গারীব । ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন।

আল-আনফাল 8:61

৬১-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ “হে নবী! যদি তোমার মুশরিক ও কাফিরদের খিয়ানতের ভয় হয় তবে সমতা রক্ষা করে তাদেরকে চুক্তি ও সন্ধিপত্র বাতিল করে দেয়ার সংবাদ অবহিত করতঃ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দাও। অতঃপর তারা যদি যুদ্ধের প্রতি উত্তেজনা প্রকাশ করে তবে আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করতঃ যুদ্ধ শুরু করে দাও। আর যদি আবার তারা সন্ধির প্রস্তাব দেয় তবে পুনরায় সন্ধি করে নাও।” এই আয়াতের উপর আমল করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুদায়বিয়ায় মক্কার কুরায়েশদের সাথে কয়েকটি শর্তের উপর নয় বছরের মেয়াদে সন্ধি করেন। আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সত্বরই মতভেদ সৃষ্টি হবে বা অন্য কোন ব্যাপার ঘটবে। সুতরাং পারলে সন্ধিই করে নাও।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে রয়েছে)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি বানু কুরাইযার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এতে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এ সমুদয় হচ্ছে বদরের ঘটনা। ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ), আতা খুরাসানী (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রাঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সূরায়ে বারাআতের সাঈফ'-এর (আরবী) (৯:২৯) এই আয়াত দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। কিন্তু এটাও চিন্তার বিষয়। কেননা, এই আয়াতে শক্তি ও সাধ্যের উপর জিহাদের হুকুম রয়েছে। কিন্তু শক্রদের সংখ্যাধিক্যের সময় তাদের সাথে সন্ধি করে নেয়া নিঃসন্দেহে জায়েয, যেমন এই আয়াতে কারীমায় রয়েছে এবং যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুদায়বিয়ার দিন করেছিলেন। সুতরাং কোন বৈপরীত্য, কোন বিশেষত্ব এবং কোন রহিতকরণ নেই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী, আল্লাহর উপর ভরসা কর, তিনিই তোমার জন্যে যথেষ্ট। তিনিই তোমার সাহায্যকারী। যদি এ মুশরিকরা তোমার সাথে প্রতারণা করে এই সন্ধির মধ্যে নিজেদের শান শওকত ও যুদ্ধাস্ত্র বৃদ্ধি করে তবে তুমি নিশ্চিন্ত থাকবে। আল্লাহ তোমার পক্ষ অবলম্বন করবেন। তোমার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। তাঁর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কেউই নেই।”এরপর আল্লাহ তা'আলা নিজের বড় নিয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলছেন- “আমি স্বীয় ফল ও করমে মুহাজির ও আনসারদের মাধ্যমে তোমার সাহায্য করেছি। তাদেরকে তোমার প্রতি ঈমান আনার ও তোমার আনুগত্য করার তাওফীক দান করেছি। তুমি যদি সারা দুনিয়ার ধন ভাণ্ডারও ব্যয় করে দিতে তবুও তাদের মধ্যে সেই প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করতে পারতে না যা আল্লাহ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাদের পুরাতন শক্রতা দূর করে দিয়েছেন। আউস ও খাযরাজ নামক আনসারদের দু'টি গোত্রের মধ্যে অজ্ঞতার যুগে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকতো। তারা সবসময় কাটাকাটি মারামারি করতো। ঈমানের আলো তাদের সেই শক্রতাকে বন্ধুত্বে পরিণত করে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের কথা স্মরণ কর যা তোমাদের উপর রয়েছে, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন, ফলে তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গিয়েছে, আর তোমরা জাহান্নামের গর্তের তীরে ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন, এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় বিধানসমূহ পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে থাকেন, যেন তোমরা (সঠিক) পথে থাকো।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হুনায়েনের যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টন করার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনসারদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে আনসারের দল! আমি কি তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট অবস্থায় পেয়ে আল্লাহর অনুগ্রহে। সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করিনি? তোমরা দরিদ্র ছিলে, অতঃপর আমার মাধ্যমে আল্লাহ কি তোমাদেরকে সম্পদশালী করেননি? তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলে, তারপর আমার মাধ্যমে কি আল্লাহ তোমাদের পরস্পরের মধ্যে মিলন ঘটাননি? “এভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তরে আনসারগণ বলতেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমাদের উপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর ইহসান এর চেয়েও বেশী রয়েছে। মোটকথা, আল্লাহ তাআলা স্বীয় ইনআ'ম ও ইকরামের বর্ণনা দেয়ার পর তাঁর মর্যাদা ও নৈপুণ্যের বর্ণনা দিয়েছেন যে, তিনি মহান ও সর্বোচ্চ এবং যে ব্যক্তি তার রহমতের আশা রাখে সে নিরাশ হয় না। যে তাঁর উপর ভরসা করে তার ইহজীবন ও পরজীবন সুখময় হয়। তিনি স্বীয় কাজেকর্মে ও হুকুম দানে মহাজ্ঞানী ও বিজ্ঞানময়। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হয় এবং নিয়ামতের প্রতিও কৃতঘ্নতা দেখা যায়, কিন্তু অন্তরের মিল মহব্বতের মত আর কিছুই দেখা যায়নি। আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী! তুমি যদি দুনিয়ার ধনভাণ্ডারও শেষ করতে তবুও তোমার এ শক্তি ছিল না যে, তুমি তাদের অন্তরে প্রেম-প্রীতি ও ভালবাসা সৃষ্টি করবে।” কবি বলেনঃ “তোমাকে প্রতারণাকারী এবং তোমার প্রতি অশ্রুক্ষেপকারী তোমার আত্মীয় নয়, বরং তোমার প্রকৃত আত্মীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে তোমার আহ্বানে সাভা দেয় এবং তোমার শত্রুকে দমন করার কাজে তোমাকে সহায়তা করে।” অনুরূপভাবে অন্য এক কবি বলেনঃ “আমি লোকদের সাথে মেলামেশা করে তাদেরকে পরীক্ষা করেছি এবং বুঝেছি যে, অন্তরের মিল আত্মীয়তার চেয়েও বড়।” ইমাম বায়হাকী (রঃ) বলেনঃ “এসব উক্তি ইবনে আব্বাসেরই (রাঃ) না কি তাঁর পরবর্তী অন্য কোন বর্ণনাকারীর তা আমার জানা নেই।” ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, তাদের এ মহব্বত ছিল আল্লাহর পথে এবং সেটা ছিল তাওহীদ ও সুন্নাহর ভিত্তির উপর। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিন্ন হয়ে যায় এবং ইহসানেরও না শুকরী করা হয়, কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে অন্তরকে যে মিলিয়ে দেয়া হয় তা কেউই পৃথক করতে পারে না। অতঃপর তিনি .... (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন।আবদা ইবনে আবি লুবাবা (রঃ) বলেন, একদা মুজাহিদ (রঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমার সাথে মুসাফাহা (কর মর্দন) করে বলেনঃ “আল্লাহর পথে মহব্বতকারী দু'টি লোক যখন পরস্পর মিলিত হয় এবং হাসিমুখে একে অপরের হাতে হাত মিলায়, তখন গাছের শুষ্ক পাতা ঝরে পড়ার মত তাদের উভয়ের পাপরাশি ঝরে পড়ে। তার এ কথা শুনে আমি বললাম, এটা তো খুবই সহজ কাজ। তখন তিনি বললেন, এ কথা বলো না। এটা হচ্ছে সেই মহব্বত যে সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেনঃ “(হে নবী)! তুমি যদি সারা দুনিয়ার ধন ভাণ্ডারও খরচ করে দাও তবুও তোমার সাধ্য নেই যে, তুমি তাদের অন্তরে মহব্বত বা প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করতে পার।” তাঁর এ কথা শুনে আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে গেল যে, তিনি আমার চেয়ে অনেক বেশী বুদ্ধিমান। ওয়ালীদ ইবনে আবি মুগীস (রঃ) বলেনঃ “আমি মুজাহিদ (রঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, যখন দু’জন মুসলমান পরস্পর মিলিত হয় ও মুসাফাহা করে তখন তাদের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি- শুধু মুসাফাহা করলেই কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ “তুমি কি আল্লাহর এই কথা শুননি?” অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন। তখন আমি বলি, আপনি আমার চেয়ে বড় আলেম। উমাইর ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, মানুষের মধ্য থেকে প্রথম যে জিনিস উঠে যাবে তা হচ্ছে মহব্বত বা ভালবাসা। তিবরানী (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে সালমান ফারসী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন মুসলমান তার কোন মুসলমান ভাইয়ের সাথে মিলিত হয়, অতঃপর তার সাথে মুসাফাহা করে তখন তাদের দুজনের গুনাহ এমনভাবে ঝরে পড়ে যেমনভাবে প্রবল বাতাসের দিনে গাছের শুষ্ক পাতাগুলো ঝরে যায়। তাদের সমস্ত গুনাহ্ মাফ করে দেয়া হয় যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমানও হয়।”

আল-আনফাল 8:62

৬১-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ “হে নবী! যদি তোমার মুশরিক ও কাফিরদের খিয়ানতের ভয় হয় তবে সমতা রক্ষা করে তাদেরকে চুক্তি ও সন্ধিপত্র বাতিল করে দেয়ার সংবাদ অবহিত করতঃ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দাও। অতঃপর তারা যদি যুদ্ধের প্রতি উত্তেজনা প্রকাশ করে তবে আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করতঃ যুদ্ধ শুরু করে দাও। আর যদি আবার তারা সন্ধির প্রস্তাব দেয় তবে পুনরায় সন্ধি করে নাও।” এই আয়াতের উপর আমল করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুদায়বিয়ায় মক্কার কুরায়েশদের সাথে কয়েকটি শর্তের উপর নয় বছরের মেয়াদে সন্ধি করেন। আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সত্বরই মতভেদ সৃষ্টি হবে বা অন্য কোন ব্যাপার ঘটবে। সুতরাং পারলে সন্ধিই করে নাও।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে রয়েছে)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি বানু কুরাইযার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এতে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এ সমুদয় হচ্ছে বদরের ঘটনা। ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ), আতা খুরাসানী (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রাঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সূরায়ে বারাআতের সাঈফ'-এর (আরবী) (৯:২৯) এই আয়াত দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। কিন্তু এটাও চিন্তার বিষয়। কেননা, এই আয়াতে শক্তি ও সাধ্যের উপর জিহাদের হুকুম রয়েছে। কিন্তু শক্রদের সংখ্যাধিক্যের সময় তাদের সাথে সন্ধি করে নেয়া নিঃসন্দেহে জায়েয, যেমন এই আয়াতে কারীমায় রয়েছে এবং যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুদায়বিয়ার দিন করেছিলেন। সুতরাং কোন বৈপরীত্য, কোন বিশেষত্ব এবং কোন রহিতকরণ নেই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী, আল্লাহর উপর ভরসা কর, তিনিই তোমার জন্যে যথেষ্ট। তিনিই তোমার সাহায্যকারী। যদি এ মুশরিকরা তোমার সাথে প্রতারণা করে এই সন্ধির মধ্যে নিজেদের শান শওকত ও যুদ্ধাস্ত্র বৃদ্ধি করে তবে তুমি নিশ্চিন্ত থাকবে। আল্লাহ তোমার পক্ষ অবলম্বন করবেন। তোমার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। তাঁর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কেউই নেই।”এরপর আল্লাহ তা'আলা নিজের বড় নিয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলছেন- “আমি স্বীয় ফল ও করমে মুহাজির ও আনসারদের মাধ্যমে তোমার সাহায্য করেছি। তাদেরকে তোমার প্রতি ঈমান আনার ও তোমার আনুগত্য করার তাওফীক দান করেছি। তুমি যদি সারা দুনিয়ার ধন ভাণ্ডারও ব্যয় করে দিতে তবুও তাদের মধ্যে সেই প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করতে পারতে না যা আল্লাহ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাদের পুরাতন শক্রতা দূর করে দিয়েছেন। আউস ও খাযরাজ নামক আনসারদের দু'টি গোত্রের মধ্যে অজ্ঞতার যুগে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকতো। তারা সবসময় কাটাকাটি মারামারি করতো। ঈমানের আলো তাদের সেই শক্রতাকে বন্ধুত্বে পরিণত করে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের কথা স্মরণ কর যা তোমাদের উপর রয়েছে, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন, ফলে তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গিয়েছে, আর তোমরা জাহান্নামের গর্তের তীরে ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন, এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় বিধানসমূহ পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে থাকেন, যেন তোমরা (সঠিক) পথে থাকো।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হুনায়েনের যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টন করার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনসারদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে আনসারের দল! আমি কি তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট অবস্থায় পেয়ে আল্লাহর অনুগ্রহে। সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করিনি? তোমরা দরিদ্র ছিলে, অতঃপর আমার মাধ্যমে আল্লাহ কি তোমাদেরকে সম্পদশালী করেননি? তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলে, তারপর আমার মাধ্যমে কি আল্লাহ তোমাদের পরস্পরের মধ্যে মিলন ঘটাননি? “এভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তরে আনসারগণ বলতেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমাদের উপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর ইহসান এর চেয়েও বেশী রয়েছে। মোটকথা, আল্লাহ তাআলা স্বীয় ইনআ'ম ও ইকরামের বর্ণনা দেয়ার পর তাঁর মর্যাদা ও নৈপুণ্যের বর্ণনা দিয়েছেন যে, তিনি মহান ও সর্বোচ্চ এবং যে ব্যক্তি তার রহমতের আশা রাখে সে নিরাশ হয় না। যে তাঁর উপর ভরসা করে তার ইহজীবন ও পরজীবন সুখময় হয়। তিনি স্বীয় কাজেকর্মে ও হুকুম দানে মহাজ্ঞানী ও বিজ্ঞানময়। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হয় এবং নিয়ামতের প্রতিও কৃতঘ্নতা দেখা যায়, কিন্তু অন্তরের মিল মহব্বতের মত আর কিছুই দেখা যায়নি। আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী! তুমি যদি দুনিয়ার ধনভাণ্ডারও শেষ করতে তবুও তোমার এ শক্তি ছিল না যে, তুমি তাদের অন্তরে প্রেম-প্রীতি ও ভালবাসা সৃষ্টি করবে।” কবি বলেনঃ “তোমাকে প্রতারণাকারী এবং তোমার প্রতি অশ্রুক্ষেপকারী তোমার আত্মীয় নয়, বরং তোমার প্রকৃত আত্মীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে তোমার আহ্বানে সাভা দেয় এবং তোমার শত্রুকে দমন করার কাজে তোমাকে সহায়তা করে।” অনুরূপভাবে অন্য এক কবি বলেনঃ “আমি লোকদের সাথে মেলামেশা করে তাদেরকে পরীক্ষা করেছি এবং বুঝেছি যে, অন্তরের মিল আত্মীয়তার চেয়েও বড়।” ইমাম বায়হাকী (রঃ) বলেনঃ “এসব উক্তি ইবনে আব্বাসেরই (রাঃ) না কি তাঁর পরবর্তী অন্য কোন বর্ণনাকারীর তা আমার জানা নেই।” ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, তাদের এ মহব্বত ছিল আল্লাহর পথে এবং সেটা ছিল তাওহীদ ও সুন্নাহর ভিত্তির উপর। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিন্ন হয়ে যায় এবং ইহসানেরও না শুকরী করা হয়, কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে অন্তরকে যে মিলিয়ে দেয়া হয় তা কেউই পৃথক করতে পারে না। অতঃপর তিনি .... (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন।আবদা ইবনে আবি লুবাবা (রঃ) বলেন, একদা মুজাহিদ (রঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমার সাথে মুসাফাহা (কর মর্দন) করে বলেনঃ “আল্লাহর পথে মহব্বতকারী দু'টি লোক যখন পরস্পর মিলিত হয় এবং হাসিমুখে একে অপরের হাতে হাত মিলায়, তখন গাছের শুষ্ক পাতা ঝরে পড়ার মত তাদের উভয়ের পাপরাশি ঝরে পড়ে। তার এ কথা শুনে আমি বললাম, এটা তো খুবই সহজ কাজ। তখন তিনি বললেন, এ কথা বলো না। এটা হচ্ছে সেই মহব্বত যে সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেনঃ “(হে নবী)! তুমি যদি সারা দুনিয়ার ধন ভাণ্ডারও খরচ করে দাও তবুও তোমার সাধ্য নেই যে, তুমি তাদের অন্তরে মহব্বত বা প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করতে পার।” তাঁর এ কথা শুনে আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে গেল যে, তিনি আমার চেয়ে অনেক বেশী বুদ্ধিমান। ওয়ালীদ ইবনে আবি মুগীস (রঃ) বলেনঃ “আমি মুজাহিদ (রঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, যখন দু’জন মুসলমান পরস্পর মিলিত হয় ও মুসাফাহা করে তখন তাদের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি- শুধু মুসাফাহা করলেই কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ “তুমি কি আল্লাহর এই কথা শুননি?” অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন। তখন আমি বলি, আপনি আমার চেয়ে বড় আলেম। উমাইর ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, মানুষের মধ্য থেকে প্রথম যে জিনিস উঠে যাবে তা হচ্ছে মহব্বত বা ভালবাসা। তিবরানী (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে সালমান ফারসী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন মুসলমান তার কোন মুসলমান ভাইয়ের সাথে মিলিত হয়, অতঃপর তার সাথে মুসাফাহা করে তখন তাদের দুজনের গুনাহ এমনভাবে ঝরে পড়ে যেমনভাবে প্রবল বাতাসের দিনে গাছের শুষ্ক পাতাগুলো ঝরে যায়। তাদের সমস্ত গুনাহ্ মাফ করে দেয়া হয় যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমানও হয়।”

আল-আনফাল 8:63

৬১-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ “হে নবী! যদি তোমার মুশরিক ও কাফিরদের খিয়ানতের ভয় হয় তবে সমতা রক্ষা করে তাদেরকে চুক্তি ও সন্ধিপত্র বাতিল করে দেয়ার সংবাদ অবহিত করতঃ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দাও। অতঃপর তারা যদি যুদ্ধের প্রতি উত্তেজনা প্রকাশ করে তবে আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করতঃ যুদ্ধ শুরু করে দাও। আর যদি আবার তারা সন্ধির প্রস্তাব দেয় তবে পুনরায় সন্ধি করে নাও।” এই আয়াতের উপর আমল করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুদায়বিয়ায় মক্কার কুরায়েশদের সাথে কয়েকটি শর্তের উপর নয় বছরের মেয়াদে সন্ধি করেন। আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সত্বরই মতভেদ সৃষ্টি হবে বা অন্য কোন ব্যাপার ঘটবে। সুতরাং পারলে সন্ধিই করে নাও।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে রয়েছে)মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি বানু কুরাইযার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এতে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এ সমুদয় হচ্ছে বদরের ঘটনা। ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ), আতা খুরাসানী (রঃ), ইকরামা (রাঃ), হাসান (রাঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সূরায়ে বারাআতের সাঈফ'-এর (আরবী) (৯:২৯) এই আয়াত দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। কিন্তু এটাও চিন্তার বিষয়। কেননা, এই আয়াতে শক্তি ও সাধ্যের উপর জিহাদের হুকুম রয়েছে। কিন্তু শক্রদের সংখ্যাধিক্যের সময় তাদের সাথে সন্ধি করে নেয়া নিঃসন্দেহে জায়েয, যেমন এই আয়াতে কারীমায় রয়েছে এবং যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুদায়বিয়ার দিন করেছিলেন। সুতরাং কোন বৈপরীত্য, কোন বিশেষত্ব এবং কোন রহিতকরণ নেই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে নবী, আল্লাহর উপর ভরসা কর, তিনিই তোমার জন্যে যথেষ্ট। তিনিই তোমার সাহায্যকারী। যদি এ মুশরিকরা তোমার সাথে প্রতারণা করে এই সন্ধির মধ্যে নিজেদের শান শওকত ও যুদ্ধাস্ত্র বৃদ্ধি করে তবে তুমি নিশ্চিন্ত থাকবে। আল্লাহ তোমার পক্ষ অবলম্বন করবেন। তোমার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। তাঁর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কেউই নেই।”এরপর আল্লাহ তা'আলা নিজের বড় নিয়ামতের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলছেন- “আমি স্বীয় ফল ও করমে মুহাজির ও আনসারদের মাধ্যমে তোমার সাহায্য করেছি। তাদেরকে তোমার প্রতি ঈমান আনার ও তোমার আনুগত্য করার তাওফীক দান করেছি। তুমি যদি সারা দুনিয়ার ধন ভাণ্ডারও ব্যয় করে দিতে তবুও তাদের মধ্যে সেই প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করতে পারতে না যা আল্লাহ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাদের পুরাতন শক্রতা দূর করে দিয়েছেন। আউস ও খাযরাজ নামক আনসারদের দু'টি গোত্রের মধ্যে অজ্ঞতার যুগে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকতো। তারা সবসময় কাটাকাটি মারামারি করতো। ঈমানের আলো তাদের সেই শক্রতাকে বন্ধুত্বে পরিণত করে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের কথা স্মরণ কর যা তোমাদের উপর রয়েছে, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন, ফলে তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গিয়েছে, আর তোমরা জাহান্নামের গর্তের তীরে ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন, এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় বিধানসমূহ পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে থাকেন, যেন তোমরা (সঠিক) পথে থাকো।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, হুনায়েনের যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টন করার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনসারদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে আনসারের দল! আমি কি তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট অবস্থায় পেয়ে আল্লাহর অনুগ্রহে। সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করিনি? তোমরা দরিদ্র ছিলে, অতঃপর আমার মাধ্যমে আল্লাহ কি তোমাদেরকে সম্পদশালী করেননি? তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলে, তারপর আমার মাধ্যমে কি আল্লাহ তোমাদের পরস্পরের মধ্যে মিলন ঘটাননি? “এভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তরে আনসারগণ বলতেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমাদের উপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর ইহসান এর চেয়েও বেশী রয়েছে। মোটকথা, আল্লাহ তাআলা স্বীয় ইনআ'ম ও ইকরামের বর্ণনা দেয়ার পর তাঁর মর্যাদা ও নৈপুণ্যের বর্ণনা দিয়েছেন যে, তিনি মহান ও সর্বোচ্চ এবং যে ব্যক্তি তার রহমতের আশা রাখে সে নিরাশ হয় না। যে তাঁর উপর ভরসা করে তার ইহজীবন ও পরজীবন সুখময় হয়। তিনি স্বীয় কাজেকর্মে ও হুকুম দানে মহাজ্ঞানী ও বিজ্ঞানময়। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হয় এবং নিয়ামতের প্রতিও কৃতঘ্নতা দেখা যায়, কিন্তু অন্তরের মিল মহব্বতের মত আর কিছুই দেখা যায়নি। আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে নবী! তুমি যদি দুনিয়ার ধনভাণ্ডারও শেষ করতে তবুও তোমার এ শক্তি ছিল না যে, তুমি তাদের অন্তরে প্রেম-প্রীতি ও ভালবাসা সৃষ্টি করবে।” কবি বলেনঃ “তোমাকে প্রতারণাকারী এবং তোমার প্রতি অশ্রুক্ষেপকারী তোমার আত্মীয় নয়, বরং তোমার প্রকৃত আত্মীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে তোমার আহ্বানে সাভা দেয় এবং তোমার শত্রুকে দমন করার কাজে তোমাকে সহায়তা করে।” অনুরূপভাবে অন্য এক কবি বলেনঃ “আমি লোকদের সাথে মেলামেশা করে তাদেরকে পরীক্ষা করেছি এবং বুঝেছি যে, অন্তরের মিল আত্মীয়তার চেয়েও বড়।” ইমাম বায়হাকী (রঃ) বলেনঃ “এসব উক্তি ইবনে আব্বাসেরই (রাঃ) না কি তাঁর পরবর্তী অন্য কোন বর্ণনাকারীর তা আমার জানা নেই।” ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, তাদের এ মহব্বত ছিল আল্লাহর পথে এবং সেটা ছিল তাওহীদ ও সুন্নাহর ভিত্তির উপর। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিন্ন হয়ে যায় এবং ইহসানেরও না শুকরী করা হয়, কিন্তু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে অন্তরকে যে মিলিয়ে দেয়া হয় তা কেউই পৃথক করতে পারে না। অতঃপর তিনি .... (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন।আবদা ইবনে আবি লুবাবা (রঃ) বলেন, একদা মুজাহিদ (রঃ)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমার সাথে মুসাফাহা (কর মর্দন) করে বলেনঃ “আল্লাহর পথে মহব্বতকারী দু'টি লোক যখন পরস্পর মিলিত হয় এবং হাসিমুখে একে অপরের হাতে হাত মিলায়, তখন গাছের শুষ্ক পাতা ঝরে পড়ার মত তাদের উভয়ের পাপরাশি ঝরে পড়ে। তার এ কথা শুনে আমি বললাম, এটা তো খুবই সহজ কাজ। তখন তিনি বললেন, এ কথা বলো না। এটা হচ্ছে সেই মহব্বত যে সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেনঃ “(হে নবী)! তুমি যদি সারা দুনিয়ার ধন ভাণ্ডারও খরচ করে দাও তবুও তোমার সাধ্য নেই যে, তুমি তাদের অন্তরে মহব্বত বা প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করতে পার।” তাঁর এ কথা শুনে আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে গেল যে, তিনি আমার চেয়ে অনেক বেশী বুদ্ধিমান। ওয়ালীদ ইবনে আবি মুগীস (রঃ) বলেনঃ “আমি মুজাহিদ (রঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, যখন দু’জন মুসলমান পরস্পর মিলিত হয় ও মুসাফাহা করে তখন তাদের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি- শুধু মুসাফাহা করলেই কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ “তুমি কি আল্লাহর এই কথা শুননি?” অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন। তখন আমি বলি, আপনি আমার চেয়ে বড় আলেম। উমাইর ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, মানুষের মধ্য থেকে প্রথম যে জিনিস উঠে যাবে তা হচ্ছে মহব্বত বা ভালবাসা। তিবরানী (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে সালমান ফারসী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন কোন মুসলমান তার কোন মুসলমান ভাইয়ের সাথে মিলিত হয়, অতঃপর তার সাথে মুসাফাহা করে তখন তাদের দুজনের গুনাহ এমনভাবে ঝরে পড়ে যেমনভাবে প্রবল বাতাসের দিনে গাছের শুষ্ক পাতাগুলো ঝরে যায়। তাদের সমস্ত গুনাহ্ মাফ করে দেয়া হয় যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমানও হয়।”

আল-আনফাল 8:64

৬৪-৬৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ) ও মুসলিমদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করছেন এবং তাদের অন্তরে প্রশান্তি দান করছেন যে, তিনি তাদেরকে শত্রুদের উপর জয়যুক্ত করবেন, যদিও তারা সংখ্যায় অধিক ও তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও বেশী, আর মুসলিমরা সংখ্যায় কম এবং তাদের যুদ্ধাস্ত্রও নগণ্য। মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ “আল্লাহই তোমার জন্যে যথেষ্ট এবং যে স্বল্প সংখ্যক মুসলিম তোমার সাথে রয়েছে তাদের দ্বারাই তুমি সফলতা লাভ করবে। এরপর আল্লাহ পাক তাঁর নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন- “তুমি মুমিনদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহ দান করতে থাক।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) সৈন্যদের শ্রেণী বিন্যাস করার সময় এবং মুকাবিলার সময় সৈন্যবাহিনীর মনে উৎসাহ-উদ্দীপনা যোগাতে থেকেছেন। বদর যুদ্ধের দিন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “উঠো, ঐ জান্নাত লাভ কর যার প্রস্থ হচ্ছে আসমান ও যমীনের সমান।” এ কথা শুনে উমায়ের ইবনে হামাম (রাঃ) বলেনঃ “প্রস্থ এতো বেশী?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ হ্যা, এতোটাই বটে।” তখন তিনি বলেনঃ “বাঃ! বাঃ!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এ কথা শুনে বলেনঃ “এ কথা তুমি কি উদ্দেশ্যে বললে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একথা এ আশায় বললাম যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকেও জান্নাত দান করবেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি যে, তুমি সত্যিই জান্নাত লাভ করবে।” তিনি তখন উঠে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হলেন এবং তরবারীর কোষ ভেঙ্গে দিলেন। অতঃপর তাঁর কাছে যা কিছু খেজুর ছিল তা খেতে শুরু করলেন। তারপর তিনি বললেনঃ “এগুলো খাওয়া পর্যন্ত আমি বিলম্ব করতে পারি না। সুতরাং তিনি ওগুলো হাত থেকে ফেলে দিলেন এবং আক্রমণে উদ্যত হয়ে সিংহের ন্যায় শত্রুদের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়লেন, আর সুতীক্ষ তরবারী দ্বারা কাফিরদেরকে হত্যা করতে করতে নিজেও শহীদ হয়ে গেলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাঁকেও সন্তুষ্ট করুন!ইবনুল মুসাইয়া (রাঃ) এবং সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াত উমার (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের সময় অবতীর্ণ হয়। ঐ সময় মুসলিমদের সংখ্যা মোট চল্লিশজন হয়েছিল। কিন্তু এ কথায় চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এটা মাদানী আয়াত । অথচ উমার (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণ হচ্ছে মক্কার ঘটনা। এটা হচ্ছে আবিসিনিয়ার হিজরতের পরের এবং মদীনায় হিজরতের পূর্বের ঘটনা। এসব বিষয় আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা মুমিনদেরকে সুসংবাদ প্রদান পূর্বক নির্দেশ দিচ্ছেন- “তোমাদের বিশজন কাফিরদের দু’শজনের উপর বিজয়ী হবে এবং একশজন এক হাজারের উপর জয়যুক্ত হবে। মোটকথা একজন মুসলিম দশজন কাফিরের উপর বিজয় লাভ করবে। অতঃপর এ হুকুম মানসূখ বা রহিত হয়ে যায়। কিন্তু সুসংবাদ বাকী রয়েছে। যখন মুসলিমদের এটা কঠিন ঠেকলো তখন আল্লাহ তাআলা তাদের উপর হুকুম হালকা করে দিলেন এবং বললেন যে, আল্লাহ তা'আলা বোঝা হালকা করে দিলেন। কিন্তু সংখ্যা যতটা কম হয়ে গেল সেই পরিমাণ ধৈর্যও কম হলো। পূর্বে হুকুম ছিল যে, বিশজন মুসলিম যেন দু’শজন কাফির থেকে পিছে না সরে। এখন এই হুকুম হলো যে, তাদের দ্বিগুণ সংখ্যা অর্থাৎ একশজন মুসলিম যেন দু’শজন কাফির থেকে পলায়ন না করে । সুতরাং পূর্বের হুকুম মুমিনদের কাছে কঠিন হওয়ার কারণে তাদের দুর্বলতা ককূল করতঃ আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর হুকুম হালকা করে দেন। অতএব যুদ্ধের ময়দানে কাফিরদের সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়া অবস্থায় মুসলিমদের পিছনে সরে যাওয়া উচিত নয়। হ্যা, তবে তাদের সংখ্যা মুসলিমদের দ্বিগুণের বেশী হলে তাদের সাথে যুদ্ধ করা মুসলিমদের উপর ওয়াজিব নয় এবং ঐ অবস্থায় তাদের পিছনে সরে যাওয়া জায়েয। (মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), হাসান (রঃ), যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এরূপই বর্ণিত হয়েছে) ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাহাবীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “পূর্বের হুকুমটি উঠে গেছে।”

আল-আনফাল 8:65

৬৪-৬৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ) ও মুসলিমদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করছেন এবং তাদের অন্তরে প্রশান্তি দান করছেন যে, তিনি তাদেরকে শত্রুদের উপর জয়যুক্ত করবেন, যদিও তারা সংখ্যায় অধিক ও তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও বেশী, আর মুসলিমরা সংখ্যায় কম এবং তাদের যুদ্ধাস্ত্রও নগণ্য। মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ “আল্লাহই তোমার জন্যে যথেষ্ট এবং যে স্বল্প সংখ্যক মুসলিম তোমার সাথে রয়েছে তাদের দ্বারাই তুমি সফলতা লাভ করবে। এরপর আল্লাহ পাক তাঁর নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন- “তুমি মুমিনদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহ দান করতে থাক।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) সৈন্যদের শ্রেণী বিন্যাস করার সময় এবং মুকাবিলার সময় সৈন্যবাহিনীর মনে উৎসাহ-উদ্দীপনা যোগাতে থেকেছেন। বদর যুদ্ধের দিন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “উঠো, ঐ জান্নাত লাভ কর যার প্রস্থ হচ্ছে আসমান ও যমীনের সমান।” এ কথা শুনে উমায়ের ইবনে হামাম (রাঃ) বলেনঃ “প্রস্থ এতো বেশী?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ হ্যা, এতোটাই বটে।” তখন তিনি বলেনঃ “বাঃ! বাঃ!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এ কথা শুনে বলেনঃ “এ কথা তুমি কি উদ্দেশ্যে বললে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একথা এ আশায় বললাম যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকেও জান্নাত দান করবেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি যে, তুমি সত্যিই জান্নাত লাভ করবে।” তিনি তখন উঠে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হলেন এবং তরবারীর কোষ ভেঙ্গে দিলেন। অতঃপর তাঁর কাছে যা কিছু খেজুর ছিল তা খেতে শুরু করলেন। তারপর তিনি বললেনঃ “এগুলো খাওয়া পর্যন্ত আমি বিলম্ব করতে পারি না। সুতরাং তিনি ওগুলো হাত থেকে ফেলে দিলেন এবং আক্রমণে উদ্যত হয়ে সিংহের ন্যায় শত্রুদের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়লেন, আর সুতীক্ষ তরবারী দ্বারা কাফিরদেরকে হত্যা করতে করতে নিজেও শহীদ হয়ে গেলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাঁকেও সন্তুষ্ট করুন!ইবনুল মুসাইয়া (রাঃ) এবং সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াত উমার (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের সময় অবতীর্ণ হয়। ঐ সময় মুসলিমদের সংখ্যা মোট চল্লিশজন হয়েছিল। কিন্তু এ কথায় চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এটা মাদানী আয়াত । অথচ উমার (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণ হচ্ছে মক্কার ঘটনা। এটা হচ্ছে আবিসিনিয়ার হিজরতের পরের এবং মদীনায় হিজরতের পূর্বের ঘটনা। এসব বিষয় আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা মুমিনদেরকে সুসংবাদ প্রদান পূর্বক নির্দেশ দিচ্ছেন- “তোমাদের বিশজন কাফিরদের দু’শজনের উপর বিজয়ী হবে এবং একশজন এক হাজারের উপর জয়যুক্ত হবে। মোটকথা একজন মুসলিম দশজন কাফিরের উপর বিজয় লাভ করবে। অতঃপর এ হুকুম মানসূখ বা রহিত হয়ে যায়। কিন্তু সুসংবাদ বাকী রয়েছে। যখন মুসলিমদের এটা কঠিন ঠেকলো তখন আল্লাহ তাআলা তাদের উপর হুকুম হালকা করে দিলেন এবং বললেন যে, আল্লাহ তা'আলা বোঝা হালকা করে দিলেন। কিন্তু সংখ্যা যতটা কম হয়ে গেল সেই পরিমাণ ধৈর্যও কম হলো। পূর্বে হুকুম ছিল যে, বিশজন মুসলিম যেন দু’শজন কাফির থেকে পিছে না সরে। এখন এই হুকুম হলো যে, তাদের দ্বিগুণ সংখ্যা অর্থাৎ একশজন মুসলিম যেন দু’শজন কাফির থেকে পলায়ন না করে । সুতরাং পূর্বের হুকুম মুমিনদের কাছে কঠিন হওয়ার কারণে তাদের দুর্বলতা ককূল করতঃ আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর হুকুম হালকা করে দেন। অতএব যুদ্ধের ময়দানে কাফিরদের সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়া অবস্থায় মুসলিমদের পিছনে সরে যাওয়া উচিত নয়। হ্যা, তবে তাদের সংখ্যা মুসলিমদের দ্বিগুণের বেশী হলে তাদের সাথে যুদ্ধ করা মুসলিমদের উপর ওয়াজিব নয় এবং ঐ অবস্থায় তাদের পিছনে সরে যাওয়া জায়েয। (মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), হাসান (রঃ), যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এরূপই বর্ণিত হয়েছে) ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাহাবীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “পূর্বের হুকুমটি উঠে গেছে।”

আল-আনফাল 8:66

৬৪-৬৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ) ও মুসলিমদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করছেন এবং তাদের অন্তরে প্রশান্তি দান করছেন যে, তিনি তাদেরকে শত্রুদের উপর জয়যুক্ত করবেন, যদিও তারা সংখ্যায় অধিক ও তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও বেশী, আর মুসলিমরা সংখ্যায় কম এবং তাদের যুদ্ধাস্ত্রও নগণ্য। মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ “আল্লাহই তোমার জন্যে যথেষ্ট এবং যে স্বল্প সংখ্যক মুসলিম তোমার সাথে রয়েছে তাদের দ্বারাই তুমি সফলতা লাভ করবে। এরপর আল্লাহ পাক তাঁর নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন- “তুমি মুমিনদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহ দান করতে থাক।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) সৈন্যদের শ্রেণী বিন্যাস করার সময় এবং মুকাবিলার সময় সৈন্যবাহিনীর মনে উৎসাহ-উদ্দীপনা যোগাতে থেকেছেন। বদর যুদ্ধের দিন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “উঠো, ঐ জান্নাত লাভ কর যার প্রস্থ হচ্ছে আসমান ও যমীনের সমান।” এ কথা শুনে উমায়ের ইবনে হামাম (রাঃ) বলেনঃ “প্রস্থ এতো বেশী?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “হ্যাঁ হ্যা, এতোটাই বটে।” তখন তিনি বলেনঃ “বাঃ! বাঃ!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এ কথা শুনে বলেনঃ “এ কথা তুমি কি উদ্দেশ্যে বললে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি একথা এ আশায় বললাম যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকেও জান্নাত দান করবেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি যে, তুমি সত্যিই জান্নাত লাভ করবে।” তিনি তখন উঠে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হলেন এবং তরবারীর কোষ ভেঙ্গে দিলেন। অতঃপর তাঁর কাছে যা কিছু খেজুর ছিল তা খেতে শুরু করলেন। তারপর তিনি বললেনঃ “এগুলো খাওয়া পর্যন্ত আমি বিলম্ব করতে পারি না। সুতরাং তিনি ওগুলো হাত থেকে ফেলে দিলেন এবং আক্রমণে উদ্যত হয়ে সিংহের ন্যায় শত্রুদের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়লেন, আর সুতীক্ষ তরবারী দ্বারা কাফিরদেরকে হত্যা করতে করতে নিজেও শহীদ হয়ে গেলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাঁকেও সন্তুষ্ট করুন!ইবনুল মুসাইয়া (রাঃ) এবং সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াত উমার (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের সময় অবতীর্ণ হয়। ঐ সময় মুসলিমদের সংখ্যা মোট চল্লিশজন হয়েছিল। কিন্তু এ কথায় চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এটা মাদানী আয়াত । অথচ উমার (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণ হচ্ছে মক্কার ঘটনা। এটা হচ্ছে আবিসিনিয়ার হিজরতের পরের এবং মদীনায় হিজরতের পূর্বের ঘটনা। এসব বিষয় আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা মুমিনদেরকে সুসংবাদ প্রদান পূর্বক নির্দেশ দিচ্ছেন- “তোমাদের বিশজন কাফিরদের দু’শজনের উপর বিজয়ী হবে এবং একশজন এক হাজারের উপর জয়যুক্ত হবে। মোটকথা একজন মুসলিম দশজন কাফিরের উপর বিজয় লাভ করবে। অতঃপর এ হুকুম মানসূখ বা রহিত হয়ে যায়। কিন্তু সুসংবাদ বাকী রয়েছে। যখন মুসলিমদের এটা কঠিন ঠেকলো তখন আল্লাহ তাআলা তাদের উপর হুকুম হালকা করে দিলেন এবং বললেন যে, আল্লাহ তা'আলা বোঝা হালকা করে দিলেন। কিন্তু সংখ্যা যতটা কম হয়ে গেল সেই পরিমাণ ধৈর্যও কম হলো। পূর্বে হুকুম ছিল যে, বিশজন মুসলিম যেন দু’শজন কাফির থেকে পিছে না সরে। এখন এই হুকুম হলো যে, তাদের দ্বিগুণ সংখ্যা অর্থাৎ একশজন মুসলিম যেন দু’শজন কাফির থেকে পলায়ন না করে । সুতরাং পূর্বের হুকুম মুমিনদের কাছে কঠিন হওয়ার কারণে তাদের দুর্বলতা ককূল করতঃ আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর হুকুম হালকা করে দেন। অতএব যুদ্ধের ময়দানে কাফিরদের সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়া অবস্থায় মুসলিমদের পিছনে সরে যাওয়া উচিত নয়। হ্যা, তবে তাদের সংখ্যা মুসলিমদের দ্বিগুণের বেশী হলে তাদের সাথে যুদ্ধ করা মুসলিমদের উপর ওয়াজিব নয় এবং ঐ অবস্থায় তাদের পিছনে সরে যাওয়া জায়েয। (মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), হাসান (রঃ), যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এরূপই বর্ণিত হয়েছে) ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাহাবীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “পূর্বের হুকুমটি উঠে গেছে।”

আল-আনফাল 8:67

৬৭-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, বদরের বন্দীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীবর্গের সাথে পরামর্শ করেন। তিনি তাদের বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা এই বন্দীদেরকে তোমাদের অধিকারে দিয়েছেন। বল, তোমাদের ইচ্ছা কি?” উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদেরকে হত্যা করা হাক।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পুনরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহ তাআলা এদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, এরা কাল পর্যন্তও তোমাদের ভাইই ছিলো।” উমার (রাঃ) দাঁড়িয়ে তাঁর উত্তরের পুনরাবৃত্তি করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবারও মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং পুনরায় ঐ কথা বললেন। এবার আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) দাড়িয়ে গিয়ে আরয করলেন- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মত এই যে, আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদের নিকট থেকে মুক্তিপণ আদায় করুন।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা থেকে চিন্তার লক্ষণ, দূরীভূত হয়। তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং মুক্তিপণ নিয়ে সকলকেই মুক্ত করে দেন। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এই সূরারই শুরুতে ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে। সহীহ মুসলিমেও এরূপ একটি হাদীস আছে যে, বদরের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের জিজ্ঞেস করেনঃ “এই বন্দীদের ব্যাপারে তোমরা কি চাও?” আবু বকর (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা তো আপনার কওমের লোক এবং আপনার পরিবারেরই মানুষ। সুতরাং এদেরকে জীবিতই ছেড়ে দেয়া হাক এবং তাওবা করিয়ে নেয়া যাক। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হয়তো কাল আল্লাহ এদের উপর দয়া করবেন।” কিন্তু উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী এবং আপনাকে দেশ থেকে বিতাড়নকারী। সুতরাং এদের গর্দান উড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দান করুন।” আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ মাঠে বহু খড়ি রয়েছে। এগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিন এবং এদেরকে এ আগুনে ফেলে দিয়ে জ্বালিয়ে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এদের কথা শুনে নীরব হয়ে যান। কাউকেও কোন জবাব না দিয়ে উঠে চলে গেলেন। এই তিন মহান ব্যক্তিরই পক্ষ অবলম্বনকারী লোক জুটে গেলেন। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) এসে বলতে লাগলেনঃ কারও কারও অন্তর দুধের চেয়েও নরম হয়ে গেছে এবং কারও কারও হৃদয় পাথরের চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে। হে আবূ বকর! তোমার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ইবরাহীম (আঃ)-এর মত। তিনি আল্লাহর নিকট আরয করেছিলেনঃ “যারা আমার অনুসরণ করেছে তারা তো আমারই লোক, আর যারা আমার অবাধ্য হয়েছে তাদের ব্যাপারেও আপনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।” হে আবূ বকর! তোমার দৃষ্টান্ত ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্তের ন্যায়ও বটে। যিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনার বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন তবে আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” হে উমার! তোমার দৃষ্টান্ত হচ্ছে মূসা (আঃ)-এর ন্যায়। তিনি বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! তাদের ধন-সম্পদ নিশ্চিহ্ন করে দিন এবং তাদের অন্তর কঠোর করে দিন, সুতরাং তারা ঈমান আনবে না যে পর্যন্ত না তারা বেদনাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে।হে আব্দুল্লাহ! তোমার দৃষ্টান্ত নূহ (আঃ)-এর ন্যায়ও বটে। তিনি বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! আপনি কাফিরদের মধ্য হতে যমীনের উপর একজনকেও অবশিষ্ট রাখবেন না।” দেখো, তোমরা এখন দারিদ্রপীড়িত। সুতরাং এই বন্দীদের। কেউই ফিদইয়া প্রদান ছাড়া মুক্তি পেতে পারে না। আর ফিদইয়া না দিলে তাদেরকে হত্যা করা হবে। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এদের থেকে সাহল ইবনে বায়যাকে বিশিষ্ট করে নিন। কেননা, সে ইসলামের আলোচনা করে থাকে।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব হয়ে যান। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি সারা দিন ভীত-সন্ত্রস্ত থাকলাম যে, না জানি আমার উপর আকাশ থেকে পাথরই বর্ষিত হয়। শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সাহীল ইবনে বায়যা ব্যতীত।” তখন আল্লাহ তা'আলা... (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম হাকিম (রঃ) এটাকে তাঁর মুসতাদরিক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, আর বলেছেন যে, এর ইসনাদ বিশুদ্ধ এবং তারা দুজন এটাকে তাখরীজ করেননি) এই কয়েদীদের মধ্যে আব্বাস (রাঃ) ছিলেন। তাঁকে একজন আনসারী গ্রেফতার করেছিলেন। এই আনসারীর ধরণা ছিল যে, তাঁকে হত্যা করা হবে। রাসূলুল্লাহও (সঃ) এ অবস্থা অবগত ছিলেন। তিনি বলেনঃ “এই চিন্তায় রাত্রে আমার ঘুম হয়নি।” উমার (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “আপনার অনুমতি হলে আমি এ ব্যাপারে আনসারদের নিকট গমন করি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অনুমতি দিলেন। সুতরাং উমার (রাঃ) আনসারদের নিকট গমন করে বললেনঃ “আব্বাস (রাঃ)-কে ছেড়ে দিন। তারা বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আমরা তাকে ছাড়বো না।” তখন উমার (রাঃ) বললেনঃ “এতেই যদি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর সন্তুষ্টি নিহিত থাকে তবুও কি ছাড়বেন না?” তারা তখন বললেনঃ “যদি এটাই হয় তবে আপনি তাঁকে নিয়ে যান। আমরা খুশী মনে তাকে ছেড়ে দিচ্ছি।” উমার (রাঃ) আব্বাস (রাঃ)-কে বললেনঃ “হে আব্বাস (রাঃ)! আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন। আল্লাহর কসম! আপনার ইসলাম গ্রহণ আমার কাছে। আমার পিতার ইসলাম গ্রহণের চাইতেও বেশী আনন্দের কারণ হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনার ইসলাম গ্রহণে খুশী হবেন।” এই সব কয়েদীর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবূ বকর (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করলেন। তখন তিনি বললেনঃ “এরা তো আমাদের গোত্রেরই লোক। সুতরাং এদেরকে ছেড়ে দিন।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) উমার (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করলে তিনি বললেনঃ “এদের সকলকেই হত্যা করে দিন।” শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) বন্দীদের কাছে মুক্তিপণ নিয়ে সকলকেই ছেড়ে দেন। আলী (রাঃ) বলেন যে, জিবরাঈল (আঃ) এসে বলেনঃ “হে রাসূল (সঃ)! আপনার সাহাবীদেরকে ইখতিয়ার দিন যে, তারা দুটোর মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণ করতে পারেন। হয় তাঁরা মুক্তিপণ নিয়ে বন্দীদেরকে ছেড়ে দিবেন, না হয় তাদেরকে হত্যা করে ফেলবেন। কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে যে, মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হলে আগামী বছর বন্দীদের সমান সংখ্যক মুসলমান শহীদ হয়ে যাবেন।” সাহাবীগণ বলেন যে, তারা প্রথমটিই গ্রহণ করলেন এবং বন্দীদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি অত্যন্ত গারীব ও দুর্বল)এই বদরী বন্দীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ হে সাহাবীর দল! যদি চাও তবে মুক্তিপণ আদায় করে তাদেরকে ছেড়ে দাও। অথবা ইচ্ছা করলে হত্যা করে দাও। কিন্তু মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিলে তাদের সমান সংখ্যক তোমাদের লোক শহীদ হয়ে যাবে।” এই সত্তরজন শহীদের মধ্যে সর্বশেষ শহীদ হচ্ছেন সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ), যিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। এই রিওয়ায়াতটি মুরসালরূপে উবাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ পাকের জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী।মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহর কিতাবে প্রথম থেকেই যদি তোমাদের জন্যে গনীমতের মাল হালাল রূপে লিপিবদ্ধ না করা হতো এবং বর্ণনা করে দেয়ার পূর্বে আমি শাস্তি প্রদান করি না- এটা যদি আমার নীতি না হতো তবে যে ফিদইয়া বা মুক্তিপণ তোমরা গ্রহণ করেছে তার কারণে আমি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করতাম। এভাবেই আল্লাহ তা'আলা ফায়সালা করে রেখেছিলেন যে, কোন বদরী সাহাবীকে তিনি শাস্তি দিবেন না। তাদের জন্যে ক্ষমা লিপিবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। উম্মুল কিতাবে তোমাদের জন্যে গনীমতের মাল হালাল বলে লিখে দেয়া হয়েছে। সুতরাং গনীমতের মাল তোমাদের জন্যে হালাল ও পবিত্র। ইচ্ছামত তোমরা তা খাও, পান কর এবং নিজেদের কাজে লাগাও।" পূর্বেই এটা লিখে দেয়া হয়েছিল যে, এই উম্মতের জন্যে এটা হালাল। এটাই ইবনে জারীর (রঃ)-এর নিকট পছন্দনীয় উক্তি। আর সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এর সাক্ষ্য মিলে। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস প্রদান করা হয়েছে যা আমার পূর্বে অন্য কোন নবীকে প্রদান করা হয়নি। (১) এক মাসের পথ পর্যন্ত ভয় ও প্রভাব দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (২) যমীনকে আমার জন্যে মসজিদ ও পবিত্র বানানো হয়েছে। (৩) গনীমতের মাল আমার জন্যে হালাল করা হয়েছে যা আমার পূর্বে আর কারো জন্যে হালাল ছিল না। (৪) আমাকে শাফাআতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। (৫) প্রত্যেক নবীকে বিশেষভাবে তাঁর নিজের কওমের কাছে প্রেরণ করা হতো। কিন্তু আমি সাধারণভাবে সকল মানবের নিকট প্রেরিত হয়েছি।”আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের ছাড়া কোন কালো মাথা বিশিষ্ট মানুষের জন্যে গনীমতের মাল হালাল করা হয়নি। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তোমরা যে গনীমতের মাল লাভ করেছো তা হালাল ও পবিত্ররূপে ভক্ষণ কর।” সাহাবীগণ কয়েদীদের নিকট থেকে মুক্তিপণ আদায় করেছিলেন । সুনানে আবি দাউদে রয়েছে যে, প্রত্যেকের নিকট থেকে চারশ করে আদায় করা হয়েছিল। সুতরাং জমহুরে উলামার মতে প্রতি যুগের ইমামের এ ইখতিয়ার রয়েছে যে, তিনি ইচ্ছা করলে বন্দী কাফিরদেরকে হত্যা করতে পারেন, যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু কুরাইযার বন্দীদেরকে হত্যা করেছিলেন। আর ইচ্ছা করলে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে পারেন, যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরী বন্দীদেরকে মুক্তিপণের বিনিময়ে আযাদ করে দিয়েছিলেন। আবার ইচ্ছা করলে মুসলমান বন্দীদের বিনিময়ে মুক্ত করে দিতে পারেন, যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাসলামা ইবনে আকওয়া গোত্রের একটি স্ত্রীলোক ও তার মেয়েকে মুশরিকদের নিকট বন্দী মুসলমানদের বিনিময়ে তাদেরকে প্রদান করেছিলেন। আর ইচ্ছা করলে ঐ বন্দীদেরকে গোলাম বানিয়ে রাখতে পারে। এটাই ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও উলামায়ে কিরামের একটি দলের মাযহাব, যদিও অন্যেরা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। এখানে এর বিস্তারিত আলোচনা করার তেমন কোন সুযোগ নেই।

আল-আনফাল 8:68

৬৭-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, বদরের বন্দীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীবর্গের সাথে পরামর্শ করেন। তিনি তাদের বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা এই বন্দীদেরকে তোমাদের অধিকারে দিয়েছেন। বল, তোমাদের ইচ্ছা কি?” উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদেরকে হত্যা করা হাক।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পুনরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহ তাআলা এদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, এরা কাল পর্যন্তও তোমাদের ভাইই ছিলো।” উমার (রাঃ) দাঁড়িয়ে তাঁর উত্তরের পুনরাবৃত্তি করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবারও মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং পুনরায় ঐ কথা বললেন। এবার আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) দাড়িয়ে গিয়ে আরয করলেন- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মত এই যে, আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদের নিকট থেকে মুক্তিপণ আদায় করুন।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা থেকে চিন্তার লক্ষণ, দূরীভূত হয়। তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং মুক্তিপণ নিয়ে সকলকেই মুক্ত করে দেন। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এই সূরারই শুরুতে ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে। সহীহ মুসলিমেও এরূপ একটি হাদীস আছে যে, বদরের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের জিজ্ঞেস করেনঃ “এই বন্দীদের ব্যাপারে তোমরা কি চাও?” আবু বকর (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা তো আপনার কওমের লোক এবং আপনার পরিবারেরই মানুষ। সুতরাং এদেরকে জীবিতই ছেড়ে দেয়া হাক এবং তাওবা করিয়ে নেয়া যাক। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হয়তো কাল আল্লাহ এদের উপর দয়া করবেন।” কিন্তু উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী এবং আপনাকে দেশ থেকে বিতাড়নকারী। সুতরাং এদের গর্দান উড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দান করুন।” আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ মাঠে বহু খড়ি রয়েছে। এগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিন এবং এদেরকে এ আগুনে ফেলে দিয়ে জ্বালিয়ে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এদের কথা শুনে নীরব হয়ে যান। কাউকেও কোন জবাব না দিয়ে উঠে চলে গেলেন। এই তিন মহান ব্যক্তিরই পক্ষ অবলম্বনকারী লোক জুটে গেলেন। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) এসে বলতে লাগলেনঃ কারও কারও অন্তর দুধের চেয়েও নরম হয়ে গেছে এবং কারও কারও হৃদয় পাথরের চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে। হে আবূ বকর! তোমার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ইবরাহীম (আঃ)-এর মত। তিনি আল্লাহর নিকট আরয করেছিলেনঃ “যারা আমার অনুসরণ করেছে তারা তো আমারই লোক, আর যারা আমার অবাধ্য হয়েছে তাদের ব্যাপারেও আপনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।” হে আবূ বকর! তোমার দৃষ্টান্ত ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্তের ন্যায়ও বটে। যিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনার বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন তবে আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” হে উমার! তোমার দৃষ্টান্ত হচ্ছে মূসা (আঃ)-এর ন্যায়। তিনি বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! তাদের ধন-সম্পদ নিশ্চিহ্ন করে দিন এবং তাদের অন্তর কঠোর করে দিন, সুতরাং তারা ঈমান আনবে না যে পর্যন্ত না তারা বেদনাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে।হে আব্দুল্লাহ! তোমার দৃষ্টান্ত নূহ (আঃ)-এর ন্যায়ও বটে। তিনি বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! আপনি কাফিরদের মধ্য হতে যমীনের উপর একজনকেও অবশিষ্ট রাখবেন না।” দেখো, তোমরা এখন দারিদ্রপীড়িত। সুতরাং এই বন্দীদের। কেউই ফিদইয়া প্রদান ছাড়া মুক্তি পেতে পারে না। আর ফিদইয়া না দিলে তাদেরকে হত্যা করা হবে। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এদের থেকে সাহল ইবনে বায়যাকে বিশিষ্ট করে নিন। কেননা, সে ইসলামের আলোচনা করে থাকে।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব হয়ে যান। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি সারা দিন ভীত-সন্ত্রস্ত থাকলাম যে, না জানি আমার উপর আকাশ থেকে পাথরই বর্ষিত হয়। শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সাহীল ইবনে বায়যা ব্যতীত।” তখন আল্লাহ তা'আলা... (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম হাকিম (রঃ) এটাকে তাঁর মুসতাদরিক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, আর বলেছেন যে, এর ইসনাদ বিশুদ্ধ এবং তারা দুজন এটাকে তাখরীজ করেননি) এই কয়েদীদের মধ্যে আব্বাস (রাঃ) ছিলেন। তাঁকে একজন আনসারী গ্রেফতার করেছিলেন। এই আনসারীর ধরণা ছিল যে, তাঁকে হত্যা করা হবে। রাসূলুল্লাহও (সঃ) এ অবস্থা অবগত ছিলেন। তিনি বলেনঃ “এই চিন্তায় রাত্রে আমার ঘুম হয়নি।” উমার (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “আপনার অনুমতি হলে আমি এ ব্যাপারে আনসারদের নিকট গমন করি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অনুমতি দিলেন। সুতরাং উমার (রাঃ) আনসারদের নিকট গমন করে বললেনঃ “আব্বাস (রাঃ)-কে ছেড়ে দিন। তারা বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আমরা তাকে ছাড়বো না।” তখন উমার (রাঃ) বললেনঃ “এতেই যদি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর সন্তুষ্টি নিহিত থাকে তবুও কি ছাড়বেন না?” তারা তখন বললেনঃ “যদি এটাই হয় তবে আপনি তাঁকে নিয়ে যান। আমরা খুশী মনে তাকে ছেড়ে দিচ্ছি।” উমার (রাঃ) আব্বাস (রাঃ)-কে বললেনঃ “হে আব্বাস (রাঃ)! আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন। আল্লাহর কসম! আপনার ইসলাম গ্রহণ আমার কাছে। আমার পিতার ইসলাম গ্রহণের চাইতেও বেশী আনন্দের কারণ হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনার ইসলাম গ্রহণে খুশী হবেন।” এই সব কয়েদীর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবূ বকর (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করলেন। তখন তিনি বললেনঃ “এরা তো আমাদের গোত্রেরই লোক। সুতরাং এদেরকে ছেড়ে দিন।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) উমার (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করলে তিনি বললেনঃ “এদের সকলকেই হত্যা করে দিন।” শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) বন্দীদের কাছে মুক্তিপণ নিয়ে সকলকেই ছেড়ে দেন। আলী (রাঃ) বলেন যে, জিবরাঈল (আঃ) এসে বলেনঃ “হে রাসূল (সঃ)! আপনার সাহাবীদেরকে ইখতিয়ার দিন যে, তারা দুটোর মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণ করতে পারেন। হয় তাঁরা মুক্তিপণ নিয়ে বন্দীদেরকে ছেড়ে দিবেন, না হয় তাদেরকে হত্যা করে ফেলবেন। কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে যে, মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হলে আগামী বছর বন্দীদের সমান সংখ্যক মুসলমান শহীদ হয়ে যাবেন।” সাহাবীগণ বলেন যে, তারা প্রথমটিই গ্রহণ করলেন এবং বন্দীদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি অত্যন্ত গারীব ও দুর্বল)এই বদরী বন্দীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ হে সাহাবীর দল! যদি চাও তবে মুক্তিপণ আদায় করে তাদেরকে ছেড়ে দাও। অথবা ইচ্ছা করলে হত্যা করে দাও। কিন্তু মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিলে তাদের সমান সংখ্যক তোমাদের লোক শহীদ হয়ে যাবে।” এই সত্তরজন শহীদের মধ্যে সর্বশেষ শহীদ হচ্ছেন সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ), যিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। এই রিওয়ায়াতটি মুরসালরূপে উবাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ পাকের জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী।মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহর কিতাবে প্রথম থেকেই যদি তোমাদের জন্যে গনীমতের মাল হালাল রূপে লিপিবদ্ধ না করা হতো এবং বর্ণনা করে দেয়ার পূর্বে আমি শাস্তি প্রদান করি না- এটা যদি আমার নীতি না হতো তবে যে ফিদইয়া বা মুক্তিপণ তোমরা গ্রহণ করেছে তার কারণে আমি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করতাম। এভাবেই আল্লাহ তা'আলা ফায়সালা করে রেখেছিলেন যে, কোন বদরী সাহাবীকে তিনি শাস্তি দিবেন না। তাদের জন্যে ক্ষমা লিপিবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। উম্মুল কিতাবে তোমাদের জন্যে গনীমতের মাল হালাল বলে লিখে দেয়া হয়েছে। সুতরাং গনীমতের মাল তোমাদের জন্যে হালাল ও পবিত্র। ইচ্ছামত তোমরা তা খাও, পান কর এবং নিজেদের কাজে লাগাও।" পূর্বেই এটা লিখে দেয়া হয়েছিল যে, এই উম্মতের জন্যে এটা হালাল। এটাই ইবনে জারীর (রঃ)-এর নিকট পছন্দনীয় উক্তি। আর সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এর সাক্ষ্য মিলে। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস প্রদান করা হয়েছে যা আমার পূর্বে অন্য কোন নবীকে প্রদান করা হয়নি। (১) এক মাসের পথ পর্যন্ত ভয় ও প্রভাব দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (২) যমীনকে আমার জন্যে মসজিদ ও পবিত্র বানানো হয়েছে। (৩) গনীমতের মাল আমার জন্যে হালাল করা হয়েছে যা আমার পূর্বে আর কারো জন্যে হালাল ছিল না। (৪) আমাকে শাফাআতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। (৫) প্রত্যেক নবীকে বিশেষভাবে তাঁর নিজের কওমের কাছে প্রেরণ করা হতো। কিন্তু আমি সাধারণভাবে সকল মানবের নিকট প্রেরিত হয়েছি।”আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের ছাড়া কোন কালো মাথা বিশিষ্ট মানুষের জন্যে গনীমতের মাল হালাল করা হয়নি। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তোমরা যে গনীমতের মাল লাভ করেছো তা হালাল ও পবিত্ররূপে ভক্ষণ কর।” সাহাবীগণ কয়েদীদের নিকট থেকে মুক্তিপণ আদায় করেছিলেন । সুনানে আবি দাউদে রয়েছে যে, প্রত্যেকের নিকট থেকে চারশ করে আদায় করা হয়েছিল। সুতরাং জমহুরে উলামার মতে প্রতি যুগের ইমামের এ ইখতিয়ার রয়েছে যে, তিনি ইচ্ছা করলে বন্দী কাফিরদেরকে হত্যা করতে পারেন, যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু কুরাইযার বন্দীদেরকে হত্যা করেছিলেন। আর ইচ্ছা করলে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে পারেন, যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরী বন্দীদেরকে মুক্তিপণের বিনিময়ে আযাদ করে দিয়েছিলেন। আবার ইচ্ছা করলে মুসলমান বন্দীদের বিনিময়ে মুক্ত করে দিতে পারেন, যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাসলামা ইবনে আকওয়া গোত্রের একটি স্ত্রীলোক ও তার মেয়েকে মুশরিকদের নিকট বন্দী মুসলমানদের বিনিময়ে তাদেরকে প্রদান করেছিলেন। আর ইচ্ছা করলে ঐ বন্দীদেরকে গোলাম বানিয়ে রাখতে পারে। এটাই ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও উলামায়ে কিরামের একটি দলের মাযহাব, যদিও অন্যেরা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। এখানে এর বিস্তারিত আলোচনা করার তেমন কোন সুযোগ নেই।

আল-আনফাল 8:69

৬৭-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, বদরের বন্দীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীবর্গের সাথে পরামর্শ করেন। তিনি তাদের বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা এই বন্দীদেরকে তোমাদের অধিকারে দিয়েছেন। বল, তোমাদের ইচ্ছা কি?” উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদেরকে হত্যা করা হাক।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পুনরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহ তাআলা এদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, এরা কাল পর্যন্তও তোমাদের ভাইই ছিলো।” উমার (রাঃ) দাঁড়িয়ে তাঁর উত্তরের পুনরাবৃত্তি করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবারও মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং পুনরায় ঐ কথা বললেন। এবার আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) দাড়িয়ে গিয়ে আরয করলেন- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার মত এই যে, আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদের নিকট থেকে মুক্তিপণ আদায় করুন।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা থেকে চিন্তার লক্ষণ, দূরীভূত হয়। তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং মুক্তিপণ নিয়ে সকলকেই মুক্ত করে দেন। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এই সূরারই শুরুতে ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে। সহীহ মুসলিমেও এরূপ একটি হাদীস আছে যে, বদরের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের জিজ্ঞেস করেনঃ “এই বন্দীদের ব্যাপারে তোমরা কি চাও?” আবু বকর (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা তো আপনার কওমের লোক এবং আপনার পরিবারেরই মানুষ। সুতরাং এদেরকে জীবিতই ছেড়ে দেয়া হাক এবং তাওবা করিয়ে নেয়া যাক। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হয়তো কাল আল্লাহ এদের উপর দয়া করবেন।” কিন্তু উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এরা আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী এবং আপনাকে দেশ থেকে বিতাড়নকারী। সুতরাং এদের গর্দান উড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দান করুন।” আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ মাঠে বহু খড়ি রয়েছে। এগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিন এবং এদেরকে এ আগুনে ফেলে দিয়ে জ্বালিয়ে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এদের কথা শুনে নীরব হয়ে যান। কাউকেও কোন জবাব না দিয়ে উঠে চলে গেলেন। এই তিন মহান ব্যক্তিরই পক্ষ অবলম্বনকারী লোক জুটে গেলেন। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) এসে বলতে লাগলেনঃ কারও কারও অন্তর দুধের চেয়েও নরম হয়ে গেছে এবং কারও কারও হৃদয় পাথরের চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে। হে আবূ বকর! তোমার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ইবরাহীম (আঃ)-এর মত। তিনি আল্লাহর নিকট আরয করেছিলেনঃ “যারা আমার অনুসরণ করেছে তারা তো আমারই লোক, আর যারা আমার অবাধ্য হয়েছে তাদের ব্যাপারেও আপনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।” হে আবূ বকর! তোমার দৃষ্টান্ত ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্তের ন্যায়ও বটে। যিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনার বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন তবে আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” হে উমার! তোমার দৃষ্টান্ত হচ্ছে মূসা (আঃ)-এর ন্যায়। তিনি বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! তাদের ধন-সম্পদ নিশ্চিহ্ন করে দিন এবং তাদের অন্তর কঠোর করে দিন, সুতরাং তারা ঈমান আনবে না যে পর্যন্ত না তারা বেদনাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে।হে আব্দুল্লাহ! তোমার দৃষ্টান্ত নূহ (আঃ)-এর ন্যায়ও বটে। তিনি বলেছিলেনঃ “হে আমার প্রভু! আপনি কাফিরদের মধ্য হতে যমীনের উপর একজনকেও অবশিষ্ট রাখবেন না।” দেখো, তোমরা এখন দারিদ্রপীড়িত। সুতরাং এই বন্দীদের। কেউই ফিদইয়া প্রদান ছাড়া মুক্তি পেতে পারে না। আর ফিদইয়া না দিলে তাদেরকে হত্যা করা হবে। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এদের থেকে সাহল ইবনে বায়যাকে বিশিষ্ট করে নিন। কেননা, সে ইসলামের আলোচনা করে থাকে।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব হয়ে যান। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি সারা দিন ভীত-সন্ত্রস্ত থাকলাম যে, না জানি আমার উপর আকাশ থেকে পাথরই বর্ষিত হয়। শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সাহীল ইবনে বায়যা ব্যতীত।” তখন আল্লাহ তা'আলা... (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম হাকিম (রঃ) এটাকে তাঁর মুসতাদরিক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, আর বলেছেন যে, এর ইসনাদ বিশুদ্ধ এবং তারা দুজন এটাকে তাখরীজ করেননি) এই কয়েদীদের মধ্যে আব্বাস (রাঃ) ছিলেন। তাঁকে একজন আনসারী গ্রেফতার করেছিলেন। এই আনসারীর ধরণা ছিল যে, তাঁকে হত্যা করা হবে। রাসূলুল্লাহও (সঃ) এ অবস্থা অবগত ছিলেন। তিনি বলেনঃ “এই চিন্তায় রাত্রে আমার ঘুম হয়নি।” উমার (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “আপনার অনুমতি হলে আমি এ ব্যাপারে আনসারদের নিকট গমন করি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে অনুমতি দিলেন। সুতরাং উমার (রাঃ) আনসারদের নিকট গমন করে বললেনঃ “আব্বাস (রাঃ)-কে ছেড়ে দিন। তারা বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আমরা তাকে ছাড়বো না।” তখন উমার (রাঃ) বললেনঃ “এতেই যদি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর সন্তুষ্টি নিহিত থাকে তবুও কি ছাড়বেন না?” তারা তখন বললেনঃ “যদি এটাই হয় তবে আপনি তাঁকে নিয়ে যান। আমরা খুশী মনে তাকে ছেড়ে দিচ্ছি।” উমার (রাঃ) আব্বাস (রাঃ)-কে বললেনঃ “হে আব্বাস (রাঃ)! আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন। আল্লাহর কসম! আপনার ইসলাম গ্রহণ আমার কাছে। আমার পিতার ইসলাম গ্রহণের চাইতেও বেশী আনন্দের কারণ হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনার ইসলাম গ্রহণে খুশী হবেন।” এই সব কয়েদীর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবূ বকর (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করলেন। তখন তিনি বললেনঃ “এরা তো আমাদের গোত্রেরই লোক। সুতরাং এদেরকে ছেড়ে দিন।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) উমার (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করলে তিনি বললেনঃ “এদের সকলকেই হত্যা করে দিন।” শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) বন্দীদের কাছে মুক্তিপণ নিয়ে সকলকেই ছেড়ে দেন। আলী (রাঃ) বলেন যে, জিবরাঈল (আঃ) এসে বলেনঃ “হে রাসূল (সঃ)! আপনার সাহাবীদেরকে ইখতিয়ার দিন যে, তারা দুটোর মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণ করতে পারেন। হয় তাঁরা মুক্তিপণ নিয়ে বন্দীদেরকে ছেড়ে দিবেন, না হয় তাদেরকে হত্যা করে ফেলবেন। কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে যে, মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হলে আগামী বছর বন্দীদের সমান সংখ্যক মুসলমান শহীদ হয়ে যাবেন।” সাহাবীগণ বলেন যে, তারা প্রথমটিই গ্রহণ করলেন এবং বন্দীদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি অত্যন্ত গারীব ও দুর্বল)এই বদরী বন্দীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ হে সাহাবীর দল! যদি চাও তবে মুক্তিপণ আদায় করে তাদেরকে ছেড়ে দাও। অথবা ইচ্ছা করলে হত্যা করে দাও। কিন্তু মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিলে তাদের সমান সংখ্যক তোমাদের লোক শহীদ হয়ে যাবে।” এই সত্তরজন শহীদের মধ্যে সর্বশেষ শহীদ হচ্ছেন সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ), যিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। এই রিওয়ায়াতটি মুরসালরূপে উবাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ পাকের জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী।মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহর কিতাবে প্রথম থেকেই যদি তোমাদের জন্যে গনীমতের মাল হালাল রূপে লিপিবদ্ধ না করা হতো এবং বর্ণনা করে দেয়ার পূর্বে আমি শাস্তি প্রদান করি না- এটা যদি আমার নীতি না হতো তবে যে ফিদইয়া বা মুক্তিপণ তোমরা গ্রহণ করেছে তার কারণে আমি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করতাম। এভাবেই আল্লাহ তা'আলা ফায়সালা করে রেখেছিলেন যে, কোন বদরী সাহাবীকে তিনি শাস্তি দিবেন না। তাদের জন্যে ক্ষমা লিপিবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। উম্মুল কিতাবে তোমাদের জন্যে গনীমতের মাল হালাল বলে লিখে দেয়া হয়েছে। সুতরাং গনীমতের মাল তোমাদের জন্যে হালাল ও পবিত্র। ইচ্ছামত তোমরা তা খাও, পান কর এবং নিজেদের কাজে লাগাও।" পূর্বেই এটা লিখে দেয়া হয়েছিল যে, এই উম্মতের জন্যে এটা হালাল। এটাই ইবনে জারীর (রঃ)-এর নিকট পছন্দনীয় উক্তি। আর সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এর সাক্ষ্য মিলে। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস প্রদান করা হয়েছে যা আমার পূর্বে অন্য কোন নবীকে প্রদান করা হয়নি। (১) এক মাসের পথ পর্যন্ত ভয় ও প্রভাব দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। (২) যমীনকে আমার জন্যে মসজিদ ও পবিত্র বানানো হয়েছে। (৩) গনীমতের মাল আমার জন্যে হালাল করা হয়েছে যা আমার পূর্বে আর কারো জন্যে হালাল ছিল না। (৪) আমাকে শাফাআতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। (৫) প্রত্যেক নবীকে বিশেষভাবে তাঁর নিজের কওমের কাছে প্রেরণ করা হতো। কিন্তু আমি সাধারণভাবে সকল মানবের নিকট প্রেরিত হয়েছি।”আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের ছাড়া কোন কালো মাথা বিশিষ্ট মানুষের জন্যে গনীমতের মাল হালাল করা হয়নি। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তোমরা যে গনীমতের মাল লাভ করেছো তা হালাল ও পবিত্ররূপে ভক্ষণ কর।” সাহাবীগণ কয়েদীদের নিকট থেকে মুক্তিপণ আদায় করেছিলেন । সুনানে আবি দাউদে রয়েছে যে, প্রত্যেকের নিকট থেকে চারশ করে আদায় করা হয়েছিল। সুতরাং জমহুরে উলামার মতে প্রতি যুগের ইমামের এ ইখতিয়ার রয়েছে যে, তিনি ইচ্ছা করলে বন্দী কাফিরদেরকে হত্যা করতে পারেন, যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানু কুরাইযার বন্দীদেরকে হত্যা করেছিলেন। আর ইচ্ছা করলে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে পারেন, যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরী বন্দীদেরকে মুক্তিপণের বিনিময়ে আযাদ করে দিয়েছিলেন। আবার ইচ্ছা করলে মুসলমান বন্দীদের বিনিময়ে মুক্ত করে দিতে পারেন, যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাসলামা ইবনে আকওয়া গোত্রের একটি স্ত্রীলোক ও তার মেয়েকে মুশরিকদের নিকট বন্দী মুসলমানদের বিনিময়ে তাদেরকে প্রদান করেছিলেন। আর ইচ্ছা করলে ঐ বন্দীদেরকে গোলাম বানিয়ে রাখতে পারে। এটাই ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও উলামায়ে কিরামের একটি দলের মাযহাব, যদিও অন্যেরা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। এখানে এর বিস্তারিত আলোচনা করার তেমন কোন সুযোগ নেই।

আল-আনফাল 8:70

৭০-৭১ নং আয়াতের তাফসীর: ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরের দিন বলেছিলেনঃ “নিশ্চিতরূপে আমি অবগত আছি যে, কোন কোন বানু হাশিমকে জোরপূর্বক এই যুদ্ধে বের করে আনা হয়েছে। আমাদের সাথে যুদ্ধ করার তাদের মোটেই ইচ্ছা ছিল না। সুতরাং বানু হাশিমকে হত্যা করো না, আবুল বাখতারী ইবনে হিশামকেও মেরে ফেলো না এবং আব্বাস ইবনে মুত্তালিবকেও হত্যা করো না। লোকেরা তাদেরকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের সাথে টেনে এনেছে।” তখন আবূ হুযাইফা ইবনে উত্মা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা আমাদের বাপদাদাদেরকে, আমাদের সন্তানদেরকে, আমাদের ভাইদেরকে এবং আমাদের আত্মীয় স্বজনদেরকে হত্যা করবো, আর আব্বাস (রাঃ)-কে ছেড়ে দেবো? আল্লাহর কসম! যদি আমি তাকে পেয়ে যাই তবে তার গর্দান উড়িয়ে দেবো।” একথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানে পৌছলে তিনি বলেন “হে আবু হাফস!” (উমার (রাঃ)-এর কুনিয়াত বা উপনাম) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচার মুখে কি তরবারীর আঘাত করা হবে?” উমার ফারূক (রাঃ) বলেনঃ “এটাই ছিল প্রথম দিন যেই দিন রাসূলুল্লাহ আমাকে আমার কুনিয়াত দ্বারা সম্বোধন করেন। তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অনুমতি হলে আমি আবূ হুযাইফা (রাঃ)-এর গর্দান উড়িয়ে দেবো। আল্লাহর কসম! সে মুনাফিক হয়ে গেছে।” আবু হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমার সেই দিনের কথার খটকা আজ পর্যন্তও রয়েছে। ঐ কথার জন্যে আমি আজও ভীত আছি। আমি তো ঐ দিনই শান্তি লাভ করবো যেই দিন আমার এই কথার কাফফারা আদায় হয়ে যাবে। আর সেই কাফফারা হচ্ছে এই যে, আমি আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যাবো।” অতঃপর তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হয়ে যান। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাঁকে সন্তুষ্ট করুন! ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যেই দিন বদরী বন্দীরা গ্রেফতার হয়ে আসে সেই রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর ঘুম হয়নি। সাহাবীগণ কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “এই কয়েদীদের মধ্য থেকে আমার চাচা আব্বাস (রাঃ)-এর কান্নাকাটির শব্দ আমার কানে আসছে।” তখন সাহাবীরা তাঁর বন্ধন খুলে দেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘুম হয়। আব্বাস (রাঃ)-কে একজন আনসারী সাহাবী গ্রেফতার করেছিলেন। তিনি খুব ধনী ছিলেন। মুক্তিপণ হিসেবে তিনি একশ আওকিয়া (এক আওকিয়ার ওজন হচ্ছে এক তোলা সাত মাশা) সোনা প্রদান করেছিলেন। কোন কোন আনসারী নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “আমরা আপনার চাচা আব্বাস (রাঃ)-কে মুক্তিপণ ছাড়াই ছেড়ে দিতে চাই।” কিন্তু সমতা কায়েমকারী নবী (সঃ) বলেনঃ “না, আল্লাহর কসম! তোমরা এক দিরহাম কম করো না। বরং পূর্ণ মুক্তিপণ আদায় করো।” কুরায়েশরা মুক্তিপণের অর্থ দিয়ে তাক পাঠিয়েছিল। প্রত্যেকই ধার্যকৃত অর্থ দিয়ে। নিজ নিজ কয়েদীকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন। আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো মুসলমানই ছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আপনার ইসলাম গ্রহণের বিষয় আমি অবগত আছি। যদি আপনার কথা সত্য হয় তবে আল্লাহ আপনাকে এর বিনিময় প্রদান করবেন। কিন্তু আহকাম বাহ্যিকের উপর জারী হয়ে থাকে বলে আপনাকে আপনার মুক্তিপণ আদায় করতেই হবে। তাছাড়া আপনার দু'ভ্রাতুস্পুত্র নওফেল ইবনে হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব ও আকীল ইবনে আবি তালিব ইবনে আবদিল মুত্তালিবের মুক্তিপণ আপনাকে আদায় করতে হবে। আরো আদায় করতে হবে আপনার মিত্র উৎবা ইবনে আমরের মুক্তিপণ, যে বানু হারিস ইবনে ফাহরের গোত্রভুক্ত।” তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে তো এতো মাল নেই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেন, আপনার ঐ মাল কোথায় গেল যা আপনি ও উম্মুল ফযল যমীনে পুঁতে রেখেছেন আর বলেছেন, “আমি যদি এই সফরে সফলকাম হই তবে এই মাল হবে বানুল ফযল, আবদুল্লাহ এবং কাসামের।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একথা শুনে আব্বাস (রাঃ) স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি জানি যে, আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল। আমার এই মাল পুঁতে রাখার ঘটনা আমি ও উম্মুল ফযল (তার স্ত্রী) ছাড়া আর কেউই জানে না! আচ্ছা, এ কাজ করুন যে, আমার নিকট থেকে আপনার সেনাবাহিনী বিশ আওকিয়া সোনা প্রাপ্ত হয়েছে, ওটাকেই আমার মুক্তিপণ হিসেবে গণ্য করা হাক।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কখনও নয়। ওটা তো আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে দান করেছেন। সুতরাং আব্বাস (রাঃ) নিজের, তাঁর দুই ভাতুস্পুত্রের এবং তাঁর মিত্রের মুক্তিপণ নিজের পক্ষ হতে আদায় করলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “তোমাদের অন্তরে কল্যাণকর কিছু রয়েছে তা যদি আল্লাহ অবগত হন তবে তোমাদের হতে (মুক্তিপণরূপে) যা কিছু নেয়া হয়েছে তা অপেক্ষা উত্তম কিছু দান করবেন।” আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার এই ঘোষণা কার্যকরী হয়েছে । আমার ইসলাম গ্রহণের কারণে আমার এই বিশ আওকিয়ার বিনিময়ে আল্লাহ আমাকে এমন বিশটি গোলাম দান করেছেন যারা সবাই ব্যবসায়ী ও সম্পদশালী । সাথে সাথে আমি এ আশাও করছি যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।” তিনি বলেনঃ ‘‘আমার ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। আমি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-কে আমার ইসলাম গ্রহণের খবর দিলাম এবং বললাম, আমার বিশ আওকিয়ার বিনিময় আমাকে দেয়া হাক। তিনি তা অস্বীকার করলেন। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যে, তিনি আমাকে আমার এই বিশ আওকিয়ার বিনিময়ে এমন বিশটি গোলাম দান করেন যারা সবাই ব্যবসায়ী।” তিনি এবং তাঁর সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “আমরা তো আপনার অহীর উপর ঈমান এনেছি, আপনার রিসালাতের আমরা সাক্ষ্য দান করছি এবং আমাদের কওমের মধ্যে আমরা আপনার মঙ্গল কামনা করেছি।” তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “সারা দুনিয়া লাভ করলেও আমি ততে খুশী হতাম না যতো খুশী হয়েছিলাম এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণে। আল্লাহর কসম! আমার নিকট থেকে মুক্তিপণ হিসেবে যা নেয়া হয়েছিল তার চেয়ে একশ গুণ বেশী আল্লাহ আমাকে প্রদান করেছেন এবং এটাও আশা করছি। যে, আমার পাপগুলোও মাফ করে দেয়া হবে।” এ আয়াতের তাফসীরে কাতাদা (রঃ) বলেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করা। হয়েছে যে, বাহরাইন থেকে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আশি হাজার পরিমাণ মাল এসে পৌঁছে তখন তিনি যোহরের সালাতের জন্যে অযু করছিলেন। অতঃপর তিনি প্রত্যেক অভিযোগকারীকেই সেই দিন ঐ মাল থেকে প্রদান করেন। এবং কোন প্রার্থনাকারীকেই বঞ্চিত করেননি। সেইদিন তিনি (যোহরের) সালাতের পূর্বেই সমস্ত মাল আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেন। আব্বাস (রাঃ)-কে তিনি ঐ মাল থেকে গ্রহণ করার নির্দেশ দেন এবং বোঝা বেঁধে নিতে বলেন। আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমার থেকে যা নেয়া হয়েছিল তার থেকে এটা বহুগুণে উত্তম এবং আমি আশা করছি যে, আমার পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া হবে।”হামীদ ইবনে হিলাল (রাঃ) বলেন যে, এই মাল ইবনে হাযরামী বাহরাইন থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। এতো মাল নবী (সঃ)-এর নিকট এর পূর্বে এবং পরে কখনো আসেনি। এ মালের পরিমাণ ছিল আশি হাজার। এ মাল চাটাইর উপর ছড়িয়ে দেয়া হয়। অতঃপর নামাযের জন্যে আযান দেয়া হয়। রাসলুল্লাহ (সঃ) আগমন করেন এবং মালের কাছে দাঁড়িয়ে যান। মসজিদের নামাযীরাও এসে পড়েন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেককে দিতে শুরু করেন। সেইদিন কোন ওজনও ছিল না এবং গণনাও ছিল না। যে আসে সেই নিয়ে যায়। তারা সবাই ইচ্ছামত নিয়ে যায়। আব্বাস (রাঃ) এসে তো চাদরের বোঝা বাঁধেন। কিন্তু উঠাতে সক্ষম না হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! একটু উঠিয়ে দিন। এতে নবী (সঃ) হেসে উঠেন, এমন কি তাঁর দাঁতের ঔজ্জ্বল্য পরিলক্ষিত হয়। তিনি তাকে বলেনঃ “কিছু কম নিন। যা উঠাতে পারবেন তাই নিন।” সুতরাং তিনি কিছু কমিয়ে নিলেন এবং তা উঠিয়ে নিয়ে বলতে বলতে গেলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। তাঁর একটি কথা তো পূর্ণ হলো। তার দ্বিতীয় ওয়াদাও ইনশাআল্লাহ পূর্ণ হয়ে যাবে (অর্থাৎ তিনি আমাকে ক্ষমা করে দিবেন)। আমার নিকট থেকে মুক্তিপণ হিসেবে যা। নেয়া হয়েছে, তার চেয়ে এটা বহুগুণে উত্তম।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ মাল বন্টন করতেই থাকেন। শেষ পর্যন্ত ঐ মালের কিছুই অবশিষ্ট থাকলো না। তিনি ঐ মাল থেকে নিজের পরিবার-পরিজনকে একটি কানাকড়িও প্রদান করলেন না। অতঃপর তিনি নামাযের জন্যে সামনে এগিয়ে যান এবং নামায পড়িয়ে দেন।এ ব্যাপারে অন্য একটি হাদীস আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বাহরাইন হতে মাল আসে। তিনি সাহাবীদেরকে বলেনঃ “এগুলো আমার মসজিদে ছড়িয়ে দাও।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অন্য সময় যে মাল এসেছিল, ওগুলোর চেয়ে এটাই ছিল অধিক মাল অর্থাৎ এর পূর্বে বা পরে এতো অধিক মাল তাঁর কাছে আসেনি। অতঃপর তিনি নামাযের জন্যে বেরিয়ে আসেন। কারো দিকে তিনি ফিরে তাকালেন না। নামায পড়িয়ে দিয়ে তিনি বসে পড়লেন। অতঃপর তিনি যাকেই দেখলেন তাকেই দিলেন। ইতিমধ্যে আব্বাস (রাঃ) এসে গেলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকেও প্রদান করুন। আমি আমার নিজের ও আকীলের মুক্তিপণ আদায় করেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “আপনি নিজের হাতেই নিয়ে নিন।" তিনি চাদরে পুটলি বাঁধলেন। কিন্তু ওটা ওজনে ভারী হয়ে যাওয়ার কারণে উঠাতে পারলেন না। সুতরাং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাউকে এটা আমার কাঁধে উঠিয়ে দিতে বলুন।” নবী (সঃ) বললেনঃ “কাউকে আমি এটা উঠিয়ে দিতে বলবো না।” তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে আপনিই উঠিয়ে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবারও অস্বীকৃতি জানালেন। কাজেই বাধ্য হয়ে তাকে কিছু কম করতেই হলো। অতঃপর তিনি ওটা কাঁধে উঠিয়ে চলতে শুরু করলেন। তাঁর এ লোভ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দিকে চেয়েই থাকলেন যে পর্যন্ত না তিনি তাঁর দৃষ্টির অন্তরাল হলেন। যখন সমস্ত মাল বন্টিত হয়ে গেল এবং একটা কড়িও বাকী থাকলো না তখন তিনি ওখান থেকে উঠলেন। ইমাম বুখারীও (রঃ) স্বীয় কিতাব সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটিকে কয়েক জায়গায় এনেছেন।আল্লাহ পাক বলেনঃ এ লোকগুলো যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে এটা কোন নতুন কথা নয়। এর পূর্বে তারা আল্লাহর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সুতরাং তাদের দ্বারা এটাও সম্ভব যে, এখন মুখে তারা যা প্রকাশ করছে, অন্তরে হয়তো এর বিপরীত কিছু গোপন করছে। এতে ঘাবড়াবার কিছুই নেই। এখন যেমন আল্লাহ তা'আলা এদেরকে তোমার ক্ষমতাধীনে রেখেছেন, এরূপই তিনি সব সময়েই করতে সক্ষম। আল্লাহর কোন কাজই কোন জ্ঞান ও হিকমত থেকে শূন্য নয়। এদের সাথে এবং সমস্ত মাখলুকের সাথে তিনি যা কিছু করেন তা নিজের চিরন্তন পূর্ণ জ্ঞান ও পূর্ণ নিপুণতার সাথেই করে থাকেন।কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি লেখক আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারাহ। এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়েছিল। আতা খুরাসানী (রঃ) বলেন যে, এটা আব্বাস (রাঃ) এবং তাঁর সাথীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন তারা বলেছিলেনঃ “আমরা আপনার মঙ্গল কামনা করতে থাকবো।” সুদ্দী (রঃ) বলেন, এটা সাধারণ এবং সবগুলোই এর অন্তর্ভুক্ত। এটা সঠিকও বটে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-আনফাল 8:71

৭০-৭১ নং আয়াতের তাফসীর: ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বদরের দিন বলেছিলেনঃ “নিশ্চিতরূপে আমি অবগত আছি যে, কোন কোন বানু হাশিমকে জোরপূর্বক এই যুদ্ধে বের করে আনা হয়েছে। আমাদের সাথে যুদ্ধ করার তাদের মোটেই ইচ্ছা ছিল না। সুতরাং বানু হাশিমকে হত্যা করো না, আবুল বাখতারী ইবনে হিশামকেও মেরে ফেলো না এবং আব্বাস ইবনে মুত্তালিবকেও হত্যা করো না। লোকেরা তাদেরকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের সাথে টেনে এনেছে।” তখন আবূ হুযাইফা ইবনে উত্মা (রাঃ) বলেনঃ “আমরা আমাদের বাপদাদাদেরকে, আমাদের সন্তানদেরকে, আমাদের ভাইদেরকে এবং আমাদের আত্মীয় স্বজনদেরকে হত্যা করবো, আর আব্বাস (রাঃ)-কে ছেড়ে দেবো? আল্লাহর কসম! যদি আমি তাকে পেয়ে যাই তবে তার গর্দান উড়িয়ে দেবো।” একথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানে পৌছলে তিনি বলেন “হে আবু হাফস!” (উমার (রাঃ)-এর কুনিয়াত বা উপনাম) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচার মুখে কি তরবারীর আঘাত করা হবে?” উমার ফারূক (রাঃ) বলেনঃ “এটাই ছিল প্রথম দিন যেই দিন রাসূলুল্লাহ আমাকে আমার কুনিয়াত দ্বারা সম্বোধন করেন। তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অনুমতি হলে আমি আবূ হুযাইফা (রাঃ)-এর গর্দান উড়িয়ে দেবো। আল্লাহর কসম! সে মুনাফিক হয়ে গেছে।” আবু হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমার সেই দিনের কথার খটকা আজ পর্যন্তও রয়েছে। ঐ কথার জন্যে আমি আজও ভীত আছি। আমি তো ঐ দিনই শান্তি লাভ করবো যেই দিন আমার এই কথার কাফফারা আদায় হয়ে যাবে। আর সেই কাফফারা হচ্ছে এই যে, আমি আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যাবো।” অতঃপর তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হয়ে যান। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাঁকে সন্তুষ্ট করুন! ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যেই দিন বদরী বন্দীরা গ্রেফতার হয়ে আসে সেই রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর ঘুম হয়নি। সাহাবীগণ কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “এই কয়েদীদের মধ্য থেকে আমার চাচা আব্বাস (রাঃ)-এর কান্নাকাটির শব্দ আমার কানে আসছে।” তখন সাহাবীরা তাঁর বন্ধন খুলে দেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘুম হয়। আব্বাস (রাঃ)-কে একজন আনসারী সাহাবী গ্রেফতার করেছিলেন। তিনি খুব ধনী ছিলেন। মুক্তিপণ হিসেবে তিনি একশ আওকিয়া (এক আওকিয়ার ওজন হচ্ছে এক তোলা সাত মাশা) সোনা প্রদান করেছিলেন। কোন কোন আনসারী নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “আমরা আপনার চাচা আব্বাস (রাঃ)-কে মুক্তিপণ ছাড়াই ছেড়ে দিতে চাই।” কিন্তু সমতা কায়েমকারী নবী (সঃ) বলেনঃ “না, আল্লাহর কসম! তোমরা এক দিরহাম কম করো না। বরং পূর্ণ মুক্তিপণ আদায় করো।” কুরায়েশরা মুক্তিপণের অর্থ দিয়ে তাক পাঠিয়েছিল। প্রত্যেকই ধার্যকৃত অর্থ দিয়ে। নিজ নিজ কয়েদীকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন। আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো মুসলমানই ছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আপনার ইসলাম গ্রহণের বিষয় আমি অবগত আছি। যদি আপনার কথা সত্য হয় তবে আল্লাহ আপনাকে এর বিনিময় প্রদান করবেন। কিন্তু আহকাম বাহ্যিকের উপর জারী হয়ে থাকে বলে আপনাকে আপনার মুক্তিপণ আদায় করতেই হবে। তাছাড়া আপনার দু'ভ্রাতুস্পুত্র নওফেল ইবনে হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব ও আকীল ইবনে আবি তালিব ইবনে আবদিল মুত্তালিবের মুক্তিপণ আপনাকে আদায় করতে হবে। আরো আদায় করতে হবে আপনার মিত্র উৎবা ইবনে আমরের মুক্তিপণ, যে বানু হারিস ইবনে ফাহরের গোত্রভুক্ত।” তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কাছে তো এতো মাল নেই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেন, আপনার ঐ মাল কোথায় গেল যা আপনি ও উম্মুল ফযল যমীনে পুঁতে রেখেছেন আর বলেছেন, “আমি যদি এই সফরে সফলকাম হই তবে এই মাল হবে বানুল ফযল, আবদুল্লাহ এবং কাসামের।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একথা শুনে আব্বাস (রাঃ) স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি জানি যে, আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল। আমার এই মাল পুঁতে রাখার ঘটনা আমি ও উম্মুল ফযল (তার স্ত্রী) ছাড়া আর কেউই জানে না! আচ্ছা, এ কাজ করুন যে, আমার নিকট থেকে আপনার সেনাবাহিনী বিশ আওকিয়া সোনা প্রাপ্ত হয়েছে, ওটাকেই আমার মুক্তিপণ হিসেবে গণ্য করা হাক।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “কখনও নয়। ওটা তো আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে দান করেছেন। সুতরাং আব্বাস (রাঃ) নিজের, তাঁর দুই ভাতুস্পুত্রের এবং তাঁর মিত্রের মুক্তিপণ নিজের পক্ষ হতে আদায় করলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “তোমাদের অন্তরে কল্যাণকর কিছু রয়েছে তা যদি আল্লাহ অবগত হন তবে তোমাদের হতে (মুক্তিপণরূপে) যা কিছু নেয়া হয়েছে তা অপেক্ষা উত্তম কিছু দান করবেন।” আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার এই ঘোষণা কার্যকরী হয়েছে । আমার ইসলাম গ্রহণের কারণে আমার এই বিশ আওকিয়ার বিনিময়ে আল্লাহ আমাকে এমন বিশটি গোলাম দান করেছেন যারা সবাই ব্যবসায়ী ও সম্পদশালী । সাথে সাথে আমি এ আশাও করছি যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।” তিনি বলেনঃ ‘‘আমার ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। আমি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-কে আমার ইসলাম গ্রহণের খবর দিলাম এবং বললাম, আমার বিশ আওকিয়ার বিনিময় আমাকে দেয়া হাক। তিনি তা অস্বীকার করলেন। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যে, তিনি আমাকে আমার এই বিশ আওকিয়ার বিনিময়ে এমন বিশটি গোলাম দান করেন যারা সবাই ব্যবসায়ী।” তিনি এবং তাঁর সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “আমরা তো আপনার অহীর উপর ঈমান এনেছি, আপনার রিসালাতের আমরা সাক্ষ্য দান করছি এবং আমাদের কওমের মধ্যে আমরা আপনার মঙ্গল কামনা করেছি।” তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “সারা দুনিয়া লাভ করলেও আমি ততে খুশী হতাম না যতো খুশী হয়েছিলাম এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণে। আল্লাহর কসম! আমার নিকট থেকে মুক্তিপণ হিসেবে যা নেয়া হয়েছিল তার চেয়ে একশ গুণ বেশী আল্লাহ আমাকে প্রদান করেছেন এবং এটাও আশা করছি। যে, আমার পাপগুলোও মাফ করে দেয়া হবে।” এ আয়াতের তাফসীরে কাতাদা (রঃ) বলেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করা। হয়েছে যে, বাহরাইন থেকে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আশি হাজার পরিমাণ মাল এসে পৌঁছে তখন তিনি যোহরের সালাতের জন্যে অযু করছিলেন। অতঃপর তিনি প্রত্যেক অভিযোগকারীকেই সেই দিন ঐ মাল থেকে প্রদান করেন। এবং কোন প্রার্থনাকারীকেই বঞ্চিত করেননি। সেইদিন তিনি (যোহরের) সালাতের পূর্বেই সমস্ত মাল আল্লাহর পথে বিলিয়ে দেন। আব্বাস (রাঃ)-কে তিনি ঐ মাল থেকে গ্রহণ করার নির্দেশ দেন এবং বোঝা বেঁধে নিতে বলেন। আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমার থেকে যা নেয়া হয়েছিল তার থেকে এটা বহুগুণে উত্তম এবং আমি আশা করছি যে, আমার পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া হবে।”হামীদ ইবনে হিলাল (রাঃ) বলেন যে, এই মাল ইবনে হাযরামী বাহরাইন থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। এতো মাল নবী (সঃ)-এর নিকট এর পূর্বে এবং পরে কখনো আসেনি। এ মালের পরিমাণ ছিল আশি হাজার। এ মাল চাটাইর উপর ছড়িয়ে দেয়া হয়। অতঃপর নামাযের জন্যে আযান দেয়া হয়। রাসলুল্লাহ (সঃ) আগমন করেন এবং মালের কাছে দাঁড়িয়ে যান। মসজিদের নামাযীরাও এসে পড়েন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেককে দিতে শুরু করেন। সেইদিন কোন ওজনও ছিল না এবং গণনাও ছিল না। যে আসে সেই নিয়ে যায়। তারা সবাই ইচ্ছামত নিয়ে যায়। আব্বাস (রাঃ) এসে তো চাদরের বোঝা বাঁধেন। কিন্তু উঠাতে সক্ষম না হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! একটু উঠিয়ে দিন। এতে নবী (সঃ) হেসে উঠেন, এমন কি তাঁর দাঁতের ঔজ্জ্বল্য পরিলক্ষিত হয়। তিনি তাকে বলেনঃ “কিছু কম নিন। যা উঠাতে পারবেন তাই নিন।” সুতরাং তিনি কিছু কমিয়ে নিলেন এবং তা উঠিয়ে নিয়ে বলতে বলতে গেলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। তাঁর একটি কথা তো পূর্ণ হলো। তার দ্বিতীয় ওয়াদাও ইনশাআল্লাহ পূর্ণ হয়ে যাবে (অর্থাৎ তিনি আমাকে ক্ষমা করে দিবেন)। আমার নিকট থেকে মুক্তিপণ হিসেবে যা। নেয়া হয়েছে, তার চেয়ে এটা বহুগুণে উত্তম।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ মাল বন্টন করতেই থাকেন। শেষ পর্যন্ত ঐ মালের কিছুই অবশিষ্ট থাকলো না। তিনি ঐ মাল থেকে নিজের পরিবার-পরিজনকে একটি কানাকড়িও প্রদান করলেন না। অতঃপর তিনি নামাযের জন্যে সামনে এগিয়ে যান এবং নামায পড়িয়ে দেন।এ ব্যাপারে অন্য একটি হাদীস আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বাহরাইন হতে মাল আসে। তিনি সাহাবীদেরকে বলেনঃ “এগুলো আমার মসজিদে ছড়িয়ে দাও।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অন্য সময় যে মাল এসেছিল, ওগুলোর চেয়ে এটাই ছিল অধিক মাল অর্থাৎ এর পূর্বে বা পরে এতো অধিক মাল তাঁর কাছে আসেনি। অতঃপর তিনি নামাযের জন্যে বেরিয়ে আসেন। কারো দিকে তিনি ফিরে তাকালেন না। নামায পড়িয়ে দিয়ে তিনি বসে পড়লেন। অতঃপর তিনি যাকেই দেখলেন তাকেই দিলেন। ইতিমধ্যে আব্বাস (রাঃ) এসে গেলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকেও প্রদান করুন। আমি আমার নিজের ও আকীলের মুক্তিপণ আদায় করেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “আপনি নিজের হাতেই নিয়ে নিন।" তিনি চাদরে পুটলি বাঁধলেন। কিন্তু ওটা ওজনে ভারী হয়ে যাওয়ার কারণে উঠাতে পারলেন না। সুতরাং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাউকে এটা আমার কাঁধে উঠিয়ে দিতে বলুন।” নবী (সঃ) বললেনঃ “কাউকে আমি এটা উঠিয়ে দিতে বলবো না।” তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে আপনিই উঠিয়ে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবারও অস্বীকৃতি জানালেন। কাজেই বাধ্য হয়ে তাকে কিছু কম করতেই হলো। অতঃপর তিনি ওটা কাঁধে উঠিয়ে চলতে শুরু করলেন। তাঁর এ লোভ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দিকে চেয়েই থাকলেন যে পর্যন্ত না তিনি তাঁর দৃষ্টির অন্তরাল হলেন। যখন সমস্ত মাল বন্টিত হয়ে গেল এবং একটা কড়িও বাকী থাকলো না তখন তিনি ওখান থেকে উঠলেন। ইমাম বুখারীও (রঃ) স্বীয় কিতাব সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটিকে কয়েক জায়গায় এনেছেন।আল্লাহ পাক বলেনঃ এ লোকগুলো যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে এটা কোন নতুন কথা নয়। এর পূর্বে তারা আল্লাহর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সুতরাং তাদের দ্বারা এটাও সম্ভব যে, এখন মুখে তারা যা প্রকাশ করছে, অন্তরে হয়তো এর বিপরীত কিছু গোপন করছে। এতে ঘাবড়াবার কিছুই নেই। এখন যেমন আল্লাহ তা'আলা এদেরকে তোমার ক্ষমতাধীনে রেখেছেন, এরূপই তিনি সব সময়েই করতে সক্ষম। আল্লাহর কোন কাজই কোন জ্ঞান ও হিকমত থেকে শূন্য নয়। এদের সাথে এবং সমস্ত মাখলুকের সাথে তিনি যা কিছু করেন তা নিজের চিরন্তন পূর্ণ জ্ঞান ও পূর্ণ নিপুণতার সাথেই করে থাকেন।কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি লেখক আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারাহ। এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়েছিল। আতা খুরাসানী (রঃ) বলেন যে, এটা আব্বাস (রাঃ) এবং তাঁর সাথীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন তারা বলেছিলেনঃ “আমরা আপনার মঙ্গল কামনা করতে থাকবো।” সুদ্দী (রঃ) বলেন, এটা সাধারণ এবং সবগুলোই এর অন্তর্ভুক্ত। এটা সঠিকও বটে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-আনফাল 8:72

এখানে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের প্রকারভেদ বর্ণনা করেছেন। প্রথম হলেন মুহাজির যারা আল্লাহর নামে স্বদেশ ত্যাগ করেছেন। তারা একমাত্র আল্লাহর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার উদ্দেশ্যে নিজেদের ঘরবাড়ী, ব্যবসা-বাণিজ্য, আত্মীয়-স্বজন এবং দোস্ত বন্ধুদের পরিত্যাগ করেছেন। তারা জীবনকে জীবন মনে করেননি এবং মালকে মাল মনে করেননি। দ্বিতীয় হলেন মদীনার আনসারগণ, যারা মুহাজিরদেরকে নিজেদের কাছে আশ্রয় দিয়েছেন, তাঁদের সম্পদের অংশ দিয়েছেন এবং তাঁদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। তাঁরা সব পরস্পর একই। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে পরস্পর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। একজন মুহাজিরকে একজন আনসারীর ভাই বানিয়ে দিয়েছিলেন। এই বানানো ভাই আত্মীয়তাকেও হার মানিয়েছিল। তারা একে অপরের উত্তরাধিকারী হয়ে যেতেন। পরে এটা মানসূখ (রহিত) হয়ে যায়। ইবনে আবদিল্লাহ আল বাজালী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুহাজির ও আনসার একে অপরের ওলী এবং মক্কা বিজয়ের আযাদকৃত কুরায়েশ ও আযাদকৃত বানু সাকীফ কিয়ামত পর্যন্ত একে অপরের ওলী। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) জারীর ইবনে আবদিল্লাহ বাজালী (রঃ) হতে তাখরীজ করেছেন এবং হাফিজ আবূ ইয়ালা (রঃ) এটা ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে মারফুরূপে বর্ণনা করেছেন) অন্য রিওয়ায়াতে আছে যে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে একে অপরের ওলী। মুহাজি ও আনসারের প্রশংসায় আরো বহু আয়াত রয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “পূর্ববর্তী (আল্লাহর) নৈকট্য লাভকারীরা হচ্ছে মুহাজির ও আনসার এবং ইহসানের সাথে যারা তাদের অনুসরণ করেছে, তাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তিনি তাদের জন্যে এমন জান্নাতসমূহ তৈরী করে রেখেছেন যেগুলোর নীচ দিয়ে ঝণাসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে।” (৯:১০০) অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেন : (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ নবী (সঃ)-এর উপর এবং ঐ সব মুহাজির ও আনসারের উপর রহমতের দৃষ্টি নিক্ষে করেছেন যারা কঠিন ও সংকটময় মুহূর্তেও তাঁর অনুসরণ পরিত্যাগ করেনি।” (৯:১১৭) আল্লাহ পাক আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(শুভ সংবাদ রয়েছে) ঐ দরিদ্র মুহাজিরদের জন্যে যাদেরকে তাদের মালধন থেকে এবং দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করে থাকে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাহায্যের কাজে লেগে রয়েছে, এরাই হচ্ছে সত্যবাদী। আর যারা তাদেরকে স্থান দিয়েছে, তাদের প্রতি ভালবাসা রেখেছে, প্রশস্ত অন্তর দিয়ে তাদেরকে দান করেছে, এমন কি নিজেদের প্রয়োজনের উপর তাদের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়েছে অর্থাৎ যে হিজরতের ফযীলত আল্লাহ মুহাজিরদেরকে প্রদান করেছেন তার উপর তারা হিংসা করে না।” (৫৯৪ ৮-৯) এসব আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, আনসারদের উপর মুহাজিরদের প্রাধান্য রয়েছে। মুসনাদে বাযযারে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুযাইফা (রাঃ)-কে ‘হিজরত’ ও ‘নুসরত’ এ দু’টির যে কোন একটিকে গ্রহণ করার ইখতিয়ার প্রদান করেন। তখন হুযাইফা (রাঃ) হিজরতকেই পছন্দ করেন।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যারা ঈমান এনেছে, কিন্তু হিজরত করেনি, তারা হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের অভিভাবকত্বের কোন দায়িত্ব তোমাদের নেই।” এটা হচ্ছে মুমিনদের তৃতীয় প্রকার। এরা হচ্ছে ওরাই যারা নিজেদের জায়গাতেই অবস্থানরত ছিল। গনীমতের মালে তাদের কোন অংশ ছিল না এবং এক পঞ্চমাংশেও ছিল না। হ্যা, তবে তারা কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে সেটা অন্য কথা ।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কাউকে কোন সেনাবাহিনীর সেনাপতি করে পাঠাতেন তখন তিনি তাঁকে উপদেশ দিতেনঃ “দেখো, অন্তরে আল্লাহর ভয় রাখবে এবং মুসলমানদের সাথে সদা শুভাকাঙক্ষামূলক ব্যবহার করবে। যাও, আল্লাহর নাম নিয়ে তার পথে জিহাদ কর, আল্লাহর সাথে কুফরীকারীদের সঙ্গে যুদ্ধ কর। তোমাদের শত্রু মুশরিকদের। সামনে তিনটি প্রস্তাব পেশ কর। এ তিনটির যে কোন একটি গ্রহণ করার তাদের ইখতিয়ার রয়েছে। প্রথমে তাদের সামনে ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব পেশ করবে। যদি তারা তা মেনে নেয় তবে তাদের থেকে বিরত থাকবে এবং তাদের ইসলাম গ্রহণকে স্বীকার করে নেবে। অতঃপর তাদেরকে বলবে যে, তারা যেন কাফিরদের দেশ ত্যাগ করে মুহাজিরদের দেশে চলে যায়। যদি তারা এ কাজ করে তবে মুহাজিরদের জন্যে যেসব হক রয়েছে, তাদের জন্যেও সেই সব হক প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মুহাজিরদের উপর যা রয়েছে তাদের উপরও তা-ই থাকবে। অন্যথায় এরা গ্রামাঞ্চলের অন্যান্য মুসলমানদের মত হয়ে যাবে। ঈমানের আহকাম তাদের উপর জারী হবে। 'ফাই' ও গনীমতের মালে তাদের কোন অংশ থাকবে না। হ্যা তবে যদি তারা কোন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তবে সেটা অন্য কথা। আর যদি তারা ইসলাম গ্রহণে সম্মত না হয় তবে তাদেরকে জিযিয়া প্রদানে বাধ্য করবে। যদি তারা এটা মেনে নেয় তবে যুদ্ধ। থেকে বিরত থাকবে এবং তাদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করবে। যদি তারা এ দুটোই অস্বীকার করে তবে আল্লাহর সাহায্যের উপর ভরসা রেখে এবং সেই সাহায্য তার কাছে প্রার্থনা করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দাও। যে গ্রাম্য মুসলিমরা তাদের জায়গাতেই মুকীম রয়েছে এবং হিজরত করেনি, তারা যদি কোন সময় তোমাদের কাছে দ্বীনের দুশমনের বিরুদ্ধে সাহায্যের প্রত্যাশী হয় তবে তাদের সাহায্য করা তোমাদের উপর ওয়াজিব। কিন্তু যদি তারা এমন জাতির মুকাবিলায় তোমাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে যে জাতির ও তোমাদের মধ্যে চুক্তি রয়েছে, তবে সাবধান! তোমরা বিশ্বাস ভঙ্গ করো না এবং কসমও ভেঙ্গে দিয়ো না।”

আল-আনফাল 8:73

উপরে আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করলেন যে, মুমিনরা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু । আর এখানে তিনি বর্ণনা করছেন যে, কাফিররা একে অপরের বন্ধু এবং তিনি মুসলমান ও কাফিরের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করে দিলেন। যেমন মুসতাদরিকে হাকিমে উসামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ ‘দু’টি ভিন্ন মাযহাবের লোক একে অপরের উত্তরাধিকারী হতে পারে না। না পারে মুসলিম কাফিরের উত্তরাধিকারী হতে এবং না পারে কাফির মুসলিমের ওয়ারিস হতে।” অতঃপর এ আয়াতটিই পাঠ করেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুসলিম কাফিরের এবং কাফির মুসলিমের ওয়ারিস হতে পারে না।” মুসনদি ও সুনান গ্রন্থে রয়েছে যে, দুটি ভিন্ন মাযহাবের লোক একে অপরের ওয়ারিস হয় না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও আসহাবুস সুনান তাখরীজ করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন) আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) যুহরী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, একজন নবদীক্ষিত মুসলমানের নিকট অঙ্গীকার গ্রহণ করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি নামায কায়েম করবে, যাকাত দিবে, বায়তুল্লাহ শরীফে হজ্ব করবে, রমযানুল মুবারাকের রোযা রাখবে এবং যেখানে শিরকের আগুন জ্বলে উঠবে সেখানে তুমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে।" এ হাদীসটি মুরসাল। বিস্তারিত বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এমন মুসলমান হতে দায়িত্বমুক্ত যে মুশরিকদের মধ্যে অবস্থান করে। দু'ধারে প্রজ্বলিত আগুন কি সে দেখতে পায় না?” (এ হাদীসটিকে ইবনে জারীর (রঃ) মুরসাল ও মুত্তাসিলরূপে তাখরীজ করেছেন) সুনানে আবি দাউদে সামুরা ইবনে জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মুশরিকদের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের মধ্যে অবস্থান করে সে তারই মত।” হাফিয আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) আবূ হাতিম আল মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যখন এমন ব্যক্তি তোমাদের কাছে আগমন করে যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তোমরা তার বিয়ে দিয়ে দাও। যদি তোমরা এ কাজ না কর তবে ভূ-পৃষ্ঠে ফিত্না ও মহাবিপর্যয় দেখা দেবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “তার মধ্যে যদি কিছু থাকে?” তিনি পুনরায় বললেনঃ “যদি তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তির বাগদান আসে যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তবে তার বিয়ে দিয়ে দাও।” এ কথা তিনি তিনবার বললেন। আয়াতের এই শব্দগুলোর ভাবার্থ হচ্ছে- তোমরা যদি মুশরিকদের থেকে দূরে না থাকো এবং মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন না কর তবে ভীষণ ফিত্না সৃষ্টি হয়ে যাবে। কাফিরদের সাথে মুসলমানদের এই মেলামেশা খারাপ পরিণতি টেনে আনবে এবং ভূ-পৃষ্ঠে মহা বিপর্যয় দেখা দেবে।

আল-আনফাল 8:74

৭৪-৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের পার্থিব হুকুম বর্ণনা করার পর আখিরাতে তাদের জন্যে কি রয়েছে তার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি তাদের ঈমানের সত্যতা প্রকাশ করছেন। যেমন এই সূরার প্রথম দিকে এ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তারা দান প্রাপ্ত হবে, তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন এবং তারা সম্মানজনক জীবিকা লাভ করবে, যা হবে চিরস্থায়ী এবং পাক ও পবিত্র। সেগুলো হবে বিভিন্ন প্রকারের উপাদেয় খাদ্য এবং সেগুলো কখনো নিঃশেষ হবে না। তাদের যারা অনুসারী এবং ঈমানে ও ভাল আমলে তাদের সাথে অংশগ্রহণকারী তারা আখিরাতেও সমমর্যাদা লাভ করবে। যেমন আল্লাহ পাক (আরবী) (৯:১০০) এবং (আরবী) (৫৯:১০) বলেছেন। এটা সর্বসম্মত মত এমন কি মুতাওয়াতির হাদীসেও রয়েছে যে, মানুষ তার সাথেই থাকবে যাকে সে ভালবাসে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন কওমের সাথে ভালবাসা রাখে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, তার হাশরও ওদের সাথেই হবে। মুসনাদে আহমাদের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, মুহাজির ও আনসার একে অপরের ওলী বা অভিভাবক। মক্কা বিজয়ের পরের মুসলমান কুরায়েশী এবং সাকীফের আযাদকৃত ব্যক্তি কিয়ামত পর্যন্ত একে অপরের অভিভাবক।এরপর উলুল আরহামের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। এখানে উলুল আরহাম দ্বারা ঐ আত্মীয়দের উদ্দেশ্য করা হয়নি যাদেরকে ফারায়েয শাস্ত্রবিদদের পরিভাষায় উলুল আরহাম বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ যাদের কোন অংশ নির্ধারিত নেই এবং যারা আসাবাও (আল্লাহ তাআলার কিতাবে যেসব ওয়ারিসের অংশ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে অংশ দেয়ার পর বাকী অংশ যেসব ওয়ারিস পেয়ে থাকে তাদেরকে ফারায়েযের পরিভাষায় আসাবা বলা) নয়। যেমন মামা, খালা, ফুফু, কন্যার ছেলেমেয়ে, বোনের ছেলেমেয়ে ইত্যাদি। কারো কারো মতে এখানে উলুল আরহাম দ্বারা এদেরকেই বুঝানো হয়েছে। তারা এ আয়াতটিকেই দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং এই ব্যাপারে তাকে স্পষ্টভাবে ওলী বলে থাকেন। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তা নয়। বরং সঠিক কথা এই যে, এ আয়াতটি আম বা সাধারণ। এটা সমস্ত আত্মীয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। যেমন ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), হাসান (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, মিত্রদের পরস্পর ওয়ারিশ হওয়া এবং বানানো ভাইদের পরস্পর ওয়ারিশ হওয়া, যা পূর্বে প্রথা ছিল, এ আয়াতটি এটাকে মানসূখ বা রহিতকারী। সুতরাং এটা বিশেষ নামের সাথে ফারায়েযের আলেমদের যাবিল আরহামকে অন্তর্ভুক্ত করবে। আর যারা এদেরকে ওয়ারিস বলেন না তাদের কয়েকটি দলীল রয়েছে। তাদের সবচেয়ে মজবুত দলীল হচ্ছে নিম্নের হাদীসটিঃ“নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করেছেন। সুতরাং কোন ওয়ারিসের জন্যে অসিয়ত নেই।” তারা বলেন যে, এরা যদি হকদার হতো তবে আল্লাহর কিতাবে এদেরও হক নির্ধারিত হতো। কিন্তু তা যখন নেই তখন তারা ওয়ারিসও নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-আনফাল 8:75

৭৪-৭৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের পার্থিব হুকুম বর্ণনা করার পর আখিরাতে তাদের জন্যে কি রয়েছে তার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি তাদের ঈমানের সত্যতা প্রকাশ করছেন। যেমন এই সূরার প্রথম দিকে এ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তারা দান প্রাপ্ত হবে, তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন এবং তারা সম্মানজনক জীবিকা লাভ করবে, যা হবে চিরস্থায়ী এবং পাক ও পবিত্র। সেগুলো হবে বিভিন্ন প্রকারের উপাদেয় খাদ্য এবং সেগুলো কখনো নিঃশেষ হবে না। তাদের যারা অনুসারী এবং ঈমানে ও ভাল আমলে তাদের সাথে অংশগ্রহণকারী তারা আখিরাতেও সমমর্যাদা লাভ করবে। যেমন আল্লাহ পাক (আরবী) (৯:১০০) এবং (আরবী) (৫৯:১০) বলেছেন। এটা সর্বসম্মত মত এমন কি মুতাওয়াতির হাদীসেও রয়েছে যে, মানুষ তার সাথেই থাকবে যাকে সে ভালবাসে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন কওমের সাথে ভালবাসা রাখে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, তার হাশরও ওদের সাথেই হবে। মুসনাদে আহমাদের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, মুহাজির ও আনসার একে অপরের ওলী বা অভিভাবক। মক্কা বিজয়ের পরের মুসলমান কুরায়েশী এবং সাকীফের আযাদকৃত ব্যক্তি কিয়ামত পর্যন্ত একে অপরের অভিভাবক।এরপর উলুল আরহামের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। এখানে উলুল আরহাম দ্বারা ঐ আত্মীয়দের উদ্দেশ্য করা হয়নি যাদেরকে ফারায়েয শাস্ত্রবিদদের পরিভাষায় উলুল আরহাম বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ যাদের কোন অংশ নির্ধারিত নেই এবং যারা আসাবাও (আল্লাহ তাআলার কিতাবে যেসব ওয়ারিসের অংশ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে অংশ দেয়ার পর বাকী অংশ যেসব ওয়ারিস পেয়ে থাকে তাদেরকে ফারায়েযের পরিভাষায় আসাবা বলা) নয়। যেমন মামা, খালা, ফুফু, কন্যার ছেলেমেয়ে, বোনের ছেলেমেয়ে ইত্যাদি। কারো কারো মতে এখানে উলুল আরহাম দ্বারা এদেরকেই বুঝানো হয়েছে। তারা এ আয়াতটিকেই দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং এই ব্যাপারে তাকে স্পষ্টভাবে ওলী বলে থাকেন। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তা নয়। বরং সঠিক কথা এই যে, এ আয়াতটি আম বা সাধারণ। এটা সমস্ত আত্মীয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। যেমন ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), হাসান (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, মিত্রদের পরস্পর ওয়ারিশ হওয়া এবং বানানো ভাইদের পরস্পর ওয়ারিশ হওয়া, যা পূর্বে প্রথা ছিল, এ আয়াতটি এটাকে মানসূখ বা রহিতকারী। সুতরাং এটা বিশেষ নামের সাথে ফারায়েযের আলেমদের যাবিল আরহামকে অন্তর্ভুক্ত করবে। আর যারা এদেরকে ওয়ারিস বলেন না তাদের কয়েকটি দলীল রয়েছে। তাদের সবচেয়ে মজবুত দলীল হচ্ছে নিম্নের হাদীসটিঃ“নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করেছেন। সুতরাং কোন ওয়ারিসের জন্যে অসিয়ত নেই।” তারা বলেন যে, এরা যদি হকদার হতো তবে আল্লাহর কিতাবে এদেরও হক নির্ধারিত হতো। কিন্তু তা যখন নেই তখন তারা ওয়ারিসও নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।