Tafseer ibn Kathir — আত-তাওবা 9:1 – আত-তাওবা 9:72
Contents
- আত-তাওবা 9:1
- আত-তাওবা 9:2
- আত-তাওবা 9:3
- আত-তাওবা 9:4
- আত-তাওবা 9:5
- আত-তাওবা 9:6
- আত-তাওবা 9:7
- আত-তাওবা 9:8
- আত-তাওবা 9:9
- আত-তাওবা 9:10
- আত-তাওবা 9:11
- আত-তাওবা 9:12
- আত-তাওবা 9:13
- আত-তাওবা 9:14
- আত-তাওবা 9:15
- আত-তাওবা 9:16
- আত-তাওবা 9:17
- আত-তাওবা 9:18
- আত-তাওবা 9:19
- আত-তাওবা 9:20
- আত-তাওবা 9:21
- আত-তাওবা 9:22
- আত-তাওবা 9:23
- আত-তাওবা 9:24
- আত-তাওবা 9:25
- আত-তাওবা 9:26
- আত-তাওবা 9:27
- আত-তাওবা 9:28
- আত-তাওবা 9:29
- আত-তাওবা 9:30
- আত-তাওবা 9:31
- আত-তাওবা 9:32
- আত-তাওবা 9:33
- আত-তাওবা 9:34
- আত-তাওবা 9:35
- আত-তাওবা 9:36
- আত-তাওবা 9:37
- আত-তাওবা 9:38
- আত-তাওবা 9:39
- আত-তাওবা 9:40
- আত-তাওবা 9:41
- আত-তাওবা 9:42
- আত-তাওবা 9:43
- আত-তাওবা 9:44
- আত-তাওবা 9:45
- আত-তাওবা 9:46
- আত-তাওবা 9:47
- আত-তাওবা 9:48
- আত-তাওবা 9:49
- আত-তাওবা 9:50
- আত-তাওবা 9:51
- আত-তাওবা 9:52
- আত-তাওবা 9:53
- আত-তাওবা 9:54
- আত-তাওবা 9:55
- আত-তাওবা 9:56
- আত-তাওবা 9:57
- আত-তাওবা 9:58
- আত-তাওবা 9:59
- আত-তাওবা 9:60
- আত-তাওবা 9:61
- আত-তাওবা 9:62
- আত-তাওবা 9:63
- আত-তাওবা 9:64
- আত-তাওবা 9:65
- আত-তাওবা 9:66
- আত-তাওবা 9:67
- আত-তাওবা 9:68
- আত-তাওবা 9:69
- আত-তাওবা 9:70
- আত-তাওবা 9:71
- আত-তাওবা 9:72
আত-তাওবা 9:1
১-২ নং আয়াতের তাফসীর: এই সম্মানিত সূরাটি হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর নাযিলকৃত সর্বশেষ সূরা । সহীহ বুখারীতে বারা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সর্বশেষ আয়াত হচ্ছে- (আরবী) (৪:১৭৬) এই আয়াতটি এবং সর্বশেষ সূরা হচ্ছে সূরায়ে বারাআত। (ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন) এই সূরার প্রথমে বিসমিল্লাহ লিখিত না থাকার কারণ এই যে, সাহাবীগণ আমীরুল মুমিনীন উসমান ইবনে আফফান (রাঃ)-কে অনুকরণ করে কুরআনে এই সূরার পূর্বে বিসমিল্লাহ লিখেননি। সুনানে তিরমিযীতে রয়েছে যে, ইবনে আব্বাস (রাঃ) উসমান (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত সূরায়ে আনফালকে (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত সূরায়ে বারাআতের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন এবং এ দু’টির মাঝে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লিখেননি, আর এটাকে সাতটি দীর্ঘ সূরার মধ্যে রেখেছেন, এর কারণ কি?” উসমান (রাঃ) উত্তরে বলেন, কোন কোন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর একই সাথে কয়েকটি সূরা অবতীর্ণ হতো। যখন কোন আয়াত অবতীর্ণ হতো তখন তিনি লেখকদের কাউকে ডেকে বলতেনঃ “এই আয়াতটিকে অমুক সূরার মধ্যে রেখে দাও যার মধ্যে এর বর্ণনা রয়েছে।” মদীনায় সর্বপ্রথম সূরায়ে আনফাল অবতীর্ণ হয়েছিল এবং সর্বশেষে অবতীর্ণ হয়েছিল সূরায়ে বারাআত। বর্ণনায় এ দুটো সূরার মধ্যে মিল ছিল। তাই আমি ভয় পেলাম যে, না জানি এটা হয়তো সূরায়ে আনফালেরই অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইনতিকাল হয়ে গেল এবং এ সূরাটি সূরায়ে আনফালের অন্তর্ভুক্ত কি-না তা তিনি বলে গেলেন না। এ জন্যেই আমি দু’টি সূরাকে মিলিতভাবে লিখেছি এবং মধ্যখানে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” লিখিনি। আর এটাকে সাতটি দীর্ঘ সূরার মধ্যে রেখেছি। এই সূরার প্রথম অংশ ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন নবী (সঃ) তাবূকের যুদ্ধ হতে ফিরে আসছিলেন। ওটা হজ্বের মওসুম ছিল। মুশরিকরা নিজেদের অভ্যাস মত হজ্ব করতে এসে উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহ শরীফের চারদিকে তাওয়াফ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সাথে মিলিত হতে অপছন্দ করে আবু বকর (রাঃ)-কে ঐ বছর হজ্বের ইমাম বানিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা করান, যেন তিনি মুসলিমদেরকে হজ্বের আহকাম শিক্ষা দেন এবং মুশরিকদের মধ্যে ঘোষণা করে দেন যে, তারা যেন আগামী বছর হজ্ব করতে না আসে। আর জনসাধারণের মধ্যে তিনি যেন সূরা বারাআতেরও ঘোষণা শুনিয়ে দেন। তাঁর পিছনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আলী (রাঃ)-কেও পাঠিয়ে দেন যে, তার নিকটতম আত্মীয় হিসেবে তিনিও যেন তাঁর পয়গাম পৌঁছিয়ে দেন। এর বিস্তারিত বর্ণনা ইনশাআল্লাহ আসছে। ঘোষণা হচ্ছে- “এটা হচ্ছে সম্পর্ক ছিন্নতা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পক্ষ হতে। কেউ কেউ বলেন যে, এই ঘোষণা ঐ চুক্তি ও অঙ্গীকার সম্পর্কে, যার জন্যে কোন সময় নির্দিষ্ট ছিল না বা যাদের সাথে চার মাসের কম সময়ের জন্যে চুক্তি ছিল। কিন্তু যাদের সাথে চুক্তির মেয়াদ দীর্ঘ ছিল ওটা যথা নিয়মে বাকী থেকে যায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তাদের অঙ্গীকার বা চুক্তি তাদের মেয়াদ পর্যন্ত পূর্ণ কর।” (৯:৪) হাদীস শরীফেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের সাথে যাদের সন্ধি বা চুক্তি রয়েছে, আমরা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ঐ চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবো।” এই ব্যাপারে আরো উক্তি রয়েছে। কিন্তু এই উক্তিটিই সবচেয়ে বেশী উত্তম ও দৃঢ়। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যাদের সাথে চুক্তি হয়েছিল, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যে চার মাসের সীমা নির্ধারণ করে দেন। আর যাদের সাথে চুক্তি ছিল না তাদের জন্যে হারাম মাসগুলো অতিক্রান্ত হওয়াকে সীমা নির্ধারণ করেন। অর্থাৎ ১০ই যিলহজ্ব হতে মুহররম মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত পঞ্চাশ দিন। এই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাদের সাথে যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হয় যে পর্যন্ত না তারা ইসলাম গ্রহণ করে। আর যাদের সাথে চুক্তি রয়েছে তারা ১০ই যিলহজ্ব ঘোষণার দিন থেকে নিয়ে ২০শে রবিউল আখির পর্যন্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। অতঃপর ইচ্ছা করলে মুকাবিলা করবে। এটা হচ্ছে নবম হিজরীর ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবূ বকর (রাঃ)-কে হজ্বের আমীর নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলেন এবং আলী (রাঃ)-কে কুরআনের এই সূরাটির ত্রিশটি অথবা চল্লিশটি আয়াতসহ পাঠিয়ে দেন যে, তিনি যেন চার মাসের মেয়াদের ঘোষণা করেন। তিনি তাদের তাঁবুতে, ঘরে এবং মনজিলে গিয়ে গিয়ে এ আয়াতগুলো তাদেরকে শুনিয়ে দেন। সাথে সাথে তাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ নির্দেশও শুনিয়ে দেন যে, এ বছরের পর কোন মুশরিক যেন হজ্ব করতে না আসে এবং কোন উলঙ্গ ব্যক্তি যেন বায়তুল্লাহ তাওয়াফ না করে। খুযাআ' গোত্র, মুদলিজ কবিলা এবং অন্যান্য সকল গোত্রের জন্যেও এই ঘোষণাই বলবৎ ছিল। তাবুক থেকে প্রত্যাবর্তন করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হজ্ব করার ইচ্ছা করেছিলেন। কিন্তু সেখানে মুশরিকদের আগমন ও উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফকরণ তার নিকট অপছন্দনীয় ছিল। এই জন্যে তিনি হজ্ব করলেন না এবং ঐ বছর আবু বকর (রাঃ) ও আলী (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। তাঁরা যিল মাজাযের বাজারসমূহে প্রত্যেক অলিতে-গলিতে, প্রত্যেক তাঁবুতে এবং মাঠে ময়দানে ঘোষণা করে দেন যে, চার মাস পর্যন্ত মুশরিকদেরকে অবকাশ দেয়া হলো, এর পরেই মুসলিমদের তরবারী তাদের উপর আঘাত হানবে। ঐ চার মাস হচ্ছে যিলহজ্ব মাসের বিশ দিন, মুহররম, সফর ও রবিউল আওয়াল এই তিন মাস পুরো এবং রবিউল আখির মাসের ১০ দিন। যুহরী (রঃ) বলেন যে, শাওয়াল থেকে মুহররম মাস পর্যন্ত অবকাশ ছিল। কিন্তু এই উক্তিটি গারীব বা দুর্বল এবং এটা মনেও ধরে না যে, হুকুম পৌছার পূর্বেই মেয়াদের গণনা কিভাবে হতে পারে?
আত-তাওবা 9:2
১-২ নং আয়াতের তাফসীর: এই সম্মানিত সূরাটি হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর নাযিলকৃত সর্বশেষ সূরা । সহীহ বুখারীতে বারা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সর্বশেষ আয়াত হচ্ছে- (আরবী) (৪:১৭৬) এই আয়াতটি এবং সর্বশেষ সূরা হচ্ছে সূরায়ে বারাআত। (ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন) এই সূরার প্রথমে বিসমিল্লাহ লিখিত না থাকার কারণ এই যে, সাহাবীগণ আমীরুল মুমিনীন উসমান ইবনে আফফান (রাঃ)-কে অনুকরণ করে কুরআনে এই সূরার পূর্বে বিসমিল্লাহ লিখেননি। সুনানে তিরমিযীতে রয়েছে যে, ইবনে আব্বাস (রাঃ) উসমান (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত সূরায়ে আনফালকে (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত সূরায়ে বারাআতের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন এবং এ দু’টির মাঝে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লিখেননি, আর এটাকে সাতটি দীর্ঘ সূরার মধ্যে রেখেছেন, এর কারণ কি?” উসমান (রাঃ) উত্তরে বলেন, কোন কোন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর একই সাথে কয়েকটি সূরা অবতীর্ণ হতো। যখন কোন আয়াত অবতীর্ণ হতো তখন তিনি লেখকদের কাউকে ডেকে বলতেনঃ “এই আয়াতটিকে অমুক সূরার মধ্যে রেখে দাও যার মধ্যে এর বর্ণনা রয়েছে।” মদীনায় সর্বপ্রথম সূরায়ে আনফাল অবতীর্ণ হয়েছিল এবং সর্বশেষে অবতীর্ণ হয়েছিল সূরায়ে বারাআত। বর্ণনায় এ দুটো সূরার মধ্যে মিল ছিল। তাই আমি ভয় পেলাম যে, না জানি এটা হয়তো সূরায়ে আনফালেরই অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইনতিকাল হয়ে গেল এবং এ সূরাটি সূরায়ে আনফালের অন্তর্ভুক্ত কি-না তা তিনি বলে গেলেন না। এ জন্যেই আমি দু’টি সূরাকে মিলিতভাবে লিখেছি এবং মধ্যখানে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” লিখিনি। আর এটাকে সাতটি দীর্ঘ সূরার মধ্যে রেখেছি। এই সূরার প্রথম অংশ ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন নবী (সঃ) তাবূকের যুদ্ধ হতে ফিরে আসছিলেন। ওটা হজ্বের মওসুম ছিল। মুশরিকরা নিজেদের অভ্যাস মত হজ্ব করতে এসে উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহ শরীফের চারদিকে তাওয়াফ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সাথে মিলিত হতে অপছন্দ করে আবু বকর (রাঃ)-কে ঐ বছর হজ্বের ইমাম বানিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা করান, যেন তিনি মুসলিমদেরকে হজ্বের আহকাম শিক্ষা দেন এবং মুশরিকদের মধ্যে ঘোষণা করে দেন যে, তারা যেন আগামী বছর হজ্ব করতে না আসে। আর জনসাধারণের মধ্যে তিনি যেন সূরা বারাআতেরও ঘোষণা শুনিয়ে দেন। তাঁর পিছনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আলী (রাঃ)-কেও পাঠিয়ে দেন যে, তার নিকটতম আত্মীয় হিসেবে তিনিও যেন তাঁর পয়গাম পৌঁছিয়ে দেন। এর বিস্তারিত বর্ণনা ইনশাআল্লাহ আসছে। ঘোষণা হচ্ছে- “এটা হচ্ছে সম্পর্ক ছিন্নতা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পক্ষ হতে। কেউ কেউ বলেন যে, এই ঘোষণা ঐ চুক্তি ও অঙ্গীকার সম্পর্কে, যার জন্যে কোন সময় নির্দিষ্ট ছিল না বা যাদের সাথে চার মাসের কম সময়ের জন্যে চুক্তি ছিল। কিন্তু যাদের সাথে চুক্তির মেয়াদ দীর্ঘ ছিল ওটা যথা নিয়মে বাকী থেকে যায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তাদের অঙ্গীকার বা চুক্তি তাদের মেয়াদ পর্যন্ত পূর্ণ কর।” (৯:৪) হাদীস শরীফেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাদের সাথে যাদের সন্ধি বা চুক্তি রয়েছে, আমরা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ঐ চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবো।” এই ব্যাপারে আরো উক্তি রয়েছে। কিন্তু এই উক্তিটিই সবচেয়ে বেশী উত্তম ও দৃঢ়। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যাদের সাথে চুক্তি হয়েছিল, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যে চার মাসের সীমা নির্ধারণ করে দেন। আর যাদের সাথে চুক্তি ছিল না তাদের জন্যে হারাম মাসগুলো অতিক্রান্ত হওয়াকে সীমা নির্ধারণ করেন। অর্থাৎ ১০ই যিলহজ্ব হতে মুহররম মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত পঞ্চাশ দিন। এই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাদের সাথে যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হয় যে পর্যন্ত না তারা ইসলাম গ্রহণ করে। আর যাদের সাথে চুক্তি রয়েছে তারা ১০ই যিলহজ্ব ঘোষণার দিন থেকে নিয়ে ২০শে রবিউল আখির পর্যন্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। অতঃপর ইচ্ছা করলে মুকাবিলা করবে। এটা হচ্ছে নবম হিজরীর ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবূ বকর (রাঃ)-কে হজ্বের আমীর নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলেন এবং আলী (রাঃ)-কে কুরআনের এই সূরাটির ত্রিশটি অথবা চল্লিশটি আয়াতসহ পাঠিয়ে দেন যে, তিনি যেন চার মাসের মেয়াদের ঘোষণা করেন। তিনি তাদের তাঁবুতে, ঘরে এবং মনজিলে গিয়ে গিয়ে এ আয়াতগুলো তাদেরকে শুনিয়ে দেন। সাথে সাথে তাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ নির্দেশও শুনিয়ে দেন যে, এ বছরের পর কোন মুশরিক যেন হজ্ব করতে না আসে এবং কোন উলঙ্গ ব্যক্তি যেন বায়তুল্লাহ তাওয়াফ না করে। খুযাআ' গোত্র, মুদলিজ কবিলা এবং অন্যান্য সকল গোত্রের জন্যেও এই ঘোষণাই বলবৎ ছিল। তাবুক থেকে প্রত্যাবর্তন করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হজ্ব করার ইচ্ছা করেছিলেন। কিন্তু সেখানে মুশরিকদের আগমন ও উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফকরণ তার নিকট অপছন্দনীয় ছিল। এই জন্যে তিনি হজ্ব করলেন না এবং ঐ বছর আবু বকর (রাঃ) ও আলী (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। তাঁরা যিল মাজাযের বাজারসমূহে প্রত্যেক অলিতে-গলিতে, প্রত্যেক তাঁবুতে এবং মাঠে ময়দানে ঘোষণা করে দেন যে, চার মাস পর্যন্ত মুশরিকদেরকে অবকাশ দেয়া হলো, এর পরেই মুসলিমদের তরবারী তাদের উপর আঘাত হানবে। ঐ চার মাস হচ্ছে যিলহজ্ব মাসের বিশ দিন, মুহররম, সফর ও রবিউল আওয়াল এই তিন মাস পুরো এবং রবিউল আখির মাসের ১০ দিন। যুহরী (রঃ) বলেন যে, শাওয়াল থেকে মুহররম মাস পর্যন্ত অবকাশ ছিল। কিন্তু এই উক্তিটি গারীব বা দুর্বল এবং এটা মনেও ধরে না যে, হুকুম পৌছার পূর্বেই মেয়াদের গণনা কিভাবে হতে পারে?
আত-তাওবা 9:3
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে এবং এটা হয়েছে আবার বড় হজ্বের দিনে অর্থাৎ কুরবানীর ঈদের দিনে, যা হজ্বের সমস্ত দিন অপেক্ষা বড় ও উত্তম। ঐ ঘোষণা এই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) মুশরিকদের থেকে দায়িত্বমুক্ত, অসন্তুষ্ট ও পৃথক। তবে হে মুশরিকদের দল! এখনও যদি তোমরা পথভ্রষ্টতা, শিক এবং দুষ্কার্য পরিত্যাগ কর তবে তা তোমাদের পক্ষে উত্তম হবে। আর যদি পরিত্যাগ না কর এবং পথভ্রষ্টতার উপরই প্রতিষ্ঠিত থাকো তবে তোমরা আল্লাহর আয়ত্তের বাইরে এখনও নও এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না। আর তোমরা আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে না। তিনি তোমাদের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি কাফিরদেরকে দুনিয়াতেও শাস্তি প্রদান করবেন এবং পরকালেও আযাবে নিপতিত করবেন। আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “কুরবানীর দিন (১০ই যিলহজ্ব) আবু বকর (রাঃ) আমাকে লোকদের মধ্যে ঐ কথা প্রচার করতে পাঠালেন যার জন্যে তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন। আমি ঘোষণা করে দিলাম- এই বছরের পর কোন মুশরিক যেন হজ্ব করতে না আসে এবং কেউ যেন উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ না করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আলী (রাঃ)-কে পাঠান যে, তিনি যেন জনগণের মধ্যে সূরায়ে তাওবাহ প্রচার করে দেন। সুতরাং তিনি মিনায় আমাদের সাথে ঈদের দিন ঐ আহকামই প্রচার করেন। হজ্বে আকবার হচ্ছে বকরা ঈদের দিন। কেননা, জনগণ এটাকে হজ্বে আসগার বলে থাকতো। আবু বকর (রাঃ)-এর এই ঘঘাষণার পর হাজ্বাতুল বিদা বা বিদায় হজ্বে একজনও মুশরিক হজ্ব করতে আসেনি। (এ হাদীসটিকে ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবুল জিহাদের মধ্যে তাখরীজ করেছেন)হুনাইনের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিরানা থেকে উমরার ইহরাম বেঁধেছিলেন। অতঃপর ঐ বছর তিনি আবু বকর (রাঃ)-কে হজ্বের আমীর নিযুক্ত করে প্রেরণ করেন। আবু বকর (রাঃ) আবূ হুরাইরা (রাঃ)-কে ঘোষণা দেয়ার জন্যে পাঠান। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আলী (রাঃ)-কে সূরায়ে বারাআতের প্রচারের জন্যে পাঠিয়ে দেন। আলী (রাঃ)-এর আগমনের পরেও হজ্বের আমীর আবু বকর (রাঃ)-ই থাকেন। কিন্তু এই বর্ণনায় গুরবাত বা দুর্বলতা রয়েছে। কেননা, জিরানা থেকে উমরার ইহরাম বাঁধার বছরে হজের আমীর ছিলেন ইতা ইবনে উসাইদ (রাঃ)। আবূ বকর (রাঃ) তো নবম হিজরীতে হজ্বের আমীর ছিলেন। মুসনাদের রিওয়ায়াতে রয়েছে যে, আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, ঐ বছর আলী (রাঃ)-এর সাথে আমি ছিলাম। আমরা সশব্দে ঘোষণা করতে থাকিঃ “জান্নাতে শুধুমাত্র মুমিনরাই যাবে। আগামী বছর থেকে কোন ব্যক্তি উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতে পারবে না। যাদের সাথে আমাদের চুক্তি ও সন্ধি রয়েছে তাদের মেয়াদ হচ্ছে আজ থেকে নিয়ে চার মাস পর্যন্ত। এই মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) মুশরিকদের থেকে দায়িত্বমুক্ত ও সম্পর্কহীন হয়ে যাবেন। এই বছরের পর থেকে কোন কাফিরের বায়তুল্লাহর হজু করার অনুমতি নেই।” এই ঘোষণা দিতে দিতে আমার কণ্ঠস্বর বসে যায়। আলী (রাঃ)-এর গলা বসে যাওয়ার পর আমি ঘোষণা দিতে শুরু করেছিলাম। আর একটি বর্ণনায় আছে যে, যাদের সাথে চুক্তি রয়েছে তাদের মেয়াদ ওটাই। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “আমার তো ভয় হচ্ছে যে, না জানি এ বাক্যটি কোন বর্ণনাকারীর সন্দেহের কারণে হয় তো এসেছে। কেননা, মেয়াদের ব্যাপারে এর বিপরীত বহু রিওয়ায়াত রয়েছে।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, সূরায়ে বারাআতের ঘোষণার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবু বকর (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। যখন তিনি যুলহুলাইফা নামক স্থানে। পৌছেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এটা প্রচার তো আমি নিজেই করবো অথবা আমার আহলে বায়তের কেউ করবে ।” অতঃপর তিনি আলী (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)আলী (রাঃ) বলেন, সূরায়ে বারাআতের দশটি আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবূ বকর (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “তুমি এগুলো নিয়ে গিয়ে মক্কাবাসীকে শুনিয়ে দাও।” তারপর আমাকে ডেকে তিনি বলেনঃ “তুমি যাও এবং আবু বকর (রাঃ)-এর সাথে মিলিত হও। যেখানে তাকে পাবে সেখানে তার নিকট থেকে কিতাব গ্রহণ করতঃ মক্কা চলে যাবে এবং লোকদেরকে তা পড়ে শুনাবে।” আমি রওয়ানা হলাম এবং ‘জুহফা নামক স্থানে আবু বকর (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ লাভ করলাম। তাঁর নিকট থেকে আমি কিতাব নিয়ে নিলাম আর তিনি ফিরে গেলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আমার ব্যাপারে কোন আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ না, জিবরাঈল (আঃ) আমার কাছে এসে বলেছেন- “এ পয়গাম হয় আপনি নিজেই প্রচার করুন, না হয় আপনার আহলে বায়তের কোন লোককে তা প্রচার করতে বলুন।” এই সনদে দুর্বলতা রয়েছে। আর এর দ্বারা এটাও উদ্দেশ্য নয় যে, আবু বকর (রাঃ) তখনই ফিরে এসেছিলেন। বরং তাঁর নেতৃত্বেই ঐ হজ্ব পালিত হয়। হজ্ব পর্ব সমাপ্ত করে তিনি ফিরে আসেন। যেমন অন্যান্য রিওয়ায়াতে পরিষ্কারভাবে এটা বর্ণিত আছে। এক হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন আলী (রাঃ)-কে এটা প্রচারের দায়িত্ব অর্পণ করেন তখন তিনি ওযর পেশ করে বলেনঃ “আমি বয়সের দিক থেকে এবং ভাষণ দেয়ার দিক দিয়ে নিজের মধ্যে ঘাটতি অনুভব করছি।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কিন্তু প্রয়োজন এটাই যে, হয় আমি নিজেই এটা প্রচার করবো, না হয় তুমি করবে।” তখন আলী (রাঃ) বলেনঃ “তা হলে ঠিক আছে, আমিই যাচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “যাও, আল্লাহ তোমার ভাষা ঠিক রাখুন এবং অন্তরে হিদায়াত দান করুন!” তারপর তিনি স্বীয় হস্ত মুবারক তাঁর মুখের উপর রাখলেন। জনগণ আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে আবু বকর (রাঃ)-এর কি কথা প্রচারের উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছিলেন?” তিনি তখন উপরের চারটি বিষয়ের কথা বললেন। মুসনাদে আহমাদ ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে কয়েকটি পন্থায় এটা এসেছে। তাতে রয়েছে- “যাদের সাথে চুক্তি রয়েছে, তাদের চুক্তি মেয়াদ পর্যন্তই বলবৎ থাকবে।” অন্য হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জনগণ বলেছিলেনঃ “আপনি এই হজ্বে আবু বকর (রাঃ)-কে আমীর করে পাঠিয়েছেন, তাঁকেই এই প্রচারের দায়িত্ব দিলেও তো চলতো!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এটা হয় আমাকেই প্রচার করতে হবে, না হয় আমার আহলে বায়তের কাউকে করতে হবে।” আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ‘আযবা' নামী উস্ত্রীর উপর সওয়ার হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁকে পথে দেখে আবু বকর (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কি সরদার নিযুক্ত হয়ে এসেছেন, না অধীনস্থ হিসেবে?” আলী (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “না, বরং আমি অধীনস্থ হিসেবেই এসেছি। সেখানে পৌছে আবু বকর (রাঃ) হজ্বের ব্যবস্থাপনায় লেগে পড়েন এবং ঈদের দিন (১০ই যিলহজ্ব) আলী (রাঃ) জনগণকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই আহকাম জানিয়ে দেন। অতঃপর তারা উভয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফিরে আসেন। মুশরিকদের মধ্যে যাদের সাথে যতদিনের চুক্তি ছিল তা ঠিকই থাকলো। অন্য রিওয়ায়াতে আছে যে, আলী (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবু বকর (রাঃ)-কে হজ্বের আমীর নিযুক্ত করে পাঠান এবং পরে আমাকে সূরায়ে বারাআতের চল্লিশটি আয়াতসহ তাঁর কাছে প্রেরণ করেন। আবু বকর (রাঃ) আরাফার দিন (৯ই যিলহজ্ব) আরাফার মাঠে জনগণের সামনে ভাষণ দেন। অতঃপর আমাকে বলেন, উঠুন এবং জনগণকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পয়গাম শুনিয়ে দিন! আমি তখন দাঁড়িয়ে ঐ চল্লিশটি আয়াত পাঠ করি। তারপর মিনায় গিয়ে জামরার উপর কংকর নিক্ষেপ করি এবং কুরবানী করে মাথা মুণ্ডন করি। তারপর আমি অবগত হই যে, ভাষণের সময় সবাই উপস্থিত ছিলেন না। তাই আমি ডেরায় ডেরায় এবং তাঁবুতে তাঁবুতে গিয়ে ঘোষণা করতে থাকি। আমার ধারণা এই যে, সম্ভবতঃ এ কারণেই সাধারণ মানুষ এটাকে ১০ই যিলহজ্বের ঘটনা মনে করেছে অথচ আসল পয়গাম আরাফার দিন অর্থাৎ ৯ই যিলহজ্ব তারিখেই পৌঁছিয়ে দেয়া হয়েছিল।”আবু ইসহাক (রঃ) বলেনঃ “আমি আবু হুজাইফা (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হজ্বে আকবার কোন দিন? তিনি উত্তরে বলেনঃ ‘আরাফার দিন। আমি পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এটা নিজের পক্ষ থেকে বলেছেন, না সাহাবীদের কাছ থেকে শুনেছেন? তিনি জবাব দিলেনঃ সব কিছু এটাই বটে। আতাও (রঃ) এটাই বলেন। উমার (রাঃ) একথাই বলার পর বলেনঃ “সুতরাং এই দিনে কেউ যেন রোযা না রাখে ।” বর্ণনাকারী বলেন, আমি আমার পিতার পরে হজ্ব করেছি। মদীনায় পৌঁছে আমি জনগণকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে আজকাল সর্বাপেক্ষা উত্তম কে? তারা উত্তরে সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রাঃ)-এর নাম বললেন। আমি তখন তাঁর খিদমতে হাযির হয়ে তাকে বললাম, আমি মদীনাবাসীকে এখানকার সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তাঁরা আপনারই নাম বললেন। তাই আমি আপনার নিকট এসেছি। আচ্ছা বলুন তো, আরাফার দিনে রোযা রাখা সম্পর্কে আপনার মতামত কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “আপনাকে আমি আমার চেয়ে একশগুণ বেশী উত্তম ব্যক্তির নাম বলছি এবং তিনি হচ্ছেন উমার (রাঃ)। তিনি এই দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করতেন এবং এই দিনকেই তিনি হজ্বে আকবার' বলতেন।” (এটা ইবনে জারীর (রঃ) ও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। অনুরূপভাবে ইবনে আব্বাস (রাঃ), আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ) এবং তাউস (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তারা আরাফার দিনকে হজ্বে আকবারের দিন বলেছেন) একটি মুরসাল হাদীসেও রয়েছে যে, আরাফার দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভাষণ দেন এবং বলেনঃ “এটা হজ্বে আকবারের দিন।”দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এর দ্বারা করা ঈদের দিনকে বুঝানো হয়েছে। আলী (রাঃ) এ কথাই বলেছেন। একবার ঈদুল আযহার দিন তিনি তাঁর সাদা খচ্চরের উপর সওয়ার হয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় একটি লোক এসে তাঁর খচ্চরের লাগাম ধরে নেন এবং হজ্বে আকবার কোন দিন তা জিজ্ঞেস করেন। তিনি উত্তরে বলেনঃ “আজকের দিনটিই হচ্ছে হজ্বে আকবারের দিন। সুতরাং লাগাম ছেড়ে দাও। আবদুল্লাহ ইবনে আওফার (রাঃ) এটাই উক্তি। মুগীরা ইবনে শু’বা (রাঃ) তাঁর ঈদের ভাষণে বলেনঃ “আজকের দিনটি হচ্ছে আযহার দিন, আজই হচ্ছে কুরবানীর এবং আজকের দিনটিই হচ্ছে হজ্বে আকবারের দিন।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। আরো বহু গুরুজন এটাই সাব্যস্ত করেছেন যে, হজ্বে আকবার হচ্ছে ঈদুল আযহার দিন। ইমাম ইবনে জারীরেরও (রঃ) পছন্দনীয় উক্তি এটাই। সহীহ বুখারীর উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্বেই হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, আবু বকর (রাঃ) ঈদের দিন মিনায় ঘোষণাকারীকে ঘোষণার জন্যে পাঠিয়েছিলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিদায় হজ্বে ১০ই যিলহজ্ব তারিখে জামরাতের নিকটে দাঁড়িয়ে বলেনঃ “আজকের দিনই হচ্ছে হজ্বে আকবারের দিন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তার উম্ভীটি ছিল লাল রং এর । তিনি জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আজকে কোন দিন তা জান কি?” জনগণ উত্তরে বলেনঃ “আজকে কুরবানীর দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “তোমরা সত্য কথাই বলেছো। আজকের দিনটিই হচ্ছে হজ্বে আকবারের দিন।” অন্য একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উষ্ট্রীর উপর সওয়ার ছিলেন। জনগণ ওর লাগাম ধরেছিল। তিনি সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আজকে কোন্ দিন তা জান কি?" (বর্ণনাকারী বলেনঃ) আমরা এই ধারণায় নীরব থাকলাম যে, সম্ভবতঃ তিনি এই দিনের অন্য কোন নাম বলবেনঃ “এটা হজ্বে আকবারের দিন নয় কি?” অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, জনগণ তাঁর প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেনঃ “এটা হচ্ছে হজ্বে আকবারের দিন।” সাঈদ ইবন মুসাইয়াব (রাঃ) বলেন যে, হজ্বে আকবারের দিন হচ্ছে ঈদের দিনের পরের দিন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, হজ্বের সমস্ত দিনেরই নাম এটাই । সুফিয়ানও (রঃ) এ কথাই বলেন। যেমন ইয়াওমে জামাল' (উষ্ট্রের যুদ্ধের দিন) এবং 'ইয়াওমে সিফফীন’ (সিফফীনের যুদ্ধের দিন) ঐ যুদ্ধগুলোর সমস্ত দিনেরই নাম। অনুরূপভাবে এটাও তাই। হাসান বসরী (রঃ)-কে এই সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “তোমাদের এটা জেনে লাভ কি? এটা তো ছিল ঐ বছর যে বছর আবু বকর (রাঃ) হজ্বে আমীর নিযুক্ত হয়েছিলেন।” ইবনে সীরীন (রঃ) এই প্রশ্নের উত্তরে বলেনঃ “এটা ছিল ঐ দিন যেই দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও সাধারণ লোকদের হজ্ব পালিত হয়েছিল।"
আত-তাওবা 9:4
পূর্বে বর্ণিত হাদীসগুলো এবং এই আয়াতের বিষয়বস্তু একই। এর দ্বারা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, যাদের সাথে সাধারণভাবে সন্ধি (চুক্তি) ছিল তাদেরকে তো চার মাসের অবকাশ দেয়া হয়, এর মধ্যে তারা যা ইচ্ছা তাই করুক। আর যাদের সাথে কোন একটা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সন্ধি-চুক্তি হয়েছে ঐসব চুক্তি ঠিক থাকবে, যদি তারা চুক্তির শর্তাবলীর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। তারা নিজেরাও মুসলিমদেরকে কোন কষ্ট দেয় না এবং মুসলিমদের শত্রুদেরকেও সাহায্য সহযোগিতা করে না। যারা ওয়াদা বা অঙ্গীকার পূর্ণ করে তাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন ও পছন্দ করেন।
আত-তাওবা 9:5
সম্মানিত মাস দ্বারা এখানে ঐ চার মাসকে বুঝানো হয়েছে যার বর্ণনা-(আরবী) (৯:৩৬) এই আয়াতে রয়েছে। সুতরাং তাদের ব্যাপারে শেষ সম্মানিত মাস হচ্ছে মুহাররামুল হারাম। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং যহ্হাক (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিন্তু এতে কিছু চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। বরং এখানে ঐ চার মাস উদ্দেশ্য যে মাসগুলোতে মুশরিকরা মুক্তি লাভ করেছিল এবং তাদেরকে বলা হয়েছিল- এর পরে তোমাদের সাথে যুদ্ধ হবে। এই সূরারই অন্য আয়াতে এর বর্ণনা রয়েছে, যা পরে আসছে। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতীত হয়ে যাবে তখন ঐ মুশরিকদের যেখানেই পাও সেখানেই হত্যা কর, তাদেরকে পাকড়াও কর, অবরোধ কর এবং ঘাটিস্থলসমূহে তাদের সন্ধানে অবস্থান কর।” আল্লাহ পাক বলেনঃ “যেখানেই পাও’, সুতরাং এটা সাধারণ নির্দেশ। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠের যেখানেই পাওনা কেন, তাদেরকে বধ কর, পাকড়াও কর ইত্যাদি। কিন্তু প্রসিদ্ধ উক্তি এই যে, এটা সাধারণ নির্দেশ নয়, বরং বিশেষ নির্দেশ। হারাম শরীফে যুদ্ধ চলতে পারে না। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তাদের সাথে মসজিদুল হারামের পাশে যুদ্ধ করো না যে পর্যন্ত না তারা নিজেদের পক্ষ থেকে যুদ্ধের সূচনা করে। যদি তারা সেখানে তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় তবে তোমাদেরকেও সেখানে তাদের সাথে যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হলো। ইচ্ছা করলে তোমরা তাদেরকে হত্যা করতে পার, বন্দী করতে পার, তাদের দুর্গ অবরোধ করতে পার এবং তাদের প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওঁৎ পেতে থেকে সামনে পেলেই মেরে ফেলতে পার। অর্থাৎ তোমাদেরকে শুধু এই অনুমতি দেয়া হচ্ছে না যে, তাদেরকে সামনে পেয়ে গেলে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে, বরং তোমাদের জন্যে এ অনুমতিও রয়েছে যে, তোমরা নিজেদের পক্ষ থেকেই তাদের উপর আক্রমণ চালাবে, তাদের পথরোধ করে দাড়াবে এবং তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করতে অথবা যুদ্ধ করতে বাধ্য করবে। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি তারা তাওবা করতঃ নামায প্রতিষ্ঠিত করে এবং যাকাত প্রদান করে তবে তাদের রাস্তা খুলে দেবে এবং তাদের উপর থেকে সংকীর্ণতা উঠিয়ে নেবে।” এই আয়াতটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেই আবু বকর (রাঃ) যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। যুদ্ধ করা এই শর্তে হারাম যে, তারা ইসলামের মধ্যে দাখিল হয়ে যাবে এবং ইসলামের অবশ্যকরণীয় কাজগুলো পালন করবে। মহান আল্লাহ এই আয়াতে ইসলামের রুকনগুলো তরতীব বা বিন্যাস সহকারে বর্ণনা করেছেন। বড় থেকে শুরু করে হোটর দিকে এসেছেন। সুতরাং আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল’ এই সাক্ষ্যদানের পর ইসলামের সর্বাপেক্ষা বড় রুকন হচ্ছে সালাত, যা মহামহিমান্বিত আল্লাহর হক। সালাতের পরে হচ্ছে যাকাত, যার উপকার ফকীর, মিসকীন ও অভাবগ্রস্তেরা লাভ করে থাকে। এর মাধ্যমে মাখলুকের বিরাট হক, যা মানুষের দায়িত্বে রয়েছে তা আদায় হয়ে যায়। এ কারণেই অধিকাংশ জায়গাতেই আল্লাহ তাআলা সালাতের সাথে সাথেই যাকাতের উল্লেখ করেছেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি এই মর্মে আদিষ্ট হয়েছি যে, আমি লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবো যে পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই ও মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল এবং তারা সালাত প্রতিষ্ঠিত করে ও যাকাত দেয়।” আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “তোমাদেরকে সালাত প্রতিষ্ঠিত করার এবং যাকাত প্রদান করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি যাকাত দেবে না তার সালাতও হবে না।” আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা কারো সালাত কখনো কবূল করবেন না যে পর্যন্ত না সে যাকাত প্রদান করে। আল্লাহ তা'আলা আবু বকর (রাঃ)-এর উপর দয়া করুন! তিনি সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী ছিলেন। (কেননা, তিনি যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন)।”মুসনাদে আহমাদে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্যে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই ও মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল, আর তারা আমাদের কিবলার দিকে মুখ করে, আমাদের যবেহকৃত (প্রাণী) ভক্ষণ করে এবং আমাদের সালাতের ন্যায় সালাত পড়ে। (যখন তারা এরূপ করবে তখন আমাদের উপর তাদের রক্ত এবং তাদের মাল হারাম হয়ে যাবে, ইসলামের হক ব্যতীত। তারা তখন ঐ সব হকের অধিকারী হয়ে যাবে যেসব হক অন্যান্য মুসলিমদের রয়েছে এবং অন্যান্য মুসলিমদের দায়িত্বে যা কিছু রয়েছে, তাদের দায়িত্বেও সেগুলো এসে যাবে।” (এ রিওয়ায়াতটি সহীহ বুখারীতে রয়েছে এবং সুনানে ইবনে মাজাহ ছাড়া অন্যান্য সুনানেও রয়েছে)ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) স্বীয় গ্রন্থে রাবী ইবনে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি দুনিয়া হতে এমন অবস্থায় বিদায় গ্রহণ করে যে, সে খাটি ভাবে আল্লাহরই ইবাদত করেছে এবং তার সাথে আর কাউকেও অংশীদার করেনি, সে ঐ অবস্থায় গমন করলো যে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি সন্তুষ্ট রয়েছেন।” আনাস (রাঃ) বলেন, এটাই হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন। সমস্ত নবী এটাই আনয়ন করেছিলেন এবং তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে নিজ নিজ উম্মতের কাছে কথা এদিক ওদিক ছড়িয়ে যাওয়ার পূর্বে এবং ইচ্ছা ও প্রবৃত্তি বিভিন্ন হওয়ার পূর্বে দাওয়াত পৌছিয়ে দিয়েছিলেন। এর সত্যতার সাক্ষ্য আল্লাহ তা'আলার শেষ অহীর মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন-(আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর যদি তারা সালাত, প্রতিষ্ঠিত করে এবং যাকাত প্রদান করে তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও।” অন্য আয়াতে এই তিনটি কাজের পরে রয়েছে-(আরবী) অর্থাৎ “তখন তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই।” (৯:১১) যহাক (রঃ) বলেন যে, এটা হচ্ছে তরবারীর আয়াত যা মুশরিকদের সাথে কৃত সমস্ত সন্ধি-চুক্তিকে কর্তন করে দিয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, সূরায়ে বারাআত অবতীর্ণ হওয়ার চার মাস পরে কোন সন্ধি ও চুক্তি অবশিষ্ট থাকেনি। পূর্বশর্তগুলো সমতার ভিত্তিতে ভেঙ্গে দেয়া হয়। এখন রাকী শুধু ইসলাম ও জিহাদ। আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে চারটি তরবারীসহ পাঠিয়েছেন। প্রথম তরবারী আরবের মুশরিকদের মধ্যে প্রয়োগের জন্যে। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও সেখানেই হত্যা কর।” এ রিওয়ায়াতটি এভাবে সংক্ষিপ্ত আকারেই আছে। (আলী রাঃ বলেনঃ) আমার ধারণা এই যে, দ্বিতীয় তরবারী হচ্ছে আহলে কিতাবের সাথে যুদ্ধের জন্যে। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আহলে কিতাবদের ঐ লোকদের সাথে তোমরা যুদ্ধ করতে থাকো, যারা আল্লাহর উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে না, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না এবং দ্বীন কবুল করে না, যে পর্যন্ত না তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় জিযিয়া প্রদানে স্বীকৃত হয়।” (৯:২৯) তৃতীয় তরবারী হলো মুনাফিকদের সাথে যুদ্ধের ব্যাপারে। প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী! তুমি কাফির ও মুনাফিকদার সাথে যুদ্ধ কর।” (৯:৭৩)। চতুর্থ তরবারী হচ্ছে বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধের জন্য। ইরশাদ হচ্ছে-(আরবী) অর্থাৎ “যদি মুমিনদের দুটি দলের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যায় তবে তোমরা তাদের মধ্যে সন্ধি আনয়ন কর, অতঃপর যদি একটি দল অপর দলটির উপর বিদ্রোহ ঘোষণা করে তবে তোমরা ঐ বিদ্রোহী দলটির সাথে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে।” (৪৯:৯) যহ্হাক (রঃ) ও সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এই তরবারীর আয়াতটি (আরবী) (অতঃপর হয় অনুগ্রহ করে ছেড়ে দাও অথবা ফিদইয়া নিয়ে ছেড়ে দাও) (৪৭:৪) এই আয়াত দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। আর কাতাদা (রঃ) এর বিপরীত বলেছেন।
আত-তাওবা 9:6
আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেন, আমি তোমাকে যে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছি তাদের মধ্য হতে কেউ যদি তোমার কাছে। নিরাপত্তা প্রার্থনা করে তবে তুমি তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করবে ও নিরাপত্তা দেবে, যেন তারা কুরআন কারীম শুনতে পায় ও তোমার কথা শুনবার সুযোগ লাভ করে। আর তারা দ্বীনের তালীম অবগত হয় এবং আল্লাহর হুজ্জত পরিপূর্ণতা লাভ করে। অতঃপর নিরাপত্তার মাধ্যমেই তাকে তার স্বদেশে নির্ভয়ে পাঠিয়ে দেবে, যেন সে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যেতে পারে। এর ফলে হয়তো বুঝে সুঝে ও চিন্তা ভাবনা করে সে সত্য দ্বীন কবূল করে নেবে। এটা এই কারণে যে, তারা অজ্ঞ ও মূখ লোক। সুতরাং তাদের কাছে দ্বীনী শিক্ষা পৌঁছিয়ে দাও। আল্লাহর দাওয়াত তাঁর বান্দাদের কানে পৌছিয়ে দিতে কোন ত্রুটি করো না। এ আয়াতের তাফসীরে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- যে কেউই তোমার কাছে ধর্মীয় কথা শুনবার জন্যে আসে সে নিরাপত্তা লাভ করবে যে পর্যন্ত না সে আল্লাহর কালাম না শুনে, অতঃপর যেখান থেকে এসেছিল সেখানে নিরাপদে ফিরে যায়। এজন্যেই, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে দ্বীন বুঝবার জন্যে বা কোন পয়গাম নিয়ে আসতো তাকে তিনি নিরাপত্তা দান করতেন। হুদায়বিয়ার সন্ধির বছর এটাই হয়েছিল। কুরায়েশের যতগুলো দূত এসেছিল তাদের কোন ভয় বিপদ ছিল না। উরওয়া ইবনে মাসউদ, মাকরাম ইবনে হাফস, সাহল ইবনে আমর প্রমুখ একের পর এক আসতে থাকে। এখানে এসে তাদের ঐ শান শওকত দৃষ্টিগোচর হয় যা রোম সম্রাট কায়সার এবং পারস্য সম্রাট কিসরার দরবারেও তারা দেখতে পায়নি। একথা তারা তাদের কওমের কাছে গিয়ে বর্ণনা করে। সুতরাং এ বিষয়টিও বহু লোকের হিদায়াতের মাধ্যম হয়েছিল। ভণ্ড নবী মুসায়লামা কায্যাবের দূত যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে আগমন করে তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি মুসায়লামার রিসালাতকে স্বীকার করেছো?" সে উত্তরে বললোঃ “হ্যা।” তখন নবী (সঃ) বললেনঃ “আমার নিকট দূতকে হত্যা করা যদি নাজায়েয না হতো তবে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দিতাম। অবশেষে এ লোকটি ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর হাতে কুফার শাসন ক্ষমতায় থাকার সময় নিহত হয়। লোকটিকে ইবনে নাওয়াহা বলা হতো। ইবনে মাসউদ (রাঃ) যখন অবহিত হন যে, সে মুসায়লামাকে নবী বলে স্বীকারকারী তখন তাকে ডেকে পাঠান এবং বলেনঃ “এখন তুমি দূত নও। সূতরাং এখন তোমাকে হত্যা করার ব্যাপারে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই।” অতঃপর তাকে হত্যা করা হয়। তার উপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হাক! মোটকথা, যদি কোন অমুসলিম দেশ থেকে কোন দূত বা ব্যবসায়ী অথবা সন্ধি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি কিংবা জিযিয়া আনয়নকারী ব্যক্তি কোন মুসলিম রাষ্ট্রে আগমন করে এবং ইমাম বা নায়েবে ইমাম তাকে নিরাপত্তা প্রদান করেন তবে যে পর্যন্ত সে ইসলামী রাষ্ট্রে অবস্থান করবে এবং স্বদেশে না পৌঁছবে সেই পর্যন্ত তাকে হত্যা করা হারাম। কিন্তু আলেমগণ বলেন যে, এরূপ ব্যক্তিকে বছর ধরে বাস করতে দেয়া চলবে না। বড়জোর তাকে চার মাস পর্যন্ত এখানে বাস করার অধিকার দেয়া যেতে পারে। আর চার মাসের অধিক ও এক বছরের কম সময় পর্যন্ত তাকে দারুল ইসলামে বাস করতে দেয়ার ব্যাপারে ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও অন্যান্য ইমামদের (রঃ) দু’টি উক্তি রয়েছে।
আত-তাওবা 9:7
এখানে আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত হুকুমের হিকমত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, মুশরিকদেরকে চার মাস অবকাশ দেয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি দানের কারণ এই যে, তারা শিরক ও কুফরী পরিত্যাগ করবে না এবং সন্ধি ও চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিতও থাকবে না। হ্যা, তবে হুদায়বিয়ার সন্ধি তাদের পক্ষ থেকে যে পর্যন্ত ভেঙ্গে না দেয়া হয় সেই পর্যন্ত তোমরাও তা ভেঙ্গে দেবে। হুদায়বিয়ায় দশ বছরের জন্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ষষ্ঠ হিজরীর যুলকাদা মাস হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চুক্তির মেয়াদ অতিক্রম করে চলছিলেন। শেষ পর্যন্ত কুরায়েশদের পক্ষ থেকে এ চুক্তি ভেঙ্গে দেয়া হয়। তাদের মিত্র বানু বকর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মিত্র খুযাআ’র উপর আক্রমণ চালিয়ে দেয়। এমন কি হারাম শরীফের মধ্যেও তাদেরকে হত্যা করে। এটার উপর ভিত্তি করেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) অষ্টম হিজরীর রমযান মাসে কুরায়েশদের উপর আক্রমণ চালান। আল্লাহ রাব্বল আলামীন তাঁকে মক্কা মুকাররামার উপর বিজয় দান করেন এবং তাদের উপর তাকে ক্ষমতার অধিকারী করেন। কিন্তু তিনি বিজয় ও ক্ষমতা লাভ করা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে যারা ইসলাম কবূল করে তাদেরকে আযাদ করে দেন। (আরবী) তাদেরকেই বা মুক্ত বলা হয়। তারা সংখ্যায় প্রায় দুই হাজার ছিল। আর যারা কুফরীর উপরই ছিল এবং এদিক ওদিক পালিয়ে গিয়েছিল, বিশ্ব শান্তির দূত মুহাম্মাদ (সঃ) তাদেরকে সাধারণভাবে আশ্রয় প্রদান করেছিলেন এবং মক্কায় আগমনের ও সেখানে নিজ নিজ বাড়ীতে অবস্থানের অনুমতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, চার মাস পর্যন্ত তারা যেখানে ইচ্ছা সেখানেই আসা-যাওয়া করতে পারে। তাদের মধ্যেই ছিলেন সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া (রাঃ) ও ইকরামা ইবনে আবি জেহেল (রাঃ) প্রমুখ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের তাওফীক দান করেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রতিটি কাজে ও পরিমাপ করণে প্রশংসিত।
আত-তাওবা 9:8
আল্লাহ তাআলা কাফিরদের প্রতারণা এবং তাদের অন্তরের শক্রতা থেকে মুসলিমদেরকে সতর্ক করেছেন, যেন তারা তাদের সাথে আন্তরিক বন্ধুত্ব না রাখে। তারা যেন তাদের কথা ও অঙ্গীকারের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত না থাকে। তাদের কুফরী ও শিরুক তাদেরকে তাদের ওয়াদার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে দেবে না। তারা তো সময়ের অপেক্ষায় রয়েছে। ক্ষমতা পেলে তারা তোমাদেরকে জ্যান্তই চিবিয়ে খেয়ে নেবে। তারা আত্মীয়তার মর্যাদা রক্ষা করবে না এবং ওয়াদা। অঙ্গীকারেরও কোন পরওয়া করবে না। তারা তাদের সাধ্যমত তোমদেরকে কষ্ট দেবে এবং এতে তৃপ্তি লাভ করবে। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে আত্মীয়তা। ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এই অর্থ বর্ণিত আছে। কবি তামীর ইবনে মুকবিল ও কবি হাসসান ইবনে সাবিতও (রাঃ) তাঁদের কবিতায় শব্দকে এই অর্থে প্রয়োগ করেছেন। আবার এর অর্থ এরূপও করা হয়েছে যে, যখন তারা বিজয় লাভ করবে তখন আল্লাহ তা'আলার প্রতিও লক্ষ্য রাখবে না এবং আর কারো প্রতিও না। এই (আরবী) শব্দটিই (আরবী) রূপ (আরবী) ও (আরবী) -এর মধ্যে এসেছে। অর্থাৎ এর অর্থ হচ্ছে “আল্লাহ।” কিন্তু প্রথম উক্তিটিই হচ্ছে বেশী স্পষ্ট ও প্রসিদ্ধ এবং অধিকাংশ মুফাসসিরেরও এটাই উক্তি। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা অঙ্গীকার বুঝানো হয়েছে। আর কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে কসম বা শপথ।
আত-তাওবা 9:9
৯-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের নিন্দার সাথে সাথে মুমিনদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করছেন। তিনি বলছেন যে, ঐ কাফিররা নগণ্য ও নশ্বর দুনিয়াকে মনোরম ও চিরস্থায়ী আখিরাতের বিনিময়ে পছন্দ করে নিয়েছে। তারা নিজেরাও আল্লাহর পথ থেকে সরে রয়েছে এবং মুমিনদেরকেও ঈমান থেকে ফিরিয়ে রেখেছে। তাদের আমল অতি জঘন্য। তারা মুমিনদের শুধু ক্ষতি করতেই চায় । তারা না কোন আত্মীয়তার খেয়াল রাখে, না চুক্তির কোন পরোয়া করে। তারা সীমালংঘন করেছে। হ্যা, তবে হে মুমিনগণ! এখনও যদি তারা তাওবা করে এবং সালাত আদায় করে ও যাকাত দেয় তবে তারা তোমাদেরই লোক হয়ে যেতে পারে। হাফিজ আবু বকর আল বাযযার (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি দুনিয়াকে এই অবস্থায় ছেড়েছে যে, সে আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর ইবাদত করেছে, তার সাথে কাউকে শরীক করেনি, সালাত প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং যাকাত দিয়েছে, সে দুনিয়া হতে এমন অবস্থায় বিচ্ছিন্ন হলো যে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট রয়েছেন।” এটাই হচ্ছে আল্লাহর ঐ দ্বীন যা নিয়ে নবীগণ (আলাইহিমুসসালাম) এসেছিলেন এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ওরই তাবলীগ করতে থাকেন। তাদের এই প্রচারকার্য ছিল কথা ছড়িয়ে পড়ার এবং ইচ্ছা ও প্রবৃত্তি বেড়ে যাওয়ার পূর্বে। এর সত্যতা আল্লাহর কিতাবের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে।যদি তারা তাওবা করে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ও মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে এবং সালাতী ও যাকাতদাতা হয়ে যায় তবে (হে মুসলিমগণ!) তোমরা তাদের পথ ছেড়ে দাও। তারা তখন তোমাদেরই দ্বীনী ভাই। ইমাম বাযযার (রঃ) বলেনঃ “আমার ধারণায় (আরবী) (অর্থাৎ সে দুনিয়া হতে এমন অবস্থায় বিচ্ছিন্ন হলো যে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট) এখান থেকেই মারফু হাদীস শেষ এবং বাকী অংশটুকু বর্ণনাকারী রাবী ইবনে আনাস (রঃ)-এর কথা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আত-তাওবা 9:10
৯-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের নিন্দার সাথে সাথে মুমিনদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করছেন। তিনি বলছেন যে, ঐ কাফিররা নগণ্য ও নশ্বর দুনিয়াকে মনোরম ও চিরস্থায়ী আখিরাতের বিনিময়ে পছন্দ করে নিয়েছে। তারা নিজেরাও আল্লাহর পথ থেকে সরে রয়েছে এবং মুমিনদেরকেও ঈমান থেকে ফিরিয়ে রেখেছে। তাদের আমল অতি জঘন্য। তারা মুমিনদের শুধু ক্ষতি করতেই চায় । তারা না কোন আত্মীয়তার খেয়াল রাখে, না চুক্তির কোন পরোয়া করে। তারা সীমালংঘন করেছে। হ্যা, তবে হে মুমিনগণ! এখনও যদি তারা তাওবা করে এবং সালাত আদায় করে ও যাকাত দেয় তবে তারা তোমাদেরই লোক হয়ে যেতে পারে। হাফিজ আবু বকর আল বাযযার (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি দুনিয়াকে এই অবস্থায় ছেড়েছে যে, সে আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর ইবাদত করেছে, তার সাথে কাউকে শরীক করেনি, সালাত প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং যাকাত দিয়েছে, সে দুনিয়া হতে এমন অবস্থায় বিচ্ছিন্ন হলো যে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট রয়েছেন।” এটাই হচ্ছে আল্লাহর ঐ দ্বীন যা নিয়ে নবীগণ (আলাইহিমুসসালাম) এসেছিলেন এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ওরই তাবলীগ করতে থাকেন। তাদের এই প্রচারকার্য ছিল কথা ছড়িয়ে পড়ার এবং ইচ্ছা ও প্রবৃত্তি বেড়ে যাওয়ার পূর্বে। এর সত্যতা আল্লাহর কিতাবের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে।যদি তারা তাওবা করে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ও মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে এবং সালাতী ও যাকাতদাতা হয়ে যায় তবে (হে মুসলিমগণ!) তোমরা তাদের পথ ছেড়ে দাও। তারা তখন তোমাদেরই দ্বীনী ভাই। ইমাম বাযযার (রঃ) বলেনঃ “আমার ধারণায় (আরবী) (অর্থাৎ সে দুনিয়া হতে এমন অবস্থায় বিচ্ছিন্ন হলো যে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট) এখান থেকেই মারফু হাদীস শেষ এবং বাকী অংশটুকু বর্ণনাকারী রাবী ইবনে আনাস (রঃ)-এর কথা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আত-তাওবা 9:11
৯-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের নিন্দার সাথে সাথে মুমিনদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করছেন। তিনি বলছেন যে, ঐ কাফিররা নগণ্য ও নশ্বর দুনিয়াকে মনোরম ও চিরস্থায়ী আখিরাতের বিনিময়ে পছন্দ করে নিয়েছে। তারা নিজেরাও আল্লাহর পথ থেকে সরে রয়েছে এবং মুমিনদেরকেও ঈমান থেকে ফিরিয়ে রেখেছে। তাদের আমল অতি জঘন্য। তারা মুমিনদের শুধু ক্ষতি করতেই চায় । তারা না কোন আত্মীয়তার খেয়াল রাখে, না চুক্তির কোন পরোয়া করে। তারা সীমালংঘন করেছে। হ্যা, তবে হে মুমিনগণ! এখনও যদি তারা তাওবা করে এবং সালাত আদায় করে ও যাকাত দেয় তবে তারা তোমাদেরই লোক হয়ে যেতে পারে। হাফিজ আবু বকর আল বাযযার (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি দুনিয়াকে এই অবস্থায় ছেড়েছে যে, সে আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর ইবাদত করেছে, তার সাথে কাউকে শরীক করেনি, সালাত প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং যাকাত দিয়েছে, সে দুনিয়া হতে এমন অবস্থায় বিচ্ছিন্ন হলো যে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট রয়েছেন।” এটাই হচ্ছে আল্লাহর ঐ দ্বীন যা নিয়ে নবীগণ (আলাইহিমুসসালাম) এসেছিলেন এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ওরই তাবলীগ করতে থাকেন। তাদের এই প্রচারকার্য ছিল কথা ছড়িয়ে পড়ার এবং ইচ্ছা ও প্রবৃত্তি বেড়ে যাওয়ার পূর্বে। এর সত্যতা আল্লাহর কিতাবের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে।যদি তারা তাওবা করে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ও মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে এবং সালাতী ও যাকাতদাতা হয়ে যায় তবে (হে মুসলিমগণ!) তোমরা তাদের পথ ছেড়ে দাও। তারা তখন তোমাদেরই দ্বীনী ভাই। ইমাম বাযযার (রঃ) বলেনঃ “আমার ধারণায় (আরবী) (অর্থাৎ সে দুনিয়া হতে এমন অবস্থায় বিচ্ছিন্ন হলো যে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট) এখান থেকেই মারফু হাদীস শেষ এবং বাকী অংশটুকু বর্ণনাকারী রাবী ইবনে আনাস (রঃ)-এর কথা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আত-তাওবা 9:12
আল্লাহ তা'আলা বলেন, যে মুশরিকদের সাথে নির্দিষ্ট মেয়াদে তোমাদের চুক্তি হয়েছে তারা যদি তাদের কসম ভেঙ্গে দিয়ে ওয়াদা ও চুক্তি ভঙ্গ করে এবং তোমাদের ধর্মের প্রতি দোষারোপ করে তবে তোমরা তাদের মাথা ভেঙ্গে দাও। এ জন্যেই আলেমগণ বলেছেন যে, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে গালি দেবে বা দ্বীনের উপর দোষারোপ করবে কিংবা ঘৃণার সাথে এর উল্লেখ করবে তাকে হত্যা করে দিতে হবে।তাদের শপথের কোনই মূল্য নেই। তাদেরকে কুফরী, শিরক ও বিরুদ্ধাচরণ হতে ফিরিয়ে আনার এটাই পন্থা। কাতাদা (রঃ) প্রমুখ মুরুব্বীগণ বলেন যে, কুফরীর অগ্রনায়ক হচ্ছে আবু জেহেল, উত্ব, শায়বা, উমাইয়া ইবনে খালফ প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গ। একদা সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) খারেজীদের একটি লোকের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন। ঐ খারেজী সা'দ (রাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেঃ “ইনি হচ্ছেন কুফরীর অগ্রনায়ক।” তখন সা'দ (রাঃ) বলেনঃ “তুমি মিথ্যা বলছো। আমি বরং কুফরীর অগ্রনায়কদেরকে হত্যা করেছি।” হুযাইফা (রাঃ) বলেন যে, এর পরে এই আয়াতওয়ালাদেরকে হত্যা করা হয়নি। আলী (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। সঠিক কথা এই যে, শানে নুযূল হিসেবে এই আয়াত দ্বারা মুশরিক কুরায়েশ উদ্দেশ্য হলেও আয়াতটি ‘আম’ বা সাধারণ। হুকুমের দিক দিয়ে তারা ও অন্যান্য সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। আবু বকর (রাঃ) সিরিয়া অভিমুকে সেনাবাহিনী প্রেরণ করার সময় তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তথায় এমন কতকগুলো লোককে দেখতে পাবে যাদের মাথা কামানো রয়েছে। তোমরা ঐ শয়তানের দলকে তরবারী দ্বারা হত্যা করে ফেলবে। আল্লাহর কসম! তাদের একজন লোককে হত্যা করা অন্য সত্তরজন লোককে হত্যা করা অপেক্ষা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তোমরা কুফরের অগ্রনায়কদেরকে হত্যা করে দাও।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আত-তাওবা 9:13
১৩-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে মুসলমানদেরকে পূর্ণমাত্রায় জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করে বলছেন, এই চুক্তি ও কসম ভঙ্গকারী কাফির ওরাই যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেশান্তর করার পূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। তাদের ইচ্ছা ছিল যে, তারা তাকে বন্দী করবে বা হত্যা করে ফেলবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করবে। তারা চক্রান্ত করলো, কিন্তু আল্লাহ তাদের চক্রান্ত বানচাল করলেন এবং আল্লাহ উত্তম চক্রান্ত (বানচাল) কারী। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা রাসূল (সঃ)-কে ও তোমাদেরকে (মুমিনদেরকে) এ কারণেই বের করেছিল যে, তোমরা তোমাদের প্রভু আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছো।” বিবাদ সৃষ্টি প্রথমে তারাই করেছে। বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বদরের দিনকে বুঝানো হয়েছে, যেই দিন তারা তাদের বাণিজ্যিক কাফেলাকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। তাদের যাত্রীদল রক্ষা পেয়ে গেল। কিন্তু তারা দম্ভ ও অহংকারের সাথে আল্লাহর সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করার উদ্দেশ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বদর প্রান্তরে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। এর পূর্ণ ঘটনা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তারা সন্ধি-চুক্তি ভঙ্গ করতঃ তাদের মিত্রদের সাথে মিলিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। খুযাআ’র বিরুদ্ধে বানু বকরকে সাহায্য করে। এই ওয়াদা খেলাফের কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে পদানত করেন। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। আল্লাহ পাক বলেন, তোমরা এই (অপবিত্র) লোকদেরকে ভয় করছো? তোমরা যদি মুমিন হও তবে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও ভয় করা তোমাদের উচিত নয়। তিনি এরই হকদার যে, মুমিনরা শুধুমাত্র তাঁকেই ভয় করবে। অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকেই ভয় কর। আমার প্রতাপ, আমার আধিপত্য, আমার শাস্তি, আমার ক্ষমতা এবং আমার অধিকার অবশ্যই এই যোগ্যতা রাখে যে, সর্বসময়ে প্রতিটি অন্তর আমার ভয়ে কাঁপতে থাকবে। সমুদয় কাজ কারবার আমার হাতে রয়েছে। আমি যা চাই তা করতে পারি এবং করে থাকি। আমার ইচ্ছা ছাড়া কিছুই হতে পারে না।”মুসলিমদের উপর জিহাদ ফরয হওয়ার রহস্য বর্ণনা করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলে এই কাফির ও মুশরিকদেরকে যে কোন শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু হে মুমিনরা! তিনি তোমাদের হাত দ্বারা তাদেরকে শাস্তি দিতে চান। তাদেরকে তোমরা নিজেরাই ধ্বংস করে দাও। যাতে তোমাদের মনের ঝাল ও আক্রোশ মিটে যায় এবং তোমাদের মনে প্রশান্তি নেমে আসে ও প্রফুল্লতা লাভ কর। এটা সমস্ত মুমিনের জন্যে সাধারণ। মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা খুযাআ গোত্রকে বুঝানো হয়েছে যাদের উপর কুরায়েশরা সন্ধি-চুক্তি ভঙ্গ করে তাদের মিত্রদের সাথে মিলিত হয়ে আক্রমণ চালিয়েছিল। (আরবী)-এর সর্বনামটিও তাদেরই দিকে প্রত্যাবর্তিত। ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন। যে, আয়েশা (রাঃ) যখন রাগান্বিত হতেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর নাকটি ধরে নিতেন এবং (আদর করে) বলতেন- হে উওয়ায়েশ! এ দু'আটি পাঠ করঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার অন্তরের ক্রোধ দূর করুন! আর আমাকে বিভ্রান্তিকর ফিত্না থেকে রক্ষা করুন।”ঐ আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের মধ্যকার যার প্রতি ইচ্ছা হয় তার তাওবা কবুল করে থাকেন। বান্দাদের জন্যে কল্যাণকর কি তা তিনি ভালরূপেই জানেন। তিনি তাঁর সমস্ত কাজ-কর্মে, সমস্ত শরঈ বিধানে ও সমস্ত হুকুমকরণে অতি নিপুণ ও বিজ্ঞানময়। তিনি যা চান তাই করেন এবং যা ইচ্ছা করেন তাই নির্দেশ দেন। তিনি ন্যায় বিচারক ও হাকিম। তিনি অত্যাচার করা থেকে পবিত্র। তিনি অণু পরিমাণও ভাল বা মন্দ নষ্ট করেন না, বরং তার প্রতিদান দুনিয়ায় ও আখিরাতে দিয়ে থাকেন।
আত-তাওবা 9:14
১৩-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে মুসলমানদেরকে পূর্ণমাত্রায় জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করে বলছেন, এই চুক্তি ও কসম ভঙ্গকারী কাফির ওরাই যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেশান্তর করার পূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। তাদের ইচ্ছা ছিল যে, তারা তাকে বন্দী করবে বা হত্যা করে ফেলবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করবে। তারা চক্রান্ত করলো, কিন্তু আল্লাহ তাদের চক্রান্ত বানচাল করলেন এবং আল্লাহ উত্তম চক্রান্ত (বানচাল) কারী। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা রাসূল (সঃ)-কে ও তোমাদেরকে (মুমিনদেরকে) এ কারণেই বের করেছিল যে, তোমরা তোমাদের প্রভু আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছো।” বিবাদ সৃষ্টি প্রথমে তারাই করেছে। বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বদরের দিনকে বুঝানো হয়েছে, যেই দিন তারা তাদের বাণিজ্যিক কাফেলাকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। তাদের যাত্রীদল রক্ষা পেয়ে গেল। কিন্তু তারা দম্ভ ও অহংকারের সাথে আল্লাহর সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করার উদ্দেশ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বদর প্রান্তরে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। এর পূর্ণ ঘটনা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তারা সন্ধি-চুক্তি ভঙ্গ করতঃ তাদের মিত্রদের সাথে মিলিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। খুযাআ’র বিরুদ্ধে বানু বকরকে সাহায্য করে। এই ওয়াদা খেলাফের কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে পদানত করেন। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। আল্লাহ পাক বলেন, তোমরা এই (অপবিত্র) লোকদেরকে ভয় করছো? তোমরা যদি মুমিন হও তবে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও ভয় করা তোমাদের উচিত নয়। তিনি এরই হকদার যে, মুমিনরা শুধুমাত্র তাঁকেই ভয় করবে। অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকেই ভয় কর। আমার প্রতাপ, আমার আধিপত্য, আমার শাস্তি, আমার ক্ষমতা এবং আমার অধিকার অবশ্যই এই যোগ্যতা রাখে যে, সর্বসময়ে প্রতিটি অন্তর আমার ভয়ে কাঁপতে থাকবে। সমুদয় কাজ কারবার আমার হাতে রয়েছে। আমি যা চাই তা করতে পারি এবং করে থাকি। আমার ইচ্ছা ছাড়া কিছুই হতে পারে না।”মুসলিমদের উপর জিহাদ ফরয হওয়ার রহস্য বর্ণনা করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলে এই কাফির ও মুশরিকদেরকে যে কোন শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু হে মুমিনরা! তিনি তোমাদের হাত দ্বারা তাদেরকে শাস্তি দিতে চান। তাদেরকে তোমরা নিজেরাই ধ্বংস করে দাও। যাতে তোমাদের মনের ঝাল ও আক্রোশ মিটে যায় এবং তোমাদের মনে প্রশান্তি নেমে আসে ও প্রফুল্লতা লাভ কর। এটা সমস্ত মুমিনের জন্যে সাধারণ। মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা খুযাআ গোত্রকে বুঝানো হয়েছে যাদের উপর কুরায়েশরা সন্ধি-চুক্তি ভঙ্গ করে তাদের মিত্রদের সাথে মিলিত হয়ে আক্রমণ চালিয়েছিল। (আরবী)-এর সর্বনামটিও তাদেরই দিকে প্রত্যাবর্তিত। ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন। যে, আয়েশা (রাঃ) যখন রাগান্বিত হতেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর নাকটি ধরে নিতেন এবং (আদর করে) বলতেন- হে উওয়ায়েশ! এ দু'আটি পাঠ করঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার অন্তরের ক্রোধ দূর করুন! আর আমাকে বিভ্রান্তিকর ফিত্না থেকে রক্ষা করুন।”ঐ আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের মধ্যকার যার প্রতি ইচ্ছা হয় তার তাওবা কবুল করে থাকেন। বান্দাদের জন্যে কল্যাণকর কি তা তিনি ভালরূপেই জানেন। তিনি তাঁর সমস্ত কাজ-কর্মে, সমস্ত শরঈ বিধানে ও সমস্ত হুকুমকরণে অতি নিপুণ ও বিজ্ঞানময়। তিনি যা চান তাই করেন এবং যা ইচ্ছা করেন তাই নির্দেশ দেন। তিনি ন্যায় বিচারক ও হাকিম। তিনি অত্যাচার করা থেকে পবিত্র। তিনি অণু পরিমাণও ভাল বা মন্দ নষ্ট করেন না, বরং তার প্রতিদান দুনিয়ায় ও আখিরাতে দিয়ে থাকেন।
আত-তাওবা 9:15
১৩-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা এখানে মুসলমানদেরকে পূর্ণমাত্রায় জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করে বলছেন, এই চুক্তি ও কসম ভঙ্গকারী কাফির ওরাই যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেশান্তর করার পূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। তাদের ইচ্ছা ছিল যে, তারা তাকে বন্দী করবে বা হত্যা করে ফেলবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করবে। তারা চক্রান্ত করলো, কিন্তু আল্লাহ তাদের চক্রান্ত বানচাল করলেন এবং আল্লাহ উত্তম চক্রান্ত (বানচাল) কারী। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা রাসূল (সঃ)-কে ও তোমাদেরকে (মুমিনদেরকে) এ কারণেই বের করেছিল যে, তোমরা তোমাদের প্রভু আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছো।” বিবাদ সৃষ্টি প্রথমে তারাই করেছে। বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বদরের দিনকে বুঝানো হয়েছে, যেই দিন তারা তাদের বাণিজ্যিক কাফেলাকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। তাদের যাত্রীদল রক্ষা পেয়ে গেল। কিন্তু তারা দম্ভ ও অহংকারের সাথে আল্লাহর সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করার উদ্দেশ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বদর প্রান্তরে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। এর পূর্ণ ঘটনা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তারা সন্ধি-চুক্তি ভঙ্গ করতঃ তাদের মিত্রদের সাথে মিলিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। খুযাআ’র বিরুদ্ধে বানু বকরকে সাহায্য করে। এই ওয়াদা খেলাফের কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে পদানত করেন। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। আল্লাহ পাক বলেন, তোমরা এই (অপবিত্র) লোকদেরকে ভয় করছো? তোমরা যদি মুমিন হও তবে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও ভয় করা তোমাদের উচিত নয়। তিনি এরই হকদার যে, মুমিনরা শুধুমাত্র তাঁকেই ভয় করবে। অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকেই ভয় কর। আমার প্রতাপ, আমার আধিপত্য, আমার শাস্তি, আমার ক্ষমতা এবং আমার অধিকার অবশ্যই এই যোগ্যতা রাখে যে, সর্বসময়ে প্রতিটি অন্তর আমার ভয়ে কাঁপতে থাকবে। সমুদয় কাজ কারবার আমার হাতে রয়েছে। আমি যা চাই তা করতে পারি এবং করে থাকি। আমার ইচ্ছা ছাড়া কিছুই হতে পারে না।”মুসলিমদের উপর জিহাদ ফরয হওয়ার রহস্য বর্ণনা করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলে এই কাফির ও মুশরিকদেরকে যে কোন শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু হে মুমিনরা! তিনি তোমাদের হাত দ্বারা তাদেরকে শাস্তি দিতে চান। তাদেরকে তোমরা নিজেরাই ধ্বংস করে দাও। যাতে তোমাদের মনের ঝাল ও আক্রোশ মিটে যায় এবং তোমাদের মনে প্রশান্তি নেমে আসে ও প্রফুল্লতা লাভ কর। এটা সমস্ত মুমিনের জন্যে সাধারণ। মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা খুযাআ গোত্রকে বুঝানো হয়েছে যাদের উপর কুরায়েশরা সন্ধি-চুক্তি ভঙ্গ করে তাদের মিত্রদের সাথে মিলিত হয়ে আক্রমণ চালিয়েছিল। (আরবী)-এর সর্বনামটিও তাদেরই দিকে প্রত্যাবর্তিত। ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন। যে, আয়েশা (রাঃ) যখন রাগান্বিত হতেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর নাকটি ধরে নিতেন এবং (আদর করে) বলতেন- হে উওয়ায়েশ! এ দু'আটি পাঠ করঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার অন্তরের ক্রোধ দূর করুন! আর আমাকে বিভ্রান্তিকর ফিত্না থেকে রক্ষা করুন।”ঐ আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের মধ্যকার যার প্রতি ইচ্ছা হয় তার তাওবা কবুল করে থাকেন। বান্দাদের জন্যে কল্যাণকর কি তা তিনি ভালরূপেই জানেন। তিনি তাঁর সমস্ত কাজ-কর্মে, সমস্ত শরঈ বিধানে ও সমস্ত হুকুমকরণে অতি নিপুণ ও বিজ্ঞানময়। তিনি যা চান তাই করেন এবং যা ইচ্ছা করেন তাই নির্দেশ দেন। তিনি ন্যায় বিচারক ও হাকিম। তিনি অত্যাচার করা থেকে পবিত্র। তিনি অণু পরিমাণও ভাল বা মন্দ নষ্ট করেন না, বরং তার প্রতিদান দুনিয়ায় ও আখিরাতে দিয়ে থাকেন।
আত-তাওবা 9:16
আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে মুমিনগণ! এটা সম্ভব নয় যে, আমি তোমাদেরকে ছেড়ে দেবো, অথচ তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো না ও দেখবো না যে, তোমাদের মধ্যে ঈমানের দাবীতে কে সত্যবাদী ও কে মিথ্যাবাদী। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে রহস্যবিদ ও দখলদার। সুতরাং ঈমানের দাবীতে সত্যবাদী ঐ ব্যক্তি যে জিহাদে আগে বেড়ে অংশ নেয় এবং প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর মঙ্গল কামনা করে ও তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। এক প্রকারের বর্ণনা দ্বিতীয় প্রকারকে প্রকাশ করে দিচ্ছিল, তাই দ্বিতীয় প্রকারের লোকদের বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা ছেড়ে দিয়েছেন। এরূপ বর্ণনারীতি কবিদের কবিতাতেও পরিলক্ষিত হয়। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “লোকেরা কি এটা ধারণা করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি একথা বললেই তারা অব্যাহতি পেয়ে যাবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? আমি ঐ লোকদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম যারা তাদের পূর্বে অতীত হয়ে গিয়েছে, সুতরাং আল্লাহ ঐ লোকদেরকে জেনে নিবেন যারা সত্যবাদী ছিল এবং তিনি মিথ্যাবাদীদেরকেও জেনে নিবেন।” আর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা এ বিষটিকেই (আরবী) এই শব্দে বর্ণনা করেছেন। অন্য একটি আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ এরূপ নন যে, তিনি মুমিনদেরকে তোমাদের এ অবস্থাতেই ছেড়ে দিবেন এবং কে কলুষিত ও কে পবিত্র তা পরীক্ষা করে পৃথক করবেন না।" (৩:১৭৯) সুতরাং শরীয়তে জিহাদের বিধান দেয়ার এটাও একটা হিকমত যে, এর দ্বারা ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য ও তারতম্য হয়ে যায়। যদিও আল্লাহ সবকিছুই অবগত আছেন, যা হবে সেটাও তিনি জানেন, যা হয়নি সেটাও জানেন, আর যখন হবে তখন ওটা কিভাবে হবে সেটাও তিনি অবগত রয়েছেন। কোন কিছু হওয়ার পূর্বেই ওর জ্ঞান তার থাকে এবং প্রত্যেক জিনিসেরই অবস্থা সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত। তবুও তিনি দুনিয়াতেও ভাল-মন্দ এবং সত্য ও মিথ্যা প্রকাশ করে দিতে চান। তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদও নেই এবং তিনি ছাড়া অন্য কোন প্রতিপালকও নেই। তাঁর ফায়সালা ও ইচ্ছাকে কেউই পরিবর্তন করতে পারে না।
আত-তাওবা 9:17
১৭-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, যারা আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে তারা আল্লাহর মসজিদগুলো আবাদ করার যোগ্যই নয়। তারা তো মুশরিক! আল্লাহর ঘরের সাথে তাদের কি সম্পর্ক? (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) ও পড়া হয়েছে। এর দ্বারা মসজিদুল হারামকে বুঝানো হয়েছে, যা দুনিয়ার মসজিদসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী মর্যাদার অধিকারী। এটা প্রথম দিন থেকে শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদতের জন্যেই নির্মিত হয়েছে। আল্লাহর খলীল ইবরাহীম (আঃ) এ ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এ লোকগুলো নিজেদের অবস্থার দ্বারা ও কথার দ্বারা নিজেদের কুফরীর স্বীকারোক্তিকারী। যেমন সুদ্দী (রঃ) বলেন, তুমি যদি খ্রীষ্টানকে জিজ্ঞেস কর – “তোমার ধর্ম কি?” সে অবশ্যই উত্তরে বলবেঃ “আমি খ্রীষ্টান ধর্মের লোক।” ইয়াহূদীকে তার ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলবেঃ “আমি ইয়াহুদী ধর্মাবলম্বী।” সাবীকে জিজ্ঞেস করলে সেও বলবেঃ “আমি সাবী।” এই মুশরিকরাও বলবে, “আমরা মুশরিক।” আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের সমস্ত আমল বিফল হয়ে গেল। কারণ তারা আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করেছে। চিরদিনের জন্যে তারা জাহান্নামী হয়ে গেল। তারা অন্যদেরকে মসজিদুল হারাম থেকে বাধা প্রদান করে থাকে। তারা নিজেদেরকে আল্লাহর বন্ধু বললেও প্রকৃতপক্ষে তারা তা নয়। আল্লাহর বন্ধু তো ওরাই যারা তাকে ভয় করে চলে। কিন্তু অধিকাংশ লোকই এটা বুঝে না ও জানে না। হ্যাঁ, আল্লাহর ঘরের আবাদ হবে মুমিনদের দ্বারা। সুতরাং যাদের দ্বারা আল্লাহর ঘর আবাদ হয়, কুরআন কারীম হচ্ছে তাদের ঈমানের সাক্ষী।আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা কোন লোককে দেখতে পাও যে, সে মসজিদে যেতে আসতে অভ্যস্ত হয়েছে তখন তোমরা তার ঈমানের সাক্ষ্য প্রদান কর।” অতঃপর তিনি (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) এবং ইমাম হাকিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মসজিদসমূহের আবাদকারীরাই হলো আল্লাহওয়ালা।” আনাস (রাঃ) হতে মারফু’রূপে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা মসজিদমুখীদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে গোটা কওমের উপর থেকেই আযাব সরিয়ে নেন।” আনাস (রাঃ) হতেই মারফু’রূপে আরো একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার সম্মান ও মর্যাদার কসম! আমি পৃথিবীবাসীর উপর শাস্তি প্রেরণের ইচ্ছা করি, কিন্তু যখন আমার ঘরসমূহের আবাদকারীদের প্রতি, আমারই সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পরস্পর প্রেম বিনিময়কারীদের প্রতি এবং প্রাতঃকালে ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের প্রতি দৃষ্টিপাত করি তখন ঐ আযাব তাদের উপর থেকে সরিয়ে থাকি।” (ইবনে আসাকের (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “শয়তান হচ্ছে মানুষের জন্যে নেকড়ে বাঘ স্বরূপ। যেমন বকরীর (শুক্র) নেকড়ে বাঘ দূরে পৃথক ও বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থানকারী বকরীকে ধরে নেয় (তদ্রুপ তোমরা দল ছাড়া হয়ে থাকলে তোমাদেরকেও শয়তান পথভ্রষ্ট করবে)। সুতরাং তোমরা মতভেদ সৃষ্টি করা থেকে বেঁচে থাক এবং নিজেদের জন্যে জামাআত, সর্বসাধারণ ও মসজিদসমূহ আঁকড়ে ধরাকে অপরিহার্য করে নও।আমর ইবনে মায়মূন আওদী (রঃ) বলেন, আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাহাবীগণকে বলতে শুনেছি- “ভূ-পৃষ্ঠের মসজিদগুলো আল্লাহর ঘর। যারা এখানে আসবে, আল্লাহর হক হচ্ছে তাদেরকে মর্যাদা দেয়া।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সালাতের আযান শোনার পর মসজিদে এসে জামাআতের সাথে সালাত আদায় করে না, তার সালাত হয় না। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর নাফরমানী করলো। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহর মসজিদগুলো আবাদ করা তাদেরই কাজ, যারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামতের দিনের প্রতি ঈমান আনয়ন করে। (এটা ইবনে মিরদুওয়াই তাখরীজ করেছেন) এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা সালাত প্রতিষ্ঠিত করে। শারীরিক ইবাদত সালাতের তারা পাবন্দ হয়ে থাকে এবং আর্থিক ইবাদত যাকাতও তারা আদায় করে। তাদের কল্যাণ তাদের নিজেদের জন্যেও হয় এবং সাধারণ মাখলুকের জন্যেও হয়। তাদের অন্তর আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও ভয় করে না। এরাই হচ্ছে সুপথপ্রাপ্ত লোক এবং এরাই হচ্ছে একত্ববাদী ও ঈমানদার। কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, যারা পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পাবন্দ, শুধুমাত্র আল্লাহকেই যারা ভয় করে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের যারা ইবাদত করে না তারাই সুপথগামী এবং সফলকাম। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই (আরবী) শব্দ এসেছে সেখানেই তা নিশ্চিত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, ‘আশা’ অর্থে নয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) এখানে অর্থ হবে- “হে নবী (সঃ)! এটা নিশ্চিত কথা যে, আল্লাহ তোমাকে মাকামে মাহমূদে পৌছিয়ে দিবেন।” (১৭:৭৯) এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর কালামে শব্দটি সত্য ও নিশ্চয়তার জন্যে এসে থাকে।
আত-তাওবা 9:18
১৭-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, যারা আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে তারা আল্লাহর মসজিদগুলো আবাদ করার যোগ্যই নয়। তারা তো মুশরিক! আল্লাহর ঘরের সাথে তাদের কি সম্পর্ক? (আরবী) শব্দটিকে (আরবী) ও পড়া হয়েছে। এর দ্বারা মসজিদুল হারামকে বুঝানো হয়েছে, যা দুনিয়ার মসজিদসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী মর্যাদার অধিকারী। এটা প্রথম দিন থেকে শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদতের জন্যেই নির্মিত হয়েছে। আল্লাহর খলীল ইবরাহীম (আঃ) এ ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এ লোকগুলো নিজেদের অবস্থার দ্বারা ও কথার দ্বারা নিজেদের কুফরীর স্বীকারোক্তিকারী। যেমন সুদ্দী (রঃ) বলেন, তুমি যদি খ্রীষ্টানকে জিজ্ঞেস কর – “তোমার ধর্ম কি?” সে অবশ্যই উত্তরে বলবেঃ “আমি খ্রীষ্টান ধর্মের লোক।” ইয়াহূদীকে তার ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলবেঃ “আমি ইয়াহুদী ধর্মাবলম্বী।” সাবীকে জিজ্ঞেস করলে সেও বলবেঃ “আমি সাবী।” এই মুশরিকরাও বলবে, “আমরা মুশরিক।” আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের সমস্ত আমল বিফল হয়ে গেল। কারণ তারা আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করেছে। চিরদিনের জন্যে তারা জাহান্নামী হয়ে গেল। তারা অন্যদেরকে মসজিদুল হারাম থেকে বাধা প্রদান করে থাকে। তারা নিজেদেরকে আল্লাহর বন্ধু বললেও প্রকৃতপক্ষে তারা তা নয়। আল্লাহর বন্ধু তো ওরাই যারা তাকে ভয় করে চলে। কিন্তু অধিকাংশ লোকই এটা বুঝে না ও জানে না। হ্যাঁ, আল্লাহর ঘরের আবাদ হবে মুমিনদের দ্বারা। সুতরাং যাদের দ্বারা আল্লাহর ঘর আবাদ হয়, কুরআন কারীম হচ্ছে তাদের ঈমানের সাক্ষী।আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা কোন লোককে দেখতে পাও যে, সে মসজিদে যেতে আসতে অভ্যস্ত হয়েছে তখন তোমরা তার ঈমানের সাক্ষ্য প্রদান কর।” অতঃপর তিনি (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) এবং ইমাম হাকিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মসজিদসমূহের আবাদকারীরাই হলো আল্লাহওয়ালা।” আনাস (রাঃ) হতে মারফু’রূপে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা মসজিদমুখীদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে গোটা কওমের উপর থেকেই আযাব সরিয়ে নেন।” আনাস (রাঃ) হতেই মারফু’রূপে আরো একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার সম্মান ও মর্যাদার কসম! আমি পৃথিবীবাসীর উপর শাস্তি প্রেরণের ইচ্ছা করি, কিন্তু যখন আমার ঘরসমূহের আবাদকারীদের প্রতি, আমারই সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পরস্পর প্রেম বিনিময়কারীদের প্রতি এবং প্রাতঃকালে ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের প্রতি দৃষ্টিপাত করি তখন ঐ আযাব তাদের উপর থেকে সরিয়ে থাকি।” (ইবনে আসাকের (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “শয়তান হচ্ছে মানুষের জন্যে নেকড়ে বাঘ স্বরূপ। যেমন বকরীর (শুক্র) নেকড়ে বাঘ দূরে পৃথক ও বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থানকারী বকরীকে ধরে নেয় (তদ্রুপ তোমরা দল ছাড়া হয়ে থাকলে তোমাদেরকেও শয়তান পথভ্রষ্ট করবে)। সুতরাং তোমরা মতভেদ সৃষ্টি করা থেকে বেঁচে থাক এবং নিজেদের জন্যে জামাআত, সর্বসাধারণ ও মসজিদসমূহ আঁকড়ে ধরাকে অপরিহার্য করে নও।আমর ইবনে মায়মূন আওদী (রঃ) বলেন, আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাহাবীগণকে বলতে শুনেছি- “ভূ-পৃষ্ঠের মসজিদগুলো আল্লাহর ঘর। যারা এখানে আসবে, আল্লাহর হক হচ্ছে তাদেরকে মর্যাদা দেয়া।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সালাতের আযান শোনার পর মসজিদে এসে জামাআতের সাথে সালাত আদায় করে না, তার সালাত হয় না। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর নাফরমানী করলো। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহর মসজিদগুলো আবাদ করা তাদেরই কাজ, যারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামতের দিনের প্রতি ঈমান আনয়ন করে। (এটা ইবনে মিরদুওয়াই তাখরীজ করেছেন) এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা সালাত প্রতিষ্ঠিত করে। শারীরিক ইবাদত সালাতের তারা পাবন্দ হয়ে থাকে এবং আর্থিক ইবাদত যাকাতও তারা আদায় করে। তাদের কল্যাণ তাদের নিজেদের জন্যেও হয় এবং সাধারণ মাখলুকের জন্যেও হয়। তাদের অন্তর আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও ভয় করে না। এরাই হচ্ছে সুপথপ্রাপ্ত লোক এবং এরাই হচ্ছে একত্ববাদী ও ঈমানদার। কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, যারা পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পাবন্দ, শুধুমাত্র আল্লাহকেই যারা ভয় করে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের যারা ইবাদত করে না তারাই সুপথগামী এবং সফলকাম। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই (আরবী) শব্দ এসেছে সেখানেই তা নিশ্চিত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, ‘আশা’ অর্থে নয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) এখানে অর্থ হবে- “হে নবী (সঃ)! এটা নিশ্চিত কথা যে, আল্লাহ তোমাকে মাকামে মাহমূদে পৌছিয়ে দিবেন।” (১৭:৭৯) এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর কালামে শব্দটি সত্য ও নিশ্চয়তার জন্যে এসে থাকে।
আত-তাওবা 9:19
১৯-২২ নং আয়াতের তাফসীর: এর তাফসীরে ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কাফিররা বলতোঃ “বায়তুল্লাহর খিদমত করা এবং হাজীদেরকে পানি পান করানো ঈমান ও জিহাদ হতে উত্তম। যেহেতু আমরা এ দুটো খিদমত আঞ্জাম দিচ্ছি সেহেতু আমাদের চেয়ে উত্তম আর কেউই হতে পারে না।” আল্লাহ তাআলা এখানে তাদের অহংকার ও দম্ভ এবং সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, হে কাফিররা! যখন তোমাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তোমরা বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও এবং সম্পূর্ণ উদাসীন থাকো। সুতরাং তোমাদের এসব গর্ব ও অহংকার বাজে ও অযৌক্তিক। এমনিতেই তো আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তার পথে জিহাদের গুরুত্ব অপরিসীম, তদুপরি তোমাদের মুকাবিলায় এর গুরুত্ব আরো বেশী। কেননা, তোমাদের যে কোন সৎকর্মকেই তো শিরূক খেয়ে ফেলে। তাই আল্লাহ পাক বলেন, এ দু'টি দল কখনো সমান হতে পারে না। এই মুশরিকরা নিজেদেরকে আল্লাহর ঘরের আবাদকারী বলছে বটে, কিন্তু আল্লাহ তাদের নামকরণ করছেন যালিমরূপে। তার ঘরের যে তারা খিদমত করছে তা সম্পূর্ণ বৃথা বলে তিনি ঘোষণা করলেন।আব্বাস (রাঃ) বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দী থাকার সময় মুসলিমরা তাঁকে শিরকের কারণে নিন্দে করলে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যদি ইসলাম ও জিহাদে থেকে থাকে তবে আমরাও তো কাবা ঘরের খিদমত এবং হাজীদেরকে পানি পান করানোর কাজে ছিলাম।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং বলা হয় যে, শিবৃকের অবস্থায় যে পুণ্যের কাজ করা হয় তার সবই বিফলে যায়। বর্ণিত আছে যে, সাহাবীগণ (রাঃ) যখন আব্বাস (রাঃ)-এর সাথে কথা কাটাকাটি শুরু করেন তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আমরা মসজিদুল হারামের মুতাওয়াল্লী ছিলাম, গোলামদেরকে আমরা আযাদ করতাম, আমরা বায়তুল্লাহর উপর গিলাফ চড়াতাম এবং হাজীদেরকে পানি পান করাতাম।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।মুহাম্মাদ ইবনে কারীম (রঃ) বলেন যে, একদা তালহা ইবনে শায়বা (রাঃ), আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) এবং আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বসেছিলেন ও নিজ নিজ মর্যাদার কথা বর্ণনা করে গৌরব প্রকাশ করছিলেন। তালহা (রাঃ) বলেনঃ “আমি বায়তুল্লাহর চাবি রক্ষক। আমি ইচ্ছা করলে সেখানেই রাত্রি যাপন করতে পারি।” আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি হাজীদেরকে যমযমের পানি পান করিয়ে থাকি এবং আমি যমযম কূপের রক্ষক। আমি ইচ্ছা করলে সারারাত মসজিদেই কাটিয়ে দিতে পারি।” আলী (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা দু’জন যা বলছে তা আমার মোটেই বোধগম্য হচ্ছে না। আমি জনগণের ছয়মাস পূর্ব থেকে কিবলামুখী হয়ে সালাত পড়েছি। আমি একজন মুজাহিদও বটে।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। আব্বাস (রাঃ) আশংকা প্রকাশ করেন যে, না জানি তাঁকে হয়তো যমযম কূপের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “না, না, আপনি এ পদেই প্রতিষ্ঠিত থাকুন! আপনার জন্যে এতেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ আয়াতের তাফসীরে একটি মারফু হাদীসও এসেছে। যা এখানেও উল্লেখ করা প্রয়োজন। নুমান ইবনে। বাশীর আল আনসারী (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এক দল সাহাবীর সাথে তার মিম্বরের নিকট বসেছিলাম। তাদের মধ্যে একজন লোক বলেনঃ “ইসলাম গ্রহণের পর হাজীদেরকে পানি পান করানো ছাড়া আমি আর কোন আমল না করলেও আমার কোন পরওয়া নেই। অন্য একটি লোক মসজিদে হারামের আবাদ করার কথা বললেন। তৃতীয় এক ব্যক্তি বললেনঃ “তোমরা দু’জন যে আমলের কথা বললে তার চেয়ে জিহাদই উত্তম।” তখন উমার (রাঃ) তাঁদেরকে ধমক দিয়ে বললেনঃ “তোমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর মিম্বরের নিকট উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো না।” ওটা ছিল জুমআর দিন। উমার (রাঃ) তাদেরকে বলেনঃ “জুমআর সালাত আদায় হলে পর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছো তা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করবো।” তিনি তাই করেন। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবী) পর্যন্ত আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) তাখরীজ করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ), ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। আর এটা তারই শব্দ)
আত-তাওবা 9:20
১৯-২২ নং আয়াতের তাফসীর: এর তাফসীরে ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কাফিররা বলতোঃ “বায়তুল্লাহর খিদমত করা এবং হাজীদেরকে পানি পান করানো ঈমান ও জিহাদ হতে উত্তম। যেহেতু আমরা এ দুটো খিদমত আঞ্জাম দিচ্ছি সেহেতু আমাদের চেয়ে উত্তম আর কেউই হতে পারে না।” আল্লাহ তাআলা এখানে তাদের অহংকার ও দম্ভ এবং সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, হে কাফিররা! যখন তোমাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তোমরা বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও এবং সম্পূর্ণ উদাসীন থাকো। সুতরাং তোমাদের এসব গর্ব ও অহংকার বাজে ও অযৌক্তিক। এমনিতেই তো আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তার পথে জিহাদের গুরুত্ব অপরিসীম, তদুপরি তোমাদের মুকাবিলায় এর গুরুত্ব আরো বেশী। কেননা, তোমাদের যে কোন সৎকর্মকেই তো শিরূক খেয়ে ফেলে। তাই আল্লাহ পাক বলেন, এ দু'টি দল কখনো সমান হতে পারে না। এই মুশরিকরা নিজেদেরকে আল্লাহর ঘরের আবাদকারী বলছে বটে, কিন্তু আল্লাহ তাদের নামকরণ করছেন যালিমরূপে। তার ঘরের যে তারা খিদমত করছে তা সম্পূর্ণ বৃথা বলে তিনি ঘোষণা করলেন।আব্বাস (রাঃ) বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দী থাকার সময় মুসলিমরা তাঁকে শিরকের কারণে নিন্দে করলে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যদি ইসলাম ও জিহাদে থেকে থাকে তবে আমরাও তো কাবা ঘরের খিদমত এবং হাজীদেরকে পানি পান করানোর কাজে ছিলাম।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং বলা হয় যে, শিবৃকের অবস্থায় যে পুণ্যের কাজ করা হয় তার সবই বিফলে যায়। বর্ণিত আছে যে, সাহাবীগণ (রাঃ) যখন আব্বাস (রাঃ)-এর সাথে কথা কাটাকাটি শুরু করেন তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আমরা মসজিদুল হারামের মুতাওয়াল্লী ছিলাম, গোলামদেরকে আমরা আযাদ করতাম, আমরা বায়তুল্লাহর উপর গিলাফ চড়াতাম এবং হাজীদেরকে পানি পান করাতাম।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।মুহাম্মাদ ইবনে কারীম (রঃ) বলেন যে, একদা তালহা ইবনে শায়বা (রাঃ), আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) এবং আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বসেছিলেন ও নিজ নিজ মর্যাদার কথা বর্ণনা করে গৌরব প্রকাশ করছিলেন। তালহা (রাঃ) বলেনঃ “আমি বায়তুল্লাহর চাবি রক্ষক। আমি ইচ্ছা করলে সেখানেই রাত্রি যাপন করতে পারি।” আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি হাজীদেরকে যমযমের পানি পান করিয়ে থাকি এবং আমি যমযম কূপের রক্ষক। আমি ইচ্ছা করলে সারারাত মসজিদেই কাটিয়ে দিতে পারি।” আলী (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা দু’জন যা বলছে তা আমার মোটেই বোধগম্য হচ্ছে না। আমি জনগণের ছয়মাস পূর্ব থেকে কিবলামুখী হয়ে সালাত পড়েছি। আমি একজন মুজাহিদও বটে।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। আব্বাস (রাঃ) আশংকা প্রকাশ করেন যে, না জানি তাঁকে হয়তো যমযম কূপের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “না, না, আপনি এ পদেই প্রতিষ্ঠিত থাকুন! আপনার জন্যে এতেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ আয়াতের তাফসীরে একটি মারফু হাদীসও এসেছে। যা এখানেও উল্লেখ করা প্রয়োজন। নুমান ইবনে। বাশীর আল আনসারী (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এক দল সাহাবীর সাথে তার মিম্বরের নিকট বসেছিলাম। তাদের মধ্যে একজন লোক বলেনঃ “ইসলাম গ্রহণের পর হাজীদেরকে পানি পান করানো ছাড়া আমি আর কোন আমল না করলেও আমার কোন পরওয়া নেই। অন্য একটি লোক মসজিদে হারামের আবাদ করার কথা বললেন। তৃতীয় এক ব্যক্তি বললেনঃ “তোমরা দু’জন যে আমলের কথা বললে তার চেয়ে জিহাদই উত্তম।” তখন উমার (রাঃ) তাঁদেরকে ধমক দিয়ে বললেনঃ “তোমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর মিম্বরের নিকট উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো না।” ওটা ছিল জুমআর দিন। উমার (রাঃ) তাদেরকে বলেনঃ “জুমআর সালাত আদায় হলে পর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছো তা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করবো।” তিনি তাই করেন। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবী) পর্যন্ত আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) তাখরীজ করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ), ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। আর এটা তারই শব্দ)
আত-তাওবা 9:21
১৯-২২ নং আয়াতের তাফসীর: এর তাফসীরে ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কাফিররা বলতোঃ “বায়তুল্লাহর খিদমত করা এবং হাজীদেরকে পানি পান করানো ঈমান ও জিহাদ হতে উত্তম। যেহেতু আমরা এ দুটো খিদমত আঞ্জাম দিচ্ছি সেহেতু আমাদের চেয়ে উত্তম আর কেউই হতে পারে না।” আল্লাহ তাআলা এখানে তাদের অহংকার ও দম্ভ এবং সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, হে কাফিররা! যখন তোমাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তোমরা বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও এবং সম্পূর্ণ উদাসীন থাকো। সুতরাং তোমাদের এসব গর্ব ও অহংকার বাজে ও অযৌক্তিক। এমনিতেই তো আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তার পথে জিহাদের গুরুত্ব অপরিসীম, তদুপরি তোমাদের মুকাবিলায় এর গুরুত্ব আরো বেশী। কেননা, তোমাদের যে কোন সৎকর্মকেই তো শিরূক খেয়ে ফেলে। তাই আল্লাহ পাক বলেন, এ দু'টি দল কখনো সমান হতে পারে না। এই মুশরিকরা নিজেদেরকে আল্লাহর ঘরের আবাদকারী বলছে বটে, কিন্তু আল্লাহ তাদের নামকরণ করছেন যালিমরূপে। তার ঘরের যে তারা খিদমত করছে তা সম্পূর্ণ বৃথা বলে তিনি ঘোষণা করলেন।আব্বাস (রাঃ) বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দী থাকার সময় মুসলিমরা তাঁকে শিরকের কারণে নিন্দে করলে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যদি ইসলাম ও জিহাদে থেকে থাকে তবে আমরাও তো কাবা ঘরের খিদমত এবং হাজীদেরকে পানি পান করানোর কাজে ছিলাম।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং বলা হয় যে, শিবৃকের অবস্থায় যে পুণ্যের কাজ করা হয় তার সবই বিফলে যায়। বর্ণিত আছে যে, সাহাবীগণ (রাঃ) যখন আব্বাস (রাঃ)-এর সাথে কথা কাটাকাটি শুরু করেন তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আমরা মসজিদুল হারামের মুতাওয়াল্লী ছিলাম, গোলামদেরকে আমরা আযাদ করতাম, আমরা বায়তুল্লাহর উপর গিলাফ চড়াতাম এবং হাজীদেরকে পানি পান করাতাম।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।মুহাম্মাদ ইবনে কারীম (রঃ) বলেন যে, একদা তালহা ইবনে শায়বা (রাঃ), আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) এবং আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বসেছিলেন ও নিজ নিজ মর্যাদার কথা বর্ণনা করে গৌরব প্রকাশ করছিলেন। তালহা (রাঃ) বলেনঃ “আমি বায়তুল্লাহর চাবি রক্ষক। আমি ইচ্ছা করলে সেখানেই রাত্রি যাপন করতে পারি।” আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি হাজীদেরকে যমযমের পানি পান করিয়ে থাকি এবং আমি যমযম কূপের রক্ষক। আমি ইচ্ছা করলে সারারাত মসজিদেই কাটিয়ে দিতে পারি।” আলী (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা দু’জন যা বলছে তা আমার মোটেই বোধগম্য হচ্ছে না। আমি জনগণের ছয়মাস পূর্ব থেকে কিবলামুখী হয়ে সালাত পড়েছি। আমি একজন মুজাহিদও বটে।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। আব্বাস (রাঃ) আশংকা প্রকাশ করেন যে, না জানি তাঁকে হয়তো যমযম কূপের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “না, না, আপনি এ পদেই প্রতিষ্ঠিত থাকুন! আপনার জন্যে এতেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ আয়াতের তাফসীরে একটি মারফু হাদীসও এসেছে। যা এখানেও উল্লেখ করা প্রয়োজন। নুমান ইবনে। বাশীর আল আনসারী (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এক দল সাহাবীর সাথে তার মিম্বরের নিকট বসেছিলাম। তাদের মধ্যে একজন লোক বলেনঃ “ইসলাম গ্রহণের পর হাজীদেরকে পানি পান করানো ছাড়া আমি আর কোন আমল না করলেও আমার কোন পরওয়া নেই। অন্য একটি লোক মসজিদে হারামের আবাদ করার কথা বললেন। তৃতীয় এক ব্যক্তি বললেনঃ “তোমরা দু’জন যে আমলের কথা বললে তার চেয়ে জিহাদই উত্তম।” তখন উমার (রাঃ) তাঁদেরকে ধমক দিয়ে বললেনঃ “তোমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর মিম্বরের নিকট উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো না।” ওটা ছিল জুমআর দিন। উমার (রাঃ) তাদেরকে বলেনঃ “জুমআর সালাত আদায় হলে পর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছো তা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করবো।” তিনি তাই করেন। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবী) পর্যন্ত আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) তাখরীজ করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ), ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। আর এটা তারই শব্দ)
আত-তাওবা 9:22
১৯-২২ নং আয়াতের তাফসীর: এর তাফসীরে ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কাফিররা বলতোঃ “বায়তুল্লাহর খিদমত করা এবং হাজীদেরকে পানি পান করানো ঈমান ও জিহাদ হতে উত্তম। যেহেতু আমরা এ দুটো খিদমত আঞ্জাম দিচ্ছি সেহেতু আমাদের চেয়ে উত্তম আর কেউই হতে পারে না।” আল্লাহ তাআলা এখানে তাদের অহংকার ও দম্ভ এবং সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, হে কাফিররা! যখন তোমাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তোমরা বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও এবং সম্পূর্ণ উদাসীন থাকো। সুতরাং তোমাদের এসব গর্ব ও অহংকার বাজে ও অযৌক্তিক। এমনিতেই তো আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তার পথে জিহাদের গুরুত্ব অপরিসীম, তদুপরি তোমাদের মুকাবিলায় এর গুরুত্ব আরো বেশী। কেননা, তোমাদের যে কোন সৎকর্মকেই তো শিরূক খেয়ে ফেলে। তাই আল্লাহ পাক বলেন, এ দু'টি দল কখনো সমান হতে পারে না। এই মুশরিকরা নিজেদেরকে আল্লাহর ঘরের আবাদকারী বলছে বটে, কিন্তু আল্লাহ তাদের নামকরণ করছেন যালিমরূপে। তার ঘরের যে তারা খিদমত করছে তা সম্পূর্ণ বৃথা বলে তিনি ঘোষণা করলেন।আব্বাস (রাঃ) বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দী থাকার সময় মুসলিমরা তাঁকে শিরকের কারণে নিন্দে করলে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যদি ইসলাম ও জিহাদে থেকে থাকে তবে আমরাও তো কাবা ঘরের খিদমত এবং হাজীদেরকে পানি পান করানোর কাজে ছিলাম।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং বলা হয় যে, শিবৃকের অবস্থায় যে পুণ্যের কাজ করা হয় তার সবই বিফলে যায়। বর্ণিত আছে যে, সাহাবীগণ (রাঃ) যখন আব্বাস (রাঃ)-এর সাথে কথা কাটাকাটি শুরু করেন তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আমরা মসজিদুল হারামের মুতাওয়াল্লী ছিলাম, গোলামদেরকে আমরা আযাদ করতাম, আমরা বায়তুল্লাহর উপর গিলাফ চড়াতাম এবং হাজীদেরকে পানি পান করাতাম।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।মুহাম্মাদ ইবনে কারীম (রঃ) বলেন যে, একদা তালহা ইবনে শায়বা (রাঃ), আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) এবং আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বসেছিলেন ও নিজ নিজ মর্যাদার কথা বর্ণনা করে গৌরব প্রকাশ করছিলেন। তালহা (রাঃ) বলেনঃ “আমি বায়তুল্লাহর চাবি রক্ষক। আমি ইচ্ছা করলে সেখানেই রাত্রি যাপন করতে পারি।” আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি হাজীদেরকে যমযমের পানি পান করিয়ে থাকি এবং আমি যমযম কূপের রক্ষক। আমি ইচ্ছা করলে সারারাত মসজিদেই কাটিয়ে দিতে পারি।” আলী (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা দু’জন যা বলছে তা আমার মোটেই বোধগম্য হচ্ছে না। আমি জনগণের ছয়মাস পূর্ব থেকে কিবলামুখী হয়ে সালাত পড়েছি। আমি একজন মুজাহিদও বটে।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। আব্বাস (রাঃ) আশংকা প্রকাশ করেন যে, না জানি তাঁকে হয়তো যমযম কূপের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “না, না, আপনি এ পদেই প্রতিষ্ঠিত থাকুন! আপনার জন্যে এতেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ আয়াতের তাফসীরে একটি মারফু হাদীসও এসেছে। যা এখানেও উল্লেখ করা প্রয়োজন। নুমান ইবনে। বাশীর আল আনসারী (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এক দল সাহাবীর সাথে তার মিম্বরের নিকট বসেছিলাম। তাদের মধ্যে একজন লোক বলেনঃ “ইসলাম গ্রহণের পর হাজীদেরকে পানি পান করানো ছাড়া আমি আর কোন আমল না করলেও আমার কোন পরওয়া নেই। অন্য একটি লোক মসজিদে হারামের আবাদ করার কথা বললেন। তৃতীয় এক ব্যক্তি বললেনঃ “তোমরা দু’জন যে আমলের কথা বললে তার চেয়ে জিহাদই উত্তম।” তখন উমার (রাঃ) তাঁদেরকে ধমক দিয়ে বললেনঃ “তোমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর মিম্বরের নিকট উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো না।” ওটা ছিল জুমআর দিন। উমার (রাঃ) তাদেরকে বলেনঃ “জুমআর সালাত আদায় হলে পর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছো তা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করবো।” তিনি তাই করেন। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবী) পর্যন্ত আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) তাখরীজ করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ), ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। আর এটা তারই শব্দ)
আত-তাওবা 9:23
২৩-২৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে মুমিনদেরকে নিষেধ করছেন, যদিও তারা তাদের মাতা, পিতা, ভাই, বোন প্রভৃতি হাক না কেন, যদি তারা ইসলামের উপর কুফরীকে পছন্দ করে নেয়। অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী!) যারা আল্লাহর উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তাদেরকে তুমি পাবে না যে, তারা বন্ধুত্ব রাখবে এমন লোকদের সাথে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে শত্রুতা রাখে, যদিও তারা তাদের পিতা হয় বা ছেলে হয় অথবা ভাই হয় কিংবা স্বগোত্রীয় হয়। এরা তারাই, যাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন এবং স্বীয় বিশেষ রুহ দ্বারা তাদেরকে সাহায্য করেছেন, তিনি তাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবিষ্ট করবেন যেগুলোর নীচ দিয়ে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হবে।” (৫৮:২২)ইমাম বায়হাকী (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, বদরের যুদ্ধের দিন আবু উবাইদাহ্ ইবনে জাররাহ (রাঃ)-এর পিতা তার সামনে এসে মূর্তির প্রশংসা করতে শুরু করে দেয়। তিনি তাকে বারবার বিরত রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু সে বেড়েই চলে। তখন পিতা-পুত্রে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আবু উবাইদাহ (রাঃ) স্বীয় পিতাকে হত্যা করে দেন। তখন আল্লাহ তাআলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে আদেশ করছেন যে, যারা তাদের পরিবারবর্গকে, আত্মীয়-স্বজনকে এবং স্বগোত্রীয়দেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর প্রাধান্য দেয় তাদেরকে যেন তিনি ভীতি প্রদর্শন করে বলেনঃ “যদি তোমাদের পিতাগণ, তোমাদের পুত্রগণ, তোমাদের ভ্রাতাগণ, তোমাদের স্ত্রীগণ, তোমাদের স্বগোত্র, আর ঐ সব ধন-সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছে, আর ঐ ব্যবসা যাতে তোমরা মন্দা পড়বার আশংকা করছো, (যদি এই সব) তোমাদের নিকট অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর চেয়ে, তবে তোমরা প্রতীক্ষা করতে থাকো এই পর্যন্ত যে, আল্লাহ নিজের নির্দেশ পাঠিয়ে দেন, আর আল্লাহ আদেশ অমান্যকারীদেরকে তাদের উদ্দিষ্ট স্থল পর্যন্ত পৌঁছান না।”মা’বাদ (রাঃ) তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (তাঁর দাদা) বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর সাথে পথ চলছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উমার (রাঃ)-এর হাত ধরেছিলেন। উমার (রাঃ) তাকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর কসম! আপনি আমার নিকট আমার প্রাণ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে প্রিয়তম।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমাদের কেউই (পূর্ণ) মুমিন হতে পারে না যে পর্যন্ত আমি তার কাছে তার প্রাণ অপেক্ষাও প্রিয় না হই।” উমার (রাঃ) তখন বললেনঃ “আপনি এখন আমার কাছে আমার জীবন থেকেও প্রিয়।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “হে উমার! তুমি এখন (পূর্ণ মুমিন হলে)।” (ইমাম বুখারী (রঃ) একাই এ হাদীসটি তাখরীজ করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তোমাদের কেউই (পূর্ণ) মুমিন হতে পারে না যে পর্যন্ত আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তান এবং সমস্ত লোক অপেক্ষা প্রিয়তম না হই।” মুসনাদে আহমাদে ও সুনানে আবি দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা ‘আয়ন'-এর ক্রয়-বিক্রয় শুরু করবে, বলদ-গাভীর লেজ ধারণ কবে এবং জিহাদ ছেড়ে দেবে তখন আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে লাঞ্ছনায় পতিত করবেন, আর তা দূর হবে না যে পর্যন্ত না তোমরা নিজেদের দ্বীনের দিকে ফিরে আসবে।”
আত-তাওবা 9:24
২৩-২৪ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে মুমিনদেরকে নিষেধ করছেন, যদিও তারা তাদের মাতা, পিতা, ভাই, বোন প্রভৃতি হাক না কেন, যদি তারা ইসলামের উপর কুফরীকে পছন্দ করে নেয়। অন্য আয়াতে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী!) যারা আল্লাহর উপর ও পরকালের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তাদেরকে তুমি পাবে না যে, তারা বন্ধুত্ব রাখবে এমন লোকদের সাথে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে শত্রুতা রাখে, যদিও তারা তাদের পিতা হয় বা ছেলে হয় অথবা ভাই হয় কিংবা স্বগোত্রীয় হয়। এরা তারাই, যাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন এবং স্বীয় বিশেষ রুহ দ্বারা তাদেরকে সাহায্য করেছেন, তিনি তাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবিষ্ট করবেন যেগুলোর নীচ দিয়ে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হবে।” (৫৮:২২)ইমাম বায়হাকী (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, বদরের যুদ্ধের দিন আবু উবাইদাহ্ ইবনে জাররাহ (রাঃ)-এর পিতা তার সামনে এসে মূর্তির প্রশংসা করতে শুরু করে দেয়। তিনি তাকে বারবার বিরত রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু সে বেড়েই চলে। তখন পিতা-পুত্রে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আবু উবাইদাহ (রাঃ) স্বীয় পিতাকে হত্যা করে দেন। তখন আল্লাহ তাআলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে আদেশ করছেন যে, যারা তাদের পরিবারবর্গকে, আত্মীয়-স্বজনকে এবং স্বগোত্রীয়দেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর প্রাধান্য দেয় তাদেরকে যেন তিনি ভীতি প্রদর্শন করে বলেনঃ “যদি তোমাদের পিতাগণ, তোমাদের পুত্রগণ, তোমাদের ভ্রাতাগণ, তোমাদের স্ত্রীগণ, তোমাদের স্বগোত্র, আর ঐ সব ধন-সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছে, আর ঐ ব্যবসা যাতে তোমরা মন্দা পড়বার আশংকা করছো, (যদি এই সব) তোমাদের নিকট অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর চেয়ে, তবে তোমরা প্রতীক্ষা করতে থাকো এই পর্যন্ত যে, আল্লাহ নিজের নির্দেশ পাঠিয়ে দেন, আর আল্লাহ আদেশ অমান্যকারীদেরকে তাদের উদ্দিষ্ট স্থল পর্যন্ত পৌঁছান না।”মা’বাদ (রাঃ) তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (তাঁর দাদা) বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর সাথে পথ চলছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উমার (রাঃ)-এর হাত ধরেছিলেন। উমার (রাঃ) তাকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর কসম! আপনি আমার নিকট আমার প্রাণ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে প্রিয়তম।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমাদের কেউই (পূর্ণ) মুমিন হতে পারে না যে পর্যন্ত আমি তার কাছে তার প্রাণ অপেক্ষাও প্রিয় না হই।” উমার (রাঃ) তখন বললেনঃ “আপনি এখন আমার কাছে আমার জীবন থেকেও প্রিয়।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “হে উমার! তুমি এখন (পূর্ণ মুমিন হলে)।” (ইমাম বুখারী (রঃ) একাই এ হাদীসটি তাখরীজ করেছেন)সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তোমাদের কেউই (পূর্ণ) মুমিন হতে পারে না যে পর্যন্ত আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তান এবং সমস্ত লোক অপেক্ষা প্রিয়তম না হই।” মুসনাদে আহমাদে ও সুনানে আবি দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা ‘আয়ন'-এর ক্রয়-বিক্রয় শুরু করবে, বলদ-গাভীর লেজ ধারণ কবে এবং জিহাদ ছেড়ে দেবে তখন আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে লাঞ্ছনায় পতিত করবেন, আর তা দূর হবে না যে পর্যন্ত না তোমরা নিজেদের দ্বীনের দিকে ফিরে আসবে।”
আত-তাওবা 9:25
২৫-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, সূরায়ে বারাআতের এটাই প্রথম আয়াত যাতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উপর তার বড় ইহসানের কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-এর সহচরদেরকে সাহায্য করতঃ তাঁদের শত্রুদের উপর তাদেরকে জয়যুক্ত করেছেন। এক জায়গায় নয়, বরং প্রতিটি জায়গায় তাদের উপর তাঁর সাহায্য থেকেছে। এ কারণেই বিজয় ও সফলতা কখনও তাদের সঙ্গ ছাড়েনি। এটা ছিল একমাত্র আল্লাহ তাআলারই সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার ফল, মাল ও যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্রের আধিক্যে নয়। আর এটা সংখ্যাধিক্যের কারণেও ছিল না। আল্লাহ পাক মুমিনদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা হুনায়েনের দিনটি স্মরণ কর। সেই দিন তোমরা তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে কিছুটা গর্ববোধ করেছিলে। তখন তোমাদের অবস্থা এই দাঁড়ালো যে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে! মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোক শুধু নবী (সঃ)-এর কাছে থাকলো । ঐ সময়েই আল্লাহর সাহায্য অবতীর্ণ হলো এবং তিনি তোমাদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করলেন যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পার যে, বিজয় লাভ শুধু আল্লাহর সাহায্যের মাধ্যমেই সম্ভব। তার সাহায্যের ফলেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল। বড় বড় দলের উপর বিজয়ী হয়ে থাকে। আল্লাহর সাহায্য ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকে।” এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে আমরা ইনশাআল্লাহ এখনই বর্ণনা করছি। মুসনাদে আহমাদে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “উত্তম সহচর হচ্ছে চার জন। উত্তম ক্ষুদ্র সেনাবাহিনীর সংখ্যা হচ্ছে চারশ’। উত্তম বৃহৎ সেনাবাহিনীর সংখ্যা হলো চার হাজার। আর বারো হাজারের সেনাবাহিনীর তো স্বল্পতার কারণে পরাজিত হতেই পারে না।” (এ হাদীসটি সুনানে আবি দাউদ ও জামিউত তিরমিযীতেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান গারীব বলেছেন। একজন বর্ণনাকারী ছাড়া অন্য সবাই এটাকে মুরসাল’ রূপে বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) ও ইমাম বায়হাকীও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। এসব বিষয় আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পর শাওয়াল মাসে হুনায়েনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মক্কা বিজয়ের ঘটনা হতে অবকাশ লাভের পর নবী (সঃ) প্রাথমিক সমুদয় কার্য সম্পাদন করেন, আর এদিকে মক্কার প্রায় সব লোকই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সকলকে আযাদও করে দেন। এমতাবস্থায় তিনি অবহিত হন যে, হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা সম্মিলিতভাবে একত্রিত হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তাদের নেতা হচ্ছে মালিক ইবনে আউফ নাসরী। সাকীফের সমস্ত গোত্রও তাদের সাথে যোগ দিয়েছে। অনুরূপভাবে বানু জাশম এবং বানু সা’দ ইবনে বকরও তাদের সাথে রয়েছে। বানু হিলালের কিছু লোকও ইন্ধন যোগাচ্ছে। বানু আমর ইবনে আমির এবং আউন ইবনে আমিরের কিছু লোকও তাদের সাথে আছে। এসব লোক একত্রিতভাবে নিজেদের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং বাড়ীর ধন-সম্পদ নিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে বেরিয়ে পড়লো। এমন কি তারা তাদের বকরী ও উটগুলোকে সাথে নিলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাথে মুহাজির ও আনসারদেরকে নিয়ে তাদের মুকাবিলার জন্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন। মক্কার প্রায় দু’হাজার নওমুসলিমও তার সাথে যোগ দেন। মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী উপত্যকায় উভয় সেনাবাহিনী মিলিত হলো। এ স্থানটির নাম ছিল হুনাইন। অতি সকালে আঁধার থাকতেই গুপ্তস্থানে গোপনীয়ভাবে অবস্থানকারী হাওয়াযেন গোত্র মুসলিমদের অজান্তে আকস্মিকভাবে তাদেরকে আক্রমণ করে বসে। তারা অসংখ্যা তীর বর্ষণ করতে করতে সম্মুখে অগ্রসর হয় এবং তরবারী চালনা শুরু করে দেয়। ফলে মুসলিমদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে যায় এবং তাঁদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায় । কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের দিকে অগ্রসর হন। এ সময় তিনি সাদা খচ্চরের উপর সওয়ার ছিলেন। আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্তুটির লাগামের ডান দিক ধরে ছিলেন এবং আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) বাম দিক ধারণ করেছিলেন। এ দু’জন জন্তুটির দ্রুতগতি প্রতিরোধ করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উচ্চৈঃস্বরে নিজের পরিচয় দিচ্ছিলেন এবং মুসলিমদেরকে ফিরে আসার নির্দেশ দান করছিলেন। তিনি জোর গলায় বলছিলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা কোথায় যাচ্ছ? এসো, আমি আল্লাহর সত্য রাসূল। আমি মিথ্যাবাদী নই। আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।” ঐ সময় তার সাথে মাত্র আশি থেকে একশজন সাহাবা উপস্থিত ছিলেন। আবু বকর (রাঃ), উমার (রাঃ), আব্বাস (রাঃ), আলী (রাঃ), ফযল ইবনে আব্বাস (রাঃ), আৰূ সুফিয়ান ইবনে হারিস (রাঃ), আইমান ইবনে উম্মে আইমান (রাঃ), উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ) প্রমুখ মহান ব্যক্তিবর্গ তার সাথেই ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর চাচা উচ্চৈঃস্বর বিশিষ্ট ব্যক্তি আব্বাস (রাঃ)-কে হুকুম দিলেন যে, তিনি যেন গাছের নীচে বায়আত গ্রহণকারীদেরকে পালাতে নিষেধ করে দেন। সুতরাং আব্বাস (রাঃ) উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিলেনঃ “হে বাবলা গাছের নীচে দীক্ষা গ্রহণকারীগণ! হে সূরায়ে বাকারার বহনকারীগণ!” এ শব্দ যাঁদেরই কাছে পৌঁছলো তারাই চারদিক থেকে লাব্বায়েক লাব্বায়েক বলতে বলতে ঐ শব্দের দিকে দৌড়িয়ে আসলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে এসে দাড়িয়ে গেলেন। এমন কি কারো উট ক্লান্ত হয়ে থেমে গেলে তিনি স্বীয় বর্ম পরিহিত হয়ে উটের উপর থেকে মাটিতে লাফিয়ে পড়েন এবং পায়ে হেঁটে নবী (সঃ)-এর সামনে হাযির হয়ে যান। যখন কিছু দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চারদিকে একত্রিত হয়ে যান তখন তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করতে শুরু করেন। প্রার্থনায় তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমার সাথে যে ওয়াদা করেছেন তা পূর্ণ করুন। অতঃপর তিনি এক মুষ্টি মাটি নেন এবং তা কাফিরদের দিকে নিক্ষেপ করেন। তাদের এমন কেউ বাকী থাকলো না যার চোখে ও মুখে ঐ মাটির কিছু না পড়লো । ফলে তারা যুদ্ধ করতে অপারগ হয়ে গেল এবং পরাজয় বরণ করলো। এদিকে মুসলিমরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলেন। মুসলিমদের বাকী সৈন্য রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট চলে গেলেন। যারা শত্রুদের পিছনে ছুটেছিলেন তারা তাদের কিছু সংখ্যক লোককে হত্যা করে ফেলেন এবং অবশিষ্টদেরকে বন্দী করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এনে হাযির করেন। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবু আবদির রহমান ফাহরী, যার নাম ইয়াযীদ ইবনে উসাইদ অথবা ইয়াযীদ ইবনে আনীস এবং যাকে কুরও বলা হয়, তিনি বলেন, আমি এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত গরম । দুপুরের সময় আমরা গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করি। সূর্য পশ্চিমে চলে যাওয়ার পর আমি আমার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হই এবং ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তাঁবুতে পৌছি। সালামের পর আমি তাঁকে বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখন বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তিনি বলেনঃ “হ্যাঁ, ঠিক আছে।” অতঃপর তিনি ডাক দেনঃ “বিলাল!” ঐ সময় বিলাল (রাঃ) একটি গাছের ছায়ায় বিশ্রাম করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ডাক শোনা মাত্রই (আরবী) এ কথা বলতে বলতে তিনি হাযির হয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আমার সওয়ারী ঠিক কর।" তখনই তিনি তার। ঘোড়ার জিন কষে দেন, যার পাল্লা দু’টি ছিল খেজুর পাতার রঞ্জু। সেখানে ছিল না কোন গর্ব ও অহংকারের বস্তু! জিন কষা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোড়ার উপর আরোহণ করেন। আমরা কাতারবন্দী হয়ে যাই। সন্ধ্যা ও রাত্রি এভাবেই কেটে যায়। অতঃপর উভয় সৈন্যদল মুখোমুখী হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে মুসলিমরা পালাতে শুরু করেন, যেমন আল্লাহ পাক কুরআন কারীমে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সবাইকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দারা! আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। হে মুহাজির দল! আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।” এরপর তিনি ঘোড়া হতে অবতরণ করেন এবং এক মুষ্টি মাটি নিয়ে বলেনঃ “এটা যেন তাদের চেহারায় পতিত হয়।”এ কথা বলে তিনি ঐ মাটি কাফিরদের দিকে নিক্ষেপ করেন। এতেই মহান আল্লাহ তাদেরকে পরাজিত করেন। ঐ মুশরিকরাই বর্ণনা করেছে- “আমাদের মধ্যে এমন কেউই বাকী ছিল না যার চোখে ও মুখে এ মাটি পড়েনি। ঐ সময় আমাদের মনে হচ্ছিল যেন যমীন ও আসমানের মাঝে কোন লোহার থালায় লোহা পতিত হচ্ছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম হাফিয বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)একটি বর্ণনায় আছে যে, পলায়নকারী মুসলিমদের মধ্যে একশজন যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফিরে আসলেন তখন ঐ সময়েই তিনি কাফিরদেরকে আক্রমণ করার আদেশ দান করলেন। প্রথমতঃ তিনি আনসারদেরকে আহ্বান করেছিলেন। অতঃপর এ আহ্বান শুধু খাজরাজদের উপরেই রয়ে যায়। এ গোত্রটি যুদ্ধের সময় বড়ই ধৈর্যের পরিচয় দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সওয়ারীর উপর থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। তিনি বলেনঃ “এখন ঘোরতর যুদ্ধ চলছে। এতে এই হলো যে, আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের যাদেরকে চাইলেন হত্যা করালেন এবং যাদেরকে চাইলেন বন্দী করালেন। আর তাদের মাল ও সন্তানগুলো ‘ফাই’ হিসেবে স্বীয় নবী (সঃ)-কে দান করলেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাকে একটি লোক বলেনঃ “হে আবূ আম্মারাহ (রাঃ)! আপনারা কি হুনায়েনের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “(এ কথা সত্য বটে) কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পা মুবারক একটুও পিছনে সরেনি। ব্যাপার ছিল এই যে, হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা তীরন্দাজীতে উস্তাদ ছিল। আল্লাহর ফযলে আমরা প্রথম আক্রমণেই তাদেরকে পরাস্ত করে দেই। কিন্তু লোকেরা যখন গনীমতের মালের উপর ঝুঁকে পড়ে তখন হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা সুযোগ বুঝে পুনরায় তীর বর্ষণ শুরু করে দেয়। ফলে মুসলিমদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়। সুবহানাল্লাহ! সেদিন দেখেছি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পূর্ণ সাহস ও বীরত্বপণা! মুসলিম সৈন্যেরা পলায়ন করেছে। তিনি এমন কোন দ্রুতগামী সওয়ারীর আরোহী ছিলেন না যে, সেটা দৌড়িয়ে পালাতে কাজে আসবে। বরং তিনি একটি খচ্চরের উপর সওয়ার ছিলেন এবং মুশরিকদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তিনি নিজেকে গোপন করে রাখেননি। বরং নিজের নাম উচ্চৈঃস্বরে উচ্চারণ করতে করতে চলছিলেন। যেন তাকে যারা চিনে না তারাও চিনতে পারে । চিন্তা করে দেখুন যে, একক সত্তার উপর তার কি পরিমাণ ভরসা! আর আল্লাহ তাআলার সাহায্যের উপর তার কত পূর্ণ বিশ্বাস! তিনি জানতেন যে, আল্লাহ তাআলা রিসালাতের ব্যাপারটাকে অবশ্যই পূর্ণ করবেন এবং তার দ্বীনকে দুনিয়ার সমস্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী করে রাখবেন। সুতরাং সদা সর্বদা তার উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক!”এখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর ও মুসলিমদের উপর প্রশান্তি অবতীর্ণ করার কথা বলছেন এবং আরো বলছেন যুদ্ধে ফেরেশতা প্রেরণের কথা যাদেরকে কেউই দেখতে পায়নি।ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) একজন মুশরিকের উক্তি নকল করেছেন যে, ঐ মুশরিক বর্ণনা করেছে- “হুনায়েনের দিন যখন আমরা যুদ্ধের জন্যে মুসলিমদের মুখোমুখী হই তখন তাদেরকে আমরা একটি বকরি দোহনে যে সময় লাগে এতটুকু সময়ও আমাদের সামনে টিকতে দেইনি, এর মধ্যেই তারা পরাজিত হয়ে যায় এবং তারা পালাতে শুরু করে। আমরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করি। এমতাবস্থায় একটি লোককে আমরা খচ্চরের উপর সওয়ার দেখতে পাই। আমরা আরো দেখতে পাই যে, কয়েকজন সুন্দর সাদা উজ্জ্বল চেহারার লোক তার চারদিকে রয়েছে এবং তাদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে, ‘তোমাদের চেহারাগুলো নষ্ট হাক, তোমরা ফিরে যাও। তাদের একথা বলার পরক্ষণেই আমাদের পরাজয় ঘটে যায়। শেষ পর্যন্ত মুসলিমরা আমাদের কাঁধে চেপে বসে।"ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুনায়েনের যুদ্ধের দিন আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথেই ছিলাম। তার সাথে মাত্র আশিজন মুহাজির ও আনসার রয়ে গিয়েছিলেন। আমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাদা খচ্চরের উপর সওয়ার হয়ে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তাঁর জন্তুটি হোঁচট খেলো । সুতরাং তিনি জিনের উপর থেকে নিচের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। আমি তাকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি উপরে উঠে যান। আল্লাহ আপনাকে উপরেই রাখবেন। তিনি তখন আমাকে বললেন, “এক মুষ্টিপূর্ণ মাটি নিয়ে এসো।” আমি তাঁকে এক মুষ্টিপূর্ণ মাটি এনে দিলাম। তিনি তা কাফিরদের দিকে নিক্ষেপ করলেন। ওটা তাদের চোখে পড়লো। অতঃপর তিনি বললেনঃ “মুহাজির ও আনসার কোথায়?” আমি উত্তরে বললাম, তারা এখানে আছে। তিনি বললেনঃ “তাদেরকে ডাক দাও।" আমি তাদেরকে ডাক দেয়া মাত্রই তারা তরবারী নিয়ে দ্রুত বেগে ধাবিত হলো। তখন মুশরিকরা দিশাহারা হয়ে পালাতে শুরু করলো।” (এ হাদীসটি হাফিয় বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন)শায়বা ইবনে উসমান (রাঃ) বলেন, হুনায়েনের যুদ্ধের দিন যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি এমন অবস্থায় দেখি যে, মুসলিম সৈন্যেরা পরাজিত হয়ে পালাতে শুরু করেছেন এবং তিনি একাকী রয়ে গেছেন, তখন আমার বদরের দিনের কথা স্মরণ হয়ে যায়। ঐদিন আমার পিতা ও চাচা আলী (রাঃ) ও হামযা (রাঃ)-এর হাতে মারা যায়। আমি মনে মনে বলি যে, এর প্রতিশোধ গ্রহণের এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কি হতে পারে? অতঃপর আমি নবী (সঃ)-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তার ডান দিকে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি যে, সেখানে আব্বাস ইবনে আব্দিল মুত্তালিব (রাঃ) চাঁদির ন্যায় সাদা বর্ম পরিহিত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমি ভাবলাম যে, তিনি স্বীয় ভ্রাতুস্পুত্রকে পূর্ণভাবে রক্ষা করার চেষ্টা করবেন। তাই আমি তার বাম দিকে চলে গেলাম। সেখানেও দেখি যে, আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) দাঁড়িয়ে আছেন। আমি চিন্তা করলাম যে, তিনি তাঁর চাচাতো ভাইকে অবশ্যই রক্ষা করার প্রাণপণ চেষ্টা করবেন। সুতরাং আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছন দিকে চলে গেলাম। আমি তাঁকে তরবারী দ্বারা আঘাত করতে উদ্যত হয়েছি এমন সময় দেখি যে, একটি আগুনের কোড়া বিদ্যুতের মত চমকিত হয়ে আমার উপর পতিত হচ্ছে। আমি দু'চোখ বন্ধ করে নিলাম এবং পশ্চাদপদে পিছন দিকে সরতে লাগলাম। ঐ সময়েই রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার দিকে ফিরে তাকালেন এবং বললেনঃ “হে শায়বা! আমার কাছে এসো।" অতঃপর বললেনঃ “হে আল্লাহ! তার সাথের শয়তানদেরকে দূর করে দিন!” চোখ খুলে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে তাকালাম। আল্লাহর শপথ! ঐ সময় তিনি আমার কাছে আমার চক্ষু ও কর্ণ অপেক্ষাও অধিক প্রিয় ছিলেন। তিনি আমাকে বললেনঃ “হে শায়বা! যাও, কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করগে।” শায়বা (রাঃ) বলেন, ঐ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমিও ছিলাম। কিন্তু ইসলামের কারণে বা ইসলামের পরিচয় লাভের ভিত্তিতে বের হইনি। বরং আমি এটা চাইনি যে, হাওয়াযেন গোত্র কুরায়েশ গোত্রের উপর জয়যুক্ত হাক। আমি তার কাছেই দণ্ডায়মান ছিলাম, এমন সময় আমি সাদা কালো মিশ্রিত রং-এর ঘোড়া দেখে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো সাদা কালো মিশ্রিত রং-এর ঘোড়া দেখতে পাচ্ছি! তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে শায়বা! এটা তো কাফিরগণ ছাড়া আর কারো দৃষ্টিগোচর হয় না!" অতঃপর তিনি আমার বক্ষে হাত রেখে দুআ করলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি শায়বাকে সুপথ প্রদর্শন করুন!" তারপর তিনি দ্বিতীয়বার ও তৃতীয়বার এরূপই করলেন এবং এটাই বললেন। আল্লাহর শপথ! তাঁর হাত আমার বক্ষ হতে সরে যাওয়ার পূর্বেই আমার অন্তরে তার প্রতি সারা দুনিয়া অপেক্ষা বেশী ভালবাসা সৃষ্টি হয়। (হাফিয বায়হাকী (রঃ)-এ হাদীসটি তাখরীজ করেছেন) তিনি পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন, যাতে রয়েছে প্রাথমিক অবস্থায় মুসলিমদের পরাজয় বরণ, আব্বাস (রাঃ)-এর তাদেরকে আহ্বান, আল্লাহর কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্য প্রার্থনা এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার মুশরিকদেরকে পরাজিতকরণ।জুবাইর ইবনে মুতইম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “হুনায়েনের যুদ্ধে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। আমি লক্ষ্য করি যে, আকাশ থেকে যেন কালো পিপড়ার মত কিছু অবতীর্ণ হচ্ছে, যা সারা মাঠকে ঘিরে ফেললো। তখনই মুশরিকদের পরাজয় ঘটে গেল। ওটা যে আসমানী মদদ বা সাহায্য ছিল এতে আমাদের কোনই সন্দেহ নেই।ইয়াযীদ ইবনে আমির সুওয়াঈ (রাঃ) তাঁর কুফরীর যুগে হুনায়েনের যুদ্ধে কাফিরদের সাথে ছিলেন। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “ঐ সময় আপনাদের মনের ভীতি ও ত্রাসের অবস্থা কেমন ছিল?” তখন তিনি থালায় কংকর রেখে তা বাজাতে বাজাতে বলেনঃ “আমাদের অন্তরে এরূপ শব্দ অনুভূত হচ্ছিল। ফলে আমাদের হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠছিল এবং অন্তরাত্মা শুকিয়ে যাচ্ছিল।” সহীহ মুসলিমে আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে ‘রুব’ বা ভক্তিযুক্ত ভয় দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে এবং আমাকে সমুদয় কালেমা প্রদান করা হয়েছে। মোটকথা আল্লাহ তাআলা কাফিরদেরকে এই শাস্তি প্রদান করেন এবং ওটা ছিল তাদের কুফরীরই বিনিময়। হাওয়াযেন গোত্রের বাকী লোকদের উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হয়। তাদেরও সৌভাগ্য লাভ হয় যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়। ঐ সময় তিনি বিজয়ী বেশে প্রত্যাবর্তনের পথে মক্কার নিকটবর্তী জেয়েররানা নামক স্থানে পৌছেছিলেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে বিশদিন অতিক্রান্ত হয়েছিল। এ জন্যেই তিনি তাদেরকে বলেছিলেনঃ “দুটোর মধ্যে যে কোন একটি তোমরা পছন্দ করে নাও, বন্দী অথবা মাল!” তারা বন্দীদেরকে ফিরিয়ে নেয়াই পছন্দ করলো । ঐ বন্দীদের ছোট-বড়, নর-নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক প্রভৃতির মোট সংখ্যা ছিল ছয় হাজার। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সব বন্দীকেই তাদেরকে ফিরিয়ে দেন এবং তাদের মালকে গনীমত হিসেবে মুসলিমদের মধ্যে বন্টন করে দেন। তিনি মক্কার আযাদকৃত নও মুসলিদেরকেও ঐ মাল থেকে কিছু কিছু প্রদান করেন, যেন তাদের অন্তর পুরোপুরিভাবে ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মালিক ইবনে আউফ নাসরীকেও তিনি একশটি উট প্রদান করেন এবং তাকেই তার কওমের নেতা বানিয়ে দেন, যেমন সে ছিল। এরই প্রশংসায় সে তার প্রসিদ্ধ কবিতায় বলেছিলঃ (অনুবাদ) “আমি তো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর মত কাউকেও দেখিওনি, শুনিওনি। দান খয়রাতে এবং অপরাধ ক্ষমাকরণে তিনি হচ্ছেন বিশ্বের মধ্যে অদ্বিতীয়। কাল কিয়ামতের দিনে যা কিছু ঘটবে তা সবই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বীরত্ব ও সাহসিকতায়ও তিনি অতুলনীয়। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি সিংহের ন্যায় গর্জন করতে করতে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হয়ে থাকেন। ”
আত-তাওবা 9:26
২৫-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, সূরায়ে বারাআতের এটাই প্রথম আয়াত যাতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উপর তার বড় ইহসানের কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-এর সহচরদেরকে সাহায্য করতঃ তাঁদের শত্রুদের উপর তাদেরকে জয়যুক্ত করেছেন। এক জায়গায় নয়, বরং প্রতিটি জায়গায় তাদের উপর তাঁর সাহায্য থেকেছে। এ কারণেই বিজয় ও সফলতা কখনও তাদের সঙ্গ ছাড়েনি। এটা ছিল একমাত্র আল্লাহ তাআলারই সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার ফল, মাল ও যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্রের আধিক্যে নয়। আর এটা সংখ্যাধিক্যের কারণেও ছিল না। আল্লাহ পাক মুমিনদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা হুনায়েনের দিনটি স্মরণ কর। সেই দিন তোমরা তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে কিছুটা গর্ববোধ করেছিলে। তখন তোমাদের অবস্থা এই দাঁড়ালো যে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে! মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোক শুধু নবী (সঃ)-এর কাছে থাকলো । ঐ সময়েই আল্লাহর সাহায্য অবতীর্ণ হলো এবং তিনি তোমাদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করলেন যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পার যে, বিজয় লাভ শুধু আল্লাহর সাহায্যের মাধ্যমেই সম্ভব। তার সাহায্যের ফলেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল। বড় বড় দলের উপর বিজয়ী হয়ে থাকে। আল্লাহর সাহায্য ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকে।” এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে আমরা ইনশাআল্লাহ এখনই বর্ণনা করছি। মুসনাদে আহমাদে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “উত্তম সহচর হচ্ছে চার জন। উত্তম ক্ষুদ্র সেনাবাহিনীর সংখ্যা হচ্ছে চারশ’। উত্তম বৃহৎ সেনাবাহিনীর সংখ্যা হলো চার হাজার। আর বারো হাজারের সেনাবাহিনীর তো স্বল্পতার কারণে পরাজিত হতেই পারে না।” (এ হাদীসটি সুনানে আবি দাউদ ও জামিউত তিরমিযীতেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান গারীব বলেছেন। একজন বর্ণনাকারী ছাড়া অন্য সবাই এটাকে মুরসাল’ রূপে বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) ও ইমাম বায়হাকীও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। এসব বিষয় আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পর শাওয়াল মাসে হুনায়েনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মক্কা বিজয়ের ঘটনা হতে অবকাশ লাভের পর নবী (সঃ) প্রাথমিক সমুদয় কার্য সম্পাদন করেন, আর এদিকে মক্কার প্রায় সব লোকই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সকলকে আযাদও করে দেন। এমতাবস্থায় তিনি অবহিত হন যে, হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা সম্মিলিতভাবে একত্রিত হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তাদের নেতা হচ্ছে মালিক ইবনে আউফ নাসরী। সাকীফের সমস্ত গোত্রও তাদের সাথে যোগ দিয়েছে। অনুরূপভাবে বানু জাশম এবং বানু সা’দ ইবনে বকরও তাদের সাথে রয়েছে। বানু হিলালের কিছু লোকও ইন্ধন যোগাচ্ছে। বানু আমর ইবনে আমির এবং আউন ইবনে আমিরের কিছু লোকও তাদের সাথে আছে। এসব লোক একত্রিতভাবে নিজেদের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং বাড়ীর ধন-সম্পদ নিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে বেরিয়ে পড়লো। এমন কি তারা তাদের বকরী ও উটগুলোকে সাথে নিলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাথে মুহাজির ও আনসারদেরকে নিয়ে তাদের মুকাবিলার জন্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন। মক্কার প্রায় দু’হাজার নওমুসলিমও তার সাথে যোগ দেন। মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী উপত্যকায় উভয় সেনাবাহিনী মিলিত হলো। এ স্থানটির নাম ছিল হুনাইন। অতি সকালে আঁধার থাকতেই গুপ্তস্থানে গোপনীয়ভাবে অবস্থানকারী হাওয়াযেন গোত্র মুসলিমদের অজান্তে আকস্মিকভাবে তাদেরকে আক্রমণ করে বসে। তারা অসংখ্যা তীর বর্ষণ করতে করতে সম্মুখে অগ্রসর হয় এবং তরবারী চালনা শুরু করে দেয়। ফলে মুসলিমদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে যায় এবং তাঁদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায় । কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের দিকে অগ্রসর হন। এ সময় তিনি সাদা খচ্চরের উপর সওয়ার ছিলেন। আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্তুটির লাগামের ডান দিক ধরে ছিলেন এবং আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) বাম দিক ধারণ করেছিলেন। এ দু’জন জন্তুটির দ্রুতগতি প্রতিরোধ করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উচ্চৈঃস্বরে নিজের পরিচয় দিচ্ছিলেন এবং মুসলিমদেরকে ফিরে আসার নির্দেশ দান করছিলেন। তিনি জোর গলায় বলছিলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা কোথায় যাচ্ছ? এসো, আমি আল্লাহর সত্য রাসূল। আমি মিথ্যাবাদী নই। আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।” ঐ সময় তার সাথে মাত্র আশি থেকে একশজন সাহাবা উপস্থিত ছিলেন। আবু বকর (রাঃ), উমার (রাঃ), আব্বাস (রাঃ), আলী (রাঃ), ফযল ইবনে আব্বাস (রাঃ), আৰূ সুফিয়ান ইবনে হারিস (রাঃ), আইমান ইবনে উম্মে আইমান (রাঃ), উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ) প্রমুখ মহান ব্যক্তিবর্গ তার সাথেই ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর চাচা উচ্চৈঃস্বর বিশিষ্ট ব্যক্তি আব্বাস (রাঃ)-কে হুকুম দিলেন যে, তিনি যেন গাছের নীচে বায়আত গ্রহণকারীদেরকে পালাতে নিষেধ করে দেন। সুতরাং আব্বাস (রাঃ) উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিলেনঃ “হে বাবলা গাছের নীচে দীক্ষা গ্রহণকারীগণ! হে সূরায়ে বাকারার বহনকারীগণ!” এ শব্দ যাঁদেরই কাছে পৌঁছলো তারাই চারদিক থেকে লাব্বায়েক লাব্বায়েক বলতে বলতে ঐ শব্দের দিকে দৌড়িয়ে আসলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে এসে দাড়িয়ে গেলেন। এমন কি কারো উট ক্লান্ত হয়ে থেমে গেলে তিনি স্বীয় বর্ম পরিহিত হয়ে উটের উপর থেকে মাটিতে লাফিয়ে পড়েন এবং পায়ে হেঁটে নবী (সঃ)-এর সামনে হাযির হয়ে যান। যখন কিছু দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চারদিকে একত্রিত হয়ে যান তখন তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করতে শুরু করেন। প্রার্থনায় তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমার সাথে যে ওয়াদা করেছেন তা পূর্ণ করুন। অতঃপর তিনি এক মুষ্টি মাটি নেন এবং তা কাফিরদের দিকে নিক্ষেপ করেন। তাদের এমন কেউ বাকী থাকলো না যার চোখে ও মুখে ঐ মাটির কিছু না পড়লো । ফলে তারা যুদ্ধ করতে অপারগ হয়ে গেল এবং পরাজয় বরণ করলো। এদিকে মুসলিমরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলেন। মুসলিমদের বাকী সৈন্য রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট চলে গেলেন। যারা শত্রুদের পিছনে ছুটেছিলেন তারা তাদের কিছু সংখ্যক লোককে হত্যা করে ফেলেন এবং অবশিষ্টদেরকে বন্দী করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এনে হাযির করেন। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবু আবদির রহমান ফাহরী, যার নাম ইয়াযীদ ইবনে উসাইদ অথবা ইয়াযীদ ইবনে আনীস এবং যাকে কুরও বলা হয়, তিনি বলেন, আমি এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত গরম । দুপুরের সময় আমরা গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করি। সূর্য পশ্চিমে চলে যাওয়ার পর আমি আমার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হই এবং ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তাঁবুতে পৌছি। সালামের পর আমি তাঁকে বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখন বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তিনি বলেনঃ “হ্যাঁ, ঠিক আছে।” অতঃপর তিনি ডাক দেনঃ “বিলাল!” ঐ সময় বিলাল (রাঃ) একটি গাছের ছায়ায় বিশ্রাম করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ডাক শোনা মাত্রই (আরবী) এ কথা বলতে বলতে তিনি হাযির হয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আমার সওয়ারী ঠিক কর।" তখনই তিনি তার। ঘোড়ার জিন কষে দেন, যার পাল্লা দু’টি ছিল খেজুর পাতার রঞ্জু। সেখানে ছিল না কোন গর্ব ও অহংকারের বস্তু! জিন কষা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোড়ার উপর আরোহণ করেন। আমরা কাতারবন্দী হয়ে যাই। সন্ধ্যা ও রাত্রি এভাবেই কেটে যায়। অতঃপর উভয় সৈন্যদল মুখোমুখী হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে মুসলিমরা পালাতে শুরু করেন, যেমন আল্লাহ পাক কুরআন কারীমে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সবাইকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দারা! আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। হে মুহাজির দল! আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।” এরপর তিনি ঘোড়া হতে অবতরণ করেন এবং এক মুষ্টি মাটি নিয়ে বলেনঃ “এটা যেন তাদের চেহারায় পতিত হয়।”এ কথা বলে তিনি ঐ মাটি কাফিরদের দিকে নিক্ষেপ করেন। এতেই মহান আল্লাহ তাদেরকে পরাজিত করেন। ঐ মুশরিকরাই বর্ণনা করেছে- “আমাদের মধ্যে এমন কেউই বাকী ছিল না যার চোখে ও মুখে এ মাটি পড়েনি। ঐ সময় আমাদের মনে হচ্ছিল যেন যমীন ও আসমানের মাঝে কোন লোহার থালায় লোহা পতিত হচ্ছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম হাফিয বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)একটি বর্ণনায় আছে যে, পলায়নকারী মুসলিমদের মধ্যে একশজন যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফিরে আসলেন তখন ঐ সময়েই তিনি কাফিরদেরকে আক্রমণ করার আদেশ দান করলেন। প্রথমতঃ তিনি আনসারদেরকে আহ্বান করেছিলেন। অতঃপর এ আহ্বান শুধু খাজরাজদের উপরেই রয়ে যায়। এ গোত্রটি যুদ্ধের সময় বড়ই ধৈর্যের পরিচয় দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সওয়ারীর উপর থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। তিনি বলেনঃ “এখন ঘোরতর যুদ্ধ চলছে। এতে এই হলো যে, আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের যাদেরকে চাইলেন হত্যা করালেন এবং যাদেরকে চাইলেন বন্দী করালেন। আর তাদের মাল ও সন্তানগুলো ‘ফাই’ হিসেবে স্বীয় নবী (সঃ)-কে দান করলেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাকে একটি লোক বলেনঃ “হে আবূ আম্মারাহ (রাঃ)! আপনারা কি হুনায়েনের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “(এ কথা সত্য বটে) কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পা মুবারক একটুও পিছনে সরেনি। ব্যাপার ছিল এই যে, হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা তীরন্দাজীতে উস্তাদ ছিল। আল্লাহর ফযলে আমরা প্রথম আক্রমণেই তাদেরকে পরাস্ত করে দেই। কিন্তু লোকেরা যখন গনীমতের মালের উপর ঝুঁকে পড়ে তখন হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা সুযোগ বুঝে পুনরায় তীর বর্ষণ শুরু করে দেয়। ফলে মুসলিমদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়। সুবহানাল্লাহ! সেদিন দেখেছি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পূর্ণ সাহস ও বীরত্বপণা! মুসলিম সৈন্যেরা পলায়ন করেছে। তিনি এমন কোন দ্রুতগামী সওয়ারীর আরোহী ছিলেন না যে, সেটা দৌড়িয়ে পালাতে কাজে আসবে। বরং তিনি একটি খচ্চরের উপর সওয়ার ছিলেন এবং মুশরিকদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তিনি নিজেকে গোপন করে রাখেননি। বরং নিজের নাম উচ্চৈঃস্বরে উচ্চারণ করতে করতে চলছিলেন। যেন তাকে যারা চিনে না তারাও চিনতে পারে । চিন্তা করে দেখুন যে, একক সত্তার উপর তার কি পরিমাণ ভরসা! আর আল্লাহ তাআলার সাহায্যের উপর তার কত পূর্ণ বিশ্বাস! তিনি জানতেন যে, আল্লাহ তাআলা রিসালাতের ব্যাপারটাকে অবশ্যই পূর্ণ করবেন এবং তার দ্বীনকে দুনিয়ার সমস্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী করে রাখবেন। সুতরাং সদা সর্বদা তার উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক!”এখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর ও মুসলিমদের উপর প্রশান্তি অবতীর্ণ করার কথা বলছেন এবং আরো বলছেন যুদ্ধে ফেরেশতা প্রেরণের কথা যাদেরকে কেউই দেখতে পায়নি।ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) একজন মুশরিকের উক্তি নকল করেছেন যে, ঐ মুশরিক বর্ণনা করেছে- “হুনায়েনের দিন যখন আমরা যুদ্ধের জন্যে মুসলিমদের মুখোমুখী হই তখন তাদেরকে আমরা একটি বকরি দোহনে যে সময় লাগে এতটুকু সময়ও আমাদের সামনে টিকতে দেইনি, এর মধ্যেই তারা পরাজিত হয়ে যায় এবং তারা পালাতে শুরু করে। আমরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করি। এমতাবস্থায় একটি লোককে আমরা খচ্চরের উপর সওয়ার দেখতে পাই। আমরা আরো দেখতে পাই যে, কয়েকজন সুন্দর সাদা উজ্জ্বল চেহারার লোক তার চারদিকে রয়েছে এবং তাদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে, ‘তোমাদের চেহারাগুলো নষ্ট হাক, তোমরা ফিরে যাও। তাদের একথা বলার পরক্ষণেই আমাদের পরাজয় ঘটে যায়। শেষ পর্যন্ত মুসলিমরা আমাদের কাঁধে চেপে বসে।"ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুনায়েনের যুদ্ধের দিন আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথেই ছিলাম। তার সাথে মাত্র আশিজন মুহাজির ও আনসার রয়ে গিয়েছিলেন। আমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাদা খচ্চরের উপর সওয়ার হয়ে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তাঁর জন্তুটি হোঁচট খেলো । সুতরাং তিনি জিনের উপর থেকে নিচের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। আমি তাকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি উপরে উঠে যান। আল্লাহ আপনাকে উপরেই রাখবেন। তিনি তখন আমাকে বললেন, “এক মুষ্টিপূর্ণ মাটি নিয়ে এসো।” আমি তাঁকে এক মুষ্টিপূর্ণ মাটি এনে দিলাম। তিনি তা কাফিরদের দিকে নিক্ষেপ করলেন। ওটা তাদের চোখে পড়লো। অতঃপর তিনি বললেনঃ “মুহাজির ও আনসার কোথায়?” আমি উত্তরে বললাম, তারা এখানে আছে। তিনি বললেনঃ “তাদেরকে ডাক দাও।" আমি তাদেরকে ডাক দেয়া মাত্রই তারা তরবারী নিয়ে দ্রুত বেগে ধাবিত হলো। তখন মুশরিকরা দিশাহারা হয়ে পালাতে শুরু করলো।” (এ হাদীসটি হাফিয় বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন)শায়বা ইবনে উসমান (রাঃ) বলেন, হুনায়েনের যুদ্ধের দিন যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি এমন অবস্থায় দেখি যে, মুসলিম সৈন্যেরা পরাজিত হয়ে পালাতে শুরু করেছেন এবং তিনি একাকী রয়ে গেছেন, তখন আমার বদরের দিনের কথা স্মরণ হয়ে যায়। ঐদিন আমার পিতা ও চাচা আলী (রাঃ) ও হামযা (রাঃ)-এর হাতে মারা যায়। আমি মনে মনে বলি যে, এর প্রতিশোধ গ্রহণের এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কি হতে পারে? অতঃপর আমি নবী (সঃ)-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তার ডান দিকে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি যে, সেখানে আব্বাস ইবনে আব্দিল মুত্তালিব (রাঃ) চাঁদির ন্যায় সাদা বর্ম পরিহিত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমি ভাবলাম যে, তিনি স্বীয় ভ্রাতুস্পুত্রকে পূর্ণভাবে রক্ষা করার চেষ্টা করবেন। তাই আমি তার বাম দিকে চলে গেলাম। সেখানেও দেখি যে, আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) দাঁড়িয়ে আছেন। আমি চিন্তা করলাম যে, তিনি তাঁর চাচাতো ভাইকে অবশ্যই রক্ষা করার প্রাণপণ চেষ্টা করবেন। সুতরাং আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছন দিকে চলে গেলাম। আমি তাঁকে তরবারী দ্বারা আঘাত করতে উদ্যত হয়েছি এমন সময় দেখি যে, একটি আগুনের কোড়া বিদ্যুতের মত চমকিত হয়ে আমার উপর পতিত হচ্ছে। আমি দু'চোখ বন্ধ করে নিলাম এবং পশ্চাদপদে পিছন দিকে সরতে লাগলাম। ঐ সময়েই রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার দিকে ফিরে তাকালেন এবং বললেনঃ “হে শায়বা! আমার কাছে এসো।" অতঃপর বললেনঃ “হে আল্লাহ! তার সাথের শয়তানদেরকে দূর করে দিন!” চোখ খুলে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে তাকালাম। আল্লাহর শপথ! ঐ সময় তিনি আমার কাছে আমার চক্ষু ও কর্ণ অপেক্ষাও অধিক প্রিয় ছিলেন। তিনি আমাকে বললেনঃ “হে শায়বা! যাও, কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করগে।” শায়বা (রাঃ) বলেন, ঐ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমিও ছিলাম। কিন্তু ইসলামের কারণে বা ইসলামের পরিচয় লাভের ভিত্তিতে বের হইনি। বরং আমি এটা চাইনি যে, হাওয়াযেন গোত্র কুরায়েশ গোত্রের উপর জয়যুক্ত হাক। আমি তার কাছেই দণ্ডায়মান ছিলাম, এমন সময় আমি সাদা কালো মিশ্রিত রং-এর ঘোড়া দেখে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো সাদা কালো মিশ্রিত রং-এর ঘোড়া দেখতে পাচ্ছি! তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে শায়বা! এটা তো কাফিরগণ ছাড়া আর কারো দৃষ্টিগোচর হয় না!" অতঃপর তিনি আমার বক্ষে হাত রেখে দুআ করলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি শায়বাকে সুপথ প্রদর্শন করুন!" তারপর তিনি দ্বিতীয়বার ও তৃতীয়বার এরূপই করলেন এবং এটাই বললেন। আল্লাহর শপথ! তাঁর হাত আমার বক্ষ হতে সরে যাওয়ার পূর্বেই আমার অন্তরে তার প্রতি সারা দুনিয়া অপেক্ষা বেশী ভালবাসা সৃষ্টি হয়। (হাফিয বায়হাকী (রঃ)-এ হাদীসটি তাখরীজ করেছেন) তিনি পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন, যাতে রয়েছে প্রাথমিক অবস্থায় মুসলিমদের পরাজয় বরণ, আব্বাস (রাঃ)-এর তাদেরকে আহ্বান, আল্লাহর কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্য প্রার্থনা এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার মুশরিকদেরকে পরাজিতকরণ।জুবাইর ইবনে মুতইম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “হুনায়েনের যুদ্ধে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। আমি লক্ষ্য করি যে, আকাশ থেকে যেন কালো পিপড়ার মত কিছু অবতীর্ণ হচ্ছে, যা সারা মাঠকে ঘিরে ফেললো। তখনই মুশরিকদের পরাজয় ঘটে গেল। ওটা যে আসমানী মদদ বা সাহায্য ছিল এতে আমাদের কোনই সন্দেহ নেই।ইয়াযীদ ইবনে আমির সুওয়াঈ (রাঃ) তাঁর কুফরীর যুগে হুনায়েনের যুদ্ধে কাফিরদের সাথে ছিলেন। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “ঐ সময় আপনাদের মনের ভীতি ও ত্রাসের অবস্থা কেমন ছিল?” তখন তিনি থালায় কংকর রেখে তা বাজাতে বাজাতে বলেনঃ “আমাদের অন্তরে এরূপ শব্দ অনুভূত হচ্ছিল। ফলে আমাদের হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠছিল এবং অন্তরাত্মা শুকিয়ে যাচ্ছিল।” সহীহ মুসলিমে আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে ‘রুব’ বা ভক্তিযুক্ত ভয় দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে এবং আমাকে সমুদয় কালেমা প্রদান করা হয়েছে। মোটকথা আল্লাহ তাআলা কাফিরদেরকে এই শাস্তি প্রদান করেন এবং ওটা ছিল তাদের কুফরীরই বিনিময়। হাওয়াযেন গোত্রের বাকী লোকদের উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হয়। তাদেরও সৌভাগ্য লাভ হয় যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়। ঐ সময় তিনি বিজয়ী বেশে প্রত্যাবর্তনের পথে মক্কার নিকটবর্তী জেয়েররানা নামক স্থানে পৌছেছিলেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে বিশদিন অতিক্রান্ত হয়েছিল। এ জন্যেই তিনি তাদেরকে বলেছিলেনঃ “দুটোর মধ্যে যে কোন একটি তোমরা পছন্দ করে নাও, বন্দী অথবা মাল!” তারা বন্দীদেরকে ফিরিয়ে নেয়াই পছন্দ করলো । ঐ বন্দীদের ছোট-বড়, নর-নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক প্রভৃতির মোট সংখ্যা ছিল ছয় হাজার। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সব বন্দীকেই তাদেরকে ফিরিয়ে দেন এবং তাদের মালকে গনীমত হিসেবে মুসলিমদের মধ্যে বন্টন করে দেন। তিনি মক্কার আযাদকৃত নও মুসলিদেরকেও ঐ মাল থেকে কিছু কিছু প্রদান করেন, যেন তাদের অন্তর পুরোপুরিভাবে ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মালিক ইবনে আউফ নাসরীকেও তিনি একশটি উট প্রদান করেন এবং তাকেই তার কওমের নেতা বানিয়ে দেন, যেমন সে ছিল। এরই প্রশংসায় সে তার প্রসিদ্ধ কবিতায় বলেছিলঃ (অনুবাদ) “আমি তো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর মত কাউকেও দেখিওনি, শুনিওনি। দান খয়রাতে এবং অপরাধ ক্ষমাকরণে তিনি হচ্ছেন বিশ্বের মধ্যে অদ্বিতীয়। কাল কিয়ামতের দিনে যা কিছু ঘটবে তা সবই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বীরত্ব ও সাহসিকতায়ও তিনি অতুলনীয়। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি সিংহের ন্যায় গর্জন করতে করতে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হয়ে থাকেন। ”
আত-তাওবা 9:27
২৫-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, সূরায়ে বারাআতের এটাই প্রথম আয়াত যাতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উপর তার বড় ইহসানের কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-এর সহচরদেরকে সাহায্য করতঃ তাঁদের শত্রুদের উপর তাদেরকে জয়যুক্ত করেছেন। এক জায়গায় নয়, বরং প্রতিটি জায়গায় তাদের উপর তাঁর সাহায্য থেকেছে। এ কারণেই বিজয় ও সফলতা কখনও তাদের সঙ্গ ছাড়েনি। এটা ছিল একমাত্র আল্লাহ তাআলারই সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার ফল, মাল ও যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্রের আধিক্যে নয়। আর এটা সংখ্যাধিক্যের কারণেও ছিল না। আল্লাহ পাক মুমিনদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা হুনায়েনের দিনটি স্মরণ কর। সেই দিন তোমরা তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে কিছুটা গর্ববোধ করেছিলে। তখন তোমাদের অবস্থা এই দাঁড়ালো যে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে! মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোক শুধু নবী (সঃ)-এর কাছে থাকলো । ঐ সময়েই আল্লাহর সাহায্য অবতীর্ণ হলো এবং তিনি তোমাদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করলেন যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পার যে, বিজয় লাভ শুধু আল্লাহর সাহায্যের মাধ্যমেই সম্ভব। তার সাহায্যের ফলেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল। বড় বড় দলের উপর বিজয়ী হয়ে থাকে। আল্লাহর সাহায্য ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকে।” এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে আমরা ইনশাআল্লাহ এখনই বর্ণনা করছি। মুসনাদে আহমাদে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “উত্তম সহচর হচ্ছে চার জন। উত্তম ক্ষুদ্র সেনাবাহিনীর সংখ্যা হচ্ছে চারশ’। উত্তম বৃহৎ সেনাবাহিনীর সংখ্যা হলো চার হাজার। আর বারো হাজারের সেনাবাহিনীর তো স্বল্পতার কারণে পরাজিত হতেই পারে না।” (এ হাদীসটি সুনানে আবি দাউদ ও জামিউত তিরমিযীতেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান গারীব বলেছেন। একজন বর্ণনাকারী ছাড়া অন্য সবাই এটাকে মুরসাল’ রূপে বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) ও ইমাম বায়হাকীও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। এসব বিষয় আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পর শাওয়াল মাসে হুনায়েনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মক্কা বিজয়ের ঘটনা হতে অবকাশ লাভের পর নবী (সঃ) প্রাথমিক সমুদয় কার্য সম্পাদন করেন, আর এদিকে মক্কার প্রায় সব লোকই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সকলকে আযাদও করে দেন। এমতাবস্থায় তিনি অবহিত হন যে, হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা সম্মিলিতভাবে একত্রিত হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তাদের নেতা হচ্ছে মালিক ইবনে আউফ নাসরী। সাকীফের সমস্ত গোত্রও তাদের সাথে যোগ দিয়েছে। অনুরূপভাবে বানু জাশম এবং বানু সা’দ ইবনে বকরও তাদের সাথে রয়েছে। বানু হিলালের কিছু লোকও ইন্ধন যোগাচ্ছে। বানু আমর ইবনে আমির এবং আউন ইবনে আমিরের কিছু লোকও তাদের সাথে আছে। এসব লোক একত্রিতভাবে নিজেদের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং বাড়ীর ধন-সম্পদ নিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে বেরিয়ে পড়লো। এমন কি তারা তাদের বকরী ও উটগুলোকে সাথে নিলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাথে মুহাজির ও আনসারদেরকে নিয়ে তাদের মুকাবিলার জন্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন। মক্কার প্রায় দু’হাজার নওমুসলিমও তার সাথে যোগ দেন। মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী উপত্যকায় উভয় সেনাবাহিনী মিলিত হলো। এ স্থানটির নাম ছিল হুনাইন। অতি সকালে আঁধার থাকতেই গুপ্তস্থানে গোপনীয়ভাবে অবস্থানকারী হাওয়াযেন গোত্র মুসলিমদের অজান্তে আকস্মিকভাবে তাদেরকে আক্রমণ করে বসে। তারা অসংখ্যা তীর বর্ষণ করতে করতে সম্মুখে অগ্রসর হয় এবং তরবারী চালনা শুরু করে দেয়। ফলে মুসলিমদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে যায় এবং তাঁদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায় । কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের দিকে অগ্রসর হন। এ সময় তিনি সাদা খচ্চরের উপর সওয়ার ছিলেন। আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্তুটির লাগামের ডান দিক ধরে ছিলেন এবং আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) বাম দিক ধারণ করেছিলেন। এ দু’জন জন্তুটির দ্রুতগতি প্রতিরোধ করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উচ্চৈঃস্বরে নিজের পরিচয় দিচ্ছিলেন এবং মুসলিমদেরকে ফিরে আসার নির্দেশ দান করছিলেন। তিনি জোর গলায় বলছিলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা কোথায় যাচ্ছ? এসো, আমি আল্লাহর সত্য রাসূল। আমি মিথ্যাবাদী নই। আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।” ঐ সময় তার সাথে মাত্র আশি থেকে একশজন সাহাবা উপস্থিত ছিলেন। আবু বকর (রাঃ), উমার (রাঃ), আব্বাস (রাঃ), আলী (রাঃ), ফযল ইবনে আব্বাস (রাঃ), আৰূ সুফিয়ান ইবনে হারিস (রাঃ), আইমান ইবনে উম্মে আইমান (রাঃ), উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ) প্রমুখ মহান ব্যক্তিবর্গ তার সাথেই ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর চাচা উচ্চৈঃস্বর বিশিষ্ট ব্যক্তি আব্বাস (রাঃ)-কে হুকুম দিলেন যে, তিনি যেন গাছের নীচে বায়আত গ্রহণকারীদেরকে পালাতে নিষেধ করে দেন। সুতরাং আব্বাস (রাঃ) উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিলেনঃ “হে বাবলা গাছের নীচে দীক্ষা গ্রহণকারীগণ! হে সূরায়ে বাকারার বহনকারীগণ!” এ শব্দ যাঁদেরই কাছে পৌঁছলো তারাই চারদিক থেকে লাব্বায়েক লাব্বায়েক বলতে বলতে ঐ শব্দের দিকে দৌড়িয়ে আসলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে এসে দাড়িয়ে গেলেন। এমন কি কারো উট ক্লান্ত হয়ে থেমে গেলে তিনি স্বীয় বর্ম পরিহিত হয়ে উটের উপর থেকে মাটিতে লাফিয়ে পড়েন এবং পায়ে হেঁটে নবী (সঃ)-এর সামনে হাযির হয়ে যান। যখন কিছু দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চারদিকে একত্রিত হয়ে যান তখন তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করতে শুরু করেন। প্রার্থনায় তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমার সাথে যে ওয়াদা করেছেন তা পূর্ণ করুন। অতঃপর তিনি এক মুষ্টি মাটি নেন এবং তা কাফিরদের দিকে নিক্ষেপ করেন। তাদের এমন কেউ বাকী থাকলো না যার চোখে ও মুখে ঐ মাটির কিছু না পড়লো । ফলে তারা যুদ্ধ করতে অপারগ হয়ে গেল এবং পরাজয় বরণ করলো। এদিকে মুসলিমরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলেন। মুসলিমদের বাকী সৈন্য রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট চলে গেলেন। যারা শত্রুদের পিছনে ছুটেছিলেন তারা তাদের কিছু সংখ্যক লোককে হত্যা করে ফেলেন এবং অবশিষ্টদেরকে বন্দী করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে এনে হাযির করেন। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবু আবদির রহমান ফাহরী, যার নাম ইয়াযীদ ইবনে উসাইদ অথবা ইয়াযীদ ইবনে আনীস এবং যাকে কুরও বলা হয়, তিনি বলেন, আমি এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত গরম । দুপুরের সময় আমরা গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করি। সূর্য পশ্চিমে চলে যাওয়ার পর আমি আমার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হই এবং ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তাঁবুতে পৌছি। সালামের পর আমি তাঁকে বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখন বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তিনি বলেনঃ “হ্যাঁ, ঠিক আছে।” অতঃপর তিনি ডাক দেনঃ “বিলাল!” ঐ সময় বিলাল (রাঃ) একটি গাছের ছায়ায় বিশ্রাম করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ডাক শোনা মাত্রই (আরবী) এ কথা বলতে বলতে তিনি হাযির হয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আমার সওয়ারী ঠিক কর।" তখনই তিনি তার। ঘোড়ার জিন কষে দেন, যার পাল্লা দু’টি ছিল খেজুর পাতার রঞ্জু। সেখানে ছিল না কোন গর্ব ও অহংকারের বস্তু! জিন কষা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোড়ার উপর আরোহণ করেন। আমরা কাতারবন্দী হয়ে যাই। সন্ধ্যা ও রাত্রি এভাবেই কেটে যায়। অতঃপর উভয় সৈন্যদল মুখোমুখী হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে মুসলিমরা পালাতে শুরু করেন, যেমন আল্লাহ পাক কুরআন কারীমে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সবাইকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর বান্দারা! আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। হে মুহাজির দল! আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।” এরপর তিনি ঘোড়া হতে অবতরণ করেন এবং এক মুষ্টি মাটি নিয়ে বলেনঃ “এটা যেন তাদের চেহারায় পতিত হয়।”এ কথা বলে তিনি ঐ মাটি কাফিরদের দিকে নিক্ষেপ করেন। এতেই মহান আল্লাহ তাদেরকে পরাজিত করেন। ঐ মুশরিকরাই বর্ণনা করেছে- “আমাদের মধ্যে এমন কেউই বাকী ছিল না যার চোখে ও মুখে এ মাটি পড়েনি। ঐ সময় আমাদের মনে হচ্ছিল যেন যমীন ও আসমানের মাঝে কোন লোহার থালায় লোহা পতিত হচ্ছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম হাফিয বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)একটি বর্ণনায় আছে যে, পলায়নকারী মুসলিমদের মধ্যে একশজন যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফিরে আসলেন তখন ঐ সময়েই তিনি কাফিরদেরকে আক্রমণ করার আদেশ দান করলেন। প্রথমতঃ তিনি আনসারদেরকে আহ্বান করেছিলেন। অতঃপর এ আহ্বান শুধু খাজরাজদের উপরেই রয়ে যায়। এ গোত্রটি যুদ্ধের সময় বড়ই ধৈর্যের পরিচয় দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সওয়ারীর উপর থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। তিনি বলেনঃ “এখন ঘোরতর যুদ্ধ চলছে। এতে এই হলো যে, আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের যাদেরকে চাইলেন হত্যা করালেন এবং যাদেরকে চাইলেন বন্দী করালেন। আর তাদের মাল ও সন্তানগুলো ‘ফাই’ হিসেবে স্বীয় নবী (সঃ)-কে দান করলেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাকে একটি লোক বলেনঃ “হে আবূ আম্মারাহ (রাঃ)! আপনারা কি হুনায়েনের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “(এ কথা সত্য বটে) কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পা মুবারক একটুও পিছনে সরেনি। ব্যাপার ছিল এই যে, হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা তীরন্দাজীতে উস্তাদ ছিল। আল্লাহর ফযলে আমরা প্রথম আক্রমণেই তাদেরকে পরাস্ত করে দেই। কিন্তু লোকেরা যখন গনীমতের মালের উপর ঝুঁকে পড়ে তখন হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা সুযোগ বুঝে পুনরায় তীর বর্ষণ শুরু করে দেয়। ফলে মুসলিমদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়। সুবহানাল্লাহ! সেদিন দেখেছি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পূর্ণ সাহস ও বীরত্বপণা! মুসলিম সৈন্যেরা পলায়ন করেছে। তিনি এমন কোন দ্রুতগামী সওয়ারীর আরোহী ছিলেন না যে, সেটা দৌড়িয়ে পালাতে কাজে আসবে। বরং তিনি একটি খচ্চরের উপর সওয়ার ছিলেন এবং মুশরিকদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তিনি নিজেকে গোপন করে রাখেননি। বরং নিজের নাম উচ্চৈঃস্বরে উচ্চারণ করতে করতে চলছিলেন। যেন তাকে যারা চিনে না তারাও চিনতে পারে । চিন্তা করে দেখুন যে, একক সত্তার উপর তার কি পরিমাণ ভরসা! আর আল্লাহ তাআলার সাহায্যের উপর তার কত পূর্ণ বিশ্বাস! তিনি জানতেন যে, আল্লাহ তাআলা রিসালাতের ব্যাপারটাকে অবশ্যই পূর্ণ করবেন এবং তার দ্বীনকে দুনিয়ার সমস্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী করে রাখবেন। সুতরাং সদা সর্বদা তার উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক!”এখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর ও মুসলিমদের উপর প্রশান্তি অবতীর্ণ করার কথা বলছেন এবং আরো বলছেন যুদ্ধে ফেরেশতা প্রেরণের কথা যাদেরকে কেউই দেখতে পায়নি।ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর (রঃ) একজন মুশরিকের উক্তি নকল করেছেন যে, ঐ মুশরিক বর্ণনা করেছে- “হুনায়েনের দিন যখন আমরা যুদ্ধের জন্যে মুসলিমদের মুখোমুখী হই তখন তাদেরকে আমরা একটি বকরি দোহনে যে সময় লাগে এতটুকু সময়ও আমাদের সামনে টিকতে দেইনি, এর মধ্যেই তারা পরাজিত হয়ে যায় এবং তারা পালাতে শুরু করে। আমরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করি। এমতাবস্থায় একটি লোককে আমরা খচ্চরের উপর সওয়ার দেখতে পাই। আমরা আরো দেখতে পাই যে, কয়েকজন সুন্দর সাদা উজ্জ্বল চেহারার লোক তার চারদিকে রয়েছে এবং তাদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে, ‘তোমাদের চেহারাগুলো নষ্ট হাক, তোমরা ফিরে যাও। তাদের একথা বলার পরক্ষণেই আমাদের পরাজয় ঘটে যায়। শেষ পর্যন্ত মুসলিমরা আমাদের কাঁধে চেপে বসে।"ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুনায়েনের যুদ্ধের দিন আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথেই ছিলাম। তার সাথে মাত্র আশিজন মুহাজির ও আনসার রয়ে গিয়েছিলেন। আমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিনি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাদা খচ্চরের উপর সওয়ার হয়ে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তাঁর জন্তুটি হোঁচট খেলো । সুতরাং তিনি জিনের উপর থেকে নিচের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। আমি তাকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি উপরে উঠে যান। আল্লাহ আপনাকে উপরেই রাখবেন। তিনি তখন আমাকে বললেন, “এক মুষ্টিপূর্ণ মাটি নিয়ে এসো।” আমি তাঁকে এক মুষ্টিপূর্ণ মাটি এনে দিলাম। তিনি তা কাফিরদের দিকে নিক্ষেপ করলেন। ওটা তাদের চোখে পড়লো। অতঃপর তিনি বললেনঃ “মুহাজির ও আনসার কোথায়?” আমি উত্তরে বললাম, তারা এখানে আছে। তিনি বললেনঃ “তাদেরকে ডাক দাও।" আমি তাদেরকে ডাক দেয়া মাত্রই তারা তরবারী নিয়ে দ্রুত বেগে ধাবিত হলো। তখন মুশরিকরা দিশাহারা হয়ে পালাতে শুরু করলো।” (এ হাদীসটি হাফিয় বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন)শায়বা ইবনে উসমান (রাঃ) বলেন, হুনায়েনের যুদ্ধের দিন যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি এমন অবস্থায় দেখি যে, মুসলিম সৈন্যেরা পরাজিত হয়ে পালাতে শুরু করেছেন এবং তিনি একাকী রয়ে গেছেন, তখন আমার বদরের দিনের কথা স্মরণ হয়ে যায়। ঐদিন আমার পিতা ও চাচা আলী (রাঃ) ও হামযা (রাঃ)-এর হাতে মারা যায়। আমি মনে মনে বলি যে, এর প্রতিশোধ গ্রহণের এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কি হতে পারে? অতঃপর আমি নবী (সঃ)-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তার ডান দিকে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি যে, সেখানে আব্বাস ইবনে আব্দিল মুত্তালিব (রাঃ) চাঁদির ন্যায় সাদা বর্ম পরিহিত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমি ভাবলাম যে, তিনি স্বীয় ভ্রাতুস্পুত্রকে পূর্ণভাবে রক্ষা করার চেষ্টা করবেন। তাই আমি তার বাম দিকে চলে গেলাম। সেখানেও দেখি যে, আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) দাঁড়িয়ে আছেন। আমি চিন্তা করলাম যে, তিনি তাঁর চাচাতো ভাইকে অবশ্যই রক্ষা করার প্রাণপণ চেষ্টা করবেন। সুতরাং আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছন দিকে চলে গেলাম। আমি তাঁকে তরবারী দ্বারা আঘাত করতে উদ্যত হয়েছি এমন সময় দেখি যে, একটি আগুনের কোড়া বিদ্যুতের মত চমকিত হয়ে আমার উপর পতিত হচ্ছে। আমি দু'চোখ বন্ধ করে নিলাম এবং পশ্চাদপদে পিছন দিকে সরতে লাগলাম। ঐ সময়েই রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার দিকে ফিরে তাকালেন এবং বললেনঃ “হে শায়বা! আমার কাছে এসো।" অতঃপর বললেনঃ “হে আল্লাহ! তার সাথের শয়তানদেরকে দূর করে দিন!” চোখ খুলে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে তাকালাম। আল্লাহর শপথ! ঐ সময় তিনি আমার কাছে আমার চক্ষু ও কর্ণ অপেক্ষাও অধিক প্রিয় ছিলেন। তিনি আমাকে বললেনঃ “হে শায়বা! যাও, কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করগে।” শায়বা (রাঃ) বলেন, ঐ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমিও ছিলাম। কিন্তু ইসলামের কারণে বা ইসলামের পরিচয় লাভের ভিত্তিতে বের হইনি। বরং আমি এটা চাইনি যে, হাওয়াযেন গোত্র কুরায়েশ গোত্রের উপর জয়যুক্ত হাক। আমি তার কাছেই দণ্ডায়মান ছিলাম, এমন সময় আমি সাদা কালো মিশ্রিত রং-এর ঘোড়া দেখে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো সাদা কালো মিশ্রিত রং-এর ঘোড়া দেখতে পাচ্ছি! তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে শায়বা! এটা তো কাফিরগণ ছাড়া আর কারো দৃষ্টিগোচর হয় না!" অতঃপর তিনি আমার বক্ষে হাত রেখে দুআ করলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি শায়বাকে সুপথ প্রদর্শন করুন!" তারপর তিনি দ্বিতীয়বার ও তৃতীয়বার এরূপই করলেন এবং এটাই বললেন। আল্লাহর শপথ! তাঁর হাত আমার বক্ষ হতে সরে যাওয়ার পূর্বেই আমার অন্তরে তার প্রতি সারা দুনিয়া অপেক্ষা বেশী ভালবাসা সৃষ্টি হয়। (হাফিয বায়হাকী (রঃ)-এ হাদীসটি তাখরীজ করেছেন) তিনি পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন, যাতে রয়েছে প্রাথমিক অবস্থায় মুসলিমদের পরাজয় বরণ, আব্বাস (রাঃ)-এর তাদেরকে আহ্বান, আল্লাহর কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্য প্রার্থনা এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার মুশরিকদেরকে পরাজিতকরণ।জুবাইর ইবনে মুতইম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “হুনায়েনের যুদ্ধে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। আমি লক্ষ্য করি যে, আকাশ থেকে যেন কালো পিপড়ার মত কিছু অবতীর্ণ হচ্ছে, যা সারা মাঠকে ঘিরে ফেললো। তখনই মুশরিকদের পরাজয় ঘটে গেল। ওটা যে আসমানী মদদ বা সাহায্য ছিল এতে আমাদের কোনই সন্দেহ নেই।ইয়াযীদ ইবনে আমির সুওয়াঈ (রাঃ) তাঁর কুফরীর যুগে হুনায়েনের যুদ্ধে কাফিরদের সাথে ছিলেন। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “ঐ সময় আপনাদের মনের ভীতি ও ত্রাসের অবস্থা কেমন ছিল?” তখন তিনি থালায় কংকর রেখে তা বাজাতে বাজাতে বলেনঃ “আমাদের অন্তরে এরূপ শব্দ অনুভূত হচ্ছিল। ফলে আমাদের হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠছিল এবং অন্তরাত্মা শুকিয়ে যাচ্ছিল।” সহীহ মুসলিমে আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে ‘রুব’ বা ভক্তিযুক্ত ভয় দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে এবং আমাকে সমুদয় কালেমা প্রদান করা হয়েছে। মোটকথা আল্লাহ তাআলা কাফিরদেরকে এই শাস্তি প্রদান করেন এবং ওটা ছিল তাদের কুফরীরই বিনিময়। হাওয়াযেন গোত্রের বাকী লোকদের উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হয়। তাদেরও সৌভাগ্য লাভ হয় যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়। ঐ সময় তিনি বিজয়ী বেশে প্রত্যাবর্তনের পথে মক্কার নিকটবর্তী জেয়েররানা নামক স্থানে পৌছেছিলেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে বিশদিন অতিক্রান্ত হয়েছিল। এ জন্যেই তিনি তাদেরকে বলেছিলেনঃ “দুটোর মধ্যে যে কোন একটি তোমরা পছন্দ করে নাও, বন্দী অথবা মাল!” তারা বন্দীদেরকে ফিরিয়ে নেয়াই পছন্দ করলো । ঐ বন্দীদের ছোট-বড়, নর-নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক প্রভৃতির মোট সংখ্যা ছিল ছয় হাজার। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সব বন্দীকেই তাদেরকে ফিরিয়ে দেন এবং তাদের মালকে গনীমত হিসেবে মুসলিমদের মধ্যে বন্টন করে দেন। তিনি মক্কার আযাদকৃত নও মুসলিদেরকেও ঐ মাল থেকে কিছু কিছু প্রদান করেন, যেন তাদের অন্তর পুরোপুরিভাবে ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মালিক ইবনে আউফ নাসরীকেও তিনি একশটি উট প্রদান করেন এবং তাকেই তার কওমের নেতা বানিয়ে দেন, যেমন সে ছিল। এরই প্রশংসায় সে তার প্রসিদ্ধ কবিতায় বলেছিলঃ (অনুবাদ) “আমি তো মুহাম্মাদ (সঃ)-এর মত কাউকেও দেখিওনি, শুনিওনি। দান খয়রাতে এবং অপরাধ ক্ষমাকরণে তিনি হচ্ছেন বিশ্বের মধ্যে অদ্বিতীয়। কাল কিয়ামতের দিনে যা কিছু ঘটবে তা সবই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বীরত্ব ও সাহসিকতায়ও তিনি অতুলনীয়। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি সিংহের ন্যায় গর্জন করতে করতে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হয়ে থাকেন। ”
আত-তাওবা 9:28
২৮-২৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র দ্বীনের অনুসারী এবং পাক পবিত্র মুসলিম বান্দাদেরকে হুকুম করছেন যে, তারা যেন ধর্মের দিক থেকে অপবিত্র মুশরিকদেরকে বায়তুল্লাহর পাশে আসতে না দেয়। এই আয়াতটি নবম হিজরীতে অবতীর্ণ হয়। ঐ বছরই রাসূলুল্লাহ (সঃ) আলী (রাঃ)-কে আবু বকর (রাঃ) -এর সাথে প্রেরণ করেন এবং নির্দেশ দেনঃ “হজ্বের সমাবেশে ঘোষণা করে দাও যে, এ বছরের পরে কোন মুশরিক যেন হজ্ব করতে না আসে এবং কেউ যেন উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ না করে। শরীয়তের এই হুকুমকে আল্লাহ তা'আলা এমনিতেই পূর্ণ করে দেন। সেখানে আর মুশরিকদের প্রবেশ লাভের সৌভাগ্য হয়নি এবং এরপরে উলঙ্গ অবস্থায় কেউ আল্লাহর ঘরের তাওয়াফও করেনি। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) গোলাম ও যিম্মী ব্যক্তিকে এই হুকুমের বহির্ভূত বলেছেন। মুসনাদে আহমাদে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এ বছরের পরে চুক্তিকৃতগণ ছাড়া এবং তাদের গোলামরা ছাড়া আর কেউই যেন আমাদের মসজিদে প্রবেশ না করে। কিন্তু এই মারফু হাদীস অপেক্ষা বেশী সহীহ সনদযুক্ত মাওকুফ রিওয়ায়াত রয়েছে।মুসলিমদের খলীফা উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) ফরমান জারী করেছিলেনঃ “ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে মুসলমানদের মসজিদে আসতে দিবে না।" এই আয়াতকে কেন্দ্র করেই তিনি এই নিষেধাজ্ঞা জারী করেছিলেন। আতা (রঃ) বলেন যে, সম্পূর্ণ হারাম শরীফই মসজিদুল হারামের অন্তর্ভুক্ত। মুশরিকরা যে অপবিত্র, এই আয়াতটিই এর দলীল। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, মুমিন অপবিত্র হয় না। বাকী থাকলো এই কথাটি যে মুশরিকদের দেহ ও সত্তাও কি অপবিত্র? এ ব্যাপারে জমহরের উক্তি এই যে, তাদের দেহ অপবিত্র নয়। কেননা আল্লাহ তা'আলা আহলে কিতাবের যবেহকৃত জন্তু হালাল করেছেন। যাহেরিয়া মাযহাবের কোন কোন লোক মুশরিকদের দেহকে অপবিত্র বলেছে। হাসান (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি মুশরিকদের সাথে মুসাফাহা করবে সে যেন তার হাতটি ধুয়ে নেয়। এ হুকুম হলে লোকদের কেউ কেউ বললোঃ “তাহলে তো আমাদের বাজার মন্দা হয়ে যাবে এবং ব্যবসার জাঁকজমক নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে আমাদের বহুবিধ ক্ষতি সাধিত হবে। (লুবাব গ্রন্থে ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, মুশরিকরা বায়তুল্লাহতে খাদ্য সম্ভার নিয়ে আসতো এবং এর মধ্যে ওরা ব্যবসা করতো। অতঃপর যখন তাদেরকে বায়তুল্লাহতে আসতে নিষেধ করে দেয়া হলো তখন মুসলমানরা বললোঃ “আমাদের জন্যে খাদ্য কোথায়?" তখন আল্লাহ তাআলা (আরবী) এ আয়াত অবতীর্ণ করেন) তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা এ ব্যাপারে কোনই ভয় করো না। আল্লাহ তোমাদের আরো বহু পন্থায় দান করবেন। আহলে কিতাবের নিকট থেকে তোমাদের জন্যে তিনি জিযিয়া আদায় করিয়ে দিবেন এবং তোমাদেরকে সম্পদশালী করবেন । তোমাদের জন্যে কোটা বেশী কল্যাণকর তা তোমাদের প্রতিপালকই ভাল জানেন। তাঁর নির্দেশ এবং নিষেধাজ্ঞা সবটাই নিপুণতাপূর্ণ। এ ব্যবসা তোমাদের জন্যে ততোটা লাভজনক নয় যতোটা লাভজনক তোমাদের জিযিয়া প্রাপ্তি ঐ আহলে কিতাবের নিকট থেকে যারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং কিয়ামতকে অস্বীকারকারী। প্রকৃত অর্থে তারা যখন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান আনলো না তখন কোন নবীর উপরই তাদের ঈমান রইলো না। বরং তারা নিজেদের প্রবৃত্তির ও তাদের বড়দের অন্ধ বিশ্বাসের পিছনে পড়ে রয়েছে। যদি তাদের নিজেদের নবীর উপর এবং নিজেদের শরীয়তের উপর পূর্ণ বিশ্বাস থাকতো তবে তারা আমাদের এই নবী (সঃ)-এর উপরে অবশ্যই ঈমান আনতো। তাঁর শুভাগমনের সুসংবাদ তো প্রত্যেক নবীই দিয়ে গেছেন এবং তার অনুসরণ করার হুকুমও সব নবীই প্রদান করেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা এই সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল (সঃ)-কে অস্বীকার করছে। সুতরাং পূর্ববর্তী নবীদের শরীয়তের সাথেও তাদের কোন সম্পর্ক নেই। এ কারণেই ঐ নবীদেরকে মুখে স্বীকার করার কোনই মূল্য নেই। কেননা মুহাম্মাদ (সঃ) হলেন নবীদের নেতা সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল, সর্বশেষ নবী এবং রাসূলদের পূর্ণকারী। অথচ তারা তাঁকেই অস্বীকার করছে। সুতরাং তাদের সাথেও জিহাদ করতে হবে।তাদের সাথে জিহাদের হুকুম হওয়ার এটাই প্রথম আয়াত। ঐ সময় পর্যন্ত আশে পাশের মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। তাদের অধিকাংশই তাওহীদের পতাকা তলে আশ্রয় নিয়েছিল। আরব উপদ্বীপে ইসলাম স্বীয় জায়গা করে নিয়েছিল। এখন ইয়াহদী ও খ্রীষ্টানদের সংবাদ নেয়ার এবং তাদেরকে সত্য পথ দেখাবার নির্দেশ দেয়া হয়। এ হুকুম অবতীর্ণ হয় হিজরী নবম সনে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। জনগণকে তিনি স্বীয় সংকল্পের কথা অবহিত করেন। মদীনার চতুম্পার্শ্বের আরবীয়দেরকে যুদ্ধের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন এবং প্রায় ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে রোম সাম্রাজ্য অভিমুখে রওয়ানা হন। এই যুদ্ধ থেকে বিমুখ থাকলো মুনাফিকরা এবং আরো কিছু সংখ্যক লোক। গরমের মৌসুম ছিল এবং গাছের ফল পেকে গিয়েছিল। রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গমনের ব্যাপারে সিরিয়ার পথ ছিল বহু দূরের পথ এবং ঐ সফর ছিল খুবই কঠিন সফর। তারা তাবূক পর্যন্ত পৌঁছে যান। সেখানে প্রায় বিশ দিন অবস্থান করেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ইসতিখারা করে সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করেন। কেননা, তাঁদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত সঙ্গীন এবং তারা খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। ইনশাআল্লাহ সত্বরই এর বর্ণনা আসছে। এই আয়াতকেই দলীল হিসেবে গ্রহণ করে কেউ কেউ বলেছেন যে, জিযিয়া শুধু আহলে কিতাবের নিকট থেকে এবং তাদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত লোকদের নিকট থেকে নেয়া যাবে, যেমন মাজুসীদের নিকট থেকে । রাসূলুল্লাহ (সঃ) হিজরের মাজুসদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করেছিলেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর এটাই মাযহাব। ইমাম আহমাদ (রঃ)-এরও প্রসিদ্ধ মাযহাব এটাই। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, সমস্ত আজমীর নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করা হবে, তারা আহলে কিতাবই হাক অথবা মুশরিকই হাক। হ্যাঁ, তবে আরবের লোকদের মধ্যে শুধুমাত্র আহলে কিতাবের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করা হবে। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, সমস্ত কাফিরের নিকট থেকেই জিযিয়া আদায় করা জায়েয। তারা আহলে কিতাবই হাক বা মাজুসীই হাক অথবা মূর্তিপূজক প্রভৃতিই হাক। তাদের মাযহাবের দলীলগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার এখানে তেমন কোন সুযোগ নেই। এসব ব্যাপার আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।আল্লাহ পাক বলেনঃ যে পর্যন্ত না তারা অধীনতা স্বীকার করে প্রজারূপে জিযিয়া দিতে স্বীকৃত হয়, তাদেরকে ছেড়ে দিয়ো না। সুতরাং মুসলিমদের উপর যিম্মীদের মর্যাদা দেয়া বৈধ নয়। সহীহ মুসলিমে আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে প্রথমে সালাম দিয়ো না এবং যদি পথে তোমাদের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয়ে যায় তবে তাদেরকে সংকীর্ণ পথে যেতে বাধ্য করো।” এ কারণেই উমার (রাঃ) তাদের সাথে এরূপই শর্ত করেছিলেন।আব্দুর রহমান ইবনে গানাম আশআরী (রাঃ) বলেন, আমি নিজের হাতে চুক্তিনামা লিখে উমার (রাঃ)-এর নিকট পাঠিয়েছিলাম যে, সিরিয়াবাসী অমুক অমুক শহুরে খ্রীষ্টানদের পক্ষ হতে এই চুক্তিনামা আল্লাহর বান্দা আমীরুল মুমিনীন উমার (রাঃ) -এর নিকট। চুক্তিপত্রের বিষয় বস্তু হচ্ছে- “যখন আপনারা আমাদের উপর এসে পড়লেন, আমরা আপনাদের নিকট আমাদের জান, মাল ও সন্তান-সন্ততির জন্যে নিরাপত্তার প্রার্থনা জানাচ্ছি। আমরা এ নিরাপত্তা চাচ্ছি এ শর্তাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে যে, আমরা এই শহরগুলোতে এবং এগুলোর আশে পাশে নতুন কোন মন্দির, গির্জা এবং খানকা নির্মাণ করবো না। এরূপ কোন নষ্ট ঘরের মেরামত ও সংস্কারও করবো না। এসব ঘরে যদি কোন মুসলিম মুসাফির অবস্থানের ইচ্ছা করেন তবে আমরা তাদেরকে বাধা দেবো না। তারা রাত্রেই অবস্থান করুন অথবা দিনেই অবস্থান করুন। আমরা পথিক ও মুসাফিরদের জন্যে ওগুলোর দরজা সব সময় খুলে রাখবো । যেসব মুসলিম আগমন করবেন আমরা তিন দিন পর্যন্ত তাঁদের মেহমানদারী করবো। আমরা ঐসব ঘরে বা বাসভূমি প্রভৃতিতে কোন গুপ্তচর লুকিয়ে রাখবো না। মুসলিমদের সাথে কোন প্রতারণা করবো না। নিজেদের সন্তানদেরকে কুরআন শিক্ষা দেবো না। নিজেরা শিরক করবো না এবং অন্য কাউকেও শিকের দিকে আহ্বান করবো না। আমাদের মধ্যে কেউ যদি ইসলাম গ্রহণ করার ইচ্ছা করে তবে আমরা তাদেরকে মোটেও বাধা দেবো না। মুসলিমদেরকে আমরা সম্মান করবো। যদি তাঁরা আমাদের কাছে বসার ইচ্ছা করেন তবে আমরা তাদের জন্যে জায়গা ছেড়ে দেবো। কোন কিছুতেই আমরা নিজেদেরকে মুসলিমদের সমান মনে করবো না। পোশাক পরিচ্ছদেও না, আমরা তাদের কথার উপর কথা বলবো না। আমরা তাঁদের পিতৃপদবী যুক্ত নামে নামকরণ করবো না। জিন বিশিষ্ট ঘোড়ার উপর আমরা সওয়ার হবো না। আমরা তরবারী লটকাবো না এবং নিজেদের সাথেও তরবারী রাখবো না। অঙ্গুরীর উপর আরবী নকশা অংকন করাবো না এবং মাথার অগ্রভাগের চুল কেটে ফেলবো না। আমরা যেখানেই থাকি না কেন, পৈতা অবশ্য অবশ্যই ফেলে রাখবো। আমাদের গির্জাসমূহের উপর ক্রুশচিহ্ন প্রকাশ করবো , আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থগুলো মুসলিমদের যাতায়াত স্থানে এবং বাজারসমূহে প্রকাশিত হতে দেবো না। গীর্জায় উচ্চৈঃস্বরে শংখ বাজাবো না, মুসলিমদের উপস্থিতিতে আমাদের ধর্মীয় পুস্তকগুলো জোরে জোরে পাঠ করবো না, রাস্তাঘাটে নিজেদের চাল চলন ও রীতি নীতি প্রকাশ করবো না, নিজেদের মৃতদের উপর হায়! হায়!! করে উচ্চৈঃস্বরে শাক প্রকাশ করবে না এবং মুসলিমদের চলার পথে মৃতদেহের সাথে আগুন নিয়ে যাবো না। যেসব গোলাম মুসলিমদের অংশে পড়বে তা আমরা গ্রহণ করবো না। আমরা অবশ্যই মুসলিমদের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে থাকবো। মুসলিমদের ঘরে আমরা উঁকি মারবো না।" যখন এই চুক্তি পত্র উমার (রাঃ)-এর সামনে পেশ করা হলো তখন তিনি তাতে আরো একটি শর্ত বাড়িয়ে নিলেন। তা হচ্ছে- “আমরা কখনো কোন মুসলিমকে প্রহার করবো না।” অতঃপর তারা বললোঃ “এসব শর্ত আমরা মেনে নিলাম। আমাদের ধর্মাবলম্বী সমস্ত লোকই এসব শর্তের উপর নিরাপত্তা লাভ করলো। এগুলোর কোন একটি যদি আমরা ভঙ্গ করি তবে আমাদেরকে নিরাপত্তা দানের ব্যাপারে আপনার কোন দায়িত্ব থাকবে না এবং আপনি আপনার শত্রুদের সাথে যা কিছু করেন, আমরাও ওরই যোগ্য ও উপযুক্ত হয়ে যাবো।”
আত-তাওবা 9:29
২৮-২৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র দ্বীনের অনুসারী এবং পাক পবিত্র মুসলিম বান্দাদেরকে হুকুম করছেন যে, তারা যেন ধর্মের দিক থেকে অপবিত্র মুশরিকদেরকে বায়তুল্লাহর পাশে আসতে না দেয়। এই আয়াতটি নবম হিজরীতে অবতীর্ণ হয়। ঐ বছরই রাসূলুল্লাহ (সঃ) আলী (রাঃ)-কে আবু বকর (রাঃ) -এর সাথে প্রেরণ করেন এবং নির্দেশ দেনঃ “হজ্বের সমাবেশে ঘোষণা করে দাও যে, এ বছরের পরে কোন মুশরিক যেন হজ্ব করতে না আসে এবং কেউ যেন উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ না করে। শরীয়তের এই হুকুমকে আল্লাহ তা'আলা এমনিতেই পূর্ণ করে দেন। সেখানে আর মুশরিকদের প্রবেশ লাভের সৌভাগ্য হয়নি এবং এরপরে উলঙ্গ অবস্থায় কেউ আল্লাহর ঘরের তাওয়াফও করেনি। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) গোলাম ও যিম্মী ব্যক্তিকে এই হুকুমের বহির্ভূত বলেছেন। মুসনাদে আহমাদে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এ বছরের পরে চুক্তিকৃতগণ ছাড়া এবং তাদের গোলামরা ছাড়া আর কেউই যেন আমাদের মসজিদে প্রবেশ না করে। কিন্তু এই মারফু হাদীস অপেক্ষা বেশী সহীহ সনদযুক্ত মাওকুফ রিওয়ায়াত রয়েছে।মুসলিমদের খলীফা উমার ইবনে আবদুল আযীয (রঃ) ফরমান জারী করেছিলেনঃ “ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে মুসলমানদের মসজিদে আসতে দিবে না।" এই আয়াতকে কেন্দ্র করেই তিনি এই নিষেধাজ্ঞা জারী করেছিলেন। আতা (রঃ) বলেন যে, সম্পূর্ণ হারাম শরীফই মসজিদুল হারামের অন্তর্ভুক্ত। মুশরিকরা যে অপবিত্র, এই আয়াতটিই এর দলীল। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, মুমিন অপবিত্র হয় না। বাকী থাকলো এই কথাটি যে মুশরিকদের দেহ ও সত্তাও কি অপবিত্র? এ ব্যাপারে জমহরের উক্তি এই যে, তাদের দেহ অপবিত্র নয়। কেননা আল্লাহ তা'আলা আহলে কিতাবের যবেহকৃত জন্তু হালাল করেছেন। যাহেরিয়া মাযহাবের কোন কোন লোক মুশরিকদের দেহকে অপবিত্র বলেছে। হাসান (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি মুশরিকদের সাথে মুসাফাহা করবে সে যেন তার হাতটি ধুয়ে নেয়। এ হুকুম হলে লোকদের কেউ কেউ বললোঃ “তাহলে তো আমাদের বাজার মন্দা হয়ে যাবে এবং ব্যবসার জাঁকজমক নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে আমাদের বহুবিধ ক্ষতি সাধিত হবে। (লুবাব গ্রন্থে ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, মুশরিকরা বায়তুল্লাহতে খাদ্য সম্ভার নিয়ে আসতো এবং এর মধ্যে ওরা ব্যবসা করতো। অতঃপর যখন তাদেরকে বায়তুল্লাহতে আসতে নিষেধ করে দেয়া হলো তখন মুসলমানরা বললোঃ “আমাদের জন্যে খাদ্য কোথায়?" তখন আল্লাহ তাআলা (আরবী) এ আয়াত অবতীর্ণ করেন) তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা এ ব্যাপারে কোনই ভয় করো না। আল্লাহ তোমাদের আরো বহু পন্থায় দান করবেন। আহলে কিতাবের নিকট থেকে তোমাদের জন্যে তিনি জিযিয়া আদায় করিয়ে দিবেন এবং তোমাদেরকে সম্পদশালী করবেন । তোমাদের জন্যে কোটা বেশী কল্যাণকর তা তোমাদের প্রতিপালকই ভাল জানেন। তাঁর নির্দেশ এবং নিষেধাজ্ঞা সবটাই নিপুণতাপূর্ণ। এ ব্যবসা তোমাদের জন্যে ততোটা লাভজনক নয় যতোটা লাভজনক তোমাদের জিযিয়া প্রাপ্তি ঐ আহলে কিতাবের নিকট থেকে যারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং কিয়ামতকে অস্বীকারকারী। প্রকৃত অর্থে তারা যখন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান আনলো না তখন কোন নবীর উপরই তাদের ঈমান রইলো না। বরং তারা নিজেদের প্রবৃত্তির ও তাদের বড়দের অন্ধ বিশ্বাসের পিছনে পড়ে রয়েছে। যদি তাদের নিজেদের নবীর উপর এবং নিজেদের শরীয়তের উপর পূর্ণ বিশ্বাস থাকতো তবে তারা আমাদের এই নবী (সঃ)-এর উপরে অবশ্যই ঈমান আনতো। তাঁর শুভাগমনের সুসংবাদ তো প্রত্যেক নবীই দিয়ে গেছেন এবং তার অনুসরণ করার হুকুমও সব নবীই প্রদান করেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা এই সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল (সঃ)-কে অস্বীকার করছে। সুতরাং পূর্ববর্তী নবীদের শরীয়তের সাথেও তাদের কোন সম্পর্ক নেই। এ কারণেই ঐ নবীদেরকে মুখে স্বীকার করার কোনই মূল্য নেই। কেননা মুহাম্মাদ (সঃ) হলেন নবীদের নেতা সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল, সর্বশেষ নবী এবং রাসূলদের পূর্ণকারী। অথচ তারা তাঁকেই অস্বীকার করছে। সুতরাং তাদের সাথেও জিহাদ করতে হবে।তাদের সাথে জিহাদের হুকুম হওয়ার এটাই প্রথম আয়াত। ঐ সময় পর্যন্ত আশে পাশের মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। তাদের অধিকাংশই তাওহীদের পতাকা তলে আশ্রয় নিয়েছিল। আরব উপদ্বীপে ইসলাম স্বীয় জায়গা করে নিয়েছিল। এখন ইয়াহদী ও খ্রীষ্টানদের সংবাদ নেয়ার এবং তাদেরকে সত্য পথ দেখাবার নির্দেশ দেয়া হয়। এ হুকুম অবতীর্ণ হয় হিজরী নবম সনে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। জনগণকে তিনি স্বীয় সংকল্পের কথা অবহিত করেন। মদীনার চতুম্পার্শ্বের আরবীয়দেরকে যুদ্ধের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন এবং প্রায় ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে রোম সাম্রাজ্য অভিমুখে রওয়ানা হন। এই যুদ্ধ থেকে বিমুখ থাকলো মুনাফিকরা এবং আরো কিছু সংখ্যক লোক। গরমের মৌসুম ছিল এবং গাছের ফল পেকে গিয়েছিল। রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গমনের ব্যাপারে সিরিয়ার পথ ছিল বহু দূরের পথ এবং ঐ সফর ছিল খুবই কঠিন সফর। তারা তাবূক পর্যন্ত পৌঁছে যান। সেখানে প্রায় বিশ দিন অবস্থান করেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ইসতিখারা করে সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করেন। কেননা, তাঁদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত সঙ্গীন এবং তারা খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। ইনশাআল্লাহ সত্বরই এর বর্ণনা আসছে। এই আয়াতকেই দলীল হিসেবে গ্রহণ করে কেউ কেউ বলেছেন যে, জিযিয়া শুধু আহলে কিতাবের নিকট থেকে এবং তাদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত লোকদের নিকট থেকে নেয়া যাবে, যেমন মাজুসীদের নিকট থেকে । রাসূলুল্লাহ (সঃ) হিজরের মাজুসদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করেছিলেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর এটাই মাযহাব। ইমাম আহমাদ (রঃ)-এরও প্রসিদ্ধ মাযহাব এটাই। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, সমস্ত আজমীর নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করা হবে, তারা আহলে কিতাবই হাক অথবা মুশরিকই হাক। হ্যাঁ, তবে আরবের লোকদের মধ্যে শুধুমাত্র আহলে কিতাবের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করা হবে। ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, সমস্ত কাফিরের নিকট থেকেই জিযিয়া আদায় করা জায়েয। তারা আহলে কিতাবই হাক বা মাজুসীই হাক অথবা মূর্তিপূজক প্রভৃতিই হাক। তাদের মাযহাবের দলীলগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার এখানে তেমন কোন সুযোগ নেই। এসব ব্যাপার আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।আল্লাহ পাক বলেনঃ যে পর্যন্ত না তারা অধীনতা স্বীকার করে প্রজারূপে জিযিয়া দিতে স্বীকৃত হয়, তাদেরকে ছেড়ে দিয়ো না। সুতরাং মুসলিমদের উপর যিম্মীদের মর্যাদা দেয়া বৈধ নয়। সহীহ মুসলিমে আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে প্রথমে সালাম দিয়ো না এবং যদি পথে তোমাদের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয়ে যায় তবে তাদেরকে সংকীর্ণ পথে যেতে বাধ্য করো।” এ কারণেই উমার (রাঃ) তাদের সাথে এরূপই শর্ত করেছিলেন।আব্দুর রহমান ইবনে গানাম আশআরী (রাঃ) বলেন, আমি নিজের হাতে চুক্তিনামা লিখে উমার (রাঃ)-এর নিকট পাঠিয়েছিলাম যে, সিরিয়াবাসী অমুক অমুক শহুরে খ্রীষ্টানদের পক্ষ হতে এই চুক্তিনামা আল্লাহর বান্দা আমীরুল মুমিনীন উমার (রাঃ) -এর নিকট। চুক্তিপত্রের বিষয় বস্তু হচ্ছে- “যখন আপনারা আমাদের উপর এসে পড়লেন, আমরা আপনাদের নিকট আমাদের জান, মাল ও সন্তান-সন্ততির জন্যে নিরাপত্তার প্রার্থনা জানাচ্ছি। আমরা এ নিরাপত্তা চাচ্ছি এ শর্তাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে যে, আমরা এই শহরগুলোতে এবং এগুলোর আশে পাশে নতুন কোন মন্দির, গির্জা এবং খানকা নির্মাণ করবো না। এরূপ কোন নষ্ট ঘরের মেরামত ও সংস্কারও করবো না। এসব ঘরে যদি কোন মুসলিম মুসাফির অবস্থানের ইচ্ছা করেন তবে আমরা তাদেরকে বাধা দেবো না। তারা রাত্রেই অবস্থান করুন অথবা দিনেই অবস্থান করুন। আমরা পথিক ও মুসাফিরদের জন্যে ওগুলোর দরজা সব সময় খুলে রাখবো । যেসব মুসলিম আগমন করবেন আমরা তিন দিন পর্যন্ত তাঁদের মেহমানদারী করবো। আমরা ঐসব ঘরে বা বাসভূমি প্রভৃতিতে কোন গুপ্তচর লুকিয়ে রাখবো না। মুসলিমদের সাথে কোন প্রতারণা করবো না। নিজেদের সন্তানদেরকে কুরআন শিক্ষা দেবো না। নিজেরা শিরক করবো না এবং অন্য কাউকেও শিকের দিকে আহ্বান করবো না। আমাদের মধ্যে কেউ যদি ইসলাম গ্রহণ করার ইচ্ছা করে তবে আমরা তাদেরকে মোটেও বাধা দেবো না। মুসলিমদেরকে আমরা সম্মান করবো। যদি তাঁরা আমাদের কাছে বসার ইচ্ছা করেন তবে আমরা তাদের জন্যে জায়গা ছেড়ে দেবো। কোন কিছুতেই আমরা নিজেদেরকে মুসলিমদের সমান মনে করবো না। পোশাক পরিচ্ছদেও না, আমরা তাদের কথার উপর কথা বলবো না। আমরা তাঁদের পিতৃপদবী যুক্ত নামে নামকরণ করবো না। জিন বিশিষ্ট ঘোড়ার উপর আমরা সওয়ার হবো না। আমরা তরবারী লটকাবো না এবং নিজেদের সাথেও তরবারী রাখবো না। অঙ্গুরীর উপর আরবী নকশা অংকন করাবো না এবং মাথার অগ্রভাগের চুল কেটে ফেলবো না। আমরা যেখানেই থাকি না কেন, পৈতা অবশ্য অবশ্যই ফেলে রাখবো। আমাদের গির্জাসমূহের উপর ক্রুশচিহ্ন প্রকাশ করবো , আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থগুলো মুসলিমদের যাতায়াত স্থানে এবং বাজারসমূহে প্রকাশিত হতে দেবো না। গীর্জায় উচ্চৈঃস্বরে শংখ বাজাবো না, মুসলিমদের উপস্থিতিতে আমাদের ধর্মীয় পুস্তকগুলো জোরে জোরে পাঠ করবো না, রাস্তাঘাটে নিজেদের চাল চলন ও রীতি নীতি প্রকাশ করবো না, নিজেদের মৃতদের উপর হায়! হায়!! করে উচ্চৈঃস্বরে শাক প্রকাশ করবে না এবং মুসলিমদের চলার পথে মৃতদেহের সাথে আগুন নিয়ে যাবো না। যেসব গোলাম মুসলিমদের অংশে পড়বে তা আমরা গ্রহণ করবো না। আমরা অবশ্যই মুসলিমদের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে থাকবো। মুসলিমদের ঘরে আমরা উঁকি মারবো না।" যখন এই চুক্তি পত্র উমার (রাঃ)-এর সামনে পেশ করা হলো তখন তিনি তাতে আরো একটি শর্ত বাড়িয়ে নিলেন। তা হচ্ছে- “আমরা কখনো কোন মুসলিমকে প্রহার করবো না।” অতঃপর তারা বললোঃ “এসব শর্ত আমরা মেনে নিলাম। আমাদের ধর্মাবলম্বী সমস্ত লোকই এসব শর্তের উপর নিরাপত্তা লাভ করলো। এগুলোর কোন একটি যদি আমরা ভঙ্গ করি তবে আমাদেরকে নিরাপত্তা দানের ব্যাপারে আপনার কোন দায়িত্ব থাকবে না এবং আপনি আপনার শত্রুদের সাথে যা কিছু করেন, আমরাও ওরই যোগ্য ও উপযুক্ত হয়ে যাবো।”
আত-তাওবা 9:30
৩০-৩১ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতগুলোতেও মহা মহিমান্বিত আল্লাহ মুমিনদেরকে মুশরিক, কাফির, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে যুদ্ধ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন। মহান আল্লাহ বলেন, দেখো! আল্লাহর শত্রুরা কেমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যবহার করছে! ইয়াহূদীরা উযায়ের (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলছে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)। আল্লাহ এটা থেকে পবিত্র ও বহু ঊর্ধে যে, তার কোন পুত্র থাকবে! ঐ লোকেরা যে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উযায়ের (আঃ) সম্পর্কে এ ধারণা পোষণ করেছিল তা এই যে, যখন আমালিকা সম্প্রদায় বানী ইসরাঈলের উপর জয়যুক্ত হয় এবং তাদের আলেমদেরকে হত্যা করে ও নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে বন্দী করে ফেলে তখন ইলম উঠে যাওয়া, কিছু সংখ্যক আলেমের নিহত হওয়া এবং বানী ইসরাঈলদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে উযায়ের (আঃ) অত্যন্ত মর্মাহত হন।তিনি এমনভাবে কাঁদতে শুরু করেন যে, তাঁর চোখের অশ্রু বন্ধই হয় না। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখের পাতাগুলোও ঝরে পড়ে। একদা এভাবে ক্রন্দনরত। অবস্থায় একটি মাঠের মধ্য দিয়ে গমন করেন। এমন সময় দেখতে পান যে, একজন মহিলা একটি কবরের পার্শ্বে বসে ক্রন্দন করছে এবং মুখে উচ্চারণ করছে- “হায়! এখন আমার খাওয়া ও পরার ব্যবস্থা কি করে হবে?” এ দেখে উযায়ের (আঃ) সেখানে দাঁড়িয়ে যান এবং মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এই লোকটির পূর্বে তোমার খাওয়া ও পরার ব্যবস্থা কে করতেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আল্লাহ তা'আলা।” তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তাহলে আল্লাহ তাআলা তো এখনো জীবিত রয়েছেন। তার তো কখনো মৃত্যু হয় না। তার এ কথা শুনে মহিলাটি উযায়ের (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ “তাহলে হে উযায়ের (আঃ)! আপনি বলুনতো- বানী ইসরাঈলের পূর্বে আলেমদেরকে বিদ্যা শিক্ষা দিতেন কে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা।” তখন মহিলাটি বলেঃ “তাহলে আপনি এভাবে কেঁদে কেটে সময় কাটাচ্ছেন কেন?” তিনি এবার বুঝে নেন যে, এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁকে সতর্ক করা হয়েছে। অতঃপর তাঁকে বলা হয়ঃ “তুমি অমুক নদীতে গিয়ে গোসল কর এবং দু'রাকআত সালাত আদায় কর । সেখানে তুমি একজন লোককে দেখতে পাবে। সে তোমাকে যা কিছু খেতে দেবে তা তুমি খেয়ে নিবে।”কথামত উযায়ের (আঃ) সেখানে গমন করেন। গোসল করে তিনি সালাত আদায় করেন। অতঃপর তিনি সেখানে একটি লোককে দেখতে পান। লোকটি তাকে বলেনঃ “মুখ খুলুন!” তিনি মুখ খুলে দেন। তখন লোকটি পাথরের মত কি একটি জিনিস তিন বার তাঁর মুখে নিক্ষেপ করেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁর বক্ষ খুলে দেন। ফলে তিনি তাওরাতের সবচেয়ে বড় আলেম হয়ে যান। তারপর তিনি বানী ইসরাঈলের কাছে গিয়ে বলেনঃ “আমি তোমাদের কাছে তাওরাত নিয়ে এসেছি।” তারা তাকে বলেঃ “হে উযায়ের (আঃ)! আপনি মিথ্যাবাদী ছিলেন না।” এরপর তিনি অঙ্গুলির সাথে কলমকে জড়িয়ে ধরেন এবং ঐ অঙ্গুলি দ্বারাই একই সময় সম্পূর্ণ তাওরাত লিখে ফেলেন। এদিকে লোকেরা যুদ্ধ হতে ফিরে আসে। তাদের সাথে তাদের আলেমগণও ফিরে আসেন। তারা উযায়ের (আঃ)-এর ব্যাপারটা জানতে পারেন। সুতরাং তারা পাহাড়ে ও গুহার মধ্যে তাওরাতের যে পুস্তিকাগুলো লুকিয়ে রেখে এসেছিলেন সেগুলো বের করে আনেন। ঐ পুস্তিকাগুলোর সাথে উযায়ের (আঃ)-এর লিখিত পুস্তিকাগুলো তারা মিলিয়ে দেখেন। দেখা যায় যে, ওগুলোর সাথে তার নুসখা সম্পূর্ণরূপে মিলে গেছে। এতে কোন কোন অজ্ঞ লোকের অন্তরে এই শয়তানী ‘ওসওয়াসা পয়দা হয়ে যায় যে, তিনি আল্লাহর পুত্র। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)।খ্রীষ্টানরা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলতো (আমরা এর থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি)। তার ঘটনা তো সর্বজন বিদিত। সুতরাং এ দু'টি দলের ভুল বর্ণনা কুরআন কারীমে বর্ণিত হচ্ছে। আল্লাহ পাক বলেন, এটা তাদের মুখের কথা মাত্র। তাদের কাছে এর কোন দলীল নেই। ইতিপূর্বে তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা যেমন কুফরী ও বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল, তদ্রুপ এরাও তাদের মুরীদ ও অন্ধ বিশ্বাসী। আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করুন! হক থেকে তারা কেমন বিভ্রান্ত হচ্ছে! আদী ইবনে হাতিম (রাঃ)-এর কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দ্বীন যখন পৌঁছে তখন তিনি সিরিয়ার দিকে পালিয়ে যান। অজ্ঞতার যুগেই তিনি খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এখানে তার ভগ্নি ও তার দলের লোকেরা বন্দী হয়ে যায় । রাসূলুল্লাহ (সঃ) দয়া পরবশ হয়ে তার ভগ্নিকে মুক্তি দেন এবং তাকে কিছু অর্থও প্রদান করেন। সে তখন সরাসরি তার ভাই-এর কাছে চলে যায় এবং তাঁকে ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করে ও মদীনায় গমনের অনুরোধ করে। সুতরাং আদী (রাঃ) মদীনায় চলে আসেন। তিনি তার ‘তাঈ' গোত্রের নেতা ছিলেন। তাঁর পিতার দানশীলতা দুনিয়াব্যাপী প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর আগমনের সংবাদ অবহিত করেন। তিনি স্বয়ং তাঁর কাছে। আসেন। ঐ সময় আদী (রাঃ)-এর স্কন্ধে রৌপ্য নির্মিত ক্রুশ লটকানো ছিল । রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখে (আরবী) এ আয়াতটি উচ্চারিত হচ্ছিল। তখন আদী (রাঃ) বলেনঃ “ইয়াহূদী খ্রীষ্টানরা তো তাদের আলেম ও দরবেশদের উপাসনা করেনি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “তাহলে শুন! তারা তাদের আলেম ও দরবেশদের হারামকৃত বিষয়কে হারাম বলে মেনে নেয় এবং হালালকৃত বিষয়কে হালাল বলে স্বীকার করে নেয়। এটাই তাদেরকে তাদের উপাসনা করার শামিল।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আদী! আল্লাহ সবচেয়ে বড় এটা কি তুমি মেনে নিতে পার না? তোমার ধারণায় আল্লাহর চেয়ে বড় কেউ আছে কি? ‘আল্লাহ ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কেউ নেই' এটা কি তুমি অস্বীকার করছো? তোমার মতে কি তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য আছে?” অতঃপর তিনি তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। আদী (রাঃ) তা ককূল করে নেন এবং আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করেন। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা মুবারক খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি বলেনঃ “ইয়াহূদীদের উপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়েছে এবং খ্রীষ্টানরা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ আয়াতের তাফসীর এরূপই বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে হারাম ও হালালের মাসআলায় আলেম ও ইমামদের কথার প্রতি তাদের অন্ধ অনুকরণ । সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তারা তাদের বুযুর্গদের কথা মানতে শুরু করে এবং আল্লাহর কিতাবকে এক দিকে সরিয়ে দেয়। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন, তাদেরকে তো শুধু এ নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না। তিনি যেটা হারাম করেছেন সেটাই হারাম এবং তিনি যেটা হালাল করেছেন সেটাই হালাল। তাঁর ফরমানই হচ্ছে শরীয়ত। তাঁর হুকুমই মান্য করার যোগ্য। তাঁরই সত্তা ইবাদতের দাবীদার। তিনি শিক ও শরীক হতে পবিত্র। তাঁর কোন শরীক, কোন নবীর ও কোন সাহায্যকারী নেই। তাঁর বিপরীতও কেউ নেই। তিনি সন্তান-সন্ততি থেকে পবিত্র। তিনি ছাড়া না আছে কোন উপাস্য, না আছে কোন প্রতিপালক।
আত-তাওবা 9:31
৩০-৩১ নং আয়াতের তাফসীর: এ আয়াতগুলোতেও মহা মহিমান্বিত আল্লাহ মুমিনদেরকে মুশরিক, কাফির, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে যুদ্ধ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন। মহান আল্লাহ বলেন, দেখো! আল্লাহর শত্রুরা কেমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যবহার করছে! ইয়াহূদীরা উযায়ের (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলছে (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)। আল্লাহ এটা থেকে পবিত্র ও বহু ঊর্ধে যে, তার কোন পুত্র থাকবে! ঐ লোকেরা যে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উযায়ের (আঃ) সম্পর্কে এ ধারণা পোষণ করেছিল তা এই যে, যখন আমালিকা সম্প্রদায় বানী ইসরাঈলের উপর জয়যুক্ত হয় এবং তাদের আলেমদেরকে হত্যা করে ও নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে বন্দী করে ফেলে তখন ইলম উঠে যাওয়া, কিছু সংখ্যক আলেমের নিহত হওয়া এবং বানী ইসরাঈলদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে উযায়ের (আঃ) অত্যন্ত মর্মাহত হন।তিনি এমনভাবে কাঁদতে শুরু করেন যে, তাঁর চোখের অশ্রু বন্ধই হয় না। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখের পাতাগুলোও ঝরে পড়ে। একদা এভাবে ক্রন্দনরত। অবস্থায় একটি মাঠের মধ্য দিয়ে গমন করেন। এমন সময় দেখতে পান যে, একজন মহিলা একটি কবরের পার্শ্বে বসে ক্রন্দন করছে এবং মুখে উচ্চারণ করছে- “হায়! এখন আমার খাওয়া ও পরার ব্যবস্থা কি করে হবে?” এ দেখে উযায়ের (আঃ) সেখানে দাঁড়িয়ে যান এবং মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এই লোকটির পূর্বে তোমার খাওয়া ও পরার ব্যবস্থা কে করতেন?” সে উত্তরে বলেঃ “আল্লাহ তা'আলা।” তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তাহলে আল্লাহ তাআলা তো এখনো জীবিত রয়েছেন। তার তো কখনো মৃত্যু হয় না। তার এ কথা শুনে মহিলাটি উযায়ের (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ “তাহলে হে উযায়ের (আঃ)! আপনি বলুনতো- বানী ইসরাঈলের পূর্বে আলেমদেরকে বিদ্যা শিক্ষা দিতেন কে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা।” তখন মহিলাটি বলেঃ “তাহলে আপনি এভাবে কেঁদে কেটে সময় কাটাচ্ছেন কেন?” তিনি এবার বুঝে নেন যে, এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁকে সতর্ক করা হয়েছে। অতঃপর তাঁকে বলা হয়ঃ “তুমি অমুক নদীতে গিয়ে গোসল কর এবং দু'রাকআত সালাত আদায় কর । সেখানে তুমি একজন লোককে দেখতে পাবে। সে তোমাকে যা কিছু খেতে দেবে তা তুমি খেয়ে নিবে।”কথামত উযায়ের (আঃ) সেখানে গমন করেন। গোসল করে তিনি সালাত আদায় করেন। অতঃপর তিনি সেখানে একটি লোককে দেখতে পান। লোকটি তাকে বলেনঃ “মুখ খুলুন!” তিনি মুখ খুলে দেন। তখন লোকটি পাথরের মত কি একটি জিনিস তিন বার তাঁর মুখে নিক্ষেপ করেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁর বক্ষ খুলে দেন। ফলে তিনি তাওরাতের সবচেয়ে বড় আলেম হয়ে যান। তারপর তিনি বানী ইসরাঈলের কাছে গিয়ে বলেনঃ “আমি তোমাদের কাছে তাওরাত নিয়ে এসেছি।” তারা তাকে বলেঃ “হে উযায়ের (আঃ)! আপনি মিথ্যাবাদী ছিলেন না।” এরপর তিনি অঙ্গুলির সাথে কলমকে জড়িয়ে ধরেন এবং ঐ অঙ্গুলি দ্বারাই একই সময় সম্পূর্ণ তাওরাত লিখে ফেলেন। এদিকে লোকেরা যুদ্ধ হতে ফিরে আসে। তাদের সাথে তাদের আলেমগণও ফিরে আসেন। তারা উযায়ের (আঃ)-এর ব্যাপারটা জানতে পারেন। সুতরাং তারা পাহাড়ে ও গুহার মধ্যে তাওরাতের যে পুস্তিকাগুলো লুকিয়ে রেখে এসেছিলেন সেগুলো বের করে আনেন। ঐ পুস্তিকাগুলোর সাথে উযায়ের (আঃ)-এর লিখিত পুস্তিকাগুলো তারা মিলিয়ে দেখেন। দেখা যায় যে, ওগুলোর সাথে তার নুসখা সম্পূর্ণরূপে মিলে গেছে। এতে কোন কোন অজ্ঞ লোকের অন্তরে এই শয়তানী ‘ওসওয়াসা পয়দা হয়ে যায় যে, তিনি আল্লাহর পুত্র। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)।খ্রীষ্টানরা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলতো (আমরা এর থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি)। তার ঘটনা তো সর্বজন বিদিত। সুতরাং এ দু'টি দলের ভুল বর্ণনা কুরআন কারীমে বর্ণিত হচ্ছে। আল্লাহ পাক বলেন, এটা তাদের মুখের কথা মাত্র। তাদের কাছে এর কোন দলীল নেই। ইতিপূর্বে তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা যেমন কুফরী ও বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল, তদ্রুপ এরাও তাদের মুরীদ ও অন্ধ বিশ্বাসী। আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করুন! হক থেকে তারা কেমন বিভ্রান্ত হচ্ছে! আদী ইবনে হাতিম (রাঃ)-এর কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দ্বীন যখন পৌঁছে তখন তিনি সিরিয়ার দিকে পালিয়ে যান। অজ্ঞতার যুগেই তিনি খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এখানে তার ভগ্নি ও তার দলের লোকেরা বন্দী হয়ে যায় । রাসূলুল্লাহ (সঃ) দয়া পরবশ হয়ে তার ভগ্নিকে মুক্তি দেন এবং তাকে কিছু অর্থও প্রদান করেন। সে তখন সরাসরি তার ভাই-এর কাছে চলে যায় এবং তাঁকে ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করে ও মদীনায় গমনের অনুরোধ করে। সুতরাং আদী (রাঃ) মদীনায় চলে আসেন। তিনি তার ‘তাঈ' গোত্রের নেতা ছিলেন। তাঁর পিতার দানশীলতা দুনিয়াব্যাপী প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর আগমনের সংবাদ অবহিত করেন। তিনি স্বয়ং তাঁর কাছে। আসেন। ঐ সময় আদী (রাঃ)-এর স্কন্ধে রৌপ্য নির্মিত ক্রুশ লটকানো ছিল । রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুখে (আরবী) এ আয়াতটি উচ্চারিত হচ্ছিল। তখন আদী (রাঃ) বলেনঃ “ইয়াহূদী খ্রীষ্টানরা তো তাদের আলেম ও দরবেশদের উপাসনা করেনি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “তাহলে শুন! তারা তাদের আলেম ও দরবেশদের হারামকৃত বিষয়কে হারাম বলে মেনে নেয় এবং হালালকৃত বিষয়কে হালাল বলে স্বীকার করে নেয়। এটাই তাদেরকে তাদের উপাসনা করার শামিল।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আদী! আল্লাহ সবচেয়ে বড় এটা কি তুমি মেনে নিতে পার না? তোমার ধারণায় আল্লাহর চেয়ে বড় কেউ আছে কি? ‘আল্লাহ ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কেউ নেই' এটা কি তুমি অস্বীকার করছো? তোমার মতে কি তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য আছে?” অতঃপর তিনি তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। আদী (রাঃ) তা ককূল করে নেন এবং আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করেন। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা মুবারক খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি বলেনঃ “ইয়াহূদীদের উপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়েছে এবং খ্রীষ্টানরা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এ আয়াতের তাফসীর এরূপই বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে হারাম ও হালালের মাসআলায় আলেম ও ইমামদের কথার প্রতি তাদের অন্ধ অনুকরণ । সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তারা তাদের বুযুর্গদের কথা মানতে শুরু করে এবং আল্লাহর কিতাবকে এক দিকে সরিয়ে দেয়। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেন, তাদেরকে তো শুধু এ নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না। তিনি যেটা হারাম করেছেন সেটাই হারাম এবং তিনি যেটা হালাল করেছেন সেটাই হালাল। তাঁর ফরমানই হচ্ছে শরীয়ত। তাঁর হুকুমই মান্য করার যোগ্য। তাঁরই সত্তা ইবাদতের দাবীদার। তিনি শিক ও শরীক হতে পবিত্র। তাঁর কোন শরীক, কোন নবীর ও কোন সাহায্যকারী নেই। তাঁর বিপরীতও কেউ নেই। তিনি সন্তান-সন্ততি থেকে পবিত্র। তিনি ছাড়া না আছে কোন উপাস্য, না আছে কোন প্রতিপালক।
আত-তাওবা 9:32
৩২-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, সর্ব শ্রেণীর কাফিরদের মনের ইচ্ছা এটাই যে, তারা আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিবে এবং তাঁর হিদায়াত ও সত্য দ্বীনকে দুনিয়ার বুক থেকে মুছে ফেলবে। তাহলে তাদের চিন্তা করে দেখা উচিত যে, যদি কেউ তার মুখের ফুৎকার দ্বারা সূর্যের বা চন্দ্রের রশ্মিকে নিভিয়ে দেয়ার ইচ্ছা করে তবে তা কখনো সম্ভব হবে কি? কখনই না। অনুরূপভাবে এ লোকগুলোও আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষে অপারগ হয়ে গেছে। এটা অবশ্যম্ভাবী বিষয় এবং আল্লাহর ফায়সালা যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যে সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করা হয়েছে তা সদা বিজয়ী থাকবেই। হে কাফির ও মুশরিকের দল! তোমরা আল্লাহর দ্বীনকে মিটিয়ে দিতে চাচ্ছ, কিন্তু আল্লাহ চাচ্ছেন তা উন্নত রাখতে। আর স্পষ্ট কথা যে, আল্লাহর ইচ্ছা তোমাদের ইচ্ছার উপর নিঃসন্দেহে বিজয়ী থাকবে। যদিও তোমাদের কাছে অপ্রীতিকর হয় তবুও কিন্তু হিদায়াতের সূর্য মধ্য গগণে পৌছে যাবেই। আরবী অভিধানে কোন জিনিস গোপনকারীকে কাফির বলা হয়। এ কারণেই রাত্রি সব জিনিসকে গোপন করে দেয় বলে ওকেই কাফির বলা হয়। কৃষককেও কাফির বলা হয়ে থাকে, কেননা সে শস্য-বীজকে মাটির মধ্যে গোপন করে দেয়। যেমন কুরআন কারীমে (আরবী) (৫৭:২০) বলা হয়েছে। ঐ আল্লাহ তাআলাই স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে হিদায়াত ও দ্বীনে হকসহ পাঠিয়েছেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্য সংবাদ, সঠিক ঈমান এবং উপকারী ইমই হচ্ছে হিদায়াত। আর উত্তম কার্যাবলী, যেগুলো দুনিয়া ও আখিরাতে ফায়দা দেয় সেটাই হচ্ছে দ্বীনে-হক। এটা দুনিয়ার সমুদয় দ্বীনের উপর বিজয়ীরূপে থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার জন্যে ভূ-পৃষ্ঠের পূর্ব ও পশ্চিম দিককে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমার উম্মতের রাজ্য এই সমুদয় স্থান পর্যন্ত পৌছে যাবে।” নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের হাতে পূর্ব ও পশ্চিম বিজিত হবে। তোমাদের নেতারা জাহান্নামী হবে, তারা ব্যতীত যারা পরহেজগার হবে এবং আমানতদাতার কাছে আমানত পৌছিয়ে দেবে।” তামীমুদদারী (রাঃ)। হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “অবশ্যই এই দ্বীন ঐ সব জায়গায় পৌছবে যেখানে রাত ও দিন পৌছে থাকে। এমন কোন কাঁচা ঘর ও পাকা ঘর বাকী থাকবে না যেখানে মহা মহিমান্বিত আল্লাহ ইসলামকে পৌঁছাবেন না। আল্লাহ তা'আলা সম্মানিতদেরকে সম্মান দেবেন এবং লাঞ্ছিতদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। যারা ইসলামের মর্যাদা দেয় তারা সম্মান পাবে এবং কাফিররা লাঞ্ছিত হবে।” তামীমুদদারী (রাঃ) বলেনঃ “এটা তো আমি স্বয়ং আমার বাড়ীতেই দেখতে পেয়েছি। যে মুসলিম হয়েছে সে কল্যাণ ও বরকত এবং সম্মান ও মর্যাদা লাভ করেছে, আর যে কাফির হয়েছে সে লাভ করেছে ঘৃণা ও অভিসম্পাত। তাদেরকে অপমানের সাথে জিযিয়া প্রদান করতে হয়েছে।”মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “ভূ-পৃষ্ঠে এমন কোন কাঁচা ও পাকা ঘর বাকী থাকবে না যেখানে আল্লাহ তা'আলা ইসলামের কালেমাকে প্রবিষ্ট করবেন না। তিনি মর্যাদাবানদেরকে মর্যাদা দিবেন এবং লাঞ্ছিতদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। যাদেরকে তিনি মর্যাদা দানের ইচ্ছা করবেন তাদেরকে তিনি ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য দান করবেন। আর যাদেরকে তিনি লাঞ্ছিত করতে চাইবেন তারা তা মানবে না, কিন্তু তাদেরকে ঐ মুসলিমদের অধীনস্থ হয়ে থাকতে হবে।” আদী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করে আমাকে বলেনঃ “তুমি ইসলাম কবুল কর, তাহলে নিরাপত্তা লাভ করবে।” আমি বললাম, আমি তো একটা দ্বীন মেনে চলছি। তিনি বললেনঃ “তোমার দ্বীন সম্পর্কে তোমার চেয়ে আমারই জ্ঞান বেশী আছে।” আমি বললাম, সত্যই কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “সম্পূর্ণরূপে সত্য। তুমি কি রাকূসিয়া’র অন্তর্ভুক্ত নও? তুমি কি তোমার কওমের নিকট থেকে ট্যাক্স আদায় কর না?” আমি জবাব দিলাম, হ্যাঁ, এ কথা সত্য বটে। তিনি বললেনঃ “তোমার ধর্মে এটা তোমার জন্যে হালাল নয়।” তার এ কথা শুনামাত্রই আমি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেলাম। অতঃপর তিনি আমাকে বললেনঃ “তোমাকে ইসলাম গ্রহণে কিসে বাধা দিচ্ছে তা আমি বেশ ভাল রূপেই জানি। দেখো, তুমি শুধু এ কারণেই বাধা প্রাপ্ত হচ্ছে যে, মুসলিমরা খুবই দুর্বল ও শক্তিহীন। সারা আরববাসী তাদেরকে ঘিরে রয়েছে। কিন্তু বলতো তুমি হীরা (রাজ্য) চেনো কি?” আমি উত্তরে বললাম, আমি হীরা (রাজ্য) কোন দিন দেখিনি বটে, তবে শুনেছি নিশ্চয়ই। তিনি তখন বললেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! আল্লাহ তা'আলা এই দ্বীনকে পূর্ণ করবেন। এমন কি একজন পর্দানশীল নারী উস্ত্রীর উপর আরোহণ করে হীরা হতে যাত্রা শুরু করবে। এবং কারো আশ্রয় ছাড়াই নিরাপদে মক্কা পৌছে যাবে ও বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করবে। আল্লাহর কসম! তোমরা কিসরার (পারস্য সম্রাট) কোষাগারগুলো জয় করে নিবে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, কিসরা ইবনে হরমূযের (কোষাগার)? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, কিসরা ইবনে হরমূযের (কোষাগার)। তোমাদের কাছে ধন-সম্পদের এতো প্রাচুর্য হবে যে, তা গ্রহণ করার লোক পাওয়া যাবে না।” এ হাদীসটি বর্ণনা করার সময় আদী (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়ে গেছে। দেখো, আজ হীরা সাম্রাজ্য হতে উষ্ট্রারোহীরা নির্ভয়ে ও কারো আশ্রয় ছাড়াই নিরাপদে মক্কায় পৌছে বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করছে। সত্যবাদী ও সত্যায়িত নবী (সঃ)-এর দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণীও সত্যে পরিণত হয়েছে। কিসরার কোষাগার বিজিত হয়েছে। আমি স্বয়ং ঐ সেনাবাহিনীতে ছিলাম যারা ইরানের ইট দ্বারা ইট বাজিয়েছে, অট্টালিকাগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে এবং কিসরার গুপ্ত কোষাগার দখল করে নিয়েছে। আল্লাহর শপথ! আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, সত্যবাদী ও সত্যায়িত রাসূল (সঃ)-এর তৃতীয় ভবিষ্যদ্বাণীও সত্যে পরিণত হবে।” আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দিন ও রাত্রির গমনাগমন অব্যাহত থাকবে যে পর্যন্ত না পুনরায় ‘লাত’ ও ‘উযযা’র ইবাদত শুরু হবে। আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমার ধারণা তো এই রয়েছে যে, এটা পূর্ণ কথা।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা, এটা পূর্ণ হয়ে গেছে এবং যতদিন পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হবে তা পূর্ণই থাকবে। অতঃপর তিনি একটা পবিত্র বায়ু প্রেরণ করবেন, যার ফলে যে ব্যক্তির অন্তরে এক সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান থাকবে তার প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে যাবে। তারপর শুধুমাত্র ঐ লোকগুলোই অবশিষ্ট থাকবে যাদের মধ্যে কোন পুণ্য ও কল্যাণ নিহিত থাকবে না। সুতরাং তারা তাদের বাপ দাদাদের ধর্মের দিকে ফিরে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)
আত-তাওবা 9:33
৩২-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, সর্ব শ্রেণীর কাফিরদের মনের ইচ্ছা এটাই যে, তারা আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিবে এবং তাঁর হিদায়াত ও সত্য দ্বীনকে দুনিয়ার বুক থেকে মুছে ফেলবে। তাহলে তাদের চিন্তা করে দেখা উচিত যে, যদি কেউ তার মুখের ফুৎকার দ্বারা সূর্যের বা চন্দ্রের রশ্মিকে নিভিয়ে দেয়ার ইচ্ছা করে তবে তা কখনো সম্ভব হবে কি? কখনই না। অনুরূপভাবে এ লোকগুলোও আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষে অপারগ হয়ে গেছে। এটা অবশ্যম্ভাবী বিষয় এবং আল্লাহর ফায়সালা যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যে সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করা হয়েছে তা সদা বিজয়ী থাকবেই। হে কাফির ও মুশরিকের দল! তোমরা আল্লাহর দ্বীনকে মিটিয়ে দিতে চাচ্ছ, কিন্তু আল্লাহ চাচ্ছেন তা উন্নত রাখতে। আর স্পষ্ট কথা যে, আল্লাহর ইচ্ছা তোমাদের ইচ্ছার উপর নিঃসন্দেহে বিজয়ী থাকবে। যদিও তোমাদের কাছে অপ্রীতিকর হয় তবুও কিন্তু হিদায়াতের সূর্য মধ্য গগণে পৌছে যাবেই। আরবী অভিধানে কোন জিনিস গোপনকারীকে কাফির বলা হয়। এ কারণেই রাত্রি সব জিনিসকে গোপন করে দেয় বলে ওকেই কাফির বলা হয়। কৃষককেও কাফির বলা হয়ে থাকে, কেননা সে শস্য-বীজকে মাটির মধ্যে গোপন করে দেয়। যেমন কুরআন কারীমে (আরবী) (৫৭:২০) বলা হয়েছে। ঐ আল্লাহ তাআলাই স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে হিদায়াত ও দ্বীনে হকসহ পাঠিয়েছেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্য সংবাদ, সঠিক ঈমান এবং উপকারী ইমই হচ্ছে হিদায়াত। আর উত্তম কার্যাবলী, যেগুলো দুনিয়া ও আখিরাতে ফায়দা দেয় সেটাই হচ্ছে দ্বীনে-হক। এটা দুনিয়ার সমুদয় দ্বীনের উপর বিজয়ীরূপে থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার জন্যে ভূ-পৃষ্ঠের পূর্ব ও পশ্চিম দিককে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমার উম্মতের রাজ্য এই সমুদয় স্থান পর্যন্ত পৌছে যাবে।” নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের হাতে পূর্ব ও পশ্চিম বিজিত হবে। তোমাদের নেতারা জাহান্নামী হবে, তারা ব্যতীত যারা পরহেজগার হবে এবং আমানতদাতার কাছে আমানত পৌছিয়ে দেবে।” তামীমুদদারী (রাঃ)। হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “অবশ্যই এই দ্বীন ঐ সব জায়গায় পৌছবে যেখানে রাত ও দিন পৌছে থাকে। এমন কোন কাঁচা ঘর ও পাকা ঘর বাকী থাকবে না যেখানে মহা মহিমান্বিত আল্লাহ ইসলামকে পৌঁছাবেন না। আল্লাহ তা'আলা সম্মানিতদেরকে সম্মান দেবেন এবং লাঞ্ছিতদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। যারা ইসলামের মর্যাদা দেয় তারা সম্মান পাবে এবং কাফিররা লাঞ্ছিত হবে।” তামীমুদদারী (রাঃ) বলেনঃ “এটা তো আমি স্বয়ং আমার বাড়ীতেই দেখতে পেয়েছি। যে মুসলিম হয়েছে সে কল্যাণ ও বরকত এবং সম্মান ও মর্যাদা লাভ করেছে, আর যে কাফির হয়েছে সে লাভ করেছে ঘৃণা ও অভিসম্পাত। তাদেরকে অপমানের সাথে জিযিয়া প্রদান করতে হয়েছে।”মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি- “ভূ-পৃষ্ঠে এমন কোন কাঁচা ও পাকা ঘর বাকী থাকবে না যেখানে আল্লাহ তা'আলা ইসলামের কালেমাকে প্রবিষ্ট করবেন না। তিনি মর্যাদাবানদেরকে মর্যাদা দিবেন এবং লাঞ্ছিতদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। যাদেরকে তিনি মর্যাদা দানের ইচ্ছা করবেন তাদেরকে তিনি ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য দান করবেন। আর যাদেরকে তিনি লাঞ্ছিত করতে চাইবেন তারা তা মানবে না, কিন্তু তাদেরকে ঐ মুসলিমদের অধীনস্থ হয়ে থাকতে হবে।” আদী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করে আমাকে বলেনঃ “তুমি ইসলাম কবুল কর, তাহলে নিরাপত্তা লাভ করবে।” আমি বললাম, আমি তো একটা দ্বীন মেনে চলছি। তিনি বললেনঃ “তোমার দ্বীন সম্পর্কে তোমার চেয়ে আমারই জ্ঞান বেশী আছে।” আমি বললাম, সত্যই কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “সম্পূর্ণরূপে সত্য। তুমি কি রাকূসিয়া’র অন্তর্ভুক্ত নও? তুমি কি তোমার কওমের নিকট থেকে ট্যাক্স আদায় কর না?” আমি জবাব দিলাম, হ্যাঁ, এ কথা সত্য বটে। তিনি বললেনঃ “তোমার ধর্মে এটা তোমার জন্যে হালাল নয়।” তার এ কথা শুনামাত্রই আমি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেলাম। অতঃপর তিনি আমাকে বললেনঃ “তোমাকে ইসলাম গ্রহণে কিসে বাধা দিচ্ছে তা আমি বেশ ভাল রূপেই জানি। দেখো, তুমি শুধু এ কারণেই বাধা প্রাপ্ত হচ্ছে যে, মুসলিমরা খুবই দুর্বল ও শক্তিহীন। সারা আরববাসী তাদেরকে ঘিরে রয়েছে। কিন্তু বলতো তুমি হীরা (রাজ্য) চেনো কি?” আমি উত্তরে বললাম, আমি হীরা (রাজ্য) কোন দিন দেখিনি বটে, তবে শুনেছি নিশ্চয়ই। তিনি তখন বললেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! আল্লাহ তা'আলা এই দ্বীনকে পূর্ণ করবেন। এমন কি একজন পর্দানশীল নারী উস্ত্রীর উপর আরোহণ করে হীরা হতে যাত্রা শুরু করবে। এবং কারো আশ্রয় ছাড়াই নিরাপদে মক্কা পৌছে যাবে ও বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করবে। আল্লাহর কসম! তোমরা কিসরার (পারস্য সম্রাট) কোষাগারগুলো জয় করে নিবে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, কিসরা ইবনে হরমূযের (কোষাগার)? তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ, হ্যাঁ, কিসরা ইবনে হরমূযের (কোষাগার)। তোমাদের কাছে ধন-সম্পদের এতো প্রাচুর্য হবে যে, তা গ্রহণ করার লোক পাওয়া যাবে না।” এ হাদীসটি বর্ণনা করার সময় আদী (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়ে গেছে। দেখো, আজ হীরা সাম্রাজ্য হতে উষ্ট্রারোহীরা নির্ভয়ে ও কারো আশ্রয় ছাড়াই নিরাপদে মক্কায় পৌছে বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করছে। সত্যবাদী ও সত্যায়িত নবী (সঃ)-এর দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণীও সত্যে পরিণত হয়েছে। কিসরার কোষাগার বিজিত হয়েছে। আমি স্বয়ং ঐ সেনাবাহিনীতে ছিলাম যারা ইরানের ইট দ্বারা ইট বাজিয়েছে, অট্টালিকাগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে এবং কিসরার গুপ্ত কোষাগার দখল করে নিয়েছে। আল্লাহর শপথ! আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, সত্যবাদী ও সত্যায়িত রাসূল (সঃ)-এর তৃতীয় ভবিষ্যদ্বাণীও সত্যে পরিণত হবে।” আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দিন ও রাত্রির গমনাগমন অব্যাহত থাকবে যে পর্যন্ত না পুনরায় ‘লাত’ ও ‘উযযা’র ইবাদত শুরু হবে। আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমার ধারণা তো এই রয়েছে যে, এটা পূর্ণ কথা।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা, এটা পূর্ণ হয়ে গেছে এবং যতদিন পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হবে তা পূর্ণই থাকবে। অতঃপর তিনি একটা পবিত্র বায়ু প্রেরণ করবেন, যার ফলে যে ব্যক্তির অন্তরে এক সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান থাকবে তার প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে যাবে। তারপর শুধুমাত্র ঐ লোকগুলোই অবশিষ্ট থাকবে যাদের মধ্যে কোন পুণ্য ও কল্যাণ নিহিত থাকবে না। সুতরাং তারা তাদের বাপ দাদাদের ধর্মের দিকে ফিরে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)
আত-তাওবা 9:34
৩৪-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ইয়াহূদী আলেমদেরকে আহবার এবং খ্রীষ্টান আবেদদেরকে রুহবান বলা হয় (আরবী) (৫:৬৩) এই আয়াতে ইয়াহুদী আলেমদেরকে ‘আহবার’ আর কুরআন কারীমের (৫:৮২) এই আয়াতে খ্রীষ্টানদের আবেদদেরকে ‘রুহবান’ এবং তাদের আলেমদেরকে ‘কিস্সীস' বলা হয়েছে। উপরোক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণকে পথভ্রষ্ট দরবেশ ও সুফীদের থেকে সতর্ক ও ভয় প্রদর্শন করা। সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) বলেন যে, আমাদের আলেমদের মধ্যে যারা ফাসাদ সৃষ্টি করে তাদের ইয়াহূদীদের সাথে কিছু না কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। আর আমাদের সুফী ও দরবেশদের মধ্যে যারা অনৈক্য সৃষ্টি করে তাদের খ্রীষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে। সহীহ হাদীসে রয়েছে- “নিশ্চিতরূপে তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের গতির উপর চলবে। তাদের সাথে তোমাদের চলনগতি এমন সাদৃশ্যযুক্ত হবে যে, মোটেই পার্থক্য থাকবে না।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের গতির উপর কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তাদেরই চলন গতির উপর।” অন্য বর্ণনায় আছে যে, জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “পারসিক ও রোমকদের গতির উপর কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এরা ছাড়া আর কে হবে?” সুতরাং তাদের কথা ও কাজের সাথে সাদৃশ্য হওয়া থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য কর্তব্য। তাদের এসবের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মধ্যে বড় বড় পদ লাভ করা ও প্রভাব বিস্তার করা। আর এর মাধ্যমে তারা চায় জনগণের মাল আত্মসাৎ করতে। অজ্ঞতার যুগে ইয়াহদী আলেমদের জনগণের মধ্যে খুবই মর্যাদা ছিল। তাদের জন্যে উপঢৌকন এবং ফকির দরবেশদের মাযারে বাতি জ্বালাবার উদ্দেশ্যে দান নির্দিষ্ট ছিল। এগুলো তাদেরকে চাইতে হতো না, বরং জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের কাছে ওগুলো পৌছিয়ে দিতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের পর এ লালসাই তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত রেখেছিল। কিন্তু সত্যের মুকাবিলা করার কারণে ওদিক থেকেও তারা আনকোরা থেকে যায় এবং আখিরাতের সুখ থেকেও বঞ্চিত রয়ে যায়। তারা আল্লাহর গজবে পতিত হয়েছে। দুনিয়ায় তারা লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত হয়েছে এবং পরকালেও তারা কঠিন শাস্তি ভোগ করবে। হারাম ভক্ষণকারী এই দলটি নিজেরা হক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্যদেরকেও ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতো। সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করে দিয়ে জনগণকেও তারা সত্যের পথ থেকে বিরত রাখতো। মূর্খদের মধ্যে বসে চড়া গলায় তারা বলতোঃ “জনগণকে আমরা সত্যের পথে আহ্বান করছি।” অথচ এটা স্পষ্ট প্রতারণা মাত্র। তারা তো লোকদেরকে জাহান্নামের দিকে ডাকতে রয়েছে। কিয়ামতের দিন এদেরকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেয়া হবে যে তাদের কোন বন্ধু ও সহায়ক থাকবে না।আলেম ও সুফী-দরবেশ অর্থাৎ বক্তা ও আবেদদের বর্ণনা দেয়ার পর এখন আমীর, সম্পদশালী এবং নেতাদের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যেমন এই দুই শ্রেণীর লোকদের মধ্যে হীন প্রবৃত্তির লোক রয়েছে, দ্রুপ এই তৃতীয় শ্রেণীর লোকদের মধ্যেও হীন ও সংকীর্ণমনা লোক রয়েছে। সাধারণতঃ মানুষের মধ্যে এই তিন শ্রেণীর লোকদের বিশেষ প্রভাব পড়ে থাকে। বহু সংখ্যক লোক তাদের অনুসারী হয়। সুতরাং যখন এই তিন শ্রেণীর লোকের অবস্থা বিগড়ে যাবে তখন সাধারণ মানুষের অবস্থাও বিগড়ে যাবে। যেমন ইবনুল মুবারক (রঃ) বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দ্বীনকে বিগড়িয়ে থাকে বাদশাহগণ এবং নিকৃষ্ট ও হীন প্রকৃতির আলেম, সুফী ও দরবেশগণ।”শরীয়তের পরিভাষায় (আরবী) ঐ মালকে বলা হয় যে মালের যাকাত আদায় করা হয় না। ইবনে উমার (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। তিনি বলেন যে, যে মালের যাকাত দেয়া হয় তা যদি সপ্তম যমীনের নীচেও থাকে তবুও তা (আরবী) নয়। আর যে মালের যাকাত দেয়া হয় না সেই মাল যমীনের উপর প্রকাশ্যভাবে ছড়িয়ে থাকলেও তা (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত হবে। (অনুরূপ বর্ণনা ইবনে আব্বাস (রাঃ), জাবির (রাঃ), আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রমুখ হতেও বর্ণিত হয়েছে) উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-ও এ কথাই বলেন এবং তিনি বলেন যে, যে মালের যাকাত আদায় করা হয় না ঐ মাল দ্বারা মালদারকে দাগ দেয়া হবে। তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এ হুকুম যাকাত ফরয হওয়ার পূর্বে ছিল। যাকাতের হুকুম অবতীর্ণ করে আল্লাহ তা'আলা ওটাকে মাল পবিত্রকারী বানিয়ে দিয়েছেন। ন্যায়পরায়ণ খলীফা উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) এবং ইরাক ইবনে মালিক (রঃ)-ও এ কথাই বলেছেন, (আরবী) (৯:১০৩) আল্লাহ পাকের এ উক্তি দ্বারা এটাকে মানসূখ বা রহিত করে দেয়া হয়েছে। আবূ উমামা (রাঃ) বলেন যে, তরবারীর যেওরও (আরবী) -এর অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আমি তোমাদেরকে ঐ কথাই শুনাচ্ছি যা আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর মুখে শুনেছি।” আলী (রাঃ) বলেন যে, চার হাজার এবং তদপেক্ষা কম হচ্ছে নাফকাহ', আর এর অধিক হলেই ওটা হবে ‘কান। কিন্তু এ উক্তিটি গারীব বা দুর্বল। মালের আধিক্যের নিন্দা এবং স্বল্পতার প্রশংসায় বহু হাদীস এসেছে। নমুনা হিসেবে আমরাও এখানে ওগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি হাদীস নকল করছি। মুসনাদে আবদির রাযযাকে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী)-এ আয়াতকে কেন্দ্র করে নবী (সঃ) বলেনঃ “সোনা ও চাদির (মালিকের) জন্যে ধ্বংস (অনিবার্য)।” এ কথা তিনি তিনবার বলেন। এটা সাহাবীদের কাছে খুবই কঠিন ঠেকে। তাই তারা প্রশ্ন করেনঃ “তাহলে আমরা কোন মাল রাখবো?” তখন উমার (রাঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আচ্ছা, আমি এটা তোমাদের জন্যে জেনে নেবো।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার এ কথাটি আপনার সাহাবীদের কাছে খুবই কঠিন বোধ হয়েছে এবং তারা কি মাল রাখবেন তা জানতে চেয়েছেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “(তারা রাখবে), যিকিরকারী জিহ্বা, শাকরকারী অন্তর এবং দ্বীনের কাজে সাহায্যকারিণী স্ত্রী।” মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, স্বর্ণ ও রৌপ্যের নিন্দায় যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং সাহাবীগণ এ নিয়ে পরস্পর আলোচনা করেন তখন উমার (রাঃ) বলেনঃ “আচ্ছা, এটা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছি।” অতঃপর তিনি স্বীয় সওয়ারীর গতি দ্রুত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, সোনা ও চদির নিন্দায় এ আয়াত অবতীর্ণ হলে সাহাবীগণ বলেনঃ “তাহলে আমরা আমাদের সন্তানদের জন্যে ছেড়ে যাবো কি?” এতে রয়েছে যে, উমার (রাঃ)-এর সাথে সাওবান (রাঃ) ছিলেন। উমার (রাঃ) নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর নবী (সঃ) ! এ আয়াতটি আপনার সাহাবীদের কাছে কঠিন বোধ হয়েছে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের বাকী মালকে পবিত্র করার জন্যেই আল্লাহ তা'আলা যাকাত ফরয করেছেন এবং তোমাদের (মৃত্যুর পরে যে মাল থাকবে তার উপর তিনি মীরাস নির্ধারণ করে দিয়েছেন।” এ কথা শুনে উমার (রাঃ) খুশীতে তাকবীর পাঠ করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি কি তোমাকে মানুষের সর্বোত্তম সঞ্চিত ধনের সংবাদ দেবো না? তা হচ্ছে সতী-সাধ্বী নারী। যখন তার স্বামী তার দিকে প্রেমের দৃষ্টিতে তাকায় আর তখন সে তাকে (স্বামীকে) সন্তুষ্ট করে, যখন তাকে কোন হুকুম করে তখন সে তৎক্ষণাৎ তা পালন করে এবং যখন সে (স্বামী) অনুপস্থিত থাকে তখন সে তার (সবকিছু) হিফাযত করে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম হাকিম (রঃ) তার মুসতাদরিক গ্রন্থে এটা রিওয়ায়াত করেছেন এবং তিনি বলেছেন যে, এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর সহীহ্, তারা দুজন এটা তাখরীজ করেননি)মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, হাসান ইবনে আতিয়া (রাঃ) বলেন, শাদ্দাদ ইবনে আউস (রাঃ) এক সফরে ছিলেন। এক মনজিলে অবতরণ করে তিনি স্বীয় গোলামকে বলেনঃ “ছুরি নিয়ে এসো, আমরা খেলা করবো।” এ কথা আমার কাছে খারাপ বোধ হলো। অতঃপর তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, ইসলাম গ্রহণের পর এমন অসতর্ক কথা আমি আর কখনো বলিনি। আপনি এটা ভুলে যান। আমি একটি হাদীস বর্ণনা করছি তা স্মরণ রাখুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন জনগণ সোনা-রূপা জমা করতে শুরু করে দেবে তখন তোমরা নিম্নের কালেমাগুলো খুব বেশী বেশী করে পাঠ করবেঃ(আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট কাজে অটলতা ও সৎ কাজের উপর দৃঢ়তা প্রার্থনা করছি। আর প্রার্থনা করছি আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ও আপনার উত্তম ইবাদতের। আপনার নিকট প্রার্থনা করছি সুধু অন্তরের ও সত্যবাদী জিহ্বার। আর আমি আপনার কাছে ঐ মঙ্গল যাঞা করছি যা আপনি মঙ্গলরূপে জানেন এবং ঐ দোষ ও অন্যায় হতে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি যা আপনি দোষ বলে জানেন। আর যে পাপগুলোকে আপনি জানেন সেগুলো থেকে আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, নিশ্চয়ই আপনি অদৃশ্য বিষয়গুলো ভালরূপে অবগত আছেন।”আয়াতে বলা হয়েছে যে, যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে যেন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দেয়া হয়। কিয়ামতের দিন ঐ মালকেই আগুনের মত অত্যধিক গরম করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের কপালে, পার্শ্বদেশে এবং পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে। অতঃপর তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে- আজকে তোমাদের সঞ্চিত মালের স্বাদ গ্রহণ কর। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- “(ফেরেশতাদেরকে বলা হবে) তোমরা তার (জাহান্নামীর) মাথায় গরম পানি ঢেলে দাও এবং (তাকে বল) শাস্তির স্বাদ গ্রহণ কর। তুমি নিজেকে বড়ই মর্যাদাবান ও বুযুর্গ মনে করতে!” এর দ্বারা এটা প্রমাণিত হলো যে, যে ব্যক্তি যে জিনিসকে ভালবেসে আল্লাহর আনুগত্যের উপর ওকে প্রাধান্য দেবে, ওর দ্বারাই তাকে শাস্তি দেয়া হবে। ঐ মালদারেরা মালের মহব্বতে আল্লাহর ফরমান ভুলে গিয়েছিল। তাই আজ ঐ মাল দ্বারাই তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। যেমন আবু লাহাব খোলাখুলিভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে শত্রুতা করতো এবং তার স্ত্রী তার সাহায্য করতো। কিয়ামতের দিন আগুনকে আরো প্রজ্বলিত করার জন্যে সে তার গলায় রশি লটকিয়ে দিয়ে কাঠ এনে এনে ঐ আগুনকে প্রজ্বলিত করবে এবং ঐ আগুনে তারা জ্বলতে থাকবে। এই মাল, যা এখানে সবচেয়ে বেশী প্রিয়, এটাই কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশী ক্ষতিকারক প্রমাণিত হবে। ওটাকেই গরম করে ওর দ্বারা দাগ দেয়া হবে ।আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, এরূপ মালদারদের দেহ এতো লম্বা-চওড়া করে দেয়া হবে যে, এক একটি দীনার ও দিরহাম ওর উপর এসে যাবে, অতঃপর সমস্ত মাল আগুনের মত করে দিয়ে পৃথক পৃথকভাবে সারা দেহে ছড়িয়ে দেয়া হবে। এটা নয় যে, একটার পর একটা দাগ পড়বে, বরং একই সাথে সমস্ত দাগ পড়বে। মার’ রূপেই এ রিওয়ায়াত এসেছে বটে, কিন্তু এর সনদ সঠিক নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।তাউস (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন সঞ্চিত মাল একণ্টা বিরাট অজগর হয়ে মালদারের পিছনে ধাবিত হবে আর সে ওর থেকে পালাতে থাকবে। ঐ সময় সাপটি তার পিছনে ছুটবে ও বলতে থাকবেঃ “আমি তোমার সঞ্চিত ধন।” অতঃপর সাপটি তার যে অঙ্গকেই পাবে ওটাকেই কামড়িয়ে ধরবে।মুসনাদে আহমাদে সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেন, যে ব্যক্তি তার পিছনে সঞ্চিত ধন ছেড়ে যাবে, কিয়ামতের দিন তার ঐ ধন বিষাক্ত অজগর সাপের রূপ ধারণ করবে, যার চক্ষুদ্বয়ের উপর দু'টি বিন্দু থাকবে। সাপটি মালদারের পিছনে ছুটবে। লোকটি তখন পালাতে পালাতে বলবেঃ “তোমার অমঙ্গল হাক! তুমি কে?” সাপটি উত্তরে বলবেঃ “আমি তোমার জমাকৃত মাল, যা তুমি তোমার পিছনে ছেড়ে এসেছিলে।” শেষ পর্যন্ত সাপটি তাকে ধরে ফেলবে এবং তার হাত চিবাতে থাকবে, এরপর তার সারা দেহকেও চিবাবে।সহীহ মুসলিমে আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার মালের যাকাত আদায় করবে না, কিয়ামতের দিন তার মালকে আগুনের তক্তা বানানো হবে এবং তা দ্বারা তার পার্শ্বদেশে, কপালে ও পিঠে দাগ দেয়া হবে। পঞ্চাশ হাজার বছর ধরে লোকদের ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত তার এ অবস্থা থাকবে। অতঃপর তাকে তার মনযিলের পথ দেখানো হবে, হয় জাহান্নামের পথ না হয় জান্নাতের পথ।” তাতে সম্পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ) এই আয়াতেরই তাফসীরে বলেন যে, যায়েদ ইবনে অহাব (রাঃ) রাব্যয় আবু যার (রাঃ) -এর সাথে মিলিত হন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এখানে আপনি কিরূপে এলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি সিরিয়ায় অবস্থান করছিলাম। সেখানে আমি .. (আরবী)-- আয়াতটি পাঠ করি । তখন মুআবিয়া (রাঃ) বলেনঃ “এ আয়াত আমাদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়নি, বরং আহলে কিতাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।” আমি তখন বলি, আমাদের এবং তাদের সকলের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। এভাবে আমার ও তার মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। তিনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে উসমান (রাঃ)-এর দরবারে চিঠি লিখেন। সুতরাং খলীফার পক্ষ থেকে আমার নামে ফরমান আসে যে, আমি যেন মদীনায় চলে আসি। মদীনায় পৌঁছে আমি দেখি যে, জনগণ চতুর্দিক থেকে আমাকে ঘিরে নিয়েছে। তারা যেন ইতিপূর্বে আমাকে দেখেনি। যা হাক, আমি মদীনাতেই অবস্থান করতে থাকি। কিন্তু সব সময় জনগণের যাতায়াতের কারণে আমি খুবই অস্বস্তি বোধ করি। শেষে আমি উসমান (রাঃ)-এর কাছে এই অভিযোগে করি। ফলে তিনি আমাকে বলেনঃ “মদীনার নিকটবর্তী কোন বিজন বনে আপনি চলে যান।” আমি তার এ হুকুমও পালন করি। কিন্তু তাকে আমি এ কথা বলে দেই যে, আল্লাহর শপথ! আমি যা বলতাম তা কখনো ছাড়তে পারি না। আবু যার (রাঃ)-এর ধারণা ছিল এই যে, ছেলেমেয়েদের ভরণ পোষণের পর যা বেঁচে যাবে তা জমা রাখা সাধারণভাবে হারাম। তিনি এটাই ফতওয়া দিতেন এবং জনগণের মধ্যে এ কথাই ছড়াতেন। জনগণকে তিনি এর উপরই উদ্বদ্ধ ও উত্তেজিত করতেন এবং তাদের এরই হুকুম দিতেন। আর যারা এর বিরুদ্ধাচরণ করতো তাদের প্রতি বড়ই কঠোরতা অবলম্বন করতেন। মুআবিয়া (রাঃ) তাকে এ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন যাতে লোকদের মধ্যে সাধারণভাবে এই ক্ষতিকর কথা ছড়িয়ে না পড়ে। তিনি যখন কোনক্রমেই মানলেন না তখন বাধ্য হয়ে তিনি খলীফা উসমান (রাঃ)-এর কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। আমীরুল মুমিনীন উসমান (রাঃ) তখন তাকে রাব্য নামক স্থানে একাকী অবস্থানের নির্দেশ দেন। উসমান (রাঃ)-এর খিলাফতকালেই সেখানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।মুআবিয়া (রাঃ) একবার পরীক্ষামূলকভাবে আবু যার (রাঃ)-এর কাছে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা প্রেরণ করেন। সন্ধ্যার পূর্বেই তিনি সমস্তই এদিক ওদিক আল্লাহর পথে খরচ করে দেন। সকালে যে লোকটি তার কাছে স্বর্ণমুদ্রাগুলো পৌছিয়ে দিয়েছিলেন, সন্ধ্যাতেই তিনি তার কাছে গমন করেন এবং বলেনঃ “আমার ভুল হয়ে গেছে। আমীরে মুআবিয়া (রাঃ) স্বর্ণমুদ্রাগুলো অন্য লোককে দেয়ার জন্যে আমাকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আমি ভুলক্রমে আপনাকে দিয়ে ফেলেছি। সুতরাং ওগুলো ফিরিয়ে দিন।” তখন আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আপনার জন্যে আমার দুঃখ হচ্ছে! এখন তো আমার কাছে ওগুলোর এক পাইও অবশিষ্ট নেই! আচ্ছা, যখন আমার মাল আসবে তখন আমি আপনাকে আপনার স্বর্ণমুদ্রাগুলো ফিরিয়ে দেবো।” সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত আহলে কিবলার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) বলেনঃ “একবার আমি মদীনা শরীফে গিয়ে দেখি যে, কুরায়েশদের একটি দল মজলিস করে বসে রয়েছে। আমিও ঐ মজলিসে গিয়ে বসে পড়ি। এমন সময় ময়লা ও মোটাসোটা কাপড় পরিহিত একটি লোক অত্যন্ত জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় এসে দাড়িয়ে যান এবং বলেনঃ “টাকা-পয়সা জমাকারীরা যেন সতর্ক হয় যায় যে, কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুনের অঙ্গার তাদের বক্ষস্থলে রাখা হবে যা কাঁধের হাড় পার হয়ে যাবে। তারপর পিছন দিক থেকে সামনের দিকে ছিদ্র করতে করতে এবং জ্বালাতে জ্বালাতে বের হয়ে যাবে।' একথা শুনে সমস্ত লোক মাথা নীচু করে বসে থাকলো, কেউ কোন কথা বললো না। ঐ লোকটি কথাগুলো বলে ফিরে চলে গেলেন এবং একটি স্তম্ভের সাথে পিঠ লাগিয়ে বসে পড়লেন। আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, এ লোকগুলোর কাছে আপনার কথাগুলো খারাপ লেগেছে। তিনি বললেনঃ এরা কিছুই জানে না।'একটি সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবু যার (রাঃ)-কে বলেনঃ “আমার কাছে যদি উহুদ পাহাড়ের সমানও সোনা থাকে তবুও আমি এটা পছন্দ করি না যে, তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর ওগুলোর কিছু আমার কাছে অবশিষ্ট থেকে যাবে। হ্যাঁ, তবে যদি ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে দু' একটা দীনার রেখে দেই সেটা অন্য কথা।” খুব সম্ভব এই হাদীসই আবু যার (রাঃ)-কে উপরোক্ত উক্তি করতে উত্তেজিত করেছিলে। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।আবদুল্লাহ ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি আবূ যার (রাঃ) -এর সাথে ছিলেন। আবু যার (রাঃ) তাঁর অংশ প্রাপ্ত হন। তাঁর দাসী তখনই প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয় করতে শুরু করে। ওগুলো ক্রয়ের পর সাতটি (মুদ্রা) বেঁচে যায়। তখন তিনি দাসীকে হুকুম করেন যে, সে যেন ওগুলোর বিনিময়ে তাম্র মুদ্রা নিয়ে নেয়। আবদুল্লাহ ইবনে সামিত (রাঃ) তখন তাঁকে বলেনঃ “ওগুলো আপনার কাছে রেখে দিন, তাহলে প্রয়োজনের সময় কাজে লাগবে কিংবা কোন অতিথি আসলে তার সেবা করা যাবে।” একথা শুনে আবু যার (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “না, আমার দোস্ত মুহাম্মাদ (সঃ) আমার নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, যে সোনা ও রূপা জমা করে রাখা হবে তা জমাকারীর জন্যে আগুনের অঙ্গার হবে যে পর্যন্ত না সে তা আল্লাহর পথে খরচ করে দেয়। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আবু সাঈদ (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “দরিদ্র হয়ে আল্লাহর সাথে মিলিত হও, ধনী হয়ে নয়।” তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কিরূপে হবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “ভিক্ষুককে ফিরিয়ে দিয়ো না এবং যা পাবে তা গোপন করো না।” তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমার দ্বারা কিরূপে হতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দেনঃ “এটাই হতে হবে, নচেৎ জাহান্নামে যেতে হবে।” এর সনদ দুর্বল।মুসনাদে আহমাদে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আহলে সুফফার মধ্যকার একটি লোক মারা যান এবং তিনি দু’টি দীনার বা দিরহাম ছেড়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এ দুটি হলো জাহান্নামের দুটি দাগ। তোমরা তোমাদের সঙ্গীর জানাযার নামায পড়ে নাও।" অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, আহলে সুফফার একটি লোক মারা গেলে তাঁর লুঙ্গির গাঁট হতে একটি দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) বেরিয়ে পড়ে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এটা আগুনের একটি দাগ।" অতঃপর আর একটি লোক মারা যান এবং তাঁর নিকট থেকে দু'টি দীনার বের হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এ দু'টি হলো আগুনের দু'টি দাগ।”ইবনে আবি হাতিম (রঃ) সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি লাল ও সাদা অর্থাৎ সোনা ও রূপা ছেড়ে মারা যাবে, ওগুলোর এক একটি কীরাতের (এক কীরাত হলো এক আউন্সের চব্বিশ ভাগের এক ভাগ পরিমাণ ওজন) বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা আগুনের এক একটি তক্তা তৈরী করবেন এবং তা দ্বারা তার পা থেকে তুথনি পর্যন্ত (সারা দেহে) দাগ দেয়া হবে।”হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি দীনারের উপর দীনার এবং দিরহামের উপর দিরহাম মিলিয়ে জমা করে রাখবে (ও তা ছেড়ে মারা যাবে), তার (দেহের) চামড়া প্রশস্ত করে কপালে, পার্শ্বদেশে এবং পৃষ্ঠদেশে ওগুলো দ্বারা দাগ দেয়া হবে এবং তাকে বলা হবেঃ “এটা হচ্ছে ঐ জিনিস যা তুমি নিজের জীবনের জন্যে জমা করে রেখেছিলে। এখন তার স্বাদ গ্রহণ কর।” (এর বর্ণনাকারী সায়েফ চরম মিথ্যাবাদী ও পরিত্যক্ত)
আত-তাওবা 9:35
৩৪-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ইয়াহূদী আলেমদেরকে আহবার এবং খ্রীষ্টান আবেদদেরকে রুহবান বলা হয় (আরবী) (৫:৬৩) এই আয়াতে ইয়াহুদী আলেমদেরকে ‘আহবার’ আর কুরআন কারীমের (৫:৮২) এই আয়াতে খ্রীষ্টানদের আবেদদেরকে ‘রুহবান’ এবং তাদের আলেমদেরকে ‘কিস্সীস' বলা হয়েছে। উপরোক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণকে পথভ্রষ্ট দরবেশ ও সুফীদের থেকে সতর্ক ও ভয় প্রদর্শন করা। সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) বলেন যে, আমাদের আলেমদের মধ্যে যারা ফাসাদ সৃষ্টি করে তাদের ইয়াহূদীদের সাথে কিছু না কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। আর আমাদের সুফী ও দরবেশদের মধ্যে যারা অনৈক্য সৃষ্টি করে তাদের খ্রীষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে। সহীহ হাদীসে রয়েছে- “নিশ্চিতরূপে তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের গতির উপর চলবে। তাদের সাথে তোমাদের চলনগতি এমন সাদৃশ্যযুক্ত হবে যে, মোটেই পার্থক্য থাকবে না।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের গতির উপর কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তাদেরই চলন গতির উপর।” অন্য বর্ণনায় আছে যে, জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “পারসিক ও রোমকদের গতির উপর কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এরা ছাড়া আর কে হবে?” সুতরাং তাদের কথা ও কাজের সাথে সাদৃশ্য হওয়া থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য কর্তব্য। তাদের এসবের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মধ্যে বড় বড় পদ লাভ করা ও প্রভাব বিস্তার করা। আর এর মাধ্যমে তারা চায় জনগণের মাল আত্মসাৎ করতে। অজ্ঞতার যুগে ইয়াহদী আলেমদের জনগণের মধ্যে খুবই মর্যাদা ছিল। তাদের জন্যে উপঢৌকন এবং ফকির দরবেশদের মাযারে বাতি জ্বালাবার উদ্দেশ্যে দান নির্দিষ্ট ছিল। এগুলো তাদেরকে চাইতে হতো না, বরং জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের কাছে ওগুলো পৌছিয়ে দিতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের পর এ লালসাই তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত রেখেছিল। কিন্তু সত্যের মুকাবিলা করার কারণে ওদিক থেকেও তারা আনকোরা থেকে যায় এবং আখিরাতের সুখ থেকেও বঞ্চিত রয়ে যায়। তারা আল্লাহর গজবে পতিত হয়েছে। দুনিয়ায় তারা লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত হয়েছে এবং পরকালেও তারা কঠিন শাস্তি ভোগ করবে। হারাম ভক্ষণকারী এই দলটি নিজেরা হক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্যদেরকেও ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতো। সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করে দিয়ে জনগণকেও তারা সত্যের পথ থেকে বিরত রাখতো। মূর্খদের মধ্যে বসে চড়া গলায় তারা বলতোঃ “জনগণকে আমরা সত্যের পথে আহ্বান করছি।” অথচ এটা স্পষ্ট প্রতারণা মাত্র। তারা তো লোকদেরকে জাহান্নামের দিকে ডাকতে রয়েছে। কিয়ামতের দিন এদেরকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেয়া হবে যে তাদের কোন বন্ধু ও সহায়ক থাকবে না।আলেম ও সুফী-দরবেশ অর্থাৎ বক্তা ও আবেদদের বর্ণনা দেয়ার পর এখন আমীর, সম্পদশালী এবং নেতাদের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যেমন এই দুই শ্রেণীর লোকদের মধ্যে হীন প্রবৃত্তির লোক রয়েছে, দ্রুপ এই তৃতীয় শ্রেণীর লোকদের মধ্যেও হীন ও সংকীর্ণমনা লোক রয়েছে। সাধারণতঃ মানুষের মধ্যে এই তিন শ্রেণীর লোকদের বিশেষ প্রভাব পড়ে থাকে। বহু সংখ্যক লোক তাদের অনুসারী হয়। সুতরাং যখন এই তিন শ্রেণীর লোকের অবস্থা বিগড়ে যাবে তখন সাধারণ মানুষের অবস্থাও বিগড়ে যাবে। যেমন ইবনুল মুবারক (রঃ) বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দ্বীনকে বিগড়িয়ে থাকে বাদশাহগণ এবং নিকৃষ্ট ও হীন প্রকৃতির আলেম, সুফী ও দরবেশগণ।”শরীয়তের পরিভাষায় (আরবী) ঐ মালকে বলা হয় যে মালের যাকাত আদায় করা হয় না। ইবনে উমার (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। তিনি বলেন যে, যে মালের যাকাত দেয়া হয় তা যদি সপ্তম যমীনের নীচেও থাকে তবুও তা (আরবী) নয়। আর যে মালের যাকাত দেয়া হয় না সেই মাল যমীনের উপর প্রকাশ্যভাবে ছড়িয়ে থাকলেও তা (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত হবে। (অনুরূপ বর্ণনা ইবনে আব্বাস (রাঃ), জাবির (রাঃ), আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রমুখ হতেও বর্ণিত হয়েছে) উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-ও এ কথাই বলেন এবং তিনি বলেন যে, যে মালের যাকাত আদায় করা হয় না ঐ মাল দ্বারা মালদারকে দাগ দেয়া হবে। তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এ হুকুম যাকাত ফরয হওয়ার পূর্বে ছিল। যাকাতের হুকুম অবতীর্ণ করে আল্লাহ তা'আলা ওটাকে মাল পবিত্রকারী বানিয়ে দিয়েছেন। ন্যায়পরায়ণ খলীফা উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) এবং ইরাক ইবনে মালিক (রঃ)-ও এ কথাই বলেছেন, (আরবী) (৯:১০৩) আল্লাহ পাকের এ উক্তি দ্বারা এটাকে মানসূখ বা রহিত করে দেয়া হয়েছে। আবূ উমামা (রাঃ) বলেন যে, তরবারীর যেওরও (আরবী) -এর অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আমি তোমাদেরকে ঐ কথাই শুনাচ্ছি যা আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর মুখে শুনেছি।” আলী (রাঃ) বলেন যে, চার হাজার এবং তদপেক্ষা কম হচ্ছে নাফকাহ', আর এর অধিক হলেই ওটা হবে ‘কান। কিন্তু এ উক্তিটি গারীব বা দুর্বল। মালের আধিক্যের নিন্দা এবং স্বল্পতার প্রশংসায় বহু হাদীস এসেছে। নমুনা হিসেবে আমরাও এখানে ওগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি হাদীস নকল করছি। মুসনাদে আবদির রাযযাকে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী)-এ আয়াতকে কেন্দ্র করে নবী (সঃ) বলেনঃ “সোনা ও চাদির (মালিকের) জন্যে ধ্বংস (অনিবার্য)।” এ কথা তিনি তিনবার বলেন। এটা সাহাবীদের কাছে খুবই কঠিন ঠেকে। তাই তারা প্রশ্ন করেনঃ “তাহলে আমরা কোন মাল রাখবো?” তখন উমার (রাঃ) তাদেরকে বলেনঃ “আচ্ছা, আমি এটা তোমাদের জন্যে জেনে নেবো।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার এ কথাটি আপনার সাহাবীদের কাছে খুবই কঠিন বোধ হয়েছে এবং তারা কি মাল রাখবেন তা জানতে চেয়েছেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “(তারা রাখবে), যিকিরকারী জিহ্বা, শাকরকারী অন্তর এবং দ্বীনের কাজে সাহায্যকারিণী স্ত্রী।” মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, স্বর্ণ ও রৌপ্যের নিন্দায় যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং সাহাবীগণ এ নিয়ে পরস্পর আলোচনা করেন তখন উমার (রাঃ) বলেনঃ “আচ্ছা, এটা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছি।” অতঃপর তিনি স্বীয় সওয়ারীর গতি দ্রুত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, সোনা ও চদির নিন্দায় এ আয়াত অবতীর্ণ হলে সাহাবীগণ বলেনঃ “তাহলে আমরা আমাদের সন্তানদের জন্যে ছেড়ে যাবো কি?” এতে রয়েছে যে, উমার (রাঃ)-এর সাথে সাওবান (রাঃ) ছিলেন। উমার (রাঃ) নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর নবী (সঃ) ! এ আয়াতটি আপনার সাহাবীদের কাছে কঠিন বোধ হয়েছে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের বাকী মালকে পবিত্র করার জন্যেই আল্লাহ তা'আলা যাকাত ফরয করেছেন এবং তোমাদের (মৃত্যুর পরে যে মাল থাকবে তার উপর তিনি মীরাস নির্ধারণ করে দিয়েছেন।” এ কথা শুনে উমার (রাঃ) খুশীতে তাকবীর পাঠ করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি কি তোমাকে মানুষের সর্বোত্তম সঞ্চিত ধনের সংবাদ দেবো না? তা হচ্ছে সতী-সাধ্বী নারী। যখন তার স্বামী তার দিকে প্রেমের দৃষ্টিতে তাকায় আর তখন সে তাকে (স্বামীকে) সন্তুষ্ট করে, যখন তাকে কোন হুকুম করে তখন সে তৎক্ষণাৎ তা পালন করে এবং যখন সে (স্বামী) অনুপস্থিত থাকে তখন সে তার (সবকিছু) হিফাযত করে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম হাকিম (রঃ) তার মুসতাদরিক গ্রন্থে এটা রিওয়ায়াত করেছেন এবং তিনি বলেছেন যে, এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর সহীহ্, তারা দুজন এটা তাখরীজ করেননি)মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, হাসান ইবনে আতিয়া (রাঃ) বলেন, শাদ্দাদ ইবনে আউস (রাঃ) এক সফরে ছিলেন। এক মনজিলে অবতরণ করে তিনি স্বীয় গোলামকে বলেনঃ “ছুরি নিয়ে এসো, আমরা খেলা করবো।” এ কথা আমার কাছে খারাপ বোধ হলো। অতঃপর তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, ইসলাম গ্রহণের পর এমন অসতর্ক কথা আমি আর কখনো বলিনি। আপনি এটা ভুলে যান। আমি একটি হাদীস বর্ণনা করছি তা স্মরণ রাখুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন জনগণ সোনা-রূপা জমা করতে শুরু করে দেবে তখন তোমরা নিম্নের কালেমাগুলো খুব বেশী বেশী করে পাঠ করবেঃ(আরবী) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট কাজে অটলতা ও সৎ কাজের উপর দৃঢ়তা প্রার্থনা করছি। আর প্রার্থনা করছি আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ও আপনার উত্তম ইবাদতের। আপনার নিকট প্রার্থনা করছি সুধু অন্তরের ও সত্যবাদী জিহ্বার। আর আমি আপনার কাছে ঐ মঙ্গল যাঞা করছি যা আপনি মঙ্গলরূপে জানেন এবং ঐ দোষ ও অন্যায় হতে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি যা আপনি দোষ বলে জানেন। আর যে পাপগুলোকে আপনি জানেন সেগুলো থেকে আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, নিশ্চয়ই আপনি অদৃশ্য বিষয়গুলো ভালরূপে অবগত আছেন।”আয়াতে বলা হয়েছে যে, যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে যেন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দেয়া হয়। কিয়ামতের দিন ঐ মালকেই আগুনের মত অত্যধিক গরম করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের কপালে, পার্শ্বদেশে এবং পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে। অতঃপর তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে- আজকে তোমাদের সঞ্চিত মালের স্বাদ গ্রহণ কর। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে- “(ফেরেশতাদেরকে বলা হবে) তোমরা তার (জাহান্নামীর) মাথায় গরম পানি ঢেলে দাও এবং (তাকে বল) শাস্তির স্বাদ গ্রহণ কর। তুমি নিজেকে বড়ই মর্যাদাবান ও বুযুর্গ মনে করতে!” এর দ্বারা এটা প্রমাণিত হলো যে, যে ব্যক্তি যে জিনিসকে ভালবেসে আল্লাহর আনুগত্যের উপর ওকে প্রাধান্য দেবে, ওর দ্বারাই তাকে শাস্তি দেয়া হবে। ঐ মালদারেরা মালের মহব্বতে আল্লাহর ফরমান ভুলে গিয়েছিল। তাই আজ ঐ মাল দ্বারাই তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। যেমন আবু লাহাব খোলাখুলিভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে শত্রুতা করতো এবং তার স্ত্রী তার সাহায্য করতো। কিয়ামতের দিন আগুনকে আরো প্রজ্বলিত করার জন্যে সে তার গলায় রশি লটকিয়ে দিয়ে কাঠ এনে এনে ঐ আগুনকে প্রজ্বলিত করবে এবং ঐ আগুনে তারা জ্বলতে থাকবে। এই মাল, যা এখানে সবচেয়ে বেশী প্রিয়, এটাই কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশী ক্ষতিকারক প্রমাণিত হবে। ওটাকেই গরম করে ওর দ্বারা দাগ দেয়া হবে ।আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, এরূপ মালদারদের দেহ এতো লম্বা-চওড়া করে দেয়া হবে যে, এক একটি দীনার ও দিরহাম ওর উপর এসে যাবে, অতঃপর সমস্ত মাল আগুনের মত করে দিয়ে পৃথক পৃথকভাবে সারা দেহে ছড়িয়ে দেয়া হবে। এটা নয় যে, একটার পর একটা দাগ পড়বে, বরং একই সাথে সমস্ত দাগ পড়বে। মার’ রূপেই এ রিওয়ায়াত এসেছে বটে, কিন্তু এর সনদ সঠিক নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।তাউস (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন সঞ্চিত মাল একণ্টা বিরাট অজগর হয়ে মালদারের পিছনে ধাবিত হবে আর সে ওর থেকে পালাতে থাকবে। ঐ সময় সাপটি তার পিছনে ছুটবে ও বলতে থাকবেঃ “আমি তোমার সঞ্চিত ধন।” অতঃপর সাপটি তার যে অঙ্গকেই পাবে ওটাকেই কামড়িয়ে ধরবে।মুসনাদে আহমাদে সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেন, যে ব্যক্তি তার পিছনে সঞ্চিত ধন ছেড়ে যাবে, কিয়ামতের দিন তার ঐ ধন বিষাক্ত অজগর সাপের রূপ ধারণ করবে, যার চক্ষুদ্বয়ের উপর দু'টি বিন্দু থাকবে। সাপটি মালদারের পিছনে ছুটবে। লোকটি তখন পালাতে পালাতে বলবেঃ “তোমার অমঙ্গল হাক! তুমি কে?” সাপটি উত্তরে বলবেঃ “আমি তোমার জমাকৃত মাল, যা তুমি তোমার পিছনে ছেড়ে এসেছিলে।” শেষ পর্যন্ত সাপটি তাকে ধরে ফেলবে এবং তার হাত চিবাতে থাকবে, এরপর তার সারা দেহকেও চিবাবে।সহীহ মুসলিমে আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার মালের যাকাত আদায় করবে না, কিয়ামতের দিন তার মালকে আগুনের তক্তা বানানো হবে এবং তা দ্বারা তার পার্শ্বদেশে, কপালে ও পিঠে দাগ দেয়া হবে। পঞ্চাশ হাজার বছর ধরে লোকদের ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত তার এ অবস্থা থাকবে। অতঃপর তাকে তার মনযিলের পথ দেখানো হবে, হয় জাহান্নামের পথ না হয় জান্নাতের পথ।” তাতে সম্পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ) এই আয়াতেরই তাফসীরে বলেন যে, যায়েদ ইবনে অহাব (রাঃ) রাব্যয় আবু যার (রাঃ) -এর সাথে মিলিত হন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এখানে আপনি কিরূপে এলেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি সিরিয়ায় অবস্থান করছিলাম। সেখানে আমি .. (আরবী)-- আয়াতটি পাঠ করি । তখন মুআবিয়া (রাঃ) বলেনঃ “এ আয়াত আমাদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়নি, বরং আহলে কিতাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।” আমি তখন বলি, আমাদের এবং তাদের সকলের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। এভাবে আমার ও তার মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। তিনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে উসমান (রাঃ)-এর দরবারে চিঠি লিখেন। সুতরাং খলীফার পক্ষ থেকে আমার নামে ফরমান আসে যে, আমি যেন মদীনায় চলে আসি। মদীনায় পৌঁছে আমি দেখি যে, জনগণ চতুর্দিক থেকে আমাকে ঘিরে নিয়েছে। তারা যেন ইতিপূর্বে আমাকে দেখেনি। যা হাক, আমি মদীনাতেই অবস্থান করতে থাকি। কিন্তু সব সময় জনগণের যাতায়াতের কারণে আমি খুবই অস্বস্তি বোধ করি। শেষে আমি উসমান (রাঃ)-এর কাছে এই অভিযোগে করি। ফলে তিনি আমাকে বলেনঃ “মদীনার নিকটবর্তী কোন বিজন বনে আপনি চলে যান।” আমি তার এ হুকুমও পালন করি। কিন্তু তাকে আমি এ কথা বলে দেই যে, আল্লাহর শপথ! আমি যা বলতাম তা কখনো ছাড়তে পারি না। আবু যার (রাঃ)-এর ধারণা ছিল এই যে, ছেলেমেয়েদের ভরণ পোষণের পর যা বেঁচে যাবে তা জমা রাখা সাধারণভাবে হারাম। তিনি এটাই ফতওয়া দিতেন এবং জনগণের মধ্যে এ কথাই ছড়াতেন। জনগণকে তিনি এর উপরই উদ্বদ্ধ ও উত্তেজিত করতেন এবং তাদের এরই হুকুম দিতেন। আর যারা এর বিরুদ্ধাচরণ করতো তাদের প্রতি বড়ই কঠোরতা অবলম্বন করতেন। মুআবিয়া (রাঃ) তাকে এ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন যাতে লোকদের মধ্যে সাধারণভাবে এই ক্ষতিকর কথা ছড়িয়ে না পড়ে। তিনি যখন কোনক্রমেই মানলেন না তখন বাধ্য হয়ে তিনি খলীফা উসমান (রাঃ)-এর কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। আমীরুল মুমিনীন উসমান (রাঃ) তখন তাকে রাব্য নামক স্থানে একাকী অবস্থানের নির্দেশ দেন। উসমান (রাঃ)-এর খিলাফতকালেই সেখানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।মুআবিয়া (রাঃ) একবার পরীক্ষামূলকভাবে আবু যার (রাঃ)-এর কাছে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা প্রেরণ করেন। সন্ধ্যার পূর্বেই তিনি সমস্তই এদিক ওদিক আল্লাহর পথে খরচ করে দেন। সকালে যে লোকটি তার কাছে স্বর্ণমুদ্রাগুলো পৌছিয়ে দিয়েছিলেন, সন্ধ্যাতেই তিনি তার কাছে গমন করেন এবং বলেনঃ “আমার ভুল হয়ে গেছে। আমীরে মুআবিয়া (রাঃ) স্বর্ণমুদ্রাগুলো অন্য লোককে দেয়ার জন্যে আমাকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আমি ভুলক্রমে আপনাকে দিয়ে ফেলেছি। সুতরাং ওগুলো ফিরিয়ে দিন।” তখন আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “আপনার জন্যে আমার দুঃখ হচ্ছে! এখন তো আমার কাছে ওগুলোর এক পাইও অবশিষ্ট নেই! আচ্ছা, যখন আমার মাল আসবে তখন আমি আপনাকে আপনার স্বর্ণমুদ্রাগুলো ফিরিয়ে দেবো।” সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত আহলে কিবলার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) বলেনঃ “একবার আমি মদীনা শরীফে গিয়ে দেখি যে, কুরায়েশদের একটি দল মজলিস করে বসে রয়েছে। আমিও ঐ মজলিসে গিয়ে বসে পড়ি। এমন সময় ময়লা ও মোটাসোটা কাপড় পরিহিত একটি লোক অত্যন্ত জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় এসে দাড়িয়ে যান এবং বলেনঃ “টাকা-পয়সা জমাকারীরা যেন সতর্ক হয় যায় যে, কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুনের অঙ্গার তাদের বক্ষস্থলে রাখা হবে যা কাঁধের হাড় পার হয়ে যাবে। তারপর পিছন দিক থেকে সামনের দিকে ছিদ্র করতে করতে এবং জ্বালাতে জ্বালাতে বের হয়ে যাবে।' একথা শুনে সমস্ত লোক মাথা নীচু করে বসে থাকলো, কেউ কোন কথা বললো না। ঐ লোকটি কথাগুলো বলে ফিরে চলে গেলেন এবং একটি স্তম্ভের সাথে পিঠ লাগিয়ে বসে পড়লেন। আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, এ লোকগুলোর কাছে আপনার কথাগুলো খারাপ লেগেছে। তিনি বললেনঃ এরা কিছুই জানে না।'একটি সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবু যার (রাঃ)-কে বলেনঃ “আমার কাছে যদি উহুদ পাহাড়ের সমানও সোনা থাকে তবুও আমি এটা পছন্দ করি না যে, তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর ওগুলোর কিছু আমার কাছে অবশিষ্ট থেকে যাবে। হ্যাঁ, তবে যদি ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে দু' একটা দীনার রেখে দেই সেটা অন্য কথা।” খুব সম্ভব এই হাদীসই আবু যার (রাঃ)-কে উপরোক্ত উক্তি করতে উত্তেজিত করেছিলে। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।আবদুল্লাহ ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি আবূ যার (রাঃ) -এর সাথে ছিলেন। আবু যার (রাঃ) তাঁর অংশ প্রাপ্ত হন। তাঁর দাসী তখনই প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয় করতে শুরু করে। ওগুলো ক্রয়ের পর সাতটি (মুদ্রা) বেঁচে যায়। তখন তিনি দাসীকে হুকুম করেন যে, সে যেন ওগুলোর বিনিময়ে তাম্র মুদ্রা নিয়ে নেয়। আবদুল্লাহ ইবনে সামিত (রাঃ) তখন তাঁকে বলেনঃ “ওগুলো আপনার কাছে রেখে দিন, তাহলে প্রয়োজনের সময় কাজে লাগবে কিংবা কোন অতিথি আসলে তার সেবা করা যাবে।” একথা শুনে আবু যার (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “না, আমার দোস্ত মুহাম্মাদ (সঃ) আমার নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, যে সোনা ও রূপা জমা করে রাখা হবে তা জমাকারীর জন্যে আগুনের অঙ্গার হবে যে পর্যন্ত না সে তা আল্লাহর পথে খরচ করে দেয়। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আবু সাঈদ (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “দরিদ্র হয়ে আল্লাহর সাথে মিলিত হও, ধনী হয়ে নয়।” তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কিরূপে হবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “ভিক্ষুককে ফিরিয়ে দিয়ো না এবং যা পাবে তা গোপন করো না।” তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমার দ্বারা কিরূপে হতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দেনঃ “এটাই হতে হবে, নচেৎ জাহান্নামে যেতে হবে।” এর সনদ দুর্বল।মুসনাদে আহমাদে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আহলে সুফফার মধ্যকার একটি লোক মারা যান এবং তিনি দু’টি দীনার বা দিরহাম ছেড়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এ দুটি হলো জাহান্নামের দুটি দাগ। তোমরা তোমাদের সঙ্গীর জানাযার নামায পড়ে নাও।" অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, আহলে সুফফার একটি লোক মারা গেলে তাঁর লুঙ্গির গাঁট হতে একটি দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) বেরিয়ে পড়ে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এটা আগুনের একটি দাগ।" অতঃপর আর একটি লোক মারা যান এবং তাঁর নিকট থেকে দু'টি দীনার বের হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এ দু'টি হলো আগুনের দু'টি দাগ।”ইবনে আবি হাতিম (রঃ) সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি লাল ও সাদা অর্থাৎ সোনা ও রূপা ছেড়ে মারা যাবে, ওগুলোর এক একটি কীরাতের (এক কীরাত হলো এক আউন্সের চব্বিশ ভাগের এক ভাগ পরিমাণ ওজন) বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা আগুনের এক একটি তক্তা তৈরী করবেন এবং তা দ্বারা তার পা থেকে তুথনি পর্যন্ত (সারা দেহে) দাগ দেয়া হবে।”হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি দীনারের উপর দীনার এবং দিরহামের উপর দিরহাম মিলিয়ে জমা করে রাখবে (ও তা ছেড়ে মারা যাবে), তার (দেহের) চামড়া প্রশস্ত করে কপালে, পার্শ্বদেশে এবং পৃষ্ঠদেশে ওগুলো দ্বারা দাগ দেয়া হবে এবং তাকে বলা হবেঃ “এটা হচ্ছে ঐ জিনিস যা তুমি নিজের জীবনের জন্যে জমা করে রেখেছিলে। এখন তার স্বাদ গ্রহণ কর।” (এর বর্ণনাকারী সায়েফ চরম মিথ্যাবাদী ও পরিত্যক্ত)
আত-তাওবা 9:36
আবু বাকরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) তাঁর (বিদায়) হজ্বের ভাষণে বলেনঃ “যামানা ঘুরে ঘুরে নিজের মূল অবস্থায় এসে গেছে। বছরের বারোটি মাস হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে চারটি হচ্ছে সম্মানিত ও মর্যাদা সম্পন্ন মাস। তিনটি ক্রমিকভাবে রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে যুলক্বাদ, যুলহাজ্বা ও মুহাররম। আর চতুর্থটি হচ্ছে মুযার গোত্রের (কাছে অতি সম্মানিত) রজব মাস, যা জামাদিউল উখরা ও শা'বানের মধ্যভাগে রয়েছে। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে তাঁর তাফসীরে পূর্ণতার সাথে তাখরীজ করেছেন) অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আজ কোন্ দিন?” (বর্ণনাকারী বলেন) আমরা উত্তরে বললামঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।" রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। আমরা মনে করলাম যে, তিনি হয়তো এর অন্য কোন নাম বলবেন। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আজ কি ইয়াওমুন নাহর' বা কুরবানীর ঈদের দিন নয়?" আমরা উত্তর দিলামঃ হ্যা। পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “এটা কোন মাস?” আমরা জবাব দিলাম, এ সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলেরই (সঃ) ভাল জ্ঞান আছে। এবারও তিনি চুপ থাকলেন। সুতরাং আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি এ মাসের অন্য কোন নাম রাখবেন। তারপর তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “এটা কি যুলহাজ্বাহ্ মাস নয়?” আমরা জবাব দিলামঃ হ্যা। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “এটা কোন শহর?” আমরা উত্তরে বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সঃ) এটা ভাল জানেন। তিনি এবারও নীরব হয়ে যান এবং আমরা এবারও মনে করলাম যে, তিনি হয় তো এর অন্য কোন নাম রাখবেন। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “এটা কি বালাদা (মক্কা) নয়?” আমরা জবাবে বললামঃ হ্যা। এরপর তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে, তোমাদের রক্ত, তোমাদের মাল, তোমাদের মান-মর্যাদা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে এরূপই মর্যাদাসম্পন্ন যেমন মর্যাদাসম্পন্ন তোমাদের এ দিনটি, এ মাসটি এবং এ শহরটি । সত্বরই তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ করবে। তখন তিনি তোমাদেরকে তোমাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। সাবধান! আমার পরে যেন তোমরা পথভ্রষ্ট না হও এবং যেন একে অপরকে হত্যা না কর! আমি কি (শরীয়তের সমস্ত কথা তোমাদের কাছে) পৌঁছিয়ে দিয়েছি? জেনে নাও, তোমাদের যারা এখানে বিদ্যমান রয়েছে তারা যেন অনুপস্থিত লোকদের কাছে এসব কথা পৌছিয়ে দেয়। কেননা, হতে পারে যে, যারা উপস্থিত নেই তাদের কেউ কেউ শ্রোতাদের অপেক্ষা বেশী স্মরণশক্তির অধিকারী।”অন্য রিওয়ায়াতে আছে যে, এটা হচ্ছে 'মিনা' নামক স্থানে ‘আইয়ামুত তাশরীক” (যিলহজ মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখকে আইয়ামুত তাশরীক বলা হয়) এর মধ্যভাগে বিদায় হজ্বের ভাষণের আলোচনা। আবূ হামযা রুকাশী (রঃ) তাঁর চাচা হতে বর্ণনা করেন যিনি একজন সাহাবী ছিলেন। তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ খুত্বার সময় আমি তাঁর উষ্ট্রীর লাগাম ধরে ছিলাম এবং মানুষের ভীড় ঠেকিয়ে রাখছিলাম।” তাঁর “যামানা ঘুরে ফিরে নিজের আসল অবস্থায় ফিরে এসেছে এ উক্তির ভাবার্থ এই যে, অজ্ঞতার যুগে মুশরিকরা মাসগুলোর ব্যাপারে যে কম বেশী করতো এবং এগিয়ে দিতে বা পিছিয়ে দিতো, সেগুলো ঘুরে ফিরে এখন সঠিক অবস্থায় এসে গেছে। যে মাস এখন আছে তা প্রকৃত অবস্থাতেই আছে। যেমন মক্কা বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “এই শহর (মক্কা) সৃষ্টির শুরু থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন ও সম্মানিত রয়েছে। আর কিয়ামত পর্যন্ত সম্মানিতই থাকবে।” সুতরাং আরবদের মধ্যে যে এই প্রথা চালু হয়েছিল যে, তারা তাদের অধিকাংশ হজ্ব যিলহজ্ব মাসে করতো না, ঐ বছর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হজ্বের ব্যাপারে এটা ঘটেনি, বরং হজ্ব সঠিক মাসেই হয়েছিল। কেউ কেউ এর সাথে একথাও বলেছেন যে, আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর হজ্ব যুলকা'দা মাসে হয়েছিল। কিন্তু এ উক্তির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। আমরা এটা ... (আরবী) আয়াতের তাফসীরে প্রমাণসহ বর্ণনা করবো। পূর্ববর্তী কোন কোন গুরুজনের এ উক্তিও রয়েছে যে, ঐ বছর ঘটনাক্রমে ইয়াহূদী, খ্রীষ্টান ও মুসলমান সবারই হজ্ব একই দিনে হয়েছিল। অর্থাৎ ঈদুল আযহার দিনে। কিন্তু এ উক্তিটি আরো বেশী গারীব বা দুর্বল।‘ফসল' বা পরিচ্ছেদ: শায়েখ ইলমুদ্দীন সাখাভী (রঃ) তাঁর (আরবী) নামক গ্রন্থে লিখেছে- মুহাররম মাসকে ওর সম্মানের কারণে মুহাররম বলা হয়ে থাকে। কিন্তু আমার মতে তো এই নামের কারণ হচ্ছে ওর সম্মানের প্রতি গুরুত্ত্বারোপকরণ। কেননা, অজ্ঞতা যুগের আরবরা ওকে বদলিয়ে দিতো। কখনো হালাল করতো, আবার কখনো হারাম করতো। এর বহুবচন (আরবী) এবং (আরবী) এসে থাকে। ‘সফর’ এর নামকরণের কারণ এই যে, এই মাসে সাধারণতঃ তাদের ঘর খালি বা শূন্য থাকতো। কেননা, এই মাসটি তারা যুদ্ধ বিগ্রহে ও ভ্রমণে কাটি দিতো। ঘর শূন্য হয়ে গেলে আরবরা (আরবী) বলে থাকে। (আরবী) হলো এর বহুবচন। যেমন (আরবী)- এর বহুবচন (আরবী) এসে থাকে।‘রাবীউল আওয়াল’ এর নামকরণের কারণ এই যে, এই মাসে আরবরা। বাড়ীতেই অবস্থান করে থাকে। অবস্থান করাকে (আরবী) বলা হয়। এর বহুবচন (আরবী) এসে থাকে। যেমন (আরবী)-এর বহুবচন (আরবী) এসে থাকে। এর বহুবচন (আরবী) ও হয়, যেমন (আরবী) -এর বহুবচন হয়। ‘রাবীউল আখির’ এর নামকরণের কারণও এটাই। এটা যেন বাড়ীতে অবস্থানের দ্বিতীয় মাস।‘জামাদিউল উলা’ এর নামকরণের কারণ এই যে, এই মাসে পানি জমে যেতো। তাদের হিসাবে মাস আবর্তিত হতো না। অর্থাৎ ঠিক প্রতি মৌসুমেই প্রতিটি মাস আসতো। কিন্তু এ কথাটি যুক্তিসঙ্গত নয়। কেননা, ঐ মাসগুলোর হিসাব যখন চন্দ্রের উপর নির্ভরশীল তখন এটা পরিষ্কার কথা যে, প্রতি বছর প্রতি মাসে মৌসুমী অবস্থা একরূপ থাকবে না। হ্যা, তবে খুব সম্ভব, যে বছর এই মাসের নাম রাখা হয় ঐ বছর ঐ মাসটি খুব কনকনে শীতে এসেছিল এবং পানি জমে গিয়েছিল। যেমন একজন কবিও বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “জামাদিউর কঠিন অন্ধকার রাত, যার অন্ধকারে গোলাম তাঁবুর খুঁটি পর্যন্ত দেখতে পায় না। ঐ রাতে কুকুর একবার ছাড়া ঘেউ ঘেউ করতে পারে না, এমন কি শেষ পর্যন্ত সে (ককনে শীতের কারণে) তার লেজকে নাকের উপর গুটিয়ে নেয়। এর বহুবচন (আরবী) আসে। যেমন (আরবী) ও (আরবী)-এর ব্যবহার। এটা পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ উভয় রূপেই ব্যবহৃত হয়।‘জামাদিউল উখরা এর নামকরণের কারণও এটাই। এটা যেন পানি জমে যাওয়ার দ্বিতীয় মাস।‘রজব' শব্দটি (আরবী) শব্দ থেকে গৃহীত। (আরবী) বলা হয় (আরবী) বা সম্মান। এই মাসটি মর্যাদাপূর্ণ মাস বলে একে রজব বলা হয়। এর বহুবচন (আরবী) এবং (আরবী) আসে। ‘শা'বান' এর নামকরণের কারণ এই যে, এই মাসে আরবরা লুটপাট করার জল বিচ্ছিন্নভাবে এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়তো। (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে পৃথক পৃথক হওয়া। এজন্যেই এই মাসের এই নাম রাখা হয়েছে। এর বহুবচন (আরবী) ও (আরবী) এসে থাকে।“রমাদান' এর নামকরণের কারণ এই যে, এই মাসে অত্যাধিক গরমের কারণে উটের পা পুড়ে যায়। (আরবী) ঐ সময় বলা হয় যখন উন্ত্রীর বাচ্চা খুবই পিপাসার্ত থাকে। এর বহুবচন (আরবী) এবং (আরবী) এসে থাকে। কারো কারো মতে এটা অলাহ তা'আলার নামসমূহের একটি নাম। কিন্তু এটা ভুল ও অযৌক্তিক কথা মাত্র। আমি বলি যে, এই ব্যাপারে একটি হাদীসও এসেছে। কিন্তু ওটা দুর্বল। (আরবী) এ আমি এটা বর্ণনা করেছি।‘শাওয়াল' (আরবী) থেকে গৃহীত। এই মাসটি হচ্ছে উটের উত্তেজনার মাস। এই মাসে উট লেজ পিঠে করে দৌড়াতে শুরু করতো। এজন্যেই এই মাসের এই নাম হয়ে যায়। এর বহুবচন। (আরবী) এবং (আরবী) এসে থাকে।‘যুলক্বাদা' নাম হওয়ার কারণ এই যে, এই মাসে আরবের লোকেরা বাড়ীতে বসে থাকতো। তারা এই মাসে যুদ্ধের জন্যেও বের হতো না এবং সফরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করতো না। এর বহুবচন (আরবী) এসে থাকে ।‘যুলহাজ্বা' মাসে হজ্বব্রত পালিত হতো বলেই এর নাম যুলহাজ্বা' হয়ে যায়। এর বহুবচন (আরবী) এসে থাকে। এতো হলো এই মাসগুলোর নামকরণের কারণ। এখন সপ্তাহের সাত দিনের নাম এবং এ নামগুলোর বহুবচন বর্ণনা করা হচ্ছে- রবিবারকে (আরবী) বলে। এর বহুবচন (আরবী) এবং (আরবী) এসে থাকে । সোমবারকে (আরবী) বলা হয়। এর বহুবচন (আরবী) আসে।মঙ্গলবারকে (আরবী) বলে। এটা পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ উভয়রূপেই কথিত হয়। এর বহুবচন (আরবী) এবং (আরবী) আসে। বুধবারকে (আরবী) বলা হয়। এর বহুবচন (আরবী) এবং (আরবী) এসে থাকে। বৃহস্পতিবারকে (আরবী) বলে। এর বহুবচন (আরবী) ও (আরবী) এসে থাকে।শুক্রবারকে (আরবী) বলে। এর (আরবী) বহুবচন (আরবী) এবং (আরবী) আসে। শনিবারকে (আরবী) বলা হয়। (আরবী) এর অর্থ হচ্ছে শেষ হওয়া। সপ্তাহের গণনা এখানেই শেষ হয় বলে একে (আরবী) বলা হয়। প্রাচীন আরবে সপ্তাহের দিনগুলোর নাম ছিল নিম্নরূপঃ আওয়াল, আহ্ওয়ান, জুবার, দুবার, মুনাস, উরূবা এবং শিয়ার। প্রাচীন খাঁটি আরব কবিদের কবিতার মধ্যেও সপ্তাহের এ নামগুলোর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ এই বারো মাসের মধ্যে চারটি মাস (বিশেষ) মর্যাদাপূর্ণ। অজ্ঞতার যুগের আরবরাও এ চার মাসকে সম্মানিত মাসরূপে স্বীকার করতো। কিন্তু বাসল’ নামক একটি দল তাদের গোঁড়ামীর কারণে আটটি মাসকে সম্মানিত মাস মনে করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভাষণে রজব মাসকে মুযার' গোত্রের দিকে সম্পর্কযুক্ত করার কারণ এই যে, যে মাসকে তারা রজব মাস হিসেবে গণনা করতো, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর নিকটেও ওটাই রজব মাস ছিল, যা জামাদিউল উখরা এবং শাবানের মাঝে রয়েছে। কিন্তু রাবীআ গোত্রের নিকট রজব মাস শাবান ও শাওয়াল মাসের মধ্যবর্তী মাস অর্থাৎ রমযানের নাম ছিল। তাই রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্পষ্টভাবে বলে দিলেন যে, সম্মানিত মাস হচ্ছে মুযার গোত্রের রজব মাস, রাবীআ' গোত্রের রজব মাস নয়। সম্মানিত এই চারটি মাসের মধ্যে তিনটি ক্রমিকরূপে হওয়ার যৌক্তিকতা এই যে, হাজীরা যুলক্বাদা মাসে বাড়ী হতে বের হন। ঐ সময় যুদ্ধ-বিগ্রহ, মারপিট, ঝগড়া-বিবাদ এবং খুনাখুনি বন্ধ করে লোকেরা বাড়ীতে বসে থাকে। অতঃপর যুলহাজ্ব মাসে তারা হজ্বের আহকাম নিরাপত্তার সাথে এবং উত্তমরূপে আদায় করেন। তারপর মর্যাদাপূর্ণ মুহাররম মাসে তারা নিরাপদে বাড়ীর দিকে প্রত্যাবর্তন করে থাকেন। বছরের মধ্যভাগে রজব মাসকে সম্মানিত বানানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে যেন যিয়ারতকারিগণ বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফের আকাঙ্ক্ষা উমরার আকারে পূর্ণ করতে পারে। যারা বহু দূরের লোক তারাও যেন সারা মাস ধরে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, এটাই হচ্ছে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম। সুতরাং তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী তোমরা এই মাসগুলোর যথাযথ মর্যাদা দান কর। বিশেষভাবে এই মাসগুলোতে পাপকার্য থেকে দূরে থাকো। কেননা, এতে পাপের দুস্ক্রিয়া আরো বৃদ্ধি পায়। যেমন হারাম শরীফে কৃত পাপ অন্যান্য স্থানে কৃত পাপ অপেক্ষা বেশী হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি ওর মধ্যে (হারাম শরীফের মধ্যে) অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি করে ধর্মদ্রোহীতার কাজে লিপ্ত হবে, আমি তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো।” অনুরূপভাবে এই মাগুলোর মধ্যে পাপকার্য করলে আন্যান্য মাসে কৃত পাপকার্যের চেয়ে গুনাহ্ বেশী হয়। এ কারণেই ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং আলেমদের একটি বৃহৎ দলের মতে এই মাসগুলোর মধ্যে কেউ কাউকেও হত্যা করলে ওর রক্তপণও কঠিন হবে। এ রকমই হারাম শরীফের ভিতরের হত্যা ও নিকটতম আত্মীয়ের হত্যা। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দ দ্বারা বছরের সমস্ত মাসকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ পাকের এ উক্তির মর্মার্থ হচ্ছে- তোমরা সমস্ত মাসে পাপকার্য থেকে বিরত থাকবে, বিশেষ করে এই চার মাসে। কেননা, এগুলো বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন মাস। এ মাসগুলোতে পাপ শাস্তির দিক দিয়ে এবং পুণ্য বা সাওয়াব প্রাপ্তির দিক দিয়ে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। কাতাদা (রাঃ) বলেন যে, এই সম্মানিত মাসগুলোতে পাপের শাস্তির বোঝা বেড়ে যায়, যদিও অত্যাচার সর্বাবস্থাতেই খারাপ। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁর যে কাজকে ইচ্ছা বড় করে থাকেন। তিনি বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সৃষ্টির মধ্য থেকেও বাছাই ও মনোনীত করেছেন। তিনি ফেরেশতাদের মধ্য থেকে দূত মনোনীত করেছেন, মানব জাতির মধ্য থেকে রাসূলদেরকে মনোনীত করেছেন, কালামের মধ্য থেকে তাঁর যিকরকে পছন্দ করেছেন, যমীনের মধ্যে মসজিদসমূহকে পছন্দ করেছেন, মাসগুলোর মধ্যে রমযান ও হারাম মাসগুলোকে মনোনীত করেছেন, দিনগুলোর মধ্যে শুক্রবারকে পছন্দ করেছেন এবং রাতগুলোর মধ্যে লায়লাতুল কদরকে মনোনীত করেছেন। এভাবে মহান আল্লাহ যেটাকে ইচ্ছা করেছেন একটির উপর অন্যটিকে প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। সুতরাং যেগুলোকে আল্লাহ তা'আলা মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন সেগুলোর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখা অপরিহার্য কর্তব্য। বুদ্ধিমান ও বিবেচক লোকদের মতে কোন বিষয়ের ঐ পরিমাণ সম্মান করা উচিত যে পরিমাণ সম্মান আল্লাহ পাক ওতে দান করেছেন। ওগুলোর সম্মান না করা হারাম। এ মাসগুলোতে যা করা হারাম তা হালাল করা চলবে না এবং যা হালাল তা হারাম করা উচিত নয়, যেমন মুশরিকরা করতো। এটা তাদের কুফরীর মধ্যে বৃদ্ধিরই শামিল।আল্লাহ তা'আলা বলেন, তোমরা এই মুশরিকদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। মর্যাদা সম্পন্ন এই চার মাসের মধ্যে যুদ্ধের সূচনা করা হারাম হওয়ার হুকুম মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে কি এখনও এ হুকুম বিদ্যমান আছে এ ব্যাপারে আলেমদের দু'টি উক্তি রয়েছে। প্রথম উক্তি এই যে, এ হুকুম রহিত হয়ে গেছে। এটাই প্রসিদ্ধতর উক্তি। এ আয়াতের শব্দগুলোর প্রতি চিন্তাযুক্ত দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, প্রথমে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-এ মাসগুলোতে যুলুম করো না। অতঃপর হুকুম করা হচ্ছে-তোমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কর। বাহ্যিক শব্দ দ্বারা তো জানা যায় যে, এ হুকুম আম বা সাধারণ। এতে হারাম মাসগুলোও এসে গেল। যদি এ মাসগুলো স্বতন্ত্র হতো তবে এগুলো অতিক্রান্ত হওয়ার শর্ত অবশ্যই আরোপিত হতো। আল্লাহর রাসূল (সঃ) যুলক্বাদা মাসে তায়েফ অবরোধ করেছিলেন যা সম্মানিত মাসগুলোর মধ্যে একটি মাস। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শাওয়াল মাসে হাওয়াযেন গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে বের হন। তারা পরাজিত হয়। তাদের মধ্যে যারা প্রাণে বেঁচে যায় তারা পালিয়ে তায়েফে আশ্রয় গ্রহণ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখানে গমন করেন এবং চল্লিশ দিন পর্যন্ত তায়েফ অবরোধ করে রাখেন। তারপর ওটা জয় না করেই তিনি সেখান থেকে ফিরে আসেন। তাহলে জানা গেল যে, তিনি হারাম মাসে তায়েফ অবরোধ করেছিলেন।দ্বিতীয় উক্তি এই যে, হারাম মাসগুলোতে যুদ্ধের সূচনা করা হারাম এবং এই মাসগুলোর হুরমতের হুকুম মানসূখ হয়নি। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর প্রতীকসমূহের অসম্মান করো না এবং সম্মানিত মাসসমূহেরও না।" অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “সম্মানিত মাস সম্মানিত মাসের বিনিময়ে, আর এসব সম্মান তো পারস্পরিক বিনিময়ের বস্তু, সুতরাং যে ব্যক্তি তোমাদের উপর উৎপীড়ন করে, তোমরাও তাদের উপর উৎপীড়ন করবে, যেরূপ সে তোমাদের প্রতি উৎপীড়ন করেছে।” আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “অতএব যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতীত হয়ে যায় তখন সেই মুশরিকদেরকে যেখানে পাও বধ কর।”এ কথা পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, এই নির্ধারিত চারটি মাস প্রতি বছরেই থাকবে, দু'টি উক্তির মধ্যে একটি উক্তি অনুযায়ী শুধুমাত্র সফরের মাসগুলোতে নয়।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা সমস্ত মুসলিম ঐ মুশরিকদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যেমন তারা তোমাদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।” হতে পারে যে, এটা পূর্ব হুকুম থেকে একটা স্বতন্ত্র হুকুম নয়। আবার এও হতে পারে যে, এটা একটা পৃথক ও নতুন হুকুম। আল্লাহ তা'আলা হয়তো মুসলিমদেরকে উৎসাহিত ও জিহাদের প্রতি উত্তেজিত করার উদ্দেশ্যে বলছেন-তারা যেমন তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে সবাই চতুর্দিক থেকে সমবেতভাবে তোমাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ছে, তদ্রুপ তোমরাও সমস্ত মুমিনকে সঙ্গে নিয়ে তাদের মুকাবিলা কর। এটাও সম্ভব যে, এই বাক্যে মুসলিমদেরকে নিষিদ্ধ মাসগুলোতেও যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে, যখন আক্রমণের সূচনা তাদের পক্ষ থেকে হবে। যেমন (আরবী) (২:১৯৪) এ আয়াতে রয়েছে এবং আরো রয়েছে। (আরবী) এই আয়াতে। অর্থাৎ “আর তোমরা তাদের (মুশরিকদের) সাথে মসজিদুল হারামের নিকট যুদ্ধ করো না, যে পর্যন্ত না তারা তথায় তোমাদের সাথে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়। যদি তারাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে অগ্রসর হয় তবে তোমরাও তাদেরকে হত্যা কর।" (২:১৯১) সম্মানিত মাসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তায়েফ অবরোধ করার জবাব এটাই যে, এটা ছিল হাওয়াযেন গোত্র ও তাদের মিত্র বানু সাকীফ গোত্রের যৌথ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যুদ্ধের সূচনা তাদের পক্ষ থেকেই হয়েছিল। তারা এদিক ওদিক থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরোধী লোকদেরকে একত্রিত করে যুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছিল। সুতরাং নবী (সঃ) তাদের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। তাঁর এই অগ্রযাত্রাও আবার সম্মানিত মাসে ছিল না। এখানে পরাজিত হয়ে ঐ লোকগুলো পালিয়ে গিয়ে তায়েফে আশ্রয় নিয়েছিল এবং সেখানে দুর্গ স্থাপন করেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কেন্দ্রকে খালি করার উদ্দেশ্যে আরো সামনে অগ্রসর হন। তারা মুসলমানদের ক্ষতি সাধন করে এবং মুসলমানদের একটি দলকে হত্যা করে ফেলে। এদিকে মিনজীক প্রভৃতি গোত্রসমূহের মাধ্যমে অবরোধ অব্যাহত থাকে। প্রায় চল্লিশ দিন পর্যন্ত তাদেরকে ঘিরে রাখা হয়। মোটকথা, যুদ্ধের সূচনা সম্মানিত মাসে হয়নি। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় সম্মানিত মাসও চলে আসে। কিছুদিন অতিবাহিত হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অবরোধ উঠিয়ে নেন। সুতরাং যুদ্ধ জারি রাখা এক কথা এবং যুদ্ধের সূচনা হওয়া আর এক কথা। এর বহু নবীর রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এ সম্পর্কে যেসব হাদীস এসেছে সেগুলো আমি “সীরাত"-এর মধ্যে বর্ণনা করেছি। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাপেক্ষা বেশী জ্ঞানের অধিকারী।
আত-তাওবা 9:37
এখানে আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের কুফরী বৃদ্ধির বর্ণনা দিচ্ছেন যে, কিভাবে তারা নিজেদের বিকৃত মত এবং নাপাক প্রবৃত্তিকে আল্লাহর শরীয়তের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে তার দ্বীনের আহকামকে পরিবর্তন করে দিচ্ছে। তারা হারামকে হালাল এবং হালালকে হারাম বানিয়ে নিতো। তিনটি মাসের মর্যাদা তারা ঠিক রাখে বটে, কিন্তু চতুর্থ মাসের সম্মান এভাবে পরিবর্তন করে যে, মুহাররম মাসকে সফর মাসের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয় এবং ওকে মর্যাদা দেয় না, যাতে বছরের চার মাসের হুরমাতও পূর্ণ হয়ে যায়, আর ওদিকে প্রকৃত হুরমাতপূর্ণ মুহাররম মাসে লুটপাট, হত্যা এবং লুণ্ঠনও চলতে থাকে। তারা যে। হারাম মাসকে হালাল করে দিতো এবং হালাল মাসকে হারাম করতো তা তারা ফখর করে তাদের কবিতাতে প্রকাশ করতো। জানাদা ইবনে আমর ইবনে উমাইয়া কিনানী নামক তাদের এক নেতা প্রতি বছর হজু করতে আসতো। তার কুনইয়াত বা পিতৃপদবীযুক্ত নাম ছিল আবু সুমামা। সে সকলের সামনে ঘোষণা করে- “জেনে রেখো যে, কেউ আবু সুমামার সামনে কোন শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না বা কেউ তার উক্তির প্রতি কোনরূপ দোষারোপ করতে পারে না। জেনে রেখো যে, প্রথম বছরের সফর মাস হালাল এবং দ্বিতীয় বছরের সফর মাস হারাম।” সুতরাং এক বছর মুহাররম মাসের সম্মান করতো না এবং পর বছর সম্মান করতো। এ আয়াতে তার কুফরীর এই বৃদ্ধির প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ লোকটি গাধার উপর সওয়ার হয়ে আসতো। যে বছর সে মুহাররম মাসকে সম্মানিত মাস বলতো, জনগণ ঐ বছর ঐ মাসের সম্মান করতো। আর যে বছর সে বলতো যে, সে মুহাররম মাসকে সরিয়ে দিয়ে সফর মাসের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে এবং সফর মাসকে আগে বাড়িয়ে দিয়ে মুহাররম মাসের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছে, ঐ বছর আরবরা কেউই মুহাররম মাসের সম্মান করতো না। একটি উক্তি এও আছে যে, বানু কিনানা গোত্রের ঐ লোকটিকে আলমাস বলা হতো। সে ঘোষণা করতো যে, এ বছর মুহাররম মাসের সম্মান করা হবে না। আগামী বছর মুহাররম ও সফর উভয় মাসেরই সম্মান দেয়া হবে। অজ্ঞতার যুগে তার কথার উপরই আমল করা হতো। এখন প্রকৃত সম্মানিত মাস, যে মাসে মানুষ তার পিতহন্তাকে পেলেও তার দিকে দৃষ্টিপাত করতো না, সেই মানুষ পরস্পরের মধ্যে গৃহযুদ্ধ, লুটপাট প্রভৃতি শুরু করে দিতো।এই উক্তিটি কিন্তু সঠিক বলে অনুভূত হয় না। কেননা, কুরআন কারীমে বলা হয়েছে যে, তারা গণনা ঠিক রাখতো। কিন্তু এতে তো গণনা ঠিক থাকছে না। কারণ এর ফলে এক বছর সম্মানিত মাসগুলোর সংখ্যা হচ্ছে তিন এবং পরবর্তী বছর ওগুলোর সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে পাচ।আর একটি উক্তি এটাও আছে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তো হজ্ব ফরয ছিল যিলহজ্বের মাসে। কিন্তু মুশরিকরা যিলহজ্ব মাসের নাম মুহাররম রেখে দিতো। তারপর তারা বরাবর গণনা করে যেতো। আর এই হিসাবে যে যিলহজ্ব মাস আসতো ঐ মাসেই তারা হজ্বব্রত পালন করতো। মুহাররম মাসের ব্যাপারে তারা নীরব থাকতো। ওর কোন উল্লেখই করতো না। আবার ফিরে এসে সফর’ নাম রেখে দিতো। তারপর রজবকে জামাদিউল আখির, শাবানকে রমযান, রমযানকে শাওয়াল, তারপর যুলক্বাদাকে শাওয়াল, যুলহাজ্বাকে যুলক্বাদা এবং মুহাররমকে যিলহজ্ব বলতো। আবার এর পুনরাবৃত্তি করতো। আর উপর্যুপরি দু' বছর প্রতি মাসেই বরাবর হজ্ব করে যেতো। যে বছর আবু বকর (রাঃ) হজ্ব করেন সেই বছর মুশরিকদের গণনা অনুসারে ওটা পরবর্তী বছরের যুলক্বাদা মাস ছিল । রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে বছর হজ্ব করেন, ঐ বছর হজ্ব ঠিক যিলহজ্ব মাসেই হয়েছিল। আর তিনি তাঁর ভাষণে ঐ দিকেই ইঙ্গিত করে বলেছেনঃ “আসমান যমীন সৃষ্টিকালে আল্লাহ তা'আলা বার্ষিক গণনার যে নিয়ম দান করেছিলেন, যুগ বা সময় ঘুরে ফিরে সেই পর্যায়ে আবার ফিরে এসেছে।”কিন্তু এ উক্তিটি সঠিক বলে মনে হয় না। কেননা, আবু বকর (রাঃ) -এর হজ্ব যদি যুলক্বাদা মাসে হয়ে থাকে তবে তার ঐ হজ্ব কিরূপে শুদ্ধ হতে পারে? অথচ আল্লাহ তাআলা ফরমান জারি করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পক্ষ হতে বড় হজ্বের দিন জনসাধারণের সামনে ঘোষণা করা হচ্ছে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) উভয়ই এই মুশরিকদের (নিরাপত্তা প্রদান করা) হতে নিঃসম্পর্ক হচ্ছেন।” (৯৩) এই ঘোষণা সিদ্দীকে আকবার (রাঃ)-এর হজ্বেই করা হয়েছিল। সুতরাং তার এ হজ্ব যদি যিলহজ্ব মাসে না হয়ে থাকতো, তবে আল্লাহ তা'আলা ঐ দিনকে হজ্বের দিন বলতেন না। এ আয়াতে মাসগুলোকে এগিয়ে দেয়া বা পিছিয়ে দেয়ার যে বর্ণনা রয়েছে, শুধু এটাকেই প্রমাণ করার জন্যে এতো কষ্ট স্বীকার করারও কোন প্রয়োজন নেই। কেননা, এ ছাড়াও তো এটা সম্ভব। কারণ মুশরিকরা এক বছরতো মুহাররামুল হারামকে হালাল করে নিতে এবং ওর বিনিময়ে সফর মাসকে হারাম করে নিতো। বছরের অবশিষ্ট মাসগুলো স্ব স্ব স্থানেই থাকতো। তারপর দ্বিতীয় বছরে মুহাররম মাসকে হারাম মনে করতো এবং ওর মর্যাদা ঠিক রাখতো, যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত সম্মানিত মাসগুলোর সংখ্যা ঠিক থাকে। সুতরাং কখনো তারা পরপর বা ক্রমিকভাবে অবস্থিত তিনটি মাসের শেষ মাস মুহাররমকে সম্মানিত মাস হিসেবেই রাখতে, আবার কখনো সফরের দিকে সরিয়ে দিতো । এখন বাকী থাকলো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ ফরমান যে, সময় ঘুরে ফিরে নিজের প্রকৃত অবস্থায় এসে গেছে অর্থাৎ তাদের নিকটে যে মাস, সঠিক গণনাতেও ঐ মাসই বটে, এর পূর্ণ বর্ণনা আমরা পূর্বেই দিয়েছি। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।ইবনে আবি হাতিম (রাঃ) ইবনে উমার (রাঃ)-এর উক্তি নকল করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আকাবা নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। জনগণ তার আশে পাশে একত্রিত হন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেন। অতঃপর বলেনঃ “ মাসগুলোকে পিছনে সরিয়ে দেয়া শয়তানের পক্ষ থেকে ছিল কুফরীর বৃদ্ধি, যেন কাফিররা বিভ্রান্ত হয়। মুশরিকরা এক বছর মুহাররম মাসকে সম্মানিত হিসেবে রাখতে এবং সফর মাসকে হালাল রূপে রাখতো। আবার কোন বছর তারা মুহাররমকে হালাল করে নিতো ।”এই ছিল তাদের এগিয়ে দেয়া ও পিছিয়ে নেয়া। এ আয়াতে এরই বর্ণনা দেয়া হয়েছে।ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) তাঁর কিতাবুস সীরাহ্' নামক গ্রন্থে এ সম্পর্কে খুব ভাল কথা বলেছেন, যা অত্যন্ত উপকারী ও উত্তম। তিনি লিখেছেন যে প্রথম ব্যক্তি আল্লাহর হারামকৃত মাসকে হালাল এবং তাঁর হালালকৃত মাসকে হারাম করার রীতি আরবে চালু করেছিল সে হলো কালমাস। আর সে-ই হচ্ছে হুযায়ফা ইবনে আব্দ। তারপর কাসীম ইবনে আদী ইবনে আমির ইবনে সালাবা ইবনে হারিস ইবনে মালিক ইবনে কিননা ইবনে খুযায়মা ইবনে মুদরিকা ইবনে ইলইয়াস ইবনে মুযার ইবনে নাযার ইবনে মাদ ইবনে আদনান। তারপর তার ছেলে আব্বাদ, এরপর তার ছেলে কালা, তারপর তার ছেলে উমাইয়া, তারপর ওর ছেলে আউফ, তারপর তার ছেলে আবু সুমামা জানাদা। তার যুগেই ইসলাম বিস্তার লাভ করে। আরবের লোকেরা হজ্বপর্ব শেষ করে তার পাশে জমা হতো। সে তখন দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করতো এবং রজব , যুলক্বাদা ও যুলহাজ্বা এ তিনটি মাসের মর্যাদা বর্ণনা করতো। আর এক বছর মুহাররমকে হালাল করতো এবং সফরকে মুহাররম বানিয়ে দিতো। আবার অন্য বছর মুহাররমকেই সম্মানিত মাস বলে দিতো। যেন আল্লাহর নিষিদ্ধ মাসগুলোর সংখ্যা ঠিক থেকে যায় এবং তার হারাম হালালও হয়ে যায়।
আত-তাওবা 9:38
৩৮-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর: ঘটনা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বহু দূরের সফর তাবুকের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার জন্যে সাহাবীদেরকে এমন সময়ে নির্দেশ দেন যখন প্রচন্ড গরম পড়েছিল, গাছের ফল পেকে উঠেছিল এবং গাছের ছায়া বেড়ে গিয়েছিল। কিছু লোক রয়ে গিয়েছিল, তাদেরকেই তিরস্কার করে বলা হচ্ছে-যখন তোমাদেরকে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার জন্যে ডাক দেয়া হচ্ছে তখন তোমরা মাটি আঁকড়ে বসে থাকছে। কেন? তোমরা কি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগ্য বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী নিয়ামতকে ভুলে বসেছো? জেনে রেখো যে, পরকালের তুলনায় দুনিয়ার কোন মূল্যই নেই।রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় তর্জনীর দিকে ইশারা করে বলেনঃ “এ অঙ্গুলিটি কেউ সমুদ্রে ডুবিয়ে উঠালে তাতে যতটুকু পানি উঠবে, ঐ পানিটুকু সমুদ্রের তুলনায় যেমন, আখিরাতের তুলনায় দুনিয়াও তেমন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) তার মুসনাদ গ্রন্থে তাখরীজ করেছেন)আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করেন- আমি শুনেছি যে, আপনি নাকি হাদীস বর্ণনা করে থাকেনঃ “আল্লাহ তা'আলা একটি পুণ্যের বিনিময়ে এক লাখ সওয়াব দিয়ে থাকেন।" এটা কি সত্য? তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, এটা তো সত্যই, তাছাড়া আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ কথাও বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তা'আলা একটা পুণ্যের বিনিময়ে দু'লাখ সওয়াব দান করবেন।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ বাক্যটি পাঠ করে বলেনঃ “দুনিয়ার যা অতীত হয়েছে এবং যা বাকী আছে সমস্তই আখিরাতের তুলনায় অতি অল্প। আবদুল আযীয ইবনে আবি হাসিম (রঃ) তার পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, আবদুল আযীয ইবনে মারওয়ান (রঃ)-এর যখন মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসলো তখন তিনি বললেনঃ “যে কাপড়ে আমাকে কাফন পরানো হবে ওটা আমার কাছে নিয়ে এসো তো, আমি একটু দেখে নিই।” কাপড়টি তার সামনে রাখা হলে তিনি ওটার দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “দুনিয়ায় তো আমার অংশ এটাই ছিল। এটুকু দুনিয়া নিয়ে আমি যাচ্ছি!” অতঃপর তিনি পিঠ ফিরিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেনঃ “হায় দুনিয়া! তোমার অধিকও অল্প এবং তোমার অল্পতো খুবই ছোট! আফসোস! আমরা ধোকার মধ্যেই পড়ে রয়েছি!”আল্লাহ তা'আলা জিহাদ পরিত্যাগ করার উপর ভীতি প্রদর্শন করে বলছেন-যদি তোমরা (যুদ্ধের জন্যে) বের না হও তবে আল্লাহ তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করবেন। একটি গোত্রকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিহাদের জন্যে আহ্বান করেন। কিন্তু তারা তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়নি। তখন আল্লাহ তাদের থেকে বৃষ্টি বন্ধ করে দেন।আল্লাহ পাক বলেন-“তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক জাতি সৃষ্টি করে দিবেন। অর্থাৎ তোমরা গর্বে ফুলে ওঠো না যে, তোমরাই তো রাসূল (সঃ)-এর সাহায্যকারী। জেনে রেখো যে, তোমরা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্যকারীরূপে না থাকো তবে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিয়ে অন্যদেরকে তাঁর সাথী ও সাহায্যকারী বানিয়ে দেবেন যারা তোমাদের মত হবে না। তোমরা আল্লাহর দ্বীনের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এটা মনে করো না যে, তোমরা জিহাদ না করলে মুজাহিদরা জিহাদ করতেই পারবে না। আল্লাহ সব কিছুর উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান। তোমাদের ছাড়াই তিনি তাঁর মুজাহিদ বান্দাদেরকে শত্রুদের উপর বিজয় দান করতে পারেন। বলা হয়েছে যে, এই আয়াতটি ও (আরবী) (৯:৪১) এই আয়াতটি এবং (৯:১২০) এই আয়াতটি (আরবী) (৯:১২২) এ আয়াত দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। কিন্তু ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এর প্রতিবাদ করে বলেন যে, এই আয়াতগুলো মানসূখ হয়নি, বরং এগুলোর ভাবার্থ এই যে, যাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিহাদে বের হওয়ার জন্যে ডাক দেবেন তাদেরকে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে যেতে হবে। যদি তারা তা পরিত্যাগ করে তবে তাদেরকে ঐ কারণে শাস্তি প্রদান করা হবে। এটাই খুব উত্তম ব্যাখ্যা বটে। আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।
আত-তাওবা 9:39
৩৮-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর: ঘটনা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বহু দূরের সফর তাবুকের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার জন্যে সাহাবীদেরকে এমন সময়ে নির্দেশ দেন যখন প্রচন্ড গরম পড়েছিল, গাছের ফল পেকে উঠেছিল এবং গাছের ছায়া বেড়ে গিয়েছিল। কিছু লোক রয়ে গিয়েছিল, তাদেরকেই তিরস্কার করে বলা হচ্ছে-যখন তোমাদেরকে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার জন্যে ডাক দেয়া হচ্ছে তখন তোমরা মাটি আঁকড়ে বসে থাকছে। কেন? তোমরা কি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগ্য বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী নিয়ামতকে ভুলে বসেছো? জেনে রেখো যে, পরকালের তুলনায় দুনিয়ার কোন মূল্যই নেই।রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় তর্জনীর দিকে ইশারা করে বলেনঃ “এ অঙ্গুলিটি কেউ সমুদ্রে ডুবিয়ে উঠালে তাতে যতটুকু পানি উঠবে, ঐ পানিটুকু সমুদ্রের তুলনায় যেমন, আখিরাতের তুলনায় দুনিয়াও তেমন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এবং ইমাম আহমাদ (রঃ) তার মুসনাদ গ্রন্থে তাখরীজ করেছেন)আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করেন- আমি শুনেছি যে, আপনি নাকি হাদীস বর্ণনা করে থাকেনঃ “আল্লাহ তা'আলা একটি পুণ্যের বিনিময়ে এক লাখ সওয়াব দিয়ে থাকেন।" এটা কি সত্য? তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, এটা তো সত্যই, তাছাড়া আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ কথাও বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তা'আলা একটা পুণ্যের বিনিময়ে দু'লাখ সওয়াব দান করবেন।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ বাক্যটি পাঠ করে বলেনঃ “দুনিয়ার যা অতীত হয়েছে এবং যা বাকী আছে সমস্তই আখিরাতের তুলনায় অতি অল্প। আবদুল আযীয ইবনে আবি হাসিম (রঃ) তার পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, আবদুল আযীয ইবনে মারওয়ান (রঃ)-এর যখন মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসলো তখন তিনি বললেনঃ “যে কাপড়ে আমাকে কাফন পরানো হবে ওটা আমার কাছে নিয়ে এসো তো, আমি একটু দেখে নিই।” কাপড়টি তার সামনে রাখা হলে তিনি ওটার দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “দুনিয়ায় তো আমার অংশ এটাই ছিল। এটুকু দুনিয়া নিয়ে আমি যাচ্ছি!” অতঃপর তিনি পিঠ ফিরিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেনঃ “হায় দুনিয়া! তোমার অধিকও অল্প এবং তোমার অল্পতো খুবই ছোট! আফসোস! আমরা ধোকার মধ্যেই পড়ে রয়েছি!”আল্লাহ তা'আলা জিহাদ পরিত্যাগ করার উপর ভীতি প্রদর্শন করে বলছেন-যদি তোমরা (যুদ্ধের জন্যে) বের না হও তবে আল্লাহ তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করবেন। একটি গোত্রকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিহাদের জন্যে আহ্বান করেন। কিন্তু তারা তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়নি। তখন আল্লাহ তাদের থেকে বৃষ্টি বন্ধ করে দেন।আল্লাহ পাক বলেন-“তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক জাতি সৃষ্টি করে দিবেন। অর্থাৎ তোমরা গর্বে ফুলে ওঠো না যে, তোমরাই তো রাসূল (সঃ)-এর সাহায্যকারী। জেনে রেখো যে, তোমরা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহায্যকারীরূপে না থাকো তবে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিয়ে অন্যদেরকে তাঁর সাথী ও সাহায্যকারী বানিয়ে দেবেন যারা তোমাদের মত হবে না। তোমরা আল্লাহর দ্বীনের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এটা মনে করো না যে, তোমরা জিহাদ না করলে মুজাহিদরা জিহাদ করতেই পারবে না। আল্লাহ সব কিছুর উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান। তোমাদের ছাড়াই তিনি তাঁর মুজাহিদ বান্দাদেরকে শত্রুদের উপর বিজয় দান করতে পারেন। বলা হয়েছে যে, এই আয়াতটি ও (আরবী) (৯:৪১) এই আয়াতটি এবং (৯:১২০) এই আয়াতটি (আরবী) (৯:১২২) এ আয়াত দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। কিন্তু ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এর প্রতিবাদ করে বলেন যে, এই আয়াতগুলো মানসূখ হয়নি, বরং এগুলোর ভাবার্থ এই যে, যাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিহাদে বের হওয়ার জন্যে ডাক দেবেন তাদেরকে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে যেতে হবে। যদি তারা তা পরিত্যাগ করে তবে তাদেরকে ঐ কারণে শাস্তি প্রদান করা হবে। এটাই খুব উত্তম ব্যাখ্যা বটে। আল্লাহ তা'আলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।
আত-তাওবা 9:40
আল্লাহ তা'আলা (জিহাদ পরিত্যাগকারীদের সম্বোধন করে) বলছেন-তোমরা যদি আমার রাসূল (সঃ)-এর সাহায্য সহযোগিতা ছেড়ে দাও তবে জেনে রেখো যে, আমি কারো মুখাপেক্ষী নই। আমি নিজেই তার সহায়ক ও পৃষ্ঠপোষক। ঐ সময়ের কথা তোমরা স্মরণ কর অর্থাৎ হিজরতের বছর যখন কাফিররা আমার রাসূল (সঃ)-কে হত্যা করা বা বন্দী করা অথবা দেশান্তর করার ষড়যন্ত্র করেছিল তখন তিনি প্রিয় ও বিশ্বস্ত সহচর আবু বকর (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে অতি সন্তর্পণে মক্কা থেকে বেরিয়ে যান। সেই সময় তার সাহায্যকারী কে ছিল? তিন দিন পর্যন্ত ‘সাওর’ পর্বতের গুহায় তারা আশ্রয় নেন। উদ্দেশ্য এই যে, তাঁদের পশ্চাদ্ধাবনকারীরা তাদেরকে না পেয়ে যখন নিরাশ হয়ে ফিরে যাবে তখন তারা মদীনার পথ ধরবেন। ক্ষণে ক্ষণে আবু বকর (রাঃ) ভীত বিহ্বল হয়ে ওঠেন যে, না জানি কেউ হয়তো জানতে পেরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কষ্ট দেয়! রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! দু’জনের কথা চিন্তা করছো কেন? তৃতীয়জন যে আল্লাহ রয়েছেন!” আবু বকর ইবনে আবু কুহাফা (রাঃ) গুহায় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “এই কাফিরদের কেউ যদি পায়ের দিকে তাকায় তবেই তো আমাদেরকে দেখে নেবে!” তখন তিনি বলেনঃ “হে আবু বকর! তুমি ঐ দু'জনকে কি মনে কর যাঁদের তৃতীয়জন আল্লাহ রয়েছেন?” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন) মোটকথা, এই জায়গাতেও মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (সঃ)-কে সাহায্য করেছিলেন। কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলা নিজের পক্ষ থেকে আবু বকর (রাঃ)-এর উপর সান্ত্বনা ও প্রশান্তি নাযিল করা বুঝানো হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও অন্যান্যদের তাফসীর এটাই। তাদের দলীল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মধ্যে তো প্রশান্তি ছিলই। কিন্তু এই বিশেষ অবস্থায় প্রশান্তি নতুনভাবে নাযিল করার মধ্যেও তো কোন বৈপরীত্য নেই। এ জন্যেই আল্লাহ পাক এরই সাথে বলেন-আমি আমার অদৃশ্য সেনাবাহিনী পাঠিয়ে অর্থাৎ ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাঁকে সাহায্য করেছি।আল্লাহ তা'আলা কালেমায়ে কুফরকে দাবিয়ে দিয়েছেন এবং নিজের কালেমাকে সমুন্নত করেছেন। তিনি শিরুককে নীচু করেছেন এবং তাওহীদকে উপরে উঠিয়েছেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “একটি লোক বীরত্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে এবং আর একটি লোক মানুষকে খুশী করার জন্যে যুদ্ধ করছে, অন্য একটি লোক যুদ্ধ করছে জাতীয় মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে, এ তিনজনের মধ্যে আল্লাহর পথের মুজাহিদ কে?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর কালেমাকে সমুন্নত করার নিয়তে যুদ্ধ করে সেই হচ্ছে আল্লাহর পথের মুজাহিদ।”প্রতিশোধ গ্রহণে আল্লাহ প্রবল পরাক্রান্ত । তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করে থাকেন। তাঁর ইচ্ছায় কেউ পরিবর্তন আনয়ন করতে পারে না। কে এমন আছে যে, তাঁর সামনে মুখ খুলতে পারে বা চক্ষু উঠাতে পারে? তাঁর সমস্ত কথা ও কাজ নিপুণতা, যুক্তিসিদ্ধতা, কল্যাণ ও সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ।
আত-তাওবা 9:41
সুফিয়ান সাওরী (রঃ) তাঁর পিতা হতে, তিনি আবুয যুহা মুসলিম ইবনে সাবীহ (রঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, সূরায়ে বারাআতের এ আয়াতটিই সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। এতে রয়েছে যে, তাবূকের যুদ্ধের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সমস্ত মুসলিমের গমন করা উচিত। আহলে কিতাবদের কাফির রোমকদের সাথে জিহাদ করার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করা অবশ্য কর্তব্য। এতে তাদের মনের ইচ্ছা থাক আর নাই থাক এবং এটা তাদের কাছে সহজ কিংবা কঠিনই মনে হাক। বৃদ্ধেরা ও রুগ্ন ব্যক্তিরা বলছিলঃ “আমরা এ যুদ্ধে গমন না করলে পাপ হবে না। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন।বৃদ্ধ ও যুবক সবারই জন্যে এ হুকুম সাধারণ হয়ে গেল। কারো কোন ওযর চললো না। আবু তালহা (রাঃ) এ আয়াতের এই তাফসীরই করেছেন। এই হুকুম পালনার্থে এই মনীষী সিরিয়ার ভূমিতে চলে যান এবং খ্রীষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জীবনদাতা আল্লাহর কাছে নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেন। আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন এবং তাঁকে সন্তুষ্ট রাখুন!আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, আবু তালহা (রাঃ) একদা (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “আমার ধারণায় তো আমাদের প্রতিপালক যুবক বৃদ্ধ সকলকেই জিহাদে অংশগ্রহণের দাওয়াত দিয়েছেন। হে আমার প্রিয় ছেলেরা! তোমরা আমার জন্যে যুদ্ধের সরঞ্জাম প্রস্তুত কর। আমি সিরিয়ার জিহাদে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে অবশ্যই যাত্রা শুরু করবো।” তার ছেলেরা তখন তাকে বললেনঃ “আব্বা! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নেতৃত্বাধীন আপনি তার জীবদ্দশায় জিহাদ করেছেন। আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতের আমলেও আপনি মুজাহিদদের সাথে থেকেছেন। উমার (রাঃ)-এর খিলাফত কালেও আপনি একজন বিখ্যাত বীর হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। এখন আপনার জিহাদ করার বয়স আর নেই। সুতরাং আপনি এখন বাড়ীতেই বিশ্রাম করুন। আমরাই আপনার পক্ষ থেকে জিহাদের ময়দানে যোগদান করছি।” কিন্তু তিনি তাদের কথা মানলেন না এবং ঐ মূহুর্তেই জিহাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন। সমুদ্র পার হওয়ার জন্যে তিনি নৌকায় আরোহণ করলেন। গন্তব্যস্থানে পৌছাতে তখনও কয়েকদিনের পথ বাকী । সমুদ্রের মাঝপথেই তার প্রাণ পাখী উড়ে যায়। নয় দিন পর্যন্ত নৌকা চলতে থাকে, কিন্তু কোন দ্বীপ পাওয়া গেল না যে সেখানে তাকে দাফন করা যায়। নয় দিন পর যাত্রীরা স্থলভাগে অবতরণ করে এবং তাঁকে দাফন করা হয়। তখন পর্যন্ত মৃতদেহের কোনই পরিবর্তন ঘটেনি। আরো বহু গুরুজন হতে (আরবী)-এর তাফসীর যুবক ও বৃদ্ধ বর্ণিত হয়েছে। মোটকথা যুবক হাক, বৃদ্ধ হাক, কাজ থেকে অবসর প্রাপ্ত হাক, কাজের মধ্যে নিয়োজিত থাক, ধনী হাক বা গরীব হাক, ভারী হাক বা হালকা হাক, অভাবী হাক, কারীগর হাক, সুখী হাক বা দুঃখী হাক, পেশাদার হাক বা ব্যবসায়ী হাক, শক্তিশালী হাক বা দুর্বল হাক, যে অবস্থাতেই থাকুক না। কেন, কোন ও্যর না করেই দাঁড়িয়ে যেতে হবে এবং জিহাদের জন্যে যাত্রা শুরু করতে হবে।এই মাসআলার বিস্তারিত ব্যাখ্যা হিসেবে ইমাম আবু আমর আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, যদি রোমের ভিতরে আক্রমণ হয় তবে মুসলিমরা হালকা ও সওয়ার অবস্থায় চলবে। আর যদি বন্দরের ধারে আক্রমণ হয় হবে হালকা, ভারী, সওয়ার ও পদব্রজ সব রকমভাবে বের হয়ে যাবে। কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, (আরবী) (৯:১২২) এ আয়াত দ্বারা এই আয়াতটি মানসূখ হয়ে গেছে। এর উপর আমরা ইনশাআল্লাহ পূর্ণভাবে আলোকপাত করবো।বর্ণিত আছে যে, মিকদাদ (রাঃ) বড় ও মোটা দেহ বিশিষ্ট লোক ছিলেন। সুতরাং তিনি নিজের অবস্থা প্রকাশ করে যুদ্ধে না যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু তাঁকে অনুমতি দেয়া হলো না এবং এ আয়াত অবতীর্ণ হলো। তখন এ হুকুম সাহাবীদের কাছে খুবই কঠিন ঠেকলো। আল্লাহ তা'আলা তখন (আরবী) (৯:৯১) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করে উক্ত আয়াতটি মানসূখ করে দেন। অর্থাৎ “ দুর্বল, রুগ্ন, অভাবী, যাদের কাছে খরচ করার কিছুই নেই, তারা যদি আল্লাহর দ্বীন ও রাসূল (সঃ)-এর শরীয়তের পক্ষপাতী ও শুভাকাঙ্ক্ষী হয় তবে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত না হলেও কোন দোষ নেই।” আবূ আইয়ুব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর তিনি একটি বছর ছাড়া কোন জিহাদেই অনুপস্থিত ছিলেন না। আর তিনি বলতেন যে, আল্লাহ তা'আলা ভারী ও হালকা উভয়কেই যুদ্ধে গমনের নির্দেশ দিয়েছেন। আর মানুষের অবস্থা তো এ দুটোই হয়ে থাকে।আবু রাশিদ হিরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অশ্বারোহী মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ)-কে হিমস -এ দেখতে পাই। তার হাড়ের জোড় ছুটে গিয়েছিল (তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন)। তবুও দেখি যে, তিনি শিবিকার উপর সওয়ার হয়ে জিহাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারতো শরীয়তসম্মত ওযর রয়েছে। তবুও আপনি এতো কষ্ট করছেন কেন? তিনি উত্তরে আমাকে বললেনঃ “দেখো, সূরাতুল বাউস অর্থাৎ সূরায়ে বারাআত আমাদের সামনে অবতীর্ণ হয়েছে। তাতে হালকা, ভারী অর্থাৎ যুবক ও বৃদ্ধ সকলকেই যুদ্ধে গমনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।”হাইয়ান ইবনে যায়েদ শারআবী (রঃ) বলেন, আমি হিমসের শাসনকর্তা সাফওয়ান ইবনে আমরের সাথে জারাজিমা অভিমুখে জিহাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। আমি দামেস্কের একজন অতি বয়স্ক বুযুর্গকে দেখলাম যিনি আক্রমণকারীদের সাথে নিজের উটের উপর সাওয়ার হয়ে আসছেন। তার জ্বগুলো চোখের উপর পড়ে রয়েছে। তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। আমি তার নিকটে গিয়ে বললাম, চাচাজান! আল্লাহ তা'আলার কাছে তো আপনার ওযর করার অবকাশ রয়েছে। একথা শুনে তিনি চোখের উপর থেকে জ্বগুলো সরালেন এবং বললেনঃ “দেখো, আল্লাহ তা'আলা হালকা ও ভারী উভয় অবস্থাতেই আমাদেরকে জিহাদে বের হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। জেনে রেখো, আল্লাহ তা'আলা যাকে ভালবাসেন তাকে তিনি পরীক্ষাও করে থাকেন। অতঃপর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তিনি তার উপর রহমত বর্ষণ করেন। দেখো, আল্লাহর পরীক্ষা শো, সবর, তাঁর যিক্র এবং খাটি তাওহীদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে।”জিহাদের হুকুম দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা তাঁর পথে ও রাসূল (সঃ)-এর সন্তুষ্টির কাজে মাল ও জান খরচ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বলছেন যে, এতেই দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গল রয়েছে। পার্থিব মঙ্গল ও লাভ এই যে, সামান্য কিছু খরচ করে বহু গনীমতের মাল লাভ করা যাবে। আর আখিরাতের লাভ এই যে, এর চেয়ে বড় পুণ্য আর নেই। যেমন আল্লাহর নবী (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তাঁর পথে জিহাদকারীর জন্যে এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন যে, হয় তাকে শহীদ করে তিনি তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করাবেন, না হয় গনীমতসহ নিরাপদে বাড়ীতে ফিরিয়ে আনবেন।” এই জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে এমতাবস্থায় যে, ওটা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়, আর তোমরা কোন কিছু হয়তো অপছন্দ করে থাকো অথচ ওটাই তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। পক্ষান্তরে তোমরা হয়তো কোন জিনিস পছন্দ করে থাকো অথচ ওটাই তোমাদের জন্যে ক্ষতিকর, আর (কোটা তোমাদের জন্যে ভাল এবং কোন্টা খারাপ তা) আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না।” আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে বলেনঃ “তুমি ইসলাম গ্রহণ কর।” লোকটি বললোঃ “আমার মন যে চায় না।” তখন তিনি তাকে বললেনঃ “মন না চাইলেও তুমি ইসলাম কবূল কর।”
আত-তাওবা 9:42
যারা তাবুকের যুদ্ধে গমন না করে বাড়ীতেই রয়েছিল এবং পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বানানো মিথ্যা ওযর পেশ করেছিল এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ধমকের সুরে বলছেন- প্রকৃতপক্ষে তাদের কোনই ওর ছিল না। যদি সহজ লভ্য গনীমতের আশা থাকতো এবং নিকটের সফর হতো তবে এই লোভীদের দল অবশ্যই সঙ্গে যেতো। কিন্তু সিরিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সফর তাদের মন ভেঙ্গে দেয়। তাই তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে মিথ্যা শপথ করে তাঁকে প্রতারিত করছে যে, তাদের যদি ওযর না থাকতো তবে অবশ্যই তারা তার সঙ্গে যুদ্ধে গমন করতো। আল্লাহ তা'আলা বলছেন, তারা মিথ্যা কথা বলে নিজেদেরকে ধ্বংস করছে। তিনি জানেন যে, তারা মিথ্যাবাদী।
আত-তাওবা 9:43
৪৩-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আউন (রাঃ) স্বীয় সাথীদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আপনারা কি এর চেয়ে উত্তম তিরস্কারের কথা শুনেছেন? মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে তিরস্কারপূর্ণ কথা বলার পূর্বেই তাকে ক্ষমা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “(হে নবী!) আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন বটে, কিন্তু কেন তুমি তাদেরকে যুদ্ধ হতে অব্যাহতির অনুমতি দিয়েছো?" (ইবনে জারীর (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, পূর্বে কোন নির্দেশ ছাড়াই নবী দু’টি কাজ করেছেন। একটি হলো মুনাফিকদের যুদ্ধ হতে অব্যাহতির অনুমতি দান এবং দ্বিতীয় হলো বদরের বন্দীদের নিকট থেকে ফিদিয়া গ্রহণ । তখন আল্লাহ তা'আলা ঐ আয়াত অবতীর্ণ করেন) এরপর তিনি সূরায়ে নূরে আয়াত অবতীর্ণ করে তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অবকাশ দেন যে, তিনি ইচ্ছা করলে তাদেরকে অনুমতি দিতে পারেন। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের কেউ যদি কোন কাজ ও ব্যস্ততার কারণে তোমার কাছে। যুদ্ধের অব্যাহতির অনুমতি প্রার্থনা করে তবে তুমি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুমতি দিতে পার।" (২৪:৬২) মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, সূরায়ে তাওবার এ আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা পরস্পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে যুদ্ধ হতে অব্যাহতির অনুমতি প্রার্থনা করবে। যদি অনুমতি মিলে যায় তবে তো ভাল কথা। আর যদি তিনি অনুমতি নাও দেন তবুও তারা যুদ্ধে গমন করবে না। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যদি তারা অনুমতি লাভ না করতো তবে এটুকু লাভ তো অবশ্যই হতো যে, সত্য ওষরকারী ও মিথ্যা। বাহানাকারীদের মধ্যে পার্থক্য প্রকাশ পেয়ে যেতো। ভাল ও মন্দ এবং সৎ ও অসতের মধ্যে প্রভেদ সৃষ্টি হতো। অনুগত লোকেরা তো হাযির হয়েই যেতো। আর অবাধ্য লোকেরা যুদ্ধ হতে অব্যাহতি লাভের অনুমতি না পেয়েও বের হতো না। কেননা, তারা তো এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে অনুমতি দিন আর নাই দিন, তারা যুদ্ধে গমন করবেই না। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা পরবর্তী আয়াতে ঘোষণা করেন- এটা সম্ভব নয় যে, খাঁটি ঈমানদার লোকেরা তোমার কাছে যুদ্ধ হতে অব্যাহতি লাভের অনুমতি প্রার্থনা করবে। তারা তো জিহাদকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় মনে করে নিজেদের জান ও মালকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করতে সর্বদা আকাক্ষী। আল্লাহ তাআলা এই পরহেযগার লোকদেরকে ভালরূপেই অবগত আছেন। আর এ লোকগুলো, যাদের শরীয়ত সম্মত কোনই ওর নেই, যারা শুধু বাহানা করে যুদ্ধ হতে অব্যাহতি লাভের অনুমতি প্রার্থনা করছে তারা বেঈমান লোক। তারা আখিরাতের পুরস্কারের কোন আশা রাখে না। হে নবী! তারা এখনও তোমার শরীয়তের ব্যাপারে সন্দিহান রয়েছে এবং তারা সদা উদ্বিগ্ন হয়ে ফিরছে। তারা এক পা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে তো আর এক পা পিছনের দিকে সরাচ্ছে। তাদের কোন ধৈর্য ও মনের স্থিরতা নেই। তারা না আছে এদিকে, না আছে। ওদিকে। হে নবী! আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি কখনো তার জন্যে কোন পথ পাবে না।
আত-তাওবা 9:44
৪৩-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আউন (রাঃ) স্বীয় সাথীদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আপনারা কি এর চেয়ে উত্তম তিরস্কারের কথা শুনেছেন? মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে তিরস্কারপূর্ণ কথা বলার পূর্বেই তাকে ক্ষমা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “(হে নবী!) আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন বটে, কিন্তু কেন তুমি তাদেরকে যুদ্ধ হতে অব্যাহতির অনুমতি দিয়েছো?" (ইবনে জারীর (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, পূর্বে কোন নির্দেশ ছাড়াই নবী দু’টি কাজ করেছেন। একটি হলো মুনাফিকদের যুদ্ধ হতে অব্যাহতির অনুমতি দান এবং দ্বিতীয় হলো বদরের বন্দীদের নিকট থেকে ফিদিয়া গ্রহণ । তখন আল্লাহ তা'আলা ঐ আয়াত অবতীর্ণ করেন) এরপর তিনি সূরায়ে নূরে আয়াত অবতীর্ণ করে তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অবকাশ দেন যে, তিনি ইচ্ছা করলে তাদেরকে অনুমতি দিতে পারেন। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের কেউ যদি কোন কাজ ও ব্যস্ততার কারণে তোমার কাছে। যুদ্ধের অব্যাহতির অনুমতি প্রার্থনা করে তবে তুমি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুমতি দিতে পার।" (২৪:৬২) মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, সূরায়ে তাওবার এ আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা পরস্পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে যুদ্ধ হতে অব্যাহতির অনুমতি প্রার্থনা করবে। যদি অনুমতি মিলে যায় তবে তো ভাল কথা। আর যদি তিনি অনুমতি নাও দেন তবুও তারা যুদ্ধে গমন করবে না। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যদি তারা অনুমতি লাভ না করতো তবে এটুকু লাভ তো অবশ্যই হতো যে, সত্য ওষরকারী ও মিথ্যা। বাহানাকারীদের মধ্যে পার্থক্য প্রকাশ পেয়ে যেতো। ভাল ও মন্দ এবং সৎ ও অসতের মধ্যে প্রভেদ সৃষ্টি হতো। অনুগত লোকেরা তো হাযির হয়েই যেতো। আর অবাধ্য লোকেরা যুদ্ধ হতে অব্যাহতি লাভের অনুমতি না পেয়েও বের হতো না। কেননা, তারা তো এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে অনুমতি দিন আর নাই দিন, তারা যুদ্ধে গমন করবেই না। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা পরবর্তী আয়াতে ঘোষণা করেন- এটা সম্ভব নয় যে, খাঁটি ঈমানদার লোকেরা তোমার কাছে যুদ্ধ হতে অব্যাহতি লাভের অনুমতি প্রার্থনা করবে। তারা তো জিহাদকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় মনে করে নিজেদের জান ও মালকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করতে সর্বদা আকাক্ষী। আল্লাহ তাআলা এই পরহেযগার লোকদেরকে ভালরূপেই অবগত আছেন। আর এ লোকগুলো, যাদের শরীয়ত সম্মত কোনই ওর নেই, যারা শুধু বাহানা করে যুদ্ধ হতে অব্যাহতি লাভের অনুমতি প্রার্থনা করছে তারা বেঈমান লোক। তারা আখিরাতের পুরস্কারের কোন আশা রাখে না। হে নবী! তারা এখনও তোমার শরীয়তের ব্যাপারে সন্দিহান রয়েছে এবং তারা সদা উদ্বিগ্ন হয়ে ফিরছে। তারা এক পা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে তো আর এক পা পিছনের দিকে সরাচ্ছে। তাদের কোন ধৈর্য ও মনের স্থিরতা নেই। তারা না আছে এদিকে, না আছে। ওদিকে। হে নবী! আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি কখনো তার জন্যে কোন পথ পাবে না।
আত-তাওবা 9:45
৪৩-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আউন (রাঃ) স্বীয় সাথীদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আপনারা কি এর চেয়ে উত্তম তিরস্কারের কথা শুনেছেন? মহান আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে তিরস্কারপূর্ণ কথা বলার পূর্বেই তাকে ক্ষমা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “(হে নবী!) আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন বটে, কিন্তু কেন তুমি তাদেরকে যুদ্ধ হতে অব্যাহতির অনুমতি দিয়েছো?" (ইবনে জারীর (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, পূর্বে কোন নির্দেশ ছাড়াই নবী দু’টি কাজ করেছেন। একটি হলো মুনাফিকদের যুদ্ধ হতে অব্যাহতির অনুমতি দান এবং দ্বিতীয় হলো বদরের বন্দীদের নিকট থেকে ফিদিয়া গ্রহণ । তখন আল্লাহ তা'আলা ঐ আয়াত অবতীর্ণ করেন) এরপর তিনি সূরায়ে নূরে আয়াত অবতীর্ণ করে তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অবকাশ দেন যে, তিনি ইচ্ছা করলে তাদেরকে অনুমতি দিতে পারেন। তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের কেউ যদি কোন কাজ ও ব্যস্ততার কারণে তোমার কাছে। যুদ্ধের অব্যাহতির অনুমতি প্রার্থনা করে তবে তুমি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুমতি দিতে পার।" (২৪:৬২) মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, সূরায়ে তাওবার এ আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা পরস্পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে যুদ্ধ হতে অব্যাহতির অনুমতি প্রার্থনা করবে। যদি অনুমতি মিলে যায় তবে তো ভাল কথা। আর যদি তিনি অনুমতি নাও দেন তবুও তারা যুদ্ধে গমন করবে না। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যদি তারা অনুমতি লাভ না করতো তবে এটুকু লাভ তো অবশ্যই হতো যে, সত্য ওষরকারী ও মিথ্যা। বাহানাকারীদের মধ্যে পার্থক্য প্রকাশ পেয়ে যেতো। ভাল ও মন্দ এবং সৎ ও অসতের মধ্যে প্রভেদ সৃষ্টি হতো। অনুগত লোকেরা তো হাযির হয়েই যেতো। আর অবাধ্য লোকেরা যুদ্ধ হতে অব্যাহতি লাভের অনুমতি না পেয়েও বের হতো না। কেননা, তারা তো এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে অনুমতি দিন আর নাই দিন, তারা যুদ্ধে গমন করবেই না। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা পরবর্তী আয়াতে ঘোষণা করেন- এটা সম্ভব নয় যে, খাঁটি ঈমানদার লোকেরা তোমার কাছে যুদ্ধ হতে অব্যাহতি লাভের অনুমতি প্রার্থনা করবে। তারা তো জিহাদকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় মনে করে নিজেদের জান ও মালকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করতে সর্বদা আকাক্ষী। আল্লাহ তাআলা এই পরহেযগার লোকদেরকে ভালরূপেই অবগত আছেন। আর এ লোকগুলো, যাদের শরীয়ত সম্মত কোনই ওর নেই, যারা শুধু বাহানা করে যুদ্ধ হতে অব্যাহতি লাভের অনুমতি প্রার্থনা করছে তারা বেঈমান লোক। তারা আখিরাতের পুরস্কারের কোন আশা রাখে না। হে নবী! তারা এখনও তোমার শরীয়তের ব্যাপারে সন্দিহান রয়েছে এবং তারা সদা উদ্বিগ্ন হয়ে ফিরছে। তারা এক পা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে তো আর এক পা পিছনের দিকে সরাচ্ছে। তাদের কোন ধৈর্য ও মনের স্থিরতা নেই। তারা না আছে এদিকে, না আছে। ওদিকে। হে নবী! আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি কখনো তার জন্যে কোন পথ পাবে না।
আত-তাওবা 9:46
৪৬-৪৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে নবী! তাদের ওযর যে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তার বাহ্যিক প্রমাণ এটাও যে, তাদের যুদ্ধে গমনের ইচ্ছা থাকলে কমপক্ষে তারা যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম তো প্রস্তুত করতো। কিন্তু তারাতো যুদ্ধে গমনের ঘোষণা ও নির্দেশের পরেও এবং দিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরেও হাতের উপর হাত রেখে বসে রয়েছে। তারা একটা খড়কুটাকেও এদিক থেকে ওদিকে নিয়ে যায়নি। অবশ্য তাদের তোমাদের সাথে বের হওয়াকে আল্লাহ তা'আলা পছন্দও করেননি। এ কারণেও তিনি তাদেরকে পিছনে সারিয়ে রেখেছেন। আর স্বাভাবিকভাবে তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন, যুদ্ধ থেকে দূরে অবস্থানকারীদের সাথে তোমরাও অবস্থান কর। হে মুসলিমরা! তোমাদের সাথে তাদের বের হওয়া আল্লাহ তাআলার নিকট অপছন্দনীয় হওয়ার কারণ এই যে, তারা তো ভীরু ও বড় রকমের কাপুরুষ। যুদ্ধ করার সাহস তাদের মোটেই নেই। তোমাদের সাথে গেলেও তারা দূরে দূরেই থাকতো। তা ছাড়া তারা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে বিবাদ বাধিয়ে দিতো। তারা এদিকের কথা ওদিকে এবং ওদিকের কথা এদিকে লাগিয়ে দিয়ে পরস্পরের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি করতে এবং কোন একটা নতুন ফিত্না খাড়া করে তোমাদের অবস্থাকে জটিল করে তুলতো। তোমাদের মধ্যে এমন লোকও বিদ্যমান রয়েছে যারা ঐসব লোককে মান্য করে চলে, তাদের মতামত সমর্থন করে এবং তাদের কার্যক্রমকে সুনজরে দেখে থাকে। তারা ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে বলে ঐসব লোকের দুঙ্কার্যের ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে বে-খবর থাকে। মুমিনদের পক্ষে এর ফল খুবই খারাপ হয়। তাদের পরস্পরের মধ্যে অনাচার ও ঝগড়া-বিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- হে মুমিনগণ! ঐ সব লোকের গুপ্তচরও তোমাদের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে, যারা তোমাদের খুঁটিনাটি সংবাদও তাদের কাছে পৌঁছিয়ে থাকে। কিন্তু এ অর্থ করাতে ঐ সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যা আয়াতের শুরুতে ছিল। অর্থাৎ ঐ লোকদের তোমাদের সাথে বের হওয়া এ জন্যেও অপছন্দনীয় যে, তোমাদের মধ্যে এমন কতকগুলো লোকও রয়েছে যারা তাদের কথা মেনে থাকে। এটা তো খুবই সঠিক কথা। কিন্তু তাদের বের না হওয়ার কারণের জন্যে গোয়েন্দাগিরির কোন বিশেষত্ব থাকতে পারে না। এ জন্যেই কাতাদা (রঃ) প্রমুখ মুফাসসিরদের উক্তি এটাই।ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, অনুমতি প্রার্থনাকারীদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এবং জাদ ইবনে কায়েসও ছিল। এরাই ছিল বড় বড় নেতা ও প্রভাবশালী মুনাফিক। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দূরে নিক্ষেপ করে দেন। যদি তারা মুসলিমদের সাথে বের হতো তবে তাদের অনুগত লোকেরা সময় সুযোগে তাদের সাথে যোগ দিয়ে মুসলিমদের ক্ষতি সাধন করতো। মুহাম্মাদী সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে যেতো। কেননা, এই মুনাফিকরা বাহ্যিক সৌন্দর্যের অধিকারী ছিল। কিছু কিছু মুসলিম তাদের প্রকৃত অবস্থা অবহিত ছিল না। তাই তারা তাদের বাহ্যিক ইসলাম ও মুখরোচক কথায় পাগল ছিল এবং তখন পর্যন্ত তাদের অন্তরে তাদের প্রতি ভালবাসা বিদ্যমান ছিল। এটা সত্য কথা যে, তাদের এ অবস্থা মুনাফিকদের আসল অবস্থা অবগত না হওয়ার কারণেই ছিল। পূর্ণ জ্ঞান তো আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে। তিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমস্ত খবরই রাখেন। তিনি অদৃশ্যের সংবাদ রাখেন বলেই মুসলিমদেরকে বলছেন- হে মুসলিমরা! এই মুনাফিকদের যুদ্ধে গমন না করাকে তোমরা গনীমত মনে কর। যদি তারা তোমাদের সাথে থাকতো তবে ফিত্না-ফাসাদ সৃষ্টি করতো। তারা নিজেরাও ভাল কাজ করতো না এবং তোমাদেরকেও করতে দিতো না।এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি তাদেরকে (কাফিরদেরকে) দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয় তবে তারা আবার নতুনভাবে ঐ কাজই করবে যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে এবং নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।” অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “যদি তাদের অন্তরে কোন কল্যাণ নিহিত থাকতো তবে অবশ্যই তিনি তাদেরকে শুনিয়ে দিতেন, আর যদি তিনি তাদেরকে শুনাতেনও তবে তারা তাচ্ছিল্যভরে ফিরে যেতো।” আর এক স্থানে আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি আমি তাদের উপর ফরয করে দিতাম (দিয়ে বলতাম)- তোমরা আত্মহত্যা কর কিংবা নিজেদের দেশ থেকে বেরিয়ে যাও, তবে অল্প কয়েকজন ব্যতীত এই আদেশ কেউই পালন করতো না, আর যদি তারা তাদেরকে যেরূপ উপদেশ দেয়া হয় তদনুযায়ী কাজ করতো, তবে তাদের জন্যে উত্তম হতো এবং ঈমানকে অধিকতর দৃঢ়কারী হতো। আর এ অবস্থায় আমি তাদেরকে বিশেষ করে আমার পক্ষ থেকে মহা পুরস্কার প্রদান করতাম। আর আমি অবশ্যই তাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করতাম।” এ ধরনের আয়াত আরো অনেক রয়েছে।
আত-তাওবা 9:47
৪৬-৪৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে নবী! তাদের ওযর যে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তার বাহ্যিক প্রমাণ এটাও যে, তাদের যুদ্ধে গমনের ইচ্ছা থাকলে কমপক্ষে তারা যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম তো প্রস্তুত করতো। কিন্তু তারাতো যুদ্ধে গমনের ঘোষণা ও নির্দেশের পরেও এবং দিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরেও হাতের উপর হাত রেখে বসে রয়েছে। তারা একটা খড়কুটাকেও এদিক থেকে ওদিকে নিয়ে যায়নি। অবশ্য তাদের তোমাদের সাথে বের হওয়াকে আল্লাহ তা'আলা পছন্দও করেননি। এ কারণেও তিনি তাদেরকে পিছনে সারিয়ে রেখেছেন। আর স্বাভাবিকভাবে তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন, যুদ্ধ থেকে দূরে অবস্থানকারীদের সাথে তোমরাও অবস্থান কর। হে মুসলিমরা! তোমাদের সাথে তাদের বের হওয়া আল্লাহ তাআলার নিকট অপছন্দনীয় হওয়ার কারণ এই যে, তারা তো ভীরু ও বড় রকমের কাপুরুষ। যুদ্ধ করার সাহস তাদের মোটেই নেই। তোমাদের সাথে গেলেও তারা দূরে দূরেই থাকতো। তা ছাড়া তারা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে বিবাদ বাধিয়ে দিতো। তারা এদিকের কথা ওদিকে এবং ওদিকের কথা এদিকে লাগিয়ে দিয়ে পরস্পরের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি করতে এবং কোন একটা নতুন ফিত্না খাড়া করে তোমাদের অবস্থাকে জটিল করে তুলতো। তোমাদের মধ্যে এমন লোকও বিদ্যমান রয়েছে যারা ঐসব লোককে মান্য করে চলে, তাদের মতামত সমর্থন করে এবং তাদের কার্যক্রমকে সুনজরে দেখে থাকে। তারা ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে বলে ঐসব লোকের দুঙ্কার্যের ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে বে-খবর থাকে। মুমিনদের পক্ষে এর ফল খুবই খারাপ হয়। তাদের পরস্পরের মধ্যে অনাচার ও ঝগড়া-বিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- হে মুমিনগণ! ঐ সব লোকের গুপ্তচরও তোমাদের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে, যারা তোমাদের খুঁটিনাটি সংবাদও তাদের কাছে পৌঁছিয়ে থাকে। কিন্তু এ অর্থ করাতে ঐ সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যা আয়াতের শুরুতে ছিল। অর্থাৎ ঐ লোকদের তোমাদের সাথে বের হওয়া এ জন্যেও অপছন্দনীয় যে, তোমাদের মধ্যে এমন কতকগুলো লোকও রয়েছে যারা তাদের কথা মেনে থাকে। এটা তো খুবই সঠিক কথা। কিন্তু তাদের বের না হওয়ার কারণের জন্যে গোয়েন্দাগিরির কোন বিশেষত্ব থাকতে পারে না। এ জন্যেই কাতাদা (রঃ) প্রমুখ মুফাসসিরদের উক্তি এটাই।ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, অনুমতি প্রার্থনাকারীদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল এবং জাদ ইবনে কায়েসও ছিল। এরাই ছিল বড় বড় নেতা ও প্রভাবশালী মুনাফিক। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দূরে নিক্ষেপ করে দেন। যদি তারা মুসলিমদের সাথে বের হতো তবে তাদের অনুগত লোকেরা সময় সুযোগে তাদের সাথে যোগ দিয়ে মুসলিমদের ক্ষতি সাধন করতো। মুহাম্মাদী সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে যেতো। কেননা, এই মুনাফিকরা বাহ্যিক সৌন্দর্যের অধিকারী ছিল। কিছু কিছু মুসলিম তাদের প্রকৃত অবস্থা অবহিত ছিল না। তাই তারা তাদের বাহ্যিক ইসলাম ও মুখরোচক কথায় পাগল ছিল এবং তখন পর্যন্ত তাদের অন্তরে তাদের প্রতি ভালবাসা বিদ্যমান ছিল। এটা সত্য কথা যে, তাদের এ অবস্থা মুনাফিকদের আসল অবস্থা অবগত না হওয়ার কারণেই ছিল। পূর্ণ জ্ঞান তো আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে। তিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমস্ত খবরই রাখেন। তিনি অদৃশ্যের সংবাদ রাখেন বলেই মুসলিমদেরকে বলছেন- হে মুসলিমরা! এই মুনাফিকদের যুদ্ধে গমন না করাকে তোমরা গনীমত মনে কর। যদি তারা তোমাদের সাথে থাকতো তবে ফিত্না-ফাসাদ সৃষ্টি করতো। তারা নিজেরাও ভাল কাজ করতো না এবং তোমাদেরকেও করতে দিতো না।এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি তাদেরকে (কাফিরদেরকে) দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয় তবে তারা আবার নতুনভাবে ঐ কাজই করবে যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে এবং নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।” অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “যদি তাদের অন্তরে কোন কল্যাণ নিহিত থাকতো তবে অবশ্যই তিনি তাদেরকে শুনিয়ে দিতেন, আর যদি তিনি তাদেরকে শুনাতেনও তবে তারা তাচ্ছিল্যভরে ফিরে যেতো।” আর এক স্থানে আল্লাহ পাক বলেনঃ “যদি আমি তাদের উপর ফরয করে দিতাম (দিয়ে বলতাম)- তোমরা আত্মহত্যা কর কিংবা নিজেদের দেশ থেকে বেরিয়ে যাও, তবে অল্প কয়েকজন ব্যতীত এই আদেশ কেউই পালন করতো না, আর যদি তারা তাদেরকে যেরূপ উপদেশ দেয়া হয় তদনুযায়ী কাজ করতো, তবে তাদের জন্যে উত্তম হতো এবং ঈমানকে অধিকতর দৃঢ়কারী হতো। আর এ অবস্থায় আমি তাদেরকে বিশেষ করে আমার পক্ষ থেকে মহা পুরস্কার প্রদান করতাম। আর আমি অবশ্যই তাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করতাম।” এ ধরনের আয়াত আরো অনেক রয়েছে।
আত-তাওবা 9:48
আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর অন্তরে মুনাফিকদের প্রতি ঘৃণার উদ্রেক করার জন্যে বলেন, হে নবী! তুমি কি ভুলে গেছ যে, এই মুনাফিকরা বহুদিন ধরে ফিত্না ও ফাসাদের অগ্নি প্রজ্বলিত করতে রয়েছে এবং তোমার কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করার সব রকমের তদবীর চালিয়েছে। মদীনায় তোমার প্রতিষ্ঠা লাভের পরই সমস্ত আরব এক হয়ে বিপদের বৃষ্টি তোমার উপর বর্ষণ করেছে। মদীনার ইয়াহূদী ও মুনাফিকরা মদীনায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে দেয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এক দিনেই তাদের সকলের কামান ভেঙ্গে চুরমান করে দেন। তিনি তাদের জোড় ঢিলা করে দেন এবং তাদের উত্তেজনা ঠাণ্ডা করে দেন। বদরের যুদ্ধ তাদেরকে হতবাক করে দেয় এবং তাদের মনের কামনা ও বাসনা মুছে ফেলেন অর্থাৎ তারা তাদের সফল হওয়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে যায়। মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তো পরিষ্কারভাবে বলে দেয়- “এ লোকগুলো এখন আমাদের ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এখন আমাদের এ ছাড়া কোন উপায় নেই যে, আমরা বাহ্যতঃ ইসলামের অনুকূলে থাকবো, কিন্তু অন্তরে যা আছে তা তো আছেই। সময় সুযোগ আসলে দেখা যাবে এবং দেখানো যাবে।” তারপর যতোই সত্যের উন্নতি হতে থাকে এবং তাওহীদ বিকাশ লাভ করতে থাকে, ততোই তারা হিংসার আগুনে দগ্ধীভূত হতে থাকে। অবশেষে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল্লাহর কালেমার বিজয় ডংকা বেজে ওঠে। আর এদিকে এই মুনাফিকদের পেট ফুলতে থাকে এবং এটা তাদের কাছে খুবই অপ্রীতিকর বোধ হয়।
আত-তাওবা 9:49
আল্লাহ তা'আলা বলেন, মুনাফিকদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যে বলেহে মুহাম্মাদ (সঃ)! আমাকে (বাড়ীতেই) বসে থাকার অনুমতি দিন এবং আপনার সাথে যুদ্ধে গমনের নির্দেশ দিয়ে আমাকে বিপদে ফেলবেন না। কেননা, রোমক যুবতী নারীদের প্রেমে হয়তো আমি পড়ে যাব। আল্লাহ তাআলা বলেন যে, এ কথা বলার কারণে তারা তো বিপদে পড়েই গেছে। যেমন একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুদ্ধে গমনের প্রস্তুতি গ্রহণের অবস্থায় জাদ ইবনে কায়েসকে বলেনঃ “তুমি এ বছর কি বানী-আসফারকে দেশান্তর করার কাজে আমাদের সঙ্গী হবে?” সে উত্তরে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে যুদ্ধে গমন না করার অনুমতি দিন এবং আমাকে বিপদে ফেলবেন না। আল্লাহর কসম! আমার কওম জানে যে, আমার চেয়ে স্ত্রীলোকদের প্রতি বেশী আকৃষ্ট আর কেউ নেই। আমি আশংকা করছি যে, আমি যদি বানী অসিফারের নারীদের দেখতে পাই তবে ধৈর্যধারণ করতে পারবো না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং বলেনঃ “আমি তোমাকে অনুমতি দিলাম।” এই জাদ ইবনে কায়েসের সম্পর্কেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) যুহরী (রঃ) হতে তাখরীজ করেছেন এবং এটা ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ একাধিক বর্ণনাকারী হতে বর্ণিত হয়েছে। আর জাদ ইবনে কায়েস ছিল বানু সালামা গোত্রের সম্ভ্রান্ত ও নেতৃস্থানীয় লোক) এ আয়াতে বলা হয়েছে- এই মুনাফিক এই বাহানা বানিয়ে নিয়েছে, অথচ সে তো ফিত্নার মধ্যে পড়েই রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গ ছেড়ে দেয়া এবং জেহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া কি কম ফিত্না? এই মুনাফিক বানু সালামা গোত্রের বড় নেতা ছিল। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই গোত্রের লোকদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের নেতা কে?” তারা তখন উত্তরে বলেঃ “আমাদের নেতা হচ্ছে জাদ ইবনে কায়েস, সে বড়ই কৃপণ।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “কৃপণতা অপেক্ষা জঘন্য রোগ আর কি আছে? জেনে রেখো যে, তোমাদের নেতা হচ্ছে সাদা দেহ ও সুন্দর চুল বিশিষ্ট নব যুবক বিশর ইবনে বারা ইবনে মা’রূর।”নিশ্চয়ই জাহান্নাম কাফিরদেরকে পরিবেষ্টনকারী। তারা জাহান্নাম থেকে রক্ষাও পাবে না, পালাতেও পারবে না এবং মুক্তি পাবে না।
আত-তাওবা 9:50
৫০-৫১ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা ঐ মুনাফিকদের অন্তরের কুটিলতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, মুসলিমদের বিজয়, সাহায্য, কল্যাণ ও উন্নতি লাভে তারা অত্যন্ত চিন্তান্বিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, আর আল্লাহ না করুন, যদি মুসলিমদের উপর কোন বিপদ এসে পড়ে তখন তারা মনে খুবই আনন্দ লাভ করে এবং নিজেদের চতুরতার প্রশংসা করে। তারা বলেঃ “এই কারণেই তো আমরা তাদের থেকে দূরে রয়েছি।” এই বলে তারা আনন্দে উৎফুল্ল হয়। আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে বলেন, তোমরা ঐ মুনাফিকদেরকে উত্তর দাও- দুঃখ ও অশান্তি আমাদের তকদীরের লিখন এবং আমরা স্বয়ং আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার অধীন। তিনিই আমাদের অভিভাবক, তিনিই আমাদের প্রতিপালক, তিনিই আমাদের আশ্রয়স্থল। আমরা মুমিন, আর মুমিনদের ভরসা আল্লাহর উপর। তিনি আমাদের জন্যে যথেষ্ট। তিনিই উত্তম কার্যসম্পাদনকারী ।
আত-তাওবা 9:51
৫০-৫১ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা ঐ মুনাফিকদের অন্তরের কুটিলতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, মুসলিমদের বিজয়, সাহায্য, কল্যাণ ও উন্নতি লাভে তারা অত্যন্ত চিন্তান্বিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, আর আল্লাহ না করুন, যদি মুসলিমদের উপর কোন বিপদ এসে পড়ে তখন তারা মনে খুবই আনন্দ লাভ করে এবং নিজেদের চতুরতার প্রশংসা করে। তারা বলেঃ “এই কারণেই তো আমরা তাদের থেকে দূরে রয়েছি।” এই বলে তারা আনন্দে উৎফুল্ল হয়। আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে বলেন, তোমরা ঐ মুনাফিকদেরকে উত্তর দাও- দুঃখ ও অশান্তি আমাদের তকদীরের লিখন এবং আমরা স্বয়ং আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার অধীন। তিনিই আমাদের অভিভাবক, তিনিই আমাদের প্রতিপালক, তিনিই আমাদের আশ্রয়স্থল। আমরা মুমিন, আর মুমিনদের ভরসা আল্লাহর উপর। তিনি আমাদের জন্যে যথেষ্ট। তিনিই উত্তম কার্যসম্পাদনকারী ।
আত-তাওবা 9:52
৫২-৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসুল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ হে রাসূল! ঐ মুনাফিকদেরকে বলে দাও- তোমরা আমাদের জন্যে দু'টি মঙ্গলের মধ্যে একটি মঙ্গলেরই প্রতীক্ষায় রয়েছে। অর্থাৎ যদি আমরা যুদ্ধে শহীদ হয়ে যাই তবে আমাদের জন্যে রয়েছে জান্নাত। এটাও আমাদের জন্যে মঙ্গল। আর যদি বিজয় লাভ করি ও গনীমতের অধিকারী হই তবে এটাও মঙ্গল। সুতরাং হে মুনাফিকের দল! তোমরা যে আমাদের ব্যাপারে অপেক্ষা করছো যে, দেখা যাক কি ঘটে, তবে জেনে রেখো যে, আমাদের জয়-পরাজয় যাই ঘটুক না কেন, দুটোই আমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। আর আমরা তোমাদের ব্যাপারে যার অপেক্ষা করছি তা হচ্ছে দু'টি মন্দের একটি মন্দ। অর্থাৎ হয়তো তোমাদের উপর আল্লাহর আযাব সরাসরি এসে যাবে অথবা আমাদের হাতে তোমাদের উপর আল্লাহর মার পড়বে। তা এই ভাবে যে, তোমরা আমাদের হাতে নিহত হবে অথবা বন্দী হবে। আচ্ছা, এখন তোমরা ও আমরা নিজ নিজ জায়গায় প্রতীক্ষায় থাকি, দেখা যাক গায়েবের পর্দা থেকে কি প্রকাশ পায়!জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের দান-খয়রাতের আশাবাদী নন। তোমরা খুশী মনে খরচ কর বা অসন্তুষ্ট চিত্তে, কোন অবস্থাতেই আল্লাহ তোমাদের দান কবুল করবেন না। (লুবাব গ্রন্থে রয়েছে, ইবনে জারীর (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, জাদ ইবনে কায়েস বলে “আমি দেখি যে, ধৈর্যধারণের শক্তি আমার নেই। তবে হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করবো।” তখন আল্লাহ তা'আলা . আয়াতটি অবতীর্ণ করেন) কেননা তোমরা তো ফাসেক বা আল্লাহর আদেশ লংঘনকারী সমাজ। তোমাদের দান-খয়রাত কবুল না করার কারণ হচ্ছে তোমাদের কুফরী। আর আমল কবূল হওয়ার শর্ত হচ্ছে কুফরী না থাকা, বরং ঈমান থাকা। তা ছাড়া কোন কাজেই তোমাদের সদিচ্ছা ও সৎ সাহস নেই । সালাত আদায় করলেও তোমরা উদাসীনতার সাথে আদায় করে থাকো। তাতে তোমাদের কোন মনোযোগ থাকে না । অলসভাবে তোমরা লোককে দেখিয়ে জামাআতে হাযির হও এবং দু’চার সিজদা দিয়ে দাও। কিন্তু তোমাদের মন থাকে সালাত থেকে সম্পূর্ণ গাফেল। সত্যবাদী ও সত্যায়িত রাসূল (সঃ) সংবাদ দিয়েছেনঃ “আল্লাহ বিরক্ত হন না যে পর্যন্ত না তোমরা বিরক্ত হও। আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিসই ককূল করে থাকেন। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এসব ফাসেকের দান-খয়রাত ও আমল কবুল করবেন না। কেননা, তিনি একমাত্র পরহেযগার লোকদের আমলই কবুল করে থাকেন।
আত-তাওবা 9:53
৫২-৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসুল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ হে রাসূল! ঐ মুনাফিকদেরকে বলে দাও- তোমরা আমাদের জন্যে দু'টি মঙ্গলের মধ্যে একটি মঙ্গলেরই প্রতীক্ষায় রয়েছে। অর্থাৎ যদি আমরা যুদ্ধে শহীদ হয়ে যাই তবে আমাদের জন্যে রয়েছে জান্নাত। এটাও আমাদের জন্যে মঙ্গল। আর যদি বিজয় লাভ করি ও গনীমতের অধিকারী হই তবে এটাও মঙ্গল। সুতরাং হে মুনাফিকের দল! তোমরা যে আমাদের ব্যাপারে অপেক্ষা করছো যে, দেখা যাক কি ঘটে, তবে জেনে রেখো যে, আমাদের জয়-পরাজয় যাই ঘটুক না কেন, দুটোই আমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। আর আমরা তোমাদের ব্যাপারে যার অপেক্ষা করছি তা হচ্ছে দু'টি মন্দের একটি মন্দ। অর্থাৎ হয়তো তোমাদের উপর আল্লাহর আযাব সরাসরি এসে যাবে অথবা আমাদের হাতে তোমাদের উপর আল্লাহর মার পড়বে। তা এই ভাবে যে, তোমরা আমাদের হাতে নিহত হবে অথবা বন্দী হবে। আচ্ছা, এখন তোমরা ও আমরা নিজ নিজ জায়গায় প্রতীক্ষায় থাকি, দেখা যাক গায়েবের পর্দা থেকে কি প্রকাশ পায়!জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের দান-খয়রাতের আশাবাদী নন। তোমরা খুশী মনে খরচ কর বা অসন্তুষ্ট চিত্তে, কোন অবস্থাতেই আল্লাহ তোমাদের দান কবুল করবেন না। (লুবাব গ্রন্থে রয়েছে, ইবনে জারীর (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, জাদ ইবনে কায়েস বলে “আমি দেখি যে, ধৈর্যধারণের শক্তি আমার নেই। তবে হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করবো।” তখন আল্লাহ তা'আলা . আয়াতটি অবতীর্ণ করেন) কেননা তোমরা তো ফাসেক বা আল্লাহর আদেশ লংঘনকারী সমাজ। তোমাদের দান-খয়রাত কবুল না করার কারণ হচ্ছে তোমাদের কুফরী। আর আমল কবূল হওয়ার শর্ত হচ্ছে কুফরী না থাকা, বরং ঈমান থাকা। তা ছাড়া কোন কাজেই তোমাদের সদিচ্ছা ও সৎ সাহস নেই । সালাত আদায় করলেও তোমরা উদাসীনতার সাথে আদায় করে থাকো। তাতে তোমাদের কোন মনোযোগ থাকে না । অলসভাবে তোমরা লোককে দেখিয়ে জামাআতে হাযির হও এবং দু’চার সিজদা দিয়ে দাও। কিন্তু তোমাদের মন থাকে সালাত থেকে সম্পূর্ণ গাফেল। সত্যবাদী ও সত্যায়িত রাসূল (সঃ) সংবাদ দিয়েছেনঃ “আল্লাহ বিরক্ত হন না যে পর্যন্ত না তোমরা বিরক্ত হও। আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিসই ককূল করে থাকেন। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এসব ফাসেকের দান-খয়রাত ও আমল কবুল করবেন না। কেননা, তিনি একমাত্র পরহেযগার লোকদের আমলই কবুল করে থাকেন।
আত-তাওবা 9:54
৫২-৫৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসুল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ হে রাসূল! ঐ মুনাফিকদেরকে বলে দাও- তোমরা আমাদের জন্যে দু'টি মঙ্গলের মধ্যে একটি মঙ্গলেরই প্রতীক্ষায় রয়েছে। অর্থাৎ যদি আমরা যুদ্ধে শহীদ হয়ে যাই তবে আমাদের জন্যে রয়েছে জান্নাত। এটাও আমাদের জন্যে মঙ্গল। আর যদি বিজয় লাভ করি ও গনীমতের অধিকারী হই তবে এটাও মঙ্গল। সুতরাং হে মুনাফিকের দল! তোমরা যে আমাদের ব্যাপারে অপেক্ষা করছো যে, দেখা যাক কি ঘটে, তবে জেনে রেখো যে, আমাদের জয়-পরাজয় যাই ঘটুক না কেন, দুটোই আমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। আর আমরা তোমাদের ব্যাপারে যার অপেক্ষা করছি তা হচ্ছে দু'টি মন্দের একটি মন্দ। অর্থাৎ হয়তো তোমাদের উপর আল্লাহর আযাব সরাসরি এসে যাবে অথবা আমাদের হাতে তোমাদের উপর আল্লাহর মার পড়বে। তা এই ভাবে যে, তোমরা আমাদের হাতে নিহত হবে অথবা বন্দী হবে। আচ্ছা, এখন তোমরা ও আমরা নিজ নিজ জায়গায় প্রতীক্ষায় থাকি, দেখা যাক গায়েবের পর্দা থেকে কি প্রকাশ পায়!জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের দান-খয়রাতের আশাবাদী নন। তোমরা খুশী মনে খরচ কর বা অসন্তুষ্ট চিত্তে, কোন অবস্থাতেই আল্লাহ তোমাদের দান কবুল করবেন না। (লুবাব গ্রন্থে রয়েছে, ইবনে জারীর (রঃ) তাখরীজ করেছেন যে, জাদ ইবনে কায়েস বলে “আমি দেখি যে, ধৈর্যধারণের শক্তি আমার নেই। তবে হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করবো।” তখন আল্লাহ তা'আলা . আয়াতটি অবতীর্ণ করেন) কেননা তোমরা তো ফাসেক বা আল্লাহর আদেশ লংঘনকারী সমাজ। তোমাদের দান-খয়রাত কবুল না করার কারণ হচ্ছে তোমাদের কুফরী। আর আমল কবূল হওয়ার শর্ত হচ্ছে কুফরী না থাকা, বরং ঈমান থাকা। তা ছাড়া কোন কাজেই তোমাদের সদিচ্ছা ও সৎ সাহস নেই । সালাত আদায় করলেও তোমরা উদাসীনতার সাথে আদায় করে থাকো। তাতে তোমাদের কোন মনোযোগ থাকে না । অলসভাবে তোমরা লোককে দেখিয়ে জামাআতে হাযির হও এবং দু’চার সিজদা দিয়ে দাও। কিন্তু তোমাদের মন থাকে সালাত থেকে সম্পূর্ণ গাফেল। সত্যবাদী ও সত্যায়িত রাসূল (সঃ) সংবাদ দিয়েছেনঃ “আল্লাহ বিরক্ত হন না যে পর্যন্ত না তোমরা বিরক্ত হও। আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিসই ককূল করে থাকেন। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এসব ফাসেকের দান-খয়রাত ও আমল কবুল করবেন না। কেননা, তিনি একমাত্র পরহেযগার লোকদের আমলই কবুল করে থাকেন।
আত-তাওবা 9:55
আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেন, তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততির প্রাচুর্য যেন তোমাকে বিস্মিত না করে। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “তুমি কদাচ ঐসব বস্তুর প্রতি চোখ তুলেও দেখো না, যদদ্বারা আমি কাফিরদের বিভিন্ন সম্প্রদায়কে উপভোগী করে রেখেছি, এটা শুধু পার্থিব জীবনের চাকচিক্য, তাদেরকে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে, আর তোমার প্রতিপালকের দান বহুগুণে শ্রেয় এবং অধিক স্থায়ী।” হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে- এটা তাদের পক্ষে ভাল ও খুশীর ব্যাপার নয়। এটা তো তাদের জন্যে পার্থিব শাস্তিও বটে। কেননা, না এর দ্বারা যাকাত আদায় করা যাবে, না আল্লাহর পথে খরচ করা চলবে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হবে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী, অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তাদের পার্থিব ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে, আল্লাহর উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, এসব বস্তুর কারণে তিনি পরকালে তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। ইবনে জারীর (রঃ) হাসান (রঃ)-এর উক্তিকেই পছন্দ করেছেন এবং এ উক্তিটিই দৃঢ় ও উত্তমও বটে।তারা ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততির মধ্যে এমনভাবে জড়িত হয়ে পড়বে যে, মৃত্যু পর্যন্ত হিদায়াত তাদের ভাগ্যে জুটবে না। এমনভাবে ধীরে ধীরে তাদেরকে পাকড়াও করা হবে যে, তারা টেরও পাবে না। এই ধন-সম্পদই জাহান্নামের আগুনে পরিণত হবে। আমরা এর থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
আত-তাওবা 9:56
৫৬-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের অস্থিরতা, হতবুদ্ধিতা, উদ্বেগ, সন্ত্রাস ও ব্যাকুলতার সংবাদ দিচ্ছেন। তিনি বলছেন- হে মুসলিমরা! এই মুনাফিকরা তোমাদের কাছে এসে তোমাদের মন জয় করার উদ্দেশ্যে এবং তোমাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে লম্বা চওড়া কসম করে করে বলেঃ “আল্লাহর শপথ! আমরা তোমাদের সাথেই রয়েছি, আমরা মুসলিম।” অথচ প্রকৃত ব্যাপার এর বিপরীত। এটা শুধু ভয় ও সন্ত্রাস, যা তাদের পেটে ব্যথা সৃষ্টি করছে। আজ যদি তারা নিজেদের রক্ষার জন্যে কোন দুর্গ পেয়ে যায় বা অন্য কোন সুরক্ষিত স্থান দেখতে পায় অথবা কোন সুড়ঙ্গের সংবাদ পায় তবে তারা সবাই উন্নতশিরে ঊর্ধ্বশ্বাসে ঐ দিকে ধাবিত হবে। তাদের একজনকেও তোমার কাছে দেখা যাবে না। কেননা, প্রকতপক্ষে তোমার সাথে তাদের কোন ভালবাসা ও বন্ধুতুই নেই। তারা তো শুধু ভয়ে বাধ্য হয়ে তোমাদেরকে তোষামোদ করতে আসছে। একমাত্র এই কারণেই যতোই ইসলামের উন্নতি হচ্ছে ততোই তারা মনঃক্ষুন্ন হচ্ছে। মুসলিমদের কল্যাণে ও খুশীতে তারা জ্বলে পুড়ে মরছে। তোমাদের উন্নতি এদের সহ্য হচ্ছে না। সুযোগ পেলেই তারা আশ্রয়স্থলের দিকে দৌড়িয়ে পালাবে।
আত-তাওবা 9:57
৫৬-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের অস্থিরতা, হতবুদ্ধিতা, উদ্বেগ, সন্ত্রাস ও ব্যাকুলতার সংবাদ দিচ্ছেন। তিনি বলছেন- হে মুসলিমরা! এই মুনাফিকরা তোমাদের কাছে এসে তোমাদের মন জয় করার উদ্দেশ্যে এবং তোমাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে লম্বা চওড়া কসম করে করে বলেঃ “আল্লাহর শপথ! আমরা তোমাদের সাথেই রয়েছি, আমরা মুসলিম।” অথচ প্রকৃত ব্যাপার এর বিপরীত। এটা শুধু ভয় ও সন্ত্রাস, যা তাদের পেটে ব্যথা সৃষ্টি করছে। আজ যদি তারা নিজেদের রক্ষার জন্যে কোন দুর্গ পেয়ে যায় বা অন্য কোন সুরক্ষিত স্থান দেখতে পায় অথবা কোন সুড়ঙ্গের সংবাদ পায় তবে তারা সবাই উন্নতশিরে ঊর্ধ্বশ্বাসে ঐ দিকে ধাবিত হবে। তাদের একজনকেও তোমার কাছে দেখা যাবে না। কেননা, প্রকতপক্ষে তোমার সাথে তাদের কোন ভালবাসা ও বন্ধুতুই নেই। তারা তো শুধু ভয়ে বাধ্য হয়ে তোমাদেরকে তোষামোদ করতে আসছে। একমাত্র এই কারণেই যতোই ইসলামের উন্নতি হচ্ছে ততোই তারা মনঃক্ষুন্ন হচ্ছে। মুসলিমদের কল্যাণে ও খুশীতে তারা জ্বলে পুড়ে মরছে। তোমাদের উন্নতি এদের সহ্য হচ্ছে না। সুযোগ পেলেই তারা আশ্রয়স্থলের দিকে দৌড়িয়ে পালাবে।
আত-তাওবা 9:58
৫৮-৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: কোন কোন মুনাফিক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অপবাদ দিতো যে, তিনি যাকাতের মালের সঠিক বণ্টন করেন না ইত্যাদি। আর এর দ্বারা তার থেকে কিছু লাভ করা ছাড়া তাদের আর কিছুই উদ্দেশ্য ছিল না। তার থেকে কিছু পেলে তো তারা খুবই সন্তুষ্ট হয়, আর না পেলে মনঃক্ষুন্ন হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাকাতের মাল যখন এদিক ওদিক বণ্টন করে দেন, তখন আনসারদের একজন উচ্চৈঃস্বরে বলেঃ “এটা ইনসাফ নয়।” তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।অন্য একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সোনা রূপা বণ্টন করছিলেন। এমতাবস্থায় একজন গ্রাম্য নওমুসলিম তার কাছে এসে বলেঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আল্লাহর কসম! আল্লাহ যদি আপনাকে ইনসাফের নির্দেশ দিয়ে থাকেন তবে কিন্তু আপনি ইনসাফ করছেন না। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “তুমি ধ্বংস হও। আমিই যদি ইনসাফকারী না হই তবে যমীনে ইনসাফকারী আর কে হবে?” অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমরা এই ব্যক্তি থেকে এবং এর সাথে সাদৃশ্যযুক্ত লোক থেকে বেঁচে থাকো। আমার উম্মতের মধ্যে এর মত লোক হবে। তারা কুরআন পাঠ করবে বটে, কিন্তু তা তাদের কণ্ঠ থেকে নীচে নামবে না। তারা যখন বের হবে তখন তাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। আবার যখন বের হবে তখন তাদেরকে মেরে ফেলো। পুনরায় যখন প্রকাশ পাবে তখন তাদের গর্দান উড়িয়ে দেবে।" এরপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে কিছু প্রদানও করবো না এবং তোমাদেরকে তা থেকে বাধাও দিবো না, আমি তো একজন খাজাঞ্চী মাত্র।” আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হুনায়েনের গনীমতের মাল বণ্টন করছিলেন তখন যুলখুওয়াইসিরা হারকুস নামক একটি লোক আপত্তি করে বলেঃ “ইনসাফ করুন, কেননা আপনি ইনসাফ করছেন না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি ধ্বংস হও, যদি না আমি ইনসাফ করে থাকি।” অতঃপর তিনি তাকে চলে যেতে দেখে বললেনঃ “এর বংশ থেকে এমন এক কওম বের হবে যাদের সালাতের তুলনায় তোমাদের সালাত নগণ্য মনে হবে এবং যাদের রামাদানের তুলনায় তোমাদের রামাদান তুচ্ছ মনে হবে। কিন্তু তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমনভাবে তীর নিক্ষেপকারীর নিকট থেকে তীর বেরিয়ে যায়। তাদেরকে তোমরা যেখানেই পাবে হত্যা করবে। আকাশের নীচে তাদের অপেক্ষা নিকৃষ্টতম হত্যাযযাগ্য আর কেউ নেই।” পরে অবশিষ্ট হাদীস বর্ণনা করেন।ইরশাদ হচ্ছে- তাদেরকে আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর মাধ্যমে যা কিছু দান করেছেন, ওর উপর যদি তারা তুষ্ট থাকতো এবং ধৈর্যধারণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলতো- “আল্লাহই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। তিনি স্বীয় অনুগ্রহে তাঁর রাসূল (সঃ)-এর মাধ্যমে আমাদেরকে আরো দান করবেন। আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা আমাদের প্রতিপালকের সত্তার সাথেই জড়িত।” তাহলে এটা তাদের পক্ষে খুবই উত্তম হতো। সুতরাং মহান আল্লাহ এখানে এই শিক্ষা দিলেন যে, তিনি যা কিছু দান করবেন তার উপর মানুষের সবর ও শশার করা উচিত। সকল কাজে তাঁরই উপর ভরসা করতে হবে এবং তাঁকেই যথেষ্ট মনে করতে হবে। আগ্রহ, মনোযোগ, লোভ, আশা ইত্যাদির সম্পর্ক তাঁর সাথেই রাখা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্যের ব্যাপারে চুল পরিমাণও যেন ক্রটি না হয়। আর আল্লাহ তা'আলার কাছে এই তাওফীক চাইতে হবে যে, তিনি যেন তাঁর হুকুম পালনের, নিষিদ্ধ কাজ বর্জনের, ভাল কথা মেনে নেয়ার এবং সঠিক আনুগত্যের দিকে পথ প্রদর্শন করেন!
আত-তাওবা 9:59
৫৮-৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: কোন কোন মুনাফিক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অপবাদ দিতো যে, তিনি যাকাতের মালের সঠিক বণ্টন করেন না ইত্যাদি। আর এর দ্বারা তার থেকে কিছু লাভ করা ছাড়া তাদের আর কিছুই উদ্দেশ্য ছিল না। তার থেকে কিছু পেলে তো তারা খুবই সন্তুষ্ট হয়, আর না পেলে মনঃক্ষুন্ন হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাকাতের মাল যখন এদিক ওদিক বণ্টন করে দেন, তখন আনসারদের একজন উচ্চৈঃস্বরে বলেঃ “এটা ইনসাফ নয়।” তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।অন্য একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সোনা রূপা বণ্টন করছিলেন। এমতাবস্থায় একজন গ্রাম্য নওমুসলিম তার কাছে এসে বলেঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আল্লাহর কসম! আল্লাহ যদি আপনাকে ইনসাফের নির্দেশ দিয়ে থাকেন তবে কিন্তু আপনি ইনসাফ করছেন না। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “তুমি ধ্বংস হও। আমিই যদি ইনসাফকারী না হই তবে যমীনে ইনসাফকারী আর কে হবে?” অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমরা এই ব্যক্তি থেকে এবং এর সাথে সাদৃশ্যযুক্ত লোক থেকে বেঁচে থাকো। আমার উম্মতের মধ্যে এর মত লোক হবে। তারা কুরআন পাঠ করবে বটে, কিন্তু তা তাদের কণ্ঠ থেকে নীচে নামবে না। তারা যখন বের হবে তখন তাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। আবার যখন বের হবে তখন তাদেরকে মেরে ফেলো। পুনরায় যখন প্রকাশ পাবে তখন তাদের গর্দান উড়িয়ে দেবে।" এরপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে কিছু প্রদানও করবো না এবং তোমাদেরকে তা থেকে বাধাও দিবো না, আমি তো একজন খাজাঞ্চী মাত্র।” আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হুনায়েনের গনীমতের মাল বণ্টন করছিলেন তখন যুলখুওয়াইসিরা হারকুস নামক একটি লোক আপত্তি করে বলেঃ “ইনসাফ করুন, কেননা আপনি ইনসাফ করছেন না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি ধ্বংস হও, যদি না আমি ইনসাফ করে থাকি।” অতঃপর তিনি তাকে চলে যেতে দেখে বললেনঃ “এর বংশ থেকে এমন এক কওম বের হবে যাদের সালাতের তুলনায় তোমাদের সালাত নগণ্য মনে হবে এবং যাদের রামাদানের তুলনায় তোমাদের রামাদান তুচ্ছ মনে হবে। কিন্তু তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমনভাবে তীর নিক্ষেপকারীর নিকট থেকে তীর বেরিয়ে যায়। তাদেরকে তোমরা যেখানেই পাবে হত্যা করবে। আকাশের নীচে তাদের অপেক্ষা নিকৃষ্টতম হত্যাযযাগ্য আর কেউ নেই।” পরে অবশিষ্ট হাদীস বর্ণনা করেন।ইরশাদ হচ্ছে- তাদেরকে আল্লাহ স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর মাধ্যমে যা কিছু দান করেছেন, ওর উপর যদি তারা তুষ্ট থাকতো এবং ধৈর্যধারণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলতো- “আল্লাহই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। তিনি স্বীয় অনুগ্রহে তাঁর রাসূল (সঃ)-এর মাধ্যমে আমাদেরকে আরো দান করবেন। আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা আমাদের প্রতিপালকের সত্তার সাথেই জড়িত।” তাহলে এটা তাদের পক্ষে খুবই উত্তম হতো। সুতরাং মহান আল্লাহ এখানে এই শিক্ষা দিলেন যে, তিনি যা কিছু দান করবেন তার উপর মানুষের সবর ও শশার করা উচিত। সকল কাজে তাঁরই উপর ভরসা করতে হবে এবং তাঁকেই যথেষ্ট মনে করতে হবে। আগ্রহ, মনোযোগ, লোভ, আশা ইত্যাদির সম্পর্ক তাঁর সাথেই রাখা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আনুগত্যের ব্যাপারে চুল পরিমাণও যেন ক্রটি না হয়। আর আল্লাহ তা'আলার কাছে এই তাওফীক চাইতে হবে যে, তিনি যেন তাঁর হুকুম পালনের, নিষিদ্ধ কাজ বর্জনের, ভাল কথা মেনে নেয়ার এবং সঠিক আনুগত্যের দিকে পথ প্রদর্শন করেন!
আত-তাওবা 9:60
পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঐ অজ্ঞ মুনাফিকদের বর্ণনা দিয়েছেন যারা সাদকা বণ্টনের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর আপত্তি উঠিয়েছিল। এখন এই আয়াতে বর্ণনা করছেন যে, যাকাতের মাল বণ্টন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়। বরং যাকাত বন্টন করার ক্ষেত্রগুলো স্বয়ং আল্লাহ বাতলিয়ে দিয়েছেন। সুনানে আবি দাউদে যিয়াদ ইবনে হারিস সুদাঈ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে তার হাতে বায়আত গ্রহণ করেছি, এমন সময় একটি লোক এসে তাঁর কাছে আবেদন করে- “সাদকার (যাকাতের) মাল থেকে আমাকে কিছু দান করুন!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সাদকার ব্যাপারে আল্লাহ নবী বা অন্য কারো ইচ্ছার উপর সন্তুষ্ট নন, বরং তিনি নিজেই তা বণ্টনের আটটি ক্ষেত্র নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং যদি তুমি এই ৮টি ক্ষেত্রের কোন একটির মধ্যে পড় তবে আমি তোমাকে দিতে পারি।এখন যাকাতের মাল এই আট প্রকার লোকের মধ্যেই বণ্টন করা ওয়াজিব, নাকি যে কোন এক প্রকারের লোককে দিলেই চলবে, এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও একদল আলেম বলেন যে, যাকাতের মাল এই আট প্রকারের সমস্ত লোকের উপর বণ্টন করা ওয়াজিব। দ্বিতীয় উক্তি হচ্ছে এই যে, সকল প্রকার লোকের উপর বণ্টন করা ওয়াজিব নয়, বরং যে কোন এক প্রকারের লোককে দিলেই যথেষ্ট হবে যদিও অন্য প্রকারের লোকও বিদ্যমান থাকে। এ উক্তি হচ্ছে ইমাম মালিক (রঃ) এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এক দল গুরুজনের। তাদের মধ্যে রয়েছেন উমার (রাঃ), হুযাইফা (রাঃ), ইবনে আব্বাস (রাঃ), আবুল আলিয়া (রঃ) সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) এবং মাইমুন ইবনে মাহরান (রঃ)।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, সাধারণ আহলুল ইলমের উক্তিও এটাই। এ আয়াতে যাকাত খরচের ক্ষেত্র বর্ণনা করা হয়েছে, সমস্ত প্রকারের লোককে দেয়ার কথা বর্ণিত হয়নি। এসব উক্তির দলীল প্রমাণাদি ও তর্ক-বিতর্কের স্থান এ কিতাব নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সর্বপ্রথম ফকীরদের বর্ণনা দেয়ার কারণ এই যে, তাদের প্রয়োজন অত্যন্ত বেশী, যদিও ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর মতে মিসকীনের অবস্থা ফকীরের চাইতেও কঠিন। উমার (রাঃ) বলেন যে, যার হাতে কোন মাল নেই শুধু তাকেই ফকীর বলা হয় না, বরং যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে, কিছু পানাহারও করছে এবং কিছু আয় উপার্জনও করছে সেও ফকীর। ইবনে আলিয়্যাহ (রঃ) বলেন যে, এই রিওয়ায়াতে (আরবী) শব্দ রয়েছে। আর আমাদের মতে (আরবী) বলা হয় তিজারত বা ব্যবসাকে। কিন্তু জমহুর এর বিপরীত মত পোষণ করেন। বহু গুরুজন বলেন যে, ফকীর হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বেঁচে থাকে। আর মিসকীন বলা হয় ভিক্ষুককে, যে লোকদের পিছু ধরে এবং ঘরে ঘরে ও অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ায়। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ফকীর হচ্ছে রোগাক্রান্ত ব্যক্তি এবং মিস্কীন হচ্ছে সুস্থ সবল লোক। ইবরাহীম (রঃ) বলেন যে, এখানে ফকীর দ্বারা মুহাজির ফকীরদেরকে বুঝানো হয়েছে। সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- পল্লীবাসীরা এর থেকে কিছুই পাবে না। ইকরামা (রঃ) বলেনঃ “দরিদ্র মুসলিমদেরকে মিসকীন বলো না, মিসকীন তো হচ্ছে আহলে কিতাবের লোক।”এখন ঐ হাদীসগুলো বর্ণনা করা হচ্ছে যেগুলো এই আট প্রকারের সম্পর্কে এসেছেঃ(১) (আরবী) ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন ঃ “সাদকা ধনী ও সুস্থ সবলের জন্যে হালাল নয়। দু’টি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে সাদকার মাল চাইলো। তিনি তখন তাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত সারা দেহ ভালভাবে দেখে বুঝতে পারলেন যে, তারা সুস্থ ও বলবান। লোক। সুতরাং তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা যদি চাও তবে আমি তোমাদেরকে দিতে পারি। তবে জেনে রেখো যে, ধনী, শক্তিশালী ও উপার্জনক্ষম ব্যক্তির এতে কোন অংশ নেই।”(২) (আরবী) আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই ঘোরাফেরাকারী ব্যক্তি মিসকীন নয়, যে লোকদের কাছে ঘোরাফেরা করে অতঃপর তাকে সে এক গ্রাস বা দু’গ্রাস (খাদ্য) এবং একটি বা দু’টি খেজুর প্রদান করে।” জনগণ জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তা হলে মিসকীন কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “যার কাছে এমন কিছু নেই যার দ্বারা সে অমুখাপেক্ষী হতে পারে, যার এমন অবস্থা প্রকাশ পায় না যা দেখে মানুষ তার অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে কিছু দান করে এবং যে কারো কাছে ভিক্ষা চায় না।”(৩) (আরবী) এরা হচ্ছে তহসীলদার। তারা ঐ সাদকার (যাকাতের) মাল থেকেই মজুরী পাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আত্মীয়-স্বজন, যাদের উপর সাদকা হারাম, এই পদে আসতে পারেন না। আব্দুল মুত্তালিব ইবনে রাবীআ ইবনে হারিস (রাঃ) এবং ফযল ইবনে আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে আবেদন করেনঃ “আমাদেরকে সাদকা আদায়কারী নিযুক্ত করুন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “মুহাম্মাদ (সঃ) ও তার বংশধরদের জন্যে সাদকা হারাম। এটা তো লোকদের ময়লা-আবর্জনা।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(৪) (আরবী) এর কয়েকটি প্রকার রয়েছে। কাউকে এই কারণে দেয়া হয় যে, এর ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করবে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াকে হুনায়েনের যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীমতের মাল থেকে প্রদান করেছিলেন। অথচ ঐ সময় সে কুফরী অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বের হয়েছিল। সে নিজেই বর্ণনা করেছেঃ “তাঁর দান ও সুবিচার আমার অন্তরে সবচেয়ে বেশী তাঁর প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি করেছিল। অথচ ইতিপূর্বে তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রু আমিই ছিলাম। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আবার কাউকে এ জন্যে দেয়া হয় যে, এর ফলে তার ইসলাম দঢ় হয়ে যাবে। আর ইসলামের উপর তার মন বসে যাবে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুনায়েনের যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীমতের মাল থেকে মক্কার আযাদকৃত লোকদের সর্দারদেরকে শত শত উট দান করেছিলেন এবং বলেছিলেনঃ “আমি একজনকে দিয়ে থাকি এবং তার চেয়ে আমার নিকট প্রিয়জনকে দিই না এই ভয়ে যে (তাকে না দিলে সে ইসলাম থেকে ফিরে যাবে, ফলে) তাকে উল্টো মুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার আলী (রাঃ) ইয়ামন থেকে মাটি মিশ্রিত কাঁচা সোনা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে প্রেরণ করেন। তিনি তা শুধুমাত্র চারজন লোকের মধ্যে বণ্টন করে দেন। তারা হলেনঃ (১) আকরা ইবনে হাবিস (রাঃ), (২) উয়াইনা ইবনে বদর (রাঃ), (৩) আলকামা ইবনে আলাসা (রাঃ) এবং (৪) যায়েদ আল খায়ের (রাঃ)। তিনি বলেনঃ “তাদের মন জয় করার উদ্দেশ্যে আমি এটা তাদেরকে প্রদান করেছি।” কাউকে এ জন্যেও দেয়া হয় যে, সে পার্শ্ববর্তী লোকদের কাছে তা পৌছিয়ে দিবে অথবা আশেপাশের শত্রুদের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখবে এবং তাদেরকে মুসলিমদের উপর আক্রমণ করার সুযোগ দিবে না। এসব বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ দেয়ার স্থান হচ্ছে আহকাম ও ফুরূ’র কিতাবগুলো, এই তাফসীর নয়। আল্লাহ তাআলাই এসব বিষয়ে সঠিক ও সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।উমার (রাঃ), আমির শাবী (রঃ) এবং এক দল আলেমের উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইতেকালের পর সাদকা (যাকাত) খরচের এ ক্ষেত্রগুলো আর বাকী নেই। কেননা, আল্লাহ তা'আলা ইসলামের মর্যাদা দান করেছেন। মুসলিমরা আজ দেশসমূহের মালিক হয়ে বসেছে এবং আল্লাহর বহু বান্দা তাদের অধীনস্থ রয়েছে। কিন্তু অন্যান্য গুরুজনদের উক্তি এই যে, মন জয়ের উদ্দেশ্যে এখনও যাকাতের মাল খরচ করা জায়েয। মক্কা বিজয় এবং হাওয়াযেন বিজয়ের পরেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ লোকদেরকে সাদকার মাল প্রদান করেছিলেন। দ্বিতীয়তঃ এখনও এরূপ প্রয়োজন দেখা দিয়ে থাকে। (৫) (আরবী) গোলাম আযাদ করার ব্যাপারে বহু বুযুর্গ ব্যক্তি বলেন যে, এর দ্বারা ঐ গোলামদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা টাকার একটা অংক নির্ধারণ করে তাদের মনিবদের সাথে আযাদী লাভের শর্ত করে নিয়েছে। যাকাতের মাল থেকে এই গোলামদেরকে এই পরিমাণ টাকা দেয়া যাবে, যাতে তারা তা আদায় করে আযাদী লাভ করতে পারে। অন্যান্য বুযুর্গগণ বলেন যে, যে গোলাম মনিবের সাথে এরূপ গোলামকেও যাকাতের মাল দিয়ে খরিদ করে নিয়ে আযাদ করে দিতে কোনই অসুবিধা নেই। মোটকথা, মুকাতাব গোলাম’ (মুকাতাব ঐ গোলামকে বলা হয় যার মনিব তাকে তার ক্রয় মূল্য উপার্জন করে দেয়ার শর্তে মুক্তির কথা দিয়েছে) বা সাধারণ গোলামকে আযাদকরণও যাকাত খরচের একটি ক্ষেত্র। হাদীসেও এর অনেক ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। এমন কি বলা হয়েছে যে, আযাদকৃত গোলামের প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে আযাদকারীর প্রতিটি অঙ্গকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন, এমন কি লজ্জাস্থানের বিনিময়ে লজ্জা স্থানকেও। কেননা, প্রত্যেক পুণ্যের বিনিময় ঐরূপই হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা যে আমল করতে তোমাদেরকে তারই প্রতিদান দেয়া হবে।” আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তিন প্রকার লোকের সাহায্য করা আল্লাহ তা'আলার দায়িত্বে রয়েছে। প্রথম ঐ গাযী, যে আল্লাহর পথে জিহাদ করে। দ্বিতীয় ঐ মুকাতাব গোলাম, যে তার চুক্তির টাকা আদায়ের ইচ্ছা করে। তৃতীয় ঐ বর বা বিয়ের পাত্র, যার বিয়ে করার উদ্দেশ্য হচ্ছে দুষ্কার্য থেকে রক্ষা পাওয়া।” বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন আমলের কথা বাতলিয়ে দিন যা আমাকে জান্নাতের নিকটবর্তী করবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ছাড়া অন্যান্য আসহাবে সুনান বর্ণনা করেছেন) রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তুমি নামা’ আযাদ কর ও গর্দান মুক্ত কর।” সে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দুটো তো একই।” তিনি বললেনঃ “না, নাসমা’ আযাদ করার অর্থ এই যে, তুমি একাই কোন গোলাম আযাদ করবে। আর গর্দান মুক্ত করার অর্থ এই যে, তুমি ওর মূল্যের ব্যাপারে সাহায্য করবে।” (এ কথার ভাবার্থ এই যে, একজন লোক একাকী একটা গোলাম আযাদ করতে পারছে না, তখন কয়েকজন মিলে এ গোলামের মূল্য সংগ্রহ করে ওকে ক্রয় করে আযাদ করে দিলো। এটাই হলো তার মূল্যের ব্যাপারে সাহায্য করা)(৬) (আরবী) এটাও কয়েক প্রকার। যেমন একটি লোক কারো বোঝা নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিলো বা কারো কর্জের সে যামিন হয়ে গেল। অতঃপর সে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হয়ে গেল অথবা নিজেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লো, কিংবা কেউ কোন নাফরমানীমূলক কাজ করার শাস্তিস্বরূপ তার উপর ঋণের বোঝা চেপে বসলো । তারপর সে তাওবাহ্ করলো। এমতাবস্থায় তাকে যাকাতের মাল দেয়া যাবে, যাতে সে এর দ্বারা তার এ ঋণ আদায় করতে পারে। এই মাসআলাটির মূল হচ্ছে কুবাইসা ইবনে মাখরিক আল্ হিলালি (রাঃ)-এর নিম্নের রিওয়ায়াতটিঃতিনি বলেন, আমি অন্যের (ঋণের) বোঝা নিজের ঘাড়ে নিয়ে ফেলেছিলাম। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে এ ব্যাপারে আবেদন নিবেদন করি। তিনি বলেনঃ “অপেক্ষা কর, আমার কাছে সাদকার (যাকাতের) মাল আসলে তা থেকে তোমাকে প্রদান করবো।” এরপর তিনি বলেনঃ “হে কুবাইসা! জেনে রেখো যে, তিন প্রকার লোকের জন্যেই শুধু ভিক্ষা হালাল। এক তো হচ্ছে যামিন ব্যক্তি যার জামানতের অর্থ পুরো না হওয়া পর্যন্ত তার জন্যে ভিক্ষা জায়েয। দ্বিতীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যার মাল কোন দৈব দুর্বিপাকে নষ্ট হয়ে গেছে, তার জন্যেও ভিক্ষা জায়েয যে পর্যন্ত না তার স্বচ্ছলতা ফিরে আসে। তৃতীয় হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যার ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন কাটে এবং তার কওমের তিনজন বিবেকবান লোক সাক্ষ্য দেয় যে, নিঃসন্দেহে অমুক ব্যক্তির ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন কাটে। তার জন্যেও ভিক্ষা করা জায়েয যে পর্যন্ত না সে কোন আশ্রয় লাভ করে এবং তার জীবিকার ব্যবস্থা হয়ে যায়। এই তিন প্রকারের লোক ছাড়া অন্যান্যদের জন্যে ভিক্ষা হারাম। যদি তারা ভিক্ষা করে কিছু খায় তবে অবৈধ উপায়ে হারাম খাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ)-এর যুগে একটি লোক একটি বাগান খরিদ করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাগানের ফল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সে ভীষণভাবে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নবী (সঃ) (জনগণকে) বললেনঃ “তোমরা তার উপর সাদকা কর।” জনগণ সাদকা করলো, কিন্তু তাতেও তার ঋণ পরিশোধ হলো না। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঋণ দাতাদেরকে বললেনঃ “তোমরা যা পেলে তাই গ্রহণ কর, এ ছাড়া তোমরা আর কিছু পাবে না।” (এ হাদীসটিও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আব্দুর রহমান ইবনে আবি বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন একজন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ডেকে তাঁর সামনে হাযির করবেন, অতঃপর বলবেনঃ “হে আদম সন্তান! তুমি কি কাজে কর্জ নিয়েছিলে এবং কিভাবে জনগণের হক নষ্ট করেছিলে?” সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রভু! আপনি তো জানেন যে, আমি তা গ্রহণ করে নিজে খাইনি, পানও করিনি এবং নষ্টও করিনি। বরং আমার হাত থেকে হয় তো চুরি হয়ে গেছে বা পুড়ে গেছে অথবা কোন দৈব দুর্বিপাকে নষ্ট গেছে।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমার বান্দা সত্য কথা বলেছে। আজ তোমার কর্জ আদায় করার সবচেয়ে বড় হকদার আমি।” অতঃপর আল্লাহ তাআলা কোন জিনিস চেয়ে পাঠাবেন। ওটা তার নেকির পাল্লায় রাখা হবে। এর ফলে তার নেকির পাল্লা পাপের পাল্লার চেয়ে ভারী হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহে তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)(৭) (আরবী) ঐ মুজাহিদ ও গাযীরা এর অন্তর্ভুক্ত যাদের দফতরে কোন হক থাকে না। হজ্বও। (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত।(৮) (আরবী) বা মুসাফির, যার সাথে কোন অর্থ নেই, তাকেও যাকাতের মাল থেকে এই পরিমাণ দেয়া যাবে যাতে সে নিজ শহরে পৌছাতে পারে। যদিও সে নিজের জায়গায় একজন ধনী লোকও হয়। ঐ ব্যক্তির জন্যেও এই হুকুম যে নিজের শহর থেকে অন্য জায়গায় সফর করতে ইচ্ছুক, কিন্তু তার কাছে মালধন নেই বলে সফরে বের হতে পারছে না। তাকেও সফরের খরচের জন্যে যাকাতের মাল দেয়া জায়েয, যা তার যাতায়াতের জন্যে যথেষ্ট হবে।এ আয়াতটি ছাড়াও নিম্নের হাদীসটি এর দলীলঃ আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ “পাঁচ প্রকারের মালদার ব্যতীত কোন মালদারের জন্যে সাদকা হালাল নয়। (১) ঐ ধনী যাকে যাকাত আদায় করার কাজে নিযুক্ত করা হয়েছে। (২) ঐ মালদার, যে যাকাতের মালের কোন জিনিস নিজের মাল দিয়ে কিনে নিয়েছে। (৩) ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি। (৪) আল্লাহর পথের গাযী । (৫) ঐ সম্পদশালী লোক, যাকে কোন মিসকীন তার যাকাত হতে প্রাপ্ত কোন মাল উপঢৌকন হিসেবে দিয়েছে। (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ্ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যাকাত ধনীর জন্যে হালাল নয়, কিন্তু যে (ধনাঢ্য ব্যক্তি আল্লাহর পথে রয়েছে বা মুসাফির অবস্থায় আছে কিংবা তার কোন মিসকীন প্রতিবেশী হাদিয়া স্বরূপ তার কাছে পাঠিয়েছে বা বাড়ীতে যিয়াফত দিয়ে ডেকে নিয়েছে (তাদের জন্যে হালাল)।”যাকাতের মাল খরচের এই আটটি ক্ষেত্র বর্ণনা করার পর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করছেন- “এ হুকুম আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত। আল্লাহ তা'আলা যাহের ও বাতেনের পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। তিনি বান্দাদের উপযযাগিতা সম্পর্কে অবহিত রয়েছেন। তিনি তাঁর কথায়, কাজে, শরীয়তে ও হুকুমে অতি প্রজ্ঞাময়। তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউই নেই এবং তিনি ছাড়া কারো কোন পালনকর্তা নেই।
আত-তাওবা 9:61
আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেন যে, মুনাফিকদের একটি দল রয়েছে, তারা বড়ই কষ্টদায়ক। তারা কথার দ্বারা নবী (সঃ)-কে দুঃখ দিয়ে থাকে। তারা বলে“নবী (সঃ) তো সবারই কথায় কর্ণপাত করে থাকেন। তিনি যার কাছে যা শুনেন তাই মেনে নেন। তিনি আমাদের মিথ্যা কসম করে বলার কথাও বিশ্বাস করে নিবেন।” আল্লাহ পাক বলেন, নবী (সঃ)-এর কান খুবই ভাল কান এবং খুব ভালই শুনে থাকেন। কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী তা তিনি ভালরূপেই জানেন। তিনি আল্লাহর কথা মেনে থাকেন এবং ঈমানদার লোকদের সত্যবাদিতা সম্পর্কেও তিনি পূর্ণ অবহিত। তিনি মুমিনদের জন্যে রহমত স্বরূপ। আর বেঈমান লোকদের জন্যে তিনি আল্লাহর হুজ্জত স্বরূপ। আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে যারা কষ্ট দেয় তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
আত-তাওবা 9:62
৬২-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: কাতাদা (রঃ) এ আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে বলেন, বর্ণিত আছে যে, মুনাফিকদের একটি লোক বলে- “আল্লাহর শপথ! আমাদের এসব সর্দার ও নেতা খুবই জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ লোক। যদি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কথা সত্যই হতো তবে কি এরা এতই বোকা যে, তা মানতে না?” তার এ কথা আঁটি মুসলিম সাহাবী শুনতে পান। তিনি তৎক্ষণাৎ বলে ওঠেনঃ “আল্লাহ কসম! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সব কথাই সত্য। আর যারা তাকে মেনে নিচ্ছে না তারা যে নির্বোধ এতে কোন সন্দেহ নেই।” ঐ সাহাবী নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ লোকটিকে (মুনাফিক) ডেকে পাঠান। কিন্তু সে শক্ত কসম করে বলে- “আমি তো এ কথা বলিনি। এ লোকটি আমার উপর অপবাদ দিচ্ছে। তখন ঐ সাহাবী দুআ করেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি সত্যবাদীকে সত্যবাদীরূপে এবং মিথ্যাবাদীকে মিথ্যাবাদীরূপে দেখিয়ে দিন!” তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ পাক বলেন, তাদের কি এ কথা জানা নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণকারী চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে? সেখানে তারা অপমানজনক শাস্তি ভোগ করবে। এর চেয়ে বড় লাঞ্ছনা ও দুর্ভাগ্য আর কি হবে?
আত-তাওবা 9:63
৬২-৬৩ নং আয়াতের তাফসীর: কাতাদা (রঃ) এ আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে বলেন, বর্ণিত আছে যে, মুনাফিকদের একটি লোক বলে- “আল্লাহর শপথ! আমাদের এসব সর্দার ও নেতা খুবই জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ লোক। যদি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কথা সত্যই হতো তবে কি এরা এতই বোকা যে, তা মানতে না?” তার এ কথা আঁটি মুসলিম সাহাবী শুনতে পান। তিনি তৎক্ষণাৎ বলে ওঠেনঃ “আল্লাহ কসম! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সব কথাই সত্য। আর যারা তাকে মেনে নিচ্ছে না তারা যে নির্বোধ এতে কোন সন্দেহ নেই।” ঐ সাহাবী নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ লোকটিকে (মুনাফিক) ডেকে পাঠান। কিন্তু সে শক্ত কসম করে বলে- “আমি তো এ কথা বলিনি। এ লোকটি আমার উপর অপবাদ দিচ্ছে। তখন ঐ সাহাবী দুআ করেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি সত্যবাদীকে সত্যবাদীরূপে এবং মিথ্যাবাদীকে মিথ্যাবাদীরূপে দেখিয়ে দিন!” তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ পাক বলেন, তাদের কি এ কথা জানা নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণকারী চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে? সেখানে তারা অপমানজনক শাস্তি ভোগ করবে। এর চেয়ে বড় লাঞ্ছনা ও দুর্ভাগ্য আর কি হবে?
আত-তাওবা 9:64
কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তারা (মুনাফিকরা) পরস্পর আলাপ আলোচনা করতো, কিন্তু সাথে সাথে এ আশংকাও করতো যে, না জানি আল্লাহ তাআলা হয়তো অহীর মারফত মুসলিমদেরকে তাদের গুপ্ত কথা জানিয়ে দিবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেনঃ “(হে নবী)! যখন তারা (মুনাফিকরা) তোমার কাছে আগমন করে তখন তোমাকে এমনভাবে সম্বোধন করে যেভাবে আল্লাহ তোমাকে সম্বোধন করেন না, অতঃপর তারা মনে মনে বলে- আমরা যা বলছি তার কারণে আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দিচ্ছে না কেন? (এই মুনাফিকদের জেনে রাখা উচিত যে,) জাহান্নামই তাদের জন্যে যথেষ্ট, ওর মধ্যে তারা প্রবেশ করবে, আর ওটা খুবই নিকৃষ্ট স্থান। এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে মুনাফিকরা! তোমরা মুসলিমদের অবস্থার উপর মন খুলে উপহাসমূলক কথা বলে নাও। কিন্তু জেনে রেখো যে, তোমাদের মনের সমস্ত গুপ্ত কথা আল্লাহ প্রকাশ করে দিবেন। আরো স্মরণ রেখো যে, একদিন তোমরা লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবেই। যেমন আল্লাহ পাক আর এক জায়গায় বলেনঃ “অন্তরে ব্যাধিযুক্ত এই লোকগুলো কি ধারণা করেছে যে, আল্লাহ তাদের অন্তরের শক্রতাকে কখনো প্রকাশ করবে না? আর হে নবী (সঃ)! আমি যদি ইচ্ছা করতাম তবে তোমাকে তাদের পূর্ণ পরিচয় বলে দিতাম, তখন তুমি তাদেরকে তাদের আকৃতি দ্বারাই চিনতে পারতে, তবে তুমি তাদেরকে তাদের কথার ধরনে অবশ্যই চিনতে পারবে; আর আল্লাহ তোমাদের সকলের কার্যাবলী অবগত আছেন। এ জন্যেই কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এই সূরারই নাম হচ্ছে “সূরায়ে ফাযিহাহ্। কেননা, এই সূরায় মুনাফিকদের মুখোশ খুলে দেয়া হয়েছে।
আত-তাওবা 9:65
৬৫-৬৬ নং আয়াতের তাফসীর: আবূ মা’শার আল মাদীনী (রঃ) মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল কারাযী (রঃ) প্রমুখ হতে বর্ণনা করেছেন, তাঁরা বলেছেন যে, মুনাফিকদের মধ্যকার একটি লোক বলে- “আমাদের এই কুরআন পাঠকারী লোকদেরকে দেখি যে, তারা আমাদের মধ্যে বড় পেটুক, বড় মিথ্যাবাদী এবং যুদ্ধের সময় বড়ই কাপুরুষ।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এর আলোচনা হলে লোকটি তার কাছে এমন এক সময় আগমন করে যখন তিনি স্বীয় উস্ত্রীর উপর সওয়ার হয়ে কোন জায়গায় যাচ্ছিলেন। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা শুধু হাসি তামাসা করছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরা আল্লাহ, তার আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে তামাসা করছিলে” ঐ মুনাফিক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তরবারীর উপর হাত রেখে পাথরের সাথে টক্কর খেতে খেতে তার সাথে সাথে চলছিল এবং ঐ কথা বলতেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দিকে চেয়েও দেখছিলেন না। যে মুসলিম তার এই কথা শুনছিলেন। তিনি তখনই তার কথার উত্তর দিয়ে বলছিলেনঃ “তুমি যা বলছো মিথ্যা বলছে। তুমি তো একজন মুনাফিক।” এটা হচ্ছে তাবুকের যুদ্ধের ঘটনা। তিনি মুনাফিক লোকটিকে মসজিদে এ কথা বলেছিলেন। সীরাতে ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাবুকের উদ্দেশ্যে গমন করছিলেন সেই সময় তাঁর সাথে মুনাফিকদের একটি দলও ছিল। তাদের মধ্যে ওয়াদীয়া ইবনে সাবিত এবং মাখশী ইবনে হুমাইর প্রমুখও ছিল। তারা পরস্পর বলতে বলতে যাচ্ছিলঃ “খ্রীষ্টানদের সাথে যুদ্ধ করাকে আরবদের পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করার ন্যায় মনে করা চরম ভুল। আল্লাহর কসম! আগামীকাল আমরা খ্রীষ্টানদের কাছে মুসলিমদের মার খাওয়া দেখবো এবং দুরে দূরে থেকে আনন্দ উপভোগ করবো।” তার একথা শুনে তাদের অন্য নেতা মাখশী বললোঃ “এসব কথা বলো না, নতুবা এর বর্ণনা কুরআন কারীমে এসে যাবে। আল্লাহর কসম! এতে অপমানিত হওয়া অপেক্ষা আমার কাছে এটাই বেশী পছন্দনীয় যে, আমাদের প্রত্যেককে একশ চাবুক মারা হবে। আগে আগে এ লোকগুলো এসব কথা বলতে বলতে চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ)-কে বললেনঃ “দেখো! এ লোকগুলো জ্বলে পুড়ে মরছে। তুমি গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, তারা কি আলোচনা করছিল। যদি তারা অস্বীকার করে তবে তুমি তাদেরকে বলবে, তোমরা এরূপ এরূপ বলছো।” আম্মার (রাঃ) তাদের কাছে গিয়ে একথা বললে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে ওর পেশ করতে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সওয়ারীর উপর উপবিষ্ট ছিলেন এমতাবস্থায় ওয়াদীয়া ইবনে সাবিত তাঁর সওয়ারীর লাগাম ধরে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা শুধু হাসি তামাসা করছিলাম।” আর মাখশী ইবনে হুমাইর বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতার নামের প্রতি লক্ষ্য করুন। এ কারণেই আমার মুখ দিয়ে এরূপ বাজে ও নির্বুদ্ধিতার কথা বেরিয়ে গেছে। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করা হাক!” আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করেও দেন। আর এ আয়াতে তাকে ক্ষমা করে দেয়ার বর্ণনাও রয়েছে। এরপরে সে তার নাম পরিবর্তন করে আবদুর রহমান রাখে এবং খাঁটি মুসলিম হয়ে যায়। অতঃপর সে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করে যে, যেন তাকে শহীদরূপে হত্যা করা হয় এবং তার স্থান অজানা থাকে। এরপর ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শহীদ হন এবং তার মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। এই আয়াত সম্পর্কে কাতাদা (রঃ) বলেন যে, নবী (সঃ) তাবুকের যুদ্ধে গমন করছিলেন এবং মুনাফিকদের একটি দল তার আগে আগে চলছিল। তারা পরস্পর বলাবলি করছিলঃ “দেখো! এ ব্যক্তি (নবী সঃ) ধারণা করছেন যে, তিনি রোমের প্রাসাদ ও দুর্গ জয় করে নিবেন। এটা তো বহু দুরের কথা!" তাদের। এই উক্তি নবী (সঃ)-এর কাছে প্রকাশ করে দেয়া হয়। তিনি তাদেরকে ডেকে পাঠান এবং বলেনঃ “তোমরা কি এসব কথা বলেছিলে?" তারা তখন শপথ করে করে বলে যে, তারা শুধু হাসি তামাসা করছিল। তবে তাদের মধ্যে একটি লোক, যাকে হয়তো আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে থাকবেন, বলেঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনার পাক কালামের একটি আয়াত শুনতে পাচ্ছি, যাতে আমার পাপ কার্যের বর্ণনা রয়েছে, যখনই তা শুনি তখনই আমার গায়ের পশম খাড়া হয়ে যায় এবং ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার তাওবা কবূল করুন এবং আমাকে আপনার পথে এমনভাবে শহীদ করুন যে, না কেউ আমাকে গোসল দেয়, না কাফন পরায়, না দাফন করে।” ইয়ামামার যুদ্ধে এ ঘটনাই ঘটে যায়। এ লোকটি শহীদদের সাথে শাহাদাত বরণ করেন। সমস্ত শহীদের মতদেহ পাওয়া যায় । কিন্তু এ লোকটির মতদেহের কোন পাত্তা পাওয়া যায়নি।অন্যান্য মুনাফিকদেরকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে জবাব দেয়া হচ্ছেএখন তোমরা কোন বাজে ওযর করো না। যদিও তোমরা মুখে ঈমানদার ছিলে, কিন্তু এখন ঐ মুখেই তোমরা কাফির হয়ে গেলে। এটা হচ্ছে কুফরী কালেমা যে, তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং কুরআন কারীমের সাথে হাসি তামাসা করবে। আমি যদি কাউকে ক্ষমা করেও দেই, তবুও জেনে রেখো যে, সকলের সাথে এরূপ ব্যবহার করা হবে না। তোমাদের এই অপরাধ, এই জঘন্য পাপ এবং কুফরী কালেমার শাস্তি তোমাদেরকে ভোগ করতেই হবে।
আত-তাওবা 9:66
৬৫-৬৬ নং আয়াতের তাফসীর: আবূ মা’শার আল মাদীনী (রঃ) মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল কারাযী (রঃ) প্রমুখ হতে বর্ণনা করেছেন, তাঁরা বলেছেন যে, মুনাফিকদের মধ্যকার একটি লোক বলে- “আমাদের এই কুরআন পাঠকারী লোকদেরকে দেখি যে, তারা আমাদের মধ্যে বড় পেটুক, বড় মিথ্যাবাদী এবং যুদ্ধের সময় বড়ই কাপুরুষ।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এর আলোচনা হলে লোকটি তার কাছে এমন এক সময় আগমন করে যখন তিনি স্বীয় উস্ত্রীর উপর সওয়ার হয়ে কোন জায়গায় যাচ্ছিলেন। সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলে- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা শুধু হাসি তামাসা করছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরা আল্লাহ, তার আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে তামাসা করছিলে” ঐ মুনাফিক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তরবারীর উপর হাত রেখে পাথরের সাথে টক্কর খেতে খেতে তার সাথে সাথে চলছিল এবং ঐ কথা বলতেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দিকে চেয়েও দেখছিলেন না। যে মুসলিম তার এই কথা শুনছিলেন। তিনি তখনই তার কথার উত্তর দিয়ে বলছিলেনঃ “তুমি যা বলছো মিথ্যা বলছে। তুমি তো একজন মুনাফিক।” এটা হচ্ছে তাবুকের যুদ্ধের ঘটনা। তিনি মুনাফিক লোকটিকে মসজিদে এ কথা বলেছিলেন। সীরাতে ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাবুকের উদ্দেশ্যে গমন করছিলেন সেই সময় তাঁর সাথে মুনাফিকদের একটি দলও ছিল। তাদের মধ্যে ওয়াদীয়া ইবনে সাবিত এবং মাখশী ইবনে হুমাইর প্রমুখও ছিল। তারা পরস্পর বলতে বলতে যাচ্ছিলঃ “খ্রীষ্টানদের সাথে যুদ্ধ করাকে আরবদের পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করার ন্যায় মনে করা চরম ভুল। আল্লাহর কসম! আগামীকাল আমরা খ্রীষ্টানদের কাছে মুসলিমদের মার খাওয়া দেখবো এবং দুরে দূরে থেকে আনন্দ উপভোগ করবো।” তার একথা শুনে তাদের অন্য নেতা মাখশী বললোঃ “এসব কথা বলো না, নতুবা এর বর্ণনা কুরআন কারীমে এসে যাবে। আল্লাহর কসম! এতে অপমানিত হওয়া অপেক্ষা আমার কাছে এটাই বেশী পছন্দনীয় যে, আমাদের প্রত্যেককে একশ চাবুক মারা হবে। আগে আগে এ লোকগুলো এসব কথা বলতে বলতে চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ)-কে বললেনঃ “দেখো! এ লোকগুলো জ্বলে পুড়ে মরছে। তুমি গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, তারা কি আলোচনা করছিল। যদি তারা অস্বীকার করে তবে তুমি তাদেরকে বলবে, তোমরা এরূপ এরূপ বলছো।” আম্মার (রাঃ) তাদের কাছে গিয়ে একথা বললে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে ওর পেশ করতে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সওয়ারীর উপর উপবিষ্ট ছিলেন এমতাবস্থায় ওয়াদীয়া ইবনে সাবিত তাঁর সওয়ারীর লাগাম ধরে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা শুধু হাসি তামাসা করছিলাম।” আর মাখশী ইবনে হুমাইর বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতার নামের প্রতি লক্ষ্য করুন। এ কারণেই আমার মুখ দিয়ে এরূপ বাজে ও নির্বুদ্ধিতার কথা বেরিয়ে গেছে। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করা হাক!” আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করেও দেন। আর এ আয়াতে তাকে ক্ষমা করে দেয়ার বর্ণনাও রয়েছে। এরপরে সে তার নাম পরিবর্তন করে আবদুর রহমান রাখে এবং খাঁটি মুসলিম হয়ে যায়। অতঃপর সে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করে যে, যেন তাকে শহীদরূপে হত্যা করা হয় এবং তার স্থান অজানা থাকে। এরপর ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শহীদ হন এবং তার মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। এই আয়াত সম্পর্কে কাতাদা (রঃ) বলেন যে, নবী (সঃ) তাবুকের যুদ্ধে গমন করছিলেন এবং মুনাফিকদের একটি দল তার আগে আগে চলছিল। তারা পরস্পর বলাবলি করছিলঃ “দেখো! এ ব্যক্তি (নবী সঃ) ধারণা করছেন যে, তিনি রোমের প্রাসাদ ও দুর্গ জয় করে নিবেন। এটা তো বহু দুরের কথা!" তাদের। এই উক্তি নবী (সঃ)-এর কাছে প্রকাশ করে দেয়া হয়। তিনি তাদেরকে ডেকে পাঠান এবং বলেনঃ “তোমরা কি এসব কথা বলেছিলে?" তারা তখন শপথ করে করে বলে যে, তারা শুধু হাসি তামাসা করছিল। তবে তাদের মধ্যে একটি লোক, যাকে হয়তো আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে থাকবেন, বলেঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনার পাক কালামের একটি আয়াত শুনতে পাচ্ছি, যাতে আমার পাপ কার্যের বর্ণনা রয়েছে, যখনই তা শুনি তখনই আমার গায়ের পশম খাড়া হয়ে যায় এবং ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার তাওবা কবূল করুন এবং আমাকে আপনার পথে এমনভাবে শহীদ করুন যে, না কেউ আমাকে গোসল দেয়, না কাফন পরায়, না দাফন করে।” ইয়ামামার যুদ্ধে এ ঘটনাই ঘটে যায়। এ লোকটি শহীদদের সাথে শাহাদাত বরণ করেন। সমস্ত শহীদের মতদেহ পাওয়া যায় । কিন্তু এ লোকটির মতদেহের কোন পাত্তা পাওয়া যায়নি।অন্যান্য মুনাফিকদেরকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে জবাব দেয়া হচ্ছেএখন তোমরা কোন বাজে ওযর করো না। যদিও তোমরা মুখে ঈমানদার ছিলে, কিন্তু এখন ঐ মুখেই তোমরা কাফির হয়ে গেলে। এটা হচ্ছে কুফরী কালেমা যে, তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং কুরআন কারীমের সাথে হাসি তামাসা করবে। আমি যদি কাউকে ক্ষমা করেও দেই, তবুও জেনে রেখো যে, সকলের সাথে এরূপ ব্যবহার করা হবে না। তোমাদের এই অপরাধ, এই জঘন্য পাপ এবং কুফরী কালেমার শাস্তি তোমাদেরকে ভোগ করতেই হবে।
আত-তাওবা 9:67
৬৭-৬৮ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন যে, মুনাফিকদের আচরণ মুমিনদের সম্পূর্ণ বিপরীত। মুমিনরা ভাল কাজের আদেশ করে থাকে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে থাকে। পক্ষান্তরে মুনাফিকরা মন্দ কাজের আদেশ করে থাকে এবং ভাল কাজ থেকে নিষেধ করে থাকে। মুমিনরা দানশীল হয়, আর মুনাফিকরা হয় কৃপণ। মুমিনরা আল্লাহর যিকিরে মগ্ন থাকে এবং মুনাফিকরা আল্লাহর যিকির থেকে উদাসীন থাকে। এর ফলে আল্লাহও তাদের সাথে ঐরূপ ব্যবহারই করেন, যেমন একজন অন্যজনকে ভুলে থাকে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদেরকে একথাই বলবেন- আজ আমি তোমাদেরকে ঐরূপই ভুলে যাবো যেরূপ তোমরা আজকের দিনে আমার সাথে সাক্ষাৎ করাকে দুনিয়ায় ভুলে গিয়েছিলে । মুনাফিকরা সরল সঠিক পথ থেকে সরে পড়েছে এবং বিভ্রান্তির পথে প্রবেশ করেছে। এই মুনাফিক ও কাফিরদের এসব দুষ্কার্যের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যে জাহান্নাম নির্ধারণ করে রেখেছেন, যেখানে তারা চিরস্থায়ী শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। সেখানে এই শাস্তিই তাদের জন্যে যথেষ্ট। তাদেরকে মহান ও দয়ালু আল্লাহ স্বীয় রহমত থেকে দূর করে দিয়েছেন। তাদের জন্যে তিনি ঠিক করে রেখেছেন চিরস্থায়ী শাস্তি।
আত-তাওবা 9:68
৬৭-৬৮ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন যে, মুনাফিকদের আচরণ মুমিনদের সম্পূর্ণ বিপরীত। মুমিনরা ভাল কাজের আদেশ করে থাকে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে থাকে। পক্ষান্তরে মুনাফিকরা মন্দ কাজের আদেশ করে থাকে এবং ভাল কাজ থেকে নিষেধ করে থাকে। মুমিনরা দানশীল হয়, আর মুনাফিকরা হয় কৃপণ। মুমিনরা আল্লাহর যিকিরে মগ্ন থাকে এবং মুনাফিকরা আল্লাহর যিকির থেকে উদাসীন থাকে। এর ফলে আল্লাহও তাদের সাথে ঐরূপ ব্যবহারই করেন, যেমন একজন অন্যজনকে ভুলে থাকে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদেরকে একথাই বলবেন- আজ আমি তোমাদেরকে ঐরূপই ভুলে যাবো যেরূপ তোমরা আজকের দিনে আমার সাথে সাক্ষাৎ করাকে দুনিয়ায় ভুলে গিয়েছিলে । মুনাফিকরা সরল সঠিক পথ থেকে সরে পড়েছে এবং বিভ্রান্তির পথে প্রবেশ করেছে। এই মুনাফিক ও কাফিরদের এসব দুষ্কার্যের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যে জাহান্নাম নির্ধারণ করে রেখেছেন, যেখানে তারা চিরস্থায়ী শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। সেখানে এই শাস্তিই তাদের জন্যে যথেষ্ট। তাদেরকে মহান ও দয়ালু আল্লাহ স্বীয় রহমত থেকে দূর করে দিয়েছেন। তাদের জন্যে তিনি ঠিক করে রেখেছেন চিরস্থায়ী শাস্তি।
আত-তাওবা 9:69
আল্লাহ তা'আলা বলেন, এই লোকদের উপরেও আল্লাহর শাস্তি পৌঁছে, যেমন এদের পূর্ববর্তীদের উপর তার শাস্তি পৌঁছেছিল। হাসান (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে দ্বীন। পূর্ববর্তী লোকেরা যেমন মিথ্যা ও বাতিলের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল, তেমনই এরাও ওর মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে। এদের এই অসৎ আমল অকেজো ও মূল্যহীন হয়ে গেল। তারা না দুনিয়ায় উপকৃত হলো, না। আখিরাতে। এটাই হচ্ছে প্রকাশ্য ক্ষতি যে, আমল করলো অথচ ফল পেলো না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যেমন আজকের রাতের সাথে কালকের রাতের সাদৃশ্য রয়েছে, তদ্রপ এই উম্মতের মধ্যেও ইয়াহূদীদের সাদৃশ্য এসে গেছে। তিনি বলেন, আমার তো ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা অবশ্যই তাদের অনুসরণ করবে, এমন কি যদি তাদের কেউ গো সাপের গর্তে প্রবেশ করে থাকে তবে তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে।” আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর কসম! তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের পন্থা অনুসরণ করবে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে ও গজে গজে। এমন কি তারা যদি কোন গো সাপের গর্তে ঢুকে গিয়ে থাকে তবে তোমরাও অবশ্যম্ভাবীরূপে তাতে ঢুকে পড়বে।” তখন জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কারা? আহলে কিতাব কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আর কারা হবে?এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা ইচ্ছা করলে (আরবী)-এ আয়াতটি পড়ে নাও।” আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ (আরবী) শব্দ দ্বারা (আরবী) বুঝানো হয়েছে। (আরবী) সম্পর্কে জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)? পারসিক ও রোমকদের মত কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “লোকদের মধ্যে এরা ছাড়া আর কেউ নয়।” এ হাদীসের সত্যতার সাক্ষ্য সহীহ হাদীসসমূহেও পাওয়া যায়।
আত-তাওবা 9:70
আল্লাহ তা'আলা বদকার মুনাফিকদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন- হে মুনাফিকের দল! তোমরা তোমাদের মতো লোকদের অবস্থার উপর গভীরভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ কর এবং দেখো, নবীদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ফল কি হয়েছিল! নূহ (আঃ)-এর কওমের ডুবে মরা এবং মুসলিম ছাড়া অন্য কেউ রক্ষা না পাওয়ার ব্যাপারটা স্মরণ কর! আ’দ সম্প্রদায়ের হূদ (আঃ)-কে না মানার কারণে প্রবল ঝটিকায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা একটু চিন্তা করে দেখো! সামূদ সম্প্রদায়ের সালেহ্ (আঃ)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এবং আল্লাহর নিদর্শনের উষ্ট্ৰীটিকে হত্যা করার কারণে এক গগণ বিদারী শব্দ দ্বারা তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়ার ঘটনাটি মনে কর । আরো স্মরণ কর-কিভাবে ইবরাহীম (আঃ) শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা পান, আর তার শত্রুরা ধ্বংস হয়ে যায়। নমরূদ ইবনে কিনআন ইবনে কুশ এর মত পরাক্রান্ত সম্রাট তার সৈন্য সামন্তসহ সমূলে বিনাশ হয়ে যায় । তোমরা ভুলে যেয়ো না যে, তারা আল্লাহর অভিশাপে পড়ে দুনিয়ার বুক থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এই দুষ্কার্য ও কুফরীর প্রতিফল হিসেবেই শুআইব (আঃ)-এর কওমকে ভূমিকম্প দ্বারা এবং ছায়ার দিনের শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হয়। তারা ছিল মাদায়েনের অধিবাসী। লূত (আঃ)-এর কওমের বসতি হচ্ছে বিধ্বস্ত জনপদ। তারা মাদায়েনে বসবাস করতো। আবার বলা হয়েছে যে, সেটা হচ্ছে সুদুম। মোটকথা, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী লূত (আঃ)-কে না মানা এবং দুষ্কার্য পরিত্যাগ না করার কারণে ধ্বংস ও বরবাদ করে দিয়েছেন। আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের কাছে আমার রাসূলগণ আমার কিবাতসমূহ, মু'জিযা এবং স্পষ্ট দলীল প্রমাণাদিসহ গমন করেছিল। কিন্তু তারা তাদেরকে মোটেই মানেনি। অবশেষে তারা নিজেরা নিজেদের উপর যুলুম করার কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা তো সত্য প্রকাশ করে দিয়েছেন, কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, রাসূলদেরকে পাঠিয়েছেন এবং হুজ্জত খতম করে দিয়েছেন। কিন্তু তারা রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ করে, আল্লাহর কিতাবের প্রতি আমল ছেড়ে দেয় এবং সত্যের মুকাবিলা করে। ফলে তাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত অবতীর্ণ হয় এবং তারা সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়।
আত-তাওবা 9:71
আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের বদভ্যাসের বর্ণনা দেয়ার পর এখানে মুমিনদের উত্তম স্বভাবের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলছেন- এই মুমিনরা পরস্পর একে। অপরের সাহায্য করে থাকে এবং একে অন্যের বাহু স্বরূপ হয়ে থাকে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে- “এক মুমিন অপর মুমিনের জন্যে দেয়াল স্বরূপ যার এক অংশ অপর অংশকে শক্ত ও মজবুত করে।”তিনি এ কথা বলে তাঁর এক হাতের অঙ্গুলিগুলোকে অন্য হাতের অঙ্গুলিগুলোর মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেখিয়ে দেন। অপর একটি সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “মুমিনদের পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও ভালবাসার দৃষ্টান্ত হচ্ছে একটি দেহের মত, দেহের একটি অংশে কষ্ট পৌঁছলে সমস্ত অংশে তা সঞ্চারিত হয় ও সর্বাঙ্গই অসুস্থ হয়ে পড়ে।”আল্লাহ তা'আলা বলেন, তারা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে থাকে। অর্থাৎ মুমিনরা অন্যদের শিক্ষা দীক্ষার ব্যাপারেও উদাসীন থাকে না। বরং তারা সকলকেই ভাল বিষয়ের শিক্ষা দেয় এবং মন্দ কাজ হতে সাধ্যমত বিরত রাখার চেষ্টা করে। যেমন আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ “তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল হওয়া উচিত যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করবে।” আল্লাহ পাকের উক্তিঃ তারা সালাত সুপ্রতিষ্ঠিত করে ও যাকাত দিয়ে থাকে। অর্থাৎ একদিকে তারা আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে তাঁর ইবাদত করে, আর অন্য দিকে তার মাখলুকের প্রতি ইহসান করে।তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলে। অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করে এবং যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকে।এসব লোকের প্রতি আল্লাহ অবশ্যই করুণা বর্ষণ করবেন। অর্থাৎ যারা উপরোক্ত গুণের অধিকারী হবে তারা অবশ্যই আল্লাহর করুণা লাভের হকদার। আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন মহাক্ষমতাবান। অর্থাৎ যারা তাঁর অনুগত হয় তাদেরকে তিনি মর্যাদা দিয়েই থাকেন। কেননা, মর্যাদা হচ্ছে আল্লাহর জন্যে, তাঁর রাসূল (সঃ)-এর জন্যে এবং মুমিনদের জন্যে।আল্লাহ হচ্ছেন হিকমতওয়ালা। এটা তাঁর হিকমত ও নিপুণতা যে, তিনি মুমিনদেরকে এসব গুণের অধিকারী করেছেন এবং মুনাফিকদের ঐ সব বদ স্বভাবের অধিকারী করেছেন। তার প্রতিটি কাজ নিপুণতায় পরিপূর্ণ। তিনি বড়ই কল্যাণময় ও মর্যাদাবান।
আত-তাওবা 9:72
মুমিন পুরুষ এবং মুমিনা নারীদের জন্যে আল্লাহ তাআলা যে কল্যাণ ও চিরস্থায়ী নিয়ামতরাজি প্রস্তুত রেখেছেন, এখানে তিনি তারই বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি তাদের জন্যে এমন জান্নাতসমূহ তৈরী করে রেখেছেন যেগুলোর নিম্নদেশে নির্মল পানির প্রস্রবণ বইতে থাকে। সেখানে রয়েছে সুউচ্চ, সুন্দর, ঝকঝকে এবং সাজসজ্জাপূর্ণ প্রাসাদসমূহ! যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু’টি জান্নাত শুধু সোনার তৈরী, ও দু'টির পাত্র এবং ও দুটির মধ্যে যা কিছু রয়েছে সবই সোনার তৈরী। আর দুটি জান্নাত রয়েছে রূপার তৈরী, ও দু’টির পাত্র এবং অন্য যা কিছু রয়েছে সবই রূপার তৈরী । তারা (জান্নাতবাসীরা) তাদের প্রতিপালকের দিকে এমন অবস্থায় তাকাবে যে, তাঁর চেহারার ঔজ্জ্বল্যময় চাদর ছাড়া অন্য কোন পর্দা থাকবে না। এটা আদন নামক জান্নাতের মধ্যে হবে।” অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মুমিনদের জন্যে জান্নাতে একটি তাবু থাকবে যা একটি মাত্র মুক্তা দ্বারা নির্মিত হবে। ওর দৈর্ঘ্য হবে ষাট মাইল। সেখানে মুমিনদের স্ত্রীরা থাকবে যাদের কাছে তারা যাতায়াত করবে, কিন্তু তারা একে অপরকে দেখতে পাবে না।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে, সালাত কায়েম করেছে ও রমযানের রোযা রেখেছে, আল্লাহ তা'আলার উপর এ হক রয়েছে যে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করাবেন, সে হিজরত করে থাকুক বা বাড়ীতে বসেই থাকুক।”লোকেরা জিজ্ঞেস করলোঃ “আমরা অন্যদেরকেও এ হাদীস শুনিয়ে দিবো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “জান্নাতে একটি শ্রেণী রয়েছে, যেগুলোকে আল্লাহ তার পথে জিহাদকারীদের জন্যে বানিয়েছেন। প্রতি দু’শ্রেণীর মাঝে এতোটা দূরত্ব রয়েছে যতটা দূরত্ব রয়েছে আসমান ও যমীনের মাঝে। সুতরাং যখনই তোমরা আল্লাহর কাছে জান্নাতের জন্যে প্রার্থনা করবে তখন জান্নাতুল ফিরদাউসের জন্যে প্রার্থনা করবে। ওটা সবচেয়ে উঁচু ও সর্বাপেক্ষা উত্তম জান্নাত। জান্নাতসমূহের সমস্ত নহর ওখান থেকেই বের হয়। ওর উপরেই রহমানের (আল্লাহর) আরশ রয়েছে।”সাহল ইবনে সাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতবাসীরা জান্নাতী প্রাসাদগুলোকে ঐরূপ দেখবে যেরূপ তোমরা আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো দেখে থাকো।” প্রকাশ থাকে যে, জান্নাতে একটি সুউচ্চ স্থান রয়েছে, যাকে ‘ওয়াসীলা' বলা হয়, যা আরশের নিকটবর্তী স্থানে রয়েছে। ওটাই হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জান্নাতের বাসস্থান। যেমন আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা আমার উপর দুরূদ পাঠ করবে তখন আল্লাহর কাছে আমার জন্যে ‘ওয়াসীলা’ চাইবে।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ‘ওয়াসীলা' কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “ওটা হচ্ছে জান্নাতের একটি উচ্চতম শ্রেণী (প্রকোষ্ঠ), যা একটি মাত্র লোক লাভ করবে। আমি প্রবল আশা রাখি যে, ঐ লোকটি আমিই।” আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যখন তুমি মুআযযিনের আযান শুনবে তখন যে শব্দগুলো সে উচ্চারণ করে তুমিও সেগুলো উচ্চারণ করবে। অতঃপর তোমরা আমার প্রতি দুরূদ পাঠ করবে। যে ব্যক্তি আমার উপর দুরূপ পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি দশটি রহমত নাযিল করেন। অতঃপর আমার জন্যে ওয়াসীলা চীও। এটা জান্নাতের এমন একটি মনযিল যা আল্লাহ তা'আলার সমস্ত সৃষ্টির মধ্য হতে একটি মাত্র লোক লাভ করবে। আমি আশা রাখি যে, ওটা আমাকেই দান করা হবে। যে ব্যক্তি আমার জন্যে এ ওয়াসীলা চাবে তার জন্যে কিয়ামতের দিন। আমার শাফাআত বৈধ হবে। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) আবূ হুরাইরা (রঃ) হতে তাখরীজকরেছেন)ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমার জন্যে ওয়াসীলা যাঞা কর। যে কেউ আমার জন্যে ওয়াসীলা যা করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার সাক্ষী ও সুপারিশকারী হবো।” আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের কাছে জান্নাতের বর্ণনা দিন! ওর ভিত্তি কোন জিনিসের হবে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “ওর ভিত্তি হবে স্বর্ণ ও রৌপ্যের ইটের। ওর গারা হবে খাঁটি মিশক। ওর কংকর হবে মুক্তা ও ইয়াকূত। ওর মাটি হবে জাফরান। সেখানে যে যাবে সে ঐ সুখ সম্ভোগের মধ্যে থাকবে যা কখনও শেষ হবে না। সেখানে সে চিরস্থায়ী জীবন লাভ করবে, যার পরে মৃত্যুর কোন ভয় নেই। না তার কাপড় খারাপ হবে, না যৌবনে কোন ভাটা পড়বে।” আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা বলেনঃ “জান্নাতে এমন প্রকোষ্ঠ বা কক্ষ রয়েছে যার ভিতরের অংশ বাহির থেকে দেখা যাবে এবং বাইরের অংশ ভিতর থেকে দেখা যাবে।” একথা শুনে একজন বেদুইন উঠে জিজ্ঞেস করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ প্রকোষ্ঠ কার জন্যে?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “যে ভাল কথা বলে, খানা খেতে দেয়, রোযা রাখে এবং রাত্রে লোকদের দ্রিা অবস্থায় (তাহাজ্জুদের) সালাত আদায় করে।”উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জান্নাতের আকাক্ষী এবং ওর জন্যে পরিশ্রমকারী কেউ আছে কি? জান্নাতকে সীমাবদ্ধকারী ওর চতুপার্শ্বে কোন প্রাচীর নেই। কা'বার প্রতিপালকের (আল্লাহর) শপথ! ওটা তো উজ্জ্বল নূর, সুগন্ধময় ফুলের বাগান, সুউচ্চ ও চাকচিক্যময় প্রাসাদ, তরঙ্গযুক্ত প্রবহমান নদী, পরিপুষ্ট ও পাকা পাকা ফলের গুচ্ছ, সুন্দর দেহ বিশিষ্টা ও পবিত্র চরিত্রের অধিকারিণী হুর, মূল্যবান রঙ্গীন রেশমী পোশাক, চিরস্থায়ী স্থান, শান্তি নিকেতন, ফল মূল, সবুজ শ্যামল পরিবেশ, প্রশস্ততা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, নিয়ামত, রহমত এবং সুউচ্চ ও সুদৃশ্য প্রাসাদ।” এ কথা শুনে জনগণ বলে উঠলেনঃ “হ্যা, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা এই জান্নাতের আকাঙ্ক্ষী ও এর জন্যে পরিশ্রমকারী।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে বললেনঃ “ইনশাআল্লাহ বল। লোকেরা তখন ইনশাআল্লাহ বললেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)আল্লাহর সন্তুষ্টি হচ্ছে সর্বাপেক্ষা বড় (নিয়ামত)- অর্থাৎ তাদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি যা তাদের সমুদয় ভোগ্য বস্তু অপেক্ষা বড় ও মর্যাদাপূর্ণ। মুসনাদে আহমাদে আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মহা মহিমান্বিত আল্লাহ জান্নাত বাসীদেরকে ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জান্নাতবাসীরা!” তখন তারা (সমস্বরে) বলে উঠবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার দরবারে হাযির আছি। আপনার হাতেই কল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তখন বলবেনঃ “তোমরা সন্তুষ্ট হয়েছো কি?” তারা উত্তরে বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! কেন আমরা সন্তুষ্ট হবো না? অথচ আপনি আমাদেরকে এমন জিনিসই দান করেছেন যা আপনার সৃষ্টির মধ্যে আর কাউকেই দান করেননি।” আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেনঃ “এর চেয়ে উত্তম জিনিস কি আমি তোমাদেরকে দান করবো না?” তারা জবাব দেবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এর চেয়ে উত্তম জিনিস আর কি আছে?” আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “হ্যা, হ্যা আছে, জেনে রেখো যে, আমি তোমাদের উপর আমার সন্তুষ্টি নাযিল করলাম । আজকের পর আমি তোমাদের উপর কখনো অসন্তুষ্ট হব না।” জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, জান্নাতবাসীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন মহিমান্বিত আল্লাহ তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমরা আর কিছু চাও কি? চাইলে আমি অতিরিক্ত আরো দেবো।" তারা উত্তরে বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে যা দিয়েছেন এর চেয়ে উত্তম আর কি হতে পারে?” আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেনঃ “ওটা হচ্ছে আমার সন্তুষ্টি, যা সবচেয়ে বড় (নিয়ামত)।” ইমাম হাফিজ যিয়া মাকদিসি (রঃ) জান্নাতের বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ বর্ণনায় একটি নির্ভরযোগ্য কিতাব লিখেছেন। সেখানে তিনি বলেছেনঃ “এ হাদীসটি আমার নিকট সহীহ এর শর্তের উপর রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।