Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আত-তাওবা 9:73 – আত-তাওবা 9:129

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আত-তাওবা 9:73
  2. আত-তাওবা 9:74
  3. আত-তাওবা 9:75
  4. আত-তাওবা 9:76
  5. আত-তাওবা 9:77
  6. আত-তাওবা 9:78
  7. আত-তাওবা 9:79
  8. আত-তাওবা 9:80
  9. আত-তাওবা 9:81
  10. আত-তাওবা 9:82
  11. আত-তাওবা 9:83
  12. আত-তাওবা 9:84
  13. আত-তাওবা 9:85
  14. আত-তাওবা 9:86
  15. আত-তাওবা 9:87
  16. আত-তাওবা 9:88
  17. আত-তাওবা 9:89
  18. আত-তাওবা 9:90
  19. আত-তাওবা 9:91
  20. আত-তাওবা 9:92
  21. আত-তাওবা 9:93
  22. আত-তাওবা 9:94
  23. আত-তাওবা 9:95
  24. আত-তাওবা 9:96
  25. আত-তাওবা 9:97
  26. আত-তাওবা 9:98
  27. আত-তাওবা 9:99
  28. আত-তাওবা 9:100
  29. আত-তাওবা 9:101
  30. আত-তাওবা 9:102
  31. আত-তাওবা 9:103
  32. আত-তাওবা 9:104
  33. আত-তাওবা 9:105
  34. আত-তাওবা 9:106
  35. আত-তাওবা 9:107
  36. আত-তাওবা 9:108
  37. আত-তাওবা 9:109
  38. আত-তাওবা 9:110
  39. আত-তাওবা 9:111
  40. আত-তাওবা 9:112
  41. আত-তাওবা 9:113
  42. আত-তাওবা 9:114
  43. আত-তাওবা 9:115
  44. আত-তাওবা 9:116
  45. আত-তাওবা 9:117
  46. আত-তাওবা 9:118
  47. আত-তাওবা 9:119
  48. আত-তাওবা 9:120
  49. আত-তাওবা 9:121
  50. আত-তাওবা 9:122
  51. আত-তাওবা 9:123
  52. আত-তাওবা 9:124
  53. আত-তাওবা 9:125
  54. আত-তাওবা 9:126
  55. আত-তাওবা 9:127
  56. আত-তাওবা 9:128
  57. আত-তাওবা 9:129

আত-তাওবা 9:73

৭৩-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার এবং তাদের প্রতি কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। আর তাঁর অনুসারী মুমিনদের সাথে নম্র ব্যবহার করার আদেশ করছেন। তিনি সংবাদ দিচ্ছেন যে, কাফিরদের মূল স্থান হচ্ছে জাহান্নাম। ইতিপূর্বে আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে চারটি তরবারীসহ প্রেরণ করা হয়েছে। একখানা মুশরিকদের (বিরুদ্ধে ব্যবহারের) জন্যে। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতীত হয়ে যাবে তখন মুশরিকদেরকে যেখানে পাও বধ কর।” (৯:৫) দ্বিতীয় তরবারী আহলে কিতাবের কাফিরদের (বিরুদ্ধে চালনার) জন্যে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেসব আহলে কিতাব আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না এবং কিয়ামতের দিবসের প্রতিও না, আর ঐ বস্তুগুলোকে হারাম মনে করে না যেগুলোকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) হারাম বলেছেন, এবং সত্য ধর্ম (ইসলাম) গ্রহণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকো, যে পর্যন্ত না তারা অধীনতা স্বীকার করে প্রজারূপে জিযিয়া দিতে স্বীকৃত হয়।” (৯:২৯) তৃতীয় তরবারী মুনাফিকদের (বিরুদ্ধে ব্যবহারের) জন্যে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর।” আর চতুর্থ তরবারী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে (যুদ্ধের জন্যে)। মহা পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে।” (৯:৪৯) এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, মুনাফিকরা যখন তাদের নিফাক (কপটতা) প্রকাশ করতে শুরু করবে তখন তাদের বিরুদ্ধে তরবারী দ্বারা যুদ্ধ ঘোষণা করা উচিত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর পছন্দনীয় মতও এটাই। ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, হাত দ্বারা না পারলে তাদেরকে তাদের মুখের উপর ধমক দিতে হবে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের বিরুদ্ধে তরবারী দ্বারা যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন, আর মুনাফিকদের সাথে মুখে জিহাদ করার হুকুম করেছেন এবং তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করার কথা বলেছেন। মুজাহিদ (রঃ)-এরও উক্তি প্রায় এটাই। তাদের উপর শরঈ হদ জারী করাও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই বটে। ভাবার্থ এই যে, প্রয়োজন বোধে মাঝে মাঝে তাদের বিরুদ্ধে তরবারীও উঠাতে হবে। তবে কাজ চললে তাদেরকে মুখে বলাই যথেষ্ট। পরিস্থিতি বুঝে কাজ করতে হবে।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “তারা শপথ করে করে বলে যে, তারা (অমুক কথা) বলেনি, অথচ নিশ্চয়ই তারা কুফরী কথা বলেছিল এবং নিজেদের (বাহ্যিক) ইসলাম গ্রহণের পর খোলাখুলিভাবে কুফরী করেছে।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। ঘটনা এই যে, এক জুহনী ও এক আনসারীর মধ্যে লড়াই বেঁধে যায়। জুহনী আনসারীর উপর চেপে বসে (আনসারীকে কাবু করে ফেলে) তখন আব্দুল্লাহ (মুনাফিকদের নেতা) আনসারদেরকে বলে, তোমরা কি তোমাদের ভাই আনসারীকে সাহায্য করবে না? আল্লাহর শপথ! আমাদের দৃষ্টান্ত ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঠিক উক্তিকারীর নিম্নের উক্তির মতঃ “তোমার কুকুরটি মোটা তাজা হয়েছে (অর্থাৎ তুমি খাওয়ায়ে মোটা তাজা করেছে), ওটা কিন্তু তোমাকেই খাবে (কামড়াবে)।” আল্লাহর কসম! যদি আমরা এখন মদীনায় ফিরে যাই তবে সম্মানিতরা হীন লোকদেরকে তথা হতে বহিষ্কার করে দেবে। একজন মুসলিম রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে গিয়ে তার এ কথা বলে দেয়। তিনি তাকে ডেকে এটা জিজ্ঞেস করলে সে কসম করে তা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন।আনাস (রাঃ) বলেন, আমার কওমের যেসব লোক হুররার যুদ্ধে শহীদ হন। তাদের জন্যে আমি খুবই দুঃখ প্রকাশ করি। এ সংবাদ যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ)-এর কাছে পৌছলে তিনি আমার কাছে একখানা চিঠি পাঠান। তাতে তিনি লিখেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আনসারদেরকে এবং তাদের সন্তানদেরকে ক্ষমা করে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এ দুআ’য় আনসারদের পৌত্রদের উল্লেখ করেছিলেন কি না এ ব্যাপারে বর্ণনাকারী ইবনুল ফযল (রঃ) সন্দেহ করেছেন । আনাস (রাঃ) তাঁর পাশের একটি লোককে যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন ঃ “তিনি হচ্ছেন সেই যায়েদ যার কানে শোনা কথার সত্যতার সাক্ষ্য স্বয়ং সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন।” ঘটনা এই যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভাষণ দিচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় এক মুনাফিক বলে ওঠেঃ “যদি এ ব্যক্তি সত্যবাদী হন তবে আমরা গাধার চেয়েও বেশী নির্বোধ।” তখন যায়েদ (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (সঃ) সত্যবাদী এবং অবশ্যই তুমি গাধার চাইতেও নির্বোধ।” অতঃপর তিনি এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানে পৌছিয়ে দেন। কিন্তু ঐ মুনাফিক ওটা অস্বীকার করে বসে এবং বলে যে, যায়েদ (রাঃ) মিথ্যা কথা বলেছেন। তার এ কথার প্রতিবাদে আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন এবং যায়েদ (রাঃ)-এর সত্যবাদিতা প্রকাশ করে দেন।কিন্তু প্রসিদ্ধ উক্তি এই যে, এটা হচ্ছে বানী মুসতালিক যুদ্ধের ঘটনা। খুব সম্ভব এই আয়াতের উল্লেখের ব্যাপারে বর্ণনাকারীর সন্দেহ হয়েছে এবং অন্য আয়াতের পরিবর্তে এ আয়াতটিকে বর্ণনা করে দিয়েছেন। এই হাদীসই সহীহ বুখারীতেও রয়েছে। কিন্তু তাতে নিম্নের বাক্য পর্যন্ত রয়েছে- “যার কানে শোনা কথার সত্যতার সাক্ষ্য দিয়েছেন স্বয়ং সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ।” সম্ভবতঃ পরের অংশটুকু বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উকবা (রঃ)-এর নিজের উক্তি। তারই একটি বর্ণনায় পরবর্তী এ অংশটুকু ইবনে শিহাব (রঃ)-এর উক্তিতে বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।উমুভী (রঃ) তাঁর ‘মাগাযী’ গ্রন্থে কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর তাবুক সম্পর্কীয় ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাতে রয়েছে যে, কা’বকে তাঁর কওমের লোকেরা বলেঃ “আপনি তো একজন কবি মানুষ। আপনি ইচ্ছা করলে কোন কারণ দর্শিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ওযর পেশ করতে পারেন। অতঃপর ঐ পাপের জন্যে আপনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। এরপর বিশদভাবে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তাতে এ কথাও রয়েছে যে, যেসব মুনাফিক পিছনে রয়ে গিয়েছিল এবং যাদের ব্যাপারে কুরআন কারীমের আয়াত নাযিল হয়, তাদের মধ্যে কেউ কেউ রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথেও ছিল। জাল্লাস ইবনে সাভীদ ইবনে সামিতও ছিল তাদের মধ্যে একজন। উমাইর ইবনে সাদ (রাঃ)-এর মাতা তার ঘরে (স্ত্রীরূপে) ছিলেন, যিনি সা’দকেও (রাঃ) সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। (উমাইর ইবনে সা'দ (রাঃ) তার মাতার অন্য স্বামীর ঔরসজাত পুত্র ছিলেন। উমাইর (রাঃ)-এর পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মাতার সাথে জাল্লাসের দ্বিতীয় বিয়ে হয় এবং বিয়ের পর তিনি তার পুত্র উমাইরকেও (রাঃ) সঙ্গে নিয়ে জাল্লাসের বাড়ীতে আসেন) যখন ঐ মুনাফিকদের ব্যাপারে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন জাল্লাস বলেঃ “আল্লাহর কসম! যদি এ ব্যক্তি (মুহাম্মাদ সঃ) তাঁর কথায় সত্যবাদী হন তবে তো আমরা এই গাধার চেয়েও নিকৃষ্ট!” এ কথা শুনে উমাইর ইবনে সা'দ (রাঃ) বলে উঠলেনঃ “আপনি তো আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং আপনার কষ্ট আমার কষ্টের চাইতেও আমার কাছে বেশী পীড়াদায়ক। কিন্তু এখন আপনি আপনার মুখ থেকে এমন একটা কথা বের করলেন যে, যদি আমি তা পৌছিয়ে দেই তবে আমার জন্যে রয়েছে লাঞ্ছনা, আর না পৌছালে রয়েছে ধ্বংস। তবে লাঞ্ছনা অবশ্যই ধ্বংস হতে হালকা।” একথা বলেই তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে ঐ কথা বলে দিলেন। জাল্লাস এ সংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে শপথ করে বলেঃ “উমাইর ইবনে সা'দ (রাঃ) মিথ্যা কথা বলেছে। আমি কখনও এ কথা বলিনি।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। বর্ণিত আছে যে, এরপর জাল্লাস তাওবাহ করে নেয় এবং ঠিক হয়ে যায়। তবে সম্ভবতঃ তার তাওবাহ্ করার কথাটা ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর নিজের উক্তি হবে, কা'ব (রাঃ)-এর উক্তি নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।উরওয়া ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি জাল্লাস ইবনে সাভীদ ইবনে সামিতের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঘটনা এই যে, সে এবং তার স্ত্রীর (পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত) পুত্র মুসআব (রাঃ) কুবা থেকে আসছিল। হঠাৎ করে জাল্লাস বলে ফেলেঃ “মুহাম্মাদ (সঃ) যা নিয়ে এসেছেন তা যদি সত্য হয় তবে তো। আমরা যে গাধার উপর সওয়ার হয়ে আছি এর থেকেও আমরা নির্বোধ!” তখন মুসআব (রাঃ) তাকে বলেনঃ “ওরে আল্লাহর শত্রু! আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে এ সংবাদ দিয়ে দেবো। আমি ভয় পাচ্ছি যে, না জানি আমার ব্যাপারে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়ে যায় বা আমার উপর আল্লাহর কোন শাস্তি এসে পড়ে, অথবা এই পাপে আমার বৈপিত্রের সাথে আমাকেও শরীক করে নেয়া হয়!” তাই আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে হাযির হয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি এবং জাল্লাস কুবা থেকে আসছিলাম। ঐ সময় সে এরূপ এরূপ বলেছে। আমি যদি এ ভয় না করতাম যে, এ অপরাধে আমার্কেও জড়িয়ে ফেলা হবে, তবে আমি আপনাকে এ খবর দিতাম না। বর্ণনাকারী বলেন যে, মুসআব (রাঃ)-এর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জাল্লাসকে ডেকে পাঠান এবং তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “মুসআব (রাঃ) যে কথা বলেছে সে কথা কি তুমি (সত্যি) বলেছো?" তখন সে আল্লাহর কসম করে তা অস্বীকার করে বসে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। তাফসীরে ইবনে জারীরে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি গাছের ছায়ায় বসেছিলেন। ঐ সময় তিনি (সাহাবীদেরকে) বলেনঃ “এখনই তোমাদের কাছে একটি লোক আসবে এবং সে তোমাদের দিকে শয়তানের দৃষ্টিতে তাকাবে। যখন সে আসবে তখন তোমরা তার সাথে কথা বলবে না।” তখনই কয়রা চক্ষু বিশিষ্ট একটি লোক এসে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি ও তোমার সঙ্গীরা আমাকে গালি দাও কেন?” তৎক্ষণাৎ সে গিয়ে তার সঙ্গী সাথীদেরকে নিয়ে আসলো এবং সবাই আল্লাহর নামে শপথ করে বললো যে, তারা এসব কথা বলেনি। শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। তখন মহা মহিমান্বিত আল্লাহ (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ পাকের (আরবী) (তারা এমন বিষয়ের সংকল্প করেছিল যা তারা কার্যকরী করতে পারেনি) এ উক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা জাল্লাসের সংকল্পকে বুঝানো হয়েছে। সে সংকল্প করেছিল যে, তার স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত যে ছেলেটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তার কথা বলে দিয়েছিলেন তাকে সে হত্যা করবে। একটি উক্তি এই যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করার সংকল্প করেছিল। একটি উক্তি এও আছে যে, কতকগুলো লোক ইচ্ছা করেছিল, মুহাম্মাদ (সঃ) সম্মত না হলেও তারা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে তাদের সরদার বানাবে। এটাও বর্ণিত আছে যে, দশজনের বেশী লোক তাবুকের যুদ্ধে গমনের সময় পথে প্রতারণা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করার সংকল্প করেছিল। হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ “আমি এবং আম্মার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উষ্ট্রীর আগে ও পিছনে চলছিলাম। একজন পিছন থেকে হাঁকাচ্ছিলাম এবং অন্যজন আগে আগে লাগাম ধরে টানছিলাম। আমরা আকাবা নামক স্থানে ছিলাম। এমন সময় দেখি যে, বারোজন লোক মুখের উপর ঢাকনা দিয়ে আসলো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উষ্ট্রীটিকে ঘিরে ধরলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করলেন। সুতরাং তারা পালিয়ে গেল। তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা তাদেরকে চিনতে পেরেছো কি?” আমরা উত্তর দিলামঃ না, তবে তাদের সওয়ারীগুলো আমাদের চোখের সামনে রয়েছে (অর্থাৎ তাদের সওয়ারীগুলো আমরা চিনতে পেরেছি)। তিনি বললেনঃ “এরা হচ্ছে মুনাফিক এবং কিয়ামত পর্যন্ত এদের অন্তরে নিফাক (কপটতা) থাকবে। এরা কোন্ উদ্দেশ্যে এসেছিল তা তোমরা জান কি?” আমরা উত্তরে বললামঃ না। তিনি বললেনঃ “এরা এসেছিল আকাবায় আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে পেরেশান করা ও কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি তাদের গোত্রগুলোর কাছে এ সংবাদ পাঠাবো না যে, প্রত্যেক কওম যেন তাদের এই প্রকারের লোকের (কর্তিত) মস্তক আপনার কাছে পাঠিয়ে দেয় (অর্থাৎ তার গর্দান উড়িয়ে দেয়। তিনি উত্তরে বললেনঃ “না, (এটা করা যায় না) তাহলে লোকেরা সমালোচনা করবে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) প্রথমে তো এই লোকদেরকে নিয়েই শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়লাভ করেছেন, আবার নিজের সেই সঙ্গীদেরকে হত্যা করে দিলেন।” অতঃপর তিনি বদ্ দুআ করলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি এদের অন্তরে আগুনের ফোঁড়া সৃষ্টি করে দিন।”মুসনাদে আহমাদে আবুত তুফাইল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাবুকের যুদ্ধ হতে ফিরবার পথে ঘোষণা করে দেনঃ “আমি আকাবার পথে গমন করবো। কেউ যেন এই পথে না আসে।” হুযাইফা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সওয়ারীর লাগাম ধরেছিলেন এবং আম্মার (রাঃ) পিছন থেকে হাঁকিয়ে যাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় এক দল লোক তাদের উষ্ট্রীগুলোর উপর সওয়ার হয়ে উপস্থিত হয়। আম্মার (রাঃ) তাদের উষ্ট্রীগুলোকে মারতে শুরু করেন। আর হুযাইফা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে তার সওয়ারীকে নীচের দিকে চালাতে শুরু করেন। যখন নীচের মাঠ এসে পড়ে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারী হতে নেমে পড়েন। ইতিমধ্যে আম্মারও (রাঃ) ফিরে আসেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আম্মার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ঐ লোকগুলোকে চিনতে পেরেছে। কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তাদের মুখ তো ঢাকা ছিল, তবে তাদের সওয়ারীগুলো আমি চিনতে পেরেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কি উদ্দেশ্যে এসেছিল তা জান কি?” তিনি জবাবে বললেনঃ “না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তারা চেয়েছিল গোলমাল ও চীৎকার করে আমার উন্ত্রীকে উত্তেজিত করতে, যাতে আমি উন্ত্রী থেকে পড়ে যাই।” আম্মার (রাঃ) একজন লোককে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছিআকাবার ঐ লোকগুলো কতজন ছিল?" সে উত্তরে বলেঃ “চৌদ্দজন।" তখন আম্মার (রাঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি যদি তাদের অন্তর্ভুক্ত হও তবে পনেরো জন হবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের মধ্যে তিনজনের নাম গণনা করেন। তারা বলেঃ “আল্লাহর শপথ! না আমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি, না আমরা আমাদের সঙ্গীদের কুমতলব অবগত ছিলাম। আম্মার (রাঃ) বলেনঃ “অবশিষ্ট বারোজন লোক আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে জিহাদকারী, দুনিয়াতেও এবং আখিরাতেও। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) অনেক লোকের নামও বলেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, আহলে আকাবার মধ্যকার একটি লোকের সাথে আম্মার (রাঃ)-এর কিছুটা সম্পর্ক ছিল। তাই তিনি লোকটিকে আল্লাহর কসম দিয়ে আহলে আকাবার সংখ্যা জিজ্ঞেস করেন। তখন লোকেরাও তাকে তাদের সংখ্যা বলতে বলে। সে বলেঃ “আমি জানতে পেরেছি যে, তারা ছিল চৌদ্দজন। আর আমাকেও যদি তাদের অন্তর্ভুক্ত ধরা যায় তবে সংখ্যা দাঁড়াবে পনেরো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের তিনজনের নাম বলে দিলে তারা বলেঃ “আল্লাহর শপথ! আমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর আহ্বানকারীর আহ্বানও শুনিনি এবং ঐ কওমের কি উদ্দেশ্য ছিল সেটাও আমরা জানতাম না।” অবশিষ্ট বারোজন দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী। গরমের মৌসুম ছিল। পানি ছিল খুবই কম। তাই তিনি বলেছিলেনঃ “আমার পূর্বে কেউ যেন সেখানে না পৌছে।” কিন্তু তবুও কিছু লোক সেখানে পৌছে গিয়েছিল। তিনি তাদের উপর অভিশাপ দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সহচরদের মধ্যে বারোজন মুনাফিক রয়েছে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং ওর সুগন্ধও পাবে না। আটজনের কাঁধে আগুনের ফোড়া হবে যা বক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। তা তাদেরকে ধ্বংস করে দিবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) একমাত্র হুযায়ফা (রাঃ)-কে ঐ মুনাফিকদের নাম বলেছিলেন বলেই তাকে তার রাযদার (যিনি গোপন কথা জানেন) বলা হতো। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।ইমাম তিবরানী (রঃ) তাঁর কিতাবে আসহাবে আকাবার নিম্নরূপ নাম দিয়েছেনঃ(১) মু'তাব ইবনে কুশাইর, (২) ওয়াদীআ' ইবনে সাবিত, (৩) জাদ্দ ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে নাবীল, এ ছিল আমর ইবনে আউফের গোত্রের লোক, (৪) হারিস ইবনে ইয়াযীদ আত্তায়ী, (৫) আউস ইবনে কাইযী, (৬) হারিস ইবনে সাভীদ, (৭) সা’দ ইবনে যারারা, (৮) কায়েস ইবনে ফাহদ, (৯) বানু হুবলা গোত্রের সাভীদ ইবনে দাইস, (১০ কায়েস ইবনে আমর ইবনে সাহল, (১১) যায়েদ ইবনে লাসীত এবং (১২) সালালা ইবনে হামাম। শেষোক্ত দু’ব্যক্তি বানু কাইনুকা গোত্রের লোক। তারা সবাই বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।এ আয়াতেই এর পরে বলা হয়েছে। তারা শুধু এরই প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে। যে, আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাঁর রাসূল (সঃ)-এর মাধ্যমে তাদেরকে মালদার করেছেন। যদি তাদের উপর আল্লাহ তাআলার পূর্ণ অনুগ্রহ হতো তবে তাদের ভাগ্যে হিদায়াতও জুটতো। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনসারদেরকে বলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট অবস্থায় পাইনি, অতঃপর আমার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন? তোমরা কি বিচ্ছিন্ন ছিলে না, অতঃপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে প্রেমের সূত্রে আবদ্ধ করেছেন? তোমরা কি দরিদ্র ছিলে না, অতঃপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে ধনী করেছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতিটি প্রশ্নের জবাবে আনসাররা বলছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমাদের উপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর এর চেয়েও বেশী ইহসান রয়েছে। মোটকথা, বর্ণনা এই যে, বিনা কারণে ও বিনা দোষে এই লোকগুলো শত্রুতা ও বেঈমানী করে বসেছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “কাফিররা মুমিনদের শুধু এরই প্রতিশোধ নিয়েছিল যে, তারা প্রবল পরাক্রান্ত ও মহা প্রশংসিত আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ইবনে জামীল শুধু এরই প্রতিশোধ নিচ্ছে যে, সে দরিদ্র ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাকে সম্পদশালী করেছেন।” এরপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তাওবার দিকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “এখনও যদি তারা তাওবা করে নেয় তবে তা তাদের জন্যে কল্যাণকর হবে। আর যদি তারা তাদের নীতির উপরই অটল থাকে তবে আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে বেদনাদায়ক শাস্তি প্রদান করবেন।” অর্থাৎ যদি তারা তাদের পন্থা ও নীতিকেই আঁকড়ে ধরে থাকে তবে আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ায় যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিবেন হত্যা, দুঃখ এবং চিন্তার দ্বারা, আর পরকালে জাহান্নামের অপমানজনক ও কষ্টদায়ক আযাব দ্বারা।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “দুনিয়ায় তাদের কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী নেই।” অর্থাৎ দুনিয়ায় এমন কেউ নেই যে তাদেরকে কোন সাহায্য করতে পারবে। না পারবে তারা তাদের কোন উপকার করতে এবং না পারবে তাদের কোন কষ্ট দূর করতে। অসহায়ভাবেই তারা জীবন কাটাবে।

আত-তাওবা 9:74

৭৩-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার এবং তাদের প্রতি কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। আর তাঁর অনুসারী মুমিনদের সাথে নম্র ব্যবহার করার আদেশ করছেন। তিনি সংবাদ দিচ্ছেন যে, কাফিরদের মূল স্থান হচ্ছে জাহান্নাম। ইতিপূর্বে আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে চারটি তরবারীসহ প্রেরণ করা হয়েছে। একখানা মুশরিকদের (বিরুদ্ধে ব্যবহারের) জন্যে। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতীত হয়ে যাবে তখন মুশরিকদেরকে যেখানে পাও বধ কর।” (৯:৫) দ্বিতীয় তরবারী আহলে কিতাবের কাফিরদের (বিরুদ্ধে চালনার) জন্যে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেসব আহলে কিতাব আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না এবং কিয়ামতের দিবসের প্রতিও না, আর ঐ বস্তুগুলোকে হারাম মনে করে না যেগুলোকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) হারাম বলেছেন, এবং সত্য ধর্ম (ইসলাম) গ্রহণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকো, যে পর্যন্ত না তারা অধীনতা স্বীকার করে প্রজারূপে জিযিয়া দিতে স্বীকৃত হয়।” (৯:২৯) তৃতীয় তরবারী মুনাফিকদের (বিরুদ্ধে ব্যবহারের) জন্যে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর।” আর চতুর্থ তরবারী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে (যুদ্ধের জন্যে)। মহা পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে।” (৯:৪৯) এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, মুনাফিকরা যখন তাদের নিফাক (কপটতা) প্রকাশ করতে শুরু করবে তখন তাদের বিরুদ্ধে তরবারী দ্বারা যুদ্ধ ঘোষণা করা উচিত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর পছন্দনীয় মতও এটাই। ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, হাত দ্বারা না পারলে তাদেরকে তাদের মুখের উপর ধমক দিতে হবে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের বিরুদ্ধে তরবারী দ্বারা যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন, আর মুনাফিকদের সাথে মুখে জিহাদ করার হুকুম করেছেন এবং তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করার কথা বলেছেন। মুজাহিদ (রঃ)-এরও উক্তি প্রায় এটাই। তাদের উপর শরঈ হদ জারী করাও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই বটে। ভাবার্থ এই যে, প্রয়োজন বোধে মাঝে মাঝে তাদের বিরুদ্ধে তরবারীও উঠাতে হবে। তবে কাজ চললে তাদেরকে মুখে বলাই যথেষ্ট। পরিস্থিতি বুঝে কাজ করতে হবে।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “তারা শপথ করে করে বলে যে, তারা (অমুক কথা) বলেনি, অথচ নিশ্চয়ই তারা কুফরী কথা বলেছিল এবং নিজেদের (বাহ্যিক) ইসলাম গ্রহণের পর খোলাখুলিভাবে কুফরী করেছে।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। ঘটনা এই যে, এক জুহনী ও এক আনসারীর মধ্যে লড়াই বেঁধে যায়। জুহনী আনসারীর উপর চেপে বসে (আনসারীকে কাবু করে ফেলে) তখন আব্দুল্লাহ (মুনাফিকদের নেতা) আনসারদেরকে বলে, তোমরা কি তোমাদের ভাই আনসারীকে সাহায্য করবে না? আল্লাহর শপথ! আমাদের দৃষ্টান্ত ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঠিক উক্তিকারীর নিম্নের উক্তির মতঃ “তোমার কুকুরটি মোটা তাজা হয়েছে (অর্থাৎ তুমি খাওয়ায়ে মোটা তাজা করেছে), ওটা কিন্তু তোমাকেই খাবে (কামড়াবে)।” আল্লাহর কসম! যদি আমরা এখন মদীনায় ফিরে যাই তবে সম্মানিতরা হীন লোকদেরকে তথা হতে বহিষ্কার করে দেবে। একজন মুসলিম রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে গিয়ে তার এ কথা বলে দেয়। তিনি তাকে ডেকে এটা জিজ্ঞেস করলে সে কসম করে তা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন।আনাস (রাঃ) বলেন, আমার কওমের যেসব লোক হুররার যুদ্ধে শহীদ হন। তাদের জন্যে আমি খুবই দুঃখ প্রকাশ করি। এ সংবাদ যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ)-এর কাছে পৌছলে তিনি আমার কাছে একখানা চিঠি পাঠান। তাতে তিনি লিখেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আনসারদেরকে এবং তাদের সন্তানদেরকে ক্ষমা করে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এ দুআ’য় আনসারদের পৌত্রদের উল্লেখ করেছিলেন কি না এ ব্যাপারে বর্ণনাকারী ইবনুল ফযল (রঃ) সন্দেহ করেছেন । আনাস (রাঃ) তাঁর পাশের একটি লোককে যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন ঃ “তিনি হচ্ছেন সেই যায়েদ যার কানে শোনা কথার সত্যতার সাক্ষ্য স্বয়ং সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন।” ঘটনা এই যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভাষণ দিচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় এক মুনাফিক বলে ওঠেঃ “যদি এ ব্যক্তি সত্যবাদী হন তবে আমরা গাধার চেয়েও বেশী নির্বোধ।” তখন যায়েদ (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (সঃ) সত্যবাদী এবং অবশ্যই তুমি গাধার চাইতেও নির্বোধ।” অতঃপর তিনি এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানে পৌছিয়ে দেন। কিন্তু ঐ মুনাফিক ওটা অস্বীকার করে বসে এবং বলে যে, যায়েদ (রাঃ) মিথ্যা কথা বলেছেন। তার এ কথার প্রতিবাদে আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন এবং যায়েদ (রাঃ)-এর সত্যবাদিতা প্রকাশ করে দেন।কিন্তু প্রসিদ্ধ উক্তি এই যে, এটা হচ্ছে বানী মুসতালিক যুদ্ধের ঘটনা। খুব সম্ভব এই আয়াতের উল্লেখের ব্যাপারে বর্ণনাকারীর সন্দেহ হয়েছে এবং অন্য আয়াতের পরিবর্তে এ আয়াতটিকে বর্ণনা করে দিয়েছেন। এই হাদীসই সহীহ বুখারীতেও রয়েছে। কিন্তু তাতে নিম্নের বাক্য পর্যন্ত রয়েছে- “যার কানে শোনা কথার সত্যতার সাক্ষ্য দিয়েছেন স্বয়ং সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ।” সম্ভবতঃ পরের অংশটুকু বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উকবা (রঃ)-এর নিজের উক্তি। তারই একটি বর্ণনায় পরবর্তী এ অংশটুকু ইবনে শিহাব (রঃ)-এর উক্তিতে বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।উমুভী (রঃ) তাঁর ‘মাগাযী’ গ্রন্থে কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর তাবুক সম্পর্কীয় ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাতে রয়েছে যে, কা’বকে তাঁর কওমের লোকেরা বলেঃ “আপনি তো একজন কবি মানুষ। আপনি ইচ্ছা করলে কোন কারণ দর্শিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে ওযর পেশ করতে পারেন। অতঃপর ঐ পাপের জন্যে আপনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। এরপর বিশদভাবে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তাতে এ কথাও রয়েছে যে, যেসব মুনাফিক পিছনে রয়ে গিয়েছিল এবং যাদের ব্যাপারে কুরআন কারীমের আয়াত নাযিল হয়, তাদের মধ্যে কেউ কেউ রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথেও ছিল। জাল্লাস ইবনে সাভীদ ইবনে সামিতও ছিল তাদের মধ্যে একজন। উমাইর ইবনে সাদ (রাঃ)-এর মাতা তার ঘরে (স্ত্রীরূপে) ছিলেন, যিনি সা’দকেও (রাঃ) সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। (উমাইর ইবনে সা'দ (রাঃ) তার মাতার অন্য স্বামীর ঔরসজাত পুত্র ছিলেন। উমাইর (রাঃ)-এর পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মাতার সাথে জাল্লাসের দ্বিতীয় বিয়ে হয় এবং বিয়ের পর তিনি তার পুত্র উমাইরকেও (রাঃ) সঙ্গে নিয়ে জাল্লাসের বাড়ীতে আসেন) যখন ঐ মুনাফিকদের ব্যাপারে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন জাল্লাস বলেঃ “আল্লাহর কসম! যদি এ ব্যক্তি (মুহাম্মাদ সঃ) তাঁর কথায় সত্যবাদী হন তবে তো আমরা এই গাধার চেয়েও নিকৃষ্ট!” এ কথা শুনে উমাইর ইবনে সা'দ (রাঃ) বলে উঠলেনঃ “আপনি তো আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং আপনার কষ্ট আমার কষ্টের চাইতেও আমার কাছে বেশী পীড়াদায়ক। কিন্তু এখন আপনি আপনার মুখ থেকে এমন একটা কথা বের করলেন যে, যদি আমি তা পৌছিয়ে দেই তবে আমার জন্যে রয়েছে লাঞ্ছনা, আর না পৌছালে রয়েছে ধ্বংস। তবে লাঞ্ছনা অবশ্যই ধ্বংস হতে হালকা।” একথা বলেই তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে ঐ কথা বলে দিলেন। জাল্লাস এ সংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে শপথ করে বলেঃ “উমাইর ইবনে সা'দ (রাঃ) মিথ্যা কথা বলেছে। আমি কখনও এ কথা বলিনি।” তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। বর্ণিত আছে যে, এরপর জাল্লাস তাওবাহ করে নেয় এবং ঠিক হয়ে যায়। তবে সম্ভবতঃ তার তাওবাহ্ করার কথাটা ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর নিজের উক্তি হবে, কা'ব (রাঃ)-এর উক্তি নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।উরওয়া ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি জাল্লাস ইবনে সাভীদ ইবনে সামিতের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঘটনা এই যে, সে এবং তার স্ত্রীর (পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত) পুত্র মুসআব (রাঃ) কুবা থেকে আসছিল। হঠাৎ করে জাল্লাস বলে ফেলেঃ “মুহাম্মাদ (সঃ) যা নিয়ে এসেছেন তা যদি সত্য হয় তবে তো। আমরা যে গাধার উপর সওয়ার হয়ে আছি এর থেকেও আমরা নির্বোধ!” তখন মুসআব (রাঃ) তাকে বলেনঃ “ওরে আল্লাহর শত্রু! আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে এ সংবাদ দিয়ে দেবো। আমি ভয় পাচ্ছি যে, না জানি আমার ব্যাপারে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়ে যায় বা আমার উপর আল্লাহর কোন শাস্তি এসে পড়ে, অথবা এই পাপে আমার বৈপিত্রের সাথে আমাকেও শরীক করে নেয়া হয়!” তাই আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে হাযির হয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি এবং জাল্লাস কুবা থেকে আসছিলাম। ঐ সময় সে এরূপ এরূপ বলেছে। আমি যদি এ ভয় না করতাম যে, এ অপরাধে আমার্কেও জড়িয়ে ফেলা হবে, তবে আমি আপনাকে এ খবর দিতাম না। বর্ণনাকারী বলেন যে, মুসআব (রাঃ)-এর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জাল্লাসকে ডেকে পাঠান এবং তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “মুসআব (রাঃ) যে কথা বলেছে সে কথা কি তুমি (সত্যি) বলেছো?" তখন সে আল্লাহর কসম করে তা অস্বীকার করে বসে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। তাফসীরে ইবনে জারীরে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি গাছের ছায়ায় বসেছিলেন। ঐ সময় তিনি (সাহাবীদেরকে) বলেনঃ “এখনই তোমাদের কাছে একটি লোক আসবে এবং সে তোমাদের দিকে শয়তানের দৃষ্টিতে তাকাবে। যখন সে আসবে তখন তোমরা তার সাথে কথা বলবে না।” তখনই কয়রা চক্ষু বিশিষ্ট একটি লোক এসে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি ও তোমার সঙ্গীরা আমাকে গালি দাও কেন?” তৎক্ষণাৎ সে গিয়ে তার সঙ্গী সাথীদেরকে নিয়ে আসলো এবং সবাই আল্লাহর নামে শপথ করে বললো যে, তারা এসব কথা বলেনি। শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। তখন মহা মহিমান্বিত আল্লাহ (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ পাকের (আরবী) (তারা এমন বিষয়ের সংকল্প করেছিল যা তারা কার্যকরী করতে পারেনি) এ উক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা জাল্লাসের সংকল্পকে বুঝানো হয়েছে। সে সংকল্প করেছিল যে, তার স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত যে ছেলেটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তার কথা বলে দিয়েছিলেন তাকে সে হত্যা করবে। একটি উক্তি এই যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করার সংকল্প করেছিল। একটি উক্তি এও আছে যে, কতকগুলো লোক ইচ্ছা করেছিল, মুহাম্মাদ (সঃ) সম্মত না হলেও তারা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে তাদের সরদার বানাবে। এটাও বর্ণিত আছে যে, দশজনের বেশী লোক তাবুকের যুদ্ধে গমনের সময় পথে প্রতারণা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা করার সংকল্প করেছিল। হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ “আমি এবং আম্মার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উষ্ট্রীর আগে ও পিছনে চলছিলাম। একজন পিছন থেকে হাঁকাচ্ছিলাম এবং অন্যজন আগে আগে লাগাম ধরে টানছিলাম। আমরা আকাবা নামক স্থানে ছিলাম। এমন সময় দেখি যে, বারোজন লোক মুখের উপর ঢাকনা দিয়ে আসলো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উষ্ট্রীটিকে ঘিরে ধরলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করলেন। সুতরাং তারা পালিয়ে গেল। তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা তাদেরকে চিনতে পেরেছো কি?” আমরা উত্তর দিলামঃ না, তবে তাদের সওয়ারীগুলো আমাদের চোখের সামনে রয়েছে (অর্থাৎ তাদের সওয়ারীগুলো আমরা চিনতে পেরেছি)। তিনি বললেনঃ “এরা হচ্ছে মুনাফিক এবং কিয়ামত পর্যন্ত এদের অন্তরে নিফাক (কপটতা) থাকবে। এরা কোন্ উদ্দেশ্যে এসেছিল তা তোমরা জান কি?” আমরা উত্তরে বললামঃ না। তিনি বললেনঃ “এরা এসেছিল আকাবায় আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে পেরেশান করা ও কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি তাদের গোত্রগুলোর কাছে এ সংবাদ পাঠাবো না যে, প্রত্যেক কওম যেন তাদের এই প্রকারের লোকের (কর্তিত) মস্তক আপনার কাছে পাঠিয়ে দেয় (অর্থাৎ তার গর্দান উড়িয়ে দেয়। তিনি উত্তরে বললেনঃ “না, (এটা করা যায় না) তাহলে লোকেরা সমালোচনা করবে যে, মুহাম্মাদ (সঃ) প্রথমে তো এই লোকদেরকে নিয়েই শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়লাভ করেছেন, আবার নিজের সেই সঙ্গীদেরকে হত্যা করে দিলেন।” অতঃপর তিনি বদ্ দুআ করলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি এদের অন্তরে আগুনের ফোঁড়া সৃষ্টি করে দিন।”মুসনাদে আহমাদে আবুত তুফাইল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাবুকের যুদ্ধ হতে ফিরবার পথে ঘোষণা করে দেনঃ “আমি আকাবার পথে গমন করবো। কেউ যেন এই পথে না আসে।” হুযাইফা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সওয়ারীর লাগাম ধরেছিলেন এবং আম্মার (রাঃ) পিছন থেকে হাঁকিয়ে যাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় এক দল লোক তাদের উষ্ট্রীগুলোর উপর সওয়ার হয়ে উপস্থিত হয়। আম্মার (রাঃ) তাদের উষ্ট্রীগুলোকে মারতে শুরু করেন। আর হুযাইফা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে তার সওয়ারীকে নীচের দিকে চালাতে শুরু করেন। যখন নীচের মাঠ এসে পড়ে তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সওয়ারী হতে নেমে পড়েন। ইতিমধ্যে আম্মারও (রাঃ) ফিরে আসেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আম্মার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ঐ লোকগুলোকে চিনতে পেরেছে। কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “তাদের মুখ তো ঢাকা ছিল, তবে তাদের সওয়ারীগুলো আমি চিনতে পেরেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কি উদ্দেশ্যে এসেছিল তা জান কি?” তিনি জবাবে বললেনঃ “না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তারা চেয়েছিল গোলমাল ও চীৎকার করে আমার উন্ত্রীকে উত্তেজিত করতে, যাতে আমি উন্ত্রী থেকে পড়ে যাই।” আম্মার (রাঃ) একজন লোককে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছিআকাবার ঐ লোকগুলো কতজন ছিল?" সে উত্তরে বলেঃ “চৌদ্দজন।" তখন আম্মার (রাঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি যদি তাদের অন্তর্ভুক্ত হও তবে পনেরো জন হবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের মধ্যে তিনজনের নাম গণনা করেন। তারা বলেঃ “আল্লাহর শপথ! না আমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর আহ্বানকারীর আহ্বান শুনেছি, না আমরা আমাদের সঙ্গীদের কুমতলব অবগত ছিলাম। আম্মার (রাঃ) বলেনঃ “অবশিষ্ট বারোজন লোক আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে জিহাদকারী, দুনিয়াতেও এবং আখিরাতেও। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) অনেক লোকের নামও বলেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, আহলে আকাবার মধ্যকার একটি লোকের সাথে আম্মার (রাঃ)-এর কিছুটা সম্পর্ক ছিল। তাই তিনি লোকটিকে আল্লাহর কসম দিয়ে আহলে আকাবার সংখ্যা জিজ্ঞেস করেন। তখন লোকেরাও তাকে তাদের সংখ্যা বলতে বলে। সে বলেঃ “আমি জানতে পেরেছি যে, তারা ছিল চৌদ্দজন। আর আমাকেও যদি তাদের অন্তর্ভুক্ত ধরা যায় তবে সংখ্যা দাঁড়াবে পনেরো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের তিনজনের নাম বলে দিলে তারা বলেঃ “আল্লাহর শপথ! আমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর আহ্বানকারীর আহ্বানও শুনিনি এবং ঐ কওমের কি উদ্দেশ্য ছিল সেটাও আমরা জানতাম না।” অবশিষ্ট বারোজন দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী। গরমের মৌসুম ছিল। পানি ছিল খুবই কম। তাই তিনি বলেছিলেনঃ “আমার পূর্বে কেউ যেন সেখানে না পৌছে।” কিন্তু তবুও কিছু লোক সেখানে পৌছে গিয়েছিল। তিনি তাদের উপর অভিশাপ দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সহচরদের মধ্যে বারোজন মুনাফিক রয়েছে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং ওর সুগন্ধও পাবে না। আটজনের কাঁধে আগুনের ফোড়া হবে যা বক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। তা তাদেরকে ধ্বংস করে দিবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) একমাত্র হুযায়ফা (রাঃ)-কে ঐ মুনাফিকদের নাম বলেছিলেন বলেই তাকে তার রাযদার (যিনি গোপন কথা জানেন) বলা হতো। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।ইমাম তিবরানী (রঃ) তাঁর কিতাবে আসহাবে আকাবার নিম্নরূপ নাম দিয়েছেনঃ(১) মু'তাব ইবনে কুশাইর, (২) ওয়াদীআ' ইবনে সাবিত, (৩) জাদ্দ ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে নাবীল, এ ছিল আমর ইবনে আউফের গোত্রের লোক, (৪) হারিস ইবনে ইয়াযীদ আত্তায়ী, (৫) আউস ইবনে কাইযী, (৬) হারিস ইবনে সাভীদ, (৭) সা’দ ইবনে যারারা, (৮) কায়েস ইবনে ফাহদ, (৯) বানু হুবলা গোত্রের সাভীদ ইবনে দাইস, (১০ কায়েস ইবনে আমর ইবনে সাহল, (১১) যায়েদ ইবনে লাসীত এবং (১২) সালালা ইবনে হামাম। শেষোক্ত দু’ব্যক্তি বানু কাইনুকা গোত্রের লোক। তারা সবাই বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।এ আয়াতেই এর পরে বলা হয়েছে। তারা শুধু এরই প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে। যে, আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাঁর রাসূল (সঃ)-এর মাধ্যমে তাদেরকে মালদার করেছেন। যদি তাদের উপর আল্লাহ তাআলার পূর্ণ অনুগ্রহ হতো তবে তাদের ভাগ্যে হিদায়াতও জুটতো। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনসারদেরকে বলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট অবস্থায় পাইনি, অতঃপর আমার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন? তোমরা কি বিচ্ছিন্ন ছিলে না, অতঃপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে প্রেমের সূত্রে আবদ্ধ করেছেন? তোমরা কি দরিদ্র ছিলে না, অতঃপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে ধনী করেছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতিটি প্রশ্নের জবাবে আনসাররা বলছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমাদের উপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর এর চেয়েও বেশী ইহসান রয়েছে। মোটকথা, বর্ণনা এই যে, বিনা কারণে ও বিনা দোষে এই লোকগুলো শত্রুতা ও বেঈমানী করে বসেছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “কাফিররা মুমিনদের শুধু এরই প্রতিশোধ নিয়েছিল যে, তারা প্রবল পরাক্রান্ত ও মহা প্রশংসিত আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ইবনে জামীল শুধু এরই প্রতিশোধ নিচ্ছে যে, সে দরিদ্র ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাকে সম্পদশালী করেছেন।” এরপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তাওবার দিকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “এখনও যদি তারা তাওবা করে নেয় তবে তা তাদের জন্যে কল্যাণকর হবে। আর যদি তারা তাদের নীতির উপরই অটল থাকে তবে আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে বেদনাদায়ক শাস্তি প্রদান করবেন।” অর্থাৎ যদি তারা তাদের পন্থা ও নীতিকেই আঁকড়ে ধরে থাকে তবে আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ায় যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিবেন হত্যা, দুঃখ এবং চিন্তার দ্বারা, আর পরকালে জাহান্নামের অপমানজনক ও কষ্টদায়ক আযাব দ্বারা।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “দুনিয়ায় তাদের কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী নেই।” অর্থাৎ দুনিয়ায় এমন কেউ নেই যে তাদেরকে কোন সাহায্য করতে পারবে। না পারবে তারা তাদের কোন উপকার করতে এবং না পারবে তাদের কোন কষ্ট দূর করতে। অসহায়ভাবেই তারা জীবন কাটাবে।

আত-তাওবা 9:75

৭৫-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, এই মুনাফিকদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছে যে, যদি তিনি তাদেরকে সম্পদশালী করে দেন। তবে তারা খুবই দান-খয়রাত করবে এবং সৎ লোক হয়ে যাবে । অতঃপর যখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধনী বানিয়ে দিলেন এবং তাদের অবস্থা স্বচ্ছল হয়ে গেল তখন সে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দিলো ও কৃপণতা করতে শুরু করলো। এর শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে চিরদিনের জন্যে নিফাক বা কপটতা সৃষ্টি করে দিলেন। এ আয়াতটি সা’লাবা ইবনে হাতিব আনসারীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। যে নবী (সঃ)-কে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাকে ধন-সম্পদ দান করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “যে অল্প মালের তুমি শাকরিয়া আদায় করবে তা ঐ অধিক মাল হতে উত্তম যার তুমি শাকরিয়া আদায় করতে সক্ষম হবে না।” সে দ্বিতীয়বার ঐ প্রার্থনাই করলো । তখন নবী (সঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি কি নিজের অবস্থা আল্লাহর নবী (সঃ)-এর মত রাখা পছন্দ কর নী? যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। তার শপথ! আমি যদি ইচ্ছা করি যে, পাহাড়গুলো সোনা ও রূপা হয়ে আমার সাথে চলতে থাকুক তবে অবশ্যই সেগুলো সেভাবেই চলতে থাকবে। সে বললোঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! যদি আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন, অতঃপর তিনি আমাকে ধন-সম্পদ দান করেন তবে আমি অবশ্যই প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি সা’লাবাকে ধন-সম্পদ দান করুন। ফলে তার বকরীগুলো এতো বেশী বৃদ্ধি পায় যেমনভাবে পোকা মাকড়গুলো বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এমন কি মদীনা শরীফ তার পশুগুলোর পক্ষে সংকীর্ণ হয়ে গেল। সুতরাং সে মদীনা থেকে দূরে চলে গেলো। যোহর ও আসরের সালাত সে জামাআতের সাথে আদায় করতো বটে, কিন্তু অন্যান্য সালাত জামাআতের সাথে আদায় করতে পারতো না। তার পশুগুলো আরো বৃদ্ধি পায়, ফলে তাকে আরো দূরে চলে যেতে হয়। এখন শুধু জুমআ ছাড়া তার সমস্ত জামাআত ছুটে যায়। মাল আরো বেড়ে গেল। ক্রমে ক্রমে সে জুমআর জামাআতে হাযির হওয়াও ছেড়ে দিলো। যেসব যাত্রীদল জুমআয় হাযির হতো তাদেরকে সে জুমআর আলোচিত বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতো। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পর্কে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা সব কিছু বর্ণনা করে দেয়। তখন তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। আর এদিকে আয়াত নাযিল হয়ে যায়। (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মাল থেকে সাদকা (যাকাত) নিয়ে নাও।” (৯৪ ১০৩) সাদকার আহকামও নাযিল হয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলিমদের নিকট থেকে যাকাত আদায় করার জন্যে দু’জন লোককে প্রেরণ করেন। একজন ছিলেন জুহাইনা গোত্রের লোক এবং অপরজন ছিলেন সুলাইম গোত্রের লোক। কিভাবে তারা মুসলিমদের নিকট থেকে যাকাত আদায় করবেন তা তিনি তাঁদেরকে লিখে দেন। আর তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা দু'জন সালাবার নিকট থেকে এবং বানু সুলাইমের অমুক ব্যক্তির নিকট থেকে যাকাত গ্রহণ কর।” সুতরাং তারা দু’জন সা'লাবার কাছে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশনামা দেখালেন এবং যাকাত চাইলেন। সে তখন বললোঃ “এটা তো জিযিয়ার বোন ছাড়া কিছুই নয়! এটা কি তা আমি বুঝতে পারছি না। আচ্ছা। এখন যাও, ফিরবার পথে এসো।” তখন তারা দু'জন চলে আসলেন। তাঁদের সংবাদ সুলাইম গোত্রের লোকটির নিকট পৌঁছলে তিনি উত্তম উটগুলো বের করে আনলেন এবং ওগুলো নিয়ে নিজেই তাদের কাছে আসলেন। তাঁরা ঐ জন্তুগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেনঃ “এগুলো তোমার উপর ওয়াজিবও নয় এবং আমরা এগুলো তোমার নিকট থেকে গ্রহণ করতেও চাই না।” তিনি বললেনঃ “আমি তো খুশী মনে আমার উত্তম পশুগুলো দিতে চাচ্ছি, সুতরাং আপনারা এগুলো কবুল করে নিন। শেষ পর্যন্ত তারা ওগুলো গ্রহণ করলেন। অন্যান্যদের নিকট থেকেও তারা যাকাত আদায় করলেন। ফিরবার পথে তারা সা'লাবার কাছে। আসলেন। সে বললোঃ “যে নির্দেশনামা তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে তা আমাকে পড়তে দাও দেখি।" পড়ে সে বলতে লাগলোঃ “এটা তো স্পষ্ট জিযিয়া । কাফিরদের উপর যে ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয় এটাতো একেবারে ঐরূপই। আচ্ছা, তোমরা এখন যাও, আমি চিন্তা ভাবনা করে দেখি।” তাঁরা দু’জন ফিরে চলে আসলেন। তাদেরকে দেখা মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) সা'লাবার উপর দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং সুলাইম গোত্রের লোকটির উপর বরকতের দুআ করলেন। এখন তারাও সা'লাবা ও সুলাইম গোত্রের লোকটির ঘটনা বর্ণনা করে শুনালেন। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন। সা'লাবার একজন নিকটতম আত্মীয় এ সবকিছু শুনে সালাবার কাছে গিয়ে বর্ণনা করলো এবং আয়াতটিও পড়ে শুনিয়ে দিলো। সা'লাবা তখন নবী (সঃ)-এর কাছে এসে যাকাত ককূল করার প্রার্থনা জানালো। নবী (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমার যাকাত কবুল করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। সে তখন নিজের মাথার উপর মাটি নিক্ষেপ করতে লাগলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “এটা তো তোমারই কর্মের ফল। আমি তোমাকে আদেশ করেছিলাম। কিন্তু তুমি আমার আদেশ অমান্য করেছে। সে তখন নিজের জায়গায় ফিরে আসলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত সা'লাবার কোন কিছুই ককূল করেননি। অতঃপর সে আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে তার কাছে আগমন করে এবং বলেঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আমার যে মর্যাদা ছিল এবং আনসারদের মধ্যে আমার যে সম্মান রয়েছে তা আপনি ভালরূপেই জানেন। সুতরাং আমার সাদকা ককূল। করুন।” তিনি উত্তর দিলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কবুল করেননি তখন আমি কে?" মোটকথা, তিনি অস্বীকার করলেন। অতঃপর যখন তিনি ইন্তেকাল করলেন এবং উমার (রাঃ) মুসলিমদের খলীফা নির্বাচিত হলেন তখন সা'লাবা তাঁর কাছে এসে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি আমার সাদকা কবুল করুন!" উমর (রাঃ) উত্তর দিলেনঃ “রাসূলুল্লাহ ও প্রথম খলীফা যখন ককূল করেননি তখন আমি কিরূপে ককূল করতে পারি?” সুতরাং তিনিও অস্বীকৃতি জানালেন। তারপর উসমান (রাঃ)-এর ফিলাফতকালে আবার ঐ চিরদিনের মুনাফিক তাঁর কাছে আসলো এবং তার সাদকা কবূল করার জন্যে তাকে অনুরোধ করলো। কিন্তু তিনি জবাব দিলেনঃ “স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সঃ) এবং তাঁর দু’জন খলীফা যখন তোমার সাদকা গ্রহণ করেননি তখন আমি কি করে তা গ্রহণ করতে পারি? সুতরাং তিনিও তা কবুল করলেন না। ঐ অবস্থাতেই লোকটি ধ্বংস হয়ে যায়। মোটকথা, প্রথমে তো সে শপথ করে বলেছিল যে, সে সাদকা ও দান-খয়রাত করবে, কিন্তু পরে ফিরে গেল এবং দান-খয়রাতের পরিবর্তে কার্পণ্য করতে শুরু করলো ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দিলো। এই অঙ্গীকার ভঙ্গের প্রতিফল হিসেবে তার অন্তরে নিফাক বা কপটতা জড়িয়ে পড়লো, যা ঐ সময় থেকে নিয়ে তার পূর্ণ জীবন পর্যন্ত তার সাথে থেকেই গেল। হাদীসে রয়েছে যে, মুনাফিকের লক্ষণ হচ্ছে তিনটি- (১) যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, (২) যখন কোন ওয়াদা করে তখন তা খিলাফ করে এবং (৩) তার কাছে কোন কিছু আমানত রাখা হলে তা খিয়ানত করে।আল্লাহ পাক বলেনঃ তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাদের মনের গুপ্ত কথা এবং গোপন পরামর্শ সবই অবগত আছেন? তিনি পূর্ব হতেই জানতেন যে, এটা শুধু তাদের মুখের কথা যে, তারা সম্পদশালী হয়ে গেলে এরূপ এরূপ দান-খয়রাত করবে, এমন এমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং এরূপ সৎকাজ করবে। কিন্তু তাদের অন্তরের উপর দৃষ্টিপাতকারী তো হচ্ছেন আল্লাহ । তিনি তো জানেন যে, মালধন পেলেই তারা তাতে মত্ত হয়ে যাবে, আমোদ আহলাদ করবে, অকৃতজ্ঞ হবে এবং কার্পণ্য করতে শুরু করবে।আল্লাহ তা'আলা সমস্ত গায়েবের খবর খুবই জ্ঞাত আছেন। তিনি সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত। সব কিছুই তাঁর সামনে উজ্জ্বল। কিছুই তার অগোচরে নেই।

আত-তাওবা 9:76

৭৫-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, এই মুনাফিকদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছে যে, যদি তিনি তাদেরকে সম্পদশালী করে দেন। তবে তারা খুবই দান-খয়রাত করবে এবং সৎ লোক হয়ে যাবে । অতঃপর যখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধনী বানিয়ে দিলেন এবং তাদের অবস্থা স্বচ্ছল হয়ে গেল তখন সে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দিলো ও কৃপণতা করতে শুরু করলো। এর শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে চিরদিনের জন্যে নিফাক বা কপটতা সৃষ্টি করে দিলেন। এ আয়াতটি সা’লাবা ইবনে হাতিব আনসারীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। যে নবী (সঃ)-কে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাকে ধন-সম্পদ দান করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “যে অল্প মালের তুমি শাকরিয়া আদায় করবে তা ঐ অধিক মাল হতে উত্তম যার তুমি শাকরিয়া আদায় করতে সক্ষম হবে না।” সে দ্বিতীয়বার ঐ প্রার্থনাই করলো । তখন নবী (সঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি কি নিজের অবস্থা আল্লাহর নবী (সঃ)-এর মত রাখা পছন্দ কর নী? যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। তার শপথ! আমি যদি ইচ্ছা করি যে, পাহাড়গুলো সোনা ও রূপা হয়ে আমার সাথে চলতে থাকুক তবে অবশ্যই সেগুলো সেভাবেই চলতে থাকবে। সে বললোঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! যদি আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন, অতঃপর তিনি আমাকে ধন-সম্পদ দান করেন তবে আমি অবশ্যই প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি সা’লাবাকে ধন-সম্পদ দান করুন। ফলে তার বকরীগুলো এতো বেশী বৃদ্ধি পায় যেমনভাবে পোকা মাকড়গুলো বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এমন কি মদীনা শরীফ তার পশুগুলোর পক্ষে সংকীর্ণ হয়ে গেল। সুতরাং সে মদীনা থেকে দূরে চলে গেলো। যোহর ও আসরের সালাত সে জামাআতের সাথে আদায় করতো বটে, কিন্তু অন্যান্য সালাত জামাআতের সাথে আদায় করতে পারতো না। তার পশুগুলো আরো বৃদ্ধি পায়, ফলে তাকে আরো দূরে চলে যেতে হয়। এখন শুধু জুমআ ছাড়া তার সমস্ত জামাআত ছুটে যায়। মাল আরো বেড়ে গেল। ক্রমে ক্রমে সে জুমআর জামাআতে হাযির হওয়াও ছেড়ে দিলো। যেসব যাত্রীদল জুমআয় হাযির হতো তাদেরকে সে জুমআর আলোচিত বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতো। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পর্কে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা সব কিছু বর্ণনা করে দেয়। তখন তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। আর এদিকে আয়াত নাযিল হয়ে যায়। (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মাল থেকে সাদকা (যাকাত) নিয়ে নাও।” (৯৪ ১০৩) সাদকার আহকামও নাযিল হয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলিমদের নিকট থেকে যাকাত আদায় করার জন্যে দু’জন লোককে প্রেরণ করেন। একজন ছিলেন জুহাইনা গোত্রের লোক এবং অপরজন ছিলেন সুলাইম গোত্রের লোক। কিভাবে তারা মুসলিমদের নিকট থেকে যাকাত আদায় করবেন তা তিনি তাঁদেরকে লিখে দেন। আর তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা দু'জন সালাবার নিকট থেকে এবং বানু সুলাইমের অমুক ব্যক্তির নিকট থেকে যাকাত গ্রহণ কর।” সুতরাং তারা দু’জন সা'লাবার কাছে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশনামা দেখালেন এবং যাকাত চাইলেন। সে তখন বললোঃ “এটা তো জিযিয়ার বোন ছাড়া কিছুই নয়! এটা কি তা আমি বুঝতে পারছি না। আচ্ছা। এখন যাও, ফিরবার পথে এসো।” তখন তারা দু'জন চলে আসলেন। তাঁদের সংবাদ সুলাইম গোত্রের লোকটির নিকট পৌঁছলে তিনি উত্তম উটগুলো বের করে আনলেন এবং ওগুলো নিয়ে নিজেই তাদের কাছে আসলেন। তাঁরা ঐ জন্তুগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেনঃ “এগুলো তোমার উপর ওয়াজিবও নয় এবং আমরা এগুলো তোমার নিকট থেকে গ্রহণ করতেও চাই না।” তিনি বললেনঃ “আমি তো খুশী মনে আমার উত্তম পশুগুলো দিতে চাচ্ছি, সুতরাং আপনারা এগুলো কবুল করে নিন। শেষ পর্যন্ত তারা ওগুলো গ্রহণ করলেন। অন্যান্যদের নিকট থেকেও তারা যাকাত আদায় করলেন। ফিরবার পথে তারা সা'লাবার কাছে। আসলেন। সে বললোঃ “যে নির্দেশনামা তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে তা আমাকে পড়তে দাও দেখি।" পড়ে সে বলতে লাগলোঃ “এটা তো স্পষ্ট জিযিয়া । কাফিরদের উপর যে ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয় এটাতো একেবারে ঐরূপই। আচ্ছা, তোমরা এখন যাও, আমি চিন্তা ভাবনা করে দেখি।” তাঁরা দু’জন ফিরে চলে আসলেন। তাদেরকে দেখা মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) সা'লাবার উপর দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং সুলাইম গোত্রের লোকটির উপর বরকতের দুআ করলেন। এখন তারাও সা'লাবা ও সুলাইম গোত্রের লোকটির ঘটনা বর্ণনা করে শুনালেন। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন। সা'লাবার একজন নিকটতম আত্মীয় এ সবকিছু শুনে সালাবার কাছে গিয়ে বর্ণনা করলো এবং আয়াতটিও পড়ে শুনিয়ে দিলো। সা'লাবা তখন নবী (সঃ)-এর কাছে এসে যাকাত ককূল করার প্রার্থনা জানালো। নবী (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমার যাকাত কবুল করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। সে তখন নিজের মাথার উপর মাটি নিক্ষেপ করতে লাগলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “এটা তো তোমারই কর্মের ফল। আমি তোমাকে আদেশ করেছিলাম। কিন্তু তুমি আমার আদেশ অমান্য করেছে। সে তখন নিজের জায়গায় ফিরে আসলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত সা'লাবার কোন কিছুই ককূল করেননি। অতঃপর সে আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে তার কাছে আগমন করে এবং বলেঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আমার যে মর্যাদা ছিল এবং আনসারদের মধ্যে আমার যে সম্মান রয়েছে তা আপনি ভালরূপেই জানেন। সুতরাং আমার সাদকা ককূল। করুন।” তিনি উত্তর দিলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কবুল করেননি তখন আমি কে?" মোটকথা, তিনি অস্বীকার করলেন। অতঃপর যখন তিনি ইন্তেকাল করলেন এবং উমার (রাঃ) মুসলিমদের খলীফা নির্বাচিত হলেন তখন সা'লাবা তাঁর কাছে এসে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি আমার সাদকা কবুল করুন!" উমর (রাঃ) উত্তর দিলেনঃ “রাসূলুল্লাহ ও প্রথম খলীফা যখন ককূল করেননি তখন আমি কিরূপে ককূল করতে পারি?” সুতরাং তিনিও অস্বীকৃতি জানালেন। তারপর উসমান (রাঃ)-এর ফিলাফতকালে আবার ঐ চিরদিনের মুনাফিক তাঁর কাছে আসলো এবং তার সাদকা কবূল করার জন্যে তাকে অনুরোধ করলো। কিন্তু তিনি জবাব দিলেনঃ “স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সঃ) এবং তাঁর দু’জন খলীফা যখন তোমার সাদকা গ্রহণ করেননি তখন আমি কি করে তা গ্রহণ করতে পারি? সুতরাং তিনিও তা কবুল করলেন না। ঐ অবস্থাতেই লোকটি ধ্বংস হয়ে যায়। মোটকথা, প্রথমে তো সে শপথ করে বলেছিল যে, সে সাদকা ও দান-খয়রাত করবে, কিন্তু পরে ফিরে গেল এবং দান-খয়রাতের পরিবর্তে কার্পণ্য করতে শুরু করলো ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দিলো। এই অঙ্গীকার ভঙ্গের প্রতিফল হিসেবে তার অন্তরে নিফাক বা কপটতা জড়িয়ে পড়লো, যা ঐ সময় থেকে নিয়ে তার পূর্ণ জীবন পর্যন্ত তার সাথে থেকেই গেল। হাদীসে রয়েছে যে, মুনাফিকের লক্ষণ হচ্ছে তিনটি- (১) যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, (২) যখন কোন ওয়াদা করে তখন তা খিলাফ করে এবং (৩) তার কাছে কোন কিছু আমানত রাখা হলে তা খিয়ানত করে।আল্লাহ পাক বলেনঃ তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাদের মনের গুপ্ত কথা এবং গোপন পরামর্শ সবই অবগত আছেন? তিনি পূর্ব হতেই জানতেন যে, এটা শুধু তাদের মুখের কথা যে, তারা সম্পদশালী হয়ে গেলে এরূপ এরূপ দান-খয়রাত করবে, এমন এমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং এরূপ সৎকাজ করবে। কিন্তু তাদের অন্তরের উপর দৃষ্টিপাতকারী তো হচ্ছেন আল্লাহ । তিনি তো জানেন যে, মালধন পেলেই তারা তাতে মত্ত হয়ে যাবে, আমোদ আহলাদ করবে, অকৃতজ্ঞ হবে এবং কার্পণ্য করতে শুরু করবে।আল্লাহ তা'আলা সমস্ত গায়েবের খবর খুবই জ্ঞাত আছেন। তিনি সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত। সব কিছুই তাঁর সামনে উজ্জ্বল। কিছুই তার অগোচরে নেই।

আত-তাওবা 9:77

৭৫-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, এই মুনাফিকদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছে যে, যদি তিনি তাদেরকে সম্পদশালী করে দেন। তবে তারা খুবই দান-খয়রাত করবে এবং সৎ লোক হয়ে যাবে । অতঃপর যখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধনী বানিয়ে দিলেন এবং তাদের অবস্থা স্বচ্ছল হয়ে গেল তখন সে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দিলো ও কৃপণতা করতে শুরু করলো। এর শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে চিরদিনের জন্যে নিফাক বা কপটতা সৃষ্টি করে দিলেন। এ আয়াতটি সা’লাবা ইবনে হাতিব আনসারীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। যে নবী (সঃ)-কে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাকে ধন-সম্পদ দান করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “যে অল্প মালের তুমি শাকরিয়া আদায় করবে তা ঐ অধিক মাল হতে উত্তম যার তুমি শাকরিয়া আদায় করতে সক্ষম হবে না।” সে দ্বিতীয়বার ঐ প্রার্থনাই করলো । তখন নবী (সঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি কি নিজের অবস্থা আল্লাহর নবী (সঃ)-এর মত রাখা পছন্দ কর নী? যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। তার শপথ! আমি যদি ইচ্ছা করি যে, পাহাড়গুলো সোনা ও রূপা হয়ে আমার সাথে চলতে থাকুক তবে অবশ্যই সেগুলো সেভাবেই চলতে থাকবে। সে বললোঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! যদি আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন, অতঃপর তিনি আমাকে ধন-সম্পদ দান করেন তবে আমি অবশ্যই প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি সা’লাবাকে ধন-সম্পদ দান করুন। ফলে তার বকরীগুলো এতো বেশী বৃদ্ধি পায় যেমনভাবে পোকা মাকড়গুলো বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এমন কি মদীনা শরীফ তার পশুগুলোর পক্ষে সংকীর্ণ হয়ে গেল। সুতরাং সে মদীনা থেকে দূরে চলে গেলো। যোহর ও আসরের সালাত সে জামাআতের সাথে আদায় করতো বটে, কিন্তু অন্যান্য সালাত জামাআতের সাথে আদায় করতে পারতো না। তার পশুগুলো আরো বৃদ্ধি পায়, ফলে তাকে আরো দূরে চলে যেতে হয়। এখন শুধু জুমআ ছাড়া তার সমস্ত জামাআত ছুটে যায়। মাল আরো বেড়ে গেল। ক্রমে ক্রমে সে জুমআর জামাআতে হাযির হওয়াও ছেড়ে দিলো। যেসব যাত্রীদল জুমআয় হাযির হতো তাদেরকে সে জুমআর আলোচিত বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতো। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পর্কে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা সব কিছু বর্ণনা করে দেয়। তখন তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। আর এদিকে আয়াত নাযিল হয়ে যায়। (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মাল থেকে সাদকা (যাকাত) নিয়ে নাও।” (৯৪ ১০৩) সাদকার আহকামও নাযিল হয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলিমদের নিকট থেকে যাকাত আদায় করার জন্যে দু’জন লোককে প্রেরণ করেন। একজন ছিলেন জুহাইনা গোত্রের লোক এবং অপরজন ছিলেন সুলাইম গোত্রের লোক। কিভাবে তারা মুসলিমদের নিকট থেকে যাকাত আদায় করবেন তা তিনি তাঁদেরকে লিখে দেন। আর তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা দু'জন সালাবার নিকট থেকে এবং বানু সুলাইমের অমুক ব্যক্তির নিকট থেকে যাকাত গ্রহণ কর।” সুতরাং তারা দু’জন সা'লাবার কাছে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশনামা দেখালেন এবং যাকাত চাইলেন। সে তখন বললোঃ “এটা তো জিযিয়ার বোন ছাড়া কিছুই নয়! এটা কি তা আমি বুঝতে পারছি না। আচ্ছা। এখন যাও, ফিরবার পথে এসো।” তখন তারা দু'জন চলে আসলেন। তাঁদের সংবাদ সুলাইম গোত্রের লোকটির নিকট পৌঁছলে তিনি উত্তম উটগুলো বের করে আনলেন এবং ওগুলো নিয়ে নিজেই তাদের কাছে আসলেন। তাঁরা ঐ জন্তুগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেনঃ “এগুলো তোমার উপর ওয়াজিবও নয় এবং আমরা এগুলো তোমার নিকট থেকে গ্রহণ করতেও চাই না।” তিনি বললেনঃ “আমি তো খুশী মনে আমার উত্তম পশুগুলো দিতে চাচ্ছি, সুতরাং আপনারা এগুলো কবুল করে নিন। শেষ পর্যন্ত তারা ওগুলো গ্রহণ করলেন। অন্যান্যদের নিকট থেকেও তারা যাকাত আদায় করলেন। ফিরবার পথে তারা সা'লাবার কাছে। আসলেন। সে বললোঃ “যে নির্দেশনামা তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে তা আমাকে পড়তে দাও দেখি।" পড়ে সে বলতে লাগলোঃ “এটা তো স্পষ্ট জিযিয়া । কাফিরদের উপর যে ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয় এটাতো একেবারে ঐরূপই। আচ্ছা, তোমরা এখন যাও, আমি চিন্তা ভাবনা করে দেখি।” তাঁরা দু’জন ফিরে চলে আসলেন। তাদেরকে দেখা মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) সা'লাবার উপর দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং সুলাইম গোত্রের লোকটির উপর বরকতের দুআ করলেন। এখন তারাও সা'লাবা ও সুলাইম গোত্রের লোকটির ঘটনা বর্ণনা করে শুনালেন। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন। সা'লাবার একজন নিকটতম আত্মীয় এ সবকিছু শুনে সালাবার কাছে গিয়ে বর্ণনা করলো এবং আয়াতটিও পড়ে শুনিয়ে দিলো। সা'লাবা তখন নবী (সঃ)-এর কাছে এসে যাকাত ককূল করার প্রার্থনা জানালো। নবী (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমার যাকাত কবুল করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। সে তখন নিজের মাথার উপর মাটি নিক্ষেপ করতে লাগলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “এটা তো তোমারই কর্মের ফল। আমি তোমাকে আদেশ করেছিলাম। কিন্তু তুমি আমার আদেশ অমান্য করেছে। সে তখন নিজের জায়গায় ফিরে আসলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত সা'লাবার কোন কিছুই ককূল করেননি। অতঃপর সে আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে তার কাছে আগমন করে এবং বলেঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আমার যে মর্যাদা ছিল এবং আনসারদের মধ্যে আমার যে সম্মান রয়েছে তা আপনি ভালরূপেই জানেন। সুতরাং আমার সাদকা ককূল। করুন।” তিনি উত্তর দিলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কবুল করেননি তখন আমি কে?" মোটকথা, তিনি অস্বীকার করলেন। অতঃপর যখন তিনি ইন্তেকাল করলেন এবং উমার (রাঃ) মুসলিমদের খলীফা নির্বাচিত হলেন তখন সা'লাবা তাঁর কাছে এসে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি আমার সাদকা কবুল করুন!" উমর (রাঃ) উত্তর দিলেনঃ “রাসূলুল্লাহ ও প্রথম খলীফা যখন ককূল করেননি তখন আমি কিরূপে ককূল করতে পারি?” সুতরাং তিনিও অস্বীকৃতি জানালেন। তারপর উসমান (রাঃ)-এর ফিলাফতকালে আবার ঐ চিরদিনের মুনাফিক তাঁর কাছে আসলো এবং তার সাদকা কবূল করার জন্যে তাকে অনুরোধ করলো। কিন্তু তিনি জবাব দিলেনঃ “স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সঃ) এবং তাঁর দু’জন খলীফা যখন তোমার সাদকা গ্রহণ করেননি তখন আমি কি করে তা গ্রহণ করতে পারি? সুতরাং তিনিও তা কবুল করলেন না। ঐ অবস্থাতেই লোকটি ধ্বংস হয়ে যায়। মোটকথা, প্রথমে তো সে শপথ করে বলেছিল যে, সে সাদকা ও দান-খয়রাত করবে, কিন্তু পরে ফিরে গেল এবং দান-খয়রাতের পরিবর্তে কার্পণ্য করতে শুরু করলো ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দিলো। এই অঙ্গীকার ভঙ্গের প্রতিফল হিসেবে তার অন্তরে নিফাক বা কপটতা জড়িয়ে পড়লো, যা ঐ সময় থেকে নিয়ে তার পূর্ণ জীবন পর্যন্ত তার সাথে থেকেই গেল। হাদীসে রয়েছে যে, মুনাফিকের লক্ষণ হচ্ছে তিনটি- (১) যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, (২) যখন কোন ওয়াদা করে তখন তা খিলাফ করে এবং (৩) তার কাছে কোন কিছু আমানত রাখা হলে তা খিয়ানত করে।আল্লাহ পাক বলেনঃ তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাদের মনের গুপ্ত কথা এবং গোপন পরামর্শ সবই অবগত আছেন? তিনি পূর্ব হতেই জানতেন যে, এটা শুধু তাদের মুখের কথা যে, তারা সম্পদশালী হয়ে গেলে এরূপ এরূপ দান-খয়রাত করবে, এমন এমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং এরূপ সৎকাজ করবে। কিন্তু তাদের অন্তরের উপর দৃষ্টিপাতকারী তো হচ্ছেন আল্লাহ । তিনি তো জানেন যে, মালধন পেলেই তারা তাতে মত্ত হয়ে যাবে, আমোদ আহলাদ করবে, অকৃতজ্ঞ হবে এবং কার্পণ্য করতে শুরু করবে।আল্লাহ তা'আলা সমস্ত গায়েবের খবর খুবই জ্ঞাত আছেন। তিনি সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত। সব কিছুই তাঁর সামনে উজ্জ্বল। কিছুই তার অগোচরে নেই।

আত-তাওবা 9:78

৭৫-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, এই মুনাফিকদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছে যে, যদি তিনি তাদেরকে সম্পদশালী করে দেন। তবে তারা খুবই দান-খয়রাত করবে এবং সৎ লোক হয়ে যাবে । অতঃপর যখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধনী বানিয়ে দিলেন এবং তাদের অবস্থা স্বচ্ছল হয়ে গেল তখন সে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দিলো ও কৃপণতা করতে শুরু করলো। এর শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে চিরদিনের জন্যে নিফাক বা কপটতা সৃষ্টি করে দিলেন। এ আয়াতটি সা’লাবা ইবনে হাতিব আনসারীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। যে নবী (সঃ)-কে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাকে ধন-সম্পদ দান করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “যে অল্প মালের তুমি শাকরিয়া আদায় করবে তা ঐ অধিক মাল হতে উত্তম যার তুমি শাকরিয়া আদায় করতে সক্ষম হবে না।” সে দ্বিতীয়বার ঐ প্রার্থনাই করলো । তখন নবী (সঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি কি নিজের অবস্থা আল্লাহর নবী (সঃ)-এর মত রাখা পছন্দ কর নী? যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। তার শপথ! আমি যদি ইচ্ছা করি যে, পাহাড়গুলো সোনা ও রূপা হয়ে আমার সাথে চলতে থাকুক তবে অবশ্যই সেগুলো সেভাবেই চলতে থাকবে। সে বললোঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! যদি আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন, অতঃপর তিনি আমাকে ধন-সম্পদ দান করেন তবে আমি অবশ্যই প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি সা’লাবাকে ধন-সম্পদ দান করুন। ফলে তার বকরীগুলো এতো বেশী বৃদ্ধি পায় যেমনভাবে পোকা মাকড়গুলো বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এমন কি মদীনা শরীফ তার পশুগুলোর পক্ষে সংকীর্ণ হয়ে গেল। সুতরাং সে মদীনা থেকে দূরে চলে গেলো। যোহর ও আসরের সালাত সে জামাআতের সাথে আদায় করতো বটে, কিন্তু অন্যান্য সালাত জামাআতের সাথে আদায় করতে পারতো না। তার পশুগুলো আরো বৃদ্ধি পায়, ফলে তাকে আরো দূরে চলে যেতে হয়। এখন শুধু জুমআ ছাড়া তার সমস্ত জামাআত ছুটে যায়। মাল আরো বেড়ে গেল। ক্রমে ক্রমে সে জুমআর জামাআতে হাযির হওয়াও ছেড়ে দিলো। যেসব যাত্রীদল জুমআয় হাযির হতো তাদেরকে সে জুমআর আলোচিত বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতো। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পর্কে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা সব কিছু বর্ণনা করে দেয়। তখন তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। আর এদিকে আয়াত নাযিল হয়ে যায়। (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মাল থেকে সাদকা (যাকাত) নিয়ে নাও।” (৯৪ ১০৩) সাদকার আহকামও নাযিল হয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলিমদের নিকট থেকে যাকাত আদায় করার জন্যে দু’জন লোককে প্রেরণ করেন। একজন ছিলেন জুহাইনা গোত্রের লোক এবং অপরজন ছিলেন সুলাইম গোত্রের লোক। কিভাবে তারা মুসলিমদের নিকট থেকে যাকাত আদায় করবেন তা তিনি তাঁদেরকে লিখে দেন। আর তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা দু'জন সালাবার নিকট থেকে এবং বানু সুলাইমের অমুক ব্যক্তির নিকট থেকে যাকাত গ্রহণ কর।” সুতরাং তারা দু’জন সা'লাবার কাছে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশনামা দেখালেন এবং যাকাত চাইলেন। সে তখন বললোঃ “এটা তো জিযিয়ার বোন ছাড়া কিছুই নয়! এটা কি তা আমি বুঝতে পারছি না। আচ্ছা। এখন যাও, ফিরবার পথে এসো।” তখন তারা দু'জন চলে আসলেন। তাঁদের সংবাদ সুলাইম গোত্রের লোকটির নিকট পৌঁছলে তিনি উত্তম উটগুলো বের করে আনলেন এবং ওগুলো নিয়ে নিজেই তাদের কাছে আসলেন। তাঁরা ঐ জন্তুগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেনঃ “এগুলো তোমার উপর ওয়াজিবও নয় এবং আমরা এগুলো তোমার নিকট থেকে গ্রহণ করতেও চাই না।” তিনি বললেনঃ “আমি তো খুশী মনে আমার উত্তম পশুগুলো দিতে চাচ্ছি, সুতরাং আপনারা এগুলো কবুল করে নিন। শেষ পর্যন্ত তারা ওগুলো গ্রহণ করলেন। অন্যান্যদের নিকট থেকেও তারা যাকাত আদায় করলেন। ফিরবার পথে তারা সা'লাবার কাছে। আসলেন। সে বললোঃ “যে নির্দেশনামা তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে তা আমাকে পড়তে দাও দেখি।" পড়ে সে বলতে লাগলোঃ “এটা তো স্পষ্ট জিযিয়া । কাফিরদের উপর যে ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয় এটাতো একেবারে ঐরূপই। আচ্ছা, তোমরা এখন যাও, আমি চিন্তা ভাবনা করে দেখি।” তাঁরা দু’জন ফিরে চলে আসলেন। তাদেরকে দেখা মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) সা'লাবার উপর দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং সুলাইম গোত্রের লোকটির উপর বরকতের দুআ করলেন। এখন তারাও সা'লাবা ও সুলাইম গোত্রের লোকটির ঘটনা বর্ণনা করে শুনালেন। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন। সা'লাবার একজন নিকটতম আত্মীয় এ সবকিছু শুনে সালাবার কাছে গিয়ে বর্ণনা করলো এবং আয়াতটিও পড়ে শুনিয়ে দিলো। সা'লাবা তখন নবী (সঃ)-এর কাছে এসে যাকাত ককূল করার প্রার্থনা জানালো। নবী (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমার যাকাত কবুল করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। সে তখন নিজের মাথার উপর মাটি নিক্ষেপ করতে লাগলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “এটা তো তোমারই কর্মের ফল। আমি তোমাকে আদেশ করেছিলাম। কিন্তু তুমি আমার আদেশ অমান্য করেছে। সে তখন নিজের জায়গায় ফিরে আসলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত সা'লাবার কোন কিছুই ককূল করেননি। অতঃপর সে আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে তার কাছে আগমন করে এবং বলেঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আমার যে মর্যাদা ছিল এবং আনসারদের মধ্যে আমার যে সম্মান রয়েছে তা আপনি ভালরূপেই জানেন। সুতরাং আমার সাদকা ককূল। করুন।” তিনি উত্তর দিলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কবুল করেননি তখন আমি কে?" মোটকথা, তিনি অস্বীকার করলেন। অতঃপর যখন তিনি ইন্তেকাল করলেন এবং উমার (রাঃ) মুসলিমদের খলীফা নির্বাচিত হলেন তখন সা'লাবা তাঁর কাছে এসে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি আমার সাদকা কবুল করুন!" উমর (রাঃ) উত্তর দিলেনঃ “রাসূলুল্লাহ ও প্রথম খলীফা যখন ককূল করেননি তখন আমি কিরূপে ককূল করতে পারি?” সুতরাং তিনিও অস্বীকৃতি জানালেন। তারপর উসমান (রাঃ)-এর ফিলাফতকালে আবার ঐ চিরদিনের মুনাফিক তাঁর কাছে আসলো এবং তার সাদকা কবূল করার জন্যে তাকে অনুরোধ করলো। কিন্তু তিনি জবাব দিলেনঃ “স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সঃ) এবং তাঁর দু’জন খলীফা যখন তোমার সাদকা গ্রহণ করেননি তখন আমি কি করে তা গ্রহণ করতে পারি? সুতরাং তিনিও তা কবুল করলেন না। ঐ অবস্থাতেই লোকটি ধ্বংস হয়ে যায়। মোটকথা, প্রথমে তো সে শপথ করে বলেছিল যে, সে সাদকা ও দান-খয়রাত করবে, কিন্তু পরে ফিরে গেল এবং দান-খয়রাতের পরিবর্তে কার্পণ্য করতে শুরু করলো ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করে দিলো। এই অঙ্গীকার ভঙ্গের প্রতিফল হিসেবে তার অন্তরে নিফাক বা কপটতা জড়িয়ে পড়লো, যা ঐ সময় থেকে নিয়ে তার পূর্ণ জীবন পর্যন্ত তার সাথে থেকেই গেল। হাদীসে রয়েছে যে, মুনাফিকের লক্ষণ হচ্ছে তিনটি- (১) যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, (২) যখন কোন ওয়াদা করে তখন তা খিলাফ করে এবং (৩) তার কাছে কোন কিছু আমানত রাখা হলে তা খিয়ানত করে।আল্লাহ পাক বলেনঃ তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাদের মনের গুপ্ত কথা এবং গোপন পরামর্শ সবই অবগত আছেন? তিনি পূর্ব হতেই জানতেন যে, এটা শুধু তাদের মুখের কথা যে, তারা সম্পদশালী হয়ে গেলে এরূপ এরূপ দান-খয়রাত করবে, এমন এমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং এরূপ সৎকাজ করবে। কিন্তু তাদের অন্তরের উপর দৃষ্টিপাতকারী তো হচ্ছেন আল্লাহ । তিনি তো জানেন যে, মালধন পেলেই তারা তাতে মত্ত হয়ে যাবে, আমোদ আহলাদ করবে, অকৃতজ্ঞ হবে এবং কার্পণ্য করতে শুরু করবে।আল্লাহ তা'আলা সমস্ত গায়েবের খবর খুবই জ্ঞাত আছেন। তিনি সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত। সব কিছুই তাঁর সামনে উজ্জ্বল। কিছুই তার অগোচরে নেই।

আত-তাওবা 9:79

এটাও মুনাফিকদের একটি বদ অভ্যাস যে, তাদের মুখের ভাষা থেকে দাতা বা কৃপণ কেউই বাঁচতে পারে না। এই দোষযুক্ত ও কর্কশভাষী লোকগুলো খুবই নিকৃষ্ট শ্রেণীর লোক। যদি কোন ব্যক্তি একটা মোটা অংকের অর্থ আল্লাহর পথে দান করে তবে এরা তাকে রিয়াকার বলতে থাকে। আর কেউ যদি সামান্য মাল নিয়ে আসে তবে তারা বলে যে, এই ব্যক্তির দানের আল্লাহ মুখাপেক্ষী নন। যখন সাদকা দেয়ার আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন সাহাবীগণ নিজ নিজ সাদকা নিয়ে হাযির হয়ে যান। এক ব্যক্তি প্রাণ খুলে খুব বড় অংকের সাদকা দেন। তখন ঐ মুনাফিকরা তার উপাধি দেয় রিয়াকার। অতঃপর একজন দরিদ্র লোক শুধুমাত্র এক সা’ (ঐ সময় আরবে দু’প্রকার সা’-এর প্রচলন ছিল। একটি হিজাযী সা’, যার ওজন ছিল পাকা দু’সের এগারো ছটাক। আর একটি ছিল ইরাকী সা', যার ওজন ছিল পাকা তিন সের ছয় ছটাক) শস্য নিয়ে আসেন। তা দেখে মুনাফিকরা বলে যে, তার এটুকু জিনিসের আল্লাহ তা'আলার কি প্রয়োজন ছিল। এরই বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে।একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাকী’তে বলেনঃ “যে ব্যক্তি সাদকা প্রদান করবে, আমি কিয়ামতের দিন তার ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করবো।” ঐ সময় একজন সাহাবী নিজের পাগড়ীর মধ্য থেকে কিছু দিতে চাইলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি তা বেঁধে নিলেন । ইত্যবসরে একজন অত্যন্ত কালো বর্ণের বেঁটে লোক একটি উন্ত্রী নিয়ে আসলেন, যার চেয়ে উত্তম উস্ত্রী সারা বাকীতে ছিল না । এসে তিনি বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমি আল্লাহর নামে খয়রাত করলাম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “বেশ, বেশ, খুব ভালো।” লোকটি বললেনঃ “নেন, এটা গ্রহণ করুন!” তখন একটি লোক বললোঃ “উষ্ট্ৰীটি তো এর চেয়ে উত্তম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা শুনতে পেয়ে বলেনঃ “তুমি মিথ্যা বলছো। সে বরং তোমার চেয়ে এবং উজ্জ্বীটির চেয়ে বহুগুণে উত্তম।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “তোমার মত শত শত উটের মালিকের জন্যে আফসোস!” এ কথা তিনি তিনবার বললেন। তারপর বললেনঃ “শুধুমাত্র ঐ ব্যক্তি দায়িত্বমুক্ত যে তার মাল দ্বারা এরূপ এরূপ করে (অর্থাৎ দান-খয়রাত করে)।”এ কথা বলার সময় তিনি অঞ্জলি ভরে ভরে নিজের হাত দ্বারা ডানে ও বামে ইশারা করেন। অর্থাৎ আল্লাহর পথে প্রত্যেক ভাল কাজে খরচ করে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “ঐ ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে অল্প মালের অধিকারী এবং অধিক ইবাদতকারী।” এ কথা তিনি তিনবার বলেন।এ আয়াতের ব্যাপারে আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ)। হতে বর্ণনা করেছেন যে, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) চল্লিশ ঊকিয়া (উকিয়ার ওজন হচ্ছে এক তোলা সাত মাশা) সোনা নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং একজন (দরিদ্র) আনসারী এক সা’ খাদ্য নিয়ে আসেন। তখন কোন কোন মুনাফিক বলেঃ “আল্লাহর শপথ! আব্দুর রহমান (রাঃ) যা এনেছে তা রিয়া (লোক-দেখাননা) ছাড়া কিছুই নয়।” আর ঐ আনসারী সম্পর্কে তারা বলেঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) এই সা’-এর মুখাপেক্ষী নন।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জন-সম্মুখে বের হয়ে ঘোষণা করেনঃ “তোমরা তোমাদের সাদকাগুলো জমা কর।” তখন জনগণ তাদের সাদকাগুলো জমা করেন। সর্বশেষ একটি লোক এক সা' খেজুর নিয়ে হাযির হন এবং বলেন- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রাত্রে বোঝা বহন করার বিনিময়ে আমি দু'সা' খেজুর লাভ করেছিলাম। এক সা' আমার সন্তানদের জন্যে রেখে বাকী এক সা’ আপনার কাছে নিয়ে এসেছি।” রাসুলুল্লাহ (সঃ) তখন তাঁর ঐ মালকে জমাকৃত মালের মধ্যে ঢেলে দিতে বললেন। মুনাফিকরা তখন বলাবলি করতে লাগলো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এই এক সা' খেজুরের মুখাপেক্ষী নন। অতঃপর আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “সাদকা দানকারীদের আর কেউ অবশিষ্ট আছে। কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তুমি ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট নেই।” তখন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) বললেনঃ, “আমার কাছে একশ’ উকিয়া সোনা রয়েছে, সবগুলো আমি সাদকা করে দিলাম।” উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তুমি কি পাগল?” তখন তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমার মধ্যে পাগলামি নেই। আমি যা করলাম সজ্ঞানেই করলাম।” উমার (রাঃ) বললেনঃ “তুমি যা করলে তা চিন্তা করে দেখেছো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যা শুনুন! আমার মাল রয়েছে আট হাজার। চার হাজার আমি আল্লাহ তা'আলাকে ঋণ দিচ্ছি এবং বাকী চার হাজার নিজের জন্য রাখছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি যা রাখলে এবং যা দান করলে তাতে আল্লাহ বরকত দান করুন!” মুনাফিকরা তখন বলতে লাগলোঃ “আল্লাহর কসম! আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) যা দান করলেন তা রিয়া ছাড়া কিছুই নয়।” আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করে বড় ও ছোট দানকারীদের সত্যবাদিতা এবং মুনাফিকদের কষ্টদায়ক কথা প্রকাশ করে দিলেন। বানু আজলান গোত্রের আসিম ইবনে আদী (রাঃ) নামক একটি লোকও মোটা অংকের দান করেছিলেন। তিনি দান করেছিলেন একশ’ অসক খেজুর । মুনাফিকরা তাঁকে রিয়াকার বলেছিল। আবূ আকীল (রাঃ) নিজের পারিশ্রমিক ও মজুরীর অংশ হতে সামান্য দান করেছিলেন। তিনি ছিলেন বানু আনীফ গোত্রের লোক । তিনি এক সা’ পরিমাণ জিনিস দান করলে মুনাফিকরা তাকে উপহাস ও নিন্দা করে। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুজাহিদদের একটি দলকে যুদ্ধে প্রেরণ করার উদ্দেশ্যে এই চাঁদা আদায় করেছিলেন। তাতে রয়েছে যে, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) দু'হাজার দিয়েছিলেন এবং দু'হাজাররেখেছিলেন। অন্য একজন দরিদ্র লোক সারা রাত্রির পরিশ্রমের বিনিময়ে দু’সা’ খেজুর লাভ করেছিলেন। এক সা' নিজের জন্যে রেখে বাকী এক সা' তিনি দান করেন। এ লোকটির নাম ছিল আবু আকীল (রাঃ)। সারারাত ধরে তিনি নিজের পিঠের উপর বোঝা বহন করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর নাম ছিল হাবাব (রাঃ), আর একটি উক্তি আছে যে, তাঁর নাম ছিল আব্দুর রহমান ইবনে সা'লাবা (রাঃ)।ঐ মনাফিকদের এই উপহাসের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে এই প্রতিশোধই গ্রহণ করলেন। পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। কেননা আমলের শাস্তি তো আমল অনুযায়ীই হয়ে থাকে।

আত-তাওবা 9:80

আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন- হে নবী (সঃ)! কাফিররা এ যোগ্যতা রাখে না যে, তুমি তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। একবার নয় বরং সত্তর বারও যদি তুমি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর তথাপি আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। এখানে যে সত্তরের উল্লেখ করা হয়েছে তা দ্বারা শুধু গণনার আধিক্য বুঝানো হয়েছে। সত্তরের কমই হাক বা আরো বেশী হাক। কেউ কেউ বলেছেন যে, এর দ্বারা সত্তরই বুঝানো হয়েছে। যেমন ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তো তাদের জন্যে সত্তর বারেরও বেশী ক্ষমা প্রার্থনা করবো যে, হয়তো আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।” তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর ভীষণ ক্রোধ ভরে ঘোষণা করলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তোমার তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা বা না করা সমান কথা, আল্লাহ তাদেরকে কখনও ক্ষমা করবেন না।"শা'বীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই যখন মত্যযন্ত্রণায় ছটফট করে তখন তার পুত্র নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে আরয করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতা মত্যুর শিয়রে শায়িত। আমার মনের আকাঙ্ক্ষা এই যে, আপনি তার কাছে তাশরীফ নিয়ে যাবেন এবং তার জানাযার নামায পড়াবেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার নাম কি?” সে উত্তরে বলেঃ “আমার নাম হাবাব।” তিনি বললেনঃ “তোমার নাম আব্দুল্লাহ (রাখা হলো)। হাবাব তো শয়তানের নাম।” অতঃপর তিনি তার সাথে গেলেন। তার পিতাকে স্বীয় ঘর্ম মাখানো জামাটি পরিধান করালেন এবং তার জানাযার নামায পড়ালেন। তাঁকে বলা হলোঃ “আপনি এর (মুনাফিকের) জানাযার সালাত পড়ছেন? তিনি উত্তরে বললেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “তুমি যদি সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর তবুও আল্লাহ তাদেরকে কখনও ক্ষমা করবেন না। তাই আমি সত্তর বার, আবার সত্তর বার এবং আবারও সত্তর বার ক্ষমা প্রার্থনা করবো। (উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রঃ), মুজাহিদ (রঃ) এবং কাদাতা ইবনে দাআ’মী (রঃ) হতে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। আর ইবনে জারীর (রঃ) এটাকে তাঁর ইসনাদসহ বর্ণনা করেছেন)

আত-তাওবা 9:81

৮১-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করছেন যারা তাবুকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গমন করেনি এবং বাড়ীতে বসে থাকায় আনন্দিত হয়েছিল। আল্লাহর পথে জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করা তাদের কাছে ছিল অপছন্দনীয়।তারা পরস্পর বলাবলি করছিলঃ “এই কঠিন গরমের সময় কোথায় যাবে?” তাবুকের যুদ্ধে বের হওয়ার সময়টা এমনই ছিল যে, একদিকে গরম ছিল অত্যন্ত কঠিন, অপরদিকে ফলগুলো সব পেকে গিয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্পর্কে বলেন, তোমরা তোমাদের দুষ্কর্মের মাধ্যমে যে দিকে যাচ্ছ, তার মধ্যে এর চেয়ে বহুগুণ গরমের প্রখরতা রয়েছে। তা হচ্ছে জাহান্নামের আগুন। দুনিয়ার আগুনতো ঐ আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।মুসনাদে আহমাদে আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের এই আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ মাত্র। অধিকন্তু এই আগুনকে সমুদ্রের পানি দ্বারা দু’বার নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। এরূপ করা না হলে তোমরা এ আগুন দ্বারা কোনই উপকার লাভ করতে পারতে না।” আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা এক হাজার বছর (জাহান্নামের) আগুনকে উত্তপ্ত করেন, তখন তা লাল বর্ণ ধারণ করে। তারপর আবার এক হাজার বছর উত্তপ্ত করেন, তখন তা সাদা হয়ে যায়। এরপর পুনরায় এক হাজার বছর তাপ দেন তখন তা কালো বর্ণ ধারণ করে। আর ওটা রাতের আঁধারের মত ভীষণ কালো হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেনঃ “আমি জানি না যে, ইয়াহইয়া (রঃ) ছাড়া অন্য কেউ এটাকে মার’ পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন।”)আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) (২:২৪) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “(জাহান্নামের) আগুনকে এক হাজার বছর উত্তপ্ত করা হয়, তখন তা সাদা হয়ে যায়। তারপর আরো এক হাজার বছর তাপ দেয়া হয়, তখন তা লাল বর্ণ ধারণ করে। তারপর আরো এক হাজার বছর উত্তপ্ত করা হয়, তখন তা রাতের আঁধারের মত কালো হয়ে যায়। ওর শিখায় কোন ঔজ্জ্বল্য অবশিষ্ট নেই।” (এ হাদীসটি আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেছেন)একটি হাদীসে এসেছে যে, জাহান্নামের আগুনের একটি স্ফুলিঙ্গ যদি পূর্ব দিকে থাকে তবে ওর উষ্ণতা পশ্চিম দিক পর্যন্ত পৌছে যাবে। (এ হাদীসটি আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) তাম্মাম ইবনে নাজীহ্ (রঃ)-এর হাদীস থেকে বর্ণনা করেছেন) আবু ইয়ালার (রঃ) একটি দুর্বল রিওয়ায়াতে রয়েছে যে, যদি এই মসজিদে এক লক্ষ বা এর চেয়েও বেশী লোক থাকে এবং কোন জাহান্নামী এখানে এসে শ্বাস গ্রহণ করে তবে ওর উষ্ণতায় মসজিদ ও মসজিদে অবস্থিত সমস্ত লোক পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, জাহান্নামে যে লোকটির শাস্তি সবচেয়ে হাল্কা হবে তা হবে এই যে, তার পায়ে আগুনের জুতা পরানো হবে, যার ফলে তার মাথার খুলি টগবগ করে ফুটতে থাকবে। সে তখন মনে করবে যে, তাকেই সর্বাপেক্ষা কঠিন শাস্তি দেয়া হচ্ছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে ওটাই হচ্ছে সর্বাপেক্ষা হাল্কা শাস্তি। কুরআন কারীমে ঘোষিত হচ্ছে- “নিশ্চয়ই ওটা (জাহান্নামের অগ্নি) হচ্ছে জ্বলন্ত হলকা যা চর্ম পর্যন্ত খসিয়ে ফেলবে।” আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “তাদের মাথার উপর ফুটন্ত গরম পানি ঢেলে দেয়া হবে, যার ফলে তাদের পেটের সমস্ত জিনিস এবং চামড়া ঝলসে যাবে। তারপর লোহার হাতুড়ী দ্বারা তাদের মস্তক পিষ্ট করা হবে। তারা যখন সেখান থেকে বের হতে চাইবে তখন তাদেরকে সেখানেই ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং বলা হবে- দাহনকারী শাস্তির স্বাদ গ্রহণ কর।” অন্য স্থানে আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করেছে আমি তাদেরকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করবো, যখন তাদের (গায়ের) চামড়া ঝলসে যাবে তখন আমি ওর পরিবর্তে অন্য চামড়া আনয়ন করবো, যেন তারা পূর্ণভাবে শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করে। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “(হে নবী!) তুমি বলে দাও- জাহান্নামের আগুন (এর চেয়ে) অধিকতর গরম, কি ভাল হতো যদি তারা বুঝতে পারতো!” অর্থাৎ যদি তারা এটা অনুধাবন করতো যে, জাহান্নামের আগুনের প্রখরতা অত্যন্ত বেশী, তবে অবশ্যই গ্রীষ্মের মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও খুশী মনে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে যুদ্ধে গমন করতো এবং নিজেদের জান ও মাল আল্লাহর পথে উৎসর্গ করতে মোটেই দ্বিধাবোধ করতো না। আরবের একজন কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার জীবনকে ঠাণ্ডা ও গরম হতে বাঁচানোর চেষ্টায় কাটিয়ে দিয়েছো, অথচ তোমার উচিত ছিল যে, তুমি আল্লাহর নাফরমানী থেকে বিরত থাকবে, তাহলে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পেতে।”এখন আল্লাহ তা'আলা এই মুনাফিকদের সম্পর্কে সাবধান বাণী উচ্চারণ করছেন যে, অল্পদিন তারা এই নশ্বর জগতে হাসি-তামাশা ও আমোদ আহলাদ করে জীবনটা কাটিয়ে দিক, অতঃপর ভবিষ্যতের চিরস্থায়ী জীবনে তাদেরকে শুধু কাঁদতেই হবে যা কখনো শেষ হবে না। আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা ক্রন্দন কর। যদি তোমাদের ক্রন্দন না আসে তবে ক্রন্দনের ভান কর। কেননা, জাহান্নামবাসীরা কাঁদতে থাকবে, এমন কি কেঁদে তাদের গণ্ডদেশে নদীর মত গর্ত হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত অশ্রু শুকিয়ে যাবে। অতঃপর তাদের চক্ষুগুলো রক্ত বর্ষণ করতে শুরু করবে। তাদের চক্ষু দিয়ে এতো বেশী অশ্রু ও রক্ত বর্ষিত হবে যে, কেউ যদি ওর উপর দিয়ে নৌকা চালানোর ইচ্ছে করে তবে চালাতে পারবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা আল মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশের পর কাঁদতে থাকবে। এতো বেশী কাঁদবে যে, অশ্রু শেষ হবার পর পুঁজ বের হতে থাকবে। ঐ সময় জাহান্নামের দারোগা তাদেরকে ডাক দিয়ে বলবেঃ “ওরে হতভাগ্যের দল! করুণার জায়গাতে তো তোমরা কখনো ক্রন্দন করনি। এখন এখানে কান্নাকাটি করা বৃথা।” তখন তারা উচ্চৈঃস্বরে চীকার করে জান্নাতবাসীদের নিকট ফরিয়াদ করবেঃ “হে জান্নাতবাসিগণ! হে পিতা, মাতা ও পুত্রদের দল! আমরা কবর থেকে পিপাসার্ত অবস্থায় উঠেছিলাম। তারপর হাশরের ময়দানেও পিপাসার্ত রয়েছিলাম এবং আজ পর্যন্ত এখানেও পিপাসার্ত অবস্থায় রয়েছি। সুতরাং আমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন কর। কিছু পানি আমাদের দিকে বহিয়ে দাও এবং যে আহার্য আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে দান করেছেন তার থেকে আমাদেরকে কিছু দান কর।” চল্লিশ বছর পর্যন্ত তারা এভাবে (কুকুরের মত) চীষ্কার করতে থাকবে। চল্লিশ বছর পর তাদেরকে উত্তর দেয়া হবেঃ “তোমাদেরকে এ অবস্থাতেই অবস্থান করতে হবে।” শেষ পর্যন্ত তারা সমস্ত কল্যাণ থেকে নিরাশ হয়ে যাবে।

আত-তাওবা 9:82

৮১-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করছেন যারা তাবুকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গমন করেনি এবং বাড়ীতে বসে থাকায় আনন্দিত হয়েছিল। আল্লাহর পথে জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করা তাদের কাছে ছিল অপছন্দনীয়।তারা পরস্পর বলাবলি করছিলঃ “এই কঠিন গরমের সময় কোথায় যাবে?” তাবুকের যুদ্ধে বের হওয়ার সময়টা এমনই ছিল যে, একদিকে গরম ছিল অত্যন্ত কঠিন, অপরদিকে ফলগুলো সব পেকে গিয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্পর্কে বলেন, তোমরা তোমাদের দুষ্কর্মের মাধ্যমে যে দিকে যাচ্ছ, তার মধ্যে এর চেয়ে বহুগুণ গরমের প্রখরতা রয়েছে। তা হচ্ছে জাহান্নামের আগুন। দুনিয়ার আগুনতো ঐ আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।মুসনাদে আহমাদে আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের এই আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ মাত্র। অধিকন্তু এই আগুনকে সমুদ্রের পানি দ্বারা দু’বার নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। এরূপ করা না হলে তোমরা এ আগুন দ্বারা কোনই উপকার লাভ করতে পারতে না।” আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা এক হাজার বছর (জাহান্নামের) আগুনকে উত্তপ্ত করেন, তখন তা লাল বর্ণ ধারণ করে। তারপর আবার এক হাজার বছর উত্তপ্ত করেন, তখন তা সাদা হয়ে যায়। এরপর পুনরায় এক হাজার বছর তাপ দেন তখন তা কালো বর্ণ ধারণ করে। আর ওটা রাতের আঁধারের মত ভীষণ কালো হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেনঃ “আমি জানি না যে, ইয়াহইয়া (রঃ) ছাড়া অন্য কেউ এটাকে মার’ পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন।”)আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) (২:২৪) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “(জাহান্নামের) আগুনকে এক হাজার বছর উত্তপ্ত করা হয়, তখন তা সাদা হয়ে যায়। তারপর আরো এক হাজার বছর তাপ দেয়া হয়, তখন তা লাল বর্ণ ধারণ করে। তারপর আরো এক হাজার বছর উত্তপ্ত করা হয়, তখন তা রাতের আঁধারের মত কালো হয়ে যায়। ওর শিখায় কোন ঔজ্জ্বল্য অবশিষ্ট নেই।” (এ হাদীসটি আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেছেন)একটি হাদীসে এসেছে যে, জাহান্নামের আগুনের একটি স্ফুলিঙ্গ যদি পূর্ব দিকে থাকে তবে ওর উষ্ণতা পশ্চিম দিক পর্যন্ত পৌছে যাবে। (এ হাদীসটি আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) তাম্মাম ইবনে নাজীহ্ (রঃ)-এর হাদীস থেকে বর্ণনা করেছেন) আবু ইয়ালার (রঃ) একটি দুর্বল রিওয়ায়াতে রয়েছে যে, যদি এই মসজিদে এক লক্ষ বা এর চেয়েও বেশী লোক থাকে এবং কোন জাহান্নামী এখানে এসে শ্বাস গ্রহণ করে তবে ওর উষ্ণতায় মসজিদ ও মসজিদে অবস্থিত সমস্ত লোক পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে। অন্য একটি হাদীসে আছে যে, জাহান্নামে যে লোকটির শাস্তি সবচেয়ে হাল্কা হবে তা হবে এই যে, তার পায়ে আগুনের জুতা পরানো হবে, যার ফলে তার মাথার খুলি টগবগ করে ফুটতে থাকবে। সে তখন মনে করবে যে, তাকেই সর্বাপেক্ষা কঠিন শাস্তি দেয়া হচ্ছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে ওটাই হচ্ছে সর্বাপেক্ষা হাল্কা শাস্তি। কুরআন কারীমে ঘোষিত হচ্ছে- “নিশ্চয়ই ওটা (জাহান্নামের অগ্নি) হচ্ছে জ্বলন্ত হলকা যা চর্ম পর্যন্ত খসিয়ে ফেলবে।” আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ “তাদের মাথার উপর ফুটন্ত গরম পানি ঢেলে দেয়া হবে, যার ফলে তাদের পেটের সমস্ত জিনিস এবং চামড়া ঝলসে যাবে। তারপর লোহার হাতুড়ী দ্বারা তাদের মস্তক পিষ্ট করা হবে। তারা যখন সেখান থেকে বের হতে চাইবে তখন তাদেরকে সেখানেই ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং বলা হবে- দাহনকারী শাস্তির স্বাদ গ্রহণ কর।” অন্য স্থানে আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করেছে আমি তাদেরকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করবো, যখন তাদের (গায়ের) চামড়া ঝলসে যাবে তখন আমি ওর পরিবর্তে অন্য চামড়া আনয়ন করবো, যেন তারা পূর্ণভাবে শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করে। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “(হে নবী!) তুমি বলে দাও- জাহান্নামের আগুন (এর চেয়ে) অধিকতর গরম, কি ভাল হতো যদি তারা বুঝতে পারতো!” অর্থাৎ যদি তারা এটা অনুধাবন করতো যে, জাহান্নামের আগুনের প্রখরতা অত্যন্ত বেশী, তবে অবশ্যই গ্রীষ্মের মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও খুশী মনে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে যুদ্ধে গমন করতো এবং নিজেদের জান ও মাল আল্লাহর পথে উৎসর্গ করতে মোটেই দ্বিধাবোধ করতো না। আরবের একজন কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার জীবনকে ঠাণ্ডা ও গরম হতে বাঁচানোর চেষ্টায় কাটিয়ে দিয়েছো, অথচ তোমার উচিত ছিল যে, তুমি আল্লাহর নাফরমানী থেকে বিরত থাকবে, তাহলে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পেতে।”এখন আল্লাহ তা'আলা এই মুনাফিকদের সম্পর্কে সাবধান বাণী উচ্চারণ করছেন যে, অল্পদিন তারা এই নশ্বর জগতে হাসি-তামাশা ও আমোদ আহলাদ করে জীবনটা কাটিয়ে দিক, অতঃপর ভবিষ্যতের চিরস্থায়ী জীবনে তাদেরকে শুধু কাঁদতেই হবে যা কখনো শেষ হবে না। আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা ক্রন্দন কর। যদি তোমাদের ক্রন্দন না আসে তবে ক্রন্দনের ভান কর। কেননা, জাহান্নামবাসীরা কাঁদতে থাকবে, এমন কি কেঁদে তাদের গণ্ডদেশে নদীর মত গর্ত হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত অশ্রু শুকিয়ে যাবে। অতঃপর তাদের চক্ষুগুলো রক্ত বর্ষণ করতে শুরু করবে। তাদের চক্ষু দিয়ে এতো বেশী অশ্রু ও রক্ত বর্ষিত হবে যে, কেউ যদি ওর উপর দিয়ে নৌকা চালানোর ইচ্ছে করে তবে চালাতে পারবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা আল মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশের পর কাঁদতে থাকবে। এতো বেশী কাঁদবে যে, অশ্রু শেষ হবার পর পুঁজ বের হতে থাকবে। ঐ সময় জাহান্নামের দারোগা তাদেরকে ডাক দিয়ে বলবেঃ “ওরে হতভাগ্যের দল! করুণার জায়গাতে তো তোমরা কখনো ক্রন্দন করনি। এখন এখানে কান্নাকাটি করা বৃথা।” তখন তারা উচ্চৈঃস্বরে চীকার করে জান্নাতবাসীদের নিকট ফরিয়াদ করবেঃ “হে জান্নাতবাসিগণ! হে পিতা, মাতা ও পুত্রদের দল! আমরা কবর থেকে পিপাসার্ত অবস্থায় উঠেছিলাম। তারপর হাশরের ময়দানেও পিপাসার্ত রয়েছিলাম এবং আজ পর্যন্ত এখানেও পিপাসার্ত অবস্থায় রয়েছি। সুতরাং আমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন কর। কিছু পানি আমাদের দিকে বহিয়ে দাও এবং যে আহার্য আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে দান করেছেন তার থেকে আমাদেরকে কিছু দান কর।” চল্লিশ বছর পর্যন্ত তারা এভাবে (কুকুরের মত) চীষ্কার করতে থাকবে। চল্লিশ বছর পর তাদেরকে উত্তর দেয়া হবেঃ “তোমাদেরকে এ অবস্থাতেই অবস্থান করতে হবে।” শেষ পর্যন্ত তারা সমস্ত কল্যাণ থেকে নিরাশ হয়ে যাবে।

আত-তাওবা 9:83

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন- হে রাসূল! যদি আল্লাহ তাআলা তোমাকে এই যুদ্ধ হতে নিরাপদে মদীনায় ফিরিয়ে আনেন এবং এই মুনাফিকদের কোন দল অন্য কোন যুদ্ধে তোমার সাথে গমনের জন্যে প্রার্থনা জানায় তবে তুমি শাস্তি দান হিসেবে স্পষ্টভাবে তাদেরকে বলে দেবে আমার সাথে যুদ্ধে গমনকারীদের সাথে তোমরা গমন করতে পারবে না এবং আমার সাথী হয়ে তোমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেও সক্ষম হবে না। তোমরা যখন যথা সময়ে প্রতারণা করেছে এবং প্রথমবার যুদ্ধে গমন না করে বাড়ীতেই বসে থেকেছো তখন এ সময়ে যুদ্ধ প্রস্তুতির কি অর্থ হতে পারে। সুতরাং এই আয়াতটি (আরবী) (৬:১১০) এই আয়াতটির মতই। পাপের প্রতিফল পাপকার্যের পরেই পাওয়া যায়। যেমন পুণ্যের প্রতিদান পুণ্য কার্যের পরেই লাভ করা যায়। হুদায়বিয়ার উমরার পর কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা যখন গনীমতের মাল গ্রহণ করতে যাবে তখন (যুদ্ধে গমন না করে) পিছনে অবস্থানকারী এই লোকগুলো বলবে- আমাদেরকে অনুমতি দাও, আমরাও তোমাদের সাথে যাবো।” (৪৮:১৫) এখানে বলা হচ্ছে- হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এই (মুনাফিক) লোকদেরকে বলে দাও, যারা তোমার সাথে জিহাদে গমন না করে বাড়ীতেই বসেছিল, বাড়ীতে অবস্থানকারীদের সাথে তোমরাও অবস্থান কর, যারা স্ত্রীলোকদের মত বাড়ীতেই লেজ গুটিয়ে বসে থাকে।

আত-তাওবা 9:84

আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন মুনাফিকদের সাথে কোনই সম্পর্ক না রাখেন, তাদের কেউ মারা গেলে যেন তার জানাযার নামায না পড়ান এবং তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা বা দুআ করার উদ্দেশ্যে যেন তার কবরের কাছে না দাঁড়ান। কেননা তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর সাথে কুফরী করেছে এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গেছে।এ আয়াতটি মুনাফিকদের নেতা ও ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালের ব্যাপারে বিশেষভাবে অবতীর্ণ হলেও এটা ব্যাপক ও সাধারণ হুকুম। যার মধ্যেই নিফাক বা কপটতা পাওয়া যাবে তারই ব্যাপারে এই হুকুম প্রযোজ্য হবে। সহীহ বুখারীতে ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মারা গেলে তার পুত্র আব্দুল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর দরবারে হাযির হয়ে আবেদন করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতার কাফনের জন্যে আপনার গায়ের জামাটি দান করুন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার আবেদন মঞ্জুর করে তাকে জামাটি দিয়ে দেন। অতঃপর তিনি নবী (সঃ)-কে তাঁর পিতার জানাযার নামায পড়াবার জন্যে অনুরোধ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এ আবেদনও কবুল করেন এবং তার জানাযা পড়াবার জন্যে দাড়িয়ে যান। তখন উমার (রাঃ) তার কাপড়ের অঞ্চল টেনে ধরে বলেনঃ “আপনি এর জানাযার নামায পড়াবেন? অথচ আল্লাহ তা'আলা আপনাকে এ থেকে নিষেধ করেছেন!”রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ “দেখো, আল্লাহ তাআলা আমাকে ইখতিয়ার দিয়ে বলেছেন- ‘তুমি তাদের (মুনাফিকদের) জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর বা নাই কর (সমান কথা), যদি তুমি তাদের জন্যে সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর তবুও আল্লাহ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবেন না। সুতরাং আমি সত্তরেরও অধিক বার ক্ষমা প্রার্থনা করবো।” উমার (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ লোকটি তো মুনাফিক ছিল।” তথাপিও রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জানাযার নামায পড়ালেন। তখন মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অন্য রিওয়ায়াতে আছে যে, ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর জানাযার নামায পড়ান এবং আমরাও তার সাথে নামায পড়ি। তখন আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।”ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মারা যায় তখন তার জানাযার নামায পড়াবার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ডাকা হয়। তিনি নামাযের জন্যে দাঁড়িয়ে গেলে আমি সফ’ বা সারির মধ্য থেকে বের হয়ে তার সামনে হাযির হই এবং বলি, আপনি কি আল্লাহর শত্রু আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর জানাযার নামায পড়াবেন? অথচ অমুক দিন সে এ কথা বলেছিল এবং অমুক দিন ঐ কথা বলেছিল। তিনি তার কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুচকি হেসে সবই শুনতে থাকেন। অবশেষে তিনি বলেনঃ “হে উমার! আমাকে ছেড়ে দাও। আল্লাহ তাআলা আমাকে ক্ষমা প্রার্থনা করার ইখতিয়ার দিয়েছেন। আমি যদি জানতে পারি যে, সত্তরের অধিকবার ক্ষমা প্রার্থনা করলে তার পাপরাশি ক্ষমা করিয়ে নিতে পারবো তবে অবশ্যই আমি সত্তরেরও অধিকবার তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো।” এ কথা বলে তিনি তার জানাযার নামায পড়ান, জানাযার সাথেও চলেন এবং দাফন কার্যেও শরীক থাকেন। উমার (রাঃ) বলেনঃ “এরপর আমার এই ঔদ্ধত্যপনার কারণে আমি দুঃখ করতে লাগলাম যে, এসব ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সঃ) খুব ভাল জানেন। সুতরাং এরূপ হঠকারিতা করা আমার পক্ষে মোটেই উচিত হয়নি। অল্পক্ষণ পরেই এ দু'টি আয়াত অবতীর্ণ হয়ে যায়। এরপরে শেষ জীবন পর্যন্ত নবী (সঃ) না কোন মুনাফিকের জানাযার নামায পড়িয়েছেন, না তার কবরে এসে দুআ' ইসতিগফার করেছেন।” (হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মারা যায় তখন তার পুত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কছে এসে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি আমার পিতার জানাযা না পড়ান তবে এটা চিরদিনের জন্যে আমাদের পক্ষে দুর্ভাগ্যের কারণ হবে।” তিনি যখন হাযির হন তখন উবাইকে কবরে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি বললেনঃ “এর পূর্বেই কেন আমাকে নিয়ে আসনি?” অতঃপর তাকে কবর থেকে উঠিয়ে নেয়া হলো। তখন তিনি তার সারা দেহে নিজের মুখের থুথু দিয়ে দম করলেন। আর তাকে জামাটি পরিয়ে দিলেন। (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সহীহ বুখারীতে আব্দল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই-এর কাছে এমন সময় আগমন করেন যখন তাকে কবরে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি তাকে কবর থেকে বের করার নির্দেশ দেন। সুতরাং তাকে কবর হতে বের করা হয়। তিনি তাকে স্বীয় জানুদ্বয়ের উপর রাখেন এবং তার উপর থুথু দিয়ে দম করেন। অতঃপর তাকে নিজের জামাটি পরিয়ে দেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, মৃত্যুর পূর্বে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই নিজেই অসিয়ত করে গিয়েছিল যেন তার জানাযা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) পড়িয়ে দেন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেনঃ “আমার পিতা অসিয়ত করে গেছেন যে, আপনি যেন তার জানাযার নামায পড়িয়ে দেন। তার এ অসিয়তও রয়েছে যে, আপনার জামা দ্বারা যেন তাকে কাফন পরানো হয়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) যেই মাত্র তার জানাযা শেষ করেছেন, তখনই জিবরাঈল (আঃ) এ আয়াতগুলো নিয়ে অবতীর্ণ হন। আর একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাপড়ের অঞ্চল ধরে তাঁর সালাতের ইচ্ছার সময়েই তাঁকে এ আয়াত শুনিয়ে দেন। কিন্তু এই রিওয়ায়াতটি দুর্বল। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই রোগাক্রান্ত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তার কাছে যাওয়ার নিবেদন করে ডেকে পাঠায়। তিনি তার নিকট গমন করেন। নবী (সঃ) তাকে বলেনঃ “ইয়াহুদীদের প্রেম তোমাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।” সে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখন ধমক ও তিরস্কারের সময় নয়। বরং আমার আকাক্ষা এই যে, আপনি আমার জন্যে দুআ ও ক্ষমা প্রার্থনা করবেন এবং যখন আমি মারা যাব তখন আপনার জামা দ্বারা আমাকে কাফন পরাবেন।” সুতরাং তার মৃত্যুর পর তার ছেলে আব্দুল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তার জামাটি চাইলেন, যেন তা দ্বারা স্বীয় পিতার কাফন বানাতে পারেন। কোন কোন গুরুজন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে জামা প্রদানের কারণ প্রসঙ্গে বলেছেন যে, আব্বাস (রাঃ) যখন আগমন করেন তখন তার জন্যে একটি জামা চাওয়া হয়। কিন্তু তিনি খুব লম্বা চওড়া দেহ বিশিষ্ট লোক ছিলেন বলে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর জামা ছাড়া অন্য কারো জামা তার গায়ে ঠিক হয়নি। তখন তার জামাটিই তাঁকে দেয়া হয়। এরই প্রতিদান হিসাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই-এর কাফনের জন্যে তার জামাটি দান করেন। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন মুনাফিকের জানাযা পড়াননি এবং কারো জন্যে ক্ষমা প্রার্থনাও করেননি।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জানাযার জন্যে ডাকা হতো তখন তিনি ঐ মৃতব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। জনগণ তার সম্পর্কে ভাল মন্তব্য করলে তিনি গিয়ে তার জানাযা পড়াতেন। আর যদি তার সম্পর্কে এরূপ ওরূপ কথা তার কানে আসতো তবে তিনি স্পষ্টভাবে যেতে অস্বীকার করতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তিকালের পর উমার (রাঃ)-এর নীতি এই ছিল যে, যার জানাযা হুযাইফা (রাঃ) পড়তেন, তিনিও তার জানাযায় শরীক হতেন। আর হুযাইফা (রাঃ) যার জানাযা পড়তেন না, তিনিও পড়তেন না। কেননা রাসূলুল্লাহ হুযাইফা (রাঃ)-কে মুনাফিকদের নাম নির্দিষ্টভাবে বলে দিয়েছিলেন। ঐ নামগুলো শুধু তাঁরই জানা ছিল। এ জন্যেই তাঁকে “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিশ্বস্তজন” আখ্যা দেয়া হয়েছে। এমন কি একদিন এটাও ঘটেছিল যে, উমার (রাঃ) এক ব্যক্তির জানাযার জন্যে দাঁড়িয়েছেন, এমন সময় হুযাইফা (রাঃ) তাঁকে চিমটি কেটে এ থেকে বিরত রাখেন।মুনাফিকদের ব্যাপারে জানাযা এবং ক্ষমা প্রার্থনা থেকে মুসলিমদেরকে বিরত রাখা এই বিষয়েরই দলীল যে, মুসলিমদের ব্যাপারে এ দুটো বিষয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এতে মৃতদের জন্যেও পূর্ণ উপকার রয়েছে এবং জীবিতদের জন্যেও পূর্ণ প্রতিদান রয়েছে, যেমন বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত। আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি জানাযায় হাযির হয়ে সালাত আদায় করা পর্যন্ত তথায় উপস্থিত থাকে তার জন্যে রয়েছে এক কীরাত (সওয়াব)। আর যে ব্যক্তি দাফন করা পর্যন্ত হাযির থাকে তার জন্যে রয়েছে দু’কিরাত (সওয়াব)।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “কীরাত কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “সবচেয়ে ছোট কীরাত হচ্ছে উহুদ পাহাড়ের মত।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, মৃতব্যক্তির দাফনকার্য শেষ করার পর তিনি তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সাহাবীদেরকে হুকুম করতেনঃ “তোমাদের সাথীর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং কবরে তার অটল ও স্থির থাকার দুআ কর। এই সময় কবরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।”

আত-তাওবা 9:85

এই বিষয়েরই আয়াত ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ। তাফসীরও লিখিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহরই জন্যে।

আত-তাওবা 9:86

৮৬-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদের কটাক্ষ করছেন যারা ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জিহাদে না গিয়ে গা ঢাকা দিয়ে থাকে এবং আল্লাহর নির্দেশ শোনার পরেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বাড়ীতে থাকার অনুমতি প্রার্থনা করে। তারা এতই নিষ্ক্রিয় যে, নারীদের সাথে তাদের সাদৃশ্য রয়েছে। সেনাবাহিনী অভিযানে বের হয়ে পড়েছে, অথচ তারা অন্তঃপুরবাসিনী মহিলাদের মত পিছনে রয়ে গেছে। যুদ্ধের সময় তারা ভীরু ও কাপুরুষের মত লেজ গুটিয়ে ঘরে অবস্থানকারী। আর শান্তি ও নিরাপত্তার সময় তারা বড় বড় কথা বলে এবং বীরতুপনা প্রকাশ করে থাকে। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃঅর্থাৎ “যখন তারা ভয়ের (যুদ্ধের) সম্মুখীন হয় তখন তুমি তাদেরকে দেখতে পাও যে, তারা তোমার প্রতি এমনভাবে তাকাতে থাকে যে, তাদের চক্ষুসমূহ ঘুরতে থাকে, যেমন কারো উপর মরণ-বিভীষিকা আচ্ছন্ন হয়, অতঃপর সেই ভয় যখন দূরীভূত হয় তখন তোমাদেরকে অতি তীব্র ভাষায় তিরস্কার করতে থাকে।” তারা শান্তি ও নিরাপত্তার সময় শক্তিশালী বীরপুরুষ, কিন্তু যুদ্ধের সময় অত্যন্ত ভীরু ও কাপুরুষ। যেমন কোন কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা শান্তি ও নিরাপত্তার সময় অত্যন্ত ধূর্ত, উদ্দমশীল ও বড় বড় বক্তব্য পেশকারী, কিন্তু যুদ্ধের সময় তারা অন্তঃপুরবাসিনী মহিলাদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত।” শান্তির সময় তারা মুসলিমদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এবং বীরত্ব প্রকাশকারী। কিন্তু যুদ্ধের সময় তারা নারীদের মত চুড়ি পরিধান করে পর্দানশীন বনে যায় এবং খাল ও ছিদ্র খুঁজে খুঁজে গা ঢাকা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে। মুসলিমরাতো সূরা অবতীর্ণ হওয়ার ও আল্লাহর হুকুম নাযিল হওয়ার দিকে অপেক্ষমান থাকে। কিন্তু রোগাক্রান্ত হৃদয়ের লোকেরা যখন জিহাদের নির্দেশ সম্বলিত কোন আয়াত অবতীর্ণ হতে দেখে তখন চক্ষু বন্ধ করে নেয়। তাদের জন্যে শত আফসোস! তাদের জন্যে ধ্বংসাত্মক বিপদ। যদি তারা অনুগত হতো এবং তাদের মুখ হতে ভাল কথা বের হতো, আর তাদের উদ্দেশ্য সৎ হতো তবে অবশ্যই অরা আল্লাহর কথার সত্যতা স্বীকার করতো। এটাই হতো তাদের জন্যে কল্যাণকর। কিন্তু তাদের দুস্কার্যের দরুন তাদের অন্তরের উপর মোহর লেগে গেছে। এখন তাদের মধ্যে এই যোগ্যতাই নেই যে, তারা নিজেদের লাভ ও লোকসান বুঝতে পারে।

আত-তাওবা 9:87

৮৬-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদের কটাক্ষ করছেন যারা ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জিহাদে না গিয়ে গা ঢাকা দিয়ে থাকে এবং আল্লাহর নির্দেশ শোনার পরেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বাড়ীতে থাকার অনুমতি প্রার্থনা করে। তারা এতই নিষ্ক্রিয় যে, নারীদের সাথে তাদের সাদৃশ্য রয়েছে। সেনাবাহিনী অভিযানে বের হয়ে পড়েছে, অথচ তারা অন্তঃপুরবাসিনী মহিলাদের মত পিছনে রয়ে গেছে। যুদ্ধের সময় তারা ভীরু ও কাপুরুষের মত লেজ গুটিয়ে ঘরে অবস্থানকারী। আর শান্তি ও নিরাপত্তার সময় তারা বড় বড় কথা বলে এবং বীরতুপনা প্রকাশ করে থাকে। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেনঃঅর্থাৎ “যখন তারা ভয়ের (যুদ্ধের) সম্মুখীন হয় তখন তুমি তাদেরকে দেখতে পাও যে, তারা তোমার প্রতি এমনভাবে তাকাতে থাকে যে, তাদের চক্ষুসমূহ ঘুরতে থাকে, যেমন কারো উপর মরণ-বিভীষিকা আচ্ছন্ন হয়, অতঃপর সেই ভয় যখন দূরীভূত হয় তখন তোমাদেরকে অতি তীব্র ভাষায় তিরস্কার করতে থাকে।” তারা শান্তি ও নিরাপত্তার সময় শক্তিশালী বীরপুরুষ, কিন্তু যুদ্ধের সময় অত্যন্ত ভীরু ও কাপুরুষ। যেমন কোন কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা শান্তি ও নিরাপত্তার সময় অত্যন্ত ধূর্ত, উদ্দমশীল ও বড় বড় বক্তব্য পেশকারী, কিন্তু যুদ্ধের সময় তারা অন্তঃপুরবাসিনী মহিলাদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত।” শান্তির সময় তারা মুসলিমদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এবং বীরত্ব প্রকাশকারী। কিন্তু যুদ্ধের সময় তারা নারীদের মত চুড়ি পরিধান করে পর্দানশীন বনে যায় এবং খাল ও ছিদ্র খুঁজে খুঁজে গা ঢাকা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে। মুসলিমরাতো সূরা অবতীর্ণ হওয়ার ও আল্লাহর হুকুম নাযিল হওয়ার দিকে অপেক্ষমান থাকে। কিন্তু রোগাক্রান্ত হৃদয়ের লোকেরা যখন জিহাদের নির্দেশ সম্বলিত কোন আয়াত অবতীর্ণ হতে দেখে তখন চক্ষু বন্ধ করে নেয়। তাদের জন্যে শত আফসোস! তাদের জন্যে ধ্বংসাত্মক বিপদ। যদি তারা অনুগত হতো এবং তাদের মুখ হতে ভাল কথা বের হতো, আর তাদের উদ্দেশ্য সৎ হতো তবে অবশ্যই অরা আল্লাহর কথার সত্যতা স্বীকার করতো। এটাই হতো তাদের জন্যে কল্যাণকর। কিন্তু তাদের দুস্কার্যের দরুন তাদের অন্তরের উপর মোহর লেগে গেছে। এখন তাদের মধ্যে এই যোগ্যতাই নেই যে, তারা নিজেদের লাভ ও লোকসান বুঝতে পারে।

আত-তাওবা 9:88

৮৮-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: মুনাফিকদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করার পর আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের প্রশংসা ও তাদের পারলৌকিক কল্যাণ ও সুখের বর্ণনা দিচ্ছেন। মুমিনরা জিহাদের জন্যে কোমর বেঁধে উঠে পড়ে লেগে যায়। তারা নিজেদের জান ও মাল আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে দেয়। তাদের ভাগ্যেই মঙ্গল ও কল্যাণ। তারাই হচ্ছে সফলকাম। তাদেরই জন্যে রয়েছে জান্নাতুল ফিরদাউস। আর তাদেরই জন্যে রয়েছে উচ্চতম মর্যাদা। তারা তাদের গন্তব্যস্থানেও সফলতায় পৌছে যাবে।

আত-তাওবা 9:89

৮৮-৮৯ নং আয়াতের তাফসীর: মুনাফিকদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করার পর আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের প্রশংসা ও তাদের পারলৌকিক কল্যাণ ও সুখের বর্ণনা দিচ্ছেন। মুমিনরা জিহাদের জন্যে কোমর বেঁধে উঠে পড়ে লেগে যায়। তারা নিজেদের জান ও মাল আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে দেয়। তাদের ভাগ্যেই মঙ্গল ও কল্যাণ। তারাই হচ্ছে সফলকাম। তাদেরই জন্যে রয়েছে জান্নাতুল ফিরদাউস। আর তাদেরই জন্যে রয়েছে উচ্চতম মর্যাদা। তারা তাদের গন্তব্যস্থানেও সফলতায় পৌছে যাবে।

আত-তাওবা 9:90

এখানে আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের বর্ণনা দিচ্ছেন যারা বাস্তবিকই শরঈ ওযরের কারণে জিহাদে অংশগ্রহণে অক্ষম ছিল। মদীনার চার পাশের এ লোকগুলো এসে নিজেদের দুর্বলতা ও অক্ষমতার কথা বর্ণনা করে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে যে, যদি তিনি তাদেরকে বাস্তবিকই মা’যুর মনে করেন তবে যেন অনুমতি দান করেন। তারা ছিল বানু গিফার গোত্রের লোক। ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর কিরআতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ওর বিশিষ্ট লোকেরা (অনুমতি প্রার্থনা করেছিল। এই অর্থটিই বেশী স্পষ্ট। কেননা, এই বাক্যের পরে ঐ লোকদের বর্ণনা রয়েছে যারা ছিল মিথ্যাবাদী। তারা না আগমন করেছিল, না জিহাদ থেকে বিরত থাকার কোন কারণ দর্শিয়েছিল, না রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে বিরত থাকার অনুমতি প্রার্থনা করেছিল। কোন কোন গুরুজন বলেন যে, ওযর পেশকারীরাও প্রকৃতপক্ষে ওযর বিশিষ্ট ছিল না। এ কারণেই তাদের ওযর গৃহীত হয়নি। কিন্তু প্রথম উক্তিটি গ্রহণযোগ্য বটে এবং ওটাই বেশী প্রকাশ্য এর একটি কারণ ওটাই যা আমরা উপরে বর্ণনা করেছি। আর দ্বিতীয় কারণ এই যে, শাস্তির অঙ্গীকারও ঐ লোকদের সাথেই করা হয়েছে। যারা যুদ্ধে গমন না করে বাড়ীতে বসেই রয়েছিল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।

আত-তাওবা 9:91

৯১-৯৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা ঐ শরীয়ত সম্মত ওযরসমূহের বর্ণনা দিচ্ছেন যে ওরগুলো কোন মানুষের মাঝে থাকলে সে যদি জিহাদে অংশগ্রহণ না করে তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে তার কোন অপরাধ হবে না। ঐ ওযরগুলোর মধ্যে এক প্রকারতো হচ্ছে এই যে, তা সব সময়ই থাকবে, কোন অবস্থাতেই মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। যেমন জন্মগতভাবে দুর্বল হওয়া, খোড়া হওয়া, অন্ধ হওয়া, বিকলাঙ্গ হওয়া, সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন হওয়া ইত্যাদি। দ্বিতীয় প্রকারের ওযর হচ্ছে ঐ সব ওযর যেগুলো কখনো থাকে আবার কখনো থাকে না। ওগুলো হচ্ছে আকস্মিক কারণ। যেমন কেউ রুগ্ন হয়ে পড়লো বা অভাবগ্রস্ত হলো অথবা সফরের ও জিহাদের সরঞ্জাম জোগাড় করতে পারছে না ইত্যাদি। সুতরাং এসব ওযর বিশিষ্ট লোকেরা জিহাদে অংশগ্রহণ না করলে শরীয়তের দৃষ্টিতে তাদের কোন অপরাধ হবে না। কিন্তু তাদের আন্তরিকতা থাকতে হবে। তাদেরকে হতে হবে মুসলিমদের ও আল্লাহর দ্বীনের শুভাকাঙ্ক্ষী। তাদের কর্তব্য হবে অন্যদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করা। বাড়ীতে বসে বসে যতটুকু সম্ভব মুজাহিদদের খিদমত করতে হবে। এরূপ সৎ প্রকৃতির লোকদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল ও দয়ালু। ঈসা (আঃ)-এর সাহায্যকারী হাওয়ারীগণ তাঁকে প্রশ্ন করেছিলঃ “আল্লাহর শুভাকাঙ্ক্ষী কারা বলুন তো?” তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “যারা আল্লাহর হককে মানুষের হকের উপর প্রাধান্য দেয় এবং যখন একটি দ্বীনের কাজ এবং একটি দুনিয়ার কাজ সামনে এসে যায় তখন যারা দ্বীনের কাজের গুরুত্বের প্রতি পূর্ণ খেয়াল রাখে । তারপর দ্বীনের কাজ শেষ করে দুনিয়ার কাজ আনজাম দেয়।”একবার দুর্ভিক্ষের সময় জনগণ ইসতিকার সালাত পড়ার জন্যে মাঠের দিকে বের হয়। তাদের সাথে বিলাল ইবনে সা'দ (রাঃ) ছিলেন। তিনি দাড়িয়ে আল্লাহ তাআলার হামদ ও সানার পর জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে উপস্থিত ভ্রাতৃবৃন্দ! আপনারা কি এটা স্বীকার করেন যে, আপনারা সবাই আল্লাহ তা'আলার পাপী বান্দা?” সবাই সমস্বরে বলে উঠলেনঃ “হ্যাঁ।” অতঃপর তিনি প্রার্থনার জন্যে হাত উঠিয়ে বলতে লাগলেন- হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আপনার কালামে পাকে বলেছেনঃ “সৎ লোকদের প্রতি কোন প্রকারের অভিযোগ নেই।” আমরা আমাদের দুষ্কর্যের স্বীকারোক্তি করছি। সুতরাং আপনি আমাদের। ক্ষমা করুন! আমাদের উপর আপনার করুণা বর্ষণ করুন! আমাদের উপর দয়াপরবশ হয়ে বৃষ্টি বর্ষণ করুন! তিনি হাত উঠালেন এবং জনগণও তাঁর সাথে হাত উঠালো। আল্লাহর করুণা উথলিয়ে উঠলো এবং মুষলধারে রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হতে শুরু হলো।যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর লেখক ছিলাম। সূরায়ে বারাআত যখন অবতীর্ণ হচ্ছিল তখন আমি ঐ সূরাটিও লিখছিলাম। আমি আমার কলমটি আমার কানের উপর রাখতাম। জিহাদের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর কি অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে সে জন্যে তিনি অপেক্ষমান ছিলেন। এমন সময় একজন অন্ধ এসে বলতে লাগলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো একজন অন্ধ লোক। সুতরাং আমি জিহাদের নির্দেশ কিরূপে পালন করতে পারি?” তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।এরপর ঐ লোকদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা জিহাদে অংশগ্রহণের জন্যে সদা উদ্বিগ্ন, কিন্তু স্বভাবগত কারণে বিরত থাকতে বাধ্য হয়। জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণা অনুযায়ী মুজাহিদগণ জমা হতে শুরু করেন। একটি দল আগমন করলেন যাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল ইবনে মাকরান মুযানীও (রাঃ) ছিলেন। তারা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের সওয়ারী নেই। সুতরাং আপনি আমাদের সওয়ারীর ব্যবস্থা করে দিন, যাতে আমরাও জিহাদের সওয়াব লাভ করতে পারি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আমার কাছে তো একটিও সওয়ারী নেই যাতে আমি তোমাদেরকে আরোহণ করতে পারি।” সুতরাং তারা নিরাশ হয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যান। তাঁদের এর চেয়ে বড় দুঃখ আর ছিল না যে, তারা জিহাদের মর্যাদা লাভে বঞ্চিত হয়ে গেলেন এবং নারীদের মত তাদেরকে ঐ সময়টা বাড়ীতেই কাটাতে হবে। তাদের না আছে নিজেদের কোন জিনিস, না কারো কাছ থেকে কোন বাহন পাচ্ছেন। তাই মহান আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করে তাদেরকে সান্তনা দান করেন। এ আয়াতটি মুযাইনা গোত্রের শাখা বানু। মাকরানের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, তাঁরা সাতজন ছিলেন। তাঁরা ছিলেন বানু আমির গোত্রের লোক। তাঁরা হচ্ছেন-(১) বানু ওয়াকিফ গোত্রের সালিম ইবনে আউফ, (২) বানু মাযিল গোত্রের হারামী ইবনে আমর, (৩) বানু মুআল্লা গোত্রের আব্দুর রহমান ইবনে কা'ব, (৪) বানু সালমা গোত্রের ফাযলুল্লাহ, (৫) আমর ইবনে উকবা, (৬) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর মুযানী, (৭) বানু হারিসা গোত্রের আলিয়্যাহ ইবনে যায়েদ। কোন কোন রিওয়ায়াতে কতকগুলো নামের হেরফেরও রয়েছে। মহৎ হৃদয়ের অধিকারী এই বুযুর্গদের ব্যাপারেই রাসূলগণের মাথার মুকুট মুহাম্মাদ (সঃ) বলেছেনঃ “হে আমার মুজাহিদ সাহাবীবর্গ! তোমরা মদীনায় যেসব লোককে পিছনে ছেড়ে এসেছে তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা তোমাদের খরচ করার মধ্যে, তোমাদের মাঠে-ময়দানে চলাফেরার মধ্যে, তোমাদের জিহাদ করার মধ্যে শরীক রয়েছে। এতে তোমাদের যে সওয়াব হবে তাতে তারাও শরীক থাকবে।” অতঃপর তিনি এই আয়াতটিই পাঠ করেন। অন্য এক রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথা শুনে সাহাবীগণ বলেনঃ “তারা বাড়ীতে বসে থেকেও সওয়াবে আমাদের শরীক হবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, কেননা তাদের ওযর রয়েছে। ওযরের কারণেই তারা জিহাদে অংশগ্রহণ করতে পারেনি।” অন্য হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “রোগ তাদেরকে জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রেখেছে।” অতঃপর প্রকৃতপক্ষে যাদের কোন ওযর নেই, আল্লাহ তাআলা তাদের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলছেনঃ অভিযোগ তো শুধু ঐ লোকদের উপরই যারা ধন-সম্পদের মালিক ও হৃষ্টপুষ্ট হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধে গমন না করার অনুমতি চাচ্ছে। তারা অন্তঃপুরবাসিনী মহিলাদের মত বাড়ীতেই অবস্থান করতে ইচ্ছুক। তারা মাটি কামড়ে বসে থাকে। তাদের দুষ্কার্যের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরসমূহের উপর মোহর মেরে দেন। সুতরাং তারা এখন নিজেদের ভাল মন্দ কিছুই জানতে পারছে না।

আত-তাওবা 9:92

৯১-৯৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা ঐ শরীয়ত সম্মত ওযরসমূহের বর্ণনা দিচ্ছেন যে ওরগুলো কোন মানুষের মাঝে থাকলে সে যদি জিহাদে অংশগ্রহণ না করে তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে তার কোন অপরাধ হবে না। ঐ ওযরগুলোর মধ্যে এক প্রকারতো হচ্ছে এই যে, তা সব সময়ই থাকবে, কোন অবস্থাতেই মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। যেমন জন্মগতভাবে দুর্বল হওয়া, খোড়া হওয়া, অন্ধ হওয়া, বিকলাঙ্গ হওয়া, সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন হওয়া ইত্যাদি। দ্বিতীয় প্রকারের ওযর হচ্ছে ঐ সব ওযর যেগুলো কখনো থাকে আবার কখনো থাকে না। ওগুলো হচ্ছে আকস্মিক কারণ। যেমন কেউ রুগ্ন হয়ে পড়লো বা অভাবগ্রস্ত হলো অথবা সফরের ও জিহাদের সরঞ্জাম জোগাড় করতে পারছে না ইত্যাদি। সুতরাং এসব ওযর বিশিষ্ট লোকেরা জিহাদে অংশগ্রহণ না করলে শরীয়তের দৃষ্টিতে তাদের কোন অপরাধ হবে না। কিন্তু তাদের আন্তরিকতা থাকতে হবে। তাদেরকে হতে হবে মুসলিমদের ও আল্লাহর দ্বীনের শুভাকাঙ্ক্ষী। তাদের কর্তব্য হবে অন্যদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করা। বাড়ীতে বসে বসে যতটুকু সম্ভব মুজাহিদদের খিদমত করতে হবে। এরূপ সৎ প্রকৃতির লোকদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল ও দয়ালু। ঈসা (আঃ)-এর সাহায্যকারী হাওয়ারীগণ তাঁকে প্রশ্ন করেছিলঃ “আল্লাহর শুভাকাঙ্ক্ষী কারা বলুন তো?” তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “যারা আল্লাহর হককে মানুষের হকের উপর প্রাধান্য দেয় এবং যখন একটি দ্বীনের কাজ এবং একটি দুনিয়ার কাজ সামনে এসে যায় তখন যারা দ্বীনের কাজের গুরুত্বের প্রতি পূর্ণ খেয়াল রাখে । তারপর দ্বীনের কাজ শেষ করে দুনিয়ার কাজ আনজাম দেয়।”একবার দুর্ভিক্ষের সময় জনগণ ইসতিকার সালাত পড়ার জন্যে মাঠের দিকে বের হয়। তাদের সাথে বিলাল ইবনে সা'দ (রাঃ) ছিলেন। তিনি দাড়িয়ে আল্লাহ তাআলার হামদ ও সানার পর জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে উপস্থিত ভ্রাতৃবৃন্দ! আপনারা কি এটা স্বীকার করেন যে, আপনারা সবাই আল্লাহ তা'আলার পাপী বান্দা?” সবাই সমস্বরে বলে উঠলেনঃ “হ্যাঁ।” অতঃপর তিনি প্রার্থনার জন্যে হাত উঠিয়ে বলতে লাগলেন- হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আপনার কালামে পাকে বলেছেনঃ “সৎ লোকদের প্রতি কোন প্রকারের অভিযোগ নেই।” আমরা আমাদের দুষ্কর্যের স্বীকারোক্তি করছি। সুতরাং আপনি আমাদের। ক্ষমা করুন! আমাদের উপর আপনার করুণা বর্ষণ করুন! আমাদের উপর দয়াপরবশ হয়ে বৃষ্টি বর্ষণ করুন! তিনি হাত উঠালেন এবং জনগণও তাঁর সাথে হাত উঠালো। আল্লাহর করুণা উথলিয়ে উঠলো এবং মুষলধারে রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হতে শুরু হলো।যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর লেখক ছিলাম। সূরায়ে বারাআত যখন অবতীর্ণ হচ্ছিল তখন আমি ঐ সূরাটিও লিখছিলাম। আমি আমার কলমটি আমার কানের উপর রাখতাম। জিহাদের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর কি অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে সে জন্যে তিনি অপেক্ষমান ছিলেন। এমন সময় একজন অন্ধ এসে বলতে লাগলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো একজন অন্ধ লোক। সুতরাং আমি জিহাদের নির্দেশ কিরূপে পালন করতে পারি?” তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।এরপর ঐ লোকদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা জিহাদে অংশগ্রহণের জন্যে সদা উদ্বিগ্ন, কিন্তু স্বভাবগত কারণে বিরত থাকতে বাধ্য হয়। জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণা অনুযায়ী মুজাহিদগণ জমা হতে শুরু করেন। একটি দল আগমন করলেন যাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল ইবনে মাকরান মুযানীও (রাঃ) ছিলেন। তারা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের সওয়ারী নেই। সুতরাং আপনি আমাদের সওয়ারীর ব্যবস্থা করে দিন, যাতে আমরাও জিহাদের সওয়াব লাভ করতে পারি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আমার কাছে তো একটিও সওয়ারী নেই যাতে আমি তোমাদেরকে আরোহণ করতে পারি।” সুতরাং তারা নিরাশ হয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যান। তাঁদের এর চেয়ে বড় দুঃখ আর ছিল না যে, তারা জিহাদের মর্যাদা লাভে বঞ্চিত হয়ে গেলেন এবং নারীদের মত তাদেরকে ঐ সময়টা বাড়ীতেই কাটাতে হবে। তাদের না আছে নিজেদের কোন জিনিস, না কারো কাছ থেকে কোন বাহন পাচ্ছেন। তাই মহান আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করে তাদেরকে সান্তনা দান করেন। এ আয়াতটি মুযাইনা গোত্রের শাখা বানু। মাকরানের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, তাঁরা সাতজন ছিলেন। তাঁরা ছিলেন বানু আমির গোত্রের লোক। তাঁরা হচ্ছেন-(১) বানু ওয়াকিফ গোত্রের সালিম ইবনে আউফ, (২) বানু মাযিল গোত্রের হারামী ইবনে আমর, (৩) বানু মুআল্লা গোত্রের আব্দুর রহমান ইবনে কা'ব, (৪) বানু সালমা গোত্রের ফাযলুল্লাহ, (৫) আমর ইবনে উকবা, (৬) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর মুযানী, (৭) বানু হারিসা গোত্রের আলিয়্যাহ ইবনে যায়েদ। কোন কোন রিওয়ায়াতে কতকগুলো নামের হেরফেরও রয়েছে। মহৎ হৃদয়ের অধিকারী এই বুযুর্গদের ব্যাপারেই রাসূলগণের মাথার মুকুট মুহাম্মাদ (সঃ) বলেছেনঃ “হে আমার মুজাহিদ সাহাবীবর্গ! তোমরা মদীনায় যেসব লোককে পিছনে ছেড়ে এসেছে তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা তোমাদের খরচ করার মধ্যে, তোমাদের মাঠে-ময়দানে চলাফেরার মধ্যে, তোমাদের জিহাদ করার মধ্যে শরীক রয়েছে। এতে তোমাদের যে সওয়াব হবে তাতে তারাও শরীক থাকবে।” অতঃপর তিনি এই আয়াতটিই পাঠ করেন। অন্য এক রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথা শুনে সাহাবীগণ বলেনঃ “তারা বাড়ীতে বসে থেকেও সওয়াবে আমাদের শরীক হবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, কেননা তাদের ওযর রয়েছে। ওযরের কারণেই তারা জিহাদে অংশগ্রহণ করতে পারেনি।” অন্য হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “রোগ তাদেরকে জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রেখেছে।” অতঃপর প্রকৃতপক্ষে যাদের কোন ওযর নেই, আল্লাহ তাআলা তাদের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলছেনঃ অভিযোগ তো শুধু ঐ লোকদের উপরই যারা ধন-সম্পদের মালিক ও হৃষ্টপুষ্ট হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধে গমন না করার অনুমতি চাচ্ছে। তারা অন্তঃপুরবাসিনী মহিলাদের মত বাড়ীতেই অবস্থান করতে ইচ্ছুক। তারা মাটি কামড়ে বসে থাকে। তাদের দুষ্কার্যের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরসমূহের উপর মোহর মেরে দেন। সুতরাং তারা এখন নিজেদের ভাল মন্দ কিছুই জানতে পারছে না।

আত-তাওবা 9:93

৯১-৯৩ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা ঐ শরীয়ত সম্মত ওযরসমূহের বর্ণনা দিচ্ছেন যে ওরগুলো কোন মানুষের মাঝে থাকলে সে যদি জিহাদে অংশগ্রহণ না করে তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে তার কোন অপরাধ হবে না। ঐ ওযরগুলোর মধ্যে এক প্রকারতো হচ্ছে এই যে, তা সব সময়ই থাকবে, কোন অবস্থাতেই মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। যেমন জন্মগতভাবে দুর্বল হওয়া, খোড়া হওয়া, অন্ধ হওয়া, বিকলাঙ্গ হওয়া, সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন হওয়া ইত্যাদি। দ্বিতীয় প্রকারের ওযর হচ্ছে ঐ সব ওযর যেগুলো কখনো থাকে আবার কখনো থাকে না। ওগুলো হচ্ছে আকস্মিক কারণ। যেমন কেউ রুগ্ন হয়ে পড়লো বা অভাবগ্রস্ত হলো অথবা সফরের ও জিহাদের সরঞ্জাম জোগাড় করতে পারছে না ইত্যাদি। সুতরাং এসব ওযর বিশিষ্ট লোকেরা জিহাদে অংশগ্রহণ না করলে শরীয়তের দৃষ্টিতে তাদের কোন অপরাধ হবে না। কিন্তু তাদের আন্তরিকতা থাকতে হবে। তাদেরকে হতে হবে মুসলিমদের ও আল্লাহর দ্বীনের শুভাকাঙ্ক্ষী। তাদের কর্তব্য হবে অন্যদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করা। বাড়ীতে বসে বসে যতটুকু সম্ভব মুজাহিদদের খিদমত করতে হবে। এরূপ সৎ প্রকৃতির লোকদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল ও দয়ালু। ঈসা (আঃ)-এর সাহায্যকারী হাওয়ারীগণ তাঁকে প্রশ্ন করেছিলঃ “আল্লাহর শুভাকাঙ্ক্ষী কারা বলুন তো?” তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “যারা আল্লাহর হককে মানুষের হকের উপর প্রাধান্য দেয় এবং যখন একটি দ্বীনের কাজ এবং একটি দুনিয়ার কাজ সামনে এসে যায় তখন যারা দ্বীনের কাজের গুরুত্বের প্রতি পূর্ণ খেয়াল রাখে । তারপর দ্বীনের কাজ শেষ করে দুনিয়ার কাজ আনজাম দেয়।”একবার দুর্ভিক্ষের সময় জনগণ ইসতিকার সালাত পড়ার জন্যে মাঠের দিকে বের হয়। তাদের সাথে বিলাল ইবনে সা'দ (রাঃ) ছিলেন। তিনি দাড়িয়ে আল্লাহ তাআলার হামদ ও সানার পর জনগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে উপস্থিত ভ্রাতৃবৃন্দ! আপনারা কি এটা স্বীকার করেন যে, আপনারা সবাই আল্লাহ তা'আলার পাপী বান্দা?” সবাই সমস্বরে বলে উঠলেনঃ “হ্যাঁ।” অতঃপর তিনি প্রার্থনার জন্যে হাত উঠিয়ে বলতে লাগলেন- হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আপনার কালামে পাকে বলেছেনঃ “সৎ লোকদের প্রতি কোন প্রকারের অভিযোগ নেই।” আমরা আমাদের দুষ্কর্যের স্বীকারোক্তি করছি। সুতরাং আপনি আমাদের। ক্ষমা করুন! আমাদের উপর আপনার করুণা বর্ষণ করুন! আমাদের উপর দয়াপরবশ হয়ে বৃষ্টি বর্ষণ করুন! তিনি হাত উঠালেন এবং জনগণও তাঁর সাথে হাত উঠালো। আল্লাহর করুণা উথলিয়ে উঠলো এবং মুষলধারে রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হতে শুরু হলো।যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর লেখক ছিলাম। সূরায়ে বারাআত যখন অবতীর্ণ হচ্ছিল তখন আমি ঐ সূরাটিও লিখছিলাম। আমি আমার কলমটি আমার কানের উপর রাখতাম। জিহাদের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর কি অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে সে জন্যে তিনি অপেক্ষমান ছিলেন। এমন সময় একজন অন্ধ এসে বলতে লাগলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো একজন অন্ধ লোক। সুতরাং আমি জিহাদের নির্দেশ কিরূপে পালন করতে পারি?” তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।এরপর ঐ লোকদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যারা জিহাদে অংশগ্রহণের জন্যে সদা উদ্বিগ্ন, কিন্তু স্বভাবগত কারণে বিরত থাকতে বাধ্য হয়। জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষণা অনুযায়ী মুজাহিদগণ জমা হতে শুরু করেন। একটি দল আগমন করলেন যাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল ইবনে মাকরান মুযানীও (রাঃ) ছিলেন। তারা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের সওয়ারী নেই। সুতরাং আপনি আমাদের সওয়ারীর ব্যবস্থা করে দিন, যাতে আমরাও জিহাদের সওয়াব লাভ করতে পারি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আমার কাছে তো একটিও সওয়ারী নেই যাতে আমি তোমাদেরকে আরোহণ করতে পারি।” সুতরাং তারা নিরাশ হয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যান। তাঁদের এর চেয়ে বড় দুঃখ আর ছিল না যে, তারা জিহাদের মর্যাদা লাভে বঞ্চিত হয়ে গেলেন এবং নারীদের মত তাদেরকে ঐ সময়টা বাড়ীতেই কাটাতে হবে। তাদের না আছে নিজেদের কোন জিনিস, না কারো কাছ থেকে কোন বাহন পাচ্ছেন। তাই মহান আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করে তাদেরকে সান্তনা দান করেন। এ আয়াতটি মুযাইনা গোত্রের শাখা বানু। মাকরানের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, তাঁরা সাতজন ছিলেন। তাঁরা ছিলেন বানু আমির গোত্রের লোক। তাঁরা হচ্ছেন-(১) বানু ওয়াকিফ গোত্রের সালিম ইবনে আউফ, (২) বানু মাযিল গোত্রের হারামী ইবনে আমর, (৩) বানু মুআল্লা গোত্রের আব্দুর রহমান ইবনে কা'ব, (৪) বানু সালমা গোত্রের ফাযলুল্লাহ, (৫) আমর ইবনে উকবা, (৬) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর মুযানী, (৭) বানু হারিসা গোত্রের আলিয়্যাহ ইবনে যায়েদ। কোন কোন রিওয়ায়াতে কতকগুলো নামের হেরফেরও রয়েছে। মহৎ হৃদয়ের অধিকারী এই বুযুর্গদের ব্যাপারেই রাসূলগণের মাথার মুকুট মুহাম্মাদ (সঃ) বলেছেনঃ “হে আমার মুজাহিদ সাহাবীবর্গ! তোমরা মদীনায় যেসব লোককে পিছনে ছেড়ে এসেছে তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা তোমাদের খরচ করার মধ্যে, তোমাদের মাঠে-ময়দানে চলাফেরার মধ্যে, তোমাদের জিহাদ করার মধ্যে শরীক রয়েছে। এতে তোমাদের যে সওয়াব হবে তাতে তারাও শরীক থাকবে।” অতঃপর তিনি এই আয়াতটিই পাঠ করেন। অন্য এক রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথা শুনে সাহাবীগণ বলেনঃ “তারা বাড়ীতে বসে থেকেও সওয়াবে আমাদের শরীক হবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, কেননা তাদের ওযর রয়েছে। ওযরের কারণেই তারা জিহাদে অংশগ্রহণ করতে পারেনি।” অন্য হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “রোগ তাদেরকে জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রেখেছে।” অতঃপর প্রকৃতপক্ষে যাদের কোন ওযর নেই, আল্লাহ তাআলা তাদের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলছেনঃ অভিযোগ তো শুধু ঐ লোকদের উপরই যারা ধন-সম্পদের মালিক ও হৃষ্টপুষ্ট হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধে গমন না করার অনুমতি চাচ্ছে। তারা অন্তঃপুরবাসিনী মহিলাদের মত বাড়ীতেই অবস্থান করতে ইচ্ছুক। তারা মাটি কামড়ে বসে থাকে। তাদের দুষ্কার্যের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরসমূহের উপর মোহর মেরে দেন। সুতরাং তারা এখন নিজেদের ভাল মন্দ কিছুই জানতে পারছে না।

আত-তাওবা 9:94

৯৪-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, মুমিনরা যখন মদীনায় ফিরে আসবে তখন ঐ মুনাফিকরা তাদের কাছে ওর পেশ করবে। তাই আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূলকে বলেছেনঃ হে নবী (সঃ)! ঐ মুনাফিকদেরকে বলে দাও- তোমরা আমাদের কাছে মিথ্যা ওযর পেশ করো না। তোমাদের কথা কখনো আমরা সত্য বলে বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তোমাদের সংবাদ অবহিত করেছেন। অতিসত্বরই তিনি দুনিয়ায় তোমাদের আমল লোকদের সামনে প্রকাশ করে দিবেন এবং তোমাদের ভাল মন্দ কার্যাবলীর খবর প্রদান করবেন। অতঃপর তোমাদেরকে তোমাদের কর্মের ফলও দেখতে হবে।এরপর মহান আল্লাহ তাদের সম্পর্কে আরো সংবাদ দিচ্ছেন তারা তাদের ওরের কথা শপথ করে করে বর্ণনা করবে, যেন তাদেরকে ক্ষমা করে দাও। কিন্তু হে মুমিনগণ! তোমরা কখনো তাদের কথার সত্যতা স্বীকার করো না এবং ঘৃণার সাথে তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। এসব ব্যাপার ঐ সময় ঘটবে যখন তোমরা যুদ্ধ শেষে মদীনায় ফিরে আসবে। জেনে রেখো যে, তাদের নফস্ কলুষিত হয়ে গেছে। তাদের ভিতর খুবই খারাপ এবং তাদের ধারণা ও বিশ্বাস অপবিত্র। পরকালে তাদের ঠিকানা জাহান্নাম। এটাই তাদের দুষ্কর্মের সঠিক প্রতিফল। আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে আরো বলে দেন- তোমরা যদি এই মুনাফিকদের কথা ও কসম বিশ্বাস করে তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাও তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি কখনো সন্তুষ্ট হবেন না। তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য হতে বেরিয়ে গেছে। তারা ফাসেক। (আরবী) শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বাইরে বের হওয়া। যেমন বলা হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “ইঁদুর দুষ্কৃতি ও ফাসাদ দৃষ্টি করার উদ্দেশ্যেই স্বীয় গর্ত হতে বের হয়ে থাকে।” আরো বলা হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “শাখা বা ডাল হতে খেজুরের গুচ্ছ বের হয়ে এসেছে।

আত-তাওবা 9:95

৯৪-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, মুমিনরা যখন মদীনায় ফিরে আসবে তখন ঐ মুনাফিকরা তাদের কাছে ওর পেশ করবে। তাই আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূলকে বলেছেনঃ হে নবী (সঃ)! ঐ মুনাফিকদেরকে বলে দাও- তোমরা আমাদের কাছে মিথ্যা ওযর পেশ করো না। তোমাদের কথা কখনো আমরা সত্য বলে বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তোমাদের সংবাদ অবহিত করেছেন। অতিসত্বরই তিনি দুনিয়ায় তোমাদের আমল লোকদের সামনে প্রকাশ করে দিবেন এবং তোমাদের ভাল মন্দ কার্যাবলীর খবর প্রদান করবেন। অতঃপর তোমাদেরকে তোমাদের কর্মের ফলও দেখতে হবে।এরপর মহান আল্লাহ তাদের সম্পর্কে আরো সংবাদ দিচ্ছেন তারা তাদের ওরের কথা শপথ করে করে বর্ণনা করবে, যেন তাদেরকে ক্ষমা করে দাও। কিন্তু হে মুমিনগণ! তোমরা কখনো তাদের কথার সত্যতা স্বীকার করো না এবং ঘৃণার সাথে তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। এসব ব্যাপার ঐ সময় ঘটবে যখন তোমরা যুদ্ধ শেষে মদীনায় ফিরে আসবে। জেনে রেখো যে, তাদের নফস্ কলুষিত হয়ে গেছে। তাদের ভিতর খুবই খারাপ এবং তাদের ধারণা ও বিশ্বাস অপবিত্র। পরকালে তাদের ঠিকানা জাহান্নাম। এটাই তাদের দুষ্কর্মের সঠিক প্রতিফল। আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে আরো বলে দেন- তোমরা যদি এই মুনাফিকদের কথা ও কসম বিশ্বাস করে তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাও তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি কখনো সন্তুষ্ট হবেন না। তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য হতে বেরিয়ে গেছে। তারা ফাসেক। (আরবী) শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বাইরে বের হওয়া। যেমন বলা হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “ইঁদুর দুষ্কৃতি ও ফাসাদ দৃষ্টি করার উদ্দেশ্যেই স্বীয় গর্ত হতে বের হয়ে থাকে।” আরো বলা হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “শাখা বা ডাল হতে খেজুরের গুচ্ছ বের হয়ে এসেছে।

আত-তাওবা 9:96

৯৪-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, মুমিনরা যখন মদীনায় ফিরে আসবে তখন ঐ মুনাফিকরা তাদের কাছে ওর পেশ করবে। তাই আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূলকে বলেছেনঃ হে নবী (সঃ)! ঐ মুনাফিকদেরকে বলে দাও- তোমরা আমাদের কাছে মিথ্যা ওযর পেশ করো না। তোমাদের কথা কখনো আমরা সত্য বলে বিশ্বাস করবো না। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তোমাদের সংবাদ অবহিত করেছেন। অতিসত্বরই তিনি দুনিয়ায় তোমাদের আমল লোকদের সামনে প্রকাশ করে দিবেন এবং তোমাদের ভাল মন্দ কার্যাবলীর খবর প্রদান করবেন। অতঃপর তোমাদেরকে তোমাদের কর্মের ফলও দেখতে হবে।এরপর মহান আল্লাহ তাদের সম্পর্কে আরো সংবাদ দিচ্ছেন তারা তাদের ওরের কথা শপথ করে করে বর্ণনা করবে, যেন তাদেরকে ক্ষমা করে দাও। কিন্তু হে মুমিনগণ! তোমরা কখনো তাদের কথার সত্যতা স্বীকার করো না এবং ঘৃণার সাথে তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। এসব ব্যাপার ঐ সময় ঘটবে যখন তোমরা যুদ্ধ শেষে মদীনায় ফিরে আসবে। জেনে রেখো যে, তাদের নফস্ কলুষিত হয়ে গেছে। তাদের ভিতর খুবই খারাপ এবং তাদের ধারণা ও বিশ্বাস অপবিত্র। পরকালে তাদের ঠিকানা জাহান্নাম। এটাই তাদের দুষ্কর্মের সঠিক প্রতিফল। আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে আরো বলে দেন- তোমরা যদি এই মুনাফিকদের কথা ও কসম বিশ্বাস করে তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাও তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি কখনো সন্তুষ্ট হবেন না। তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য হতে বেরিয়ে গেছে। তারা ফাসেক। (আরবী) শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বাইরে বের হওয়া। যেমন বলা হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “ইঁদুর দুষ্কৃতি ও ফাসাদ দৃষ্টি করার উদ্দেশ্যেই স্বীয় গর্ত হতে বের হয়ে থাকে।” আরো বলা হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “শাখা বা ডাল হতে খেজুরের গুচ্ছ বের হয়ে এসেছে।

আত-তাওবা 9:97

৯৭-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা এখানে সংবাদ দিচ্ছেন যে, গ্রাম্য লোকদের মধ্যে কাফিরও রয়েছে, মুনাফিকও রয়েছে। আর তাদের কুফরী ও নিফাক অন্যদের তুলনায় খুবই বড় ও কঠিন এবং তারা এরই যোগ্য যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর উপর যে হুকুম ও আহকাম নাযিল করেছেন তা থেকে তারা বে-খবর থাকে। যেমন- আমাশ (রঃ) ইবরাহীম (রঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একজন গ্রাম্য বেদুঈন যায়েদ ইবনে সাওহান (রঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিল। তিনি তার সঙ্গীদের সাথে আলাপ-আলোচনা করছিলেন। নাহাওয়ান্দের যুদ্ধে তাঁর হাত কেটে গিয়েছিল। বেদুঈনটি তাঁকে বললোঃ “আপনার কথাগুলো তো খুবই ভাল। এবং আপনাকে ভাল লোক বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু আপনার কর্তিত হাত আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” তখন যায়েদ (রঃ) বললেনঃ “আমার কর্তিত হাত দেখে তোমার সন্দেহ হচ্ছে কেন? এটা তো বাম হাত।” বেদুঈন বললোঃ “আল্লাহর শপথ! চুরির অপরাধে ডান হাত কাটা হয় কি বাম হাত কাটা হয় তা আমার জানা নেই।” তখন যায়েদ ইবনে সাওহান (রঃ) বলে উঠলেন যে, আল্লাহ সত্য বলেছেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “গ্রামবাসী লোকেরা কুফরী ও কপটতায় অতি কঠোর, আর তাদের এরূপ হওয়াই উচিত কারণ, তাদের ঐসব আহকামের জ্ঞান নেই যা আল্লাহ তাঁর রাসূল (সঃ)-এর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন।”ইমাম আহমাদ (রঃ) ইসনাদসহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যারা পল্লীতে বাস করে তারা যেন নির্বাসিত লোক, যারা শিকারের পিছে দৌড়াদৌড়ি করে তারা নির্বোধ এবং যারা কোন বাদশাহ্র সাহচর্য গ্রহণ করে তারা ফিত্রায় পতিত হয়ে থাকে।” (সুনানে আবি দাউদ, জামেউত তিরমিযী এবং সুনানে নাসাঈতেও সুফইয়ান সাওরী (রঃ) হতে এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন। সাওরী (রঃ)-এর রিওয়ায়াত ছাড়া আর কারো রিওয়ায়াত আমাদের জানা নেই) বেদুঈনরা সাধারণতঃ বদ মেযাজী, বোকা এবং অভদ্র হয়ে থাকে, তাই আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে কোন রাসূলের জন্ম দেননি। নবুওয়াতের অধিকারী একমাত্র শহুরে ও দ্র লোকেরাই হয়ে থাকেন। যেমন- আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তোমার পূর্বে জনপদবাসীদের মধ্য হতে পুরুষগণকেই প্রেরণ করেছিলাম যাদের নিকট ওহী পাঠাতাম।” (১২:১০৯) একবার এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে কিছু হাদিয়া পাঠায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে পর্যন্ত তার কাছে ওর কয়েকগুণ বেশী হাদিয়া না পাঠান সেই পর্যন্ত সে খুশী হয়নি। ঐ সময় তিনি বলেছিলেনঃ “আমি এখন সংকল্প করেছি যে, কারাশী, সাকাফী, আনসারী এবং দাওসী ছাড়া আর কারো হাদিয়া কবুল করবো না । কেননা, এরা হচ্ছে শহুরে লোক। এরা মক্কা, তায়েফ, মদীনা এবং ইয়ামনের অধিবাসী। বেদুঈনের তুলনায় এদের চরিত্র বহুগুণে উত্তম। বেদুঈনরা সাধারণতঃ বোকাই হয়। সন্তানকে চুম্বন করার ব্যাপারে বেদুঈনের হাদীসঃ সহীহ মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, বেদুঈনদের কতকগুলো লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “তোমরা তোমাদের শিশুদেরকে চুম্বন করে থাকো?” তারা (সাহাবীগণ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা।” তখন তারা বললোঃ “আল্লাহর শপথ! আমরা কিন্তু (আমাদের) শিশুদেরকে চুম্বন করি না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বললেনঃ “আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তর থেকে রহমত বের করে নেন তবে আমি কি করে তার যিম্মাদার হতে পারি?” (সহীহ বুখারীর ইবারত হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমার জন্যে যিম্মাদার হতে পারি যদি আল্লাহ তোমার অন্তর থেকে রহমত বের করে নেন?)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ “আল্লাহ হচ্ছেন মহাজ্ঞানী, অতি প্রজ্ঞাময়।” অর্থাৎ আল্লাহ ঐ লোকদেরকে ভালরূপেই জানেন যারা এর যোগ্য যে, তাদেরকে জ্ঞান ও ঈমানের তাওফীক দেয়া হবে। তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে জ্ঞান, অজ্ঞতা, ঈমান, কুফরী এবং নিফাকের বন্টন অত্যন্ত বিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার সাথে করেছেন। তিনি তার জ্ঞান ও নৈপুণ্যের ভিত্তিতে যা কিছু করেন এর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে পারে না।আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা আল্লাহর পথে কিছু খরচ করলে ওটাকে জরিমানা মনে করে থাকে এবং মুমিনরা কোন দৈব দুর্বিপাকে পতিত হাক তারা এরই প্রতীক্ষায় থাকে। কিন্তু তারা নিজেরাই সেই দুর্বিপাকে পতিত হবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের কথা খুবই ভাল শুনেন ও জানেন। অপমান ও ব্যর্থতার যোগ্য কারা এবং কারা সাহায্য প্রাপ্তি ও সফলতার যোগ্য এটাও তিনি ভালরূপেই জানেন। পল্লীবাসীদের আর এক শ্রেণীর লোক প্রশংসার পাত্র। তারা হচ্ছে ওরাই যারা আল্লাহর পথে খরচ করাকে তাঁর নৈকট্য লাভ ও সন্তুষ্টির মাধ্যম মনে করে থাকে। তারা এটা কামনা করে যে, এর কারণে তারা তাদের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুআয়ে খায়ের লাভ করবে। হ্যা, অবশ্যই এই খরচ তাদের জন্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কারণ হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে স্বীয় রহমতের মধ্যে প্রবেশ করাবেন। আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

আত-তাওবা 9:98

৯৭-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা এখানে সংবাদ দিচ্ছেন যে, গ্রাম্য লোকদের মধ্যে কাফিরও রয়েছে, মুনাফিকও রয়েছে। আর তাদের কুফরী ও নিফাক অন্যদের তুলনায় খুবই বড় ও কঠিন এবং তারা এরই যোগ্য যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর উপর যে হুকুম ও আহকাম নাযিল করেছেন তা থেকে তারা বে-খবর থাকে। যেমন- আমাশ (রঃ) ইবরাহীম (রঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একজন গ্রাম্য বেদুঈন যায়েদ ইবনে সাওহান (রঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিল। তিনি তার সঙ্গীদের সাথে আলাপ-আলোচনা করছিলেন। নাহাওয়ান্দের যুদ্ধে তাঁর হাত কেটে গিয়েছিল। বেদুঈনটি তাঁকে বললোঃ “আপনার কথাগুলো তো খুবই ভাল। এবং আপনাকে ভাল লোক বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু আপনার কর্তিত হাত আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” তখন যায়েদ (রঃ) বললেনঃ “আমার কর্তিত হাত দেখে তোমার সন্দেহ হচ্ছে কেন? এটা তো বাম হাত।” বেদুঈন বললোঃ “আল্লাহর শপথ! চুরির অপরাধে ডান হাত কাটা হয় কি বাম হাত কাটা হয় তা আমার জানা নেই।” তখন যায়েদ ইবনে সাওহান (রঃ) বলে উঠলেন যে, আল্লাহ সত্য বলেছেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “গ্রামবাসী লোকেরা কুফরী ও কপটতায় অতি কঠোর, আর তাদের এরূপ হওয়াই উচিত কারণ, তাদের ঐসব আহকামের জ্ঞান নেই যা আল্লাহ তাঁর রাসূল (সঃ)-এর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন।”ইমাম আহমাদ (রঃ) ইসনাদসহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যারা পল্লীতে বাস করে তারা যেন নির্বাসিত লোক, যারা শিকারের পিছে দৌড়াদৌড়ি করে তারা নির্বোধ এবং যারা কোন বাদশাহ্র সাহচর্য গ্রহণ করে তারা ফিত্রায় পতিত হয়ে থাকে।” (সুনানে আবি দাউদ, জামেউত তিরমিযী এবং সুনানে নাসাঈতেও সুফইয়ান সাওরী (রঃ) হতে এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন। সাওরী (রঃ)-এর রিওয়ায়াত ছাড়া আর কারো রিওয়ায়াত আমাদের জানা নেই) বেদুঈনরা সাধারণতঃ বদ মেযাজী, বোকা এবং অভদ্র হয়ে থাকে, তাই আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে কোন রাসূলের জন্ম দেননি। নবুওয়াতের অধিকারী একমাত্র শহুরে ও দ্র লোকেরাই হয়ে থাকেন। যেমন- আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তোমার পূর্বে জনপদবাসীদের মধ্য হতে পুরুষগণকেই প্রেরণ করেছিলাম যাদের নিকট ওহী পাঠাতাম।” (১২:১০৯) একবার এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে কিছু হাদিয়া পাঠায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে পর্যন্ত তার কাছে ওর কয়েকগুণ বেশী হাদিয়া না পাঠান সেই পর্যন্ত সে খুশী হয়নি। ঐ সময় তিনি বলেছিলেনঃ “আমি এখন সংকল্প করেছি যে, কারাশী, সাকাফী, আনসারী এবং দাওসী ছাড়া আর কারো হাদিয়া কবুল করবো না । কেননা, এরা হচ্ছে শহুরে লোক। এরা মক্কা, তায়েফ, মদীনা এবং ইয়ামনের অধিবাসী। বেদুঈনের তুলনায় এদের চরিত্র বহুগুণে উত্তম। বেদুঈনরা সাধারণতঃ বোকাই হয়। সন্তানকে চুম্বন করার ব্যাপারে বেদুঈনের হাদীসঃ সহীহ মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, বেদুঈনদের কতকগুলো লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “তোমরা তোমাদের শিশুদেরকে চুম্বন করে থাকো?” তারা (সাহাবীগণ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা।” তখন তারা বললোঃ “আল্লাহর শপথ! আমরা কিন্তু (আমাদের) শিশুদেরকে চুম্বন করি না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বললেনঃ “আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তর থেকে রহমত বের করে নেন তবে আমি কি করে তার যিম্মাদার হতে পারি?” (সহীহ বুখারীর ইবারত হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমার জন্যে যিম্মাদার হতে পারি যদি আল্লাহ তোমার অন্তর থেকে রহমত বের করে নেন?)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ “আল্লাহ হচ্ছেন মহাজ্ঞানী, অতি প্রজ্ঞাময়।” অর্থাৎ আল্লাহ ঐ লোকদেরকে ভালরূপেই জানেন যারা এর যোগ্য যে, তাদেরকে জ্ঞান ও ঈমানের তাওফীক দেয়া হবে। তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে জ্ঞান, অজ্ঞতা, ঈমান, কুফরী এবং নিফাকের বন্টন অত্যন্ত বিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার সাথে করেছেন। তিনি তার জ্ঞান ও নৈপুণ্যের ভিত্তিতে যা কিছু করেন এর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে পারে না।আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা আল্লাহর পথে কিছু খরচ করলে ওটাকে জরিমানা মনে করে থাকে এবং মুমিনরা কোন দৈব দুর্বিপাকে পতিত হাক তারা এরই প্রতীক্ষায় থাকে। কিন্তু তারা নিজেরাই সেই দুর্বিপাকে পতিত হবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের কথা খুবই ভাল শুনেন ও জানেন। অপমান ও ব্যর্থতার যোগ্য কারা এবং কারা সাহায্য প্রাপ্তি ও সফলতার যোগ্য এটাও তিনি ভালরূপেই জানেন। পল্লীবাসীদের আর এক শ্রেণীর লোক প্রশংসার পাত্র। তারা হচ্ছে ওরাই যারা আল্লাহর পথে খরচ করাকে তাঁর নৈকট্য লাভ ও সন্তুষ্টির মাধ্যম মনে করে থাকে। তারা এটা কামনা করে যে, এর কারণে তারা তাদের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুআয়ে খায়ের লাভ করবে। হ্যা, অবশ্যই এই খরচ তাদের জন্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কারণ হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে স্বীয় রহমতের মধ্যে প্রবেশ করাবেন। আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

আত-তাওবা 9:99

৯৭-৯৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা এখানে সংবাদ দিচ্ছেন যে, গ্রাম্য লোকদের মধ্যে কাফিরও রয়েছে, মুনাফিকও রয়েছে। আর তাদের কুফরী ও নিফাক অন্যদের তুলনায় খুবই বড় ও কঠিন এবং তারা এরই যোগ্য যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর উপর যে হুকুম ও আহকাম নাযিল করেছেন তা থেকে তারা বে-খবর থাকে। যেমন- আমাশ (রঃ) ইবরাহীম (রঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একজন গ্রাম্য বেদুঈন যায়েদ ইবনে সাওহান (রঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিল। তিনি তার সঙ্গীদের সাথে আলাপ-আলোচনা করছিলেন। নাহাওয়ান্দের যুদ্ধে তাঁর হাত কেটে গিয়েছিল। বেদুঈনটি তাঁকে বললোঃ “আপনার কথাগুলো তো খুবই ভাল। এবং আপনাকে ভাল লোক বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু আপনার কর্তিত হাত আমাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।” তখন যায়েদ (রঃ) বললেনঃ “আমার কর্তিত হাত দেখে তোমার সন্দেহ হচ্ছে কেন? এটা তো বাম হাত।” বেদুঈন বললোঃ “আল্লাহর শপথ! চুরির অপরাধে ডান হাত কাটা হয় কি বাম হাত কাটা হয় তা আমার জানা নেই।” তখন যায়েদ ইবনে সাওহান (রঃ) বলে উঠলেন যে, আল্লাহ সত্য বলেছেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “গ্রামবাসী লোকেরা কুফরী ও কপটতায় অতি কঠোর, আর তাদের এরূপ হওয়াই উচিত কারণ, তাদের ঐসব আহকামের জ্ঞান নেই যা আল্লাহ তাঁর রাসূল (সঃ)-এর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন।”ইমাম আহমাদ (রঃ) ইসনাদসহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যারা পল্লীতে বাস করে তারা যেন নির্বাসিত লোক, যারা শিকারের পিছে দৌড়াদৌড়ি করে তারা নির্বোধ এবং যারা কোন বাদশাহ্র সাহচর্য গ্রহণ করে তারা ফিত্রায় পতিত হয়ে থাকে।” (সুনানে আবি দাউদ, জামেউত তিরমিযী এবং সুনানে নাসাঈতেও সুফইয়ান সাওরী (রঃ) হতে এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন। সাওরী (রঃ)-এর রিওয়ায়াত ছাড়া আর কারো রিওয়ায়াত আমাদের জানা নেই) বেদুঈনরা সাধারণতঃ বদ মেযাজী, বোকা এবং অভদ্র হয়ে থাকে, তাই আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে কোন রাসূলের জন্ম দেননি। নবুওয়াতের অধিকারী একমাত্র শহুরে ও দ্র লোকেরাই হয়ে থাকেন। যেমন- আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তোমার পূর্বে জনপদবাসীদের মধ্য হতে পুরুষগণকেই প্রেরণ করেছিলাম যাদের নিকট ওহী পাঠাতাম।” (১২:১০৯) একবার এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে কিছু হাদিয়া পাঠায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে পর্যন্ত তার কাছে ওর কয়েকগুণ বেশী হাদিয়া না পাঠান সেই পর্যন্ত সে খুশী হয়নি। ঐ সময় তিনি বলেছিলেনঃ “আমি এখন সংকল্প করেছি যে, কারাশী, সাকাফী, আনসারী এবং দাওসী ছাড়া আর কারো হাদিয়া কবুল করবো না । কেননা, এরা হচ্ছে শহুরে লোক। এরা মক্কা, তায়েফ, মদীনা এবং ইয়ামনের অধিবাসী। বেদুঈনের তুলনায় এদের চরিত্র বহুগুণে উত্তম। বেদুঈনরা সাধারণতঃ বোকাই হয়। সন্তানকে চুম্বন করার ব্যাপারে বেদুঈনের হাদীসঃ সহীহ মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, বেদুঈনদের কতকগুলো লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “তোমরা তোমাদের শিশুদেরকে চুম্বন করে থাকো?” তারা (সাহাবীগণ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা।” তখন তারা বললোঃ “আল্লাহর শপথ! আমরা কিন্তু (আমাদের) শিশুদেরকে চুম্বন করি না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বললেনঃ “আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তর থেকে রহমত বের করে নেন তবে আমি কি করে তার যিম্মাদার হতে পারি?” (সহীহ বুখারীর ইবারত হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমার জন্যে যিম্মাদার হতে পারি যদি আল্লাহ তোমার অন্তর থেকে রহমত বের করে নেন?)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ “আল্লাহ হচ্ছেন মহাজ্ঞানী, অতি প্রজ্ঞাময়।” অর্থাৎ আল্লাহ ঐ লোকদেরকে ভালরূপেই জানেন যারা এর যোগ্য যে, তাদেরকে জ্ঞান ও ঈমানের তাওফীক দেয়া হবে। তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে জ্ঞান, অজ্ঞতা, ঈমান, কুফরী এবং নিফাকের বন্টন অত্যন্ত বিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার সাথে করেছেন। তিনি তার জ্ঞান ও নৈপুণ্যের ভিত্তিতে যা কিছু করেন এর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে পারে না।আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা আল্লাহর পথে কিছু খরচ করলে ওটাকে জরিমানা মনে করে থাকে এবং মুমিনরা কোন দৈব দুর্বিপাকে পতিত হাক তারা এরই প্রতীক্ষায় থাকে। কিন্তু তারা নিজেরাই সেই দুর্বিপাকে পতিত হবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের কথা খুবই ভাল শুনেন ও জানেন। অপমান ও ব্যর্থতার যোগ্য কারা এবং কারা সাহায্য প্রাপ্তি ও সফলতার যোগ্য এটাও তিনি ভালরূপেই জানেন। পল্লীবাসীদের আর এক শ্রেণীর লোক প্রশংসার পাত্র। তারা হচ্ছে ওরাই যারা আল্লাহর পথে খরচ করাকে তাঁর নৈকট্য লাভ ও সন্তুষ্টির মাধ্যম মনে করে থাকে। তারা এটা কামনা করে যে, এর কারণে তারা তাদের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দুআয়ে খায়ের লাভ করবে। হ্যা, অবশ্যই এই খরচ তাদের জন্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কারণ হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে স্বীয় রহমতের মধ্যে প্রবেশ করাবেন। আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

আত-তাওবা 9:100

আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন- আমি ঐসব মুহাজির, আনসার ও তাদের অনুসারীদের প্রতি সন্তুষ্ট যারা আমার সন্তুষ্টি লাভ করার ব্যাপারে অগ্রবর্তী হয়েছে। আমি যে তাদের প্রতি সন্তুষ্ট রয়েছি তা এইভাবে প্রমাণিত যে, আমি তাদের জন্যে সুখময় জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছি।শাবী (রঃ) বলেন যে, মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে অগ্রবর্তী ও প্রথম তারাই যারা হুদায়বিয়ায় বায়আ’তে রিযওয়ানের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। আর আবূ মূসা আশআরী (রাঃ), সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব (রঃ), মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ), হাসান (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তারা হচ্ছেন ঐসব লোক যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে দুই কিবলার (বায়তুল মুকাদ্দাস ও কাবা) দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছেন।মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল কারাসী (রঃ) বলেন যে, উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এমন একজন লোকের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন যিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করছিলেনঃ (আরবী) তখন উমার (রাঃ) তার হাতখানা ধরে নেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কে তোমাকে এটা এরূপে পাঠ করালেন?” লোকটি উত্তরে বললেনঃ “উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ)।” তখন উমার (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “চলো, আমরা উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ)-এর কাছে যাই এবং তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করি।” অতঃপর উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কি এই আয়াতটিকে এভাবে পড়তে বলেছেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ।” তখন পুনরায় উমার (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কি আপনি এভাবেই পড়তে শুনেছেন?” জবাবে তিনি বলেনঃ “হ্যা ।” উমার (রাঃ) তখন বললেনঃ “তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, আমরা এমন এক মর্যাদা লাভ করেছি যা আমাদের পরে কেউ লাভ করতে পারবে না।” এ কথা শুনে উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াতের সত্যতা প্রমাণকারী সূরায়ে জুমাআ’র প্রথম দিকের আয়াতটিও বটে। তা হচ্ছে- (আরবী) অর্থাৎ আর (উপস্থিতরা ব্যতীত) অন্যান্য লোকদের জন্যেও, যারা তাদের সাথে শামিল হবে, কিন্তু এখনও শামিল হয়নি, আর তিনি মহাপরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।”(৬২:৩) সূরায়ে হাশরেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর (তাদের জন্যেও) যারা (ইসলাম ধর্মে) তাদের (আনসার ও মুহাজিরদের) পরে এসেছে, যারা প্রার্থনা করে-হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ক্ষমা করুন, আর আমাদের ঐ ভাইদেরকেও যারা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছে এবং ঈমানদারদের প্রতি আমাদের অন্তরে যেন ঈর্ষা না হয়। হে আমাদের রব! আপনি বড় স্নেহশীল, করুণাময়।” (৫৯:১০) সূরায়ে আনফালেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর যারা (নবী সঃ-এর হিজরতের) পরবর্তীকালে ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং তোমাদের সাথে একত্রে জিহাদ করেছে, বস্তুতঃ তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (৮:৭৫) ইবনে জারীর (রঃ) এটা রিওয়ায়াত করেছেন এবং বলেছেন যে, হাসান বসরী (রঃ) শব্দটিকে পেশ দিয়ে অর্থাৎ পড়তেন এবং (আরবী) এর উপর করতেন। তখন অর্থ দাঁড়াবেঃ “মুহাজিরদের মধ্যে যারা অগ্রবর্তী ও প্রথম এবং আনসার ও তাদের অনুসারীদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট।” আফসোস ঐ হতভাগ্যদের প্রতি যারা এই সাহাবীদের প্রতি হিংসা পোষণ করে থাকে, তাদেরকে গালি দেয়। অথবা কোন কোন সাহাবীকে গালি দিয়ে থাকে, বিশেষ করে ঐ সাহাবীকে যিনি সমস্ত সাহাবীর নেতা, নবী (সঃ)-এর স্থলাভিষিক্ত, রাসলুল্লাহ (সঃ)-এর পরেই যার মর্যাদা, যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন অর্থাৎ মহান খলীফা আবু বকর ইবনে আবি কুহাফা (রাঃ)! এরা হচ্ছে রাফেযী সম্প্রদায়ের বিভ্রান্ত দল। তারা সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবীর প্রতি শত্রুতা পোষণ করে থাকে। তাকে তারা গালি-গালাজ করে। আমরা এই দুষ্কার্য থেকে মহান আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এটা এ কথাই প্রমাণ করে যে, এদের বুদ্ধি-বিবেক লোপ পেয়েছে এবং অন্তর বিগড়ে গেছে। যদি এই দুৰ্বত্তের দল এমন লোকদেরকে গালি দেয় যাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং পবিত্র কুরআনে তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার সনদ দিয়েছেন, তবে কোন্ মুখে তারা কুরআনের প্রতি ঈমান আনার দাবী করে? এখন কুরআনের উপর ঈমানই আর কি করে থাকলো? আর আহলে সুন্নাত ঐ লোকদেরকে সম্মান করেন এবং ঐ লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন যাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট রয়েছেন। এই আহলে সুন্নাত ঐ লোকদেরকে মন্দ বলেন যাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) মন্দ বলেছেন। আর তাঁরা ঐ লোকদেরকে ভালবাসেন যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন। তারা ঐ লোকদের বিরুদ্ধাচরণ করেন স্বয়ং আল্লাহ যাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। তারা হিদায়াতের অনুসারী। তারা বিদআতী নন। তাঁরা নবী (সঃ)-এরই অনুসরণ করে থাকেন। তারাই হচ্ছেন আল্লাহর দল এবং তারাই সফলকাম। তারাই হচ্ছেন আল্লাহর মুমিন বান্দা।

আত-তাওবা 9:101

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে খবর দিচ্ছেন- মদীনার চতুষ্পর্শ্বে অবস্থানকারী আরব গোত্রগুলোর মধ্যে কতকগুলো লোক মুনাফিক রয়েছে এবং স্বয়ং মদীনায় বসবাসকারীদের মধ্যে কিছুসংখ্যক মুসলমানও প্রকৃতপক্ষে মুনাফিক। তারা কপটতা থেকে বিরত থাকছে না। বলা হয় (আরবী) (২২:৩) এবং আরো বলা হয়। (আরবী) অর্থাৎ অমুক ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্য হয়েছে। আল্লাহ তা'আলার (আরবী) এই উক্তি এবং (আরবী) (৪৭:৩০) এই উক্তির মধ্যে কোনই বৈপরীত্য নেই। কেননা, এটা এই প্রকারের জিনিস যে, এর মাধ্যমে তাদের গুণাবলী চিহ্নিত করা হয়েছে, যেন তাদেরকে চেনা যায়। এর অর্থ এটা নয় যে, নবী (সঃ) নির্দিষ্টভাবে সমস্ত মুনাফিককেই চিনতেন। তিনি মদীনাবাসীদের মধ্যে শুধুমাত্র ঐ কতিপয় মুনাফিককেই চিনতেন যারা রাত-দিন তার সাথে উঠা-বসা করতো এবং সকাল-সন্ধ্যায় তিনি তাদেরকে দেখতেন। নিম্নের রিওয়ায়াতটির দ্বারাও এ কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়। ইমাম আহমাদ (রঃ) ইসনাদসহ জুবাইর ইবনে মুতইম (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, জুবাইর (রাঃ) বলেনঃ “আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ লোকগুলো ধারণা করে যে, মক্কায় তারা কোনই প্রতিদান পায়নি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে জুবাইর (রাঃ)! তোমাদেরকে তোমাদের (কর্মের) প্রতিদান অবশ্যই দেয়া হবে, শুধু মক্কায় নয়, এমন কি যদিও তোমরা শৃগালের গর্তেও বাস কর না কেন।” অতঃপর তিনি আমার দিকে মাথা ঝাকিয়ে গোপনীয়ভাবে বললেনঃ “আমার সাহাবীদের মধ্যে কিছু কিছু মুনাফিকও রয়েছে।” ভাবার্থ এই যে, কোন কোন মুনাফিক এরূপ এরূপ সুরে কথা বলে থাকে যা মোটেই সত্য নয়। সুতরাং এটাও এই ধরনেরই কথা ছিল যা জুবাইর ইবনে মুতইম (রাঃ) শুনেছিলেন। (আরবী) (৯:৭৪) অংশের তাফসীরে এটা বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (সঃ) হুযাইফা (রাঃ)-কে ১৪ বা ১৫ জন লোকের নাম বলে দিয়েছিলেন যারা প্রকৃতপক্ষে মুনাফিক ছিল। এই বিশিষ্টকরণ এটা দাবী করে না যে, তিনি সমস্ত মুনাফিকেরই নাম জানতেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জ্ঞান রাখেন।হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) তারজুমাতু আবি উমার আল বাইরূতী’ এর মধ্যে ইসনাদসহ রিওয়ায়াত করে বলেছেনঃ হারমালা’ নামক একটি লোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বলেঃ “ঈমান তো এখানে রয়েছে।” ঐ সময় সে তার জিহ্বার দিকে ইশারা করে। তারপর বলেঃ “আর নিফাক বা কপটতা থাকে এখানে।” এ কথা বলার সময় সে অন্তরের দিকে ইশারা করে। আল্লাহর নাম কিন্তু সে খুব কমই নেয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি তার জিহ্বাটিকে যিকরকারী বানিয়ে দিন, তার অন্তরকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী করে দিন, তার মধ্যে আমার প্রতি মহব্বত পয়দা করুন, যারা আমাকে ভালবাসে, তার মধ্যে তাদের প্রতি ভালবাসা দিয়ে দিন এবং তাদের সমস্ত কাজ উত্তম করে দিন।” সাথে সাথে তার সমস্ত কপটতা দূর হয়ে গেল এবং সে বলতে লাগলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার অধিকাংশ সঙ্গী মুনাফিক এবং আমি তাদের নেতা ছিলাম। আমি তাদেরকে আপনার কাছে ধরে আনবো কি?” নবী (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যে স্বেচ্ছায় আমার কাছে আসবে, আমি তার জন্যে। আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো। আর যে নিফাককেই আঁকড়ে ধরে থাকবে, আল্লাহ তাআলা তাকে দেখে নিবেন। তুমি কারো গোপন তথ্য প্রকাশ করো না।” (এ হাদীসটি শায়েখ আবূ উমার বায়রূতী (রঃ) আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)আবু আহমাদ হাকিমও (রঃ) এরূপই রিওয়ায়াত করেছেন। এই আয়াতের ব্যাপারে কাতাদা (রাঃ) বলেনঃ “ঐ লোকদের কি হয়েছে যারা কৃত্রিমভাবে মানুষের ব্যাপারে নিজেদের নিশ্চিত জ্ঞান প্রকাশ করে বলে যে, অমুক ব্যক্তি জান্নাতী ও অমুক ব্যক্তি জাহান্নামী? অথচ যদি স্বয়ং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়আচ্ছা বলতো, তোমরা জান্নাতী, না জাহান্নামী? তখন তারা বলে- আমরা এটা জানি না। অথচ যারা অন্যদের সম্পর্কে বলতে পারে যে, তারা জান্নাতী কি জাহান্নামী, তারা তো নিজেদের সম্পর্কে আরো ভাল জানতে পারবে। আসলে তারা এমন কিছু দাবী করছে যে দাবী নবীরাও করেননি।”আল্লাহর নবী নূহ (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি করছে তা আমি জানি না।” (২৬:১১২) আল্লাহ তা'আলার নবী শুআইব (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর নিকট তোমাদের জন্যে কল্যাণ রয়েছে যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো । আর আমি তোমাদের উপর রক্ষক নই।” (১১ ঃ ৮৬) আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে এখানে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে জান না, আমি তাদেরকে জানি।”এই আয়াতের ব্যাপারে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ) জুমআর খুতবার উদ্দেশ্যে দাঁড়ালেন এবং বললেনঃ “ হে অমুক অমুক ব্যক্তি! তোমরা মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাও। কেননা, তোমরা মুনাফিক।” সুতরাং তারা অত্যন্ত লাঞ্ছনা ও অপমানের সাথে মসজিদ থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল। ঐ সময় উমার (রাঃ) মসজিদের দিকে আসছিলেন। তখন উমার (রাঃ) মনে করলেন যে, হয়তো জুমআর সালাত শেষ হয়ে গেছে তাই লোকেরা ফিরে আসছে। সুতরাং তিনি খুবই লজ্জিত হলেন এবং লজ্জাবশতঃ নিজেকে ঐলোকগুলো হতে গোপন করতে লাগলেন। আর ওদিকে ঐ লোকগুলো মনে করলো যে, উমারও (রাঃ) হয়তো তাদের নিফাকের কথা জেনে ফেলেছেন, তাই তারাও নিজেদেরকে উমার (রাঃ) থেকে গোপন করতে লাগলো। মোটকথা, উমার (রাঃ) যখন মসজিদে আসলেন তখন তিনি জানতে পারলেন যে, তখনও জুমআর সালাত পড়া হয়নি। একজন মুসলিম তাকে খবর জানিয়ে দিয়ে বললেনঃ “হে উমার (রাঃ) খুশী থাকুন যে, আজ আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদেরকে অপমানিত করেছেন।” ইবনে আব্বাস (রাঃ)! বলেন যে, এভাবে মসজিদ থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে প্রথম শাস্তি এবং দ্বিতীয় শাস্তি হবে কবরের শাস্তি। সাওরীও (রঃ) ইসনাদসহ একথাই বলেছেন। মুজাহিদ (রঃ) (আরবী) আল্লাহ তাআলার এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে হত্যা ও বন্দী। অন্য এক রিওয়ায়াতে ক্ষুধা ও কবরের আযাব অর্থ নেয়া হয়েছে। অতঃপর বড় আযাবের দিকে ফিরানো হবে। ইবনে জুরাইজ (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এর দ্বারা দুনিয়ার আযাব ও কবরের আযাব বুঝানো হয়েছে। অতঃপর “আযাবে আযীম” অর্থাৎ জাহান্নামের শাস্তিতে জড়িয়ে দেয়া হবে। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে দুনিয়ার শাস্তি ও কবরের শাস্তি। আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, দুনিয়ার শাস্তি হচ্ছে ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততির ফিত্নার শাস্তি। অতঃপর তিনি আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তিটি পাঠ করে শুনালেন- (আরবী) অর্থাৎ তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে, আল্লাহ চান যে, এগুলোর মাধ্যমে পার্থিব জীবনেই তিনি তাদেরকে আযাবে জড়িয়ে ফেলেন।" (৯:৫৫) কেননা এই বিপদসমূহ তাদের জন্যে শাস্তি কিন্তু মুমিনদের জন্যে প্রতিদানের কারণ। আর আখিরাতের শাস্তি দ্বারা জাহান্নামের শাস্তি বুঝানো হয়েছে।মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, প্রথম শাস্তি দ্বারা বুঝানো হচ্ছে ঐ শাস্তি যা ইসলাম প্রসার লাভ করার মাধ্যমে তাদের উপর পতিত হয়েছিল এবং সীমাহীন দুঃখ ও আফসোস তাদের উপর জারী হয়েছিল। দ্বিতীয় শাস্তি হচ্ছে। কবরের শাস্তি। আর “আযাবে আযীম” (বড় শাস্তি) হচ্ছে ঐ শাস্তি যা আখিরাতে তারা ভোগ করবে এবং তা চিরস্থায়ীভাবে ভোগ করতে থাকবে।সাঈদ (রঃ) কাতাদা (রঃ) হতে বর্ণনা করে বলেছেন যে, নবী (সঃ) হ্যাইফা (রাঃ)-এর কানে কানে বলেছিলেনঃ “বারোজন মুনাফিক রয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জনের জন্যে ‘দাবীলা’ যথেষ্ট। তা হচ্ছে জাহান্নামের একটি অগ্নিশিখা যা তাদের স্কন্ধে লেগে যাবে এবং বক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। অর্থাৎ পেটের ব্যথা ও অভ্যন্তরীণ রোগে মৃত্যুবরণ করবে। আর বাকী ছয়জনের স্বাভাবিক মৃত্যু হবে।”সাঈদ (রঃ) আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, যখন কেউ মারা যেতো এবং উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর দৃষ্টিতে সে সন্দেহযুক্ত হতো তখন তিনি হুযাইফা (রাঃ)-এর দিকে তাকাতেন। তিনি ঐ মৃতের জানাযার সালাত আদায় করলে তিনিও পড়তেন এই বিশ্বাস করে যে, ঐ মৃতব্যক্তি ঐ বারোজন মুনাফিকের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর হুযাইফা (রাঃ) জানাযার সালাত না পড়লে তিনিও পড়তেন না। জানা গেছে যে, উমার (রাঃ) হুযাইফা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাকে বলুন, ঐ বারোজনের মধ্যে আমি একজন নই তো?” হুযাইফা (রাঃ) উত্তরে তাকে বলেনঃ “আপনি তাদের অন্তর্ভুক্ত নন। কিন্তু আপনি ছাড়া আমি আর কারো যিম্মাদারী নিচ্ছি না।”

আত-তাওবা 9:102

আল্লাহ তা'আলা যখন ঐসব মুনাফিকের অবস্থার বর্ণনা শেষ করলেন যারা মুসলিমদের সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রয়েছিল এবং যুদ্ধে শরীক হওয়া থেকে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল, আর মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল ও সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, তখন তিনি ঐ পাপীদের বর্ণনা শুরু করলেন যারা শুধুমাত্র অলসতা ও আরামপ্রিয়তার কারণেই জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত ছিল। কিন্তু তারা প্রকৃতপক্ষে হক পন্থী ও ঈমানদার ছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা বলেন-ঐ মুনাফিকদের ছাড়া অন্যেরা যে জিহাদে শরীক হওয়া থেকে বিরত ছিল তারা নিজেদের দোষ ও অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছে। তারা এমনই লোক যে, তাদের ভালো আমলও রয়েছে। আর ঐ সৎ আমলের সাথে কিছু দোষত্রুটিও জড়িয়ে দিয়েছে, যেমন জিহাদে শরীক হওয়া থেকে বিরত থাকা। কিন্তু তাদের এই দোষ-ক্রটিকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। আর ঐ মুনাফিকদের অপরাধ আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। তাদের কোন নেক আমলও নেই।এ আয়াতটি কতকগুলো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও সমস্ত অপরাধী ও পাপী মুমিনদের জন্যেও এটা সাধারণ এবং তাদের সকলের ব্যাপারেই এটা প্রযোজ্য। মুজাহিদ (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এটা আবু লুবাবার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন সে বানু কুরাইযা গোত্রকে বলেছিল যে, (আরবী) ওটা যবেহ করার স্থান এবং স্বীয় হাত দ্বারা সে তার গলার দিকে ইশারা করেছিল। ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, দ্বারা আবু লুবাবা ও তার দলকে বুঝানো হয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তালূকের যুদ্ধে না গিয়ে পিছনে রয়ে গিয়েছিল। কেউ কেউ বলেন যে, আবু লুবাবার সাথে আরো পাঁচজন বা সাতজন অথবা নয়জন লোক ছিল। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাবূক হতে ফিরে আসেন তখন তারা নিজেদেরকে মসজিদের থামের সাথে বেঁধে ফেলে এবং কসম করে বলে“যে পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে স্বয়ং না খুলবেন সেই পর্যন্ত আমাদেরকে খোলা হবে না।” অতঃপর যখন (আরবী) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে খুলে দেন এবং তাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার অপরাধ ক্ষমা করে দেন।ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন, সামুরা ইবনে জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আজ রাত্রে দু’জন আগন্তুক আমার নিকট আগমন করে এবং আমাকে এমন এক শহর পর্যন্ত নিয়ে যায় যা স্বর্ণ ও রৌপ্যের ইট দ্বারা নির্মিত ছিল। সেখানে আমি এমন কতগুলো লোক দেখতে পেলাম যাদের দেহের অর্ধাংশ খুবই সুন্দর ছিল। কিন্তু বাকী অর্ধাংশ ছিল অত্যন্ত কুৎসিত। ওদিকে তাকাতেই মন চাচ্ছিল না। আমার সঙ্গীদ্বয় তাদেরকে বললোঃ “তোমরা এই নদীতে ডুব দিয়ে এসো।” তারা ডুব দিয়ে যখন বের হয়ে আসলো তখন তাদের। দেহের সর্বাংশ সুন্দর দেখালো। আমার সঙ্গীদ্বয় আমাকে বললোঃ “এটা হচ্ছে জান্নাতে আদন। এটাই হচ্ছে আপনার মনযিল।” অতঃপর তারা বললোঃ “এই যে লোকগুলো, যাদের দেহের অর্ধাংশ ছিল খুবই সুন্দর এবং বাকী অর্ধাংশ ছিল অত্যন্ত কুৎসিত, তার কারণ এই যে, তারা নেক আমলের সাথে বদ আমলও মিশিয়ে দিয়েছিল। আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।” ইমাম বুখারী (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে সংক্ষেপে এরূপই রিওয়ায়াত করেছেন।

আত-তাওবা 9:103

১০৩-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন-হে নবী! তুমি তাদের মালের যাকাত আদায় কর। এটা তাদেরকে পাক পবিত্র করবে। কতকগুলো লোক (আরবী)- এর সর্বনাম ঐ লোকদের দিকে ফিরিয়েছেন যারা নিজেদের পাপ ও অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছিল এবং ভালো ও মন্দ উভয় আমল করেছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই হুকুম বিশিষ্ট নয়, বরং এটা সাধারণ হুকুম। এ কারণেই আরব গোত্রগুলোর মধ্যে কতকগুলো লোক যাকাত দিতে অস্বীকার করে বসেছিল। তাদের মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়েছিল যে, ইমামের যাকাত নেয়ার অধিকার নেই। এটা শুধু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যেই নির্দিষ্ট ছিল। আর এ জন্যেই তারা আল্লাহ তা'আলার (আরবী)-এই উক্তিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু আবু বকর (রাঃ) এবং অন্যান্য সমস্ত সাহাবী তাদের ভুল ব্যাখ্যা ও বাজে অনুভূতি খণ্ডন করে দিয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে। যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তখন বাধ্য হয়ে তারা সেই সময়ের খলীফাকে যাকাত প্রদান করেছে যেমন তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রদান করতো। এমন কি আবু বকর (রাঃ) ঘোষণা করেছিলেনঃ “যদি তারা যাকাতের মালের একটি উষ্ট্রীর বাচ্চা বা রঞ্জুর একটা খণ্ডও আদায় করা থেকে বিরত থাকে তবুও আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো।”আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের জন্যে দুআ কর এবং ক্ষমা প্রার্থনা কর।” যেমন সহীহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যখন কারো কাছে যাকাতের মাল আসতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ অনুযায়ী তার জন্যে দুআ করতেন। আমার পিতা যখন যাকাতের মাল পেশ করলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুআ করলেনঃ “হে আল্লাহ! আবূ আওফার (রাঃ) বংশধরের উপর দয়া করুন।” অন্য একটি হাদীসে আছে যে, একটি স্ত্রীলোক বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার জন্যে ও আমার স্বামীর জন্যে দুআ করুন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহ তোমার উপর ও তোমার স্বামীর উপর রহম করুন।” আল্লাহ তাআলার উক্তি- (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমার দুআ হচ্ছে তাদের জন্যে শান্তির কারণ।” কেউ কেউ (আরবী) কে বহুবচন করে (আরবী) পড়েছেন। আবার অন্যেরা একবচন ধরে পড়েছেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে রহমত। আর কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) বা পদমর্যাদা।(আরবী) অর্থাৎ হে নবী! তোমার দুআ আল্লাহ শ্রবণকারী (আরবী) অর্থাৎ (হে নবী সঃ)! কে তোমার দুআ’র দাবীদার তা আল্লাহ খুব ভালই জানেন। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে- ওয়াকী (রঃ) ইসনাদসহ বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) যখন কারো জন্যে দুআ করতেন তখন তা তার পক্ষে, তার পুত্রদের পক্ষে এবং তার পৌত্রদের পক্ষে ককূল হয়ে যেতো। আবূ নাঈম (রঃ) হতে ইসনাদসহ বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ)-এর দুআ' কোন মানুষের পক্ষে, তার পুত্রদের পক্ষে এবং তার পৌত্রদের পক্ষে অবশ্যই ককূল হয়ে যেতো। আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা কি এটা অবগত নয় যে, আল্লাহই নিজ বান্দাদের তাওবা কবুল করেন, আর তিনিই দান-খয়রাত কবূল করে থাকেন? এর উদ্দেশ্য হচ্ছে তাওবা ও দান খয়রাতের উপর মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। কেননা এ দুটোই মানুষ থেকে পাপকে সরিয়ে দেয় এবং নাফরমানী নিশ্চিহ্ন করে দেয়। আল্লাহ তাআলা খবর দিয়েছেন যে, যে তাঁর কাছে তাওবা পেশ করে তিনি তার সেই তাওবা কবুল করে থাকেন। যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন থেকে একটি খণ্ডও সাদকা করে, আল্লাহ সেটা তার ডান হাতে গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি ওটাকে সাদকাকারীর জন্যে বিনিয়োগ করতে থাকেন এবং ছোট থেকে বড় করে দেন। শেষ পর্যন্ত সাদকার ঐ একটি মাত্র খেজুর উহুদ পাহাড়ের মত হয়ে যায়। যেমন এই হাদীসেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত আছে এবং যেমন ওয়াকী (রঃ) ইসনাদসহ আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সাদকা কবুল করে থাকেন এবং ওটাকে নিজের দক্ষিণ হস্তে গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি ওটাকে বড় করতে থাকেন, যেমন তোমরা ঘোড়ার বাচ্চাকে লালন পালন করে বড় করে থাকো। শেষ পর্যন্ত সাদকার এক লুকমাও উহুদ পাহাড় হয়ে যায়। আল্লাহর কিতাবের দ্বারাও এর সত্যতা প্রমাণিত হয়। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তারা কি জানে না যে, আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন এবং যাকাত ও সাদকাও নিয়ে থাকেন?” মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেন: (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ সুদকে বরবাদ করে দেন এবং যাকাতকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেন।” (২:২৭৬)সাওরী (রঃ) ইসনাদসহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, সাদকার মাল ভিক্ষুকের হাতে পড়ার পূর্বেই আল্লাহর হাতে পড়ে যায়। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এ উক্তিটি পাঠ করেন। ইবনে আসাকির (রঃ) স্বীয় ইতিহাসের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনুশ শাইর আসসাকীর (রঃ) ইতিহাসকে অন্তর্ভুক্ত করে (যিনি দেমাকী ছিলেন, কিন্তু তার প্রকৃত দেশ ছিল হিমস এবং তিনি ফকীহদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন) বর্ণনা করেছেন যে, মুআবিয়া (রাঃ) -এর যুগে জনগণ জিহাদে গমন করেন, যাঁদের নেতা ছিলেন আব্দুর রহমান ইবনে খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)। তখন একজন মুসলিম গনীমতের মালের মধ্য থেকে একশ দীনার (স্বর্ণমদ্রা) আত্মসাৎ করে । অতঃপর যখন সেনাবাহিনী ফিরে যায় এবং লোকেরা নিজ নিজ বাড়ীতে গমন করে তখন ঐ (আত্মসাৎকারী) মুসলিমটি খুবই লজ্জিত হয়। সে তখন ঐ দীনারগুলো সেনাপতির কাছে পৌঁছিয়ে দিতে যায়। কিন্তু সেনাপতি ওগুলো নিতে অস্বীকার করেন এবং বলেনঃ “সৈন্যরা তো নিজ নিজ বাড়ী চলে গেছে যাদের মধ্যে এগুলো বণ্টন করা যেতো। সুতরাং আমিতো এখন এগুলো নিতে পারি না। এগুলো তুমি কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে পেশ করবে।” লোকটি তখন সাহাবীদের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করতে থাকে। কিন্তু সবাই ঐ কথাই বলে। সে তখন দামেস্ক আসে এবং মুআবিয়া (রাঃ)-কে তা কবূল করতে বলে। কিন্তু তিনিও তা কবূল করতে অস্বীকার করেন। সে সেখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসে এবং আব্দুল্লাহ ইবনুশ শাইর আসসাকীর (রঃ) পার্শ্ব দিয়ে গমন করে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কাঁদছো কেন?” উত্তরে সে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে এবং বলে যে, কোন আমীরই তার আত্মসাৎকৃত একশ’টি দীনার গ্রহণ করলেন না। তখন আব্দুল্লাহ (রঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি আমার কথা শুনবে কি?” সে উত্তর দিলোঃ “হ্যা অবশ্যই।” তিনি বললেনঃ “তুমি মুআবিয়া (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে বল-বায়তুল মালের হক এক পঞ্চমাংশ আপনি নিয়ে নিন। সুতরাং বিশ দীনার তাকে দিয়ে দাও। আর অবশিষ্ট আশি দীনার ঐ সৈন্যদের পক্ষ থেকে খয়রাত করে দাও যারা এর হকদার ছিল। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন। তিনি ঐ সৈন্যদের নাম, বাসস্থান ইত্যাদি সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফ হাল। তিনি তাদেরকে এর সাওয়াব পৌছিয়ে দিবেন।” ঐ লোকটি তখন এই কাজই করলো। মুআবিয়া (রাঃ) বললেনঃ “আমি যদি তাকে এই ফতওয়া দিতাম তবে এটা আমার কাছে আমার সাম্রাজ্যের চাইতেও প্রিয় ছিল। তিনি খুব সুন্দর তদবীর বাতলিয়ে দিয়েছেন।”

আত-তাওবা 9:104

১০৩-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন-হে নবী! তুমি তাদের মালের যাকাত আদায় কর। এটা তাদেরকে পাক পবিত্র করবে। কতকগুলো লোক (আরবী)- এর সর্বনাম ঐ লোকদের দিকে ফিরিয়েছেন যারা নিজেদের পাপ ও অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছিল এবং ভালো ও মন্দ উভয় আমল করেছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই হুকুম বিশিষ্ট নয়, বরং এটা সাধারণ হুকুম। এ কারণেই আরব গোত্রগুলোর মধ্যে কতকগুলো লোক যাকাত দিতে অস্বীকার করে বসেছিল। তাদের মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়েছিল যে, ইমামের যাকাত নেয়ার অধিকার নেই। এটা শুধু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যেই নির্দিষ্ট ছিল। আর এ জন্যেই তারা আল্লাহ তা'আলার (আরবী)-এই উক্তিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু আবু বকর (রাঃ) এবং অন্যান্য সমস্ত সাহাবী তাদের ভুল ব্যাখ্যা ও বাজে অনুভূতি খণ্ডন করে দিয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে। যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তখন বাধ্য হয়ে তারা সেই সময়ের খলীফাকে যাকাত প্রদান করেছে যেমন তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রদান করতো। এমন কি আবু বকর (রাঃ) ঘোষণা করেছিলেনঃ “যদি তারা যাকাতের মালের একটি উষ্ট্রীর বাচ্চা বা রঞ্জুর একটা খণ্ডও আদায় করা থেকে বিরত থাকে তবুও আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো।”আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের জন্যে দুআ কর এবং ক্ষমা প্রার্থনা কর।” যেমন সহীহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যখন কারো কাছে যাকাতের মাল আসতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ অনুযায়ী তার জন্যে দুআ করতেন। আমার পিতা যখন যাকাতের মাল পেশ করলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুআ করলেনঃ “হে আল্লাহ! আবূ আওফার (রাঃ) বংশধরের উপর দয়া করুন।” অন্য একটি হাদীসে আছে যে, একটি স্ত্রীলোক বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার জন্যে ও আমার স্বামীর জন্যে দুআ করুন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহ তোমার উপর ও তোমার স্বামীর উপর রহম করুন।” আল্লাহ তাআলার উক্তি- (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমার দুআ হচ্ছে তাদের জন্যে শান্তির কারণ।” কেউ কেউ (আরবী) কে বহুবচন করে (আরবী) পড়েছেন। আবার অন্যেরা একবচন ধরে পড়েছেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে রহমত। আর কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) বা পদমর্যাদা।(আরবী) অর্থাৎ হে নবী! তোমার দুআ আল্লাহ শ্রবণকারী (আরবী) অর্থাৎ (হে নবী সঃ)! কে তোমার দুআ’র দাবীদার তা আল্লাহ খুব ভালই জানেন। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে- ওয়াকী (রঃ) ইসনাদসহ বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) যখন কারো জন্যে দুআ করতেন তখন তা তার পক্ষে, তার পুত্রদের পক্ষে এবং তার পৌত্রদের পক্ষে ককূল হয়ে যেতো। আবূ নাঈম (রঃ) হতে ইসনাদসহ বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ)-এর দুআ' কোন মানুষের পক্ষে, তার পুত্রদের পক্ষে এবং তার পৌত্রদের পক্ষে অবশ্যই ককূল হয়ে যেতো। আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা কি এটা অবগত নয় যে, আল্লাহই নিজ বান্দাদের তাওবা কবুল করেন, আর তিনিই দান-খয়রাত কবূল করে থাকেন? এর উদ্দেশ্য হচ্ছে তাওবা ও দান খয়রাতের উপর মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। কেননা এ দুটোই মানুষ থেকে পাপকে সরিয়ে দেয় এবং নাফরমানী নিশ্চিহ্ন করে দেয়। আল্লাহ তাআলা খবর দিয়েছেন যে, যে তাঁর কাছে তাওবা পেশ করে তিনি তার সেই তাওবা কবুল করে থাকেন। যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন থেকে একটি খণ্ডও সাদকা করে, আল্লাহ সেটা তার ডান হাতে গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি ওটাকে সাদকাকারীর জন্যে বিনিয়োগ করতে থাকেন এবং ছোট থেকে বড় করে দেন। শেষ পর্যন্ত সাদকার ঐ একটি মাত্র খেজুর উহুদ পাহাড়ের মত হয়ে যায়। যেমন এই হাদীসেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত আছে এবং যেমন ওয়াকী (রঃ) ইসনাদসহ আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সাদকা কবুল করে থাকেন এবং ওটাকে নিজের দক্ষিণ হস্তে গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি ওটাকে বড় করতে থাকেন, যেমন তোমরা ঘোড়ার বাচ্চাকে লালন পালন করে বড় করে থাকো। শেষ পর্যন্ত সাদকার এক লুকমাও উহুদ পাহাড় হয়ে যায়। আল্লাহর কিতাবের দ্বারাও এর সত্যতা প্রমাণিত হয়। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তারা কি জানে না যে, আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন এবং যাকাত ও সাদকাও নিয়ে থাকেন?” মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেন: (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ সুদকে বরবাদ করে দেন এবং যাকাতকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেন।” (২:২৭৬)সাওরী (রঃ) ইসনাদসহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, সাদকার মাল ভিক্ষুকের হাতে পড়ার পূর্বেই আল্লাহর হাতে পড়ে যায়। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এ উক্তিটি পাঠ করেন। ইবনে আসাকির (রঃ) স্বীয় ইতিহাসের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনুশ শাইর আসসাকীর (রঃ) ইতিহাসকে অন্তর্ভুক্ত করে (যিনি দেমাকী ছিলেন, কিন্তু তার প্রকৃত দেশ ছিল হিমস এবং তিনি ফকীহদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন) বর্ণনা করেছেন যে, মুআবিয়া (রাঃ) -এর যুগে জনগণ জিহাদে গমন করেন, যাঁদের নেতা ছিলেন আব্দুর রহমান ইবনে খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)। তখন একজন মুসলিম গনীমতের মালের মধ্য থেকে একশ দীনার (স্বর্ণমদ্রা) আত্মসাৎ করে । অতঃপর যখন সেনাবাহিনী ফিরে যায় এবং লোকেরা নিজ নিজ বাড়ীতে গমন করে তখন ঐ (আত্মসাৎকারী) মুসলিমটি খুবই লজ্জিত হয়। সে তখন ঐ দীনারগুলো সেনাপতির কাছে পৌঁছিয়ে দিতে যায়। কিন্তু সেনাপতি ওগুলো নিতে অস্বীকার করেন এবং বলেনঃ “সৈন্যরা তো নিজ নিজ বাড়ী চলে গেছে যাদের মধ্যে এগুলো বণ্টন করা যেতো। সুতরাং আমিতো এখন এগুলো নিতে পারি না। এগুলো তুমি কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে পেশ করবে।” লোকটি তখন সাহাবীদের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করতে থাকে। কিন্তু সবাই ঐ কথাই বলে। সে তখন দামেস্ক আসে এবং মুআবিয়া (রাঃ)-কে তা কবূল করতে বলে। কিন্তু তিনিও তা কবূল করতে অস্বীকার করেন। সে সেখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসে এবং আব্দুল্লাহ ইবনুশ শাইর আসসাকীর (রঃ) পার্শ্ব দিয়ে গমন করে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “কাঁদছো কেন?” উত্তরে সে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে এবং বলে যে, কোন আমীরই তার আত্মসাৎকৃত একশ’টি দীনার গ্রহণ করলেন না। তখন আব্দুল্লাহ (রঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি আমার কথা শুনবে কি?” সে উত্তর দিলোঃ “হ্যা অবশ্যই।” তিনি বললেনঃ “তুমি মুআবিয়া (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে বল-বায়তুল মালের হক এক পঞ্চমাংশ আপনি নিয়ে নিন। সুতরাং বিশ দীনার তাকে দিয়ে দাও। আর অবশিষ্ট আশি দীনার ঐ সৈন্যদের পক্ষ থেকে খয়রাত করে দাও যারা এর হকদার ছিল। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন। তিনি ঐ সৈন্যদের নাম, বাসস্থান ইত্যাদি সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফ হাল। তিনি তাদেরকে এর সাওয়াব পৌছিয়ে দিবেন।” ঐ লোকটি তখন এই কাজই করলো। মুআবিয়া (রাঃ) বললেনঃ “আমি যদি তাকে এই ফতওয়া দিতাম তবে এটা আমার কাছে আমার সাম্রাজ্যের চাইতেও প্রিয় ছিল। তিনি খুব সুন্দর তদবীর বাতলিয়ে দিয়েছেন।”

আত-তাওবা 9:105

মুজাহিদ (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণকারীদের জন্যে ভীতি প্রদর্শন যে, তাদের কার্যাবলী আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সামনে পেশ করা হবে। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও মুমিনদের মধ্যেও তাদের কার্য প্রকাশিত হয়ে পড়বে। কিয়ামতের দিন এটা অবশ্যই হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন (কিয়ামতের দিন) তোমাদের কোন গোপন বিষয়ও গোপন থাকবে না।” (৬৯:১৮) অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ অর্থাৎ “যেই দিন সকলের গুপ্ত বিষয় প্রকাশ হয়ে যাবে।” (৮৬:৯) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর যা কিছু অন্তরসমূহের মধ্যে রয়েছে তা প্রকাশ হয়ে পড়বে।” (১০০:১০) দুনিয়ার লোক তা জেনে নিবে। যেমন ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন- হাসান ইবনে মূসা (রঃ) আবু সাঈদ (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যদি দরযা ও ছিদ্র বিহীন কোন শক্ত পাথরের মধ্যে গোপনে কোন কাজ করে তবুও আল্লাহ তা'আলা ওটাকে লোকদের সামনে এমনভাবে প্রকাশ করে দিবেন যে, যেন সে ঐ কাজ তাদের সামনেই করেছে। হাদীসে এসেছে যে, জীবিতদের আমলগুলো তাদের মৃত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এবং গোত্রীয় লোকদের সামনে পেশ করা হয়, যারা আলমে বারযাখে রয়েছে।সাতাত ইবনে দীনার (রঃ) হাসান (রঃ) হতে এবং তিনি জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের আমলগুলো তোমাদের মৃত আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রীয় লোকদের কবরে পেশ করা হয়। আমলগুলো ভাল হলে তারা খুশী হয়। আর সেগুলো খারাপ হলে তারা বলেঃ “হে আল্লাহ! তাদেরকে আপনার অনুগত হওয়ার তাওফীক প্রদান করুন।” (এ হাদীসটি আবু দাউদ তায়ালেসী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) সুফইয়ান (রঃ) আনাস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেন, তোমাদের আমলগুলো তোমাদের মৃত আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রীয় লোকদের সামনে পেশ করা হয় । আমলগুলো ভাল হলে ঐ মৃত লোকগুলো খুশী হয়। আর সেগুলো ভাল না হলে তারা বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে মৃত্যু মুখে পতিত করবেন না যে পর্যন্ত না তারা ঐ রূপ হিদায়াত লাভ করে যেরূপ হিদায়াত আপনি আমাদেরকে দান করেছেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম বুখারী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আয়েশা (রাঃ) বলেন, যখন তোমরা কোন মুসলিমের নেক আমলে সন্তুষ্ট হও তখন তাদেরকে বলঃ “তোমরা আমল করে যাও, অনন্তর তোমাদের আমল অচিরেই আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং মুমিনগণ দেখে নিবেন।” এ ধরনের আর একটি হাদীস এসেছে, ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন, ইসনাদসহ আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা কারো ভাল আমল দেখে খুশী হয়ো না, বরং অপেক্ষা কর, তার সমাপ্তি ভাল আমলের উপর হচ্ছে কি না। কেননা, একজন আমলকারী দীর্ঘদিন পর্যন্ত নেক আমল করতে থাকে এবং ঐ নেক আমলের উপর মারা গেলে সে জান্নাতে চলে যেতো। কিন্তু হঠাৎ করে তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটে যায় এবং সে খারাপ আমল করতে শুরু করে। আর এক বান্দা এরূপই হয় যে, কিছুকাল ধরে সে খারাপ আমল করতে থাকে। ঐ আমলের উপর মারা গেলে নিশ্চিতরূপে সে জাহান্নামে চলে যেতো। কিন্তু অকস্মাৎ তার কার্য পরিবর্তন হয়ে যায় এবং সে ভাল আমল করতে শুরু করে। আল্লাহ যখন কোন বান্দার প্রতি কল্যাণের ইচ্ছা করেন তখন মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাকে পুণ্য লাভের তাওফীক দান করেন এবং সে ঐ পুণ্যের উপরই মৃত্যুবরণ করে।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কিরূপে হয়?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তাকে ভাল কাজের তাওফীক দান করা হয়, তারপর তার রূহ কবয করা হয়।” (এ হাদীসটি এই ধারায় ইমাম আহমাদ (রঃ) একাকী বর্ণনা করেছেন)

আত-তাওবা 9:106

ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, তাঁরা ছিলেন তিন ব্যক্তি যাদের তাওবা ককূল হওয়ার ব্যাপারটা পিছিয়ে গিয়েছিল। তারা হচ্ছেন মারারা ইবনে রাবী (রাঃ), কাব ইবনে মালিক (রাঃ) এবং হিলাল ইবনে উমাইয়া (রাঃ)। তারা তাপূর্কের যুদ্ধে ঐ লোকদের সাথেই রয়ে গিয়েছিলেন যারা অলসতা ও আরামপ্রিয়তার কারণে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। আর একটি কারণ ছিল এই যে, তাঁদের বাগানের ফল পেকে গিয়েছিল এবং সময়টা ছিল মনোমুগ্ধকর ও চিত্তাকর্ষক বসন্তকাল। তাদের যুদ্ধের প্রতি অবহেলা সন্দেহ ও নিফাকের কারণে ছিল না। তাঁদের মধ্যে কতক লোক এমনও ছিলেন যারা নিজেদেরকে স্তম্ভের সাথে বেঁধে ফেলেছিলেন। যেমন আবু লুবাবাহ্ ও তাঁর সঙ্গীরা। অন্যান্য কতকগুলো লোক এরূপ করেননি। তাঁরা ছিলেন উপরোল্লিখিত তিন ব্যক্তি। আবু লুবাবাহ (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের তাওবা এঁদের পূর্বেই কবুল হয়েছিল। এই তিন ব্যক্তির তাওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে বিলম্ব হয়েছিল। অবশেষে আল্লাহ তাআলা আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ নবী (সঃ), মুহাজির এবং আনসারের তাওবা কবুল করে নিয়েছেন (আয়াতের শেষ পর্যন্ত) আর ঐ তিন ব্যক্তির তাওবাও আল্লাহ ককূল করে নিয়েছেন যারা যুদ্ধ থেকে পিছনে রয়ে গিয়েছিল, এমন কি এতো প্রশস্ত যমীনও তাদের কাছে সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল এবং কোন জায়গাতেই তারা আশ্রয় পাচ্ছিল না।” (৯:১১৭-১১৮) যেমন কাব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর হাদীসের বর্ণনা আসছে।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ এটা আল্লাহর ইচ্ছাধীন রয়েছে, তিনি ইচ্ছা করলে তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন এবং ইচ্ছা করলে তাদের তাওবা কবূল করবেন (এবং ক্ষমা করে দিবেন)। কিন্তু আল্লাহর রহমত তার গযবের উপর জয়যুক্ত। কে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য এবং কে ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য তা তিনি ভালরূপেই জানেন। তিনি তার কাজে ও কথায় বিজ্ঞানময় এবং তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ ও প্রতিপালক নেই।

আত-তাওবা 9:107

১০৭-১০৮ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতগুলোর শানে নুযূল (অবতীর্ণ হওয়ার কারণ) এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় আগমনের পূর্বে সেখানে খাযরাজ গোত্রের একটি পোর্ক বাস করতো যার নাম ছিল আবু আমির রাহিব । অজ্ঞতার যুগে সে খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং আহলে কিতাবের জ্ঞান লাভ করেছিল। জাহিলিয়াতের যুগে সে। বড় আবিদ লোক ছিল। নিজের গোত্রের মধ্যে সে খুব মর্যাদা লাভ করেছিল। নবী (সঃ) যখন হিজরত করে মদীনায় আসেন এবং মুসলিমরা তাঁর কাছে একত্রিত হতে শুরু করে ও ইসলামের উন্নতি সাধিত হয় এবং বদরের যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে জয়যুক্ত করেন, তখন এটা আবু আমিরের কাছে খুবই কঠিন বোধ হয়। সুতরাং সে খোলাখুলিভাবে ইসলামের প্রতি শ্রঞতা প্রকাশ করতে শুরু করে এবং মদীনা হতে পলায়ন করে মক্কার কাফির ও মুশরিক। কুরায়েশদের সাথে মিলিত হয়। তাদেরকে সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে আরবের সমস্ত গোত্র একত্রিত হয় এবং উহুদ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। অবশেষে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং মুসলিমদের উপর যে বিপদ ও কষ্ট পৌছার ছিল তা পৌঁছে যায়। মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এই যুদ্ধে মুসলিমদেরকে পরীক্ষা করেন। তবে পরিণাম ফল তো আল্লাহভীরুদের জন্যেই বটে। এ পাপাচারী (আবু আমির) উভয় দিকের সারির মাঝে কয়েকটি গর্ত খনন করে রেখেছিল। একটি গর্তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পড়ে যান এবং আঘাতপ্রাপ্ত হন। তার চেহারা মুবারক যখম হয়ে যায় এবং নীচের দিকের সামনের চারটি দাঁত ভেঙ্গে যায়। তাঁর পবিত্র মস্তকও যখম হয়। যুদ্ধের শুরুতে আবু আমির তার কওম আনসারের দিকে অগ্রসর হয়ে তাদেরকে সম্বোধন করে তাকে সাহায্য সহযোগিতার জন্যে দাওয়াত দেয়। যখন আনসারগণ আবৃ আমিরের এসব কার্যকলাপ লক্ষ্য করলেন তখন তারা তাকে বললেনঃ “ওরে নরাধম ও পাপাচারী! ওরে আল্লাহর শত্রু! আল্লাহ তোকে ধ্বংস করুন!” এভাবে তারা তাকে গালি দেন। ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করেন। তখন সে বলেঃ “আমার পরে আমার কওম আরো বিগড়ে গেছে।” এ কথা বলে সে ফিরে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে তার মদীনা হতে পলায়নের পূর্বে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং কুরআনের অহী শুনিয়েছিলেন। কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় এবং ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার প্রতি বদ দুআ' দেন যে, সে যেন নির্বাসিত হয় এবং বিদেশেই যেন সে মৃত্যুবরণ করে। এই বদ দুআ তার প্রতি কার্যকরী হয়ে যায় এবং এটা এভাবে সংঘটিত হয় যে, জনগণ যখন উহুদ যুদ্ধ শেষ করলো এবং সে লক্ষ্য করলো যে, ইসলাম দিন দিন উন্নতির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে তখন সে রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে গমন করলো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধে তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করলো। সম্রাট তাকে সাহায্য করার অঙ্গীকার করলো। সে তার আশা পূর্ণ হতে দেখে হিরাক্লিয়াসের কাছেই অবস্থান করলো। সে তার কওম আনসারদের মধ্যকার মুনাফিকদেরকে এ বলে মক্কা পাঠিয়ে দিলোঃ “আমি সেনাবাহিনী নিয়ে আসছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ভীষণ যুদ্ধ সংঘটিত হবে। আমরা তার উপর জয়যুক্ত হবো এবং ইসলামের পূর্বে তার অবস্থা যেমন ছিল তিনি ঐ অবস্থাতেই ফিরে যাবেন।” সে ঐ মুনাফিকদের কাছে চিঠি লিখলো যে, তারা যেন তার জন্যে একটা আশ্রয়স্থান নির্মাণ করে রাখে। আর যেসব দূত তার নির্দেশনামা নিয়ে যাবে তাদের জন্যেও যেন অবস্থানস্থল ও নিরাপদ জায়গা বানানো হয়, যাতে সে নিজেও যখন যাবে তখন সেটা গুপ্ত অবস্থান রূপে কাজ দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঐ মুনাফিকরা মসজিদে কুবার নিকটেই আর একটি মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করে এবং ওটাকে পাকা করে নির্মাণ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তাবুক অভিমুখে বের হওয়ার পূর্বেই তারা ওর নির্মাণ কার্য শেষ করে ফেলে। অতঃপর তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে আবেদন করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদের ওখানে চলুন এবং আমাদের মসজিদে সালাত পড়ুন, যাতে এই সনদ হয়ে যায় যে, এই মসজিদটি স্বীয় স্থানে অবস্থানযোগ্য এবং এতে আপনার সমর্থন রয়েছে। তাঁর সামনে তারা বর্ণনা করে যে, দুর্বল লোকদের জন্যেই তারা এই মসজিদটি নির্মাণ করেছে এবং ঠাণ্ডার। রাত্রিতে যেসব রোগগ্রস্ত লোক দূরের মসজিদে যেতে অক্ষম হবে তাদের পক্ষে এই মসজিদে আসা সহজ হবে, এই উদ্দেশ্যেই তারা মসজিদটি নির্মাণ করেছে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তো স্বীয় নবী (সঃ)-কে ঐ মসজিদে সালাত আদায় করা থেকে রক্ষা করতে চাচ্ছিলেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “এখন তো আমরা সফরে বের হওয়ার জন্যে ব্যস্ত রয়েছি, ফিরে আসলে আল্লাহ চান তো দেখা যাবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তালূক হতে মদীনার দিকে প্রত্যাবর্তন করেন এবং মদীনায় পৌছতে একদিনের পথ বাকী থাকে বা তার চেয়ে কিছু কম, তখন জিবরাঈল (আঃ) মসজিদে যিরারের খবর নিয়ে তার কাছে হাযির হন এবং মুনাফিকদের গোপন তথ্য প্রকাশ করে দেন যে, মসজিদে কুবার নিকটে আর একটি মসজিদ নির্মাণ করে মুসলিমদের দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করাই হচ্ছে ঐ কাফির ও মুনাফিকদের আসল উদ্দেশ্য। মসজিদে কুবা হচ্ছে এমন এক মসজিদ যার ভিত্তি প্রথমদিন হতেই তাওয়ার উপর স্থাপিত হয়েছে।এটা জানার পর নবী (সঃ) মদীনা পৌছার পূর্বেই কতকগুলো লোককে মসজিদে যিরার বিধ্বস্ত করার জন্যে পাঠিয়ে দেন। যেমন আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করে বলেন যে, তারা ছিল আনসারের লোক যারা একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিল এবং আবৃ আমির তাদেরকে বলেছিলঃ “তোমরা একটি মসজিদ নির্মাণ কর এবং সম্ভব মত সেখানে অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের আসবাবপত্র লুকিয়ে রাখো, আর ওটাকে আশ্রয়স্থল ও গুপ্তস্থান বানিয়ে দাও। কেননা আমি রোমক বাদশাহর নিকট যাচ্ছি। রোম থেকে আমি সৈন্য-সামন্ত নিয়ে আসবো এবং মুহাম্মাদ (সঃ) ও তাঁর সঙ্গী সাথীদেরকে মদীনা হতে বের করে দেবো।” সুতরাং মুনাফিকরা মসজিদে যিরারের নির্মাণ কার্য সমাপ্ত করে নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয় এবং আবেদন করেঃ “আমাদের আন্তরিক ইচ্ছা এই যে, আপনি আমাদের মসজিদে গিয়ে সালাত পড়বেন এবং আমাদের জন্যে বরকতের দুআ করবেন।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) ইসনাদসহ এই রিওয়ায়াত করেছেন যে, নবী (সঃ) তাবক হতে ফিরার পথে “যীরাওমান” নামক স্থানে অবতরণ করেন । মদীনা এখান থেকে কয়েক ঘন্টার পথ। নবী (সঃ) যখন তাবূকের সফরের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণে ব্যস্ত ছিলেন সেই সময় মসজিদে যিরারের নির্মাণকারীরা তাঁর কাছে এসে বলেছিলঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা রুগ্ন, অভাবী এবং বর্ষা ও ঠাণ্ডার রাত্রে আগমনকারী মুসলিম জামাআতের উপকারার্থে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছি। আমরা চাই যে, আপনি সেখানে তাশরীফ এনে আমাদেরকে নামায পড়াবেন। তিনি তাদেরকে বলেছিলেনঃ “এখন তো সফর যাত্রায় খুবই ব্যস্ত রয়েছি।” অথবা তিনি বলেছিলেনঃ “ফিরে আসার পর ইনশাআল্লাহ আমি তোমাদের ওখানে যাবো এবং তোমাদের সাথে সালাত আদায় করব।” সুতরাং যখন তিনি তাবুক হতে মদীনায় ফিরবার পথে “যীরওমান” নামক স্থানে অবতরণ করেন তখন তিনি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ঐ মসজিদে যিরারের খবর পান। তিনি তখন বানু সালিমের ভাই মালিক ইবনে দাখশামকে ও মাআন ইবনে আদী অথবা তার ভাই আমির ইবনে আদীকে আহ্বান করেন। তিনি তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা দু'জন ঐ যালিমদের মসজিদটির নিকট গমন কর এবং ওটাকে বিধ্বস্ত কর ও জ্বালিয়ে দাও।” তৎক্ষণাৎ তারা দু'জন বানু সালিম ইবনে আউফের নিকট আগমন করে। সে ছিল মালিক ইবনে দাখনানের গোত্রের লোক। মালিক মাআনকে বললোঃ “থামো, আমি আমার লোকদের নিকট থেকে আগুন নিয়ে আসি।” এ কথা বলে মালিক নিজের লোকদের কাছে আসলো। গাছের একটি বড় ডাল নিল এবং তাতে আগুন ধরিয়ে দিলো। ওটা নিয়ে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়লো । তারা উভয়ে মসজিদে পৌছলো। মসজিদে তখন কাফিররা মওজুদ ছিল। ঐ দু’জন ঐ মসজিদকে জ্বালিয়ে দিলো। লোকেরা সেখান থেকে পালিয়ে গেল এবং ঐ মুনাফিকদের ব্যাপারে (আরবী) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়ে গেল। যারা এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিল তারা ছিল বারোজন। তারা হচ্ছে-(১) খুযাম ইবনে খালিদ, তারই বাড়ী থেকে মসজিদে শিকাকের রাস্তা বের হয়ে এসেছে। (২) বান উমাইয়ার খাদেম সা'লাবা ইবনে হাতিব। (৩) মাতআব ইবনে কুশায়ের। (৪) আবু হাবীবাহ্ ইবনে আজআর । (৫) আব্বাদ ইবনে হানীফ। (৬) হারিসা ইবনে আমির। (৭) মাজমা ইবনে হারিসা। (৮) যায়েদ ইবনে হারিসা। (৯) নাবতাল আল হারিসা। (১) নাজরা। (১১) বাজ্জাদ ইবনে ইমরান এবং (১২) আবু লুবাবার গোত্রের খাদেম ওয়াদীআহ ইবনে সাবিত। যারা এ মসজিদটি নির্মাণ করেছিল তারা শপথ করে করে বলেছিলঃ “আমরা তো সৎ উদ্দেশ্যেই এর ভিত্তি স্থাপন করেছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু জনগণের মঙ্গল কামনা।” কিন্তু আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ (আরবী)। অর্থাৎ “আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।” অর্থাৎ তারা তাদের যে উদ্দেশ্য ও নিয়তের কথা বলছে তাতে তারা মিথ্যাবাদী। তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে শুধু মসজিদুল কুবার ক্ষতি সাধন করা, কুফরী ছড়িয়ে দেয়া, মুসলিমদের মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে গুপ্ত স্থান বানিয়ে রাখা, যেখানে তাদের পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হবে। ঐ লোকটি হচ্ছে আবূ আমির, সে পাপাচারী, যাকে রাহিব বা আবিদ বলা হতো, আল্লাহ তার উপর লা'নত বর্ষণ করুন।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ঐ মসজিদে সালাত পড়তে নিষেধ করে দিয়েছেন । সালাত না পড়ার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুসারী এবং উম্মতও শামিল রয়েছে। সুতরাং মুসলিমদের প্রতিও এই গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে যে, তারাও যেন ঐ মসজিদে কখনো সালাত আদায় না করে। অতঃপর মসজিদে কুবায় সালাত পড়তে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। প্রথম থেকেই মসজিদে কুবার ভিত্তি আল্লাহভীরুতার উপর স্থাপন করা হয়েছে। তাকওয়া বলা হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করাকে। এখানে মুসলিমরা পরস্পর মিলিত হয় এবং ধর্মীয় পরামর্শ করে। এটা হচ্ছে ইসলাম ও আহলে ইসলামের আশ্রয়স্থল। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্য যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন হতেই তাকওয়ার উপর স্থাপিত হয়েছে তা এরই উপযোগী যে, তুমি তাতে সালাতের জন্যে দাঁড়াবে। আর ইবাদতের হিসাব মসজিদে কুবার সাথে সম্পর্কযুক্ত। এ জন্যেই সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মসজিদে কুবায় সালাত পড়া (সওয়াবের দিক দিয়ে) একটি উমরা আদায় করার মত।” আরো সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে কুবায় সওয়ার হয়েও আসতেন এবং পদব্রজেও আসতেন। বিশুদ্ধ হাদীসে আরো এসেছে যে, রাসূলল্লাহ (সঃ) যখন মসজিদে কুবা নির্মাণ করেন এবং ওর ভিত্তি স্থাপন করেন তখন তিনি সর্বপ্রথম আমর ইবনে আউফ গোত্রের নিকট অবস্থান করতে শুরু করেন এবং জিবরাঈল (আঃ) কিবলার দিক নির্ধারিত করে দেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী। আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) -এ আয়াতটি আহলে কুবার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তিনি বলেন যে, তারা পানি দ্বারা পবিত্রতা লাভ করতো। সুতরাং তাদের প্রশংসায় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি সুনানে আবি দাউদে আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন তিনি উওয়াইম ইবনে সাঈদা (রাঃ)-এর নিকট লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের এটা কোন পবিত্রতা যার কারণে আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রশংসা করেছেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! আমাদের কোন পুরুষ বা স্ত্রী লোক যখন পায়খানার কাজ সেরে বেরিয়ে আসে তখন সে তার লিঙ্গ ও গুহ্যদ্বারকে পানি দ্বারা উত্তমরূপে ধৌত করে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা, (প্রশংসার কারণ) এটাই বটে।”উওয়াইম ইবনে সাঈদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) মসজিদে কুবায় তাদের নিকট আগমন করেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মসজিদের ঘটনায় তোমাদের পবিত্রতার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা অতি উত্তম ভাষায় প্রশংসা করেছেন। তোমরা যদদ্বারা পবিত্রতা লাভ করে থাকো সেটা কি?” তাঁরা উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ, আমরা তো এটা ছাড়া আর কিছুই জানি না যে, ইয়াহূদীরা আমাদের প্রতিবেশী ছিল। তারা পায়খানার কাজ সেরে পানি দ্বারা তাদের গুহ্যদ্বার ধৌত করতো। সুতরাং আমরাও তদ্রুপ করে থাকি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইবনে খুযাইমা (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে লিখেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উওয়াইম ইবনে সাঈদা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের কি প্রকারের পবিত্রতার কারণে তোমাদের প্রশংসা করেছেন? তিনি জবাবে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পানি দ্বারা আমরা আমাদের গুহ্যদ্বার ধৌত করে থাকি।” ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এই আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা (পায়খানার কাজ সেরে) তাদের গুহ্যদ্বার পানি দ্বারা ধৌত করতো।ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) ইসনাদসহ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে কুবাতে এসে (আহলে কুবাকে) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের পবিত্রতার খুবই প্রশংসা করেছেন, সেটা কি?” উত্তরে তারা বলেনঃ “আমরা তাওরাতে পানি দ্বারা ইসতিনজা করার নির্দেশ লিখিত পেয়েছি।” তাঁদের মধ্যে একজন বর্ণনাকারী ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ), যিনি আহলে তাওরাত ছিলেন।সহীহ হাদীসে এসেছে যে, মদীনার মধ্যস্থলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যে মসজিদটি রয়েছে ওটাই হচ্ছে সেই মসজিদ যার ভিত্তি তাকওয়ার উপর স্থাপন করা হয়েছে। এটা সঠিক কথাও বটে। এই আয়াত এবং এই হাদীসের মধ্যে কোনই বৈপরীত্য নেই। কেননা প্রথম দিন থেকে মসজিদে কুবার ভিত্তি যখন তাকওয়ার উপর স্থাপন করা হয়েছে তখন মসজিদে নববীর ভিত্তি যে তাকওয়ার উপর স্থাপিত এটা তো বলাই বাহুল্য। এ জন্যেই মুসনাদে আহমাদে উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে মসজিদের ভিত্তি তাকওয়ার উপর স্থাপন করা হয়েছে তা আমার এই মসজিদই বটে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) একাকী বর্ণনা করেছেন)সাহল ইবনে সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে দু'টি লোকের মধ্যে ঐ মসজিদের ব্যাপারে মতানৈক্য হয় যার ভিত্তি তাকওয়ার উপর স্থাপিত। একজন বলে যে, এটা হচ্ছে মসজিদে নববী (সঃ)। আর অপরজন বলে যে, ওটা হচ্ছে মসজিদে কুবা। অতঃপর তারা উভয়ে নবী (সঃ)-এর কাছে এসে ঐ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দেনঃ “ওটা হচ্ছে আমার এই মসজিদ।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, দু’টি লোকের মধ্যে ঐ মসজিদ সম্পর্কে মতভেদ সৃষ্টি হয় যার ভিত্তি প্রথম দিন হতেই তাকওয়ার উপর স্থাপিত। একজন বলে যে, ওটা হচ্ছে মসজিদে কুবা এবং অপরজন বলে যে, ওটা হচ্ছে মসজিদে নববী। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ওটা হচ্ছে আমার মসজিদ।” (মুসনাদে আহমাদেই এই হাদীসও বর্ণিত হয়েছে)এর পরে এ বিষয়েরই আরো কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হামীদ আল খারাত আল মাদানী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু সালমা ইবনে আবদির রহমান ইবনে আবি সাঈদ (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, মসজিদে তাকওয়ার ব্যাপারে আপনি আপনার পিতা থেকে কি শুনেছেন? তিনি উত্তরে (পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করি এবং তার কোন এক স্ত্রীর বাড়ীতে তার কাছে প্রবেশ করি। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে মসজিদের ভিত্তি তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত সেটা কোথায়? তিনি তখন এক মুষ্টি কংকর উঠিয়ে নিয়ে যমীনে মেরে বললেনঃ “ওটা হচ্ছে এই মসজিদটি (অর্থাৎ মসজিদে নববী)।” ইমাম মুসলিম (রঃ) ইসনাদসহ হামীদ আল খারাত (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুরুজনদের একটি দলের এটাই উক্তি যে, ওটা মসজিদে নববী । উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ), তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ (রাঃ), যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) এবং সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাকে পছন্দ করেছেন। (আরবী)-এই আয়াতটি এ কথার দলীল যে, যে। প্রাচীন মসজিদগুলোর প্রথম ভিত্তি এক ও লা-শারিক আল্লাহর ইবাদতের উপর প্রতিষ্ঠিত সেগুলোতে সালাত পড়া মুসতাহাব। এই মুসতাহাব হওয়ারও দলীল এই যে, জামাআতে সালেহীন ও ইবাদে আমেলীনের সাথে সালাত পড়া উচিত এবং যথানিয়মে পূর্ণ মাত্রায় অযু করা দরকার, আর সালাতে ময়লা ও অপবিত্র কাপড় পরিধান না করা উচিত।ইমাম আহমাদ (রঃ) ইসনাদসহ বর্ণনা করেছেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের সালাত পড়ান এবং তাতে সূরায়ে “রূম” পাঠ করেন। পাঠে তাঁর কিছু সন্দেহ হয়। সালাত শেষে তিনি বলেনঃ “আমার কুরআন পাঠে কিছু বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়েছিল। দেখো! তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে যে আমার সাথে সালাত আদায় করে, কিন্তু উত্তমরূপে অযু করে না। সুতরাং যে আমাদের সাথে সালাত পড়তে চায় তার উচিত উত্তমরূপে অযু করার ব্যাপারে কোন ত্রুটি করা।”যুলকিলা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সালাত পড়েন, তখন তিনি তাঁকে এই হিদায়াতই করেন। এটা এরই প্রমাণ যে, উত্তমরূপে অযু করা ইবাদতে দাঁড়ানো অবস্থাকে সহজ করে তোলে এবং ইবাদতের পরিপূর্ণতায় সহায়ক হয়। আকূল আলিয়া (রঃ) (আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তির ব্যাপারে বলেন যে, পানি দ্বারা পবিত্রতা লাভ করা তো অতি উত্তম কাজ বটেই, তবে আল্লাহ তা'আলা যাদের পবিত্রতার প্রশংসা করেছেন তারা হচ্ছেন ঐসব লোক যাঁরা নিজেদেরকে গুনাহ থেকে পবিত্র রেখেছেন। আ’মাশ (রঃ) বলেন যে, এই তাহারাত দ্বারা গুনাহ থেকে তাওবা করা এবং শিরক থেকে পবিত্র থাকা বুঝানো হয়েছে। হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আহলে কুবাকে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা যে তোমাদের তাহারাতের প্রশংসা করেছেন তা কিরূপ?” তারা উত্তরে বলেনঃ “আমরা পানি দ্বারাই ইসতিনজা করে থাকি।”হাফিজ আবু বকর বাযযায (রঃ) ইসনাদসহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এই আয়াতটি আহলে কুবার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আহলে কুবাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের তাহারাত কিরূপ?” তারা উত্তরে বলেনঃ “প্রথমে আমরা ঢিলা ব্যবহার করি, তারপর পানি দ্বারা ধৌত করি।” এটা বায (রঃ) রিওয়ায়াত করেছেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “এটাকে শুধু মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল আযীয এবং তাঁর থেকে তাঁর পুত্র বর্ণনা করেছেন।” আমি বলি, আমি এ ব্যাখ্যা এখানে এই জন্যেই করলাম যে, এটা ফকীহদের নিকট মাশহুর হলেও পরবর্তী অধিকাংশ মুহাদ্দিস এটাকে সুপরিচিত হিসাবে স্বীকার করেন না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আত-তাওবা 9:108

১০৭-১০৮ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতগুলোর শানে নুযূল (অবতীর্ণ হওয়ার কারণ) এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদীনায় আগমনের পূর্বে সেখানে খাযরাজ গোত্রের একটি পোর্ক বাস করতো যার নাম ছিল আবু আমির রাহিব । অজ্ঞতার যুগে সে খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং আহলে কিতাবের জ্ঞান লাভ করেছিল। জাহিলিয়াতের যুগে সে। বড় আবিদ লোক ছিল। নিজের গোত্রের মধ্যে সে খুব মর্যাদা লাভ করেছিল। নবী (সঃ) যখন হিজরত করে মদীনায় আসেন এবং মুসলিমরা তাঁর কাছে একত্রিত হতে শুরু করে ও ইসলামের উন্নতি সাধিত হয় এবং বদরের যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে জয়যুক্ত করেন, তখন এটা আবু আমিরের কাছে খুবই কঠিন বোধ হয়। সুতরাং সে খোলাখুলিভাবে ইসলামের প্রতি শ্রঞতা প্রকাশ করতে শুরু করে এবং মদীনা হতে পলায়ন করে মক্কার কাফির ও মুশরিক। কুরায়েশদের সাথে মিলিত হয়। তাদেরকে সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে আরবের সমস্ত গোত্র একত্রিত হয় এবং উহুদ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। অবশেষে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং মুসলিমদের উপর যে বিপদ ও কষ্ট পৌছার ছিল তা পৌঁছে যায়। মহা মহিমান্বিত আল্লাহ এই যুদ্ধে মুসলিমদেরকে পরীক্ষা করেন। তবে পরিণাম ফল তো আল্লাহভীরুদের জন্যেই বটে। এ পাপাচারী (আবু আমির) উভয় দিকের সারির মাঝে কয়েকটি গর্ত খনন করে রেখেছিল। একটি গর্তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পড়ে যান এবং আঘাতপ্রাপ্ত হন। তার চেহারা মুবারক যখম হয়ে যায় এবং নীচের দিকের সামনের চারটি দাঁত ভেঙ্গে যায়। তাঁর পবিত্র মস্তকও যখম হয়। যুদ্ধের শুরুতে আবু আমির তার কওম আনসারের দিকে অগ্রসর হয়ে তাদেরকে সম্বোধন করে তাকে সাহায্য সহযোগিতার জন্যে দাওয়াত দেয়। যখন আনসারগণ আবৃ আমিরের এসব কার্যকলাপ লক্ষ্য করলেন তখন তারা তাকে বললেনঃ “ওরে নরাধম ও পাপাচারী! ওরে আল্লাহর শত্রু! আল্লাহ তোকে ধ্বংস করুন!” এভাবে তারা তাকে গালি দেন। ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করেন। তখন সে বলেঃ “আমার পরে আমার কওম আরো বিগড়ে গেছে।” এ কথা বলে সে ফিরে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে তার মদীনা হতে পলায়নের পূর্বে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং কুরআনের অহী শুনিয়েছিলেন। কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় এবং ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার প্রতি বদ দুআ' দেন যে, সে যেন নির্বাসিত হয় এবং বিদেশেই যেন সে মৃত্যুবরণ করে। এই বদ দুআ তার প্রতি কার্যকরী হয়ে যায় এবং এটা এভাবে সংঘটিত হয় যে, জনগণ যখন উহুদ যুদ্ধ শেষ করলো এবং সে লক্ষ্য করলো যে, ইসলাম দিন দিন উন্নতির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে তখন সে রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে গমন করলো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধে তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করলো। সম্রাট তাকে সাহায্য করার অঙ্গীকার করলো। সে তার আশা পূর্ণ হতে দেখে হিরাক্লিয়াসের কাছেই অবস্থান করলো। সে তার কওম আনসারদের মধ্যকার মুনাফিকদেরকে এ বলে মক্কা পাঠিয়ে দিলোঃ “আমি সেনাবাহিনী নিয়ে আসছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ভীষণ যুদ্ধ সংঘটিত হবে। আমরা তার উপর জয়যুক্ত হবো এবং ইসলামের পূর্বে তার অবস্থা যেমন ছিল তিনি ঐ অবস্থাতেই ফিরে যাবেন।” সে ঐ মুনাফিকদের কাছে চিঠি লিখলো যে, তারা যেন তার জন্যে একটা আশ্রয়স্থান নির্মাণ করে রাখে। আর যেসব দূত তার নির্দেশনামা নিয়ে যাবে তাদের জন্যেও যেন অবস্থানস্থল ও নিরাপদ জায়গা বানানো হয়, যাতে সে নিজেও যখন যাবে তখন সেটা গুপ্ত অবস্থান রূপে কাজ দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঐ মুনাফিকরা মসজিদে কুবার নিকটেই আর একটি মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করে এবং ওটাকে পাকা করে নির্মাণ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তাবুক অভিমুখে বের হওয়ার পূর্বেই তারা ওর নির্মাণ কার্য শেষ করে ফেলে। অতঃপর তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে আবেদন করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদের ওখানে চলুন এবং আমাদের মসজিদে সালাত পড়ুন, যাতে এই সনদ হয়ে যায় যে, এই মসজিদটি স্বীয় স্থানে অবস্থানযোগ্য এবং এতে আপনার সমর্থন রয়েছে। তাঁর সামনে তারা বর্ণনা করে যে, দুর্বল লোকদের জন্যেই তারা এই মসজিদটি নির্মাণ করেছে এবং ঠাণ্ডার। রাত্রিতে যেসব রোগগ্রস্ত লোক দূরের মসজিদে যেতে অক্ষম হবে তাদের পক্ষে এই মসজিদে আসা সহজ হবে, এই উদ্দেশ্যেই তারা মসজিদটি নির্মাণ করেছে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তো স্বীয় নবী (সঃ)-কে ঐ মসজিদে সালাত আদায় করা থেকে রক্ষা করতে চাচ্ছিলেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “এখন তো আমরা সফরে বের হওয়ার জন্যে ব্যস্ত রয়েছি, ফিরে আসলে আল্লাহ চান তো দেখা যাবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তালূক হতে মদীনার দিকে প্রত্যাবর্তন করেন এবং মদীনায় পৌছতে একদিনের পথ বাকী থাকে বা তার চেয়ে কিছু কম, তখন জিবরাঈল (আঃ) মসজিদে যিরারের খবর নিয়ে তার কাছে হাযির হন এবং মুনাফিকদের গোপন তথ্য প্রকাশ করে দেন যে, মসজিদে কুবার নিকটে আর একটি মসজিদ নির্মাণ করে মুসলিমদের দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করাই হচ্ছে ঐ কাফির ও মুনাফিকদের আসল উদ্দেশ্য। মসজিদে কুবা হচ্ছে এমন এক মসজিদ যার ভিত্তি প্রথমদিন হতেই তাওয়ার উপর স্থাপিত হয়েছে।এটা জানার পর নবী (সঃ) মদীনা পৌছার পূর্বেই কতকগুলো লোককে মসজিদে যিরার বিধ্বস্ত করার জন্যে পাঠিয়ে দেন। যেমন আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করে বলেন যে, তারা ছিল আনসারের লোক যারা একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিল এবং আবৃ আমির তাদেরকে বলেছিলঃ “তোমরা একটি মসজিদ নির্মাণ কর এবং সম্ভব মত সেখানে অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের আসবাবপত্র লুকিয়ে রাখো, আর ওটাকে আশ্রয়স্থল ও গুপ্তস্থান বানিয়ে দাও। কেননা আমি রোমক বাদশাহর নিকট যাচ্ছি। রোম থেকে আমি সৈন্য-সামন্ত নিয়ে আসবো এবং মুহাম্মাদ (সঃ) ও তাঁর সঙ্গী সাথীদেরকে মদীনা হতে বের করে দেবো।” সুতরাং মুনাফিকরা মসজিদে যিরারের নির্মাণ কার্য সমাপ্ত করে নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয় এবং আবেদন করেঃ “আমাদের আন্তরিক ইচ্ছা এই যে, আপনি আমাদের মসজিদে গিয়ে সালাত পড়বেন এবং আমাদের জন্যে বরকতের দুআ করবেন।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) ইসনাদসহ এই রিওয়ায়াত করেছেন যে, নবী (সঃ) তাবক হতে ফিরার পথে “যীরাওমান” নামক স্থানে অবতরণ করেন । মদীনা এখান থেকে কয়েক ঘন্টার পথ। নবী (সঃ) যখন তাবূকের সফরের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণে ব্যস্ত ছিলেন সেই সময় মসজিদে যিরারের নির্মাণকারীরা তাঁর কাছে এসে বলেছিলঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা রুগ্ন, অভাবী এবং বর্ষা ও ঠাণ্ডার রাত্রে আগমনকারী মুসলিম জামাআতের উপকারার্থে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছি। আমরা চাই যে, আপনি সেখানে তাশরীফ এনে আমাদেরকে নামায পড়াবেন। তিনি তাদেরকে বলেছিলেনঃ “এখন তো সফর যাত্রায় খুবই ব্যস্ত রয়েছি।” অথবা তিনি বলেছিলেনঃ “ফিরে আসার পর ইনশাআল্লাহ আমি তোমাদের ওখানে যাবো এবং তোমাদের সাথে সালাত আদায় করব।” সুতরাং যখন তিনি তাবুক হতে মদীনায় ফিরবার পথে “যীরওমান” নামক স্থানে অবতরণ করেন তখন তিনি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ঐ মসজিদে যিরারের খবর পান। তিনি তখন বানু সালিমের ভাই মালিক ইবনে দাখশামকে ও মাআন ইবনে আদী অথবা তার ভাই আমির ইবনে আদীকে আহ্বান করেন। তিনি তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা দু'জন ঐ যালিমদের মসজিদটির নিকট গমন কর এবং ওটাকে বিধ্বস্ত কর ও জ্বালিয়ে দাও।” তৎক্ষণাৎ তারা দু'জন বানু সালিম ইবনে আউফের নিকট আগমন করে। সে ছিল মালিক ইবনে দাখনানের গোত্রের লোক। মালিক মাআনকে বললোঃ “থামো, আমি আমার লোকদের নিকট থেকে আগুন নিয়ে আসি।” এ কথা বলে মালিক নিজের লোকদের কাছে আসলো। গাছের একটি বড় ডাল নিল এবং তাতে আগুন ধরিয়ে দিলো। ওটা নিয়ে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়লো । তারা উভয়ে মসজিদে পৌছলো। মসজিদে তখন কাফিররা মওজুদ ছিল। ঐ দু’জন ঐ মসজিদকে জ্বালিয়ে দিলো। লোকেরা সেখান থেকে পালিয়ে গেল এবং ঐ মুনাফিকদের ব্যাপারে (আরবী) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়ে গেল। যারা এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিল তারা ছিল বারোজন। তারা হচ্ছে-(১) খুযাম ইবনে খালিদ, তারই বাড়ী থেকে মসজিদে শিকাকের রাস্তা বের হয়ে এসেছে। (২) বান উমাইয়ার খাদেম সা'লাবা ইবনে হাতিব। (৩) মাতআব ইবনে কুশায়ের। (৪) আবু হাবীবাহ্ ইবনে আজআর । (৫) আব্বাদ ইবনে হানীফ। (৬) হারিসা ইবনে আমির। (৭) মাজমা ইবনে হারিসা। (৮) যায়েদ ইবনে হারিসা। (৯) নাবতাল আল হারিসা। (১) নাজরা। (১১) বাজ্জাদ ইবনে ইমরান এবং (১২) আবু লুবাবার গোত্রের খাদেম ওয়াদীআহ ইবনে সাবিত। যারা এ মসজিদটি নির্মাণ করেছিল তারা শপথ করে করে বলেছিলঃ “আমরা তো সৎ উদ্দেশ্যেই এর ভিত্তি স্থাপন করেছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু জনগণের মঙ্গল কামনা।” কিন্তু আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ (আরবী)। অর্থাৎ “আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।” অর্থাৎ তারা তাদের যে উদ্দেশ্য ও নিয়তের কথা বলছে তাতে তারা মিথ্যাবাদী। তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে শুধু মসজিদুল কুবার ক্ষতি সাধন করা, কুফরী ছড়িয়ে দেয়া, মুসলিমদের মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে গুপ্ত স্থান বানিয়ে রাখা, যেখানে তাদের পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হবে। ঐ লোকটি হচ্ছে আবূ আমির, সে পাপাচারী, যাকে রাহিব বা আবিদ বলা হতো, আল্লাহ তার উপর লা'নত বর্ষণ করুন।আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ঐ মসজিদে সালাত পড়তে নিষেধ করে দিয়েছেন । সালাত না পড়ার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুসারী এবং উম্মতও শামিল রয়েছে। সুতরাং মুসলিমদের প্রতিও এই গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে যে, তারাও যেন ঐ মসজিদে কখনো সালাত আদায় না করে। অতঃপর মসজিদে কুবায় সালাত পড়তে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। প্রথম থেকেই মসজিদে কুবার ভিত্তি আল্লাহভীরুতার উপর স্থাপন করা হয়েছে। তাকওয়া বলা হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করাকে। এখানে মুসলিমরা পরস্পর মিলিত হয় এবং ধর্মীয় পরামর্শ করে। এটা হচ্ছে ইসলাম ও আহলে ইসলামের আশ্রয়স্থল। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্য যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন হতেই তাকওয়ার উপর স্থাপিত হয়েছে তা এরই উপযোগী যে, তুমি তাতে সালাতের জন্যে দাঁড়াবে। আর ইবাদতের হিসাব মসজিদে কুবার সাথে সম্পর্কযুক্ত। এ জন্যেই সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মসজিদে কুবায় সালাত পড়া (সওয়াবের দিক দিয়ে) একটি উমরা আদায় করার মত।” আরো সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে কুবায় সওয়ার হয়েও আসতেন এবং পদব্রজেও আসতেন। বিশুদ্ধ হাদীসে আরো এসেছে যে, রাসূলল্লাহ (সঃ) যখন মসজিদে কুবা নির্মাণ করেন এবং ওর ভিত্তি স্থাপন করেন তখন তিনি সর্বপ্রথম আমর ইবনে আউফ গোত্রের নিকট অবস্থান করতে শুরু করেন এবং জিবরাঈল (আঃ) কিবলার দিক নির্ধারিত করে দেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী। আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) -এ আয়াতটি আহলে কুবার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তিনি বলেন যে, তারা পানি দ্বারা পবিত্রতা লাভ করতো। সুতরাং তাদের প্রশংসায় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি সুনানে আবি দাউদে আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন তিনি উওয়াইম ইবনে সাঈদা (রাঃ)-এর নিকট লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের এটা কোন পবিত্রতা যার কারণে আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রশংসা করেছেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! আমাদের কোন পুরুষ বা স্ত্রী লোক যখন পায়খানার কাজ সেরে বেরিয়ে আসে তখন সে তার লিঙ্গ ও গুহ্যদ্বারকে পানি দ্বারা উত্তমরূপে ধৌত করে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা, (প্রশংসার কারণ) এটাই বটে।”উওয়াইম ইবনে সাঈদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) মসজিদে কুবায় তাদের নিকট আগমন করেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মসজিদের ঘটনায় তোমাদের পবিত্রতার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা অতি উত্তম ভাষায় প্রশংসা করেছেন। তোমরা যদদ্বারা পবিত্রতা লাভ করে থাকো সেটা কি?” তাঁরা উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ, আমরা তো এটা ছাড়া আর কিছুই জানি না যে, ইয়াহূদীরা আমাদের প্রতিবেশী ছিল। তারা পায়খানার কাজ সেরে পানি দ্বারা তাদের গুহ্যদ্বার ধৌত করতো। সুতরাং আমরাও তদ্রুপ করে থাকি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইবনে খুযাইমা (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে লিখেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উওয়াইম ইবনে সাঈদা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের কি প্রকারের পবিত্রতার কারণে তোমাদের প্রশংসা করেছেন? তিনি জবাবে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পানি দ্বারা আমরা আমাদের গুহ্যদ্বার ধৌত করে থাকি।” ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এই আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা (পায়খানার কাজ সেরে) তাদের গুহ্যদ্বার পানি দ্বারা ধৌত করতো।ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) ইসনাদসহ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে কুবাতে এসে (আহলে কুবাকে) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের পবিত্রতার খুবই প্রশংসা করেছেন, সেটা কি?” উত্তরে তারা বলেনঃ “আমরা তাওরাতে পানি দ্বারা ইসতিনজা করার নির্দেশ লিখিত পেয়েছি।” তাঁদের মধ্যে একজন বর্ণনাকারী ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ), যিনি আহলে তাওরাত ছিলেন।সহীহ হাদীসে এসেছে যে, মদীনার মধ্যস্থলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যে মসজিদটি রয়েছে ওটাই হচ্ছে সেই মসজিদ যার ভিত্তি তাকওয়ার উপর স্থাপন করা হয়েছে। এটা সঠিক কথাও বটে। এই আয়াত এবং এই হাদীসের মধ্যে কোনই বৈপরীত্য নেই। কেননা প্রথম দিন থেকে মসজিদে কুবার ভিত্তি যখন তাকওয়ার উপর স্থাপন করা হয়েছে তখন মসজিদে নববীর ভিত্তি যে তাকওয়ার উপর স্থাপিত এটা তো বলাই বাহুল্য। এ জন্যেই মুসনাদে আহমাদে উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে মসজিদের ভিত্তি তাকওয়ার উপর স্থাপন করা হয়েছে তা আমার এই মসজিদই বটে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) একাকী বর্ণনা করেছেন)সাহল ইবনে সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে দু'টি লোকের মধ্যে ঐ মসজিদের ব্যাপারে মতানৈক্য হয় যার ভিত্তি তাকওয়ার উপর স্থাপিত। একজন বলে যে, এটা হচ্ছে মসজিদে নববী (সঃ)। আর অপরজন বলে যে, ওটা হচ্ছে মসজিদে কুবা। অতঃপর তারা উভয়ে নবী (সঃ)-এর কাছে এসে ঐ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দেনঃ “ওটা হচ্ছে আমার এই মসজিদ।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, দু’টি লোকের মধ্যে ঐ মসজিদ সম্পর্কে মতভেদ সৃষ্টি হয় যার ভিত্তি প্রথম দিন হতেই তাকওয়ার উপর স্থাপিত। একজন বলে যে, ওটা হচ্ছে মসজিদে কুবা এবং অপরজন বলে যে, ওটা হচ্ছে মসজিদে নববী। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ওটা হচ্ছে আমার মসজিদ।” (মুসনাদে আহমাদেই এই হাদীসও বর্ণিত হয়েছে)এর পরে এ বিষয়েরই আরো কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হামীদ আল খারাত আল মাদানী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু সালমা ইবনে আবদির রহমান ইবনে আবি সাঈদ (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, মসজিদে তাকওয়ার ব্যাপারে আপনি আপনার পিতা থেকে কি শুনেছেন? তিনি উত্তরে (পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করি এবং তার কোন এক স্ত্রীর বাড়ীতে তার কাছে প্রবেশ করি। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে মসজিদের ভিত্তি তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত সেটা কোথায়? তিনি তখন এক মুষ্টি কংকর উঠিয়ে নিয়ে যমীনে মেরে বললেনঃ “ওটা হচ্ছে এই মসজিদটি (অর্থাৎ মসজিদে নববী)।” ইমাম মুসলিম (রঃ) ইসনাদসহ হামীদ আল খারাত (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুরুজনদের একটি দলের এটাই উক্তি যে, ওটা মসজিদে নববী । উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ), তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ (রাঃ), যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) এবং সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাকে পছন্দ করেছেন। (আরবী)-এই আয়াতটি এ কথার দলীল যে, যে। প্রাচীন মসজিদগুলোর প্রথম ভিত্তি এক ও লা-শারিক আল্লাহর ইবাদতের উপর প্রতিষ্ঠিত সেগুলোতে সালাত পড়া মুসতাহাব। এই মুসতাহাব হওয়ারও দলীল এই যে, জামাআতে সালেহীন ও ইবাদে আমেলীনের সাথে সালাত পড়া উচিত এবং যথানিয়মে পূর্ণ মাত্রায় অযু করা দরকার, আর সালাতে ময়লা ও অপবিত্র কাপড় পরিধান না করা উচিত।ইমাম আহমাদ (রঃ) ইসনাদসহ বর্ণনা করেছেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের সালাত পড়ান এবং তাতে সূরায়ে “রূম” পাঠ করেন। পাঠে তাঁর কিছু সন্দেহ হয়। সালাত শেষে তিনি বলেনঃ “আমার কুরআন পাঠে কিছু বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়েছিল। দেখো! তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে যে আমার সাথে সালাত আদায় করে, কিন্তু উত্তমরূপে অযু করে না। সুতরাং যে আমাদের সাথে সালাত পড়তে চায় তার উচিত উত্তমরূপে অযু করার ব্যাপারে কোন ত্রুটি করা।”যুলকিলা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সালাত পড়েন, তখন তিনি তাঁকে এই হিদায়াতই করেন। এটা এরই প্রমাণ যে, উত্তমরূপে অযু করা ইবাদতে দাঁড়ানো অবস্থাকে সহজ করে তোলে এবং ইবাদতের পরিপূর্ণতায় সহায়ক হয়। আকূল আলিয়া (রঃ) (আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তির ব্যাপারে বলেন যে, পানি দ্বারা পবিত্রতা লাভ করা তো অতি উত্তম কাজ বটেই, তবে আল্লাহ তা'আলা যাদের পবিত্রতার প্রশংসা করেছেন তারা হচ্ছেন ঐসব লোক যাঁরা নিজেদেরকে গুনাহ থেকে পবিত্র রেখেছেন। আ’মাশ (রঃ) বলেন যে, এই তাহারাত দ্বারা গুনাহ থেকে তাওবা করা এবং শিরক থেকে পবিত্র থাকা বুঝানো হয়েছে। হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আহলে কুবাকে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা যে তোমাদের তাহারাতের প্রশংসা করেছেন তা কিরূপ?” তারা উত্তরে বলেনঃ “আমরা পানি দ্বারাই ইসতিনজা করে থাকি।”হাফিজ আবু বকর বাযযায (রঃ) ইসনাদসহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এই আয়াতটি আহলে কুবার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আহলে কুবাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের তাহারাত কিরূপ?” তারা উত্তরে বলেনঃ “প্রথমে আমরা ঢিলা ব্যবহার করি, তারপর পানি দ্বারা ধৌত করি।” এটা বায (রঃ) রিওয়ায়াত করেছেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “এটাকে শুধু মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল আযীয এবং তাঁর থেকে তাঁর পুত্র বর্ণনা করেছেন।” আমি বলি, আমি এ ব্যাখ্যা এখানে এই জন্যেই করলাম যে, এটা ফকীহদের নিকট মাশহুর হলেও পরবর্তী অধিকাংশ মুহাদ্দিস এটাকে সুপরিচিত হিসাবে স্বীকার করেন না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আত-তাওবা 9:109

১০৯-১১০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, যারা মসজিদের ভিত্তি তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উপর স্থাপন করেছে, আর যারা মসজিদে যিরার ও মসজিদে কুফর। বানিয়েছে এবং মুমিনদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেছে ও আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ঐ মসজিদকে আশ্রয়স্থল করেছে তারা কখনো সমান হতে পারে না। ঐ লোকগুলো তো মসজিদে যিরারের ভিত্তি যেন একটি গহ্বরের কিনারার উপর স্থাপন করেছে, যা ধ্বসে পড়ার উপক্রম, অতঃপর তা তাকে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে পতিত হয়েছে। যারা সীমালংঘন করে আল্লাহ তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন না। অর্থাৎ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের আমলকে সংশোধন করেন না।জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “আমি মসজিদে যিরারটি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে যখন তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় তখন তার থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল।” ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেনঃ “আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, লোকেরা এক জায়গায় গর্ত খনন করে এবং সেখান থেকে তারা ধোঁয়া বের হতে দেখে।” কাতাদাও (রঃ) অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। খালাফ ইবনে ইয়াসীন আল কূফী (রঃ) বলেনঃ “আমি মুনাফিকদের ঐ মসজিদটি দেখেছি যার বর্ণনা আল্লাহ কুরআনে করেছেন, তাতে একটি ছিদ্র রয়েছে যার মধ্য দিয়ে ধূম্র বের হচ্ছে। সেটা আজ আবর্জনা ফেলার জায়গায় পরিণত হয়েছে।” ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবী) অর্থাৎ ঐ ইমারত যা তারা নির্মাণ করেছে, তা সর্বদা তাদের মনে খটকা সৃষ্টি করতে থাকবে। এর কারণে তাদের অন্তরে নিফাকের বীজ বপন করার কাজ চলতে থাকবে। যেমন গো-বৎস পূজারীদের অন্তরে ওর মহব্বত সৃষ্টি হয়েছিল।অর্থাৎ অবশ্যই যদি তাদের সেই অন্তরই ধ্বংস হয়ে যায় তবে তো কোন কথাই থাকে না। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের আমলগুলো সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল এবং তিনি ভাল ও মন্দের প্রতিদান দেয়ার ব্যাপারে মহাজ্ঞানী ও বড় বিজ্ঞানময়।

আত-তাওবা 9:110

১০৯-১১০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, যারা মসজিদের ভিত্তি তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উপর স্থাপন করেছে, আর যারা মসজিদে যিরার ও মসজিদে কুফর। বানিয়েছে এবং মুমিনদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেছে ও আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ঐ মসজিদকে আশ্রয়স্থল করেছে তারা কখনো সমান হতে পারে না। ঐ লোকগুলো তো মসজিদে যিরারের ভিত্তি যেন একটি গহ্বরের কিনারার উপর স্থাপন করেছে, যা ধ্বসে পড়ার উপক্রম, অতঃপর তা তাকে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে পতিত হয়েছে। যারা সীমালংঘন করে আল্লাহ তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন না। অর্থাৎ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের আমলকে সংশোধন করেন না।জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “আমি মসজিদে যিরারটি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে যখন তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় তখন তার থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল।” ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেনঃ “আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, লোকেরা এক জায়গায় গর্ত খনন করে এবং সেখান থেকে তারা ধোঁয়া বের হতে দেখে।” কাতাদাও (রঃ) অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। খালাফ ইবনে ইয়াসীন আল কূফী (রঃ) বলেনঃ “আমি মুনাফিকদের ঐ মসজিদটি দেখেছি যার বর্ণনা আল্লাহ কুরআনে করেছেন, তাতে একটি ছিদ্র রয়েছে যার মধ্য দিয়ে ধূম্র বের হচ্ছে। সেটা আজ আবর্জনা ফেলার জায়গায় পরিণত হয়েছে।” ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবী) অর্থাৎ ঐ ইমারত যা তারা নির্মাণ করেছে, তা সর্বদা তাদের মনে খটকা সৃষ্টি করতে থাকবে। এর কারণে তাদের অন্তরে নিফাকের বীজ বপন করার কাজ চলতে থাকবে। যেমন গো-বৎস পূজারীদের অন্তরে ওর মহব্বত সৃষ্টি হয়েছিল।অর্থাৎ অবশ্যই যদি তাদের সেই অন্তরই ধ্বংস হয়ে যায় তবে তো কোন কথাই থাকে না। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের আমলগুলো সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল এবং তিনি ভাল ও মন্দের প্রতিদান দেয়ার ব্যাপারে মহাজ্ঞানী ও বড় বিজ্ঞানময়।

আত-তাওবা 9:111

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে তাঁর পথে ব্যয়কৃত জান ও মালের বিনিময় হিসেবে জান্নাত প্রদান করবেন। আর এটা বিনিময় নয় বরং তার ফল, করম ও অনুগ্রহ। কেননা, বান্দাদের সাধ্যে যা ছিল তা তারা করেছে। এখন তিনি তার অনুগত বান্দাদের জন্যে কোন বিনিময় বা প্রতিদান ঠিক করলে জান্নাতই ঠিক করবেন। এ জন্যেই হাসান বসরী (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যখন তাঁর বান্দাদের সাথে বেচাকেনা করলেন তখন তিনি তাদের খিদমতের বিরাট ও উচ্চমূল্য প্রদান করলেন। আর শামর ইবনে আতিয়্যা (রঃ) বলেন যে, এমন কোন মুসলিম নেই যার স্কন্ধে আল্লাহর অঙ্গীকার ও চুক্তি নেই, যা সে পূর্ণ করে এবং যার উপর সে মৃত্যুবরণ করে। অতঃপর তিনি উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন। এ জন্যেই বলা হয় যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদ করার উদ্দেশ্যে বের হলো সে যেন আল্লাহর সাথে বেচাকেনা করলো এবং আল্লাহ তার সাথে এই আ কবূল করে নিলেন ও তা পূর্ণ করলেন।মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল কারাযী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) লাইলাতুল আকাবার সময় বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আল্লাহর জন্যে এবং আপনার জন্যেও যা ইচ্ছা হয় আমাদের উপর শর্ত আরোপ করুন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ সম্পর্কে আমি তোমাদের উপর এই শর্ত আরোপ করছি যে, তোমরা তার খাটি বান্দা হয়ে থাকবে, তাঁর ইবাদত করবে এবং তার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। আর আমার সম্পর্কে তোমাদের উপর এই শর্ত আরোপ করছি যে, যেসব বিষয় থেকে তোমরা নিজেদের জান ও মালকে রক্ষা করে থাকো সেই সব বিষয়ে আমার ব্যাপারেও শুভাকাঙক্ষী হয়ে থাকবে।” তখন তিনি বলেনঃ “এর বিনিময়ে আমরা কি পাবো? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এর বিনিময় হচ্ছে জান্নাত।” তাঁর এ কথা শুনে প্রশ্নকারীরা বললেনঃ “এটা তো বড় লাভের ব্যবসা। আমরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করবো না এবং আমাদের সাথে কৃত অঙ্গীকারও ভঙ্গ করা হবে না।” তখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, অতঃপর হত্যা করে ও নিহত হয়। সাওয়াবের দিক দিয়ে দুটোই সমান হয়। তারা হত্যা করে গাযী হাক অথবা নিহত হয়ে শহীদ হাক। সর্বাবস্থাতেই তাদের জন্যে জান্নাত অবধারিত রয়েছে। এ জন্যেই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এসেছে- “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে বের হয়, আর এই বের হওয়ার পেছনে একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে তার পথে জিহাদ করা এবং তার রাসূলদের সত্যতা প্রমাণ করা, এ অবস্থাতেই তার মৃত্যু হয়, আল্লাহ তার যিম্মাদার যে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করাবেন। আর যদি মারা না যায় তবে আল্লাহ এই দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন যে, সে যেখান থেকে বের হয়েছে সেখানে তাকে তার লাভকৃত গনীমতের মালসহ পৌছিয়ে দিবেন।”(আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তিটি তার ওয়ার্দার গুরুত্ব হিসেবে করা হয়েছে। বলা হচ্ছে যে, তিনি নিজের পবিত্র সত্তার উপর এটা ফরয করে নিয়েছেন এবং তাঁর রাসূলদের উপর তাঁর এই ওয়াদার অহীও পাঠিয়েছেন, যা মূসা (আঃ)-এর উপর অবতারিত কিতাব তাওরাতে লিপিবদ্ধ আছে এবং ঈসা (আঃ)-এর উপর অবতারিত কিতাব ইঞ্জীলেও লিখিত রয়েছে, আর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতারিত কিতাব আল কুরআনের মধ্যে লিখা আছে। তাদের সবারই উপর আল্লাহর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হাক। মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ অপেক্ষা স্বীয় ওয়াদা অধিক পূর্ণকারী আর কে হতে পারে? কেননা, তিনি কখনো ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কথায় আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী আর কে আছে?” (৪:৮৭) আর এক স্থানে তিনি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ কথা বলায় আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী আর কে হতে পারে?" (৪:১২২) এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে-আল্লাহর সাথে তোমরা যে বেচা-কেনা করেছে এতে তোমরা খুশী হয়ে যাও এবং এই সফলতা হচ্ছে বিরাট সফলতা, যদি তোমরাও নিজেদের অঙ্গীকার পূর্ণ কর।

আত-তাওবা 9:112

এই পবিত্র আয়াতটি ঐ মুমিনদের প্রশংসায় অবতীর্ণ হয়েছে যাদের জান ও মালকে আল্লাহ তা'আলা তাদের এই উত্তম গুণাবলীর বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা সমস্ত পাপ ও নির্লজ্জতাপূর্ণ কার্য থেকে বিরত থাকে, নিজেদের প্রতিপালকের ইবাদতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং নিজেদের কথা ও কাজের উপর কড়া দৃষ্টি রাখে। কথার মধ্যে বিশিষ্ট বিষয় হচ্ছে আল্লাহর প্রশংসা। এ জন্যেই মহান আল্লাহ (আরবী) বলেছেন। আর আমল ও কাজের দিক দিয়ে উত্তম কাজ হচ্ছে সিয়াম। সিয়াম বা রোযা বলা হয় পানাহার, স্ত্রী-সহবাস হতে বিরত থাকাকে। আর (আরবী) দ্বারা এই সিয়ামকেই বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা (আরবী) বলেছেন। যেমন তিনি (আরবী) শব্দ দ্বারা নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণীদের প্রশংসা করেছেন। এই (আরবী) দ্বারা (আরবী) ভাবার্থ নেয়া হয়েছে। অনুরূপভাবে (আরবী) ও (আরবী) দ্বারা সালাত বা নামায অর্থ নেয়া হয়েছে এবং (আরবী) ও (আরবী) বলা হয়েছে। তারা শুধু নিজেদের উপকারের প্রতি লক্ষ্য রেখেই ইবাদত করে না, বরং আল্লাহর অন্যান্য বান্দাদেরকেও সুপথ প্রদর্শন করতঃ “সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ”-এর উপর আমল করে উপকার পৌছিয়ে থাকে। কোন্ কাজ করা উচিত এবং কোন্ কাজ পরিত্যাগ করা ওয়াজিব এসব কথা বাতলিয়ে থাকে আর জ্ঞান ও আমল উভয় প্রকারে হালাল ও হারামের ব্যাপারে আল্লাহর সীমা সংরক্ষণের প্রতি তারা পূর্ণ দৃষ্টি রাখে। সুতরাং তারা আল্লাহর ইবাদত ও সৃষ্টজীবের মঙ্গল কামনা-এই উভয় প্রকারের ইবাদতে পতাকাধারী। এ জন্যেই মহান প্রতিপালক আল্লাহ বলেন-মুমিনদেরকে শুভ সংবাদ দিয়ে দাও, কেননা ও দুটোর সমষ্টির নামই হচ্ছে ঈমান এবং পূর্ণমাত্রায় সৌভাগ্য তো তারাই লাভ করেছে যারা এই দুটো গুণে গুণান্বিত।(আরবী) দ্বারা (আরবী) বা রোযাকে বুঝানো হয়েছে। সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে (আরবী) বা সিয়াম পালনকারীগণ। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ পাক কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই (আরবী) শব্দ ব্যবহার করেছেন সেখানেই উদ্দেশ্য হচ্ছে (আরবী) বা (আরবী) রোযা। যহহাকও (রঃ) এ কথাই বলেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, এই উম্মতের (আরবী) হচ্ছে রমযানের সিয়াম পালন করা। মুজাহিদ (রঃ), সাঈদ (রঃ), আতা (রঃ), আব্দুর রহমান (রঃ), যহ্হাক (রঃ) এবং সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা (রঃ) সবাই এই খেয়ালই রাখেন যে, দ্বারা রোযাদারদেরকে বুঝানো হয়েছে। হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে রমযানের রোযাদারগণ। আবূ আমর আল আবদীও (রঃ) এ কথাই বলেন। একটি মারফ হাদীসেও এটাই এসেছে। আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সিয়ামকারী লোকদেরকে বলা হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন । এটা মাওকুফ, অত্যধিক বিশুদ্ধ) উবাইদ ইবনে উমাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, নবী (সঃ)-কে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “তারা হচ্ছে সিয়ামকারী।” (এ হাদীসটি ‘মুরসাল’ এবং খুবই উত্তম। আর এটা বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধতম উক্তি) এই উক্তিও আছে যে, (আরবী) দ্বারা জিহাদকে বুঝানো হয়েছে। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) স্বীয় কিতাব সুনানের মধ্যে আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আবেদন করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে ‘সিয়াহাত’-এর অনুমতি দিন!” তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “আমার উম্মতের ‘সিয়াহাত’ হচ্ছে আল্লাহর পথে জিহাদ।”আম্মারা ইবনে গাযিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট (আরবী) সম্পর্কে আলোচনা করা হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্যে আল্লাহর পথে জিহাদ করাকে ও প্রত্যেক উঁচু স্থানের উপর তাকবীর পাঠ করাকে (আরবী) বানিয়েছেন।” ইকরামা (রঃ)-এর খেয়াল এই যে, এর দ্বারা বিদ্যা অন্বেষণকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। আর আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুহাজিরদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। এই উক্তি দু’টি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এখানে এটা মনে রাখার বিষয় যে, এই স্থালে ‘সিয়াহাত' দ্বারা ঐ অর্থ বুঝানো হয়নি যা কোন কোন দরবেশ ও বনবাসী প্রকৃতির লোক বুঝেছেন যে, এর অর্থ হচ্ছে ভূ-পৃষ্ঠে একাকী সফর করা এবং ঐ লোকগুলোর উদ্দেশ্য, যারা পাহাড়-পর্বতে, খাল-খন্দকে এবং বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় ও জনপদ থেকে পলায়ন করে। কেননা এরূপ করা শরীয়ত সম্মত নয়। তবে হ্যাঁ, যদি ফিৎনার যুগ হয় এবং দ্বীনের মধ্যে অসঙ্গতিপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর অবস্থার সৃষ্টি হয় তাহলে সেটা অন্য কথা। যেমন সহীহ বুখারীতে আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অচিরেই এমন এক যামানা আসবে যখন কোন ব্যক্তির সর্বোত্তম মাল হবে তার বকরীগুলো, যেগুলোকে সে পাহাড়-পর্বতে ও বৃষ্টিবর্ষণের স্থানে চরিয়ে নিয়ে বেড়াবে এবং ফিত্না হতে বাঁচার উদ্দেশ্যে নিজের দ্বীন নিয়ে পালাতে থাকবে।”(আরবী) দ্বারা আল্লাহর আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদেরকে বুঝানো হয়েছে। আর হাসান বসরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা ঐ সব। লোককে বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ যথাযথভাবে পালন করে এবং তার উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে।

আত-তাওবা 9:113

১১৩-১১৪ নং আয়াতের তাফসীর: মুসনাদে আহমাদে ইবনুল মুসাইয়াব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আবু তালিব যখন মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছিলেন, সেই সময় নবী (সঃ) তাঁর কাছে গমন করেন। ঐ সময় তাঁর কছে আবু জাহেল ও আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই উমাইয়া উপস্থিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বললেনঃ “হে চাচা! আপনি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠ করুন! এই বাক্যটিকেই আমি আপনার মার্জনার পক্ষে আল্লাহর নিকট হুজ্জত হিসেবে পেশ করবো।” তখন আবূ জাহেল এবং আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই উমাইয়া বললোঃ “হে আবু তালিব! তুমি আব্দুল মুত্তালিবের মিল্লাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে?” আবু তালিব তখন বললেনঃ “আমি আব্দুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরই রয়ে গেলাম।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “আমি ঐ পর্যন্ত আপনার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবো যে পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা আমাকে নিষেধ না করেন। আল্লাহ তাআলা তখন। (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ “নবী (সঃ) ও মুমিনদের জন্যে এটা জয়েয নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে।” (আরবী) আয়াতটিও এই সম্পর্কেই নাযিল হয়। অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! নিশ্চয়ই তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত করতে পার না, বরং আল্লাহই যাকে চান তাকে তিনি হিদায়াত করে থাকেন।” (২৮:৫৬)আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-আমি একজন লোককে দেখলাম যে, তার মুশরিক পিতা-মাতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছে। আমি তাকে বললাম, তুমি তোমার মুশরিক পিতা-মাতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছো! সে তখন বললোঃ “ইবরাহীম (আঃ) কি তার মুশরিক পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেনি?” আমি ঘটনাটি নবী (সঃ)-এর সামনে বর্ণনা করলাম। তখন (আরবী) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।(আরবী) -এর পরে (আরবী) -এই শব্দগুলোও বলা হয়েছে। কিন্তু আমি বলতে পারি না যে, সুফিয়ান (রঃ) স্বয়ং বলেছেন, কিংবা ইসরাঈল (রঃ) বলেছেন, অথবা স্বয়ং হাদীসেই এই শব্দগুলো রয়েছে। আমি বলি- এটা প্রমাণিত যে, এই শব্দগুলো মুজাহিদ (রঃ) বলেছেন।বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা এক সফরে নবী (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। আমরা এক জায়গায় অবতরণ করি। আমরা প্রায় এক হাজার আরোহী ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখানে দু'রাকাআত সালাত পড়েন। অতঃপর তিনি আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসেন। আমরা দেখলাম যে, তার চক্ষু দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। উমার (রাঃ) তার কাছে এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতা-মাতা আপনার উপর উৎসর্গিত হোন! আপনার কাঁদার কারণ কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেছিলমি যে, আমাকে যেন আমার মায়ের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু তিনি আমাকে অনুমতি দেননি। তখন আগুনের ভয়ে আমার মায়ের প্রতি আমার করুণার উদ্রেক হলো এবং এ কারণেই আমার চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। ইতিপূর্বে আমি তোমাদেরকে তিনটি জিনিস থেকে নিষেধ করেছিলাম। তোমাদেরকে আমি কবর যিয়ারত হতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এখন থেকে তোমরা কবর যিয়ারত করতে পার; উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, এর ফলে তোমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ হবে এবং তোমরা কল্যাণের দিকে ঝুঁকে পড়বে। ইতিপূর্বে আমি তোমাদেরকে কুরবানীর গোশত তিন দিনের বেশী জমা রাখতে নিষেধ করেছিলাম। এখন হতে তোমরা যত ইচ্ছা খেতে পার এবং যত দিন ইচ্ছা জমা করে রাখতে পার। ইতিপূর্বে আমি তোমাদেরকে চারটি পান-পাত্র থেকে নিষেধ। করেছিলাম। কিন্তু এখন থেকে তোমরা যে কোন পাত্র থেকেই পনি করতে পার। কিন্তু কোন নেশা আনয়নকারী জিনিস পান করো না। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সঃ) যখন মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন তখন তিনি পথে একটি কবরের পার্শ্বে এসে বসে পড়েন এবং কবরকে সম্বোধন করতে শুরু করেন। অতঃপর তিনি কাঁদতে কাঁদতে উঠে পড়েন। তখন আমরা বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি যা করেছেন তা আমরা দেখেছি। তিনি বলেনঃ “আমি আল্লাহ তাআলার নিকট আমার মায়ের কবর যিয়ারত করার অনুমতি চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। অতঃপর আমি তাঁর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চাইলে আমাকে অনুমতি দেয়া হয়নি।” সেই দিন তিনি এতো বেশী কেঁদেছিলেন যে, ইতিপূর্বে আমরা তাকে কখনো এতো কাঁদতে দেখিনি। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) গোরস্থানের দিকে বেরিয়ে যান। আমরাও তাঁর অনুসরণ করি। তিনি একটি কবরের পাশে বসে পড়েন। অতঃপর তিনি দীর্ঘক্ষণ ধরে মুনাজাত করতে থাকেন। তারপর তিনি কাঁদতে শুরু করেন। তাঁকে কাঁদতে দেখে আমরাও কাঁদতে থাকি। উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাঁর কাছে যান। তিনি উমার (রাঃ)-কে এবং আমাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কাঁদছিলে কেন?" আমরা উত্তরে বলি, আপনাকে কাদতে দেখে আমাদেরও কান্না এসে যায়। তিনি তখন বলেনঃ “আমি যে কবরের নিকট বসেছিলাম সেটা আমার মায়ের কবর । আমি আল্লাহ তাআলার নিকট এই কবর যিয়ারত করার অনুমতি চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে অনুমতি দান করেন।” (এই হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তাঁর তাফসীরে বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসটি অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে। ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর হাদীসটিরই প্রায় অনুরূপ। তবে তাতে এ কথাও রয়েছে- “আমি আমেনার জন্যে দুআ করার অনুমতি চাই। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা অনুমতি দেননি এবং তিনি উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। সুতরাং মাতার জন্যে ছেলের মন যেমন দুঃখিত হয় দ্রুপ আমার মনও দুঃখিত হয়েছে। আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করা থেকে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এখন হতে তোমরা কবর যিয়ারত করবে। কেননা, এটা আখিরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।”ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাবুকের যুদ্ধ হতে ফিরে আসেন ও উমরার নিয়ত করেন এবং যখন তিনি ‘গাসফান' ঘাঁটি হতে অবতরণ করেন তখন স্বীয় সাহাবীদেরকে নির্দেশ দেনঃ “তোমরা আকাবায় বিশ্রাম কর, আমি তোমাদের কাছে (কিছুক্ষণের মধ্যেই) ফিরে আসছি।” তিনি সেখানে তার মায়ের কবরের পার্শ্বে অবস্থান করলেন। সেখানে তিনি অনেকক্ষণ স্বীয় প্রতিপালকের নিকট মুনাজাত করলেন। তারপর তিনি কাঁদতে লাগলেন। এবং বহুক্ষণ ধরে কাঁদলেন। তাঁকে কাঁদতে দেখে লোকেরাও কাঁদতে লাগলেন। এবং বললেনঃ “এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জিনিস কাঁদালো? তার উম্মতের ব্যাপারে এমন নতুন কিছু কি ঘটেছে যা তিনি সহ্য করতে পারছেন না?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকদেরকে কাঁদতে দেখে তাদের কাছে আসলেন এবং জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা কাঁদছো কেন?” তারা উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে কাঁদতে দেখে আমাদেরও কান্না এসে গেল। আমাদের ধারণা হলো যে, আপনার উম্মতের ব্যাপারে হয়তো এমন নতুন কিছু ঘটেছে যা আপনি সহ্য করতে পারছেন না। তিনি তখন বললেন, না, না, এটা একটা সাধারণ ব্যাপার ছিল। ঘটনা এই যে, আমি আমার মায়ের কবরের পার্শ্বে অবস্থান করছিলাম এবং কিয়ামতের দিন তার শাফাআতের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেছিলাম। কিন্তু তিনি অনুমতি দিতে অস্বীকার করেছেন। এতে আমার অন্তর ফেটে যায়। কেননা তিনি আমার মা। তাই, আমি কাঁদছিলাম । এরপর জিবরাঈল (আঃ) আমার নিকট আগমন করেন এবং বলেন, ইবরাহীম (আঃ)-এর তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা শুধু এ কারণেই ছিল যে, তিনি তাঁর পিতার সাথে অঙ্গীকার করে বলেছিলেনঃ “আমি আপনার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারলেন যে, সে আল্লাহর শত্রু তখন তিনি তা থেকে বিরত থাকেন। সুতরাং হে নবী (সঃ)! ইবরাহীম (আঃ) যেমন তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা থেকে বিরত থেকেছিলেন, তদ্রুপ আপনিও আপনার মায়ের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা থেকে বিরত থাকুন।” তিনি তো আমার মা ছিলেন। কাজেই এটা আমার মনে রেখাপাত করবে না কেন? আর আমি আমার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করেছিলাম যে, তিনি আমার উম্মত হতে যেন চারটি জিনিসের বোঝা উঠিয়ে নেন। তখন অল্লিাহ তা'আলা দুটি শাস্তি উঠিয়ে নেন এবং দু'টি বাকী রেখে দেন। আমি দুআ করেছিলাম যে, আমার উম্মতের উপর যেন আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত না হয়, যেমন অন্যান্য উম্মতদের উপর বর্ষিত হয়েছিল।আমি প্রার্থনা করেছিলাম যে, শাস্তি হিসাবে আমার উম্মতকে যেন যমীনে ধ্বসিয়ে দেয়া না হয়। আরও প্রার্থনা করেছিলাম যে, আমার উম্মত যেন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে না পড়ে।আমার আর একটি প্রার্থনা ছিল এই যে, আমার উম্মত যেন পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হয়ে না পড়ে। আল্লাহ তা'আলা প্রথম দু’টি ককূল করেন বটে, কিন্তু পরের দু'টি কবুল করেননি।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাস্তা কেটে তাঁর মায়ের কবরের নিকট গিয়েছিলেন। কেননা তাঁর মায়ের কবর একটি টিলার নীচে ছিল। এ হাদীসটি গারীব। এর বর্ণনা বিস্ময়কর বটে। এর চেয়ে বেশী বিস্ময়কর ও অস্বীকারযোগ্য হচ্ছে ঐ রিওয়ায়াতটি যা খাতীব বাগদাদী তাঁর কিতাবুস সায়েক ওয়াল লাহিক’ নামক গ্রন্থে অপরিচিত সনদে বর্ণনা করেছেন এবং আয়েশা (রাঃ) হতে ইসনাদ জুড়ে দিয়েছেন। কাহিনীটি এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মাতা আমেনাকে জীবিত করেছিলেন এবং জীবিত হয়ে তিনি ঈমান এনেছিলেন । তারপর মারা গিয়েছিলেন। সাহীলীও ‘রাও’ এর মধ্যে অপরিচিত একটি দলের সনদে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিতা ও মাতা উভয়কেই জীবিত করেছিলেন এবং তাঁরা ঈমান এনেছিলেন। হাকিম ইবনে দাহইয়া (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি মিথ্যা। কুরআন ও ইজমা উভয়ই এটাকে রদ করছে। আল্লাহ তী'আলা স্বয়ং কুরআন কারীমে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ আর ঐ লোকদেরকে ক্ষমা করা হবে না যারা কুফরী অবস্থায় মারা গেছে।” (৪:১৮) আবু আবদিল্লাহ কুরতুবী (রঃ) বলেন। যে, এই হাদীসের দাবীর উপর চিন্তা করা হাক এবং তিনি বড় রকমের তীর মেরে এই দলীল পেশ করেছেন যে, এই নব জীবন দান ঠিক এই রূপেই হতে পারে যেমন আসরের সময় চলে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মু'জিযা বলে সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর পুনরায় বেরিয়ে আসে এবং তিনি আসরের সালাত আদায় করেন। এই দলীল দ্বারা তিনি ইবনে দাহ্ইয়ার উক্তি খণ্ডন করেছেন। সূর্য পুনঃউদয় হাদীসটি প্রমাণিত। কুরতবী বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিতা-মাতার পুনর্জীবন লাভ জ্ঞানের দিক দিয়েও অসম্ভব নয় এবং শরীয়তের দিক দিয়েও অসম্ভব নয়। আমি তো এ কথাও শুনেছি যে, আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচা আবু তালিবকেও জীবিত করেছিলেন এবং তিনি ঈমান এনেছিলেন।” আমি বলি-এটা হাদীসের বিশুদ্ধতার উপর নির্ভরশীল। যদি হাদীস বিশুদ্ধ হয় তবে তা মানতে কোন বাধা নেই। আর যদি হাদীসই সহীহ না হয় তবে কোন ঝগড়াই নেই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।আওফী (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) তাঁর মাতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার ইচ্ছা করেছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে তা থেকে নিষেধ করে দেন। তখন তিনি বলেন “ইবরাহীম খালীলুল্লাহ (আঃ) তো তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। এ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। এই আয়াতের ব্যাপারে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, লোকেরা তাদের মৃতদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতো। তখন (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। জনগণ তখন ঐ নাজায়েয ক্ষমা প্রার্থনা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু মুসলিমদেরকে তাদের জীবিত মুশরিক আত্মীয় স্বজনদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে নিষেধ করা হয়নি।কাতাদা (রঃ) এই আয়াত সম্পর্কে বলেন যে, নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের কতকগুলো লোক তাকে বললেন, হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আমাদের পূর্বপুরুষরা বড়ই সৎ লোক ছিল। তারা প্রতিবেশীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করতে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখতে অভ্যস্ত ছিল। তারা বন্দীদেরকে ছাড়িয়ে নেয়ার এবং জনগণের ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যাপারে টাকা পয়সা খরচ করতো। আমরা কি ঐ মৃতদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো না? উত্তরে নবী (সঃ) বললেনঃ “কেন করবে না? আল্লাহর শপথ! আমিও ইবরাহীম (আঃ)-এর মত আমার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো।” তখনই উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ)-কে ক্ষমার্হ সাব্যস্ত করে বলছেন যে, তাঁর ক্ষমা প্রার্থনা শুধুমাত্র ঐ ওয়াদার কারণে ছিল যা তিনি তাঁর পিতার সাথে করেছিলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমার উপর এমন কতকগুলো কালেমার অহী করলেন যা আমার কানে গুঞ্জরিত হচ্ছে এবং আমার অন্তরে বদ্ধমূল হয়েছে। আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীদের জন্যে আমি ক্ষমা প্রার্থনা না করি। আর যে ব্যক্তি তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাল সাদকা করে দিলো সেটা তার জন্যে বড় রকমের কল্যাণ লাভের কারণ হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তা থেকে বিরত থাকলো, সেটা তার জন্যে হবে বড়ই ক্ষতির কারণ। যারা প্রয়োজন মোতাবেক আহার করে ও খরচ করে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার কোন আপত্তি নেই।ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার একজন ইয়াহুদী মারা যায়। তার পুত্র ছিল মুসলিম। সে তার ঐ পিতার কাফন দাফনের জন্যে বেরিয়ে আসলো না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা জানতে পেরে বললেনঃ “তার পুত্রের উচিত ছিল তার (ইয়াহূদী) পিতার কাফন দাফনের ব্যবস্থা করে দেয়া এবং তার জীবিত থাকা পর্যন্ত তার কল্যাণের নিমিত্ত প্রার্থনা করা এবং মৃত্যুর পরে তার নিজের অবস্থার উপর সমর্পণ করা। এরপর আর তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা চলবে না।” এর সঠিকতার প্রমাণ পাওয়া যায় আলী (রাঃ)-এর নিম্ন বর্ণিত রিওয়ায়াত দ্বারা তিনি বলেন, যখন (আমার পিতা) আবু তালিব মারা যান তখন আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার পথভ্রষ্ট পিতৃব্য মারা গেছেন, সুতরাং এখন কি করা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাকে দাফন করে দাও। আর কিছুই করতে হবে না। এরপর আমার কাছে আসবে।” অতঃপর সম্পূর্ণ হাদীসটি উল্লেখ করা হয়। আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে যখন আবূ তালিবের জানাযা গমন করে তখন তিনি (আবেগে তার মৃতদেহকে) সম্বোধন করে বলেনঃ “হে চাচা! আমি আপনার আত্মীয়তার সম্পর্কের হক আদায় করে দিয়েছি।” আতা ইবনে আবু রাবাহ (রঃ) বলেনঃ “আমি কোন আহলৈ কিবলার জানাযার সালাত পড়তে বাধা দেবো না, যদিও সে ব্যভিচার দ্বারা গর্ভধারিণী হাবশী মহিলাও হয়। কেননা, জানাযার সালাত হচ্ছে দুআ। আর মুশরিক ছাড়া আর কারো জন্যে দুআ করতে আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেননি।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)রামিল (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ হুরাইরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপর দয়া করুন যে ব্যক্তি আবু হুরাইরা (রাঃ) ও তাঁর মাতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কৱে।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ “আর তাঁর পিতার জন্যে?” তিনি উত্তরে বললেন- “না, আমার পিতা মুশরিক অবস্থায় মারা গিয়েছে।”(আরবী) সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইবরাহীম (আঃ) তার পিতার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। তার মৃত্যুর পর যখন তিনি অবহিত হলেন যে, সে আল্লাহর শত্রু ছিল তখন তিনি তা থেকে বিরত থাকেন। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন ইবরাহীম (আঃ) যখন পিতার সাথে মিলিত হবেন তখন দেখবেন যে, সে অত্যন্ত ব্যাকুল ও উদ্বিগ্ন হয়ে ফিরছে। তিনি তার থেকে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ হয়ে যাবেন। ঐ সময় তাঁর পিতা তাঁকে বলবেঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! (দুনিয়ায়) আমি তোমার কথা মানিনি। কিন্তু আজ আমি তোমার কোন কথাই অমান্য করবো না।” তখন ইবরাহীম (আঃ) বলবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমার সাথে ওয়াদা করেননি যে, কিয়ামতের দিন আমাকে অপমানিত করবেন না? তাহলে আজকের দিন এর চেয়ে বড় অপমান আর কি হতে পারে (যে, আমার পিতা অত্যন্ত লাঞ্ছিতভাবে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে)?” তখন তাকে বলা হবেঃ “তোমার পিছন দিকে তাকাও।” তিনি তখন দেখতে পাবেন যে, একটি অর্ধমৃত জানোয়ার পড়ে রয়েছে এবং একটি বেজীর আকারে রূপান্তরিত হয়েছে। ওর পা ধরে টেনে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, শব্দের অর্থ হচ্ছে অত্যধিক প্রার্থনাকারী। শাদ্দাদ ইবনুল হাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা নবী (সঃ)-এর নিকট বসেছিলেন। এমন সময় একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! শব্দের অর্থ কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “অত্যন্ত বিনয় প্রকাশকারী ।” ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর অর্থ ‘দয়ালু’ বলেছেন। হাসনি বসরী (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ বান্দাদের প্রতি দয়ালু। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর অর্থ মুমিন বলেছেন। আলী ইবনে আবি তলিহা (রঃ) এর অর্থ তাওবাকারী মুমিন বলেছেন। উকবা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুন্নাজাদীন (রাঃ) নামক একটি লোক সম্পর্কে বলেনঃ “নিশ্চয়ই এই লোকটি (আরবী) বটে।” এর কারণ এই যে, কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই আল্লাহ তা'আলার নাম আসতো সেখানেই তিনি উচ্চৈঃস্বরে প্রার্থনা করতে শুরু করতেন। (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সকাল বেলায় যে ব্যক্তি তাসবীহ পাঠরত থাকে তাকেই (আরবী) বলা হয়। আবু আইয়ুব (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যে নিজের গুনাহকে স্মরণ করে ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসলিম ইবনে বায়ান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক খুব বেশী তাসবীহ পাঠ করতেন, তখন আল্লাহর নবী (সঃ) তাঁকে (আরবী) বলেন। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর নবী (সঃ) একটি লোককে দাফন করার পর বলেনঃ “আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন! তুমি তো একজন (আরবী) ছিলে।” এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল এই যে, লোকটি কুরআন কারীমের একজন বড় পাঠক ছিলেন। একটি লোক কাবা শরীফ তাওয়াফ করা অবস্থায় দুআ' করার সময় আহ! আহ! করতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তাঁর আলোচনা হলে তিনি বলেনঃ সে (আরবী) ছিল। আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাত্রে আমি বাইরে বের হয়ে দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ লোকটিকেই দাফন করছেন এবং তার সাথে প্রদীপ রয়েছে।” এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সর্বাপেক্ষা উত্তম কথা এই যে, শব্দের অর্থ হচ্ছে দুআ' বা প্রার্থনা। আর এটা বচন রীতির উপযুক্ত ও যোগ্যও বটে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করলেন যে, ইবরাহীম (আঃ)-এর দুআ’র ভিত্তি ছিল ওয়াদার উপর এবং তিনি অধিক প্রার্থনাকারী ছিলেন, দুর্ব্যবহারকারীর ব্যাপারে তিনি ছিলেন সহিষ্ণু। তাই তো তিনি পিতার নিকট থেকে কষ্ট পাওয়া সত্ত্বেও তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে (ইবরাহীমের আঃ পিতা) বললো, হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার মা’দগণ হতে ফিরে আছ (এবং আমাকেও বারণ করছে)? (স্মরণ রেখো) যদি তুমি এটা হতে নিবৃত্ত না হও, তবে আমি নিশ্চয়ই তোমাকে প্রস্তরাঘাতে মেরে। ফেলবো, আর দূর হয়ে যাও আমা হতে চিরতরে। ইবরাহীম বললো, আমার সালাম গ্রহণ কর, এখন আমি তোমার জন্যে আমার প্রতিপালকের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করবো; নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল।” (১৯:৪৬-৪৭) মোটকথা, পিতা থেকে কষ্ট পাওয়া সত্ত্বেও ইবরাহীম (আঃ) সহিষ্ণুতা অবলম্বন করেছিলেন। তিনি পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। তাই আল্লাহ তা'আলা তাকে (আরবী) বা সহিষ্ণু উপাধিতে ভূষিত করেছেন।

আত-তাওবা 9:114

১১৩-১১৪ নং আয়াতের তাফসীর: মুসনাদে আহমাদে ইবনুল মুসাইয়াব (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আবু তালিব যখন মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছিলেন, সেই সময় নবী (সঃ) তাঁর কাছে গমন করেন। ঐ সময় তাঁর কছে আবু জাহেল ও আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই উমাইয়া উপস্থিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বললেনঃ “হে চাচা! আপনি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠ করুন! এই বাক্যটিকেই আমি আপনার মার্জনার পক্ষে আল্লাহর নিকট হুজ্জত হিসেবে পেশ করবো।” তখন আবূ জাহেল এবং আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই উমাইয়া বললোঃ “হে আবু তালিব! তুমি আব্দুল মুত্তালিবের মিল্লাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে?” আবু তালিব তখন বললেনঃ “আমি আব্দুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরই রয়ে গেলাম।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “আমি ঐ পর্যন্ত আপনার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবো যে পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা আমাকে নিষেধ না করেন। আল্লাহ তাআলা তখন। (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ “নবী (সঃ) ও মুমিনদের জন্যে এটা জয়েয নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে।” (আরবী) আয়াতটিও এই সম্পর্কেই নাযিল হয়। অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! নিশ্চয়ই তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত করতে পার না, বরং আল্লাহই যাকে চান তাকে তিনি হিদায়াত করে থাকেন।” (২৮:৫৬)আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-আমি একজন লোককে দেখলাম যে, তার মুশরিক পিতা-মাতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছে। আমি তাকে বললাম, তুমি তোমার মুশরিক পিতা-মাতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছো! সে তখন বললোঃ “ইবরাহীম (আঃ) কি তার মুশরিক পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেনি?” আমি ঘটনাটি নবী (সঃ)-এর সামনে বর্ণনা করলাম। তখন (আরবী) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।(আরবী) -এর পরে (আরবী) -এই শব্দগুলোও বলা হয়েছে। কিন্তু আমি বলতে পারি না যে, সুফিয়ান (রঃ) স্বয়ং বলেছেন, কিংবা ইসরাঈল (রঃ) বলেছেন, অথবা স্বয়ং হাদীসেই এই শব্দগুলো রয়েছে। আমি বলি- এটা প্রমাণিত যে, এই শব্দগুলো মুজাহিদ (রঃ) বলেছেন।বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা এক সফরে নবী (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। আমরা এক জায়গায় অবতরণ করি। আমরা প্রায় এক হাজার আরোহী ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখানে দু'রাকাআত সালাত পড়েন। অতঃপর তিনি আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসেন। আমরা দেখলাম যে, তার চক্ষু দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। উমার (রাঃ) তার কাছে এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতা-মাতা আপনার উপর উৎসর্গিত হোন! আপনার কাঁদার কারণ কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেছিলমি যে, আমাকে যেন আমার মায়ের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু তিনি আমাকে অনুমতি দেননি। তখন আগুনের ভয়ে আমার মায়ের প্রতি আমার করুণার উদ্রেক হলো এবং এ কারণেই আমার চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। ইতিপূর্বে আমি তোমাদেরকে তিনটি জিনিস থেকে নিষেধ করেছিলাম। তোমাদেরকে আমি কবর যিয়ারত হতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এখন থেকে তোমরা কবর যিয়ারত করতে পার; উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, এর ফলে তোমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ হবে এবং তোমরা কল্যাণের দিকে ঝুঁকে পড়বে। ইতিপূর্বে আমি তোমাদেরকে কুরবানীর গোশত তিন দিনের বেশী জমা রাখতে নিষেধ করেছিলাম। এখন হতে তোমরা যত ইচ্ছা খেতে পার এবং যত দিন ইচ্ছা জমা করে রাখতে পার। ইতিপূর্বে আমি তোমাদেরকে চারটি পান-পাত্র থেকে নিষেধ। করেছিলাম। কিন্তু এখন থেকে তোমরা যে কোন পাত্র থেকেই পনি করতে পার। কিন্তু কোন নেশা আনয়নকারী জিনিস পান করো না। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সঃ) যখন মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন তখন তিনি পথে একটি কবরের পার্শ্বে এসে বসে পড়েন এবং কবরকে সম্বোধন করতে শুরু করেন। অতঃপর তিনি কাঁদতে কাঁদতে উঠে পড়েন। তখন আমরা বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি যা করেছেন তা আমরা দেখেছি। তিনি বলেনঃ “আমি আল্লাহ তাআলার নিকট আমার মায়ের কবর যিয়ারত করার অনুমতি চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। অতঃপর আমি তাঁর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চাইলে আমাকে অনুমতি দেয়া হয়নি।” সেই দিন তিনি এতো বেশী কেঁদেছিলেন যে, ইতিপূর্বে আমরা তাকে কখনো এতো কাঁদতে দেখিনি। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) গোরস্থানের দিকে বেরিয়ে যান। আমরাও তাঁর অনুসরণ করি। তিনি একটি কবরের পাশে বসে পড়েন। অতঃপর তিনি দীর্ঘক্ষণ ধরে মুনাজাত করতে থাকেন। তারপর তিনি কাঁদতে শুরু করেন। তাঁকে কাঁদতে দেখে আমরাও কাঁদতে থাকি। উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) তাঁর কাছে যান। তিনি উমার (রাঃ)-কে এবং আমাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কাঁদছিলে কেন?" আমরা উত্তরে বলি, আপনাকে কাদতে দেখে আমাদেরও কান্না এসে যায়। তিনি তখন বলেনঃ “আমি যে কবরের নিকট বসেছিলাম সেটা আমার মায়ের কবর । আমি আল্লাহ তাআলার নিকট এই কবর যিয়ারত করার অনুমতি চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে অনুমতি দান করেন।” (এই হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তাঁর তাফসীরে বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসটি অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে। ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর হাদীসটিরই প্রায় অনুরূপ। তবে তাতে এ কথাও রয়েছে- “আমি আমেনার জন্যে দুআ করার অনুমতি চাই। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা অনুমতি দেননি এবং তিনি উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। সুতরাং মাতার জন্যে ছেলের মন যেমন দুঃখিত হয় দ্রুপ আমার মনও দুঃখিত হয়েছে। আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করা থেকে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এখন হতে তোমরা কবর যিয়ারত করবে। কেননা, এটা আখিরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।”ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাবুকের যুদ্ধ হতে ফিরে আসেন ও উমরার নিয়ত করেন এবং যখন তিনি ‘গাসফান' ঘাঁটি হতে অবতরণ করেন তখন স্বীয় সাহাবীদেরকে নির্দেশ দেনঃ “তোমরা আকাবায় বিশ্রাম কর, আমি তোমাদের কাছে (কিছুক্ষণের মধ্যেই) ফিরে আসছি।” তিনি সেখানে তার মায়ের কবরের পার্শ্বে অবস্থান করলেন। সেখানে তিনি অনেকক্ষণ স্বীয় প্রতিপালকের নিকট মুনাজাত করলেন। তারপর তিনি কাঁদতে লাগলেন। এবং বহুক্ষণ ধরে কাঁদলেন। তাঁকে কাঁদতে দেখে লোকেরাও কাঁদতে লাগলেন। এবং বললেনঃ “এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জিনিস কাঁদালো? তার উম্মতের ব্যাপারে এমন নতুন কিছু কি ঘটেছে যা তিনি সহ্য করতে পারছেন না?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকদেরকে কাঁদতে দেখে তাদের কাছে আসলেন এবং জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা কাঁদছো কেন?” তারা উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে কাঁদতে দেখে আমাদেরও কান্না এসে গেল। আমাদের ধারণা হলো যে, আপনার উম্মতের ব্যাপারে হয়তো এমন নতুন কিছু ঘটেছে যা আপনি সহ্য করতে পারছেন না। তিনি তখন বললেন, না, না, এটা একটা সাধারণ ব্যাপার ছিল। ঘটনা এই যে, আমি আমার মায়ের কবরের পার্শ্বে অবস্থান করছিলাম এবং কিয়ামতের দিন তার শাফাআতের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেছিলাম। কিন্তু তিনি অনুমতি দিতে অস্বীকার করেছেন। এতে আমার অন্তর ফেটে যায়। কেননা তিনি আমার মা। তাই, আমি কাঁদছিলাম । এরপর জিবরাঈল (আঃ) আমার নিকট আগমন করেন এবং বলেন, ইবরাহীম (আঃ)-এর তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা শুধু এ কারণেই ছিল যে, তিনি তাঁর পিতার সাথে অঙ্গীকার করে বলেছিলেনঃ “আমি আপনার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারলেন যে, সে আল্লাহর শত্রু তখন তিনি তা থেকে বিরত থাকেন। সুতরাং হে নবী (সঃ)! ইবরাহীম (আঃ) যেমন তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা থেকে বিরত থেকেছিলেন, তদ্রুপ আপনিও আপনার মায়ের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা থেকে বিরত থাকুন।” তিনি তো আমার মা ছিলেন। কাজেই এটা আমার মনে রেখাপাত করবে না কেন? আর আমি আমার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করেছিলাম যে, তিনি আমার উম্মত হতে যেন চারটি জিনিসের বোঝা উঠিয়ে নেন। তখন অল্লিাহ তা'আলা দুটি শাস্তি উঠিয়ে নেন এবং দু'টি বাকী রেখে দেন। আমি দুআ করেছিলাম যে, আমার উম্মতের উপর যেন আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত না হয়, যেমন অন্যান্য উম্মতদের উপর বর্ষিত হয়েছিল।আমি প্রার্থনা করেছিলাম যে, শাস্তি হিসাবে আমার উম্মতকে যেন যমীনে ধ্বসিয়ে দেয়া না হয়। আরও প্রার্থনা করেছিলাম যে, আমার উম্মত যেন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে না পড়ে।আমার আর একটি প্রার্থনা ছিল এই যে, আমার উম্মত যেন পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হয়ে না পড়ে। আল্লাহ তা'আলা প্রথম দু’টি ককূল করেন বটে, কিন্তু পরের দু'টি কবুল করেননি।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাস্তা কেটে তাঁর মায়ের কবরের নিকট গিয়েছিলেন। কেননা তাঁর মায়ের কবর একটি টিলার নীচে ছিল। এ হাদীসটি গারীব। এর বর্ণনা বিস্ময়কর বটে। এর চেয়ে বেশী বিস্ময়কর ও অস্বীকারযোগ্য হচ্ছে ঐ রিওয়ায়াতটি যা খাতীব বাগদাদী তাঁর কিতাবুস সায়েক ওয়াল লাহিক’ নামক গ্রন্থে অপরিচিত সনদে বর্ণনা করেছেন এবং আয়েশা (রাঃ) হতে ইসনাদ জুড়ে দিয়েছেন। কাহিনীটি এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মাতা আমেনাকে জীবিত করেছিলেন এবং জীবিত হয়ে তিনি ঈমান এনেছিলেন । তারপর মারা গিয়েছিলেন। সাহীলীও ‘রাও’ এর মধ্যে অপরিচিত একটি দলের সনদে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিতা ও মাতা উভয়কেই জীবিত করেছিলেন এবং তাঁরা ঈমান এনেছিলেন। হাকিম ইবনে দাহইয়া (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি মিথ্যা। কুরআন ও ইজমা উভয়ই এটাকে রদ করছে। আল্লাহ তী'আলা স্বয়ং কুরআন কারীমে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ আর ঐ লোকদেরকে ক্ষমা করা হবে না যারা কুফরী অবস্থায় মারা গেছে।” (৪:১৮) আবু আবদিল্লাহ কুরতুবী (রঃ) বলেন। যে, এই হাদীসের দাবীর উপর চিন্তা করা হাক এবং তিনি বড় রকমের তীর মেরে এই দলীল পেশ করেছেন যে, এই নব জীবন দান ঠিক এই রূপেই হতে পারে যেমন আসরের সময় চলে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মু'জিযা বলে সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর পুনরায় বেরিয়ে আসে এবং তিনি আসরের সালাত আদায় করেন। এই দলীল দ্বারা তিনি ইবনে দাহ্ইয়ার উক্তি খণ্ডন করেছেন। সূর্য পুনঃউদয় হাদীসটি প্রমাণিত। কুরতবী বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিতা-মাতার পুনর্জীবন লাভ জ্ঞানের দিক দিয়েও অসম্ভব নয় এবং শরীয়তের দিক দিয়েও অসম্ভব নয়। আমি তো এ কথাও শুনেছি যে, আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচা আবু তালিবকেও জীবিত করেছিলেন এবং তিনি ঈমান এনেছিলেন।” আমি বলি-এটা হাদীসের বিশুদ্ধতার উপর নির্ভরশীল। যদি হাদীস বিশুদ্ধ হয় তবে তা মানতে কোন বাধা নেই। আর যদি হাদীসই সহীহ না হয় তবে কোন ঝগড়াই নেই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।আওফী (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) তাঁর মাতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার ইচ্ছা করেছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে তা থেকে নিষেধ করে দেন। তখন তিনি বলেন “ইবরাহীম খালীলুল্লাহ (আঃ) তো তাঁর পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। এ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। এই আয়াতের ব্যাপারে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, লোকেরা তাদের মৃতদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতো। তখন (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। জনগণ তখন ঐ নাজায়েয ক্ষমা প্রার্থনা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু মুসলিমদেরকে তাদের জীবিত মুশরিক আত্মীয় স্বজনদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে নিষেধ করা হয়নি।কাতাদা (রঃ) এই আয়াত সম্পর্কে বলেন যে, নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের কতকগুলো লোক তাকে বললেন, হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আমাদের পূর্বপুরুষরা বড়ই সৎ লোক ছিল। তারা প্রতিবেশীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করতে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখতে অভ্যস্ত ছিল। তারা বন্দীদেরকে ছাড়িয়ে নেয়ার এবং জনগণের ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যাপারে টাকা পয়সা খরচ করতো। আমরা কি ঐ মৃতদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো না? উত্তরে নবী (সঃ) বললেনঃ “কেন করবে না? আল্লাহর শপথ! আমিও ইবরাহীম (আঃ)-এর মত আমার পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবো।” তখনই উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ)-কে ক্ষমার্হ সাব্যস্ত করে বলছেন যে, তাঁর ক্ষমা প্রার্থনা শুধুমাত্র ঐ ওয়াদার কারণে ছিল যা তিনি তাঁর পিতার সাথে করেছিলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমার উপর এমন কতকগুলো কালেমার অহী করলেন যা আমার কানে গুঞ্জরিত হচ্ছে এবং আমার অন্তরে বদ্ধমূল হয়েছে। আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীদের জন্যে আমি ক্ষমা প্রার্থনা না করি। আর যে ব্যক্তি তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাল সাদকা করে দিলো সেটা তার জন্যে বড় রকমের কল্যাণ লাভের কারণ হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তা থেকে বিরত থাকলো, সেটা তার জন্যে হবে বড়ই ক্ষতির কারণ। যারা প্রয়োজন মোতাবেক আহার করে ও খরচ করে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার কোন আপত্তি নেই।ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার একজন ইয়াহুদী মারা যায়। তার পুত্র ছিল মুসলিম। সে তার ঐ পিতার কাফন দাফনের জন্যে বেরিয়ে আসলো না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটা জানতে পেরে বললেনঃ “তার পুত্রের উচিত ছিল তার (ইয়াহূদী) পিতার কাফন দাফনের ব্যবস্থা করে দেয়া এবং তার জীবিত থাকা পর্যন্ত তার কল্যাণের নিমিত্ত প্রার্থনা করা এবং মৃত্যুর পরে তার নিজের অবস্থার উপর সমর্পণ করা। এরপর আর তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা চলবে না।” এর সঠিকতার প্রমাণ পাওয়া যায় আলী (রাঃ)-এর নিম্ন বর্ণিত রিওয়ায়াত দ্বারা তিনি বলেন, যখন (আমার পিতা) আবু তালিব মারা যান তখন আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার পথভ্রষ্ট পিতৃব্য মারা গেছেন, সুতরাং এখন কি করা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাকে দাফন করে দাও। আর কিছুই করতে হবে না। এরপর আমার কাছে আসবে।” অতঃপর সম্পূর্ণ হাদীসটি উল্লেখ করা হয়। আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে যখন আবূ তালিবের জানাযা গমন করে তখন তিনি (আবেগে তার মৃতদেহকে) সম্বোধন করে বলেনঃ “হে চাচা! আমি আপনার আত্মীয়তার সম্পর্কের হক আদায় করে দিয়েছি।” আতা ইবনে আবু রাবাহ (রঃ) বলেনঃ “আমি কোন আহলৈ কিবলার জানাযার সালাত পড়তে বাধা দেবো না, যদিও সে ব্যভিচার দ্বারা গর্ভধারিণী হাবশী মহিলাও হয়। কেননা, জানাযার সালাত হচ্ছে দুআ। আর মুশরিক ছাড়া আর কারো জন্যে দুআ করতে আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেননি।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)রামিল (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ হুরাইরা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপর দয়া করুন যে ব্যক্তি আবু হুরাইরা (রাঃ) ও তাঁর মাতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কৱে।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ “আর তাঁর পিতার জন্যে?” তিনি উত্তরে বললেন- “না, আমার পিতা মুশরিক অবস্থায় মারা গিয়েছে।”(আরবী) সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইবরাহীম (আঃ) তার পিতার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। তার মৃত্যুর পর যখন তিনি অবহিত হলেন যে, সে আল্লাহর শত্রু ছিল তখন তিনি তা থেকে বিরত থাকেন। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন ইবরাহীম (আঃ) যখন পিতার সাথে মিলিত হবেন তখন দেখবেন যে, সে অত্যন্ত ব্যাকুল ও উদ্বিগ্ন হয়ে ফিরছে। তিনি তার থেকে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ হয়ে যাবেন। ঐ সময় তাঁর পিতা তাঁকে বলবেঃ “হে ইবরাহীম (আঃ)! (দুনিয়ায়) আমি তোমার কথা মানিনি। কিন্তু আজ আমি তোমার কোন কথাই অমান্য করবো না।” তখন ইবরাহীম (আঃ) বলবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমার সাথে ওয়াদা করেননি যে, কিয়ামতের দিন আমাকে অপমানিত করবেন না? তাহলে আজকের দিন এর চেয়ে বড় অপমান আর কি হতে পারে (যে, আমার পিতা অত্যন্ত লাঞ্ছিতভাবে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে)?” তখন তাকে বলা হবেঃ “তোমার পিছন দিকে তাকাও।” তিনি তখন দেখতে পাবেন যে, একটি অর্ধমৃত জানোয়ার পড়ে রয়েছে এবং একটি বেজীর আকারে রূপান্তরিত হয়েছে। ওর পা ধরে টেনে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ (আরবী) ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, শব্দের অর্থ হচ্ছে অত্যধিক প্রার্থনাকারী। শাদ্দাদ ইবনুল হাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা নবী (সঃ)-এর নিকট বসেছিলেন। এমন সময় একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! শব্দের অর্থ কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “অত্যন্ত বিনয় প্রকাশকারী ।” ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর অর্থ ‘দয়ালু’ বলেছেন। হাসনি বসরী (রঃ), কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ বান্দাদের প্রতি দয়ালু। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর অর্থ মুমিন বলেছেন। আলী ইবনে আবি তলিহা (রঃ) এর অর্থ তাওবাকারী মুমিন বলেছেন। উকবা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুন্নাজাদীন (রাঃ) নামক একটি লোক সম্পর্কে বলেনঃ “নিশ্চয়ই এই লোকটি (আরবী) বটে।” এর কারণ এই যে, কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই আল্লাহ তা'আলার নাম আসতো সেখানেই তিনি উচ্চৈঃস্বরে প্রার্থনা করতে শুরু করতেন। (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সকাল বেলায় যে ব্যক্তি তাসবীহ পাঠরত থাকে তাকেই (আরবী) বলা হয়। আবু আইয়ুব (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যে নিজের গুনাহকে স্মরণ করে ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসলিম ইবনে বায়ান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক খুব বেশী তাসবীহ পাঠ করতেন, তখন আল্লাহর নবী (সঃ) তাঁকে (আরবী) বলেন। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর নবী (সঃ) একটি লোককে দাফন করার পর বলেনঃ “আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন! তুমি তো একজন (আরবী) ছিলে।” এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল এই যে, লোকটি কুরআন কারীমের একজন বড় পাঠক ছিলেন। একটি লোক কাবা শরীফ তাওয়াফ করা অবস্থায় দুআ' করার সময় আহ! আহ! করতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তাঁর আলোচনা হলে তিনি বলেনঃ সে (আরবী) ছিল। আবু যার (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাত্রে আমি বাইরে বের হয়ে দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ লোকটিকেই দাফন করছেন এবং তার সাথে প্রদীপ রয়েছে।” এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সর্বাপেক্ষা উত্তম কথা এই যে, শব্দের অর্থ হচ্ছে দুআ' বা প্রার্থনা। আর এটা বচন রীতির উপযুক্ত ও যোগ্যও বটে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করলেন যে, ইবরাহীম (আঃ)-এর দুআ’র ভিত্তি ছিল ওয়াদার উপর এবং তিনি অধিক প্রার্থনাকারী ছিলেন, দুর্ব্যবহারকারীর ব্যাপারে তিনি ছিলেন সহিষ্ণু। তাই তো তিনি পিতার নিকট থেকে কষ্ট পাওয়া সত্ত্বেও তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে (ইবরাহীমের আঃ পিতা) বললো, হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার মা’দগণ হতে ফিরে আছ (এবং আমাকেও বারণ করছে)? (স্মরণ রেখো) যদি তুমি এটা হতে নিবৃত্ত না হও, তবে আমি নিশ্চয়ই তোমাকে প্রস্তরাঘাতে মেরে। ফেলবো, আর দূর হয়ে যাও আমা হতে চিরতরে। ইবরাহীম বললো, আমার সালাম গ্রহণ কর, এখন আমি তোমার জন্যে আমার প্রতিপালকের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করবো; নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল।” (১৯:৪৬-৪৭) মোটকথা, পিতা থেকে কষ্ট পাওয়া সত্ত্বেও ইবরাহীম (আঃ) সহিষ্ণুতা অবলম্বন করেছিলেন। তিনি পিতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। তাই আল্লাহ তা'আলা তাকে (আরবী) বা সহিষ্ণু উপাধিতে ভূষিত করেছেন।

আত-তাওবা 9:115

১১৫-১১৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় মহান সত্তা ও ন্যায়নীতিপূর্ণ হিকমত সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি যেই পর্যন্ত না কোন কওমের নিকট রাসূল পাঠিয়ে ফিতনা খতম করেন সেই পর্যন্ত তাদেরকে পথভ্রষ্টতার জন্যে ছেড়ে দেন। যেমন তিনি অন্য এক জায়গায় বলেনঃ “সামূদ সম্প্রদায়কে আমি পথ প্রদর্শন করেছিলাম।” মুজাহিদ (রঃ) আল্লাহ তাআলার (আরবী) -এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, মৃত মুশরিকদের জন্যে মুমিনদের ক্ষমা প্রার্থনা করা। ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে মহিমান্বিত আল্লাহর বর্ণনাটি হচ্ছে বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। আর তাদের তাঁর আনুগত্য এবং অবাধ্যতার কাজটি হচ্ছে সাধারণ । অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমাদের ইচ্ছার স্বাধীনতা রয়েছে। ইচ্ছানুযায়ী হয় তোমরা আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার কর, না হয় তার নাফরমানী কর। তোমরা এটা কর বা ছেড়ে দাও। কিন্তু ক্ষমা প্রার্থনা পরিত্যাগ করার বর্ণনাটি সাধারণ নয়, বরং বিশিষ্ট।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ পাক বলেন, যদি তোমরা তোমাদের মধ্যস্থিত মৃত মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর তবে কেন তিনি। তোমাদের উপর পথভ্রষ্টতার ফায়সালা দিবেন না? কেননা তিনি আমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়নের তাওফীক দিয়েছেন। আর তোমাদেরকে নিষিদ্ধ বিষয় হতে দূরে রেখেছেন এবং তোমরা তা থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তু এর পূর্বে নয় যে, তিনি। ঐ নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর নিকৃষ্টতা বর্ণনা করে দিয়েছেন এবং তোমরা ঐগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। ঐ অবস্থায় কি করে তিনি তোমাদের উপর পথভ্রষ্টতার হুকুম লাগাতে পারেন? কেননা, আনুগত্য ও অবাধ্যতা তো আদেশ ও নিষেধের সাথে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু যে ঈমানই আনেনি এবং বিরতও থাকেনি, তাকে অনুগত বলা যাবে না এবং অবাধ্যও বলা চলবে না।আল্লাহ তা'আলার উক্তি-“আল্লাহরই রাজত্ব রয়েছে আসমানসমূহে ও যমীনে এবং তিনিই জীবন দান করেন ও তিনিই মৃত্যু ঘটিয়ে থাকেন।” এটা দ্বারা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে কাফির ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রতি উৎসাহ ও উদ্দীপনা প্রদান করা হয়েছে এবং এ কথা বুঝানো হয়েছে যে, তাদের আল্লাহ তা'আলার সাহায্যের উপর ভরসা করা উচিত এবং তার শত্রুদেরকে ভয় করা মোটেই উচিত নয়। কেননা তারা আল্লাহকে ছেড়ে দিয়েছে। সুতরাং তাদের না কোন বন্ধু আছে, না আছে কোন সাহায্যকারী ।হাকীম ইবনে হিযাম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে বসেছিলাম। এমন সময় তিনি বললেনঃ “আমি যা শুনতে পাচ্ছি তা তোমরা শুনতে পাচ্ছ কি?” তাঁরা (সাহাবীগণ) বললেনঃ “আমরা তো কিছুই শুনতে পাচ্ছিনে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আমি আকাশের চড় চড় শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আকাশ চড় চড় কেন করবে না? তাতে আধহাত পরিমাণও জায়গা এমন নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা সিজদা বা দাঁড়ানো অবস্থায় বিদ্যমান না রয়েছেন।” (এই হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কা’বুল আহবার (রঃ) বলেন যে, যমীনের মধ্যে সূঁচের ছিদ্র পরিমাণও এমন জায়গা নেই যেখানে কোন ফেরেশতা আল্লাহর তাসবীহ্ পাঠে রত না আছেন। আর আকাশের ফেরেশতাদের সংখ্যা মাটির অণু-পরমাণুর সংখ্যা অপেক্ষাও বেশী। আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের পায়ের গিট হতে পদনালি পর্যন্ত জায়গার ব্যবধান একশ বছরের দূরত্ব।

আত-তাওবা 9:116

১১৫-১১৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় মহান সত্তা ও ন্যায়নীতিপূর্ণ হিকমত সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি যেই পর্যন্ত না কোন কওমের নিকট রাসূল পাঠিয়ে ফিতনা খতম করেন সেই পর্যন্ত তাদেরকে পথভ্রষ্টতার জন্যে ছেড়ে দেন। যেমন তিনি অন্য এক জায়গায় বলেনঃ “সামূদ সম্প্রদায়কে আমি পথ প্রদর্শন করেছিলাম।” মুজাহিদ (রঃ) আল্লাহ তাআলার (আরবী) -এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, মৃত মুশরিকদের জন্যে মুমিনদের ক্ষমা প্রার্থনা করা। ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে মহিমান্বিত আল্লাহর বর্ণনাটি হচ্ছে বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। আর তাদের তাঁর আনুগত্য এবং অবাধ্যতার কাজটি হচ্ছে সাধারণ । অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমাদের ইচ্ছার স্বাধীনতা রয়েছে। ইচ্ছানুযায়ী হয় তোমরা আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার কর, না হয় তার নাফরমানী কর। তোমরা এটা কর বা ছেড়ে দাও। কিন্তু ক্ষমা প্রার্থনা পরিত্যাগ করার বর্ণনাটি সাধারণ নয়, বরং বিশিষ্ট।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ পাক বলেন, যদি তোমরা তোমাদের মধ্যস্থিত মৃত মুশরিকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর তবে কেন তিনি। তোমাদের উপর পথভ্রষ্টতার ফায়সালা দিবেন না? কেননা তিনি আমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়নের তাওফীক দিয়েছেন। আর তোমাদেরকে নিষিদ্ধ বিষয় হতে দূরে রেখেছেন এবং তোমরা তা থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তু এর পূর্বে নয় যে, তিনি। ঐ নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর নিকৃষ্টতা বর্ণনা করে দিয়েছেন এবং তোমরা ঐগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। ঐ অবস্থায় কি করে তিনি তোমাদের উপর পথভ্রষ্টতার হুকুম লাগাতে পারেন? কেননা, আনুগত্য ও অবাধ্যতা তো আদেশ ও নিষেধের সাথে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু যে ঈমানই আনেনি এবং বিরতও থাকেনি, তাকে অনুগত বলা যাবে না এবং অবাধ্যও বলা চলবে না।আল্লাহ তা'আলার উক্তি-“আল্লাহরই রাজত্ব রয়েছে আসমানসমূহে ও যমীনে এবং তিনিই জীবন দান করেন ও তিনিই মৃত্যু ঘটিয়ে থাকেন।” এটা দ্বারা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে কাফির ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রতি উৎসাহ ও উদ্দীপনা প্রদান করা হয়েছে এবং এ কথা বুঝানো হয়েছে যে, তাদের আল্লাহ তা'আলার সাহায্যের উপর ভরসা করা উচিত এবং তার শত্রুদেরকে ভয় করা মোটেই উচিত নয়। কেননা তারা আল্লাহকে ছেড়ে দিয়েছে। সুতরাং তাদের না কোন বন্ধু আছে, না আছে কোন সাহায্যকারী ।হাকীম ইবনে হিযাম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে বসেছিলাম। এমন সময় তিনি বললেনঃ “আমি যা শুনতে পাচ্ছি তা তোমরা শুনতে পাচ্ছ কি?” তাঁরা (সাহাবীগণ) বললেনঃ “আমরা তো কিছুই শুনতে পাচ্ছিনে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আমি আকাশের চড় চড় শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আকাশ চড় চড় কেন করবে না? তাতে আধহাত পরিমাণও জায়গা এমন নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা সিজদা বা দাঁড়ানো অবস্থায় বিদ্যমান না রয়েছেন।” (এই হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কা’বুল আহবার (রঃ) বলেন যে, যমীনের মধ্যে সূঁচের ছিদ্র পরিমাণও এমন জায়গা নেই যেখানে কোন ফেরেশতা আল্লাহর তাসবীহ্ পাঠে রত না আছেন। আর আকাশের ফেরেশতাদের সংখ্যা মাটির অণু-পরমাণুর সংখ্যা অপেক্ষাও বেশী। আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের পায়ের গিট হতে পদনালি পর্যন্ত জায়গার ব্যবধান একশ বছরের দূরত্ব।

আত-তাওবা 9:117

মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এ আয়াতটি তাবুকের যুদ্ধ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ জনগণ যখন তাবুকের যুদ্ধে বের হন তখন কঠিন গরমের সময় ছিল। সেটা ছিল দুর্ভিক্ষের বছর এবং পানি ও পাথেয়ের বডই সংকট ছিল। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যখন মুজাহিদরা তাবুকের পথে যাত্রা শুরু করেন তখন ছিল কঠিন গরমের সময়। মুজাহিদরা কত বড় বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন তা আল্লাহ তা'আলাই জানেন। এমন কি বলা হয় যে, একটি খেজুরকে দু'টুকরা করে দু’জন মুজাহিদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হতো, খেজুর হাতে হাতে বাড়িতে দেয়া হতো। একজন কিছু চুষে নিয়ে পানি পান করতেন। তারপর অন্য একজন ঐ খেজুর চুষতেন এবং পরে পানি পান করতেন। এভাবেই তারা সান্ত্বনা লাভ করতেন। অতঃপর মহান আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া পরবশ হন। তারা যুদ্ধক্ষেত্র হতে ফিরে আসেন।আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-কে তাবুকের সংকট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমরা তাকূকের উদ্দেশ্যে নবী (সঃ)-এর সাথে বের হই। কঠিন গরমের মৌসুম ছিল । আমরা এক জায়গায় অবস্থান করি। সেখানে আমরা পিপাসায় এমন কাতর হয়ে পড়ি যে, মনে হলো আমরা প্রাণে আর বাঁচবো না। কেউ পানির খোঁজে বের হলে সে বিশ্বাস করে নিতো যে, ফিরবার পূর্বেই তার মৃত্যু ঘটে যাবে। লোকেরা উট যবেহ করতো। উটের পাকস্থলীর এক জায়গায় পানি সঞ্চিত থাকতো। তারা তা বের করে নিয়ে পান করতো। তখন আবু বকর (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার দুআ তো ককূল হওয়ার যোগ্য। সুতরাং আপনি আমাদের জন্যে দুআ করেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরা কি এটাই চাও?” আবু বকর (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন দুআ'র জন্যে তার হাত দু'টি উঠালেন। দুআ' শেষ না হতেই আকাশ মেঘে ছেয়ে গেল এবং মুষলধারে বৃষ্টি হতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি থামলো। জনগণ পানি দ্বারা তাদের পাত্রগুলো ভর্তি করে নিলো। তারপর আমরা সেখান থেকে প্রস্থান করলাম। দেখলাম যে, সামনে আর কোন জায়গায় বৃষ্টি বর্ষিত হয়নি।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) আল্লাহ তা'আলার (আরবী) এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, এই আয়াতের (আরবী) শব্দ দ্বারা জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় ব্যয়, পথ খরচ এবং পানির সংকীর্ণতা বুঝানো হয়েছে।(আরবী) অর্থাৎ এরপর যে, তাদের মধ্যকার এক দলের অন্তর বিচলিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তারা সত্যের পথ থেকে সরে পড়ার কাছাকাছি হয়েছিল। তারা এই সফরে এত বড় বিপদের সম্মুখীন হয়েছিল যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দ্বীনের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে উঠেছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি দয়া করেন এবং তাদেরকে তাঁর দিকে ফিরে আসার তাওফীক দান করেন। আর তাদেরকে দ্বীনের উপর অটল থাকার মর্যাদা প্রদান করেন। তিনি বড়ই স্নেহশীল ও করুণাময়।

আত-তাওবা 9:118

১১৮-১১৯ নং আয়াতের তাফসীর: আব্দুল্লাহ ইবনে কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) তাবুকের যুদ্ধে তার অংশগ্রহণ না করার কাহিনী এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গমন না করার ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, তাবুকের যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোন যুদ্ধে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গ লাভ থেকে বঞ্চিত হইনি। অবশ্য বদর যুদ্ধেও আমি শরীক হতে পারিনি। তবে এ যুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করতে পারেনি তাদের প্রতি কোন দোষারোপ করা হয়নি। ব্যাপারটা ছিল এই যে, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরায়েশদের একটি যাত্রীদলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন। সেখানে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছানুযায়ী পূর্বে কোন দিন নির্ধারণ করা ছাড়াই তার শত্রুদের সাথে মুকাবিলা হয়। আকাবার রাত্রে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথেই ছিলাম, তিনি ইসলামের উপর আমাদের বায়আত গ্রহণ করেছিলেন। বদরের যুদ্ধে উপস্থিতি অপেক্ষা আকাবার রাত্রে উপস্থিতি আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় ছিল, যদিও জনগণের মধ্যে বদরের খ্যাতি বেশী রয়েছে। এখন তাবুকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমি যে অংশগ্রহণ করতে পারিনি তার ঘটনা এই যে, যেই সময় আমি তাবুকের যুদ্ধ থেকে পিছনে রয়ে গিয়েছিলাম সেই সময় আমার আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই স্বচ্ছল। ইতিপূর্বে আমার কখনো দু’টি সওয়ারী ছিল না। কিন্তু এই যুদ্ধে আমি দু’টি সওয়ারীও রাখতে পারতাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কোন যুদ্ধ যাত্রার ইচ্ছা করতেন তখন তিনি সাধারণভাবে এ সংবাদ ছড়িয়ে দিতেন না। এই যুদ্ধে গমনের সময় কঠিন গরম ছিল এবং এটা ছিল খুবই দূরের সফর। আর এই সফরে বন জঙ্গল অতিক্রম করতে হয়েছিল এবং বহু সংখ্যক শত্রুর মুকাবিলা করতে হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলিমদেরকে এ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন যে, তারা তাদের সুবিধামত শত্রুর মুকাবিলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে। তিনি নিজের ইচ্ছার কথা মুসলিমদের নিকট প্রকাশ করেছিলেন। মুসলিমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এতো অধিক সংখ্যায় ছিলেন যে, তাদেরকে তালিকাভুক্ত করা কঠিন ছিল। কা'ব (রাঃ) বলেন, এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম হবে যাদের অনুপস্থিতির খবর রাসূলুল্লাহ (সঃ) জানতে পারবেন। বরং এই ধারণা ছিল যে, সৈন্যদের সংখ্যাধিক্যের কারণে অনুপস্থিতদের খবর তিনি জানতেই পারবেন না, যতক্ষণ না আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁকে জানিয়ে দেয়া হয়। এই যুদ্ধের উদ্দেশ্যে এমন সময় যাত্রা শুরু করা হয়েছিল যখন গাছের ফল পেকে গিয়েছিল এবং গাছের ছায়া ছিল তখন অনেক আরামদায়ক। এমতাবস্থায় আমার প্রবৃত্তি আরামপ্রিয়তার দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং মুসলিমরা যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি শুরু করে দেন। সকালে উঠে আমি জিহাদের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে বের হতাম কিন্তু শূন্য হাতে ফিরে আসতাম। প্রস্তুতি এবং সফরের আসবাবপত্র ক্রয় ইত্যাদি কিছুই করতাম না। মনকে এ বলে প্রবোধ দিতাম যে, যখনই ইচ্ছা করবো তখনই ক্ষণিকের মধ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করে ফেলবো। এভাবে দিন অতিবাহিত হতে থাকে। জনগণ পূর্ণমাত্রায় প্রস্তুতি গ্রহণ করে ফেলে, এমন কি মুসলিমরা এবং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিহাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে দেন। আমি মনে মনে বলি যে, দু একদিন পরে প্রস্তুতি গ্রহণ করে আমিও তাদের সাথে মিলিত হয়ে যাবো।ইতিমধ্যে মুসলিম সেনাদল বহু দূরে চলে গেছেন। আমি প্রস্তুতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে বের হই। কিন্তু এবারও প্রস্তুতি গ্রহণ ছাড়াই ফিরে আসি। শেষ পর্যন্ত প্রত্যহ এরূপই হতে থাকে এবং দিন অতিবাহিত হতেই থাকে। সৈন্যেরা যুদ্ধ করতে লাগলেন। এখন আমি ইচ্ছা করলাম যে, তাড়াতাড়ি যাত্রা শুরু করে তাদের সাথে মিলিত হয়ে যাবো। তখনও যদি আমি যাত্রা শুরু করতাম! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাও হয়ে উঠলো না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুদ্ধে গমনের পর যখন আমি বাজারে যেতাম তখন এ দেখে আমার বড়ই দুঃখ হতো যে, কোন মুসলিম দৃষ্টিগোচর হলে হয় তার উপর কপটতার অভিশাপ পরিলক্ষিত হতো, না হয় এমন মুসলিমকে দেখা যেতো যারা বাস্তবিকই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ক্ষমার্হ অথবা খোড়া ও বিকলাঙ্গ ছিল। তাবুকে পৌছার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে স্মরণ করে জিজ্ঞেস করেনঃ কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর কি হয়েছে?' তখন বানু সালমা গোত্রের একটি লোক উত্তরে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! স্বচ্ছলতা ও আরামপ্রিয়তা তাকে মদীনাতেই আটকিয়ে রেখেছে।” এ কথা শুনে মুয়াজ ইবনে জাবাল (রাঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি ভুল ধারণা পোষণ করছো। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার সম্পর্কে আমরা ভাল ধারণাই রাখি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এ কথা শুনে নীরব হয়ে যান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাবূক হতে প্রত্যাবর্তন করেন তখন আমি ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলাম যে, এখন কি করি? আমি মিথ্যা বাহানার কথা চিন্তা করলাম যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে পারি। সুতরাং আমি সকলের মত জানতে লাগলাম এবং যখন অবগত হলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এসেই পড়েছেন তখন মিথ্যা চিন্তা মন থেকে দূর করে দিলাম। এখন আমি ভালরূপে বুঝতে পারলাম যে, কোন বাহানা দ্বারা আমি রক্ষা পেতে পারি না। তাই আমি সত্য বলারই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম। নবী (সঃ) সফর থেকে ফিরে এসে সর্বপ্রথম মসজিদে অবস্থান করলেন। দু'রাকাআত সালাত আদায় করে তিনি লোকদেরকে নিয়ে বৈঠক করলেন। এখন যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি তারা এসে ওর পেশ করতে লাগলো এবং কসম খেতে শুরু করলো। এরূপ লোকদের সংখ্যা আশিজনের কিছু বেশী ছিল। নবী (সঃ) তাদের বাহ্যিক কথার উপর ভিত্তি করে তা ককূল করে নিচ্ছিলেন এবং তাদের অবহেলার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনাও করছিলেন। কিন্তু তাদের মনের গোপন কথা তিনি আল্লাহ তা'আলার দিকে সমর্পণ করছিলেন। অতঃপর আমার পালা আসলো। আমি গিয়ে সালাম করলাম। তিনি ক্রোধের হাসি হাসলেন। তারপর আমাকে বললেনঃ “এখানে এসো।” আমি তার সামনে গিয়ে বসলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি কেন (যুদ্ধে না গিয়ে) পিছনে রয়ে গিয়েছিলে? তুমি কি যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে আসবাবপত্র ক্রয় করনি?” আমি উত্তরে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আমি এ সময় আপনি ছাড়া আর কারো সাথে কথা বলতাম তবে এমন বানানো ওযর পেশ করতাম যে, তা কবুল করতেই হতো। কেননা, কথা বানানো, তর্ক বিতর্ক এবং ওযর পেশ করার যোগ্যতা আমার যথেষ্ট আছে। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি জানি যে, এই সময় মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পারবো বটে, তবে আল্লাহ আপনাকে সত্বরই আমার ব্যাপারে অসন্তুষ্ট করবেন। আর যদি আমি সত্য কথা বলি তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি উত্তম পরিণামের আশা করতে পারি। হে নবী (সঃ)! আমার কোন গ্রহণযোগ্য ওযর ছিল না। প্রকৃতপক্ষে আমার কাছে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কোনই বাহানা নেই। আমার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এ লোকটি বাস্তবিকই সত্য কথা বলেছে। ঠিক আছে, তুমি এখন যাও এবং তোমার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের অপেক্ষা কর।” সুতরাং আমি চলে আসলাম। বানু সালমা গোত্রের লোকেরাও আমার সাথে আসলো এবং আমাকে বললোঃ “আল্লাহর কসম! ইতিপূর্বে আমরা আপনাকে কোন অপরাধ করতে দেখিনি। অন্যান্য লোকেরা যেমন আল্লাহর নবী (সঃ)-এর সামনে ওযর পেশ করলো তেমনি আপনিও কেন তাঁর কাছে কোন একটা ওযর পেশ করলেন না? তাহলে নবী (সঃ) অন্যদের ন্যায় আপনার জন্যেও ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। আর তার ক্ষমা প্রার্থনাই আপনার জন্যে যথেষ্ট হতো। মোটকথা, লোকগুলো এর উপর এতো জোর দিলো যে, আমি পুনরায় ফিরে গিয়ে কিছু ওযর পেশ করার ইচ্ছা করেই ফেললাম। তাই আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার মত আর কারো কি এরূপ পরিস্থিতি হয়েছে? তারা উত্তরে বললোঃ “হ্যা, আপনার মত আরো দুটি লোক সত্য কথাই বলে দিয়েছে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, তারা কারা? উত্তরে বলা হলোঃ “তারা হচ্ছে মুরারাহ্ ইবনে রাবী' এবং হিলাল ইবনে উমাইয়া আলওয়াকেফী।” বলা হয়েছে যে, এ দু'টি লোক সৎলোক রূপে পরিচিত ছিলেন এবং বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমি তাদেরই পদাংক অনুসরণ করলাম। সুতরাং আমি পুনরায় আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করলাম না। এখন আমি জানতে পারলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে আমাদের সাথে সালাম-কালাম করতে নিষেধ করে দিয়েছেন এবং লোকেরা আমাদেরকে বয়কট করেছে। তারা আমাদের থেকে এমনভাবে বদলে গেছে যে, যমীনে অবস্থান আমাদের কাছে একটা বোঝা স্বরূপ মনে হয়েছে। এভাবে আমাদের উপর দিয়ে পঞ্চাশ দিন অতিবাহিত হয়ে যায় । ঐ দু’জন তো মুখ লুকিয়ে গৃহ-বাস অবলম্বন করতঃ সদা কাঁদতে থাকেন। কিন্তু আমি কিছুটা শক্ত প্রকৃতির লোক ছিলাম বলে আমার মধ্যে ধৈর্য অবলম্বনের শক্তি ছিল। তাই আমি বরাবর জামাআতে সালাত পড়তে থাকি এবং বাজারে ঘোরাফেরা করি। কিন্তু আমার সাথে কেউ কথা বলতো না। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে যেতাম, তাঁকে সালাম করতাম এবং সালামের জবাবে তাঁর ঠোট নড়ছে কি-না তা লক্ষ্য করতাম। আমি তার পাশেই সালাত আদায় । করতাম। আমি আড়চোখে তাকাতাম এবং দেখতাম যে, আমি সালাত শুরু করলে তিনি আমার দিকে দৃষ্টিপাত করতেন। আর আমি তার দিকে মুখ করে বসলে তিনি আমার দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেন। যখন এই বয়কটের। সময়কাল দীর্ঘ হয়ে যায় তখন আমি একদা আবু কাতাদা (রাঃ)-এর বাড়ীর প্রাচীরের উপর দিয়ে তার কাছে গমন করি। তিনি আমার চাচাতো ভাই হতেন। আমি তাকে খুবই ভালবাসতাম। আমি তাঁকে সালাম দেই। কিন্তু আল্লাহর কসম! তিনি আমার সালামের জবাব দেননি । আমি তাকে বলি, হে আবু কাতাদা (রাঃ)! আপনার কি জানা আছে যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে ভালবাসি? তিনি শুনে নীরব থাকেন। আমি আল্লাহর কসম দিয়ে কথা বলি। তবুও তিনি কথা বলেন না। পুনরায় আমি কসম দেই। কিন্তু তিনি অপরিচিতের মত বলেনঃ “আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-ই খুব ভাল জানেন।” এতে আমার কান্না এসে যায়। অতঃপর আমি প্রাচীর টপকে ফিরে আসি। একদা আমি মদীনার বাজারে ঘুরতেছিলাম। এমন সময় সিরিয়ার একজন কিবতী, যে মদীনার বাজারে কিছু খাবারের জিনিস বিক্রি করছিল, লোকদেরকে জিজ্ঞেস করেঃ “কেউ আমাকে কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর ঠিকানা দিতে পারে কি?” লোকেরা আমাকে ইশারায় দেখিয়ে দেয় । সুতরাং সে আমার কাছে আগমন করে এবং গাসসানের বাদশাহর একখানা চিঠি আমাকে প্রদান করে। আমি লিখাপড়া জানতাম। চিঠি পড়ে দেখি যে, তাতে লিখা রয়েছে- “আমাদের কাছে এ খবর পৌঁছেছে যে, আপনার সঙ্গী (নবী সঃ) আপনার প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। আল্লাহ তো আপনাকে একজন সাধারণ লোক করেননি! আপনার মর্যাদা রয়েছে। সুতরাং আপনি আমাদের কাছে চলে আসুন । আপনাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দান করবো।” এটা পড়ে আমি মনে মনে বললাম যে, এটি একটি নতুন বিপদ। অতঃপর আমি চিঠিখানা (আগুনের) চুল্লীতে ফেলে দেই। পঞ্চাশ দিনের মধ্যে যখন চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একজন দূত আমার নিকট এসে বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে স্ত্রী থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম, তালাক দিতে বলেছেন। কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “না, শুধুমাত্র স্ত্রী হতে পৃথক থাকতে বলেছেন।” দূত এ কথাও বললেন যে, অপর দু’জনকেও এই নির্দেশই দেয়া হয়েছে। সুতরাং আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, বাপের বাড়ী চলে যাও। দেখা যাক, আল্লাহ তাআলার কি নির্দেশ আসে। হিলাল ইবনে উমাইয়া (রাঃ)-এর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে আরয করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার স্বামী একজন খুবই দুর্বল ও বৃদ্ধ লোক। তাঁর সেবা করার কোন লোক নেই । আমি যদি তার সেবায় লেগে থাকি তবে আশা করি আপনি অমত করবেন না!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে। তবে তুমি তার সাথে সহবাস করবে না ।” সে তখন বলেঃ “তার তো নড়াচড়া করারই শক্তি নেই। আপনার অসন্তুষ্টির দিন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি শুধু কাঁদছেনই।” আমার পরিবারের একজন লোক আমাকে বললোঃ “আপনিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আপনার স্ত্রী থেকে খিদমত নেয়ার অনুমতি প্রার্থনা করুন, যেমন হিলাল (রাঃ) অনুমতি লাভ করেছেন।” আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এ ব্যাপারে আবেদন করবো না। জানি না তিনি কি বলেন! আমি তো একজন যুবক লোক। কারো সেবা গ্রহণের আমার প্রয়োজন নেই। এরপর আরো দশ দিন অতিবাহিত হয়ে যায় এবং জনগণের সম্পর্ক ছিন্নতার পঞ্চাশ দিন কেটে যায়। পঞ্চাশতম দিনের সকালে আমার ঘরের ছাদের উপর ফজরের সালাত আদায় করে ঐ অবস্থায় বসেছিলাম যে অবস্থার কথা মহান আল্লাহ তাঁর কালামে পাকে বলেছেনঃ “যখন ভূ-পৃষ্ঠ নিজ প্রশস্ততা সত্ত্বেও তাদের প্রতি সংকীর্ণ হতে লাগলো এবং তারা নিজেরা নিজেদের জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়লো, আর তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহর পাকড়াও হতে কোথাও আশ্রয় পাওয়া যেতে পারে না তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করা ব্যতীত ।” এমন সময় ‘সালা' পাহাড় হতে একজন চীকারকারীর শব্দ আমার কানে আসলো । সে উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করে বলছিলঃ “হে কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন!” এটা শোনা মাত্রই আমি সিজদায় পতিত হই এবং বুঝতে পারি যে, আল্লাহ তা'আলা আমার দুআ কবুল করেছেন। আমার দুঃখ ও বিপদের দিন ফুরিয়েছে। ফজরের সালাতের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষণা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা এই তিনজনের তাওবা কবূল করেছেন। লোকেরা আমাদেরকে সুসংবাদ জানাতে দৌড়িয়ে আসে। তারা ঐ দু'জনের কাছেও যায় এবং আমার কাছেও আসে । একটি লোক দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে আমার কাছে আগমন করে। কিন্তু পাহাড়ের উপর উঠে চীকারকারী সবচেয়ে বেশী সফলকাম হয়। কেননা, তার মাধ্যমেই আমি সর্বপ্রথম সংবাদ পাই। কারণ, ঘোড়ার গতি অপেক্ষা শব্দের গতি বেশী। সুতরাং যখন ঐ লোকটি আমার সাথে সাক্ষাৎ করে যার শব্দ আমি শুনেছিলাম, তখন তার শুভ সংবাদ প্রদানের বিনিময়ে আমি আমার পরনের কাপড় তাকে পরিয়ে দেই। আল্লাহর কসম! সেই সময় আমার কাছে দ্বিতীয় কাপড় আর ছিল না, অপরের কাছে কাপড় ধার করে আমি তা পরিধান করি। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বের হই। পথে লোকেরা দলে দলে আমার সাথে মিলিত হয় এবং আমাকে মুবারকবাদ জানাতে থাকে। আমি মসজিদে প্রবেশ করে দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকজনের মাঝে বসে আছেন। আমাকে দেখেই তালহা ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) দৌড়িয়ে এসে। আমার সাথে মুসাফাহা করেন এবং আমাকে মুবারকবাদ জানান। আল্লাহর কমস! মুহাজিরদের মধ্যে তিনি ছাড়া অন্য কেউ আমাকে এই অভ্যর্থনা করেননি। কা'ব (রাঃ) তালহা (রাঃ)-এর এই আন্তরিকতা কখনো বিস্মৃতি হননি। আমি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সালাম করি। তাঁর মুখমণ্ডল খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি বললেনঃ “খুশী হয়ে যাও। সম্ভবতঃ তোমার জন্মগ্রহণের পর থেকে আজ পর্যন্ত তোমার জীবনে এর চেয়ে বড় খুশীর দিন আর আসেনি।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই সুসংবাদ কি আপনার পক্ষ থেকে না আল্লাহর পক্ষ থেকে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহর পক্ষ থেকে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন খুশী হতেন তখন তার চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। তা যেন চাদের খণ্ড বিশেষ। তাঁর খুশীর চিহ্ন তাঁর চেহারাতেই প্রকাশিত হতো। আমি আর করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার তাওবা ককূলের এই বরকত হওয়া উচিত যে, আমি আমার সমস্ত সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পথে বিলিয়ে দেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এরূপ করো না, কিছু রেখে দাও এবং কিছু সাদকা কর। এটাই হচ্ছে উত্তম পন্থা।” এ কারণে খায়বার থেকে আমি যে অংশ লাভ করেছি তা আমার জন্যে রেখে দিলাম। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সত্যবাদিতার বরকতে আল্লাহ আমাকে মুক্তি দান করেছেন। আল্লাহর শপথ! যখন থেকে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে সত্যবাদিতার বর্ণনা করেছি তখন। থেকে কখনো মিথ্যা কথা বলিনি। আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা এই যে, ভবিষ্যতেও যেন তিনি আমার মুখ দিয়ে মিথ্যা কথা বের না করেন। (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে কা'ব (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আমার ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আমার উপর আল্লাহ তা'আলার এর চেয়ে বড় নিয়ামত আর কি হতে পারে যে, তিনি আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে সত্য কথা বলার তাওফীক দান করেছেন? নতুবা আমিও ঐ লোকদের মতই ধ্বংস হয়ে যেতাম যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে। মিথ্যা কথা বলে পারলৌকিক জীবনের দিক দিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। এই লোকদের সম্পর্কেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হ্যা, তারা তখন তোমাদের সামনে আল্লাহর শপথ করে বলবে যখন তোমরা তাদের কাছে ফিরে যাবে, যেন তোমরা তাদেরকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও; অতএব, তারা হচ্ছে অতিশয় অপবিত্র আর তাদের ঠিকানা হচ্ছে। জাহান্নাম, সেই সব কর্মের বিনিময়ে যা তারা করতো। তারা এ জন্যে শপথ করবে যেন তোমরা তাদের প্রতি রাযী হয়ে যাও, অনন্তর যদি তোমরা তাদের প্রতি রাযী হয়ে যাও, তবে আল্লাহ তো এমন দুষ্কর্মকারী লোকদের প্রতি রাযী হন না।” (৯:৯৫-৯৬) এই আয়াতটি পাঠ করে কা'ব (রাঃ) বলেনঃ “আমাদের তিন ব্যক্তির ফায়সালা ঐ লোকদের পিছনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল যারা মিথ্যা শপথ করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাদের বাহ্যিক শপথকে মেনে নিয়ে তাদের বায়আত ককূল করতে হয়েছিল। তিনি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনাও করেছিলেন। কিন্তু আমাদের ফায়সালা তিনি স্থগিত রেখেছিলেন যে পর্যন্ত না আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। আমাদেরকে পিছনে নিক্ষেপ করা দ্বারা আমাদের ফায়সালাকে পিছনে নিক্ষেপ করা বুঝানো হয়েছে, এটা নয় যে, আমাদেরকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে পিছনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।" এই হাদীসটি বিশুদ্ধরূপে প্রমাণিত এবং মুত্তাফিক আলাইহে। ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিমও (রঃ) যুহরী (রঃ)-এর হাদীস হতে এরূপই রিওয়ায়াত করেছেন। এই হাদীসটি উত্তম পন্থায় এই আয়াতে কারীমার তাফসীর করছে। পূর্ববর্তী গুরুজনদের প্রায় সবাই এরূপই রিওয়ায়াত করেছেন। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এরও এই আয়াত সম্পর্কে এই উক্তিই রয়েছে যে, এই তিনজন হচ্ছেন কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ), হিলাল ইবনে উমাইয়া (রাঃ) এবং মুরারা ইবনে রাবী (রাঃ)। এঁরা সবাই আনসারী ছিলেন। মুজাহিদ (রঃ), যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ), সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ এটাই বলেছেন। সবাই মুরারা ইবনে রাবীআ বলেছেন। ইমাম মুসলিমও (রঃ) ইবনে রাবীআ' লিখেছেন। কিন্তু কোন কোন নুসখায় রয়েছে রাবী ইবনে মুরারা। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে মুরারা ইবনে রাবীআ (রাঃ) লিখিত আছে। আর রিওয়ায়াতও এটাই আছে। আর এ কথা যে বলা হয়েছে যে, অপর দু’ব্যক্তি বদরের যুদ্ধে শরীক ছিলেন তা ইমাম যুহরী (রঃ)-এর ভুল ধারণা মনে করা হয়েছে। কেননা, এই তিনজনের কেউই বদরের যুদ্ধে শরীক ছিলেন না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।আল্লাহ তা'আলা ঐ তিন ব্যক্তির দুশ্চিন্তার বর্ণনা দিলেন যা তারা মুসলিমদের বয়কটের পঞ্চাশ দিন ভোগ করেছিলেন এবং তাঁদের জীবন ও দুনিয়া তাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল। তাঁদের বাইরে যাতায়াতও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারা কি করবেন তা অনুধাবন করতে পারছিলেন না। তারা বুঝেছিলেন যে, ধৈর্য ধারণ এবং লাঞ্ছনা ও অপমানের উপর সন্তুষ্ট থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে মিথ্যা ওযর পেশ না করার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে কিছুকাল শাস্তি ভোগ করানোর পর তাদের তাওবা কবুল করেন। এ জন্যে তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং (কাজে কর্মে) সত্যবাদীদের সধ্যে থাকো।” তাহলে তোমরা ধ্বংস ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে। ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)। বলেছেনঃ “তোমরা শুধু সত্য কথা বল। কেননা, সত্যবাদিতা হচ্ছে পুণ্যের কাজ। আর পুণ্য জান্নাত পর্যন্ত পৌছিয়ে থাকে। যে ব্যক্তি সত্য কথা বলে, তার নাম আল্লাহর দফতরে সত্যবাদীরূপে লিখিত হয়। মিথ্যা কথা বলা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকো। কেননা, মিথ্যা পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়। আর পাপাচার জাহান্নাম পর্যন্ত পৌছিয়ে দেয়। মানুষ যখন মিথ্যা কথা বলতে থাকে তখন আল্লাহর দফতরে তার নাম ‘মিথ্যাবাদী' রূপে লিখে দেয়া হয়। এই হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আন্তরিকভাবে বা রহস্যভাবে, কোন অবস্থাতেই মিথ্যা বলা বৈধ নয়। ইচ্ছা করলে আল্লাহ তাআলার (আরবী) -এই উক্তিটি পাঠ কর।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমরা কি মনে করতে পার যে, কেউ এই হুকুমের আওতার বহির্ভূত হতে পারে?” আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীগণ। যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আবু বকর (রাঃ) ও উমার (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ (আরবী) বা সত্যবাদীদের সাথে সামিল হতে চাইলে দুনিয়া হতে উদাসীন থাকো এবং সাধারণ মানুষের সাথে মেলামেশা কম কর।”

আত-তাওবা 9:119

১১৮-১১৯ নং আয়াতের তাফসীর: আব্দুল্লাহ ইবনে কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) তাবুকের যুদ্ধে তার অংশগ্রহণ না করার কাহিনী এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গমন না করার ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, তাবুকের যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোন যুদ্ধে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গ লাভ থেকে বঞ্চিত হইনি। অবশ্য বদর যুদ্ধেও আমি শরীক হতে পারিনি। তবে এ যুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করতে পারেনি তাদের প্রতি কোন দোষারোপ করা হয়নি। ব্যাপারটা ছিল এই যে, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরায়েশদের একটি যাত্রীদলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন। সেখানে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছানুযায়ী পূর্বে কোন দিন নির্ধারণ করা ছাড়াই তার শত্রুদের সাথে মুকাবিলা হয়। আকাবার রাত্রে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথেই ছিলাম, তিনি ইসলামের উপর আমাদের বায়আত গ্রহণ করেছিলেন। বদরের যুদ্ধে উপস্থিতি অপেক্ষা আকাবার রাত্রে উপস্থিতি আমার নিকট বেশী পছন্দনীয় ছিল, যদিও জনগণের মধ্যে বদরের খ্যাতি বেশী রয়েছে। এখন তাবুকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমি যে অংশগ্রহণ করতে পারিনি তার ঘটনা এই যে, যেই সময় আমি তাবুকের যুদ্ধ থেকে পিছনে রয়ে গিয়েছিলাম সেই সময় আমার আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই স্বচ্ছল। ইতিপূর্বে আমার কখনো দু’টি সওয়ারী ছিল না। কিন্তু এই যুদ্ধে আমি দু’টি সওয়ারীও রাখতে পারতাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কোন যুদ্ধ যাত্রার ইচ্ছা করতেন তখন তিনি সাধারণভাবে এ সংবাদ ছড়িয়ে দিতেন না। এই যুদ্ধে গমনের সময় কঠিন গরম ছিল এবং এটা ছিল খুবই দূরের সফর। আর এই সফরে বন জঙ্গল অতিক্রম করতে হয়েছিল এবং বহু সংখ্যক শত্রুর মুকাবিলা করতে হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলিমদেরকে এ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন যে, তারা তাদের সুবিধামত শত্রুর মুকাবিলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে। তিনি নিজের ইচ্ছার কথা মুসলিমদের নিকট প্রকাশ করেছিলেন। মুসলিমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এতো অধিক সংখ্যায় ছিলেন যে, তাদেরকে তালিকাভুক্ত করা কঠিন ছিল। কা'ব (রাঃ) বলেন, এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম হবে যাদের অনুপস্থিতির খবর রাসূলুল্লাহ (সঃ) জানতে পারবেন। বরং এই ধারণা ছিল যে, সৈন্যদের সংখ্যাধিক্যের কারণে অনুপস্থিতদের খবর তিনি জানতেই পারবেন না, যতক্ষণ না আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁকে জানিয়ে দেয়া হয়। এই যুদ্ধের উদ্দেশ্যে এমন সময় যাত্রা শুরু করা হয়েছিল যখন গাছের ফল পেকে গিয়েছিল এবং গাছের ছায়া ছিল তখন অনেক আরামদায়ক। এমতাবস্থায় আমার প্রবৃত্তি আরামপ্রিয়তার দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং মুসলিমরা যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি শুরু করে দেন। সকালে উঠে আমি জিহাদের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে বের হতাম কিন্তু শূন্য হাতে ফিরে আসতাম। প্রস্তুতি এবং সফরের আসবাবপত্র ক্রয় ইত্যাদি কিছুই করতাম না। মনকে এ বলে প্রবোধ দিতাম যে, যখনই ইচ্ছা করবো তখনই ক্ষণিকের মধ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করে ফেলবো। এভাবে দিন অতিবাহিত হতে থাকে। জনগণ পূর্ণমাত্রায় প্রস্তুতি গ্রহণ করে ফেলে, এমন কি মুসলিমরা এবং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিহাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে দেন। আমি মনে মনে বলি যে, দু একদিন পরে প্রস্তুতি গ্রহণ করে আমিও তাদের সাথে মিলিত হয়ে যাবো।ইতিমধ্যে মুসলিম সেনাদল বহু দূরে চলে গেছেন। আমি প্রস্তুতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে বের হই। কিন্তু এবারও প্রস্তুতি গ্রহণ ছাড়াই ফিরে আসি। শেষ পর্যন্ত প্রত্যহ এরূপই হতে থাকে এবং দিন অতিবাহিত হতেই থাকে। সৈন্যেরা যুদ্ধ করতে লাগলেন। এখন আমি ইচ্ছা করলাম যে, তাড়াতাড়ি যাত্রা শুরু করে তাদের সাথে মিলিত হয়ে যাবো। তখনও যদি আমি যাত্রা শুরু করতাম! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাও হয়ে উঠলো না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুদ্ধে গমনের পর যখন আমি বাজারে যেতাম তখন এ দেখে আমার বড়ই দুঃখ হতো যে, কোন মুসলিম দৃষ্টিগোচর হলে হয় তার উপর কপটতার অভিশাপ পরিলক্ষিত হতো, না হয় এমন মুসলিমকে দেখা যেতো যারা বাস্তবিকই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ক্ষমার্হ অথবা খোড়া ও বিকলাঙ্গ ছিল। তাবুকে পৌছার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে স্মরণ করে জিজ্ঞেস করেনঃ কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর কি হয়েছে?' তখন বানু সালমা গোত্রের একটি লোক উত্তরে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! স্বচ্ছলতা ও আরামপ্রিয়তা তাকে মদীনাতেই আটকিয়ে রেখেছে।” এ কথা শুনে মুয়াজ ইবনে জাবাল (রাঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি ভুল ধারণা পোষণ করছো। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার সম্পর্কে আমরা ভাল ধারণাই রাখি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এ কথা শুনে নীরব হয়ে যান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাবূক হতে প্রত্যাবর্তন করেন তখন আমি ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলাম যে, এখন কি করি? আমি মিথ্যা বাহানার কথা চিন্তা করলাম যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে পারি। সুতরাং আমি সকলের মত জানতে লাগলাম এবং যখন অবগত হলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এসেই পড়েছেন তখন মিথ্যা চিন্তা মন থেকে দূর করে দিলাম। এখন আমি ভালরূপে বুঝতে পারলাম যে, কোন বাহানা দ্বারা আমি রক্ষা পেতে পারি না। তাই আমি সত্য বলারই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম। নবী (সঃ) সফর থেকে ফিরে এসে সর্বপ্রথম মসজিদে অবস্থান করলেন। দু'রাকাআত সালাত আদায় করে তিনি লোকদেরকে নিয়ে বৈঠক করলেন। এখন যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি তারা এসে ওর পেশ করতে লাগলো এবং কসম খেতে শুরু করলো। এরূপ লোকদের সংখ্যা আশিজনের কিছু বেশী ছিল। নবী (সঃ) তাদের বাহ্যিক কথার উপর ভিত্তি করে তা ককূল করে নিচ্ছিলেন এবং তাদের অবহেলার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনাও করছিলেন। কিন্তু তাদের মনের গোপন কথা তিনি আল্লাহ তা'আলার দিকে সমর্পণ করছিলেন। অতঃপর আমার পালা আসলো। আমি গিয়ে সালাম করলাম। তিনি ক্রোধের হাসি হাসলেন। তারপর আমাকে বললেনঃ “এখানে এসো।” আমি তার সামনে গিয়ে বসলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি কেন (যুদ্ধে না গিয়ে) পিছনে রয়ে গিয়েছিলে? তুমি কি যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে আসবাবপত্র ক্রয় করনি?” আমি উত্তরে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আমি এ সময় আপনি ছাড়া আর কারো সাথে কথা বলতাম তবে এমন বানানো ওযর পেশ করতাম যে, তা কবুল করতেই হতো। কেননা, কথা বানানো, তর্ক বিতর্ক এবং ওযর পেশ করার যোগ্যতা আমার যথেষ্ট আছে। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি জানি যে, এই সময় মিথ্যা কথা বানিয়ে নিয়ে আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পারবো বটে, তবে আল্লাহ আপনাকে সত্বরই আমার ব্যাপারে অসন্তুষ্ট করবেন। আর যদি আমি সত্য কথা বলি তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি উত্তম পরিণামের আশা করতে পারি। হে নবী (সঃ)! আমার কোন গ্রহণযোগ্য ওযর ছিল না। প্রকৃতপক্ষে আমার কাছে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কোনই বাহানা নেই। আমার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এ লোকটি বাস্তবিকই সত্য কথা বলেছে। ঠিক আছে, তুমি এখন যাও এবং তোমার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের অপেক্ষা কর।” সুতরাং আমি চলে আসলাম। বানু সালমা গোত্রের লোকেরাও আমার সাথে আসলো এবং আমাকে বললোঃ “আল্লাহর কসম! ইতিপূর্বে আমরা আপনাকে কোন অপরাধ করতে দেখিনি। অন্যান্য লোকেরা যেমন আল্লাহর নবী (সঃ)-এর সামনে ওযর পেশ করলো তেমনি আপনিও কেন তাঁর কাছে কোন একটা ওযর পেশ করলেন না? তাহলে নবী (সঃ) অন্যদের ন্যায় আপনার জন্যেও ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। আর তার ক্ষমা প্রার্থনাই আপনার জন্যে যথেষ্ট হতো। মোটকথা, লোকগুলো এর উপর এতো জোর দিলো যে, আমি পুনরায় ফিরে গিয়ে কিছু ওযর পেশ করার ইচ্ছা করেই ফেললাম। তাই আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার মত আর কারো কি এরূপ পরিস্থিতি হয়েছে? তারা উত্তরে বললোঃ “হ্যা, আপনার মত আরো দুটি লোক সত্য কথাই বলে দিয়েছে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, তারা কারা? উত্তরে বলা হলোঃ “তারা হচ্ছে মুরারাহ্ ইবনে রাবী' এবং হিলাল ইবনে উমাইয়া আলওয়াকেফী।” বলা হয়েছে যে, এ দু'টি লোক সৎলোক রূপে পরিচিত ছিলেন এবং বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমি তাদেরই পদাংক অনুসরণ করলাম। সুতরাং আমি পুনরায় আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করলাম না। এখন আমি জানতে পারলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে আমাদের সাথে সালাম-কালাম করতে নিষেধ করে দিয়েছেন এবং লোকেরা আমাদেরকে বয়কট করেছে। তারা আমাদের থেকে এমনভাবে বদলে গেছে যে, যমীনে অবস্থান আমাদের কাছে একটা বোঝা স্বরূপ মনে হয়েছে। এভাবে আমাদের উপর দিয়ে পঞ্চাশ দিন অতিবাহিত হয়ে যায় । ঐ দু’জন তো মুখ লুকিয়ে গৃহ-বাস অবলম্বন করতঃ সদা কাঁদতে থাকেন। কিন্তু আমি কিছুটা শক্ত প্রকৃতির লোক ছিলাম বলে আমার মধ্যে ধৈর্য অবলম্বনের শক্তি ছিল। তাই আমি বরাবর জামাআতে সালাত পড়তে থাকি এবং বাজারে ঘোরাফেরা করি। কিন্তু আমার সাথে কেউ কথা বলতো না। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে যেতাম, তাঁকে সালাম করতাম এবং সালামের জবাবে তাঁর ঠোট নড়ছে কি-না তা লক্ষ্য করতাম। আমি তার পাশেই সালাত আদায় । করতাম। আমি আড়চোখে তাকাতাম এবং দেখতাম যে, আমি সালাত শুরু করলে তিনি আমার দিকে দৃষ্টিপাত করতেন। আর আমি তার দিকে মুখ করে বসলে তিনি আমার দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেন। যখন এই বয়কটের। সময়কাল দীর্ঘ হয়ে যায় তখন আমি একদা আবু কাতাদা (রাঃ)-এর বাড়ীর প্রাচীরের উপর দিয়ে তার কাছে গমন করি। তিনি আমার চাচাতো ভাই হতেন। আমি তাকে খুবই ভালবাসতাম। আমি তাঁকে সালাম দেই। কিন্তু আল্লাহর কসম! তিনি আমার সালামের জবাব দেননি । আমি তাকে বলি, হে আবু কাতাদা (রাঃ)! আপনার কি জানা আছে যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে ভালবাসি? তিনি শুনে নীরব থাকেন। আমি আল্লাহর কসম দিয়ে কথা বলি। তবুও তিনি কথা বলেন না। পুনরায় আমি কসম দেই। কিন্তু তিনি অপরিচিতের মত বলেনঃ “আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-ই খুব ভাল জানেন।” এতে আমার কান্না এসে যায়। অতঃপর আমি প্রাচীর টপকে ফিরে আসি। একদা আমি মদীনার বাজারে ঘুরতেছিলাম। এমন সময় সিরিয়ার একজন কিবতী, যে মদীনার বাজারে কিছু খাবারের জিনিস বিক্রি করছিল, লোকদেরকে জিজ্ঞেস করেঃ “কেউ আমাকে কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)-এর ঠিকানা দিতে পারে কি?” লোকেরা আমাকে ইশারায় দেখিয়ে দেয় । সুতরাং সে আমার কাছে আগমন করে এবং গাসসানের বাদশাহর একখানা চিঠি আমাকে প্রদান করে। আমি লিখাপড়া জানতাম। চিঠি পড়ে দেখি যে, তাতে লিখা রয়েছে- “আমাদের কাছে এ খবর পৌঁছেছে যে, আপনার সঙ্গী (নবী সঃ) আপনার প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। আল্লাহ তো আপনাকে একজন সাধারণ লোক করেননি! আপনার মর্যাদা রয়েছে। সুতরাং আপনি আমাদের কাছে চলে আসুন । আপনাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দান করবো।” এটা পড়ে আমি মনে মনে বললাম যে, এটি একটি নতুন বিপদ। অতঃপর আমি চিঠিখানা (আগুনের) চুল্লীতে ফেলে দেই। পঞ্চাশ দিনের মধ্যে যখন চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একজন দূত আমার নিকট এসে বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে স্ত্রী থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম, তালাক দিতে বলেছেন। কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “না, শুধুমাত্র স্ত্রী হতে পৃথক থাকতে বলেছেন।” দূত এ কথাও বললেন যে, অপর দু’জনকেও এই নির্দেশই দেয়া হয়েছে। সুতরাং আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, বাপের বাড়ী চলে যাও। দেখা যাক, আল্লাহ তাআলার কি নির্দেশ আসে। হিলাল ইবনে উমাইয়া (রাঃ)-এর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে আরয করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার স্বামী একজন খুবই দুর্বল ও বৃদ্ধ লোক। তাঁর সেবা করার কোন লোক নেই । আমি যদি তার সেবায় লেগে থাকি তবে আশা করি আপনি অমত করবেন না!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে। তবে তুমি তার সাথে সহবাস করবে না ।” সে তখন বলেঃ “তার তো নড়াচড়া করারই শক্তি নেই। আপনার অসন্তুষ্টির দিন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি শুধু কাঁদছেনই।” আমার পরিবারের একজন লোক আমাকে বললোঃ “আপনিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আপনার স্ত্রী থেকে খিদমত নেয়ার অনুমতি প্রার্থনা করুন, যেমন হিলাল (রাঃ) অনুমতি লাভ করেছেন।” আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এ ব্যাপারে আবেদন করবো না। জানি না তিনি কি বলেন! আমি তো একজন যুবক লোক। কারো সেবা গ্রহণের আমার প্রয়োজন নেই। এরপর আরো দশ দিন অতিবাহিত হয়ে যায় এবং জনগণের সম্পর্ক ছিন্নতার পঞ্চাশ দিন কেটে যায়। পঞ্চাশতম দিনের সকালে আমার ঘরের ছাদের উপর ফজরের সালাত আদায় করে ঐ অবস্থায় বসেছিলাম যে অবস্থার কথা মহান আল্লাহ তাঁর কালামে পাকে বলেছেনঃ “যখন ভূ-পৃষ্ঠ নিজ প্রশস্ততা সত্ত্বেও তাদের প্রতি সংকীর্ণ হতে লাগলো এবং তারা নিজেরা নিজেদের জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়লো, আর তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহর পাকড়াও হতে কোথাও আশ্রয় পাওয়া যেতে পারে না তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করা ব্যতীত ।” এমন সময় ‘সালা' পাহাড় হতে একজন চীকারকারীর শব্দ আমার কানে আসলো । সে উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করে বলছিলঃ “হে কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন!” এটা শোনা মাত্রই আমি সিজদায় পতিত হই এবং বুঝতে পারি যে, আল্লাহ তা'আলা আমার দুআ কবুল করেছেন। আমার দুঃখ ও বিপদের দিন ফুরিয়েছে। ফজরের সালাতের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষণা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা এই তিনজনের তাওবা কবূল করেছেন। লোকেরা আমাদেরকে সুসংবাদ জানাতে দৌড়িয়ে আসে। তারা ঐ দু'জনের কাছেও যায় এবং আমার কাছেও আসে । একটি লোক দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে আমার কাছে আগমন করে। কিন্তু পাহাড়ের উপর উঠে চীকারকারী সবচেয়ে বেশী সফলকাম হয়। কেননা, তার মাধ্যমেই আমি সর্বপ্রথম সংবাদ পাই। কারণ, ঘোড়ার গতি অপেক্ষা শব্দের গতি বেশী। সুতরাং যখন ঐ লোকটি আমার সাথে সাক্ষাৎ করে যার শব্দ আমি শুনেছিলাম, তখন তার শুভ সংবাদ প্রদানের বিনিময়ে আমি আমার পরনের কাপড় তাকে পরিয়ে দেই। আল্লাহর কসম! সেই সময় আমার কাছে দ্বিতীয় কাপড় আর ছিল না, অপরের কাছে কাপড় ধার করে আমি তা পরিধান করি। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বের হই। পথে লোকেরা দলে দলে আমার সাথে মিলিত হয় এবং আমাকে মুবারকবাদ জানাতে থাকে। আমি মসজিদে প্রবেশ করে দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকজনের মাঝে বসে আছেন। আমাকে দেখেই তালহা ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) দৌড়িয়ে এসে। আমার সাথে মুসাফাহা করেন এবং আমাকে মুবারকবাদ জানান। আল্লাহর কমস! মুহাজিরদের মধ্যে তিনি ছাড়া অন্য কেউ আমাকে এই অভ্যর্থনা করেননি। কা'ব (রাঃ) তালহা (রাঃ)-এর এই আন্তরিকতা কখনো বিস্মৃতি হননি। আমি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সালাম করি। তাঁর মুখমণ্ডল খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি বললেনঃ “খুশী হয়ে যাও। সম্ভবতঃ তোমার জন্মগ্রহণের পর থেকে আজ পর্যন্ত তোমার জীবনে এর চেয়ে বড় খুশীর দিন আর আসেনি।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই সুসংবাদ কি আপনার পক্ষ থেকে না আল্লাহর পক্ষ থেকে? তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহর পক্ষ থেকে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন খুশী হতেন তখন তার চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। তা যেন চাদের খণ্ড বিশেষ। তাঁর খুশীর চিহ্ন তাঁর চেহারাতেই প্রকাশিত হতো। আমি আর করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার তাওবা ককূলের এই বরকত হওয়া উচিত যে, আমি আমার সমস্ত সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পথে বিলিয়ে দেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এরূপ করো না, কিছু রেখে দাও এবং কিছু সাদকা কর। এটাই হচ্ছে উত্তম পন্থা।” এ কারণে খায়বার থেকে আমি যে অংশ লাভ করেছি তা আমার জন্যে রেখে দিলাম। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সত্যবাদিতার বরকতে আল্লাহ আমাকে মুক্তি দান করেছেন। আল্লাহর শপথ! যখন থেকে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে সত্যবাদিতার বর্ণনা করেছি তখন। থেকে কখনো মিথ্যা কথা বলিনি। আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা এই যে, ভবিষ্যতেও যেন তিনি আমার মুখ দিয়ে মিথ্যা কথা বের না করেন। (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে কা'ব (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আমার ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আমার উপর আল্লাহ তা'আলার এর চেয়ে বড় নিয়ামত আর কি হতে পারে যে, তিনি আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে সত্য কথা বলার তাওফীক দান করেছেন? নতুবা আমিও ঐ লোকদের মতই ধ্বংস হয়ে যেতাম যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে। মিথ্যা কথা বলে পারলৌকিক জীবনের দিক দিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। এই লোকদের সম্পর্কেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হ্যা, তারা তখন তোমাদের সামনে আল্লাহর শপথ করে বলবে যখন তোমরা তাদের কাছে ফিরে যাবে, যেন তোমরা তাদেরকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও; অতএব, তারা হচ্ছে অতিশয় অপবিত্র আর তাদের ঠিকানা হচ্ছে। জাহান্নাম, সেই সব কর্মের বিনিময়ে যা তারা করতো। তারা এ জন্যে শপথ করবে যেন তোমরা তাদের প্রতি রাযী হয়ে যাও, অনন্তর যদি তোমরা তাদের প্রতি রাযী হয়ে যাও, তবে আল্লাহ তো এমন দুষ্কর্মকারী লোকদের প্রতি রাযী হন না।” (৯:৯৫-৯৬) এই আয়াতটি পাঠ করে কা'ব (রাঃ) বলেনঃ “আমাদের তিন ব্যক্তির ফায়সালা ঐ লোকদের পিছনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল যারা মিথ্যা শপথ করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাদের বাহ্যিক শপথকে মেনে নিয়ে তাদের বায়আত ককূল করতে হয়েছিল। তিনি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনাও করেছিলেন। কিন্তু আমাদের ফায়সালা তিনি স্থগিত রেখেছিলেন যে পর্যন্ত না আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। আমাদেরকে পিছনে নিক্ষেপ করা দ্বারা আমাদের ফায়সালাকে পিছনে নিক্ষেপ করা বুঝানো হয়েছে, এটা নয় যে, আমাদেরকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে পিছনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।" এই হাদীসটি বিশুদ্ধরূপে প্রমাণিত এবং মুত্তাফিক আলাইহে। ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিমও (রঃ) যুহরী (রঃ)-এর হাদীস হতে এরূপই রিওয়ায়াত করেছেন। এই হাদীসটি উত্তম পন্থায় এই আয়াতে কারীমার তাফসীর করছে। পূর্ববর্তী গুরুজনদের প্রায় সবাই এরূপই রিওয়ায়াত করেছেন। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ)-এরও এই আয়াত সম্পর্কে এই উক্তিই রয়েছে যে, এই তিনজন হচ্ছেন কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ), হিলাল ইবনে উমাইয়া (রাঃ) এবং মুরারা ইবনে রাবী (রাঃ)। এঁরা সবাই আনসারী ছিলেন। মুজাহিদ (রঃ), যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ), সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ এটাই বলেছেন। সবাই মুরারা ইবনে রাবীআ বলেছেন। ইমাম মুসলিমও (রঃ) ইবনে রাবীআ' লিখেছেন। কিন্তু কোন কোন নুসখায় রয়েছে রাবী ইবনে মুরারা। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে মুরারা ইবনে রাবীআ (রাঃ) লিখিত আছে। আর রিওয়ায়াতও এটাই আছে। আর এ কথা যে বলা হয়েছে যে, অপর দু’ব্যক্তি বদরের যুদ্ধে শরীক ছিলেন তা ইমাম যুহরী (রঃ)-এর ভুল ধারণা মনে করা হয়েছে। কেননা, এই তিনজনের কেউই বদরের যুদ্ধে শরীক ছিলেন না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।আল্লাহ তা'আলা ঐ তিন ব্যক্তির দুশ্চিন্তার বর্ণনা দিলেন যা তারা মুসলিমদের বয়কটের পঞ্চাশ দিন ভোগ করেছিলেন এবং তাঁদের জীবন ও দুনিয়া তাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল। তাঁদের বাইরে যাতায়াতও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারা কি করবেন তা অনুধাবন করতে পারছিলেন না। তারা বুঝেছিলেন যে, ধৈর্য ধারণ এবং লাঞ্ছনা ও অপমানের উপর সন্তুষ্ট থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে মিথ্যা ওযর পেশ না করার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে কিছুকাল শাস্তি ভোগ করানোর পর তাদের তাওবা কবুল করেন। এ জন্যে তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং (কাজে কর্মে) সত্যবাদীদের সধ্যে থাকো।” তাহলে তোমরা ধ্বংস ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে। ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)। বলেছেনঃ “তোমরা শুধু সত্য কথা বল। কেননা, সত্যবাদিতা হচ্ছে পুণ্যের কাজ। আর পুণ্য জান্নাত পর্যন্ত পৌছিয়ে থাকে। যে ব্যক্তি সত্য কথা বলে, তার নাম আল্লাহর দফতরে সত্যবাদীরূপে লিখিত হয়। মিথ্যা কথা বলা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকো। কেননা, মিথ্যা পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়। আর পাপাচার জাহান্নাম পর্যন্ত পৌছিয়ে দেয়। মানুষ যখন মিথ্যা কথা বলতে থাকে তখন আল্লাহর দফতরে তার নাম ‘মিথ্যাবাদী' রূপে লিখে দেয়া হয়। এই হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আন্তরিকভাবে বা রহস্যভাবে, কোন অবস্থাতেই মিথ্যা বলা বৈধ নয়। ইচ্ছা করলে আল্লাহ তাআলার (আরবী) -এই উক্তিটি পাঠ কর।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমরা কি মনে করতে পার যে, কেউ এই হুকুমের আওতার বহির্ভূত হতে পারে?” আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীগণ। যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা আবু বকর (রাঃ) ও উমার (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ (আরবী) বা সত্যবাদীদের সাথে সামিল হতে চাইলে দুনিয়া হতে উদাসীন থাকো এবং সাধারণ মানুষের সাথে মেলামেশা কম কর।”

আত-তাওবা 9:120

তাবুকের যুদ্ধে মদীনাবাসীদের যে আরব গোত্রগুলো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা। থেকে বিরত ছিল এবং নবী (সঃ)-কে যুদ্ধে যে দুঃখকষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল তাতে সহানুভূতি না দেখিয়ে বরং আরামপ্রিয়তা অবলম্বন করেছিল তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ক্রোধের সুরে বলেন যে, তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রতিদান থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করেছে। তারা না পিপাসার কষ্ট পেয়েছে, না যুদ্ধের ক্লান্তি সহ্য করেছে। না ক্ষুধার কষ্ট অনুধাবন করেছে, না তারা এমন স্থানে এসেছে যা কাফিরদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতো, আর না তারা কাফিরদের উপর জয়যুক্ত ও সফলকাম হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছে। পক্ষান্তরে, যারা এসব কষ্ট সহ্য করেছে এবং এসব কষ্ট যারা স্বেচ্ছাপ্রণাদিত হয়ে স্বীকার করে নিয়েছে, তাদের উপর কোন জোর জবরদস্তি করা হয়নি, আল্লাহ এসব নেককার লোকের নেক কাজের প্রতিদান কখনো নষ্ট করবেন না। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি ভাল কাজ করেছে, আমি তার প্রতিদান বিনষ্ট করবো না।” (১৮:৩০)

আত-তাওবা 9:121

আল্লাহ পাক বলেন- এই গাযী লোকগুলো আল্লাহর পথে ছোট বড় খরচও করে এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে বন জঙ্গলের অল্পবিস্তর পথ অতিক্রমও করে। এর প্রতিদান তারা অবশ্যই পাবে। আল্লাহ তা'আলা এখানে (আরবী) বলেছেন। আর পূর্ববর্তী আয়াতে (আরবী) বলেছেন। এই, (আরবী) -এর ভাবার্থ এই যে, এই খরচকরণ এবং শত্রুদের দিকে এই গমনাগমন হচ্ছে তাদের ব্যক্তিগত ও নিজস্ব কাজ। এ জন্যেই এই আয়াতে শারীফায় (আরবী) বলেছেন। আর পূর্ববর্তী আয়াতে কারীমায় আল্লাহর পথে ক্ষুধা, পিপাসা ইত্যাদির কষ্ট আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ছিল। এ জন্যে এ আয়াতে (আরবী) ও আনা হয়নি এবং আমলকে তাদের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করাও হয়নি। আমীরুল মুমিন উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) এই আয়াতে কারীমা হতে একটা পূর্ণ ও বিরাট অংশ লাভ করেছেন। কেননা, তাবুকের যুদ্ধে তিনি মুসলিম সেনাবাহিনীকে তার প্রচুর সম্পদ দান করেছিলেন। ইবনে হাব আসসালমী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ভাষণ দান করেন এবং এই দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার জন্যে জনগণকে উৎসাহিত ও উত্তেজিত করেন। তখন উসমান (রাঃ) বললেনঃ “আমার উপর রইলো জিন ও গদিসহ একশটি উট (অর্থাৎ আমি একশটি উট দান করবো)।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় কওমের কাছে চাঁদা চাইলেন। এবারও উসমান (রাঃ) বললেনঃ “আমার উপর থাকলো জিন, গদি ইত্যাদিসহ একশ'টি উট।” নবী (সঃ) মিম্বরের উপর থেকে এক সিঁড়ি নেমে আবার বললেনঃ “হে লোক সকল! আরো সাহায্যের প্রয়োজন রয়েছে।” তখন উসমান (রাঃ) বললেনঃ “সাজ ও সামানসহ একশ’টি উট।” (বর্ণনাকারী বলেন) আমি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখলাম যে, তিনি খুশীতে তাঁর হাত এভাবে নাড়াচ্ছেন (সর্বশেষ বর্ণনাকারী আব্দুস সামাদ (রঃ) এ কথা বলার সময় তাঁর হাত নাড়ালেন) এবং তিনি (নবী সঃ) বললেনঃ “এরপর উসমান (রাঃ) যে আমলই করুক না কেন তার (জাহান্নামের আগুনে দগ্ধীভূত হওয়ার) আর কোন ভয় নেই।” অতঃপর উসমান (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রার একটি থলে নিয়ে আসলেন এবং তা তাঁর ক্রোড়ে রেখে দিলেন, যেন তিনি তা দিয়ে অভাব ও অসুবিধাগ্রস্ত সেনাবাহিনীর যুদ্ধ যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণের ব্যবস্থা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বর্ণমুদ্রাগুলো নাড়াচ্ছিলেন এবং বলছিলেনঃ “আজ থেকে উসমান (রাঃ)-কে তার কোন আমল কোন কষ্টে ফেলতে পারবে না। এই এক আমলই তার মুক্তির জন্যে যথেষ্ট।” আর খুশীতে তিনি বার বার ঐ মুদ্রাগুলোকে নাড়াচাড়া করছিলেন। (এ হাদীসটি আব্দুর রহমান ইবনে সামরা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)কাতাদা (রঃ) আল্লাহ তা'আলার। (আরবী)-এই উক্তি সম্পর্কে বলেন যে, আল্লাহর পথে সফর করতে গিয়ে মানুষ যত দূর পথ অতিক্রম করে ততই তারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের দিক দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়।

আত-তাওবা 9:122

এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা এই বর্ণমা দিয়েছেন যে, তাবূকের যুদ্ধে জনগণ যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গমনের ইচ্ছা করলেন তখন পূর্ববর্তীদের একটি দলের এই ধারণা হলো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন যুদ্ধের জন্যে বের হবেন তখন প্রত্যেক মুমিনের উপর সেই যুদ্ধে গমন করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা (আরবী) (৯:৪১) বলেছেন এবং (আরবী) -এই উক্তি করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে, এই আয়াত দ্বারা উপরের আয়াতগুলো মনসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। এ কথা বলা হয়েছে যে, সমস্ত গোত্রের সফর করা বা কোন গোত্রের সবাই বের না হয়ে কতক না গিয়ে নবী (সঃ) -এর সাথে অবস্থান করবে তারা যেন নতুন অবতারিত অহী লিখে নেয় এবং মুখস্থ করে রাখে এবং সফর হতে প্রত্যাবর্তনকারীদেরকে আল্লাহ পাকের আহকাম জানিয়ে দেয়। আর সফর হতে প্রত্যাবর্তনকারীদের কর্তব্য হবে নবী (সঃ)-এর সাথে অবস্থানকারীদেরকে এটা জানিয়ে দেয়া যে, তারা শত্রুদের সাথে কিভাবে সময় কাটিয়েছে এবং কাফিরদের অবস্থা কিরূপ। এখন এই স্থিরীকত সফরে দু'টি বিষয় একত্রিত হলো। এক স্থিরীকত সফর ঐ লোকদের, যারা জিহাদে যাচ্ছে। আর দ্বিতীয় ঐ লোকদের অবস্থান যারা ধর্মীয় জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে নবী (সঃ)-এর সাথে রয়ে গেছে। কেননা, এটা হচ্ছে ফরযে কিফায়া। কিছু লোক না করলে বাকী লোকদের উপর তা জরুরী ও ফরয। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন (আরবী)-এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- মুমিনদের জন্যে এটা উচিত নয় যে, নবী (সঃ)-এর নিকট থেকে সবাই চলে যাবে এবং নবী (সঃ)-কে একাকী ছেড়ে দেবে। আর এরূপ কেন হবে না যে, প্রত্যেক দলের মধ্য থেকে লোক যাবে যাতে অবশিষ্ট লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে থেকে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করতে পারে এবং যখন তারা ফিরে আসবে তখন এরা নিজেদের কওমের কাছে গিয়ে তাদেরকে দ্বীন সম্পর্কে অবহিত করবে ও আল্লাহ থেকে ভয় প্রদর্শন করবে। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) যতক্ষণ না সফরে গমনের অনুমতি দেন ততক্ষণ সফরে গমন করবে না। এই লোকদের অনুপস্থিতির সময়কালে কুরআনের যেসব আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। ঐগুলোকে নবী (সঃ)-এর কাছে অবস্থানকারী লোকেরা তা জানিয়ে দেবে এবং বলে দেবেঃ “আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর উপর এগুলো অবতীর্ণ করেছেন, আমরা এগুলো শিখেছি। এখন তোমরা সফর হতে ফিরে এসেছে, সুতরাং তোমরাও এগুলো শিখে নাও।" এখন আবার দ্বিতীয় দলকে পাঠানো হবে যেন তারা পরহেয় করে চলে। (আরবী)-এর অর্থ এটাই। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের মধ্যে ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা শিক্ষা লাভ করে নিজেদের পল্লীতে চলে যায়। সেখানে জনগণের নিকট থেকে উপকার লাভ করে, শান্তি ও আরাম প্রাপ্ত হয়, ধন-সম্পদও উপার্জন করে এবং দ্বীনের তবলীগও করে। কিন্তু জনগণ তাদেরকে বলেঃ “তোমরা নবী (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদের সাহচর্য পরিত্যাগ করে আমাদের কাছে চলে এসেছে এবং তাঁর সঙ্গ লাভ হতে সরে পড়েছো!” এ কথায় তারা মনে খুব ব্যথা ও দুঃখ অনুভব করলো। তারা সবাই পল্লী হতে নবী (সঃ)-এর কাছে এসে গেল। এ ব্যাপারেই আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করলেনঃ “এমন কেন করা হয় না যে, তাদের প্রত্যেকটি বড় দল হতে এক একটি ছোট দল (জিহাদে) বহির্গত হয় যাতে অবশিষ্টরা ধর্মজ্ঞান অর্জন করতে থাকে, আর যাতে তারা নিজ কওম অর্থাৎ জিহাদে অংশগ্রহণকারীদেরকে নাফরমানী হতে ভয় প্রদর্শন করে যখন তারা ওদের নিকট প্রত্যাবর্তন করে, যেন তারা পরহেয় করে চলে।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তারা যেন নবী (সঃ)-এর সাথে থেকে যুদ্ধ করে। কিন্তু অন্য একটি দল যেন তাঁর সাথে অবস্থান করে, যাতে তারা ধর্মীয় জ্ঞান লাভ করতে পারে। আর অন্য আরেকটি দল যেন নিজের গোত্রের কাছে পল্লীতে চলে যায় এবং আল্লাহর ঐ আযাব থেকে তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করে যে আযাব তাদের পূর্ববর্তী কওমদের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। যহহাক (রঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন স্বয়ং যুদ্ধে গমন করেন তখন ওযর বিশিষ্ট লোকদের ছাড়া আর কারো এই অনুমতি নেই যে, সে পিছনে রয়ে যায়। আর যদি তিনি স্বয়ং না যান বরং সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেন তবে তার অনুমতি ছাড়া কেউ সেনাবাহিনীর মধ্যে শরীক হতে পারে না। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কর্তৃক প্রেরিত সেনাবাহিনী যুদ্ধে গমন করে এবং তাদের অনুপস্থিতিকালে যে অহী অবতীর্ণ হয়, আর নবী (সঃ) তাঁর পাশে অবস্থানকারীদেরকে তা শুনিয়ে দেন, তখন ঐ সেনাবাহিনী ফিরে আসলে এই অবস্থানরত লোকেরা তাদেরকে তা শুনিয়ে দিয়ে বলবেঃ “তোমাদের যুদ্ধে গমনের পর এই অহী অবতীর্ণ হয়েছে।” এভাবে তাদের মধ্যেও ধর্মীয় জ্ঞান সৃষ্টি করতে হবে। সবারই যুদ্ধে গমন না করার নির্দেশ ঐ অবস্থায় প্রযোজ্য হবে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দিয়ে নিজে বাড়ীতে অবস্থান করেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবী) -এই আয়াতটি জিহাদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়নি। বরং রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মুযার গোত্রের উপর দুর্ভিক্ষের বদ দুআ করেন এবং সবাই দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়, তখন সবাই মদীনায় এসে বাস করতে শুরু করে এবং নিজেদেরকে ঝুট মুট মুসলিম বলে পরিচয় দেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের উপর তাদের মেহমানদারী বোঝা স্বরূপ হয়। তখন আল্লাহ তা'আলা অহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জানিয়ে দেন যে, প্রকৃতপক্ষে তারা মুসলিম নয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে নিজ নিজ গোত্রের নিকট ফিরিয়ে দেন। আর দ্বিতীয়বার যেন এরূপ না করা হয় এ ব্যাপারে তাদেরকে সতর্ক করে দেন।(আরবী) -এই আয়াতের ব্যাপারে ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আরবের প্রত্যেকটি গোত্রের মধ্য হতে দলে দলে লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতো। তারা তাঁকে ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতো। তাদের ধর্মীয় জ্ঞান লাভের ইচ্ছা থাকতো। তারা নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করতোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদেরকে কি কাজের নির্দেশ দিচ্ছেন?” তারা আরো বলতোঃ “আমাদের গোত্রের কাছে গিয়ে আমরা কি করবো?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে উপদেশ দিতেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করার এবং বলতেনঃ “তোমরা তোমাদের কওমের কাছে গিয়ে তাদের মধ্যে সালাত ও যাকাতের প্রসার ঘটাবে।” তারা তখন তাদের গোত্রের কাছে গিয়ে তাদেরকে পরিষ্কারভাবে বলে দিতোঃ “তোমরা যদি ইসলাম গ্রহণ কর তবে আমরা তোমাদের সাথে রয়েছি, নচেৎ নই।” আর তারা তাদেরকে আল্লাহ হতে ভয় প্রদর্শন করতো। এমন কি এরূপ হিদায়াতপ্রাপ্ত লোক নিজের কাফির পিতা-মাতা থেকেও সম্পর্ক ছিন্ন করতো। নবী (সঃ) তাদেরকে সতর্ক করতেন এবং আল্লাহ হতে ভয় প্রদর্শন করতেন। ঐ লোকগুলো যখন নিজেদের লোকদের কাছে ফিরে যেতো তখন তাদেরকে দ্বীন ইসলামের দিকে আহ্বান করতো, জাহান্নাম হতে ভয় দেখাতে এবং জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করতো। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, যখন (আরবী) (৯:৩৯) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন কাফিররা বলতে শুরু করেঃ “এখন তো তাহলে ঐ গ্রাম্য মুসলিমরা ধ্বংস হয়ে গেল যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে যুদ্ধে গমন না করে পিছনে রয়েছিল।” অথচ তারা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের মধ্যকার ঐ সব লোক ছিলেন যারা নিজেদের কওমের লোকদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে গমন করেছিলেন এবং তাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কারণ তো ছিল এটাই। তাই আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করে দিলেন-এই লোর্কগুলো যুদ্ধের জন্যে কেন গমন করবে? কিছু লোক অন্যদেরকে দ্বীন শিখাবার জন্যে কেন রয়ে যাবে না? ঐ সময় .. (আরবী) (৪২:১৬) এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।হাসান বসরী (রঃ) বলেন, এই আয়াতের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যারা যুদ্ধে গমন করেছে তারা যখন নিজেদের লোকদের কাছে ফিরে আসবে তখন যুদ্ধের ফলাফলে তারা যে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভাব দেখেছে এবং ইসলামের শান-শওকতপূর্ণ বিজয় অবলোকন করেছে, তা যেন জনগণকে অবহিত করে।

আত-তাওবা 9:123

আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন প্রথমে ঐ জায়গার কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করে যা ইসলামের কেন্দ্রস্থলের অতি নিকটবর্তী। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) সর্বপ্রথম আরব উপদ্বীপের মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। তারপর তিনি মক্কা, মদীনা, তায়েফ, ইয়ামন, ইয়ামামা, হিজর, খায়বার, হাযারা মাউত প্রভৃতি জায়গার অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। মোটকথা, প্রথমে তিনি আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চল জয় করেন এবং ওগুলোর অধিবাসীদেরকে মুসলিম বানিয়ে নেন। আরব গোত্রগুলো দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এরপর আহলে কিতাবদের সাথে যুদ্ধ হয় এবং রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এই লোকগুলো আরব উপদ্বীপের নিকটেই বসবাস করতো। ইসলামের দাওয়াত সর্বপ্রথম তাদেরকে দেয়ারই প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া তারা ছিল আহলে কিতাব। কিন্তু তাবুক পর্যন্ত পৌছে মুসলিমরা আর আগে না বেড়ে ফিরে আসেন। কেননা, তাঁদের অবস্থা ছিল ঐ সময় খুবই সংকীর্ণ এবং তাঁরা দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়েছিলেন। এটা ছিল নবম হিজরীর ঘটনা। দশম হিজরীতে নবী (সঃ) বিদায় হজ্বের ব্যাপারে মশগুল ছিলেন। বিদায় হজ্বের একাশি দিন পরে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার ইন্তেকালের পর তাঁর নির্দেশ পূরণকারীরূপে দাড়িয়ে গেলেন তাঁর উযীর ও বন্ধু আবু বকর (রাঃ)। এই বাধ্যতামূলক ইনকিলাবের সময়ে দ্বীনের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আবু বকর (রাঃ)-এর মাধ্যমে দ্বীনের মধ্যে দৃঢ়তা আনয়ন। করেন। আবূ বকর (রাঃ) দ্বীনকে মজবুত করে দেন এবং এর স্তম্ভকে দৃঢ় করেন। আর ধর্মত্যাগী লোকদেরকে পুনরায় ধর্মের দিকে ফিরিয়ে আনেন। যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল তাদেরকে যাকাত প্রদানে বাধ্য করেন। যারা ধর্মের মাসআলা থেকে বিস্মরণ হয়ে গিয়েছিল তাদেরকে তা স্মরণ করিয়ে দেন।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব কর্তব্য ছিল সেগুলো তিনি পূর্ণ করেন। তারপর তিনি মুসলিম সেনাবাহিনীকে রোম সাম্রাজ্যের দিকে প্রেরণ করেন। তারা ছিল শূলের পূজারী। ইসলামী বাহিনীকে তিনি অগ্নিপূজক পারস্যবাসীদের দিকেও প্রেরণ করেন। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর বরকতে এই অঞ্চলগুলোর উপর মুসলিমদেরকে বিজয় দান করেন। আর (পারস্য সম্রাট) কিসরা ও (রোম সম্রাট) কায়সার এবং তাদের অনুসারীরা হয় লাঞ্ছিত ও অপমানিত। এই দুই সম্রাটের ধনভাণ্ডার আল্লাহর পথে খরচ করা হয়, যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইতিপূর্বে এর সংবাদ দিয়েছিলেন। সুতরাং তাঁর উপদেশ প্রাপ্ত ব্যক্তি আবু বকর (রাঃ) তাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ করেন। তারপর পূর্ণ করেন আবু বকর (রাঃ)-এর স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি উমার (রাঃ)। উমার (রাঃ)-এর মাধ্যমে এই বিপথগামী কাফিরদেরকে খুবই লাঞ্ছিত করা হয়। বিদ্রোহী ও মুনাফিকদেরকে পূর্ণরূপে দমন করেন এবং পূর্ব ও পশ্চিমের সমস্ত সাম্রাজ্যের উপর বিজয় লাভ করেন। নিকটের ও দূরের সমস্ত রাজ্যের ধন-সম্পদ ইসলামের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসা হয়। এসব সম্পদ শরীয়তের বিধান অনুযায়ী হকদার লোকদের মধ্যে ও জরুরী কাজে ব্যয় করা হয়। উমার (রাঃ) জীবিত থাকলেন প্রশংসার পাত্র হয়ে এবং মারা গেলেন শহীদরূপে। তারপর মুহাজির ও আনসারগণ সর্বসম্মতভাবে আমীরুল মুমিনীন উসমান (রাঃ)-কে খলীফা নির্বাচন করলেন। উসমান (রাঃ)-এর যুগে ইসলামের শান-শওকত বৃদ্ধি পায় এবং সুনাম অর্জিত হয়। আর সারা ইসলাম জগতে মানুষের উপর হুজ্জতে ইসলাম জয়যুক্ত হয়। তাঁর যুগেই পূর্ব ও পশ্চিমের সব জায়গাতেই ইসলাম উন্নতির উচ্চ শিখরে আরোহণ করে । আল্লাহর কালেমার প্রভাব প্রতিটি জায়গায় মানুষদের উপর ছড়িয়ে পড়ে এবং মিল্লাতে হানীফিয়্যা আল্লাহর শত্রুদের উপর পূর্ণ বিজয় লাভ করে। কোন সময় এক কওমের উপর এবং কোন সময় অন্য কওমের উপর ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। আবার কখনো এমন কওমের উপর বিজয় লাভ করে যাদের ঐ কাফির ও মুশরিকদের সাথে মিত্রতা রয়েছে। এটা ছিল আল্লাহ তা'আলার নিম্নের নির্দেশ অনুযায়ী (আরবী)। আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা কাফিরদের সাথে যুদ্ধ কর যারা তোমাদের নিকটবর্তী এবং তারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা পায়।” কেননা, পূর্ণ মুমিন হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যার আচরণ নিজেদের মধ্যে খুবই কোমল এবং কাফিরদের উপর অত্যন্ত কঠোর। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অচিরেই আল্লাহ এমন কওমকে আনয়ন করবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসেন এবং তারাও তাঁকে ভালবাসে। তারা মু'মিনদের প্রতি কোমল ও কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে।” (৫:৫৪) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (সঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা কাফিরদের উপর অত্যন্ত কঠোর এবং তাদের পরস্পরের প্রতি খুবই দয়ালু।” (৪৮:২৯) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! কাফির ও মুনাফিকদের সাথে যুদ্ধ কর এবং তাদের উপর কঠোর হও।” (৬৬:৯)হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি খুব হাস্যকারী, আবার খুব যুদ্ধকারীও বটে।” অর্থাৎ আমি বন্ধুদের জন্যে খোশ মেযাজী, আবার শত্রুদের সাথে ভীষণ যুদ্ধকারীও বটে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তোমরা কাফিরদের সাথে যুদ্ধ কর এবং আল্লাহর উপর ভরসা কর। আর বিশ্বাস রেখো যে, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর আনুগত্য কর তবে তিনি সদা তোমাদের সাথে রয়েছেন। এ বিষয়টি এই উম্মতের সর্বোত্তম যুগ কুরূণে সালাসার মধ্যে খুবই দৃঢ়তার সাথে ছিল। আর এ যুগটা ছিল আল্লাহর আনুগত্য প্রতিষ্ঠার যুগ। মুসলিমরা সদা কাফিরদের উপর বিজয়ী থাকে এবং কাফিররা সর্বদা ক্ষতিগ্রস্ত ও লাঞ্ছিত হয়। যখন বাদশাহদের মধ্যে গণ্ডগোল ও মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তখন শত্রুরা দেশসমূহের চারদিকে দৃষ্টিপাত করতে শুরু করে। তারা ইসলামী সাম্রাজ্যগুলোর দিকে ধাবিত হয় এবং শক্র দেশগুলো একে অপরের সাথে এক জোট হয়ে যায়। তারপর একে অপরের সাহায্যে ইসলামী সাম্রাজ্যগুলোর সীমান্তের উপর চড়াও হয়। এভাবে তারা মুসলিমদের বহু দেশ দখল করে নেয়। কিন্তু যে ইসলামী বাদশাহ্ আল্লাহর আহকাম মেনে নেয়, আল্লাহর উপর ভরসা করে, তখন আল্লাহ অবশ্যই তাকে বিজয় দান করেন এবং সে হারানো দেশ পুনরুদ্ধার করে। আমরা আশা রাখি যে, আল্লাহ তাআলা পুনরায় মুসলিমদের বিজয় দান করবেন এবং সারা দুনিয়ায় তাওহীদের কালেমা সমুন্নত হবে। তিনি হচ্ছেন পরম দাতা ও দয়ালু।

আত-তাওবা 9:124

১২৪-১২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, যখন এই সূরা অবতীর্ণ হয় তখন মুনাফিকরা একে অপরকে বলে-আচ্ছা, এই সূরাটি মুসলিমদের মধ্যে এমন কোন অতিরিক্ত ঈমান এবং অতিরিক্ত সৌন্দর্য সৃষ্টি করলো? তাদের এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হ্যাঁ, হ্যা, নিশ্চয়ই মুসলিমদের মধ্যে অধিক ঈমান সৃষ্টি হয়েছে। আর তারা এতে খুশীও হয়েছে। এই আয়াতটি এই ব্যাপারে বড় দলীল যে, ঈমান বাড়ে এবং কমে। এটা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অধিকাংশ আলেমের মাযহাব। এমন কি অধিকাংশের উক্তি এই যে, এই ইতেকাদ বা বিশ্বাসের উপর উম্মতের ইজমা হয়েছে। শারহে বুখারীর শুরুতে এই মাসআলার উপর দীর্ঘ আলোচনা করা হয়েছে।কিন্তু যাদের অন্তরে পীড়া রয়েছে, এই আয়াতের মাধ্যমে তাদের সন্দেহ আরো বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি যা হচ্ছে (অন্তর রোগের) শিফা।” (১৭:৮২) আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি মুমিনদেরকে বলে দাও যে, কুরআন হচ্ছে ঈমানদারদের জন্যে হিদায়াত ও শিফা। আর যারা ঈমান আনে না, (কুরআনের দিক থেকে) তাদের কানে বধিরতা রয়েছে, তাদের চক্ষুগুলো অন্ধ হয়ে আছে, তাদেরকে যেন এতো দূর থেকে ডাকা হচ্ছে যে, তারা শুনতে পাচ্ছে না।” (৪১:৪৪) এটা কতই না দুর্ভাগ্যের কথা যে, যে জিনিস অন্তরের হিদায়াতের যোগ্যতা রাখে, সেটাই তাদের পথভ্রষ্টতা ও ধ্বংসের কারণ হয়ে যায়। যেমন রুগ্ন ব্যক্তিকে ভাল খাবার দিলেও তা তার ক্ষতি সাধনই করে থাকে।

আত-তাওবা 9:125

১২৪-১২৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন, যখন এই সূরা অবতীর্ণ হয় তখন মুনাফিকরা একে অপরকে বলে-আচ্ছা, এই সূরাটি মুসলিমদের মধ্যে এমন কোন অতিরিক্ত ঈমান এবং অতিরিক্ত সৌন্দর্য সৃষ্টি করলো? তাদের এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হ্যাঁ, হ্যা, নিশ্চয়ই মুসলিমদের মধ্যে অধিক ঈমান সৃষ্টি হয়েছে। আর তারা এতে খুশীও হয়েছে। এই আয়াতটি এই ব্যাপারে বড় দলীল যে, ঈমান বাড়ে এবং কমে। এটা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অধিকাংশ আলেমের মাযহাব। এমন কি অধিকাংশের উক্তি এই যে, এই ইতেকাদ বা বিশ্বাসের উপর উম্মতের ইজমা হয়েছে। শারহে বুখারীর শুরুতে এই মাসআলার উপর দীর্ঘ আলোচনা করা হয়েছে।কিন্তু যাদের অন্তরে পীড়া রয়েছে, এই আয়াতের মাধ্যমে তাদের সন্দেহ আরো বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি যা হচ্ছে (অন্তর রোগের) শিফা।” (১৭:৮২) আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি মুমিনদেরকে বলে দাও যে, কুরআন হচ্ছে ঈমানদারদের জন্যে হিদায়াত ও শিফা। আর যারা ঈমান আনে না, (কুরআনের দিক থেকে) তাদের কানে বধিরতা রয়েছে, তাদের চক্ষুগুলো অন্ধ হয়ে আছে, তাদেরকে যেন এতো দূর থেকে ডাকা হচ্ছে যে, তারা শুনতে পাচ্ছে না।” (৪১:৪৪) এটা কতই না দুর্ভাগ্যের কথা যে, যে জিনিস অন্তরের হিদায়াতের যোগ্যতা রাখে, সেটাই তাদের পথভ্রষ্টতা ও ধ্বংসের কারণ হয়ে যায়। যেমন রুগ্ন ব্যক্তিকে ভাল খাবার দিলেও তা তার ক্ষতি সাধনই করে থাকে।

আত-তাওবা 9:126

১২৬-১২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেন- এই মুনাফিকরা কি এটুকুও বুঝে না যে, প্রতি বছর তাদেরকে একবার বা দু'বার ফিত্যায় জড়িয়ে ফেলা হয়। তথাপি তারা তাদের পূর্ববর্তী গুনাহ্ থেকে বিরত থাকছে না এবং এই ব্যাপারে আগামীতে তাদের যে অবস্থা ঘটতে যাচ্ছে তা থেকে একটুও ভয় করছে না? কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যুদ্ধের বিপদ তাদের মাথায় পতিত হতো। সাহাবীগণ বলেনঃ “প্রতি বছর আমরা কোন না কোন মিথ্যা গুজব শুনতাম যার ফলে অধিকাংশ লোক বিভ্রান্ত হয়ে পড়তো। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “কাঠিন্যের যুগ বেড়ে চলছে, হীনমন্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রত্যেক বছর পূর্ব বছরের তুলনায় খারাপ অনুভূত হচ্ছে।” উল্লিখিত আয়াত মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয়েছে যে, নবী (সঃ)-এর উপর যখন কোন সূরা অবতীর্ণ হয় তখন তারা একে অপরকে লক্ষ্য করে বলে- তোমাদেরকে কেউ দেখছে না তো? তারপর তারা সত্য থেকে ফিরে যায়। দুনিয়ায় এই মুনাফিকদের অবস্থা এই যে, না তারা সত্যের সামনে আসে, না তা বুঝে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের কি হলো যে, তারা এই উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে? যেন তারা বন্য গাধা যারা ব্যাঘ্র হতে পলায়ন করছে।” (৭৪:৪৯-৫১) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুতরাং কাফিরদের কি হলো যে, তারা (এসব বিষয় জেনে নেয়া সত্ত্বেও তা মিথ্যা প্রতিপাদনের জন্যে) তোমার দিকে দৌড়িয়ে আসছে ডনি দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে দলবদ্ধভাবে?” (৭০:৩৬-৩৭) তারা যেন বন্য পশু। তারা ব্যাঘ্র হতে পলায়ন করছে এবং একবার ডান দিকে যাচ্ছে, একবার বাম দিকে যাচ্ছে। সত্য থেকে মিথ্যার দিকে তারা ঝুঁকে পড়ছে। আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরগুলো ফিরিয়ে দিয়েছেন। না তারা আল্লাহর ডাক বুঝতে পারছে, না বুঝবার চেষ্টা করছে।

আত-তাওবা 9:127

১২৬-১২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেন- এই মুনাফিকরা কি এটুকুও বুঝে না যে, প্রতি বছর তাদেরকে একবার বা দু'বার ফিত্যায় জড়িয়ে ফেলা হয়। তথাপি তারা তাদের পূর্ববর্তী গুনাহ্ থেকে বিরত থাকছে না এবং এই ব্যাপারে আগামীতে তাদের যে অবস্থা ঘটতে যাচ্ছে তা থেকে একটুও ভয় করছে না? কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যুদ্ধের বিপদ তাদের মাথায় পতিত হতো। সাহাবীগণ বলেনঃ “প্রতি বছর আমরা কোন না কোন মিথ্যা গুজব শুনতাম যার ফলে অধিকাংশ লোক বিভ্রান্ত হয়ে পড়তো। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “কাঠিন্যের যুগ বেড়ে চলছে, হীনমন্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রত্যেক বছর পূর্ব বছরের তুলনায় খারাপ অনুভূত হচ্ছে।” উল্লিখিত আয়াত মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয়েছে যে, নবী (সঃ)-এর উপর যখন কোন সূরা অবতীর্ণ হয় তখন তারা একে অপরকে লক্ষ্য করে বলে- তোমাদেরকে কেউ দেখছে না তো? তারপর তারা সত্য থেকে ফিরে যায়। দুনিয়ায় এই মুনাফিকদের অবস্থা এই যে, না তারা সত্যের সামনে আসে, না তা বুঝে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের কি হলো যে, তারা এই উপদেশ হতে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে? যেন তারা বন্য গাধা যারা ব্যাঘ্র হতে পলায়ন করছে।” (৭৪:৪৯-৫১) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুতরাং কাফিরদের কি হলো যে, তারা (এসব বিষয় জেনে নেয়া সত্ত্বেও তা মিথ্যা প্রতিপাদনের জন্যে) তোমার দিকে দৌড়িয়ে আসছে ডনি দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে দলবদ্ধভাবে?” (৭০:৩৬-৩৭) তারা যেন বন্য পশু। তারা ব্যাঘ্র হতে পলায়ন করছে এবং একবার ডান দিকে যাচ্ছে, একবার বাম দিকে যাচ্ছে। সত্য থেকে মিথ্যার দিকে তারা ঝুঁকে পড়ছে। আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরগুলো ফিরিয়ে দিয়েছেন। না তারা আল্লাহর ডাক বুঝতে পারছে, না বুঝবার চেষ্টা করছে।

আত-তাওবা 9:128

১২৮-১২৯ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের উপর নিজের ইহসান প্রকাশ করে বলেন- আমি তোমাদের জন্যে তোমাদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি। যেমন ইবরাহীম (আঃ) প্রার্থনা করেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তাদের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করুন।” (২৪ ১২৯) আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর ইহসান করেছেন, কারণ তিনি তাদের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে একজন রাসূল (সঃ) প্রেরণ করেছেন।” (৩:১৬৪) অন্য এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই তোমাদের কাছে তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল আগমন করেছে। যেমন জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) নাজ্জাশীকে এবং মুগীরা (রাঃ) কিসরার (পারস্য সম্রাট) দূতকে বলেছিলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাদের মধ্যে আমাদেরই কওমের একজনকে রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেছেন যার বংশ সম্পর্কে আমরা অবহিত রয়েছি, যাঁর গুণাবলী আমরা জানি। যার উঠা, বসা, আসা, যাওয়া, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে। অজ্ঞতার যুগ থেকেও যার বংশের মধ্যে কোন কলংক নেই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি বিয়ের মাধ্যমে বের হয়েছি, ব্যভিচারের মাধ্যমে বের হইনি। আদম (আঃ) থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমার পূর্বপুরুষদের কেউই বিবাহের মাধ্যম ছাড়া জন্মগ্রহণ করেনি।”আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আদম (আঃ) থেকে নিয়ে আমার পিতা মাতা আমাকে জন্ম দেয়া পর্যন্ত আমার বংশধারা বিবাহের মাধ্যমে চলে আসছে, ব্যভিচারের মাধ্যমে নয়।” আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ হে উম্মতে মুহাম্মাদী। তোমাদের যে কোন কষ্ট ও ক্ষতিকর বিষয় তাঁর (রাসূল সঃ-এর) কাছে খুবই কঠিন ঠেকে। হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেঃ। অর্থাৎ “আমি সহজ দ্বীন নিয়ে আগমন করেছি।” সহীহ হাদীসে রয়েছে- “এই শরীয়ত খুবই সহজ। আল্লাহ তা'আলা এটাকে খুবই সহজ করে পাঠিয়েছেন।”(আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা বড়ই আশা পোষণ করেন যে, তোমরা হিদায়াত লাভ করে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উপকার প্রাপ্ত হও। আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে এমন সাধারণ জ্ঞান দান করেন যে, আকাশে উড়ন্ত কোন পাখী সম্পর্কেও তিনি আমাদেরকে জ্ঞান দেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতের নিকটবর্তীকারী এবং জাহান্নাম হতে দূরকারী এমন কোন কিছু বাকী নেই যা আমি তোমাদের কাছে বর্ণনা করিনি।” (এই হাদীস দু’টি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক হারাম ও নাজায়েয বিষয় সম্পর্কে। তোমাদেরকে অবহিত করেছেন। সুতরাং যদি তোমরা তাঁর বর্ণনাকৃত হারাম বিষয় থেকে দূরে না থাকো তবে আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছি যে, তোমরা এমনভাবে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে যেমনভাবে পোকা মাকড় আগুনে পতিত হয়ে থাকে।” (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (একদা) নবী (সঃ)-এর কাছে দু’জন ফিরিশতা আগমন করেন। ঐ সময় তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। একজন তার মাথার কাছে বসলেন। পায়ের কাছে উপবিষ্ট ফিরিশতা মাথার কাছে উপবিষ্ট ফিরিশতাকে বললেনঃ “তাঁর (নবী সঃ-এর ) এবং তাঁর উম্মতের অবস্থা উপযোগী কোন একটি উপমা বর্ণনা করুন!” তখন শিয়রে উপবিষ্ট ফিরিশতা বললেন, তাঁর উপমা তার উম্মতের সাথে এইরূপ, যেমন একদল লোক সফর করতে করতে এক জন-মানবহীন বিস্তীর্ণ মরু প্রান্তরের মাঝে পৌছে গেল। তাদের পাথেয় নিঃশেষ হয়ে গেছে। তারা এখন না পারছে সামনে অগ্রসর হতে, না পারছে পিছনে ফিরে আসতে। এমতাবস্থায় একজন সুন্দর পোশাক পরিহিত লোক তাদের কাছে আসলেন এবং বললেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এখান থেকে বের করে এক সুন্দর সবুজ বাগানে নিয়ে যাবো? সেখানে রয়েছে নহর ও পানির হাউজ! তোমরা আমার সাথে যাবেকি?” তারা তার কথায় খুবই খুশী মনে সম্মত হয়ে যায়। তিনি তাদেরকে ঐ সুন্দর সবুজ বাগানে নিয়ে যান। তারা সেখানে সুস্বাদু ফল খেয়ে ও সুপেয় পানি পান করে পরিতুষ্ট ও পরিতৃপ্ত হয় এবং বেশ মোটা তাজা হয়। অতঃপর ঐ লোকটি তাদেরকে বলেনঃ “আমি কি তোমাদের শুভাকাঙক্ষী হিসেবে তোমাদের হক আদায় করিনি এবং তোমাদেরকে সুন্দর শ্যামল স্থানে পৌছিয়ে দেইনি? এখন জেনে রেখো যে, তোমাদের সামনে এর চেয়েও বেশী মনোরম ও আনন্দদায়ক সবুজ শ্যামল বাগান রয়েছে এবং সেখানে সুপেয় পানির হাউজও রয়েছে। চল, আমি তোমাদেরকে সেখানে নিয়ে যাই।” তখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ বললোঃ “আপনি ইতিপূর্বেও সত্য কথা বলেছিলেন এবং এখনও সত্য কথাই বলছেন। অবশ্যই আমরা আপনার সাথে রয়েছি।” আর কতকগুলো তাক বললোঃ “আমরা তো এখানেই ভাল রয়েছি। আমাদের জন্যে এটাই যথেষ্ট। ভবিষ্যতের ভোগ্য বস্তুর আমাদের কোনই প্রয়োজন নেই।” অর্থাৎ এরা হচ্ছে ঐসব লোক যারা দুনিয়ার পিছনেই পাগল হয়ে রয়েছে, পরকালের কোন খবর তাদের নেই। অথচ এখানকার তুলনায় সেখানকার সুখ বহুগুণে বেশী।আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে কিছু আর্থিক সাহায্য চাইলো। ইকরামা (রঃ) বলেন, আমার মনে হয় লোকটি রক্তপণ আদায় করার জন্যে সাহায্য চেয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে কিছু দান করে বলেনঃ “লও, আমি তোমার কাজ চালিয়ে দিলাম এবং তোমার সাথে উত্তম ব্যবহার করলাম।” লোকটি তখন বললোঃ “না, আপনি আমার প্রতি কোন ইহসান বা অনুগ্রহ করেননি। তার এ কথা শুনে কয়েকজন সাহাবী ক্রোধান্বিত হন এবং তাকে আক্রমণ করার ইচ্ছা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইঙ্গিতে তাঁদেরকে নিষেধ করে দেন। অতঃপর তিনি উঠে নিজের মনযিলে চলে যান এবং ঐ বেদুঈনকে ডেকে পাঠান। তারপর তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি কিছু চেয়েছিলে, আমি তোমাকে দিয়েছিলাম। এর পর তুমি যা বলার তা বলেছো। আচ্ছা, আরো লও।” আবার তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এবারও কি আমি তোমার সাথে উত্তম ব্যবহার করিনি?” বেদুঈন উত্তরে বললোঃ “হা, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আমার সাহাবীগণ তোমার প্রতি ক্রোধান্বিত রয়েছে। সুতরাং তুমি এখন তাদের কাছে যাও এবং আমার সামনে যা বললে তাদের সামনেও তাই বলো যাতে তাদের ক্রোধ দূর হয়ে যায়। বেদুঈন তখন বললোঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে।” অতঃপর যখন বেদুঈন তাঁদের কাছে আসলো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সম্পর্কে বললেনঃ “এ লোকটি আমার কাছে কিছু চেয়েছিল, আমি কিছু তাকে দিয়েছিলাম। কিন্তু সে যা বলেছিল তা তোমরা অবগত আছ। তারপর আমি তাকে ডেকে আরো দিয়েছি। সে এখন সন্তুষ্ট হয়েছে। হে বেদুঈন! আমার এ কথা সত্য কি?” বেদুঈন উত্তরে বললোঃ “হ্যা, আল্লাহ আপনাকে প্রতিদান প্রদান করুন!”রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আমার ও এই বেদুঈনের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এইরূপ, যেমন কোন লোকের একটি উন্ত্রী রয়েছে। উজ্জ্বীটি উত্তেজিত হয়ে উঠলো। জনগণ ওর পিছনে ছুটলো। উষ্ট্ৰীটি আরো দ্রুত বেগে পালাতে লাগলো। তখন উষ্ট্রীর মালিক জনগণকে বললোঃ “তোমরা উজ্জ্বীটিকে অনুগত করার ব্যাপারটা আমার উপর ছেড়ে দাও। কারণ ওর আচরণ সম্পর্কে আমিই ভাল জানি। আমি ওকে নম্র করে নেবো।” তারপর সে ঘাস নিয়ে ওকে ডাকতে লাগলো। ও এসে গেল। লোকটি তখন ওকে ঘাস খেতে দিয়ে ধরে ফেললো। ওর উপর জিন ফেলে দিলো। আমিও যদি এই বেদুঈনের দুর্ব্যবহারের কারণে তোমাদের মত তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যেতাম তবে সে জাহান্নামী হয়ে যেতো। (এ হাদীসটি বাযযায (রঃ) বর্ণনা করেছেন) কিন্তু এই হাদীসটি দুর্বল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) এই আয়াতে কারীমাতেও এই নির্দেশই দেয়া হচ্ছে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যে মহান শরীয়ত তুমি আনয়ন করেছে, যদি এই লোকগুলো এর থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে তবে তুমি তাদেরকে বলে দাও-আমার জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট। আমি তোমাদের উপর নয়, বরং তাঁরই উপর ভরসা করছি। তিনি প্রত্যেক জিনিসের মালিক ও স্রষ্টা, তিনি বিরাট আরশের রব। তার বিরাট আরশ হচ্ছে সারা মাখলুকাতের ছাদ স্বরূপ। যমীন ও আসমানের সমস্ত মাখলুক তার আরশের নীচে রয়েছে। সমস্ত সৃষ্টজীব তাঁর ক্ষমতার দখলে রয়েছে। তার জ্ঞান সমস্ত বস্তুকে পরিবেষ্টনকারী। উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, আয়াতটিই হচ্ছে কুরআন কারীমের শেষ আয়াত। কুরআনের সমস্ত আয়াত ও সূরা আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে বিন্যস্ত কুরআনের আকারে জমা করা হয়। লোকেরা লিখতেন এবং উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) লিখাতেন। যখন সূরায়ে বারাআতের (আরবী) -এই আয়াতে পৌছেন, তখন ধারণা করা হয় যে, এটাই কুরআন কারীমের শেষ আয়াত। তখন তিনি তাদেরকে বলেন, এর পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে নিম্নের দু'টি আয়াতও শুনিয়েছিলেনঃ (আরবী) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত। তিনি বলেন যে, এ হচ্ছে কুরআন কারীমের শেষ আয়াত এবং যার উপর শুরু হয়েছিল তারই উপর শেষ হয়েছে। অর্থাৎ ঐ আল্লাহর নামে যিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। এ সম্পর্কেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যে নবীকেই পাঠিয়েছি তার কাছেই আমি এই অহী করেছি-আমি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত করো।” (২১:২৫) (এ হাদীসটিও গারীব বা দুর্বল)আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, হারিস ইবনে খুযাইমা (রাঃ) সূরায়ে বারাআতের শেষ দু’টি আয়াত নিয়ে উমার (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন। উমার (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এই অহীর সাক্ষ্য আর কে দিবে?” হারিস (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আর কেউ এটা জানে কি না তা তো আমার জানা নেই। তবে আল্লাহর কসম! আমি স্বয়ং এটা নবী (সঃ)-এর মুখে শুনেছি এবং সঠিক মনে রেখেছি।” তখন উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি।” তারপর তিনি বলেনঃ “যদি এটা কমপক্ষে তিনটি আয়াত হতো তবে আমি এটাকে একটা পৃথক সূরারূপে নির্ধারণ করতাম। তুমি এটাকে কুরআন কারীমের কোন এক জায়গায় রেখে দাও।” সুতরাং এটাকে সূরায়ে বরাআতের শেষে রাখা হয়েছে।' (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-ই আবু বকর (রাঃ)-কে পরামর্শ দিয়েছিলেন যেন কুরআন কারীমের সমস্ত আয়াতকে খুঁজে খুঁজে এক জায়গায় জমা করা হয় এবং এটা খুবই কল্যাণকর কাজ হবে। সুতরাং আবু বকর (রাঃ) যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ)-কে কুরআন জমা করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ মোতাবেক যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) কুরআন জমা করতেন ও বিন্যস্ত করে চলতেন এবং উমার (রাঃ)-ও সেখানে উপস্থিত থাকতেন।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, যায়েদ (রাঃ) বলেছেনঃ “সূরায়ে বারাআতের শেষ অংশটুকু আমি খুযাইমা ইবনে সাবিত বা আবু খুযাইমা (রাঃ)-এর নিকট পেয়েছিলাম। আর এটাও আমি বর্ণনা করে দিয়েছি যে, সাহাবীদের একটি দল নবী (সঃ)-এর সামনে এর বর্ণনা করেছেন, যেমন খুযাইমা ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেছিলেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী। আবু দারদা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি সকাল সন্ধ্যায় নিম্নের কালেমা সাতবার করে পাঠ করে, আল্লাহ তা'আলা তার সকল কাজ সমাধা করে দেন এবং তার সকল ইচ্ছা পূর্ণ করেন। কালেমাটি হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই, আমি তাঁরই উপর নির্ভর করেছি, আর তিনি হচ্ছেন অতি বড় আরশের মালিক।” আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যে ব্যক্তি এই অংশটুকু সাতবার পাঠ করবে, তার ইচ্ছা পূর্ণ করার জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট, সে তা নিষ্টার সাথে পাঠ করুক বা নাই করুক। কিন্তু এই বর্ধিত অংশটুকু গারীব বা দুর্বল। একটি মারফু হাদীসেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।

আত-তাওবা 9:129

১২৮-১২৯ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের উপর নিজের ইহসান প্রকাশ করে বলেন- আমি তোমাদের জন্যে তোমাদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি। যেমন ইবরাহীম (আঃ) প্রার্থনা করেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তাদের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করুন।” (২৪ ১২৯) আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর ইহসান করেছেন, কারণ তিনি তাদের মধ্যে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে একজন রাসূল (সঃ) প্রেরণ করেছেন।” (৩:১৬৪) অন্য এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই তোমাদের কাছে তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল আগমন করেছে। যেমন জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) নাজ্জাশীকে এবং মুগীরা (রাঃ) কিসরার (পারস্য সম্রাট) দূতকে বলেছিলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাদের মধ্যে আমাদেরই কওমের একজনকে রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেছেন যার বংশ সম্পর্কে আমরা অবহিত রয়েছি, যাঁর গুণাবলী আমরা জানি। যার উঠা, বসা, আসা, যাওয়া, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে। অজ্ঞতার যুগ থেকেও যার বংশের মধ্যে কোন কলংক নেই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি বিয়ের মাধ্যমে বের হয়েছি, ব্যভিচারের মাধ্যমে বের হইনি। আদম (আঃ) থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমার পূর্বপুরুষদের কেউই বিবাহের মাধ্যম ছাড়া জন্মগ্রহণ করেনি।”আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আদম (আঃ) থেকে নিয়ে আমার পিতা মাতা আমাকে জন্ম দেয়া পর্যন্ত আমার বংশধারা বিবাহের মাধ্যমে চলে আসছে, ব্যভিচারের মাধ্যমে নয়।” আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ হে উম্মতে মুহাম্মাদী। তোমাদের যে কোন কষ্ট ও ক্ষতিকর বিষয় তাঁর (রাসূল সঃ-এর) কাছে খুবই কঠিন ঠেকে। হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেঃ। অর্থাৎ “আমি সহজ দ্বীন নিয়ে আগমন করেছি।” সহীহ হাদীসে রয়েছে- “এই শরীয়ত খুবই সহজ। আল্লাহ তা'আলা এটাকে খুবই সহজ করে পাঠিয়েছেন।”(আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা বড়ই আশা পোষণ করেন যে, তোমরা হিদায়াত লাভ করে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উপকার প্রাপ্ত হও। আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে এমন সাধারণ জ্ঞান দান করেন যে, আকাশে উড়ন্ত কোন পাখী সম্পর্কেও তিনি আমাদেরকে জ্ঞান দেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতের নিকটবর্তীকারী এবং জাহান্নাম হতে দূরকারী এমন কোন কিছু বাকী নেই যা আমি তোমাদের কাছে বর্ণনা করিনি।” (এই হাদীস দু’টি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক হারাম ও নাজায়েয বিষয় সম্পর্কে। তোমাদেরকে অবহিত করেছেন। সুতরাং যদি তোমরা তাঁর বর্ণনাকৃত হারাম বিষয় থেকে দূরে না থাকো তবে আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছি যে, তোমরা এমনভাবে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে যেমনভাবে পোকা মাকড় আগুনে পতিত হয়ে থাকে।” (এই হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (একদা) নবী (সঃ)-এর কাছে দু’জন ফিরিশতা আগমন করেন। ঐ সময় তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। একজন তার মাথার কাছে বসলেন। পায়ের কাছে উপবিষ্ট ফিরিশতা মাথার কাছে উপবিষ্ট ফিরিশতাকে বললেনঃ “তাঁর (নবী সঃ-এর ) এবং তাঁর উম্মতের অবস্থা উপযোগী কোন একটি উপমা বর্ণনা করুন!” তখন শিয়রে উপবিষ্ট ফিরিশতা বললেন, তাঁর উপমা তার উম্মতের সাথে এইরূপ, যেমন একদল লোক সফর করতে করতে এক জন-মানবহীন বিস্তীর্ণ মরু প্রান্তরের মাঝে পৌছে গেল। তাদের পাথেয় নিঃশেষ হয়ে গেছে। তারা এখন না পারছে সামনে অগ্রসর হতে, না পারছে পিছনে ফিরে আসতে। এমতাবস্থায় একজন সুন্দর পোশাক পরিহিত লোক তাদের কাছে আসলেন এবং বললেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে এখান থেকে বের করে এক সুন্দর সবুজ বাগানে নিয়ে যাবো? সেখানে রয়েছে নহর ও পানির হাউজ! তোমরা আমার সাথে যাবেকি?” তারা তার কথায় খুবই খুশী মনে সম্মত হয়ে যায়। তিনি তাদেরকে ঐ সুন্দর সবুজ বাগানে নিয়ে যান। তারা সেখানে সুস্বাদু ফল খেয়ে ও সুপেয় পানি পান করে পরিতুষ্ট ও পরিতৃপ্ত হয় এবং বেশ মোটা তাজা হয়। অতঃপর ঐ লোকটি তাদেরকে বলেনঃ “আমি কি তোমাদের শুভাকাঙক্ষী হিসেবে তোমাদের হক আদায় করিনি এবং তোমাদেরকে সুন্দর শ্যামল স্থানে পৌছিয়ে দেইনি? এখন জেনে রেখো যে, তোমাদের সামনে এর চেয়েও বেশী মনোরম ও আনন্দদায়ক সবুজ শ্যামল বাগান রয়েছে এবং সেখানে সুপেয় পানির হাউজও রয়েছে। চল, আমি তোমাদেরকে সেখানে নিয়ে যাই।” তখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ বললোঃ “আপনি ইতিপূর্বেও সত্য কথা বলেছিলেন এবং এখনও সত্য কথাই বলছেন। অবশ্যই আমরা আপনার সাথে রয়েছি।” আর কতকগুলো তাক বললোঃ “আমরা তো এখানেই ভাল রয়েছি। আমাদের জন্যে এটাই যথেষ্ট। ভবিষ্যতের ভোগ্য বস্তুর আমাদের কোনই প্রয়োজন নেই।” অর্থাৎ এরা হচ্ছে ঐসব লোক যারা দুনিয়ার পিছনেই পাগল হয়ে রয়েছে, পরকালের কোন খবর তাদের নেই। অথচ এখানকার তুলনায় সেখানকার সুখ বহুগুণে বেশী।আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এসে কিছু আর্থিক সাহায্য চাইলো। ইকরামা (রঃ) বলেন, আমার মনে হয় লোকটি রক্তপণ আদায় করার জন্যে সাহায্য চেয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে কিছু দান করে বলেনঃ “লও, আমি তোমার কাজ চালিয়ে দিলাম এবং তোমার সাথে উত্তম ব্যবহার করলাম।” লোকটি তখন বললোঃ “না, আপনি আমার প্রতি কোন ইহসান বা অনুগ্রহ করেননি। তার এ কথা শুনে কয়েকজন সাহাবী ক্রোধান্বিত হন এবং তাকে আক্রমণ করার ইচ্ছা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইঙ্গিতে তাঁদেরকে নিষেধ করে দেন। অতঃপর তিনি উঠে নিজের মনযিলে চলে যান এবং ঐ বেদুঈনকে ডেকে পাঠান। তারপর তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি কিছু চেয়েছিলে, আমি তোমাকে দিয়েছিলাম। এর পর তুমি যা বলার তা বলেছো। আচ্ছা, আরো লও।” আবার তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এবারও কি আমি তোমার সাথে উত্তম ব্যবহার করিনি?” বেদুঈন উত্তরে বললোঃ “হা, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আমার সাহাবীগণ তোমার প্রতি ক্রোধান্বিত রয়েছে। সুতরাং তুমি এখন তাদের কাছে যাও এবং আমার সামনে যা বললে তাদের সামনেও তাই বলো যাতে তাদের ক্রোধ দূর হয়ে যায়। বেদুঈন তখন বললোঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে।” অতঃপর যখন বেদুঈন তাঁদের কাছে আসলো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সম্পর্কে বললেনঃ “এ লোকটি আমার কাছে কিছু চেয়েছিল, আমি কিছু তাকে দিয়েছিলাম। কিন্তু সে যা বলেছিল তা তোমরা অবগত আছ। তারপর আমি তাকে ডেকে আরো দিয়েছি। সে এখন সন্তুষ্ট হয়েছে। হে বেদুঈন! আমার এ কথা সত্য কি?” বেদুঈন উত্তরে বললোঃ “হ্যা, আল্লাহ আপনাকে প্রতিদান প্রদান করুন!”রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আমার ও এই বেদুঈনের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এইরূপ, যেমন কোন লোকের একটি উন্ত্রী রয়েছে। উজ্জ্বীটি উত্তেজিত হয়ে উঠলো। জনগণ ওর পিছনে ছুটলো। উষ্ট্ৰীটি আরো দ্রুত বেগে পালাতে লাগলো। তখন উষ্ট্রীর মালিক জনগণকে বললোঃ “তোমরা উজ্জ্বীটিকে অনুগত করার ব্যাপারটা আমার উপর ছেড়ে দাও। কারণ ওর আচরণ সম্পর্কে আমিই ভাল জানি। আমি ওকে নম্র করে নেবো।” তারপর সে ঘাস নিয়ে ওকে ডাকতে লাগলো। ও এসে গেল। লোকটি তখন ওকে ঘাস খেতে দিয়ে ধরে ফেললো। ওর উপর জিন ফেলে দিলো। আমিও যদি এই বেদুঈনের দুর্ব্যবহারের কারণে তোমাদের মত তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যেতাম তবে সে জাহান্নামী হয়ে যেতো। (এ হাদীসটি বাযযায (রঃ) বর্ণনা করেছেন) কিন্তু এই হাদীসটি দুর্বল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবী) এই আয়াতে কারীমাতেও এই নির্দেশই দেয়া হচ্ছে-হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যে মহান শরীয়ত তুমি আনয়ন করেছে, যদি এই লোকগুলো এর থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে তবে তুমি তাদেরকে বলে দাও-আমার জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট। আমি তোমাদের উপর নয়, বরং তাঁরই উপর ভরসা করছি। তিনি প্রত্যেক জিনিসের মালিক ও স্রষ্টা, তিনি বিরাট আরশের রব। তার বিরাট আরশ হচ্ছে সারা মাখলুকাতের ছাদ স্বরূপ। যমীন ও আসমানের সমস্ত মাখলুক তার আরশের নীচে রয়েছে। সমস্ত সৃষ্টজীব তাঁর ক্ষমতার দখলে রয়েছে। তার জ্ঞান সমস্ত বস্তুকে পরিবেষ্টনকারী। উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, আয়াতটিই হচ্ছে কুরআন কারীমের শেষ আয়াত। কুরআনের সমস্ত আয়াত ও সূরা আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে বিন্যস্ত কুরআনের আকারে জমা করা হয়। লোকেরা লিখতেন এবং উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) লিখাতেন। যখন সূরায়ে বারাআতের (আরবী) -এই আয়াতে পৌছেন, তখন ধারণা করা হয় যে, এটাই কুরআন কারীমের শেষ আয়াত। তখন তিনি তাদেরকে বলেন, এর পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে নিম্নের দু'টি আয়াতও শুনিয়েছিলেনঃ (আরবী) হতে সূরার শেষ পর্যন্ত। তিনি বলেন যে, এ হচ্ছে কুরআন কারীমের শেষ আয়াত এবং যার উপর শুরু হয়েছিল তারই উপর শেষ হয়েছে। অর্থাৎ ঐ আল্লাহর নামে যিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। এ সম্পর্কেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যে নবীকেই পাঠিয়েছি তার কাছেই আমি এই অহী করেছি-আমি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত করো।” (২১:২৫) (এ হাদীসটিও গারীব বা দুর্বল)আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, হারিস ইবনে খুযাইমা (রাঃ) সূরায়ে বারাআতের শেষ দু’টি আয়াত নিয়ে উমার (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন। উমার (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এই অহীর সাক্ষ্য আর কে দিবে?” হারিস (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আর কেউ এটা জানে কি না তা তো আমার জানা নেই। তবে আল্লাহর কসম! আমি স্বয়ং এটা নবী (সঃ)-এর মুখে শুনেছি এবং সঠিক মনে রেখেছি।” তখন উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি।” তারপর তিনি বলেনঃ “যদি এটা কমপক্ষে তিনটি আয়াত হতো তবে আমি এটাকে একটা পৃথক সূরারূপে নির্ধারণ করতাম। তুমি এটাকে কুরআন কারীমের কোন এক জায়গায় রেখে দাও।” সুতরাং এটাকে সূরায়ে বরাআতের শেষে রাখা হয়েছে।' (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-ই আবু বকর (রাঃ)-কে পরামর্শ দিয়েছিলেন যেন কুরআন কারীমের সমস্ত আয়াতকে খুঁজে খুঁজে এক জায়গায় জমা করা হয় এবং এটা খুবই কল্যাণকর কাজ হবে। সুতরাং আবু বকর (রাঃ) যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ)-কে কুরআন জমা করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ মোতাবেক যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) কুরআন জমা করতেন ও বিন্যস্ত করে চলতেন এবং উমার (রাঃ)-ও সেখানে উপস্থিত থাকতেন।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, যায়েদ (রাঃ) বলেছেনঃ “সূরায়ে বারাআতের শেষ অংশটুকু আমি খুযাইমা ইবনে সাবিত বা আবু খুযাইমা (রাঃ)-এর নিকট পেয়েছিলাম। আর এটাও আমি বর্ণনা করে দিয়েছি যে, সাহাবীদের একটি দল নবী (সঃ)-এর সামনে এর বর্ণনা করেছেন, যেমন খুযাইমা ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেছিলেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী। আবু দারদা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি সকাল সন্ধ্যায় নিম্নের কালেমা সাতবার করে পাঠ করে, আল্লাহ তা'আলা তার সকল কাজ সমাধা করে দেন এবং তার সকল ইচ্ছা পূর্ণ করেন। কালেমাটি হচ্ছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই, আমি তাঁরই উপর নির্ভর করেছি, আর তিনি হচ্ছেন অতি বড় আরশের মালিক।” আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, যে ব্যক্তি এই অংশটুকু সাতবার পাঠ করবে, তার ইচ্ছা পূর্ণ করার জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট, সে তা নিষ্টার সাথে পাঠ করুক বা নাই করুক। কিন্তু এই বর্ধিত অংশটুকু গারীব বা দুর্বল। একটি মারফু হাদীসেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।