Tafseer ibn Kathir — আল-আহযাব 33:1 – আল-আহযাব 33:48
Contents
- আল-আহযাব 33:1
- আল-আহযাব 33:2
- আল-আহযাব 33:3
- আল-আহযাব 33:4
- আল-আহযাব 33:5
- আল-আহযাব 33:6
- আল-আহযাব 33:7
- আল-আহযাব 33:8
- আল-আহযাব 33:9
- আল-আহযাব 33:10
- আল-আহযাব 33:11
- আল-আহযাব 33:12
- আল-আহযাব 33:13
- আল-আহযাব 33:14
- আল-আহযাব 33:15
- আল-আহযাব 33:16
- আল-আহযাব 33:17
- আল-আহযাব 33:18
- আল-আহযাব 33:19
- আল-আহযাব 33:20
- আল-আহযাব 33:21
- আল-আহযাব 33:22
- আল-আহযাব 33:23
- আল-আহযাব 33:24
- আল-আহযাব 33:25
- আল-আহযাব 33:26
- আল-আহযাব 33:27
- আল-আহযাব 33:28
- আল-আহযাব 33:29
- আল-আহযাব 33:30
- আল-আহযাব 33:31
- আল-আহযাব 33:32
- আল-আহযাব 33:33
- আল-আহযাব 33:34
- আল-আহযাব 33:35
- আল-আহযাব 33:36
- আল-আহযাব 33:37
- আল-আহযাব 33:38
- আল-আহযাব 33:39
- আল-আহযাব 33:40
- আল-আহযাব 33:41
- আল-আহযাব 33:42
- আল-আহযাব 33:43
- আল-আহযাব 33:44
- আল-আহযাব 33:45
- আল-আহযাব 33:46
- আল-আহযাব 33:47
- আল-আহযাব 33:48
আল-আহযাব 33:1
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হযরত যির (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “সূরায়ে আহযাবের কতটি আয়াত গণনা করা হয়?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “ তেহাত্তরটি।” তখন হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেনঃ “না, না। আমি তো দেখেছি যে, এ সূরাটি প্রায় সূরায়ে বাকারার সমান ছিল। এই সূরার মধ্যেই নিম্নের আয়াতটিও আমরা পাঠ করতামঃ (আরবি)অর্থাৎ “বুড়ো ও বুড়ী যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে তোমরা তাদেরকে অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে হত্যা করে ফেললো, এটা হলো আল্লাহর পক্ষ হতে শাস্তি এবং আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়।” এর দ্বারা জানা যায় যে, এই সূরার। কতকগুলো আয়াত আল্লাহর নির্দেশক্রমে রহিত হয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। ১-৩ নং আয়াতের তাফসীরসতর্ক করার সুন্দর পন্থা এই যে, বড়দেরকে বলতে হবে যাতে ছোটরা তা শুনে সাবধান হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে যখন কোন কথা গুরুত্বের সাথে বলেন তখন বুঝে নিতে হবে যে, অন্যের জন্যে এর গুরুত্ব আরো বেশী। আল্লাহর হিদায়াত অনুযায়ী পুণ্য লাভ করার নিয়তে তাঁর ফরমানের আনুগত্য করা এবং তাঁর ফরমান অনুযায়ী তার শাস্তি থেকে বাচার উদ্দেশ্যে তাঁর নাফরমানী পরিত্যাগ করার নাম হলো তাকওয়া। আর কাফির ও মুনাফিকদের কথা না মানা, তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ না করা এবং স্বীকার করে নেয়ার নিয়তে তাদের কথা না শোনার নামও তাকওয়া। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী তো। একমাত্র আল্লাহ। তিনি তাঁর প্রশস্ত ও ব্যাপক জ্ঞানের মাধ্যমে প্রত্যেক কাজের ফুল বা পরিণাম সম্যক অবগত। তার সীমাহীন হিকমতের কারণে তার কোন কাজ, কোন কথা বিবেচনা ও নীতি বহিভূর্ত হয় না। তাই তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ অতএব তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অহী করা হয় তুমি তারই অনুসরণ কর, যাতে তুমি খারাপ পরিণতি ও বিভ্রান্তি হতে বাঁচতে পার। আল্লাহ তা'আলার কাছে কারো ক্রিয়াকলাপ গোপন নেই। নিজের সমস্ত কাজকর্মে শুধু আল্লাহর উপরই ভরসা কর। তার উপর যে ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট হন। কারণ তিনি সমস্ত কাজের উপর পূর্ণ শক্তিশালী। তাঁর প্রতি যে আকৃষ্ট হয় বা তাঁর দিকে যে ঝুঁকে পড়ে সে সফলকামই হয়ে থাকে।
আল-আহযাব 33:2
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হযরত যির (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “সূরায়ে আহযাবের কতটি আয়াত গণনা করা হয়?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “ তেহাত্তরটি।” তখন হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেনঃ “না, না। আমি তো দেখেছি যে, এ সূরাটি প্রায় সূরায়ে বাকারার সমান ছিল। এই সূরার মধ্যেই নিম্নের আয়াতটিও আমরা পাঠ করতামঃ (আরবি)অর্থাৎ “বুড়ো ও বুড়ী যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে তোমরা তাদেরকে অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে হত্যা করে ফেললো, এটা হলো আল্লাহর পক্ষ হতে শাস্তি এবং আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়।” এর দ্বারা জানা যায় যে, এই সূরার। কতকগুলো আয়াত আল্লাহর নির্দেশক্রমে রহিত হয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। ১-৩ নং আয়াতের তাফসীরসতর্ক করার সুন্দর পন্থা এই যে, বড়দেরকে বলতে হবে যাতে ছোটরা তা শুনে সাবধান হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে যখন কোন কথা গুরুত্বের সাথে বলেন তখন বুঝে নিতে হবে যে, অন্যের জন্যে এর গুরুত্ব আরো বেশী। আল্লাহর হিদায়াত অনুযায়ী পুণ্য লাভ করার নিয়তে তাঁর ফরমানের আনুগত্য করা এবং তাঁর ফরমান অনুযায়ী তার শাস্তি থেকে বাচার উদ্দেশ্যে তাঁর নাফরমানী পরিত্যাগ করার নাম হলো তাকওয়া। আর কাফির ও মুনাফিকদের কথা না মানা, তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ না করা এবং স্বীকার করে নেয়ার নিয়তে তাদের কথা না শোনার নামও তাকওয়া। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী তো। একমাত্র আল্লাহ। তিনি তাঁর প্রশস্ত ও ব্যাপক জ্ঞানের মাধ্যমে প্রত্যেক কাজের ফুল বা পরিণাম সম্যক অবগত। তার সীমাহীন হিকমতের কারণে তার কোন কাজ, কোন কথা বিবেচনা ও নীতি বহিভূর্ত হয় না। তাই তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ অতএব তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অহী করা হয় তুমি তারই অনুসরণ কর, যাতে তুমি খারাপ পরিণতি ও বিভ্রান্তি হতে বাঁচতে পার। আল্লাহ তা'আলার কাছে কারো ক্রিয়াকলাপ গোপন নেই। নিজের সমস্ত কাজকর্মে শুধু আল্লাহর উপরই ভরসা কর। তার উপর যে ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট হন। কারণ তিনি সমস্ত কাজের উপর পূর্ণ শক্তিশালী। তাঁর প্রতি যে আকৃষ্ট হয় বা তাঁর দিকে যে ঝুঁকে পড়ে সে সফলকামই হয়ে থাকে।
আল-আহযাব 33:3
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হযরত যির (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “সূরায়ে আহযাবের কতটি আয়াত গণনা করা হয়?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “ তেহাত্তরটি।” তখন হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেনঃ “না, না। আমি তো দেখেছি যে, এ সূরাটি প্রায় সূরায়ে বাকারার সমান ছিল। এই সূরার মধ্যেই নিম্নের আয়াতটিও আমরা পাঠ করতামঃ (আরবি)অর্থাৎ “বুড়ো ও বুড়ী যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে তোমরা তাদেরকে অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে হত্যা করে ফেললো, এটা হলো আল্লাহর পক্ষ হতে শাস্তি এবং আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়।” এর দ্বারা জানা যায় যে, এই সূরার। কতকগুলো আয়াত আল্লাহর নির্দেশক্রমে রহিত হয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। ১-৩ নং আয়াতের তাফসীরসতর্ক করার সুন্দর পন্থা এই যে, বড়দেরকে বলতে হবে যাতে ছোটরা তা শুনে সাবধান হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে যখন কোন কথা গুরুত্বের সাথে বলেন তখন বুঝে নিতে হবে যে, অন্যের জন্যে এর গুরুত্ব আরো বেশী। আল্লাহর হিদায়াত অনুযায়ী পুণ্য লাভ করার নিয়তে তাঁর ফরমানের আনুগত্য করা এবং তাঁর ফরমান অনুযায়ী তার শাস্তি থেকে বাচার উদ্দেশ্যে তাঁর নাফরমানী পরিত্যাগ করার নাম হলো তাকওয়া। আর কাফির ও মুনাফিকদের কথা না মানা, তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ না করা এবং স্বীকার করে নেয়ার নিয়তে তাদের কথা না শোনার নামও তাকওয়া। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী তো। একমাত্র আল্লাহ। তিনি তাঁর প্রশস্ত ও ব্যাপক জ্ঞানের মাধ্যমে প্রত্যেক কাজের ফুল বা পরিণাম সম্যক অবগত। তার সীমাহীন হিকমতের কারণে তার কোন কাজ, কোন কথা বিবেচনা ও নীতি বহিভূর্ত হয় না। তাই তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ অতএব তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অহী করা হয় তুমি তারই অনুসরণ কর, যাতে তুমি খারাপ পরিণতি ও বিভ্রান্তি হতে বাঁচতে পার। আল্লাহ তা'আলার কাছে কারো ক্রিয়াকলাপ গোপন নেই। নিজের সমস্ত কাজকর্মে শুধু আল্লাহর উপরই ভরসা কর। তার উপর যে ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট হন। কারণ তিনি সমস্ত কাজের উপর পূর্ণ শক্তিশালী। তাঁর প্রতি যে আকৃষ্ট হয় বা তাঁর দিকে যে ঝুঁকে পড়ে সে সফলকামই হয়ে থাকে।
আল-আহযাব 33:4
৪-৫ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা উদ্দেশ্য বর্ণনা করার পূর্বে ভূমিকা ও প্রমাণের দৃষ্টান্ত স্বরূপ দু'একটি ঐ কথা বলেছেন যা সবাই অনুভব করে থাকে। অতঃপর সেদিক থেকে চিন্তা ও খেয়াল ফিরিয়ে নিজের উদ্দেশ্যের দিকে নিয়ে গিয়েছেন। তিনি বলেনঃ কোন মানুষের হৃদয় বা অন্তর দু’টি হয় না। এভাবেই তুমি বুঝে নাও যে, তুমি যদি তোমার কোন স্ত্রীকে মা বলে দাও তবে সে সত্যিই তোমার মা হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে অপরের পুত্রকে তুমি পুত্র বানিয়ে নিলে সে সত্যিকারের পুত্র হবে না। কেউ যদি ক্রোধের সময় তার স্ত্রীকে বলে ফেলেঃ তুমি আমার কাছে এমনই যেমন আমার মায়ের পিঠ। এরূপ বললে সে সত্যি সত্যিই মা হয়ে যাবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা তাদের মা নয়, তাদের মা তো তারাই যাদেরকে তারা জন্ম দিয়েছে বা প্রসব করেছে।” (৫৮:২) এ দু'টি কথা বর্ণনা করার পর মূল উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হচ্ছে যে, মানুষের পালক পুত্র তার প্রকৃত পুত্র হতে পারে না। এ আয়াতটি হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নবুওয়াতের পূর্বে তাঁকে পোষ্যপুত্র করে রেখেছিলেন। তাঁকে যায়েদ (রাঃ) ইবনে মুহাম্মাদ (সঃ) বলা হতো। এ আয়াত দ্বারা এ সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়াই উদ্দেশ্য। যেমন এই সূরারই মধ্যে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “মুহাম্মাদ (সঃ) তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নয়, রবং সে আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (৩৩:৪০) এখানে মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা তো তোমাদের মুখের কথা মাত্র। তোমরা কারো ছেলেকে অন্য কারো ছেলে বলবে এবং এভাবেই বাস্তব পরিবর্তন হয়ে যাবে এটা হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে তার পিতা সেই যার পিঠ হতে সে বের হয়েছে। একটি ছেলের দু’টি পিতা হওয়া অসম্ভব, যেমন একটি বক্ষে দু'টি অন্তর হওয়া অসম্ভব। আল্লাহ তা'আলা সত্য কথা বলে থাকেন ও সরল-সোজা পথ প্রদর্শন করে থাকেন। এ আয়াতটি একটি কুরায়েশীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যে প্রচার করে রেখেছিল যে, তার দুটি অন্তর আছে এবং দুটোই জ্ঞান ও বোধশক্তিতে পরিপূর্ণ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তার একথাকে খণ্ডন করে দেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা নামাযে দণ্ডায়মান ছিলেন, এমতাবস্থায় তিনি আতংকগ্রস্ত হলেন। তখন যেসব মুনাফিক তাঁর সাথে নামায পড়ছিল তারা পরস্পর বলাবলি করলো: “দেখো, তাঁর দু’টি অন্তর রয়েছে, একটি তোমাদের সাথে এবং অপরটি তাদের সাথে।” ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।যুহরী (রঃ) বলেন যে, এটা শুধু দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা হয়েছে। অর্থাৎ যেমন কোন লোকের দু’টি অন্তর হয় না, তেমনই কোন ছেলের দু’টি পিতা হয় না। এ মুতাবেকই আমরাও এ আয়াতের তাফসীর করেছি। এসব ব্যাপারে মহামহিমান্বিত আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। পূর্বে তো এর অবকাশ ছিল যে, পালক পুত্রকে পালনকারীর দিকে সম্বন্ধ লাগিয়ে তার পুত্র বলে ডাকা যাবে। কিন্তু এখন ইসলাম এটাকে রহিত করে দিয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, তাকে তার প্রকৃত পিতার দিকে সম্পর্ক লাগিয়ে ডাকতে হবে। ন্যায়, হক ও সত্য এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আমরা হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে যায়েদ (রাঃ) ইবনে মুহাম্মাদ (সঃ) বলতাম। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর আমরা এটা বলা পরিত্যাগ করি। পূর্বে তো পালক পুত্রের ঐ সমুদয় হক থাকতো যা ঔরষজাত ছেলের থাকে।"এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর হযরত সালেহ বিনতে সুহায়েল (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা সালিম (রাঃ)-কে মৌখিক পুত্র বানিয়ে রেখেছিলাম। এখন কুরআন তার ব্যাপারে ফায়সালা করে দিয়েছে। আমি এখন পর্যন্ত তার থেকে পর্দা করিনি। সে আসে এবং যায়। আমার স্বামী হযরত হুযাইফা (রাঃ) তার এভাবে যাতায়াতে কিছুটা অসন্তুষ্ট রয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাহলে যাও, সালিম (রাঃ)-কে তোমার দুধ পান করিয়ে দাও। এতে তুমি তার উপর হারাম হয়ে যাবে (শেষ পর্যন্ত)।”মোটকথা পূর্বের হুকুম রহিত হয়ে যায়। এখন পোষ্যপুত্রদের স্ত্রীদেরকে পোষ্যপুত্র রূপে গ্রহণকারীদের জন্যে বৈধ করে দেয়া হয়। অর্থাৎ তারা তাদের পোষ্যপুত্রদের স্ত্রীদেরকে বিয়ে করে নিতে পারে। হযরত যায়েদ (রাঃ) যখন তার স্ত্রী হযরত যয়নব বিনতে জাহশ (রাঃ)-কে তালাক দেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বিয়ে করে নেন এবং এভাবে মুসলমানরা একটি কঠিন সমস্যা হতে রক্ষা পেয়ে গেলেন। এর প্রতি লক্ষ্য রেখেই যেসব নারীকে বিয়ে করা হারাম তাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং তোমাদের জন্যে অবৈধ বা নিষিদ্ধ তোমাদের ঔরষজাত পুত্রদের স্ত্রীরা।" (৪:২৩) তবে এখানে দুগ্ধ সম্পৰ্কীয় ছেলেরাও ঔরষজাত ছেলেদের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীস রয়েছে যে, দুধপানের কারণে ঐ সব আত্মীয় হারাম যা বংশের কারণে হারাম হয়ে থাকে। তবে কেউ যদি স্নেহ বশতঃ কাউকেও পুত্র বলে ডাকে তাহলে সেটা অন্য কথা, এতে কোন দোষ নেই।মুসনাদে আহমাদ ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমাদের ন্যায় আবদুল মুত্তালিব বংশের ছোট বালকদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুযদালাফাহ হতে রাত্রেই জামরাতের দিকে বিদায় করে দেন এবং আমাদের উরুতে হাত বুলিয়ে বলেনঃ “হে আমার ছেলেরা!সূর্যোদয়ের পূর্বে জামরাতের উপর কংকর মারবে না।” এটা দশম হিজরীর যিলহজ্ব মাসের ঘটনা। এটা প্রমাণ করছে যে, স্নেহের বাক্য ধর্তব্য নয়।হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ) যার ব্যাপারে এ হুকুম অবতীর্ণ হয়েছে, ৮ম হিজরীতে মূতার যুদ্ধে শহীদ হন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ‘হে আমার প্রিয় পুত্র বলে সম্বোধন করতেন।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তোমরা তাদের পিতৃ-পরিচয় না জান তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভ্রাতা ও বন্ধু।উমরাতুল কাযার বছরে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা হতে প্রত্যাবর্তন করেন তখন হযরত হামযা (রাঃ)-এর কন্যা তাকে চাচা বলে ডাকতে ডাকতে তার পিছনে পিছনে দৌড়তে শুরু করে। হযরত আলী (রাঃ) তখন তাকে ধরে হযরত ফাতেমা (রাঃ)-এর কাছে নিয়ে গেলেন এবং বললেনঃ “এটা তোমার চাচাতো বোন, একে ভালভাবে রাখো।" তখন হযরত যায়েদ (রাঃ) ও হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলে উঠলেনঃ “এই শিশু কন্যার হকদার আমরাই। আমরাই একে লালন-পালন করবো।” হযরত আলী (রাঃ) প্রমাণ পেশ করলেন যে, সে তার চাচার মেয়ে। আর হযরত যায়েদ (রাঃ) বললেন যে, সে তার ভাই-এর কন্যা। হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বললেন : “এটা আমার চাচার মেয়ে এবং তার চাচী আমার বাড়ীতেই আছে অর্থাৎ হযরত আসমা বিনতে উমায়েস (রাঃ)।” অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ ফায়সালা করলেন যে, এ কন্যা তার খালার কাছেই থাকবে, যেহেতু খালা মায়ের স্থলাভিষিক্তা। হযরত আলী (রাঃ)-কে তিনি বললেনঃ “তুমি আমার ও আমি তোমার।” হযরত জাফর (রাঃ)-কে বললেনঃ “তোমার আকৃতি ও চরিত্র তো আমার সাথেই সাদৃশ্যযুক্ত। হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে তিনি বললেনঃ “তুমি আমার ভাই ও আমার আযাদকৃত দাস।” এ হাদীসে বহু কিছু হুকুম রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ন্যায়ের হুকুম শুনিয়ে দিলেন, অথচ দাবীদারদেরকেও তিনি অসন্তুষ্ট করলেন না, বরং নম্র ভাষার মাধ্যমে তাঁদের অন্তর জয় করলেন। তিনি এ আয়াতের উপর আমল করতে গিয়ে হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে বললেনঃ “তুমি আমার ভাই ও বন্ধু।” হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “এ আয়াত অনুযায়ী আমি তোমাদের দ্বীনী ভাই।” হযরত উবাই (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! যদি জানা যেতো যে, তার পিতা ছিল গাদা তবে অবশ্যই তার দিকে সে সম্পর্কিত হতো।”হাদীসে এসেছে যে, যদি কোন লোক তার সম্পর্ক জেনে শুনে তার পিতা ছাড়া অন্যের দিকে জুড়ে দেয় তবে সে কুফরী করলো। এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নিজেকে নিজের সঠিক ও প্রকৃত বংশ হতে সরিয়ে অন্য বংশের সাথে সম্পর্কিত করা খুব বড় পাপ। এরপর বলা হচ্ছেঃ তোমরা যদি তোমাদের সাধ্যমত তাহকীক ও যাচাই করার পর কাউকেও কারো দিকে সম্পর্কিত কর এবং সেটা ভুল হয়ে যায় তবে এতে তোমাদের কোন অপরাধ হবে না। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ তাবারাক ওয়া। তাআলা আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, আমরা যেন বলিঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা বিস্মৃত হই অথবা ভুল করি তবে আপনি আমাদেরকে অপরাধী করবেন না।" (২:২৮৬) সহীহ মুসলিমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন বান্দা এ প্রার্থনা করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাই করলাম অর্থাৎ তোমাদের প্রার্থনা কবুল করে নিলাম।”হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যদি বিচারক (বিচারের ব্যাপারে) ইজতেহাদ (সঠিকতায় পৌছার জন্যে চেষ্টা-তদবীর ও চিন্তা-ভাবনা করে এবং এতে সে সঠিকতায় পৌঁছে যায় তবে তার জন্যে দ্বিগুণ পুণ্য রয়েছে। আর যদি তার ইজতিহাদে ভুল হয়ে যায় তবে তার জন্যে রয়েছে একটি পুণ্য। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের ভুল-চুক এবং যে কাজ তাদের দ্বারা জোরপূর্বক করিয়ে নেয়া হয় তা ক্ষমা করে দিয়েছেন। এখানেও মহান আল্লাহ একথা বলার পর বলেনঃ কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকলে অপরাধ হবে।কসম সম্পর্কেও ঐ একই কথা। উপরে যে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, নসব বা বংশ পরিবর্তনকারী কাফিরের পর্যায়ভুক্ত, সেখানেও বলা হয়েছে যে, এরূপ অপরাধ হবে জেনে শুনে করলে। কুরআন কারীমের আয়াত, যার তিলাওয়াত বা পঠন এখন মানসূখ বা রহিত, তাতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমাদের নিজেদের পিতাদের দিক হতে সম্পর্ক সরিয়ে নেয়া কুফরী।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, তাঁর প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তাতে রজমের আয়াত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজে রজম করেছেন অর্থাৎ ব্যভিচারের অপরাধে বিবাহিত পুরুষ ও বিবাহিতা নারীকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করেছেন। আমরাও তার পরে রজম করেছি।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “আমরা পাঠ করতাম কুরআন কারীমের (আরবি)-এ আয়াতটি (যার পঠন এখন রহিত হয়ে গেছে)।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমার প্রশংসার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর প্রশংসার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা হয়েছিল। আমি তো আল্লাহর বান্দা। সুতরাং তোমরা আমাকে তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলবে।” একটি রিওয়াইয়াতে শুধু ইবনে মারইয়াম (আঃ) আছে। আর একটি হাদীসে আছে যে, মানুষের মধ্যে তিনটি কুফরী (স্বভাব) রয়েছে। এগুলো হচ্ছেঃ বংশকে ভৎর্সনা ও ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা, মৃতের উপর ক্রন্দন করা এবং তারকার মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করা।
আল-আহযাব 33:5
৪-৫ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা উদ্দেশ্য বর্ণনা করার পূর্বে ভূমিকা ও প্রমাণের দৃষ্টান্ত স্বরূপ দু'একটি ঐ কথা বলেছেন যা সবাই অনুভব করে থাকে। অতঃপর সেদিক থেকে চিন্তা ও খেয়াল ফিরিয়ে নিজের উদ্দেশ্যের দিকে নিয়ে গিয়েছেন। তিনি বলেনঃ কোন মানুষের হৃদয় বা অন্তর দু’টি হয় না। এভাবেই তুমি বুঝে নাও যে, তুমি যদি তোমার কোন স্ত্রীকে মা বলে দাও তবে সে সত্যিই তোমার মা হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে অপরের পুত্রকে তুমি পুত্র বানিয়ে নিলে সে সত্যিকারের পুত্র হবে না। কেউ যদি ক্রোধের সময় তার স্ত্রীকে বলে ফেলেঃ তুমি আমার কাছে এমনই যেমন আমার মায়ের পিঠ। এরূপ বললে সে সত্যি সত্যিই মা হয়ে যাবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা তাদের মা নয়, তাদের মা তো তারাই যাদেরকে তারা জন্ম দিয়েছে বা প্রসব করেছে।” (৫৮:২) এ দু'টি কথা বর্ণনা করার পর মূল উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হচ্ছে যে, মানুষের পালক পুত্র তার প্রকৃত পুত্র হতে পারে না। এ আয়াতটি হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নবুওয়াতের পূর্বে তাঁকে পোষ্যপুত্র করে রেখেছিলেন। তাঁকে যায়েদ (রাঃ) ইবনে মুহাম্মাদ (সঃ) বলা হতো। এ আয়াত দ্বারা এ সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়াই উদ্দেশ্য। যেমন এই সূরারই মধ্যে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “মুহাম্মাদ (সঃ) তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নয়, রবং সে আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (৩৩:৪০) এখানে মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা তো তোমাদের মুখের কথা মাত্র। তোমরা কারো ছেলেকে অন্য কারো ছেলে বলবে এবং এভাবেই বাস্তব পরিবর্তন হয়ে যাবে এটা হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে তার পিতা সেই যার পিঠ হতে সে বের হয়েছে। একটি ছেলের দু’টি পিতা হওয়া অসম্ভব, যেমন একটি বক্ষে দু'টি অন্তর হওয়া অসম্ভব। আল্লাহ তা'আলা সত্য কথা বলে থাকেন ও সরল-সোজা পথ প্রদর্শন করে থাকেন। এ আয়াতটি একটি কুরায়েশীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যে প্রচার করে রেখেছিল যে, তার দুটি অন্তর আছে এবং দুটোই জ্ঞান ও বোধশক্তিতে পরিপূর্ণ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তার একথাকে খণ্ডন করে দেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা নামাযে দণ্ডায়মান ছিলেন, এমতাবস্থায় তিনি আতংকগ্রস্ত হলেন। তখন যেসব মুনাফিক তাঁর সাথে নামায পড়ছিল তারা পরস্পর বলাবলি করলো: “দেখো, তাঁর দু’টি অন্তর রয়েছে, একটি তোমাদের সাথে এবং অপরটি তাদের সাথে।” ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।যুহরী (রঃ) বলেন যে, এটা শুধু দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা হয়েছে। অর্থাৎ যেমন কোন লোকের দু’টি অন্তর হয় না, তেমনই কোন ছেলের দু’টি পিতা হয় না। এ মুতাবেকই আমরাও এ আয়াতের তাফসীর করেছি। এসব ব্যাপারে মহামহিমান্বিত আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। পূর্বে তো এর অবকাশ ছিল যে, পালক পুত্রকে পালনকারীর দিকে সম্বন্ধ লাগিয়ে তার পুত্র বলে ডাকা যাবে। কিন্তু এখন ইসলাম এটাকে রহিত করে দিয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, তাকে তার প্রকৃত পিতার দিকে সম্পর্ক লাগিয়ে ডাকতে হবে। ন্যায়, হক ও সত্য এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আমরা হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে যায়েদ (রাঃ) ইবনে মুহাম্মাদ (সঃ) বলতাম। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর আমরা এটা বলা পরিত্যাগ করি। পূর্বে তো পালক পুত্রের ঐ সমুদয় হক থাকতো যা ঔরষজাত ছেলের থাকে।"এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর হযরত সালেহ বিনতে সুহায়েল (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা সালিম (রাঃ)-কে মৌখিক পুত্র বানিয়ে রেখেছিলাম। এখন কুরআন তার ব্যাপারে ফায়সালা করে দিয়েছে। আমি এখন পর্যন্ত তার থেকে পর্দা করিনি। সে আসে এবং যায়। আমার স্বামী হযরত হুযাইফা (রাঃ) তার এভাবে যাতায়াতে কিছুটা অসন্তুষ্ট রয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাহলে যাও, সালিম (রাঃ)-কে তোমার দুধ পান করিয়ে দাও। এতে তুমি তার উপর হারাম হয়ে যাবে (শেষ পর্যন্ত)।”মোটকথা পূর্বের হুকুম রহিত হয়ে যায়। এখন পোষ্যপুত্রদের স্ত্রীদেরকে পোষ্যপুত্র রূপে গ্রহণকারীদের জন্যে বৈধ করে দেয়া হয়। অর্থাৎ তারা তাদের পোষ্যপুত্রদের স্ত্রীদেরকে বিয়ে করে নিতে পারে। হযরত যায়েদ (রাঃ) যখন তার স্ত্রী হযরত যয়নব বিনতে জাহশ (রাঃ)-কে তালাক দেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বিয়ে করে নেন এবং এভাবে মুসলমানরা একটি কঠিন সমস্যা হতে রক্ষা পেয়ে গেলেন। এর প্রতি লক্ষ্য রেখেই যেসব নারীকে বিয়ে করা হারাম তাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং তোমাদের জন্যে অবৈধ বা নিষিদ্ধ তোমাদের ঔরষজাত পুত্রদের স্ত্রীরা।" (৪:২৩) তবে এখানে দুগ্ধ সম্পৰ্কীয় ছেলেরাও ঔরষজাত ছেলেদের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীস রয়েছে যে, দুধপানের কারণে ঐ সব আত্মীয় হারাম যা বংশের কারণে হারাম হয়ে থাকে। তবে কেউ যদি স্নেহ বশতঃ কাউকেও পুত্র বলে ডাকে তাহলে সেটা অন্য কথা, এতে কোন দোষ নেই।মুসনাদে আহমাদ ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমাদের ন্যায় আবদুল মুত্তালিব বংশের ছোট বালকদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুযদালাফাহ হতে রাত্রেই জামরাতের দিকে বিদায় করে দেন এবং আমাদের উরুতে হাত বুলিয়ে বলেনঃ “হে আমার ছেলেরা!সূর্যোদয়ের পূর্বে জামরাতের উপর কংকর মারবে না।” এটা দশম হিজরীর যিলহজ্ব মাসের ঘটনা। এটা প্রমাণ করছে যে, স্নেহের বাক্য ধর্তব্য নয়।হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ) যার ব্যাপারে এ হুকুম অবতীর্ণ হয়েছে, ৮ম হিজরীতে মূতার যুদ্ধে শহীদ হন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ‘হে আমার প্রিয় পুত্র বলে সম্বোধন করতেন।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তোমরা তাদের পিতৃ-পরিচয় না জান তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভ্রাতা ও বন্ধু।উমরাতুল কাযার বছরে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা হতে প্রত্যাবর্তন করেন তখন হযরত হামযা (রাঃ)-এর কন্যা তাকে চাচা বলে ডাকতে ডাকতে তার পিছনে পিছনে দৌড়তে শুরু করে। হযরত আলী (রাঃ) তখন তাকে ধরে হযরত ফাতেমা (রাঃ)-এর কাছে নিয়ে গেলেন এবং বললেনঃ “এটা তোমার চাচাতো বোন, একে ভালভাবে রাখো।" তখন হযরত যায়েদ (রাঃ) ও হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলে উঠলেনঃ “এই শিশু কন্যার হকদার আমরাই। আমরাই একে লালন-পালন করবো।” হযরত আলী (রাঃ) প্রমাণ পেশ করলেন যে, সে তার চাচার মেয়ে। আর হযরত যায়েদ (রাঃ) বললেন যে, সে তার ভাই-এর কন্যা। হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বললেন : “এটা আমার চাচার মেয়ে এবং তার চাচী আমার বাড়ীতেই আছে অর্থাৎ হযরত আসমা বিনতে উমায়েস (রাঃ)।” অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ ফায়সালা করলেন যে, এ কন্যা তার খালার কাছেই থাকবে, যেহেতু খালা মায়ের স্থলাভিষিক্তা। হযরত আলী (রাঃ)-কে তিনি বললেনঃ “তুমি আমার ও আমি তোমার।” হযরত জাফর (রাঃ)-কে বললেনঃ “তোমার আকৃতি ও চরিত্র তো আমার সাথেই সাদৃশ্যযুক্ত। হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে তিনি বললেনঃ “তুমি আমার ভাই ও আমার আযাদকৃত দাস।” এ হাদীসে বহু কিছু হুকুম রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ন্যায়ের হুকুম শুনিয়ে দিলেন, অথচ দাবীদারদেরকেও তিনি অসন্তুষ্ট করলেন না, বরং নম্র ভাষার মাধ্যমে তাঁদের অন্তর জয় করলেন। তিনি এ আয়াতের উপর আমল করতে গিয়ে হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে বললেনঃ “তুমি আমার ভাই ও বন্ধু।” হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “এ আয়াত অনুযায়ী আমি তোমাদের দ্বীনী ভাই।” হযরত উবাই (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! যদি জানা যেতো যে, তার পিতা ছিল গাদা তবে অবশ্যই তার দিকে সে সম্পর্কিত হতো।”হাদীসে এসেছে যে, যদি কোন লোক তার সম্পর্ক জেনে শুনে তার পিতা ছাড়া অন্যের দিকে জুড়ে দেয় তবে সে কুফরী করলো। এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নিজেকে নিজের সঠিক ও প্রকৃত বংশ হতে সরিয়ে অন্য বংশের সাথে সম্পর্কিত করা খুব বড় পাপ। এরপর বলা হচ্ছেঃ তোমরা যদি তোমাদের সাধ্যমত তাহকীক ও যাচাই করার পর কাউকেও কারো দিকে সম্পর্কিত কর এবং সেটা ভুল হয়ে যায় তবে এতে তোমাদের কোন অপরাধ হবে না। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ তাবারাক ওয়া। তাআলা আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, আমরা যেন বলিঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা বিস্মৃত হই অথবা ভুল করি তবে আপনি আমাদেরকে অপরাধী করবেন না।" (২:২৮৬) সহীহ মুসলিমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন বান্দা এ প্রার্থনা করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাই করলাম অর্থাৎ তোমাদের প্রার্থনা কবুল করে নিলাম।”হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যদি বিচারক (বিচারের ব্যাপারে) ইজতেহাদ (সঠিকতায় পৌছার জন্যে চেষ্টা-তদবীর ও চিন্তা-ভাবনা করে এবং এতে সে সঠিকতায় পৌঁছে যায় তবে তার জন্যে দ্বিগুণ পুণ্য রয়েছে। আর যদি তার ইজতিহাদে ভুল হয়ে যায় তবে তার জন্যে রয়েছে একটি পুণ্য। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের ভুল-চুক এবং যে কাজ তাদের দ্বারা জোরপূর্বক করিয়ে নেয়া হয় তা ক্ষমা করে দিয়েছেন। এখানেও মহান আল্লাহ একথা বলার পর বলেনঃ কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকলে অপরাধ হবে।কসম সম্পর্কেও ঐ একই কথা। উপরে যে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, নসব বা বংশ পরিবর্তনকারী কাফিরের পর্যায়ভুক্ত, সেখানেও বলা হয়েছে যে, এরূপ অপরাধ হবে জেনে শুনে করলে। কুরআন কারীমের আয়াত, যার তিলাওয়াত বা পঠন এখন মানসূখ বা রহিত, তাতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমাদের নিজেদের পিতাদের দিক হতে সম্পর্ক সরিয়ে নেয়া কুফরী।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, তাঁর প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তাতে রজমের আয়াত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজে রজম করেছেন অর্থাৎ ব্যভিচারের অপরাধে বিবাহিত পুরুষ ও বিবাহিতা নারীকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করেছেন। আমরাও তার পরে রজম করেছি।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “আমরা পাঠ করতাম কুরআন কারীমের (আরবি)-এ আয়াতটি (যার পঠন এখন রহিত হয়ে গেছে)।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমার প্রশংসার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর প্রশংসার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা হয়েছিল। আমি তো আল্লাহর বান্দা। সুতরাং তোমরা আমাকে তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলবে।” একটি রিওয়াইয়াতে শুধু ইবনে মারইয়াম (আঃ) আছে। আর একটি হাদীসে আছে যে, মানুষের মধ্যে তিনটি কুফরী (স্বভাব) রয়েছে। এগুলো হচ্ছেঃ বংশকে ভৎর্সনা ও ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা, মৃতের উপর ক্রন্দন করা এবং তারকার মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করা।
আল-আহযাব 33:6
আল্লাহ তা'আলা জানেন যে, তাঁর রাসূল (সঃ) নিজের জীবন অপেক্ষা নিজের উম্মতের উপর অধিকতর দয়ালু, এজন্যে তিনি তাঁর রাসূল (সঃ)-কে তাদের উপর তাদের জীবনের চেয়েও বেশী অধিকার দিয়েছেন। তারা নিজেদের জন্যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না, বরং রাসূল (সঃ)-এর প্রত্যেক হুকুমকে জান-প্রাণ দিয়ে তাদেরকে কবুল করতে হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ বিসম্বাদের বিচারের ভার তোমার উপর অর্পণ না করে; অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে ওটা মেনে না নেয়।” (৪:৬৫) সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! ততামাদের মধ্যে কেউ মুমিন হতে পারে না যে পর্যন্ত না আমি তার কাছে প্রিয়। হই তার নিজের জান, মাল, সন্তান এবং সমস্ত লোক অপেক্ষা।” সহীহ হাদীসে আরো বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ! নিশ্চয়ই আপনি আমার নিকট আমার প্রাণ ছাড়া সবকিছু হতেই প্রিয়।" তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে উমার (রাঃ)! না (এতেও তুমি মুমিন হতে পার না), বরং আমি যেন তোমার কাছে তোমার জীবন অপেক্ষাও প্রিয় হই।" তখন তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর শপথ! (এখন হতে) আপনি আমার নিকট সব কিছু হতেই প্রিয় হয়ে গেলেন। এমনকি আমার নিজের জীবন হতেও।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “হে উমার (রাঃ)! এখন (তুমি পূর্ণ মুমিন হলে)।” এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, নবী (সঃ) মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর।এ আয়াতের তাফসীরে সহীহ বুখারীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়া ও আখিরাতে সমস্ত মুমিনের সবচেয়ে বেশী হকদার আমিই, এমনকি তাদের নিজেদের জীবনের চেয়েও। তোমরা ইচ্ছা করলে। (আরবি)-এই আয়াতটি পড়ে নাও। জেনে রেখো যে, যদি কোন মুসলমান মাল-ধন রেখে মারা যায় তবে সেই মালের হকদার হবে তার উত্তরাধিকারীরা। আর যদি কোন মুসলমান তার কাঁধে ঋণের বোঝা রেখে মারা যায় অথবা ছোট ছোট ছেলে মেয়ে রেখে মারা যায় তবে তার ঋণ পরিশোধ করার দায়িত্ব আমার এবং তার ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের লালন-পালনের দায়িত্ব ভারও আমারই উপর ন্যাস্ত।”এরপর ঘোষিত হচ্ছেঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পত্নীগণ মুমিনদের মাতাতুল্য। তারা তাদের সম্মানের পাত্রী। সম্মান, বুযর্গী ইত্যাদির দিক দিয়ে তাঁরা যেন তাদের মা। হ্যা, তবে মায়ের সাথে অন্যান্য আহকাম যেমন নির্জনতা ইত্যাদিতে পার্থক্য আছে। তাঁদের গর্ভজাত কন্যাদের সাথে এবং বোনদের সাথে বিয়ে হারাম হওয়ার কথা এখানে বলা হয়নি। কোন কোন আলেম তাদের কন্যাদেরও মুসলমানদের বোন বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন ইমাম শাফেয়ী (রঃ) মুখতাসার গ্রন্থে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা ইবারতের প্রয়োগ, হুকুম সাব্যস্ত করা নয়। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) প্রমুখ কোন না কোন উম্মুল মুমিনীনের ভাই ছিলেন। তাঁকে মামা বলা যাবে কি না এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন যে, বলা যেতে পারে। বাকী রইলো এখন এই কথা যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আবুল মুমিনীন (মুমিনদের পিতা) বলা যাবে কি-না? এটাও খেয়াল করা প্রয়োজন যে, আবুল মুমিনীন বললে স্ত্রীলোকেরাও এসে যায়।এর মধ্যে আধিক্য হিসেবে স্ত্রী লিঙ্গও রয়েছে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, আবুল মুমিনীন বলা যাবে না। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) (আরবি)-এর দু’টি উক্তির মধ্যেও অধিকতর সঠিক উক্তি এটাই। হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)(আরবি)-এর কিরআতে -এর পরে।(এবং তিনি তাদের পিতা) এরূপও রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর মাযহাবেও একটি উক্তি এটাই এবং নিম্নের হাদীসটিও এ উক্তির পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ (আরবি) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের পিতাদের স্থলাভিষিক্ত। আমি তোমাদেরকে শিক্ষা দিচ্ছি যে, তোমাদের কেউ পায়খানায় গেলে কিবলার দিকে যেন মুখ না করে এবং পিঠও যেন না করে, ডান হাতে যেন ঢিলা ব্যবহার না করে এবং ডান হাতে যেন ইসতিজাও না করে।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) তিনি ইসতিজার জন্যে তিনটি ঢিলা নিতে বলেছেন। গোবর ও হাড় দ্বারা ইসতিজা করতে তিনি নিষেধ করেছেন। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে পিতা বলা যাবে না। কেননা কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “মুহাম্মাদ (সঃ) তোমাদের পুরুষদের কারো পিতা নন।” (৩৩:৪০)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহর বিধান অনুসারে মুমিনও মুহাজিরগণ অপেক্ষা যারা আত্মীয়, তারা পরস্পরের নিকটতর। ইতিপূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছিলেন ঐ দিক দিয়েই তারা একে অপরের উত্তরাধিকারী হতেন। শপথ করে যারা সম্বন্ধ জুড়ে দিতেন তারাও তাঁদের সম্পত্তির হকদার হয়ে যেতেন। এ আয়াত দ্বারা এগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।পূর্বে কোন আনসার মারা গেলে তাঁর নিকটাত্মীয়রা ওয়ারিস হতো না, বরং মুহাজিররা ওয়ারিস হতেন, যাদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপন করেছিলেন। হযরত যুহায়ের ইবনে আওয়াম (রাঃ) বলেনঃ “এই হুকুম বিশেষভাবে আমাদের আনসার ও মুহাজিরদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। আমরা যখন মক্কা ছেড়ে মদীনায় আগমন করি তখন আমাদের কাছে কিছুই ছিল না। এখানে (মদীনায়) এসে আমরা আনসারদের সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হই। তারা আমাদের উত্তম ভাই সাব্যস্ত হন। এমনকি তাদের মৃত্যুর পর আমরা তাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতাম। হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপিত হয়েছিল হযরত খারেজা ইবনে যায়েদ (রাঃ)-এর সাথে। হযরত উমার (রাঃ)-এর হয়েছিল অমুকের সাথে। হযরত উসমান (রাঃ) ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন একজন যারকী ব্যক্তির সাথে। আর স্বয়ং আমার ভাই হয়েছিলেন হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ)। তিনি মারাত্মকভাবে আহত হলেন। ঐ সময় তার ইন্তেকাল হলে আমিও তার ওয়ারিস হয়ে যেতাম। অতঃপর এ আয়াত অবতীর্ণ হলো এবং মীরাসের সাধারণ হুকুম আমাদের জন্যেও প্রযোজ্য হয়ে গেল ।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তবে তোমরা যদি তোমাদের বন্ধু-বান্ধবদের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করতে চাও তবে তা করতে পার। তুমি তার জন্যে অসিয়ত করে যেতে পার। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহর এই হুকুম প্রথম হতেই এই কিতাবে লিপিবদ্ধ ছিল। তাতে কোন পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা হয়নি। মধ্যখানে পাতানো ভাই-এর উপর যে ওয়ারিসী স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এটা শুধু একটা বিশেষ যুক্তিসঙ্গতার ভিত্তিতে হয়েছিল একটা বিশেষ ও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এরপর এটা উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন মূল হুকুম জারী হয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-আহযাব 33:7
৭-৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি এই পাঁচজন স্থিরপ্রতিজ্ঞ নবীর নিকট হতে এবং সাধারণ সমস্ত নবীর নিকট হতে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তারা আমার দ্বীনের প্রচার করবেন ও তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবেন। তারা পরস্পরে একে অপরকে সাহায্য করবেন এবং একে অপরকে সমর্থন করবেন। তারা পরস্পরের মধ্যে ইত্তেহাদ ও ইত্তেফাক কায়েম রাখবেন। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার নিয়েছিলেনঃ তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত যা কিছু দিয়েছি তার শপথ! যখন একজন রাসূল আসবে তখন নিশ্চয়ই তোমরা তাকে বিশ্বাস করবে এবং তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেনঃ তোমরা কি স্বীকার করলে? এবং এই সম্পর্কে আমার অঙ্গীকার কি তোমরা গ্রহণ করলে? তারা বললো: আমরা স্বীকার করলাম। তিনি বললেনঃ তবে তোমরা সাক্ষী থাকো এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী থাকলাম।” (৩:৮১) এখানে সাধারণ নবীদের বর্ণনা দেয়ার পর বিশিষ্ট মর্যাদা সম্পন্ন নবীদের নামও উল্লেখ করেছেন। অনুরূপভাবে তাদের নাম নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ (আরবি)এখানে হযরত নূহ (আঃ)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে যিনি ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহ তাআলার সর্বপ্রথম নবী ছিলেন। হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে যিনি ছিলেন সর্বশেষ নবী এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে যারা ছিলেন মধ্যবর্তী নবী। এতে সূক্ষ্মদর্শিতা এই রয়েছে যে, প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ)-এর পরবর্তী নবী হযরত নূহ (আঃ)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর পূর্ববর্তী নবী হযরত ঈসা (আঃ)-এর নাম উল্লেখ রয়েছে। আর মধ্যবর্তী নবীদের মধ্যে হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও তো এই ক্রমপর্যায় রয়েছে যে, প্রথম ও শেষের নাম উল্লেখ করার পর মধ্যবর্তী নবীদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আর এ আয়াতে সর্বপ্রথম সর্বশেষ নবী (সঃ)-এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কারণ তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাপেক্ষা অধিক মর্যাদা সম্পন্ন নবী। অতঃপর একের পর এক ক্রমানুযায়ী অন্যান্য নবীদের উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর সমস্ত নবীর উপর দরূদ ও সালাম নাযিল করুন! এই আয়াতের তাফসীরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি সমস্ত নবীর পূর্বে সৃষ্ট হয়েছি এবং দুনিয়ায় সর্বশেষে আগমন করেছি। তাই আমা হতেই শুরু করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) কিন্তু এর একজন বর্ণনাকারী সাঈদ ইবনে বাশীর দুর্বল এবং সনদ হিসেবে এটা মুরসাল রূপে বর্ণিত হয়েছে। এটাই বেশী সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেউ কেউ এটাকে মাওকুফ রূপে বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে পাঁচজন নবী আল্লাহ তা'আলার নিকট খুইব পছন্দনীয়। তাঁরা হলেনঃ হযরত নূহ (আঃ), হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) এবং হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ)। এর একজন বর্ণনাকারী হামযাহ দুর্বল। এও বলা হয়েছে যে, এই আয়াতে যে অঙ্গীকারের বর্ণনা রয়েছে তা হলো ওটাই যা আল্লাহ তা'আলা রোযে আযলে হযরত আদম (আঃ)-এর পিঠ হতে সমস্ত মানুষকে বের করে গ্রহণ করেছিলেন।হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আদম (আঃ)-কে উচ্চে তুলে ধরা হয়। তিনি তাঁর সন্তানদের দেখেন। তাদের মধ্যে তিনি ধনী, নির্ধন, সুন্দর, কুৎসিত সর্বপ্রকারের লোককেই দেখতে পান। তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! যদি আপনি এদের সবাইকে সমান করতেন তবে কতই না ভাল হতো!” মহামহিমান্বিত আল্লাহ জবাবে বলেনঃ “এটা এজন্যেই করা হয়েছে যে, যেন আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। তাদের মধ্যে যারা নবী ছিলেন। তিনি তাদেরকেও দেখেন। তাঁরা জ্যোতির্ময় রূপে প্রকাশিত ছিলেন। তাঁদের উপর নূর বর্ষিত হচ্ছিল। তাদের নিকট হতেও নবুওয়াত ও রিসালাতের একটি বিশেষ অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল। যার বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে।ঘোষিত হচ্ছেঃ সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদীতা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করবার জন্যে, অর্থাৎ তাদেরকে রাসূল (সঃ)-এর হাদীসগুলো পৌঁছিয়ে দিতো। আর আল্লাহ তা'আলা অমান্যকারীদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন বেদনাদায়ক শাস্তি। সুতরাং হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি এবং মনে প্রাণে বিশ্বাস করছি যে, আপনার রাসূলগণ আপনার বান্দাদের কাছে আপনার বাণী কমবেশী ছাড়াই পৌছিয়ে দিয়েছেন। তারা পূর্ণভাবে মঙ্গল কামনা করেছে এবং সত্যকে পরিষ্কারভাবে উজ্জ্বল পন্থায় জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন। যাতে সন্দেহের লেশ মাত্র নেই, যদিও হতভাগ্য ও হঠকারীরা তাদেরকে মানেনি। আমাদের বিশ্বাস আছে যে, আপনার রাসূলদের সমস্ত কথা ন্যায় ও সত্য। যারা তাঁদের পথ অনুসরণ করেনি তারা বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট। তারা বাতিলের উপর রয়েছে।
আল-আহযাব 33:8
৭-৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি এই পাঁচজন স্থিরপ্রতিজ্ঞ নবীর নিকট হতে এবং সাধারণ সমস্ত নবীর নিকট হতে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তারা আমার দ্বীনের প্রচার করবেন ও তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবেন। তারা পরস্পরে একে অপরকে সাহায্য করবেন এবং একে অপরকে সমর্থন করবেন। তারা পরস্পরের মধ্যে ইত্তেহাদ ও ইত্তেফাক কায়েম রাখবেন। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার নিয়েছিলেনঃ তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত যা কিছু দিয়েছি তার শপথ! যখন একজন রাসূল আসবে তখন নিশ্চয়ই তোমরা তাকে বিশ্বাস করবে এবং তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেনঃ তোমরা কি স্বীকার করলে? এবং এই সম্পর্কে আমার অঙ্গীকার কি তোমরা গ্রহণ করলে? তারা বললো: আমরা স্বীকার করলাম। তিনি বললেনঃ তবে তোমরা সাক্ষী থাকো এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী থাকলাম।” (৩:৮১) এখানে সাধারণ নবীদের বর্ণনা দেয়ার পর বিশিষ্ট মর্যাদা সম্পন্ন নবীদের নামও উল্লেখ করেছেন। অনুরূপভাবে তাদের নাম নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ (আরবি)এখানে হযরত নূহ (আঃ)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে যিনি ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহ তাআলার সর্বপ্রথম নবী ছিলেন। হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে যিনি ছিলেন সর্বশেষ নবী এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে যারা ছিলেন মধ্যবর্তী নবী। এতে সূক্ষ্মদর্শিতা এই রয়েছে যে, প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ)-এর পরবর্তী নবী হযরত নূহ (আঃ)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর পূর্ববর্তী নবী হযরত ঈসা (আঃ)-এর নাম উল্লেখ রয়েছে। আর মধ্যবর্তী নবীদের মধ্যে হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও তো এই ক্রমপর্যায় রয়েছে যে, প্রথম ও শেষের নাম উল্লেখ করার পর মধ্যবর্তী নবীদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আর এ আয়াতে সর্বপ্রথম সর্বশেষ নবী (সঃ)-এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কারণ তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাপেক্ষা অধিক মর্যাদা সম্পন্ন নবী। অতঃপর একের পর এক ক্রমানুযায়ী অন্যান্য নবীদের উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর সমস্ত নবীর উপর দরূদ ও সালাম নাযিল করুন! এই আয়াতের তাফসীরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি সমস্ত নবীর পূর্বে সৃষ্ট হয়েছি এবং দুনিয়ায় সর্বশেষে আগমন করেছি। তাই আমা হতেই শুরু করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) কিন্তু এর একজন বর্ণনাকারী সাঈদ ইবনে বাশীর দুর্বল এবং সনদ হিসেবে এটা মুরসাল রূপে বর্ণিত হয়েছে। এটাই বেশী সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেউ কেউ এটাকে মাওকুফ রূপে বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্যে পাঁচজন নবী আল্লাহ তা'আলার নিকট খুইব পছন্দনীয়। তাঁরা হলেনঃ হযরত নূহ (আঃ), হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) এবং হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ)। এর একজন বর্ণনাকারী হামযাহ দুর্বল। এও বলা হয়েছে যে, এই আয়াতে যে অঙ্গীকারের বর্ণনা রয়েছে তা হলো ওটাই যা আল্লাহ তা'আলা রোযে আযলে হযরত আদম (আঃ)-এর পিঠ হতে সমস্ত মানুষকে বের করে গ্রহণ করেছিলেন।হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আদম (আঃ)-কে উচ্চে তুলে ধরা হয়। তিনি তাঁর সন্তানদের দেখেন। তাদের মধ্যে তিনি ধনী, নির্ধন, সুন্দর, কুৎসিত সর্বপ্রকারের লোককেই দেখতে পান। তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! যদি আপনি এদের সবাইকে সমান করতেন তবে কতই না ভাল হতো!” মহামহিমান্বিত আল্লাহ জবাবে বলেনঃ “এটা এজন্যেই করা হয়েছে যে, যেন আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। তাদের মধ্যে যারা নবী ছিলেন। তিনি তাদেরকেও দেখেন। তাঁরা জ্যোতির্ময় রূপে প্রকাশিত ছিলেন। তাঁদের উপর নূর বর্ষিত হচ্ছিল। তাদের নিকট হতেও নবুওয়াত ও রিসালাতের একটি বিশেষ অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল। যার বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে।ঘোষিত হচ্ছেঃ সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদীতা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করবার জন্যে, অর্থাৎ তাদেরকে রাসূল (সঃ)-এর হাদীসগুলো পৌঁছিয়ে দিতো। আর আল্লাহ তা'আলা অমান্যকারীদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন বেদনাদায়ক শাস্তি। সুতরাং হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি এবং মনে প্রাণে বিশ্বাস করছি যে, আপনার রাসূলগণ আপনার বান্দাদের কাছে আপনার বাণী কমবেশী ছাড়াই পৌছিয়ে দিয়েছেন। তারা পূর্ণভাবে মঙ্গল কামনা করেছে এবং সত্যকে পরিষ্কারভাবে উজ্জ্বল পন্থায় জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন। যাতে সন্দেহের লেশ মাত্র নেই, যদিও হতভাগ্য ও হঠকারীরা তাদেরকে মানেনি। আমাদের বিশ্বাস আছে যে, আপনার রাসূলদের সমস্ত কথা ন্যায় ও সত্য। যারা তাঁদের পথ অনুসরণ করেনি তারা বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট। তারা বাতিলের উপর রয়েছে।
আল-আহযাব 33:9
৯-১০ নং আয়াতের তাফসীরপঞ্চম হিজরীর শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে। আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের উপর যে দয়া ও অনুগ্রহ করেছিলেন এখানে তিনি তারই বর্ণনা দিচ্ছেন। যখন মুশরিকরা মুসলমানদেরকে দুনিয়া হতে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার উদ্দেশ্যে পূর্ণ শক্তিসহ বিরাট বাহিনী নিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করেছিল। কেউ কেউ বলেন যে, খন্দকের যুদ্ধ চতুর্থ হিজরীতে সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধের ঘটনা এই যে, বানু নাযীরের ইয়াহুদী নেতৃবর্গ, যাদের মধ্যে সালাম ইবনে আবি হাকীক, সালাম ইবনে মুশকাম, কিনানাহ, ইবনে রাবী প্রমুখ ছিল, মক্কায় এসে পূর্ব হতেই প্রস্তুত কুরায়েশদেরকে যুদ্ধের জন্যে উত্তেজিত করলো এবং তাদের সাথে অঙ্গীকার করলো যে, তারা তাদের অধীনস্থ লোকদেরকে সাথে নিয়ে তাদের দলে যোগদান করবে। সেখানে তাদের সাথে কথা শেষ করে তারা গাতফান গোত্রের লোকদের নিকট গমন করলো এবং তাদের সাথে কথাবার্তা বলে তাদেরকেও তাদের সাথে মিলিত করলো। কুরায়েশরাও এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে সারা আরবে আলোড়ন সৃষ্টি করলো এবং আরো কিছু লোক যোগাড় করে নিলো। এসবের সরদার নির্বাচিত হলেন আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারব এবং গাতফান গোত্রের নেতা নির্বাচিত হলো উয়াইনা ইবনে হাসান ইবনে বদর। এভাবে চেষ্টা তদবীর চালিয়ে তারা দশ হাজার যোদ্ধা একত্রিত করলো এবং মদীনার দিকে ধাওয়া করলো। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সংবাদ পেয়ে হযরত সালমান ফারসী (রাঃ)-এর পরামর্শক্রমে, মদীনার পূর্ব দিকে খন্দক খনন করতে শুরু করলেন। সমস্ত মুহাজির ও আনসার এ খনন কার্যে অংশগ্রহণ করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেও একাজে অংশ নিলেন। স্বয়ং তিনি কাদা-মাটি বহন করতে লাগলেন। মুশরিকদের সেনাবাহিনী বিনা বাধায় মদীনা পর্যন্ত পৌঁছে গেল এবং মদীনার পূর্বাংশে উহুদ পাহাড় সংলগ্ন স্থানে নিজেদের শিবির স্থাপন করলো। এটা ছিল মদীনার নিম্নাংশ। মদীনার উপরাংশে তারা এক বিরাট সৈন্য দল পাঠিয়ে দিলো যারা মদীনার উঁচু অংশে শিবির স্থাপন করলো এবং নীচে ও উপরের দিক থেকে মুলমানদেরকে অবরোধ করে ফেললো। মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা তিন হাজারেরও কম ছিল। কোন কোন রিওয়াইয়াতে শুধু সাতশ’ বলা হয়েছে। এই অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুকাবিলার জন্যে আসলেন। তিনি সালা পাহাড়কে পিছনের দিকে করলেন। শত্রুদের দিকে মুখ করে তিনি সৈন্য সমাবেশ করলেন। যে খন্দক তিনি খনন করেছিলেন তাতে পানি ইত্যাদি ছিল না। তা শুধু একটি গর্ত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) শিশু ও মহিলাদেরকে মদীনার একটি মহল্লায় একত্রিত করে রেখে দেন। মদীনায় বানু কুরায়যা নামক ইয়াহুদীদের একটি গোত্র বসবাস করতো। তাদের মহল্লা ছিল মদীনার পূর্ব দিকে। নবী (সঃ)-এর সাথে তাদের দৃঢ় সন্ধিচুক্তি ছিল। তাদেরও বিরাট দল ছিল। প্রায় আটশ’ জন বীর যোদ্ধা তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। মুশরিক ও ইয়াহূদীরা তাদের কাছে হুয়াই ইবনে আখতাব নারীকে পাঠিয়ে দিলো। সে তাদেরকে নানা প্রকারের লোভ-লালসা দেখিয়ে নিজেদের পক্ষে করে নিলো। তারাও ঠিক সময়ে মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো এবং প্রকাশ্যভাবে সন্ধি ভেঙ্গে দিলো। বাইরে দশহাজার শত্রু সৈন্য ছাউনি ফেলে বসে আছে। এদিকে ইয়াহূদীদের এই বিশ্বাসঘাতকতা যেন বগলে ফোড়া বের হওয়া। বত্রিশ দাঁতের মধ্যে জিহ্বা অথবা আটার মধ্যে লবণের মত মুসলমানদের অবস্থা হয়ে গেল। এ সাতশ জন লোক কি-ই বা করতে পারে? এটা ছিল ঐ সময় যার চিত্র কুরআন কারীম অংকন করেছে যে, তখন মুমিনরা পরীক্ষিত হয়েছিল এবং তারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল। শত্রুরা একমাস ধরে অবরোধ অব্যাহত রাখলো। যদিও মুশরিকরা খন্দক অতিক্রম করতে মক্ষম হলো না। তবে তারা মাসাধিককাল ধরে মুসলমাদেরকে ঘিরে বসে থাকলো। এতে মুসলমানরা ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লো। আমর ইবনে আবদে অদ্দ, যে ছিল আরবের বিখ্যাত বীর পুরুষ, সেনাপতিত্ব বিষয়ে যে ছিল অদ্বিতীয়, একবার সে নিজের সাথে কয়েকজন দুঃসাহসী বীরপুরুষকে নিয়ে সাহস করে অশ্বচালনা করলো এবং খন্দক পার হয়ে গেল। এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় অশ্বারোহীদের প্রতি ইঙ্গিত করলেন। কিন্তু বলা হয় যে, তাদেরকে তিনি প্রস্তুত না পেয়ে হযরত আলী (রাঃ)-কে তাদের মুকাবিলা করার নির্দেশ দিলেন। অল্পক্ষণ ধরে উভয় পক্ষের বীরপুরুষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ চলতে থাকলো। অবশেষে আল্লাহর সিংহ হযরত আলী (রাঃ) শত্রুদেরকে তরবারীর আঘাতে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। এতে মুসলমানরা খুবই খুশী হলেন এবং তাঁদের সাহস ও উৎসাহ বেড়ে গেল। তারা বুঝে নিলেন যে, তাদের জয় সুনিশ্চিত। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে ভীষণ বেগে ঝড় তুফান ও ঘূর্ণিবার্তা প্রবাহিত হতে শুরু করলো। এর ফলে কাফিরদের সমস্ত তাঁবু মূলোৎপাটিত হলো। কিছুই অবশিষ্ট থাকলো না। অগ্নি জ্বালানো কঠিন হয়ে গেল। কোন আশ্রয়স্থল তাদের দৃষ্টিগোচর হলো না। পরিশেষে তারা ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে গেল। এরই বর্ণনা কুরআন কারীমে দেয়া হয়েছে এবং আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু। এ আয়াতে যে বায়ুর কথা বলা হয়েছে হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর মতে ওটা ছিল পূবালী হাওয়া। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিও এর পৃষ্ঠপোষকতা করে। তিনি বলেনঃ “পূবালী বায়ু দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে এবং আ’দ সম্প্রদায়কে দাৰূর’ দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।”ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, দক্ষিণা হাওয়া উত্তরা হাওয়াকে আহযাবের যুদ্ধের সময় বলেঃ “চল, আমরা উভয়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সাহায্য করি।” তখন উত্তরা হাওয়া জবাবে বলেঃ “রাত্রে গরম বা প্রখরতা চলে না।” অতঃপর পূবালী হাওয়া প্রবাহিত হলো। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমার মামা হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ) খন্দকের যুদ্ধের রাত্রে কঠিন শীত ও প্রচণ্ড বাতাসের সময় খাদ্য ও লেপ আনার জন্যে আমাকে মদীনায় প্রেরণ করেন। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি আমাকে অনুমতি প্রদান করেন। তিনি আমাকে বলেনঃ “আমার কোন সাহাবীর সাথে তোমার দেখা হলে তাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবে।” আমি চললাম। ভীষণ জোরে বাতাস বইতে ছিল। যে সাহাবীর সাথে আমার সাক্ষাৎ হচ্ছিল আমি তাঁর কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পয়গাম পৌছিয়ে দিচ্ছিলাম। যিনি পয়গাম শুনছিলেন তিনিই তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে চলে আসছিলেন। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ পিছন ফিরেও দেখছিলো না। বাতাস আমার ঢালে ধাক্কা দিচ্ছিল এবং আমি তাতে আঘাত পাচ্ছিলাম। এমনকি ওর লোহা আমার পায়ে পড়ে গেল। আমি ওটাকে নীচে ফেলে দিলাম। (এটাও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি এমন এক বাহিনী প্রেরণ করেছিলাম যা তোমরা দেখোনি।” তাঁরা ছিলেন ফেরেশতা। তাঁরা মুশরিকদের অন্তর ও বক্ষ ভয়, সন্ত্রাস এবং প্রভাব দ্বারা পূর্ণ করে দিয়েছিলেন। এমনকি তাদের সমস্ত নেতা তাদের অধীনস্থ সৈন্যদেরকে কাছে ডেকে ডেকে বলেছিলঃ “তোমরা মুক্তির পথ অন্বেষণ কর, বাঁচার পথ বের করে নাও।” এটা ছিল ফেরেশতাদের নিক্ষিপ্ত ভয় ও প্রভাব এবং তারাই ছিলেন ঐ সেনাবাহিনী যার বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে।কুফার অধিবাসী একজন নব্যযুবক হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে আবু আবদিল্লাহ (রাঃ)! আপনি বড়ই ভাগ্যবান যে, আপনি আল্লাহর নবী (সঃ)-কে স্বচক্ষে দেখেছেন এবং তাঁর মজলিসে বসেছেন। বলুন তো, তখন আপনি কি করতেন?” হযরত হুযাইফা (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি তখন জীবন দানে প্রস্তুত থাকতাম।”এ কথা শুনে যুবকটি বলেনঃ “শুনুন চাচা! যদি আমরা নবী (সঃ)-এর যামানা পেতাম তবে আল্লাহর শপথ! আমরা তাঁর পা মাটিতে পড়তে দিতাম না। তাঁকে আমরা নিজেদের ঘাড়ে উঠিয়ে নিয়ে ফিরতাম।” তিনি তখন বললেনঃ “হে আমার প্রিয় ভ্রাতুস্পুত্র! তাহলে একটি ঘটনা বলি, শুননা। খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) গভীর রাত্রি পর্যন্ত নামায পড়ছিলেন। নামায শেষ করে তিনি বললেনঃ “কাফিরদের খবরাখবর আনতে পারে এমন কেউ তোমাদের মধ্যে আছে কি? আল্লাহর নবী (সঃ) তার সাথে শৰ্ত করছেন যে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” তাঁর এ কথায় কেউই দাঁড়ালো না। কেননা সবারই ভয়, ক্ষুধা ও ঠাণ্ডা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। আবার তিনি অনেকক্ষণ ধরে নামায পড়লেন। তারপর পুনরায় বললেনঃ “যে। ব্যক্তি বিপক্ষ দলের খবর নিয়ে আসবে, আমি তাকে অভয় দিচ্ছি যে, সে অবশ্যই (অক্ষত ও নিরাপদ অবস্থায়) ফিরে আসবে। আমি দু'আ করি যে, তাকে যেন আল্লাহ জান্নাতে আমার বন্ধু হিসেবে স্থান দেন।” এবারও কেউ দাঁড়ালো না। আর দাঁড়াবেই বা কি করে? ক্ষুধার জ্বালায় তাদের পেট কোমরের সাথে লেগে গিয়েছিল এবং ঠাণ্ডায় দাঁতে দাঁতে বাজতে শুরু করেছিল। ভয়ে তাদের রক্ত পানি হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নাম ধরে ডাক দিলেন। আমার তো তখন আর তার ডাকে সাড়া দেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকলো না। তিনি বললেনঃ “হুযাইফা (রাঃ) তুমি যাও এবং দেখে এসো তারা কি করছে। দেখো, তুমি যে পর্যন্ত আমার কাছে ফিরে না আসো সে পর্যন্ত নতুন কোন কাজ করে বসো না।” আমি খুব আচ্ছা’ বলে আমার পথ ধরলাম। সাহস করে আমি শত্রুর মধ্যে ঢুকে পড়লাম। সেখানে গিয়ে বিস্ময়কর অবস্থা দেখলাম। তা এই যে, আল্লাহ তা'আলার অদৃশ্য সৈন্যরা আনন্দের সাথে নিজেদের কাজ করতে রয়েছে। বাতাস চুলার উপর হতে ডেকচিগুলোকে উল্টিয়ে ফেলেছে। তাঁবুর খুঁটি উৎপাটিত হয়েছে। তারা আগুন জ্বালাতে পারছে না। কোন কিছুই সজ্জিত অবস্থায় নেই। ঐ সময় আবু সুফিয়ান দাড়িয়ে উচ্চ স্বরে সকলকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে কুরায়েশরা! তোমরা নিজ নিজ সঙ্গী হতে সতর্ক হয়ে যাও। নিজ সাথীদের দেখা শোনা কর। এমন যেন না হয় যে, অন্য কেউ তোমাদের পাশে দাড়িয়ে তোমাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে।” আমি কথাগুলো শুনার সাথে সাথে আমার পাশে যে কুরায়েশী দাঁড়িয়েছিল তার হাত ধরে ফেললাম এবং তাকে। বললামঃ কে তুমি? সে উত্তরে বললো: “আমি অমুকের পুত্র অমুক।” আমি বললামঃ এখন থেকে সতর্ক থাকবে। আবু সুফিয়ান বললেনঃ “হে কুরায়েশের দল! আল্লাহর কসম, আমাদের আর কোথাও দাঁড়াবার স্থান নেই। আমাদের গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তুগুলো এবং আমাদের উটগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। বানু কুরাইযা আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা আমাদেরকে খুব কষ্ট দিয়েছে। অতঃপর এই ঝড়ো হাওয়া আমাদেরকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে। আমরা রান্না করে খেতে পারছি না। তবু ও থাকার স্থান আমরা ঠিক রাখতে পারছি না। তোমরা বিরক্ত হয়ে উঠেছে। আমি তো ফিরে যাবার কথা চিন্তা করছি। আমি তোমাদের সকলকেই ফিরে যাবার নির্দেশ দিচ্ছি।” এ কথা বলেই পাশে যে উটটি বসিয়ে রাখা হয়েছিল তার উপর তিনি উঠে বসলেন। উটকে মার দিতেই সে তিন পায়ে দাঁড়িয়ে গেল। সে সময় আমার এমন সুযোগ হয়েছিল যে, আমি ইচ্ছা করলে আবু সুফিয়ান (রাঃ)-কে একটি তীরের আঘাতেই খতম করে দিতে পারতাম। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশ ছিল যে, আমি যেন নতুন কোন কাজ না করে বসি। তাই আমি এ কাজ হতে বিরত থাকলাম। এখন আমি ফিরে চললাম এবং আমার সৈন্যদলের মধ্যে পৌছে গেলাম। আমি যখন পৌঁছি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি চাদর গায়ে দিয়ে নামায পড়ছিলেন। চাদরটি ছিল তাঁর কোন এক পত্নীর। আমাকে দেখতে পেয়ে তিনি আমাকে তাঁর দুই পায়ের মাঝে বসিয়ে নিলেন এবং তাঁর ঐ চাদর দ্বারা আমাকে আবৃত করলেন। অতঃপর তিনি রুকু সিজদা করলেন। আর আমি সেখানেই চাদরমুড়ি দিয়ে বসে থাকলাম। তাঁর নামায পড়া শেষ হলে আমি তাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। গাতফান গোত্র যখন কুরায়েশদের ফিরে যাবার কথা শুনলো তখন তারাও নিজেদের তলপি-তলপা বেঁধে নিয়ে ফিরে চললো।”অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর কসম! ককনে শীত সত্ত্বেও আমার মনে হচ্ছিল যে, আমি যেন কোন গরম হাম্মাম খানায় রয়েছি। ঐ সময় আবু সুফিয়ান (রাঃ) আগুন জ্বেলে তাপ গ্রহণ করছিল। আমি তাকে দেখে চিনে ফেললাম। সাথে সাথে আমি কামানে তীর যোজন করলাম। মনে করলাম যে, তীর ছুঁড়ে দিই। তিনি আমার তীরের আওতার মধ্যেই ছিলেন। আমার লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার কোন কারণই ছিল না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথা আমার স্মরণ হয়ে গেল যে, আমি যেন এমন কোন নতুন কাজ করে না বসি যার ফলে শত্রুরা সতর্ক হয়ে যেতে পারে। সুতরাং আমি আমার বাসনা পরিত্যাগ করলাম। যখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফিরে আসলাম তার পূর্ব পর্যন্ত আমি কোন ঠাণ্ডা অনুভব করিনি। আমার মনে হচ্ছিল যে, যেন আমি গরম হাম্মাম খানায় আছি। তবে যখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছলাম তখন খুবই ঠাণ্ডা অনুভূত হতে লাগলো। আমি ঠাণ্ডায় কাঁপতে লাগলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার চাদর দিয়ে আমাকে ঢেকে দিলেন। আমি সকাল পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমালাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে এ বলে জাগালেনঃ “হে নিদিত ব্যক্তি! জেগে ওঠো।অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, যখন ঐ তাবেয়ী বলেনঃ “হায়! যদি আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখতাম এবং তাঁর যুগটা পেতাম।” তখন হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ “হায়! যদি তোমার মত আমার ঈমান হতো। তাকে না দেখেই তুমি তাঁর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখেছো! তবে হে আমার প্রিয় ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি যে আকাক্ষা করছে তা শুধু আকাঙ্ক্ষাই মাত্র। সেই সময় থাকলে তুমি কি করতে তা তুমি জানো না। আমাদের উপর দিয়ে কত কঠিন সময় গত হয়েছে!” অতঃপর তিনি তাঁর সামনে উপরোল্লিখিত ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। তাতে তিনি একথাও বললেনঃ “ঝড় তুফানের সাথে সাথে বৃষ্টিও বর্ষিত হচ্ছিল।”আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত হুযাইফা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথের ঘটনাটি বর্ণনা করছিলেন তখন মজলিসে যারা উপস্থিত ছিলেন। তারা বললেনঃ “আমরা যদি সে সময় উপস্থিত থাকতাম তবে এই করতাম, ঐ করতাম।” তাঁদের একথা শুনে হযরত হুযাইফা (রাঃ) ঘটনাটি বর্ণনা করেনঃ ‘বাহির হতে তো দশ হাজার সৈন্য আমাদেরকে ঘিরে বসে আছে, আর ভিতর হতে বানু কুরাইযার আটশ' জন ইয়াহূদী বিদ্রোহী হয়ে গেছে এবং শিশুরা ও নারীরা মদীনায় পড়ে আছে। এভাবে সবদিক দিয়েই বিপদ লেগে আছে। যদি বানু কুরাইযা গোত্র এদিকে লক্ষ্য করে তাহলে ক্ষণেকের মধ্যে শিশু ও নারীদের ফায়সালা করে দিবে। আল্লাহর শপথ! এ রাত্রের মত ভীতি-বিহ্বল অবস্থা আমার আর কখনো হয়নি। এর উপর ঝড় বইছে, তুফান সমানভাবে চলতেই আছে, চতুর্দিক অন্ধকারে ছেয়ে গেছে, মেঘ গর্জন করছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, সবই মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর ইচ্ছেতেই হচ্ছে। সাথীদেরকে কোথায় দেখা যাবে? নিজের হাতের অঙ্গুলীও দেখা যায় না। মুনাফিকরা বাহানা করতে শুরু করে দিয়েছে যে, তাদের ছেলে মেয়ে, স্ত্রী পরিবারকে দেখবার কেউ নেই। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) যেন তাদেরকে ফিরে যাবার অনুমতি প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাউকেও ফিরে যেতে বাধা দিলেন না। যেই অনুমিত চায় তাকেই তিনি বলেনঃ “যাও, আগ্রহের সাথেই যাও।” সুতরাং তারা এক এক করে সরে পড়ে। আমরা শুধু প্রায় তিনশর মত রয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এসে আমাদেরকে এক এক করে দেখলেন। আমার অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। আমার কাছে শত্রুর হাত হতে রক্ষা পাওয়ার না ছিল কোন অস্ত্র এবং ঠাণ্ডা হতে বাঁচবার না ছিল কোন ব্যবস্থা। শুধু আমার স্ত্রীর ছোট একটি চাদর ছিল যা আমার হাঁটু পর্যন্ত পৌছেনি। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আসলেন তখন আমি আমার হাঁটুতে মাথা লাগিয়ে কাঁপছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “এটা কে?" আমি উত্তরে বললামঃ আমি হুযাইফা। তিনি তখন বললেনঃ “হে হুযাইফা (রাঃ)! শুন।” তাঁর একথা শুনে আল্লাহর কসম! পৃথিবী আমার উপর সংকুচিত হয়ে গেল যে, না জানি হয়তো তিনি আমাকে দাঁড়াতে বলবেন। আর দাঁড়ালে তো আমার দুর্গতির কোন সীমা থাকবে না। কিন্তু করি কি? আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নির্দেশ তো? বাধ্য হয়ে বললামঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার আদেশ পালন করতে প্রস্তুত আছি।” তিনি বললেনঃ “শত্রুদের মধ্যে এক নতুন ব্যাপার শুরু হয়ে গেছে। যাও, এর খবর নাও।” আল্লাহর কসম! ঐ সময় আমার চেয়ে অধিক না কারো ভয়-ভীতি ছিল, না আমার চেয়ে বেশী কাউকেও ঠাণ্ডা লাগছিল। কিন্তু এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আদেশ শোনা মাত্রই আমি রওয়ানা হয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার জন্যে দু'আ করছেন। এটা আমার কানে আসলো। তিনি দু'আ করছিলেনঃ “হে আল্লাহ! তার সামনে হতে, পিছন হতে, ডান দিক হতে, বাম দিক হতে, উপর হতে এবং নীচ হতে তাকে হিফাযত করুন।” তার দু'আর সাথে সাথে আমার অন্তর হতে ভয়-ভীতি দূর হয়ে গেল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডেকে বললেনঃ “শুন হে হুযাইফা (রাঃ)! সেখান হতে আমার নিকট ফিরে না আসা পর্যন্ত নতুন কিছু করে বসো না।” এ রিওয়াইয়াতে এও আছে যে, হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ “ইতিপূর্বে আমি আবু সুফিয়ান (রাঃ)-কে চিনতাম না। ওখানে গিয়ে আমি এ শব্দই শুনতে পেলামঃ “চল, ফিরে চল।” একটি আশ্চর্য ব্যাপার এও দেখলাম যে, ঐ ভয়াবহ বাতাস যা ডেকচিগুলোকে উল্টিয়ে দিচ্ছিল তা শুধু তাদের সেনাবাহিনীর অবস্থানস্থল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। আল্লাহর শপথ! তা থেকে অর্ধ হাতও বাইরে যায়নি। আমি দেখলাম যে, পাথর উড়ে উড়ে তাদের উপর পড়ছিল। যখন আমি ফিরে আসলাম তখন দেখলাম যে, পাগড়ি পরিহিত প্রায় ২০ জন অশ্বারোহী রয়েছেন যারা আমাকে বললেনঃ “যাও, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সংবাদ দাও যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর জন্যে যথেষ্ট হয়েছেন এবং তাঁর শত্রুদেরকে তিনি পরাজিত ও লাঞ্ছিত করেছেন।” এই বর্ণনায় এও উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল, যখন তিনি কোন বিপদের সম্মুখীন হতেন তখন নামায পড়া শুরু করে দিতেন। এতে আরো রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ খবর পৌছানো হয় তখনই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। সুতরাং এ আয়াতে নিম্ন অঞ্চল হতে আগমনকারী দ্বারা বানু কুরাইযাকে বুঝানো হয়েছে।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের চক্ষু বিস্ফারিত হয়েছিল, তোমাদের প্রাণ হয়ে পড়েছিল কণ্ঠাগত এবং তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে নানাবিধ ধারণা পোষণ করছিলে। এমনকি কোন কোন মুনাফিক তো এটা মনে করে নিয়েছিল যে, এ যুদ্ধে কাফিররাই জয়যুক্ত হবে। সাধারণ মুনাফিকদের কথা তো দূরে থাক, এমনকি মুতাব ইবনে কুশায়ের বলতে শুরু করলো: “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো আমাদেরকে বলেছিলেন যে, আমরা নাকি কাইসার ও কিসরার ধন-সম্পদের মালিক হয়ে যাবো, অথচ এখানকার অবস্থা এই যে, পায়খানায় যাওয়াও আমাদের জন্যে কষ্টকর হয়ে পড়েছে।” এ রকম বিভিন্ন লোকের ধারণা বিভিন্ন ছিল। তবে মুসলমানদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তাঁদের জয় সুনিশ্চিত।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “খন্দকের যুদ্ধের দিন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের প্রাণ তো হয়েছে কণ্ঠাগত, এখন আমাদের বলার কিছু আছে কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তোমরা বলো (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মর্যাদা রক্ষা করুন এবং আমাদের ভয়-ভীতিকে শান্তি ও নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করুন।” এদিকে মুসলমানদের এ দু'আ উচ্চারিত হচ্ছিল, আর ঐ দিকে আল্লাহর সৈন্য বাতাসের রূপ ধারণ করে এসে পড়ে এবং কাফিরদের দুর্গতি চরম সীমায় পৌঁছিয়ে দেয়। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-আহযাব 33:10
৯-১০ নং আয়াতের তাফসীরপঞ্চম হিজরীর শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে। আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের উপর যে দয়া ও অনুগ্রহ করেছিলেন এখানে তিনি তারই বর্ণনা দিচ্ছেন। যখন মুশরিকরা মুসলমানদেরকে দুনিয়া হতে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার উদ্দেশ্যে পূর্ণ শক্তিসহ বিরাট বাহিনী নিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করেছিল। কেউ কেউ বলেন যে, খন্দকের যুদ্ধ চতুর্থ হিজরীতে সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধের ঘটনা এই যে, বানু নাযীরের ইয়াহুদী নেতৃবর্গ, যাদের মধ্যে সালাম ইবনে আবি হাকীক, সালাম ইবনে মুশকাম, কিনানাহ, ইবনে রাবী প্রমুখ ছিল, মক্কায় এসে পূর্ব হতেই প্রস্তুত কুরায়েশদেরকে যুদ্ধের জন্যে উত্তেজিত করলো এবং তাদের সাথে অঙ্গীকার করলো যে, তারা তাদের অধীনস্থ লোকদেরকে সাথে নিয়ে তাদের দলে যোগদান করবে। সেখানে তাদের সাথে কথা শেষ করে তারা গাতফান গোত্রের লোকদের নিকট গমন করলো এবং তাদের সাথে কথাবার্তা বলে তাদেরকেও তাদের সাথে মিলিত করলো। কুরায়েশরাও এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে সারা আরবে আলোড়ন সৃষ্টি করলো এবং আরো কিছু লোক যোগাড় করে নিলো। এসবের সরদার নির্বাচিত হলেন আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারব এবং গাতফান গোত্রের নেতা নির্বাচিত হলো উয়াইনা ইবনে হাসান ইবনে বদর। এভাবে চেষ্টা তদবীর চালিয়ে তারা দশ হাজার যোদ্ধা একত্রিত করলো এবং মদীনার দিকে ধাওয়া করলো। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সংবাদ পেয়ে হযরত সালমান ফারসী (রাঃ)-এর পরামর্শক্রমে, মদীনার পূর্ব দিকে খন্দক খনন করতে শুরু করলেন। সমস্ত মুহাজির ও আনসার এ খনন কার্যে অংশগ্রহণ করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেও একাজে অংশ নিলেন। স্বয়ং তিনি কাদা-মাটি বহন করতে লাগলেন। মুশরিকদের সেনাবাহিনী বিনা বাধায় মদীনা পর্যন্ত পৌঁছে গেল এবং মদীনার পূর্বাংশে উহুদ পাহাড় সংলগ্ন স্থানে নিজেদের শিবির স্থাপন করলো। এটা ছিল মদীনার নিম্নাংশ। মদীনার উপরাংশে তারা এক বিরাট সৈন্য দল পাঠিয়ে দিলো যারা মদীনার উঁচু অংশে শিবির স্থাপন করলো এবং নীচে ও উপরের দিক থেকে মুলমানদেরকে অবরোধ করে ফেললো। মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা তিন হাজারেরও কম ছিল। কোন কোন রিওয়াইয়াতে শুধু সাতশ’ বলা হয়েছে। এই অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুকাবিলার জন্যে আসলেন। তিনি সালা পাহাড়কে পিছনের দিকে করলেন। শত্রুদের দিকে মুখ করে তিনি সৈন্য সমাবেশ করলেন। যে খন্দক তিনি খনন করেছিলেন তাতে পানি ইত্যাদি ছিল না। তা শুধু একটি গর্ত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) শিশু ও মহিলাদেরকে মদীনার একটি মহল্লায় একত্রিত করে রেখে দেন। মদীনায় বানু কুরায়যা নামক ইয়াহুদীদের একটি গোত্র বসবাস করতো। তাদের মহল্লা ছিল মদীনার পূর্ব দিকে। নবী (সঃ)-এর সাথে তাদের দৃঢ় সন্ধিচুক্তি ছিল। তাদেরও বিরাট দল ছিল। প্রায় আটশ’ জন বীর যোদ্ধা তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। মুশরিক ও ইয়াহূদীরা তাদের কাছে হুয়াই ইবনে আখতাব নারীকে পাঠিয়ে দিলো। সে তাদেরকে নানা প্রকারের লোভ-লালসা দেখিয়ে নিজেদের পক্ষে করে নিলো। তারাও ঠিক সময়ে মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো এবং প্রকাশ্যভাবে সন্ধি ভেঙ্গে দিলো। বাইরে দশহাজার শত্রু সৈন্য ছাউনি ফেলে বসে আছে। এদিকে ইয়াহূদীদের এই বিশ্বাসঘাতকতা যেন বগলে ফোড়া বের হওয়া। বত্রিশ দাঁতের মধ্যে জিহ্বা অথবা আটার মধ্যে লবণের মত মুসলমানদের অবস্থা হয়ে গেল। এ সাতশ জন লোক কি-ই বা করতে পারে? এটা ছিল ঐ সময় যার চিত্র কুরআন কারীম অংকন করেছে যে, তখন মুমিনরা পরীক্ষিত হয়েছিল এবং তারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল। শত্রুরা একমাস ধরে অবরোধ অব্যাহত রাখলো। যদিও মুশরিকরা খন্দক অতিক্রম করতে মক্ষম হলো না। তবে তারা মাসাধিককাল ধরে মুসলমাদেরকে ঘিরে বসে থাকলো। এতে মুসলমানরা ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লো। আমর ইবনে আবদে অদ্দ, যে ছিল আরবের বিখ্যাত বীর পুরুষ, সেনাপতিত্ব বিষয়ে যে ছিল অদ্বিতীয়, একবার সে নিজের সাথে কয়েকজন দুঃসাহসী বীরপুরুষকে নিয়ে সাহস করে অশ্বচালনা করলো এবং খন্দক পার হয়ে গেল। এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় অশ্বারোহীদের প্রতি ইঙ্গিত করলেন। কিন্তু বলা হয় যে, তাদেরকে তিনি প্রস্তুত না পেয়ে হযরত আলী (রাঃ)-কে তাদের মুকাবিলা করার নির্দেশ দিলেন। অল্পক্ষণ ধরে উভয় পক্ষের বীরপুরুষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ চলতে থাকলো। অবশেষে আল্লাহর সিংহ হযরত আলী (রাঃ) শত্রুদেরকে তরবারীর আঘাতে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। এতে মুসলমানরা খুবই খুশী হলেন এবং তাঁদের সাহস ও উৎসাহ বেড়ে গেল। তারা বুঝে নিলেন যে, তাদের জয় সুনিশ্চিত। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে ভীষণ বেগে ঝড় তুফান ও ঘূর্ণিবার্তা প্রবাহিত হতে শুরু করলো। এর ফলে কাফিরদের সমস্ত তাঁবু মূলোৎপাটিত হলো। কিছুই অবশিষ্ট থাকলো না। অগ্নি জ্বালানো কঠিন হয়ে গেল। কোন আশ্রয়স্থল তাদের দৃষ্টিগোচর হলো না। পরিশেষে তারা ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে গেল। এরই বর্ণনা কুরআন কারীমে দেয়া হয়েছে এবং আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু। এ আয়াতে যে বায়ুর কথা বলা হয়েছে হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর মতে ওটা ছিল পূবালী হাওয়া। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিও এর পৃষ্ঠপোষকতা করে। তিনি বলেনঃ “পূবালী বায়ু দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে এবং আ’দ সম্প্রদায়কে দাৰূর’ দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।”ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, দক্ষিণা হাওয়া উত্তরা হাওয়াকে আহযাবের যুদ্ধের সময় বলেঃ “চল, আমরা উভয়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সাহায্য করি।” তখন উত্তরা হাওয়া জবাবে বলেঃ “রাত্রে গরম বা প্রখরতা চলে না।” অতঃপর পূবালী হাওয়া প্রবাহিত হলো। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমার মামা হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ) খন্দকের যুদ্ধের রাত্রে কঠিন শীত ও প্রচণ্ড বাতাসের সময় খাদ্য ও লেপ আনার জন্যে আমাকে মদীনায় প্রেরণ করেন। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি আমাকে অনুমতি প্রদান করেন। তিনি আমাকে বলেনঃ “আমার কোন সাহাবীর সাথে তোমার দেখা হলে তাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবে।” আমি চললাম। ভীষণ জোরে বাতাস বইতে ছিল। যে সাহাবীর সাথে আমার সাক্ষাৎ হচ্ছিল আমি তাঁর কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পয়গাম পৌছিয়ে দিচ্ছিলাম। যিনি পয়গাম শুনছিলেন তিনিই তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে চলে আসছিলেন। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ পিছন ফিরেও দেখছিলো না। বাতাস আমার ঢালে ধাক্কা দিচ্ছিল এবং আমি তাতে আঘাত পাচ্ছিলাম। এমনকি ওর লোহা আমার পায়ে পড়ে গেল। আমি ওটাকে নীচে ফেলে দিলাম। (এটাও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি এমন এক বাহিনী প্রেরণ করেছিলাম যা তোমরা দেখোনি।” তাঁরা ছিলেন ফেরেশতা। তাঁরা মুশরিকদের অন্তর ও বক্ষ ভয়, সন্ত্রাস এবং প্রভাব দ্বারা পূর্ণ করে দিয়েছিলেন। এমনকি তাদের সমস্ত নেতা তাদের অধীনস্থ সৈন্যদেরকে কাছে ডেকে ডেকে বলেছিলঃ “তোমরা মুক্তির পথ অন্বেষণ কর, বাঁচার পথ বের করে নাও।” এটা ছিল ফেরেশতাদের নিক্ষিপ্ত ভয় ও প্রভাব এবং তারাই ছিলেন ঐ সেনাবাহিনী যার বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে।কুফার অধিবাসী একজন নব্যযুবক হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে আবু আবদিল্লাহ (রাঃ)! আপনি বড়ই ভাগ্যবান যে, আপনি আল্লাহর নবী (সঃ)-কে স্বচক্ষে দেখেছেন এবং তাঁর মজলিসে বসেছেন। বলুন তো, তখন আপনি কি করতেন?” হযরত হুযাইফা (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি তখন জীবন দানে প্রস্তুত থাকতাম।”এ কথা শুনে যুবকটি বলেনঃ “শুনুন চাচা! যদি আমরা নবী (সঃ)-এর যামানা পেতাম তবে আল্লাহর শপথ! আমরা তাঁর পা মাটিতে পড়তে দিতাম না। তাঁকে আমরা নিজেদের ঘাড়ে উঠিয়ে নিয়ে ফিরতাম।” তিনি তখন বললেনঃ “হে আমার প্রিয় ভ্রাতুস্পুত্র! তাহলে একটি ঘটনা বলি, শুননা। খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) গভীর রাত্রি পর্যন্ত নামায পড়ছিলেন। নামায শেষ করে তিনি বললেনঃ “কাফিরদের খবরাখবর আনতে পারে এমন কেউ তোমাদের মধ্যে আছে কি? আল্লাহর নবী (সঃ) তার সাথে শৰ্ত করছেন যে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” তাঁর এ কথায় কেউই দাঁড়ালো না। কেননা সবারই ভয়, ক্ষুধা ও ঠাণ্ডা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। আবার তিনি অনেকক্ষণ ধরে নামায পড়লেন। তারপর পুনরায় বললেনঃ “যে। ব্যক্তি বিপক্ষ দলের খবর নিয়ে আসবে, আমি তাকে অভয় দিচ্ছি যে, সে অবশ্যই (অক্ষত ও নিরাপদ অবস্থায়) ফিরে আসবে। আমি দু'আ করি যে, তাকে যেন আল্লাহ জান্নাতে আমার বন্ধু হিসেবে স্থান দেন।” এবারও কেউ দাঁড়ালো না। আর দাঁড়াবেই বা কি করে? ক্ষুধার জ্বালায় তাদের পেট কোমরের সাথে লেগে গিয়েছিল এবং ঠাণ্ডায় দাঁতে দাঁতে বাজতে শুরু করেছিল। ভয়ে তাদের রক্ত পানি হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নাম ধরে ডাক দিলেন। আমার তো তখন আর তার ডাকে সাড়া দেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকলো না। তিনি বললেনঃ “হুযাইফা (রাঃ) তুমি যাও এবং দেখে এসো তারা কি করছে। দেখো, তুমি যে পর্যন্ত আমার কাছে ফিরে না আসো সে পর্যন্ত নতুন কোন কাজ করে বসো না।” আমি খুব আচ্ছা’ বলে আমার পথ ধরলাম। সাহস করে আমি শত্রুর মধ্যে ঢুকে পড়লাম। সেখানে গিয়ে বিস্ময়কর অবস্থা দেখলাম। তা এই যে, আল্লাহ তা'আলার অদৃশ্য সৈন্যরা আনন্দের সাথে নিজেদের কাজ করতে রয়েছে। বাতাস চুলার উপর হতে ডেকচিগুলোকে উল্টিয়ে ফেলেছে। তাঁবুর খুঁটি উৎপাটিত হয়েছে। তারা আগুন জ্বালাতে পারছে না। কোন কিছুই সজ্জিত অবস্থায় নেই। ঐ সময় আবু সুফিয়ান দাড়িয়ে উচ্চ স্বরে সকলকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে কুরায়েশরা! তোমরা নিজ নিজ সঙ্গী হতে সতর্ক হয়ে যাও। নিজ সাথীদের দেখা শোনা কর। এমন যেন না হয় যে, অন্য কেউ তোমাদের পাশে দাড়িয়ে তোমাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে।” আমি কথাগুলো শুনার সাথে সাথে আমার পাশে যে কুরায়েশী দাঁড়িয়েছিল তার হাত ধরে ফেললাম এবং তাকে। বললামঃ কে তুমি? সে উত্তরে বললো: “আমি অমুকের পুত্র অমুক।” আমি বললামঃ এখন থেকে সতর্ক থাকবে। আবু সুফিয়ান বললেনঃ “হে কুরায়েশের দল! আল্লাহর কসম, আমাদের আর কোথাও দাঁড়াবার স্থান নেই। আমাদের গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তুগুলো এবং আমাদের উটগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। বানু কুরাইযা আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা আমাদেরকে খুব কষ্ট দিয়েছে। অতঃপর এই ঝড়ো হাওয়া আমাদেরকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে। আমরা রান্না করে খেতে পারছি না। তবু ও থাকার স্থান আমরা ঠিক রাখতে পারছি না। তোমরা বিরক্ত হয়ে উঠেছে। আমি তো ফিরে যাবার কথা চিন্তা করছি। আমি তোমাদের সকলকেই ফিরে যাবার নির্দেশ দিচ্ছি।” এ কথা বলেই পাশে যে উটটি বসিয়ে রাখা হয়েছিল তার উপর তিনি উঠে বসলেন। উটকে মার দিতেই সে তিন পায়ে দাঁড়িয়ে গেল। সে সময় আমার এমন সুযোগ হয়েছিল যে, আমি ইচ্ছা করলে আবু সুফিয়ান (রাঃ)-কে একটি তীরের আঘাতেই খতম করে দিতে পারতাম। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশ ছিল যে, আমি যেন নতুন কোন কাজ না করে বসি। তাই আমি এ কাজ হতে বিরত থাকলাম। এখন আমি ফিরে চললাম এবং আমার সৈন্যদলের মধ্যে পৌছে গেলাম। আমি যখন পৌঁছি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি চাদর গায়ে দিয়ে নামায পড়ছিলেন। চাদরটি ছিল তাঁর কোন এক পত্নীর। আমাকে দেখতে পেয়ে তিনি আমাকে তাঁর দুই পায়ের মাঝে বসিয়ে নিলেন এবং তাঁর ঐ চাদর দ্বারা আমাকে আবৃত করলেন। অতঃপর তিনি রুকু সিজদা করলেন। আর আমি সেখানেই চাদরমুড়ি দিয়ে বসে থাকলাম। তাঁর নামায পড়া শেষ হলে আমি তাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। গাতফান গোত্র যখন কুরায়েশদের ফিরে যাবার কথা শুনলো তখন তারাও নিজেদের তলপি-তলপা বেঁধে নিয়ে ফিরে চললো।”অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর কসম! ককনে শীত সত্ত্বেও আমার মনে হচ্ছিল যে, আমি যেন কোন গরম হাম্মাম খানায় রয়েছি। ঐ সময় আবু সুফিয়ান (রাঃ) আগুন জ্বেলে তাপ গ্রহণ করছিল। আমি তাকে দেখে চিনে ফেললাম। সাথে সাথে আমি কামানে তীর যোজন করলাম। মনে করলাম যে, তীর ছুঁড়ে দিই। তিনি আমার তীরের আওতার মধ্যেই ছিলেন। আমার লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার কোন কারণই ছিল না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথা আমার স্মরণ হয়ে গেল যে, আমি যেন এমন কোন নতুন কাজ করে না বসি যার ফলে শত্রুরা সতর্ক হয়ে যেতে পারে। সুতরাং আমি আমার বাসনা পরিত্যাগ করলাম। যখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফিরে আসলাম তার পূর্ব পর্যন্ত আমি কোন ঠাণ্ডা অনুভব করিনি। আমার মনে হচ্ছিল যে, যেন আমি গরম হাম্মাম খানায় আছি। তবে যখন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছলাম তখন খুবই ঠাণ্ডা অনুভূত হতে লাগলো। আমি ঠাণ্ডায় কাঁপতে লাগলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার চাদর দিয়ে আমাকে ঢেকে দিলেন। আমি সকাল পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমালাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে এ বলে জাগালেনঃ “হে নিদিত ব্যক্তি! জেগে ওঠো।অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, যখন ঐ তাবেয়ী বলেনঃ “হায়! যদি আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখতাম এবং তাঁর যুগটা পেতাম।” তখন হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ “হায়! যদি তোমার মত আমার ঈমান হতো। তাকে না দেখেই তুমি তাঁর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখেছো! তবে হে আমার প্রিয় ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি যে আকাক্ষা করছে তা শুধু আকাঙ্ক্ষাই মাত্র। সেই সময় থাকলে তুমি কি করতে তা তুমি জানো না। আমাদের উপর দিয়ে কত কঠিন সময় গত হয়েছে!” অতঃপর তিনি তাঁর সামনে উপরোল্লিখিত ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। তাতে তিনি একথাও বললেনঃ “ঝড় তুফানের সাথে সাথে বৃষ্টিও বর্ষিত হচ্ছিল।”আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত হুযাইফা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথের ঘটনাটি বর্ণনা করছিলেন তখন মজলিসে যারা উপস্থিত ছিলেন। তারা বললেনঃ “আমরা যদি সে সময় উপস্থিত থাকতাম তবে এই করতাম, ঐ করতাম।” তাঁদের একথা শুনে হযরত হুযাইফা (রাঃ) ঘটনাটি বর্ণনা করেনঃ ‘বাহির হতে তো দশ হাজার সৈন্য আমাদেরকে ঘিরে বসে আছে, আর ভিতর হতে বানু কুরাইযার আটশ' জন ইয়াহূদী বিদ্রোহী হয়ে গেছে এবং শিশুরা ও নারীরা মদীনায় পড়ে আছে। এভাবে সবদিক দিয়েই বিপদ লেগে আছে। যদি বানু কুরাইযা গোত্র এদিকে লক্ষ্য করে তাহলে ক্ষণেকের মধ্যে শিশু ও নারীদের ফায়সালা করে দিবে। আল্লাহর শপথ! এ রাত্রের মত ভীতি-বিহ্বল অবস্থা আমার আর কখনো হয়নি। এর উপর ঝড় বইছে, তুফান সমানভাবে চলতেই আছে, চতুর্দিক অন্ধকারে ছেয়ে গেছে, মেঘ গর্জন করছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, সবই মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর ইচ্ছেতেই হচ্ছে। সাথীদেরকে কোথায় দেখা যাবে? নিজের হাতের অঙ্গুলীও দেখা যায় না। মুনাফিকরা বাহানা করতে শুরু করে দিয়েছে যে, তাদের ছেলে মেয়ে, স্ত্রী পরিবারকে দেখবার কেউ নেই। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ) যেন তাদেরকে ফিরে যাবার অনুমতি প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাউকেও ফিরে যেতে বাধা দিলেন না। যেই অনুমিত চায় তাকেই তিনি বলেনঃ “যাও, আগ্রহের সাথেই যাও।” সুতরাং তারা এক এক করে সরে পড়ে। আমরা শুধু প্রায় তিনশর মত রয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এসে আমাদেরকে এক এক করে দেখলেন। আমার অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। আমার কাছে শত্রুর হাত হতে রক্ষা পাওয়ার না ছিল কোন অস্ত্র এবং ঠাণ্ডা হতে বাঁচবার না ছিল কোন ব্যবস্থা। শুধু আমার স্ত্রীর ছোট একটি চাদর ছিল যা আমার হাঁটু পর্যন্ত পৌছেনি। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আসলেন তখন আমি আমার হাঁটুতে মাথা লাগিয়ে কাঁপছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “এটা কে?" আমি উত্তরে বললামঃ আমি হুযাইফা। তিনি তখন বললেনঃ “হে হুযাইফা (রাঃ)! শুন।” তাঁর একথা শুনে আল্লাহর কসম! পৃথিবী আমার উপর সংকুচিত হয়ে গেল যে, না জানি হয়তো তিনি আমাকে দাঁড়াতে বলবেন। আর দাঁড়ালে তো আমার দুর্গতির কোন সীমা থাকবে না। কিন্তু করি কি? আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর নির্দেশ তো? বাধ্য হয়ে বললামঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার আদেশ পালন করতে প্রস্তুত আছি।” তিনি বললেনঃ “শত্রুদের মধ্যে এক নতুন ব্যাপার শুরু হয়ে গেছে। যাও, এর খবর নাও।” আল্লাহর কসম! ঐ সময় আমার চেয়ে অধিক না কারো ভয়-ভীতি ছিল, না আমার চেয়ে বেশী কাউকেও ঠাণ্ডা লাগছিল। কিন্তু এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আদেশ শোনা মাত্রই আমি রওয়ানা হয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার জন্যে দু'আ করছেন। এটা আমার কানে আসলো। তিনি দু'আ করছিলেনঃ “হে আল্লাহ! তার সামনে হতে, পিছন হতে, ডান দিক হতে, বাম দিক হতে, উপর হতে এবং নীচ হতে তাকে হিফাযত করুন।” তার দু'আর সাথে সাথে আমার অন্তর হতে ভয়-ভীতি দূর হয়ে গেল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডেকে বললেনঃ “শুন হে হুযাইফা (রাঃ)! সেখান হতে আমার নিকট ফিরে না আসা পর্যন্ত নতুন কিছু করে বসো না।” এ রিওয়াইয়াতে এও আছে যে, হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ “ইতিপূর্বে আমি আবু সুফিয়ান (রাঃ)-কে চিনতাম না। ওখানে গিয়ে আমি এ শব্দই শুনতে পেলামঃ “চল, ফিরে চল।” একটি আশ্চর্য ব্যাপার এও দেখলাম যে, ঐ ভয়াবহ বাতাস যা ডেকচিগুলোকে উল্টিয়ে দিচ্ছিল তা শুধু তাদের সেনাবাহিনীর অবস্থানস্থল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। আল্লাহর শপথ! তা থেকে অর্ধ হাতও বাইরে যায়নি। আমি দেখলাম যে, পাথর উড়ে উড়ে তাদের উপর পড়ছিল। যখন আমি ফিরে আসলাম তখন দেখলাম যে, পাগড়ি পরিহিত প্রায় ২০ জন অশ্বারোহী রয়েছেন যারা আমাকে বললেনঃ “যাও, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সংবাদ দাও যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর জন্যে যথেষ্ট হয়েছেন এবং তাঁর শত্রুদেরকে তিনি পরাজিত ও লাঞ্ছিত করেছেন।” এই বর্ণনায় এও উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল, যখন তিনি কোন বিপদের সম্মুখীন হতেন তখন নামায পড়া শুরু করে দিতেন। এতে আরো রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ খবর পৌছানো হয় তখনই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। সুতরাং এ আয়াতে নিম্ন অঞ্চল হতে আগমনকারী দ্বারা বানু কুরাইযাকে বুঝানো হয়েছে।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের চক্ষু বিস্ফারিত হয়েছিল, তোমাদের প্রাণ হয়ে পড়েছিল কণ্ঠাগত এবং তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে নানাবিধ ধারণা পোষণ করছিলে। এমনকি কোন কোন মুনাফিক তো এটা মনে করে নিয়েছিল যে, এ যুদ্ধে কাফিররাই জয়যুক্ত হবে। সাধারণ মুনাফিকদের কথা তো দূরে থাক, এমনকি মুতাব ইবনে কুশায়ের বলতে শুরু করলো: “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো আমাদেরকে বলেছিলেন যে, আমরা নাকি কাইসার ও কিসরার ধন-সম্পদের মালিক হয়ে যাবো, অথচ এখানকার অবস্থা এই যে, পায়খানায় যাওয়াও আমাদের জন্যে কষ্টকর হয়ে পড়েছে।” এ রকম বিভিন্ন লোকের ধারণা বিভিন্ন ছিল। তবে মুসলমানদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তাঁদের জয় সুনিশ্চিত।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “খন্দকের যুদ্ধের দিন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের প্রাণ তো হয়েছে কণ্ঠাগত, এখন আমাদের বলার কিছু আছে কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, তোমরা বলো (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মর্যাদা রক্ষা করুন এবং আমাদের ভয়-ভীতিকে শান্তি ও নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করুন।” এদিকে মুসলমানদের এ দু'আ উচ্চারিত হচ্ছিল, আর ঐ দিকে আল্লাহর সৈন্য বাতাসের রূপ ধারণ করে এসে পড়ে এবং কাফিরদের দুর্গতি চরম সীমায় পৌঁছিয়ে দেয়। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল-আহযাব 33:11
১১-১৩ নং আয়াতের তাফসীরআহযাবের যুদ্ধে মুসলমানরা যে ভীতি-বিহ্বলতা ও উদ্বেগপূর্ণ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। বাহির হতে আগত শত্রুরা পূর্ণ শক্তি ও বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর ভিতরে শহরের মধ্যে বিদ্রোহের অগ্নি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। ইয়াহূদীরা হঠাৎ করে সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে অস্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি করে দিয়েছে। মুসলমানরা খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে পতিত হয়েছে। মুনাফিকরা প্রকাশ্যভাবে পৃথক হয়ে গেছে। দুর্বল মনের লোকেরা বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে শুরু করেছে। তারা একে অপরকে বলছেঃ “পাগল হয়েছো না কি? দেখতে পাচ্ছ না যে, অতি অল্পক্ষণের মধ্যে পট পরিবর্তন হতে যাচ্ছে? চলো, পালিয়ে যাই।” ইয়াসরিব দ্বারা মদীনাকে বুঝানো হয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “স্বপ্নে আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থান দেখানো হয়েছে। তা দু’টি কংকরময় ভূমির মধ্যস্থলে অবস্থিত। প্রথম আমার ধারণা হয়েছিল যে, ওটা বোধহয় হিজর হবে। কিন্তু না, তা ইয়াসরিব।” আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, ঐ স্থানটি হলো মদীনা। অবশ্য একটি দুর্বল রিওয়াইয়াতে আছে যে, যে ব্যক্তি মদীনাকে ইয়াসরিব বলে সে যেন তা হতে তাওবা করে। মদীনা তো হলো তাবা, ওটা তাবা। (এ হাদীসটি শুধু মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। এর ইসনাদে দুর্বলতা রয়েছে)বর্ণিত আছে যে, আমালীকের মধ্যে যে লোকটি এখানে এসে অবস্থান করেছিল তার নাম ছিল ইয়াসরিব ইবনে আবীদ ইবনে মাহবীল ইবনে আউস ইবনে আমলাক ইবনে লাআয ইবনে ইরাম ইবনে সাম ইবনে নূহ (আঃ)। তার নামানুসারেই এ শহরটিও ইয়াসরিব নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। একটি উক্তি এও আছে যে, তাওরাত শরীফে এর এগারোটি নাম রয়েছে। ওগুলো হলো: মদীনা, তাবা, তায়্যেবাহ্, সাকীনা, জাবিরাহ, মুহিব্বাহ, মাহবুবাহ, কাসিমাহ, মাজরূরাহ, আযরা এবং মারহ্মাহ্।কা’ব আহ্বার (রঃ) বলেন, আমরা তাওরাতে একথাগুলো পেয়েছি যে, আল্লাহ তা'আলা মদীনা শরীফকে বলেনঃ “হে তাইয়্যেবা, হে তাবা এবং হে মাসকীনা! ধন-ভাণ্ডারে জড়িত হয়ে পড়ো না। সমস্ত জনপদের মধ্যে তোমার মর্যাদা সমুন্নত হবে। কিছু লোক খন্দকের যুদ্ধের সময় বলেছিলঃ “হে ইয়াসরিববাসী! এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই, তোমরা ফিরে চল।' বানু হারিসা গোত্র বলতে শুরু করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের বাড়ীতে চুরি হওয়ার আশংকা রয়েছে। ওগুলো জনহীন অবস্থায় পড়ে আছে। সুতরাং আমাদেরকে বাড়ী ফিরে যাবার অনুমতি দিন।” আউস ইবনে কায়সী বলেছিলঃ “আমাদের বাড়ীতে শত্রুদের ঢুকে পড়ার ভয় রয়েছে। সুতরাং আমাদেরকে বাড়ী ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হালে।” আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরের কথা বলে দিলেন যে, আসলে পলায়ন করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য, তাদের ঘরবাড়ী অরক্ষিত ছিল না।
আল-আহযাব 33:12
১১-১৩ নং আয়াতের তাফসীরআহযাবের যুদ্ধে মুসলমানরা যে ভীতি-বিহ্বলতা ও উদ্বেগপূর্ণ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। বাহির হতে আগত শত্রুরা পূর্ণ শক্তি ও বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর ভিতরে শহরের মধ্যে বিদ্রোহের অগ্নি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। ইয়াহূদীরা হঠাৎ করে সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে অস্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি করে দিয়েছে। মুসলমানরা খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে পতিত হয়েছে। মুনাফিকরা প্রকাশ্যভাবে পৃথক হয়ে গেছে। দুর্বল মনের লোকেরা বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে শুরু করেছে। তারা একে অপরকে বলছেঃ “পাগল হয়েছো না কি? দেখতে পাচ্ছ না যে, অতি অল্পক্ষণের মধ্যে পট পরিবর্তন হতে যাচ্ছে? চলো, পালিয়ে যাই।” ইয়াসরিব দ্বারা মদীনাকে বুঝানো হয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “স্বপ্নে আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থান দেখানো হয়েছে। তা দু’টি কংকরময় ভূমির মধ্যস্থলে অবস্থিত। প্রথম আমার ধারণা হয়েছিল যে, ওটা বোধহয় হিজর হবে। কিন্তু না, তা ইয়াসরিব।” আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, ঐ স্থানটি হলো মদীনা। অবশ্য একটি দুর্বল রিওয়াইয়াতে আছে যে, যে ব্যক্তি মদীনাকে ইয়াসরিব বলে সে যেন তা হতে তাওবা করে। মদীনা তো হলো তাবা, ওটা তাবা। (এ হাদীসটি শুধু মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। এর ইসনাদে দুর্বলতা রয়েছে)বর্ণিত আছে যে, আমালীকের মধ্যে যে লোকটি এখানে এসে অবস্থান করেছিল তার নাম ছিল ইয়াসরিব ইবনে আবীদ ইবনে মাহবীল ইবনে আউস ইবনে আমলাক ইবনে লাআয ইবনে ইরাম ইবনে সাম ইবনে নূহ (আঃ)। তার নামানুসারেই এ শহরটিও ইয়াসরিব নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। একটি উক্তি এও আছে যে, তাওরাত শরীফে এর এগারোটি নাম রয়েছে। ওগুলো হলো: মদীনা, তাবা, তায়্যেবাহ্, সাকীনা, জাবিরাহ, মুহিব্বাহ, মাহবুবাহ, কাসিমাহ, মাজরূরাহ, আযরা এবং মারহ্মাহ্।কা’ব আহ্বার (রঃ) বলেন, আমরা তাওরাতে একথাগুলো পেয়েছি যে, আল্লাহ তা'আলা মদীনা শরীফকে বলেনঃ “হে তাইয়্যেবা, হে তাবা এবং হে মাসকীনা! ধন-ভাণ্ডারে জড়িত হয়ে পড়ো না। সমস্ত জনপদের মধ্যে তোমার মর্যাদা সমুন্নত হবে। কিছু লোক খন্দকের যুদ্ধের সময় বলেছিলঃ “হে ইয়াসরিববাসী! এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই, তোমরা ফিরে চল।' বানু হারিসা গোত্র বলতে শুরু করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের বাড়ীতে চুরি হওয়ার আশংকা রয়েছে। ওগুলো জনহীন অবস্থায় পড়ে আছে। সুতরাং আমাদেরকে বাড়ী ফিরে যাবার অনুমতি দিন।” আউস ইবনে কায়সী বলেছিলঃ “আমাদের বাড়ীতে শত্রুদের ঢুকে পড়ার ভয় রয়েছে। সুতরাং আমাদেরকে বাড়ী ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হালে।” আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরের কথা বলে দিলেন যে, আসলে পলায়ন করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য, তাদের ঘরবাড়ী অরক্ষিত ছিল না।
আল-আহযাব 33:13
১১-১৩ নং আয়াতের তাফসীরআহযাবের যুদ্ধে মুসলমানরা যে ভীতি-বিহ্বলতা ও উদ্বেগপূর্ণ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। বাহির হতে আগত শত্রুরা পূর্ণ শক্তি ও বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর ভিতরে শহরের মধ্যে বিদ্রোহের অগ্নি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। ইয়াহূদীরা হঠাৎ করে সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে অস্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি করে দিয়েছে। মুসলমানরা খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে পতিত হয়েছে। মুনাফিকরা প্রকাশ্যভাবে পৃথক হয়ে গেছে। দুর্বল মনের লোকেরা বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে শুরু করেছে। তারা একে অপরকে বলছেঃ “পাগল হয়েছো না কি? দেখতে পাচ্ছ না যে, অতি অল্পক্ষণের মধ্যে পট পরিবর্তন হতে যাচ্ছে? চলো, পালিয়ে যাই।” ইয়াসরিব দ্বারা মদীনাকে বুঝানো হয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “স্বপ্নে আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থান দেখানো হয়েছে। তা দু’টি কংকরময় ভূমির মধ্যস্থলে অবস্থিত। প্রথম আমার ধারণা হয়েছিল যে, ওটা বোধহয় হিজর হবে। কিন্তু না, তা ইয়াসরিব।” আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, ঐ স্থানটি হলো মদীনা। অবশ্য একটি দুর্বল রিওয়াইয়াতে আছে যে, যে ব্যক্তি মদীনাকে ইয়াসরিব বলে সে যেন তা হতে তাওবা করে। মদীনা তো হলো তাবা, ওটা তাবা। (এ হাদীসটি শুধু মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। এর ইসনাদে দুর্বলতা রয়েছে)বর্ণিত আছে যে, আমালীকের মধ্যে যে লোকটি এখানে এসে অবস্থান করেছিল তার নাম ছিল ইয়াসরিব ইবনে আবীদ ইবনে মাহবীল ইবনে আউস ইবনে আমলাক ইবনে লাআয ইবনে ইরাম ইবনে সাম ইবনে নূহ (আঃ)। তার নামানুসারেই এ শহরটিও ইয়াসরিব নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। একটি উক্তি এও আছে যে, তাওরাত শরীফে এর এগারোটি নাম রয়েছে। ওগুলো হলো: মদীনা, তাবা, তায়্যেবাহ্, সাকীনা, জাবিরাহ, মুহিব্বাহ, মাহবুবাহ, কাসিমাহ, মাজরূরাহ, আযরা এবং মারহ্মাহ্।কা’ব আহ্বার (রঃ) বলেন, আমরা তাওরাতে একথাগুলো পেয়েছি যে, আল্লাহ তা'আলা মদীনা শরীফকে বলেনঃ “হে তাইয়্যেবা, হে তাবা এবং হে মাসকীনা! ধন-ভাণ্ডারে জড়িত হয়ে পড়ো না। সমস্ত জনপদের মধ্যে তোমার মর্যাদা সমুন্নত হবে। কিছু লোক খন্দকের যুদ্ধের সময় বলেছিলঃ “হে ইয়াসরিববাসী! এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই, তোমরা ফিরে চল।' বানু হারিসা গোত্র বলতে শুরু করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের বাড়ীতে চুরি হওয়ার আশংকা রয়েছে। ওগুলো জনহীন অবস্থায় পড়ে আছে। সুতরাং আমাদেরকে বাড়ী ফিরে যাবার অনুমতি দিন।” আউস ইবনে কায়সী বলেছিলঃ “আমাদের বাড়ীতে শত্রুদের ঢুকে পড়ার ভয় রয়েছে। সুতরাং আমাদেরকে বাড়ী ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হালে।” আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরের কথা বলে দিলেন যে, আসলে পলায়ন করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য, তাদের ঘরবাড়ী অরক্ষিত ছিল না।
আল-আহযাব 33:14
১৪-১৭ নং আয়াতের তাফসীরযারা ওযর করে জিহাদ হতে পালিয়ে যাচ্ছিল যে, তাদের ঘরবাড়ী অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, যার বর্ণনা উপরে দেয়া হয়েছে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি শত্রুরা নগরীর বিভিন্ন দিক হতে প্রবেশ করে তাদেরকে কুফরীর মধ্যে প্রবেশের জন্যে প্ররোচিত করতো তবে তারা অবশ্যই কোন চিন্তা-ভাবনা না করে কুফরীকে ককূল করে নিতো। তারা সামান্য ভয়-ভীতির কারণে ঈমানের কোন হিফাযত করতো না ও ঈমানকে আঁকড়ে ধরে থাকতো না। এভাবে মহান আল্লাহ তাদের নিন্দে করেছেন।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এরা তো পূর্বেই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ-প্রদর্শন করবে না। তারা জানে না যে, আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার সম্বন্ধে অবশ্যই তারা জিজ্ঞাসিত হবে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এভাবে মৃত্যু অথবা হত্যার ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করে কোন লাভ হবে না, এতে তোমাদের প্রাণ রক্ষা পেতে পারে না। বরং হতে পারে যে, এর কারণে অকস্মাৎ আল্লাহর পাকড়াও এসে যাবে এবংদুনিয়ার সুখ-সম্ভোগ তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেয়া হবে। দুনিয়া তো চিরস্থায়ী আখিরাতের তুলনায় অতি নগণ্য ও তুচ্ছ জিনিস।। এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আল্লাহ তা'আলা যদি তোমাদের অমঙ্গল ইচ্ছা করেন। তবে এমন কেউ নেই যে তোমাদেরকে আল্লাহ হতে রক্ষা করতে পারে। পক্ষান্তরে, তিনি যদি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করার ইচ্ছা করেন তবে এমন কেউ নেই যে তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারে। তোমরা আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।
আল-আহযাব 33:15
১৪-১৭ নং আয়াতের তাফসীরযারা ওযর করে জিহাদ হতে পালিয়ে যাচ্ছিল যে, তাদের ঘরবাড়ী অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, যার বর্ণনা উপরে দেয়া হয়েছে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি শত্রুরা নগরীর বিভিন্ন দিক হতে প্রবেশ করে তাদেরকে কুফরীর মধ্যে প্রবেশের জন্যে প্ররোচিত করতো তবে তারা অবশ্যই কোন চিন্তা-ভাবনা না করে কুফরীকে ককূল করে নিতো। তারা সামান্য ভয়-ভীতির কারণে ঈমানের কোন হিফাযত করতো না ও ঈমানকে আঁকড়ে ধরে থাকতো না। এভাবে মহান আল্লাহ তাদের নিন্দে করেছেন।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এরা তো পূর্বেই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ-প্রদর্শন করবে না। তারা জানে না যে, আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার সম্বন্ধে অবশ্যই তারা জিজ্ঞাসিত হবে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এভাবে মৃত্যু অথবা হত্যার ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করে কোন লাভ হবে না, এতে তোমাদের প্রাণ রক্ষা পেতে পারে না। বরং হতে পারে যে, এর কারণে অকস্মাৎ আল্লাহর পাকড়াও এসে যাবে এবংদুনিয়ার সুখ-সম্ভোগ তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেয়া হবে। দুনিয়া তো চিরস্থায়ী আখিরাতের তুলনায় অতি নগণ্য ও তুচ্ছ জিনিস।। এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আল্লাহ তা'আলা যদি তোমাদের অমঙ্গল ইচ্ছা করেন। তবে এমন কেউ নেই যে তোমাদেরকে আল্লাহ হতে রক্ষা করতে পারে। পক্ষান্তরে, তিনি যদি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করার ইচ্ছা করেন তবে এমন কেউ নেই যে তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারে। তোমরা আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।
আল-আহযাব 33:16
১৪-১৭ নং আয়াতের তাফসীরযারা ওযর করে জিহাদ হতে পালিয়ে যাচ্ছিল যে, তাদের ঘরবাড়ী অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, যার বর্ণনা উপরে দেয়া হয়েছে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি শত্রুরা নগরীর বিভিন্ন দিক হতে প্রবেশ করে তাদেরকে কুফরীর মধ্যে প্রবেশের জন্যে প্ররোচিত করতো তবে তারা অবশ্যই কোন চিন্তা-ভাবনা না করে কুফরীকে ককূল করে নিতো। তারা সামান্য ভয়-ভীতির কারণে ঈমানের কোন হিফাযত করতো না ও ঈমানকে আঁকড়ে ধরে থাকতো না। এভাবে মহান আল্লাহ তাদের নিন্দে করেছেন।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এরা তো পূর্বেই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ-প্রদর্শন করবে না। তারা জানে না যে, আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার সম্বন্ধে অবশ্যই তারা জিজ্ঞাসিত হবে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এভাবে মৃত্যু অথবা হত্যার ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করে কোন লাভ হবে না, এতে তোমাদের প্রাণ রক্ষা পেতে পারে না। বরং হতে পারে যে, এর কারণে অকস্মাৎ আল্লাহর পাকড়াও এসে যাবে এবংদুনিয়ার সুখ-সম্ভোগ তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেয়া হবে। দুনিয়া তো চিরস্থায়ী আখিরাতের তুলনায় অতি নগণ্য ও তুচ্ছ জিনিস।। এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আল্লাহ তা'আলা যদি তোমাদের অমঙ্গল ইচ্ছা করেন। তবে এমন কেউ নেই যে তোমাদেরকে আল্লাহ হতে রক্ষা করতে পারে। পক্ষান্তরে, তিনি যদি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করার ইচ্ছা করেন তবে এমন কেউ নেই যে তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারে। তোমরা আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।
আল-আহযাব 33:17
১৪-১৭ নং আয়াতের তাফসীরযারা ওযর করে জিহাদ হতে পালিয়ে যাচ্ছিল যে, তাদের ঘরবাড়ী অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, যার বর্ণনা উপরে দেয়া হয়েছে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি শত্রুরা নগরীর বিভিন্ন দিক হতে প্রবেশ করে তাদেরকে কুফরীর মধ্যে প্রবেশের জন্যে প্ররোচিত করতো তবে তারা অবশ্যই কোন চিন্তা-ভাবনা না করে কুফরীকে ককূল করে নিতো। তারা সামান্য ভয়-ভীতির কারণে ঈমানের কোন হিফাযত করতো না ও ঈমানকে আঁকড়ে ধরে থাকতো না। এভাবে মহান আল্লাহ তাদের নিন্দে করেছেন।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এরা তো পূর্বেই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ-প্রদর্শন করবে না। তারা জানে না যে, আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার সম্বন্ধে অবশ্যই তারা জিজ্ঞাসিত হবে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এভাবে মৃত্যু অথবা হত্যার ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করে কোন লাভ হবে না, এতে তোমাদের প্রাণ রক্ষা পেতে পারে না। বরং হতে পারে যে, এর কারণে অকস্মাৎ আল্লাহর পাকড়াও এসে যাবে এবংদুনিয়ার সুখ-সম্ভোগ তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেয়া হবে। দুনিয়া তো চিরস্থায়ী আখিরাতের তুলনায় অতি নগণ্য ও তুচ্ছ জিনিস।। এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আল্লাহ তা'আলা যদি তোমাদের অমঙ্গল ইচ্ছা করেন। তবে এমন কেউ নেই যে তোমাদেরকে আল্লাহ হতে রক্ষা করতে পারে। পক্ষান্তরে, তিনি যদি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করার ইচ্ছা করেন তবে এমন কেউ নেই যে তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারে। তোমরা আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।
আল-আহযাব 33:18
১৮-১৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি তার ব্যাপক ও প্রশস্ত জ্ঞানের দ্বারা ঐ লোকদের ভালরূপেই অবগত আছেন যারা অন্যদেরকেও জিহাদে গমন হতে বাধা দেয় এবং নিজেদের সঙ্গী-সাথী ও বন্ধু-বান্ধবদেরকে এবং আত্মীয়-স্বজনকে বলেঃ “তোমরাও আমাদের সঙ্গেই থাকো এবং নিজেদের ঘরবাড়ী, আরাম-আয়েশ, জমি-জমা ও পরিবারবর্গকে পরিত্যাগ করে জিহাদে যোগদান করো না। তারা নিজেরাও জিহাদে অংশগ্রহণ করে না। কোন কোন সময় তারা মুখ দেখিয়ে যায় এবং নাম লিখিয়ে দেয় সেটা অন্যকথা।মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) ও মুমিনদেরকে বলেনঃ এরা অত্যন্ত কৃপণ। তাদের নিকট থেকে তোমরা কোন আর্থিক সাহায্য পাবে না এবং তোমাদের প্রতি তাদের অন্তরে কোন সহানুভূতিও নেই। তোমরা যখন গনীমতের মাল প্রাপ্ত হও তখন তারা অসন্তুষ্ট হয়। যখন বিপদ আসে তখন তোমরা দেখতে পাও যে, মৃত্যু ভয়ে মুচ্ছাতুর ব্যক্তির মত চক্ষু উল্টিয়ে তারা তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু যখন বিপদ দূর হয়ে যায় তখন তারা ধনের লোভে তোমাদেরকে তীক্ষ্ণ ভাষায় বিদ্ধ করে। তারা নবী (সঃ)-কে বলেঃ আমরা তো আপনারই সঙ্গী। আমরা আপনার সঙ্গে থেকে রীতিমত যুদ্ধ করেছি। সুতরাং গনীমতের মালে আমাদেরও অংশ রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের সময় তারা মুখও দেখায় না। তারা পলাতকদের আগে এবং যোদ্ধাদের পিছনে থাকে। মালের দিকে তারা মাছির মত লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায়। মিথ্যা ও কাপুরুষতা এ দুটো দোষই তাদের মধ্যে বিদ্যমান। এ দুটো দোষে যারা দোষী হয় তাদের কাছে কল্যাণের কোন আশা করা যায় কি? শান্তির সময় প্রতারণা, দুশ্চরিত্রতা এবং রূঢ়তা, আর যুদ্ধের সময় ভীরুতা ও নারীত্বপনা! যুদ্ধের সময় ঋতুবতী নারীর ন্যায় পৃথক হয়ে যাওয়া, আর মাল নেয়ার সময় গাধার মত লোভনীয় দৃষ্টি নিক্ষেপ করাই তাদের কাজ।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা ঈমান আনেনি, এজন্যে আল্লাহ তাদের কার্যাবলী নিষ্ফল করেছেন এবং আল্লাহর পক্ষে এটা সহজ।
আল-আহযাব 33:19
১৮-১৯ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি তার ব্যাপক ও প্রশস্ত জ্ঞানের দ্বারা ঐ লোকদের ভালরূপেই অবগত আছেন যারা অন্যদেরকেও জিহাদে গমন হতে বাধা দেয় এবং নিজেদের সঙ্গী-সাথী ও বন্ধু-বান্ধবদেরকে এবং আত্মীয়-স্বজনকে বলেঃ “তোমরাও আমাদের সঙ্গেই থাকো এবং নিজেদের ঘরবাড়ী, আরাম-আয়েশ, জমি-জমা ও পরিবারবর্গকে পরিত্যাগ করে জিহাদে যোগদান করো না। তারা নিজেরাও জিহাদে অংশগ্রহণ করে না। কোন কোন সময় তারা মুখ দেখিয়ে যায় এবং নাম লিখিয়ে দেয় সেটা অন্যকথা।মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ) ও মুমিনদেরকে বলেনঃ এরা অত্যন্ত কৃপণ। তাদের নিকট থেকে তোমরা কোন আর্থিক সাহায্য পাবে না এবং তোমাদের প্রতি তাদের অন্তরে কোন সহানুভূতিও নেই। তোমরা যখন গনীমতের মাল প্রাপ্ত হও তখন তারা অসন্তুষ্ট হয়। যখন বিপদ আসে তখন তোমরা দেখতে পাও যে, মৃত্যু ভয়ে মুচ্ছাতুর ব্যক্তির মত চক্ষু উল্টিয়ে তারা তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু যখন বিপদ দূর হয়ে যায় তখন তারা ধনের লোভে তোমাদেরকে তীক্ষ্ণ ভাষায় বিদ্ধ করে। তারা নবী (সঃ)-কে বলেঃ আমরা তো আপনারই সঙ্গী। আমরা আপনার সঙ্গে থেকে রীতিমত যুদ্ধ করেছি। সুতরাং গনীমতের মালে আমাদেরও অংশ রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের সময় তারা মুখও দেখায় না। তারা পলাতকদের আগে এবং যোদ্ধাদের পিছনে থাকে। মালের দিকে তারা মাছির মত লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায়। মিথ্যা ও কাপুরুষতা এ দুটো দোষই তাদের মধ্যে বিদ্যমান। এ দুটো দোষে যারা দোষী হয় তাদের কাছে কল্যাণের কোন আশা করা যায় কি? শান্তির সময় প্রতারণা, দুশ্চরিত্রতা এবং রূঢ়তা, আর যুদ্ধের সময় ভীরুতা ও নারীত্বপনা! যুদ্ধের সময় ঋতুবতী নারীর ন্যায় পৃথক হয়ে যাওয়া, আর মাল নেয়ার সময় গাধার মত লোভনীয় দৃষ্টি নিক্ষেপ করাই তাদের কাজ।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারা ঈমান আনেনি, এজন্যে আল্লাহ তাদের কার্যাবলী নিষ্ফল করেছেন এবং আল্লাহর পক্ষে এটা সহজ।
আল-আহযাব 33:20
এই মুনাফিকদের কাপুরুষতা ও ভীতি-বিহ্বলতার অবস্থা এই যে, কাফির সৈন্যরা যে ফিরে গেছে এ বিশ্বাসই তাদের হয়নি। তাদের মনে এ ভয় রয়েই গেছে যে, না জানি হয়তো তারা আবার ফিরে আসবে। মুশরিকদের সৈন্যদেরকে দেখেই তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। তারা আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে যে, যদি তারা মুসলমানদের সাথে ঐ শহরেই না থাকতো তবে কতই না ভাল হতো! বরং তারা যদি অশিক্ষিত ও অজ্ঞদের সাথে কোন জনমানবহীন গ্রামে অথবা কোন বন জঙ্গলে অবস্থান করতো এবং কোন পথিককে যুদ্ধের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতো তবে কতই না ভাল হতো! মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা তোমাদের সাথে অবস্থান করলেও যুদ্ধ অল্পই করতো। তাদের মন তো মরে গেছে। কাপুরুষতার ঘুণ তাদেরকে ধরে বসেছে। তারা যুদ্ধ করবে কি, কী বীরত্বপনা তারা দেখাবে?
আল-আহযাব 33:21
২১-২২ নং আয়াতের তাফসীরএ আয়াত ঐ বিষয়ের উপর বড় দলীল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমস্ত কথা, কাজ ও অবস্থা আনুগত্য ও অনুসরণের যোগ্য। আহযাবের যুদ্ধে তিনি যে ধৈর্য, সহনশীলতা ও বীরত্বের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যেমন আল্লাহর পথের প্রস্তুতি, জিহাদের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ এবং কাঠিন্যের সময়ও আসমানী সাহায্যের আশা যে তিনি করেছিলেন, এগুলো নিঃসন্দেহে এ যোগ্যতা রাখে যে, মুসলমানরা এগুলোকে জীবনের বিরাট অংশ বানিয়ে নেয়। আর যেন আল্লাহর প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে নিজেদের জন্যে উত্তম নমুনা বানিয়ে নেয় এবং তার গুণাবলী যেন নিজেদের মধ্যে আনয়ন করে। এই কারণেই ভয় ও উদ্বেগ প্রকাশকারী লোকদের জন্যে আল্লাহ পাক কুরআন কারীমে ঘোষণা দেনঃ তোমরা আমার নবী (সঃ)-এর অনুসরণ কর না কেন? আমার রাসূল (সঃ) তো তোমাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছেন। তার নমুনা তোমাদের সামনে বিদ্যমান ছিল। তোমাদেরকে তিনি ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বনের কথা শুধু শিক্ষাই দিচ্ছেন না বরং কার্যে অটলতা, ধৈর্য এবং দৃঢ়তা তিনি নিজের জীবনেও ফুটিয়ে তুলেছেন। তোমরা যখন আল্লাহর উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাসের দাবী করছো তখন তাকে নমুনা বানাতে আপত্তি কিসের?এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর সেনাবাহিনী, খাঁটি মুসলমান এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্য সঙ্গীদের পাকা ঈমানের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, মুমিনরা যখন শত্রুপক্ষীয় ভীরু ও কাপুরুষ সম্মিলিত বাহিনীকে দেখলো তখন তারা বলে উঠলো: এটা তো তাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) যার প্রতিশ্রুতি আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) সত্যই বলেছিলেন। আর এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেলো।খুব সম্ভব আল্লাহর যে ওয়াদার দিকে এতে ইঙ্গিত রয়েছে তা সূরায়ে বাকারার নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদিও এখনো তোমাদের নিকট তোমাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা আসেনি? অর্থ সংকট ও দুঃখ-ক্লেশ তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত ও কম্পিত হয়েছিল।এমনকি রাসূল এবং তার সাথে ঈমান আনয়নকারীরা বলে উঠেছিলঃ আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? হ্যা, হ্যা, আল্লাহর সাহায্য নিকটেই।” (২:২১৪) অর্থাৎ এটা তো পরীক্ষা মাত্র। এদিকে তোমরা যুদ্ধে অটল থেকেছো, আর ওদিকে আল্লাহর সাহায্য এসেছে। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ এবং তার রাসূল (সঃ) সত্য বলেছেন এবং এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেলো। অর্থাৎ তাদের ঈমান পূর্ণ হয়ে গেল এবং আনুগত্য আরো বৃদ্ধি পেলো। ঈমান বেশী হওয়ার একটি দলীল এই আয়াতটি এবং অন্যদের তুলনায় তাঁদের ঈমান বেশী হওয়ারও দলীল। জমহুর ইমামগণও একথাই বলেন যে, ঈমান বাড়ে ও কমে। আমরাও সহীহ বুখারীর শরাহের শুরুতে এটা বর্ণনা করেছি। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। মহান আল্লাহ তাই বলেনঃ তাদের ঈমান যা ছিল, কঠিন বিপদের সময় তা আরো বৃদ্ধি পেয়ে গেল।
আল-আহযাব 33:22
২১-২২ নং আয়াতের তাফসীরএ আয়াত ঐ বিষয়ের উপর বড় দলীল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমস্ত কথা, কাজ ও অবস্থা আনুগত্য ও অনুসরণের যোগ্য। আহযাবের যুদ্ধে তিনি যে ধৈর্য, সহনশীলতা ও বীরত্বের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যেমন আল্লাহর পথের প্রস্তুতি, জিহাদের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ এবং কাঠিন্যের সময়ও আসমানী সাহায্যের আশা যে তিনি করেছিলেন, এগুলো নিঃসন্দেহে এ যোগ্যতা রাখে যে, মুসলমানরা এগুলোকে জীবনের বিরাট অংশ বানিয়ে নেয়। আর যেন আল্লাহর প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে নিজেদের জন্যে উত্তম নমুনা বানিয়ে নেয় এবং তার গুণাবলী যেন নিজেদের মধ্যে আনয়ন করে। এই কারণেই ভয় ও উদ্বেগ প্রকাশকারী লোকদের জন্যে আল্লাহ পাক কুরআন কারীমে ঘোষণা দেনঃ তোমরা আমার নবী (সঃ)-এর অনুসরণ কর না কেন? আমার রাসূল (সঃ) তো তোমাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছেন। তার নমুনা তোমাদের সামনে বিদ্যমান ছিল। তোমাদেরকে তিনি ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বনের কথা শুধু শিক্ষাই দিচ্ছেন না বরং কার্যে অটলতা, ধৈর্য এবং দৃঢ়তা তিনি নিজের জীবনেও ফুটিয়ে তুলেছেন। তোমরা যখন আল্লাহর উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাসের দাবী করছো তখন তাকে নমুনা বানাতে আপত্তি কিসের?এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর সেনাবাহিনী, খাঁটি মুসলমান এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্য সঙ্গীদের পাকা ঈমানের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, মুমিনরা যখন শত্রুপক্ষীয় ভীরু ও কাপুরুষ সম্মিলিত বাহিনীকে দেখলো তখন তারা বলে উঠলো: এটা তো তাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) যার প্রতিশ্রুতি আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) সত্যই বলেছিলেন। আর এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেলো।খুব সম্ভব আল্লাহর যে ওয়াদার দিকে এতে ইঙ্গিত রয়েছে তা সূরায়ে বাকারার নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদিও এখনো তোমাদের নিকট তোমাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা আসেনি? অর্থ সংকট ও দুঃখ-ক্লেশ তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত ও কম্পিত হয়েছিল।এমনকি রাসূল এবং তার সাথে ঈমান আনয়নকারীরা বলে উঠেছিলঃ আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? হ্যা, হ্যা, আল্লাহর সাহায্য নিকটেই।” (২:২১৪) অর্থাৎ এটা তো পরীক্ষা মাত্র। এদিকে তোমরা যুদ্ধে অটল থেকেছো, আর ওদিকে আল্লাহর সাহায্য এসেছে। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ এবং তার রাসূল (সঃ) সত্য বলেছেন এবং এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেলো। অর্থাৎ তাদের ঈমান পূর্ণ হয়ে গেল এবং আনুগত্য আরো বৃদ্ধি পেলো। ঈমান বেশী হওয়ার একটি দলীল এই আয়াতটি এবং অন্যদের তুলনায় তাঁদের ঈমান বেশী হওয়ারও দলীল। জমহুর ইমামগণও একথাই বলেন যে, ঈমান বাড়ে ও কমে। আমরাও সহীহ বুখারীর শরাহের শুরুতে এটা বর্ণনা করেছি। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। মহান আল্লাহ তাই বলেনঃ তাদের ঈমান যা ছিল, কঠিন বিপদের সময় তা আরো বৃদ্ধি পেয়ে গেল।
আল-আহযাব 33:23
২৩-২৪ নং আয়াতের তাফসীরএখানে মুমিন ও মুনাফিকদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সময় আসার পূর্বে মুনাফিকরা বড় বড় বুলি আওড়িয়ে থাকে কিন্তু যখন সময় এসে যায় তখন। অত্যন্ত ভীরুতা ও কাপুরুষতা প্রদর্শন করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে কৃত ওয়াদা সব ভুলে যায়। সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করার পরিবর্তে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। পক্ষান্তরে মুমিনরা তাদের ওয়াদা পূর্ণভাবে পালন করে। কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করে এবং কেউ কেউ শাহাদাতের প্রতীক্ষায় থাকে।হযরত সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “যখন আমি কুরআন মাজীদ লিখতে শুরু করি তখন একটি আয়াত আমি পাচ্ছিলাম না। অথচ সূরায়ে আহযাবে আমি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তা শুনেছিলাম। অবশেষে হযরত খুযাইমা ইবনে সাবিত আনসারী (রঃ)-এর নিকট আয়াতটি পাওয়া গেল। ইনি ঐ সাহাবী, যাঁর একার সাক্ষ্যকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দু’জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের সমান করে দিয়েছিলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (আরবি)-এ আয়াতটি হযরত আনাস ইবনে মাযার (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঘটনাটি এই যে, তিনি বদরের যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি বলে মনে অত্যন্ত দুঃখ ও ব্যথা অনুভব করেছিলেন। তার দুঃখের কারণ ছিল এই যে, যে যুদ্ধে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপস্থিত থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন সেই যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করতে পারলেন না। সুতরাং তার মত। হতভাগ্য আর কে আছে? তাই তিনি অঙ্গীকার করে বলেনঃ “আবার যদি জিহাদের সুযোগ এসে যায় তবে অবশ্যই আমি আল্লাহ তাআলাকে আমার সত্যবাদিতা ও সৎ সাহসিকতা প্রদর্শন করবো আর এও দেখিয়ে দেবো যে, আমি কি করছি!” অতঃপর যখন উহুদ যুদ্ধের সুযোগ আসলো তখন তিনি দেখতে পেলেন যে, সামনের দিক হতে হযরত সা’দ ইবনে মুআয (রাঃ) ফিরে আসছেন। তাকে এভাবে ফিরে আসতে দেখে তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আবু আমর (রাঃ)! কোথায় যাচ্ছেন? আল্লাহর শপথ! উহুদ পাহাড়ের এই দিক হতে আমি জান্নাতের সুগন্ধ পাচ্ছি।” এ কথা বলেই তিনি সামনের দিকে অগ্রসর হন এবং মুশরিকদের মধ্যে প্রবেশ করে বহুক্ষণ ধরে তরবারী চালনা করেন। কিন্তু মুসলমানরা সবাই ফিরে গিয়েছিলেন বলে তিনি একা হয়ে গেলেন। তাঁর এই আকস্মিক আক্রমণের ফলে মুশরিকরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো এবং তাঁকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেললো। অতঃপর তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। তার দেহে আশিটিরও বেশী যখম হয়েছিল। কোনটি ছিল বর্শার যখম এবং কোনটি ছিল তরবারীর যখম। শাহাদাতের পর তাঁকে কেউ চিনতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তাঁর ভগ্নী তাঁকে তাঁর হাতের অঙ্গুলীগুলোর অগ্রভাগ দেখে চিনতে পারেন। তার ব্যাপারেই (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, যখন মুসলমানরা যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করে তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা মুসলমানরা) যা করলো এজন্যে আমি আপনার নিকট ওযর প্রকাশ করছি এবং মুশরিকরা যা করেছে সে জন্যে আমি আপনার নিকট অসন্তোষ প্রকাশ করছি।” তাতে এও রয়েছে যে, হযরত সা'দ (রাঃ) তাকে বলেনঃ “আমি আপনার সাথেই রয়েছি। আমি তার সাথে চলছিলামও বটে। কিন্তু তিনি যা করছিলেন। তা আমার সাধ্যের অতিরিক্ত ছিল।”হযরত তালহা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ উহুদের যুদ্ধ হতে মদীনায় ফিরে এসে মিম্বরের উপর আরোহণ করেন এবং আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও গুণকীর্তনের পর মুসলমানদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। যারা শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের মর্যাদার বর্ণনা দেন। অতঃপর তিনি (আরবি) এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। একজন মুসলমান দাঁড়িয়ে গিয়ে প্রশ্ন করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ আয়াতে যাদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাঁরা কারা?” ঐ সময় আমি সামনের দিক হতে আসছিলাম এবং হারামী ও সবুজ রঙ-এর দু'টি কাপড় পরিহিত ছিলাম। আমার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেনঃ “হে প্রশ্নকারী ব্যক্তি! এই লোকটিও তাদের মধ্যে একজন।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা ইবনে তালহা (রাঃ) হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর দরবারে গমন করেন। যখন তিনি তার দরবার হতে ফিরে আসতে উদ্যত হন তখন তিনি তাকে ডেকে বলেনঃ “হে মূসা (রাঃ)! এসো, আমার নিকট হতে একটি হাদীস শুনে যাও। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি। যে, (আরবি)-এই আয়াতে যেসব লোকের বর্ণনা রয়েছে তাদের মধ্যে তোমার পিতা হযরত তালহা (রাঃ) একজন।”এটাও মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে।এঁদের বর্ণনা দেয়ার পর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আর কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে যে, আবার যুদ্ধের সুযোগ আসলে তারা তাদের কাজ আল্লাহকে প্রদর্শন করবে এবং শাহাদাতের পেয়ালা পান করবে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি। এই ভীতি এবং এই সন্ত্রাস এই কারণেই ছিল যে, আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে পুরস্কৃত করেন তাদের সত্যবাদিতার জন্যে এবং তাঁর ইচ্ছা হলে মুনাফিকদেরকে শাস্তি দেন অথবা তাদেরকে ক্ষমা করেন। আল্লাহ তা'আলা হলেন আলেমুল গায়েব। তার কাছে প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবই সমান। যা হয়নি তা তিনি তেমনি জানেন যেমন জানেন যা হয়ে গেছে। কিন্তু তার অভ্যাস এই যে, বান্দা কোন কাজ যে পর্যন্ত না করে বসে সে পর্যন্ত তাকে শুধু নিজের জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে শাস্তি প্রদান করেন না। যেমন তিনি বলেনঃ (আারবি)অর্থাৎ “আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো, যতক্ষণ না আমি জেনে নিই তোমাদের মধ্যে জিহাদকারী ও ধৈর্যশীলদের এবং আমি তোমাদের ব্যাপারে পরীক্ষা করি।” (৪৭:৩১) সুতরাং অস্তিত্বের পূর্বের জ্ঞান, তারপর অস্তিত্ব লাভের পরের জ্ঞান উভয়ই আল্লাহ তা'আলার রয়েছে। আর অস্তিত্বে আসার পর হবে পুরস্কার অথবা শাস্তি। যেমন মহান আল্লাহ অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আারবি)অর্থাৎ “অসৎকে সৎ হতে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছে। আল্লাহ মুমিনদেরকে সেই অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না। অদৃশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদেরকে অবহিত করবার নন।” (৩:১৭৯) সুতরাং আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ তার ইচ্ছা হলে তিনি মুনাফিকদেরকে শাস্তি দেন অথবা তাদেরকে ক্ষমা করেন। অর্থাৎ তাদেরকে তিনি খাটি অন্তরে তাওবা করার তাওফীক দেন। ফলে তারা তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে। আল্লাহ তা'আলা তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তাঁর করুণা ও রহমত তার গযব ও ক্রোধের উপর বিজয়ী।
আল-আহযাব 33:24
২৩-২৪ নং আয়াতের তাফসীরএখানে মুমিন ও মুনাফিকদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সময় আসার পূর্বে মুনাফিকরা বড় বড় বুলি আওড়িয়ে থাকে কিন্তু যখন সময় এসে যায় তখন। অত্যন্ত ভীরুতা ও কাপুরুষতা প্রদর্শন করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাথে কৃত ওয়াদা সব ভুলে যায়। সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করার পরিবর্তে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। পক্ষান্তরে মুমিনরা তাদের ওয়াদা পূর্ণভাবে পালন করে। কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করে এবং কেউ কেউ শাহাদাতের প্রতীক্ষায় থাকে।হযরত সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “যখন আমি কুরআন মাজীদ লিখতে শুরু করি তখন একটি আয়াত আমি পাচ্ছিলাম না। অথচ সূরায়ে আহযাবে আমি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে তা শুনেছিলাম। অবশেষে হযরত খুযাইমা ইবনে সাবিত আনসারী (রঃ)-এর নিকট আয়াতটি পাওয়া গেল। ইনি ঐ সাহাবী, যাঁর একার সাক্ষ্যকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দু’জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের সমান করে দিয়েছিলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (আরবি)-এ আয়াতটি হযরত আনাস ইবনে মাযার (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঘটনাটি এই যে, তিনি বদরের যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি বলে মনে অত্যন্ত দুঃখ ও ব্যথা অনুভব করেছিলেন। তার দুঃখের কারণ ছিল এই যে, যে যুদ্ধে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপস্থিত থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন সেই যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করতে পারলেন না। সুতরাং তার মত। হতভাগ্য আর কে আছে? তাই তিনি অঙ্গীকার করে বলেনঃ “আবার যদি জিহাদের সুযোগ এসে যায় তবে অবশ্যই আমি আল্লাহ তাআলাকে আমার সত্যবাদিতা ও সৎ সাহসিকতা প্রদর্শন করবো আর এও দেখিয়ে দেবো যে, আমি কি করছি!” অতঃপর যখন উহুদ যুদ্ধের সুযোগ আসলো তখন তিনি দেখতে পেলেন যে, সামনের দিক হতে হযরত সা’দ ইবনে মুআয (রাঃ) ফিরে আসছেন। তাকে এভাবে ফিরে আসতে দেখে তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আবু আমর (রাঃ)! কোথায় যাচ্ছেন? আল্লাহর শপথ! উহুদ পাহাড়ের এই দিক হতে আমি জান্নাতের সুগন্ধ পাচ্ছি।” এ কথা বলেই তিনি সামনের দিকে অগ্রসর হন এবং মুশরিকদের মধ্যে প্রবেশ করে বহুক্ষণ ধরে তরবারী চালনা করেন। কিন্তু মুসলমানরা সবাই ফিরে গিয়েছিলেন বলে তিনি একা হয়ে গেলেন। তাঁর এই আকস্মিক আক্রমণের ফলে মুশরিকরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো এবং তাঁকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেললো। অতঃপর তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। তার দেহে আশিটিরও বেশী যখম হয়েছিল। কোনটি ছিল বর্শার যখম এবং কোনটি ছিল তরবারীর যখম। শাহাদাতের পর তাঁকে কেউ চিনতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তাঁর ভগ্নী তাঁকে তাঁর হাতের অঙ্গুলীগুলোর অগ্রভাগ দেখে চিনতে পারেন। তার ব্যাপারেই (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, যখন মুসলমানরা যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করে তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা মুসলমানরা) যা করলো এজন্যে আমি আপনার নিকট ওযর প্রকাশ করছি এবং মুশরিকরা যা করেছে সে জন্যে আমি আপনার নিকট অসন্তোষ প্রকাশ করছি।” তাতে এও রয়েছে যে, হযরত সা'দ (রাঃ) তাকে বলেনঃ “আমি আপনার সাথেই রয়েছি। আমি তার সাথে চলছিলামও বটে। কিন্তু তিনি যা করছিলেন। তা আমার সাধ্যের অতিরিক্ত ছিল।”হযরত তালহা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ উহুদের যুদ্ধ হতে মদীনায় ফিরে এসে মিম্বরের উপর আরোহণ করেন এবং আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও গুণকীর্তনের পর মুসলমানদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। যারা শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের মর্যাদার বর্ণনা দেন। অতঃপর তিনি (আরবি) এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। একজন মুসলমান দাঁড়িয়ে গিয়ে প্রশ্ন করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ আয়াতে যাদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাঁরা কারা?” ঐ সময় আমি সামনের দিক হতে আসছিলাম এবং হারামী ও সবুজ রঙ-এর দু'টি কাপড় পরিহিত ছিলাম। আমার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেনঃ “হে প্রশ্নকারী ব্যক্তি! এই লোকটিও তাদের মধ্যে একজন।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা ইবনে তালহা (রাঃ) হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর দরবারে গমন করেন। যখন তিনি তার দরবার হতে ফিরে আসতে উদ্যত হন তখন তিনি তাকে ডেকে বলেনঃ “হে মূসা (রাঃ)! এসো, আমার নিকট হতে একটি হাদীস শুনে যাও। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি। যে, (আরবি)-এই আয়াতে যেসব লোকের বর্ণনা রয়েছে তাদের মধ্যে তোমার পিতা হযরত তালহা (রাঃ) একজন।”এটাও মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে।এঁদের বর্ণনা দেয়ার পর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আর কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে যে, আবার যুদ্ধের সুযোগ আসলে তারা তাদের কাজ আল্লাহকে প্রদর্শন করবে এবং শাহাদাতের পেয়ালা পান করবে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি। এই ভীতি এবং এই সন্ত্রাস এই কারণেই ছিল যে, আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে পুরস্কৃত করেন তাদের সত্যবাদিতার জন্যে এবং তাঁর ইচ্ছা হলে মুনাফিকদেরকে শাস্তি দেন অথবা তাদেরকে ক্ষমা করেন। আল্লাহ তা'আলা হলেন আলেমুল গায়েব। তার কাছে প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবই সমান। যা হয়নি তা তিনি তেমনি জানেন যেমন জানেন যা হয়ে গেছে। কিন্তু তার অভ্যাস এই যে, বান্দা কোন কাজ যে পর্যন্ত না করে বসে সে পর্যন্ত তাকে শুধু নিজের জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে শাস্তি প্রদান করেন না। যেমন তিনি বলেনঃ (আারবি)অর্থাৎ “আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো, যতক্ষণ না আমি জেনে নিই তোমাদের মধ্যে জিহাদকারী ও ধৈর্যশীলদের এবং আমি তোমাদের ব্যাপারে পরীক্ষা করি।” (৪৭:৩১) সুতরাং অস্তিত্বের পূর্বের জ্ঞান, তারপর অস্তিত্ব লাভের পরের জ্ঞান উভয়ই আল্লাহ তা'আলার রয়েছে। আর অস্তিত্বে আসার পর হবে পুরস্কার অথবা শাস্তি। যেমন মহান আল্লাহ অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আারবি)অর্থাৎ “অসৎকে সৎ হতে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছে। আল্লাহ মুমিনদেরকে সেই অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না। অদৃশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদেরকে অবহিত করবার নন।” (৩:১৭৯) সুতরাং আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ তার ইচ্ছা হলে তিনি মুনাফিকদেরকে শাস্তি দেন অথবা তাদেরকে ক্ষমা করেন। অর্থাৎ তাদেরকে তিনি খাটি অন্তরে তাওবা করার তাওফীক দেন। ফলে তারা তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে। আল্লাহ তা'আলা তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তাঁর করুণা ও রহমত তার গযব ও ক্রোধের উপর বিজয়ী।
আল-আহযাব 33:25
আল্লাহ তা'আলা নিজের ইহসান বা অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি ঝড়-তুফান ও অদৃশ্য সেনাবাহিনী প্রেরণ করে কাফিরদের শক্তি-সাহস সবকিছু চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছেন। তারা কঠিন নৈরাশ্যের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। অকৃতকার্য অবস্থায় তারা অবরোধ উঠিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। যদি তারা বিশ্ব শান্তির দূত হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতের মধ্যে না থাকতো তবে এ ঝড়-তুফান তাদের সাথে ঐ ব্যবহারই করতো যেমন ব্যবহার করেছিল আ’দ জাতির সাথে। যেহেতু বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেছেনঃ যতদিন তুমি তাদের মধ্যে অবস্থান করবে ততদিন আল্লাহ তাদের উপর সাধারণ আযাব নাযিল করবেন না, সেহেতু তিনি তাদেরকে তাদের দুষ্টামির স্বাদ গ্রহণ করালেন তাদের একতাকে ভেঙ্গে দিয়ে, তাদেরকে তিনি ছিন্ন ভিন্ন করে দিলেন এবং নিজের আযাব সরিয়ে নিলেন। তাদের একতাবদ্ধতা তাদের প্রবৃত্তি প্রসূত ছিল বলে ঝড়-তুফানই তাদেরকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিলো। যারা চিন্তা-ভাবনা করে এসেছিল তারাও সবাই মাটির সাথে মিশে গেল। কোথায় গেল তাদের গনীমতের মাল এবং কোথায় গেল তাদের বিজয়! তাদের জীবনের উপর মরিচা পড়ে গেল। তারা হাতে হাত মলতে লাগলো; দাঁতে দাঁত পিষতে লাগলো। ঘুরানো চক্রে আপতিত হয়ে অপমান ও লাঞ্ছনার সাথে উদ্দেশ্য সাধন ছাড়াই অকৃতকার্য হয়ে তারা ফিরে গেল। দুনিয়ার ক্ষতি তাদের পৃথকভাবে হলো এবং আখিরাতের শাস্তি তো পৃথকভাবে আছেই। কেননা, কেউ যদি কোন কাজ করার নিয়ত করে এবং তা কার্যে পরিণত করে, তবে সে তাতে কৃতকার্য হালে আর নাই হালে, পাপ তার হবেই। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যা ও তার দ্বীনকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা ইত্যাদি সব কিছুই তারা করেছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা উভয় জগতের বিপদ তাদের উপর আপতিত করে তাদের অন্তর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেন এবং তাদেরকে ব্যর্থ মনোরথ করে ফিরিয়ে দেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের পক্ষ থেকে তাদের মুকাবিলা করেন। মুসলমানরা না তাদের সাথে লড়েছে, না তাদেরকে সরিয়ে দিয়েছে। বরং মুসলমানরা তাদের জায়গাতেই অবস্থান করেছে। আর কাফির ও মুশরিকরা এমনিতেই পলায়ন করেছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর সেনাবাহিনীর মর্যাদা রক্ষা করলেন, নিজের বান্দাদের তিনি সাহায্য করলেন এবং নিজেই তিনি যথেষ্ট হয়ে গেলেন। এজন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক, তাঁর ওয়াদা সত্য, তিনি তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন, তার সেনাবাহিনীর মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন, সম্মিলিত বাহিনী পরাজিত হলো এবং এরপরে আর কিছুই নেই। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে তাখরীজ করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আহযাবের যুদ্ধে দু'আ করেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! হে কিতাব অবতীর্ণকারী, হে তাড়াতাড়ি হিসাব গ্রহণকারী! সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করুন এবং তাদেরকে আন্দোলিত ও প্রকম্পিত করুন।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ “যুদ্ধে মুমিনদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট। এতে একটি অতি সূক্ষ্ম কথা এই আছে যে, মুসলমানরা শুধু এই যুদ্ধ হতেই মুক্ত হননি, বরং আগামীতে সদা-সর্বদার জন্যে সাহাবীগণ (রাঃ) যুদ্ধ হতে মুক্তি লাভ করেছিলেন। মুশরিকরা আর তাঁদের উপর আক্রমণ করার সাহস কখনো করেনি। ইতিহাস সাক্ষী আছে যে, আহযাবের যুদ্ধের পর কাফিরদের এ সাহস হয়নি যে, তারা মদীনার উপর অথবা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর কোন স্থান হতে আক্রমণ করে। তাদের এ অপবিত্র পদক্ষেপ হতে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে এবং তার বাসস্থান ও আরামের জায়গাকে সুরক্ষিত রেখেছেন। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। বরং অপরপক্ষে মুসলমানরা তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করেছেন। এমনকি আল্লাহ তা'আলা আরব উপমহাদেশ হতে শিরক ও কফরী সমলে উৎপাটিত করেছেন। যখন কাফিররা এ যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তন করে। তখনই রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে বলেছিলেনঃ “এ বছরের পর কুরায়েশরা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করবে না। বরং তোমরাই তাদের সাথে যুদ্ধ করবে।” তাই হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মক্কা বিজিত হলো। আল্লাহর শক্তির মুকাবেলা করা বান্দার সাধ্যাতীত। আল্লাহকে কেউই পরাজিত করতে পারে না। তিনিই স্বীয় শক্তি ও সাহায্যবলে ঐ সম্মিলিত বাহিনীকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছিলেন। তাদের নাম নেয়ার মত কেউই থাকলো না। তিনি ইসলাম ও মুসলমানদেরকে বিজয় দান করলেন এবং স্বীয় ওয়াদাকে সত্য করে দেখালেন। তিনি স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সাহায্য করলেন। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহরই জন্যে।
আল-আহযাব 33:26
২৬-২৭ নং আয়াতের তাফসীরইতিপূর্বে আমরা বর্ণনা করেছি যে, যখন মুশরিক ও ইয়াহূদীদের সেনাবাহিনী মদীনায় আসে ও অবরোধ সৃষ্টি করে তখন বানু কুরাইযা গোত্রের ইয়াহুদীরা যারা মদীনার অধিবাসী ছিল এবং যাদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চুক্তি হয়েছিল, তারাও ঠিক এই সময় বিশ্বাসঘাতকতা করলো এবং সন্ধি ভেঙ্গে দিলো। তারা চোখ রাঙাতে শুরু করলো। তাদের সরদার কাব ইবনে আসাদ আলাপ আলোচনার জন্য আসলো। ম্লেচ্ছ হুয়াই ইবনে আখতাব ঐ সরদারকে সন্ধি ভঙ্গ করতে উদ্বুদ্ধ করলো। প্রথমে সে সন্ধি ভঙ্গ করতে সম্মত হলো না। সে এ সন্ধির উপর দৃঢ় থাকতে চাইলো। হুয়াই বললো: “এটা কেমন কথা হলো? আমি তোমাকে সম্মানের উচ্চাসনে বসিয়ে তোমার মস্তকে রাজ মুকুট পরাতে চাচ্ছি, অথচ তুমি তা মানছো না? কুরায়েশরা ও তাদের অন্যান্য সঙ্গীসহ আমরা সবাই এক সাথে আছি। আমরা শপথ করেছি যে, যে পর্যন্ত না আমরা এক একজন মুসলমানের মাংস ছেদন করবো সে পর্যন্ত এখান হতে সরবো না।” কা'বের দুনিয়ার অভিজ্ঞতা ভাল ছিল বলে সে উত্তর দিলো: “এটা ভুল কথা। এটা তোমাদের ক্ষমতার বাইরে। তোমরা আমাকে লাঞ্ছনার বেড়ী পরাতে এসেছে। তুমি একটা কুলক্ষণে লোক। সুতরাং তুমি আমার নিকট হতে সরে যাও। আমাকে তোমার ধোকাবাজীর শিকারে পরিণত করো না।" হুয়াই কিন্তু তখনো তার পিছন ছাড়লো না। সে তাকে বারবার বুঝাতে থাকলো। অবশেষে সে বললো: “মনে কর যে, কুরায়েশ ও গাতফান গোত্র পালিয়ে গেল, তাহলে আমরা দলবলসহ তোমার গর্তে গিয়ে পড়বো। তোমার ও তোমার গোত্রের যে দশা হবে, আমার ও আমার গোত্রেরও সেই দশাই হবে।"অবশেষে কাবের উপর হুয়াই-এর যাদু ক্রিয়াশীল হলো। বানু কুরাইযা সন্ধি ভঙ্গ করলো। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও সাহাবীগণ (রাঃ) অত্যন্ত দুঃখিত হলেন এবং এটা তাঁদের কাছে খুবই কঠিন ঠেকলো। আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের সাহায্য করলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণ সমভিব্যাহারে বিজয়ীর বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন। সাহাবীগণ (রাঃ) অস্ত্র-শস্ত্র খুলে ফেললেন এবং রাসূলুল্লাহও (সঃ) অস্ত্র-শস্ত্র খুলে ফেলে হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর গৃহে ধূলো-ধূসরিত অবস্থায় হাযির হলেন এবং পাক সাফ হওয়ার জন্যে গোসল করতে যাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আবির্ভূত হন। তাঁর মস্তকোপরি রেশমী পাগড়ী ছিল। তিনি খচ্চরের উপর উপবিষ্ট ছিলেন। ওর পিঠে রেশমী গদি ছিল। তিনি বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি অস্ত্র-শস্ত্র খুলে ফেলেছেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা।” হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “ফেরেশতারা কিন্তু এখনো অস্ত্র-শস্ত্র হতে পৃথক হয়নি। আমি কাফিরদের পশ্চাদ্ধাবন হতে এইমাত্র ফিরে এলাম। জেনে রাখুন! আল্লাহর নির্দেশ, বানু কুরাইযার দিকে চলুন! তাদেরকে উপযুক্ত শিক্ষা দান করুন! আমার প্রতিও মহান আল্লাহর এ নির্দেশ রয়েছে যে, আমি যেন তাদেরকে প্রকম্পিত করি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে যান। নিজে প্রস্তুতি গ্রহণ করে সাহাবীদেরকেও প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা সবাই বানু কুরাইযার ওখানেই আসরের নামায আদায় করবে। যুহরের নামাযের পর এ হুকুম দেয়া হলো। বানু কুরাইযার দুর্গ মদীনা হতে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। পথেই নামাযের সময় হয়ে গেল। তাদের কেউ কেউ নামায আদায় করে নিলেন। তাঁরা বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথা বলার উদ্দেশ্য ছিল যে, তারা যেন খুব তাড়াতাড়ি চলে আসেন।” আবার কেউ কেউ বললেনঃ “আমরা সেখানে না পৌঁছে নামায পড়বো না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ খবর জানতে পেরে দু’দলের কাউকেই তিনি ভৎসনা বা তিরস্কার করলেন না। তিনি ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-কে মদীনার খলীফা নিযুক্ত করলেন। সেনাবাহিনীর পতাকা হযরত আলী (রাঃ)-এর হাতে প্রদান করলেন। তিনি নিজেও সৈন্যদের পিছনে পিছনে চলতে লাগলেন। সেখানে গিয়েই তিনি তাদের দুর্গ অবরোধ করে ফেললেন। পঁচিশ দিন পর্যন্ত অবরোধ স্থায়ী হলো। যখন ইয়াহূদীদের দম নাকে এসে গেল তখন তাদের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে উঠলো। তারা হযরত সা’দ ইবনে মুআয (রাঃ)-কে নিজেদের সালিশ বা মীমাংসাকারী নির্ধারণ করলো। কারণ তিনি আউস গোত্রের সরদার ছিলেন। বানু কুরাইযা ও আউস গোত্রের মধ্যে যুগ-যুগ ধরে বন্ধুত্ব ও মিত্রতা চলে আসছিল। তারা একে অপরের সাহায্য করতো। তাদের ধারণা ছিল যে, হযরত সা'দ (রাঃ) তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করবেন। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সাল্ল বানু কাইনুকা গোত্রকে ছাড়িয়ে নিয়েছিল। এদিকে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর দেহে একটি তীর বিদ্ধ হয়েছিল, যার কারণে সেখান হতে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার ক্ষতস্থানে দাগ লাগিয়েছিলেন এবং মসজিদের তাঁবুতে তাঁর স্থান করেছিলেন। যাতে তাঁকে দেখতে যাওয়ার সুবিধা হয়। হযরত সা'দ (রাঃ) যে দু'আ করেছিলেন তন্মধ্যে একটি দু'আ এও ছিলঃ “হে আমার প্রতিপালক। যদি আরো কোন যুদ্ধ আপনার নবী (সঃ)-এর উপর থেকে থাকে যেমন কাফির মুশরিকরা আপনার নবী (সঃ)-এর উপর আক্রমণ চালিয়েছে, তবে আমাকে জীবিত রাখুন, যেন আমি তার সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারি। আর যদি কোন যুদ্ধ অবশিষ্ট না থেকে থাকে তবে আমার ক্ষতস্থান হতে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকুক। কিন্তু হে আমার প্রতিপালক! যে পর্যন্ত না আমি বানু কুরাইযা গোত্রের বিদ্রোহের পূর্ণ শাস্তি দেখে আমার চক্ষুদ্বয় ঠাণ্ডা করতে পারি সে পর্যন্ত আমার মৃত্যুকে বিলম্বিত করুন। হযরত সা'দ (রাঃ)-এর প্রার্থনা কবুল হওয়ার দৃশ দেখে বিস্মিত হতে হয়। তিনি এদিকে প্রার্থনা করছেন, আর ওদিকে বানু কুরাইযা গোত্র স্বীকার করে নিয়েছে যে, হযরত সা'দ (রাঃ) তাদের যে মীমাংসা করবেন তা তারা মেনে নেবে এবং তাদের দুর্গ মুসলমানদের হাতে সমর্পণ করবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নিকট সংবাদ পাঠালেন যে, তিনি যেন এসে তাদেরকে তার ফায়সালা শুনিয়ে দেন।হযরত সা'দ (রাঃ)-কে গাধার উপর সওয়ার করিয়ে নিয়ে আসা হলো। আউস গোত্রের সমস্ত লোক তাকে জড়িয়ে ধরে বললো: “দেখুন, বানু কুরাইযা গোত্র আপনারই লোক। তারা আপনার উপর ভরসা করেছে। তারা আপনার কওমের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। সুতরাং আপনি তাদের উপর দয়া করুন এবং তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করুন!” হযরত সা'দ (রাঃ) নীরব ছিলেন। তাদের কথার কোন জবাব তিনি দিচ্ছিলেন না। তারা তাকে উত্তর দেয়ার জন্যে পীড়াপীড়ি করতে লাগলো এবং তার পিছন ছাড়লো না। অবশেষে তিনি বললেনঃ “ঐ সময় এসে গেছে, হযরত সা’দ এটা প্রমাণ করতে চান যে, আল্লাহর পথে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারের তিনি কোন পরওয়া করবেন না। তাঁর এ কথা শোনা মাত্রই ঐ লোকগুলো হতাশ হয়ে পড়লো যে, বানু কুরাইযা গোত্রের কোন রেহাই নেই। যখন হযরত সা'দ (রাঃ)-এর সওয়ারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তাঁবুর নিকট আসলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরা তোমাদের সরদারের অভ্যর্থনার জন্যে দাঁড়িয়ে যাও।” তখন মুসলমানরা সবাই দাঁড়িয়ে গেলেন। অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাকে সওয়ারী হতে নামানো হলো। এরূপ করার কারণ ছিল এই যে, ঐ সময় তিনি ফায়সালাকারীর মর্যাদা লাভ করেছিলেন। ঐ সময় তার ফায়সালাই চূড়ান্ত বলে গৃহীত হবে। তিনি উপবেশন করা মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “বানু কুরাইযা গোত্র তোমার ফায়সালা মেনে নিতে সম্মত হয়েছে এবং দুর্গ আমাদের হাতে সমর্পণ করেছে। সুতরাং তুমি এখন তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দিয়ে দাও।” হযরত সা'দ (রাঃ) বললেনঃ “তাদের ব্যাপারে আমি যা ফায়সালা করবো তাই কি পূর্ণ করা হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “নিশ্চয়ই।” তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “এই তাঁবুবাসীদের জন্যেও কি আমার ফায়সালা মেনে নেয়া জরুরী হবে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা, অবশ্যই।” আবার তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “এই দিকের লোকদের জন্যেও কি?” ঐ সময় তিনি ঐ দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন যেই দিকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইজ্জত ও বুযর্গীর খাতিরে তিনি তাঁর দিকে তাকালেন না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “হ্যা, এই দিকের লোলেদের জন্যেও এটা মেনে নেয়া জরুরী হবে।” তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বললেনঃ “তাহলে এখন আমার ফায়সালা শুনুন! বানু কুরাইযার মধ্যে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার মত যত লোক রয়েছে তাদের সবাইকেই হত্যা করে দেয়া হবে। তাদের শিশু সন্তানদেরকে বন্দী করা হবে এবং তাদের ধন-সম্পদ মুসলমানদের অধিকারভুক্ত হবে।” তাঁর এই ফায়সালা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে সা’দ (রাঃ)! তুমি এ ব্যাপারে ঐ ফায়সালাই করেছে যা আল্লাহ তা'আলা সপ্তম আকাশের উপর ফায়সালা করেছেন। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে সা’দ (রাঃ)! প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহর যে ফায়সালা সেই ফায়সালাই তুমি শুনিয়েছো।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে গর্ত খনন করা হয় এবং বানু কুরাইযা গোত্রের লোকদেরকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় হত্যা করে তাতে নিক্ষেপ করা হয়। তাদের সংখ্যা ছিল সাতশ’ বা আটশ'। তাদের নারীদেরকে ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদেরকে এবং তাদের সমস্ত মালধন হস্তগত করা হয়। আমি এসব ঘটনা আমার ‘কিতাবুস সিয়ার’ গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই জন্যে।তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ কিতাবীদের মধ্যে যারা তাদেরকে সাহায্য করেছিল, তাদেরকে তিনি তাদের দুর্গ হতে অবতরণে বাধ্য করলেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করলেন। এখন তোমরা তাদের কতককে হত্যা করছে এবং কতককে করছো বন্দী। এই বানু কুরাইযা গোত্রের বড় নেতা, যার দ্বারা এই বংশ চালু হয়েছিল, পূর্ব যুগে এ আশায় সে হিজাযে এসে বসতি স্থাপন করেছিল যে, যে শেষ নবী (সঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী তাদের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, তিনি যেহেতু হিজায প্রদেশে আবির্ভূত হবেন, সেহেতু তারা যেন সর্বপ্রথম তাঁর আনুগত্যের মর্যাদা লাভ করতে পারে। কিন্তু শেষ নবী (সঃ)-এর যখন আগমন ঘটলো তখন তার অযোগ্য উত্তরসূরীরা তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো। যার ফলে তাদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হলো।(আরবি) দ্বারা দুর্গকে বুঝানো হয়েছে। এই কারণে জন্তুর মাথার শিংকেও (আরবি) বলা হয়। কেননা, জন্তুদের দেহের সবচেয়ে উপরে শিংই থাকে। আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে প্রভাব সৃষ্টি করে দিলেন। তারাই মুশরিকদেরকে উত্তেজিত করে তুলেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর আক্রমণ চালিয়েছিল। শিক্ষিত ও মূর্খ কখনো সমান হয় না। তারাই মুসলমানদেরকে সমূলে উৎপাটিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু ঘটনা তার বিপরীত হয়ে গেল। শক্তি দুর্বলতায় এবং সফলতা বিফলতায় পরিবর্তিত হলো। চিত্র নষ্ট হয়ে গেল। মিত্ররা পলায়ন করলো এবং তারা একেবারে অসহায় হয়ে পড়লো। সম্মানের জায়গা অসম্মান দখল করে নিলো। মুসলমানদেরকে দুনিয়া হতে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার আনন্দ তাদের নিজেদেরকেই নিশ্চিহ্ন করে দিলো। এরপর আখিরাতের পালা তো আছেই। তাদের কিছু সংখ্যককে হত্যা করে দেয়া হলো। আতিয়্যা কারামী বর্ণনা করেছে, যখন আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে হাযির করা হলো তখন তিনি বললেনঃ “দেখো, যদি এর নাভীর নীচে চুল গজিয়ে থাকে তবে একে হত্যা করে দেবে। অন্যথায় একে বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত করবে।” দেখা গেল যে, তখনো আমার শৈশবকাল কাটেনি। সুতরাং জীবিত ছেড়ে দেয়া হলো।মুসলমানদেরকে তাদের ভূমি, ঘরবাড়ী ও ধন-সম্পদের অধিকারী করে দেয়া হলো। এমনকি তাদেরকে ঐ ভূমির মালিক করে দেয়া হলো যা তখনো পদানত হয়নি। অর্থাৎ খাইবারের ভূমি অথবা মক্কা শরীফের ভূমি কিংবা পারস্য অথবা রোমের ভূমি। কিংবা হতে পারে যে, সব জায়গারই ভূমি। অর্থাৎ সব জমিই বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “খন্দকের যুদ্ধের দিন আমি বের হলাম, আমার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধে সেনাবাহিনীর অবস্থা অবহিত হওয়া। এমন সময় আমার পিছন দিক থেকে কারো সবেগে আগমনের আভাষ পেলাম। তার অস্ত্রের ঝনঝনানীর শব্দও আমার কানে এলো। আমি তখন রাস্তা হতে সরে গিয়ে এক জায়গায় বসে পড়লাম। দেখলাম যে, হযরত সা'দ (রাঃ) সেনাবাহিনীর সাথে মিলিত হতে যাচ্ছেন। তার সাথে তাঁর ভাই হারিস ইবনে আউস (রাঃ)-ও ছিলেন। তাঁর হাতে ঢাল ছিল। হযরত সা'দ (রাঃ) লৌহবর্ম পরিহিত ছিলেন। তিনি খুবই লম্বা দেহ বিশিষ্ট লোক ছিলেন বলে তাঁর দেহ বর্মে সম্পূর্ণরূপে আচ্ছাদিত হয়নি। তাঁর হাত খোলা ছিল। যুদ্ধের কবিতা পাঠ করতে করতে তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি সেখান হতে আরো কিছুদূর এগিয়ে গেলাম। একটি বাগানে আমি প্রবেশ করলাম। সেখানে কিছু মুসলমান উপস্থিত ছিলেন। একটি লোক লৌহ-শিরস্ত্রাণ পরিহিত ছিলেন। ঐ লোকদের মধ্যে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-ও বিদ্যমান ছিলেন। তিনি আমাকে দেখে ফেলেছিলেন এবং এ কারণে তিনি আমার উপর অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। তিনি বলতে লাগলেনঃ “হে বীরাঙ্গনা! আপনি কি জানেন না যে, যুদ্ধ চলছে? আল্লাহ তাআলাই জানেন পরিণতি কি হবে! আপনি কি করে এখানে আসতে পারলেন? ইত্যাদি অনেক কিছু বলে তিনি আমাকে ভৎসনা করলেন। তিনি আমাকে এতো বেশী তিরস্কার করলেন যে, যদি যমীন ফেটে যেতো তবে আমি তাতে ঢুকে পড়তাম। যে লোকটি মুখ ঢেকে ছিলেন তিনি হযরত উমারের এসব কথা শুনে মাথা হতে লোহার টুপি নামিয়ে ফেললেন। তখন আমি তাকে দেখে চিনতে পারলাম। তিনি ছিলেন হযরত তালাহা ইবনে উবাইদিল্লাহ (রাঃ)। তিনি হযরত উমার (রাঃ)-কে নীরব করিয়ে দিয়ে বললেনঃ “কি ভৎসনা করছেন? পরিণামের জন্যে কি ভয়? আপনি এতো ভয় করছেন কেন? কেউ যদি পালিয়ে যায় তবে সে যাবে কোথায়? সবকিছুই আল্লাহর হাতে।” একজন কুরায়েশী হযরত সা'দ (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে তীর মেরে দিলো এবং বললো: “আমি হলাম ইবনে আরকা।” হযরত সা’দ (রাঃ)-এর রক্তবাহী শিরায় তীরটি বিদ্ধ হয়ে গেল এবং রক্তের ফোয়ারা ছুটলো। ঐ সময় তিনি দু'আ করলেনঃ “হে আল্লাহ! আমার মৃত্যু ঘটাবেন না যে পর্যন্ত না আমি বানু কুরাইযা গোত্রের ধ্বংস স্বচক্ষে দেখে যেতে পারি।” আল্লাহ তাআলার কি মাহাত্ম্য যে, তৎক্ষণাৎ তার ক্ষতস্থানের রক্ত বন্ধ হয়ে গেল। ঝড়-তুফান মুশরিকদেরকে তাড়িয়ে দিলো। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উপর সদয় হলেন। আবু সুফিয়ান এবং তার সঙ্গী-সাথীরা তেহামায় পালিয়ে গেল। উয়াইনা ইবনে বদর এবং তার সঙ্গীরা পালিয়ে গেল নজদের দিকে। বানু কুরাইযা গোত্র তাদের দুর্গে আশ্রয় নিলো। যুদ্ধক্ষেত্র শূন্য দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় ফিরে গেলেন। হযরত সা'দ (রাঃ)-এর জন্যে মসজিদে নববীতেই একটা তাঁবুর ব্যবস্থা করে দেয়া হলো। ঐ সময়েই হযরত জিবরাঈল (আঃ) আসলেন। তার চেহারা ধূলিময় ছিল। তিনি বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি অস্ত্র-শস্ত্র রেখে দিয়েছেন? ফেরেশতারা কিন্তু এখনো অস্ত্র-শস্ত্র খুলে ফেলেননি। চলুন, বানু কুরাইযার ব্যাপারেও একটা ফায়সালা করে নেয়া হালে। তাদের উপর আক্রমণ চালানো হালে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তৎক্ষণাৎ অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হলেন এবং সাহাবীদেরকেও যুদ্ধযাত্রার নির্দেশ প্রদান করলেন। বানু তামীম গোত্রের ঘরবাড়ী মসজিদে নববী সংলগ্ন ছিল। পথে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আচ্ছা ভাই! এখান দিয়ে কাউকেও যেতে দেখেছো কি?” তারা উত্তরে বললো: “এখনই হযরত দাহইয়া কালবী (রাঃ) গেলেন।” অথচ উনিই তো ছিলেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ)। তাঁর দাড়ী এবং চেহারা সম্পূর্ণরূপে হযরত দাহইয়া কালবী (রাঃ)-এর সাথে সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) গিয়ে বানু কুরাইযার দুর্গ অবরোধ করে বসলেন। পঁচিশ দিন পর্যন্ত এই অবরোধ স্থায়ী হলো। যখন তারা অত্যন্ত সংকটময় অবস্থায় পতিত হলো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “দুর্গ আমাদের হাতে ছেড়ে দাও এবং তোমরা নিজেরাও আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ কর। আমি তোমাদের ব্যাপারে যা ইচ্ছা ফায়সালা করবো।” তারা আবু লুবাবা আব্দুল মুনযিরের সাথে পরামর্শ করলো। সে ইঙ্গিতে বললো: “এ অবস্থায় তোমরা জীবনের আশা পরিত্যাগ কর।” তারা এটা জানতে পেরে এতে অসম্মতি জানালো। তারা বললো: “আমরা আমাদের দুর্গ শূন্য করে দিচ্ছি এবং এটা আপনার সেনাবাহিনীর হাতে সমর্পণ করছি। আমাদের ব্যাপারে আমরা হযরত সা'দ (রাঃ)-কে আমাদের ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নিচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ প্রস্তাবে সম্মত হয়ে গেলেন। তিনি হযরত সা'দ (রাঃ)-কে ডেকে পাঠালেন। তিনি গাধার উপর সওয়ার হয়ে আসছিলেন যার উপর খেজুর গাছের বাকলের গদি ছিল। তাঁকে অতি কষ্টে ওর উপর সওয়ার করে দেয়া হয়। তাঁর কওম তাকে ঘিরে ফেলেছিল। তারা তাকে বুঝাচ্ছিলঃ “দেখুন, বানু কুরাইযা আমাদের মিত্র। তারা আমাদের বন্ধু। সুখে-দুঃখে তারা আমাদের সাথী। তাদের সাথে আমাদের যে সম্পর্ক রয়েছে তা আপনার অজানা নয়।” হযরত সা'দ (রাঃ) নীরবে তাদের কথা শুনে যাচ্ছিলেন। যখন তিনি তাদের মহল্লায় পৌছেন তখন ঐদিকে দৃষ্টিপাত করে বলেনঃ “এখন এমন সময় এসে গেছে যখন আমি আল্লাহর পথে কোন ভৎসনাকারীর ভৎসনাকে মোটেই পরওয়া করবো না।” যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তাঁবুর নিকট হযরত সা'দ (রাঃ)-এর সওয়ারী পৌছলো তখন তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদের সাইয়্যেদের জন্যে উঠে দাঁড়াও এবং তাঁকে নামিয়ে নাও।” এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আমাদের সাইয়্যেদ তো স্বয়ং আল্লাহ।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তাঁকে নামিয়ে নাও।” সবাই তখন মিলে জুলে তাঁকে সওয়ারী হতে নামিয়ে নিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “হে সা'দ (রাঃ)! তাদের ব্যাপারে তুমি যে ফায়সালা করতে চাও, কর।” তিনি তখন বললেনঃ “তাদের বড়দেরকে হত্যা করা হালে, ছোটদেরকে গোলাম বানিয়ে নেয়া হালে এবং তাদের মালধন বন্টন করে নেয়া হালে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার এ ফায়সালা শুনে বললেনঃ “হে সা’দ (রাঃ)! এই ফায়সালায় তুমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুকূল্য করেছো।” অতঃপর হযরত সা'দ (রাঃ) প্রার্থনা করেনঃ “হে আল্লাহ! যদি আপনার নবী (সঃ)-এর উপর কুরায়েশদের আর কোন আক্রমণ বাকী থেকে থাকে তবে তাতে অংশগ্রহণের জন্যে আমাকে জীবিত রাখুন। অন্যথায় আমাকে আপনার নিকট উঠিয়ে নিন।” তৎক্ষণাৎ তাঁর ক্ষতস্থান হতে রক্তের ফোয়ারা ছুটতে শুরু করলো। অথচ ওটা সম্পূর্ণরূপে ভাল হয়েই গিয়েছিল। সামান্য কিছু বাকী ছিল। সুতরাং তাকে তার তাঁবুতে ফিরিয়ে আনা হয় এবং সেখানেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ), হযরতআবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ) প্রমুখ মহান ব্যক্তিগণও আসলেন। তাঁরা সবাই কাঁদছিলেন। আমি হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-এর ক্রন্দনের শব্দ পৃথক পৃথকভাবে বুঝতে পারছিলাম। আমি ঐ সময় আমার কক্ষে ছিলাম। সত্যিই তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহচরই ছিলেন। যেমন মহান আল্লাহ তাঁদের সম্পর্কে বলেনঃ (আারবি) অর্থাৎ “তারা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল।” (৪৮:২৯)হযরত আলকামা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিভাবে কাঁদতেন তা বলুন তো?” উত্তরে হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেনঃ “কারো জন্যে তাঁর চক্ষু দিয়ে অশ্রু ঝরতো না। তবে, দুঃখ ও বেদনার সময় তিনি স্বীয় দাড়ি মুবারক স্বীয় মুষ্টির মধ্যে নিয়ে নিতেন।”
আল-আহযাব 33:27
২৬-২৭ নং আয়াতের তাফসীরইতিপূর্বে আমরা বর্ণনা করেছি যে, যখন মুশরিক ও ইয়াহূদীদের সেনাবাহিনী মদীনায় আসে ও অবরোধ সৃষ্টি করে তখন বানু কুরাইযা গোত্রের ইয়াহুদীরা যারা মদীনার অধিবাসী ছিল এবং যাদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চুক্তি হয়েছিল, তারাও ঠিক এই সময় বিশ্বাসঘাতকতা করলো এবং সন্ধি ভেঙ্গে দিলো। তারা চোখ রাঙাতে শুরু করলো। তাদের সরদার কাব ইবনে আসাদ আলাপ আলোচনার জন্য আসলো। ম্লেচ্ছ হুয়াই ইবনে আখতাব ঐ সরদারকে সন্ধি ভঙ্গ করতে উদ্বুদ্ধ করলো। প্রথমে সে সন্ধি ভঙ্গ করতে সম্মত হলো না। সে এ সন্ধির উপর দৃঢ় থাকতে চাইলো। হুয়াই বললো: “এটা কেমন কথা হলো? আমি তোমাকে সম্মানের উচ্চাসনে বসিয়ে তোমার মস্তকে রাজ মুকুট পরাতে চাচ্ছি, অথচ তুমি তা মানছো না? কুরায়েশরা ও তাদের অন্যান্য সঙ্গীসহ আমরা সবাই এক সাথে আছি। আমরা শপথ করেছি যে, যে পর্যন্ত না আমরা এক একজন মুসলমানের মাংস ছেদন করবো সে পর্যন্ত এখান হতে সরবো না।” কা'বের দুনিয়ার অভিজ্ঞতা ভাল ছিল বলে সে উত্তর দিলো: “এটা ভুল কথা। এটা তোমাদের ক্ষমতার বাইরে। তোমরা আমাকে লাঞ্ছনার বেড়ী পরাতে এসেছে। তুমি একটা কুলক্ষণে লোক। সুতরাং তুমি আমার নিকট হতে সরে যাও। আমাকে তোমার ধোকাবাজীর শিকারে পরিণত করো না।" হুয়াই কিন্তু তখনো তার পিছন ছাড়লো না। সে তাকে বারবার বুঝাতে থাকলো। অবশেষে সে বললো: “মনে কর যে, কুরায়েশ ও গাতফান গোত্র পালিয়ে গেল, তাহলে আমরা দলবলসহ তোমার গর্তে গিয়ে পড়বো। তোমার ও তোমার গোত্রের যে দশা হবে, আমার ও আমার গোত্রেরও সেই দশাই হবে।"অবশেষে কাবের উপর হুয়াই-এর যাদু ক্রিয়াশীল হলো। বানু কুরাইযা সন্ধি ভঙ্গ করলো। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও সাহাবীগণ (রাঃ) অত্যন্ত দুঃখিত হলেন এবং এটা তাঁদের কাছে খুবই কঠিন ঠেকলো। আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের সাহায্য করলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণ সমভিব্যাহারে বিজয়ীর বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন। সাহাবীগণ (রাঃ) অস্ত্র-শস্ত্র খুলে ফেললেন এবং রাসূলুল্লাহও (সঃ) অস্ত্র-শস্ত্র খুলে ফেলে হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর গৃহে ধূলো-ধূসরিত অবস্থায় হাযির হলেন এবং পাক সাফ হওয়ার জন্যে গোসল করতে যাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আবির্ভূত হন। তাঁর মস্তকোপরি রেশমী পাগড়ী ছিল। তিনি খচ্চরের উপর উপবিষ্ট ছিলেন। ওর পিঠে রেশমী গদি ছিল। তিনি বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি অস্ত্র-শস্ত্র খুলে ফেলেছেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা।” হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “ফেরেশতারা কিন্তু এখনো অস্ত্র-শস্ত্র হতে পৃথক হয়নি। আমি কাফিরদের পশ্চাদ্ধাবন হতে এইমাত্র ফিরে এলাম। জেনে রাখুন! আল্লাহর নির্দেশ, বানু কুরাইযার দিকে চলুন! তাদেরকে উপযুক্ত শিক্ষা দান করুন! আমার প্রতিও মহান আল্লাহর এ নির্দেশ রয়েছে যে, আমি যেন তাদেরকে প্রকম্পিত করি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে যান। নিজে প্রস্তুতি গ্রহণ করে সাহাবীদেরকেও প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা সবাই বানু কুরাইযার ওখানেই আসরের নামায আদায় করবে। যুহরের নামাযের পর এ হুকুম দেয়া হলো। বানু কুরাইযার দুর্গ মদীনা হতে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। পথেই নামাযের সময় হয়ে গেল। তাদের কেউ কেউ নামায আদায় করে নিলেন। তাঁরা বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কথা বলার উদ্দেশ্য ছিল যে, তারা যেন খুব তাড়াতাড়ি চলে আসেন।” আবার কেউ কেউ বললেনঃ “আমরা সেখানে না পৌঁছে নামায পড়বো না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ খবর জানতে পেরে দু’দলের কাউকেই তিনি ভৎসনা বা তিরস্কার করলেন না। তিনি ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-কে মদীনার খলীফা নিযুক্ত করলেন। সেনাবাহিনীর পতাকা হযরত আলী (রাঃ)-এর হাতে প্রদান করলেন। তিনি নিজেও সৈন্যদের পিছনে পিছনে চলতে লাগলেন। সেখানে গিয়েই তিনি তাদের দুর্গ অবরোধ করে ফেললেন। পঁচিশ দিন পর্যন্ত অবরোধ স্থায়ী হলো। যখন ইয়াহূদীদের দম নাকে এসে গেল তখন তাদের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে উঠলো। তারা হযরত সা’দ ইবনে মুআয (রাঃ)-কে নিজেদের সালিশ বা মীমাংসাকারী নির্ধারণ করলো। কারণ তিনি আউস গোত্রের সরদার ছিলেন। বানু কুরাইযা ও আউস গোত্রের মধ্যে যুগ-যুগ ধরে বন্ধুত্ব ও মিত্রতা চলে আসছিল। তারা একে অপরের সাহায্য করতো। তাদের ধারণা ছিল যে, হযরত সা'দ (রাঃ) তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করবেন। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সাল্ল বানু কাইনুকা গোত্রকে ছাড়িয়ে নিয়েছিল। এদিকে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর দেহে একটি তীর বিদ্ধ হয়েছিল, যার কারণে সেখান হতে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার ক্ষতস্থানে দাগ লাগিয়েছিলেন এবং মসজিদের তাঁবুতে তাঁর স্থান করেছিলেন। যাতে তাঁকে দেখতে যাওয়ার সুবিধা হয়। হযরত সা'দ (রাঃ) যে দু'আ করেছিলেন তন্মধ্যে একটি দু'আ এও ছিলঃ “হে আমার প্রতিপালক। যদি আরো কোন যুদ্ধ আপনার নবী (সঃ)-এর উপর থেকে থাকে যেমন কাফির মুশরিকরা আপনার নবী (সঃ)-এর উপর আক্রমণ চালিয়েছে, তবে আমাকে জীবিত রাখুন, যেন আমি তার সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারি। আর যদি কোন যুদ্ধ অবশিষ্ট না থেকে থাকে তবে আমার ক্ষতস্থান হতে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকুক। কিন্তু হে আমার প্রতিপালক! যে পর্যন্ত না আমি বানু কুরাইযা গোত্রের বিদ্রোহের পূর্ণ শাস্তি দেখে আমার চক্ষুদ্বয় ঠাণ্ডা করতে পারি সে পর্যন্ত আমার মৃত্যুকে বিলম্বিত করুন। হযরত সা'দ (রাঃ)-এর প্রার্থনা কবুল হওয়ার দৃশ দেখে বিস্মিত হতে হয়। তিনি এদিকে প্রার্থনা করছেন, আর ওদিকে বানু কুরাইযা গোত্র স্বীকার করে নিয়েছে যে, হযরত সা'দ (রাঃ) তাদের যে মীমাংসা করবেন তা তারা মেনে নেবে এবং তাদের দুর্গ মুসলমানদের হাতে সমর্পণ করবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নিকট সংবাদ পাঠালেন যে, তিনি যেন এসে তাদেরকে তার ফায়সালা শুনিয়ে দেন।হযরত সা'দ (রাঃ)-কে গাধার উপর সওয়ার করিয়ে নিয়ে আসা হলো। আউস গোত্রের সমস্ত লোক তাকে জড়িয়ে ধরে বললো: “দেখুন, বানু কুরাইযা গোত্র আপনারই লোক। তারা আপনার উপর ভরসা করেছে। তারা আপনার কওমের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। সুতরাং আপনি তাদের উপর দয়া করুন এবং তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করুন!” হযরত সা'দ (রাঃ) নীরব ছিলেন। তাদের কথার কোন জবাব তিনি দিচ্ছিলেন না। তারা তাকে উত্তর দেয়ার জন্যে পীড়াপীড়ি করতে লাগলো এবং তার পিছন ছাড়লো না। অবশেষে তিনি বললেনঃ “ঐ সময় এসে গেছে, হযরত সা’দ এটা প্রমাণ করতে চান যে, আল্লাহর পথে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারের তিনি কোন পরওয়া করবেন না। তাঁর এ কথা শোনা মাত্রই ঐ লোকগুলো হতাশ হয়ে পড়লো যে, বানু কুরাইযা গোত্রের কোন রেহাই নেই। যখন হযরত সা'দ (রাঃ)-এর সওয়ারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তাঁবুর নিকট আসলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরা তোমাদের সরদারের অভ্যর্থনার জন্যে দাঁড়িয়ে যাও।” তখন মুসলমানরা সবাই দাঁড়িয়ে গেলেন। অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাকে সওয়ারী হতে নামানো হলো। এরূপ করার কারণ ছিল এই যে, ঐ সময় তিনি ফায়সালাকারীর মর্যাদা লাভ করেছিলেন। ঐ সময় তার ফায়সালাই চূড়ান্ত বলে গৃহীত হবে। তিনি উপবেশন করা মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “বানু কুরাইযা গোত্র তোমার ফায়সালা মেনে নিতে সম্মত হয়েছে এবং দুর্গ আমাদের হাতে সমর্পণ করেছে। সুতরাং তুমি এখন তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দিয়ে দাও।” হযরত সা'দ (রাঃ) বললেনঃ “তাদের ব্যাপারে আমি যা ফায়সালা করবো তাই কি পূর্ণ করা হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “নিশ্চয়ই।” তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “এই তাঁবুবাসীদের জন্যেও কি আমার ফায়সালা মেনে নেয়া জরুরী হবে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা, অবশ্যই।” আবার তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “এই দিকের লোকদের জন্যেও কি?” ঐ সময় তিনি ঐ দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন যেই দিকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইজ্জত ও বুযর্গীর খাতিরে তিনি তাঁর দিকে তাকালেন না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “হ্যা, এই দিকের লোলেদের জন্যেও এটা মেনে নেয়া জরুরী হবে।” তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বললেনঃ “তাহলে এখন আমার ফায়সালা শুনুন! বানু কুরাইযার মধ্যে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার মত যত লোক রয়েছে তাদের সবাইকেই হত্যা করে দেয়া হবে। তাদের শিশু সন্তানদেরকে বন্দী করা হবে এবং তাদের ধন-সম্পদ মুসলমানদের অধিকারভুক্ত হবে।” তাঁর এই ফায়সালা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে সা’দ (রাঃ)! তুমি এ ব্যাপারে ঐ ফায়সালাই করেছে যা আল্লাহ তা'আলা সপ্তম আকাশের উপর ফায়সালা করেছেন। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে সা’দ (রাঃ)! প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহর যে ফায়সালা সেই ফায়সালাই তুমি শুনিয়েছো।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে গর্ত খনন করা হয় এবং বানু কুরাইযা গোত্রের লোকদেরকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় হত্যা করে তাতে নিক্ষেপ করা হয়। তাদের সংখ্যা ছিল সাতশ’ বা আটশ'। তাদের নারীদেরকে ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদেরকে এবং তাদের সমস্ত মালধন হস্তগত করা হয়। আমি এসব ঘটনা আমার ‘কিতাবুস সিয়ার’ গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই জন্যে।তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ কিতাবীদের মধ্যে যারা তাদেরকে সাহায্য করেছিল, তাদেরকে তিনি তাদের দুর্গ হতে অবতরণে বাধ্য করলেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করলেন। এখন তোমরা তাদের কতককে হত্যা করছে এবং কতককে করছো বন্দী। এই বানু কুরাইযা গোত্রের বড় নেতা, যার দ্বারা এই বংশ চালু হয়েছিল, পূর্ব যুগে এ আশায় সে হিজাযে এসে বসতি স্থাপন করেছিল যে, যে শেষ নবী (সঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী তাদের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, তিনি যেহেতু হিজায প্রদেশে আবির্ভূত হবেন, সেহেতু তারা যেন সর্বপ্রথম তাঁর আনুগত্যের মর্যাদা লাভ করতে পারে। কিন্তু শেষ নবী (সঃ)-এর যখন আগমন ঘটলো তখন তার অযোগ্য উত্তরসূরীরা তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো। যার ফলে তাদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হলো।(আরবি) দ্বারা দুর্গকে বুঝানো হয়েছে। এই কারণে জন্তুর মাথার শিংকেও (আরবি) বলা হয়। কেননা, জন্তুদের দেহের সবচেয়ে উপরে শিংই থাকে। আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে প্রভাব সৃষ্টি করে দিলেন। তারাই মুশরিকদেরকে উত্তেজিত করে তুলেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর আক্রমণ চালিয়েছিল। শিক্ষিত ও মূর্খ কখনো সমান হয় না। তারাই মুসলমানদেরকে সমূলে উৎপাটিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু ঘটনা তার বিপরীত হয়ে গেল। শক্তি দুর্বলতায় এবং সফলতা বিফলতায় পরিবর্তিত হলো। চিত্র নষ্ট হয়ে গেল। মিত্ররা পলায়ন করলো এবং তারা একেবারে অসহায় হয়ে পড়লো। সম্মানের জায়গা অসম্মান দখল করে নিলো। মুসলমানদেরকে দুনিয়া হতে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার আনন্দ তাদের নিজেদেরকেই নিশ্চিহ্ন করে দিলো। এরপর আখিরাতের পালা তো আছেই। তাদের কিছু সংখ্যককে হত্যা করে দেয়া হলো। আতিয়্যা কারামী বর্ণনা করেছে, যখন আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে হাযির করা হলো তখন তিনি বললেনঃ “দেখো, যদি এর নাভীর নীচে চুল গজিয়ে থাকে তবে একে হত্যা করে দেবে। অন্যথায় একে বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত করবে।” দেখা গেল যে, তখনো আমার শৈশবকাল কাটেনি। সুতরাং জীবিত ছেড়ে দেয়া হলো।মুসলমানদেরকে তাদের ভূমি, ঘরবাড়ী ও ধন-সম্পদের অধিকারী করে দেয়া হলো। এমনকি তাদেরকে ঐ ভূমির মালিক করে দেয়া হলো যা তখনো পদানত হয়নি। অর্থাৎ খাইবারের ভূমি অথবা মক্কা শরীফের ভূমি কিংবা পারস্য অথবা রোমের ভূমি। কিংবা হতে পারে যে, সব জায়গারই ভূমি। অর্থাৎ সব জমিই বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “খন্দকের যুদ্ধের দিন আমি বের হলাম, আমার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধে সেনাবাহিনীর অবস্থা অবহিত হওয়া। এমন সময় আমার পিছন দিক থেকে কারো সবেগে আগমনের আভাষ পেলাম। তার অস্ত্রের ঝনঝনানীর শব্দও আমার কানে এলো। আমি তখন রাস্তা হতে সরে গিয়ে এক জায়গায় বসে পড়লাম। দেখলাম যে, হযরত সা'দ (রাঃ) সেনাবাহিনীর সাথে মিলিত হতে যাচ্ছেন। তার সাথে তাঁর ভাই হারিস ইবনে আউস (রাঃ)-ও ছিলেন। তাঁর হাতে ঢাল ছিল। হযরত সা'দ (রাঃ) লৌহবর্ম পরিহিত ছিলেন। তিনি খুবই লম্বা দেহ বিশিষ্ট লোক ছিলেন বলে তাঁর দেহ বর্মে সম্পূর্ণরূপে আচ্ছাদিত হয়নি। তাঁর হাত খোলা ছিল। যুদ্ধের কবিতা পাঠ করতে করতে তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি সেখান হতে আরো কিছুদূর এগিয়ে গেলাম। একটি বাগানে আমি প্রবেশ করলাম। সেখানে কিছু মুসলমান উপস্থিত ছিলেন। একটি লোক লৌহ-শিরস্ত্রাণ পরিহিত ছিলেন। ঐ লোকদের মধ্যে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-ও বিদ্যমান ছিলেন। তিনি আমাকে দেখে ফেলেছিলেন এবং এ কারণে তিনি আমার উপর অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। তিনি বলতে লাগলেনঃ “হে বীরাঙ্গনা! আপনি কি জানেন না যে, যুদ্ধ চলছে? আল্লাহ তাআলাই জানেন পরিণতি কি হবে! আপনি কি করে এখানে আসতে পারলেন? ইত্যাদি অনেক কিছু বলে তিনি আমাকে ভৎসনা করলেন। তিনি আমাকে এতো বেশী তিরস্কার করলেন যে, যদি যমীন ফেটে যেতো তবে আমি তাতে ঢুকে পড়তাম। যে লোকটি মুখ ঢেকে ছিলেন তিনি হযরত উমারের এসব কথা শুনে মাথা হতে লোহার টুপি নামিয়ে ফেললেন। তখন আমি তাকে দেখে চিনতে পারলাম। তিনি ছিলেন হযরত তালাহা ইবনে উবাইদিল্লাহ (রাঃ)। তিনি হযরত উমার (রাঃ)-কে নীরব করিয়ে দিয়ে বললেনঃ “কি ভৎসনা করছেন? পরিণামের জন্যে কি ভয়? আপনি এতো ভয় করছেন কেন? কেউ যদি পালিয়ে যায় তবে সে যাবে কোথায়? সবকিছুই আল্লাহর হাতে।” একজন কুরায়েশী হযরত সা'দ (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে তীর মেরে দিলো এবং বললো: “আমি হলাম ইবনে আরকা।” হযরত সা’দ (রাঃ)-এর রক্তবাহী শিরায় তীরটি বিদ্ধ হয়ে গেল এবং রক্তের ফোয়ারা ছুটলো। ঐ সময় তিনি দু'আ করলেনঃ “হে আল্লাহ! আমার মৃত্যু ঘটাবেন না যে পর্যন্ত না আমি বানু কুরাইযা গোত্রের ধ্বংস স্বচক্ষে দেখে যেতে পারি।” আল্লাহ তাআলার কি মাহাত্ম্য যে, তৎক্ষণাৎ তার ক্ষতস্থানের রক্ত বন্ধ হয়ে গেল। ঝড়-তুফান মুশরিকদেরকে তাড়িয়ে দিলো। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উপর সদয় হলেন। আবু সুফিয়ান এবং তার সঙ্গী-সাথীরা তেহামায় পালিয়ে গেল। উয়াইনা ইবনে বদর এবং তার সঙ্গীরা পালিয়ে গেল নজদের দিকে। বানু কুরাইযা গোত্র তাদের দুর্গে আশ্রয় নিলো। যুদ্ধক্ষেত্র শূন্য দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় ফিরে গেলেন। হযরত সা'দ (রাঃ)-এর জন্যে মসজিদে নববীতেই একটা তাঁবুর ব্যবস্থা করে দেয়া হলো। ঐ সময়েই হযরত জিবরাঈল (আঃ) আসলেন। তার চেহারা ধূলিময় ছিল। তিনি বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি অস্ত্র-শস্ত্র রেখে দিয়েছেন? ফেরেশতারা কিন্তু এখনো অস্ত্র-শস্ত্র খুলে ফেলেননি। চলুন, বানু কুরাইযার ব্যাপারেও একটা ফায়সালা করে নেয়া হালে। তাদের উপর আক্রমণ চালানো হালে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তৎক্ষণাৎ অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হলেন এবং সাহাবীদেরকেও যুদ্ধযাত্রার নির্দেশ প্রদান করলেন। বানু তামীম গোত্রের ঘরবাড়ী মসজিদে নববী সংলগ্ন ছিল। পথে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আচ্ছা ভাই! এখান দিয়ে কাউকেও যেতে দেখেছো কি?” তারা উত্তরে বললো: “এখনই হযরত দাহইয়া কালবী (রাঃ) গেলেন।” অথচ উনিই তো ছিলেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ)। তাঁর দাড়ী এবং চেহারা সম্পূর্ণরূপে হযরত দাহইয়া কালবী (রাঃ)-এর সাথে সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) গিয়ে বানু কুরাইযার দুর্গ অবরোধ করে বসলেন। পঁচিশ দিন পর্যন্ত এই অবরোধ স্থায়ী হলো। যখন তারা অত্যন্ত সংকটময় অবস্থায় পতিত হলো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “দুর্গ আমাদের হাতে ছেড়ে দাও এবং তোমরা নিজেরাও আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ কর। আমি তোমাদের ব্যাপারে যা ইচ্ছা ফায়সালা করবো।” তারা আবু লুবাবা আব্দুল মুনযিরের সাথে পরামর্শ করলো। সে ইঙ্গিতে বললো: “এ অবস্থায় তোমরা জীবনের আশা পরিত্যাগ কর।” তারা এটা জানতে পেরে এতে অসম্মতি জানালো। তারা বললো: “আমরা আমাদের দুর্গ শূন্য করে দিচ্ছি এবং এটা আপনার সেনাবাহিনীর হাতে সমর্পণ করছি। আমাদের ব্যাপারে আমরা হযরত সা'দ (রাঃ)-কে আমাদের ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নিচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের এ প্রস্তাবে সম্মত হয়ে গেলেন। তিনি হযরত সা'দ (রাঃ)-কে ডেকে পাঠালেন। তিনি গাধার উপর সওয়ার হয়ে আসছিলেন যার উপর খেজুর গাছের বাকলের গদি ছিল। তাঁকে অতি কষ্টে ওর উপর সওয়ার করে দেয়া হয়। তাঁর কওম তাকে ঘিরে ফেলেছিল। তারা তাকে বুঝাচ্ছিলঃ “দেখুন, বানু কুরাইযা আমাদের মিত্র। তারা আমাদের বন্ধু। সুখে-দুঃখে তারা আমাদের সাথী। তাদের সাথে আমাদের যে সম্পর্ক রয়েছে তা আপনার অজানা নয়।” হযরত সা'দ (রাঃ) নীরবে তাদের কথা শুনে যাচ্ছিলেন। যখন তিনি তাদের মহল্লায় পৌছেন তখন ঐদিকে দৃষ্টিপাত করে বলেনঃ “এখন এমন সময় এসে গেছে যখন আমি আল্লাহর পথে কোন ভৎসনাকারীর ভৎসনাকে মোটেই পরওয়া করবো না।” যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তাঁবুর নিকট হযরত সা'দ (রাঃ)-এর সওয়ারী পৌছলো তখন তিনি স্বীয় সাহাবীদেরকে বললেনঃ “তোমাদের সাইয়্যেদের জন্যে উঠে দাঁড়াও এবং তাঁকে নামিয়ে নাও।” এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আমাদের সাইয়্যেদ তো স্বয়ং আল্লাহ।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তাঁকে নামিয়ে নাও।” সবাই তখন মিলে জুলে তাঁকে সওয়ারী হতে নামিয়ে নিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “হে সা'দ (রাঃ)! তাদের ব্যাপারে তুমি যে ফায়সালা করতে চাও, কর।” তিনি তখন বললেনঃ “তাদের বড়দেরকে হত্যা করা হালে, ছোটদেরকে গোলাম বানিয়ে নেয়া হালে এবং তাদের মালধন বন্টন করে নেয়া হালে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার এ ফায়সালা শুনে বললেনঃ “হে সা’দ (রাঃ)! এই ফায়সালায় তুমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুকূল্য করেছো।” অতঃপর হযরত সা'দ (রাঃ) প্রার্থনা করেনঃ “হে আল্লাহ! যদি আপনার নবী (সঃ)-এর উপর কুরায়েশদের আর কোন আক্রমণ বাকী থেকে থাকে তবে তাতে অংশগ্রহণের জন্যে আমাকে জীবিত রাখুন। অন্যথায় আমাকে আপনার নিকট উঠিয়ে নিন।” তৎক্ষণাৎ তাঁর ক্ষতস্থান হতে রক্তের ফোয়ারা ছুটতে শুরু করলো। অথচ ওটা সম্পূর্ণরূপে ভাল হয়েই গিয়েছিল। সামান্য কিছু বাকী ছিল। সুতরাং তাকে তার তাঁবুতে ফিরিয়ে আনা হয় এবং সেখানেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ), হযরতআবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ) প্রমুখ মহান ব্যক্তিগণও আসলেন। তাঁরা সবাই কাঁদছিলেন। আমি হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-এর ক্রন্দনের শব্দ পৃথক পৃথকভাবে বুঝতে পারছিলাম। আমি ঐ সময় আমার কক্ষে ছিলাম। সত্যিই তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহচরই ছিলেন। যেমন মহান আল্লাহ তাঁদের সম্পর্কে বলেনঃ (আারবি) অর্থাৎ “তারা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল।” (৪৮:২৯)হযরত আলকামা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিভাবে কাঁদতেন তা বলুন তো?” উত্তরে হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেনঃ “কারো জন্যে তাঁর চক্ষু দিয়ে অশ্রু ঝরতো না। তবে, দুঃখ ও বেদনার সময় তিনি স্বীয় দাড়ি মুবারক স্বীয় মুষ্টির মধ্যে নিয়ে নিতেন।”
আল-আহযাব 33:28
২৮-২৯ নং আয়াতের তাফসীরএ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন তাঁর সহধর্মিণীদেরকে দুটি জিনিসের একটি বেছে নেয়ার স্বাধীনতা প্রদান করেন। যদি তারা পার্থিব জগতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সৌন্দর্য ও আঁক-জমক পছন্দ করে তবে তিনি যেন তাদেরকে তাঁর বিবাহ-সম্পর্ক হতে বিচ্ছিন্ন করে দেন। আর যদি দুনিয়ার অভাব অনটনে ধৈর্য ধারণ করতঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সন্তুষ্টি এবং আখিরাতের সুখ-শান্তি কামনা করে তবে যেন তারা তাঁর সাথে ধৈর্য অবলম্বন করে জীবন অতিবাহিত করে। আল্লাহ তা'আলা সমস্ত নিয়ামত দ্বারা তাদেরকে সন্তুষ্ট রাখবেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের মাতা নবী (সঃ)-এর সমস্ত সহধর্মিণীর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। তাঁরা সবাই আল্লাহকে, তাঁর রাসূল (সঃ)-কে এবং আখিরাতকেই পছন্দ করে নেন। ফলে মহান আল্লাহ তাদের সবারই উপর খুশী হন। অতঃপর তিনি তাদেরকে আখিরাতের সাথে সাথে দুনিয়ার আনন্দ ও সুখ-শান্তিও দান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর নবী (সঃ) তাঁর নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “আমি তোমাকে একটি কথা বলতে চাই। তুমি তাড়াতাড়ি উত্তর দেয়ার চেষ্টা করো না। বরং পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ করে উত্তর দাও।” তিনি বলেনঃ “তিনি তো অবশ্যই জানেন যে, আমার পিতা-মাতা যে তার বিবাহ বন্ধন হতে বিচ্ছিন্ন হবার পরামর্শ আমাকে দেবেন এটা অসম্ভব। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করে আমাকে শুনিয়ে দেন। আমি উত্তরে তাকে বললাম, এ ব্যাপারে আমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ করার কিছুই নেই। আমার আল্লাহ কাম্য, তাঁর রাসূল (সঃ) কাম্য এবং আখিরাতের সুখ-শান্তিই কাম্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অন্যান্য সমস্ত স্ত্রী আমার মতই কথা বলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, তিনবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ “দেখো, তোমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ করা ছাড়া তুমি নিজেই কোন ফায়সালা করে ফেললা না।” অতঃপর আমার জবাব শুনে তিনি অত্যন্ত খুশী হয়ে যান এবং হেসে ওঠেন। তারপর তিনি তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদের কাছে যান এবং তাদেরকে পূর্বেই বলেছেন যে, আয়েশা (রাঃ) এ কথা বলেছে। তারা তখন বলেন যে, তাদেরও জবাব এটাই।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এই ইখতিয়ার প্রদানের পর আমরা যে তাঁকেই গ্রহণ করলাম, সুতরাং এটা তালাকের মধ্যে গণ্য হলো না।” হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। জনগণ তাঁর দরযার উপর উপবিষ্ট ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভিতরে অবস্থান করছিলেন। তিনি প্রবেশের অনুমতি পাননি এমতাবস্থায় হযরত উমার (রাঃ) এসে পড়েন। তিনিও অনুমতি প্রার্থনা করলেন। কিন্তু অনুমতি পেলেন না। কিছুক্ষণ পর দু’জনকেই অনুমতি দেয়া হলো। তাঁরা ভিতরে প্রবেশ করে দেখতে পান যে, তার স্ত্রীরা তার পার্শ্বে বসে আছে এবং তিনি নীরব হয়ে আছেন। হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “দেখো, আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে হাসিয়ে দিচ্ছি।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি দেখতেন যে, আজ আমার স্ত্রী আমার কাছে টাকা-পয়সা চাইলো। আমার কাছে টাকা-পয়সা ছিল না। যখন কঠিন জিদ করতে লাগলো তখন আমি উঠে গিয়ে গর্দান মাপলাম।” এ কথা শুনেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠলেন এবং বলতে লাগলেনঃ “এখানেও এ ব্যাপারই ঘটেছে। দেখুন, এরা সবাই আমার কাছে ধন-মাল চাইতে শুরু করেছে!” এ কথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর দিকে এবং হযরত উমার (রাঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-এর দিকে ধাবিত হলেন এবং বললেনঃ “বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, তোমরা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে এমন কিছু চাচ্ছ যা তাঁর কাছে নেই?””ভাগ্য ভাল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের দু’জনকে থামিয়ে দিলেন। নতুবা তাঁরা যে নিজ নিজ কন্যাকে প্রহার করতেন এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। তখন তার সব স্ত্রীই বলতে লাগলেনঃ “আমাদের অপরাধ হয়েছে। আর কখনো আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এমনভাবে বিব্রত ও ব্যতিব্যস্ত করে তুলবো না।” অতঃপর এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো। সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর নিকট গমন করলেন। তিনি আখিরাতকেই পছন্দ করলেন যেমন উপরে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হলো। সাথে সাথে হযরত আয়েশা (রাঃ) আবেদন জানালেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি যে আপনাকে গ্রহণ করলাম এ কথাটি আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রীকে বলবেন না।” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহ আমাকে গোপনকারী রূপে প্রেরণ করেননি। বরং আমাকে শিক্ষাদাতা ও সহজকারী রূপে প্রেরণ করা হয়েছে। আমাকে যে যা বলবে, আমি তাকে সঠিক ও পরিষ্কারভাবেই উত্তর দেবো।হযরত আলী (রাঃ) বলেন, তালাক গ্রহণের স্বাধীনতা দেয়া হয়নি। বরং দুনিয়া বা আখিরাতকে প্রাধান্য দেয়ার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এর সনদেও বিচ্ছিন্নতা রয়েছে এবং এটা প্রকাশ্য আয়াতের বিপরীতও বটে। কেননা, প্রথম আয়াতের শেষে স্পষ্টভাবে রয়েছেঃ ‘এসো, আমি তোমাদের ভোগ-সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিই এবং সৌজন্যের সাথে তোমাদেরকে বিদায় দিই।”এতে উলামায়ে কিরামের মতভেদ রয়েছে যে, যদি তিনি স্বীয় স্ত্রীদেরকে তালাক প্রদান করেন তবে তাদেরকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা জায়েয হবে কি কিন্তু সঠিক কথা এই যে, এটা জায়েয হবে, যাতে এই তালাকের ফল তারা পেয়ে যায় অর্থাৎ পার্থিব সুখ-সম্ভোগ ও সৌন্দর্য কামনা এবং দুনিয়ার সুখ-শান্তি লাভ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হুকুম স্বীয় সহধর্মিণীদেরকে শুনিয়ে দেন তখন তার নয়জন স্ত্রী ছিলেন। পাঁচজন ছিলেন কুরায়েশ বংশের। তাঁরা হলেনঃ হযরত আয়েশা (রাঃ), হযরত হাফসা (রাঃ), হযরত উম্মে হাবীবাহ (রাঃ), হযরত সাওদাহ (রাঃ) এবং হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)। আর বাকী চারজন হলেনঃ হযরত সাফিয়া বিনতে হুওয়াই (রাঃ), তিনি ছিলেন নাযার গোত্রের নারী। হযরত মাইমূনা বিনতে হারিস (রাঃ), তিনি ছিলেন হালালিয়্যাহ গোত্রের নারী। হযরত যয়নব বিনতে জহশ (রাঃ), তিনি ছিলেন আসাদিয়্যাহ গোত্রের নারী। যুওয়াইরিয়্যাহ বিনতে হারিস (রাঃ), তিনি ছিলেন মুসতালিক গোত্রের নারী।
আল-আহযাব 33:29
২৮-২৯ নং আয়াতের তাফসীরএ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন তাঁর সহধর্মিণীদেরকে দুটি জিনিসের একটি বেছে নেয়ার স্বাধীনতা প্রদান করেন। যদি তারা পার্থিব জগতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সৌন্দর্য ও আঁক-জমক পছন্দ করে তবে তিনি যেন তাদেরকে তাঁর বিবাহ-সম্পর্ক হতে বিচ্ছিন্ন করে দেন। আর যদি দুনিয়ার অভাব অনটনে ধৈর্য ধারণ করতঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সন্তুষ্টি এবং আখিরাতের সুখ-শান্তি কামনা করে তবে যেন তারা তাঁর সাথে ধৈর্য অবলম্বন করে জীবন অতিবাহিত করে। আল্লাহ তা'আলা সমস্ত নিয়ামত দ্বারা তাদেরকে সন্তুষ্ট রাখবেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের মাতা নবী (সঃ)-এর সমস্ত সহধর্মিণীর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। তাঁরা সবাই আল্লাহকে, তাঁর রাসূল (সঃ)-কে এবং আখিরাতকেই পছন্দ করে নেন। ফলে মহান আল্লাহ তাদের সবারই উপর খুশী হন। অতঃপর তিনি তাদেরকে আখিরাতের সাথে সাথে দুনিয়ার আনন্দ ও সুখ-শান্তিও দান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর নবী (সঃ) তাঁর নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ “আমি তোমাকে একটি কথা বলতে চাই। তুমি তাড়াতাড়ি উত্তর দেয়ার চেষ্টা করো না। বরং পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ করে উত্তর দাও।” তিনি বলেনঃ “তিনি তো অবশ্যই জানেন যে, আমার পিতা-মাতা যে তার বিবাহ বন্ধন হতে বিচ্ছিন্ন হবার পরামর্শ আমাকে দেবেন এটা অসম্ভব। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করে আমাকে শুনিয়ে দেন। আমি উত্তরে তাকে বললাম, এ ব্যাপারে আমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ করার কিছুই নেই। আমার আল্লাহ কাম্য, তাঁর রাসূল (সঃ) কাম্য এবং আখিরাতের সুখ-শান্তিই কাম্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অন্যান্য সমস্ত স্ত্রী আমার মতই কথা বলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, তিনবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ “দেখো, তোমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ করা ছাড়া তুমি নিজেই কোন ফায়সালা করে ফেললা না।” অতঃপর আমার জবাব শুনে তিনি অত্যন্ত খুশী হয়ে যান এবং হেসে ওঠেন। তারপর তিনি তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদের কাছে যান এবং তাদেরকে পূর্বেই বলেছেন যে, আয়েশা (রাঃ) এ কথা বলেছে। তারা তখন বলেন যে, তাদেরও জবাব এটাই।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এই ইখতিয়ার প্রদানের পর আমরা যে তাঁকেই গ্রহণ করলাম, সুতরাং এটা তালাকের মধ্যে গণ্য হলো না।” হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। জনগণ তাঁর দরযার উপর উপবিষ্ট ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভিতরে অবস্থান করছিলেন। তিনি প্রবেশের অনুমতি পাননি এমতাবস্থায় হযরত উমার (রাঃ) এসে পড়েন। তিনিও অনুমতি প্রার্থনা করলেন। কিন্তু অনুমতি পেলেন না। কিছুক্ষণ পর দু’জনকেই অনুমতি দেয়া হলো। তাঁরা ভিতরে প্রবেশ করে দেখতে পান যে, তার স্ত্রীরা তার পার্শ্বে বসে আছে এবং তিনি নীরব হয়ে আছেন। হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “দেখো, আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে হাসিয়ে দিচ্ছি।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি দেখতেন যে, আজ আমার স্ত্রী আমার কাছে টাকা-পয়সা চাইলো। আমার কাছে টাকা-পয়সা ছিল না। যখন কঠিন জিদ করতে লাগলো তখন আমি উঠে গিয়ে গর্দান মাপলাম।” এ কথা শুনেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠলেন এবং বলতে লাগলেনঃ “এখানেও এ ব্যাপারই ঘটেছে। দেখুন, এরা সবাই আমার কাছে ধন-মাল চাইতে শুরু করেছে!” এ কথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর দিকে এবং হযরত উমার (রাঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-এর দিকে ধাবিত হলেন এবং বললেনঃ “বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, তোমরা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে এমন কিছু চাচ্ছ যা তাঁর কাছে নেই?””ভাগ্য ভাল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের দু’জনকে থামিয়ে দিলেন। নতুবা তাঁরা যে নিজ নিজ কন্যাকে প্রহার করতেন এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। তখন তার সব স্ত্রীই বলতে লাগলেনঃ “আমাদের অপরাধ হয়েছে। আর কখনো আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এমনভাবে বিব্রত ও ব্যতিব্যস্ত করে তুলবো না।” অতঃপর এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হলো। সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর নিকট গমন করলেন। তিনি আখিরাতকেই পছন্দ করলেন যেমন উপরে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হলো। সাথে সাথে হযরত আয়েশা (রাঃ) আবেদন জানালেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি যে আপনাকে গ্রহণ করলাম এ কথাটি আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রীকে বলবেন না।” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহ আমাকে গোপনকারী রূপে প্রেরণ করেননি। বরং আমাকে শিক্ষাদাতা ও সহজকারী রূপে প্রেরণ করা হয়েছে। আমাকে যে যা বলবে, আমি তাকে সঠিক ও পরিষ্কারভাবেই উত্তর দেবো।হযরত আলী (রাঃ) বলেন, তালাক গ্রহণের স্বাধীনতা দেয়া হয়নি। বরং দুনিয়া বা আখিরাতকে প্রাধান্য দেয়ার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এর সনদেও বিচ্ছিন্নতা রয়েছে এবং এটা প্রকাশ্য আয়াতের বিপরীতও বটে। কেননা, প্রথম আয়াতের শেষে স্পষ্টভাবে রয়েছেঃ ‘এসো, আমি তোমাদের ভোগ-সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিই এবং সৌজন্যের সাথে তোমাদেরকে বিদায় দিই।”এতে উলামায়ে কিরামের মতভেদ রয়েছে যে, যদি তিনি স্বীয় স্ত্রীদেরকে তালাক প্রদান করেন তবে তাদেরকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা জায়েয হবে কি কিন্তু সঠিক কথা এই যে, এটা জায়েয হবে, যাতে এই তালাকের ফল তারা পেয়ে যায় অর্থাৎ পার্থিব সুখ-সম্ভোগ ও সৌন্দর্য কামনা এবং দুনিয়ার সুখ-শান্তি লাভ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হুকুম স্বীয় সহধর্মিণীদেরকে শুনিয়ে দেন তখন তার নয়জন স্ত্রী ছিলেন। পাঁচজন ছিলেন কুরায়েশ বংশের। তাঁরা হলেনঃ হযরত আয়েশা (রাঃ), হযরত হাফসা (রাঃ), হযরত উম্মে হাবীবাহ (রাঃ), হযরত সাওদাহ (রাঃ) এবং হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)। আর বাকী চারজন হলেনঃ হযরত সাফিয়া বিনতে হুওয়াই (রাঃ), তিনি ছিলেন নাযার গোত্রের নারী। হযরত মাইমূনা বিনতে হারিস (রাঃ), তিনি ছিলেন হালালিয়্যাহ গোত্রের নারী। হযরত যয়নব বিনতে জহশ (রাঃ), তিনি ছিলেন আসাদিয়্যাহ গোত্রের নারী। যুওয়াইরিয়্যাহ বিনতে হারিস (রাঃ), তিনি ছিলেন মুসতালিক গোত্রের নারী।
আল-আহযাব 33:30
রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরা অর্থাৎ মুমিনদের মাতারা যখন আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং আখিরাতকে পছন্দ করলেন তখন মহান আল্লাহ এই আয়াতে তাঁদেরকে উপদেশ দিচ্ছেনঃ হে নবী-সহধর্মিণীরা! তোমাদের কাজ কারবার সাধারণ নারীদের মত নয়। মনে কর, যদি তোমরা নবী (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণ কর কিংবা তোমাদের দ্বারা কোন নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজ সংঘটিত হয়ে যায় তবে জেনে রেখো যে, দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের শাস্তি দ্বিগুণ হবে। কেননা, মর্যাদার দিক দিয়ে তোমরা সাধারণ নারীদের হতে বহু উর্ধে। সুতরাং পাপকার্য হতে তোমাদের সম্পূর্ণরূপে দূরে থাকা উচিত। অন্যথায় মর্যাদা অনুপাতে তোমাদের শাস্তিও বহুগুণে বেশী হবে। আল্লাহ তা'আলার কাছে সবকিছুই সহজ।এটা স্মরণ রাখা উচিত যে, এ কথাগুলো শর্তের উপর বলা হয়েছে এবং শর্ত হয়ে যাওয়া জরুরী নয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! যদি তুমি শিরক কর তবে অবশ্যই তোমার আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে।” (৩১:৬৫) অন্য এক জায়গায় নবীদের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যদি তারা শিরক করে তবে তাদের আমলগুলো অবশ্যই বিনষ্ট হয়ে যাবে।” (৬:৮৯) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি রহমানের (আল্লাহর) সন্তান হতো তবে আমিই হতাম সর্বপ্রথম ইবাদতকারী।” (৩৯:৮১) আর একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি আল্লাহ সন্তান গ্রহণের ইচ্ছা করতেন তবে তিনি স্বীয় সৃষ্টজীবের মধ্য হতে যাকে পছন্দ করতেন সন্তান বানিয়ে নিতেন। তিনি তো পবিত্র, একক, বিজয়ী এবং সবারই উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।” (৩৯:৮) সুতরাং এ পাঁচটি আয়াতে শর্তের সাথে বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু এরূপ হয়নি। না নবীদের দ্বারা শিরকের কাজ হয়েছে, না নবীদের নেতা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দ্বারা শিরকের কাজ সম্ভব, না আল্লাহ তা'আলার সন্তান গ্রহণ সম্ভব। অনুরূপভাবে নবী-সহধর্মিণী ও মুমিনদের মাতাদের সম্পর্কে যে বলা হয়েছেঃ যদি তোমাদের মধ্যে কেউ অশ্লীল কাজ করে বসে তবে তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দেয়া হবে, এর দ্বারা এটা মনে করা যাবে না যে, তাঁদের মধ্যে কেউ কখনো এরূপ কোন বেহায়াপনা ও নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজ করেছেন। নাঊযুবিল্লাহ!
আল-আহযাব 33:31
এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ন্যায়পরায়ণতা ও অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ তোমাদেরকে তোমাদের অনুগত ও সকার্যের জন্যে দ্বিগুণ পুরস্কার প্রদান করা হবে। তোমাদের জন্যে জান্নাতে সম্মান জনক আহার্য প্রস্তুত রয়েছে। কেননা, তোমরা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর বাসস্থানে অবস্থান করবে। আর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বাসস্থান ইল্লীঈনের উচ্চতম স্থানে অবস্থিত রয়েছে। এটা সমস্ত মানুষের বাসস্থান হতে উঁচুতে রয়েছে। এরই নাম ওয়াসিলা। এটা জান্নাতের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু মনযিল যার ছাদ হলো আল্লাহর আরশ।
আল-আহযাব 33:32
৩২-৩৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় প্রিয়তম নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণীদেরকে আদব-কায়দা ও ভদ্রতা শিক্ষা দিচ্ছেন। সমস্ত স্ত্রীলোক তাদের অধীনস্থ। সুতরাং এই নির্দেশাবলী সমস্ত মুসলিম নারীর জন্যেই প্রযোজ্য। তিনি নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী-পত্নীরা! তোমরা অন্যান্য সাধারণ নারীদের মত নও। তাদের তুলনায় তোমাদের মর্যাদা অনেক বেশী। যদি তোমরা আল্লীহূকে ভয় কর তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয় এবং তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। স্ত্রীলোকদের পরপুরুষের সাথে কোমল সুরে ও লোভনীয় ভঙ্গিতে কথা বলা নিষিদ্ধ। সুমিষ্ট ভাষায় ও নরম সুরে শুধুমাত্র স্বামীর সাথে কথা বলা যেতে পারে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কোন জরুরী কাজকর্ম ছাড়া তোমরা বাড়ী হতে বের হবে না। মসজিদে নামায পড়তে যাওয়া শরয়ী প্রয়োজন। যেমন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর বাদীদেরকে আল্লাহ্র মসজিদে যেতে বাধা প্রদান করো না। কিন্তু তাদের উচিত যে, তারা বাড়ীতে যে সাদাসিধা পোশাক পরে থাকে ঐ পোশাক পরেই যেন মসজিদে গমন করে। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, স্ত্রীলোকদের জন্যে বাড়ীই উত্তম।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা স্ত্রীলোকেরা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! পুরুষ লোকেরা আল্লাহর পথে জিহাদের ফযীলত নিয়ে যায়। আমাদের জন্যে কি এমন আমল আছে যার দ্বারা আমরা আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের সমমর্যাদা লাভ করতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যারা নিজেদের বাড়ীতে (পর্দার সাথে) বসে থাকে (অথবা এ ধরনের কথা তিনি বললেন), তারা আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের আমলের মর্যাদা লাভ করবে। (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বায্যার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই স্ত্রীলোক পর্দার বস্তু। এরা যখন বাড়ী হতে বের হয় তখন শয়তান তাদের প্রতি ওঁৎ পেতে থাকে। তারা আল্লাহ্ তা'আলার খুব বেশী নিকটবর্তী হয় তখন যখন নিজেদের বাড়ীতে অবস্থান করে। (এ হাদীসটিও হাফিয আবু বকর আল বাযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)নবী (সঃ) বলেছেনঃ “নারীর অন্দর মহলের নামায তার বাড়ীর নামায হতে উত্তম এবং বাড়ীর নামায আঙ্গিনার নামায হতে উত্তম। (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অজ্ঞতার যুগে নারীরা বেপর্দাভাবে চলাফেরা করতো। ইসলাম এরূপ বেপর্দাভাবে চলাফেরা করাকে হারাম ঘোষণা করেছে। ভঙ্গিমা করে নেচে নেচে চলাকে ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দো-পাট্টা ও চাদর গায়ে দিয়ে চলাফেরা করতে হবে। তা গায়ে দিয়ে গলায় জড়িয়ে রাখা ঠিক নয়। যাতে গলা ও কানের অলংকার অন্যের নযরে না পড়ে সেভাবে গায়ে দিতে হবে। এগুলো অসত্য ও বর্বর যুগের নিয়ম-পদ্ধতি ছিল। যা এ আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত ইদরীস (আঃ)-এর মধ্যকার ব্যবধান ছিল এক হাজার বছর। এই মধ্যবর্তী যুগে হযরত আদম (আঃ)-এর দু’টি বংশ আবাদ ছিল। একটি পাহাড়ী এলাকায় এবং অপরটি সমতল ভূমিতে বসবাস করতো। পাহাড়ীয় অঞ্চলের পুরুষ লোকেরা চরিত্রবান ও সুন্দর ছিল এবং স্ত্রীলোকেরা ছিল কুৎসিত। পুরুষদের দেহের রং ছিল শ্যামল ও সুশ্রী। ইবলীস তাদেরকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে মানুষের রূপ ধারণ করে সমতল ভূমির লোকদের কাছে গেল। একটি লোকের গোলাম হয়ে তথায় থাকতে লাগলো। সেখানে সে বাঁশীর মত একটি জিনিস আবিষ্কার করলো এবং তা বাজাতে লাগলো। এই বশীর সুরে জনগণ খুবই মুগ্ধ হয়ে গেল এবং সেখানে ভীড় জমাতে শুরু করলো। এভাবে একদিন সেখানে মেলা বসে গেল। হাজার হাজার নারী-পুরুষ সেখানে একত্রিত হলো। আকস্মিকভাবে একদিন এক পাহাড়ী লোকও সেখানে পৌঁছে গেল। বাড়ী ফিরে গিয়ে সে নিজের লোকদের সামনে তাদের সৌন্দর্যের আলোচনা করতে লাগলো। তখন তারাও খুব ঘন ঘন সেখানে আসতে লাগলো। দেখাদেখির মাধ্যমে এদের নারীদের সাথে তাদের মেলামেশা বেড়ে গেল। সাথে সাথে ব্যভিচার ও অনান্য অসৎ কর্ম বেড়ে চললো। এভাবেই অসভ্যতা ও বর্বরতার পত্তন হলো। এ ধরনের কাজে বাধা দেয়ার পর কিছু কিছু নির্দেশাবলীর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। মহান আল্লাহ্ বলেনঃ আল্লাহর ইবাদত সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইবাদত হচ্ছে নামায। সুতরাং তোমরা নিয়মানুবর্তিতার সাথে নামায প্রতিষ্ঠিত করবে। অনুরূপভাবে আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ যাকাত প্রদান করতে হবে। এই বিশেষ আদেশ প্রদানের পর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তার ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করার নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো শুধু চান তোমাদের হতে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। এই আয়াতটি এটাই প্রমাণ করে যে, নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণীরা আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত। এ আয়াতটি তাঁদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। আয়াতের শানে নুযূল তো আয়াতের আদেশ-নিষেধ। মুতাবেক হয়ে থাকে। কেউ কেউ বলেন যে, আয়াতের বিষয়বস্তু তাদের উপর বর্তাবে যাদের শানে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা তো হবেই, তা ছাড়া তারাও এর অন্তর্ভুক্ত হবে যাদের ক্রিয়া-কলাপ এদের অনুরূপ হবে। দ্বিতীয় কথাটিই অধিকতর সঠিক। হযরত ইকরামা (রাঃ) বাজারে বাজারে বলে বেড়াতেনঃ “এ আয়াতটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীদের জন্যে বিশেষভাবে অবতীর্ণ হয়েছে।” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ কথা বলেছেন। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলতেনঃ “যদি কেউ এ ব্যাপারে মুকাবিলা করতে চায় তবে আমি মুকাবিলা করতে সদা প্রস্তুত।” এ আয়াতটি শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণীদের শানে অবতীর্ণ হয়েছে- একথার ভাবার্থ এই যে, এর শানে নুযূল অবশ্যই এটাই। যদি এর উদ্দেশ্য এই হয় যে, আহূলে বায়েতের সাথে অন্যান্যরাও জড়িত, তবে এখানে আবার প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে যে, এ আয়াতে বর্ণিত আহলে বায়েত ছাড়া অন্যান্যরাও শামিল রয়েছে।মুসনাদে আহমাদ ও জামেউত তিরমিযীতে উল্লিখিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফজরের নামাযের জন্যে বের হতেন তখন তিনি হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর দরযার নিকট গিয়ে বলতেনঃ “হে আহলে বায়েত! নামাযের সময় হয়ে গেছে। অতঃপর তিনি এই পবিত্র আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন। (ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান ও গারীব বলেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর এরূপ একটি হাদীসে সাত মাসের বর্ণনা রয়েছে) (এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী আবু দাউদ আমানাকী ইবনে হারিস চরম মিথ্যাবাদী। এ রিওয়াইয়াতটি সঠিক নয)শাদ্দাদ ইবনে আম্মার (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি একবার হযরত ওয়াসিলা ইবনে আসফা (রাঃ)-এর নিকট গেলাম। ঐ সময় সেখানে আরো কিছু লোক বসেছিল এবং হযরত আলী (রাঃ) সম্পর্কে আলোচনা চলছিল। তারা তাঁকে ভাল-মন্দ বলছিল। আমিও তাদের সাথে যোগ দিলাম। যখন তারা চলে গেল তখন হযরত ওয়াসিলা (রাঃ) বললেনঃ “তুমিও হযরত আলী (রাঃ) সম্পর্কে অসম্মানজনক মন্তব্য করলে?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যাঁ, আমি তাদের কথায় সমর্থন যোগিয়েছি মাত্র। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “তাহলে শুনো, আমি যা দেখেছি তা তোমাকে শুনাচ্ছি। একদা আমি হযরত আলী (রাঃ)-এর বাড়ী গিয়ে জানতে পারি যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে গিয়েছেন। আমি তার আগমনের অপেক্ষায় সেখানেই বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পরেই দেখি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আসছেন এবং তার সাথে হযরত আলী (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইনও (রাঃ) রয়েছেন। হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অঙ্গুলী ধরে ছিলেন। তিনি হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর সামনে বসলেন এবং নাতিদ্বয়কে কোলের উপর বসালেন। একখানা চাদর দ্বারা তাদেরকে আবৃত করলেন। অতঃপর এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ! এরাই আমার আহলে বায়েত। আর আমার আহলে বায়েতই বেশী হকদার।” অন্য রিওয়াইয়াতে নিম্নের কথাটুকু বেশী আছে যে, হযরত ওয়াসিলা (রাঃ) বলেন, আমি এ দেখে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও কি আপনার আহ্লে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত? উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, তুমিও আমার আহলে বায়েতেরই অন্তর্ভুক্ত।” হযরত ওয়াসিলা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর এই ঘোষণা আমার জন্যে বড়ই আশাব্যঞ্জক।”অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত ওয়াসিলা (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম এমন সময় হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) এবং হযরত হুসাইন (রাঃ) আসলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় চাদরখানা তাঁদের উপর ফেলে দিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়েত। হে আল্লাহ! তাদের হতে অপবিত্রতা দূরীভূত করুন এবং তাদেরকে পবিত্র করে দিন।” আমি বললামঃ আমিও কি? তিনি জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তুমিও। নিশ্চয়ই তুমি কল্যাণের উপর রয়েছে।”হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার ঘরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অবস্থান করছিলেন এমন সময় হযরত ফাতিমা (রাঃ) রেশমী কাপড়ের একটি পুঁটলিতে করে কিছু নিয়ে আসলেন। তিনি (নবী সঃ) বললেনঃ “তোমার স্বামীকে ও দুই শিশুকে নিয়ে এসো।” সুতরাং তারাও এসে গেলেন ও খেতে শুরু করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার বিছানায় ছিলেন। বিছানায় খায়বারের একটি উত্তম চাদর বিছানো ছিল। আমি কামরায় নামায পড়ছিলাম। এমন সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। তিনি চাদরের ভিতর থেকে হাত দুটি বের করলেন এবং আকাশের দিকে উঠিয়ে দু'আ করলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়েত ও আমার সাহায্যকারী। আপনি এদের অপবিত্রতা দূর করে দিন এবং এদেরকে পবিত্র করুন!” আমি আমার মাথাটি ঘর থেকে বের করে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও তো আপনাদের সবারই সাথে রয়েছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, অবশ্যই। তুমি তো সদা কল্যাণের উপর রয়েছে। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) এ রিওয়াইয়াতের সনদে আতার নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং তিনি কি ধরনের বর্ণনাকারী সেটাও বলা হয়নি। অবশিষ্ট বর্ণনাকারীরা বিশ্বাসযোগ্য।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “একদা আমার সামনে হযরত আলী (রাঃ)-এর আলোচনা শুরু হলো। আমি বললাম, আয়াতে তাতহীর তো আমার ঘরে অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট এসে বললেনঃ “কাউকেও এখানে আসার অনুমতি দেবে না।” অল্পক্ষণ পরেই হযরত ফাতিমা (রাঃ) আসলেন। কি করে আমি মেয়েকে তাঁর পিতার নিকট যেতে বাধা দিতে পারি? অতঃপর হযরত হাসান (রাঃ) আসলেন। কে নাতিকে তার নানার কাছে যেতে বাধা দেবে? তারপর হযরত হুসাইন (রাঃ)আসলেন। তাঁকেও আমি বাধা দিলাম না। এরপর হযরত আলী (রাঃ) আগমন করলেন। তাঁকেও আমি বাধা দিতে পারলাম না। তারা সবাই যখন একত্রিত হলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে চাদর দ্বারা আবৃত করলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়েত। সুতরাং আপনি এদের অপবিত্রতা দূর করে দিন এবং এদেরকে পবিত্র করুন!” ঐ সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন এঁদেরকে চাদর দ্বারা আবৃত করা হলো তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও কি এদের অন্তর্ভুক্ত? কিন্তু আল্লাহ জানেন, তিনি আমার এ প্রশ্নে সন্তোষ প্রকাশ করলেন না। তবে শুধু বললেনঃ “তুমি কল্যাণের দিকেই রয়েছে।”হাদীসের অন্য ধারাঃহযরত আতিয়্যাহ তাফাভী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) তার কাছে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার ঘরে ছিলেন। খাদেম খবর দিলো যে হযরত ফাতিমা (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) এসেছেন। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “একটু সরে যাও, আমার আহলে বায়েত এসেছে।” একথা শুনে আমি ঘরের এক কোণে সরে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) শিশুদ্বয়কে কোলে নিলেন ও আদর করলেন। একটি হাত তিনি হযরত আলী (রাঃ)-এর উপর রাখলেন এবং আর একটি হাত রাখলেন হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর ঘাড়ের উপর। অতঃপর উভয়কেই তিনি স্নেহ করলেন। তারপর একটি কালো রং এর চাদর সকলের উপর বিছিয়ে দিয়ে তাঁদেরকে আবৃত করলেন। এরপর তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছি, আগুনের দিকে নয়। এরাও আমার আহলে বায়েত।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ আমিও কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, তুমিও। (এ বর্ণনাটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)অন্য ধারাঃহযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (আরবি) -এ আয়াতটি আমার বাড়ীতে অবতীর্ণ হয়েছে। আমি ঘরের দরজায় বসেছিলাম এমতাবস্থায় আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কি আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত নই? জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি কল্যাণের উপর রয়েছে এবং তুমি নবী (সঃ)-এর স্ত্রীদের একজন।” ঐ সময় আমার বাড়ীতে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) অবস্থান করছিলেন।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য ধারাঃহযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে একত্রিত করেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে তার কাপড়ের নীচে প্রবিষ্ট করেন। অতঃপর তিনি মহামহিমান্বিত আল্লাহকে বলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহ্লে বায়েত।” তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। তিনি তখন বললেনঃ “তুমিও আমার পরিবারের একজন।”অন্য হাদীসঃ হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা সকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কালো চাদর গায়ে দিয়ে বের হলেন। অতঃপর পর্যায়ক্রমে হযরত হাসান (রাঃ), হযরত হুসাইন (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) আসলেন। সকলকেই তিনি তার ঐ চাদরের মধ্যে প্রবিষ্ট করলেন। তারপর তিনি (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য ধারাঃহযরত ইবনে হাওশিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর চাচাতো ভাই হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, একদা আমি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট গমন করে তাঁকে হযরত আলী (রাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তখন তিনি বলেনঃ তুমি আমাকে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছো যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি। তার বাড়ীতেই তাঁর প্রিয়তমা কন্যা ছিলেন। যিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সবচেয়ে বেশী ভালবাসার পাত্রী আমি অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখেছি যে, তিনি হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে আহ্বান করেন। অতঃপর তিনি তাঁদের উপর কাপড় নিক্ষেপ করেন এবং বলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়েত। সুতরাং আপনি তাদের থেকে অপবিত্রতা দূরীভূত করুন এবং তাদেরকে পবিত্র করে দিন!” আমি তখন তাদের নিকটবর্তী হলাম। অতঃপর বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও কি আপনার আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত? তিনি জবাবে বললেনঃ “নিশ্চয়ই, জেনে রেখো যে, তুমি কল্যাণের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য হাদীসঃ হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) এ আয়াতটি আমাদের পাঁচজনের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ আমি, হযরত আলী (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ), হযরত হুসাইন (রাঃ) এবং হযরত ফাতিমা (রাঃ)।” অন্য সনদে এটা হযরত আবু সাঈদ (রাঃ)-এর নিজস্ব উক্তিরূপে বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী ।হযরত সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অহী অবতীর্ণ হয় তখন তিনি হযরত আলী (রাঃ), তাঁর দুই ছেলে এবং হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে ধরে তাঁর কাপড়ের নীচে প্রবিষ্ট করেন। অতঃপর বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! এরা আমার আহলে বায়েত।" (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে হিব্বান (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি, হুসাইন ইবনে সাবরা (রঃ) এবং হযরত উমার ইবনে সালমা (রঃ) হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ)-এর নিকট গমন করি। আমরা তাঁর কাছে উপবেশন করলে হযরত হুসাইন (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে যায়েদ (রাঃ)! আপনি তো বহু কল্যাণ লাভ করেছেন। আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখেছেন, তাঁর হাদীস শুনেছেন, তার সাথে যুদ্ধ করেছেন এবং তার পিছনে নামায পড়েছেন। সুতরাং হে যায়েদ (রাঃ)! আপনি বহু কল্যাণ ও মঙ্গল লাভ করেছেন! হে যায়েদ (রাঃ)! আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে যা শুনেছেন তা আমাদের নিকট বর্ণনা করুন।” তিনি তখন বললেন, হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! আল্লাহর কসম! এখন আমার বয়স খুব বেশী হয়ে গেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যমানা দূরে চলে গেছে, যা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি তার কিছু কিছু বিস্মরণ হয়েছি। এখন আমি তোমাকে যা বলি তাই কর এবং তা মেনে নাও আমাকে তুমি এ ব্যাপারে কষ্ট দিয়ো না। শুনো, মক্কা ও মদীনার মাঝখানে একটি পানির জায়গা রয়েছে যার নাম ‘খাম'। সেখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে ভাষণ দান করেন। তিনি বলেনঃ “আমি একজন মানুষ। খুব সম্ভব আমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে আমার নিকট একজন দূত আগমন করবেন। আমি যেন তার কথা মেনে নিই। আমি তোমাদের কাছে দু'টি বস্তু ছেড়ে যাচ্ছি। একটি হলো আল্লাহর কিতাব, যাতে হিদায়াত ও জ্যোতি রয়েছে। তোমরা আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ কর ও ওকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর।” অতঃপর তিনি আল্লাহর কিতাবের দিকে আমাদের দৃষ্টি পূর্ণভাবে আকর্ষণ করলেন। তারপর তিনি বললেনঃ “আমার আহলে বায়েতের ব্যাপারে আমি আল্লাহর কথা তোমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি ।” তিনবার তিনি একথার পুনরাবৃত্তি করলেন। তখন হুসাইন (রঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে যায়েদ (রাঃ)! আহলে বায়েত কারা? তাঁর স্ত্রীরা কি আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত নন?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “তাঁর স্ত্রীরাও আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত বটে, তবে তার আহ্ল তাঁরা যাদের উপর তার পরে সাদকা হারাম।” আবার তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কারা?' জবাবে তিনি বললেনঃ “তারা হলেন হযরত আলী (রাঃ)-এর বংশধর, হযরত আকীল (রাঃ)-এর বংশধর ও হযরত আব্বাস (রাঃ)-এর বংশধর।” তাকে প্রশ্ন করা হলো: “এঁদের সবারই উপর কি সাদকা হারাম?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যা। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণনা করা হয়েছেঃ আমি জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরাও কি আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত? তিনি জবাব দিলেনঃ “না। আল্লাহর কসম! স্ত্রীরা তো দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর সাথে অবস্থান করে। কিন্তু যদি স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দেয় তবে সে তার পিত্রালয়ের সদস্যা ও নিজ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহলে বায়েত হবে তাঁর মূল ও আসাবা।. যেসব ওয়ারিশের অংশ নির্ধারিত থাকে না, বরং যাদের অংশ নির্ধারিত রয়েছে তাদের অংশ নেয়ার পর বাকী অংশ যারা পায় তাদেরকেই ফারায়েযের পরিভাষায় আসাবা বলা হয়। তার পরে তাদের উপর সাদকা হারাম।” এ রিওয়াইয়াতে এ রকমই আছে। কিন্তু প্রথম রিওয়াইয়াতটিই বেশী গ্রহণযোগ্য। আর দ্বিতীয়টিতে রয়েছে তার উদ্দেশ্য হলো শুধু ঐ আহলে বায়েত যাদের কথা হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে। কেননা সেখানে ঐ (আরবি) উদ্দেশ্য যাদের উপর সাদকা হারাম। কিংবা এটাই যে, উদ্দেশ্য শুধু স্ত্রীরাই নয়, বরং তারাসহ তার অন্যান্য (আরবি)-ও উদ্দেশ্য। এ কথাটিই বেশী যুক্তিযুক্ত। এর দ্বারা এ বর্ণনা ও পূর্ববর্তী বর্ণনার মধ্যে সমন্বয় সাধিত হচ্ছে। কুরআন ও পূর্ববর্তী হাদীসগুলোর মধ্যেও সমন্বয় হয়ে যাচ্ছে। তবে তখনই তা সম্ভব হবে যখন এ হাদীসগুলোকে সহীহ বলে মেনে নেয়া হবে। কেননা, এগুলোর কোন কোন সনদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে।যে ব্যক্তি মারেফাতের জ্যোতি লাভ করেছে এবং যাদের কুরআন কারীম সম্পর্কে গবেষণা করার অভ্যাস আছে তারা এক দৃষ্টিতেই এটা অবশ্যই জানতে পারবে যে, নবী (সঃ)-এর স্ত্রীরাও নিঃসন্দেহে এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। কেননা, উপর হতেই প্রসঙ্গটি তাদের সম্পর্কে এবং তাঁদের ব্যাপারেই চলে আসছে। এরপরে মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেনঃ আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানের কথা, যা তোমাদের গৃহে পঠিত হয় তা তোমরা স্মরণ রাখবে; আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে অবহিত। সুতরাং হযরত কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি হিসেবে আল্লাহর আয়াত ও হিকমত দ্বারা কিতাব ও সুন্নাতকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং এটা একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য যা তাঁরা ছাড়া আর কেউই লাভ করতে পারেনি। তা এই যে, তাঁদের গৃহেই আল্লাহর অহী ও রহমতে ইলাহী অবতীর্ণ হয়ে থাকে। আর তাঁদের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) সবচেয়ে বেশী লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কেননা, হাদীসে পরিষ্কারভাবে উল্লিখিত হয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বিছানা ছাড়া আর কারো বিছানায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অহী আসেনি। এটা এ কারণেই যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) ছাড়া অন্য কোন কুমারী নারীকে বিয়ে করেননি। তাঁর বিছানা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছাড়া আর কারো জন্যে ছিল না। সুতরাং তিনি সঠিকভাবেই এই উচ্চ মর্যাদার অধিকারিণী ছিলেন। হ্যা, তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণীরাই যখন তাঁর আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত তখন তাঁর নিকটাত্মীয়গণ স্বাভাবিকভাবেই তাঁর আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত হবেন। যেমন হাদীসে গত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার আহ্বালে বায়েত সবচেয়ে বেশী হকদার।” সহীহ মুসলিমে যে হাদীসটি এসেছে এটা ওর সঙ্গে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যখন (আরবি) মসজিদ যার ভিত্তি প্রথম দিন হতেই তাকওয়ার উপর স্থাপিত) (৯:১০৮) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় তখন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “ওটা আমার এই মসজিদ।" কথাটি মসজিদে কুবা সম্বন্ধে বলা হয়েছে। হাদীসে এটা পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু সহীহ্ মুসলিমে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো: “এই মসজিদ বলতে কোন মসজিদকে বুঝানো হয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমার মসজিদ অর্থাৎ মসজিদে নববী (সঃ)।” সুতরাং যে মর্যাদা মসজিদে কুবার ছিল সে মর্যাদা মসজিদে নববীরও (সঃ) রয়েছে। এ জন্যে এই মসজিদকেও ঐ নামের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর শাহাদাতের পর হযরত হাসান (রাঃ)-কে খলীফা নির্বাচন করা হলো। তিনি ঐ সময় নামায পড়ছিলেন। বানী আসাদের গোত্রভুক্ত এক ব্যক্তি হঠাৎ এসে পড়লো এবং সিজদারত অবস্থায় তাঁকে ছুরি মেরে দিলো। ছুরিটি তাঁর গোশতের উপর লাগলো। কয়েক ঘন্টা মাত্র তিনি শয্যাগত থাকলেন। যখন একটু সুস্থ হলেন তখন তিনি মসজিদে এলেন এবং মিম্বরের উপর বসে বসে খুৎবা পাঠ করলেন ও বললেনঃ “হে ইরাকবাসী! আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। আমি তোমাদের নেতা ও তোমাদের মেহমান। আমি আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত। যাদের সম্পর্কে (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। এ কথাটির উপর তিনি খুব জোর দিলেন এবং বাক্যগুলো বারবার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বললেন। যারা মসজিদে ছিল তারা কাঁদতে লাগলো।একবার তিনি এক সিরিয়াবাসীকে বলেছিলেনঃ “তুমি কি সরায়ে আহযাবের আয়াতে তাতহীর তিলাওয়াত করেছো?” সে জবাব দিলো: “হ্যা। এর দ্বারা কি আপনাদেরকেই বুঝানো হয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ হ্যা। সে বললো: “আল্লাহ তা'আলা বড়ই স্নেহশীল, দয়াময়, সবজান্তা এবং সবকিছুরই খবর তিনি রাখেন। তিনি জানতেন যে, আপনারা তাঁর দয়া ও স্নেহলাভের যোগ্য। তাই তিনি আপনাদেরকে এ নিয়ামতগুলো দান করেছেন।” সুতরাং তাফসীরে ইবনে জারীরের বর্ণনা অনুযায়ী আয়াতের অর্থ হবেঃ “হে মুমিনদের মাতা ও নবী (সঃ)-এর স্ত্রীরা! তোমাদের উপর যে আল্লাহর নিয়ামত রয়েছে তা তোমরা স্মরণ কর। তিনি তোমাদেরকে এমন বাড়ীতে অবস্থান করতে দিয়েছেন যেখানে আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানের কথা পঠিত হয়। আল্লাহর এসব নিয়ামতের জন্যে তোমাদের তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। এখানে হিকমতের অর্থ হাদীস আল্লাহ তাআলা শেষ পরিণতিরও খবর রাখেন। তাই তিনি সঠিক ও পূর্ণ জ্ঞান দ্বারা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে থাকেন। নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জনকারিণী কারা হবেন তা তিনি নির্বাচন করেন। প্রকৃতপক্ষে এগুলোও তোমাদের উপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে বড় অনুগ্রহ। তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে অবহিত।
আল-আহযাব 33:33
৩২-৩৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় প্রিয়তম নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণীদেরকে আদব-কায়দা ও ভদ্রতা শিক্ষা দিচ্ছেন। সমস্ত স্ত্রীলোক তাদের অধীনস্থ। সুতরাং এই নির্দেশাবলী সমস্ত মুসলিম নারীর জন্যেই প্রযোজ্য। তিনি নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী-পত্নীরা! তোমরা অন্যান্য সাধারণ নারীদের মত নও। তাদের তুলনায় তোমাদের মর্যাদা অনেক বেশী। যদি তোমরা আল্লীহূকে ভয় কর তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয় এবং তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। স্ত্রীলোকদের পরপুরুষের সাথে কোমল সুরে ও লোভনীয় ভঙ্গিতে কথা বলা নিষিদ্ধ। সুমিষ্ট ভাষায় ও নরম সুরে শুধুমাত্র স্বামীর সাথে কথা বলা যেতে পারে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কোন জরুরী কাজকর্ম ছাড়া তোমরা বাড়ী হতে বের হবে না। মসজিদে নামায পড়তে যাওয়া শরয়ী প্রয়োজন। যেমন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর বাদীদেরকে আল্লাহ্র মসজিদে যেতে বাধা প্রদান করো না। কিন্তু তাদের উচিত যে, তারা বাড়ীতে যে সাদাসিধা পোশাক পরে থাকে ঐ পোশাক পরেই যেন মসজিদে গমন করে। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, স্ত্রীলোকদের জন্যে বাড়ীই উত্তম।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা স্ত্রীলোকেরা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! পুরুষ লোকেরা আল্লাহর পথে জিহাদের ফযীলত নিয়ে যায়। আমাদের জন্যে কি এমন আমল আছে যার দ্বারা আমরা আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের সমমর্যাদা লাভ করতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যারা নিজেদের বাড়ীতে (পর্দার সাথে) বসে থাকে (অথবা এ ধরনের কথা তিনি বললেন), তারা আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের আমলের মর্যাদা লাভ করবে। (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বায্যার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই স্ত্রীলোক পর্দার বস্তু। এরা যখন বাড়ী হতে বের হয় তখন শয়তান তাদের প্রতি ওঁৎ পেতে থাকে। তারা আল্লাহ্ তা'আলার খুব বেশী নিকটবর্তী হয় তখন যখন নিজেদের বাড়ীতে অবস্থান করে। (এ হাদীসটিও হাফিয আবু বকর আল বাযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)নবী (সঃ) বলেছেনঃ “নারীর অন্দর মহলের নামায তার বাড়ীর নামায হতে উত্তম এবং বাড়ীর নামায আঙ্গিনার নামায হতে উত্তম। (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অজ্ঞতার যুগে নারীরা বেপর্দাভাবে চলাফেরা করতো। ইসলাম এরূপ বেপর্দাভাবে চলাফেরা করাকে হারাম ঘোষণা করেছে। ভঙ্গিমা করে নেচে নেচে চলাকে ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দো-পাট্টা ও চাদর গায়ে দিয়ে চলাফেরা করতে হবে। তা গায়ে দিয়ে গলায় জড়িয়ে রাখা ঠিক নয়। যাতে গলা ও কানের অলংকার অন্যের নযরে না পড়ে সেভাবে গায়ে দিতে হবে। এগুলো অসত্য ও বর্বর যুগের নিয়ম-পদ্ধতি ছিল। যা এ আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত ইদরীস (আঃ)-এর মধ্যকার ব্যবধান ছিল এক হাজার বছর। এই মধ্যবর্তী যুগে হযরত আদম (আঃ)-এর দু’টি বংশ আবাদ ছিল। একটি পাহাড়ী এলাকায় এবং অপরটি সমতল ভূমিতে বসবাস করতো। পাহাড়ীয় অঞ্চলের পুরুষ লোকেরা চরিত্রবান ও সুন্দর ছিল এবং স্ত্রীলোকেরা ছিল কুৎসিত। পুরুষদের দেহের রং ছিল শ্যামল ও সুশ্রী। ইবলীস তাদেরকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে মানুষের রূপ ধারণ করে সমতল ভূমির লোকদের কাছে গেল। একটি লোকের গোলাম হয়ে তথায় থাকতে লাগলো। সেখানে সে বাঁশীর মত একটি জিনিস আবিষ্কার করলো এবং তা বাজাতে লাগলো। এই বশীর সুরে জনগণ খুবই মুগ্ধ হয়ে গেল এবং সেখানে ভীড় জমাতে শুরু করলো। এভাবে একদিন সেখানে মেলা বসে গেল। হাজার হাজার নারী-পুরুষ সেখানে একত্রিত হলো। আকস্মিকভাবে একদিন এক পাহাড়ী লোকও সেখানে পৌঁছে গেল। বাড়ী ফিরে গিয়ে সে নিজের লোকদের সামনে তাদের সৌন্দর্যের আলোচনা করতে লাগলো। তখন তারাও খুব ঘন ঘন সেখানে আসতে লাগলো। দেখাদেখির মাধ্যমে এদের নারীদের সাথে তাদের মেলামেশা বেড়ে গেল। সাথে সাথে ব্যভিচার ও অনান্য অসৎ কর্ম বেড়ে চললো। এভাবেই অসভ্যতা ও বর্বরতার পত্তন হলো। এ ধরনের কাজে বাধা দেয়ার পর কিছু কিছু নির্দেশাবলীর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। মহান আল্লাহ্ বলেনঃ আল্লাহর ইবাদত সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইবাদত হচ্ছে নামায। সুতরাং তোমরা নিয়মানুবর্তিতার সাথে নামায প্রতিষ্ঠিত করবে। অনুরূপভাবে আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ যাকাত প্রদান করতে হবে। এই বিশেষ আদেশ প্রদানের পর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তার ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করার নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো শুধু চান তোমাদের হতে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। এই আয়াতটি এটাই প্রমাণ করে যে, নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণীরা আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত। এ আয়াতটি তাঁদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। আয়াতের শানে নুযূল তো আয়াতের আদেশ-নিষেধ। মুতাবেক হয়ে থাকে। কেউ কেউ বলেন যে, আয়াতের বিষয়বস্তু তাদের উপর বর্তাবে যাদের শানে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা তো হবেই, তা ছাড়া তারাও এর অন্তর্ভুক্ত হবে যাদের ক্রিয়া-কলাপ এদের অনুরূপ হবে। দ্বিতীয় কথাটিই অধিকতর সঠিক। হযরত ইকরামা (রাঃ) বাজারে বাজারে বলে বেড়াতেনঃ “এ আয়াতটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীদের জন্যে বিশেষভাবে অবতীর্ণ হয়েছে।” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ কথা বলেছেন। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলতেনঃ “যদি কেউ এ ব্যাপারে মুকাবিলা করতে চায় তবে আমি মুকাবিলা করতে সদা প্রস্তুত।” এ আয়াতটি শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণীদের শানে অবতীর্ণ হয়েছে- একথার ভাবার্থ এই যে, এর শানে নুযূল অবশ্যই এটাই। যদি এর উদ্দেশ্য এই হয় যে, আহূলে বায়েতের সাথে অন্যান্যরাও জড়িত, তবে এখানে আবার প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে যে, এ আয়াতে বর্ণিত আহলে বায়েত ছাড়া অন্যান্যরাও শামিল রয়েছে।মুসনাদে আহমাদ ও জামেউত তিরমিযীতে উল্লিখিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফজরের নামাযের জন্যে বের হতেন তখন তিনি হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর দরযার নিকট গিয়ে বলতেনঃ “হে আহলে বায়েত! নামাযের সময় হয়ে গেছে। অতঃপর তিনি এই পবিত্র আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন। (ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান ও গারীব বলেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর এরূপ একটি হাদীসে সাত মাসের বর্ণনা রয়েছে) (এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী আবু দাউদ আমানাকী ইবনে হারিস চরম মিথ্যাবাদী। এ রিওয়াইয়াতটি সঠিক নয)শাদ্দাদ ইবনে আম্মার (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি একবার হযরত ওয়াসিলা ইবনে আসফা (রাঃ)-এর নিকট গেলাম। ঐ সময় সেখানে আরো কিছু লোক বসেছিল এবং হযরত আলী (রাঃ) সম্পর্কে আলোচনা চলছিল। তারা তাঁকে ভাল-মন্দ বলছিল। আমিও তাদের সাথে যোগ দিলাম। যখন তারা চলে গেল তখন হযরত ওয়াসিলা (রাঃ) বললেনঃ “তুমিও হযরত আলী (রাঃ) সম্পর্কে অসম্মানজনক মন্তব্য করলে?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যাঁ, আমি তাদের কথায় সমর্থন যোগিয়েছি মাত্র। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “তাহলে শুনো, আমি যা দেখেছি তা তোমাকে শুনাচ্ছি। একদা আমি হযরত আলী (রাঃ)-এর বাড়ী গিয়ে জানতে পারি যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে গিয়েছেন। আমি তার আগমনের অপেক্ষায় সেখানেই বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পরেই দেখি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আসছেন এবং তার সাথে হযরত আলী (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইনও (রাঃ) রয়েছেন। হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অঙ্গুলী ধরে ছিলেন। তিনি হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর সামনে বসলেন এবং নাতিদ্বয়কে কোলের উপর বসালেন। একখানা চাদর দ্বারা তাদেরকে আবৃত করলেন। অতঃপর এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ! এরাই আমার আহলে বায়েত। আর আমার আহলে বায়েতই বেশী হকদার।” অন্য রিওয়াইয়াতে নিম্নের কথাটুকু বেশী আছে যে, হযরত ওয়াসিলা (রাঃ) বলেন, আমি এ দেখে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও কি আপনার আহ্লে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত? উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, তুমিও আমার আহলে বায়েতেরই অন্তর্ভুক্ত।” হযরত ওয়াসিলা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর এই ঘোষণা আমার জন্যে বড়ই আশাব্যঞ্জক।”অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত ওয়াসিলা (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম এমন সময় হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) এবং হযরত হুসাইন (রাঃ) আসলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় চাদরখানা তাঁদের উপর ফেলে দিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়েত। হে আল্লাহ! তাদের হতে অপবিত্রতা দূরীভূত করুন এবং তাদেরকে পবিত্র করে দিন।” আমি বললামঃ আমিও কি? তিনি জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তুমিও। নিশ্চয়ই তুমি কল্যাণের উপর রয়েছে।”হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার ঘরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অবস্থান করছিলেন এমন সময় হযরত ফাতিমা (রাঃ) রেশমী কাপড়ের একটি পুঁটলিতে করে কিছু নিয়ে আসলেন। তিনি (নবী সঃ) বললেনঃ “তোমার স্বামীকে ও দুই শিশুকে নিয়ে এসো।” সুতরাং তারাও এসে গেলেন ও খেতে শুরু করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার বিছানায় ছিলেন। বিছানায় খায়বারের একটি উত্তম চাদর বিছানো ছিল। আমি কামরায় নামায পড়ছিলাম। এমন সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। তিনি চাদরের ভিতর থেকে হাত দুটি বের করলেন এবং আকাশের দিকে উঠিয়ে দু'আ করলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়েত ও আমার সাহায্যকারী। আপনি এদের অপবিত্রতা দূর করে দিন এবং এদেরকে পবিত্র করুন!” আমি আমার মাথাটি ঘর থেকে বের করে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও তো আপনাদের সবারই সাথে রয়েছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, অবশ্যই। তুমি তো সদা কল্যাণের উপর রয়েছে। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) এ রিওয়াইয়াতের সনদে আতার নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং তিনি কি ধরনের বর্ণনাকারী সেটাও বলা হয়নি। অবশিষ্ট বর্ণনাকারীরা বিশ্বাসযোগ্য।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “একদা আমার সামনে হযরত আলী (রাঃ)-এর আলোচনা শুরু হলো। আমি বললাম, আয়াতে তাতহীর তো আমার ঘরে অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট এসে বললেনঃ “কাউকেও এখানে আসার অনুমতি দেবে না।” অল্পক্ষণ পরেই হযরত ফাতিমা (রাঃ) আসলেন। কি করে আমি মেয়েকে তাঁর পিতার নিকট যেতে বাধা দিতে পারি? অতঃপর হযরত হাসান (রাঃ) আসলেন। কে নাতিকে তার নানার কাছে যেতে বাধা দেবে? তারপর হযরত হুসাইন (রাঃ)আসলেন। তাঁকেও আমি বাধা দিলাম না। এরপর হযরত আলী (রাঃ) আগমন করলেন। তাঁকেও আমি বাধা দিতে পারলাম না। তারা সবাই যখন একত্রিত হলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে চাদর দ্বারা আবৃত করলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়েত। সুতরাং আপনি এদের অপবিত্রতা দূর করে দিন এবং এদেরকে পবিত্র করুন!” ঐ সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন এঁদেরকে চাদর দ্বারা আবৃত করা হলো তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও কি এদের অন্তর্ভুক্ত? কিন্তু আল্লাহ জানেন, তিনি আমার এ প্রশ্নে সন্তোষ প্রকাশ করলেন না। তবে শুধু বললেনঃ “তুমি কল্যাণের দিকেই রয়েছে।”হাদীসের অন্য ধারাঃহযরত আতিয়্যাহ তাফাভী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) তার কাছে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার ঘরে ছিলেন। খাদেম খবর দিলো যে হযরত ফাতিমা (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) এসেছেন। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “একটু সরে যাও, আমার আহলে বায়েত এসেছে।” একথা শুনে আমি ঘরের এক কোণে সরে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) শিশুদ্বয়কে কোলে নিলেন ও আদর করলেন। একটি হাত তিনি হযরত আলী (রাঃ)-এর উপর রাখলেন এবং আর একটি হাত রাখলেন হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর ঘাড়ের উপর। অতঃপর উভয়কেই তিনি স্নেহ করলেন। তারপর একটি কালো রং এর চাদর সকলের উপর বিছিয়ে দিয়ে তাঁদেরকে আবৃত করলেন। এরপর তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছি, আগুনের দিকে নয়। এরাও আমার আহলে বায়েত।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ আমিও কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, তুমিও। (এ বর্ণনাটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)অন্য ধারাঃহযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (আরবি) -এ আয়াতটি আমার বাড়ীতে অবতীর্ণ হয়েছে। আমি ঘরের দরজায় বসেছিলাম এমতাবস্থায় আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কি আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত নই? জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি কল্যাণের উপর রয়েছে এবং তুমি নবী (সঃ)-এর স্ত্রীদের একজন।” ঐ সময় আমার বাড়ীতে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) অবস্থান করছিলেন।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য ধারাঃহযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে একত্রিত করেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে তার কাপড়ের নীচে প্রবিষ্ট করেন। অতঃপর তিনি মহামহিমান্বিত আল্লাহকে বলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহ্লে বায়েত।” তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। তিনি তখন বললেনঃ “তুমিও আমার পরিবারের একজন।”অন্য হাদীসঃ হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা সকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কালো চাদর গায়ে দিয়ে বের হলেন। অতঃপর পর্যায়ক্রমে হযরত হাসান (রাঃ), হযরত হুসাইন (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) আসলেন। সকলকেই তিনি তার ঐ চাদরের মধ্যে প্রবিষ্ট করলেন। তারপর তিনি (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য ধারাঃহযরত ইবনে হাওশিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর চাচাতো ভাই হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, একদা আমি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট গমন করে তাঁকে হযরত আলী (রাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তখন তিনি বলেনঃ তুমি আমাকে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছো যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি। তার বাড়ীতেই তাঁর প্রিয়তমা কন্যা ছিলেন। যিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সবচেয়ে বেশী ভালবাসার পাত্রী আমি অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখেছি যে, তিনি হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে আহ্বান করেন। অতঃপর তিনি তাঁদের উপর কাপড় নিক্ষেপ করেন এবং বলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়েত। সুতরাং আপনি তাদের থেকে অপবিত্রতা দূরীভূত করুন এবং তাদেরকে পবিত্র করে দিন!” আমি তখন তাদের নিকটবর্তী হলাম। অতঃপর বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও কি আপনার আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত? তিনি জবাবে বললেনঃ “নিশ্চয়ই, জেনে রেখো যে, তুমি কল্যাণের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য হাদীসঃ হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) এ আয়াতটি আমাদের পাঁচজনের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ আমি, হযরত আলী (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ), হযরত হুসাইন (রাঃ) এবং হযরত ফাতিমা (রাঃ)।” অন্য সনদে এটা হযরত আবু সাঈদ (রাঃ)-এর নিজস্ব উক্তিরূপে বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী ।হযরত সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অহী অবতীর্ণ হয় তখন তিনি হযরত আলী (রাঃ), তাঁর দুই ছেলে এবং হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে ধরে তাঁর কাপড়ের নীচে প্রবিষ্ট করেন। অতঃপর বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! এরা আমার আহলে বায়েত।" (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে হিব্বান (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি, হুসাইন ইবনে সাবরা (রঃ) এবং হযরত উমার ইবনে সালমা (রঃ) হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ)-এর নিকট গমন করি। আমরা তাঁর কাছে উপবেশন করলে হযরত হুসাইন (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে যায়েদ (রাঃ)! আপনি তো বহু কল্যাণ লাভ করেছেন। আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখেছেন, তাঁর হাদীস শুনেছেন, তার সাথে যুদ্ধ করেছেন এবং তার পিছনে নামায পড়েছেন। সুতরাং হে যায়েদ (রাঃ)! আপনি বহু কল্যাণ ও মঙ্গল লাভ করেছেন! হে যায়েদ (রাঃ)! আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে যা শুনেছেন তা আমাদের নিকট বর্ণনা করুন।” তিনি তখন বললেন, হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! আল্লাহর কসম! এখন আমার বয়স খুব বেশী হয়ে গেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যমানা দূরে চলে গেছে, যা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি তার কিছু কিছু বিস্মরণ হয়েছি। এখন আমি তোমাকে যা বলি তাই কর এবং তা মেনে নাও আমাকে তুমি এ ব্যাপারে কষ্ট দিয়ো না। শুনো, মক্কা ও মদীনার মাঝখানে একটি পানির জায়গা রয়েছে যার নাম ‘খাম'। সেখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে ভাষণ দান করেন। তিনি বলেনঃ “আমি একজন মানুষ। খুব সম্ভব আমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে আমার নিকট একজন দূত আগমন করবেন। আমি যেন তার কথা মেনে নিই। আমি তোমাদের কাছে দু'টি বস্তু ছেড়ে যাচ্ছি। একটি হলো আল্লাহর কিতাব, যাতে হিদায়াত ও জ্যোতি রয়েছে। তোমরা আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ কর ও ওকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর।” অতঃপর তিনি আল্লাহর কিতাবের দিকে আমাদের দৃষ্টি পূর্ণভাবে আকর্ষণ করলেন। তারপর তিনি বললেনঃ “আমার আহলে বায়েতের ব্যাপারে আমি আল্লাহর কথা তোমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি ।” তিনবার তিনি একথার পুনরাবৃত্তি করলেন। তখন হুসাইন (রঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে যায়েদ (রাঃ)! আহলে বায়েত কারা? তাঁর স্ত্রীরা কি আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত নন?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “তাঁর স্ত্রীরাও আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত বটে, তবে তার আহ্ল তাঁরা যাদের উপর তার পরে সাদকা হারাম।” আবার তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কারা?' জবাবে তিনি বললেনঃ “তারা হলেন হযরত আলী (রাঃ)-এর বংশধর, হযরত আকীল (রাঃ)-এর বংশধর ও হযরত আব্বাস (রাঃ)-এর বংশধর।” তাকে প্রশ্ন করা হলো: “এঁদের সবারই উপর কি সাদকা হারাম?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যা। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণনা করা হয়েছেঃ আমি জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরাও কি আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত? তিনি জবাব দিলেনঃ “না। আল্লাহর কসম! স্ত্রীরা তো দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর সাথে অবস্থান করে। কিন্তু যদি স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দেয় তবে সে তার পিত্রালয়ের সদস্যা ও নিজ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহলে বায়েত হবে তাঁর মূল ও আসাবা।. যেসব ওয়ারিশের অংশ নির্ধারিত থাকে না, বরং যাদের অংশ নির্ধারিত রয়েছে তাদের অংশ নেয়ার পর বাকী অংশ যারা পায় তাদেরকেই ফারায়েযের পরিভাষায় আসাবা বলা হয়। তার পরে তাদের উপর সাদকা হারাম।” এ রিওয়াইয়াতে এ রকমই আছে। কিন্তু প্রথম রিওয়াইয়াতটিই বেশী গ্রহণযোগ্য। আর দ্বিতীয়টিতে রয়েছে তার উদ্দেশ্য হলো শুধু ঐ আহলে বায়েত যাদের কথা হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে। কেননা সেখানে ঐ (আরবি) উদ্দেশ্য যাদের উপর সাদকা হারাম। কিংবা এটাই যে, উদ্দেশ্য শুধু স্ত্রীরাই নয়, বরং তারাসহ তার অন্যান্য (আরবি)-ও উদ্দেশ্য। এ কথাটিই বেশী যুক্তিযুক্ত। এর দ্বারা এ বর্ণনা ও পূর্ববর্তী বর্ণনার মধ্যে সমন্বয় সাধিত হচ্ছে। কুরআন ও পূর্ববর্তী হাদীসগুলোর মধ্যেও সমন্বয় হয়ে যাচ্ছে। তবে তখনই তা সম্ভব হবে যখন এ হাদীসগুলোকে সহীহ বলে মেনে নেয়া হবে। কেননা, এগুলোর কোন কোন সনদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে।যে ব্যক্তি মারেফাতের জ্যোতি লাভ করেছে এবং যাদের কুরআন কারীম সম্পর্কে গবেষণা করার অভ্যাস আছে তারা এক দৃষ্টিতেই এটা অবশ্যই জানতে পারবে যে, নবী (সঃ)-এর স্ত্রীরাও নিঃসন্দেহে এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। কেননা, উপর হতেই প্রসঙ্গটি তাদের সম্পর্কে এবং তাঁদের ব্যাপারেই চলে আসছে। এরপরে মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেনঃ আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানের কথা, যা তোমাদের গৃহে পঠিত হয় তা তোমরা স্মরণ রাখবে; আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে অবহিত। সুতরাং হযরত কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি হিসেবে আল্লাহর আয়াত ও হিকমত দ্বারা কিতাব ও সুন্নাতকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং এটা একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য যা তাঁরা ছাড়া আর কেউই লাভ করতে পারেনি। তা এই যে, তাঁদের গৃহেই আল্লাহর অহী ও রহমতে ইলাহী অবতীর্ণ হয়ে থাকে। আর তাঁদের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) সবচেয়ে বেশী লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কেননা, হাদীসে পরিষ্কারভাবে উল্লিখিত হয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বিছানা ছাড়া আর কারো বিছানায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অহী আসেনি। এটা এ কারণেই যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) ছাড়া অন্য কোন কুমারী নারীকে বিয়ে করেননি। তাঁর বিছানা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছাড়া আর কারো জন্যে ছিল না। সুতরাং তিনি সঠিকভাবেই এই উচ্চ মর্যাদার অধিকারিণী ছিলেন। হ্যা, তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণীরাই যখন তাঁর আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত তখন তাঁর নিকটাত্মীয়গণ স্বাভাবিকভাবেই তাঁর আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত হবেন। যেমন হাদীসে গত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার আহ্বালে বায়েত সবচেয়ে বেশী হকদার।” সহীহ মুসলিমে যে হাদীসটি এসেছে এটা ওর সঙ্গে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যখন (আরবি) মসজিদ যার ভিত্তি প্রথম দিন হতেই তাকওয়ার উপর স্থাপিত) (৯:১০৮) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় তখন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “ওটা আমার এই মসজিদ।" কথাটি মসজিদে কুবা সম্বন্ধে বলা হয়েছে। হাদীসে এটা পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু সহীহ্ মুসলিমে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো: “এই মসজিদ বলতে কোন মসজিদকে বুঝানো হয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমার মসজিদ অর্থাৎ মসজিদে নববী (সঃ)।” সুতরাং যে মর্যাদা মসজিদে কুবার ছিল সে মর্যাদা মসজিদে নববীরও (সঃ) রয়েছে। এ জন্যে এই মসজিদকেও ঐ নামের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর শাহাদাতের পর হযরত হাসান (রাঃ)-কে খলীফা নির্বাচন করা হলো। তিনি ঐ সময় নামায পড়ছিলেন। বানী আসাদের গোত্রভুক্ত এক ব্যক্তি হঠাৎ এসে পড়লো এবং সিজদারত অবস্থায় তাঁকে ছুরি মেরে দিলো। ছুরিটি তাঁর গোশতের উপর লাগলো। কয়েক ঘন্টা মাত্র তিনি শয্যাগত থাকলেন। যখন একটু সুস্থ হলেন তখন তিনি মসজিদে এলেন এবং মিম্বরের উপর বসে বসে খুৎবা পাঠ করলেন ও বললেনঃ “হে ইরাকবাসী! আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। আমি তোমাদের নেতা ও তোমাদের মেহমান। আমি আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত। যাদের সম্পর্কে (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। এ কথাটির উপর তিনি খুব জোর দিলেন এবং বাক্যগুলো বারবার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বললেন। যারা মসজিদে ছিল তারা কাঁদতে লাগলো।একবার তিনি এক সিরিয়াবাসীকে বলেছিলেনঃ “তুমি কি সরায়ে আহযাবের আয়াতে তাতহীর তিলাওয়াত করেছো?” সে জবাব দিলো: “হ্যা। এর দ্বারা কি আপনাদেরকেই বুঝানো হয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ হ্যা। সে বললো: “আল্লাহ তা'আলা বড়ই স্নেহশীল, দয়াময়, সবজান্তা এবং সবকিছুরই খবর তিনি রাখেন। তিনি জানতেন যে, আপনারা তাঁর দয়া ও স্নেহলাভের যোগ্য। তাই তিনি আপনাদেরকে এ নিয়ামতগুলো দান করেছেন।” সুতরাং তাফসীরে ইবনে জারীরের বর্ণনা অনুযায়ী আয়াতের অর্থ হবেঃ “হে মুমিনদের মাতা ও নবী (সঃ)-এর স্ত্রীরা! তোমাদের উপর যে আল্লাহর নিয়ামত রয়েছে তা তোমরা স্মরণ কর। তিনি তোমাদেরকে এমন বাড়ীতে অবস্থান করতে দিয়েছেন যেখানে আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানের কথা পঠিত হয়। আল্লাহর এসব নিয়ামতের জন্যে তোমাদের তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। এখানে হিকমতের অর্থ হাদীস আল্লাহ তাআলা শেষ পরিণতিরও খবর রাখেন। তাই তিনি সঠিক ও পূর্ণ জ্ঞান দ্বারা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে থাকেন। নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জনকারিণী কারা হবেন তা তিনি নির্বাচন করেন। প্রকৃতপক্ষে এগুলোও তোমাদের উপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে বড় অনুগ্রহ। তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে অবহিত।
আল-আহযাব 33:34
৩২-৩৪ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় প্রিয়তম নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণীদেরকে আদব-কায়দা ও ভদ্রতা শিক্ষা দিচ্ছেন। সমস্ত স্ত্রীলোক তাদের অধীনস্থ। সুতরাং এই নির্দেশাবলী সমস্ত মুসলিম নারীর জন্যেই প্রযোজ্য। তিনি নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী-পত্নীরা! তোমরা অন্যান্য সাধারণ নারীদের মত নও। তাদের তুলনায় তোমাদের মর্যাদা অনেক বেশী। যদি তোমরা আল্লীহূকে ভয় কর তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয় এবং তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। স্ত্রীলোকদের পরপুরুষের সাথে কোমল সুরে ও লোভনীয় ভঙ্গিতে কথা বলা নিষিদ্ধ। সুমিষ্ট ভাষায় ও নরম সুরে শুধুমাত্র স্বামীর সাথে কথা বলা যেতে পারে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কোন জরুরী কাজকর্ম ছাড়া তোমরা বাড়ী হতে বের হবে না। মসজিদে নামায পড়তে যাওয়া শরয়ী প্রয়োজন। যেমন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর বাদীদেরকে আল্লাহ্র মসজিদে যেতে বাধা প্রদান করো না। কিন্তু তাদের উচিত যে, তারা বাড়ীতে যে সাদাসিধা পোশাক পরে থাকে ঐ পোশাক পরেই যেন মসজিদে গমন করে। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, স্ত্রীলোকদের জন্যে বাড়ীই উত্তম।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা স্ত্রীলোকেরা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! পুরুষ লোকেরা আল্লাহর পথে জিহাদের ফযীলত নিয়ে যায়। আমাদের জন্যে কি এমন আমল আছে যার দ্বারা আমরা আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের সমমর্যাদা লাভ করতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যারা নিজেদের বাড়ীতে (পর্দার সাথে) বসে থাকে (অথবা এ ধরনের কথা তিনি বললেন), তারা আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের আমলের মর্যাদা লাভ করবে। (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বায্যার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই স্ত্রীলোক পর্দার বস্তু। এরা যখন বাড়ী হতে বের হয় তখন শয়তান তাদের প্রতি ওঁৎ পেতে থাকে। তারা আল্লাহ্ তা'আলার খুব বেশী নিকটবর্তী হয় তখন যখন নিজেদের বাড়ীতে অবস্থান করে। (এ হাদীসটিও হাফিয আবু বকর আল বাযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)নবী (সঃ) বলেছেনঃ “নারীর অন্দর মহলের নামায তার বাড়ীর নামায হতে উত্তম এবং বাড়ীর নামায আঙ্গিনার নামায হতে উত্তম। (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অজ্ঞতার যুগে নারীরা বেপর্দাভাবে চলাফেরা করতো। ইসলাম এরূপ বেপর্দাভাবে চলাফেরা করাকে হারাম ঘোষণা করেছে। ভঙ্গিমা করে নেচে নেচে চলাকে ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দো-পাট্টা ও চাদর গায়ে দিয়ে চলাফেরা করতে হবে। তা গায়ে দিয়ে গলায় জড়িয়ে রাখা ঠিক নয়। যাতে গলা ও কানের অলংকার অন্যের নযরে না পড়ে সেভাবে গায়ে দিতে হবে। এগুলো অসত্য ও বর্বর যুগের নিয়ম-পদ্ধতি ছিল। যা এ আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত ইদরীস (আঃ)-এর মধ্যকার ব্যবধান ছিল এক হাজার বছর। এই মধ্যবর্তী যুগে হযরত আদম (আঃ)-এর দু’টি বংশ আবাদ ছিল। একটি পাহাড়ী এলাকায় এবং অপরটি সমতল ভূমিতে বসবাস করতো। পাহাড়ীয় অঞ্চলের পুরুষ লোকেরা চরিত্রবান ও সুন্দর ছিল এবং স্ত্রীলোকেরা ছিল কুৎসিত। পুরুষদের দেহের রং ছিল শ্যামল ও সুশ্রী। ইবলীস তাদেরকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে মানুষের রূপ ধারণ করে সমতল ভূমির লোকদের কাছে গেল। একটি লোকের গোলাম হয়ে তথায় থাকতে লাগলো। সেখানে সে বাঁশীর মত একটি জিনিস আবিষ্কার করলো এবং তা বাজাতে লাগলো। এই বশীর সুরে জনগণ খুবই মুগ্ধ হয়ে গেল এবং সেখানে ভীড় জমাতে শুরু করলো। এভাবে একদিন সেখানে মেলা বসে গেল। হাজার হাজার নারী-পুরুষ সেখানে একত্রিত হলো। আকস্মিকভাবে একদিন এক পাহাড়ী লোকও সেখানে পৌঁছে গেল। বাড়ী ফিরে গিয়ে সে নিজের লোকদের সামনে তাদের সৌন্দর্যের আলোচনা করতে লাগলো। তখন তারাও খুব ঘন ঘন সেখানে আসতে লাগলো। দেখাদেখির মাধ্যমে এদের নারীদের সাথে তাদের মেলামেশা বেড়ে গেল। সাথে সাথে ব্যভিচার ও অনান্য অসৎ কর্ম বেড়ে চললো। এভাবেই অসভ্যতা ও বর্বরতার পত্তন হলো। এ ধরনের কাজে বাধা দেয়ার পর কিছু কিছু নির্দেশাবলীর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। মহান আল্লাহ্ বলেনঃ আল্লাহর ইবাদত সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইবাদত হচ্ছে নামায। সুতরাং তোমরা নিয়মানুবর্তিতার সাথে নামায প্রতিষ্ঠিত করবে। অনুরূপভাবে আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ যাকাত প্রদান করতে হবে। এই বিশেষ আদেশ প্রদানের পর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তার ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করার নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো শুধু চান তোমাদের হতে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। এই আয়াতটি এটাই প্রমাণ করে যে, নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণীরা আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত। এ আয়াতটি তাঁদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। আয়াতের শানে নুযূল তো আয়াতের আদেশ-নিষেধ। মুতাবেক হয়ে থাকে। কেউ কেউ বলেন যে, আয়াতের বিষয়বস্তু তাদের উপর বর্তাবে যাদের শানে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা তো হবেই, তা ছাড়া তারাও এর অন্তর্ভুক্ত হবে যাদের ক্রিয়া-কলাপ এদের অনুরূপ হবে। দ্বিতীয় কথাটিই অধিকতর সঠিক। হযরত ইকরামা (রাঃ) বাজারে বাজারে বলে বেড়াতেনঃ “এ আয়াতটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীদের জন্যে বিশেষভাবে অবতীর্ণ হয়েছে।” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ কথা বলেছেন। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলতেনঃ “যদি কেউ এ ব্যাপারে মুকাবিলা করতে চায় তবে আমি মুকাবিলা করতে সদা প্রস্তুত।” এ আয়াতটি শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণীদের শানে অবতীর্ণ হয়েছে- একথার ভাবার্থ এই যে, এর শানে নুযূল অবশ্যই এটাই। যদি এর উদ্দেশ্য এই হয় যে, আহূলে বায়েতের সাথে অন্যান্যরাও জড়িত, তবে এখানে আবার প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে যে, এ আয়াতে বর্ণিত আহলে বায়েত ছাড়া অন্যান্যরাও শামিল রয়েছে।মুসনাদে আহমাদ ও জামেউত তিরমিযীতে উল্লিখিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফজরের নামাযের জন্যে বের হতেন তখন তিনি হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর দরযার নিকট গিয়ে বলতেনঃ “হে আহলে বায়েত! নামাযের সময় হয়ে গেছে। অতঃপর তিনি এই পবিত্র আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন। (ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান ও গারীব বলেছেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর এরূপ একটি হাদীসে সাত মাসের বর্ণনা রয়েছে) (এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী আবু দাউদ আমানাকী ইবনে হারিস চরম মিথ্যাবাদী। এ রিওয়াইয়াতটি সঠিক নয)শাদ্দাদ ইবনে আম্মার (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি একবার হযরত ওয়াসিলা ইবনে আসফা (রাঃ)-এর নিকট গেলাম। ঐ সময় সেখানে আরো কিছু লোক বসেছিল এবং হযরত আলী (রাঃ) সম্পর্কে আলোচনা চলছিল। তারা তাঁকে ভাল-মন্দ বলছিল। আমিও তাদের সাথে যোগ দিলাম। যখন তারা চলে গেল তখন হযরত ওয়াসিলা (রাঃ) বললেনঃ “তুমিও হযরত আলী (রাঃ) সম্পর্কে অসম্মানজনক মন্তব্য করলে?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যাঁ, আমি তাদের কথায় সমর্থন যোগিয়েছি মাত্র। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “তাহলে শুনো, আমি যা দেখেছি তা তোমাকে শুনাচ্ছি। একদা আমি হযরত আলী (রাঃ)-এর বাড়ী গিয়ে জানতে পারি যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে গিয়েছেন। আমি তার আগমনের অপেক্ষায় সেখানেই বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পরেই দেখি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আসছেন এবং তার সাথে হযরত আলী (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইনও (রাঃ) রয়েছেন। হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অঙ্গুলী ধরে ছিলেন। তিনি হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর সামনে বসলেন এবং নাতিদ্বয়কে কোলের উপর বসালেন। একখানা চাদর দ্বারা তাদেরকে আবৃত করলেন। অতঃপর এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ! এরাই আমার আহলে বায়েত। আর আমার আহলে বায়েতই বেশী হকদার।” অন্য রিওয়াইয়াতে নিম্নের কথাটুকু বেশী আছে যে, হযরত ওয়াসিলা (রাঃ) বলেন, আমি এ দেখে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও কি আপনার আহ্লে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত? উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, তুমিও আমার আহলে বায়েতেরই অন্তর্ভুক্ত।” হযরত ওয়াসিলা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর এই ঘোষণা আমার জন্যে বড়ই আশাব্যঞ্জক।”অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত ওয়াসিলা (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম এমন সময় হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) এবং হযরত হুসাইন (রাঃ) আসলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় চাদরখানা তাঁদের উপর ফেলে দিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়েত। হে আল্লাহ! তাদের হতে অপবিত্রতা দূরীভূত করুন এবং তাদেরকে পবিত্র করে দিন।” আমি বললামঃ আমিও কি? তিনি জবাব দিলেনঃ “হ্যা, তুমিও। নিশ্চয়ই তুমি কল্যাণের উপর রয়েছে।”হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমার ঘরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অবস্থান করছিলেন এমন সময় হযরত ফাতিমা (রাঃ) রেশমী কাপড়ের একটি পুঁটলিতে করে কিছু নিয়ে আসলেন। তিনি (নবী সঃ) বললেনঃ “তোমার স্বামীকে ও দুই শিশুকে নিয়ে এসো।” সুতরাং তারাও এসে গেলেন ও খেতে শুরু করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার বিছানায় ছিলেন। বিছানায় খায়বারের একটি উত্তম চাদর বিছানো ছিল। আমি কামরায় নামায পড়ছিলাম। এমন সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। তিনি চাদরের ভিতর থেকে হাত দুটি বের করলেন এবং আকাশের দিকে উঠিয়ে দু'আ করলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়েত ও আমার সাহায্যকারী। আপনি এদের অপবিত্রতা দূর করে দিন এবং এদেরকে পবিত্র করুন!” আমি আমার মাথাটি ঘর থেকে বের করে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও তো আপনাদের সবারই সাথে রয়েছি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, অবশ্যই। তুমি তো সদা কল্যাণের উপর রয়েছে। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) এ রিওয়াইয়াতের সনদে আতার নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং তিনি কি ধরনের বর্ণনাকারী সেটাও বলা হয়নি। অবশিষ্ট বর্ণনাকারীরা বিশ্বাসযোগ্য।অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “একদা আমার সামনে হযরত আলী (রাঃ)-এর আলোচনা শুরু হলো। আমি বললাম, আয়াতে তাতহীর তো আমার ঘরে অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট এসে বললেনঃ “কাউকেও এখানে আসার অনুমতি দেবে না।” অল্পক্ষণ পরেই হযরত ফাতিমা (রাঃ) আসলেন। কি করে আমি মেয়েকে তাঁর পিতার নিকট যেতে বাধা দিতে পারি? অতঃপর হযরত হাসান (রাঃ) আসলেন। কে নাতিকে তার নানার কাছে যেতে বাধা দেবে? তারপর হযরত হুসাইন (রাঃ)আসলেন। তাঁকেও আমি বাধা দিলাম না। এরপর হযরত আলী (রাঃ) আগমন করলেন। তাঁকেও আমি বাধা দিতে পারলাম না। তারা সবাই যখন একত্রিত হলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে চাদর দ্বারা আবৃত করলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়েত। সুতরাং আপনি এদের অপবিত্রতা দূর করে দিন এবং এদেরকে পবিত্র করুন!” ঐ সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন এঁদেরকে চাদর দ্বারা আবৃত করা হলো তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও কি এদের অন্তর্ভুক্ত? কিন্তু আল্লাহ জানেন, তিনি আমার এ প্রশ্নে সন্তোষ প্রকাশ করলেন না। তবে শুধু বললেনঃ “তুমি কল্যাণের দিকেই রয়েছে।”হাদীসের অন্য ধারাঃহযরত আতিয়্যাহ তাফাভী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) তার কাছে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার ঘরে ছিলেন। খাদেম খবর দিলো যে হযরত ফাতিমা (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) এসেছেন। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “একটু সরে যাও, আমার আহলে বায়েত এসেছে।” একথা শুনে আমি ঘরের এক কোণে সরে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) শিশুদ্বয়কে কোলে নিলেন ও আদর করলেন। একটি হাত তিনি হযরত আলী (রাঃ)-এর উপর রাখলেন এবং আর একটি হাত রাখলেন হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর ঘাড়ের উপর। অতঃপর উভয়কেই তিনি স্নেহ করলেন। তারপর একটি কালো রং এর চাদর সকলের উপর বিছিয়ে দিয়ে তাঁদেরকে আবৃত করলেন। এরপর তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ! আমি আপনার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছি, আগুনের দিকে নয়। এরাও আমার আহলে বায়েত।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ আমিও কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, তুমিও। (এ বর্ণনাটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)অন্য ধারাঃহযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (আরবি) -এ আয়াতটি আমার বাড়ীতে অবতীর্ণ হয়েছে। আমি ঘরের দরজায় বসেছিলাম এমতাবস্থায় আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কি আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত নই? জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি কল্যাণের উপর রয়েছে এবং তুমি নবী (সঃ)-এর স্ত্রীদের একজন।” ঐ সময় আমার বাড়ীতে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) অবস্থান করছিলেন।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য ধারাঃহযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে একত্রিত করেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে তার কাপড়ের নীচে প্রবিষ্ট করেন। অতঃপর তিনি মহামহিমান্বিত আল্লাহকে বলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহ্লে বায়েত।” তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। তিনি তখন বললেনঃ “তুমিও আমার পরিবারের একজন।”অন্য হাদীসঃ হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা সকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কালো চাদর গায়ে দিয়ে বের হলেন। অতঃপর পর্যায়ক্রমে হযরত হাসান (রাঃ), হযরত হুসাইন (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) আসলেন। সকলকেই তিনি তার ঐ চাদরের মধ্যে প্রবিষ্ট করলেন। তারপর তিনি (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য ধারাঃহযরত ইবনে হাওশিব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর চাচাতো ভাই হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, একদা আমি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট গমন করে তাঁকে হযরত আলী (রাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তখন তিনি বলেনঃ তুমি আমাকে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছো যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি। তার বাড়ীতেই তাঁর প্রিয়তমা কন্যা ছিলেন। যিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সবচেয়ে বেশী ভালবাসার পাত্রী আমি অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখেছি যে, তিনি হযরত আলী (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-কে আহ্বান করেন। অতঃপর তিনি তাঁদের উপর কাপড় নিক্ষেপ করেন এবং বলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়েত। সুতরাং আপনি তাদের থেকে অপবিত্রতা দূরীভূত করুন এবং তাদেরকে পবিত্র করে দিন!” আমি তখন তাদের নিকটবর্তী হলাম। অতঃপর বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমিও কি আপনার আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত? তিনি জবাবে বললেনঃ “নিশ্চয়ই, জেনে রেখো যে, তুমি কল্যাণের উপর রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য হাদীসঃ হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) এ আয়াতটি আমাদের পাঁচজনের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ আমি, হযরত আলী (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ), হযরত হুসাইন (রাঃ) এবং হযরত ফাতিমা (রাঃ)।” অন্য সনদে এটা হযরত আবু সাঈদ (রাঃ)-এর নিজস্ব উক্তিরূপে বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী ।হযরত সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অহী অবতীর্ণ হয় তখন তিনি হযরত আলী (রাঃ), তাঁর দুই ছেলে এবং হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে ধরে তাঁর কাপড়ের নীচে প্রবিষ্ট করেন। অতঃপর বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! এরা আমার আহলে বায়েত।" (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইয়াযীদ ইবনে হিব্বান (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি, হুসাইন ইবনে সাবরা (রঃ) এবং হযরত উমার ইবনে সালমা (রঃ) হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ)-এর নিকট গমন করি। আমরা তাঁর কাছে উপবেশন করলে হযরত হুসাইন (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে যায়েদ (রাঃ)! আপনি তো বহু কল্যাণ লাভ করেছেন। আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখেছেন, তাঁর হাদীস শুনেছেন, তার সাথে যুদ্ধ করেছেন এবং তার পিছনে নামায পড়েছেন। সুতরাং হে যায়েদ (রাঃ)! আপনি বহু কল্যাণ ও মঙ্গল লাভ করেছেন! হে যায়েদ (রাঃ)! আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে যা শুনেছেন তা আমাদের নিকট বর্ণনা করুন।” তিনি তখন বললেন, হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! আল্লাহর কসম! এখন আমার বয়স খুব বেশী হয়ে গেছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যমানা দূরে চলে গেছে, যা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি তার কিছু কিছু বিস্মরণ হয়েছি। এখন আমি তোমাকে যা বলি তাই কর এবং তা মেনে নাও আমাকে তুমি এ ব্যাপারে কষ্ট দিয়ো না। শুনো, মক্কা ও মদীনার মাঝখানে একটি পানির জায়গা রয়েছে যার নাম ‘খাম'। সেখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে ভাষণ দান করেন। তিনি বলেনঃ “আমি একজন মানুষ। খুব সম্ভব আমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে আমার নিকট একজন দূত আগমন করবেন। আমি যেন তার কথা মেনে নিই। আমি তোমাদের কাছে দু'টি বস্তু ছেড়ে যাচ্ছি। একটি হলো আল্লাহর কিতাব, যাতে হিদায়াত ও জ্যোতি রয়েছে। তোমরা আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ কর ও ওকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর।” অতঃপর তিনি আল্লাহর কিতাবের দিকে আমাদের দৃষ্টি পূর্ণভাবে আকর্ষণ করলেন। তারপর তিনি বললেনঃ “আমার আহলে বায়েতের ব্যাপারে আমি আল্লাহর কথা তোমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি ।” তিনবার তিনি একথার পুনরাবৃত্তি করলেন। তখন হুসাইন (রঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে যায়েদ (রাঃ)! আহলে বায়েত কারা? তাঁর স্ত্রীরা কি আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত নন?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “তাঁর স্ত্রীরাও আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত বটে, তবে তার আহ্ল তাঁরা যাদের উপর তার পরে সাদকা হারাম।” আবার তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কারা?' জবাবে তিনি বললেনঃ “তারা হলেন হযরত আলী (রাঃ)-এর বংশধর, হযরত আকীল (রাঃ)-এর বংশধর ও হযরত আব্বাস (রাঃ)-এর বংশধর।” তাকে প্রশ্ন করা হলো: “এঁদের সবারই উপর কি সাদকা হারাম?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যা। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)অন্য সনদে বর্ণনা করা হয়েছেঃ আমি জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরাও কি আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত? তিনি জবাব দিলেনঃ “না। আল্লাহর কসম! স্ত্রীরা তো দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর সাথে অবস্থান করে। কিন্তু যদি স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দেয় তবে সে তার পিত্রালয়ের সদস্যা ও নিজ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আহলে বায়েত হবে তাঁর মূল ও আসাবা।. যেসব ওয়ারিশের অংশ নির্ধারিত থাকে না, বরং যাদের অংশ নির্ধারিত রয়েছে তাদের অংশ নেয়ার পর বাকী অংশ যারা পায় তাদেরকেই ফারায়েযের পরিভাষায় আসাবা বলা হয়। তার পরে তাদের উপর সাদকা হারাম।” এ রিওয়াইয়াতে এ রকমই আছে। কিন্তু প্রথম রিওয়াইয়াতটিই বেশী গ্রহণযোগ্য। আর দ্বিতীয়টিতে রয়েছে তার উদ্দেশ্য হলো শুধু ঐ আহলে বায়েত যাদের কথা হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে। কেননা সেখানে ঐ (আরবি) উদ্দেশ্য যাদের উপর সাদকা হারাম। কিংবা এটাই যে, উদ্দেশ্য শুধু স্ত্রীরাই নয়, বরং তারাসহ তার অন্যান্য (আরবি)-ও উদ্দেশ্য। এ কথাটিই বেশী যুক্তিযুক্ত। এর দ্বারা এ বর্ণনা ও পূর্ববর্তী বর্ণনার মধ্যে সমন্বয় সাধিত হচ্ছে। কুরআন ও পূর্ববর্তী হাদীসগুলোর মধ্যেও সমন্বয় হয়ে যাচ্ছে। তবে তখনই তা সম্ভব হবে যখন এ হাদীসগুলোকে সহীহ বলে মেনে নেয়া হবে। কেননা, এগুলোর কোন কোন সনদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে।যে ব্যক্তি মারেফাতের জ্যোতি লাভ করেছে এবং যাদের কুরআন কারীম সম্পর্কে গবেষণা করার অভ্যাস আছে তারা এক দৃষ্টিতেই এটা অবশ্যই জানতে পারবে যে, নবী (সঃ)-এর স্ত্রীরাও নিঃসন্দেহে এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। কেননা, উপর হতেই প্রসঙ্গটি তাদের সম্পর্কে এবং তাঁদের ব্যাপারেই চলে আসছে। এরপরে মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেনঃ আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানের কথা, যা তোমাদের গৃহে পঠিত হয় তা তোমরা স্মরণ রাখবে; আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে অবহিত। সুতরাং হযরত কাতাদা (রঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি হিসেবে আল্লাহর আয়াত ও হিকমত দ্বারা কিতাব ও সুন্নাতকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং এটা একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য যা তাঁরা ছাড়া আর কেউই লাভ করতে পারেনি। তা এই যে, তাঁদের গৃহেই আল্লাহর অহী ও রহমতে ইলাহী অবতীর্ণ হয়ে থাকে। আর তাঁদের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) সবচেয়ে বেশী লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কেননা, হাদীসে পরিষ্কারভাবে উল্লিখিত হয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বিছানা ছাড়া আর কারো বিছানায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অহী আসেনি। এটা এ কারণেই যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) ছাড়া অন্য কোন কুমারী নারীকে বিয়ে করেননি। তাঁর বিছানা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছাড়া আর কারো জন্যে ছিল না। সুতরাং তিনি সঠিকভাবেই এই উচ্চ মর্যাদার অধিকারিণী ছিলেন। হ্যা, তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণীরাই যখন তাঁর আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত তখন তাঁর নিকটাত্মীয়গণ স্বাভাবিকভাবেই তাঁর আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত হবেন। যেমন হাদীসে গত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার আহ্বালে বায়েত সবচেয়ে বেশী হকদার।” সহীহ মুসলিমে যে হাদীসটি এসেছে এটা ওর সঙ্গে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যখন (আরবি) মসজিদ যার ভিত্তি প্রথম দিন হতেই তাকওয়ার উপর স্থাপিত) (৯:১০৮) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় তখন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “ওটা আমার এই মসজিদ।" কথাটি মসজিদে কুবা সম্বন্ধে বলা হয়েছে। হাদীসে এটা পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু সহীহ্ মুসলিমে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো: “এই মসজিদ বলতে কোন মসজিদকে বুঝানো হয়েছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমার মসজিদ অর্থাৎ মসজিদে নববী (সঃ)।” সুতরাং যে মর্যাদা মসজিদে কুবার ছিল সে মর্যাদা মসজিদে নববীরও (সঃ) রয়েছে। এ জন্যে এই মসজিদকেও ঐ নামের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর শাহাদাতের পর হযরত হাসান (রাঃ)-কে খলীফা নির্বাচন করা হলো। তিনি ঐ সময় নামায পড়ছিলেন। বানী আসাদের গোত্রভুক্ত এক ব্যক্তি হঠাৎ এসে পড়লো এবং সিজদারত অবস্থায় তাঁকে ছুরি মেরে দিলো। ছুরিটি তাঁর গোশতের উপর লাগলো। কয়েক ঘন্টা মাত্র তিনি শয্যাগত থাকলেন। যখন একটু সুস্থ হলেন তখন তিনি মসজিদে এলেন এবং মিম্বরের উপর বসে বসে খুৎবা পাঠ করলেন ও বললেনঃ “হে ইরাকবাসী! আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। আমি তোমাদের নেতা ও তোমাদের মেহমান। আমি আহলে বায়েতের অন্তর্ভুক্ত। যাদের সম্পর্কে (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। এ কথাটির উপর তিনি খুব জোর দিলেন এবং বাক্যগুলো বারবার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বললেন। যারা মসজিদে ছিল তারা কাঁদতে লাগলো।একবার তিনি এক সিরিয়াবাসীকে বলেছিলেনঃ “তুমি কি সরায়ে আহযাবের আয়াতে তাতহীর তিলাওয়াত করেছো?” সে জবাব দিলো: “হ্যা। এর দ্বারা কি আপনাদেরকেই বুঝানো হয়েছে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ হ্যা। সে বললো: “আল্লাহ তা'আলা বড়ই স্নেহশীল, দয়াময়, সবজান্তা এবং সবকিছুরই খবর তিনি রাখেন। তিনি জানতেন যে, আপনারা তাঁর দয়া ও স্নেহলাভের যোগ্য। তাই তিনি আপনাদেরকে এ নিয়ামতগুলো দান করেছেন।” সুতরাং তাফসীরে ইবনে জারীরের বর্ণনা অনুযায়ী আয়াতের অর্থ হবেঃ “হে মুমিনদের মাতা ও নবী (সঃ)-এর স্ত্রীরা! তোমাদের উপর যে আল্লাহর নিয়ামত রয়েছে তা তোমরা স্মরণ কর। তিনি তোমাদেরকে এমন বাড়ীতে অবস্থান করতে দিয়েছেন যেখানে আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানের কথা পঠিত হয়। আল্লাহর এসব নিয়ামতের জন্যে তোমাদের তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। এখানে হিকমতের অর্থ হাদীস আল্লাহ তাআলা শেষ পরিণতিরও খবর রাখেন। তাই তিনি সঠিক ও পূর্ণ জ্ঞান দ্বারা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে থাকেন। নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জনকারিণী কারা হবেন তা তিনি নির্বাচন করেন। প্রকৃতপক্ষে এগুলোও তোমাদের উপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে বড় অনুগ্রহ। তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে অবহিত।
আল-আহযাব 33:35
উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কুরআন কারীমে আল্লাহ তা'আলা পুরুষদের কথা উল্লেখ করেছেন, আর আমরা স্ত্রীলোক, আমাদের কথা উল্লেখ করা হয়নি কেন?" হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “একদিন আমি আমার ঘরে বসে আমার মাথার যত্ন করছিলাম এমন সময় মিম্বর হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শব্দ শুনতে পেলাম। তখন আমি আমার চুলগুলো ঐ অবস্থায় জড়িয়ে নিলাম এবং কক্ষে বসে তার কথাগুলো শুনতে লাগলাম। ঐ সময় তিনি মিম্বরে পাঠ করছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আল্লাহ বলেনঃ অবশ্য আত্মসমর্পণকারী পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারিণী নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিনা নারী।” (হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদের বর্ণনা করেছেন। অন্য ধারায় ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, কতিপয় স্ত্রীলোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ কথা বলেছিলেন।আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, স্ত্রীলোকেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীদেরকে একথা বলেছিলেন। ইসলাম ও ঈমানকে পৃথক পৃথকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, এর দ্বারা তো প্রমাণিত হচ্ছে যে, ঈমান ইসলাম হতে পৃথক এবং ঈমান ইসলাম হতে বিশিষ্টতর। কেননা, মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আরব মরুবাসীরা বলেঃ আমরা ঈমান আনলাম। (হে মুহাম্মাদ সঃ) তুমি বলঃ তোমরা ঈমান আননি, বরং তোমরা বলঃ আমরা আত্মসমর্পণ করেছি। কারণ ঈমান এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি।” (৪৯:১৪) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ব্যভিচারী ব্যভিচার করার সময় মুমিন থাকে না। আবার এ বিষয়ের উপর সবাই একমত যে, ব্যভিচার দ্বারা মানুষ প্রকৃত কাফের হয়ে যায় না। এটা একটা দলীল যা আমি শরহে বুখারীতে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রমাণ করেছি।শব্দের অর্থ হলো শান্তভাবে আনুগত্য করা। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “ঐ ব্যক্তি কি যে রাত্রিকালে আনুগত্যকারী হয় সিজদাকারী ও দণ্ডায়মানরূপে, আখিরাতকে ভয় করে এবং তার প্রতিপালকের করুণার আশা রাখে?” (৩৯:৯) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে যারা রয়েছে সবাই তার অনুগত।” (৩০:২৬) আরো একটি জায়গায় মহান আল্লাহ বলেন (আরবি)অর্থাৎ “হে মারইয়াম (আঃ)! তোমার প্রতিপালকের অনুগত হও ও সিজদা কর এবং যারা রুকূ' করে তাদের সাথে রুকূ' কর।” (৩:৪৩) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা আনুগত্যের অবস্থায় আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হও।” (২:২৩৮) অতএব বুঝা গেল যে, ঈমানের মর্যাদা ইসলামের উপরে। উভয়ের একত্র মিলনে মানুষের ভিতরে আনুগত্যের শক্তি বৃদ্ধি পায়। সত্য কথা বলা আল্লাহ তাআলার নিকট অত্যন্ত প্রিয়। আর এ অভ্যাস সর্বাবস্থাতেই প্রশংসনীয়। সাহাবীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বোত্তম ব্যক্তি যিনি অজ্ঞতার যুগেও কখনো মিথ্যা কথা বলেননি। সত্যবাদিতা ঈমানের একটি লক্ষণ। সত্যবাদী লোক পরিত্রাণ পেয়ে থাকে। মানুষের উচিত সব সময় সত্য কথা বলা। সত্যবাদিতা মানুষকে সৎ কাজের ও জান্নাতের পথ প্রদর্শন করে। মিথ্যা কথা বলা পরিহার করা উচিত। মিথ্যাবাদিতা মানুষকে অসৎ কাজ এবং ফিক ও ফুজুরের পথ দেখিয়ে থাকে। আর ফিসক ও ফুজুর মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। সত্যবাদী লোক যখন সব সময় সত্য কথা বলে, সত্য কাজের প্রচেষ্টা চালায় তখন তার নামটি সিদ্দীকের খাতায় লিপিবদ্ধ হয়। পক্ষান্তরে মিথ্যাবাদী লোক সব সময় মিথ্যা কথা বলে ও মিথ্যার প্রচেষ্টা চালায় বলে তার নামটি আল্লাহ তা'আলা মিথ্যাবাদীদের খাতায় লিপিবদ্ধ করেন। এ সম্বন্ধে বহু হাদীস রয়েছে।সবর বলা হয় বিপদে-আপদে দৃঢ়ভাবে ধৈর্যধারণ করাকে। তাকদীরের সাথে জড়িয়ে সবরকে লিখার কোন দলীল আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে কঠিন সবর বলা হয় মানসিক আঘাতের প্রাথমিক অবস্থায় দৃঢ়ভাবে ধৈর্যধারণ করাকে। আল্লাহ তা'আলার কাছে এর প্রতিদান অত্যন্ত বেশী। অতঃপর যখন ধীরে ধীরে সময় অতিবাহিত হয় তখন সবর আপনা আপনিই এসে যায়।(আরবি)-এর অর্থ হলো শান্তি, সন্তুষ্টি ও অনুরোধ। মানুষের মনে যখন আল্লাহর ভয় বিরাজ করে তখন মানুষের মনে এটা আপনা আপনিই এসে পড়ে। যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলাকে সব জায়গায় চির বিরাজমান বলে বিশ্বাস করে তার অন্তরে এটা প্রবেশ করে। তখন সে এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করে যে, যেন সে স্বয়ং আল্লাহকে দেখছে। আল্লাহকে দেখছে এ ধারণা যদি করতে না পারে তবে অবশ্যই এটা মনে করে যে, আল্লাহ তা'আলা তাকে নিশ্চয়ই দেখছেন।সাদকা বলা হয় সেই দানকে যা গরীব-দুঃখীকে দেয়া হয়, যাদের আয়-উপার্জন করার কোন ক্ষমতা নেই। এ ধরনের লোককে নিজের প্রয়োজন। অপূর্ণ রেখে দান করাকেই সাদকা বলে। এ নিয়তে দান করলে এটা আল্লাহর আনুগত্য বলে বিবেচিত হবে। এর ফলে তার সৃষ্টজীব উপকৃত হয়ে থাকে।হাদীসে আছে যে, কিয়ামতের দিন সাত প্রকারের লোককে আল্লাহ তা'আলা তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন যেই দিন তাঁর (আরশের) ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না। এই সাত প্রকারের মধ্যে একটি এও আছে যে, সে যা কিছু দান-খয়রাত করে তা এতো গোপনে করে যে, তার দক্ষিণ হস্ত যা দান করে বাম হস্ত তা জানতে পারে না। হাদীসে আরো বর্ণিত হয়েছে যে, সাদকা দোষগুলোকে মুছে দেয় যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। এ বিষয়ের উপর আরো বহু হাদীস রয়েছে যেগুলো স্ব-স্ব স্থানে বর্ণিত হয়েছে। রোযা সম্বন্ধে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এটা শরীরের যাকাত অর্থাৎ এর দ্বারা শরীর পবিত্র ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়। আর এটা মন্দ স্বভাবকে পরিবর্তন করে দেয়।হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি রমান মাসের রোযা রাখার পর প্রত্যেক মাসে তিনটি করে রোযা রাখে সে আসসায়েমূন ও আসসায়েমাতের অন্তর্ভুক্ত। রোযা কাম-শক্তিকে প্রশমিত করে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে যুবকের দল! তোমাদের মধ্যে যারা শক্তিশালী। তারা যেন বিয়ে করে নেয়। যাতে তোমাদের দৃষ্টি নিম্নমুখী হয় এবং তোমরা পবিত্রতা অর্জন করতে পার। আর যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে না তারা যেন রোযা রাখে। এটা তার জন্যে খাসি হওয়ার সমতুল্য।” এ জন্যে রোযার বিধানের সাথে সাথে মন্দ কর্ম হতে বাঁচবার পথ দেখানো হয়েছে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং যারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে তাদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্র ব্যতীত, এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। তবে কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তারা হবে সীমালংঘনকারী।” (২৩:৫-৭)(আরবি) (আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও অধিক স্মরণকারী নারী)- হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি রাত্রে জাগ্রত হয় এবং স্বীয় স্ত্রীকে জাগায়, অতঃপর দু'রাকাত নামায পড়ে নেয়, ঐ রাত্রে তারা দুজন (আরবি)-এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রাঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি কে হবে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “অত্যধিক যিকরকারী ব্যক্তি। তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মুজাহিদের চেয়েও কি বেশী?” জবাবে তিনি বললেনঃ “যদিও মজাহিদ কাফিরের উপর তরবারী চালনা করতে করতে তরবারী ভেঙ্গে ফেলে, আর সে রক্তে রঞ্জিত হয়ে পড়ে তবুও আল্লাহর যিকরকারীর মর্যাদা তার চেয়ে বেশী।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কার পথ দিয়ে চলছিলেন। জামদান নামক স্থানে পৌঁছে তিনি বললেনঃ “এ জায়গাটি জামদান। সামনে চলতে থাকে, কারণ মুফরাদুনরা অগ্রগামী হয়েছে।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “মুফরাদুন কারা?" জবাবে তিনি বললেনঃ “আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও নারীরা।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদেরকে ক্ষমা করে দিন।” জনগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যারা চুল ছেটে ফেলেছে তাদের জন্যেও দুআ করুন!” এবারও তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদেরকে আপনি ক্ষমা করুন!" জনগণ পুনরায় বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যারা চুল হেঁটে ফেলেছে তাদের জন্যেও ক্ষমা প্রার্থনা করুন!” এবার তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ! যারা মাথার চুল ছেটেছে তাদেরকেও ক্ষমা করে দিন! (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর আযাব হতে রক্ষা পাওয়ার বড় হাতিয়ার আল্লাহর যিকর ছাড়া আর কিছুই নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)একবার তিনি বললেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে উত্তম, সবচেয়ে পবিত্র এবং সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন আমলের কথা বলে দিবো না যা তোমাদের জন্যে আল্লাহর পথে স্বর্ণ ও রৌপ্য লুটিয়ে দেয়ার চেয়ে উত্তম? আর তোমরা শত্রুদের মুকাবিলা করবে, তাদের গর্দান দ্বিখণ্ডিত করবে এবং তারাও তোমাদের গর্দান দ্বিখণ্ডিত করবে এর চেয়েও উত্তম? সাহাবীগণ সমস্বরে উত্তর দিলেনঃ “হ্যা, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) (আমাদেরকে এই খবর দিন)!” তিনি তখন বললেনঃ “তোমরা মহামহিমান্বিত আল্লাহর যিকর কর।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আনাস আল জুনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ “কোন ধরনের মুজাহিদ বড় পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহর যিকরকারী (সেই সবচেয়ে বড় পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য)।" লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করেঃ “কোন রোযাদার বেশী পুণ্য লাভের যোগ্য?” জবাবে রাসূলুল্লাহ বললেনঃ “যে মহামহিমান্বিত আল্লাহর অধিক যিকরকারী।” তারপর লোকটি নামায, যাকাত, হজ্ব এবং দান-খয়রাতের ব্যাপারেও জিজ্ঞেস করে এবং প্রত্যেকটির ব্যাপারেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহর যিকরকারী (সেই সবচেয়ে বড় পুণ্য লাভের যোগ্য)।” তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে বললেনঃ “তাহলে তো যিকরকারীরাই সমস্ত কল্যাণ ও পুণ্য নিয়ে গেল?” তাঁর এ প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “হ্যাঁ, অবশ্যই।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)অধিক যিকর সম্পর্কে বাকী যে হাদীসগুলো রয়েছে তা আমরা ইনশাআল্লাহ এই সূরার নিম্নের আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করবো। আয়াতটি হলো: (আরবি) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে এবং সকালসন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে।মহান আল্লাহর উক্তি: এদের জন্যে আল্লাহ রেখেছেন ক্ষমা ও মহা প্রতিদান। অর্থাৎ উল্লিখিত গুণ বিশিষ্ট লোকদের প্রতিদান সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, এই সমুদয় গুণের অধিকারী লোকদের পাপসমূহ তিনি ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদের জন্যে রেখেছেন তিনি মহা প্রতিদান এবং ওটা হলো জান্নাত।
আল-আহযাব 33:36
রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ)-এর পয়গাম নিয়ে হযরত যয়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ)-এর কাছে হাযির হন। তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমি তাকে বিয়ে করবো না।” তিনি বললেনঃ “এমন কথা বলো না, বরং তার সাথে বিবাহিতা হয়ে যাও।” হযরত যয়নাব (রাঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, আমাকে কিছু সময় দিন, আমি একটু চিন্তা-ভাবনা করে দেখি।” এ ধরনের কথাবার্তা চলছে এমন সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়ে গেল। এটা শুনে হযরত যয়নাব (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি এ বিয়েতে সম্মত আছেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা।” তখন হযরত যয়নাব (রাঃ) বললেনঃ “তাহলে আমারও কোন আপত্তি নেই। আমি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা করবো না। আমি তাকে আমার স্বামী হিসেবে বরণ করে নিলাম।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, বংশ মর্যাদার দিক থেকে হযরত যয়নাব (রাঃ) হযরত যায়েদ (রাঃ)-এর ঊর্ধে ছিলেন। হযরত যায়েদ (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আযাদকৃত গোলাম।হযরত আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রাঃ) বলেছেন যে, এ আয়াতটি উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা ইবনে আবি মুঈত (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর সর্বপ্রথম মুহাজির মহিলা ছিলেন ইনিই। তিনি নবী (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “আমি আমার নফসকে আপনার নিকট হিবা করলাম।” তিনি উত্তরে বললেনঃ “বেশ, আমি তা কবূল করলাম। অতঃপর তিনি হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ)-এর সাথে তাঁর বিয়ে দিয়ে দিলেন। খুব সম্ভব হযরত যয়নাব (রাঃ) হতে পৃথক হওয়ার পর এ বিয়ে সংঘটিত হয়েছিল। হযরত উম্মে কুলসূম (রাঃ) এ বিয়েতে অসম্মত হলেন এবং তাঁর ভাইও অমত প্রকাশ করলেন। কারণ তাদের ইচ্ছা ছিল স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বিয়ে দেয়ার, তার গোলামের সাথে নয়। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং ব্যাপারটি আরো পরিষ্কার করে দিয়ে বলা হয়ঃ (আরবি)অর্থাৎ “নবী (সঃ) মুমিনদের সাথে তাদের নফসের চেয়েও অধিক। সম্পর্কযুক্ত।” (৩৩:৬) সুতরাং (আরবি) আয়াতটি (আরবি) বা বিশিষ্ট এবং এর চেয়েও ব্যাপক আয়াত এইটি। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একজন আনসারীকে বললেনঃ “তুমি জালবীব (রাঃ)-এর সাথে তোমার কন্যার বিয়ে দিয়ে দাও।” তিনি জবাবে বললেনঃ “ঠিক আছে, আমি তার মায়ের সাথে একটু পরামর্শ করে নিই।” তিনি তাঁর সাথে পরামর্শ করলেন এবং তাঁর স্ত্রী বললেনঃ “না, হবে না। কারণ তার চেয়ে বড় বড় অমুক অমুক লোকের পয়গাম ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। আর আজ নাকি জালবীব (রাঃ)-এর সাথে বিয়ে দিবো?” আনসারী স্ত্রীর কথা শুনে নবী (সঃ)-এর কাছে যাবেন এমন সময় তার মেয়ে পর্দার আড়াল থেকে সব কথা শুনলো এবং বললো: “তোমরা নবী (সঃ)-এর কথা মানবে না? তিনি যখন এ বিয়েতে খুশী তখন তোমাদের এ পয়গাম রদ করা ঠিক হবে না।” তখন তারা উভয়ে বললেনঃ “মেয়ে ঠিক কথাই বলেছে। এ বিয়ের মাধ্যম যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং তখন এতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা তাঁকে অমান্য করারই শামিল। তাঁর এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা মোটেই ঠিক নয়। সুতরাং আনসারী সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললেনঃ “এ বিয়েতে আপনি খুশী আছেন তো?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আমি এ বিয়েতে খুশী ও সম্মত আছি।” তখন আনসারী বললেনঃ “তাহলে আপনার যা ইচ্ছা তাই হালে। আপনি বিয়ে দিয়ে দিন।” সুতরাং বিয়ে হয়ে গেল।একদা মদীনার মুসলমানরা শত্রুর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। এ যুদ্ধে হযরত জালবীব (রাঃ) শহীদ হয়ে যান। তিনি বহু কাফিরকে হত্যা করেছিলেন যাদের মৃতদেহ তাঁরই পার্শ্বে পড়েছিল। হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি দেখেছি যে, তাঁর বাড়ী সদা আনন্দমুখর থাকতো। সারা মদীনায় তার মত খরচকারী লোক আর ছিল না।” অন্য রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, হযরত আবু বারযাহ আসলামী (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ “হযরত জালবীব (রাঃ) বড়ই আমোদী লোক ছিলেন। এ জন্যে আমি আমার বাড়ীর লোকদেরকে বলে দিয়েছিলামঃ “এ লোকটি যেন তোমাদের কাছে আসে। আনসারীদের অভ্যাস ছিল এই যে, তারা কোন স্ত্রী লোককে বিয়ে করতেন না যে পর্যন্ত না তারা জানতে পারতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার সম্পর্কে কিছু বলেননি।” অতঃপর এ ঘটনাটি শুনালেন যা উপরে বর্ণিত হলো। তাতে একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত জালবীব (রাঃ) এ যুদ্ধে সাতজন কাফিরকে হত্যা করেছিলেন। অতঃপর কাফিররা তাঁকে ভীড়ের মধ্যে হত্যা করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর মৃতদেহ খুঁজতে খুঁজতে তার কাছে পৌঁছলেন। তাঁকে দেখে তিনি বললেনঃ “এ ব্যক্তি সাতজন কাফিরকে হত্যা করে শহীদ হয়েছে। এ আমার এবং আমি তার।” তিনি দু’বার বা তিনবার একথাটি বললেন। অতঃপর কবর খনন করিয়ে নিজ হাতে তাঁকে তিনি কবরে নামালেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র হাতই ছিল তাঁর জানাযা। অন্য কোন খাট-খাটুলী ছিল না। তাঁকে গোসল দেয়া ইত্যাদির কোন উল্লেখ নেই। আর যে সতী-সাধ্বী মহিলাটি তাঁর পিতা-মাতাকে বুঝিয়েছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা যাবে না, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জন্যে দু'আ করেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি এ মহিলার উপর করুণা বর্ষণ করুন! তার জীবনের যাবতীয় স্বাদ পূর্ণ করে দিন!” সমস্ত আনসারীর মধ্যে তাঁর ন্যায় অধিক খরচকারিণী আর কেউ ছিল যখন সে পর্দার আড়াল থেকে পিতা-মাতাকে উপরোক্ত কথা বলেছিল ঐ সময় (আরবি) এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল। হযরত তাউস (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আসরের নামাযের পর দু'রাকাত (নফল) নামায পড়া যায় কি?” উত্তরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) নিষেধ করেন এবং(আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করেন। সুতরাং এ আয়াতটি শানে নুযূলের দিক দিয়ে বিশিষ্ট হলেও হুকুমের দিক দিয়ে সাধারণ। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর নির্দেশ থাকা অবস্থায় না কেউ ঐ হুকুমের বিরোধিতা করতে পারে, না ওটা মানা বা না মানার কারো কোন অধিকার থাকতে পারে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কিন্তু না, তোমাদের প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচারভার তোমার উপর অর্পণ করে; অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না। থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে না নেয়।” (৪:৬৫)।হাদীসে এসেছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদের মধ্যে কেউ মুমিন হতে পারে না যে পর্যন্ত না তার প্রবৃত্তি আমি যা নিয়ে আগমন করেছি তার অনুগত হয়। যারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা করে তারা প্রকাশ্যে পাপী। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অমান্য করলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।” যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যারা নবী (সঃ)-এর আদেশের বিরোধিতা করে তাদের উপর কোন বিপদ আপতিত হয় অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এসে পড়ে এর থেকে তাদের সতর্ক থাকা ও ভয় করা উচিত।” (২৪:৬৩)
আল-আহযাব 33:37
আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় আযাদকৃত গোলাম হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ)-কে বিশেষভাবে বুঝিয়েছেন। তার উপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ মেহেরবানী ছিল। তাঁকে তিনি ইসলাম ও নবী (সঃ)-এর অনুসরণ করার তাওফীক দান করেছিলেন। তাঁর প্রতি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিশেষ আকর্ষণ ছিল। তাঁকে তিনি গোলামী হতে মুক্তি দান করেছিলেন। তিনি বড়ই জাঁকজমকপূর্ণ লোক ছিলেন। তিনি(আরবি) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। এমন কি সমস্ত মুসলমান তাঁকে রাসূলের প্রিয়’ নামে আখ্যায়িত করেছিলেন। তাঁর পুত্র হযরত উসামা (রাঃ)-কে (আরবি) ‘প্রিয়ের প্রিয়’ নামে সবাই সম্বোধন করতেন। হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, কোন স্থানে সৈন্য পাঠালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকেই দলের নেতা মনোনীত করতেন। যদি তিনি শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতেন তবে তাকেই হয়তো তিনি তাঁর খলীফা নিযুক্ত করে যেতেন।হযরত উসামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি এক সময় মসজিদে অবস্থান করছিলাম এমন সময় আমার কাছে হযরত আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) আসলেন ও বললেনঃ “যান, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে আমাদের জন্যে অনুমতি নিয়ে আসেন।” আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ খবর দিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কি জন্যে এসেছে তা তুমি জান কি?" আমি উত্তর দিলামঃ জ্বি না। তখন তিনি বললেনঃ “আমি কিন্তু জানি। যাও, তাদেরকে ডেকে আনো।” তাঁরা এলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বলুন তো, আপনার পরিবারে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে? তিনি জবাবে বললেনঃ “আমার কন্যা ফাতিমা (রাঃ)। তাঁরা বললেনঃ “আমরা হযরত ফাতিমা (রাঃ) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করিনি।” তখন তিনি বললেনঃ “উসামা ইবনে যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ), যাকে আল্লাহ তাআলা পুরস্কৃত করেছেন এবং আমিও যার প্রতি স্নেহশীল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ফুফু উমাইমা বিনতে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ)-এর কন্যা হযরত যয়নাব বিনতে জাহশ আসাদিয়্যা (রাঃ)-এর সাথে তাঁর (যায়েদ রাঃ -এর) বিয়ে দিয়েছিলেন। মোহর হিসেবে দশ দীনার (স্বর্ণ মুদ্রা) ও সাত দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) প্রদান করেছিলেন। আর দিয়েছিলেন একখানা শাড়ী, একখানা চাদর এবং একটি জামা। আরো দিয়েছিলেন পঞ্চাশ মুদ্দ (ওযন বিশেষ) শস্য ও দশ মুদ্দ খেজুর। এক বছর অথবা তা থেকে কিছু কম-বেশী সময়ের মধ্যে নিজ সংসার তিনি গুছিয়ে নিয়েছিলেন। পরে তাদের মনোমালিন্য শুরু হয়ে যায়। হযরত যায়েদ (রাঃ) গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অভিযোগ করেন। তিনি তাকে বুঝিয়ে বললেনঃ “সংসার ভেঙ্গে দিয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর।” এই জায়গায় ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) সঠিক নয় এরূপ বহু আসার বর্ণনা করেছেন, যেগুলো বর্ণনা করা উচিত নয় মনে করে আমরা ছেড়ে দিলাম। কেননা ওগুলোর মধ্যে একটিও প্রমাণিত ও সঠিক নয়। মুসনাদে আহমাদেও হযরত আনাস (রাঃ) হতে একটি রিওয়াইয়াত রয়েছে। কিন্তু তাতেও বড়ই অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হয়। এ জন্যে আমরা ওটাও বর্ণনা করলাম না। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, এ আয়াতটি হযরত যয়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ) ও হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, যয়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী হবেন একথা পূর্বে আল্লাহ তাকে অবহিত করেছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথাটি প্রকাশ করেননি। তিনি হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে বুঝিয়ে বলেছিলেনঃ “তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখো এবং আল্লাহকে ভয় কর।” তাই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ “তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করছে আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন।”হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “যদি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর উপর অহীকৃত কিতাবুল্লাহর কোন আয়াত গোপন করতেন তবে অবশ্যই (আরবি)-এ আয়াতটিই গোপন করতেন।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবি) শব্দের অর্থ হলো প্রয়োজন। ভাবার্থ হচ্ছেঃ যখন হযরত যায়েদ (রাঃ)-এর মন ভেঙ্গে গেল এবং বহু বুঝানোর পরেও তাদের মনোমালিন্য কাটলো না, বরং তালাক হয়ে গেল তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত যয়নাব (রাঃ)-কে স্বীয় নবী (সঃ)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলেন। এজন্যে অলী, প্রস্তাব-সমর্থন, মহর এবং সাক্ষীদের কোন প্রয়োজন থাকলো না। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, যখন হযরত যয়নাব (রাঃ)-এর ইদ্দত পূর্ণ হয়ে গেল তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ)-কে বললেনঃ “তুমি যাও এবং তাকে আমার বিবাহের পয়গাম পৌঁছিয়ে দাও।" হযরত যায়েদ (রাঃ) গেলেন। ঐ সময় হযরত যয়নাব (রাঃ) আটা ঠাসছিলেন। হযরত যায়েদ (রাঃ)-এর উপর তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা এমনভাবে ছেয়ে গেল যে, সামনে থেকে তার সাথে কথা বলতে পারলেন না। বরং তিনি মুখ ফিরিয়ে বসে পড়লেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর প্রস্তাব শুনিয়ে দিলেন। হযরত যয়নাব (রাঃ) তখন তাকে বললেনঃ “থামুন, আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ইসতিখারা (লক্ষণ দ্বারা শুভাশুভ বিচার) করে নিই।” অতঃপর তিনি দাড়িয়ে নামায পড়তে শুরু করলেন। আর এদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অহী অবতীর্ণ হলো এবং তাকে বলা হলো: “আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ করলাম।” সুতরাং নবী (সঃ) কোন খবর না দিয়ে সেখানে চলে গেলেন। ওলীমার দাওয়াতে তিনি সাহাবীদেরকে গোশত ও রুটি খাওয়ালেন। সব লোক খাওয়া-দাওয়া শেষ করে চলে গেলেন। কতিপয় লোক সেখানে বসে থেকে খোশ-গল্পে মত্ত হয়ে পড়লো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বের হয়ে তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদের নিকট গেলেন। তিনি তাদেরকে সালাম দিচ্ছিলেন। তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞেস করছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বলুন, আপনি আপনার স্ত্রীকে (যয়নাব রাঃ-কে) কিরূপ পেয়েছেন?" বর্ণনাকারী হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “লোকেরা তার বাড়ী হতে চলে গেছে এ খবর আমি তাঁকে দিলাম কি অন্য কারো মাধ্যমে তাঁকে এ খবর দেয়া হলো তা আমার জানা নেই। এরপর তিনি তাঁর বাড়ীতে গেলেন। আমিও তার সাথে ছিলাম। আমি তার সাথে তার বাড়ীতে যাওয়ার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু তিনি পর্দা ফেলেদিলেন। ফলে আমার ও তাঁর মধ্যে আড় হয়ে গেল। ঐ সময় পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হলো এবং তিনি সাহাবীদের যা উপদেশ দেয়ার তা দিলেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা নবী (সঃ)-এর বাড়ীতে তাঁর অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করো।” (৩৩:৫৩) (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত যয়নাব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অন্যান্য স্ত্রীদের কাছে গর্ব করে বলতেনঃ “তোমাদের বিয়ে দিয়েছেন তোমাদের অভিভাবক ও ওয়ারিশরা। আর আমার বিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা সপ্তম আকাশের উপর।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সূরায়ে নূরের তাফসীরে আমরা এ রিওয়াইয়াতটি বর্ণনা করেছি যে, হযরত যয়নাব (রাঃ) বলেছিলেনঃ “আমার বিবাহ আকাশ হতে অবতীর্ণ হয়েছে।” তাঁর একথার জবাবে হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমার নিষ্কলুষতা ও সতীত্বের আয়াতগুলো আকাশ হতে অবতীর্ণ হয়েছে।” হযরত যয়নাব (রাঃ) তাঁর একথা স্বীকার করে নেন।হযরত শা’বী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত যয়নাব (রাঃ) নবী (সঃ)-কে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমার মধ্যে তিনটি বিশেষত্ব রেখেছেন যা আপনার অন্যান্য স্ত্রীদের মধ্যে নেই। প্রথম এই যে, আমার নানা ও আপনার দাদা একই ব্যক্তি। দ্বিতীয় এই যে, আপনার সাথে আমার বিবাহ আল্লাহ তা'আলা আকাশে পড়িয়েছেন। আর তৃতীয় হলো এই যে, আমাদের মাঝে সংবাদবাহক ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ) (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তার সাথে তোমার বিবাহ বৈধ করলাম, যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা নিজ স্ত্রীর সাথে বিবাহসূত্র ছিন্ন করলেই সেই সব রমণীকে বিবাহ করায় মুমিনদের কোন বিঘ্ন না হয়। আরবে এ প্রথা চালু ছিল যে, পোষ্যপুত্রদের স্ত্রীদের বিয়ে করা বৈধ নয়। এ আয়াত দ্বারা তাদের ঐ কু-প্রথাকে উঠিয়ে দেয়া হলো। কারণ আরব দেশে এ ধরনের পুত্র বহু বাড়ীতে বিদ্যমান ছিল। হযরত যয়নাব (রাঃ)-এর জন্যে এ গৌরব প্রথম থেকেই আল্লাহর ইলমে নির্ধারিত ছিল যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র ও সতী-সাধ্বী স্ত্রীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।
আল-আহযাব 33:38
আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ পোষ্যপুত্রের তালাক দেয়া স্ত্রীকে বিয়ে করা যখন বৈধ কাজ তখন এ কাজ যদি নবী (সঃ) করেন তাহলে তাতে দোষ কি? তাতে কোন দোষ নেই। পূর্ববর্তী নবীদের উপর আল্লাহ তা'আলা যে হুকুম নাযিল করতেন ওর উপর আমল করায় তাদের কোন দোষ ছিল না। এখানে এ কথাটি বলার উদ্দেশ্য মুনাফিকদের ঐ কথার প্রতিবাদ করা ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা বলতো যে, নবী (সঃ) তাঁর ছেলের স্ত্রীকে বিয়ে করেছেন। আল্লাহর আইন অবশ্যই পূর্ণ হয়ে থাকে। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই করে থাকেন। আর যা তিনি ইচ্ছা করেন না তা কখনই হয় না।
আল-আহযাব 33:39
৩৯-৪০ নং আয়াতের তাফসীরএখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ঐ লোকদের (নবীদের) প্রশংসা করছেন যারা আল্লাহর সমগ্র সৃষ্টির কাছে তাঁর পয়গাম পৌঁছিয়ে দেন। তাঁরা আল্লাহকে ভয় করেন এবং তাঁকে ছাড়া আর কাউকেও ভয় করেন না। কোন ভীতি-বিহ্বল কাজে অথবা কারো প্রভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আল্লাহর দাওয়াত পৌঁছিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হন না। আল্লাহ তা'আলার সাহায্য-সহানুভূতিই যথেষ্ট।এই পদ ও দায়িত্ব পালনে সবারই নেতা, এমন কি প্রত্যেক কাজে-কর্মে ও প্রতিটি বিষয়ে সবারই সর্দার বা নেতা হলেন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, পূর্বে ও পশ্চিমে সমস্ত বানী আদমের কাছে আল্লাহর দ্বীনের প্রচার করেছেন তিনিই। যতদিন আল্লাহর এই দ্বীন চারদিকে ছড়িয়ে না পড়েছে ততদিন তিনি বরাবরই দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে গেছেন। তিনি আল্লাহর দ্বীনের প্রচারের ব্যাপারে সদা ব্যতিব্যস্ত থাকতেন। তাঁর পূর্বে যেসব নবী-রাসূল এসেছিলেন তাঁরা নিজ নিজ জাতির জন্যে এসেছিলেন। কিন্তু শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এসেছিলেন সারা দুনিয়ার জন্যে। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ!) তুমি বলে দাও- হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সকলের নিকট রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি।” (৭:১৫৮) তাঁর পরে এ দ্বীনের প্রচারের দায়িত্ব তাঁর উম্মতের স্কন্ধে অর্পিত হয়েছে। তাঁর পরে নেতৃত্বের দায়িত্ব তাঁর সাহাবীদের উপর ন্যস্ত হয়েছে। তাঁরা যা কিছু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে শিখেছিলেন তা তাদের পরবর্তীদের শিখিয়ে দেন। তারা সমস্ত কাজ ও কথা, পরিস্থিতি, রাত-দিনের সফর, তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সবকিছু তুলে ধরেছেন। সুতরাং তিনি তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁদেরকে সন্তুষ্ট করেছেন। পরবর্তী লোকেরা উত্তরাধিকার সূত্রে এগুলো প্রাপ্ত হয়েছে। এভাবেই পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের ওয়ারিশ হয়েছে। আল্লাহর দ্বীন এভাবেই ছড়াতে থাকে। কুরআন ও হাদীস জনগণের কাছে পৌঁছতে থাকে। হিদায়াত প্রাপ্তরা তাঁদের অনুসরণ করে জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠেন। যাঁরা ভাল কাজ করার তাওফীক লাভ করেছেন তাঁরা তাঁদের মাসলাকের বা চলার পথের উপর চলতে থাকেন। করুণাময় আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা এই যে, তিনি যেন আমাদেকে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যেন নিজেকে লাঞ্ছিত না করে যে সে কাউকে শরীয়ত বিরোধী কাজ করতে দেখেও নীরব তাকে। (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেনঃ “এ ব্যাপারে কিছু বলতে তোমাকে কিসে বাধা দিয়েছিল”? সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি লোকদেরকে ভয় করতাম।তখন আল্লাহ বলবেনঃ “আমাকে সবচেয়ে বেশী ভয় করা উচিত ছিল।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ মুহাম্মাদ (সঃ) তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নয়। আল্লাহ তা'আলা নিষেধ করছেন যে, এরপরে যেন যায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ (সঃ) বলা না হয়। অর্থাৎ তিনি যায়েদ (রাঃ)-এর পিতা নন। যদিও তিনি তাঁকে পুত্র বানিয়ে নিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন পুত্র সন্তান প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত জীবিত থাকেননি। কাসেম, তাইয়েব ও তাহের নামক তার তিনটি পুত্র সন্তান হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর গর্ভজাত ছিলেন। কিন্তু তিনজনই শৈশবে ইন্তেকাল করেন। হযরত মারিয়াহ কিবতিয়াহ (রাঃ)-এর গর্ভজাত একটি পুত্র সন্তান ছিলেন, তাঁর নাম ছিল ইবরাহীম। তিনি দুগ্ধ পান অবস্থাতেই ইন্তেকাল করেন। হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর গর্ভজাত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চার কন্যা সন্তান ছিলেন। তাঁরা হলেন হযরত যয়নাব (রাঃ), হযরত রুকাইয়া (রাঃ), হযরত উম্মে কুলসুম (রাঃ) ও হযরত ফাতিমা (রাঃ)। তাঁদের মধ্যে তিনজন তাঁর জীবদ্দশাতেই ইন্তেকাল করেছিলেন। শুধুমাত্র হযরত ফাতিমা (রাঃ) তাঁর ইন্তেকালের ছয় মাস পরে ইন্তেকাল করেছিলেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ বরং মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল ও শেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ্ তাঁর রিসালাত কোথায় রাখবেন তা তিনি খুব ভাল জানেন।” (৬:১২৫) সুতরাং এ আয়াতটি এটাই প্রমাণ করে যে, তার পরে কোন নবী নেই। আর তার পরে যখন কোন নবী নেই তখন তাঁর পরে কোন রাসূলও যে নেই তা বলাই বাহুল্য। রিসালাত তো নবুওয়াত হতে বিশিষ্ট। প্রত্যেক রাসূলই নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসূল নন। তিনি যে খাতামুন নাবীঈন তা হাদীসে মুতাওয়াতির দ্বারাও প্রমাণিত।হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “নবীদের মধ্যে আমার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্তের মত যে একটি বাড়ী তৈরী করলো এবং ওটা পূর্ণরূপে ও উত্তমভাবে নির্মাণ করলো, কিন্তু তাতে একটা ইট পরিমাণ জায়গা ছেড়ে দিলো। সেখানে কিছুই করলো না। লোকেরা চারদিক থেকে তা দেখতে লাগলো এবং ওর নির্মাণকার্যে সবাই বিস্ময় প্রকাশ করলো। কিন্তু তারা বলতে লাগলো: 'যদি এ স্থানটি খালি না থাকতো তবে আরো কত সুন্দর হতো!' সুতরাং নবীদের মধ্যে আমি ঐ নবী যিনি ঐ স্থানটি পূর্ণ করে দিয়েছেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযীও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং একে হাসান সহীহ বলেছেন) অপর একটি হাদীসঃ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “রিসালাত ও নবুওয়াত শেষ হয়ে গেছে। আমার পরে আর কোন রাসূল বা নবী আসবে না।” সাহাবীদের কাছে তাঁর “একথাটি খুবই কঠিন বোধ হলো। তখন তিনি বললেনঃ “কিন্তু সুসংবাদ দানকারীরা থাকবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সুসংবাদদাতা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “মুসলমানদের স্বপ্ন, যা নবুওয়াতের একটি অংশ বিশেষ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ গারীব বলেছেন) অন্য একটি হাদীসঃ অন্য একটি হাদীসঃ হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার দৃষ্টান্ত ও নবীদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্তের মত যে একটি ঘর বানালো এবং পূর্ণ ও সুন্দর করে বানালো। কিন্তু একটি ইট পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রেখে দিলো। সুতরাং যেই সেখানে প্রবেশ করে ও ওর দিকে তাকায় সেই বলেঃ ‘এটা কতইনা সুন্দর! যদি এই ইট পরিমাণ জায়গাটি ফাঁকা না থাকতো!' আমি ঐ খালি স্থানের ইট। আমার মাধ্যমে নবীদের ধারাবাহিকতা শেষ করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসিলম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য একটি হাদীসঃ হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার দৃষ্টান্ত ও নবীদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্তের ন্যায় যে একটি ঘর নির্মাণ করলো এবং পূর্ণভাবে করলো, কিন্তু একটি ইট পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রেখে দিলো। অতঃপর আমি আগমন করলাম ও ঐ ইট পরিমাণ খালি জায়গাটি পূর্ণ করে দিলাম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আর একটি হাদীসঃ হযরত আবূ তোফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার পরে কোন নবী নেই। তবে সুসংবাদ বহনকারী বিদ্যমান থাকবে।” জিজ্ঞেস করা হলো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সুসংবাদ বহনকারী আবার কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “উত্তম ও ভাল স্বপ্ন।” অন্য একটি হাদীসঃ হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার ও নবীদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্তের ন্যায় যে একটি ঘর নির্মাণ করলো এবং তা পূর্ণরূপে ও উত্তমরূপে নির্মাণ করলো। কিন্তু একটি ইট পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রেখে দিলো। তখন চতুর্দিক হতে লোকেরা এ ঘরটি দেখতে আসলো এবং তা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। অতঃপর লোকটিকে তারা জিজ্ঞেস করলো: ‘এখানে তুমি কেন ইট রাখখানি? এখানে ইট দিলে তো তোমার এ দালানটি পূর্ণ হতো? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন: আমিই ঐ ইট। (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা আবদুর রাযযাকের হাদীস হতে তাখরীজ করেছেন) আর একটি হাদীসঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে ছয়টি জিনিসের মাধ্যমে সমস্ত নবীর উপর ফযীলত দান করা হয়েছে। প্রথমঃ আমাকে জামে’ কালিমাত বা ব্যাপক ও সার্বজনীন কথা প্রদান করা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রভাব বা গাম্ভীর্য দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। তৃতীয়ঃ আমার জন্যে গানীমাত বা যুদ্ধলব্ধ মাল হালাল করা হয়েছে। চতুর্থঃ আমার জন্যে সারা দুনিয়াকে মসজিদ ও অযুর স্থানরূপে নির্ধারণ করা হয়েছে। পঞ্চমঃ সমস্ত সৃষ্টির নিকট আমাকে নবী করে পাঠানো হয়েছে। ষষ্ঠঃ আমার দ্বারা নবী আগমনের ধারাবাহিকতা শেষ করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান সহীহ বলেছেন) আর একটি হাদীসঃ হযরত ইরবায ইবনে সারিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, নবী (সঃ) তাকে বলেছেনঃ “আল্লাহর নিকট আমি নবীদেরকে শেষকারীরূপে ছিলাম ঐ সময় যখন হযরত আদম (আঃ) পূর্ণরূপে সৃষ্ট হননি।” আর একটি হাদীসঃ হযরত মুতইম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “নিশ্চয়ই আমার কয়েকটি নাম রয়েছে। আমি মুহাম্মাদ (সঃ), আমি আহমাদ (সঃ), আমি মাহী। আমার কারণে আল্লাহ তাআলা কুফরীকে মিটিয়ে দিবেন। আমি হাশের। আমার পায়ের উপর দিয়ে জনগণকে উঠানো ও একত্রিত করা হবে। আমি আকেব। আমার পরে আর কোন নবী হবে না।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীসটিকে তাখরীজ করা হয়েছে)হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের কাছে এমনভাবে আসলেন যেন তিনি আমাদের থেকে বিদায় গ্রহণকারী। তিনি তিনবার বললেনঃ “আমি মুহাম্মাদ (সঃ) নিরক্ষর নবী। আমার পরে কোন নবী নেই। আমাকে ব্যাপক ও সার্বজনীন কালেমা প্রদান করা হয়েছে। আমি সর্ববিজয়ী ও পরিপূর্ণ জ্ঞানী। জাহান্নামের দারোগা যত আছে, আরশ বহনকারী ফেরেশতা যতজন আছেন তাদেরকে আমার সমস্ত উম্মতের সাথে পরিচিত করা হয়েছে। আমি যতদিন তোমাদের সাথে আছি আমার কথা মেনে চলো। যখন আমি তোমাদের মধ্য থেকে বিদায় গ্রহণ করবো তখন তোমরা আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধরে থাকবে। আল্লাহর কিতাব যা হালাল করেছে তাকে হালাল জানবে এবং যা হারাম করেছে তা হারাম বলে মেনে নেবে।” এ বিষয়ের উপর আরো বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলার এ ব্যাপক রহমতের জন্যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। তিনি তাঁর দয়া-দাক্ষিণ্যের কারণে আমাদের জন্যে শ্রেষ্ঠ নবী (সঃ)-কে পাঠিয়েছেন। তিনি তার হাতে সহজ ও সরল জীবন ব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ স্বীয় কিতাবে এবং বিশ্ব শান্তির দূত হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) মুতাওয়াতির হাদীসে এ খবর জানিয়ে দিয়েছেন যে, তার পরে আর কোন নবী নেই। অতএব তাঁর পরে যদি কেউ নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবী করে তবে নিঃসন্দেহে সে মিথ্যাবাদী, প্রতারক, দাজ্জাল, পথভ্রষ্ট এবং পথভ্রষ্টকারী। যদিও সে ফন্দী করে, যাদু করে, বড় বড় জ্ঞানীদের জ্ঞানকে বিভ্রান্ত করে, বিস্ময়কর বিষয়গুলো দেখিয়ে দেয়, বিভিন্ন প্রকারের ডিগবাজী প্রদর্শন করে, তবুও জ্ঞানীরা অবশ্যই জানে যে, এ সবই প্রতারণা ও চালাকী ছাড়া আর কিছুই নয়। ইয়ামনের নবুওয়াতের দাবীদার আনসী ও ইয়ামামার নবুওয়াতের দাবীদার মুসাইলামা কাযযাবকে দেখলেই বুঝা যাবে যে, তারা যা করেছিল তা দেখে দুনিয়াবাসী তাদেরকে ধরে ফেলেছিল। তাদের আসল রূপ জনগণের কাছে উদ্ভাসিত হয়ে পড়েছিল। কিয়ামত পর্যন্ত তাদেরও ঐ অবস্থাই হবে যারা এ ধরনের মিথ্যা দাবী নিয়ে আল্লাহর সৃষ্টির কাছে হাযির হবে। এমনকি সর্বশেষে আসবে মাসীহ্ দাজ্জাল। তার চিহ্নসমূহ দেখে প্রত্যেক আলেম এবং প্রত্যেক মুমিন সে যে মিথ্যাবাদী তা জেনে নেবে। এটাও আল্লাহ তা'আলার একটা অশেষ মেহেরবানী। এ ধরনের মিথ্যা দাবীদারদের এ নসীবই হয় না যে, তারা পুণ্যের আহকাম জারী করে এবং মন্দ কাজ থেকে লোকদেরকে ফিরিয়ে দেয়। অবশ্য যে কাজের তার উদ্দেশ্য হবে তাতে সে সিদ্ধিলাভ করবে। তার কথা ও কাজ ধোকা ও প্রতারণামূলকই হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে খবর দেবো কি যাদের কাছে শয়তানরা এসে থাকে? তারা প্রত্যেক ধোকাবাজ, পাপীর কাছে আসে।” (২৬:২২১-২২২)সত্য নবীদের ঘটনা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁরা পুণ্যময় সঠিক হিদায়াত দানকারী। তাঁরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাঁদের কথা ও কাজ পুণ্য বিজড়িত। তাঁরা মানুষকে ভাল কাজের আদেশ করেন এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখেন। তারা আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। মুজিযা বা অলৌকিক কাজের দ্বারা তাঁদের সত্যবাদিতা প্রকাশিত হয়। তাঁদের নবুওয়াতের উপর এমন সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল দলীল থাকে যে, সুস্থির মন তাঁদের নবুওয়াতকে মেনে নিতে বাধ্য হয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর সমস্ত নবীর উপর কিয়ামত পর্যন্ত দরূদ ও সালাম নাযিল করতে থাকুন!
আল-আহযাব 33:40
৩৯-৪০ নং আয়াতের তাফসীরএখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ঐ লোকদের (নবীদের) প্রশংসা করছেন যারা আল্লাহর সমগ্র সৃষ্টির কাছে তাঁর পয়গাম পৌঁছিয়ে দেন। তাঁরা আল্লাহকে ভয় করেন এবং তাঁকে ছাড়া আর কাউকেও ভয় করেন না। কোন ভীতি-বিহ্বল কাজে অথবা কারো প্রভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আল্লাহর দাওয়াত পৌঁছিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হন না। আল্লাহ তা'আলার সাহায্য-সহানুভূতিই যথেষ্ট।এই পদ ও দায়িত্ব পালনে সবারই নেতা, এমন কি প্রত্যেক কাজে-কর্মে ও প্রতিটি বিষয়ে সবারই সর্দার বা নেতা হলেন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, পূর্বে ও পশ্চিমে সমস্ত বানী আদমের কাছে আল্লাহর দ্বীনের প্রচার করেছেন তিনিই। যতদিন আল্লাহর এই দ্বীন চারদিকে ছড়িয়ে না পড়েছে ততদিন তিনি বরাবরই দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে গেছেন। তিনি আল্লাহর দ্বীনের প্রচারের ব্যাপারে সদা ব্যতিব্যস্ত থাকতেন। তাঁর পূর্বে যেসব নবী-রাসূল এসেছিলেন তাঁরা নিজ নিজ জাতির জন্যে এসেছিলেন। কিন্তু শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এসেছিলেন সারা দুনিয়ার জন্যে। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ!) তুমি বলে দাও- হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সকলের নিকট রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি।” (৭:১৫৮) তাঁর পরে এ দ্বীনের প্রচারের দায়িত্ব তাঁর উম্মতের স্কন্ধে অর্পিত হয়েছে। তাঁর পরে নেতৃত্বের দায়িত্ব তাঁর সাহাবীদের উপর ন্যস্ত হয়েছে। তাঁরা যা কিছু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে শিখেছিলেন তা তাদের পরবর্তীদের শিখিয়ে দেন। তারা সমস্ত কাজ ও কথা, পরিস্থিতি, রাত-দিনের সফর, তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সবকিছু তুলে ধরেছেন। সুতরাং তিনি তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁদেরকে সন্তুষ্ট করেছেন। পরবর্তী লোকেরা উত্তরাধিকার সূত্রে এগুলো প্রাপ্ত হয়েছে। এভাবেই পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের ওয়ারিশ হয়েছে। আল্লাহর দ্বীন এভাবেই ছড়াতে থাকে। কুরআন ও হাদীস জনগণের কাছে পৌঁছতে থাকে। হিদায়াত প্রাপ্তরা তাঁদের অনুসরণ করে জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠেন। যাঁরা ভাল কাজ করার তাওফীক লাভ করেছেন তাঁরা তাঁদের মাসলাকের বা চলার পথের উপর চলতে থাকেন। করুণাময় আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা এই যে, তিনি যেন আমাদেকে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যেন নিজেকে লাঞ্ছিত না করে যে সে কাউকে শরীয়ত বিরোধী কাজ করতে দেখেও নীরব তাকে। (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেনঃ “এ ব্যাপারে কিছু বলতে তোমাকে কিসে বাধা দিয়েছিল”? সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি লোকদেরকে ভয় করতাম।তখন আল্লাহ বলবেনঃ “আমাকে সবচেয়ে বেশী ভয় করা উচিত ছিল।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ মুহাম্মাদ (সঃ) তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নয়। আল্লাহ তা'আলা নিষেধ করছেন যে, এরপরে যেন যায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ (সঃ) বলা না হয়। অর্থাৎ তিনি যায়েদ (রাঃ)-এর পিতা নন। যদিও তিনি তাঁকে পুত্র বানিয়ে নিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন পুত্র সন্তান প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত জীবিত থাকেননি। কাসেম, তাইয়েব ও তাহের নামক তার তিনটি পুত্র সন্তান হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর গর্ভজাত ছিলেন। কিন্তু তিনজনই শৈশবে ইন্তেকাল করেন। হযরত মারিয়াহ কিবতিয়াহ (রাঃ)-এর গর্ভজাত একটি পুত্র সন্তান ছিলেন, তাঁর নাম ছিল ইবরাহীম। তিনি দুগ্ধ পান অবস্থাতেই ইন্তেকাল করেন। হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর গর্ভজাত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চার কন্যা সন্তান ছিলেন। তাঁরা হলেন হযরত যয়নাব (রাঃ), হযরত রুকাইয়া (রাঃ), হযরত উম্মে কুলসুম (রাঃ) ও হযরত ফাতিমা (রাঃ)। তাঁদের মধ্যে তিনজন তাঁর জীবদ্দশাতেই ইন্তেকাল করেছিলেন। শুধুমাত্র হযরত ফাতিমা (রাঃ) তাঁর ইন্তেকালের ছয় মাস পরে ইন্তেকাল করেছিলেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ বরং মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল ও শেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ্ তাঁর রিসালাত কোথায় রাখবেন তা তিনি খুব ভাল জানেন।” (৬:১২৫) সুতরাং এ আয়াতটি এটাই প্রমাণ করে যে, তার পরে কোন নবী নেই। আর তার পরে যখন কোন নবী নেই তখন তাঁর পরে কোন রাসূলও যে নেই তা বলাই বাহুল্য। রিসালাত তো নবুওয়াত হতে বিশিষ্ট। প্রত্যেক রাসূলই নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসূল নন। তিনি যে খাতামুন নাবীঈন তা হাদীসে মুতাওয়াতির দ্বারাও প্রমাণিত।হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “নবীদের মধ্যে আমার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্তের মত যে একটি বাড়ী তৈরী করলো এবং ওটা পূর্ণরূপে ও উত্তমভাবে নির্মাণ করলো, কিন্তু তাতে একটা ইট পরিমাণ জায়গা ছেড়ে দিলো। সেখানে কিছুই করলো না। লোকেরা চারদিক থেকে তা দেখতে লাগলো এবং ওর নির্মাণকার্যে সবাই বিস্ময় প্রকাশ করলো। কিন্তু তারা বলতে লাগলো: 'যদি এ স্থানটি খালি না থাকতো তবে আরো কত সুন্দর হতো!' সুতরাং নবীদের মধ্যে আমি ঐ নবী যিনি ঐ স্থানটি পূর্ণ করে দিয়েছেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযীও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং একে হাসান সহীহ বলেছেন) অপর একটি হাদীসঃ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “রিসালাত ও নবুওয়াত শেষ হয়ে গেছে। আমার পরে আর কোন রাসূল বা নবী আসবে না।” সাহাবীদের কাছে তাঁর “একথাটি খুবই কঠিন বোধ হলো। তখন তিনি বললেনঃ “কিন্তু সুসংবাদ দানকারীরা থাকবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সুসংবাদদাতা কি?" তিনি উত্তরে বললেনঃ “মুসলমানদের স্বপ্ন, যা নবুওয়াতের একটি অংশ বিশেষ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ গারীব বলেছেন) অন্য একটি হাদীসঃ অন্য একটি হাদীসঃ হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার দৃষ্টান্ত ও নবীদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্তের মত যে একটি ঘর বানালো এবং পূর্ণ ও সুন্দর করে বানালো। কিন্তু একটি ইট পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রেখে দিলো। সুতরাং যেই সেখানে প্রবেশ করে ও ওর দিকে তাকায় সেই বলেঃ ‘এটা কতইনা সুন্দর! যদি এই ইট পরিমাণ জায়গাটি ফাঁকা না থাকতো!' আমি ঐ খালি স্থানের ইট। আমার মাধ্যমে নবীদের ধারাবাহিকতা শেষ করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসিলম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য একটি হাদীসঃ হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার দৃষ্টান্ত ও নবীদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্তের ন্যায় যে একটি ঘর নির্মাণ করলো এবং পূর্ণভাবে করলো, কিন্তু একটি ইট পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রেখে দিলো। অতঃপর আমি আগমন করলাম ও ঐ ইট পরিমাণ খালি জায়গাটি পূর্ণ করে দিলাম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আর একটি হাদীসঃ হযরত আবূ তোফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার পরে কোন নবী নেই। তবে সুসংবাদ বহনকারী বিদ্যমান থাকবে।” জিজ্ঞেস করা হলো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সুসংবাদ বহনকারী আবার কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “উত্তম ও ভাল স্বপ্ন।” অন্য একটি হাদীসঃ হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার ও নবীদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্তের ন্যায় যে একটি ঘর নির্মাণ করলো এবং তা পূর্ণরূপে ও উত্তমরূপে নির্মাণ করলো। কিন্তু একটি ইট পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রেখে দিলো। তখন চতুর্দিক হতে লোকেরা এ ঘরটি দেখতে আসলো এবং তা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। অতঃপর লোকটিকে তারা জিজ্ঞেস করলো: ‘এখানে তুমি কেন ইট রাখখানি? এখানে ইট দিলে তো তোমার এ দালানটি পূর্ণ হতো? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন: আমিই ঐ ইট। (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা আবদুর রাযযাকের হাদীস হতে তাখরীজ করেছেন) আর একটি হাদীসঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে ছয়টি জিনিসের মাধ্যমে সমস্ত নবীর উপর ফযীলত দান করা হয়েছে। প্রথমঃ আমাকে জামে’ কালিমাত বা ব্যাপক ও সার্বজনীন কথা প্রদান করা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রভাব বা গাম্ভীর্য দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। তৃতীয়ঃ আমার জন্যে গানীমাত বা যুদ্ধলব্ধ মাল হালাল করা হয়েছে। চতুর্থঃ আমার জন্যে সারা দুনিয়াকে মসজিদ ও অযুর স্থানরূপে নির্ধারণ করা হয়েছে। পঞ্চমঃ সমস্ত সৃষ্টির নিকট আমাকে নবী করে পাঠানো হয়েছে। ষষ্ঠঃ আমার দ্বারা নবী আগমনের ধারাবাহিকতা শেষ করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান সহীহ বলেছেন) আর একটি হাদীসঃ হযরত ইরবায ইবনে সারিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, নবী (সঃ) তাকে বলেছেনঃ “আল্লাহর নিকট আমি নবীদেরকে শেষকারীরূপে ছিলাম ঐ সময় যখন হযরত আদম (আঃ) পূর্ণরূপে সৃষ্ট হননি।” আর একটি হাদীসঃ হযরত মুতইম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “নিশ্চয়ই আমার কয়েকটি নাম রয়েছে। আমি মুহাম্মাদ (সঃ), আমি আহমাদ (সঃ), আমি মাহী। আমার কারণে আল্লাহ তাআলা কুফরীকে মিটিয়ে দিবেন। আমি হাশের। আমার পায়ের উপর দিয়ে জনগণকে উঠানো ও একত্রিত করা হবে। আমি আকেব। আমার পরে আর কোন নবী হবে না।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীসটিকে তাখরীজ করা হয়েছে)হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের কাছে এমনভাবে আসলেন যেন তিনি আমাদের থেকে বিদায় গ্রহণকারী। তিনি তিনবার বললেনঃ “আমি মুহাম্মাদ (সঃ) নিরক্ষর নবী। আমার পরে কোন নবী নেই। আমাকে ব্যাপক ও সার্বজনীন কালেমা প্রদান করা হয়েছে। আমি সর্ববিজয়ী ও পরিপূর্ণ জ্ঞানী। জাহান্নামের দারোগা যত আছে, আরশ বহনকারী ফেরেশতা যতজন আছেন তাদেরকে আমার সমস্ত উম্মতের সাথে পরিচিত করা হয়েছে। আমি যতদিন তোমাদের সাথে আছি আমার কথা মেনে চলো। যখন আমি তোমাদের মধ্য থেকে বিদায় গ্রহণ করবো তখন তোমরা আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধরে থাকবে। আল্লাহর কিতাব যা হালাল করেছে তাকে হালাল জানবে এবং যা হারাম করেছে তা হারাম বলে মেনে নেবে।” এ বিষয়ের উপর আরো বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলার এ ব্যাপক রহমতের জন্যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। তিনি তাঁর দয়া-দাক্ষিণ্যের কারণে আমাদের জন্যে শ্রেষ্ঠ নবী (সঃ)-কে পাঠিয়েছেন। তিনি তার হাতে সহজ ও সরল জীবন ব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ স্বীয় কিতাবে এবং বিশ্ব শান্তির দূত হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) মুতাওয়াতির হাদীসে এ খবর জানিয়ে দিয়েছেন যে, তার পরে আর কোন নবী নেই। অতএব তাঁর পরে যদি কেউ নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবী করে তবে নিঃসন্দেহে সে মিথ্যাবাদী, প্রতারক, দাজ্জাল, পথভ্রষ্ট এবং পথভ্রষ্টকারী। যদিও সে ফন্দী করে, যাদু করে, বড় বড় জ্ঞানীদের জ্ঞানকে বিভ্রান্ত করে, বিস্ময়কর বিষয়গুলো দেখিয়ে দেয়, বিভিন্ন প্রকারের ডিগবাজী প্রদর্শন করে, তবুও জ্ঞানীরা অবশ্যই জানে যে, এ সবই প্রতারণা ও চালাকী ছাড়া আর কিছুই নয়। ইয়ামনের নবুওয়াতের দাবীদার আনসী ও ইয়ামামার নবুওয়াতের দাবীদার মুসাইলামা কাযযাবকে দেখলেই বুঝা যাবে যে, তারা যা করেছিল তা দেখে দুনিয়াবাসী তাদেরকে ধরে ফেলেছিল। তাদের আসল রূপ জনগণের কাছে উদ্ভাসিত হয়ে পড়েছিল। কিয়ামত পর্যন্ত তাদেরও ঐ অবস্থাই হবে যারা এ ধরনের মিথ্যা দাবী নিয়ে আল্লাহর সৃষ্টির কাছে হাযির হবে। এমনকি সর্বশেষে আসবে মাসীহ্ দাজ্জাল। তার চিহ্নসমূহ দেখে প্রত্যেক আলেম এবং প্রত্যেক মুমিন সে যে মিথ্যাবাদী তা জেনে নেবে। এটাও আল্লাহ তা'আলার একটা অশেষ মেহেরবানী। এ ধরনের মিথ্যা দাবীদারদের এ নসীবই হয় না যে, তারা পুণ্যের আহকাম জারী করে এবং মন্দ কাজ থেকে লোকদেরকে ফিরিয়ে দেয়। অবশ্য যে কাজের তার উদ্দেশ্য হবে তাতে সে সিদ্ধিলাভ করবে। তার কথা ও কাজ ধোকা ও প্রতারণামূলকই হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে খবর দেবো কি যাদের কাছে শয়তানরা এসে থাকে? তারা প্রত্যেক ধোকাবাজ, পাপীর কাছে আসে।” (২৬:২২১-২২২)সত্য নবীদের ঘটনা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁরা পুণ্যময় সঠিক হিদায়াত দানকারী। তাঁরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাঁদের কথা ও কাজ পুণ্য বিজড়িত। তাঁরা মানুষকে ভাল কাজের আদেশ করেন এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখেন। তারা আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। মুজিযা বা অলৌকিক কাজের দ্বারা তাঁদের সত্যবাদিতা প্রকাশিত হয়। তাঁদের নবুওয়াতের উপর এমন সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল দলীল থাকে যে, সুস্থির মন তাঁদের নবুওয়াতকে মেনে নিতে বাধ্য হয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর সমস্ত নবীর উপর কিয়ামত পর্যন্ত দরূদ ও সালাম নাযিল করতে থাকুন!
আল-আহযাব 33:41
৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীরবহু প্রকারের নিয়ামতদাতা আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ আমাকে অধিক মাত্রায় স্মরণ করা তোমাদের উচিত। তাছাড়াও তিনি আরো বহু প্রকারের নিয়ামত প্রদানের ওয়াদা করেছেন। হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে উত্তম কাজ, পবিত্র আমল, সবচেয়ে উচ্চ পর্যায়ের পুণ্য, স্বর্ণ-রৌপ্য আল্লাহর পথে ব্যয় করা অপেক্ষা অধিক উত্তম এবং জিহাদ হতে অধিক মর্যাদা সম্পন্ন কাজের কথা বলবো না?” সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেটা কি উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহর যিক্র বা স্মরণ। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) (আরবি) আয়াতের তাফসীরে এগুলো ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে এমন এক দু'আ শুনেছি যা আমি কখনো পরিত্যাগ করি না। তা হলো: (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার বড় কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আপনার উপদেশের অনুসরণকারী, আপনার অধিক যিকরকারী এবং আপনার অসিয়তের অধিক হিফাযতকারী বানিয়ে দিন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বাশার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, দু'জন বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলো। তাদের একজন জিজ্ঞেস করলো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম কে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “যে ব্যক্তি দীর্ঘ সময় পেলো ও ভাল কাজ করলো।” দ্বিতীয়জন জিজ্ঞেস করলো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের উপর ইসলামের বিধান তো অনেক রয়েছে। আমাকে একটি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বিধান বাতলিয়ে দিন যার সাথে আমি সদা লেগে থাকবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহর যিক্র দ্বারা সদা-সর্বদা তোমার জিহ্বাকে সিক্ত রাখবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা খুব বেশী বেশী আল্লাহর যি কর, এমনকি জনগণ তোমাদেরকে পাগল বলে ফেলে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা খুব বেশী বেশী আল্লাহর যিক্র কর, শেষ পর্যন্ত যেন মুনাফিকরা বলতে শুরু করে যে, তোমরা লোক দেখানো যিক্র করছে। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে কওম এমন মজলিসে বসে যেখানে আল্লাহর যিক্র হয় না, তারা কিয়ামতের দিন এ জন্যে আফসোস ও দুঃখ প্রকাশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবি) আল্লাহ তা'আলার এই উক্তির ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক ফরয কাজের একটা সীমা আছে এবং বিশেষ ওজর বশতঃ তা মাফও করা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর যিক্রের কোন সীমা নেই। কোন সময়েই তা সঙ্গ ছাড়া হয় না। তবে কেউ যদি পাগল হয়ে যায় তবে সেটা অন্য কথা। দাঁড়িয়ে, বসে, রাত্রে, দিবসে, স্থলে, পানিতে, বাড়ীতে, সফরে, ধনী অবস্থায় ও দরিদ্র অবস্থায়, সুস্থ অবস্থায় ও অসুস্থ অবস্থায়, গোপনে ও প্রকাশ্যে, মোটকথা সর্বাবস্থায়ই আল্লাহর যিকর করতে হবে। সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতে হবে। তুমি যখন এগুলো করতে থাকবে তখন আল্লাহ তা'আলা তোমার উপর তার রহমত বর্ষণ করতে থাকবেন। আর ফেরেশতারাও তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবেন। এ সম্পর্কে আরো বহু হাদীস ও আসার রয়েছে। এই আয়াতেও খুব বেশী বেশী আল্লাহর যিক্র করার হিদায়াত করা হয়েছে। অনেকে আল্লাহর যিক্র ও অযীফা সম্পর্কে বহু স্বতন্ত্র পুস্তক রচনা করেছেন, যেমন ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম মামারী (রঃ) প্রমুখ। এগুলোর মধ্যে এ বিষয়ের উপর সর্বোত্তম কিতাব হচ্ছে ইমাম নববী (রঃ)-এর লিখিত কিতাব।মহান আল্লাহ বলেনঃ সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা কর সন্ধ্যায় ও সকালে। তারই জন্যে প্রশংসা আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে এবং বিকালে ও যোহরের সময়।” (৩০:১৭-১৮)অতঃপর এর ফযীলত বর্ণনা এবং এর প্রতি উৎসাহ প্রদান করার জন্যে মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ স্বয়ং তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। এতদসত্ত্বেও কি তোমরা তাঁর যি হতে উদাসীন থাকবে? যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যেমন আমি তোমাদের মধ্যে তোমাদেরই মধ্য হতে এমন এক রাসূল পাঠিয়েছি যে তোমাদের কাছে আমার নিদর্শনাবলী পাঠ করে থাকে ও তোমাদেরকে (পাপ হতে) পবিত্র করে এবং তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয় এবং তোমাদেরকে এমন কিছু শিক্ষা দেয় যা তোমরা জানতে না। সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো, এবং তোমরা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর ও অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” (২:১৫১-১৫২)।নবী (সঃ) বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে আমাকে তার অন্তরে স্মরণ করে আমিও তাকে আমার অন্তরে স্মরণ করি, আর যে আমাকে কোন জামাআত বা দলের মধ্যে স্মরণ করে, আমি তাকে এমন জামাআতের মধ্যে স্মরণ করি যা তার জামাআত হতে উত্তম।”(আারবি) শব্দটি যখন আল্লাহ তা'আলার দিকে সম্বন্ধযুক্ত হয় তখন ওর অর্থ হয় আল্লাহ তা'আলা তার কল্যাণ ও মঙ্গল তাঁর ফেরেশতাদের সামনে বর্ণনা করেন। অন্য কেউ বলেছেন যে, (আারবি) শব্দটি আল্লাহ তা'আলার দিকে সম্বন্ধযুক্ত হলে ওর অর্থ হবে রহমত। এ দু'টি উক্তির মধ্যে কোন বৈপরিত্য নেই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। আর শব্দটি (আারবি) ফেরেশতাদের দিকে সম্বন্ধযুক্ত হলে তখন অর্থ হবে মানুষের জন্যে দু'আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আারবি)অর্থাৎ “আরশ বহনকারীরা ও ওর আশে-পাশে অবস্থানকারীরা তাদের প্রতিপালকের মহিমা কীর্তন করে ও তাঁর উপর ঈমান আনে এবং মুমিন বান্দাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে গিয়ে বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আপানি প্রত্যেক জিনিসকে রহমত ও ইলম দ্বারা পরিবেষ্টন করে রেখেছেন। হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন যারা তাওবা করে ও আপনার পথে চলে। তাদেরকে আপনি জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করুন এবং জান্নাতে আদনে প্রবিষ্ট করুন যার ওয়াদা আপনি তাদের সাথে করেছেন। আর তাদের সাথে তাদেরকেও পৌছিয়ে দিন যারা তাদের বাপ-দাদা, স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে সৎকর্মশীল নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ। আর তাদেরকে মন্দ ও অসৎ কাজ হতে বাঁচিয়ে নিন।” (৪০:৭-৯) এই দু'আ ও ক্ষমা প্রার্থনার পরিপ্রেক্ষিতে মুমিন বান্দাদের উপর মহান আল্লাহ স্বীয় রহমত বর্ষণ করেন। তাদেরকে তিনি অজ্ঞতা ও কুফরীর অন্ধকার হতে বের করে ঈমানের আলোকের দিকে আনয়ন করেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু। দুনিয়ায় তিনি তাদেরকে সত্যের পথ প্রদর্শন করেন ও জীবিকার ব্যবস্থা করেন এবং আখিরাতে তিনি তাদেরকে ভয়-ভীতি ও কঠিন শাস্তি হতে বাঁচিয়ে নিবেন। ফেরেশতারা বারবার মুমিনদের কাছে এসে তাদেরকে সুসংবাদ দেন। তাদেরকে তারা বলেনঃ “তোমরা জাহান্নাম হতে মুক্তি পেয়েছে এবং জান্নাতে প্রবেশের অধিকার লাভ করেছে। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে এই যে, মহান আল্লাহ তার মুমিন বান্দাদের উপর অত্যন্ত দয়ালু ও স্নেহশীল।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে সাথে নিয়ে পথ চলছিলেন। ঐ সময় রাস্তার উপর একটি ছোট ছেলে ছিল। একটি দল আসছে দেখে ছেলেটির মা ভয় পেয়ে গেল এবং আমার ছেলে আমার ছেলে বলে চীৎকার করতে করতে ছুটে আসলো এবং ছেলেকে কোলে উঠিয়ে নিয়ে একদিকে সরে গেল। ছেলের প্রতি মায়ের এই স্নেহ ও মমতা দেখে সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মা কি এই ছেলেটিকে আগুনে ফেলতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের উদ্দেশ্য বুঝে নিয়ে বললেনঃ “না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তা'আলা কখনো তাঁর বন্ধুকে আগুনে নিক্ষেপ করবেন না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বন্দিনী নারীকে দেখেন যে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দেখা মাত্রই উঠিয়ে নিলো এবং বুকে লাগিয়ে দিয়ে দুধ পান করাতে শুরু করলো। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “আচ্ছা বল তো, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই মহিলাটি তার এই ছেলেটিকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে কি? সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! এই মহিলা তার ছেলের প্রতি যতটা স্নেহশীল ও দয়ালু, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এর চেয়ে অনেক বেশী দয়ালু।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ যেদিন তারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সেদিন তাদের প্রতি অভিবাদন হবে ‘সালাম'। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আারবি)অর্থাৎ “পরম দয়ালু প্রতিপালকের পক্ষ হতে তাদেরকে বলা হবেঃ সালাম।” (৩৬:৫৮) কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো: পরকালে মুমিনরা যখন আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তারা একে অপরকে সালাম দেবে। ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটি পছন্দ করেছেন। আমি বলিঃ এই উক্তির স্বপক্ষে দলীল হচ্ছে নিম্নের আয়াতটিঃ(আারবি) অর্থাৎ “সেখানে তাদের ধ্বনি হবে- হে আল্লাহ! আপনি মহান, পবিত্র! এবং সেখানে তাদের অভিবাদন হবেঃ সালাম এবং তাদের শেষ ধ্বনি হবে- প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর প্রাপ্য।” (১০:১০)মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনি তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন উত্তম প্রতিদান। অর্থাৎ জান্নাত এবং ওর সমুদয় ভোগ্যবস্ত যেগুলো তাদের জন্যে নির্ধারিত করে রাখা হয়েছে। সেখানে তারা পানাহারের দ্রব্য, পরিধানের বস্ত্র, বাসস্থান, স্ত্রী, নয়নাভিরাম সৌন্দর্য অবলোকন ইত্যাদি সবকিছুই পাবে! এগুলোর ধ্যান-ধারণা মানুষ করতেই পারে না। এগুলো এমনই যে, মানুষ চোখে দেখেনি, কানে শুনেনি এবং অন্তরে কল্পনাও করেনি।
আল-আহযাব 33:42
৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীরবহু প্রকারের নিয়ামতদাতা আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ আমাকে অধিক মাত্রায় স্মরণ করা তোমাদের উচিত। তাছাড়াও তিনি আরো বহু প্রকারের নিয়ামত প্রদানের ওয়াদা করেছেন। হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে উত্তম কাজ, পবিত্র আমল, সবচেয়ে উচ্চ পর্যায়ের পুণ্য, স্বর্ণ-রৌপ্য আল্লাহর পথে ব্যয় করা অপেক্ষা অধিক উত্তম এবং জিহাদ হতে অধিক মর্যাদা সম্পন্ন কাজের কথা বলবো না?” সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেটা কি উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহর যিক্র বা স্মরণ। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) (আরবি) আয়াতের তাফসীরে এগুলো ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে এমন এক দু'আ শুনেছি যা আমি কখনো পরিত্যাগ করি না। তা হলো: (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার বড় কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আপনার উপদেশের অনুসরণকারী, আপনার অধিক যিকরকারী এবং আপনার অসিয়তের অধিক হিফাযতকারী বানিয়ে দিন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বাশার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, দু'জন বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলো। তাদের একজন জিজ্ঞেস করলো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম কে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “যে ব্যক্তি দীর্ঘ সময় পেলো ও ভাল কাজ করলো।” দ্বিতীয়জন জিজ্ঞেস করলো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের উপর ইসলামের বিধান তো অনেক রয়েছে। আমাকে একটি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বিধান বাতলিয়ে দিন যার সাথে আমি সদা লেগে থাকবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহর যিক্র দ্বারা সদা-সর্বদা তোমার জিহ্বাকে সিক্ত রাখবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা খুব বেশী বেশী আল্লাহর যি কর, এমনকি জনগণ তোমাদেরকে পাগল বলে ফেলে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা খুব বেশী বেশী আল্লাহর যিক্র কর, শেষ পর্যন্ত যেন মুনাফিকরা বলতে শুরু করে যে, তোমরা লোক দেখানো যিক্র করছে। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে কওম এমন মজলিসে বসে যেখানে আল্লাহর যিক্র হয় না, তারা কিয়ামতের দিন এ জন্যে আফসোস ও দুঃখ প্রকাশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবি) আল্লাহ তা'আলার এই উক্তির ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক ফরয কাজের একটা সীমা আছে এবং বিশেষ ওজর বশতঃ তা মাফও করা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর যিক্রের কোন সীমা নেই। কোন সময়েই তা সঙ্গ ছাড়া হয় না। তবে কেউ যদি পাগল হয়ে যায় তবে সেটা অন্য কথা। দাঁড়িয়ে, বসে, রাত্রে, দিবসে, স্থলে, পানিতে, বাড়ীতে, সফরে, ধনী অবস্থায় ও দরিদ্র অবস্থায়, সুস্থ অবস্থায় ও অসুস্থ অবস্থায়, গোপনে ও প্রকাশ্যে, মোটকথা সর্বাবস্থায়ই আল্লাহর যিকর করতে হবে। সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতে হবে। তুমি যখন এগুলো করতে থাকবে তখন আল্লাহ তা'আলা তোমার উপর তার রহমত বর্ষণ করতে থাকবেন। আর ফেরেশতারাও তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবেন। এ সম্পর্কে আরো বহু হাদীস ও আসার রয়েছে। এই আয়াতেও খুব বেশী বেশী আল্লাহর যিক্র করার হিদায়াত করা হয়েছে। অনেকে আল্লাহর যিক্র ও অযীফা সম্পর্কে বহু স্বতন্ত্র পুস্তক রচনা করেছেন, যেমন ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম মামারী (রঃ) প্রমুখ। এগুলোর মধ্যে এ বিষয়ের উপর সর্বোত্তম কিতাব হচ্ছে ইমাম নববী (রঃ)-এর লিখিত কিতাব।মহান আল্লাহ বলেনঃ সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা কর সন্ধ্যায় ও সকালে। তারই জন্যে প্রশংসা আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে এবং বিকালে ও যোহরের সময়।” (৩০:১৭-১৮)অতঃপর এর ফযীলত বর্ণনা এবং এর প্রতি উৎসাহ প্রদান করার জন্যে মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ স্বয়ং তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। এতদসত্ত্বেও কি তোমরা তাঁর যি হতে উদাসীন থাকবে? যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যেমন আমি তোমাদের মধ্যে তোমাদেরই মধ্য হতে এমন এক রাসূল পাঠিয়েছি যে তোমাদের কাছে আমার নিদর্শনাবলী পাঠ করে থাকে ও তোমাদেরকে (পাপ হতে) পবিত্র করে এবং তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয় এবং তোমাদেরকে এমন কিছু শিক্ষা দেয় যা তোমরা জানতে না। সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো, এবং তোমরা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর ও অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” (২:১৫১-১৫২)।নবী (সঃ) বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে আমাকে তার অন্তরে স্মরণ করে আমিও তাকে আমার অন্তরে স্মরণ করি, আর যে আমাকে কোন জামাআত বা দলের মধ্যে স্মরণ করে, আমি তাকে এমন জামাআতের মধ্যে স্মরণ করি যা তার জামাআত হতে উত্তম।”(আারবি) শব্দটি যখন আল্লাহ তা'আলার দিকে সম্বন্ধযুক্ত হয় তখন ওর অর্থ হয় আল্লাহ তা'আলা তার কল্যাণ ও মঙ্গল তাঁর ফেরেশতাদের সামনে বর্ণনা করেন। অন্য কেউ বলেছেন যে, (আারবি) শব্দটি আল্লাহ তা'আলার দিকে সম্বন্ধযুক্ত হলে ওর অর্থ হবে রহমত। এ দু'টি উক্তির মধ্যে কোন বৈপরিত্য নেই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। আর শব্দটি (আারবি) ফেরেশতাদের দিকে সম্বন্ধযুক্ত হলে তখন অর্থ হবে মানুষের জন্যে দু'আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আারবি)অর্থাৎ “আরশ বহনকারীরা ও ওর আশে-পাশে অবস্থানকারীরা তাদের প্রতিপালকের মহিমা কীর্তন করে ও তাঁর উপর ঈমান আনে এবং মুমিন বান্দাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে গিয়ে বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আপানি প্রত্যেক জিনিসকে রহমত ও ইলম দ্বারা পরিবেষ্টন করে রেখেছেন। হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন যারা তাওবা করে ও আপনার পথে চলে। তাদেরকে আপনি জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করুন এবং জান্নাতে আদনে প্রবিষ্ট করুন যার ওয়াদা আপনি তাদের সাথে করেছেন। আর তাদের সাথে তাদেরকেও পৌছিয়ে দিন যারা তাদের বাপ-দাদা, স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে সৎকর্মশীল নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ। আর তাদেরকে মন্দ ও অসৎ কাজ হতে বাঁচিয়ে নিন।” (৪০:৭-৯) এই দু'আ ও ক্ষমা প্রার্থনার পরিপ্রেক্ষিতে মুমিন বান্দাদের উপর মহান আল্লাহ স্বীয় রহমত বর্ষণ করেন। তাদেরকে তিনি অজ্ঞতা ও কুফরীর অন্ধকার হতে বের করে ঈমানের আলোকের দিকে আনয়ন করেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু। দুনিয়ায় তিনি তাদেরকে সত্যের পথ প্রদর্শন করেন ও জীবিকার ব্যবস্থা করেন এবং আখিরাতে তিনি তাদেরকে ভয়-ভীতি ও কঠিন শাস্তি হতে বাঁচিয়ে নিবেন। ফেরেশতারা বারবার মুমিনদের কাছে এসে তাদেরকে সুসংবাদ দেন। তাদেরকে তারা বলেনঃ “তোমরা জাহান্নাম হতে মুক্তি পেয়েছে এবং জান্নাতে প্রবেশের অধিকার লাভ করেছে। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে এই যে, মহান আল্লাহ তার মুমিন বান্দাদের উপর অত্যন্ত দয়ালু ও স্নেহশীল।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে সাথে নিয়ে পথ চলছিলেন। ঐ সময় রাস্তার উপর একটি ছোট ছেলে ছিল। একটি দল আসছে দেখে ছেলেটির মা ভয় পেয়ে গেল এবং আমার ছেলে আমার ছেলে বলে চীৎকার করতে করতে ছুটে আসলো এবং ছেলেকে কোলে উঠিয়ে নিয়ে একদিকে সরে গেল। ছেলের প্রতি মায়ের এই স্নেহ ও মমতা দেখে সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মা কি এই ছেলেটিকে আগুনে ফেলতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের উদ্দেশ্য বুঝে নিয়ে বললেনঃ “না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তা'আলা কখনো তাঁর বন্ধুকে আগুনে নিক্ষেপ করবেন না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বন্দিনী নারীকে দেখেন যে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দেখা মাত্রই উঠিয়ে নিলো এবং বুকে লাগিয়ে দিয়ে দুধ পান করাতে শুরু করলো। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “আচ্ছা বল তো, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই মহিলাটি তার এই ছেলেটিকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে কি? সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! এই মহিলা তার ছেলের প্রতি যতটা স্নেহশীল ও দয়ালু, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এর চেয়ে অনেক বেশী দয়ালু।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ যেদিন তারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সেদিন তাদের প্রতি অভিবাদন হবে ‘সালাম'। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আারবি)অর্থাৎ “পরম দয়ালু প্রতিপালকের পক্ষ হতে তাদেরকে বলা হবেঃ সালাম।” (৩৬:৫৮) কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো: পরকালে মুমিনরা যখন আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তারা একে অপরকে সালাম দেবে। ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটি পছন্দ করেছেন। আমি বলিঃ এই উক্তির স্বপক্ষে দলীল হচ্ছে নিম্নের আয়াতটিঃ(আারবি) অর্থাৎ “সেখানে তাদের ধ্বনি হবে- হে আল্লাহ! আপনি মহান, পবিত্র! এবং সেখানে তাদের অভিবাদন হবেঃ সালাম এবং তাদের শেষ ধ্বনি হবে- প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর প্রাপ্য।” (১০:১০)মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনি তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন উত্তম প্রতিদান। অর্থাৎ জান্নাত এবং ওর সমুদয় ভোগ্যবস্ত যেগুলো তাদের জন্যে নির্ধারিত করে রাখা হয়েছে। সেখানে তারা পানাহারের দ্রব্য, পরিধানের বস্ত্র, বাসস্থান, স্ত্রী, নয়নাভিরাম সৌন্দর্য অবলোকন ইত্যাদি সবকিছুই পাবে! এগুলোর ধ্যান-ধারণা মানুষ করতেই পারে না। এগুলো এমনই যে, মানুষ চোখে দেখেনি, কানে শুনেনি এবং অন্তরে কল্পনাও করেনি।
আল-আহযাব 33:43
৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীরবহু প্রকারের নিয়ামতদাতা আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ আমাকে অধিক মাত্রায় স্মরণ করা তোমাদের উচিত। তাছাড়াও তিনি আরো বহু প্রকারের নিয়ামত প্রদানের ওয়াদা করেছেন। হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে উত্তম কাজ, পবিত্র আমল, সবচেয়ে উচ্চ পর্যায়ের পুণ্য, স্বর্ণ-রৌপ্য আল্লাহর পথে ব্যয় করা অপেক্ষা অধিক উত্তম এবং জিহাদ হতে অধিক মর্যাদা সম্পন্ন কাজের কথা বলবো না?” সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেটা কি উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহর যিক্র বা স্মরণ। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) (আরবি) আয়াতের তাফসীরে এগুলো ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে এমন এক দু'আ শুনেছি যা আমি কখনো পরিত্যাগ করি না। তা হলো: (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার বড় কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আপনার উপদেশের অনুসরণকারী, আপনার অধিক যিকরকারী এবং আপনার অসিয়তের অধিক হিফাযতকারী বানিয়ে দিন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বাশার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, দু'জন বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলো। তাদের একজন জিজ্ঞেস করলো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম কে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “যে ব্যক্তি দীর্ঘ সময় পেলো ও ভাল কাজ করলো।” দ্বিতীয়জন জিজ্ঞেস করলো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের উপর ইসলামের বিধান তো অনেক রয়েছে। আমাকে একটি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বিধান বাতলিয়ে দিন যার সাথে আমি সদা লেগে থাকবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহর যিক্র দ্বারা সদা-সর্বদা তোমার জিহ্বাকে সিক্ত রাখবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা খুব বেশী বেশী আল্লাহর যি কর, এমনকি জনগণ তোমাদেরকে পাগল বলে ফেলে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা খুব বেশী বেশী আল্লাহর যিক্র কর, শেষ পর্যন্ত যেন মুনাফিকরা বলতে শুরু করে যে, তোমরা লোক দেখানো যিক্র করছে। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে কওম এমন মজলিসে বসে যেখানে আল্লাহর যিক্র হয় না, তারা কিয়ামতের দিন এ জন্যে আফসোস ও দুঃখ প্রকাশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবি) আল্লাহ তা'আলার এই উক্তির ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক ফরয কাজের একটা সীমা আছে এবং বিশেষ ওজর বশতঃ তা মাফও করা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর যিক্রের কোন সীমা নেই। কোন সময়েই তা সঙ্গ ছাড়া হয় না। তবে কেউ যদি পাগল হয়ে যায় তবে সেটা অন্য কথা। দাঁড়িয়ে, বসে, রাত্রে, দিবসে, স্থলে, পানিতে, বাড়ীতে, সফরে, ধনী অবস্থায় ও দরিদ্র অবস্থায়, সুস্থ অবস্থায় ও অসুস্থ অবস্থায়, গোপনে ও প্রকাশ্যে, মোটকথা সর্বাবস্থায়ই আল্লাহর যিকর করতে হবে। সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতে হবে। তুমি যখন এগুলো করতে থাকবে তখন আল্লাহ তা'আলা তোমার উপর তার রহমত বর্ষণ করতে থাকবেন। আর ফেরেশতারাও তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবেন। এ সম্পর্কে আরো বহু হাদীস ও আসার রয়েছে। এই আয়াতেও খুব বেশী বেশী আল্লাহর যিক্র করার হিদায়াত করা হয়েছে। অনেকে আল্লাহর যিক্র ও অযীফা সম্পর্কে বহু স্বতন্ত্র পুস্তক রচনা করেছেন, যেমন ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম মামারী (রঃ) প্রমুখ। এগুলোর মধ্যে এ বিষয়ের উপর সর্বোত্তম কিতাব হচ্ছে ইমাম নববী (রঃ)-এর লিখিত কিতাব।মহান আল্লাহ বলেনঃ সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা কর সন্ধ্যায় ও সকালে। তারই জন্যে প্রশংসা আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে এবং বিকালে ও যোহরের সময়।” (৩০:১৭-১৮)অতঃপর এর ফযীলত বর্ণনা এবং এর প্রতি উৎসাহ প্রদান করার জন্যে মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ স্বয়ং তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। এতদসত্ত্বেও কি তোমরা তাঁর যি হতে উদাসীন থাকবে? যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যেমন আমি তোমাদের মধ্যে তোমাদেরই মধ্য হতে এমন এক রাসূল পাঠিয়েছি যে তোমাদের কাছে আমার নিদর্শনাবলী পাঠ করে থাকে ও তোমাদেরকে (পাপ হতে) পবিত্র করে এবং তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয় এবং তোমাদেরকে এমন কিছু শিক্ষা দেয় যা তোমরা জানতে না। সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো, এবং তোমরা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর ও অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” (২:১৫১-১৫২)।নবী (সঃ) বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে আমাকে তার অন্তরে স্মরণ করে আমিও তাকে আমার অন্তরে স্মরণ করি, আর যে আমাকে কোন জামাআত বা দলের মধ্যে স্মরণ করে, আমি তাকে এমন জামাআতের মধ্যে স্মরণ করি যা তার জামাআত হতে উত্তম।”(আারবি) শব্দটি যখন আল্লাহ তা'আলার দিকে সম্বন্ধযুক্ত হয় তখন ওর অর্থ হয় আল্লাহ তা'আলা তার কল্যাণ ও মঙ্গল তাঁর ফেরেশতাদের সামনে বর্ণনা করেন। অন্য কেউ বলেছেন যে, (আারবি) শব্দটি আল্লাহ তা'আলার দিকে সম্বন্ধযুক্ত হলে ওর অর্থ হবে রহমত। এ দু'টি উক্তির মধ্যে কোন বৈপরিত্য নেই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। আর শব্দটি (আারবি) ফেরেশতাদের দিকে সম্বন্ধযুক্ত হলে তখন অর্থ হবে মানুষের জন্যে দু'আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আারবি)অর্থাৎ “আরশ বহনকারীরা ও ওর আশে-পাশে অবস্থানকারীরা তাদের প্রতিপালকের মহিমা কীর্তন করে ও তাঁর উপর ঈমান আনে এবং মুমিন বান্দাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে গিয়ে বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আপানি প্রত্যেক জিনিসকে রহমত ও ইলম দ্বারা পরিবেষ্টন করে রেখেছেন। হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন যারা তাওবা করে ও আপনার পথে চলে। তাদেরকে আপনি জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করুন এবং জান্নাতে আদনে প্রবিষ্ট করুন যার ওয়াদা আপনি তাদের সাথে করেছেন। আর তাদের সাথে তাদেরকেও পৌছিয়ে দিন যারা তাদের বাপ-দাদা, স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে সৎকর্মশীল নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ। আর তাদেরকে মন্দ ও অসৎ কাজ হতে বাঁচিয়ে নিন।” (৪০:৭-৯) এই দু'আ ও ক্ষমা প্রার্থনার পরিপ্রেক্ষিতে মুমিন বান্দাদের উপর মহান আল্লাহ স্বীয় রহমত বর্ষণ করেন। তাদেরকে তিনি অজ্ঞতা ও কুফরীর অন্ধকার হতে বের করে ঈমানের আলোকের দিকে আনয়ন করেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু। দুনিয়ায় তিনি তাদেরকে সত্যের পথ প্রদর্শন করেন ও জীবিকার ব্যবস্থা করেন এবং আখিরাতে তিনি তাদেরকে ভয়-ভীতি ও কঠিন শাস্তি হতে বাঁচিয়ে নিবেন। ফেরেশতারা বারবার মুমিনদের কাছে এসে তাদেরকে সুসংবাদ দেন। তাদেরকে তারা বলেনঃ “তোমরা জাহান্নাম হতে মুক্তি পেয়েছে এবং জান্নাতে প্রবেশের অধিকার লাভ করেছে। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে এই যে, মহান আল্লাহ তার মুমিন বান্দাদের উপর অত্যন্ত দয়ালু ও স্নেহশীল।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে সাথে নিয়ে পথ চলছিলেন। ঐ সময় রাস্তার উপর একটি ছোট ছেলে ছিল। একটি দল আসছে দেখে ছেলেটির মা ভয় পেয়ে গেল এবং আমার ছেলে আমার ছেলে বলে চীৎকার করতে করতে ছুটে আসলো এবং ছেলেকে কোলে উঠিয়ে নিয়ে একদিকে সরে গেল। ছেলের প্রতি মায়ের এই স্নেহ ও মমতা দেখে সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মা কি এই ছেলেটিকে আগুনে ফেলতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের উদ্দেশ্য বুঝে নিয়ে বললেনঃ “না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তা'আলা কখনো তাঁর বন্ধুকে আগুনে নিক্ষেপ করবেন না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বন্দিনী নারীকে দেখেন যে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দেখা মাত্রই উঠিয়ে নিলো এবং বুকে লাগিয়ে দিয়ে দুধ পান করাতে শুরু করলো। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “আচ্ছা বল তো, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই মহিলাটি তার এই ছেলেটিকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে কি? সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! এই মহিলা তার ছেলের প্রতি যতটা স্নেহশীল ও দয়ালু, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এর চেয়ে অনেক বেশী দয়ালু।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ যেদিন তারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সেদিন তাদের প্রতি অভিবাদন হবে ‘সালাম'। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আারবি)অর্থাৎ “পরম দয়ালু প্রতিপালকের পক্ষ হতে তাদেরকে বলা হবেঃ সালাম।” (৩৬:৫৮) কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো: পরকালে মুমিনরা যখন আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তারা একে অপরকে সালাম দেবে। ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটি পছন্দ করেছেন। আমি বলিঃ এই উক্তির স্বপক্ষে দলীল হচ্ছে নিম্নের আয়াতটিঃ(আারবি) অর্থাৎ “সেখানে তাদের ধ্বনি হবে- হে আল্লাহ! আপনি মহান, পবিত্র! এবং সেখানে তাদের অভিবাদন হবেঃ সালাম এবং তাদের শেষ ধ্বনি হবে- প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর প্রাপ্য।” (১০:১০)মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনি তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন উত্তম প্রতিদান। অর্থাৎ জান্নাত এবং ওর সমুদয় ভোগ্যবস্ত যেগুলো তাদের জন্যে নির্ধারিত করে রাখা হয়েছে। সেখানে তারা পানাহারের দ্রব্য, পরিধানের বস্ত্র, বাসস্থান, স্ত্রী, নয়নাভিরাম সৌন্দর্য অবলোকন ইত্যাদি সবকিছুই পাবে! এগুলোর ধ্যান-ধারণা মানুষ করতেই পারে না। এগুলো এমনই যে, মানুষ চোখে দেখেনি, কানে শুনেনি এবং অন্তরে কল্পনাও করেনি।
আল-আহযাব 33:44
৪১-৪৪ নং আয়াতের তাফসীরবহু প্রকারের নিয়ামতদাতা আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ আমাকে অধিক মাত্রায় স্মরণ করা তোমাদের উচিত। তাছাড়াও তিনি আরো বহু প্রকারের নিয়ামত প্রদানের ওয়াদা করেছেন। হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে উত্তম কাজ, পবিত্র আমল, সবচেয়ে উচ্চ পর্যায়ের পুণ্য, স্বর্ণ-রৌপ্য আল্লাহর পথে ব্যয় করা অপেক্ষা অধিক উত্তম এবং জিহাদ হতে অধিক মর্যাদা সম্পন্ন কাজের কথা বলবো না?” সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেটা কি উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহর যিক্র বা স্মরণ। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) (আরবি) আয়াতের তাফসীরে এগুলো ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে এমন এক দু'আ শুনেছি যা আমি কখনো পরিত্যাগ করি না। তা হলো: (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার বড় কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী, আপনার উপদেশের অনুসরণকারী, আপনার অধিক যিকরকারী এবং আপনার অসিয়তের অধিক হিফাযতকারী বানিয়ে দিন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বাশার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, দু'জন বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলো। তাদের একজন জিজ্ঞেস করলো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লোকদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম কে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “যে ব্যক্তি দীর্ঘ সময় পেলো ও ভাল কাজ করলো।” দ্বিতীয়জন জিজ্ঞেস করলো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের উপর ইসলামের বিধান তো অনেক রয়েছে। আমাকে একটি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বিধান বাতলিয়ে দিন যার সাথে আমি সদা লেগে থাকবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহর যিক্র দ্বারা সদা-সর্বদা তোমার জিহ্বাকে সিক্ত রাখবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা খুব বেশী বেশী আল্লাহর যি কর, এমনকি জনগণ তোমাদেরকে পাগল বলে ফেলে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা খুব বেশী বেশী আল্লাহর যিক্র কর, শেষ পর্যন্ত যেন মুনাফিকরা বলতে শুরু করে যে, তোমরা লোক দেখানো যিক্র করছে। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে কওম এমন মজলিসে বসে যেখানে আল্লাহর যিক্র হয় না, তারা কিয়ামতের দিন এ জন্যে আফসোস ও দুঃখ প্রকাশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবি) আল্লাহ তা'আলার এই উক্তির ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক ফরয কাজের একটা সীমা আছে এবং বিশেষ ওজর বশতঃ তা মাফও করা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর যিক্রের কোন সীমা নেই। কোন সময়েই তা সঙ্গ ছাড়া হয় না। তবে কেউ যদি পাগল হয়ে যায় তবে সেটা অন্য কথা। দাঁড়িয়ে, বসে, রাত্রে, দিবসে, স্থলে, পানিতে, বাড়ীতে, সফরে, ধনী অবস্থায় ও দরিদ্র অবস্থায়, সুস্থ অবস্থায় ও অসুস্থ অবস্থায়, গোপনে ও প্রকাশ্যে, মোটকথা সর্বাবস্থায়ই আল্লাহর যিকর করতে হবে। সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতে হবে। তুমি যখন এগুলো করতে থাকবে তখন আল্লাহ তা'আলা তোমার উপর তার রহমত বর্ষণ করতে থাকবেন। আর ফেরেশতারাও তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবেন। এ সম্পর্কে আরো বহু হাদীস ও আসার রয়েছে। এই আয়াতেও খুব বেশী বেশী আল্লাহর যিক্র করার হিদায়াত করা হয়েছে। অনেকে আল্লাহর যিক্র ও অযীফা সম্পর্কে বহু স্বতন্ত্র পুস্তক রচনা করেছেন, যেমন ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম মামারী (রঃ) প্রমুখ। এগুলোর মধ্যে এ বিষয়ের উপর সর্বোত্তম কিতাব হচ্ছে ইমাম নববী (রঃ)-এর লিখিত কিতাব।মহান আল্লাহ বলেনঃ সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা কর সন্ধ্যায় ও সকালে। তারই জন্যে প্রশংসা আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে এবং বিকালে ও যোহরের সময়।” (৩০:১৭-১৮)অতঃপর এর ফযীলত বর্ণনা এবং এর প্রতি উৎসাহ প্রদান করার জন্যে মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ স্বয়ং তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। এতদসত্ত্বেও কি তোমরা তাঁর যি হতে উদাসীন থাকবে? যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যেমন আমি তোমাদের মধ্যে তোমাদেরই মধ্য হতে এমন এক রাসূল পাঠিয়েছি যে তোমাদের কাছে আমার নিদর্শনাবলী পাঠ করে থাকে ও তোমাদেরকে (পাপ হতে) পবিত্র করে এবং তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয় এবং তোমাদেরকে এমন কিছু শিক্ষা দেয় যা তোমরা জানতে না। সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো, এবং তোমরা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর ও অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” (২:১৫১-১৫২)।নবী (সঃ) বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে আমাকে তার অন্তরে স্মরণ করে আমিও তাকে আমার অন্তরে স্মরণ করি, আর যে আমাকে কোন জামাআত বা দলের মধ্যে স্মরণ করে, আমি তাকে এমন জামাআতের মধ্যে স্মরণ করি যা তার জামাআত হতে উত্তম।”(আারবি) শব্দটি যখন আল্লাহ তা'আলার দিকে সম্বন্ধযুক্ত হয় তখন ওর অর্থ হয় আল্লাহ তা'আলা তার কল্যাণ ও মঙ্গল তাঁর ফেরেশতাদের সামনে বর্ণনা করেন। অন্য কেউ বলেছেন যে, (আারবি) শব্দটি আল্লাহ তা'আলার দিকে সম্বন্ধযুক্ত হলে ওর অর্থ হবে রহমত। এ দু'টি উক্তির মধ্যে কোন বৈপরিত্য নেই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। আর শব্দটি (আারবি) ফেরেশতাদের দিকে সম্বন্ধযুক্ত হলে তখন অর্থ হবে মানুষের জন্যে দু'আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আারবি)অর্থাৎ “আরশ বহনকারীরা ও ওর আশে-পাশে অবস্থানকারীরা তাদের প্রতিপালকের মহিমা কীর্তন করে ও তাঁর উপর ঈমান আনে এবং মুমিন বান্দাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে গিয়ে বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আপানি প্রত্যেক জিনিসকে রহমত ও ইলম দ্বারা পরিবেষ্টন করে রেখেছেন। হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন যারা তাওবা করে ও আপনার পথে চলে। তাদেরকে আপনি জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করুন এবং জান্নাতে আদনে প্রবিষ্ট করুন যার ওয়াদা আপনি তাদের সাথে করেছেন। আর তাদের সাথে তাদেরকেও পৌছিয়ে দিন যারা তাদের বাপ-দাদা, স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে সৎকর্মশীল নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ। আর তাদেরকে মন্দ ও অসৎ কাজ হতে বাঁচিয়ে নিন।” (৪০:৭-৯) এই দু'আ ও ক্ষমা প্রার্থনার পরিপ্রেক্ষিতে মুমিন বান্দাদের উপর মহান আল্লাহ স্বীয় রহমত বর্ষণ করেন। তাদেরকে তিনি অজ্ঞতা ও কুফরীর অন্ধকার হতে বের করে ঈমানের আলোকের দিকে আনয়ন করেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু। দুনিয়ায় তিনি তাদেরকে সত্যের পথ প্রদর্শন করেন ও জীবিকার ব্যবস্থা করেন এবং আখিরাতে তিনি তাদেরকে ভয়-ভীতি ও কঠিন শাস্তি হতে বাঁচিয়ে নিবেন। ফেরেশতারা বারবার মুমিনদের কাছে এসে তাদেরকে সুসংবাদ দেন। তাদেরকে তারা বলেনঃ “তোমরা জাহান্নাম হতে মুক্তি পেয়েছে এবং জান্নাতে প্রবেশের অধিকার লাভ করেছে। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে এই যে, মহান আল্লাহ তার মুমিন বান্দাদের উপর অত্যন্ত দয়ালু ও স্নেহশীল।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে সাথে নিয়ে পথ চলছিলেন। ঐ সময় রাস্তার উপর একটি ছোট ছেলে ছিল। একটি দল আসছে দেখে ছেলেটির মা ভয় পেয়ে গেল এবং আমার ছেলে আমার ছেলে বলে চীৎকার করতে করতে ছুটে আসলো এবং ছেলেকে কোলে উঠিয়ে নিয়ে একদিকে সরে গেল। ছেলের প্রতি মায়ের এই স্নেহ ও মমতা দেখে সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মা কি এই ছেলেটিকে আগুনে ফেলতে পারে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের উদ্দেশ্য বুঝে নিয়ে বললেনঃ “না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তা'আলা কখনো তাঁর বন্ধুকে আগুনে নিক্ষেপ করবেন না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বন্দিনী নারীকে দেখেন যে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দেখা মাত্রই উঠিয়ে নিলো এবং বুকে লাগিয়ে দিয়ে দুধ পান করাতে শুরু করলো। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে বললেনঃ “আচ্ছা বল তো, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই মহিলাটি তার এই ছেলেটিকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে কি? সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! এই মহিলা তার ছেলের প্রতি যতটা স্নেহশীল ও দয়ালু, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এর চেয়ে অনেক বেশী দয়ালু।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহর উক্তিঃ যেদিন তারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সেদিন তাদের প্রতি অভিবাদন হবে ‘সালাম'। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আারবি)অর্থাৎ “পরম দয়ালু প্রতিপালকের পক্ষ হতে তাদেরকে বলা হবেঃ সালাম।” (৩৬:৫৮) কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলো: পরকালে মুমিনরা যখন আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তারা একে অপরকে সালাম দেবে। ইবনে জারীর (রঃ) এ উক্তিটি পছন্দ করেছেন। আমি বলিঃ এই উক্তির স্বপক্ষে দলীল হচ্ছে নিম্নের আয়াতটিঃ(আারবি) অর্থাৎ “সেখানে তাদের ধ্বনি হবে- হে আল্লাহ! আপনি মহান, পবিত্র! এবং সেখানে তাদের অভিবাদন হবেঃ সালাম এবং তাদের শেষ ধ্বনি হবে- প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর প্রাপ্য।” (১০:১০)মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনি তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন উত্তম প্রতিদান। অর্থাৎ জান্নাত এবং ওর সমুদয় ভোগ্যবস্ত যেগুলো তাদের জন্যে নির্ধারিত করে রাখা হয়েছে। সেখানে তারা পানাহারের দ্রব্য, পরিধানের বস্ত্র, বাসস্থান, স্ত্রী, নয়নাভিরাম সৌন্দর্য অবলোকন ইত্যাদি সবকিছুই পাবে! এগুলোর ধ্যান-ধারণা মানুষ করতেই পারে না। এগুলো এমনই যে, মানুষ চোখে দেখেনি, কানে শুনেনি এবং অন্তরে কল্পনাও করেনি।
আল-আহযাব 33:45
৪৫-৪৮ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আতা ইবনে ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাঁকে বললামঃ তাওরাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যে বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে আমাকে তার খবর দিন। উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, কুরআন কারীমে তার যে বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে তারই কতক অংশ তাওরাতেও বর্ণিত হয়েছে। তাওরাতে রয়েছেঃ হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে। অজ্ঞ ও নিরক্ষর লোকদেরকে তুমি সতর্ক করবে। তুমি আমার বান্দা ও রাসূল। আমি তোমার নাম মুতাওয়াকিল (ভরসাকারী) রেখেছি। তুমি কঠোর চিত্ত ও কর্কশভাষী নও। তুমি বাজারে গোলমাল ও চীকার করে বেড়াও না। তুমি মন্দকে মন্দ দ্বারা দূরীভূত কর না। বরং তুমি ক্ষমা ও মাফ করে থাকো। আল্লাহ তোমাকে কখনো উঠিয়ে নিবেন না যে পর্যন্ত না তুমি মানুষের বক্রকৃত দ্বীনকে সোজা করবে। আর তারা যে পর্যন্ত বলবেঃ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। যার দ্বারা অন্ধের চক্ষু উজ্জ্বল হয়ে যাবে, বধির শ্রবণশক্তি ফিরে পাবে এবং মোহরকৃত অন্তর খুলে যাবে।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের নবীদের মধ্যে শুইয়া (আঃ) নামক একজন নবীর নিকট অহী করলেনঃ “তুমি তোমার কওম বানী ইসরাঈলের জন্যে দাঁড়িয়ে যাও। আমি তোমার মুখের ভাষায় আমার কথা বলবো। আমি অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের মধ্যে। একজন নিরক্ষর নবীকে পাঠাবো। সে না বদ স্বভাবের হবে, না কর্কশভাষী হবে। সে হাটে-বাজারে হট্টগোল সৃষ্টি করবে না। সে এতো শান্ত-শিষ্ট হবে যে, জ্বলন্ত প্রদীপের পার্শ্ব দিয়ে সে গমন করলেও প্রদীপটি নিভে যাবে না। যদি সে বাঁশের উপর দিয়েও চলে তবুও তাতে তার পায়ের শব্দ হবে না। আমি তাকে সুসংবাদ প্রদানকারী ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করবো। সে সত্যভাষী হবে। আমি তার সম্মানার্থে অন্ধের চক্ষ খুলে দিবো, বধির শ্রবণশক্তি ফিরে পাবে এবং দাগ ও কালিমাযুক্ত অন্তরকে পরিষ্কার করে দিবো। আমি তাকে প্রত্যেক ভাল কাজের দিকে পরিচালিত করবো। সমস্ত ভাল স্বভাব তার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। লোকের অন্তর জয়কারী হবে তার পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সৎ কাজ করা তার প্রকৃতিগত বিষয় হবে। তার অন্তর আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকবে। তার কথাবার্তা হবে হিকমত পূর্ণ। সত্যবাদিতা ও অঙ্গীকার পালন হবে তার স্বভাবগত বিষয়। ক্ষমা ও সদাচরণ হবে তার চরিত্রগত গুণ। সত্য হবে তার শরীয়ত। তার স্বভাব-চরিত্রে থাকবে ন্যায়পরায়ণতা। হিদায়াত হবে তার কাম্য। ইসলাম হবে তার মিল্লাত। তার নাম হবে আহমাদ (সঃ)। তার মাধ্যমে আমি পথভ্রষ্টকে সুপথ প্রদর্শন করবো, মূর্খদেরকে বিদ্বান বানিয়ে দিবো। অধঃপতিতকে করবো মর্যাদাবান। অপরিচিতকে করবো খ্যাতি সম্পন্ন ও সকলের পরিচিত। তার কারণে আমি রিক্ত হস্তকে দান করবো প্রচুর সম্পদ। ফকীরকে বানিয়ে দিবো বাদশাহ। কঠোর হৃদয়ের লোকের অন্তরে আমি দয়া ও প্রেম-প্রীতি দিয়ে দিবো। মতভেদকে ইত্তেফাকে পরিবর্তিত করবো। মতপার্থক্যকে করে দিবো একমত। তার কারণে আমি দুনিয়াকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করবো। সমস্ত উম্মত হতে তার উম্মত হবে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদা সম্পন্ন। মানব জাতির উপকারার্থে তাদের আবির্ভাব ঘটবে, তারা সৎ কার্যের নির্দেশ দান করবে ও মন্দ কার্যে বাধা দেবে। তারা হবে একত্ববাদী মুমিন ও নিষ্ঠাবান। পূর্ববর্তী নবীদের উপর যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তারা মেনে নেবে। তারা মসজিদে, মজলিসে, চলা-ফেরাতে এবং উঠা-বসাতে আমার মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণাকারী হবে। তারা আমার জন্যে দাঁড়িয়ে ও বসে নামায পড়বে। আল্লাহর পথে দলবদ্ধ ও সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধ করবে। তাদের মধ্যে হাজার হাজার লোক আমার সন্তুষ্টির অন্বেষণে ঘরবাড়ী ছেড়ে জিহাদের জন্যে সদা প্রস্তুত থাকবে। অযু করার জন্যে তারা মুখ-হাত ধৌত করবে। পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত তারা কাপড় পরিধান করবে। আমার কিতাব তাদের বুকে বাঁধা থাকবে। আমার নামে তারা কুরবানী করবে। তারা হবে রাত্রে আবেদ এবং দিনে মুজাহিদ। এই নবীর আহূলে বায়েত ও সন্তানদের মধ্যে আমি অগ্রগামী, সত্যের সাধক, শহীদ ও সৎ লোকদেরকে সৃষ্টি করবো। তারপরে তার উম্মত দুনিয়ায় সত্যের পথে মানুষকে আহ্বান করতে থাকবে এবং ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম করবে। তাদেরকে যারা সাহায্য করবে তাদেরকে আমি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবো। পক্ষান্তরে তাদের যারা বিরোধিতা ও বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং অমঙ্গল কামনা করবে তাদের জন্যে আমি খুব মন্দ দিন আনয়ন করবো। আমি এই নবীর উম্মতকে নবীর ওয়ারিশ বানিয়ে দিবো। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে আহ্বানকারী হবে। তারা ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করবে। তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। ঐ ভাল কাজ আমি তাদের হাতেই সমাপ্ত করাবো, যা তারা শুরু করেছিল। এটা আমার অনুগ্রহ। এই অনুগ্রহ আমি। যাকে ইচ্ছা প্রদান করে থাকি এবং আমি বড় অনুগ্রহশীল।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় ঐ সময় যখন তিনি হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত মুআয (রাঃ)-কে ইয়ামনের শাসনকর্তা করে পাঠাচ্ছিলেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা দু’জন যাও, সুসংবাদ শুনাবে, ঘৃণা উৎপাদন করবে না, সহজ পন্থা বাতলাবে, তাদের প্রতি কঠোর হবে কেননা, আমার প্রতি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে- “হে নবী (সঃ)! আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে।' অর্থাৎ তুমি তোমার উম্মতের উপর সাক্ষী হবে, জান্নাতের সুসংবাদদাতা ও জাহান্নাম হতে সতর্ককারী হবে এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে এই সাক্ষ্যদানের দিকে আহ্বানকারী হবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং কুরআনের মাধ্যমে উজ্জ্বল প্রদীপ হবে।” সুতরাং আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) বা সাক্ষী দ্বারা বুঝানো হয়েছে আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষী হওয়াকে। আর কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মানুষের আমলের উপর সাক্ষী হবেন। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করবো।” (৪:৪১) যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যেন তোমরা (উম্মতে মুহাম্মাদী সঃ) লোকদের (অন্যান্য নবীদের উম্মতের) উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল (সঃ) তোমাদের উপর সাক্ষী হন।” (২:১৪৩)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি মুমিনদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদানকারী এবং কাফিরদেরকে জাহান্নাম হতে ভয় প্রদর্শনকারী। আর তুমি আল্লাহর অনুমতিক্রমে সমগ্র সৃষ্টিকে আল্লাহর দাসত্বের দিকে আহ্বানকারী। তোমার সত্যতা ঐ রকম সুপ্রতিষ্ঠিত যেমন সূর্যের আলো সুপ্রতিষ্ঠিত। যদি কোন হঠকারী লোক অকারণে হঠকারিতা করে তবে সেটা অন্য কথা।এরপর মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তুমি কাফির ও মুনাফিকদের কথা মেনে নিয়ো না, বরং তাদের কথা ছেড়ে দাও। আর তারা যে তোমাকে কষ্ট দেয় ও তোমার প্রতি নির্যাতন করে সেটা তুমি উপেক্ষা কর, ওটাকে কিছুই মনে করো , বরং আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভরশীল হও। কর্মবিধায়করূপে তিনিই যথেষ্ট।
আল-আহযাব 33:46
৪৫-৪৮ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আতা ইবনে ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাঁকে বললামঃ তাওরাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যে বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে আমাকে তার খবর দিন। উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, কুরআন কারীমে তার যে বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে তারই কতক অংশ তাওরাতেও বর্ণিত হয়েছে। তাওরাতে রয়েছেঃ হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে। অজ্ঞ ও নিরক্ষর লোকদেরকে তুমি সতর্ক করবে। তুমি আমার বান্দা ও রাসূল। আমি তোমার নাম মুতাওয়াকিল (ভরসাকারী) রেখেছি। তুমি কঠোর চিত্ত ও কর্কশভাষী নও। তুমি বাজারে গোলমাল ও চীকার করে বেড়াও না। তুমি মন্দকে মন্দ দ্বারা দূরীভূত কর না। বরং তুমি ক্ষমা ও মাফ করে থাকো। আল্লাহ তোমাকে কখনো উঠিয়ে নিবেন না যে পর্যন্ত না তুমি মানুষের বক্রকৃত দ্বীনকে সোজা করবে। আর তারা যে পর্যন্ত বলবেঃ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। যার দ্বারা অন্ধের চক্ষু উজ্জ্বল হয়ে যাবে, বধির শ্রবণশক্তি ফিরে পাবে এবং মোহরকৃত অন্তর খুলে যাবে।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের নবীদের মধ্যে শুইয়া (আঃ) নামক একজন নবীর নিকট অহী করলেনঃ “তুমি তোমার কওম বানী ইসরাঈলের জন্যে দাঁড়িয়ে যাও। আমি তোমার মুখের ভাষায় আমার কথা বলবো। আমি অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের মধ্যে। একজন নিরক্ষর নবীকে পাঠাবো। সে না বদ স্বভাবের হবে, না কর্কশভাষী হবে। সে হাটে-বাজারে হট্টগোল সৃষ্টি করবে না। সে এতো শান্ত-শিষ্ট হবে যে, জ্বলন্ত প্রদীপের পার্শ্ব দিয়ে সে গমন করলেও প্রদীপটি নিভে যাবে না। যদি সে বাঁশের উপর দিয়েও চলে তবুও তাতে তার পায়ের শব্দ হবে না। আমি তাকে সুসংবাদ প্রদানকারী ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করবো। সে সত্যভাষী হবে। আমি তার সম্মানার্থে অন্ধের চক্ষ খুলে দিবো, বধির শ্রবণশক্তি ফিরে পাবে এবং দাগ ও কালিমাযুক্ত অন্তরকে পরিষ্কার করে দিবো। আমি তাকে প্রত্যেক ভাল কাজের দিকে পরিচালিত করবো। সমস্ত ভাল স্বভাব তার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। লোকের অন্তর জয়কারী হবে তার পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সৎ কাজ করা তার প্রকৃতিগত বিষয় হবে। তার অন্তর আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকবে। তার কথাবার্তা হবে হিকমত পূর্ণ। সত্যবাদিতা ও অঙ্গীকার পালন হবে তার স্বভাবগত বিষয়। ক্ষমা ও সদাচরণ হবে তার চরিত্রগত গুণ। সত্য হবে তার শরীয়ত। তার স্বভাব-চরিত্রে থাকবে ন্যায়পরায়ণতা। হিদায়াত হবে তার কাম্য। ইসলাম হবে তার মিল্লাত। তার নাম হবে আহমাদ (সঃ)। তার মাধ্যমে আমি পথভ্রষ্টকে সুপথ প্রদর্শন করবো, মূর্খদেরকে বিদ্বান বানিয়ে দিবো। অধঃপতিতকে করবো মর্যাদাবান। অপরিচিতকে করবো খ্যাতি সম্পন্ন ও সকলের পরিচিত। তার কারণে আমি রিক্ত হস্তকে দান করবো প্রচুর সম্পদ। ফকীরকে বানিয়ে দিবো বাদশাহ। কঠোর হৃদয়ের লোকের অন্তরে আমি দয়া ও প্রেম-প্রীতি দিয়ে দিবো। মতভেদকে ইত্তেফাকে পরিবর্তিত করবো। মতপার্থক্যকে করে দিবো একমত। তার কারণে আমি দুনিয়াকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করবো। সমস্ত উম্মত হতে তার উম্মত হবে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদা সম্পন্ন। মানব জাতির উপকারার্থে তাদের আবির্ভাব ঘটবে, তারা সৎ কার্যের নির্দেশ দান করবে ও মন্দ কার্যে বাধা দেবে। তারা হবে একত্ববাদী মুমিন ও নিষ্ঠাবান। পূর্ববর্তী নবীদের উপর যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তারা মেনে নেবে। তারা মসজিদে, মজলিসে, চলা-ফেরাতে এবং উঠা-বসাতে আমার মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণাকারী হবে। তারা আমার জন্যে দাঁড়িয়ে ও বসে নামায পড়বে। আল্লাহর পথে দলবদ্ধ ও সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধ করবে। তাদের মধ্যে হাজার হাজার লোক আমার সন্তুষ্টির অন্বেষণে ঘরবাড়ী ছেড়ে জিহাদের জন্যে সদা প্রস্তুত থাকবে। অযু করার জন্যে তারা মুখ-হাত ধৌত করবে। পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত তারা কাপড় পরিধান করবে। আমার কিতাব তাদের বুকে বাঁধা থাকবে। আমার নামে তারা কুরবানী করবে। তারা হবে রাত্রে আবেদ এবং দিনে মুজাহিদ। এই নবীর আহূলে বায়েত ও সন্তানদের মধ্যে আমি অগ্রগামী, সত্যের সাধক, শহীদ ও সৎ লোকদেরকে সৃষ্টি করবো। তারপরে তার উম্মত দুনিয়ায় সত্যের পথে মানুষকে আহ্বান করতে থাকবে এবং ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম করবে। তাদেরকে যারা সাহায্য করবে তাদেরকে আমি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবো। পক্ষান্তরে তাদের যারা বিরোধিতা ও বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং অমঙ্গল কামনা করবে তাদের জন্যে আমি খুব মন্দ দিন আনয়ন করবো। আমি এই নবীর উম্মতকে নবীর ওয়ারিশ বানিয়ে দিবো। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে আহ্বানকারী হবে। তারা ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করবে। তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। ঐ ভাল কাজ আমি তাদের হাতেই সমাপ্ত করাবো, যা তারা শুরু করেছিল। এটা আমার অনুগ্রহ। এই অনুগ্রহ আমি। যাকে ইচ্ছা প্রদান করে থাকি এবং আমি বড় অনুগ্রহশীল।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় ঐ সময় যখন তিনি হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত মুআয (রাঃ)-কে ইয়ামনের শাসনকর্তা করে পাঠাচ্ছিলেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা দু’জন যাও, সুসংবাদ শুনাবে, ঘৃণা উৎপাদন করবে না, সহজ পন্থা বাতলাবে, তাদের প্রতি কঠোর হবে কেননা, আমার প্রতি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে- “হে নবী (সঃ)! আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে।' অর্থাৎ তুমি তোমার উম্মতের উপর সাক্ষী হবে, জান্নাতের সুসংবাদদাতা ও জাহান্নাম হতে সতর্ককারী হবে এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে এই সাক্ষ্যদানের দিকে আহ্বানকারী হবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং কুরআনের মাধ্যমে উজ্জ্বল প্রদীপ হবে।” সুতরাং আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) বা সাক্ষী দ্বারা বুঝানো হয়েছে আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষী হওয়াকে। আর কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মানুষের আমলের উপর সাক্ষী হবেন। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করবো।” (৪:৪১) যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যেন তোমরা (উম্মতে মুহাম্মাদী সঃ) লোকদের (অন্যান্য নবীদের উম্মতের) উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল (সঃ) তোমাদের উপর সাক্ষী হন।” (২:১৪৩)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি মুমিনদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদানকারী এবং কাফিরদেরকে জাহান্নাম হতে ভয় প্রদর্শনকারী। আর তুমি আল্লাহর অনুমতিক্রমে সমগ্র সৃষ্টিকে আল্লাহর দাসত্বের দিকে আহ্বানকারী। তোমার সত্যতা ঐ রকম সুপ্রতিষ্ঠিত যেমন সূর্যের আলো সুপ্রতিষ্ঠিত। যদি কোন হঠকারী লোক অকারণে হঠকারিতা করে তবে সেটা অন্য কথা।এরপর মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তুমি কাফির ও মুনাফিকদের কথা মেনে নিয়ো না, বরং তাদের কথা ছেড়ে দাও। আর তারা যে তোমাকে কষ্ট দেয় ও তোমার প্রতি নির্যাতন করে সেটা তুমি উপেক্ষা কর, ওটাকে কিছুই মনে করো , বরং আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভরশীল হও। কর্মবিধায়করূপে তিনিই যথেষ্ট।
আল-আহযাব 33:47
৪৫-৪৮ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আতা ইবনে ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাঁকে বললামঃ তাওরাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যে বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে আমাকে তার খবর দিন। উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, কুরআন কারীমে তার যে বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে তারই কতক অংশ তাওরাতেও বর্ণিত হয়েছে। তাওরাতে রয়েছেঃ হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে। অজ্ঞ ও নিরক্ষর লোকদেরকে তুমি সতর্ক করবে। তুমি আমার বান্দা ও রাসূল। আমি তোমার নাম মুতাওয়াকিল (ভরসাকারী) রেখেছি। তুমি কঠোর চিত্ত ও কর্কশভাষী নও। তুমি বাজারে গোলমাল ও চীকার করে বেড়াও না। তুমি মন্দকে মন্দ দ্বারা দূরীভূত কর না। বরং তুমি ক্ষমা ও মাফ করে থাকো। আল্লাহ তোমাকে কখনো উঠিয়ে নিবেন না যে পর্যন্ত না তুমি মানুষের বক্রকৃত দ্বীনকে সোজা করবে। আর তারা যে পর্যন্ত বলবেঃ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। যার দ্বারা অন্ধের চক্ষু উজ্জ্বল হয়ে যাবে, বধির শ্রবণশক্তি ফিরে পাবে এবং মোহরকৃত অন্তর খুলে যাবে।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের নবীদের মধ্যে শুইয়া (আঃ) নামক একজন নবীর নিকট অহী করলেনঃ “তুমি তোমার কওম বানী ইসরাঈলের জন্যে দাঁড়িয়ে যাও। আমি তোমার মুখের ভাষায় আমার কথা বলবো। আমি অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের মধ্যে। একজন নিরক্ষর নবীকে পাঠাবো। সে না বদ স্বভাবের হবে, না কর্কশভাষী হবে। সে হাটে-বাজারে হট্টগোল সৃষ্টি করবে না। সে এতো শান্ত-শিষ্ট হবে যে, জ্বলন্ত প্রদীপের পার্শ্ব দিয়ে সে গমন করলেও প্রদীপটি নিভে যাবে না। যদি সে বাঁশের উপর দিয়েও চলে তবুও তাতে তার পায়ের শব্দ হবে না। আমি তাকে সুসংবাদ প্রদানকারী ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করবো। সে সত্যভাষী হবে। আমি তার সম্মানার্থে অন্ধের চক্ষ খুলে দিবো, বধির শ্রবণশক্তি ফিরে পাবে এবং দাগ ও কালিমাযুক্ত অন্তরকে পরিষ্কার করে দিবো। আমি তাকে প্রত্যেক ভাল কাজের দিকে পরিচালিত করবো। সমস্ত ভাল স্বভাব তার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। লোকের অন্তর জয়কারী হবে তার পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সৎ কাজ করা তার প্রকৃতিগত বিষয় হবে। তার অন্তর আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকবে। তার কথাবার্তা হবে হিকমত পূর্ণ। সত্যবাদিতা ও অঙ্গীকার পালন হবে তার স্বভাবগত বিষয়। ক্ষমা ও সদাচরণ হবে তার চরিত্রগত গুণ। সত্য হবে তার শরীয়ত। তার স্বভাব-চরিত্রে থাকবে ন্যায়পরায়ণতা। হিদায়াত হবে তার কাম্য। ইসলাম হবে তার মিল্লাত। তার নাম হবে আহমাদ (সঃ)। তার মাধ্যমে আমি পথভ্রষ্টকে সুপথ প্রদর্শন করবো, মূর্খদেরকে বিদ্বান বানিয়ে দিবো। অধঃপতিতকে করবো মর্যাদাবান। অপরিচিতকে করবো খ্যাতি সম্পন্ন ও সকলের পরিচিত। তার কারণে আমি রিক্ত হস্তকে দান করবো প্রচুর সম্পদ। ফকীরকে বানিয়ে দিবো বাদশাহ। কঠোর হৃদয়ের লোকের অন্তরে আমি দয়া ও প্রেম-প্রীতি দিয়ে দিবো। মতভেদকে ইত্তেফাকে পরিবর্তিত করবো। মতপার্থক্যকে করে দিবো একমত। তার কারণে আমি দুনিয়াকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করবো। সমস্ত উম্মত হতে তার উম্মত হবে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদা সম্পন্ন। মানব জাতির উপকারার্থে তাদের আবির্ভাব ঘটবে, তারা সৎ কার্যের নির্দেশ দান করবে ও মন্দ কার্যে বাধা দেবে। তারা হবে একত্ববাদী মুমিন ও নিষ্ঠাবান। পূর্ববর্তী নবীদের উপর যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তারা মেনে নেবে। তারা মসজিদে, মজলিসে, চলা-ফেরাতে এবং উঠা-বসাতে আমার মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণাকারী হবে। তারা আমার জন্যে দাঁড়িয়ে ও বসে নামায পড়বে। আল্লাহর পথে দলবদ্ধ ও সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধ করবে। তাদের মধ্যে হাজার হাজার লোক আমার সন্তুষ্টির অন্বেষণে ঘরবাড়ী ছেড়ে জিহাদের জন্যে সদা প্রস্তুত থাকবে। অযু করার জন্যে তারা মুখ-হাত ধৌত করবে। পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত তারা কাপড় পরিধান করবে। আমার কিতাব তাদের বুকে বাঁধা থাকবে। আমার নামে তারা কুরবানী করবে। তারা হবে রাত্রে আবেদ এবং দিনে মুজাহিদ। এই নবীর আহূলে বায়েত ও সন্তানদের মধ্যে আমি অগ্রগামী, সত্যের সাধক, শহীদ ও সৎ লোকদেরকে সৃষ্টি করবো। তারপরে তার উম্মত দুনিয়ায় সত্যের পথে মানুষকে আহ্বান করতে থাকবে এবং ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম করবে। তাদেরকে যারা সাহায্য করবে তাদেরকে আমি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবো। পক্ষান্তরে তাদের যারা বিরোধিতা ও বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং অমঙ্গল কামনা করবে তাদের জন্যে আমি খুব মন্দ দিন আনয়ন করবো। আমি এই নবীর উম্মতকে নবীর ওয়ারিশ বানিয়ে দিবো। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে আহ্বানকারী হবে। তারা ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করবে। তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। ঐ ভাল কাজ আমি তাদের হাতেই সমাপ্ত করাবো, যা তারা শুরু করেছিল। এটা আমার অনুগ্রহ। এই অনুগ্রহ আমি। যাকে ইচ্ছা প্রদান করে থাকি এবং আমি বড় অনুগ্রহশীল।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় ঐ সময় যখন তিনি হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত মুআয (রাঃ)-কে ইয়ামনের শাসনকর্তা করে পাঠাচ্ছিলেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা দু’জন যাও, সুসংবাদ শুনাবে, ঘৃণা উৎপাদন করবে না, সহজ পন্থা বাতলাবে, তাদের প্রতি কঠোর হবে কেননা, আমার প্রতি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে- “হে নবী (সঃ)! আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে।' অর্থাৎ তুমি তোমার উম্মতের উপর সাক্ষী হবে, জান্নাতের সুসংবাদদাতা ও জাহান্নাম হতে সতর্ককারী হবে এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে এই সাক্ষ্যদানের দিকে আহ্বানকারী হবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং কুরআনের মাধ্যমে উজ্জ্বল প্রদীপ হবে।” সুতরাং আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) বা সাক্ষী দ্বারা বুঝানো হয়েছে আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষী হওয়াকে। আর কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মানুষের আমলের উপর সাক্ষী হবেন। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করবো।” (৪:৪১) যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যেন তোমরা (উম্মতে মুহাম্মাদী সঃ) লোকদের (অন্যান্য নবীদের উম্মতের) উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল (সঃ) তোমাদের উপর সাক্ষী হন।” (২:১৪৩)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি মুমিনদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদানকারী এবং কাফিরদেরকে জাহান্নাম হতে ভয় প্রদর্শনকারী। আর তুমি আল্লাহর অনুমতিক্রমে সমগ্র সৃষ্টিকে আল্লাহর দাসত্বের দিকে আহ্বানকারী। তোমার সত্যতা ঐ রকম সুপ্রতিষ্ঠিত যেমন সূর্যের আলো সুপ্রতিষ্ঠিত। যদি কোন হঠকারী লোক অকারণে হঠকারিতা করে তবে সেটা অন্য কথা।এরপর মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তুমি কাফির ও মুনাফিকদের কথা মেনে নিয়ো না, বরং তাদের কথা ছেড়ে দাও। আর তারা যে তোমাকে কষ্ট দেয় ও তোমার প্রতি নির্যাতন করে সেটা তুমি উপেক্ষা কর, ওটাকে কিছুই মনে করো , বরং আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভরশীল হও। কর্মবিধায়করূপে তিনিই যথেষ্ট।
আল-আহযাব 33:48
৪৫-৪৮ নং আয়াতের তাফসীরহযরত আতা ইবনে ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাঁকে বললামঃ তাওরাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যে বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে আমাকে তার খবর দিন। উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যা, কুরআন কারীমে তার যে বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে তারই কতক অংশ তাওরাতেও বর্ণিত হয়েছে। তাওরাতে রয়েছেঃ হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে। অজ্ঞ ও নিরক্ষর লোকদেরকে তুমি সতর্ক করবে। তুমি আমার বান্দা ও রাসূল। আমি তোমার নাম মুতাওয়াকিল (ভরসাকারী) রেখেছি। তুমি কঠোর চিত্ত ও কর্কশভাষী নও। তুমি বাজারে গোলমাল ও চীকার করে বেড়াও না। তুমি মন্দকে মন্দ দ্বারা দূরীভূত কর না। বরং তুমি ক্ষমা ও মাফ করে থাকো। আল্লাহ তোমাকে কখনো উঠিয়ে নিবেন না যে পর্যন্ত না তুমি মানুষের বক্রকৃত দ্বীনকে সোজা করবে। আর তারা যে পর্যন্ত বলবেঃ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। যার দ্বারা অন্ধের চক্ষু উজ্জ্বল হয়ে যাবে, বধির শ্রবণশক্তি ফিরে পাবে এবং মোহরকৃত অন্তর খুলে যাবে।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলের নবীদের মধ্যে শুইয়া (আঃ) নামক একজন নবীর নিকট অহী করলেনঃ “তুমি তোমার কওম বানী ইসরাঈলের জন্যে দাঁড়িয়ে যাও। আমি তোমার মুখের ভাষায় আমার কথা বলবো। আমি অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের মধ্যে। একজন নিরক্ষর নবীকে পাঠাবো। সে না বদ স্বভাবের হবে, না কর্কশভাষী হবে। সে হাটে-বাজারে হট্টগোল সৃষ্টি করবে না। সে এতো শান্ত-শিষ্ট হবে যে, জ্বলন্ত প্রদীপের পার্শ্ব দিয়ে সে গমন করলেও প্রদীপটি নিভে যাবে না। যদি সে বাঁশের উপর দিয়েও চলে তবুও তাতে তার পায়ের শব্দ হবে না। আমি তাকে সুসংবাদ প্রদানকারী ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করবো। সে সত্যভাষী হবে। আমি তার সম্মানার্থে অন্ধের চক্ষ খুলে দিবো, বধির শ্রবণশক্তি ফিরে পাবে এবং দাগ ও কালিমাযুক্ত অন্তরকে পরিষ্কার করে দিবো। আমি তাকে প্রত্যেক ভাল কাজের দিকে পরিচালিত করবো। সমস্ত ভাল স্বভাব তার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। লোকের অন্তর জয়কারী হবে তার পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সৎ কাজ করা তার প্রকৃতিগত বিষয় হবে। তার অন্তর আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকবে। তার কথাবার্তা হবে হিকমত পূর্ণ। সত্যবাদিতা ও অঙ্গীকার পালন হবে তার স্বভাবগত বিষয়। ক্ষমা ও সদাচরণ হবে তার চরিত্রগত গুণ। সত্য হবে তার শরীয়ত। তার স্বভাব-চরিত্রে থাকবে ন্যায়পরায়ণতা। হিদায়াত হবে তার কাম্য। ইসলাম হবে তার মিল্লাত। তার নাম হবে আহমাদ (সঃ)। তার মাধ্যমে আমি পথভ্রষ্টকে সুপথ প্রদর্শন করবো, মূর্খদেরকে বিদ্বান বানিয়ে দিবো। অধঃপতিতকে করবো মর্যাদাবান। অপরিচিতকে করবো খ্যাতি সম্পন্ন ও সকলের পরিচিত। তার কারণে আমি রিক্ত হস্তকে দান করবো প্রচুর সম্পদ। ফকীরকে বানিয়ে দিবো বাদশাহ। কঠোর হৃদয়ের লোকের অন্তরে আমি দয়া ও প্রেম-প্রীতি দিয়ে দিবো। মতভেদকে ইত্তেফাকে পরিবর্তিত করবো। মতপার্থক্যকে করে দিবো একমত। তার কারণে আমি দুনিয়াকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করবো। সমস্ত উম্মত হতে তার উম্মত হবে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদা সম্পন্ন। মানব জাতির উপকারার্থে তাদের আবির্ভাব ঘটবে, তারা সৎ কার্যের নির্দেশ দান করবে ও মন্দ কার্যে বাধা দেবে। তারা হবে একত্ববাদী মুমিন ও নিষ্ঠাবান। পূর্ববর্তী নবীদের উপর যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তারা মেনে নেবে। তারা মসজিদে, মজলিসে, চলা-ফেরাতে এবং উঠা-বসাতে আমার মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণাকারী হবে। তারা আমার জন্যে দাঁড়িয়ে ও বসে নামায পড়বে। আল্লাহর পথে দলবদ্ধ ও সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধ করবে। তাদের মধ্যে হাজার হাজার লোক আমার সন্তুষ্টির অন্বেষণে ঘরবাড়ী ছেড়ে জিহাদের জন্যে সদা প্রস্তুত থাকবে। অযু করার জন্যে তারা মুখ-হাত ধৌত করবে। পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত তারা কাপড় পরিধান করবে। আমার কিতাব তাদের বুকে বাঁধা থাকবে। আমার নামে তারা কুরবানী করবে। তারা হবে রাত্রে আবেদ এবং দিনে মুজাহিদ। এই নবীর আহূলে বায়েত ও সন্তানদের মধ্যে আমি অগ্রগামী, সত্যের সাধক, শহীদ ও সৎ লোকদেরকে সৃষ্টি করবো। তারপরে তার উম্মত দুনিয়ায় সত্যের পথে মানুষকে আহ্বান করতে থাকবে এবং ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম করবে। তাদেরকে যারা সাহায্য করবে তাদেরকে আমি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবো। পক্ষান্তরে তাদের যারা বিরোধিতা ও বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং অমঙ্গল কামনা করবে তাদের জন্যে আমি খুব মন্দ দিন আনয়ন করবো। আমি এই নবীর উম্মতকে নবীর ওয়ারিশ বানিয়ে দিবো। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে আহ্বানকারী হবে। তারা ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করবে। তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। ঐ ভাল কাজ আমি তাদের হাতেই সমাপ্ত করাবো, যা তারা শুরু করেছিল। এটা আমার অনুগ্রহ। এই অনুগ্রহ আমি। যাকে ইচ্ছা প্রদান করে থাকি এবং আমি বড় অনুগ্রহশীল।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় ঐ সময় যখন তিনি হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত মুআয (রাঃ)-কে ইয়ামনের শাসনকর্তা করে পাঠাচ্ছিলেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা দু’জন যাও, সুসংবাদ শুনাবে, ঘৃণা উৎপাদন করবে না, সহজ পন্থা বাতলাবে, তাদের প্রতি কঠোর হবে কেননা, আমার প্রতি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে- “হে নবী (সঃ)! আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে।' অর্থাৎ তুমি তোমার উম্মতের উপর সাক্ষী হবে, জান্নাতের সুসংবাদদাতা ও জাহান্নাম হতে সতর্ককারী হবে এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে এই সাক্ষ্যদানের দিকে আহ্বানকারী হবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং কুরআনের মাধ্যমে উজ্জ্বল প্রদীপ হবে।” সুতরাং আল্লাহ তা'আলার উক্তি (আরবি) বা সাক্ষী দ্বারা বুঝানো হয়েছে আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষী হওয়াকে। আর কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মানুষের আমলের উপর সাক্ষী হবেন। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করবো।” (৪:৪১) যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যেন তোমরা (উম্মতে মুহাম্মাদী সঃ) লোকদের (অন্যান্য নবীদের উম্মতের) উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল (সঃ) তোমাদের উপর সাক্ষী হন।” (২:১৪৩)মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি মুমিনদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদানকারী এবং কাফিরদেরকে জাহান্নাম হতে ভয় প্রদর্শনকারী। আর তুমি আল্লাহর অনুমতিক্রমে সমগ্র সৃষ্টিকে আল্লাহর দাসত্বের দিকে আহ্বানকারী। তোমার সত্যতা ঐ রকম সুপ্রতিষ্ঠিত যেমন সূর্যের আলো সুপ্রতিষ্ঠিত। যদি কোন হঠকারী লোক অকারণে হঠকারিতা করে তবে সেটা অন্য কথা।এরপর মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তুমি কাফির ও মুনাফিকদের কথা মেনে নিয়ো না, বরং তাদের কথা ছেড়ে দাও। আর তারা যে তোমাকে কষ্ট দেয় ও তোমার প্রতি নির্যাতন করে সেটা তুমি উপেক্ষা কর, ওটাকে কিছুই মনে করো , বরং আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভরশীল হও। কর্মবিধায়করূপে তিনিই যথেষ্ট।