Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-আহযাব 33:49 – সাবা 34:34

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-আহযাব 33:49
  2. আল-আহযাব 33:50
  3. আল-আহযাব 33:51
  4. আল-আহযাব 33:52
  5. আল-আহযাব 33:53
  6. আল-আহযাব 33:54
  7. আল-আহযাব 33:55
  8. আল-আহযাব 33:56
  9. আল-আহযাব 33:57
  10. আল-আহযাব 33:58
  11. আল-আহযাব 33:59
  12. আল-আহযাব 33:60
  13. আল-আহযাব 33:61
  14. আল-আহযাব 33:62
  15. আল-আহযাব 33:63
  16. আল-আহযাব 33:64
  17. আল-আহযাব 33:65
  18. আল-আহযাব 33:66
  19. আল-আহযাব 33:67
  20. আল-আহযাব 33:68
  21. আল-আহযাব 33:69
  22. আল-আহযাব 33:70
  23. আল-আহযাব 33:71
  24. আল-আহযাব 33:72
  25. আল-আহযাব 33:73
  26. সাবা 34:1
  27. সাবা 34:2
  28. সাবা 34:3
  29. সাবা 34:4
  30. সাবা 34:5
  31. সাবা 34:6
  32. সাবা 34:7
  33. সাবা 34:8
  34. সাবা 34:9
  35. সাবা 34:10
  36. সাবা 34:11
  37. সাবা 34:12
  38. সাবা 34:13
  39. সাবা 34:14
  40. সাবা 34:15
  41. সাবা 34:16
  42. সাবা 34:17
  43. সাবা 34:18
  44. সাবা 34:19
  45. সাবা 34:20
  46. সাবা 34:21
  47. সাবা 34:22
  48. সাবা 34:23
  49. সাবা 34:24
  50. সাবা 34:25
  51. সাবা 34:26
  52. সাবা 34:27
  53. সাবা 34:28
  54. সাবা 34:29
  55. সাবা 34:30
  56. সাবা 34:31
  57. সাবা 34:32
  58. সাবা 34:33
  59. সাবা 34:34

আল-আহযাব 33:49

এই আয়াতে অনেকগুলো হুকুম বর্ণনা করা হয়েছে। এ কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, শুধু বিবাহ বন্ধনের পরও তালাক দেয়া যেতে পারে। এর প্রমাণ হিসেবে এর চেয়ে উত্তম আর কোন আয়াত নেই। এতে কিছুটা মতভেদ রয়েছে যে, প্রকৃতপক্ষে বিবাহ কি শুধু ঈযাব-ককূলের নাম? না কি শুধু সহবাসের জন্যেই বিবাহ? না কি উভয় কাজের জন্যেই বিবাহ? কুরআন কারীমে কথাটি বন্ধন ও সহবাস উভয় কাজের জন্যে প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু এই আয়াতে শুধু বন্ধনের জন্যে ব্যবহৃত হয়েছে। এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, সহবাসের পূর্বে স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে। এখানে মুমিনাতের উল্লেখ করার কারণ এই যে, সাধারণতঃ মুমিনরা মুমিনা নারীদেরকেই বিয়ে করে থাকে। তবে আহলে কিতাব স্ত্রীদের ব্যাপারেও এটাই প্রযোজ্য হবে। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের একটি বড় দল এ আয়াত হতে একটি দলীল গ্রহণ করেছেন যে, তালাক তখনই প্রযোজ্য হবে যখন পূর্বে বিবাহ হয়ে থাকবে। এ আয়াতে বিবাহের পরে তালাকের কথা উল্লেখ করা। হয়েছে। বিবাহের পূর্বে তালাক সহীহ নয় এবং তা প্রযোজ্যও হয় না। ইমাম শাফেয়ী (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং আরো কয়েকজন বড় বড় মনীষীরও উক্তি এটাই। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ও ইমাম মালিক (রঃ)-এর মত এই যে, বিবাহের পূর্বেও তালাক হয়ে থাকে। যেমন কেউ যদি বলে, “আমি যদি অমুক মহিলাকে বিয়ে করি তবে সে তালাকপ্রাপ্তা ।" এমতাবস্থায় তাঁদের উভয়ের মতে যদি সে ঐ মহিলাকে বিয়ে করে তবে তার তালাক হয়ে যাবে। আবার ইমাম মালিক (রঃ) ও ইমাম আবূ হানীফা (রঃ)-এর মধ্যে ঐ লোকটির ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে যে বলেঃ ‘আমি যে মহিলাকে বিয়ে করবো সেই তালাকপ্রাপ্তা হবে।” এই অবস্থায় ইমাম আবু হানীফা (রঃ) বলেন যে, যে নারীকেই সে বিয়ে করবে সেই তালাকপ্রাপ্তা হয়ে যাবে। কিন্তু ইমাম মালিক (রঃ)-এর মত এই যে, তার তালাক হবে না। কেননা লোকটি কোন নারীকে নির্দিষ্ট করেনি। জমহুর উলামা এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তাঁদের দলীল এ আয়াতটি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয় যে, যদি কেউ বলেঃ “আমি যে মহিলাকে বিয়ে করবো তার উপরই তালাক পড়ে যাবে, তবে এর হকুম কি? উত্তরে তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “এই অবস্থায় তালাক হবে না। কেননা, মহামহিমান্বিত আল্লাহ বিবাহের পরে তালাকের কথা বলেছেন। সুতরাং বিবাহের পূর্বের তালাক কিছুই নয়।" হযরত আমর ইবনে শুআয়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইবনে আদম যার মালিক নয় তাতে তালাক নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ, (রঃ) ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন) অন্য এক হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বিবাহের পূর্বে তালাক নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা মুমিনা নারীদেরকে বিয়ে করার পর তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিলে তোমাদের জন্যে তাদের পালনীয় কোন ইদ্দত নেই যা তোমরা গণনা করবে। এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত যে, যদি কোন নারীকে সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হয় তবে তার জন্যে কোন ইদ্দত নেই। সুতরাং সে তখনই যার সাথে ইচ্ছা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। হ্যা, তবে যদি এই অবস্থায় তার স্বামী মৃত্যুবরণ করে তাহলে এ হুকুম প্রযোজ্য হবে না। বরং তাকে চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করতে হবে। সুতরাং বিবাহের পরেই এবং স্পর্শ করার পূর্বেই যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেয়, আর যদি এ বিবাহের মহরও ধার্য হয়ে থাকে তবে স্ত্রী অর্ধেক মহর পাবে। কিন্তু যদি মহর নির্ধারিত না হয়ে থাকে তবে অল্প কিছু স্ত্রীকে দিলেই তা যথেষ্ট হবে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তোমরা তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বেই তালাক প্রদান কর এবং তাদের জন্যে মহর নির্ধারণ করে থাকো তবে যা নির্ধারণ করেছে তার অর্ধেক তারা পাবে।” (২:২৩৭) আর এক জায়গায় রয়েছে (আরবি)অর্থাৎ “যদি তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে স্পর্শ করার পূর্বেই তালাক দিয়ে দাও তবে এতে কোন অপরাধ নেই। যদি তাদের জন্যে কোন মহর নির্ধারণ না করে থাকো তবে নিজ নিজ সাধ্যানুসারে তাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে দাও। ধনী তার শক্তি অনুযায়ী দেবে এবং গরীবও তার শক্তি অনুযায়ী দেবে, এটা প্রচলিত পন্থায় দিতে হবে, এটা সৎকর্মশীলদের জন্যে অবশ্যকরণীয় কাজ।” (২:২৩৬)হযরত সাহল ইবনে সা'দ (রাঃ) ও হযরত আবু উসায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তারা দু'জন বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উমাইয়া বিনতে শারাহীলকে বিয়ে করেন। অতঃপর সে যখন নবী (সঃ)-এর কাছে আসলো তখন তিনি তার দিকে হাত বাড়ালেন। কিন্তু সে যেন এটা অপছন্দ করলো। তখন তিনি হযরত আবু উসায়েদ (রাঃ)-কে হুকুম করলেন যে, তার বিদায়ের সামান তৈরী করে দেয়া হালে এবং মূল্যবান দু'খানা কাপড় তাকে পরিয়ে দেয়া হোক। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) বলেন যে, যদি স্ত্রীর জন্যে মহর নির্ধারণ করা হয় এবং স্পর্শ করার পূর্বেই তালাক দিয়ে দেয়া হয় হবে তার জন্যে অর্ধেক মহর ছাড়া আর কিছুই নেই। আর মহর ধার্য করা না হলে তাকে সাধ্যমত প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কিছু দিতে হবে এবং এটাই হবে সৌজন্যের সাথে বিদায় করা।

আল-আহযাব 33:50

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেনঃ তুমি যেসব স্ত্রীর মহর আদায় করে দিয়েছে তারা তোমার জন্যে হালাল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমস্ত স্ত্রীর মহর ছিল সাড়ে বারো উকিয়া, যার মূল্য হয় তখনকার পাঁচশ' দিরহাম। উম্মল মুমিনীন হযরত হাবীবা বিনতে আবি সুফিয়ান (রাঃ)-এর মহর ছিল এই পরিমাণই। হ্যরত নাজ্জাশী (রঃ) নিজের পক্ষ হতে চারশ’ দীনার (স্বর্ণ মুদ্রা) দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে উম্মুল মুমিনীন হযরত সুফিয়া বিনতে হুওয়াই (রাঃ)-এর মহর ছিল শুধু তাঁকে আযাদী দান। খাইবারের ইয়াহুদীদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে মুক্ত করে দিয়ে বিয়ে করে নেন।হযরত জুওয়াইরিয়া বিনতে হারেসা মুসতালেকিয়্যাহ যত অর্থের উপর মুকাতাবা করেছিলেন, তার সমুদয় অর্থ রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত ইবনে কায়েস ইবনে শাম্মাস (রাঃ)-কে আদায় করে দিয়ে তাঁর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমস্ত স্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। এভাবেই যেসব বাদী গানীমাতের মাল স্বরূপ তাঁর অধীনে এসেছিল সেগুলোও তাঁর জন্যে হালাল ছিল। সুফিয়া (রাঃ) ও জুওয়াইরিয়্যা (রাঃ)-এর মালিক হয়েছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে আযাদ করে দিয়ে বিবাহ করেছিলেন। রাইহানা বিনতে শামাউন্ নারিয়্যাহ ও মারিয়া কিবতিয়্যারও তিনি মালিক ছিলেন। হযরত মারিয়া (রাঃ)-এর গর্ভে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একটি সন্তানও হয়েছিল যার নাম ছিল ইবরাহীম। যেহেতু বিবাহের ব্যাপারে নাসারা ও ইয়াহূদীদের ভিতরে খুব বাড়াবাড়ী প্রচলিত ছিল এবং সেভাবেই কাজ করা হয়েছিল, সেহেতু আদল ও ইনসাফ বিশিষ্ট সহজ ও স্বচ্ছ শরীয়ত মধ্যম পন্থা প্রকাশ করে দিয়েছে। নাসারাগণ সাত পিড়ী পর্যন্ত যে পুরুষ বা স্ত্রী লোকের নসবনামা (বংশ তালিকা) পেতো না তার বিবাহ জায়েয বলে মেনে নিতো না। ইয়াহূদীরা ভাই বা বোনের ছেলে মেয়েদেরকে বিবাহ করে নিতো। ইসলাম ভাতিজী ও ভাগিনীর সাথে বিবাহ অবৈধ ঘোষণা করেছে। চাচার মেয়ে, ফুফুর মেয়ে, মামার মেয়ে ও খালার মেয়ের সাথে বিবাহ ইসলাম জায়ে রেখেছে। এ আয়াতের শব্দগুলো কতই না চমৎকার! (আরবি) (চাচা) এবং (আরবি) (মামা) এ শব্দগুলোকে এক বচন ব্যবহার করা হয়েছে। আর (ফুফুরা) এবং (আরবি) (খালারা) এই শব্দগুলোকে বহু বচন ব্যবহার করা হয়েছে। এতে পুরুষ লোকদের স্ত্রীলোকদের উপর এক ধরনের ফযীলত বা মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেমন বলা হয়েছেঃ(আরবি) (ডান ও বাম হতে) (১৬:৪৮) (আরবি) (তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোকের দিকে বের করে আনেন) (২:২৫৭) এবং(আরবি) (তিনি অন্ধকার ও আলো করেছেন)। (৬:১) এখানে ডানের ফযীলত বামের উপর এবং আলোর ফযীলত অন্ধকারের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কারণ (আরবি) শব্দটিকে বহু বচন এবং (আরবি) শব্দটিকে এক বচন ব্যবহার করা হয়েছে। অনুরূপভাবে (আরবি) শব্দটিকে বহু বচন এবং শব্দটিকে এক বচন ব্যবহার করা হয়েছে। এর আরো বহু উপমা দেয়া যেতে পারে।মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা তোমার সাথে দেশ ত্যাগ করেছে। হযরত উম্মে হানী (রাঃ) বলেনঃ “আমার কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পয়গাম এলো। আমি আমার অপারগতা প্রকাশ করলাম। তিনি তা মেনে নিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতটি নাযিল করলেন। আমি তার জন্যে বৈধকৃত স্ত্রীদের মধ্যেও ছিলাম না এবং তার সাথে হিজরতকারীদের অন্তর্ভুক্তও না। বরং আমি মক্কা বিজয়ের পর ঈমান এনেছিলাম। আমি ছিলাম আযাদকৃতদের অন্তর্ভুক্ত।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)তাফসীর কারকগণও একথাই বলেছেন। আসল কথা হলো যারা মদীনায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হিজরত করেছেন। হযরত কাতাদা (রঃ) হতে একটি রিওয়াইয়াত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) রয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেছেনঃ কোন মুমিনা নারী নবী (সঃ)-এর নিকট নিজেকে নিবেদন করলে এবং নবী (সঃ) তাকে বিয়ে করতে চাইলে সেও বৈধ। এ আদেশ দুটি শর্তের উপর প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! মুমিনা নারী তোমার জন্যে বৈধ যদি সে নিজেকে তোমার নিকট নিবেদন করে যে, তুমি ইচ্ছা করলে তাকে বিনা মহরে বিয়ে করতে পার। যেমন আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে খবর দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর কওমকে বলেছিলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আর আমি তোমাদেরকে নসীহত করলেও আমার নসীহত তোমাদের কোন উপকারে আসবে না যদি আল্লাহ তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করার ইচ্ছা করেন।” (১১:৩৪) এবং হযরত মূসা (আঃ)-এর উক্তির মত। তিনি বলেছিলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আমার কওম! যদি তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাকো। তবে তার উপরই ভরসা কর যদি তোমরা আত্মসমর্পণকারী হও।” (১০:৮৪)আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যদি মুমিনা নারী নবী (সঃ)-এর নিকট নিজেকে নিবেদন করে।”হযরত সাহল ইবনে সা'দ সায়েদী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে একটি মহিলা এসে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমি নিজেকে আপনার জন্যে নিবেদন করেছি।” অতঃপর সে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তখন একটি লোক দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি তার প্রয়োজন আপনার না তাকে তবে আমার সাথে তার বিয়ে দিয়ে দিন?" রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “তাকে তুমি মহর হিসেবে দিতে পার এমন কোন জিনিস তোমার কাছে আছে কি?” উত্তরে লোকটি বললো: “আমার কাছে আমার এই লুঙ্গিটি ছাড়া আর কিছুই নেই।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “একটি লোহার আংটি হলেও তুমি খোজ কর।” তখন সে খোঁজ করলো, কিন্তু কিছুই পেলো না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তোমার কুরআনের কিছু অংশ মুখস্থ আছে কি?” লোকটি জবাব দিলো: “হ্যা, আমার অমুক অমুক সূরা মুখস্থ আছে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তাহলে তুমি তাকে কুরআন শিক্ষাদানের বিনিময়ে বিয়ে করে নাও। (হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা হযরত আনাস (রাঃ)-এর নিকট বসেছিলেন এবং ঐ সময় তাঁর নিকট তাঁর কন্যাও ছিল। হযরত আনাস বলেন যে, একটি স্ত্রীলোক নবী (সঃ)-এর কাছে এসে বলেঃ “আমার কোন প্রয়োজন আপনার আছে কি?” তখন তাঁর কন্যাটি বলেঃ “মহিলাটির লজ্জা-শরম কত কম!” তার একথা শুনে হযরত আনাস (রাঃ) তাকে বলেনঃ “ঐ মহিলা তোমার চেয়ে বরং ভাল যে, সে নিজেকে নবী (সঃ)-এর নিকট নিবেদন করেছে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি মহিলা নবী (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার এ রকম এ রকম একটি মেয়ে আছে।” অতঃপর সে তার সৌন্দর্যের বর্ণনা দিলো। অতঃপর বললো: “আমি চাই যে, আপনি আমার এ মেয়েকে বিয়ে করে নিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার এ প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করলেন। মহিলাটি কিন্তু তার কন্যার প্রশংসা করতেই থাকলো। এমনকি শেষ পর্যন্ত সে বললো যে, তার মেয়ে কখনো রোগে ভোগেনি এবং তার মাথায় কখনো ব্যথা হয়নি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমার মেয়ের আমার প্রয়োজন নেই।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে মহিলাটি নবী (সঃ)-এর নিকট নিজেকে নিবেদন করেছে সে হলো হযরত খাওলা বিনতে হাকীম (রাঃ)। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ইনি বানী সালীম গোত্রভুক্ত ছিলেন। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি অত্যন্ত সতী-সাধ্বী রমণী ছিলেন। হতে পারে যে, উম্মে সালীমই ছিলেন হযরত খাওলা (রাঃ) আবার তিনি অন্য কোন মহিলাও হতে পারেন। হযরত মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রাঃ), হযরত উমার ইবনুল হাকাম (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উবাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাঁরা বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তেরোটি বিবাহ করেছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন কুরায়েশ গোত্রভুক্ত। তাঁরা হলেনঃ হযরত খাদীজা (রা), হযরত আয়েশা (রাঃ), হযরত হাফসা (রাঃ), হযরত উম্মে হাবীবা (রাঃ), হযরত সাওদা (রাঃ)। এবং হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)। তিনজন ছিলেন বানু আমির ইবনে সাসা গোত্রভুক্ত। দু’জন ছিলেন বানু হিলাল ইবনে আমির গোত্রভুক্ত। তাঁরা হলেন হযরত মায়মূনা বিনতে হারিস (রাঃ), ইনি তিনিই যিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে নিজেকে নিবেদন করেছিলেন এবং হযরত যয়নাব, উম্মুল মাসাকীন (রাঃ)। একজন ছিলেন বানু বকর ইবনে কিবলা গোত্রভুক্ত। ইনি ঐ মহিলা যিনি দুনিয়াকে পছন্দ করেছিলেন। একজন স্ত্রী ছিলেন বানুল জুন গোত্রভুক্ত, যিনি ছিলেন আশ্রয় প্রার্থিনী। আর একজন স্ত্রী ছিলেন যয়নাব বিনতে জাহশ আসাদিয়্যা (রাঃ)। আর দু’জন ছিলেন বন্দিনী। তাঁরা হলেন: সুফিয়া বিনতে হুওয়াই ইবনে আখতাব (রাঃ) এবং জুওয়াইরিয়া বিনতে হারিস ইবনে আমর ইবনুল মুসতালিক আল খুযাইয়্যা (রাঃ)।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যে মুমিনা নারী নিজেকে নবী (সঃ)-এর নিকট নিবেদন করেছিলেন তিনি হলেন মায়মূনা বিনতে হারিস (রাঃ)। কিন্তু এতে ইনকিতা বা ছেদ-কাটা রয়েছে। এ রিওয়াইয়াতটি মুরসাল। এটা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, হযরত যয়নাব (রাঃ), যার কুনইয়াত ছিল উম্মুল মাসাকীন, তিনি হলেন যয়নাব বিনতে খুযাইমা (রাঃ)। তিনি ছিলেন আনসারিয়্যা। তিনি নবী (সঃ)-এর জীবদ্দশাতেই তাঁর নিকট ইন্তেকাল করেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। উদ্দেশ্য এই যে, যারা নিজেদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইখতিয়ারে দিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা অনেকেই ছিলেন। যেমন হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমিরাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ সব স্ত্রী হতে আত্মগরিমায় থাকতাম যারা নিজেদেরকে তাঁর নিকট নিবেদন করেছিলেন। আমি বিস্ময় বোধ করতাম যে, কেমন করে স্ত্রীলোক নিজেকে নিবেদন করতে পারে! অতঃপর যখন আল্লাহ তাআলা নিম্ন লিখিত আয়াতটি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তোমার নিকট হতে দূরে রাখতে পার এবং যাকে ইচ্ছা তোমার নিকট স্থান দিতে পার এবং তুমি যাকে দূরে রেখেছে, তাকে কামনা করলে তোমার কোন অপরাধ নেই।” (৩৩:৫১) তখন আমি বললামঃ আপনার প্রতিপালক তো আপনার পথ খুবই সহজ ও প্রশস্ত করে দিয়েছেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এমন কোন স্ত্রীলোক ছিল না যে নিজেকে তাঁর কাছে নিবেদন করেছে। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন) ইউনুস ইবনে বুকায়ের (রাঃ) এর ভাবার্থ বর্ণনা করেছেন যে, যেসব স্ত্রীলোলে নিজেদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট নিবেদন করেছে তাদের একজনকেও তিনি গ্রহণ করেননি, যদিও এটা তার জন্যে জায়েয ও বিশিষ্ট ছিল। কেননা, এটা তাঁর ইচ্ছার উপর ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ (আারবি)অর্থাৎ “নবী (সঃ) যদি তাকে বিয়ে করার ইচ্ছা করে।" মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা বিশেষ করে তোমারই জন্যে, অন্য মুমিনদের জন্যে নয়। তবে যদি মহর আদায় করে তাহলে জায়েয হবে। যেমন হযরত বন্ধু বিনতে ওয়াশিক (রাঃ) নিজেকে নিবেদন করে দিয়েছিলেন। যখন তাঁর স্বামী মারা যান তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফায়সালা করলেন যে, তার বংশের অন্যান্য মহিলাদের মত তাকে মহর দিতে হবে। এভাবেই শুধু সহবাসের পর মহর আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যাবে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হুকুমের বাইরে রয়েছেন। ঐ স্ত্রী লোকদেরকে কিছু দেয়া তাঁর উপর ওয়াজিব ছিল না। তাঁকে এ মর্যাদা প্রদান করা হয়েছিল যে, তিনি বিনা মহরে, বিনা ওলীতে এবং বিনা সাক্ষীতে বিবাহ করার অধিকার প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যেমন হযরত যয়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ)-এর ঘটনা। হযরত কাতাদা (রঃ) বর্ণনা করেছেনঃ কোন স্ত্রী লোকের এ অধিকার নেই যে, বিনা মহরে ও বিনা ওলীতে সে কারো কাছে নিজেকে বিবাহের জন্যে পেশ করতে পারে। এটা শুধু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যেই খাস ছিল। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ মুমিনদের স্ত্রী এবং তাদের মালিকানাধীন দাসীগণ সম্বন্ধে যা নির্ধারিত করেছি তা আমি জানি। অর্থাৎ কোন পুরুষ এক সাথে চারের অধিক স্ত্রী রাখতে পারে না। হ্যা, তবে স্ত্রীদের ছাড়াও সে দাসীদেরকে রাখতে পারে এবং তাদের ব্যাপারে কোন সংখ্যা নির্ধারিত নেই। অনুরূপভাবে মুমিনদের জন্যে ওলী, মহর ও সাক্ষীরও শর্ত রয়েছে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে এই নির্দেশ। কিন্তু তার জন্যে এই ধরা-বাঁধা কোন বিধান নেই এবং এ কাজে তার কোন দোষও নেই।

আল-আহযাব 33:51

হযরত উরওয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) ঐ সব মহিলাকে অবজ্ঞা করতেন যাঁরা নিজেদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হিবা করে দিয়েছিলেন। তিনি বলতেন যে, নারীরা বিনা মহরে নিজেকে হিবা করতে লজ্জা বোধ করে না? অতঃপর আল্লাহ তাআলা (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “আমি দেখি যে, আপনার চাহিদার ব্যাপারে প্রশস্ততা আনয়ন করেছেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারীও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন যা ইতিপূর্বে গত হয়েছে) সুতরাং বুঝা গেল যে, এই আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য এই মহিলারাই। এদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ইখতিয়ার দেয়া হয়েছে যে, তিনি যাকে ইচ্ছা কবূল করবেন এবং যাকে ইচ্ছা কবুল করবেন না। এর পরেও তাঁকে অধিকার দেয়া হয়েছে যে, যাদেরকে তিনি কবুল করেননি তাদেরকেও ইচ্ছা করলে পরে কবুল করে নিতে পারেন।হযরত আমের শাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যাদেরকে দূরে রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে উম্মে শুরায়েকও (রাঃ) ছিলেন।এই বাক্যের একটি ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, স্ত্রীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে অধিকার দেয়া হয়েছিল যে, তিনি ইচ্ছা করলে তাঁদের মধ্যে (পালা) ভাগ-বাটোয়ারা করে দিতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে তা নাও করতে পারেন। যাকে ইচ্ছা আগে করতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা পিছে করতে পারেন। কিন্তু এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সারাটি জীবন স্ত্রীদের মধ্যে পর্ণ আদল ও ইনসাফের সাথে (পালা) ভাগ-বাটোয়ারা করে গেছেন। ফকীহদের মধ্যে ইমাম শাফেয়ী (রঃ) এ মত পোষণ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর (পালার) সমতার বণ্টন ওয়াজিব ছিল। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরেও স্ত্রীর পালার দিনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের কাছে অনুমতি চাইতেন।” বর্ণনাকারী মুআয (রাঃ)। তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কি বলতেন?” উত্তরে তিনি বলেন, আমি বলতামঃ এটা যদি আমার প্রাপ্য হয়ে থাকে তবে আমি অন্য কাউকেও আমার উপর প্রাধান্য দিতে চাইনে। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুতরাং সঠিক কথা যা অতি উত্তম এবং যার দ্বারা এই উক্তিগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্যতাও এসে যায়, তা এই যে, আয়াতটি সাধারণ। নিজেকে নিবেদনকারী ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরা সবাই এর আওতায় পড়ে যায়। নিজেদেরকে হিবাকারিণীদের ব্যাপারে তাদেরকে বিয়ে করা ও না করা এবং বিবাহিতা স্ত্রীদের মধ্যে (পালা) বণ্টন করা বা না করা তাঁর ইচ্ছাধীন ছিল। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ এই বিধান এই জন্যে যে, এতে তাদের তুষ্টি সহজতর হবে এবং তারা দুঃখ পাবে না, আর তুমি তাদেরকে যা দিবে তাতে তাদের প্রত্যেকেই প্রীত থাকবে। অর্থাৎ তারা যখন জানতে পারবেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর পালা বণ্টন জরুরী নয় তবুও তিনি সমতা প্রতিষ্ঠিত রাখছেন তখন তাঁরা তাঁর প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হবেন এবং তার কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্য প্রকাশ করবেন। তারা তার ইনসাফকে মুবারকবাদ জানাবেন।আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তোমাদের অন্তরে যা আছে আল্লাহ তা জানেন। অর্থাৎ কার প্রতি কার আকর্ষণ আছে তা আল্লাহ ভালরূপেই অবগত আছেন। যেমন হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ন্যায় ও ইনসাফের সাথে তার স্ত্রীদের মধ্যে (পালা) বণ্টন করতেন। অতঃপর তিনি বলতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! যা আমার অধিকারে ছিল তা আমি করলাম, এখন যা আপনার অধিকারে আছে, কিন্তু আমার অধিকারে নেই সেজন্যে আপনি আমাকে তিরস্কার করবেন না।”

আল-আহযাব 33:52

পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে এটা গত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণীরা ইচ্ছা করলে তার বিবাহ বন্ধনে থাকতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে পৃথক হয়ে যেতে পারেন এ অধিকার তিনি তাদেরকে প্রদান করেছিলেন। কিন্তু মুমিনদের মাতারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অঞ্চল ছেড়ে দেয়া পছন্দ করেননি। এ কারণেই আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তারা পার্থিব একটি প্রতিদান এই লাভ করলেন যে, এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিলেনঃ এরপর তোমার জন্যে কোন নারী বৈধ নয় এবং তোমার স্ত্রীদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণও বৈধ নয় যদিও তাদের সৌন্দর্য তোমাকে বিস্মিত করে। তবে তোমার অধিকারভুক্ত দাসীদের ব্যাপারে এই বিধান প্রযোজ্য নয়। পরে অবশ্য আল্লাহ তাআলা তার উপর থেকে এই বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে নিয়েছিলেন এবং তাঁকে আরো বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এরপরে আর কোন বিয়ে করেননি। এ বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে নেয়া এবং এতদসত্ত্বেও তা না করার মধ্যে এক বড় যৌক্তিকতা এই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ইহসান তাঁর স্ত্রীদের উপর রয়েছে। যেমন আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইন্তেকাল করেননি যে পর্যন্ত না আল্লাহ তাআলা অন্যান্য স্ত্রী লোকদেরকেও তার জন্যে হালাল করেছেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে তাঁর ইচ্ছায় যে কোন মহিলাকে বিবাহ করা বৈধ হওয়ার আয়াত হলো (আরবি) এটাই যা এর পূর্বে গত হয়েছে। বর্ণনা করার দিক দিয়ে ওটা পূর্বে এবং নাযিল হওয়ার দিক দিয়ে পরে। সূরায়ে বাকারাতেও অনুরূপভাবে মৃত্যুর ইদ্দত সম্পৰ্কীয় পরের আয়াতটি মানসূখ বা রহিত এবং পূর্বের আয়াতটি ওর নাসিখ বা রহিতকারী। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।এই আয়াতের অন্য আর একটি অর্থও অনেক আলেম কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা বলেনঃ এর উদ্দেশ্য হলো: যেসব স্ত্রীলোকের বর্ণনা ইতিপূর্বে দেয়া হয়েছে তাদের ছাড়া অন্যেরা হালাল নয়। যরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যে স্ত্রীরা ছিলেন, তারা যদি তার জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করতেন, তাহলে কি তিনি আর বিবাহ করতে পারতেন না?” উত্তরে হযরত উবাই (রাঃ) বললেনঃ “কেন পারতেন না?” তখন প্রশ্নকারী। (আরবি)-এ আয়াতটি পাঠ করে শুনালেন। তখন হযরত উবাই (রাঃ) বললেনঃ “এ কথার উদ্দেশ্য এই যে, স্ত্রীদের যে প্রকারগুলো ইতিপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে, অর্থাৎ বিবাহিতা স্ত্রী, দাসী, চাচা, ফুফু, মামা ও খালাদের মেয়েরা এবং নিজেদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হিবাকারী স্ত্রী লোকেরা, এগুলো ছাড়া অন্য প্রকারের যারা হবে এবং তারা যদি বর্ণিত গুণের অধিকারিণী না হয় তবে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে হালাল নয়।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন, এই হিজরতকারিণী মুমিনা নারীরা ছাড়া অন্যান্য স্ত্রী লোকদেরকে বিয়ে করতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নিষেধ করা হয়েছে। অমুসলিম মহিলাদের সাথে বিবাহ হারাম করা হয়েছে। কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “ঈমানের পরে যারা কুফরী করে তাদের আমল বিনষ্ট হয়ে যায়।” (৫:৫) সুতরাং আল্লাহ তা'আলা (আরবি) (৩৩:৫০)-এই আয়াতে স্ত্রী লোকদের যে প্রকারগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন ঐগুলো তো হালাল, ওগুলো ছাড়া অন্যগুলো হারাম। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এগুলো ছাড়া সর্বপ্রকারের স্ত্রী লোকই হারাম, তারা মুসলমানই হালে বা ইয়াহদীই হালে অথবা খৃষ্টানই হালে। আবু সালেহ্ (রঃ) বলেন যে, গ্রাম্য ও অপরিচিতা স্ত্রী লোকদের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু যে স্ত্রী লোকগুলো হালাল ছিল তাদের মধ্য হতে তিনশ' জনকে বিয়ে করলেও তা হালাল হবে। মোটকথা, আয়াতটি সাধারণ। যেসব স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাড়ীতে ছিলেন এবং যেসব স্ত্রীর প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে সবই এর অন্তর্ভুক্ত। আর যেসব লোক হতে এর বিপরীত বর্ণিত হয়েছে তাঁদের থেকেই এর অনুকূলেও বর্ণিত আছে। সুতরাং এতে কোনই বৈপরীত্য নেই। এর উপর একটি কথা বাকী থেকে যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে তালাক দিয়েছিলেন এবং পরে আবার ফিরিয়েও নিয়েছিলেন। আর হযরত সাওদা (রাঃ)-কে তিনি তালাক দিতে চেয়েছিলেন যার উপর হযরত সাওদা (রাঃ) নিজের পালার দিনটি হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে প্রদান করেছিলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এর উত্তর এই দিয়েছিলেন যে, এটা এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বের ঘটনা। কথা এটাই বটে কিন্তু আমরা বলি যে, এ জবাবেরও দরকার নেই। কারণ এ আয়াতে তাদেরকে ছাড়া অন্যদেরকে বিয়ে করা এবং তাদেরকে বের করে দিয়ে অন্যকে ঘরে আনায় বাধা প্রদান করা হয়েছে, তালাক দেয়ার কথা বলা হয়নি ও উল্লেখ করা হয়নি। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত সাওদা (রাঃ)-এর ঘটনার ব্যাপারে সহীহ হাদীসে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা হলো আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির শানে নুযূলঃ (আরবি)অর্থাৎ “কোন স্ত্রী যদি তার স্বামীর দুর্ব্যবহার ও উপেক্ষার আংশকা করে তবে তারা আপোস-নিষ্পত্তি করতে চাইলে তাদের কোন দোষ নেই এবং আপোস-নিষ্পত্তিই শ্রেয়।" (৪:১২৮) আর হযরত হাফসা (রাঃ) সম্পৰ্কীয় ঘটনাটি সুনানে আবি দাউদ, সুনানে নাসাঈ, সুনানে ইবনে মাজাহ প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেছনঃ হযরত উমার (রাঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-এর নিকট এমন অবস্থায় প্রবেশ করেন যে, তিনি কাঁদছিলেন। তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কাঁদছো কেন? সম্ভবতঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাকে তালাক দিয়েছেন। নিশ্চয়ই একবার তিনি তোমাকে তালাক দিয়েছিলেন। অতঃপর আমারই কারণে তোমাকে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। দ্বিতীয়বার যদি তিনি তোমাকে তালাক দিয়ে থাকেন তবে আমি কখনো তোমার সাথে কথা বলবো না।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমার স্ত্রীদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণও বৈধ নয় যদিও তাদের সৌন্দর্য তোমাকে বিস্মিত করে। এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বাড়াবাড়ী করতে ও কাউকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে সে স্থানে অন্য কাউকে আনতে নিষেধ করেছেন ও দাসীকে হালাল করেছেন।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “অজ্ঞতার যুগে একটি জঘন্য প্রথা প্রচলিত ছিল যে, জনগণ তাদের স্ত্রীদেরকে আপোসে বদলা-বদলী করে নিতো। একজন নিজের স্ত্রী অন্যকে দিয়ে দিতো এবং অন্যজন তার স্ত্রী ঐ ব্যক্তিকে দিয়ে দিতো। ইসলাম এ ধরনের জঘন্য প্রথাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এক সময়ের একটি ঘটনা এই যে, উয়াইনা ইবনে হাসান আল ফাযারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলো এবং নিজের অজ্ঞতা যুগের অভ্যাস অনুযায়ী অনুমতি না নিয়েই প্রবেশ করলো। ঐ সময় হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি অনুমতি না নিয়ে আসলে কেন?” সে উত্তরে বললো: “আমি তো আজ পর্যন্ত মুযার গোত্রের কারো কাছে অনুমিত প্রার্থনা করিনি।” অতঃপর সে বললো: “আপনার নিকট যে মহিলা বসেছিলেন উনি কে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “সে হলো উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)।” সে বললো: “আপনি আমার কাছে তাকে দিয়ে দিন, আর আমি তার পরিবর্তে আমার স্ত্রীকে আপনার কাছে দিয়ে দিচ্ছি। তার সৌন্দর্যের কোন তুলনাই হয় না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “এরূপ করা আল্লাহ তাআলা হারাম করে দিয়েছেন।” যখন সে চলে গেল তখন উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “লোকটি কি বলছিল? এবং সে কে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “সে হলো এক নির্বোধ সরদার। তুমি তো তার কথা শুনেছো। এমন নির্বোধ হওয়া সত্ত্বেও কিন্তু সে তার কওমের সরদার।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন) তিনি বলেন যে, এ হাদীসের একজন বর্ণনকারী ইসহাক ইবনে আবদিল্লাহ রয়েছেন। তিনি খুবই নিম্ন পর্যায়ের লোক।

আল-আহযাব 33:53

৫৩-৫৪ নং আয়াতের তাফসীরএ আয়াতে পর্দার হুকুম রয়েছে ও আদবের আহকাম বৰ্ণনা করা হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ)-এর উক্তি অনুযায়ী যে আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় ওগুলোর মধ্যে এটিও একটি। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত আল্লাহর আমি আনুকূল্য করেছি তিনটি বিষয়ে। আমি বলেছিলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান বানিয়ে নিতেন (তাহলে কতই না ভাল হতো)। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান বানিয়ে নাও।” (২:১২৫) আমি বলেছিলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার স্ত্রীদের নিকট সৎ ও অসৎ সবাই প্রবেশ করে থাকে। সুতরাং যদি আপনি তাদের উপর পর্দা করতেন (তবে খুব ভাল হতো)! আল্লাহ তাআলা তখন পর্দার আয়াত অবতীর্ণ করেন। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরা মর্যাদা বোধের কারণে কিছু বলতে কইতে শুরু করেন তখন আমি বললামঃ অহংকার করবেন না। যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাদেরকে তালাক দিয়ে দেন তবে সত্বরই আল্লাহ তা'আলা আপনাদের পরিবর্তে তাঁকে আপনাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করবেন। তখন আল্লাহ তা'আলা এরূপই আয়াত অবতীর্ণ করেন না।" সহীহ মুসলিমে চতুর্থ আর একটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে। তাহলে বদর যুদ্ধের বন্দীদের ব্যাপারে ফায়সালা সংক্রান্ত বিষয়।হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার কাছে সৎ ও অসৎ সর্বপ্রকারের লোকই এসে থাকে। সুতরাং যদি আপনি মুমিনদের মাতাদেরকে পর্দার নির্দেশ দিতেন (তবে ভাল হতো)।” তখন আল্লাহ তাআলা পর্দার আয়াত অবতীর্ণ করেন। আর ঐ সময়টা ছিল ৫ম হিজরীর যুল-কাদাহ মাসের ঐ দিনের সকাল যেই দিন তিনি হযরত যয়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ)-কে স্ত্রী রূপে বরণ করে নিয়েছিলেন এবং যে বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা দিয়েছিলেন। অনেকেই এ ঘটনাটি তৃতীয় হিজরীর ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) যয়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ)-কে বিয়ে করেন তখন তিনি জনগণকে ওলীমার দাওয়াত করেন। তারা খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বসে গল্প-গুজবে মেতে উঠে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উঠবার জন্যে তৈরী হলেন, কিন্তু তখনো তারা উঠলো না। তা দেখে তিনি উঠে গেলেন এবং কিছু লোক তাঁর সাথে সাথে উঠে চলে গেল। কিন্তু এর পরেও তিনজন লোক বসে থাকলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাড়ীতে প্রবেশ করার উদ্দেশ্যে আসলেন। কিন্তু দেখেন যে, তখনো লোকগুলো বসেই আছে। এরপর তারা উঠে চলে গেল। বর্ণনাকারী হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি তখন এসে নবী (সঃ)-কে খবর দিলাম যে, লোকগুলো চলে গেছে। তখন তিনি এসে বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করলেন। আমিও তাঁর সাথে যেতে লাগলাম। কিন্তু তিনি আমার ও তার মাঝে পর্দা ফেলে। দিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সময় জনগণকে রুটি ও গোশত আহার করিয়েছিলেন। হযরত আনাস (রাঃ)-কে তিনি লোকদেরকে ডাকতে পাঠিয়েছিলেন। লোকেরা এসেছিল ও খেয়েছিল এবং ফিরে যাচ্ছিল। যখন আর কাউকেও ডাকতে বাকী থাকলো না তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ খবর। দিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে দস্তরখান উঠিয়ে নিতে বললেন। পানাহার শেষ করে সবাই চলে গিয়েছিল। শুধুমাত্র তিনজন লোক পানাহার শেষ করার পরেও বসে বসে গল্প করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বেরিয়ে গিয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কক্ষের দিকে গেলেন। অতঃপর বললেনঃ “হে আহলে বায়েত! তোমাদের উপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকত বর্ষিত হালে!” উত্তরে হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেনঃ “আপনার উপরও শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হালে। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আপনার (নব-পরিণিতা) স্ত্রীকে কেমন পেয়েছেন? আপনাকে আল্লাহ বরকত দান করুন!” এভাবে তিনি তাঁর সমস্ত স্ত্রীর নিকট গেলন এবং সবারই সাথে একই কথা-বার্তা হলো। অতঃপর ফিরে এসে দেখলেন যে, ঐ তিন ব্যক্তি তখনো গল্পে মেতে আছে। তারা তখনো যায়নি। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর লজ্জা-শরম খুব বেশী ছিল বলে তিনি তাদেরকে কিছু বলতে পারলেন না। তিনি আবার হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরের দিকে চলে গেলেন। হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি জানি না যে, লোকগুলো চলে গেছে এ খবর তাঁকে আমিই দিলাম কি অন্যেরা দিলো। এ খবর পেয়ে তিনি ফিরে আসলেন এবং এসে তাঁর পা দরযার চৌকাঠের উপর রাখলেন। এক পা তার দরযার ভিতরে ছিল এবং আর এক পা দরযার বাইরে ছিল এমন সময় তিনি আমার ও তাঁর মধ্যে পর্দা ফেলে দিলেন এবং পর্দার আয়াত নাযিল হয়ে গেল। একটি রিওয়াইয়াতে তিনজনের স্থলে দু’জন লোকের কথা রয়েছে। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন এক বিবাহে হযরত উম্মে সালীম (রাঃ) মালীদা (এক প্রকার খাদ্য) তৈরী করেন এবং পাত্রে রেখে আমাকে বলেনঃ “এটা নিয়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে পৌছিয়ে দাও এবং বলো: এ সামান্য উপটৌকন হযরত উম্মে সালীম (রাঃ)-এর পক্ষ হতে। তিনি যেন এটা কবুল করে নেন। আর তাকে আমার সালাম জানাবে।” ঐ সময় জনগণ খুব অভাবী ছিল। আমি ওটা নিয়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সালাম বললাম ও হযরত উম্মে সালীমেরও (রাঃ) সালাম জানালাম এবং খবরও পৌছালাম। তিনি বললেনঃ “আচ্ছা, ওটা রেখে দাও। আমি তখন ঘরের এক কোণে ওটা রেখে দিলাম। অতঃপর তিনি আমাকে বললেনঃ “অমুক অমুককে ডেকে নিয়ে এসো।” তিনি বহু লোকের নাম করলেন। তারপর আবার বললেনঃ “তাছাড়া যে মুসলমানকেই পাবে ডেকে নিয়ে আসবে।” আমি তাই করলাম। যাকেই পেলাম তাকেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট খাবারের জন্যে পাঠাতে লাগলাম। ফিরে এসে দেখলাম যে ঘর, বৈঠকখানা ও আঙ্গিনা লোকে পূর্ণ হয়ে গেছে। প্রায় তিনশ’ লোক এসে গেছে। অতঃপর তিনি আমাকে বললেনঃ “যাও, ঐ খাবারের পাত্রটি নিয়ে এসো।” আমি সেটা নিয়ে আসলে তিনি তাতে হাত লাগিয়ে দু'আ করলেন এবং আল্লাহ যা চাইলেন তিনি মুখে উচ্চারণ করলেন। অতঃপর বললেনঃ “দশ দশজন লোকের দল করে বসিয়ে দাও।” সবাই বিসমিল্লাহ বলে খেতে শুরু করলো। এভাবে খাওয়া চলতে লাগলো। সবাই খাওয়া শেষ করলো। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “পাত্রটি উঠিয়ে নাও।” আমি তখন পাত্রটি উঠালাম। আমি সঠিকভাবে বলতে পারবো না যে, যখন আমি পাত্রটি রেখেছিলাম তখন তাতে খাবার বেশী ছিল, না এখন বেশী আছে। বেশকিছু লোক তখনো বসে বসে গল্প করছিল। উম্মুল মুমিনীন দেয়ালের দিকে মুখ করে বসেছিলেন। লোকগুলোর এতক্ষণ ধরে বসে থাকা এবং চলে না যাওয়া রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে খুবই কঠিন ঠেকছিল। কিন্তু তিনি লজ্জা করে কিছুই বলতে পারছিলেন না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই মানসিক অবস্থার কথা জানতে পারলে লোকগুলো অবশ্যই উঠে চলে যেতো। কিন্তু তারা কিছুই জানতে পারেনি বলে নিশ্চিন্তে গল্পে মেতেছিল। তিনি ঘর হতে বের হয়ে স্ত্রীদের কক্ষের দিকে চলে গেলেন। ফিরে এসে দেখেন যে, তারা তখনো বসেই আছে। তখন তারা বুঝতে পেরে লজ্জিত হলো এবং তাড়াতাড়ি চলে গেলো। তিনি বাড়ীর ভিতরে গেলেন এবং পর্দা লটকিয়ে দিলেন। আমি আমার কক্ষেই ছিলাম এমতাবস্থায় এ আয়াত নাযিল হলো। তিনি আয়াতটি তিলাওয়াত করতে করতে বেরিয়ে আসলেন। সর্বপ্রথম এ আয়াতটি মহিলারাই শুনেছিলেন। আমি তো এর পূর্বেই শুনেছিলাম ।হযরত যয়নাব (রাঃ)-এর কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রস্তাব নিয়ে যাবার রিওয়াইয়াতটি (আরবি) এ আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে। এর শেষে কোন কোন রিওয়াইয়াতে এও আছে যে, এরপর লোকদেরকে উপদেশ দেয়া হয় এবং হাশিমের এ হাদীসে এই আয়াতের বর্ণনা রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সতী-সাধ্বী সহধর্মিণীরা প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে ময়দানের দিকে চলে যেতেন। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) এটা পছন্দ করতেন না। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতেনঃ ‘এভাবে তাদেরকে যেতে দিবেন না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেদিকে কোন খেয়াল করতেন না। একদা হযরত সাওদা বিনতে জামআ (রাঃ) বাড়ী হতে বের হলেন। এদিকে হযরত উমার (রাঃ) চাচ্ছিলেন যে, এ প্রথা রহিত হয়ে যাক। তিনি তার দেহের গঠন দেখেই তাকে চিনতে পারলেন এবং উচ্চ স্বরে বললেনঃ “(হে সাওদা রাঃ)! আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি।” অতঃপর আল্লাহ তা'আলা পর্দার আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। এই রিওয়াইয়াতে এ প্রকারই বলা হয়েছে। কিন্তু আসল কথাটি হলো এই যে, এটা পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরের ঘটনা। কাজেই মুসনাদে আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরে হযরত সাওদা (রাঃ) বের হয়েছিলেন। একথা এখানে বলা হয়েছে যে, তিনি হযরত উমার (রাঃ)-এর একথা শুনে সাথে সাথে ফিরে চলে আসেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রের খাদ্য খাচ্ছিলেন এবং তাঁর হাতে একটি হাড় ছিল এমতাবস্থায় হযরত সাওদা (রাঃ) সেখানে পৌছে তার ঘটনাটি বর্ণনা করেন। ঐ সময় অহী নাযিল হয়। যখন অহী আসা শেষ হলো তখনো তার হাতে ঐ হাড়টি ছিল। তিনি তা ফেলে দেননি। তখন তিনি বললেনঃ “আল্লাহ তাআলা তোমাকে প্রয়োজনে বাইরে যাবার অনুমতি প্রদান করেছেন। এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঐ অভ্যাসে বাধা প্রদান করেছেন যা অজ্ঞতার যুগে ও ইসলামের প্রাথমিক যুগে প্রচলিত ছিল। যেমন তখন বিনা অনুমতিতে অন্যের বাড়ীতে যাওয়া প্রচলিত ছিল। আল্লাহ তা'আলা উম্মতে মুহাম্মদীকে (সঃ) সম্মানের সাথে আদব শিক্ষা দিয়েছেন। একটি হাদীসেও এ বিষয়টি রয়েছেঃ “সাবধান! স্ত্রী লোকদের নিকট যেয়ো না।” অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে স্বতন্ত্র করলেন যাদেরকে অনুমতি দেয়া হবে। আরো বলা হচ্ছেঃ তোমরা আহার্য প্রস্তুতির জন্যে অপেক্ষা না করে ভোজনের জন্যে নবী-গৃহে প্রবেশ করো না এবং ভোজন শেষে তোমরা চলে যেয়ো। মুজাহিদ (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, খাদ্য রান্না করা এবং প্রস্তুত হওয়ার সময়েই যেতে হবে যখন বুঝতে পারবে যে, খাদ্য প্রস্তুত হচ্ছে তখনই যে উপস্থিত হয়ে যাবে এ আচরণ আল্লাহ তা'আলার নিকট পছন্দনীয় নয়। এটা তোফায়লী বনে যাওয়া হারাম হওয়ার দলীল। ইমাম খতীব বাগদাদী (রঃ) এটা নিন্দনীয় হওয়ার উপর একটি পূর্ণ কিতাব লিখেছেন।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমাদেরকে আহ্বান করলে প্রবেশ করো এবং ভোজন শেষে চলে যেয়ো। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্য হতে কাউকেও যদি তার ভাই (খাবার জন্যে) আহ্বান করে তবে তার দাওয়াত কবূল করা উচিত। ঐ দাওয়াত বিবাহের হালে বা অন্য কিছুরই হোক। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)অন্য একটি সহীহ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে যদি একটি খেজুরের দাওয়াত দেয়া হয় তবুও আমি তা কবূল করবো।” দাওয়াত খাওয়ার নিয়ম-কানুনের কথাও তিনি বলেছেনঃ “যখন খাওয়া শেষ হয়ে যাবে তখন সেখানে জেঁকে বসে থেকো না, বরং সেখান হতে চলে যেয়ো। গল্পে মশগুল হয়ে যেয়ো না। যেমন বর্ণিত তিন ব্যক্তি করেছিল, যার কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুবই অস্বস্তি বোধ করছিলেন। কিন্তু তিনি লজ্জা করে কিছু বলতে পারেননি। এর উদ্দেশ্যে এও বটে যে, বিনা অনুমতিতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাড়ীতে চলে যাওয়া তাঁর জন্যে কষ্টদায়ক। কিন্তু তিনি লজ্জা-শরমের কারণে তোমাদেরকে কিছু বলতে পারেন না। আল্লাহর এটা স্পষ্ট নির্দেশ যে, এর পরে যেন এর পুনরাবৃত্তি না হয়। আল্লাহ তা'আলা যখন আদেশ করেছেন তখন। তোমাদের উচিত তা মেনে নেয়া। যেমন বিনা অনুমতিতে তার সহধর্মিণীদের সামনে চলে যাওয়া নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে তাঁদের দিকে চোখ তুলে তাকানোও নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা তাঁর পত্নীদের নিকট কিছু চাইলে পর্দার অন্তরাল হতে চাইবে।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমি নবী (সঃ)-এর সাথে মালীদাহ্ (এক প্রকার খাদ্য) খাচ্ছিলাম। এমন সময় হযরত উমার (রাঃ) সেখান দিয়ে গমন করেন। তিনি তাঁকে ডেকে নেন। তখন তিনি (আমাদের সাথে) খেতে শুরু করে দেন। খেতে খেতে তার অঙ্গুলী আমার অঙ্গুলীতে ঠেকে যায়। তখন তিনি বলে উঠেনঃ “যদি আমার কথা মেনে নিতেন। ও পর্দার ব্যবস্থা করা হতো তবে কারো উপর কারো দৃষ্টি পড়তো না।” ঐ সময়েই পর্দার আয়াত নাযিল হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর এই পর্দার উপকারিতা বর্ণনা করতে গিয়ে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্যে অধিকতর পবিত্র। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের কারো পক্ষে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে কষ্ট দেয়া অথবা তার মৃত্যুর পর তাঁর পত্নীদেরকে বিয়ে করা কখনো সঙ্গত নয়। আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা ঘোরতর অপরাধ। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণীরা এখানে ও জান্নাতে তাঁরই সহধর্মিণী থাকবেন। সমস্ত মুসলমানের তাঁরা মাতা। এই জন্যে তাদেরকে বিয়ে করা মুসলমানদের জন্যে হারাম করে দেয়া হয়েছে। এ আদেশ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ সহধর্মিণীদের জন্যে যারা তার মৃত্যুকালে তার বাড়ীতেই ছিলেন। কিন্তু নবী (সঃ) তাঁর যে পত্নীদেরকে তাঁর জীবদ্দশায় তালাক দিয়েছেন এবং তার সাথে সহবাস হয়েছে তাকে কেউ বিয়ে করতে পারে কি না এতে দু'টি উক্তি রয়েছে। আর যার সাথে সহবাস হয়নি। তাকে অন্য লোক বিয়ে করতে পারে। হযরত আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কীলা বিনতে আশআস ইবনে কায়েস রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর অধিকারভুক্ত হয়েছিলেন। তার ইন্তেকালের পর সে ইকরামা ইবনে আবু জেহেলের সাথে বিবাহিতা হয়। হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর কাছে এটা খুবই অপছন্দনীয় হয়। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) তাঁকে বুঝিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর খলীফা! সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রী ছিল না। তিনি তাকে কোন অধিকারও প্রদান করেননি এবং পর্দারও হুকুম দেননি। তার কওমের হীনতার সাথে তার নিজের হীনতা ও নীচতার কারণে আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ) হতে তাকে মুক্ত করে দিয়েছেন।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের কারো পক্ষে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে কষ্ট দেয়া অথবা তার মৃত্যুর পর তার পত্নীদেরকে বিয়ে করা কখনো সঙ্গত নয়। আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা ঘোরতর অপরাধ। তোমাদের গোপন ও প্রকাশ সবই আল্লাহর কাছে উন্মুক্ত। তাঁর কাছে ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম বস্তুও গোপন নেই। চোখের খিয়ানত, অন্তরের গোপন তথ্য, মনের বাসনা ইত্যাদি তিনি সবই জানেন।

আল-আহযাব 33:54

৫৩-৫৪ নং আয়াতের তাফসীরএ আয়াতে পর্দার হুকুম রয়েছে ও আদবের আহকাম বৰ্ণনা করা হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ)-এর উক্তি অনুযায়ী যে আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় ওগুলোর মধ্যে এটিও একটি। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত আল্লাহর আমি আনুকূল্য করেছি তিনটি বিষয়ে। আমি বলেছিলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আপনি মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান বানিয়ে নিতেন (তাহলে কতই না ভাল হতো)। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান বানিয়ে নাও।” (২:১২৫) আমি বলেছিলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার স্ত্রীদের নিকট সৎ ও অসৎ সবাই প্রবেশ করে থাকে। সুতরাং যদি আপনি তাদের উপর পর্দা করতেন (তবে খুব ভাল হতো)! আল্লাহ তাআলা তখন পর্দার আয়াত অবতীর্ণ করেন। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরা মর্যাদা বোধের কারণে কিছু বলতে কইতে শুরু করেন তখন আমি বললামঃ অহংকার করবেন না। যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাদেরকে তালাক দিয়ে দেন তবে সত্বরই আল্লাহ তা'আলা আপনাদের পরিবর্তে তাঁকে আপনাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করবেন। তখন আল্লাহ তা'আলা এরূপই আয়াত অবতীর্ণ করেন না।" সহীহ মুসলিমে চতুর্থ আর একটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে। তাহলে বদর যুদ্ধের বন্দীদের ব্যাপারে ফায়সালা সংক্রান্ত বিষয়।হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার কাছে সৎ ও অসৎ সর্বপ্রকারের লোকই এসে থাকে। সুতরাং যদি আপনি মুমিনদের মাতাদেরকে পর্দার নির্দেশ দিতেন (তবে ভাল হতো)।” তখন আল্লাহ তাআলা পর্দার আয়াত অবতীর্ণ করেন। আর ঐ সময়টা ছিল ৫ম হিজরীর যুল-কাদাহ মাসের ঐ দিনের সকাল যেই দিন তিনি হযরত যয়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ)-কে স্ত্রী রূপে বরণ করে নিয়েছিলেন এবং যে বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা দিয়েছিলেন। অনেকেই এ ঘটনাটি তৃতীয় হিজরীর ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) যয়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ)-কে বিয়ে করেন তখন তিনি জনগণকে ওলীমার দাওয়াত করেন। তারা খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বসে গল্প-গুজবে মেতে উঠে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উঠবার জন্যে তৈরী হলেন, কিন্তু তখনো তারা উঠলো না। তা দেখে তিনি উঠে গেলেন এবং কিছু লোক তাঁর সাথে সাথে উঠে চলে গেল। কিন্তু এর পরেও তিনজন লোক বসে থাকলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাড়ীতে প্রবেশ করার উদ্দেশ্যে আসলেন। কিন্তু দেখেন যে, তখনো লোকগুলো বসেই আছে। এরপর তারা উঠে চলে গেল। বর্ণনাকারী হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি তখন এসে নবী (সঃ)-কে খবর দিলাম যে, লোকগুলো চলে গেছে। তখন তিনি এসে বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করলেন। আমিও তাঁর সাথে যেতে লাগলাম। কিন্তু তিনি আমার ও তার মাঝে পর্দা ফেলে। দিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সময় জনগণকে রুটি ও গোশত আহার করিয়েছিলেন। হযরত আনাস (রাঃ)-কে তিনি লোকদেরকে ডাকতে পাঠিয়েছিলেন। লোকেরা এসেছিল ও খেয়েছিল এবং ফিরে যাচ্ছিল। যখন আর কাউকেও ডাকতে বাকী থাকলো না তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ খবর। দিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে দস্তরখান উঠিয়ে নিতে বললেন। পানাহার শেষ করে সবাই চলে গিয়েছিল। শুধুমাত্র তিনজন লোক পানাহার শেষ করার পরেও বসে বসে গল্প করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বেরিয়ে গিয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কক্ষের দিকে গেলেন। অতঃপর বললেনঃ “হে আহলে বায়েত! তোমাদের উপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকত বর্ষিত হালে!” উত্তরে হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেনঃ “আপনার উপরও শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হালে। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আপনার (নব-পরিণিতা) স্ত্রীকে কেমন পেয়েছেন? আপনাকে আল্লাহ বরকত দান করুন!” এভাবে তিনি তাঁর সমস্ত স্ত্রীর নিকট গেলন এবং সবারই সাথে একই কথা-বার্তা হলো। অতঃপর ফিরে এসে দেখলেন যে, ঐ তিন ব্যক্তি তখনো গল্পে মেতে আছে। তারা তখনো যায়নি। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর লজ্জা-শরম খুব বেশী ছিল বলে তিনি তাদেরকে কিছু বলতে পারলেন না। তিনি আবার হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরের দিকে চলে গেলেন। হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি জানি না যে, লোকগুলো চলে গেছে এ খবর তাঁকে আমিই দিলাম কি অন্যেরা দিলো। এ খবর পেয়ে তিনি ফিরে আসলেন এবং এসে তাঁর পা দরযার চৌকাঠের উপর রাখলেন। এক পা তার দরযার ভিতরে ছিল এবং আর এক পা দরযার বাইরে ছিল এমন সময় তিনি আমার ও তাঁর মধ্যে পর্দা ফেলে দিলেন এবং পর্দার আয়াত নাযিল হয়ে গেল। একটি রিওয়াইয়াতে তিনজনের স্থলে দু’জন লোকের কথা রয়েছে। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন এক বিবাহে হযরত উম্মে সালীম (রাঃ) মালীদা (এক প্রকার খাদ্য) তৈরী করেন এবং পাত্রে রেখে আমাকে বলেনঃ “এটা নিয়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে পৌছিয়ে দাও এবং বলো: এ সামান্য উপটৌকন হযরত উম্মে সালীম (রাঃ)-এর পক্ষ হতে। তিনি যেন এটা কবুল করে নেন। আর তাকে আমার সালাম জানাবে।” ঐ সময় জনগণ খুব অভাবী ছিল। আমি ওটা নিয়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সালাম বললাম ও হযরত উম্মে সালীমেরও (রাঃ) সালাম জানালাম এবং খবরও পৌছালাম। তিনি বললেনঃ “আচ্ছা, ওটা রেখে দাও। আমি তখন ঘরের এক কোণে ওটা রেখে দিলাম। অতঃপর তিনি আমাকে বললেনঃ “অমুক অমুককে ডেকে নিয়ে এসো।” তিনি বহু লোকের নাম করলেন। তারপর আবার বললেনঃ “তাছাড়া যে মুসলমানকেই পাবে ডেকে নিয়ে আসবে।” আমি তাই করলাম। যাকেই পেলাম তাকেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট খাবারের জন্যে পাঠাতে লাগলাম। ফিরে এসে দেখলাম যে ঘর, বৈঠকখানা ও আঙ্গিনা লোকে পূর্ণ হয়ে গেছে। প্রায় তিনশ’ লোক এসে গেছে। অতঃপর তিনি আমাকে বললেনঃ “যাও, ঐ খাবারের পাত্রটি নিয়ে এসো।” আমি সেটা নিয়ে আসলে তিনি তাতে হাত লাগিয়ে দু'আ করলেন এবং আল্লাহ যা চাইলেন তিনি মুখে উচ্চারণ করলেন। অতঃপর বললেনঃ “দশ দশজন লোকের দল করে বসিয়ে দাও।” সবাই বিসমিল্লাহ বলে খেতে শুরু করলো। এভাবে খাওয়া চলতে লাগলো। সবাই খাওয়া শেষ করলো। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “পাত্রটি উঠিয়ে নাও।” আমি তখন পাত্রটি উঠালাম। আমি সঠিকভাবে বলতে পারবো না যে, যখন আমি পাত্রটি রেখেছিলাম তখন তাতে খাবার বেশী ছিল, না এখন বেশী আছে। বেশকিছু লোক তখনো বসে বসে গল্প করছিল। উম্মুল মুমিনীন দেয়ালের দিকে মুখ করে বসেছিলেন। লোকগুলোর এতক্ষণ ধরে বসে থাকা এবং চলে না যাওয়া রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে খুবই কঠিন ঠেকছিল। কিন্তু তিনি লজ্জা করে কিছুই বলতে পারছিলেন না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই মানসিক অবস্থার কথা জানতে পারলে লোকগুলো অবশ্যই উঠে চলে যেতো। কিন্তু তারা কিছুই জানতে পারেনি বলে নিশ্চিন্তে গল্পে মেতেছিল। তিনি ঘর হতে বের হয়ে স্ত্রীদের কক্ষের দিকে চলে গেলেন। ফিরে এসে দেখেন যে, তারা তখনো বসেই আছে। তখন তারা বুঝতে পেরে লজ্জিত হলো এবং তাড়াতাড়ি চলে গেলো। তিনি বাড়ীর ভিতরে গেলেন এবং পর্দা লটকিয়ে দিলেন। আমি আমার কক্ষেই ছিলাম এমতাবস্থায় এ আয়াত নাযিল হলো। তিনি আয়াতটি তিলাওয়াত করতে করতে বেরিয়ে আসলেন। সর্বপ্রথম এ আয়াতটি মহিলারাই শুনেছিলেন। আমি তো এর পূর্বেই শুনেছিলাম ।হযরত যয়নাব (রাঃ)-এর কাছে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রস্তাব নিয়ে যাবার রিওয়াইয়াতটি (আরবি) এ আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে। এর শেষে কোন কোন রিওয়াইয়াতে এও আছে যে, এরপর লোকদেরকে উপদেশ দেয়া হয় এবং হাশিমের এ হাদীসে এই আয়াতের বর্ণনা রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সতী-সাধ্বী সহধর্মিণীরা প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে ময়দানের দিকে চলে যেতেন। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) এটা পছন্দ করতেন না। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতেনঃ ‘এভাবে তাদেরকে যেতে দিবেন না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেদিকে কোন খেয়াল করতেন না। একদা হযরত সাওদা বিনতে জামআ (রাঃ) বাড়ী হতে বের হলেন। এদিকে হযরত উমার (রাঃ) চাচ্ছিলেন যে, এ প্রথা রহিত হয়ে যাক। তিনি তার দেহের গঠন দেখেই তাকে চিনতে পারলেন এবং উচ্চ স্বরে বললেনঃ “(হে সাওদা রাঃ)! আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি।” অতঃপর আল্লাহ তা'আলা পর্দার আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। এই রিওয়াইয়াতে এ প্রকারই বলা হয়েছে। কিন্তু আসল কথাটি হলো এই যে, এটা পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরের ঘটনা। কাজেই মুসনাদে আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরে হযরত সাওদা (রাঃ) বের হয়েছিলেন। একথা এখানে বলা হয়েছে যে, তিনি হযরত উমার (রাঃ)-এর একথা শুনে সাথে সাথে ফিরে চলে আসেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রের খাদ্য খাচ্ছিলেন এবং তাঁর হাতে একটি হাড় ছিল এমতাবস্থায় হযরত সাওদা (রাঃ) সেখানে পৌছে তার ঘটনাটি বর্ণনা করেন। ঐ সময় অহী নাযিল হয়। যখন অহী আসা শেষ হলো তখনো তার হাতে ঐ হাড়টি ছিল। তিনি তা ফেলে দেননি। তখন তিনি বললেনঃ “আল্লাহ তাআলা তোমাকে প্রয়োজনে বাইরে যাবার অনুমতি প্রদান করেছেন। এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঐ অভ্যাসে বাধা প্রদান করেছেন যা অজ্ঞতার যুগে ও ইসলামের প্রাথমিক যুগে প্রচলিত ছিল। যেমন তখন বিনা অনুমতিতে অন্যের বাড়ীতে যাওয়া প্রচলিত ছিল। আল্লাহ তা'আলা উম্মতে মুহাম্মদীকে (সঃ) সম্মানের সাথে আদব শিক্ষা দিয়েছেন। একটি হাদীসেও এ বিষয়টি রয়েছেঃ “সাবধান! স্ত্রী লোকদের নিকট যেয়ো না।” অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে স্বতন্ত্র করলেন যাদেরকে অনুমতি দেয়া হবে। আরো বলা হচ্ছেঃ তোমরা আহার্য প্রস্তুতির জন্যে অপেক্ষা না করে ভোজনের জন্যে নবী-গৃহে প্রবেশ করো না এবং ভোজন শেষে তোমরা চলে যেয়ো। মুজাহিদ (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, খাদ্য রান্না করা এবং প্রস্তুত হওয়ার সময়েই যেতে হবে যখন বুঝতে পারবে যে, খাদ্য প্রস্তুত হচ্ছে তখনই যে উপস্থিত হয়ে যাবে এ আচরণ আল্লাহ তা'আলার নিকট পছন্দনীয় নয়। এটা তোফায়লী বনে যাওয়া হারাম হওয়ার দলীল। ইমাম খতীব বাগদাদী (রঃ) এটা নিন্দনীয় হওয়ার উপর একটি পূর্ণ কিতাব লিখেছেন।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমাদেরকে আহ্বান করলে প্রবেশ করো এবং ভোজন শেষে চলে যেয়ো। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্য হতে কাউকেও যদি তার ভাই (খাবার জন্যে) আহ্বান করে তবে তার দাওয়াত কবূল করা উচিত। ঐ দাওয়াত বিবাহের হালে বা অন্য কিছুরই হোক। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)অন্য একটি সহীহ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে যদি একটি খেজুরের দাওয়াত দেয়া হয় তবুও আমি তা কবূল করবো।” দাওয়াত খাওয়ার নিয়ম-কানুনের কথাও তিনি বলেছেনঃ “যখন খাওয়া শেষ হয়ে যাবে তখন সেখানে জেঁকে বসে থেকো না, বরং সেখান হতে চলে যেয়ো। গল্পে মশগুল হয়ে যেয়ো না। যেমন বর্ণিত তিন ব্যক্তি করেছিল, যার কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুবই অস্বস্তি বোধ করছিলেন। কিন্তু তিনি লজ্জা করে কিছু বলতে পারেননি। এর উদ্দেশ্যে এও বটে যে, বিনা অনুমতিতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাড়ীতে চলে যাওয়া তাঁর জন্যে কষ্টদায়ক। কিন্তু তিনি লজ্জা-শরমের কারণে তোমাদেরকে কিছু বলতে পারেন না। আল্লাহর এটা স্পষ্ট নির্দেশ যে, এর পরে যেন এর পুনরাবৃত্তি না হয়। আল্লাহ তা'আলা যখন আদেশ করেছেন তখন। তোমাদের উচিত তা মেনে নেয়া। যেমন বিনা অনুমতিতে তার সহধর্মিণীদের সামনে চলে যাওয়া নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে তাঁদের দিকে চোখ তুলে তাকানোও নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা তাঁর পত্নীদের নিকট কিছু চাইলে পর্দার অন্তরাল হতে চাইবে।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমি নবী (সঃ)-এর সাথে মালীদাহ্ (এক প্রকার খাদ্য) খাচ্ছিলাম। এমন সময় হযরত উমার (রাঃ) সেখান দিয়ে গমন করেন। তিনি তাঁকে ডেকে নেন। তখন তিনি (আমাদের সাথে) খেতে শুরু করে দেন। খেতে খেতে তার অঙ্গুলী আমার অঙ্গুলীতে ঠেকে যায়। তখন তিনি বলে উঠেনঃ “যদি আমার কথা মেনে নিতেন। ও পর্দার ব্যবস্থা করা হতো তবে কারো উপর কারো দৃষ্টি পড়তো না।” ঐ সময়েই পর্দার আয়াত নাযিল হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর এই পর্দার উপকারিতা বর্ণনা করতে গিয়ে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এই বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্যে অধিকতর পবিত্র। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের কারো পক্ষে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে কষ্ট দেয়া অথবা তার মৃত্যুর পর তাঁর পত্নীদেরকে বিয়ে করা কখনো সঙ্গত নয়। আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা ঘোরতর অপরাধ। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণীরা এখানে ও জান্নাতে তাঁরই সহধর্মিণী থাকবেন। সমস্ত মুসলমানের তাঁরা মাতা। এই জন্যে তাদেরকে বিয়ে করা মুসলমানদের জন্যে হারাম করে দেয়া হয়েছে। এ আদেশ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ সহধর্মিণীদের জন্যে যারা তার মৃত্যুকালে তার বাড়ীতেই ছিলেন। কিন্তু নবী (সঃ) তাঁর যে পত্নীদেরকে তাঁর জীবদ্দশায় তালাক দিয়েছেন এবং তার সাথে সহবাস হয়েছে তাকে কেউ বিয়ে করতে পারে কি না এতে দু'টি উক্তি রয়েছে। আর যার সাথে সহবাস হয়নি। তাকে অন্য লোক বিয়ে করতে পারে। হযরত আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কীলা বিনতে আশআস ইবনে কায়েস রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর অধিকারভুক্ত হয়েছিলেন। তার ইন্তেকালের পর সে ইকরামা ইবনে আবু জেহেলের সাথে বিবাহিতা হয়। হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর কাছে এটা খুবই অপছন্দনীয় হয়। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) তাঁকে বুঝিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর খলীফা! সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রী ছিল না। তিনি তাকে কোন অধিকারও প্রদান করেননি এবং পর্দারও হুকুম দেননি। তার কওমের হীনতার সাথে তার নিজের হীনতা ও নীচতার কারণে আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ) হতে তাকে মুক্ত করে দিয়েছেন।” একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের কারো পক্ষে আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে কষ্ট দেয়া অথবা তার মৃত্যুর পর তার পত্নীদেরকে বিয়ে করা কখনো সঙ্গত নয়। আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা ঘোরতর অপরাধ। তোমাদের গোপন ও প্রকাশ সবই আল্লাহর কাছে উন্মুক্ত। তাঁর কাছে ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম বস্তুও গোপন নেই। চোখের খিয়ানত, অন্তরের গোপন তথ্য, মনের বাসনা ইত্যাদি তিনি সবই জানেন।

আল-আহযাব 33:55

পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর স্ত্রী লোকদের জন্যে যেসব নিকটতম আত্মীয়ের সামনে বের হলে কোন দোষ হবে না, এ আয়াতে তার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। সূরায়ে নূরে বলা হয়েছেঃ “নারীরা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত তাদের আভরণ প্রদর্শন না করে, তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নীপুত্র, আপন নারীগণ, মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনা রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারো নিকট তাদের আভরণ প্রকাশ না করে।” এর পূর্ণ তাফসীর এই আয়াতের আলোচনায় বর্ণিত হয়েছে। চাচা ও মামার উল্লেখ এ জন্যেই করা হয়নি যে, সম্ভবতঃ তারা তাদের ছেলেদের সামনে এদের বিশেষণ বর্ণনা করে দেবে। হযরত শা’বী (রঃ) ও ইকরামা (রঃ) তো এ দু’জনের সামনে স্ত্রী লোকের দো-পাট্টা নামিয়ে ফেলা মাকরূহ মনে করতেন। (আরবি) দ্বারা মুমিন নারীদেরকে বুঝানো হয়েছে।(আরবি) দ্বারা দাস-দাসীকে বুঝানো হয়েছে। যেমন পূর্বে এর বর্ণনা গত হয়েছে। হাদীসও আমরা সেখানে আনয়ন করেছি। সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা শুধু দাসীদেরকে বুঝানো হয়েছে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহকে ভয় কর, তিনি সবকিছুই প্রত্যক্ষ করেন। গোপনীয় ও প্রকাশ্য সবই তিনি জানেন।

আল-আহযাব 33:56

সহীহ বুখারীতে হযরত আবুল আলিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলার স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করার ভাবার্থ হলো তাঁর নিজ ফেরেশতাদের কাছে নবী (সঃ)-এর প্রশংসা ও গুণাবলীর বর্ণনা দেয়া। আর ফেরেশতাদের তার উপর দরূদ পাঠের অর্থ হলো তার জন্যে দু'আ করা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন যে, বারাকাতের দুআ। আলেমগণ বলেন যে, আল্লাহর দরূদ অর্থ তাঁর রহমত এবং ফেরেশতাদের দরূদ পাঠের অর্থ ইসতিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা। আতা (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাবারাকা। ওয়া তা'আলার সালাতের ভাবার্থ হলো: (আরবি)অর্থাৎ “আমি মহান ও পবিত্র, আমার রহমত আমার গযবের উপর বিজয়ী।” এই আয়াতে কারীমার উদ্দেশ্য এই যে, যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কদর, মান-মর্যাদা ও ইজ্জত-সম্মান মানুষের নিকট প্রকাশ পেয়ে যায়। তারা যেন জানতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং তাঁর প্রশংসাকারী এবং তাঁর ফেরেশতারা তার উপর দরূদ পাঠকারী। মালায়ে আ’লার এই খবর দিয়ে জগতবাসীকে আল্লাহ তাআলা এই নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারাও যেন তার উপর দরূদ ও সালাম পাঠাতে থাকেন। যাতে মালায়ে আ’লা ও দুনিয়াবাসীর মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে যায়। হযরত মূসা (আঃ)-কে বানী ইসরাঈল জিজ্ঞেস করেছিলঃ “আপনার উপর কি আল্লাহ তা'আলা দরূদ পড়ে থাকেন?” আল্লাহ তা'আলা তখন তার কাছে অহী। পাঠিয়ে তাঁকে জানিয়ে দিলেনঃ “তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, হা, মহান আল্লাহ নিজ নবী ও রাসূলদের উপর রহমত বর্ষণ করে থাকেন। এ আয়াতে ঐ দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা খবর দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর মুমিন বান্দাদের উপরও রহমত বর্ষণ করে থাকেন। তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ তাআলাকে বেশী বেশী স্মরণ কর এবং সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর তাসবীহ পাঠ কর। আল্লাহ তিনিই যিনি তোমাদের উপর রহমত বর্ষণ করে থাকেন এবং তাঁর ফেরেশতারাও।” (৩৩:৪১-৪৩) অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে দাও যাদের উপর বিপদ আপতিত হলে বলেঃ আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভাবে তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।এরাই তারা যাদের প্রতি তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে আশীষ ও দয়া বর্ষিত হয়।” (২:১৫৫-১৫৭) হাদীসে রয়েছেঃ “আল্লাহ তা'আলা কাতারের (সারীর) ডান দিকের লোকদের উপর দরূদ পড়ে থাকেন।” অন্য হাদীসে আছেঃ “হে আল্লাহ! আবুল আওফার বংশধরদের উপর রহমত বর্ষণ করুন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে হযরত জাবির (রাঃ)-এর স্ত্রী আবেদন জানিয়েছিলেন যে, তিনি যেন তাঁর উপর ও তাঁর স্বামীর উপর দরূদ পাঠ করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আল্লাহ তোমার উপর ও তোমার স্বামীর উপর রহমত বর্ষণ করুন।”রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠের নির্দেশ সম্পর্কে বহু মুতাওয়াতির হাদীস এসেছে। ওগুলোর মধ্যে আমরা কিছু কিছু বর্ণনা করবো ইনশাআল্লাহ। তাঁরই নিকট আমরা সাহায্য প্রার্থনা করি।এই আয়াতের তাফসীরে হযরত কা'ব ইবনে আজরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে সালাম করা তো আমরা জানি। কিন্তু আপনার উপর সালাত বা দরূদ পাঠ কেমন?” উত্তরে তিনি বলেন, তোমরা বলো: (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি দরূদ নাযিল করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বংশধরের উপর, যেমন আপনি দরূদ নাযিল করেছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর ও ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধরের উপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও সম্মানিত। হে আল্লাহ! আপনি বরকত নাযিল করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বংশধরের উপর, যেমন আপনি বরকত নাযিল করেছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর ও ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধরের উপর, নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও সম্মানিত।” (এভাবে এই দরূদ শরীফ ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারীও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন কিন্তু তার বর্ণনায় (আরবি) শব্দ নেই) অন্য হাদীসঃ হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আপনার উপর সালাম, কিন্তু আপনার উপর আমরা দরূদ পাঠ করবো কিভাবে? উত্তরে তিনি বলেন, তোমরা বলো: (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি দরূদ নাযিল করুন আপনার বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর, যেমন দরূদ নাযিল করেছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধরের উপর এবং বরকত নাযিল করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বংশধরের উপর, যেমন বরকত নাযিল করেছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধরের উপর।” (এভাবে এই দরূদ ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য হাদীসঃ আবু হুমাইদ সায়েদী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তারা বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিভাবে আমরা আপনার উপর দরূদ পাঠ করবো?” জবাবে তিনি বলেন, তোমরা বলো: (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! দরূদ নাযিল করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর এবং তার স্ত্রীদের উপর ও তার সন্তানদের উপর যেমন দরূদ নাযিল করেছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর এবং বরকত নাযিল করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর এবং তাঁর স্ত্রীদের ও সন্তানদের উপর, যেমন বরকত নাযিল করেছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধরের উপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, সম্মানিত। (এভাবে এই দরূদ ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য হাদীসঃ হযরত আবু মাসঊদ আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করেন যখন আমরা হযরত সা’দ ইবনে উবাদা (রাঃ)-এর মজলিসে বসেছিলাম। অতঃপর তাঁকে হযরত বাশীর ইবনে সা’দ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেন আপনার উপর দরূদ পাঠ করি। সুতরাং কিভাবে আমরা আপনার উপর দরূদ পাঠ করবো?” বর্ণনাকারী বলেন যে, একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর বললেন, তোমরা বলো: (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি দরূদ নাযিল করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বংশধরের উপর যেমন আপনি দরূদ বর্ষণ করেছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধরের উপর, এবং আপনি বরকত নাযিল করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বংশধরের উপর, যেমন আপনি বরকত নাযিল করেছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধরের উপর সারা বিশ্বজগতে, নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মর্যাদাবান।” আর সালাম তো তেমনই যেমন তোমরা জান। (এভাবে ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ),ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)হযরত ইবনে মাসউদ বদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাহাবীগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সালাম তো আমরা জানি। কিন্তু আমরা যখন নামায পড়বো তখন আপনার উপর দরূদ কিভাবে পাঠ করবো?” উত্তরে তিনি বলেন, তোমরা বলো: (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি দরূদ নাযিল করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বংশধরের উপর।” ইমাম শাফিয়ী (রঃ) স্বীয় মুসনাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে অনুরূপ আনয়ন করেছেন।ইমাম শাফিয়ী (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, নামাযের শেষ তাশাহহুদে কেউ যদি দরূদ না পড়ে তবে তার নামায শুদ্ধ হবে না। এই জায়গায় দরূদ পাঠ করা ওয়াজিব। পরবর্তী যুগের কোন কোন গুরুজন এই মাসআলায় ইমাম শাফিয়ী (রঃ)-এর মতকে খণ্ডন করেছেন এবং বলেছেন যে, এটা শুধু তাঁরই উক্তি। তাঁর উক্তির বিপরীত কথার উপর ইজমা হয়েছে। অথচ এটা ভুল। সাহাবীদের আর একটি দল এটাই বলেছেন, যেমন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), আবু মাসউদ বদরী (রাঃ) এবং জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ)। তাবেয়ীদের মধ্যেও এই মাযহাবের লোক গত হয়েছেন, যেমন শাবী (রঃ), আবু জাফর বাকির (রঃ) এবং মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ)। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) তো এদিকেই গিয়েছেন। এ ব্যাপারে তার মধ্যে ও তাঁর সহচরদের মধ্যে কোনই মতানৈক্য নেই। ইমাম আহমাদ (রঃ)-এরও শেষ উক্তি এটাই, যেমন আবু যারআহ দেমাশকী (রঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে। ইসহাক ইবনে রাহওয়াই (রঃ), ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম ফকীহও (রঃ) এটাই বলেন। এমন কি কোন কোন হাম্বলী মাযহাবের ইমাম বলেন যে, নামাযে কমপক্ষে (আরবি) বলাওয়াজিব। যেমন তিনি তাঁর সঙ্গীদের প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষা দিয়েছেন। আর আমাদের কোন কোন সঙ্গী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বংশধরের উপর দরূদ পাঠও ওয়াজিব বলেছেন। মোটকথা, নামাযে দরূদ পাঠ ওয়াজিব হওয়ার উক্তিটি খুবই প্রকাশমান। আর হাদীসেও এর দলীল বিদ্যমান রয়েছে। পূর্বযুগীয় ও পরবর্তী যুগের গুরুজনদের মধ্যে ইমাম শাফিয়ী (রঃ) ছাড়াও অন্যান্য ইমামগণও এই উক্তিই করেছেন। সুতরাং এটা বলা কোনক্রমেই ঠিক হবে না যে, এটা শুধু ইমাম শাফিয়ী (রঃ)-এর উক্তি এবং এটা ইজমার বিপরীত। আল্লাহ তাআলাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। তাছাড়া নিম্নের হাদীসটিও এর পৃষ্ঠপোষকতা করেঃহযরত ফুযালা ইবনে উবায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে তার নামাযে দু'আ করতে শুনতে পান যে দু'আয় সে আল্লাহর প্রশংসা করেনি এবং নবী (সঃ)-এর উপর দরূদও পাঠ করেনি। তখন তিনি বলেনঃ “এ লোকটি খুব তাড়াতাড়ি করলো। তারপর তিনি তাকে ডাকলেন এবং তাকে অথবা অন্য কাউকে বললেনঃ “তোমাদের কেউ যখন দুআ করবে তখন যেন প্রথমে মহামহিমান্বিত আল্লাহর প্রশংসা করে ও তার উপর সানা পড়ে, তারপর যেন নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করে। অতঃপর যা ইচ্ছা করে তাই যেন চায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) (তিনি এটাকে সহীহ বলেছেন), ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইবনে খুযাইমা (রঃ) এবং ইবনে হিব্বান (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এর সমর্থনে নিম্নের হাদীসটিও রয়েছেঃহযরত সাহল ইবনে সা’দ সায়েদী (রাঃ) তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার অযু নেই তার নামায নেই, ঐ ব্যক্তির অযু হয় না যে অযুর সময় বিসমিল্লাহ বলে না, ঐ ব্যক্তির নামায হয় না যে নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পড়ে না এবং ঐ ব্যক্তির নামায হয় না যে আনসারকে ভালবাসে না।” (এ হাদীস ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য হাদীসঃ হযরত বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে কিভাবে সালাম দিতে হবে তা আমরা জানি। কিন্তু কিভাবে আপনার উপর দরূদ পাঠ করবো? তিনি উত্তরে বললেন, তোমরা বললঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনার অনুগ্রহ, আপনার রহমত এবং আপনার বরকত নাযির করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বংশধরের উপর, যেমন তা করেছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর ও ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধরের উপর, নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মর্যাদাবান। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী আবু দাউদ আলআমা, যার নাম নাফী ইবনে হারিস পরিত্যক্ত ব্যক্তি। হযরত সালামা আল কানদী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আলী (রাঃ) জনগণকে নিম্ন লিখিত দু'আটি শিক্ষা দিতেনঃ (আরবি) ঐ হাদীসের সনদ ঠিক নয়। এর বর্ণনাকারী আবু হারবাজ মুযীঃ সালামা কানদী পরিচিতও নয় এবং হযরত আলী (রাঃ)-এর সাথে তার সাক্ষাৎ প্রমাণিতও নয়।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “যখন তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করবে তখন খুব উত্তমরূপে পাঠ করবে। কারণ তোমরা জান না যে, হয়তো এটা তার উপর পেশ করা হবে।” জনগণ তখন তাকে বললেনঃ “তাহলে আপনি আমাদেরকে শিখিয়ে দিন। তিনি বললেন, তোমরা বলো: (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আপনার অনুগ্রহ, আপনার রহমত এবং আপনার বরকত দান করুন রাসূলদের নেতা, সংযমীদের ইমাম, নবীদেরকে শেষকারী, আপনার বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর, যিনি কল্যাণের ইমাম, মঙ্গলের পরিচালক এবং রহমতের রাসূল। হে আল্লাহ! তাঁকে প্রশংসিত জায়গায় পাঠিয়ে দিন যার প্রতি পূর্ববর্তী ও পরবর্তীরা ঈর্ষা পোষণ করেন। হে আল্লাহ! আপনি দরূদ নাযিল করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বংশধরের উপর, যেমন আপনি দরূদ নাযিল করেছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর ও ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধরের উপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহাসম্মানিত। হে আল্লাহ! আপনি বরকত নাযিল করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বংশধরের উপর, যেমন আপনি বরকত নাযিল করেছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর ও ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধরের উপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহামর্যাদাবান।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ্ বর্ণনা করেছেন। এ রিওয়াইয়াতটি মাওকুফ)হযরত ইউনুস ইবনে খাব্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, তাঁকে এমন এক ব্যক্তি খবর দিয়েছেন যিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেন : “সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার উপর সালাম সম্পর্কে আমরা জানি। এখন বলুনঃ আপনার উপর দরূদ কিভাবে পাঠ করতে হবে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! দরূদ নাযিল করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর পরিবারের উপর, যেমন দরূদ নাযিল করেছেন ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর ও ইবরাহীম (আঃ)-এর পরিবারের উপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহাসম্মানিত। আর দয়া করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর পরিবারের প্রতি, যেমন দয়া করেছেন ইবরাহীম (আঃ)-এর পরিবারের প্রতি। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহাসম্মানিত। আর বরকত নাযিল করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বংশধরের উপর যেমন আপনি বরকত নাযিল করেছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর উপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহাসম্মানিত। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এর দ্বারা এ দলীলও গ্রহণ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে রহম বা করুণারও দু'আ রয়েছে। জমহূরের এটাই মাযহাব। এর আরো দৃঢ়তা নিম্নের হাদীস দ্বারা হয়ঃ হাদীসটি এই যে, একজন গ্রাম্য লোলে বলেছিলঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমার ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর দয়া করুন এবং আমাদের সাথে আর কারো উপর দয়া করবেন না।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি খুব বেশী প্রশস্ত জিনিসকে সংকীর্ণ করে দিলে।” কাযী আইয়ায (রঃ) জমহুর মালেকিয়া হতে এর অবৈধতা বর্ণনা করেছেন এবং আবু মুহাম্মাদ ইবনে আবি যায়েদ (রঃ) এটাকে জায়েয বলেছেন। অন্য একটি হাদীসঃহযরত রাবীআহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার উপর দরূদ পাঠ করে তার জন্যে ফেরেশতারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন যতক্ষণ সে আমার উপর দরূদ পড়তে থাকে। সুতরাং বান্দা এখন দরূদ পাঠ কম করুক অথবা বেশী করুক।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আর একটি হাদীসঃহযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “লোকদের মধ্যে যারা আমার উপর অধিক দরূদ পাঠকারী তারাই হবে কিয়ামতের দিন সর্বোত্তম লোক। [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তিরমিযী (রঃ)]হযরত যায়েদ ইবনে তালহা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে একজন আগন্তুক আমার নিকট এসে বলেনঃ “যে বান্দা আপনার উপর একটি দুরূদ পাঠ করে আল্লাহ তার উপর দশটি রহমত বর্ষণ করেন। তখন একটি লোক দাঁড়িয়ে গিয়ে বললো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি অবশ্যই আমার দু'আর অর্ধেক সময় আপনার উপর দরূদ পাঠে ব্যয় করবো।” জবাবে তিনি তাকে বললেনঃ “তুমি ইচ্ছা করলে তাই কর।” লোকটি আবার বললো: “আমার দু'আর দুই তৃতীয়াংশ সময় আমি আপনার উপর দরূদ পাঠে লাগাবো।” তিনি বললেনঃ “ইচ্ছা হলে তাই কর।” লোকটি পুনরায় বললো: “আমি আমার দু'আর সর্বাংশই আপনার উপর দরূদ পাঠে লাগিয়ে দিবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তাহলে আল্লাহ তা'আলা তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতের চিন্তা হতে মুক্তি দান করবেন এবং তিনিই তোমার জন্যে যথেষ্ট হবেন। (এ হাদীসটি ইসমাঈল কাযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য একটি হাদীসঃ হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, মধ্যরাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বের হতেন এবং বলতেনঃ “প্রকম্পিতকারী আসছে এবং ওকে অনুসরণকারী পরবর্তী ধ্বনিও রয়েছে এবং মৃত্যু তার মধ্যে যা আছে তা নিয়ে আসছে।” [এ হাদীসটিও বর্ণনা করেছেন ইসমাঈল কাযী (রঃ)]হযরত উবাই (রাঃ) একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা রাত্রে নামায পড়ে থাকি। আমি আমার নামাযের এক তৃতীয়াংশ সময় আপনার উপর দরূদ পাঠে কাটিয়ে দিবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “অর্ধেক (কাটাবে)।” তিনি বললেনঃ “ঠিক আছে, তাহলে অর্ধেক সময় আপনার উপর দরূদ পাঠে লাগিয়ে দিবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “দুই তৃতীয়াংশ।” হযরত উবাই (রাঃ) বললেনঃ “আমি আমার নামাযের সমস্ত সময়ই আপনার উপর দরূদ পাঠে ব্যয় করে দিবো।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তাহলে তো আল্লাহ তা'আলা তোমার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন।”হযরত কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রাতের এক তৃতীয়াংশ সময় অতিবাহিত হতো তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) উঠতেন ও বলতেনঃ “হে লোক সকল! আল্লাহকে স্মরণ কর, আল্লাহকে স্মরণ কর! প্রকম্পিতকারী আসছে এবং ওকে অনুসরণকারীও আসছে। মৃত্যু তার মধ্যস্থিত বিপদ-আপদ নিয়ে চলে আসছে, মৃত্যু তার মধ্যস্থিত বিপদ-আপদ নিয়ে চলে আসছে।" হযরত উবাই (রাঃ) তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার উপর অধিক দরূদ পাঠ করে থাকি। বলুন তো, আমি আমার নামাযের কত অংশ আপনার উপর দরূদ পাঠে ব্যয় করবো?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তুমি যা চাইবে।” তিনি বললেনঃ “এক চতুর্থাংশ?” নবী (সঃ) জবাব দিলেনঃ “তুমি যা ইচ্ছা করবে। তুমি যদি বেশী সময় ব্যয় কর তবে সেটা তোমার জন্যে কল্যাণকর হবে।” উবাই বললেনঃ “তাহলে অর্ধেক?” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি যা চাইবে, তবে তুমি যদি বেশী কর তখন তা তোমার জন্যে মঙ্গলজনক হবে।” হযরত উবাই বললেনঃ “তাহলে দুই তৃতীয়াংশ?” নবী (সঃ) জবাব দিলেনঃ “তুমি যা ইচ্ছা করবে। তবে যদি তুমি বেশী কর তা তোমার জন্যে হবে কল্যাণকর।” তখন হযরত উবাই (রাঃ) বললেনঃ “তাহলে আমার নামাযের সমস্ত সময়ই আমি আপনার উপর দরূদ পাঠে কাটিয়ে দিবো।” তার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তাহলে আল্লাহ তোমাকে সমস্ত চিন্তা ও দুর্ভাবনা হতে রক্ষা করবেন এবং গুনাহ্ মাফ করে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং একে হাসান বলেছেন)হযরত উবাই (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একটি লোক বললো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি আমি আমার সমস্ত দরূদ আপনার উপর পাঠ করি তবে কি হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাহলে আল্লাহ তা'আলা তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত চিন্তা হতে বাঁচিয়ে নিবেন। এবং তোমার সমস্ত উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (একদা) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বের হলেন এবং আমিও তার অনুসরণ করলাম। তিনি একটি খেজুরের বাগানে প্রবেশ করলেন। সেখানে তিনি সিজদায় পড়ে গেলেন। তিনি এতো দীর্ঘক্ষণ ধরে সিজদায় পড়ে থাকলেন যে, আমার মনে সন্দেহ হলো, তার রূহ বের হয়ে যায়নি তো! নিকটে গিয়ে আমি তাকে দেখতে লাগলাম। ইতিমধ্যে তিনি মাথা উঠালেন এবং আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” আমি আমার অবস্থা তার কাছে প্রকাশ করলাম। তিনি তখন বললেনঃ “ব্যাপার ছিল এই যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে বললেন, আমি আপনাকে একটি শুভ সংবাদ শুনাচ্ছি যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহ আপনাকে বলেছেন- যে তোমার উপর দরূদ পাঠ করবে আমিও তার উপর রহমত নাযিল করবো এবং যে তোমার উপর সালাম পাঠাবে আমিও তার উপর সালাম পাঠাবো। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, শেষে রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমি মহিমান্বিত আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপনার্থে এ সিজদা করেছিলাম।” হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন কার্যোপলক্ষে বের হন। তাঁর সাথে যাবে এমন কেউ ছিল না। তখন হযরত উমার (রাঃ) দ্রুত গতিতে তার পিছনে পিছনে চলতে থাকেন। দেখেন যে, তিনি সিজদায় পড়ে রয়েছেন। তিনি দূরে সরে গিয়ে দাঁড়িয়ে যান। তিনি সিজদা হতে মাথা উঠিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলেন, তুমি যে আমাকে সিজদার অবস্থায় দেখে দূরে সরে গেছো এটা খুব ভাল কাজ করেছো, জেনে রেখো যে, আমার কাছে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে বললেনঃ “আপনার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি একবার আপনার উপর দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার উপর দশটি রহমত নাযিল করবেন এবং তার দশধাপ মর্যাদা বাড়িয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি আবুল কাসেম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু তালহা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের নিকট আসেন, ঐ সময় তাঁর চেহারায় আনন্দের লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছিল। সাহাবীগণ তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “একজন ফেরেশতা আমার নিকট এসে আমাকে এই সুসংবাদ দিলেন যে, আমার উম্মতের মধ্যে কেউ আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করলে তার উপর আল্লাহর দশটি রহমত নাযিল হবে। অনুরূপভাবে আমার উপর কেউ একটি সালাম পাঠালে আল্লাহ তার উপর দশটি সালাম পাঠাবেন করেছেন। (ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, একটি দরূদের বিনিময়ে সে দশটি পুণ্য লাভ করবে, দশটি গুনাহ্ তার মাফ হয়ে যাবে, মর্যাদা দশ ধাপ উঁচু হয়ে যাবে এবং ওরই অনুরূপ তার উপর ফিরিয়ে দেয়া হবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার উপর একটি দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তার উপর দশটি রহমত নাযিল করবেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে হাসান সহীহ বলেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ তোমরা আমার উপর দরূদ পাঠ কর, কেননা এটা তোমাদের যাকাত। আর তোমরা আমার জন্যে আল্লাহর নিকট ওয়াসিলা যাজ্ঞা কর। এটা জান্নাতের একটি বিশেষ উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন জায়গা। ওটা একজন লোকই শুধু লাভ করবে। আমি আশা করি যে, ঐ লোকটি আমিই হবো। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা তার উপর সত্তর বার দরূদ নাযিল করবেন। এখন যার ইচ্ছা কম করুক এবং যার ইচ্ছা বেশী করুক। জেনে রেখো যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট বের হয়ে আসলেন, তিনি যেন কাউকেও বিদায় সম্ভাষণ জানাচ্ছিলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আমি মুহাম্মাদ (সঃ) উম্মী নবী।” একথা তিনি তিনবার বলেন। এরপর বলেনঃ “আমার পরে কোন নবী নেই। আমাকে অত্যন্ত উন্মুক্ত এবং খুবই ব্যাপক ও খতমকারী কালাম প্রদান করা হযেছে। জাহান্নামের দারোগা ও আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের সংখ্যা কত তা আমি জানি। আমাকে বিশেষ দানে। ভূষিত করা হয়েছে। আমাকে ও আমার উম্মতকে সুস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা দান করা হয়েছে। যতদিন আমি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকবে ততদিন তোমরা আমার কথা শুনবে ও মানবে। যখন আমার প্রতিপালক আমাকে উঠিয়ে নিবেন তখন তোমরা আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে। তাতে বর্ণিত হালালকে হালাল ও হারামকে হারাম মনে করবে।” (মুসনাদে আহমাদে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার সামনে আমার নাম উল্লেখ করা হয় সে যেন আমার উপর দরূদ পাঠ করে।” অন্য হাদীসঃ যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তার উপর দশটি রহমত নাযিল করেন।” (এ হাদীসটি আবু দাউদ তায়ালেসী (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। অন্য হাদীসঃ হযরত হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি বখীল বা কৃপণ যার সামনে আমার নাম উল্লেখ করা হয় অথচ সে আমার উপর দরূদ পাঠ করে না।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান, গারীব, সহীহ বলেছেন) অন্য হাদীসঃ হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার সামনে আমার নাম উচ্চারণ করা হয় অথচ সে আমার উপর দরূদ পাঠ করে না সে হলো মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় কৃপণ। (এ হাদীসটি ইসমাঈল কাযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আর একটি হাদীসঃ হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হালে যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হয় অথচ সে আমার উপর দরূদ পাঠ করে না। ঐ ব্যক্তির নাক ধুলো-মলিন হালে যার উপর রমযান মাস অতিবাহিত হয়ে গেল অথচ তার গুনাহ মাফ হলো না। ঐ ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হালে যে তার পিতা-মাতাকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেল অথচ (তাদের খিদমত করে) সে জান্নাতে যেতে পারলো না। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)এ হাদীসগুলো দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দরূদ পড়া ওয়াজিব। আলেমদের একটি বড় দল এই মতের সমর্থক। যেমন তাহাবী (রঃ), হালীমী (রঃ) প্রমুখ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার উপর দরূদ পড়তে ভুলে গেছে সে জান্নাতের পথ ভুল করেছে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটি মুরসাল হাদীস কিন্তু পূর্বের হাদীস দ্বারা এটা সবলতা লাভ করেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন)কোন কোন আলেম বলেন যে, মজলিসে অন্ততঃ একবার দরূদ পাঠ ওয়াজিব এবং পরেরগুলো মুস্তাহাব। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যারা কোন মজলিসে বসে এবং আল্লাহর যিকর ও নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ ছাড়াই উঠে পড়ে তারা কিয়ামতের দিন হতভাগ্য হবে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে শাস্তিও দিতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে ক্ষমাও করে দিতে পারেন। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আল্লাহর যিকরের উল্লেখ নেই। তাতে এও আছে যে, তারা জান্নাতে গেলেও দরূদ পাঠের সওয়াব লাভে বঞ্চিত হওয়ার কারণে আফসোস করতে থাকবে।কারো কারো উক্তি এই যে, জীবনে একবার নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ ওয়াজিব, তারপর মুস্তাহাব, যাতে আয়াতের উপর আমল করা যায়। কাযী আইয়ায (রঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ ওয়াজিব হওয়ার কথা বলার পর এই উক্তির পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। কিন্তু তাবারী (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত দ্বারা তো নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ মুস্তাহাব হওয়াই প্রমাণিত হচ্ছে এবং এর উপর ইজমা হওয়ার তিনি দাবী করেছেন। খুব সম্ভব তারও উদ্দেশ্য এটাই যে, একবার ওয়াজিব এবং পরে মুস্তাহাব। যেমন তার নবুওয়াতের সাক্ষ্য দান। কিন্তু আমি বলি যে, এটা খুবই গরীব বা দুর্বল উক্তি। কেননা, নবী (সঃ)-এর উপর বহু সময় দরূদ পাঠের নির্দেশ এসেছে। এগুলোর মধ্যে কোনটা ওয়াজিব। এবং কোনটা মুস্তাহাব। যেমন আযান সম্পর্কে হাদীসে এসেছেঃ হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যখন তোমরা মুআযযিনকে আযান দিতে শোন তখন সে যা বলে তোমরাও তা-ই বলো। অতঃপর আমার উপর দরূদ পাঠ করবে। কেননা, যে আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তার উপর দশটি রহমত বর্ষণ করেন। তারপর আমার জন্যে আল্লাহর নিকট ওয়াসীল যা করবে। নিশ্চয়ই ওটা জান্নাতের এমন একটি স্থান যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একজন বান্দা ছাড়া আর কারো জন্যে শোভনীয় নয়। আমি আশা করি যে, আমিই সেই বান্দা। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার জন্যে ওয়াসীলা যাঞা করবে তার জন্যে আমার। শাফাআত ওয়াজিব হয়ে যাবে।' অন্য ধারাঃ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আমার জন্যে ওয়াসীলা প্রার্থনা করবে, কিয়ামতের দিন তার জন্যে আমার শাফাআত ওয়াজিব হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন) অন্য হাদীসঃ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমার উপর দরূদ পাঠ করবে। কেননা, আমার উপর তোমাদের দরূদ পাঠ তোমাদের জন্যে যাকাত। আর তোমরা আমার জন্যে ওয়াসীলা প্রার্থনা কর। ওয়াসীলা হচ্ছে জান্নাতের মধ্যে একটি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন স্থান। একটি লোক ছাড়া তা কেউ লাভ করতে পারবে না এবং আমি আশা করি যে, ঐ লোকটি আমিই হবো।” (এ হাদীসটি ইসমাঈল কাযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত রুওয়াইফা ইবনে সাবিত আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করে এবং বলেঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! তাঁকে আপনি আপনার নিকটতম আসন দান করুন,” কিয়ামতের দিন তার জন্যে আমার শাফাআত ওয়াজিব হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত তাউস হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বড় শাফাআ'ত কবুল করুন এবং তার উঁচু দরযা উপরে উঠিয়ে দিন, তাঁর পারলৌকিক ও ইহলৌকিক চাহিদার জিনিস তাকে প্রদান করুন, যেমন প্রদান করেছিলেন ইবরাহীম (আঃ) ও মূসা (আঃ)-কে।” এর ইসনাদ উত্তম, সবল ও সঠিক।দরূদ পাঠ করতে হবে মসজিদে প্রবেশ করার সময় এবং মসজিদ হতে বের হবার সময়। কেননা, এরূপ হাদীস রয়েছে যা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীস হলো: হযরত ফাতিমা (রাঃ) বিনতে রাসূলিল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মসজিদে প্রবেশ করতেন তখন তিনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর দরূদ পড়তেন, তারপর বলতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমার পাপসমূহ ক্ষমা করে দিন এবং আমার জন্যে আপনার রহমতের দরগুলো খুলে দিন। আর যখন মসজিদ হতে বের হতেন। তখন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করতেন, তারপর বলতেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমার গুনাহগুলো মাফ করে দিন এবং আপনার অনুগ্রহের দুরগুলো খুলে দিন!”ইসমাঈল কাযী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আলী (রাঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা মসজিদে গমন করবে তখন নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করবে।” নামাযের শেষের আত্তাহিয়্যাতু এর আলোচনা পূর্বেই গত হয়েছে। তবে প্রথম তাশাহহুদে এটাকে কেউই ওয়াজিব বলেননি। অবশ্য এটা মুস্তাহাব হওয়ার একটি উক্তি ইমাম শাফিয়ী (রঃ)-এর রয়েছে। যদিও দ্বিতীয় উক্তিতে এর বিপরীতও তার থেকেই বর্ণিত হয়েছে। জানাযার নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দরূদ পড়তে হবে। সুন্নাত তারীকা এই যে, প্রথম তাকবীরে সূরায়ে ফাতেহা পড়তে হবে, দ্বিতীয় তাকবীরে পড়তে হবে দরূদ শরীফ, তৃতীয় তাকবীরে মৃতের জন্যে দু'আ করতে হবে এবং চতুর্থ তাকবীরে পড়তে হবে: (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! এর পূণ্য হতে আমাদেরকে বঞ্চিত করবেন না এবং এর পরে আমাদেরকে ফিত্নায় ফেলবেন না।” নবী (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তির উক্তি হলো এই যে, জানাযার নামাযের মাসনূন তরীকা হলো: ইমাম সাহেব তাকবীর পড়ে আস্তে আস্তে সূরায়ে ফাতেহা পড়বেন। তারপর নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করবেন এবং মৃতের জন্যে আন্তরিকতার সাথে দু'আ করবেন এবং তাকবীরগুলোতে কিছুই পড়বেন। তারপর চুপে চুপে সালাম ফিরাবেন। (এটা ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ঈদের নামাযের পূর্বে হযরত ওয়ালীদ ইবনে উকবা (রাঃ) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত আবু মূসা (রাঃ) এবং হযরত হুযাইফা (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন। এসে তিনি বলেনঃ “আজ তো ঈদের দিন। বলুন তো তাকবীরের নিয়ম কি?” উত্তরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “তাকবীরে তাহরীমা বলে আল্লাহর প্রশংসা করবে ও নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পড়বে। তারপর দু'আ করবে। এপর তাকবীর বলে এটাই করবে, আবার তাকবীর বলে এটাই করবে, পুনরায় তাকবীর বলে এটাই করবে, আবার তাকবীর বলে এটাই করবে। এরপর কিরআত পড়বে। তারপর তাকবীর পাঠ করে রুকু করবে। তারপর দাঁড়িয়ে পাঠ করবে এবং স্বীয় প্রতিপালকের প্রশংসা করবে ও নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পড়বে। এরপর দু'আ করবে ও তাকবীর দিবে এবং এভাবে আবার রুকূতে যাবে।” হযরত হুযাইফা (রাঃ) ও হযরত আবু মূসাও (রাঃ) তাঁর কথা সত্যায়িত করেন।নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠের সাথে দু'আ শেষ করতে হবে। এটা মুস্তাহাব। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “দু’আ আসমান ও যমীনের মাঝে রুদ্ধ থাকে যে পর্যন্ত না তুমি তোমার নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ কর।” রাযীন ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) তাঁর কিতাবে মারফুরূপে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “দু'আ আসমান ও যমীনের মাঝে রুদ্ধ থেকে যায় যে পর্যন্ত আমার উপর দরূদ পাঠ করা হয়। তোমরা আমাকে আরোহীর পানপাত্রের মত করো না। তোমরা দুআর প্রথমে, শেষে ও মধ্যে আমার উপর দরূদ পাঠ করো।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেছেনঃ “তোমরা আমাকে সওয়ারের পেয়ালার মত করো না। যখন সে তার প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো গ্রহণ করে তখন পানপাত্রটিও পূর্ণ করে থাকে। অযুর প্রয়োজন হলে তা থেকে অযু করে, পিপাসা পেলে তা হতে পান করে, অন্যথায় ফেলে দেয়। তোমরা দু'আর শুরুতে, মধ্যভাগে এবং শেষে আমার উপর দরূদ পাঠ করে নিবে। এটি গারীব বা দুর্বল হাদীস। বিশেষ করে দু'আয়ে কুনূতে এর খুবই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ) বলেনঃ “আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কয়েকটি কালেমা শিখিয়ে দিয়েছেন যা বেতরের নামাযে পড়ে থাকি। সেগুলো হলো: (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি যাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন তাদের মধ্যে আমাকেও হিদায়াত দান করুন, যাদেরকে আপনি নিরাপদে রেখেছেন তাদের মধ্যে আমাকেও নিরাপদে রাখুন, যাদের আপনি কর্ম সম্পাদন করেছেন তাদের মধ্যে আমারও কর্ম সম্পাদন করুন, আমাকে আপনি যা দিয়েছেন তাতে আমার জন্যে বরকত দান করুন, আপনি যে অমঙ্গলের ফায়সালা করেছেন তা হতে আমাকে রক্ষা করুন। নিশ্চয়ই আপনি ফায়সালা করেন এবং আপনার উপর ফায়সালা করা হয় না। নিশ্চয়ই যাকে আপনি বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেন সে লাঞ্ছিত হয় না এবং যার সাথে আপনি শত্রুতা রাখেন সে সম্মান লাভ করে না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি কল্যাণময় এবং সমুচ্চ।” সুনানে নাসাঈতে এর পরে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “নবী (সঃ)-এর উপর আল্লাহ দুরূদ নাযিল করুন।”জুমআর দিনে ও রাত্রে নবী (সঃ)-এর উপর বেশী বেশী দরূদ পাঠ করা মুস্তাহাব। হযরত আউস ইবনে আউস সাকাফী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বোত্তম দিন হলো জুমআর দিন। এদিনেই হযরত আদম (রাঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়, এই দিনেই তাঁর রূহ কবয করা হয়। এই দিনেই শিঙ্গায় ফুঙ্কার দেয়া হবে এবং এই দিনেই সবাই অজ্ঞান হবে। সুতরাং তোমরা এই দিনে খুব বেশী বেশী আমার উপর দরূদ পাঠ করবে। তোমাদের দরূদ আমার উপর পেশ করা হয়।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাকে তো যমীনে দাফন করে দেয়া হবে, সুতরাং এমতাবস্থায় কিভাবে আমাদের দরূদ আপনার উপর পেশ করা হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা যমীনের উপর নবীদের দেহকে ভক্ষণ করা হারাম করে দিয়েছেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানে আবি দাউদ, সুনানে নাসাঈ প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থেও হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে) অন্য একটি হাদীসঃ হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জুমআর দিন তোমরা খুব বেশী বেশী দরূদ পড়বে। ঐ দিন ফেরেশতা হাযির হন। যখন কেউ আমার উপর দরূদ পড়ে তখন তার দরূদ আমার উপর পেশ করা হয় যে পর্যন্ত না সে এর থেকে ফারেগ হয়।” জিজ্ঞেস করা হলো: “মৃত্যুর পরেও কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ নবীদের দেহকে খাওয়া যমীনের উপর হারাম করে দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহর নবীরা জীবিত থাকেন এবং তাঁদেরকে আহার্য পৌঁছানো হয়। (এ হাদীসটি আবু আবদিল্লাহ ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব এবং ছেদ কাটা। এসব ব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন)ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জুমআর দিনে ও রাত্রে আমার উপর খুব বেশী বেশী দরূদ পড়বে।” (এ হাদীসটিও দুর্বল)একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, যার সাথে রুহুল কুদুস (হযরত জিবরাঈল আঃ) কথা বলেছেন তার দেহ যমীনে খায় না। এ হাদীসটি মুরসাল। আর একটি মুরসাল হাদীসেও জুমআর দিনে ও রাত্রে খুব বেশী করে দরূদ পাঠের হুকুম রয়েছে। অনুরূপভাবে খতীবের উপর দুই খুৎবায় দরূদ পাঠ ওয়াজিব। এটা ছাড়া খুৎবা শুদ্ধ হবে না। কেননা, এটা ইবাদত এবং ইবাদতে আল্লাহর যিকর ওয়াজিব। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যিকরও ওয়াজিব হবে। যেমন আযান ও নামায। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর মাযহাব এটাই।আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর কবর যিয়ারত করার সময়ও তার উপর দরূদ পাঠ মুস্তাহাব। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের কেউ আমার উপর সালাম পাঠ করে তখন আল্লাহ আমার উপর রূহ ফিরিয়ে দেন, শেষ পর্যন্ত আমি তার সালামের জবাব দিয়ে থাকি।” (ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম নববী (রঃ) এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিয়ে নেবে না এবং আমার কবরে মেলা বসাবে না। হ্যা, তবে আমার উপর দরূদ পাঠ করবে। কেননা, তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, তোমাদের দরূদ আমার কাছে পৌঁছে থাকে। (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, একটি লোক প্রত্যহ সকালে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রওযা মুবারকের উপর আসততা এবং তার উপর দরূদ পাঠ করতো। একদা তাকে হযরত আলী ইবনে হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) বললেনঃ “তুমি এরূপ কর কেন?” সে উত্তরে বললো: “নবী (সঃ)-এর উপর সালাম পাঠ আমি খুব পছন্দ করি।” তখন তিনি লোকটিকে বললেন, তাহলে শুন, আমি তোমাকে একটি হাদীস শুনাচ্ছি যা আমি আমার পিতা হতে এবং তিনি আমার দাদা হতে শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমার কবরকে ঈদ বানিয়ে নিয়ো না। নিজেদের ঘরগুলোকে তোমরা কবর বানিয়ে নিয়ো না। যেখানেই তোমরা থাকো না কেন আমার উপর দরূদ ও সালাম পাঠ করতে থাকবে। ঐ দরূদ ও সালাম আমার নিকট পৌঁছে যায়। এ হাদীসটি কাযী ইসমাঈল ইবনে ইসহাক (রঃ) স্বীয় কিতাব ফাযলুস সলাতে আলান নাবিয়্যি (সঃ)'-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদে একজন বর্ণনাকারী সন্দেহযুক্ত রয়েছে যার নাম উল্লেখ করা হয়নি। অন্য সনদে এ রিওয়াইয়াতটি মরসালরূপে বর্ণিত হয়েছে যাতে হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কবরের পার্শ্বে কতকগুলো লোককে দেখে তাদেরকে এই হাদীসটি শুনিয়েছিলেন এবং তাঁর কবরে মেলা বসাতে তিনি নিষেধ করেছিলেন। খুব সম্ভব, লোকগুলোর বেআদবীর কারণেই তিনি তাদেরকে হাদীসটি শুনিয়েছিলেন এবং তাদেরকে এটা শুনানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যেতে পারে যে, তারা হয়তো উচ্চস্বরে দরূদ পাঠ করছিল।এটাও বর্ণিত আছে যে, তিনি একটি লোককে দিনের পর দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রওযা মুবারকের পার্শ্বে আসতে দেখে তাকে বলেনঃ “তুমি এবং যে ব্যক্তি স্পেনে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দরূদ ও সালাম পাঠ করার দিব দিয়ে উভয়েই সমান।”হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যেখানেই থাকো না কেন আমার উপর দরূদ পাঠ করো। কেননা, তোমাদের দরূদ আমার নিকট পৌঁছে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “এটা একটা বিশেষ গোপনীয় বিষয়। যদি তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করতে তবে আমি বলতাম না। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা আমার সাথে দু’জন ফেরেশতা নিযুক্ত রেখেছেন। যখন কোন মুসলমানের সামনে আমার যিকর করা হয় এবং সে আমার উপর দরূদ পাঠ করে তখন ঐ ফেরেশতা দু’জন বলেনঃ “আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন!” তখন আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা ঐ দু’জন ফেরেশতার এ কথার জবাবে ‘আমীন’ বলেন। (এ হাদীসটিও ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি খুবই দুর্বল এবং সদনও দুর্বল)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর যেসব ফেরেশতা যমীনে চলাফেরা করেন তারা আমার উম্মতের সালাম আমার নিকট পৌঁছিয়ে থাকেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) প্রমুখ বর্ণনা করেছেন) একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আমার কবরের পার্শ্বে আমার উপর সালাম পাঠ করে আমি তার ঐ সালাম শুনে থাকি এবং যে দরূদ ও সালাম পাঠায়, আমার কাছে তা পৌঁছিয়ে দেয়া হয়।” সনদের দিক দিয়ে এ হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়। মুহাম্মাদ ইবনে মারওয়ান সুদ্দী সাগীর পরিত্যক্ত। আমাদের সাথীরা বলেছেন যে, যে ব্যক্তি হজ্বের ইহরাম বেঁধেছে সে যখন তালবিয়া বা লাব্বায়েক' পাঠ হতে ফারেগ হবে তখন তারও উচিত নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করা। মুহাম্মাদ ইবনে আবি কবর (রাঃ) বলেন যে, মানুষ যখন তালবিয়া পাঠ হতে ফারেগ হবে তখন সর্বাবস্থায় তাকে নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (এটা ইমাম শাফিয়ী (রঃ) ও ইমাম দারে কুনী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “যখন তোমরা মক্কায় পৌঁছবে তখন সাতবার বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবে ও মাকামে ইবরাহীমে দু'রাকআত নামায পড়বে। তারপর সাফা পাহাড়ের উপর উঠবে যেখান থেকে তোমরা বায়তুল্লাহকে দেখতে পাবে, সেখানে সাতবার তাকবীর পাঠ করবে যার মাঝে আল্লাহর উপর হামদ ও সানা এবং নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করবে ও নিজের জন্যে দুআ করবে। মারওয়া পাহাড়েও অনুরূপ কাজ করবে। এটা ইসমাঈল কাযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ খুবই উত্তম, সুন্দর ও সবল।আমাদের সাথীরা একথাও বলেছেন যে, কুরবানীর পশু যবেহ করার সময়ও আল্লাহর যিরের সাথে নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পড়া মুস্তাহাব। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং আমি তোমার খ্যাতিকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছি।” (৯৪:৪)। জমহুর এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তাঁরা বলেন যে, এখানে শুধু আল্লাহর যিকরই যথেষ্ট। যেমন আহারের সময়, সহবাসের সময় ইত্যাদি। এই সময়গুলোতে দরূদ পাঠ সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত নয়। অন্য একটি হাদীসঃ হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর সমস্ত নবী ও রাসূলের উপরও দরূদ ও সালাম পাঠ করবে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা আমার ন্যায় তাঁদেরকেও প্রেরণ করেছেন। (এ হাদীসটি ইসমাঈল কাযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদে দুই জন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন। তারা হলেন আমর ইবনে হারূন ও তার শায়েখ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী)কানের টুনটুন শব্দের সময়ও নবী (সঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করা মুস্তাহাব।হযরত আবু রাফে’ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমাদের কারো কানে যখন টুনটুন শব্দ হবে তখন যেন সে আমাকে স্মরণ করে ও আমার উপর দরূদ পাঠ করে এবং বলেঃ “যে আমাকে মঙ্গলের স্মরণ করেছে তাকেও যেন আল্লাহ তা'আলা স্মরণ করেন।" এর ইসনাদ দুর্বল এবং এটা প্রমাণিত হওয়ার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। মাসআলাঃ লিখকগণ এটা মুস্তাহাব বলেছেন যে, লিখক যখনই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নাম লিখবে তখনই যেন সে (আরবি) লিখে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন কিতাবে আমার উপর দরূদ লিখে, তার দরূদের সওয়াব ঐ সময় পর্যন্ত জারি থাকে যে সময় পর্যন্ত এ কিতাবখানা বিদ্যমান থাকে।” বিভিন্ন কারণে এ হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়। এমনকি ইমাম যাহাবী (রঃ)-এর শায়েখ এটাকে মাওযু হাদীস বলেছেন।(আরবি)বা অধ্যায়ঃ নবীগণ ছাড়া অন্যদের উপর দরূদ পাঠ যদি নবীদের সাথে জড়িত বা মিলিতভাবে হয় তবে তা নিঃসন্দেহে জায়েয। যেমন পূর্বে বর্ণিত হাদীসে গত হয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি দরূদ নাযিল করুন মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর এবং তাঁর পরিবারবর্গের উপর, তাঁর স্ত্রীদের উপর এবং তাঁর সন্তানদের উপর।” হ্যাঁ, তবে শুধু গায়ের নবীদের উপর দরূদ পাঠের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ একে জায়েয বলেছেন এবং দলীল হিসেবে (আরবি) (৩৩:৩) এবং (আরবি) (২:১৫৭) আল্লাহ তা'আলার এ উক্তিকে গ্রহণ করেছেন। তাছাড়া তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাণীকেও দলীল হিসেবে পেশ করেছেন। যখন তার কাছে কোন কওমের সাদকা আসতো তখন তিনি বলতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি তাদের উপর দরূদ নাযিল করুন!” যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রাঃ) বলেন, যখন আমার পিতা সাদকার মাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসলেন তখন তিনি বললেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আবু আওফা (রাঃ)-এর পরিবারের উপর দরূদ নাযিল করুন।”অন্য একটি হাদীসে আছে যে, একটি স্ত্রীলোক বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার উপর ও আমার স্বামীর উপর দরূদ পাঠ করুন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ তোমার উপর ও তোমার স্বামীর উপর রহমত নাযিল করুন।”কিন্তু জমহুর উলামা এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তাঁরা বলেন যে, স্বতন্ত্রভাবে গায়ের নবীদের উপর দরূদ পাঠ জায়েয নয়। কেননা এর ব্যবহার নবীদের জন্যে এতো বেশী প্রচলিত যে, এটা শুনা মাত্রই যমীনে এই খেয়াল জেগে ওঠে যে, এ নাম কোন নবীরই হবে। সুতরাং এটা গায়ের নবীর জন্যে ব্যবহার না করাই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। যেমন আবু বকর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অথবা আলী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলা ঠিক হবে না, যদিও অর্থের দিক দিয়ে তেমন কোন দোষ নেই। অনুরূপভাবে (আরবি) বলা চলবে না, যদিও মুহাম্মাদ (সঃ) মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। কেননা, এ শব্দগুলো আল্লাহ তা'আলার জন্যেই প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। আর কিতাব ও সুন্নাতে (আরবি) শব্দের ব্যবহার গায়ের নবীদের জন্যে এসেছে দুআ হিসেবে। এ কারণেই আলে আবি আওফাকে এর পরে কেউই এই শব্দগুলোর দ্বারা স্মরণ করেনি। এই পন্থা আমাদের কাছেও ভাল লাগছে। তবে এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। কেউ কেউ অন্য একটি কারণও বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ নবীদের ছাড়া অন্যদের জন্যে এই ‘সালাত' শব্দ ব্যবহার করা প্রবৃত্তি পূজকদের আচরণ। তারা তাদের বুযর্গদের ব্যাপারেও এরূপ শব্দ ব্যবহার করে থাকে। সুতরাং তাদের অনুসরণ করা আমাদের উচিত নয়।এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা বিরোধ কি পর্যায়ের সে সম্পর্কেও মতানৈক্য রয়েছে যে, এটা কি তাহরীম না কারাহাতে তানযীহিয়্যাহ? না পূর্ববর্তীদের বিরোধ? সঠিক কথা এই যে, এটা মাকরূহে তানযীহী। কেননা, এটা প্রবৃত্তি পূজকদের রীতি। সুতরাং আমাদের তাদের অনুসারী হওয়া উচিত নয়। আর মাকরূহ তো ওটাই যেটা ছেড়ে দেয়াই উত্তম। আমাদের সাথীরা বলেনঃ নির্ভরযোগ্য কথা হচ্ছে এটাই যে, পূর্বযুগীয় মনীষীরা ‘সালাত' শব্দটিকে নবীদের জন্যেই নির্দিষ্ট করেছেন। যেমন (আরবি) শব্দটি আল্লাহ তা'আলার জন্যেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এখন থাকলো সালাম সম্পর্কে কথা। এ সম্পর্কে শায়েখ আবু মুহাম্মাদ জুওয়াইনী (রঃ) বলেন যে, এটাও (আরবি) এর অর্থ প্রকাশ করে থাকে। সুতরাং অনুপস্থিতের উপর এটা ব্যবহৃত হয় না। আর যে নবী নয়, বিশেষ করে তার জন্যে এটা ব্যবহার করা চলবে না। সুতরাং আলী (আলাইহিস সালাম) বলা যাবে না। জীবিত ও মৃতদের এটাই হুকুম। হ্যাঁ, তবে যে সামনে বিদ্যমান থাকে তাকে সম্বোধন করে (আরবি) বা (আরবি) অথবা(আরবি) কিংবা (আরবি) বলা জায়েয। আর এর উপর ইজমা হয়েছে। এ কথা স্মরণ রাখা উচিত যে, লেখকদের কলমে আলী আলাইহিস সালাম বা আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু লিখিত হয়ে থাকে। যদিও অর্থের দিক দিয়ে এতে কোন দোষ নেই, কিন্তু এর দ্বারা অন্যান্য সাহাবীদের সাথে কিছুটা বেআদবী করা হয়। সমস্ত সাহাবীর সাথেই আমাদের ভাল ধারণা রাখা উচিত। এ শব্দগুলো তাযীম ও তাকরীমের জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুতরাং এ শব্দগুলো তো হযরত আলী (রাঃ)-এর চেয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ) এবং হযরত উসমান (রাঃ)-এর জন্যে বেশী প্রযোজ্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নবী (সঃ) ছাড়া আর কারো জন্যে দুরূদ পাঠ উচিত নয়। হ্যা, তবে মুসলমান নর ও নারীর জন্যে দু'আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) তঁার এক পত্রে লিখেনঃ “কতক লোক আখিরাতের আমল দ্বারা দুনিয়া লাভের চিন্তায় লেগে রয়েছে। আর কতক লোক তাদের খলীফা ও আমীরদের জন্যে ‘সালাত' শব্দটি ব্যবহার করছে যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে ছিল। যখন তোমার কাছে আমার এই পত্র পৌঁছবে তখন তুমি তাদেরকে বলে দেবে যে, তারা যেন 'সালাত' শব্দটি শুধু নবীদের জন্যে ব্যবহার করে এবং সাধারণ মুসলমানদের জন্যে এটা ছাড়া যা ইচ্ছা প্রার্থনাকরে।” ইসমাঈল কাযী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। এটি উত্তম ‘আসার'।হযরত কা'ব (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যহ সকালে সত্তর হাজার ফেরেশতা এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কবরকে ঘিরে নেন এবং নিজেদের ডানাগুলো গুটিয়ে নিয়ে তাঁর জন্যে রহমতের প্রার্থনা করতে থাকেন এবং সত্তর হাজার ফেরেশতা রাত্রে আসেন এবং সত্তর হাজার ফেরেশতা দিনে আসেন। এমনকি যখন তাঁর কবর মুবারক ফেটে যাবে তখনও সত্তর হাজার ফেরেশতা তাঁর সাথে থাকবেন। (এ হাদীসটিও ইসমাঈল কাযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ফরা বা শাখা ইমাম নববী (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দরূদ ও সালাম এক সাথে পাঠ করা উচিত। শুধু (আরবি) অথবা শুধু (আরবি) বলা উচিত নয়। এ আয়াতেও দুটোরই হুকুম রয়েছে। সুতরাং(আরবি) এরূপ বলাই উত্তম।

আল-আহযাব 33:57

৫৭-৫৮ নং আয়াতের তাফসীরযারা আল্লাহর আহকামের বিরোধিতা করে, তার নিষিদ্ধ কাজগুলো হতে বিরত না থেকে তাঁর অবাধ্যতায় চরমভাবে লেগে থাকে এবং এভাবে তাঁকে অসন্তুষ্ট করে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ধমক দিচ্ছেন ও ভয় প্রদর্শন করছেন। তাছাড়া তারা তাঁর রাসূল (সঃ)-কে নানা প্রকারের অপবাদ দেয়। তাই তারা অভিশপ্ত ও শাস্তির যোগ্য। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা প্রতিমা তৈরীকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আদম সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়। তারা যুগকে গালি দেয়, অথচ যুগতো আমিই। আমিই তো রাত্রি ও দিবসের পরিবর্তন আনয়ন করি। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)ভাবার্থ এই যে, অজ্ঞতার যুগের লোকেরা বলতোঃ হায়, হায়! কি যুগ এলো! খারাপ যুগের কারণেই আমাদের এ অবস্থা হলো! এভাবে আল্লাহর কাজকে যুগের উপর চাপিয়ে দিয়ে যুগকে গালি দেয়। তাহলে যুগের যিনি পরিবর্তনকারী প্রকারান্তরে তাঁকেই গালি দেয়া হলো। হযরত সুফিয়া (রাঃ)-কে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিয়ে করলেন তখন কতগুলো লোক সমালোচনা শুরু করে দিয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর কথামত এ আয়াত এই ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। তবে আয়াতটি সাধারণ। যে কোন দিক দিয়েই যে ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে কষ্ট দিবে সেই এই আয়াতের মর্মমূলে অভিশপ্ত ও শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। কেননা, আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে কষ্ট দেয়ার অর্থ আল্লাহকেই কষ্ট দেয়া।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল আল মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তোমাদেরকে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। দেখো, আমি আল্লাহকে মাঝে রেখে বলছি যে, আমার পরে আমার সঙ্গীদেরকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করো না। আমাকে ভালবাসার কারণে তাদেরকেও ভালবাসবে। তাদের সাথে শত্রুতা পোষণকারী মূলতঃ আমার সাথেই শত্রুতাকারী। তাদেরকে যারা কষ্ট দিবে তারা আমাকে কষ্ট দিবে। আর যে আমাকে কষ্ট দিলে সে আল্লাহকে কষ্ট দিলো। আর যে আল্লাহকে কষ্ট দিলো, আল্লাহ সত্বরই তাকে পাকড়াও করবেন।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অতঃপর ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেছেন যে, এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মহান আল্লাহ বলেনঃ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী কোন অপরাধ না করলেও যারা তাদেরকে পীড়া দেয়, তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে। আল্লাহ তা'আলার এই শাস্তির প্রতিজ্ঞার মধ্যে প্রথমে কাফিররা শামিল ছিল, পরে রাফেয়ী এবং শীআ'রাও এর অন্তর্ভুক্ত হয় যারা ঐ সাহাবীদের (রাঃ) দোষ অন্বেষণ করতো আল্লাহ যাদের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তা'আলা পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন যে, তিনি আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি সন্তুষ্ট। কুরআন কারীমে জায়গায় জায়গায় তাদের প্রশংসা ও স্তুতি বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু এই অনভিজ্ঞ ও স্থূল বুদ্ধির ললাকেরা তাদের মন্দ বলে ও তাদের নিন্দে করে। তারা তাদেরকে এমন দোষে দোষারোপ করে যে দোষ তাঁদের মধ্যে মোটেই নেই। সত্য কথা তো এই যে, আল্লাহর পক্ষ হতে তাদের অন্তর উল্টে গেছে। এজন্যেই তাদের জিহ্বাও উল্টে গেছে। ফলে তারা তাদের দুর্নাম করছে যারা প্রশংসার যোগ্য এবং যারা নিন্দার পাত্র তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জিজ্ঞেস করা হলো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গীবত কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তোমার ভাই সম্পর্কে তোমার এমন আলোচনা, যা শুনলে সে অসন্তুষ্ট হবে। আবার প্রশ্ন করা হলো: “আমি আমার ভাই সম্পর্কে যা বলি তা যদি সত্যিই তার মধ্যে থাকে (তাহলেও কি ওটা গীবত হবে)?” জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি তোমার ভাই সম্বন্ধে যা বললে তা যদি সত্যিই তার মধ্যে থাকে তবেই তো তুমি তার গীবত করলে। আর তুমি তার সম্বন্ধে যা বললে তা যদি তার মধ্যে না থাকে তবে তো তুমি তাকে অপবাদ দিলে। (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এরূপ বর্ণনা ইমাম তিরযিমীও (রঃ) করেছেন এবং তিনি এ হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় সুদ কোনটি (তা তোমরা জান কি)?” সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সঃ) সবচেয়ে ভাল জানেন।” তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় সুদ হলো কোন মুসলমানকে বে-ইজ্জত ও অপদস্থ করা।” অতঃপর তিনি; (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-আহযাব 33:58

৫৭-৫৮ নং আয়াতের তাফসীরযারা আল্লাহর আহকামের বিরোধিতা করে, তার নিষিদ্ধ কাজগুলো হতে বিরত না থেকে তাঁর অবাধ্যতায় চরমভাবে লেগে থাকে এবং এভাবে তাঁকে অসন্তুষ্ট করে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ধমক দিচ্ছেন ও ভয় প্রদর্শন করছেন। তাছাড়া তারা তাঁর রাসূল (সঃ)-কে নানা প্রকারের অপবাদ দেয়। তাই তারা অভিশপ্ত ও শাস্তির যোগ্য। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা প্রতিমা তৈরীকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আদম সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়। তারা যুগকে গালি দেয়, অথচ যুগতো আমিই। আমিই তো রাত্রি ও দিবসের পরিবর্তন আনয়ন করি। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)ভাবার্থ এই যে, অজ্ঞতার যুগের লোকেরা বলতোঃ হায়, হায়! কি যুগ এলো! খারাপ যুগের কারণেই আমাদের এ অবস্থা হলো! এভাবে আল্লাহর কাজকে যুগের উপর চাপিয়ে দিয়ে যুগকে গালি দেয়। তাহলে যুগের যিনি পরিবর্তনকারী প্রকারান্তরে তাঁকেই গালি দেয়া হলো। হযরত সুফিয়া (রাঃ)-কে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিয়ে করলেন তখন কতগুলো লোক সমালোচনা শুরু করে দিয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর কথামত এ আয়াত এই ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। তবে আয়াতটি সাধারণ। যে কোন দিক দিয়েই যে ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে কষ্ট দিবে সেই এই আয়াতের মর্মমূলে অভিশপ্ত ও শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। কেননা, আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে কষ্ট দেয়ার অর্থ আল্লাহকেই কষ্ট দেয়া।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল আল মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি তোমাদেরকে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। দেখো, আমি আল্লাহকে মাঝে রেখে বলছি যে, আমার পরে আমার সঙ্গীদেরকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করো না। আমাকে ভালবাসার কারণে তাদেরকেও ভালবাসবে। তাদের সাথে শত্রুতা পোষণকারী মূলতঃ আমার সাথেই শত্রুতাকারী। তাদেরকে যারা কষ্ট দিবে তারা আমাকে কষ্ট দিবে। আর যে আমাকে কষ্ট দিলে সে আল্লাহকে কষ্ট দিলো। আর যে আল্লাহকে কষ্ট দিলো, আল্লাহ সত্বরই তাকে পাকড়াও করবেন।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অতঃপর ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেছেন যে, এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)মহান আল্লাহ বলেনঃ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী কোন অপরাধ না করলেও যারা তাদেরকে পীড়া দেয়, তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে। আল্লাহ তা'আলার এই শাস্তির প্রতিজ্ঞার মধ্যে প্রথমে কাফিররা শামিল ছিল, পরে রাফেয়ী এবং শীআ'রাও এর অন্তর্ভুক্ত হয় যারা ঐ সাহাবীদের (রাঃ) দোষ অন্বেষণ করতো আল্লাহ যাদের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তা'আলা পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন যে, তিনি আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি সন্তুষ্ট। কুরআন কারীমে জায়গায় জায়গায় তাদের প্রশংসা ও স্তুতি বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু এই অনভিজ্ঞ ও স্থূল বুদ্ধির ললাকেরা তাদের মন্দ বলে ও তাদের নিন্দে করে। তারা তাদেরকে এমন দোষে দোষারোপ করে যে দোষ তাঁদের মধ্যে মোটেই নেই। সত্য কথা তো এই যে, আল্লাহর পক্ষ হতে তাদের অন্তর উল্টে গেছে। এজন্যেই তাদের জিহ্বাও উল্টে গেছে। ফলে তারা তাদের দুর্নাম করছে যারা প্রশংসার যোগ্য এবং যারা নিন্দার পাত্র তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জিজ্ঞেস করা হলো: “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গীবত কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তোমার ভাই সম্পর্কে তোমার এমন আলোচনা, যা শুনলে সে অসন্তুষ্ট হবে। আবার প্রশ্ন করা হলো: “আমি আমার ভাই সম্পর্কে যা বলি তা যদি সত্যিই তার মধ্যে থাকে (তাহলেও কি ওটা গীবত হবে)?” জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি তোমার ভাই সম্বন্ধে যা বললে তা যদি সত্যিই তার মধ্যে থাকে তবেই তো তুমি তার গীবত করলে। আর তুমি তার সম্বন্ধে যা বললে তা যদি তার মধ্যে না থাকে তবে তো তুমি তাকে অপবাদ দিলে। (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এরূপ বর্ণনা ইমাম তিরযিমীও (রঃ) করেছেন এবং তিনি এ হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় সুদ কোনটি (তা তোমরা জান কি)?” সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সঃ) সবচেয়ে ভাল জানেন।” তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় সুদ হলো কোন মুসলমানকে বে-ইজ্জত ও অপদস্থ করা।” অতঃপর তিনি; (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-আহযাব 33:59

৫৯-৬২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তুমি মুমিন নারীদেরকে বলে দাও, বিশেষ করে তোমার পত্নীদেরকে ও তোমার কন্যাদেরকে, কারণ তারা সারা দুনিয়ার স্ত্রীলোকদের জন্যে আদর্শ স্থানীয়া, উত্তম মর্যাদার অধিকারিণী, যে তারা যেন চাদর দিয়ে নিজেদের সারা দেহ আচ্ছাদিত করে নেয়। যাতে মুমিন স্ত্রীলোক এবং অমুসলিম স্ত্রীলোকদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়ে যায়। এভাবেই যেন আযাদ মহিলা ও দাসীদের মধ্যে পার্থক্য করতে কোন অসুবিধা না হয়। ‘জালবাব’ ঐ চাদরকে বলা হয় যা স্ত্রীলোকেরা তাদের দো-পাট্টার উপর পরে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা মুসলিম নারীদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তারা যখন কোন কাজে বাড়ীর বাইরে যাবে তখন যেন তারা তাদের দো-পাট্টা মুখের নীচে টেনে দিয়ে মুখ ঢেকে নেয়। শুধুমাত্র চোখ দুটি ভোলা রাখবে।ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ)-এর প্রশ্নের উত্তরে হযরত উবাইদাহ সালমানী (রঃ) স্বীয় চেহারা এবং মাথা ঢেকে ও চক্ষু খুলে রেখে বলেন যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহর (আরবি) উক্তির ভাবার্থ এটাই।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, নিজের চাদর দিয়ে গলা ঢেকে নিবে। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর আনসারদের মহিলারা যখন বাইরে বের হতেন তখন এতো গোপনীয়ভাবে চলতেন যে, যেন তাদের মাথার উপর পাখী বসে আছে। নিজেদের দেহের উপর তারা কালো চাদর ফেলে দিতেন। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইউনুস ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত যুহরী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো: “দাসীরা বিবাহিতা বা অবিবাহিতা হালে, তাদেরকেও কি চাদর গায়ে দিতে হবে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “দো-পাট্টা তারা অবশ্যই পরবে, তবে তারা চাদর পরবে না, যাতে তাদের মধ্যে ও স্বাধীন মহিলাদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে। (এটাও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যিম্মী নারীদের সৌন্দর্য দর্শন করা শুধু ব্যভিচারের ভয়ে নিষিদ্ধ, তাদের সম্মান ও মর্যাদার কারণে নয়। কেননা আয়াতে মুমিনা নারীদের বর্ণনা রয়েছে। চাদর লটকানো হচ্ছে আযাদ সতী-সাধ্বী মহিলাদের লক্ষণ, কাজেই চাদর লটকানো দ্বারা এটা জানা যাবে যে, এরা বাজে স্ত্রী লোকও নয় এবং নাবালিকা মেয়েও নয়। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ফাসেক লোকেরা অন্ধকার মদীনার পথে বের হতো এবং নারীদেরকে অনুসন্ধান করতো। মদীনাবাসী ছিলেন দরিদ্র শ্রেণীর লোক। কাজেই রাত্রে যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসতো তখন মহিলারা প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরো করার উদ্দেশ্যে পথে বের হতেন। আর দুষ্ট শ্রেণীর লোকেরা এই সুযোগের সন্ধানেই থাকতো। অতঃপর যখন তারা চাদর পরিধানকারিণী মহিলাদেরকে দেখতো তখন বলতো যে, এঁরা আযাদ মহিলা। সুতরাং তারা দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকতো। আর যখন ঐ সব মহিলাকে দেখতে যাদের দেহে চাদর থাকতো না তখন তারা বলতো যে, এরা দাসী। তখন তারা তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়তো।মহান আল্লাহ বলেনঃ অজ্ঞতার যুগে বেপর্দাভাবে চলার যে প্রচলন ছিল, যখন তোমরা আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশের উপর আমলকারী হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তা'আলা তোমাদের পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন। যেহেতু তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে ও যারা নগরে গুজব রটনা করে বেড়ায়, তারা বিরত না হয় তবে আমি নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে প্রবল করবো এবং তাদের উপর তোমার আধিপত্য বিস্তার করবো। এরপর তারা খুব কম সময়ই মদীনায় অবস্থান করতে পারবে। অতি সত্বরই তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যে কয়েক দিন তারা মদীনায় অবস্থান করবে সে কয়েকদিনও তারা কাটাবে অভিশপ্ত অবস্থায়। চারদিক থেকে তাদেরকে ধিক্কার দেয়া হবে। তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই ধরা হবে এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করা হবে।আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেনঃ পূর্বে যারা গত হয়ে গেছে তাদের ব্যাপারে এটাই ছিল আল্লাহর বিধান। হে নবী (সঃ)! তুমি কখনো আল্লাহর বিধানে কোন পরিবর্তন পাবে না।

আল-আহযাব 33:60

৫৯-৬২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তুমি মুমিন নারীদেরকে বলে দাও, বিশেষ করে তোমার পত্নীদেরকে ও তোমার কন্যাদেরকে, কারণ তারা সারা দুনিয়ার স্ত্রীলোকদের জন্যে আদর্শ স্থানীয়া, উত্তম মর্যাদার অধিকারিণী, যে তারা যেন চাদর দিয়ে নিজেদের সারা দেহ আচ্ছাদিত করে নেয়। যাতে মুমিন স্ত্রীলোক এবং অমুসলিম স্ত্রীলোকদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়ে যায়। এভাবেই যেন আযাদ মহিলা ও দাসীদের মধ্যে পার্থক্য করতে কোন অসুবিধা না হয়। ‘জালবাব’ ঐ চাদরকে বলা হয় যা স্ত্রীলোকেরা তাদের দো-পাট্টার উপর পরে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা মুসলিম নারীদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তারা যখন কোন কাজে বাড়ীর বাইরে যাবে তখন যেন তারা তাদের দো-পাট্টা মুখের নীচে টেনে দিয়ে মুখ ঢেকে নেয়। শুধুমাত্র চোখ দুটি ভোলা রাখবে।ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ)-এর প্রশ্নের উত্তরে হযরত উবাইদাহ সালমানী (রঃ) স্বীয় চেহারা এবং মাথা ঢেকে ও চক্ষু খুলে রেখে বলেন যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহর (আরবি) উক্তির ভাবার্থ এটাই।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, নিজের চাদর দিয়ে গলা ঢেকে নিবে। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর আনসারদের মহিলারা যখন বাইরে বের হতেন তখন এতো গোপনীয়ভাবে চলতেন যে, যেন তাদের মাথার উপর পাখী বসে আছে। নিজেদের দেহের উপর তারা কালো চাদর ফেলে দিতেন। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইউনুস ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত যুহরী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো: “দাসীরা বিবাহিতা বা অবিবাহিতা হালে, তাদেরকেও কি চাদর গায়ে দিতে হবে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “দো-পাট্টা তারা অবশ্যই পরবে, তবে তারা চাদর পরবে না, যাতে তাদের মধ্যে ও স্বাধীন মহিলাদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে। (এটাও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যিম্মী নারীদের সৌন্দর্য দর্শন করা শুধু ব্যভিচারের ভয়ে নিষিদ্ধ, তাদের সম্মান ও মর্যাদার কারণে নয়। কেননা আয়াতে মুমিনা নারীদের বর্ণনা রয়েছে। চাদর লটকানো হচ্ছে আযাদ সতী-সাধ্বী মহিলাদের লক্ষণ, কাজেই চাদর লটকানো দ্বারা এটা জানা যাবে যে, এরা বাজে স্ত্রী লোকও নয় এবং নাবালিকা মেয়েও নয়। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ফাসেক লোকেরা অন্ধকার মদীনার পথে বের হতো এবং নারীদেরকে অনুসন্ধান করতো। মদীনাবাসী ছিলেন দরিদ্র শ্রেণীর লোক। কাজেই রাত্রে যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসতো তখন মহিলারা প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরো করার উদ্দেশ্যে পথে বের হতেন। আর দুষ্ট শ্রেণীর লোকেরা এই সুযোগের সন্ধানেই থাকতো। অতঃপর যখন তারা চাদর পরিধানকারিণী মহিলাদেরকে দেখতো তখন বলতো যে, এঁরা আযাদ মহিলা। সুতরাং তারা দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকতো। আর যখন ঐ সব মহিলাকে দেখতে যাদের দেহে চাদর থাকতো না তখন তারা বলতো যে, এরা দাসী। তখন তারা তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়তো।মহান আল্লাহ বলেনঃ অজ্ঞতার যুগে বেপর্দাভাবে চলার যে প্রচলন ছিল, যখন তোমরা আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশের উপর আমলকারী হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তা'আলা তোমাদের পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন। যেহেতু তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে ও যারা নগরে গুজব রটনা করে বেড়ায়, তারা বিরত না হয় তবে আমি নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে প্রবল করবো এবং তাদের উপর তোমার আধিপত্য বিস্তার করবো। এরপর তারা খুব কম সময়ই মদীনায় অবস্থান করতে পারবে। অতি সত্বরই তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যে কয়েক দিন তারা মদীনায় অবস্থান করবে সে কয়েকদিনও তারা কাটাবে অভিশপ্ত অবস্থায়। চারদিক থেকে তাদেরকে ধিক্কার দেয়া হবে। তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই ধরা হবে এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করা হবে।আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেনঃ পূর্বে যারা গত হয়ে গেছে তাদের ব্যাপারে এটাই ছিল আল্লাহর বিধান। হে নবী (সঃ)! তুমি কখনো আল্লাহর বিধানে কোন পরিবর্তন পাবে না।

আল-আহযাব 33:61

৫৯-৬২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তুমি মুমিন নারীদেরকে বলে দাও, বিশেষ করে তোমার পত্নীদেরকে ও তোমার কন্যাদেরকে, কারণ তারা সারা দুনিয়ার স্ত্রীলোকদের জন্যে আদর্শ স্থানীয়া, উত্তম মর্যাদার অধিকারিণী, যে তারা যেন চাদর দিয়ে নিজেদের সারা দেহ আচ্ছাদিত করে নেয়। যাতে মুমিন স্ত্রীলোক এবং অমুসলিম স্ত্রীলোকদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়ে যায়। এভাবেই যেন আযাদ মহিলা ও দাসীদের মধ্যে পার্থক্য করতে কোন অসুবিধা না হয়। ‘জালবাব’ ঐ চাদরকে বলা হয় যা স্ত্রীলোকেরা তাদের দো-পাট্টার উপর পরে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা মুসলিম নারীদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তারা যখন কোন কাজে বাড়ীর বাইরে যাবে তখন যেন তারা তাদের দো-পাট্টা মুখের নীচে টেনে দিয়ে মুখ ঢেকে নেয়। শুধুমাত্র চোখ দুটি ভোলা রাখবে।ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ)-এর প্রশ্নের উত্তরে হযরত উবাইদাহ সালমানী (রঃ) স্বীয় চেহারা এবং মাথা ঢেকে ও চক্ষু খুলে রেখে বলেন যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহর (আরবি) উক্তির ভাবার্থ এটাই।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, নিজের চাদর দিয়ে গলা ঢেকে নিবে। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর আনসারদের মহিলারা যখন বাইরে বের হতেন তখন এতো গোপনীয়ভাবে চলতেন যে, যেন তাদের মাথার উপর পাখী বসে আছে। নিজেদের দেহের উপর তারা কালো চাদর ফেলে দিতেন। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইউনুস ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত যুহরী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো: “দাসীরা বিবাহিতা বা অবিবাহিতা হালে, তাদেরকেও কি চাদর গায়ে দিতে হবে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “দো-পাট্টা তারা অবশ্যই পরবে, তবে তারা চাদর পরবে না, যাতে তাদের মধ্যে ও স্বাধীন মহিলাদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে। (এটাও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যিম্মী নারীদের সৌন্দর্য দর্শন করা শুধু ব্যভিচারের ভয়ে নিষিদ্ধ, তাদের সম্মান ও মর্যাদার কারণে নয়। কেননা আয়াতে মুমিনা নারীদের বর্ণনা রয়েছে। চাদর লটকানো হচ্ছে আযাদ সতী-সাধ্বী মহিলাদের লক্ষণ, কাজেই চাদর লটকানো দ্বারা এটা জানা যাবে যে, এরা বাজে স্ত্রী লোকও নয় এবং নাবালিকা মেয়েও নয়। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ফাসেক লোকেরা অন্ধকার মদীনার পথে বের হতো এবং নারীদেরকে অনুসন্ধান করতো। মদীনাবাসী ছিলেন দরিদ্র শ্রেণীর লোক। কাজেই রাত্রে যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসতো তখন মহিলারা প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরো করার উদ্দেশ্যে পথে বের হতেন। আর দুষ্ট শ্রেণীর লোকেরা এই সুযোগের সন্ধানেই থাকতো। অতঃপর যখন তারা চাদর পরিধানকারিণী মহিলাদেরকে দেখতো তখন বলতো যে, এঁরা আযাদ মহিলা। সুতরাং তারা দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকতো। আর যখন ঐ সব মহিলাকে দেখতে যাদের দেহে চাদর থাকতো না তখন তারা বলতো যে, এরা দাসী। তখন তারা তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়তো।মহান আল্লাহ বলেনঃ অজ্ঞতার যুগে বেপর্দাভাবে চলার যে প্রচলন ছিল, যখন তোমরা আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশের উপর আমলকারী হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তা'আলা তোমাদের পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন। যেহেতু তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে ও যারা নগরে গুজব রটনা করে বেড়ায়, তারা বিরত না হয় তবে আমি নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে প্রবল করবো এবং তাদের উপর তোমার আধিপত্য বিস্তার করবো। এরপর তারা খুব কম সময়ই মদীনায় অবস্থান করতে পারবে। অতি সত্বরই তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যে কয়েক দিন তারা মদীনায় অবস্থান করবে সে কয়েকদিনও তারা কাটাবে অভিশপ্ত অবস্থায়। চারদিক থেকে তাদেরকে ধিক্কার দেয়া হবে। তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই ধরা হবে এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করা হবে।আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেনঃ পূর্বে যারা গত হয়ে গেছে তাদের ব্যাপারে এটাই ছিল আল্লাহর বিধান। হে নবী (সঃ)! তুমি কখনো আল্লাহর বিধানে কোন পরিবর্তন পাবে না।

আল-আহযাব 33:62

৫৯-৬২ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তুমি মুমিন নারীদেরকে বলে দাও, বিশেষ করে তোমার পত্নীদেরকে ও তোমার কন্যাদেরকে, কারণ তারা সারা দুনিয়ার স্ত্রীলোকদের জন্যে আদর্শ স্থানীয়া, উত্তম মর্যাদার অধিকারিণী, যে তারা যেন চাদর দিয়ে নিজেদের সারা দেহ আচ্ছাদিত করে নেয়। যাতে মুমিন স্ত্রীলোক এবং অমুসলিম স্ত্রীলোকদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়ে যায়। এভাবেই যেন আযাদ মহিলা ও দাসীদের মধ্যে পার্থক্য করতে কোন অসুবিধা না হয়। ‘জালবাব’ ঐ চাদরকে বলা হয় যা স্ত্রীলোকেরা তাদের দো-পাট্টার উপর পরে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা মুসলিম নারীদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ তারা যখন কোন কাজে বাড়ীর বাইরে যাবে তখন যেন তারা তাদের দো-পাট্টা মুখের নীচে টেনে দিয়ে মুখ ঢেকে নেয়। শুধুমাত্র চোখ দুটি ভোলা রাখবে।ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ)-এর প্রশ্নের উত্তরে হযরত উবাইদাহ সালমানী (রঃ) স্বীয় চেহারা এবং মাথা ঢেকে ও চক্ষু খুলে রেখে বলেন যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহর (আরবি) উক্তির ভাবার্থ এটাই।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, নিজের চাদর দিয়ে গলা ঢেকে নিবে। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেনঃ “এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর আনসারদের মহিলারা যখন বাইরে বের হতেন তখন এতো গোপনীয়ভাবে চলতেন যে, যেন তাদের মাথার উপর পাখী বসে আছে। নিজেদের দেহের উপর তারা কালো চাদর ফেলে দিতেন। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইউনুস ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত যুহরী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো: “দাসীরা বিবাহিতা বা অবিবাহিতা হালে, তাদেরকেও কি চাদর গায়ে দিতে হবে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “দো-পাট্টা তারা অবশ্যই পরবে, তবে তারা চাদর পরবে না, যাতে তাদের মধ্যে ও স্বাধীন মহিলাদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে। (এটাও ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যিম্মী নারীদের সৌন্দর্য দর্শন করা শুধু ব্যভিচারের ভয়ে নিষিদ্ধ, তাদের সম্মান ও মর্যাদার কারণে নয়। কেননা আয়াতে মুমিনা নারীদের বর্ণনা রয়েছে। চাদর লটকানো হচ্ছে আযাদ সতী-সাধ্বী মহিলাদের লক্ষণ, কাজেই চাদর লটকানো দ্বারা এটা জানা যাবে যে, এরা বাজে স্ত্রী লোকও নয় এবং নাবালিকা মেয়েও নয়। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ফাসেক লোকেরা অন্ধকার মদীনার পথে বের হতো এবং নারীদেরকে অনুসন্ধান করতো। মদীনাবাসী ছিলেন দরিদ্র শ্রেণীর লোক। কাজেই রাত্রে যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসতো তখন মহিলারা প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরো করার উদ্দেশ্যে পথে বের হতেন। আর দুষ্ট শ্রেণীর লোকেরা এই সুযোগের সন্ধানেই থাকতো। অতঃপর যখন তারা চাদর পরিধানকারিণী মহিলাদেরকে দেখতো তখন বলতো যে, এঁরা আযাদ মহিলা। সুতরাং তারা দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকতো। আর যখন ঐ সব মহিলাকে দেখতে যাদের দেহে চাদর থাকতো না তখন তারা বলতো যে, এরা দাসী। তখন তারা তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়তো।মহান আল্লাহ বলেনঃ অজ্ঞতার যুগে বেপর্দাভাবে চলার যে প্রচলন ছিল, যখন তোমরা আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশের উপর আমলকারী হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তা'আলা তোমাদের পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন। যেহেতু তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে ও যারা নগরে গুজব রটনা করে বেড়ায়, তারা বিরত না হয় তবে আমি নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে প্রবল করবো এবং তাদের উপর তোমার আধিপত্য বিস্তার করবো। এরপর তারা খুব কম সময়ই মদীনায় অবস্থান করতে পারবে। অতি সত্বরই তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যে কয়েক দিন তারা মদীনায় অবস্থান করবে সে কয়েকদিনও তারা কাটাবে অভিশপ্ত অবস্থায়। চারদিক থেকে তাদেরকে ধিক্কার দেয়া হবে। তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই ধরা হবে এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করা হবে।আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেনঃ পূর্বে যারা গত হয়ে গেছে তাদের ব্যাপারে এটাই ছিল আল্লাহর বিধান। হে নবী (সঃ)! তুমি কখনো আল্লাহর বিধানে কোন পরিবর্তন পাবে না।

আল-আহযাব 33:63

৬৩-৬৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, লোকেরা তাঁকে। কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেও তার সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই। এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে। সূরায়ে আরাফেও এই বর্ণনা আছে এবং এই সূরায়ও রয়েছে। সূরায়ে আ'রাফ মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে মদীনায়। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত কিয়ামতের সঠিক জ্ঞান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ছিল না। তবে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে এটুকু জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, কিয়ামত অতি নিকটবর্তী। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।” (৫৪:১) আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।” (২১:১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ আসবেই, সুতরাং ওটা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না।” (১৬:১)মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ কাফিরদেরকে অভিশপ্ত করেছেন অর্থাৎ তাদেরকে স্বীয় রহমত হতে দূর করে দিয়েছেন। আর তাদের জন্যে (পরকালে) প্রস্তুত রেখেছেন জ্বলন্ত অগ্নি।তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। অর্থাৎ সেখান হতে তারা বের হতেও পারবে না এবং নিষ্কৃতিও লাভ করবে না। সেখানে তাদের অভিযোগ শুনবার মত কেউ থাকবে না। সেখানে তাদের জন্যে এমন কোন বন্ধু-বান্ধব থাকবে না যারা তাদেরকে কিছুমাত্র সাহায্য করতে পারে বা ঐ কঠিন বিপদ হতে তাদেরকে ছাড়িয়ে নিতে পারে। তাদেরকে উল্টোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারা সেদিন আফসোস করে বলবেঃ হায়! আমরা যদি আল্লাহকে মানতাম ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে মানতাম! যেমন আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে খবর দিয়েছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যালিম ব্যক্তি সেই দিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবেঃ হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধু রূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে সে তো বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ পৌছবার পর। শয়তান তো মানুষের জন্যে মহা প্রতারক।" (২৫:২৭-২৯) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কখনো কখনো কাফিররা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হতো!” (১৫:২)অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানে ঐ কাফিরদের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড় লোকদের আনুগত্য করেছিলাম এবং তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। আমরা ভেবেছিলাম যে, আমাদের নেতারা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। তাদের কাছে হক ও সত্য আছে। কিন্তু এখন আমরা বুঝতে পারছি যে, তারা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যার উপর ছিল। তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। সুতরাং হে আমাদের প্রতিপালক! তাদেরকে আপনি দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন। একতো এই কারণে যে, তারা নিজেরা কুফরী করেছে। আর দ্বিতীয় কারণ এই যে, তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করে আমাদের সর্বনাশ সাধন করেছে। আর তাদেরকে মহা অভিসম্পাত দিন!একটি কিরআতে (আরবি) এর স্থলে (আরবি) শব্দ রয়েছে। দুটোরই ভাবার্থ একই। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে একটি দু'আ শিখিয়ে দিন যা আমি আমার নামাযে পাঠ করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি নিম্নের দু'আটি পড়বেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আমার নফসের উপর বহু যুলুম করেছি। এবং আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ মাফ করতে পারে না। সুতরাং আপনার পক্ষ হতে আমাকে ক্ষমা করে দিন এবং আমার উপর দয়া করুন, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন) কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, দু'আয় (আরবি) ও (আরবি) এই দু’টি শব্দই মিলিয়ে নেয়া উচিত। কিন্তু এটা ঠিক নয়। বরং সঠিক কথা এটাই যে, কোন সময় বলতে (আরবি) হবে এবং কোন সময় (আরবি) বলতে হবে। যেটা ইচ্ছা সেটাই বলা যাবে কিন্তু দুটোকেই এক সাথে জমা করা যাবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-আহযাব 33:64

৬৩-৬৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, লোকেরা তাঁকে। কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেও তার সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই। এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে। সূরায়ে আরাফেও এই বর্ণনা আছে এবং এই সূরায়ও রয়েছে। সূরায়ে আ'রাফ মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে মদীনায়। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত কিয়ামতের সঠিক জ্ঞান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ছিল না। তবে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে এটুকু জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, কিয়ামত অতি নিকটবর্তী। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।” (৫৪:১) আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।” (২১:১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ আসবেই, সুতরাং ওটা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না।” (১৬:১)মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ কাফিরদেরকে অভিশপ্ত করেছেন অর্থাৎ তাদেরকে স্বীয় রহমত হতে দূর করে দিয়েছেন। আর তাদের জন্যে (পরকালে) প্রস্তুত রেখেছেন জ্বলন্ত অগ্নি।তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। অর্থাৎ সেখান হতে তারা বের হতেও পারবে না এবং নিষ্কৃতিও লাভ করবে না। সেখানে তাদের অভিযোগ শুনবার মত কেউ থাকবে না। সেখানে তাদের জন্যে এমন কোন বন্ধু-বান্ধব থাকবে না যারা তাদেরকে কিছুমাত্র সাহায্য করতে পারে বা ঐ কঠিন বিপদ হতে তাদেরকে ছাড়িয়ে নিতে পারে। তাদেরকে উল্টোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারা সেদিন আফসোস করে বলবেঃ হায়! আমরা যদি আল্লাহকে মানতাম ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে মানতাম! যেমন আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে খবর দিয়েছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যালিম ব্যক্তি সেই দিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবেঃ হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধু রূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে সে তো বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ পৌছবার পর। শয়তান তো মানুষের জন্যে মহা প্রতারক।" (২৫:২৭-২৯) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কখনো কখনো কাফিররা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হতো!” (১৫:২)অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানে ঐ কাফিরদের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড় লোকদের আনুগত্য করেছিলাম এবং তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। আমরা ভেবেছিলাম যে, আমাদের নেতারা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। তাদের কাছে হক ও সত্য আছে। কিন্তু এখন আমরা বুঝতে পারছি যে, তারা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যার উপর ছিল। তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। সুতরাং হে আমাদের প্রতিপালক! তাদেরকে আপনি দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন। একতো এই কারণে যে, তারা নিজেরা কুফরী করেছে। আর দ্বিতীয় কারণ এই যে, তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করে আমাদের সর্বনাশ সাধন করেছে। আর তাদেরকে মহা অভিসম্পাত দিন!একটি কিরআতে (আরবি) এর স্থলে (আরবি) শব্দ রয়েছে। দুটোরই ভাবার্থ একই। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে একটি দু'আ শিখিয়ে দিন যা আমি আমার নামাযে পাঠ করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি নিম্নের দু'আটি পড়বেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আমার নফসের উপর বহু যুলুম করেছি। এবং আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ মাফ করতে পারে না। সুতরাং আপনার পক্ষ হতে আমাকে ক্ষমা করে দিন এবং আমার উপর দয়া করুন, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন) কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, দু'আয় (আরবি) ও (আরবি) এই দু’টি শব্দই মিলিয়ে নেয়া উচিত। কিন্তু এটা ঠিক নয়। বরং সঠিক কথা এটাই যে, কোন সময় বলতে (আরবি) হবে এবং কোন সময় (আরবি) বলতে হবে। যেটা ইচ্ছা সেটাই বলা যাবে কিন্তু দুটোকেই এক সাথে জমা করা যাবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-আহযাব 33:65

৬৩-৬৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, লোকেরা তাঁকে। কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেও তার সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই। এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে। সূরায়ে আরাফেও এই বর্ণনা আছে এবং এই সূরায়ও রয়েছে। সূরায়ে আ'রাফ মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে মদীনায়। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত কিয়ামতের সঠিক জ্ঞান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ছিল না। তবে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে এটুকু জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, কিয়ামত অতি নিকটবর্তী। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।” (৫৪:১) আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।” (২১:১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ আসবেই, সুতরাং ওটা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না।” (১৬:১)মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ কাফিরদেরকে অভিশপ্ত করেছেন অর্থাৎ তাদেরকে স্বীয় রহমত হতে দূর করে দিয়েছেন। আর তাদের জন্যে (পরকালে) প্রস্তুত রেখেছেন জ্বলন্ত অগ্নি।তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। অর্থাৎ সেখান হতে তারা বের হতেও পারবে না এবং নিষ্কৃতিও লাভ করবে না। সেখানে তাদের অভিযোগ শুনবার মত কেউ থাকবে না। সেখানে তাদের জন্যে এমন কোন বন্ধু-বান্ধব থাকবে না যারা তাদেরকে কিছুমাত্র সাহায্য করতে পারে বা ঐ কঠিন বিপদ হতে তাদেরকে ছাড়িয়ে নিতে পারে। তাদেরকে উল্টোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারা সেদিন আফসোস করে বলবেঃ হায়! আমরা যদি আল্লাহকে মানতাম ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে মানতাম! যেমন আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে খবর দিয়েছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যালিম ব্যক্তি সেই দিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবেঃ হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধু রূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে সে তো বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ পৌছবার পর। শয়তান তো মানুষের জন্যে মহা প্রতারক।" (২৫:২৭-২৯) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কখনো কখনো কাফিররা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হতো!” (১৫:২)অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানে ঐ কাফিরদের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড় লোকদের আনুগত্য করেছিলাম এবং তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। আমরা ভেবেছিলাম যে, আমাদের নেতারা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। তাদের কাছে হক ও সত্য আছে। কিন্তু এখন আমরা বুঝতে পারছি যে, তারা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যার উপর ছিল। তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। সুতরাং হে আমাদের প্রতিপালক! তাদেরকে আপনি দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন। একতো এই কারণে যে, তারা নিজেরা কুফরী করেছে। আর দ্বিতীয় কারণ এই যে, তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করে আমাদের সর্বনাশ সাধন করেছে। আর তাদেরকে মহা অভিসম্পাত দিন!একটি কিরআতে (আরবি) এর স্থলে (আরবি) শব্দ রয়েছে। দুটোরই ভাবার্থ একই। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে একটি দু'আ শিখিয়ে দিন যা আমি আমার নামাযে পাঠ করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি নিম্নের দু'আটি পড়বেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আমার নফসের উপর বহু যুলুম করেছি। এবং আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ মাফ করতে পারে না। সুতরাং আপনার পক্ষ হতে আমাকে ক্ষমা করে দিন এবং আমার উপর দয়া করুন, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন) কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, দু'আয় (আরবি) ও (আরবি) এই দু’টি শব্দই মিলিয়ে নেয়া উচিত। কিন্তু এটা ঠিক নয়। বরং সঠিক কথা এটাই যে, কোন সময় বলতে (আরবি) হবে এবং কোন সময় (আরবি) বলতে হবে। যেটা ইচ্ছা সেটাই বলা যাবে কিন্তু দুটোকেই এক সাথে জমা করা যাবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-আহযাব 33:66

৬৩-৬৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, লোকেরা তাঁকে। কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেও তার সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই। এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে। সূরায়ে আরাফেও এই বর্ণনা আছে এবং এই সূরায়ও রয়েছে। সূরায়ে আ'রাফ মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে মদীনায়। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত কিয়ামতের সঠিক জ্ঞান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ছিল না। তবে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে এটুকু জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, কিয়ামত অতি নিকটবর্তী। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।” (৫৪:১) আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।” (২১:১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ আসবেই, সুতরাং ওটা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না।” (১৬:১)মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ কাফিরদেরকে অভিশপ্ত করেছেন অর্থাৎ তাদেরকে স্বীয় রহমত হতে দূর করে দিয়েছেন। আর তাদের জন্যে (পরকালে) প্রস্তুত রেখেছেন জ্বলন্ত অগ্নি।তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। অর্থাৎ সেখান হতে তারা বের হতেও পারবে না এবং নিষ্কৃতিও লাভ করবে না। সেখানে তাদের অভিযোগ শুনবার মত কেউ থাকবে না। সেখানে তাদের জন্যে এমন কোন বন্ধু-বান্ধব থাকবে না যারা তাদেরকে কিছুমাত্র সাহায্য করতে পারে বা ঐ কঠিন বিপদ হতে তাদেরকে ছাড়িয়ে নিতে পারে। তাদেরকে উল্টোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারা সেদিন আফসোস করে বলবেঃ হায়! আমরা যদি আল্লাহকে মানতাম ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে মানতাম! যেমন আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে খবর দিয়েছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যালিম ব্যক্তি সেই দিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবেঃ হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধু রূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে সে তো বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ পৌছবার পর। শয়তান তো মানুষের জন্যে মহা প্রতারক।" (২৫:২৭-২৯) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কখনো কখনো কাফিররা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হতো!” (১৫:২)অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানে ঐ কাফিরদের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড় লোকদের আনুগত্য করেছিলাম এবং তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। আমরা ভেবেছিলাম যে, আমাদের নেতারা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। তাদের কাছে হক ও সত্য আছে। কিন্তু এখন আমরা বুঝতে পারছি যে, তারা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যার উপর ছিল। তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। সুতরাং হে আমাদের প্রতিপালক! তাদেরকে আপনি দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন। একতো এই কারণে যে, তারা নিজেরা কুফরী করেছে। আর দ্বিতীয় কারণ এই যে, তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করে আমাদের সর্বনাশ সাধন করেছে। আর তাদেরকে মহা অভিসম্পাত দিন!একটি কিরআতে (আরবি) এর স্থলে (আরবি) শব্দ রয়েছে। দুটোরই ভাবার্থ একই। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে একটি দু'আ শিখিয়ে দিন যা আমি আমার নামাযে পাঠ করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি নিম্নের দু'আটি পড়বেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আমার নফসের উপর বহু যুলুম করেছি। এবং আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ মাফ করতে পারে না। সুতরাং আপনার পক্ষ হতে আমাকে ক্ষমা করে দিন এবং আমার উপর দয়া করুন, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন) কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, দু'আয় (আরবি) ও (আরবি) এই দু’টি শব্দই মিলিয়ে নেয়া উচিত। কিন্তু এটা ঠিক নয়। বরং সঠিক কথা এটাই যে, কোন সময় বলতে (আরবি) হবে এবং কোন সময় (আরবি) বলতে হবে। যেটা ইচ্ছা সেটাই বলা যাবে কিন্তু দুটোকেই এক সাথে জমা করা যাবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-আহযাব 33:67

৬৩-৬৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, লোকেরা তাঁকে। কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেও তার সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই। এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে। সূরায়ে আরাফেও এই বর্ণনা আছে এবং এই সূরায়ও রয়েছে। সূরায়ে আ'রাফ মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে মদীনায়। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত কিয়ামতের সঠিক জ্ঞান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ছিল না। তবে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে এটুকু জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, কিয়ামত অতি নিকটবর্তী। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।” (৫৪:১) আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।” (২১:১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ আসবেই, সুতরাং ওটা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না।” (১৬:১)মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ কাফিরদেরকে অভিশপ্ত করেছেন অর্থাৎ তাদেরকে স্বীয় রহমত হতে দূর করে দিয়েছেন। আর তাদের জন্যে (পরকালে) প্রস্তুত রেখেছেন জ্বলন্ত অগ্নি।তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। অর্থাৎ সেখান হতে তারা বের হতেও পারবে না এবং নিষ্কৃতিও লাভ করবে না। সেখানে তাদের অভিযোগ শুনবার মত কেউ থাকবে না। সেখানে তাদের জন্যে এমন কোন বন্ধু-বান্ধব থাকবে না যারা তাদেরকে কিছুমাত্র সাহায্য করতে পারে বা ঐ কঠিন বিপদ হতে তাদেরকে ছাড়িয়ে নিতে পারে। তাদেরকে উল্টোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারা সেদিন আফসোস করে বলবেঃ হায়! আমরা যদি আল্লাহকে মানতাম ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে মানতাম! যেমন আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে খবর দিয়েছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যালিম ব্যক্তি সেই দিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবেঃ হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধু রূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে সে তো বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ পৌছবার পর। শয়তান তো মানুষের জন্যে মহা প্রতারক।" (২৫:২৭-২৯) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কখনো কখনো কাফিররা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হতো!” (১৫:২)অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানে ঐ কাফিরদের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড় লোকদের আনুগত্য করেছিলাম এবং তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। আমরা ভেবেছিলাম যে, আমাদের নেতারা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। তাদের কাছে হক ও সত্য আছে। কিন্তু এখন আমরা বুঝতে পারছি যে, তারা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যার উপর ছিল। তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। সুতরাং হে আমাদের প্রতিপালক! তাদেরকে আপনি দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন। একতো এই কারণে যে, তারা নিজেরা কুফরী করেছে। আর দ্বিতীয় কারণ এই যে, তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করে আমাদের সর্বনাশ সাধন করেছে। আর তাদেরকে মহা অভিসম্পাত দিন!একটি কিরআতে (আরবি) এর স্থলে (আরবি) শব্দ রয়েছে। দুটোরই ভাবার্থ একই। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে একটি দু'আ শিখিয়ে দিন যা আমি আমার নামাযে পাঠ করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি নিম্নের দু'আটি পড়বেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আমার নফসের উপর বহু যুলুম করেছি। এবং আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ মাফ করতে পারে না। সুতরাং আপনার পক্ষ হতে আমাকে ক্ষমা করে দিন এবং আমার উপর দয়া করুন, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন) কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, দু'আয় (আরবি) ও (আরবি) এই দু’টি শব্দই মিলিয়ে নেয়া উচিত। কিন্তু এটা ঠিক নয়। বরং সঠিক কথা এটাই যে, কোন সময় বলতে (আরবি) হবে এবং কোন সময় (আরবি) বলতে হবে। যেটা ইচ্ছা সেটাই বলা যাবে কিন্তু দুটোকেই এক সাথে জমা করা যাবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-আহযাব 33:68

৬৩-৬৮ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, লোকেরা তাঁকে। কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেও তার সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই। এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই রয়েছে। সূরায়ে আরাফেও এই বর্ণনা আছে এবং এই সূরায়ও রয়েছে। সূরায়ে আ'রাফ মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে মদীনায়। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত কিয়ামতের সঠিক জ্ঞান রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ছিল না। তবে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে এটুকু জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, কিয়ামত অতি নিকটবর্তী। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।” (৫৪:১) আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।” (২১:১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ আসবেই, সুতরাং ওটা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না।” (১৬:১)মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ কাফিরদেরকে অভিশপ্ত করেছেন অর্থাৎ তাদেরকে স্বীয় রহমত হতে দূর করে দিয়েছেন। আর তাদের জন্যে (পরকালে) প্রস্তুত রেখেছেন জ্বলন্ত অগ্নি।তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। অর্থাৎ সেখান হতে তারা বের হতেও পারবে না এবং নিষ্কৃতিও লাভ করবে না। সেখানে তাদের অভিযোগ শুনবার মত কেউ থাকবে না। সেখানে তাদের জন্যে এমন কোন বন্ধু-বান্ধব থাকবে না যারা তাদেরকে কিছুমাত্র সাহায্য করতে পারে বা ঐ কঠিন বিপদ হতে তাদেরকে ছাড়িয়ে নিতে পারে। তাদেরকে উল্টোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারা সেদিন আফসোস করে বলবেঃ হায়! আমরা যদি আল্লাহকে মানতাম ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে মানতাম! যেমন আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে খবর দিয়েছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যালিম ব্যক্তি সেই দিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবেঃ হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধু রূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে সে তো বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ পৌছবার পর। শয়তান তো মানুষের জন্যে মহা প্রতারক।" (২৫:২৭-২৯) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “কখনো কখনো কাফিররা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হতো!” (১৫:২)অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানে ঐ কাফিরদের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড় লোকদের আনুগত্য করেছিলাম এবং তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। আমরা ভেবেছিলাম যে, আমাদের নেতারা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। তাদের কাছে হক ও সত্য আছে। কিন্তু এখন আমরা বুঝতে পারছি যে, তারা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যার উপর ছিল। তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। সুতরাং হে আমাদের প্রতিপালক! তাদেরকে আপনি দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন। একতো এই কারণে যে, তারা নিজেরা কুফরী করেছে। আর দ্বিতীয় কারণ এই যে, তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করে আমাদের সর্বনাশ সাধন করেছে। আর তাদেরকে মহা অভিসম্পাত দিন!একটি কিরআতে (আরবি) এর স্থলে (আরবি) শব্দ রয়েছে। দুটোরই ভাবার্থ একই। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে একটি দু'আ শিখিয়ে দিন যা আমি আমার নামাযে পাঠ করবো।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি নিম্নের দু'আটি পড়বেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আমার নফসের উপর বহু যুলুম করেছি। এবং আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ মাফ করতে পারে না। সুতরাং আপনার পক্ষ হতে আমাকে ক্ষমা করে দিন এবং আমার উপর দয়া করুন, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন) কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, দু'আয় (আরবি) ও (আরবি) এই দু’টি শব্দই মিলিয়ে নেয়া উচিত। কিন্তু এটা ঠিক নয়। বরং সঠিক কথা এটাই যে, কোন সময় বলতে (আরবি) হবে এবং কোন সময় (আরবি) বলতে হবে। যেটা ইচ্ছা সেটাই বলা যাবে কিন্তু দুটোকেই এক সাথে জমা করা যাবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-আহযাব 33:69

সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের তাফসীরে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত মূসা (আঃ) একজন বড় লজ্জাবান লোক ছিলেন।” ইমাম বুখারীও তাঁর সহীহ গ্রন্থের ‘কিতাবুত তাফসীর’-এ কুরআন কারীমের এই আয়াতের ভাবার্থ এভাবেই সংক্ষেপে আনয়ন করেছেন। কিন্তু নবীদের হাদীসগুলোর বর্ণনায় এটাকে দীর্ঘভাবে এনেছেন। তাতে এও রয়েছে যে, তিনি অত্যধিক লজ্জার কারণে নিজের দেহের কোন অংশ কারো সামনে উলঙ্গ করতেন না। বানী ইসরাঈল তাকে কষ্ট দেয়ার ইচ্ছা করলো। তারা গুজব রটিয়ে দিলো যে, তাঁর দেহে শ্বেত-কুষ্টের দাগ রয়েছে অথবা এক শিরার কারণে একটি অণ্ডকোষ বড় হয়ে গেছে বা অন্য কোন রোগ রয়েছে, যার কারণে তিনি এভাবে তার দেহকে ঢেকে রাখেন। আল্লাহ তাআলা তার উপর থেকে এই বদধারণা দূর করে দেয়ার ইচ্ছা করলেন। একদা তিনি নির্জনে উলঙ্গ অবস্থায় গোসল করছিলেন। একটি পাথরের উপর তার পরনের কাপড় রেখে দিয়েছিলেন। গোসল শেষ করে তিনি কাপড় নিতে যাবেন এমতাবস্থায় পাথরটি দূরে সরে গেল। তিনি তাঁর লাঠিটি নিয়ে পাথরের দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু পাথরটি দৌড়াতেই থাকলো। তিনিও হে পাথর! আমার কাপড়, আমার কাপড় বলে চীৎকার করতে করতে পাথরের পিছনে পিছনে দৌড়াতে শুরু করলেন। বানী ইসরাঈলের একটি দল এক জায়গায় বসেছিল। যখন তিনি লোকগুলোর কাছে পৌঁছে গেলেন তখন আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে পাথরটি সেখানে থেমে গেল। তিনি তাঁর কাপড় নিয়ে পরে নিলেন। বানী ইসরাঈল তার সমস্ত শরীর দেখে নিলো। যে গুজব তারা শুনেছিল তা থেকে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (আঃ)-কে মুক্ত করে দিলেন। রাগে হযরত মূসা (আঃ) পাথরের উপর তার লাঠি দ্বারা তিন বার বা চার বার অথবা পাঁচ বার আঘাত করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! ঐ পাথরের উপর তাঁর লাঠির দাগ পড়ে গিয়েছিল।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়নি। এই রিওয়াইয়াত বহু সনদে বহু কিতাবে বর্ণিত আছে। কিছু কিছু মাওকুফ রিওয়াইয়াতও রয়েছে)এই (আরবি) বা মুক্ত করার কথাই এই আয়াতে বলা হয়েছে (আরবি) আল্লাহ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ) পাহাড়ের উপর গিয়েছিলেন যেখানে হযরত হারূন (আঃ) ইন্তেকাল করেন। জনগণ হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর অহেতুক সন্দেহ পোষণ করতে লাগলো এবং তাকে শাসাতে ও ধমকাতে শুরু করলো। মহামহিমান্বিত আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে ফেরেশতারা তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে বানী ইসরাঈলের একটি মজলিসের পার্শ্ব দিয়ে চলতে থাকলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বাকশক্তি দান করলেন। তিনি প্রকাশ করলেন যে, তিনি স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন। তার কবরের সঠিক চিহ্ন জানা যায় না। শুধু ঐ পাহাড়টিই তার কবরের স্থানটির কথা জানে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা ওকে বাকশক্তিহীন করেছেন। তাহলে হতে পারে যে, (আরবি) বা কষ্ট দেয়া এটাই অথবা হতে পারে যে, (আরবি) দ্বারা ঐ কষ্টকে বুঝাননা হয়েছে যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আমি বলি যে, এটা এবং ওটা দুটোই উদ্দেশ্য হতে পারে বা এ দু'টো ছাড়া অন্য কষ্টও উদ্দেশ্য হতে পারে। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকদের মধ্যে কিছু বন্টন করেন। একটি লোক বলেঃ “এই বন্টনে আল্লাহর সন্তুষ্টির ইচ্ছা করা হয়নি।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “ওরে আল্লাহর শত্রু! আমি অবশ্যই তোমার এ কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জানিয়ে দিবো।” সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা জানিয়ে দিলেন। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা মুবারক রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহ হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর সদয় হোন! তাকে এর চেয়েও বেশী কষ্ট দেয়া হয়েছিল। তথাপি তিনি ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীদেরকে বলেনঃ “আমার সাহাবীদের কেউ যেন কারো কথা আমার কাছে পৌঁছিয়ে না দেয়। কেননা, আমি পছন্দ করি যে, কারো বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোেগ নেই এমতাবস্থায় যেন আমি তোমাদের মধ্যে বের হয়ে আসি।” অতঃপর একবার তাঁর কাছে কিছু মাল আসে। তিনি তা বন্টন করে দেন। বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি দু'টি লোকের পার্শ্ব দিয়ে গমন করি। তাদের একজন অপরজনকে বলছেঃ “আল্লাহর কসম! এ বন্টনে মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের ঘর কামনা করেননি।” এ কথা শুনে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি বলেছেন যে, কেউ যেন কারো কোন কথা আপনার নিকট পৌঁছিয়ে না দেয়। কিন্তু আমি অমুক অমুক দুটি লোকের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেছিলাম। তাদের একজন অপরজনকে এরূপ এরূপ কথা বলেছিল।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চেহারা মুবারক লাল হয়ে যায় এবং এটা তাঁর নিকট খুবই কঠিন বোধ হয়। অতঃপর তিনি বলেনঃ “ছেড়ে দাও, হযরত মূসা (আঃ)-কে এর চেয়ে বেশী কষ্ট দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।” (হাদীসটি এই ধারায় ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ঘোষিত হচ্ছেঃ মূসা (আঃ) আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান ছিল। তাঁর দুআ মহান আল্লাহর নিকট গৃহীত হতো। হ্যাঁ, তবে তিনি আল্লাহকে দর্শনের দু'আ করেছিলেন, তা গৃহীত হয়নি। কেননা, ওটা ছিল মানবীয় শক্তি বহির্ভূত। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, তিনি তাঁর ভাই-এর নবুওয়াতের জন্যে দু'আ করেছিলেন, সেটাও আল্লাহ তা'আলার নিকট গৃহীত হয়েছিল। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি নিজ অনুগ্রহে তাকে দিলাম তার ভ্রাতা হারূন (আঃ)-কে নবীরূপে।” (১৯:৫৩)

আল-আহযাব 33:70

৭০-৭১ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে তাঁকে ভয় করার হিদায়াত করছেন। তিনি তাদেরকে বলছেন যে, তারা যেন তার ইবাদত এমনভাবে করে যেন তারা তাকে দেখছে এবং তারা সত্য ও সঠিক কথা বলে। তাদের কথায় কোন বক্রতা ও পাঁচ না থাকে। যখন তারা অন্তরে তাকওয়া পোষণ করে এবং মুখে সত্য কথা বলে তখন এর বদৌলতে আল্লাহ তাদেরকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করেন। তাদের সমস্ত গুনাহ তিনি মাফ করে দেন। আর ভবিষ্যতেও ক্ষমার সুযোগ দান করেন, যেন গুনাহ বাকী রয়ে না যায়। আল্লাহ ও রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যই হলো সত্যিকারের সফলতা। এর মাধ্যমেই মানুষ জাহান্নাম হতে দূরে থাকে এবং জান্নাতের নিকটবর্তী হয়। হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমাদেরকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যোহরের নামায পড়েন। সালাম ফিরানোর পর তিনি আমাদের প্রতি বসার ইঙ্গিত করেন। সুতরাং আমরা বসে পড়ি। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে হুকুম করেছেন যে, আমি যেন তোমাদেরকে আল্লাহকে ভয় করার ও সঠিক কথা বলার নির্দেশ দিই।" তারপর তিনি মহিলাদের নিকট আসেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “আল্লাহ আমাকে হুকুম করেছেন যে, আমি যেন তোমাদেরকে আল্লাহকে ভয় করার এবং সত্য ও সঠিক কথা বলার নির্দেশ দিই।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরে দাঁড়ালেই আমি তাঁকে বলতে শুনতামঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল।" (এ হাদীসটি ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) কিতাবুত তাকওয়ায় বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা খুবই গারীব বা দুর্বল হাদীস)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেনঃ যে এতে আনন্দ পায় যে, লোকে তার সম্মান করুক সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো (আরবি) বা সঠিক কথা। অন্য কেউ বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো সত্যবাদিতা। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো সোজা ও সঠিক কথা। এ সবই (আরবি) এর অন্তর্ভুক্ত।

আল-আহযাব 33:71

৭০-৭১ নং আয়াতের তাফসীরআল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে তাঁকে ভয় করার হিদায়াত করছেন। তিনি তাদেরকে বলছেন যে, তারা যেন তার ইবাদত এমনভাবে করে যেন তারা তাকে দেখছে এবং তারা সত্য ও সঠিক কথা বলে। তাদের কথায় কোন বক্রতা ও পাঁচ না থাকে। যখন তারা অন্তরে তাকওয়া পোষণ করে এবং মুখে সত্য কথা বলে তখন এর বদৌলতে আল্লাহ তাদেরকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করেন। তাদের সমস্ত গুনাহ তিনি মাফ করে দেন। আর ভবিষ্যতেও ক্ষমার সুযোগ দান করেন, যেন গুনাহ বাকী রয়ে না যায়। আল্লাহ ও রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যই হলো সত্যিকারের সফলতা। এর মাধ্যমেই মানুষ জাহান্নাম হতে দূরে থাকে এবং জান্নাতের নিকটবর্তী হয়। হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমাদেরকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যোহরের নামায পড়েন। সালাম ফিরানোর পর তিনি আমাদের প্রতি বসার ইঙ্গিত করেন। সুতরাং আমরা বসে পড়ি। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে হুকুম করেছেন যে, আমি যেন তোমাদেরকে আল্লাহকে ভয় করার ও সঠিক কথা বলার নির্দেশ দিই।" তারপর তিনি মহিলাদের নিকট আসেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “আল্লাহ আমাকে হুকুম করেছেন যে, আমি যেন তোমাদেরকে আল্লাহকে ভয় করার এবং সত্য ও সঠিক কথা বলার নির্দেশ দিই।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরে দাঁড়ালেই আমি তাঁকে বলতে শুনতামঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল।" (এ হাদীসটি ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) কিতাবুত তাকওয়ায় বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা খুবই গারীব বা দুর্বল হাদীস)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেনঃ যে এতে আনন্দ পায় যে, লোকে তার সম্মান করুক সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো (আরবি) বা সঠিক কথা। অন্য কেউ বলেন যে, (আরবি)-এর অর্থ হলো সত্যবাদিতা। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো সোজা ও সঠিক কথা। এ সবই (আরবি) এর অন্তর্ভুক্ত।

আল-আহযাব 33:72

৭২-৭৩ নং আয়াতের তাফসীরহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এখানে (আরবি) অর্থ হলো (আরবি) বা আনুগত্য। এটা হযরত আদম (আঃ)-এর উপর পেশ করার পূর্বে যমীন, আসমান ও পাহাড়ের উপর পেশ করা হয়। তারা সবাই কিন্তু এই বিরাট দয়িত্ব পালনে অক্ষমতা প্রকাশ করে। তখন মহা মহিমান্বিত আল্লাহ ওটা হযরত আদম (আঃ)-এর সামনে পেশ করেন এবং বলেনঃ “ওরা সবাই তো অস্বীকার করলো, এখন তুমি কি বলছো, বল।” হযরত আদম (আঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” আল্লাহ্ তা'আলা উত্তরে বললেনঃ “এতে যা রয়েছে তা যদি তুমি মেনে চল তবে তুমি পুণ্য লাভ করবে ও ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে। আর যদি অমান্য কর তবে শাস্তি পাবে।” তখন হযরত আদম (আঃ) বললেনঃ “আমি এ দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত আছি।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে যে, এখানে আমানত দ্বারা ফারায়েয উদ্দেশ্য। অন্যান্যদের কাছে যে এটা পেশ করা হয়েছিল তা আদেশ পর্যায়ে ছিল না, বরং শুধু তাদের মনোভাব জেনে নেয়াই উদ্দেশ্য ছিল। তাদের অস্বীকৃতি ও অক্ষমতা প্রকাশের কারণে তাদের কোন গুনাহ ছিল না। বরং ওটা তাদের এক ধরনের তা'যীম ছিল। পরিপূর্ণভাবে অনুসরণের ব্যাপারেই তারা কেঁপে উঠেছিল। তারা ভয় করেছিল যে, পূর্ণভাবে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে তাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে।কিন্তু মানুষ অজ্ঞতা ও দুর্বলতার কারণে সন্তুষ্ট চিত্তে ঐ আমানত উঠিয়ে নিয়েছিল।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেই এটাও বর্ণিত আছে যে, প্রায় আসরের সময় মানুষ এই আমানত উঠিয়ে নিয়েছিল এবং মাগরিবের পূর্বেই ভুল প্রকাশ পেয়েছিল।হযরত উবাই (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, নারীদের সতীত্ব রক্ষাও একটা আমানত। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তি আছে যে, ফারায়েয, হুদুদ ইত্যাদি সবই আল্লাহর আমানত। কারো কারো উক্তিমতে অপবিত্রতার গোসলও আমানত। যায়েদ ইবনে আসলাম বলেন যে, তিনটি জিনিস হলো আল্লাহর আমানত। ওগুলো হলো: অপবিত্রতার গোসল, রোযা এবং নাযায। ভাবার্থ এই যে, এগুলো সবই আল্লাহর আমানতের অন্তর্ভুক্ত। সমস্ত আদেশ পালন এবং সমস্ত নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকা মানুষের দায়িত্ব। যে ঐ দায়িত্ব পালন করবে সে সওয়াব পাবে এবং যে পালন করবে না সে পাপী হবে এবং শাস্তি পাবে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেছেনঃ চিন্তা করে দেখো, আসমান নিরাপদ, সুন্দর এবং সৎ ও নিস্পাপ ফেরেশতাদের বাসস্থান হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর আমানত উঠাতে সাহস করেনি। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল যে, ঐ আমানত রক্ষায় অপারগ হলে সে শাস্তির যোগ্য হয়ে যাবে। যমীন অত্যন্ত শক্ত, দীর্ঘ ও প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও ঐ আমানত বহনের ব্যাপারে ভীত হয়ে গেল এবং বিনীতভাবে নিজের অক্ষমতা ও অপাগরতার কথা জানিয়ে দিলো। পাহাড় স্বীয় উচ্চতা, দৃঢ়তা ও কাঠিন্য সত্ত্বেও আমানতের ব্যাপারে কেঁপে উঠলো এবং নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করলো। মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, আসমানসমূহ উত্তরে বলেছিলঃ “আমরা তো। এমনিতেই আপনার বাধ্য। কিন্তু এটা বহনের শক্তি আমাদের নেই। কেননা এতে অকৃতকার্য হলে বড় রকম বিপদের আশংকা রয়েছে। তারপর মহান আল্লাহ যমীনকে বললেনঃ “তুমি যদি এটা পূর্ণভাবে প্রতিপালন করতে পার তবে আমি তোমাকে দয়া, অনুগ্রহ ও দানে ভূষিত করবো।" সে উত্তর দিয়েছিলঃ “আমি তো সবকিছুতেই আপনার অনুগত। আপনি যে আদেশই আমাকে করেন আমি তা পালন করে থাকি। কিন্তু এটা আমার সাধ্যের অতিরিক্ত।” অতঃপর পাহাড়কে বলা হলে সেও উত্তরে বলেঃ “আমি তো আপনার অবাধ্য নই। কথা হলো এই যে, যদি আমানত আমার উপর চাপিয়ে দেয়া হয় তবে তা আমি অবশ্যই উঠিয়ে নিবো, কিন্তু আসলে এটা বহনের ক্ষমতা আমার নেই। সুতরাং এটা হতে আমাকে অব্যাহতি দান করা হালে।” অতঃপর হযরত আদম (আঃ)-কে বলা হলো তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ! যদি আমি এটা পূর্ণভাবে প্রতিপালন করতে পারি তবে কি পাবো?” উত্তরে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তাহলে তুমি অতি সম্মানের স্থান জান্নাত লাভ করবে। তুমি দয়া ও অনুগ্রহে ভূষিত হবে। আর যদি তুমি অবাধ্য হও তবে এই অবাধ্যতার কারণে তোমাকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। তোমাকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে। তিনি তখন বললেনঃ “হে আল্লাহ! আমি এটা গ্রহণ করে নিলাম।”মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আসমান উত্তরে বলেছিলঃ “হে আল্লাহ! আমি তারকামণ্ডলীকে স্থান এবং ফেরেশতাদেরকে জায়গা দিয়েছি, কিন্তু আমি এ দায়িত্ব পালন করতে পারবো না। এতো ফরযসমূহের ভার। এটা বহনের শক্তিই তো আমার নেই।যমীন বলেছিলঃ “হে আল্লাহ! আমার উপর আপনি গাছপালা লাগিয়েছেন, সাগর জারি করেছেন, মানুষকে স্থান দিয়েছেন। এগুলো আমি বহন করেই চলেছি। কিন্তু এখন যে আমানতের দায়িত্বভার আমার উপর অর্পণ করতে চাচ্ছেন, এটা বহন করা আমার সাধ্যের অতীত। আমি সওয়াবের আশায় আযাবের সম্ভাবনা কাঁধে নিতে পারবো না।" পাহাড়ও এ ধরনেরই জবাব দিলো। কিন্তু মানুষ ঐ দায়িত্বভার গ্রহণ করে নিলো। কোন কোন রিওয়াইয়াতে আছে যে, তারা তিন দিন পর্যন্ত কাঁদতে থাকে ও নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করতে থাকে। কিন্তু মানুষ ওটাকে কাঁধে উঠিয়ে নেয়। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ মানুষকে সম্বোধন করে বলেনঃ “শুনো, যদি তোমার নিয়ত ভাল হয় তবে আমার সাহায্য সদা তোমার উপর থাকবে। তোমার চোখের দু’টি পলক করে দিবো। আমার অসন্তুষ্টির জিনিস হতে তোমার চোখ দুটি হেফাজত করবে। তোমার মুখে আমি দুটি ঠোট বানিয়ে দিচ্ছি। সে আমার মর্জির বিপরীত কিছু বলতে চাইলে ওকে বন্ধ করে দিবে। তোমার লজ্জাস্থানের হিফাজতের জন্যে আমি পোশাকের ব্যবস্থা করছি। আমার মর্জির বিপরীত তুমি ওটা খুলবে না।”যমীন ও আসমান সওয়াব ও আযাবকে প্রত্যাখ্যান করলো এবং আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লেগে থাকলো। কিন্তু মানুষ তা গ্রহণ করে নিলো।একটি খুবই গরীব বা দুর্বল মারফু হাদীসে আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমানত ও অফা মানুষের উপর নবীদের মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহর কালাম নবীদের মুখ হয়ে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। নবীদের ভাষার মাধ্যমে তারা ভাল-মন্দ সবকিছু জানতে পেরেছে। প্রত্যেকই পুণ্য ও পাপ সম্পর্কে অবহিত হয়েছে। জেনে রেখো যে, আমানতই হলো সর্বপ্রথম জিনিস যা উঠানো হয় এবং মানুষের অন্তরে এর লক্ষণ বাকী রয়েছে। তারপর উঠানো হয় অফা, আহাদ বা অঙ্গীকার ও যিম্মাদারী। কিতাবসমূহ তাদের হাতে রয়েছে। আলেমরা আমল করছে। আর অজ্ঞরা জানছে, কিন্তু না জানার ভান করছে। এখন এই আমানত এবং অফা আমি পর্যন্ত ও আমার উম্মত পর্যন্ত পৌঁছেছে। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাকেই ধ্বংস করেন যে নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে। তারা উদাসীনতায় লিপ্ত থাকে। হে লোক সকল! তোমরা সাবধান হয়ে যাও, ভাল হয়ে চল, শয়তানের প্রতারণায় প্রতারিত হয়ো না। আল্লাহ তোমাদেরকে পরীক্ষা করছেন যে, তোমাদের মধ্যে ভাল আমলকারী কে?” হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন ঈমানসহ পাঁচটি জিনিস যে নিয়ে আসবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের হিফাজত করবে, ওগুলোর অ্যু, রুকূ', সিজদা ও সময়সহ আদায় করবে আর খুশী মনে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের মালের যাকাত দিবে, অতঃপর তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম! মুমিন ছাড়া এটা কেউ করতে পারে না এবং আমানত আদায় করে।” জনগণ প্রশ্ন করলেনঃ “হে আবু দারদা (রাঃ)! আমানত আদায় করা কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “অপবিত্রতার গোসল। কেননা, আল্লাহ তাআলা স্বীয় দ্বীনকে রক্ষার ব্যাপারে আদম সন্তানকে এর চেয়ে বড় আমানত আর কিছু দেননি।” হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, আল্লাহর পথে জীবন দান সমস্ত পাপ মুছে ফেলে। কিন্তু আমানতের খিয়ানতকারীকে ক্ষমা করা হয় না। খিয়ানতকারীকে কিয়ামতের দিন আনয়ন করা হবে। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “তোমার আমানত আদায় কর।” সে উত্তর দিবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! কোথা হতে এবং কি করে আদায় করবো, দুনিয়া তো শেষ হয়ে গেছে।” তিনবার তাকে এ কথা বলা হবে এবং তিনবারই সে এই ব্রনের উত্তর দিবে। অতঃপর আদেশ করা হবেঃ “একে হাবিয়া জাহান্নামে নিয়ে যাও।” ফেরেশতারা তখন তাকে ধাক্কা দিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। সে একেবারে তলদেশে পৌঁছে যাবে। অতঃপর সেখানে ঐ আমানতের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত আগুনের জিনিস তার দৃষ্টিগোচর হবে। ওটাকে সে উপরের দিকে উঠাতে থাকবে। যখন জাহান্নামের ধারে পৌছবে তখন তার পা পিছলে যাবে এবং আবার নীচে পড়ে যাবে। আবার জাহান্নামের তলদেশে চলে যাবে। পুনরায় উঠবে এবং পুনরায় পড়বে। চিরকাল সে ঐ শাস্তিই ভোগ করতে থাকবে।অযু এবং নামাযেও আমানত আছে। কথা-বার্তার মধ্যেও আছে আমানত। সবচেয়ে বড় আমানত ঐ জিনিসগুলোতে রয়েছে যেগুলো আমানত হিসেবে কারো কাছে রাখা হয়। হযরত বারা (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হলো: “আপনার ভাই আবদুল্লাহ (রাঃ) কি হাদীস বর্ণনা করলেন তা কি আপনি শুনলেন না?” তিনি উত্তরে বললেন যে, তিনি সত্য বলেছেন।হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের কাছে দু’টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। একটি তো আমি স্বচক্ষে দেখেছি এবং দ্বিতীয়টির জন্যে অপেক্ষা করছি। প্রথম এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমানত মানুষের প্রকৃতির মধ্যে অবতীর্ণ করা হয়েছে। কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে এবং হাদীসসমূহ বর্ণিত হয়েছে।” অতঃপর তিনি আমানত উঠে যাওয়া সম্পর্কে বলেনঃ “মানুষ শয়ন করবে এমতাবস্থায় তার অন্তর হতে আমানত উঠে যাবে। এমন একটি দাগ থেকে যাবে যা দেখে মনে হবে যেন কোন জ্বলন্ত কাঠ তার পায়ে লেগে আছে এবং এর ফলে তার পায়ে ফোস্কা পড়ে গেছে। আর ওটা বেশ উঁচু হয়ে আছে। কিন্তু তার ভিতরে কিছুই থাকবে না।” অতঃপর তিনি একটি কংকর নিয়ে নিজ পায়ে চেপে দিয়ে লোকদেরকে তা দেখিয়ে দিলেন যে, এইভাবে জনগণ লেন-দেন ও ক্রয়-বিক্রয় করতে থাকবে। কিন্তু তাদের মধ্যে একজনও ঈমানদার থাকবে না। এমন কি এটা মশহুর হয়ে পড়বে যে, অমুক গোত্রের মধ্যে একজন আমানতদার লোক রয়েছে এবং এতদূর পর্যন্ত বলা হবে যে, এ লোকটি কতই না জ্ঞানী, বিজ্ঞ, বিদ্বান ও বিচক্ষণ! অথচ তার মধ্যে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান থাকবে না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ “দেখো, ইতিপূর্বে তো আমি অনেককেই ধার কর্জ দিতাম এবং অনেকের নিকট হতে ধার নিতাম। কেননা, সে মুসলমান হলে তো আমার প্রাপ্য আমাকে দিয়ে যাবে। আর সে ইয়াহূদী বা খৃষ্টান হলে ইসলামী শাসন তার নিকট হতে আমাকে আমার প্রাপ্য আদায় করিয়ে দিবে। কিন্তু বর্তমানে আমি শুধু অমুক অমকুকে ধার কর্জ দিয়ে থাকি এবং বাকী সবাইকে ধার দেয়া বন্ধ করে দিয়েছি। (এটা ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁদের সহীহ গ্রন্থে তাখরীজ করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন চারটি জিনিস তোমার মধ্যে থাকবে তখন সারা দুনিয়া ধ্বংস হয়ে গেলেও তোমার কোন ক্ষতি নেই। সেগুলো হলো : আমানত রক্ষা করা, সত্য কথা বলা, চরিত্র ভাল হওয়া এবং খাদ্য পবিত্র ও হালাল হওয়া।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) কিতাবুয যুহদে বলেছেন যে, একদা খাননাস ইবনে সাহীম অথবা জিবিল্লাহ ইবনে সাহীম (রঃ) যিয়াদ ইবনে হাদীর (রঃ)-এর সাথে ছিলেন। ঘটনাক্রমে তার মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়ঃ “আমানতের কসম!”এ কথা শুনে হযরত যিয়াদ (রঃ) কাঁদতে শুরু করেন। দীর্ঘক্ষণ ধরে তিনি কাঁদতে থাকেন। তখন ইবনে সাহীম (রঃ) ভয় পেলেন যে, তার মুখ দিয়ে খুব কঠিন কথা বের হলো না কি! তাই তিনি বলেনঃ “তিনি কি ওটাকে মন্দ জানতেন? উত্তরে হযরত যিয়াদ (রঃ) বললেনঃ “হ্যা, হযরত উমার (রাঃ) এটাকে খুবই মন্দ জানতেন এবং এটা হতে নিষেধ করতেন।”হযরত বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আমানতের কসম খায় সে আমাদের মধ্যে নয়। (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাঊদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ হযরত আদম (আঃ) যা করলেন এবং পরিণামে আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী এবং মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারী অর্থাৎ যারা বাহ্যিক মুসলমান এবং ভিতরে কাফির ছিল, আর যারা বাইরে ও ভিতরে উভয় ক্ষেত্রেই কাফির ছিল, তাদেরকে শাস্তি দিবেন এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হবে। যারা আল্লাহকে, তাঁর ফেরেশতাদেরকে এবং তাঁর রাসূলদেরকে মেনে চলতো এবং তার আনুগত্য করতো সঠিকভাবে। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

আল-আহযাব 33:73

৭২-৭৩ নং আয়াতের তাফসীরহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এখানে (আরবি) অর্থ হলো (আরবি) বা আনুগত্য। এটা হযরত আদম (আঃ)-এর উপর পেশ করার পূর্বে যমীন, আসমান ও পাহাড়ের উপর পেশ করা হয়। তারা সবাই কিন্তু এই বিরাট দয়িত্ব পালনে অক্ষমতা প্রকাশ করে। তখন মহা মহিমান্বিত আল্লাহ ওটা হযরত আদম (আঃ)-এর সামনে পেশ করেন এবং বলেনঃ “ওরা সবাই তো অস্বীকার করলো, এখন তুমি কি বলছো, বল।” হযরত আদম (আঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” আল্লাহ্ তা'আলা উত্তরে বললেনঃ “এতে যা রয়েছে তা যদি তুমি মেনে চল তবে তুমি পুণ্য লাভ করবে ও ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে। আর যদি অমান্য কর তবে শাস্তি পাবে।” তখন হযরত আদম (আঃ) বললেনঃ “আমি এ দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত আছি।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে যে, এখানে আমানত দ্বারা ফারায়েয উদ্দেশ্য। অন্যান্যদের কাছে যে এটা পেশ করা হয়েছিল তা আদেশ পর্যায়ে ছিল না, বরং শুধু তাদের মনোভাব জেনে নেয়াই উদ্দেশ্য ছিল। তাদের অস্বীকৃতি ও অক্ষমতা প্রকাশের কারণে তাদের কোন গুনাহ ছিল না। বরং ওটা তাদের এক ধরনের তা'যীম ছিল। পরিপূর্ণভাবে অনুসরণের ব্যাপারেই তারা কেঁপে উঠেছিল। তারা ভয় করেছিল যে, পূর্ণভাবে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে তাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে।কিন্তু মানুষ অজ্ঞতা ও দুর্বলতার কারণে সন্তুষ্ট চিত্তে ঐ আমানত উঠিয়ে নিয়েছিল।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেই এটাও বর্ণিত আছে যে, প্রায় আসরের সময় মানুষ এই আমানত উঠিয়ে নিয়েছিল এবং মাগরিবের পূর্বেই ভুল প্রকাশ পেয়েছিল।হযরত উবাই (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, নারীদের সতীত্ব রক্ষাও একটা আমানত। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তি আছে যে, ফারায়েয, হুদুদ ইত্যাদি সবই আল্লাহর আমানত। কারো কারো উক্তিমতে অপবিত্রতার গোসলও আমানত। যায়েদ ইবনে আসলাম বলেন যে, তিনটি জিনিস হলো আল্লাহর আমানত। ওগুলো হলো: অপবিত্রতার গোসল, রোযা এবং নাযায। ভাবার্থ এই যে, এগুলো সবই আল্লাহর আমানতের অন্তর্ভুক্ত। সমস্ত আদেশ পালন এবং সমস্ত নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকা মানুষের দায়িত্ব। যে ঐ দায়িত্ব পালন করবে সে সওয়াব পাবে এবং যে পালন করবে না সে পাপী হবে এবং শাস্তি পাবে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেছেনঃ চিন্তা করে দেখো, আসমান নিরাপদ, সুন্দর এবং সৎ ও নিস্পাপ ফেরেশতাদের বাসস্থান হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর আমানত উঠাতে সাহস করেনি। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল যে, ঐ আমানত রক্ষায় অপারগ হলে সে শাস্তির যোগ্য হয়ে যাবে। যমীন অত্যন্ত শক্ত, দীর্ঘ ও প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও ঐ আমানত বহনের ব্যাপারে ভীত হয়ে গেল এবং বিনীতভাবে নিজের অক্ষমতা ও অপাগরতার কথা জানিয়ে দিলো। পাহাড় স্বীয় উচ্চতা, দৃঢ়তা ও কাঠিন্য সত্ত্বেও আমানতের ব্যাপারে কেঁপে উঠলো এবং নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করলো। মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, আসমানসমূহ উত্তরে বলেছিলঃ “আমরা তো। এমনিতেই আপনার বাধ্য। কিন্তু এটা বহনের শক্তি আমাদের নেই। কেননা এতে অকৃতকার্য হলে বড় রকম বিপদের আশংকা রয়েছে। তারপর মহান আল্লাহ যমীনকে বললেনঃ “তুমি যদি এটা পূর্ণভাবে প্রতিপালন করতে পার তবে আমি তোমাকে দয়া, অনুগ্রহ ও দানে ভূষিত করবো।" সে উত্তর দিয়েছিলঃ “আমি তো সবকিছুতেই আপনার অনুগত। আপনি যে আদেশই আমাকে করেন আমি তা পালন করে থাকি। কিন্তু এটা আমার সাধ্যের অতিরিক্ত।” অতঃপর পাহাড়কে বলা হলে সেও উত্তরে বলেঃ “আমি তো আপনার অবাধ্য নই। কথা হলো এই যে, যদি আমানত আমার উপর চাপিয়ে দেয়া হয় তবে তা আমি অবশ্যই উঠিয়ে নিবো, কিন্তু আসলে এটা বহনের ক্ষমতা আমার নেই। সুতরাং এটা হতে আমাকে অব্যাহতি দান করা হালে।” অতঃপর হযরত আদম (আঃ)-কে বলা হলো তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ! যদি আমি এটা পূর্ণভাবে প্রতিপালন করতে পারি তবে কি পাবো?” উত্তরে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তাহলে তুমি অতি সম্মানের স্থান জান্নাত লাভ করবে। তুমি দয়া ও অনুগ্রহে ভূষিত হবে। আর যদি তুমি অবাধ্য হও তবে এই অবাধ্যতার কারণে তোমাকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। তোমাকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে। তিনি তখন বললেনঃ “হে আল্লাহ! আমি এটা গ্রহণ করে নিলাম।”মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আসমান উত্তরে বলেছিলঃ “হে আল্লাহ! আমি তারকামণ্ডলীকে স্থান এবং ফেরেশতাদেরকে জায়গা দিয়েছি, কিন্তু আমি এ দায়িত্ব পালন করতে পারবো না। এতো ফরযসমূহের ভার। এটা বহনের শক্তিই তো আমার নেই।যমীন বলেছিলঃ “হে আল্লাহ! আমার উপর আপনি গাছপালা লাগিয়েছেন, সাগর জারি করেছেন, মানুষকে স্থান দিয়েছেন। এগুলো আমি বহন করেই চলেছি। কিন্তু এখন যে আমানতের দায়িত্বভার আমার উপর অর্পণ করতে চাচ্ছেন, এটা বহন করা আমার সাধ্যের অতীত। আমি সওয়াবের আশায় আযাবের সম্ভাবনা কাঁধে নিতে পারবো না।" পাহাড়ও এ ধরনেরই জবাব দিলো। কিন্তু মানুষ ঐ দায়িত্বভার গ্রহণ করে নিলো। কোন কোন রিওয়াইয়াতে আছে যে, তারা তিন দিন পর্যন্ত কাঁদতে থাকে ও নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করতে থাকে। কিন্তু মানুষ ওটাকে কাঁধে উঠিয়ে নেয়। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ মানুষকে সম্বোধন করে বলেনঃ “শুনো, যদি তোমার নিয়ত ভাল হয় তবে আমার সাহায্য সদা তোমার উপর থাকবে। তোমার চোখের দু’টি পলক করে দিবো। আমার অসন্তুষ্টির জিনিস হতে তোমার চোখ দুটি হেফাজত করবে। তোমার মুখে আমি দুটি ঠোট বানিয়ে দিচ্ছি। সে আমার মর্জির বিপরীত কিছু বলতে চাইলে ওকে বন্ধ করে দিবে। তোমার লজ্জাস্থানের হিফাজতের জন্যে আমি পোশাকের ব্যবস্থা করছি। আমার মর্জির বিপরীত তুমি ওটা খুলবে না।”যমীন ও আসমান সওয়াব ও আযাবকে প্রত্যাখ্যান করলো এবং আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লেগে থাকলো। কিন্তু মানুষ তা গ্রহণ করে নিলো।একটি খুবই গরীব বা দুর্বল মারফু হাদীসে আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমানত ও অফা মানুষের উপর নবীদের মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহর কালাম নবীদের মুখ হয়ে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। নবীদের ভাষার মাধ্যমে তারা ভাল-মন্দ সবকিছু জানতে পেরেছে। প্রত্যেকই পুণ্য ও পাপ সম্পর্কে অবহিত হয়েছে। জেনে রেখো যে, আমানতই হলো সর্বপ্রথম জিনিস যা উঠানো হয় এবং মানুষের অন্তরে এর লক্ষণ বাকী রয়েছে। তারপর উঠানো হয় অফা, আহাদ বা অঙ্গীকার ও যিম্মাদারী। কিতাবসমূহ তাদের হাতে রয়েছে। আলেমরা আমল করছে। আর অজ্ঞরা জানছে, কিন্তু না জানার ভান করছে। এখন এই আমানত এবং অফা আমি পর্যন্ত ও আমার উম্মত পর্যন্ত পৌঁছেছে। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তাকেই ধ্বংস করেন যে নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে। তারা উদাসীনতায় লিপ্ত থাকে। হে লোক সকল! তোমরা সাবধান হয়ে যাও, ভাল হয়ে চল, শয়তানের প্রতারণায় প্রতারিত হয়ো না। আল্লাহ তোমাদেরকে পরীক্ষা করছেন যে, তোমাদের মধ্যে ভাল আমলকারী কে?” হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন ঈমানসহ পাঁচটি জিনিস যে নিয়ে আসবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের হিফাজত করবে, ওগুলোর অ্যু, রুকূ', সিজদা ও সময়সহ আদায় করবে আর খুশী মনে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের মালের যাকাত দিবে, অতঃপর তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম! মুমিন ছাড়া এটা কেউ করতে পারে না এবং আমানত আদায় করে।” জনগণ প্রশ্ন করলেনঃ “হে আবু দারদা (রাঃ)! আমানত আদায় করা কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “অপবিত্রতার গোসল। কেননা, আল্লাহ তাআলা স্বীয় দ্বীনকে রক্ষার ব্যাপারে আদম সন্তানকে এর চেয়ে বড় আমানত আর কিছু দেননি।” হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, আল্লাহর পথে জীবন দান সমস্ত পাপ মুছে ফেলে। কিন্তু আমানতের খিয়ানতকারীকে ক্ষমা করা হয় না। খিয়ানতকারীকে কিয়ামতের দিন আনয়ন করা হবে। অতঃপর তাকে বলা হবেঃ “তোমার আমানত আদায় কর।” সে উত্তর দিবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! কোথা হতে এবং কি করে আদায় করবো, দুনিয়া তো শেষ হয়ে গেছে।” তিনবার তাকে এ কথা বলা হবে এবং তিনবারই সে এই ব্রনের উত্তর দিবে। অতঃপর আদেশ করা হবেঃ “একে হাবিয়া জাহান্নামে নিয়ে যাও।” ফেরেশতারা তখন তাকে ধাক্কা দিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। সে একেবারে তলদেশে পৌঁছে যাবে। অতঃপর সেখানে ঐ আমানতের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত আগুনের জিনিস তার দৃষ্টিগোচর হবে। ওটাকে সে উপরের দিকে উঠাতে থাকবে। যখন জাহান্নামের ধারে পৌছবে তখন তার পা পিছলে যাবে এবং আবার নীচে পড়ে যাবে। আবার জাহান্নামের তলদেশে চলে যাবে। পুনরায় উঠবে এবং পুনরায় পড়বে। চিরকাল সে ঐ শাস্তিই ভোগ করতে থাকবে।অযু এবং নামাযেও আমানত আছে। কথা-বার্তার মধ্যেও আছে আমানত। সবচেয়ে বড় আমানত ঐ জিনিসগুলোতে রয়েছে যেগুলো আমানত হিসেবে কারো কাছে রাখা হয়। হযরত বারা (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হলো: “আপনার ভাই আবদুল্লাহ (রাঃ) কি হাদীস বর্ণনা করলেন তা কি আপনি শুনলেন না?” তিনি উত্তরে বললেন যে, তিনি সত্য বলেছেন।হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের কাছে দু’টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। একটি তো আমি স্বচক্ষে দেখেছি এবং দ্বিতীয়টির জন্যে অপেক্ষা করছি। প্রথম এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমানত মানুষের প্রকৃতির মধ্যে অবতীর্ণ করা হয়েছে। কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে এবং হাদীসসমূহ বর্ণিত হয়েছে।” অতঃপর তিনি আমানত উঠে যাওয়া সম্পর্কে বলেনঃ “মানুষ শয়ন করবে এমতাবস্থায় তার অন্তর হতে আমানত উঠে যাবে। এমন একটি দাগ থেকে যাবে যা দেখে মনে হবে যেন কোন জ্বলন্ত কাঠ তার পায়ে লেগে আছে এবং এর ফলে তার পায়ে ফোস্কা পড়ে গেছে। আর ওটা বেশ উঁচু হয়ে আছে। কিন্তু তার ভিতরে কিছুই থাকবে না।” অতঃপর তিনি একটি কংকর নিয়ে নিজ পায়ে চেপে দিয়ে লোকদেরকে তা দেখিয়ে দিলেন যে, এইভাবে জনগণ লেন-দেন ও ক্রয়-বিক্রয় করতে থাকবে। কিন্তু তাদের মধ্যে একজনও ঈমানদার থাকবে না। এমন কি এটা মশহুর হয়ে পড়বে যে, অমুক গোত্রের মধ্যে একজন আমানতদার লোক রয়েছে এবং এতদূর পর্যন্ত বলা হবে যে, এ লোকটি কতই না জ্ঞানী, বিজ্ঞ, বিদ্বান ও বিচক্ষণ! অথচ তার মধ্যে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান থাকবে না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ “দেখো, ইতিপূর্বে তো আমি অনেককেই ধার কর্জ দিতাম এবং অনেকের নিকট হতে ধার নিতাম। কেননা, সে মুসলমান হলে তো আমার প্রাপ্য আমাকে দিয়ে যাবে। আর সে ইয়াহূদী বা খৃষ্টান হলে ইসলামী শাসন তার নিকট হতে আমাকে আমার প্রাপ্য আদায় করিয়ে দিবে। কিন্তু বর্তমানে আমি শুধু অমুক অমকুকে ধার কর্জ দিয়ে থাকি এবং বাকী সবাইকে ধার দেয়া বন্ধ করে দিয়েছি। (এটা ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁদের সহীহ গ্রন্থে তাখরীজ করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন চারটি জিনিস তোমার মধ্যে থাকবে তখন সারা দুনিয়া ধ্বংস হয়ে গেলেও তোমার কোন ক্ষতি নেই। সেগুলো হলো : আমানত রক্ষা করা, সত্য কথা বলা, চরিত্র ভাল হওয়া এবং খাদ্য পবিত্র ও হালাল হওয়া।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রঃ) কিতাবুয যুহদে বলেছেন যে, একদা খাননাস ইবনে সাহীম অথবা জিবিল্লাহ ইবনে সাহীম (রঃ) যিয়াদ ইবনে হাদীর (রঃ)-এর সাথে ছিলেন। ঘটনাক্রমে তার মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়ঃ “আমানতের কসম!”এ কথা শুনে হযরত যিয়াদ (রঃ) কাঁদতে শুরু করেন। দীর্ঘক্ষণ ধরে তিনি কাঁদতে থাকেন। তখন ইবনে সাহীম (রঃ) ভয় পেলেন যে, তার মুখ দিয়ে খুব কঠিন কথা বের হলো না কি! তাই তিনি বলেনঃ “তিনি কি ওটাকে মন্দ জানতেন? উত্তরে হযরত যিয়াদ (রঃ) বললেনঃ “হ্যা, হযরত উমার (রাঃ) এটাকে খুবই মন্দ জানতেন এবং এটা হতে নিষেধ করতেন।”হযরত বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আমানতের কসম খায় সে আমাদের মধ্যে নয়। (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাঊদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ হযরত আদম (আঃ) যা করলেন এবং পরিণামে আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী এবং মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারী অর্থাৎ যারা বাহ্যিক মুসলমান এবং ভিতরে কাফির ছিল, আর যারা বাইরে ও ভিতরে উভয় ক্ষেত্রেই কাফির ছিল, তাদেরকে শাস্তি দিবেন এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হবে। যারা আল্লাহকে, তাঁর ফেরেশতাদেরকে এবং তাঁর রাসূলদেরকে মেনে চলতো এবং তার আনুগত্য করতো সঠিকভাবে। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

সাবা 34:1

১-২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় মহান সত্তা সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত নিয়ামত ও রহমত তাঁরই নিকট হতে আসে। সমস্ত হুকুমতের হাকিম তিনিই। সুতরাং সর্ব প্রকারের প্রশংসা ও গুণ-কীর্তনের হকদার একমাত্র তিনিই। তিনিই মাবুদ। তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউই নেই। তাঁরই জন্যে দুনিয়া ও আখিরাতের তারীফ ও প্রশংসা শোভনীয়। হুকুমত একমাত্র তাঁরই এবং তাঁরই নিকট সবকিছু প্রত্যাবর্তিত হবে। যমীনে ও আসমানে যা কিছু আছে সবই তাঁর অধীনস্থ। যত কিছু আছে সবাই তাঁর দাস ও অনুগত। আর সবই তাঁর আয়ত্তাধীন। সবারই উপর তাঁর আধিপত্য রয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমারই জন্যে আদি ও অন্ত।”(৯২:১৩) আখিরাতে তাঁরই প্রশংসা হবে। তাঁর কথা, তাঁর কাজ এবং তাঁর আহকাম তাঁরই হুকুমতে বিরাজিত। তিনি এতো সজাগ যে, তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন থাকে না। তাঁর কাছে একটি অণুও গোপন থাকবার নয়। তিনি স্বীয় আহকামের মধ্যে অতি বিজ্ঞ। তিনি স্বীয় সৃষ্টি সম্বন্ধে সচেতন। পানির যতগুলো ফোঁটা যমীনে যায়, যতগুলো বীজ যমীনে বপন করা হয়, কিছুই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। যমীন হতে যা কিছু বের হয় সেটাও তিনি জানেন। তাঁর সীমাহীন ও প্রশস্ত জ্ঞানের বাইরে কিছুই থাকতে পারে না। প্রত্যেক বস্তুর সংখ্যা, প্রকৃতি এবং গুণাগুণ তাঁর জানা আছে। মেঘ হতে যে বৃষ্টি বর্ষিত হয়, তাতে কতটা ফোঁটা আছে তা তাঁর অজানা থাকে না। যে খাদ্য সেখান হতে নাযিল হয় সেটা সম্পর্কেও তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। ভাল কাজ যা আকাশের উপর উঠে যায় সে খবরও তিনি রাখেন।তিনি স্বীয় বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান। এ কারণেই তাদের পাপরাশি অবগত হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাড়াতাড়ি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন না। বরং তাদেরকে তাওবা করার সুযোগ দিয়ে থাকেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। একদিকে বান্দা তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে অনুনয়-বিনয় ও কান্নাকাটি করে, আর অপরদিকে তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। তাওবাকারীকে তিনি ধমক দিয়ে সরিয়ে দেন না। তার উপর ভরসাকারীরা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

সাবা 34:2

১-২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় মহান সত্তা সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত নিয়ামত ও রহমত তাঁরই নিকট হতে আসে। সমস্ত হুকুমতের হাকিম তিনিই। সুতরাং সর্ব প্রকারের প্রশংসা ও গুণ-কীর্তনের হকদার একমাত্র তিনিই। তিনিই মাবুদ। তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউই নেই। তাঁরই জন্যে দুনিয়া ও আখিরাতের তারীফ ও প্রশংসা শোভনীয়। হুকুমত একমাত্র তাঁরই এবং তাঁরই নিকট সবকিছু প্রত্যাবর্তিত হবে। যমীনে ও আসমানে যা কিছু আছে সবই তাঁর অধীনস্থ। যত কিছু আছে সবাই তাঁর দাস ও অনুগত। আর সবই তাঁর আয়ত্তাধীন। সবারই উপর তাঁর আধিপত্য রয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমারই জন্যে আদি ও অন্ত।”(৯২:১৩) আখিরাতে তাঁরই প্রশংসা হবে। তাঁর কথা, তাঁর কাজ এবং তাঁর আহকাম তাঁরই হুকুমতে বিরাজিত। তিনি এতো সজাগ যে, তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন থাকে না। তাঁর কাছে একটি অণুও গোপন থাকবার নয়। তিনি স্বীয় আহকামের মধ্যে অতি বিজ্ঞ। তিনি স্বীয় সৃষ্টি সম্বন্ধে সচেতন। পানির যতগুলো ফোঁটা যমীনে যায়, যতগুলো বীজ যমীনে বপন করা হয়, কিছুই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। যমীন হতে যা কিছু বের হয় সেটাও তিনি জানেন। তাঁর সীমাহীন ও প্রশস্ত জ্ঞানের বাইরে কিছুই থাকতে পারে না। প্রত্যেক বস্তুর সংখ্যা, প্রকৃতি এবং গুণাগুণ তাঁর জানা আছে। মেঘ হতে যে বৃষ্টি বর্ষিত হয়, তাতে কতটা ফোঁটা আছে তা তাঁর অজানা থাকে না। যে খাদ্য সেখান হতে নাযিল হয় সেটা সম্পর্কেও তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। ভাল কাজ যা আকাশের উপর উঠে যায় সে খবরও তিনি রাখেন।তিনি স্বীয় বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান। এ কারণেই তাদের পাপরাশি অবগত হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাড়াতাড়ি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন না। বরং তাদেরকে তাওবা করার সুযোগ দিয়ে থাকেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। একদিকে বান্দা তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে অনুনয়-বিনয় ও কান্নাকাটি করে, আর অপরদিকে তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। তাওবাকারীকে তিনি ধমক দিয়ে সরিয়ে দেন না। তার উপর ভরসাকারীরা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

সাবা 34:3

৩-৬ নং আয়াতের তাফসীর: সম্পূর্ণ কুরআন কারীমে তিনটি আয়াত রয়েছে যেখানে কিয়ামত আগমনের উপর শপথ করা হয়েছে। একটি সূরায়ে ইউনুসের আয়াত। তা হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা তোমার কাছে জানতে চায়ঃ এটা কি সত্য? তুমি বলঃ হ্যা, আমার প্রতিপালকের শপথ! এটা অবশ্যই সত্য এবং তোমরা এটা ব্যর্থ করতে পারবে না।”(১০:৫৩) দ্বিতীয় হলো এই সূরায়ে সাবার। (আরবী)-এই আয়াতটি। আর তৃতীয় হলো সূরায়ে তাগাবুনের নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবী) অর্থাৎ “কাফিররা ধারণা করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বলঃ নিশ্চয়ই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা নিশ্চয়ই পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”(৬৪:৭) এখানেও কাফিরদের কিয়ামতের অস্বীকৃতির উল্লেখ করে স্বীয় নবী (সঃ)-কে শপথমূলক উত্তর দিতে বলার পর আরো গুরুত্বের সাথে বলছেনঃ সেই আল্লাহ তিনি, যিনি আলেমুল গায়েব, যার অগোচর নয় আকাশ ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তদপেক্ষা ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ কিছু। যে হাড়গুলো পচে সড়ে যায়, মানুষের শরীরের জোড়গুলো যে খুলে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, ওগুলো যায় কোথায় এবং ওগুলোর সংখ্যাই বা কত ইত্যাদি সবকিছুই আল্লাহ জ্ঞাত আছেন। তিনি এগুলো একত্রিত করতে সক্ষম, যেমন তিনি প্রথমে সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি সমস্ত কিছুই জানেন। সবকিছুই তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামত আসার হিকমত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, যারা মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণ তিনি তাদেরকে পুরস্কৃত করবেন। তাদেরই জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও সম্মান জনক রিযক। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর আয়াত সমূহকে ব্যর্থ করবার চেষ্টা করে তাদের জন্যে রয়েছে ভয়ংকর মর্মন্তুদ শাস্তি। সৎকর্মশীল মুমিনরা পুরস্কৃত হবে এবং দুষ্ট ও পাপী কাফিররা হবে শাস্তিপ্রাপ্ত। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতের অধিবাসীরাই সফলকাম।"(৫৯:২০) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদেরকে ভূ-পৃষ্ঠে বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের মত করবো অথবা আমি কি সংযমী ও আল্লাহভীরুদেরকে করবো পাপাসক্তদের মত?”(৩৮:২৮)। এরপর আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের আর একটি হিকমত বর্ণনায় বলেনঃ কিয়ামতের দিন ঈমানদার লোকেরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত হতে এবং পাপীদেরকে শাস্তিপ্রাপ্ত হতে দেখে নিশ্চিত জ্ঞান দ্বারা চাক্ষুষ প্রত্যয় লাভ করবে। ঐ সময় তারা বলে উঠবেঃ আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ সত্য আনয়ন করেছিলেন। আরো বলা হবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দয়াময় আল্লাহ্ তো এরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্য বলেছিলেন।”(৩৬:৫২) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ্ কিতাবে লিপিবদ্ধ ছিল যে, তোমরা পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবস্থান করবে, তাহলে পুনরুত্থান দিবস তো এটাই।”(৩০:৫৬)আল্লাহ পরাক্রমশালী অর্থাৎ তিনি প্রবল পরাক্রান্ত, বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন, মহাশক্তির অধিকারী, ক্ষমতাবান শাসক এবং পূর্ণ বিজয়ী। তার উপর কারো কোন আদেশ চলে না এবং কারো কোন জোরও খাটে না। প্রত্যেক বস্তুই তাঁর কাছে শক্তিহীন ও অপারগ। তাঁর কথা ও কাজ চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী। তাঁর সমুদয় সৃষ্টজীব তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

সাবা 34:4

৩-৬ নং আয়াতের তাফসীর: সম্পূর্ণ কুরআন কারীমে তিনটি আয়াত রয়েছে যেখানে কিয়ামত আগমনের উপর শপথ করা হয়েছে। একটি সূরায়ে ইউনুসের আয়াত। তা হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা তোমার কাছে জানতে চায়ঃ এটা কি সত্য? তুমি বলঃ হ্যা, আমার প্রতিপালকের শপথ! এটা অবশ্যই সত্য এবং তোমরা এটা ব্যর্থ করতে পারবে না।”(১০:৫৩) দ্বিতীয় হলো এই সূরায়ে সাবার। (আরবী)-এই আয়াতটি। আর তৃতীয় হলো সূরায়ে তাগাবুনের নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবী) অর্থাৎ “কাফিররা ধারণা করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বলঃ নিশ্চয়ই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা নিশ্চয়ই পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”(৬৪:৭) এখানেও কাফিরদের কিয়ামতের অস্বীকৃতির উল্লেখ করে স্বীয় নবী (সঃ)-কে শপথমূলক উত্তর দিতে বলার পর আরো গুরুত্বের সাথে বলছেনঃ সেই আল্লাহ তিনি, যিনি আলেমুল গায়েব, যার অগোচর নয় আকাশ ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তদপেক্ষা ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ কিছু। যে হাড়গুলো পচে সড়ে যায়, মানুষের শরীরের জোড়গুলো যে খুলে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, ওগুলো যায় কোথায় এবং ওগুলোর সংখ্যাই বা কত ইত্যাদি সবকিছুই আল্লাহ জ্ঞাত আছেন। তিনি এগুলো একত্রিত করতে সক্ষম, যেমন তিনি প্রথমে সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি সমস্ত কিছুই জানেন। সবকিছুই তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামত আসার হিকমত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, যারা মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণ তিনি তাদেরকে পুরস্কৃত করবেন। তাদেরই জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও সম্মান জনক রিযক। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর আয়াত সমূহকে ব্যর্থ করবার চেষ্টা করে তাদের জন্যে রয়েছে ভয়ংকর মর্মন্তুদ শাস্তি। সৎকর্মশীল মুমিনরা পুরস্কৃত হবে এবং দুষ্ট ও পাপী কাফিররা হবে শাস্তিপ্রাপ্ত। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতের অধিবাসীরাই সফলকাম।"(৫৯:২০) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদেরকে ভূ-পৃষ্ঠে বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের মত করবো অথবা আমি কি সংযমী ও আল্লাহভীরুদেরকে করবো পাপাসক্তদের মত?”(৩৮:২৮)। এরপর আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের আর একটি হিকমত বর্ণনায় বলেনঃ কিয়ামতের দিন ঈমানদার লোকেরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত হতে এবং পাপীদেরকে শাস্তিপ্রাপ্ত হতে দেখে নিশ্চিত জ্ঞান দ্বারা চাক্ষুষ প্রত্যয় লাভ করবে। ঐ সময় তারা বলে উঠবেঃ আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ সত্য আনয়ন করেছিলেন। আরো বলা হবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দয়াময় আল্লাহ্ তো এরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্য বলেছিলেন।”(৩৬:৫২) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ্ কিতাবে লিপিবদ্ধ ছিল যে, তোমরা পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবস্থান করবে, তাহলে পুনরুত্থান দিবস তো এটাই।”(৩০:৫৬)আল্লাহ পরাক্রমশালী অর্থাৎ তিনি প্রবল পরাক্রান্ত, বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন, মহাশক্তির অধিকারী, ক্ষমতাবান শাসক এবং পূর্ণ বিজয়ী। তার উপর কারো কোন আদেশ চলে না এবং কারো কোন জোরও খাটে না। প্রত্যেক বস্তুই তাঁর কাছে শক্তিহীন ও অপারগ। তাঁর কথা ও কাজ চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী। তাঁর সমুদয় সৃষ্টজীব তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

সাবা 34:5

৩-৬ নং আয়াতের তাফসীর: সম্পূর্ণ কুরআন কারীমে তিনটি আয়াত রয়েছে যেখানে কিয়ামত আগমনের উপর শপথ করা হয়েছে। একটি সূরায়ে ইউনুসের আয়াত। তা হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা তোমার কাছে জানতে চায়ঃ এটা কি সত্য? তুমি বলঃ হ্যা, আমার প্রতিপালকের শপথ! এটা অবশ্যই সত্য এবং তোমরা এটা ব্যর্থ করতে পারবে না।”(১০:৫৩) দ্বিতীয় হলো এই সূরায়ে সাবার। (আরবী)-এই আয়াতটি। আর তৃতীয় হলো সূরায়ে তাগাবুনের নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবী) অর্থাৎ “কাফিররা ধারণা করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বলঃ নিশ্চয়ই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা নিশ্চয়ই পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”(৬৪:৭) এখানেও কাফিরদের কিয়ামতের অস্বীকৃতির উল্লেখ করে স্বীয় নবী (সঃ)-কে শপথমূলক উত্তর দিতে বলার পর আরো গুরুত্বের সাথে বলছেনঃ সেই আল্লাহ তিনি, যিনি আলেমুল গায়েব, যার অগোচর নয় আকাশ ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তদপেক্ষা ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ কিছু। যে হাড়গুলো পচে সড়ে যায়, মানুষের শরীরের জোড়গুলো যে খুলে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, ওগুলো যায় কোথায় এবং ওগুলোর সংখ্যাই বা কত ইত্যাদি সবকিছুই আল্লাহ জ্ঞাত আছেন। তিনি এগুলো একত্রিত করতে সক্ষম, যেমন তিনি প্রথমে সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি সমস্ত কিছুই জানেন। সবকিছুই তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামত আসার হিকমত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, যারা মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণ তিনি তাদেরকে পুরস্কৃত করবেন। তাদেরই জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও সম্মান জনক রিযক। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর আয়াত সমূহকে ব্যর্থ করবার চেষ্টা করে তাদের জন্যে রয়েছে ভয়ংকর মর্মন্তুদ শাস্তি। সৎকর্মশীল মুমিনরা পুরস্কৃত হবে এবং দুষ্ট ও পাপী কাফিররা হবে শাস্তিপ্রাপ্ত। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতের অধিবাসীরাই সফলকাম।"(৫৯:২০) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদেরকে ভূ-পৃষ্ঠে বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের মত করবো অথবা আমি কি সংযমী ও আল্লাহভীরুদেরকে করবো পাপাসক্তদের মত?”(৩৮:২৮)। এরপর আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের আর একটি হিকমত বর্ণনায় বলেনঃ কিয়ামতের দিন ঈমানদার লোকেরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত হতে এবং পাপীদেরকে শাস্তিপ্রাপ্ত হতে দেখে নিশ্চিত জ্ঞান দ্বারা চাক্ষুষ প্রত্যয় লাভ করবে। ঐ সময় তারা বলে উঠবেঃ আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ সত্য আনয়ন করেছিলেন। আরো বলা হবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দয়াময় আল্লাহ্ তো এরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্য বলেছিলেন।”(৩৬:৫২) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ্ কিতাবে লিপিবদ্ধ ছিল যে, তোমরা পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবস্থান করবে, তাহলে পুনরুত্থান দিবস তো এটাই।”(৩০:৫৬)আল্লাহ পরাক্রমশালী অর্থাৎ তিনি প্রবল পরাক্রান্ত, বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন, মহাশক্তির অধিকারী, ক্ষমতাবান শাসক এবং পূর্ণ বিজয়ী। তার উপর কারো কোন আদেশ চলে না এবং কারো কোন জোরও খাটে না। প্রত্যেক বস্তুই তাঁর কাছে শক্তিহীন ও অপারগ। তাঁর কথা ও কাজ চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী। তাঁর সমুদয় সৃষ্টজীব তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

সাবা 34:6

৩-৬ নং আয়াতের তাফসীর: সম্পূর্ণ কুরআন কারীমে তিনটি আয়াত রয়েছে যেখানে কিয়ামত আগমনের উপর শপথ করা হয়েছে। একটি সূরায়ে ইউনুসের আয়াত। তা হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা তোমার কাছে জানতে চায়ঃ এটা কি সত্য? তুমি বলঃ হ্যা, আমার প্রতিপালকের শপথ! এটা অবশ্যই সত্য এবং তোমরা এটা ব্যর্থ করতে পারবে না।”(১০:৫৩) দ্বিতীয় হলো এই সূরায়ে সাবার। (আরবী)-এই আয়াতটি। আর তৃতীয় হলো সূরায়ে তাগাবুনের নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবী) অর্থাৎ “কাফিররা ধারণা করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বলঃ নিশ্চয়ই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা নিশ্চয়ই পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”(৬৪:৭) এখানেও কাফিরদের কিয়ামতের অস্বীকৃতির উল্লেখ করে স্বীয় নবী (সঃ)-কে শপথমূলক উত্তর দিতে বলার পর আরো গুরুত্বের সাথে বলছেনঃ সেই আল্লাহ তিনি, যিনি আলেমুল গায়েব, যার অগোচর নয় আকাশ ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তদপেক্ষা ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ কিছু। যে হাড়গুলো পচে সড়ে যায়, মানুষের শরীরের জোড়গুলো যে খুলে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, ওগুলো যায় কোথায় এবং ওগুলোর সংখ্যাই বা কত ইত্যাদি সবকিছুই আল্লাহ জ্ঞাত আছেন। তিনি এগুলো একত্রিত করতে সক্ষম, যেমন তিনি প্রথমে সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি সমস্ত কিছুই জানেন। সবকিছুই তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামত আসার হিকমত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, যারা মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণ তিনি তাদেরকে পুরস্কৃত করবেন। তাদেরই জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও সম্মান জনক রিযক। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর আয়াত সমূহকে ব্যর্থ করবার চেষ্টা করে তাদের জন্যে রয়েছে ভয়ংকর মর্মন্তুদ শাস্তি। সৎকর্মশীল মুমিনরা পুরস্কৃত হবে এবং দুষ্ট ও পাপী কাফিররা হবে শাস্তিপ্রাপ্ত। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতের অধিবাসীরাই সফলকাম।"(৫৯:২০) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদেরকে ভূ-পৃষ্ঠে বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের মত করবো অথবা আমি কি সংযমী ও আল্লাহভীরুদেরকে করবো পাপাসক্তদের মত?”(৩৮:২৮)। এরপর আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের আর একটি হিকমত বর্ণনায় বলেনঃ কিয়ামতের দিন ঈমানদার লোকেরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত হতে এবং পাপীদেরকে শাস্তিপ্রাপ্ত হতে দেখে নিশ্চিত জ্ঞান দ্বারা চাক্ষুষ প্রত্যয় লাভ করবে। ঐ সময় তারা বলে উঠবেঃ আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ সত্য আনয়ন করেছিলেন। আরো বলা হবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দয়াময় আল্লাহ্ তো এরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্য বলেছিলেন।”(৩৬:৫২) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ্ কিতাবে লিপিবদ্ধ ছিল যে, তোমরা পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবস্থান করবে, তাহলে পুনরুত্থান দিবস তো এটাই।”(৩০:৫৬)আল্লাহ পরাক্রমশালী অর্থাৎ তিনি প্রবল পরাক্রান্ত, বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন, মহাশক্তির অধিকারী, ক্ষমতাবান শাসক এবং পূর্ণ বিজয়ী। তার উপর কারো কোন আদেশ চলে না এবং কারো কোন জোরও খাটে না। প্রত্যেক বস্তুই তাঁর কাছে শক্তিহীন ও অপারগ। তাঁর কথা ও কাজ চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী। তাঁর সমুদয় সৃষ্টজীব তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

সাবা 34:7

৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: কাফির ও বিপথগামী, যারা কিয়ামত সংঘটিত হওয়াকে অস্বীকার করে এবং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উপহাস করে, এখানে তাদেরই খবর আল্লাহ তা'আলা দিচ্ছেন। তারা পরস্পর বলাবলি করতোঃ দেখো, আমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি রয়েছে যে বলে যে, যখন আমরা মরে মাটির সাথে মিশে যাবো ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবো, তার পরেও নাকি আমরা আবার জীবিত হয়ে উঠবো! এ লোকটা সম্পর্কে দুটো কথা বলা যায়। হয়তো সে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ। করছে, না হয় সে উন্মাদ। আল্লাহ তাআলা তাদের এ কথার জবাবে বলেনঃ না, এ কথা নয়। বরং মুহাম্মাদ (সঃ) সত্যবাদী, সৎ, সুপথ প্রাপ্ত ও জ্ঞানী। সে যাহেরী ও বাতেনী জ্ঞানে পরিপক্ক। সে বড়ই দূরদর্শী। কিন্তু এর কি ওষুধ আছে যে কাফিররা মূর্খতা এবং অজ্ঞতামূলক কাজ-কাম করতে রয়েছে? তারা চিন্তা-ভাবনা করে কোন কাজের গভীরতায় পৌঁছবার কোন চেষ্টাই করে না। তারা শুধু অস্বীকার করতেই জানে। তারা যে কোন কথায় যেখানে সেখানে শুধু অস্বীকার করেই থাকে। কেননা, সত্য কথা ও সঠিক পথ তারা ভুলে যায়। সেখান থেকে তারা বহু দূরে ছিটকে পড়ে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা কি তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে, আসমানে ও যমীনে যা আছে তার প্রতি লক্ষ্য করে না? তিনি এতে ক্ষমতাবান যে, এতে আকাশ ও এমন বিস্তৃত যমীন সৃষ্টি করেছেন! না আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে, না যমীন ধ্বসে যাচ্ছে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আকাশকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেছি এবং আমি প্রশস্ততার অধিকারী। আর আমি যমীনকে বিছিয়ে দিয়েছি এবং আমি বিছিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কতই না উত্তম!”(৫১:৪৭-৪৮) তাদের উচিত সামনে ও পিছনে এবং আকাশ ও পৃথিবীর প্রতি লক্ষ্য করা। এগুলোর প্রতি লক্ষ্য করলেই তারা অনুধাবন করতে পারবে যে, যিনি এত বড় সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা এবং ব্যাপক ও অসীম শক্তির অধিকারী, তিনি কি মানুষের ন্যায় ক্ষুদ্র সৃষ্টিকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন না? তিনি তো ইচ্ছা করলে তাদেরকেসহ ভূমি ধ্বসিয়ে দিতে পারেন অথবা তাদের উপর আকাশ খণ্ডের পতন ঘটিয়ে দিতে পারেন! এরূপ অবাধ্য বান্দা কিন্তু এরূপ শাস্তিরই যোগ্য। কিন্তু ক্ষমা করে দেয়া আল্লাহর অভ্যাস। তিনি মানুষকে অবকাশ দিচ্ছেন মাত্র। যার জ্ঞান-বুদ্ধি আছে, দূরদর্শিতা আছে, আছে চিন্তা-ভাবনা করার ক্ষমতা, যার মধ্যে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার যোগ্যতা আছে, যার অন্তর আছে এবং অন্তরে জ্যোতি আছে, সে এসব বিরাট বিরাট নিদর্শন দেখার পর মহাশক্তির অধিকারী ও সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর এ সৃষ্টিতে সন্দেহ পোষণ করতেই পারে না যে, মৃত্যুর পর মানুষ পুনরুজ্জীবিত হবে। আকাশের ন্যায় সামিয়ানা এবং পৃথিবীর ন্যায় বিছানা যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর জন্যে মানুষকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা তো মোটেই কঠিন কাজ নয়! যিনি প্রথমবার হাড়-গোশত সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন, সেগুলো সড়ে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবার পর আবার ঐগুলোকে পুনর্বার সৃষ্টি করতে কেন তিনি সক্ষম হবেন না? যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তিনি কি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সমর্থ নন? হ্যা, নিশ্চয়ই (তিনি সক্ষম)।”(৩৬:৮১) আর একটি আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি তো মানব সৃষ্টি অপেক্ষা বেশী কঠিন। কিন্তু অধিকাংশ লোকই জানে না।” (৪০:৫৭)

সাবা 34:8

৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: কাফির ও বিপথগামী, যারা কিয়ামত সংঘটিত হওয়াকে অস্বীকার করে এবং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উপহাস করে, এখানে তাদেরই খবর আল্লাহ তা'আলা দিচ্ছেন। তারা পরস্পর বলাবলি করতোঃ দেখো, আমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি রয়েছে যে বলে যে, যখন আমরা মরে মাটির সাথে মিশে যাবো ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবো, তার পরেও নাকি আমরা আবার জীবিত হয়ে উঠবো! এ লোকটা সম্পর্কে দুটো কথা বলা যায়। হয়তো সে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ। করছে, না হয় সে উন্মাদ। আল্লাহ তাআলা তাদের এ কথার জবাবে বলেনঃ না, এ কথা নয়। বরং মুহাম্মাদ (সঃ) সত্যবাদী, সৎ, সুপথ প্রাপ্ত ও জ্ঞানী। সে যাহেরী ও বাতেনী জ্ঞানে পরিপক্ক। সে বড়ই দূরদর্শী। কিন্তু এর কি ওষুধ আছে যে কাফিররা মূর্খতা এবং অজ্ঞতামূলক কাজ-কাম করতে রয়েছে? তারা চিন্তা-ভাবনা করে কোন কাজের গভীরতায় পৌঁছবার কোন চেষ্টাই করে না। তারা শুধু অস্বীকার করতেই জানে। তারা যে কোন কথায় যেখানে সেখানে শুধু অস্বীকার করেই থাকে। কেননা, সত্য কথা ও সঠিক পথ তারা ভুলে যায়। সেখান থেকে তারা বহু দূরে ছিটকে পড়ে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা কি তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে, আসমানে ও যমীনে যা আছে তার প্রতি লক্ষ্য করে না? তিনি এতে ক্ষমতাবান যে, এতে আকাশ ও এমন বিস্তৃত যমীন সৃষ্টি করেছেন! না আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে, না যমীন ধ্বসে যাচ্ছে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আকাশকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেছি এবং আমি প্রশস্ততার অধিকারী। আর আমি যমীনকে বিছিয়ে দিয়েছি এবং আমি বিছিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কতই না উত্তম!”(৫১:৪৭-৪৮) তাদের উচিত সামনে ও পিছনে এবং আকাশ ও পৃথিবীর প্রতি লক্ষ্য করা। এগুলোর প্রতি লক্ষ্য করলেই তারা অনুধাবন করতে পারবে যে, যিনি এত বড় সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা এবং ব্যাপক ও অসীম শক্তির অধিকারী, তিনি কি মানুষের ন্যায় ক্ষুদ্র সৃষ্টিকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন না? তিনি তো ইচ্ছা করলে তাদেরকেসহ ভূমি ধ্বসিয়ে দিতে পারেন অথবা তাদের উপর আকাশ খণ্ডের পতন ঘটিয়ে দিতে পারেন! এরূপ অবাধ্য বান্দা কিন্তু এরূপ শাস্তিরই যোগ্য। কিন্তু ক্ষমা করে দেয়া আল্লাহর অভ্যাস। তিনি মানুষকে অবকাশ দিচ্ছেন মাত্র। যার জ্ঞান-বুদ্ধি আছে, দূরদর্শিতা আছে, আছে চিন্তা-ভাবনা করার ক্ষমতা, যার মধ্যে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার যোগ্যতা আছে, যার অন্তর আছে এবং অন্তরে জ্যোতি আছে, সে এসব বিরাট বিরাট নিদর্শন দেখার পর মহাশক্তির অধিকারী ও সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর এ সৃষ্টিতে সন্দেহ পোষণ করতেই পারে না যে, মৃত্যুর পর মানুষ পুনরুজ্জীবিত হবে। আকাশের ন্যায় সামিয়ানা এবং পৃথিবীর ন্যায় বিছানা যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর জন্যে মানুষকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা তো মোটেই কঠিন কাজ নয়! যিনি প্রথমবার হাড়-গোশত সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন, সেগুলো সড়ে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবার পর আবার ঐগুলোকে পুনর্বার সৃষ্টি করতে কেন তিনি সক্ষম হবেন না? যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তিনি কি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সমর্থ নন? হ্যা, নিশ্চয়ই (তিনি সক্ষম)।”(৩৬:৮১) আর একটি আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি তো মানব সৃষ্টি অপেক্ষা বেশী কঠিন। কিন্তু অধিকাংশ লোকই জানে না।” (৪০:৫৭)

সাবা 34:9

৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: কাফির ও বিপথগামী, যারা কিয়ামত সংঘটিত হওয়াকে অস্বীকার করে এবং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উপহাস করে, এখানে তাদেরই খবর আল্লাহ তা'আলা দিচ্ছেন। তারা পরস্পর বলাবলি করতোঃ দেখো, আমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি রয়েছে যে বলে যে, যখন আমরা মরে মাটির সাথে মিশে যাবো ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবো, তার পরেও নাকি আমরা আবার জীবিত হয়ে উঠবো! এ লোকটা সম্পর্কে দুটো কথা বলা যায়। হয়তো সে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ। করছে, না হয় সে উন্মাদ। আল্লাহ তাআলা তাদের এ কথার জবাবে বলেনঃ না, এ কথা নয়। বরং মুহাম্মাদ (সঃ) সত্যবাদী, সৎ, সুপথ প্রাপ্ত ও জ্ঞানী। সে যাহেরী ও বাতেনী জ্ঞানে পরিপক্ক। সে বড়ই দূরদর্শী। কিন্তু এর কি ওষুধ আছে যে কাফিররা মূর্খতা এবং অজ্ঞতামূলক কাজ-কাম করতে রয়েছে? তারা চিন্তা-ভাবনা করে কোন কাজের গভীরতায় পৌঁছবার কোন চেষ্টাই করে না। তারা শুধু অস্বীকার করতেই জানে। তারা যে কোন কথায় যেখানে সেখানে শুধু অস্বীকার করেই থাকে। কেননা, সত্য কথা ও সঠিক পথ তারা ভুলে যায়। সেখান থেকে তারা বহু দূরে ছিটকে পড়ে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা কি তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে, আসমানে ও যমীনে যা আছে তার প্রতি লক্ষ্য করে না? তিনি এতে ক্ষমতাবান যে, এতে আকাশ ও এমন বিস্তৃত যমীন সৃষ্টি করেছেন! না আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে, না যমীন ধ্বসে যাচ্ছে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আকাশকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেছি এবং আমি প্রশস্ততার অধিকারী। আর আমি যমীনকে বিছিয়ে দিয়েছি এবং আমি বিছিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কতই না উত্তম!”(৫১:৪৭-৪৮) তাদের উচিত সামনে ও পিছনে এবং আকাশ ও পৃথিবীর প্রতি লক্ষ্য করা। এগুলোর প্রতি লক্ষ্য করলেই তারা অনুধাবন করতে পারবে যে, যিনি এত বড় সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা এবং ব্যাপক ও অসীম শক্তির অধিকারী, তিনি কি মানুষের ন্যায় ক্ষুদ্র সৃষ্টিকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন না? তিনি তো ইচ্ছা করলে তাদেরকেসহ ভূমি ধ্বসিয়ে দিতে পারেন অথবা তাদের উপর আকাশ খণ্ডের পতন ঘটিয়ে দিতে পারেন! এরূপ অবাধ্য বান্দা কিন্তু এরূপ শাস্তিরই যোগ্য। কিন্তু ক্ষমা করে দেয়া আল্লাহর অভ্যাস। তিনি মানুষকে অবকাশ দিচ্ছেন মাত্র। যার জ্ঞান-বুদ্ধি আছে, দূরদর্শিতা আছে, আছে চিন্তা-ভাবনা করার ক্ষমতা, যার মধ্যে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার যোগ্যতা আছে, যার অন্তর আছে এবং অন্তরে জ্যোতি আছে, সে এসব বিরাট বিরাট নিদর্শন দেখার পর মহাশক্তির অধিকারী ও সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর এ সৃষ্টিতে সন্দেহ পোষণ করতেই পারে না যে, মৃত্যুর পর মানুষ পুনরুজ্জীবিত হবে। আকাশের ন্যায় সামিয়ানা এবং পৃথিবীর ন্যায় বিছানা যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর জন্যে মানুষকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা তো মোটেই কঠিন কাজ নয়! যিনি প্রথমবার হাড়-গোশত সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন, সেগুলো সড়ে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবার পর আবার ঐগুলোকে পুনর্বার সৃষ্টি করতে কেন তিনি সক্ষম হবেন না? যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তিনি কি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সমর্থ নন? হ্যা, নিশ্চয়ই (তিনি সক্ষম)।”(৩৬:৮১) আর একটি আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি তো মানব সৃষ্টি অপেক্ষা বেশী কঠিন। কিন্তু অধিকাংশ লোকই জানে না।” (৪০:৫৭)

সাবা 34:10

১০-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দা ও রাসূল হযরত দাউদ (আঃ)-এর উপর পার্থিব ও পারলৌকিক রহমত নাযিল করেছিলেন। তাকে তিনি নবুওয়াতও দান করেছিলেন, রাজত্বও দিয়েছিলেন, সৈন্য-সামন্তও প্রদান করেছিলেন, শক্তি সামর্থ্যও দিয়েছিলেন এবং আরো একটি মুজিযা দান করেছিলেন। একদিকে হযরত দাউদ (আঃ) মিষ্টি সুরে আল্লাহর একত্ববাদের গান ধরেছেন আর অপরদিকে পক্ষীকুলের তন্ময়তা শুরু হয়ে গেছে। পাহাড় পর্বত সুরে সুর মিলিয়ে আল্লাহর হামদ ও সানা শুরু করে দিয়েছে। পক্ষীকুল ডানা নাড়া-চাড়া দিয়ে তাদের বিভিন্ন প্রকারের মিষ্টি সুরে আল্লাহর একত্ববাদের গীত গাইতে লেগেছে। একটি সহীহ হাদীসে আছে যে, একদা রাত্রে রাসুলল্লাহ (সঃ) হযরত আব। মূসা আশআরী (রাঃ)-এর কুরআন পাঠ শুনে দাঁড়িয়ে যান এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে শুনতে থাকেন। অতঃপর বলেনঃ একে নাগমায়ে দাউদীর (দাউদ আঃ-এর মিষ্টি সুরের গানের) কিছু অংশ দেয়া হয়েছে।”হযরত আবু উসমান নাহূদী (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি আবূ মূসা আশআরী (রাঃ)-এর সুরের চেয়ে মিষ্টি সুর কোন বাদ্যযন্ত্রেও শুনিনি।” হাবশী ভাষায় (আরবী) শব্দের অর্থ হলোঃ ‘তাসবীহ পাঠ কর।' কিন্তু আমাদের মতে এ ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। আরবী ভাষায় এ শব্দটির মধ্যে (আরবী) -এর অর্থ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং পর্বতরাশি ও পক্ষীকুলকে হুকুম দেয়া হচ্ছে যে, তারাও যেন হযরত দাউদ (আঃ)-এর সুরের সাথে সুর মিলিয়ে নেয়।(আরবী)-এর একটি অর্থ দিনে চলা’ও এসে থাকে। যেমন রাত্রে চলার আরবী শব্দ (আরবী) এসে থাকে। কিন্তু এই অর্থটিও এখানে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে অর্থ হলোঃ দাউদ (আঃ)-এর তাসবীহ এর সুরে তোমরাও সুর মিলাও। আরো সুন্দর সুরে আল্লাহ তাআলার হামদ বর্ণনা কর। তাছাড়া তার উপর এ অনুগ্রহও ছিল যে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে লৌহকে নরম করে দিয়েছিলেন। ঐ লৌহকে ভাটিতে দিবার কোন প্রয়োজন হতো না বা হাতুড়ী দিয়ে পিটবারও দরকার হতো না। পিটবার কাজ হাত দিয়েই হয়ে যেতো। তার হাতে লোহাকে সূতার মত মনে হতো। ঐ লোহা দিয়ে তিনি আল্লাহর নির্দেশক্রমে লৌহ-বর্ম তৈরী করতেন। এমন কি একথাও বলা হয়ে থাকে যে, তিনিই সর্বপ্রথম পৃথিবীতে লৌহ নির্মিত যুদ্ধ-পোশাক তৈরী করেছিলেন। দৈনিক তিনি একটি করে বর্ম তৈরী করতেন। ছয় হাজার টাকায় এক একটি বর্ম বিক্রি করতেন। দৈনিক বাড়ীর খরচের জন্যে দু' হাজার টাকা রেখে দিতেন এবং বাকী চার হাজার টাকা লোকদেরকে খাওয়াতে পরাতে ব্যয় করতেন। যেরা বা বর্ম তৈরীর পদ্ধতি স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাঁকে শিখিয়েছিলেন যে, কড়া যেন ঠিকমত দেয়া হয়। ছোট বড় যেন না হয়। মাপ যেন অনুমান মত হয়। কড়াগুলো যেন শক্ত হয়।ইবনে আসাকীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত দাউদ (আঃ) ছদ্মবেশে শহরে বের হতেন। লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। স্থানীয় ও বহিরাগত লোকদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখতেন। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করতেনঃ “দাঊদ (আঃ) কেমন লোক?” প্রত্যেককেই তিনি তাঁর প্রশংসা করতে শুনতেন। কারো নিকট হতে তিনি সংশোধনযোগ্য কোন অপরাধের কথা শুনতে পেতেন না। একদা আল্লাহ একজন ফেরেশতাকে তাঁর কাছে মানুষরূপে প্রেরণ করেন। হযরত দাউদ (আঃ)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়ে গেল। তিনি অন্যান্যদের কাছে যেসব প্রশ্ন করতেন তাঁকেও সেই ভাবে প্রশ্ন করলেন। ফেরেশতা উত্তরে বললেনঃ “দাউদ (আঃ) লোকটি তো ভাল, কিন্তু একটি দোষ যদি তাঁর মধ্যে না থাকতো। তবে তিনি কামেল লোকে পরিণত হতেন।” হযরত দাউদ (আঃ) অত্যন্ত আগ্রহের সাথে পুনরায় মানুষরূপী ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ঐ দোষটি কি?” ফেরেশতা জবাব দিলেনঃ “তিনি নিজের বোঝা মুসলমানদের বায়তুল মালের সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন। তিনি স্বয়ং তা থেকে গ্রহণ করেন এবং তার পরিবারবর্গও তা হতে খাদ্য গ্রহণ করে থাকে।” হযরত দাউদ (আঃ)-এর অন্তরে কথাটি দাগ কেটে দিল। তিনি মনে মনে বললেনঃ “লোকটি সঠিক কথাই বলেছেন।” সাথে সাথে তিনি আল্লাহর দরবারে সিজদায় পড়ে গেলেন ও কেঁদে কেঁদে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলেন। তিনি বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহ্! আপনি আমাকে এমন একটি কাজ শিখিয়ে দিন যার দ্বারা আমি আমার পেট পূর্ণ করতে পারি। কোন শিল্প বা কারিগরি বিদ্যা আমাকে শিখিয়ে দিন যার আয় আমার ও আমার পরিবারবর্গের জন্যে যথেষ্ট হয়।” আল্লাহ্ তা'আলা তার প্রার্থনা ককূল করে নেন এবং তাঁকে একজন শিল্পী বানিয়ে দেন। তাঁর প্রতি রহমত হিসেবে লোহাকে তিনি তার জন্যে নরম করে দেন। দুনিয়ায় সর্বপ্রথম তিনিই যেরা বা লৌহ-বর্ম তৈরী করেছিলেন। তিনি একটি বর্ম তৈরী করে তা বিক্রী করে দিতেন এবং বিক্রয়লব্ধ টাকা তিন ভাগ করতেন। এক ভাগ নিজের ও পরিবারবর্গের ভরণ-পোষণের কাজে ব্যয় করতেন, এক ভাগ দান করতেন এবং এক ভাগ জমা করে রেখে দিতেন, যাতে দ্বিতীয় বর্ম তৈরী না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর বান্দাদেরকে তা থেকে দান-খয়রাত করতে পারেন। হযরত দাউদ (আঃ)-কে আল্লাহ্ তা'আলা সঙ্গীত শিক্ষা দিয়েছিলেন যা অতুলনীয় ছিল। তিনি যখন আল্লাহর কালামের ঝংকার তুলতেন তখন মধুর কণ্ঠের সুর পশু-পাখী, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদি সব কিছুকেই মাতিয়ে তুলতো। তারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আল্লাহর কালাম শুনতে মশগুল হয়ে পড়তো। বর্তমান যুগের সমস্ত বাদ্যযন্ত্র শয়তানী কায়দায় দাউদী সুরের বিকাশ মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর তুলনাবিহীন সুরের অতি নগণ্য অংশ মাত্র।আল্লাহ তাআলা নিজের এসব নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর নির্দেশ দিচ্ছেনঃ এখন তোমাদেরও উচিত সকর্মে আত্মনিয়োগ করা এবং আমার আদেশের বিপরীত কিছু না করা। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, যার এতগুলো ইহসান রয়েছে তার নির্দেশ কি পালিত হবে না? তোমরা যা কিছু কর আমি ওর সম্যক দ্রষ্টা। তোমাদের সব আমল, ছোট হোক, বড় হোক, ভাল হোক বা মন্দই হোক, আমার কাছে প্রকাশমান। কিছুই আমার কাছে গোপন নেই।

সাবা 34:11

১০-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর বান্দা ও রাসূল হযরত দাউদ (আঃ)-এর উপর পার্থিব ও পারলৌকিক রহমত নাযিল করেছিলেন। তাকে তিনি নবুওয়াতও দান করেছিলেন, রাজত্বও দিয়েছিলেন, সৈন্য-সামন্তও প্রদান করেছিলেন, শক্তি সামর্থ্যও দিয়েছিলেন এবং আরো একটি মুজিযা দান করেছিলেন। একদিকে হযরত দাউদ (আঃ) মিষ্টি সুরে আল্লাহর একত্ববাদের গান ধরেছেন আর অপরদিকে পক্ষীকুলের তন্ময়তা শুরু হয়ে গেছে। পাহাড় পর্বত সুরে সুর মিলিয়ে আল্লাহর হামদ ও সানা শুরু করে দিয়েছে। পক্ষীকুল ডানা নাড়া-চাড়া দিয়ে তাদের বিভিন্ন প্রকারের মিষ্টি সুরে আল্লাহর একত্ববাদের গীত গাইতে লেগেছে। একটি সহীহ হাদীসে আছে যে, একদা রাত্রে রাসুলল্লাহ (সঃ) হযরত আব। মূসা আশআরী (রাঃ)-এর কুরআন পাঠ শুনে দাঁড়িয়ে যান এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে শুনতে থাকেন। অতঃপর বলেনঃ একে নাগমায়ে দাউদীর (দাউদ আঃ-এর মিষ্টি সুরের গানের) কিছু অংশ দেয়া হয়েছে।”হযরত আবু উসমান নাহূদী (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি আবূ মূসা আশআরী (রাঃ)-এর সুরের চেয়ে মিষ্টি সুর কোন বাদ্যযন্ত্রেও শুনিনি।” হাবশী ভাষায় (আরবী) শব্দের অর্থ হলোঃ ‘তাসবীহ পাঠ কর।' কিন্তু আমাদের মতে এ ব্যাপারে বহু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। আরবী ভাষায় এ শব্দটির মধ্যে (আরবী) -এর অর্থ বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং পর্বতরাশি ও পক্ষীকুলকে হুকুম দেয়া হচ্ছে যে, তারাও যেন হযরত দাউদ (আঃ)-এর সুরের সাথে সুর মিলিয়ে নেয়।(আরবী)-এর একটি অর্থ দিনে চলা’ও এসে থাকে। যেমন রাত্রে চলার আরবী শব্দ (আরবী) এসে থাকে। কিন্তু এই অর্থটিও এখানে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে অর্থ হলোঃ দাউদ (আঃ)-এর তাসবীহ এর সুরে তোমরাও সুর মিলাও। আরো সুন্দর সুরে আল্লাহ তাআলার হামদ বর্ণনা কর। তাছাড়া তার উপর এ অনুগ্রহও ছিল যে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে লৌহকে নরম করে দিয়েছিলেন। ঐ লৌহকে ভাটিতে দিবার কোন প্রয়োজন হতো না বা হাতুড়ী দিয়ে পিটবারও দরকার হতো না। পিটবার কাজ হাত দিয়েই হয়ে যেতো। তার হাতে লোহাকে সূতার মত মনে হতো। ঐ লোহা দিয়ে তিনি আল্লাহর নির্দেশক্রমে লৌহ-বর্ম তৈরী করতেন। এমন কি একথাও বলা হয়ে থাকে যে, তিনিই সর্বপ্রথম পৃথিবীতে লৌহ নির্মিত যুদ্ধ-পোশাক তৈরী করেছিলেন। দৈনিক তিনি একটি করে বর্ম তৈরী করতেন। ছয় হাজার টাকায় এক একটি বর্ম বিক্রি করতেন। দৈনিক বাড়ীর খরচের জন্যে দু' হাজার টাকা রেখে দিতেন এবং বাকী চার হাজার টাকা লোকদেরকে খাওয়াতে পরাতে ব্যয় করতেন। যেরা বা বর্ম তৈরীর পদ্ধতি স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাঁকে শিখিয়েছিলেন যে, কড়া যেন ঠিকমত দেয়া হয়। ছোট বড় যেন না হয়। মাপ যেন অনুমান মত হয়। কড়াগুলো যেন শক্ত হয়।ইবনে আসাকীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত দাউদ (আঃ) ছদ্মবেশে শহরে বের হতেন। লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। স্থানীয় ও বহিরাগত লোকদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখতেন। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করতেনঃ “দাঊদ (আঃ) কেমন লোক?” প্রত্যেককেই তিনি তাঁর প্রশংসা করতে শুনতেন। কারো নিকট হতে তিনি সংশোধনযোগ্য কোন অপরাধের কথা শুনতে পেতেন না। একদা আল্লাহ একজন ফেরেশতাকে তাঁর কাছে মানুষরূপে প্রেরণ করেন। হযরত দাউদ (আঃ)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়ে গেল। তিনি অন্যান্যদের কাছে যেসব প্রশ্ন করতেন তাঁকেও সেই ভাবে প্রশ্ন করলেন। ফেরেশতা উত্তরে বললেনঃ “দাউদ (আঃ) লোকটি তো ভাল, কিন্তু একটি দোষ যদি তাঁর মধ্যে না থাকতো। তবে তিনি কামেল লোকে পরিণত হতেন।” হযরত দাউদ (আঃ) অত্যন্ত আগ্রহের সাথে পুনরায় মানুষরূপী ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ঐ দোষটি কি?” ফেরেশতা জবাব দিলেনঃ “তিনি নিজের বোঝা মুসলমানদের বায়তুল মালের সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন। তিনি স্বয়ং তা থেকে গ্রহণ করেন এবং তার পরিবারবর্গও তা হতে খাদ্য গ্রহণ করে থাকে।” হযরত দাউদ (আঃ)-এর অন্তরে কথাটি দাগ কেটে দিল। তিনি মনে মনে বললেনঃ “লোকটি সঠিক কথাই বলেছেন।” সাথে সাথে তিনি আল্লাহর দরবারে সিজদায় পড়ে গেলেন ও কেঁদে কেঁদে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলেন। তিনি বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহ্! আপনি আমাকে এমন একটি কাজ শিখিয়ে দিন যার দ্বারা আমি আমার পেট পূর্ণ করতে পারি। কোন শিল্প বা কারিগরি বিদ্যা আমাকে শিখিয়ে দিন যার আয় আমার ও আমার পরিবারবর্গের জন্যে যথেষ্ট হয়।” আল্লাহ্ তা'আলা তার প্রার্থনা ককূল করে নেন এবং তাঁকে একজন শিল্পী বানিয়ে দেন। তাঁর প্রতি রহমত হিসেবে লোহাকে তিনি তার জন্যে নরম করে দেন। দুনিয়ায় সর্বপ্রথম তিনিই যেরা বা লৌহ-বর্ম তৈরী করেছিলেন। তিনি একটি বর্ম তৈরী করে তা বিক্রী করে দিতেন এবং বিক্রয়লব্ধ টাকা তিন ভাগ করতেন। এক ভাগ নিজের ও পরিবারবর্গের ভরণ-পোষণের কাজে ব্যয় করতেন, এক ভাগ দান করতেন এবং এক ভাগ জমা করে রেখে দিতেন, যাতে দ্বিতীয় বর্ম তৈরী না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর বান্দাদেরকে তা থেকে দান-খয়রাত করতে পারেন। হযরত দাউদ (আঃ)-কে আল্লাহ্ তা'আলা সঙ্গীত শিক্ষা দিয়েছিলেন যা অতুলনীয় ছিল। তিনি যখন আল্লাহর কালামের ঝংকার তুলতেন তখন মধুর কণ্ঠের সুর পশু-পাখী, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদি সব কিছুকেই মাতিয়ে তুলতো। তারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আল্লাহর কালাম শুনতে মশগুল হয়ে পড়তো। বর্তমান যুগের সমস্ত বাদ্যযন্ত্র শয়তানী কায়দায় দাউদী সুরের বিকাশ মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর তুলনাবিহীন সুরের অতি নগণ্য অংশ মাত্র।আল্লাহ তাআলা নিজের এসব নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পর নির্দেশ দিচ্ছেনঃ এখন তোমাদেরও উচিত সকর্মে আত্মনিয়োগ করা এবং আমার আদেশের বিপরীত কিছু না করা। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, যার এতগুলো ইহসান রয়েছে তার নির্দেশ কি পালিত হবে না? তোমরা যা কিছু কর আমি ওর সম্যক দ্রষ্টা। তোমাদের সব আমল, ছোট হোক, বড় হোক, ভাল হোক বা মন্দই হোক, আমার কাছে প্রকাশমান। কিছুই আমার কাছে গোপন নেই।

সাবা 34:12

১২-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত দাউদ (আঃ)-এর উপর আল্লাহ তা'আলা যে নিয়ামতরাজি অবতীর্ণ। করেছিলেন সেগুলোর বর্ণনা দেয়ার পর তাঁর পুত্র হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর উপর যেসব নিয়ামত নাযিল করেছিলেন সেগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “আমি বাতাসকে তার অধীন ও অনুগত করে দিয়েছিলাম। সে সকাল হতে হতেই এক মাসের পথ অতিক্রম করতো এবং এই পরিমাণ পথ সন্ধ্যায়ও অতিক্রম করতো। যেমন সিংহাসনে বসে দামেস্ক হতে লোক-লকর ও সাজ-সরঞ্জামসহ উড়ে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ইমতাখারে পৌঁছে যেতেন। দ্রুতগামী অশ্বারোহীর জন্যে এটা এক মাসের পথ ছিল। অনুরূপভাবে সিরিয়া হতে সন্ধ্যায় উড়ে সন্ধ্যাতেই তিনি কাবুলে পৌঁছে যেতেন। মহান আল্লাহ্ তাঁর জন্যে তামাকে পানি করে দিয়ে এর নহর বইয়ে দিয়েছিলেন। যখন যে কাজে যে অবস্থায় লাগাতে ইচ্ছা করতেন, বিনা কষ্টে অতি সহজে সেই কাজে ওটাকে লাগাতে পারতেন। তাঁর সময় থেকেই তাম্র মানুষের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সুদ্দী (রঃ) বলেছেন যে, তিনদিন পর্যন্ত এগুলো বয়ে চলেছিল। মহামহিমান্বিত আল্লাহ জ্বিনদেরকে তার অধীনস্থ ও অনুগত করে দিয়েছিলেন। তিনি যখন কোন কাজ করতে ইচ্ছা করতেন তখন সেই কাজ তাঁর সামনে তাদের দ্বারা করিয়ে নিতেন। কোন জ্বিন কাজে ফাকি দিলে সাথে সাথে তাকে তা জানিয়ে দেয়া হতো। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “জ্বিনদের তিনটি শ্রেণী আছে। একটি হলো পরনির্ভরশীল, দ্বিতীয়টি সর্প এবং তৃতীয় শ্রেণীটি ওরাই যারা সওয়ারীর উপর আরোহণ করে, আবার হেঁটেও চলে।” হাদীসটি অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল।ইবনে নাআম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জ্বিনেরা তিন প্রকার। এক প্রকারের জন্যে আযাব ও সওয়াব আছে। দ্বিতীয়টি আকাশ ও পাতালে উড়ে বেড়ায় এবং তৃতীয় প্রকারের জ্বিনেরা হলো সাপ ও কুকুর। মানুষও তিন প্রকারের। এক প্রকারের মানুষকে আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন, যেদিন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না। দ্বিতীয় প্রকারের মানুষ চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়, বরং ওদের চেয়েও নিকৃষ্ট। তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ আকারে মানুষ বটে, কিন্তু তাদের অন্তর শয়তানীতে পরিপূর্ণ। অর্থাৎ তারা মানবরূপী শয়তান।হযরত হাসান (রঃ) বলেছেন যে, জ্বিন ইবলীসের বংশধর এবং মানুষ হযরত আদম (আঃ)-এর বংশধর। উভয়ের মধ্যেই মুমিনও আছে, কাফিরও আছে। আযাব ও সওয়াব উভয়েই সমানভাবে প্রাপ্ত হবে। উভয়ের মধ্যেই ঈমানদার এবং লী-আল্লাহ্ও আছে আবার উভয়ের মধ্যেই বে-ঈমান এবং শয়তানও আছে।(আরবী) বলা হয় উৎকৃষ্ট ইমারতকে, বাড়ীর উৎকৃষ্টতম অংশকে এবং কোন সমাবেশের সভাপতির আসনকে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ সব ইমারত যেগুলো মহল্লার মধ্যে নিম্নমানের। যহহাক (রঃ)-এর মতে মসজিদের গম্বুজকে (আরবী) বলা হয় এবং বড় বড় ইমারত ও মসজিদকেও বলা হয়। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, বাড়ীর আসবাবপত্রকে (আরবী) বলা হয়।মূর্তিগুলো শীশার তৈরী ছিল। কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন যে, মূর্তিগুলো ছিল শীশা ও মাটি দ্বারা নির্মিত।(আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহুবচন। (আরবী) ঐ হাউজকে বলা হয় যাতে পানি আসতে থাকে। এগুলো পুকুরের মত ছিল। খুব বড় বড় লগন (খাদ্য রাখার বড় পাত্র) ছিল যাতে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর বিরাট বাহিনীর জন্যে এক সাথে। খাদ্য তৈরী করা সম্ভব হয়। আর তার দ্বারা তাদের সামনে খাদ্য হাযির করাও সম্ভব হতে পারে। ডেগগুলো খুব বড় ও ভারি হওয়ার কারণে ওগুলোকে এদিক ওদিক সরানো ও নড়াননা-চড়ানো সম্ভবপর হতো না।তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বলে দিয়েছিলেনঃ হে দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞতার সাথে তোমরা কাজ করতে থাকো।(আরবী) শব্দটি (আরবী) ছাড়াই (আরবী) রূপে ব্যবহৃত হয়েছে অথবা (আরবী) হয়েছে এবং দুটোই হয়েছে উহ্যরূপে। এতে এই ইঙ্গিত রয়েছে যে, শোকর যেমন কথা ও নিয়ত দ্বারা হয়, তেমনি কাজ দ্বারাও হয়। যেমন কবি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার পক্ষ থেকে নিয়ামত তোমাদের তিন প্রকারের উপকার করতে পারে। (অর্থাৎ তিন প্রকারে আমি তোমাদের নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে পারি)। হাতের দ্বারা, মুখের দ্বারা ও লুক্কায়িত অন্তর দ্বারা। এখানে কবিও আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া তিন প্রকারে প্রকাশ করার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন যে, শুকরিয়া তিন প্রকারে আদায় করা চলে। অর্থাৎ কর্মের মাধ্যমে, মৌখিক কথার মাধ্যমে ও অন্তরের মাধ্যমে।হযরত আবু আবদির রহমান (রঃ) বলেন যে, নামাযও শোকর, রোযাও শোকর এবং প্রত্যেক ভাল আমল যা মহিমান্বিত আল্লাহর জন্যে করা হয় সবই শোকর। অর্থাৎ এগুলো সবই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম। আর সর্বোৎকৃষ্ট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হচ্ছে হামদ বা আল্লাহর প্রশংসা-কীর্তন করা।মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হচ্ছে। তাকওয়া ও সৎ আমল। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত দাউদ (আঃ)-এর পরিবার দুই প্রকারেই আল্লাহ তা'আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। অর্থাৎ কথার দ্বারাও এবং কাজের দ্বারাও।হযরত সাবিত বানানী (রঃ) বলেনঃ হযরত দাউদ (আঃ) স্বীয় পরিবার, সন্তানাদি এবং নারীদের উপর সময়ের পাবন্দীর সাথে নফল নামায় এমনভাবে বন্টন করে দিয়েছিলেন যে, সর্বসময়ে কেউ না কেউ নামাযে রত থাকতেন।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার নিকট হযরত দাউদ (আঃ)-এর নামাযই ছিল সবেচেয়ে পছন্দনীয়। তিনি রাত্রির অর্ধাংশ শুইতেন, এক তৃতীয়াংশ দাড়িয়ে নামায পড়তেন এবং এক ষষ্ঠাংশ ঘুমাতেন। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় রোযা ছিল হযরত দাউদ (আঃ)-এর রোষা। তিনি একদিন রোযা অবস্থায় থাকতেন এবং একদিন রোযাহীন বা বেরোযা অবস্থায় থাকতেন। তাঁর মধ্যে আর একটি উত্তম গুণ এই ছিল যে, তিনি ক্ষেত্র হতে কখনো পালাতেন না।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলছেন, (একদা) সুলাইমান ইবনে দাউদ (আঃ)-এর মাতা সুলাইমান (আঃ)-কে বলেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! রাত্রে অধিক ঘুমাবে না। কেননা, রাত্রের অধিক ঘুম কিয়ামতের দিন মানুষকে দরিদ্র করে ছাড়বে।” (এ হাদীসটি আবু আবদিল্লাহ ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এখানে ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত দাউদ (আঃ) সম্পর্কে একটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও বিস্ময়কর আসার বর্ণনা করেছেন। তাতে এও আছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কিরূপে আমি আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো? কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তো আপনার একটি নিয়ামত!” জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যখন তুমি জানতে পারলে যে, সমস্ত নিয়ামত আমারই পক্ষ থেকে আসে তখনই তুমি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ। একটি একটি সত্য ও বাস্তব ব্যাপার সম্পর্কে খবর দান।

সাবা 34:13

১২-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত দাউদ (আঃ)-এর উপর আল্লাহ তা'আলা যে নিয়ামতরাজি অবতীর্ণ। করেছিলেন সেগুলোর বর্ণনা দেয়ার পর তাঁর পুত্র হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর উপর যেসব নিয়ামত নাযিল করেছিলেন সেগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “আমি বাতাসকে তার অধীন ও অনুগত করে দিয়েছিলাম। সে সকাল হতে হতেই এক মাসের পথ অতিক্রম করতো এবং এই পরিমাণ পথ সন্ধ্যায়ও অতিক্রম করতো। যেমন সিংহাসনে বসে দামেস্ক হতে লোক-লকর ও সাজ-সরঞ্জামসহ উড়ে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ইমতাখারে পৌঁছে যেতেন। দ্রুতগামী অশ্বারোহীর জন্যে এটা এক মাসের পথ ছিল। অনুরূপভাবে সিরিয়া হতে সন্ধ্যায় উড়ে সন্ধ্যাতেই তিনি কাবুলে পৌঁছে যেতেন। মহান আল্লাহ্ তাঁর জন্যে তামাকে পানি করে দিয়ে এর নহর বইয়ে দিয়েছিলেন। যখন যে কাজে যে অবস্থায় লাগাতে ইচ্ছা করতেন, বিনা কষ্টে অতি সহজে সেই কাজে ওটাকে লাগাতে পারতেন। তাঁর সময় থেকেই তাম্র মানুষের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সুদ্দী (রঃ) বলেছেন যে, তিনদিন পর্যন্ত এগুলো বয়ে চলেছিল। মহামহিমান্বিত আল্লাহ জ্বিনদেরকে তার অধীনস্থ ও অনুগত করে দিয়েছিলেন। তিনি যখন কোন কাজ করতে ইচ্ছা করতেন তখন সেই কাজ তাঁর সামনে তাদের দ্বারা করিয়ে নিতেন। কোন জ্বিন কাজে ফাকি দিলে সাথে সাথে তাকে তা জানিয়ে দেয়া হতো। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “জ্বিনদের তিনটি শ্রেণী আছে। একটি হলো পরনির্ভরশীল, দ্বিতীয়টি সর্প এবং তৃতীয় শ্রেণীটি ওরাই যারা সওয়ারীর উপর আরোহণ করে, আবার হেঁটেও চলে।” হাদীসটি অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল।ইবনে নাআম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জ্বিনেরা তিন প্রকার। এক প্রকারের জন্যে আযাব ও সওয়াব আছে। দ্বিতীয়টি আকাশ ও পাতালে উড়ে বেড়ায় এবং তৃতীয় প্রকারের জ্বিনেরা হলো সাপ ও কুকুর। মানুষও তিন প্রকারের। এক প্রকারের মানুষকে আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন, যেদিন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না। দ্বিতীয় প্রকারের মানুষ চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়, বরং ওদের চেয়েও নিকৃষ্ট। তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ আকারে মানুষ বটে, কিন্তু তাদের অন্তর শয়তানীতে পরিপূর্ণ। অর্থাৎ তারা মানবরূপী শয়তান।হযরত হাসান (রঃ) বলেছেন যে, জ্বিন ইবলীসের বংশধর এবং মানুষ হযরত আদম (আঃ)-এর বংশধর। উভয়ের মধ্যেই মুমিনও আছে, কাফিরও আছে। আযাব ও সওয়াব উভয়েই সমানভাবে প্রাপ্ত হবে। উভয়ের মধ্যেই ঈমানদার এবং লী-আল্লাহ্ও আছে আবার উভয়ের মধ্যেই বে-ঈমান এবং শয়তানও আছে।(আরবী) বলা হয় উৎকৃষ্ট ইমারতকে, বাড়ীর উৎকৃষ্টতম অংশকে এবং কোন সমাবেশের সভাপতির আসনকে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) হলো ঐ সব ইমারত যেগুলো মহল্লার মধ্যে নিম্নমানের। যহহাক (রঃ)-এর মতে মসজিদের গম্বুজকে (আরবী) বলা হয় এবং বড় বড় ইমারত ও মসজিদকেও বলা হয়। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, বাড়ীর আসবাবপত্রকে (আরবী) বলা হয়।মূর্তিগুলো শীশার তৈরী ছিল। কাতাদাহ (রঃ) বলেছেন যে, মূর্তিগুলো ছিল শীশা ও মাটি দ্বারা নির্মিত।(আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের বহুবচন। (আরবী) ঐ হাউজকে বলা হয় যাতে পানি আসতে থাকে। এগুলো পুকুরের মত ছিল। খুব বড় বড় লগন (খাদ্য রাখার বড় পাত্র) ছিল যাতে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর বিরাট বাহিনীর জন্যে এক সাথে। খাদ্য তৈরী করা সম্ভব হয়। আর তার দ্বারা তাদের সামনে খাদ্য হাযির করাও সম্ভব হতে পারে। ডেগগুলো খুব বড় ও ভারি হওয়ার কারণে ওগুলোকে এদিক ওদিক সরানো ও নড়াননা-চড়ানো সম্ভবপর হতো না।তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বলে দিয়েছিলেনঃ হে দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞতার সাথে তোমরা কাজ করতে থাকো।(আরবী) শব্দটি (আরবী) ছাড়াই (আরবী) রূপে ব্যবহৃত হয়েছে অথবা (আরবী) হয়েছে এবং দুটোই হয়েছে উহ্যরূপে। এতে এই ইঙ্গিত রয়েছে যে, শোকর যেমন কথা ও নিয়ত দ্বারা হয়, তেমনি কাজ দ্বারাও হয়। যেমন কবি বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার পক্ষ থেকে নিয়ামত তোমাদের তিন প্রকারের উপকার করতে পারে। (অর্থাৎ তিন প্রকারে আমি তোমাদের নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে পারি)। হাতের দ্বারা, মুখের দ্বারা ও লুক্কায়িত অন্তর দ্বারা। এখানে কবিও আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া তিন প্রকারে প্রকাশ করার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন যে, শুকরিয়া তিন প্রকারে আদায় করা চলে। অর্থাৎ কর্মের মাধ্যমে, মৌখিক কথার মাধ্যমে ও অন্তরের মাধ্যমে।হযরত আবু আবদির রহমান (রঃ) বলেন যে, নামাযও শোকর, রোযাও শোকর এবং প্রত্যেক ভাল আমল যা মহিমান্বিত আল্লাহর জন্যে করা হয় সবই শোকর। অর্থাৎ এগুলো সবই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম। আর সর্বোৎকৃষ্ট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হচ্ছে হামদ বা আল্লাহর প্রশংসা-কীর্তন করা।মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কারাযী (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হচ্ছে। তাকওয়া ও সৎ আমল। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত দাউদ (আঃ)-এর পরিবার দুই প্রকারেই আল্লাহ তা'আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। অর্থাৎ কথার দ্বারাও এবং কাজের দ্বারাও।হযরত সাবিত বানানী (রঃ) বলেনঃ হযরত দাউদ (আঃ) স্বীয় পরিবার, সন্তানাদি এবং নারীদের উপর সময়ের পাবন্দীর সাথে নফল নামায় এমনভাবে বন্টন করে দিয়েছিলেন যে, সর্বসময়ে কেউ না কেউ নামাযে রত থাকতেন।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলার নিকট হযরত দাউদ (আঃ)-এর নামাযই ছিল সবেচেয়ে পছন্দনীয়। তিনি রাত্রির অর্ধাংশ শুইতেন, এক তৃতীয়াংশ দাড়িয়ে নামায পড়তেন এবং এক ষষ্ঠাংশ ঘুমাতেন। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় রোযা ছিল হযরত দাউদ (আঃ)-এর রোষা। তিনি একদিন রোযা অবস্থায় থাকতেন এবং একদিন রোযাহীন বা বেরোযা অবস্থায় থাকতেন। তাঁর মধ্যে আর একটি উত্তম গুণ এই ছিল যে, তিনি ক্ষেত্র হতে কখনো পালাতেন না।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলছেন, (একদা) সুলাইমান ইবনে দাউদ (আঃ)-এর মাতা সুলাইমান (আঃ)-কে বলেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! রাত্রে অধিক ঘুমাবে না। কেননা, রাত্রের অধিক ঘুম কিয়ামতের দিন মানুষকে দরিদ্র করে ছাড়বে।” (এ হাদীসটি আবু আবদিল্লাহ ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এখানে ইবনে আবি হাতিম (রঃ) হযরত দাউদ (আঃ) সম্পর্কে একটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও বিস্ময়কর আসার বর্ণনা করেছেন। তাতে এও আছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট আরয করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কিরূপে আমি আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো? কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তো আপনার একটি নিয়ামত!” জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যখন তুমি জানতে পারলে যে, সমস্ত নিয়ামত আমারই পক্ষ থেকে আসে তখনই তুমি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ। একটি একটি সত্য ও বাস্তব ব্যাপার সম্পর্কে খবর দান।

সাবা 34:14

এখানে আল্লাহ তাআলা হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর মৃত্যুর অবস্থা বর্ণনা। করছেন। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর মৃত্যুর পরেও তাঁর মৃতদেহটি তাঁর লাঠির উপর ভর করে দাঁড়িয়েই ছিল। তাঁর অধীনস্থ জ্বিনেরা তিনি জীবিতই আছেন ভেবে মাথা নীচু করে বড় বড় কঠিন কাজে লিপ্তই ছিল।হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এভাবেই প্রায় এক বছর কেটে যায়। যে লাঠিটির সাহায্যে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন তাতে যখন উই ধরে ওটাকে খেয়ে শেষ করে দেয় তখন তাঁর মৃতদেহ পড়ে যায়। ঐ সময় তারা তার মৃত্যুর খবর জানতে পারে। তখন শুধু মানুষই নয়, বরং জ্বিনদেরও এ দৃঢ় বিশ্বাস জনিলো যে, তাদের মধ্যে কেউই গায়েবের খবর রাখে না। একটি মুনকার ও গারীব মারফু হাদীসে আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, হযরত সুলাইমান (আঃ) যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন সামনে কোন গাছ দেখতে পেলে জিজ্ঞেস করতেনঃ “তোমার নাম কি? তোমার দ্বারা কি কাজ হয়?” গাছটি তখন তার নাম বলতো এবং কি কাজে ব্যবহৃত হয় সেটাও বলতো। তখন হযরত সুলাইমান (আঃ) ওটাকে ঐ কাজেই ব্যবহার করতেন। একবার তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যান এবং একটি গাছ দেখতে পেয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার নাম কি? উত্তরে গাছটি বলেঃ “আমার নাম খারূব।” আবার তিনি গাছটিকে প্রশ্ন করেনঃ “তুমি কি কাজে লাগবে?” গাছটি জবাব দেয়ঃ “এই ঘরকে উজাড় ও ধ্বংস করার কাজে আমি ব্যবহৃত হবো।” তখন হযরত সুলাইমান (আঃ) প্রার্থনা করলেনঃ “হে আল্লাহ! আমার মৃত্যুর খবর আপনি জ্বিনদেরকে জানতে দিবেন না। যাতে মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, জ্বিনেরা গায়েব জানে না।”অতঃপর তিনি একটি লাঠির উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং জ্বিনদেরকে কঠিন কাজে লাগিয়ে দিলেন। এমতাবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়ে গেল। কিন্তু লাঠির উপর তার মৃতদেহ দাঁড়িয়েই ছিল। জ্বিনেরা তাকে দেখছিল আর ভাবছিল যে, তিনি জীবিতই আছেন। সুতরাং তারা তাদের উপর অর্পিত কাজ করতেই থাকলো। এভাবেই এক বছর কেটে গেল। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর লাঠিতে উঁই ধরলো এবং লাঠিকে খেতে শুরু করলো। এক বছরে ঐ লাঠিকে খেয়ে শেষ করে দিলো। তখন হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর মৃতদেহ মাটিতে পড়ে গেল। তখন মানুষ জানতে পারলো যে, জ্বিনেরা গায়েবের খবর রাখে না। তা না হলে। দীর্ঘ এক বছর তারা এ কঠিন কাজে লিপ্ত থাকতো না।” (এ হাদীসটি তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে কিন্তু হাদীসটি মার’রূপে বর্ণিত হওয়া সঠিক নয়)কোন কোন সাহাবী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, কোন সময় তিন বছর ধরে এবং কোন সময় দু' বছর ধরে মসজিদে কুদসে ইতেকাফে বসে যাওয়া হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর অভ্যাস ছিল। প্রত্যহ সকালে তিনি তাঁর সামনে একটি গাছ দেখতে পেতেন। তিনি গাছটিকে ওর নাম জিজ্ঞেস করতেন এবং ওর। উপকারিতা কি তা জানতে চাইতেন। গাছটি বলতো এবং তিনি ওকে ঐ কাজে ব্যবহার করতেন। অবশেষে একটি গাছ প্রকাশিত হয় এবং ওটা নিজের নাম ‘খারূবাহ' বলে। হযরত সুলাইমান (আঃ) ওকে প্রশ্ন করেনঃ “তোমার উদ্দেশ্য কি?” গাছটি জবাবে বলেঃ “এই মসজিদকে ধ্বংস করার জন্যে আমি প্রকাশিত হয়েছি। হযরত সুলাইমান (আঃ) বুঝতে পারলেন। সুতরাং তিনি গাছটিকে বললেনঃ “আমার জীবিতাবস্থায় তো এই মসজিদ ধ্বংস হবে না। অবশ্যই তুমি আমার মৃত্যু ও ধ্বংসের জন্যেই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি গাছটিকে তার বাগানে লাগিয়ে দিলেন। মসজিদের মধ্যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে তার লাঠির উপর ভর করে তিনি নামায শুরু করে দেন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। কেউই তা জানতে পারলো না। শয়তানরা তার আদেশ অনুযায়ী নিজ নিজ দায়িত্ব প্রতিপালনে লেগে থাকলো। তারা চিন্তা করছিল যে, যদি তাদের কাজে কোন শৈথিল্য প্রকাশ পায় এবং আল্লাহর নবী হযরত সুলাইমান (আঃ) তা দেখে নেন তবে তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিবেন। তারা মেহরাবের সামনে ও পিছনে এসে গেল। তাদের মধ্যে যে একজন বড় দুষ্ট শয়তান ছিল সে বললোঃ “দেখো, এর আগে ও পিছনে ছিদ্র রয়েছে। যদি আমি এখান হতে গিয়ে সেখান হতে বেরিয়ে আসতে পারি তবে তোমরা আমার শক্তির কথা স্বীকার করবে তো?” অতঃপর সে গেল এবং বেরিয়ে আসলো। কিন্তু সে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর কোন শব্দ শুনতে পেলো না। কিন্তু সে তো তাঁর দিকে তাকিয়ে তাঁকে দেখতে পারছিল না। কেননা, তাঁর দিকে তাকালেই সে জ্বলে পুড়ে মরে যেতো। কিন্তু তার মনে সন্দেহের উদ্রেক হলো। সুতরাং সে আরো সাহস দেখালো। সে মসজিদের মধ্যে চলে গেল। দেখলো যে, সেখানে যাওয়ার পরেও সে জুলে পুড়ে গেল না। কাজেই তার সাহস আরো বেড়ে গেল। সে চোখ ভরে তাকে দেখলো। তখন দেখলো যে, তিনি পড়ে আছেন এবং তাঁর মৃত্যু হয়ে গেছে। তখন এসে সে সবাইকে খবর দিলো। লোকেরা আসলো এবং মেহরাব খুলে দেখলো যে, সত্যিই আল্লাহর নবী (আঃ) ইন্তেকাল করেছেন। তারা তাঁকে মসজিদ হতে বের করে আনলো। তার ইন্তেকাল কতদিন পূর্বে হয়েছে তা পরীক্ষা করার জন্যে তারা তাঁর লাঠিকে উঁই এর সামনে রেখে দিলো। একদিন ও একরাত ধরে উঁই লাঠিটিকে যে পরিমাণ খেলো তা দেখে তারা অনুমান করলো যে, এক বছর পূর্বে তার মৃত্যু হয়েছে। সমস্ত লোকের তখন দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিলো যে, জ্বিনেরা যে গায়েবের খবর জানে বলে দাবী করে তা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তা না হলে দীর্ঘ এক বছর ধরে তারা লাঞ্ছনাজক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকতো না। ঐ সময় হতে জ্বিনেরা ঘুণের পোকাকে মাটি ও পানি এনে দেয়। এটা যেন তাদের ঘুণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। তারা পোকাগুলোকে একথাও বলেছিলঃ “তোমরা যদি কিছু খেতে ও পান করতে তবে আমরা ভাল ভাল খাদ্য তোমাদেরকে এনে দিতাম।”কিন্তু এগুলো সব বানী ইসরাঈলের আলেমদের কথা। তবে তাদের এ কথাগুলোর যেটা হক বা সত্য সেটা আমাদের কাছে গ্রহণীয়। আর যা সত্যের বিপরীত তা বর্জনীয়। এগুলোকে না সত্য বলে মেনে নেয়া যায়, না মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেয়া যায়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের। অধিকারী। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) মালাকুল মাউতকে বলে রেখেছিলেনঃ “আমার মৃত্যুর সময়টা আমাকে কিছুকাল পূর্বে জ্ঞাত করাবেন।” তার এ কথা অনুযায়ী মালাকুল মাউত (মৃত্যুর ফেরেশতা) তাঁকে তাঁর মৃত্যুর সময়টা জানিয়ে দিলেন। তখন তিনি দরবিহীন একটি শীশার ঘর নির্মাণ করার জন্যে জ্বিনদেরকে আদেশ করলেন। তাতে তিনি একটি লাঠির উপর ভর করে নামায শুরু করে দিলেন। এটা তার মৃত্যু-ভয়ের কারণে ছিল না। মালাকুল মাউত সময়মত এসে যান এবং তাঁর রূহ কবয করে নিয়ে চলে যান। অতঃপর তার মৃতদেহ এক বছর ধরে লাঠির উপর দাঁড়িয়েই থাকে। জ্বিনেরা তাঁকে জীবিত মনে করে নিজেদের কাজে লেগেই থাকে। কিন্তু যে পোকা তাঁর লাঠিকে খাচ্ছিল, যখন অর্ধেক খেয়ে ফেলেছে তখন ঐ লাঠি আর তার মৃতদেহ ধরে রাখতে সক্ষম হয়নি। সুতরাং তার মৃতদেহ পড়ে যায়। তখন জ্বিনেরা জানতে পারে যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। অতঃপর তারা সেখান থেকে পলায়ন করে। পূর্বযুগীয় গুরুজন হতে আরো বহু কিছু বর্ণিত আছে।

সাবা 34:15

১৫-১৭ নং আয়াতের তাফসীর: সাবা গোত্র ইয়ামনে বসবাস করতো। বিলকীসও এ গোত্রেরই নারী ছিল। এরা বড় নিয়ামত ও শান্তির মধ্যে ছিল। বড়ই সুখ-শান্তিতে তারা জীবন যাপন করছিল। তাদের কাছে আল্লাহর রাসূল আসলেন এবং তাদেরকে আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার উপদেশ দিলেন। তাদেরকে তিনি আল্লাহর একত্বের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের আহ্বান জানালেন। তাদেরকে আল্লাহর ইবাদতের কথা বুঝালেন। কিছু দিন পর্যন্ত তারা এভাবেই চললো। কিন্তু পরে যখন তারা বিরুদ্ধাচরণ করলো, মুখ ফিরিয়ে নিলো এবং আল্লাহর আহকামকে উপেক্ষা করলো তখন তাদের উপর ভীষণ বন্যা নেমে এলো। সারা দেশ, বাগ-বাগিচা, জমি-জমা ইত্যাদি সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেল। এগুলোর বিবরণ হলো নিম্নরূপঃহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সাবা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে যে, সাবা কোন স্ত্রীলোকের নাম না পুরুষ লোকের নাম, না কোন জায়গার নাম? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “সে। একজন পুরুষ লোক ছিল, যার দশটি পুত্র ছিল। এদের মধ্যে ছয়জন ইয়ামনে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল এবং চারজন ছিল সিরিয়ায়। যে ছয়জন ইয়ামনে বসবাস করছিল তাদের নাম হলোঃ মুশৃহাজ, কিনদাহ, ইদ, আশআরী, আনমার এবং হুমায়ের। যারা সিরিয়ায় ছিল তাদের নাম হলো ও লাখাম, জুযাম, আমেলাহ এবং গাসসান।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ফারওয়াহ ইবনে মুসায়েক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আগমন করে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার গোত্রের যারা দ্বীনকে মেনে নিয়ে আগে বেড়ে গিয়েছে, আমি কি তাদেরকে নিয়ে যুদ্ধ করবো ঐ লোকদের সাথে, আমার গোত্রের যারা দ্বীনকে মেনে না নিয়ে পিছনে সরে গেছে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলে অবশ্যই যুদ্ধ করবে।” আমি ফিরে যেতে উদ্যত হলে তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, তুমি তাদেরকে প্রথমে ইসলামের দাওয়াত দেবে। যদি না মানে তখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সাবা কি একটা উপত্যকা, না একটা পাহাড়,কি? জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রায় ঐ কথাই বললেন যা উপরে বর্ণিত হলো। তাতে এও রয়েছে যে, আমার গোত্রকে জীলাহ এবং খাশআ’মও বলা হয়। অন্য একটি দীর্ঘ রিওয়াইয়াতে এই আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে এরই সাথে রয়েছে যে, হযরত ফারওয়াহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অজ্ঞতার যুগে সাবা কওমের খুব মর্যাদা ছিল। এখন আমার ভয় হচ্ছে যে, তারা মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে গেছে। তাহলে আপনার অনুমতি পেলে আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দিয়েছিলেনঃ “তাদের ব্যাপারে এর নির্দেশ দেয়া হয়নি।” তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এই বর্ণনায় গারাবাত রয়েছে। এর দ্বারা তো বুঝা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী আয়াত। অথচ এটা মক্কী সূরা) মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) সাবার বংশ-তালিকা নিম্নরূপ বর্ণনা করেছেনঃআবদে শামস ইবনে ইয়াশজাব ইবনে ইয়া’রব ইবনে কাহতান। তাদেরকে সাবা বলার কারণ এই যে, তারা সর্বপ্রথম আরবে শত্রুদেরকে বন্দী করার প্রথা চালু করেছিল। আর তারাই সর্বপ্রথম যুদ্ধলব্ধ মাল সৈনিকদের মধ্যে বন্টন করে দেয়ার প্রথা চালু করে দেয়। এজন্যে তাদেরকে রায়েশও বলা হয়ে থাকে। আরবরা মালকে রীশ এবং রিয়াশ বলে থাকে।এটাও বর্ণিত আছে যে, তাদের বাদশাহ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর আগমনের পূর্বেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলঃ “আমার পরে এ দেশের মালিক হবেন একজন নবী যিনি হারাম শরীফের খুবই ইজ্জত ও কদর করবেন। তার পর তাঁর খলীফা হবেন যাদের সামনে দুনিয়ার বাদশাহদের মাথা নত হয়ে যাবে। তারপর আমাদের মধ্যেও রাজত্ব আসবে এবং বানু কাহতানের সৎ বাদশাহও হবেন। ঐ নবীর নাম হবে আহমাদ (সঃ)। হায়! আমি যদি তাঁর নবুওয়াতের যুগ পেতাম তবে আমি তাঁর সর্বপ্রকারের খিদমতকে আমার জন্যে গানীমাত মনে করতাম। হে জনমণ্ডলী! শুনে রেখো যে, যখনই ঐ নবী (সঃ)-এর আবির্ভাব ঘটবে তখন তোমাদের অবশ্যকর্তব্য হবে তাঁকে সর্বপ্রকারের সাহায্য করা। যেই তার সাথে মিলিত হবে, আমার পক্ষ থেকে তাঁকে সালাম পৌঁছিয়ে দেয়া হবে তার কর্তব্য।” (এটা হামাদানী (রঃ) কিতাবুল আকলীলে বর্ণনা করেছেন)কাহ্তানের ব্যাপারে তিনটি উক্তির উপর মতানৈক্য রয়েছে। প্রথম উক্তি হলোঃ তিনি ইরাম ইবনে সাম ইবনে নূহ (আঃ)-এর বংশধর। দ্বিতীয় উক্তি হলোঃ তিনি আবির অর্থাৎ হূদ (আঃ)-এর বংশধর। তৃতীয় উক্তি হলোঃ তিনি হযরত ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর বংশধর। এসবগুলো ইমাম হাফিয আবু উমার আব্দুল বার নামরী (রঃ) তাঁর (আরবী) নামক কিতাবে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, তিনি একজন আরবীয় ছিলেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, আসলাম গোত্রের লোক তীরন্দাজী করছিল এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান দিয়ে গমন করেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “হে ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানরা! তোমরা তীরন্দাজী কর। কেননা, তোমাদের পিতাও তীরন্দাজ ছিলেন।”এর দ্বারা জানা যায় যে, সাবার বংশক্রম হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আসলাম আনসারদেরই একটি গোত্র ছিল। আর আনসারদের সবাই ছিলেন গাসসান বংশোদ্ভূত। তাঁরা সবাই ছিলেন ইয়ামানী। সবাই সাবার সন্তান। এরা ঐ সময় মদীনায় আগমন করে যখন বন্যায় তাদের দেশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। একটি দল এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছিল এবং আর একটি দল সিরিয়ায় চলে গিয়েছিল। তাদেরকে গাস্সানী বলার কারণ এই যে, ঐ নামেরই পানি বিশিষ্ট একটি জায়গায় তারা অবস্থান করেছিল। একথাও বলা হয়েছে যে, এ স্থানটি মুসাল্লালের নিকটে অবস্থিত। হযরত হাসসান ইবনে সাবিত (রাঃ)-এর কবিতাতেও এটা পাওয়া যায় যে, গাসসান ছিল একটা কূপের নাম।রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে বলেছেন, সাবার দশ পুত্র ছিল, এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য প্রকৃত বা ঔরষজাত পুত্র নয়। কেননা, তাদের কেউ কেউ দুই দুই বা তিন তিন পুরুষের পরের সন্তানও ছিল। যেমন নসব নামার কিতাবগুলোতে বিদ্যমান রয়েছে। তারা যে সিরিয়া ও ইয়ামনে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল সেটাও বন্যার পরের কথা। কেউ কেউ সেখানে থেকে গেল; আবার কেউ কেউ সেখান হতে এদিক ওদিক চলে গেল। দেয়ালের ঘটনা এই যে, তার দুই দিকে পাহাড় ছিল। সেখান থেকে ঝরণা বেরিয়ে শহরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। এ জন্যেই শহরের এদিকে-ওদিকে অনেক নদী-নালা ছিল। তাদের বাদশাহদের মধ্যে কোন এক বাদশাহ দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থলে একটি শক্ত বাঁধ বেঁধে দিয়েছিল। এ বাঁধের কারণে পানি এদিক-ওদিক চলে যেতো আর এ কারণেই সুন্দর একটি নদী প্রবাহিত হতো। ঐ নদীর দুই দিকে তারা বাগান ও চাষাবাদের জমি তৈরী করেছিল। পানির কারণে সেখানকার মাটি খুবই উর্বরা হয়ে উঠেছিল। সব সময় এটা তরু-তাজা থাকতো। এমন কি হযরত কাতাদা (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, কোন স্ত্রী লোক ডালি নিয়ে গেলে কিছু দূর যেতে না যেতেই ডালিটি ফলে ভর্তি হয়ে যেতো। গাছ হতে যে ফলগুলো আপনা আপনিই পড়তো ওগুলো এতো বেশী হতো যে, হাত দ্বারা ভেঙ্গে দেয়ার কোন প্রয়োজনই হতো না। এ দেয়ালটি মারাবে অবস্থিত ছিল। ওটা সানআ’ হতে তিন মনযিল দূরে ছিল। এটা সাদ্দে মারিব নামে খ্যাত ছিল। আল্লাহর ফজল ও করমে সেখানকার আবহাওয়া এমন সুন্দর ও স্বাস্থ্যের উপযোগী ছিল যে, তথায় মশা, মাছি এবং বিষাক্ত পোকা-মাকড় ছিলই না। এটা এ জন্যেই ছিল যে, যেন তথাকার লোক আল্লাহর একত্ববাদকে মেনে নেয় এবং আন্তরিকতার সাথে তাঁর ইবাদত করে। এগুলোই ছিল আল্লাহ প্রদত্ত নিদর্শন যার বর্ণনা এ আয়াতে দেয়া হয়েছে। পাহাড়ের মাঝে ছিল গ্রাম। গ্রামের এদিকে-ওদিকে ফল-ফুল সুশোভিত বাগান ছিল এবং ছিল নহর ও শস্যক্ষেত্র। মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাদেরকে বলেছিলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রতিপালক প্রদত্ত রিযক ভোগ কর এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। উত্তম এই স্থান এবং ক্ষমাশীল তোমাদের প্রতিপালক।কিন্তু পরে তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করলো এবং তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কথা ভুলে গেল। তারা সূর্য পূজায় মেতে উঠলো। যেমন হৃদহূদ এসে হযরত সুলাইমান (আঃ)-কে খবর দিলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আপনার কাছে সাবা হতে সুনিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি। আমি এক নারীকে দেখলাম তাদের উপর রাজত্ব করছে। তাকে সব কিছু হতে দেয়া হয়েছে এবং তার আছে এক বিরাট সিংহাসন। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম যে, তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। শয়তান তাদের কার্যাবলী তাদের নিকট শোভনীয় করেছে এবং তাদেরকে সৎপথ হতে নিবৃত্ত করেছে, ফলে তারা সৎপথ পায় না।”(২৭:২২-২৪) বর্ণিত আছে যে, বারোজন অথবা তেরোজন নবী তাদের কাছে এসেছিলেন। অবশেষে তাদের দুষ্কর্মের ফল ফলতে শুরু করলো। তারা যে বাঁধটি বেঁধে রেখেছিল সেটা ইঁদুরে ভিতর হতে কেটে ফাঁপা করে দিলো। বর্ষার সময় সেটা ভেঙ্গে গেল। পানি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লো। এরই সাথে সাথে নদীর পানি, ঝরণার পানি, বর্ষার পানি, নালার পানি সব একত্রিত ও মিলিত হয়ে গেল। তাদের ঘর-বাড়ী, বাগ-বাগিচা, জমি-জমা ইত্যাদি সবই ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এখন হাত কামড়াতে লাগলো। তাদের সর্ব প্রকারের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। আরো বিপদ দেখা দিলো তাদের বাগানে কোন ফলবান বৃক্ষ জন্মে না। মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ তাদেরকে যে সুন্দর দু’টি উদ্যান দিয়েছিলেন, ও দু’টিকে পরিবর্তন করে দিয়ে তিনি এমন দু'টি উদ্যান দিলেন যাতে উৎপন্ন হয় শুধু বিস্বাদ ফল-মূল, ঝাউগাছ এবং কুল গাছ। এটা ছিল তাদের কুফরী, শিরক, হঠকারিতা ও অহংকারের প্রতিফল যে, তারা আল্লাহর নিয়ামতগুলোকে হারিয়ে ফেললো এবং তার গযবে জড়িয়ে পড়লো। আল্লাহ তা'আলা কৃতঘ্ন ছাড়া অন্য কাউকেও এমন শাস্তি দেন না ।হযরত আবু যাখীরা (রঃ) বলেন, পাপসমূহের বিনিময় এটাই হয় যে, ইবাদতে অলসতা আসে, আয়-উপার্জন কমে যায়, অভাব-অনটন বেড়ে যায়, সবকিছুর স্বাদ উঠে যায়, কোন শান্তির সন্ধান পাওয়া যায় না, বরং সেখানে অন্য কোন প্রতিবন্ধকতা এসে যায় এবং সমস্ত আশা নৈরাশ্যে পরিণত হয়।

সাবা 34:16

১৫-১৭ নং আয়াতের তাফসীর: সাবা গোত্র ইয়ামনে বসবাস করতো। বিলকীসও এ গোত্রেরই নারী ছিল। এরা বড় নিয়ামত ও শান্তির মধ্যে ছিল। বড়ই সুখ-শান্তিতে তারা জীবন যাপন করছিল। তাদের কাছে আল্লাহর রাসূল আসলেন এবং তাদেরকে আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার উপদেশ দিলেন। তাদেরকে তিনি আল্লাহর একত্বের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের আহ্বান জানালেন। তাদেরকে আল্লাহর ইবাদতের কথা বুঝালেন। কিছু দিন পর্যন্ত তারা এভাবেই চললো। কিন্তু পরে যখন তারা বিরুদ্ধাচরণ করলো, মুখ ফিরিয়ে নিলো এবং আল্লাহর আহকামকে উপেক্ষা করলো তখন তাদের উপর ভীষণ বন্যা নেমে এলো। সারা দেশ, বাগ-বাগিচা, জমি-জমা ইত্যাদি সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেল। এগুলোর বিবরণ হলো নিম্নরূপঃহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সাবা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে যে, সাবা কোন স্ত্রীলোকের নাম না পুরুষ লোকের নাম, না কোন জায়গার নাম? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “সে। একজন পুরুষ লোক ছিল, যার দশটি পুত্র ছিল। এদের মধ্যে ছয়জন ইয়ামনে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল এবং চারজন ছিল সিরিয়ায়। যে ছয়জন ইয়ামনে বসবাস করছিল তাদের নাম হলোঃ মুশৃহাজ, কিনদাহ, ইদ, আশআরী, আনমার এবং হুমায়ের। যারা সিরিয়ায় ছিল তাদের নাম হলো ও লাখাম, জুযাম, আমেলাহ এবং গাসসান।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ফারওয়াহ ইবনে মুসায়েক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আগমন করে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার গোত্রের যারা দ্বীনকে মেনে নিয়ে আগে বেড়ে গিয়েছে, আমি কি তাদেরকে নিয়ে যুদ্ধ করবো ঐ লোকদের সাথে, আমার গোত্রের যারা দ্বীনকে মেনে না নিয়ে পিছনে সরে গেছে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলে অবশ্যই যুদ্ধ করবে।” আমি ফিরে যেতে উদ্যত হলে তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, তুমি তাদেরকে প্রথমে ইসলামের দাওয়াত দেবে। যদি না মানে তখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সাবা কি একটা উপত্যকা, না একটা পাহাড়,কি? জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রায় ঐ কথাই বললেন যা উপরে বর্ণিত হলো। তাতে এও রয়েছে যে, আমার গোত্রকে জীলাহ এবং খাশআ’মও বলা হয়। অন্য একটি দীর্ঘ রিওয়াইয়াতে এই আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে এরই সাথে রয়েছে যে, হযরত ফারওয়াহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অজ্ঞতার যুগে সাবা কওমের খুব মর্যাদা ছিল। এখন আমার ভয় হচ্ছে যে, তারা মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে গেছে। তাহলে আপনার অনুমতি পেলে আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দিয়েছিলেনঃ “তাদের ব্যাপারে এর নির্দেশ দেয়া হয়নি।” তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এই বর্ণনায় গারাবাত রয়েছে। এর দ্বারা তো বুঝা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী আয়াত। অথচ এটা মক্কী সূরা) মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) সাবার বংশ-তালিকা নিম্নরূপ বর্ণনা করেছেনঃআবদে শামস ইবনে ইয়াশজাব ইবনে ইয়া’রব ইবনে কাহতান। তাদেরকে সাবা বলার কারণ এই যে, তারা সর্বপ্রথম আরবে শত্রুদেরকে বন্দী করার প্রথা চালু করেছিল। আর তারাই সর্বপ্রথম যুদ্ধলব্ধ মাল সৈনিকদের মধ্যে বন্টন করে দেয়ার প্রথা চালু করে দেয়। এজন্যে তাদেরকে রায়েশও বলা হয়ে থাকে। আরবরা মালকে রীশ এবং রিয়াশ বলে থাকে।এটাও বর্ণিত আছে যে, তাদের বাদশাহ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর আগমনের পূর্বেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলঃ “আমার পরে এ দেশের মালিক হবেন একজন নবী যিনি হারাম শরীফের খুবই ইজ্জত ও কদর করবেন। তার পর তাঁর খলীফা হবেন যাদের সামনে দুনিয়ার বাদশাহদের মাথা নত হয়ে যাবে। তারপর আমাদের মধ্যেও রাজত্ব আসবে এবং বানু কাহতানের সৎ বাদশাহও হবেন। ঐ নবীর নাম হবে আহমাদ (সঃ)। হায়! আমি যদি তাঁর নবুওয়াতের যুগ পেতাম তবে আমি তাঁর সর্বপ্রকারের খিদমতকে আমার জন্যে গানীমাত মনে করতাম। হে জনমণ্ডলী! শুনে রেখো যে, যখনই ঐ নবী (সঃ)-এর আবির্ভাব ঘটবে তখন তোমাদের অবশ্যকর্তব্য হবে তাঁকে সর্বপ্রকারের সাহায্য করা। যেই তার সাথে মিলিত হবে, আমার পক্ষ থেকে তাঁকে সালাম পৌঁছিয়ে দেয়া হবে তার কর্তব্য।” (এটা হামাদানী (রঃ) কিতাবুল আকলীলে বর্ণনা করেছেন)কাহ্তানের ব্যাপারে তিনটি উক্তির উপর মতানৈক্য রয়েছে। প্রথম উক্তি হলোঃ তিনি ইরাম ইবনে সাম ইবনে নূহ (আঃ)-এর বংশধর। দ্বিতীয় উক্তি হলোঃ তিনি আবির অর্থাৎ হূদ (আঃ)-এর বংশধর। তৃতীয় উক্তি হলোঃ তিনি হযরত ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর বংশধর। এসবগুলো ইমাম হাফিয আবু উমার আব্দুল বার নামরী (রঃ) তাঁর (আরবী) নামক কিতাবে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, তিনি একজন আরবীয় ছিলেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, আসলাম গোত্রের লোক তীরন্দাজী করছিল এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান দিয়ে গমন করেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “হে ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানরা! তোমরা তীরন্দাজী কর। কেননা, তোমাদের পিতাও তীরন্দাজ ছিলেন।”এর দ্বারা জানা যায় যে, সাবার বংশক্রম হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আসলাম আনসারদেরই একটি গোত্র ছিল। আর আনসারদের সবাই ছিলেন গাসসান বংশোদ্ভূত। তাঁরা সবাই ছিলেন ইয়ামানী। সবাই সাবার সন্তান। এরা ঐ সময় মদীনায় আগমন করে যখন বন্যায় তাদের দেশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। একটি দল এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছিল এবং আর একটি দল সিরিয়ায় চলে গিয়েছিল। তাদেরকে গাস্সানী বলার কারণ এই যে, ঐ নামেরই পানি বিশিষ্ট একটি জায়গায় তারা অবস্থান করেছিল। একথাও বলা হয়েছে যে, এ স্থানটি মুসাল্লালের নিকটে অবস্থিত। হযরত হাসসান ইবনে সাবিত (রাঃ)-এর কবিতাতেও এটা পাওয়া যায় যে, গাসসান ছিল একটা কূপের নাম।রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে বলেছেন, সাবার দশ পুত্র ছিল, এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য প্রকৃত বা ঔরষজাত পুত্র নয়। কেননা, তাদের কেউ কেউ দুই দুই বা তিন তিন পুরুষের পরের সন্তানও ছিল। যেমন নসব নামার কিতাবগুলোতে বিদ্যমান রয়েছে। তারা যে সিরিয়া ও ইয়ামনে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল সেটাও বন্যার পরের কথা। কেউ কেউ সেখানে থেকে গেল; আবার কেউ কেউ সেখান হতে এদিক ওদিক চলে গেল। দেয়ালের ঘটনা এই যে, তার দুই দিকে পাহাড় ছিল। সেখান থেকে ঝরণা বেরিয়ে শহরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। এ জন্যেই শহরের এদিকে-ওদিকে অনেক নদী-নালা ছিল। তাদের বাদশাহদের মধ্যে কোন এক বাদশাহ দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থলে একটি শক্ত বাঁধ বেঁধে দিয়েছিল। এ বাঁধের কারণে পানি এদিক-ওদিক চলে যেতো আর এ কারণেই সুন্দর একটি নদী প্রবাহিত হতো। ঐ নদীর দুই দিকে তারা বাগান ও চাষাবাদের জমি তৈরী করেছিল। পানির কারণে সেখানকার মাটি খুবই উর্বরা হয়ে উঠেছিল। সব সময় এটা তরু-তাজা থাকতো। এমন কি হযরত কাতাদা (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, কোন স্ত্রী লোক ডালি নিয়ে গেলে কিছু দূর যেতে না যেতেই ডালিটি ফলে ভর্তি হয়ে যেতো। গাছ হতে যে ফলগুলো আপনা আপনিই পড়তো ওগুলো এতো বেশী হতো যে, হাত দ্বারা ভেঙ্গে দেয়ার কোন প্রয়োজনই হতো না। এ দেয়ালটি মারাবে অবস্থিত ছিল। ওটা সানআ’ হতে তিন মনযিল দূরে ছিল। এটা সাদ্দে মারিব নামে খ্যাত ছিল। আল্লাহর ফজল ও করমে সেখানকার আবহাওয়া এমন সুন্দর ও স্বাস্থ্যের উপযোগী ছিল যে, তথায় মশা, মাছি এবং বিষাক্ত পোকা-মাকড় ছিলই না। এটা এ জন্যেই ছিল যে, যেন তথাকার লোক আল্লাহর একত্ববাদকে মেনে নেয় এবং আন্তরিকতার সাথে তাঁর ইবাদত করে। এগুলোই ছিল আল্লাহ প্রদত্ত নিদর্শন যার বর্ণনা এ আয়াতে দেয়া হয়েছে। পাহাড়ের মাঝে ছিল গ্রাম। গ্রামের এদিকে-ওদিকে ফল-ফুল সুশোভিত বাগান ছিল এবং ছিল নহর ও শস্যক্ষেত্র। মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাদেরকে বলেছিলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রতিপালক প্রদত্ত রিযক ভোগ কর এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। উত্তম এই স্থান এবং ক্ষমাশীল তোমাদের প্রতিপালক।কিন্তু পরে তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করলো এবং তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কথা ভুলে গেল। তারা সূর্য পূজায় মেতে উঠলো। যেমন হৃদহূদ এসে হযরত সুলাইমান (আঃ)-কে খবর দিলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আপনার কাছে সাবা হতে সুনিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি। আমি এক নারীকে দেখলাম তাদের উপর রাজত্ব করছে। তাকে সব কিছু হতে দেয়া হয়েছে এবং তার আছে এক বিরাট সিংহাসন। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম যে, তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। শয়তান তাদের কার্যাবলী তাদের নিকট শোভনীয় করেছে এবং তাদেরকে সৎপথ হতে নিবৃত্ত করেছে, ফলে তারা সৎপথ পায় না।”(২৭:২২-২৪) বর্ণিত আছে যে, বারোজন অথবা তেরোজন নবী তাদের কাছে এসেছিলেন। অবশেষে তাদের দুষ্কর্মের ফল ফলতে শুরু করলো। তারা যে বাঁধটি বেঁধে রেখেছিল সেটা ইঁদুরে ভিতর হতে কেটে ফাঁপা করে দিলো। বর্ষার সময় সেটা ভেঙ্গে গেল। পানি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লো। এরই সাথে সাথে নদীর পানি, ঝরণার পানি, বর্ষার পানি, নালার পানি সব একত্রিত ও মিলিত হয়ে গেল। তাদের ঘর-বাড়ী, বাগ-বাগিচা, জমি-জমা ইত্যাদি সবই ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এখন হাত কামড়াতে লাগলো। তাদের সর্ব প্রকারের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। আরো বিপদ দেখা দিলো তাদের বাগানে কোন ফলবান বৃক্ষ জন্মে না। মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ তাদেরকে যে সুন্দর দু’টি উদ্যান দিয়েছিলেন, ও দু’টিকে পরিবর্তন করে দিয়ে তিনি এমন দু'টি উদ্যান দিলেন যাতে উৎপন্ন হয় শুধু বিস্বাদ ফল-মূল, ঝাউগাছ এবং কুল গাছ। এটা ছিল তাদের কুফরী, শিরক, হঠকারিতা ও অহংকারের প্রতিফল যে, তারা আল্লাহর নিয়ামতগুলোকে হারিয়ে ফেললো এবং তার গযবে জড়িয়ে পড়লো। আল্লাহ তা'আলা কৃতঘ্ন ছাড়া অন্য কাউকেও এমন শাস্তি দেন না ।হযরত আবু যাখীরা (রঃ) বলেন, পাপসমূহের বিনিময় এটাই হয় যে, ইবাদতে অলসতা আসে, আয়-উপার্জন কমে যায়, অভাব-অনটন বেড়ে যায়, সবকিছুর স্বাদ উঠে যায়, কোন শান্তির সন্ধান পাওয়া যায় না, বরং সেখানে অন্য কোন প্রতিবন্ধকতা এসে যায় এবং সমস্ত আশা নৈরাশ্যে পরিণত হয়।

সাবা 34:17

১৫-১৭ নং আয়াতের তাফসীর: সাবা গোত্র ইয়ামনে বসবাস করতো। বিলকীসও এ গোত্রেরই নারী ছিল। এরা বড় নিয়ামত ও শান্তির মধ্যে ছিল। বড়ই সুখ-শান্তিতে তারা জীবন যাপন করছিল। তাদের কাছে আল্লাহর রাসূল আসলেন এবং তাদেরকে আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার উপদেশ দিলেন। তাদেরকে তিনি আল্লাহর একত্বের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের আহ্বান জানালেন। তাদেরকে আল্লাহর ইবাদতের কথা বুঝালেন। কিছু দিন পর্যন্ত তারা এভাবেই চললো। কিন্তু পরে যখন তারা বিরুদ্ধাচরণ করলো, মুখ ফিরিয়ে নিলো এবং আল্লাহর আহকামকে উপেক্ষা করলো তখন তাদের উপর ভীষণ বন্যা নেমে এলো। সারা দেশ, বাগ-বাগিচা, জমি-জমা ইত্যাদি সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেল। এগুলোর বিবরণ হলো নিম্নরূপঃহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সাবা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে যে, সাবা কোন স্ত্রীলোকের নাম না পুরুষ লোকের নাম, না কোন জায়গার নাম? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “সে। একজন পুরুষ লোক ছিল, যার দশটি পুত্র ছিল। এদের মধ্যে ছয়জন ইয়ামনে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল এবং চারজন ছিল সিরিয়ায়। যে ছয়জন ইয়ামনে বসবাস করছিল তাদের নাম হলোঃ মুশৃহাজ, কিনদাহ, ইদ, আশআরী, আনমার এবং হুমায়ের। যারা সিরিয়ায় ছিল তাদের নাম হলো ও লাখাম, জুযাম, আমেলাহ এবং গাসসান।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ফারওয়াহ ইবনে মুসায়েক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আগমন করে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার গোত্রের যারা দ্বীনকে মেনে নিয়ে আগে বেড়ে গিয়েছে, আমি কি তাদেরকে নিয়ে যুদ্ধ করবো ঐ লোকদের সাথে, আমার গোত্রের যারা দ্বীনকে মেনে না নিয়ে পিছনে সরে গেছে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলে অবশ্যই যুদ্ধ করবে।” আমি ফিরে যেতে উদ্যত হলে তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, তুমি তাদেরকে প্রথমে ইসলামের দাওয়াত দেবে। যদি না মানে তখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সাবা কি একটা উপত্যকা, না একটা পাহাড়,কি? জবাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রায় ঐ কথাই বললেন যা উপরে বর্ণিত হলো। তাতে এও রয়েছে যে, আমার গোত্রকে জীলাহ এবং খাশআ’মও বলা হয়। অন্য একটি দীর্ঘ রিওয়াইয়াতে এই আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে এরই সাথে রয়েছে যে, হযরত ফারওয়াহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অজ্ঞতার যুগে সাবা কওমের খুব মর্যাদা ছিল। এখন আমার ভয় হচ্ছে যে, তারা মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে গেছে। তাহলে আপনার অনুমতি পেলে আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দিয়েছিলেনঃ “তাদের ব্যাপারে এর নির্দেশ দেয়া হয়নি।” তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এই বর্ণনায় গারাবাত রয়েছে। এর দ্বারা তো বুঝা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী আয়াত। অথচ এটা মক্কী সূরা) মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) সাবার বংশ-তালিকা নিম্নরূপ বর্ণনা করেছেনঃআবদে শামস ইবনে ইয়াশজাব ইবনে ইয়া’রব ইবনে কাহতান। তাদেরকে সাবা বলার কারণ এই যে, তারা সর্বপ্রথম আরবে শত্রুদেরকে বন্দী করার প্রথা চালু করেছিল। আর তারাই সর্বপ্রথম যুদ্ধলব্ধ মাল সৈনিকদের মধ্যে বন্টন করে দেয়ার প্রথা চালু করে দেয়। এজন্যে তাদেরকে রায়েশও বলা হয়ে থাকে। আরবরা মালকে রীশ এবং রিয়াশ বলে থাকে।এটাও বর্ণিত আছে যে, তাদের বাদশাহ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর আগমনের পূর্বেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলঃ “আমার পরে এ দেশের মালিক হবেন একজন নবী যিনি হারাম শরীফের খুবই ইজ্জত ও কদর করবেন। তার পর তাঁর খলীফা হবেন যাদের সামনে দুনিয়ার বাদশাহদের মাথা নত হয়ে যাবে। তারপর আমাদের মধ্যেও রাজত্ব আসবে এবং বানু কাহতানের সৎ বাদশাহও হবেন। ঐ নবীর নাম হবে আহমাদ (সঃ)। হায়! আমি যদি তাঁর নবুওয়াতের যুগ পেতাম তবে আমি তাঁর সর্বপ্রকারের খিদমতকে আমার জন্যে গানীমাত মনে করতাম। হে জনমণ্ডলী! শুনে রেখো যে, যখনই ঐ নবী (সঃ)-এর আবির্ভাব ঘটবে তখন তোমাদের অবশ্যকর্তব্য হবে তাঁকে সর্বপ্রকারের সাহায্য করা। যেই তার সাথে মিলিত হবে, আমার পক্ষ থেকে তাঁকে সালাম পৌঁছিয়ে দেয়া হবে তার কর্তব্য।” (এটা হামাদানী (রঃ) কিতাবুল আকলীলে বর্ণনা করেছেন)কাহ্তানের ব্যাপারে তিনটি উক্তির উপর মতানৈক্য রয়েছে। প্রথম উক্তি হলোঃ তিনি ইরাম ইবনে সাম ইবনে নূহ (আঃ)-এর বংশধর। দ্বিতীয় উক্তি হলোঃ তিনি আবির অর্থাৎ হূদ (আঃ)-এর বংশধর। তৃতীয় উক্তি হলোঃ তিনি হযরত ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম খলীল (আঃ)-এর বংশধর। এসবগুলো ইমাম হাফিয আবু উমার আব্দুল বার নামরী (রঃ) তাঁর (আরবী) নামক কিতাবে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।আর একটি বর্ণনায় আছে যে, তিনি একজন আরবীয় ছিলেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, আসলাম গোত্রের লোক তীরন্দাজী করছিল এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান দিয়ে গমন করেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “হে ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানরা! তোমরা তীরন্দাজী কর। কেননা, তোমাদের পিতাও তীরন্দাজ ছিলেন।”এর দ্বারা জানা যায় যে, সাবার বংশক্রম হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আসলাম আনসারদেরই একটি গোত্র ছিল। আর আনসারদের সবাই ছিলেন গাসসান বংশোদ্ভূত। তাঁরা সবাই ছিলেন ইয়ামানী। সবাই সাবার সন্তান। এরা ঐ সময় মদীনায় আগমন করে যখন বন্যায় তাদের দেশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। একটি দল এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছিল এবং আর একটি দল সিরিয়ায় চলে গিয়েছিল। তাদেরকে গাস্সানী বলার কারণ এই যে, ঐ নামেরই পানি বিশিষ্ট একটি জায়গায় তারা অবস্থান করেছিল। একথাও বলা হয়েছে যে, এ স্থানটি মুসাল্লালের নিকটে অবস্থিত। হযরত হাসসান ইবনে সাবিত (রাঃ)-এর কবিতাতেও এটা পাওয়া যায় যে, গাসসান ছিল একটা কূপের নাম।রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে বলেছেন, সাবার দশ পুত্র ছিল, এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য প্রকৃত বা ঔরষজাত পুত্র নয়। কেননা, তাদের কেউ কেউ দুই দুই বা তিন তিন পুরুষের পরের সন্তানও ছিল। যেমন নসব নামার কিতাবগুলোতে বিদ্যমান রয়েছে। তারা যে সিরিয়া ও ইয়ামনে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল সেটাও বন্যার পরের কথা। কেউ কেউ সেখানে থেকে গেল; আবার কেউ কেউ সেখান হতে এদিক ওদিক চলে গেল। দেয়ালের ঘটনা এই যে, তার দুই দিকে পাহাড় ছিল। সেখান থেকে ঝরণা বেরিয়ে শহরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। এ জন্যেই শহরের এদিকে-ওদিকে অনেক নদী-নালা ছিল। তাদের বাদশাহদের মধ্যে কোন এক বাদশাহ দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থলে একটি শক্ত বাঁধ বেঁধে দিয়েছিল। এ বাঁধের কারণে পানি এদিক-ওদিক চলে যেতো আর এ কারণেই সুন্দর একটি নদী প্রবাহিত হতো। ঐ নদীর দুই দিকে তারা বাগান ও চাষাবাদের জমি তৈরী করেছিল। পানির কারণে সেখানকার মাটি খুবই উর্বরা হয়ে উঠেছিল। সব সময় এটা তরু-তাজা থাকতো। এমন কি হযরত কাতাদা (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, কোন স্ত্রী লোক ডালি নিয়ে গেলে কিছু দূর যেতে না যেতেই ডালিটি ফলে ভর্তি হয়ে যেতো। গাছ হতে যে ফলগুলো আপনা আপনিই পড়তো ওগুলো এতো বেশী হতো যে, হাত দ্বারা ভেঙ্গে দেয়ার কোন প্রয়োজনই হতো না। এ দেয়ালটি মারাবে অবস্থিত ছিল। ওটা সানআ’ হতে তিন মনযিল দূরে ছিল। এটা সাদ্দে মারিব নামে খ্যাত ছিল। আল্লাহর ফজল ও করমে সেখানকার আবহাওয়া এমন সুন্দর ও স্বাস্থ্যের উপযোগী ছিল যে, তথায় মশা, মাছি এবং বিষাক্ত পোকা-মাকড় ছিলই না। এটা এ জন্যেই ছিল যে, যেন তথাকার লোক আল্লাহর একত্ববাদকে মেনে নেয় এবং আন্তরিকতার সাথে তাঁর ইবাদত করে। এগুলোই ছিল আল্লাহ প্রদত্ত নিদর্শন যার বর্ণনা এ আয়াতে দেয়া হয়েছে। পাহাড়ের মাঝে ছিল গ্রাম। গ্রামের এদিকে-ওদিকে ফল-ফুল সুশোভিত বাগান ছিল এবং ছিল নহর ও শস্যক্ষেত্র। মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাদেরকে বলেছিলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রতিপালক প্রদত্ত রিযক ভোগ কর এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। উত্তম এই স্থান এবং ক্ষমাশীল তোমাদের প্রতিপালক।কিন্তু পরে তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করলো এবং তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কথা ভুলে গেল। তারা সূর্য পূজায় মেতে উঠলো। যেমন হৃদহূদ এসে হযরত সুলাইমান (আঃ)-কে খবর দিলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আপনার কাছে সাবা হতে সুনিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি। আমি এক নারীকে দেখলাম তাদের উপর রাজত্ব করছে। তাকে সব কিছু হতে দেয়া হয়েছে এবং তার আছে এক বিরাট সিংহাসন। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম যে, তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। শয়তান তাদের কার্যাবলী তাদের নিকট শোভনীয় করেছে এবং তাদেরকে সৎপথ হতে নিবৃত্ত করেছে, ফলে তারা সৎপথ পায় না।”(২৭:২২-২৪) বর্ণিত আছে যে, বারোজন অথবা তেরোজন নবী তাদের কাছে এসেছিলেন। অবশেষে তাদের দুষ্কর্মের ফল ফলতে শুরু করলো। তারা যে বাঁধটি বেঁধে রেখেছিল সেটা ইঁদুরে ভিতর হতে কেটে ফাঁপা করে দিলো। বর্ষার সময় সেটা ভেঙ্গে গেল। পানি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লো। এরই সাথে সাথে নদীর পানি, ঝরণার পানি, বর্ষার পানি, নালার পানি সব একত্রিত ও মিলিত হয়ে গেল। তাদের ঘর-বাড়ী, বাগ-বাগিচা, জমি-জমা ইত্যাদি সবই ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এখন হাত কামড়াতে লাগলো। তাদের সর্ব প্রকারের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। আরো বিপদ দেখা দিলো তাদের বাগানে কোন ফলবান বৃক্ষ জন্মে না। মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ তাদেরকে যে সুন্দর দু’টি উদ্যান দিয়েছিলেন, ও দু’টিকে পরিবর্তন করে দিয়ে তিনি এমন দু'টি উদ্যান দিলেন যাতে উৎপন্ন হয় শুধু বিস্বাদ ফল-মূল, ঝাউগাছ এবং কুল গাছ। এটা ছিল তাদের কুফরী, শিরক, হঠকারিতা ও অহংকারের প্রতিফল যে, তারা আল্লাহর নিয়ামতগুলোকে হারিয়ে ফেললো এবং তার গযবে জড়িয়ে পড়লো। আল্লাহ তা'আলা কৃতঘ্ন ছাড়া অন্য কাউকেও এমন শাস্তি দেন না ।হযরত আবু যাখীরা (রঃ) বলেন, পাপসমূহের বিনিময় এটাই হয় যে, ইবাদতে অলসতা আসে, আয়-উপার্জন কমে যায়, অভাব-অনটন বেড়ে যায়, সবকিছুর স্বাদ উঠে যায়, কোন শান্তির সন্ধান পাওয়া যায় না, বরং সেখানে অন্য কোন প্রতিবন্ধকতা এসে যায় এবং সমস্ত আশা নৈরাশ্যে পরিণত হয়।

সাবা 34:18

১৮-১৯ নং আয়াতের তাফসীর: এগুলো ছাড়াও তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা আরো যেসব নিয়ামত দান। করেছিলেন সেগুলোর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তারা কাছাকাছি বসবাস করতো। কোন মুসাফিরকে বিদেশে যাবার জন্যে রসদ-পত্র, পানি ইত্যাদি সাথে নেয়ার কোন প্রয়োজন হতো না। প্রত্যেক মঞ্জিলে পাকা, তাজা, মিষ্ট ফল, ভাল পানি মজুদ থাকতো। প্রত্যেক রাত্রে তারা যে কোন গ্রামে আরামের সাথে ও নিরাপদে আসা যাওয়া করতো। কথিত আছে যে, গ্রামগুলো সানআ’র নিকট অবস্থিত ছিল।(আরবী) শব্দটিরও দ্বিতীয় পঠন (আরবী) রয়েছে। এ রকম আরাম ও শান্তি পেয়ে তারা ফুলে উঠেছিল। যেমনভাবে বানী ইসরাঈলরা মান্নাও সালওয়ার পরিবর্তে পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি দাবী করেছিল, ঠিক তেমনিভাবে তারাও দূরবর্তী সফরের দাবী জানালো, যেন তাদের সফরের মাঝে জঙ্গল পড়ে, অনাবাদ প্রান্তর পড়ে এবং রসদ-পত্র সাথে নেয়ার মজাও উপভোগ করতে পারে। হযরত মূসা (আঃ)-এর কওমের ঐ দাবীর কারণে তাদের উপর অপমান, লাঞ্ছনা ও দারিদ্র নেমে এসেছিল। ঠিক তেমনি তাদের উপরেও স্বচ্ছলতার পরে অস্বচ্ছলতা ও ধ্বংস নেমে এসেছিল। তাদের উপর নেমে আসে ক্ষুধা ও ভীতি। শান্তি ও নিরাপত্তা তাদের বিনষ্ট হয়। কুফরী করে তারা নিজেদেরই সর্বনাশ ডেকে আনে। তারা কাহিনীর বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। তারা একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। এমন কি যে জাতি উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছিল সেই জাতি অধঃপতনের অতল তলে নেমে গেল। ইকরামা (রাঃ) তাদের কাহিনী এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, তাদের মধ্যে একজন যাদুকর ও একজন যাদুকরণী ছিল। জুিনেরা তাদের কাছে এদিক-ওদিক থেকে কিছু খবর সংগ্রহ করে আনতো। তাদের যাদুকর কোথা হতে এ খবর সগ্রহ করলো যে, এই লোকালয় ধ্বংসের নিকটবর্তী হয়ে গেছে এবং এখানকার লোকেরা ধ্বংস হয়ে যাবে! ঐ যাদুকর ছিল খুবই ধনী। সে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক ছিল। সে চিন্তা করতে লাগলো যে, এখন তার কি করা দরকার? শেষ পর্যন্ত একটি কথা তার মনে উদয় হয়ে গেল। তার শ্বশুরালয়ে বহু লোক ছিল, যারা ছিল খুবই সাহসী। তাছাড়া তাদেরও ধন-সম্পদের প্রাচুর্য ছিল। সে তার ছেলেকে ডেকে বললোঃ “দেখো, আগামীকাল বহু লোক আমার কাছে এসে কত্রিত হবে। আমি যখন তোমাকে কোন কথা বলবো তখন তুমি তা অস্বীকার করবে। যখন আমি তোমাকে গাল-মন্দ দিবো তখন তুমি মুখের উপর আমাকে জবাব দিবে। আমি উঠে গিয়ে তোমাকে চড় মেরে দিবো। তখন তুমিও প্রতিশোধ হিসেবে আমাকে চড় মারবে।” ছেলেটি তার পিতার এ কথা শুনে বললাঃ “আব্বা! এ কাজ কি করে আমার দ্বারা সম্ভব হতে পারে?" যাদুকর। তখন ছেলেকে বললোঃ “তুমি বুঝতে পারনি। এমন একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে যে, তোমাকে আমার এ আদেশ মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই।” ছেলে তখন বাধ্য হয়ে সম্মত হয়ে গেল। পরের দিন যখন লোকেরা তার কাছে এসে একত্রিত হলো তখন সে তার ঐ ছেলেকে কোন কাজের আদেশ করলো। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি তার পিতার এ আদেশ মান্য করতে অস্বীকার করলো। সুতরাং সে তাকে খুবই গালাগালি করলো। ছেলেও তখন পিতাকে পাল্টা গালি দিলো। এতে সে ভীষণ রেগে গিয়ে ছেলেকে এক চড় মেরে দিলো। ছেলেও পাল্টা চড় মারলো। সে তখন আরো ক্রুদ্ধ হয়ে গেল এবং বললোঃ “ছুরি নিয়ে এসো, আমি একে কেটে ফেলবো।” লোকেরা এতে কঠিন ভয় পেলো এবং তাকে এ কাজ হতে বিরত থাকার জন্যে খুবই বুঝাতে লাগলো। কিন্তু সে বলতেই থাকলোঃ “আমি একে হত্যা করে ফেলবো।” লোকগুলো তখন দৌড়ে পালিয়ে গেল এবং ছেলেটির নানা-নানীর বাড়ীতে এ খবর পাঠিয়ে দিলো। খবর পেয়েই সেখান হতে লোক ছুটে আসলো। তারা প্রথমে তাকে অনুরোধ করে বুঝাতে চেষ্টা করলো। কিন্তু তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হলো। সে কিছুতেই মানলো না। তারা তাকে বললোঃ “আপনি তাকে অন্য কোন শাস্তি দেন। তার পরিবর্তে আমাদেরকেই যা। ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করুন!” কিন্তু তখনো সে বললোঃ “আমি তাকে মাটিতে শয়ন করিয়ে দিয়ে যথানিয়মে স্বহস্তে যবেহ করবো।" তার একথা শুনে ছেলেটির নানার লোকেরা বললোঃ “আপনাকে এ কাজ করতে দেয়া হবে না। তার পূর্বেই আমরা আপনাকে হত্যা করে ফেলবো।" যাদুকর তখন বললোঃ “অবস্থা যখন এতো দূরই গড়িয়ে গেল তখন আমি আর এ শহরে থাকবো না। যে শহরে আমার নিজস্ব ও ব্যক্তিগত ব্যাপারে অন্য লোকেরা নাক গলাবে সে শহরে আমার থাকা চলবে না। আমার ঘর-বাড়ী, জায়গা-জমি সবই তোমরা কিনে নাও। আমি অন্য কোথাও চলে যাই।” এভাবে সে তার সব কিছু বিক্রি করে দিলো এবং মূল্য নগদ আদায় করলো। যখন এদিক থেকে সে মানসিক প্রশান্তি লাভ করলো তখন সে তার কওমের লোকদেরকে বললোঃ “তোমাদের উপর আল্লাহর আযাব আসছে। তোমাদের পতনের সময় নিকটবর্তী হয়ে গেছে। এখন তোমাদের মধ্যে যারা কষ্ট ও পরিশ্রম করে দীর্ঘ সফর করতঃ নতুন ঘর বাধতে ইচ্ছুক তারা যেন আম্মান চলে যায়। যারা পানাহারের প্রতি বেশী আকৃষ্ট তাদের বসরা চলে যাওয়া উচিত। আর যারা স্বাধীনভাবে মিষ্টি খেজুর খেতে ইচ্ছুক তারা যেন মদীনায় চলে যায়। তার কওম তার কথা বিশ্বাস করতো। তাই যার যেদিকে মন চাইলো সে সেই দিকে পালিয়ে গেল। কেউ গেল আম্মানের দিকে, কেউ গেল বসরার দিকে এবং কেউ গেল মদীনার দিকে। মদীনার দিকে তিনটি গোত্র গিয়েছিল। গোত্র তিনটি হলো আউস, খাযরাজ ও বানু উসমান। যখন তারা বাতনে মার’ নামক স্থানে পৌঁছলো তখন বললোঃ “এটা খুবই পছন্দনীয় জায়গা, আমরা আর সামনে বাড়বো না।” সুতরাং তারা সেখানেই বসবাস করতে শুরু করলো। আর এ কারণেই তাদেরকে খুযাআহ বলা হয়। কেননা, তারা তাদের সাথীদের পিছনে পড়ে গিয়েছিল। আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয় সরাসরি মদীনায় পৌঁছে যায় এবং সেখানে বসতি স্থাপন করে। (এটা খুবই বিস্ময়কর ‘আসার’। এতে যে যাদুকরের কথা বর্ণিত হয়েছে তার নাম ছিল আমর ইবনে আমির। সে ছিল ইয়ামনের সরদার এবং সাবার একজন প্রভাবশালী লোক। সে ছিল তাদের যাদুকর)সীরাতে ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, এই যাদুকরই সর্বপ্রথম ইয়ামন হতে বের হয়েছিল। কেননা, সেই সাদ্দে মা'রিবকে দেখেছিল যে, ইঁদুরগুলো ওকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। তখনই সে বুঝতে পেরেছিল যে, ইয়ামনের আর রক্ষা নেই। সে ভেবে নিয়েছিল যে, এই উঁচু উঁচু দেয়াল, ঘরবাড়ী ইত্যাদি সবই বন্যার অতল তলে তলিয়ে যাবে। তাই সে তার সর্বকনিষ্ঠ ছেলেকে এই মকর শিখিয়েছিল। যার বর্ণনা উপরে উল্লিখিত হলো। ঐ সময় সে রেগে গিয়ে বলেছিলঃ “এমন শহরে আমি থাকতে চাইনে। আমি আমার বাড়ী-ঘর, জায়গা-জমি ইত্যাদি এখনই বিক্রি করে দিবো।” জনগণ আমরের এই ক্রোধকে গানীমাত মনে করলো এবং এর সুযোগ তারা গ্রহণ করলো। সুতরাং ঐ যাদুকর কম বেশী মূল্য নিয়ে সবকিছুই বিক্রি করে ফেললো এবং সেখান থেকে বিদায় গ্রহণ করলো। আসাদ গোত্রটিও তার সঙ্গ নিলো। পথে আককা. গোত্রের লোকেরা তাদের সাথে যুদ্ধ করলো। যুদ্ধ চলতেই থাকলো, যার বর্ণনা আব্বাস ইবনে মারদাস সালমী (রাঃ)-এর কবিতাতেও রয়েছে। অতঃপর সেখান হতে রওয়ানা হয়ে তারা বিভিন্ন শহরে পৌঁছে যায়। আ’লে জাফনা ইবনে আমর ইবনে আমির সিরিয়ায় গমন করলো, আউস ও খাযরাজ গেল মদীনায়, খুযাআ গেল মুরুরায়, ইযদুস সুরাত অবতরণ করলো সুরাতে এবং ইযদ আম্মান গেল আম্মানে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বন্যা পাঠিয়ে দিলেন এবং মারিবের বাঁধটি ভেঙ্গে গেল। এ ব্যাপারেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।সুদ্দী (রঃ) এই কাহিনীতে বর্ণনা করেছেন যে, আমর ইবনে আমির যাদুকর মকর শিখিয়েছিল তার ভ্রাতুস্পুত্রকে, পুত্রকে নয়। আহলুল ইলম বর্ণনা করেছেন যে, আমর ইবনে আমিরের আরীফা নামী স্ত্রী তার যাদু বলে এ ব্যাপার জানতে পেরে সব লোককে আহ্বান করেছিল। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, আম্মানে গাসসানী ও ইযদ এ দু’টি গোত্রকেও ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। সেখানে মিষ্ট ও ঠাণ্ডা পানি, শস্য ভরা ক্ষেত্র এবং ফলভরা গাছ থাকা সত্ত্বেও বাধভাঙ্গা বন্যার কারণে এই অবস্থা হয়েছিল যে, তারা এক মুঠো ভাত এবং এক ফোঁটা পানির জন্যে অস্থির হয়ে পড়েছিল। তাদের এই পাকড়াও ও শাস্তি এবং অভাব অনটনের মধ্যে প্রত্যেক ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্যে নিদর্শন রয়েছে। তারা এর থেকে যথেষ্ট শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। আল্লাহর অবাধ্যতার কারণে তাঁর আযাব তাদেরকে কতই না শক্তভাবে ঘিরে নিয়েছিল। তারা সুখ-শান্তির পরিবর্তে দুঃখ-কষ্ট ডেকে এনেছিল। বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণকারী এবং নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীরা এতে দালায়েলে কুদরত লাভ করবে।রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনদের জন্যে বিস্ময়কর ফায়সালা করেছেন যে, যদি তারা আরাম ও শান্তি লাভ করে ও তাতে কৃতজ্ঞতা, প্রকাশ করে তবে পুরস্কার পাবে এবং যদি বিপদ-আপদে পতিত হয় ও তাতে ধৈর্যধারণ করে তাহলেও পুরস্কার লাভ করবে। মোটকথা, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই মুমিনকে সাওয়াব প্রদান করা হয়, এমন কি খাদ্যের যে গ্রাস সে তার স্ত্রীর মুখে উঠিয়ে দেয় তাতেও সে পুণ্য প্রাপ্ত হয়।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিনের জন্যে বিস্ময় যে, আল্লাহ্ তার জন্যে যে ফায়সালাই করেন তা তার জন্যে কল্যাণকরই হয়ে থাকে। সে যদি শান্তি ও আরাম লাভ করে এবং শুকরিয়া আদায় করে তবে তা হয় তার জন্যে মঙ্গলজনক। আর যদি তার উপর কোন বিপদ-আপদ আসে এবং তাতে সে ধৈর্যধারণ করে তবে সেটাও হয় তার জন্যে কল্যাণকর। কিন্তু এটা শুধু মুমিনের জন্যেই।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত মুতরাফ (রঃ) বলেন যে, ধৈর্যধারণকারী ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী কতই না উত্তম! যখন সে কোন নিয়ামত লাভ করে তখন কৃতজ্ঞ হয় এবং যখন বিপদে পড়ে তখন ধৈর্যশীল হয়।

সাবা 34:19

১৮-১৯ নং আয়াতের তাফসীর: এগুলো ছাড়াও তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা আরো যেসব নিয়ামত দান। করেছিলেন সেগুলোর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তারা কাছাকাছি বসবাস করতো। কোন মুসাফিরকে বিদেশে যাবার জন্যে রসদ-পত্র, পানি ইত্যাদি সাথে নেয়ার কোন প্রয়োজন হতো না। প্রত্যেক মঞ্জিলে পাকা, তাজা, মিষ্ট ফল, ভাল পানি মজুদ থাকতো। প্রত্যেক রাত্রে তারা যে কোন গ্রামে আরামের সাথে ও নিরাপদে আসা যাওয়া করতো। কথিত আছে যে, গ্রামগুলো সানআ’র নিকট অবস্থিত ছিল।(আরবী) শব্দটিরও দ্বিতীয় পঠন (আরবী) রয়েছে। এ রকম আরাম ও শান্তি পেয়ে তারা ফুলে উঠেছিল। যেমনভাবে বানী ইসরাঈলরা মান্নাও সালওয়ার পরিবর্তে পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি দাবী করেছিল, ঠিক তেমনিভাবে তারাও দূরবর্তী সফরের দাবী জানালো, যেন তাদের সফরের মাঝে জঙ্গল পড়ে, অনাবাদ প্রান্তর পড়ে এবং রসদ-পত্র সাথে নেয়ার মজাও উপভোগ করতে পারে। হযরত মূসা (আঃ)-এর কওমের ঐ দাবীর কারণে তাদের উপর অপমান, লাঞ্ছনা ও দারিদ্র নেমে এসেছিল। ঠিক তেমনি তাদের উপরেও স্বচ্ছলতার পরে অস্বচ্ছলতা ও ধ্বংস নেমে এসেছিল। তাদের উপর নেমে আসে ক্ষুধা ও ভীতি। শান্তি ও নিরাপত্তা তাদের বিনষ্ট হয়। কুফরী করে তারা নিজেদেরই সর্বনাশ ডেকে আনে। তারা কাহিনীর বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। তারা একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। এমন কি যে জাতি উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছিল সেই জাতি অধঃপতনের অতল তলে নেমে গেল। ইকরামা (রাঃ) তাদের কাহিনী এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, তাদের মধ্যে একজন যাদুকর ও একজন যাদুকরণী ছিল। জুিনেরা তাদের কাছে এদিক-ওদিক থেকে কিছু খবর সংগ্রহ করে আনতো। তাদের যাদুকর কোথা হতে এ খবর সগ্রহ করলো যে, এই লোকালয় ধ্বংসের নিকটবর্তী হয়ে গেছে এবং এখানকার লোকেরা ধ্বংস হয়ে যাবে! ঐ যাদুকর ছিল খুবই ধনী। সে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক ছিল। সে চিন্তা করতে লাগলো যে, এখন তার কি করা দরকার? শেষ পর্যন্ত একটি কথা তার মনে উদয় হয়ে গেল। তার শ্বশুরালয়ে বহু লোক ছিল, যারা ছিল খুবই সাহসী। তাছাড়া তাদেরও ধন-সম্পদের প্রাচুর্য ছিল। সে তার ছেলেকে ডেকে বললোঃ “দেখো, আগামীকাল বহু লোক আমার কাছে এসে কত্রিত হবে। আমি যখন তোমাকে কোন কথা বলবো তখন তুমি তা অস্বীকার করবে। যখন আমি তোমাকে গাল-মন্দ দিবো তখন তুমি মুখের উপর আমাকে জবাব দিবে। আমি উঠে গিয়ে তোমাকে চড় মেরে দিবো। তখন তুমিও প্রতিশোধ হিসেবে আমাকে চড় মারবে।” ছেলেটি তার পিতার এ কথা শুনে বললাঃ “আব্বা! এ কাজ কি করে আমার দ্বারা সম্ভব হতে পারে?" যাদুকর। তখন ছেলেকে বললোঃ “তুমি বুঝতে পারনি। এমন একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে যে, তোমাকে আমার এ আদেশ মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই।” ছেলে তখন বাধ্য হয়ে সম্মত হয়ে গেল। পরের দিন যখন লোকেরা তার কাছে এসে একত্রিত হলো তখন সে তার ঐ ছেলেকে কোন কাজের আদেশ করলো। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি তার পিতার এ আদেশ মান্য করতে অস্বীকার করলো। সুতরাং সে তাকে খুবই গালাগালি করলো। ছেলেও তখন পিতাকে পাল্টা গালি দিলো। এতে সে ভীষণ রেগে গিয়ে ছেলেকে এক চড় মেরে দিলো। ছেলেও পাল্টা চড় মারলো। সে তখন আরো ক্রুদ্ধ হয়ে গেল এবং বললোঃ “ছুরি নিয়ে এসো, আমি একে কেটে ফেলবো।” লোকেরা এতে কঠিন ভয় পেলো এবং তাকে এ কাজ হতে বিরত থাকার জন্যে খুবই বুঝাতে লাগলো। কিন্তু সে বলতেই থাকলোঃ “আমি একে হত্যা করে ফেলবো।” লোকগুলো তখন দৌড়ে পালিয়ে গেল এবং ছেলেটির নানা-নানীর বাড়ীতে এ খবর পাঠিয়ে দিলো। খবর পেয়েই সেখান হতে লোক ছুটে আসলো। তারা প্রথমে তাকে অনুরোধ করে বুঝাতে চেষ্টা করলো। কিন্তু তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হলো। সে কিছুতেই মানলো না। তারা তাকে বললোঃ “আপনি তাকে অন্য কোন শাস্তি দেন। তার পরিবর্তে আমাদেরকেই যা। ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করুন!” কিন্তু তখনো সে বললোঃ “আমি তাকে মাটিতে শয়ন করিয়ে দিয়ে যথানিয়মে স্বহস্তে যবেহ করবো।" তার একথা শুনে ছেলেটির নানার লোকেরা বললোঃ “আপনাকে এ কাজ করতে দেয়া হবে না। তার পূর্বেই আমরা আপনাকে হত্যা করে ফেলবো।" যাদুকর তখন বললোঃ “অবস্থা যখন এতো দূরই গড়িয়ে গেল তখন আমি আর এ শহরে থাকবো না। যে শহরে আমার নিজস্ব ও ব্যক্তিগত ব্যাপারে অন্য লোকেরা নাক গলাবে সে শহরে আমার থাকা চলবে না। আমার ঘর-বাড়ী, জায়গা-জমি সবই তোমরা কিনে নাও। আমি অন্য কোথাও চলে যাই।” এভাবে সে তার সব কিছু বিক্রি করে দিলো এবং মূল্য নগদ আদায় করলো। যখন এদিক থেকে সে মানসিক প্রশান্তি লাভ করলো তখন সে তার কওমের লোকদেরকে বললোঃ “তোমাদের উপর আল্লাহর আযাব আসছে। তোমাদের পতনের সময় নিকটবর্তী হয়ে গেছে। এখন তোমাদের মধ্যে যারা কষ্ট ও পরিশ্রম করে দীর্ঘ সফর করতঃ নতুন ঘর বাধতে ইচ্ছুক তারা যেন আম্মান চলে যায়। যারা পানাহারের প্রতি বেশী আকৃষ্ট তাদের বসরা চলে যাওয়া উচিত। আর যারা স্বাধীনভাবে মিষ্টি খেজুর খেতে ইচ্ছুক তারা যেন মদীনায় চলে যায়। তার কওম তার কথা বিশ্বাস করতো। তাই যার যেদিকে মন চাইলো সে সেই দিকে পালিয়ে গেল। কেউ গেল আম্মানের দিকে, কেউ গেল বসরার দিকে এবং কেউ গেল মদীনার দিকে। মদীনার দিকে তিনটি গোত্র গিয়েছিল। গোত্র তিনটি হলো আউস, খাযরাজ ও বানু উসমান। যখন তারা বাতনে মার’ নামক স্থানে পৌঁছলো তখন বললোঃ “এটা খুবই পছন্দনীয় জায়গা, আমরা আর সামনে বাড়বো না।” সুতরাং তারা সেখানেই বসবাস করতে শুরু করলো। আর এ কারণেই তাদেরকে খুযাআহ বলা হয়। কেননা, তারা তাদের সাথীদের পিছনে পড়ে গিয়েছিল। আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয় সরাসরি মদীনায় পৌঁছে যায় এবং সেখানে বসতি স্থাপন করে। (এটা খুবই বিস্ময়কর ‘আসার’। এতে যে যাদুকরের কথা বর্ণিত হয়েছে তার নাম ছিল আমর ইবনে আমির। সে ছিল ইয়ামনের সরদার এবং সাবার একজন প্রভাবশালী লোক। সে ছিল তাদের যাদুকর)সীরাতে ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, এই যাদুকরই সর্বপ্রথম ইয়ামন হতে বের হয়েছিল। কেননা, সেই সাদ্দে মা'রিবকে দেখেছিল যে, ইঁদুরগুলো ওকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। তখনই সে বুঝতে পেরেছিল যে, ইয়ামনের আর রক্ষা নেই। সে ভেবে নিয়েছিল যে, এই উঁচু উঁচু দেয়াল, ঘরবাড়ী ইত্যাদি সবই বন্যার অতল তলে তলিয়ে যাবে। তাই সে তার সর্বকনিষ্ঠ ছেলেকে এই মকর শিখিয়েছিল। যার বর্ণনা উপরে উল্লিখিত হলো। ঐ সময় সে রেগে গিয়ে বলেছিলঃ “এমন শহরে আমি থাকতে চাইনে। আমি আমার বাড়ী-ঘর, জায়গা-জমি ইত্যাদি এখনই বিক্রি করে দিবো।” জনগণ আমরের এই ক্রোধকে গানীমাত মনে করলো এবং এর সুযোগ তারা গ্রহণ করলো। সুতরাং ঐ যাদুকর কম বেশী মূল্য নিয়ে সবকিছুই বিক্রি করে ফেললো এবং সেখান থেকে বিদায় গ্রহণ করলো। আসাদ গোত্রটিও তার সঙ্গ নিলো। পথে আককা. গোত্রের লোকেরা তাদের সাথে যুদ্ধ করলো। যুদ্ধ চলতেই থাকলো, যার বর্ণনা আব্বাস ইবনে মারদাস সালমী (রাঃ)-এর কবিতাতেও রয়েছে। অতঃপর সেখান হতে রওয়ানা হয়ে তারা বিভিন্ন শহরে পৌঁছে যায়। আ’লে জাফনা ইবনে আমর ইবনে আমির সিরিয়ায় গমন করলো, আউস ও খাযরাজ গেল মদীনায়, খুযাআ গেল মুরুরায়, ইযদুস সুরাত অবতরণ করলো সুরাতে এবং ইযদ আম্মান গেল আম্মানে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বন্যা পাঠিয়ে দিলেন এবং মারিবের বাঁধটি ভেঙ্গে গেল। এ ব্যাপারেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।সুদ্দী (রঃ) এই কাহিনীতে বর্ণনা করেছেন যে, আমর ইবনে আমির যাদুকর মকর শিখিয়েছিল তার ভ্রাতুস্পুত্রকে, পুত্রকে নয়। আহলুল ইলম বর্ণনা করেছেন যে, আমর ইবনে আমিরের আরীফা নামী স্ত্রী তার যাদু বলে এ ব্যাপার জানতে পেরে সব লোককে আহ্বান করেছিল। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, আম্মানে গাসসানী ও ইযদ এ দু’টি গোত্রকেও ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। সেখানে মিষ্ট ও ঠাণ্ডা পানি, শস্য ভরা ক্ষেত্র এবং ফলভরা গাছ থাকা সত্ত্বেও বাধভাঙ্গা বন্যার কারণে এই অবস্থা হয়েছিল যে, তারা এক মুঠো ভাত এবং এক ফোঁটা পানির জন্যে অস্থির হয়ে পড়েছিল। তাদের এই পাকড়াও ও শাস্তি এবং অভাব অনটনের মধ্যে প্রত্যেক ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্যে নিদর্শন রয়েছে। তারা এর থেকে যথেষ্ট শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। আল্লাহর অবাধ্যতার কারণে তাঁর আযাব তাদেরকে কতই না শক্তভাবে ঘিরে নিয়েছিল। তারা সুখ-শান্তির পরিবর্তে দুঃখ-কষ্ট ডেকে এনেছিল। বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণকারী এবং নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীরা এতে দালায়েলে কুদরত লাভ করবে।রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনদের জন্যে বিস্ময়কর ফায়সালা করেছেন যে, যদি তারা আরাম ও শান্তি লাভ করে ও তাতে কৃতজ্ঞতা, প্রকাশ করে তবে পুরস্কার পাবে এবং যদি বিপদ-আপদে পতিত হয় ও তাতে ধৈর্যধারণ করে তাহলেও পুরস্কার লাভ করবে। মোটকথা, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই মুমিনকে সাওয়াব প্রদান করা হয়, এমন কি খাদ্যের যে গ্রাস সে তার স্ত্রীর মুখে উঠিয়ে দেয় তাতেও সে পুণ্য প্রাপ্ত হয়।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিনের জন্যে বিস্ময় যে, আল্লাহ্ তার জন্যে যে ফায়সালাই করেন তা তার জন্যে কল্যাণকরই হয়ে থাকে। সে যদি শান্তি ও আরাম লাভ করে এবং শুকরিয়া আদায় করে তবে তা হয় তার জন্যে মঙ্গলজনক। আর যদি তার উপর কোন বিপদ-আপদ আসে এবং তাতে সে ধৈর্যধারণ করে তবে সেটাও হয় তার জন্যে কল্যাণকর। কিন্তু এটা শুধু মুমিনের জন্যেই।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত মুতরাফ (রঃ) বলেন যে, ধৈর্যধারণকারী ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী কতই না উত্তম! যখন সে কোন নিয়ামত লাভ করে তখন কৃতজ্ঞ হয় এবং যখন বিপদে পড়ে তখন ধৈর্যশীল হয়।

সাবা 34:20

২০-২১ নং আয়াতের তাফসীর: সাবার ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ্ তা'আলা শয়তান ও তার মুরীদদের বর্ণনা সাধারণভাবে দিচ্ছেন। তারা হিদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতা, ভালর বদলে মন্দ বেছে নিয়েছে। ইবলীস এখন তাদের উপাসনার স্থানে বসে গেছে। সে বলেছিলঃ “আপনি আমার উপর যাকে মর্যাদা দান করলেন, যদি কিয়ামত পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দেন তবে তার সন্তানদেরকে অল্প সংখ্যক ব্যতীত আপনার পথ হতে দূরে সরিয়ে দিবো।” সে আরো বলেছিলঃ “অতঃপর অবশ্যই আমি তাদের কাছে আসবো তাদের সামনে হতে, পিছন হতে, ডান ও বাম হতে এবং তাদের অধিকাংশকেই আপনি কৃতজ্ঞ পাবেন না।” সে এটা করে দেখিয়ে দিলো। আদম-সন্তানদেরকে সে নিজের মুষ্টির মধ্যে আবদ্ধ করে নিলো। যখন হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-কে তাদের পাপের কারণে নীচে নামিয়ে দেয়া হলো এবং অভিশপ্ত ইবলীসও তাঁদের সাথে নেমে এলো তখন সে খুবই আনন্দিত হলো এবং মনে মনে বললো যে, হযরত আদম (আঃ)-কে যখন সে পথভ্রষ্ট করতে পেরেছে তখন তার সন্তানরা তো তার বাম হাতের ক্রীড়নক। এ খাবীসের কথা ছিল যে, সে আদম-সন্তানকে সবুজ বাগান দেখাতে থাকবে। সে তাদেরকে উদাসীন করে রাখবে, বিভিন্নভাবে তাদেরকে প্রতারিত করবে এবং তার চক্রান্তের ফাদে আবদ্ধ রাখবে। উত্তরে মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেছিলেনঃ আমার মর্যাদার কসম! মরণের পূর্বে যখন তারা আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে তখন আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিবো। যখনই আমাকে তারা ডাকবে তখনই আমি তাদের ডাকে সাড়া দিবো। যখনই তারা আমার কাছে কিছু চাইবে তখনই আমি তাদেরকে তা দিবো। যখনই আমার কাছে তারা মাফ চাইবে তখনই আমি তাদেরকে মাফ করে দিবো। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তাদের উপর শয়তানের কোন আধিপত্য ছিল না। সে মানুষকে মারপিট করে না এবং এটা করার ক্ষমতাও তার নেই। সে শুধু মানুষকে ধোকা দেয় এবং তার উপর প্রতারণার জাল বিস্তার করে। আর তার এই প্রতারণার জালেই মানুষ আবদ্ধ হয়ে যায়। এতে আল্লাহর হিকমত এই ছিল যে, যাতে মুমিন ও কাফির প্রকাশ হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর হুজ্জত শেষ হয়ে যায়। যারা আখিরাতকে বিশ্বাস করে তারা কখনো শয়তানকে মানবে না। তারা সর্বাবস্থায় আল্লাহরই অনুগত থাকবে। আল্লাহ তাআলা সর্ব বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক। মুমিনদের দল তারই হিফাযতের আশ্রয় নেয়। এ কারণে শয়তান অদের কোনই ক্ষতি করতে পারে না। পক্ষান্তরে কাফিরের দল আল্লাহকে ছেড়ে দেয়। এ জন্যে তাদের উপর থেকে আল্লাহর হিফাযত উঠে যায়। ফলে তারা শয়তানের সব রকম প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার শিকার হয়ে যায়।

সাবা 34:21

২০-২১ নং আয়াতের তাফসীর: সাবার ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ্ তা'আলা শয়তান ও তার মুরীদদের বর্ণনা সাধারণভাবে দিচ্ছেন। তারা হিদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতা, ভালর বদলে মন্দ বেছে নিয়েছে। ইবলীস এখন তাদের উপাসনার স্থানে বসে গেছে। সে বলেছিলঃ “আপনি আমার উপর যাকে মর্যাদা দান করলেন, যদি কিয়ামত পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দেন তবে তার সন্তানদেরকে অল্প সংখ্যক ব্যতীত আপনার পথ হতে দূরে সরিয়ে দিবো।” সে আরো বলেছিলঃ “অতঃপর অবশ্যই আমি তাদের কাছে আসবো তাদের সামনে হতে, পিছন হতে, ডান ও বাম হতে এবং তাদের অধিকাংশকেই আপনি কৃতজ্ঞ পাবেন না।” সে এটা করে দেখিয়ে দিলো। আদম-সন্তানদেরকে সে নিজের মুষ্টির মধ্যে আবদ্ধ করে নিলো। যখন হযরত আদম (আঃ) ও হযরত হাওয়া (আঃ)-কে তাদের পাপের কারণে নীচে নামিয়ে দেয়া হলো এবং অভিশপ্ত ইবলীসও তাঁদের সাথে নেমে এলো তখন সে খুবই আনন্দিত হলো এবং মনে মনে বললো যে, হযরত আদম (আঃ)-কে যখন সে পথভ্রষ্ট করতে পেরেছে তখন তার সন্তানরা তো তার বাম হাতের ক্রীড়নক। এ খাবীসের কথা ছিল যে, সে আদম-সন্তানকে সবুজ বাগান দেখাতে থাকবে। সে তাদেরকে উদাসীন করে রাখবে, বিভিন্নভাবে তাদেরকে প্রতারিত করবে এবং তার চক্রান্তের ফাদে আবদ্ধ রাখবে। উত্তরে মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেছিলেনঃ আমার মর্যাদার কসম! মরণের পূর্বে যখন তারা আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে তখন আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিবো। যখনই আমাকে তারা ডাকবে তখনই আমি তাদের ডাকে সাড়া দিবো। যখনই তারা আমার কাছে কিছু চাইবে তখনই আমি তাদেরকে তা দিবো। যখনই আমার কাছে তারা মাফ চাইবে তখনই আমি তাদেরকে মাফ করে দিবো। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তাদের উপর শয়তানের কোন আধিপত্য ছিল না। সে মানুষকে মারপিট করে না এবং এটা করার ক্ষমতাও তার নেই। সে শুধু মানুষকে ধোকা দেয় এবং তার উপর প্রতারণার জাল বিস্তার করে। আর তার এই প্রতারণার জালেই মানুষ আবদ্ধ হয়ে যায়। এতে আল্লাহর হিকমত এই ছিল যে, যাতে মুমিন ও কাফির প্রকাশ হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর হুজ্জত শেষ হয়ে যায়। যারা আখিরাতকে বিশ্বাস করে তারা কখনো শয়তানকে মানবে না। তারা সর্বাবস্থায় আল্লাহরই অনুগত থাকবে। আল্লাহ তাআলা সর্ব বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক। মুমিনদের দল তারই হিফাযতের আশ্রয় নেয়। এ কারণে শয়তান অদের কোনই ক্ষতি করতে পারে না। পক্ষান্তরে কাফিরের দল আল্লাহকে ছেড়ে দেয়। এ জন্যে তাদের উপর থেকে আল্লাহর হিফাযত উঠে যায়। ফলে তারা শয়তানের সব রকম প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার শিকার হয়ে যায়।

সাবা 34:22

২২-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বর্ণনা করছেন যে, তিনি এক ও একক। তিনি অমুখাপেক্ষী ও অভাবমুক্ত। তিনি ছাড়া কোনই মা'বুদ নেই। তিনি তুলনাবিহীন ও অংশীবিহীন। তাঁর কোন শরীক নেই, সাথী নেই, পরামর্শদাতা নেই, মন্ত্রী নেই এবং পরিচালক নেই। সুতরাং কে তাঁর সামনে হঠকারিতা করবে এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করবে? তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ যাদের কাছে তোমরা আবেদন করে থাকো, জেনে রেখো যে, অণু পরিমাণও ক্ষমতা তাদের নেই। তারা শক্তিহীন ও অক্ষম। না দুনিয়ায় তাদের কোন ক্ষমতা চলে, না আখিরাতে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যাদেরকে তারা আল্লাহ ছাড়া ডাকে তারা খেজুরের ছালেরও মালিকানা রাখে না।”(৩৫:১৩) তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা নেই এবং মালিকানার ভিত্তিতে কোন রাজত্ব নেই। আল্লাহ তা'আলা তাঁর কাজে তাদের কাছে কোনই সাহায্য গ্রহণ করেন না। অথচ তারা সবাই দরিদ্র, ফকীর ও অন্যের মুখাপেক্ষী। তারা সবাই গোলাম ও বান্দা। তার শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব, ইজ্জত ও মর্যাদা এমনই যে, তার অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে কেউ কারো জন্যে সুপারিশ করার সাহস রাখে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কে সে, যে তার অনুমতি ব্যতীত তাঁর নিকট সুপারিশ করবে?”(২:২৫৫) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আকাশের বহু ফেরেশতাও কারো সুপারিশের জন্যে মুখ খুলতে পারে না। হ্যাঁ, তবে আল্লাহ স্বীয় সম্মতিক্রমে যার জন্যে অনুমতি দিবেন (তার জন্যে অরে)।”(৫৩:২৬) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা শুধু তারই জন্যে সুপারিশ করতে পারে যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট রয়েছেন এবং তারা তাঁর ভয়ে কম্পমান থাকে।”(২১:২৮)যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, সমস্ত আদম-সন্তানের নেতা ও সবচেয়ে বড় সুপারিশকারী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) কিয়ামতের দিন যখন মাকামে মাহমূদে শাফাআতের জন্যে উপস্থিত হবেন এবং সবাই ফায়সালার জন্যে তাদের প্রতিপালকের নিকট আসবে, ঐ সময়ের কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আমি আল্লাহ তা'আলার সামনে সিজদায় পড়ে যাবো। কতক্ষণ যে আমি জিদায় পড়ে থাকবো তা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। ঐ সিজদায় আমি আল্লাহ তা'আলার এতো প্রশংসা করবো যে, ঐ শব্দগুলো এখন আমার মনে হচ্ছে না। তখন আল্লাহ বলবেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! মাথা উঠাও এবং কথা বল, তোমার কথা শোনা হবে। তুমি চাও, তোমাকে দেয়া হবে। তুমি শাফাআত কর, কবূল করা হবে।” প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্বের আর একটি বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যখন তিনি স্বীয় অহীর মাধ্যমে কথা বলেন, আর আকাশসমূহে আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী। ফেরেশতারা তা শুনে থাকেন, তখন তাঁরা ভয়ে কেঁপে ওঠেন এবং তাদের জ্ঞান লোপ পাওয়ার উপক্রম হয়। পরে যখন তাদের অন্তর হতে ভয় বিদূরিত হয় (আরবী) শব্দটি কোন কোন পঠনে (আরবী) ও এসেছে, দুটোরই ভাবার্থ একই। তখন তাঁরা একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এই সময় প্রতিপালকের কি হুকুম নাযিল হলো?” আহলে আরশ তাদের পার্শ্ববর্তীদের নিকট ধারাবাহিকভাবে ও সঠিকভাবে আল্লাহর আদেশ পৌছিয়ে থাকেন। এই আয়াতের একটি ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, যখন মৃত্যু-যাতনার সময় আসে তখন মুশরিক একথা বলে থাকে এবং অনুরূপভাবে কিয়ামতের দিনও বলবে যখন তাদের জ্ঞান ফিরবে তাদের দুনিয়ার গাফিলতির পর, অর্থাৎ দুনিয়ায় যে তারা আল্লাহকে, তাঁর রাসূল (সঃ)-কে, আখিরাতকে ইত্যাদি সবকিছুকেই ভুলে ছিল, কিয়ামতের দিন যখন তাদের জ্ঞান ফিরবে এবং সব কিছু বুঝতে পারবে তখন তারা পরস্পর বলাবলি করবেঃ “তোমাদের প্রতিপালক কি বললেন?" উত্তরে বলা হবেঃ “যা সত্য তিনি তাই বলেছেন।” যে জিনিস হতে তারা দুনিয়ায় নিশ্চিন্ত থাকতো আজ সেটা তাদের সামনে পেশ করা হবে। তাহলে অন্তর হতে ভয় দূর হওয়ার অর্থ এই হলো যে, যখন তাদের চোখের উপর হতে পর্দা সরিয়ে দেয়া হবে তখন তাদের পূর্বের সব সন্দেহ ও অবিশ্বাস মিটে যাবে এবং শয়তানী কুমন্ত্রণা দূর হয়ে যাবে, ঐ সময় তারা আল্লাহ তা'আলার সমস্ত কথার সত্যতা স্বীকার করে নিবে এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্মের কথা মেনে নিবে। সুতরাং মৃত্যুর সময়ের স্বীকারুক্তিও কোন কাজে আসবে না এবং কিয়ামতের দিনের স্বীকারুক্তিতেও কোন লাভ হবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর মতে প্রথম তাফসীরই সঠিক। অর্থাৎ এটা ফেরেশতাদের উক্তি হওয়াই যুক্তিযুক্ত। হাদীসে ও আসারেও এর উপরই জোর দেয়া হয়েছে। সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তাআলা কোন বিষয়ের ফায়সালা আসমানে করেন তখন ফেরেশতারা বিনয়ের সাথে তাদের ডানা ঝুঁকিয়ে থাকেন এবং প্রতিপালকের কালাম এমনই হয় যেমন ঐ শিকলের শব্দ, যা পাথরের উপর বাজানো হয়। যখন তাদের ভয় কমে আসে তখন তারা পরস্পরের মধ্যে বিজ্ঞাসাবাদ করেনঃ “তোমাদের প্রতিপালক কি বললেন?" উত্তরে বলা হয়ঃ “যা সত্য তিনি তাই বলেছেন। তিনি সমুচ্চ, মহান।" কোন কোন সময় জ্বিনেরা ফেরেশতাদের কথা শুনার জন্যে তাদের নির্ধারিত স্থানে গমন করে এবং চুরি করে কিছু শুনেও ফেলে। তাদের যারা উপরে থাকে তারা তাদের নীচে অবস্থানকারীদেরকে তা বলে দেয়। এভাবে ঐ কথাগুলো দুনিয়ায় চলে আসে এবং গণক ও যাদুকরদের কানে পৌঁছে যায়। ঐ শয়তান জ্বিনদেরকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্যে জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে। কিন্তু তার পূর্বেই কিছু কিছু খবর তারা দুনিয়ায় পৌঁছিয়ে দেয়। কখনো কখনো আবার খবর পৌঁছানোর পূর্বেই তারা জ্বলে পুড়ে যায়।গণক বা যাদুকর দু' একটি ঐ সত্য কথার সাথে শত শতটি মিথ্যা মিলিয়ে জনগণের সামনে প্রচার করে। কাহেনের দু' একটি কথা যখন সত্য প্রমাণিত হয় তখন জনগণ তার মুরীদ হতে শুরু করে। তারা একে অপরকে বলেঃ “দেখো, এ কাজটি তার কথা অনুযায়ী হয়েছে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের দলে বসেছিলেন। এমন সময় একটি তারকা খসে পড়লো, ফলে চতুর্দিক আলোকিত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “অজ্ঞতার যুগে এভাবে তারকা ছিটকে পড়লে তোমরা কি বলতে?” সাহাবীরা জবাবে বললেনঃ “এ অবস্থায় আমরা বলতাম যে, হয়তো কোন বড় ও সম্ভান্ত মানুষ জন্মগ্রহণ করেছে অথবা মারা গেছে। বর্ণনাকারী যুহরী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ অজ্ঞতার যুগেও কি এই ভাবে তারকা ঝরে বা ছিটকে পড়তো?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের যুগেই এটা খুব বেশী হয়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের ঐ কথার উত্তরে বললেনঃ “জেনে রেখো যে, কারো জন্ম বা মৃত্যুর সাথে ওগুলোর কোন সম্পর্কে নেই। কথা হলো এই যে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা যখন আকাশে কোন বিষয়ের ফায়সালা করেন তখন আরশ বহনকারী ফেরেশতারা তাঁর তাসবীহ পাঠ করতে থাকেন। তারপর সপ্তম আকাশবাসী, এরপর ষষ্ঠ আকাশবাসী তাঁর মহিমা ঘঘাষণা করতে থাকেন। আর এভাবে শেষ পর্যন্ত এই তাসবীহ্ দুনিয়ার আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারপর আরশের আশে পাশের ফেরেশতারা আরশ বহনকারী ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ তা'আলা কি বললেন?” তারা তখন তাঁদেরকে তা বলে দেন। এভাবে প্রত্যেক নীচের ফেরেশতা তাদের উপরের ফেরেশতাদেরকে এটা জিজ্ঞেস করেন এবং তাঁদেরকে তা বলে দেন। শেষ পর্যন্ত প্রথম আকাশে এ খবর পৌছে যায়। কখনো কখনো চুরি করে শ্রবণকারী জ্বিনেরা ওটা শুনে নেয়। তখন তাদের উপর তারকা ছিটকে পড়ে। এতদসত্ত্বেও যে কথা পৌঁছানোর ইচ্ছা আল্লাহ তাআলা করেন, ওটা ঐ জ্বিন নিয়ে নেয় এবং ওর সাথে কহু কিছু মিথ্যা মিলিয়ে নিয়ে জনগণের মধ্যে প্রচার করে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা কোন বিষয়ের অহী করার ইচ্ছা করেন তখন তিনি অহীর মাধ্যমে কথা বলেন। সুতরাং যখন তিনি কথা বলেন তখন আকাশ ভয়ে কাপতে শুরু করে। আর ফেরেশতারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সিজদায় পড়ে যান। সর্বপ্রথম হযরত জিবরাঈল (আঃ) মাথা উঠান এবং আল্লাহর আদেশ শ্রবণ করেন। অতঃপর তার মুখে অন্যান্য ফেরেশতারা শুনেন এবং বলতে থাকেন যে, আল্লাহ সত্য বলেছেন। তিনি উচ্চতা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। তিনি সমুচ্চ ও মহান।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, এটা হলো ঐ অহী যা হযরত ঈসা (আঃ)-এর পরে নবী-শূন্য যামানায় বন্ধ থাকে। অতঃপর খাতিমুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর নতুনভাবে নাযিল হওয়া শুরু হয়। প্রকৃত কথা এই যে, এই ইবতিদা বা নতুনভাবে শুরু হওয়াটাও এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। তবে আয়াতটি এটাকেও অন্তর্ভুক্ত করে এবং অন্য সবকেও করে।

সাবা 34:23

২২-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বর্ণনা করছেন যে, তিনি এক ও একক। তিনি অমুখাপেক্ষী ও অভাবমুক্ত। তিনি ছাড়া কোনই মা'বুদ নেই। তিনি তুলনাবিহীন ও অংশীবিহীন। তাঁর কোন শরীক নেই, সাথী নেই, পরামর্শদাতা নেই, মন্ত্রী নেই এবং পরিচালক নেই। সুতরাং কে তাঁর সামনে হঠকারিতা করবে এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করবে? তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ যাদের কাছে তোমরা আবেদন করে থাকো, জেনে রেখো যে, অণু পরিমাণও ক্ষমতা তাদের নেই। তারা শক্তিহীন ও অক্ষম। না দুনিয়ায় তাদের কোন ক্ষমতা চলে, না আখিরাতে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যাদেরকে তারা আল্লাহ ছাড়া ডাকে তারা খেজুরের ছালেরও মালিকানা রাখে না।”(৩৫:১৩) তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা নেই এবং মালিকানার ভিত্তিতে কোন রাজত্ব নেই। আল্লাহ তা'আলা তাঁর কাজে তাদের কাছে কোনই সাহায্য গ্রহণ করেন না। অথচ তারা সবাই দরিদ্র, ফকীর ও অন্যের মুখাপেক্ষী। তারা সবাই গোলাম ও বান্দা। তার শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব, ইজ্জত ও মর্যাদা এমনই যে, তার অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে কেউ কারো জন্যে সুপারিশ করার সাহস রাখে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কে সে, যে তার অনুমতি ব্যতীত তাঁর নিকট সুপারিশ করবে?”(২:২৫৫) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আকাশের বহু ফেরেশতাও কারো সুপারিশের জন্যে মুখ খুলতে পারে না। হ্যাঁ, তবে আল্লাহ স্বীয় সম্মতিক্রমে যার জন্যে অনুমতি দিবেন (তার জন্যে অরে)।”(৫৩:২৬) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা শুধু তারই জন্যে সুপারিশ করতে পারে যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট রয়েছেন এবং তারা তাঁর ভয়ে কম্পমান থাকে।”(২১:২৮)যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, সমস্ত আদম-সন্তানের নেতা ও সবচেয়ে বড় সুপারিশকারী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) কিয়ামতের দিন যখন মাকামে মাহমূদে শাফাআতের জন্যে উপস্থিত হবেন এবং সবাই ফায়সালার জন্যে তাদের প্রতিপালকের নিকট আসবে, ঐ সময়ের কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আমি আল্লাহ তা'আলার সামনে সিজদায় পড়ে যাবো। কতক্ষণ যে আমি জিদায় পড়ে থাকবো তা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। ঐ সিজদায় আমি আল্লাহ তা'আলার এতো প্রশংসা করবো যে, ঐ শব্দগুলো এখন আমার মনে হচ্ছে না। তখন আল্লাহ বলবেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! মাথা উঠাও এবং কথা বল, তোমার কথা শোনা হবে। তুমি চাও, তোমাকে দেয়া হবে। তুমি শাফাআত কর, কবূল করা হবে।” প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্বের আর একটি বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যখন তিনি স্বীয় অহীর মাধ্যমে কথা বলেন, আর আকাশসমূহে আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী। ফেরেশতারা তা শুনে থাকেন, তখন তাঁরা ভয়ে কেঁপে ওঠেন এবং তাদের জ্ঞান লোপ পাওয়ার উপক্রম হয়। পরে যখন তাদের অন্তর হতে ভয় বিদূরিত হয় (আরবী) শব্দটি কোন কোন পঠনে (আরবী) ও এসেছে, দুটোরই ভাবার্থ একই। তখন তাঁরা একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এই সময় প্রতিপালকের কি হুকুম নাযিল হলো?” আহলে আরশ তাদের পার্শ্ববর্তীদের নিকট ধারাবাহিকভাবে ও সঠিকভাবে আল্লাহর আদেশ পৌছিয়ে থাকেন। এই আয়াতের একটি ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, যখন মৃত্যু-যাতনার সময় আসে তখন মুশরিক একথা বলে থাকে এবং অনুরূপভাবে কিয়ামতের দিনও বলবে যখন তাদের জ্ঞান ফিরবে তাদের দুনিয়ার গাফিলতির পর, অর্থাৎ দুনিয়ায় যে তারা আল্লাহকে, তাঁর রাসূল (সঃ)-কে, আখিরাতকে ইত্যাদি সবকিছুকেই ভুলে ছিল, কিয়ামতের দিন যখন তাদের জ্ঞান ফিরবে এবং সব কিছু বুঝতে পারবে তখন তারা পরস্পর বলাবলি করবেঃ “তোমাদের প্রতিপালক কি বললেন?" উত্তরে বলা হবেঃ “যা সত্য তিনি তাই বলেছেন।” যে জিনিস হতে তারা দুনিয়ায় নিশ্চিন্ত থাকতো আজ সেটা তাদের সামনে পেশ করা হবে। তাহলে অন্তর হতে ভয় দূর হওয়ার অর্থ এই হলো যে, যখন তাদের চোখের উপর হতে পর্দা সরিয়ে দেয়া হবে তখন তাদের পূর্বের সব সন্দেহ ও অবিশ্বাস মিটে যাবে এবং শয়তানী কুমন্ত্রণা দূর হয়ে যাবে, ঐ সময় তারা আল্লাহ তা'আলার সমস্ত কথার সত্যতা স্বীকার করে নিবে এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্মের কথা মেনে নিবে। সুতরাং মৃত্যুর সময়ের স্বীকারুক্তিও কোন কাজে আসবে না এবং কিয়ামতের দিনের স্বীকারুক্তিতেও কোন লাভ হবে না। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর মতে প্রথম তাফসীরই সঠিক। অর্থাৎ এটা ফেরেশতাদের উক্তি হওয়াই যুক্তিযুক্ত। হাদীসে ও আসারেও এর উপরই জোর দেয়া হয়েছে। সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তাআলা কোন বিষয়ের ফায়সালা আসমানে করেন তখন ফেরেশতারা বিনয়ের সাথে তাদের ডানা ঝুঁকিয়ে থাকেন এবং প্রতিপালকের কালাম এমনই হয় যেমন ঐ শিকলের শব্দ, যা পাথরের উপর বাজানো হয়। যখন তাদের ভয় কমে আসে তখন তারা পরস্পরের মধ্যে বিজ্ঞাসাবাদ করেনঃ “তোমাদের প্রতিপালক কি বললেন?" উত্তরে বলা হয়ঃ “যা সত্য তিনি তাই বলেছেন। তিনি সমুচ্চ, মহান।" কোন কোন সময় জ্বিনেরা ফেরেশতাদের কথা শুনার জন্যে তাদের নির্ধারিত স্থানে গমন করে এবং চুরি করে কিছু শুনেও ফেলে। তাদের যারা উপরে থাকে তারা তাদের নীচে অবস্থানকারীদেরকে তা বলে দেয়। এভাবে ঐ কথাগুলো দুনিয়ায় চলে আসে এবং গণক ও যাদুকরদের কানে পৌঁছে যায়। ঐ শয়তান জ্বিনদেরকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্যে জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে। কিন্তু তার পূর্বেই কিছু কিছু খবর তারা দুনিয়ায় পৌঁছিয়ে দেয়। কখনো কখনো আবার খবর পৌঁছানোর পূর্বেই তারা জ্বলে পুড়ে যায়।গণক বা যাদুকর দু' একটি ঐ সত্য কথার সাথে শত শতটি মিথ্যা মিলিয়ে জনগণের সামনে প্রচার করে। কাহেনের দু' একটি কথা যখন সত্য প্রমাণিত হয় তখন জনগণ তার মুরীদ হতে শুরু করে। তারা একে অপরকে বলেঃ “দেখো, এ কাজটি তার কথা অনুযায়ী হয়েছে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের দলে বসেছিলেন। এমন সময় একটি তারকা খসে পড়লো, ফলে চতুর্দিক আলোকিত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “অজ্ঞতার যুগে এভাবে তারকা ছিটকে পড়লে তোমরা কি বলতে?” সাহাবীরা জবাবে বললেনঃ “এ অবস্থায় আমরা বলতাম যে, হয়তো কোন বড় ও সম্ভান্ত মানুষ জন্মগ্রহণ করেছে অথবা মারা গেছে। বর্ণনাকারী যুহরী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ অজ্ঞতার যুগেও কি এই ভাবে তারকা ঝরে বা ছিটকে পড়তো?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের যুগেই এটা খুব বেশী হয়।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের ঐ কথার উত্তরে বললেনঃ “জেনে রেখো যে, কারো জন্ম বা মৃত্যুর সাথে ওগুলোর কোন সম্পর্কে নেই। কথা হলো এই যে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা যখন আকাশে কোন বিষয়ের ফায়সালা করেন তখন আরশ বহনকারী ফেরেশতারা তাঁর তাসবীহ পাঠ করতে থাকেন। তারপর সপ্তম আকাশবাসী, এরপর ষষ্ঠ আকাশবাসী তাঁর মহিমা ঘঘাষণা করতে থাকেন। আর এভাবে শেষ পর্যন্ত এই তাসবীহ্ দুনিয়ার আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারপর আরশের আশে পাশের ফেরেশতারা আরশ বহনকারী ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ তা'আলা কি বললেন?” তারা তখন তাঁদেরকে তা বলে দেন। এভাবে প্রত্যেক নীচের ফেরেশতা তাদের উপরের ফেরেশতাদেরকে এটা জিজ্ঞেস করেন এবং তাঁদেরকে তা বলে দেন। শেষ পর্যন্ত প্রথম আকাশে এ খবর পৌছে যায়। কখনো কখনো চুরি করে শ্রবণকারী জ্বিনেরা ওটা শুনে নেয়। তখন তাদের উপর তারকা ছিটকে পড়ে। এতদসত্ত্বেও যে কথা পৌঁছানোর ইচ্ছা আল্লাহ তাআলা করেন, ওটা ঐ জ্বিন নিয়ে নেয় এবং ওর সাথে কহু কিছু মিথ্যা মিলিয়ে নিয়ে জনগণের মধ্যে প্রচার করে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা কোন বিষয়ের অহী করার ইচ্ছা করেন তখন তিনি অহীর মাধ্যমে কথা বলেন। সুতরাং যখন তিনি কথা বলেন তখন আকাশ ভয়ে কাপতে শুরু করে। আর ফেরেশতারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সিজদায় পড়ে যান। সর্বপ্রথম হযরত জিবরাঈল (আঃ) মাথা উঠান এবং আল্লাহর আদেশ শ্রবণ করেন। অতঃপর তার মুখে অন্যান্য ফেরেশতারা শুনেন এবং বলতে থাকেন যে, আল্লাহ সত্য বলেছেন। তিনি উচ্চতা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। তিনি সমুচ্চ ও মহান।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, এটা হলো ঐ অহী যা হযরত ঈসা (আঃ)-এর পরে নবী-শূন্য যামানায় বন্ধ থাকে। অতঃপর খাতিমুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর নতুনভাবে নাযিল হওয়া শুরু হয়। প্রকৃত কথা এই যে, এই ইবতিদা বা নতুনভাবে শুরু হওয়াটাও এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। তবে আয়াতটি এটাকেও অন্তর্ভুক্ত করে এবং অন্য সবকেও করে।

সাবা 34:24

২৪-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা এটা সাব্যস্ত করছেন যে, শুধু তিনিই সৃষ্টিকারী ও আহার্যদাতা এবং একমাত্র তিনিই ইবাদতের যোগ্য। যেমন তারা স্বীকার করে যে, আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণকারী এবং যমীন হতে ফসল উৎপন্নকারী একমাত্র আল্লাহ। অনুরূপভাবে তাদের এটাও মেনে নেয়া উচিত যে, ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি এই কাফির মুশরিকদেরকে বলঃ যখন আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এতো মতানৈক্য ও মতভেদ রয়েছে তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, একদল হিদায়াতের উপর এবং অপর দল বিভ্রান্তির উপর রয়েছে। এটা হতে পারে না যে, দুই দলই হিদায়াতের উপর রয়েছে বা দুই দলই বিভ্রান্তির উপর রয়েছে। আমরা হলাম একতুবাদী এবং আমরা একত্ববাদের স্পষ্ট ও জাজ্বল্যমান দলীল-প্রমাণাদি বর্ণনা করেছি। আর তোমরা রয়েছে শিরকের উপর, যার কোন দলীল তোমাদের কাছে নেই। সুতরাং নিঃসন্দেহে আমরা হিদায়াতের উপর রয়েছি এবং তোমরা রয়েছে বিভ্রান্তির উপর। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ মুশরিকদেরকে এ কথাই বলেছিলেনঃ “আমাদের দুইটি দলের মধ্যে একটি দল অবশ্যই সত্যের উপর রয়েছে। কেননা, এরূপ বিপরীতমুখী দুটি দলই সত্যের উপর থাকা অসম্ভব। এটা বিবেক-বুদ্ধির কাছেও অসম্ভবই বটে।এ আয়াতের একটি অর্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ আমরাই আছি হিদায়াতের উপর এবং তোমরা আছ ভ্রান্তির উপর। আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোন সম্পর্কই নেই। আমরা তোমাদের হতে ও তোমাদের আমল হতে সম্পূর্ণরূপে দায়িত্বমুক্ত। হ্যা, তবে আমরা যে পথে রয়েছি তোমরাও যদি সেই পথে চলে আসে তাহলে অবশ্যই তোমরা আমাদের হবে এবং আমরা তোমাদের হবে। অন্যথায় আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোনই সম্পর্ক থাকবে না। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তারা যদি তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন বা অবিশ্বাস করে তবে তুমি তাদেরকে বলে দাও আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে। তোমরা আমার আমল হতে দায়িত্বমুক্ত এবং আমিও তোমাদের আমল হতে দায়িত্বমুক্ত।”(১০:৪১)।সূরায়ে কাফিরূনে বলা হয়েছে:(হে নবী সঃ)! তুমি বল- হে কাফিরগণ! আমি তার ইবাদত করি না যার ইবাদত তোমরা কর এবং তোমরাও তার ইবাদতকারী নও যার ইবাদত আমি করি, এবং আমি ইবাদতকারী নই তার যার ইবাদত তোমরা করে আসছে। আর তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও যার ইবাদত আমি করি। তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার।”জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুশরিকদেরকে বলে দাও আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ কিয়ামতের মাঠে সকলকে একত্রিত করবেন এবং তাদের মধ্যে সঠিক ফায়সালা করে দিবেন। সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কার এবং দুষ্কর্মকারীদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। ঐ দিন আমাদের সত্যতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন সবাই পৃথক পৃথক হয়ে যাবে। মুমিনরা ও সৎকর্মশীলরা বাগ-বাগিচার মধ্যে আমোদ-আহ্লাদে সময় কাটাবে। আর যারা কুফরী করেছে, আমার আয়াতসমূহকে, আখিরাতের সাক্ষাৎকে আবিশ্বাস করেছে। তারা জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (৩০:১৪) আল্লাহ তা'আলা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম ফায়সালাকারী এবং তিনি সর্বজ্ঞ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, তুমি কাফির ও মুশরিকদেরকে বলে দাওতোমরা আমায় তাদেরকে দেখিয়ে দাও যাদেরকে তোমরা শরীকরূপে আল্লাহর সাথে জুড়ে দিয়েছো। না, কখনো না। তোমরা আল্লাহর শরীক হিসেবে তাদেরকে দেখাতে সক্ষম হবে না। কেননা, তিনি তো তুলনাবিহীন এবং শরীকবিহীন। তিনি একক। তিনি পরাক্রমশালী। তিনি সকলকেই নিজের অধিকারভুক্ত করে রেখেছেন। তিনি সবারই উপর বিজয়ী। তিনি প্রজ্ঞাময়। তিনি অতি পবিত্র ও মহান। মুশরিকরা তার প্রতি যে অপবাদ দেয় তা থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র।

সাবা 34:25

২৪-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা এটা সাব্যস্ত করছেন যে, শুধু তিনিই সৃষ্টিকারী ও আহার্যদাতা এবং একমাত্র তিনিই ইবাদতের যোগ্য। যেমন তারা স্বীকার করে যে, আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণকারী এবং যমীন হতে ফসল উৎপন্নকারী একমাত্র আল্লাহ। অনুরূপভাবে তাদের এটাও মেনে নেয়া উচিত যে, ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি এই কাফির মুশরিকদেরকে বলঃ যখন আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এতো মতানৈক্য ও মতভেদ রয়েছে তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, একদল হিদায়াতের উপর এবং অপর দল বিভ্রান্তির উপর রয়েছে। এটা হতে পারে না যে, দুই দলই হিদায়াতের উপর রয়েছে বা দুই দলই বিভ্রান্তির উপর রয়েছে। আমরা হলাম একতুবাদী এবং আমরা একত্ববাদের স্পষ্ট ও জাজ্বল্যমান দলীল-প্রমাণাদি বর্ণনা করেছি। আর তোমরা রয়েছে শিরকের উপর, যার কোন দলীল তোমাদের কাছে নেই। সুতরাং নিঃসন্দেহে আমরা হিদায়াতের উপর রয়েছি এবং তোমরা রয়েছে বিভ্রান্তির উপর। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ মুশরিকদেরকে এ কথাই বলেছিলেনঃ “আমাদের দুইটি দলের মধ্যে একটি দল অবশ্যই সত্যের উপর রয়েছে। কেননা, এরূপ বিপরীতমুখী দুটি দলই সত্যের উপর থাকা অসম্ভব। এটা বিবেক-বুদ্ধির কাছেও অসম্ভবই বটে।এ আয়াতের একটি অর্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ আমরাই আছি হিদায়াতের উপর এবং তোমরা আছ ভ্রান্তির উপর। আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোন সম্পর্কই নেই। আমরা তোমাদের হতে ও তোমাদের আমল হতে সম্পূর্ণরূপে দায়িত্বমুক্ত। হ্যা, তবে আমরা যে পথে রয়েছি তোমরাও যদি সেই পথে চলে আসে তাহলে অবশ্যই তোমরা আমাদের হবে এবং আমরা তোমাদের হবে। অন্যথায় আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোনই সম্পর্ক থাকবে না। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তারা যদি তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন বা অবিশ্বাস করে তবে তুমি তাদেরকে বলে দাও আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে। তোমরা আমার আমল হতে দায়িত্বমুক্ত এবং আমিও তোমাদের আমল হতে দায়িত্বমুক্ত।”(১০:৪১)।সূরায়ে কাফিরূনে বলা হয়েছে:(হে নবী সঃ)! তুমি বল- হে কাফিরগণ! আমি তার ইবাদত করি না যার ইবাদত তোমরা কর এবং তোমরাও তার ইবাদতকারী নও যার ইবাদত আমি করি, এবং আমি ইবাদতকারী নই তার যার ইবাদত তোমরা করে আসছে। আর তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও যার ইবাদত আমি করি। তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার।”জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুশরিকদেরকে বলে দাও আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ কিয়ামতের মাঠে সকলকে একত্রিত করবেন এবং তাদের মধ্যে সঠিক ফায়সালা করে দিবেন। সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কার এবং দুষ্কর্মকারীদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। ঐ দিন আমাদের সত্যতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন সবাই পৃথক পৃথক হয়ে যাবে। মুমিনরা ও সৎকর্মশীলরা বাগ-বাগিচার মধ্যে আমোদ-আহ্লাদে সময় কাটাবে। আর যারা কুফরী করেছে, আমার আয়াতসমূহকে, আখিরাতের সাক্ষাৎকে আবিশ্বাস করেছে। তারা জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (৩০:১৪) আল্লাহ তা'আলা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম ফায়সালাকারী এবং তিনি সর্বজ্ঞ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, তুমি কাফির ও মুশরিকদেরকে বলে দাওতোমরা আমায় তাদেরকে দেখিয়ে দাও যাদেরকে তোমরা শরীকরূপে আল্লাহর সাথে জুড়ে দিয়েছো। না, কখনো না। তোমরা আল্লাহর শরীক হিসেবে তাদেরকে দেখাতে সক্ষম হবে না। কেননা, তিনি তো তুলনাবিহীন এবং শরীকবিহীন। তিনি একক। তিনি পরাক্রমশালী। তিনি সকলকেই নিজের অধিকারভুক্ত করে রেখেছেন। তিনি সবারই উপর বিজয়ী। তিনি প্রজ্ঞাময়। তিনি অতি পবিত্র ও মহান। মুশরিকরা তার প্রতি যে অপবাদ দেয় তা থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র।

সাবা 34:26

২৪-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা এটা সাব্যস্ত করছেন যে, শুধু তিনিই সৃষ্টিকারী ও আহার্যদাতা এবং একমাত্র তিনিই ইবাদতের যোগ্য। যেমন তারা স্বীকার করে যে, আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণকারী এবং যমীন হতে ফসল উৎপন্নকারী একমাত্র আল্লাহ। অনুরূপভাবে তাদের এটাও মেনে নেয়া উচিত যে, ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি এই কাফির মুশরিকদেরকে বলঃ যখন আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এতো মতানৈক্য ও মতভেদ রয়েছে তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, একদল হিদায়াতের উপর এবং অপর দল বিভ্রান্তির উপর রয়েছে। এটা হতে পারে না যে, দুই দলই হিদায়াতের উপর রয়েছে বা দুই দলই বিভ্রান্তির উপর রয়েছে। আমরা হলাম একতুবাদী এবং আমরা একত্ববাদের স্পষ্ট ও জাজ্বল্যমান দলীল-প্রমাণাদি বর্ণনা করেছি। আর তোমরা রয়েছে শিরকের উপর, যার কোন দলীল তোমাদের কাছে নেই। সুতরাং নিঃসন্দেহে আমরা হিদায়াতের উপর রয়েছি এবং তোমরা রয়েছে বিভ্রান্তির উপর। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ মুশরিকদেরকে এ কথাই বলেছিলেনঃ “আমাদের দুইটি দলের মধ্যে একটি দল অবশ্যই সত্যের উপর রয়েছে। কেননা, এরূপ বিপরীতমুখী দুটি দলই সত্যের উপর থাকা অসম্ভব। এটা বিবেক-বুদ্ধির কাছেও অসম্ভবই বটে।এ আয়াতের একটি অর্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ আমরাই আছি হিদায়াতের উপর এবং তোমরা আছ ভ্রান্তির উপর। আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোন সম্পর্কই নেই। আমরা তোমাদের হতে ও তোমাদের আমল হতে সম্পূর্ণরূপে দায়িত্বমুক্ত। হ্যা, তবে আমরা যে পথে রয়েছি তোমরাও যদি সেই পথে চলে আসে তাহলে অবশ্যই তোমরা আমাদের হবে এবং আমরা তোমাদের হবে। অন্যথায় আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোনই সম্পর্ক থাকবে না। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তারা যদি তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন বা অবিশ্বাস করে তবে তুমি তাদেরকে বলে দাও আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে। তোমরা আমার আমল হতে দায়িত্বমুক্ত এবং আমিও তোমাদের আমল হতে দায়িত্বমুক্ত।”(১০:৪১)।সূরায়ে কাফিরূনে বলা হয়েছে:(হে নবী সঃ)! তুমি বল- হে কাফিরগণ! আমি তার ইবাদত করি না যার ইবাদত তোমরা কর এবং তোমরাও তার ইবাদতকারী নও যার ইবাদত আমি করি, এবং আমি ইবাদতকারী নই তার যার ইবাদত তোমরা করে আসছে। আর তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও যার ইবাদত আমি করি। তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার।”জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুশরিকদেরকে বলে দাও আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ কিয়ামতের মাঠে সকলকে একত্রিত করবেন এবং তাদের মধ্যে সঠিক ফায়সালা করে দিবেন। সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কার এবং দুষ্কর্মকারীদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। ঐ দিন আমাদের সত্যতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন সবাই পৃথক পৃথক হয়ে যাবে। মুমিনরা ও সৎকর্মশীলরা বাগ-বাগিচার মধ্যে আমোদ-আহ্লাদে সময় কাটাবে। আর যারা কুফরী করেছে, আমার আয়াতসমূহকে, আখিরাতের সাক্ষাৎকে আবিশ্বাস করেছে। তারা জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (৩০:১৪) আল্লাহ তা'আলা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম ফায়সালাকারী এবং তিনি সর্বজ্ঞ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, তুমি কাফির ও মুশরিকদেরকে বলে দাওতোমরা আমায় তাদেরকে দেখিয়ে দাও যাদেরকে তোমরা শরীকরূপে আল্লাহর সাথে জুড়ে দিয়েছো। না, কখনো না। তোমরা আল্লাহর শরীক হিসেবে তাদেরকে দেখাতে সক্ষম হবে না। কেননা, তিনি তো তুলনাবিহীন এবং শরীকবিহীন। তিনি একক। তিনি পরাক্রমশালী। তিনি সকলকেই নিজের অধিকারভুক্ত করে রেখেছেন। তিনি সবারই উপর বিজয়ী। তিনি প্রজ্ঞাময়। তিনি অতি পবিত্র ও মহান। মুশরিকরা তার প্রতি যে অপবাদ দেয় তা থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র।

সাবা 34:27

২৪-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা এটা সাব্যস্ত করছেন যে, শুধু তিনিই সৃষ্টিকারী ও আহার্যদাতা এবং একমাত্র তিনিই ইবাদতের যোগ্য। যেমন তারা স্বীকার করে যে, আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণকারী এবং যমীন হতে ফসল উৎপন্নকারী একমাত্র আল্লাহ। অনুরূপভাবে তাদের এটাও মেনে নেয়া উচিত যে, ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি এই কাফির মুশরিকদেরকে বলঃ যখন আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এতো মতানৈক্য ও মতভেদ রয়েছে তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, একদল হিদায়াতের উপর এবং অপর দল বিভ্রান্তির উপর রয়েছে। এটা হতে পারে না যে, দুই দলই হিদায়াতের উপর রয়েছে বা দুই দলই বিভ্রান্তির উপর রয়েছে। আমরা হলাম একতুবাদী এবং আমরা একত্ববাদের স্পষ্ট ও জাজ্বল্যমান দলীল-প্রমাণাদি বর্ণনা করেছি। আর তোমরা রয়েছে শিরকের উপর, যার কোন দলীল তোমাদের কাছে নেই। সুতরাং নিঃসন্দেহে আমরা হিদায়াতের উপর রয়েছি এবং তোমরা রয়েছে বিভ্রান্তির উপর। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ মুশরিকদেরকে এ কথাই বলেছিলেনঃ “আমাদের দুইটি দলের মধ্যে একটি দল অবশ্যই সত্যের উপর রয়েছে। কেননা, এরূপ বিপরীতমুখী দুটি দলই সত্যের উপর থাকা অসম্ভব। এটা বিবেক-বুদ্ধির কাছেও অসম্ভবই বটে।এ আয়াতের একটি অর্থ নিম্নরূপও বর্ণনা করা হয়েছেঃ আমরাই আছি হিদায়াতের উপর এবং তোমরা আছ ভ্রান্তির উপর। আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোন সম্পর্কই নেই। আমরা তোমাদের হতে ও তোমাদের আমল হতে সম্পূর্ণরূপে দায়িত্বমুক্ত। হ্যা, তবে আমরা যে পথে রয়েছি তোমরাও যদি সেই পথে চলে আসে তাহলে অবশ্যই তোমরা আমাদের হবে এবং আমরা তোমাদের হবে। অন্যথায় আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোনই সম্পর্ক থাকবে না। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তারা যদি তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন বা অবিশ্বাস করে তবে তুমি তাদেরকে বলে দাও আমার আমল আমার জন্যে এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্যে। তোমরা আমার আমল হতে দায়িত্বমুক্ত এবং আমিও তোমাদের আমল হতে দায়িত্বমুক্ত।”(১০:৪১)।সূরায়ে কাফিরূনে বলা হয়েছে:(হে নবী সঃ)! তুমি বল- হে কাফিরগণ! আমি তার ইবাদত করি না যার ইবাদত তোমরা কর এবং তোমরাও তার ইবাদতকারী নও যার ইবাদত আমি করি, এবং আমি ইবাদতকারী নই তার যার ইবাদত তোমরা করে আসছে। আর তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও যার ইবাদত আমি করি। তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার।”জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি কাফির ও মুশরিকদেরকে বলে দাও আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ কিয়ামতের মাঠে সকলকে একত্রিত করবেন এবং তাদের মধ্যে সঠিক ফায়সালা করে দিবেন। সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কার এবং দুষ্কর্মকারীদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। ঐ দিন আমাদের সত্যতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন সবাই পৃথক পৃথক হয়ে যাবে। মুমিনরা ও সৎকর্মশীলরা বাগ-বাগিচার মধ্যে আমোদ-আহ্লাদে সময় কাটাবে। আর যারা কুফরী করেছে, আমার আয়াতসমূহকে, আখিরাতের সাক্ষাৎকে আবিশ্বাস করেছে। তারা জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।” (৩০:১৪) আল্লাহ তা'আলা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম ফায়সালাকারী এবং তিনি সর্বজ্ঞ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, তুমি কাফির ও মুশরিকদেরকে বলে দাওতোমরা আমায় তাদেরকে দেখিয়ে দাও যাদেরকে তোমরা শরীকরূপে আল্লাহর সাথে জুড়ে দিয়েছো। না, কখনো না। তোমরা আল্লাহর শরীক হিসেবে তাদেরকে দেখাতে সক্ষম হবে না। কেননা, তিনি তো তুলনাবিহীন এবং শরীকবিহীন। তিনি একক। তিনি পরাক্রমশালী। তিনি সকলকেই নিজের অধিকারভুক্ত করে রেখেছেন। তিনি সবারই উপর বিজয়ী। তিনি প্রজ্ঞাময়। তিনি অতি পবিত্র ও মহান। মুশরিকরা তার প্রতি যে অপবাদ দেয় তা থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র।

সাবা 34:28

২৮-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বলছেনঃ আমি তোমাকে সারা বিশ্বের জন্যে রাসূল করে পাঠিয়েছি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে রাসূল সঃ)! তুমি বলে দাও হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সবারই নিকট আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি।”(৭:১৫৮) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “কত মহান তিনি যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরকার অবতীর্ণ করেছেন যাতে সে বিশ্ব জগতের জন্যে সতর্ককারী হতে পারে।”(২৫:১) এখানেও আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমি তো তোমাকে সমগ্র মানব জাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ অজ্ঞতাবশতঃ নবী (সঃ)-কে মানে না। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কামনা করলেও অধিকাংশ লোকই মুমিন নয়।"(১২:১০৩) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তুমি ভূ-পৃষ্ঠের অধিকাংশ লোকের কথা মেনে চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে ভ্রষ্ট করে দেবে।”(৬:১১৬)সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাত সাধারণ লোকদের জন্যে ছিল। আরব, অনারব সবারই জন্যেই ছিলেন তিনি নবী। সুতরাং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ও সম্মানিত হলো ঐ ব্যক্তি যে তার খুব বেশী অনুগত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে আকাশবাসীর উপর এবং নবীদের উপর সবারই উপর ফযীলত দান করেছেন। জনগণ এর দলীল জানতে চাইলে তিনি বলেনঃ দেখো, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক রাসূলকে তার কওমের ভাষাসহ পাঠিয়েছি যাতে সে তাদের সামনে খোলাখুলি ও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে পারে।”(১৪:৪) (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা অন্য কোন নবীকে দেয়া হয়নি। এক মাসের পথ পর্যন্ত আমাকে শুধু প্রভাব ও গাম্ভীর্য দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। (এক মাসের পথের দূরত্ব হতে শত্রুরা আমার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়)। আমার জন্যে সমস্ত যমীনকে সিজদার জায়গা ও পবিত্র করা হয়েছে। আমার উম্মতের যে কেউই যে কোন জায়গাতেই থাক, নামাযের সময় হয়ে গেলে সে সেখানেই নামায পড়ে নিতে পারে। আমার পূর্বে কোন নবীর জন্যে গানীমতের মাল হালাল ছিল না। কিন্তু আমার জন্যে তা হালাল করা হয়েছে। প্রত্যেক নবীকে শুধু তার কওমের নিকট পাঠানো হয়েছিল, আর আমাকে সমস্ত মানুষের নিকট নবী করে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ দানব ও মানব এবং আরব ও অনারব সবারই নিকট আমি নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)এরপর কাফিররা যে কিয়ামত সংঘটিত হওয়াকে অসম্ভব মনে করতো, আল্লাহ্ তা'আলা এখানে তারই বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, তারা জিজ্ঞেস করেতোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে বলঃ এই প্রতিশ্রুতি (কেয়ামতের প্রতিশ্রুতি) কখন বাস্তবায়িত হবে? যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কেয়ামতকে যারা বিশ্বাস করে না তারা এ ব্যাপারে তাড়াহুড়া করে। আর মুমিনরা ওর ভয়ে প্রকম্পিত হয় এবং তারা জানে যে, ওটা (সংঘটিত হওয়া) সত্য।”(৪২:১৮)।তাদের কথার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের জন্যে আছে এক নির্ধারিত দিন, যা তোমরা বিলম্বিত করতে পারবে না এবং ত্বরান্বিত করতেও পারবে না। যেমন অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহর নির্ধারিত সময় যখন এসে যাবে তখন ওটাকে পিছনে সরানো হবে না।”(৭১:৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে নির্ধারিত সময়কাল পর্যন্তই অবকাশ দিচ্ছি। ঐ দিন যখন এসে যাবে তখন তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ কথা বলতে পারবে না। সেই দিন কেউ হবে হতভাগ্য এবং কেউ হবে সৌভাগ্যবান।”(১১:১০৪-১০৫)

সাবা 34:29

২৮-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বলছেনঃ আমি তোমাকে সারা বিশ্বের জন্যে রাসূল করে পাঠিয়েছি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে রাসূল সঃ)! তুমি বলে দাও হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সবারই নিকট আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি।”(৭:১৫৮) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “কত মহান তিনি যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরকার অবতীর্ণ করেছেন যাতে সে বিশ্ব জগতের জন্যে সতর্ককারী হতে পারে।”(২৫:১) এখানেও আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমি তো তোমাকে সমগ্র মানব জাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ অজ্ঞতাবশতঃ নবী (সঃ)-কে মানে না। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কামনা করলেও অধিকাংশ লোকই মুমিন নয়।"(১২:১০৩) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তুমি ভূ-পৃষ্ঠের অধিকাংশ লোকের কথা মেনে চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে ভ্রষ্ট করে দেবে।”(৬:১১৬)সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাত সাধারণ লোকদের জন্যে ছিল। আরব, অনারব সবারই জন্যেই ছিলেন তিনি নবী। সুতরাং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ও সম্মানিত হলো ঐ ব্যক্তি যে তার খুব বেশী অনুগত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে আকাশবাসীর উপর এবং নবীদের উপর সবারই উপর ফযীলত দান করেছেন। জনগণ এর দলীল জানতে চাইলে তিনি বলেনঃ দেখো, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক রাসূলকে তার কওমের ভাষাসহ পাঠিয়েছি যাতে সে তাদের সামনে খোলাখুলি ও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে পারে।”(১৪:৪) (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা অন্য কোন নবীকে দেয়া হয়নি। এক মাসের পথ পর্যন্ত আমাকে শুধু প্রভাব ও গাম্ভীর্য দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। (এক মাসের পথের দূরত্ব হতে শত্রুরা আমার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়)। আমার জন্যে সমস্ত যমীনকে সিজদার জায়গা ও পবিত্র করা হয়েছে। আমার উম্মতের যে কেউই যে কোন জায়গাতেই থাক, নামাযের সময় হয়ে গেলে সে সেখানেই নামায পড়ে নিতে পারে। আমার পূর্বে কোন নবীর জন্যে গানীমতের মাল হালাল ছিল না। কিন্তু আমার জন্যে তা হালাল করা হয়েছে। প্রত্যেক নবীকে শুধু তার কওমের নিকট পাঠানো হয়েছিল, আর আমাকে সমস্ত মানুষের নিকট নবী করে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ দানব ও মানব এবং আরব ও অনারব সবারই নিকট আমি নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)এরপর কাফিররা যে কিয়ামত সংঘটিত হওয়াকে অসম্ভব মনে করতো, আল্লাহ্ তা'আলা এখানে তারই বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, তারা জিজ্ঞেস করেতোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে বলঃ এই প্রতিশ্রুতি (কেয়ামতের প্রতিশ্রুতি) কখন বাস্তবায়িত হবে? যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কেয়ামতকে যারা বিশ্বাস করে না তারা এ ব্যাপারে তাড়াহুড়া করে। আর মুমিনরা ওর ভয়ে প্রকম্পিত হয় এবং তারা জানে যে, ওটা (সংঘটিত হওয়া) সত্য।”(৪২:১৮)।তাদের কথার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের জন্যে আছে এক নির্ধারিত দিন, যা তোমরা বিলম্বিত করতে পারবে না এবং ত্বরান্বিত করতেও পারবে না। যেমন অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহর নির্ধারিত সময় যখন এসে যাবে তখন ওটাকে পিছনে সরানো হবে না।”(৭১:৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে নির্ধারিত সময়কাল পর্যন্তই অবকাশ দিচ্ছি। ঐ দিন যখন এসে যাবে তখন তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ কথা বলতে পারবে না। সেই দিন কেউ হবে হতভাগ্য এবং কেউ হবে সৌভাগ্যবান।”(১১:১০৪-১০৫)

সাবা 34:30

২৮-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বলছেনঃ আমি তোমাকে সারা বিশ্বের জন্যে রাসূল করে পাঠিয়েছি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে রাসূল সঃ)! তুমি বলে দাও হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সবারই নিকট আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি।”(৭:১৫৮) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “কত মহান তিনি যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরকার অবতীর্ণ করেছেন যাতে সে বিশ্ব জগতের জন্যে সতর্ককারী হতে পারে।”(২৫:১) এখানেও আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমি তো তোমাকে সমগ্র মানব জাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ অজ্ঞতাবশতঃ নবী (সঃ)-কে মানে না। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি কামনা করলেও অধিকাংশ লোকই মুমিন নয়।"(১২:১০৩) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তুমি ভূ-পৃষ্ঠের অধিকাংশ লোকের কথা মেনে চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে ভ্রষ্ট করে দেবে।”(৬:১১৬)সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাত সাধারণ লোকদের জন্যে ছিল। আরব, অনারব সবারই জন্যেই ছিলেন তিনি নবী। সুতরাং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ও সম্মানিত হলো ঐ ব্যক্তি যে তার খুব বেশী অনুগত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে আকাশবাসীর উপর এবং নবীদের উপর সবারই উপর ফযীলত দান করেছেন। জনগণ এর দলীল জানতে চাইলে তিনি বলেনঃ দেখো, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক রাসূলকে তার কওমের ভাষাসহ পাঠিয়েছি যাতে সে তাদের সামনে খোলাখুলি ও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে পারে।”(১৪:৪) (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা অন্য কোন নবীকে দেয়া হয়নি। এক মাসের পথ পর্যন্ত আমাকে শুধু প্রভাব ও গাম্ভীর্য দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। (এক মাসের পথের দূরত্ব হতে শত্রুরা আমার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়)। আমার জন্যে সমস্ত যমীনকে সিজদার জায়গা ও পবিত্র করা হয়েছে। আমার উম্মতের যে কেউই যে কোন জায়গাতেই থাক, নামাযের সময় হয়ে গেলে সে সেখানেই নামায পড়ে নিতে পারে। আমার পূর্বে কোন নবীর জন্যে গানীমতের মাল হালাল ছিল না। কিন্তু আমার জন্যে তা হালাল করা হয়েছে। প্রত্যেক নবীকে শুধু তার কওমের নিকট পাঠানো হয়েছিল, আর আমাকে সমস্ত মানুষের নিকট নবী করে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ দানব ও মানব এবং আরব ও অনারব সবারই নিকট আমি নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)এরপর কাফিররা যে কিয়ামত সংঘটিত হওয়াকে অসম্ভব মনে করতো, আল্লাহ্ তা'আলা এখানে তারই বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, তারা জিজ্ঞেস করেতোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে বলঃ এই প্রতিশ্রুতি (কেয়ামতের প্রতিশ্রুতি) কখন বাস্তবায়িত হবে? যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কেয়ামতকে যারা বিশ্বাস করে না তারা এ ব্যাপারে তাড়াহুড়া করে। আর মুমিনরা ওর ভয়ে প্রকম্পিত হয় এবং তারা জানে যে, ওটা (সংঘটিত হওয়া) সত্য।”(৪২:১৮)।তাদের কথার উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমাদের জন্যে আছে এক নির্ধারিত দিন, যা তোমরা বিলম্বিত করতে পারবে না এবং ত্বরান্বিত করতেও পারবে না। যেমন অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহর নির্ধারিত সময় যখন এসে যাবে তখন ওটাকে পিছনে সরানো হবে না।”(৭১:৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে নির্ধারিত সময়কাল পর্যন্তই অবকাশ দিচ্ছি। ঐ দিন যখন এসে যাবে তখন তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ কথা বলতে পারবে না। সেই দিন কেউ হবে হতভাগ্য এবং কেউ হবে সৌভাগ্যবান।”(১১:১০৪-১০৫)

সাবা 34:31

৩১-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর: কাফিরদের ঔদ্ধত্যপনা ও বাতিলের জিদের বর্ণনা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তারা ফায়সালা করে নিয়েছে যে, যদিও তারা কুরআন কারীমের সত্যতার হাজার দলীল দেখে নেয় তবুও ওর উপর ঈমান আনবে না। এমনকি ওর পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর উপরও না। তারা তাদের এই কথার স্বাদ ঐ সময় গ্রহণ করবে যখন আল্লাহর সামনে জাহান্নামের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছছাটরা বড়দেরকে এবং বড়রা ছোটদেরকে দোষারোপ করবে। প্রত্যেকেই অপরকে দোষী বলবে। অনুসারীরা অনুসৃতদেরকে বলবেঃ তোমরা না থাকলে অবশ্যই আমরা মুমিন হতাম। অনুসৃতরা তখন অনুসারীদেরকে জবাবে বলবেঃ তোমাদের কাছে সৎ পথের দিশা আসার পর আমরা কি তোমাদেরকে ওটা হতে নিবৃত্ত করেছিলাম? আমরা তোমাদেরকে যে কথা বলেছিলাম তোমরা জানতে যে, ওটার কোন দলীল নেই। অন্যদিক হতে দলীলসমূহের বর্ষিত বৃষ্টি তোমাদের চোখের সামনে বিদ্যমান ছিল। অতঃপর তোমরা ঐগুলোর অনুসরণ ছেড়ে দিয়ে আমাদের কথা কেন মেনেছিলে! সুতরাং তোমরাই তো ছিলে অপরাধী।অনুসারীরা আবার অনুসৃতদেরকে জবাব দিবে! প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দিবারাত্র চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে। তোমরা আমাদেরকে আশ্বাস দিয়েছিলে যে, তোমাদের আকীদা ও কাজ-কারবার ঠিক আছে। তোমরা বার বার আমাদেরকে নির্দেশ দিতে যে, আমরা যেন আল্লাহকে অমান্য করি এবং তাঁর শরীক স্থাপন করি। আমরা যেন আমাদের বাপ-দাদাদের রীতি-নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং কুফরী ও শিক পরিত্যাগ না করি। আমাদের ঈমান আনয়ন হতে বিরত থাকার এটাই কারণ। ইসলাম থেকে তোমরাই আমাদেরকে ফিরিয়ে রেখেছিলে।এভাবে একদল অপর দলকে দোষারোপ করবে এবং প্রত্যেক দলই নিজেকে দোষমুক্ত বলে দাবী করবে। অতঃপর যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন তারা অনুতাপ গোপন রাখবে। আল্লাহ্ তা'আলা কাফিরদের গলদেশে শৃঙ্খল পরিয়ে দিবেন। তারা যা করতো তারই প্রতিফল তাদেরকে দেয়া হবে। যারা পথভ্রষ্ট করেছিল এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছিল উভয় দলই প্রতিফল প্রাপ্ত হবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামীদের যখন জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নামের একটি মাত্র লেলিহান শিখায় তাদের দেহ ঝলসে যাবে। দেহ ঝলসানোর পর ঐ অগ্নিশিখা তাদের পায়ের উপর এসে পড়বে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান ইবনে ইয়াহইয়া খুশানী (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামের প্রত্যেক কয়েদখানায়, প্রত্যেক গর্তে, প্রত্যেক শিকলে জাহান্নামীদের নাম লিখিত থাকবে। হযরত সুলাইমান দারানী (রঃ)-এর সামনে এটা বর্ণিত হলে তিনি খুব ক্রন্দন করেন। অতঃপর বলেনঃ “হায়! হায়! ঐ ব্যক্তির অবস্থা কি হবে যার উপর সমস্ত শাস্তি একত্রিত হবে! পায়ে বেড়ি, হাতে হাতকড়ি ও গলায় তওক থাকবে। অতঃপর ধাক্কা দিয়ে জাহান্নামের গর্তে নিক্ষেপ করা হবে। হে আল্লাহ! আমাদেরকে নিরাপত্তা দান করুন!”

সাবা 34:32

৩১-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর: কাফিরদের ঔদ্ধত্যপনা ও বাতিলের জিদের বর্ণনা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তারা ফায়সালা করে নিয়েছে যে, যদিও তারা কুরআন কারীমের সত্যতার হাজার দলীল দেখে নেয় তবুও ওর উপর ঈমান আনবে না। এমনকি ওর পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর উপরও না। তারা তাদের এই কথার স্বাদ ঐ সময় গ্রহণ করবে যখন আল্লাহর সামনে জাহান্নামের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছছাটরা বড়দেরকে এবং বড়রা ছোটদেরকে দোষারোপ করবে। প্রত্যেকেই অপরকে দোষী বলবে। অনুসারীরা অনুসৃতদেরকে বলবেঃ তোমরা না থাকলে অবশ্যই আমরা মুমিন হতাম। অনুসৃতরা তখন অনুসারীদেরকে জবাবে বলবেঃ তোমাদের কাছে সৎ পথের দিশা আসার পর আমরা কি তোমাদেরকে ওটা হতে নিবৃত্ত করেছিলাম? আমরা তোমাদেরকে যে কথা বলেছিলাম তোমরা জানতে যে, ওটার কোন দলীল নেই। অন্যদিক হতে দলীলসমূহের বর্ষিত বৃষ্টি তোমাদের চোখের সামনে বিদ্যমান ছিল। অতঃপর তোমরা ঐগুলোর অনুসরণ ছেড়ে দিয়ে আমাদের কথা কেন মেনেছিলে! সুতরাং তোমরাই তো ছিলে অপরাধী।অনুসারীরা আবার অনুসৃতদেরকে জবাব দিবে! প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দিবারাত্র চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে। তোমরা আমাদেরকে আশ্বাস দিয়েছিলে যে, তোমাদের আকীদা ও কাজ-কারবার ঠিক আছে। তোমরা বার বার আমাদেরকে নির্দেশ দিতে যে, আমরা যেন আল্লাহকে অমান্য করি এবং তাঁর শরীক স্থাপন করি। আমরা যেন আমাদের বাপ-দাদাদের রীতি-নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং কুফরী ও শিক পরিত্যাগ না করি। আমাদের ঈমান আনয়ন হতে বিরত থাকার এটাই কারণ। ইসলাম থেকে তোমরাই আমাদেরকে ফিরিয়ে রেখেছিলে।এভাবে একদল অপর দলকে দোষারোপ করবে এবং প্রত্যেক দলই নিজেকে দোষমুক্ত বলে দাবী করবে। অতঃপর যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন তারা অনুতাপ গোপন রাখবে। আল্লাহ্ তা'আলা কাফিরদের গলদেশে শৃঙ্খল পরিয়ে দিবেন। তারা যা করতো তারই প্রতিফল তাদেরকে দেয়া হবে। যারা পথভ্রষ্ট করেছিল এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছিল উভয় দলই প্রতিফল প্রাপ্ত হবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামীদের যখন জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নামের একটি মাত্র লেলিহান শিখায় তাদের দেহ ঝলসে যাবে। দেহ ঝলসানোর পর ঐ অগ্নিশিখা তাদের পায়ের উপর এসে পড়বে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান ইবনে ইয়াহইয়া খুশানী (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামের প্রত্যেক কয়েদখানায়, প্রত্যেক গর্তে, প্রত্যেক শিকলে জাহান্নামীদের নাম লিখিত থাকবে। হযরত সুলাইমান দারানী (রঃ)-এর সামনে এটা বর্ণিত হলে তিনি খুব ক্রন্দন করেন। অতঃপর বলেনঃ “হায়! হায়! ঐ ব্যক্তির অবস্থা কি হবে যার উপর সমস্ত শাস্তি একত্রিত হবে! পায়ে বেড়ি, হাতে হাতকড়ি ও গলায় তওক থাকবে। অতঃপর ধাক্কা দিয়ে জাহান্নামের গর্তে নিক্ষেপ করা হবে। হে আল্লাহ! আমাদেরকে নিরাপত্তা দান করুন!”

সাবা 34:33

৩১-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর: কাফিরদের ঔদ্ধত্যপনা ও বাতিলের জিদের বর্ণনা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তারা ফায়সালা করে নিয়েছে যে, যদিও তারা কুরআন কারীমের সত্যতার হাজার দলীল দেখে নেয় তবুও ওর উপর ঈমান আনবে না। এমনকি ওর পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর উপরও না। তারা তাদের এই কথার স্বাদ ঐ সময় গ্রহণ করবে যখন আল্লাহর সামনে জাহান্নামের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছছাটরা বড়দেরকে এবং বড়রা ছোটদেরকে দোষারোপ করবে। প্রত্যেকেই অপরকে দোষী বলবে। অনুসারীরা অনুসৃতদেরকে বলবেঃ তোমরা না থাকলে অবশ্যই আমরা মুমিন হতাম। অনুসৃতরা তখন অনুসারীদেরকে জবাবে বলবেঃ তোমাদের কাছে সৎ পথের দিশা আসার পর আমরা কি তোমাদেরকে ওটা হতে নিবৃত্ত করেছিলাম? আমরা তোমাদেরকে যে কথা বলেছিলাম তোমরা জানতে যে, ওটার কোন দলীল নেই। অন্যদিক হতে দলীলসমূহের বর্ষিত বৃষ্টি তোমাদের চোখের সামনে বিদ্যমান ছিল। অতঃপর তোমরা ঐগুলোর অনুসরণ ছেড়ে দিয়ে আমাদের কথা কেন মেনেছিলে! সুতরাং তোমরাই তো ছিলে অপরাধী।অনুসারীরা আবার অনুসৃতদেরকে জবাব দিবে! প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দিবারাত্র চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে। তোমরা আমাদেরকে আশ্বাস দিয়েছিলে যে, তোমাদের আকীদা ও কাজ-কারবার ঠিক আছে। তোমরা বার বার আমাদেরকে নির্দেশ দিতে যে, আমরা যেন আল্লাহকে অমান্য করি এবং তাঁর শরীক স্থাপন করি। আমরা যেন আমাদের বাপ-দাদাদের রীতি-নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং কুফরী ও শিক পরিত্যাগ না করি। আমাদের ঈমান আনয়ন হতে বিরত থাকার এটাই কারণ। ইসলাম থেকে তোমরাই আমাদেরকে ফিরিয়ে রেখেছিলে।এভাবে একদল অপর দলকে দোষারোপ করবে এবং প্রত্যেক দলই নিজেকে দোষমুক্ত বলে দাবী করবে। অতঃপর যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন তারা অনুতাপ গোপন রাখবে। আল্লাহ্ তা'আলা কাফিরদের গলদেশে শৃঙ্খল পরিয়ে দিবেন। তারা যা করতো তারই প্রতিফল তাদেরকে দেয়া হবে। যারা পথভ্রষ্ট করেছিল এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছিল উভয় দলই প্রতিফল প্রাপ্ত হবে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামীদের যখন জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নামের একটি মাত্র লেলিহান শিখায় তাদের দেহ ঝলসে যাবে। দেহ ঝলসানোর পর ঐ অগ্নিশিখা তাদের পায়ের উপর এসে পড়বে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান ইবনে ইয়াহইয়া খুশানী (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামের প্রত্যেক কয়েদখানায়, প্রত্যেক গর্তে, প্রত্যেক শিকলে জাহান্নামীদের নাম লিখিত থাকবে। হযরত সুলাইমান দারানী (রঃ)-এর সামনে এটা বর্ণিত হলে তিনি খুব ক্রন্দন করেন। অতঃপর বলেনঃ “হায়! হায়! ঐ ব্যক্তির অবস্থা কি হবে যার উপর সমস্ত শাস্তি একত্রিত হবে! পায়ে বেড়ি, হাতে হাতকড়ি ও গলায় তওক থাকবে। অতঃপর ধাক্কা দিয়ে জাহান্নামের গর্তে নিক্ষেপ করা হবে। হে আল্লাহ! আমাদেরকে নিরাপত্তা দান করুন!”

সাবা 34:34

৩৪-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এবং পূর্ববর্তী নবীদের ন্যায় চরিত্র গড়ে তোলার উপদেশ দান করেছেন। যে লোকালয়েই তারা গিয়েছেন সেখানেই তাদের বিরোধিতা করা হয়েছে। ধনী ও প্রভাবশালী লোকেরা তাঁদেরকে অমান্য করেছে। তবে গরীবেরা তাঁদের অনুগত হয়েছে। যেমন হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম তাকে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমরা কি তোমার উপর ঈমান আনবো, অথচ নিম্নশ্রেণীর লোকেরাই শুধু তোমার অনুসরণ করেছে?”(২৬:১১১) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমরা তো দেখছি যে, আমাদের মধ্যে যারা নিম্নশ্রেণীর লোক তারাই শুধু তোমার অনুসরণ করেছে।”(১১:২৭) হযরত সালেহ (আঃ)-এর কওমের প্রভাবশালী অহংকারী লোকেরা যাদেরকে দুর্বল মনে করা হতো এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি জান যে, সালেহ (আঃ) তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ হতে রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছেন? তারা উত্তরে বললোঃ যা সহ তিনি প্রেরিত হয়েছেন আমরা ওর উপর ঈমান আনয়নকারী। তখন অহংকারীরা বললো:তোমরা যার উপর ঈমান এনেছো আমরা তাকে অস্বীকারকারী।”(৭:৭৫-৭৬)মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এভাবেই আমি তাদের এককে অপরের দ্বারা ফিনায় ফেলে থাকি যাতে তারা বলেঃ এরাই কি তারা যাদের উপর আমাদের মাঝে হতে আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন? কৃতজ্ঞদেরকে কি আল্লাহ অবগত নন?”(৬:৫৩) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ “প্রত্যেক জনপদে তথাকার বড় ও প্রভাবশালী লোকেরা পাপী ও চক্রান্তকারী হয়ে থাকে। অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কোন জনপদকে যখন আমি ধ্বংস করার ইচ্ছা করি তখন তথাকার উদ্ধত ও অবাধ্য লোকদেরকে কিছু আদেশ প্রদান করি, তারা সেগুলো অমান্য করে তখন আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিই।”(১৭:১৬)।মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানে বলেনঃ যখন আমি কোন লোকালয়ে সতর্ককারী অর্থাৎ নবী বা রাসুল প্রেরণ করেছি তখনই ওর বিত্তশালী, ধনাঢ্য এবং প্রভাবশালী অধিবাসীরা বলেছেঃ তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি।হযরত আবু রাযীন (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, দু'টি লোক একে অপরের (সাথে ব্যবসায়ে) অংশীদার ছিল। একজন সাগর পারে চলে গেল এবং অপরজন সেখানেই রয়ে গেল। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রেরিত হলেন তখন সাগর পারের লোকটি তার ঐ সাথীকে পত্রের মাধ্যমে জিজ্ঞেস করলোঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবস্থা কি?” সে জবাবে লিখলোঃ “নিম্নশ্রেণীর লোকেরাই তার কথা শুনছে ও মানছে। কিন্তু কুরায়েশ বংশের সম্ভ্রান্ত লোকেরা তাঁকে মানছে না।” পত্র পাঠ করে সে ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে চলে আসলো এবং তার ঐ সাথীর নিকট হাযির হলো। সে লেখা পড়া জানতো। আসমানী কিতাবগুলোতে তার ভাল জ্ঞান ছিল। সে তার সাথী থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এখন কোথায় তা জেনে নিয়ে তার। খিদমতে হাযির হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সে জিজ্ঞেস করলোঃ “আপনি মানুষকে কিসের দিকে আহ্বান করেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “আমি মানুষকে এরূপ এরূপের দিকে আহ্বান করে থাকি।” এটা শুনেই সে বললোঃ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি এটা কি করে জানলে?” উত্তরে সে বললোঃ “যে নবীই প্রেরিত হয়েছেন, তাঁর অনুসারী হয়েছে শুধুমাত্র নিম্নশ্রেণীর ও দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরা।” বর্ণনাকারী বলেন যে, তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ লোকটিকে জানিয়ে দেন যে, তার উক্তির সত্যতায় আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেছেন। অনুরূপ উক্তি রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসও করেছিল, যখন সে আবু সুফিয়ানকে তাঁর অজ্ঞতার অবস্থায় জিজ্ঞেস করেছিলঃ “সম্ভ্রান্ত লোকেরা তাঁর অনুসরণ করছে, না দুর্বল ও নিম্নশ্রেণীর লোকেরা?” উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ “দুর্বল ও নিম্নশ্রেণীর লোকেরাই তাঁর অনুসারী হচ্ছে। ঐ সময় হিরাক্লিয়াস মন্তব্য করেছিল যে, প্রত্যেক রাসূলেরই অনুসারী হয়েছে দুর্বল ও নিম্নশ্রেণীর লোকেরাই।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, কাফিররা ও মুশরিকরা বলতোঃ আমরা ধনে-জনে সমৃদ্ধশালী, সুতরাং আমাদেরকে কিছুতেই শাস্তি দেয়া হবে না। এ কথা তারা ফখর করে বলতো যে তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা। যদি তাদের উপর তার বিশেষ মেহেরবানী না হতো তবে তিনি তাদেরকে এসব নিয়ামত দা করতেন না। আর দুনিয়ায় যখন তিনি তাদের উপর মেহেরবানী করেছেন তখন আখিরাতেও তাদের উপর মেহেরবানী করবেন। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জায়গাতেই তাদের এ দাবী খণ্ডন করেছেন। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি মনে করে যে, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্যই তাদের বড় হওয়া ও উত্তম হওয়ার মাপকাঠি? না, এগুলোই তাদের জন্যে মন্দের কারণ, কিন্তু তারা বুঝে না।” (২৩:৫৫) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মাল ও তাদের সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে, আল্লাহ পার্থিব জীবনেও তাদেরকে শাস্তি দিতে চান এবং তাদের মৃত্যুও কুফরীর অবস্থাতেই হবে।”(৯:৫৫) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাকে ছেড়ে দাও এবং তাকে আমি সৃষ্টি করেছি অসাধারণ করে। আমি তাকে দিয়েছি বিপুল ধন-সম্পদ এবং নিত্যসঙ্গী পুত্রগণ। আর তাকে দিয়েছি স্বচ্ছন্দ জীবনের প্রচুর উপকরণ। এরপরও সে কামনা করে যে, আমি তাকে আরো অধিক দিই। না, তা হবে না, সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।”(৭৪:১১-১৭)। ঐ ব্যক্তির কথাও বর্ণিত হয়েছে যে, যার দু'টি বাগান ছিল। সে ধনশালী ছিল, ফল-ফুলের মালিক ছিল, সন্তানাদিও ছিল। কিন্তু কোন জিনিসই তার উপকার করেনি। আল্লাহর আযাবে সবকিছুই ধ্বংস ও মাটি হয়ে গিয়েছিল আখিরাতের পূর্বেই। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ আল্লাহ যার প্রতি ইচ্ছা তার রিযক বর্ধিত করেন অথবা এটা সীমিত করেন। দুনিয়াতে তিনি শত্রু-মিত্র সকলকেই দান করে থাকেন। গরীব বা ধনী হওয়া আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির লক্ষণ নয়। বরং তাতে অন্য কোন হিকমত লুক্কায়িত থাকে। কিন্তু অধিকাংশ লোকই এটা জানে না।মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন কিছু নয় যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে দিবে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের আকৃতি ও তোমাদের মালের দিকে দেখেন না, বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তরের দিকে ও তোমাদের আমলের দিকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তবে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তারাই তাদের কর্মের জন্যে পাবে বহুগুণ পুরস্কার, তারা প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে। তাদের এক একটি পুণ্য দশগুণ হবে এবং এভাবে বাড়াতে বাড়াতে সাতশ' গুণ পর্যন্ত করে দেয়া হবে। জান্নাতের বালাখানায় তারা নিরাপদে অবস্থান করবে। তাদের কোন ভয় ও চিন্তা থাকবে না। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে এমন প্রাসাদ রয়েছে যার ভিতর থেকে বাহির এবং বাহির থেকে ভিতর দেখা যাবে।” তখন একজন বেদুঈন জিজ্ঞেস করলোঃ “এটা কার জন্যে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যে উত্তম ও নরম কথা বলে, গরীবকে খাদ্য খেতে দেয়, অধিক রোযা রাখে এবং লোকেরা যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন উঠে (তাহাজ্জুদের) নামায পড়ে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা আমার আয়াতকে ব্যর্থ করবার চেষ্টা করবে, অন্যদেরকে আল্লাহর পথে বাধা দেবে এবং রাসূলদের অনুসরণ হতে জনগণকে ফিরিয়ে রাখবে তারা জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ আল্লাহ তার পরিপূর্ণ হিকমত অনুযায়ী যাকে ইচ্ছা করেন দুনিয়ায় বহু কিছু দান করে থাকেন এবং যাকে ইচ্ছা খুব কম দেন। একজন সুখ-সাগরে ভেসে আছে এবং আর একজন অতি দুঃখ-কষ্টে কাল যাপন করছে। তার এ হিকমতের কথা কেউ বুঝতে পারবে না। এর গোপন রহস্য তিনিই জানেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “লক্ষ্য কর, আমি কিভাবে তাদের একদলকে অপর দলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম, আখিরাত তো নিশ্চয়ই মর্যাদায় মহত্তর ও গুণে শ্রেষ্ঠতর।”(১৭:২১) অর্থাৎ আখিরাতের ফযীলত ও মর্যাদা সবচেয়ে বড়। এখানে যেমন ধনী ও গরীবের ভিত্তিতে মর্যাদার উঁচু ও নীচু আছে, ঠিক তেমনই আখিরাতেও আমলের ভিত্তিতে মর্যাদা কম-বেশী হবে। সৎ লোকেরা তো জান্নাতের উচ্চ প্রাসাদে অবস্থান করবে। আর অসৎ লোকেরা জাহান্নামের নিম্নস্তরে থাকবে মর্যাদাহীন অবস্থায়।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে, দুনিয়ায় সবচেয়ে উত্তম হলো ঐ ব্যক্তি যে খাঁটি মুসলমান হয় এবং প্রয়োজন মত রুযী পায়, আর আল্লাহর পক্ষ হতে যাকে অল্পে তুষ্ট রাখা হয়। (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর বৈধ করা কাজের সীমার মধ্যে থেকে মানুষ যা কিছু খরচ করবে তার বিনিময় তিনি তাদেরকে দুই জাহানে প্রদান করবেন।হাদীসে এসেছে যে, প্রত্যহ সকালে একজন ফেরেশতা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! কৃপণের মালকে ধ্বংস ও বরবাদ করে দিন।” আর একজন ফেরেশতা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! (আপনার পথে) খরচকারীকে উত্তম বিনিময় প্রদান করুন।” একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত বিলাল (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে বিলাল (রাঃ)! খরচ করে যাও এবং আরশের মালিকের পক্ষ হতে সংকীর্ণতার ধারণা করো না।”হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের এই যুগের পরে এমন এক যুগ আসছে যে মানুষকে কেটে খেয়ে ফেলবে। মালদার স্বচ্ছল ব্যক্তি তার হাতে যা থাকবে তা খরচ হয়ে যাবার ভয়ে ওর উপর কামড়াতে থাকবে।" আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে তিনি তার প্রতিদান দিবেন। তিনিই শ্রেষ্ঠ রিযকদাতা।আর একটি হাদীসে আছেঃ “লোকদের মধ্যে সেই হলো নিকৃষ্টতম লোক যে নিরুপায় ও অসহায় লোকের জিনিস কম দামে কিনে নেয়। মনে রেখো যে, এই ধরনের ক্রয়-বিক্রয় হারাম।” একথা তিনি দুই বার বললেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তার উপর যুলুম করবে না এবং তাকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করবে না। তুমি পারলে অন্যের সাথে উত্তম ব্যবহার কর ও তার কল্যাণ সাধন কর। আর তা না হলে অন্ততঃ তার কষ্ট ও বিপদ-আপদ আরো বাড়িয়ে দিয়ো না।” এই ধারায় এ হাদীসটি দুর্বল। এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে) হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেছেনঃ “এই আয়াতের ভুল মতলব গ্রহণ করো না। নিজ মাল খরচ করার ব্যাপারে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করবে। কেননা, রুযী ভাগ করে দেয়া হয়েছে বা রিযক বন্টিত হয়ে আছে।