Tafseer ibn Kathir — আয-যুমার 39:69 – গাফির 40:50
Contents
- আয-যুমার 39:69
- আয-যুমার 39:70
- আয-যুমার 39:71
- আয-যুমার 39:72
- আয-যুমার 39:73
- আয-যুমার 39:74
- আয-যুমার 39:75
- গাফির 40:1
- গাফির 40:2
- গাফির 40:3
- গাফির 40:4
- গাফির 40:5
- গাফির 40:6
- গাফির 40:7
- গাফির 40:8
- গাফির 40:9
- গাফির 40:10
- গাফির 40:11
- গাফির 40:12
- গাফির 40:13
- গাফির 40:14
- গাফির 40:15
- গাফির 40:16
- গাফির 40:17
- গাফির 40:18
- গাফির 40:19
- গাফির 40:20
- গাফির 40:21
- গাফির 40:22
- গাফির 40:23
- গাফির 40:24
- গাফির 40:25
- গাফির 40:26
- গাফির 40:27
- গাফির 40:28
- গাফির 40:29
- গাফির 40:30
- গাফির 40:31
- গাফির 40:32
- গাফির 40:33
- গাফির 40:34
- গাফির 40:35
- গাফির 40:36
- গাফির 40:37
- গাফির 40:38
- গাফির 40:39
- গাফির 40:40
- গাফির 40:41
- গাফির 40:42
- গাফির 40:43
- গাফির 40:44
- গাফির 40:45
- গাফির 40:46
- গাফির 40:47
- গাফির 40:48
- গাফির 40:49
- গাফির 40:50
আয-যুমার 39:69
৬৮-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের ভয়াবহতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে এবং এটা হবে দ্বিতীয় ফুঙ্কার, যার ফলে প্রত্যেক জীবিত মরে যাবে, সে আসমানেই থাকুক বা যমীনেই থাকুক। কিন্তু আল্লাহ যাদেরকে ইচ্ছা করেন জীবিত ও সজ্ঞান রাখার তাদের কথা স্বতন্ত্র। মশহুর হাদীসে আছে যে, এরপর অবশিষ্টদের রূহগুলো কবয করা হবে, এমন কি সর্বশেষে স্বয়ং হযরত মালাকুল মাউতের রূহ কবয করে নেয়া হবে। শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলাই বাকী থাকবেন, যিনি জীবিত ও চিরঞ্জীব। যিনি পূর্ব হতেই ছিলেন এবং পরেও চিরস্থায়ীভাবে থাকবেন। অতঃপর তিনি বলবেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আজ রাজত্ব কার?” (৪০:১৬) এ কথা তিনি তিনবার বলবেন। তারপর তিনি নিজেকেই নিজে উত্তর দিবেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(আজকে রাজত্ব হচ্ছে) এক আল্লাহর জন্যে তিনি মহাপরাক্রমশালী।” (৪০:১৬) তিনিই আজ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, যিনি প্রত্যেক জিনিসকে নিজের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। আজ তিনি সবকিছুকেই ধ্বংসের হুকুম দান করেছেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুককে দ্বিতীয়বার জীবিত করবেন। সর্বপ্রথম তিনি জীবিত করবেন হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে। তাঁকে আবার তিনি শিংগায় ফুস্কার দেয়ার নির্দেশ দিবেন। এটা হবে তৃতীয় ফুকার যার ফলে সমস্ত সৃষ্টজীব, যারা মৃত ছিল, জীবিত হয়ে যাবে, যার বর্ণনা এই আয়াতে দেয়া হয়েছে যে, আবার শিংগায় ফুকার দেয়া হবে, তৎক্ষণাৎ তারা দণ্ডায়মান হয়ে তাকাতে থাকবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটাতো শুধু এক বিকট শব্দ, তখনই ময়দানে তাদের আবির্ভাব হবে।” (৭৯:১৩-১৪) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তোমাদেরকে আহ্বান করবেন সেই দিন তোমরা তাঁর প্রশংসা করতে করতে তার আহ্বানে সাড়া দিবে এবং তোমরা ধারণা করবে যে, দুনিয়ায় তোমরা অল্প দিনই অবস্থান করেছিলে।” (১৭:৫২) মহান আল্লাহ অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে তারই আদেশে আকাশ ও পৃথিবীর স্থিতি, অতঃপর আল্লাহ যখন তোমাদেরকে মৃত্তিকা হতে উঠাবার জন্যে একবার আহ্বান করবেন তখন তোমরা উঠে আসবে।” (৩০:২৫)মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-কে বলেঃ “আপনি বলে থাকেন যে, এরূপ এরূপ সময়ে কিয়ামত সংঘটিত হবে (তা কখন হবে?)।” হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তার এ কথায় অসন্তুষ্ট হয়ে বলেনঃ “আমার মন তো চাচ্ছে যে, তোমাদের কাছে কিছুই বর্ণনা করবো না। আমি তো বলেছিলাম যে, অল্প দিনের মধ্যেই তোমরা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার অবলোকন করবে। অতঃপর তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমার উম্মতের মধ্যে দাজ্জাল আসবে এবং চল্লিশ পর্যন্ত অবস্থান করবে। চল্লিশ দিন না চল্লিশ মাস, না চল্লিশ বছর, না চল্লিশ রাত তা আমি জানি না। তারপর আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-কে প্রেরণ করবেন। তিনি আকৃতিতে হযরত উরওয়া ইবন মাসউদ (রাঃ)-এর সাথে খুবই সাদৃশ্যযুক্ত। আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিজয়ী করবেন এবং দাজ্জাল তার হাতে মারা পড়বে। এর পর সাত বছর পর্যন্ত লোক এমনভাবে মিলে-জুলে থাকবে যে, দুই ব্যক্তির মধ্যে কোন শত্রুতা থাকবে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা সিরিয়ার দিক হতে এক হালকা ঠাণ্ডা বাতাস প্রবাহিত করবেন, যার দ্বারা সমস্ত মুমিন ব্যক্তির জীবন কবয করে নেয়া হবে। এমনকি যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান রয়েছে সেও মরে যাবে, সে যেখানেই থাকুক না কেন। যদি সে পাহাড়ের গহ্বরেও অবস্থান করে তবুও ঐ বায়ু সেখানে পৌঁছে যাবে।” আমি এটা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি। অতঃপর শুধুমাত্র মন্দ ও পাপী লোকেরাই বেঁচে থাকবে যারা হবে পাখী ও পশুর মত বিবেক-বুদ্ধিহীন। না তারা ভাল চিনবে না বুঝবে, না মন্দকে মন্দ বলে জানবে। তাদের উপর শয়তান প্রকাশিত হবে এবং সে তাদেরকে বলবেঃ “তোমাদের লজ্জা করে না যে, তোমরা মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করেছো?” অতঃপর সে তাদেরকে মূর্তিপূজার নির্দেশ দিবে এবং তারা তখন ওগুলোর পূজা শুরু করে দিবে। ঐ অবস্থাতেও আল্লাহ তা'আলা তাদের রুযী-রোযগারে প্রশস্ততা দান করতে থাকবেন। তারপর শিংগায় ফুঙ্কার দেয়া হবে। যার কানে এ শব্দ পৌঁছবে সে এদিকে পড়ে যাবে এবং ওদিকে দাঁড়িয়ে যাবে, আবার পড়বে। সর্বপ্রথম এই শব্দ যার কানে পৌঁছবে সে হবে ঐ ব্যক্তি যে তার হাউয বা চৌবাচ্চা ঠিকঠাক করতে থাকবে। তৎক্ষণাৎ সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। তারপর সবাই বেহুশ ও আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়বে। এরপর আল্লাহ তাআলা বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যা শিশিরের মত হবে, যার দ্বারা মানুষের দেহ উদগত হবে। তারপর দ্বিতীয়বার শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে তখন সবাই দণ্ডায়মান হয়ে তাকাতে থাকবে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ “হে লোক সকল! তোমাদের প্রতিপালকের দিকে চল।” (আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ) “তাদেরকে দাঁড় করাও, তারা জিজ্ঞাসিত হবে। তারপর বলা হবেঃ “জাহান্নামের অংশ বের করে নাও।” জিজ্ঞেস করা হবেঃ “কত?” উত্তরে বলা হবেঃ “প্রতি হাজারে নয়শ’ নিরানব্বই জন।" এটা হবে ঐদিন যেই দিন (ভয়ে) বালক বৃন্ধ হয়ে যাবে এবং পদনালী খুলে যাবে। [আরবী) -এর শাব্দিক অর্থ হলো ‘পদনালী বা পায়ের গোছা উন্মোচিত হবে'। এটি একটি আরবী বাগধারা। এর ভাবার্থ হলো (আরবী) বা চরম সংকট]হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “দুই ফুঙ্কারের মাঝে চল্লিশের ব্যবধান থাকবে। জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু হুরাইরা (রাঃ)! চল্লিশ দিন কি?" জবাবে তিনি বলেনঃ “আমি (উত্তর দিতে) অস্বীকার করলাম। তারা বললোঃ “চল্লিশ বছর কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমি (এর উত্তর দিতেও) অস্বীকৃতি জানাচ্ছি।” তারা জিজ্ঞেস করলোঃ “চল্লিশ মাস কি?” তিনি জবাবে বললেনঃ “আমি (এর উত্তর দানেও) অস্বীকার করছি। কথা হলো এই যে, মানুষের দেহের) সব কিছুই সড়ে পচে নষ্ট ও বিলীন হয়ে যাবে। শুধুমাত্র মেরুদণ্ডের একটি অস্থি ঠিক থাকবে। ওটা দ্বারা সৃষ্টির পুনর্বিন্যাস করা হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, আমি হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ (আরবী) এই আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছায় যারা মূৰ্ছিত হবে না তারা কারা? উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “তারা হলো শহীদ, যারা তরবারী লটকানো অবস্থায় আল্লাহর আরশের চতুর্দিকে অবস্থান করবে। ফেরেশতাবর্গ অভ্যর্থনা করে তাদেরকে হাশরের মাঠে নিয়ে যাবেন। তারা মণি-মানিক্যের উষ্ট্রের উপর সওয়ার হবে, যেগুলোর গদি রেশমের চেয়েও নরম হবে। মানুষের দৃষ্টি যতদূর যায় ততদূর পর্যন্ত হবে উষ্ট্রগুলোর এক কদম। তারা জান্নাতের মধ্যে পরম সুখে ও আরাম আয়েশের মধ্যে থাকবে। তারা বলবেঃ চল, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর সৃষ্টজীবের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করবেন তা আমরা দেখবো। সুতরাং তাদের দিকে দেখে আল্লাহ তা'আলা হেসে উঠবেন। যেখানে আল্লাহ পাক কোন বান্দাকে দেখে হাসেন সেখানে তার উপর কোন হিসাব নেই।” (এ হাদীসটি আবু ইয়া’লা (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সমস্ত বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। কিন্তু ইসমাঈল ইবনে আইয়াশ (রঃ)-এর উস্তাদ অপরিচিত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ পাকই সবচেয়ে ভাল জানেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ বিশ্ব ওর প্রতিপালকের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে, আমলনামা পেশ করা হবে এবং নবীদেরকে আনয়ন করা হবে। যাঁরা সাক্ষ্য দিবেন যে, তাঁরা নিজেদের উম্মতদের নিকট তাবলীগ বা প্রচারকার্য চালিয়েছিলেন। আর বান্দাদের ভাল ও মন্দ কাজের রক্ষক ফেরেশতাদেরকে আনয়ন করা হবে এবং আদল ও ইনসাফের সাথে মাখলুকের বিচার মীমাংসা করা হবে। কারো উপর কোন প্রকারের অত্যাচার করা হবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন আমি ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লা প্রতিষ্ঠিত করবো এবং কারো প্রতি বিন্দুমাত্র যুলুম করা হবে না। কোন আমল যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় তবুও আমি তা হাযির করবো এবং আমিই হিসাব নেয়ার জন্যে যথেষ্ট।” (২১:৪৭) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তাআলা অণু পরিমাণও অত্যাচার করেন না। যদি একটি পুণ্য হয় তবে তিনি তা বৃদ্ধি করে দেন এবং নিজের নিকট হতে তিনি বড় প্রতিদান প্রদান করেন।” (৪:৪০) এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানে বলেনঃ প্রত্যেককে তার ভাল-মন্দ কার্যের পূর্ণ প্রতিফল দেয়া হবে এবং তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সৃবিশেষ অবহিত।
আয-যুমার 39:70
৬৮-৭০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের ভয়াবহতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে এবং এটা হবে দ্বিতীয় ফুঙ্কার, যার ফলে প্রত্যেক জীবিত মরে যাবে, সে আসমানেই থাকুক বা যমীনেই থাকুক। কিন্তু আল্লাহ যাদেরকে ইচ্ছা করেন জীবিত ও সজ্ঞান রাখার তাদের কথা স্বতন্ত্র। মশহুর হাদীসে আছে যে, এরপর অবশিষ্টদের রূহগুলো কবয করা হবে, এমন কি সর্বশেষে স্বয়ং হযরত মালাকুল মাউতের রূহ কবয করে নেয়া হবে। শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলাই বাকী থাকবেন, যিনি জীবিত ও চিরঞ্জীব। যিনি পূর্ব হতেই ছিলেন এবং পরেও চিরস্থায়ীভাবে থাকবেন। অতঃপর তিনি বলবেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আজ রাজত্ব কার?” (৪০:১৬) এ কথা তিনি তিনবার বলবেন। তারপর তিনি নিজেকেই নিজে উত্তর দিবেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(আজকে রাজত্ব হচ্ছে) এক আল্লাহর জন্যে তিনি মহাপরাক্রমশালী।” (৪০:১৬) তিনিই আজ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, যিনি প্রত্যেক জিনিসকে নিজের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। আজ তিনি সবকিছুকেই ধ্বংসের হুকুম দান করেছেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুককে দ্বিতীয়বার জীবিত করবেন। সর্বপ্রথম তিনি জীবিত করবেন হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে। তাঁকে আবার তিনি শিংগায় ফুস্কার দেয়ার নির্দেশ দিবেন। এটা হবে তৃতীয় ফুকার যার ফলে সমস্ত সৃষ্টজীব, যারা মৃত ছিল, জীবিত হয়ে যাবে, যার বর্ণনা এই আয়াতে দেয়া হয়েছে যে, আবার শিংগায় ফুকার দেয়া হবে, তৎক্ষণাৎ তারা দণ্ডায়মান হয়ে তাকাতে থাকবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটাতো শুধু এক বিকট শব্দ, তখনই ময়দানে তাদের আবির্ভাব হবে।” (৭৯:১৩-১৪) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন আল্লাহ তোমাদেরকে আহ্বান করবেন সেই দিন তোমরা তাঁর প্রশংসা করতে করতে তার আহ্বানে সাড়া দিবে এবং তোমরা ধারণা করবে যে, দুনিয়ায় তোমরা অল্প দিনই অবস্থান করেছিলে।” (১৭:৫২) মহান আল্লাহ অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে তারই আদেশে আকাশ ও পৃথিবীর স্থিতি, অতঃপর আল্লাহ যখন তোমাদেরকে মৃত্তিকা হতে উঠাবার জন্যে একবার আহ্বান করবেন তখন তোমরা উঠে আসবে।” (৩০:২৫)মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-কে বলেঃ “আপনি বলে থাকেন যে, এরূপ এরূপ সময়ে কিয়ামত সংঘটিত হবে (তা কখন হবে?)।” হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তার এ কথায় অসন্তুষ্ট হয়ে বলেনঃ “আমার মন তো চাচ্ছে যে, তোমাদের কাছে কিছুই বর্ণনা করবো না। আমি তো বলেছিলাম যে, অল্প দিনের মধ্যেই তোমরা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার অবলোকন করবে। অতঃপর তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “আমার উম্মতের মধ্যে দাজ্জাল আসবে এবং চল্লিশ পর্যন্ত অবস্থান করবে। চল্লিশ দিন না চল্লিশ মাস, না চল্লিশ বছর, না চল্লিশ রাত তা আমি জানি না। তারপর আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-কে প্রেরণ করবেন। তিনি আকৃতিতে হযরত উরওয়া ইবন মাসউদ (রাঃ)-এর সাথে খুবই সাদৃশ্যযুক্ত। আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিজয়ী করবেন এবং দাজ্জাল তার হাতে মারা পড়বে। এর পর সাত বছর পর্যন্ত লোক এমনভাবে মিলে-জুলে থাকবে যে, দুই ব্যক্তির মধ্যে কোন শত্রুতা থাকবে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা সিরিয়ার দিক হতে এক হালকা ঠাণ্ডা বাতাস প্রবাহিত করবেন, যার দ্বারা সমস্ত মুমিন ব্যক্তির জীবন কবয করে নেয়া হবে। এমনকি যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান রয়েছে সেও মরে যাবে, সে যেখানেই থাকুক না কেন। যদি সে পাহাড়ের গহ্বরেও অবস্থান করে তবুও ঐ বায়ু সেখানে পৌঁছে যাবে।” আমি এটা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি। অতঃপর শুধুমাত্র মন্দ ও পাপী লোকেরাই বেঁচে থাকবে যারা হবে পাখী ও পশুর মত বিবেক-বুদ্ধিহীন। না তারা ভাল চিনবে না বুঝবে, না মন্দকে মন্দ বলে জানবে। তাদের উপর শয়তান প্রকাশিত হবে এবং সে তাদেরকে বলবেঃ “তোমাদের লজ্জা করে না যে, তোমরা মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করেছো?” অতঃপর সে তাদেরকে মূর্তিপূজার নির্দেশ দিবে এবং তারা তখন ওগুলোর পূজা শুরু করে দিবে। ঐ অবস্থাতেও আল্লাহ তা'আলা তাদের রুযী-রোযগারে প্রশস্ততা দান করতে থাকবেন। তারপর শিংগায় ফুঙ্কার দেয়া হবে। যার কানে এ শব্দ পৌঁছবে সে এদিকে পড়ে যাবে এবং ওদিকে দাঁড়িয়ে যাবে, আবার পড়বে। সর্বপ্রথম এই শব্দ যার কানে পৌঁছবে সে হবে ঐ ব্যক্তি যে তার হাউয বা চৌবাচ্চা ঠিকঠাক করতে থাকবে। তৎক্ষণাৎ সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। তারপর সবাই বেহুশ ও আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়বে। এরপর আল্লাহ তাআলা বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যা শিশিরের মত হবে, যার দ্বারা মানুষের দেহ উদগত হবে। তারপর দ্বিতীয়বার শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে তখন সবাই দণ্ডায়মান হয়ে তাকাতে থাকবে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ “হে লোক সকল! তোমাদের প্রতিপালকের দিকে চল।” (আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ) “তাদেরকে দাঁড় করাও, তারা জিজ্ঞাসিত হবে। তারপর বলা হবেঃ “জাহান্নামের অংশ বের করে নাও।” জিজ্ঞেস করা হবেঃ “কত?” উত্তরে বলা হবেঃ “প্রতি হাজারে নয়শ’ নিরানব্বই জন।" এটা হবে ঐদিন যেই দিন (ভয়ে) বালক বৃন্ধ হয়ে যাবে এবং পদনালী খুলে যাবে। [আরবী) -এর শাব্দিক অর্থ হলো ‘পদনালী বা পায়ের গোছা উন্মোচিত হবে'। এটি একটি আরবী বাগধারা। এর ভাবার্থ হলো (আরবী) বা চরম সংকট]হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “দুই ফুঙ্কারের মাঝে চল্লিশের ব্যবধান থাকবে। জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আবু হুরাইরা (রাঃ)! চল্লিশ দিন কি?" জবাবে তিনি বলেনঃ “আমি (উত্তর দিতে) অস্বীকার করলাম। তারা বললোঃ “চল্লিশ বছর কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আমি (এর উত্তর দিতেও) অস্বীকৃতি জানাচ্ছি।” তারা জিজ্ঞেস করলোঃ “চল্লিশ মাস কি?” তিনি জবাবে বললেনঃ “আমি (এর উত্তর দানেও) অস্বীকার করছি। কথা হলো এই যে, মানুষের দেহের) সব কিছুই সড়ে পচে নষ্ট ও বিলীন হয়ে যাবে। শুধুমাত্র মেরুদণ্ডের একটি অস্থি ঠিক থাকবে। ওটা দ্বারা সৃষ্টির পুনর্বিন্যাস করা হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, আমি হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ (আরবী) এই আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছায় যারা মূৰ্ছিত হবে না তারা কারা? উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “তারা হলো শহীদ, যারা তরবারী লটকানো অবস্থায় আল্লাহর আরশের চতুর্দিকে অবস্থান করবে। ফেরেশতাবর্গ অভ্যর্থনা করে তাদেরকে হাশরের মাঠে নিয়ে যাবেন। তারা মণি-মানিক্যের উষ্ট্রের উপর সওয়ার হবে, যেগুলোর গদি রেশমের চেয়েও নরম হবে। মানুষের দৃষ্টি যতদূর যায় ততদূর পর্যন্ত হবে উষ্ট্রগুলোর এক কদম। তারা জান্নাতের মধ্যে পরম সুখে ও আরাম আয়েশের মধ্যে থাকবে। তারা বলবেঃ চল, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর সৃষ্টজীবের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করবেন তা আমরা দেখবো। সুতরাং তাদের দিকে দেখে আল্লাহ তা'আলা হেসে উঠবেন। যেখানে আল্লাহ পাক কোন বান্দাকে দেখে হাসেন সেখানে তার উপর কোন হিসাব নেই।” (এ হাদীসটি আবু ইয়া’লা (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সমস্ত বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। কিন্তু ইসমাঈল ইবনে আইয়াশ (রঃ)-এর উস্তাদ অপরিচিত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ পাকই সবচেয়ে ভাল জানেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ বিশ্ব ওর প্রতিপালকের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে, আমলনামা পেশ করা হবে এবং নবীদেরকে আনয়ন করা হবে। যাঁরা সাক্ষ্য দিবেন যে, তাঁরা নিজেদের উম্মতদের নিকট তাবলীগ বা প্রচারকার্য চালিয়েছিলেন। আর বান্দাদের ভাল ও মন্দ কাজের রক্ষক ফেরেশতাদেরকে আনয়ন করা হবে এবং আদল ও ইনসাফের সাথে মাখলুকের বিচার মীমাংসা করা হবে। কারো উপর কোন প্রকারের অত্যাচার করা হবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন আমি ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লা প্রতিষ্ঠিত করবো এবং কারো প্রতি বিন্দুমাত্র যুলুম করা হবে না। কোন আমল যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় তবুও আমি তা হাযির করবো এবং আমিই হিসাব নেয়ার জন্যে যথেষ্ট।” (২১:৪৭) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তাআলা অণু পরিমাণও অত্যাচার করেন না। যদি একটি পুণ্য হয় তবে তিনি তা বৃদ্ধি করে দেন এবং নিজের নিকট হতে তিনি বড় প্রতিদান প্রদান করেন।” (৪:৪০) এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানে বলেনঃ প্রত্যেককে তার ভাল-মন্দ কার্যের পূর্ণ প্রতিফল দেয়া হবে এবং তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সৃবিশেষ অবহিত।
আয-যুমার 39:71
৭১-৭২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী হতভাগ্য কাফিরদের পরিণাম সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, তাদেরকে জন্তুর মত শাসন-গর্জন ও ধমকের সাথে লাঞ্ছিত অবস্থায় দলে দলে হাঁকিয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেই দিন তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।”(৫২:১৩) অর্থাৎ তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং তারা হবে কঠিন পিপাসার্ত। যেমন মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন দয়াময়ের নিকট মুত্তাকীদেরকে সম্মানিত মেহমানরূপে সমবেত করবো, এবং অপরাধীদেরকে তৃষ্ণাতুর অবস্থায় জাহান্নামের দিকে খেদিয়ে নিয়ে যাবো।” (১৯:৮৫-৮৬) তা ছাড়া তারা সেদিন হবে বধির, মূক ও অন্ধ এবং তাদেরকে মুখের ভরে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হবে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন আমি তাদেরকে সমবেত করবো তাদের মুখের ভরে চলা অবস্থায় অন্ধ, মূক ও বধির করে। তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম; যখনই তা স্তিমিত হবে আমি তখন তাদের জন্যে অগ্নিশিখা বৃদ্ধি করে দিবো।” (১৭:৯৭)মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন তারা জাহান্নামের নিকটবর্তী হবে তখন ওর প্রবেশদ্বারগুলো খুলে দেয়া হবে, যাতে তৎক্ষণাৎ শাস্তি শুরু হয়ে যায়। অতঃপর তাদেরকে তথাকার রক্ষী ফেরেশতারা লজ্জিত করার জন্যে ধমকের সুরে বলবেঃ তোমাদের নিকট কি তোমাদের মধ্য হতে রাসূল আসেননি যারা তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের আয়াত আবৃত্তি করতেন এবং এই দিনের সাক্ষাৎ সম্বন্ধে তোমাদেরকে সতর্ক করতেন? তারা জবাবে বলবেঃ হ্যাঁ, আমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল অবশ্যই এসেছিলেন, দলীলও কায়েম করেছিলেন, বহু কিছু আমাদেরকে শুনিয়েছিলেন, বুঝিয়েছিলেন এবং এই দিনের সাক্ষাৎ সম্বন্ধে সতর্কও করেছিলেন। কিন্তু আমরা তাঁদের কথায় কর্ণপাত করিনি, বরং তাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলাম। কেননা, আমরা হলাম হতভাগ্য। আমাদের ভাগ্যে এই বিড়ম্বনাই ছিল। বস্তুতঃ কাফিরদের প্রতি শাস্তির কথা বাস্তবায়িত হয়েছে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাদের সম্বন্ধে খবর দিতে গিয়ে অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখনই ওতে কোন দলকে নিক্ষেপ করা হবে, তাদেরকে রক্ষীরা জিজ্ঞেস করবেঃ তোমাদের নিকট কি কোন সতর্ককারী আসেনি? তারা জবাবে বলবেঃ অবশ্যই আমাদের নিকট সতর্ককারী এসেছিল, আমরা তাদেরকে মিথ্যাবাদী গণ্য করেছিলাম এবং বলেছিলামঃ আল্লাহ কিছুই অবতীর্ণ করেননি, তোমরা তো মহা বিভ্রান্তিতে রয়েছে। তারা আরো বলবেঃ যদি আমরা শুনতাম অথবা বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করতাম, তাহলে আমরা জাহান্নামবাসী হতাম না।” (৬৭:৮-১০) অর্থাৎ এভাবে তারা নিজেদেরকে তিরস্কার করবে এবং খুবই অনুতপ্ত হবে। তাই আল্লাহ তা'আলা এর পরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করবে। অভিশাপ জাহান্নামীদের জন্যে!” (৬৭:১১)আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ তাদেরকে বলা হবে- জাহান্নামের দ্বারসমূহে প্রবেশ কর তাতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে। অর্থাৎ যেই তাদেরকে দেখবে এবং তাদের অবস্থা জানবে সেই পরিষ্কারভাবে বলে উঠবে যে, নিশ্চয়ই এরা এরই যোগ্য। এই উক্তিকারীর নাম নেয়া হয়নি, বরং তাকে সাধারণভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে যাতে তার সাধারণত্ব বাকী থাকে। আর যাতে আল্লাহ তা'আলার ন্যায়ের সাক্ষ্য পুরো হয়ে যায়। তাদেরকে বলা হবেঃ এখন তোমরা জাহান্নামে চলে যাও। সেখানে স্বায়ীভাবে জ্বলতে পুড়তে থাকো। এখান হতে না তোমরা কখনো ছুটতে পারবে, তোমাদের মৃত্যু হবে। আহা! উদ্ধতদের আবাসস্থল কতই না নিকৃষ্ট। যেখানে তাদেরকে দিনরাত জ্বলতে পুড়তে হবে! অহংকারীদের অহংকার ও সত্যকে প্রত্যাখ্যান করার প্রতিফল এটাই, যা তাদেরকে এরূপ নিকৃষ্ট জায়গায় পৌঁছিয়ে দিয়েছে। এটা কতই না জঘন্য অবস্থা! কতই না শিক্ষামূলক পরিণাম এটা!
আয-যুমার 39:72
৭১-৭২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী হতভাগ্য কাফিরদের পরিণাম সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, তাদেরকে জন্তুর মত শাসন-গর্জন ও ধমকের সাথে লাঞ্ছিত অবস্থায় দলে দলে হাঁকিয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেই দিন তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।”(৫২:১৩) অর্থাৎ তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং তারা হবে কঠিন পিপাসার্ত। যেমন মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন দয়াময়ের নিকট মুত্তাকীদেরকে সম্মানিত মেহমানরূপে সমবেত করবো, এবং অপরাধীদেরকে তৃষ্ণাতুর অবস্থায় জাহান্নামের দিকে খেদিয়ে নিয়ে যাবো।” (১৯:৮৫-৮৬) তা ছাড়া তারা সেদিন হবে বধির, মূক ও অন্ধ এবং তাদেরকে মুখের ভরে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হবে। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন আমি তাদেরকে সমবেত করবো তাদের মুখের ভরে চলা অবস্থায় অন্ধ, মূক ও বধির করে। তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম; যখনই তা স্তিমিত হবে আমি তখন তাদের জন্যে অগ্নিশিখা বৃদ্ধি করে দিবো।” (১৭:৯৭)মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন তারা জাহান্নামের নিকটবর্তী হবে তখন ওর প্রবেশদ্বারগুলো খুলে দেয়া হবে, যাতে তৎক্ষণাৎ শাস্তি শুরু হয়ে যায়। অতঃপর তাদেরকে তথাকার রক্ষী ফেরেশতারা লজ্জিত করার জন্যে ধমকের সুরে বলবেঃ তোমাদের নিকট কি তোমাদের মধ্য হতে রাসূল আসেননি যারা তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের আয়াত আবৃত্তি করতেন এবং এই দিনের সাক্ষাৎ সম্বন্ধে তোমাদেরকে সতর্ক করতেন? তারা জবাবে বলবেঃ হ্যাঁ, আমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল অবশ্যই এসেছিলেন, দলীলও কায়েম করেছিলেন, বহু কিছু আমাদেরকে শুনিয়েছিলেন, বুঝিয়েছিলেন এবং এই দিনের সাক্ষাৎ সম্বন্ধে সতর্কও করেছিলেন। কিন্তু আমরা তাঁদের কথায় কর্ণপাত করিনি, বরং তাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলাম। কেননা, আমরা হলাম হতভাগ্য। আমাদের ভাগ্যে এই বিড়ম্বনাই ছিল। বস্তুতঃ কাফিরদের প্রতি শাস্তির কথা বাস্তবায়িত হয়েছে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাদের সম্বন্ধে খবর দিতে গিয়ে অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখনই ওতে কোন দলকে নিক্ষেপ করা হবে, তাদেরকে রক্ষীরা জিজ্ঞেস করবেঃ তোমাদের নিকট কি কোন সতর্ককারী আসেনি? তারা জবাবে বলবেঃ অবশ্যই আমাদের নিকট সতর্ককারী এসেছিল, আমরা তাদেরকে মিথ্যাবাদী গণ্য করেছিলাম এবং বলেছিলামঃ আল্লাহ কিছুই অবতীর্ণ করেননি, তোমরা তো মহা বিভ্রান্তিতে রয়েছে। তারা আরো বলবেঃ যদি আমরা শুনতাম অথবা বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করতাম, তাহলে আমরা জাহান্নামবাসী হতাম না।” (৬৭:৮-১০) অর্থাৎ এভাবে তারা নিজেদেরকে তিরস্কার করবে এবং খুবই অনুতপ্ত হবে। তাই আল্লাহ তা'আলা এর পরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করবে। অভিশাপ জাহান্নামীদের জন্যে!” (৬৭:১১)আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ তাদেরকে বলা হবে- জাহান্নামের দ্বারসমূহে প্রবেশ কর তাতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে। অর্থাৎ যেই তাদেরকে দেখবে এবং তাদের অবস্থা জানবে সেই পরিষ্কারভাবে বলে উঠবে যে, নিশ্চয়ই এরা এরই যোগ্য। এই উক্তিকারীর নাম নেয়া হয়নি, বরং তাকে সাধারণভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে যাতে তার সাধারণত্ব বাকী থাকে। আর যাতে আল্লাহ তা'আলার ন্যায়ের সাক্ষ্য পুরো হয়ে যায়। তাদেরকে বলা হবেঃ এখন তোমরা জাহান্নামে চলে যাও। সেখানে স্বায়ীভাবে জ্বলতে পুড়তে থাকো। এখান হতে না তোমরা কখনো ছুটতে পারবে, তোমাদের মৃত্যু হবে। আহা! উদ্ধতদের আবাসস্থল কতই না নিকৃষ্ট। যেখানে তাদেরকে দিনরাত জ্বলতে পুড়তে হবে! অহংকারীদের অহংকার ও সত্যকে প্রত্যাখ্যান করার প্রতিফল এটাই, যা তাদেরকে এরূপ নিকৃষ্ট জায়গায় পৌঁছিয়ে দিয়েছে। এটা কতই না জঘন্য অবস্থা! কতই না শিক্ষামূলক পরিণাম এটা!
আয-যুমার 39:73
৭৩-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: উপরে হতভাগ্য ও পাপীদের পরিণাম ও তাদের অবস্থার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এখানে ভাগ্যবান আল্লাহভীরু ও সৎ লোকদের পরিণামের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে উত্তম ও সুন্দর উষ্ট্রীর উপর আরোহণ করিয়ে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তাদের বিভিন্ন দল থাকবে। প্রথমে আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বিশিষ্ট লোকদের দল, তারপর পুণ্যবানদের দল, এরপর তাদের চেয়ে কম মর্যাদাপূর্ণ লোকদের দল এবং এরপর তাদের চেয়েও কম মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের দল থাকবে। নবীগণ থাকবেন নবীদের দলে, সিদ্দীকগণ থাকবেন তাদের সমপর্যায়ের লোকদের দলে, শহীদগণ থাকবেন শহীদদের দলে এবং আলেমগণ থাকবেন আলেমদের দলে। মোটকথা, প্রত্যেকেই তাঁর সমপর্যায়ের লোকের সাথে থাকবেন। যখন তারা জান্নাতের নিকট পৌঁছে যাবেন এবং পুলসিরাত অতিক্রম করে ফেলবেন তখন তথায় একটি পুলের উপর তাদেরকে দাঁড় করানো হবে এবং তাঁদের পরস্পরের মধ্যে যে যুলুম ও উৎপীড়ন ছিল তার প্রতিশোধ ও বদলা গ্রহণ করিয়ে দেয়া হবে। যখন তারা সম্পূর্ণরূপে পাক-সাফ হয়ে যাবেন তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দান করা হবে।সূর বা শিংগার সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, জান্নাতের দরযার উপর পৌঁছে জান্নাতীরা পরস্পরের মধ্যে পরামর্শ করবেঃ দেখা যাক, কাকে প্রথমে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়! অতঃপর তারা ইচ্ছা করবে হযরত আদম (আঃ)-এর, তারপর হযরত নূহ (আঃ)-এর, তারপর হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর, এরপর হযরত মূসা (আঃ)-এর, তারপর হযরত ঈসা (আঃ)-এর এবং এরপর তারা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি ইচ্ছা পোষণ করবে, যেমন হাশরের মাঠে সুপারিশের ক্ষেত্রে করেছিল। এর দ্বারা সর্বক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ফযীলত প্রকাশ করাই উদ্দেশ্য। সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে আমিই হবে প্রথম সুপারিশকারী।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমিই হলাম এমন এক ব্যক্তি যে, সর্বপ্রথম আমিই জান্নাতের দরযায় করাঘাত করবো।” মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমি জান্নাতের দরযা খুলতে চাইলে তথাকার দারোগা আমাকে জিজ্ঞেস করবেঃ “আপনি কে?” আমি উত্তরে বলবোঃ আমি হলাম মুহাম্মাদ (সঃ)! সে তখন বলবেঃ “আমার উপর এই নির্দেশই ছিল যে, আপনার আগমনের পূর্বে আমি যেন কারো জন্যে জান্নাতের দর না খুলি।”হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রথম যে দলটি জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের মত উজ্জ্বল হবে। থুথু, প্রস্রাব, পায়খানা ইত্যাদি কিছুই সেখানে হবে না। তাদের পানাহারের পাত্রগুলো হবে স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত। তাদের অঙ্গার ধাণিকা হতে সুগন্ধি বিচ্ছুরিত হবে। তাদের ঘর্ম হবে মিশক আম্বর। তাদের প্রত্যেকের দু’জন স্ত্রী হবে, যাদের পদনালী এমন সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন হবে যে, ওর মজ্জা মাংসের পিছন হতে দেখা যাবে। কোন দু’জন লোকের মধ্যে কোন মতানৈক্য, হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা থাকবে না। তাদের অন্তরগুলো একটি অন্তরে পরিণত হয়ে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতে থাকবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হাফিয আবু ইয়া’লা (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে রয়েছেঃ প্রথম যে দলটি জান্নাতে যাবে তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের মত উজ্জ্বল হবে। তাদের পরবর্তী দলটির চেহারা হবে আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের মত উজ্জ্বল। তারপর তাতে প্রায় উপরে বর্ণিত হাদীস-এর বর্ণনার মতই বর্ণনা রয়েছে এবং এও রয়েছে যে, তাদের দেহ হবে ষাট হাত লম্বা, যেমন হযরত আদম (আঃ)-এর দেহ ছিল। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল, যাদের সংখ্যা হবে সত্তর হাজার, সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল হবে।” একথা শুনে হযরত আক্কাশা মুহসিন (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমার জন্যে দু'আ করুন যেন আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুআ করলেনঃ “হে আল্লাহ! তাকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করুন!” অতঃপর একজন আনসারী দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার জন্যে দু'আ করুন যেন আল্লাহ আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তখন তিনি তাকে বলেনঃ “আক্কাশা (রাঃ) তোমার অগ্রগামী হয়ে গেছে।” এই সত্তর হাজার লোকের বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করার কথা বহু কিতাবে বহু সনদে বহু সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে।হযরত সাহল ইবনে সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার অথবা সাত লক্ষ লোক এক সাথে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা একে অপরকে ধরে থাকবে। তারা একই সাথে জান্নাতে পা রাখবে। তাদের চেহারা হবে চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের মত (উজ্বল)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা আল বাহেলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আমার সাথে আমার প্রতিপালকের ওয়াদা রয়েছে যে, আমার উম্মতের সত্তর হাজার লোক জান্নাতে যাবে এবং প্রতি হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজার হবে, তাদের না হিসাব হবে, না শাস্তি হবে। তারা ছাড়া আরো তিন লপ বা অঞ্জলি পূর্ণ লোক (জান্নাতে বিনা হিসাবে যাবে), যাদেরকে আল্লাহ নিজের হাতের অঞ্জলি ভরে জান্নাতে পৌছিয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) এবং ইবনে আবি শায়বা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) যখন এই সৌভাগ্যবান বুযুর্গ ব্যক্তিরা জান্নাতের নিকট পৌঁছে যাবেন তখন তাঁদের জন্যে জান্নাতের দরগুলো খুলে দেয়া হবে। সেখানে তাদের খুবই ইযযত ও সম্মান হবে। তথাকার রক্ষক ফেরেশতারা তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান করবেন, তাঁদের প্রশংসা করবেন এবং সালাম জানাবেন। এরপরের উত্তর কুরআন কারীমে উহ্য রাখা হয়েছে, যাতে সাধারণত্ব বাকী থাকে। ভাবার্থ এই যে, ঐ সময় তারা পূর্ণভাবে খুশী হয়ে যাবেন। তথায় তারা কল্পনাতীত আনন্দ, শান্তি এবং আরাম ও আয়েশ লাভ করবেন। তাদের সর্বপ্রকারের মনোবাসনা পূর্ণ হয়ে যাবে।এখানে একথা বর্ণনা করে দেয়াও জরুরী যে, কতকগুলো লোক (আরবী)-এর (আরবী) টিকে যে অষ্টম (আরবী) বলেছেন এবং এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, জান্নাতের আটটি দরযা রয়েছে, তাঁরা খুব লৌকিকতা করেছেন এবং অযথা কষ্ট স্বীকার করেছেন। জান্নাতের আটটি দরযার কথা তো সহীহ হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণিত। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি নিজের মাল হতে আল্লাহর পথে জোড়া জোড়া খরচ করবে তাকে জান্নাতের সবগুলো দরযা হতে ডাক দেয়া হবে। জান্নাতের কয়েকটি দর রয়েছে। নামাযীকে ‘বাবুসসালাত’ হতে, দাতাকে বাবুস সাদকা হতে, মুজাহিদকে বাবুল জিহাদ’ হতে এবং রোযাদারকে ‘বাবুর রাইয়ান’ হতে ডাক দেয়া হবে।” একথা শুনে হযরত আবূ বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর তো কোন প্রয়োজন নেই যে, প্রত্যেক দর হতে ডাক দেয়া হোক, কারণ যে দরযা হতেই ডাক দেয়া হোক না কেন, উদ্দেশ্য তো হলো জান্নাতে প্রবেশ করা। কিন্তু এমন কোন লোক কি আছে যাকে সমস্ত দুর থেকে ডাক দেয়া হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা, আছে এবং আমি আশা করি যে, তুমিই হবে তাদের মধ্যে একজন।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম এবং মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) হযরত সাহল ইবনে সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতের আটটি দর রয়েছে। ঐগুলোর মধ্যে একটির নাম হচ্ছে ‘বাবুর রাইয়ান’। এটা দিয়ে শুধু রোযাদারই প্রবেশ করবে।” হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ভালভাবে ও পূর্ণমাত্রায় অযু করার পর পাঠ করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।” তার জন্যে জান্নাতের আটটি দরযা খুলে দেয়া হয়, যে দর দিয়ে ইচ্ছা সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণনা করা হয়েছে)হযরত মু'আয (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ হচ্ছে জান্নাতের চাবি।” জান্নাতের দরগুলোর প্রশস্ততার বর্ণনাঃ আমরা আল্লাহর নিকট তাঁর মহান অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি যে, তিনি যেন আমাদেরকেও জান্নাতের অধিবাসী করেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমার উম্মতের মধ্যে যাদের হিসাব হবে না তাদেরকে ডান দিকের দর দিয়ে জান্নাতে নিয়ে যাও। তারা কিন্তু অন্যান্য দরগুলোতেও জনগণের সাথে শরীক হবে।” যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তার শপথ! জান্নাতের চৌকাঠ এতো বড় ও প্রশস্ত যে, ওর প্রশস্ততা মক্কা ও হিজরের মধ্যকার দূরত্বের সমান অথবা হিজর ও মক্কার মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান।" (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে)হযরত উবা ইবনে গাওয়ান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর ভাষণে বলেনঃ “আমার নিকট এটা বর্ণনা করা হয়েছে যে, জান্নাতের দরগুলোর প্রশস্ততা হবে চল্লিশ বছরের পথের দূরত্বের সমান। এমন একটি দিন আসবে যে, ঐ দিন জান্নাতে প্রবেশকারীদের অত্যন্ত ভীড় হবে, ফলে এই প্রশস্ত দরগুলোও লোকে পূর্ণ হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতের চৌকাঠের প্রশস্ততা হবে চল্লিশ বছরের পথের দূরত্বের সমান।” (আবদ ইবনে হুমায়েদ (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেন যে, জান্নাতীরা যখন জান্নাতের নিকটবর্তী হবে তখন রক্ষক ফেরেশতারা তাদেরকে বলবেঃ “তোমাদের প্রতি সালাম। তোমরা সুখী হও এবং জান্নাতে প্রবেশ কর স্থায়ীভাবে অবস্থিতির জন্যে। তোমাদের আমল, কথাবার্তা, চেষ্টা-তদবীর এবং বদলা-বিনিময় ইত্যাদি সবই আনন্দদায়ক।” যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন এক যুদ্ধের সময় স্বীয় ঘোষককে বলেছিলেনঃ “যাও, ঘোষণা করে দাও যে, জান্নাতে শুধু মুসলমানরাই যাবে কিংবা বলেছিলেন, মুমিনরাই শুধু জান্নাতে যাবে। ফেরেশতারা জান্নাতীদেরকে আরো বলবেনঃ “তোমাদেরকে এ জান্নাত হতে কখনো বের করা হবে না। বরং তোমরা এখানে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে।” জান্নাতীরা নিজেদের এই অবস্থা দেখে খুশী হয়ে মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং বলবেঃ “প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন। দুনিয়ায় তাদের এই প্রার্থনাই ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার রাসূলদের মাধ্যমে আমাদেরকে যা দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা আমাদেরকে প্রদান করুন এবং কিয়ামতের দিন আমাদেরকে হেয় করবেন না। আপনি তো প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না।” (৩:১৯৪) অন্য আয়াতে আছে যে, তারা এ সময় বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে এর জন্যে হিদায়াত দান করেছেন, তিনি আমাদেরকে হিদায়াত না করলে আমরা হিদায়াত লাভ করতাম না। অবশ্যই আমাদের নিকট আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ সত্য নিয়ে এসেছিলেন।” (৭:৪৩) তারা আরো বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সমুদয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের চিন্তা-দুঃখ দূর করে দিয়েছেন, নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিপালক ক্ষমাশীল ও গুণগ্রাহী। যিনি আমাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে এই পবিত্র স্থান দান করেছেন, এখানে আমাদেরকে কোন দুঃখ-বেদনা এবং কষ্ট ও বিপদ স্পর্শ করে না।" (৩৫:৩৪-৩৫)। মহান আল্লাহ জান্নাতীদের আরো উক্তি উদ্ধৃত করেনঃ ‘আল্লাহ আমাদেরকে অধিকারী করেছেন এই ভূমির; আমরা জান্নাতে যেথায় ইচ্ছা বসবাস করবো। আল্লাহ পাক বলেনঃ সদাচারীদের পুরস্কার কত উত্তম!এ আয়াতটি মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যিকরের বা উপদেশের পরে যৰূরে লিখে দিয়েছিলাম যে, আমার সৎ বা যোগ্যতা সম্পন্ন বান্দারা যমীনের ওয়ারিস হবে।” (২১:১০৫) এজন্যেই তারা বলবে, জান্নাতে যেথায় ইচ্ছা আমরা বসবাস করবো। এটাই হলো আমাদের আমলের উত্তম পুরস্কার। মিরাজের ঘটনায় হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলে আমি দেখি যে, ওর তাঁবুগুলো মণিমুক্তা নির্মিত এবং ওর মাটি খাঁটি মিশক আম্বর।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবনে সায়েদ (রাঃ)-কে জান্নাতের মাটি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “ওটা সাদা ময়দার মত খাটি মিশক আম্বর। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য কথা বলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) ও আবদ ইবনে হামীদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জান্নাতের দরযায় পৌঁছে জান্নাতীরা একটি গাছ দেখতে পাবে, যার মূল হতে দু’টি নহর বের হতে থাকবে। একটি নহরে তারা গোসল করবে, যার ফলে তারা এমন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হবে যে, তাদের দেহ ও মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তাদের মাথার চুল তেল লাগানো ও চিরুণীকৃত থাকবে। আর কখনো চিরুণী করার প্রয়োজন হবে না। তাদের দেহের ও চেহারার রং-এর কোন পরিবর্তন ঘটবে না। অতঃপর তারা দ্বিতীয় নহরে যাবে। হয়তো তারা এর জন্যে আদিষ্ট থাকবে। ঐ নহরের পানি তারা পান করবে। ফলে সমস্ত ঘৃণিত জিনিস হতে তারা সম্পূর্ণরূপে পাক সাফ হয়ে যাবে। জান্নাতের ফেরেশতারা তাদেরকে সালাম দিবেন ও মুবারকবাদ জানাবেন এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করতে বলবেন। তাদের প্রত্যেকের কাছে কিশোর পরিচারকরা আসবে এবং তাদের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখবে। তারা ঐ জান্নাতবাসীদের বলবেঃ “আপনারা সন্তুষ্ট থাকুন। আল্লাহ তাআলা আপনাদের জন্যে বিভিন্ন প্রকারের নিয়ামত প্রস্তুত রেখেছেন। তাদের মধ্য হতে কেউ দৌড়িয়ে যাবে এবং যে জান্নাতবাসীর জন্যে যে হ্র নির্দিষ্ট রয়েছে। তাকে গিয়ে বলবেঃ “আপনাকে জানাই মুবারকবাদ। অমুক সাহেব এসে পড়েছেন। তার নাম শোনা মাত্রই ঐ হ্র খুশী হয়ে কিশোর পরিচারককে বলবেঃ “তুমি কি স্বয়ং তাঁকে দেখেছো?" সে উত্তরে বলবেঃ “হ্যা, আমি স্বচক্ষে তাঁকে দেখে এসেছি।” ঐ হর তখন আনন্দে আটখানা হয়ে দরযার উপর এসে দাড়িয়ে যাবে। জান্নাতবাসী তার কক্ষে এসে দেখবে যে, সেখানে উন্নত মর্যাদা সম্পন্ন শয্যা রয়েছে, প্রস্তুত আছে পানপাত্র এবং সারি সারি উপাধান। বিছানা দেখার পর দেয়ালের প্রতি দৃষ্টি পড়লে সে দেখতে পাবে যে, ওটা লাল, সবুজ, হলদে, সাদা এবং নানা প্রকারের মণি-মুক্তা দ্বারা নির্মিত রয়েছে। অতঃপর ছাদের প্রতি চোখ পড়লে দেখবে যে, ওটা এতো পরিষ্কার পরিছন্ন যে, আলোর ন্যায় ঝকমক করছে। ওর আলো চোখের আলোকে নিভিয়ে দিবে যদি মহান আল্লাহ চোখের জ্যোতি ঠিক না রাখেন। অতঃপর সে স্বীয় স্ত্রীদের প্রতি অর্থাৎ জান্নাতী হ্রীদের প্রতি প্রেমের দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে। তারপর সে নিজের আসনসমূহের যেটার উপর ইচ্ছা উপবেশন করবে এবং বলবেঃ “আল্লাহর শোকর যে, তিনি আমাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেছেন। যদি তিনি আমাদেরকে এ পথ প্রদর্শন না করতেন তবে কখনো আমরা এ পথে পরিচালিত হতাম না।”অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে সেই সত্তার শপথ! যখন এ লোকগুলো (জান্নাতী লোকগুলো) কবর হতে বের হবে তখন তাদের অভ্যর্থনা করা হবে। তাদের জন্যে ডানা বিশিষ্ট উষ্ট্র আনয়ন করা হবে যেগুলোর উপর সোনার হাওদা থাকবে। তাদের জুতার তলার লম্বা চামড়াটাও আলোয় ঝকমক করবে। এই উষ্ট্রগুলো এক একটি কদম এতো দূরে রাখবে যতদূর মানুষের দৃষ্টি যায়। তারা একটি গাছের নিকট পৌঁছবে যার নীচ হতে দু'টি নহর বয়ে যাচ্ছে। একটি নহরের পানি তারা পান করবে, যার ফলে তাদের পেটের সব জঞ্জাল এবং ময়লা আবর্জনা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। তারপর দ্বিতীয় নহরটিতে তারা গোসল করবে। এরপর আর কখনো তাদের দেহ ময়লাযুক্ত হবে না এবং তাদের মাথার চুল এলোমেলো হবে না। তাদের শরীর ও চেহারা সদা উজ্জ্বল থাকবে। অতঃপর তারা জান্নাতের দর উপর আসবে। তারা দেখতে পাবে যে, লাল বর্ণের মণি-মাণিক্যের একটি গোলাকৃতি জিনিস সোনার তক্তার উপর ঝুলানো রয়েছে। তারা তখন তাতে আঘাত করবে এবং তা বেজে উঠবে। এ শব্দ শোনা মাত্রই প্রত্যেক হুর জেনে নিবে যে, তার স্বামী এসে গেছে। প্রত্যেকে তখন নিজ নিজ দারোয়ানকে দর খুলে দেয়ার হুকুম করবে। তখন দারোয়ান দরযা খুলে দিবে। সে ভিতরে পা রাখা মাত্রই দ্বাররক্ষীর আলোকোজ্জ্বল চেহারা দেখে সিজদায় পড়ে যাবে। কিন্তু ঐ দ্বাররক্ষী তাকে বাধা দিয়ে বলবেঃ “মস্তক উত্তোলন করুন! আমি তো আপনার অধীনস্থ। অতঃপর ঐ দ্বাররক্ষী তাকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাবে। যখন সে মণি-মুক্তা নির্মিত তাঁবুর কাছে পৌঁছবে যেখানে তার হ্র রয়েছে তখন ঐ হ্র আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাঁবু হতে দৌড়িয়ে আসবে এবং তার সাথে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে বলবেঃ “আপনি আমার প্রেমপাত্র এবং আমি আপনার প্রেমপাত্রী। আমি এখানে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবো, কখনো আর মত্যবরণ করবো না। আমি বহু নিয়ামতের অধিকারিণী, দারিদ্র ও অভাব হতে আমি বহু দূরে রয়েছি। আমি আপনার প্রতি সদা সন্তুষ্ট থাকবো, কখনো অসন্তুষ্ট হবে না। সদা-সর্বদা আমি আপনার খিদমতে লেগে থাকবো। কখনো এদিক ওদিক সরে যাবো না।” অতঃপর ঐ জান্নাতবাসী ঘরে প্রবেশ করবে যার ছাদ মেঝে হতে এক লাখ হাত উঁচু হবে। ঐ ঘরের দেয়ালগুলো হবে নানা প্রকারের ও রঙ বেরঙের মণি-মুক্তা দ্বারা নির্মিত। ঐ ঘরে সত্তরটি আসন থাকবে। প্রতিটি আসনে সত্তরটি করে গদি থাকবে। প্রতিটি গদিতে সত্তরজন হুর থাকবে। প্রতিটি হ্র সত্তরটি করে হুল্লা পরিধান করে থাকবে। ঐ হুল্লাগুলোর মধ্য দিয়ে তাদের পদনালীর মজ্জা দেখা যাবে। তার সাথে সহবাসে দুনিয়ার রাত্রির প্রায় পুরো একটি রাত্রি কেটে যাবে। তাদের বাগান ও বাড়ীর নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হবে। ওর পানি কখনো দুর্গন্ধময় হবে না। ওর পানি হবে মুক্তার মত স্বচ্ছ। তথায় একটি দুধের নহর হবে, যার স্বাদ কখনো পরিবর্তন হবে না, যে দুধ কোন জন্তুর স্তন হতে বের হয়নি। একটি হবে সুরার নহর, যা হবে অত্যন্ত সুস্বাদু এবং যা কোন মানুষের হাতের তৈরী নয়। একটি খাঁটি মধুর নহর হবে যা মৌমাছির পেট হতে বহির্গত মধু নয়। এর চতুর্দিকে বিভিন্ন প্রকারের ফলে পরিপূর্ণ বৃক্ষরাজি থাকবে যেগুলোর ফল জান্নাতীদের দিকে ঝুঁকে পড়বে। তারা দাড়িয়ে দাড়িয়ে ফল নেয়ার ইচ্ছা করলে নিতে পারবে। যদি তারা বসে বসে ফল ভাঙ্গার ইচ্ছা করে তবে গাছের শাখা এমনভাবে ঝুঁকে পড়বে যে, তারা বসে বসেই ফল ভাঙ্গতে পারবে। শুয়ে শুয়ে ফল পাড়ার ইচ্ছা করলে শাখা ঐ পরিমাণই ঝুঁকে পড়বে।” অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াত পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সন্নিহিত বৃক্ষছায়া তাদের উপর থাকবে এবং ওর ফলমূল সম্পূর্ণরূপে তাদের আয়ত্তাধীন করা হবে।” (৭৬:১৪) তারা যখন খাদ্য খাওয়ার ইচ্ছা করবে তখন সাদা বা সবুজ রঙ এর পাখী তাদের কাছে এসে স্বীয় পালক উঁচু করে দিবে। তারা ওর পার্শ্বদেশের যে প্রকারের গোশত খাওয়ার ইচ্ছা করবে খেয়ে নিবে। অতঃপর পাখীটি পূর্ববৎ জীবিত হয়ে উড়ে যাবে। ফেরেশতারা ঐ জান্নাতীদের কাছে আসবেন এবং সালাম করে বলবেনঃ “এগুলো হচ্ছে জান্নাত যেগুলোর ওয়ারিস তোমাদের আমলের কারণে তোমাদেরকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে।”যদি কোন হুরের একটি চুল যমীনে এসে পড়ে তবে ওটা স্বীয় ঔজ্জ্বল্য ও কৃষ্ণতার দ্বারা সূর্যের কিরণকে আরো উজ্জ্বল করে দিবে এবং ওর কৃষ্ণতা প্রতীয়মান থাকবে। (এটা গারীব হাদীস, এটা যেন মুরসাল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
আয-যুমার 39:74
৭৩-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর: উপরে হতভাগ্য ও পাপীদের পরিণাম ও তাদের অবস্থার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এখানে ভাগ্যবান আল্লাহভীরু ও সৎ লোকদের পরিণামের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে উত্তম ও সুন্দর উষ্ট্রীর উপর আরোহণ করিয়ে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তাদের বিভিন্ন দল থাকবে। প্রথমে আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বিশিষ্ট লোকদের দল, তারপর পুণ্যবানদের দল, এরপর তাদের চেয়ে কম মর্যাদাপূর্ণ লোকদের দল এবং এরপর তাদের চেয়েও কম মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের দল থাকবে। নবীগণ থাকবেন নবীদের দলে, সিদ্দীকগণ থাকবেন তাদের সমপর্যায়ের লোকদের দলে, শহীদগণ থাকবেন শহীদদের দলে এবং আলেমগণ থাকবেন আলেমদের দলে। মোটকথা, প্রত্যেকেই তাঁর সমপর্যায়ের লোকের সাথে থাকবেন। যখন তারা জান্নাতের নিকট পৌঁছে যাবেন এবং পুলসিরাত অতিক্রম করে ফেলবেন তখন তথায় একটি পুলের উপর তাদেরকে দাঁড় করানো হবে এবং তাঁদের পরস্পরের মধ্যে যে যুলুম ও উৎপীড়ন ছিল তার প্রতিশোধ ও বদলা গ্রহণ করিয়ে দেয়া হবে। যখন তারা সম্পূর্ণরূপে পাক-সাফ হয়ে যাবেন তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দান করা হবে।সূর বা শিংগার সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, জান্নাতের দরযার উপর পৌঁছে জান্নাতীরা পরস্পরের মধ্যে পরামর্শ করবেঃ দেখা যাক, কাকে প্রথমে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়! অতঃপর তারা ইচ্ছা করবে হযরত আদম (আঃ)-এর, তারপর হযরত নূহ (আঃ)-এর, তারপর হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর, এরপর হযরত মূসা (আঃ)-এর, তারপর হযরত ঈসা (আঃ)-এর এবং এরপর তারা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রতি ইচ্ছা পোষণ করবে, যেমন হাশরের মাঠে সুপারিশের ক্ষেত্রে করেছিল। এর দ্বারা সর্বক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ফযীলত প্রকাশ করাই উদ্দেশ্য। সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে আমিই হবে প্রথম সুপারিশকারী।” অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমিই হলাম এমন এক ব্যক্তি যে, সর্বপ্রথম আমিই জান্নাতের দরযায় করাঘাত করবো।” মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমি জান্নাতের দরযা খুলতে চাইলে তথাকার দারোগা আমাকে জিজ্ঞেস করবেঃ “আপনি কে?” আমি উত্তরে বলবোঃ আমি হলাম মুহাম্মাদ (সঃ)! সে তখন বলবেঃ “আমার উপর এই নির্দেশই ছিল যে, আপনার আগমনের পূর্বে আমি যেন কারো জন্যে জান্নাতের দর না খুলি।”হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রথম যে দলটি জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের মত উজ্জ্বল হবে। থুথু, প্রস্রাব, পায়খানা ইত্যাদি কিছুই সেখানে হবে না। তাদের পানাহারের পাত্রগুলো হবে স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত। তাদের অঙ্গার ধাণিকা হতে সুগন্ধি বিচ্ছুরিত হবে। তাদের ঘর্ম হবে মিশক আম্বর। তাদের প্রত্যেকের দু’জন স্ত্রী হবে, যাদের পদনালী এমন সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন হবে যে, ওর মজ্জা মাংসের পিছন হতে দেখা যাবে। কোন দু’জন লোকের মধ্যে কোন মতানৈক্য, হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা থাকবে না। তাদের অন্তরগুলো একটি অন্তরে পরিণত হয়ে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতে থাকবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হাফিয আবু ইয়া’লা (রঃ)-এর হাদীস গ্রন্থে রয়েছেঃ প্রথম যে দলটি জান্নাতে যাবে তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের মত উজ্জ্বল হবে। তাদের পরবর্তী দলটির চেহারা হবে আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের মত উজ্জ্বল। তারপর তাতে প্রায় উপরে বর্ণিত হাদীস-এর বর্ণনার মতই বর্ণনা রয়েছে এবং এও রয়েছে যে, তাদের দেহ হবে ষাট হাত লম্বা, যেমন হযরত আদম (আঃ)-এর দেহ ছিল। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল, যাদের সংখ্যা হবে সত্তর হাজার, সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল হবে।” একথা শুনে হযরত আক্কাশা মুহসিন (রাঃ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমার জন্যে দু'আ করুন যেন আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুআ করলেনঃ “হে আল্লাহ! তাকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করুন!” অতঃপর একজন আনসারী দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার জন্যে দু'আ করুন যেন আল্লাহ আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তখন তিনি তাকে বলেনঃ “আক্কাশা (রাঃ) তোমার অগ্রগামী হয়ে গেছে।” এই সত্তর হাজার লোকের বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করার কথা বহু কিতাবে বহু সনদে বহু সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে।হযরত সাহল ইবনে সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার অথবা সাত লক্ষ লোক এক সাথে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা একে অপরকে ধরে থাকবে। তারা একই সাথে জান্নাতে পা রাখবে। তাদের চেহারা হবে চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের মত (উজ্বল)।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা আল বাহেলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আমার সাথে আমার প্রতিপালকের ওয়াদা রয়েছে যে, আমার উম্মতের সত্তর হাজার লোক জান্নাতে যাবে এবং প্রতি হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজার হবে, তাদের না হিসাব হবে, না শাস্তি হবে। তারা ছাড়া আরো তিন লপ বা অঞ্জলি পূর্ণ লোক (জান্নাতে বিনা হিসাবে যাবে), যাদেরকে আল্লাহ নিজের হাতের অঞ্জলি ভরে জান্নাতে পৌছিয়ে দিবেন। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) এবং ইবনে আবি শায়বা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) যখন এই সৌভাগ্যবান বুযুর্গ ব্যক্তিরা জান্নাতের নিকট পৌঁছে যাবেন তখন তাঁদের জন্যে জান্নাতের দরগুলো খুলে দেয়া হবে। সেখানে তাদের খুবই ইযযত ও সম্মান হবে। তথাকার রক্ষক ফেরেশতারা তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান করবেন, তাঁদের প্রশংসা করবেন এবং সালাম জানাবেন। এরপরের উত্তর কুরআন কারীমে উহ্য রাখা হয়েছে, যাতে সাধারণত্ব বাকী থাকে। ভাবার্থ এই যে, ঐ সময় তারা পূর্ণভাবে খুশী হয়ে যাবেন। তথায় তারা কল্পনাতীত আনন্দ, শান্তি এবং আরাম ও আয়েশ লাভ করবেন। তাদের সর্বপ্রকারের মনোবাসনা পূর্ণ হয়ে যাবে।এখানে একথা বর্ণনা করে দেয়াও জরুরী যে, কতকগুলো লোক (আরবী)-এর (আরবী) টিকে যে অষ্টম (আরবী) বলেছেন এবং এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, জান্নাতের আটটি দরযা রয়েছে, তাঁরা খুব লৌকিকতা করেছেন এবং অযথা কষ্ট স্বীকার করেছেন। জান্নাতের আটটি দরযার কথা তো সহীহ হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণিত। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি নিজের মাল হতে আল্লাহর পথে জোড়া জোড়া খরচ করবে তাকে জান্নাতের সবগুলো দরযা হতে ডাক দেয়া হবে। জান্নাতের কয়েকটি দর রয়েছে। নামাযীকে ‘বাবুসসালাত’ হতে, দাতাকে বাবুস সাদকা হতে, মুজাহিদকে বাবুল জিহাদ’ হতে এবং রোযাদারকে ‘বাবুর রাইয়ান’ হতে ডাক দেয়া হবে।” একথা শুনে হযরত আবূ বকর (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর তো কোন প্রয়োজন নেই যে, প্রত্যেক দর হতে ডাক দেয়া হোক, কারণ যে দরযা হতেই ডাক দেয়া হোক না কেন, উদ্দেশ্য তো হলো জান্নাতে প্রবেশ করা। কিন্তু এমন কোন লোক কি আছে যাকে সমস্ত দুর থেকে ডাক দেয়া হবে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা, আছে এবং আমি আশা করি যে, তুমিই হবে তাদের মধ্যে একজন।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম এবং মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) হযরত সাহল ইবনে সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতের আটটি দর রয়েছে। ঐগুলোর মধ্যে একটির নাম হচ্ছে ‘বাবুর রাইয়ান’। এটা দিয়ে শুধু রোযাদারই প্রবেশ করবে।” হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ভালভাবে ও পূর্ণমাত্রায় অযু করার পর পাঠ করেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।” তার জন্যে জান্নাতের আটটি দরযা খুলে দেয়া হয়, যে দর দিয়ে ইচ্ছা সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণনা করা হয়েছে)হযরত মু'আয (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ হচ্ছে জান্নাতের চাবি।” জান্নাতের দরগুলোর প্রশস্ততার বর্ণনাঃ আমরা আল্লাহর নিকট তাঁর মহান অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি যে, তিনি যেন আমাদেরকেও জান্নাতের অধিবাসী করেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমার উম্মতের মধ্যে যাদের হিসাব হবে না তাদেরকে ডান দিকের দর দিয়ে জান্নাতে নিয়ে যাও। তারা কিন্তু অন্যান্য দরগুলোতেও জনগণের সাথে শরীক হবে।” যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তার শপথ! জান্নাতের চৌকাঠ এতো বড় ও প্রশস্ত যে, ওর প্রশস্ততা মক্কা ও হিজরের মধ্যকার দূরত্বের সমান অথবা হিজর ও মক্কার মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান।" (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে)হযরত উবা ইবনে গাওয়ান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর ভাষণে বলেনঃ “আমার নিকট এটা বর্ণনা করা হয়েছে যে, জান্নাতের দরগুলোর প্রশস্ততা হবে চল্লিশ বছরের পথের দূরত্বের সমান। এমন একটি দিন আসবে যে, ঐ দিন জান্নাতে প্রবেশকারীদের অত্যন্ত ভীড় হবে, ফলে এই প্রশস্ত দরগুলোও লোকে পূর্ণ হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতের চৌকাঠের প্রশস্ততা হবে চল্লিশ বছরের পথের দূরত্বের সমান।” (আবদ ইবনে হুমায়েদ (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেন যে, জান্নাতীরা যখন জান্নাতের নিকটবর্তী হবে তখন রক্ষক ফেরেশতারা তাদেরকে বলবেঃ “তোমাদের প্রতি সালাম। তোমরা সুখী হও এবং জান্নাতে প্রবেশ কর স্থায়ীভাবে অবস্থিতির জন্যে। তোমাদের আমল, কথাবার্তা, চেষ্টা-তদবীর এবং বদলা-বিনিময় ইত্যাদি সবই আনন্দদায়ক।” যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন এক যুদ্ধের সময় স্বীয় ঘোষককে বলেছিলেনঃ “যাও, ঘোষণা করে দাও যে, জান্নাতে শুধু মুসলমানরাই যাবে কিংবা বলেছিলেন, মুমিনরাই শুধু জান্নাতে যাবে। ফেরেশতারা জান্নাতীদেরকে আরো বলবেনঃ “তোমাদেরকে এ জান্নাত হতে কখনো বের করা হবে না। বরং তোমরা এখানে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে।” জান্নাতীরা নিজেদের এই অবস্থা দেখে খুশী হয়ে মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং বলবেঃ “প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন। দুনিয়ায় তাদের এই প্রার্থনাই ছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার রাসূলদের মাধ্যমে আমাদেরকে যা দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা আমাদেরকে প্রদান করুন এবং কিয়ামতের দিন আমাদেরকে হেয় করবেন না। আপনি তো প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না।” (৩:১৯৪) অন্য আয়াতে আছে যে, তারা এ সময় বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে এর জন্যে হিদায়াত দান করেছেন, তিনি আমাদেরকে হিদায়াত না করলে আমরা হিদায়াত লাভ করতাম না। অবশ্যই আমাদের নিকট আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ সত্য নিয়ে এসেছিলেন।” (৭:৪৩) তারা আরো বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সমুদয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের চিন্তা-দুঃখ দূর করে দিয়েছেন, নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিপালক ক্ষমাশীল ও গুণগ্রাহী। যিনি আমাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে এই পবিত্র স্থান দান করেছেন, এখানে আমাদেরকে কোন দুঃখ-বেদনা এবং কষ্ট ও বিপদ স্পর্শ করে না।" (৩৫:৩৪-৩৫)। মহান আল্লাহ জান্নাতীদের আরো উক্তি উদ্ধৃত করেনঃ ‘আল্লাহ আমাদেরকে অধিকারী করেছেন এই ভূমির; আমরা জান্নাতে যেথায় ইচ্ছা বসবাস করবো। আল্লাহ পাক বলেনঃ সদাচারীদের পুরস্কার কত উত্তম!এ আয়াতটি মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যিকরের বা উপদেশের পরে যৰূরে লিখে দিয়েছিলাম যে, আমার সৎ বা যোগ্যতা সম্পন্ন বান্দারা যমীনের ওয়ারিস হবে।” (২১:১০৫) এজন্যেই তারা বলবে, জান্নাতে যেথায় ইচ্ছা আমরা বসবাস করবো। এটাই হলো আমাদের আমলের উত্তম পুরস্কার। মিরাজের ঘটনায় হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলে আমি দেখি যে, ওর তাঁবুগুলো মণিমুক্তা নির্মিত এবং ওর মাটি খাঁটি মিশক আম্বর।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবনে সায়েদ (রাঃ)-কে জান্নাতের মাটি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “ওটা সাদা ময়দার মত খাটি মিশক আম্বর। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য কথা বলেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) ও আবদ ইবনে হামীদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)(আরবী) আল্লাহ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, জান্নাতের দরযায় পৌঁছে জান্নাতীরা একটি গাছ দেখতে পাবে, যার মূল হতে দু’টি নহর বের হতে থাকবে। একটি নহরে তারা গোসল করবে, যার ফলে তারা এমন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হবে যে, তাদের দেহ ও মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তাদের মাথার চুল তেল লাগানো ও চিরুণীকৃত থাকবে। আর কখনো চিরুণী করার প্রয়োজন হবে না। তাদের দেহের ও চেহারার রং-এর কোন পরিবর্তন ঘটবে না। অতঃপর তারা দ্বিতীয় নহরে যাবে। হয়তো তারা এর জন্যে আদিষ্ট থাকবে। ঐ নহরের পানি তারা পান করবে। ফলে সমস্ত ঘৃণিত জিনিস হতে তারা সম্পূর্ণরূপে পাক সাফ হয়ে যাবে। জান্নাতের ফেরেশতারা তাদেরকে সালাম দিবেন ও মুবারকবাদ জানাবেন এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করতে বলবেন। তাদের প্রত্যেকের কাছে কিশোর পরিচারকরা আসবে এবং তাদের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখবে। তারা ঐ জান্নাতবাসীদের বলবেঃ “আপনারা সন্তুষ্ট থাকুন। আল্লাহ তাআলা আপনাদের জন্যে বিভিন্ন প্রকারের নিয়ামত প্রস্তুত রেখেছেন। তাদের মধ্য হতে কেউ দৌড়িয়ে যাবে এবং যে জান্নাতবাসীর জন্যে যে হ্র নির্দিষ্ট রয়েছে। তাকে গিয়ে বলবেঃ “আপনাকে জানাই মুবারকবাদ। অমুক সাহেব এসে পড়েছেন। তার নাম শোনা মাত্রই ঐ হ্র খুশী হয়ে কিশোর পরিচারককে বলবেঃ “তুমি কি স্বয়ং তাঁকে দেখেছো?" সে উত্তরে বলবেঃ “হ্যা, আমি স্বচক্ষে তাঁকে দেখে এসেছি।” ঐ হর তখন আনন্দে আটখানা হয়ে দরযার উপর এসে দাড়িয়ে যাবে। জান্নাতবাসী তার কক্ষে এসে দেখবে যে, সেখানে উন্নত মর্যাদা সম্পন্ন শয্যা রয়েছে, প্রস্তুত আছে পানপাত্র এবং সারি সারি উপাধান। বিছানা দেখার পর দেয়ালের প্রতি দৃষ্টি পড়লে সে দেখতে পাবে যে, ওটা লাল, সবুজ, হলদে, সাদা এবং নানা প্রকারের মণি-মুক্তা দ্বারা নির্মিত রয়েছে। অতঃপর ছাদের প্রতি চোখ পড়লে দেখবে যে, ওটা এতো পরিষ্কার পরিছন্ন যে, আলোর ন্যায় ঝকমক করছে। ওর আলো চোখের আলোকে নিভিয়ে দিবে যদি মহান আল্লাহ চোখের জ্যোতি ঠিক না রাখেন। অতঃপর সে স্বীয় স্ত্রীদের প্রতি অর্থাৎ জান্নাতী হ্রীদের প্রতি প্রেমের দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে। তারপর সে নিজের আসনসমূহের যেটার উপর ইচ্ছা উপবেশন করবে এবং বলবেঃ “আল্লাহর শোকর যে, তিনি আমাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেছেন। যদি তিনি আমাদেরকে এ পথ প্রদর্শন না করতেন তবে কখনো আমরা এ পথে পরিচালিত হতাম না।”অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে সেই সত্তার শপথ! যখন এ লোকগুলো (জান্নাতী লোকগুলো) কবর হতে বের হবে তখন তাদের অভ্যর্থনা করা হবে। তাদের জন্যে ডানা বিশিষ্ট উষ্ট্র আনয়ন করা হবে যেগুলোর উপর সোনার হাওদা থাকবে। তাদের জুতার তলার লম্বা চামড়াটাও আলোয় ঝকমক করবে। এই উষ্ট্রগুলো এক একটি কদম এতো দূরে রাখবে যতদূর মানুষের দৃষ্টি যায়। তারা একটি গাছের নিকট পৌঁছবে যার নীচ হতে দু'টি নহর বয়ে যাচ্ছে। একটি নহরের পানি তারা পান করবে, যার ফলে তাদের পেটের সব জঞ্জাল এবং ময়লা আবর্জনা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। তারপর দ্বিতীয় নহরটিতে তারা গোসল করবে। এরপর আর কখনো তাদের দেহ ময়লাযুক্ত হবে না এবং তাদের মাথার চুল এলোমেলো হবে না। তাদের শরীর ও চেহারা সদা উজ্জ্বল থাকবে। অতঃপর তারা জান্নাতের দর উপর আসবে। তারা দেখতে পাবে যে, লাল বর্ণের মণি-মাণিক্যের একটি গোলাকৃতি জিনিস সোনার তক্তার উপর ঝুলানো রয়েছে। তারা তখন তাতে আঘাত করবে এবং তা বেজে উঠবে। এ শব্দ শোনা মাত্রই প্রত্যেক হুর জেনে নিবে যে, তার স্বামী এসে গেছে। প্রত্যেকে তখন নিজ নিজ দারোয়ানকে দর খুলে দেয়ার হুকুম করবে। তখন দারোয়ান দরযা খুলে দিবে। সে ভিতরে পা রাখা মাত্রই দ্বাররক্ষীর আলোকোজ্জ্বল চেহারা দেখে সিজদায় পড়ে যাবে। কিন্তু ঐ দ্বাররক্ষী তাকে বাধা দিয়ে বলবেঃ “মস্তক উত্তোলন করুন! আমি তো আপনার অধীনস্থ। অতঃপর ঐ দ্বাররক্ষী তাকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাবে। যখন সে মণি-মুক্তা নির্মিত তাঁবুর কাছে পৌঁছবে যেখানে তার হ্র রয়েছে তখন ঐ হ্র আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাঁবু হতে দৌড়িয়ে আসবে এবং তার সাথে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে বলবেঃ “আপনি আমার প্রেমপাত্র এবং আমি আপনার প্রেমপাত্রী। আমি এখানে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবো, কখনো আর মত্যবরণ করবো না। আমি বহু নিয়ামতের অধিকারিণী, দারিদ্র ও অভাব হতে আমি বহু দূরে রয়েছি। আমি আপনার প্রতি সদা সন্তুষ্ট থাকবো, কখনো অসন্তুষ্ট হবে না। সদা-সর্বদা আমি আপনার খিদমতে লেগে থাকবো। কখনো এদিক ওদিক সরে যাবো না।” অতঃপর ঐ জান্নাতবাসী ঘরে প্রবেশ করবে যার ছাদ মেঝে হতে এক লাখ হাত উঁচু হবে। ঐ ঘরের দেয়ালগুলো হবে নানা প্রকারের ও রঙ বেরঙের মণি-মুক্তা দ্বারা নির্মিত। ঐ ঘরে সত্তরটি আসন থাকবে। প্রতিটি আসনে সত্তরটি করে গদি থাকবে। প্রতিটি গদিতে সত্তরজন হুর থাকবে। প্রতিটি হ্র সত্তরটি করে হুল্লা পরিধান করে থাকবে। ঐ হুল্লাগুলোর মধ্য দিয়ে তাদের পদনালীর মজ্জা দেখা যাবে। তার সাথে সহবাসে দুনিয়ার রাত্রির প্রায় পুরো একটি রাত্রি কেটে যাবে। তাদের বাগান ও বাড়ীর নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হবে। ওর পানি কখনো দুর্গন্ধময় হবে না। ওর পানি হবে মুক্তার মত স্বচ্ছ। তথায় একটি দুধের নহর হবে, যার স্বাদ কখনো পরিবর্তন হবে না, যে দুধ কোন জন্তুর স্তন হতে বের হয়নি। একটি হবে সুরার নহর, যা হবে অত্যন্ত সুস্বাদু এবং যা কোন মানুষের হাতের তৈরী নয়। একটি খাঁটি মধুর নহর হবে যা মৌমাছির পেট হতে বহির্গত মধু নয়। এর চতুর্দিকে বিভিন্ন প্রকারের ফলে পরিপূর্ণ বৃক্ষরাজি থাকবে যেগুলোর ফল জান্নাতীদের দিকে ঝুঁকে পড়বে। তারা দাড়িয়ে দাড়িয়ে ফল নেয়ার ইচ্ছা করলে নিতে পারবে। যদি তারা বসে বসে ফল ভাঙ্গার ইচ্ছা করে তবে গাছের শাখা এমনভাবে ঝুঁকে পড়বে যে, তারা বসে বসেই ফল ভাঙ্গতে পারবে। শুয়ে শুয়ে ফল পাড়ার ইচ্ছা করলে শাখা ঐ পরিমাণই ঝুঁকে পড়বে।” অতঃপর তিনি নিম্নের আয়াত পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সন্নিহিত বৃক্ষছায়া তাদের উপর থাকবে এবং ওর ফলমূল সম্পূর্ণরূপে তাদের আয়ত্তাধীন করা হবে।” (৭৬:১৪) তারা যখন খাদ্য খাওয়ার ইচ্ছা করবে তখন সাদা বা সবুজ রঙ এর পাখী তাদের কাছে এসে স্বীয় পালক উঁচু করে দিবে। তারা ওর পার্শ্বদেশের যে প্রকারের গোশত খাওয়ার ইচ্ছা করবে খেয়ে নিবে। অতঃপর পাখীটি পূর্ববৎ জীবিত হয়ে উড়ে যাবে। ফেরেশতারা ঐ জান্নাতীদের কাছে আসবেন এবং সালাম করে বলবেনঃ “এগুলো হচ্ছে জান্নাত যেগুলোর ওয়ারিস তোমাদের আমলের কারণে তোমাদেরকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে।”যদি কোন হুরের একটি চুল যমীনে এসে পড়ে তবে ওটা স্বীয় ঔজ্জ্বল্য ও কৃষ্ণতার দ্বারা সূর্যের কিরণকে আরো উজ্জ্বল করে দিবে এবং ওর কৃষ্ণতা প্রতীয়মান থাকবে। (এটা গারীব হাদীস, এটা যেন মুরসাল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
আয-যুমার 39:75
আল্লাহ তা'আলা যখন জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীদের ফায়সালা শুনিয়ে দেয়া এবং তাদেরকে তাদের আবাসস্থলে পৌঁছিয়ে দেয়ার অবস্থা বর্ণনা করা হতে ফারেগ হলেন এবং তাতে নিজের আদল ও ইনসাফ প্রমাণ করলেন, তখন এই আয়াতে তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে সংবাদ দিলেন যে, হে নবী (সঃ)! কিয়ামতের দিন তুমি ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাবে যে, তারা আরশের চতুষ্পর্শ্বে ঘিরে তাদের প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছে। আর সমস্ত মাখলুকের মধ্যে ন্যায়ের সাথে বিচার করা হবে। এই সরাসরি ন্যায় ও করুণাপূর্ণ ফায়সালায় খুশী হয়ে সারা বিশ্বজগত আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করতে শুরু করবে এবং প্রাণী ও নির্জীব বস্তু হতে শব্দ উঠবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সমুদয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর প্রাপ্য।” যেহেতু ঐ সময় প্রত্যেক শুষ্ক ও সিক্ত জিনিস আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করবে সেই হেতু এখানে (আরবী) বা কর্মবাচ্যের রূপ আনয়ন করে কর্তাকে (আরবী) বা সাধারণ করা হয়েছে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, মাখলুককে সৃষ্টি করার সূচনাও হয়েছে আল্লাহর প্রশংসা দ্বারা। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।” (৬:১) আর মাখলুকের পরিসমাপ্তিও হয়েছে প্রশংসা দ্বারা। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের মধ্যে বিচার করা হবে ন্যায়ের সাথে; বলা হবে- প্রশংসা জাতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই প্রাপ্য।”
গাফির 40:1
পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, যেসব সূরা (আরবী) দ্বারা শুরু করা হয়েছে ওগুলোকে (আরবী) বলা মাকরূহ্, ওগুলোকে (আরবী) বলা উচিত। হযরত মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ)-ও এ কথাই বলেন। হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) হলো কুরআন কারীমের মুখবন্ধ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জিনিসেরই দরযা রয়েছে, আর (আরবী) অথবা (বলেছেনঃ) (আরবী) হলো কুরআন কারীমের দর। মাসআ’র ইবনে কুদাম (রঃ) বলেন যে, এই সূরাগুলোকে (আরবী) বলা হতো। (আরবী) কলা হয় নব বধূকে। হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ) বলেন যে, কুরআন কারীমের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মত যে তার পরিবারবর্গের জন্যে কোন একটি ভাল মঞ্জিলের অনুসন্ধানে বের হলো। সে এমন এক জায়গায় পৌছলো যেখানে সবেমাত্র যেন বৃষ্টিপাত হয়েছে। সে আরো একটু অগ্রসর হলো। দেখে যে, সবুজ-শ্যামল কয়েকটি বাগান রয়েছে। সে প্রথমে সিক্ত ভূমি দেখেই তো মুগ্ধ হয়েছিল, এখন সে আরো বেশী মুগ্ধ হলো। তখন তাকে বলা হলোঃ প্রথমটির দৃষ্টান্ত তো হলো কুরআন কারীমের শ্রেষ্ঠত্বের দৃষ্টান্ত এবং ঐ বাগানগুলোর দৃষ্টান্ত হলো এমনই যেমন কুরআন কারীমে (আরবী) যুক্ত সূরাগুলো রয়েছে। (ইমাম বাগাভী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জিনিসেরই দরযা থাকে, কুরআন কারীমের দরযা হলো (আরবী) যুক্ত সূরাগুলো।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “যখন আমি কুরআন কারীম পাঠ করতে করতে যুক্ত সূরাগুলোর উপর পৌছি তখন আমার মনে হয় যে, আমি যেন সবুজ-শ্যামল ফুলে-ফলে ভর্তি বাগানসমূহে ভ্রমণ করছি।” একটি লোক হযরত আবু দারদা (রাঃ)-কে মসজিদ নির্মাণ করতে দেখে জিজ্ঞেস করেঃ “এটা কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমি এটা (আরবী) দ্বারা শুরুকৃত সূরাগুলোর জন্যে নির্মাণ করছি।” এটা হলো ঐ মসজিদ যা দামেশকের দূর্গের মধ্যে রয়েছে এবং তাঁরই নামে সম্পর্কিত আছে। এও হতে পারে যে, ওর হিফাযত হযরত আবু দারদা (রাঃ)-এর নেক নিয়তের কারণে হয়েছিল এবং যে উদ্দেশ্যে এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল তারই বরকতের কারণে হয়েছিল। এই কথায় শক্রদের উপর জয় লাভ করার দলীলও রয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কোন এক জিহাদে তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেনঃ “রাত্রে তোমরা অকস্মাৎ আক্রমণ করলে (আরবী) বল।” আর একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) বল।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আয়াতুল কুরসী এবং হা-মীম-আল মুমিনের প্রথম অংশ পাঠ করে নেয়, সে ঐ দিনের সর্বপ্রকারের অনিষ্ট হতে রক্ষা পায়।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বার (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর বর্ণনাকারীর স্মরণশক্তির ব্যাপারে কিছু সমালোচনা রয়েছে) ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর: সূরাসমূহের শুরুতে যে হুরূফে মুকাত্তাআ'ত বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলো এসে থাকে সেগুলোর পূর্ণ আলোচনা সূরায়ে বাকারার তাফসীরের শুরুতে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। কারো কারো উক্তি আছে যে, আল্লাহ তা'আলার একটি নাম এবং এর দলীল হিসেবে তাঁরা নিম্নের কবিতাংশটুকু পেশ করে থাকেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে আমাকে (আরবী)-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এবং বর্শা নিক্ষিপ্ত হয়েছে, সুতরাং কেন সে এর পূর্বেই (আরবী) পাঠ করেনি?”হযরত মিহলাব ইবনে আবু সার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যদি তোমরা রাত্রে আকস্মিকভাবে আক্রান্ত হয়ে পড় তবে তোমরা (আরবী) বল।” হযরত আবু উবায়েদ (রাঃ) বলেন যে, তার নিকট পছন্দনীয় হলো হাদীসটিকে এভাবে রিওয়াইয়াত করা যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা বলঃ (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) ছাড়াই। তাহলে তার নিকট যেন (আরবী)-এর (আরবী) হলো (আরবী) ক্রিয়াটি। অর্থাৎ “তোমরা যদি এটা বল তবে তোমরা পরাজিত হবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ এই কিতাব অর্থাৎ কুরআন মাজীদ আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত যিনি পরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ। যিনি পবিত্র মর্যাদার অধিকারী, যার কাছে অণু পরিমাণ জিনিসও গোপন নেই যদিও তা বহু পর্দার মধ্যে লুক্কায়িত থাকে। তিনি পাপ ক্ষমাকারী। যে তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে তিনিও তার দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। পক্ষান্তরে, যে তার থেকে বেপরোয়া হয় তাঁর সামনে অহংকার ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে, দুনিয়াকে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয় এবং আল্লাহর হুকুম অমান্য করে তাকে তিনি কঠোর শাস্তি প্রদান করেন। যেমন মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! আমার বান্দাদেরকে তুমি (আমার সম্পর্কে) খবর দাও যে, আমি হলাম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু, আবার আমার শাস্তিও অত্যন্ত বেদনাদায়ক। (১৫:৪৯-৫০) কুরআন কারীমের মধ্যে এই ধরনের বহু আয়াত। রয়েছে, যেগুলোতে রহম ও করমের সাথে সাথে আযাব ও শাস্তির কথাও রয়েছে, যাতে বান্দা ভয় ও আশা এই উভয় অবস্থার মধ্যে থাকে। তিনি অভাবমুক্ত ও প্রশংসাৰ্হ। তিনি বড় মর্যাদাবান, অত্যন্ত অনুগ্রহশীল, সীমাহীন নিয়ামত ও করুণার আধার। বান্দাদের উপর তার ইনআ'ম ও ইহসান এতো বেশী রয়েছে। যে, কেউ ওগুলো গণনা করতে পারে না। মানুষ আল্লাহ্ তা'আলার একটি নিয়ামতেরও শুকরিয়া আদায় করতে সক্ষম নয়। তাঁর মত কেউই নেই। তাঁর একটি গুণও কারো মধ্যে নেই। তিনি ছাড়া কেউই ইবাদতের যোগ্য নয়। তিনি ছাড়া কেউ কারো পালনকর্তা হতে পারে না। সবারই প্রত্যাবর্তন তাঁরই নিকট। ঐ সময় তিনি প্রত্যেককে তার আমল অনুযায়ী পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান করবেন। তিনি তাড়াতাড়ি হিসাব গ্রহণকারী।একটি লোক হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আমি একজনকে হত্যা করে ফেলেছি, এমতাবস্থায় আমার তাওবা কবুল হবে কি?” তিনি তখন (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত তাকে পাঠ করে শুনান এবং বলেনঃ “তুমি কাজ করে যাও এবং নিরাশ হয়ো না।" (এটা ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সিরিয়ার একজন প্রভাবশালী লোক মাঝে মাঝে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট আসতো। একবার দীর্ঘদিন পর্যন্ত সে তাঁর নিকট আগমন করেনি। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) জনগণকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা উত্তর দেয় যে, সে এখন খুব বেশী মদ্য পান করতে শুরু করে দিয়েছে। হযরত উমার (রাঃ) তখন তাঁর লেখককে ডেকে নিয়ে বলেনঃ “লিখো, এই পত্রটি হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর পক্ষ হতে অমুকের পুত্র অমুকের নিকট। সালামের পর আমি তোমার সামনে ঐ আল্লাহর প্রশংসা করছি। যিনি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, যিনি পাপ ক্ষমা করেন, তওবা কবুল করেন, যিনি শাস্তি দানে কঠোর, শক্তিশালী। তিনি ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। প্রত্যাবর্তন তারই নিকট।” ঐ লোকটির নিকট পত্রটি পাঠিয়ে দিয়ে হযরত উমার (রাঃ) স্বীয় সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমরা তোমাদের এই (মুসলমান) ভাইটির জন্যে প্রার্থনা কর যে, আল্লাহ্ তা'আলা যেন তার অন্তর তার দিকে ফিরিয়ে দেন এবং তার তাওবা কবূল করেন।” লোকটির নিকট পত্রটি পৌছলে সে বারবার তা পড়তে থাকে এবং বলতে শুরু করেঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে তার শাস্তির ভয়ও দেখিয়েছেন এবং এর সাথে আমাকে তাঁর রহমতের আশা দিয়ে আমার পাপ ক্ষমা করে দেয়ার ওয়াদাও দিয়েছেন। কয়েকবার ওটা পাঠ করে সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে এবং খাটি অন্তরে তাওবা করে, যখন হযরত উমার (রাঃ) এ খবর জানতে পারেন তখন তিনি অত্যন্ত খুশী হন এবং স্বীয় সাথীদেরকে বলেনঃ “দেখো, তোমরা তোমাদের কোন মুসলমান ভাই-এর পদস্খলন ঘটতে দেখলে তাকে সোজা করে দিবে ও সুদৃঢ় করবে এবং তার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবে। তোমরা শয়তানের সাহায্যকারী হবে না।" (এ ঘটনাটিও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাবিত বানাঈ (রঃ) বলেনঃ “আমি হযরত মুসআব ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-এর সাথে কূফার আশেপাশে ছিলাম। একদা আমি একটি বাগানে গিয়ে দুই রাকআত নামায শুরু করি এবং এই সূরায়ে মুমিন তিলাওয়াত করতে থাকি। আমি যেই মাত্র (আরবী) পর্যন্ত পৌছেছি এমতাবস্থায় একটি লোক, যিনি আমার পিছনে সাদা খচ্চরের উপর সওয়ার ছিলেন এবং যার গায়ে ইয়ামনী চাদর ছিল, আমাকে বললেনঃ “যখন (আরবী) পড়বে তখন (আরবী) বলো, যখন (আরবী) পড়বে তখন (আরবী) বলো এবং যখন (আরবী) পড়বে তখন (আরবী) বলো।” আমি চোখ ফিরিয়ে দেখলাম, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। নামায শেষ করে দরযার উপর পৌছলে দেখি যে, সেখানে কতকগুলো লোক বসে রয়েছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলামঃ ইয়ামনী চাদর পরিহিত একটি লোককে তোমাদের এখান দিয়ে যেতে দেখেছো কি? তারা উত্তরে বললোঃ “না তো, এখান দিয়ে কোন লোককে তো যেতে আসতে দেখিনি।” তখন লোকেরা এ ধারণ করলো যে, তিনি হযরত ইলিয়াস (আঃ) ছিলেন। (এ ঘটনাটিও ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ রিওয়াইয়াতটি অন্য সনদেও বর্ণিত আছে। কিন্তু তাতে হযরত ইলিয়াস (আঃ)-এর উল্লেখ নেই। মহান আল্লাহই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন)
গাফির 40:2
পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, যেসব সূরা (আরবী) দ্বারা শুরু করা হয়েছে ওগুলোকে (আরবী) বলা মাকরূহ্, ওগুলোকে (আরবী) বলা উচিত। হযরত মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ)-ও এ কথাই বলেন। হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) হলো কুরআন কারীমের মুখবন্ধ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জিনিসেরই দরযা রয়েছে, আর (আরবী) অথবা (বলেছেনঃ) (আরবী) হলো কুরআন কারীমের দর। মাসআ’র ইবনে কুদাম (রঃ) বলেন যে, এই সূরাগুলোকে (আরবী) বলা হতো। (আরবী) কলা হয় নব বধূকে। হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ) বলেন যে, কুরআন কারীমের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মত যে তার পরিবারবর্গের জন্যে কোন একটি ভাল মঞ্জিলের অনুসন্ধানে বের হলো। সে এমন এক জায়গায় পৌছলো যেখানে সবেমাত্র যেন বৃষ্টিপাত হয়েছে। সে আরো একটু অগ্রসর হলো। দেখে যে, সবুজ-শ্যামল কয়েকটি বাগান রয়েছে। সে প্রথমে সিক্ত ভূমি দেখেই তো মুগ্ধ হয়েছিল, এখন সে আরো বেশী মুগ্ধ হলো। তখন তাকে বলা হলোঃ প্রথমটির দৃষ্টান্ত তো হলো কুরআন কারীমের শ্রেষ্ঠত্বের দৃষ্টান্ত এবং ঐ বাগানগুলোর দৃষ্টান্ত হলো এমনই যেমন কুরআন কারীমে (আরবী) যুক্ত সূরাগুলো রয়েছে। (ইমাম বাগাভী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জিনিসেরই দরযা থাকে, কুরআন কারীমের দরযা হলো (আরবী) যুক্ত সূরাগুলো।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “যখন আমি কুরআন কারীম পাঠ করতে করতে যুক্ত সূরাগুলোর উপর পৌছি তখন আমার মনে হয় যে, আমি যেন সবুজ-শ্যামল ফুলে-ফলে ভর্তি বাগানসমূহে ভ্রমণ করছি।” একটি লোক হযরত আবু দারদা (রাঃ)-কে মসজিদ নির্মাণ করতে দেখে জিজ্ঞেস করেঃ “এটা কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমি এটা (আরবী) দ্বারা শুরুকৃত সূরাগুলোর জন্যে নির্মাণ করছি।” এটা হলো ঐ মসজিদ যা দামেশকের দূর্গের মধ্যে রয়েছে এবং তাঁরই নামে সম্পর্কিত আছে। এও হতে পারে যে, ওর হিফাযত হযরত আবু দারদা (রাঃ)-এর নেক নিয়তের কারণে হয়েছিল এবং যে উদ্দেশ্যে এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল তারই বরকতের কারণে হয়েছিল। এই কথায় শক্রদের উপর জয় লাভ করার দলীলও রয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কোন এক জিহাদে তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেনঃ “রাত্রে তোমরা অকস্মাৎ আক্রমণ করলে (আরবী) বল।” আর একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) বল।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আয়াতুল কুরসী এবং হা-মীম-আল মুমিনের প্রথম অংশ পাঠ করে নেয়, সে ঐ দিনের সর্বপ্রকারের অনিষ্ট হতে রক্ষা পায়।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বার (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর বর্ণনাকারীর স্মরণশক্তির ব্যাপারে কিছু সমালোচনা রয়েছে) ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর: সূরাসমূহের শুরুতে যে হুরূফে মুকাত্তাআ'ত বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলো এসে থাকে সেগুলোর পূর্ণ আলোচনা সূরায়ে বাকারার তাফসীরের শুরুতে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। কারো কারো উক্তি আছে যে, আল্লাহ তা'আলার একটি নাম এবং এর দলীল হিসেবে তাঁরা নিম্নের কবিতাংশটুকু পেশ করে থাকেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে আমাকে (আরবী)-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এবং বর্শা নিক্ষিপ্ত হয়েছে, সুতরাং কেন সে এর পূর্বেই (আরবী) পাঠ করেনি?”হযরত মিহলাব ইবনে আবু সার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যদি তোমরা রাত্রে আকস্মিকভাবে আক্রান্ত হয়ে পড় তবে তোমরা (আরবী) বল।” হযরত আবু উবায়েদ (রাঃ) বলেন যে, তার নিকট পছন্দনীয় হলো হাদীসটিকে এভাবে রিওয়াইয়াত করা যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা বলঃ (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) ছাড়াই। তাহলে তার নিকট যেন (আরবী)-এর (আরবী) হলো (আরবী) ক্রিয়াটি। অর্থাৎ “তোমরা যদি এটা বল তবে তোমরা পরাজিত হবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ এই কিতাব অর্থাৎ কুরআন মাজীদ আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত যিনি পরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ। যিনি পবিত্র মর্যাদার অধিকারী, যার কাছে অণু পরিমাণ জিনিসও গোপন নেই যদিও তা বহু পর্দার মধ্যে লুক্কায়িত থাকে। তিনি পাপ ক্ষমাকারী। যে তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে তিনিও তার দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। পক্ষান্তরে, যে তার থেকে বেপরোয়া হয় তাঁর সামনে অহংকার ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে, দুনিয়াকে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয় এবং আল্লাহর হুকুম অমান্য করে তাকে তিনি কঠোর শাস্তি প্রদান করেন। যেমন মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! আমার বান্দাদেরকে তুমি (আমার সম্পর্কে) খবর দাও যে, আমি হলাম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু, আবার আমার শাস্তিও অত্যন্ত বেদনাদায়ক। (১৫:৪৯-৫০) কুরআন কারীমের মধ্যে এই ধরনের বহু আয়াত। রয়েছে, যেগুলোতে রহম ও করমের সাথে সাথে আযাব ও শাস্তির কথাও রয়েছে, যাতে বান্দা ভয় ও আশা এই উভয় অবস্থার মধ্যে থাকে। তিনি অভাবমুক্ত ও প্রশংসাৰ্হ। তিনি বড় মর্যাদাবান, অত্যন্ত অনুগ্রহশীল, সীমাহীন নিয়ামত ও করুণার আধার। বান্দাদের উপর তার ইনআ'ম ও ইহসান এতো বেশী রয়েছে। যে, কেউ ওগুলো গণনা করতে পারে না। মানুষ আল্লাহ্ তা'আলার একটি নিয়ামতেরও শুকরিয়া আদায় করতে সক্ষম নয়। তাঁর মত কেউই নেই। তাঁর একটি গুণও কারো মধ্যে নেই। তিনি ছাড়া কেউই ইবাদতের যোগ্য নয়। তিনি ছাড়া কেউ কারো পালনকর্তা হতে পারে না। সবারই প্রত্যাবর্তন তাঁরই নিকট। ঐ সময় তিনি প্রত্যেককে তার আমল অনুযায়ী পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান করবেন। তিনি তাড়াতাড়ি হিসাব গ্রহণকারী।একটি লোক হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আমি একজনকে হত্যা করে ফেলেছি, এমতাবস্থায় আমার তাওবা কবুল হবে কি?” তিনি তখন (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত তাকে পাঠ করে শুনান এবং বলেনঃ “তুমি কাজ করে যাও এবং নিরাশ হয়ো না।" (এটা ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সিরিয়ার একজন প্রভাবশালী লোক মাঝে মাঝে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট আসতো। একবার দীর্ঘদিন পর্যন্ত সে তাঁর নিকট আগমন করেনি। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) জনগণকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা উত্তর দেয় যে, সে এখন খুব বেশী মদ্য পান করতে শুরু করে দিয়েছে। হযরত উমার (রাঃ) তখন তাঁর লেখককে ডেকে নিয়ে বলেনঃ “লিখো, এই পত্রটি হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর পক্ষ হতে অমুকের পুত্র অমুকের নিকট। সালামের পর আমি তোমার সামনে ঐ আল্লাহর প্রশংসা করছি। যিনি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, যিনি পাপ ক্ষমা করেন, তওবা কবুল করেন, যিনি শাস্তি দানে কঠোর, শক্তিশালী। তিনি ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। প্রত্যাবর্তন তারই নিকট।” ঐ লোকটির নিকট পত্রটি পাঠিয়ে দিয়ে হযরত উমার (রাঃ) স্বীয় সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমরা তোমাদের এই (মুসলমান) ভাইটির জন্যে প্রার্থনা কর যে, আল্লাহ্ তা'আলা যেন তার অন্তর তার দিকে ফিরিয়ে দেন এবং তার তাওবা কবূল করেন।” লোকটির নিকট পত্রটি পৌছলে সে বারবার তা পড়তে থাকে এবং বলতে শুরু করেঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে তার শাস্তির ভয়ও দেখিয়েছেন এবং এর সাথে আমাকে তাঁর রহমতের আশা দিয়ে আমার পাপ ক্ষমা করে দেয়ার ওয়াদাও দিয়েছেন। কয়েকবার ওটা পাঠ করে সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে এবং খাটি অন্তরে তাওবা করে, যখন হযরত উমার (রাঃ) এ খবর জানতে পারেন তখন তিনি অত্যন্ত খুশী হন এবং স্বীয় সাথীদেরকে বলেনঃ “দেখো, তোমরা তোমাদের কোন মুসলমান ভাই-এর পদস্খলন ঘটতে দেখলে তাকে সোজা করে দিবে ও সুদৃঢ় করবে এবং তার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবে। তোমরা শয়তানের সাহায্যকারী হবে না।" (এ ঘটনাটিও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাবিত বানাঈ (রঃ) বলেনঃ “আমি হযরত মুসআব ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-এর সাথে কূফার আশেপাশে ছিলাম। একদা আমি একটি বাগানে গিয়ে দুই রাকআত নামায শুরু করি এবং এই সূরায়ে মুমিন তিলাওয়াত করতে থাকি। আমি যেই মাত্র (আরবী) পর্যন্ত পৌছেছি এমতাবস্থায় একটি লোক, যিনি আমার পিছনে সাদা খচ্চরের উপর সওয়ার ছিলেন এবং যার গায়ে ইয়ামনী চাদর ছিল, আমাকে বললেনঃ “যখন (আরবী) পড়বে তখন (আরবী) বলো, যখন (আরবী) পড়বে তখন (আরবী) বলো এবং যখন (আরবী) পড়বে তখন (আরবী) বলো।” আমি চোখ ফিরিয়ে দেখলাম, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। নামায শেষ করে দরযার উপর পৌছলে দেখি যে, সেখানে কতকগুলো লোক বসে রয়েছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলামঃ ইয়ামনী চাদর পরিহিত একটি লোককে তোমাদের এখান দিয়ে যেতে দেখেছো কি? তারা উত্তরে বললোঃ “না তো, এখান দিয়ে কোন লোককে তো যেতে আসতে দেখিনি।” তখন লোকেরা এ ধারণ করলো যে, তিনি হযরত ইলিয়াস (আঃ) ছিলেন। (এ ঘটনাটিও ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ রিওয়াইয়াতটি অন্য সনদেও বর্ণিত আছে। কিন্তু তাতে হযরত ইলিয়াস (আঃ)-এর উল্লেখ নেই। মহান আল্লাহই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন)
গাফির 40:3
পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, যেসব সূরা (আরবী) দ্বারা শুরু করা হয়েছে ওগুলোকে (আরবী) বলা মাকরূহ্, ওগুলোকে (আরবী) বলা উচিত। হযরত মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ)-ও এ কথাই বলেন। হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) হলো কুরআন কারীমের মুখবন্ধ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জিনিসেরই দরযা রয়েছে, আর (আরবী) অথবা (বলেছেনঃ) (আরবী) হলো কুরআন কারীমের দর। মাসআ’র ইবনে কুদাম (রঃ) বলেন যে, এই সূরাগুলোকে (আরবী) বলা হতো। (আরবী) কলা হয় নব বধূকে। হযরত আব্দুল্লাহ্ (রাঃ) বলেন যে, কুরআন কারীমের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মত যে তার পরিবারবর্গের জন্যে কোন একটি ভাল মঞ্জিলের অনুসন্ধানে বের হলো। সে এমন এক জায়গায় পৌছলো যেখানে সবেমাত্র যেন বৃষ্টিপাত হয়েছে। সে আরো একটু অগ্রসর হলো। দেখে যে, সবুজ-শ্যামল কয়েকটি বাগান রয়েছে। সে প্রথমে সিক্ত ভূমি দেখেই তো মুগ্ধ হয়েছিল, এখন সে আরো বেশী মুগ্ধ হলো। তখন তাকে বলা হলোঃ প্রথমটির দৃষ্টান্ত তো হলো কুরআন কারীমের শ্রেষ্ঠত্বের দৃষ্টান্ত এবং ঐ বাগানগুলোর দৃষ্টান্ত হলো এমনই যেমন কুরআন কারীমে (আরবী) যুক্ত সূরাগুলো রয়েছে। (ইমাম বাগাভী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক জিনিসেরই দরযা থাকে, কুরআন কারীমের দরযা হলো (আরবী) যুক্ত সূরাগুলো।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “যখন আমি কুরআন কারীম পাঠ করতে করতে যুক্ত সূরাগুলোর উপর পৌছি তখন আমার মনে হয় যে, আমি যেন সবুজ-শ্যামল ফুলে-ফলে ভর্তি বাগানসমূহে ভ্রমণ করছি।” একটি লোক হযরত আবু দারদা (রাঃ)-কে মসজিদ নির্মাণ করতে দেখে জিজ্ঞেস করেঃ “এটা কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমি এটা (আরবী) দ্বারা শুরুকৃত সূরাগুলোর জন্যে নির্মাণ করছি।” এটা হলো ঐ মসজিদ যা দামেশকের দূর্গের মধ্যে রয়েছে এবং তাঁরই নামে সম্পর্কিত আছে। এও হতে পারে যে, ওর হিফাযত হযরত আবু দারদা (রাঃ)-এর নেক নিয়তের কারণে হয়েছিল এবং যে উদ্দেশ্যে এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল তারই বরকতের কারণে হয়েছিল। এই কথায় শক্রদের উপর জয় লাভ করার দলীলও রয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কোন এক জিহাদে তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেনঃ “রাত্রে তোমরা অকস্মাৎ আক্রমণ করলে (আরবী) বল।” আর একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) বল।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আয়াতুল কুরসী এবং হা-মীম-আল মুমিনের প্রথম অংশ পাঠ করে নেয়, সে ঐ দিনের সর্বপ্রকারের অনিষ্ট হতে রক্ষা পায়।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বার (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর বর্ণনাকারীর স্মরণশক্তির ব্যাপারে কিছু সমালোচনা রয়েছে) ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর: সূরাসমূহের শুরুতে যে হুরূফে মুকাত্তাআ'ত বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলো এসে থাকে সেগুলোর পূর্ণ আলোচনা সূরায়ে বাকারার তাফসীরের শুরুতে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। কারো কারো উক্তি আছে যে, আল্লাহ তা'আলার একটি নাম এবং এর দলীল হিসেবে তাঁরা নিম্নের কবিতাংশটুকু পেশ করে থাকেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে আমাকে (আরবী)-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এবং বর্শা নিক্ষিপ্ত হয়েছে, সুতরাং কেন সে এর পূর্বেই (আরবী) পাঠ করেনি?”হযরত মিহলাব ইবনে আবু সার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যদি তোমরা রাত্রে আকস্মিকভাবে আক্রান্ত হয়ে পড় তবে তোমরা (আরবী) বল।” হযরত আবু উবায়েদ (রাঃ) বলেন যে, তার নিকট পছন্দনীয় হলো হাদীসটিকে এভাবে রিওয়াইয়াত করা যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা বলঃ (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) ছাড়াই। তাহলে তার নিকট যেন (আরবী)-এর (আরবী) হলো (আরবী) ক্রিয়াটি। অর্থাৎ “তোমরা যদি এটা বল তবে তোমরা পরাজিত হবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ এই কিতাব অর্থাৎ কুরআন মাজীদ আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত যিনি পরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ। যিনি পবিত্র মর্যাদার অধিকারী, যার কাছে অণু পরিমাণ জিনিসও গোপন নেই যদিও তা বহু পর্দার মধ্যে লুক্কায়িত থাকে। তিনি পাপ ক্ষমাকারী। যে তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে তিনিও তার দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। পক্ষান্তরে, যে তার থেকে বেপরোয়া হয় তাঁর সামনে অহংকার ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে, দুনিয়াকে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয় এবং আল্লাহর হুকুম অমান্য করে তাকে তিনি কঠোর শাস্তি প্রদান করেন। যেমন মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! আমার বান্দাদেরকে তুমি (আমার সম্পর্কে) খবর দাও যে, আমি হলাম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু, আবার আমার শাস্তিও অত্যন্ত বেদনাদায়ক। (১৫:৪৯-৫০) কুরআন কারীমের মধ্যে এই ধরনের বহু আয়াত। রয়েছে, যেগুলোতে রহম ও করমের সাথে সাথে আযাব ও শাস্তির কথাও রয়েছে, যাতে বান্দা ভয় ও আশা এই উভয় অবস্থার মধ্যে থাকে। তিনি অভাবমুক্ত ও প্রশংসাৰ্হ। তিনি বড় মর্যাদাবান, অত্যন্ত অনুগ্রহশীল, সীমাহীন নিয়ামত ও করুণার আধার। বান্দাদের উপর তার ইনআ'ম ও ইহসান এতো বেশী রয়েছে। যে, কেউ ওগুলো গণনা করতে পারে না। মানুষ আল্লাহ্ তা'আলার একটি নিয়ামতেরও শুকরিয়া আদায় করতে সক্ষম নয়। তাঁর মত কেউই নেই। তাঁর একটি গুণও কারো মধ্যে নেই। তিনি ছাড়া কেউই ইবাদতের যোগ্য নয়। তিনি ছাড়া কেউ কারো পালনকর্তা হতে পারে না। সবারই প্রত্যাবর্তন তাঁরই নিকট। ঐ সময় তিনি প্রত্যেককে তার আমল অনুযায়ী পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান করবেন। তিনি তাড়াতাড়ি হিসাব গ্রহণকারী।একটি লোক হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আমি একজনকে হত্যা করে ফেলেছি, এমতাবস্থায় আমার তাওবা কবুল হবে কি?” তিনি তখন (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত তাকে পাঠ করে শুনান এবং বলেনঃ “তুমি কাজ করে যাও এবং নিরাশ হয়ো না।" (এটা ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সিরিয়ার একজন প্রভাবশালী লোক মাঝে মাঝে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট আসতো। একবার দীর্ঘদিন পর্যন্ত সে তাঁর নিকট আগমন করেনি। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) জনগণকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা উত্তর দেয় যে, সে এখন খুব বেশী মদ্য পান করতে শুরু করে দিয়েছে। হযরত উমার (রাঃ) তখন তাঁর লেখককে ডেকে নিয়ে বলেনঃ “লিখো, এই পত্রটি হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর পক্ষ হতে অমুকের পুত্র অমুকের নিকট। সালামের পর আমি তোমার সামনে ঐ আল্লাহর প্রশংসা করছি। যিনি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, যিনি পাপ ক্ষমা করেন, তওবা কবুল করেন, যিনি শাস্তি দানে কঠোর, শক্তিশালী। তিনি ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। প্রত্যাবর্তন তারই নিকট।” ঐ লোকটির নিকট পত্রটি পাঠিয়ে দিয়ে হযরত উমার (রাঃ) স্বীয় সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমরা তোমাদের এই (মুসলমান) ভাইটির জন্যে প্রার্থনা কর যে, আল্লাহ্ তা'আলা যেন তার অন্তর তার দিকে ফিরিয়ে দেন এবং তার তাওবা কবূল করেন।” লোকটির নিকট পত্রটি পৌছলে সে বারবার তা পড়তে থাকে এবং বলতে শুরু করেঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে তার শাস্তির ভয়ও দেখিয়েছেন এবং এর সাথে আমাকে তাঁর রহমতের আশা দিয়ে আমার পাপ ক্ষমা করে দেয়ার ওয়াদাও দিয়েছেন। কয়েকবার ওটা পাঠ করে সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে এবং খাটি অন্তরে তাওবা করে, যখন হযরত উমার (রাঃ) এ খবর জানতে পারেন তখন তিনি অত্যন্ত খুশী হন এবং স্বীয় সাথীদেরকে বলেনঃ “দেখো, তোমরা তোমাদের কোন মুসলমান ভাই-এর পদস্খলন ঘটতে দেখলে তাকে সোজা করে দিবে ও সুদৃঢ় করবে এবং তার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবে। তোমরা শয়তানের সাহায্যকারী হবে না।" (এ ঘটনাটিও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাবিত বানাঈ (রঃ) বলেনঃ “আমি হযরত মুসআব ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-এর সাথে কূফার আশেপাশে ছিলাম। একদা আমি একটি বাগানে গিয়ে দুই রাকআত নামায শুরু করি এবং এই সূরায়ে মুমিন তিলাওয়াত করতে থাকি। আমি যেই মাত্র (আরবী) পর্যন্ত পৌছেছি এমতাবস্থায় একটি লোক, যিনি আমার পিছনে সাদা খচ্চরের উপর সওয়ার ছিলেন এবং যার গায়ে ইয়ামনী চাদর ছিল, আমাকে বললেনঃ “যখন (আরবী) পড়বে তখন (আরবী) বলো, যখন (আরবী) পড়বে তখন (আরবী) বলো এবং যখন (আরবী) পড়বে তখন (আরবী) বলো।” আমি চোখ ফিরিয়ে দেখলাম, কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। নামায শেষ করে দরযার উপর পৌছলে দেখি যে, সেখানে কতকগুলো লোক বসে রয়েছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলামঃ ইয়ামনী চাদর পরিহিত একটি লোককে তোমাদের এখান দিয়ে যেতে দেখেছো কি? তারা উত্তরে বললোঃ “না তো, এখান দিয়ে কোন লোককে তো যেতে আসতে দেখিনি।” তখন লোকেরা এ ধারণ করলো যে, তিনি হযরত ইলিয়াস (আঃ) ছিলেন। (এ ঘটনাটিও ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ রিওয়াইয়াতটি অন্য সনদেও বর্ণিত আছে। কিন্তু তাতে হযরত ইলিয়াস (আঃ)-এর উল্লেখ নেই। মহান আল্লাহই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন)
গাফির 40:4
৪-৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সত্য প্রকাশিত হয়ে যাবার পর ওকে না মানা এবং তাতে ক্ষতি সৃষ্টি করা কাফিরদেরই কাজ। হে নবী (সঃ)! এ লোকগুলো যদি ধন-মাল ও মান-মর্যাদার অধিকারী হয়ে যায় তবে তুমি যেন প্রতারিত না হও যে, এরা যদি আল্লাহর নিকট ভাল না হতো তবে তিনি তাদেরকে এই নিয়ামতগুলো কেন দিয়ে রেখেছেন? যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা কুফরী করেছে, দেশে দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন কিছুতেই তোমাকে বিভ্রান্ত না করে। এটা সামান্য ভোগ মাত্র; অতঃপর জাহান্নাম তাদের আবাস, আর ওটা কত নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল!” (৩:১৯৬-১৯৭) অন্য এক আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সামান্য দিন তাদেরকে আমি সুখ ভোগ করতে দিবো, অতঃপর তাদেরকে কঠিন শাস্তির দিকে আসতে বাধ্য করবো।”(৩১-২৪)এরপর আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)! লোকেরা যে তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে এ কারণে তুমি দুঃখিত ও চিন্তিত হয়ো না। তোমার পূর্ববর্তী নবীদের (আঃ) অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর যে, তাদেরকেও তাদের কওম অবিশ্বাস করেছিল এবং তাদের প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। হযরত নূহ, যিনি বানী আদমের মধ্যে সর্বপ্রথম রাসল হয়ে এসেছিলেন, জনগণের মধ্যে যখন প্রথম প্রথম প্রতিমা-পূজা শুরু হয় তখন ঐ লোকগুলো তাঁকেও অবিশ্বাস করে এবং তার পরেও যতজন নবী এসেছিলেন তাদেরকেও তাদের উম্মতরা অবিশ্বাস করতে থাকে। এমনকি সবাই নিজ নিজ যামানার নবীকে বন্দী করা ও হত্যা করার ইচ্ছা করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাতে সফলকামও হয় এবং নিজেদের সন্দেহ ও মিথ্যা দ্বারা সত্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে চায় এবং সত্যকে ব্যর্থ করে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যকে দুর্বল করে দেয়ার উদ্দেশ্যে বাতিলের সাহায্য করে তার উপর হতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) দায়িত্বমুক্ত হয়ে যান।” (এ হাদীসটি আবুল কাসেম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ আমি ঐ বাতিলপন্থীদেরকে পাকড়াও করলাম এবং তাদেরকে তাদের বড় পাপ ও ঘৃণ্য হঠকারিতার কারণে ধ্বংস করে দিলাম। এখন তোমরা চিন্তা করে দেখো যে, তাদের উপর আমার শাস্তি কতই না কঠোর ছিল! অর্থাৎ তাদের উপর আমার শাস্তি ছিল অত্যন্ত কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক। এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ যেমনভাবে তাদের উপর তাদের জঘন্য আমলের কারণে আমার শাস্তি আপতিত হয়েছিল, তেমনিভাবে এই উম্মতের মধ্যে যারা এই শেষ নবী (সঃ)-কে অবিশ্বাস করছে, তাদের উপরও এরূপই শাস্তি আপতিত হবে। যদিও তারা পূর্ববর্তী নবীদেরকে (আঃ) সত্য বলে স্বীকার করে নেয়, কিন্তু যে পর্যন্ত তারা শেষ নবী (সঃ)-এর নবুওয়াতকে স্বীকার না করবে, পূর্ববর্তী নবীদের উপর তাদের বিশ্বাস প্রত্যাখ্যাত হবে। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ্।
গাফির 40:5
৪-৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সত্য প্রকাশিত হয়ে যাবার পর ওকে না মানা এবং তাতে ক্ষতি সৃষ্টি করা কাফিরদেরই কাজ। হে নবী (সঃ)! এ লোকগুলো যদি ধন-মাল ও মান-মর্যাদার অধিকারী হয়ে যায় তবে তুমি যেন প্রতারিত না হও যে, এরা যদি আল্লাহর নিকট ভাল না হতো তবে তিনি তাদেরকে এই নিয়ামতগুলো কেন দিয়ে রেখেছেন? যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা কুফরী করেছে, দেশে দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন কিছুতেই তোমাকে বিভ্রান্ত না করে। এটা সামান্য ভোগ মাত্র; অতঃপর জাহান্নাম তাদের আবাস, আর ওটা কত নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল!” (৩:১৯৬-১৯৭) অন্য এক আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সামান্য দিন তাদেরকে আমি সুখ ভোগ করতে দিবো, অতঃপর তাদেরকে কঠিন শাস্তির দিকে আসতে বাধ্য করবো।”(৩১-২৪)এরপর আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)! লোকেরা যে তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে এ কারণে তুমি দুঃখিত ও চিন্তিত হয়ো না। তোমার পূর্ববর্তী নবীদের (আঃ) অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর যে, তাদেরকেও তাদের কওম অবিশ্বাস করেছিল এবং তাদের প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। হযরত নূহ, যিনি বানী আদমের মধ্যে সর্বপ্রথম রাসল হয়ে এসেছিলেন, জনগণের মধ্যে যখন প্রথম প্রথম প্রতিমা-পূজা শুরু হয় তখন ঐ লোকগুলো তাঁকেও অবিশ্বাস করে এবং তার পরেও যতজন নবী এসেছিলেন তাদেরকেও তাদের উম্মতরা অবিশ্বাস করতে থাকে। এমনকি সবাই নিজ নিজ যামানার নবীকে বন্দী করা ও হত্যা করার ইচ্ছা করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাতে সফলকামও হয় এবং নিজেদের সন্দেহ ও মিথ্যা দ্বারা সত্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে চায় এবং সত্যকে ব্যর্থ করে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যকে দুর্বল করে দেয়ার উদ্দেশ্যে বাতিলের সাহায্য করে তার উপর হতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) দায়িত্বমুক্ত হয়ে যান।” (এ হাদীসটি আবুল কাসেম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ আমি ঐ বাতিলপন্থীদেরকে পাকড়াও করলাম এবং তাদেরকে তাদের বড় পাপ ও ঘৃণ্য হঠকারিতার কারণে ধ্বংস করে দিলাম। এখন তোমরা চিন্তা করে দেখো যে, তাদের উপর আমার শাস্তি কতই না কঠোর ছিল! অর্থাৎ তাদের উপর আমার শাস্তি ছিল অত্যন্ত কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক। এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ যেমনভাবে তাদের উপর তাদের জঘন্য আমলের কারণে আমার শাস্তি আপতিত হয়েছিল, তেমনিভাবে এই উম্মতের মধ্যে যারা এই শেষ নবী (সঃ)-কে অবিশ্বাস করছে, তাদের উপরও এরূপই শাস্তি আপতিত হবে। যদিও তারা পূর্ববর্তী নবীদেরকে (আঃ) সত্য বলে স্বীকার করে নেয়, কিন্তু যে পর্যন্ত তারা শেষ নবী (সঃ)-এর নবুওয়াতকে স্বীকার না করবে, পূর্ববর্তী নবীদের উপর তাদের বিশ্বাস প্রত্যাখ্যাত হবে। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ্।
গাফির 40:6
৪-৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সত্য প্রকাশিত হয়ে যাবার পর ওকে না মানা এবং তাতে ক্ষতি সৃষ্টি করা কাফিরদেরই কাজ। হে নবী (সঃ)! এ লোকগুলো যদি ধন-মাল ও মান-মর্যাদার অধিকারী হয়ে যায় তবে তুমি যেন প্রতারিত না হও যে, এরা যদি আল্লাহর নিকট ভাল না হতো তবে তিনি তাদেরকে এই নিয়ামতগুলো কেন দিয়ে রেখেছেন? যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা কুফরী করেছে, দেশে দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন কিছুতেই তোমাকে বিভ্রান্ত না করে। এটা সামান্য ভোগ মাত্র; অতঃপর জাহান্নাম তাদের আবাস, আর ওটা কত নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল!” (৩:১৯৬-১৯৭) অন্য এক আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সামান্য দিন তাদেরকে আমি সুখ ভোগ করতে দিবো, অতঃপর তাদেরকে কঠিন শাস্তির দিকে আসতে বাধ্য করবো।”(৩১-২৪)এরপর আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেনঃ হে নবী (সঃ)! লোকেরা যে তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে এ কারণে তুমি দুঃখিত ও চিন্তিত হয়ো না। তোমার পূর্ববর্তী নবীদের (আঃ) অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর যে, তাদেরকেও তাদের কওম অবিশ্বাস করেছিল এবং তাদের প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। হযরত নূহ, যিনি বানী আদমের মধ্যে সর্বপ্রথম রাসল হয়ে এসেছিলেন, জনগণের মধ্যে যখন প্রথম প্রথম প্রতিমা-পূজা শুরু হয় তখন ঐ লোকগুলো তাঁকেও অবিশ্বাস করে এবং তার পরেও যতজন নবী এসেছিলেন তাদেরকেও তাদের উম্মতরা অবিশ্বাস করতে থাকে। এমনকি সবাই নিজ নিজ যামানার নবীকে বন্দী করা ও হত্যা করার ইচ্ছা করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাতে সফলকামও হয় এবং নিজেদের সন্দেহ ও মিথ্যা দ্বারা সত্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে চায় এবং সত্যকে ব্যর্থ করে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যকে দুর্বল করে দেয়ার উদ্দেশ্যে বাতিলের সাহায্য করে তার উপর হতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) দায়িত্বমুক্ত হয়ে যান।” (এ হাদীসটি আবুল কাসেম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ আমি ঐ বাতিলপন্থীদেরকে পাকড়াও করলাম এবং তাদেরকে তাদের বড় পাপ ও ঘৃণ্য হঠকারিতার কারণে ধ্বংস করে দিলাম। এখন তোমরা চিন্তা করে দেখো যে, তাদের উপর আমার শাস্তি কতই না কঠোর ছিল! অর্থাৎ তাদের উপর আমার শাস্তি ছিল অত্যন্ত কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক। এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ যেমনভাবে তাদের উপর তাদের জঘন্য আমলের কারণে আমার শাস্তি আপতিত হয়েছিল, তেমনিভাবে এই উম্মতের মধ্যে যারা এই শেষ নবী (সঃ)-কে অবিশ্বাস করছে, তাদের উপরও এরূপই শাস্তি আপতিত হবে। যদিও তারা পূর্ববর্তী নবীদেরকে (আঃ) সত্য বলে স্বীকার করে নেয়, কিন্তু যে পর্যন্ত তারা শেষ নবী (সঃ)-এর নবুওয়াতকে স্বীকার না করবে, পূর্ববর্তী নবীদের উপর তাদের বিশ্বাস প্রত্যাখ্যাত হবে। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ্।
গাফির 40:7
৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: আরশ বহনকারী চারজন ফেরেশতা এবং এর আশেপাশের সমস্ত ভাল ও সম্মানিত ফেরেশতা এক দিকে তো আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করেন, সমস্ত দোষ ও অপরাধ হতে তাঁকে দূর বলেন এবং অপরদিকে তাকে সমস্ত গুণ ও প্রশংসার যোগ্য মেনে নিয়ে তার প্রশংসা কীর্তন করেন। মোটকথা, যা আল্লাহর মধ্যে নেই তা হতে তারা তাকে পবিত্র ও মুক্ত বলেন এবং যা তাঁর মধ্যে রয়েছে তা তারা সাব্যস্ত করেন। তারা তার উপর ঈমান ও বিশ্বাস রাখেন এবং নিজেদের নীচতা ও অপারগতা প্রকাশ করেন। যমীনবাসী সমস্ত মুমিন পুরুষ ও স্ত্রীর জন্যে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। পৃথিবীবাসীদের আল্লাহর উপর ঈমান তাঁকে না দেখেই ছিল বলে তিনি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তাঁর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করে দেন। সুতরাং তারা তাদেরকে না দেখেই সদা-সর্বদা তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, যখন কোন মুসলিম তার কোন (মুসলিম) ভাই-এর অনুপস্থিতির সময় তার জন্যে দু'আ করে তখন ফেরেশতা তার দু'আয় আমীন বলেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ তোমাকেও ওটাই প্রদান করুন যা তুমি তোমার ঐ মুমিন ভাই-এর জন্যে চাচ্ছ।”মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উমাইয়া ইবনে সালাতের কোন কোন কবিতার সত্যতা স্বীকার করেন। যেমন নিম্নের কবিতাঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বহনকারী ফেরেশতা চারজন। দুই জন একদিকে এবং অপর দুই জন অন্যদিকে থাকেন।”তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য বলেছে।” তারপর ঐ কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সূর্য প্রত্যেক রাত্রির শেষে রক্তিম বর্ণে উদিত হয়, তারপর গোলাপী বর্ণ ধারণ করে। এটা কখনো স্বীয় আকৃতিতে প্রকাশিত হয় না, বরং রুক্ষ ও পানসেই থাকে।” এবারও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য বলেছে।” (এর সনদ খুব পাকা ও মযবৃত। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এই সময় আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের সংখ্যা চারজন হবে)কিয়ামতের দিন কিন্তু আটজন ফেরেশতা আরশ বহন করবেন। যেমন কুরআন মাজীদে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন আটজন ফেরেশতা তাদের প্রতিপালকের আর্শকে ধারণ করবে তাদের ঊর্ধ্বে।” (৬৯-১৭) হ্যাঁ, তবে এই আয়াতের ভাবার্থেও এই হাদীস হতে দলীল গ্রহণে একটি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে, সুনানে আবি দাউদের একটি হাদীসে রয়েছেঃ হযরত আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা বাতহা নামক স্থানে একটি সমাবেশে ছিলেন যেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-ও অবস্থান করছিলেন। এমন সময় (আকাশে) এক খণ্ড মেঘ চলতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ মেঘের দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “এর নাম কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “আমরা এটাকে (আরবী) বলে থাকি।” তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ “তোমরা কি এটাকে (আরবী)-ও বল না?” তাঁরা জবাব দিলেনঃ “হ্যা এটাকে আমরা (আরবী)-ও বলে থাকি।” তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা এটাকে (আরবী)-ও কি বল না?” তারা উত্তর দিলেনঃ “ হ্যা, (আরবী)-ও বলি বটে।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “আসমান ও যমীনের মধ্যে দূরত্ব কত তা কি তোমরা জান?” তারা উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তিনি বললেনঃ “এ দু'টোর মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে একাত্তর, বাহাত্তর অথবা তেহাত্তর বছরের পৃথ। এর উপরের আসমানও এই প্রথম আসমান হতে এরূপই দূরত্বে রয়েছে। সপ্তম আকাশ পর্যন্ত একটি হতে অপরটির মাঝে অনুরূপ দূরত্ব রয়েছে। সপ্তম আকাশের উপর একটি সমুদ্র রয়েছে যার গভীরতা এই পরিমাণই। ওর উপর আট জন ফেরেশতা পাহাড়ী ছাগলের আকারে রয়েছেন যেগুলোর খুর হতে হাঁটু পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হলো এক আকাশ হতে অন্য আকাশের দূরত্বের সমান। তাঁদের পিঠের উপর আল্লাহ্ তা'আলার আরুশ রয়েছে। যার উচ্চতাও এই পরিমাণ। এর উপরে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রয়েছেন। (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন) এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এই সময় আল্লাহ্ তা'আলার আরশ আটজন ফেরেশতার উপর রয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনের তাসবীহ্ নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসাসহ আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। সমস্ত প্রশংসা আপনারই প্রাপ্য যে, আপনি (আপনার বান্দাদের পাপরাশি) জানা সত্ত্বেও সহনশীলতা প্রদর্শন করছেন।”অপর চারজন ফেরেশতার তাসবীহ নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমতার পরেও (আপনার বান্দাদের পাপরাশি) ক্ষমা করছেন এ জন্যে আমি আপনার মহিমা ঘোষণা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি।” এ জন্যেই মুমিনদের ক্ষমা প্রার্থনায় তারা এ কথাও বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী। বানী আদমের সমস্ত গুনাহ ও তাদের অপরাধের উপর আপনার রহমত ছেয়ে আছে। অনুরূপভাবে আপনার জ্ঞানও তাদের সমস্ত কথা এবং কাজকে পরিবেষ্টন করে আছে। তাদের সমস্ত অঙ্গ-ভঙ্গী সম্পর্কে আপনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। সুতরাং তাদের এই ব্যক্তিরা যখন তাওবা করতঃ আপনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। পাপকার্য হতে বিরত থাকে, আপনার আহকাম পালন করে, ভাল কাজ করে ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে তখন আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদেরকে জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করুন এবং আপনি তাদেরকে দাখিল করুন স্থায়ী জান্নাতে, যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তাদেরকেও ক্ষমা করে দিন। আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরাও তাদের ঈমানের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদেরকেরও তাদের সাথে মিলিত করবো এবং তাদের আমলের কিছুই কম করবো না।” (৫২:২১) অর্থাৎ তাদের সবকেই মর্যাদার দিক দিয়ে সমান করবো, যাতে উভয় পক্ষেরই চক্ষু ঠাণ্ডা হয়। আর আমি এটা করবো না যে, উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের মর্যাদা কমিয়ে দিবো, বরং যাদের মর্যাদা কম তাদের মর্যাদা আমি বাড়িয়ে দিবো এবং এটা তাদের উপর আমার দয়া ও অনুগ্রহেরই ফল। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন, মুমিন জান্নাতে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেঃ “আমার পিতা, আমার ভাই এবং আমার সন্তান-সন্ততি কোথায়?” উত্তর দেয়া হবেঃ “তাদের পুণ্য এতো ছিল না যে, তারা এরূপ মর্যাদায় পৌছতে পারে।” সে বলবেঃ “আমি তো আমার জন্যে এবং তাদের সবারই জন্যে আমল করেছিলাম। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকেও তার মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দিবেন। অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত মুতরাফ ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতারাও মুমিনদের মঙ্গল কামনা করে থাকেন। অতঃপর তিনিও এই আয়াতটিই পাঠ করেন। আর শয়তান তাদের অমঙ্গল কামনা করে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” অর্থাৎ তিনি এমন বিজয়ী যার উপর কেউ বিজয় লাভ করতে পারে না এবং যাকে কেউ বাধা দিতে পারে না। তিনি যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হয় না। তিনি স্বীয় কথায়, কাজে এবং শরীয়তে ও তকদীরে প্রজ্ঞাময়। সুতরাং ফেরেশতারা প্রার্থনায় আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি মুমিনদেরকে আপনার শাস্তি হতে রক্ষা করুন। সেই দিন আপনি যাকে শাস্তি হতে রক্ষা করবেন তার প্রতি তো আপনি অনুগ্রহই করবেন। আর এটাই তো মহা সাফল্য।
গাফির 40:8
৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: আরশ বহনকারী চারজন ফেরেশতা এবং এর আশেপাশের সমস্ত ভাল ও সম্মানিত ফেরেশতা এক দিকে তো আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করেন, সমস্ত দোষ ও অপরাধ হতে তাঁকে দূর বলেন এবং অপরদিকে তাকে সমস্ত গুণ ও প্রশংসার যোগ্য মেনে নিয়ে তার প্রশংসা কীর্তন করেন। মোটকথা, যা আল্লাহর মধ্যে নেই তা হতে তারা তাকে পবিত্র ও মুক্ত বলেন এবং যা তাঁর মধ্যে রয়েছে তা তারা সাব্যস্ত করেন। তারা তার উপর ঈমান ও বিশ্বাস রাখেন এবং নিজেদের নীচতা ও অপারগতা প্রকাশ করেন। যমীনবাসী সমস্ত মুমিন পুরুষ ও স্ত্রীর জন্যে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। পৃথিবীবাসীদের আল্লাহর উপর ঈমান তাঁকে না দেখেই ছিল বলে তিনি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তাঁর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করে দেন। সুতরাং তারা তাদেরকে না দেখেই সদা-সর্বদা তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, যখন কোন মুসলিম তার কোন (মুসলিম) ভাই-এর অনুপস্থিতির সময় তার জন্যে দু'আ করে তখন ফেরেশতা তার দু'আয় আমীন বলেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ তোমাকেও ওটাই প্রদান করুন যা তুমি তোমার ঐ মুমিন ভাই-এর জন্যে চাচ্ছ।”মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উমাইয়া ইবনে সালাতের কোন কোন কবিতার সত্যতা স্বীকার করেন। যেমন নিম্নের কবিতাঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বহনকারী ফেরেশতা চারজন। দুই জন একদিকে এবং অপর দুই জন অন্যদিকে থাকেন।”তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য বলেছে।” তারপর ঐ কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সূর্য প্রত্যেক রাত্রির শেষে রক্তিম বর্ণে উদিত হয়, তারপর গোলাপী বর্ণ ধারণ করে। এটা কখনো স্বীয় আকৃতিতে প্রকাশিত হয় না, বরং রুক্ষ ও পানসেই থাকে।” এবারও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য বলেছে।” (এর সনদ খুব পাকা ও মযবৃত। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এই সময় আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের সংখ্যা চারজন হবে)কিয়ামতের দিন কিন্তু আটজন ফেরেশতা আরশ বহন করবেন। যেমন কুরআন মাজীদে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন আটজন ফেরেশতা তাদের প্রতিপালকের আর্শকে ধারণ করবে তাদের ঊর্ধ্বে।” (৬৯-১৭) হ্যাঁ, তবে এই আয়াতের ভাবার্থেও এই হাদীস হতে দলীল গ্রহণে একটি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে, সুনানে আবি দাউদের একটি হাদীসে রয়েছেঃ হযরত আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা বাতহা নামক স্থানে একটি সমাবেশে ছিলেন যেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-ও অবস্থান করছিলেন। এমন সময় (আকাশে) এক খণ্ড মেঘ চলতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ মেঘের দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “এর নাম কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “আমরা এটাকে (আরবী) বলে থাকি।” তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ “তোমরা কি এটাকে (আরবী)-ও বল না?” তাঁরা জবাব দিলেনঃ “হ্যা এটাকে আমরা (আরবী)-ও বলে থাকি।” তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা এটাকে (আরবী)-ও কি বল না?” তারা উত্তর দিলেনঃ “ হ্যা, (আরবী)-ও বলি বটে।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “আসমান ও যমীনের মধ্যে দূরত্ব কত তা কি তোমরা জান?” তারা উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তিনি বললেনঃ “এ দু'টোর মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে একাত্তর, বাহাত্তর অথবা তেহাত্তর বছরের পৃথ। এর উপরের আসমানও এই প্রথম আসমান হতে এরূপই দূরত্বে রয়েছে। সপ্তম আকাশ পর্যন্ত একটি হতে অপরটির মাঝে অনুরূপ দূরত্ব রয়েছে। সপ্তম আকাশের উপর একটি সমুদ্র রয়েছে যার গভীরতা এই পরিমাণই। ওর উপর আট জন ফেরেশতা পাহাড়ী ছাগলের আকারে রয়েছেন যেগুলোর খুর হতে হাঁটু পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হলো এক আকাশ হতে অন্য আকাশের দূরত্বের সমান। তাঁদের পিঠের উপর আল্লাহ্ তা'আলার আরুশ রয়েছে। যার উচ্চতাও এই পরিমাণ। এর উপরে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রয়েছেন। (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন) এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এই সময় আল্লাহ্ তা'আলার আরশ আটজন ফেরেশতার উপর রয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনের তাসবীহ্ নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসাসহ আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। সমস্ত প্রশংসা আপনারই প্রাপ্য যে, আপনি (আপনার বান্দাদের পাপরাশি) জানা সত্ত্বেও সহনশীলতা প্রদর্শন করছেন।”অপর চারজন ফেরেশতার তাসবীহ নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমতার পরেও (আপনার বান্দাদের পাপরাশি) ক্ষমা করছেন এ জন্যে আমি আপনার মহিমা ঘোষণা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি।” এ জন্যেই মুমিনদের ক্ষমা প্রার্থনায় তারা এ কথাও বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী। বানী আদমের সমস্ত গুনাহ ও তাদের অপরাধের উপর আপনার রহমত ছেয়ে আছে। অনুরূপভাবে আপনার জ্ঞানও তাদের সমস্ত কথা এবং কাজকে পরিবেষ্টন করে আছে। তাদের সমস্ত অঙ্গ-ভঙ্গী সম্পর্কে আপনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। সুতরাং তাদের এই ব্যক্তিরা যখন তাওবা করতঃ আপনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। পাপকার্য হতে বিরত থাকে, আপনার আহকাম পালন করে, ভাল কাজ করে ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে তখন আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদেরকে জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করুন এবং আপনি তাদেরকে দাখিল করুন স্থায়ী জান্নাতে, যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তাদেরকেও ক্ষমা করে দিন। আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরাও তাদের ঈমানের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদেরকেরও তাদের সাথে মিলিত করবো এবং তাদের আমলের কিছুই কম করবো না।” (৫২:২১) অর্থাৎ তাদের সবকেই মর্যাদার দিক দিয়ে সমান করবো, যাতে উভয় পক্ষেরই চক্ষু ঠাণ্ডা হয়। আর আমি এটা করবো না যে, উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের মর্যাদা কমিয়ে দিবো, বরং যাদের মর্যাদা কম তাদের মর্যাদা আমি বাড়িয়ে দিবো এবং এটা তাদের উপর আমার দয়া ও অনুগ্রহেরই ফল। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন, মুমিন জান্নাতে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেঃ “আমার পিতা, আমার ভাই এবং আমার সন্তান-সন্ততি কোথায়?” উত্তর দেয়া হবেঃ “তাদের পুণ্য এতো ছিল না যে, তারা এরূপ মর্যাদায় পৌছতে পারে।” সে বলবেঃ “আমি তো আমার জন্যে এবং তাদের সবারই জন্যে আমল করেছিলাম। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকেও তার মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দিবেন। অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত মুতরাফ ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতারাও মুমিনদের মঙ্গল কামনা করে থাকেন। অতঃপর তিনিও এই আয়াতটিই পাঠ করেন। আর শয়তান তাদের অমঙ্গল কামনা করে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” অর্থাৎ তিনি এমন বিজয়ী যার উপর কেউ বিজয় লাভ করতে পারে না এবং যাকে কেউ বাধা দিতে পারে না। তিনি যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হয় না। তিনি স্বীয় কথায়, কাজে এবং শরীয়তে ও তকদীরে প্রজ্ঞাময়। সুতরাং ফেরেশতারা প্রার্থনায় আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি মুমিনদেরকে আপনার শাস্তি হতে রক্ষা করুন। সেই দিন আপনি যাকে শাস্তি হতে রক্ষা করবেন তার প্রতি তো আপনি অনুগ্রহই করবেন। আর এটাই তো মহা সাফল্য।
গাফির 40:9
৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: আরশ বহনকারী চারজন ফেরেশতা এবং এর আশেপাশের সমস্ত ভাল ও সম্মানিত ফেরেশতা এক দিকে তো আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করেন, সমস্ত দোষ ও অপরাধ হতে তাঁকে দূর বলেন এবং অপরদিকে তাকে সমস্ত গুণ ও প্রশংসার যোগ্য মেনে নিয়ে তার প্রশংসা কীর্তন করেন। মোটকথা, যা আল্লাহর মধ্যে নেই তা হতে তারা তাকে পবিত্র ও মুক্ত বলেন এবং যা তাঁর মধ্যে রয়েছে তা তারা সাব্যস্ত করেন। তারা তার উপর ঈমান ও বিশ্বাস রাখেন এবং নিজেদের নীচতা ও অপারগতা প্রকাশ করেন। যমীনবাসী সমস্ত মুমিন পুরুষ ও স্ত্রীর জন্যে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। পৃথিবীবাসীদের আল্লাহর উপর ঈমান তাঁকে না দেখেই ছিল বলে তিনি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তাঁর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাদেরকে নিযুক্ত করে দেন। সুতরাং তারা তাদেরকে না দেখেই সদা-সর্বদা তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, যখন কোন মুসলিম তার কোন (মুসলিম) ভাই-এর অনুপস্থিতির সময় তার জন্যে দু'আ করে তখন ফেরেশতা তার দু'আয় আমীন বলেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ তোমাকেও ওটাই প্রদান করুন যা তুমি তোমার ঐ মুমিন ভাই-এর জন্যে চাচ্ছ।”মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উমাইয়া ইবনে সালাতের কোন কোন কবিতার সত্যতা স্বীকার করেন। যেমন নিম্নের কবিতাঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বহনকারী ফেরেশতা চারজন। দুই জন একদিকে এবং অপর দুই জন অন্যদিকে থাকেন।”তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য বলেছে।” তারপর ঐ কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সূর্য প্রত্যেক রাত্রির শেষে রক্তিম বর্ণে উদিত হয়, তারপর গোলাপী বর্ণ ধারণ করে। এটা কখনো স্বীয় আকৃতিতে প্রকাশিত হয় না, বরং রুক্ষ ও পানসেই থাকে।” এবারও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “সে সত্য বলেছে।” (এর সনদ খুব পাকা ও মযবৃত। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এই সময় আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের সংখ্যা চারজন হবে)কিয়ামতের দিন কিন্তু আটজন ফেরেশতা আরশ বহন করবেন। যেমন কুরআন মাজীদে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন আটজন ফেরেশতা তাদের প্রতিপালকের আর্শকে ধারণ করবে তাদের ঊর্ধ্বে।” (৬৯-১৭) হ্যাঁ, তবে এই আয়াতের ভাবার্থেও এই হাদীস হতে দলীল গ্রহণে একটি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে, সুনানে আবি দাউদের একটি হাদীসে রয়েছেঃ হযরত আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা বাতহা নামক স্থানে একটি সমাবেশে ছিলেন যেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-ও অবস্থান করছিলেন। এমন সময় (আকাশে) এক খণ্ড মেঘ চলতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ঐ মেঘের দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “এর নাম কি?” সাহাবীগণ (রাঃ) উত্তরে বললেনঃ “আমরা এটাকে (আরবী) বলে থাকি।” তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ “তোমরা কি এটাকে (আরবী)-ও বল না?” তাঁরা জবাব দিলেনঃ “হ্যা এটাকে আমরা (আরবী)-ও বলে থাকি।” তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা এটাকে (আরবী)-ও কি বল না?” তারা উত্তর দিলেনঃ “ হ্যা, (আরবী)-ও বলি বটে।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ “আসমান ও যমীনের মধ্যে দূরত্ব কত তা কি তোমরা জান?” তারা উত্তরে বললেনঃ “জ্বী, না।” তিনি বললেনঃ “এ দু'টোর মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে একাত্তর, বাহাত্তর অথবা তেহাত্তর বছরের পৃথ। এর উপরের আসমানও এই প্রথম আসমান হতে এরূপই দূরত্বে রয়েছে। সপ্তম আকাশ পর্যন্ত একটি হতে অপরটির মাঝে অনুরূপ দূরত্ব রয়েছে। সপ্তম আকাশের উপর একটি সমুদ্র রয়েছে যার গভীরতা এই পরিমাণই। ওর উপর আট জন ফেরেশতা পাহাড়ী ছাগলের আকারে রয়েছেন যেগুলোর খুর হতে হাঁটু পর্যন্ত স্থানের দূরত্ব হলো এক আকাশ হতে অন্য আকাশের দূরত্বের সমান। তাঁদের পিঠের উপর আল্লাহ্ তা'আলার আরুশ রয়েছে। যার উচ্চতাও এই পরিমাণ। এর উপরে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রয়েছেন। (এ হাদীসটি জামেউত তিরমিযীতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন) এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এই সময় আল্লাহ্ তা'আলার আরশ আটজন ফেরেশতার উপর রয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনের তাসবীহ্ নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসাসহ আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। সমস্ত প্রশংসা আপনারই প্রাপ্য যে, আপনি (আপনার বান্দাদের পাপরাশি) জানা সত্ত্বেও সহনশীলতা প্রদর্শন করছেন।”অপর চারজন ফেরেশতার তাসবীহ নিম্নরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমতার পরেও (আপনার বান্দাদের পাপরাশি) ক্ষমা করছেন এ জন্যে আমি আপনার মহিমা ঘোষণা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি।” এ জন্যেই মুমিনদের ক্ষমা প্রার্থনায় তারা এ কথাও বলেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী। বানী আদমের সমস্ত গুনাহ ও তাদের অপরাধের উপর আপনার রহমত ছেয়ে আছে। অনুরূপভাবে আপনার জ্ঞানও তাদের সমস্ত কথা এবং কাজকে পরিবেষ্টন করে আছে। তাদের সমস্ত অঙ্গ-ভঙ্গী সম্পর্কে আপনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। সুতরাং তাদের এই ব্যক্তিরা যখন তাওবা করতঃ আপনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। পাপকার্য হতে বিরত থাকে, আপনার আহকাম পালন করে, ভাল কাজ করে ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে তখন আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদেরকে জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করুন এবং আপনি তাদেরকে দাখিল করুন স্থায়ী জান্নাতে, যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তাদেরকেও ক্ষমা করে দিন। আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরাও তাদের ঈমানের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদেরকেরও তাদের সাথে মিলিত করবো এবং তাদের আমলের কিছুই কম করবো না।” (৫২:২১) অর্থাৎ তাদের সবকেই মর্যাদার দিক দিয়ে সমান করবো, যাতে উভয় পক্ষেরই চক্ষু ঠাণ্ডা হয়। আর আমি এটা করবো না যে, উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের মর্যাদা কমিয়ে দিবো, বরং যাদের মর্যাদা কম তাদের মর্যাদা আমি বাড়িয়ে দিবো এবং এটা তাদের উপর আমার দয়া ও অনুগ্রহেরই ফল। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন, মুমিন জান্নাতে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেঃ “আমার পিতা, আমার ভাই এবং আমার সন্তান-সন্ততি কোথায়?” উত্তর দেয়া হবেঃ “তাদের পুণ্য এতো ছিল না যে, তারা এরূপ মর্যাদায় পৌছতে পারে।” সে বলবেঃ “আমি তো আমার জন্যে এবং তাদের সবারই জন্যে আমল করেছিলাম। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকেও তার মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দিবেন। অতঃপর তিনি (আরবী) এ আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত মুতরাফ ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতারাও মুমিনদের মঙ্গল কামনা করে থাকেন। অতঃপর তিনিও এই আয়াতটিই পাঠ করেন। আর শয়তান তাদের অমঙ্গল কামনা করে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” অর্থাৎ তিনি এমন বিজয়ী যার উপর কেউ বিজয় লাভ করতে পারে না এবং যাকে কেউ বাধা দিতে পারে না। তিনি যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হয় না। তিনি স্বীয় কথায়, কাজে এবং শরীয়তে ও তকদীরে প্রজ্ঞাময়। সুতরাং ফেরেশতারা প্রার্থনায় আরো বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি মুমিনদেরকে আপনার শাস্তি হতে রক্ষা করুন। সেই দিন আপনি যাকে শাস্তি হতে রক্ষা করবেন তার প্রতি তো আপনি অনুগ্রহই করবেন। আর এটাই তো মহা সাফল্য।
গাফির 40:10
১০-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন তারা আগুনের কূপে থাকবে এবং আল্লাহর আযাব দেখে নিবে এবং যেসব শাস্তি হবে সবই চোখের সামনে থাকবে, তখন তারা নিজেদের প্রাণের শত্রু হয়ে যাবে এবং কঠিন শত্রু হবে। কেননা, নিজেদের মন্দ কর্মের কারণে তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। ঐ সময় ফেরেশতারা তাদেরকে উচ্চ কণ্ঠে বলবেনঃ আজ তোমাদের নিজেদের প্রতি তোমাদের ক্ষোভ অপেক্ষা দুনিয়ায় তোমাদের উপর আল্লাহর অপ্রসন্নতা ছিল অধিক, যখন তোমাদেরকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করা হয়েছিল আর তোমরা তা অস্বীকার করেছিলে। মহান আল্লাহর ... (আরবী)-এই উক্তিটি তাঁর নিম্নের উক্তিটির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিরূপে আল্লাহকে অস্বীকার কর? অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন, তিনি তোমাদেরকে জীবন্ত করেছেন, আবার তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন ও পুনরায় জীবন্ত করবেন, পরিণামে তার দিকেই তোমরা ফিরে যাবে।” (২:২৮) সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে দুনিয়ায় একবার মৃত্যু দান করা হয়, তারপর কবরে একবার জীবিত করা হয়, এরপর সওয়াল-জবাব শেষ করে আবার মৃত্যু ঘটান হয় এবং কিয়ামতের দিন পুনরায় জীবিত করা হবে। দুইবার মৃত্যু দান ও দুইবার জীবন দানের অর্থ এটাই। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে অঙ্গীকার গ্রহণের দিন জীবিত করা হয়, এরপর মায়ের পেটের মধ্যে রূহ ফুকে দেয়া হয়, তারপর মৃত্যু দান করা হয় এবং এরপর কিয়ামতের দিন আবার জীবন দান করা হবে। কিন্তু এ উক্তি দু’টি ঠিক নয়। কেননা, এটা অর্থ হলে তিনবার মৃত্যু দান ও তিনবার জীবন দান অপরিহার্য হচ্ছে, অথচ আয়াতে দু’বার মৃত্যু দান ও দু’বার জীবন দানের উল্লেখ রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং তাঁদের সঙ্গী সাথীদের উক্তিটিই সঠিক। অর্থাৎ মায়ের পেট হতে ভূমিষ্ট হওয়া একটি জীবন ও কিয়ামতের দিনের জীবন হলো দ্বিতীয় জীবন। আর দুনিয়ায় সৃষ্ট হওয়ার পূর্বের অবস্থা হলো একটি মৃত্যু এবং দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ হচ্ছে আর একটি মৃত্যু। আয়াতে এ দুই মত্য ও এ দুই জীবনই উদ্দেশ্য। ঐ দিন কাফিররা কিয়ামতের মাঠে আল্লাহ তা'আলার নিকট আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করবে যে, তাঁদেরকে যদি আর একবার দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হতো! যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে অধোবদন হয়ে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম; এখন আপনি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করুন, আমরা সকার্য করবো, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।” (৩২:১২) কিন্তু তাদের এ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করা হবে না। অতঃপর যখন তারা জাহান্নাম এবং ওর আগুন দেখবে এবং তাদেরকে জাহান্নামের ধারে পৌছিয়ে দেয়া হবে তখন দ্বিতীয়বার তারা ঐ আবেদন করবে এবং প্রথমবারের চেয়ে বেশী জোর দিয়ে বলবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন তাদেরকে জাহান্নামের পার্শ্বে দাড় করানো হবে তখন তারা বলবেঃ যদি আমাদেরকে দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়া হতো তাহলে আমরা আমাদের প্রতিপালকের আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করতাম না এবং আমরা ঈমানদার হতাম! বরং ইতিপূর্বে তারা যা গোপন করতো তা তাদের জন্যে প্রকাশ হয়ে পড়েছে, যদি তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবে আবার তারা ওটাই করবে যা হতে তাদেরকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।” (৬:২৭-২৮)এর পরে যখন তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে দেয়া হবে এবং তাদের আযাব শুরু হয়ে যাবে তখন তারা আরো জোর ভাষায় এই আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ করবে। ঐ সময় তারা অত্যন্ত চীৎকার করে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! এখান হতে আমাদেরকে বের করে নিন, আমরা ভাল কাজ করবো, ঐ কাজ করবো না যা ইতিপূর্বে করতাম। (উত্তরে বলা হবেঃ) আমি কি তোমাদেরকে এমন বয়স দেইনি যে, যে উপদেশ গ্রহণের ইচ্ছা করতো সে উপদেশ গ্রহণ করতে পারতো? আর তোমাদের কাছে তো সতর্ককারী এসেছিল? সুতরাং তোমরা (শাস্তির) স্বাদ গ্রহণ কর, যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” (৩৫:৩৭) তারা আরো বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এখান হতে বের করে নিন, এর পরেও যদি আমরা ঐ কাজই করি তবে তো আমরা নিশ্চিতরূপে যালিম হিসেবে পরিগণিত হবো। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ দূর হয়ে যাও, এর মধ্যেই তোমরা পড়ে থাকে এবং আমার সাথে কথা বলো না।" (২৩:১০৭-১০৮) এই আয়াতে ঐ লোকগুলো নিজেদের প্রশ্নের বা আবেদনের পূর্বে একটি মুকদ্দমা কায়েম করে আবেদনের মধ্যে এই ধরনের নমনীয়তা সৃষ্টি করেছে। তারা আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক শক্তির বর্ণনা দিয়েছে যে, তারা মৃত ছিল, তিনি তাদেরকে জীবন দান করেছিলেন। তারপর আবার তাদের মৃত্যু ঘটিয়েছিলেন এবং পুনরায় জীবন দান করেছেন। সুতরাং আল্লাহ সব কিছুর উপরই পূর্ণ। ক্ষমতাবান। তিনি যা চান তাই করতে পারেন। তাই তারা বলেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের পাপ ও অপরাধ স্বীকার করছি। নিশ্চয়ই আমরা নিজেদের উপর যুলুম করেছি ও সীমালংঘন করেছি। এখন আমাদের পরিত্রাণের কোন উপায় আছে কি? অর্থাৎ আপনি আমাদের পরিত্রাণের উপায় বের করে দিন এবং আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যার ক্ষমতা আপনার রয়েছে। এবার দুনিয়ায় গিয়ে আমরা ভাল কাজ করবো এবং এটা হবে আমাদের পূর্বের কৃতকর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত। এবার দুনিয়ায় গিয়েও যদি আমরা পূর্বের কর্মের পুনরাবৃত্তি করি তবে তো আমরা অবশ্যই যালিম বলে গণ্য হবো।” তাদেরকে জবাবে বলা হবেঃ “এখন দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার কোন পথ নেই। কেননা, যদি তোমাদেরকে আবার ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবুও তোমরা পূর্বে যা করতে তাই করবে। তোমরা আসলে নিজেদের অন্তর বক্র করে ফেলেছে। এখনো তোমরা সত্যকে কবুল করবে না, বরং বিপরীতই করবে। তোমাদের অবস্থা তো এই ছিল যে, যখন এক আল্লাহকে ডাকা হতো তখন তোমরা তাঁকে অস্বীকার করতে এবং আল্লাহর শরীক স্থাপন করা হলে তোমরা তা বিশ্বাস করতে। এই অবস্থাই তোমাদের পুনরায় হবে। দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় গেলে তোমরা পুনরায় এই কাজই করবে। সুতরাং প্রকৃত হাকিম যার হুকুমে কোন প্রকারের। যুলুম নেই, বরং যার ফায়সালায় ন্যায় ও ইনসাফই রয়েছে তিনিই আল্লাহ। তিনি যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। যার উপর। ইচ্ছা তিনি রহম করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করেন। তার ফায়সালা ও ইনসাফের ব্যাপারে তার কোন শরীক নেই। ঐ আল্লাহ স্বীয় ক্ষমতা লোকদের উপর প্রকাশ করে থাকেন। যমীন ও আসমানে তাঁর তাওহীদের অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। যার দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সবারই সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা একমাত্র তিনিই। তিনি আকাশ হতে রূযী অর্থাৎ বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন যার দ্বারা সর্বপ্রকারের শস্য, নানা প্রকারের উত্তম স্বাদের, বিভিন্ন রং-এর এবং নানা আকারের ফল-ফুল উৎপন্ন হয়ে থাকে। অথচ পানিও এক এবং যমীনও এক। সুতরাং এর দ্বারা মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়। সত্য তো এই যে, শিক্ষা ও উপদেশ এবং চিন্তা ও গবেষণার তাওফীক শুধু সেই লাভ করে যে আল্লাহ তা'আলার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। মহান আল্লাহ বলেনঃ সুতরাং আল্লাহকে ডাকো তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে, যদিও কাফিররা এটা অপছন্দ করে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) প্রত্যেক ফরয নামাযের সালামের পরে নিম্নের তাসবীহ পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন অংশীদার নেই, রাজতু ও প্রশংসা তারই এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর তাওফীক ছাড়া গুনাহ হতে বেঁচে থাকার ও আল্লাহর ইবাদতে লেগে থাকার ক্ষমতা কারো নেই। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, আমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করি। নিয়ামত, অনুগ্রহ এবং উত্তম প্রশংসা তাঁরই। আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। আল্লাহর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে আমরা শুধু তাকেই ডাকি, যদিও কাফিররা এটা অপছন্দ করে।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলতেন যে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে এটা পাঠ করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে রয়েছে এবং এটা ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট দু'আ করো এবং ককূল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস রেখো এবং জেনে রেখো যে, উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দু'আ আল্লাহ কবূল করেন না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
গাফির 40:11
১০-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন তারা আগুনের কূপে থাকবে এবং আল্লাহর আযাব দেখে নিবে এবং যেসব শাস্তি হবে সবই চোখের সামনে থাকবে, তখন তারা নিজেদের প্রাণের শত্রু হয়ে যাবে এবং কঠিন শত্রু হবে। কেননা, নিজেদের মন্দ কর্মের কারণে তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। ঐ সময় ফেরেশতারা তাদেরকে উচ্চ কণ্ঠে বলবেনঃ আজ তোমাদের নিজেদের প্রতি তোমাদের ক্ষোভ অপেক্ষা দুনিয়ায় তোমাদের উপর আল্লাহর অপ্রসন্নতা ছিল অধিক, যখন তোমাদেরকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করা হয়েছিল আর তোমরা তা অস্বীকার করেছিলে। মহান আল্লাহর ... (আরবী)-এই উক্তিটি তাঁর নিম্নের উক্তিটির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিরূপে আল্লাহকে অস্বীকার কর? অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন, তিনি তোমাদেরকে জীবন্ত করেছেন, আবার তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন ও পুনরায় জীবন্ত করবেন, পরিণামে তার দিকেই তোমরা ফিরে যাবে।” (২:২৮) সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে দুনিয়ায় একবার মৃত্যু দান করা হয়, তারপর কবরে একবার জীবিত করা হয়, এরপর সওয়াল-জবাব শেষ করে আবার মৃত্যু ঘটান হয় এবং কিয়ামতের দিন পুনরায় জীবিত করা হবে। দুইবার মৃত্যু দান ও দুইবার জীবন দানের অর্থ এটাই। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে অঙ্গীকার গ্রহণের দিন জীবিত করা হয়, এরপর মায়ের পেটের মধ্যে রূহ ফুকে দেয়া হয়, তারপর মৃত্যু দান করা হয় এবং এরপর কিয়ামতের দিন আবার জীবন দান করা হবে। কিন্তু এ উক্তি দু’টি ঠিক নয়। কেননা, এটা অর্থ হলে তিনবার মৃত্যু দান ও তিনবার জীবন দান অপরিহার্য হচ্ছে, অথচ আয়াতে দু’বার মৃত্যু দান ও দু’বার জীবন দানের উল্লেখ রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং তাঁদের সঙ্গী সাথীদের উক্তিটিই সঠিক। অর্থাৎ মায়ের পেট হতে ভূমিষ্ট হওয়া একটি জীবন ও কিয়ামতের দিনের জীবন হলো দ্বিতীয় জীবন। আর দুনিয়ায় সৃষ্ট হওয়ার পূর্বের অবস্থা হলো একটি মৃত্যু এবং দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ হচ্ছে আর একটি মৃত্যু। আয়াতে এ দুই মত্য ও এ দুই জীবনই উদ্দেশ্য। ঐ দিন কাফিররা কিয়ামতের মাঠে আল্লাহ তা'আলার নিকট আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করবে যে, তাঁদেরকে যদি আর একবার দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হতো! যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে অধোবদন হয়ে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম; এখন আপনি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করুন, আমরা সকার্য করবো, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।” (৩২:১২) কিন্তু তাদের এ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করা হবে না। অতঃপর যখন তারা জাহান্নাম এবং ওর আগুন দেখবে এবং তাদেরকে জাহান্নামের ধারে পৌছিয়ে দেয়া হবে তখন দ্বিতীয়বার তারা ঐ আবেদন করবে এবং প্রথমবারের চেয়ে বেশী জোর দিয়ে বলবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন তাদেরকে জাহান্নামের পার্শ্বে দাড় করানো হবে তখন তারা বলবেঃ যদি আমাদেরকে দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়া হতো তাহলে আমরা আমাদের প্রতিপালকের আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করতাম না এবং আমরা ঈমানদার হতাম! বরং ইতিপূর্বে তারা যা গোপন করতো তা তাদের জন্যে প্রকাশ হয়ে পড়েছে, যদি তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবে আবার তারা ওটাই করবে যা হতে তাদেরকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।” (৬:২৭-২৮)এর পরে যখন তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে দেয়া হবে এবং তাদের আযাব শুরু হয়ে যাবে তখন তারা আরো জোর ভাষায় এই আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ করবে। ঐ সময় তারা অত্যন্ত চীৎকার করে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! এখান হতে আমাদেরকে বের করে নিন, আমরা ভাল কাজ করবো, ঐ কাজ করবো না যা ইতিপূর্বে করতাম। (উত্তরে বলা হবেঃ) আমি কি তোমাদেরকে এমন বয়স দেইনি যে, যে উপদেশ গ্রহণের ইচ্ছা করতো সে উপদেশ গ্রহণ করতে পারতো? আর তোমাদের কাছে তো সতর্ককারী এসেছিল? সুতরাং তোমরা (শাস্তির) স্বাদ গ্রহণ কর, যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” (৩৫:৩৭) তারা আরো বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এখান হতে বের করে নিন, এর পরেও যদি আমরা ঐ কাজই করি তবে তো আমরা নিশ্চিতরূপে যালিম হিসেবে পরিগণিত হবো। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ দূর হয়ে যাও, এর মধ্যেই তোমরা পড়ে থাকে এবং আমার সাথে কথা বলো না।" (২৩:১০৭-১০৮) এই আয়াতে ঐ লোকগুলো নিজেদের প্রশ্নের বা আবেদনের পূর্বে একটি মুকদ্দমা কায়েম করে আবেদনের মধ্যে এই ধরনের নমনীয়তা সৃষ্টি করেছে। তারা আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক শক্তির বর্ণনা দিয়েছে যে, তারা মৃত ছিল, তিনি তাদেরকে জীবন দান করেছিলেন। তারপর আবার তাদের মৃত্যু ঘটিয়েছিলেন এবং পুনরায় জীবন দান করেছেন। সুতরাং আল্লাহ সব কিছুর উপরই পূর্ণ। ক্ষমতাবান। তিনি যা চান তাই করতে পারেন। তাই তারা বলেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের পাপ ও অপরাধ স্বীকার করছি। নিশ্চয়ই আমরা নিজেদের উপর যুলুম করেছি ও সীমালংঘন করেছি। এখন আমাদের পরিত্রাণের কোন উপায় আছে কি? অর্থাৎ আপনি আমাদের পরিত্রাণের উপায় বের করে দিন এবং আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যার ক্ষমতা আপনার রয়েছে। এবার দুনিয়ায় গিয়ে আমরা ভাল কাজ করবো এবং এটা হবে আমাদের পূর্বের কৃতকর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত। এবার দুনিয়ায় গিয়েও যদি আমরা পূর্বের কর্মের পুনরাবৃত্তি করি তবে তো আমরা অবশ্যই যালিম বলে গণ্য হবো।” তাদেরকে জবাবে বলা হবেঃ “এখন দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার কোন পথ নেই। কেননা, যদি তোমাদেরকে আবার ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবুও তোমরা পূর্বে যা করতে তাই করবে। তোমরা আসলে নিজেদের অন্তর বক্র করে ফেলেছে। এখনো তোমরা সত্যকে কবুল করবে না, বরং বিপরীতই করবে। তোমাদের অবস্থা তো এই ছিল যে, যখন এক আল্লাহকে ডাকা হতো তখন তোমরা তাঁকে অস্বীকার করতে এবং আল্লাহর শরীক স্থাপন করা হলে তোমরা তা বিশ্বাস করতে। এই অবস্থাই তোমাদের পুনরায় হবে। দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় গেলে তোমরা পুনরায় এই কাজই করবে। সুতরাং প্রকৃত হাকিম যার হুকুমে কোন প্রকারের। যুলুম নেই, বরং যার ফায়সালায় ন্যায় ও ইনসাফই রয়েছে তিনিই আল্লাহ। তিনি যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। যার উপর। ইচ্ছা তিনি রহম করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করেন। তার ফায়সালা ও ইনসাফের ব্যাপারে তার কোন শরীক নেই। ঐ আল্লাহ স্বীয় ক্ষমতা লোকদের উপর প্রকাশ করে থাকেন। যমীন ও আসমানে তাঁর তাওহীদের অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। যার দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সবারই সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা একমাত্র তিনিই। তিনি আকাশ হতে রূযী অর্থাৎ বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন যার দ্বারা সর্বপ্রকারের শস্য, নানা প্রকারের উত্তম স্বাদের, বিভিন্ন রং-এর এবং নানা আকারের ফল-ফুল উৎপন্ন হয়ে থাকে। অথচ পানিও এক এবং যমীনও এক। সুতরাং এর দ্বারা মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়। সত্য তো এই যে, শিক্ষা ও উপদেশ এবং চিন্তা ও গবেষণার তাওফীক শুধু সেই লাভ করে যে আল্লাহ তা'আলার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। মহান আল্লাহ বলেনঃ সুতরাং আল্লাহকে ডাকো তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে, যদিও কাফিররা এটা অপছন্দ করে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) প্রত্যেক ফরয নামাযের সালামের পরে নিম্নের তাসবীহ পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন অংশীদার নেই, রাজতু ও প্রশংসা তারই এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর তাওফীক ছাড়া গুনাহ হতে বেঁচে থাকার ও আল্লাহর ইবাদতে লেগে থাকার ক্ষমতা কারো নেই। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, আমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করি। নিয়ামত, অনুগ্রহ এবং উত্তম প্রশংসা তাঁরই। আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। আল্লাহর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে আমরা শুধু তাকেই ডাকি, যদিও কাফিররা এটা অপছন্দ করে।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলতেন যে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে এটা পাঠ করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে রয়েছে এবং এটা ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট দু'আ করো এবং ককূল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস রেখো এবং জেনে রেখো যে, উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দু'আ আল্লাহ কবূল করেন না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
গাফির 40:12
১০-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন তারা আগুনের কূপে থাকবে এবং আল্লাহর আযাব দেখে নিবে এবং যেসব শাস্তি হবে সবই চোখের সামনে থাকবে, তখন তারা নিজেদের প্রাণের শত্রু হয়ে যাবে এবং কঠিন শত্রু হবে। কেননা, নিজেদের মন্দ কর্মের কারণে তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। ঐ সময় ফেরেশতারা তাদেরকে উচ্চ কণ্ঠে বলবেনঃ আজ তোমাদের নিজেদের প্রতি তোমাদের ক্ষোভ অপেক্ষা দুনিয়ায় তোমাদের উপর আল্লাহর অপ্রসন্নতা ছিল অধিক, যখন তোমাদেরকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করা হয়েছিল আর তোমরা তা অস্বীকার করেছিলে। মহান আল্লাহর ... (আরবী)-এই উক্তিটি তাঁর নিম্নের উক্তিটির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিরূপে আল্লাহকে অস্বীকার কর? অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন, তিনি তোমাদেরকে জীবন্ত করেছেন, আবার তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন ও পুনরায় জীবন্ত করবেন, পরিণামে তার দিকেই তোমরা ফিরে যাবে।” (২:২৮) সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে দুনিয়ায় একবার মৃত্যু দান করা হয়, তারপর কবরে একবার জীবিত করা হয়, এরপর সওয়াল-জবাব শেষ করে আবার মৃত্যু ঘটান হয় এবং কিয়ামতের দিন পুনরায় জীবিত করা হবে। দুইবার মৃত্যু দান ও দুইবার জীবন দানের অর্থ এটাই। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে অঙ্গীকার গ্রহণের দিন জীবিত করা হয়, এরপর মায়ের পেটের মধ্যে রূহ ফুকে দেয়া হয়, তারপর মৃত্যু দান করা হয় এবং এরপর কিয়ামতের দিন আবার জীবন দান করা হবে। কিন্তু এ উক্তি দু’টি ঠিক নয়। কেননা, এটা অর্থ হলে তিনবার মৃত্যু দান ও তিনবার জীবন দান অপরিহার্য হচ্ছে, অথচ আয়াতে দু’বার মৃত্যু দান ও দু’বার জীবন দানের উল্লেখ রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং তাঁদের সঙ্গী সাথীদের উক্তিটিই সঠিক। অর্থাৎ মায়ের পেট হতে ভূমিষ্ট হওয়া একটি জীবন ও কিয়ামতের দিনের জীবন হলো দ্বিতীয় জীবন। আর দুনিয়ায় সৃষ্ট হওয়ার পূর্বের অবস্থা হলো একটি মৃত্যু এবং দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ হচ্ছে আর একটি মৃত্যু। আয়াতে এ দুই মত্য ও এ দুই জীবনই উদ্দেশ্য। ঐ দিন কাফিররা কিয়ামতের মাঠে আল্লাহ তা'আলার নিকট আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করবে যে, তাঁদেরকে যদি আর একবার দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হতো! যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে অধোবদন হয়ে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম; এখন আপনি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করুন, আমরা সকার্য করবো, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।” (৩২:১২) কিন্তু তাদের এ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করা হবে না। অতঃপর যখন তারা জাহান্নাম এবং ওর আগুন দেখবে এবং তাদেরকে জাহান্নামের ধারে পৌছিয়ে দেয়া হবে তখন দ্বিতীয়বার তারা ঐ আবেদন করবে এবং প্রথমবারের চেয়ে বেশী জোর দিয়ে বলবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন তাদেরকে জাহান্নামের পার্শ্বে দাড় করানো হবে তখন তারা বলবেঃ যদি আমাদেরকে দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়া হতো তাহলে আমরা আমাদের প্রতিপালকের আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করতাম না এবং আমরা ঈমানদার হতাম! বরং ইতিপূর্বে তারা যা গোপন করতো তা তাদের জন্যে প্রকাশ হয়ে পড়েছে, যদি তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবে আবার তারা ওটাই করবে যা হতে তাদেরকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।” (৬:২৭-২৮)এর পরে যখন তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে দেয়া হবে এবং তাদের আযাব শুরু হয়ে যাবে তখন তারা আরো জোর ভাষায় এই আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ করবে। ঐ সময় তারা অত্যন্ত চীৎকার করে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! এখান হতে আমাদেরকে বের করে নিন, আমরা ভাল কাজ করবো, ঐ কাজ করবো না যা ইতিপূর্বে করতাম। (উত্তরে বলা হবেঃ) আমি কি তোমাদেরকে এমন বয়স দেইনি যে, যে উপদেশ গ্রহণের ইচ্ছা করতো সে উপদেশ গ্রহণ করতে পারতো? আর তোমাদের কাছে তো সতর্ককারী এসেছিল? সুতরাং তোমরা (শাস্তির) স্বাদ গ্রহণ কর, যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” (৩৫:৩৭) তারা আরো বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এখান হতে বের করে নিন, এর পরেও যদি আমরা ঐ কাজই করি তবে তো আমরা নিশ্চিতরূপে যালিম হিসেবে পরিগণিত হবো। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ দূর হয়ে যাও, এর মধ্যেই তোমরা পড়ে থাকে এবং আমার সাথে কথা বলো না।" (২৩:১০৭-১০৮) এই আয়াতে ঐ লোকগুলো নিজেদের প্রশ্নের বা আবেদনের পূর্বে একটি মুকদ্দমা কায়েম করে আবেদনের মধ্যে এই ধরনের নমনীয়তা সৃষ্টি করেছে। তারা আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক শক্তির বর্ণনা দিয়েছে যে, তারা মৃত ছিল, তিনি তাদেরকে জীবন দান করেছিলেন। তারপর আবার তাদের মৃত্যু ঘটিয়েছিলেন এবং পুনরায় জীবন দান করেছেন। সুতরাং আল্লাহ সব কিছুর উপরই পূর্ণ। ক্ষমতাবান। তিনি যা চান তাই করতে পারেন। তাই তারা বলেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের পাপ ও অপরাধ স্বীকার করছি। নিশ্চয়ই আমরা নিজেদের উপর যুলুম করেছি ও সীমালংঘন করেছি। এখন আমাদের পরিত্রাণের কোন উপায় আছে কি? অর্থাৎ আপনি আমাদের পরিত্রাণের উপায় বের করে দিন এবং আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যার ক্ষমতা আপনার রয়েছে। এবার দুনিয়ায় গিয়ে আমরা ভাল কাজ করবো এবং এটা হবে আমাদের পূর্বের কৃতকর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত। এবার দুনিয়ায় গিয়েও যদি আমরা পূর্বের কর্মের পুনরাবৃত্তি করি তবে তো আমরা অবশ্যই যালিম বলে গণ্য হবো।” তাদেরকে জবাবে বলা হবেঃ “এখন দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার কোন পথ নেই। কেননা, যদি তোমাদেরকে আবার ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবুও তোমরা পূর্বে যা করতে তাই করবে। তোমরা আসলে নিজেদের অন্তর বক্র করে ফেলেছে। এখনো তোমরা সত্যকে কবুল করবে না, বরং বিপরীতই করবে। তোমাদের অবস্থা তো এই ছিল যে, যখন এক আল্লাহকে ডাকা হতো তখন তোমরা তাঁকে অস্বীকার করতে এবং আল্লাহর শরীক স্থাপন করা হলে তোমরা তা বিশ্বাস করতে। এই অবস্থাই তোমাদের পুনরায় হবে। দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় গেলে তোমরা পুনরায় এই কাজই করবে। সুতরাং প্রকৃত হাকিম যার হুকুমে কোন প্রকারের। যুলুম নেই, বরং যার ফায়সালায় ন্যায় ও ইনসাফই রয়েছে তিনিই আল্লাহ। তিনি যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। যার উপর। ইচ্ছা তিনি রহম করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করেন। তার ফায়সালা ও ইনসাফের ব্যাপারে তার কোন শরীক নেই। ঐ আল্লাহ স্বীয় ক্ষমতা লোকদের উপর প্রকাশ করে থাকেন। যমীন ও আসমানে তাঁর তাওহীদের অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। যার দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সবারই সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা একমাত্র তিনিই। তিনি আকাশ হতে রূযী অর্থাৎ বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন যার দ্বারা সর্বপ্রকারের শস্য, নানা প্রকারের উত্তম স্বাদের, বিভিন্ন রং-এর এবং নানা আকারের ফল-ফুল উৎপন্ন হয়ে থাকে। অথচ পানিও এক এবং যমীনও এক। সুতরাং এর দ্বারা মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়। সত্য তো এই যে, শিক্ষা ও উপদেশ এবং চিন্তা ও গবেষণার তাওফীক শুধু সেই লাভ করে যে আল্লাহ তা'আলার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। মহান আল্লাহ বলেনঃ সুতরাং আল্লাহকে ডাকো তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে, যদিও কাফিররা এটা অপছন্দ করে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) প্রত্যেক ফরয নামাযের সালামের পরে নিম্নের তাসবীহ পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন অংশীদার নেই, রাজতু ও প্রশংসা তারই এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর তাওফীক ছাড়া গুনাহ হতে বেঁচে থাকার ও আল্লাহর ইবাদতে লেগে থাকার ক্ষমতা কারো নেই। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, আমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করি। নিয়ামত, অনুগ্রহ এবং উত্তম প্রশংসা তাঁরই। আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। আল্লাহর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে আমরা শুধু তাকেই ডাকি, যদিও কাফিররা এটা অপছন্দ করে।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলতেন যে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে এটা পাঠ করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে রয়েছে এবং এটা ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট দু'আ করো এবং ককূল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস রেখো এবং জেনে রেখো যে, উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দু'আ আল্লাহ কবূল করেন না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
গাফির 40:13
১০-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন তারা আগুনের কূপে থাকবে এবং আল্লাহর আযাব দেখে নিবে এবং যেসব শাস্তি হবে সবই চোখের সামনে থাকবে, তখন তারা নিজেদের প্রাণের শত্রু হয়ে যাবে এবং কঠিন শত্রু হবে। কেননা, নিজেদের মন্দ কর্মের কারণে তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। ঐ সময় ফেরেশতারা তাদেরকে উচ্চ কণ্ঠে বলবেনঃ আজ তোমাদের নিজেদের প্রতি তোমাদের ক্ষোভ অপেক্ষা দুনিয়ায় তোমাদের উপর আল্লাহর অপ্রসন্নতা ছিল অধিক, যখন তোমাদেরকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করা হয়েছিল আর তোমরা তা অস্বীকার করেছিলে। মহান আল্লাহর ... (আরবী)-এই উক্তিটি তাঁর নিম্নের উক্তিটির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিরূপে আল্লাহকে অস্বীকার কর? অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন, তিনি তোমাদেরকে জীবন্ত করেছেন, আবার তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন ও পুনরায় জীবন্ত করবেন, পরিণামে তার দিকেই তোমরা ফিরে যাবে।” (২:২৮) সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে দুনিয়ায় একবার মৃত্যু দান করা হয়, তারপর কবরে একবার জীবিত করা হয়, এরপর সওয়াল-জবাব শেষ করে আবার মৃত্যু ঘটান হয় এবং কিয়ামতের দিন পুনরায় জীবিত করা হবে। দুইবার মৃত্যু দান ও দুইবার জীবন দানের অর্থ এটাই। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে অঙ্গীকার গ্রহণের দিন জীবিত করা হয়, এরপর মায়ের পেটের মধ্যে রূহ ফুকে দেয়া হয়, তারপর মৃত্যু দান করা হয় এবং এরপর কিয়ামতের দিন আবার জীবন দান করা হবে। কিন্তু এ উক্তি দু’টি ঠিক নয়। কেননা, এটা অর্থ হলে তিনবার মৃত্যু দান ও তিনবার জীবন দান অপরিহার্য হচ্ছে, অথচ আয়াতে দু’বার মৃত্যু দান ও দু’বার জীবন দানের উল্লেখ রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং তাঁদের সঙ্গী সাথীদের উক্তিটিই সঠিক। অর্থাৎ মায়ের পেট হতে ভূমিষ্ট হওয়া একটি জীবন ও কিয়ামতের দিনের জীবন হলো দ্বিতীয় জীবন। আর দুনিয়ায় সৃষ্ট হওয়ার পূর্বের অবস্থা হলো একটি মৃত্যু এবং দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ হচ্ছে আর একটি মৃত্যু। আয়াতে এ দুই মত্য ও এ দুই জীবনই উদ্দেশ্য। ঐ দিন কাফিররা কিয়ামতের মাঠে আল্লাহ তা'আলার নিকট আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করবে যে, তাঁদেরকে যদি আর একবার দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হতো! যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে অধোবদন হয়ে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম; এখন আপনি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করুন, আমরা সকার্য করবো, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।” (৩২:১২) কিন্তু তাদের এ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করা হবে না। অতঃপর যখন তারা জাহান্নাম এবং ওর আগুন দেখবে এবং তাদেরকে জাহান্নামের ধারে পৌছিয়ে দেয়া হবে তখন দ্বিতীয়বার তারা ঐ আবেদন করবে এবং প্রথমবারের চেয়ে বেশী জোর দিয়ে বলবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন তাদেরকে জাহান্নামের পার্শ্বে দাড় করানো হবে তখন তারা বলবেঃ যদি আমাদেরকে দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়া হতো তাহলে আমরা আমাদের প্রতিপালকের আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করতাম না এবং আমরা ঈমানদার হতাম! বরং ইতিপূর্বে তারা যা গোপন করতো তা তাদের জন্যে প্রকাশ হয়ে পড়েছে, যদি তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবে আবার তারা ওটাই করবে যা হতে তাদেরকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।” (৬:২৭-২৮)এর পরে যখন তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে দেয়া হবে এবং তাদের আযাব শুরু হয়ে যাবে তখন তারা আরো জোর ভাষায় এই আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ করবে। ঐ সময় তারা অত্যন্ত চীৎকার করে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! এখান হতে আমাদেরকে বের করে নিন, আমরা ভাল কাজ করবো, ঐ কাজ করবো না যা ইতিপূর্বে করতাম। (উত্তরে বলা হবেঃ) আমি কি তোমাদেরকে এমন বয়স দেইনি যে, যে উপদেশ গ্রহণের ইচ্ছা করতো সে উপদেশ গ্রহণ করতে পারতো? আর তোমাদের কাছে তো সতর্ককারী এসেছিল? সুতরাং তোমরা (শাস্তির) স্বাদ গ্রহণ কর, যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” (৩৫:৩৭) তারা আরো বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এখান হতে বের করে নিন, এর পরেও যদি আমরা ঐ কাজই করি তবে তো আমরা নিশ্চিতরূপে যালিম হিসেবে পরিগণিত হবো। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ দূর হয়ে যাও, এর মধ্যেই তোমরা পড়ে থাকে এবং আমার সাথে কথা বলো না।" (২৩:১০৭-১০৮) এই আয়াতে ঐ লোকগুলো নিজেদের প্রশ্নের বা আবেদনের পূর্বে একটি মুকদ্দমা কায়েম করে আবেদনের মধ্যে এই ধরনের নমনীয়তা সৃষ্টি করেছে। তারা আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক শক্তির বর্ণনা দিয়েছে যে, তারা মৃত ছিল, তিনি তাদেরকে জীবন দান করেছিলেন। তারপর আবার তাদের মৃত্যু ঘটিয়েছিলেন এবং পুনরায় জীবন দান করেছেন। সুতরাং আল্লাহ সব কিছুর উপরই পূর্ণ। ক্ষমতাবান। তিনি যা চান তাই করতে পারেন। তাই তারা বলেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের পাপ ও অপরাধ স্বীকার করছি। নিশ্চয়ই আমরা নিজেদের উপর যুলুম করেছি ও সীমালংঘন করেছি। এখন আমাদের পরিত্রাণের কোন উপায় আছে কি? অর্থাৎ আপনি আমাদের পরিত্রাণের উপায় বের করে দিন এবং আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যার ক্ষমতা আপনার রয়েছে। এবার দুনিয়ায় গিয়ে আমরা ভাল কাজ করবো এবং এটা হবে আমাদের পূর্বের কৃতকর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত। এবার দুনিয়ায় গিয়েও যদি আমরা পূর্বের কর্মের পুনরাবৃত্তি করি তবে তো আমরা অবশ্যই যালিম বলে গণ্য হবো।” তাদেরকে জবাবে বলা হবেঃ “এখন দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার কোন পথ নেই। কেননা, যদি তোমাদেরকে আবার ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবুও তোমরা পূর্বে যা করতে তাই করবে। তোমরা আসলে নিজেদের অন্তর বক্র করে ফেলেছে। এখনো তোমরা সত্যকে কবুল করবে না, বরং বিপরীতই করবে। তোমাদের অবস্থা তো এই ছিল যে, যখন এক আল্লাহকে ডাকা হতো তখন তোমরা তাঁকে অস্বীকার করতে এবং আল্লাহর শরীক স্থাপন করা হলে তোমরা তা বিশ্বাস করতে। এই অবস্থাই তোমাদের পুনরায় হবে। দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় গেলে তোমরা পুনরায় এই কাজই করবে। সুতরাং প্রকৃত হাকিম যার হুকুমে কোন প্রকারের। যুলুম নেই, বরং যার ফায়সালায় ন্যায় ও ইনসাফই রয়েছে তিনিই আল্লাহ। তিনি যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। যার উপর। ইচ্ছা তিনি রহম করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করেন। তার ফায়সালা ও ইনসাফের ব্যাপারে তার কোন শরীক নেই। ঐ আল্লাহ স্বীয় ক্ষমতা লোকদের উপর প্রকাশ করে থাকেন। যমীন ও আসমানে তাঁর তাওহীদের অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। যার দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সবারই সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা একমাত্র তিনিই। তিনি আকাশ হতে রূযী অর্থাৎ বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন যার দ্বারা সর্বপ্রকারের শস্য, নানা প্রকারের উত্তম স্বাদের, বিভিন্ন রং-এর এবং নানা আকারের ফল-ফুল উৎপন্ন হয়ে থাকে। অথচ পানিও এক এবং যমীনও এক। সুতরাং এর দ্বারা মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়। সত্য তো এই যে, শিক্ষা ও উপদেশ এবং চিন্তা ও গবেষণার তাওফীক শুধু সেই লাভ করে যে আল্লাহ তা'আলার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। মহান আল্লাহ বলেনঃ সুতরাং আল্লাহকে ডাকো তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে, যদিও কাফিররা এটা অপছন্দ করে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) প্রত্যেক ফরয নামাযের সালামের পরে নিম্নের তাসবীহ পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন অংশীদার নেই, রাজতু ও প্রশংসা তারই এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর তাওফীক ছাড়া গুনাহ হতে বেঁচে থাকার ও আল্লাহর ইবাদতে লেগে থাকার ক্ষমতা কারো নেই। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, আমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করি। নিয়ামত, অনুগ্রহ এবং উত্তম প্রশংসা তাঁরই। আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। আল্লাহর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে আমরা শুধু তাকেই ডাকি, যদিও কাফিররা এটা অপছন্দ করে।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলতেন যে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে এটা পাঠ করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে রয়েছে এবং এটা ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট দু'আ করো এবং ককূল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস রেখো এবং জেনে রেখো যে, উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দু'আ আল্লাহ কবূল করেন না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
গাফির 40:14
১০-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন যখন তারা আগুনের কূপে থাকবে এবং আল্লাহর আযাব দেখে নিবে এবং যেসব শাস্তি হবে সবই চোখের সামনে থাকবে, তখন তারা নিজেদের প্রাণের শত্রু হয়ে যাবে এবং কঠিন শত্রু হবে। কেননা, নিজেদের মন্দ কর্মের কারণে তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হচ্ছে। ঐ সময় ফেরেশতারা তাদেরকে উচ্চ কণ্ঠে বলবেনঃ আজ তোমাদের নিজেদের প্রতি তোমাদের ক্ষোভ অপেক্ষা দুনিয়ায় তোমাদের উপর আল্লাহর অপ্রসন্নতা ছিল অধিক, যখন তোমাদেরকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করা হয়েছিল আর তোমরা তা অস্বীকার করেছিলে। মহান আল্লাহর ... (আরবী)-এই উক্তিটি তাঁর নিম্নের উক্তিটির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিরূপে আল্লাহকে অস্বীকার কর? অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন, তিনি তোমাদেরকে জীবন্ত করেছেন, আবার তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন ও পুনরায় জীবন্ত করবেন, পরিণামে তার দিকেই তোমরা ফিরে যাবে।” (২:২৮) সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে দুনিয়ায় একবার মৃত্যু দান করা হয়, তারপর কবরে একবার জীবিত করা হয়, এরপর সওয়াল-জবাব শেষ করে আবার মৃত্যু ঘটান হয় এবং কিয়ামতের দিন পুনরায় জীবিত করা হবে। দুইবার মৃত্যু দান ও দুইবার জীবন দানের অর্থ এটাই। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে অঙ্গীকার গ্রহণের দিন জীবিত করা হয়, এরপর মায়ের পেটের মধ্যে রূহ ফুকে দেয়া হয়, তারপর মৃত্যু দান করা হয় এবং এরপর কিয়ামতের দিন আবার জীবন দান করা হবে। কিন্তু এ উক্তি দু’টি ঠিক নয়। কেননা, এটা অর্থ হলে তিনবার মৃত্যু দান ও তিনবার জীবন দান অপরিহার্য হচ্ছে, অথচ আয়াতে দু’বার মৃত্যু দান ও দু’বার জীবন দানের উল্লেখ রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং তাঁদের সঙ্গী সাথীদের উক্তিটিই সঠিক। অর্থাৎ মায়ের পেট হতে ভূমিষ্ট হওয়া একটি জীবন ও কিয়ামতের দিনের জীবন হলো দ্বিতীয় জীবন। আর দুনিয়ায় সৃষ্ট হওয়ার পূর্বের অবস্থা হলো একটি মৃত্যু এবং দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ হচ্ছে আর একটি মৃত্যু। আয়াতে এ দুই মত্য ও এ দুই জীবনই উদ্দেশ্য। ঐ দিন কাফিররা কিয়ামতের মাঠে আল্লাহ তা'আলার নিকট আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করবে যে, তাঁদেরকে যদি আর একবার দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হতো! যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে অধোবদন হয়ে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম; এখন আপনি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করুন, আমরা সকার্য করবো, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।” (৩২:১২) কিন্তু তাদের এ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করা হবে না। অতঃপর যখন তারা জাহান্নাম এবং ওর আগুন দেখবে এবং তাদেরকে জাহান্নামের ধারে পৌছিয়ে দেয়া হবে তখন দ্বিতীয়বার তারা ঐ আবেদন করবে এবং প্রথমবারের চেয়ে বেশী জোর দিয়ে বলবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন তাদেরকে জাহান্নামের পার্শ্বে দাড় করানো হবে তখন তারা বলবেঃ যদি আমাদেরকে দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেয়া হতো তাহলে আমরা আমাদের প্রতিপালকের আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করতাম না এবং আমরা ঈমানদার হতাম! বরং ইতিপূর্বে তারা যা গোপন করতো তা তাদের জন্যে প্রকাশ হয়ে পড়েছে, যদি তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবে আবার তারা ওটাই করবে যা হতে তাদেরকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।” (৬:২৭-২৮)এর পরে যখন তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে দেয়া হবে এবং তাদের আযাব শুরু হয়ে যাবে তখন তারা আরো জোর ভাষায় এই আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ করবে। ঐ সময় তারা অত্যন্ত চীৎকার করে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! এখান হতে আমাদেরকে বের করে নিন, আমরা ভাল কাজ করবো, ঐ কাজ করবো না যা ইতিপূর্বে করতাম। (উত্তরে বলা হবেঃ) আমি কি তোমাদেরকে এমন বয়স দেইনি যে, যে উপদেশ গ্রহণের ইচ্ছা করতো সে উপদেশ গ্রহণ করতে পারতো? আর তোমাদের কাছে তো সতর্ককারী এসেছিল? সুতরাং তোমরা (শাস্তির) স্বাদ গ্রহণ কর, যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” (৩৫:৩৭) তারা আরো বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এখান হতে বের করে নিন, এর পরেও যদি আমরা ঐ কাজই করি তবে তো আমরা নিশ্চিতরূপে যালিম হিসেবে পরিগণিত হবো। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ দূর হয়ে যাও, এর মধ্যেই তোমরা পড়ে থাকে এবং আমার সাথে কথা বলো না।" (২৩:১০৭-১০৮) এই আয়াতে ঐ লোকগুলো নিজেদের প্রশ্নের বা আবেদনের পূর্বে একটি মুকদ্দমা কায়েম করে আবেদনের মধ্যে এই ধরনের নমনীয়তা সৃষ্টি করেছে। তারা আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক শক্তির বর্ণনা দিয়েছে যে, তারা মৃত ছিল, তিনি তাদেরকে জীবন দান করেছিলেন। তারপর আবার তাদের মৃত্যু ঘটিয়েছিলেন এবং পুনরায় জীবন দান করেছেন। সুতরাং আল্লাহ সব কিছুর উপরই পূর্ণ। ক্ষমতাবান। তিনি যা চান তাই করতে পারেন। তাই তারা বলেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের পাপ ও অপরাধ স্বীকার করছি। নিশ্চয়ই আমরা নিজেদের উপর যুলুম করেছি ও সীমালংঘন করেছি। এখন আমাদের পরিত্রাণের কোন উপায় আছে কি? অর্থাৎ আপনি আমাদের পরিত্রাণের উপায় বের করে দিন এবং আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যার ক্ষমতা আপনার রয়েছে। এবার দুনিয়ায় গিয়ে আমরা ভাল কাজ করবো এবং এটা হবে আমাদের পূর্বের কৃতকর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত। এবার দুনিয়ায় গিয়েও যদি আমরা পূর্বের কর্মের পুনরাবৃত্তি করি তবে তো আমরা অবশ্যই যালিম বলে গণ্য হবো।” তাদেরকে জবাবে বলা হবেঃ “এখন দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার কোন পথ নেই। কেননা, যদি তোমাদেরকে আবার ফিরিয়ে দেয়াও হয় তবুও তোমরা পূর্বে যা করতে তাই করবে। তোমরা আসলে নিজেদের অন্তর বক্র করে ফেলেছে। এখনো তোমরা সত্যকে কবুল করবে না, বরং বিপরীতই করবে। তোমাদের অবস্থা তো এই ছিল যে, যখন এক আল্লাহকে ডাকা হতো তখন তোমরা তাঁকে অস্বীকার করতে এবং আল্লাহর শরীক স্থাপন করা হলে তোমরা তা বিশ্বাস করতে। এই অবস্থাই তোমাদের পুনরায় হবে। দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় গেলে তোমরা পুনরায় এই কাজই করবে। সুতরাং প্রকৃত হাকিম যার হুকুমে কোন প্রকারের। যুলুম নেই, বরং যার ফায়সালায় ন্যায় ও ইনসাফই রয়েছে তিনিই আল্লাহ। তিনি যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। যার উপর। ইচ্ছা তিনি রহম করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করেন। তার ফায়সালা ও ইনসাফের ব্যাপারে তার কোন শরীক নেই। ঐ আল্লাহ স্বীয় ক্ষমতা লোকদের উপর প্রকাশ করে থাকেন। যমীন ও আসমানে তাঁর তাওহীদের অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। যার দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সবারই সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা একমাত্র তিনিই। তিনি আকাশ হতে রূযী অর্থাৎ বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন যার দ্বারা সর্বপ্রকারের শস্য, নানা প্রকারের উত্তম স্বাদের, বিভিন্ন রং-এর এবং নানা আকারের ফল-ফুল উৎপন্ন হয়ে থাকে। অথচ পানিও এক এবং যমীনও এক। সুতরাং এর দ্বারা মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়। সত্য তো এই যে, শিক্ষা ও উপদেশ এবং চিন্তা ও গবেষণার তাওফীক শুধু সেই লাভ করে যে আল্লাহ তা'আলার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। মহান আল্লাহ বলেনঃ সুতরাং আল্লাহকে ডাকো তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে, যদিও কাফিররা এটা অপছন্দ করে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) প্রত্যেক ফরয নামাযের সালামের পরে নিম্নের তাসবীহ পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন অংশীদার নেই, রাজতু ও প্রশংসা তারই এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর তাওফীক ছাড়া গুনাহ হতে বেঁচে থাকার ও আল্লাহর ইবাদতে লেগে থাকার ক্ষমতা কারো নেই। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, আমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করি। নিয়ামত, অনুগ্রহ এবং উত্তম প্রশংসা তাঁরই। আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। আল্লাহর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে আমরা শুধু তাকেই ডাকি, যদিও কাফিররা এটা অপছন্দ করে।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলতেন যে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে এটা পাঠ করতেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে রয়েছে এবং এটা ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর নিকট দু'আ করো এবং ককূল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস রেখো এবং জেনে রেখো যে, উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দু'আ আল্লাহ কবূল করেন না।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
গাফির 40:15
১৫-১৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গৌরব, শ্রেষ্ঠত্ব এবং নিজের আরশের বড়ত্ব ও প্রশস্ততার বর্ণনা দিচ্ছেন যা সমস্ত মাখলুককে ছাদের মত আচ্ছাদন করে রয়েছে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(এই শাস্তি আসবে) আল্লাহর পক্ষ হতে, যিনি সমুচ্চ মর্যাদার অধিকারী। ফেরেশতা এবং রূহ আল্লাহর দিকে ঊর্ধ্বগামী হয় এমন এক দিনে যা পার্থিব পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান।” (৭০:৩-৪) এর বর্ণনা ইনশাআল্লাহ সামনে আসবে যে, এই দূরত্ব হলো সাত আসমান ও যমীন হতে নিয়ে আরশ পর্যন্ত স্থানের। যেমন পূর্বযুগীয় ও পরযুগীয় মনীষীদের একটি দলের উক্তি এটাই এবং সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত এটাই বটে।বহু তাফসীরকার হতে বর্ণিত আছে যে, আরশ রক্তিম বর্ণের মণি-মাণিক্য দ্বারা নির্মিত। যার দু'টি প্রান্তের প্রশস্ততা পঞ্চাশ হাজার বছরের পথের দূরত্বের সমান। আর যার উচ্চতা সপ্তম যমীন হতে পঞ্চাশ হাজার বছরের পথ। ইতিপূর্বে যে হাদীসে ফেরেশতাদের আরশ বহন করার কথা বর্ণিত হয়েছে তাতে এও রয়েছে যে, ওটা সপ্ত আকাশ হতেও উঁচু।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা অহী প্রেরণ করেন। যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি ফেরেশতাদেরকে অহীসহ স্বীয় নির্দেশে স্বীয় বান্দাদের মধ্যে। যাদের নিকট ইচ্ছা প্রেরণ করেন (এই বলে) যে, তোমরা তাদেরকে (আমার ব্যাপারে) সতর্ক করে দাও যে, আমি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমাকেই ভয় কর।” (১৬:২) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ হতে অবতারিত। এটা নিয়ে বিশ্বস্ত আত্মা (জিবরাঈল আঃ) অবতরণ করে এবং তা তোমার (মুহাম্মাদ সঃ) অন্তরে অবতীর্ণ করে যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।” (২৬:১৯২-১৯৪) এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানে বলেনঃ যাতে সে সতর্ক করতে পারে কিয়ামত দিবস সম্পর্কে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) কিয়ামতের নামসমূহের মধ্যে একটি নাম, যা হতে আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে ভয় প্রদর্শন করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একথাও বলেন যে, এই দিনে হযরত আদম (আঃ) এবং তাঁর সর্বশেষ সন্তানেরও মিলন ঘটবে। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, বান্দা আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে মিলিত হবে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আসমানবাসী ও যমীনবাসী পরস্পর মিলিত হবে। সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টজীবের মধ্যে মিলন ঘটবে। মায়মূন ইবনে মাহরান (রঃ) বলেন যে, অত্যাচারী ও অত্যাচারিতের মধ্যে মিলন হবে। ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেকেই অন্যের সঙ্গে মিলিত হবে। এমনকি আমলকারীর সাথে তার আমল মিলিত হবে, যেমন অন্যান্য গুরুজন বলেছেন।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট তাদের কিছুই গোপন থাকবে না। অর্থাৎ সবাই আল্লাহ তা'আলার সামনে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা হতে কিছুই তাদেরকে গোপন রাখতে পারবে না। এমন কি কোন ছায়ার স্থানও থাকবে না। ঐ দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আজ রাজত্ব ও কর্তৃত্ব কার?" সেই দিন কার এমন ক্ষমতা হবে যে, তাঁর এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারে? সুতরাং নিজেই তার এই প্রশ্নের জবাবে বলবেনঃ “আজ কর্তৃত্ব ও রাজত্ব হলো এক, পরাক্রমশালী আল্লাহরই।” এ হাদীস গত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে জড়িয়ে নিয়ে স্বীয় দক্ষিণ হস্তে রাখবেন এবং বলবেনঃ “(আজ) আমিই বাদশাহ, আমিই গর্বকারী। দুনিয়ার বাদশাহ, প্রতাপশালী ও অহংকারীরা আজ কোথায়?”শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হাদীসে রয়েছে যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টজীবের রূহ কবয করে নিবেন এবং ঐ এক অংশীবিহীন আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জীবিত থাকবে না। ঐ সময় তিনি তিনবার বলবেনঃ “আজ রাজত্ব কার?” অতঃপর তিনি নিজেই জবাব দিবেনঃ “আজ রাজত্ব ও কর্তৃত্ব এক পরাক্রমশালী আল্লাহরই।” অর্থাৎ আজ ঐ আল্লাহর কর্তৃত্ব যিনি এক, সর্ববিজয়ী এবং যার হাতে রয়েছে সব কিছুরই আধিপত্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় একজন ঘোষক ঘোষণা করবেনঃ “হে লোক সকল! কিয়ামত এসে গেছে। এ ঘোষণা জীবিত ও মৃত সবাই শুনবে। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আকাশের উপর অবতরণ করবেন এবং বলবেনঃ “আজ কর্তৃত্ব কার?” অতঃপর তিনি নিজেই জবাব দিবেনঃ “(আজ কতৃত্ব) এক, পরাক্রমশালী আল্লাহরই।”এরপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় ন্যায় ও ইনসাফের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, আজ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের ফল দেয়া হবে; আজ কারো প্রতি যুলুম করা হবে না। অর্থাৎ “আজ আল্লাহ তা'আলা কারো প্রতি অণু পরিমাণও যুলুম করবেন না। এমন কি পুণ্যগুলো দশগুণ করে বাড়িয়ে দেয়া হবে, আর পাপরাশি ঠিকই রেখে দেয়া হবে, তিল পরিমাণও বেশী করা হবে না। যেমন হযরত আবু যার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “হে আমার বান্দারা! নিশ্চয়ই আমি আমার নিজের উপর যুলুমকে হারাম করে দিয়েছি (অর্থাৎ আমি বান্দার উপর যুলুম করাকে নিজের উপর হারাম করে দিয়েছি)। সুতরাং তোমাদের কেউ যেন কারো উপর যুলুম না করে। শেষের দিকে রয়েছেঃ “হে আমার বান্দাগণ! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের আমলগুলো গণে গণে রাখছি (অর্থাৎ তোমাদের আমলগুলোর উপর পূর্ণভাবে দৃষ্টি রাখছি), আমি এগুলোর পূর্ণ প্রতিফল প্রদান করবো। সুতরাং যে ব্যক্তি কল্যাণ পাবে সে যেন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার প্রশংসা করে। আর যে ব্যক্তি এটা ছাড়া অন্য কিছু পাবে সে যেন নিজেকেই ভৎসনা করে (কেননা ওটা তার নিজেরই কৃতকর্মের ফল)।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর মহান আল্লাহ তাড়াতাড়ি হিসাব গ্রহণের বর্ণনা দিচ্ছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর। সমস্ত সৃষ্টজীবের হিসাব গ্রহণ তাঁর কাছে একজনের হিসাব গ্রহণের মতই সহজ। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের সকলকে সৃষ্টি করা এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা আমার নিকট একটি লোককে সৃষ্টি করা এবং তার মৃত্যুর পর তাকে পুনর্জীবিত করার মতই (সহজ)।” (৩১:২৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার হুকুমের সাথে সাথেই কাজ হয়ে যায়, যেমন কেউ চক্ষু বন্ধ করেই খুলে দেয় (এটুকু সময় লাগে মাত্র)।” (৫৪:৫০)
গাফির 40:16
১৫-১৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গৌরব, শ্রেষ্ঠত্ব এবং নিজের আরশের বড়ত্ব ও প্রশস্ততার বর্ণনা দিচ্ছেন যা সমস্ত মাখলুককে ছাদের মত আচ্ছাদন করে রয়েছে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(এই শাস্তি আসবে) আল্লাহর পক্ষ হতে, যিনি সমুচ্চ মর্যাদার অধিকারী। ফেরেশতা এবং রূহ আল্লাহর দিকে ঊর্ধ্বগামী হয় এমন এক দিনে যা পার্থিব পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান।” (৭০:৩-৪) এর বর্ণনা ইনশাআল্লাহ সামনে আসবে যে, এই দূরত্ব হলো সাত আসমান ও যমীন হতে নিয়ে আরশ পর্যন্ত স্থানের। যেমন পূর্বযুগীয় ও পরযুগীয় মনীষীদের একটি দলের উক্তি এটাই এবং সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত এটাই বটে।বহু তাফসীরকার হতে বর্ণিত আছে যে, আরশ রক্তিম বর্ণের মণি-মাণিক্য দ্বারা নির্মিত। যার দু'টি প্রান্তের প্রশস্ততা পঞ্চাশ হাজার বছরের পথের দূরত্বের সমান। আর যার উচ্চতা সপ্তম যমীন হতে পঞ্চাশ হাজার বছরের পথ। ইতিপূর্বে যে হাদীসে ফেরেশতাদের আরশ বহন করার কথা বর্ণিত হয়েছে তাতে এও রয়েছে যে, ওটা সপ্ত আকাশ হতেও উঁচু।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা অহী প্রেরণ করেন। যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি ফেরেশতাদেরকে অহীসহ স্বীয় নির্দেশে স্বীয় বান্দাদের মধ্যে। যাদের নিকট ইচ্ছা প্রেরণ করেন (এই বলে) যে, তোমরা তাদেরকে (আমার ব্যাপারে) সতর্ক করে দাও যে, আমি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমাকেই ভয় কর।” (১৬:২) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ হতে অবতারিত। এটা নিয়ে বিশ্বস্ত আত্মা (জিবরাঈল আঃ) অবতরণ করে এবং তা তোমার (মুহাম্মাদ সঃ) অন্তরে অবতীর্ণ করে যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।” (২৬:১৯২-১৯৪) এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানে বলেনঃ যাতে সে সতর্ক করতে পারে কিয়ামত দিবস সম্পর্কে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) কিয়ামতের নামসমূহের মধ্যে একটি নাম, যা হতে আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে ভয় প্রদর্শন করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একথাও বলেন যে, এই দিনে হযরত আদম (আঃ) এবং তাঁর সর্বশেষ সন্তানেরও মিলন ঘটবে। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, বান্দা আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে মিলিত হবে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আসমানবাসী ও যমীনবাসী পরস্পর মিলিত হবে। সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টজীবের মধ্যে মিলন ঘটবে। মায়মূন ইবনে মাহরান (রঃ) বলেন যে, অত্যাচারী ও অত্যাচারিতের মধ্যে মিলন হবে। ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেকেই অন্যের সঙ্গে মিলিত হবে। এমনকি আমলকারীর সাথে তার আমল মিলিত হবে, যেমন অন্যান্য গুরুজন বলেছেন।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট তাদের কিছুই গোপন থাকবে না। অর্থাৎ সবাই আল্লাহ তা'আলার সামনে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা হতে কিছুই তাদেরকে গোপন রাখতে পারবে না। এমন কি কোন ছায়ার স্থানও থাকবে না। ঐ দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আজ রাজত্ব ও কর্তৃত্ব কার?" সেই দিন কার এমন ক্ষমতা হবে যে, তাঁর এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারে? সুতরাং নিজেই তার এই প্রশ্নের জবাবে বলবেনঃ “আজ কর্তৃত্ব ও রাজত্ব হলো এক, পরাক্রমশালী আল্লাহরই।” এ হাদীস গত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে জড়িয়ে নিয়ে স্বীয় দক্ষিণ হস্তে রাখবেন এবং বলবেনঃ “(আজ) আমিই বাদশাহ, আমিই গর্বকারী। দুনিয়ার বাদশাহ, প্রতাপশালী ও অহংকারীরা আজ কোথায়?”শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হাদীসে রয়েছে যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টজীবের রূহ কবয করে নিবেন এবং ঐ এক অংশীবিহীন আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জীবিত থাকবে না। ঐ সময় তিনি তিনবার বলবেনঃ “আজ রাজত্ব কার?” অতঃপর তিনি নিজেই জবাব দিবেনঃ “আজ রাজত্ব ও কর্তৃত্ব এক পরাক্রমশালী আল্লাহরই।” অর্থাৎ আজ ঐ আল্লাহর কর্তৃত্ব যিনি এক, সর্ববিজয়ী এবং যার হাতে রয়েছে সব কিছুরই আধিপত্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় একজন ঘোষক ঘোষণা করবেনঃ “হে লোক সকল! কিয়ামত এসে গেছে। এ ঘোষণা জীবিত ও মৃত সবাই শুনবে। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আকাশের উপর অবতরণ করবেন এবং বলবেনঃ “আজ কর্তৃত্ব কার?” অতঃপর তিনি নিজেই জবাব দিবেনঃ “(আজ কতৃত্ব) এক, পরাক্রমশালী আল্লাহরই।”এরপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় ন্যায় ও ইনসাফের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, আজ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের ফল দেয়া হবে; আজ কারো প্রতি যুলুম করা হবে না। অর্থাৎ “আজ আল্লাহ তা'আলা কারো প্রতি অণু পরিমাণও যুলুম করবেন না। এমন কি পুণ্যগুলো দশগুণ করে বাড়িয়ে দেয়া হবে, আর পাপরাশি ঠিকই রেখে দেয়া হবে, তিল পরিমাণও বেশী করা হবে না। যেমন হযরত আবু যার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “হে আমার বান্দারা! নিশ্চয়ই আমি আমার নিজের উপর যুলুমকে হারাম করে দিয়েছি (অর্থাৎ আমি বান্দার উপর যুলুম করাকে নিজের উপর হারাম করে দিয়েছি)। সুতরাং তোমাদের কেউ যেন কারো উপর যুলুম না করে। শেষের দিকে রয়েছেঃ “হে আমার বান্দাগণ! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের আমলগুলো গণে গণে রাখছি (অর্থাৎ তোমাদের আমলগুলোর উপর পূর্ণভাবে দৃষ্টি রাখছি), আমি এগুলোর পূর্ণ প্রতিফল প্রদান করবো। সুতরাং যে ব্যক্তি কল্যাণ পাবে সে যেন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার প্রশংসা করে। আর যে ব্যক্তি এটা ছাড়া অন্য কিছু পাবে সে যেন নিজেকেই ভৎসনা করে (কেননা ওটা তার নিজেরই কৃতকর্মের ফল)।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর মহান আল্লাহ তাড়াতাড়ি হিসাব গ্রহণের বর্ণনা দিচ্ছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর। সমস্ত সৃষ্টজীবের হিসাব গ্রহণ তাঁর কাছে একজনের হিসাব গ্রহণের মতই সহজ। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের সকলকে সৃষ্টি করা এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা আমার নিকট একটি লোককে সৃষ্টি করা এবং তার মৃত্যুর পর তাকে পুনর্জীবিত করার মতই (সহজ)।” (৩১:২৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার হুকুমের সাথে সাথেই কাজ হয়ে যায়, যেমন কেউ চক্ষু বন্ধ করেই খুলে দেয় (এটুকু সময় লাগে মাত্র)।” (৫৪:৫০)
গাফির 40:17
১৫-১৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গৌরব, শ্রেষ্ঠত্ব এবং নিজের আরশের বড়ত্ব ও প্রশস্ততার বর্ণনা দিচ্ছেন যা সমস্ত মাখলুককে ছাদের মত আচ্ছাদন করে রয়েছে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(এই শাস্তি আসবে) আল্লাহর পক্ষ হতে, যিনি সমুচ্চ মর্যাদার অধিকারী। ফেরেশতা এবং রূহ আল্লাহর দিকে ঊর্ধ্বগামী হয় এমন এক দিনে যা পার্থিব পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান।” (৭০:৩-৪) এর বর্ণনা ইনশাআল্লাহ সামনে আসবে যে, এই দূরত্ব হলো সাত আসমান ও যমীন হতে নিয়ে আরশ পর্যন্ত স্থানের। যেমন পূর্বযুগীয় ও পরযুগীয় মনীষীদের একটি দলের উক্তি এটাই এবং সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত এটাই বটে।বহু তাফসীরকার হতে বর্ণিত আছে যে, আরশ রক্তিম বর্ণের মণি-মাণিক্য দ্বারা নির্মিত। যার দু'টি প্রান্তের প্রশস্ততা পঞ্চাশ হাজার বছরের পথের দূরত্বের সমান। আর যার উচ্চতা সপ্তম যমীন হতে পঞ্চাশ হাজার বছরের পথ। ইতিপূর্বে যে হাদীসে ফেরেশতাদের আরশ বহন করার কথা বর্ণিত হয়েছে তাতে এও রয়েছে যে, ওটা সপ্ত আকাশ হতেও উঁচু।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা অহী প্রেরণ করেন। যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি ফেরেশতাদেরকে অহীসহ স্বীয় নির্দেশে স্বীয় বান্দাদের মধ্যে। যাদের নিকট ইচ্ছা প্রেরণ করেন (এই বলে) যে, তোমরা তাদেরকে (আমার ব্যাপারে) সতর্ক করে দাও যে, আমি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমাকেই ভয় কর।” (১৬:২) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ হতে অবতারিত। এটা নিয়ে বিশ্বস্ত আত্মা (জিবরাঈল আঃ) অবতরণ করে এবং তা তোমার (মুহাম্মাদ সঃ) অন্তরে অবতীর্ণ করে যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।” (২৬:১৯২-১৯৪) এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানে বলেনঃ যাতে সে সতর্ক করতে পারে কিয়ামত দিবস সম্পর্কে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) কিয়ামতের নামসমূহের মধ্যে একটি নাম, যা হতে আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে ভয় প্রদর্শন করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একথাও বলেন যে, এই দিনে হযরত আদম (আঃ) এবং তাঁর সর্বশেষ সন্তানেরও মিলন ঘটবে। হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, বান্দা আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে মিলিত হবে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আসমানবাসী ও যমীনবাসী পরস্পর মিলিত হবে। সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টজীবের মধ্যে মিলন ঘটবে। মায়মূন ইবনে মাহরান (রঃ) বলেন যে, অত্যাচারী ও অত্যাচারিতের মধ্যে মিলন হবে। ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেকেই অন্যের সঙ্গে মিলিত হবে। এমনকি আমলকারীর সাথে তার আমল মিলিত হবে, যেমন অন্যান্য গুরুজন বলেছেন।মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন আল্লাহর নিকট তাদের কিছুই গোপন থাকবে না। অর্থাৎ সবাই আল্লাহ তা'আলার সামনে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা হতে কিছুই তাদেরকে গোপন রাখতে পারবে না। এমন কি কোন ছায়ার স্থানও থাকবে না। ঐ দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আজ রাজত্ব ও কর্তৃত্ব কার?" সেই দিন কার এমন ক্ষমতা হবে যে, তাঁর এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারে? সুতরাং নিজেই তার এই প্রশ্নের জবাবে বলবেনঃ “আজ কর্তৃত্ব ও রাজত্ব হলো এক, পরাক্রমশালী আল্লাহরই।” এ হাদীস গত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনকে জড়িয়ে নিয়ে স্বীয় দক্ষিণ হস্তে রাখবেন এবং বলবেনঃ “(আজ) আমিই বাদশাহ, আমিই গর্বকারী। দুনিয়ার বাদশাহ, প্রতাপশালী ও অহংকারীরা আজ কোথায়?”শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হাদীসে রয়েছে যে, মহামহিমান্বিত আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টজীবের রূহ কবয করে নিবেন এবং ঐ এক অংশীবিহীন আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জীবিত থাকবে না। ঐ সময় তিনি তিনবার বলবেনঃ “আজ রাজত্ব কার?” অতঃপর তিনি নিজেই জবাব দিবেনঃ “আজ রাজত্ব ও কর্তৃত্ব এক পরাক্রমশালী আল্লাহরই।” অর্থাৎ আজ ঐ আল্লাহর কর্তৃত্ব যিনি এক, সর্ববিজয়ী এবং যার হাতে রয়েছে সব কিছুরই আধিপত্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় একজন ঘোষক ঘোষণা করবেনঃ “হে লোক সকল! কিয়ামত এসে গেছে। এ ঘোষণা জীবিত ও মৃত সবাই শুনবে। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আকাশের উপর অবতরণ করবেন এবং বলবেনঃ “আজ কর্তৃত্ব কার?” অতঃপর তিনি নিজেই জবাব দিবেনঃ “(আজ কতৃত্ব) এক, পরাক্রমশালী আল্লাহরই।”এরপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় ন্যায় ও ইনসাফের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, আজ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের ফল দেয়া হবে; আজ কারো প্রতি যুলুম করা হবে না। অর্থাৎ “আজ আল্লাহ তা'আলা কারো প্রতি অণু পরিমাণও যুলুম করবেন না। এমন কি পুণ্যগুলো দশগুণ করে বাড়িয়ে দেয়া হবে, আর পাপরাশি ঠিকই রেখে দেয়া হবে, তিল পরিমাণও বেশী করা হবে না। যেমন হযরত আবু যার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “হে আমার বান্দারা! নিশ্চয়ই আমি আমার নিজের উপর যুলুমকে হারাম করে দিয়েছি (অর্থাৎ আমি বান্দার উপর যুলুম করাকে নিজের উপর হারাম করে দিয়েছি)। সুতরাং তোমাদের কেউ যেন কারো উপর যুলুম না করে। শেষের দিকে রয়েছেঃ “হে আমার বান্দাগণ! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের আমলগুলো গণে গণে রাখছি (অর্থাৎ তোমাদের আমলগুলোর উপর পূর্ণভাবে দৃষ্টি রাখছি), আমি এগুলোর পূর্ণ প্রতিফল প্রদান করবো। সুতরাং যে ব্যক্তি কল্যাণ পাবে সে যেন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার প্রশংসা করে। আর যে ব্যক্তি এটা ছাড়া অন্য কিছু পাবে সে যেন নিজেকেই ভৎসনা করে (কেননা ওটা তার নিজেরই কৃতকর্মের ফল)।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর মহান আল্লাহ তাড়াতাড়ি হিসাব গ্রহণের বর্ণনা দিচ্ছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর। সমস্ত সৃষ্টজীবের হিসাব গ্রহণ তাঁর কাছে একজনের হিসাব গ্রহণের মতই সহজ। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের সকলকে সৃষ্টি করা এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা আমার নিকট একটি লোককে সৃষ্টি করা এবং তার মৃত্যুর পর তাকে পুনর্জীবিত করার মতই (সহজ)।” (৩১:২৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার হুকুমের সাথে সাথেই কাজ হয়ে যায়, যেমন কেউ চক্ষু বন্ধ করেই খুলে দেয় (এটুকু সময় লাগে মাত্র)।” (৫৪:৫০)
গাফির 40:18
১৮-২০ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) কিয়ামতের একটি নাম। কেননা, কিয়ামত খুবই নিকটবর্তী। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন। আল্লাহ ছাড়া কেউই এটা ব্যক্ত করতে সক্ষম নয়।”(৫৩:৫৭-৫৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।” (৫৪:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মানুষের হিসাব নিকাশের সময় আসন্ন।"(২১:১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ আসবেই; সুতরাং এটা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না।” (১৬:১) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তারা ওটাকে নিকটবর্তী দেখবে তখন কাফিরদের চেহারা কালো হয়ে যাবে।” (৬৭:২৭) মোটকথা, নিকটবর্তী হওয়ার কারণে কিয়ামতের নাম (আরবী) হয়েছে।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন দুঃখ-কষ্টে তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ভয় ও সন্ত্রাসের কারণে তাদের কণ্ঠাগত প্রাণ হবে। সুতরাং তা বেরও হবে না এবং স্বস্থানে ফিরে যেতেও পারবে না। ইকরামা (রঃ) এবং সুদ্দীও (রঃ) একথাই বলেছেন। কারো মুখ দিয়ে কোন কথা সরবে না। সবাই থাকবে নীরব-নিস্তব্ধ। কার ক্ষমতা যে, মুখ খুলে! সবাই কাদতে থাকবে এবং হতবুদ্ধি অবস্থায় অবস্থান করবে। যারা আল্লাহর সঙ্গে শরীক স্থাপন করে নিজেদের উপর যুলুম করেছে তাদের সেই দিন কোন বন্ধু থাকবে না এবং তাদের দুঃখে কেউ সমবেদনা জানাবে না। তাদের জন্যে এমন কেউ সুপারিশকারী হবে না যার সুপারিশ কবূল করা হবে। সেই দিন মঙ্গল ও কল্যাণের উপায় উপকরণ সবই ছিন্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহর জ্ঞান সব কিছুকেই পরিবেষ্টন করে রয়েছে। ছোট-বড়, প্রকাশ্য-গোপনীয় এবং মোটা ও পাতলা সবই তার কাছে সমানভাবে প্রকাশমান। এমন ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী তিনি যে, তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নেই। তাকে প্রত্যেকেরই ভয় করা উচিত এবং কারো এ ধারণা করা উচিত নয় যে, কোন এক সময় সে তার থেকে গোপন রয়েছে এবং তার অবস্থা সম্পর্কে তিনি অবহিত নন। বরং সদা-সর্বদা তার এ বিশ্বাস রাখা উচিত যে, তিনি তাকে দেখছেন। তাঁর জ্ঞান তাকে ঘিরে রয়েছে। সুতরাং সব সময় তাঁকে স্মরণ রাখা। উচিত এবং তার নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকা একান্ত কর্তব্য। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ চক্ষুর অপব্যবহার এবং অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে আল্লাহ অবহিত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াতে ঐ ব্যক্তি উদ্দেশ্য যে হয়তো কোন বাড়ীতে গেল যেখানে কোন সুন্দরী মহিলা রয়েছে, কিংবা সে হয়তো যাতায়াত করে থাকে। তখন ঐ লোকটি কোন আড়াল হতে ঐ মহিলাটির দিকে তাকায় যেখানে তাকে কেউ দেখতে পায় না। তার দিকে যখনই কারো দৃষ্টি পড়ে তখনই সে মহিলাটির দিক হতে চক্ষু ফিরিয়ে নেয়। আবার যখন সুযোগ পায় তখন পুনরায় তার দিকে তাকায়। তাই মহান আল্লাহ বলেন যে, বিশ্বাসঘাতক চক্ষুর বিশ্বাসঘাতকতা এবং অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত। অর্থাৎ তার অন্তরে হয়তো এটা রয়েছে যে, সম্ভব হলে সে মহিলাটির গুপ্তাঙ্গও দেখে নিবে। তার এই গোপন ইচ্ছাও আল্লাহ তাআলার অজানা নয়। যহহাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলো চোখমারা, ইশারা করা এবং মানুষের বলাঃ “আমি দেখেছি।” অথচ সে দেখেনি এবং তার বলাঃ “আমি দেখিনি।” অথচ সে দেখেছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, দৃষ্টি যে নিয়তে নিক্ষেপ করা হয় তা আল্লাহ তাআলার কাছে উজ্জ্বল ও প্রকাশমান। আর অন্তরের মধ্যে এই লুক্কায়িত খেয়াল যে, যদি সুযোগ পায় এবং ক্ষমতা থাকে তবে নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজ হতে সে বিরত থাকবে কি থাকবে না এটাও তিনি জানেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, অন্তরের কুমন্ত্রণা সম্পর্কেও আল্লাহ পূর্ণ ওয়াকিফহাল।আল্লাহ তা'আলা সঠিকভাবে ও ন্যায়ের সাথে বিচার করে থাকেন। পুণ্যের বিনিময়ে পুরস্কার এবং পাপের বিনিময়ে শাস্তি দানে তিনি সক্ষম। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেন তিনি মন্দ লোকদেরকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি প্রদান করেন এবং সৎকর্মশীলদেরকে তাদের ভাল কাজের পুরস্কার প্রদান করেন।”(৫৩:৩১)আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, অর্থাৎ মূর্তি, প্রতিমা ইত্যাদি, তারা বিচার করতে অক্ষম। অর্থাৎ তারা কোন কিছুরই মালিক নয় এবং তাদের হুকুমত নেই, সুতরাং তারা বিচার ফায়সালা করবেই বা কি? আল্লাহ তাআলাই তাঁর সৃষ্টজীবের কথা শুনেন এবং তাদের অবস্থা দেখেন। যাকে ইচ্ছা তিনি পথ প্রদর্শন করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। এর মধ্যেও তার পুরোপুরি ন্যায় ও ইনসাফ বিদ্যমান রয়েছে।
গাফির 40:19
১৮-২০ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) কিয়ামতের একটি নাম। কেননা, কিয়ামত খুবই নিকটবর্তী। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন। আল্লাহ ছাড়া কেউই এটা ব্যক্ত করতে সক্ষম নয়।”(৫৩:৫৭-৫৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।” (৫৪:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মানুষের হিসাব নিকাশের সময় আসন্ন।"(২১:১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ আসবেই; সুতরাং এটা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না।” (১৬:১) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তারা ওটাকে নিকটবর্তী দেখবে তখন কাফিরদের চেহারা কালো হয়ে যাবে।” (৬৭:২৭) মোটকথা, নিকটবর্তী হওয়ার কারণে কিয়ামতের নাম (আরবী) হয়েছে।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন দুঃখ-কষ্টে তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ভয় ও সন্ত্রাসের কারণে তাদের কণ্ঠাগত প্রাণ হবে। সুতরাং তা বেরও হবে না এবং স্বস্থানে ফিরে যেতেও পারবে না। ইকরামা (রঃ) এবং সুদ্দীও (রঃ) একথাই বলেছেন। কারো মুখ দিয়ে কোন কথা সরবে না। সবাই থাকবে নীরব-নিস্তব্ধ। কার ক্ষমতা যে, মুখ খুলে! সবাই কাদতে থাকবে এবং হতবুদ্ধি অবস্থায় অবস্থান করবে। যারা আল্লাহর সঙ্গে শরীক স্থাপন করে নিজেদের উপর যুলুম করেছে তাদের সেই দিন কোন বন্ধু থাকবে না এবং তাদের দুঃখে কেউ সমবেদনা জানাবে না। তাদের জন্যে এমন কেউ সুপারিশকারী হবে না যার সুপারিশ কবূল করা হবে। সেই দিন মঙ্গল ও কল্যাণের উপায় উপকরণ সবই ছিন্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহর জ্ঞান সব কিছুকেই পরিবেষ্টন করে রয়েছে। ছোট-বড়, প্রকাশ্য-গোপনীয় এবং মোটা ও পাতলা সবই তার কাছে সমানভাবে প্রকাশমান। এমন ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী তিনি যে, তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নেই। তাকে প্রত্যেকেরই ভয় করা উচিত এবং কারো এ ধারণা করা উচিত নয় যে, কোন এক সময় সে তার থেকে গোপন রয়েছে এবং তার অবস্থা সম্পর্কে তিনি অবহিত নন। বরং সদা-সর্বদা তার এ বিশ্বাস রাখা উচিত যে, তিনি তাকে দেখছেন। তাঁর জ্ঞান তাকে ঘিরে রয়েছে। সুতরাং সব সময় তাঁকে স্মরণ রাখা। উচিত এবং তার নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকা একান্ত কর্তব্য। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ চক্ষুর অপব্যবহার এবং অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে আল্লাহ অবহিত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াতে ঐ ব্যক্তি উদ্দেশ্য যে হয়তো কোন বাড়ীতে গেল যেখানে কোন সুন্দরী মহিলা রয়েছে, কিংবা সে হয়তো যাতায়াত করে থাকে। তখন ঐ লোকটি কোন আড়াল হতে ঐ মহিলাটির দিকে তাকায় যেখানে তাকে কেউ দেখতে পায় না। তার দিকে যখনই কারো দৃষ্টি পড়ে তখনই সে মহিলাটির দিক হতে চক্ষু ফিরিয়ে নেয়। আবার যখন সুযোগ পায় তখন পুনরায় তার দিকে তাকায়। তাই মহান আল্লাহ বলেন যে, বিশ্বাসঘাতক চক্ষুর বিশ্বাসঘাতকতা এবং অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত। অর্থাৎ তার অন্তরে হয়তো এটা রয়েছে যে, সম্ভব হলে সে মহিলাটির গুপ্তাঙ্গও দেখে নিবে। তার এই গোপন ইচ্ছাও আল্লাহ তাআলার অজানা নয়। যহহাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলো চোখমারা, ইশারা করা এবং মানুষের বলাঃ “আমি দেখেছি।” অথচ সে দেখেনি এবং তার বলাঃ “আমি দেখিনি।” অথচ সে দেখেছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, দৃষ্টি যে নিয়তে নিক্ষেপ করা হয় তা আল্লাহ তাআলার কাছে উজ্জ্বল ও প্রকাশমান। আর অন্তরের মধ্যে এই লুক্কায়িত খেয়াল যে, যদি সুযোগ পায় এবং ক্ষমতা থাকে তবে নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজ হতে সে বিরত থাকবে কি থাকবে না এটাও তিনি জানেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, অন্তরের কুমন্ত্রণা সম্পর্কেও আল্লাহ পূর্ণ ওয়াকিফহাল।আল্লাহ তা'আলা সঠিকভাবে ও ন্যায়ের সাথে বিচার করে থাকেন। পুণ্যের বিনিময়ে পুরস্কার এবং পাপের বিনিময়ে শাস্তি দানে তিনি সক্ষম। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেন তিনি মন্দ লোকদেরকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি প্রদান করেন এবং সৎকর্মশীলদেরকে তাদের ভাল কাজের পুরস্কার প্রদান করেন।”(৫৩:৩১)আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, অর্থাৎ মূর্তি, প্রতিমা ইত্যাদি, তারা বিচার করতে অক্ষম। অর্থাৎ তারা কোন কিছুরই মালিক নয় এবং তাদের হুকুমত নেই, সুতরাং তারা বিচার ফায়সালা করবেই বা কি? আল্লাহ তাআলাই তাঁর সৃষ্টজীবের কথা শুনেন এবং তাদের অবস্থা দেখেন। যাকে ইচ্ছা তিনি পথ প্রদর্শন করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। এর মধ্যেও তার পুরোপুরি ন্যায় ও ইনসাফ বিদ্যমান রয়েছে।
গাফির 40:20
১৮-২০ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) কিয়ামতের একটি নাম। কেননা, কিয়ামত খুবই নিকটবর্তী। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন। আল্লাহ ছাড়া কেউই এটা ব্যক্ত করতে সক্ষম নয়।”(৫৩:৫৭-৫৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।” (৫৪:১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ মানুষের হিসাব নিকাশের সময় আসন্ন।"(২১:১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ আসবেই; সুতরাং এটা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না।” (১৬:১) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তারা ওটাকে নিকটবর্তী দেখবে তখন কাফিরদের চেহারা কালো হয়ে যাবে।” (৬৭:২৭) মোটকথা, নিকটবর্তী হওয়ার কারণে কিয়ামতের নাম (আরবী) হয়েছে।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন দুঃখ-কষ্টে তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ভয় ও সন্ত্রাসের কারণে তাদের কণ্ঠাগত প্রাণ হবে। সুতরাং তা বেরও হবে না এবং স্বস্থানে ফিরে যেতেও পারবে না। ইকরামা (রঃ) এবং সুদ্দীও (রঃ) একথাই বলেছেন। কারো মুখ দিয়ে কোন কথা সরবে না। সবাই থাকবে নীরব-নিস্তব্ধ। কার ক্ষমতা যে, মুখ খুলে! সবাই কাদতে থাকবে এবং হতবুদ্ধি অবস্থায় অবস্থান করবে। যারা আল্লাহর সঙ্গে শরীক স্থাপন করে নিজেদের উপর যুলুম করেছে তাদের সেই দিন কোন বন্ধু থাকবে না এবং তাদের দুঃখে কেউ সমবেদনা জানাবে না। তাদের জন্যে এমন কেউ সুপারিশকারী হবে না যার সুপারিশ কবূল করা হবে। সেই দিন মঙ্গল ও কল্যাণের উপায় উপকরণ সবই ছিন্ন হয়ে যাবে।মহান আল্লাহর জ্ঞান সব কিছুকেই পরিবেষ্টন করে রয়েছে। ছোট-বড়, প্রকাশ্য-গোপনীয় এবং মোটা ও পাতলা সবই তার কাছে সমানভাবে প্রকাশমান। এমন ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী তিনি যে, তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নেই। তাকে প্রত্যেকেরই ভয় করা উচিত এবং কারো এ ধারণা করা উচিত নয় যে, কোন এক সময় সে তার থেকে গোপন রয়েছে এবং তার অবস্থা সম্পর্কে তিনি অবহিত নন। বরং সদা-সর্বদা তার এ বিশ্বাস রাখা উচিত যে, তিনি তাকে দেখছেন। তাঁর জ্ঞান তাকে ঘিরে রয়েছে। সুতরাং সব সময় তাঁকে স্মরণ রাখা। উচিত এবং তার নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকা একান্ত কর্তব্য। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ চক্ষুর অপব্যবহার এবং অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে আল্লাহ অবহিত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াতে ঐ ব্যক্তি উদ্দেশ্য যে হয়তো কোন বাড়ীতে গেল যেখানে কোন সুন্দরী মহিলা রয়েছে, কিংবা সে হয়তো যাতায়াত করে থাকে। তখন ঐ লোকটি কোন আড়াল হতে ঐ মহিলাটির দিকে তাকায় যেখানে তাকে কেউ দেখতে পায় না। তার দিকে যখনই কারো দৃষ্টি পড়ে তখনই সে মহিলাটির দিক হতে চক্ষু ফিরিয়ে নেয়। আবার যখন সুযোগ পায় তখন পুনরায় তার দিকে তাকায়। তাই মহান আল্লাহ বলেন যে, বিশ্বাসঘাতক চক্ষুর বিশ্বাসঘাতকতা এবং অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত। অর্থাৎ তার অন্তরে হয়তো এটা রয়েছে যে, সম্ভব হলে সে মহিলাটির গুপ্তাঙ্গও দেখে নিবে। তার এই গোপন ইচ্ছাও আল্লাহ তাআলার অজানা নয়। যহহাক (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলো চোখমারা, ইশারা করা এবং মানুষের বলাঃ “আমি দেখেছি।” অথচ সে দেখেনি এবং তার বলাঃ “আমি দেখিনি।” অথচ সে দেখেছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, দৃষ্টি যে নিয়তে নিক্ষেপ করা হয় তা আল্লাহ তাআলার কাছে উজ্জ্বল ও প্রকাশমান। আর অন্তরের মধ্যে এই লুক্কায়িত খেয়াল যে, যদি সুযোগ পায় এবং ক্ষমতা থাকে তবে নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজ হতে সে বিরত থাকবে কি থাকবে না এটাও তিনি জানেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, অন্তরের কুমন্ত্রণা সম্পর্কেও আল্লাহ পূর্ণ ওয়াকিফহাল।আল্লাহ তা'আলা সঠিকভাবে ও ন্যায়ের সাথে বিচার করে থাকেন। পুণ্যের বিনিময়ে পুরস্কার এবং পাপের বিনিময়ে শাস্তি দানে তিনি সক্ষম। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেন তিনি মন্দ লোকদেরকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি প্রদান করেন এবং সৎকর্মশীলদেরকে তাদের ভাল কাজের পুরস্কার প্রদান করেন।”(৫৩:৩১)আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, অর্থাৎ মূর্তি, প্রতিমা ইত্যাদি, তারা বিচার করতে অক্ষম। অর্থাৎ তারা কোন কিছুরই মালিক নয় এবং তাদের হুকুমত নেই, সুতরাং তারা বিচার ফায়সালা করবেই বা কি? আল্লাহ তাআলাই তাঁর সৃষ্টজীবের কথা শুনেন এবং তাদের অবস্থা দেখেন। যাকে ইচ্ছা তিনি পথ প্রদর্শন করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। এর মধ্যেও তার পুরোপুরি ন্যায় ও ইনসাফ বিদ্যমান রয়েছে।
গাফির 40:21
২১-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার রিসালাতকে অবিশ্বাসকারীরা কি এদিক ওদিক ভ্রমণ করে তাদের পূর্ববর্তী রাসূলদেরকে অবিশ্বাসকারী কাফিরদের অবস্থা অবলোকন করেনি? তারা তো এদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী ছিল এবং কীর্তিতেও ছিল তারা এদের চেয়ে উন্নততর। তাদের ঘরবাড়ী এবং আকাশচুম্বী অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ এখনো বিদ্যমান রয়েছে। এদের চেয়ে তারা বয়সও বেশী পেয়েছিল। যখন তাদের কুফরী ও পাপের কারণে তাদের উপর আল্লাহর আযাব আপতিত হলো তখন না কেউ তাদের হতে আযাব সরাতে পারলো, না কারো মধ্যে ঐ শাস্তির মুকাবিলা করার শক্তি পাওয়া গেল, না তাদের বাঁচবার কোন উপায় বের হলো। তাদের উপর আল্লাহর গযব অবতীর্ণ হওয়ার বড় কারণ এই ছিল যে, তাদের কাছেও তাদের রাসূলগণ স্পষ্ট দলীল ও উজ্জ্বল প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ধ্বংস করে দেন। অন্যান্য কাফিরদের জন্যে এটাকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের উপকরণ বানিয়ে দেন। আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ ক্ষমতাবান এবং শাস্তিদানে তিনি অত্যন্ত কঠোর। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাদেরকে এসব আযাব হতে পরিত্রাণ দান করুন!
গাফির 40:22
২১-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার রিসালাতকে অবিশ্বাসকারীরা কি এদিক ওদিক ভ্রমণ করে তাদের পূর্ববর্তী রাসূলদেরকে অবিশ্বাসকারী কাফিরদের অবস্থা অবলোকন করেনি? তারা তো এদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী ছিল এবং কীর্তিতেও ছিল তারা এদের চেয়ে উন্নততর। তাদের ঘরবাড়ী এবং আকাশচুম্বী অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ এখনো বিদ্যমান রয়েছে। এদের চেয়ে তারা বয়সও বেশী পেয়েছিল। যখন তাদের কুফরী ও পাপের কারণে তাদের উপর আল্লাহর আযাব আপতিত হলো তখন না কেউ তাদের হতে আযাব সরাতে পারলো, না কারো মধ্যে ঐ শাস্তির মুকাবিলা করার শক্তি পাওয়া গেল, না তাদের বাঁচবার কোন উপায় বের হলো। তাদের উপর আল্লাহর গযব অবতীর্ণ হওয়ার বড় কারণ এই ছিল যে, তাদের কাছেও তাদের রাসূলগণ স্পষ্ট দলীল ও উজ্জ্বল প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ধ্বংস করে দেন। অন্যান্য কাফিরদের জন্যে এটাকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের উপকরণ বানিয়ে দেন। আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ ক্ষমতাবান এবং শাস্তিদানে তিনি অত্যন্ত কঠোর। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাদেরকে এসব আযাব হতে পরিত্রাণ দান করুন!
গাফির 40:23
২৩-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলদের (আঃ) বর্ণনা দিচ্ছেন যে, পরিণামে যেমন তারাই জয়যুক্ত ও সফলকাম হয়েছিলেন, অনুরূপভাবে তিনিও তার সময়ের কাফিরদের উপর বিজয়ী হবেন। সুতরাং তাঁর চিন্তিত ও ভীত হওয়ার কোনই কারণ নেই। যেমন হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর ঘটনা তার সামনে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দলীল প্রমাণাদিসহ কিবতীদের বাদশাহ ফিরাউনের নিকট, যে ছিল মিসরের সম্রাট, তার প্রধানমন্ত্রী হামানের নিকট এবং সেই যুগের সবচেয়ে ধনী এবং বণিকদের বাদশাহ নামে খ্যাত কারূনের নিকট প্রেরণ করেন। এই হতভাগারা এই মহান রাসূল (সঃ)-কে অবিশ্বাস করে এবং তাকে ঘৃণার, চোখে দেখে। তারা পরিষ্কারভাবে বলেঃ “এ ব্যক্তি যাদুকর এবং চরম মিথ্যাবাদী।” এই উত্তরই তাঁর পূর্ববর্তী নবীগণও পেয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এরূপই তাদের পূর্ববর্তী লোকদের নিকট কোন রাসূল (আঃ) আসলেই তারা বলতোঃ এ ব্যক্তি যাদুকর অথবা পাগল। তারা কি তার সম্পর্কে পরস্পরে এটাই স্থির করে নিয়েছে? না, বরং তারা হলো উদ্ধত সম্প্রদায়।”(৫১:৫২-৫৩)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমার রাসূল মূসা (আঃ) যখন আমার নিকট হতে সত্য নিয়ে তাদের নিকট হাযির হলো তখন তারা তাকে দুঃখ-কষ্ট দিতে শুরু করলো। ফিরাউন হুকুম জারী করলোঃ “এই রাসূল (আঃ)-এর উপর যারা ঈমান এনেছে তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করে ফেলো এবং কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত রাখো।” এর পূর্বেও সে এই নির্দেশ জারী করে রেখেছিল। কেননা, তার আশংকা ছিল যে, না জানি হয়তো হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্ম হবে, অথবা হয়তো এ জন্যে যে, যেন বানী ইসরাঈলের সংখ্যা কমে যায়। ফলে যেন তারা দুর্বল ও শক্তিহীন হয়ে পড়ে। অথবা সম্ভবতঃ এ দু’টি যুক্তিই তার সামনে ছিল। এখন দ্বিতীয়বার সে এই হুকুম জারী করে। এর কারণও ছিল এটাই যে, যেন বানী ইসরাঈল দলটি বিজিত থাকে এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি না পায়। আর তারা যেন লাঞ্ছিত অবস্থায় কালাতিপাত করে। আর বানী ইসরাঈলের মনে যেন এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, তাদের এ বিপদের কারণ হলো হযরত মূসা (আঃ)। যেহেতু তারা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেও ছিলঃ “আপনি আসার পূর্বেও আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হয়েছিল এবং আপনার আগমনের পরেও আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে।” তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “তাড়াতাড়ি করো না, খুব সম্ভব আল্লাহ তাআলা তোমাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করে দিবেন এবং তোমাদেরকে যমীনের প্রতিনিধি বানিয়ে দিবেন, অতঃপর তোমরা কেমন আমল কর তা তিনি দেখবেন।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা ছিল ফিরাউনের দ্বিতীয়বারের হুকুম।মহান আল্লাহ বলেনঃ 'কাফিরদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবেই।' অর্থাৎ ফিরাউন যে চক্রান্ত করেছিল যে, বানী ইসরাঈল ধ্বংস হয়ে যাবে তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছিল।অতঃপর ফিরাউনের ঘৃণ্য ইচ্ছার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে হযরত মূসা (আঃ)-কে হত্যা করার ইচ্ছা করে এবং স্বীয় কওমকে বলেঃ “তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মূসা (আঃ)-কে হত্যা করে ফেলবো। সে তার প্রতিপালকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুক, আমি এর কোন পরোয়া করি না। আমি আশংকা করছি যে, যদি তাকে জীবিত ছেড়ে দেয়া হয় তবে সে তোমাদের দ্বীনের পরিবর্তন ঘটাবে অথবা সে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে ।" এ জন্যেই আরবে নিম্নের প্রবাদ প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফিরাউনও উপদেশদাতা হয়ে গেল।” অনেকেই (আরবী)-এরূপ পড়েছেন। অন্যেরা (আরবী)-এরূপ পাঠ করেছেন। আর কেউ কেউ (আরবী) পড়েছেন। হযরত মূসা (আঃ) যখন ফিরাউনের ঘৃণ্য উদ্দেশ্যের বিষয় জানতে পারলেন তখন তিনি বললেনঃ “যারা বিচার দিবসে বিশ্বাস করে না, ঐ সব উদ্ধত ও হঠকারী ব্যক্তি হতে আমি আমার ও (হে সম্বোধনকৃত ব্যক্তিরা) তোমাদের প্রতিপালকের শরণাপন্ন হয়েছি।” এ জন্যেই হাদীসে এসেছেঃ হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কোন কওম হতে ভীত হতেন তখন বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা তাদের (শত্রুদের) অনিষ্ট হতে আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনাকে তাদের মুকাবিলায় (দাঁড়) করছি।”
গাফির 40:24
২৩-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলদের (আঃ) বর্ণনা দিচ্ছেন যে, পরিণামে যেমন তারাই জয়যুক্ত ও সফলকাম হয়েছিলেন, অনুরূপভাবে তিনিও তার সময়ের কাফিরদের উপর বিজয়ী হবেন। সুতরাং তাঁর চিন্তিত ও ভীত হওয়ার কোনই কারণ নেই। যেমন হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর ঘটনা তার সামনে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দলীল প্রমাণাদিসহ কিবতীদের বাদশাহ ফিরাউনের নিকট, যে ছিল মিসরের সম্রাট, তার প্রধানমন্ত্রী হামানের নিকট এবং সেই যুগের সবচেয়ে ধনী এবং বণিকদের বাদশাহ নামে খ্যাত কারূনের নিকট প্রেরণ করেন। এই হতভাগারা এই মহান রাসূল (সঃ)-কে অবিশ্বাস করে এবং তাকে ঘৃণার, চোখে দেখে। তারা পরিষ্কারভাবে বলেঃ “এ ব্যক্তি যাদুকর এবং চরম মিথ্যাবাদী।” এই উত্তরই তাঁর পূর্ববর্তী নবীগণও পেয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এরূপই তাদের পূর্ববর্তী লোকদের নিকট কোন রাসূল (আঃ) আসলেই তারা বলতোঃ এ ব্যক্তি যাদুকর অথবা পাগল। তারা কি তার সম্পর্কে পরস্পরে এটাই স্থির করে নিয়েছে? না, বরং তারা হলো উদ্ধত সম্প্রদায়।”(৫১:৫২-৫৩)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমার রাসূল মূসা (আঃ) যখন আমার নিকট হতে সত্য নিয়ে তাদের নিকট হাযির হলো তখন তারা তাকে দুঃখ-কষ্ট দিতে শুরু করলো। ফিরাউন হুকুম জারী করলোঃ “এই রাসূল (আঃ)-এর উপর যারা ঈমান এনেছে তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করে ফেলো এবং কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত রাখো।” এর পূর্বেও সে এই নির্দেশ জারী করে রেখেছিল। কেননা, তার আশংকা ছিল যে, না জানি হয়তো হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্ম হবে, অথবা হয়তো এ জন্যে যে, যেন বানী ইসরাঈলের সংখ্যা কমে যায়। ফলে যেন তারা দুর্বল ও শক্তিহীন হয়ে পড়ে। অথবা সম্ভবতঃ এ দু’টি যুক্তিই তার সামনে ছিল। এখন দ্বিতীয়বার সে এই হুকুম জারী করে। এর কারণও ছিল এটাই যে, যেন বানী ইসরাঈল দলটি বিজিত থাকে এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি না পায়। আর তারা যেন লাঞ্ছিত অবস্থায় কালাতিপাত করে। আর বানী ইসরাঈলের মনে যেন এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, তাদের এ বিপদের কারণ হলো হযরত মূসা (আঃ)। যেহেতু তারা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেও ছিলঃ “আপনি আসার পূর্বেও আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হয়েছিল এবং আপনার আগমনের পরেও আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে।” তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “তাড়াতাড়ি করো না, খুব সম্ভব আল্লাহ তাআলা তোমাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করে দিবেন এবং তোমাদেরকে যমীনের প্রতিনিধি বানিয়ে দিবেন, অতঃপর তোমরা কেমন আমল কর তা তিনি দেখবেন।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা ছিল ফিরাউনের দ্বিতীয়বারের হুকুম।মহান আল্লাহ বলেনঃ 'কাফিরদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবেই।' অর্থাৎ ফিরাউন যে চক্রান্ত করেছিল যে, বানী ইসরাঈল ধ্বংস হয়ে যাবে তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছিল।অতঃপর ফিরাউনের ঘৃণ্য ইচ্ছার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে হযরত মূসা (আঃ)-কে হত্যা করার ইচ্ছা করে এবং স্বীয় কওমকে বলেঃ “তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মূসা (আঃ)-কে হত্যা করে ফেলবো। সে তার প্রতিপালকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুক, আমি এর কোন পরোয়া করি না। আমি আশংকা করছি যে, যদি তাকে জীবিত ছেড়ে দেয়া হয় তবে সে তোমাদের দ্বীনের পরিবর্তন ঘটাবে অথবা সে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে ।" এ জন্যেই আরবে নিম্নের প্রবাদ প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফিরাউনও উপদেশদাতা হয়ে গেল।” অনেকেই (আরবী)-এরূপ পড়েছেন। অন্যেরা (আরবী)-এরূপ পাঠ করেছেন। আর কেউ কেউ (আরবী) পড়েছেন। হযরত মূসা (আঃ) যখন ফিরাউনের ঘৃণ্য উদ্দেশ্যের বিষয় জানতে পারলেন তখন তিনি বললেনঃ “যারা বিচার দিবসে বিশ্বাস করে না, ঐ সব উদ্ধত ও হঠকারী ব্যক্তি হতে আমি আমার ও (হে সম্বোধনকৃত ব্যক্তিরা) তোমাদের প্রতিপালকের শরণাপন্ন হয়েছি।” এ জন্যেই হাদীসে এসেছেঃ হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কোন কওম হতে ভীত হতেন তখন বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা তাদের (শত্রুদের) অনিষ্ট হতে আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনাকে তাদের মুকাবিলায় (দাঁড়) করছি।”
গাফির 40:25
২৩-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলদের (আঃ) বর্ণনা দিচ্ছেন যে, পরিণামে যেমন তারাই জয়যুক্ত ও সফলকাম হয়েছিলেন, অনুরূপভাবে তিনিও তার সময়ের কাফিরদের উপর বিজয়ী হবেন। সুতরাং তাঁর চিন্তিত ও ভীত হওয়ার কোনই কারণ নেই। যেমন হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর ঘটনা তার সামনে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দলীল প্রমাণাদিসহ কিবতীদের বাদশাহ ফিরাউনের নিকট, যে ছিল মিসরের সম্রাট, তার প্রধানমন্ত্রী হামানের নিকট এবং সেই যুগের সবচেয়ে ধনী এবং বণিকদের বাদশাহ নামে খ্যাত কারূনের নিকট প্রেরণ করেন। এই হতভাগারা এই মহান রাসূল (সঃ)-কে অবিশ্বাস করে এবং তাকে ঘৃণার, চোখে দেখে। তারা পরিষ্কারভাবে বলেঃ “এ ব্যক্তি যাদুকর এবং চরম মিথ্যাবাদী।” এই উত্তরই তাঁর পূর্ববর্তী নবীগণও পেয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এরূপই তাদের পূর্ববর্তী লোকদের নিকট কোন রাসূল (আঃ) আসলেই তারা বলতোঃ এ ব্যক্তি যাদুকর অথবা পাগল। তারা কি তার সম্পর্কে পরস্পরে এটাই স্থির করে নিয়েছে? না, বরং তারা হলো উদ্ধত সম্প্রদায়।”(৫১:৫২-৫৩)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমার রাসূল মূসা (আঃ) যখন আমার নিকট হতে সত্য নিয়ে তাদের নিকট হাযির হলো তখন তারা তাকে দুঃখ-কষ্ট দিতে শুরু করলো। ফিরাউন হুকুম জারী করলোঃ “এই রাসূল (আঃ)-এর উপর যারা ঈমান এনেছে তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করে ফেলো এবং কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত রাখো।” এর পূর্বেও সে এই নির্দেশ জারী করে রেখেছিল। কেননা, তার আশংকা ছিল যে, না জানি হয়তো হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্ম হবে, অথবা হয়তো এ জন্যে যে, যেন বানী ইসরাঈলের সংখ্যা কমে যায়। ফলে যেন তারা দুর্বল ও শক্তিহীন হয়ে পড়ে। অথবা সম্ভবতঃ এ দু’টি যুক্তিই তার সামনে ছিল। এখন দ্বিতীয়বার সে এই হুকুম জারী করে। এর কারণও ছিল এটাই যে, যেন বানী ইসরাঈল দলটি বিজিত থাকে এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি না পায়। আর তারা যেন লাঞ্ছিত অবস্থায় কালাতিপাত করে। আর বানী ইসরাঈলের মনে যেন এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, তাদের এ বিপদের কারণ হলো হযরত মূসা (আঃ)। যেহেতু তারা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেও ছিলঃ “আপনি আসার পূর্বেও আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হয়েছিল এবং আপনার আগমনের পরেও আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে।” তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “তাড়াতাড়ি করো না, খুব সম্ভব আল্লাহ তাআলা তোমাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করে দিবেন এবং তোমাদেরকে যমীনের প্রতিনিধি বানিয়ে দিবেন, অতঃপর তোমরা কেমন আমল কর তা তিনি দেখবেন।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা ছিল ফিরাউনের দ্বিতীয়বারের হুকুম।মহান আল্লাহ বলেনঃ 'কাফিরদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবেই।' অর্থাৎ ফিরাউন যে চক্রান্ত করেছিল যে, বানী ইসরাঈল ধ্বংস হয়ে যাবে তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছিল।অতঃপর ফিরাউনের ঘৃণ্য ইচ্ছার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে হযরত মূসা (আঃ)-কে হত্যা করার ইচ্ছা করে এবং স্বীয় কওমকে বলেঃ “তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মূসা (আঃ)-কে হত্যা করে ফেলবো। সে তার প্রতিপালকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুক, আমি এর কোন পরোয়া করি না। আমি আশংকা করছি যে, যদি তাকে জীবিত ছেড়ে দেয়া হয় তবে সে তোমাদের দ্বীনের পরিবর্তন ঘটাবে অথবা সে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে ।" এ জন্যেই আরবে নিম্নের প্রবাদ প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফিরাউনও উপদেশদাতা হয়ে গেল।” অনেকেই (আরবী)-এরূপ পড়েছেন। অন্যেরা (আরবী)-এরূপ পাঠ করেছেন। আর কেউ কেউ (আরবী) পড়েছেন। হযরত মূসা (আঃ) যখন ফিরাউনের ঘৃণ্য উদ্দেশ্যের বিষয় জানতে পারলেন তখন তিনি বললেনঃ “যারা বিচার দিবসে বিশ্বাস করে না, ঐ সব উদ্ধত ও হঠকারী ব্যক্তি হতে আমি আমার ও (হে সম্বোধনকৃত ব্যক্তিরা) তোমাদের প্রতিপালকের শরণাপন্ন হয়েছি।” এ জন্যেই হাদীসে এসেছেঃ হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কোন কওম হতে ভীত হতেন তখন বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা তাদের (শত্রুদের) অনিষ্ট হতে আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনাকে তাদের মুকাবিলায় (দাঁড়) করছি।”
গাফির 40:26
২৩-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলদের (আঃ) বর্ণনা দিচ্ছেন যে, পরিণামে যেমন তারাই জয়যুক্ত ও সফলকাম হয়েছিলেন, অনুরূপভাবে তিনিও তার সময়ের কাফিরদের উপর বিজয়ী হবেন। সুতরাং তাঁর চিন্তিত ও ভীত হওয়ার কোনই কারণ নেই। যেমন হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর ঘটনা তার সামনে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দলীল প্রমাণাদিসহ কিবতীদের বাদশাহ ফিরাউনের নিকট, যে ছিল মিসরের সম্রাট, তার প্রধানমন্ত্রী হামানের নিকট এবং সেই যুগের সবচেয়ে ধনী এবং বণিকদের বাদশাহ নামে খ্যাত কারূনের নিকট প্রেরণ করেন। এই হতভাগারা এই মহান রাসূল (সঃ)-কে অবিশ্বাস করে এবং তাকে ঘৃণার, চোখে দেখে। তারা পরিষ্কারভাবে বলেঃ “এ ব্যক্তি যাদুকর এবং চরম মিথ্যাবাদী।” এই উত্তরই তাঁর পূর্ববর্তী নবীগণও পেয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এরূপই তাদের পূর্ববর্তী লোকদের নিকট কোন রাসূল (আঃ) আসলেই তারা বলতোঃ এ ব্যক্তি যাদুকর অথবা পাগল। তারা কি তার সম্পর্কে পরস্পরে এটাই স্থির করে নিয়েছে? না, বরং তারা হলো উদ্ধত সম্প্রদায়।”(৫১:৫২-৫৩)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমার রাসূল মূসা (আঃ) যখন আমার নিকট হতে সত্য নিয়ে তাদের নিকট হাযির হলো তখন তারা তাকে দুঃখ-কষ্ট দিতে শুরু করলো। ফিরাউন হুকুম জারী করলোঃ “এই রাসূল (আঃ)-এর উপর যারা ঈমান এনেছে তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করে ফেলো এবং কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত রাখো।” এর পূর্বেও সে এই নির্দেশ জারী করে রেখেছিল। কেননা, তার আশংকা ছিল যে, না জানি হয়তো হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্ম হবে, অথবা হয়তো এ জন্যে যে, যেন বানী ইসরাঈলের সংখ্যা কমে যায়। ফলে যেন তারা দুর্বল ও শক্তিহীন হয়ে পড়ে। অথবা সম্ভবতঃ এ দু’টি যুক্তিই তার সামনে ছিল। এখন দ্বিতীয়বার সে এই হুকুম জারী করে। এর কারণও ছিল এটাই যে, যেন বানী ইসরাঈল দলটি বিজিত থাকে এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি না পায়। আর তারা যেন লাঞ্ছিত অবস্থায় কালাতিপাত করে। আর বানী ইসরাঈলের মনে যেন এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, তাদের এ বিপদের কারণ হলো হযরত মূসা (আঃ)। যেহেতু তারা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেও ছিলঃ “আপনি আসার পূর্বেও আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হয়েছিল এবং আপনার আগমনের পরেও আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে।” তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “তাড়াতাড়ি করো না, খুব সম্ভব আল্লাহ তাআলা তোমাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করে দিবেন এবং তোমাদেরকে যমীনের প্রতিনিধি বানিয়ে দিবেন, অতঃপর তোমরা কেমন আমল কর তা তিনি দেখবেন।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা ছিল ফিরাউনের দ্বিতীয়বারের হুকুম।মহান আল্লাহ বলেনঃ 'কাফিরদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবেই।' অর্থাৎ ফিরাউন যে চক্রান্ত করেছিল যে, বানী ইসরাঈল ধ্বংস হয়ে যাবে তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছিল।অতঃপর ফিরাউনের ঘৃণ্য ইচ্ছার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে হযরত মূসা (আঃ)-কে হত্যা করার ইচ্ছা করে এবং স্বীয় কওমকে বলেঃ “তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মূসা (আঃ)-কে হত্যা করে ফেলবো। সে তার প্রতিপালকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুক, আমি এর কোন পরোয়া করি না। আমি আশংকা করছি যে, যদি তাকে জীবিত ছেড়ে দেয়া হয় তবে সে তোমাদের দ্বীনের পরিবর্তন ঘটাবে অথবা সে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে ।" এ জন্যেই আরবে নিম্নের প্রবাদ প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফিরাউনও উপদেশদাতা হয়ে গেল।” অনেকেই (আরবী)-এরূপ পড়েছেন। অন্যেরা (আরবী)-এরূপ পাঠ করেছেন। আর কেউ কেউ (আরবী) পড়েছেন। হযরত মূসা (আঃ) যখন ফিরাউনের ঘৃণ্য উদ্দেশ্যের বিষয় জানতে পারলেন তখন তিনি বললেনঃ “যারা বিচার দিবসে বিশ্বাস করে না, ঐ সব উদ্ধত ও হঠকারী ব্যক্তি হতে আমি আমার ও (হে সম্বোধনকৃত ব্যক্তিরা) তোমাদের প্রতিপালকের শরণাপন্ন হয়েছি।” এ জন্যেই হাদীসে এসেছেঃ হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কোন কওম হতে ভীত হতেন তখন বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা তাদের (শত্রুদের) অনিষ্ট হতে আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনাকে তাদের মুকাবিলায় (দাঁড়) করছি।”
গাফির 40:27
২৩-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলদের (আঃ) বর্ণনা দিচ্ছেন যে, পরিণামে যেমন তারাই জয়যুক্ত ও সফলকাম হয়েছিলেন, অনুরূপভাবে তিনিও তার সময়ের কাফিরদের উপর বিজয়ী হবেন। সুতরাং তাঁর চিন্তিত ও ভীত হওয়ার কোনই কারণ নেই। যেমন হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর ঘটনা তার সামনে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দলীল প্রমাণাদিসহ কিবতীদের বাদশাহ ফিরাউনের নিকট, যে ছিল মিসরের সম্রাট, তার প্রধানমন্ত্রী হামানের নিকট এবং সেই যুগের সবচেয়ে ধনী এবং বণিকদের বাদশাহ নামে খ্যাত কারূনের নিকট প্রেরণ করেন। এই হতভাগারা এই মহান রাসূল (সঃ)-কে অবিশ্বাস করে এবং তাকে ঘৃণার, চোখে দেখে। তারা পরিষ্কারভাবে বলেঃ “এ ব্যক্তি যাদুকর এবং চরম মিথ্যাবাদী।” এই উত্তরই তাঁর পূর্ববর্তী নবীগণও পেয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এরূপই তাদের পূর্ববর্তী লোকদের নিকট কোন রাসূল (আঃ) আসলেই তারা বলতোঃ এ ব্যক্তি যাদুকর অথবা পাগল। তারা কি তার সম্পর্কে পরস্পরে এটাই স্থির করে নিয়েছে? না, বরং তারা হলো উদ্ধত সম্প্রদায়।”(৫১:৫২-৫৩)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমার রাসূল মূসা (আঃ) যখন আমার নিকট হতে সত্য নিয়ে তাদের নিকট হাযির হলো তখন তারা তাকে দুঃখ-কষ্ট দিতে শুরু করলো। ফিরাউন হুকুম জারী করলোঃ “এই রাসূল (আঃ)-এর উপর যারা ঈমান এনেছে তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করে ফেলো এবং কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত রাখো।” এর পূর্বেও সে এই নির্দেশ জারী করে রেখেছিল। কেননা, তার আশংকা ছিল যে, না জানি হয়তো হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্ম হবে, অথবা হয়তো এ জন্যে যে, যেন বানী ইসরাঈলের সংখ্যা কমে যায়। ফলে যেন তারা দুর্বল ও শক্তিহীন হয়ে পড়ে। অথবা সম্ভবতঃ এ দু’টি যুক্তিই তার সামনে ছিল। এখন দ্বিতীয়বার সে এই হুকুম জারী করে। এর কারণও ছিল এটাই যে, যেন বানী ইসরাঈল দলটি বিজিত থাকে এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি না পায়। আর তারা যেন লাঞ্ছিত অবস্থায় কালাতিপাত করে। আর বানী ইসরাঈলের মনে যেন এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, তাদের এ বিপদের কারণ হলো হযরত মূসা (আঃ)। যেহেতু তারা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেও ছিলঃ “আপনি আসার পূর্বেও আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হয়েছিল এবং আপনার আগমনের পরেও আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে।” তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “তাড়াতাড়ি করো না, খুব সম্ভব আল্লাহ তাআলা তোমাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করে দিবেন এবং তোমাদেরকে যমীনের প্রতিনিধি বানিয়ে দিবেন, অতঃপর তোমরা কেমন আমল কর তা তিনি দেখবেন।” কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এটা ছিল ফিরাউনের দ্বিতীয়বারের হুকুম।মহান আল্লাহ বলেনঃ 'কাফিরদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবেই।' অর্থাৎ ফিরাউন যে চক্রান্ত করেছিল যে, বানী ইসরাঈল ধ্বংস হয়ে যাবে তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছিল।অতঃপর ফিরাউনের ঘৃণ্য ইচ্ছার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সে হযরত মূসা (আঃ)-কে হত্যা করার ইচ্ছা করে এবং স্বীয় কওমকে বলেঃ “তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মূসা (আঃ)-কে হত্যা করে ফেলবো। সে তার প্রতিপালকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুক, আমি এর কোন পরোয়া করি না। আমি আশংকা করছি যে, যদি তাকে জীবিত ছেড়ে দেয়া হয় তবে সে তোমাদের দ্বীনের পরিবর্তন ঘটাবে অথবা সে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে ।" এ জন্যেই আরবে নিম্নের প্রবাদ প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফিরাউনও উপদেশদাতা হয়ে গেল।” অনেকেই (আরবী)-এরূপ পড়েছেন। অন্যেরা (আরবী)-এরূপ পাঠ করেছেন। আর কেউ কেউ (আরবী) পড়েছেন। হযরত মূসা (আঃ) যখন ফিরাউনের ঘৃণ্য উদ্দেশ্যের বিষয় জানতে পারলেন তখন তিনি বললেনঃ “যারা বিচার দিবসে বিশ্বাস করে না, ঐ সব উদ্ধত ও হঠকারী ব্যক্তি হতে আমি আমার ও (হে সম্বোধনকৃত ব্যক্তিরা) তোমাদের প্রতিপালকের শরণাপন্ন হয়েছি।” এ জন্যেই হাদীসে এসেছেঃ হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন কোন কওম হতে ভীত হতেন তখন বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা তাদের (শত্রুদের) অনিষ্ট হতে আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি এবং আপনাকে তাদের মুকাবিলায় (দাঁড়) করছি।”
গাফির 40:28
২৮-২৯ নং আয়াতের তাফসীর: প্রসিদ্ধ কথা তো এটাই যে, এই মুমিন লোকটি কিবতী ছিল। সে ছিল ফিরাউনের বংশধর। এমনকি সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সে ছিল ফিরাউনের চাচাতো ভাই। একথাও বলা হয়েছে যে, সে হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে মুক্তি পেয়েছিল। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। এমনকি যাঁদের উক্তি রয়েছে যে, ঐ মমিন লোকটিও ইসরাঈলী ছিলেন তিনি তা খণ্ডন করেছেন এবং বলেছেন যে, যদি মুমিন লোকটি ইসরাঈলী হতেন তবে ফিরাউন কখনো এভাবে ধৈর্যের সাথে তাঁর নসীহত শুনতো না এবং হযরত মূসা (আঃ)-এর হত্যার অভিপ্রায় হতে বিরত থাকতো না। বরং তাকে কষ্ট দিতো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফিরাউনের বংশের মধ্যে একজন ঈমানদার ছিলেন এই লোকটি। আর একজন যিনি ঈমান এনেছিলেন তিনি ছিলেন ফিরাউনের স্ত্রী এবং তৃতীয় ঈমানদার ছিলেন ঐ ব্যক্তি যিনি হযরত মূসা (আঃ)-কে সংবাদ দিয়েছিলেন যে, নেতৃস্থানীয় লোকেরা তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।এই মুমিন লোকটি নিজের ঈমান আনয়নের কথা গোপন রেখেছিলেন। ফিরাউন যখন বলেছিলঃ “তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মূসা (আঃ)-কে হত্যা করি’ সেদিনই শুধু তিনি নিজের ঈমানের কথা প্রকাশ করেছিলেন। আর প্রকৃতপক্ষে এটাই সর্বোত্তম জিহাদ যে, অত্যাচারী বাদশাহর সামনে মানুষ সত্য কথা বলে দেয়, যেমন হাদীসে এসেছে। আর ফিরাউনের সামনে এর চেয়ে বড় ও সত্য কথা আর কিছুই ছিল না। সুতরাং এ লোকটি বড় উচ্চ পর্যায়ের মুজাহিদ ছিলেন, যার সাথে কারো তুলনা করা যায় না। তবে অবশ্যই সহীহ বুখারী ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থে একটি ঘটনা কয়েকটি রিওয়াইয়াতে বর্ণিত আছে, যার সারমর্ম এই যে, হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রাঃ) একদা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আচ্ছা, বলুন তো, মুরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সবচেয়ে বড় কষ্ট কি দিয়েছিল?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তাহলে শুন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাবা শরীফে নামায পড়ছিলেন। এমন সময় উকবা ইবনে আবি মুঈত এসে তাকে ধরে ফেললো এবং তার Bদরখানা তার গলায় বেঁধে দিয়ে টানতে শুরু করলো, যার ফলে তার গলা চিপে গেল এবং তার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তৎক্ষণাৎ হযরত আবু বকর (রাঃ) দৌড়িয়ে এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন এবং বললেনঃ “তোমরা কি এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করতে চাচ্ছ যিনি বলেন, “আমার প্রতিপালক আল্লাহ এবং যিনি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে দলীল প্রমাণাদি নিয়ে এসেছেন?” আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এক জায়গায় কুরায়েশদের সমাবেশ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান দিয়ে গমন করলে তারা বললোঃ “তুমিই কি আমাদেরকে আমাদের পিতৃপুরুষদের মা'বুদগুলোর ইবাদত করতে নিষেধ করে থাকো?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, আমিই ঐ ব্যক্তি বটে।” তখন তারা উঠে গিয়ে তার কাপড় ধরে টানতে থাকে। তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) তার পিছন হতে দৌড়িয়ে গিয়ে তাঁকে তাদের হাত হতে রক্ষা করেন এবং তার দুই চক্ষু দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। এমতাবস্থায় তিনি উচ্চ স্বরে চীৎকার করে বলেনঃ “তোমরা কি এমন একটি লোককে হত্যা করতে যাচ্ছ- যিনি বলেন, আমার প্রতিপালক আল্লাহ এবং যিনি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে দলীল প্রমাণাদি নিয়ে এসেছেন?” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ঐ মুমিন লোকটিও একথাই বলেছিলেনঃ “তোমরা এক ব্যক্তিকে এই জন্যে হত্যা করবে যে, সে বলে- “আমার প্রতিপালক আল্লাহ' অথচ সে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের নিকট এসেছে? যদি সে মিথ্যাবাদীই হয় তবে তার মিথ্যাবাদিতার জন্যে সে-ই দায়ী হবে, আর যদি সত্যবাদী হয়, তবে সে তোমাদেরকে যে শাস্তির কথা বলে, তার কিছু তো তোমাদের উপর আপতিত হবেই। সুতরাং বিবেক সম্মত কথা এটাই যে, তোমরা তাকে ছেড়ে দাও। যারা তাদের অনুসারী হবার তারা হয়ে যাক। তোমরা তাদের ব্যাপারে কোন হস্তক্ষেপ করো না।” হযরত মূসা (আঃ)-ও ফিরাউন এবং তার লোকদের নিকট হতে এটাই কামনা করেছিলেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের পূর্বে ফিরাউনের কওমকে পরীক্ষা করেছি। তাদের কাছে সম্মানিত রাসূল এসেছিল এবং তাদেরকে বলেছিলঃ আল্লাহর বান্দাদেরকে (বানী ইসরাঈলকে) আমার নিকট সমর্পণ করে দাও। আমি তোমাদের কাছে বিশ্বস্ত রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি। তোমরা আল্লাহর উপর বিদ্রোহ ঘোষণা করো না। আমিও তোমাদের নিকট সুস্পষ্ট দলীল নিয়ে এসেছি। তোমরা আমাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করবে তা হতে আমি আমার প্রতিপালকের এবং তোমাদের প্রতিপালকের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যদি তোমরা ঈমান আনয়ন না কর তবে তোমরা আমা হতে দূরে থাকো (আমাকে কষ্ট দিয়ো না)।” (৪৪:১৭-২১)রাসূলুল্লাহও (সঃ) স্বীয় কওমকে একথাই বলেছিলেনঃ “আল্লাহর বান্দাদেরকে তাঁর দিকে আমাকে ডাকতে দাও। তোমরা আমাকে কষ্ট দেয়া হতে বিরত থাকো। আমার আত্মীয়তার প্রতি লক্ষ্য রেখে আমাকে কষ্ট দিয়ো না।” হুদায়বিয়ার সন্ধিও প্রকৃতপক্ষে এটাই ছিল, যাকে প্রকাশ্য বিজয় বলা হয়েছে।ঐ মুমিন লোকটি তার কওমকে আরো বললেনঃ “আল্লাহ সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। তাদের উপর আল্লাহর সাহায্য থাকে না। তাদের কথা ও কাজ সত্বরই তাদের খিয়ানতকে প্রকাশ করে দিবে। পক্ষান্তরে এই নবী (আঃ) বিশৃংখলা সৃষ্টি করা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তিনি সরল, সঠিক ও সত্য পথের উপর রয়েছেন। তিনি কথায় সত্যবাদী এবং আমলে পাকা। যদি তিনি সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদী হতেন তবে তার মধ্যে কখনো এই সততা ও সত্যবাদিতা থাকতো না।” অতঃপর স্বীয় সম্প্রদায়কে উপদেশ দিচ্ছেন এবং তাদেরকে আল্লাহর আযাব হতে ভয় প্রদর্শন করছেন। তিনি তাদেরকে বলেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! আজ কর্তৃত্ব তোমাদের, দেশে তোমরাই প্রবল। কিন্তু আমাদের উপর শাস্তি এসে পড়লে কে আমাদেরকে সাহায্য করবে?” অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা এদেশের শাসন ক্ষমতা তোমাদেরকেই দান করেছেন এবং তোমাদেরকে বড়ই মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার এই নিয়ামতের জন্যে তোমাদের তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-কে সত্যবাদী হিসেবে মেনে নেয়া একান্ত কর্তব্য। যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও এবং তাঁর রাসূল (আঃ)-এর প্রতি মন্দ দৃষ্টি নিক্ষেপ কর তবে নিশ্চয়ই আল্লাহর আযাব তোমাদের উপর আপতিত হবে। বলতে, ঐ সময় কে তোমাদেরকে আল্লাহর আযাব হতে রক্ষা করবে? তোমাদের এ সেনাবাহিনী, জান ও মাল তোমাদের কোনই কাজে আসবে না।ফিরাউন ঐ ব্যক্তির একথার কোন জ্ঞান সম্মত উত্তর দিতে পারলো না। সুতরাং বাহ্যিকভাবে সহানুভূতি দেখিয়ে বললোঃ “আমি তো তোমাদের শুভাকাক্ষী। আমি তোমাদেরকে ধোকা দিচ্ছি না। আমি যা বুঝছি তাই তোমাদেরকে বলছি। আমি তোমাদেরকে শুধু সৎপথই দেখিয়ে থাকি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটাও ছিল তার বিশ্বাসঘাতকতা। সে ভালভাবেই জানতো যে, হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর রাসূল। যেমন মহান আল্লাহ হযরত মূসা (আঃ)-এর উক্তি উদ্ধৃত করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে ফিরাউন!) তুমি তো জান যে, এগুলো (এ বিস্ময়কর জিনিসগুলো) আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালকই অবতীর্ণ করেছেন, যেগুলো জ্ঞানবর্তিকা স্বরূপ।" (১৭:১০২) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অন্তরে বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও শুধু যুলুম ও সীমালংঘন হিসেবেই তারা অস্বীকার করে বসেছে।” (২৭:১৪) অনুরূপভাবে তার আমি যা বুঝি, তাই তোমাদেরকে বলছি' এ কথাও ছিল সম্পূর্ণ ভুল। প্রকৃতপক্ষে সে জনগণকে প্রতারিত করছিল এবং প্রজাবর্গের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছিল। তার কওম তার প্রতারণার ফাঁদে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল এবং তার কথা মেনে নিয়েছিল। ফিরাউন তাদেরকে কোন ভাল পথে আনয়ন করেনি। তার কাজ সঠিকই ছিল না। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফিরাউন তার কওমকে পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেনি।” (২০:৭৯) হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে নেতা তার প্রজাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না, অথচ জান্নাতের সুগন্ধ পাঁচশ বছরের পথের ব্যবধান হতেও এসে থাকে। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
গাফির 40:29
২৮-২৯ নং আয়াতের তাফসীর: প্রসিদ্ধ কথা তো এটাই যে, এই মুমিন লোকটি কিবতী ছিল। সে ছিল ফিরাউনের বংশধর। এমনকি সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, সে ছিল ফিরাউনের চাচাতো ভাই। একথাও বলা হয়েছে যে, সে হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে মুক্তি পেয়েছিল। ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। এমনকি যাঁদের উক্তি রয়েছে যে, ঐ মমিন লোকটিও ইসরাঈলী ছিলেন তিনি তা খণ্ডন করেছেন এবং বলেছেন যে, যদি মুমিন লোকটি ইসরাঈলী হতেন তবে ফিরাউন কখনো এভাবে ধৈর্যের সাথে তাঁর নসীহত শুনতো না এবং হযরত মূসা (আঃ)-এর হত্যার অভিপ্রায় হতে বিরত থাকতো না। বরং তাকে কষ্ট দিতো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ফিরাউনের বংশের মধ্যে একজন ঈমানদার ছিলেন এই লোকটি। আর একজন যিনি ঈমান এনেছিলেন তিনি ছিলেন ফিরাউনের স্ত্রী এবং তৃতীয় ঈমানদার ছিলেন ঐ ব্যক্তি যিনি হযরত মূসা (আঃ)-কে সংবাদ দিয়েছিলেন যে, নেতৃস্থানীয় লোকেরা তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।এই মুমিন লোকটি নিজের ঈমান আনয়নের কথা গোপন রেখেছিলেন। ফিরাউন যখন বলেছিলঃ “তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মূসা (আঃ)-কে হত্যা করি’ সেদিনই শুধু তিনি নিজের ঈমানের কথা প্রকাশ করেছিলেন। আর প্রকৃতপক্ষে এটাই সর্বোত্তম জিহাদ যে, অত্যাচারী বাদশাহর সামনে মানুষ সত্য কথা বলে দেয়, যেমন হাদীসে এসেছে। আর ফিরাউনের সামনে এর চেয়ে বড় ও সত্য কথা আর কিছুই ছিল না। সুতরাং এ লোকটি বড় উচ্চ পর্যায়ের মুজাহিদ ছিলেন, যার সাথে কারো তুলনা করা যায় না। তবে অবশ্যই সহীহ বুখারী ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থে একটি ঘটনা কয়েকটি রিওয়াইয়াতে বর্ণিত আছে, যার সারমর্ম এই যে, হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রাঃ) একদা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আচ্ছা, বলুন তো, মুরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সবচেয়ে বড় কষ্ট কি দিয়েছিল?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তাহলে শুন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাবা শরীফে নামায পড়ছিলেন। এমন সময় উকবা ইবনে আবি মুঈত এসে তাকে ধরে ফেললো এবং তার Bদরখানা তার গলায় বেঁধে দিয়ে টানতে শুরু করলো, যার ফলে তার গলা চিপে গেল এবং তার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তৎক্ষণাৎ হযরত আবু বকর (রাঃ) দৌড়িয়ে এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন এবং বললেনঃ “তোমরা কি এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করতে চাচ্ছ যিনি বলেন, “আমার প্রতিপালক আল্লাহ এবং যিনি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে দলীল প্রমাণাদি নিয়ে এসেছেন?” আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এক জায়গায় কুরায়েশদের সমাবেশ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান দিয়ে গমন করলে তারা বললোঃ “তুমিই কি আমাদেরকে আমাদের পিতৃপুরুষদের মা'বুদগুলোর ইবাদত করতে নিষেধ করে থাকো?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, আমিই ঐ ব্যক্তি বটে।” তখন তারা উঠে গিয়ে তার কাপড় ধরে টানতে থাকে। তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) তার পিছন হতে দৌড়িয়ে গিয়ে তাঁকে তাদের হাত হতে রক্ষা করেন এবং তার দুই চক্ষু দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। এমতাবস্থায় তিনি উচ্চ স্বরে চীৎকার করে বলেনঃ “তোমরা কি এমন একটি লোককে হত্যা করতে যাচ্ছ- যিনি বলেন, আমার প্রতিপালক আল্লাহ এবং যিনি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে দলীল প্রমাণাদি নিয়ে এসেছেন?” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ঐ মুমিন লোকটিও একথাই বলেছিলেনঃ “তোমরা এক ব্যক্তিকে এই জন্যে হত্যা করবে যে, সে বলে- “আমার প্রতিপালক আল্লাহ' অথচ সে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের নিকট এসেছে? যদি সে মিথ্যাবাদীই হয় তবে তার মিথ্যাবাদিতার জন্যে সে-ই দায়ী হবে, আর যদি সত্যবাদী হয়, তবে সে তোমাদেরকে যে শাস্তির কথা বলে, তার কিছু তো তোমাদের উপর আপতিত হবেই। সুতরাং বিবেক সম্মত কথা এটাই যে, তোমরা তাকে ছেড়ে দাও। যারা তাদের অনুসারী হবার তারা হয়ে যাক। তোমরা তাদের ব্যাপারে কোন হস্তক্ষেপ করো না।” হযরত মূসা (আঃ)-ও ফিরাউন এবং তার লোকদের নিকট হতে এটাই কামনা করেছিলেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের পূর্বে ফিরাউনের কওমকে পরীক্ষা করেছি। তাদের কাছে সম্মানিত রাসূল এসেছিল এবং তাদেরকে বলেছিলঃ আল্লাহর বান্দাদেরকে (বানী ইসরাঈলকে) আমার নিকট সমর্পণ করে দাও। আমি তোমাদের কাছে বিশ্বস্ত রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি। তোমরা আল্লাহর উপর বিদ্রোহ ঘোষণা করো না। আমিও তোমাদের নিকট সুস্পষ্ট দলীল নিয়ে এসেছি। তোমরা আমাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করবে তা হতে আমি আমার প্রতিপালকের এবং তোমাদের প্রতিপালকের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যদি তোমরা ঈমান আনয়ন না কর তবে তোমরা আমা হতে দূরে থাকো (আমাকে কষ্ট দিয়ো না)।” (৪৪:১৭-২১)রাসূলুল্লাহও (সঃ) স্বীয় কওমকে একথাই বলেছিলেনঃ “আল্লাহর বান্দাদেরকে তাঁর দিকে আমাকে ডাকতে দাও। তোমরা আমাকে কষ্ট দেয়া হতে বিরত থাকো। আমার আত্মীয়তার প্রতি লক্ষ্য রেখে আমাকে কষ্ট দিয়ো না।” হুদায়বিয়ার সন্ধিও প্রকৃতপক্ষে এটাই ছিল, যাকে প্রকাশ্য বিজয় বলা হয়েছে।ঐ মুমিন লোকটি তার কওমকে আরো বললেনঃ “আল্লাহ সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। তাদের উপর আল্লাহর সাহায্য থাকে না। তাদের কথা ও কাজ সত্বরই তাদের খিয়ানতকে প্রকাশ করে দিবে। পক্ষান্তরে এই নবী (আঃ) বিশৃংখলা সৃষ্টি করা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তিনি সরল, সঠিক ও সত্য পথের উপর রয়েছেন। তিনি কথায় সত্যবাদী এবং আমলে পাকা। যদি তিনি সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদী হতেন তবে তার মধ্যে কখনো এই সততা ও সত্যবাদিতা থাকতো না।” অতঃপর স্বীয় সম্প্রদায়কে উপদেশ দিচ্ছেন এবং তাদেরকে আল্লাহর আযাব হতে ভয় প্রদর্শন করছেন। তিনি তাদেরকে বলেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! আজ কর্তৃত্ব তোমাদের, দেশে তোমরাই প্রবল। কিন্তু আমাদের উপর শাস্তি এসে পড়লে কে আমাদেরকে সাহায্য করবে?” অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা এদেশের শাসন ক্ষমতা তোমাদেরকেই দান করেছেন এবং তোমাদেরকে বড়ই মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার এই নিয়ামতের জন্যে তোমাদের তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-কে সত্যবাদী হিসেবে মেনে নেয়া একান্ত কর্তব্য। যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও এবং তাঁর রাসূল (আঃ)-এর প্রতি মন্দ দৃষ্টি নিক্ষেপ কর তবে নিশ্চয়ই আল্লাহর আযাব তোমাদের উপর আপতিত হবে। বলতে, ঐ সময় কে তোমাদেরকে আল্লাহর আযাব হতে রক্ষা করবে? তোমাদের এ সেনাবাহিনী, জান ও মাল তোমাদের কোনই কাজে আসবে না।ফিরাউন ঐ ব্যক্তির একথার কোন জ্ঞান সম্মত উত্তর দিতে পারলো না। সুতরাং বাহ্যিকভাবে সহানুভূতি দেখিয়ে বললোঃ “আমি তো তোমাদের শুভাকাক্ষী। আমি তোমাদেরকে ধোকা দিচ্ছি না। আমি যা বুঝছি তাই তোমাদেরকে বলছি। আমি তোমাদেরকে শুধু সৎপথই দেখিয়ে থাকি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটাও ছিল তার বিশ্বাসঘাতকতা। সে ভালভাবেই জানতো যে, হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর রাসূল। যেমন মহান আল্লাহ হযরত মূসা (আঃ)-এর উক্তি উদ্ধৃত করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে ফিরাউন!) তুমি তো জান যে, এগুলো (এ বিস্ময়কর জিনিসগুলো) আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালকই অবতীর্ণ করেছেন, যেগুলো জ্ঞানবর্তিকা স্বরূপ।" (১৭:১০২) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অন্তরে বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও শুধু যুলুম ও সীমালংঘন হিসেবেই তারা অস্বীকার করে বসেছে।” (২৭:১৪) অনুরূপভাবে তার আমি যা বুঝি, তাই তোমাদেরকে বলছি' এ কথাও ছিল সম্পূর্ণ ভুল। প্রকৃতপক্ষে সে জনগণকে প্রতারিত করছিল এবং প্রজাবর্গের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছিল। তার কওম তার প্রতারণার ফাঁদে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল এবং তার কথা মেনে নিয়েছিল। ফিরাউন তাদেরকে কোন ভাল পথে আনয়ন করেনি। তার কাজ সঠিকই ছিল না। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফিরাউন তার কওমকে পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেনি।” (২০:৭৯) হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে নেতা তার প্রজাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না, অথচ জান্নাতের সুগন্ধ পাঁচশ বছরের পথের ব্যবধান হতেও এসে থাকে। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
গাফির 40:30
৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: ঐ মুমিন লোকটির নসীহতের শেষাংশের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় কওমকে সম্বোধন করে আরো বলেনঃ “হে আমার কওম! যদি তোমরা আল্লাহর এই রাসূল (সঃ)-কে নামানো এবং নিজেদের হঠকারিতার উপর স্থির থাকো তবে আমি আশংকা করছি যে, তোমাদের পূর্ববর্তী কওমের মত তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে। হযরত নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়, আ’দ সম্প্রদায় এবং সামূদ সম্প্রদায়ের প্রতি লক্ষ্য কর যে, রাসূলদেরকে (আঃ) না মানার কারণে তাদের উপর কি ভীষণ আযাবই না আপতিত হয়েছিল! এমন কেউ ছিল না যে, তাদেরকে ঐ আযাব হতে রক্ষা করতে পারে। এতে তাদের প্রতি মহান আল্লাহর কোন যুলুম ছিল না। তার মহান সত্তা বান্দাদের উপর যুলুম করা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। ওটা ছিল তাদের নিজেদেরই কৃতকর্মের ফল। আমি তোমাদের ব্যাপারে কিয়ামত দিবসের শাস্তিকে ভয় করি, যেই দিন অত্যন্ত ভয়াবহ হবে।”শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হাদীসে রয়েছে যে, যখন যমীনের উপর ভূমিকম্প আসবে এবং যমীন ফেটে যাবে তখন জনগণ ভয় ও সন্ত্রাসে হতবুদ্ধি হয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে এবং একে অপরকে ডাকাডাকি করতে থাকবে। যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এটা ঐ সময়ের বর্ণনা, যখন জাহান্নামকে আনয়ন করা হবে এবং জনগণ ওটা দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে থাকবে এবং ফেরেশতামণ্ডলী তাদেরকে হাশরের ময়দানের দিকে ফিরিয়ে আনবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফেরেশতারা আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে।” আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে জ্বিন ও মনুষ্য সম্প্রদায়! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সীমা তোমরা যদি অতিক্রম করতে পার, অতিক্রম কর, কিন্তু তোমরা তা পারবে না শক্তি ব্যতিরেকে।” (৫৫:৩৩) হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ)-এর কিরআতে অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে তাশদীদ রয়েছে। এটা (আরবী) বাক্য হতে গৃহীত হয়েছে। যখন উট বেয়াড়া ও উদ্ধত হয়ে উঠে তখন এই বাক্য বলা হয়ে থাকে।বলা হয়েছে যে, যে দাঁড়িপাল্লায় আমল ওযন করা হবে সেখানে একজন ফেরেশতা থাকবেন। যার পুণ্য বেশী হবে তার ব্যাপারে ঐ ফেরেস্তা উচ্চ স্বরে ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জনমণ্ডলী! অমুকের পুত্র অমুক সৌভাগ্যবান হয়ে গেছে এবং আজকের পরে তার ভাগ্য কখনো আর খারাপ হবে না। আর যার পুণ্য কমে যাবে তার সম্পর্কে ঐ ফেরেশতা উচ্চ স্বরে ডাক দিয়ে বলবেনঃ “অমুকের পুত্র অমুক হতভাগ্য হয়ে গেছে এবং সে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে।”হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ কিয়ামতকে (আরবী) বলার কারণ এই যে, প্রত্যেক কওমকে তাদের আমলসহ ডাক দেয়া হবে। জান্নাতবাসী ডাকবে জান্নাতবাসীকে এবং জাহান্নামবাসী ডাকবে জাহান্নামবাসীকে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, জান্নাতবাসীরা জাহান্নামবাসীদেরকে ডাক দিবে এবং জাহান্নামবাসীরা জান্নাতবাসীদেরকে আহ্বান করবে বলেই কিয়ামত দিবসকে (আরবী) বলা হয়েছে। যেমন জান্নাতীরা জাহান্নামীদের ডাক দিয়ে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা তো তা সত্য পেয়েছি। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যা বলেছিলেন তোমরাও তা সত্য পেয়েছো কি? তারা বলবে, হাঁ।” (৭:৪৪) আর জাহান্নামীরা জান্নাতীদেরকে সম্বোধন করে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের উপর কিছু পানি ঢেলে দাও, অথবা আল্লাহ্ জীবিকারূপে তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা হতে কিছু দাও। তারা বলবেঃ আল্লাহ্ এ দু'টি নিষিদ্ধ করেছেন কাফিরদের উপর।”(৭:৫০) আর এ কারণেও যে, আরাফবাসীরা জান্নাতবাসীদেরকে ও জাহান্নাম বাসীদেরকে ডাক দিবে। যেমন এগুলো সূরায়ে আ'রাফে বর্ণিত হয়েছে।ইমাম বাগাভী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন এটাই গ্রহণ করেছেন যে, এসব কারণেই কিয়ামত দিবসকে (আরবী) বলা হয়েছে। এই উক্তিটি খুবই পছন্দনীয় বটে। তবে এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন মানুষ পশ্চাৎ ফিরে পলায়ন করতে চাইবে, কিন্তু পালাবার কোন জায়গা পাবে না এবং তাদেরকে বলা হবেঃ আজ অবস্থান স্থল এটাই। সেই দিন আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করার কেউ থাকবে না। আল্লাহ ছাড়া ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী আর কেউই নেই। তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন পথ প্রদর্শক নেই।এরপর ইরশাদ হচ্ছে ? ইতিপূর্বে মিসরবাসীদের নিকট হযরত ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর নবী হিসেবে আগমন করেছিলেন। তিনিই প্রেরিত হয়েছিলেন হযরত মূসা (আঃ)-এর পূর্বে। মিসরের আযীযও তিনি ছিলেন। তিনি স্বীয় উম্মতকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কওম তার কথা মানেনি। তবে পার্থিব শাসন ক্ষমতা তার ছিল বলে পার্থিব দিক দিয়ে তাদেরকে তাঁর অধীনতা স্বীকার করতেই হয়েছিল। তাই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ পরিশেষে যখন ইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যু হলো তখন তোমরা বলেছিলেঃ তার পরে আল্লাহ্ আর কাউকেও রাসূল করে প্রেরণ করবেন না। এই ছিল তাদের কুফরী ও অবিশ্বাসকরণ। এই ভাবে আল্লাহ্ বিভ্রান্ত করেন সীমালংঘনকারী ও সংশয়বাদীদেরকে। অর্থাৎ তোমাদের যে অবস্থা হয়েছে এই অবস্থাই এমন সবারই হয়ে থাকে যারা সীমালংঘন করে সংশয় সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়। যারা সত্যকে মিথ্যা দ্বারা সরিয়ে দেয় এবং বিনা দলীলে প্রকৃত দলীলসমূহ পরিহার করে ও বিতর্কে লিপ্ত হয়। এ কারণে আল্লাহ তাদের প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট। তাদের এ কার্যকলাপ যখন আল্লাহ্ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ তখন মুমিনরাও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট। যেসব লোকের মধ্যে এই ঘৃণ্য বিশেষণ থাকে তাদের অন্তরে আল্লাহ্ তা'আলা মোহর মেরে দেন, যার কারণে এর পরে তারা না ভাল-কে ভাল বলে বুঝতে পারে, না . মন্দকে মন্দ জ্ঞান করতে পারে। তাই তো মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে আল্লাহ্ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর করে দেন। হযরত শা'বী (রঃ) বলেন যে, জাব্বার হলো ঐ ব্যক্তি যে দু’জন লোককে হত্যা করে। আবূ ইমরান জাওনী (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে অন্যায়ভাবে কাউকেও হত্যা করে সেই হলো জাব্বার। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:31
৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: ঐ মুমিন লোকটির নসীহতের শেষাংশের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় কওমকে সম্বোধন করে আরো বলেনঃ “হে আমার কওম! যদি তোমরা আল্লাহর এই রাসূল (সঃ)-কে নামানো এবং নিজেদের হঠকারিতার উপর স্থির থাকো তবে আমি আশংকা করছি যে, তোমাদের পূর্ববর্তী কওমের মত তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে। হযরত নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়, আ’দ সম্প্রদায় এবং সামূদ সম্প্রদায়ের প্রতি লক্ষ্য কর যে, রাসূলদেরকে (আঃ) না মানার কারণে তাদের উপর কি ভীষণ আযাবই না আপতিত হয়েছিল! এমন কেউ ছিল না যে, তাদেরকে ঐ আযাব হতে রক্ষা করতে পারে। এতে তাদের প্রতি মহান আল্লাহর কোন যুলুম ছিল না। তার মহান সত্তা বান্দাদের উপর যুলুম করা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। ওটা ছিল তাদের নিজেদেরই কৃতকর্মের ফল। আমি তোমাদের ব্যাপারে কিয়ামত দিবসের শাস্তিকে ভয় করি, যেই দিন অত্যন্ত ভয়াবহ হবে।”শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হাদীসে রয়েছে যে, যখন যমীনের উপর ভূমিকম্প আসবে এবং যমীন ফেটে যাবে তখন জনগণ ভয় ও সন্ত্রাসে হতবুদ্ধি হয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে এবং একে অপরকে ডাকাডাকি করতে থাকবে। যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এটা ঐ সময়ের বর্ণনা, যখন জাহান্নামকে আনয়ন করা হবে এবং জনগণ ওটা দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে থাকবে এবং ফেরেশতামণ্ডলী তাদেরকে হাশরের ময়দানের দিকে ফিরিয়ে আনবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফেরেশতারা আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে।” আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে জ্বিন ও মনুষ্য সম্প্রদায়! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সীমা তোমরা যদি অতিক্রম করতে পার, অতিক্রম কর, কিন্তু তোমরা তা পারবে না শক্তি ব্যতিরেকে।” (৫৫:৩৩) হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ)-এর কিরআতে অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে তাশদীদ রয়েছে। এটা (আরবী) বাক্য হতে গৃহীত হয়েছে। যখন উট বেয়াড়া ও উদ্ধত হয়ে উঠে তখন এই বাক্য বলা হয়ে থাকে।বলা হয়েছে যে, যে দাঁড়িপাল্লায় আমল ওযন করা হবে সেখানে একজন ফেরেশতা থাকবেন। যার পুণ্য বেশী হবে তার ব্যাপারে ঐ ফেরেস্তা উচ্চ স্বরে ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জনমণ্ডলী! অমুকের পুত্র অমুক সৌভাগ্যবান হয়ে গেছে এবং আজকের পরে তার ভাগ্য কখনো আর খারাপ হবে না। আর যার পুণ্য কমে যাবে তার সম্পর্কে ঐ ফেরেশতা উচ্চ স্বরে ডাক দিয়ে বলবেনঃ “অমুকের পুত্র অমুক হতভাগ্য হয়ে গেছে এবং সে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে।”হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ কিয়ামতকে (আরবী) বলার কারণ এই যে, প্রত্যেক কওমকে তাদের আমলসহ ডাক দেয়া হবে। জান্নাতবাসী ডাকবে জান্নাতবাসীকে এবং জাহান্নামবাসী ডাকবে জাহান্নামবাসীকে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, জান্নাতবাসীরা জাহান্নামবাসীদেরকে ডাক দিবে এবং জাহান্নামবাসীরা জান্নাতবাসীদেরকে আহ্বান করবে বলেই কিয়ামত দিবসকে (আরবী) বলা হয়েছে। যেমন জান্নাতীরা জাহান্নামীদের ডাক দিয়ে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা তো তা সত্য পেয়েছি। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যা বলেছিলেন তোমরাও তা সত্য পেয়েছো কি? তারা বলবে, হাঁ।” (৭:৪৪) আর জাহান্নামীরা জান্নাতীদেরকে সম্বোধন করে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের উপর কিছু পানি ঢেলে দাও, অথবা আল্লাহ্ জীবিকারূপে তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা হতে কিছু দাও। তারা বলবেঃ আল্লাহ্ এ দু'টি নিষিদ্ধ করেছেন কাফিরদের উপর।”(৭:৫০) আর এ কারণেও যে, আরাফবাসীরা জান্নাতবাসীদেরকে ও জাহান্নাম বাসীদেরকে ডাক দিবে। যেমন এগুলো সূরায়ে আ'রাফে বর্ণিত হয়েছে।ইমাম বাগাভী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন এটাই গ্রহণ করেছেন যে, এসব কারণেই কিয়ামত দিবসকে (আরবী) বলা হয়েছে। এই উক্তিটি খুবই পছন্দনীয় বটে। তবে এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন মানুষ পশ্চাৎ ফিরে পলায়ন করতে চাইবে, কিন্তু পালাবার কোন জায়গা পাবে না এবং তাদেরকে বলা হবেঃ আজ অবস্থান স্থল এটাই। সেই দিন আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করার কেউ থাকবে না। আল্লাহ ছাড়া ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী আর কেউই নেই। তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন পথ প্রদর্শক নেই।এরপর ইরশাদ হচ্ছে ? ইতিপূর্বে মিসরবাসীদের নিকট হযরত ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর নবী হিসেবে আগমন করেছিলেন। তিনিই প্রেরিত হয়েছিলেন হযরত মূসা (আঃ)-এর পূর্বে। মিসরের আযীযও তিনি ছিলেন। তিনি স্বীয় উম্মতকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কওম তার কথা মানেনি। তবে পার্থিব শাসন ক্ষমতা তার ছিল বলে পার্থিব দিক দিয়ে তাদেরকে তাঁর অধীনতা স্বীকার করতেই হয়েছিল। তাই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ পরিশেষে যখন ইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যু হলো তখন তোমরা বলেছিলেঃ তার পরে আল্লাহ্ আর কাউকেও রাসূল করে প্রেরণ করবেন না। এই ছিল তাদের কুফরী ও অবিশ্বাসকরণ। এই ভাবে আল্লাহ্ বিভ্রান্ত করেন সীমালংঘনকারী ও সংশয়বাদীদেরকে। অর্থাৎ তোমাদের যে অবস্থা হয়েছে এই অবস্থাই এমন সবারই হয়ে থাকে যারা সীমালংঘন করে সংশয় সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়। যারা সত্যকে মিথ্যা দ্বারা সরিয়ে দেয় এবং বিনা দলীলে প্রকৃত দলীলসমূহ পরিহার করে ও বিতর্কে লিপ্ত হয়। এ কারণে আল্লাহ তাদের প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট। তাদের এ কার্যকলাপ যখন আল্লাহ্ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ তখন মুমিনরাও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট। যেসব লোকের মধ্যে এই ঘৃণ্য বিশেষণ থাকে তাদের অন্তরে আল্লাহ্ তা'আলা মোহর মেরে দেন, যার কারণে এর পরে তারা না ভাল-কে ভাল বলে বুঝতে পারে, না . মন্দকে মন্দ জ্ঞান করতে পারে। তাই তো মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে আল্লাহ্ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর করে দেন। হযরত শা'বী (রঃ) বলেন যে, জাব্বার হলো ঐ ব্যক্তি যে দু’জন লোককে হত্যা করে। আবূ ইমরান জাওনী (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে অন্যায়ভাবে কাউকেও হত্যা করে সেই হলো জাব্বার। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:32
৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: ঐ মুমিন লোকটির নসীহতের শেষাংশের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় কওমকে সম্বোধন করে আরো বলেনঃ “হে আমার কওম! যদি তোমরা আল্লাহর এই রাসূল (সঃ)-কে নামানো এবং নিজেদের হঠকারিতার উপর স্থির থাকো তবে আমি আশংকা করছি যে, তোমাদের পূর্ববর্তী কওমের মত তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে। হযরত নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়, আ’দ সম্প্রদায় এবং সামূদ সম্প্রদায়ের প্রতি লক্ষ্য কর যে, রাসূলদেরকে (আঃ) না মানার কারণে তাদের উপর কি ভীষণ আযাবই না আপতিত হয়েছিল! এমন কেউ ছিল না যে, তাদেরকে ঐ আযাব হতে রক্ষা করতে পারে। এতে তাদের প্রতি মহান আল্লাহর কোন যুলুম ছিল না। তার মহান সত্তা বান্দাদের উপর যুলুম করা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। ওটা ছিল তাদের নিজেদেরই কৃতকর্মের ফল। আমি তোমাদের ব্যাপারে কিয়ামত দিবসের শাস্তিকে ভয় করি, যেই দিন অত্যন্ত ভয়াবহ হবে।”শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হাদীসে রয়েছে যে, যখন যমীনের উপর ভূমিকম্প আসবে এবং যমীন ফেটে যাবে তখন জনগণ ভয় ও সন্ত্রাসে হতবুদ্ধি হয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে এবং একে অপরকে ডাকাডাকি করতে থাকবে। যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এটা ঐ সময়ের বর্ণনা, যখন জাহান্নামকে আনয়ন করা হবে এবং জনগণ ওটা দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে থাকবে এবং ফেরেশতামণ্ডলী তাদেরকে হাশরের ময়দানের দিকে ফিরিয়ে আনবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফেরেশতারা আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে।” আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে জ্বিন ও মনুষ্য সম্প্রদায়! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সীমা তোমরা যদি অতিক্রম করতে পার, অতিক্রম কর, কিন্তু তোমরা তা পারবে না শক্তি ব্যতিরেকে।” (৫৫:৩৩) হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ)-এর কিরআতে অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে তাশদীদ রয়েছে। এটা (আরবী) বাক্য হতে গৃহীত হয়েছে। যখন উট বেয়াড়া ও উদ্ধত হয়ে উঠে তখন এই বাক্য বলা হয়ে থাকে।বলা হয়েছে যে, যে দাঁড়িপাল্লায় আমল ওযন করা হবে সেখানে একজন ফেরেশতা থাকবেন। যার পুণ্য বেশী হবে তার ব্যাপারে ঐ ফেরেস্তা উচ্চ স্বরে ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জনমণ্ডলী! অমুকের পুত্র অমুক সৌভাগ্যবান হয়ে গেছে এবং আজকের পরে তার ভাগ্য কখনো আর খারাপ হবে না। আর যার পুণ্য কমে যাবে তার সম্পর্কে ঐ ফেরেশতা উচ্চ স্বরে ডাক দিয়ে বলবেনঃ “অমুকের পুত্র অমুক হতভাগ্য হয়ে গেছে এবং সে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে।”হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ কিয়ামতকে (আরবী) বলার কারণ এই যে, প্রত্যেক কওমকে তাদের আমলসহ ডাক দেয়া হবে। জান্নাতবাসী ডাকবে জান্নাতবাসীকে এবং জাহান্নামবাসী ডাকবে জাহান্নামবাসীকে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, জান্নাতবাসীরা জাহান্নামবাসীদেরকে ডাক দিবে এবং জাহান্নামবাসীরা জান্নাতবাসীদেরকে আহ্বান করবে বলেই কিয়ামত দিবসকে (আরবী) বলা হয়েছে। যেমন জান্নাতীরা জাহান্নামীদের ডাক দিয়ে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা তো তা সত্য পেয়েছি। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যা বলেছিলেন তোমরাও তা সত্য পেয়েছো কি? তারা বলবে, হাঁ।” (৭:৪৪) আর জাহান্নামীরা জান্নাতীদেরকে সম্বোধন করে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের উপর কিছু পানি ঢেলে দাও, অথবা আল্লাহ্ জীবিকারূপে তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা হতে কিছু দাও। তারা বলবেঃ আল্লাহ্ এ দু'টি নিষিদ্ধ করেছেন কাফিরদের উপর।”(৭:৫০) আর এ কারণেও যে, আরাফবাসীরা জান্নাতবাসীদেরকে ও জাহান্নাম বাসীদেরকে ডাক দিবে। যেমন এগুলো সূরায়ে আ'রাফে বর্ণিত হয়েছে।ইমাম বাগাভী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন এটাই গ্রহণ করেছেন যে, এসব কারণেই কিয়ামত দিবসকে (আরবী) বলা হয়েছে। এই উক্তিটি খুবই পছন্দনীয় বটে। তবে এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন মানুষ পশ্চাৎ ফিরে পলায়ন করতে চাইবে, কিন্তু পালাবার কোন জায়গা পাবে না এবং তাদেরকে বলা হবেঃ আজ অবস্থান স্থল এটাই। সেই দিন আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করার কেউ থাকবে না। আল্লাহ ছাড়া ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী আর কেউই নেই। তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন পথ প্রদর্শক নেই।এরপর ইরশাদ হচ্ছে ? ইতিপূর্বে মিসরবাসীদের নিকট হযরত ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর নবী হিসেবে আগমন করেছিলেন। তিনিই প্রেরিত হয়েছিলেন হযরত মূসা (আঃ)-এর পূর্বে। মিসরের আযীযও তিনি ছিলেন। তিনি স্বীয় উম্মতকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কওম তার কথা মানেনি। তবে পার্থিব শাসন ক্ষমতা তার ছিল বলে পার্থিব দিক দিয়ে তাদেরকে তাঁর অধীনতা স্বীকার করতেই হয়েছিল। তাই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ পরিশেষে যখন ইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যু হলো তখন তোমরা বলেছিলেঃ তার পরে আল্লাহ্ আর কাউকেও রাসূল করে প্রেরণ করবেন না। এই ছিল তাদের কুফরী ও অবিশ্বাসকরণ। এই ভাবে আল্লাহ্ বিভ্রান্ত করেন সীমালংঘনকারী ও সংশয়বাদীদেরকে। অর্থাৎ তোমাদের যে অবস্থা হয়েছে এই অবস্থাই এমন সবারই হয়ে থাকে যারা সীমালংঘন করে সংশয় সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়। যারা সত্যকে মিথ্যা দ্বারা সরিয়ে দেয় এবং বিনা দলীলে প্রকৃত দলীলসমূহ পরিহার করে ও বিতর্কে লিপ্ত হয়। এ কারণে আল্লাহ তাদের প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট। তাদের এ কার্যকলাপ যখন আল্লাহ্ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ তখন মুমিনরাও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট। যেসব লোকের মধ্যে এই ঘৃণ্য বিশেষণ থাকে তাদের অন্তরে আল্লাহ্ তা'আলা মোহর মেরে দেন, যার কারণে এর পরে তারা না ভাল-কে ভাল বলে বুঝতে পারে, না . মন্দকে মন্দ জ্ঞান করতে পারে। তাই তো মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে আল্লাহ্ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর করে দেন। হযরত শা'বী (রঃ) বলেন যে, জাব্বার হলো ঐ ব্যক্তি যে দু’জন লোককে হত্যা করে। আবূ ইমরান জাওনী (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে অন্যায়ভাবে কাউকেও হত্যা করে সেই হলো জাব্বার। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:33
৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: ঐ মুমিন লোকটির নসীহতের শেষাংশের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় কওমকে সম্বোধন করে আরো বলেনঃ “হে আমার কওম! যদি তোমরা আল্লাহর এই রাসূল (সঃ)-কে নামানো এবং নিজেদের হঠকারিতার উপর স্থির থাকো তবে আমি আশংকা করছি যে, তোমাদের পূর্ববর্তী কওমের মত তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে। হযরত নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়, আ’দ সম্প্রদায় এবং সামূদ সম্প্রদায়ের প্রতি লক্ষ্য কর যে, রাসূলদেরকে (আঃ) না মানার কারণে তাদের উপর কি ভীষণ আযাবই না আপতিত হয়েছিল! এমন কেউ ছিল না যে, তাদেরকে ঐ আযাব হতে রক্ষা করতে পারে। এতে তাদের প্রতি মহান আল্লাহর কোন যুলুম ছিল না। তার মহান সত্তা বান্দাদের উপর যুলুম করা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। ওটা ছিল তাদের নিজেদেরই কৃতকর্মের ফল। আমি তোমাদের ব্যাপারে কিয়ামত দিবসের শাস্তিকে ভয় করি, যেই দিন অত্যন্ত ভয়াবহ হবে।”শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হাদীসে রয়েছে যে, যখন যমীনের উপর ভূমিকম্প আসবে এবং যমীন ফেটে যাবে তখন জনগণ ভয় ও সন্ত্রাসে হতবুদ্ধি হয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে এবং একে অপরকে ডাকাডাকি করতে থাকবে। যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এটা ঐ সময়ের বর্ণনা, যখন জাহান্নামকে আনয়ন করা হবে এবং জনগণ ওটা দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে থাকবে এবং ফেরেশতামণ্ডলী তাদেরকে হাশরের ময়দানের দিকে ফিরিয়ে আনবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফেরেশতারা আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে।” আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে জ্বিন ও মনুষ্য সম্প্রদায়! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সীমা তোমরা যদি অতিক্রম করতে পার, অতিক্রম কর, কিন্তু তোমরা তা পারবে না শক্তি ব্যতিরেকে।” (৫৫:৩৩) হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ)-এর কিরআতে অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে তাশদীদ রয়েছে। এটা (আরবী) বাক্য হতে গৃহীত হয়েছে। যখন উট বেয়াড়া ও উদ্ধত হয়ে উঠে তখন এই বাক্য বলা হয়ে থাকে।বলা হয়েছে যে, যে দাঁড়িপাল্লায় আমল ওযন করা হবে সেখানে একজন ফেরেশতা থাকবেন। যার পুণ্য বেশী হবে তার ব্যাপারে ঐ ফেরেস্তা উচ্চ স্বরে ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জনমণ্ডলী! অমুকের পুত্র অমুক সৌভাগ্যবান হয়ে গেছে এবং আজকের পরে তার ভাগ্য কখনো আর খারাপ হবে না। আর যার পুণ্য কমে যাবে তার সম্পর্কে ঐ ফেরেশতা উচ্চ স্বরে ডাক দিয়ে বলবেনঃ “অমুকের পুত্র অমুক হতভাগ্য হয়ে গেছে এবং সে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে।”হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ কিয়ামতকে (আরবী) বলার কারণ এই যে, প্রত্যেক কওমকে তাদের আমলসহ ডাক দেয়া হবে। জান্নাতবাসী ডাকবে জান্নাতবাসীকে এবং জাহান্নামবাসী ডাকবে জাহান্নামবাসীকে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, জান্নাতবাসীরা জাহান্নামবাসীদেরকে ডাক দিবে এবং জাহান্নামবাসীরা জান্নাতবাসীদেরকে আহ্বান করবে বলেই কিয়ামত দিবসকে (আরবী) বলা হয়েছে। যেমন জান্নাতীরা জাহান্নামীদের ডাক দিয়ে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা তো তা সত্য পেয়েছি। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যা বলেছিলেন তোমরাও তা সত্য পেয়েছো কি? তারা বলবে, হাঁ।” (৭:৪৪) আর জাহান্নামীরা জান্নাতীদেরকে সম্বোধন করে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের উপর কিছু পানি ঢেলে দাও, অথবা আল্লাহ্ জীবিকারূপে তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা হতে কিছু দাও। তারা বলবেঃ আল্লাহ্ এ দু'টি নিষিদ্ধ করেছেন কাফিরদের উপর।”(৭:৫০) আর এ কারণেও যে, আরাফবাসীরা জান্নাতবাসীদেরকে ও জাহান্নাম বাসীদেরকে ডাক দিবে। যেমন এগুলো সূরায়ে আ'রাফে বর্ণিত হয়েছে।ইমাম বাগাভী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন এটাই গ্রহণ করেছেন যে, এসব কারণেই কিয়ামত দিবসকে (আরবী) বলা হয়েছে। এই উক্তিটি খুবই পছন্দনীয় বটে। তবে এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন মানুষ পশ্চাৎ ফিরে পলায়ন করতে চাইবে, কিন্তু পালাবার কোন জায়গা পাবে না এবং তাদেরকে বলা হবেঃ আজ অবস্থান স্থল এটাই। সেই দিন আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করার কেউ থাকবে না। আল্লাহ ছাড়া ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী আর কেউই নেই। তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন পথ প্রদর্শক নেই।এরপর ইরশাদ হচ্ছে ? ইতিপূর্বে মিসরবাসীদের নিকট হযরত ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর নবী হিসেবে আগমন করেছিলেন। তিনিই প্রেরিত হয়েছিলেন হযরত মূসা (আঃ)-এর পূর্বে। মিসরের আযীযও তিনি ছিলেন। তিনি স্বীয় উম্মতকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কওম তার কথা মানেনি। তবে পার্থিব শাসন ক্ষমতা তার ছিল বলে পার্থিব দিক দিয়ে তাদেরকে তাঁর অধীনতা স্বীকার করতেই হয়েছিল। তাই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ পরিশেষে যখন ইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যু হলো তখন তোমরা বলেছিলেঃ তার পরে আল্লাহ্ আর কাউকেও রাসূল করে প্রেরণ করবেন না। এই ছিল তাদের কুফরী ও অবিশ্বাসকরণ। এই ভাবে আল্লাহ্ বিভ্রান্ত করেন সীমালংঘনকারী ও সংশয়বাদীদেরকে। অর্থাৎ তোমাদের যে অবস্থা হয়েছে এই অবস্থাই এমন সবারই হয়ে থাকে যারা সীমালংঘন করে সংশয় সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়। যারা সত্যকে মিথ্যা দ্বারা সরিয়ে দেয় এবং বিনা দলীলে প্রকৃত দলীলসমূহ পরিহার করে ও বিতর্কে লিপ্ত হয়। এ কারণে আল্লাহ তাদের প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট। তাদের এ কার্যকলাপ যখন আল্লাহ্ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ তখন মুমিনরাও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট। যেসব লোকের মধ্যে এই ঘৃণ্য বিশেষণ থাকে তাদের অন্তরে আল্লাহ্ তা'আলা মোহর মেরে দেন, যার কারণে এর পরে তারা না ভাল-কে ভাল বলে বুঝতে পারে, না . মন্দকে মন্দ জ্ঞান করতে পারে। তাই তো মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে আল্লাহ্ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর করে দেন। হযরত শা'বী (রঃ) বলেন যে, জাব্বার হলো ঐ ব্যক্তি যে দু’জন লোককে হত্যা করে। আবূ ইমরান জাওনী (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে অন্যায়ভাবে কাউকেও হত্যা করে সেই হলো জাব্বার। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:34
৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: ঐ মুমিন লোকটির নসীহতের শেষাংশের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় কওমকে সম্বোধন করে আরো বলেনঃ “হে আমার কওম! যদি তোমরা আল্লাহর এই রাসূল (সঃ)-কে নামানো এবং নিজেদের হঠকারিতার উপর স্থির থাকো তবে আমি আশংকা করছি যে, তোমাদের পূর্ববর্তী কওমের মত তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে। হযরত নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়, আ’দ সম্প্রদায় এবং সামূদ সম্প্রদায়ের প্রতি লক্ষ্য কর যে, রাসূলদেরকে (আঃ) না মানার কারণে তাদের উপর কি ভীষণ আযাবই না আপতিত হয়েছিল! এমন কেউ ছিল না যে, তাদেরকে ঐ আযাব হতে রক্ষা করতে পারে। এতে তাদের প্রতি মহান আল্লাহর কোন যুলুম ছিল না। তার মহান সত্তা বান্দাদের উপর যুলুম করা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। ওটা ছিল তাদের নিজেদেরই কৃতকর্মের ফল। আমি তোমাদের ব্যাপারে কিয়ামত দিবসের শাস্তিকে ভয় করি, যেই দিন অত্যন্ত ভয়াবহ হবে।”শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হাদীসে রয়েছে যে, যখন যমীনের উপর ভূমিকম্প আসবে এবং যমীন ফেটে যাবে তখন জনগণ ভয় ও সন্ত্রাসে হতবুদ্ধি হয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে এবং একে অপরকে ডাকাডাকি করতে থাকবে। যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এটা ঐ সময়ের বর্ণনা, যখন জাহান্নামকে আনয়ন করা হবে এবং জনগণ ওটা দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে থাকবে এবং ফেরেশতামণ্ডলী তাদেরকে হাশরের ময়দানের দিকে ফিরিয়ে আনবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফেরেশতারা আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে।” আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে জ্বিন ও মনুষ্য সম্প্রদায়! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সীমা তোমরা যদি অতিক্রম করতে পার, অতিক্রম কর, কিন্তু তোমরা তা পারবে না শক্তি ব্যতিরেকে।” (৫৫:৩৩) হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ)-এর কিরআতে অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে তাশদীদ রয়েছে। এটা (আরবী) বাক্য হতে গৃহীত হয়েছে। যখন উট বেয়াড়া ও উদ্ধত হয়ে উঠে তখন এই বাক্য বলা হয়ে থাকে।বলা হয়েছে যে, যে দাঁড়িপাল্লায় আমল ওযন করা হবে সেখানে একজন ফেরেশতা থাকবেন। যার পুণ্য বেশী হবে তার ব্যাপারে ঐ ফেরেস্তা উচ্চ স্বরে ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জনমণ্ডলী! অমুকের পুত্র অমুক সৌভাগ্যবান হয়ে গেছে এবং আজকের পরে তার ভাগ্য কখনো আর খারাপ হবে না। আর যার পুণ্য কমে যাবে তার সম্পর্কে ঐ ফেরেশতা উচ্চ স্বরে ডাক দিয়ে বলবেনঃ “অমুকের পুত্র অমুক হতভাগ্য হয়ে গেছে এবং সে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে।”হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ কিয়ামতকে (আরবী) বলার কারণ এই যে, প্রত্যেক কওমকে তাদের আমলসহ ডাক দেয়া হবে। জান্নাতবাসী ডাকবে জান্নাতবাসীকে এবং জাহান্নামবাসী ডাকবে জাহান্নামবাসীকে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, জান্নাতবাসীরা জাহান্নামবাসীদেরকে ডাক দিবে এবং জাহান্নামবাসীরা জান্নাতবাসীদেরকে আহ্বান করবে বলেই কিয়ামত দিবসকে (আরবী) বলা হয়েছে। যেমন জান্নাতীরা জাহান্নামীদের ডাক দিয়ে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা তো তা সত্য পেয়েছি। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যা বলেছিলেন তোমরাও তা সত্য পেয়েছো কি? তারা বলবে, হাঁ।” (৭:৪৪) আর জাহান্নামীরা জান্নাতীদেরকে সম্বোধন করে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের উপর কিছু পানি ঢেলে দাও, অথবা আল্লাহ্ জীবিকারূপে তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা হতে কিছু দাও। তারা বলবেঃ আল্লাহ্ এ দু'টি নিষিদ্ধ করেছেন কাফিরদের উপর।”(৭:৫০) আর এ কারণেও যে, আরাফবাসীরা জান্নাতবাসীদেরকে ও জাহান্নাম বাসীদেরকে ডাক দিবে। যেমন এগুলো সূরায়ে আ'রাফে বর্ণিত হয়েছে।ইমাম বাগাভী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন এটাই গ্রহণ করেছেন যে, এসব কারণেই কিয়ামত দিবসকে (আরবী) বলা হয়েছে। এই উক্তিটি খুবই পছন্দনীয় বটে। তবে এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন মানুষ পশ্চাৎ ফিরে পলায়ন করতে চাইবে, কিন্তু পালাবার কোন জায়গা পাবে না এবং তাদেরকে বলা হবেঃ আজ অবস্থান স্থল এটাই। সেই দিন আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করার কেউ থাকবে না। আল্লাহ ছাড়া ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী আর কেউই নেই। তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন পথ প্রদর্শক নেই।এরপর ইরশাদ হচ্ছে ? ইতিপূর্বে মিসরবাসীদের নিকট হযরত ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর নবী হিসেবে আগমন করেছিলেন। তিনিই প্রেরিত হয়েছিলেন হযরত মূসা (আঃ)-এর পূর্বে। মিসরের আযীযও তিনি ছিলেন। তিনি স্বীয় উম্মতকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কওম তার কথা মানেনি। তবে পার্থিব শাসন ক্ষমতা তার ছিল বলে পার্থিব দিক দিয়ে তাদেরকে তাঁর অধীনতা স্বীকার করতেই হয়েছিল। তাই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ পরিশেষে যখন ইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যু হলো তখন তোমরা বলেছিলেঃ তার পরে আল্লাহ্ আর কাউকেও রাসূল করে প্রেরণ করবেন না। এই ছিল তাদের কুফরী ও অবিশ্বাসকরণ। এই ভাবে আল্লাহ্ বিভ্রান্ত করেন সীমালংঘনকারী ও সংশয়বাদীদেরকে। অর্থাৎ তোমাদের যে অবস্থা হয়েছে এই অবস্থাই এমন সবারই হয়ে থাকে যারা সীমালংঘন করে সংশয় সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়। যারা সত্যকে মিথ্যা দ্বারা সরিয়ে দেয় এবং বিনা দলীলে প্রকৃত দলীলসমূহ পরিহার করে ও বিতর্কে লিপ্ত হয়। এ কারণে আল্লাহ তাদের প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট। তাদের এ কার্যকলাপ যখন আল্লাহ্ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ তখন মুমিনরাও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট। যেসব লোকের মধ্যে এই ঘৃণ্য বিশেষণ থাকে তাদের অন্তরে আল্লাহ্ তা'আলা মোহর মেরে দেন, যার কারণে এর পরে তারা না ভাল-কে ভাল বলে বুঝতে পারে, না . মন্দকে মন্দ জ্ঞান করতে পারে। তাই তো মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে আল্লাহ্ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর করে দেন। হযরত শা'বী (রঃ) বলেন যে, জাব্বার হলো ঐ ব্যক্তি যে দু’জন লোককে হত্যা করে। আবূ ইমরান জাওনী (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে অন্যায়ভাবে কাউকেও হত্যা করে সেই হলো জাব্বার। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:35
৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: ঐ মুমিন লোকটির নসীহতের শেষাংশের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি স্বীয় কওমকে সম্বোধন করে আরো বলেনঃ “হে আমার কওম! যদি তোমরা আল্লাহর এই রাসূল (সঃ)-কে নামানো এবং নিজেদের হঠকারিতার উপর স্থির থাকো তবে আমি আশংকা করছি যে, তোমাদের পূর্ববর্তী কওমের মত তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে। হযরত নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়, আ’দ সম্প্রদায় এবং সামূদ সম্প্রদায়ের প্রতি লক্ষ্য কর যে, রাসূলদেরকে (আঃ) না মানার কারণে তাদের উপর কি ভীষণ আযাবই না আপতিত হয়েছিল! এমন কেউ ছিল না যে, তাদেরকে ঐ আযাব হতে রক্ষা করতে পারে। এতে তাদের প্রতি মহান আল্লাহর কোন যুলুম ছিল না। তার মহান সত্তা বান্দাদের উপর যুলুম করা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। ওটা ছিল তাদের নিজেদেরই কৃতকর্মের ফল। আমি তোমাদের ব্যাপারে কিয়ামত দিবসের শাস্তিকে ভয় করি, যেই দিন অত্যন্ত ভয়াবহ হবে।”শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হাদীসে রয়েছে যে, যখন যমীনের উপর ভূমিকম্প আসবে এবং যমীন ফেটে যাবে তখন জনগণ ভয় ও সন্ত্রাসে হতবুদ্ধি হয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে এবং একে অপরকে ডাকাডাকি করতে থাকবে। যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এটা ঐ সময়ের বর্ণনা, যখন জাহান্নামকে আনয়ন করা হবে এবং জনগণ ওটা দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে থাকবে এবং ফেরেশতামণ্ডলী তাদেরকে হাশরের ময়দানের দিকে ফিরিয়ে আনবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফেরেশতারা আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে।” আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে জ্বিন ও মনুষ্য সম্প্রদায়! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সীমা তোমরা যদি অতিক্রম করতে পার, অতিক্রম কর, কিন্তু তোমরা তা পারবে না শক্তি ব্যতিরেকে।” (৫৫:৩৩) হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ)-এর কিরআতে অর্থাৎ (আরবী) অক্ষরে তাশদীদ রয়েছে। এটা (আরবী) বাক্য হতে গৃহীত হয়েছে। যখন উট বেয়াড়া ও উদ্ধত হয়ে উঠে তখন এই বাক্য বলা হয়ে থাকে।বলা হয়েছে যে, যে দাঁড়িপাল্লায় আমল ওযন করা হবে সেখানে একজন ফেরেশতা থাকবেন। যার পুণ্য বেশী হবে তার ব্যাপারে ঐ ফেরেস্তা উচ্চ স্বরে ডাক দিয়ে বলবেনঃ “হে জনমণ্ডলী! অমুকের পুত্র অমুক সৌভাগ্যবান হয়ে গেছে এবং আজকের পরে তার ভাগ্য কখনো আর খারাপ হবে না। আর যার পুণ্য কমে যাবে তার সম্পর্কে ঐ ফেরেশতা উচ্চ স্বরে ডাক দিয়ে বলবেনঃ “অমুকের পুত্র অমুক হতভাগ্য হয়ে গেছে এবং সে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে।”হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ কিয়ামতকে (আরবী) বলার কারণ এই যে, প্রত্যেক কওমকে তাদের আমলসহ ডাক দেয়া হবে। জান্নাতবাসী ডাকবে জান্নাতবাসীকে এবং জাহান্নামবাসী ডাকবে জাহান্নামবাসীকে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, জান্নাতবাসীরা জাহান্নামবাসীদেরকে ডাক দিবে এবং জাহান্নামবাসীরা জান্নাতবাসীদেরকে আহ্বান করবে বলেই কিয়ামত দিবসকে (আরবী) বলা হয়েছে। যেমন জান্নাতীরা জাহান্নামীদের ডাক দিয়ে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা তো তা সত্য পেয়েছি। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যা বলেছিলেন তোমরাও তা সত্য পেয়েছো কি? তারা বলবে, হাঁ।” (৭:৪৪) আর জাহান্নামীরা জান্নাতীদেরকে সম্বোধন করে বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের উপর কিছু পানি ঢেলে দাও, অথবা আল্লাহ্ জীবিকারূপে তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা হতে কিছু দাও। তারা বলবেঃ আল্লাহ্ এ দু'টি নিষিদ্ধ করেছেন কাফিরদের উপর।”(৭:৫০) আর এ কারণেও যে, আরাফবাসীরা জান্নাতবাসীদেরকে ও জাহান্নাম বাসীদেরকে ডাক দিবে। যেমন এগুলো সূরায়ে আ'রাফে বর্ণিত হয়েছে।ইমাম বাগাভী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন এটাই গ্রহণ করেছেন যে, এসব কারণেই কিয়ামত দিবসকে (আরবী) বলা হয়েছে। এই উক্তিটি খুবই পছন্দনীয় বটে। তবে এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ সেই দিন মানুষ পশ্চাৎ ফিরে পলায়ন করতে চাইবে, কিন্তু পালাবার কোন জায়গা পাবে না এবং তাদেরকে বলা হবেঃ আজ অবস্থান স্থল এটাই। সেই দিন আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করার কেউ থাকবে না। আল্লাহ ছাড়া ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী আর কেউই নেই। তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন পথ প্রদর্শক নেই।এরপর ইরশাদ হচ্ছে ? ইতিপূর্বে মিসরবাসীদের নিকট হযরত ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর নবী হিসেবে আগমন করেছিলেন। তিনিই প্রেরিত হয়েছিলেন হযরত মূসা (আঃ)-এর পূর্বে। মিসরের আযীযও তিনি ছিলেন। তিনি স্বীয় উম্মতকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কওম তার কথা মানেনি। তবে পার্থিব শাসন ক্ষমতা তার ছিল বলে পার্থিব দিক দিয়ে তাদেরকে তাঁর অধীনতা স্বীকার করতেই হয়েছিল। তাই মহান আল্লাহ্ বলেনঃ পরিশেষে যখন ইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যু হলো তখন তোমরা বলেছিলেঃ তার পরে আল্লাহ্ আর কাউকেও রাসূল করে প্রেরণ করবেন না। এই ছিল তাদের কুফরী ও অবিশ্বাসকরণ। এই ভাবে আল্লাহ্ বিভ্রান্ত করেন সীমালংঘনকারী ও সংশয়বাদীদেরকে। অর্থাৎ তোমাদের যে অবস্থা হয়েছে এই অবস্থাই এমন সবারই হয়ে থাকে যারা সীমালংঘন করে সংশয় সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়। যারা সত্যকে মিথ্যা দ্বারা সরিয়ে দেয় এবং বিনা দলীলে প্রকৃত দলীলসমূহ পরিহার করে ও বিতর্কে লিপ্ত হয়। এ কারণে আল্লাহ তাদের প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট। তাদের এ কার্যকলাপ যখন আল্লাহ্ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ তখন মুমিনরাও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট। যেসব লোকের মধ্যে এই ঘৃণ্য বিশেষণ থাকে তাদের অন্তরে আল্লাহ্ তা'আলা মোহর মেরে দেন, যার কারণে এর পরে তারা না ভাল-কে ভাল বলে বুঝতে পারে, না . মন্দকে মন্দ জ্ঞান করতে পারে। তাই তো মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে আল্লাহ্ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর করে দেন। হযরত শা'বী (রঃ) বলেন যে, জাব্বার হলো ঐ ব্যক্তি যে দু’জন লোককে হত্যা করে। আবূ ইমরান জাওনী (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে অন্যায়ভাবে কাউকেও হত্যা করে সেই হলো জাব্বার। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:36
৩৬-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা ফিরাউনের হঠকারিতা ও অহংকারের খবর দিচ্ছেন যে, সে তার উযীর হামানকে বললোঃ হে হামান! তুমি আমার জন্যে একটি সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ কর। ইষ্টক ও চূর্ণ দ্বারা পাকা ও খুবই উচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ কর। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে হামান! ইট পাকা করে আমার জন্যে সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ কর।”(২৮:৩৮)।ইবরাহীম নাখঈ (রঃ)-এর উক্তি এই যে, কবরকে পাকা করা ও তাতে চুনকাম করাকে পূর্বযুগীয় গুরুজন অপছন্দ করতেন। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ফিরাউন বললোঃ আমি এ প্রাসাদ এ জন্যেই নির্মাণ করাতে চাচ্ছি যে, যাতে আমি আসমানের দর ও আসপথ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারি। অতঃপর যেন আমি মূসা (আঃ)-এর মাবুদকে দেখতে পাই। তবে আমি জানি যে, মূসা (আঃ) মিথ্যাবাদী। সে যে বলছে, আল্লাহ্ তাকে পাঠিয়েছেন এটা সম্পূর্ণ বাজে ও মিথ্যা কথা। আসলে ফিরাউনের এটা একটা প্রতারণা ছিল এবং সে তার প্রজাবর্গের উপর এটা প্রকাশ করতে চেয়েছিল যে, সে এমন কাজ করতে যাচ্ছে যার দ্বারা মূসা (আঃ)-এর মিথ্যা খুলে যাবে এবং তার মত তার প্রজাদেরও বিশ্বাস হয়ে যাবে যে, মূসা (আঃ) প্রতারক ও মিথ্যাবাদী। ফিরাউনকে সরল পথ হতে নিবৃত্ত করা হয়েছিল এবং তার ষড়যন্ত্র সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছিল। ওটা হয়েছিল তার জন্যে ক্ষতিকর এবং ওটা তাকে ধ্বংসের মুখেই ঠেলে দিয়েছিল।
গাফির 40:37
৩৬-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা ফিরাউনের হঠকারিতা ও অহংকারের খবর দিচ্ছেন যে, সে তার উযীর হামানকে বললোঃ হে হামান! তুমি আমার জন্যে একটি সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ কর। ইষ্টক ও চূর্ণ দ্বারা পাকা ও খুবই উচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ কর। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে হামান! ইট পাকা করে আমার জন্যে সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ কর।”(২৮:৩৮)।ইবরাহীম নাখঈ (রঃ)-এর উক্তি এই যে, কবরকে পাকা করা ও তাতে চুনকাম করাকে পূর্বযুগীয় গুরুজন অপছন্দ করতেন। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ফিরাউন বললোঃ আমি এ প্রাসাদ এ জন্যেই নির্মাণ করাতে চাচ্ছি যে, যাতে আমি আসমানের দর ও আসপথ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারি। অতঃপর যেন আমি মূসা (আঃ)-এর মাবুদকে দেখতে পাই। তবে আমি জানি যে, মূসা (আঃ) মিথ্যাবাদী। সে যে বলছে, আল্লাহ্ তাকে পাঠিয়েছেন এটা সম্পূর্ণ বাজে ও মিথ্যা কথা। আসলে ফিরাউনের এটা একটা প্রতারণা ছিল এবং সে তার প্রজাবর্গের উপর এটা প্রকাশ করতে চেয়েছিল যে, সে এমন কাজ করতে যাচ্ছে যার দ্বারা মূসা (আঃ)-এর মিথ্যা খুলে যাবে এবং তার মত তার প্রজাদেরও বিশ্বাস হয়ে যাবে যে, মূসা (আঃ) প্রতারক ও মিথ্যাবাদী। ফিরাউনকে সরল পথ হতে নিবৃত্ত করা হয়েছিল এবং তার ষড়যন্ত্র সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছিল। ওটা হয়েছিল তার জন্যে ক্ষতিকর এবং ওটা তাকে ধ্বংসের মুখেই ঠেলে দিয়েছিল।
গাফির 40:38
৩৮-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্ণিত মুমিন লোকটি স্বীয় সম্প্রদায়ের উদ্ধত, আত্মম্ভরী ও অহংকারী লোকদেরকে উপদেশ দিতে গিয়ে আরো বললেনঃ হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমার কথা মেনে নাও এবং আমার পথে চলো। আমি তোমাদেরকে সরল-সঠিক পথে পৌছিয়ে দিবো। এ মুমিন লোকটি তাঁর এ উক্তিতে ফিরাউনের ন্যায় মিথ্যাবাদী ছিলেন না। ফিরাউন তো স্বীয় কওমকে প্রতারিত করছিল, আর এ মুমিন লোকটি তাদের মঙ্গল কামনা করছিলেন।অতঃপর ঐ মুমিন তাঁর কওমকে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত ও আখিরাতের প্রতি আসক্ত হওয়ার উপদেশ দেন। তিনি বলেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! এই পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু এবং আখিরাতই হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাস। আখিরাতের শান্তি ও দুর্ভোগ হবে চিরস্থায়ী। কেউ মন্দ কর্ম করলে সে শুধু তার কর্মের অনুরূপ শাস্তি পাবে এবং পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে যারা মুমিন হওয়া অবস্থায় সঙ্কর্ম করে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। সেথায় তাদেরকে অপরিমিত জীবনোপকরণ দেয়া হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:39
৩৮-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্ণিত মুমিন লোকটি স্বীয় সম্প্রদায়ের উদ্ধত, আত্মম্ভরী ও অহংকারী লোকদেরকে উপদেশ দিতে গিয়ে আরো বললেনঃ হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমার কথা মেনে নাও এবং আমার পথে চলো। আমি তোমাদেরকে সরল-সঠিক পথে পৌছিয়ে দিবো। এ মুমিন লোকটি তাঁর এ উক্তিতে ফিরাউনের ন্যায় মিথ্যাবাদী ছিলেন না। ফিরাউন তো স্বীয় কওমকে প্রতারিত করছিল, আর এ মুমিন লোকটি তাদের মঙ্গল কামনা করছিলেন।অতঃপর ঐ মুমিন তাঁর কওমকে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত ও আখিরাতের প্রতি আসক্ত হওয়ার উপদেশ দেন। তিনি বলেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! এই পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু এবং আখিরাতই হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাস। আখিরাতের শান্তি ও দুর্ভোগ হবে চিরস্থায়ী। কেউ মন্দ কর্ম করলে সে শুধু তার কর্মের অনুরূপ শাস্তি পাবে এবং পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে যারা মুমিন হওয়া অবস্থায় সঙ্কর্ম করে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। সেথায় তাদেরকে অপরিমিত জীবনোপকরণ দেয়া হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:40
৩৮-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: পূর্ববর্ণিত মুমিন লোকটি স্বীয় সম্প্রদায়ের উদ্ধত, আত্মম্ভরী ও অহংকারী লোকদেরকে উপদেশ দিতে গিয়ে আরো বললেনঃ হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমার কথা মেনে নাও এবং আমার পথে চলো। আমি তোমাদেরকে সরল-সঠিক পথে পৌছিয়ে দিবো। এ মুমিন লোকটি তাঁর এ উক্তিতে ফিরাউনের ন্যায় মিথ্যাবাদী ছিলেন না। ফিরাউন তো স্বীয় কওমকে প্রতারিত করছিল, আর এ মুমিন লোকটি তাদের মঙ্গল কামনা করছিলেন।অতঃপর ঐ মুমিন তাঁর কওমকে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত ও আখিরাতের প্রতি আসক্ত হওয়ার উপদেশ দেন। তিনি বলেনঃ “হে আমার সম্প্রদায়! এই পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু এবং আখিরাতই হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাস। আখিরাতের শান্তি ও দুর্ভোগ হবে চিরস্থায়ী। কেউ মন্দ কর্ম করলে সে শুধু তার কর্মের অনুরূপ শাস্তি পাবে এবং পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে যারা মুমিন হওয়া অবস্থায় সঙ্কর্ম করে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। সেথায় তাদেরকে অপরিমিত জীবনোপকরণ দেয়া হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:41
৪১-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর: ফিরাউনের কওমের মুমিন লোকটি স্বীয় উপদেশপূর্ণ বক্তৃতা চালু রেখে বলেনঃ এটা কতই না বিস্ময়কর ব্যাপার যে, আমি তোমাদেরকে তাওহীদ অর্থাৎ এক ও শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছি এবং রাসূল (আঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করার দিকে ডাকছি, আর তোমরা আমাকে ডাকছো কুফরী ও শিরুকের দিকে! তোমরা চাচ্ছ যে, আমি যেন অজ্ঞ হয়ে যাই এবং বিনা দলীলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (আঃ)-এর বিরোধিতা করি! তোমরা একটু চিন্তা করে দেখো তো যে, তোমাদের ও আমার দাওয়াতের মধ্যে কতো পার্থক্য রয়েছে! আমি তোমাদেরকে ঐ আল্লাহর দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছি যিনি বড়ই ইয্যত ও মর্যাদার অধিকারী এবং ব্যাপক ক্ষমতাবান। এতদসত্ত্বেও তিনি এমন প্রত্যেক ব্যক্তির তাওবা কবুল করে থাকেন যে তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে।(আরবী)-এর অর্থ হলো হক ও সত্যতা। অর্থাৎ এটা নিশ্চিত সত্য যে, যেদিকে তোমরা আমাকে আহ্বান করছে অর্থাৎ মূর্তি এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্যান্যদের ইবাদতের দিকে, ওগুলো এমনই যে, ওদের দ্বীন ও দুনিয়ার কোন আধিপত্য নেই। ওগুলো না পারে কারো কোন উপকার করতে এবং না পারে কোন ক্ষতি করতে। ওরা ওদের আহ্বানকারীদের আহ্বান শুনতে পায় না এবং ককূল করতেও পারে না, এই দুনিয়াতেও না এবং পরকালেও না। এটা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার নিম্নের উক্তির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই ব্যক্তি অপেক্ষা বড় পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে যে আল্লাহকে ছাড়া এমন কিছুকে ডেকে থাকে যারা কিয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দিতে পারে না? আর তারা তাদের ডাক হতে উদাসীন ও অমনোযোগী। যখন লোকদেরকে একত্রিত করা হবে তখন তারা তাদের আহ্বানকারীদের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বসবে।” (৪৬:৫-৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তোমরা তাদেরকে ডাকো তবে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না, আর (মনে করা যাক যে,) যদি শুনেও বা তবুও তোমাদের ডাকে তারা সাড়া দিতে পারবে না।” (৩৫:১৪) মুমিন লোকটি বললেনঃ আমাদের প্রত্যাবর্তন তো আল্লাহরই নিকট। অর্থাৎ পরকালে আমাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট ফিরে যেতে হবে। অতঃপর তিনি প্রত্যেককে তার আমলের প্রতিফল দিবেন। এ জন্যেই বলেনঃ ‘সীমালংঘনকারীরাই জাহান্নামের অধিবাসী।'মুমিন লোকটি তাদেরকে আরো বললেনঃ আমি তোমাদেরকে যা বলছি তোমরা অচিরেই তা স্মরণ করবে। তখন তোমরা হা-হুতাশ ও আফসোস করবে। কিন্তু তখন সবই বৃথা হবে। আমি তো আমার ব্যাপার আল্লাহর কাছে সমর্পণ করছি। আমার ভরসা তাঁরই উপর। আমি আমার প্রতিটি কাজে তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি। এখন তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমি তোমাদের কাজে ঘৃণা প্রকাশ করছি। তোমাদের হতে আমি এখন সম্পূর্ণ পৃথক। আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের প্রতি সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।' যারা সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন। আর যারা পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য তাদেরকে তিনি হিদায়াত লাভে বঞ্চিত করেন। তাঁর প্রতিটি কাজ হিকমতে পূর্ণ এবং তার সমস্ত কৌশল কল্যাণময়।আল্লাহ্ তা'আলা মুমিন লোকটিকে ফিরাউনের ও তার কওমের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট হতে রক্ষা করলেন। দুনিয়াতেও তিনি রক্ষা পেলেন অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে মুক্তি পেলেন এবং আখিরাতের কঠিন শাস্তি হতেও রক্ষা পাবেন। বাকী সবাই তারা নিকৃষ্ট শাস্তির শিকার হলো। অর্থাৎ ফিরাউন তার কওমসহ সমুদ্রে নিমজ্জিত হলো। এতো হলো দুনিয়ার শাস্তি। আর আখিরাতে তো তাদের জন্যে কঠিন শাস্তি রয়েছেই। সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে উপস্থিত করা হয় আগুনের সামনে। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের এ শাস্তি হতেই থাকবে। আর কিয়ামতের দিন তাদের আত্মাগুলোকে দেহসহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সেই দিন তাদেরকে বলা হবেঃ “হে ফিরাউনীরা! তোমরা ভীষণ কষ্ট ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে চলে যাও।” আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলবেনঃ “ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে।এ আয়াতটি আহলে সুন্নাতের ঐ মাযহাবের এই কথার উপর বড় দলীল যে, কবরে শাস্তি হয়ে থাকে। তবে এখানে এ কথাটি স্মরণ রাখা দরকার যে, কোন কোন হাদীসে এমন কতকগুলো বিষয় এসেছে যেগুলো দ্বারা জানা যায় যে, বারযাখের শাস্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অবহিত হয়েছিলেন মদীনায় হিজরতের পর। আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মক্কায়। তাহলে এর জবাব এই যে, এই আয়াত দ্বারা শুধু এটুকু জানা যাচ্ছে যে, মুশরিকদের আত্মাগুলোকে সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের সামনে পেশ করা হয়। বাকী থাকলো এই কথাটি যে, এই শাস্তি কি সব সময় হয়, না সব সময় নয়? আর এটাও যে, এই আযাব কি শুধু রূহের উপর হয়, না দেহের উপরও হয়ে থাকে? এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অবহিত হন মদীনায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা বর্ণনা করে দিয়েছেন। সুতরাং হাদীস ও কুরআনকে মিলিয়ে এই মাসআলা বের হলো যে, কবরের শাস্তি ও শান্তি আত্মা ও দেহ উভয়ের উপর হয়ে থাকে। আর এটাই সত্য বটে।' হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন ইয়াহুদিনী তাঁর খিদমতে নিয়োজিতা ছিল। হযরত আয়েশা তার প্রতি কোন অনুগ্রহ করলেই সে বলতোঃ “আল্লাহ্ আপনাকে কবরের আযাব হতে রক্ষা করুন!” একদা হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের পূর্বেও কি কবরে আযাব হয়?তিনি উত্তরে বললেনঃ “না। কে এ কথা বলেছে?” হযরত আয়েশা (রাঃ) ঐ ইয়াহূদী মহিলাটির ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “ইয়াহূদী মিথ্যাবাদী। তারা তো এর চেয়েও বড় মিথ্যা আরোপ করে থাকে। কিয়ামতের পূর্বে কোন শাস্তি নেই।” ইতিমধ্যে কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুহরের সময় কাপড় গুটানো অবস্থায় আগমন করেন এবং তাঁর চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল। তিনি উচ্চ স্বরে বলছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে তোমরা অবশ্যই হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশী। হে লোক সকল! কবরের আযাব হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর। নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, কবরের আযাব সত্য।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর সহীহ। তারা এটা তাখরীজ করেননি)অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, একজন ইয়াহূদী মহিলা হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে এসে কিছু ভিক্ষা চায়। তিনি তাকে কিছু দান করেন। তখন সে বলেঃ “আল্লাহ আপনাকে কবরের আযাব হতে রক্ষা করুন!” এর শেষে রয়েছে যে, এর কিছুদিন পরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার নিকট ওহী করেছেন যে, তোমাদেরকে তোমাদের কবরে ফিতায় ফেলে দেয়া হয়।”সুতরাং এই আয়াত ও হাদীসগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান প্রথমতঃ এই ভাবে হতে পারে যা উপরে বর্ণিত হলো। দ্বিতীয়তঃ আয়াতের (আরবী) দ্বারা শুধু এটুকু সাব্যস্ত হয় যে, কাফিরদেরকে আলমে বরযখে শাস্তি দেয়া হয়। কিন্তু এর দ্বারা এটা অপরিহার্য নয় যে, মুমিনকেও তার কিছু পাপের কারণে তার কবরে শাস্তি দেয়া হয়। এটা শুধু হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর নিকট প্রবেশ করেন। ঐ সময় একজন ইয়াহূদী মহিলা তাঁর নিকট বসেছিল। সে তাঁকে বলেঃ “আপনাদেরকে আপনাদের কবরে আজমায়েশ করা হবে এটা কি আপনি জানেন?” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কেঁপে ওঠেন এবং বলেনঃ “ইয়াহুদীকে আজমায়েশ করা হবে। এর কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “সাবধান! তোমরা তোমাদের কবরে আজমায়েশের মধ্যে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কবরের ফিত্না হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকতেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত আছে)এটাও হতে পারে যে, এ আয়াত দ্বারা শুধু রূহের উপর শাস্তির কথা প্রমাণিত হয়, দেহের উপরও শাস্তি হওয়া প্রমাণিত হয় না। পরে ওহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, কবরের আযাব দেহ ও আত্মা উভয়ের উপর হয়ে থাকে। সুতরাং পরে তিনি এর থেকে মুক্তির প্রার্থনা শুরু করেন। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি ইয়াহুদী মহিলা তার কাছে এসে বলেঃ “কবরের আযাব হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।” তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কবরের আযাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, কবরের আযাব সত্য।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এরপর থেকে আমি দেখতাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে কবরের আযাব হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।” এ হাদীস দ্বারা তো প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদী মহিলাটির কথা শুনা মাত্রই তার সত্যতা স্বীকার করেন। আর উপরে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তার কথাকে তিনি মিথ্যা বলেন। এ দ্বন্দ্বের সমাধান এই যে, এখানে ঘটনা হলো দু'টি। প্রথম ঘটনার সময় তাকে ওহীর দ্বারা জানানো হয়নি বলেই তিনি মহিলাটির কথার সত্যতা অস্বীকার করেন। তারপর যখন জানতে পারেন তখন তার কথার সত্যতা স্বীকার করেন। এসব ব্যাপারে একমাত্র মহান আল্লাহই সর্বাপেক্ষা সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, দুনিয়া থাকা পর্যন্ত প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যায় ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহগুলোকে জাহান্নামের সামনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ওগুলোকে বলা হয়ঃ “হে ফিরাউন সম্প্রদায়! এটা তোমাদের চিরস্থায়ী আবাসস্থল।” যাতে তাদের দুঃখ-চিন্তা বেড়ে যায় এবং তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। সুতরাং আজও তারা শাস্তির মধ্যেই রয়েছে। আর স্থায়ীভাবে ওর মধ্যেই থাকবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, শহীদদের আত্মাগুলো সবুজ রঙ এর পাখীসমূহের দেহের মধ্যে থাকে। তারা ইচ্ছামত জান্নাতের যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। আর মুমিনদের শিশুগুলোর আত্মাও পাখীর দেহের মধ্যে থাকে। তারাও জান্নাতের যেখানে সেখানে ইচ্ছামত চলাফেরা করে। আর তারা আরশের সাথে লটকানো লণ্ঠনের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। পক্ষান্তরে, ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহগুলো কালো পাখীর দেহে অবস্থান করে। পাখীগুলো সকালে ও সন্ধ্যায় জাহান্নামের নিকট যায়। এটাই হলো তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করা। মিরাজের সুদীর্ঘ হাদীসের মধ্যে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে এক বিরাট মাখলুকের নিকট নিয়ে গেলেন যাদের প্রত্যেকের পেট ছিল খুব বড় ঘরের মত, যারা ফিরাউন সম্প্রদায়ের পার্শ্বে বন্দী ছিল। ফিরাউন সম্পদায়কে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সম্মুখে উপস্থিত করা হয়।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন আল্লাহ তাআলা (ফেরেশতাদেরকে) বলবেনঃ ‘ফিরাউন সম্প্রদায়কে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।' এই ফিরাউনী লোকগুলো লাগাম দেয়া উটের মত মুখ নীচু করে পাথর ও গাছ চাটছে এবং তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞান ও নির্বোধ। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ইহ্সান করে আল্লাহ তাকে তার প্রতিদান অবশ্যই দেন, সে মুসলমানই হোক বা কাফিরই হোক।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাফিরদের প্রতিদান কেমন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “যদি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখে, সাদকা করে অথবা অন্য কোন ভাল কাজ করে তবে আল্লাহ তা'আলা ওর প্রতিদান তার ধন-মালে, তার স্বাস্থ্যে এবং এরূপই অন্যান্য জিনিসে দিয়ে থাকেন।" সাহাবীগণ আবার প্রশ্ন করলেনঃ “পরকালে তারা কি বিনিময় লাভ করবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “বড় আযাব হতে ছোট আযাব।” অতঃপর তিনি (আরবী) (ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে) এ আয়াত পাঠ করলেন। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আওযায়ী (রঃ)-কে একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “আচ্ছা বলুন তো, বহু ঝাকের ঝক সাদা পাখীকে আমরা সমুদ্র হতে বের হতে দেখি। ওরা সমুদ্রের পশ্চিম তীরে সকাল বেলায় উড়ে যায়। ওগুলোর সংখ্যা এতো বেশী যে, কেউ গণনা করতে সক্ষম হবে না। সন্ধ্যার সময় ঐ ভাবেই ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরে আসে। কিন্তু ঐ সময় ওগুলোর রঙ সম্পূর্ণ কালো হয়ে যায়। এর কারণ কি?” উত্তরে হযরত আওযায়ী (রঃ) তাকে বলেন, “তুমি কি সত্যিই এরূপ লক্ষ্য করেছো?” লোকটি জবাব দেয়ঃ হ্যা। তখন তিনি বলেনঃ “ঐ পাখীগুলোর দেহের মধ্যে ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহ রয়েছে যেগুলোকে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সামনে উপস্থিত করা হয়। অতঃপর ওগুলো ওদের বাসায় ফিরে আসে। ওদের পালকগুলো পুড়ে গিয়ে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। রাত্রে আবার পালক বের হয় এবং কালো রঙ দূর হয়ে যায়। দুনিয়ায় তাদের এই অবস্থা হতে থাকে। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলবেনঃ “তোমরা কঠিন শাস্তির মধ্যে প্রবেশ কর।” (ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)কথিত আছে যে, তাদের সংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ, যারা ফিরাউনের সৈন্য ছিল।হ্যরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ মারা যায় তখন সকাল-সন্ধ্যায় তার (স্থায়ী) বাসস্থান তাকে দেখানো হয়। সে জান্নাতী হলে জান্নাত এবং জাহান্নামী হলে জাহান্নাম দেখানো হয়ে থাকে। অতঃপর তাকে বলা হয়ঃ “এটা তোমার আসল বাসস্থান, যেখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন তোমাকে পাঠিয়ে দিবেন।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)
গাফির 40:42
৪১-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর: ফিরাউনের কওমের মুমিন লোকটি স্বীয় উপদেশপূর্ণ বক্তৃতা চালু রেখে বলেনঃ এটা কতই না বিস্ময়কর ব্যাপার যে, আমি তোমাদেরকে তাওহীদ অর্থাৎ এক ও শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছি এবং রাসূল (আঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করার দিকে ডাকছি, আর তোমরা আমাকে ডাকছো কুফরী ও শিরুকের দিকে! তোমরা চাচ্ছ যে, আমি যেন অজ্ঞ হয়ে যাই এবং বিনা দলীলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (আঃ)-এর বিরোধিতা করি! তোমরা একটু চিন্তা করে দেখো তো যে, তোমাদের ও আমার দাওয়াতের মধ্যে কতো পার্থক্য রয়েছে! আমি তোমাদেরকে ঐ আল্লাহর দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছি যিনি বড়ই ইয্যত ও মর্যাদার অধিকারী এবং ব্যাপক ক্ষমতাবান। এতদসত্ত্বেও তিনি এমন প্রত্যেক ব্যক্তির তাওবা কবুল করে থাকেন যে তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে।(আরবী)-এর অর্থ হলো হক ও সত্যতা। অর্থাৎ এটা নিশ্চিত সত্য যে, যেদিকে তোমরা আমাকে আহ্বান করছে অর্থাৎ মূর্তি এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্যান্যদের ইবাদতের দিকে, ওগুলো এমনই যে, ওদের দ্বীন ও দুনিয়ার কোন আধিপত্য নেই। ওগুলো না পারে কারো কোন উপকার করতে এবং না পারে কোন ক্ষতি করতে। ওরা ওদের আহ্বানকারীদের আহ্বান শুনতে পায় না এবং ককূল করতেও পারে না, এই দুনিয়াতেও না এবং পরকালেও না। এটা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার নিম্নের উক্তির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই ব্যক্তি অপেক্ষা বড় পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে যে আল্লাহকে ছাড়া এমন কিছুকে ডেকে থাকে যারা কিয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দিতে পারে না? আর তারা তাদের ডাক হতে উদাসীন ও অমনোযোগী। যখন লোকদেরকে একত্রিত করা হবে তখন তারা তাদের আহ্বানকারীদের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বসবে।” (৪৬:৫-৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তোমরা তাদেরকে ডাকো তবে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না, আর (মনে করা যাক যে,) যদি শুনেও বা তবুও তোমাদের ডাকে তারা সাড়া দিতে পারবে না।” (৩৫:১৪) মুমিন লোকটি বললেনঃ আমাদের প্রত্যাবর্তন তো আল্লাহরই নিকট। অর্থাৎ পরকালে আমাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট ফিরে যেতে হবে। অতঃপর তিনি প্রত্যেককে তার আমলের প্রতিফল দিবেন। এ জন্যেই বলেনঃ ‘সীমালংঘনকারীরাই জাহান্নামের অধিবাসী।'মুমিন লোকটি তাদেরকে আরো বললেনঃ আমি তোমাদেরকে যা বলছি তোমরা অচিরেই তা স্মরণ করবে। তখন তোমরা হা-হুতাশ ও আফসোস করবে। কিন্তু তখন সবই বৃথা হবে। আমি তো আমার ব্যাপার আল্লাহর কাছে সমর্পণ করছি। আমার ভরসা তাঁরই উপর। আমি আমার প্রতিটি কাজে তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি। এখন তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমি তোমাদের কাজে ঘৃণা প্রকাশ করছি। তোমাদের হতে আমি এখন সম্পূর্ণ পৃথক। আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের প্রতি সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।' যারা সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন। আর যারা পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য তাদেরকে তিনি হিদায়াত লাভে বঞ্চিত করেন। তাঁর প্রতিটি কাজ হিকমতে পূর্ণ এবং তার সমস্ত কৌশল কল্যাণময়।আল্লাহ্ তা'আলা মুমিন লোকটিকে ফিরাউনের ও তার কওমের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট হতে রক্ষা করলেন। দুনিয়াতেও তিনি রক্ষা পেলেন অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে মুক্তি পেলেন এবং আখিরাতের কঠিন শাস্তি হতেও রক্ষা পাবেন। বাকী সবাই তারা নিকৃষ্ট শাস্তির শিকার হলো। অর্থাৎ ফিরাউন তার কওমসহ সমুদ্রে নিমজ্জিত হলো। এতো হলো দুনিয়ার শাস্তি। আর আখিরাতে তো তাদের জন্যে কঠিন শাস্তি রয়েছেই। সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে উপস্থিত করা হয় আগুনের সামনে। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের এ শাস্তি হতেই থাকবে। আর কিয়ামতের দিন তাদের আত্মাগুলোকে দেহসহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সেই দিন তাদেরকে বলা হবেঃ “হে ফিরাউনীরা! তোমরা ভীষণ কষ্ট ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে চলে যাও।” আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলবেনঃ “ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে।এ আয়াতটি আহলে সুন্নাতের ঐ মাযহাবের এই কথার উপর বড় দলীল যে, কবরে শাস্তি হয়ে থাকে। তবে এখানে এ কথাটি স্মরণ রাখা দরকার যে, কোন কোন হাদীসে এমন কতকগুলো বিষয় এসেছে যেগুলো দ্বারা জানা যায় যে, বারযাখের শাস্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অবহিত হয়েছিলেন মদীনায় হিজরতের পর। আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মক্কায়। তাহলে এর জবাব এই যে, এই আয়াত দ্বারা শুধু এটুকু জানা যাচ্ছে যে, মুশরিকদের আত্মাগুলোকে সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের সামনে পেশ করা হয়। বাকী থাকলো এই কথাটি যে, এই শাস্তি কি সব সময় হয়, না সব সময় নয়? আর এটাও যে, এই আযাব কি শুধু রূহের উপর হয়, না দেহের উপরও হয়ে থাকে? এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অবহিত হন মদীনায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা বর্ণনা করে দিয়েছেন। সুতরাং হাদীস ও কুরআনকে মিলিয়ে এই মাসআলা বের হলো যে, কবরের শাস্তি ও শান্তি আত্মা ও দেহ উভয়ের উপর হয়ে থাকে। আর এটাই সত্য বটে।' হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন ইয়াহুদিনী তাঁর খিদমতে নিয়োজিতা ছিল। হযরত আয়েশা তার প্রতি কোন অনুগ্রহ করলেই সে বলতোঃ “আল্লাহ্ আপনাকে কবরের আযাব হতে রক্ষা করুন!” একদা হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের পূর্বেও কি কবরে আযাব হয়?তিনি উত্তরে বললেনঃ “না। কে এ কথা বলেছে?” হযরত আয়েশা (রাঃ) ঐ ইয়াহূদী মহিলাটির ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “ইয়াহূদী মিথ্যাবাদী। তারা তো এর চেয়েও বড় মিথ্যা আরোপ করে থাকে। কিয়ামতের পূর্বে কোন শাস্তি নেই।” ইতিমধ্যে কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুহরের সময় কাপড় গুটানো অবস্থায় আগমন করেন এবং তাঁর চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল। তিনি উচ্চ স্বরে বলছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে তোমরা অবশ্যই হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশী। হে লোক সকল! কবরের আযাব হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর। নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, কবরের আযাব সত্য।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর সহীহ। তারা এটা তাখরীজ করেননি)অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, একজন ইয়াহূদী মহিলা হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে এসে কিছু ভিক্ষা চায়। তিনি তাকে কিছু দান করেন। তখন সে বলেঃ “আল্লাহ আপনাকে কবরের আযাব হতে রক্ষা করুন!” এর শেষে রয়েছে যে, এর কিছুদিন পরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার নিকট ওহী করেছেন যে, তোমাদেরকে তোমাদের কবরে ফিতায় ফেলে দেয়া হয়।”সুতরাং এই আয়াত ও হাদীসগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান প্রথমতঃ এই ভাবে হতে পারে যা উপরে বর্ণিত হলো। দ্বিতীয়তঃ আয়াতের (আরবী) দ্বারা শুধু এটুকু সাব্যস্ত হয় যে, কাফিরদেরকে আলমে বরযখে শাস্তি দেয়া হয়। কিন্তু এর দ্বারা এটা অপরিহার্য নয় যে, মুমিনকেও তার কিছু পাপের কারণে তার কবরে শাস্তি দেয়া হয়। এটা শুধু হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর নিকট প্রবেশ করেন। ঐ সময় একজন ইয়াহূদী মহিলা তাঁর নিকট বসেছিল। সে তাঁকে বলেঃ “আপনাদেরকে আপনাদের কবরে আজমায়েশ করা হবে এটা কি আপনি জানেন?” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কেঁপে ওঠেন এবং বলেনঃ “ইয়াহুদীকে আজমায়েশ করা হবে। এর কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “সাবধান! তোমরা তোমাদের কবরে আজমায়েশের মধ্যে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কবরের ফিত্না হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকতেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত আছে)এটাও হতে পারে যে, এ আয়াত দ্বারা শুধু রূহের উপর শাস্তির কথা প্রমাণিত হয়, দেহের উপরও শাস্তি হওয়া প্রমাণিত হয় না। পরে ওহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, কবরের আযাব দেহ ও আত্মা উভয়ের উপর হয়ে থাকে। সুতরাং পরে তিনি এর থেকে মুক্তির প্রার্থনা শুরু করেন। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি ইয়াহুদী মহিলা তার কাছে এসে বলেঃ “কবরের আযাব হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।” তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কবরের আযাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, কবরের আযাব সত্য।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এরপর থেকে আমি দেখতাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে কবরের আযাব হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।” এ হাদীস দ্বারা তো প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদী মহিলাটির কথা শুনা মাত্রই তার সত্যতা স্বীকার করেন। আর উপরে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তার কথাকে তিনি মিথ্যা বলেন। এ দ্বন্দ্বের সমাধান এই যে, এখানে ঘটনা হলো দু'টি। প্রথম ঘটনার সময় তাকে ওহীর দ্বারা জানানো হয়নি বলেই তিনি মহিলাটির কথার সত্যতা অস্বীকার করেন। তারপর যখন জানতে পারেন তখন তার কথার সত্যতা স্বীকার করেন। এসব ব্যাপারে একমাত্র মহান আল্লাহই সর্বাপেক্ষা সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, দুনিয়া থাকা পর্যন্ত প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যায় ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহগুলোকে জাহান্নামের সামনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ওগুলোকে বলা হয়ঃ “হে ফিরাউন সম্প্রদায়! এটা তোমাদের চিরস্থায়ী আবাসস্থল।” যাতে তাদের দুঃখ-চিন্তা বেড়ে যায় এবং তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। সুতরাং আজও তারা শাস্তির মধ্যেই রয়েছে। আর স্থায়ীভাবে ওর মধ্যেই থাকবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, শহীদদের আত্মাগুলো সবুজ রঙ এর পাখীসমূহের দেহের মধ্যে থাকে। তারা ইচ্ছামত জান্নাতের যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। আর মুমিনদের শিশুগুলোর আত্মাও পাখীর দেহের মধ্যে থাকে। তারাও জান্নাতের যেখানে সেখানে ইচ্ছামত চলাফেরা করে। আর তারা আরশের সাথে লটকানো লণ্ঠনের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। পক্ষান্তরে, ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহগুলো কালো পাখীর দেহে অবস্থান করে। পাখীগুলো সকালে ও সন্ধ্যায় জাহান্নামের নিকট যায়। এটাই হলো তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করা। মিরাজের সুদীর্ঘ হাদীসের মধ্যে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে এক বিরাট মাখলুকের নিকট নিয়ে গেলেন যাদের প্রত্যেকের পেট ছিল খুব বড় ঘরের মত, যারা ফিরাউন সম্প্রদায়ের পার্শ্বে বন্দী ছিল। ফিরাউন সম্পদায়কে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সম্মুখে উপস্থিত করা হয়।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন আল্লাহ তাআলা (ফেরেশতাদেরকে) বলবেনঃ ‘ফিরাউন সম্প্রদায়কে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।' এই ফিরাউনী লোকগুলো লাগাম দেয়া উটের মত মুখ নীচু করে পাথর ও গাছ চাটছে এবং তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞান ও নির্বোধ। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ইহ্সান করে আল্লাহ তাকে তার প্রতিদান অবশ্যই দেন, সে মুসলমানই হোক বা কাফিরই হোক।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাফিরদের প্রতিদান কেমন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “যদি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখে, সাদকা করে অথবা অন্য কোন ভাল কাজ করে তবে আল্লাহ তা'আলা ওর প্রতিদান তার ধন-মালে, তার স্বাস্থ্যে এবং এরূপই অন্যান্য জিনিসে দিয়ে থাকেন।" সাহাবীগণ আবার প্রশ্ন করলেনঃ “পরকালে তারা কি বিনিময় লাভ করবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “বড় আযাব হতে ছোট আযাব।” অতঃপর তিনি (আরবী) (ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে) এ আয়াত পাঠ করলেন। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আওযায়ী (রঃ)-কে একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “আচ্ছা বলুন তো, বহু ঝাকের ঝক সাদা পাখীকে আমরা সমুদ্র হতে বের হতে দেখি। ওরা সমুদ্রের পশ্চিম তীরে সকাল বেলায় উড়ে যায়। ওগুলোর সংখ্যা এতো বেশী যে, কেউ গণনা করতে সক্ষম হবে না। সন্ধ্যার সময় ঐ ভাবেই ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরে আসে। কিন্তু ঐ সময় ওগুলোর রঙ সম্পূর্ণ কালো হয়ে যায়। এর কারণ কি?” উত্তরে হযরত আওযায়ী (রঃ) তাকে বলেন, “তুমি কি সত্যিই এরূপ লক্ষ্য করেছো?” লোকটি জবাব দেয়ঃ হ্যা। তখন তিনি বলেনঃ “ঐ পাখীগুলোর দেহের মধ্যে ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহ রয়েছে যেগুলোকে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সামনে উপস্থিত করা হয়। অতঃপর ওগুলো ওদের বাসায় ফিরে আসে। ওদের পালকগুলো পুড়ে গিয়ে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। রাত্রে আবার পালক বের হয় এবং কালো রঙ দূর হয়ে যায়। দুনিয়ায় তাদের এই অবস্থা হতে থাকে। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলবেনঃ “তোমরা কঠিন শাস্তির মধ্যে প্রবেশ কর।” (ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)কথিত আছে যে, তাদের সংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ, যারা ফিরাউনের সৈন্য ছিল।হ্যরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ মারা যায় তখন সকাল-সন্ধ্যায় তার (স্থায়ী) বাসস্থান তাকে দেখানো হয়। সে জান্নাতী হলে জান্নাত এবং জাহান্নামী হলে জাহান্নাম দেখানো হয়ে থাকে। অতঃপর তাকে বলা হয়ঃ “এটা তোমার আসল বাসস্থান, যেখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন তোমাকে পাঠিয়ে দিবেন।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)
গাফির 40:43
৪১-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর: ফিরাউনের কওমের মুমিন লোকটি স্বীয় উপদেশপূর্ণ বক্তৃতা চালু রেখে বলেনঃ এটা কতই না বিস্ময়কর ব্যাপার যে, আমি তোমাদেরকে তাওহীদ অর্থাৎ এক ও শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছি এবং রাসূল (আঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করার দিকে ডাকছি, আর তোমরা আমাকে ডাকছো কুফরী ও শিরুকের দিকে! তোমরা চাচ্ছ যে, আমি যেন অজ্ঞ হয়ে যাই এবং বিনা দলীলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (আঃ)-এর বিরোধিতা করি! তোমরা একটু চিন্তা করে দেখো তো যে, তোমাদের ও আমার দাওয়াতের মধ্যে কতো পার্থক্য রয়েছে! আমি তোমাদেরকে ঐ আল্লাহর দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছি যিনি বড়ই ইয্যত ও মর্যাদার অধিকারী এবং ব্যাপক ক্ষমতাবান। এতদসত্ত্বেও তিনি এমন প্রত্যেক ব্যক্তির তাওবা কবুল করে থাকেন যে তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে।(আরবী)-এর অর্থ হলো হক ও সত্যতা। অর্থাৎ এটা নিশ্চিত সত্য যে, যেদিকে তোমরা আমাকে আহ্বান করছে অর্থাৎ মূর্তি এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্যান্যদের ইবাদতের দিকে, ওগুলো এমনই যে, ওদের দ্বীন ও দুনিয়ার কোন আধিপত্য নেই। ওগুলো না পারে কারো কোন উপকার করতে এবং না পারে কোন ক্ষতি করতে। ওরা ওদের আহ্বানকারীদের আহ্বান শুনতে পায় না এবং ককূল করতেও পারে না, এই দুনিয়াতেও না এবং পরকালেও না। এটা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার নিম্নের উক্তির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই ব্যক্তি অপেক্ষা বড় পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে যে আল্লাহকে ছাড়া এমন কিছুকে ডেকে থাকে যারা কিয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দিতে পারে না? আর তারা তাদের ডাক হতে উদাসীন ও অমনোযোগী। যখন লোকদেরকে একত্রিত করা হবে তখন তারা তাদের আহ্বানকারীদের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বসবে।” (৪৬:৫-৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তোমরা তাদেরকে ডাকো তবে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না, আর (মনে করা যাক যে,) যদি শুনেও বা তবুও তোমাদের ডাকে তারা সাড়া দিতে পারবে না।” (৩৫:১৪) মুমিন লোকটি বললেনঃ আমাদের প্রত্যাবর্তন তো আল্লাহরই নিকট। অর্থাৎ পরকালে আমাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট ফিরে যেতে হবে। অতঃপর তিনি প্রত্যেককে তার আমলের প্রতিফল দিবেন। এ জন্যেই বলেনঃ ‘সীমালংঘনকারীরাই জাহান্নামের অধিবাসী।'মুমিন লোকটি তাদেরকে আরো বললেনঃ আমি তোমাদেরকে যা বলছি তোমরা অচিরেই তা স্মরণ করবে। তখন তোমরা হা-হুতাশ ও আফসোস করবে। কিন্তু তখন সবই বৃথা হবে। আমি তো আমার ব্যাপার আল্লাহর কাছে সমর্পণ করছি। আমার ভরসা তাঁরই উপর। আমি আমার প্রতিটি কাজে তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি। এখন তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমি তোমাদের কাজে ঘৃণা প্রকাশ করছি। তোমাদের হতে আমি এখন সম্পূর্ণ পৃথক। আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের প্রতি সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।' যারা সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন। আর যারা পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য তাদেরকে তিনি হিদায়াত লাভে বঞ্চিত করেন। তাঁর প্রতিটি কাজ হিকমতে পূর্ণ এবং তার সমস্ত কৌশল কল্যাণময়।আল্লাহ্ তা'আলা মুমিন লোকটিকে ফিরাউনের ও তার কওমের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট হতে রক্ষা করলেন। দুনিয়াতেও তিনি রক্ষা পেলেন অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে মুক্তি পেলেন এবং আখিরাতের কঠিন শাস্তি হতেও রক্ষা পাবেন। বাকী সবাই তারা নিকৃষ্ট শাস্তির শিকার হলো। অর্থাৎ ফিরাউন তার কওমসহ সমুদ্রে নিমজ্জিত হলো। এতো হলো দুনিয়ার শাস্তি। আর আখিরাতে তো তাদের জন্যে কঠিন শাস্তি রয়েছেই। সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে উপস্থিত করা হয় আগুনের সামনে। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের এ শাস্তি হতেই থাকবে। আর কিয়ামতের দিন তাদের আত্মাগুলোকে দেহসহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সেই দিন তাদেরকে বলা হবেঃ “হে ফিরাউনীরা! তোমরা ভীষণ কষ্ট ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে চলে যাও।” আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলবেনঃ “ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে।এ আয়াতটি আহলে সুন্নাতের ঐ মাযহাবের এই কথার উপর বড় দলীল যে, কবরে শাস্তি হয়ে থাকে। তবে এখানে এ কথাটি স্মরণ রাখা দরকার যে, কোন কোন হাদীসে এমন কতকগুলো বিষয় এসেছে যেগুলো দ্বারা জানা যায় যে, বারযাখের শাস্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অবহিত হয়েছিলেন মদীনায় হিজরতের পর। আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মক্কায়। তাহলে এর জবাব এই যে, এই আয়াত দ্বারা শুধু এটুকু জানা যাচ্ছে যে, মুশরিকদের আত্মাগুলোকে সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের সামনে পেশ করা হয়। বাকী থাকলো এই কথাটি যে, এই শাস্তি কি সব সময় হয়, না সব সময় নয়? আর এটাও যে, এই আযাব কি শুধু রূহের উপর হয়, না দেহের উপরও হয়ে থাকে? এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অবহিত হন মদীনায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা বর্ণনা করে দিয়েছেন। সুতরাং হাদীস ও কুরআনকে মিলিয়ে এই মাসআলা বের হলো যে, কবরের শাস্তি ও শান্তি আত্মা ও দেহ উভয়ের উপর হয়ে থাকে। আর এটাই সত্য বটে।' হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন ইয়াহুদিনী তাঁর খিদমতে নিয়োজিতা ছিল। হযরত আয়েশা তার প্রতি কোন অনুগ্রহ করলেই সে বলতোঃ “আল্লাহ্ আপনাকে কবরের আযাব হতে রক্ষা করুন!” একদা হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের পূর্বেও কি কবরে আযাব হয়?তিনি উত্তরে বললেনঃ “না। কে এ কথা বলেছে?” হযরত আয়েশা (রাঃ) ঐ ইয়াহূদী মহিলাটির ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “ইয়াহূদী মিথ্যাবাদী। তারা তো এর চেয়েও বড় মিথ্যা আরোপ করে থাকে। কিয়ামতের পূর্বে কোন শাস্তি নেই।” ইতিমধ্যে কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুহরের সময় কাপড় গুটানো অবস্থায় আগমন করেন এবং তাঁর চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল। তিনি উচ্চ স্বরে বলছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে তোমরা অবশ্যই হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশী। হে লোক সকল! কবরের আযাব হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর। নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, কবরের আযাব সত্য।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর সহীহ। তারা এটা তাখরীজ করেননি)অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, একজন ইয়াহূদী মহিলা হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে এসে কিছু ভিক্ষা চায়। তিনি তাকে কিছু দান করেন। তখন সে বলেঃ “আল্লাহ আপনাকে কবরের আযাব হতে রক্ষা করুন!” এর শেষে রয়েছে যে, এর কিছুদিন পরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার নিকট ওহী করেছেন যে, তোমাদেরকে তোমাদের কবরে ফিতায় ফেলে দেয়া হয়।”সুতরাং এই আয়াত ও হাদীসগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান প্রথমতঃ এই ভাবে হতে পারে যা উপরে বর্ণিত হলো। দ্বিতীয়তঃ আয়াতের (আরবী) দ্বারা শুধু এটুকু সাব্যস্ত হয় যে, কাফিরদেরকে আলমে বরযখে শাস্তি দেয়া হয়। কিন্তু এর দ্বারা এটা অপরিহার্য নয় যে, মুমিনকেও তার কিছু পাপের কারণে তার কবরে শাস্তি দেয়া হয়। এটা শুধু হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর নিকট প্রবেশ করেন। ঐ সময় একজন ইয়াহূদী মহিলা তাঁর নিকট বসেছিল। সে তাঁকে বলেঃ “আপনাদেরকে আপনাদের কবরে আজমায়েশ করা হবে এটা কি আপনি জানেন?” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কেঁপে ওঠেন এবং বলেনঃ “ইয়াহুদীকে আজমায়েশ করা হবে। এর কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “সাবধান! তোমরা তোমাদের কবরে আজমায়েশের মধ্যে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কবরের ফিত্না হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকতেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত আছে)এটাও হতে পারে যে, এ আয়াত দ্বারা শুধু রূহের উপর শাস্তির কথা প্রমাণিত হয়, দেহের উপরও শাস্তি হওয়া প্রমাণিত হয় না। পরে ওহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, কবরের আযাব দেহ ও আত্মা উভয়ের উপর হয়ে থাকে। সুতরাং পরে তিনি এর থেকে মুক্তির প্রার্থনা শুরু করেন। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি ইয়াহুদী মহিলা তার কাছে এসে বলেঃ “কবরের আযাব হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।” তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কবরের আযাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, কবরের আযাব সত্য।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এরপর থেকে আমি দেখতাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে কবরের আযাব হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।” এ হাদীস দ্বারা তো প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদী মহিলাটির কথা শুনা মাত্রই তার সত্যতা স্বীকার করেন। আর উপরে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তার কথাকে তিনি মিথ্যা বলেন। এ দ্বন্দ্বের সমাধান এই যে, এখানে ঘটনা হলো দু'টি। প্রথম ঘটনার সময় তাকে ওহীর দ্বারা জানানো হয়নি বলেই তিনি মহিলাটির কথার সত্যতা অস্বীকার করেন। তারপর যখন জানতে পারেন তখন তার কথার সত্যতা স্বীকার করেন। এসব ব্যাপারে একমাত্র মহান আল্লাহই সর্বাপেক্ষা সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, দুনিয়া থাকা পর্যন্ত প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যায় ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহগুলোকে জাহান্নামের সামনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ওগুলোকে বলা হয়ঃ “হে ফিরাউন সম্প্রদায়! এটা তোমাদের চিরস্থায়ী আবাসস্থল।” যাতে তাদের দুঃখ-চিন্তা বেড়ে যায় এবং তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। সুতরাং আজও তারা শাস্তির মধ্যেই রয়েছে। আর স্থায়ীভাবে ওর মধ্যেই থাকবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, শহীদদের আত্মাগুলো সবুজ রঙ এর পাখীসমূহের দেহের মধ্যে থাকে। তারা ইচ্ছামত জান্নাতের যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। আর মুমিনদের শিশুগুলোর আত্মাও পাখীর দেহের মধ্যে থাকে। তারাও জান্নাতের যেখানে সেখানে ইচ্ছামত চলাফেরা করে। আর তারা আরশের সাথে লটকানো লণ্ঠনের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। পক্ষান্তরে, ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহগুলো কালো পাখীর দেহে অবস্থান করে। পাখীগুলো সকালে ও সন্ধ্যায় জাহান্নামের নিকট যায়। এটাই হলো তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করা। মিরাজের সুদীর্ঘ হাদীসের মধ্যে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে এক বিরাট মাখলুকের নিকট নিয়ে গেলেন যাদের প্রত্যেকের পেট ছিল খুব বড় ঘরের মত, যারা ফিরাউন সম্প্রদায়ের পার্শ্বে বন্দী ছিল। ফিরাউন সম্পদায়কে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সম্মুখে উপস্থিত করা হয়।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন আল্লাহ তাআলা (ফেরেশতাদেরকে) বলবেনঃ ‘ফিরাউন সম্প্রদায়কে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।' এই ফিরাউনী লোকগুলো লাগাম দেয়া উটের মত মুখ নীচু করে পাথর ও গাছ চাটছে এবং তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞান ও নির্বোধ। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ইহ্সান করে আল্লাহ তাকে তার প্রতিদান অবশ্যই দেন, সে মুসলমানই হোক বা কাফিরই হোক।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাফিরদের প্রতিদান কেমন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “যদি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখে, সাদকা করে অথবা অন্য কোন ভাল কাজ করে তবে আল্লাহ তা'আলা ওর প্রতিদান তার ধন-মালে, তার স্বাস্থ্যে এবং এরূপই অন্যান্য জিনিসে দিয়ে থাকেন।" সাহাবীগণ আবার প্রশ্ন করলেনঃ “পরকালে তারা কি বিনিময় লাভ করবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “বড় আযাব হতে ছোট আযাব।” অতঃপর তিনি (আরবী) (ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে) এ আয়াত পাঠ করলেন। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আওযায়ী (রঃ)-কে একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “আচ্ছা বলুন তো, বহু ঝাকের ঝক সাদা পাখীকে আমরা সমুদ্র হতে বের হতে দেখি। ওরা সমুদ্রের পশ্চিম তীরে সকাল বেলায় উড়ে যায়। ওগুলোর সংখ্যা এতো বেশী যে, কেউ গণনা করতে সক্ষম হবে না। সন্ধ্যার সময় ঐ ভাবেই ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরে আসে। কিন্তু ঐ সময় ওগুলোর রঙ সম্পূর্ণ কালো হয়ে যায়। এর কারণ কি?” উত্তরে হযরত আওযায়ী (রঃ) তাকে বলেন, “তুমি কি সত্যিই এরূপ লক্ষ্য করেছো?” লোকটি জবাব দেয়ঃ হ্যা। তখন তিনি বলেনঃ “ঐ পাখীগুলোর দেহের মধ্যে ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহ রয়েছে যেগুলোকে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সামনে উপস্থিত করা হয়। অতঃপর ওগুলো ওদের বাসায় ফিরে আসে। ওদের পালকগুলো পুড়ে গিয়ে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। রাত্রে আবার পালক বের হয় এবং কালো রঙ দূর হয়ে যায়। দুনিয়ায় তাদের এই অবস্থা হতে থাকে। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলবেনঃ “তোমরা কঠিন শাস্তির মধ্যে প্রবেশ কর।” (ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)কথিত আছে যে, তাদের সংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ, যারা ফিরাউনের সৈন্য ছিল।হ্যরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ মারা যায় তখন সকাল-সন্ধ্যায় তার (স্থায়ী) বাসস্থান তাকে দেখানো হয়। সে জান্নাতী হলে জান্নাত এবং জাহান্নামী হলে জাহান্নাম দেখানো হয়ে থাকে। অতঃপর তাকে বলা হয়ঃ “এটা তোমার আসল বাসস্থান, যেখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন তোমাকে পাঠিয়ে দিবেন।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)
গাফির 40:44
৪১-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর: ফিরাউনের কওমের মুমিন লোকটি স্বীয় উপদেশপূর্ণ বক্তৃতা চালু রেখে বলেনঃ এটা কতই না বিস্ময়কর ব্যাপার যে, আমি তোমাদেরকে তাওহীদ অর্থাৎ এক ও শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছি এবং রাসূল (আঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করার দিকে ডাকছি, আর তোমরা আমাকে ডাকছো কুফরী ও শিরুকের দিকে! তোমরা চাচ্ছ যে, আমি যেন অজ্ঞ হয়ে যাই এবং বিনা দলীলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (আঃ)-এর বিরোধিতা করি! তোমরা একটু চিন্তা করে দেখো তো যে, তোমাদের ও আমার দাওয়াতের মধ্যে কতো পার্থক্য রয়েছে! আমি তোমাদেরকে ঐ আল্লাহর দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছি যিনি বড়ই ইয্যত ও মর্যাদার অধিকারী এবং ব্যাপক ক্ষমতাবান। এতদসত্ত্বেও তিনি এমন প্রত্যেক ব্যক্তির তাওবা কবুল করে থাকেন যে তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে।(আরবী)-এর অর্থ হলো হক ও সত্যতা। অর্থাৎ এটা নিশ্চিত সত্য যে, যেদিকে তোমরা আমাকে আহ্বান করছে অর্থাৎ মূর্তি এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্যান্যদের ইবাদতের দিকে, ওগুলো এমনই যে, ওদের দ্বীন ও দুনিয়ার কোন আধিপত্য নেই। ওগুলো না পারে কারো কোন উপকার করতে এবং না পারে কোন ক্ষতি করতে। ওরা ওদের আহ্বানকারীদের আহ্বান শুনতে পায় না এবং ককূল করতেও পারে না, এই দুনিয়াতেও না এবং পরকালেও না। এটা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার নিম্নের উক্তির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই ব্যক্তি অপেক্ষা বড় পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে যে আল্লাহকে ছাড়া এমন কিছুকে ডেকে থাকে যারা কিয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দিতে পারে না? আর তারা তাদের ডাক হতে উদাসীন ও অমনোযোগী। যখন লোকদেরকে একত্রিত করা হবে তখন তারা তাদের আহ্বানকারীদের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বসবে।” (৪৬:৫-৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তোমরা তাদেরকে ডাকো তবে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না, আর (মনে করা যাক যে,) যদি শুনেও বা তবুও তোমাদের ডাকে তারা সাড়া দিতে পারবে না।” (৩৫:১৪) মুমিন লোকটি বললেনঃ আমাদের প্রত্যাবর্তন তো আল্লাহরই নিকট। অর্থাৎ পরকালে আমাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট ফিরে যেতে হবে। অতঃপর তিনি প্রত্যেককে তার আমলের প্রতিফল দিবেন। এ জন্যেই বলেনঃ ‘সীমালংঘনকারীরাই জাহান্নামের অধিবাসী।'মুমিন লোকটি তাদেরকে আরো বললেনঃ আমি তোমাদেরকে যা বলছি তোমরা অচিরেই তা স্মরণ করবে। তখন তোমরা হা-হুতাশ ও আফসোস করবে। কিন্তু তখন সবই বৃথা হবে। আমি তো আমার ব্যাপার আল্লাহর কাছে সমর্পণ করছি। আমার ভরসা তাঁরই উপর। আমি আমার প্রতিটি কাজে তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি। এখন তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমি তোমাদের কাজে ঘৃণা প্রকাশ করছি। তোমাদের হতে আমি এখন সম্পূর্ণ পৃথক। আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের প্রতি সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।' যারা সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন। আর যারা পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য তাদেরকে তিনি হিদায়াত লাভে বঞ্চিত করেন। তাঁর প্রতিটি কাজ হিকমতে পূর্ণ এবং তার সমস্ত কৌশল কল্যাণময়।আল্লাহ্ তা'আলা মুমিন লোকটিকে ফিরাউনের ও তার কওমের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট হতে রক্ষা করলেন। দুনিয়াতেও তিনি রক্ষা পেলেন অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে মুক্তি পেলেন এবং আখিরাতের কঠিন শাস্তি হতেও রক্ষা পাবেন। বাকী সবাই তারা নিকৃষ্ট শাস্তির শিকার হলো। অর্থাৎ ফিরাউন তার কওমসহ সমুদ্রে নিমজ্জিত হলো। এতো হলো দুনিয়ার শাস্তি। আর আখিরাতে তো তাদের জন্যে কঠিন শাস্তি রয়েছেই। সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে উপস্থিত করা হয় আগুনের সামনে। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের এ শাস্তি হতেই থাকবে। আর কিয়ামতের দিন তাদের আত্মাগুলোকে দেহসহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সেই দিন তাদেরকে বলা হবেঃ “হে ফিরাউনীরা! তোমরা ভীষণ কষ্ট ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে চলে যাও।” আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলবেনঃ “ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে।এ আয়াতটি আহলে সুন্নাতের ঐ মাযহাবের এই কথার উপর বড় দলীল যে, কবরে শাস্তি হয়ে থাকে। তবে এখানে এ কথাটি স্মরণ রাখা দরকার যে, কোন কোন হাদীসে এমন কতকগুলো বিষয় এসেছে যেগুলো দ্বারা জানা যায় যে, বারযাখের শাস্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অবহিত হয়েছিলেন মদীনায় হিজরতের পর। আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মক্কায়। তাহলে এর জবাব এই যে, এই আয়াত দ্বারা শুধু এটুকু জানা যাচ্ছে যে, মুশরিকদের আত্মাগুলোকে সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের সামনে পেশ করা হয়। বাকী থাকলো এই কথাটি যে, এই শাস্তি কি সব সময় হয়, না সব সময় নয়? আর এটাও যে, এই আযাব কি শুধু রূহের উপর হয়, না দেহের উপরও হয়ে থাকে? এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অবহিত হন মদীনায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা বর্ণনা করে দিয়েছেন। সুতরাং হাদীস ও কুরআনকে মিলিয়ে এই মাসআলা বের হলো যে, কবরের শাস্তি ও শান্তি আত্মা ও দেহ উভয়ের উপর হয়ে থাকে। আর এটাই সত্য বটে।' হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন ইয়াহুদিনী তাঁর খিদমতে নিয়োজিতা ছিল। হযরত আয়েশা তার প্রতি কোন অনুগ্রহ করলেই সে বলতোঃ “আল্লাহ্ আপনাকে কবরের আযাব হতে রক্ষা করুন!” একদা হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের পূর্বেও কি কবরে আযাব হয়?তিনি উত্তরে বললেনঃ “না। কে এ কথা বলেছে?” হযরত আয়েশা (রাঃ) ঐ ইয়াহূদী মহিলাটির ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “ইয়াহূদী মিথ্যাবাদী। তারা তো এর চেয়েও বড় মিথ্যা আরোপ করে থাকে। কিয়ামতের পূর্বে কোন শাস্তি নেই।” ইতিমধ্যে কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুহরের সময় কাপড় গুটানো অবস্থায় আগমন করেন এবং তাঁর চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল। তিনি উচ্চ স্বরে বলছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে তোমরা অবশ্যই হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশী। হে লোক সকল! কবরের আযাব হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর। নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, কবরের আযাব সত্য।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর সহীহ। তারা এটা তাখরীজ করেননি)অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, একজন ইয়াহূদী মহিলা হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে এসে কিছু ভিক্ষা চায়। তিনি তাকে কিছু দান করেন। তখন সে বলেঃ “আল্লাহ আপনাকে কবরের আযাব হতে রক্ষা করুন!” এর শেষে রয়েছে যে, এর কিছুদিন পরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার নিকট ওহী করেছেন যে, তোমাদেরকে তোমাদের কবরে ফিতায় ফেলে দেয়া হয়।”সুতরাং এই আয়াত ও হাদীসগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান প্রথমতঃ এই ভাবে হতে পারে যা উপরে বর্ণিত হলো। দ্বিতীয়তঃ আয়াতের (আরবী) দ্বারা শুধু এটুকু সাব্যস্ত হয় যে, কাফিরদেরকে আলমে বরযখে শাস্তি দেয়া হয়। কিন্তু এর দ্বারা এটা অপরিহার্য নয় যে, মুমিনকেও তার কিছু পাপের কারণে তার কবরে শাস্তি দেয়া হয়। এটা শুধু হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর নিকট প্রবেশ করেন। ঐ সময় একজন ইয়াহূদী মহিলা তাঁর নিকট বসেছিল। সে তাঁকে বলেঃ “আপনাদেরকে আপনাদের কবরে আজমায়েশ করা হবে এটা কি আপনি জানেন?” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কেঁপে ওঠেন এবং বলেনঃ “ইয়াহুদীকে আজমায়েশ করা হবে। এর কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “সাবধান! তোমরা তোমাদের কবরে আজমায়েশের মধ্যে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কবরের ফিত্না হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকতেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত আছে)এটাও হতে পারে যে, এ আয়াত দ্বারা শুধু রূহের উপর শাস্তির কথা প্রমাণিত হয়, দেহের উপরও শাস্তি হওয়া প্রমাণিত হয় না। পরে ওহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, কবরের আযাব দেহ ও আত্মা উভয়ের উপর হয়ে থাকে। সুতরাং পরে তিনি এর থেকে মুক্তির প্রার্থনা শুরু করেন। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি ইয়াহুদী মহিলা তার কাছে এসে বলেঃ “কবরের আযাব হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।” তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কবরের আযাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, কবরের আযাব সত্য।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এরপর থেকে আমি দেখতাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে কবরের আযাব হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।” এ হাদীস দ্বারা তো প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদী মহিলাটির কথা শুনা মাত্রই তার সত্যতা স্বীকার করেন। আর উপরে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তার কথাকে তিনি মিথ্যা বলেন। এ দ্বন্দ্বের সমাধান এই যে, এখানে ঘটনা হলো দু'টি। প্রথম ঘটনার সময় তাকে ওহীর দ্বারা জানানো হয়নি বলেই তিনি মহিলাটির কথার সত্যতা অস্বীকার করেন। তারপর যখন জানতে পারেন তখন তার কথার সত্যতা স্বীকার করেন। এসব ব্যাপারে একমাত্র মহান আল্লাহই সর্বাপেক্ষা সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, দুনিয়া থাকা পর্যন্ত প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যায় ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহগুলোকে জাহান্নামের সামনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ওগুলোকে বলা হয়ঃ “হে ফিরাউন সম্প্রদায়! এটা তোমাদের চিরস্থায়ী আবাসস্থল।” যাতে তাদের দুঃখ-চিন্তা বেড়ে যায় এবং তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। সুতরাং আজও তারা শাস্তির মধ্যেই রয়েছে। আর স্থায়ীভাবে ওর মধ্যেই থাকবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, শহীদদের আত্মাগুলো সবুজ রঙ এর পাখীসমূহের দেহের মধ্যে থাকে। তারা ইচ্ছামত জান্নাতের যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। আর মুমিনদের শিশুগুলোর আত্মাও পাখীর দেহের মধ্যে থাকে। তারাও জান্নাতের যেখানে সেখানে ইচ্ছামত চলাফেরা করে। আর তারা আরশের সাথে লটকানো লণ্ঠনের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। পক্ষান্তরে, ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহগুলো কালো পাখীর দেহে অবস্থান করে। পাখীগুলো সকালে ও সন্ধ্যায় জাহান্নামের নিকট যায়। এটাই হলো তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করা। মিরাজের সুদীর্ঘ হাদীসের মধ্যে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে এক বিরাট মাখলুকের নিকট নিয়ে গেলেন যাদের প্রত্যেকের পেট ছিল খুব বড় ঘরের মত, যারা ফিরাউন সম্প্রদায়ের পার্শ্বে বন্দী ছিল। ফিরাউন সম্পদায়কে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সম্মুখে উপস্থিত করা হয়।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন আল্লাহ তাআলা (ফেরেশতাদেরকে) বলবেনঃ ‘ফিরাউন সম্প্রদায়কে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।' এই ফিরাউনী লোকগুলো লাগাম দেয়া উটের মত মুখ নীচু করে পাথর ও গাছ চাটছে এবং তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞান ও নির্বোধ। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ইহ্সান করে আল্লাহ তাকে তার প্রতিদান অবশ্যই দেন, সে মুসলমানই হোক বা কাফিরই হোক।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাফিরদের প্রতিদান কেমন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “যদি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখে, সাদকা করে অথবা অন্য কোন ভাল কাজ করে তবে আল্লাহ তা'আলা ওর প্রতিদান তার ধন-মালে, তার স্বাস্থ্যে এবং এরূপই অন্যান্য জিনিসে দিয়ে থাকেন।" সাহাবীগণ আবার প্রশ্ন করলেনঃ “পরকালে তারা কি বিনিময় লাভ করবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “বড় আযাব হতে ছোট আযাব।” অতঃপর তিনি (আরবী) (ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে) এ আয়াত পাঠ করলেন। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আওযায়ী (রঃ)-কে একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “আচ্ছা বলুন তো, বহু ঝাকের ঝক সাদা পাখীকে আমরা সমুদ্র হতে বের হতে দেখি। ওরা সমুদ্রের পশ্চিম তীরে সকাল বেলায় উড়ে যায়। ওগুলোর সংখ্যা এতো বেশী যে, কেউ গণনা করতে সক্ষম হবে না। সন্ধ্যার সময় ঐ ভাবেই ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরে আসে। কিন্তু ঐ সময় ওগুলোর রঙ সম্পূর্ণ কালো হয়ে যায়। এর কারণ কি?” উত্তরে হযরত আওযায়ী (রঃ) তাকে বলেন, “তুমি কি সত্যিই এরূপ লক্ষ্য করেছো?” লোকটি জবাব দেয়ঃ হ্যা। তখন তিনি বলেনঃ “ঐ পাখীগুলোর দেহের মধ্যে ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহ রয়েছে যেগুলোকে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সামনে উপস্থিত করা হয়। অতঃপর ওগুলো ওদের বাসায় ফিরে আসে। ওদের পালকগুলো পুড়ে গিয়ে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। রাত্রে আবার পালক বের হয় এবং কালো রঙ দূর হয়ে যায়। দুনিয়ায় তাদের এই অবস্থা হতে থাকে। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলবেনঃ “তোমরা কঠিন শাস্তির মধ্যে প্রবেশ কর।” (ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)কথিত আছে যে, তাদের সংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ, যারা ফিরাউনের সৈন্য ছিল।হ্যরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ মারা যায় তখন সকাল-সন্ধ্যায় তার (স্থায়ী) বাসস্থান তাকে দেখানো হয়। সে জান্নাতী হলে জান্নাত এবং জাহান্নামী হলে জাহান্নাম দেখানো হয়ে থাকে। অতঃপর তাকে বলা হয়ঃ “এটা তোমার আসল বাসস্থান, যেখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন তোমাকে পাঠিয়ে দিবেন।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)
গাফির 40:45
৪১-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর: ফিরাউনের কওমের মুমিন লোকটি স্বীয় উপদেশপূর্ণ বক্তৃতা চালু রেখে বলেনঃ এটা কতই না বিস্ময়কর ব্যাপার যে, আমি তোমাদেরকে তাওহীদ অর্থাৎ এক ও শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছি এবং রাসূল (আঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করার দিকে ডাকছি, আর তোমরা আমাকে ডাকছো কুফরী ও শিরুকের দিকে! তোমরা চাচ্ছ যে, আমি যেন অজ্ঞ হয়ে যাই এবং বিনা দলীলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (আঃ)-এর বিরোধিতা করি! তোমরা একটু চিন্তা করে দেখো তো যে, তোমাদের ও আমার দাওয়াতের মধ্যে কতো পার্থক্য রয়েছে! আমি তোমাদেরকে ঐ আল্লাহর দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছি যিনি বড়ই ইয্যত ও মর্যাদার অধিকারী এবং ব্যাপক ক্ষমতাবান। এতদসত্ত্বেও তিনি এমন প্রত্যেক ব্যক্তির তাওবা কবুল করে থাকেন যে তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে।(আরবী)-এর অর্থ হলো হক ও সত্যতা। অর্থাৎ এটা নিশ্চিত সত্য যে, যেদিকে তোমরা আমাকে আহ্বান করছে অর্থাৎ মূর্তি এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্যান্যদের ইবাদতের দিকে, ওগুলো এমনই যে, ওদের দ্বীন ও দুনিয়ার কোন আধিপত্য নেই। ওগুলো না পারে কারো কোন উপকার করতে এবং না পারে কোন ক্ষতি করতে। ওরা ওদের আহ্বানকারীদের আহ্বান শুনতে পায় না এবং ককূল করতেও পারে না, এই দুনিয়াতেও না এবং পরকালেও না। এটা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার নিম্নের উক্তির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই ব্যক্তি অপেক্ষা বড় পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে যে আল্লাহকে ছাড়া এমন কিছুকে ডেকে থাকে যারা কিয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দিতে পারে না? আর তারা তাদের ডাক হতে উদাসীন ও অমনোযোগী। যখন লোকদেরকে একত্রিত করা হবে তখন তারা তাদের আহ্বানকারীদের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বসবে।” (৪৬:৫-৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তোমরা তাদেরকে ডাকো তবে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না, আর (মনে করা যাক যে,) যদি শুনেও বা তবুও তোমাদের ডাকে তারা সাড়া দিতে পারবে না।” (৩৫:১৪) মুমিন লোকটি বললেনঃ আমাদের প্রত্যাবর্তন তো আল্লাহরই নিকট। অর্থাৎ পরকালে আমাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট ফিরে যেতে হবে। অতঃপর তিনি প্রত্যেককে তার আমলের প্রতিফল দিবেন। এ জন্যেই বলেনঃ ‘সীমালংঘনকারীরাই জাহান্নামের অধিবাসী।'মুমিন লোকটি তাদেরকে আরো বললেনঃ আমি তোমাদেরকে যা বলছি তোমরা অচিরেই তা স্মরণ করবে। তখন তোমরা হা-হুতাশ ও আফসোস করবে। কিন্তু তখন সবই বৃথা হবে। আমি তো আমার ব্যাপার আল্লাহর কাছে সমর্পণ করছি। আমার ভরসা তাঁরই উপর। আমি আমার প্রতিটি কাজে তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি। এখন তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমি তোমাদের কাজে ঘৃণা প্রকাশ করছি। তোমাদের হতে আমি এখন সম্পূর্ণ পৃথক। আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের প্রতি সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।' যারা সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন। আর যারা পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য তাদেরকে তিনি হিদায়াত লাভে বঞ্চিত করেন। তাঁর প্রতিটি কাজ হিকমতে পূর্ণ এবং তার সমস্ত কৌশল কল্যাণময়।আল্লাহ্ তা'আলা মুমিন লোকটিকে ফিরাউনের ও তার কওমের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট হতে রক্ষা করলেন। দুনিয়াতেও তিনি রক্ষা পেলেন অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে মুক্তি পেলেন এবং আখিরাতের কঠিন শাস্তি হতেও রক্ষা পাবেন। বাকী সবাই তারা নিকৃষ্ট শাস্তির শিকার হলো। অর্থাৎ ফিরাউন তার কওমসহ সমুদ্রে নিমজ্জিত হলো। এতো হলো দুনিয়ার শাস্তি। আর আখিরাতে তো তাদের জন্যে কঠিন শাস্তি রয়েছেই। সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে উপস্থিত করা হয় আগুনের সামনে। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের এ শাস্তি হতেই থাকবে। আর কিয়ামতের দিন তাদের আত্মাগুলোকে দেহসহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সেই দিন তাদেরকে বলা হবেঃ “হে ফিরাউনীরা! তোমরা ভীষণ কষ্ট ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে চলে যাও।” আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলবেনঃ “ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে।এ আয়াতটি আহলে সুন্নাতের ঐ মাযহাবের এই কথার উপর বড় দলীল যে, কবরে শাস্তি হয়ে থাকে। তবে এখানে এ কথাটি স্মরণ রাখা দরকার যে, কোন কোন হাদীসে এমন কতকগুলো বিষয় এসেছে যেগুলো দ্বারা জানা যায় যে, বারযাখের শাস্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অবহিত হয়েছিলেন মদীনায় হিজরতের পর। আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মক্কায়। তাহলে এর জবাব এই যে, এই আয়াত দ্বারা শুধু এটুকু জানা যাচ্ছে যে, মুশরিকদের আত্মাগুলোকে সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের সামনে পেশ করা হয়। বাকী থাকলো এই কথাটি যে, এই শাস্তি কি সব সময় হয়, না সব সময় নয়? আর এটাও যে, এই আযাব কি শুধু রূহের উপর হয়, না দেহের উপরও হয়ে থাকে? এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অবহিত হন মদীনায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা বর্ণনা করে দিয়েছেন। সুতরাং হাদীস ও কুরআনকে মিলিয়ে এই মাসআলা বের হলো যে, কবরের শাস্তি ও শান্তি আত্মা ও দেহ উভয়ের উপর হয়ে থাকে। আর এটাই সত্য বটে।' হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন ইয়াহুদিনী তাঁর খিদমতে নিয়োজিতা ছিল। হযরত আয়েশা তার প্রতি কোন অনুগ্রহ করলেই সে বলতোঃ “আল্লাহ্ আপনাকে কবরের আযাব হতে রক্ষা করুন!” একদা হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের পূর্বেও কি কবরে আযাব হয়?তিনি উত্তরে বললেনঃ “না। কে এ কথা বলেছে?” হযরত আয়েশা (রাঃ) ঐ ইয়াহূদী মহিলাটির ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “ইয়াহূদী মিথ্যাবাদী। তারা তো এর চেয়েও বড় মিথ্যা আরোপ করে থাকে। কিয়ামতের পূর্বে কোন শাস্তি নেই।” ইতিমধ্যে কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুহরের সময় কাপড় গুটানো অবস্থায় আগমন করেন এবং তাঁর চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল। তিনি উচ্চ স্বরে বলছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে তোমরা অবশ্যই হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশী। হে লোক সকল! কবরের আযাব হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর। নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, কবরের আযাব সত্য।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর সহীহ। তারা এটা তাখরীজ করেননি)অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, একজন ইয়াহূদী মহিলা হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে এসে কিছু ভিক্ষা চায়। তিনি তাকে কিছু দান করেন। তখন সে বলেঃ “আল্লাহ আপনাকে কবরের আযাব হতে রক্ষা করুন!” এর শেষে রয়েছে যে, এর কিছুদিন পরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার নিকট ওহী করেছেন যে, তোমাদেরকে তোমাদের কবরে ফিতায় ফেলে দেয়া হয়।”সুতরাং এই আয়াত ও হাদীসগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান প্রথমতঃ এই ভাবে হতে পারে যা উপরে বর্ণিত হলো। দ্বিতীয়তঃ আয়াতের (আরবী) দ্বারা শুধু এটুকু সাব্যস্ত হয় যে, কাফিরদেরকে আলমে বরযখে শাস্তি দেয়া হয়। কিন্তু এর দ্বারা এটা অপরিহার্য নয় যে, মুমিনকেও তার কিছু পাপের কারণে তার কবরে শাস্তি দেয়া হয়। এটা শুধু হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর নিকট প্রবেশ করেন। ঐ সময় একজন ইয়াহূদী মহিলা তাঁর নিকট বসেছিল। সে তাঁকে বলেঃ “আপনাদেরকে আপনাদের কবরে আজমায়েশ করা হবে এটা কি আপনি জানেন?” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কেঁপে ওঠেন এবং বলেনঃ “ইয়াহুদীকে আজমায়েশ করা হবে। এর কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “সাবধান! তোমরা তোমাদের কবরে আজমায়েশের মধ্যে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কবরের ফিত্না হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকতেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত আছে)এটাও হতে পারে যে, এ আয়াত দ্বারা শুধু রূহের উপর শাস্তির কথা প্রমাণিত হয়, দেহের উপরও শাস্তি হওয়া প্রমাণিত হয় না। পরে ওহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, কবরের আযাব দেহ ও আত্মা উভয়ের উপর হয়ে থাকে। সুতরাং পরে তিনি এর থেকে মুক্তির প্রার্থনা শুরু করেন। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি ইয়াহুদী মহিলা তার কাছে এসে বলেঃ “কবরের আযাব হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।” তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কবরের আযাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, কবরের আযাব সত্য।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এরপর থেকে আমি দেখতাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে কবরের আযাব হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।” এ হাদীস দ্বারা তো প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদী মহিলাটির কথা শুনা মাত্রই তার সত্যতা স্বীকার করেন। আর উপরে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তার কথাকে তিনি মিথ্যা বলেন। এ দ্বন্দ্বের সমাধান এই যে, এখানে ঘটনা হলো দু'টি। প্রথম ঘটনার সময় তাকে ওহীর দ্বারা জানানো হয়নি বলেই তিনি মহিলাটির কথার সত্যতা অস্বীকার করেন। তারপর যখন জানতে পারেন তখন তার কথার সত্যতা স্বীকার করেন। এসব ব্যাপারে একমাত্র মহান আল্লাহই সর্বাপেক্ষা সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, দুনিয়া থাকা পর্যন্ত প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যায় ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহগুলোকে জাহান্নামের সামনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ওগুলোকে বলা হয়ঃ “হে ফিরাউন সম্প্রদায়! এটা তোমাদের চিরস্থায়ী আবাসস্থল।” যাতে তাদের দুঃখ-চিন্তা বেড়ে যায় এবং তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। সুতরাং আজও তারা শাস্তির মধ্যেই রয়েছে। আর স্থায়ীভাবে ওর মধ্যেই থাকবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, শহীদদের আত্মাগুলো সবুজ রঙ এর পাখীসমূহের দেহের মধ্যে থাকে। তারা ইচ্ছামত জান্নাতের যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। আর মুমিনদের শিশুগুলোর আত্মাও পাখীর দেহের মধ্যে থাকে। তারাও জান্নাতের যেখানে সেখানে ইচ্ছামত চলাফেরা করে। আর তারা আরশের সাথে লটকানো লণ্ঠনের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। পক্ষান্তরে, ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহগুলো কালো পাখীর দেহে অবস্থান করে। পাখীগুলো সকালে ও সন্ধ্যায় জাহান্নামের নিকট যায়। এটাই হলো তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করা। মিরাজের সুদীর্ঘ হাদীসের মধ্যে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে এক বিরাট মাখলুকের নিকট নিয়ে গেলেন যাদের প্রত্যেকের পেট ছিল খুব বড় ঘরের মত, যারা ফিরাউন সম্প্রদায়ের পার্শ্বে বন্দী ছিল। ফিরাউন সম্পদায়কে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সম্মুখে উপস্থিত করা হয়।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন আল্লাহ তাআলা (ফেরেশতাদেরকে) বলবেনঃ ‘ফিরাউন সম্প্রদায়কে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।' এই ফিরাউনী লোকগুলো লাগাম দেয়া উটের মত মুখ নীচু করে পাথর ও গাছ চাটছে এবং তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞান ও নির্বোধ। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ইহ্সান করে আল্লাহ তাকে তার প্রতিদান অবশ্যই দেন, সে মুসলমানই হোক বা কাফিরই হোক।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাফিরদের প্রতিদান কেমন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “যদি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখে, সাদকা করে অথবা অন্য কোন ভাল কাজ করে তবে আল্লাহ তা'আলা ওর প্রতিদান তার ধন-মালে, তার স্বাস্থ্যে এবং এরূপই অন্যান্য জিনিসে দিয়ে থাকেন।" সাহাবীগণ আবার প্রশ্ন করলেনঃ “পরকালে তারা কি বিনিময় লাভ করবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “বড় আযাব হতে ছোট আযাব।” অতঃপর তিনি (আরবী) (ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে) এ আয়াত পাঠ করলেন। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আওযায়ী (রঃ)-কে একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “আচ্ছা বলুন তো, বহু ঝাকের ঝক সাদা পাখীকে আমরা সমুদ্র হতে বের হতে দেখি। ওরা সমুদ্রের পশ্চিম তীরে সকাল বেলায় উড়ে যায়। ওগুলোর সংখ্যা এতো বেশী যে, কেউ গণনা করতে সক্ষম হবে না। সন্ধ্যার সময় ঐ ভাবেই ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরে আসে। কিন্তু ঐ সময় ওগুলোর রঙ সম্পূর্ণ কালো হয়ে যায়। এর কারণ কি?” উত্তরে হযরত আওযায়ী (রঃ) তাকে বলেন, “তুমি কি সত্যিই এরূপ লক্ষ্য করেছো?” লোকটি জবাব দেয়ঃ হ্যা। তখন তিনি বলেনঃ “ঐ পাখীগুলোর দেহের মধ্যে ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহ রয়েছে যেগুলোকে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সামনে উপস্থিত করা হয়। অতঃপর ওগুলো ওদের বাসায় ফিরে আসে। ওদের পালকগুলো পুড়ে গিয়ে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। রাত্রে আবার পালক বের হয় এবং কালো রঙ দূর হয়ে যায়। দুনিয়ায় তাদের এই অবস্থা হতে থাকে। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলবেনঃ “তোমরা কঠিন শাস্তির মধ্যে প্রবেশ কর।” (ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)কথিত আছে যে, তাদের সংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ, যারা ফিরাউনের সৈন্য ছিল।হ্যরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ মারা যায় তখন সকাল-সন্ধ্যায় তার (স্থায়ী) বাসস্থান তাকে দেখানো হয়। সে জান্নাতী হলে জান্নাত এবং জাহান্নামী হলে জাহান্নাম দেখানো হয়ে থাকে। অতঃপর তাকে বলা হয়ঃ “এটা তোমার আসল বাসস্থান, যেখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন তোমাকে পাঠিয়ে দিবেন।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)
গাফির 40:46
৪১-৪৬ নং আয়াতের তাফসীর: ফিরাউনের কওমের মুমিন লোকটি স্বীয় উপদেশপূর্ণ বক্তৃতা চালু রেখে বলেনঃ এটা কতই না বিস্ময়কর ব্যাপার যে, আমি তোমাদেরকে তাওহীদ অর্থাৎ এক ও শরীক বিহীন আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছি এবং রাসূল (আঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করার দিকে ডাকছি, আর তোমরা আমাকে ডাকছো কুফরী ও শিরুকের দিকে! তোমরা চাচ্ছ যে, আমি যেন অজ্ঞ হয়ে যাই এবং বিনা দলীলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (আঃ)-এর বিরোধিতা করি! তোমরা একটু চিন্তা করে দেখো তো যে, তোমাদের ও আমার দাওয়াতের মধ্যে কতো পার্থক্য রয়েছে! আমি তোমাদেরকে ঐ আল্লাহর দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছি যিনি বড়ই ইয্যত ও মর্যাদার অধিকারী এবং ব্যাপক ক্ষমতাবান। এতদসত্ত্বেও তিনি এমন প্রত্যেক ব্যক্তির তাওবা কবুল করে থাকেন যে তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে।(আরবী)-এর অর্থ হলো হক ও সত্যতা। অর্থাৎ এটা নিশ্চিত সত্য যে, যেদিকে তোমরা আমাকে আহ্বান করছে অর্থাৎ মূর্তি এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্যান্যদের ইবাদতের দিকে, ওগুলো এমনই যে, ওদের দ্বীন ও দুনিয়ার কোন আধিপত্য নেই। ওগুলো না পারে কারো কোন উপকার করতে এবং না পারে কোন ক্ষতি করতে। ওরা ওদের আহ্বানকারীদের আহ্বান শুনতে পায় না এবং ককূল করতেও পারে না, এই দুনিয়াতেও না এবং পরকালেও না। এটা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার নিম্নের উক্তির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই ব্যক্তি অপেক্ষা বড় পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে যে আল্লাহকে ছাড়া এমন কিছুকে ডেকে থাকে যারা কিয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দিতে পারে না? আর তারা তাদের ডাক হতে উদাসীন ও অমনোযোগী। যখন লোকদেরকে একত্রিত করা হবে তখন তারা তাদের আহ্বানকারীদের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বসবে।” (৪৬:৫-৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তোমরা তাদেরকে ডাকো তবে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না, আর (মনে করা যাক যে,) যদি শুনেও বা তবুও তোমাদের ডাকে তারা সাড়া দিতে পারবে না।” (৩৫:১৪) মুমিন লোকটি বললেনঃ আমাদের প্রত্যাবর্তন তো আল্লাহরই নিকট। অর্থাৎ পরকালে আমাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট ফিরে যেতে হবে। অতঃপর তিনি প্রত্যেককে তার আমলের প্রতিফল দিবেন। এ জন্যেই বলেনঃ ‘সীমালংঘনকারীরাই জাহান্নামের অধিবাসী।'মুমিন লোকটি তাদেরকে আরো বললেনঃ আমি তোমাদেরকে যা বলছি তোমরা অচিরেই তা স্মরণ করবে। তখন তোমরা হা-হুতাশ ও আফসোস করবে। কিন্তু তখন সবই বৃথা হবে। আমি তো আমার ব্যাপার আল্লাহর কাছে সমর্পণ করছি। আমার ভরসা তাঁরই উপর। আমি আমার প্রতিটি কাজে তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি। এখন তোমাদের সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমি তোমাদের কাজে ঘৃণা প্রকাশ করছি। তোমাদের হতে আমি এখন সম্পূর্ণ পৃথক। আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের প্রতি সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।' যারা সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেন। আর যারা পথভ্রষ্ট হওয়ার যোগ্য তাদেরকে তিনি হিদায়াত লাভে বঞ্চিত করেন। তাঁর প্রতিটি কাজ হিকমতে পূর্ণ এবং তার সমস্ত কৌশল কল্যাণময়।আল্লাহ্ তা'আলা মুমিন লোকটিকে ফিরাউনের ও তার কওমের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট হতে রক্ষা করলেন। দুনিয়াতেও তিনি রক্ষা পেলেন অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে মুক্তি পেলেন এবং আখিরাতের কঠিন শাস্তি হতেও রক্ষা পাবেন। বাকী সবাই তারা নিকৃষ্ট শাস্তির শিকার হলো। অর্থাৎ ফিরাউন তার কওমসহ সমুদ্রে নিমজ্জিত হলো। এতো হলো দুনিয়ার শাস্তি। আর আখিরাতে তো তাদের জন্যে কঠিন শাস্তি রয়েছেই। সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে উপস্থিত করা হয় আগুনের সামনে। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের এ শাস্তি হতেই থাকবে। আর কিয়ামতের দিন তাদের আত্মাগুলোকে দেহসহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সেই দিন তাদেরকে বলা হবেঃ “হে ফিরাউনীরা! তোমরা ভীষণ কষ্ট ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে চলে যাও।” আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলবেনঃ “ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে।এ আয়াতটি আহলে সুন্নাতের ঐ মাযহাবের এই কথার উপর বড় দলীল যে, কবরে শাস্তি হয়ে থাকে। তবে এখানে এ কথাটি স্মরণ রাখা দরকার যে, কোন কোন হাদীসে এমন কতকগুলো বিষয় এসেছে যেগুলো দ্বারা জানা যায় যে, বারযাখের শাস্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অবহিত হয়েছিলেন মদীনায় হিজরতের পর। আর এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় মক্কায়। তাহলে এর জবাব এই যে, এই আয়াত দ্বারা শুধু এটুকু জানা যাচ্ছে যে, মুশরিকদের আত্মাগুলোকে সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের সামনে পেশ করা হয়। বাকী থাকলো এই কথাটি যে, এই শাস্তি কি সব সময় হয়, না সব সময় নয়? আর এটাও যে, এই আযাব কি শুধু রূহের উপর হয়, না দেহের উপরও হয়ে থাকে? এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অবহিত হন মদীনায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা বর্ণনা করে দিয়েছেন। সুতরাং হাদীস ও কুরআনকে মিলিয়ে এই মাসআলা বের হলো যে, কবরের শাস্তি ও শান্তি আত্মা ও দেহ উভয়ের উপর হয়ে থাকে। আর এটাই সত্য বটে।' হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন ইয়াহুদিনী তাঁর খিদমতে নিয়োজিতা ছিল। হযরত আয়েশা তার প্রতি কোন অনুগ্রহ করলেই সে বলতোঃ “আল্লাহ্ আপনাকে কবরের আযাব হতে রক্ষা করুন!” একদা হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামতের পূর্বেও কি কবরে আযাব হয়?তিনি উত্তরে বললেনঃ “না। কে এ কথা বলেছে?” হযরত আয়েশা (রাঃ) ঐ ইয়াহূদী মহিলাটির ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “ইয়াহূদী মিথ্যাবাদী। তারা তো এর চেয়েও বড় মিথ্যা আরোপ করে থাকে। কিয়ামতের পূর্বে কোন শাস্তি নেই।” ইতিমধ্যে কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুহরের সময় কাপড় গুটানো অবস্থায় আগমন করেন এবং তাঁর চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল। তিনি উচ্চ স্বরে বলছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে তোমরা অবশ্যই হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশী। হে লোক সকল! কবরের আযাব হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর। নিশ্চিতরূপে জেনে রেখো যে, কবরের আযাব সত্য।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ)-এর শর্তের উপর সহীহ। তারা এটা তাখরীজ করেননি)অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, একজন ইয়াহূদী মহিলা হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে এসে কিছু ভিক্ষা চায়। তিনি তাকে কিছু দান করেন। তখন সে বলেঃ “আল্লাহ আপনাকে কবরের আযাব হতে রক্ষা করুন!” এর শেষে রয়েছে যে, এর কিছুদিন পরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার নিকট ওহী করেছেন যে, তোমাদেরকে তোমাদের কবরে ফিতায় ফেলে দেয়া হয়।”সুতরাং এই আয়াত ও হাদীসগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান প্রথমতঃ এই ভাবে হতে পারে যা উপরে বর্ণিত হলো। দ্বিতীয়তঃ আয়াতের (আরবী) দ্বারা শুধু এটুকু সাব্যস্ত হয় যে, কাফিরদেরকে আলমে বরযখে শাস্তি দেয়া হয়। কিন্তু এর দ্বারা এটা অপরিহার্য নয় যে, মুমিনকেও তার কিছু পাপের কারণে তার কবরে শাস্তি দেয়া হয়। এটা শুধু হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর নিকট প্রবেশ করেন। ঐ সময় একজন ইয়াহূদী মহিলা তাঁর নিকট বসেছিল। সে তাঁকে বলেঃ “আপনাদেরকে আপনাদের কবরে আজমায়েশ করা হবে এটা কি আপনি জানেন?” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কেঁপে ওঠেন এবং বলেনঃ “ইয়াহুদীকে আজমায়েশ করা হবে। এর কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “সাবধান! তোমরা তোমাদের কবরে আজমায়েশের মধ্যে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কবরের ফিত্না হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকতেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত আছে)এটাও হতে পারে যে, এ আয়াত দ্বারা শুধু রূহের উপর শাস্তির কথা প্রমাণিত হয়, দেহের উপরও শাস্তি হওয়া প্রমাণিত হয় না। পরে ওহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, কবরের আযাব দেহ ও আত্মা উভয়ের উপর হয়ে থাকে। সুতরাং পরে তিনি এর থেকে মুক্তির প্রার্থনা শুরু করেন। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি ইয়াহুদী মহিলা তার কাছে এসে বলেঃ “কবরের আযাব হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।” তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কবরের আযাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “হ্যা, কবরের আযাব সত্য।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “এরপর থেকে আমি দেখতাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে কবরের আযাব হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।” এ হাদীস দ্বারা তো প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ইয়াহূদী মহিলাটির কথা শুনা মাত্রই তার সত্যতা স্বীকার করেন। আর উপরে বর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, তার কথাকে তিনি মিথ্যা বলেন। এ দ্বন্দ্বের সমাধান এই যে, এখানে ঘটনা হলো দু'টি। প্রথম ঘটনার সময় তাকে ওহীর দ্বারা জানানো হয়নি বলেই তিনি মহিলাটির কথার সত্যতা অস্বীকার করেন। তারপর যখন জানতে পারেন তখন তার কথার সত্যতা স্বীকার করেন। এসব ব্যাপারে একমাত্র মহান আল্লাহই সর্বাপেক্ষা সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, দুনিয়া থাকা পর্যন্ত প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যায় ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহগুলোকে জাহান্নামের সামনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ওগুলোকে বলা হয়ঃ “হে ফিরাউন সম্প্রদায়! এটা তোমাদের চিরস্থায়ী আবাসস্থল।” যাতে তাদের দুঃখ-চিন্তা বেড়ে যায় এবং তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। সুতরাং আজও তারা শাস্তির মধ্যেই রয়েছে। আর স্থায়ীভাবে ওর মধ্যেই থাকবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, শহীদদের আত্মাগুলো সবুজ রঙ এর পাখীসমূহের দেহের মধ্যে থাকে। তারা ইচ্ছামত জান্নাতের যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। আর মুমিনদের শিশুগুলোর আত্মাও পাখীর দেহের মধ্যে থাকে। তারাও জান্নাতের যেখানে সেখানে ইচ্ছামত চলাফেরা করে। আর তারা আরশের সাথে লটকানো লণ্ঠনের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। পক্ষান্তরে, ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহগুলো কালো পাখীর দেহে অবস্থান করে। পাখীগুলো সকালে ও সন্ধ্যায় জাহান্নামের নিকট যায়। এটাই হলো তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করা। মিরাজের সুদীর্ঘ হাদীসের মধ্যে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে এক বিরাট মাখলুকের নিকট নিয়ে গেলেন যাদের প্রত্যেকের পেট ছিল খুব বড় ঘরের মত, যারা ফিরাউন সম্প্রদায়ের পার্শ্বে বন্দী ছিল। ফিরাউন সম্পদায়কে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সম্মুখে উপস্থিত করা হয়।”মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন আল্লাহ তাআলা (ফেরেশতাদেরকে) বলবেনঃ ‘ফিরাউন সম্প্রদায়কে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।' এই ফিরাউনী লোকগুলো লাগাম দেয়া উটের মত মুখ নীচু করে পাথর ও গাছ চাটছে এবং তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞান ও নির্বোধ। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ইহ্সান করে আল্লাহ তাকে তার প্রতিদান অবশ্যই দেন, সে মুসলমানই হোক বা কাফিরই হোক।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাফিরদের প্রতিদান কেমন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “যদি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখে, সাদকা করে অথবা অন্য কোন ভাল কাজ করে তবে আল্লাহ তা'আলা ওর প্রতিদান তার ধন-মালে, তার স্বাস্থ্যে এবং এরূপই অন্যান্য জিনিসে দিয়ে থাকেন।" সাহাবীগণ আবার প্রশ্ন করলেনঃ “পরকালে তারা কি বিনিময় লাভ করবে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “বড় আযাব হতে ছোট আযাব।” অতঃপর তিনি (আরবী) (ফিরাউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে) এ আয়াত পাঠ করলেন। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আওযায়ী (রঃ)-কে একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “আচ্ছা বলুন তো, বহু ঝাকের ঝক সাদা পাখীকে আমরা সমুদ্র হতে বের হতে দেখি। ওরা সমুদ্রের পশ্চিম তীরে সকাল বেলায় উড়ে যায়। ওগুলোর সংখ্যা এতো বেশী যে, কেউ গণনা করতে সক্ষম হবে না। সন্ধ্যার সময় ঐ ভাবেই ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরে আসে। কিন্তু ঐ সময় ওগুলোর রঙ সম্পূর্ণ কালো হয়ে যায়। এর কারণ কি?” উত্তরে হযরত আওযায়ী (রঃ) তাকে বলেন, “তুমি কি সত্যিই এরূপ লক্ষ্য করেছো?” লোকটি জবাব দেয়ঃ হ্যা। তখন তিনি বলেনঃ “ঐ পাখীগুলোর দেহের মধ্যে ফিরাউন সম্প্রদায়ের রূহ রয়েছে যেগুলোকে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সামনে উপস্থিত করা হয়। অতঃপর ওগুলো ওদের বাসায় ফিরে আসে। ওদের পালকগুলো পুড়ে গিয়ে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। রাত্রে আবার পালক বের হয় এবং কালো রঙ দূর হয়ে যায়। দুনিয়ায় তাদের এই অবস্থা হতে থাকে। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলবেনঃ “তোমরা কঠিন শাস্তির মধ্যে প্রবেশ কর।” (ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)কথিত আছে যে, তাদের সংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ, যারা ফিরাউনের সৈন্য ছিল।হ্যরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ মারা যায় তখন সকাল-সন্ধ্যায় তার (স্থায়ী) বাসস্থান তাকে দেখানো হয়। সে জান্নাতী হলে জান্নাত এবং জাহান্নামী হলে জাহান্নাম দেখানো হয়ে থাকে। অতঃপর তাকে বলা হয়ঃ “এটা তোমার আসল বাসস্থান, যেখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামতের দিন তোমাকে পাঠিয়ে দিবেন।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)
গাফির 40:47
৪৭-৫০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, জাহান্নামীরা জাহান্নামের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদে ও তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়ে পড়বে। ছোটরা বড়দের সাথে বাক-বিতণ্ডা করবে। অর্থাৎ অনুসারীরা যাদের অনুসরণ করতো এবং বড় বলে মানতো ও তাদের কথা মত চলতো তাদেরকে বলবেঃ “দুনিয়ায় আমরা তোমাদের অনুসারী ছিলাম। তোমরা আমাদেরকে যা করার আদেশ করতে আমরা তা পালন করতাম। তোমাদের কুফরী ও বিভ্রান্তিমূলক হুকুমও আমরা মেনে চলতাম। তোমাদের পবিত্রতা, জ্ঞান, মর্যাদা এবং নেতৃত্বের ভিত্তিতে আমরা সবই মানতাম। এখন এই ভয়াবহ অবস্থায় তোমরা আমাদের কোন উপকার করতে পারবে কি? এখন আমাদের শাস্তির কিছু অংশ তোমরা নিজেদের উপর উঠিয়ে নাও তো।” তাদের এ কথার জবাবে ঐ নেতারা বলবেঃ “আমরা নিজেরাও তো তোমাদের সাথে জ্বলতে পুড়তে রয়েছি। আমাদের উপর যে শাস্তি হচ্ছে তা কি কিছু কম? মোটেই কম বা হালকা নয়। সুতরাং কি করে আমরা তোমাদের শাস্তির কিছু অংশ আমাদের উপর উঠাতে পারি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তো বান্দাদের বিচার করে ফেলেছেন। প্রত্যেককেই তিনি তার অসৎ আমল অনুযায়ী শাস্তি দিয়েছেন। এটা কম করা সম্ভব নয়।" যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি বলবেনঃ প্রত্যেকের জন্যে দ্বিগুণ (শাস্তি), কিন্তু তোমরা জান না।' (৭:৩৮)মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “জাহান্নামীরা ওর প্রহরীদেরকে বলবেঃ তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা কর, তিনি যেন আমাদের হতে লাঘব করেন শাস্তি এক দিনের। অর্থাৎ জাহান্নামীরা যখন বুঝে নিবে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের দু'আ কবুল করবেন না, বরং তিনি তাদের কথার দিকে কানও দেন না। এমনকি তাদেরকে ধমকের সুরে বলে দিয়েছেনঃ “তোমরা এখানেই পড়ে থাকো এবং আমার সাথে কথা বলো না, তখন তারা জাহান্নামের প্রহরীদেরকে বলবে, যারা দুনিয়ার জেলখানার রক্ষক ও প্রহরীর মত জাহান্নামের প্রহরী হিসেবে রয়েছেনঃ ‘তোমরাই আমাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট একটু প্রার্থনা কর যে, তিনি যেন এক দিনের জন্যে হলেও আমাদের শাস্তি লাঘব করেন। তারা উত্তরে বলবেনঃ “তোমাদের নিকট কি স্পষ্ট নিদর্শনসহ তোমাদের রাসূলগণ আগমন করেননি?' তারা জবাবে বলবেঃ ‘হ্যা, আমাদের নিকট রাসূলদের (আঃ) আগমন ঘটেছিল বটে।' তখন ফেরেশতাগণ বলবেনঃ তাহলে তোমরা নিজেরাই আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ কর। আমরা তোমাদের পক্ষ হতে তার কাছে কোনই আবেদন করতে পারবো না। বরং আমরা নিজেরাও আজ তোমাদের হা-হুতাশের প্রতি কোনই দৃকপাত করবো না। আমরা নিজেরাও তো। তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট রয়েছি। আমরা আজ তোমাদের শত্রু। আমরা তোমাদেরকে পরিষ্কারভাবে বলে দিচ্ছি যে, তোমরা হয় নিজেরাই দু'আ কর অথবা অন্য কেউ তোমাদের জন্যে দু'আ করুক, তোমাদের শাস্তি হালকা হওয়া অসম্ভব। কাফিরদের প্রার্থনা প্রত্যাখ্যাত ও ব্যর্থই হয়ে থাকে।
গাফির 40:48
৪৭-৫০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, জাহান্নামীরা জাহান্নামের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদে ও তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়ে পড়বে। ছোটরা বড়দের সাথে বাক-বিতণ্ডা করবে। অর্থাৎ অনুসারীরা যাদের অনুসরণ করতো এবং বড় বলে মানতো ও তাদের কথা মত চলতো তাদেরকে বলবেঃ “দুনিয়ায় আমরা তোমাদের অনুসারী ছিলাম। তোমরা আমাদেরকে যা করার আদেশ করতে আমরা তা পালন করতাম। তোমাদের কুফরী ও বিভ্রান্তিমূলক হুকুমও আমরা মেনে চলতাম। তোমাদের পবিত্রতা, জ্ঞান, মর্যাদা এবং নেতৃত্বের ভিত্তিতে আমরা সবই মানতাম। এখন এই ভয়াবহ অবস্থায় তোমরা আমাদের কোন উপকার করতে পারবে কি? এখন আমাদের শাস্তির কিছু অংশ তোমরা নিজেদের উপর উঠিয়ে নাও তো।” তাদের এ কথার জবাবে ঐ নেতারা বলবেঃ “আমরা নিজেরাও তো তোমাদের সাথে জ্বলতে পুড়তে রয়েছি। আমাদের উপর যে শাস্তি হচ্ছে তা কি কিছু কম? মোটেই কম বা হালকা নয়। সুতরাং কি করে আমরা তোমাদের শাস্তির কিছু অংশ আমাদের উপর উঠাতে পারি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তো বান্দাদের বিচার করে ফেলেছেন। প্রত্যেককেই তিনি তার অসৎ আমল অনুযায়ী শাস্তি দিয়েছেন। এটা কম করা সম্ভব নয়।" যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি বলবেনঃ প্রত্যেকের জন্যে দ্বিগুণ (শাস্তি), কিন্তু তোমরা জান না।' (৭:৩৮)মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “জাহান্নামীরা ওর প্রহরীদেরকে বলবেঃ তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা কর, তিনি যেন আমাদের হতে লাঘব করেন শাস্তি এক দিনের। অর্থাৎ জাহান্নামীরা যখন বুঝে নিবে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের দু'আ কবুল করবেন না, বরং তিনি তাদের কথার দিকে কানও দেন না। এমনকি তাদেরকে ধমকের সুরে বলে দিয়েছেনঃ “তোমরা এখানেই পড়ে থাকো এবং আমার সাথে কথা বলো না, তখন তারা জাহান্নামের প্রহরীদেরকে বলবে, যারা দুনিয়ার জেলখানার রক্ষক ও প্রহরীর মত জাহান্নামের প্রহরী হিসেবে রয়েছেনঃ ‘তোমরাই আমাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট একটু প্রার্থনা কর যে, তিনি যেন এক দিনের জন্যে হলেও আমাদের শাস্তি লাঘব করেন। তারা উত্তরে বলবেনঃ “তোমাদের নিকট কি স্পষ্ট নিদর্শনসহ তোমাদের রাসূলগণ আগমন করেননি?' তারা জবাবে বলবেঃ ‘হ্যা, আমাদের নিকট রাসূলদের (আঃ) আগমন ঘটেছিল বটে।' তখন ফেরেশতাগণ বলবেনঃ তাহলে তোমরা নিজেরাই আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ কর। আমরা তোমাদের পক্ষ হতে তার কাছে কোনই আবেদন করতে পারবো না। বরং আমরা নিজেরাও আজ তোমাদের হা-হুতাশের প্রতি কোনই দৃকপাত করবো না। আমরা নিজেরাও তো। তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট রয়েছি। আমরা আজ তোমাদের শত্রু। আমরা তোমাদেরকে পরিষ্কারভাবে বলে দিচ্ছি যে, তোমরা হয় নিজেরাই দু'আ কর অথবা অন্য কেউ তোমাদের জন্যে দু'আ করুক, তোমাদের শাস্তি হালকা হওয়া অসম্ভব। কাফিরদের প্রার্থনা প্রত্যাখ্যাত ও ব্যর্থই হয়ে থাকে।
গাফির 40:49
৪৭-৫০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, জাহান্নামীরা জাহান্নামের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদে ও তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়ে পড়বে। ছোটরা বড়দের সাথে বাক-বিতণ্ডা করবে। অর্থাৎ অনুসারীরা যাদের অনুসরণ করতো এবং বড় বলে মানতো ও তাদের কথা মত চলতো তাদেরকে বলবেঃ “দুনিয়ায় আমরা তোমাদের অনুসারী ছিলাম। তোমরা আমাদেরকে যা করার আদেশ করতে আমরা তা পালন করতাম। তোমাদের কুফরী ও বিভ্রান্তিমূলক হুকুমও আমরা মেনে চলতাম। তোমাদের পবিত্রতা, জ্ঞান, মর্যাদা এবং নেতৃত্বের ভিত্তিতে আমরা সবই মানতাম। এখন এই ভয়াবহ অবস্থায় তোমরা আমাদের কোন উপকার করতে পারবে কি? এখন আমাদের শাস্তির কিছু অংশ তোমরা নিজেদের উপর উঠিয়ে নাও তো।” তাদের এ কথার জবাবে ঐ নেতারা বলবেঃ “আমরা নিজেরাও তো তোমাদের সাথে জ্বলতে পুড়তে রয়েছি। আমাদের উপর যে শাস্তি হচ্ছে তা কি কিছু কম? মোটেই কম বা হালকা নয়। সুতরাং কি করে আমরা তোমাদের শাস্তির কিছু অংশ আমাদের উপর উঠাতে পারি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তো বান্দাদের বিচার করে ফেলেছেন। প্রত্যেককেই তিনি তার অসৎ আমল অনুযায়ী শাস্তি দিয়েছেন। এটা কম করা সম্ভব নয়।" যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি বলবেনঃ প্রত্যেকের জন্যে দ্বিগুণ (শাস্তি), কিন্তু তোমরা জান না।' (৭:৩৮)মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “জাহান্নামীরা ওর প্রহরীদেরকে বলবেঃ তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা কর, তিনি যেন আমাদের হতে লাঘব করেন শাস্তি এক দিনের। অর্থাৎ জাহান্নামীরা যখন বুঝে নিবে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের দু'আ কবুল করবেন না, বরং তিনি তাদের কথার দিকে কানও দেন না। এমনকি তাদেরকে ধমকের সুরে বলে দিয়েছেনঃ “তোমরা এখানেই পড়ে থাকো এবং আমার সাথে কথা বলো না, তখন তারা জাহান্নামের প্রহরীদেরকে বলবে, যারা দুনিয়ার জেলখানার রক্ষক ও প্রহরীর মত জাহান্নামের প্রহরী হিসেবে রয়েছেনঃ ‘তোমরাই আমাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট একটু প্রার্থনা কর যে, তিনি যেন এক দিনের জন্যে হলেও আমাদের শাস্তি লাঘব করেন। তারা উত্তরে বলবেনঃ “তোমাদের নিকট কি স্পষ্ট নিদর্শনসহ তোমাদের রাসূলগণ আগমন করেননি?' তারা জবাবে বলবেঃ ‘হ্যা, আমাদের নিকট রাসূলদের (আঃ) আগমন ঘটেছিল বটে।' তখন ফেরেশতাগণ বলবেনঃ তাহলে তোমরা নিজেরাই আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ কর। আমরা তোমাদের পক্ষ হতে তার কাছে কোনই আবেদন করতে পারবো না। বরং আমরা নিজেরাও আজ তোমাদের হা-হুতাশের প্রতি কোনই দৃকপাত করবো না। আমরা নিজেরাও তো। তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট রয়েছি। আমরা আজ তোমাদের শত্রু। আমরা তোমাদেরকে পরিষ্কারভাবে বলে দিচ্ছি যে, তোমরা হয় নিজেরাই দু'আ কর অথবা অন্য কেউ তোমাদের জন্যে দু'আ করুক, তোমাদের শাস্তি হালকা হওয়া অসম্ভব। কাফিরদের প্রার্থনা প্রত্যাখ্যাত ও ব্যর্থই হয়ে থাকে।
গাফির 40:50
৪৭-৫০ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, জাহান্নামীরা জাহান্নামের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদে ও তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়ে পড়বে। ছোটরা বড়দের সাথে বাক-বিতণ্ডা করবে। অর্থাৎ অনুসারীরা যাদের অনুসরণ করতো এবং বড় বলে মানতো ও তাদের কথা মত চলতো তাদেরকে বলবেঃ “দুনিয়ায় আমরা তোমাদের অনুসারী ছিলাম। তোমরা আমাদেরকে যা করার আদেশ করতে আমরা তা পালন করতাম। তোমাদের কুফরী ও বিভ্রান্তিমূলক হুকুমও আমরা মেনে চলতাম। তোমাদের পবিত্রতা, জ্ঞান, মর্যাদা এবং নেতৃত্বের ভিত্তিতে আমরা সবই মানতাম। এখন এই ভয়াবহ অবস্থায় তোমরা আমাদের কোন উপকার করতে পারবে কি? এখন আমাদের শাস্তির কিছু অংশ তোমরা নিজেদের উপর উঠিয়ে নাও তো।” তাদের এ কথার জবাবে ঐ নেতারা বলবেঃ “আমরা নিজেরাও তো তোমাদের সাথে জ্বলতে পুড়তে রয়েছি। আমাদের উপর যে শাস্তি হচ্ছে তা কি কিছু কম? মোটেই কম বা হালকা নয়। সুতরাং কি করে আমরা তোমাদের শাস্তির কিছু অংশ আমাদের উপর উঠাতে পারি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তো বান্দাদের বিচার করে ফেলেছেন। প্রত্যেককেই তিনি তার অসৎ আমল অনুযায়ী শাস্তি দিয়েছেন। এটা কম করা সম্ভব নয়।" যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি বলবেনঃ প্রত্যেকের জন্যে দ্বিগুণ (শাস্তি), কিন্তু তোমরা জান না।' (৭:৩৮)মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “জাহান্নামীরা ওর প্রহরীদেরকে বলবেঃ তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা কর, তিনি যেন আমাদের হতে লাঘব করেন শাস্তি এক দিনের। অর্থাৎ জাহান্নামীরা যখন বুঝে নিবে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের দু'আ কবুল করবেন না, বরং তিনি তাদের কথার দিকে কানও দেন না। এমনকি তাদেরকে ধমকের সুরে বলে দিয়েছেনঃ “তোমরা এখানেই পড়ে থাকো এবং আমার সাথে কথা বলো না, তখন তারা জাহান্নামের প্রহরীদেরকে বলবে, যারা দুনিয়ার জেলখানার রক্ষক ও প্রহরীর মত জাহান্নামের প্রহরী হিসেবে রয়েছেনঃ ‘তোমরাই আমাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট একটু প্রার্থনা কর যে, তিনি যেন এক দিনের জন্যে হলেও আমাদের শাস্তি লাঘব করেন। তারা উত্তরে বলবেনঃ “তোমাদের নিকট কি স্পষ্ট নিদর্শনসহ তোমাদের রাসূলগণ আগমন করেননি?' তারা জবাবে বলবেঃ ‘হ্যা, আমাদের নিকট রাসূলদের (আঃ) আগমন ঘটেছিল বটে।' তখন ফেরেশতাগণ বলবেনঃ তাহলে তোমরা নিজেরাই আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ কর। আমরা তোমাদের পক্ষ হতে তার কাছে কোনই আবেদন করতে পারবো না। বরং আমরা নিজেরাও আজ তোমাদের হা-হুতাশের প্রতি কোনই দৃকপাত করবো না। আমরা নিজেরাও তো। তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট রয়েছি। আমরা আজ তোমাদের শত্রু। আমরা তোমাদেরকে পরিষ্কারভাবে বলে দিচ্ছি যে, তোমরা হয় নিজেরাই দু'আ কর অথবা অন্য কেউ তোমাদের জন্যে দু'আ করুক, তোমাদের শাস্তি হালকা হওয়া অসম্ভব। কাফিরদের প্রার্থনা প্রত্যাখ্যাত ও ব্যর্থই হয়ে থাকে।