Tafseer ibn Kathir — গাফির 40:51 – ফুসসিলাত 41:23
Contents
- গাফির 40:51
- গাফির 40:52
- গাফির 40:53
- গাফির 40:54
- গাফির 40:55
- গাফির 40:56
- গাফির 40:57
- গাফির 40:58
- গাফির 40:59
- গাফির 40:60
- গাফির 40:61
- গাফির 40:62
- গাফির 40:63
- গাফির 40:64
- গাফির 40:65
- গাফির 40:66
- গাফির 40:67
- গাফির 40:68
- গাফির 40:69
- গাফির 40:70
- গাফির 40:71
- গাফির 40:72
- গাফির 40:73
- গাফির 40:74
- গাফির 40:75
- গাফির 40:76
- গাফির 40:77
- গাফির 40:78
- গাফির 40:79
- গাফির 40:80
- গাফির 40:81
- গাফির 40:82
- গাফির 40:83
- গাফির 40:84
- গাফির 40:85
- ফুসসিলাত 41:1
- ফুসসিলাত 41:2
- ফুসসিলাত 41:3
- ফুসসিলাত 41:4
- ফুসসিলাত 41:5
- ফুসসিলাত 41:6
- ফুসসিলাত 41:7
- ফুসসিলাত 41:8
- ফুসসিলাত 41:9
- ফুসসিলাত 41:10
- ফুসসিলাত 41:11
- ফুসসিলাত 41:12
- ফুসসিলাত 41:13
- ফুসসিলাত 41:14
- ফুসসিলাত 41:15
- ফুসসিলাত 41:16
- ফুসসিলাত 41:17
- ফুসসিলাত 41:18
- ফুসসিলাত 41:19
- ফুসসিলাত 41:20
- ফুসসিলাত 41:21
- ফুসসিলাত 41:22
- ফুসসিলাত 41:23
গাফির 40:51
৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে রাসূলদেরকে (আঃ) সাহায্য করার ওয়াদা রয়েছে। আমরা দেখি যে, কতক নবী (আঃ)-কে তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকেরা হত্যা করে দিয়েছে। যেমন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ) এবং হযরত শা’ইয়া (আঃ)। আর কোন কোন নবী (আঃ)-কে হিজরত করতে হয়েছে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)। আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আসমানে হিজরত করান। এখানে প্রশ্ন হতে পারে যে, দুনিয়ায় যে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীদেরকে সাহায্য করার ওয়াদা করেছেন তা পূর্ণ হলো কিরূপে? এর দু'টি উত্তর রয়েছে। একটি উত্তর এই যে, এখানে খবর আম বা সাধারণ হলেও এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কতক। আর অভিধানে এটা প্রায়ই দেখা যায়। আর দ্বিতীয় উত্তর এই যে, এখানে সাহায্য করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রতিশোধ গ্রহণ করা। দেখা যায় যে, এমন কোন নবী গত হননি যাঁকে কষ্টদাতাদের উপর চরমভাবে আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিশোধ গ্রহণ না করেছেন। যেমন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ) এবং হযরত শা’ইয়া (আঃ)-এর হন্তাদের উপর তাদের শত্রুদেরকে বিজয় দান করেছেন, যারা তাদেরকে হত্যা করে রক্তের স্রোত বহিয়ে দিয়েছে এবং তাদেরকে অত্যন্ত লাঞ্ছিত অবস্থায় মৃত্যুর ঘাটে নামিয়ে দিয়েছে। বিশ্বাসঘাতক নমরূদকে আল্লাহ্ তা'আলা কিভাবে পাকড়াও করেছিলেন এবং সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন তা সর্বজন বিদিত। হযরত ঈসা (আঃ)-কে যে ইয়াহুদীরা শূলবিদ্ধ করার চেষ্টা। করেছিল তাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলা রোমকদেরকে বিজয়ী করেছিলেন। তাদের হাতে ঐ ইয়াহূদীরা খুবই লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে যখন হযরত ঈসা (আঃ) দুনিয়ায় অবতরণ করবেন তখন তিনি দাজ্জালসহ ঐ ইয়াহুদীদেরকেও মেরে ফেলবেন যারা তার সেনাবাহিনীর লোক হবে। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে তশরীফ আনবেন। তিনি ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়াকে বাতিল করবেন এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কিছুই ককূল করবেন না। এটাই হলো আল্লাহর বিরাট সাহায্য। এটাই হলো আল্লাহর রীতি, যা পূর্ব হতেই আছে এবং এখনো চালু রয়েছে যে, তিনি স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে পার্থিব সাহায্যও করে থাকেন এবং তিনি স্বয়ং তাদের শত্রুদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা করে থাকেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমার বন্ধুদের সাথে শত্রুতা করে সে আমার সাথে যুদ্ধের জন্যে বের হয়ে থাকে। (সে যেন তার সাথে যুদ্ধের জন্য আল্লাহ তা'আলাকে তলব করে)।” অন্য হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি আমার বন্ধুদের পক্ষ হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি যেমন প্রতিশোধ গ্রহণ করে সিংহ।” এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম, আ’দ, সামূদ, আসহাবুর রাসস, হযরত লূত (আঃ)-এর কওম, আহলে মাদইয়ান এবং তাদের ন্যায় ঐ সমুদয় লোক হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন যারা রাসূলদেরকে (আঃ) অবিশ্বাস করেছিল এবং সত্যের বিরোধী হয়েছিল। এক এক করে বেছে বেছে তিনি তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আর তাদের মধ্যে যারা মুমিন ছিল তাদেরকে তিনি রক্ষা করেছেন। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যে কওমের মধ্যে আল্লাহর রাসূল এসেছেন অথবা মুমিন বান্দা তাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্যে দাঁড়িয়েছেন, অতঃপর ঐ কওম ঐ নবী বা মুমিনদের অসম্মান করেছে, তাদেরকে মারপিট করেছে বা হত্যা করেছে, তাদের উপর অবশ্যই ঐ যুগেই আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়েছে। নবীদের (আঃ) হন্তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা উঠে দাঁড়িয়েছে এবং পানির মত তাদের রক্ত দ্বারা তৃষ্ণার্ত ভূমিকে সিক্ত করেছে। সুতরাং এখানে যদিও নবীরা (আঃ) ও মুমিনরা নিহত হয়েছেন, কিন্তু তাদের রক্ত বৃথা যায়নি। তাদের শত্রুদেরকে তুষের ন্যায় উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এরূপ বিশিষ্ট বান্দাদের সাহায্য করা হবে না এটা অসম্ভব। তাদের শত্রুদের উপর পূর্ণমাত্রায় প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়েছে। নবীকূল শিরোমণি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর জীবনী দুনিয়াবাসীর সামনে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এবং তাঁর সহচরদেরকে বিজয় দান করেন, তাঁর কালেমা সুউচ্চ করেন এবং তাঁর শত্রুদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। তাঁর দ্বীন দুনিয়ার সমস্ত দ্বীনের উপর ছেয়ে যায়। যখন তাঁর কওম চরমভাবে তাঁর বিরোধিতা শুরু করে তখন মহান আল্লাহ তাঁকে মদীনায় পৌঁছিয়ে দেন এবং মদীনাবাসীকে তাঁর পরম ভক্ত বানিয়ে দেন। মদীনাবাসী তাঁর জন্যে জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত হয়ে যান। অতঃপর বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে যায়। তাদের বহু নেতৃস্থানীয় লোক এ যুদ্ধে নিহত হয় এবং অনেকে মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। এভাবে তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। পরম দয়ালু আল্লাহ তাদের উপর ইহসান করেন এবং তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ নিয়ে তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া হয়। এভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথে ফিরে আসার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এর পরেও যখন তারা অন্যায় হতে বিরত হলো না, বরং পূর্বের দুষ্কর্মকেই আঁকড়ে ধরে থাকলো তখন এমন এক সময় এসে গেল যে, যেখান হতে নবী (সঃ)-কে রাত্রির অন্ধকারে চুপে চুপে পদব্রজে হিজরত করতে হয়েছিল, সেখানে তিনি বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করলেন এবং অত্যন্ত অসহায় ও নিরুপায় অবস্থায় তার শত্রুদেরকে তাঁর সামনে হাযির করা হলো। হারাম শহরের ইযযত ও হুরমত মহান রাসূল (সঃ)-এর কারণে পূর্ণভাবে রক্ষিত হলো। সমস্ত শিরক ও কুফরী এবং সর্বপ্রকারের বে-আদবী হতে আল্লাহর ঘরকে পবিত্র করা হলো। অবশেষে ইয়ামনও বিজিত হলো এবং সারা আরব উপদ্বীপের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। অতঃপর জনগণ দলে দলে এসে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে শুরু করলো। পরিশেষে মহান রাব্বল আলামীন স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নিজের কাছে ডেকে নিলেন এবং তথায় তাঁকে স্বীয় সম্মানিত অতিথি হিসেবে গ্রহণ করলেন। তারপর তার সকর্মশীল সাহাবীদেরকে (সঃ) তার স্থলাভিষিক্ত করলেন, যারা মুহাম্মাদ (সঃ) ঝাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহর মাখলুককে তাঁর একত্ববাদের দিকে ডাকতে লাগলেন। তাঁরা পথের বাধাকে অতিক্রম করলেন এবং ইসলামরূপ বাগানের কাটাকে কেটে সাফ করলেন। এভাবে তারা গ্রামে গ্রামে এবং শহরে শহরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দিলেন। এ পথে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলো তাদেরকে তারা এর স্বাদ চাখিয়ে দিলেন। এরূপে প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করলো।সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) শুধু যমীনের উপর এবং যমীনবাসীর দেহের উপরই বিজয় লাভ করেননি, বরং তাদের অন্তরকেও জয় করে নেন। তারা তাদের অন্তরে ইসলামের চিত্র অংকিত করে দেন এবং সকলকে কালেমায়ে তাওহীদের পতাকা তলে একত্রিত করেন। দ্বীনে মুহাম্মাদ (সঃ) ভূ-পৃষ্ঠের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে যায় এবং এভাবে সব জায়গাই ওর দখলে এসে পড়ে। দাওয়াতে মুহাম্মাদ (সঃ) বধির কর্ণেও পৌঁছে যায়, সিরাতে মুহাম্মাদী (সঃ) তারাও দেখে নেয়।সমুদয় প্রশংসা মহান আল্লাহর প্রাপ্য যে, আজ পর্যন্ত আল্লাহর দ্বীন জয়যুক্তই হয়েছে। এখন পর্যন্ত মুসলমানদের হাতে হুকুমত ও শাসন ক্ষমতা বিদ্যমান রয়েছে। আজ পর্যন্ত তাদের হাতে আল্লাহর এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর কালাম মওজুদ আছে। এখনও তাদের মাথার উপর আল্লাহর হাত রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত এই দ্বীন জয়যুক্ত ও সাহায্য প্রাপ্তই থাকবে। যে এর মুকাবিলায় আসবে তার মুখে চুনকালি পড়বে এবং আর কখনো সে মুখ দেখাতে পারবে না। এই পবিত্র আয়াতের ভাবার্থ এটাই। কিয়ামতের দিনেও দ্বীনদারদের সাহায্য করা হবে এবং ঐ সাহায্য হবে খুব উচ্চ পর্যায়ের। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, সাক্ষী দ্বারা ফেরেশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে।আল্লাহ তাআলার (আরবী)-এই উক্তিটি তার (আরবী)-এ উক্তি হতে (আরবী) হয়েছে। অন্যেরা পড়েছেন (আরবী) তখন এটা যেন পূর্বের -এর তাফসীর। এখানে যালিমদের দ্বারা মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। কিয়ামতের দিন তাদের কোন ওযর-আপত্তি ও মুক্তিপণ গৃহীত হবে না। সেদিন তাদেরকে আল্লাহর রহমত হতে দূর করে দেয়া হবে। তাদের জন্যে হবে নিকৃষ্ট আবাস অর্থাৎ জাহান্নাম। তাদের পরিণাম হবে মন্দ।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি অবশ্যই মূসা (আঃ)-কে দান করেছিলাম পথ-নির্দেশ এবং বানী ইসরাঈলকে উত্তরাধিকারী করেছিলাম সেই কিতাবের।' অর্থাৎ তাদেরকে ফিরাউনের ধন-দৌলত ও ভূমির ওয়ারিশ বানিয়েছিলাম। কেননা তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (আঃ)-এর আনুগত্যে স্থির থেকে কষ্ট ও বিপদাপদ সহ্য করেছিল। যে কিতাবের তাদেরকে ওয়ারিশ করা হয়েছিল তা ছিল বোধশক্তি সম্পন্ন লোকদের জন্যে পথ-নির্দেশ ও উপদেশ স্বরূপ।মহান আল্লাহ বলেনঃ সুতরাং হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ধৈর্য ধারণ কর; আল্লাহর ওয়াদা সত্য। তোমারই পরিণাম ভাল হবে, আর তোমরাই হবে বিজয়ী। তোমার প্রতিপালক আল্লাহ কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর দ্বীন সমুচ্চ থাকবে। তুমি তোমার ত্রুটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তাকে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দ্বারা প্রকৃতপক্ষে তাঁর উম্মতকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। রাত্রির শেষাংশে, দিনের প্রথমভাগে এবং দিনের শেষাংশে বিশেষভাবে মহান আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা নিজেদের নিকট কোন দলীল না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, আল্লাহর কালামের কোন মর্যাদা দেয় না, তাদের অন্তরে আছে শুধু অহংকার, কিন্তু যে বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চ মর্যাদা তারা কামনা করে তা কখনো সফল হবার নয়। ওটা তারা কখনো লাভ করতে পারবে না। অতএব আল্লাহর শরণাপন্ন হও; আল্লাহ তো সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। এই আয়াত ইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা বলতো যে, দাজ্জাল তাদের মধ্য হতেই হবে, যে তার যামানায় যমীনের বাদশাহ হবে। তাই মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ ‘দাজ্জালের ফিত্না হতে তুমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” (হযরত কা'ব (রঃ) ও হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ আয়াতইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলা, দাজ্জালের বাদশাহী এবং তার ফিত্র থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনার হুকুম ইত্যাদি কথাগুলো লৌকিকতায় ভরপুর। এটা স্বীকার্য যে, তাফসীরে ইবনে হাতিমে এটা রয়েছে। কিন্তু এটা খুবই দুর্বল উক্তি। সঠিক কথা এটাই যে, এটা সাধারণ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ পাকই সবচেয়ে ভাল জানেন)
গাফির 40:52
৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে রাসূলদেরকে (আঃ) সাহায্য করার ওয়াদা রয়েছে। আমরা দেখি যে, কতক নবী (আঃ)-কে তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকেরা হত্যা করে দিয়েছে। যেমন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ) এবং হযরত শা’ইয়া (আঃ)। আর কোন কোন নবী (আঃ)-কে হিজরত করতে হয়েছে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)। আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আসমানে হিজরত করান। এখানে প্রশ্ন হতে পারে যে, দুনিয়ায় যে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীদেরকে সাহায্য করার ওয়াদা করেছেন তা পূর্ণ হলো কিরূপে? এর দু'টি উত্তর রয়েছে। একটি উত্তর এই যে, এখানে খবর আম বা সাধারণ হলেও এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কতক। আর অভিধানে এটা প্রায়ই দেখা যায়। আর দ্বিতীয় উত্তর এই যে, এখানে সাহায্য করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রতিশোধ গ্রহণ করা। দেখা যায় যে, এমন কোন নবী গত হননি যাঁকে কষ্টদাতাদের উপর চরমভাবে আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিশোধ গ্রহণ না করেছেন। যেমন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ) এবং হযরত শা’ইয়া (আঃ)-এর হন্তাদের উপর তাদের শত্রুদেরকে বিজয় দান করেছেন, যারা তাদেরকে হত্যা করে রক্তের স্রোত বহিয়ে দিয়েছে এবং তাদেরকে অত্যন্ত লাঞ্ছিত অবস্থায় মৃত্যুর ঘাটে নামিয়ে দিয়েছে। বিশ্বাসঘাতক নমরূদকে আল্লাহ্ তা'আলা কিভাবে পাকড়াও করেছিলেন এবং সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন তা সর্বজন বিদিত। হযরত ঈসা (আঃ)-কে যে ইয়াহুদীরা শূলবিদ্ধ করার চেষ্টা। করেছিল তাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলা রোমকদেরকে বিজয়ী করেছিলেন। তাদের হাতে ঐ ইয়াহূদীরা খুবই লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে যখন হযরত ঈসা (আঃ) দুনিয়ায় অবতরণ করবেন তখন তিনি দাজ্জালসহ ঐ ইয়াহুদীদেরকেও মেরে ফেলবেন যারা তার সেনাবাহিনীর লোক হবে। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে তশরীফ আনবেন। তিনি ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়াকে বাতিল করবেন এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কিছুই ককূল করবেন না। এটাই হলো আল্লাহর বিরাট সাহায্য। এটাই হলো আল্লাহর রীতি, যা পূর্ব হতেই আছে এবং এখনো চালু রয়েছে যে, তিনি স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে পার্থিব সাহায্যও করে থাকেন এবং তিনি স্বয়ং তাদের শত্রুদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা করে থাকেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমার বন্ধুদের সাথে শত্রুতা করে সে আমার সাথে যুদ্ধের জন্যে বের হয়ে থাকে। (সে যেন তার সাথে যুদ্ধের জন্য আল্লাহ তা'আলাকে তলব করে)।” অন্য হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি আমার বন্ধুদের পক্ষ হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি যেমন প্রতিশোধ গ্রহণ করে সিংহ।” এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম, আ’দ, সামূদ, আসহাবুর রাসস, হযরত লূত (আঃ)-এর কওম, আহলে মাদইয়ান এবং তাদের ন্যায় ঐ সমুদয় লোক হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন যারা রাসূলদেরকে (আঃ) অবিশ্বাস করেছিল এবং সত্যের বিরোধী হয়েছিল। এক এক করে বেছে বেছে তিনি তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আর তাদের মধ্যে যারা মুমিন ছিল তাদেরকে তিনি রক্ষা করেছেন। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যে কওমের মধ্যে আল্লাহর রাসূল এসেছেন অথবা মুমিন বান্দা তাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্যে দাঁড়িয়েছেন, অতঃপর ঐ কওম ঐ নবী বা মুমিনদের অসম্মান করেছে, তাদেরকে মারপিট করেছে বা হত্যা করেছে, তাদের উপর অবশ্যই ঐ যুগেই আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়েছে। নবীদের (আঃ) হন্তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা উঠে দাঁড়িয়েছে এবং পানির মত তাদের রক্ত দ্বারা তৃষ্ণার্ত ভূমিকে সিক্ত করেছে। সুতরাং এখানে যদিও নবীরা (আঃ) ও মুমিনরা নিহত হয়েছেন, কিন্তু তাদের রক্ত বৃথা যায়নি। তাদের শত্রুদেরকে তুষের ন্যায় উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এরূপ বিশিষ্ট বান্দাদের সাহায্য করা হবে না এটা অসম্ভব। তাদের শত্রুদের উপর পূর্ণমাত্রায় প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়েছে। নবীকূল শিরোমণি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর জীবনী দুনিয়াবাসীর সামনে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এবং তাঁর সহচরদেরকে বিজয় দান করেন, তাঁর কালেমা সুউচ্চ করেন এবং তাঁর শত্রুদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। তাঁর দ্বীন দুনিয়ার সমস্ত দ্বীনের উপর ছেয়ে যায়। যখন তাঁর কওম চরমভাবে তাঁর বিরোধিতা শুরু করে তখন মহান আল্লাহ তাঁকে মদীনায় পৌঁছিয়ে দেন এবং মদীনাবাসীকে তাঁর পরম ভক্ত বানিয়ে দেন। মদীনাবাসী তাঁর জন্যে জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত হয়ে যান। অতঃপর বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে যায়। তাদের বহু নেতৃস্থানীয় লোক এ যুদ্ধে নিহত হয় এবং অনেকে মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। এভাবে তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। পরম দয়ালু আল্লাহ তাদের উপর ইহসান করেন এবং তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ নিয়ে তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া হয়। এভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথে ফিরে আসার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এর পরেও যখন তারা অন্যায় হতে বিরত হলো না, বরং পূর্বের দুষ্কর্মকেই আঁকড়ে ধরে থাকলো তখন এমন এক সময় এসে গেল যে, যেখান হতে নবী (সঃ)-কে রাত্রির অন্ধকারে চুপে চুপে পদব্রজে হিজরত করতে হয়েছিল, সেখানে তিনি বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করলেন এবং অত্যন্ত অসহায় ও নিরুপায় অবস্থায় তার শত্রুদেরকে তাঁর সামনে হাযির করা হলো। হারাম শহরের ইযযত ও হুরমত মহান রাসূল (সঃ)-এর কারণে পূর্ণভাবে রক্ষিত হলো। সমস্ত শিরক ও কুফরী এবং সর্বপ্রকারের বে-আদবী হতে আল্লাহর ঘরকে পবিত্র করা হলো। অবশেষে ইয়ামনও বিজিত হলো এবং সারা আরব উপদ্বীপের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। অতঃপর জনগণ দলে দলে এসে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে শুরু করলো। পরিশেষে মহান রাব্বল আলামীন স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নিজের কাছে ডেকে নিলেন এবং তথায় তাঁকে স্বীয় সম্মানিত অতিথি হিসেবে গ্রহণ করলেন। তারপর তার সকর্মশীল সাহাবীদেরকে (সঃ) তার স্থলাভিষিক্ত করলেন, যারা মুহাম্মাদ (সঃ) ঝাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহর মাখলুককে তাঁর একত্ববাদের দিকে ডাকতে লাগলেন। তাঁরা পথের বাধাকে অতিক্রম করলেন এবং ইসলামরূপ বাগানের কাটাকে কেটে সাফ করলেন। এভাবে তারা গ্রামে গ্রামে এবং শহরে শহরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দিলেন। এ পথে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলো তাদেরকে তারা এর স্বাদ চাখিয়ে দিলেন। এরূপে প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করলো।সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) শুধু যমীনের উপর এবং যমীনবাসীর দেহের উপরই বিজয় লাভ করেননি, বরং তাদের অন্তরকেও জয় করে নেন। তারা তাদের অন্তরে ইসলামের চিত্র অংকিত করে দেন এবং সকলকে কালেমায়ে তাওহীদের পতাকা তলে একত্রিত করেন। দ্বীনে মুহাম্মাদ (সঃ) ভূ-পৃষ্ঠের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে যায় এবং এভাবে সব জায়গাই ওর দখলে এসে পড়ে। দাওয়াতে মুহাম্মাদ (সঃ) বধির কর্ণেও পৌঁছে যায়, সিরাতে মুহাম্মাদী (সঃ) তারাও দেখে নেয়।সমুদয় প্রশংসা মহান আল্লাহর প্রাপ্য যে, আজ পর্যন্ত আল্লাহর দ্বীন জয়যুক্তই হয়েছে। এখন পর্যন্ত মুসলমানদের হাতে হুকুমত ও শাসন ক্ষমতা বিদ্যমান রয়েছে। আজ পর্যন্ত তাদের হাতে আল্লাহর এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর কালাম মওজুদ আছে। এখনও তাদের মাথার উপর আল্লাহর হাত রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত এই দ্বীন জয়যুক্ত ও সাহায্য প্রাপ্তই থাকবে। যে এর মুকাবিলায় আসবে তার মুখে চুনকালি পড়বে এবং আর কখনো সে মুখ দেখাতে পারবে না। এই পবিত্র আয়াতের ভাবার্থ এটাই। কিয়ামতের দিনেও দ্বীনদারদের সাহায্য করা হবে এবং ঐ সাহায্য হবে খুব উচ্চ পর্যায়ের। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, সাক্ষী দ্বারা ফেরেশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে।আল্লাহ তাআলার (আরবী)-এই উক্তিটি তার (আরবী)-এ উক্তি হতে (আরবী) হয়েছে। অন্যেরা পড়েছেন (আরবী) তখন এটা যেন পূর্বের -এর তাফসীর। এখানে যালিমদের দ্বারা মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। কিয়ামতের দিন তাদের কোন ওযর-আপত্তি ও মুক্তিপণ গৃহীত হবে না। সেদিন তাদেরকে আল্লাহর রহমত হতে দূর করে দেয়া হবে। তাদের জন্যে হবে নিকৃষ্ট আবাস অর্থাৎ জাহান্নাম। তাদের পরিণাম হবে মন্দ।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি অবশ্যই মূসা (আঃ)-কে দান করেছিলাম পথ-নির্দেশ এবং বানী ইসরাঈলকে উত্তরাধিকারী করেছিলাম সেই কিতাবের।' অর্থাৎ তাদেরকে ফিরাউনের ধন-দৌলত ও ভূমির ওয়ারিশ বানিয়েছিলাম। কেননা তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (আঃ)-এর আনুগত্যে স্থির থেকে কষ্ট ও বিপদাপদ সহ্য করেছিল। যে কিতাবের তাদেরকে ওয়ারিশ করা হয়েছিল তা ছিল বোধশক্তি সম্পন্ন লোকদের জন্যে পথ-নির্দেশ ও উপদেশ স্বরূপ।মহান আল্লাহ বলেনঃ সুতরাং হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ধৈর্য ধারণ কর; আল্লাহর ওয়াদা সত্য। তোমারই পরিণাম ভাল হবে, আর তোমরাই হবে বিজয়ী। তোমার প্রতিপালক আল্লাহ কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর দ্বীন সমুচ্চ থাকবে। তুমি তোমার ত্রুটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তাকে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দ্বারা প্রকৃতপক্ষে তাঁর উম্মতকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। রাত্রির শেষাংশে, দিনের প্রথমভাগে এবং দিনের শেষাংশে বিশেষভাবে মহান আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা নিজেদের নিকট কোন দলীল না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, আল্লাহর কালামের কোন মর্যাদা দেয় না, তাদের অন্তরে আছে শুধু অহংকার, কিন্তু যে বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চ মর্যাদা তারা কামনা করে তা কখনো সফল হবার নয়। ওটা তারা কখনো লাভ করতে পারবে না। অতএব আল্লাহর শরণাপন্ন হও; আল্লাহ তো সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। এই আয়াত ইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা বলতো যে, দাজ্জাল তাদের মধ্য হতেই হবে, যে তার যামানায় যমীনের বাদশাহ হবে। তাই মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ ‘দাজ্জালের ফিত্না হতে তুমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” (হযরত কা'ব (রঃ) ও হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ আয়াতইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলা, দাজ্জালের বাদশাহী এবং তার ফিত্র থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনার হুকুম ইত্যাদি কথাগুলো লৌকিকতায় ভরপুর। এটা স্বীকার্য যে, তাফসীরে ইবনে হাতিমে এটা রয়েছে। কিন্তু এটা খুবই দুর্বল উক্তি। সঠিক কথা এটাই যে, এটা সাধারণ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ পাকই সবচেয়ে ভাল জানেন)
গাফির 40:53
৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে রাসূলদেরকে (আঃ) সাহায্য করার ওয়াদা রয়েছে। আমরা দেখি যে, কতক নবী (আঃ)-কে তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকেরা হত্যা করে দিয়েছে। যেমন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ) এবং হযরত শা’ইয়া (আঃ)। আর কোন কোন নবী (আঃ)-কে হিজরত করতে হয়েছে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)। আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আসমানে হিজরত করান। এখানে প্রশ্ন হতে পারে যে, দুনিয়ায় যে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীদেরকে সাহায্য করার ওয়াদা করেছেন তা পূর্ণ হলো কিরূপে? এর দু'টি উত্তর রয়েছে। একটি উত্তর এই যে, এখানে খবর আম বা সাধারণ হলেও এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কতক। আর অভিধানে এটা প্রায়ই দেখা যায়। আর দ্বিতীয় উত্তর এই যে, এখানে সাহায্য করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রতিশোধ গ্রহণ করা। দেখা যায় যে, এমন কোন নবী গত হননি যাঁকে কষ্টদাতাদের উপর চরমভাবে আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিশোধ গ্রহণ না করেছেন। যেমন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ) এবং হযরত শা’ইয়া (আঃ)-এর হন্তাদের উপর তাদের শত্রুদেরকে বিজয় দান করেছেন, যারা তাদেরকে হত্যা করে রক্তের স্রোত বহিয়ে দিয়েছে এবং তাদেরকে অত্যন্ত লাঞ্ছিত অবস্থায় মৃত্যুর ঘাটে নামিয়ে দিয়েছে। বিশ্বাসঘাতক নমরূদকে আল্লাহ্ তা'আলা কিভাবে পাকড়াও করেছিলেন এবং সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন তা সর্বজন বিদিত। হযরত ঈসা (আঃ)-কে যে ইয়াহুদীরা শূলবিদ্ধ করার চেষ্টা। করেছিল তাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলা রোমকদেরকে বিজয়ী করেছিলেন। তাদের হাতে ঐ ইয়াহূদীরা খুবই লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে যখন হযরত ঈসা (আঃ) দুনিয়ায় অবতরণ করবেন তখন তিনি দাজ্জালসহ ঐ ইয়াহুদীদেরকেও মেরে ফেলবেন যারা তার সেনাবাহিনীর লোক হবে। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে তশরীফ আনবেন। তিনি ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়াকে বাতিল করবেন এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কিছুই ককূল করবেন না। এটাই হলো আল্লাহর বিরাট সাহায্য। এটাই হলো আল্লাহর রীতি, যা পূর্ব হতেই আছে এবং এখনো চালু রয়েছে যে, তিনি স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে পার্থিব সাহায্যও করে থাকেন এবং তিনি স্বয়ং তাদের শত্রুদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা করে থাকেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমার বন্ধুদের সাথে শত্রুতা করে সে আমার সাথে যুদ্ধের জন্যে বের হয়ে থাকে। (সে যেন তার সাথে যুদ্ধের জন্য আল্লাহ তা'আলাকে তলব করে)।” অন্য হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি আমার বন্ধুদের পক্ষ হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি যেমন প্রতিশোধ গ্রহণ করে সিংহ।” এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম, আ’দ, সামূদ, আসহাবুর রাসস, হযরত লূত (আঃ)-এর কওম, আহলে মাদইয়ান এবং তাদের ন্যায় ঐ সমুদয় লোক হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন যারা রাসূলদেরকে (আঃ) অবিশ্বাস করেছিল এবং সত্যের বিরোধী হয়েছিল। এক এক করে বেছে বেছে তিনি তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আর তাদের মধ্যে যারা মুমিন ছিল তাদেরকে তিনি রক্ষা করেছেন। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যে কওমের মধ্যে আল্লাহর রাসূল এসেছেন অথবা মুমিন বান্দা তাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্যে দাঁড়িয়েছেন, অতঃপর ঐ কওম ঐ নবী বা মুমিনদের অসম্মান করেছে, তাদেরকে মারপিট করেছে বা হত্যা করেছে, তাদের উপর অবশ্যই ঐ যুগেই আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়েছে। নবীদের (আঃ) হন্তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা উঠে দাঁড়িয়েছে এবং পানির মত তাদের রক্ত দ্বারা তৃষ্ণার্ত ভূমিকে সিক্ত করেছে। সুতরাং এখানে যদিও নবীরা (আঃ) ও মুমিনরা নিহত হয়েছেন, কিন্তু তাদের রক্ত বৃথা যায়নি। তাদের শত্রুদেরকে তুষের ন্যায় উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এরূপ বিশিষ্ট বান্দাদের সাহায্য করা হবে না এটা অসম্ভব। তাদের শত্রুদের উপর পূর্ণমাত্রায় প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়েছে। নবীকূল শিরোমণি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর জীবনী দুনিয়াবাসীর সামনে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এবং তাঁর সহচরদেরকে বিজয় দান করেন, তাঁর কালেমা সুউচ্চ করেন এবং তাঁর শত্রুদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। তাঁর দ্বীন দুনিয়ার সমস্ত দ্বীনের উপর ছেয়ে যায়। যখন তাঁর কওম চরমভাবে তাঁর বিরোধিতা শুরু করে তখন মহান আল্লাহ তাঁকে মদীনায় পৌঁছিয়ে দেন এবং মদীনাবাসীকে তাঁর পরম ভক্ত বানিয়ে দেন। মদীনাবাসী তাঁর জন্যে জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত হয়ে যান। অতঃপর বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে যায়। তাদের বহু নেতৃস্থানীয় লোক এ যুদ্ধে নিহত হয় এবং অনেকে মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। এভাবে তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। পরম দয়ালু আল্লাহ তাদের উপর ইহসান করেন এবং তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ নিয়ে তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া হয়। এভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথে ফিরে আসার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এর পরেও যখন তারা অন্যায় হতে বিরত হলো না, বরং পূর্বের দুষ্কর্মকেই আঁকড়ে ধরে থাকলো তখন এমন এক সময় এসে গেল যে, যেখান হতে নবী (সঃ)-কে রাত্রির অন্ধকারে চুপে চুপে পদব্রজে হিজরত করতে হয়েছিল, সেখানে তিনি বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করলেন এবং অত্যন্ত অসহায় ও নিরুপায় অবস্থায় তার শত্রুদেরকে তাঁর সামনে হাযির করা হলো। হারাম শহরের ইযযত ও হুরমত মহান রাসূল (সঃ)-এর কারণে পূর্ণভাবে রক্ষিত হলো। সমস্ত শিরক ও কুফরী এবং সর্বপ্রকারের বে-আদবী হতে আল্লাহর ঘরকে পবিত্র করা হলো। অবশেষে ইয়ামনও বিজিত হলো এবং সারা আরব উপদ্বীপের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। অতঃপর জনগণ দলে দলে এসে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে শুরু করলো। পরিশেষে মহান রাব্বল আলামীন স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নিজের কাছে ডেকে নিলেন এবং তথায় তাঁকে স্বীয় সম্মানিত অতিথি হিসেবে গ্রহণ করলেন। তারপর তার সকর্মশীল সাহাবীদেরকে (সঃ) তার স্থলাভিষিক্ত করলেন, যারা মুহাম্মাদ (সঃ) ঝাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহর মাখলুককে তাঁর একত্ববাদের দিকে ডাকতে লাগলেন। তাঁরা পথের বাধাকে অতিক্রম করলেন এবং ইসলামরূপ বাগানের কাটাকে কেটে সাফ করলেন। এভাবে তারা গ্রামে গ্রামে এবং শহরে শহরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দিলেন। এ পথে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলো তাদেরকে তারা এর স্বাদ চাখিয়ে দিলেন। এরূপে প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করলো।সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) শুধু যমীনের উপর এবং যমীনবাসীর দেহের উপরই বিজয় লাভ করেননি, বরং তাদের অন্তরকেও জয় করে নেন। তারা তাদের অন্তরে ইসলামের চিত্র অংকিত করে দেন এবং সকলকে কালেমায়ে তাওহীদের পতাকা তলে একত্রিত করেন। দ্বীনে মুহাম্মাদ (সঃ) ভূ-পৃষ্ঠের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে যায় এবং এভাবে সব জায়গাই ওর দখলে এসে পড়ে। দাওয়াতে মুহাম্মাদ (সঃ) বধির কর্ণেও পৌঁছে যায়, সিরাতে মুহাম্মাদী (সঃ) তারাও দেখে নেয়।সমুদয় প্রশংসা মহান আল্লাহর প্রাপ্য যে, আজ পর্যন্ত আল্লাহর দ্বীন জয়যুক্তই হয়েছে। এখন পর্যন্ত মুসলমানদের হাতে হুকুমত ও শাসন ক্ষমতা বিদ্যমান রয়েছে। আজ পর্যন্ত তাদের হাতে আল্লাহর এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর কালাম মওজুদ আছে। এখনও তাদের মাথার উপর আল্লাহর হাত রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত এই দ্বীন জয়যুক্ত ও সাহায্য প্রাপ্তই থাকবে। যে এর মুকাবিলায় আসবে তার মুখে চুনকালি পড়বে এবং আর কখনো সে মুখ দেখাতে পারবে না। এই পবিত্র আয়াতের ভাবার্থ এটাই। কিয়ামতের দিনেও দ্বীনদারদের সাহায্য করা হবে এবং ঐ সাহায্য হবে খুব উচ্চ পর্যায়ের। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, সাক্ষী দ্বারা ফেরেশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে।আল্লাহ তাআলার (আরবী)-এই উক্তিটি তার (আরবী)-এ উক্তি হতে (আরবী) হয়েছে। অন্যেরা পড়েছেন (আরবী) তখন এটা যেন পূর্বের -এর তাফসীর। এখানে যালিমদের দ্বারা মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। কিয়ামতের দিন তাদের কোন ওযর-আপত্তি ও মুক্তিপণ গৃহীত হবে না। সেদিন তাদেরকে আল্লাহর রহমত হতে দূর করে দেয়া হবে। তাদের জন্যে হবে নিকৃষ্ট আবাস অর্থাৎ জাহান্নাম। তাদের পরিণাম হবে মন্দ।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি অবশ্যই মূসা (আঃ)-কে দান করেছিলাম পথ-নির্দেশ এবং বানী ইসরাঈলকে উত্তরাধিকারী করেছিলাম সেই কিতাবের।' অর্থাৎ তাদেরকে ফিরাউনের ধন-দৌলত ও ভূমির ওয়ারিশ বানিয়েছিলাম। কেননা তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (আঃ)-এর আনুগত্যে স্থির থেকে কষ্ট ও বিপদাপদ সহ্য করেছিল। যে কিতাবের তাদেরকে ওয়ারিশ করা হয়েছিল তা ছিল বোধশক্তি সম্পন্ন লোকদের জন্যে পথ-নির্দেশ ও উপদেশ স্বরূপ।মহান আল্লাহ বলেনঃ সুতরাং হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ধৈর্য ধারণ কর; আল্লাহর ওয়াদা সত্য। তোমারই পরিণাম ভাল হবে, আর তোমরাই হবে বিজয়ী। তোমার প্রতিপালক আল্লাহ কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর দ্বীন সমুচ্চ থাকবে। তুমি তোমার ত্রুটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তাকে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দ্বারা প্রকৃতপক্ষে তাঁর উম্মতকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। রাত্রির শেষাংশে, দিনের প্রথমভাগে এবং দিনের শেষাংশে বিশেষভাবে মহান আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা নিজেদের নিকট কোন দলীল না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, আল্লাহর কালামের কোন মর্যাদা দেয় না, তাদের অন্তরে আছে শুধু অহংকার, কিন্তু যে বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চ মর্যাদা তারা কামনা করে তা কখনো সফল হবার নয়। ওটা তারা কখনো লাভ করতে পারবে না। অতএব আল্লাহর শরণাপন্ন হও; আল্লাহ তো সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। এই আয়াত ইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা বলতো যে, দাজ্জাল তাদের মধ্য হতেই হবে, যে তার যামানায় যমীনের বাদশাহ হবে। তাই মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ ‘দাজ্জালের ফিত্না হতে তুমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” (হযরত কা'ব (রঃ) ও হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ আয়াতইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলা, দাজ্জালের বাদশাহী এবং তার ফিত্র থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনার হুকুম ইত্যাদি কথাগুলো লৌকিকতায় ভরপুর। এটা স্বীকার্য যে, তাফসীরে ইবনে হাতিমে এটা রয়েছে। কিন্তু এটা খুবই দুর্বল উক্তি। সঠিক কথা এটাই যে, এটা সাধারণ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ পাকই সবচেয়ে ভাল জানেন)
গাফির 40:54
৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে রাসূলদেরকে (আঃ) সাহায্য করার ওয়াদা রয়েছে। আমরা দেখি যে, কতক নবী (আঃ)-কে তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকেরা হত্যা করে দিয়েছে। যেমন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ) এবং হযরত শা’ইয়া (আঃ)। আর কোন কোন নবী (আঃ)-কে হিজরত করতে হয়েছে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)। আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আসমানে হিজরত করান। এখানে প্রশ্ন হতে পারে যে, দুনিয়ায় যে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীদেরকে সাহায্য করার ওয়াদা করেছেন তা পূর্ণ হলো কিরূপে? এর দু'টি উত্তর রয়েছে। একটি উত্তর এই যে, এখানে খবর আম বা সাধারণ হলেও এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কতক। আর অভিধানে এটা প্রায়ই দেখা যায়। আর দ্বিতীয় উত্তর এই যে, এখানে সাহায্য করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রতিশোধ গ্রহণ করা। দেখা যায় যে, এমন কোন নবী গত হননি যাঁকে কষ্টদাতাদের উপর চরমভাবে আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিশোধ গ্রহণ না করেছেন। যেমন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ) এবং হযরত শা’ইয়া (আঃ)-এর হন্তাদের উপর তাদের শত্রুদেরকে বিজয় দান করেছেন, যারা তাদেরকে হত্যা করে রক্তের স্রোত বহিয়ে দিয়েছে এবং তাদেরকে অত্যন্ত লাঞ্ছিত অবস্থায় মৃত্যুর ঘাটে নামিয়ে দিয়েছে। বিশ্বাসঘাতক নমরূদকে আল্লাহ্ তা'আলা কিভাবে পাকড়াও করেছিলেন এবং সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন তা সর্বজন বিদিত। হযরত ঈসা (আঃ)-কে যে ইয়াহুদীরা শূলবিদ্ধ করার চেষ্টা। করেছিল তাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলা রোমকদেরকে বিজয়ী করেছিলেন। তাদের হাতে ঐ ইয়াহূদীরা খুবই লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে যখন হযরত ঈসা (আঃ) দুনিয়ায় অবতরণ করবেন তখন তিনি দাজ্জালসহ ঐ ইয়াহুদীদেরকেও মেরে ফেলবেন যারা তার সেনাবাহিনীর লোক হবে। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে তশরীফ আনবেন। তিনি ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়াকে বাতিল করবেন এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কিছুই ককূল করবেন না। এটাই হলো আল্লাহর বিরাট সাহায্য। এটাই হলো আল্লাহর রীতি, যা পূর্ব হতেই আছে এবং এখনো চালু রয়েছে যে, তিনি স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে পার্থিব সাহায্যও করে থাকেন এবং তিনি স্বয়ং তাদের শত্রুদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা করে থাকেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমার বন্ধুদের সাথে শত্রুতা করে সে আমার সাথে যুদ্ধের জন্যে বের হয়ে থাকে। (সে যেন তার সাথে যুদ্ধের জন্য আল্লাহ তা'আলাকে তলব করে)।” অন্য হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি আমার বন্ধুদের পক্ষ হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি যেমন প্রতিশোধ গ্রহণ করে সিংহ।” এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম, আ’দ, সামূদ, আসহাবুর রাসস, হযরত লূত (আঃ)-এর কওম, আহলে মাদইয়ান এবং তাদের ন্যায় ঐ সমুদয় লোক হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন যারা রাসূলদেরকে (আঃ) অবিশ্বাস করেছিল এবং সত্যের বিরোধী হয়েছিল। এক এক করে বেছে বেছে তিনি তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আর তাদের মধ্যে যারা মুমিন ছিল তাদেরকে তিনি রক্ষা করেছেন। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যে কওমের মধ্যে আল্লাহর রাসূল এসেছেন অথবা মুমিন বান্দা তাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্যে দাঁড়িয়েছেন, অতঃপর ঐ কওম ঐ নবী বা মুমিনদের অসম্মান করেছে, তাদেরকে মারপিট করেছে বা হত্যা করেছে, তাদের উপর অবশ্যই ঐ যুগেই আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়েছে। নবীদের (আঃ) হন্তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা উঠে দাঁড়িয়েছে এবং পানির মত তাদের রক্ত দ্বারা তৃষ্ণার্ত ভূমিকে সিক্ত করেছে। সুতরাং এখানে যদিও নবীরা (আঃ) ও মুমিনরা নিহত হয়েছেন, কিন্তু তাদের রক্ত বৃথা যায়নি। তাদের শত্রুদেরকে তুষের ন্যায় উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এরূপ বিশিষ্ট বান্দাদের সাহায্য করা হবে না এটা অসম্ভব। তাদের শত্রুদের উপর পূর্ণমাত্রায় প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়েছে। নবীকূল শিরোমণি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর জীবনী দুনিয়াবাসীর সামনে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এবং তাঁর সহচরদেরকে বিজয় দান করেন, তাঁর কালেমা সুউচ্চ করেন এবং তাঁর শত্রুদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। তাঁর দ্বীন দুনিয়ার সমস্ত দ্বীনের উপর ছেয়ে যায়। যখন তাঁর কওম চরমভাবে তাঁর বিরোধিতা শুরু করে তখন মহান আল্লাহ তাঁকে মদীনায় পৌঁছিয়ে দেন এবং মদীনাবাসীকে তাঁর পরম ভক্ত বানিয়ে দেন। মদীনাবাসী তাঁর জন্যে জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত হয়ে যান। অতঃপর বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে যায়। তাদের বহু নেতৃস্থানীয় লোক এ যুদ্ধে নিহত হয় এবং অনেকে মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। এভাবে তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। পরম দয়ালু আল্লাহ তাদের উপর ইহসান করেন এবং তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ নিয়ে তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া হয়। এভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথে ফিরে আসার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এর পরেও যখন তারা অন্যায় হতে বিরত হলো না, বরং পূর্বের দুষ্কর্মকেই আঁকড়ে ধরে থাকলো তখন এমন এক সময় এসে গেল যে, যেখান হতে নবী (সঃ)-কে রাত্রির অন্ধকারে চুপে চুপে পদব্রজে হিজরত করতে হয়েছিল, সেখানে তিনি বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করলেন এবং অত্যন্ত অসহায় ও নিরুপায় অবস্থায় তার শত্রুদেরকে তাঁর সামনে হাযির করা হলো। হারাম শহরের ইযযত ও হুরমত মহান রাসূল (সঃ)-এর কারণে পূর্ণভাবে রক্ষিত হলো। সমস্ত শিরক ও কুফরী এবং সর্বপ্রকারের বে-আদবী হতে আল্লাহর ঘরকে পবিত্র করা হলো। অবশেষে ইয়ামনও বিজিত হলো এবং সারা আরব উপদ্বীপের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। অতঃপর জনগণ দলে দলে এসে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে শুরু করলো। পরিশেষে মহান রাব্বল আলামীন স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নিজের কাছে ডেকে নিলেন এবং তথায় তাঁকে স্বীয় সম্মানিত অতিথি হিসেবে গ্রহণ করলেন। তারপর তার সকর্মশীল সাহাবীদেরকে (সঃ) তার স্থলাভিষিক্ত করলেন, যারা মুহাম্মাদ (সঃ) ঝাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহর মাখলুককে তাঁর একত্ববাদের দিকে ডাকতে লাগলেন। তাঁরা পথের বাধাকে অতিক্রম করলেন এবং ইসলামরূপ বাগানের কাটাকে কেটে সাফ করলেন। এভাবে তারা গ্রামে গ্রামে এবং শহরে শহরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দিলেন। এ পথে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলো তাদেরকে তারা এর স্বাদ চাখিয়ে দিলেন। এরূপে প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করলো।সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) শুধু যমীনের উপর এবং যমীনবাসীর দেহের উপরই বিজয় লাভ করেননি, বরং তাদের অন্তরকেও জয় করে নেন। তারা তাদের অন্তরে ইসলামের চিত্র অংকিত করে দেন এবং সকলকে কালেমায়ে তাওহীদের পতাকা তলে একত্রিত করেন। দ্বীনে মুহাম্মাদ (সঃ) ভূ-পৃষ্ঠের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে যায় এবং এভাবে সব জায়গাই ওর দখলে এসে পড়ে। দাওয়াতে মুহাম্মাদ (সঃ) বধির কর্ণেও পৌঁছে যায়, সিরাতে মুহাম্মাদী (সঃ) তারাও দেখে নেয়।সমুদয় প্রশংসা মহান আল্লাহর প্রাপ্য যে, আজ পর্যন্ত আল্লাহর দ্বীন জয়যুক্তই হয়েছে। এখন পর্যন্ত মুসলমানদের হাতে হুকুমত ও শাসন ক্ষমতা বিদ্যমান রয়েছে। আজ পর্যন্ত তাদের হাতে আল্লাহর এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর কালাম মওজুদ আছে। এখনও তাদের মাথার উপর আল্লাহর হাত রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত এই দ্বীন জয়যুক্ত ও সাহায্য প্রাপ্তই থাকবে। যে এর মুকাবিলায় আসবে তার মুখে চুনকালি পড়বে এবং আর কখনো সে মুখ দেখাতে পারবে না। এই পবিত্র আয়াতের ভাবার্থ এটাই। কিয়ামতের দিনেও দ্বীনদারদের সাহায্য করা হবে এবং ঐ সাহায্য হবে খুব উচ্চ পর্যায়ের। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, সাক্ষী দ্বারা ফেরেশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে।আল্লাহ তাআলার (আরবী)-এই উক্তিটি তার (আরবী)-এ উক্তি হতে (আরবী) হয়েছে। অন্যেরা পড়েছেন (আরবী) তখন এটা যেন পূর্বের -এর তাফসীর। এখানে যালিমদের দ্বারা মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। কিয়ামতের দিন তাদের কোন ওযর-আপত্তি ও মুক্তিপণ গৃহীত হবে না। সেদিন তাদেরকে আল্লাহর রহমত হতে দূর করে দেয়া হবে। তাদের জন্যে হবে নিকৃষ্ট আবাস অর্থাৎ জাহান্নাম। তাদের পরিণাম হবে মন্দ।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি অবশ্যই মূসা (আঃ)-কে দান করেছিলাম পথ-নির্দেশ এবং বানী ইসরাঈলকে উত্তরাধিকারী করেছিলাম সেই কিতাবের।' অর্থাৎ তাদেরকে ফিরাউনের ধন-দৌলত ও ভূমির ওয়ারিশ বানিয়েছিলাম। কেননা তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (আঃ)-এর আনুগত্যে স্থির থেকে কষ্ট ও বিপদাপদ সহ্য করেছিল। যে কিতাবের তাদেরকে ওয়ারিশ করা হয়েছিল তা ছিল বোধশক্তি সম্পন্ন লোকদের জন্যে পথ-নির্দেশ ও উপদেশ স্বরূপ।মহান আল্লাহ বলেনঃ সুতরাং হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ধৈর্য ধারণ কর; আল্লাহর ওয়াদা সত্য। তোমারই পরিণাম ভাল হবে, আর তোমরাই হবে বিজয়ী। তোমার প্রতিপালক আল্লাহ কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর দ্বীন সমুচ্চ থাকবে। তুমি তোমার ত্রুটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তাকে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দ্বারা প্রকৃতপক্ষে তাঁর উম্মতকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। রাত্রির শেষাংশে, দিনের প্রথমভাগে এবং দিনের শেষাংশে বিশেষভাবে মহান আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা নিজেদের নিকট কোন দলীল না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, আল্লাহর কালামের কোন মর্যাদা দেয় না, তাদের অন্তরে আছে শুধু অহংকার, কিন্তু যে বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চ মর্যাদা তারা কামনা করে তা কখনো সফল হবার নয়। ওটা তারা কখনো লাভ করতে পারবে না। অতএব আল্লাহর শরণাপন্ন হও; আল্লাহ তো সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। এই আয়াত ইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা বলতো যে, দাজ্জাল তাদের মধ্য হতেই হবে, যে তার যামানায় যমীনের বাদশাহ হবে। তাই মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ ‘দাজ্জালের ফিত্না হতে তুমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” (হযরত কা'ব (রঃ) ও হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ আয়াতইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলা, দাজ্জালের বাদশাহী এবং তার ফিত্র থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনার হুকুম ইত্যাদি কথাগুলো লৌকিকতায় ভরপুর। এটা স্বীকার্য যে, তাফসীরে ইবনে হাতিমে এটা রয়েছে। কিন্তু এটা খুবই দুর্বল উক্তি। সঠিক কথা এটাই যে, এটা সাধারণ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ পাকই সবচেয়ে ভাল জানেন)
গাফির 40:55
৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে রাসূলদেরকে (আঃ) সাহায্য করার ওয়াদা রয়েছে। আমরা দেখি যে, কতক নবী (আঃ)-কে তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকেরা হত্যা করে দিয়েছে। যেমন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ) এবং হযরত শা’ইয়া (আঃ)। আর কোন কোন নবী (আঃ)-কে হিজরত করতে হয়েছে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)। আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আসমানে হিজরত করান। এখানে প্রশ্ন হতে পারে যে, দুনিয়ায় যে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীদেরকে সাহায্য করার ওয়াদা করেছেন তা পূর্ণ হলো কিরূপে? এর দু'টি উত্তর রয়েছে। একটি উত্তর এই যে, এখানে খবর আম বা সাধারণ হলেও এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কতক। আর অভিধানে এটা প্রায়ই দেখা যায়। আর দ্বিতীয় উত্তর এই যে, এখানে সাহায্য করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রতিশোধ গ্রহণ করা। দেখা যায় যে, এমন কোন নবী গত হননি যাঁকে কষ্টদাতাদের উপর চরমভাবে আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিশোধ গ্রহণ না করেছেন। যেমন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ) এবং হযরত শা’ইয়া (আঃ)-এর হন্তাদের উপর তাদের শত্রুদেরকে বিজয় দান করেছেন, যারা তাদেরকে হত্যা করে রক্তের স্রোত বহিয়ে দিয়েছে এবং তাদেরকে অত্যন্ত লাঞ্ছিত অবস্থায় মৃত্যুর ঘাটে নামিয়ে দিয়েছে। বিশ্বাসঘাতক নমরূদকে আল্লাহ্ তা'আলা কিভাবে পাকড়াও করেছিলেন এবং সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন তা সর্বজন বিদিত। হযরত ঈসা (আঃ)-কে যে ইয়াহুদীরা শূলবিদ্ধ করার চেষ্টা। করেছিল তাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলা রোমকদেরকে বিজয়ী করেছিলেন। তাদের হাতে ঐ ইয়াহূদীরা খুবই লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে যখন হযরত ঈসা (আঃ) দুনিয়ায় অবতরণ করবেন তখন তিনি দাজ্জালসহ ঐ ইয়াহুদীদেরকেও মেরে ফেলবেন যারা তার সেনাবাহিনীর লোক হবে। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে তশরীফ আনবেন। তিনি ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়াকে বাতিল করবেন এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কিছুই ককূল করবেন না। এটাই হলো আল্লাহর বিরাট সাহায্য। এটাই হলো আল্লাহর রীতি, যা পূর্ব হতেই আছে এবং এখনো চালু রয়েছে যে, তিনি স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে পার্থিব সাহায্যও করে থাকেন এবং তিনি স্বয়ং তাদের শত্রুদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা করে থাকেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমার বন্ধুদের সাথে শত্রুতা করে সে আমার সাথে যুদ্ধের জন্যে বের হয়ে থাকে। (সে যেন তার সাথে যুদ্ধের জন্য আল্লাহ তা'আলাকে তলব করে)।” অন্য হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি আমার বন্ধুদের পক্ষ হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি যেমন প্রতিশোধ গ্রহণ করে সিংহ।” এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম, আ’দ, সামূদ, আসহাবুর রাসস, হযরত লূত (আঃ)-এর কওম, আহলে মাদইয়ান এবং তাদের ন্যায় ঐ সমুদয় লোক হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন যারা রাসূলদেরকে (আঃ) অবিশ্বাস করেছিল এবং সত্যের বিরোধী হয়েছিল। এক এক করে বেছে বেছে তিনি তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আর তাদের মধ্যে যারা মুমিন ছিল তাদেরকে তিনি রক্ষা করেছেন। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যে কওমের মধ্যে আল্লাহর রাসূল এসেছেন অথবা মুমিন বান্দা তাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্যে দাঁড়িয়েছেন, অতঃপর ঐ কওম ঐ নবী বা মুমিনদের অসম্মান করেছে, তাদেরকে মারপিট করেছে বা হত্যা করেছে, তাদের উপর অবশ্যই ঐ যুগেই আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়েছে। নবীদের (আঃ) হন্তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা উঠে দাঁড়িয়েছে এবং পানির মত তাদের রক্ত দ্বারা তৃষ্ণার্ত ভূমিকে সিক্ত করেছে। সুতরাং এখানে যদিও নবীরা (আঃ) ও মুমিনরা নিহত হয়েছেন, কিন্তু তাদের রক্ত বৃথা যায়নি। তাদের শত্রুদেরকে তুষের ন্যায় উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এরূপ বিশিষ্ট বান্দাদের সাহায্য করা হবে না এটা অসম্ভব। তাদের শত্রুদের উপর পূর্ণমাত্রায় প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়েছে। নবীকূল শিরোমণি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর জীবনী দুনিয়াবাসীর সামনে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এবং তাঁর সহচরদেরকে বিজয় দান করেন, তাঁর কালেমা সুউচ্চ করেন এবং তাঁর শত্রুদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। তাঁর দ্বীন দুনিয়ার সমস্ত দ্বীনের উপর ছেয়ে যায়। যখন তাঁর কওম চরমভাবে তাঁর বিরোধিতা শুরু করে তখন মহান আল্লাহ তাঁকে মদীনায় পৌঁছিয়ে দেন এবং মদীনাবাসীকে তাঁর পরম ভক্ত বানিয়ে দেন। মদীনাবাসী তাঁর জন্যে জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত হয়ে যান। অতঃপর বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে যায়। তাদের বহু নেতৃস্থানীয় লোক এ যুদ্ধে নিহত হয় এবং অনেকে মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। এভাবে তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। পরম দয়ালু আল্লাহ তাদের উপর ইহসান করেন এবং তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ নিয়ে তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া হয়। এভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথে ফিরে আসার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এর পরেও যখন তারা অন্যায় হতে বিরত হলো না, বরং পূর্বের দুষ্কর্মকেই আঁকড়ে ধরে থাকলো তখন এমন এক সময় এসে গেল যে, যেখান হতে নবী (সঃ)-কে রাত্রির অন্ধকারে চুপে চুপে পদব্রজে হিজরত করতে হয়েছিল, সেখানে তিনি বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করলেন এবং অত্যন্ত অসহায় ও নিরুপায় অবস্থায় তার শত্রুদেরকে তাঁর সামনে হাযির করা হলো। হারাম শহরের ইযযত ও হুরমত মহান রাসূল (সঃ)-এর কারণে পূর্ণভাবে রক্ষিত হলো। সমস্ত শিরক ও কুফরী এবং সর্বপ্রকারের বে-আদবী হতে আল্লাহর ঘরকে পবিত্র করা হলো। অবশেষে ইয়ামনও বিজিত হলো এবং সারা আরব উপদ্বীপের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। অতঃপর জনগণ দলে দলে এসে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে শুরু করলো। পরিশেষে মহান রাব্বল আলামীন স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নিজের কাছে ডেকে নিলেন এবং তথায় তাঁকে স্বীয় সম্মানিত অতিথি হিসেবে গ্রহণ করলেন। তারপর তার সকর্মশীল সাহাবীদেরকে (সঃ) তার স্থলাভিষিক্ত করলেন, যারা মুহাম্মাদ (সঃ) ঝাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহর মাখলুককে তাঁর একত্ববাদের দিকে ডাকতে লাগলেন। তাঁরা পথের বাধাকে অতিক্রম করলেন এবং ইসলামরূপ বাগানের কাটাকে কেটে সাফ করলেন। এভাবে তারা গ্রামে গ্রামে এবং শহরে শহরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দিলেন। এ পথে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলো তাদেরকে তারা এর স্বাদ চাখিয়ে দিলেন। এরূপে প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করলো।সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) শুধু যমীনের উপর এবং যমীনবাসীর দেহের উপরই বিজয় লাভ করেননি, বরং তাদের অন্তরকেও জয় করে নেন। তারা তাদের অন্তরে ইসলামের চিত্র অংকিত করে দেন এবং সকলকে কালেমায়ে তাওহীদের পতাকা তলে একত্রিত করেন। দ্বীনে মুহাম্মাদ (সঃ) ভূ-পৃষ্ঠের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে যায় এবং এভাবে সব জায়গাই ওর দখলে এসে পড়ে। দাওয়াতে মুহাম্মাদ (সঃ) বধির কর্ণেও পৌঁছে যায়, সিরাতে মুহাম্মাদী (সঃ) তারাও দেখে নেয়।সমুদয় প্রশংসা মহান আল্লাহর প্রাপ্য যে, আজ পর্যন্ত আল্লাহর দ্বীন জয়যুক্তই হয়েছে। এখন পর্যন্ত মুসলমানদের হাতে হুকুমত ও শাসন ক্ষমতা বিদ্যমান রয়েছে। আজ পর্যন্ত তাদের হাতে আল্লাহর এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর কালাম মওজুদ আছে। এখনও তাদের মাথার উপর আল্লাহর হাত রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত এই দ্বীন জয়যুক্ত ও সাহায্য প্রাপ্তই থাকবে। যে এর মুকাবিলায় আসবে তার মুখে চুনকালি পড়বে এবং আর কখনো সে মুখ দেখাতে পারবে না। এই পবিত্র আয়াতের ভাবার্থ এটাই। কিয়ামতের দিনেও দ্বীনদারদের সাহায্য করা হবে এবং ঐ সাহায্য হবে খুব উচ্চ পর্যায়ের। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, সাক্ষী দ্বারা ফেরেশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে।আল্লাহ তাআলার (আরবী)-এই উক্তিটি তার (আরবী)-এ উক্তি হতে (আরবী) হয়েছে। অন্যেরা পড়েছেন (আরবী) তখন এটা যেন পূর্বের -এর তাফসীর। এখানে যালিমদের দ্বারা মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। কিয়ামতের দিন তাদের কোন ওযর-আপত্তি ও মুক্তিপণ গৃহীত হবে না। সেদিন তাদেরকে আল্লাহর রহমত হতে দূর করে দেয়া হবে। তাদের জন্যে হবে নিকৃষ্ট আবাস অর্থাৎ জাহান্নাম। তাদের পরিণাম হবে মন্দ।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি অবশ্যই মূসা (আঃ)-কে দান করেছিলাম পথ-নির্দেশ এবং বানী ইসরাঈলকে উত্তরাধিকারী করেছিলাম সেই কিতাবের।' অর্থাৎ তাদেরকে ফিরাউনের ধন-দৌলত ও ভূমির ওয়ারিশ বানিয়েছিলাম। কেননা তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (আঃ)-এর আনুগত্যে স্থির থেকে কষ্ট ও বিপদাপদ সহ্য করেছিল। যে কিতাবের তাদেরকে ওয়ারিশ করা হয়েছিল তা ছিল বোধশক্তি সম্পন্ন লোকদের জন্যে পথ-নির্দেশ ও উপদেশ স্বরূপ।মহান আল্লাহ বলেনঃ সুতরাং হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ধৈর্য ধারণ কর; আল্লাহর ওয়াদা সত্য। তোমারই পরিণাম ভাল হবে, আর তোমরাই হবে বিজয়ী। তোমার প্রতিপালক আল্লাহ কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর দ্বীন সমুচ্চ থাকবে। তুমি তোমার ত্রুটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তাকে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দ্বারা প্রকৃতপক্ষে তাঁর উম্মতকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। রাত্রির শেষাংশে, দিনের প্রথমভাগে এবং দিনের শেষাংশে বিশেষভাবে মহান আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা নিজেদের নিকট কোন দলীল না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, আল্লাহর কালামের কোন মর্যাদা দেয় না, তাদের অন্তরে আছে শুধু অহংকার, কিন্তু যে বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চ মর্যাদা তারা কামনা করে তা কখনো সফল হবার নয়। ওটা তারা কখনো লাভ করতে পারবে না। অতএব আল্লাহর শরণাপন্ন হও; আল্লাহ তো সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। এই আয়াত ইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা বলতো যে, দাজ্জাল তাদের মধ্য হতেই হবে, যে তার যামানায় যমীনের বাদশাহ হবে। তাই মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ ‘দাজ্জালের ফিত্না হতে তুমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” (হযরত কা'ব (রঃ) ও হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ আয়াতইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলা, দাজ্জালের বাদশাহী এবং তার ফিত্র থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনার হুকুম ইত্যাদি কথাগুলো লৌকিকতায় ভরপুর। এটা স্বীকার্য যে, তাফসীরে ইবনে হাতিমে এটা রয়েছে। কিন্তু এটা খুবই দুর্বল উক্তি। সঠিক কথা এটাই যে, এটা সাধারণ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ পাকই সবচেয়ে ভাল জানেন)
গাফির 40:56
৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে রাসূলদেরকে (আঃ) সাহায্য করার ওয়াদা রয়েছে। আমরা দেখি যে, কতক নবী (আঃ)-কে তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকেরা হত্যা করে দিয়েছে। যেমন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ) এবং হযরত শা’ইয়া (আঃ)। আর কোন কোন নবী (আঃ)-কে হিজরত করতে হয়েছে। যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)। আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আসমানে হিজরত করান। এখানে প্রশ্ন হতে পারে যে, দুনিয়ায় যে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীদেরকে সাহায্য করার ওয়াদা করেছেন তা পূর্ণ হলো কিরূপে? এর দু'টি উত্তর রয়েছে। একটি উত্তর এই যে, এখানে খবর আম বা সাধারণ হলেও এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কতক। আর অভিধানে এটা প্রায়ই দেখা যায়। আর দ্বিতীয় উত্তর এই যে, এখানে সাহায্য করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রতিশোধ গ্রহণ করা। দেখা যায় যে, এমন কোন নবী গত হননি যাঁকে কষ্টদাতাদের উপর চরমভাবে আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিশোধ গ্রহণ না করেছেন। যেমন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ), হযরত যাকারিয়া (আঃ) এবং হযরত শা’ইয়া (আঃ)-এর হন্তাদের উপর তাদের শত্রুদেরকে বিজয় দান করেছেন, যারা তাদেরকে হত্যা করে রক্তের স্রোত বহিয়ে দিয়েছে এবং তাদেরকে অত্যন্ত লাঞ্ছিত অবস্থায় মৃত্যুর ঘাটে নামিয়ে দিয়েছে। বিশ্বাসঘাতক নমরূদকে আল্লাহ্ তা'আলা কিভাবে পাকড়াও করেছিলেন এবং সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন তা সর্বজন বিদিত। হযরত ঈসা (আঃ)-কে যে ইয়াহুদীরা শূলবিদ্ধ করার চেষ্টা। করেছিল তাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলা রোমকদেরকে বিজয়ী করেছিলেন। তাদের হাতে ঐ ইয়াহূদীরা খুবই লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে যখন হযরত ঈসা (আঃ) দুনিয়ায় অবতরণ করবেন তখন তিনি দাজ্জালসহ ঐ ইয়াহুদীদেরকেও মেরে ফেলবেন যারা তার সেনাবাহিনীর লোক হবে। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে তশরীফ আনবেন। তিনি ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়াকে বাতিল করবেন এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কিছুই ককূল করবেন না। এটাই হলো আল্লাহর বিরাট সাহায্য। এটাই হলো আল্লাহর রীতি, যা পূর্ব হতেই আছে এবং এখনো চালু রয়েছে যে, তিনি স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে পার্থিব সাহায্যও করে থাকেন এবং তিনি স্বয়ং তাদের শত্রুদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে তাদের চক্ষু ঠাণ্ডা করে থাকেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমার বন্ধুদের সাথে শত্রুতা করে সে আমার সাথে যুদ্ধের জন্যে বের হয়ে থাকে। (সে যেন তার সাথে যুদ্ধের জন্য আল্লাহ তা'আলাকে তলব করে)।” অন্য হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি আমার বন্ধুদের পক্ষ হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি যেমন প্রতিশোধ গ্রহণ করে সিংহ।” এজন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম, আ’দ, সামূদ, আসহাবুর রাসস, হযরত লূত (আঃ)-এর কওম, আহলে মাদইয়ান এবং তাদের ন্যায় ঐ সমুদয় লোক হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন যারা রাসূলদেরকে (আঃ) অবিশ্বাস করেছিল এবং সত্যের বিরোধী হয়েছিল। এক এক করে বেছে বেছে তিনি তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আর তাদের মধ্যে যারা মুমিন ছিল তাদেরকে তিনি রক্ষা করেছেন। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, যে কওমের মধ্যে আল্লাহর রাসূল এসেছেন অথবা মুমিন বান্দা তাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্যে দাঁড়িয়েছেন, অতঃপর ঐ কওম ঐ নবী বা মুমিনদের অসম্মান করেছে, তাদেরকে মারপিট করেছে বা হত্যা করেছে, তাদের উপর অবশ্যই ঐ যুগেই আল্লাহর শাস্তি আপতিত হয়েছে। নবীদের (আঃ) হন্তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা উঠে দাঁড়িয়েছে এবং পানির মত তাদের রক্ত দ্বারা তৃষ্ণার্ত ভূমিকে সিক্ত করেছে। সুতরাং এখানে যদিও নবীরা (আঃ) ও মুমিনরা নিহত হয়েছেন, কিন্তু তাদের রক্ত বৃথা যায়নি। তাদের শত্রুদেরকে তুষের ন্যায় উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এরূপ বিশিষ্ট বান্দাদের সাহায্য করা হবে না এটা অসম্ভব। তাদের শত্রুদের উপর পূর্ণমাত্রায় প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়েছে। নবীকূল শিরোমণি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর জীবনী দুনিয়াবাসীর সামনে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এবং তাঁর সহচরদেরকে বিজয় দান করেন, তাঁর কালেমা সুউচ্চ করেন এবং তাঁর শত্রুদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। তাঁর দ্বীন দুনিয়ার সমস্ত দ্বীনের উপর ছেয়ে যায়। যখন তাঁর কওম চরমভাবে তাঁর বিরোধিতা শুরু করে তখন মহান আল্লাহ তাঁকে মদীনায় পৌঁছিয়ে দেন এবং মদীনাবাসীকে তাঁর পরম ভক্ত বানিয়ে দেন। মদীনাবাসী তাঁর জন্যে জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত হয়ে যান। অতঃপর বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে যায়। তাদের বহু নেতৃস্থানীয় লোক এ যুদ্ধে নিহত হয় এবং অনেকে মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। এভাবে তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। পরম দয়ালু আল্লাহ তাদের উপর ইহসান করেন এবং তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ নিয়ে তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া হয়। এভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথে ফিরে আসার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এর পরেও যখন তারা অন্যায় হতে বিরত হলো না, বরং পূর্বের দুষ্কর্মকেই আঁকড়ে ধরে থাকলো তখন এমন এক সময় এসে গেল যে, যেখান হতে নবী (সঃ)-কে রাত্রির অন্ধকারে চুপে চুপে পদব্রজে হিজরত করতে হয়েছিল, সেখানে তিনি বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করলেন এবং অত্যন্ত অসহায় ও নিরুপায় অবস্থায় তার শত্রুদেরকে তাঁর সামনে হাযির করা হলো। হারাম শহরের ইযযত ও হুরমত মহান রাসূল (সঃ)-এর কারণে পূর্ণভাবে রক্ষিত হলো। সমস্ত শিরক ও কুফরী এবং সর্বপ্রকারের বে-আদবী হতে আল্লাহর ঘরকে পবিত্র করা হলো। অবশেষে ইয়ামনও বিজিত হলো এবং সারা আরব উপদ্বীপের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। অতঃপর জনগণ দলে দলে এসে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে শুরু করলো। পরিশেষে মহান রাব্বল আলামীন স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নিজের কাছে ডেকে নিলেন এবং তথায় তাঁকে স্বীয় সম্মানিত অতিথি হিসেবে গ্রহণ করলেন। তারপর তার সকর্মশীল সাহাবীদেরকে (সঃ) তার স্থলাভিষিক্ত করলেন, যারা মুহাম্মাদ (সঃ) ঝাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহর মাখলুককে তাঁর একত্ববাদের দিকে ডাকতে লাগলেন। তাঁরা পথের বাধাকে অতিক্রম করলেন এবং ইসলামরূপ বাগানের কাটাকে কেটে সাফ করলেন। এভাবে তারা গ্রামে গ্রামে এবং শহরে শহরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দিলেন। এ পথে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলো তাদেরকে তারা এর স্বাদ চাখিয়ে দিলেন। এরূপে প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করলো।সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) শুধু যমীনের উপর এবং যমীনবাসীর দেহের উপরই বিজয় লাভ করেননি, বরং তাদের অন্তরকেও জয় করে নেন। তারা তাদের অন্তরে ইসলামের চিত্র অংকিত করে দেন এবং সকলকে কালেমায়ে তাওহীদের পতাকা তলে একত্রিত করেন। দ্বীনে মুহাম্মাদ (সঃ) ভূ-পৃষ্ঠের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে যায় এবং এভাবে সব জায়গাই ওর দখলে এসে পড়ে। দাওয়াতে মুহাম্মাদ (সঃ) বধির কর্ণেও পৌঁছে যায়, সিরাতে মুহাম্মাদী (সঃ) তারাও দেখে নেয়।সমুদয় প্রশংসা মহান আল্লাহর প্রাপ্য যে, আজ পর্যন্ত আল্লাহর দ্বীন জয়যুক্তই হয়েছে। এখন পর্যন্ত মুসলমানদের হাতে হুকুমত ও শাসন ক্ষমতা বিদ্যমান রয়েছে। আজ পর্যন্ত তাদের হাতে আল্লাহর এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর কালাম মওজুদ আছে। এখনও তাদের মাথার উপর আল্লাহর হাত রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত এই দ্বীন জয়যুক্ত ও সাহায্য প্রাপ্তই থাকবে। যে এর মুকাবিলায় আসবে তার মুখে চুনকালি পড়বে এবং আর কখনো সে মুখ দেখাতে পারবে না। এই পবিত্র আয়াতের ভাবার্থ এটাই। কিয়ামতের দিনেও দ্বীনদারদের সাহায্য করা হবে এবং ঐ সাহায্য হবে খুব উচ্চ পর্যায়ের। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, সাক্ষী দ্বারা ফেরেশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে।আল্লাহ তাআলার (আরবী)-এই উক্তিটি তার (আরবী)-এ উক্তি হতে (আরবী) হয়েছে। অন্যেরা পড়েছেন (আরবী) তখন এটা যেন পূর্বের -এর তাফসীর। এখানে যালিমদের দ্বারা মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। কিয়ামতের দিন তাদের কোন ওযর-আপত্তি ও মুক্তিপণ গৃহীত হবে না। সেদিন তাদেরকে আল্লাহর রহমত হতে দূর করে দেয়া হবে। তাদের জন্যে হবে নিকৃষ্ট আবাস অর্থাৎ জাহান্নাম। তাদের পরিণাম হবে মন্দ।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি অবশ্যই মূসা (আঃ)-কে দান করেছিলাম পথ-নির্দেশ এবং বানী ইসরাঈলকে উত্তরাধিকারী করেছিলাম সেই কিতাবের।' অর্থাৎ তাদেরকে ফিরাউনের ধন-দৌলত ও ভূমির ওয়ারিশ বানিয়েছিলাম। কেননা তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (আঃ)-এর আনুগত্যে স্থির থেকে কষ্ট ও বিপদাপদ সহ্য করেছিল। যে কিতাবের তাদেরকে ওয়ারিশ করা হয়েছিল তা ছিল বোধশক্তি সম্পন্ন লোকদের জন্যে পথ-নির্দেশ ও উপদেশ স্বরূপ।মহান আল্লাহ বলেনঃ সুতরাং হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি ধৈর্য ধারণ কর; আল্লাহর ওয়াদা সত্য। তোমারই পরিণাম ভাল হবে, আর তোমরাই হবে বিজয়ী। তোমার প্রতিপালক আল্লাহ কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর দ্বীন সমুচ্চ থাকবে। তুমি তোমার ত্রুটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তাকে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দ্বারা প্রকৃতপক্ষে তাঁর উম্মতকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। রাত্রির শেষাংশে, দিনের প্রথমভাগে এবং দিনের শেষাংশে বিশেষভাবে মহান আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যারা নিজেদের নিকট কোন দলীল না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, আল্লাহর কালামের কোন মর্যাদা দেয় না, তাদের অন্তরে আছে শুধু অহংকার, কিন্তু যে বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চ মর্যাদা তারা কামনা করে তা কখনো সফল হবার নয়। ওটা তারা কখনো লাভ করতে পারবে না। অতএব আল্লাহর শরণাপন্ন হও; আল্লাহ তো সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। এই আয়াত ইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তারা বলতো যে, দাজ্জাল তাদের মধ্য হতেই হবে, যে তার যামানায় যমীনের বাদশাহ হবে। তাই মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ ‘দাজ্জালের ফিত্না হতে তুমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।” (হযরত কা'ব (রঃ) ও হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ আয়াতইয়াহূদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলা, দাজ্জালের বাদশাহী এবং তার ফিত্র থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনার হুকুম ইত্যাদি কথাগুলো লৌকিকতায় ভরপুর। এটা স্বীকার্য যে, তাফসীরে ইবনে হাতিমে এটা রয়েছে। কিন্তু এটা খুবই দুর্বল উক্তি। সঠিক কথা এটাই যে, এটা সাধারণ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ পাকই সবচেয়ে ভাল জানেন)
গাফির 40:57
৫৭-৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ বলেন যে, তিনি কিয়ামতের দিন মাখলুককে নতুনভাবে অবশ্যই সৃষ্টি করবেন। তিনি যখন আকাশ ও পৃথিবীর মত বিরাট বস্তু সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তখন মানুষকে সৃষ্টি করা অথবা ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় তাদেরকে সৃষ্টি করা তার কাছে মোটেই কঠিন নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি দেখে না যে, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং ওগুলো সৃষ্টি করতে ক্লান্ত হননি, তিনি কি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম নন? হাঁ (অবশ্যই তিনি সক্ষম), নিশ্চয়ই তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান।” (৪৬:৩৩) যার সামনে এমন সুস্পষ্ট দলীল বিদ্যমান তার পক্ষে এটা অবিশ্বাস করা তার অজ্ঞানতা ও নির্বুদ্ধিতারই পরিচায়ক বটে। সে যে একেবারে নির্বোধ এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এটা বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, বিরাট হতে বিরাটতম জিনিসকে মেনে নেয়া হচ্ছে, অথচ ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম জিনিসকে মেনে নেয়া হচ্ছে না! বরং এটাকে অসম্ভব মনে করা হচ্ছে! অন্ধ ও চক্ষুষ্মনের পার্থক্য যেমন প্রকাশমান, অনুরূপভাবে মুসলিম ও মুজরিমের পার্থক্যও সুস্পষ্ট। সৎকর্মশীল ও দুষ্কৃতিকারীর পার্থক্য পরিষ্কার। অধিকাংশ লোকই উপদেশ খুব কমই গ্রহণ করে থাকে। কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। তথাপি অধিকাংশ লোকই এটা বিশ্বাস করে না। একজন ইয়ামনবাসী তার শোনা কথা বর্ণনা করেছেন যে, যখন কিয়ামত নিকটবর্তী হবে তখন মানুষের উপর খুব বেশী বিপদাপদ আপতিত হবে এবং সূর্যের প্রখরতা খুব বেশী হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:58
৫৭-৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ বলেন যে, তিনি কিয়ামতের দিন মাখলুককে নতুনভাবে অবশ্যই সৃষ্টি করবেন। তিনি যখন আকাশ ও পৃথিবীর মত বিরাট বস্তু সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তখন মানুষকে সৃষ্টি করা অথবা ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় তাদেরকে সৃষ্টি করা তার কাছে মোটেই কঠিন নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি দেখে না যে, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং ওগুলো সৃষ্টি করতে ক্লান্ত হননি, তিনি কি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম নন? হাঁ (অবশ্যই তিনি সক্ষম), নিশ্চয়ই তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান।” (৪৬:৩৩) যার সামনে এমন সুস্পষ্ট দলীল বিদ্যমান তার পক্ষে এটা অবিশ্বাস করা তার অজ্ঞানতা ও নির্বুদ্ধিতারই পরিচায়ক বটে। সে যে একেবারে নির্বোধ এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এটা বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, বিরাট হতে বিরাটতম জিনিসকে মেনে নেয়া হচ্ছে, অথচ ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম জিনিসকে মেনে নেয়া হচ্ছে না! বরং এটাকে অসম্ভব মনে করা হচ্ছে! অন্ধ ও চক্ষুষ্মনের পার্থক্য যেমন প্রকাশমান, অনুরূপভাবে মুসলিম ও মুজরিমের পার্থক্যও সুস্পষ্ট। সৎকর্মশীল ও দুষ্কৃতিকারীর পার্থক্য পরিষ্কার। অধিকাংশ লোকই উপদেশ খুব কমই গ্রহণ করে থাকে। কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। তথাপি অধিকাংশ লোকই এটা বিশ্বাস করে না। একজন ইয়ামনবাসী তার শোনা কথা বর্ণনা করেছেন যে, যখন কিয়ামত নিকটবর্তী হবে তখন মানুষের উপর খুব বেশী বিপদাপদ আপতিত হবে এবং সূর্যের প্রখরতা খুব বেশী হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:59
৫৭-৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ বলেন যে, তিনি কিয়ামতের দিন মাখলুককে নতুনভাবে অবশ্যই সৃষ্টি করবেন। তিনি যখন আকাশ ও পৃথিবীর মত বিরাট বস্তু সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তখন মানুষকে সৃষ্টি করা অথবা ধ্বংস করে দিয়ে পুনরায় তাদেরকে সৃষ্টি করা তার কাছে মোটেই কঠিন নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি দেখে না যে, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং ওগুলো সৃষ্টি করতে ক্লান্ত হননি, তিনি কি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম নন? হাঁ (অবশ্যই তিনি সক্ষম), নিশ্চয়ই তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান।” (৪৬:৩৩) যার সামনে এমন সুস্পষ্ট দলীল বিদ্যমান তার পক্ষে এটা অবিশ্বাস করা তার অজ্ঞানতা ও নির্বুদ্ধিতারই পরিচায়ক বটে। সে যে একেবারে নির্বোধ এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এটা বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার যে, বিরাট হতে বিরাটতম জিনিসকে মেনে নেয়া হচ্ছে, অথচ ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম জিনিসকে মেনে নেয়া হচ্ছে না! বরং এটাকে অসম্ভব মনে করা হচ্ছে! অন্ধ ও চক্ষুষ্মনের পার্থক্য যেমন প্রকাশমান, অনুরূপভাবে মুসলিম ও মুজরিমের পার্থক্যও সুস্পষ্ট। সৎকর্মশীল ও দুষ্কৃতিকারীর পার্থক্য পরিষ্কার। অধিকাংশ লোকই উপদেশ খুব কমই গ্রহণ করে থাকে। কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। তথাপি অধিকাংশ লোকই এটা বিশ্বাস করে না। একজন ইয়ামনবাসী তার শোনা কথা বর্ণনা করেছেন যে, যখন কিয়ামত নিকটবর্তী হবে তখন মানুষের উপর খুব বেশী বিপদাপদ আপতিত হবে এবং সূর্যের প্রখরতা খুব বেশী হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:60
আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলার এই অনুগ্রহ ও দয়ার উপর আমাদের জীবনকে উৎসর্গ করা উচিত যে, তিনি আমাদেরকে তাঁর নিকট প্রার্থনা করার জন্যে হিদায়াত করছেন এবং তা কবূল করার ওয়াদা করছেন! হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলতেন:“হে ঐ সত্তা, যাঁর কাছে ঐ বান্দা খুবই প্রিয়পাত্র হয় যে তার কাছে খুব বেশী প্রার্থনা করে এবং ঐ বান্দা খুবই মন্দ ও অপ্রিয় হয় যে তার কাছে প্রার্থনা করে না। হে আমার প্রতিপালক! এই গুণ তো একমাত্র আপনার মধ্যেই রয়েছে। কবি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর মাহাত্ম্য এই যে, যদি তুমি তার কাছে চাওয়া পরিত্যাগ কর তবে তিনি অসন্তুষ্ট হন, পক্ষান্তরে আদম সন্তানের কাছে যখন চাওয়া হয় তখন সে অসন্তুষ্ট হয়।”হযরত কা'বুল আহ্বার (রাঃ) বলেন, উম্মতে মুহাম্মাদ (সঃ)-কে এমন তিনটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা পূর্ববর্তী কোন উম্মতকে দেয়া হয়নি। আল্লাহ তা'আলা যখন কোন নবী (আঃ)-কে পাঠাতেন তখন তাকে বলতেনঃ “তুমি তোমার উম্মতের উপর সাক্ষী থাকলে।” আর তোমাদেরকে (উম্মতে মুহাম্মাদী সঃ-কে) তিনি সমস্ত লোকের উপর সাক্ষী করেছেন। পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবী (আঃ)-কে বলা হতোঃ “দ্বীনের ব্যাপারে তোমার উপর কোন বাধ্য-বাধকতা নেই। পক্ষান্তরে এই উম্মতকে বলা হয়েছেঃ “তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন বাধ্যবাধকতা নেই।” পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবী (আঃ)-কে বলা হতোঃ “তুমি আমাকে ডাকো, আমি তোমার ডাকে সাড়া দিবো।” আর এই উম্মতকে বলা হয়েছেঃ “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলেনঃ “চারটি স্বভাব রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে একটি আমার জন্যে, একটি তোমার জন্যে, একটি আমার ও তোমার মাঝে এবং একটি তোমার ও অন্যান্য বান্দাদের মাঝে। যা আমার জন্যে তা এই যে আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। তোমার হক আমার উপর এই যে, আমি তোমাকে তোমার প্রতিটি ভাল কাজের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবো। যা তোমার ও আমার মাঝে তা এই যে, তুমি আমার কাছে প্রার্থনা করবে এবং আমি তোমার প্রার্থনা কবুল করবো। আর যা তোমার এবং আমার অন্যান্য বান্দাদের মাঝে তা এই যে, তুমি তাদের জন্যে ওটাই পছন্দ করবে যা তুমি নিজের জন্যে পছন্দ কর।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু'আ হলো ইবাদত।” অতঃপর তিনি ... (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানের মধ্যে এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন। ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং হাকিমও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে না তিনি তার প্রতি রাগান্বিত হন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুহাম্মাদ ইবনে মুসাল্লামা আনসারীর (রাঃ) মৃত্যুর পর তাঁর তরবারীর কোষ হতে এক টুকরা কাগজ বের হয়। তাতে লিখিত ছিলঃ “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের রহমত লাভের সুযোগ অন্বেষণ করতে থাকো। খুব সম্ভব যে, তোমরা কল্যাণের দু'আ করবে, আর ঐ সময় আল্লাহর রহমত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠবে এবং তোমরা এমন সৌভাগ্য লাভ করবে যার পরে আর কখনো তোমাদেরকে দুঃখ ও আফসোস করতে হবে না।” (এটা হাফিয আবু মুহাম্মদ হাসান ইবনে আবদির রহমান রামহারামযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ আয়াতে ইবাদত দ্বারা দু'আ ও তাওহীদকে বুঝানো হয়েছে।হযরত আমর ইবনে শুআয়েব (রাঃ) তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন অহংকারী লোকদেরকে পিঁপড়ার আকারে একত্রিত করা হবে। ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম জিনিসও তাদের উপর থাকবে। তাদেরকে কূলাস নামক জাহান্নামের জেলখানায় নিক্ষেপ করা হবে। প্রজ্বলিত অগ্নি তাদের মাথার উপর থাকবে। তাদেরকে জাহান্নামীদের রক্ত, পুঁজ এবং প্রস্রাব-পায়খানা খেতে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)অহীব ইবনুল অরদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাঁকে একজন বুযুর্গ ব্যক্তি বলেছেন, রোমে আমি কাফিরদের হাতে বন্দী হয়েছিলাম। একদা আমি শুনতে পেলাম যে, এক অদৃশ্য আহ্বানকারী পর্বতের চূড়া হতে উচ্চস্বরে আহ্বান করে বলছেঃ “হে আমার প্রতিপালক! ঐ ব্যক্তির জন্যে বিস্মিত হতে হয় যে আপনাকে চেনা জানা সত্ত্বেও অন্যের সাথে তার আশা-আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক রাখতে চায়। হে আমার প্রতিপালক! ঐ ব্যক্তির জন্যে বিস্ময়বোধ হয় যে আপনার পরিচয় লাভ করা সত্ত্বেও নিজের প্রয়োজন পুরো করবার জন্যে অন্যের কাছে গমন করে!” এরপর কিছুক্ষণ থেমে থেকে আরো উচ্চস্বরে বললোঃ “আরো বেশী বিস্মিত হতে হয় ঐ ব্যক্তির জন্যে যে মহান আল্লাহর পরিচয় জানা সত্ত্বেও অন্যের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এমন কাজ করে যে কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন।” একথা শুনে আমি উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলামঃ তুমি কি দানব, না মানব? সে উত্তরে বললোঃ “মানব!” তারপর বললোঃ “ঐ সব কাজ হতে তুমি তোমার ধ্যান সরিয়ে নাও যাতে তোমার কোন উপকার নেই এবং যে কাজে তোমার উপকার আছে সেই কাজে মগ্ন হয়ে পড়।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
গাফির 40:61
৬১-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি রাত্রিকে সৃষ্টি করেছেন বিশ্রামের জন্যে, আর দিবসকে করেছেন আলোকোজ্জ্বল, যাতে মানুষ তাদের কাজে-কর্মে, সফরে এবং জীবিকা উপার্জনে সুবিধা লাভ করতে পারে এবং সারা দিনের ক্লান্তি রাত্রির বিশ্রামের মাধ্যমে দূর হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সৃষ্টজীবের প্রতি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই মহান আল্লাহর নিয়ামতরাজির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। এই সমুদয় জিনিসের সৃষ্টিকর্তা এবং এই শান্তি ও বিশ্রামের ব্যবস্থাপক একমাত্র আল্লাহ। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি ছাড়া সৃষ্টজীবের পালনকর্তা আর কেউ নেই। তাই তো মহান আল্লাহ বলেনঃ এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক, সবকিছুর স্রষ্টা; তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই! সুতরাং তোমরা কিভাবে বিপদগামী হচ্ছ? আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদত করছে তারা তো নিজেরাই সষ্ট। সুতরাং তারা কোন কিছুই সৃষ্টি করেনি। বরং তোমরা যেসব মূর্তির উপাসনা করছো সেগুলো তো তোমরা নিজেদের হাতেই তৈরী করেছে। এদের পূর্ববর্তী মুশরিকরাও এভাবেই বিভ্রান্ত হয়েছিল এবং বিনা দলীলে তারা গায়রুল্লাহর ইবাদত করতো। নিজেদের কুপ্রবৃত্তিকে সামনে রেখে তারা আল্লাহর দলীল প্রমাণকে অস্বীকার করতো। নিজেদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাকে সামনে করে তারা বিভ্রান্ত হতো।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে করেছেন বাসোপযোগী। অর্থাৎ পৃথিবীকে তিনি তোমাদের জন্যে বিছানা স্বরূপ বানিয়েছেন, যাতে আরাম-আয়েশে তোমরা এখানে জীবন যাপন করতে পার, চলো, ফিরো এবং গমনাগমন কর। যমীনের উপর পাহাড়-পর্বত স্থাপন করে তিনি যমীনকে হেলা দোলা হতে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আসমানকে তিনি ছাদ স্বরূপ বানিয়েছেন যা সব দিক দিয়েই রক্ষিত রয়েছে। তিনিই তোমাদের আকৃতি গঠন করেছেন এবং ঐ আকৃতি করেছেন খুবই উৎকৃষ্ট। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তিনি সঠিকভাবে সজ্জিত করেছেন। মানানসই দেহ এবং সেই মুতাবেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং সুন্দর চেহারা দান করেছেন। আর তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন উৎকৃষ্ট রিযক বা আহার্য। সৃষ্টি করেছেন তিনি, বসতি দান করেছেন তিনি, পানাহার করাচ্ছেন তিনি এবং পোশাক পরিচ্ছদ দান করেছেন তিনি। সুতরাং সঠিক অর্থে তিনিই হলেন সৃষ্টিকর্তা, আহার্যদাতা। তিনিই জগতসমূহের প্রতিপালক। যেমন সূরায়ে বাকারায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্যে বিছানা ও আকাশকে ছাদ করেছেন এবং আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তদ্দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্যে ফল-মূল উৎপাদন করেন। সুতরাং জেনে শুনে কাউকেও আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করো না।”(২:২১-২২)। আল্লাহ তা'আলা এখানেও এ সমুদয় সৃষ্টির বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ “এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক! কত মহান জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্! তিনি চিরঞ্জীব। তিনি শুরু হতেই আছেন এবং শেষ পর্যন্ত থাকবেন। তাঁর লয় নেই, ক্ষয় নেই। তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ। তিনিই ব্যক্ত, তিনিই গুপ্ত। তার কোন গুণ অন্য কারো মধ্যে নেই। তাঁর সমতুল্য কেউই নেই। সুতরাং তোমাদের উচিত তোমরা তাঁর তাওহীদকে মেনে নিয়ে তাঁরই কাছে প্রার্থনা জানাতে থাকবে এবং তাঁরই ইবাদতে লিপ্ত থাকবে। সমুদয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই প্রাপ্য।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আহলে ইলমের একটি দলের উক্তি হলোঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করে তার এর সাথে সাথে (আরবী) পড়ে নেয়াও উচিত, যাতে এই আয়াতের উপর আমল হয়ে যায়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেনঃ “যখন তুমি (আরবী) পাঠ করবে তখন পড়ে নিবে এবং সাথে সাথে (আরবী) এটাও পাঠ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) প্রত্যেক নামাযের সালামের পরে নিম্নলিখিত কালেমাগুলো পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই, রাজ্য তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর তাওফীক ছাড়া পাপ হতে বিরত থাকা যায় না এবং ইবাদত করার শক্তিও থাকে না। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করি। নিয়ামত তাঁরই, অনুগ্রহ তাঁরই এবং উত্তম প্রশংসাও তারই প্রাপ্য। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বূদ নেই। আমরা একনিষ্ঠভাবে তারই আনুগত্য করি, যদিও কাফিররা অসন্তুষ্ট হয়। আর তিনি বলতেন যে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) ঐ কালেমাগুলো প্রত্যেক নামাযের পরে পাঠ করতেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
গাফির 40:62
৬১-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি রাত্রিকে সৃষ্টি করেছেন বিশ্রামের জন্যে, আর দিবসকে করেছেন আলোকোজ্জ্বল, যাতে মানুষ তাদের কাজে-কর্মে, সফরে এবং জীবিকা উপার্জনে সুবিধা লাভ করতে পারে এবং সারা দিনের ক্লান্তি রাত্রির বিশ্রামের মাধ্যমে দূর হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সৃষ্টজীবের প্রতি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই মহান আল্লাহর নিয়ামতরাজির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। এই সমুদয় জিনিসের সৃষ্টিকর্তা এবং এই শান্তি ও বিশ্রামের ব্যবস্থাপক একমাত্র আল্লাহ। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি ছাড়া সৃষ্টজীবের পালনকর্তা আর কেউ নেই। তাই তো মহান আল্লাহ বলেনঃ এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক, সবকিছুর স্রষ্টা; তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই! সুতরাং তোমরা কিভাবে বিপদগামী হচ্ছ? আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদত করছে তারা তো নিজেরাই সষ্ট। সুতরাং তারা কোন কিছুই সৃষ্টি করেনি। বরং তোমরা যেসব মূর্তির উপাসনা করছো সেগুলো তো তোমরা নিজেদের হাতেই তৈরী করেছে। এদের পূর্ববর্তী মুশরিকরাও এভাবেই বিভ্রান্ত হয়েছিল এবং বিনা দলীলে তারা গায়রুল্লাহর ইবাদত করতো। নিজেদের কুপ্রবৃত্তিকে সামনে রেখে তারা আল্লাহর দলীল প্রমাণকে অস্বীকার করতো। নিজেদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাকে সামনে করে তারা বিভ্রান্ত হতো।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে করেছেন বাসোপযোগী। অর্থাৎ পৃথিবীকে তিনি তোমাদের জন্যে বিছানা স্বরূপ বানিয়েছেন, যাতে আরাম-আয়েশে তোমরা এখানে জীবন যাপন করতে পার, চলো, ফিরো এবং গমনাগমন কর। যমীনের উপর পাহাড়-পর্বত স্থাপন করে তিনি যমীনকে হেলা দোলা হতে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আসমানকে তিনি ছাদ স্বরূপ বানিয়েছেন যা সব দিক দিয়েই রক্ষিত রয়েছে। তিনিই তোমাদের আকৃতি গঠন করেছেন এবং ঐ আকৃতি করেছেন খুবই উৎকৃষ্ট। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তিনি সঠিকভাবে সজ্জিত করেছেন। মানানসই দেহ এবং সেই মুতাবেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং সুন্দর চেহারা দান করেছেন। আর তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন উৎকৃষ্ট রিযক বা আহার্য। সৃষ্টি করেছেন তিনি, বসতি দান করেছেন তিনি, পানাহার করাচ্ছেন তিনি এবং পোশাক পরিচ্ছদ দান করেছেন তিনি। সুতরাং সঠিক অর্থে তিনিই হলেন সৃষ্টিকর্তা, আহার্যদাতা। তিনিই জগতসমূহের প্রতিপালক। যেমন সূরায়ে বাকারায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্যে বিছানা ও আকাশকে ছাদ করেছেন এবং আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তদ্দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্যে ফল-মূল উৎপাদন করেন। সুতরাং জেনে শুনে কাউকেও আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করো না।”(২:২১-২২)। আল্লাহ তা'আলা এখানেও এ সমুদয় সৃষ্টির বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ “এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক! কত মহান জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্! তিনি চিরঞ্জীব। তিনি শুরু হতেই আছেন এবং শেষ পর্যন্ত থাকবেন। তাঁর লয় নেই, ক্ষয় নেই। তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ। তিনিই ব্যক্ত, তিনিই গুপ্ত। তার কোন গুণ অন্য কারো মধ্যে নেই। তাঁর সমতুল্য কেউই নেই। সুতরাং তোমাদের উচিত তোমরা তাঁর তাওহীদকে মেনে নিয়ে তাঁরই কাছে প্রার্থনা জানাতে থাকবে এবং তাঁরই ইবাদতে লিপ্ত থাকবে। সমুদয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই প্রাপ্য।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আহলে ইলমের একটি দলের উক্তি হলোঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করে তার এর সাথে সাথে (আরবী) পড়ে নেয়াও উচিত, যাতে এই আয়াতের উপর আমল হয়ে যায়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেনঃ “যখন তুমি (আরবী) পাঠ করবে তখন পড়ে নিবে এবং সাথে সাথে (আরবী) এটাও পাঠ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) প্রত্যেক নামাযের সালামের পরে নিম্নলিখিত কালেমাগুলো পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই, রাজ্য তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর তাওফীক ছাড়া পাপ হতে বিরত থাকা যায় না এবং ইবাদত করার শক্তিও থাকে না। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করি। নিয়ামত তাঁরই, অনুগ্রহ তাঁরই এবং উত্তম প্রশংসাও তারই প্রাপ্য। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বূদ নেই। আমরা একনিষ্ঠভাবে তারই আনুগত্য করি, যদিও কাফিররা অসন্তুষ্ট হয়। আর তিনি বলতেন যে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) ঐ কালেমাগুলো প্রত্যেক নামাযের পরে পাঠ করতেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
গাফির 40:63
৬১-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি রাত্রিকে সৃষ্টি করেছেন বিশ্রামের জন্যে, আর দিবসকে করেছেন আলোকোজ্জ্বল, যাতে মানুষ তাদের কাজে-কর্মে, সফরে এবং জীবিকা উপার্জনে সুবিধা লাভ করতে পারে এবং সারা দিনের ক্লান্তি রাত্রির বিশ্রামের মাধ্যমে দূর হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সৃষ্টজীবের প্রতি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই মহান আল্লাহর নিয়ামতরাজির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। এই সমুদয় জিনিসের সৃষ্টিকর্তা এবং এই শান্তি ও বিশ্রামের ব্যবস্থাপক একমাত্র আল্লাহ। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি ছাড়া সৃষ্টজীবের পালনকর্তা আর কেউ নেই। তাই তো মহান আল্লাহ বলেনঃ এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক, সবকিছুর স্রষ্টা; তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই! সুতরাং তোমরা কিভাবে বিপদগামী হচ্ছ? আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদত করছে তারা তো নিজেরাই সষ্ট। সুতরাং তারা কোন কিছুই সৃষ্টি করেনি। বরং তোমরা যেসব মূর্তির উপাসনা করছো সেগুলো তো তোমরা নিজেদের হাতেই তৈরী করেছে। এদের পূর্ববর্তী মুশরিকরাও এভাবেই বিভ্রান্ত হয়েছিল এবং বিনা দলীলে তারা গায়রুল্লাহর ইবাদত করতো। নিজেদের কুপ্রবৃত্তিকে সামনে রেখে তারা আল্লাহর দলীল প্রমাণকে অস্বীকার করতো। নিজেদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাকে সামনে করে তারা বিভ্রান্ত হতো।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে করেছেন বাসোপযোগী। অর্থাৎ পৃথিবীকে তিনি তোমাদের জন্যে বিছানা স্বরূপ বানিয়েছেন, যাতে আরাম-আয়েশে তোমরা এখানে জীবন যাপন করতে পার, চলো, ফিরো এবং গমনাগমন কর। যমীনের উপর পাহাড়-পর্বত স্থাপন করে তিনি যমীনকে হেলা দোলা হতে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আসমানকে তিনি ছাদ স্বরূপ বানিয়েছেন যা সব দিক দিয়েই রক্ষিত রয়েছে। তিনিই তোমাদের আকৃতি গঠন করেছেন এবং ঐ আকৃতি করেছেন খুবই উৎকৃষ্ট। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তিনি সঠিকভাবে সজ্জিত করেছেন। মানানসই দেহ এবং সেই মুতাবেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং সুন্দর চেহারা দান করেছেন। আর তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন উৎকৃষ্ট রিযক বা আহার্য। সৃষ্টি করেছেন তিনি, বসতি দান করেছেন তিনি, পানাহার করাচ্ছেন তিনি এবং পোশাক পরিচ্ছদ দান করেছেন তিনি। সুতরাং সঠিক অর্থে তিনিই হলেন সৃষ্টিকর্তা, আহার্যদাতা। তিনিই জগতসমূহের প্রতিপালক। যেমন সূরায়ে বাকারায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্যে বিছানা ও আকাশকে ছাদ করেছেন এবং আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তদ্দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্যে ফল-মূল উৎপাদন করেন। সুতরাং জেনে শুনে কাউকেও আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করো না।”(২:২১-২২)। আল্লাহ তা'আলা এখানেও এ সমুদয় সৃষ্টির বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ “এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক! কত মহান জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্! তিনি চিরঞ্জীব। তিনি শুরু হতেই আছেন এবং শেষ পর্যন্ত থাকবেন। তাঁর লয় নেই, ক্ষয় নেই। তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ। তিনিই ব্যক্ত, তিনিই গুপ্ত। তার কোন গুণ অন্য কারো মধ্যে নেই। তাঁর সমতুল্য কেউই নেই। সুতরাং তোমাদের উচিত তোমরা তাঁর তাওহীদকে মেনে নিয়ে তাঁরই কাছে প্রার্থনা জানাতে থাকবে এবং তাঁরই ইবাদতে লিপ্ত থাকবে। সমুদয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই প্রাপ্য।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আহলে ইলমের একটি দলের উক্তি হলোঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করে তার এর সাথে সাথে (আরবী) পড়ে নেয়াও উচিত, যাতে এই আয়াতের উপর আমল হয়ে যায়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেনঃ “যখন তুমি (আরবী) পাঠ করবে তখন পড়ে নিবে এবং সাথে সাথে (আরবী) এটাও পাঠ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) প্রত্যেক নামাযের সালামের পরে নিম্নলিখিত কালেমাগুলো পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই, রাজ্য তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর তাওফীক ছাড়া পাপ হতে বিরত থাকা যায় না এবং ইবাদত করার শক্তিও থাকে না। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করি। নিয়ামত তাঁরই, অনুগ্রহ তাঁরই এবং উত্তম প্রশংসাও তারই প্রাপ্য। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বূদ নেই। আমরা একনিষ্ঠভাবে তারই আনুগত্য করি, যদিও কাফিররা অসন্তুষ্ট হয়। আর তিনি বলতেন যে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) ঐ কালেমাগুলো প্রত্যেক নামাযের পরে পাঠ করতেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
গাফির 40:64
৬১-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি রাত্রিকে সৃষ্টি করেছেন বিশ্রামের জন্যে, আর দিবসকে করেছেন আলোকোজ্জ্বল, যাতে মানুষ তাদের কাজে-কর্মে, সফরে এবং জীবিকা উপার্জনে সুবিধা লাভ করতে পারে এবং সারা দিনের ক্লান্তি রাত্রির বিশ্রামের মাধ্যমে দূর হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সৃষ্টজীবের প্রতি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই মহান আল্লাহর নিয়ামতরাজির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। এই সমুদয় জিনিসের সৃষ্টিকর্তা এবং এই শান্তি ও বিশ্রামের ব্যবস্থাপক একমাত্র আল্লাহ। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি ছাড়া সৃষ্টজীবের পালনকর্তা আর কেউ নেই। তাই তো মহান আল্লাহ বলেনঃ এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক, সবকিছুর স্রষ্টা; তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই! সুতরাং তোমরা কিভাবে বিপদগামী হচ্ছ? আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদত করছে তারা তো নিজেরাই সষ্ট। সুতরাং তারা কোন কিছুই সৃষ্টি করেনি। বরং তোমরা যেসব মূর্তির উপাসনা করছো সেগুলো তো তোমরা নিজেদের হাতেই তৈরী করেছে। এদের পূর্ববর্তী মুশরিকরাও এভাবেই বিভ্রান্ত হয়েছিল এবং বিনা দলীলে তারা গায়রুল্লাহর ইবাদত করতো। নিজেদের কুপ্রবৃত্তিকে সামনে রেখে তারা আল্লাহর দলীল প্রমাণকে অস্বীকার করতো। নিজেদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাকে সামনে করে তারা বিভ্রান্ত হতো।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে করেছেন বাসোপযোগী। অর্থাৎ পৃথিবীকে তিনি তোমাদের জন্যে বিছানা স্বরূপ বানিয়েছেন, যাতে আরাম-আয়েশে তোমরা এখানে জীবন যাপন করতে পার, চলো, ফিরো এবং গমনাগমন কর। যমীনের উপর পাহাড়-পর্বত স্থাপন করে তিনি যমীনকে হেলা দোলা হতে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আসমানকে তিনি ছাদ স্বরূপ বানিয়েছেন যা সব দিক দিয়েই রক্ষিত রয়েছে। তিনিই তোমাদের আকৃতি গঠন করেছেন এবং ঐ আকৃতি করেছেন খুবই উৎকৃষ্ট। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তিনি সঠিকভাবে সজ্জিত করেছেন। মানানসই দেহ এবং সেই মুতাবেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং সুন্দর চেহারা দান করেছেন। আর তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন উৎকৃষ্ট রিযক বা আহার্য। সৃষ্টি করেছেন তিনি, বসতি দান করেছেন তিনি, পানাহার করাচ্ছেন তিনি এবং পোশাক পরিচ্ছদ দান করেছেন তিনি। সুতরাং সঠিক অর্থে তিনিই হলেন সৃষ্টিকর্তা, আহার্যদাতা। তিনিই জগতসমূহের প্রতিপালক। যেমন সূরায়ে বাকারায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্যে বিছানা ও আকাশকে ছাদ করেছেন এবং আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তদ্দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্যে ফল-মূল উৎপাদন করেন। সুতরাং জেনে শুনে কাউকেও আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করো না।”(২:২১-২২)। আল্লাহ তা'আলা এখানেও এ সমুদয় সৃষ্টির বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ “এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক! কত মহান জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্! তিনি চিরঞ্জীব। তিনি শুরু হতেই আছেন এবং শেষ পর্যন্ত থাকবেন। তাঁর লয় নেই, ক্ষয় নেই। তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ। তিনিই ব্যক্ত, তিনিই গুপ্ত। তার কোন গুণ অন্য কারো মধ্যে নেই। তাঁর সমতুল্য কেউই নেই। সুতরাং তোমাদের উচিত তোমরা তাঁর তাওহীদকে মেনে নিয়ে তাঁরই কাছে প্রার্থনা জানাতে থাকবে এবং তাঁরই ইবাদতে লিপ্ত থাকবে। সমুদয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই প্রাপ্য।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আহলে ইলমের একটি দলের উক্তি হলোঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করে তার এর সাথে সাথে (আরবী) পড়ে নেয়াও উচিত, যাতে এই আয়াতের উপর আমল হয়ে যায়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেনঃ “যখন তুমি (আরবী) পাঠ করবে তখন পড়ে নিবে এবং সাথে সাথে (আরবী) এটাও পাঠ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) প্রত্যেক নামাযের সালামের পরে নিম্নলিখিত কালেমাগুলো পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই, রাজ্য তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর তাওফীক ছাড়া পাপ হতে বিরত থাকা যায় না এবং ইবাদত করার শক্তিও থাকে না। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করি। নিয়ামত তাঁরই, অনুগ্রহ তাঁরই এবং উত্তম প্রশংসাও তারই প্রাপ্য। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বূদ নেই। আমরা একনিষ্ঠভাবে তারই আনুগত্য করি, যদিও কাফিররা অসন্তুষ্ট হয়। আর তিনি বলতেন যে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) ঐ কালেমাগুলো প্রত্যেক নামাযের পরে পাঠ করতেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
গাফির 40:65
৬১-৬৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি রাত্রিকে সৃষ্টি করেছেন বিশ্রামের জন্যে, আর দিবসকে করেছেন আলোকোজ্জ্বল, যাতে মানুষ তাদের কাজে-কর্মে, সফরে এবং জীবিকা উপার্জনে সুবিধা লাভ করতে পারে এবং সারা দিনের ক্লান্তি রাত্রির বিশ্রামের মাধ্যমে দূর হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সৃষ্টজীবের প্রতি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই মহান আল্লাহর নিয়ামতরাজির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। এই সমুদয় জিনিসের সৃষ্টিকর্তা এবং এই শান্তি ও বিশ্রামের ব্যবস্থাপক একমাত্র আল্লাহ। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি ছাড়া সৃষ্টজীবের পালনকর্তা আর কেউ নেই। তাই তো মহান আল্লাহ বলেনঃ এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক, সবকিছুর স্রষ্টা; তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই! সুতরাং তোমরা কিভাবে বিপদগামী হচ্ছ? আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদত করছে তারা তো নিজেরাই সষ্ট। সুতরাং তারা কোন কিছুই সৃষ্টি করেনি। বরং তোমরা যেসব মূর্তির উপাসনা করছো সেগুলো তো তোমরা নিজেদের হাতেই তৈরী করেছে। এদের পূর্ববর্তী মুশরিকরাও এভাবেই বিভ্রান্ত হয়েছিল এবং বিনা দলীলে তারা গায়রুল্লাহর ইবাদত করতো। নিজেদের কুপ্রবৃত্তিকে সামনে রেখে তারা আল্লাহর দলীল প্রমাণকে অস্বীকার করতো। নিজেদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতাকে সামনে করে তারা বিভ্রান্ত হতো।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে করেছেন বাসোপযোগী। অর্থাৎ পৃথিবীকে তিনি তোমাদের জন্যে বিছানা স্বরূপ বানিয়েছেন, যাতে আরাম-আয়েশে তোমরা এখানে জীবন যাপন করতে পার, চলো, ফিরো এবং গমনাগমন কর। যমীনের উপর পাহাড়-পর্বত স্থাপন করে তিনি যমীনকে হেলা দোলা হতে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আসমানকে তিনি ছাদ স্বরূপ বানিয়েছেন যা সব দিক দিয়েই রক্ষিত রয়েছে। তিনিই তোমাদের আকৃতি গঠন করেছেন এবং ঐ আকৃতি করেছেন খুবই উৎকৃষ্ট। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তিনি সঠিকভাবে সজ্জিত করেছেন। মানানসই দেহ এবং সেই মুতাবেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং সুন্দর চেহারা দান করেছেন। আর তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন উৎকৃষ্ট রিযক বা আহার্য। সৃষ্টি করেছেন তিনি, বসতি দান করেছেন তিনি, পানাহার করাচ্ছেন তিনি এবং পোশাক পরিচ্ছদ দান করেছেন তিনি। সুতরাং সঠিক অর্থে তিনিই হলেন সৃষ্টিকর্তা, আহার্যদাতা। তিনিই জগতসমূহের প্রতিপালক। যেমন সূরায়ে বাকারায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্যে বিছানা ও আকাশকে ছাদ করেছেন এবং আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তদ্দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্যে ফল-মূল উৎপাদন করেন। সুতরাং জেনে শুনে কাউকেও আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করো না।”(২:২১-২২)। আল্লাহ তা'আলা এখানেও এ সমুদয় সৃষ্টির বর্ণনা দেয়ার পর বলেনঃ “এই তো আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক! কত মহান জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্! তিনি চিরঞ্জীব। তিনি শুরু হতেই আছেন এবং শেষ পর্যন্ত থাকবেন। তাঁর লয় নেই, ক্ষয় নেই। তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ। তিনিই ব্যক্ত, তিনিই গুপ্ত। তার কোন গুণ অন্য কারো মধ্যে নেই। তাঁর সমতুল্য কেউই নেই। সুতরাং তোমাদের উচিত তোমরা তাঁর তাওহীদকে মেনে নিয়ে তাঁরই কাছে প্রার্থনা জানাতে থাকবে এবং তাঁরই ইবাদতে লিপ্ত থাকবে। সমুদয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই প্রাপ্য।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আহলে ইলমের একটি দলের উক্তি হলোঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করে তার এর সাথে সাথে (আরবী) পড়ে নেয়াও উচিত, যাতে এই আয়াতের উপর আমল হয়ে যায়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) বলেনঃ “যখন তুমি (আরবী) পাঠ করবে তখন পড়ে নিবে এবং সাথে সাথে (আরবী) এটাও পাঠ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) প্রত্যেক নামাযের সালামের পরে নিম্নলিখিত কালেমাগুলো পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই, রাজ্য তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর তাওফীক ছাড়া পাপ হতে বিরত থাকা যায় না এবং ইবাদত করার শক্তিও থাকে না। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করি। নিয়ামত তাঁরই, অনুগ্রহ তাঁরই এবং উত্তম প্রশংসাও তারই প্রাপ্য। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বূদ নেই। আমরা একনিষ্ঠভাবে তারই আনুগত্য করি, যদিও কাফিররা অসন্তুষ্ট হয়। আর তিনি বলতেন যে, রাসূলুল্লাহও (সঃ) ঐ কালেমাগুলো প্রত্যেক নামাযের পরে পাঠ করতেন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
গাফির 40:66
৬৬-৬৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি এই মুশরিকদেরকে বলে দাও- আল্লাহ তা'আলা নিজের ছাড়া অন্য যে কারো ইবাদত করতে স্বীয় সৃষ্টজীবকে নিষেধ করে দিয়েছেন। তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের হকদার নয়। এর বড় দলীল হলো এর পরবর্তী আয়াতটি যাতে বলা হয়েছেঃ তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মৃত্তিকা হতে, পরে শুক্রবিন্দু হতে, তারপর রক্তপিণ্ড হতে, তারপর তোমাদেরকে বের করেন (তোমাদের মায়ের পেট হতে) শিশুরূপে, অতঃপর যেন তোমরা উপনীত হও যৌবনে, তারপর হও বৃদ্ধ। এসব কাজ ঐ এক আল্লাহর নির্দেশক্রমে হয়ে থাকে। সুতরাং এটা কত বড়ই না অকৃতজ্ঞতা যে, তার সাথে অন্য কারো ইবাদত করা হবে। তোমাদের মধ্যে কারো এর পূর্বেই মৃত্যু ঘটে। কেউ পূর্বে নষ্ট হয়ে যায় অর্থাৎ শিশু পরিপুষ্ট হওয়ার পূর্বে গর্ভপাত হয়ে যায়। কেউ শৈশবেই মারা যায়, কেউ মারা যায় যৌবনাবস্থায় এবং বার্ধক্যের পূর্বে প্রৌঢ় অবস্থায় দুনিয়া হতে বিদায় নেয়। কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার চাহিদামত একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমি মাতৃ গর্ভাশয়ে স্থিতিশীল রাখি।” (২২:৫) আর এখানে মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, তোমরা নির্ধারিত কাল প্রাপ্ত হও এবং যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পার। অর্থাৎ তোমাদের অবস্থার এই পরিবর্তন দেখে তোমরা যেন এই বিশ্বাস স্থাপন কর যে, এই দুনিয়ার পরেও তোমাদেরকে নতুন জীবনে একদিন দণ্ডায়মান হতে হবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনিই জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। তার কোন হুকুমকে, কোন ফায়সালাকে এবং তার ইচ্ছাকে কেউ টলাতে পারে না। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই হয়ে থাকে এবং যা তিনি চান না তা হওয়া সম্ভব নয়।
গাফির 40:67
৬৬-৬৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি এই মুশরিকদেরকে বলে দাও- আল্লাহ তা'আলা নিজের ছাড়া অন্য যে কারো ইবাদত করতে স্বীয় সৃষ্টজীবকে নিষেধ করে দিয়েছেন। তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের হকদার নয়। এর বড় দলীল হলো এর পরবর্তী আয়াতটি যাতে বলা হয়েছেঃ তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মৃত্তিকা হতে, পরে শুক্রবিন্দু হতে, তারপর রক্তপিণ্ড হতে, তারপর তোমাদেরকে বের করেন (তোমাদের মায়ের পেট হতে) শিশুরূপে, অতঃপর যেন তোমরা উপনীত হও যৌবনে, তারপর হও বৃদ্ধ। এসব কাজ ঐ এক আল্লাহর নির্দেশক্রমে হয়ে থাকে। সুতরাং এটা কত বড়ই না অকৃতজ্ঞতা যে, তার সাথে অন্য কারো ইবাদত করা হবে। তোমাদের মধ্যে কারো এর পূর্বেই মৃত্যু ঘটে। কেউ পূর্বে নষ্ট হয়ে যায় অর্থাৎ শিশু পরিপুষ্ট হওয়ার পূর্বে গর্ভপাত হয়ে যায়। কেউ শৈশবেই মারা যায়, কেউ মারা যায় যৌবনাবস্থায় এবং বার্ধক্যের পূর্বে প্রৌঢ় অবস্থায় দুনিয়া হতে বিদায় নেয়। কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার চাহিদামত একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমি মাতৃ গর্ভাশয়ে স্থিতিশীল রাখি।” (২২:৫) আর এখানে মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, তোমরা নির্ধারিত কাল প্রাপ্ত হও এবং যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পার। অর্থাৎ তোমাদের অবস্থার এই পরিবর্তন দেখে তোমরা যেন এই বিশ্বাস স্থাপন কর যে, এই দুনিয়ার পরেও তোমাদেরকে নতুন জীবনে একদিন দণ্ডায়মান হতে হবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনিই জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। তার কোন হুকুমকে, কোন ফায়সালাকে এবং তার ইচ্ছাকে কেউ টলাতে পারে না। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই হয়ে থাকে এবং যা তিনি চান না তা হওয়া সম্ভব নয়।
গাফির 40:68
৬৬-৬৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তুমি এই মুশরিকদেরকে বলে দাও- আল্লাহ তা'আলা নিজের ছাড়া অন্য যে কারো ইবাদত করতে স্বীয় সৃষ্টজীবকে নিষেধ করে দিয়েছেন। তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের হকদার নয়। এর বড় দলীল হলো এর পরবর্তী আয়াতটি যাতে বলা হয়েছেঃ তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মৃত্তিকা হতে, পরে শুক্রবিন্দু হতে, তারপর রক্তপিণ্ড হতে, তারপর তোমাদেরকে বের করেন (তোমাদের মায়ের পেট হতে) শিশুরূপে, অতঃপর যেন তোমরা উপনীত হও যৌবনে, তারপর হও বৃদ্ধ। এসব কাজ ঐ এক আল্লাহর নির্দেশক্রমে হয়ে থাকে। সুতরাং এটা কত বড়ই না অকৃতজ্ঞতা যে, তার সাথে অন্য কারো ইবাদত করা হবে। তোমাদের মধ্যে কারো এর পূর্বেই মৃত্যু ঘটে। কেউ পূর্বে নষ্ট হয়ে যায় অর্থাৎ শিশু পরিপুষ্ট হওয়ার পূর্বে গর্ভপাত হয়ে যায়। কেউ শৈশবেই মারা যায়, কেউ মারা যায় যৌবনাবস্থায় এবং বার্ধক্যের পূর্বে প্রৌঢ় অবস্থায় দুনিয়া হতে বিদায় নেয়। কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার চাহিদামত একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমি মাতৃ গর্ভাশয়ে স্থিতিশীল রাখি।” (২২:৫) আর এখানে মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, তোমরা নির্ধারিত কাল প্রাপ্ত হও এবং যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পার। অর্থাৎ তোমাদের অবস্থার এই পরিবর্তন দেখে তোমরা যেন এই বিশ্বাস স্থাপন কর যে, এই দুনিয়ার পরেও তোমাদেরকে নতুন জীবনে একদিন দণ্ডায়মান হতে হবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনিই জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। তার কোন হুকুমকে, কোন ফায়সালাকে এবং তার ইচ্ছাকে কেউ টলাতে পারে না। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই হয়ে থাকে এবং যা তিনি চান না তা হওয়া সম্ভব নয়।
গাফির 40:69
৬৯-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অবিশ্বাস করে এবং বাতিল দ্বারা সত্য সম্পর্কে বিতণ্ডা করে তাদের এ কাজে কি তুমি বিস্ময় বোধ করছো না? কিভাবে তাদেরকে বিপথগামী করা হচ্ছে তা কি তুমি দেখো না? কিভাবে তারা ভালকে ছেড়ে মন্দকে আঁকড়ে ধরে থাকছে তা কি লক্ষ্য করছো না? অতঃপর কাফিরদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যারা অস্বীকার করে কিতাব এবং যা সহ আমি রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছিলাম, তা, অর্থাৎ হিদায়াত ও বর্ণনা, তারা শীঘ্রই এর পরিণাম জানতে পারবে। যেমন প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেন (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন দুর্ভোগ মিথ্যা আরোপকারীদের জন্যে।” (৭৭:১৫) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে এবং জাহান্নামের রক্ষকগণ টেনে নিয়ে যাবেন ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে, সেদিন তারা নিজেদের দুষ্কর্মের পরিণাম জানতে পারবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটাই সেই জাহান্নাম যা অপরাধীরা অবিশ্বাস করতো। তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।” (৫৫:৪৩-৪৪) অন্য আয়াতসমূহে তাদের যাকূম গাছ খাওয়া ও গরম পানি পান করার বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে।” (৩৭:৬৮) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! তারা থাকবে অত্যুষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে, কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রের ছায়ায়, যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়।” (৫৬:৪১-৪৪) কয়েকটি আয়াতের পর আবার বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আরোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে, এবং ওটা দ্বারা তোমরা উদর পূর্ণ করবে। তারপর তোমরা পান করবে অত্যুষ্ণ পানি পান করবে তৃষ্ণার্ত উষ্ট্রের ন্যায়। কিয়ামতের দিন এটাই হবে তাদের আপ্যায়ন।” (৫৬:৫১-৫৬) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যাকূম বৃক্ষ হবে পাপীর খাদ্য, গলিত তাম্রের মত; ওটা তার উদরে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত পানির মত। তাকে ধর এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। অতঃপর তার মস্তকের উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে শাস্তি দাও। আর বলা হবেঃ আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত। এটা তো ওটাই, যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করতে।" (৪৪:৪৩-৫০) উদ্দেশ্য। এই যে, এক দিকে তো তারা দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে থাকবে, যা উপরে বর্ণিত হলো, অপর দিকে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করার জন্যে শাসন-গর্জন, ধমক, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের সুরে তাদের সাথে কথা বলা হবে, যা উল্লিখিত হলো। হযরত ইয়া'লা ইবনে মুনাব্বাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন, মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ জাহান্নামীদের জন্যে একদিকে কালো মেঘ উঠাবেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “হে জাহান্নামবাসী! তোমরা (এ মেঘ হতে) কি চাও?” তারা ওটা দুনিয়ার মেঘের মতই মেঘ মনে করে বলবেঃ “আমরা চাই যে, এ মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হোক!” তখন ঐ মেঘ হতে বেড়ি, শৃংখল এবং আগুনের অঙ্গার বর্ষিত হতে শুরু করবে, যার শিখা তাদেরকে জ্বালাতে পুড়াতে থাকবে এবং তাদের গলদেশে যে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, ওগুলোর সাথে এগুলোও যুক্ত করে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা গারীব হাদীস) অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ “দুনিয়ায় আল্লাহ ছাড়া যাদের পূজা করতে তারা আজ কোথায়? কোথায় গেল তোমাদের উপাস্য প্রতিমাগুলো? কেন আজ তারা তোমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসছে না? কেন আজ তারা তোমাদেরকে এ অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছে?” তারা উত্তরে বলবেঃ “তারা তো আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তারা আজ আমাদের কোনই উপকার করবে না।” অতঃপর তাদের মনে একটা খেয়াল জাগবে এবং বলবেঃ ‘ইতিপূর্বে আমরা তাদের মোটেই ইবাদত করিনি। পূর্বে আমরা এমন কিছুকেই আহ্বান করিনি।' অর্থাৎ তারা তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর তাদের ফিত্না তো এটাই যে, তারা বলবেঃ আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে তিনি কাফিরদেরকে বিভ্রান্ত করেন।ফেরেশতারা তাদেরকে বলবেনঃ এটা এই কারণে যে, তোমরা পৃথিবীতে অযথা উল্লাস করতে এবং এই জন্যে যে, তোমরা দম্ভ-অহংকার করতে। সুতরাং যাও, এখন জাহান্নামে প্রবেশ কর। তথায় তোমাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান। করতে হবে। আর উদ্ধতদের আবাসস্থল কতই না নিকৃষ্ট! অর্থাৎ তোমরা যে পরিমাণ গর্ব ও অহংকার করতে সেই পরিমাণই তোমরা আজ লাঞ্ছিত ও অপমাণিত হবে। যতটা উপরে চড়েছিলে ততটা আজ নীচে নেমে যাবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:70
৬৯-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অবিশ্বাস করে এবং বাতিল দ্বারা সত্য সম্পর্কে বিতণ্ডা করে তাদের এ কাজে কি তুমি বিস্ময় বোধ করছো না? কিভাবে তাদেরকে বিপথগামী করা হচ্ছে তা কি তুমি দেখো না? কিভাবে তারা ভালকে ছেড়ে মন্দকে আঁকড়ে ধরে থাকছে তা কি লক্ষ্য করছো না? অতঃপর কাফিরদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যারা অস্বীকার করে কিতাব এবং যা সহ আমি রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছিলাম, তা, অর্থাৎ হিদায়াত ও বর্ণনা, তারা শীঘ্রই এর পরিণাম জানতে পারবে। যেমন প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেন (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন দুর্ভোগ মিথ্যা আরোপকারীদের জন্যে।” (৭৭:১৫) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে এবং জাহান্নামের রক্ষকগণ টেনে নিয়ে যাবেন ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে, সেদিন তারা নিজেদের দুষ্কর্মের পরিণাম জানতে পারবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটাই সেই জাহান্নাম যা অপরাধীরা অবিশ্বাস করতো। তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।” (৫৫:৪৩-৪৪) অন্য আয়াতসমূহে তাদের যাকূম গাছ খাওয়া ও গরম পানি পান করার বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে।” (৩৭:৬৮) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! তারা থাকবে অত্যুষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে, কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রের ছায়ায়, যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়।” (৫৬:৪১-৪৪) কয়েকটি আয়াতের পর আবার বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আরোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে, এবং ওটা দ্বারা তোমরা উদর পূর্ণ করবে। তারপর তোমরা পান করবে অত্যুষ্ণ পানি পান করবে তৃষ্ণার্ত উষ্ট্রের ন্যায়। কিয়ামতের দিন এটাই হবে তাদের আপ্যায়ন।” (৫৬:৫১-৫৬) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যাকূম বৃক্ষ হবে পাপীর খাদ্য, গলিত তাম্রের মত; ওটা তার উদরে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত পানির মত। তাকে ধর এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। অতঃপর তার মস্তকের উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে শাস্তি দাও। আর বলা হবেঃ আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত। এটা তো ওটাই, যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করতে।" (৪৪:৪৩-৫০) উদ্দেশ্য। এই যে, এক দিকে তো তারা দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে থাকবে, যা উপরে বর্ণিত হলো, অপর দিকে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করার জন্যে শাসন-গর্জন, ধমক, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের সুরে তাদের সাথে কথা বলা হবে, যা উল্লিখিত হলো। হযরত ইয়া'লা ইবনে মুনাব্বাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন, মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ জাহান্নামীদের জন্যে একদিকে কালো মেঘ উঠাবেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “হে জাহান্নামবাসী! তোমরা (এ মেঘ হতে) কি চাও?” তারা ওটা দুনিয়ার মেঘের মতই মেঘ মনে করে বলবেঃ “আমরা চাই যে, এ মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হোক!” তখন ঐ মেঘ হতে বেড়ি, শৃংখল এবং আগুনের অঙ্গার বর্ষিত হতে শুরু করবে, যার শিখা তাদেরকে জ্বালাতে পুড়াতে থাকবে এবং তাদের গলদেশে যে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, ওগুলোর সাথে এগুলোও যুক্ত করে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা গারীব হাদীস) অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ “দুনিয়ায় আল্লাহ ছাড়া যাদের পূজা করতে তারা আজ কোথায়? কোথায় গেল তোমাদের উপাস্য প্রতিমাগুলো? কেন আজ তারা তোমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসছে না? কেন আজ তারা তোমাদেরকে এ অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছে?” তারা উত্তরে বলবেঃ “তারা তো আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তারা আজ আমাদের কোনই উপকার করবে না।” অতঃপর তাদের মনে একটা খেয়াল জাগবে এবং বলবেঃ ‘ইতিপূর্বে আমরা তাদের মোটেই ইবাদত করিনি। পূর্বে আমরা এমন কিছুকেই আহ্বান করিনি।' অর্থাৎ তারা তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর তাদের ফিত্না তো এটাই যে, তারা বলবেঃ আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে তিনি কাফিরদেরকে বিভ্রান্ত করেন।ফেরেশতারা তাদেরকে বলবেনঃ এটা এই কারণে যে, তোমরা পৃথিবীতে অযথা উল্লাস করতে এবং এই জন্যে যে, তোমরা দম্ভ-অহংকার করতে। সুতরাং যাও, এখন জাহান্নামে প্রবেশ কর। তথায় তোমাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান। করতে হবে। আর উদ্ধতদের আবাসস্থল কতই না নিকৃষ্ট! অর্থাৎ তোমরা যে পরিমাণ গর্ব ও অহংকার করতে সেই পরিমাণই তোমরা আজ লাঞ্ছিত ও অপমাণিত হবে। যতটা উপরে চড়েছিলে ততটা আজ নীচে নেমে যাবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:71
৬৯-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অবিশ্বাস করে এবং বাতিল দ্বারা সত্য সম্পর্কে বিতণ্ডা করে তাদের এ কাজে কি তুমি বিস্ময় বোধ করছো না? কিভাবে তাদেরকে বিপথগামী করা হচ্ছে তা কি তুমি দেখো না? কিভাবে তারা ভালকে ছেড়ে মন্দকে আঁকড়ে ধরে থাকছে তা কি লক্ষ্য করছো না? অতঃপর কাফিরদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যারা অস্বীকার করে কিতাব এবং যা সহ আমি রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছিলাম, তা, অর্থাৎ হিদায়াত ও বর্ণনা, তারা শীঘ্রই এর পরিণাম জানতে পারবে। যেমন প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেন (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন দুর্ভোগ মিথ্যা আরোপকারীদের জন্যে।” (৭৭:১৫) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে এবং জাহান্নামের রক্ষকগণ টেনে নিয়ে যাবেন ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে, সেদিন তারা নিজেদের দুষ্কর্মের পরিণাম জানতে পারবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটাই সেই জাহান্নাম যা অপরাধীরা অবিশ্বাস করতো। তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।” (৫৫:৪৩-৪৪) অন্য আয়াতসমূহে তাদের যাকূম গাছ খাওয়া ও গরম পানি পান করার বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে।” (৩৭:৬৮) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! তারা থাকবে অত্যুষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে, কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রের ছায়ায়, যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়।” (৫৬:৪১-৪৪) কয়েকটি আয়াতের পর আবার বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আরোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে, এবং ওটা দ্বারা তোমরা উদর পূর্ণ করবে। তারপর তোমরা পান করবে অত্যুষ্ণ পানি পান করবে তৃষ্ণার্ত উষ্ট্রের ন্যায়। কিয়ামতের দিন এটাই হবে তাদের আপ্যায়ন।” (৫৬:৫১-৫৬) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যাকূম বৃক্ষ হবে পাপীর খাদ্য, গলিত তাম্রের মত; ওটা তার উদরে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত পানির মত। তাকে ধর এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। অতঃপর তার মস্তকের উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে শাস্তি দাও। আর বলা হবেঃ আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত। এটা তো ওটাই, যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করতে।" (৪৪:৪৩-৫০) উদ্দেশ্য। এই যে, এক দিকে তো তারা দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে থাকবে, যা উপরে বর্ণিত হলো, অপর দিকে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করার জন্যে শাসন-গর্জন, ধমক, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের সুরে তাদের সাথে কথা বলা হবে, যা উল্লিখিত হলো। হযরত ইয়া'লা ইবনে মুনাব্বাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন, মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ জাহান্নামীদের জন্যে একদিকে কালো মেঘ উঠাবেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “হে জাহান্নামবাসী! তোমরা (এ মেঘ হতে) কি চাও?” তারা ওটা দুনিয়ার মেঘের মতই মেঘ মনে করে বলবেঃ “আমরা চাই যে, এ মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হোক!” তখন ঐ মেঘ হতে বেড়ি, শৃংখল এবং আগুনের অঙ্গার বর্ষিত হতে শুরু করবে, যার শিখা তাদেরকে জ্বালাতে পুড়াতে থাকবে এবং তাদের গলদেশে যে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, ওগুলোর সাথে এগুলোও যুক্ত করে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা গারীব হাদীস) অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ “দুনিয়ায় আল্লাহ ছাড়া যাদের পূজা করতে তারা আজ কোথায়? কোথায় গেল তোমাদের উপাস্য প্রতিমাগুলো? কেন আজ তারা তোমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসছে না? কেন আজ তারা তোমাদেরকে এ অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছে?” তারা উত্তরে বলবেঃ “তারা তো আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তারা আজ আমাদের কোনই উপকার করবে না।” অতঃপর তাদের মনে একটা খেয়াল জাগবে এবং বলবেঃ ‘ইতিপূর্বে আমরা তাদের মোটেই ইবাদত করিনি। পূর্বে আমরা এমন কিছুকেই আহ্বান করিনি।' অর্থাৎ তারা তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর তাদের ফিত্না তো এটাই যে, তারা বলবেঃ আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে তিনি কাফিরদেরকে বিভ্রান্ত করেন।ফেরেশতারা তাদেরকে বলবেনঃ এটা এই কারণে যে, তোমরা পৃথিবীতে অযথা উল্লাস করতে এবং এই জন্যে যে, তোমরা দম্ভ-অহংকার করতে। সুতরাং যাও, এখন জাহান্নামে প্রবেশ কর। তথায় তোমাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান। করতে হবে। আর উদ্ধতদের আবাসস্থল কতই না নিকৃষ্ট! অর্থাৎ তোমরা যে পরিমাণ গর্ব ও অহংকার করতে সেই পরিমাণই তোমরা আজ লাঞ্ছিত ও অপমাণিত হবে। যতটা উপরে চড়েছিলে ততটা আজ নীচে নেমে যাবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:72
৬৯-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অবিশ্বাস করে এবং বাতিল দ্বারা সত্য সম্পর্কে বিতণ্ডা করে তাদের এ কাজে কি তুমি বিস্ময় বোধ করছো না? কিভাবে তাদেরকে বিপথগামী করা হচ্ছে তা কি তুমি দেখো না? কিভাবে তারা ভালকে ছেড়ে মন্দকে আঁকড়ে ধরে থাকছে তা কি লক্ষ্য করছো না? অতঃপর কাফিরদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যারা অস্বীকার করে কিতাব এবং যা সহ আমি রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছিলাম, তা, অর্থাৎ হিদায়াত ও বর্ণনা, তারা শীঘ্রই এর পরিণাম জানতে পারবে। যেমন প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেন (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন দুর্ভোগ মিথ্যা আরোপকারীদের জন্যে।” (৭৭:১৫) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে এবং জাহান্নামের রক্ষকগণ টেনে নিয়ে যাবেন ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে, সেদিন তারা নিজেদের দুষ্কর্মের পরিণাম জানতে পারবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটাই সেই জাহান্নাম যা অপরাধীরা অবিশ্বাস করতো। তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।” (৫৫:৪৩-৪৪) অন্য আয়াতসমূহে তাদের যাকূম গাছ খাওয়া ও গরম পানি পান করার বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে।” (৩৭:৬৮) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! তারা থাকবে অত্যুষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে, কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রের ছায়ায়, যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়।” (৫৬:৪১-৪৪) কয়েকটি আয়াতের পর আবার বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আরোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে, এবং ওটা দ্বারা তোমরা উদর পূর্ণ করবে। তারপর তোমরা পান করবে অত্যুষ্ণ পানি পান করবে তৃষ্ণার্ত উষ্ট্রের ন্যায়। কিয়ামতের দিন এটাই হবে তাদের আপ্যায়ন।” (৫৬:৫১-৫৬) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যাকূম বৃক্ষ হবে পাপীর খাদ্য, গলিত তাম্রের মত; ওটা তার উদরে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত পানির মত। তাকে ধর এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। অতঃপর তার মস্তকের উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে শাস্তি দাও। আর বলা হবেঃ আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত। এটা তো ওটাই, যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করতে।" (৪৪:৪৩-৫০) উদ্দেশ্য। এই যে, এক দিকে তো তারা দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে থাকবে, যা উপরে বর্ণিত হলো, অপর দিকে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করার জন্যে শাসন-গর্জন, ধমক, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের সুরে তাদের সাথে কথা বলা হবে, যা উল্লিখিত হলো। হযরত ইয়া'লা ইবনে মুনাব্বাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন, মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ জাহান্নামীদের জন্যে একদিকে কালো মেঘ উঠাবেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “হে জাহান্নামবাসী! তোমরা (এ মেঘ হতে) কি চাও?” তারা ওটা দুনিয়ার মেঘের মতই মেঘ মনে করে বলবেঃ “আমরা চাই যে, এ মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হোক!” তখন ঐ মেঘ হতে বেড়ি, শৃংখল এবং আগুনের অঙ্গার বর্ষিত হতে শুরু করবে, যার শিখা তাদেরকে জ্বালাতে পুড়াতে থাকবে এবং তাদের গলদেশে যে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, ওগুলোর সাথে এগুলোও যুক্ত করে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা গারীব হাদীস) অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ “দুনিয়ায় আল্লাহ ছাড়া যাদের পূজা করতে তারা আজ কোথায়? কোথায় গেল তোমাদের উপাস্য প্রতিমাগুলো? কেন আজ তারা তোমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসছে না? কেন আজ তারা তোমাদেরকে এ অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছে?” তারা উত্তরে বলবেঃ “তারা তো আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তারা আজ আমাদের কোনই উপকার করবে না।” অতঃপর তাদের মনে একটা খেয়াল জাগবে এবং বলবেঃ ‘ইতিপূর্বে আমরা তাদের মোটেই ইবাদত করিনি। পূর্বে আমরা এমন কিছুকেই আহ্বান করিনি।' অর্থাৎ তারা তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর তাদের ফিত্না তো এটাই যে, তারা বলবেঃ আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে তিনি কাফিরদেরকে বিভ্রান্ত করেন।ফেরেশতারা তাদেরকে বলবেনঃ এটা এই কারণে যে, তোমরা পৃথিবীতে অযথা উল্লাস করতে এবং এই জন্যে যে, তোমরা দম্ভ-অহংকার করতে। সুতরাং যাও, এখন জাহান্নামে প্রবেশ কর। তথায় তোমাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান। করতে হবে। আর উদ্ধতদের আবাসস্থল কতই না নিকৃষ্ট! অর্থাৎ তোমরা যে পরিমাণ গর্ব ও অহংকার করতে সেই পরিমাণই তোমরা আজ লাঞ্ছিত ও অপমাণিত হবে। যতটা উপরে চড়েছিলে ততটা আজ নীচে নেমে যাবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:73
৬৯-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অবিশ্বাস করে এবং বাতিল দ্বারা সত্য সম্পর্কে বিতণ্ডা করে তাদের এ কাজে কি তুমি বিস্ময় বোধ করছো না? কিভাবে তাদেরকে বিপথগামী করা হচ্ছে তা কি তুমি দেখো না? কিভাবে তারা ভালকে ছেড়ে মন্দকে আঁকড়ে ধরে থাকছে তা কি লক্ষ্য করছো না? অতঃপর কাফিরদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যারা অস্বীকার করে কিতাব এবং যা সহ আমি রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছিলাম, তা, অর্থাৎ হিদায়াত ও বর্ণনা, তারা শীঘ্রই এর পরিণাম জানতে পারবে। যেমন প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেন (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন দুর্ভোগ মিথ্যা আরোপকারীদের জন্যে।” (৭৭:১৫) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে এবং জাহান্নামের রক্ষকগণ টেনে নিয়ে যাবেন ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে, সেদিন তারা নিজেদের দুষ্কর্মের পরিণাম জানতে পারবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটাই সেই জাহান্নাম যা অপরাধীরা অবিশ্বাস করতো। তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।” (৫৫:৪৩-৪৪) অন্য আয়াতসমূহে তাদের যাকূম গাছ খাওয়া ও গরম পানি পান করার বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে।” (৩৭:৬৮) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! তারা থাকবে অত্যুষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে, কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রের ছায়ায়, যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়।” (৫৬:৪১-৪৪) কয়েকটি আয়াতের পর আবার বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আরোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে, এবং ওটা দ্বারা তোমরা উদর পূর্ণ করবে। তারপর তোমরা পান করবে অত্যুষ্ণ পানি পান করবে তৃষ্ণার্ত উষ্ট্রের ন্যায়। কিয়ামতের দিন এটাই হবে তাদের আপ্যায়ন।” (৫৬:৫১-৫৬) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যাকূম বৃক্ষ হবে পাপীর খাদ্য, গলিত তাম্রের মত; ওটা তার উদরে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত পানির মত। তাকে ধর এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। অতঃপর তার মস্তকের উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে শাস্তি দাও। আর বলা হবেঃ আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত। এটা তো ওটাই, যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করতে।" (৪৪:৪৩-৫০) উদ্দেশ্য। এই যে, এক দিকে তো তারা দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে থাকবে, যা উপরে বর্ণিত হলো, অপর দিকে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করার জন্যে শাসন-গর্জন, ধমক, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের সুরে তাদের সাথে কথা বলা হবে, যা উল্লিখিত হলো। হযরত ইয়া'লা ইবনে মুনাব্বাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন, মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ জাহান্নামীদের জন্যে একদিকে কালো মেঘ উঠাবেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “হে জাহান্নামবাসী! তোমরা (এ মেঘ হতে) কি চাও?” তারা ওটা দুনিয়ার মেঘের মতই মেঘ মনে করে বলবেঃ “আমরা চাই যে, এ মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হোক!” তখন ঐ মেঘ হতে বেড়ি, শৃংখল এবং আগুনের অঙ্গার বর্ষিত হতে শুরু করবে, যার শিখা তাদেরকে জ্বালাতে পুড়াতে থাকবে এবং তাদের গলদেশে যে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, ওগুলোর সাথে এগুলোও যুক্ত করে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা গারীব হাদীস) অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ “দুনিয়ায় আল্লাহ ছাড়া যাদের পূজা করতে তারা আজ কোথায়? কোথায় গেল তোমাদের উপাস্য প্রতিমাগুলো? কেন আজ তারা তোমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসছে না? কেন আজ তারা তোমাদেরকে এ অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছে?” তারা উত্তরে বলবেঃ “তারা তো আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তারা আজ আমাদের কোনই উপকার করবে না।” অতঃপর তাদের মনে একটা খেয়াল জাগবে এবং বলবেঃ ‘ইতিপূর্বে আমরা তাদের মোটেই ইবাদত করিনি। পূর্বে আমরা এমন কিছুকেই আহ্বান করিনি।' অর্থাৎ তারা তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর তাদের ফিত্না তো এটাই যে, তারা বলবেঃ আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে তিনি কাফিরদেরকে বিভ্রান্ত করেন।ফেরেশতারা তাদেরকে বলবেনঃ এটা এই কারণে যে, তোমরা পৃথিবীতে অযথা উল্লাস করতে এবং এই জন্যে যে, তোমরা দম্ভ-অহংকার করতে। সুতরাং যাও, এখন জাহান্নামে প্রবেশ কর। তথায় তোমাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান। করতে হবে। আর উদ্ধতদের আবাসস্থল কতই না নিকৃষ্ট! অর্থাৎ তোমরা যে পরিমাণ গর্ব ও অহংকার করতে সেই পরিমাণই তোমরা আজ লাঞ্ছিত ও অপমাণিত হবে। যতটা উপরে চড়েছিলে ততটা আজ নীচে নেমে যাবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:74
৬৯-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অবিশ্বাস করে এবং বাতিল দ্বারা সত্য সম্পর্কে বিতণ্ডা করে তাদের এ কাজে কি তুমি বিস্ময় বোধ করছো না? কিভাবে তাদেরকে বিপথগামী করা হচ্ছে তা কি তুমি দেখো না? কিভাবে তারা ভালকে ছেড়ে মন্দকে আঁকড়ে ধরে থাকছে তা কি লক্ষ্য করছো না? অতঃপর কাফিরদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যারা অস্বীকার করে কিতাব এবং যা সহ আমি রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছিলাম, তা, অর্থাৎ হিদায়াত ও বর্ণনা, তারা শীঘ্রই এর পরিণাম জানতে পারবে। যেমন প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেন (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন দুর্ভোগ মিথ্যা আরোপকারীদের জন্যে।” (৭৭:১৫) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে এবং জাহান্নামের রক্ষকগণ টেনে নিয়ে যাবেন ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে, সেদিন তারা নিজেদের দুষ্কর্মের পরিণাম জানতে পারবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটাই সেই জাহান্নাম যা অপরাধীরা অবিশ্বাস করতো। তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।” (৫৫:৪৩-৪৪) অন্য আয়াতসমূহে তাদের যাকূম গাছ খাওয়া ও গরম পানি পান করার বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে।” (৩৭:৬৮) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! তারা থাকবে অত্যুষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে, কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রের ছায়ায়, যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়।” (৫৬:৪১-৪৪) কয়েকটি আয়াতের পর আবার বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আরোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে, এবং ওটা দ্বারা তোমরা উদর পূর্ণ করবে। তারপর তোমরা পান করবে অত্যুষ্ণ পানি পান করবে তৃষ্ণার্ত উষ্ট্রের ন্যায়। কিয়ামতের দিন এটাই হবে তাদের আপ্যায়ন।” (৫৬:৫১-৫৬) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যাকূম বৃক্ষ হবে পাপীর খাদ্য, গলিত তাম্রের মত; ওটা তার উদরে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত পানির মত। তাকে ধর এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। অতঃপর তার মস্তকের উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে শাস্তি দাও। আর বলা হবেঃ আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত। এটা তো ওটাই, যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করতে।" (৪৪:৪৩-৫০) উদ্দেশ্য। এই যে, এক দিকে তো তারা দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে থাকবে, যা উপরে বর্ণিত হলো, অপর দিকে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করার জন্যে শাসন-গর্জন, ধমক, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের সুরে তাদের সাথে কথা বলা হবে, যা উল্লিখিত হলো। হযরত ইয়া'লা ইবনে মুনাব্বাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন, মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ জাহান্নামীদের জন্যে একদিকে কালো মেঘ উঠাবেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “হে জাহান্নামবাসী! তোমরা (এ মেঘ হতে) কি চাও?” তারা ওটা দুনিয়ার মেঘের মতই মেঘ মনে করে বলবেঃ “আমরা চাই যে, এ মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হোক!” তখন ঐ মেঘ হতে বেড়ি, শৃংখল এবং আগুনের অঙ্গার বর্ষিত হতে শুরু করবে, যার শিখা তাদেরকে জ্বালাতে পুড়াতে থাকবে এবং তাদের গলদেশে যে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, ওগুলোর সাথে এগুলোও যুক্ত করে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা গারীব হাদীস) অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ “দুনিয়ায় আল্লাহ ছাড়া যাদের পূজা করতে তারা আজ কোথায়? কোথায় গেল তোমাদের উপাস্য প্রতিমাগুলো? কেন আজ তারা তোমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসছে না? কেন আজ তারা তোমাদেরকে এ অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছে?” তারা উত্তরে বলবেঃ “তারা তো আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তারা আজ আমাদের কোনই উপকার করবে না।” অতঃপর তাদের মনে একটা খেয়াল জাগবে এবং বলবেঃ ‘ইতিপূর্বে আমরা তাদের মোটেই ইবাদত করিনি। পূর্বে আমরা এমন কিছুকেই আহ্বান করিনি।' অর্থাৎ তারা তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর তাদের ফিত্না তো এটাই যে, তারা বলবেঃ আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে তিনি কাফিরদেরকে বিভ্রান্ত করেন।ফেরেশতারা তাদেরকে বলবেনঃ এটা এই কারণে যে, তোমরা পৃথিবীতে অযথা উল্লাস করতে এবং এই জন্যে যে, তোমরা দম্ভ-অহংকার করতে। সুতরাং যাও, এখন জাহান্নামে প্রবেশ কর। তথায় তোমাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান। করতে হবে। আর উদ্ধতদের আবাসস্থল কতই না নিকৃষ্ট! অর্থাৎ তোমরা যে পরিমাণ গর্ব ও অহংকার করতে সেই পরিমাণই তোমরা আজ লাঞ্ছিত ও অপমাণিত হবে। যতটা উপরে চড়েছিলে ততটা আজ নীচে নেমে যাবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:75
৬৯-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অবিশ্বাস করে এবং বাতিল দ্বারা সত্য সম্পর্কে বিতণ্ডা করে তাদের এ কাজে কি তুমি বিস্ময় বোধ করছো না? কিভাবে তাদেরকে বিপথগামী করা হচ্ছে তা কি তুমি দেখো না? কিভাবে তারা ভালকে ছেড়ে মন্দকে আঁকড়ে ধরে থাকছে তা কি লক্ষ্য করছো না? অতঃপর কাফিরদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যারা অস্বীকার করে কিতাব এবং যা সহ আমি রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছিলাম, তা, অর্থাৎ হিদায়াত ও বর্ণনা, তারা শীঘ্রই এর পরিণাম জানতে পারবে। যেমন প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেন (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন দুর্ভোগ মিথ্যা আরোপকারীদের জন্যে।” (৭৭:১৫) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে এবং জাহান্নামের রক্ষকগণ টেনে নিয়ে যাবেন ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে, সেদিন তারা নিজেদের দুষ্কর্মের পরিণাম জানতে পারবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটাই সেই জাহান্নাম যা অপরাধীরা অবিশ্বাস করতো। তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।” (৫৫:৪৩-৪৪) অন্য আয়াতসমূহে তাদের যাকূম গাছ খাওয়া ও গরম পানি পান করার বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে।” (৩৭:৬৮) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! তারা থাকবে অত্যুষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে, কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রের ছায়ায়, যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়।” (৫৬:৪১-৪৪) কয়েকটি আয়াতের পর আবার বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আরোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে, এবং ওটা দ্বারা তোমরা উদর পূর্ণ করবে। তারপর তোমরা পান করবে অত্যুষ্ণ পানি পান করবে তৃষ্ণার্ত উষ্ট্রের ন্যায়। কিয়ামতের দিন এটাই হবে তাদের আপ্যায়ন।” (৫৬:৫১-৫৬) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যাকূম বৃক্ষ হবে পাপীর খাদ্য, গলিত তাম্রের মত; ওটা তার উদরে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত পানির মত। তাকে ধর এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। অতঃপর তার মস্তকের উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে শাস্তি দাও। আর বলা হবেঃ আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত। এটা তো ওটাই, যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করতে।" (৪৪:৪৩-৫০) উদ্দেশ্য। এই যে, এক দিকে তো তারা দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে থাকবে, যা উপরে বর্ণিত হলো, অপর দিকে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করার জন্যে শাসন-গর্জন, ধমক, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের সুরে তাদের সাথে কথা বলা হবে, যা উল্লিখিত হলো। হযরত ইয়া'লা ইবনে মুনাব্বাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন, মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ জাহান্নামীদের জন্যে একদিকে কালো মেঘ উঠাবেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “হে জাহান্নামবাসী! তোমরা (এ মেঘ হতে) কি চাও?” তারা ওটা দুনিয়ার মেঘের মতই মেঘ মনে করে বলবেঃ “আমরা চাই যে, এ মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হোক!” তখন ঐ মেঘ হতে বেড়ি, শৃংখল এবং আগুনের অঙ্গার বর্ষিত হতে শুরু করবে, যার শিখা তাদেরকে জ্বালাতে পুড়াতে থাকবে এবং তাদের গলদেশে যে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, ওগুলোর সাথে এগুলোও যুক্ত করে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা গারীব হাদীস) অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ “দুনিয়ায় আল্লাহ ছাড়া যাদের পূজা করতে তারা আজ কোথায়? কোথায় গেল তোমাদের উপাস্য প্রতিমাগুলো? কেন আজ তারা তোমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসছে না? কেন আজ তারা তোমাদেরকে এ অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছে?” তারা উত্তরে বলবেঃ “তারা তো আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তারা আজ আমাদের কোনই উপকার করবে না।” অতঃপর তাদের মনে একটা খেয়াল জাগবে এবং বলবেঃ ‘ইতিপূর্বে আমরা তাদের মোটেই ইবাদত করিনি। পূর্বে আমরা এমন কিছুকেই আহ্বান করিনি।' অর্থাৎ তারা তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর তাদের ফিত্না তো এটাই যে, তারা বলবেঃ আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে তিনি কাফিরদেরকে বিভ্রান্ত করেন।ফেরেশতারা তাদেরকে বলবেনঃ এটা এই কারণে যে, তোমরা পৃথিবীতে অযথা উল্লাস করতে এবং এই জন্যে যে, তোমরা দম্ভ-অহংকার করতে। সুতরাং যাও, এখন জাহান্নামে প্রবেশ কর। তথায় তোমাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান। করতে হবে। আর উদ্ধতদের আবাসস্থল কতই না নিকৃষ্ট! অর্থাৎ তোমরা যে পরিমাণ গর্ব ও অহংকার করতে সেই পরিমাণই তোমরা আজ লাঞ্ছিত ও অপমাণিত হবে। যতটা উপরে চড়েছিলে ততটা আজ নীচে নেমে যাবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:76
৬৯-৭৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অবিশ্বাস করে এবং বাতিল দ্বারা সত্য সম্পর্কে বিতণ্ডা করে তাদের এ কাজে কি তুমি বিস্ময় বোধ করছো না? কিভাবে তাদেরকে বিপথগামী করা হচ্ছে তা কি তুমি দেখো না? কিভাবে তারা ভালকে ছেড়ে মন্দকে আঁকড়ে ধরে থাকছে তা কি লক্ষ্য করছো না? অতঃপর কাফিরদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যারা অস্বীকার করে কিতাব এবং যা সহ আমি রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছিলাম, তা, অর্থাৎ হিদায়াত ও বর্ণনা, তারা শীঘ্রই এর পরিণাম জানতে পারবে। যেমন প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেন (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন দুর্ভোগ মিথ্যা আরোপকারীদের জন্যে।” (৭৭:১৫) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে এবং জাহান্নামের রক্ষকগণ টেনে নিয়ে যাবেন ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে দগ্ধ করা হবে অগ্নিতে, সেদিন তারা নিজেদের দুষ্কর্মের পরিণাম জানতে পারবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটাই সেই জাহান্নাম যা অপরাধীরা অবিশ্বাস করতো। তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।” (৫৫:৪৩-৪৪) অন্য আয়াতসমূহে তাদের যাকূম গাছ খাওয়া ও গরম পানি পান করার বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত অগ্নির দিকে।” (৩৭:৬৮) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! তারা থাকবে অত্যুষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে, কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রের ছায়ায়, যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়।” (৫৬:৪১-৪৪) কয়েকটি আয়াতের পর আবার বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর হে বিভ্রান্ত মিথ্যা আরোপকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাকূম বৃক্ষ হতে, এবং ওটা দ্বারা তোমরা উদর পূর্ণ করবে। তারপর তোমরা পান করবে অত্যুষ্ণ পানি পান করবে তৃষ্ণার্ত উষ্ট্রের ন্যায়। কিয়ামতের দিন এটাই হবে তাদের আপ্যায়ন।” (৫৬:৫১-৫৬) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যাকূম বৃক্ষ হবে পাপীর খাদ্য, গলিত তাম্রের মত; ওটা তার উদরে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত পানির মত। তাকে ধর এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। অতঃপর তার মস্তকের উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে শাস্তি দাও। আর বলা হবেঃ আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত। এটা তো ওটাই, যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করতে।" (৪৪:৪৩-৫০) উদ্দেশ্য। এই যে, এক দিকে তো তারা দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে থাকবে, যা উপরে বর্ণিত হলো, অপর দিকে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করার জন্যে শাসন-গর্জন, ধমক, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের সুরে তাদের সাথে কথা বলা হবে, যা উল্লিখিত হলো। হযরত ইয়া'লা ইবনে মুনাব্বাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেন, মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ জাহান্নামীদের জন্যে একদিকে কালো মেঘ উঠাবেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “হে জাহান্নামবাসী! তোমরা (এ মেঘ হতে) কি চাও?” তারা ওটা দুনিয়ার মেঘের মতই মেঘ মনে করে বলবেঃ “আমরা চাই যে, এ মেঘ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হোক!” তখন ঐ মেঘ হতে বেড়ি, শৃংখল এবং আগুনের অঙ্গার বর্ষিত হতে শুরু করবে, যার শিখা তাদেরকে জ্বালাতে পুড়াতে থাকবে এবং তাদের গলদেশে যে বেড়ি ও শৃংখল থাকবে, ওগুলোর সাথে এগুলোও যুক্ত করে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা গারীব হাদীস) অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ “দুনিয়ায় আল্লাহ ছাড়া যাদের পূজা করতে তারা আজ কোথায়? কোথায় গেল তোমাদের উপাস্য প্রতিমাগুলো? কেন আজ তারা তোমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসছে না? কেন আজ তারা তোমাদেরকে এ অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছে?” তারা উত্তরে বলবেঃ “তারা তো আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তারা আজ আমাদের কোনই উপকার করবে না।” অতঃপর তাদের মনে একটা খেয়াল জাগবে এবং বলবেঃ ‘ইতিপূর্বে আমরা তাদের মোটেই ইবাদত করিনি। পূর্বে আমরা এমন কিছুকেই আহ্বান করিনি।' অর্থাৎ তারা তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতঃপর তাদের ফিত্না তো এটাই যে, তারা বলবেঃ আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) মহান আল্লাহ বলেনঃ এই ভাবে তিনি কাফিরদেরকে বিভ্রান্ত করেন।ফেরেশতারা তাদেরকে বলবেনঃ এটা এই কারণে যে, তোমরা পৃথিবীতে অযথা উল্লাস করতে এবং এই জন্যে যে, তোমরা দম্ভ-অহংকার করতে। সুতরাং যাও, এখন জাহান্নামে প্রবেশ কর। তথায় তোমাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান। করতে হবে। আর উদ্ধতদের আবাসস্থল কতই না নিকৃষ্ট! অর্থাৎ তোমরা যে পরিমাণ গর্ব ও অহংকার করতে সেই পরিমাণই তোমরা আজ লাঞ্ছিত ও অপমাণিত হবে। যতটা উপরে চড়েছিলে ততটা আজ নীচে নেমে যাবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
গাফির 40:77
৭৭-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে কাফিরদের তাঁকে অবিশ্বাস করার উপর ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ হে রাসূল (সঃ)! যারা তোমার কথা মানছে না, বরং তোমাকে মিথ্যাবাদী বলছে এবং তোমাকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছে, তুমি এতে ধৈর্য ধর। তাদের উপর আল্লাহ তোমাকে জয়যুক্ত করবেন। পরিণামে সব দিক দিয়ে তোমারই মঙ্গল হবে। তুমি এবং তোমার অনুসারীরা সারা বিশ্বের উপর বিজয়ী থাকবে। আর আখিরাতের কল্যাণ তো শুধু তোমাদেরই জন্যে। জেনে রেখো যে, আমি তোমার সঙ্গে যে ওয়াদা করেছি তার কিছুটা আমি তোমার জীবদ্দশাতেই পূর্ণ করে দেখিয়ে দিবো। আর হয়েছিলও তাই। বদরের যুদ্ধের দিন কাফিরদের মস্তক দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছিল। কুরায়েশদের বড় বড় নেতা মারা গিয়েছিল। পরিশেষে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশাতেই মক্কা বিজিত হয়। তিনি দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করেননি যে পর্যন্ত না সারা আরব উপদ্বীপ তাঁর পদানত হয় এবং তার শত্রুরা তাঁর সামনে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয় এবং মহান আল্লাহ তাঁর চক্ষু ঠাণ্ডা করেন। আর যদি আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে মৃত্যুদান করে নিজের নিকট উঠিয়েও নেন তবুও তাদের এটা জেনে রাখা উচিত যে, তাদেরকে তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন তিনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবেন।এরপর আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে আরো সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেনঃ ‘আমি তো তোমার পূর্বে অনেক রাসূল প্রেরণ করেছিলাম; তাদের কারো কারো কথা আমি তোমার নিকট বিবৃত করেছি আর কারো কারো কথা তোমার নিকট বিবৃত করিনি। যেমন সূরায়ে নিসাতেও এটা বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং যাদের ঘটনা আমি তোমার কাছে বর্ণনা করেছি তাদের সাথে তাদের কওম কি দুর্ব্যবহার করেছিল এবং কিভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল তা তুমি দেখে নাও ও বুঝে নাও! আর তাদের কারো কারো ঘটনা আমি তোমার নিকট বিবৃত করিনি।” এদের সংখ্যা তাদের তুলনায় অনেক বেশী। যেমন আমরা সূরায়ে নিসার তাফসীরে বর্ণনা করেছি। সুতরাং প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহরই প্রাপ্য।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন নিদর্শন বা মুজিযা দেখানো কোন রাসূলের কাজ নয়। হ্যা, তবে আল্লাহর হুকুম ও অনুমতির পর তারা তা দেখাতে পারেন। কেননা, নবীদের অধিকারে কোন কিছুই নেই। যখন আল্লাহর আযাব কাফিরদের উপর এসে পড়ে তখন তারা আর রক্ষা পেতে পারে না। মুমিন পরিত্রাণ পেয়ে যায় এবং মিথ্যাশ্রয়ীরা ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গাফির 40:78
৭৭-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে কাফিরদের তাঁকে অবিশ্বাস করার উপর ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ হে রাসূল (সঃ)! যারা তোমার কথা মানছে না, বরং তোমাকে মিথ্যাবাদী বলছে এবং তোমাকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছে, তুমি এতে ধৈর্য ধর। তাদের উপর আল্লাহ তোমাকে জয়যুক্ত করবেন। পরিণামে সব দিক দিয়ে তোমারই মঙ্গল হবে। তুমি এবং তোমার অনুসারীরা সারা বিশ্বের উপর বিজয়ী থাকবে। আর আখিরাতের কল্যাণ তো শুধু তোমাদেরই জন্যে। জেনে রেখো যে, আমি তোমার সঙ্গে যে ওয়াদা করেছি তার কিছুটা আমি তোমার জীবদ্দশাতেই পূর্ণ করে দেখিয়ে দিবো। আর হয়েছিলও তাই। বদরের যুদ্ধের দিন কাফিরদের মস্তক দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছিল। কুরায়েশদের বড় বড় নেতা মারা গিয়েছিল। পরিশেষে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশাতেই মক্কা বিজিত হয়। তিনি দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করেননি যে পর্যন্ত না সারা আরব উপদ্বীপ তাঁর পদানত হয় এবং তার শত্রুরা তাঁর সামনে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয় এবং মহান আল্লাহ তাঁর চক্ষু ঠাণ্ডা করেন। আর যদি আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে মৃত্যুদান করে নিজের নিকট উঠিয়েও নেন তবুও তাদের এটা জেনে রাখা উচিত যে, তাদেরকে তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন তিনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবেন।এরপর আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে আরো সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেনঃ ‘আমি তো তোমার পূর্বে অনেক রাসূল প্রেরণ করেছিলাম; তাদের কারো কারো কথা আমি তোমার নিকট বিবৃত করেছি আর কারো কারো কথা তোমার নিকট বিবৃত করিনি। যেমন সূরায়ে নিসাতেও এটা বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং যাদের ঘটনা আমি তোমার কাছে বর্ণনা করেছি তাদের সাথে তাদের কওম কি দুর্ব্যবহার করেছিল এবং কিভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল তা তুমি দেখে নাও ও বুঝে নাও! আর তাদের কারো কারো ঘটনা আমি তোমার নিকট বিবৃত করিনি।” এদের সংখ্যা তাদের তুলনায় অনেক বেশী। যেমন আমরা সূরায়ে নিসার তাফসীরে বর্ণনা করেছি। সুতরাং প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহরই প্রাপ্য।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন নিদর্শন বা মুজিযা দেখানো কোন রাসূলের কাজ নয়। হ্যা, তবে আল্লাহর হুকুম ও অনুমতির পর তারা তা দেখাতে পারেন। কেননা, নবীদের অধিকারে কোন কিছুই নেই। যখন আল্লাহর আযাব কাফিরদের উপর এসে পড়ে তখন তারা আর রক্ষা পেতে পারে না। মুমিন পরিত্রাণ পেয়ে যায় এবং মিথ্যাশ্রয়ীরা ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গাফির 40:79
৭৯-৮১ নং আয়াতের তাফসীর: আন'আম অর্থাৎ উট, গরু, ছাগল ইত্যাদিকে আল্লাহ্ তা'আলা মানুষের বিভিন্ন প্রকারের উপকারের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। ওগুলো সওয়ারীর কাজে লাগে এবং কতকগুলোকে খাওয়া হয়ে থাকে। উট দ্বারা সওয়ারীর কাজ হয়, গোশতও খাওয়া হয়, দুধও দেয়, বোঝাও বহন করে, দূর-দূরান্তের সফর অতি সহজে অতিক্রম করায়। গরুর গোশত খাওয়া হয়, দুধও দেয়, লাঙ্গলও চালায়। ছাগলের গোশত খাওয়া হয় এবং দুধও দেয়। এগুলোর পশমও বহু কাজে লাগে। যেমন সূরায়ে আন'আম, সূরায়ে নাহল ইত্যাদির মধ্যে এর বর্ণনা গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ এতে তোমাদের জন্যে রয়েছে বহু উপকার, তোমরা যা প্রয়োজনবোধ কর, এটা দ্বারা তা পূর্ণ করে থাকো এবং এদের উপর ও নৌযানের উপর তোমাদেরকে বহন করা হয়। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তিনি তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শনাবলী দেখিয়ে থাকেন। দুনিয়া জাহান এবং ওর প্রান্তে প্রান্তে, জগতের অণু-পরমাণুর মধ্যে এবং স্বয়ং তোমাদের নিজেদের জীবনের মধ্যে আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত বিদ্যমান রয়েছে। সঠিক কথা তো এটাই যে, তাঁর অগণিত নিয়ামত রাশির কোন একটিকেও কোন লোক প্রকৃত অর্থে অস্বীকার করতে পারে না। তারা যে হঠকারিতা ও অহংকার করছে সেটা হলো অন্য কথা।
গাফির 40:80
৭৯-৮১ নং আয়াতের তাফসীর: আন'আম অর্থাৎ উট, গরু, ছাগল ইত্যাদিকে আল্লাহ্ তা'আলা মানুষের বিভিন্ন প্রকারের উপকারের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। ওগুলো সওয়ারীর কাজে লাগে এবং কতকগুলোকে খাওয়া হয়ে থাকে। উট দ্বারা সওয়ারীর কাজ হয়, গোশতও খাওয়া হয়, দুধও দেয়, বোঝাও বহন করে, দূর-দূরান্তের সফর অতি সহজে অতিক্রম করায়। গরুর গোশত খাওয়া হয়, দুধও দেয়, লাঙ্গলও চালায়। ছাগলের গোশত খাওয়া হয় এবং দুধও দেয়। এগুলোর পশমও বহু কাজে লাগে। যেমন সূরায়ে আন'আম, সূরায়ে নাহল ইত্যাদির মধ্যে এর বর্ণনা গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ এতে তোমাদের জন্যে রয়েছে বহু উপকার, তোমরা যা প্রয়োজনবোধ কর, এটা দ্বারা তা পূর্ণ করে থাকো এবং এদের উপর ও নৌযানের উপর তোমাদেরকে বহন করা হয়। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তিনি তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শনাবলী দেখিয়ে থাকেন। দুনিয়া জাহান এবং ওর প্রান্তে প্রান্তে, জগতের অণু-পরমাণুর মধ্যে এবং স্বয়ং তোমাদের নিজেদের জীবনের মধ্যে আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত বিদ্যমান রয়েছে। সঠিক কথা তো এটাই যে, তাঁর অগণিত নিয়ামত রাশির কোন একটিকেও কোন লোক প্রকৃত অর্থে অস্বীকার করতে পারে না। তারা যে হঠকারিতা ও অহংকার করছে সেটা হলো অন্য কথা।
গাফির 40:81
৭৯-৮১ নং আয়াতের তাফসীর: আন'আম অর্থাৎ উট, গরু, ছাগল ইত্যাদিকে আল্লাহ্ তা'আলা মানুষের বিভিন্ন প্রকারের উপকারের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। ওগুলো সওয়ারীর কাজে লাগে এবং কতকগুলোকে খাওয়া হয়ে থাকে। উট দ্বারা সওয়ারীর কাজ হয়, গোশতও খাওয়া হয়, দুধও দেয়, বোঝাও বহন করে, দূর-দূরান্তের সফর অতি সহজে অতিক্রম করায়। গরুর গোশত খাওয়া হয়, দুধও দেয়, লাঙ্গলও চালায়। ছাগলের গোশত খাওয়া হয় এবং দুধও দেয়। এগুলোর পশমও বহু কাজে লাগে। যেমন সূরায়ে আন'আম, সূরায়ে নাহল ইত্যাদির মধ্যে এর বর্ণনা গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ এতে তোমাদের জন্যে রয়েছে বহু উপকার, তোমরা যা প্রয়োজনবোধ কর, এটা দ্বারা তা পূর্ণ করে থাকো এবং এদের উপর ও নৌযানের উপর তোমাদেরকে বহন করা হয়। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তিনি তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শনাবলী দেখিয়ে থাকেন। দুনিয়া জাহান এবং ওর প্রান্তে প্রান্তে, জগতের অণু-পরমাণুর মধ্যে এবং স্বয়ং তোমাদের নিজেদের জীবনের মধ্যে আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত বিদ্যমান রয়েছে। সঠিক কথা তো এটাই যে, তাঁর অগণিত নিয়ামত রাশির কোন একটিকেও কোন লোক প্রকৃত অর্থে অস্বীকার করতে পারে না। তারা যে হঠকারিতা ও অহংকার করছে সেটা হলো অন্য কথা।
গাফির 40:82
৮২-৮৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী উম্মতদের খবর দিচ্ছেন যারা ইতিপূর্বে তাদের রাসূলদেরকে অবিশ্বাস করেছিল। সাথে সাথে তিনি তাদের পরিণামে শাস্তি ভোগ করার কথাও বলেছেন। অথচ তারা এদের চাইতে বহুগুণে শক্তিশালী ছিল। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণ করেছিল এবং তারা ছিল প্রচুর ধন-মালের অধিকারী। কিন্তু এগুলোর কোন কিছুই তাদের কোন উপকারে আসেনি। এগুলো তাদের শাস্তি না পেরেছে দূর করতে এবং না পেরেছে হ্রাস করতে। তারা ধ্বংস হওয়ারই যোগ্য ছিল। কেননা, তাদের কাছে যখন রাসূলগণ সুস্পষ্ট দলীলসমূহ সহ আগমন করেছিলেন এবং তাদের কাছে এনেছিলেন মু'জিযা ও পবিত্র তা’লীম, তখন তারা তাদের দিকে চোখ তুলেও দেখেনি, গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং রাসূলদের শিক্ষার প্রতি তারা ঘৃণা প্রদর্শন করেছিল। তারা বলেছিল যে, তারাই বড় আলেম বা বিদ্বান। তাদের মধ্যে বিদ্যার কোন অভাব নেই। হিসাব-নিকাশ এবং শাস্তি ও সওয়াব এগুলো কিছুই নয়। এভাবে নিজেদের অজ্ঞতাকে তারা জ্ঞান মনে করে নিয়েছিল। অতঃপর তাদের উপর এমন শাস্তি এসে পড়ে যা তারা মিথ্যা বলে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে উড়িয়ে দিতো। ঐ শাস্তি তাদেরকে তচনচ করে দেয়। তারা সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহর শাস্তি আসতে দেখে তারা ঈমান আনয়নের কথা স্বীকার করে এবং একত্ববাদে বিশ্বাসী হয় এবং গায়রুল্লাহকে স্পষ্টভাবে অস্বীকারও করে। কিন্তু ঐ সময়ের তাওবা, ঈমান আনয়ন এবং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ সবই বৃথা হয়। ফিরাউনও সমুদ্রে নিমজ্জিত হবার সময় বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি ঈমান আনলাম যে, তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই যার উপর বানু ইসরাঈল ঈমান এনেছে এবং আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হলাম।" (১০:৯০) তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এখন? অথচ ইতিপূর্বে তুমি অবাধ্যাচরণ করে এসেছে এবং তুমি বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।” (১০:৯১) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তার ঈমান কবুল করলেন না। কেননা, তার নবী হযরত মূসা (আঃ) তাদের বিরুদ্ধে যে বদ দু'আ করেছিলেন তা তিনি ককূল করে নিয়েছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউন ও তার কওমের বিরুদ্ধে বদ দুআ করেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের অন্তরকে কঠিন করে দিন, সুতরাং তারা যেন ঈমান আনয়ন করে যে পর্যন্ত না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে।" (১০:৮৮) অনুরূপভাবে এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করলো তখন তাদের ঈমান তাদের কোন উপকারে আসলো না। আল্লাহর এই বিধান পূর্ব হতেই চলে আসছে।” অর্থাৎ এটাই আল্লাহর বিধান যে, যে কেউই শাস্তি প্রত্যক্ষ করার পর তাওবা করবে তার তাওবা গৃহীত হবে না। এজন্যেই হাদীসে এসেছেঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবা কবূল করে থাকেন যে পর্যন্ত না তার ঘড়ঘড়ি শুরু হয়ে যায়। (অর্থাৎ যে পর্যন্ত না প্রাণ কষ্ঠাগত হয়)।” যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হয়ে যায় তখন তার তাওবা কবূল হয় না। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “সেই ক্ষেত্রে কাফিররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
গাফির 40:83
৮২-৮৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী উম্মতদের খবর দিচ্ছেন যারা ইতিপূর্বে তাদের রাসূলদেরকে অবিশ্বাস করেছিল। সাথে সাথে তিনি তাদের পরিণামে শাস্তি ভোগ করার কথাও বলেছেন। অথচ তারা এদের চাইতে বহুগুণে শক্তিশালী ছিল। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণ করেছিল এবং তারা ছিল প্রচুর ধন-মালের অধিকারী। কিন্তু এগুলোর কোন কিছুই তাদের কোন উপকারে আসেনি। এগুলো তাদের শাস্তি না পেরেছে দূর করতে এবং না পেরেছে হ্রাস করতে। তারা ধ্বংস হওয়ারই যোগ্য ছিল। কেননা, তাদের কাছে যখন রাসূলগণ সুস্পষ্ট দলীলসমূহ সহ আগমন করেছিলেন এবং তাদের কাছে এনেছিলেন মু'জিযা ও পবিত্র তা’লীম, তখন তারা তাদের দিকে চোখ তুলেও দেখেনি, গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং রাসূলদের শিক্ষার প্রতি তারা ঘৃণা প্রদর্শন করেছিল। তারা বলেছিল যে, তারাই বড় আলেম বা বিদ্বান। তাদের মধ্যে বিদ্যার কোন অভাব নেই। হিসাব-নিকাশ এবং শাস্তি ও সওয়াব এগুলো কিছুই নয়। এভাবে নিজেদের অজ্ঞতাকে তারা জ্ঞান মনে করে নিয়েছিল। অতঃপর তাদের উপর এমন শাস্তি এসে পড়ে যা তারা মিথ্যা বলে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে উড়িয়ে দিতো। ঐ শাস্তি তাদেরকে তচনচ করে দেয়। তারা সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহর শাস্তি আসতে দেখে তারা ঈমান আনয়নের কথা স্বীকার করে এবং একত্ববাদে বিশ্বাসী হয় এবং গায়রুল্লাহকে স্পষ্টভাবে অস্বীকারও করে। কিন্তু ঐ সময়ের তাওবা, ঈমান আনয়ন এবং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ সবই বৃথা হয়। ফিরাউনও সমুদ্রে নিমজ্জিত হবার সময় বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি ঈমান আনলাম যে, তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই যার উপর বানু ইসরাঈল ঈমান এনেছে এবং আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হলাম।" (১০:৯০) তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এখন? অথচ ইতিপূর্বে তুমি অবাধ্যাচরণ করে এসেছে এবং তুমি বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।” (১০:৯১) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তার ঈমান কবুল করলেন না। কেননা, তার নবী হযরত মূসা (আঃ) তাদের বিরুদ্ধে যে বদ দু'আ করেছিলেন তা তিনি ককূল করে নিয়েছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউন ও তার কওমের বিরুদ্ধে বদ দুআ করেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের অন্তরকে কঠিন করে দিন, সুতরাং তারা যেন ঈমান আনয়ন করে যে পর্যন্ত না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে।" (১০:৮৮) অনুরূপভাবে এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করলো তখন তাদের ঈমান তাদের কোন উপকারে আসলো না। আল্লাহর এই বিধান পূর্ব হতেই চলে আসছে।” অর্থাৎ এটাই আল্লাহর বিধান যে, যে কেউই শাস্তি প্রত্যক্ষ করার পর তাওবা করবে তার তাওবা গৃহীত হবে না। এজন্যেই হাদীসে এসেছেঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবা কবূল করে থাকেন যে পর্যন্ত না তার ঘড়ঘড়ি শুরু হয়ে যায়। (অর্থাৎ যে পর্যন্ত না প্রাণ কষ্ঠাগত হয়)।” যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হয়ে যায় তখন তার তাওবা কবূল হয় না। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “সেই ক্ষেত্রে কাফিররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
গাফির 40:84
৮২-৮৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী উম্মতদের খবর দিচ্ছেন যারা ইতিপূর্বে তাদের রাসূলদেরকে অবিশ্বাস করেছিল। সাথে সাথে তিনি তাদের পরিণামে শাস্তি ভোগ করার কথাও বলেছেন। অথচ তারা এদের চাইতে বহুগুণে শক্তিশালী ছিল। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণ করেছিল এবং তারা ছিল প্রচুর ধন-মালের অধিকারী। কিন্তু এগুলোর কোন কিছুই তাদের কোন উপকারে আসেনি। এগুলো তাদের শাস্তি না পেরেছে দূর করতে এবং না পেরেছে হ্রাস করতে। তারা ধ্বংস হওয়ারই যোগ্য ছিল। কেননা, তাদের কাছে যখন রাসূলগণ সুস্পষ্ট দলীলসমূহ সহ আগমন করেছিলেন এবং তাদের কাছে এনেছিলেন মু'জিযা ও পবিত্র তা’লীম, তখন তারা তাদের দিকে চোখ তুলেও দেখেনি, গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং রাসূলদের শিক্ষার প্রতি তারা ঘৃণা প্রদর্শন করেছিল। তারা বলেছিল যে, তারাই বড় আলেম বা বিদ্বান। তাদের মধ্যে বিদ্যার কোন অভাব নেই। হিসাব-নিকাশ এবং শাস্তি ও সওয়াব এগুলো কিছুই নয়। এভাবে নিজেদের অজ্ঞতাকে তারা জ্ঞান মনে করে নিয়েছিল। অতঃপর তাদের উপর এমন শাস্তি এসে পড়ে যা তারা মিথ্যা বলে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে উড়িয়ে দিতো। ঐ শাস্তি তাদেরকে তচনচ করে দেয়। তারা সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহর শাস্তি আসতে দেখে তারা ঈমান আনয়নের কথা স্বীকার করে এবং একত্ববাদে বিশ্বাসী হয় এবং গায়রুল্লাহকে স্পষ্টভাবে অস্বীকারও করে। কিন্তু ঐ সময়ের তাওবা, ঈমান আনয়ন এবং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ সবই বৃথা হয়। ফিরাউনও সমুদ্রে নিমজ্জিত হবার সময় বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি ঈমান আনলাম যে, তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই যার উপর বানু ইসরাঈল ঈমান এনেছে এবং আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হলাম।" (১০:৯০) তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এখন? অথচ ইতিপূর্বে তুমি অবাধ্যাচরণ করে এসেছে এবং তুমি বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।” (১০:৯১) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তার ঈমান কবুল করলেন না। কেননা, তার নবী হযরত মূসা (আঃ) তাদের বিরুদ্ধে যে বদ দু'আ করেছিলেন তা তিনি ককূল করে নিয়েছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউন ও তার কওমের বিরুদ্ধে বদ দুআ করেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের অন্তরকে কঠিন করে দিন, সুতরাং তারা যেন ঈমান আনয়ন করে যে পর্যন্ত না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে।" (১০:৮৮) অনুরূপভাবে এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করলো তখন তাদের ঈমান তাদের কোন উপকারে আসলো না। আল্লাহর এই বিধান পূর্ব হতেই চলে আসছে।” অর্থাৎ এটাই আল্লাহর বিধান যে, যে কেউই শাস্তি প্রত্যক্ষ করার পর তাওবা করবে তার তাওবা গৃহীত হবে না। এজন্যেই হাদীসে এসেছেঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবা কবূল করে থাকেন যে পর্যন্ত না তার ঘড়ঘড়ি শুরু হয়ে যায়। (অর্থাৎ যে পর্যন্ত না প্রাণ কষ্ঠাগত হয়)।” যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হয়ে যায় তখন তার তাওবা কবূল হয় না। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “সেই ক্ষেত্রে কাফিররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
গাফির 40:85
৮২-৮৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী উম্মতদের খবর দিচ্ছেন যারা ইতিপূর্বে তাদের রাসূলদেরকে অবিশ্বাস করেছিল। সাথে সাথে তিনি তাদের পরিণামে শাস্তি ভোগ করার কথাও বলেছেন। অথচ তারা এদের চাইতে বহুগুণে শক্তিশালী ছিল। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণ করেছিল এবং তারা ছিল প্রচুর ধন-মালের অধিকারী। কিন্তু এগুলোর কোন কিছুই তাদের কোন উপকারে আসেনি। এগুলো তাদের শাস্তি না পেরেছে দূর করতে এবং না পেরেছে হ্রাস করতে। তারা ধ্বংস হওয়ারই যোগ্য ছিল। কেননা, তাদের কাছে যখন রাসূলগণ সুস্পষ্ট দলীলসমূহ সহ আগমন করেছিলেন এবং তাদের কাছে এনেছিলেন মু'জিযা ও পবিত্র তা’লীম, তখন তারা তাদের দিকে চোখ তুলেও দেখেনি, গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং রাসূলদের শিক্ষার প্রতি তারা ঘৃণা প্রদর্শন করেছিল। তারা বলেছিল যে, তারাই বড় আলেম বা বিদ্বান। তাদের মধ্যে বিদ্যার কোন অভাব নেই। হিসাব-নিকাশ এবং শাস্তি ও সওয়াব এগুলো কিছুই নয়। এভাবে নিজেদের অজ্ঞতাকে তারা জ্ঞান মনে করে নিয়েছিল। অতঃপর তাদের উপর এমন শাস্তি এসে পড়ে যা তারা মিথ্যা বলে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে উড়িয়ে দিতো। ঐ শাস্তি তাদেরকে তচনচ করে দেয়। তারা সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহর শাস্তি আসতে দেখে তারা ঈমান আনয়নের কথা স্বীকার করে এবং একত্ববাদে বিশ্বাসী হয় এবং গায়রুল্লাহকে স্পষ্টভাবে অস্বীকারও করে। কিন্তু ঐ সময়ের তাওবা, ঈমান আনয়ন এবং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ সবই বৃথা হয়। ফিরাউনও সমুদ্রে নিমজ্জিত হবার সময় বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি ঈমান আনলাম যে, তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই যার উপর বানু ইসরাঈল ঈমান এনেছে এবং আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হলাম।" (১০:৯০) তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এখন? অথচ ইতিপূর্বে তুমি অবাধ্যাচরণ করে এসেছে এবং তুমি বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।” (১০:৯১) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তার ঈমান কবুল করলেন না। কেননা, তার নবী হযরত মূসা (আঃ) তাদের বিরুদ্ধে যে বদ দু'আ করেছিলেন তা তিনি ককূল করে নিয়েছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউন ও তার কওমের বিরুদ্ধে বদ দুআ করেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের অন্তরকে কঠিন করে দিন, সুতরাং তারা যেন ঈমান আনয়ন করে যে পর্যন্ত না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে।" (১০:৮৮) অনুরূপভাবে এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করলো তখন তাদের ঈমান তাদের কোন উপকারে আসলো না। আল্লাহর এই বিধান পূর্ব হতেই চলে আসছে।” অর্থাৎ এটাই আল্লাহর বিধান যে, যে কেউই শাস্তি প্রত্যক্ষ করার পর তাওবা করবে তার তাওবা গৃহীত হবে না। এজন্যেই হাদীসে এসেছেঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবা কবূল করে থাকেন যে পর্যন্ত না তার ঘড়ঘড়ি শুরু হয়ে যায়। (অর্থাৎ যে পর্যন্ত না প্রাণ কষ্ঠাগত হয়)।” যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হয়ে যায় তখন তার তাওবা কবূল হয় না। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “সেই ক্ষেত্রে কাফিররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
ফুসসিলাত 41:1
১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, আরবী ভাষার এই কুরআন পরম দয়ালু আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল- এটা (আল-কুরআন) তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে পবিত্র আত্মা (হযরত জিবরাঈল আঃ) সত্যের সাথে অবতীর্ণ করেছেন।”(১৬:১০২) আর এ জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। এটা বিশ্বস্ত আত্মা (হযরত জিবরাঈল আঃ) তোমার অন্তরে অবতীর্ণ করেছে যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।”(২৬:১৯২-১৯৪) মহান আল্লাহ বলেনঃ এর আয়াতগুলো বিশদভাবে বিবৃত। এর অর্থ প্রকাশমান এবং আহকাম মযবূত। এর শব্দগুলোও স্পষ্ট এবং পাঠ করতে সহজ। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) (১০:১) অর্থাৎ “এটা এমন কিতাব যার আয়াতসমূহ দৃঢ় ও সুরক্ষিত, অতঃপর ওগুলো বিশদভাবে বিবৃত, এটা হচ্ছে ঐ আল্লাহর কালাম যিনি বিজ্ঞানময় এবং যিনি সবকিছুরই খবর রাখেন। অর্থাৎ এটা শব্দ ও অর্থের দিক দিয়ে অলৌকিক। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওর কাছে ওর সামনে এবং ওর পিছন হতে বাতিল আসতে পারে না। এটা বিজ্ঞানময় প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত।” (৪১:৪২) আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্যে।” অর্থাৎ এই বর্ণনা ও বিশদ ব্যাখ্যা জ্ঞানী সম্প্রদায়ই অনুধাবন করে থাকে। এই কুরআন একদিকে মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় এবং অপরদিকে কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শন করে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তাদের অধিকাংশই বিমুখ হয়েছে। সুতরাং তারা শুনবে না। অর্থাৎ কুরআন কারীমের এমন গুণাবলী থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ কুরায়েশ এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারা বলেঃ তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহ্বান করছে সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণ-আচ্ছাদিত এবং আমাদের কর্ণে আছে বধিরতা, আর তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে অন্তরাল। সুতরাং তুমি যা বলছে তার কিছুই আমাদের বোধগম্য হয় না। সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর এবং আমরা আমাদের কাজ করি। অর্থাৎ তোমার পন্থায় তুমি কাজ করে যাও এবং আমরা আমাদের পন্থায় কাজ করে যাই। আমরা কখনো আমাদের নীতি পরিত্যাগ করে তোমার নীতি গ্রহণ করতে পারি না।হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা কুরায়েশরা সমবেত হয়ে পরস্পর পরামর্শ করলোঃ “যে ব্যক্তি যাদু ও কাব্য কবিতায় সবচেয়ে বেশি পারদর্শী, চল আমরা তাকে নিয়ে ঐ লোকটির নিকট অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করি, যে আমাদের দলের মধ্যে ভাঙ্গন ধরিয়ে দিয়েছে এবং আমাদের সমস্ত কাজের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছে। ও আমাদের দ্বীনের উপর দোষারোপ করতে শুরু করেছে। একে যেন ঐ ব্যক্তি বিভিন্ন প্রশ্ন করে নিরুত্তর করে দিতে পারে। তারা সবাই বললোঃ “আমাদের মধ্যে উবা ইবনে রাবীআ' ছাড়া এরূপ লোক আর কেউ নেই। সুতরাং তারা উবার নিকট গেল এবং তার সামনে তাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করলো। সে তার কওমের কথা মেনে নিলো এবং প্রস্তুতি নিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করলো। অতঃপর সে তাকে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আচ্ছা, বলতোঃ তুমি ভাল, না আবদুল্লাহ (তার পিতা) ভাল?” তিনি কোন উত্তর দিলেন না। সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “তুমি ভাল, না (তোমার দাদা) আবদুল মুত্তালিব ভাল?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবারও নীরব থাকলেন। তখন সে বললোঃ “দেখো, তুমি যদি তোমার বাপ-দাদাকে ভাল মনে করে থাকো তবে জেনে নাও যে, তারা ঐ সব মা'বুদেরই পূজা করতেন যেগুলোর পূজা আমরা করে থাকি, আর তুমি সেগুলোর উপর দোষারোপ করে থাকো। আর যদি তুমি নিজেকে তাঁদের চেয়ে ভাল মনে করে থাকো তবে তুমি তোমার কথা বলঃ আমরা শুনি। আল্লাহর শপথ! দুনিয়ায় কোন কওমের জন্যে তোমার চেয়ে বেশী ক্ষতিকারক মানুষ সৃষ্ট হয়নি। তুমি আমাদের জামাআতের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরিয়েছো। তুমি আমাদের দ্বীন সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করেছো। সারা আরবের মধ্যে তুমি আমাদের বদনাম করেছে এবং আমাদেরকে অপদস্থ করেছে। এখন তো সব জায়গাতেই এই আলোচনা চলছে যে, কুরায়েশদের মধ্যে একজন যাদুকর রয়েছে, একজন গণক রয়েছে। এখন শুধু এটুকুই বাকী রয়েছে যে, আমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি এবং একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করি। এই ভাবে আমাদেরকে পরস্পরে লড়িয়ে দিয়ে তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করে দিতে চাও। শুন, তোমার ধন-মালের প্রতি যদি লোভ থাকে তবে বল, আমরা সবাই মিলে তোমাকে এমন ধন-দৌলতের মালিক করে দিবো যে, সারা আরবে তোমার চেয়ে বড় ধনী আর কেউ থাকবে না। আর যদি তুমি স্ত্রী লোকদের সাথে কাম-বাসনা চরিতার্থ করতে চাও তবে বল, আমাদের মধ্যে যার মেয়ে তোমার পছন্দ হয়, আমরা একটা কেন, তোমার দশটা বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তোমার কথা বলা শেষ হয়েছে কি?” উত্তরে সে বললোঃ “হ্যা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ (আরবী) অবশেষে তিনি নিম্নের আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তবুও তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বল- আমি তো তোমাদেরকে সতর্ক করছি এক ধ্বংসকর শাস্তির, আ’দ ও সামূদের শাস্তির অনুরূপ।” এটুকু শুনেই উৎবা বলে উঠলোঃ “আচ্ছা, থামো। তোমার কাছে তাহলে এ ছাড়া আর কিছুই নেই?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “না।” তখন সে সেখান হতে চলে গেল। কুরায়েশরা তো তার জন্যে অধীরভাবে অপেক্ষা করছিল। তাদের কাছে সে পৌঁছা মাত্রই তারা তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ব্যাপার কি, তাড়াতাড়ি বল।” সে উত্তর দিলোঃ “দেখো, তোমরা সবাই মিলে তাকে যত কিছু বলতে পারতে আমি একাই তার সবই বলেছি। তারা জিজ্ঞেস করলোঃ “সে তোমার কথার উত্তরে কিছু বলেছে কি?” উবা জবাবে বললোঃ “হ্যা, সে জবাব দিয়েছে বটে, কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমি তার কথার একটি অক্ষরও বুঝতে পারিনি। শুধু এটুকু বুঝেছি যে, সে আমাদেরকে আসমানী আযাব হতে সতর্ক করছে যে আযাব আ’দ ও সামূদ জাতির উপর আপতিত হয়েছিল। তারা তখন তাকে বললোঃ তোমার অকল্যাণ হোক! একটি লোক তোমার সাথে তোমার নিজেরই ভাষা আরবীতে কথা বলছে অথচ তুমি বলছো যে, তুমি তার কথার একটি অক্ষরও বুঝতে পারনি?” উৎবা উত্তরে বললোঃ “আমি সত্যিই বলছি যে, শাস্তির বর্ণনা ছাড়া আমি আর কিছুই বুঝিনি।” (এটা ইমাম আব ইবনে হুমায়েদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)ইমাম বাগাভীও (রঃ) এ রিওয়াইয়াতটি আনয়ন করেছেন, তাতে এও রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়াতগুলো পাঠ করতে করতে ... (আরবী)-এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন তখন উবা তাঁর পবিত্র মুখের উপর হাত রেখে দিলো এবং তাঁকে আল্লাহর কসম দিতে ও আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা স্মরণ করাতে লাগলো। অতঃপর সে সেখান হতে সরাসরি বাড়ীতে ফিরে গেল এবং বাড়ীতেই থাকতে লাগলো ও কুরায়েশদের সমাবেশে উঠাবসা ও যাতায়াত পরিত্যাগ করলো। এ দেখে আবু জেহেল কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করে বললোঃ “হে কুরায়েশদের দল! আমার ধারণা যে, উত্বও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দিকে ঝুঁকে পড়েছে এবং তথাকার পানাহারে মজে গেছে। সে তো অভাবীও ছিল। চলো, আমরা তার কাছে যাই।” অতঃপর তারা তার কাছে গমন করলো। আবু জেহেল তাকে বললোঃ “তুমি যে আমাদের কাছে যাতায়াত ছেড়ে দিয়েছো এর কারণ কি? আমার মনে হয় এর কারণ শুধু একটিই। তা এই যে, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দস্তরখানা তোমার পছন্দ হয়ে গেছে এবং তুমিও তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। অভাব খুবই খারাপ জিনিস। আমি মনে করছি যে, আমরা পরস্পরের মধ্যে চাঁদা উঠিয়ে তোমার আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল করে দিবো, যাতে তুমি এই বিপদ ও লাঞ্ছনা হতে মুক্তি পেতে পারো এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ও তার নতুন মাযহাবের তোমার কোন প্রয়োজন না হয়। তার একথা শুনে উবা ভীষণ রাগান্বিত হয় এবং বলে ওঠেঃ “মুহাম্মাদ (সঃ)-এর আমার কি প্রয়োজন? আল্লাহর শপথ! আমি তার সাথে আর কখনো কথা বলতে যাবো না। তুমি আমার সম্পর্কে এমন অপমানকর মন্তব্য করলে? অথচ তুমি তো জান যে, কুরায়েশদের মধ্যে আমার চেয়ে বড় ধনী আর কেউ নেই! ব্যাপার এই যে, তোমাদের সবারই কথায় আমি তার কাছে গিয়েছিলাম এবং সব ঘটনা খুলে বলেছিলাম। আমার কথার জবাবে সে যে কালাম পাঠ করেছে, আল্লাহর কসম! তা কবিতা নয়, গণকের কথা নয় এবং যাদু ইত্যাদিও নয়। যখন সে পড়তে পড়তে ... (আরবী) পর্যন্ত পৌঁছে তখন আমি তার মুখে হাত রেখে দিই এবং তাকে আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে থেমে যেতে বলি। আমার ভয় হয় যে, না জানি হয়তো তখনই আমার উপর ঐ শাস্তি আপতিত হয় যে শাস্তি আ’দ ও সামূদ সম্প্রদায়ের উপর আপতিত হয়েছিল। আর এটা সর্বজন বিদিত যে, মুহাম্মাদ (সঃ) মিথ্যাবাদী নয়।” সীরাতে আবি ইসহাক গ্রন্থে এ ঘটনাটি অন্য ধারায় রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, একদা কুরয়েশরা এক জায়গায় একত্রিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) খানায়ে কা’বার এক প্রান্তে বসেছিলেন। উত্বা কুরায়েশদেরকে বললোঃ “তোমাদের পরামর্শ হলে আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করবো। তাকে বুঝাবো এবং কিছু লোভ দেখাবো। যদি সে লোভের বশবর্তী হয়ে কিছু চেয়ে বসে তবে আমরা তাকে তা দিয়ে দিবো এবং তার এ কাজ হতে তাকে বিরত রাখবো।” এটা হলো ঐ সময়ের ঘটনা, যখন হযরত হামযা (রাঃ) মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন এবং মুসলমানদের সংখ্যা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছিল ও দিন দিন বাড়তেই ছিল। উবার কথায় কুরায়েশরা সম্মত হয়ে যায়। সুতরাং সে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট এসে বলতে শুরু করেঃ “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি সম্ভ্রান্ত বংশের লোক। তুমি আমাদেরই একজন। তুমি হলে আমাদের চোখের তারা এবং আমাদের কলিজার টুকরা। বড়ই দুঃখের বিষয় যে, তুমি তোমার কওমের কাছে একটি নতুন বিস্ময়কর জিনিস আনয়ন করেছে এবং তাদের দলে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে দিয়েছে। তাদের জ্ঞানীদেরকে নির্বোধ বলছে, তাদের মা’বৃদদের প্রতি দোষারোপ করছে এবং তাদের দ্বীনকে খারাপ বলতে শুরু করেছে। আর তাদের বুড়োদেরকে কাফির বলছো। এখন জেনে রেখো যে, আজ আমি তোমার কাছে একটা শেষ ফায়সালার জন্যে এসেছি। তোমার কাছে আমি কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করছি। এগুলোর মধ্যে যেটা ইচ্ছা তুমি গ্রহণ কর এবং আল্লাহর ওয়াস্তে এই হাঙ্গামার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দাও।” তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেন:“তুমি যা বলতে চাও বল, আমি শুনছি।” সে বলতে শুরু করলোঃ “দেখো, তোমার এই চাল দ্বারা যদি মাল জমা করার ইচ্ছা থাকে তবে আমরা সবাই মিলে তোমার জন্যে এতো বেশী মাল জমা করে দিচ্ছি যে, সমস্ত কুরায়েশের মধ্যে তোমার চেয়ে বড় মালদার আর কেউ হবে না। আর যদি নেতৃত্বের ইচ্ছা করে থাকো তবে আমরা সবাই মিলে তোমার নেতৃত্ব মেনে নিচ্ছি। যদি তোমার বাদশাহ্ হওয়ার ইচ্ছা থাকে তবে সারা রাজ্য আমরা তোমাকে সমর্পণ করছি এবং আমরা সবাই তোমার প্রজা হয়ে যাচ্ছি। আর যদি তোমাকে জ্বিনে ধরে থাকে তবে আমরা আমাদের মাল খরচ করে বড় বড় ডাক্তার ও ঝাড়-ফুককারীদের ডেকে তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি। অনেক সময় এমন ঘটে থাকে যে, অনুগত জ্বিন তার আমলকারীর উপর বিজয়ী হয়ে যায়। তখন এই ভাবে তার থেকে মুক্তি লাভ করতে হয়।”অতঃপর উত্বা নীরব হলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তোমার কথা বলা শেষ হয়েছে কি?” সে জবাব দিলোঃ “হ্যা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাহলে এখন আমার কথা শুন।” সে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিলো। তিনি (আরবী) বলে এই সূরাটি তিলাওয়াত শুরু করলেন এবং উত্বা আদবের সাথে শুনতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত তিনি সিজদার আয়াত পাঠ করলেন এবং সিজদা করলেন। অতঃপর বললেনঃ “হে আবুল ওয়ালীদ।আমার যা বলার ছিল তা আমি বললাম। এখন তোমার মনে যা হয় তাই তুমি কর।” উবা সেখান হতে উঠে তার সাথীদের কাছে চলে গেল। তারা তার চেহারা দেখেই বলতে লাগলো যে, উহ্বার অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ব্যাপার কি?” উত্তরে সে বললোঃ “আল্লাহর শপথ! আমি এমন কথা শুনেছি যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। কসম আল্লাহর! ওটা যাদুও নয়, কবিতাও নয় এবং গণকদের কথাও নয়। হে কুরায়েশদের দল! শুনো, তোমরা আমার কথা মেনে নাও। তাকে তার ধারণার উপর ছেড়ে দাও। তার আনুকূল্যও করো না এবং বিরোধিতাও করো না। সে যা কিছু বলছে ও দাবী করছে সে ব্যাপারে সারা আরব তার বিরোধী হয়ে গেছে। তারা তার বিরুদ্ধে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। তারা যদি তার উপর বিজয় লাভ করে তবে তো। সহজেই তোমরা তার থেকে পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। আর যদি সে-ই তাদের উপর। বিজয়ী হয়ে যায় তবে তার রাজ্যকে তোমাদেরই রাজ্য বলা হবে এবং তার মর্যাদা হবে তোমাদেরই মর্যাদা। আর তোমরাই হবে তার নিকট সবেচেয়ে বেশী গৃহীত।” তার এই কথা শুনে কুরায়েশরা বললোঃ “হে আবুল ওয়ালীদ! আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (সঃ) তোমার উপর যাদু করে ফেলেছে।” সে জবাব দিলোঃ “দেখো, আমার অভিমত আমি তোমাদের নিকট পেশ করে দিলাম। এখন তোমাদের যা ইচ্ছা হয় তা-ই কর।”
ফুসসিলাত 41:2
১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, আরবী ভাষার এই কুরআন পরম দয়ালু আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল- এটা (আল-কুরআন) তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে পবিত্র আত্মা (হযরত জিবরাঈল আঃ) সত্যের সাথে অবতীর্ণ করেছেন।”(১৬:১০২) আর এ জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। এটা বিশ্বস্ত আত্মা (হযরত জিবরাঈল আঃ) তোমার অন্তরে অবতীর্ণ করেছে যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।”(২৬:১৯২-১৯৪) মহান আল্লাহ বলেনঃ এর আয়াতগুলো বিশদভাবে বিবৃত। এর অর্থ প্রকাশমান এবং আহকাম মযবূত। এর শব্দগুলোও স্পষ্ট এবং পাঠ করতে সহজ। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) (১০:১) অর্থাৎ “এটা এমন কিতাব যার আয়াতসমূহ দৃঢ় ও সুরক্ষিত, অতঃপর ওগুলো বিশদভাবে বিবৃত, এটা হচ্ছে ঐ আল্লাহর কালাম যিনি বিজ্ঞানময় এবং যিনি সবকিছুরই খবর রাখেন। অর্থাৎ এটা শব্দ ও অর্থের দিক দিয়ে অলৌকিক। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওর কাছে ওর সামনে এবং ওর পিছন হতে বাতিল আসতে পারে না। এটা বিজ্ঞানময় প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত।” (৪১:৪২) আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্যে।” অর্থাৎ এই বর্ণনা ও বিশদ ব্যাখ্যা জ্ঞানী সম্প্রদায়ই অনুধাবন করে থাকে। এই কুরআন একদিকে মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় এবং অপরদিকে কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শন করে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তাদের অধিকাংশই বিমুখ হয়েছে। সুতরাং তারা শুনবে না। অর্থাৎ কুরআন কারীমের এমন গুণাবলী থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ কুরায়েশ এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারা বলেঃ তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহ্বান করছে সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণ-আচ্ছাদিত এবং আমাদের কর্ণে আছে বধিরতা, আর তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে অন্তরাল। সুতরাং তুমি যা বলছে তার কিছুই আমাদের বোধগম্য হয় না। সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর এবং আমরা আমাদের কাজ করি। অর্থাৎ তোমার পন্থায় তুমি কাজ করে যাও এবং আমরা আমাদের পন্থায় কাজ করে যাই। আমরা কখনো আমাদের নীতি পরিত্যাগ করে তোমার নীতি গ্রহণ করতে পারি না।হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা কুরায়েশরা সমবেত হয়ে পরস্পর পরামর্শ করলোঃ “যে ব্যক্তি যাদু ও কাব্য কবিতায় সবচেয়ে বেশি পারদর্শী, চল আমরা তাকে নিয়ে ঐ লোকটির নিকট অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করি, যে আমাদের দলের মধ্যে ভাঙ্গন ধরিয়ে দিয়েছে এবং আমাদের সমস্ত কাজের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছে। ও আমাদের দ্বীনের উপর দোষারোপ করতে শুরু করেছে। একে যেন ঐ ব্যক্তি বিভিন্ন প্রশ্ন করে নিরুত্তর করে দিতে পারে। তারা সবাই বললোঃ “আমাদের মধ্যে উবা ইবনে রাবীআ' ছাড়া এরূপ লোক আর কেউ নেই। সুতরাং তারা উবার নিকট গেল এবং তার সামনে তাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করলো। সে তার কওমের কথা মেনে নিলো এবং প্রস্তুতি নিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করলো। অতঃপর সে তাকে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আচ্ছা, বলতোঃ তুমি ভাল, না আবদুল্লাহ (তার পিতা) ভাল?” তিনি কোন উত্তর দিলেন না। সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “তুমি ভাল, না (তোমার দাদা) আবদুল মুত্তালিব ভাল?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবারও নীরব থাকলেন। তখন সে বললোঃ “দেখো, তুমি যদি তোমার বাপ-দাদাকে ভাল মনে করে থাকো তবে জেনে নাও যে, তারা ঐ সব মা'বুদেরই পূজা করতেন যেগুলোর পূজা আমরা করে থাকি, আর তুমি সেগুলোর উপর দোষারোপ করে থাকো। আর যদি তুমি নিজেকে তাঁদের চেয়ে ভাল মনে করে থাকো তবে তুমি তোমার কথা বলঃ আমরা শুনি। আল্লাহর শপথ! দুনিয়ায় কোন কওমের জন্যে তোমার চেয়ে বেশী ক্ষতিকারক মানুষ সৃষ্ট হয়নি। তুমি আমাদের জামাআতের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরিয়েছো। তুমি আমাদের দ্বীন সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করেছো। সারা আরবের মধ্যে তুমি আমাদের বদনাম করেছে এবং আমাদেরকে অপদস্থ করেছে। এখন তো সব জায়গাতেই এই আলোচনা চলছে যে, কুরায়েশদের মধ্যে একজন যাদুকর রয়েছে, একজন গণক রয়েছে। এখন শুধু এটুকুই বাকী রয়েছে যে, আমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি এবং একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করি। এই ভাবে আমাদেরকে পরস্পরে লড়িয়ে দিয়ে তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করে দিতে চাও। শুন, তোমার ধন-মালের প্রতি যদি লোভ থাকে তবে বল, আমরা সবাই মিলে তোমাকে এমন ধন-দৌলতের মালিক করে দিবো যে, সারা আরবে তোমার চেয়ে বড় ধনী আর কেউ থাকবে না। আর যদি তুমি স্ত্রী লোকদের সাথে কাম-বাসনা চরিতার্থ করতে চাও তবে বল, আমাদের মধ্যে যার মেয়ে তোমার পছন্দ হয়, আমরা একটা কেন, তোমার দশটা বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তোমার কথা বলা শেষ হয়েছে কি?” উত্তরে সে বললোঃ “হ্যা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ (আরবী) অবশেষে তিনি নিম্নের আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তবুও তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বল- আমি তো তোমাদেরকে সতর্ক করছি এক ধ্বংসকর শাস্তির, আ’দ ও সামূদের শাস্তির অনুরূপ।” এটুকু শুনেই উৎবা বলে উঠলোঃ “আচ্ছা, থামো। তোমার কাছে তাহলে এ ছাড়া আর কিছুই নেই?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “না।” তখন সে সেখান হতে চলে গেল। কুরায়েশরা তো তার জন্যে অধীরভাবে অপেক্ষা করছিল। তাদের কাছে সে পৌঁছা মাত্রই তারা তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ব্যাপার কি, তাড়াতাড়ি বল।” সে উত্তর দিলোঃ “দেখো, তোমরা সবাই মিলে তাকে যত কিছু বলতে পারতে আমি একাই তার সবই বলেছি। তারা জিজ্ঞেস করলোঃ “সে তোমার কথার উত্তরে কিছু বলেছে কি?” উবা জবাবে বললোঃ “হ্যা, সে জবাব দিয়েছে বটে, কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমি তার কথার একটি অক্ষরও বুঝতে পারিনি। শুধু এটুকু বুঝেছি যে, সে আমাদেরকে আসমানী আযাব হতে সতর্ক করছে যে আযাব আ’দ ও সামূদ জাতির উপর আপতিত হয়েছিল। তারা তখন তাকে বললোঃ তোমার অকল্যাণ হোক! একটি লোক তোমার সাথে তোমার নিজেরই ভাষা আরবীতে কথা বলছে অথচ তুমি বলছো যে, তুমি তার কথার একটি অক্ষরও বুঝতে পারনি?” উৎবা উত্তরে বললোঃ “আমি সত্যিই বলছি যে, শাস্তির বর্ণনা ছাড়া আমি আর কিছুই বুঝিনি।” (এটা ইমাম আব ইবনে হুমায়েদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)ইমাম বাগাভীও (রঃ) এ রিওয়াইয়াতটি আনয়ন করেছেন, তাতে এও রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়াতগুলো পাঠ করতে করতে ... (আরবী)-এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন তখন উবা তাঁর পবিত্র মুখের উপর হাত রেখে দিলো এবং তাঁকে আল্লাহর কসম দিতে ও আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা স্মরণ করাতে লাগলো। অতঃপর সে সেখান হতে সরাসরি বাড়ীতে ফিরে গেল এবং বাড়ীতেই থাকতে লাগলো ও কুরায়েশদের সমাবেশে উঠাবসা ও যাতায়াত পরিত্যাগ করলো। এ দেখে আবু জেহেল কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করে বললোঃ “হে কুরায়েশদের দল! আমার ধারণা যে, উত্বও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দিকে ঝুঁকে পড়েছে এবং তথাকার পানাহারে মজে গেছে। সে তো অভাবীও ছিল। চলো, আমরা তার কাছে যাই।” অতঃপর তারা তার কাছে গমন করলো। আবু জেহেল তাকে বললোঃ “তুমি যে আমাদের কাছে যাতায়াত ছেড়ে দিয়েছো এর কারণ কি? আমার মনে হয় এর কারণ শুধু একটিই। তা এই যে, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দস্তরখানা তোমার পছন্দ হয়ে গেছে এবং তুমিও তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। অভাব খুবই খারাপ জিনিস। আমি মনে করছি যে, আমরা পরস্পরের মধ্যে চাঁদা উঠিয়ে তোমার আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল করে দিবো, যাতে তুমি এই বিপদ ও লাঞ্ছনা হতে মুক্তি পেতে পারো এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ও তার নতুন মাযহাবের তোমার কোন প্রয়োজন না হয়। তার একথা শুনে উবা ভীষণ রাগান্বিত হয় এবং বলে ওঠেঃ “মুহাম্মাদ (সঃ)-এর আমার কি প্রয়োজন? আল্লাহর শপথ! আমি তার সাথে আর কখনো কথা বলতে যাবো না। তুমি আমার সম্পর্কে এমন অপমানকর মন্তব্য করলে? অথচ তুমি তো জান যে, কুরায়েশদের মধ্যে আমার চেয়ে বড় ধনী আর কেউ নেই! ব্যাপার এই যে, তোমাদের সবারই কথায় আমি তার কাছে গিয়েছিলাম এবং সব ঘটনা খুলে বলেছিলাম। আমার কথার জবাবে সে যে কালাম পাঠ করেছে, আল্লাহর কসম! তা কবিতা নয়, গণকের কথা নয় এবং যাদু ইত্যাদিও নয়। যখন সে পড়তে পড়তে ... (আরবী) পর্যন্ত পৌঁছে তখন আমি তার মুখে হাত রেখে দিই এবং তাকে আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে থেমে যেতে বলি। আমার ভয় হয় যে, না জানি হয়তো তখনই আমার উপর ঐ শাস্তি আপতিত হয় যে শাস্তি আ’দ ও সামূদ সম্প্রদায়ের উপর আপতিত হয়েছিল। আর এটা সর্বজন বিদিত যে, মুহাম্মাদ (সঃ) মিথ্যাবাদী নয়।” সীরাতে আবি ইসহাক গ্রন্থে এ ঘটনাটি অন্য ধারায় রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, একদা কুরয়েশরা এক জায়গায় একত্রিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) খানায়ে কা’বার এক প্রান্তে বসেছিলেন। উত্বা কুরায়েশদেরকে বললোঃ “তোমাদের পরামর্শ হলে আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করবো। তাকে বুঝাবো এবং কিছু লোভ দেখাবো। যদি সে লোভের বশবর্তী হয়ে কিছু চেয়ে বসে তবে আমরা তাকে তা দিয়ে দিবো এবং তার এ কাজ হতে তাকে বিরত রাখবো।” এটা হলো ঐ সময়ের ঘটনা, যখন হযরত হামযা (রাঃ) মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন এবং মুসলমানদের সংখ্যা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছিল ও দিন দিন বাড়তেই ছিল। উবার কথায় কুরায়েশরা সম্মত হয়ে যায়। সুতরাং সে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট এসে বলতে শুরু করেঃ “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি সম্ভ্রান্ত বংশের লোক। তুমি আমাদেরই একজন। তুমি হলে আমাদের চোখের তারা এবং আমাদের কলিজার টুকরা। বড়ই দুঃখের বিষয় যে, তুমি তোমার কওমের কাছে একটি নতুন বিস্ময়কর জিনিস আনয়ন করেছে এবং তাদের দলে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে দিয়েছে। তাদের জ্ঞানীদেরকে নির্বোধ বলছে, তাদের মা’বৃদদের প্রতি দোষারোপ করছে এবং তাদের দ্বীনকে খারাপ বলতে শুরু করেছে। আর তাদের বুড়োদেরকে কাফির বলছো। এখন জেনে রেখো যে, আজ আমি তোমার কাছে একটা শেষ ফায়সালার জন্যে এসেছি। তোমার কাছে আমি কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করছি। এগুলোর মধ্যে যেটা ইচ্ছা তুমি গ্রহণ কর এবং আল্লাহর ওয়াস্তে এই হাঙ্গামার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দাও।” তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেন:“তুমি যা বলতে চাও বল, আমি শুনছি।” সে বলতে শুরু করলোঃ “দেখো, তোমার এই চাল দ্বারা যদি মাল জমা করার ইচ্ছা থাকে তবে আমরা সবাই মিলে তোমার জন্যে এতো বেশী মাল জমা করে দিচ্ছি যে, সমস্ত কুরায়েশের মধ্যে তোমার চেয়ে বড় মালদার আর কেউ হবে না। আর যদি নেতৃত্বের ইচ্ছা করে থাকো তবে আমরা সবাই মিলে তোমার নেতৃত্ব মেনে নিচ্ছি। যদি তোমার বাদশাহ্ হওয়ার ইচ্ছা থাকে তবে সারা রাজ্য আমরা তোমাকে সমর্পণ করছি এবং আমরা সবাই তোমার প্রজা হয়ে যাচ্ছি। আর যদি তোমাকে জ্বিনে ধরে থাকে তবে আমরা আমাদের মাল খরচ করে বড় বড় ডাক্তার ও ঝাড়-ফুককারীদের ডেকে তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি। অনেক সময় এমন ঘটে থাকে যে, অনুগত জ্বিন তার আমলকারীর উপর বিজয়ী হয়ে যায়। তখন এই ভাবে তার থেকে মুক্তি লাভ করতে হয়।”অতঃপর উত্বা নীরব হলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তোমার কথা বলা শেষ হয়েছে কি?” সে জবাব দিলোঃ “হ্যা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাহলে এখন আমার কথা শুন।” সে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিলো। তিনি (আরবী) বলে এই সূরাটি তিলাওয়াত শুরু করলেন এবং উত্বা আদবের সাথে শুনতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত তিনি সিজদার আয়াত পাঠ করলেন এবং সিজদা করলেন। অতঃপর বললেনঃ “হে আবুল ওয়ালীদ।আমার যা বলার ছিল তা আমি বললাম। এখন তোমার মনে যা হয় তাই তুমি কর।” উবা সেখান হতে উঠে তার সাথীদের কাছে চলে গেল। তারা তার চেহারা দেখেই বলতে লাগলো যে, উহ্বার অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ব্যাপার কি?” উত্তরে সে বললোঃ “আল্লাহর শপথ! আমি এমন কথা শুনেছি যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। কসম আল্লাহর! ওটা যাদুও নয়, কবিতাও নয় এবং গণকদের কথাও নয়। হে কুরায়েশদের দল! শুনো, তোমরা আমার কথা মেনে নাও। তাকে তার ধারণার উপর ছেড়ে দাও। তার আনুকূল্যও করো না এবং বিরোধিতাও করো না। সে যা কিছু বলছে ও দাবী করছে সে ব্যাপারে সারা আরব তার বিরোধী হয়ে গেছে। তারা তার বিরুদ্ধে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। তারা যদি তার উপর বিজয় লাভ করে তবে তো। সহজেই তোমরা তার থেকে পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। আর যদি সে-ই তাদের উপর। বিজয়ী হয়ে যায় তবে তার রাজ্যকে তোমাদেরই রাজ্য বলা হবে এবং তার মর্যাদা হবে তোমাদেরই মর্যাদা। আর তোমরাই হবে তার নিকট সবেচেয়ে বেশী গৃহীত।” তার এই কথা শুনে কুরায়েশরা বললোঃ “হে আবুল ওয়ালীদ! আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (সঃ) তোমার উপর যাদু করে ফেলেছে।” সে জবাব দিলোঃ “দেখো, আমার অভিমত আমি তোমাদের নিকট পেশ করে দিলাম। এখন তোমাদের যা ইচ্ছা হয় তা-ই কর।”
ফুসসিলাত 41:3
১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, আরবী ভাষার এই কুরআন পরম দয়ালু আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল- এটা (আল-কুরআন) তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে পবিত্র আত্মা (হযরত জিবরাঈল আঃ) সত্যের সাথে অবতীর্ণ করেছেন।”(১৬:১০২) আর এ জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। এটা বিশ্বস্ত আত্মা (হযরত জিবরাঈল আঃ) তোমার অন্তরে অবতীর্ণ করেছে যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।”(২৬:১৯২-১৯৪) মহান আল্লাহ বলেনঃ এর আয়াতগুলো বিশদভাবে বিবৃত। এর অর্থ প্রকাশমান এবং আহকাম মযবূত। এর শব্দগুলোও স্পষ্ট এবং পাঠ করতে সহজ। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) (১০:১) অর্থাৎ “এটা এমন কিতাব যার আয়াতসমূহ দৃঢ় ও সুরক্ষিত, অতঃপর ওগুলো বিশদভাবে বিবৃত, এটা হচ্ছে ঐ আল্লাহর কালাম যিনি বিজ্ঞানময় এবং যিনি সবকিছুরই খবর রাখেন। অর্থাৎ এটা শব্দ ও অর্থের দিক দিয়ে অলৌকিক। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওর কাছে ওর সামনে এবং ওর পিছন হতে বাতিল আসতে পারে না। এটা বিজ্ঞানময় প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত।” (৪১:৪২) আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্যে।” অর্থাৎ এই বর্ণনা ও বিশদ ব্যাখ্যা জ্ঞানী সম্প্রদায়ই অনুধাবন করে থাকে। এই কুরআন একদিকে মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় এবং অপরদিকে কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শন করে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তাদের অধিকাংশই বিমুখ হয়েছে। সুতরাং তারা শুনবে না। অর্থাৎ কুরআন কারীমের এমন গুণাবলী থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ কুরায়েশ এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারা বলেঃ তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহ্বান করছে সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণ-আচ্ছাদিত এবং আমাদের কর্ণে আছে বধিরতা, আর তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে অন্তরাল। সুতরাং তুমি যা বলছে তার কিছুই আমাদের বোধগম্য হয় না। সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর এবং আমরা আমাদের কাজ করি। অর্থাৎ তোমার পন্থায় তুমি কাজ করে যাও এবং আমরা আমাদের পন্থায় কাজ করে যাই। আমরা কখনো আমাদের নীতি পরিত্যাগ করে তোমার নীতি গ্রহণ করতে পারি না।হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা কুরায়েশরা সমবেত হয়ে পরস্পর পরামর্শ করলোঃ “যে ব্যক্তি যাদু ও কাব্য কবিতায় সবচেয়ে বেশি পারদর্শী, চল আমরা তাকে নিয়ে ঐ লোকটির নিকট অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করি, যে আমাদের দলের মধ্যে ভাঙ্গন ধরিয়ে দিয়েছে এবং আমাদের সমস্ত কাজের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছে। ও আমাদের দ্বীনের উপর দোষারোপ করতে শুরু করেছে। একে যেন ঐ ব্যক্তি বিভিন্ন প্রশ্ন করে নিরুত্তর করে দিতে পারে। তারা সবাই বললোঃ “আমাদের মধ্যে উবা ইবনে রাবীআ' ছাড়া এরূপ লোক আর কেউ নেই। সুতরাং তারা উবার নিকট গেল এবং তার সামনে তাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করলো। সে তার কওমের কথা মেনে নিলো এবং প্রস্তুতি নিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করলো। অতঃপর সে তাকে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আচ্ছা, বলতোঃ তুমি ভাল, না আবদুল্লাহ (তার পিতা) ভাল?” তিনি কোন উত্তর দিলেন না। সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “তুমি ভাল, না (তোমার দাদা) আবদুল মুত্তালিব ভাল?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবারও নীরব থাকলেন। তখন সে বললোঃ “দেখো, তুমি যদি তোমার বাপ-দাদাকে ভাল মনে করে থাকো তবে জেনে নাও যে, তারা ঐ সব মা'বুদেরই পূজা করতেন যেগুলোর পূজা আমরা করে থাকি, আর তুমি সেগুলোর উপর দোষারোপ করে থাকো। আর যদি তুমি নিজেকে তাঁদের চেয়ে ভাল মনে করে থাকো তবে তুমি তোমার কথা বলঃ আমরা শুনি। আল্লাহর শপথ! দুনিয়ায় কোন কওমের জন্যে তোমার চেয়ে বেশী ক্ষতিকারক মানুষ সৃষ্ট হয়নি। তুমি আমাদের জামাআতের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরিয়েছো। তুমি আমাদের দ্বীন সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করেছো। সারা আরবের মধ্যে তুমি আমাদের বদনাম করেছে এবং আমাদেরকে অপদস্থ করেছে। এখন তো সব জায়গাতেই এই আলোচনা চলছে যে, কুরায়েশদের মধ্যে একজন যাদুকর রয়েছে, একজন গণক রয়েছে। এখন শুধু এটুকুই বাকী রয়েছে যে, আমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি এবং একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করি। এই ভাবে আমাদেরকে পরস্পরে লড়িয়ে দিয়ে তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করে দিতে চাও। শুন, তোমার ধন-মালের প্রতি যদি লোভ থাকে তবে বল, আমরা সবাই মিলে তোমাকে এমন ধন-দৌলতের মালিক করে দিবো যে, সারা আরবে তোমার চেয়ে বড় ধনী আর কেউ থাকবে না। আর যদি তুমি স্ত্রী লোকদের সাথে কাম-বাসনা চরিতার্থ করতে চাও তবে বল, আমাদের মধ্যে যার মেয়ে তোমার পছন্দ হয়, আমরা একটা কেন, তোমার দশটা বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তোমার কথা বলা শেষ হয়েছে কি?” উত্তরে সে বললোঃ “হ্যা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ (আরবী) অবশেষে তিনি নিম্নের আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তবুও তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বল- আমি তো তোমাদেরকে সতর্ক করছি এক ধ্বংসকর শাস্তির, আ’দ ও সামূদের শাস্তির অনুরূপ।” এটুকু শুনেই উৎবা বলে উঠলোঃ “আচ্ছা, থামো। তোমার কাছে তাহলে এ ছাড়া আর কিছুই নেই?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “না।” তখন সে সেখান হতে চলে গেল। কুরায়েশরা তো তার জন্যে অধীরভাবে অপেক্ষা করছিল। তাদের কাছে সে পৌঁছা মাত্রই তারা তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ব্যাপার কি, তাড়াতাড়ি বল।” সে উত্তর দিলোঃ “দেখো, তোমরা সবাই মিলে তাকে যত কিছু বলতে পারতে আমি একাই তার সবই বলেছি। তারা জিজ্ঞেস করলোঃ “সে তোমার কথার উত্তরে কিছু বলেছে কি?” উবা জবাবে বললোঃ “হ্যা, সে জবাব দিয়েছে বটে, কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমি তার কথার একটি অক্ষরও বুঝতে পারিনি। শুধু এটুকু বুঝেছি যে, সে আমাদেরকে আসমানী আযাব হতে সতর্ক করছে যে আযাব আ’দ ও সামূদ জাতির উপর আপতিত হয়েছিল। তারা তখন তাকে বললোঃ তোমার অকল্যাণ হোক! একটি লোক তোমার সাথে তোমার নিজেরই ভাষা আরবীতে কথা বলছে অথচ তুমি বলছো যে, তুমি তার কথার একটি অক্ষরও বুঝতে পারনি?” উৎবা উত্তরে বললোঃ “আমি সত্যিই বলছি যে, শাস্তির বর্ণনা ছাড়া আমি আর কিছুই বুঝিনি।” (এটা ইমাম আব ইবনে হুমায়েদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)ইমাম বাগাভীও (রঃ) এ রিওয়াইয়াতটি আনয়ন করেছেন, তাতে এও রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়াতগুলো পাঠ করতে করতে ... (আরবী)-এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন তখন উবা তাঁর পবিত্র মুখের উপর হাত রেখে দিলো এবং তাঁকে আল্লাহর কসম দিতে ও আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা স্মরণ করাতে লাগলো। অতঃপর সে সেখান হতে সরাসরি বাড়ীতে ফিরে গেল এবং বাড়ীতেই থাকতে লাগলো ও কুরায়েশদের সমাবেশে উঠাবসা ও যাতায়াত পরিত্যাগ করলো। এ দেখে আবু জেহেল কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করে বললোঃ “হে কুরায়েশদের দল! আমার ধারণা যে, উত্বও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দিকে ঝুঁকে পড়েছে এবং তথাকার পানাহারে মজে গেছে। সে তো অভাবীও ছিল। চলো, আমরা তার কাছে যাই।” অতঃপর তারা তার কাছে গমন করলো। আবু জেহেল তাকে বললোঃ “তুমি যে আমাদের কাছে যাতায়াত ছেড়ে দিয়েছো এর কারণ কি? আমার মনে হয় এর কারণ শুধু একটিই। তা এই যে, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দস্তরখানা তোমার পছন্দ হয়ে গেছে এবং তুমিও তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। অভাব খুবই খারাপ জিনিস। আমি মনে করছি যে, আমরা পরস্পরের মধ্যে চাঁদা উঠিয়ে তোমার আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল করে দিবো, যাতে তুমি এই বিপদ ও লাঞ্ছনা হতে মুক্তি পেতে পারো এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ও তার নতুন মাযহাবের তোমার কোন প্রয়োজন না হয়। তার একথা শুনে উবা ভীষণ রাগান্বিত হয় এবং বলে ওঠেঃ “মুহাম্মাদ (সঃ)-এর আমার কি প্রয়োজন? আল্লাহর শপথ! আমি তার সাথে আর কখনো কথা বলতে যাবো না। তুমি আমার সম্পর্কে এমন অপমানকর মন্তব্য করলে? অথচ তুমি তো জান যে, কুরায়েশদের মধ্যে আমার চেয়ে বড় ধনী আর কেউ নেই! ব্যাপার এই যে, তোমাদের সবারই কথায় আমি তার কাছে গিয়েছিলাম এবং সব ঘটনা খুলে বলেছিলাম। আমার কথার জবাবে সে যে কালাম পাঠ করেছে, আল্লাহর কসম! তা কবিতা নয়, গণকের কথা নয় এবং যাদু ইত্যাদিও নয়। যখন সে পড়তে পড়তে ... (আরবী) পর্যন্ত পৌঁছে তখন আমি তার মুখে হাত রেখে দিই এবং তাকে আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে থেমে যেতে বলি। আমার ভয় হয় যে, না জানি হয়তো তখনই আমার উপর ঐ শাস্তি আপতিত হয় যে শাস্তি আ’দ ও সামূদ সম্প্রদায়ের উপর আপতিত হয়েছিল। আর এটা সর্বজন বিদিত যে, মুহাম্মাদ (সঃ) মিথ্যাবাদী নয়।” সীরাতে আবি ইসহাক গ্রন্থে এ ঘটনাটি অন্য ধারায় রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, একদা কুরয়েশরা এক জায়গায় একত্রিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) খানায়ে কা’বার এক প্রান্তে বসেছিলেন। উত্বা কুরায়েশদেরকে বললোঃ “তোমাদের পরামর্শ হলে আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করবো। তাকে বুঝাবো এবং কিছু লোভ দেখাবো। যদি সে লোভের বশবর্তী হয়ে কিছু চেয়ে বসে তবে আমরা তাকে তা দিয়ে দিবো এবং তার এ কাজ হতে তাকে বিরত রাখবো।” এটা হলো ঐ সময়ের ঘটনা, যখন হযরত হামযা (রাঃ) মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন এবং মুসলমানদের সংখ্যা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছিল ও দিন দিন বাড়তেই ছিল। উবার কথায় কুরায়েশরা সম্মত হয়ে যায়। সুতরাং সে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট এসে বলতে শুরু করেঃ “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি সম্ভ্রান্ত বংশের লোক। তুমি আমাদেরই একজন। তুমি হলে আমাদের চোখের তারা এবং আমাদের কলিজার টুকরা। বড়ই দুঃখের বিষয় যে, তুমি তোমার কওমের কাছে একটি নতুন বিস্ময়কর জিনিস আনয়ন করেছে এবং তাদের দলে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে দিয়েছে। তাদের জ্ঞানীদেরকে নির্বোধ বলছে, তাদের মা’বৃদদের প্রতি দোষারোপ করছে এবং তাদের দ্বীনকে খারাপ বলতে শুরু করেছে। আর তাদের বুড়োদেরকে কাফির বলছো। এখন জেনে রেখো যে, আজ আমি তোমার কাছে একটা শেষ ফায়সালার জন্যে এসেছি। তোমার কাছে আমি কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করছি। এগুলোর মধ্যে যেটা ইচ্ছা তুমি গ্রহণ কর এবং আল্লাহর ওয়াস্তে এই হাঙ্গামার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দাও।” তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেন:“তুমি যা বলতে চাও বল, আমি শুনছি।” সে বলতে শুরু করলোঃ “দেখো, তোমার এই চাল দ্বারা যদি মাল জমা করার ইচ্ছা থাকে তবে আমরা সবাই মিলে তোমার জন্যে এতো বেশী মাল জমা করে দিচ্ছি যে, সমস্ত কুরায়েশের মধ্যে তোমার চেয়ে বড় মালদার আর কেউ হবে না। আর যদি নেতৃত্বের ইচ্ছা করে থাকো তবে আমরা সবাই মিলে তোমার নেতৃত্ব মেনে নিচ্ছি। যদি তোমার বাদশাহ্ হওয়ার ইচ্ছা থাকে তবে সারা রাজ্য আমরা তোমাকে সমর্পণ করছি এবং আমরা সবাই তোমার প্রজা হয়ে যাচ্ছি। আর যদি তোমাকে জ্বিনে ধরে থাকে তবে আমরা আমাদের মাল খরচ করে বড় বড় ডাক্তার ও ঝাড়-ফুককারীদের ডেকে তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি। অনেক সময় এমন ঘটে থাকে যে, অনুগত জ্বিন তার আমলকারীর উপর বিজয়ী হয়ে যায়। তখন এই ভাবে তার থেকে মুক্তি লাভ করতে হয়।”অতঃপর উত্বা নীরব হলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তোমার কথা বলা শেষ হয়েছে কি?” সে জবাব দিলোঃ “হ্যা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাহলে এখন আমার কথা শুন।” সে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিলো। তিনি (আরবী) বলে এই সূরাটি তিলাওয়াত শুরু করলেন এবং উত্বা আদবের সাথে শুনতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত তিনি সিজদার আয়াত পাঠ করলেন এবং সিজদা করলেন। অতঃপর বললেনঃ “হে আবুল ওয়ালীদ।আমার যা বলার ছিল তা আমি বললাম। এখন তোমার মনে যা হয় তাই তুমি কর।” উবা সেখান হতে উঠে তার সাথীদের কাছে চলে গেল। তারা তার চেহারা দেখেই বলতে লাগলো যে, উহ্বার অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ব্যাপার কি?” উত্তরে সে বললোঃ “আল্লাহর শপথ! আমি এমন কথা শুনেছি যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। কসম আল্লাহর! ওটা যাদুও নয়, কবিতাও নয় এবং গণকদের কথাও নয়। হে কুরায়েশদের দল! শুনো, তোমরা আমার কথা মেনে নাও। তাকে তার ধারণার উপর ছেড়ে দাও। তার আনুকূল্যও করো না এবং বিরোধিতাও করো না। সে যা কিছু বলছে ও দাবী করছে সে ব্যাপারে সারা আরব তার বিরোধী হয়ে গেছে। তারা তার বিরুদ্ধে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। তারা যদি তার উপর বিজয় লাভ করে তবে তো। সহজেই তোমরা তার থেকে পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। আর যদি সে-ই তাদের উপর। বিজয়ী হয়ে যায় তবে তার রাজ্যকে তোমাদেরই রাজ্য বলা হবে এবং তার মর্যাদা হবে তোমাদেরই মর্যাদা। আর তোমরাই হবে তার নিকট সবেচেয়ে বেশী গৃহীত।” তার এই কথা শুনে কুরায়েশরা বললোঃ “হে আবুল ওয়ালীদ! আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (সঃ) তোমার উপর যাদু করে ফেলেছে।” সে জবাব দিলোঃ “দেখো, আমার অভিমত আমি তোমাদের নিকট পেশ করে দিলাম। এখন তোমাদের যা ইচ্ছা হয় তা-ই কর।”
ফুসসিলাত 41:4
১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, আরবী ভাষার এই কুরআন পরম দয়ালু আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল- এটা (আল-কুরআন) তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে পবিত্র আত্মা (হযরত জিবরাঈল আঃ) সত্যের সাথে অবতীর্ণ করেছেন।”(১৬:১০২) আর এ জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। এটা বিশ্বস্ত আত্মা (হযরত জিবরাঈল আঃ) তোমার অন্তরে অবতীর্ণ করেছে যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।”(২৬:১৯২-১৯৪) মহান আল্লাহ বলেনঃ এর আয়াতগুলো বিশদভাবে বিবৃত। এর অর্থ প্রকাশমান এবং আহকাম মযবূত। এর শব্দগুলোও স্পষ্ট এবং পাঠ করতে সহজ। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) (১০:১) অর্থাৎ “এটা এমন কিতাব যার আয়াতসমূহ দৃঢ় ও সুরক্ষিত, অতঃপর ওগুলো বিশদভাবে বিবৃত, এটা হচ্ছে ঐ আল্লাহর কালাম যিনি বিজ্ঞানময় এবং যিনি সবকিছুরই খবর রাখেন। অর্থাৎ এটা শব্দ ও অর্থের দিক দিয়ে অলৌকিক। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওর কাছে ওর সামনে এবং ওর পিছন হতে বাতিল আসতে পারে না। এটা বিজ্ঞানময় প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত।” (৪১:৪২) আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্যে।” অর্থাৎ এই বর্ণনা ও বিশদ ব্যাখ্যা জ্ঞানী সম্প্রদায়ই অনুধাবন করে থাকে। এই কুরআন একদিকে মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় এবং অপরদিকে কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শন করে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তাদের অধিকাংশই বিমুখ হয়েছে। সুতরাং তারা শুনবে না। অর্থাৎ কুরআন কারীমের এমন গুণাবলী থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ কুরায়েশ এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারা বলেঃ তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহ্বান করছে সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণ-আচ্ছাদিত এবং আমাদের কর্ণে আছে বধিরতা, আর তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে অন্তরাল। সুতরাং তুমি যা বলছে তার কিছুই আমাদের বোধগম্য হয় না। সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর এবং আমরা আমাদের কাজ করি। অর্থাৎ তোমার পন্থায় তুমি কাজ করে যাও এবং আমরা আমাদের পন্থায় কাজ করে যাই। আমরা কখনো আমাদের নীতি পরিত্যাগ করে তোমার নীতি গ্রহণ করতে পারি না।হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা কুরায়েশরা সমবেত হয়ে পরস্পর পরামর্শ করলোঃ “যে ব্যক্তি যাদু ও কাব্য কবিতায় সবচেয়ে বেশি পারদর্শী, চল আমরা তাকে নিয়ে ঐ লোকটির নিকট অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করি, যে আমাদের দলের মধ্যে ভাঙ্গন ধরিয়ে দিয়েছে এবং আমাদের সমস্ত কাজের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছে। ও আমাদের দ্বীনের উপর দোষারোপ করতে শুরু করেছে। একে যেন ঐ ব্যক্তি বিভিন্ন প্রশ্ন করে নিরুত্তর করে দিতে পারে। তারা সবাই বললোঃ “আমাদের মধ্যে উবা ইবনে রাবীআ' ছাড়া এরূপ লোক আর কেউ নেই। সুতরাং তারা উবার নিকট গেল এবং তার সামনে তাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করলো। সে তার কওমের কথা মেনে নিলো এবং প্রস্তুতি নিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করলো। অতঃপর সে তাকে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আচ্ছা, বলতোঃ তুমি ভাল, না আবদুল্লাহ (তার পিতা) ভাল?” তিনি কোন উত্তর দিলেন না। সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “তুমি ভাল, না (তোমার দাদা) আবদুল মুত্তালিব ভাল?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবারও নীরব থাকলেন। তখন সে বললোঃ “দেখো, তুমি যদি তোমার বাপ-দাদাকে ভাল মনে করে থাকো তবে জেনে নাও যে, তারা ঐ সব মা'বুদেরই পূজা করতেন যেগুলোর পূজা আমরা করে থাকি, আর তুমি সেগুলোর উপর দোষারোপ করে থাকো। আর যদি তুমি নিজেকে তাঁদের চেয়ে ভাল মনে করে থাকো তবে তুমি তোমার কথা বলঃ আমরা শুনি। আল্লাহর শপথ! দুনিয়ায় কোন কওমের জন্যে তোমার চেয়ে বেশী ক্ষতিকারক মানুষ সৃষ্ট হয়নি। তুমি আমাদের জামাআতের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরিয়েছো। তুমি আমাদের দ্বীন সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করেছো। সারা আরবের মধ্যে তুমি আমাদের বদনাম করেছে এবং আমাদেরকে অপদস্থ করেছে। এখন তো সব জায়গাতেই এই আলোচনা চলছে যে, কুরায়েশদের মধ্যে একজন যাদুকর রয়েছে, একজন গণক রয়েছে। এখন শুধু এটুকুই বাকী রয়েছে যে, আমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি এবং একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করি। এই ভাবে আমাদেরকে পরস্পরে লড়িয়ে দিয়ে তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করে দিতে চাও। শুন, তোমার ধন-মালের প্রতি যদি লোভ থাকে তবে বল, আমরা সবাই মিলে তোমাকে এমন ধন-দৌলতের মালিক করে দিবো যে, সারা আরবে তোমার চেয়ে বড় ধনী আর কেউ থাকবে না। আর যদি তুমি স্ত্রী লোকদের সাথে কাম-বাসনা চরিতার্থ করতে চাও তবে বল, আমাদের মধ্যে যার মেয়ে তোমার পছন্দ হয়, আমরা একটা কেন, তোমার দশটা বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তোমার কথা বলা শেষ হয়েছে কি?” উত্তরে সে বললোঃ “হ্যা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ (আরবী) অবশেষে তিনি নিম্নের আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তবুও তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বল- আমি তো তোমাদেরকে সতর্ক করছি এক ধ্বংসকর শাস্তির, আ’দ ও সামূদের শাস্তির অনুরূপ।” এটুকু শুনেই উৎবা বলে উঠলোঃ “আচ্ছা, থামো। তোমার কাছে তাহলে এ ছাড়া আর কিছুই নেই?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “না।” তখন সে সেখান হতে চলে গেল। কুরায়েশরা তো তার জন্যে অধীরভাবে অপেক্ষা করছিল। তাদের কাছে সে পৌঁছা মাত্রই তারা তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ব্যাপার কি, তাড়াতাড়ি বল।” সে উত্তর দিলোঃ “দেখো, তোমরা সবাই মিলে তাকে যত কিছু বলতে পারতে আমি একাই তার সবই বলেছি। তারা জিজ্ঞেস করলোঃ “সে তোমার কথার উত্তরে কিছু বলেছে কি?” উবা জবাবে বললোঃ “হ্যা, সে জবাব দিয়েছে বটে, কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমি তার কথার একটি অক্ষরও বুঝতে পারিনি। শুধু এটুকু বুঝেছি যে, সে আমাদেরকে আসমানী আযাব হতে সতর্ক করছে যে আযাব আ’দ ও সামূদ জাতির উপর আপতিত হয়েছিল। তারা তখন তাকে বললোঃ তোমার অকল্যাণ হোক! একটি লোক তোমার সাথে তোমার নিজেরই ভাষা আরবীতে কথা বলছে অথচ তুমি বলছো যে, তুমি তার কথার একটি অক্ষরও বুঝতে পারনি?” উৎবা উত্তরে বললোঃ “আমি সত্যিই বলছি যে, শাস্তির বর্ণনা ছাড়া আমি আর কিছুই বুঝিনি।” (এটা ইমাম আব ইবনে হুমায়েদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)ইমাম বাগাভীও (রঃ) এ রিওয়াইয়াতটি আনয়ন করেছেন, তাতে এও রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়াতগুলো পাঠ করতে করতে ... (আরবী)-এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন তখন উবা তাঁর পবিত্র মুখের উপর হাত রেখে দিলো এবং তাঁকে আল্লাহর কসম দিতে ও আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা স্মরণ করাতে লাগলো। অতঃপর সে সেখান হতে সরাসরি বাড়ীতে ফিরে গেল এবং বাড়ীতেই থাকতে লাগলো ও কুরায়েশদের সমাবেশে উঠাবসা ও যাতায়াত পরিত্যাগ করলো। এ দেখে আবু জেহেল কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করে বললোঃ “হে কুরায়েশদের দল! আমার ধারণা যে, উত্বও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দিকে ঝুঁকে পড়েছে এবং তথাকার পানাহারে মজে গেছে। সে তো অভাবীও ছিল। চলো, আমরা তার কাছে যাই।” অতঃপর তারা তার কাছে গমন করলো। আবু জেহেল তাকে বললোঃ “তুমি যে আমাদের কাছে যাতায়াত ছেড়ে দিয়েছো এর কারণ কি? আমার মনে হয় এর কারণ শুধু একটিই। তা এই যে, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দস্তরখানা তোমার পছন্দ হয়ে গেছে এবং তুমিও তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। অভাব খুবই খারাপ জিনিস। আমি মনে করছি যে, আমরা পরস্পরের মধ্যে চাঁদা উঠিয়ে তোমার আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল করে দিবো, যাতে তুমি এই বিপদ ও লাঞ্ছনা হতে মুক্তি পেতে পারো এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ও তার নতুন মাযহাবের তোমার কোন প্রয়োজন না হয়। তার একথা শুনে উবা ভীষণ রাগান্বিত হয় এবং বলে ওঠেঃ “মুহাম্মাদ (সঃ)-এর আমার কি প্রয়োজন? আল্লাহর শপথ! আমি তার সাথে আর কখনো কথা বলতে যাবো না। তুমি আমার সম্পর্কে এমন অপমানকর মন্তব্য করলে? অথচ তুমি তো জান যে, কুরায়েশদের মধ্যে আমার চেয়ে বড় ধনী আর কেউ নেই! ব্যাপার এই যে, তোমাদের সবারই কথায় আমি তার কাছে গিয়েছিলাম এবং সব ঘটনা খুলে বলেছিলাম। আমার কথার জবাবে সে যে কালাম পাঠ করেছে, আল্লাহর কসম! তা কবিতা নয়, গণকের কথা নয় এবং যাদু ইত্যাদিও নয়। যখন সে পড়তে পড়তে ... (আরবী) পর্যন্ত পৌঁছে তখন আমি তার মুখে হাত রেখে দিই এবং তাকে আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে থেমে যেতে বলি। আমার ভয় হয় যে, না জানি হয়তো তখনই আমার উপর ঐ শাস্তি আপতিত হয় যে শাস্তি আ’দ ও সামূদ সম্প্রদায়ের উপর আপতিত হয়েছিল। আর এটা সর্বজন বিদিত যে, মুহাম্মাদ (সঃ) মিথ্যাবাদী নয়।” সীরাতে আবি ইসহাক গ্রন্থে এ ঘটনাটি অন্য ধারায় রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, একদা কুরয়েশরা এক জায়গায় একত্রিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) খানায়ে কা’বার এক প্রান্তে বসেছিলেন। উত্বা কুরায়েশদেরকে বললোঃ “তোমাদের পরামর্শ হলে আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করবো। তাকে বুঝাবো এবং কিছু লোভ দেখাবো। যদি সে লোভের বশবর্তী হয়ে কিছু চেয়ে বসে তবে আমরা তাকে তা দিয়ে দিবো এবং তার এ কাজ হতে তাকে বিরত রাখবো।” এটা হলো ঐ সময়ের ঘটনা, যখন হযরত হামযা (রাঃ) মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন এবং মুসলমানদের সংখ্যা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছিল ও দিন দিন বাড়তেই ছিল। উবার কথায় কুরায়েশরা সম্মত হয়ে যায়। সুতরাং সে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট এসে বলতে শুরু করেঃ “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি সম্ভ্রান্ত বংশের লোক। তুমি আমাদেরই একজন। তুমি হলে আমাদের চোখের তারা এবং আমাদের কলিজার টুকরা। বড়ই দুঃখের বিষয় যে, তুমি তোমার কওমের কাছে একটি নতুন বিস্ময়কর জিনিস আনয়ন করেছে এবং তাদের দলে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে দিয়েছে। তাদের জ্ঞানীদেরকে নির্বোধ বলছে, তাদের মা’বৃদদের প্রতি দোষারোপ করছে এবং তাদের দ্বীনকে খারাপ বলতে শুরু করেছে। আর তাদের বুড়োদেরকে কাফির বলছো। এখন জেনে রেখো যে, আজ আমি তোমার কাছে একটা শেষ ফায়সালার জন্যে এসেছি। তোমার কাছে আমি কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করছি। এগুলোর মধ্যে যেটা ইচ্ছা তুমি গ্রহণ কর এবং আল্লাহর ওয়াস্তে এই হাঙ্গামার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দাও।” তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেন:“তুমি যা বলতে চাও বল, আমি শুনছি।” সে বলতে শুরু করলোঃ “দেখো, তোমার এই চাল দ্বারা যদি মাল জমা করার ইচ্ছা থাকে তবে আমরা সবাই মিলে তোমার জন্যে এতো বেশী মাল জমা করে দিচ্ছি যে, সমস্ত কুরায়েশের মধ্যে তোমার চেয়ে বড় মালদার আর কেউ হবে না। আর যদি নেতৃত্বের ইচ্ছা করে থাকো তবে আমরা সবাই মিলে তোমার নেতৃত্ব মেনে নিচ্ছি। যদি তোমার বাদশাহ্ হওয়ার ইচ্ছা থাকে তবে সারা রাজ্য আমরা তোমাকে সমর্পণ করছি এবং আমরা সবাই তোমার প্রজা হয়ে যাচ্ছি। আর যদি তোমাকে জ্বিনে ধরে থাকে তবে আমরা আমাদের মাল খরচ করে বড় বড় ডাক্তার ও ঝাড়-ফুককারীদের ডেকে তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি। অনেক সময় এমন ঘটে থাকে যে, অনুগত জ্বিন তার আমলকারীর উপর বিজয়ী হয়ে যায়। তখন এই ভাবে তার থেকে মুক্তি লাভ করতে হয়।”অতঃপর উত্বা নীরব হলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তোমার কথা বলা শেষ হয়েছে কি?” সে জবাব দিলোঃ “হ্যা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাহলে এখন আমার কথা শুন।” সে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিলো। তিনি (আরবী) বলে এই সূরাটি তিলাওয়াত শুরু করলেন এবং উত্বা আদবের সাথে শুনতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত তিনি সিজদার আয়াত পাঠ করলেন এবং সিজদা করলেন। অতঃপর বললেনঃ “হে আবুল ওয়ালীদ।আমার যা বলার ছিল তা আমি বললাম। এখন তোমার মনে যা হয় তাই তুমি কর।” উবা সেখান হতে উঠে তার সাথীদের কাছে চলে গেল। তারা তার চেহারা দেখেই বলতে লাগলো যে, উহ্বার অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ব্যাপার কি?” উত্তরে সে বললোঃ “আল্লাহর শপথ! আমি এমন কথা শুনেছি যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। কসম আল্লাহর! ওটা যাদুও নয়, কবিতাও নয় এবং গণকদের কথাও নয়। হে কুরায়েশদের দল! শুনো, তোমরা আমার কথা মেনে নাও। তাকে তার ধারণার উপর ছেড়ে দাও। তার আনুকূল্যও করো না এবং বিরোধিতাও করো না। সে যা কিছু বলছে ও দাবী করছে সে ব্যাপারে সারা আরব তার বিরোধী হয়ে গেছে। তারা তার বিরুদ্ধে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। তারা যদি তার উপর বিজয় লাভ করে তবে তো। সহজেই তোমরা তার থেকে পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। আর যদি সে-ই তাদের উপর। বিজয়ী হয়ে যায় তবে তার রাজ্যকে তোমাদেরই রাজ্য বলা হবে এবং তার মর্যাদা হবে তোমাদেরই মর্যাদা। আর তোমরাই হবে তার নিকট সবেচেয়ে বেশী গৃহীত।” তার এই কথা শুনে কুরায়েশরা বললোঃ “হে আবুল ওয়ালীদ! আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (সঃ) তোমার উপর যাদু করে ফেলেছে।” সে জবাব দিলোঃ “দেখো, আমার অভিমত আমি তোমাদের নিকট পেশ করে দিলাম। এখন তোমাদের যা ইচ্ছা হয় তা-ই কর।”
ফুসসিলাত 41:5
১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, আরবী ভাষার এই কুরআন পরম দয়ালু আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল- এটা (আল-কুরআন) তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে পবিত্র আত্মা (হযরত জিবরাঈল আঃ) সত্যের সাথে অবতীর্ণ করেছেন।”(১৬:১০২) আর এ জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। এটা বিশ্বস্ত আত্মা (হযরত জিবরাঈল আঃ) তোমার অন্তরে অবতীর্ণ করেছে যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।”(২৬:১৯২-১৯৪) মহান আল্লাহ বলেনঃ এর আয়াতগুলো বিশদভাবে বিবৃত। এর অর্থ প্রকাশমান এবং আহকাম মযবূত। এর শব্দগুলোও স্পষ্ট এবং পাঠ করতে সহজ। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) (১০:১) অর্থাৎ “এটা এমন কিতাব যার আয়াতসমূহ দৃঢ় ও সুরক্ষিত, অতঃপর ওগুলো বিশদভাবে বিবৃত, এটা হচ্ছে ঐ আল্লাহর কালাম যিনি বিজ্ঞানময় এবং যিনি সবকিছুরই খবর রাখেন। অর্থাৎ এটা শব্দ ও অর্থের দিক দিয়ে অলৌকিক। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওর কাছে ওর সামনে এবং ওর পিছন হতে বাতিল আসতে পারে না। এটা বিজ্ঞানময় প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত।” (৪১:৪২) আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্যে।” অর্থাৎ এই বর্ণনা ও বিশদ ব্যাখ্যা জ্ঞানী সম্প্রদায়ই অনুধাবন করে থাকে। এই কুরআন একদিকে মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় এবং অপরদিকে কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শন করে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তাদের অধিকাংশই বিমুখ হয়েছে। সুতরাং তারা শুনবে না। অর্থাৎ কুরআন কারীমের এমন গুণাবলী থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ কুরায়েশ এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারা বলেঃ তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহ্বান করছে সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণ-আচ্ছাদিত এবং আমাদের কর্ণে আছে বধিরতা, আর তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে অন্তরাল। সুতরাং তুমি যা বলছে তার কিছুই আমাদের বোধগম্য হয় না। সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর এবং আমরা আমাদের কাজ করি। অর্থাৎ তোমার পন্থায় তুমি কাজ করে যাও এবং আমরা আমাদের পন্থায় কাজ করে যাই। আমরা কখনো আমাদের নীতি পরিত্যাগ করে তোমার নীতি গ্রহণ করতে পারি না।হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা কুরায়েশরা সমবেত হয়ে পরস্পর পরামর্শ করলোঃ “যে ব্যক্তি যাদু ও কাব্য কবিতায় সবচেয়ে বেশি পারদর্শী, চল আমরা তাকে নিয়ে ঐ লোকটির নিকট অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করি, যে আমাদের দলের মধ্যে ভাঙ্গন ধরিয়ে দিয়েছে এবং আমাদের সমস্ত কাজের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছে। ও আমাদের দ্বীনের উপর দোষারোপ করতে শুরু করেছে। একে যেন ঐ ব্যক্তি বিভিন্ন প্রশ্ন করে নিরুত্তর করে দিতে পারে। তারা সবাই বললোঃ “আমাদের মধ্যে উবা ইবনে রাবীআ' ছাড়া এরূপ লোক আর কেউ নেই। সুতরাং তারা উবার নিকট গেল এবং তার সামনে তাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করলো। সে তার কওমের কথা মেনে নিলো এবং প্রস্তুতি নিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করলো। অতঃপর সে তাকে বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আচ্ছা, বলতোঃ তুমি ভাল, না আবদুল্লাহ (তার পিতা) ভাল?” তিনি কোন উত্তর দিলেন না। সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “তুমি ভাল, না (তোমার দাদা) আবদুল মুত্তালিব ভাল?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবারও নীরব থাকলেন। তখন সে বললোঃ “দেখো, তুমি যদি তোমার বাপ-দাদাকে ভাল মনে করে থাকো তবে জেনে নাও যে, তারা ঐ সব মা'বুদেরই পূজা করতেন যেগুলোর পূজা আমরা করে থাকি, আর তুমি সেগুলোর উপর দোষারোপ করে থাকো। আর যদি তুমি নিজেকে তাঁদের চেয়ে ভাল মনে করে থাকো তবে তুমি তোমার কথা বলঃ আমরা শুনি। আল্লাহর শপথ! দুনিয়ায় কোন কওমের জন্যে তোমার চেয়ে বেশী ক্ষতিকারক মানুষ সৃষ্ট হয়নি। তুমি আমাদের জামাআতের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরিয়েছো। তুমি আমাদের দ্বীন সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করেছো। সারা আরবের মধ্যে তুমি আমাদের বদনাম করেছে এবং আমাদেরকে অপদস্থ করেছে। এখন তো সব জায়গাতেই এই আলোচনা চলছে যে, কুরায়েশদের মধ্যে একজন যাদুকর রয়েছে, একজন গণক রয়েছে। এখন শুধু এটুকুই বাকী রয়েছে যে, আমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি এবং একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করি। এই ভাবে আমাদেরকে পরস্পরে লড়িয়ে দিয়ে তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করে দিতে চাও। শুন, তোমার ধন-মালের প্রতি যদি লোভ থাকে তবে বল, আমরা সবাই মিলে তোমাকে এমন ধন-দৌলতের মালিক করে দিবো যে, সারা আরবে তোমার চেয়ে বড় ধনী আর কেউ থাকবে না। আর যদি তুমি স্ত্রী লোকদের সাথে কাম-বাসনা চরিতার্থ করতে চাও তবে বল, আমাদের মধ্যে যার মেয়ে তোমার পছন্দ হয়, আমরা একটা কেন, তোমার দশটা বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তোমার কথা বলা শেষ হয়েছে কি?” উত্তরে সে বললোঃ “হ্যা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ (আরবী) অবশেষে তিনি নিম্নের আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তবুও তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বল- আমি তো তোমাদেরকে সতর্ক করছি এক ধ্বংসকর শাস্তির, আ’দ ও সামূদের শাস্তির অনুরূপ।” এটুকু শুনেই উৎবা বলে উঠলোঃ “আচ্ছা, থামো। তোমার কাছে তাহলে এ ছাড়া আর কিছুই নেই?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর দিলেনঃ “না।” তখন সে সেখান হতে চলে গেল। কুরায়েশরা তো তার জন্যে অধীরভাবে অপেক্ষা করছিল। তাদের কাছে সে পৌঁছা মাত্রই তারা তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ব্যাপার কি, তাড়াতাড়ি বল।” সে উত্তর দিলোঃ “দেখো, তোমরা সবাই মিলে তাকে যত কিছু বলতে পারতে আমি একাই তার সবই বলেছি। তারা জিজ্ঞেস করলোঃ “সে তোমার কথার উত্তরে কিছু বলেছে কি?” উবা জবাবে বললোঃ “হ্যা, সে জবাব দিয়েছে বটে, কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমি তার কথার একটি অক্ষরও বুঝতে পারিনি। শুধু এটুকু বুঝেছি যে, সে আমাদেরকে আসমানী আযাব হতে সতর্ক করছে যে আযাব আ’দ ও সামূদ জাতির উপর আপতিত হয়েছিল। তারা তখন তাকে বললোঃ তোমার অকল্যাণ হোক! একটি লোক তোমার সাথে তোমার নিজেরই ভাষা আরবীতে কথা বলছে অথচ তুমি বলছো যে, তুমি তার কথার একটি অক্ষরও বুঝতে পারনি?” উৎবা উত্তরে বললোঃ “আমি সত্যিই বলছি যে, শাস্তির বর্ণনা ছাড়া আমি আর কিছুই বুঝিনি।” (এটা ইমাম আব ইবনে হুমায়েদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)ইমাম বাগাভীও (রঃ) এ রিওয়াইয়াতটি আনয়ন করেছেন, তাতে এও রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়াতগুলো পাঠ করতে করতে ... (আরবী)-এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন তখন উবা তাঁর পবিত্র মুখের উপর হাত রেখে দিলো এবং তাঁকে আল্লাহর কসম দিতে ও আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা স্মরণ করাতে লাগলো। অতঃপর সে সেখান হতে সরাসরি বাড়ীতে ফিরে গেল এবং বাড়ীতেই থাকতে লাগলো ও কুরায়েশদের সমাবেশে উঠাবসা ও যাতায়াত পরিত্যাগ করলো। এ দেখে আবু জেহেল কুরায়েশদেরকে সম্বোধন করে বললোঃ “হে কুরায়েশদের দল! আমার ধারণা যে, উত্বও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দিকে ঝুঁকে পড়েছে এবং তথাকার পানাহারে মজে গেছে। সে তো অভাবীও ছিল। চলো, আমরা তার কাছে যাই।” অতঃপর তারা তার কাছে গমন করলো। আবু জেহেল তাকে বললোঃ “তুমি যে আমাদের কাছে যাতায়াত ছেড়ে দিয়েছো এর কারণ কি? আমার মনে হয় এর কারণ শুধু একটিই। তা এই যে, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর দস্তরখানা তোমার পছন্দ হয়ে গেছে এবং তুমিও তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। অভাব খুবই খারাপ জিনিস। আমি মনে করছি যে, আমরা পরস্পরের মধ্যে চাঁদা উঠিয়ে তোমার আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল করে দিবো, যাতে তুমি এই বিপদ ও লাঞ্ছনা হতে মুক্তি পেতে পারো এবং মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ও তার নতুন মাযহাবের তোমার কোন প্রয়োজন না হয়। তার একথা শুনে উবা ভীষণ রাগান্বিত হয় এবং বলে ওঠেঃ “মুহাম্মাদ (সঃ)-এর আমার কি প্রয়োজন? আল্লাহর শপথ! আমি তার সাথে আর কখনো কথা বলতে যাবো না। তুমি আমার সম্পর্কে এমন অপমানকর মন্তব্য করলে? অথচ তুমি তো জান যে, কুরায়েশদের মধ্যে আমার চেয়ে বড় ধনী আর কেউ নেই! ব্যাপার এই যে, তোমাদের সবারই কথায় আমি তার কাছে গিয়েছিলাম এবং সব ঘটনা খুলে বলেছিলাম। আমার কথার জবাবে সে যে কালাম পাঠ করেছে, আল্লাহর কসম! তা কবিতা নয়, গণকের কথা নয় এবং যাদু ইত্যাদিও নয়। যখন সে পড়তে পড়তে ... (আরবী) পর্যন্ত পৌঁছে তখন আমি তার মুখে হাত রেখে দিই এবং তাকে আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে থেমে যেতে বলি। আমার ভয় হয় যে, না জানি হয়তো তখনই আমার উপর ঐ শাস্তি আপতিত হয় যে শাস্তি আ’দ ও সামূদ সম্প্রদায়ের উপর আপতিত হয়েছিল। আর এটা সর্বজন বিদিত যে, মুহাম্মাদ (সঃ) মিথ্যাবাদী নয়।” সীরাতে আবি ইসহাক গ্রন্থে এ ঘটনাটি অন্য ধারায় রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, একদা কুরয়েশরা এক জায়গায় একত্রিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) খানায়ে কা’বার এক প্রান্তে বসেছিলেন। উত্বা কুরায়েশদেরকে বললোঃ “তোমাদের পরামর্শ হলে আমি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট গমন করবো। তাকে বুঝাবো এবং কিছু লোভ দেখাবো। যদি সে লোভের বশবর্তী হয়ে কিছু চেয়ে বসে তবে আমরা তাকে তা দিয়ে দিবো এবং তার এ কাজ হতে তাকে বিরত রাখবো।” এটা হলো ঐ সময়ের ঘটনা, যখন হযরত হামযা (রাঃ) মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন এবং মুসলমানদের সংখ্যা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছিল ও দিন দিন বাড়তেই ছিল। উবার কথায় কুরায়েশরা সম্মত হয়ে যায়। সুতরাং সে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট এসে বলতে শুরু করেঃ “হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি সম্ভ্রান্ত বংশের লোক। তুমি আমাদেরই একজন। তুমি হলে আমাদের চোখের তারা এবং আমাদের কলিজার টুকরা। বড়ই দুঃখের বিষয় যে, তুমি তোমার কওমের কাছে একটি নতুন বিস্ময়কর জিনিস আনয়ন করেছে এবং তাদের দলে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে দিয়েছে। তাদের জ্ঞানীদেরকে নির্বোধ বলছে, তাদের মা’বৃদদের প্রতি দোষারোপ করছে এবং তাদের দ্বীনকে খারাপ বলতে শুরু করেছে। আর তাদের বুড়োদেরকে কাফির বলছো। এখন জেনে রেখো যে, আজ আমি তোমার কাছে একটা শেষ ফায়সালার জন্যে এসেছি। তোমার কাছে আমি কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করছি। এগুলোর মধ্যে যেটা ইচ্ছা তুমি গ্রহণ কর এবং আল্লাহর ওয়াস্তে এই হাঙ্গামার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দাও।” তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেন:“তুমি যা বলতে চাও বল, আমি শুনছি।” সে বলতে শুরু করলোঃ “দেখো, তোমার এই চাল দ্বারা যদি মাল জমা করার ইচ্ছা থাকে তবে আমরা সবাই মিলে তোমার জন্যে এতো বেশী মাল জমা করে দিচ্ছি যে, সমস্ত কুরায়েশের মধ্যে তোমার চেয়ে বড় মালদার আর কেউ হবে না। আর যদি নেতৃত্বের ইচ্ছা করে থাকো তবে আমরা সবাই মিলে তোমার নেতৃত্ব মেনে নিচ্ছি। যদি তোমার বাদশাহ্ হওয়ার ইচ্ছা থাকে তবে সারা রাজ্য আমরা তোমাকে সমর্পণ করছি এবং আমরা সবাই তোমার প্রজা হয়ে যাচ্ছি। আর যদি তোমাকে জ্বিনে ধরে থাকে তবে আমরা আমাদের মাল খরচ করে বড় বড় ডাক্তার ও ঝাড়-ফুককারীদের ডেকে তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি। অনেক সময় এমন ঘটে থাকে যে, অনুগত জ্বিন তার আমলকারীর উপর বিজয়ী হয়ে যায়। তখন এই ভাবে তার থেকে মুক্তি লাভ করতে হয়।”অতঃপর উত্বা নীরব হলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তোমার কথা বলা শেষ হয়েছে কি?” সে জবাব দিলোঃ “হ্যা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাহলে এখন আমার কথা শুন।” সে তাঁর কথায় কান লাগিয়ে দিলো। তিনি (আরবী) বলে এই সূরাটি তিলাওয়াত শুরু করলেন এবং উত্বা আদবের সাথে শুনতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত তিনি সিজদার আয়াত পাঠ করলেন এবং সিজদা করলেন। অতঃপর বললেনঃ “হে আবুল ওয়ালীদ।আমার যা বলার ছিল তা আমি বললাম। এখন তোমার মনে যা হয় তাই তুমি কর।” উবা সেখান হতে উঠে তার সাথীদের কাছে চলে গেল। তারা তার চেহারা দেখেই বলতে লাগলো যে, উহ্বার অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “ব্যাপার কি?” উত্তরে সে বললোঃ “আল্লাহর শপথ! আমি এমন কথা শুনেছি যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। কসম আল্লাহর! ওটা যাদুও নয়, কবিতাও নয় এবং গণকদের কথাও নয়। হে কুরায়েশদের দল! শুনো, তোমরা আমার কথা মেনে নাও। তাকে তার ধারণার উপর ছেড়ে দাও। তার আনুকূল্যও করো না এবং বিরোধিতাও করো না। সে যা কিছু বলছে ও দাবী করছে সে ব্যাপারে সারা আরব তার বিরোধী হয়ে গেছে। তারা তার বিরুদ্ধে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। তারা যদি তার উপর বিজয় লাভ করে তবে তো। সহজেই তোমরা তার থেকে পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। আর যদি সে-ই তাদের উপর। বিজয়ী হয়ে যায় তবে তার রাজ্যকে তোমাদেরই রাজ্য বলা হবে এবং তার মর্যাদা হবে তোমাদেরই মর্যাদা। আর তোমরাই হবে তার নিকট সবেচেয়ে বেশী গৃহীত।” তার এই কথা শুনে কুরায়েশরা বললোঃ “হে আবুল ওয়ালীদ! আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (সঃ) তোমার উপর যাদু করে ফেলেছে।” সে জবাব দিলোঃ “দেখো, আমার অভিমত আমি তোমাদের নিকট পেশ করে দিলাম। এখন তোমাদের যা ইচ্ছা হয় তা-ই কর।”
ফুসসিলাত 41:6
৬-৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এই মিথ্যা প্রশ্নকারী মুশরিকদেরকে বলে দাও- আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমাকে অহীর মাধ্যমে বলে দেয়া হয়েছে যে, তোমাদের সবারই মা'বুদ এক আল্লাহ। তোমরা যে কতকগুলো মা'বূদ বানিয়ে নিয়েছো এটা সরাসরি বিভ্রান্তিকর পন্থা। তোমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত কর এবং ঠিক ঐভাবে কর যেভাবে তোমরা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর মাধ্যমে জানতে পেরেছে। আর তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী গুনাহ্ হতে তাওবা কর এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। বিশ্বাস রেখো যে, আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপনকারীরা ধ্বংস হয়ে যাবে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ যারা যাকাত প্রদান করে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে এর ভাবার্থ হলোঃ “আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই’ এই সাক্ষ্য যারা প্রদান করে না। ইকরামাও (রঃ) এ কথাই বলেন। এই উক্তিটি আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলার নিম্নের উক্তির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।”(৯২:৯-১০) নিমের উক্তিটিও অনুরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে যে পবিত্রতা অর্জন করে এবং তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করে ও নামায পড়ে।”(৮৭:১৪-১৫) আল্লাহ্ তাআলার নিম্নের এ উক্তিটিও ঐরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার পবিত্রতা অর্জন করার খেয়াল আছে কি?”(৭৯:১৮) এ আয়াতগুলোতে যাকাত অর্থাৎ পবিত্রতা দ্বারা নফকে বাজে চরিত্র হতে মুক্ত রাখা উদ্দেশ্য। আর এর সবচেয়ে বড় ও প্রথম প্রকার হচ্ছে শিরূক হতে পবিত্র হওয়া। অনুরূপভাবে উপরোক্ত আয়াতে যাকাত না দেয়া দ্বারা তাওহীদকে অমান্য করা বুঝানো হয়েছে। মালের যাকাতকে যাকাত বলার কারণ এই যে, এটা মালকে অবৈধতা হতে পবিত্র করে এবং মালের বৃদ্ধি ও বরকতের কারণ হয়। আর আল্লাহর পথে ঐ মাল হতে কিছু খরচ করার তাওফীক লাভ হয়। কিন্তু ইমাম সুদ্দী (রঃ), মুআবিয়া ইবনে কুরুরা (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং অন্যান্য তাফসীরকারগণ এর অর্থ করেছেন মালের যাকাত না দেয়া এবং বাহ্যতঃ এটাই বুঝা যাচ্ছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-ও এটাকেই পছন্দ করেছেন। কিন্তু এ উক্তিটির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, যাকাত ফরয হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। আর এ আয়াত অবতীর্ণ হয় মক্কায়। বড় জোর এই তাফসীরকে মেনে নিয়ে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, সাদকা ও যাকাতের আসল হুকুম তো নবুওয়াতের শুরুতেই ছিল। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিন তোমরা তার হক দিয়ে দাও।”(৬:১৪১) হ্যা, তবে ঐ যাকাত, যার নিসাব ও পরিমাণ আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নির্ধারিত হয় তা হয় মদীনায়। এটি এমন একটি উক্তি যে, এর দ্বারা দু’টি উক্তির মধ্যে সামঞ্জস্য এসে যায়।নামাযের ব্যাপারেও এটা দেখা যায় যে, নামায সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে নবুওয়াতের শুরুতেই ফরয হয়েছিল। কিন্তু মিরাজের রাত্রে হিজরতের দেড় বছর পূর্বে পাঁচ ওয়াক্ত নামায নিয়মিতভাবে শর্ত ও আরকানসহ নির্ধারিত হয়। আর ধীরে ধীরে এর সমুদয় সম্পর্কিত বিষয় পুরো করে দেয়া হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্যে রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার।” এটা কখনো শেষ হবার নয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যাতে তারা হবে চিরস্থায়ী।”(১৮:৩) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদেরকে যে ইনআ'ম দেয়া হবে তা কখনো ভাঙ্গবার বা শেষ হবার নয়, বরং অনবরতই থাকবে।”(১১:১০৮) সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে যেন এটা তাদের প্রাপ্য হিসেবে দেয়া হবে, অনুগ্রহ হিসেবে নয়। কিন্তু কতক ইমাম তাঁর এ উক্তি খণ্ডন করেছেন। কেননা, জান্নাতবাসীর উপরও নিশ্চিতরূপে আল্লাহর অনুগ্রহ রয়েছে, এ কথা বলতে হবে। স্বয়ং আল্লাহ্ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “বরং আল্লাহ্ই ঈমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন বা তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।”(৪৯:১৭) জান্নাতবাসীদের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ্ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি হতে রক্ষা করেছেন।”(৫২:২৭) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ কিন্তু এই যে, আল্লাহ্ আমাকে স্বীয় রহমত, অনুগ্রহ ও ইহসানের মধ্যে নিয়ে নিবেন।
ফুসসিলাত 41:7
৬-৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এই মিথ্যা প্রশ্নকারী মুশরিকদেরকে বলে দাও- আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমাকে অহীর মাধ্যমে বলে দেয়া হয়েছে যে, তোমাদের সবারই মা'বুদ এক আল্লাহ। তোমরা যে কতকগুলো মা'বূদ বানিয়ে নিয়েছো এটা সরাসরি বিভ্রান্তিকর পন্থা। তোমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত কর এবং ঠিক ঐভাবে কর যেভাবে তোমরা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর মাধ্যমে জানতে পেরেছে। আর তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী গুনাহ্ হতে তাওবা কর এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। বিশ্বাস রেখো যে, আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপনকারীরা ধ্বংস হয়ে যাবে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ যারা যাকাত প্রদান করে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে এর ভাবার্থ হলোঃ “আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই’ এই সাক্ষ্য যারা প্রদান করে না। ইকরামাও (রঃ) এ কথাই বলেন। এই উক্তিটি আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলার নিম্নের উক্তির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।”(৯২:৯-১০) নিমের উক্তিটিও অনুরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে যে পবিত্রতা অর্জন করে এবং তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করে ও নামায পড়ে।”(৮৭:১৪-১৫) আল্লাহ্ তাআলার নিম্নের এ উক্তিটিও ঐরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার পবিত্রতা অর্জন করার খেয়াল আছে কি?”(৭৯:১৮) এ আয়াতগুলোতে যাকাত অর্থাৎ পবিত্রতা দ্বারা নফকে বাজে চরিত্র হতে মুক্ত রাখা উদ্দেশ্য। আর এর সবচেয়ে বড় ও প্রথম প্রকার হচ্ছে শিরূক হতে পবিত্র হওয়া। অনুরূপভাবে উপরোক্ত আয়াতে যাকাত না দেয়া দ্বারা তাওহীদকে অমান্য করা বুঝানো হয়েছে। মালের যাকাতকে যাকাত বলার কারণ এই যে, এটা মালকে অবৈধতা হতে পবিত্র করে এবং মালের বৃদ্ধি ও বরকতের কারণ হয়। আর আল্লাহর পথে ঐ মাল হতে কিছু খরচ করার তাওফীক লাভ হয়। কিন্তু ইমাম সুদ্দী (রঃ), মুআবিয়া ইবনে কুরুরা (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং অন্যান্য তাফসীরকারগণ এর অর্থ করেছেন মালের যাকাত না দেয়া এবং বাহ্যতঃ এটাই বুঝা যাচ্ছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-ও এটাকেই পছন্দ করেছেন। কিন্তু এ উক্তিটির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, যাকাত ফরয হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। আর এ আয়াত অবতীর্ণ হয় মক্কায়। বড় জোর এই তাফসীরকে মেনে নিয়ে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, সাদকা ও যাকাতের আসল হুকুম তো নবুওয়াতের শুরুতেই ছিল। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিন তোমরা তার হক দিয়ে দাও।”(৬:১৪১) হ্যা, তবে ঐ যাকাত, যার নিসাব ও পরিমাণ আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নির্ধারিত হয় তা হয় মদীনায়। এটি এমন একটি উক্তি যে, এর দ্বারা দু’টি উক্তির মধ্যে সামঞ্জস্য এসে যায়।নামাযের ব্যাপারেও এটা দেখা যায় যে, নামায সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে নবুওয়াতের শুরুতেই ফরয হয়েছিল। কিন্তু মিরাজের রাত্রে হিজরতের দেড় বছর পূর্বে পাঁচ ওয়াক্ত নামায নিয়মিতভাবে শর্ত ও আরকানসহ নির্ধারিত হয়। আর ধীরে ধীরে এর সমুদয় সম্পর্কিত বিষয় পুরো করে দেয়া হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্যে রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার।” এটা কখনো শেষ হবার নয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যাতে তারা হবে চিরস্থায়ী।”(১৮:৩) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদেরকে যে ইনআ'ম দেয়া হবে তা কখনো ভাঙ্গবার বা শেষ হবার নয়, বরং অনবরতই থাকবে।”(১১:১০৮) সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে যেন এটা তাদের প্রাপ্য হিসেবে দেয়া হবে, অনুগ্রহ হিসেবে নয়। কিন্তু কতক ইমাম তাঁর এ উক্তি খণ্ডন করেছেন। কেননা, জান্নাতবাসীর উপরও নিশ্চিতরূপে আল্লাহর অনুগ্রহ রয়েছে, এ কথা বলতে হবে। স্বয়ং আল্লাহ্ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “বরং আল্লাহ্ই ঈমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন বা তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।”(৪৯:১৭) জান্নাতবাসীদের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ্ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি হতে রক্ষা করেছেন।”(৫২:২৭) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ কিন্তু এই যে, আল্লাহ্ আমাকে স্বীয় রহমত, অনুগ্রহ ও ইহসানের মধ্যে নিয়ে নিবেন।
ফুসসিলাত 41:8
৬-৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এই মিথ্যা প্রশ্নকারী মুশরিকদেরকে বলে দাও- আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমাকে অহীর মাধ্যমে বলে দেয়া হয়েছে যে, তোমাদের সবারই মা'বুদ এক আল্লাহ। তোমরা যে কতকগুলো মা'বূদ বানিয়ে নিয়েছো এটা সরাসরি বিভ্রান্তিকর পন্থা। তোমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত কর এবং ঠিক ঐভাবে কর যেভাবে তোমরা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর মাধ্যমে জানতে পেরেছে। আর তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী গুনাহ্ হতে তাওবা কর এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। বিশ্বাস রেখো যে, আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপনকারীরা ধ্বংস হয়ে যাবে। মহান আল্লাহর উক্তিঃ যারা যাকাত প্রদান করে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে এর ভাবার্থ হলোঃ “আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই’ এই সাক্ষ্য যারা প্রদান করে না। ইকরামাও (রঃ) এ কথাই বলেন। এই উক্তিটি আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলার নিম্নের উক্তির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।”(৯২:৯-১০) নিমের উক্তিটিও অনুরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে যে পবিত্রতা অর্জন করে এবং তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করে ও নামায পড়ে।”(৮৭:১৪-১৫) আল্লাহ্ তাআলার নিম্নের এ উক্তিটিও ঐরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার পবিত্রতা অর্জন করার খেয়াল আছে কি?”(৭৯:১৮) এ আয়াতগুলোতে যাকাত অর্থাৎ পবিত্রতা দ্বারা নফকে বাজে চরিত্র হতে মুক্ত রাখা উদ্দেশ্য। আর এর সবচেয়ে বড় ও প্রথম প্রকার হচ্ছে শিরূক হতে পবিত্র হওয়া। অনুরূপভাবে উপরোক্ত আয়াতে যাকাত না দেয়া দ্বারা তাওহীদকে অমান্য করা বুঝানো হয়েছে। মালের যাকাতকে যাকাত বলার কারণ এই যে, এটা মালকে অবৈধতা হতে পবিত্র করে এবং মালের বৃদ্ধি ও বরকতের কারণ হয়। আর আল্লাহর পথে ঐ মাল হতে কিছু খরচ করার তাওফীক লাভ হয়। কিন্তু ইমাম সুদ্দী (রঃ), মুআবিয়া ইবনে কুরুরা (রঃ), কাতাদা (রঃ) এবং অন্যান্য তাফসীরকারগণ এর অর্থ করেছেন মালের যাকাত না দেয়া এবং বাহ্যতঃ এটাই বুঝা যাচ্ছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-ও এটাকেই পছন্দ করেছেন। কিন্তু এ উক্তিটির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, যাকাত ফরয হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে। আর এ আয়াত অবতীর্ণ হয় মক্কায়। বড় জোর এই তাফসীরকে মেনে নিয়ে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, সাদকা ও যাকাতের আসল হুকুম তো নবুওয়াতের শুরুতেই ছিল। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ফসল কাটার দিন তোমরা তার হক দিয়ে দাও।”(৬:১৪১) হ্যা, তবে ঐ যাকাত, যার নিসাব ও পরিমাণ আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নির্ধারিত হয় তা হয় মদীনায়। এটি এমন একটি উক্তি যে, এর দ্বারা দু’টি উক্তির মধ্যে সামঞ্জস্য এসে যায়।নামাযের ব্যাপারেও এটা দেখা যায় যে, নামায সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে নবুওয়াতের শুরুতেই ফরয হয়েছিল। কিন্তু মিরাজের রাত্রে হিজরতের দেড় বছর পূর্বে পাঁচ ওয়াক্ত নামায নিয়মিতভাবে শর্ত ও আরকানসহ নির্ধারিত হয়। আর ধীরে ধীরে এর সমুদয় সম্পর্কিত বিষয় পুরো করে দেয়া হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্যে রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার।” এটা কখনো শেষ হবার নয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যাতে তারা হবে চিরস্থায়ী।”(১৮:৩) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদেরকে যে ইনআ'ম দেয়া হবে তা কখনো ভাঙ্গবার বা শেষ হবার নয়, বরং অনবরতই থাকবে।”(১১:১০৮) সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে যেন এটা তাদের প্রাপ্য হিসেবে দেয়া হবে, অনুগ্রহ হিসেবে নয়। কিন্তু কতক ইমাম তাঁর এ উক্তি খণ্ডন করেছেন। কেননা, জান্নাতবাসীর উপরও নিশ্চিতরূপে আল্লাহর অনুগ্রহ রয়েছে, এ কথা বলতে হবে। স্বয়ং আল্লাহ্ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “বরং আল্লাহ্ই ঈমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন বা তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।”(৪৯:১৭) জান্নাতবাসীদের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ্ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি হতে রক্ষা করেছেন।”(৫২:২৭) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ কিন্তু এই যে, আল্লাহ্ আমাকে স্বীয় রহমত, অনুগ্রহ ও ইহসানের মধ্যে নিয়ে নিবেন।
ফুসসিলাত 41:9
৯-১২ নং আয়াতের তাফসীর: সবারই সৃষ্টিকর্তা, অধিকর্তা, শাসনকর্তা এবং পালনকর্তা একমাত্র আল্লাহ। সবারই উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান একমাত্র তিনিই। যমীনের ন্যায় প্রশস্ত সৃষ্ট জিনিসকে তিনি স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতাবলে মাত্র দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের তার সাথে কুফরী করাও উচিত নয় এবং শির্ক করাও না। তিনিই যেমন সবারই সৃষ্টিকর্তা তেমনই তিনিই সবারই পালনকর্তা। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, অন্যান্য আয়াতে যমীন ও আসমানকে ছয় দিনে সৃষ্টি করার কথা বর্ণিত হয়েছে, আর এখানে এগুলোকে সৃষ্টি করার সময় পৃথকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং জানা গেল যে, প্রথমে যমীনকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অট্টালিকা নির্মাণ করারও পদ্ধতি এটাই যে, প্রথমে ভিত্তি ও নীচের অংশ নির্মাণ করা হয়। তারপর উপরের অংশ ও ছাদ নির্মাণ করা হয়ে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন, তৎপর তিনি আকাশের দিকে মনোসংযোগ করেন এবং ওকে সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেন।”(২:২৯) আর আল্লাহ তাআলা যে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই এটা নির্মাণ করেছেন; তিনি এটাকে সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত করেছেন। তিনি রাত্রিকে করেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং প্রকাশ করেছেন সূর্যালোক; এবং পৃথিবীকে এরপর বিস্তৃত করেছেন। তিনি ওটা হতে বহির্গত করেছেন ওর পানি ও তৃণ, এবং পর্বতকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছেন। এসব তোমাদের ও তোমাদের (গৃহপালিত) চতুষ্পদ জন্তুর ভোগের জন্যে।”(৭৯ ২৭-৩৩) এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, আসমানকে প্রথমে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং যমীনকে এর পরে বিছানো হয়েছে; কিন্তু এর দ্বারা ভাবার্থ এই যে, পরে যমীন হতে পানি, চারা বের করা হয়েছে এবং পাহাড়কে গেড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন এর পরেই রয়েছেঃ “তিনি ওটা হতে বের করেছেন ওর পানি ও তৃণ।” তারপর তিনি আসমান ও যমীনকে ঠিকঠাক করেছেন। সুতরাং দু’টি আয়াতের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “কুরআন কারীমের কতকগুলো আয়াতের মধ্যে আমি কিছুটা অনৈক্য দেখতে পাচ্ছি। যেমন একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ দিন তাদের মধ্যে কোন বংশ সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করবে না।”(২৩:১০১) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা একে অপরের সামনা-সামনি হয়ে পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করবে।”(৫২:২৫) এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা আল্লাহর কাছে কোন কথা গোপন করবে না।”(৪:৪২) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর কসম! আমরা মুশরিক ছিলাম না।”(৬:২৩) এ আয়াতে রয়েছে যে, তারা গোপন করবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই এটা সৃষ্টি করেছেন।...... এবং পৃথিবীকে এরপর বিস্তৃত করেছেন।”(৭৯:২৭-৩০) এখানে মহান আল্লাহ্ আকাশ সৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন যমীনের পূর্বে। আর এখানে (সূরায়ে হা-মীম, আস্ সাজদায়) বলেছেনঃ (আরবী) এখানে তিনি যমীন সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করেছেন আকাশ সৃষ্টির পূর্বে। আর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) তাহলে কি আল্লাহ্ এরূপ ছিলেন, তারপর গত হয়ে গেছেন? দয়া করে এগুলোর সঠিক অর্থ বুঝিয়ে দিন, যাতে অনৈক্য দূর হয়ে যায়। লোকটির এসব প্রশ্নের উত্তরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “যে দু’টি আয়াতের একটির মধ্যে পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদের কথা রয়েছে এবং অন্যটিতে তা অস্বীকার করা হয়েছে। এটা দুই সময়ের কথা। শিংগায় দুটি ফুকার দেয়া হবে। প্রথম ফুৎকারের সময় পরস্পরের মধ্যে কোন জিজ্ঞাসাবাদ হবে না। দ্বিতীয় ফুঙ্কারের সময় পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ হবে। যে দুটি আয়াতের একটির মধ্যে কোন কথা গোপন না করার এবং অন্য আয়াতে গোপন করার কথা রয়েছে। এরও স্থল দু’টি। যখন মুশরিকরা দেখবে যে, একত্ববাদীদের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে তখন তারা বলবেঃ “আমরা মুশরিক ছিলাম না। কিন্তু যখন তাদের মুখে মোহর লেগে যাবে এবং দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সাক্ষ্য দিতে শুরু করবে তখন আর কিছুই গোপন থাকবে না এবং তাদের কৃতকর্মের স্বীকারুক্তি হয়ে যাবে। তখন তারা বলবেঃ “হায়! আমরা যদি মাটি হয়ে যেতাম।”আসমান এবং যমীনের সৃষ্টির ক্রম পর্যায়ের ব্যাপারেও কোন অনৈক্য নেই। প্রথমে দুই দিনে যমীনকে সৃষ্টি করা হয়। তারপর দুই দিনে আসমানকে সৃষ্টি করা হয়। অতঃপর যমীনের জিনিসগুলো, যেমন পানি, চারা, পাহাড়-পর্বত, প্রস্তরাদি, জড় পদার্থ ইত্যাদি দুই দিনে সৃষ্টি করেন। (আরবী)-এর অর্থ এটাই। সুতরাং যমীনের পূর্ণ সৃষ্টিকার্য চার দিনে হয়েছে। আর আসমান সৃষ্টি করেছেন দুই দিনে।যে নামগুলো আল্লাহ তা'আলা নিজের জন্যে নির্ধারণ করেছেন ওগুলোর তিনি বর্ণনা দিয়েছেন যে, সদা-সর্বদা তিনি ঐরূপই থাকবেন। আল্লাহ তা'আলার কোন ইচ্ছাই অপূর্ণ থাকে না। সুতরাং কুরআন কারীমের মধ্যে মোটেই অনৈক্য নেই এবং এর আয়াতগুলো পরস্পর বিরোধী নয়। এর এক একটি শব্দ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার পক্ষ হতে এসেছে। যমীনকে আল্লাহ তা'আলা দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ রবিবার ও সোমবারে। আর যমীনের উপর পাহাড়-পর্বত বানিয়েছেন। যমীনকে তিনি বরকতময় করেছেন। মানুষ এতে বীজ বপন করে এবং তা হতে গাছ, ফলমূল ইত্যাদি উৎপন্ন হয়। পৃথিবীবাসীর যেসব জিনিসের প্রয়োজন তার সবই যমীনেই উৎপন্ন হয়। ক্ষেত এবং বাগানের স্থানও তিনি বানিয়ে দিয়েছেন। যমীনের এই ঠিক-ঠাককরণ মঙ্গল ও বুধবারে হয়। চার দিনে যমীনের সৃষ্টিকার্য সমাপ্ত হয়। যে লোকগুলো এর জ্ঞান লাভ করতে চাচ্ছিল তারা পূর্ণ জবাব পেয়ে যায়। সুতরাং এ বিষয়ে তারা জ্ঞান লাভে সক্ষম হয়। যমীনের প্রতিটি অংশে মহান আল্লাহ ঐ জিনিস সরবরাহ করেছেন যা তথাকার বাসিন্দার জন্যে উপযোগী। যেমন ইয়ামনে আসব’, সাকূরে ‘সাকূরী’ এবং রাষ্ট্র এ তায়ালিসা’। আয়াতের শেষ বাক্যের ভাবার্থ এটাই। এটাও বলা। হয়েছে যে, যার যা প্রয়োজন ছিল, আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে তা সরবরাহ করেছেন। এ অর্থটি আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির সহিত সাদৃশ্যপূর্ণঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যা কিছু চেয়েছে, তিনি (আল্লাহ) তোমাদেরকে তার সবই দিয়েছেন।”(১৪:৩৪) এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ বিশেষ। আল্লাহ একে এবং পৃথিবীকে বললেনঃ তোমরা উভয়ে এসো ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। অর্থাৎ আমার হুকুম মেনে নিয়ে আমি যা বলি তাই হয়ে যাও, খুশী মনে অথবা বাধ্য হয়ে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যেমন আকাশকে হুকুম করা হলো সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি উদিত করার। আর যমীনকে হুকুম করা হলো পানির নহর জারী করার এবং ফল-মূল উৎপন্ন করার ইত্যাদি। উভয়েই খুশী মনে হুকুম মেনে নিতে সম্মত হয়ে গেল এবং বললোঃ “আমরা আসলাম অনুগত হয়ে। কথিত আছে যে, এদুটোকে কথোপকথনকারীদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়। একথাও। বলা হয়েছে যে, যমীনের ঐ অংশ কথা বলেছিল যেখানে কাবা ঘর নির্মিত হয়েছে। আর আসমানের ঐ অংশ কথা বলেছিল যা ঠিক এর উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যদি আসমান ও যমীন আনুগত্য স্বীকার না করতো তবে ওদেরকে শাস্তি দেয়া হতো, যে শাস্তির যন্ত্রণা তারা অনুভব করতো।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আকাশমণ্ডলকে দুই দিনে সপ্তাকাশে পরিণত করলেন। অর্থাৎ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারে। প্রত্যেক আকাশে তিনি ইচ্ছামত জিনিস ও ফেরেশতামণ্ডলী প্রতিষ্ঠিত ও নিয়োজিত করে দেন। দুনিয়ার আকাশকে তিনি তারকারাজি দ্বারা সুশোভিত করেন যেগুলো যমীনে আলো বিচ্ছুরিত করে এবং ঐ শয়তানদের প্রতি ওরা সজাগ দৃষ্টি রাখে যারা উর্ধ জগতের কিছু শুনবার উদ্দেশ্য উপরে উঠার ইচ্ছা করে এবং ওগুলো সব দিক হতে ঐ শয়তানদের প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা, যিনি সবারই উপর বিজয়ী, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিটি অংশের সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয়ের খবর রাখেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকার্য সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা রবিবার ও সোমবারে যমীন সৃষ্টি করেন। পাহাড় পর্বত এবং সমুদয় উপকারী বস্তুকে সৃষ্টি করেন মঙ্গলবারে। বুধবারে গাছ-পালা, পানি, শহর এবং আবাদী ও অনাবাদি অর্থাৎ জনপদ ও মরু প্রান্তর সৃষ্টি করেন। সুতরাং এটা হলো চার দিন।” এটা বর্ণনা করার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটিই পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “বৃহস্পতিবারে আল্লাহ তা'আলা আসমান সৃষ্টি করেন এবং শুক্রবারে তিন ঘন্টা বাকী থাকা পর্যন্ত নক্ষত্ররাজি, সূর্য, চন্দ্র এবং ফেরেশতামণ্ডলী সৃষ্টি করেন। দ্বিতীয় ঘন্টায় প্রত্যেকটি জিনিসের উপর বিপদ আপতিত করেন যার থেকে লোক উপকার লাভ করে থাকে। তৃতীয় ঘন্টায় তিনি হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন, তাঁকে বেহেশতে প্রতিষ্ঠিত করেন, ইবলীসকে হুকুম করেন হযরত আদম (আঃ)-কে সিজদা করার এবং পরিশেষে তাকে সেখান হতে বের করে দেন।” ইয়াহূদীরা বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এরপর কি হলো?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন। তারা বললোঃ “আপনি সবই ঠিক বলেছেন, কিন্তু শেষ কথাটি বলেননি। তা হলো এই যে, অতঃপর তিনি আরাম গ্রহণ করেন। তাদের একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাগান্বিত হলেন। তখন নিম্নলিখিত আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত সবকিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে; আমাকে কোন ক্লান্তি স্পর্শ করেনি। অতএব, তারা যা বলে তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ কর।”(৫০:৩৮-৩৯) (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ বর্ণনাটি গারীব) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (একদা) রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার হাত ধরে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা মাটিকে শনিবারের দিন সৃষ্টি করেন। তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেন রবিবারে। বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করেন সোমবারে। অপ্রীতিকর জিনিস সৃষ্টি করেন মঙ্গলবারে। আলো সৃষ্টি করেন বুধবারে। জীব-জন্তু যমীনে ছড়িয়ে দেন বৃহস্পতিবারে। আর শুক্রবারের দিন আসরের এবং রাত্রির মাঝামাঝি সময়ে, দিনের শেষ ভাগে হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন এবং এভাবে সৃষ্টিকার্য সমাপ্ত করেন।” (এ হাদীসটি ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বর্ণনা করেন। ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটাও গারীব হাদীস। ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে মুআল্লাল বলেছেন এবং বলেছেন যে, কেউ কেউ এটাকে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে এবং হযরত হুরাইরা (রাঃ) কা'ব আহবার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং এটাই সঠিকতম)
ফুসসিলাত 41:10
৯-১২ নং আয়াতের তাফসীর: সবারই সৃষ্টিকর্তা, অধিকর্তা, শাসনকর্তা এবং পালনকর্তা একমাত্র আল্লাহ। সবারই উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান একমাত্র তিনিই। যমীনের ন্যায় প্রশস্ত সৃষ্ট জিনিসকে তিনি স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতাবলে মাত্র দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের তার সাথে কুফরী করাও উচিত নয় এবং শির্ক করাও না। তিনিই যেমন সবারই সৃষ্টিকর্তা তেমনই তিনিই সবারই পালনকর্তা। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, অন্যান্য আয়াতে যমীন ও আসমানকে ছয় দিনে সৃষ্টি করার কথা বর্ণিত হয়েছে, আর এখানে এগুলোকে সৃষ্টি করার সময় পৃথকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং জানা গেল যে, প্রথমে যমীনকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অট্টালিকা নির্মাণ করারও পদ্ধতি এটাই যে, প্রথমে ভিত্তি ও নীচের অংশ নির্মাণ করা হয়। তারপর উপরের অংশ ও ছাদ নির্মাণ করা হয়ে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন, তৎপর তিনি আকাশের দিকে মনোসংযোগ করেন এবং ওকে সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেন।”(২:২৯) আর আল্লাহ তাআলা যে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই এটা নির্মাণ করেছেন; তিনি এটাকে সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত করেছেন। তিনি রাত্রিকে করেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং প্রকাশ করেছেন সূর্যালোক; এবং পৃথিবীকে এরপর বিস্তৃত করেছেন। তিনি ওটা হতে বহির্গত করেছেন ওর পানি ও তৃণ, এবং পর্বতকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছেন। এসব তোমাদের ও তোমাদের (গৃহপালিত) চতুষ্পদ জন্তুর ভোগের জন্যে।”(৭৯ ২৭-৩৩) এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, আসমানকে প্রথমে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং যমীনকে এর পরে বিছানো হয়েছে; কিন্তু এর দ্বারা ভাবার্থ এই যে, পরে যমীন হতে পানি, চারা বের করা হয়েছে এবং পাহাড়কে গেড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন এর পরেই রয়েছেঃ “তিনি ওটা হতে বের করেছেন ওর পানি ও তৃণ।” তারপর তিনি আসমান ও যমীনকে ঠিকঠাক করেছেন। সুতরাং দু’টি আয়াতের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “কুরআন কারীমের কতকগুলো আয়াতের মধ্যে আমি কিছুটা অনৈক্য দেখতে পাচ্ছি। যেমন একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ দিন তাদের মধ্যে কোন বংশ সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করবে না।”(২৩:১০১) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা একে অপরের সামনা-সামনি হয়ে পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করবে।”(৫২:২৫) এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা আল্লাহর কাছে কোন কথা গোপন করবে না।”(৪:৪২) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর কসম! আমরা মুশরিক ছিলাম না।”(৬:২৩) এ আয়াতে রয়েছে যে, তারা গোপন করবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই এটা সৃষ্টি করেছেন।...... এবং পৃথিবীকে এরপর বিস্তৃত করেছেন।”(৭৯:২৭-৩০) এখানে মহান আল্লাহ্ আকাশ সৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন যমীনের পূর্বে। আর এখানে (সূরায়ে হা-মীম, আস্ সাজদায়) বলেছেনঃ (আরবী) এখানে তিনি যমীন সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করেছেন আকাশ সৃষ্টির পূর্বে। আর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) তাহলে কি আল্লাহ্ এরূপ ছিলেন, তারপর গত হয়ে গেছেন? দয়া করে এগুলোর সঠিক অর্থ বুঝিয়ে দিন, যাতে অনৈক্য দূর হয়ে যায়। লোকটির এসব প্রশ্নের উত্তরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “যে দু’টি আয়াতের একটির মধ্যে পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদের কথা রয়েছে এবং অন্যটিতে তা অস্বীকার করা হয়েছে। এটা দুই সময়ের কথা। শিংগায় দুটি ফুকার দেয়া হবে। প্রথম ফুৎকারের সময় পরস্পরের মধ্যে কোন জিজ্ঞাসাবাদ হবে না। দ্বিতীয় ফুঙ্কারের সময় পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ হবে। যে দুটি আয়াতের একটির মধ্যে কোন কথা গোপন না করার এবং অন্য আয়াতে গোপন করার কথা রয়েছে। এরও স্থল দু’টি। যখন মুশরিকরা দেখবে যে, একত্ববাদীদের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে তখন তারা বলবেঃ “আমরা মুশরিক ছিলাম না। কিন্তু যখন তাদের মুখে মোহর লেগে যাবে এবং দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সাক্ষ্য দিতে শুরু করবে তখন আর কিছুই গোপন থাকবে না এবং তাদের কৃতকর্মের স্বীকারুক্তি হয়ে যাবে। তখন তারা বলবেঃ “হায়! আমরা যদি মাটি হয়ে যেতাম।”আসমান এবং যমীনের সৃষ্টির ক্রম পর্যায়ের ব্যাপারেও কোন অনৈক্য নেই। প্রথমে দুই দিনে যমীনকে সৃষ্টি করা হয়। তারপর দুই দিনে আসমানকে সৃষ্টি করা হয়। অতঃপর যমীনের জিনিসগুলো, যেমন পানি, চারা, পাহাড়-পর্বত, প্রস্তরাদি, জড় পদার্থ ইত্যাদি দুই দিনে সৃষ্টি করেন। (আরবী)-এর অর্থ এটাই। সুতরাং যমীনের পূর্ণ সৃষ্টিকার্য চার দিনে হয়েছে। আর আসমান সৃষ্টি করেছেন দুই দিনে।যে নামগুলো আল্লাহ তা'আলা নিজের জন্যে নির্ধারণ করেছেন ওগুলোর তিনি বর্ণনা দিয়েছেন যে, সদা-সর্বদা তিনি ঐরূপই থাকবেন। আল্লাহ তা'আলার কোন ইচ্ছাই অপূর্ণ থাকে না। সুতরাং কুরআন কারীমের মধ্যে মোটেই অনৈক্য নেই এবং এর আয়াতগুলো পরস্পর বিরোধী নয়। এর এক একটি শব্দ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার পক্ষ হতে এসেছে। যমীনকে আল্লাহ তা'আলা দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ রবিবার ও সোমবারে। আর যমীনের উপর পাহাড়-পর্বত বানিয়েছেন। যমীনকে তিনি বরকতময় করেছেন। মানুষ এতে বীজ বপন করে এবং তা হতে গাছ, ফলমূল ইত্যাদি উৎপন্ন হয়। পৃথিবীবাসীর যেসব জিনিসের প্রয়োজন তার সবই যমীনেই উৎপন্ন হয়। ক্ষেত এবং বাগানের স্থানও তিনি বানিয়ে দিয়েছেন। যমীনের এই ঠিক-ঠাককরণ মঙ্গল ও বুধবারে হয়। চার দিনে যমীনের সৃষ্টিকার্য সমাপ্ত হয়। যে লোকগুলো এর জ্ঞান লাভ করতে চাচ্ছিল তারা পূর্ণ জবাব পেয়ে যায়। সুতরাং এ বিষয়ে তারা জ্ঞান লাভে সক্ষম হয়। যমীনের প্রতিটি অংশে মহান আল্লাহ ঐ জিনিস সরবরাহ করেছেন যা তথাকার বাসিন্দার জন্যে উপযোগী। যেমন ইয়ামনে আসব’, সাকূরে ‘সাকূরী’ এবং রাষ্ট্র এ তায়ালিসা’। আয়াতের শেষ বাক্যের ভাবার্থ এটাই। এটাও বলা। হয়েছে যে, যার যা প্রয়োজন ছিল, আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে তা সরবরাহ করেছেন। এ অর্থটি আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির সহিত সাদৃশ্যপূর্ণঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যা কিছু চেয়েছে, তিনি (আল্লাহ) তোমাদেরকে তার সবই দিয়েছেন।”(১৪:৩৪) এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ বিশেষ। আল্লাহ একে এবং পৃথিবীকে বললেনঃ তোমরা উভয়ে এসো ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। অর্থাৎ আমার হুকুম মেনে নিয়ে আমি যা বলি তাই হয়ে যাও, খুশী মনে অথবা বাধ্য হয়ে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যেমন আকাশকে হুকুম করা হলো সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি উদিত করার। আর যমীনকে হুকুম করা হলো পানির নহর জারী করার এবং ফল-মূল উৎপন্ন করার ইত্যাদি। উভয়েই খুশী মনে হুকুম মেনে নিতে সম্মত হয়ে গেল এবং বললোঃ “আমরা আসলাম অনুগত হয়ে। কথিত আছে যে, এদুটোকে কথোপকথনকারীদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়। একথাও। বলা হয়েছে যে, যমীনের ঐ অংশ কথা বলেছিল যেখানে কাবা ঘর নির্মিত হয়েছে। আর আসমানের ঐ অংশ কথা বলেছিল যা ঠিক এর উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যদি আসমান ও যমীন আনুগত্য স্বীকার না করতো তবে ওদেরকে শাস্তি দেয়া হতো, যে শাস্তির যন্ত্রণা তারা অনুভব করতো।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আকাশমণ্ডলকে দুই দিনে সপ্তাকাশে পরিণত করলেন। অর্থাৎ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারে। প্রত্যেক আকাশে তিনি ইচ্ছামত জিনিস ও ফেরেশতামণ্ডলী প্রতিষ্ঠিত ও নিয়োজিত করে দেন। দুনিয়ার আকাশকে তিনি তারকারাজি দ্বারা সুশোভিত করেন যেগুলো যমীনে আলো বিচ্ছুরিত করে এবং ঐ শয়তানদের প্রতি ওরা সজাগ দৃষ্টি রাখে যারা উর্ধ জগতের কিছু শুনবার উদ্দেশ্য উপরে উঠার ইচ্ছা করে এবং ওগুলো সব দিক হতে ঐ শয়তানদের প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা, যিনি সবারই উপর বিজয়ী, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিটি অংশের সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয়ের খবর রাখেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকার্য সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা রবিবার ও সোমবারে যমীন সৃষ্টি করেন। পাহাড় পর্বত এবং সমুদয় উপকারী বস্তুকে সৃষ্টি করেন মঙ্গলবারে। বুধবারে গাছ-পালা, পানি, শহর এবং আবাদী ও অনাবাদি অর্থাৎ জনপদ ও মরু প্রান্তর সৃষ্টি করেন। সুতরাং এটা হলো চার দিন।” এটা বর্ণনা করার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটিই পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “বৃহস্পতিবারে আল্লাহ তা'আলা আসমান সৃষ্টি করেন এবং শুক্রবারে তিন ঘন্টা বাকী থাকা পর্যন্ত নক্ষত্ররাজি, সূর্য, চন্দ্র এবং ফেরেশতামণ্ডলী সৃষ্টি করেন। দ্বিতীয় ঘন্টায় প্রত্যেকটি জিনিসের উপর বিপদ আপতিত করেন যার থেকে লোক উপকার লাভ করে থাকে। তৃতীয় ঘন্টায় তিনি হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন, তাঁকে বেহেশতে প্রতিষ্ঠিত করেন, ইবলীসকে হুকুম করেন হযরত আদম (আঃ)-কে সিজদা করার এবং পরিশেষে তাকে সেখান হতে বের করে দেন।” ইয়াহূদীরা বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এরপর কি হলো?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন। তারা বললোঃ “আপনি সবই ঠিক বলেছেন, কিন্তু শেষ কথাটি বলেননি। তা হলো এই যে, অতঃপর তিনি আরাম গ্রহণ করেন। তাদের একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাগান্বিত হলেন। তখন নিম্নলিখিত আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত সবকিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে; আমাকে কোন ক্লান্তি স্পর্শ করেনি। অতএব, তারা যা বলে তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ কর।”(৫০:৩৮-৩৯) (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ বর্ণনাটি গারীব) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (একদা) রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার হাত ধরে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা মাটিকে শনিবারের দিন সৃষ্টি করেন। তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেন রবিবারে। বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করেন সোমবারে। অপ্রীতিকর জিনিস সৃষ্টি করেন মঙ্গলবারে। আলো সৃষ্টি করেন বুধবারে। জীব-জন্তু যমীনে ছড়িয়ে দেন বৃহস্পতিবারে। আর শুক্রবারের দিন আসরের এবং রাত্রির মাঝামাঝি সময়ে, দিনের শেষ ভাগে হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন এবং এভাবে সৃষ্টিকার্য সমাপ্ত করেন।” (এ হাদীসটি ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বর্ণনা করেন। ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটাও গারীব হাদীস। ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে মুআল্লাল বলেছেন এবং বলেছেন যে, কেউ কেউ এটাকে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে এবং হযরত হুরাইরা (রাঃ) কা'ব আহবার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং এটাই সঠিকতম)
ফুসসিলাত 41:11
৯-১২ নং আয়াতের তাফসীর: সবারই সৃষ্টিকর্তা, অধিকর্তা, শাসনকর্তা এবং পালনকর্তা একমাত্র আল্লাহ। সবারই উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান একমাত্র তিনিই। যমীনের ন্যায় প্রশস্ত সৃষ্ট জিনিসকে তিনি স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতাবলে মাত্র দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের তার সাথে কুফরী করাও উচিত নয় এবং শির্ক করাও না। তিনিই যেমন সবারই সৃষ্টিকর্তা তেমনই তিনিই সবারই পালনকর্তা। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, অন্যান্য আয়াতে যমীন ও আসমানকে ছয় দিনে সৃষ্টি করার কথা বর্ণিত হয়েছে, আর এখানে এগুলোকে সৃষ্টি করার সময় পৃথকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং জানা গেল যে, প্রথমে যমীনকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অট্টালিকা নির্মাণ করারও পদ্ধতি এটাই যে, প্রথমে ভিত্তি ও নীচের অংশ নির্মাণ করা হয়। তারপর উপরের অংশ ও ছাদ নির্মাণ করা হয়ে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন, তৎপর তিনি আকাশের দিকে মনোসংযোগ করেন এবং ওকে সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেন।”(২:২৯) আর আল্লাহ তাআলা যে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই এটা নির্মাণ করেছেন; তিনি এটাকে সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত করেছেন। তিনি রাত্রিকে করেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং প্রকাশ করেছেন সূর্যালোক; এবং পৃথিবীকে এরপর বিস্তৃত করেছেন। তিনি ওটা হতে বহির্গত করেছেন ওর পানি ও তৃণ, এবং পর্বতকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছেন। এসব তোমাদের ও তোমাদের (গৃহপালিত) চতুষ্পদ জন্তুর ভোগের জন্যে।”(৭৯ ২৭-৩৩) এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, আসমানকে প্রথমে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং যমীনকে এর পরে বিছানো হয়েছে; কিন্তু এর দ্বারা ভাবার্থ এই যে, পরে যমীন হতে পানি, চারা বের করা হয়েছে এবং পাহাড়কে গেড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন এর পরেই রয়েছেঃ “তিনি ওটা হতে বের করেছেন ওর পানি ও তৃণ।” তারপর তিনি আসমান ও যমীনকে ঠিকঠাক করেছেন। সুতরাং দু’টি আয়াতের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “কুরআন কারীমের কতকগুলো আয়াতের মধ্যে আমি কিছুটা অনৈক্য দেখতে পাচ্ছি। যেমন একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ দিন তাদের মধ্যে কোন বংশ সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করবে না।”(২৩:১০১) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা একে অপরের সামনা-সামনি হয়ে পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করবে।”(৫২:২৫) এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা আল্লাহর কাছে কোন কথা গোপন করবে না।”(৪:৪২) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর কসম! আমরা মুশরিক ছিলাম না।”(৬:২৩) এ আয়াতে রয়েছে যে, তারা গোপন করবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই এটা সৃষ্টি করেছেন।...... এবং পৃথিবীকে এরপর বিস্তৃত করেছেন।”(৭৯:২৭-৩০) এখানে মহান আল্লাহ্ আকাশ সৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন যমীনের পূর্বে। আর এখানে (সূরায়ে হা-মীম, আস্ সাজদায়) বলেছেনঃ (আরবী) এখানে তিনি যমীন সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করেছেন আকাশ সৃষ্টির পূর্বে। আর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) তাহলে কি আল্লাহ্ এরূপ ছিলেন, তারপর গত হয়ে গেছেন? দয়া করে এগুলোর সঠিক অর্থ বুঝিয়ে দিন, যাতে অনৈক্য দূর হয়ে যায়। লোকটির এসব প্রশ্নের উত্তরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “যে দু’টি আয়াতের একটির মধ্যে পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদের কথা রয়েছে এবং অন্যটিতে তা অস্বীকার করা হয়েছে। এটা দুই সময়ের কথা। শিংগায় দুটি ফুকার দেয়া হবে। প্রথম ফুৎকারের সময় পরস্পরের মধ্যে কোন জিজ্ঞাসাবাদ হবে না। দ্বিতীয় ফুঙ্কারের সময় পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ হবে। যে দুটি আয়াতের একটির মধ্যে কোন কথা গোপন না করার এবং অন্য আয়াতে গোপন করার কথা রয়েছে। এরও স্থল দু’টি। যখন মুশরিকরা দেখবে যে, একত্ববাদীদের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে তখন তারা বলবেঃ “আমরা মুশরিক ছিলাম না। কিন্তু যখন তাদের মুখে মোহর লেগে যাবে এবং দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সাক্ষ্য দিতে শুরু করবে তখন আর কিছুই গোপন থাকবে না এবং তাদের কৃতকর্মের স্বীকারুক্তি হয়ে যাবে। তখন তারা বলবেঃ “হায়! আমরা যদি মাটি হয়ে যেতাম।”আসমান এবং যমীনের সৃষ্টির ক্রম পর্যায়ের ব্যাপারেও কোন অনৈক্য নেই। প্রথমে দুই দিনে যমীনকে সৃষ্টি করা হয়। তারপর দুই দিনে আসমানকে সৃষ্টি করা হয়। অতঃপর যমীনের জিনিসগুলো, যেমন পানি, চারা, পাহাড়-পর্বত, প্রস্তরাদি, জড় পদার্থ ইত্যাদি দুই দিনে সৃষ্টি করেন। (আরবী)-এর অর্থ এটাই। সুতরাং যমীনের পূর্ণ সৃষ্টিকার্য চার দিনে হয়েছে। আর আসমান সৃষ্টি করেছেন দুই দিনে।যে নামগুলো আল্লাহ তা'আলা নিজের জন্যে নির্ধারণ করেছেন ওগুলোর তিনি বর্ণনা দিয়েছেন যে, সদা-সর্বদা তিনি ঐরূপই থাকবেন। আল্লাহ তা'আলার কোন ইচ্ছাই অপূর্ণ থাকে না। সুতরাং কুরআন কারীমের মধ্যে মোটেই অনৈক্য নেই এবং এর আয়াতগুলো পরস্পর বিরোধী নয়। এর এক একটি শব্দ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার পক্ষ হতে এসেছে। যমীনকে আল্লাহ তা'আলা দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ রবিবার ও সোমবারে। আর যমীনের উপর পাহাড়-পর্বত বানিয়েছেন। যমীনকে তিনি বরকতময় করেছেন। মানুষ এতে বীজ বপন করে এবং তা হতে গাছ, ফলমূল ইত্যাদি উৎপন্ন হয়। পৃথিবীবাসীর যেসব জিনিসের প্রয়োজন তার সবই যমীনেই উৎপন্ন হয়। ক্ষেত এবং বাগানের স্থানও তিনি বানিয়ে দিয়েছেন। যমীনের এই ঠিক-ঠাককরণ মঙ্গল ও বুধবারে হয়। চার দিনে যমীনের সৃষ্টিকার্য সমাপ্ত হয়। যে লোকগুলো এর জ্ঞান লাভ করতে চাচ্ছিল তারা পূর্ণ জবাব পেয়ে যায়। সুতরাং এ বিষয়ে তারা জ্ঞান লাভে সক্ষম হয়। যমীনের প্রতিটি অংশে মহান আল্লাহ ঐ জিনিস সরবরাহ করেছেন যা তথাকার বাসিন্দার জন্যে উপযোগী। যেমন ইয়ামনে আসব’, সাকূরে ‘সাকূরী’ এবং রাষ্ট্র এ তায়ালিসা’। আয়াতের শেষ বাক্যের ভাবার্থ এটাই। এটাও বলা। হয়েছে যে, যার যা প্রয়োজন ছিল, আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে তা সরবরাহ করেছেন। এ অর্থটি আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির সহিত সাদৃশ্যপূর্ণঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যা কিছু চেয়েছে, তিনি (আল্লাহ) তোমাদেরকে তার সবই দিয়েছেন।”(১৪:৩৪) এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ বিশেষ। আল্লাহ একে এবং পৃথিবীকে বললেনঃ তোমরা উভয়ে এসো ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। অর্থাৎ আমার হুকুম মেনে নিয়ে আমি যা বলি তাই হয়ে যাও, খুশী মনে অথবা বাধ্য হয়ে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যেমন আকাশকে হুকুম করা হলো সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি উদিত করার। আর যমীনকে হুকুম করা হলো পানির নহর জারী করার এবং ফল-মূল উৎপন্ন করার ইত্যাদি। উভয়েই খুশী মনে হুকুম মেনে নিতে সম্মত হয়ে গেল এবং বললোঃ “আমরা আসলাম অনুগত হয়ে। কথিত আছে যে, এদুটোকে কথোপকথনকারীদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়। একথাও। বলা হয়েছে যে, যমীনের ঐ অংশ কথা বলেছিল যেখানে কাবা ঘর নির্মিত হয়েছে। আর আসমানের ঐ অংশ কথা বলেছিল যা ঠিক এর উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যদি আসমান ও যমীন আনুগত্য স্বীকার না করতো তবে ওদেরকে শাস্তি দেয়া হতো, যে শাস্তির যন্ত্রণা তারা অনুভব করতো।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আকাশমণ্ডলকে দুই দিনে সপ্তাকাশে পরিণত করলেন। অর্থাৎ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারে। প্রত্যেক আকাশে তিনি ইচ্ছামত জিনিস ও ফেরেশতামণ্ডলী প্রতিষ্ঠিত ও নিয়োজিত করে দেন। দুনিয়ার আকাশকে তিনি তারকারাজি দ্বারা সুশোভিত করেন যেগুলো যমীনে আলো বিচ্ছুরিত করে এবং ঐ শয়তানদের প্রতি ওরা সজাগ দৃষ্টি রাখে যারা উর্ধ জগতের কিছু শুনবার উদ্দেশ্য উপরে উঠার ইচ্ছা করে এবং ওগুলো সব দিক হতে ঐ শয়তানদের প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা, যিনি সবারই উপর বিজয়ী, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিটি অংশের সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয়ের খবর রাখেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকার্য সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা রবিবার ও সোমবারে যমীন সৃষ্টি করেন। পাহাড় পর্বত এবং সমুদয় উপকারী বস্তুকে সৃষ্টি করেন মঙ্গলবারে। বুধবারে গাছ-পালা, পানি, শহর এবং আবাদী ও অনাবাদি অর্থাৎ জনপদ ও মরু প্রান্তর সৃষ্টি করেন। সুতরাং এটা হলো চার দিন।” এটা বর্ণনা করার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটিই পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “বৃহস্পতিবারে আল্লাহ তা'আলা আসমান সৃষ্টি করেন এবং শুক্রবারে তিন ঘন্টা বাকী থাকা পর্যন্ত নক্ষত্ররাজি, সূর্য, চন্দ্র এবং ফেরেশতামণ্ডলী সৃষ্টি করেন। দ্বিতীয় ঘন্টায় প্রত্যেকটি জিনিসের উপর বিপদ আপতিত করেন যার থেকে লোক উপকার লাভ করে থাকে। তৃতীয় ঘন্টায় তিনি হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন, তাঁকে বেহেশতে প্রতিষ্ঠিত করেন, ইবলীসকে হুকুম করেন হযরত আদম (আঃ)-কে সিজদা করার এবং পরিশেষে তাকে সেখান হতে বের করে দেন।” ইয়াহূদীরা বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এরপর কি হলো?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন। তারা বললোঃ “আপনি সবই ঠিক বলেছেন, কিন্তু শেষ কথাটি বলেননি। তা হলো এই যে, অতঃপর তিনি আরাম গ্রহণ করেন। তাদের একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাগান্বিত হলেন। তখন নিম্নলিখিত আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত সবকিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে; আমাকে কোন ক্লান্তি স্পর্শ করেনি। অতএব, তারা যা বলে তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ কর।”(৫০:৩৮-৩৯) (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ বর্ণনাটি গারীব) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (একদা) রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার হাত ধরে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা মাটিকে শনিবারের দিন সৃষ্টি করেন। তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেন রবিবারে। বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করেন সোমবারে। অপ্রীতিকর জিনিস সৃষ্টি করেন মঙ্গলবারে। আলো সৃষ্টি করেন বুধবারে। জীব-জন্তু যমীনে ছড়িয়ে দেন বৃহস্পতিবারে। আর শুক্রবারের দিন আসরের এবং রাত্রির মাঝামাঝি সময়ে, দিনের শেষ ভাগে হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন এবং এভাবে সৃষ্টিকার্য সমাপ্ত করেন।” (এ হাদীসটি ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বর্ণনা করেন। ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটাও গারীব হাদীস। ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে মুআল্লাল বলেছেন এবং বলেছেন যে, কেউ কেউ এটাকে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে এবং হযরত হুরাইরা (রাঃ) কা'ব আহবার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং এটাই সঠিকতম)
ফুসসিলাত 41:12
৯-১২ নং আয়াতের তাফসীর: সবারই সৃষ্টিকর্তা, অধিকর্তা, শাসনকর্তা এবং পালনকর্তা একমাত্র আল্লাহ। সবারই উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান একমাত্র তিনিই। যমীনের ন্যায় প্রশস্ত সৃষ্ট জিনিসকে তিনি স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতাবলে মাত্র দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের তার সাথে কুফরী করাও উচিত নয় এবং শির্ক করাও না। তিনিই যেমন সবারই সৃষ্টিকর্তা তেমনই তিনিই সবারই পালনকর্তা। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, অন্যান্য আয়াতে যমীন ও আসমানকে ছয় দিনে সৃষ্টি করার কথা বর্ণিত হয়েছে, আর এখানে এগুলোকে সৃষ্টি করার সময় পৃথকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং জানা গেল যে, প্রথমে যমীনকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অট্টালিকা নির্মাণ করারও পদ্ধতি এটাই যে, প্রথমে ভিত্তি ও নীচের অংশ নির্মাণ করা হয়। তারপর উপরের অংশ ও ছাদ নির্মাণ করা হয়ে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন, তৎপর তিনি আকাশের দিকে মনোসংযোগ করেন এবং ওকে সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেন।”(২:২৯) আর আল্লাহ তাআলা যে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই এটা নির্মাণ করেছেন; তিনি এটাকে সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত করেছেন। তিনি রাত্রিকে করেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং প্রকাশ করেছেন সূর্যালোক; এবং পৃথিবীকে এরপর বিস্তৃত করেছেন। তিনি ওটা হতে বহির্গত করেছেন ওর পানি ও তৃণ, এবং পর্বতকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছেন। এসব তোমাদের ও তোমাদের (গৃহপালিত) চতুষ্পদ জন্তুর ভোগের জন্যে।”(৭৯ ২৭-৩৩) এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, আসমানকে প্রথমে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং যমীনকে এর পরে বিছানো হয়েছে; কিন্তু এর দ্বারা ভাবার্থ এই যে, পরে যমীন হতে পানি, চারা বের করা হয়েছে এবং পাহাড়কে গেড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন এর পরেই রয়েছেঃ “তিনি ওটা হতে বের করেছেন ওর পানি ও তৃণ।” তারপর তিনি আসমান ও যমীনকে ঠিকঠাক করেছেন। সুতরাং দু’টি আয়াতের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “কুরআন কারীমের কতকগুলো আয়াতের মধ্যে আমি কিছুটা অনৈক্য দেখতে পাচ্ছি। যেমন একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ঐ দিন তাদের মধ্যে কোন বংশ সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করবে না।”(২৩:১০১) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা একে অপরের সামনা-সামনি হয়ে পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করবে।”(৫২:২৫) এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা আল্লাহর কাছে কোন কথা গোপন করবে না।”(৪:৪২) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর কসম! আমরা মুশরিক ছিলাম না।”(৬:২৩) এ আয়াতে রয়েছে যে, তারা গোপন করবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই এটা সৃষ্টি করেছেন।...... এবং পৃথিবীকে এরপর বিস্তৃত করেছেন।”(৭৯:২৭-৩০) এখানে মহান আল্লাহ্ আকাশ সৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন যমীনের পূর্বে। আর এখানে (সূরায়ে হা-মীম, আস্ সাজদায়) বলেছেনঃ (আরবী) এখানে তিনি যমীন সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করেছেন আকাশ সৃষ্টির পূর্বে। আর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) তাহলে কি আল্লাহ্ এরূপ ছিলেন, তারপর গত হয়ে গেছেন? দয়া করে এগুলোর সঠিক অর্থ বুঝিয়ে দিন, যাতে অনৈক্য দূর হয়ে যায়। লোকটির এসব প্রশ্নের উত্তরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “যে দু’টি আয়াতের একটির মধ্যে পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদের কথা রয়েছে এবং অন্যটিতে তা অস্বীকার করা হয়েছে। এটা দুই সময়ের কথা। শিংগায় দুটি ফুকার দেয়া হবে। প্রথম ফুৎকারের সময় পরস্পরের মধ্যে কোন জিজ্ঞাসাবাদ হবে না। দ্বিতীয় ফুঙ্কারের সময় পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ হবে। যে দুটি আয়াতের একটির মধ্যে কোন কথা গোপন না করার এবং অন্য আয়াতে গোপন করার কথা রয়েছে। এরও স্থল দু’টি। যখন মুশরিকরা দেখবে যে, একত্ববাদীদের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে তখন তারা বলবেঃ “আমরা মুশরিক ছিলাম না। কিন্তু যখন তাদের মুখে মোহর লেগে যাবে এবং দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সাক্ষ্য দিতে শুরু করবে তখন আর কিছুই গোপন থাকবে না এবং তাদের কৃতকর্মের স্বীকারুক্তি হয়ে যাবে। তখন তারা বলবেঃ “হায়! আমরা যদি মাটি হয়ে যেতাম।”আসমান এবং যমীনের সৃষ্টির ক্রম পর্যায়ের ব্যাপারেও কোন অনৈক্য নেই। প্রথমে দুই দিনে যমীনকে সৃষ্টি করা হয়। তারপর দুই দিনে আসমানকে সৃষ্টি করা হয়। অতঃপর যমীনের জিনিসগুলো, যেমন পানি, চারা, পাহাড়-পর্বত, প্রস্তরাদি, জড় পদার্থ ইত্যাদি দুই দিনে সৃষ্টি করেন। (আরবী)-এর অর্থ এটাই। সুতরাং যমীনের পূর্ণ সৃষ্টিকার্য চার দিনে হয়েছে। আর আসমান সৃষ্টি করেছেন দুই দিনে।যে নামগুলো আল্লাহ তা'আলা নিজের জন্যে নির্ধারণ করেছেন ওগুলোর তিনি বর্ণনা দিয়েছেন যে, সদা-সর্বদা তিনি ঐরূপই থাকবেন। আল্লাহ তা'আলার কোন ইচ্ছাই অপূর্ণ থাকে না। সুতরাং কুরআন কারীমের মধ্যে মোটেই অনৈক্য নেই এবং এর আয়াতগুলো পরস্পর বিরোধী নয়। এর এক একটি শব্দ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার পক্ষ হতে এসেছে। যমীনকে আল্লাহ তা'আলা দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ রবিবার ও সোমবারে। আর যমীনের উপর পাহাড়-পর্বত বানিয়েছেন। যমীনকে তিনি বরকতময় করেছেন। মানুষ এতে বীজ বপন করে এবং তা হতে গাছ, ফলমূল ইত্যাদি উৎপন্ন হয়। পৃথিবীবাসীর যেসব জিনিসের প্রয়োজন তার সবই যমীনেই উৎপন্ন হয়। ক্ষেত এবং বাগানের স্থানও তিনি বানিয়ে দিয়েছেন। যমীনের এই ঠিক-ঠাককরণ মঙ্গল ও বুধবারে হয়। চার দিনে যমীনের সৃষ্টিকার্য সমাপ্ত হয়। যে লোকগুলো এর জ্ঞান লাভ করতে চাচ্ছিল তারা পূর্ণ জবাব পেয়ে যায়। সুতরাং এ বিষয়ে তারা জ্ঞান লাভে সক্ষম হয়। যমীনের প্রতিটি অংশে মহান আল্লাহ ঐ জিনিস সরবরাহ করেছেন যা তথাকার বাসিন্দার জন্যে উপযোগী। যেমন ইয়ামনে আসব’, সাকূরে ‘সাকূরী’ এবং রাষ্ট্র এ তায়ালিসা’। আয়াতের শেষ বাক্যের ভাবার্থ এটাই। এটাও বলা। হয়েছে যে, যার যা প্রয়োজন ছিল, আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে তা সরবরাহ করেছেন। এ অর্থটি আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির সহিত সাদৃশ্যপূর্ণঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যা কিছু চেয়েছে, তিনি (আল্লাহ) তোমাদেরকে তার সবই দিয়েছেন।”(১৪:৩৪) এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ বিশেষ। আল্লাহ একে এবং পৃথিবীকে বললেনঃ তোমরা উভয়ে এসো ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। অর্থাৎ আমার হুকুম মেনে নিয়ে আমি যা বলি তাই হয়ে যাও, খুশী মনে অথবা বাধ্য হয়ে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যেমন আকাশকে হুকুম করা হলো সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি উদিত করার। আর যমীনকে হুকুম করা হলো পানির নহর জারী করার এবং ফল-মূল উৎপন্ন করার ইত্যাদি। উভয়েই খুশী মনে হুকুম মেনে নিতে সম্মত হয়ে গেল এবং বললোঃ “আমরা আসলাম অনুগত হয়ে। কথিত আছে যে, এদুটোকে কথোপকথনকারীদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়। একথাও। বলা হয়েছে যে, যমীনের ঐ অংশ কথা বলেছিল যেখানে কাবা ঘর নির্মিত হয়েছে। আর আসমানের ঐ অংশ কথা বলেছিল যা ঠিক এর উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।ইমাম হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যদি আসমান ও যমীন আনুগত্য স্বীকার না করতো তবে ওদেরকে শাস্তি দেয়া হতো, যে শাস্তির যন্ত্রণা তারা অনুভব করতো।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আকাশমণ্ডলকে দুই দিনে সপ্তাকাশে পরিণত করলেন। অর্থাৎ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারে। প্রত্যেক আকাশে তিনি ইচ্ছামত জিনিস ও ফেরেশতামণ্ডলী প্রতিষ্ঠিত ও নিয়োজিত করে দেন। দুনিয়ার আকাশকে তিনি তারকারাজি দ্বারা সুশোভিত করেন যেগুলো যমীনে আলো বিচ্ছুরিত করে এবং ঐ শয়তানদের প্রতি ওরা সজাগ দৃষ্টি রাখে যারা উর্ধ জগতের কিছু শুনবার উদ্দেশ্য উপরে উঠার ইচ্ছা করে এবং ওগুলো সব দিক হতে ঐ শয়তানদের প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা, যিনি সবারই উপর বিজয়ী, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিটি অংশের সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয়ের খবর রাখেন।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকার্য সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা রবিবার ও সোমবারে যমীন সৃষ্টি করেন। পাহাড় পর্বত এবং সমুদয় উপকারী বস্তুকে সৃষ্টি করেন মঙ্গলবারে। বুধবারে গাছ-পালা, পানি, শহর এবং আবাদী ও অনাবাদি অর্থাৎ জনপদ ও মরু প্রান্তর সৃষ্টি করেন। সুতরাং এটা হলো চার দিন।” এটা বর্ণনা করার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটিই পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “বৃহস্পতিবারে আল্লাহ তা'আলা আসমান সৃষ্টি করেন এবং শুক্রবারে তিন ঘন্টা বাকী থাকা পর্যন্ত নক্ষত্ররাজি, সূর্য, চন্দ্র এবং ফেরেশতামণ্ডলী সৃষ্টি করেন। দ্বিতীয় ঘন্টায় প্রত্যেকটি জিনিসের উপর বিপদ আপতিত করেন যার থেকে লোক উপকার লাভ করে থাকে। তৃতীয় ঘন্টায় তিনি হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন, তাঁকে বেহেশতে প্রতিষ্ঠিত করেন, ইবলীসকে হুকুম করেন হযরত আদম (আঃ)-কে সিজদা করার এবং পরিশেষে তাকে সেখান হতে বের করে দেন।” ইয়াহূদীরা বললোঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এরপর কি হলো?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন। তারা বললোঃ “আপনি সবই ঠিক বলেছেন, কিন্তু শেষ কথাটি বলেননি। তা হলো এই যে, অতঃপর তিনি আরাম গ্রহণ করেন। তাদের একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাগান্বিত হলেন। তখন নিম্নলিখিত আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত সবকিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে; আমাকে কোন ক্লান্তি স্পর্শ করেনি। অতএব, তারা যা বলে তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ কর।”(৫০:৩৮-৩৯) (এটা ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ বর্ণনাটি গারীব) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (একদা) রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার হাত ধরে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা মাটিকে শনিবারের দিন সৃষ্টি করেন। তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেন রবিবারে। বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করেন সোমবারে। অপ্রীতিকর জিনিস সৃষ্টি করেন মঙ্গলবারে। আলো সৃষ্টি করেন বুধবারে। জীব-জন্তু যমীনে ছড়িয়ে দেন বৃহস্পতিবারে। আর শুক্রবারের দিন আসরের এবং রাত্রির মাঝামাঝি সময়ে, দিনের শেষ ভাগে হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন এবং এভাবে সৃষ্টিকার্য সমাপ্ত করেন।” (এ হাদীসটি ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বর্ণনা করেন। ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটাও গারীব হাদীস। ইমাম বুখারী (রঃ) এটাকে মুআল্লাল বলেছেন এবং বলেছেন যে, কেউ কেউ এটাকে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে এবং হযরত হুরাইরা (রাঃ) কা'ব আহবার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং এটাই সঠিকতম)
ফুসসিলাত 41:13
১৩-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমাকে যারা অবিশ্বাস করছে। এবং আল্লাহর সাথে কুফরী করছে তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যদি শিক্ষা ও উপদেশমূলক কথা হতে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে তোমাদের পরিণাম ভাল হবে না। জেনে রেখো যে, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা তাদের নবীদেরকে (আঃ) অমান্য করার কারণে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে, তোমাদের কৃতকর্ম যেন তোমাদেরকে তাদের মত না করে দেয়। আ’দ, সামূদ এবং তাদের মত অন্যান্য সম্প্রদায়ের অবস্থা তোমাদের সামনে রয়েছে। তাদের কাছে পর্যায়ক্রমে রাসূলদের আগমন ঘটেছিল। তারা এই গ্রামে, ঐ গ্রামে, এই বস্তীতে, সেই বস্তীতে এসে তাদেরকে আল্লাহর বাণী শুনাতে থাকতেন। কিন্তু তারা গর্বভরে তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করে। তারা রাসূলদেরকে (আঃ) বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের এইরূপ ইচ্ছা হলে তিনি অবশ্যই ফেরেশতা প্রেরণ করতেন। অতএব, তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করলাম। আ’দ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই যে, তারা পৃথিবীতে অযথা দম্ভ করতো। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করতো। তাদের গর্ব ও হঠকারিতা চরমে পৌঁছে। গিয়েছিল। তাদের ঔদ্ধত্য ও অগ্রাহ্যতা এমন শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা বলে উঠেছিলঃ “আমাদের অপেক্ষা শক্তিশালী আর কে আছে?” অর্থাৎ আমাদের মত শক্তিশালী, দৃঢ় ও মযবূত আর কেউ নেই। সুতরাং আল্লাহর আযাব আমাদের কি ক্ষতি করতে পারে?তারা এতো বেশী ফুলে উঠে যে, আল্লাহকে সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়। তারা কি তবে লক্ষ্য করেনি যে, আল্লাহ, যিনি তাদের সৃষ্টিকর্তা, তিনি তাদের চেয়ে বহু গুণে শক্তিশালী? তার শক্তির অনুমানও করা যায় না। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার হাতে আকাশ সৃষ্টি করেছি এবং আমি ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী।”(৫১:৪৭)।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর আমি তাদেরকে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাবার জন্যে তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু অশুভ দিনে, যাতে তাদের দর্প চূর্ণ হয়ে যায় এবং তারা সমূলে ধ্বংস হয়।(আরবী) বলা হয় ভীষণ শব্দ বিশিষ্ট বায়ুকে। পূর্বদিকে একটি নদী রয়েছে, যা ভীষণ শব্দ করে প্রবাহিত হয়। এ জন্যে আরববাসী ওটাকেও (আরবী) বলে থাকে। দ্বারা পর্যায়ক্রমে বা অনবরত চলা বুঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(ঐ ঝঞাবায়ু তাদের উপর) সপ্তরাত্রি ও অষ্টদিবস বিরামহীন ভাবে (প্রবাহিত হয়েছিল)।”(৬৯:৭) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(তাদের উপর আমি প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু) নিরবচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের দিনে।”(৫৪:১৯) যে শাস্তি তাদের উপর আপতিত হয়েছিল সাত রাত এবং আট দিন পর্যন্ত স্থায়ীভাবে ছিল। ফলে সবাই তারা ধ্বংসের ঘাটে এসে পতিত হয়েছিল এবং তাদের বীজ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর পরকালের শাস্তি তো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক এবং তাদেরকে সাহায্য করা হবে না। না দুনিয়ায় কেউ তাদের সাহায্য করতে পারলো, না পরকালে কেউ তাদের সাহায্য করতে পারবে। উভয় জগতেই তারা বন্ধনহীন রয়ে গেল। প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ আর সামূদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার তো এই যে, আমি তাদেরকে পথ-নির্দেশ করেছিলাম। হিদায়াত তাদের কাছে খুলে দিয়েছিলাম এবং তাদেরকে সৎপথে আহ্বান করেছিলাম। হযরত সালেহ (আঃ) তাদের কাছে সত্যকে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা বিরোধিতা ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং হযরত সালেহ (আঃ)-এর সত্যবাদিতার। প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ্ তা'আলা যে উষ্ট্ৰীটি পাঠিয়েছিলেন তারা তার পা কেটে ফেলে। ফলে তাদের উপরও আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। তাদেরকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আঘাত হানলো, অর্থাৎ তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হলো এক প্রলয়ংকর বিপর্যয় দ্বারা। এটা ছিল তাদের কৃতকর্মেরই প্রতিফল।তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান এনেছিল এবং নবীদের (আঃ) সত্যতা স্বীকার করেছিল এবং অন্তরে আল্লাহর ভয় রাখতো তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বাঁচিয়ে নেন। তাদের মোটেই কষ্ট হয়নি। তারা তাদের নবী (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ তা'আলার লাঞ্ছনাজনক শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করে।
ফুসসিলাত 41:14
১৩-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমাকে যারা অবিশ্বাস করছে। এবং আল্লাহর সাথে কুফরী করছে তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যদি শিক্ষা ও উপদেশমূলক কথা হতে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে তোমাদের পরিণাম ভাল হবে না। জেনে রেখো যে, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা তাদের নবীদেরকে (আঃ) অমান্য করার কারণে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে, তোমাদের কৃতকর্ম যেন তোমাদেরকে তাদের মত না করে দেয়। আ’দ, সামূদ এবং তাদের মত অন্যান্য সম্প্রদায়ের অবস্থা তোমাদের সামনে রয়েছে। তাদের কাছে পর্যায়ক্রমে রাসূলদের আগমন ঘটেছিল। তারা এই গ্রামে, ঐ গ্রামে, এই বস্তীতে, সেই বস্তীতে এসে তাদেরকে আল্লাহর বাণী শুনাতে থাকতেন। কিন্তু তারা গর্বভরে তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করে। তারা রাসূলদেরকে (আঃ) বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের এইরূপ ইচ্ছা হলে তিনি অবশ্যই ফেরেশতা প্রেরণ করতেন। অতএব, তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করলাম। আ’দ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই যে, তারা পৃথিবীতে অযথা দম্ভ করতো। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করতো। তাদের গর্ব ও হঠকারিতা চরমে পৌঁছে। গিয়েছিল। তাদের ঔদ্ধত্য ও অগ্রাহ্যতা এমন শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা বলে উঠেছিলঃ “আমাদের অপেক্ষা শক্তিশালী আর কে আছে?” অর্থাৎ আমাদের মত শক্তিশালী, দৃঢ় ও মযবূত আর কেউ নেই। সুতরাং আল্লাহর আযাব আমাদের কি ক্ষতি করতে পারে?তারা এতো বেশী ফুলে উঠে যে, আল্লাহকে সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়। তারা কি তবে লক্ষ্য করেনি যে, আল্লাহ, যিনি তাদের সৃষ্টিকর্তা, তিনি তাদের চেয়ে বহু গুণে শক্তিশালী? তার শক্তির অনুমানও করা যায় না। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার হাতে আকাশ সৃষ্টি করেছি এবং আমি ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী।”(৫১:৪৭)।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর আমি তাদেরকে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাবার জন্যে তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু অশুভ দিনে, যাতে তাদের দর্প চূর্ণ হয়ে যায় এবং তারা সমূলে ধ্বংস হয়।(আরবী) বলা হয় ভীষণ শব্দ বিশিষ্ট বায়ুকে। পূর্বদিকে একটি নদী রয়েছে, যা ভীষণ শব্দ করে প্রবাহিত হয়। এ জন্যে আরববাসী ওটাকেও (আরবী) বলে থাকে। দ্বারা পর্যায়ক্রমে বা অনবরত চলা বুঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(ঐ ঝঞাবায়ু তাদের উপর) সপ্তরাত্রি ও অষ্টদিবস বিরামহীন ভাবে (প্রবাহিত হয়েছিল)।”(৬৯:৭) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(তাদের উপর আমি প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু) নিরবচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের দিনে।”(৫৪:১৯) যে শাস্তি তাদের উপর আপতিত হয়েছিল সাত রাত এবং আট দিন পর্যন্ত স্থায়ীভাবে ছিল। ফলে সবাই তারা ধ্বংসের ঘাটে এসে পতিত হয়েছিল এবং তাদের বীজ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর পরকালের শাস্তি তো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক এবং তাদেরকে সাহায্য করা হবে না। না দুনিয়ায় কেউ তাদের সাহায্য করতে পারলো, না পরকালে কেউ তাদের সাহায্য করতে পারবে। উভয় জগতেই তারা বন্ধনহীন রয়ে গেল। প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ আর সামূদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার তো এই যে, আমি তাদেরকে পথ-নির্দেশ করেছিলাম। হিদায়াত তাদের কাছে খুলে দিয়েছিলাম এবং তাদেরকে সৎপথে আহ্বান করেছিলাম। হযরত সালেহ (আঃ) তাদের কাছে সত্যকে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা বিরোধিতা ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং হযরত সালেহ (আঃ)-এর সত্যবাদিতার। প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ্ তা'আলা যে উষ্ট্ৰীটি পাঠিয়েছিলেন তারা তার পা কেটে ফেলে। ফলে তাদের উপরও আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। তাদেরকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আঘাত হানলো, অর্থাৎ তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হলো এক প্রলয়ংকর বিপর্যয় দ্বারা। এটা ছিল তাদের কৃতকর্মেরই প্রতিফল।তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান এনেছিল এবং নবীদের (আঃ) সত্যতা স্বীকার করেছিল এবং অন্তরে আল্লাহর ভয় রাখতো তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বাঁচিয়ে নেন। তাদের মোটেই কষ্ট হয়নি। তারা তাদের নবী (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ তা'আলার লাঞ্ছনাজনক শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করে।
ফুসসিলাত 41:15
১৩-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমাকে যারা অবিশ্বাস করছে। এবং আল্লাহর সাথে কুফরী করছে তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যদি শিক্ষা ও উপদেশমূলক কথা হতে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে তোমাদের পরিণাম ভাল হবে না। জেনে রেখো যে, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা তাদের নবীদেরকে (আঃ) অমান্য করার কারণে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে, তোমাদের কৃতকর্ম যেন তোমাদেরকে তাদের মত না করে দেয়। আ’দ, সামূদ এবং তাদের মত অন্যান্য সম্প্রদায়ের অবস্থা তোমাদের সামনে রয়েছে। তাদের কাছে পর্যায়ক্রমে রাসূলদের আগমন ঘটেছিল। তারা এই গ্রামে, ঐ গ্রামে, এই বস্তীতে, সেই বস্তীতে এসে তাদেরকে আল্লাহর বাণী শুনাতে থাকতেন। কিন্তু তারা গর্বভরে তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করে। তারা রাসূলদেরকে (আঃ) বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের এইরূপ ইচ্ছা হলে তিনি অবশ্যই ফেরেশতা প্রেরণ করতেন। অতএব, তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করলাম। আ’দ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই যে, তারা পৃথিবীতে অযথা দম্ভ করতো। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করতো। তাদের গর্ব ও হঠকারিতা চরমে পৌঁছে। গিয়েছিল। তাদের ঔদ্ধত্য ও অগ্রাহ্যতা এমন শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা বলে উঠেছিলঃ “আমাদের অপেক্ষা শক্তিশালী আর কে আছে?” অর্থাৎ আমাদের মত শক্তিশালী, দৃঢ় ও মযবূত আর কেউ নেই। সুতরাং আল্লাহর আযাব আমাদের কি ক্ষতি করতে পারে?তারা এতো বেশী ফুলে উঠে যে, আল্লাহকে সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়। তারা কি তবে লক্ষ্য করেনি যে, আল্লাহ, যিনি তাদের সৃষ্টিকর্তা, তিনি তাদের চেয়ে বহু গুণে শক্তিশালী? তার শক্তির অনুমানও করা যায় না। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার হাতে আকাশ সৃষ্টি করেছি এবং আমি ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী।”(৫১:৪৭)।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর আমি তাদেরকে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাবার জন্যে তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু অশুভ দিনে, যাতে তাদের দর্প চূর্ণ হয়ে যায় এবং তারা সমূলে ধ্বংস হয়।(আরবী) বলা হয় ভীষণ শব্দ বিশিষ্ট বায়ুকে। পূর্বদিকে একটি নদী রয়েছে, যা ভীষণ শব্দ করে প্রবাহিত হয়। এ জন্যে আরববাসী ওটাকেও (আরবী) বলে থাকে। দ্বারা পর্যায়ক্রমে বা অনবরত চলা বুঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(ঐ ঝঞাবায়ু তাদের উপর) সপ্তরাত্রি ও অষ্টদিবস বিরামহীন ভাবে (প্রবাহিত হয়েছিল)।”(৬৯:৭) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(তাদের উপর আমি প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু) নিরবচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের দিনে।”(৫৪:১৯) যে শাস্তি তাদের উপর আপতিত হয়েছিল সাত রাত এবং আট দিন পর্যন্ত স্থায়ীভাবে ছিল। ফলে সবাই তারা ধ্বংসের ঘাটে এসে পতিত হয়েছিল এবং তাদের বীজ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর পরকালের শাস্তি তো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক এবং তাদেরকে সাহায্য করা হবে না। না দুনিয়ায় কেউ তাদের সাহায্য করতে পারলো, না পরকালে কেউ তাদের সাহায্য করতে পারবে। উভয় জগতেই তারা বন্ধনহীন রয়ে গেল। প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ আর সামূদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার তো এই যে, আমি তাদেরকে পথ-নির্দেশ করেছিলাম। হিদায়াত তাদের কাছে খুলে দিয়েছিলাম এবং তাদেরকে সৎপথে আহ্বান করেছিলাম। হযরত সালেহ (আঃ) তাদের কাছে সত্যকে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা বিরোধিতা ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং হযরত সালেহ (আঃ)-এর সত্যবাদিতার। প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ্ তা'আলা যে উষ্ট্ৰীটি পাঠিয়েছিলেন তারা তার পা কেটে ফেলে। ফলে তাদের উপরও আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। তাদেরকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আঘাত হানলো, অর্থাৎ তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হলো এক প্রলয়ংকর বিপর্যয় দ্বারা। এটা ছিল তাদের কৃতকর্মেরই প্রতিফল।তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান এনেছিল এবং নবীদের (আঃ) সত্যতা স্বীকার করেছিল এবং অন্তরে আল্লাহর ভয় রাখতো তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বাঁচিয়ে নেন। তাদের মোটেই কষ্ট হয়নি। তারা তাদের নবী (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ তা'আলার লাঞ্ছনাজনক শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করে।
ফুসসিলাত 41:16
১৩-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমাকে যারা অবিশ্বাস করছে। এবং আল্লাহর সাথে কুফরী করছে তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যদি শিক্ষা ও উপদেশমূলক কথা হতে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে তোমাদের পরিণাম ভাল হবে না। জেনে রেখো যে, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা তাদের নবীদেরকে (আঃ) অমান্য করার কারণে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে, তোমাদের কৃতকর্ম যেন তোমাদেরকে তাদের মত না করে দেয়। আ’দ, সামূদ এবং তাদের মত অন্যান্য সম্প্রদায়ের অবস্থা তোমাদের সামনে রয়েছে। তাদের কাছে পর্যায়ক্রমে রাসূলদের আগমন ঘটেছিল। তারা এই গ্রামে, ঐ গ্রামে, এই বস্তীতে, সেই বস্তীতে এসে তাদেরকে আল্লাহর বাণী শুনাতে থাকতেন। কিন্তু তারা গর্বভরে তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করে। তারা রাসূলদেরকে (আঃ) বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের এইরূপ ইচ্ছা হলে তিনি অবশ্যই ফেরেশতা প্রেরণ করতেন। অতএব, তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করলাম। আ’দ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই যে, তারা পৃথিবীতে অযথা দম্ভ করতো। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করতো। তাদের গর্ব ও হঠকারিতা চরমে পৌঁছে। গিয়েছিল। তাদের ঔদ্ধত্য ও অগ্রাহ্যতা এমন শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা বলে উঠেছিলঃ “আমাদের অপেক্ষা শক্তিশালী আর কে আছে?” অর্থাৎ আমাদের মত শক্তিশালী, দৃঢ় ও মযবূত আর কেউ নেই। সুতরাং আল্লাহর আযাব আমাদের কি ক্ষতি করতে পারে?তারা এতো বেশী ফুলে উঠে যে, আল্লাহকে সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়। তারা কি তবে লক্ষ্য করেনি যে, আল্লাহ, যিনি তাদের সৃষ্টিকর্তা, তিনি তাদের চেয়ে বহু গুণে শক্তিশালী? তার শক্তির অনুমানও করা যায় না। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার হাতে আকাশ সৃষ্টি করেছি এবং আমি ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী।”(৫১:৪৭)।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর আমি তাদেরকে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাবার জন্যে তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু অশুভ দিনে, যাতে তাদের দর্প চূর্ণ হয়ে যায় এবং তারা সমূলে ধ্বংস হয়।(আরবী) বলা হয় ভীষণ শব্দ বিশিষ্ট বায়ুকে। পূর্বদিকে একটি নদী রয়েছে, যা ভীষণ শব্দ করে প্রবাহিত হয়। এ জন্যে আরববাসী ওটাকেও (আরবী) বলে থাকে। দ্বারা পর্যায়ক্রমে বা অনবরত চলা বুঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(ঐ ঝঞাবায়ু তাদের উপর) সপ্তরাত্রি ও অষ্টদিবস বিরামহীন ভাবে (প্রবাহিত হয়েছিল)।”(৬৯:৭) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(তাদের উপর আমি প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু) নিরবচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের দিনে।”(৫৪:১৯) যে শাস্তি তাদের উপর আপতিত হয়েছিল সাত রাত এবং আট দিন পর্যন্ত স্থায়ীভাবে ছিল। ফলে সবাই তারা ধ্বংসের ঘাটে এসে পতিত হয়েছিল এবং তাদের বীজ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর পরকালের শাস্তি তো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক এবং তাদেরকে সাহায্য করা হবে না। না দুনিয়ায় কেউ তাদের সাহায্য করতে পারলো, না পরকালে কেউ তাদের সাহায্য করতে পারবে। উভয় জগতেই তারা বন্ধনহীন রয়ে গেল। প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ আর সামূদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার তো এই যে, আমি তাদেরকে পথ-নির্দেশ করেছিলাম। হিদায়াত তাদের কাছে খুলে দিয়েছিলাম এবং তাদেরকে সৎপথে আহ্বান করেছিলাম। হযরত সালেহ (আঃ) তাদের কাছে সত্যকে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা বিরোধিতা ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং হযরত সালেহ (আঃ)-এর সত্যবাদিতার। প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ্ তা'আলা যে উষ্ট্ৰীটি পাঠিয়েছিলেন তারা তার পা কেটে ফেলে। ফলে তাদের উপরও আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। তাদেরকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আঘাত হানলো, অর্থাৎ তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হলো এক প্রলয়ংকর বিপর্যয় দ্বারা। এটা ছিল তাদের কৃতকর্মেরই প্রতিফল।তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান এনেছিল এবং নবীদের (আঃ) সত্যতা স্বীকার করেছিল এবং অন্তরে আল্লাহর ভয় রাখতো তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বাঁচিয়ে নেন। তাদের মোটেই কষ্ট হয়নি। তারা তাদের নবী (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ তা'আলার লাঞ্ছনাজনক শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করে।
ফুসসিলাত 41:17
১৩-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমাকে যারা অবিশ্বাস করছে। এবং আল্লাহর সাথে কুফরী করছে তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যদি শিক্ষা ও উপদেশমূলক কথা হতে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে তোমাদের পরিণাম ভাল হবে না। জেনে রেখো যে, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা তাদের নবীদেরকে (আঃ) অমান্য করার কারণে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে, তোমাদের কৃতকর্ম যেন তোমাদেরকে তাদের মত না করে দেয়। আ’দ, সামূদ এবং তাদের মত অন্যান্য সম্প্রদায়ের অবস্থা তোমাদের সামনে রয়েছে। তাদের কাছে পর্যায়ক্রমে রাসূলদের আগমন ঘটেছিল। তারা এই গ্রামে, ঐ গ্রামে, এই বস্তীতে, সেই বস্তীতে এসে তাদেরকে আল্লাহর বাণী শুনাতে থাকতেন। কিন্তু তারা গর্বভরে তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করে। তারা রাসূলদেরকে (আঃ) বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের এইরূপ ইচ্ছা হলে তিনি অবশ্যই ফেরেশতা প্রেরণ করতেন। অতএব, তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করলাম। আ’দ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই যে, তারা পৃথিবীতে অযথা দম্ভ করতো। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করতো। তাদের গর্ব ও হঠকারিতা চরমে পৌঁছে। গিয়েছিল। তাদের ঔদ্ধত্য ও অগ্রাহ্যতা এমন শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা বলে উঠেছিলঃ “আমাদের অপেক্ষা শক্তিশালী আর কে আছে?” অর্থাৎ আমাদের মত শক্তিশালী, দৃঢ় ও মযবূত আর কেউ নেই। সুতরাং আল্লাহর আযাব আমাদের কি ক্ষতি করতে পারে?তারা এতো বেশী ফুলে উঠে যে, আল্লাহকে সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়। তারা কি তবে লক্ষ্য করেনি যে, আল্লাহ, যিনি তাদের সৃষ্টিকর্তা, তিনি তাদের চেয়ে বহু গুণে শক্তিশালী? তার শক্তির অনুমানও করা যায় না। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার হাতে আকাশ সৃষ্টি করেছি এবং আমি ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী।”(৫১:৪৭)।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর আমি তাদেরকে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাবার জন্যে তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু অশুভ দিনে, যাতে তাদের দর্প চূর্ণ হয়ে যায় এবং তারা সমূলে ধ্বংস হয়।(আরবী) বলা হয় ভীষণ শব্দ বিশিষ্ট বায়ুকে। পূর্বদিকে একটি নদী রয়েছে, যা ভীষণ শব্দ করে প্রবাহিত হয়। এ জন্যে আরববাসী ওটাকেও (আরবী) বলে থাকে। দ্বারা পর্যায়ক্রমে বা অনবরত চলা বুঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(ঐ ঝঞাবায়ু তাদের উপর) সপ্তরাত্রি ও অষ্টদিবস বিরামহীন ভাবে (প্রবাহিত হয়েছিল)।”(৬৯:৭) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(তাদের উপর আমি প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু) নিরবচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের দিনে।”(৫৪:১৯) যে শাস্তি তাদের উপর আপতিত হয়েছিল সাত রাত এবং আট দিন পর্যন্ত স্থায়ীভাবে ছিল। ফলে সবাই তারা ধ্বংসের ঘাটে এসে পতিত হয়েছিল এবং তাদের বীজ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর পরকালের শাস্তি তো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক এবং তাদেরকে সাহায্য করা হবে না। না দুনিয়ায় কেউ তাদের সাহায্য করতে পারলো, না পরকালে কেউ তাদের সাহায্য করতে পারবে। উভয় জগতেই তারা বন্ধনহীন রয়ে গেল। প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ আর সামূদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার তো এই যে, আমি তাদেরকে পথ-নির্দেশ করেছিলাম। হিদায়াত তাদের কাছে খুলে দিয়েছিলাম এবং তাদেরকে সৎপথে আহ্বান করেছিলাম। হযরত সালেহ (আঃ) তাদের কাছে সত্যকে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা বিরোধিতা ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং হযরত সালেহ (আঃ)-এর সত্যবাদিতার। প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ্ তা'আলা যে উষ্ট্ৰীটি পাঠিয়েছিলেন তারা তার পা কেটে ফেলে। ফলে তাদের উপরও আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। তাদেরকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আঘাত হানলো, অর্থাৎ তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হলো এক প্রলয়ংকর বিপর্যয় দ্বারা। এটা ছিল তাদের কৃতকর্মেরই প্রতিফল।তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান এনেছিল এবং নবীদের (আঃ) সত্যতা স্বীকার করেছিল এবং অন্তরে আল্লাহর ভয় রাখতো তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বাঁচিয়ে নেন। তাদের মোটেই কষ্ট হয়নি। তারা তাদের নবী (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ তা'আলার লাঞ্ছনাজনক শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করে।
ফুসসিলাত 41:18
১৩-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমাকে যারা অবিশ্বাস করছে। এবং আল্লাহর সাথে কুফরী করছে তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যদি শিক্ষা ও উপদেশমূলক কথা হতে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে তোমাদের পরিণাম ভাল হবে না। জেনে রেখো যে, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা তাদের নবীদেরকে (আঃ) অমান্য করার কারণে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে, তোমাদের কৃতকর্ম যেন তোমাদেরকে তাদের মত না করে দেয়। আ’দ, সামূদ এবং তাদের মত অন্যান্য সম্প্রদায়ের অবস্থা তোমাদের সামনে রয়েছে। তাদের কাছে পর্যায়ক্রমে রাসূলদের আগমন ঘটেছিল। তারা এই গ্রামে, ঐ গ্রামে, এই বস্তীতে, সেই বস্তীতে এসে তাদেরকে আল্লাহর বাণী শুনাতে থাকতেন। কিন্তু তারা গর্বভরে তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করে। তারা রাসূলদেরকে (আঃ) বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের এইরূপ ইচ্ছা হলে তিনি অবশ্যই ফেরেশতা প্রেরণ করতেন। অতএব, তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করলাম। আ’দ সম্প্রদায়ের ব্যাপার এই যে, তারা পৃথিবীতে অযথা দম্ভ করতো। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করতো। তাদের গর্ব ও হঠকারিতা চরমে পৌঁছে। গিয়েছিল। তাদের ঔদ্ধত্য ও অগ্রাহ্যতা এমন শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা বলে উঠেছিলঃ “আমাদের অপেক্ষা শক্তিশালী আর কে আছে?” অর্থাৎ আমাদের মত শক্তিশালী, দৃঢ় ও মযবূত আর কেউ নেই। সুতরাং আল্লাহর আযাব আমাদের কি ক্ষতি করতে পারে?তারা এতো বেশী ফুলে উঠে যে, আল্লাহকে সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়। তারা কি তবে লক্ষ্য করেনি যে, আল্লাহ, যিনি তাদের সৃষ্টিকর্তা, তিনি তাদের চেয়ে বহু গুণে শক্তিশালী? তার শক্তির অনুমানও করা যায় না। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার হাতে আকাশ সৃষ্টি করেছি এবং আমি ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী।”(৫১:৪৭)।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর আমি তাদেরকে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাবার জন্যে তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু অশুভ দিনে, যাতে তাদের দর্প চূর্ণ হয়ে যায় এবং তারা সমূলে ধ্বংস হয়।(আরবী) বলা হয় ভীষণ শব্দ বিশিষ্ট বায়ুকে। পূর্বদিকে একটি নদী রয়েছে, যা ভীষণ শব্দ করে প্রবাহিত হয়। এ জন্যে আরববাসী ওটাকেও (আরবী) বলে থাকে। দ্বারা পর্যায়ক্রমে বা অনবরত চলা বুঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(ঐ ঝঞাবায়ু তাদের উপর) সপ্তরাত্রি ও অষ্টদিবস বিরামহীন ভাবে (প্রবাহিত হয়েছিল)।”(৬৯:৭) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(তাদের উপর আমি প্রেরণ করেছিলাম ঝঞাবায়ু) নিরবচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের দিনে।”(৫৪:১৯) যে শাস্তি তাদের উপর আপতিত হয়েছিল সাত রাত এবং আট দিন পর্যন্ত স্থায়ীভাবে ছিল। ফলে সবাই তারা ধ্বংসের ঘাটে এসে পতিত হয়েছিল এবং তাদের বীজ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর পরকালের শাস্তি তো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক এবং তাদেরকে সাহায্য করা হবে না। না দুনিয়ায় কেউ তাদের সাহায্য করতে পারলো, না পরকালে কেউ তাদের সাহায্য করতে পারবে। উভয় জগতেই তারা বন্ধনহীন রয়ে গেল। প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ আর সামূদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার তো এই যে, আমি তাদেরকে পথ-নির্দেশ করেছিলাম। হিদায়াত তাদের কাছে খুলে দিয়েছিলাম এবং তাদেরকে সৎপথে আহ্বান করেছিলাম। হযরত সালেহ (আঃ) তাদের কাছে সত্যকে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা বিরোধিতা ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং হযরত সালেহ (আঃ)-এর সত্যবাদিতার। প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ্ তা'আলা যে উষ্ট্ৰীটি পাঠিয়েছিলেন তারা তার পা কেটে ফেলে। ফলে তাদের উপরও আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। তাদেরকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আঘাত হানলো, অর্থাৎ তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হলো এক প্রলয়ংকর বিপর্যয় দ্বারা। এটা ছিল তাদের কৃতকর্মেরই প্রতিফল।তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান এনেছিল এবং নবীদের (আঃ) সত্যতা স্বীকার করেছিল এবং অন্তরে আল্লাহর ভয় রাখতো তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বাঁচিয়ে নেন। তাদের মোটেই কষ্ট হয়নি। তারা তাদের নবী (আঃ)-এর সাথে আল্লাহ তা'আলার লাঞ্ছনাজনক শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করে।
ফুসসিলাত 41:19
১৯-২৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এই মুশরিকদেরকে বলে দাও- কিয়ামতের দিন তাদেরকে জাহান্নাম অভিমুখে সমবেত করা হবে এবং জাহান্নামের রক্ষক তাদেরকে একত্রিত করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি অপরাধীদেরকে জাহান্নামের দিকে কঠিন পিপাসার্ত অবস্থায় হাঁকিয়ে নিয়ে যাবো।”(১৯:৮৬) তাদেরকে জাহান্নামের ধারে দাঁড় করিয়ে দেয়া হবে এবং তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, দেহ, কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তাদের আমলগুলোর সাক্ষ্য প্রদান করবে। তাদের পূর্বের ও পরের সমস্ত দোষ প্রকাশিত হয়ে পড়বে। দেহের প্রতিটি অঙ্গ বলে উঠবেঃ “সে আমার দ্বারা এই গুনাহ করেছে।” তখন সে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে ভৎসনা করে বলবেঃ “কেন তোমরা আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করছো?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমরা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করছি মাত্র। তিনি আমাদেরকে কথা বলার শক্তি দান করেছেন। সুতরাং আমরা সত্য সত্য কথা শুনিয়ে দিয়েছি। তিনিই তোমাদেরকে প্রথমে সৃষ্টিকারী। তিনিই সবকিছুকে বাকশক্তি দান করেছেন। সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধাচরণ এবং তার হুকুমের অবাধ্যাচরণ কে করতে পারে?হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আমি কেন হাসলাম তা তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করলে না যে?” সাহাবীগণ (রাঃ) তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি হাসলেন কেন?" উত্তরে তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন বান্দার তার প্রতিপালকের সাথে ঝগড়ার কথা মনে করে আমি বিস্ময়বোধ করছি। বান্দা বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করেননি যে, আপনি আমার উপর যুলুম করবেন না?আল্লাহ তা'আলা জবাবে বলবেনঃ “হ্যা (অবশ্যই করেছিলাম)।” সে বলবেঃ “আমি তো আমার আমলের উপর আমার নিজের ছাড়া আর কারো সাক্ষ্য কবুল করবে না। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “আমি এবং আমার সম্মানিত ফেরেশতারা কি সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট নই?" কিন্তু সে বারবার তার একথাই বলতে থাকবে। তখন আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জ্জতের জন্যে তার মুখে মোহর লাগিয়ে দিবেন এবং তার। দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে বলা হবেঃ “সে যা কিছু করেছে তার সাক্ষ্য তোমরা প্রদান কর।” তারা তখন পরিষ্কারভাবে সত্য সাক্ষ্য দিয়ে দিবে। সে তখন। তাদেরকে তিরস্কার করে বলবেঃ “আমি তো তোমাদেরকেই রক্ষা করার জন্যে তর্ক করছিলাম।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযায় (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন) হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “কাফির এবং মুনাফিকদেরকে হিসাবের জন্যে ডাক দেয়া হবে। তিনি তাদের প্রত্যেকের সামনে তার কৃতকর্ম পেশ করবেন। তাদের প্রত্যেক ব্যক্তি শপথ করে করে নিজের কৃতকর্ম অস্বীকার করবে এবং বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার ফেরেশতারা এমন কিছু লিখে রেখেছেন যা আমি কখনো করিনি। ফেরেশতারা বলবেনঃ “তুমি কি অমুক দিন অমুক জায়গায় অমুক আমল করনি?” সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার মর্যাদার শপথ! আমি এ কাজ কখনো করিনি।” অতঃপর তার মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে এবং দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে। সর্বপ্রথম তার ডান উরু কথা বলবে।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন কাফিরের সামনে তার কৃত মন্দ আমলগুলো পেশ করা হবে। সে তখন ওগুলো অস্বীকার করবে এবং তর্ক-বিতর্ক শুরু করে দিবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “এই যে তোমার প্রতিবেশীরা তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে?” সে বলবেঃ “তারা মিথ্যা বলছে।” মহান আল্লাহ বলবেনঃ “এই যে এরা তোমার পরিবারবর্গ, এরা সাক্ষ্য দিচ্ছে? সে উত্তর দিবেঃ “এরাও সবাই মিথ্যাবাদী।” আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে শপথ করাবেন। তখন তারা শপথ করবে। তথাপি সে অস্বীকারই করবে। আল্লাহ তাআলা তখন তাদেরকে নীরব করবেন এবং স্বয়ং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান করবে এবং তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ইবনুল আরাক (রঃ)-কে বলেনঃ “কিয়ামতের দিন একটি সময় তো এমন হবে যে, কাউকেও কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে না এবং কোন ওযর-আপত্তিও শুনা হবে না। অতঃপর যখন কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে তখন বান্দা ঝগড়া ও তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করবে এবং স্বীয় কৃতকর্মকে অস্বীকার করে বসবে। তারা মিথ্যা শপথ করবে। অবশেষে তাদের মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং তাদের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন তাদের ত্বক, চক্ষু, হাত, পা ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে। অতঃপর তাদের মুখ খুলে দেয়া হবে। তখন তারা তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার কারণে তিরস্কার করবে। তারা তখন বলবেঃ “আল্লাহ, যিনি সবকিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন তিনি। আমাদেরকেও বাকশক্তি দিয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন প্রথমবার এবং তাঁর নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।' তখন মুখও স্বীকার করে নিবে।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত রাফে আবুল হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, স্বীয় কৃতকর্ম অস্বীকার করার কারণে তার জিহ্বা এতো মোটা করে দেয়া হবে যে, ওটা একটা কথাও বলতে পারবে না। তখন দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে সাক্ষ্য দিতে বলা হবে। তারা প্রত্যেকেই তখন নিজ নিজ আমলের কথা বলে দিবে। কর্ণ, চক্ষু, ত্বক, লজ্জাস্থান, হাত, পা ইত্যাদি সবাই সাক্ষ্য দিবে। (এটাও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এর অনুরূপ আরো বহু হাদীস ও আসার সূরায়ে ইয়াসীনের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। আয়াতটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আজ তাদের মুখ মোহর করে দিবো, তাদের হস্ত কথা বলবে আমার সাথে এবং তাদের চরণ সাক্ষ্য দিবে তাদের কৃতকর্মের।”(৩৬:৬৫)।হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আমরা সমুদ্রের হিজরত হতে ফিরে আসি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা আমাদেরকে বললেনঃ “তোমরা হাবশা দেশে (আবিসিনিয়ায়) বিস্ময়কর ঘটনা কিছু দেখে থাকলে বর্ণনা কর।” তখন একজন যুবক বললোঃ “একদা আমরা সেখানে বসে আছি এমন সময় তাদের আলেমদের একজন বৃদ্ধা মহিলা মাথায় একটি কলসি নিয়ে আমাদের পার্শ্ব দিয়ে গমন করে। তাদের একজন যুবক তাকে ধাক্কা দেয়। ফলে সে পড়ে যায় এবং কলসিটি ভেঙ্গে যায়। তখন ঐ বৃদ্ধা মহিলাটি উঠে ঐ যুবকটির দিকে দৃষ্টিপাত করে বললোঃ “ওরে প্রতারক! তুই এর পরিণাম তখনই জানতে পারবি যখন আল্লাহ তাআলা স্বীয় কুরসীর উপর সমাসীন হবেন এবং তার বান্দাদেরকে একত্রিত করবেন। ঐ সময় তাদের হাত, পা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে এবং প্রত্যেকের প্রত্যেকটি আমল প্রকাশিত হয়ে পড়বে। ঐদিন তোর এবং আমার মধ্যে ফায়সালা হয়ে যাবে।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “বৃদ্ধা মহিলাটি সত্য কথাই বলেছে, আল্লাহ তা'আলা ঐ সম্প্রদায়কে কিভাবে পবিত্র করবেন যাদের দুর্বলদের প্রতিশোধ সবলদের হতে গ্রহণ না করবেন?” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা এই সনদে গারীব)ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) এই রিওয়াইয়াতটিই অন্য সনদে বর্ণনা করেছেন। যখন বান্দা স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দানের কারণে ভসনা। করবে তখন তারা উত্তর দিতে গিয়ে এ কথাও বলবেঃ “তোমাদের আমলগুলো আসলে গোপন ছিল না। আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টির সামনে তোমরা কুফরী ও অবাধ্যাচরণের কাজে লিপ্ত থাকতে এবং কিছুই পরোয়া করতে না। কেননা, তোমরা মনে করতে যে, তোমাদের বহু কাজ আল্লাহর নিকট গোপন থাকছে। এই মিথ্যা ধারণাই তোমাদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাই আজ তোমরা ধ্বংস হয়ে গেছে।” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমি কাবা শরীফের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিলাম। এমতাবস্থায় তথায় তিনজন লোক আসলো, যাদের পেট ছিল বড় এবং জ্ঞান ছিল কম। তাদের একজন বললোঃ “আচ্ছা বলতো, আমরা যে কথা বলছি তা কি আল্লাহ শুনতে পাচ্ছেন?” দ্বিতীয়জন বললোঃ “আমরা উচ্চস্বরে কথা বললে তিনি শুনতে পান এবং নিম্ন স্বরে কথা বললে তিনি শুনতে পান না।” তৃতীয় জন বললোঃ “তিনি কিছু শুনতে পেলে সবই শুনতে পান।” আমি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ঘটনাটি বর্ণনা করলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিছু গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না .......... ফলে তোমরা হয়েছে ক্ষগ্রিস্ত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত বাহ্য ইবনে হাকীম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে এমন অবস্থায় আহ্বান করা হবে যে, তোমাদের মুখের উপর মোহর মারা থাকবে। তোমাদের মধ্যে কারো আমল সর্বপ্রথম যে (অঙ্গ) প্রকাশ করবে তা হবে তার উরু ও স্কন্ধ।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মা’মার (রঃ) বলেন যে, হযরত হাসান (রঃ) (আরবী) পাঠ করার পরে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে, আমি তার সাথে ঐ ব্যবহারই করে থাকি। আর যখন সে আমাকে ডাকে আমি তখন তার সাথেই থাকি।” হযরত হাসান (রঃ) এটুকু বলার পর কিছুক্ষণ চিন্তা করে আবার বলতে শুরু করেনঃ আল্লাহ সম্পর্কে যে ব্যক্তি যে ধরিণা করে তার আমলও ঐরূপই হয়ে থাকে। মুমিন আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা রাখে বলে তার আমলও ভাল হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে কাফির ও মুনাফিক আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে বলে তার আমলও মন্দ হয়। অতঃপর তিনি বলেন যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিছু গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না ........ তোমাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে তোমাদের এই ধারণাই তোমাদের ধ্বংস এনেছে। ফলে তোমরা ধ্বংস হয়েছে।”হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যেন এই অবস্থা ছাড়া মৃত্যু বরণ না করে যে, আল্লাহর প্রতি তার ধারণা ভাল রয়েছে। কারণ যে সম্প্রদায় আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা রেখেছে (আরবী) আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন।” অতঃপর তিনি ... (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এখন তারা ধৈর্যধারণ করলেও জাহান্নামই হবে তাদের আবাস এবং তারা অনুগ্রহ চাইলেও তারা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হবে না। অর্থাৎ জাহান্নামীদের জাহান্নামের মধ্যে ধৈর্যধারণ করা বা না করা সমান। তাদের কোন ওযর-আপত্তিও গ্রহণ করা হবে না এবং তাদের পাপও ক্ষমা করা হবে না। তাদের জন্যে দুনিয়ায় পুনরায় প্রত্যাবর্তনের পথও বন্ধ। এটা আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলবে- হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর আমাদের। দুর্ভাগ্য ছেয়ে গেছে, নিশ্চয়ই আমরা ছিলাম বিভ্রান্ত। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এর থেকে বের করে নিন, যদি আমরা পুনরায় এ কাজই করি তবে তো আমরা অবশ্যই যালিম হবো। আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলবেনঃ তোমরা এর মধ্যেই পড়ে থাকো এবং আমার সাথে কথা বলে না।”(২৩:১০৬-১০৮)
ফুসসিলাত 41:20
১৯-২৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এই মুশরিকদেরকে বলে দাও- কিয়ামতের দিন তাদেরকে জাহান্নাম অভিমুখে সমবেত করা হবে এবং জাহান্নামের রক্ষক তাদেরকে একত্রিত করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি অপরাধীদেরকে জাহান্নামের দিকে কঠিন পিপাসার্ত অবস্থায় হাঁকিয়ে নিয়ে যাবো।”(১৯:৮৬) তাদেরকে জাহান্নামের ধারে দাঁড় করিয়ে দেয়া হবে এবং তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, দেহ, কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তাদের আমলগুলোর সাক্ষ্য প্রদান করবে। তাদের পূর্বের ও পরের সমস্ত দোষ প্রকাশিত হয়ে পড়বে। দেহের প্রতিটি অঙ্গ বলে উঠবেঃ “সে আমার দ্বারা এই গুনাহ করেছে।” তখন সে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে ভৎসনা করে বলবেঃ “কেন তোমরা আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করছো?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমরা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করছি মাত্র। তিনি আমাদেরকে কথা বলার শক্তি দান করেছেন। সুতরাং আমরা সত্য সত্য কথা শুনিয়ে দিয়েছি। তিনিই তোমাদেরকে প্রথমে সৃষ্টিকারী। তিনিই সবকিছুকে বাকশক্তি দান করেছেন। সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধাচরণ এবং তার হুকুমের অবাধ্যাচরণ কে করতে পারে?হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আমি কেন হাসলাম তা তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করলে না যে?” সাহাবীগণ (রাঃ) তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি হাসলেন কেন?" উত্তরে তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন বান্দার তার প্রতিপালকের সাথে ঝগড়ার কথা মনে করে আমি বিস্ময়বোধ করছি। বান্দা বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করেননি যে, আপনি আমার উপর যুলুম করবেন না?আল্লাহ তা'আলা জবাবে বলবেনঃ “হ্যা (অবশ্যই করেছিলাম)।” সে বলবেঃ “আমি তো আমার আমলের উপর আমার নিজের ছাড়া আর কারো সাক্ষ্য কবুল করবে না। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “আমি এবং আমার সম্মানিত ফেরেশতারা কি সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট নই?" কিন্তু সে বারবার তার একথাই বলতে থাকবে। তখন আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জ্জতের জন্যে তার মুখে মোহর লাগিয়ে দিবেন এবং তার। দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে বলা হবেঃ “সে যা কিছু করেছে তার সাক্ষ্য তোমরা প্রদান কর।” তারা তখন পরিষ্কারভাবে সত্য সাক্ষ্য দিয়ে দিবে। সে তখন। তাদেরকে তিরস্কার করে বলবেঃ “আমি তো তোমাদেরকেই রক্ষা করার জন্যে তর্ক করছিলাম।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযায় (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন) হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “কাফির এবং মুনাফিকদেরকে হিসাবের জন্যে ডাক দেয়া হবে। তিনি তাদের প্রত্যেকের সামনে তার কৃতকর্ম পেশ করবেন। তাদের প্রত্যেক ব্যক্তি শপথ করে করে নিজের কৃতকর্ম অস্বীকার করবে এবং বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার ফেরেশতারা এমন কিছু লিখে রেখেছেন যা আমি কখনো করিনি। ফেরেশতারা বলবেনঃ “তুমি কি অমুক দিন অমুক জায়গায় অমুক আমল করনি?” সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার মর্যাদার শপথ! আমি এ কাজ কখনো করিনি।” অতঃপর তার মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে এবং দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে। সর্বপ্রথম তার ডান উরু কথা বলবে।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন কাফিরের সামনে তার কৃত মন্দ আমলগুলো পেশ করা হবে। সে তখন ওগুলো অস্বীকার করবে এবং তর্ক-বিতর্ক শুরু করে দিবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “এই যে তোমার প্রতিবেশীরা তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে?” সে বলবেঃ “তারা মিথ্যা বলছে।” মহান আল্লাহ বলবেনঃ “এই যে এরা তোমার পরিবারবর্গ, এরা সাক্ষ্য দিচ্ছে? সে উত্তর দিবেঃ “এরাও সবাই মিথ্যাবাদী।” আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে শপথ করাবেন। তখন তারা শপথ করবে। তথাপি সে অস্বীকারই করবে। আল্লাহ তাআলা তখন তাদেরকে নীরব করবেন এবং স্বয়ং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান করবে এবং তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ইবনুল আরাক (রঃ)-কে বলেনঃ “কিয়ামতের দিন একটি সময় তো এমন হবে যে, কাউকেও কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে না এবং কোন ওযর-আপত্তিও শুনা হবে না। অতঃপর যখন কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে তখন বান্দা ঝগড়া ও তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করবে এবং স্বীয় কৃতকর্মকে অস্বীকার করে বসবে। তারা মিথ্যা শপথ করবে। অবশেষে তাদের মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং তাদের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন তাদের ত্বক, চক্ষু, হাত, পা ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে। অতঃপর তাদের মুখ খুলে দেয়া হবে। তখন তারা তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার কারণে তিরস্কার করবে। তারা তখন বলবেঃ “আল্লাহ, যিনি সবকিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন তিনি। আমাদেরকেও বাকশক্তি দিয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন প্রথমবার এবং তাঁর নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।' তখন মুখও স্বীকার করে নিবে।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত রাফে আবুল হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, স্বীয় কৃতকর্ম অস্বীকার করার কারণে তার জিহ্বা এতো মোটা করে দেয়া হবে যে, ওটা একটা কথাও বলতে পারবে না। তখন দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে সাক্ষ্য দিতে বলা হবে। তারা প্রত্যেকেই তখন নিজ নিজ আমলের কথা বলে দিবে। কর্ণ, চক্ষু, ত্বক, লজ্জাস্থান, হাত, পা ইত্যাদি সবাই সাক্ষ্য দিবে। (এটাও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এর অনুরূপ আরো বহু হাদীস ও আসার সূরায়ে ইয়াসীনের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। আয়াতটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আজ তাদের মুখ মোহর করে দিবো, তাদের হস্ত কথা বলবে আমার সাথে এবং তাদের চরণ সাক্ষ্য দিবে তাদের কৃতকর্মের।”(৩৬:৬৫)।হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আমরা সমুদ্রের হিজরত হতে ফিরে আসি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা আমাদেরকে বললেনঃ “তোমরা হাবশা দেশে (আবিসিনিয়ায়) বিস্ময়কর ঘটনা কিছু দেখে থাকলে বর্ণনা কর।” তখন একজন যুবক বললোঃ “একদা আমরা সেখানে বসে আছি এমন সময় তাদের আলেমদের একজন বৃদ্ধা মহিলা মাথায় একটি কলসি নিয়ে আমাদের পার্শ্ব দিয়ে গমন করে। তাদের একজন যুবক তাকে ধাক্কা দেয়। ফলে সে পড়ে যায় এবং কলসিটি ভেঙ্গে যায়। তখন ঐ বৃদ্ধা মহিলাটি উঠে ঐ যুবকটির দিকে দৃষ্টিপাত করে বললোঃ “ওরে প্রতারক! তুই এর পরিণাম তখনই জানতে পারবি যখন আল্লাহ তাআলা স্বীয় কুরসীর উপর সমাসীন হবেন এবং তার বান্দাদেরকে একত্রিত করবেন। ঐ সময় তাদের হাত, পা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে এবং প্রত্যেকের প্রত্যেকটি আমল প্রকাশিত হয়ে পড়বে। ঐদিন তোর এবং আমার মধ্যে ফায়সালা হয়ে যাবে।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “বৃদ্ধা মহিলাটি সত্য কথাই বলেছে, আল্লাহ তা'আলা ঐ সম্প্রদায়কে কিভাবে পবিত্র করবেন যাদের দুর্বলদের প্রতিশোধ সবলদের হতে গ্রহণ না করবেন?” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা এই সনদে গারীব)ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) এই রিওয়াইয়াতটিই অন্য সনদে বর্ণনা করেছেন। যখন বান্দা স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দানের কারণে ভসনা। করবে তখন তারা উত্তর দিতে গিয়ে এ কথাও বলবেঃ “তোমাদের আমলগুলো আসলে গোপন ছিল না। আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টির সামনে তোমরা কুফরী ও অবাধ্যাচরণের কাজে লিপ্ত থাকতে এবং কিছুই পরোয়া করতে না। কেননা, তোমরা মনে করতে যে, তোমাদের বহু কাজ আল্লাহর নিকট গোপন থাকছে। এই মিথ্যা ধারণাই তোমাদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাই আজ তোমরা ধ্বংস হয়ে গেছে।” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমি কাবা শরীফের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিলাম। এমতাবস্থায় তথায় তিনজন লোক আসলো, যাদের পেট ছিল বড় এবং জ্ঞান ছিল কম। তাদের একজন বললোঃ “আচ্ছা বলতো, আমরা যে কথা বলছি তা কি আল্লাহ শুনতে পাচ্ছেন?” দ্বিতীয়জন বললোঃ “আমরা উচ্চস্বরে কথা বললে তিনি শুনতে পান এবং নিম্ন স্বরে কথা বললে তিনি শুনতে পান না।” তৃতীয় জন বললোঃ “তিনি কিছু শুনতে পেলে সবই শুনতে পান।” আমি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ঘটনাটি বর্ণনা করলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিছু গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না .......... ফলে তোমরা হয়েছে ক্ষগ্রিস্ত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত বাহ্য ইবনে হাকীম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে এমন অবস্থায় আহ্বান করা হবে যে, তোমাদের মুখের উপর মোহর মারা থাকবে। তোমাদের মধ্যে কারো আমল সর্বপ্রথম যে (অঙ্গ) প্রকাশ করবে তা হবে তার উরু ও স্কন্ধ।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মা’মার (রঃ) বলেন যে, হযরত হাসান (রঃ) (আরবী) পাঠ করার পরে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে, আমি তার সাথে ঐ ব্যবহারই করে থাকি। আর যখন সে আমাকে ডাকে আমি তখন তার সাথেই থাকি।” হযরত হাসান (রঃ) এটুকু বলার পর কিছুক্ষণ চিন্তা করে আবার বলতে শুরু করেনঃ আল্লাহ সম্পর্কে যে ব্যক্তি যে ধরিণা করে তার আমলও ঐরূপই হয়ে থাকে। মুমিন আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা রাখে বলে তার আমলও ভাল হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে কাফির ও মুনাফিক আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে বলে তার আমলও মন্দ হয়। অতঃপর তিনি বলেন যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিছু গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না ........ তোমাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে তোমাদের এই ধারণাই তোমাদের ধ্বংস এনেছে। ফলে তোমরা ধ্বংস হয়েছে।”হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যেন এই অবস্থা ছাড়া মৃত্যু বরণ না করে যে, আল্লাহর প্রতি তার ধারণা ভাল রয়েছে। কারণ যে সম্প্রদায় আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা রেখেছে (আরবী) আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন।” অতঃপর তিনি ... (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এখন তারা ধৈর্যধারণ করলেও জাহান্নামই হবে তাদের আবাস এবং তারা অনুগ্রহ চাইলেও তারা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হবে না। অর্থাৎ জাহান্নামীদের জাহান্নামের মধ্যে ধৈর্যধারণ করা বা না করা সমান। তাদের কোন ওযর-আপত্তিও গ্রহণ করা হবে না এবং তাদের পাপও ক্ষমা করা হবে না। তাদের জন্যে দুনিয়ায় পুনরায় প্রত্যাবর্তনের পথও বন্ধ। এটা আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলবে- হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর আমাদের। দুর্ভাগ্য ছেয়ে গেছে, নিশ্চয়ই আমরা ছিলাম বিভ্রান্ত। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এর থেকে বের করে নিন, যদি আমরা পুনরায় এ কাজই করি তবে তো আমরা অবশ্যই যালিম হবো। আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলবেনঃ তোমরা এর মধ্যেই পড়ে থাকো এবং আমার সাথে কথা বলে না।”(২৩:১০৬-১০৮)
ফুসসিলাত 41:21
১৯-২৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এই মুশরিকদেরকে বলে দাও- কিয়ামতের দিন তাদেরকে জাহান্নাম অভিমুখে সমবেত করা হবে এবং জাহান্নামের রক্ষক তাদেরকে একত্রিত করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি অপরাধীদেরকে জাহান্নামের দিকে কঠিন পিপাসার্ত অবস্থায় হাঁকিয়ে নিয়ে যাবো।”(১৯:৮৬) তাদেরকে জাহান্নামের ধারে দাঁড় করিয়ে দেয়া হবে এবং তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, দেহ, কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তাদের আমলগুলোর সাক্ষ্য প্রদান করবে। তাদের পূর্বের ও পরের সমস্ত দোষ প্রকাশিত হয়ে পড়বে। দেহের প্রতিটি অঙ্গ বলে উঠবেঃ “সে আমার দ্বারা এই গুনাহ করেছে।” তখন সে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে ভৎসনা করে বলবেঃ “কেন তোমরা আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করছো?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমরা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করছি মাত্র। তিনি আমাদেরকে কথা বলার শক্তি দান করেছেন। সুতরাং আমরা সত্য সত্য কথা শুনিয়ে দিয়েছি। তিনিই তোমাদেরকে প্রথমে সৃষ্টিকারী। তিনিই সবকিছুকে বাকশক্তি দান করেছেন। সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধাচরণ এবং তার হুকুমের অবাধ্যাচরণ কে করতে পারে?হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আমি কেন হাসলাম তা তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করলে না যে?” সাহাবীগণ (রাঃ) তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি হাসলেন কেন?" উত্তরে তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন বান্দার তার প্রতিপালকের সাথে ঝগড়ার কথা মনে করে আমি বিস্ময়বোধ করছি। বান্দা বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করেননি যে, আপনি আমার উপর যুলুম করবেন না?আল্লাহ তা'আলা জবাবে বলবেনঃ “হ্যা (অবশ্যই করেছিলাম)।” সে বলবেঃ “আমি তো আমার আমলের উপর আমার নিজের ছাড়া আর কারো সাক্ষ্য কবুল করবে না। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “আমি এবং আমার সম্মানিত ফেরেশতারা কি সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট নই?" কিন্তু সে বারবার তার একথাই বলতে থাকবে। তখন আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জ্জতের জন্যে তার মুখে মোহর লাগিয়ে দিবেন এবং তার। দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে বলা হবেঃ “সে যা কিছু করেছে তার সাক্ষ্য তোমরা প্রদান কর।” তারা তখন পরিষ্কারভাবে সত্য সাক্ষ্য দিয়ে দিবে। সে তখন। তাদেরকে তিরস্কার করে বলবেঃ “আমি তো তোমাদেরকেই রক্ষা করার জন্যে তর্ক করছিলাম।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযায় (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন) হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “কাফির এবং মুনাফিকদেরকে হিসাবের জন্যে ডাক দেয়া হবে। তিনি তাদের প্রত্যেকের সামনে তার কৃতকর্ম পেশ করবেন। তাদের প্রত্যেক ব্যক্তি শপথ করে করে নিজের কৃতকর্ম অস্বীকার করবে এবং বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার ফেরেশতারা এমন কিছু লিখে রেখেছেন যা আমি কখনো করিনি। ফেরেশতারা বলবেনঃ “তুমি কি অমুক দিন অমুক জায়গায় অমুক আমল করনি?” সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার মর্যাদার শপথ! আমি এ কাজ কখনো করিনি।” অতঃপর তার মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে এবং দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে। সর্বপ্রথম তার ডান উরু কথা বলবে।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন কাফিরের সামনে তার কৃত মন্দ আমলগুলো পেশ করা হবে। সে তখন ওগুলো অস্বীকার করবে এবং তর্ক-বিতর্ক শুরু করে দিবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “এই যে তোমার প্রতিবেশীরা তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে?” সে বলবেঃ “তারা মিথ্যা বলছে।” মহান আল্লাহ বলবেনঃ “এই যে এরা তোমার পরিবারবর্গ, এরা সাক্ষ্য দিচ্ছে? সে উত্তর দিবেঃ “এরাও সবাই মিথ্যাবাদী।” আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে শপথ করাবেন। তখন তারা শপথ করবে। তথাপি সে অস্বীকারই করবে। আল্লাহ তাআলা তখন তাদেরকে নীরব করবেন এবং স্বয়ং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান করবে এবং তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ইবনুল আরাক (রঃ)-কে বলেনঃ “কিয়ামতের দিন একটি সময় তো এমন হবে যে, কাউকেও কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে না এবং কোন ওযর-আপত্তিও শুনা হবে না। অতঃপর যখন কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে তখন বান্দা ঝগড়া ও তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করবে এবং স্বীয় কৃতকর্মকে অস্বীকার করে বসবে। তারা মিথ্যা শপথ করবে। অবশেষে তাদের মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং তাদের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন তাদের ত্বক, চক্ষু, হাত, পা ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে। অতঃপর তাদের মুখ খুলে দেয়া হবে। তখন তারা তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার কারণে তিরস্কার করবে। তারা তখন বলবেঃ “আল্লাহ, যিনি সবকিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন তিনি। আমাদেরকেও বাকশক্তি দিয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন প্রথমবার এবং তাঁর নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।' তখন মুখও স্বীকার করে নিবে।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত রাফে আবুল হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, স্বীয় কৃতকর্ম অস্বীকার করার কারণে তার জিহ্বা এতো মোটা করে দেয়া হবে যে, ওটা একটা কথাও বলতে পারবে না। তখন দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে সাক্ষ্য দিতে বলা হবে। তারা প্রত্যেকেই তখন নিজ নিজ আমলের কথা বলে দিবে। কর্ণ, চক্ষু, ত্বক, লজ্জাস্থান, হাত, পা ইত্যাদি সবাই সাক্ষ্য দিবে। (এটাও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এর অনুরূপ আরো বহু হাদীস ও আসার সূরায়ে ইয়াসীনের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। আয়াতটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আজ তাদের মুখ মোহর করে দিবো, তাদের হস্ত কথা বলবে আমার সাথে এবং তাদের চরণ সাক্ষ্য দিবে তাদের কৃতকর্মের।”(৩৬:৬৫)।হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আমরা সমুদ্রের হিজরত হতে ফিরে আসি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা আমাদেরকে বললেনঃ “তোমরা হাবশা দেশে (আবিসিনিয়ায়) বিস্ময়কর ঘটনা কিছু দেখে থাকলে বর্ণনা কর।” তখন একজন যুবক বললোঃ “একদা আমরা সেখানে বসে আছি এমন সময় তাদের আলেমদের একজন বৃদ্ধা মহিলা মাথায় একটি কলসি নিয়ে আমাদের পার্শ্ব দিয়ে গমন করে। তাদের একজন যুবক তাকে ধাক্কা দেয়। ফলে সে পড়ে যায় এবং কলসিটি ভেঙ্গে যায়। তখন ঐ বৃদ্ধা মহিলাটি উঠে ঐ যুবকটির দিকে দৃষ্টিপাত করে বললোঃ “ওরে প্রতারক! তুই এর পরিণাম তখনই জানতে পারবি যখন আল্লাহ তাআলা স্বীয় কুরসীর উপর সমাসীন হবেন এবং তার বান্দাদেরকে একত্রিত করবেন। ঐ সময় তাদের হাত, পা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে এবং প্রত্যেকের প্রত্যেকটি আমল প্রকাশিত হয়ে পড়বে। ঐদিন তোর এবং আমার মধ্যে ফায়সালা হয়ে যাবে।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “বৃদ্ধা মহিলাটি সত্য কথাই বলেছে, আল্লাহ তা'আলা ঐ সম্প্রদায়কে কিভাবে পবিত্র করবেন যাদের দুর্বলদের প্রতিশোধ সবলদের হতে গ্রহণ না করবেন?” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা এই সনদে গারীব)ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) এই রিওয়াইয়াতটিই অন্য সনদে বর্ণনা করেছেন। যখন বান্দা স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দানের কারণে ভসনা। করবে তখন তারা উত্তর দিতে গিয়ে এ কথাও বলবেঃ “তোমাদের আমলগুলো আসলে গোপন ছিল না। আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টির সামনে তোমরা কুফরী ও অবাধ্যাচরণের কাজে লিপ্ত থাকতে এবং কিছুই পরোয়া করতে না। কেননা, তোমরা মনে করতে যে, তোমাদের বহু কাজ আল্লাহর নিকট গোপন থাকছে। এই মিথ্যা ধারণাই তোমাদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাই আজ তোমরা ধ্বংস হয়ে গেছে।” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমি কাবা শরীফের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিলাম। এমতাবস্থায় তথায় তিনজন লোক আসলো, যাদের পেট ছিল বড় এবং জ্ঞান ছিল কম। তাদের একজন বললোঃ “আচ্ছা বলতো, আমরা যে কথা বলছি তা কি আল্লাহ শুনতে পাচ্ছেন?” দ্বিতীয়জন বললোঃ “আমরা উচ্চস্বরে কথা বললে তিনি শুনতে পান এবং নিম্ন স্বরে কথা বললে তিনি শুনতে পান না।” তৃতীয় জন বললোঃ “তিনি কিছু শুনতে পেলে সবই শুনতে পান।” আমি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ঘটনাটি বর্ণনা করলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিছু গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না .......... ফলে তোমরা হয়েছে ক্ষগ্রিস্ত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত বাহ্য ইবনে হাকীম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে এমন অবস্থায় আহ্বান করা হবে যে, তোমাদের মুখের উপর মোহর মারা থাকবে। তোমাদের মধ্যে কারো আমল সর্বপ্রথম যে (অঙ্গ) প্রকাশ করবে তা হবে তার উরু ও স্কন্ধ।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মা’মার (রঃ) বলেন যে, হযরত হাসান (রঃ) (আরবী) পাঠ করার পরে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে, আমি তার সাথে ঐ ব্যবহারই করে থাকি। আর যখন সে আমাকে ডাকে আমি তখন তার সাথেই থাকি।” হযরত হাসান (রঃ) এটুকু বলার পর কিছুক্ষণ চিন্তা করে আবার বলতে শুরু করেনঃ আল্লাহ সম্পর্কে যে ব্যক্তি যে ধরিণা করে তার আমলও ঐরূপই হয়ে থাকে। মুমিন আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা রাখে বলে তার আমলও ভাল হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে কাফির ও মুনাফিক আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে বলে তার আমলও মন্দ হয়। অতঃপর তিনি বলেন যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিছু গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না ........ তোমাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে তোমাদের এই ধারণাই তোমাদের ধ্বংস এনেছে। ফলে তোমরা ধ্বংস হয়েছে।”হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যেন এই অবস্থা ছাড়া মৃত্যু বরণ না করে যে, আল্লাহর প্রতি তার ধারণা ভাল রয়েছে। কারণ যে সম্প্রদায় আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা রেখেছে (আরবী) আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন।” অতঃপর তিনি ... (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এখন তারা ধৈর্যধারণ করলেও জাহান্নামই হবে তাদের আবাস এবং তারা অনুগ্রহ চাইলেও তারা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হবে না। অর্থাৎ জাহান্নামীদের জাহান্নামের মধ্যে ধৈর্যধারণ করা বা না করা সমান। তাদের কোন ওযর-আপত্তিও গ্রহণ করা হবে না এবং তাদের পাপও ক্ষমা করা হবে না। তাদের জন্যে দুনিয়ায় পুনরায় প্রত্যাবর্তনের পথও বন্ধ। এটা আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলবে- হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর আমাদের। দুর্ভাগ্য ছেয়ে গেছে, নিশ্চয়ই আমরা ছিলাম বিভ্রান্ত। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এর থেকে বের করে নিন, যদি আমরা পুনরায় এ কাজই করি তবে তো আমরা অবশ্যই যালিম হবো। আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলবেনঃ তোমরা এর মধ্যেই পড়ে থাকো এবং আমার সাথে কথা বলে না।”(২৩:১০৬-১০৮)
ফুসসিলাত 41:22
১৯-২৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এই মুশরিকদেরকে বলে দাও- কিয়ামতের দিন তাদেরকে জাহান্নাম অভিমুখে সমবেত করা হবে এবং জাহান্নামের রক্ষক তাদেরকে একত্রিত করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি অপরাধীদেরকে জাহান্নামের দিকে কঠিন পিপাসার্ত অবস্থায় হাঁকিয়ে নিয়ে যাবো।”(১৯:৮৬) তাদেরকে জাহান্নামের ধারে দাঁড় করিয়ে দেয়া হবে এবং তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, দেহ, কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তাদের আমলগুলোর সাক্ষ্য প্রদান করবে। তাদের পূর্বের ও পরের সমস্ত দোষ প্রকাশিত হয়ে পড়বে। দেহের প্রতিটি অঙ্গ বলে উঠবেঃ “সে আমার দ্বারা এই গুনাহ করেছে।” তখন সে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে ভৎসনা করে বলবেঃ “কেন তোমরা আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করছো?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমরা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করছি মাত্র। তিনি আমাদেরকে কথা বলার শক্তি দান করেছেন। সুতরাং আমরা সত্য সত্য কথা শুনিয়ে দিয়েছি। তিনিই তোমাদেরকে প্রথমে সৃষ্টিকারী। তিনিই সবকিছুকে বাকশক্তি দান করেছেন। সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধাচরণ এবং তার হুকুমের অবাধ্যাচরণ কে করতে পারে?হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আমি কেন হাসলাম তা তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করলে না যে?” সাহাবীগণ (রাঃ) তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি হাসলেন কেন?" উত্তরে তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন বান্দার তার প্রতিপালকের সাথে ঝগড়ার কথা মনে করে আমি বিস্ময়বোধ করছি। বান্দা বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করেননি যে, আপনি আমার উপর যুলুম করবেন না?আল্লাহ তা'আলা জবাবে বলবেনঃ “হ্যা (অবশ্যই করেছিলাম)।” সে বলবেঃ “আমি তো আমার আমলের উপর আমার নিজের ছাড়া আর কারো সাক্ষ্য কবুল করবে না। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “আমি এবং আমার সম্মানিত ফেরেশতারা কি সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট নই?" কিন্তু সে বারবার তার একথাই বলতে থাকবে। তখন আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জ্জতের জন্যে তার মুখে মোহর লাগিয়ে দিবেন এবং তার। দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে বলা হবেঃ “সে যা কিছু করেছে তার সাক্ষ্য তোমরা প্রদান কর।” তারা তখন পরিষ্কারভাবে সত্য সাক্ষ্য দিয়ে দিবে। সে তখন। তাদেরকে তিরস্কার করে বলবেঃ “আমি তো তোমাদেরকেই রক্ষা করার জন্যে তর্ক করছিলাম।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযায় (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন) হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “কাফির এবং মুনাফিকদেরকে হিসাবের জন্যে ডাক দেয়া হবে। তিনি তাদের প্রত্যেকের সামনে তার কৃতকর্ম পেশ করবেন। তাদের প্রত্যেক ব্যক্তি শপথ করে করে নিজের কৃতকর্ম অস্বীকার করবে এবং বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার ফেরেশতারা এমন কিছু লিখে রেখেছেন যা আমি কখনো করিনি। ফেরেশতারা বলবেনঃ “তুমি কি অমুক দিন অমুক জায়গায় অমুক আমল করনি?” সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার মর্যাদার শপথ! আমি এ কাজ কখনো করিনি।” অতঃপর তার মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে এবং দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে। সর্বপ্রথম তার ডান উরু কথা বলবে।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন কাফিরের সামনে তার কৃত মন্দ আমলগুলো পেশ করা হবে। সে তখন ওগুলো অস্বীকার করবে এবং তর্ক-বিতর্ক শুরু করে দিবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “এই যে তোমার প্রতিবেশীরা তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে?” সে বলবেঃ “তারা মিথ্যা বলছে।” মহান আল্লাহ বলবেনঃ “এই যে এরা তোমার পরিবারবর্গ, এরা সাক্ষ্য দিচ্ছে? সে উত্তর দিবেঃ “এরাও সবাই মিথ্যাবাদী।” আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে শপথ করাবেন। তখন তারা শপথ করবে। তথাপি সে অস্বীকারই করবে। আল্লাহ তাআলা তখন তাদেরকে নীরব করবেন এবং স্বয়ং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান করবে এবং তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ইবনুল আরাক (রঃ)-কে বলেনঃ “কিয়ামতের দিন একটি সময় তো এমন হবে যে, কাউকেও কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে না এবং কোন ওযর-আপত্তিও শুনা হবে না। অতঃপর যখন কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে তখন বান্দা ঝগড়া ও তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করবে এবং স্বীয় কৃতকর্মকে অস্বীকার করে বসবে। তারা মিথ্যা শপথ করবে। অবশেষে তাদের মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং তাদের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন তাদের ত্বক, চক্ষু, হাত, পা ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে। অতঃপর তাদের মুখ খুলে দেয়া হবে। তখন তারা তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার কারণে তিরস্কার করবে। তারা তখন বলবেঃ “আল্লাহ, যিনি সবকিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন তিনি। আমাদেরকেও বাকশক্তি দিয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন প্রথমবার এবং তাঁর নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।' তখন মুখও স্বীকার করে নিবে।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত রাফে আবুল হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, স্বীয় কৃতকর্ম অস্বীকার করার কারণে তার জিহ্বা এতো মোটা করে দেয়া হবে যে, ওটা একটা কথাও বলতে পারবে না। তখন দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে সাক্ষ্য দিতে বলা হবে। তারা প্রত্যেকেই তখন নিজ নিজ আমলের কথা বলে দিবে। কর্ণ, চক্ষু, ত্বক, লজ্জাস্থান, হাত, পা ইত্যাদি সবাই সাক্ষ্য দিবে। (এটাও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এর অনুরূপ আরো বহু হাদীস ও আসার সূরায়ে ইয়াসীনের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। আয়াতটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আজ তাদের মুখ মোহর করে দিবো, তাদের হস্ত কথা বলবে আমার সাথে এবং তাদের চরণ সাক্ষ্য দিবে তাদের কৃতকর্মের।”(৩৬:৬৫)।হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আমরা সমুদ্রের হিজরত হতে ফিরে আসি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা আমাদেরকে বললেনঃ “তোমরা হাবশা দেশে (আবিসিনিয়ায়) বিস্ময়কর ঘটনা কিছু দেখে থাকলে বর্ণনা কর।” তখন একজন যুবক বললোঃ “একদা আমরা সেখানে বসে আছি এমন সময় তাদের আলেমদের একজন বৃদ্ধা মহিলা মাথায় একটি কলসি নিয়ে আমাদের পার্শ্ব দিয়ে গমন করে। তাদের একজন যুবক তাকে ধাক্কা দেয়। ফলে সে পড়ে যায় এবং কলসিটি ভেঙ্গে যায়। তখন ঐ বৃদ্ধা মহিলাটি উঠে ঐ যুবকটির দিকে দৃষ্টিপাত করে বললোঃ “ওরে প্রতারক! তুই এর পরিণাম তখনই জানতে পারবি যখন আল্লাহ তাআলা স্বীয় কুরসীর উপর সমাসীন হবেন এবং তার বান্দাদেরকে একত্রিত করবেন। ঐ সময় তাদের হাত, পা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে এবং প্রত্যেকের প্রত্যেকটি আমল প্রকাশিত হয়ে পড়বে। ঐদিন তোর এবং আমার মধ্যে ফায়সালা হয়ে যাবে।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “বৃদ্ধা মহিলাটি সত্য কথাই বলেছে, আল্লাহ তা'আলা ঐ সম্প্রদায়কে কিভাবে পবিত্র করবেন যাদের দুর্বলদের প্রতিশোধ সবলদের হতে গ্রহণ না করবেন?” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা এই সনদে গারীব)ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) এই রিওয়াইয়াতটিই অন্য সনদে বর্ণনা করেছেন। যখন বান্দা স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দানের কারণে ভসনা। করবে তখন তারা উত্তর দিতে গিয়ে এ কথাও বলবেঃ “তোমাদের আমলগুলো আসলে গোপন ছিল না। আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টির সামনে তোমরা কুফরী ও অবাধ্যাচরণের কাজে লিপ্ত থাকতে এবং কিছুই পরোয়া করতে না। কেননা, তোমরা মনে করতে যে, তোমাদের বহু কাজ আল্লাহর নিকট গোপন থাকছে। এই মিথ্যা ধারণাই তোমাদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাই আজ তোমরা ধ্বংস হয়ে গেছে।” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমি কাবা শরীফের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিলাম। এমতাবস্থায় তথায় তিনজন লোক আসলো, যাদের পেট ছিল বড় এবং জ্ঞান ছিল কম। তাদের একজন বললোঃ “আচ্ছা বলতো, আমরা যে কথা বলছি তা কি আল্লাহ শুনতে পাচ্ছেন?” দ্বিতীয়জন বললোঃ “আমরা উচ্চস্বরে কথা বললে তিনি শুনতে পান এবং নিম্ন স্বরে কথা বললে তিনি শুনতে পান না।” তৃতীয় জন বললোঃ “তিনি কিছু শুনতে পেলে সবই শুনতে পান।” আমি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ঘটনাটি বর্ণনা করলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিছু গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না .......... ফলে তোমরা হয়েছে ক্ষগ্রিস্ত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত বাহ্য ইবনে হাকীম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে এমন অবস্থায় আহ্বান করা হবে যে, তোমাদের মুখের উপর মোহর মারা থাকবে। তোমাদের মধ্যে কারো আমল সর্বপ্রথম যে (অঙ্গ) প্রকাশ করবে তা হবে তার উরু ও স্কন্ধ।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মা’মার (রঃ) বলেন যে, হযরত হাসান (রঃ) (আরবী) পাঠ করার পরে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে, আমি তার সাথে ঐ ব্যবহারই করে থাকি। আর যখন সে আমাকে ডাকে আমি তখন তার সাথেই থাকি।” হযরত হাসান (রঃ) এটুকু বলার পর কিছুক্ষণ চিন্তা করে আবার বলতে শুরু করেনঃ আল্লাহ সম্পর্কে যে ব্যক্তি যে ধরিণা করে তার আমলও ঐরূপই হয়ে থাকে। মুমিন আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা রাখে বলে তার আমলও ভাল হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে কাফির ও মুনাফিক আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে বলে তার আমলও মন্দ হয়। অতঃপর তিনি বলেন যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিছু গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না ........ তোমাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে তোমাদের এই ধারণাই তোমাদের ধ্বংস এনেছে। ফলে তোমরা ধ্বংস হয়েছে।”হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যেন এই অবস্থা ছাড়া মৃত্যু বরণ না করে যে, আল্লাহর প্রতি তার ধারণা ভাল রয়েছে। কারণ যে সম্প্রদায় আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা রেখেছে (আরবী) আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন।” অতঃপর তিনি ... (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এখন তারা ধৈর্যধারণ করলেও জাহান্নামই হবে তাদের আবাস এবং তারা অনুগ্রহ চাইলেও তারা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হবে না। অর্থাৎ জাহান্নামীদের জাহান্নামের মধ্যে ধৈর্যধারণ করা বা না করা সমান। তাদের কোন ওযর-আপত্তিও গ্রহণ করা হবে না এবং তাদের পাপও ক্ষমা করা হবে না। তাদের জন্যে দুনিয়ায় পুনরায় প্রত্যাবর্তনের পথও বন্ধ। এটা আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলবে- হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর আমাদের। দুর্ভাগ্য ছেয়ে গেছে, নিশ্চয়ই আমরা ছিলাম বিভ্রান্ত। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এর থেকে বের করে নিন, যদি আমরা পুনরায় এ কাজই করি তবে তো আমরা অবশ্যই যালিম হবো। আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলবেনঃ তোমরা এর মধ্যেই পড়ে থাকো এবং আমার সাথে কথা বলে না।”(২৩:১০৬-১০৮)
ফুসসিলাত 41:23
১৯-২৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এই মুশরিকদেরকে বলে দাও- কিয়ামতের দিন তাদেরকে জাহান্নাম অভিমুখে সমবেত করা হবে এবং জাহান্নামের রক্ষক তাদেরকে একত্রিত করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি অপরাধীদেরকে জাহান্নামের দিকে কঠিন পিপাসার্ত অবস্থায় হাঁকিয়ে নিয়ে যাবো।”(১৯:৮৬) তাদেরকে জাহান্নামের ধারে দাঁড় করিয়ে দেয়া হবে এবং তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, দেহ, কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তাদের আমলগুলোর সাক্ষ্য প্রদান করবে। তাদের পূর্বের ও পরের সমস্ত দোষ প্রকাশিত হয়ে পড়বে। দেহের প্রতিটি অঙ্গ বলে উঠবেঃ “সে আমার দ্বারা এই গুনাহ করেছে।” তখন সে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে ভৎসনা করে বলবেঃ “কেন তোমরা আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করছো?” তারা উত্তরে বলবেঃ “আমরা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করছি মাত্র। তিনি আমাদেরকে কথা বলার শক্তি দান করেছেন। সুতরাং আমরা সত্য সত্য কথা শুনিয়ে দিয়েছি। তিনিই তোমাদেরকে প্রথমে সৃষ্টিকারী। তিনিই সবকিছুকে বাকশক্তি দান করেছেন। সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধাচরণ এবং তার হুকুমের অবাধ্যাচরণ কে করতে পারে?হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আমি কেন হাসলাম তা তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করলে না যে?” সাহাবীগণ (রাঃ) তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি হাসলেন কেন?" উত্তরে তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন বান্দার তার প্রতিপালকের সাথে ঝগড়ার কথা মনে করে আমি বিস্ময়বোধ করছি। বান্দা বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করেননি যে, আপনি আমার উপর যুলুম করবেন না?আল্লাহ তা'আলা জবাবে বলবেনঃ “হ্যা (অবশ্যই করেছিলাম)।” সে বলবেঃ “আমি তো আমার আমলের উপর আমার নিজের ছাড়া আর কারো সাক্ষ্য কবুল করবে না। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “আমি এবং আমার সম্মানিত ফেরেশতারা কি সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে যথেষ্ট নই?" কিন্তু সে বারবার তার একথাই বলতে থাকবে। তখন আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জ্জতের জন্যে তার মুখে মোহর লাগিয়ে দিবেন এবং তার। দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে বলা হবেঃ “সে যা কিছু করেছে তার সাক্ষ্য তোমরা প্রদান কর।” তারা তখন পরিষ্কারভাবে সত্য সাক্ষ্য দিয়ে দিবে। সে তখন। তাদেরকে তিরস্কার করে বলবেঃ “আমি তো তোমাদেরকেই রক্ষা করার জন্যে তর্ক করছিলাম।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযায় (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন) হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “কাফির এবং মুনাফিকদেরকে হিসাবের জন্যে ডাক দেয়া হবে। তিনি তাদের প্রত্যেকের সামনে তার কৃতকর্ম পেশ করবেন। তাদের প্রত্যেক ব্যক্তি শপথ করে করে নিজের কৃতকর্ম অস্বীকার করবে এবং বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার ফেরেশতারা এমন কিছু লিখে রেখেছেন যা আমি কখনো করিনি। ফেরেশতারা বলবেনঃ “তুমি কি অমুক দিন অমুক জায়গায় অমুক আমল করনি?” সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার মর্যাদার শপথ! আমি এ কাজ কখনো করিনি।” অতঃপর তার মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে এবং দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে। সর্বপ্রথম তার ডান উরু কথা বলবে।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন কাফিরের সামনে তার কৃত মন্দ আমলগুলো পেশ করা হবে। সে তখন ওগুলো অস্বীকার করবে এবং তর্ক-বিতর্ক শুরু করে দিবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “এই যে তোমার প্রতিবেশীরা তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে?” সে বলবেঃ “তারা মিথ্যা বলছে।” মহান আল্লাহ বলবেনঃ “এই যে এরা তোমার পরিবারবর্গ, এরা সাক্ষ্য দিচ্ছে? সে উত্তর দিবেঃ “এরাও সবাই মিথ্যাবাদী।” আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে শপথ করাবেন। তখন তারা শপথ করবে। তথাপি সে অস্বীকারই করবে। আল্লাহ তাআলা তখন তাদেরকে নীরব করবেন এবং স্বয়ং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান করবে এবং তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ইবনুল আরাক (রঃ)-কে বলেনঃ “কিয়ামতের দিন একটি সময় তো এমন হবে যে, কাউকেও কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে না এবং কোন ওযর-আপত্তিও শুনা হবে না। অতঃপর যখন কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে তখন বান্দা ঝগড়া ও তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করবে এবং স্বীয় কৃতকর্মকে অস্বীকার করে বসবে। তারা মিথ্যা শপথ করবে। অবশেষে তাদের মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে। সুতরাং তাদের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন তাদের ত্বক, চক্ষু, হাত, পা ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে। অতঃপর তাদের মুখ খুলে দেয়া হবে। তখন তারা তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার কারণে তিরস্কার করবে। তারা তখন বলবেঃ “আল্লাহ, যিনি সবকিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন তিনি। আমাদেরকেও বাকশক্তি দিয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন প্রথমবার এবং তাঁর নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।' তখন মুখও স্বীকার করে নিবে।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত রাফে আবুল হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, স্বীয় কৃতকর্ম অস্বীকার করার কারণে তার জিহ্বা এতো মোটা করে দেয়া হবে যে, ওটা একটা কথাও বলতে পারবে না। তখন দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে সাক্ষ্য দিতে বলা হবে। তারা প্রত্যেকেই তখন নিজ নিজ আমলের কথা বলে দিবে। কর্ণ, চক্ষু, ত্বক, লজ্জাস্থান, হাত, পা ইত্যাদি সবাই সাক্ষ্য দিবে। (এটাও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এর অনুরূপ আরো বহু হাদীস ও আসার সূরায়ে ইয়াসীনের নিম্নের আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। আয়াতটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আজ তাদের মুখ মোহর করে দিবো, তাদের হস্ত কথা বলবে আমার সাথে এবং তাদের চরণ সাক্ষ্য দিবে তাদের কৃতকর্মের।”(৩৬:৬৫)।হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আমরা সমুদ্রের হিজরত হতে ফিরে আসি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা আমাদেরকে বললেনঃ “তোমরা হাবশা দেশে (আবিসিনিয়ায়) বিস্ময়কর ঘটনা কিছু দেখে থাকলে বর্ণনা কর।” তখন একজন যুবক বললোঃ “একদা আমরা সেখানে বসে আছি এমন সময় তাদের আলেমদের একজন বৃদ্ধা মহিলা মাথায় একটি কলসি নিয়ে আমাদের পার্শ্ব দিয়ে গমন করে। তাদের একজন যুবক তাকে ধাক্কা দেয়। ফলে সে পড়ে যায় এবং কলসিটি ভেঙ্গে যায়। তখন ঐ বৃদ্ধা মহিলাটি উঠে ঐ যুবকটির দিকে দৃষ্টিপাত করে বললোঃ “ওরে প্রতারক! তুই এর পরিণাম তখনই জানতে পারবি যখন আল্লাহ তাআলা স্বীয় কুরসীর উপর সমাসীন হবেন এবং তার বান্দাদেরকে একত্রিত করবেন। ঐ সময় তাদের হাত, পা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে এবং প্রত্যেকের প্রত্যেকটি আমল প্রকাশিত হয়ে পড়বে। ঐদিন তোর এবং আমার মধ্যে ফায়সালা হয়ে যাবে।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “বৃদ্ধা মহিলাটি সত্য কথাই বলেছে, আল্লাহ তা'আলা ঐ সম্প্রদায়কে কিভাবে পবিত্র করবেন যাদের দুর্বলদের প্রতিশোধ সবলদের হতে গ্রহণ না করবেন?” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা এই সনদে গারীব)ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) এই রিওয়াইয়াতটিই অন্য সনদে বর্ণনা করেছেন। যখন বান্দা স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দানের কারণে ভসনা। করবে তখন তারা উত্তর দিতে গিয়ে এ কথাও বলবেঃ “তোমাদের আমলগুলো আসলে গোপন ছিল না। আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টির সামনে তোমরা কুফরী ও অবাধ্যাচরণের কাজে লিপ্ত থাকতে এবং কিছুই পরোয়া করতে না। কেননা, তোমরা মনে করতে যে, তোমাদের বহু কাজ আল্লাহর নিকট গোপন থাকছে। এই মিথ্যা ধারণাই তোমাদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাই আজ তোমরা ধ্বংস হয়ে গেছে।” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমি কাবা শরীফের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিলাম। এমতাবস্থায় তথায় তিনজন লোক আসলো, যাদের পেট ছিল বড় এবং জ্ঞান ছিল কম। তাদের একজন বললোঃ “আচ্ছা বলতো, আমরা যে কথা বলছি তা কি আল্লাহ শুনতে পাচ্ছেন?” দ্বিতীয়জন বললোঃ “আমরা উচ্চস্বরে কথা বললে তিনি শুনতে পান এবং নিম্ন স্বরে কথা বললে তিনি শুনতে পান না।” তৃতীয় জন বললোঃ “তিনি কিছু শুনতে পেলে সবই শুনতে পান।” আমি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ঘটনাটি বর্ণনা করলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিছু গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না .......... ফলে তোমরা হয়েছে ক্ষগ্রিস্ত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত বাহ্য ইবনে হাকীম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে এমন অবস্থায় আহ্বান করা হবে যে, তোমাদের মুখের উপর মোহর মারা থাকবে। তোমাদের মধ্যে কারো আমল সর্বপ্রথম যে (অঙ্গ) প্রকাশ করবে তা হবে তার উরু ও স্কন্ধ।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মা’মার (রঃ) বলেন যে, হযরত হাসান (রঃ) (আরবী) পাঠ করার পরে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে, আমি তার সাথে ঐ ব্যবহারই করে থাকি। আর যখন সে আমাকে ডাকে আমি তখন তার সাথেই থাকি।” হযরত হাসান (রঃ) এটুকু বলার পর কিছুক্ষণ চিন্তা করে আবার বলতে শুরু করেনঃ আল্লাহ সম্পর্কে যে ব্যক্তি যে ধরিণা করে তার আমলও ঐরূপই হয়ে থাকে। মুমিন আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা রাখে বলে তার আমলও ভাল হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে কাফির ও মুনাফিক আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে বলে তার আমলও মন্দ হয়। অতঃপর তিনি বলেন যে, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কিছু গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না ........ তোমাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে তোমাদের এই ধারণাই তোমাদের ধ্বংস এনেছে। ফলে তোমরা ধ্বংস হয়েছে।”হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যেন এই অবস্থা ছাড়া মৃত্যু বরণ না করে যে, আল্লাহর প্রতি তার ধারণা ভাল রয়েছে। কারণ যে সম্প্রদায় আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা রেখেছে (আরবী) আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন।” অতঃপর তিনি ... (আরবী)-এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এখন তারা ধৈর্যধারণ করলেও জাহান্নামই হবে তাদের আবাস এবং তারা অনুগ্রহ চাইলেও তারা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হবে না। অর্থাৎ জাহান্নামীদের জাহান্নামের মধ্যে ধৈর্যধারণ করা বা না করা সমান। তাদের কোন ওযর-আপত্তিও গ্রহণ করা হবে না এবং তাদের পাপও ক্ষমা করা হবে না। তাদের জন্যে দুনিয়ায় পুনরায় প্রত্যাবর্তনের পথও বন্ধ। এটা আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির মতঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলবে- হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর আমাদের। দুর্ভাগ্য ছেয়ে গেছে, নিশ্চয়ই আমরা ছিলাম বিভ্রান্ত। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এর থেকে বের করে নিন, যদি আমরা পুনরায় এ কাজই করি তবে তো আমরা অবশ্যই যালিম হবো। আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলবেনঃ তোমরা এর মধ্যেই পড়ে থাকো এবং আমার সাথে কথা বলে না।”(২৩:১০৬-১০৮)