Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-হুজুরাত 49:1 – ক্বাফ 50:27

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-হুজুরাত 49:1
  2. আল-হুজুরাত 49:2
  3. আল-হুজুরাত 49:3
  4. আল-হুজুরাত 49:4
  5. আল-হুজুরাত 49:5
  6. আল-হুজুরাত 49:6
  7. আল-হুজুরাত 49:7
  8. আল-হুজুরাত 49:8
  9. আল-হুজুরাত 49:9
  10. আল-হুজুরাত 49:10
  11. আল-হুজুরাত 49:11
  12. আল-হুজুরাত 49:12
  13. আল-হুজুরাত 49:13
  14. আল-হুজুরাত 49:14
  15. আল-হুজুরাত 49:15
  16. আল-হুজুরাত 49:16
  17. আল-হুজুরাত 49:17
  18. আল-হুজুরাত 49:18
  19. ক্বাফ 50:1
  20. ক্বাফ 50:2
  21. ক্বাফ 50:3
  22. ক্বাফ 50:4
  23. ক্বাফ 50:5
  24. ক্বাফ 50:6
  25. ক্বাফ 50:7
  26. ক্বাফ 50:8
  27. ক্বাফ 50:9
  28. ক্বাফ 50:10
  29. ক্বাফ 50:11
  30. ক্বাফ 50:12
  31. ক্বাফ 50:13
  32. ক্বাফ 50:14
  33. ক্বাফ 50:15
  34. ক্বাফ 50:16
  35. ক্বাফ 50:17
  36. ক্বাফ 50:18
  37. ক্বাফ 50:19
  38. ক্বাফ 50:20
  39. ক্বাফ 50:21
  40. ক্বাফ 50:22
  41. ক্বাফ 50:23
  42. ক্বাফ 50:24
  43. ক্বাফ 50:25
  44. ক্বাফ 50:26
  45. ক্বাফ 50:27

আল-হুজুরাত 49:1

১-৩ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতসমূহে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে তাঁর নবী। (সঃ)-এর ব্যাপারে আদব শিক্ষা দিচ্ছেন যে, নবী (সঃ)-এর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখা তাদের একান্ত কর্তব্য। সমস্ত কাজ-কর্মে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পিছনে থাকা তাদের উচিত। তাদের উচিত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করা।রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হযরত মু'আয (রাঃ)-কে ইয়ামনে প্রেরণ করেন তখন তাঁকে প্রশ্ন করেনঃ “তুমি কিসের মাধ্যমে ফায়সালা করবে?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কিতাবের মাধ্যমে। আবার তিনি প্রশ্ন করেনঃ “যদি আল্লাহর কিতাবে পাও?" জবাবে তিনি বলেনঃ “তাহলে সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর মাধ্যমে ফায়সালা করবে।” পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “যদি তাতেও না পাও?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “তাহলে আমি চিন্তা-গবেষণা করবে এবং ওরই মাধ্যমে ফায়সালা করবে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার বুকে হাত মেরে বললেনঃ “আল্লাহর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দূতকে এমন বিষয়ের তাওফীক দিয়েছেন যাতে তাঁর রাসূল (সঃ) সন্তুষ্ট। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এখানে এ হাদীসটি আনয়নের উদ্দেশ্য আমাদের এই যে, হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ইজতিহাদকে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলিল্লাহ (সঃ)-এর পরে স্থান দিয়েছেন। সুতরাং স্বীয় মতকে কিতাব ও সুন্নাতের আগে স্থান দেয়াই হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আগে বেড়ে যাওয়া।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, একথার ভাবার্থ হচ্ছেঃ “কিতাব ও সুন্নাতের বিপরীত কথা তোমরা বলো না।' হযরত আওফী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথার উপর কথা বলো না।' হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ “কোন বিষয় সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে পর্যন্ত কোন কিছু না বলেন সেই পর্যন্ত তোমরাও কিছুই বলে না, বরং নীরবতা অবলম্বন করো।' হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘আমরে দ্বীন ও আহকামে শরয়ীর ব্যাপারে তোমরা আল্লাহর কালাম ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর হাদীস ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা ফায়সালা করো না।' হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ “তোমরা কোন কথায় ও কাজে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অগ্রণী হয়ো না।' হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ “তোমরা ইমামের পূর্বে দু'আ করো না।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর’ অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম প্রতিপালনের ব্যাপারে মনে আল্লাহর ভয় রাখো। ‘আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ, অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের কথা শুনে থাকেন এবং তোমাদের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের খবর তিনি রাখেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে আর একটি আদব বা দ্রতা শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তারা যেন নবী (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু না করে। এ আয়াতটি হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত আবূ মুলাইকা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, দুই মহান ব্যক্তি অর্থাৎ হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) যেন প্রায় ধ্বংসই হয়ে যাবেন, যেহেতু তাঁরা নবী (সঃ)-এর সামনে তাঁদের কণ্ঠস্বর উঁচু করেছিলেন যখন বানী তামীম গোত্রের প্রতিনিধি হাযির হয়েছিলেন। তাদের একজন হযরত হাবিস ইবনে আকরার (রাঃ) প্রতি ইঙ্গিত করেন এবং অপরজন ইঙ্গিত করেন অন্য একজনের প্রতি, বর্ণনাকারী নাফে’ (রাঃ)-এর তাঁর নাম মনে নেই। তখন হযরত আবূ বকর (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি তো সব সময় আমার বিরধিতাই করে থাকেন?” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনার এটা ভুল ধারণা।" এই ভাবে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয় এবং তাদের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলেনঃ “এরপর হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (রাঃ)-এর সাথে এতো নিম্নস্বরে কথা বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দ্বিতীয়বার তাকে জিজ্ঞেস করতে হতো।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলছিলেনঃ “হযরত কাকা ইবনে মা'বাদ (রাঃ)-কে আমীর নিযুক্ত করুন। আর হযরত উমার (রাঃ) বলছিলেনঃ হযরত আকরা ইবনে হাবিস (রাঃ)-কে আমীর বানানো হোক।” এই মতভেদের কারণে উভয়ের মধ্যে কিছু উচ্চবাচ্য হয় এবং তাঁদের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়। (আরবী) তখন পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটিও ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় ‘সহিহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখন হতে আমি আপনার সাথে এমনভাবে কথা বলবে যেমনভাবে কেউ কানে কানে কথা বলে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মজলিসে কয়েক দিন পর্যন্ত দেখা যায়নি। একটি লোক বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে আমি তার সম্পর্কে খবর দিবো।” অতঃপর লোকটি হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর বাড়ীতে গিয়ে দেখেন যে, তিনি মাথা ঝুঁকানো অবস্থায় বসে আছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আচ্ছা বলুন তো আপনার অবস্থা কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমার অবস্থা খুব খারাপ। আমি নবী (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর নিজের কণ্ঠস্বর উঁচু করতাম। আমার আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে এবং আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি।” লোকটি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন ঐ লোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখ হতে এক অতি বড় সুসংবাদ নিয়ে দ্বিতীয়বার হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর নিকট গমন করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে বলেছিলেন, তুমি সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে বললাঃ “আপনি জাহান্নামী নন, বরং জান্নাতী।" (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন হতে পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়, আর হযরত সাবিত ইবনে কায়েস ইবনে শামাস (রাঃ) ছিলেন উচ্চ কণ্ঠস্বর বিশিষ্ট লোক, সুতরাং তিনি তখন বলেনঃ “আমি আমার কণ্ঠস্বর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর উঁচু করতাম, কাজেই আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি এবং আমার আমল নিষ্ফল হয়ে গেছে। তাই তিনি চিন্তিত অবস্থায় বাড়ীতেই বসে পড়েন এবং নবী (সঃ)-এর মজলিসে উঠাবসা ছেড়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর খোঁজ নিলে কওমের কোন একজন লোক তার কাছে গিয়ে তাকে বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে তার মজলিসে না পেয়ে আপনার খোঁজ নিয়েছেন। তখন তিনি বলেনঃ “আমি আমার কণ্ঠস্বর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর উঁচু করেছি। সুতরাং আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি এবং আমার কর্ম নিষ্ফল হয়ে গেছে।” লোকটি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে এ খবর দেন। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “না, বরং সে জান্নাতী।” হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “অতঃপর আমরা হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-কে জীবিত অবস্থায় চলাফেরা করতে দেখতাম এবং জানতাম যে, তিনি জান্নাতবাসী। অতঃপর ইয়ামামার যুদ্ধে যখন অমরা কিছুটা ভগ্নোৎসাহ হয়ে পড়ি তখন আমরা দেখি যে, হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ) সুগন্ধময় কাফন পরিহিত হয়ে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন এবং বলতে রয়েছেনঃ “হে মুসলিমবৃন্দ! তোমরা তোমাদের পরবর্তীদের জন্যে মন্দ নমুনা ছেড়ে যেয়ো না।” এ কথা বলে তিনি শত্রুদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে যান (আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন)। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)সহীহ মুসলিমে রয়েছে, হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ ইবনে মু'আয (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আবূ আমর (রাঃ)! সাবিত (রাঃ)-এর খবর কি? সে কি অসুস্থ?” হযরত সা'দ (রাঃ) জবাবে বলেনঃ “হযরত সাবিত (রাঃ) আমার প্রতিবেশী। কিন্তু তিনি যে অসুস্থ এটা তো আমার জানা নেই।” অতঃপর হযরত সা’দ হযরত সাবিত (রাঃ)-এর নিকট গমন করে তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথা শুনিয়ে দেন। তখন হযরত সাবিত (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করেছেন, আর আপনারা তো জানেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর আপনাদের সবারই চেয়ে আমার কণ্ঠস্বর বেশী উঁচু। সুতরাং আমি তো জাহান্নামী হয়ে গেছি।” হযরত সা'দ (রাঃ) তখন নবী (সঃ)-কে হযরত সাবিত (রাঃ)-এর একথা শুনিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “না, বরং সে জান্নাতী।"অন্যান্য রিওয়াইয়াতে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নাম উল্লেখ করা হয়নি। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ রিওয়াইয়াতটি মুআল্লাল এবং এটাই সঠিক কথাও বটে। কেননা, হযরত সা'দ (রাঃ) ঐ সময় জীবিতই ছিলেন না। বানু কুরাইযার যুদ্ধের অল্প কিছুদিন পরেই তিনি ইন্তেকাল করেন। আর বানু কুরাইযার যুদ্ধ হয়েছিল হিজরী পঞ্চম সনে এবং এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় বানু তামীম গোত্রের প্রতিনিধির আগমনের সময়। আর ওটা হিজরী নবম সনের ঘটনা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ) রাস্তার উপর বসে পড়েন এবং কাঁদতে শুরু করেন।এমতাবস্থায় বানু আজলান গোত্রের হযরত আসিম ইবনে আদ্দী (রাঃ) তাঁর পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কাঁদছেন কেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ায় আমি ভয় করছি যে, এটা হয়তো আমার ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। কেননা, আমার কণ্ঠস্বর খুব উঁচু।” তাঁর একথা শুনে হযরত আসিম ইবনে আদ্দী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করেন, আর এদিকে হযরত সাবিত (রাঃ) কান্নায় একেবারে ভেঙ্গে পড়েন। তিনি বাড়ী গিয়ে তার স্ত্রী জামীলা বিনতু আবদিল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালকে বলেনঃ “আমি এখন বিছানার ঘরে (অর্থাৎ শয়ন কক্ষে) প্রবেশ করছি। তুমি বাহির হতে দরযা বন্ধ করে পেরেক মেরে দাও। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আমি ঘর হতে বের হবো না। যে পর্যন্ত না আল্লাহ আমার মৃত্যু ঘটাবেন অথবা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। এদিকে তার এই অবস্থা হয়েছে। আর ওদিকে হযরত আসিম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তার খবর দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আসিম (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি তার কাছে গিয়ে তাকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো।" হযরত আসিম (রাঃ) ঐ স্থানে গিয়ে তাঁকে না পেয়ে তার বাড়ী এবং তাঁকে তাঁর শয়নকক্ষে ঐ অবস্থায় পান। তাঁকে তিনি বলেনঃ “চলুন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে ডাকছেন।” তখন তিনি হযরত আসিম (রাঃ)-কে বলেনঃ “পেরেক ভেঙ্গে ফেলুন।” অতঃপর তারা দু'জন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে সাবিত (রাঃ)! তুমি কাঁদছিলে কেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমার কণ্ঠস্বর উচ্চ এবং আমি ভয় করছি যে, এ আয়াতটি আমার ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। তাই আমার কান্না এসেছিল।” রাসললাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ “তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমি প্রশংসিত অবস্থায় জীবন যাপন করবে, শহীদ রূপে মৃত্যুবরণ করবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে?” হযরত সাবিত (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর এই সুসংবাদ পেয়ে আমি খুবই খুশী হয়েছি এবং এর পরে আমি আর কখনো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর আমার কণ্ঠস্বরকে উঁচু করবে না।” তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। এই ঘটনাটি এভাবে কয়েকজন তাবেয়ী হতেও বর্ণিত আছে। মোটকথা, আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সামনে কণ্ঠস্বর উঁচু করতে নিষেধ করেছেন।আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) মসজিদে নববী (সঃ)-এর মধ্যে দুইজন লোককে উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনে তথায় গিয়ে তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা কোথায় রয়েছে তা কি জান?” অতঃপর তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা কোথাকার অধিবাসী?" উত্তরে তারা বললোঃ “আমরা তায়েফের অধিবাসী।” তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “যদি তোমরা মদীনার অধিবাসী হতে তবে আমি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দিতাম।”উলামায়ে কিরামের উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কবরের পার্শ্বেও উচ্চস্বরে কথা বলা মাকরূহ। যেমন তার জীবদ্দশায় তাঁর সামনে উচ্চস্বরে কথা বলা মাকরূহ ছিল। কেননা, তিনি যেমন জীবদ্দশায় সম্মানের পাত্র ছিলেন তেমনি সব সময় তিনি কবরেও সম্মানের পাত্র হিসেবেই থাকবেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলে থাকো, নবী (সঃ)-এর সাথে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো না, বরং তার সাথে অতি সম্মান ও আদবের সাথে কথা বলতে হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (হে মুসলমানগণ!) তোমরা রাসূল (সঃ)-কে এমনভাবে ডাকবে না। যেমনভাবে তোমরা একে অপরকে ডেকে থাকো।''(২৪:৬৩)এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমাদেরকে নবী (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কণ্ঠস্বরকে উঁচু করতে নিষেধ করার কারণ এই যে, হয়তো এর কারণে কোন সময় নবী (সঃ) তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন এবং এর ফলে তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে। যেমন সহীহ হাদীসে আছে যে, মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কোন কথা মুখেই উচ্চারণ করে যা তার। কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু ওটা আল্লাহ তা'আলার নিকট এতই পছন্দনীয় হয় যে, এ কারণে তিনি তাকে জান্নাতবাসী করে দেন। পক্ষান্তরে মানুষ আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে যা তার কাছে তেমন খারাপ কথা নয়, কিন্তু ওরই কারণে আল্লাহ তাকে জাহান্নামী করে দেন এবং তাকে জাহান্নামের এতো নিম্নস্তরে নামিয়ে দেন যে, ঐ গর্তটি আসমান ও যমীন হতেও গভীরতম। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্বর নীচু করার প্রতি উৎসাহিত করতে গিয়ে বলেনঃ যারা রাসূল (সঃ)-এর সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্যে পরিশোধিত করেছেন। তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। ইমাম আহমাদ (রঃ) কিতাবুয যুহদের মধ্যে একটি রিওয়াইয়াত বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট লিখিতভাবে ফতওয়া জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! এক ঐ ব্যক্তি যার অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপের প্রবৃত্তি ও বাসনাই নেই এবং সে কোন অবাধ্যতামূলক কার্য করেও না এবং আর এক ব্যক্তি, যার অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপের প্রবৃত্তি ও বাসনা রয়েছে, কিন্তু এসব অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপ হতে সে দূরে থাকে, এদের দু'জনের মধ্যে কে বেশী উত্তম?" উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “যার অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপের প্রবৃত্তি রয়েছে, তথাপি সে এসব কার্যকলাপ হতে বেঁচে থাকে সেই বেশী উত্তম। এ ধরনের লোক সম্পর্কেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্যে পরিশোধিত করেছেন। তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।"

আল-হুজুরাত 49:2

১-৩ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতসমূহে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে তাঁর নবী। (সঃ)-এর ব্যাপারে আদব শিক্ষা দিচ্ছেন যে, নবী (সঃ)-এর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখা তাদের একান্ত কর্তব্য। সমস্ত কাজ-কর্মে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পিছনে থাকা তাদের উচিত। তাদের উচিত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করা।রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হযরত মু'আয (রাঃ)-কে ইয়ামনে প্রেরণ করেন তখন তাঁকে প্রশ্ন করেনঃ “তুমি কিসের মাধ্যমে ফায়সালা করবে?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কিতাবের মাধ্যমে। আবার তিনি প্রশ্ন করেনঃ “যদি আল্লাহর কিতাবে পাও?" জবাবে তিনি বলেনঃ “তাহলে সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর মাধ্যমে ফায়সালা করবে।” পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “যদি তাতেও না পাও?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “তাহলে আমি চিন্তা-গবেষণা করবে এবং ওরই মাধ্যমে ফায়সালা করবে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার বুকে হাত মেরে বললেনঃ “আল্লাহর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দূতকে এমন বিষয়ের তাওফীক দিয়েছেন যাতে তাঁর রাসূল (সঃ) সন্তুষ্ট। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এখানে এ হাদীসটি আনয়নের উদ্দেশ্য আমাদের এই যে, হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ইজতিহাদকে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলিল্লাহ (সঃ)-এর পরে স্থান দিয়েছেন। সুতরাং স্বীয় মতকে কিতাব ও সুন্নাতের আগে স্থান দেয়াই হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আগে বেড়ে যাওয়া।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, একথার ভাবার্থ হচ্ছেঃ “কিতাব ও সুন্নাতের বিপরীত কথা তোমরা বলো না।' হযরত আওফী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথার উপর কথা বলো না।' হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ “কোন বিষয় সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে পর্যন্ত কোন কিছু না বলেন সেই পর্যন্ত তোমরাও কিছুই বলে না, বরং নীরবতা অবলম্বন করো।' হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘আমরে দ্বীন ও আহকামে শরয়ীর ব্যাপারে তোমরা আল্লাহর কালাম ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর হাদীস ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা ফায়সালা করো না।' হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ “তোমরা কোন কথায় ও কাজে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অগ্রণী হয়ো না।' হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ “তোমরা ইমামের পূর্বে দু'আ করো না।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর’ অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম প্রতিপালনের ব্যাপারে মনে আল্লাহর ভয় রাখো। ‘আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ, অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের কথা শুনে থাকেন এবং তোমাদের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের খবর তিনি রাখেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে আর একটি আদব বা দ্রতা শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তারা যেন নবী (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু না করে। এ আয়াতটি হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত আবূ মুলাইকা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, দুই মহান ব্যক্তি অর্থাৎ হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) যেন প্রায় ধ্বংসই হয়ে যাবেন, যেহেতু তাঁরা নবী (সঃ)-এর সামনে তাঁদের কণ্ঠস্বর উঁচু করেছিলেন যখন বানী তামীম গোত্রের প্রতিনিধি হাযির হয়েছিলেন। তাদের একজন হযরত হাবিস ইবনে আকরার (রাঃ) প্রতি ইঙ্গিত করেন এবং অপরজন ইঙ্গিত করেন অন্য একজনের প্রতি, বর্ণনাকারী নাফে’ (রাঃ)-এর তাঁর নাম মনে নেই। তখন হযরত আবূ বকর (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি তো সব সময় আমার বিরধিতাই করে থাকেন?” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনার এটা ভুল ধারণা।" এই ভাবে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয় এবং তাদের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলেনঃ “এরপর হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (রাঃ)-এর সাথে এতো নিম্নস্বরে কথা বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দ্বিতীয়বার তাকে জিজ্ঞেস করতে হতো।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলছিলেনঃ “হযরত কাকা ইবনে মা'বাদ (রাঃ)-কে আমীর নিযুক্ত করুন। আর হযরত উমার (রাঃ) বলছিলেনঃ হযরত আকরা ইবনে হাবিস (রাঃ)-কে আমীর বানানো হোক।” এই মতভেদের কারণে উভয়ের মধ্যে কিছু উচ্চবাচ্য হয় এবং তাঁদের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়। (আরবী) তখন পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটিও ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় ‘সহিহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখন হতে আমি আপনার সাথে এমনভাবে কথা বলবে যেমনভাবে কেউ কানে কানে কথা বলে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মজলিসে কয়েক দিন পর্যন্ত দেখা যায়নি। একটি লোক বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে আমি তার সম্পর্কে খবর দিবো।” অতঃপর লোকটি হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর বাড়ীতে গিয়ে দেখেন যে, তিনি মাথা ঝুঁকানো অবস্থায় বসে আছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আচ্ছা বলুন তো আপনার অবস্থা কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমার অবস্থা খুব খারাপ। আমি নবী (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর নিজের কণ্ঠস্বর উঁচু করতাম। আমার আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে এবং আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি।” লোকটি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন ঐ লোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখ হতে এক অতি বড় সুসংবাদ নিয়ে দ্বিতীয়বার হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর নিকট গমন করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে বলেছিলেন, তুমি সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে বললাঃ “আপনি জাহান্নামী নন, বরং জান্নাতী।" (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন হতে পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়, আর হযরত সাবিত ইবনে কায়েস ইবনে শামাস (রাঃ) ছিলেন উচ্চ কণ্ঠস্বর বিশিষ্ট লোক, সুতরাং তিনি তখন বলেনঃ “আমি আমার কণ্ঠস্বর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর উঁচু করতাম, কাজেই আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি এবং আমার আমল নিষ্ফল হয়ে গেছে। তাই তিনি চিন্তিত অবস্থায় বাড়ীতেই বসে পড়েন এবং নবী (সঃ)-এর মজলিসে উঠাবসা ছেড়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর খোঁজ নিলে কওমের কোন একজন লোক তার কাছে গিয়ে তাকে বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে তার মজলিসে না পেয়ে আপনার খোঁজ নিয়েছেন। তখন তিনি বলেনঃ “আমি আমার কণ্ঠস্বর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর উঁচু করেছি। সুতরাং আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি এবং আমার কর্ম নিষ্ফল হয়ে গেছে।” লোকটি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে এ খবর দেন। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “না, বরং সে জান্নাতী।” হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “অতঃপর আমরা হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-কে জীবিত অবস্থায় চলাফেরা করতে দেখতাম এবং জানতাম যে, তিনি জান্নাতবাসী। অতঃপর ইয়ামামার যুদ্ধে যখন অমরা কিছুটা ভগ্নোৎসাহ হয়ে পড়ি তখন আমরা দেখি যে, হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ) সুগন্ধময় কাফন পরিহিত হয়ে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন এবং বলতে রয়েছেনঃ “হে মুসলিমবৃন্দ! তোমরা তোমাদের পরবর্তীদের জন্যে মন্দ নমুনা ছেড়ে যেয়ো না।” এ কথা বলে তিনি শত্রুদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে যান (আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন)। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)সহীহ মুসলিমে রয়েছে, হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ ইবনে মু'আয (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আবূ আমর (রাঃ)! সাবিত (রাঃ)-এর খবর কি? সে কি অসুস্থ?” হযরত সা'দ (রাঃ) জবাবে বলেনঃ “হযরত সাবিত (রাঃ) আমার প্রতিবেশী। কিন্তু তিনি যে অসুস্থ এটা তো আমার জানা নেই।” অতঃপর হযরত সা’দ হযরত সাবিত (রাঃ)-এর নিকট গমন করে তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথা শুনিয়ে দেন। তখন হযরত সাবিত (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করেছেন, আর আপনারা তো জানেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর আপনাদের সবারই চেয়ে আমার কণ্ঠস্বর বেশী উঁচু। সুতরাং আমি তো জাহান্নামী হয়ে গেছি।” হযরত সা'দ (রাঃ) তখন নবী (সঃ)-কে হযরত সাবিত (রাঃ)-এর একথা শুনিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “না, বরং সে জান্নাতী।"অন্যান্য রিওয়াইয়াতে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নাম উল্লেখ করা হয়নি। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ রিওয়াইয়াতটি মুআল্লাল এবং এটাই সঠিক কথাও বটে। কেননা, হযরত সা'দ (রাঃ) ঐ সময় জীবিতই ছিলেন না। বানু কুরাইযার যুদ্ধের অল্প কিছুদিন পরেই তিনি ইন্তেকাল করেন। আর বানু কুরাইযার যুদ্ধ হয়েছিল হিজরী পঞ্চম সনে এবং এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় বানু তামীম গোত্রের প্রতিনিধির আগমনের সময়। আর ওটা হিজরী নবম সনের ঘটনা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ) রাস্তার উপর বসে পড়েন এবং কাঁদতে শুরু করেন।এমতাবস্থায় বানু আজলান গোত্রের হযরত আসিম ইবনে আদ্দী (রাঃ) তাঁর পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কাঁদছেন কেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ায় আমি ভয় করছি যে, এটা হয়তো আমার ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। কেননা, আমার কণ্ঠস্বর খুব উঁচু।” তাঁর একথা শুনে হযরত আসিম ইবনে আদ্দী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করেন, আর এদিকে হযরত সাবিত (রাঃ) কান্নায় একেবারে ভেঙ্গে পড়েন। তিনি বাড়ী গিয়ে তার স্ত্রী জামীলা বিনতু আবদিল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালকে বলেনঃ “আমি এখন বিছানার ঘরে (অর্থাৎ শয়ন কক্ষে) প্রবেশ করছি। তুমি বাহির হতে দরযা বন্ধ করে পেরেক মেরে দাও। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আমি ঘর হতে বের হবো না। যে পর্যন্ত না আল্লাহ আমার মৃত্যু ঘটাবেন অথবা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। এদিকে তার এই অবস্থা হয়েছে। আর ওদিকে হযরত আসিম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তার খবর দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আসিম (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি তার কাছে গিয়ে তাকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো।" হযরত আসিম (রাঃ) ঐ স্থানে গিয়ে তাঁকে না পেয়ে তার বাড়ী এবং তাঁকে তাঁর শয়নকক্ষে ঐ অবস্থায় পান। তাঁকে তিনি বলেনঃ “চলুন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে ডাকছেন।” তখন তিনি হযরত আসিম (রাঃ)-কে বলেনঃ “পেরেক ভেঙ্গে ফেলুন।” অতঃপর তারা দু'জন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে সাবিত (রাঃ)! তুমি কাঁদছিলে কেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমার কণ্ঠস্বর উচ্চ এবং আমি ভয় করছি যে, এ আয়াতটি আমার ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। তাই আমার কান্না এসেছিল।” রাসললাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ “তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমি প্রশংসিত অবস্থায় জীবন যাপন করবে, শহীদ রূপে মৃত্যুবরণ করবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে?” হযরত সাবিত (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর এই সুসংবাদ পেয়ে আমি খুবই খুশী হয়েছি এবং এর পরে আমি আর কখনো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর আমার কণ্ঠস্বরকে উঁচু করবে না।” তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। এই ঘটনাটি এভাবে কয়েকজন তাবেয়ী হতেও বর্ণিত আছে। মোটকথা, আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সামনে কণ্ঠস্বর উঁচু করতে নিষেধ করেছেন।আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) মসজিদে নববী (সঃ)-এর মধ্যে দুইজন লোককে উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনে তথায় গিয়ে তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা কোথায় রয়েছে তা কি জান?” অতঃপর তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা কোথাকার অধিবাসী?" উত্তরে তারা বললোঃ “আমরা তায়েফের অধিবাসী।” তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “যদি তোমরা মদীনার অধিবাসী হতে তবে আমি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দিতাম।”উলামায়ে কিরামের উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কবরের পার্শ্বেও উচ্চস্বরে কথা বলা মাকরূহ। যেমন তার জীবদ্দশায় তাঁর সামনে উচ্চস্বরে কথা বলা মাকরূহ ছিল। কেননা, তিনি যেমন জীবদ্দশায় সম্মানের পাত্র ছিলেন তেমনি সব সময় তিনি কবরেও সম্মানের পাত্র হিসেবেই থাকবেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলে থাকো, নবী (সঃ)-এর সাথে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো না, বরং তার সাথে অতি সম্মান ও আদবের সাথে কথা বলতে হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (হে মুসলমানগণ!) তোমরা রাসূল (সঃ)-কে এমনভাবে ডাকবে না। যেমনভাবে তোমরা একে অপরকে ডেকে থাকো।''(২৪:৬৩)এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমাদেরকে নবী (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কণ্ঠস্বরকে উঁচু করতে নিষেধ করার কারণ এই যে, হয়তো এর কারণে কোন সময় নবী (সঃ) তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন এবং এর ফলে তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে। যেমন সহীহ হাদীসে আছে যে, মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কোন কথা মুখেই উচ্চারণ করে যা তার। কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু ওটা আল্লাহ তা'আলার নিকট এতই পছন্দনীয় হয় যে, এ কারণে তিনি তাকে জান্নাতবাসী করে দেন। পক্ষান্তরে মানুষ আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে যা তার কাছে তেমন খারাপ কথা নয়, কিন্তু ওরই কারণে আল্লাহ তাকে জাহান্নামী করে দেন এবং তাকে জাহান্নামের এতো নিম্নস্তরে নামিয়ে দেন যে, ঐ গর্তটি আসমান ও যমীন হতেও গভীরতম। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্বর নীচু করার প্রতি উৎসাহিত করতে গিয়ে বলেনঃ যারা রাসূল (সঃ)-এর সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্যে পরিশোধিত করেছেন। তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। ইমাম আহমাদ (রঃ) কিতাবুয যুহদের মধ্যে একটি রিওয়াইয়াত বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট লিখিতভাবে ফতওয়া জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! এক ঐ ব্যক্তি যার অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপের প্রবৃত্তি ও বাসনাই নেই এবং সে কোন অবাধ্যতামূলক কার্য করেও না এবং আর এক ব্যক্তি, যার অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপের প্রবৃত্তি ও বাসনা রয়েছে, কিন্তু এসব অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপ হতে সে দূরে থাকে, এদের দু'জনের মধ্যে কে বেশী উত্তম?" উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “যার অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপের প্রবৃত্তি রয়েছে, তথাপি সে এসব কার্যকলাপ হতে বেঁচে থাকে সেই বেশী উত্তম। এ ধরনের লোক সম্পর্কেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্যে পরিশোধিত করেছেন। তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।"

আল-হুজুরাত 49:3

১-৩ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতসমূহে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে তাঁর নবী। (সঃ)-এর ব্যাপারে আদব শিক্ষা দিচ্ছেন যে, নবী (সঃ)-এর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখা তাদের একান্ত কর্তব্য। সমস্ত কাজ-কর্মে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পিছনে থাকা তাদের উচিত। তাদের উচিত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করা।রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন হযরত মু'আয (রাঃ)-কে ইয়ামনে প্রেরণ করেন তখন তাঁকে প্রশ্ন করেনঃ “তুমি কিসের মাধ্যমে ফায়সালা করবে?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কিতাবের মাধ্যমে। আবার তিনি প্রশ্ন করেনঃ “যদি আল্লাহর কিতাবে পাও?" জবাবে তিনি বলেনঃ “তাহলে সুন্নাতে রাসূল (সঃ)-এর মাধ্যমে ফায়সালা করবে।” পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “যদি তাতেও না পাও?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “তাহলে আমি চিন্তা-গবেষণা করবে এবং ওরই মাধ্যমে ফায়সালা করবে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার বুকে হাত মেরে বললেনঃ “আল্লাহর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যিনি তাঁর রাসূল (সঃ)-এর দূতকে এমন বিষয়ের তাওফীক দিয়েছেন যাতে তাঁর রাসূল (সঃ) সন্তুষ্ট। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এখানে এ হাদীসটি আনয়নের উদ্দেশ্য আমাদের এই যে, হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ইজতিহাদকে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলিল্লাহ (সঃ)-এর পরে স্থান দিয়েছেন। সুতরাং স্বীয় মতকে কিতাব ও সুন্নাতের আগে স্থান দেয়াই হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আগে বেড়ে যাওয়া।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, একথার ভাবার্থ হচ্ছেঃ “কিতাব ও সুন্নাতের বিপরীত কথা তোমরা বলো না।' হযরত আওফী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথার উপর কথা বলো না।' হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ “কোন বিষয় সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে পর্যন্ত কোন কিছু না বলেন সেই পর্যন্ত তোমরাও কিছুই বলে না, বরং নীরবতা অবলম্বন করো।' হযরত যহহাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘আমরে দ্বীন ও আহকামে শরয়ীর ব্যাপারে তোমরা আল্লাহর কালাম ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর হাদীস ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা ফায়সালা করো না।' হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ “তোমরা কোন কথায় ও কাজে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অগ্রণী হয়ো না।' হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ “তোমরা ইমামের পূর্বে দু'আ করো না।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর’ অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম প্রতিপালনের ব্যাপারে মনে আল্লাহর ভয় রাখো। ‘আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ, অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের কথা শুনে থাকেন এবং তোমাদের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের খবর তিনি রাখেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে আর একটি আদব বা দ্রতা শিক্ষা দিচ্ছেন যে, তারা যেন নবী (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু না করে। এ আয়াতটি হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত আবূ মুলাইকা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, দুই মহান ব্যক্তি অর্থাৎ হযরত আবূ বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ) যেন প্রায় ধ্বংসই হয়ে যাবেন, যেহেতু তাঁরা নবী (সঃ)-এর সামনে তাঁদের কণ্ঠস্বর উঁচু করেছিলেন যখন বানী তামীম গোত্রের প্রতিনিধি হাযির হয়েছিলেন। তাদের একজন হযরত হাবিস ইবনে আকরার (রাঃ) প্রতি ইঙ্গিত করেন এবং অপরজন ইঙ্গিত করেন অন্য একজনের প্রতি, বর্ণনাকারী নাফে’ (রাঃ)-এর তাঁর নাম মনে নেই। তখন হযরত আবূ বকর (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি তো সব সময় আমার বিরধিতাই করে থাকেন?” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনার এটা ভুল ধারণা।" এই ভাবে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয় এবং তাদের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলেনঃ “এরপর হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (রাঃ)-এর সাথে এতো নিম্নস্বরে কথা বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দ্বিতীয়বার তাকে জিজ্ঞেস করতে হতো।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলছিলেনঃ “হযরত কাকা ইবনে মা'বাদ (রাঃ)-কে আমীর নিযুক্ত করুন। আর হযরত উমার (রাঃ) বলছিলেনঃ হযরত আকরা ইবনে হাবিস (রাঃ)-কে আমীর বানানো হোক।” এই মতভেদের কারণে উভয়ের মধ্যে কিছু উচ্চবাচ্য হয় এবং তাঁদের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়। (আরবী) তখন পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটিও ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় ‘সহিহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এখন হতে আমি আপনার সাথে এমনভাবে কথা বলবে যেমনভাবে কেউ কানে কানে কথা বলে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মজলিসে কয়েক দিন পর্যন্ত দেখা যায়নি। একটি লোক বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে আমি তার সম্পর্কে খবর দিবো।” অতঃপর লোকটি হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর বাড়ীতে গিয়ে দেখেন যে, তিনি মাথা ঝুঁকানো অবস্থায় বসে আছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আচ্ছা বলুন তো আপনার অবস্থা কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমার অবস্থা খুব খারাপ। আমি নবী (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর নিজের কণ্ঠস্বর উঁচু করতাম। আমার আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে এবং আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি।” লোকটি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন ঐ লোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখ হতে এক অতি বড় সুসংবাদ নিয়ে দ্বিতীয়বার হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর নিকট গমন করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে বলেছিলেন, তুমি সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে বললাঃ “আপনি জাহান্নামী নন, বরং জান্নাতী।" (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন হতে পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়, আর হযরত সাবিত ইবনে কায়েস ইবনে শামাস (রাঃ) ছিলেন উচ্চ কণ্ঠস্বর বিশিষ্ট লোক, সুতরাং তিনি তখন বলেনঃ “আমি আমার কণ্ঠস্বর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর উঁচু করতাম, কাজেই আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি এবং আমার আমল নিষ্ফল হয়ে গেছে। তাই তিনি চিন্তিত অবস্থায় বাড়ীতেই বসে পড়েন এবং নবী (সঃ)-এর মজলিসে উঠাবসা ছেড়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর খোঁজ নিলে কওমের কোন একজন লোক তার কাছে গিয়ে তাকে বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে তার মজলিসে না পেয়ে আপনার খোঁজ নিয়েছেন। তখন তিনি বলেনঃ “আমি আমার কণ্ঠস্বর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর উঁচু করেছি। সুতরাং আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি এবং আমার কর্ম নিষ্ফল হয়ে গেছে।” লোকটি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে এ খবর দেন। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ “না, বরং সে জান্নাতী।” হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “অতঃপর আমরা হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ)-কে জীবিত অবস্থায় চলাফেরা করতে দেখতাম এবং জানতাম যে, তিনি জান্নাতবাসী। অতঃপর ইয়ামামার যুদ্ধে যখন অমরা কিছুটা ভগ্নোৎসাহ হয়ে পড়ি তখন আমরা দেখি যে, হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ) সুগন্ধময় কাফন পরিহিত হয়ে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন এবং বলতে রয়েছেনঃ “হে মুসলিমবৃন্দ! তোমরা তোমাদের পরবর্তীদের জন্যে মন্দ নমুনা ছেড়ে যেয়ো না।” এ কথা বলে তিনি শত্রুদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে যান (আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন)। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)সহীহ মুসলিমে রয়েছে, হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সা'দ ইবনে মু'আয (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আবূ আমর (রাঃ)! সাবিত (রাঃ)-এর খবর কি? সে কি অসুস্থ?” হযরত সা'দ (রাঃ) জবাবে বলেনঃ “হযরত সাবিত (রাঃ) আমার প্রতিবেশী। কিন্তু তিনি যে অসুস্থ এটা তো আমার জানা নেই।” অতঃপর হযরত সা’দ হযরত সাবিত (রাঃ)-এর নিকট গমন করে তাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথা শুনিয়ে দেন। তখন হযরত সাবিত (রাঃ) তাঁকে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করেছেন, আর আপনারা তো জানেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর আপনাদের সবারই চেয়ে আমার কণ্ঠস্বর বেশী উঁচু। সুতরাং আমি তো জাহান্নামী হয়ে গেছি।” হযরত সা'দ (রাঃ) তখন নবী (সঃ)-কে হযরত সাবিত (রাঃ)-এর একথা শুনিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “না, বরং সে জান্নাতী।"অন্যান্য রিওয়াইয়াতে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নাম উল্লেখ করা হয়নি। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এ রিওয়াইয়াতটি মুআল্লাল এবং এটাই সঠিক কথাও বটে। কেননা, হযরত সা'দ (রাঃ) ঐ সময় জীবিতই ছিলেন না। বানু কুরাইযার যুদ্ধের অল্প কিছুদিন পরেই তিনি ইন্তেকাল করেন। আর বানু কুরাইযার যুদ্ধ হয়েছিল হিজরী পঞ্চম সনে এবং এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় বানু তামীম গোত্রের প্রতিনিধির আগমনের সময়। আর ওটা হিজরী নবম সনের ঘটনা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন হযরত সাবিত ইবনে কায়েস (রাঃ) রাস্তার উপর বসে পড়েন এবং কাঁদতে শুরু করেন।এমতাবস্থায় বানু আজলান গোত্রের হযরত আসিম ইবনে আদ্দী (রাঃ) তাঁর পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কাঁদছেন কেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ায় আমি ভয় করছি যে, এটা হয়তো আমার ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। কেননা, আমার কণ্ঠস্বর খুব উঁচু।” তাঁর একথা শুনে হযরত আসিম ইবনে আদ্দী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করেন, আর এদিকে হযরত সাবিত (রাঃ) কান্নায় একেবারে ভেঙ্গে পড়েন। তিনি বাড়ী গিয়ে তার স্ত্রী জামীলা বিনতু আবদিল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালকে বলেনঃ “আমি এখন বিছানার ঘরে (অর্থাৎ শয়ন কক্ষে) প্রবেশ করছি। তুমি বাহির হতে দরযা বন্ধ করে পেরেক মেরে দাও। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আমি ঘর হতে বের হবো না। যে পর্যন্ত না আল্লাহ আমার মৃত্যু ঘটাবেন অথবা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। এদিকে তার এই অবস্থা হয়েছে। আর ওদিকে হযরত আসিম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তার খবর দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আসিম (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি তার কাছে গিয়ে তাকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো।" হযরত আসিম (রাঃ) ঐ স্থানে গিয়ে তাঁকে না পেয়ে তার বাড়ী এবং তাঁকে তাঁর শয়নকক্ষে ঐ অবস্থায় পান। তাঁকে তিনি বলেনঃ “চলুন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আপনাকে ডাকছেন।” তখন তিনি হযরত আসিম (রাঃ)-কে বলেনঃ “পেরেক ভেঙ্গে ফেলুন।” অতঃপর তারা দু'জন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে সাবিত (রাঃ)! তুমি কাঁদছিলে কেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমার কণ্ঠস্বর উচ্চ এবং আমি ভয় করছি যে, এ আয়াতটি আমার ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। তাই আমার কান্না এসেছিল।” রাসললাহ (সঃ) তখন তাকে বলেনঃ “তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমি প্রশংসিত অবস্থায় জীবন যাপন করবে, শহীদ রূপে মৃত্যুবরণ করবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে?” হযরত সাবিত (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর এই সুসংবাদ পেয়ে আমি খুবই খুশী হয়েছি এবং এর পরে আমি আর কখনো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর আমার কণ্ঠস্বরকে উঁচু করবে না।” তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। এই ঘটনাটি এভাবে কয়েকজন তাবেয়ী হতেও বর্ণিত আছে। মোটকথা, আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সামনে কণ্ঠস্বর উঁচু করতে নিষেধ করেছেন।আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) মসজিদে নববী (সঃ)-এর মধ্যে দুইজন লোককে উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনে তথায় গিয়ে তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা কোথায় রয়েছে তা কি জান?” অতঃপর তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমরা কোথাকার অধিবাসী?" উত্তরে তারা বললোঃ “আমরা তায়েফের অধিবাসী।” তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “যদি তোমরা মদীনার অধিবাসী হতে তবে আমি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দিতাম।”উলামায়ে কিরামের উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কবরের পার্শ্বেও উচ্চস্বরে কথা বলা মাকরূহ। যেমন তার জীবদ্দশায় তাঁর সামনে উচ্চস্বরে কথা বলা মাকরূহ ছিল। কেননা, তিনি যেমন জীবদ্দশায় সম্মানের পাত্র ছিলেন তেমনি সব সময় তিনি কবরেও সম্মানের পাত্র হিসেবেই থাকবেন।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলে থাকো, নবী (সঃ)-এর সাথে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো না, বরং তার সাথে অতি সম্মান ও আদবের সাথে কথা বলতে হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (হে মুসলমানগণ!) তোমরা রাসূল (সঃ)-কে এমনভাবে ডাকবে না। যেমনভাবে তোমরা একে অপরকে ডেকে থাকো।''(২৪:৬৩)এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমাদেরকে নবী (সঃ)-এর কণ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কণ্ঠস্বরকে উঁচু করতে নিষেধ করার কারণ এই যে, হয়তো এর কারণে কোন সময় নবী (সঃ) তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন এবং এর ফলে তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে। যেমন সহীহ হাদীসে আছে যে, মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কোন কথা মুখেই উচ্চারণ করে যা তার। কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু ওটা আল্লাহ তা'আলার নিকট এতই পছন্দনীয় হয় যে, এ কারণে তিনি তাকে জান্নাতবাসী করে দেন। পক্ষান্তরে মানুষ আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে যা তার কাছে তেমন খারাপ কথা নয়, কিন্তু ওরই কারণে আল্লাহ তাকে জাহান্নামী করে দেন এবং তাকে জাহান্নামের এতো নিম্নস্তরে নামিয়ে দেন যে, ঐ গর্তটি আসমান ও যমীন হতেও গভীরতম। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্বর নীচু করার প্রতি উৎসাহিত করতে গিয়ে বলেনঃ যারা রাসূল (সঃ)-এর সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্যে পরিশোধিত করেছেন। তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। ইমাম আহমাদ (রঃ) কিতাবুয যুহদের মধ্যে একটি রিওয়াইয়াত বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট লিখিতভাবে ফতওয়া জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! এক ঐ ব্যক্তি যার অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপের প্রবৃত্তি ও বাসনাই নেই এবং সে কোন অবাধ্যতামূলক কার্য করেও না এবং আর এক ব্যক্তি, যার অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপের প্রবৃত্তি ও বাসনা রয়েছে, কিন্তু এসব অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপ হতে সে দূরে থাকে, এদের দু'জনের মধ্যে কে বেশী উত্তম?" উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “যার অবাধ্যতামূলক কার্যকলাপের প্রবৃত্তি রয়েছে, তথাপি সে এসব কার্যকলাপ হতে বেঁচে থাকে সেই বেশী উত্তম। এ ধরনের লোক সম্পর্কেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্যে পরিশোধিত করেছেন। তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।"

আল-হুজুরাত 49:4

৪-৫ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকগুলোর নিন্দে করছেন যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তার বাড়ীর পিছন হতে ডাকতো, যেমন এটা আরববাসীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। তাই আল্লাহ পাক বলেন যে, তাদের অধিকাংশই নির্বোধ।অতঃপর এই ব্যাপারে আদব বা দ্রতা শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বের হয়ে তাদের নিকট আসা পর্যন্ত তারা যদি ধৈর্য ধারণ করতে তবে ওটাই তাদের জন্যে উত্তম হতো।' অর্থাৎ তাদের উচিত ছিল যে, তারা নবী (সঃ)-এর অপেক্ষায় থাকতো এবং যখন তিনি বাড়ী হতে বের হতেন তখন তাকে যা বলার ছিল তাই তারা বলতো এবং বাহির হতে তাঁকে ডাক দেয়া তাদের জন্যে মোটেই উচিত ছিল না। এরূপভাবে বাহির হতে তাঁকে ডাক না দিলে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ তারা লাভ করতো। অতঃপর মহান আল্লাহ যেন হুকুম দিচ্ছেন যে, এরূপ লোকদের উচিত আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। কেননা, তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। এ আয়াতটি হযরত আকরা ইবনে হাবিস (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হে মুহাম্মাদ (সঃ), হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এভাবে নাম ধরে ডাক দেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন জবাব দিলেন না। তখন সে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার প্রশংসা করা শ্রেষ্ঠত্নের কারণ। এবং আমার নিন্দা করা লাঞ্ছনার কারণ।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “এরূপ। সত্তা তো হলেন একমাত্র মহামহিমান্বিত আল্লাহ।” হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হযরত হাবীব ইবনে আবি উমরা (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, একদা বিশর ইবনে গালিব এবং লাবীদ ইবনে আতারিদ হাজ্জাজের সামনে বসেছিলেন। বিশর ইবনে গালিব লাবীদ ইবনে আতারিদকে বললেনঃ “তোমার কওম বানু তামীমের ব্যাপারে (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে।” যখন হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ)-এর সামনে এটা বর্ণনা করা হলো তখন তিনি বললেনঃ সে যদি আলেম হতো তবে এ সূরার (আরবী)-এই আয়াত পাঠ করে জবাব। দিতো। তারা বলেছিলঃ “আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি, সুতরাং বানু আসাদ গোত্র আপনার সাথে যুদ্ধ করবে না।”হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ কতকগুলো আরব বেদুঈন একত্রিত হয় এবং তারা বলেঃ “চলো, আমরা এ লোকটির (নবী সঃ)-এর কাছে যাই। যদি তিনি নবী হন তাহলে তাঁর নিকট হতে সৌভাগ্য লাভ করার ব্যাপারে আমরাই বড় হকদার। আর যদি তিনি বাদশাহ হন তবে আমরা তার ডানার নীচে পড়ে থাকবো।” আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ খবর দিলাম। ইতিমধ্যে তারা এসে পড়লো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তার ঘরের পিছন হতে হে মুহাম্মাদ (সঃ)! হে মুহাম্মাদ (সঃ)! বলে ডাকতে লাগলো। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন আমার কান ধরে বললেনঃ “হে যায়েদ (রাঃ)! আল্লাহ তোমার কথা সত্যরূপে দেখিয়েছেন। হে যায়েদ (রাঃ)! অবশ্যই আল্লাহ তোমার কথা সত্যরূপে দেখিয়েছেন।”

আল-হুজুরাত 49:5

৪-৫ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকগুলোর নিন্দে করছেন যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তার বাড়ীর পিছন হতে ডাকতো, যেমন এটা আরববাসীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। তাই আল্লাহ পাক বলেন যে, তাদের অধিকাংশই নির্বোধ।অতঃপর এই ব্যাপারে আদব বা দ্রতা শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি বের হয়ে তাদের নিকট আসা পর্যন্ত তারা যদি ধৈর্য ধারণ করতে তবে ওটাই তাদের জন্যে উত্তম হতো।' অর্থাৎ তাদের উচিত ছিল যে, তারা নবী (সঃ)-এর অপেক্ষায় থাকতো এবং যখন তিনি বাড়ী হতে বের হতেন তখন তাকে যা বলার ছিল তাই তারা বলতো এবং বাহির হতে তাঁকে ডাক দেয়া তাদের জন্যে মোটেই উচিত ছিল না। এরূপভাবে বাহির হতে তাঁকে ডাক না দিলে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ তারা লাভ করতো। অতঃপর মহান আল্লাহ যেন হুকুম দিচ্ছেন যে, এরূপ লোকদের উচিত আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। কেননা, তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। এ আয়াতটি হযরত আকরা ইবনে হাবিস (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হে মুহাম্মাদ (সঃ), হে মুহাম্মাদ (সঃ)! এভাবে নাম ধরে ডাক দেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন জবাব দিলেন না। তখন সে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার প্রশংসা করা শ্রেষ্ঠত্নের কারণ। এবং আমার নিন্দা করা লাঞ্ছনার কারণ।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “এরূপ। সত্তা তো হলেন একমাত্র মহামহিমান্বিত আল্লাহ।” হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) হযরত হাবীব ইবনে আবি উমরা (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, একদা বিশর ইবনে গালিব এবং লাবীদ ইবনে আতারিদ হাজ্জাজের সামনে বসেছিলেন। বিশর ইবনে গালিব লাবীদ ইবনে আতারিদকে বললেনঃ “তোমার কওম বানু তামীমের ব্যাপারে (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে।” যখন হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ)-এর সামনে এটা বর্ণনা করা হলো তখন তিনি বললেনঃ সে যদি আলেম হতো তবে এ সূরার (আরবী)-এই আয়াত পাঠ করে জবাব। দিতো। তারা বলেছিলঃ “আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি, সুতরাং বানু আসাদ গোত্র আপনার সাথে যুদ্ধ করবে না।”হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ কতকগুলো আরব বেদুঈন একত্রিত হয় এবং তারা বলেঃ “চলো, আমরা এ লোকটির (নবী সঃ)-এর কাছে যাই। যদি তিনি নবী হন তাহলে তাঁর নিকট হতে সৌভাগ্য লাভ করার ব্যাপারে আমরাই বড় হকদার। আর যদি তিনি বাদশাহ হন তবে আমরা তার ডানার নীচে পড়ে থাকবো।” আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ খবর দিলাম। ইতিমধ্যে তারা এসে পড়লো এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তার ঘরের পিছন হতে হে মুহাম্মাদ (সঃ)! হে মুহাম্মাদ (সঃ)! বলে ডাকতে লাগলো। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন আমার কান ধরে বললেনঃ “হে যায়েদ (রাঃ)! আল্লাহ তোমার কথা সত্যরূপে দেখিয়েছেন। হে যায়েদ (রাঃ)! অবশ্যই আল্লাহ তোমার কথা সত্যরূপে দেখিয়েছেন।”

আল-হুজুরাত 49:6

৬-৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন পাপাচারীর খবরের উপর নির্ভর না করে। যে পর্যন্ত সত্যতা যাচাই ও পরীক্ষা করে প্রকৃত ঘটনা জানা না যায় সেই পর্যন্ত কোন কাজ করে ফেলা উচিত নয়। হতে পারে যে, কোন পাপাচারী ব্যক্তি কোন মিথ্যা কথা বলে দিলো বা সে ভুল করে ফেললো এবং তার খবর অনুযায়ী মুমিনরা কোন কাজ করে বসলো, এতে প্রকৃতপক্ষে তারই অনুসরণ করা হলো। আর পাপাচারী ও বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী লোকদের অনুসরণ করা আলেমদের মতে হারাম। এই আয়াতের উপর ভিত্তি করেই কোন কোন মুহাদ্দিস ঐ ব্যক্তির রিওয়াইয়াতকেও নির্ভরযোগ্য মনে করেন যার অবস্থা জানা নেই। কেননা, হতে পারে যে, প্রকৃতপক্ষে ঐ ব্যক্তি পাপাচারী। তবে কতক লোক এরূপ অজ্ঞাত লোকের রিওয়াইয়াতও গ্রহণ করেছেন এবং তারা বলেছেনঃ “ফাসিক বা পাপাচারী লোকের খবর কবুল করতে নিষেধ করা হয়েছে, আর যার অবস্থা জানা নেই তার ফাসিক হওয়া আমাদের নিকট প্রকাশিত নয়। আমরা শরহে বুখারীর কিতাবুল ইলমের মধ্যে এ মাসআলাটি, বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলারই প্রাপ্য। অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এ আয়াতটি ওয়ালীদ ইবনে উকবা ইবনে আবি মুঈতের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বানু মুসতালিক গোত্রের নিকট যাকাত আদায় করার জন্যে পাঠিয়েছিলেন। যেমন মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত জুওয়াইরিয়া (রাঃ)-এর পিতা হযরত হারিস ইবনে আবি যরার খুযায়ী (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হলাম। তিনি আমাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। আমি তা কবূল করলাম এবং মুসলমান হয়ে গেলাম। অতঃপর তিনি যাকাত ফরয হওয়ার কথা শুনালেন। আমি ওটাও মেনে নিলাম এবং বললামঃ আমি আমার কওমের নিকট ফিরে যাচ্ছি। আমি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিবো। তাদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে এবং যাকাত দিবে, আমি তাদের যাকাত জমা করবে। আপনি এতদিন পরে আমার নিকট কোন লোক পাঠিয়ে দিবেন। আমি তার হাতে যাকাতের জমাকৃত মাল দিয়ে দিবো। এভাবে যাকাতের মাল আপনার নিকট পৌঁছে যাবে।” হযরত হারিস (রাঃ) ফিরে গিয়ে তাই করলেন অর্থাৎ যাকাতের সম্পদ একত্রিত করলেন। যখন নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত তথায় গেলেন না, তখন তিনি তাঁর কওমের নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে একত্রিত করলেন এবং তাদেরকে বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোন দূতকে যে আমাদের নিকট পাঠাবেন না এটা অসম্ভব। আমার ভয় হচ্ছে যে, কোন কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হয়তো আমাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং এজন্যেই কোন দূতকে আমাদের নিকট যাকাতের মাল নেয়ার জন্যে পাঠাননি। সুতরাং যদি আপনারা একমত হন তবে আমি নিজেই এ মাল নিয়ে মদীনা শরীফ গমন করি এবং নবী (সঃ)-এর নিকট পেশ করি।” অতঃপর সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে গেল এবং হযরত হারিস (রাঃ) যাকাতের মাল নিয়ে মদীনার পথে যাত্রা শুরু করলেন। আর ওদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ালীদ ইবনে উকবাকে স্বীয় দূত হিসেবে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সে ভয়ে রাস্তা হতেই ফিরে আসে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খবর দেয় যে, হারিস (রাঃ) যাকাতের মালও আটকিয়ে দিয়েছে এবং সে তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। এ খবর শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যন্ত অসন্তুষ্ট ও দুঃখিত হলেন এবং কিছু লোককে হযরত হারিস (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দিলেন। মদীনার কাছাকাছি পথেই এই ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী হযরত হারিস (রাঃ)-কে পেয়ে গেলেন। হযরত হারিস (রাঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি? তোমরা কোথা হতে আসছো এবং কোথায় যাচ্ছ?” তারা উত্তরে বললেনঃ “আমাদেরকে তোমারই বিরুদ্ধে পাঠানো হয়েছে।” “কেন?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন। তারা উত্তরে বললেনঃ “কারণ এই যে, তুমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূতকে যাকাতের মাল প্রদান করনি, এমনকি তাকে তুমি হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলে।" হযরত হারিস (রাঃ) বললেনঃ “যে আল্লাহ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সত্য নবীরূপে প্রেরণ করেছেন তার শপথ! আমি তাকে দেখিওনি এবং আমার নিকট সে আসেওনি। চলো, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হচ্ছি।” অতঃপর সেখান হতে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “তুমি যাকাতের মাল আটকিয়ে রেখেছিলে এবং আমার প্রেরিত দূতকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলে এটা কি সত্য?” তিনি জবাব দেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কখনো সত্য নয়। যিনি আপনাকে সত্য রাসূলরূপে পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ! না আমি তাকে দেখেছি এবং না সে আমার কাছে এসেছিল। বরং আমি যখন দেখলাম যে, আপনার কোন লোক যাকাতের মাল নেয়ার জন্যে আমাদের ওখানে গেল না তখন আমি ভয় করলাম যে, না জানি হয়তো আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং এই কারণেই হয়তো আমাদের কাছে কোন লোককে প্রেরণ করা হয়নি, তাই আমি স্বয়ং যাকাতের মাল নিয়ে আপনার খিদমতে হাযির হয়েছি।” তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।ইমাম তিবরানীর (রঃ) বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত যখন হযরত হারিস (রাঃ)-এর বস্তীর নিকট পৌছে তখন বস্তীর লোকেরা খুশী হয়ে তার অভ্যর্থনার বিশেষ প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়ে পড়ে। ওদিকে ঐ লোকটির মনে এই শয়তানী খেয়াল চেপে যায় যে, ঐ লোকগুলো তাকে আক্রমণ করতে আসছে। সুতরাং সে ফিরে চলে আসে। লোকগুলো তাকে ফিরে চলে যেতে দেখে নিজেরাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে এসে হাযির হয়ে যায়। যোহরের নামাযের পরে তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আরয করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি যাকাত আদায় করার জন্যে তোক পাঠিয়েছেন দেখে আমাদের চক্ষু ঠাণ্ডা হয়। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হই। কিন্তু আল্লাহ জানেন, কি হলো যে, আপনার প্রেরিত লোকটি রাস্তা হতেই ফিরে চলে আসে। তখন আমরা ভয় করলাম যে, আল্লাহ হয়তো আমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন, তাই আমরা আপনার দরবারে হাযির হয়েছি। এভাবে তারা ওযর পেশ করতে থাকে। এদিকে হযরত বিলাল (রাঃ) যখন আসরের আযান দেন তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে উকবার এই খবরের পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ বস্তী অভিমুখে কিছু লোক পাঠাবার চিন্তা করছিলেন এমতাবস্থায় তাদের প্রতিনিধিদল তার কাছে এসে পড়ে। তারা আরয করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার দূত অর্ধেক রাস্তা হতেই ফিরে আসে। তখন আমরা ধারণা করলাম যে, আপনি হয়তো কোন অসন্তুষ্টির কারণে তাকে ফিরে আসার নির্দেশ দিয়েছেন। এ জন্যেই আমরা আপনার খিদমতে হাযির হয়েছি। আমরা আল্লাহর ক্রোধ এবং আপনার অসন্তুষ্টি হতে আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন এবং তাদের ওযর সত্য বলে ঘোষণা দেন। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, দূত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ কথাও বলেছিলঃ “ঐ লোকগুলো আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে সৈন্যদেরকে একত্রিত করেছে এবং তারা ইসলাম ত্যাগ করেছে। তার এই খবর শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে তাদের বিরুদ্ধে একদল সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেন। কিন্তু হযরত খালিদ (রাঃ)-কে তিনি উপদেশ দেনঃ “প্রথমে ভালভাবে খবরের সত্যাসত্য যাচাই করবে, ত্বরিৎগতিতে আক্রমণ করে বসবে না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উপদেশ অনুযায়ী হযরত খালিদ (রাঃ) সেখানে গিয়ে একজন গুপ্তচরকে শহরে পাঠিয়ে দেন। গুপ্তচর এ খবর আনেন যে, তারা দ্বীন ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। মসজিদে আযান হচ্ছে এবং তিনি স্বয়ং তাদেরকে নামায পড়তে দেখেছেন। সকাল হওয়া মাত্রই হযরত খালিদ (রাঃ) নিজে গিয়ে তথাকার ইসলামী দৃশ্য দেখে খুশী হন এবং ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খবর দেন। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।এই ঘটনা বর্ণনাকারী হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সত্যতা পরীক্ষা, সহনশীলতা এবং দূরদর্শিতা আল্লাহর পক্ষ হতে এবং তাড়াহুড়া ও দ্রুততা শয়তানের পক্ষ হতে।” হযরত কাতাদা (রঃ) ছাড়াও আরো বহু মনীষীও এটাই বর্ণনা করেছেন। যেমন ইবনে আবি লাইলা (রঃ), ইয়াযীদ ইবনে রূমান (রঃ), যহহাক (রঃ), মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) প্রমুখ। এঁদের সবারই বর্ণনা এই যে, এই আয়াত ওয়ালীদ ইবনে উকবার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা জেনে রেখো যে, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসূল (সঃ) রয়েছেন। তোমাদের উচিত তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং তাঁর নির্দেশাবলী ঠিক ঠিকভাবে মেনে চলা। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী। তোমাদেরকে তিনি খুবই ভালবাসেন। তোমাদেরকে বিপদে ফেলতে তিনি কখনই চান না। তোমরা নিজেদের ততো কল্যাণকামী নও যতোটা তিনি তোমাদের কল্যাণকামী। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নবী (সঃ) মুমিনদের সাথে তাদের নিজেদের চেয়েও বেশী সম্পর্কযুক্ত।” (৩৩:৬)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি মুহাম্মাদ (সঃ) বহু বিষয়ে তোমাদের কথা শুনতেন এবং সেই মুতাবেক কাজ করতেন তবে তোমরাই কষ্ট পেতে এবং তোমাদেরই ক্ষতি সাধিত হতো। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি সত্য প্রতিপালক তাদের চাহিদা বা প্রবৃত্তি অনুযায়ী চলেন তবে আকাশ ও পৃথিবী এবং এতোদুভয়ের মধ্যস্থিত সবকিছু বিনষ্ট হয়ে যেতো, বরং আমি তাদের কাছে তাদের উপদেশ পৌঁছিয়ে দিয়েছি, কিন্তু তারা তাদের উপদেশ হতে বিমুখ হয়ে যায়।” (২৩:৭১)অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ তোমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং ওটাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইসলাম প্রকাশ্য এবং ঈমান অন্তরের মধ্যে রয়েছে।” অতঃপর তিনি তিনবার বীয় হাত দ্বারা স্বীয় বক্ষের দিকে ইশারা করেন। তারপর বলেনঃ “তাকওয়া এবানে, তাকওয়া এখানে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ কুফরী, পাপাচার, অবাধ্যতাকে করেছেন তোমাদের নিকট অপ্রিয়। আর এই ভাবে ক্রমান্বয়ে তিনি তোমাদের উপর স্বীয় নিয়ামত পূর্ণ করে দিয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ওরাই সৎপথ অবলম্বনকারী।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, উহুদের যুদ্ধের দিন যখন মুশরিকরা ফিরে যায় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীদেরকে বলেনঃ “তোমরা সোজাভাবে ঠিকঠাক হয়ে যাও, আমি মহামহিমান্বিত আল্লাহর প্রশংসা কীর্তন করবে।” তখন জনগণ তার পিছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যান। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের দুআটি পাঠ করেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা আপনারই প্রাপ্য। আপনি যাকে প্রশস্ততা দান করেন তার কেউ সংকীর্ণতা আনয়ন করতে পারে না, আর আপনি যাকে সংকীর্ণতা দেন তার কেউ প্রশস্ততা আনয়ন করতে পারে না। আপনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না, আর আপনি যাকে পথ প্রদর্শন করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আপনি যাকে বঞ্চিত করেন তাকে কেউ দিতে পারে না, আর আপনি যাকে দেন তাকে কেউ বঞ্চিত করতে পারে। আপনি যাকে দূরে করেন তাকে কেউ কাছে করতে পারে না, আর আপনি যাকে কাছে করেন তাকে কেউ দূরে করতে পারে না। হে আল্লাহ! আমাদের উপর আপনি আপনার বরকত, রহমত, অনুগ্রহ ও জীবিকা প্রশস্ত করে দিন! হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ঐ চিরস্থায়ী নিয়ামত যাজ্ঞা করছি যা না এদিক। ওদিক হবে এবং না নষ্ট হবে। হে আল্লাহ! দারিদ্র ও প্রয়োজনের দিন আমি আপনার নিকট নিয়ামত প্রার্থনা করছি এবং ভয়ের দিন আমি আপনার নিকট শান্তি ও নিরাপত্তা চাচ্ছি। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যা দিয়েছেন এবং যা দেননি এসবের অনিষ্ট হতে আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে আপনি ঈমানকে প্রিয় করে দিন এবং কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে আমাদের নিকট অপ্রিয় করুন! আর আমাদেরকে সৎপথ অবলম্বনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। হে আল্লাহ! মুসলমান অবস্থায় আমাদের মৃত্যু ঘটান, মুসলমান অবস্থায় জীবিত রাখুন এবং সৎ লোকদের সাথে আমাদেরকে মিলিত করুন। আমাদেরকে অপমানিত করবেন না এবং ফিত্রায় ফেলবেন না। হে আল্লাহ! আপনি ঐ কাফিরদেরকে ধ্বংস করুন যারা আপনার রাসূলদেরকে অবিশ্বাস করে ও আপনার পথ হতে নিবৃত্ত করে এবং তাদের উপর আপনার শাস্তি ও আযাব নাযিল করুন। হে আল্লাহ! আপনি আহলে কিতাবের কাফিরদেরকেও ধ্বংস করুন, হে সত্য মাবূদ!”মারফু হাদীসে রয়েছেঃ “যার কাছে পুণ্যের কাজ ভাল লাগে এবং পাপের কাজ মন্দ লাগে সে মুমিন।”এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “এটা আল্লাহর দান ও অনুগ্রহ।” সপথ প্রাপ্তির হকদার ও পথভ্রষ্ট হওয়ার হকদারদেরকে তিনি ভালরূপেই জানেন। তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

আল-হুজুরাত 49:7

৬-৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন পাপাচারীর খবরের উপর নির্ভর না করে। যে পর্যন্ত সত্যতা যাচাই ও পরীক্ষা করে প্রকৃত ঘটনা জানা না যায় সেই পর্যন্ত কোন কাজ করে ফেলা উচিত নয়। হতে পারে যে, কোন পাপাচারী ব্যক্তি কোন মিথ্যা কথা বলে দিলো বা সে ভুল করে ফেললো এবং তার খবর অনুযায়ী মুমিনরা কোন কাজ করে বসলো, এতে প্রকৃতপক্ষে তারই অনুসরণ করা হলো। আর পাপাচারী ও বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী লোকদের অনুসরণ করা আলেমদের মতে হারাম। এই আয়াতের উপর ভিত্তি করেই কোন কোন মুহাদ্দিস ঐ ব্যক্তির রিওয়াইয়াতকেও নির্ভরযোগ্য মনে করেন যার অবস্থা জানা নেই। কেননা, হতে পারে যে, প্রকৃতপক্ষে ঐ ব্যক্তি পাপাচারী। তবে কতক লোক এরূপ অজ্ঞাত লোকের রিওয়াইয়াতও গ্রহণ করেছেন এবং তারা বলেছেনঃ “ফাসিক বা পাপাচারী লোকের খবর কবুল করতে নিষেধ করা হয়েছে, আর যার অবস্থা জানা নেই তার ফাসিক হওয়া আমাদের নিকট প্রকাশিত নয়। আমরা শরহে বুখারীর কিতাবুল ইলমের মধ্যে এ মাসআলাটি, বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলারই প্রাপ্য। অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এ আয়াতটি ওয়ালীদ ইবনে উকবা ইবনে আবি মুঈতের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বানু মুসতালিক গোত্রের নিকট যাকাত আদায় করার জন্যে পাঠিয়েছিলেন। যেমন মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত জুওয়াইরিয়া (রাঃ)-এর পিতা হযরত হারিস ইবনে আবি যরার খুযায়ী (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হলাম। তিনি আমাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। আমি তা কবূল করলাম এবং মুসলমান হয়ে গেলাম। অতঃপর তিনি যাকাত ফরয হওয়ার কথা শুনালেন। আমি ওটাও মেনে নিলাম এবং বললামঃ আমি আমার কওমের নিকট ফিরে যাচ্ছি। আমি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিবো। তাদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে এবং যাকাত দিবে, আমি তাদের যাকাত জমা করবে। আপনি এতদিন পরে আমার নিকট কোন লোক পাঠিয়ে দিবেন। আমি তার হাতে যাকাতের জমাকৃত মাল দিয়ে দিবো। এভাবে যাকাতের মাল আপনার নিকট পৌঁছে যাবে।” হযরত হারিস (রাঃ) ফিরে গিয়ে তাই করলেন অর্থাৎ যাকাতের সম্পদ একত্রিত করলেন। যখন নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত তথায় গেলেন না, তখন তিনি তাঁর কওমের নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে একত্রিত করলেন এবং তাদেরকে বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোন দূতকে যে আমাদের নিকট পাঠাবেন না এটা অসম্ভব। আমার ভয় হচ্ছে যে, কোন কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হয়তো আমাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং এজন্যেই কোন দূতকে আমাদের নিকট যাকাতের মাল নেয়ার জন্যে পাঠাননি। সুতরাং যদি আপনারা একমত হন তবে আমি নিজেই এ মাল নিয়ে মদীনা শরীফ গমন করি এবং নবী (সঃ)-এর নিকট পেশ করি।” অতঃপর সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে গেল এবং হযরত হারিস (রাঃ) যাকাতের মাল নিয়ে মদীনার পথে যাত্রা শুরু করলেন। আর ওদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ালীদ ইবনে উকবাকে স্বীয় দূত হিসেবে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সে ভয়ে রাস্তা হতেই ফিরে আসে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খবর দেয় যে, হারিস (রাঃ) যাকাতের মালও আটকিয়ে দিয়েছে এবং সে তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। এ খবর শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যন্ত অসন্তুষ্ট ও দুঃখিত হলেন এবং কিছু লোককে হযরত হারিস (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দিলেন। মদীনার কাছাকাছি পথেই এই ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী হযরত হারিস (রাঃ)-কে পেয়ে গেলেন। হযরত হারিস (রাঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি? তোমরা কোথা হতে আসছো এবং কোথায় যাচ্ছ?” তারা উত্তরে বললেনঃ “আমাদেরকে তোমারই বিরুদ্ধে পাঠানো হয়েছে।” “কেন?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন। তারা উত্তরে বললেনঃ “কারণ এই যে, তুমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূতকে যাকাতের মাল প্রদান করনি, এমনকি তাকে তুমি হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলে।" হযরত হারিস (রাঃ) বললেনঃ “যে আল্লাহ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সত্য নবীরূপে প্রেরণ করেছেন তার শপথ! আমি তাকে দেখিওনি এবং আমার নিকট সে আসেওনি। চলো, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হচ্ছি।” অতঃপর সেখান হতে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “তুমি যাকাতের মাল আটকিয়ে রেখেছিলে এবং আমার প্রেরিত দূতকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলে এটা কি সত্য?” তিনি জবাব দেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কখনো সত্য নয়। যিনি আপনাকে সত্য রাসূলরূপে পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ! না আমি তাকে দেখেছি এবং না সে আমার কাছে এসেছিল। বরং আমি যখন দেখলাম যে, আপনার কোন লোক যাকাতের মাল নেয়ার জন্যে আমাদের ওখানে গেল না তখন আমি ভয় করলাম যে, না জানি হয়তো আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং এই কারণেই হয়তো আমাদের কাছে কোন লোককে প্রেরণ করা হয়নি, তাই আমি স্বয়ং যাকাতের মাল নিয়ে আপনার খিদমতে হাযির হয়েছি।” তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।ইমাম তিবরানীর (রঃ) বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত যখন হযরত হারিস (রাঃ)-এর বস্তীর নিকট পৌছে তখন বস্তীর লোকেরা খুশী হয়ে তার অভ্যর্থনার বিশেষ প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়ে পড়ে। ওদিকে ঐ লোকটির মনে এই শয়তানী খেয়াল চেপে যায় যে, ঐ লোকগুলো তাকে আক্রমণ করতে আসছে। সুতরাং সে ফিরে চলে আসে। লোকগুলো তাকে ফিরে চলে যেতে দেখে নিজেরাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে এসে হাযির হয়ে যায়। যোহরের নামাযের পরে তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আরয করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি যাকাত আদায় করার জন্যে তোক পাঠিয়েছেন দেখে আমাদের চক্ষু ঠাণ্ডা হয়। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হই। কিন্তু আল্লাহ জানেন, কি হলো যে, আপনার প্রেরিত লোকটি রাস্তা হতেই ফিরে চলে আসে। তখন আমরা ভয় করলাম যে, আল্লাহ হয়তো আমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন, তাই আমরা আপনার দরবারে হাযির হয়েছি। এভাবে তারা ওযর পেশ করতে থাকে। এদিকে হযরত বিলাল (রাঃ) যখন আসরের আযান দেন তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে উকবার এই খবরের পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ বস্তী অভিমুখে কিছু লোক পাঠাবার চিন্তা করছিলেন এমতাবস্থায় তাদের প্রতিনিধিদল তার কাছে এসে পড়ে। তারা আরয করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার দূত অর্ধেক রাস্তা হতেই ফিরে আসে। তখন আমরা ধারণা করলাম যে, আপনি হয়তো কোন অসন্তুষ্টির কারণে তাকে ফিরে আসার নির্দেশ দিয়েছেন। এ জন্যেই আমরা আপনার খিদমতে হাযির হয়েছি। আমরা আল্লাহর ক্রোধ এবং আপনার অসন্তুষ্টি হতে আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন এবং তাদের ওযর সত্য বলে ঘোষণা দেন। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, দূত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ কথাও বলেছিলঃ “ঐ লোকগুলো আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে সৈন্যদেরকে একত্রিত করেছে এবং তারা ইসলাম ত্যাগ করেছে। তার এই খবর শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে তাদের বিরুদ্ধে একদল সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেন। কিন্তু হযরত খালিদ (রাঃ)-কে তিনি উপদেশ দেনঃ “প্রথমে ভালভাবে খবরের সত্যাসত্য যাচাই করবে, ত্বরিৎগতিতে আক্রমণ করে বসবে না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উপদেশ অনুযায়ী হযরত খালিদ (রাঃ) সেখানে গিয়ে একজন গুপ্তচরকে শহরে পাঠিয়ে দেন। গুপ্তচর এ খবর আনেন যে, তারা দ্বীন ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। মসজিদে আযান হচ্ছে এবং তিনি স্বয়ং তাদেরকে নামায পড়তে দেখেছেন। সকাল হওয়া মাত্রই হযরত খালিদ (রাঃ) নিজে গিয়ে তথাকার ইসলামী দৃশ্য দেখে খুশী হন এবং ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খবর দেন। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।এই ঘটনা বর্ণনাকারী হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সত্যতা পরীক্ষা, সহনশীলতা এবং দূরদর্শিতা আল্লাহর পক্ষ হতে এবং তাড়াহুড়া ও দ্রুততা শয়তানের পক্ষ হতে।” হযরত কাতাদা (রঃ) ছাড়াও আরো বহু মনীষীও এটাই বর্ণনা করেছেন। যেমন ইবনে আবি লাইলা (রঃ), ইয়াযীদ ইবনে রূমান (রঃ), যহহাক (রঃ), মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) প্রমুখ। এঁদের সবারই বর্ণনা এই যে, এই আয়াত ওয়ালীদ ইবনে উকবার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা জেনে রেখো যে, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসূল (সঃ) রয়েছেন। তোমাদের উচিত তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং তাঁর নির্দেশাবলী ঠিক ঠিকভাবে মেনে চলা। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী। তোমাদেরকে তিনি খুবই ভালবাসেন। তোমাদেরকে বিপদে ফেলতে তিনি কখনই চান না। তোমরা নিজেদের ততো কল্যাণকামী নও যতোটা তিনি তোমাদের কল্যাণকামী। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নবী (সঃ) মুমিনদের সাথে তাদের নিজেদের চেয়েও বেশী সম্পর্কযুক্ত।” (৩৩:৬)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি মুহাম্মাদ (সঃ) বহু বিষয়ে তোমাদের কথা শুনতেন এবং সেই মুতাবেক কাজ করতেন তবে তোমরাই কষ্ট পেতে এবং তোমাদেরই ক্ষতি সাধিত হতো। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি সত্য প্রতিপালক তাদের চাহিদা বা প্রবৃত্তি অনুযায়ী চলেন তবে আকাশ ও পৃথিবী এবং এতোদুভয়ের মধ্যস্থিত সবকিছু বিনষ্ট হয়ে যেতো, বরং আমি তাদের কাছে তাদের উপদেশ পৌঁছিয়ে দিয়েছি, কিন্তু তারা তাদের উপদেশ হতে বিমুখ হয়ে যায়।” (২৩:৭১)অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ তোমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং ওটাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইসলাম প্রকাশ্য এবং ঈমান অন্তরের মধ্যে রয়েছে।” অতঃপর তিনি তিনবার বীয় হাত দ্বারা স্বীয় বক্ষের দিকে ইশারা করেন। তারপর বলেনঃ “তাকওয়া এবানে, তাকওয়া এখানে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ কুফরী, পাপাচার, অবাধ্যতাকে করেছেন তোমাদের নিকট অপ্রিয়। আর এই ভাবে ক্রমান্বয়ে তিনি তোমাদের উপর স্বীয় নিয়ামত পূর্ণ করে দিয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ওরাই সৎপথ অবলম্বনকারী।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, উহুদের যুদ্ধের দিন যখন মুশরিকরা ফিরে যায় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীদেরকে বলেনঃ “তোমরা সোজাভাবে ঠিকঠাক হয়ে যাও, আমি মহামহিমান্বিত আল্লাহর প্রশংসা কীর্তন করবে।” তখন জনগণ তার পিছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যান। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের দুআটি পাঠ করেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা আপনারই প্রাপ্য। আপনি যাকে প্রশস্ততা দান করেন তার কেউ সংকীর্ণতা আনয়ন করতে পারে না, আর আপনি যাকে সংকীর্ণতা দেন তার কেউ প্রশস্ততা আনয়ন করতে পারে না। আপনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না, আর আপনি যাকে পথ প্রদর্শন করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আপনি যাকে বঞ্চিত করেন তাকে কেউ দিতে পারে না, আর আপনি যাকে দেন তাকে কেউ বঞ্চিত করতে পারে। আপনি যাকে দূরে করেন তাকে কেউ কাছে করতে পারে না, আর আপনি যাকে কাছে করেন তাকে কেউ দূরে করতে পারে না। হে আল্লাহ! আমাদের উপর আপনি আপনার বরকত, রহমত, অনুগ্রহ ও জীবিকা প্রশস্ত করে দিন! হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ঐ চিরস্থায়ী নিয়ামত যাজ্ঞা করছি যা না এদিক। ওদিক হবে এবং না নষ্ট হবে। হে আল্লাহ! দারিদ্র ও প্রয়োজনের দিন আমি আপনার নিকট নিয়ামত প্রার্থনা করছি এবং ভয়ের দিন আমি আপনার নিকট শান্তি ও নিরাপত্তা চাচ্ছি। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যা দিয়েছেন এবং যা দেননি এসবের অনিষ্ট হতে আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে আপনি ঈমানকে প্রিয় করে দিন এবং কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে আমাদের নিকট অপ্রিয় করুন! আর আমাদেরকে সৎপথ অবলম্বনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। হে আল্লাহ! মুসলমান অবস্থায় আমাদের মৃত্যু ঘটান, মুসলমান অবস্থায় জীবিত রাখুন এবং সৎ লোকদের সাথে আমাদেরকে মিলিত করুন। আমাদেরকে অপমানিত করবেন না এবং ফিত্রায় ফেলবেন না। হে আল্লাহ! আপনি ঐ কাফিরদেরকে ধ্বংস করুন যারা আপনার রাসূলদেরকে অবিশ্বাস করে ও আপনার পথ হতে নিবৃত্ত করে এবং তাদের উপর আপনার শাস্তি ও আযাব নাযিল করুন। হে আল্লাহ! আপনি আহলে কিতাবের কাফিরদেরকেও ধ্বংস করুন, হে সত্য মাবূদ!”মারফু হাদীসে রয়েছেঃ “যার কাছে পুণ্যের কাজ ভাল লাগে এবং পাপের কাজ মন্দ লাগে সে মুমিন।”এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “এটা আল্লাহর দান ও অনুগ্রহ।” সপথ প্রাপ্তির হকদার ও পথভ্রষ্ট হওয়ার হকদারদেরকে তিনি ভালরূপেই জানেন। তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

আল-হুজুরাত 49:8

৬-৮ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন পাপাচারীর খবরের উপর নির্ভর না করে। যে পর্যন্ত সত্যতা যাচাই ও পরীক্ষা করে প্রকৃত ঘটনা জানা না যায় সেই পর্যন্ত কোন কাজ করে ফেলা উচিত নয়। হতে পারে যে, কোন পাপাচারী ব্যক্তি কোন মিথ্যা কথা বলে দিলো বা সে ভুল করে ফেললো এবং তার খবর অনুযায়ী মুমিনরা কোন কাজ করে বসলো, এতে প্রকৃতপক্ষে তারই অনুসরণ করা হলো। আর পাপাচারী ও বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী লোকদের অনুসরণ করা আলেমদের মতে হারাম। এই আয়াতের উপর ভিত্তি করেই কোন কোন মুহাদ্দিস ঐ ব্যক্তির রিওয়াইয়াতকেও নির্ভরযোগ্য মনে করেন যার অবস্থা জানা নেই। কেননা, হতে পারে যে, প্রকৃতপক্ষে ঐ ব্যক্তি পাপাচারী। তবে কতক লোক এরূপ অজ্ঞাত লোকের রিওয়াইয়াতও গ্রহণ করেছেন এবং তারা বলেছেনঃ “ফাসিক বা পাপাচারী লোকের খবর কবুল করতে নিষেধ করা হয়েছে, আর যার অবস্থা জানা নেই তার ফাসিক হওয়া আমাদের নিকট প্রকাশিত নয়। আমরা শরহে বুখারীর কিতাবুল ইলমের মধ্যে এ মাসআলাটি, বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলারই প্রাপ্য। অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে এ আয়াতটি ওয়ালীদ ইবনে উকবা ইবনে আবি মুঈতের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বানু মুসতালিক গোত্রের নিকট যাকাত আদায় করার জন্যে পাঠিয়েছিলেন। যেমন মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত জুওয়াইরিয়া (রাঃ)-এর পিতা হযরত হারিস ইবনে আবি যরার খুযায়ী (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হলাম। তিনি আমাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। আমি তা কবূল করলাম এবং মুসলমান হয়ে গেলাম। অতঃপর তিনি যাকাত ফরয হওয়ার কথা শুনালেন। আমি ওটাও মেনে নিলাম এবং বললামঃ আমি আমার কওমের নিকট ফিরে যাচ্ছি। আমি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিবো। তাদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে এবং যাকাত দিবে, আমি তাদের যাকাত জমা করবে। আপনি এতদিন পরে আমার নিকট কোন লোক পাঠিয়ে দিবেন। আমি তার হাতে যাকাতের জমাকৃত মাল দিয়ে দিবো। এভাবে যাকাতের মাল আপনার নিকট পৌঁছে যাবে।” হযরত হারিস (রাঃ) ফিরে গিয়ে তাই করলেন অর্থাৎ যাকাতের সম্পদ একত্রিত করলেন। যখন নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত তথায় গেলেন না, তখন তিনি তাঁর কওমের নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে একত্রিত করলেন এবং তাদেরকে বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোন দূতকে যে আমাদের নিকট পাঠাবেন না এটা অসম্ভব। আমার ভয় হচ্ছে যে, কোন কারণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হয়তো আমাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং এজন্যেই কোন দূতকে আমাদের নিকট যাকাতের মাল নেয়ার জন্যে পাঠাননি। সুতরাং যদি আপনারা একমত হন তবে আমি নিজেই এ মাল নিয়ে মদীনা শরীফ গমন করি এবং নবী (সঃ)-এর নিকট পেশ করি।” অতঃপর সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে গেল এবং হযরত হারিস (রাঃ) যাকাতের মাল নিয়ে মদীনার পথে যাত্রা শুরু করলেন। আর ওদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ালীদ ইবনে উকবাকে স্বীয় দূত হিসেবে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সে ভয়ে রাস্তা হতেই ফিরে আসে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খবর দেয় যে, হারিস (রাঃ) যাকাতের মালও আটকিয়ে দিয়েছে এবং সে তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। এ খবর শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যন্ত অসন্তুষ্ট ও দুঃখিত হলেন এবং কিছু লোককে হযরত হারিস (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দিলেন। মদীনার কাছাকাছি পথেই এই ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী হযরত হারিস (রাঃ)-কে পেয়ে গেলেন। হযরত হারিস (রাঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি? তোমরা কোথা হতে আসছো এবং কোথায় যাচ্ছ?” তারা উত্তরে বললেনঃ “আমাদেরকে তোমারই বিরুদ্ধে পাঠানো হয়েছে।” “কেন?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন। তারা উত্তরে বললেনঃ “কারণ এই যে, তুমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূতকে যাকাতের মাল প্রদান করনি, এমনকি তাকে তুমি হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলে।" হযরত হারিস (রাঃ) বললেনঃ “যে আল্লাহ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে সত্য নবীরূপে প্রেরণ করেছেন তার শপথ! আমি তাকে দেখিওনি এবং আমার নিকট সে আসেওনি। চলো, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হচ্ছি।” অতঃপর সেখান হতে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “তুমি যাকাতের মাল আটকিয়ে রেখেছিলে এবং আমার প্রেরিত দূতকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলে এটা কি সত্য?” তিনি জবাব দেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কখনো সত্য নয়। যিনি আপনাকে সত্য রাসূলরূপে পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ! না আমি তাকে দেখেছি এবং না সে আমার কাছে এসেছিল। বরং আমি যখন দেখলাম যে, আপনার কোন লোক যাকাতের মাল নেয়ার জন্যে আমাদের ওখানে গেল না তখন আমি ভয় করলাম যে, না জানি হয়তো আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং এই কারণেই হয়তো আমাদের কাছে কোন লোককে প্রেরণ করা হয়নি, তাই আমি স্বয়ং যাকাতের মাল নিয়ে আপনার খিদমতে হাযির হয়েছি।” তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।ইমাম তিবরানীর (রঃ) বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত যখন হযরত হারিস (রাঃ)-এর বস্তীর নিকট পৌছে তখন বস্তীর লোকেরা খুশী হয়ে তার অভ্যর্থনার বিশেষ প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়ে পড়ে। ওদিকে ঐ লোকটির মনে এই শয়তানী খেয়াল চেপে যায় যে, ঐ লোকগুলো তাকে আক্রমণ করতে আসছে। সুতরাং সে ফিরে চলে আসে। লোকগুলো তাকে ফিরে চলে যেতে দেখে নিজেরাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে এসে হাযির হয়ে যায়। যোহরের নামাযের পরে তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আরয করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি যাকাত আদায় করার জন্যে তোক পাঠিয়েছেন দেখে আমাদের চক্ষু ঠাণ্ডা হয়। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হই। কিন্তু আল্লাহ জানেন, কি হলো যে, আপনার প্রেরিত লোকটি রাস্তা হতেই ফিরে চলে আসে। তখন আমরা ভয় করলাম যে, আল্লাহ হয়তো আমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন, তাই আমরা আপনার দরবারে হাযির হয়েছি। এভাবে তারা ওযর পেশ করতে থাকে। এদিকে হযরত বিলাল (রাঃ) যখন আসরের আযান দেন তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ওয়ালীদ ইবনে উকবার এই খবরের পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ বস্তী অভিমুখে কিছু লোক পাঠাবার চিন্তা করছিলেন এমতাবস্থায় তাদের প্রতিনিধিদল তার কাছে এসে পড়ে। তারা আরয করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার দূত অর্ধেক রাস্তা হতেই ফিরে আসে। তখন আমরা ধারণা করলাম যে, আপনি হয়তো কোন অসন্তুষ্টির কারণে তাকে ফিরে আসার নির্দেশ দিয়েছেন। এ জন্যেই আমরা আপনার খিদমতে হাযির হয়েছি। আমরা আল্লাহর ক্রোধ এবং আপনার অসন্তুষ্টি হতে আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন এবং তাদের ওযর সত্য বলে ঘোষণা দেন। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, দূত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ কথাও বলেছিলঃ “ঐ লোকগুলো আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে সৈন্যদেরকে একত্রিত করেছে এবং তারা ইসলাম ত্যাগ করেছে। তার এই খবর শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে তাদের বিরুদ্ধে একদল সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেন। কিন্তু হযরত খালিদ (রাঃ)-কে তিনি উপদেশ দেনঃ “প্রথমে ভালভাবে খবরের সত্যাসত্য যাচাই করবে, ত্বরিৎগতিতে আক্রমণ করে বসবে না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই উপদেশ অনুযায়ী হযরত খালিদ (রাঃ) সেখানে গিয়ে একজন গুপ্তচরকে শহরে পাঠিয়ে দেন। গুপ্তচর এ খবর আনেন যে, তারা দ্বীন ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। মসজিদে আযান হচ্ছে এবং তিনি স্বয়ং তাদেরকে নামায পড়তে দেখেছেন। সকাল হওয়া মাত্রই হযরত খালিদ (রাঃ) নিজে গিয়ে তথাকার ইসলামী দৃশ্য দেখে খুশী হন এবং ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খবর দেন। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।এই ঘটনা বর্ণনাকারী হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সত্যতা পরীক্ষা, সহনশীলতা এবং দূরদর্শিতা আল্লাহর পক্ষ হতে এবং তাড়াহুড়া ও দ্রুততা শয়তানের পক্ষ হতে।” হযরত কাতাদা (রঃ) ছাড়াও আরো বহু মনীষীও এটাই বর্ণনা করেছেন। যেমন ইবনে আবি লাইলা (রঃ), ইয়াযীদ ইবনে রূমান (রঃ), যহহাক (রঃ), মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) প্রমুখ। এঁদের সবারই বর্ণনা এই যে, এই আয়াত ওয়ালীদ ইবনে উকবার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা জেনে রেখো যে, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসূল (সঃ) রয়েছেন। তোমাদের উচিত তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং তাঁর নির্দেশাবলী ঠিক ঠিকভাবে মেনে চলা। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী। তোমাদেরকে তিনি খুবই ভালবাসেন। তোমাদেরকে বিপদে ফেলতে তিনি কখনই চান না। তোমরা নিজেদের ততো কল্যাণকামী নও যতোটা তিনি তোমাদের কল্যাণকামী। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নবী (সঃ) মুমিনদের সাথে তাদের নিজেদের চেয়েও বেশী সম্পর্কযুক্ত।” (৩৩:৬)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি মুহাম্মাদ (সঃ) বহু বিষয়ে তোমাদের কথা শুনতেন এবং সেই মুতাবেক কাজ করতেন তবে তোমরাই কষ্ট পেতে এবং তোমাদেরই ক্ষতি সাধিত হতো। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি সত্য প্রতিপালক তাদের চাহিদা বা প্রবৃত্তি অনুযায়ী চলেন তবে আকাশ ও পৃথিবী এবং এতোদুভয়ের মধ্যস্থিত সবকিছু বিনষ্ট হয়ে যেতো, বরং আমি তাদের কাছে তাদের উপদেশ পৌঁছিয়ে দিয়েছি, কিন্তু তারা তাদের উপদেশ হতে বিমুখ হয়ে যায়।” (২৩:৭১)অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ তোমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং ওটাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইসলাম প্রকাশ্য এবং ঈমান অন্তরের মধ্যে রয়েছে।” অতঃপর তিনি তিনবার বীয় হাত দ্বারা স্বীয় বক্ষের দিকে ইশারা করেন। তারপর বলেনঃ “তাকওয়া এবানে, তাকওয়া এখানে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ কুফরী, পাপাচার, অবাধ্যতাকে করেছেন তোমাদের নিকট অপ্রিয়। আর এই ভাবে ক্রমান্বয়ে তিনি তোমাদের উপর স্বীয় নিয়ামত পূর্ণ করে দিয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ওরাই সৎপথ অবলম্বনকারী।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, উহুদের যুদ্ধের দিন যখন মুশরিকরা ফিরে যায় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীদেরকে বলেনঃ “তোমরা সোজাভাবে ঠিকঠাক হয়ে যাও, আমি মহামহিমান্বিত আল্লাহর প্রশংসা কীর্তন করবে।” তখন জনগণ তার পিছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যান। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের দুআটি পাঠ করেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা আপনারই প্রাপ্য। আপনি যাকে প্রশস্ততা দান করেন তার কেউ সংকীর্ণতা আনয়ন করতে পারে না, আর আপনি যাকে সংকীর্ণতা দেন তার কেউ প্রশস্ততা আনয়ন করতে পারে না। আপনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না, আর আপনি যাকে পথ প্রদর্শন করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আপনি যাকে বঞ্চিত করেন তাকে কেউ দিতে পারে না, আর আপনি যাকে দেন তাকে কেউ বঞ্চিত করতে পারে। আপনি যাকে দূরে করেন তাকে কেউ কাছে করতে পারে না, আর আপনি যাকে কাছে করেন তাকে কেউ দূরে করতে পারে না। হে আল্লাহ! আমাদের উপর আপনি আপনার বরকত, রহমত, অনুগ্রহ ও জীবিকা প্রশস্ত করে দিন! হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ঐ চিরস্থায়ী নিয়ামত যাজ্ঞা করছি যা না এদিক। ওদিক হবে এবং না নষ্ট হবে। হে আল্লাহ! দারিদ্র ও প্রয়োজনের দিন আমি আপনার নিকট নিয়ামত প্রার্থনা করছি এবং ভয়ের দিন আমি আপনার নিকট শান্তি ও নিরাপত্তা চাচ্ছি। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যা দিয়েছেন এবং যা দেননি এসবের অনিষ্ট হতে আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে আপনি ঈমানকে প্রিয় করে দিন এবং কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে আমাদের নিকট অপ্রিয় করুন! আর আমাদেরকে সৎপথ অবলম্বনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। হে আল্লাহ! মুসলমান অবস্থায় আমাদের মৃত্যু ঘটান, মুসলমান অবস্থায় জীবিত রাখুন এবং সৎ লোকদের সাথে আমাদেরকে মিলিত করুন। আমাদেরকে অপমানিত করবেন না এবং ফিত্রায় ফেলবেন না। হে আল্লাহ! আপনি ঐ কাফিরদেরকে ধ্বংস করুন যারা আপনার রাসূলদেরকে অবিশ্বাস করে ও আপনার পথ হতে নিবৃত্ত করে এবং তাদের উপর আপনার শাস্তি ও আযাব নাযিল করুন। হে আল্লাহ! আপনি আহলে কিতাবের কাফিরদেরকেও ধ্বংস করুন, হে সত্য মাবূদ!”মারফু হাদীসে রয়েছেঃ “যার কাছে পুণ্যের কাজ ভাল লাগে এবং পাপের কাজ মন্দ লাগে সে মুমিন।”এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “এটা আল্লাহর দান ও অনুগ্রহ।” সপথ প্রাপ্তির হকদার ও পথভ্রষ্ট হওয়ার হকদারদেরকে তিনি ভালরূপেই জানেন। তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

আল-হুজুরাত 49:9

৯-১০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যদি মুসলমানদের দুই দল পরস্পর দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে অন্যান্য মুসলমানদের উচিত তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়া। পরস্পর বিবাদমান দু’টি দলকে মুমিনই বলা হয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন এটাকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে বলেন যে, কোন মুসলমান যত বড়ই নাফরমান হোক না কেন সে ঈমান হতে বের হয়ে যাবে না, যদিও খারেজী, মু'তাযিলা ইত্যাদি সম্প্রদায় এর বিপরীত মত পোষণ করে। নিম্নের হাদীসটিও এ আয়াতের পৃষ্ঠপোষকতা করেঃহযরত আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর ভাষণ দিচ্ছিলেন এবং তাঁর সাথে হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ)-ও মিম্বরের উপর ছিলেন। কখনো তিনি হযরত হাসান (রাঃ)-এর দিকে তাকাচ্ছিলেন এবং কখনো জনগণের দিকে দেখছিলেন। আর বলছিলেনঃ “আমার এ ছেলে (নাতী) নেতা এবং আল্লাহ তা'আলা এর মাধ্যমে মুসলমানদের বিরাট দু’টি দলের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দেবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে রূপায়িত হয়েছে। সিরিয়াবাসী ও ইরাকবাসীদের মধ্যে বড় বড় ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পর তাঁরই মাধ্যমে তাদের মধ্যে সন্ধি হয়। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি একদল অন্য দলের উপর বাড়াবাড়ি করে এবং তাদেরকে আক্রমণ করে বসে তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে অত্যাচারী হোক অথবা অত্যাচারিত হোক।” বর্ণনাকারী হযরত আনাস (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি সাহায্য করতে পারি অত্যাচারিতকে, কিন্তু আমি অত্যাচারীকে কিরূপে সাহায্য করতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “অত্যাচারীকে তুমি অত্যাচার করা হতে বাধা দিবে ও বিরত রাখবে, এটাই হবে তোমার তাকে সাহায্য করা।”হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ)-কে বলা হয়ঃ “যদি আপনি আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর নিকট একবার যেতেন!” অতঃপর নবী (সঃ) গাধার উপর সওয়ার হয়ে চললেন এবং মুসলমানরাও তাঁর সাথে চলতে লাগলেন। যখন তারা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর নিকট পৌঁছেন তখন সে নবী (সঃ)-কে বলেঃ “আপনি আমা হতে দূরে থাকুন। আল্লাহর কসম! আপনার গাধার গন্ধ আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। তার একথা শুনে আনসারদের একজন লোক তাকে বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! তোমার গন্ধের চেয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গাধার গন্ধ বহুগুণে উত্তম ও পবিত্র।” তাঁর একথা শুনে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর কতক লোকে ভীষণ রেগে গেল এবং এরপর উভয় দলের প্রত্যেক লোকই রাগান্বিত হলো। অতঃপর অবস্থা এতদূর গরালো যে, তাদের মধ্যে হাতাহাতি ও জুতা মারামারি শুরু হয়ে গেল। তাদের ব্যাপারে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারীতেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কিছু ঝগড়া-বিবাদ হয়েছিল। তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়ার হুকুম এই আয়াতে রয়েছে।হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ইমরান নামক একজন আনসারী ছিলেন। তার স্ত্রীর নাম ছিল উম্মে যায়েদ। তিনি (তাঁর স্ত্রী) তার পিত্রালয়ে যেতে চান। কিন্তু তার স্বামী বাধা দেন এবং বলে দেন যে, তাঁর স্ত্রীর পিত্রালয়ের কোন লোক যেন তার বাড়ীতে না আসে। স্ত্রী তখন তাঁর পিত্রালয়ে এ খবর পাঠিয়ে দেন। খবর পেয়ে সেখান হতে লোক এসে উম্মে যায়েদকে বাড়ী হতে বের করে এবং সাথে করে নিয়ে যাবার ইচ্ছা করে। ঐ সময় তাঁর স্বামী বাড়ীতে ছিলেন না। তাঁর লোকে তার চাচাতো ভাইদেরকে খবর দেয়। খবর পেয়ে তারা দৌড়িয়ে আসে এবং স্ত্রীর লোক ও স্বামীর লোকদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায় এবং মারামারি ও জুতা ছুঁড়াছুঁড়িও হয়। তাদের ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উভয়পক্ষের লোকদেরকে ডেকে তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা দুই দলের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ায় ন্যায়-বিচারকারীরা পরম দয়ালু, মহিমান্বিত আল্লাহর সামনে মণি-মুক্তার আসনে উপবিষ্ট থাকবে, এটা হবে তাদের দুনিয়ায় ন্যায়-বিচার করার প্রতিদান।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “ন্যায়-বিচারকারীরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ডান দিকে নূরের আসনে উপবিষ্ট থাকবে। তারা তাদের হুকুমে, পরিবার পরিজনের মধ্যে এবং যা কিছু তাদের অধিকারে ছিল সবারই মধ্যে ন্যায়ের সাথে বিচার করতো।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।' অর্থাৎ মুমিনরা সবাই পরস্পর দ্বীনী ভাই। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ ততক্ষণ বান্দাকে সাহায্য করতে থাকেন যতক্ষণ বান্দা তার (মুমিন) ভাইকে সাহায্য করতে থাকে।” সহীহ হাদীসে আরো রয়েছেঃ যখন কোন মুসলমান তার (মুসলমান) ভাই এর অনুপস্থিতিতে তার জন্যে দুআ করে তখন ফেরেশতা তার দুআয় আমীন বলেন এবং বলেনঃ আল্লাহ তোমাকেও অনুরূপই প্রদান করুন।" এই ব্যাপারে আরো বহু সহীহ হাদীস রয়েছে। আরো সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “মুসলমানের পরিস্পরিক প্রেম-প্রীতি, দয়া-সহানুভূতি ও মিলামিশার দৃষ্টান্ত একটি দেহের মত। যখন কোন অঙ্গে ব্যথা হয় তখন গোটা দেহ ঐ ব্যথা অনুভব করে, সারা দেহে জ্বর এসে যায় এবং সারা দেহ জেগে থাকার (অর্থাৎ ঘুম না আসার) কষ্ট পায়।" অন্য সহীহ হাদীসে আছেঃ “এক মুমিন অপর মুমিনের জন্যে একটি দেয়ালের মত, যার একটি অংশ অপর অংশকে শক্ত ও দৃঢ় করে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার এক হাতের অঙ্গুলিগুলোকে অপর হাতের অঙ্গুলিগুলোর মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেখিয়ে দেন।হযরত সাহল ইবনে সা'দ সায়েদী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিনের ঈমানদারের সাথে ঐ সম্পর্ক রয়েছে, যে সম্পর্ক মাথার দেহের সাথে রয়েছে। মুমিন ঈমানদারের জন্যে ঐ ব্যথা অনুভব করে যে ব্যথা অনুভব করে দেহ মাথার জন্যে (অর্থাৎ মাথায় ব্যথা হলে যেমন দেহ তা অনুভব করে, অনুরূপভাবে এক মুমিন ব্যথা পেলে অন্য মুমিনও তার ব্যথায় ব্যথিত হয়)।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘সুতরাং তোমরা তোমাদের ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে সন্ধি স্থাপন কর।' অর্থাৎ বিবাদমান দুই ভাইয়ের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দাও। আর সমস্ত কাজ-কর্মের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে চল। আর এটা এমন বিশেষণ যার কারণে তোমাদের উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হবে। যারা আল্লাহকে ভয় করে চলে তাদের সাথেই আল্লাহর রহমত থাকে।

আল-হুজুরাত 49:10

৯-১০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যদি মুসলমানদের দুই দল পরস্পর দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে অন্যান্য মুসলমানদের উচিত তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়া। পরস্পর বিবাদমান দু’টি দলকে মুমিনই বলা হয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন এটাকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে বলেন যে, কোন মুসলমান যত বড়ই নাফরমান হোক না কেন সে ঈমান হতে বের হয়ে যাবে না, যদিও খারেজী, মু'তাযিলা ইত্যাদি সম্প্রদায় এর বিপরীত মত পোষণ করে। নিম্নের হাদীসটিও এ আয়াতের পৃষ্ঠপোষকতা করেঃহযরত আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর ভাষণ দিচ্ছিলেন এবং তাঁর সাথে হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ)-ও মিম্বরের উপর ছিলেন। কখনো তিনি হযরত হাসান (রাঃ)-এর দিকে তাকাচ্ছিলেন এবং কখনো জনগণের দিকে দেখছিলেন। আর বলছিলেনঃ “আমার এ ছেলে (নাতী) নেতা এবং আল্লাহ তা'আলা এর মাধ্যমে মুসলমানদের বিরাট দু’টি দলের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দেবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে রূপায়িত হয়েছে। সিরিয়াবাসী ও ইরাকবাসীদের মধ্যে বড় বড় ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পর তাঁরই মাধ্যমে তাদের মধ্যে সন্ধি হয়। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি একদল অন্য দলের উপর বাড়াবাড়ি করে এবং তাদেরকে আক্রমণ করে বসে তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে অত্যাচারী হোক অথবা অত্যাচারিত হোক।” বর্ণনাকারী হযরত আনাস (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি সাহায্য করতে পারি অত্যাচারিতকে, কিন্তু আমি অত্যাচারীকে কিরূপে সাহায্য করতে পারি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “অত্যাচারীকে তুমি অত্যাচার করা হতে বাধা দিবে ও বিরত রাখবে, এটাই হবে তোমার তাকে সাহায্য করা।”হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী (সঃ)-কে বলা হয়ঃ “যদি আপনি আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর নিকট একবার যেতেন!” অতঃপর নবী (সঃ) গাধার উপর সওয়ার হয়ে চললেন এবং মুসলমানরাও তাঁর সাথে চলতে লাগলেন। যখন তারা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর নিকট পৌঁছেন তখন সে নবী (সঃ)-কে বলেঃ “আপনি আমা হতে দূরে থাকুন। আল্লাহর কসম! আপনার গাধার গন্ধ আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। তার একথা শুনে আনসারদের একজন লোক তাকে বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! তোমার গন্ধের চেয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গাধার গন্ধ বহুগুণে উত্তম ও পবিত্র।” তাঁর একথা শুনে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর কতক লোকে ভীষণ রেগে গেল এবং এরপর উভয় দলের প্রত্যেক লোকই রাগান্বিত হলো। অতঃপর অবস্থা এতদূর গরালো যে, তাদের মধ্যে হাতাহাতি ও জুতা মারামারি শুরু হয়ে গেল। তাদের ব্যাপারে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারীতেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কিছু ঝগড়া-বিবাদ হয়েছিল। তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়ার হুকুম এই আয়াতে রয়েছে।হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ইমরান নামক একজন আনসারী ছিলেন। তার স্ত্রীর নাম ছিল উম্মে যায়েদ। তিনি (তাঁর স্ত্রী) তার পিত্রালয়ে যেতে চান। কিন্তু তার স্বামী বাধা দেন এবং বলে দেন যে, তাঁর স্ত্রীর পিত্রালয়ের কোন লোক যেন তার বাড়ীতে না আসে। স্ত্রী তখন তাঁর পিত্রালয়ে এ খবর পাঠিয়ে দেন। খবর পেয়ে সেখান হতে লোক এসে উম্মে যায়েদকে বাড়ী হতে বের করে এবং সাথে করে নিয়ে যাবার ইচ্ছা করে। ঐ সময় তাঁর স্বামী বাড়ীতে ছিলেন না। তাঁর লোকে তার চাচাতো ভাইদেরকে খবর দেয়। খবর পেয়ে তারা দৌড়িয়ে আসে এবং স্ত্রীর লোক ও স্বামীর লোকদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায় এবং মারামারি ও জুতা ছুঁড়াছুঁড়িও হয়। তাদের ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উভয়পক্ষের লোকদেরকে ডেকে তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা দুই দলের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ায় ন্যায়-বিচারকারীরা পরম দয়ালু, মহিমান্বিত আল্লাহর সামনে মণি-মুক্তার আসনে উপবিষ্ট থাকবে, এটা হবে তাদের দুনিয়ায় ন্যায়-বিচার করার প্রতিদান।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “ন্যায়-বিচারকারীরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ডান দিকে নূরের আসনে উপবিষ্ট থাকবে। তারা তাদের হুকুমে, পরিবার পরিজনের মধ্যে এবং যা কিছু তাদের অধিকারে ছিল সবারই মধ্যে ন্যায়ের সাথে বিচার করতো।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।' অর্থাৎ মুমিনরা সবাই পরস্পর দ্বীনী ভাই। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ ততক্ষণ বান্দাকে সাহায্য করতে থাকেন যতক্ষণ বান্দা তার (মুমিন) ভাইকে সাহায্য করতে থাকে।” সহীহ হাদীসে আরো রয়েছেঃ যখন কোন মুসলমান তার (মুসলমান) ভাই এর অনুপস্থিতিতে তার জন্যে দুআ করে তখন ফেরেশতা তার দুআয় আমীন বলেন এবং বলেনঃ আল্লাহ তোমাকেও অনুরূপই প্রদান করুন।" এই ব্যাপারে আরো বহু সহীহ হাদীস রয়েছে। আরো সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “মুসলমানের পরিস্পরিক প্রেম-প্রীতি, দয়া-সহানুভূতি ও মিলামিশার দৃষ্টান্ত একটি দেহের মত। যখন কোন অঙ্গে ব্যথা হয় তখন গোটা দেহ ঐ ব্যথা অনুভব করে, সারা দেহে জ্বর এসে যায় এবং সারা দেহ জেগে থাকার (অর্থাৎ ঘুম না আসার) কষ্ট পায়।" অন্য সহীহ হাদীসে আছেঃ “এক মুমিন অপর মুমিনের জন্যে একটি দেয়ালের মত, যার একটি অংশ অপর অংশকে শক্ত ও দৃঢ় করে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার এক হাতের অঙ্গুলিগুলোকে অপর হাতের অঙ্গুলিগুলোর মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেখিয়ে দেন।হযরত সাহল ইবনে সা'দ সায়েদী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুমিনের ঈমানদারের সাথে ঐ সম্পর্ক রয়েছে, যে সম্পর্ক মাথার দেহের সাথে রয়েছে। মুমিন ঈমানদারের জন্যে ঐ ব্যথা অনুভব করে যে ব্যথা অনুভব করে দেহ মাথার জন্যে (অর্থাৎ মাথায় ব্যথা হলে যেমন দেহ তা অনুভব করে, অনুরূপভাবে এক মুমিন ব্যথা পেলে অন্য মুমিনও তার ব্যথায় ব্যথিত হয়)।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘সুতরাং তোমরা তোমাদের ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে সন্ধি স্থাপন কর।' অর্থাৎ বিবাদমান দুই ভাইয়ের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দাও। আর সমস্ত কাজ-কর্মের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে চল। আর এটা এমন বিশেষণ যার কারণে তোমাদের উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হবে। যারা আল্লাহকে ভয় করে চলে তাদের সাথেই আল্লাহর রহমত থাকে।

আল-হুজুরাত 49:11

আল্লাহ তা'আলা মানুষকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করতে এবং তাদেরকে ঠাট্টা-উপহাস করতে নিষেধ করেছেন। হাদীসে আছে যে, গর্ব-অহংকার হলো সত্য হতে বিমুখ হওয়া এবং মানুষকে ঘৃণ্য ও তুচ্ছ জ্ঞান করার নাম। আল্লাহ তা'আলা এর কারণ এই বর্ণনা করছেন যে, মানুষ যাকে লাঞ্ছিত-অপমানিত করছে এবং উপহাসের পাত্র মনে করছে সেই হয়তো আল্লাহ তা'আলার নিকট বেশী মর্যাদাবান। পুরুষকে এটা হতে নিষেধ করার পর পৃথকভাবে নারীদেরকে এটা হতে নিষেধ করছেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা একে অপরের দোষ অন্বেষণ করা এবং একে অপরকে দোষারোপ করা হারাম বলে ঘোষণা করছেন। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দুর্ভোগ প্রত্যেকের যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে।” (১০৪:১) (আরবী) হয় কাজ দ্বারা এবং হয় কথা দ্বারা। অন্য একটি আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরকে লাগিয়ে বেড়ায়।” (৬৮:১১) এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের নফসকে হত্যা করো না।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ) এবং হযরত মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তোমরা একে অপরকে বিদ্রুপ করো না।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো। অর্থাৎ তার এমন উপাধী বের করো না যা শুনতে সে অপছন্দ করে।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, এই হুকুম বানু সালমা গোত্রের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদীনায় আগমন করেন তখন তথাকারপ্রত্যেকটি লোকের দু’টি বা তিনটি করে নাম ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাউকেও যখন কোন একটি নাম ধরে ডাকতেন তখন লোকেরা বলতোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ নামে ডাকলে সে অসন্তুষ্ট হয়। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঈমানের পর মন্দ নামে ডাকা বড়ই গর্হিত কাজ। সুতরাং যারা এই ধরনের কাজ হতে নিবৃত্ত না হয় তারাই যালিম।

আল-হুজুরাত 49:12

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে কুধারণা পোষণ করা হতে, অপবাদ দেয়া হতে এবং পরিবার পরিজন এবং অপর লোকদের অন্তরে অযথা ভয় সৃষ্টি করা হতে নিষেধ করছেন। তিনি বলেছেন যে, অনেক সময় এরূপ ধারণা সম্পূর্ণ পাপের কারণ হয়ে থাকে। সুতরাং মানুষের এ ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “তোমার মুসলমান ভাই এর মুখ হতে যে কালেমা বের হয় তুমি যথা সম্ভব ওটার প্রতি ভাল ধারণাই পোষণ করবে।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি নবী (সঃ)-কে দেখেছি যে, তিনি কা'বা ঘরের তাওয়াফ করছেন এবং বলছেনঃ “তুমি কতই না পবিত্র ঘর! তোমার গন্ধ কতই না উত্তম! তুমি কতই না সম্মানিত! তুমি কতই না মর্যাদা সম্পন্ন! যার হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! মুমিনের মর্যাদা, তার জান ও মালের মর্যাদা এবং তার সম্পর্কে শুধুমাত্র ভাল ধারণা পোষণ করা হবে এই হিসেবে তার মর্যাদা আল্লাহ তাআলার নিকট তোমার মর্যাদার চেয়েও বেশী বড়।” (এ হাদীসটি আবু আবদিল্লাহ ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা কু-ধারণা হতে বেঁচে থাকো, কু-ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা। তোমরা কারো গোপন তথ্য সন্ধান করো না, একে অপরের বুযুর্গী লাভ করার চেষ্টায় লেগে থেকো না, হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করো না এবং সবাই মিলে তোমরা আল্লাহর বান্দারা ভাই ভাই হয়ে যাও।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা একে অপরের সাথে মতবিরোধ করো না, একে অপরের সাথে মেলামেশা পরিত্যাগ করো না, একে অপরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করো, বরং আল্লাহর বান্দারা সবাই মিলে ভাই ভাই হয়ে যাও। কোন মুসলমানের জন্যে এটা বৈধ নয় যে, সে তার মুসলমান ভাইএর সাথে তিন দিনের বেশী কথাবার্তা বলা ও মেলামেশা করা পরিত্যাগ করে। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে সহীহ বলেছেন)হযরত হারেসাহ ইবনে নু'মান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিনটি অভ্যাস আমার উম্মতের মধ্যে অবশ্যই থাকবে। (এক) লক্ষণ দেখে শুভাশুভ নির্ণয় করা, (দুই) হিংসা করা এবং (তিন) কু-ধারণা পোষণ করা।” একটি লোক জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এর সংশোধন কিরূপে হতে পারে? উত্তরে তিনি বলেনঃ “হিংসা করলে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, কু-ধারণা পোষণ করলে তা ছেড়ে দিবে এবং লক্ষণ দেখে যখন শুভাশুভ নির্ণয় করবে তখন স্বীয় কাজ হতে বিরত থাকবে না, বরং সেই কাজ পুরো করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোককে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট আনয়ন করা হয় এবং তাকে বলা হয়ঃ “এটা অমুক। ব্যক্তি, এর দাড়ি হতে মদ্যের ফোটা পড়তে রয়েছে।” তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেনঃ “আমাদের কারো গোপন বিষয় সন্ধান করতে নিষেধ করা হয়েছে। যদি আমাদের সামনে কারো কোন বিষয় প্রকাশ হয়ে পড়ে তবে আমরা তাকে ঐ জন্যে পাকড়াও করতে পারি।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বর্ণিত আছে যে, উকবার লেখক দাজীন (রাঃ)-এর নিকট হযরত আবুল হায়সাম (রঃ) গেলেন এবং তাঁকে বললেনঃ “আমার প্রতিবেশীদের কতক মদ্যপায়ী রয়েছে। আমার মনে হচ্ছে যে, আমি পুলিশ ডেকে তাদেরকে ধরিয়ে দিই।” হযরত দাজীন (রাঃ) বললেনঃ “না, না, এ কাজ করো না, বরং তাদেরকে বুঝাও, উপদেশ দাও। আর তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করতে থাকো।” কিছুদিন পর হযরত আবুল হায়সাম (রঃ) হযরত দাজীন (রাঃ)-এর নিকট আবার আসলেন এবং তাঁকে বললেনঃ “আমি কোনক্রমেই তাদেরকে মদ্যপান হতে বিরত রাখতে পারলাম না। সুতরাং এখন অবশ্যই আমি পুলিশকে ডেকে এনে তাদেরকে ধরিয়ে দিবো।” হযরত দাজীন (রাঃ) বললেন, আমি তোমাকে এ কাজ না করতে অনুরোধ করছি। জেনে রেখো যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ গোপন করে রাখে সে এতো বেশী পুণ্য লাভ করে যে, সে যেন কোন জীবন্ত প্রোথিতকৃতা মেয়েকে বাঁচিয়ে নিলো।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যখন তুমি জনগণের গোপন দোষের সন্ধানে লেগে পড়বে তখন তুমি তাদেরকে প্রায় বিনষ্ট করে ফেলবে।” তখন হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেনঃ “হযরত মুআবিয়া (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে যে কথাটি শুনেছেন তার দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাঁর উপকার সাধন করেছেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আমীর বা বাদশাহ যখন নিজের অধীনস্থ লোকদের গোপন দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করতে থাকে তখন সে যেন তাদেরকে বিনষ্টই করে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আবূ দাঊদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা একে অপরের গোপন মহান আল্লাহ বলেনঃ বিষয় সন্ধান করো না।”(আরবী) শব্দের প্রয়োগ সাধারণতঃ মন্দের উপরই হয়ে থাকে। আর (আরবী)-এর প্রয়োগ হয় ভাল কিছু সন্ধানের উপর। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, তিনি তার সন্তানদেরকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার পুত্রগণ! তোমরা যাও, ইউসুফ ও তার সহদরের (সহদর ভাই-এর) অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহর আশিস হতে তোমরা নিরাশ হয়ো না।” (১২:৮৭) আবার কখনো কখনো এ দুটো শব্দেরই প্রয়োগ মন্দের উপর হয়ে থাকে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না, একে অপরের প্রতিহিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরকে দেখে মুখ বাঁকিয়ে চলো না এবং তোমরা আল্লাহর বান্দারা সব ভাই ভাই হয়ে যাও।”ইমাম আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, (আরবী) বলা হয় কোন বিষয়ে খোঁজ নেয়াকে। আর (আরবী) বলা হয় ঐ লোকদের কানা-ঘুষার উপর কান লাগিয়ে দেয়াকে যারা কাউকেও নিজেদের কথা গোপনে শুনাতে চায় এবং (আরবী) বলা হয় একে অপরের উপর বিরক্ত হয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করাকে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা গীবত করতে নিষেধ করছেন।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গীবত কি?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “গীবত হলো এই যে, তুমি তোমার (মুসলমান) ভাইএর অসাক্ষাতে তার সম্বন্ধে এমন কিছু আলোচনা করবে যা সে অপছন্দ করে। আবার প্রশ্ন করা হয়ঃ “তার সম্বন্ধে যা আলোচনা করা হয় তা যদি তার মধ্যে বাস্তবে থাকে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “হ্যাঁ, গীবত তো এটাই। আর যদি বাস্তবে ঐ দোষ তার মধ্যে না থাকে তবে ওটা তো অপবাদ।" (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “সুফিয়া (রাঃ) তো এরূপ এরূপ অর্থাৎ বেঁটে!” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তুমি এমন কথা বললে যে, যদি তা সমুদ্রের পানিতে মিলানো যায় তবে সমুদ্রের সমস্ত পানিকে নষ্ট করে দিবে।" হযরত আয়েশা (রাঃ) অন্য একটি লোক সম্বন্ধে এই ধরনের কথা বললে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি এটা শুনতে পছন্দ করি না যদিও এতে আমার বড় লাভ হয়।” (ইমাম আবু দাউদই (রঃ) এ হাদীসটিও বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসসান ইবনে মাখরিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা একটি মহিলা হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে। যখন সে ফিরে যেতে উদ্যতা হয় তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) মহিলাটির দিকে ইঙ্গিত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “মহিলাটি খুবই বেঁটে।" রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে বললেনঃ “তুমি তার গীবত করলে?” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মোটকথা, গীবত হারাম বা অবৈধ এবং এর অবৈধতার উপর মুসলমানদের ইজমা হয়েছে। হ্যাঁ, তবে শরীয়তের যৌক্তিকতায় কারো এ ধরনের কথা আলোচনা করা গীবতের অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন সতর্ককরণ, উপদেশ দান এবং মঙ্গল কামনাকরণ। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) একজন পাপাচারী লোকের সম্পর্কে বলেছিলেনঃ “তাকে তোমরা আমার কাছে আসার অনুমতি দাও, তবে সে তার গোত্রের মধ্যে বড় মন্দ লোক।” যেমন তিনি আরো বলেছিলেনঃ “মুআবিয়া দরিদ্র লোক, আর আবুল জাহম বড়ই প্রহারকারী ব্যক্তি।” একথা তিনি ঐ সময় বলেছিলেন যখন তাঁরা দু’জন হযরত ফাতিমা বিনতে কায়েস (রাঃ)-কে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আরো এ ধরনের ব্যাপারে এর অনুমতি রয়েছে। বাকী অন্যান্য সর্বক্ষেত্রেই গীবত হারাম ও কবীরা গুনাহ। এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভ্রাতার গোশত ভক্ষণ করতে চাইবে?' অর্থাৎ তোমরা তোমাদের মৃত ভাই-এর গোশত খেতে যেমন ঘৃণাবোধ কর, গীবতকে এর চেয়েও বেশী ঘৃণা করা তোমাদের উচিত। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে কোন কিছু দান করার পর তা ফিরিয়ে নেয় সে ঐ কুকুরের মত যে বমি করার পর পুনরায় তা ভক্ষণ করে।" আরো বলেনঃ “খারাপ দৃষ্টান্ত আমাদের জন্যে সমীচীন নয়।” বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের মান-মর্যাদা তোমাদের উপর এমনই পবিত্র যেমন পবিত্র তোমাদের এই দিনটি, এই মাসটি ও এই শহরটি।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক মুসলমানের উপর প্রত্যেক মুসলমানের মাল, মান-সম্মান ও রক্ত হারাম (অর্থাৎ মাল আত্মসাৎ করা, মান-সম্মান হানী করা এবং খুন করা হারাম)। মানুষের মন্দ হওয়ার জন্যে এটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার অন্য মুসলমান ভাইকে ঘৃণা করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আবূ দাঊদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু বুরদা আল বালভী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ হে ঐ লোকের দল! যারা শুধু মুখে ঈমান এনেছো, কিন্তু অন্তরে ঈমান রাখখানি, তোমরা মুসলমানদের গীবত করা ছেড়ে দাও, তাদের গোপন দোষ অনুসন্ধান করো না। যদি তোমরা তাদের গোপন দোষ অনুসন্ধান কর এবং ওগুলোর পিছনে লেগে থাকে, তবে আল্লাহ তাআলা তোমাদের গোপন দোষ প্রকাশ করে দিবেন, এমন কি তোমরা তোমাদের পরিবার পরিজনদের কাছেও মন্দ লোক বলে বিবেচিত হবে এবং লজ্জিত হবে।” (এহাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা ভাষণদান করেন, যা পর্দানশীন মহিলাদের কর্ণকুহরেও পৌঁছে। এই ভাষণে তিনি উপরে বর্ণিত হাদীসটি বর্ণনা করেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আবি ইয়ালায় বর্ণিত হয়েছে)একদা হযরত ইবনে উমার (রাঃ) কাবার দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “তোমার পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলে শেষ করা যায় না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার নিকট একজন মুমিন মানুষের মর্যাদা, পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব তোমার চেয়েও বেশী।” হযরত মিসওয়ার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের ক্ষতিসাধন করে এর বিনিময়ে এক গ্রাস খাদ্য লাভ করবে, (কিয়ামতের দিন) তাকে আল্লাহ তা'আলা জাহান্নাম হতে ঐ পরিমাণ খাদ্য খাওয়াবেন। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের ক্ষতিসাধন করে ওর বিনিময়ে পোশাক লাভ করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ঐ পরিমাণ জাহান্নামের পোশাক পরাবেন। যে ব্যক্তি কোন লোকের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাবার ও শুনাবার জন্যে দাড়াবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখাবার শুনাবার জায়গায় দাড় করবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মিরাজের রাত্রে আমি দেখি যে, কতকগুলো লোকের তামার নখ রয়েছে, ঐগুলো দিয়ে তারা নিজেদের চেহারা নুচতে রয়েছে। আমি হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ এরা কারা? উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “এরা ওরাই যারা লোকদের গোশত খেতো (অর্থাৎ গীবতকরতো)।” (এ হাদীসটিও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি মিরাজের রাত্রিতে যা দেখেছিলেন তা আমাদের নিকট বর্ণনা করুন। তিনি বললেনঃ “জিবরাঈল (আঃ) আমাকে বহু লোকের সমাবেশের, পার্শ্ব দিয়ে নিয়ে গেলেন যাদের মধ্যে পুরুষও ছিল এবং নারীও ছিল। ফেরেশতারা তাদের পার্শ্বদেশের গোশত কেটে নিচ্ছেন, অতঃপর তাদেরকে তা খেতে বাধ্য করছেন। তারা তা চিবাতে রয়েছে। আমি তাদের সম্পর্কে প্রশ্ন করলে হযরত জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বলেনঃ “এরা হলো ঐ সব লোক যারা ছিল তিরস্কারকারী, গীবতকারী এবং চুগলখোর। আজ তাদেরকে তাদের নিজেদেরই গোশত খাওয়ানো হচ্ছে। [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ)] এটা খুবই দীর্ঘ হাদীস এবং আমরা পূর্ণ হাদীসটি সূরায়ে সুবহান বা বানী ইসরাঈলের তাফসীরেও বর্ণনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই প্রাপ্য। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে রোযা রাখার নির্দেশ দেন এবং বলেনঃ “আমি না বলা পর্যন্ত কেউ যেন ইফতার না করে। সন্ধ্যার সময় জনগণ এক এক করে আসতে থাকে এবং তার নিকট ইফতার করার অনুমতি প্রার্থনা করে। তিনি প্রত্যেককে অনুমতি দেন এবং তারা প্রত্যেকে ইফতার করে। ইতিমধ্যে একজন লোক এসে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দু’জন স্ত্রীলোকও রোযা রেখেছিল যারা আপনার পরিবারেরই মহিলা। সুতরাং তাদেরকে আপনি ইফতার করার অনুমতি দিন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন লোকটির দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। লোকটি দ্বিতীয়বার আর করলো। তখন তিনি বললেনঃ “তারা রোযা রাখেনি। যারা মানুষের গোশত খায় তারা কি রোযাদার হতে পারে? যাও, তাদেরকে বলো, যদি তারা রোযা রেখে থাকে তবে যেন বমি করে ফেলে দেয়।” সুতরাং তারা বমি করলো যার ফলে রক্তপিণ্ড বের হয়ে পড়লো। লোকটি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ সংবাদ দিলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যদি তারা ঐ অবস্থাতেই মারা যেতো তবে অবশ্যই তারা জাহান্নামের গ্রাস হয়ে যেতো। (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ তায়ালেসী (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর সনদও দুর্বল এবং মতনও গারীব)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ঐ লোকটি বলেছিলঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মহিলা দু’টির অবস্থা রোযার কারণে খুবই শোচনীয় হয়ে গেছে। পিপাসায় তারা অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েছে।” ওটা ছিল দুপুর বেলা। তার কথায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব থাকলেন। লোকটি পুনরায় বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মহিলাদ্বয়ের অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে যে, অল্পক্ষণের মধ্যে হয়তো তারা মারাই যাবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তাদেরকে ডেকে নিয়ে এসো।” তারা আসলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের একজনের সামনে দুধের একটি পেয়ালা রেখে বললেনঃ “এতে বমি কর।” সে বমি করলে তার মুখ দিয়ে পূজ, জমাট বৃক্ত ইত্যাদি বের হয়ে আসলো। তাতে পেয়ালাটির অর্ধেক ভর্তি হলো। অতঃপর অপর মহিলাটির সামনে পেয়ালাটি রেখে তাতে তাকেও বমি করতে বললেন। সে বমি করলে তার মুখ দিয়েও উপরোক্তে জিনিসগুলো এবং গোশতের টুকরা ইত্যাদি বের হলো। এখন পেয়ালাটি এসব জিনিসে সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ হয়ে গেল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “মহিলা দু’টিকে তোমরা দেখো, তারা এমন জিনিস দ্বারা রোযা রেখেছিল যা আল্লাহ তাদের জন্যে হালাল করেছেন, আর তারা এমন জিনিস দিয়ে ইফতার করেছে যা আল্লাহ তাদের উপর হারাম করেছেন। তারা দুজনে বসে মানুষের গোশত খাচ্ছিল (অর্থাৎ গীবত করছিল)।”হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মায়েয (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি ব্যভিচার করে ফেলেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এমনকি হযরত মায়েয (রাঃ) চারবার একথার পুনরাবৃত্তি করলেন। পঞ্চমবারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি কি সত্যিই ব্যভিচার করেছো?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “জ্বী, হা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) পুনরায় তাঁকে প্রশ্ন করলেনঃ “ব্যভিচার কাকে বলে তা তুমি জান কি?” জবাবে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, মানুষ তার হালাল স্ত্রীর সাথে যা করে আমি হারাম স্ত্রীলোকের সাথে ঠিক তাই করেছি।” রাসূলুল্লাহ প্রশ্ন করলেনঃ “এখন তোমার উদ্দেশ্য কি?” “আমার উদ্দেশ্য এই যে, আমাকে আপনি এই গুনাহ হতে পবিত্র করবেন।” জবাব দিলেন তিনি। “তুমি কি তোমার গুপ্তাঙ্গকে এরূপভাবে প্রবেশ করিয়েছিলে যেরূপভাবে শলাকা সুরমাদানীর মধ্যে এবং কাষ্ঠ কুঁয়ার মধ্যে প্রবেশ করে?” প্রশ্ন করলেন তিনি। “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হ্যাঁ এই ভাবেই।” তিনি উত্তর দিলেন। তখন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে রজম করার অর্থাৎ অর্ধেক পুঁতে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করার নির্দেশ দেন এবং এভাবেই তাঁকে হত্যা করা হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) দু'টি লোককে পরস্পর বলাবলি করতে শুনলেনঃ “এ লোকটিকে দেখো, আল্লাহ তার দোষ গোপন করে রেখেছিলেন, কিন্তু সে নিজেই নিজেকে ছাড়লো না, ফলে কুকুরের মত তাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা হলো।" রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে চলতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি দেখলেন যে, পথে একটি মৃত গাধা পড়ে রয়েছে। তিনি বললেনঃ “অমুক অমুক কোথায়?" তারা আসলে তিনি বললেনঃ “তোমরা সওয়ারী হতে অবতরণ কর এবং এই মৃত গাধার গোশত ভক্ষণ কর।" তারা বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, এটা কি খাওয়ার যোগ্য?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “তোমরা তোমাদের (মুসলমান) ভাই এর যে দোষ বর্ণনা করছিলে ওটা এর চেয়েও জঘন্য ছিল। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! সে (অর্থাৎ হযরত মায়েয রাঃ) তো এখন জান্নাতের নদীতে সাঁতার দিচ্ছে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটির ইসনাদ বিশুদ্ধ)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা নবী (সঃ)-এর সাথে (সফরে) ছিলাম এমন সময় মৃত সড়া-পচা দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস বইতে শুরু করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “এটা কিসের দুর্গন্ধ তা তোমরা জান কি?” এটা হলো ঐ লোকদের দুর্গন্ধ যারা মানুষের গীবত করে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা একবার এক সফরে নবী (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। হঠাৎ দুর্গন্ধময় বাতাস বইতে শুরু করে। তখন নবী (সঃ) বললেনঃ “এটা হলো মুনাফিকদের দুর্গন্ধ যারা মুসলমানদের গীবত করে ?" (এ হাদীসটি হযরত আবদ ইবনে হুমায়েদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত সুদ্দী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, এক সফরে হযরত সালমান (রাঃ) দুজন লোকের সঙ্গে ছিলেন যাদের তিনি খিদমত করতেন। তারা তাকে খেতে দিতেন। একবার হযরত সালমান (রাঃ) শুয়ে পড়েছিলেন, ইতিমধ্যে যাত্রীদল তথা হতে প্রস্থান করেন। পরবর্তী বিশ্রামস্থলে পৌঁছে ঐ দুই ব্যক্তি দেখেন যে, হযরত সালমান (রাঃ) আসেননি। কাজেই বাধ্য হয়ে তাদেরকে নিজেদের হাতেই তাঁবু খাটাতে হয়। তাই তাঁরা রাগান্বিত হয়ে বলেনঃ “সালমান (রাঃ)-এর কাজতো এটাই যে, অপরের রান্নাকৃত খাবার খাবে এবং অপরের খাটানো তাবুতে বিশ্রাম করবে (অর্থাৎ নিজে কিছুই করবে না)।” কিছুক্ষণ পর হযরত সালমান (রাঃ) আসলেন। ঐ দুই ব্যক্তির নিকট তরকারী ছিল না। সুতরাং তারা তাকে বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তুমি আমাদের জন্যে কিছু তরকারী নিয়ে এসো।” তিনি গেলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! আমার সঙ্গীদ্বয় আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। যদি আপনার কাছে তরকারী থাকে তবে আমাকে দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ ‘তারা তরকারী কি করবে? তারা তরকারী তো পেয়েই গেছে।” হযরত সালমান (রাঃ) ফিরে গেলেন এবং গিয়ে সঙ্গীদ্বয়কে ঐ কথা বললেন। তাঁরা উঠে তখন নিজেরাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হাযির হলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের কাছে তো তরকারী নেই এবং আপনি তা পাঠানওনি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে বললেনঃ “তোমরা তো সালমান (রাঃ)-এর গোশতের তরকারী খেয়েছো, যেহেতু তোমরা তার সম্পর্কে এরূপ এরূপ কথা বলেছে।” ঐ সময় (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (আরবী) বলার কারণ এই যে, ঐ সময় হযরত সালমান (রাঃ) ঘুমিয়ে ছিলেন, আর তাঁর সঙ্গীদ্বয় তাঁর গীবত করছিলেন। হাফিয যিয়াউল মুকাদ্দাসী (রঃ) স্বীয় মুখতার' নামক গ্রন্থে প্রায় এ ধরনেরই একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন এবং ওটা হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর ঘটনা। তাতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “তোমাদের ঐ খাদেমের গোশত আমি তোমাদের দাঁতে লেগে থাকতে দেখছি।” তাঁদের গোলামটি তাদের খাদ্য রান্না করেই ঘুমিয়েছিল এমতাবস্থায় তার সম্পর্কে তাঁদের শুধু এটুকু বলা বর্ণিত আছেঃ “এ তো দেখি খুবই ঘুমাতে পারে?” তাঁরা দু’জন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করুন!” তিনি তখন তাঁদেরকে বলেনঃ “তোমরা তাকেই (গোলামকেই) তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বল। সেই তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।”হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি দুনিয়ায় তার (মুসলিম) ভাই এর গোশত খেয়েছে (অর্থাৎ তার গীবত করেছে), কিয়ামতের দিন ঐ গোশত তার সামনে আনয়ন করা হবে এবং তাকে বলা হবেঃ “যেমন তুমি তার জীবিতাবস্থায় তার গোশত খেয়েছিলে তেমনই এখন মৃত অবস্থায়ও তার গোশত ভক্ষণ কর।” সে তখন ভীষণ চীৎকার ও হায় হায় করবে। তাকে জোরপূর্বক ঐ গোশত ভক্ষণ করানো হবে।” (এটা হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা খুবই দুর্বল রিওয়াইয়াত)এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর।' অর্থাৎ তাঁকে ভয় করে তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চল এবং তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়। তাওবাকারীর তাওবা আল্লাহ কবুল করে থাকেন। যে তার দিকে ফিরে আসে এবং তার উপর নির্ভরশীল হয়, তিনি তার উপর দয়া করেন। যেহেতু তিনি তাওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু। জমহুর উলামা বলেনঃ গীবতকারীর তাওবার পন্থা এই যে, সে ঐ অভ্যাস পরিত্যাগ করবে এবং আর কখনো ঐ পাপ করবে না।পূর্বে যা করেছে ওর উপরও লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া শর্ত কিনা এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। যার গীবত করেছে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া শর্ত কি না এ ব্যাপারেও মতানৈক্য আছে। কেউ কেউ বলেন যে, এটাও শর্ত নয়। কারণ হয় ততা সে কোন খবরই রাখে না। সুতরাং যখন সে তার কাছে ক্ষমা চাইতে যাবে তখন সে হয় তো দুঃখিত হবে। সুতরাং এর উৎকৃষ্ট পন্থা এই যে, যে মজলিসে তার দোষ সে বর্ণনা করতো সেই মজলিসে তার গুণ বর্ণনা করবে। আর ঐ অন্যায় হতে সে যথাসাধ্য নিজেকে বিরত রাখবে। এটাই বিনিময় হয়ে যাবে।হযরত আনাস জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন মুমিনের সহায়তা করে এমন অবস্থায় যে, কোন মুনাফিক তার দুর্নাম করছে, আল্লাহ তখন একজন ফেরেশতাকে নিযুক্ত করে দেন যিনি কিয়ামতের দিন তার (দেহের) গোশতকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা করবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুমিনের উপর কোন অপবাদ দিবে এবং এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হয় শুধু তাকে কলংকিত করা, আল্লাহ তা'আলা তাকে পুলসিরাতের উপর আটক করে দিবেন, যে পর্যন্ত না প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ ও সুনানে আবি দাউদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) এবং হযরত আবু তালহা ইবনে সাহল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন মুমিনের বে-ইযযতী করে এমন জায়গায় যেখানে তার মানহানী করা হয়, তাকে আল্লাহ তা'আলা এমন জায়গায় অপমানিত করবেন যেখানে সে তার সাহায্যের প্রত্যাশী। আর যে ব্যক্তি এরূপ স্থলে তার (মুসলিম) ভাই এর সহায়তা করবে, আল্লাহ তা'আলাও এরূপ জায়গায় তাকে সাহায্য করবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-হুজুরাত 49:13

আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, তিনি সমস্ত মানুষকে একটি মাত্র প্রাণ হতে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ হযরত আদম (আঃ) হতে। হযরত আদম (আঃ) হতেই তিনি তাঁর স্ত্রী হযরত হাওয়া (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর এ দু’জন হতে তিনি সমস্ত মানুষ ভূ-পৃষ্ঠে ছড়িয়ে দিয়েছেন। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দ হতে (আরবী) বা সাধারণ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে, আরব (আরবী)-এর অন্তর্ভুক্ত। তারপর কুরায়েশ, গায়ের কুরায়েশ, এরপর আবার এটা বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হওয়া এসবগুলো (আরবী)-এর মধ্যে পড়ে। কেউ কেউ বলেন যে, (আরবী) দ্বারা অনারব এবং (আরবী) দ্বারা আরব দলগুলোকে বুঝানো হয়েছে। যেমন বানী ইসরাঈলকে (আরবী) বলা হয়েছে। আমি এসব বিষয় একটি পৃথক ভূমিকায় লিখে দিয়েছি, যেগুলো আমি আবূ উমার ইবনে আবদিল বারর (রঃ)-এর কিতাবুল ইশবাহ' হতে এবং ‘কিতাবুল ফাসদ ওয়াল উমাম ফী মা'রেফাতে আনসাবিল আরাবে ওয়াল আজামে’ হতে সগ্রহ করেছি। এই পবিত্র আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, হযরত আদম (আঃ) যাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে, তার দিকে সম্পর্কিত হওয়ার দিক দিয়ে সারা জাহানের মানুষ একই মর্যাদা বিশিষ্ট। এখন যিনি যা কিছু ফযীলত লাভ করেছেন বা করবেন তা হবে দ্বীনি কাজকর্ম এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের ভিত্তিতে। রহস্য এটাই যে, এই আয়াতটিকে গীবত হতে বিরত রাখা এবং একে অপরকে অপদস্থ, অপমানিত এবং তুচ্ছ ও ঘৃণিত জ্ঞান করা হতে নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত আয়াতের পরে আনয়ন করা হয়েছে যে, সমস্ত মানুষ সৃষ্টি সম্পর্কের দিক দিয়ে সমান। জাতি, গোত্র ইত্যাদি শুধু পারস্পরিক পরিচয়ের জন্যে। যেমন বলা হয়ঃ অমুকের পুত্র অমুক, অমুক গোত্রের লোক। আসলে মানুষ হিসেবে সবাই সমান। হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, হুমায়ের গোত্র তাদের মিত্রদের দিকে সম্পর্কিত হতো এবং হিজাযী আরব নিজেদেরকে নিজেদের গোত্রসমূহের দিকে সম্পর্কযুক্ত করতো।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা নসবনামা বা বংশ তালিকার জ্ঞান লাভ কর, যাতে তোমরা আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখতে পার। আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখার কারণে জনগণ তোমাদেরকে মহব্বত করবে এবং তোমাদের ধন-মাল ও জীবন-আয়ুতে বরকত হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এই সনদে এ হাদীসটি গারীব)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আল্লাহ তাআলার নিকট বংশ গরিমা মর্যাদা লাভের কোন কারণ নয়, বরং) আল্লাহ তাআলার নিকট তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই অধিক মর্যাদা সম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী বা আল্লাহভীরু।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “সর্বাধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি কে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যে সর্বাধিক আল্লাহভীরু (সেই সর্বাধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি)।” সাহাবীগণ (রাঃ) বললেনঃ “আমরা আপনাকে এটা জিজ্ঞেস করিনি।” তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাবান ছিলেন হযরত ইউসুফ (আঃ)। তিনি নিজে আল্লাহর নবী ছিলেন, আল্লাহর নবীর তিনি পুত্র ছিলেন, তাঁর দাদাও ছিলেন নবী এবং তাঁর দাদার পিতা তো ছিলেন হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ)।” তাঁরা পুনরায় বললেনঃ “আমরা আপনাকে এটাও জিজ্ঞেস করিনি।' তিনি বললেনঃ “তাহলে কি তোমরা আমাকে আরবদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছো?” তাঁরা জবাবে বললেনঃ “হ্যাঁ।” তিনি তখন বললেনঃ “অজ্ঞতার যুগে তোমাদের মধ্যে যারা উত্তম ছিল, ইসলামেও তারাই উত্তম হবে যখন তারা দ্বীনের বোধশক্তি লাভ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তোমাদের আকৃতির দিকে দেখেন না এবং তোমাদের ধন-মালের দিকেও দেখেন না, বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তরের দিকে ও তোমাদের আমলের দিকে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তুমি মনে রেখো যে, তুমি লাল ও কালোর কারণে কোন মর্যাদা রাখে না। হ্যাঁ, তবে তুমি মর্যাদা লাভ করতে পার আল্লাহভীরুতার মাধ্যমে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত খারাশ আল আসরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “মুসলমানরা সবাই পরস্পর ভাই ভাই। কারো উপর কারো কোন ফযীলত নেই, শুধু তাকওয়ার মাধ্যমে ফযীলত রয়েছে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসেম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা সবাই আদম সন্তান, আর আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি দ্বারা। (মানব) সম্প্রদায় যেন তাদের বাপ-দাদাদের নামের উপর গৌরব প্রকাশ করা হতে বিরত থাকে, নতুবা তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট বালুর ঢিবি অথবা আবী পাখি হতেও হালকা হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি আবু বকর আল বাযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন তাঁর কাসওয়া নামক উষ্ট্রীর উপর সওয়ার হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করেন। তাঁর হাতের ছড়ি দ্বারা তিনি রুকনগুলো চুম্বন করেন। অতঃপর মসজিদে উষ্ট্ৰীটিকে বসাবার মত জায়গা ছিল না বলে জনগণ তাকে হাতে হাতে নামিয়ে নেন এবং উজ্জ্বীটিকে বাতনে সায়েলে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দেন। অতঃপর তিনি স্বীয় উষ্ট্রীর উপর সওয়ার হয়ে জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন যাতে আল্লাহ তা'আলার হামদ ও সানা বর্ণনা করার পর তিনি বলেনঃ “এখন আল্লাহ তা'আলা তোমাদের হতে অজ্ঞতার যুগের উপকরণসমূহ এবং বাপ দাদার নামে গর্ব করার প্রথা দূর করে দিয়েছেন। দুই শ্রেণীর মানুষ রয়েছে। এক শ্রেণীর মানুষ তো নেককার, পরহেযগার এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট উচ্চ মর্যাদার অধিকারী, আর দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ বদকার এবং আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিতে লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত।” অতঃপর তিনি (আরবী) এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আমি আমার এ কথা বলছি এবং আমি আমার জন্যে ও তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উকবা ইবনে আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের এই নসবনামা বা বংশ-তালিকা তোমাদের জন্যে কোন ফলদায়ক নয়। তোমরা সবাই সমভাবে হযরত আদম (আঃ)-এরই সন্তান। তোমাদের কারো উপর কারো কোন মর্যাদা নেই। মর্যাদা শুধু তাকওয়ার কারণে রয়েছে। মানুষের মন্দ হওয়ার জন্যে এটাই যথেষ্ট যে, সে হবে কর্কশ ভাষী, কৃপণ ও অকথ্যভাবে উচ্চারণকারী।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তোমাদের বংশাবলী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদা সম্পন্ন যে অধিক আল্লাহভীরু।হযরত দুররাহ বিনতে আবি লাহাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা মিম্বরের উপর ছিলেন এমন সময় একটি লোক জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর নিকট সবচেয়ে উত্তম লোক কে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “যে সবচেয়ে বেশী অতিথি সেবক, সর্বাপেক্ষা বেশী পরহেযগার, সবচেয়ে বেশী ভাল কাজের আদেশদাতা, সর্বাপেক্ষা অধিক মন্দ কাজ হতে নিষেধকারী এবং সবচেয়ে বেশী আত্মীয়তার সম্পর্ক মিলিতকারী (সেই সর্বাপেক্ষা উত্তম লোক)।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহকে ভয় করে এরূপ লোক ছাড়া দুনিয়ার কোন জিনিস এবং কোন লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কখনো মুগ্ধ করতো না।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদের সম্পর্কে সবকিছু জানেন এবং তোমাদের সমস্ত কাজ-কর্মের খবর রাখেন।' হিদায়াত লাভের যে যোগ্য তাকে তিনি হিদায়াত দান করে থাকেন এবং যে এর যোগ্য নয় সে সুপথ প্রাপ্ত হয় না। করুণা ও শাস্তি আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। ফযীলত বা মর্যাদা তাঁরই হাতে। তিনি যাকে চান তাকে বুযুর্গী দান করে থাকেন। সমস্ত বিষয়ের খবর তিনি রাখেন। কিছুই তার জ্ঞান বহির্ভূত নয়। এই আয়াত এবং উপরে বর্ণিত হাদীসগুলোকে দলীল রূপে গ্রহণ করে আলেমগণ বলেন যে, বিবাহে বংশ ও আভিজাত্য শর্ত নয়। দ্বীন ছাড়া অন্য কোন শর্তই ধর্তব্য নয়। কোন কোন আলেমের মতে বংশ ও আভিজাত্যের বিচার বিবেচনা করাও শর্ত। এঁদের অন্য দলীল রয়েছে, যা ইলমে ফিকাহর কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। আর আমরাও এগুলোকে কিতাবুল আহকামে বর্ণনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই প্রাপ্য। হযরত আবদুর রহমান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বানু হাশেম গোত্রের একটি লোককে তিনি বলতে শুনেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আমিই সবচেয়ে বেশী সম্পর্কযুক্ত। তখন আর একটি লোকে বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে তোমার যে সম্পর্ক রয়েছে তদপেক্ষা বেশী সম্পর্ক তার সাথে আমার রয়েছে।” (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-হুজুরাত 49:14

১৪-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: যেসব আরব বেদুঈন ইসলামে দাখিল হওয়া মাত্রই বাড়িয়ে-চাড়িয়ে নিজেদের ঈমানের দাবী করতে শুরু করেছিল, অথচ প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে ঈমান দৃঢ় হয়নি তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা এই দাবী করতে নিষেধ করছেন। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, যেহেতু ঈমান তাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রবেশ করেনি সেই হেতু তারা ঈমান এনেছে একথা যেন না বলে, বরং যেন বলে যে, তারা ইসলামের গণ্ডীর মধ্যে এসেছে এবং নবী (সঃ)-এর অনুগত হয়েছে।এ আয়াত দ্বারা এটা জানা গেল যে, ঈমান ইসলাম হতে মাখসূস বা বিশিষ্ট, যেমন এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাযহাব। হযরত জিবরাঈল (আঃ) যুক্ত হাদীসটিও এটাই প্রমাণ করে। তিনি (হযরত জিবরাইল আঃ) ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন এবং পরে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করেন ইহসান সম্পর্কে। সুতরাং সাধারণ হতে ক্রমান্বয়ে বিশিষ্টের দিকে উঠে যান। তারপর উঠে যান আরো খাস বা বিশিষ্টের দিকে। হযরত সা'দ ইবনে আবি অক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কতগুলো লোককে (দানের মাল হতে) প্রদান করলেন এবং একটি লোককে কিছুই দিলেন না। তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি অমুক, অমুককে দিলেন আর অমুককে দিলেন না, অথচ সে মুমিন?" একথা তিনি তিনবার বললেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “অথবা সে মুসলিম?" এই জবাবই তিনিও তিনবার দিলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “নিশ্চয়ই আমি কতক লোককে প্রদান করি এবং তাদের মধ্যে আমার নিকট যে খুবই প্রিয় তাকে ছেড়ে দিই, কিছুই দিই না এই ভয়ে যে, (যাদেরকে প্রদান করি তাদেরকে প্রদান না করলে) তারা (হয়তো ইসলাম পরিত্যাগ করবে এবং এর ফলে) উল্টো মুখে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাদের নিজ নিজ সহীহ গ্রন্থে তাখরীজ করেছেন) সুতরাং এ হাদীসেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুমিন ও মুসলিমের মধ্যে পার্থক্য করলেন এবং জানা গেল যে, ইসলামের তুলনায় ঈমান অধিক খাস বা বিশিষ্ট। আমরা এটাকে দলীল প্রমাণাদিসহ সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমানের শরাহতে বর্ণনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই প্রাপ্য। এ হাদীস দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় যে, এ লোকটি মুসলমান ছিল, মুনাফিক ছিল না। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে কিছু প্রদান করেননি এবং তাকে তার ইসলামের উপর সমর্পণ করে দেন। সুতরাং জানা গেল যে, এই আয়াতে যে বেদুঈনদের বর্ণনা রয়েছে তারা মুনাফিক ছিল না, তারা ছিল তো মুসলমান, কিন্তু ঈমান তাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হয়নি। তারা ঈমানের এমন উচ্চ স্তরে পৌছার দাবী করেছিল যেখানে তারা আসলে পৌঁছতে পারেনি। এ জন্যেই তাদেরকে আদব বা ভদ্রতা শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এই ভাবার্থই হবে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তির। এটাকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) গ্রহণ করেছেন। আমাদের এসব কথা এজন্যেই বলতে হলো যে, ইমাম বুখারী (রঃ)-এর মতে এলোকগুলো মুনাফিক ছিল, যারা নিজেদেরকে বাহ্যিকভাবে মুমিন রূপে প্রকাশ করতো, কিন্তু আসলে মুমিন ছিল না।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, ঈমান ও ইসলামের মধ্যে ঐ সময় পার্থক্য হবে যখন ইসলাম স্বীয় হাকীকতের উপর না হবে। যখন ইসলাম হাকীকী হবে তখন ঐ ইসলামই ঈমান। ঐ সময় ঈমান ও ইসলামের মধ্যে কোনই পার্থক্য থাকবে না। এর বহু সবল দলীল প্রমাণ ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় কিতাব সহীহ বুখারীর মধ্যে বর্ণনা করেছেন।হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যে বলেছেনঃ বরং তোমরা বল’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমরা নিহত হওয়া থেকে এবং বন্দী হওয়া থেকে বাঁচার জন্যে ফরমানের প্রতি অনুগত হলাম। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি বানু আসাদ ইবনে খুযাইমার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা মনে করেছিল যে, তারা ঈমান এনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি অনুগ্রহ করেছে। কিন্তু প্রথমটিই সঠিক কথা যে, এই আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা ঈমানের স্থানে পৌঁছে যাওয়ার দাবী করতো, অথচ সেখানে তারা পৌঁছতে পারেনি। সুতরাং তাদেরকে আদব বা দ্রতা শিক্ষা দেয়া হয় যে, তখন পর্যন্ত তারা ঈমানের স্তর পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। যদি তারা মুনাফিক হতো তবে অবশ্যই তাদেরকে ধমকানো হতো এবং ভীতি প্রদর্শন করা হতো। আর করা হতো তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত। যেমন সূরায়ে বারাআতে মুনাফিকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখানে তো শুধু তাদেরকে আদব শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য কর তবে তোমাদের কর্ম সামান্য পরিমাণও লাঘব হবে না। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের আমল হতে কিছুই কমিয়ে দিই নি।” (৫২:২১)। মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ যারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, অন্যায় কাজ হতে বিরত থাকে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে থাকেন এবং তাদের প্রতি দয়া করেন। কেননা, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারাই পূর্ণ মুমিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না, বরং ঈমানের উপর অটল থাকে এবং জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, তারাই সত্যনিষ্ঠ। অর্থাৎ এরাই এমন লোক যারা বলতে পারে যে, তারা ঈমান এনেছে। তারা ঐ লোকদের মত নয় যারা শুধু মুখেই ঈমানের দাবী করে। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ায় তিন প্রকারের মুমিন রয়েছে। (এক) যারা আল্লাহর উপর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে, অতঃপর কোন সন্দেহ পোষণ করেনি এবং নিজেদের মাল-ধন ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে। (দুই) যাদের থেকে লোকেরা নিরাপত্তা লাভ করেছে। তারা না তাদের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করে, না তাদেরকে হত্যা করে। (তিন) যারা লোভনীয় বস্তুর দিকে ঝুঁকে পড়ার পর মহামহিমান্বিত আল্লাহর (ভয়ের জন্যে তা পরিত্যাগ করে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তোমরা তোমাদের ঈমান ও দ্বীনের কথা আল্লাহকে জানাচ্ছ? অথচ আল্লাহ এমনই যে, যমীন ও আসমানের অণুপরিমাণ জিনিসও তাঁর নিকট গোপন নেই। যা কিছু আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে রয়েছে সবই তিনি জানেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত।মহান আল্লাহ বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যেসব আরব বেদুঈন ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে তোমাকে অনুগ্রহের খোটা দিচ্ছে তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা ইসলাম কবুল করেছে বলে আমাকে অনুগ্রহের খোটা দিয়ো না। তোমরা ইসলাম কবুল করলে, আমার আনুগত্য করলে এবং আমাকে সাহায্য করলে তোমাদের নিজেদেরই উপকার হবে, বরং আল্লাহই ঈমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন, এটা তোমাদের প্রতিই আল্লাহর বড় অনুগ্রহ, যদি তোমরা তোমাদের ঈমানের দাবীতে সত্যবাদী হও। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার কাউকেও ঈমানের পথ দেখানো অর্থ তার উপর তার ইহসান বা অনুগ্রহ করা। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুনায়েনের যুদ্ধের শেষে (যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টনের ক্ষেত্রে) আনসারদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট অবস্থায় পেয়েছিলাম না? অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আমার কারণে তোমাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেছেন? তোমরা তো পৃথক পৃথক হয়েছিলে? অতঃপর আমার কারণে আল্লাহ তোমাদেরকে একত্রিত করেছেন এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যে প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করেছেন? তোমরা তো দরিদ্র ছিলে? অতঃপর আল্লাহ আমার কারণে তোমাদেরকে সম্পদশালী করেছেন?” তারা তার প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তরে সমস্বরে বলতে থাকেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর চেয়েও বেশী আমাদের উপর অনুগ্রহকারী।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বানু আসাদ গোত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে এবং বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা মুসলমান হয়েছি এবং আরবরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, কিন্তু আমরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিনি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সম্পর্কে বলেনঃ “এদের বোধশক্তি কম এবং তাদের মুখ দ্বারা শয়তানরা কথা বলছে।” তখন (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। পুনরায় আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রশস্ত ও ব্যাপক জ্ঞান এবং বান্দাদের সমস্ত আমল সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত আছেন। তাঁর বান্দাদের সমস্ত আমলের তিনি পূর্ণ খবর রাখেন।

আল-হুজুরাত 49:15

১৪-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: যেসব আরব বেদুঈন ইসলামে দাখিল হওয়া মাত্রই বাড়িয়ে-চাড়িয়ে নিজেদের ঈমানের দাবী করতে শুরু করেছিল, অথচ প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে ঈমান দৃঢ় হয়নি তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা এই দাবী করতে নিষেধ করছেন। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, যেহেতু ঈমান তাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রবেশ করেনি সেই হেতু তারা ঈমান এনেছে একথা যেন না বলে, বরং যেন বলে যে, তারা ইসলামের গণ্ডীর মধ্যে এসেছে এবং নবী (সঃ)-এর অনুগত হয়েছে।এ আয়াত দ্বারা এটা জানা গেল যে, ঈমান ইসলাম হতে মাখসূস বা বিশিষ্ট, যেমন এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাযহাব। হযরত জিবরাঈল (আঃ) যুক্ত হাদীসটিও এটাই প্রমাণ করে। তিনি (হযরত জিবরাইল আঃ) ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন এবং পরে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করেন ইহসান সম্পর্কে। সুতরাং সাধারণ হতে ক্রমান্বয়ে বিশিষ্টের দিকে উঠে যান। তারপর উঠে যান আরো খাস বা বিশিষ্টের দিকে। হযরত সা'দ ইবনে আবি অক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কতগুলো লোককে (দানের মাল হতে) প্রদান করলেন এবং একটি লোককে কিছুই দিলেন না। তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি অমুক, অমুককে দিলেন আর অমুককে দিলেন না, অথচ সে মুমিন?" একথা তিনি তিনবার বললেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “অথবা সে মুসলিম?" এই জবাবই তিনিও তিনবার দিলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “নিশ্চয়ই আমি কতক লোককে প্রদান করি এবং তাদের মধ্যে আমার নিকট যে খুবই প্রিয় তাকে ছেড়ে দিই, কিছুই দিই না এই ভয়ে যে, (যাদেরকে প্রদান করি তাদেরকে প্রদান না করলে) তারা (হয়তো ইসলাম পরিত্যাগ করবে এবং এর ফলে) উল্টো মুখে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাদের নিজ নিজ সহীহ গ্রন্থে তাখরীজ করেছেন) সুতরাং এ হাদীসেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুমিন ও মুসলিমের মধ্যে পার্থক্য করলেন এবং জানা গেল যে, ইসলামের তুলনায় ঈমান অধিক খাস বা বিশিষ্ট। আমরা এটাকে দলীল প্রমাণাদিসহ সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমানের শরাহতে বর্ণনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই প্রাপ্য। এ হাদীস দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় যে, এ লোকটি মুসলমান ছিল, মুনাফিক ছিল না। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে কিছু প্রদান করেননি এবং তাকে তার ইসলামের উপর সমর্পণ করে দেন। সুতরাং জানা গেল যে, এই আয়াতে যে বেদুঈনদের বর্ণনা রয়েছে তারা মুনাফিক ছিল না, তারা ছিল তো মুসলমান, কিন্তু ঈমান তাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হয়নি। তারা ঈমানের এমন উচ্চ স্তরে পৌছার দাবী করেছিল যেখানে তারা আসলে পৌঁছতে পারেনি। এ জন্যেই তাদেরকে আদব বা ভদ্রতা শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এই ভাবার্থই হবে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তির। এটাকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) গ্রহণ করেছেন। আমাদের এসব কথা এজন্যেই বলতে হলো যে, ইমাম বুখারী (রঃ)-এর মতে এলোকগুলো মুনাফিক ছিল, যারা নিজেদেরকে বাহ্যিকভাবে মুমিন রূপে প্রকাশ করতো, কিন্তু আসলে মুমিন ছিল না।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, ঈমান ও ইসলামের মধ্যে ঐ সময় পার্থক্য হবে যখন ইসলাম স্বীয় হাকীকতের উপর না হবে। যখন ইসলাম হাকীকী হবে তখন ঐ ইসলামই ঈমান। ঐ সময় ঈমান ও ইসলামের মধ্যে কোনই পার্থক্য থাকবে না। এর বহু সবল দলীল প্রমাণ ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় কিতাব সহীহ বুখারীর মধ্যে বর্ণনা করেছেন।হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যে বলেছেনঃ বরং তোমরা বল’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমরা নিহত হওয়া থেকে এবং বন্দী হওয়া থেকে বাঁচার জন্যে ফরমানের প্রতি অনুগত হলাম। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি বানু আসাদ ইবনে খুযাইমার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা মনে করেছিল যে, তারা ঈমান এনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি অনুগ্রহ করেছে। কিন্তু প্রথমটিই সঠিক কথা যে, এই আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা ঈমানের স্থানে পৌঁছে যাওয়ার দাবী করতো, অথচ সেখানে তারা পৌঁছতে পারেনি। সুতরাং তাদেরকে আদব বা দ্রতা শিক্ষা দেয়া হয় যে, তখন পর্যন্ত তারা ঈমানের স্তর পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। যদি তারা মুনাফিক হতো তবে অবশ্যই তাদেরকে ধমকানো হতো এবং ভীতি প্রদর্শন করা হতো। আর করা হতো তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত। যেমন সূরায়ে বারাআতে মুনাফিকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখানে তো শুধু তাদেরকে আদব শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য কর তবে তোমাদের কর্ম সামান্য পরিমাণও লাঘব হবে না। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের আমল হতে কিছুই কমিয়ে দিই নি।” (৫২:২১)। মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ যারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, অন্যায় কাজ হতে বিরত থাকে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে থাকেন এবং তাদের প্রতি দয়া করেন। কেননা, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারাই পূর্ণ মুমিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না, বরং ঈমানের উপর অটল থাকে এবং জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, তারাই সত্যনিষ্ঠ। অর্থাৎ এরাই এমন লোক যারা বলতে পারে যে, তারা ঈমান এনেছে। তারা ঐ লোকদের মত নয় যারা শুধু মুখেই ঈমানের দাবী করে। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ায় তিন প্রকারের মুমিন রয়েছে। (এক) যারা আল্লাহর উপর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে, অতঃপর কোন সন্দেহ পোষণ করেনি এবং নিজেদের মাল-ধন ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে। (দুই) যাদের থেকে লোকেরা নিরাপত্তা লাভ করেছে। তারা না তাদের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করে, না তাদেরকে হত্যা করে। (তিন) যারা লোভনীয় বস্তুর দিকে ঝুঁকে পড়ার পর মহামহিমান্বিত আল্লাহর (ভয়ের জন্যে তা পরিত্যাগ করে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তোমরা তোমাদের ঈমান ও দ্বীনের কথা আল্লাহকে জানাচ্ছ? অথচ আল্লাহ এমনই যে, যমীন ও আসমানের অণুপরিমাণ জিনিসও তাঁর নিকট গোপন নেই। যা কিছু আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে রয়েছে সবই তিনি জানেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত।মহান আল্লাহ বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যেসব আরব বেদুঈন ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে তোমাকে অনুগ্রহের খোটা দিচ্ছে তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা ইসলাম কবুল করেছে বলে আমাকে অনুগ্রহের খোটা দিয়ো না। তোমরা ইসলাম কবুল করলে, আমার আনুগত্য করলে এবং আমাকে সাহায্য করলে তোমাদের নিজেদেরই উপকার হবে, বরং আল্লাহই ঈমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন, এটা তোমাদের প্রতিই আল্লাহর বড় অনুগ্রহ, যদি তোমরা তোমাদের ঈমানের দাবীতে সত্যবাদী হও। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার কাউকেও ঈমানের পথ দেখানো অর্থ তার উপর তার ইহসান বা অনুগ্রহ করা। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুনায়েনের যুদ্ধের শেষে (যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টনের ক্ষেত্রে) আনসারদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট অবস্থায় পেয়েছিলাম না? অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আমার কারণে তোমাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেছেন? তোমরা তো পৃথক পৃথক হয়েছিলে? অতঃপর আমার কারণে আল্লাহ তোমাদেরকে একত্রিত করেছেন এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যে প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করেছেন? তোমরা তো দরিদ্র ছিলে? অতঃপর আল্লাহ আমার কারণে তোমাদেরকে সম্পদশালী করেছেন?” তারা তার প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তরে সমস্বরে বলতে থাকেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর চেয়েও বেশী আমাদের উপর অনুগ্রহকারী।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বানু আসাদ গোত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে এবং বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা মুসলমান হয়েছি এবং আরবরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, কিন্তু আমরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিনি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সম্পর্কে বলেনঃ “এদের বোধশক্তি কম এবং তাদের মুখ দ্বারা শয়তানরা কথা বলছে।” তখন (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। পুনরায় আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রশস্ত ও ব্যাপক জ্ঞান এবং বান্দাদের সমস্ত আমল সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত আছেন। তাঁর বান্দাদের সমস্ত আমলের তিনি পূর্ণ খবর রাখেন।

আল-হুজুরাত 49:16

১৪-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: যেসব আরব বেদুঈন ইসলামে দাখিল হওয়া মাত্রই বাড়িয়ে-চাড়িয়ে নিজেদের ঈমানের দাবী করতে শুরু করেছিল, অথচ প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে ঈমান দৃঢ় হয়নি তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা এই দাবী করতে নিষেধ করছেন। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, যেহেতু ঈমান তাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রবেশ করেনি সেই হেতু তারা ঈমান এনেছে একথা যেন না বলে, বরং যেন বলে যে, তারা ইসলামের গণ্ডীর মধ্যে এসেছে এবং নবী (সঃ)-এর অনুগত হয়েছে।এ আয়াত দ্বারা এটা জানা গেল যে, ঈমান ইসলাম হতে মাখসূস বা বিশিষ্ট, যেমন এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাযহাব। হযরত জিবরাঈল (আঃ) যুক্ত হাদীসটিও এটাই প্রমাণ করে। তিনি (হযরত জিবরাইল আঃ) ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন এবং পরে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করেন ইহসান সম্পর্কে। সুতরাং সাধারণ হতে ক্রমান্বয়ে বিশিষ্টের দিকে উঠে যান। তারপর উঠে যান আরো খাস বা বিশিষ্টের দিকে। হযরত সা'দ ইবনে আবি অক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কতগুলো লোককে (দানের মাল হতে) প্রদান করলেন এবং একটি লোককে কিছুই দিলেন না। তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি অমুক, অমুককে দিলেন আর অমুককে দিলেন না, অথচ সে মুমিন?" একথা তিনি তিনবার বললেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “অথবা সে মুসলিম?" এই জবাবই তিনিও তিনবার দিলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “নিশ্চয়ই আমি কতক লোককে প্রদান করি এবং তাদের মধ্যে আমার নিকট যে খুবই প্রিয় তাকে ছেড়ে দিই, কিছুই দিই না এই ভয়ে যে, (যাদেরকে প্রদান করি তাদেরকে প্রদান না করলে) তারা (হয়তো ইসলাম পরিত্যাগ করবে এবং এর ফলে) উল্টো মুখে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাদের নিজ নিজ সহীহ গ্রন্থে তাখরীজ করেছেন) সুতরাং এ হাদীসেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুমিন ও মুসলিমের মধ্যে পার্থক্য করলেন এবং জানা গেল যে, ইসলামের তুলনায় ঈমান অধিক খাস বা বিশিষ্ট। আমরা এটাকে দলীল প্রমাণাদিসহ সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমানের শরাহতে বর্ণনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই প্রাপ্য। এ হাদীস দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় যে, এ লোকটি মুসলমান ছিল, মুনাফিক ছিল না। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে কিছু প্রদান করেননি এবং তাকে তার ইসলামের উপর সমর্পণ করে দেন। সুতরাং জানা গেল যে, এই আয়াতে যে বেদুঈনদের বর্ণনা রয়েছে তারা মুনাফিক ছিল না, তারা ছিল তো মুসলমান, কিন্তু ঈমান তাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হয়নি। তারা ঈমানের এমন উচ্চ স্তরে পৌছার দাবী করেছিল যেখানে তারা আসলে পৌঁছতে পারেনি। এ জন্যেই তাদেরকে আদব বা ভদ্রতা শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এই ভাবার্থই হবে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তির। এটাকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) গ্রহণ করেছেন। আমাদের এসব কথা এজন্যেই বলতে হলো যে, ইমাম বুখারী (রঃ)-এর মতে এলোকগুলো মুনাফিক ছিল, যারা নিজেদেরকে বাহ্যিকভাবে মুমিন রূপে প্রকাশ করতো, কিন্তু আসলে মুমিন ছিল না।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, ঈমান ও ইসলামের মধ্যে ঐ সময় পার্থক্য হবে যখন ইসলাম স্বীয় হাকীকতের উপর না হবে। যখন ইসলাম হাকীকী হবে তখন ঐ ইসলামই ঈমান। ঐ সময় ঈমান ও ইসলামের মধ্যে কোনই পার্থক্য থাকবে না। এর বহু সবল দলীল প্রমাণ ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় কিতাব সহীহ বুখারীর মধ্যে বর্ণনা করেছেন।হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যে বলেছেনঃ বরং তোমরা বল’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমরা নিহত হওয়া থেকে এবং বন্দী হওয়া থেকে বাঁচার জন্যে ফরমানের প্রতি অনুগত হলাম। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি বানু আসাদ ইবনে খুযাইমার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা মনে করেছিল যে, তারা ঈমান এনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি অনুগ্রহ করেছে। কিন্তু প্রথমটিই সঠিক কথা যে, এই আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা ঈমানের স্থানে পৌঁছে যাওয়ার দাবী করতো, অথচ সেখানে তারা পৌঁছতে পারেনি। সুতরাং তাদেরকে আদব বা দ্রতা শিক্ষা দেয়া হয় যে, তখন পর্যন্ত তারা ঈমানের স্তর পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। যদি তারা মুনাফিক হতো তবে অবশ্যই তাদেরকে ধমকানো হতো এবং ভীতি প্রদর্শন করা হতো। আর করা হতো তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত। যেমন সূরায়ে বারাআতে মুনাফিকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখানে তো শুধু তাদেরকে আদব শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য কর তবে তোমাদের কর্ম সামান্য পরিমাণও লাঘব হবে না। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের আমল হতে কিছুই কমিয়ে দিই নি।” (৫২:২১)। মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ যারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, অন্যায় কাজ হতে বিরত থাকে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে থাকেন এবং তাদের প্রতি দয়া করেন। কেননা, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারাই পূর্ণ মুমিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না, বরং ঈমানের উপর অটল থাকে এবং জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, তারাই সত্যনিষ্ঠ। অর্থাৎ এরাই এমন লোক যারা বলতে পারে যে, তারা ঈমান এনেছে। তারা ঐ লোকদের মত নয় যারা শুধু মুখেই ঈমানের দাবী করে। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ায় তিন প্রকারের মুমিন রয়েছে। (এক) যারা আল্লাহর উপর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে, অতঃপর কোন সন্দেহ পোষণ করেনি এবং নিজেদের মাল-ধন ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে। (দুই) যাদের থেকে লোকেরা নিরাপত্তা লাভ করেছে। তারা না তাদের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করে, না তাদেরকে হত্যা করে। (তিন) যারা লোভনীয় বস্তুর দিকে ঝুঁকে পড়ার পর মহামহিমান্বিত আল্লাহর (ভয়ের জন্যে তা পরিত্যাগ করে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তোমরা তোমাদের ঈমান ও দ্বীনের কথা আল্লাহকে জানাচ্ছ? অথচ আল্লাহ এমনই যে, যমীন ও আসমানের অণুপরিমাণ জিনিসও তাঁর নিকট গোপন নেই। যা কিছু আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে রয়েছে সবই তিনি জানেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত।মহান আল্লাহ বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যেসব আরব বেদুঈন ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে তোমাকে অনুগ্রহের খোটা দিচ্ছে তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা ইসলাম কবুল করেছে বলে আমাকে অনুগ্রহের খোটা দিয়ো না। তোমরা ইসলাম কবুল করলে, আমার আনুগত্য করলে এবং আমাকে সাহায্য করলে তোমাদের নিজেদেরই উপকার হবে, বরং আল্লাহই ঈমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন, এটা তোমাদের প্রতিই আল্লাহর বড় অনুগ্রহ, যদি তোমরা তোমাদের ঈমানের দাবীতে সত্যবাদী হও। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার কাউকেও ঈমানের পথ দেখানো অর্থ তার উপর তার ইহসান বা অনুগ্রহ করা। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুনায়েনের যুদ্ধের শেষে (যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টনের ক্ষেত্রে) আনসারদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট অবস্থায় পেয়েছিলাম না? অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আমার কারণে তোমাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেছেন? তোমরা তো পৃথক পৃথক হয়েছিলে? অতঃপর আমার কারণে আল্লাহ তোমাদেরকে একত্রিত করেছেন এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যে প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করেছেন? তোমরা তো দরিদ্র ছিলে? অতঃপর আল্লাহ আমার কারণে তোমাদেরকে সম্পদশালী করেছেন?” তারা তার প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তরে সমস্বরে বলতে থাকেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর চেয়েও বেশী আমাদের উপর অনুগ্রহকারী।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বানু আসাদ গোত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে এবং বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা মুসলমান হয়েছি এবং আরবরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, কিন্তু আমরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিনি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সম্পর্কে বলেনঃ “এদের বোধশক্তি কম এবং তাদের মুখ দ্বারা শয়তানরা কথা বলছে।” তখন (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। পুনরায় আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রশস্ত ও ব্যাপক জ্ঞান এবং বান্দাদের সমস্ত আমল সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত আছেন। তাঁর বান্দাদের সমস্ত আমলের তিনি পূর্ণ খবর রাখেন।

আল-হুজুরাত 49:17

১৪-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: যেসব আরব বেদুঈন ইসলামে দাখিল হওয়া মাত্রই বাড়িয়ে-চাড়িয়ে নিজেদের ঈমানের দাবী করতে শুরু করেছিল, অথচ প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে ঈমান দৃঢ় হয়নি তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা এই দাবী করতে নিষেধ করছেন। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, যেহেতু ঈমান তাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রবেশ করেনি সেই হেতু তারা ঈমান এনেছে একথা যেন না বলে, বরং যেন বলে যে, তারা ইসলামের গণ্ডীর মধ্যে এসেছে এবং নবী (সঃ)-এর অনুগত হয়েছে।এ আয়াত দ্বারা এটা জানা গেল যে, ঈমান ইসলাম হতে মাখসূস বা বিশিষ্ট, যেমন এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাযহাব। হযরত জিবরাঈল (আঃ) যুক্ত হাদীসটিও এটাই প্রমাণ করে। তিনি (হযরত জিবরাইল আঃ) ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন এবং পরে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করেন ইহসান সম্পর্কে। সুতরাং সাধারণ হতে ক্রমান্বয়ে বিশিষ্টের দিকে উঠে যান। তারপর উঠে যান আরো খাস বা বিশিষ্টের দিকে। হযরত সা'দ ইবনে আবি অক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কতগুলো লোককে (দানের মাল হতে) প্রদান করলেন এবং একটি লোককে কিছুই দিলেন না। তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি অমুক, অমুককে দিলেন আর অমুককে দিলেন না, অথচ সে মুমিন?" একথা তিনি তিনবার বললেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “অথবা সে মুসলিম?" এই জবাবই তিনিও তিনবার দিলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “নিশ্চয়ই আমি কতক লোককে প্রদান করি এবং তাদের মধ্যে আমার নিকট যে খুবই প্রিয় তাকে ছেড়ে দিই, কিছুই দিই না এই ভয়ে যে, (যাদেরকে প্রদান করি তাদেরকে প্রদান না করলে) তারা (হয়তো ইসলাম পরিত্যাগ করবে এবং এর ফলে) উল্টো মুখে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাদের নিজ নিজ সহীহ গ্রন্থে তাখরীজ করেছেন) সুতরাং এ হাদীসেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুমিন ও মুসলিমের মধ্যে পার্থক্য করলেন এবং জানা গেল যে, ইসলামের তুলনায় ঈমান অধিক খাস বা বিশিষ্ট। আমরা এটাকে দলীল প্রমাণাদিসহ সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমানের শরাহতে বর্ণনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই প্রাপ্য। এ হাদীস দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় যে, এ লোকটি মুসলমান ছিল, মুনাফিক ছিল না। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে কিছু প্রদান করেননি এবং তাকে তার ইসলামের উপর সমর্পণ করে দেন। সুতরাং জানা গেল যে, এই আয়াতে যে বেদুঈনদের বর্ণনা রয়েছে তারা মুনাফিক ছিল না, তারা ছিল তো মুসলমান, কিন্তু ঈমান তাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হয়নি। তারা ঈমানের এমন উচ্চ স্তরে পৌছার দাবী করেছিল যেখানে তারা আসলে পৌঁছতে পারেনি। এ জন্যেই তাদেরকে আদব বা ভদ্রতা শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এই ভাবার্থই হবে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তির। এটাকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) গ্রহণ করেছেন। আমাদের এসব কথা এজন্যেই বলতে হলো যে, ইমাম বুখারী (রঃ)-এর মতে এলোকগুলো মুনাফিক ছিল, যারা নিজেদেরকে বাহ্যিকভাবে মুমিন রূপে প্রকাশ করতো, কিন্তু আসলে মুমিন ছিল না।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, ঈমান ও ইসলামের মধ্যে ঐ সময় পার্থক্য হবে যখন ইসলাম স্বীয় হাকীকতের উপর না হবে। যখন ইসলাম হাকীকী হবে তখন ঐ ইসলামই ঈমান। ঐ সময় ঈমান ও ইসলামের মধ্যে কোনই পার্থক্য থাকবে না। এর বহু সবল দলীল প্রমাণ ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় কিতাব সহীহ বুখারীর মধ্যে বর্ণনা করেছেন।হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যে বলেছেনঃ বরং তোমরা বল’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমরা নিহত হওয়া থেকে এবং বন্দী হওয়া থেকে বাঁচার জন্যে ফরমানের প্রতি অনুগত হলাম। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি বানু আসাদ ইবনে খুযাইমার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা মনে করেছিল যে, তারা ঈমান এনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি অনুগ্রহ করেছে। কিন্তু প্রথমটিই সঠিক কথা যে, এই আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা ঈমানের স্থানে পৌঁছে যাওয়ার দাবী করতো, অথচ সেখানে তারা পৌঁছতে পারেনি। সুতরাং তাদেরকে আদব বা দ্রতা শিক্ষা দেয়া হয় যে, তখন পর্যন্ত তারা ঈমানের স্তর পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। যদি তারা মুনাফিক হতো তবে অবশ্যই তাদেরকে ধমকানো হতো এবং ভীতি প্রদর্শন করা হতো। আর করা হতো তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত। যেমন সূরায়ে বারাআতে মুনাফিকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখানে তো শুধু তাদেরকে আদব শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য কর তবে তোমাদের কর্ম সামান্য পরিমাণও লাঘব হবে না। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের আমল হতে কিছুই কমিয়ে দিই নি।” (৫২:২১)। মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ যারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, অন্যায় কাজ হতে বিরত থাকে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে থাকেন এবং তাদের প্রতি দয়া করেন। কেননা, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারাই পূর্ণ মুমিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না, বরং ঈমানের উপর অটল থাকে এবং জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, তারাই সত্যনিষ্ঠ। অর্থাৎ এরাই এমন লোক যারা বলতে পারে যে, তারা ঈমান এনেছে। তারা ঐ লোকদের মত নয় যারা শুধু মুখেই ঈমানের দাবী করে। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ায় তিন প্রকারের মুমিন রয়েছে। (এক) যারা আল্লাহর উপর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে, অতঃপর কোন সন্দেহ পোষণ করেনি এবং নিজেদের মাল-ধন ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে। (দুই) যাদের থেকে লোকেরা নিরাপত্তা লাভ করেছে। তারা না তাদের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করে, না তাদেরকে হত্যা করে। (তিন) যারা লোভনীয় বস্তুর দিকে ঝুঁকে পড়ার পর মহামহিমান্বিত আল্লাহর (ভয়ের জন্যে তা পরিত্যাগ করে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তোমরা তোমাদের ঈমান ও দ্বীনের কথা আল্লাহকে জানাচ্ছ? অথচ আল্লাহ এমনই যে, যমীন ও আসমানের অণুপরিমাণ জিনিসও তাঁর নিকট গোপন নেই। যা কিছু আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে রয়েছে সবই তিনি জানেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত।মহান আল্লাহ বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যেসব আরব বেদুঈন ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে তোমাকে অনুগ্রহের খোটা দিচ্ছে তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা ইসলাম কবুল করেছে বলে আমাকে অনুগ্রহের খোটা দিয়ো না। তোমরা ইসলাম কবুল করলে, আমার আনুগত্য করলে এবং আমাকে সাহায্য করলে তোমাদের নিজেদেরই উপকার হবে, বরং আল্লাহই ঈমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন, এটা তোমাদের প্রতিই আল্লাহর বড় অনুগ্রহ, যদি তোমরা তোমাদের ঈমানের দাবীতে সত্যবাদী হও। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার কাউকেও ঈমানের পথ দেখানো অর্থ তার উপর তার ইহসান বা অনুগ্রহ করা। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুনায়েনের যুদ্ধের শেষে (যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টনের ক্ষেত্রে) আনসারদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট অবস্থায় পেয়েছিলাম না? অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আমার কারণে তোমাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেছেন? তোমরা তো পৃথক পৃথক হয়েছিলে? অতঃপর আমার কারণে আল্লাহ তোমাদেরকে একত্রিত করেছেন এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যে প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করেছেন? তোমরা তো দরিদ্র ছিলে? অতঃপর আল্লাহ আমার কারণে তোমাদেরকে সম্পদশালী করেছেন?” তারা তার প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তরে সমস্বরে বলতে থাকেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর চেয়েও বেশী আমাদের উপর অনুগ্রহকারী।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বানু আসাদ গোত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে এবং বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা মুসলমান হয়েছি এবং আরবরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, কিন্তু আমরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিনি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সম্পর্কে বলেনঃ “এদের বোধশক্তি কম এবং তাদের মুখ দ্বারা শয়তানরা কথা বলছে।” তখন (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। পুনরায় আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রশস্ত ও ব্যাপক জ্ঞান এবং বান্দাদের সমস্ত আমল সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত আছেন। তাঁর বান্দাদের সমস্ত আমলের তিনি পূর্ণ খবর রাখেন।

আল-হুজুরাত 49:18

১৪-১৮ নং আয়াতের তাফসীর: যেসব আরব বেদুঈন ইসলামে দাখিল হওয়া মাত্রই বাড়িয়ে-চাড়িয়ে নিজেদের ঈমানের দাবী করতে শুরু করেছিল, অথচ প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে ঈমান দৃঢ় হয়নি তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা এই দাবী করতে নিষেধ করছেন। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, যেহেতু ঈমান তাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রবেশ করেনি সেই হেতু তারা ঈমান এনেছে একথা যেন না বলে, বরং যেন বলে যে, তারা ইসলামের গণ্ডীর মধ্যে এসেছে এবং নবী (সঃ)-এর অনুগত হয়েছে।এ আয়াত দ্বারা এটা জানা গেল যে, ঈমান ইসলাম হতে মাখসূস বা বিশিষ্ট, যেমন এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাযহাব। হযরত জিবরাঈল (আঃ) যুক্ত হাদীসটিও এটাই প্রমাণ করে। তিনি (হযরত জিবরাইল আঃ) ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন এবং পরে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করেন ইহসান সম্পর্কে। সুতরাং সাধারণ হতে ক্রমান্বয়ে বিশিষ্টের দিকে উঠে যান। তারপর উঠে যান আরো খাস বা বিশিষ্টের দিকে। হযরত সা'দ ইবনে আবি অক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কতগুলো লোককে (দানের মাল হতে) প্রদান করলেন এবং একটি লোককে কিছুই দিলেন না। তখন হযরত সা'দ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি অমুক, অমুককে দিলেন আর অমুককে দিলেন না, অথচ সে মুমিন?" একথা তিনি তিনবার বললেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “অথবা সে মুসলিম?" এই জবাবই তিনিও তিনবার দিলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “নিশ্চয়ই আমি কতক লোককে প্রদান করি এবং তাদের মধ্যে আমার নিকট যে খুবই প্রিয় তাকে ছেড়ে দিই, কিছুই দিই না এই ভয়ে যে, (যাদেরকে প্রদান করি তাদেরকে প্রদান না করলে) তারা (হয়তো ইসলাম পরিত্যাগ করবে এবং এর ফলে) উল্টো মুখে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাদের নিজ নিজ সহীহ গ্রন্থে তাখরীজ করেছেন) সুতরাং এ হাদীসেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুমিন ও মুসলিমের মধ্যে পার্থক্য করলেন এবং জানা গেল যে, ইসলামের তুলনায় ঈমান অধিক খাস বা বিশিষ্ট। আমরা এটাকে দলীল প্রমাণাদিসহ সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমানের শরাহতে বর্ণনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই প্রাপ্য। এ হাদীস দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় যে, এ লোকটি মুসলমান ছিল, মুনাফিক ছিল না। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে কিছু প্রদান করেননি এবং তাকে তার ইসলামের উপর সমর্পণ করে দেন। সুতরাং জানা গেল যে, এই আয়াতে যে বেদুঈনদের বর্ণনা রয়েছে তারা মুনাফিক ছিল না, তারা ছিল তো মুসলমান, কিন্তু ঈমান তাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হয়নি। তারা ঈমানের এমন উচ্চ স্তরে পৌছার দাবী করেছিল যেখানে তারা আসলে পৌঁছতে পারেনি। এ জন্যেই তাদেরকে আদব বা ভদ্রতা শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এই ভাবার্থই হবে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তির। এটাকেই ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) গ্রহণ করেছেন। আমাদের এসব কথা এজন্যেই বলতে হলো যে, ইমাম বুখারী (রঃ)-এর মতে এলোকগুলো মুনাফিক ছিল, যারা নিজেদেরকে বাহ্যিকভাবে মুমিন রূপে প্রকাশ করতো, কিন্তু আসলে মুমিন ছিল না।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, ঈমান ও ইসলামের মধ্যে ঐ সময় পার্থক্য হবে যখন ইসলাম স্বীয় হাকীকতের উপর না হবে। যখন ইসলাম হাকীকী হবে তখন ঐ ইসলামই ঈমান। ঐ সময় ঈমান ও ইসলামের মধ্যে কোনই পার্থক্য থাকবে না। এর বহু সবল দলীল প্রমাণ ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় কিতাব সহীহ বুখারীর মধ্যে বর্ণনা করেছেন।হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং হযরত ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যে বলেছেনঃ বরং তোমরা বল’ এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমরা নিহত হওয়া থেকে এবং বন্দী হওয়া থেকে বাঁচার জন্যে ফরমানের প্রতি অনুগত হলাম। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি বানু আসাদ ইবনে খুযাইমার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা মনে করেছিল যে, তারা ঈমান এনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি অনুগ্রহ করেছে। কিন্তু প্রথমটিই সঠিক কথা যে, এই আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা ঈমানের স্থানে পৌঁছে যাওয়ার দাবী করতো, অথচ সেখানে তারা পৌঁছতে পারেনি। সুতরাং তাদেরকে আদব বা দ্রতা শিক্ষা দেয়া হয় যে, তখন পর্যন্ত তারা ঈমানের স্তর পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। যদি তারা মুনাফিক হতো তবে অবশ্যই তাদেরকে ধমকানো হতো এবং ভীতি প্রদর্শন করা হতো। আর করা হতো তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত। যেমন সূরায়ে বারাআতে মুনাফিকদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখানে তো শুধু তাদেরকে আদব শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য কর তবে তোমাদের কর্ম সামান্য পরিমাণও লাঘব হবে না। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের আমল হতে কিছুই কমিয়ে দিই নি।” (৫২:২১)। মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ যারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, অন্যায় কাজ হতে বিরত থাকে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে থাকেন এবং তাদের প্রতি দয়া করেন। কেননা, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারাই পূর্ণ মুমিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না, বরং ঈমানের উপর অটল থাকে এবং জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, তারাই সত্যনিষ্ঠ। অর্থাৎ এরাই এমন লোক যারা বলতে পারে যে, তারা ঈমান এনেছে। তারা ঐ লোকদের মত নয় যারা শুধু মুখেই ঈমানের দাবী করে। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ায় তিন প্রকারের মুমিন রয়েছে। (এক) যারা আল্লাহর উপর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে, অতঃপর কোন সন্দেহ পোষণ করেনি এবং নিজেদের মাল-ধন ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে। (দুই) যাদের থেকে লোকেরা নিরাপত্তা লাভ করেছে। তারা না তাদের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করে, না তাদেরকে হত্যা করে। (তিন) যারা লোভনীয় বস্তুর দিকে ঝুঁকে পড়ার পর মহামহিমান্বিত আল্লাহর (ভয়ের জন্যে তা পরিত্যাগ করে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ তোমরা তোমাদের ঈমান ও দ্বীনের কথা আল্লাহকে জানাচ্ছ? অথচ আল্লাহ এমনই যে, যমীন ও আসমানের অণুপরিমাণ জিনিসও তাঁর নিকট গোপন নেই। যা কিছু আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে রয়েছে সবই তিনি জানেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত।মহান আল্লাহ বলেনঃ হে মুহাম্মাদ (সঃ)! যেসব আরব বেদুঈন ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে তোমাকে অনুগ্রহের খোটা দিচ্ছে তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ তোমরা ইসলাম কবুল করেছে বলে আমাকে অনুগ্রহের খোটা দিয়ো না। তোমরা ইসলাম কবুল করলে, আমার আনুগত্য করলে এবং আমাকে সাহায্য করলে তোমাদের নিজেদেরই উপকার হবে, বরং আল্লাহই ঈমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন, এটা তোমাদের প্রতিই আল্লাহর বড় অনুগ্রহ, যদি তোমরা তোমাদের ঈমানের দাবীতে সত্যবাদী হও। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার কাউকেও ঈমানের পথ দেখানো অর্থ তার উপর তার ইহসান বা অনুগ্রহ করা। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হুনায়েনের যুদ্ধের শেষে (যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টনের ক্ষেত্রে) আনসারদেরকে বলেছিলেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট অবস্থায় পেয়েছিলাম না? অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আমার কারণে তোমাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করেছেন? তোমরা তো পৃথক পৃথক হয়েছিলে? অতঃপর আমার কারণে আল্লাহ তোমাদেরকে একত্রিত করেছেন এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যে প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করেছেন? তোমরা তো দরিদ্র ছিলে? অতঃপর আল্লাহ আমার কারণে তোমাদেরকে সম্পদশালী করেছেন?” তারা তার প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তরে সমস্বরে বলতে থাকেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর চেয়েও বেশী আমাদের উপর অনুগ্রহকারী।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বানু আসাদ গোত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে এবং বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা মুসলমান হয়েছি এবং আরবরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, কিন্তু আমরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিনি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের সম্পর্কে বলেনঃ “এদের বোধশক্তি কম এবং তাদের মুখ দ্বারা শয়তানরা কথা বলছে।” তখন (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। পুনরায় আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রশস্ত ও ব্যাপক জ্ঞান এবং বান্দাদের সমস্ত আমল সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত আছেন। তাঁর বান্দাদের সমস্ত আমলের তিনি পূর্ণ খবর রাখেন।

ক্বাফ 50:1

যেসব সূরাকে মুফাস্সাল সূরা বলা হয় ওগুলোর মধ্যে সূরায়ে কাফই প্রথম। তবে একটি উক্তি এও আছে যে, মুফাস্সাল সূরাগুলো সূরায়ে হুজুরাত হতে শুরু হয়েছে। সর্বসাধারণের মধ্যে এটা যে প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, মুফাস্সাল সূরাগুলো (আরবী) হতে শুরু হয় এটা একেবারে ভিত্তিহীন কথা। আলেমদের কেউই এর উক্তিকারী নন। মুফাস্সাল সূরাগুলোর প্রথম সূরা এই সূরায়ে কাফই বটে। এর দলীল হচ্ছে সুনানে আবি দাউদের ঐ হাদীসটি যা ‘বাবু তাহযীবিল কুরআন’-এর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আউস ইবনে হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ সাকীফ প্রতিনিধি দলের মধ্যে শামিল হয়ে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হই। আহলাফ তো হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রাঃ)-এর ওখানে অবস্থান। করেন। আর বানু মালিককে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের ওখানে অবস্থান করান। তাঁদের মধ্যে মুসাদ্দাদ (রাঃ) নামক এক ব্যক্তি বলেনঃ “প্রত্যহ রাত্রে ইশা'র নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট আসতেন এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে তাঁর নিজের কথা শুনাতেন। এমন কি বিলম্ব হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর পা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতো। কখনো তিনি এই পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং কখনো ঐ পায়ের উপর। প্রায়ই তিনি আমাদের সামনে ঐ সব দুঃখপূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করতেন যেগুলো কুরায়েশরা ঘটিয়েছিল। অতঃপর তিনি বলতেনঃ “কোন দুঃখ নেই, আমরা মক্কায় দুর্বল ছিলাম, শক্তিহীন ছিলাম। তারপর আমরা মদীনায় আসলাম। এরপর মক্কাবাসী ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং ফল হয় বালতির মত অর্থাৎ কখনো আমরা তাদের উপর বিজয়ী হই এবং কখনো তারা আমাদের উপর বিজয়ী হয়। মোটকথা, প্রত্যহ রাত্রে আমরা তাঁর প্রিয় সাহচর্য লাভ করে গৌরবান্বিত হতাম। একদা রাত্রে তাঁর আগমনের সময় হয়ে গেল কিন্তু তিনি আসলেন না। বহুক্ষণ পর আসলেন। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আজ তো আসতে আপনার খুব বিলম্ব হলো (কারণ কি?) উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, কুরআন কারীমের যে অংশ আমি দৈনিক পাঠ করে থাকি তা এই সময় পাঠ করছিলাম। অসমাপ্ত ছেড়ে আসতে আমার মন চাইলো না (তাই সমাপ্ত করে আসতে বিলম্ব হলো)।” হযরত আউস (রাঃ) বলেনঃ আমি সাহাবীদেরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলামঃ আপনারা কুরআন কারীমকে কিভাবে ভাগ করতেন? তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “আমাদের ভাগ করার পদ্ধতি নিম্নরূপঃ প্রথম তিনটি সূরার একটি মনযিল, তারপর পাঁচটি সূরার এক মনযিল, এরপর সাতটি সূরার এক মনযিল, তারপর নয়টি সূরার এক মনযিল, অতঃপর এগারোটি সূরার এক মনযিল এবং এরপর তেরোটি সূরার এক মনযিল আর শেষে মুফাসসাল সূরাগুলোর এক মনযিল।” এ হাদীসটি সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে। সুতরাং প্রথম ছয় মনযিলে মোট আটচল্লিশটি সূরা হচ্ছে। তারপর মুফাসসালের সমস্ত সূরার একটি মনযিল হলো। আর এই মনযিলের প্রথমেই সূরায়ে কা’ফ রয়েছে। নিয়মিতভাবে গণনা নিম্নরূপঃ প্রথম মনযিলের তিনটি সূরা হলোঃ সূরায়ে বাকারা, সূরায়ে আলে ইমরান এবং সূরায়ে নিসা। দ্বিতীয় মনযিলের পাঁচটি সূরা হলোঃ সূরায়ে মায়েদাহ, সূরায়ে আনআম, সূরায়ে আ'রাফ, সূরায়ে আনফাল এবং সূরায়ে বারাআত। তৃতীয় মনযিলের সাতটি সূরা হচ্ছেঃ সূরায়ে ইউনুস, সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ইউসুফ, সূরায়ে রা’দ, সূরায়ে ইবরাহীম, সূরায়ে হিজর এবং সূরায়ে নাহল। চতুর্থ মনযিলের নয়টি সূরা হলোঃ সূরায়ে সুবহান, সূরায়ে কাহাফ, সূরায়ে মারইয়াম, সূরায়ে তোয়া-হা, সূরায়ে আম্বিয়া, সূরায়ে হাজ্ব, সূরায়ে মু'মিনূন, সূরায়ে নূর এবং সূরায়ে ফুরকান। পঞ্চম মনযিলের এগারোটি সূরা হচ্ছেঃ সূরায়ে শুআরা, সূরায়ে নামল, সূরায়ে কাসাস, সূরায়ে আনকাবূত, সূরায়ে রূম, সূরায়ে লোকমান, সূরায়ে আলিফ-লাম-মীম-আস্সাজদাহ, সূরায়ে আহযার, সূরায়ে সাবা, সূরায়ে ফাতির এবং সূরায়ে ইয়াসীন। ষষ্ঠ মনযিলের তেরোটি সূরা হলোঃ সূরায়ে আস-সফফাত, সূরায়ে সা’দ, সূরায়ে যুমার, সূরায়ে গাফির, সূরায়ে হা-মীম আসসাজদাহ, সূরায়ে হা-মীম-আইন-সীন-কাফ, সূরায়ে যুখরুফ, সূরায়ে দুখান, সূরায়ে জাসিয়াহ, সূরায়ে আহকাফ, সূরায়ে কিতাল, সূরায়ে ফাতহ এবং সূরায়ে হুজুরাত। তারপর শেষের মুফাসসাল সূরাগুলোর মনযিল, যেমন সাহাবীগণ (রাঃ) বলেছেন এবং এটা সূরায়ে কা'ফ হতেই শুরু হয়েছে যা আমরা বলেছি। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হযরত আবু ওয়াফিদ লাইসীকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “ঈদের নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি পড়তেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ঈদের নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরায়ে কাফ এবং সূরায়ে ইকতারাবাত পাঠ করতেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উম্মে হিশাম বিনতে হারেসাহ (রাঃ) বলেনঃ “দুই বছর অথবা এক বছর ও কয়েক মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এবং আমাদের চুল্লী একটিই ছিল। আমি সূরায়ে কা'ফ-ওয়াল-কুরআনিল মাজীদ, এই সূরাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনে শুনে মুখস্থ করে নিয়েছিলাম। কেননা, প্রত্যেক জুমআর দিন যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের সামনে ভাষণ দেয়ার জন্যে মিম্বরের উপর দাড়াতেন তখন এই সূরাটি তিনি তিলাওয়াত করতেন। মোটকথা, বড় বড় সমাবেশে, যেমন ঈদ ও জুমআতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই সূরাটি পড়তেন। কেননা, এর মধ্যে সৃষ্টির সূচনা, মৃত্যুর পরে পুনর্জীবন, আল্লাহ তা'আলার সামনে দাঁড়ানো, হিসাব-কিতাব, জান্নাত-জাহান্নাম, পুরস্কার-শাস্তি, উৎসাহ প্রদান এবং ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) হুরূফে হিজার মধ্যে একটি হরফ বা অক্ষর যেগুলো সূরাসমূহের প্রথমে এসে থাকে। যেমন (আরবী) ইত্যাদি। আমরা এগুলোর পূর্ণ ব্যাখ্যা সূরায়ে বাকারার তাফসীরের শুরুতে করে দিয়েছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, কাফ একটি পাহাড় যা সারা যমীনকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। মনে হয় এটা বানী ইসরাঈলের বানানো কথা যা কতক লোক তাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছে এই মনে করে যে, তাদের থেকে রিওয়াইয়াত গ্রহণ করা বৈধ। যদিও তা সত্যও বলা যায় না এবং মিথ্যাও না। কিন্তু আমার ধারণা এই যে, এটা এবং এই ধরনের আরো বহু। রিওয়াইয়াত তো বানী ইসরাঈলের অবিশ্বাসী লোকেরা গড়িয়ে বা বানিয়ে নিয়েছে যাতে দ্বীনকে তারা জনগণের উপর মিশ্রিত করে দিতে পারে। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, যদিও এই উম্মতের মধ্যে বড় বড় আলেম, হাফি, দ্বীনদার ও অকপট লোক সর্বযুগে ছিল এবং এখনো আছে তথাপি আল্লাহর একত্ববাদে অবিশ্বাসী লোকেরা অতি অল্প কালের মধ্যে মাওযূ' হাদীসসমূহ রচনা করে ফেলেছে! তাহলে বানী ইসরাঈল, যাদের উপর দীর্ঘ যুগ অতীত হয়েছে এবং যাদের মধ্যে হাফিয ও আলেমের সংখ্যা অতি নগণ্য ছিল, যারা আল্লাহর কালামকে মূলতত্ত্ব হতে সরিয়ে দিতো, যারা মদ্য পানে লিপ্ত থাকতো, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে বদলিয়ে দিতো, তারা যে অনেক কিছু নিজেরাই বানিয়ে নিবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। সুতরাং হাদীসে তাদের হতে যে রিওয়াইয়াতগুলো গ্রহণ করা জায়েয রাখা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ঐ রিওয়াইয়াত যেগুলো কমপক্ষে জ্ঞানে ধরে ও বুঝে আসে। ওগুলো নয় যেগুলো স্পষ্টভাবে বিবেক বিরোধী। যেগুলো শোনমাত্রই জ্ঞানে ধরা পড়ে যে, ওগুলো মিথ্যা ও বাজে। ওগুলো মিথ্যা হওয়া এমনই প্রকাশমান যে, এর জন্যে দলীল আনয়নের কোনই প্রয়োজন হয় না। সুতরাং উপরে বর্ণিত রিওয়াইয়াতটিও অনুরূপ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।বড়ই দুঃখজনক যে, পূর্বযুগীয় ও পরবর্তী যুগের বহু গুরুজন আহলে কিতাব হতে এই ধরনের বর্ণনা ও কাহিনীগুলো কুরআন কারীমের তাফসীরে আনয়ন করেছেন। আসলে কুরআন মাজীদ এই প্রকারের রিওয়াইয়াতের মোটেই মুখাপেক্ষী নয়। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই প্রাপ্য।মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান ইবনে আবি হাতিম আর রাযীও (রঃ) এখানে এক অতি বিস্ময়কর আসার হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন, যার সনদ সঠিক নয়। তাতে রয়েছেঃ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা একটি সমুদ্র সৃষ্টি করেছেন যা গোটা পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে। এই সমুদ্রের পিছনে একটি পাহাড় রয়েছে যা ওকে পরিবেষ্টন করে আছে, ওরই নাম কাফ। আকাশ ও পৃথিবী ওরই উপর উঠানো রয়েছে। আবার এই পাহাড়ের পিছনে আল্লাহ তাআলা এক যমীন সৃষ্টি করেছেন যা এই যমীন হতে সাতগুণ বড়। ওর পিছনে আবার একটি সমুদ্র রয়েছে যা ওকে ঘিরে রয়েছে। আবার ওর পিছনে একটি পাহাড় আছে যা ওকে পরিবেষ্টন করে আছে। ওটাকেও কাফ বলা হয়। দ্বিতীয় আকাশকে ওরই উপর উঁচু করা আছে। এই ভাবে সাতটি যমীন, সাতটি সমুদ্র, সাতটি পাহাড় এবং সাতটি আকাশ গণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, আল্লাহর নিমের উক্তির তাৎপর্য এটাইঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই যে সমুদ্র এর সহিত যদি আরো সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়।” (৩১:২৭) এর ইসনাদ ছেদ কাটা।হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে যা বর্ণনা করেছেন তাতে রয়েছে যে, (আরবী) আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে একটি নাম। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) অক্ষরটিও (আরবী) প্রভৃতি হুরূফে হিজার মতই একটি হরফ বা অক্ষর। সুতরাং এসব উক্তি দ্বারা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত বলে ধারণাকৃত পূর্বের উক্তিটি দূর হয়ে যায়। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছেঃ “আল্লাহর কসম! কাজের ফায়সালা করে দেয়া হয়েছে এবং বলে অবশিষ্ট বাক্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন কবির উক্তিঃ(আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে (মহিলাটিকে) বললামঃ থামো, তখন সে বললো।” কিন্তু এই তাফসীরের ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, উহ্যের উপর ইঙ্গিতকারী কালাম পরিষ্কার হওয়া উচিত। তাহলে এখানে কোন্ কালাম রয়েছে যদদ্বারা এতো বড় বাক্য উহ্য থাকার প্রতি ইঙ্গিত করছো?অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ মহাসম্মানিত কুরআনের শপথ করছেন যার সামনে হতে ও পিছন হতে বাতিল আসতেই পারে না, যা বিজ্ঞানময় ও প্রশংসার্হ আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত।এই কসমের জবাব কি এ সম্পর্কেও কয়েকটি উক্তি রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) তো কোন কোন নাহভী হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর জবাব হলো (আরবী) হতে পূর্ণ আয়াত পর্যন্ত। কিন্তু এ ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। বরং এই কসমের জবাব হলো কসমের পরবর্তী কালামের বিষয় অর্থাৎ নবুওয়াত এবং দ্বিতীয় বারের জীবনকে সাব্যস্ত করণ, যদিও শব্দ দ্বারা এটা বলা হয়নি। এরূপ কসমের জবাব কুরআন কারীমে বহু রয়েছে। যেমন সূরায়ে (আরবী)-এর শুরুতে এটা গত হয়েছে। এখানেও ঐরূপ হয়েছে। এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “কিন্তু কাফিররা তাদের মধ্যে একজন সতর্ককারী আবির্ভূত হতে দেখে বিস্ময় বোধ করে ও বলেঃ এটা তো এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার!' অর্থাৎ তারা এ দেখে খুবই বিস্ময় প্রকাশ করেছে যে, তাদেরই মধ্য হতে একজন মানুষ কিভাবে রাসূল হয়ে গেল! যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “লোকেরা কি এতে বিস্ময় বোধ করেছে যে, আমি তাদেরই মধ্য হতে একজন লোকের উপর অহী অবতীর্ণ করেছি (এই বলার জন্যে) যে, তুমি লোকদেরকে ভয় প্রদর্শন কর....?” (১০:২) অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে এটা বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না। আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মধ্যে যাকে চান রিসালাতের জন্যে মনোনীত করেন এবং মানুষের মধ্যে যাকে চান রাসূলরূপে মনোনীত করেন। এরই সাথে এটাও বর্ণিত হচ্ছে যে, তারা মৃত্যুর পরে পুনর্জীবনকেও বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখেছে। তারা বলেছেঃ আমরা যখন মরে যাবো এবং আমাদের মৃতদেহ গলে পচে মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে যাবে, এরপরেও কি আমরা পুনরুত্থিত হবো? অর্থাৎ আমাদের অবস্থা এরূপ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের পুনর্জীবন লাভ অসম্ভব। তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ মৃত্তিকা তাদের কতটুকু ক্ষয় করে তা তো আমি জানি। অর্থাৎ তাদের মৃতদেহের অণু-পরমাণু মাটির কোথায় যায় এবং কি অবস্থায় কোথায় থাকে তা আমার অজানা থাকে না। আমার নিকট যে রক্ষিত ফলক রয়েছে তাতে সব কিছুই লিপিবদ্ধ রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে তাদের গোশত, চামড়া, হাড়, চুল ইত্যাদি যা কিছু মৃত্তিকায় খেয়ে ফেলে তা আমার জানা আছে। এরপর আল্লাহ তাআলা তাদের এটাকে অসম্ভব মনে করার প্রকৃত কারণ বর্ণনা করছেন যে, তারা আসলে তাদের নিকট সত্য আসার পর তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আর যারা এভাবে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের ভাল বোধশক্তি ছিনিয়ে নেয়া হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিভিন্ন, অস্থির, প্রত্যাখ্যানকারী এবং মিশ্রণ। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা বিভিন্ন উক্তির মধ্যে রয়েছে। কুরআনের অনুসরণ হতে সেই বিরত থাকে যাকে কল্যাণ হতে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৫১:৮-৯)

ক্বাফ 50:2

যেসব সূরাকে মুফাস্সাল সূরা বলা হয় ওগুলোর মধ্যে সূরায়ে কাফই প্রথম। তবে একটি উক্তি এও আছে যে, মুফাস্সাল সূরাগুলো সূরায়ে হুজুরাত হতে শুরু হয়েছে। সর্বসাধারণের মধ্যে এটা যে প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, মুফাস্সাল সূরাগুলো (আরবী) হতে শুরু হয় এটা একেবারে ভিত্তিহীন কথা। আলেমদের কেউই এর উক্তিকারী নন। মুফাস্সাল সূরাগুলোর প্রথম সূরা এই সূরায়ে কাফই বটে। এর দলীল হচ্ছে সুনানে আবি দাউদের ঐ হাদীসটি যা ‘বাবু তাহযীবিল কুরআন’-এর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আউস ইবনে হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ সাকীফ প্রতিনিধি দলের মধ্যে শামিল হয়ে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হই। আহলাফ তো হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রাঃ)-এর ওখানে অবস্থান। করেন। আর বানু মালিককে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের ওখানে অবস্থান করান। তাঁদের মধ্যে মুসাদ্দাদ (রাঃ) নামক এক ব্যক্তি বলেনঃ “প্রত্যহ রাত্রে ইশা'র নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট আসতেন এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে তাঁর নিজের কথা শুনাতেন। এমন কি বিলম্ব হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর পা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতো। কখনো তিনি এই পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং কখনো ঐ পায়ের উপর। প্রায়ই তিনি আমাদের সামনে ঐ সব দুঃখপূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করতেন যেগুলো কুরায়েশরা ঘটিয়েছিল। অতঃপর তিনি বলতেনঃ “কোন দুঃখ নেই, আমরা মক্কায় দুর্বল ছিলাম, শক্তিহীন ছিলাম। তারপর আমরা মদীনায় আসলাম। এরপর মক্কাবাসী ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং ফল হয় বালতির মত অর্থাৎ কখনো আমরা তাদের উপর বিজয়ী হই এবং কখনো তারা আমাদের উপর বিজয়ী হয়। মোটকথা, প্রত্যহ রাত্রে আমরা তাঁর প্রিয় সাহচর্য লাভ করে গৌরবান্বিত হতাম। একদা রাত্রে তাঁর আগমনের সময় হয়ে গেল কিন্তু তিনি আসলেন না। বহুক্ষণ পর আসলেন। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আজ তো আসতে আপনার খুব বিলম্ব হলো (কারণ কি?) উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, কুরআন কারীমের যে অংশ আমি দৈনিক পাঠ করে থাকি তা এই সময় পাঠ করছিলাম। অসমাপ্ত ছেড়ে আসতে আমার মন চাইলো না (তাই সমাপ্ত করে আসতে বিলম্ব হলো)।” হযরত আউস (রাঃ) বলেনঃ আমি সাহাবীদেরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলামঃ আপনারা কুরআন কারীমকে কিভাবে ভাগ করতেন? তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “আমাদের ভাগ করার পদ্ধতি নিম্নরূপঃ প্রথম তিনটি সূরার একটি মনযিল, তারপর পাঁচটি সূরার এক মনযিল, এরপর সাতটি সূরার এক মনযিল, তারপর নয়টি সূরার এক মনযিল, অতঃপর এগারোটি সূরার এক মনযিল এবং এরপর তেরোটি সূরার এক মনযিল আর শেষে মুফাসসাল সূরাগুলোর এক মনযিল।” এ হাদীসটি সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে। সুতরাং প্রথম ছয় মনযিলে মোট আটচল্লিশটি সূরা হচ্ছে। তারপর মুফাসসালের সমস্ত সূরার একটি মনযিল হলো। আর এই মনযিলের প্রথমেই সূরায়ে কা’ফ রয়েছে। নিয়মিতভাবে গণনা নিম্নরূপঃ প্রথম মনযিলের তিনটি সূরা হলোঃ সূরায়ে বাকারা, সূরায়ে আলে ইমরান এবং সূরায়ে নিসা। দ্বিতীয় মনযিলের পাঁচটি সূরা হলোঃ সূরায়ে মায়েদাহ, সূরায়ে আনআম, সূরায়ে আ'রাফ, সূরায়ে আনফাল এবং সূরায়ে বারাআত। তৃতীয় মনযিলের সাতটি সূরা হচ্ছেঃ সূরায়ে ইউনুস, সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ইউসুফ, সূরায়ে রা’দ, সূরায়ে ইবরাহীম, সূরায়ে হিজর এবং সূরায়ে নাহল। চতুর্থ মনযিলের নয়টি সূরা হলোঃ সূরায়ে সুবহান, সূরায়ে কাহাফ, সূরায়ে মারইয়াম, সূরায়ে তোয়া-হা, সূরায়ে আম্বিয়া, সূরায়ে হাজ্ব, সূরায়ে মু'মিনূন, সূরায়ে নূর এবং সূরায়ে ফুরকান। পঞ্চম মনযিলের এগারোটি সূরা হচ্ছেঃ সূরায়ে শুআরা, সূরায়ে নামল, সূরায়ে কাসাস, সূরায়ে আনকাবূত, সূরায়ে রূম, সূরায়ে লোকমান, সূরায়ে আলিফ-লাম-মীম-আস্সাজদাহ, সূরায়ে আহযার, সূরায়ে সাবা, সূরায়ে ফাতির এবং সূরায়ে ইয়াসীন। ষষ্ঠ মনযিলের তেরোটি সূরা হলোঃ সূরায়ে আস-সফফাত, সূরায়ে সা’দ, সূরায়ে যুমার, সূরায়ে গাফির, সূরায়ে হা-মীম আসসাজদাহ, সূরায়ে হা-মীম-আইন-সীন-কাফ, সূরায়ে যুখরুফ, সূরায়ে দুখান, সূরায়ে জাসিয়াহ, সূরায়ে আহকাফ, সূরায়ে কিতাল, সূরায়ে ফাতহ এবং সূরায়ে হুজুরাত। তারপর শেষের মুফাসসাল সূরাগুলোর মনযিল, যেমন সাহাবীগণ (রাঃ) বলেছেন এবং এটা সূরায়ে কা'ফ হতেই শুরু হয়েছে যা আমরা বলেছি। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হযরত আবু ওয়াফিদ লাইসীকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “ঈদের নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি পড়তেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ঈদের নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরায়ে কাফ এবং সূরায়ে ইকতারাবাত পাঠ করতেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উম্মে হিশাম বিনতে হারেসাহ (রাঃ) বলেনঃ “দুই বছর অথবা এক বছর ও কয়েক মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এবং আমাদের চুল্লী একটিই ছিল। আমি সূরায়ে কা'ফ-ওয়াল-কুরআনিল মাজীদ, এই সূরাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনে শুনে মুখস্থ করে নিয়েছিলাম। কেননা, প্রত্যেক জুমআর দিন যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের সামনে ভাষণ দেয়ার জন্যে মিম্বরের উপর দাড়াতেন তখন এই সূরাটি তিনি তিলাওয়াত করতেন। মোটকথা, বড় বড় সমাবেশে, যেমন ঈদ ও জুমআতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই সূরাটি পড়তেন। কেননা, এর মধ্যে সৃষ্টির সূচনা, মৃত্যুর পরে পুনর্জীবন, আল্লাহ তা'আলার সামনে দাঁড়ানো, হিসাব-কিতাব, জান্নাত-জাহান্নাম, পুরস্কার-শাস্তি, উৎসাহ প্রদান এবং ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) হুরূফে হিজার মধ্যে একটি হরফ বা অক্ষর যেগুলো সূরাসমূহের প্রথমে এসে থাকে। যেমন (আরবী) ইত্যাদি। আমরা এগুলোর পূর্ণ ব্যাখ্যা সূরায়ে বাকারার তাফসীরের শুরুতে করে দিয়েছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, কাফ একটি পাহাড় যা সারা যমীনকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। মনে হয় এটা বানী ইসরাঈলের বানানো কথা যা কতক লোক তাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছে এই মনে করে যে, তাদের থেকে রিওয়াইয়াত গ্রহণ করা বৈধ। যদিও তা সত্যও বলা যায় না এবং মিথ্যাও না। কিন্তু আমার ধারণা এই যে, এটা এবং এই ধরনের আরো বহু। রিওয়াইয়াত তো বানী ইসরাঈলের অবিশ্বাসী লোকেরা গড়িয়ে বা বানিয়ে নিয়েছে যাতে দ্বীনকে তারা জনগণের উপর মিশ্রিত করে দিতে পারে। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, যদিও এই উম্মতের মধ্যে বড় বড় আলেম, হাফি, দ্বীনদার ও অকপট লোক সর্বযুগে ছিল এবং এখনো আছে তথাপি আল্লাহর একত্ববাদে অবিশ্বাসী লোকেরা অতি অল্প কালের মধ্যে মাওযূ' হাদীসসমূহ রচনা করে ফেলেছে! তাহলে বানী ইসরাঈল, যাদের উপর দীর্ঘ যুগ অতীত হয়েছে এবং যাদের মধ্যে হাফিয ও আলেমের সংখ্যা অতি নগণ্য ছিল, যারা আল্লাহর কালামকে মূলতত্ত্ব হতে সরিয়ে দিতো, যারা মদ্য পানে লিপ্ত থাকতো, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে বদলিয়ে দিতো, তারা যে অনেক কিছু নিজেরাই বানিয়ে নিবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। সুতরাং হাদীসে তাদের হতে যে রিওয়াইয়াতগুলো গ্রহণ করা জায়েয রাখা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ঐ রিওয়াইয়াত যেগুলো কমপক্ষে জ্ঞানে ধরে ও বুঝে আসে। ওগুলো নয় যেগুলো স্পষ্টভাবে বিবেক বিরোধী। যেগুলো শোনমাত্রই জ্ঞানে ধরা পড়ে যে, ওগুলো মিথ্যা ও বাজে। ওগুলো মিথ্যা হওয়া এমনই প্রকাশমান যে, এর জন্যে দলীল আনয়নের কোনই প্রয়োজন হয় না। সুতরাং উপরে বর্ণিত রিওয়াইয়াতটিও অনুরূপ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।বড়ই দুঃখজনক যে, পূর্বযুগীয় ও পরবর্তী যুগের বহু গুরুজন আহলে কিতাব হতে এই ধরনের বর্ণনা ও কাহিনীগুলো কুরআন কারীমের তাফসীরে আনয়ন করেছেন। আসলে কুরআন মাজীদ এই প্রকারের রিওয়াইয়াতের মোটেই মুখাপেক্ষী নয়। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই প্রাপ্য।মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান ইবনে আবি হাতিম আর রাযীও (রঃ) এখানে এক অতি বিস্ময়কর আসার হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন, যার সনদ সঠিক নয়। তাতে রয়েছেঃ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা একটি সমুদ্র সৃষ্টি করেছেন যা গোটা পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে। এই সমুদ্রের পিছনে একটি পাহাড় রয়েছে যা ওকে পরিবেষ্টন করে আছে, ওরই নাম কাফ। আকাশ ও পৃথিবী ওরই উপর উঠানো রয়েছে। আবার এই পাহাড়ের পিছনে আল্লাহ তাআলা এক যমীন সৃষ্টি করেছেন যা এই যমীন হতে সাতগুণ বড়। ওর পিছনে আবার একটি সমুদ্র রয়েছে যা ওকে ঘিরে রয়েছে। আবার ওর পিছনে একটি পাহাড় আছে যা ওকে পরিবেষ্টন করে আছে। ওটাকেও কাফ বলা হয়। দ্বিতীয় আকাশকে ওরই উপর উঁচু করা আছে। এই ভাবে সাতটি যমীন, সাতটি সমুদ্র, সাতটি পাহাড় এবং সাতটি আকাশ গণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, আল্লাহর নিমের উক্তির তাৎপর্য এটাইঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই যে সমুদ্র এর সহিত যদি আরো সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়।” (৩১:২৭) এর ইসনাদ ছেদ কাটা।হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে যা বর্ণনা করেছেন তাতে রয়েছে যে, (আরবী) আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে একটি নাম। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) অক্ষরটিও (আরবী) প্রভৃতি হুরূফে হিজার মতই একটি হরফ বা অক্ষর। সুতরাং এসব উক্তি দ্বারা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত বলে ধারণাকৃত পূর্বের উক্তিটি দূর হয়ে যায়। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছেঃ “আল্লাহর কসম! কাজের ফায়সালা করে দেয়া হয়েছে এবং বলে অবশিষ্ট বাক্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন কবির উক্তিঃ(আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে (মহিলাটিকে) বললামঃ থামো, তখন সে বললো।” কিন্তু এই তাফসীরের ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, উহ্যের উপর ইঙ্গিতকারী কালাম পরিষ্কার হওয়া উচিত। তাহলে এখানে কোন্ কালাম রয়েছে যদদ্বারা এতো বড় বাক্য উহ্য থাকার প্রতি ইঙ্গিত করছো?অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ মহাসম্মানিত কুরআনের শপথ করছেন যার সামনে হতে ও পিছন হতে বাতিল আসতেই পারে না, যা বিজ্ঞানময় ও প্রশংসার্হ আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত।এই কসমের জবাব কি এ সম্পর্কেও কয়েকটি উক্তি রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) তো কোন কোন নাহভী হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর জবাব হলো (আরবী) হতে পূর্ণ আয়াত পর্যন্ত। কিন্তু এ ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। বরং এই কসমের জবাব হলো কসমের পরবর্তী কালামের বিষয় অর্থাৎ নবুওয়াত এবং দ্বিতীয় বারের জীবনকে সাব্যস্ত করণ, যদিও শব্দ দ্বারা এটা বলা হয়নি। এরূপ কসমের জবাব কুরআন কারীমে বহু রয়েছে। যেমন সূরায়ে (আরবী)-এর শুরুতে এটা গত হয়েছে। এখানেও ঐরূপ হয়েছে। এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “কিন্তু কাফিররা তাদের মধ্যে একজন সতর্ককারী আবির্ভূত হতে দেখে বিস্ময় বোধ করে ও বলেঃ এটা তো এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার!' অর্থাৎ তারা এ দেখে খুবই বিস্ময় প্রকাশ করেছে যে, তাদেরই মধ্য হতে একজন মানুষ কিভাবে রাসূল হয়ে গেল! যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “লোকেরা কি এতে বিস্ময় বোধ করেছে যে, আমি তাদেরই মধ্য হতে একজন লোকের উপর অহী অবতীর্ণ করেছি (এই বলার জন্যে) যে, তুমি লোকদেরকে ভয় প্রদর্শন কর....?” (১০:২) অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে এটা বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না। আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মধ্যে যাকে চান রিসালাতের জন্যে মনোনীত করেন এবং মানুষের মধ্যে যাকে চান রাসূলরূপে মনোনীত করেন। এরই সাথে এটাও বর্ণিত হচ্ছে যে, তারা মৃত্যুর পরে পুনর্জীবনকেও বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখেছে। তারা বলেছেঃ আমরা যখন মরে যাবো এবং আমাদের মৃতদেহ গলে পচে মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে যাবে, এরপরেও কি আমরা পুনরুত্থিত হবো? অর্থাৎ আমাদের অবস্থা এরূপ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের পুনর্জীবন লাভ অসম্ভব। তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ মৃত্তিকা তাদের কতটুকু ক্ষয় করে তা তো আমি জানি। অর্থাৎ তাদের মৃতদেহের অণু-পরমাণু মাটির কোথায় যায় এবং কি অবস্থায় কোথায় থাকে তা আমার অজানা থাকে না। আমার নিকট যে রক্ষিত ফলক রয়েছে তাতে সব কিছুই লিপিবদ্ধ রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে তাদের গোশত, চামড়া, হাড়, চুল ইত্যাদি যা কিছু মৃত্তিকায় খেয়ে ফেলে তা আমার জানা আছে। এরপর আল্লাহ তাআলা তাদের এটাকে অসম্ভব মনে করার প্রকৃত কারণ বর্ণনা করছেন যে, তারা আসলে তাদের নিকট সত্য আসার পর তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আর যারা এভাবে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের ভাল বোধশক্তি ছিনিয়ে নেয়া হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিভিন্ন, অস্থির, প্রত্যাখ্যানকারী এবং মিশ্রণ। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা বিভিন্ন উক্তির মধ্যে রয়েছে। কুরআনের অনুসরণ হতে সেই বিরত থাকে যাকে কল্যাণ হতে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৫১:৮-৯)

ক্বাফ 50:3

যেসব সূরাকে মুফাস্সাল সূরা বলা হয় ওগুলোর মধ্যে সূরায়ে কাফই প্রথম। তবে একটি উক্তি এও আছে যে, মুফাস্সাল সূরাগুলো সূরায়ে হুজুরাত হতে শুরু হয়েছে। সর্বসাধারণের মধ্যে এটা যে প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, মুফাস্সাল সূরাগুলো (আরবী) হতে শুরু হয় এটা একেবারে ভিত্তিহীন কথা। আলেমদের কেউই এর উক্তিকারী নন। মুফাস্সাল সূরাগুলোর প্রথম সূরা এই সূরায়ে কাফই বটে। এর দলীল হচ্ছে সুনানে আবি দাউদের ঐ হাদীসটি যা ‘বাবু তাহযীবিল কুরআন’-এর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আউস ইবনে হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ সাকীফ প্রতিনিধি দলের মধ্যে শামিল হয়ে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হই। আহলাফ তো হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রাঃ)-এর ওখানে অবস্থান। করেন। আর বানু মালিককে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের ওখানে অবস্থান করান। তাঁদের মধ্যে মুসাদ্দাদ (রাঃ) নামক এক ব্যক্তি বলেনঃ “প্রত্যহ রাত্রে ইশা'র নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট আসতেন এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে তাঁর নিজের কথা শুনাতেন। এমন কি বিলম্ব হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর পা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতো। কখনো তিনি এই পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং কখনো ঐ পায়ের উপর। প্রায়ই তিনি আমাদের সামনে ঐ সব দুঃখপূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করতেন যেগুলো কুরায়েশরা ঘটিয়েছিল। অতঃপর তিনি বলতেনঃ “কোন দুঃখ নেই, আমরা মক্কায় দুর্বল ছিলাম, শক্তিহীন ছিলাম। তারপর আমরা মদীনায় আসলাম। এরপর মক্কাবাসী ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং ফল হয় বালতির মত অর্থাৎ কখনো আমরা তাদের উপর বিজয়ী হই এবং কখনো তারা আমাদের উপর বিজয়ী হয়। মোটকথা, প্রত্যহ রাত্রে আমরা তাঁর প্রিয় সাহচর্য লাভ করে গৌরবান্বিত হতাম। একদা রাত্রে তাঁর আগমনের সময় হয়ে গেল কিন্তু তিনি আসলেন না। বহুক্ষণ পর আসলেন। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আজ তো আসতে আপনার খুব বিলম্ব হলো (কারণ কি?) উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, কুরআন কারীমের যে অংশ আমি দৈনিক পাঠ করে থাকি তা এই সময় পাঠ করছিলাম। অসমাপ্ত ছেড়ে আসতে আমার মন চাইলো না (তাই সমাপ্ত করে আসতে বিলম্ব হলো)।” হযরত আউস (রাঃ) বলেনঃ আমি সাহাবীদেরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলামঃ আপনারা কুরআন কারীমকে কিভাবে ভাগ করতেন? তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “আমাদের ভাগ করার পদ্ধতি নিম্নরূপঃ প্রথম তিনটি সূরার একটি মনযিল, তারপর পাঁচটি সূরার এক মনযিল, এরপর সাতটি সূরার এক মনযিল, তারপর নয়টি সূরার এক মনযিল, অতঃপর এগারোটি সূরার এক মনযিল এবং এরপর তেরোটি সূরার এক মনযিল আর শেষে মুফাসসাল সূরাগুলোর এক মনযিল।” এ হাদীসটি সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে। সুতরাং প্রথম ছয় মনযিলে মোট আটচল্লিশটি সূরা হচ্ছে। তারপর মুফাসসালের সমস্ত সূরার একটি মনযিল হলো। আর এই মনযিলের প্রথমেই সূরায়ে কা’ফ রয়েছে। নিয়মিতভাবে গণনা নিম্নরূপঃ প্রথম মনযিলের তিনটি সূরা হলোঃ সূরায়ে বাকারা, সূরায়ে আলে ইমরান এবং সূরায়ে নিসা। দ্বিতীয় মনযিলের পাঁচটি সূরা হলোঃ সূরায়ে মায়েদাহ, সূরায়ে আনআম, সূরায়ে আ'রাফ, সূরায়ে আনফাল এবং সূরায়ে বারাআত। তৃতীয় মনযিলের সাতটি সূরা হচ্ছেঃ সূরায়ে ইউনুস, সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ইউসুফ, সূরায়ে রা’দ, সূরায়ে ইবরাহীম, সূরায়ে হিজর এবং সূরায়ে নাহল। চতুর্থ মনযিলের নয়টি সূরা হলোঃ সূরায়ে সুবহান, সূরায়ে কাহাফ, সূরায়ে মারইয়াম, সূরায়ে তোয়া-হা, সূরায়ে আম্বিয়া, সূরায়ে হাজ্ব, সূরায়ে মু'মিনূন, সূরায়ে নূর এবং সূরায়ে ফুরকান। পঞ্চম মনযিলের এগারোটি সূরা হচ্ছেঃ সূরায়ে শুআরা, সূরায়ে নামল, সূরায়ে কাসাস, সূরায়ে আনকাবূত, সূরায়ে রূম, সূরায়ে লোকমান, সূরায়ে আলিফ-লাম-মীম-আস্সাজদাহ, সূরায়ে আহযার, সূরায়ে সাবা, সূরায়ে ফাতির এবং সূরায়ে ইয়াসীন। ষষ্ঠ মনযিলের তেরোটি সূরা হলোঃ সূরায়ে আস-সফফাত, সূরায়ে সা’দ, সূরায়ে যুমার, সূরায়ে গাফির, সূরায়ে হা-মীম আসসাজদাহ, সূরায়ে হা-মীম-আইন-সীন-কাফ, সূরায়ে যুখরুফ, সূরায়ে দুখান, সূরায়ে জাসিয়াহ, সূরায়ে আহকাফ, সূরায়ে কিতাল, সূরায়ে ফাতহ এবং সূরায়ে হুজুরাত। তারপর শেষের মুফাসসাল সূরাগুলোর মনযিল, যেমন সাহাবীগণ (রাঃ) বলেছেন এবং এটা সূরায়ে কা'ফ হতেই শুরু হয়েছে যা আমরা বলেছি। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হযরত আবু ওয়াফিদ লাইসীকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “ঈদের নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি পড়তেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ঈদের নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরায়ে কাফ এবং সূরায়ে ইকতারাবাত পাঠ করতেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উম্মে হিশাম বিনতে হারেসাহ (রাঃ) বলেনঃ “দুই বছর অথবা এক বছর ও কয়েক মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এবং আমাদের চুল্লী একটিই ছিল। আমি সূরায়ে কা'ফ-ওয়াল-কুরআনিল মাজীদ, এই সূরাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনে শুনে মুখস্থ করে নিয়েছিলাম। কেননা, প্রত্যেক জুমআর দিন যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের সামনে ভাষণ দেয়ার জন্যে মিম্বরের উপর দাড়াতেন তখন এই সূরাটি তিনি তিলাওয়াত করতেন। মোটকথা, বড় বড় সমাবেশে, যেমন ঈদ ও জুমআতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই সূরাটি পড়তেন। কেননা, এর মধ্যে সৃষ্টির সূচনা, মৃত্যুর পরে পুনর্জীবন, আল্লাহ তা'আলার সামনে দাঁড়ানো, হিসাব-কিতাব, জান্নাত-জাহান্নাম, পুরস্কার-শাস্তি, উৎসাহ প্রদান এবং ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) হুরূফে হিজার মধ্যে একটি হরফ বা অক্ষর যেগুলো সূরাসমূহের প্রথমে এসে থাকে। যেমন (আরবী) ইত্যাদি। আমরা এগুলোর পূর্ণ ব্যাখ্যা সূরায়ে বাকারার তাফসীরের শুরুতে করে দিয়েছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, কাফ একটি পাহাড় যা সারা যমীনকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। মনে হয় এটা বানী ইসরাঈলের বানানো কথা যা কতক লোক তাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছে এই মনে করে যে, তাদের থেকে রিওয়াইয়াত গ্রহণ করা বৈধ। যদিও তা সত্যও বলা যায় না এবং মিথ্যাও না। কিন্তু আমার ধারণা এই যে, এটা এবং এই ধরনের আরো বহু। রিওয়াইয়াত তো বানী ইসরাঈলের অবিশ্বাসী লোকেরা গড়িয়ে বা বানিয়ে নিয়েছে যাতে দ্বীনকে তারা জনগণের উপর মিশ্রিত করে দিতে পারে। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, যদিও এই উম্মতের মধ্যে বড় বড় আলেম, হাফি, দ্বীনদার ও অকপট লোক সর্বযুগে ছিল এবং এখনো আছে তথাপি আল্লাহর একত্ববাদে অবিশ্বাসী লোকেরা অতি অল্প কালের মধ্যে মাওযূ' হাদীসসমূহ রচনা করে ফেলেছে! তাহলে বানী ইসরাঈল, যাদের উপর দীর্ঘ যুগ অতীত হয়েছে এবং যাদের মধ্যে হাফিয ও আলেমের সংখ্যা অতি নগণ্য ছিল, যারা আল্লাহর কালামকে মূলতত্ত্ব হতে সরিয়ে দিতো, যারা মদ্য পানে লিপ্ত থাকতো, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে বদলিয়ে দিতো, তারা যে অনেক কিছু নিজেরাই বানিয়ে নিবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। সুতরাং হাদীসে তাদের হতে যে রিওয়াইয়াতগুলো গ্রহণ করা জায়েয রাখা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ঐ রিওয়াইয়াত যেগুলো কমপক্ষে জ্ঞানে ধরে ও বুঝে আসে। ওগুলো নয় যেগুলো স্পষ্টভাবে বিবেক বিরোধী। যেগুলো শোনমাত্রই জ্ঞানে ধরা পড়ে যে, ওগুলো মিথ্যা ও বাজে। ওগুলো মিথ্যা হওয়া এমনই প্রকাশমান যে, এর জন্যে দলীল আনয়নের কোনই প্রয়োজন হয় না। সুতরাং উপরে বর্ণিত রিওয়াইয়াতটিও অনুরূপ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।বড়ই দুঃখজনক যে, পূর্বযুগীয় ও পরবর্তী যুগের বহু গুরুজন আহলে কিতাব হতে এই ধরনের বর্ণনা ও কাহিনীগুলো কুরআন কারীমের তাফসীরে আনয়ন করেছেন। আসলে কুরআন মাজীদ এই প্রকারের রিওয়াইয়াতের মোটেই মুখাপেক্ষী নয়। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই প্রাপ্য।মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান ইবনে আবি হাতিম আর রাযীও (রঃ) এখানে এক অতি বিস্ময়কর আসার হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন, যার সনদ সঠিক নয়। তাতে রয়েছেঃ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা একটি সমুদ্র সৃষ্টি করেছেন যা গোটা পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে। এই সমুদ্রের পিছনে একটি পাহাড় রয়েছে যা ওকে পরিবেষ্টন করে আছে, ওরই নাম কাফ। আকাশ ও পৃথিবী ওরই উপর উঠানো রয়েছে। আবার এই পাহাড়ের পিছনে আল্লাহ তাআলা এক যমীন সৃষ্টি করেছেন যা এই যমীন হতে সাতগুণ বড়। ওর পিছনে আবার একটি সমুদ্র রয়েছে যা ওকে ঘিরে রয়েছে। আবার ওর পিছনে একটি পাহাড় আছে যা ওকে পরিবেষ্টন করে আছে। ওটাকেও কাফ বলা হয়। দ্বিতীয় আকাশকে ওরই উপর উঁচু করা আছে। এই ভাবে সাতটি যমীন, সাতটি সমুদ্র, সাতটি পাহাড় এবং সাতটি আকাশ গণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, আল্লাহর নিমের উক্তির তাৎপর্য এটাইঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই যে সমুদ্র এর সহিত যদি আরো সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়।” (৩১:২৭) এর ইসনাদ ছেদ কাটা।হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে যা বর্ণনা করেছেন তাতে রয়েছে যে, (আরবী) আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে একটি নাম। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) অক্ষরটিও (আরবী) প্রভৃতি হুরূফে হিজার মতই একটি হরফ বা অক্ষর। সুতরাং এসব উক্তি দ্বারা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত বলে ধারণাকৃত পূর্বের উক্তিটি দূর হয়ে যায়। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছেঃ “আল্লাহর কসম! কাজের ফায়সালা করে দেয়া হয়েছে এবং বলে অবশিষ্ট বাক্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন কবির উক্তিঃ(আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে (মহিলাটিকে) বললামঃ থামো, তখন সে বললো।” কিন্তু এই তাফসীরের ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, উহ্যের উপর ইঙ্গিতকারী কালাম পরিষ্কার হওয়া উচিত। তাহলে এখানে কোন্ কালাম রয়েছে যদদ্বারা এতো বড় বাক্য উহ্য থাকার প্রতি ইঙ্গিত করছো?অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ মহাসম্মানিত কুরআনের শপথ করছেন যার সামনে হতে ও পিছন হতে বাতিল আসতেই পারে না, যা বিজ্ঞানময় ও প্রশংসার্হ আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত।এই কসমের জবাব কি এ সম্পর্কেও কয়েকটি উক্তি রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) তো কোন কোন নাহভী হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর জবাব হলো (আরবী) হতে পূর্ণ আয়াত পর্যন্ত। কিন্তু এ ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। বরং এই কসমের জবাব হলো কসমের পরবর্তী কালামের বিষয় অর্থাৎ নবুওয়াত এবং দ্বিতীয় বারের জীবনকে সাব্যস্ত করণ, যদিও শব্দ দ্বারা এটা বলা হয়নি। এরূপ কসমের জবাব কুরআন কারীমে বহু রয়েছে। যেমন সূরায়ে (আরবী)-এর শুরুতে এটা গত হয়েছে। এখানেও ঐরূপ হয়েছে। এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “কিন্তু কাফিররা তাদের মধ্যে একজন সতর্ককারী আবির্ভূত হতে দেখে বিস্ময় বোধ করে ও বলেঃ এটা তো এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার!' অর্থাৎ তারা এ দেখে খুবই বিস্ময় প্রকাশ করেছে যে, তাদেরই মধ্য হতে একজন মানুষ কিভাবে রাসূল হয়ে গেল! যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “লোকেরা কি এতে বিস্ময় বোধ করেছে যে, আমি তাদেরই মধ্য হতে একজন লোকের উপর অহী অবতীর্ণ করেছি (এই বলার জন্যে) যে, তুমি লোকদেরকে ভয় প্রদর্শন কর....?” (১০:২) অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে এটা বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না। আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মধ্যে যাকে চান রিসালাতের জন্যে মনোনীত করেন এবং মানুষের মধ্যে যাকে চান রাসূলরূপে মনোনীত করেন। এরই সাথে এটাও বর্ণিত হচ্ছে যে, তারা মৃত্যুর পরে পুনর্জীবনকেও বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখেছে। তারা বলেছেঃ আমরা যখন মরে যাবো এবং আমাদের মৃতদেহ গলে পচে মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে যাবে, এরপরেও কি আমরা পুনরুত্থিত হবো? অর্থাৎ আমাদের অবস্থা এরূপ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের পুনর্জীবন লাভ অসম্ভব। তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ মৃত্তিকা তাদের কতটুকু ক্ষয় করে তা তো আমি জানি। অর্থাৎ তাদের মৃতদেহের অণু-পরমাণু মাটির কোথায় যায় এবং কি অবস্থায় কোথায় থাকে তা আমার অজানা থাকে না। আমার নিকট যে রক্ষিত ফলক রয়েছে তাতে সব কিছুই লিপিবদ্ধ রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে তাদের গোশত, চামড়া, হাড়, চুল ইত্যাদি যা কিছু মৃত্তিকায় খেয়ে ফেলে তা আমার জানা আছে। এরপর আল্লাহ তাআলা তাদের এটাকে অসম্ভব মনে করার প্রকৃত কারণ বর্ণনা করছেন যে, তারা আসলে তাদের নিকট সত্য আসার পর তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আর যারা এভাবে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের ভাল বোধশক্তি ছিনিয়ে নেয়া হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিভিন্ন, অস্থির, প্রত্যাখ্যানকারী এবং মিশ্রণ। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা বিভিন্ন উক্তির মধ্যে রয়েছে। কুরআনের অনুসরণ হতে সেই বিরত থাকে যাকে কল্যাণ হতে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৫১:৮-৯)

ক্বাফ 50:4

যেসব সূরাকে মুফাস্সাল সূরা বলা হয় ওগুলোর মধ্যে সূরায়ে কাফই প্রথম। তবে একটি উক্তি এও আছে যে, মুফাস্সাল সূরাগুলো সূরায়ে হুজুরাত হতে শুরু হয়েছে। সর্বসাধারণের মধ্যে এটা যে প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, মুফাস্সাল সূরাগুলো (আরবী) হতে শুরু হয় এটা একেবারে ভিত্তিহীন কথা। আলেমদের কেউই এর উক্তিকারী নন। মুফাস্সাল সূরাগুলোর প্রথম সূরা এই সূরায়ে কাফই বটে। এর দলীল হচ্ছে সুনানে আবি দাউদের ঐ হাদীসটি যা ‘বাবু তাহযীবিল কুরআন’-এর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আউস ইবনে হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ সাকীফ প্রতিনিধি দলের মধ্যে শামিল হয়ে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হই। আহলাফ তো হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রাঃ)-এর ওখানে অবস্থান। করেন। আর বানু মালিককে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের ওখানে অবস্থান করান। তাঁদের মধ্যে মুসাদ্দাদ (রাঃ) নামক এক ব্যক্তি বলেনঃ “প্রত্যহ রাত্রে ইশা'র নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট আসতেন এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে তাঁর নিজের কথা শুনাতেন। এমন কি বিলম্ব হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর পা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতো। কখনো তিনি এই পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং কখনো ঐ পায়ের উপর। প্রায়ই তিনি আমাদের সামনে ঐ সব দুঃখপূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করতেন যেগুলো কুরায়েশরা ঘটিয়েছিল। অতঃপর তিনি বলতেনঃ “কোন দুঃখ নেই, আমরা মক্কায় দুর্বল ছিলাম, শক্তিহীন ছিলাম। তারপর আমরা মদীনায় আসলাম। এরপর মক্কাবাসী ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং ফল হয় বালতির মত অর্থাৎ কখনো আমরা তাদের উপর বিজয়ী হই এবং কখনো তারা আমাদের উপর বিজয়ী হয়। মোটকথা, প্রত্যহ রাত্রে আমরা তাঁর প্রিয় সাহচর্য লাভ করে গৌরবান্বিত হতাম। একদা রাত্রে তাঁর আগমনের সময় হয়ে গেল কিন্তু তিনি আসলেন না। বহুক্ষণ পর আসলেন। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আজ তো আসতে আপনার খুব বিলম্ব হলো (কারণ কি?) উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, কুরআন কারীমের যে অংশ আমি দৈনিক পাঠ করে থাকি তা এই সময় পাঠ করছিলাম। অসমাপ্ত ছেড়ে আসতে আমার মন চাইলো না (তাই সমাপ্ত করে আসতে বিলম্ব হলো)।” হযরত আউস (রাঃ) বলেনঃ আমি সাহাবীদেরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলামঃ আপনারা কুরআন কারীমকে কিভাবে ভাগ করতেন? তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “আমাদের ভাগ করার পদ্ধতি নিম্নরূপঃ প্রথম তিনটি সূরার একটি মনযিল, তারপর পাঁচটি সূরার এক মনযিল, এরপর সাতটি সূরার এক মনযিল, তারপর নয়টি সূরার এক মনযিল, অতঃপর এগারোটি সূরার এক মনযিল এবং এরপর তেরোটি সূরার এক মনযিল আর শেষে মুফাসসাল সূরাগুলোর এক মনযিল।” এ হাদীসটি সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে। সুতরাং প্রথম ছয় মনযিলে মোট আটচল্লিশটি সূরা হচ্ছে। তারপর মুফাসসালের সমস্ত সূরার একটি মনযিল হলো। আর এই মনযিলের প্রথমেই সূরায়ে কা’ফ রয়েছে। নিয়মিতভাবে গণনা নিম্নরূপঃ প্রথম মনযিলের তিনটি সূরা হলোঃ সূরায়ে বাকারা, সূরায়ে আলে ইমরান এবং সূরায়ে নিসা। দ্বিতীয় মনযিলের পাঁচটি সূরা হলোঃ সূরায়ে মায়েদাহ, সূরায়ে আনআম, সূরায়ে আ'রাফ, সূরায়ে আনফাল এবং সূরায়ে বারাআত। তৃতীয় মনযিলের সাতটি সূরা হচ্ছেঃ সূরায়ে ইউনুস, সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ইউসুফ, সূরায়ে রা’দ, সূরায়ে ইবরাহীম, সূরায়ে হিজর এবং সূরায়ে নাহল। চতুর্থ মনযিলের নয়টি সূরা হলোঃ সূরায়ে সুবহান, সূরায়ে কাহাফ, সূরায়ে মারইয়াম, সূরায়ে তোয়া-হা, সূরায়ে আম্বিয়া, সূরায়ে হাজ্ব, সূরায়ে মু'মিনূন, সূরায়ে নূর এবং সূরায়ে ফুরকান। পঞ্চম মনযিলের এগারোটি সূরা হচ্ছেঃ সূরায়ে শুআরা, সূরায়ে নামল, সূরায়ে কাসাস, সূরায়ে আনকাবূত, সূরায়ে রূম, সূরায়ে লোকমান, সূরায়ে আলিফ-লাম-মীম-আস্সাজদাহ, সূরায়ে আহযার, সূরায়ে সাবা, সূরায়ে ফাতির এবং সূরায়ে ইয়াসীন। ষষ্ঠ মনযিলের তেরোটি সূরা হলোঃ সূরায়ে আস-সফফাত, সূরায়ে সা’দ, সূরায়ে যুমার, সূরায়ে গাফির, সূরায়ে হা-মীম আসসাজদাহ, সূরায়ে হা-মীম-আইন-সীন-কাফ, সূরায়ে যুখরুফ, সূরায়ে দুখান, সূরায়ে জাসিয়াহ, সূরায়ে আহকাফ, সূরায়ে কিতাল, সূরায়ে ফাতহ এবং সূরায়ে হুজুরাত। তারপর শেষের মুফাসসাল সূরাগুলোর মনযিল, যেমন সাহাবীগণ (রাঃ) বলেছেন এবং এটা সূরায়ে কা'ফ হতেই শুরু হয়েছে যা আমরা বলেছি। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হযরত আবু ওয়াফিদ লাইসীকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “ঈদের নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি পড়তেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ঈদের নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরায়ে কাফ এবং সূরায়ে ইকতারাবাত পাঠ করতেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উম্মে হিশাম বিনতে হারেসাহ (রাঃ) বলেনঃ “দুই বছর অথবা এক বছর ও কয়েক মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এবং আমাদের চুল্লী একটিই ছিল। আমি সূরায়ে কা'ফ-ওয়াল-কুরআনিল মাজীদ, এই সূরাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনে শুনে মুখস্থ করে নিয়েছিলাম। কেননা, প্রত্যেক জুমআর দিন যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের সামনে ভাষণ দেয়ার জন্যে মিম্বরের উপর দাড়াতেন তখন এই সূরাটি তিনি তিলাওয়াত করতেন। মোটকথা, বড় বড় সমাবেশে, যেমন ঈদ ও জুমআতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই সূরাটি পড়তেন। কেননা, এর মধ্যে সৃষ্টির সূচনা, মৃত্যুর পরে পুনর্জীবন, আল্লাহ তা'আলার সামনে দাঁড়ানো, হিসাব-কিতাব, জান্নাত-জাহান্নাম, পুরস্কার-শাস্তি, উৎসাহ প্রদান এবং ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) হুরূফে হিজার মধ্যে একটি হরফ বা অক্ষর যেগুলো সূরাসমূহের প্রথমে এসে থাকে। যেমন (আরবী) ইত্যাদি। আমরা এগুলোর পূর্ণ ব্যাখ্যা সূরায়ে বাকারার তাফসীরের শুরুতে করে দিয়েছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, কাফ একটি পাহাড় যা সারা যমীনকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। মনে হয় এটা বানী ইসরাঈলের বানানো কথা যা কতক লোক তাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছে এই মনে করে যে, তাদের থেকে রিওয়াইয়াত গ্রহণ করা বৈধ। যদিও তা সত্যও বলা যায় না এবং মিথ্যাও না। কিন্তু আমার ধারণা এই যে, এটা এবং এই ধরনের আরো বহু। রিওয়াইয়াত তো বানী ইসরাঈলের অবিশ্বাসী লোকেরা গড়িয়ে বা বানিয়ে নিয়েছে যাতে দ্বীনকে তারা জনগণের উপর মিশ্রিত করে দিতে পারে। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, যদিও এই উম্মতের মধ্যে বড় বড় আলেম, হাফি, দ্বীনদার ও অকপট লোক সর্বযুগে ছিল এবং এখনো আছে তথাপি আল্লাহর একত্ববাদে অবিশ্বাসী লোকেরা অতি অল্প কালের মধ্যে মাওযূ' হাদীসসমূহ রচনা করে ফেলেছে! তাহলে বানী ইসরাঈল, যাদের উপর দীর্ঘ যুগ অতীত হয়েছে এবং যাদের মধ্যে হাফিয ও আলেমের সংখ্যা অতি নগণ্য ছিল, যারা আল্লাহর কালামকে মূলতত্ত্ব হতে সরিয়ে দিতো, যারা মদ্য পানে লিপ্ত থাকতো, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে বদলিয়ে দিতো, তারা যে অনেক কিছু নিজেরাই বানিয়ে নিবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। সুতরাং হাদীসে তাদের হতে যে রিওয়াইয়াতগুলো গ্রহণ করা জায়েয রাখা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ঐ রিওয়াইয়াত যেগুলো কমপক্ষে জ্ঞানে ধরে ও বুঝে আসে। ওগুলো নয় যেগুলো স্পষ্টভাবে বিবেক বিরোধী। যেগুলো শোনমাত্রই জ্ঞানে ধরা পড়ে যে, ওগুলো মিথ্যা ও বাজে। ওগুলো মিথ্যা হওয়া এমনই প্রকাশমান যে, এর জন্যে দলীল আনয়নের কোনই প্রয়োজন হয় না। সুতরাং উপরে বর্ণিত রিওয়াইয়াতটিও অনুরূপ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।বড়ই দুঃখজনক যে, পূর্বযুগীয় ও পরবর্তী যুগের বহু গুরুজন আহলে কিতাব হতে এই ধরনের বর্ণনা ও কাহিনীগুলো কুরআন কারীমের তাফসীরে আনয়ন করেছেন। আসলে কুরআন মাজীদ এই প্রকারের রিওয়াইয়াতের মোটেই মুখাপেক্ষী নয়। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই প্রাপ্য।মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান ইবনে আবি হাতিম আর রাযীও (রঃ) এখানে এক অতি বিস্ময়কর আসার হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন, যার সনদ সঠিক নয়। তাতে রয়েছেঃ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা একটি সমুদ্র সৃষ্টি করেছেন যা গোটা পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে। এই সমুদ্রের পিছনে একটি পাহাড় রয়েছে যা ওকে পরিবেষ্টন করে আছে, ওরই নাম কাফ। আকাশ ও পৃথিবী ওরই উপর উঠানো রয়েছে। আবার এই পাহাড়ের পিছনে আল্লাহ তাআলা এক যমীন সৃষ্টি করেছেন যা এই যমীন হতে সাতগুণ বড়। ওর পিছনে আবার একটি সমুদ্র রয়েছে যা ওকে ঘিরে রয়েছে। আবার ওর পিছনে একটি পাহাড় আছে যা ওকে পরিবেষ্টন করে আছে। ওটাকেও কাফ বলা হয়। দ্বিতীয় আকাশকে ওরই উপর উঁচু করা আছে। এই ভাবে সাতটি যমীন, সাতটি সমুদ্র, সাতটি পাহাড় এবং সাতটি আকাশ গণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, আল্লাহর নিমের উক্তির তাৎপর্য এটাইঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই যে সমুদ্র এর সহিত যদি আরো সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়।” (৩১:২৭) এর ইসনাদ ছেদ কাটা।হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে যা বর্ণনা করেছেন তাতে রয়েছে যে, (আরবী) আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে একটি নাম। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) অক্ষরটিও (আরবী) প্রভৃতি হুরূফে হিজার মতই একটি হরফ বা অক্ষর। সুতরাং এসব উক্তি দ্বারা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত বলে ধারণাকৃত পূর্বের উক্তিটি দূর হয়ে যায়। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছেঃ “আল্লাহর কসম! কাজের ফায়সালা করে দেয়া হয়েছে এবং বলে অবশিষ্ট বাক্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন কবির উক্তিঃ(আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে (মহিলাটিকে) বললামঃ থামো, তখন সে বললো।” কিন্তু এই তাফসীরের ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, উহ্যের উপর ইঙ্গিতকারী কালাম পরিষ্কার হওয়া উচিত। তাহলে এখানে কোন্ কালাম রয়েছে যদদ্বারা এতো বড় বাক্য উহ্য থাকার প্রতি ইঙ্গিত করছো?অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ মহাসম্মানিত কুরআনের শপথ করছেন যার সামনে হতে ও পিছন হতে বাতিল আসতেই পারে না, যা বিজ্ঞানময় ও প্রশংসার্হ আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত।এই কসমের জবাব কি এ সম্পর্কেও কয়েকটি উক্তি রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) তো কোন কোন নাহভী হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর জবাব হলো (আরবী) হতে পূর্ণ আয়াত পর্যন্ত। কিন্তু এ ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। বরং এই কসমের জবাব হলো কসমের পরবর্তী কালামের বিষয় অর্থাৎ নবুওয়াত এবং দ্বিতীয় বারের জীবনকে সাব্যস্ত করণ, যদিও শব্দ দ্বারা এটা বলা হয়নি। এরূপ কসমের জবাব কুরআন কারীমে বহু রয়েছে। যেমন সূরায়ে (আরবী)-এর শুরুতে এটা গত হয়েছে। এখানেও ঐরূপ হয়েছে। এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “কিন্তু কাফিররা তাদের মধ্যে একজন সতর্ককারী আবির্ভূত হতে দেখে বিস্ময় বোধ করে ও বলেঃ এটা তো এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার!' অর্থাৎ তারা এ দেখে খুবই বিস্ময় প্রকাশ করেছে যে, তাদেরই মধ্য হতে একজন মানুষ কিভাবে রাসূল হয়ে গেল! যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “লোকেরা কি এতে বিস্ময় বোধ করেছে যে, আমি তাদেরই মধ্য হতে একজন লোকের উপর অহী অবতীর্ণ করেছি (এই বলার জন্যে) যে, তুমি লোকদেরকে ভয় প্রদর্শন কর....?” (১০:২) অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে এটা বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না। আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মধ্যে যাকে চান রিসালাতের জন্যে মনোনীত করেন এবং মানুষের মধ্যে যাকে চান রাসূলরূপে মনোনীত করেন। এরই সাথে এটাও বর্ণিত হচ্ছে যে, তারা মৃত্যুর পরে পুনর্জীবনকেও বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখেছে। তারা বলেছেঃ আমরা যখন মরে যাবো এবং আমাদের মৃতদেহ গলে পচে মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে যাবে, এরপরেও কি আমরা পুনরুত্থিত হবো? অর্থাৎ আমাদের অবস্থা এরূপ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের পুনর্জীবন লাভ অসম্ভব। তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ মৃত্তিকা তাদের কতটুকু ক্ষয় করে তা তো আমি জানি। অর্থাৎ তাদের মৃতদেহের অণু-পরমাণু মাটির কোথায় যায় এবং কি অবস্থায় কোথায় থাকে তা আমার অজানা থাকে না। আমার নিকট যে রক্ষিত ফলক রয়েছে তাতে সব কিছুই লিপিবদ্ধ রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে তাদের গোশত, চামড়া, হাড়, চুল ইত্যাদি যা কিছু মৃত্তিকায় খেয়ে ফেলে তা আমার জানা আছে। এরপর আল্লাহ তাআলা তাদের এটাকে অসম্ভব মনে করার প্রকৃত কারণ বর্ণনা করছেন যে, তারা আসলে তাদের নিকট সত্য আসার পর তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আর যারা এভাবে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের ভাল বোধশক্তি ছিনিয়ে নেয়া হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিভিন্ন, অস্থির, প্রত্যাখ্যানকারী এবং মিশ্রণ। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা বিভিন্ন উক্তির মধ্যে রয়েছে। কুরআনের অনুসরণ হতে সেই বিরত থাকে যাকে কল্যাণ হতে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৫১:৮-৯)

ক্বাফ 50:5

যেসব সূরাকে মুফাস্সাল সূরা বলা হয় ওগুলোর মধ্যে সূরায়ে কাফই প্রথম। তবে একটি উক্তি এও আছে যে, মুফাস্সাল সূরাগুলো সূরায়ে হুজুরাত হতে শুরু হয়েছে। সর্বসাধারণের মধ্যে এটা যে প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, মুফাস্সাল সূরাগুলো (আরবী) হতে শুরু হয় এটা একেবারে ভিত্তিহীন কথা। আলেমদের কেউই এর উক্তিকারী নন। মুফাস্সাল সূরাগুলোর প্রথম সূরা এই সূরায়ে কাফই বটে। এর দলীল হচ্ছে সুনানে আবি দাউদের ঐ হাদীসটি যা ‘বাবু তাহযীবিল কুরআন’-এর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আউস ইবনে হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ সাকীফ প্রতিনিধি দলের মধ্যে শামিল হয়ে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হই। আহলাফ তো হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রাঃ)-এর ওখানে অবস্থান। করেন। আর বানু মালিককে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের ওখানে অবস্থান করান। তাঁদের মধ্যে মুসাদ্দাদ (রাঃ) নামক এক ব্যক্তি বলেনঃ “প্রত্যহ রাত্রে ইশা'র নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট আসতেন এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে তাঁর নিজের কথা শুনাতেন। এমন কি বিলম্ব হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর পা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতো। কখনো তিনি এই পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং কখনো ঐ পায়ের উপর। প্রায়ই তিনি আমাদের সামনে ঐ সব দুঃখপূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করতেন যেগুলো কুরায়েশরা ঘটিয়েছিল। অতঃপর তিনি বলতেনঃ “কোন দুঃখ নেই, আমরা মক্কায় দুর্বল ছিলাম, শক্তিহীন ছিলাম। তারপর আমরা মদীনায় আসলাম। এরপর মক্কাবাসী ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং ফল হয় বালতির মত অর্থাৎ কখনো আমরা তাদের উপর বিজয়ী হই এবং কখনো তারা আমাদের উপর বিজয়ী হয়। মোটকথা, প্রত্যহ রাত্রে আমরা তাঁর প্রিয় সাহচর্য লাভ করে গৌরবান্বিত হতাম। একদা রাত্রে তাঁর আগমনের সময় হয়ে গেল কিন্তু তিনি আসলেন না। বহুক্ষণ পর আসলেন। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আজ তো আসতে আপনার খুব বিলম্ব হলো (কারণ কি?) উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, কুরআন কারীমের যে অংশ আমি দৈনিক পাঠ করে থাকি তা এই সময় পাঠ করছিলাম। অসমাপ্ত ছেড়ে আসতে আমার মন চাইলো না (তাই সমাপ্ত করে আসতে বিলম্ব হলো)।” হযরত আউস (রাঃ) বলেনঃ আমি সাহাবীদেরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলামঃ আপনারা কুরআন কারীমকে কিভাবে ভাগ করতেন? তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “আমাদের ভাগ করার পদ্ধতি নিম্নরূপঃ প্রথম তিনটি সূরার একটি মনযিল, তারপর পাঁচটি সূরার এক মনযিল, এরপর সাতটি সূরার এক মনযিল, তারপর নয়টি সূরার এক মনযিল, অতঃপর এগারোটি সূরার এক মনযিল এবং এরপর তেরোটি সূরার এক মনযিল আর শেষে মুফাসসাল সূরাগুলোর এক মনযিল।” এ হাদীসটি সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে। সুতরাং প্রথম ছয় মনযিলে মোট আটচল্লিশটি সূরা হচ্ছে। তারপর মুফাসসালের সমস্ত সূরার একটি মনযিল হলো। আর এই মনযিলের প্রথমেই সূরায়ে কা’ফ রয়েছে। নিয়মিতভাবে গণনা নিম্নরূপঃ প্রথম মনযিলের তিনটি সূরা হলোঃ সূরায়ে বাকারা, সূরায়ে আলে ইমরান এবং সূরায়ে নিসা। দ্বিতীয় মনযিলের পাঁচটি সূরা হলোঃ সূরায়ে মায়েদাহ, সূরায়ে আনআম, সূরায়ে আ'রাফ, সূরায়ে আনফাল এবং সূরায়ে বারাআত। তৃতীয় মনযিলের সাতটি সূরা হচ্ছেঃ সূরায়ে ইউনুস, সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ইউসুফ, সূরায়ে রা’দ, সূরায়ে ইবরাহীম, সূরায়ে হিজর এবং সূরায়ে নাহল। চতুর্থ মনযিলের নয়টি সূরা হলোঃ সূরায়ে সুবহান, সূরায়ে কাহাফ, সূরায়ে মারইয়াম, সূরায়ে তোয়া-হা, সূরায়ে আম্বিয়া, সূরায়ে হাজ্ব, সূরায়ে মু'মিনূন, সূরায়ে নূর এবং সূরায়ে ফুরকান। পঞ্চম মনযিলের এগারোটি সূরা হচ্ছেঃ সূরায়ে শুআরা, সূরায়ে নামল, সূরায়ে কাসাস, সূরায়ে আনকাবূত, সূরায়ে রূম, সূরায়ে লোকমান, সূরায়ে আলিফ-লাম-মীম-আস্সাজদাহ, সূরায়ে আহযার, সূরায়ে সাবা, সূরায়ে ফাতির এবং সূরায়ে ইয়াসীন। ষষ্ঠ মনযিলের তেরোটি সূরা হলোঃ সূরায়ে আস-সফফাত, সূরায়ে সা’দ, সূরায়ে যুমার, সূরায়ে গাফির, সূরায়ে হা-মীম আসসাজদাহ, সূরায়ে হা-মীম-আইন-সীন-কাফ, সূরায়ে যুখরুফ, সূরায়ে দুখান, সূরায়ে জাসিয়াহ, সূরায়ে আহকাফ, সূরায়ে কিতাল, সূরায়ে ফাতহ এবং সূরায়ে হুজুরাত। তারপর শেষের মুফাসসাল সূরাগুলোর মনযিল, যেমন সাহাবীগণ (রাঃ) বলেছেন এবং এটা সূরায়ে কা'ফ হতেই শুরু হয়েছে যা আমরা বলেছি। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হযরত আবু ওয়াফিদ লাইসীকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “ঈদের নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি পড়তেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ঈদের নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরায়ে কাফ এবং সূরায়ে ইকতারাবাত পাঠ করতেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উম্মে হিশাম বিনতে হারেসাহ (রাঃ) বলেনঃ “দুই বছর অথবা এক বছর ও কয়েক মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এবং আমাদের চুল্লী একটিই ছিল। আমি সূরায়ে কা'ফ-ওয়াল-কুরআনিল মাজীদ, এই সূরাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনে শুনে মুখস্থ করে নিয়েছিলাম। কেননা, প্রত্যেক জুমআর দিন যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের সামনে ভাষণ দেয়ার জন্যে মিম্বরের উপর দাড়াতেন তখন এই সূরাটি তিনি তিলাওয়াত করতেন। মোটকথা, বড় বড় সমাবেশে, যেমন ঈদ ও জুমআতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই সূরাটি পড়তেন। কেননা, এর মধ্যে সৃষ্টির সূচনা, মৃত্যুর পরে পুনর্জীবন, আল্লাহ তা'আলার সামনে দাঁড়ানো, হিসাব-কিতাব, জান্নাত-জাহান্নাম, পুরস্কার-শাস্তি, উৎসাহ প্রদান এবং ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। ১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) হুরূফে হিজার মধ্যে একটি হরফ বা অক্ষর যেগুলো সূরাসমূহের প্রথমে এসে থাকে। যেমন (আরবী) ইত্যাদি। আমরা এগুলোর পূর্ণ ব্যাখ্যা সূরায়ে বাকারার তাফসীরের শুরুতে করে দিয়েছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, কাফ একটি পাহাড় যা সারা যমীনকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। মনে হয় এটা বানী ইসরাঈলের বানানো কথা যা কতক লোক তাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছে এই মনে করে যে, তাদের থেকে রিওয়াইয়াত গ্রহণ করা বৈধ। যদিও তা সত্যও বলা যায় না এবং মিথ্যাও না। কিন্তু আমার ধারণা এই যে, এটা এবং এই ধরনের আরো বহু। রিওয়াইয়াত তো বানী ইসরাঈলের অবিশ্বাসী লোকেরা গড়িয়ে বা বানিয়ে নিয়েছে যাতে দ্বীনকে তারা জনগণের উপর মিশ্রিত করে দিতে পারে। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, যদিও এই উম্মতের মধ্যে বড় বড় আলেম, হাফি, দ্বীনদার ও অকপট লোক সর্বযুগে ছিল এবং এখনো আছে তথাপি আল্লাহর একত্ববাদে অবিশ্বাসী লোকেরা অতি অল্প কালের মধ্যে মাওযূ' হাদীসসমূহ রচনা করে ফেলেছে! তাহলে বানী ইসরাঈল, যাদের উপর দীর্ঘ যুগ অতীত হয়েছে এবং যাদের মধ্যে হাফিয ও আলেমের সংখ্যা অতি নগণ্য ছিল, যারা আল্লাহর কালামকে মূলতত্ত্ব হতে সরিয়ে দিতো, যারা মদ্য পানে লিপ্ত থাকতো, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে বদলিয়ে দিতো, তারা যে অনেক কিছু নিজেরাই বানিয়ে নিবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। সুতরাং হাদীসে তাদের হতে যে রিওয়াইয়াতগুলো গ্রহণ করা জায়েয রাখা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ঐ রিওয়াইয়াত যেগুলো কমপক্ষে জ্ঞানে ধরে ও বুঝে আসে। ওগুলো নয় যেগুলো স্পষ্টভাবে বিবেক বিরোধী। যেগুলো শোনমাত্রই জ্ঞানে ধরা পড়ে যে, ওগুলো মিথ্যা ও বাজে। ওগুলো মিথ্যা হওয়া এমনই প্রকাশমান যে, এর জন্যে দলীল আনয়নের কোনই প্রয়োজন হয় না। সুতরাং উপরে বর্ণিত রিওয়াইয়াতটিও অনুরূপ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।বড়ই দুঃখজনক যে, পূর্বযুগীয় ও পরবর্তী যুগের বহু গুরুজন আহলে কিতাব হতে এই ধরনের বর্ণনা ও কাহিনীগুলো কুরআন কারীমের তাফসীরে আনয়ন করেছেন। আসলে কুরআন মাজীদ এই প্রকারের রিওয়াইয়াতের মোটেই মুখাপেক্ষী নয়। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই প্রাপ্য।মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান ইবনে আবি হাতিম আর রাযীও (রঃ) এখানে এক অতি বিস্ময়কর আসার হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন, যার সনদ সঠিক নয়। তাতে রয়েছেঃ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা একটি সমুদ্র সৃষ্টি করেছেন যা গোটা পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে। এই সমুদ্রের পিছনে একটি পাহাড় রয়েছে যা ওকে পরিবেষ্টন করে আছে, ওরই নাম কাফ। আকাশ ও পৃথিবী ওরই উপর উঠানো রয়েছে। আবার এই পাহাড়ের পিছনে আল্লাহ তাআলা এক যমীন সৃষ্টি করেছেন যা এই যমীন হতে সাতগুণ বড়। ওর পিছনে আবার একটি সমুদ্র রয়েছে যা ওকে ঘিরে রয়েছে। আবার ওর পিছনে একটি পাহাড় আছে যা ওকে পরিবেষ্টন করে আছে। ওটাকেও কাফ বলা হয়। দ্বিতীয় আকাশকে ওরই উপর উঁচু করা আছে। এই ভাবে সাতটি যমীন, সাতটি সমুদ্র, সাতটি পাহাড় এবং সাতটি আকাশ গণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, আল্লাহর নিমের উক্তির তাৎপর্য এটাইঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই যে সমুদ্র এর সহিত যদি আরো সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়।” (৩১:২৭) এর ইসনাদ ছেদ কাটা।হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে যা বর্ণনা করেছেন তাতে রয়েছে যে, (আরবী) আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে একটি নাম। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) অক্ষরটিও (আরবী) প্রভৃতি হুরূফে হিজার মতই একটি হরফ বা অক্ষর। সুতরাং এসব উক্তি দ্বারা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত বলে ধারণাকৃত পূর্বের উক্তিটি দূর হয়ে যায়। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছেঃ “আল্লাহর কসম! কাজের ফায়সালা করে দেয়া হয়েছে এবং বলে অবশিষ্ট বাক্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন কবির উক্তিঃ(আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে (মহিলাটিকে) বললামঃ থামো, তখন সে বললো।” কিন্তু এই তাফসীরের ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, উহ্যের উপর ইঙ্গিতকারী কালাম পরিষ্কার হওয়া উচিত। তাহলে এখানে কোন্ কালাম রয়েছে যদদ্বারা এতো বড় বাক্য উহ্য থাকার প্রতি ইঙ্গিত করছো?অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ মহাসম্মানিত কুরআনের শপথ করছেন যার সামনে হতে ও পিছন হতে বাতিল আসতেই পারে না, যা বিজ্ঞানময় ও প্রশংসার্হ আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত।এই কসমের জবাব কি এ সম্পর্কেও কয়েকটি উক্তি রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) তো কোন কোন নাহভী হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর জবাব হলো (আরবী) হতে পূর্ণ আয়াত পর্যন্ত। কিন্তু এ ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। বরং এই কসমের জবাব হলো কসমের পরবর্তী কালামের বিষয় অর্থাৎ নবুওয়াত এবং দ্বিতীয় বারের জীবনকে সাব্যস্ত করণ, যদিও শব্দ দ্বারা এটা বলা হয়নি। এরূপ কসমের জবাব কুরআন কারীমে বহু রয়েছে। যেমন সূরায়ে (আরবী)-এর শুরুতে এটা গত হয়েছে। এখানেও ঐরূপ হয়েছে। এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “কিন্তু কাফিররা তাদের মধ্যে একজন সতর্ককারী আবির্ভূত হতে দেখে বিস্ময় বোধ করে ও বলেঃ এটা তো এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার!' অর্থাৎ তারা এ দেখে খুবই বিস্ময় প্রকাশ করেছে যে, তাদেরই মধ্য হতে একজন মানুষ কিভাবে রাসূল হয়ে গেল! যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “লোকেরা কি এতে বিস্ময় বোধ করেছে যে, আমি তাদেরই মধ্য হতে একজন লোকের উপর অহী অবতীর্ণ করেছি (এই বলার জন্যে) যে, তুমি লোকদেরকে ভয় প্রদর্শন কর....?” (১০:২) অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে এটা বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না। আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মধ্যে যাকে চান রিসালাতের জন্যে মনোনীত করেন এবং মানুষের মধ্যে যাকে চান রাসূলরূপে মনোনীত করেন। এরই সাথে এটাও বর্ণিত হচ্ছে যে, তারা মৃত্যুর পরে পুনর্জীবনকেও বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখেছে। তারা বলেছেঃ আমরা যখন মরে যাবো এবং আমাদের মৃতদেহ গলে পচে মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে যাবে, এরপরেও কি আমরা পুনরুত্থিত হবো? অর্থাৎ আমাদের অবস্থা এরূপ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের পুনর্জীবন লাভ অসম্ভব। তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ মৃত্তিকা তাদের কতটুকু ক্ষয় করে তা তো আমি জানি। অর্থাৎ তাদের মৃতদেহের অণু-পরমাণু মাটির কোথায় যায় এবং কি অবস্থায় কোথায় থাকে তা আমার অজানা থাকে না। আমার নিকট যে রক্ষিত ফলক রয়েছে তাতে সব কিছুই লিপিবদ্ধ রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে তাদের গোশত, চামড়া, হাড়, চুল ইত্যাদি যা কিছু মৃত্তিকায় খেয়ে ফেলে তা আমার জানা আছে। এরপর আল্লাহ তাআলা তাদের এটাকে অসম্ভব মনে করার প্রকৃত কারণ বর্ণনা করছেন যে, তারা আসলে তাদের নিকট সত্য আসার পর তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আর যারা এভাবে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের ভাল বোধশক্তি ছিনিয়ে নেয়া হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিভিন্ন, অস্থির, প্রত্যাখ্যানকারী এবং মিশ্রণ। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা বিভিন্ন উক্তির মধ্যে রয়েছে। কুরআনের অনুসরণ হতে সেই বিরত থাকে যাকে কল্যাণ হতে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৫১:৮-৯)

ক্বাফ 50:6

৬-১১ নং আয়াতের তাফসীর: এ লোকগুলো যেটাকে অসম্ভব মনে করছে, বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ ওর চেয়েও নিজের বড় শক্তির নমুনা তাদের সামনে পেশ করে বলছেনঃ তোমরা আকাশের দিকে চেয়ে দেখো, ওর নির্মাণ কৌশলের কথা একটু চিন্তা কর, ওর উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজির প্রতি দৃষ্টিপাত কর এবং লক্ষ্য কর যে, ওর কোন জায়গায় কোন ছিদ্র বা ফাটল নেই। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “যিনি সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে সপ্তাকাশ। দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোন খুঁত দেখতে পাবে না। আবার তাকিয়ে দেখো, কোন ত্রুটি দেখতে পাও কি?” অতঃপর তুমি বারবার দৃষ্টি ফিরাও, সেই দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে। (৬৭:৩-৪)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা যাতে যমীন হেলা-দোলা না করে। কেননা, যমীন চতুর্দিক হতে পানি দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছে। আর আমি ওতে উদাত করেছি নয়ন প্রীতিকর সর্বপ্রকার উদ্ভিদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক জিনিসকে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছি যাতে তোমরা উপদেশ লাভ কর।” (৫১:৪৯)। অতঃপর মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আসমান, যমীন এবং এ ছাড়াও আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার আরো বহু নিদর্শন রয়েছে, এগুলো আল্লাহর অনুরাগী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে জ্ঞান ও উপদেশ স্বরূপ।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আকাশ হতে কল্যাণকর বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তদ্দ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান ও পরিপক্ক শস্যরাজি এবং সমুন্নত খর্জুর বৃক্ষ যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর। এগুলো আমার বান্দাদের জীবিকা স্বরূপ। বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত ও শুষ্ক ভূমিকে সঞ্জীবিত করে থাকি। ভূমি তখন সবুজ-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত হতে থাকে। এভাবেই মৃতকে পুনর্জীবিত করা হবে এবং পুনরুত্থান এভাবেই ঘটবে। মানুষ তো এসব নিদর্শন দৈনন্দিন দেখছে। এরপরেও কি তাদের জ্ঞানচক্ষু ফিরবে না? তারা কি এখনো বিশ্বাস করবে না যে, আল্লাহ তাআলা মৃতকে পুনর্জীবন দান করতে পূর্ণরূপে ক্ষমতাবান? যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি মানব সৃষ্টি অপেক্ষা খুব বড় (ভারী বা কঠিন)।” (৪০:৫৭) আর একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি অনুধাবন করে না যে, আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী। সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবনদান করতেও সক্ষম? বস্তুতঃ তিনি সর্বশক্তিমান।” (৪৬:৩৩) মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “এবং তার একটি নিদর্শন এই যে, তুমি ভূমিকে দেখতে পাও শুষ্ক, উর্বর, অতঃপর আমি ওতে বারি বর্ষণ করলে ওটা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়; যিনি ভূমিকে জীবিত করেন তিনিই মৃতের জীবন দানকারী। তিনি তো সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (৪১:৩৯)।

ক্বাফ 50:7

৬-১১ নং আয়াতের তাফসীর: এ লোকগুলো যেটাকে অসম্ভব মনে করছে, বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ ওর চেয়েও নিজের বড় শক্তির নমুনা তাদের সামনে পেশ করে বলছেনঃ তোমরা আকাশের দিকে চেয়ে দেখো, ওর নির্মাণ কৌশলের কথা একটু চিন্তা কর, ওর উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজির প্রতি দৃষ্টিপাত কর এবং লক্ষ্য কর যে, ওর কোন জায়গায় কোন ছিদ্র বা ফাটল নেই। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “যিনি সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে সপ্তাকাশ। দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোন খুঁত দেখতে পাবে না। আবার তাকিয়ে দেখো, কোন ত্রুটি দেখতে পাও কি?” অতঃপর তুমি বারবার দৃষ্টি ফিরাও, সেই দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে। (৬৭:৩-৪)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা যাতে যমীন হেলা-দোলা না করে। কেননা, যমীন চতুর্দিক হতে পানি দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছে। আর আমি ওতে উদাত করেছি নয়ন প্রীতিকর সর্বপ্রকার উদ্ভিদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক জিনিসকে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছি যাতে তোমরা উপদেশ লাভ কর।” (৫১:৪৯)। অতঃপর মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আসমান, যমীন এবং এ ছাড়াও আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার আরো বহু নিদর্শন রয়েছে, এগুলো আল্লাহর অনুরাগী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে জ্ঞান ও উপদেশ স্বরূপ।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আকাশ হতে কল্যাণকর বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তদ্দ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান ও পরিপক্ক শস্যরাজি এবং সমুন্নত খর্জুর বৃক্ষ যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর। এগুলো আমার বান্দাদের জীবিকা স্বরূপ। বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত ও শুষ্ক ভূমিকে সঞ্জীবিত করে থাকি। ভূমি তখন সবুজ-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত হতে থাকে। এভাবেই মৃতকে পুনর্জীবিত করা হবে এবং পুনরুত্থান এভাবেই ঘটবে। মানুষ তো এসব নিদর্শন দৈনন্দিন দেখছে। এরপরেও কি তাদের জ্ঞানচক্ষু ফিরবে না? তারা কি এখনো বিশ্বাস করবে না যে, আল্লাহ তাআলা মৃতকে পুনর্জীবন দান করতে পূর্ণরূপে ক্ষমতাবান? যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি মানব সৃষ্টি অপেক্ষা খুব বড় (ভারী বা কঠিন)।” (৪০:৫৭) আর একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি অনুধাবন করে না যে, আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী। সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবনদান করতেও সক্ষম? বস্তুতঃ তিনি সর্বশক্তিমান।” (৪৬:৩৩) মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “এবং তার একটি নিদর্শন এই যে, তুমি ভূমিকে দেখতে পাও শুষ্ক, উর্বর, অতঃপর আমি ওতে বারি বর্ষণ করলে ওটা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়; যিনি ভূমিকে জীবিত করেন তিনিই মৃতের জীবন দানকারী। তিনি তো সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (৪১:৩৯)।

ক্বাফ 50:8

৬-১১ নং আয়াতের তাফসীর: এ লোকগুলো যেটাকে অসম্ভব মনে করছে, বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ ওর চেয়েও নিজের বড় শক্তির নমুনা তাদের সামনে পেশ করে বলছেনঃ তোমরা আকাশের দিকে চেয়ে দেখো, ওর নির্মাণ কৌশলের কথা একটু চিন্তা কর, ওর উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজির প্রতি দৃষ্টিপাত কর এবং লক্ষ্য কর যে, ওর কোন জায়গায় কোন ছিদ্র বা ফাটল নেই। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “যিনি সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে সপ্তাকাশ। দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোন খুঁত দেখতে পাবে না। আবার তাকিয়ে দেখো, কোন ত্রুটি দেখতে পাও কি?” অতঃপর তুমি বারবার দৃষ্টি ফিরাও, সেই দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে। (৬৭:৩-৪)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা যাতে যমীন হেলা-দোলা না করে। কেননা, যমীন চতুর্দিক হতে পানি দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছে। আর আমি ওতে উদাত করেছি নয়ন প্রীতিকর সর্বপ্রকার উদ্ভিদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক জিনিসকে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছি যাতে তোমরা উপদেশ লাভ কর।” (৫১:৪৯)। অতঃপর মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আসমান, যমীন এবং এ ছাড়াও আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার আরো বহু নিদর্শন রয়েছে, এগুলো আল্লাহর অনুরাগী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে জ্ঞান ও উপদেশ স্বরূপ।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আকাশ হতে কল্যাণকর বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তদ্দ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান ও পরিপক্ক শস্যরাজি এবং সমুন্নত খর্জুর বৃক্ষ যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর। এগুলো আমার বান্দাদের জীবিকা স্বরূপ। বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত ও শুষ্ক ভূমিকে সঞ্জীবিত করে থাকি। ভূমি তখন সবুজ-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত হতে থাকে। এভাবেই মৃতকে পুনর্জীবিত করা হবে এবং পুনরুত্থান এভাবেই ঘটবে। মানুষ তো এসব নিদর্শন দৈনন্দিন দেখছে। এরপরেও কি তাদের জ্ঞানচক্ষু ফিরবে না? তারা কি এখনো বিশ্বাস করবে না যে, আল্লাহ তাআলা মৃতকে পুনর্জীবন দান করতে পূর্ণরূপে ক্ষমতাবান? যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি মানব সৃষ্টি অপেক্ষা খুব বড় (ভারী বা কঠিন)।” (৪০:৫৭) আর একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি অনুধাবন করে না যে, আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী। সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবনদান করতেও সক্ষম? বস্তুতঃ তিনি সর্বশক্তিমান।” (৪৬:৩৩) মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “এবং তার একটি নিদর্শন এই যে, তুমি ভূমিকে দেখতে পাও শুষ্ক, উর্বর, অতঃপর আমি ওতে বারি বর্ষণ করলে ওটা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়; যিনি ভূমিকে জীবিত করেন তিনিই মৃতের জীবন দানকারী। তিনি তো সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (৪১:৩৯)।

ক্বাফ 50:9

৬-১১ নং আয়াতের তাফসীর: এ লোকগুলো যেটাকে অসম্ভব মনে করছে, বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ ওর চেয়েও নিজের বড় শক্তির নমুনা তাদের সামনে পেশ করে বলছেনঃ তোমরা আকাশের দিকে চেয়ে দেখো, ওর নির্মাণ কৌশলের কথা একটু চিন্তা কর, ওর উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজির প্রতি দৃষ্টিপাত কর এবং লক্ষ্য কর যে, ওর কোন জায়গায় কোন ছিদ্র বা ফাটল নেই। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “যিনি সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে সপ্তাকাশ। দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোন খুঁত দেখতে পাবে না। আবার তাকিয়ে দেখো, কোন ত্রুটি দেখতে পাও কি?” অতঃপর তুমি বারবার দৃষ্টি ফিরাও, সেই দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে। (৬৭:৩-৪)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা যাতে যমীন হেলা-দোলা না করে। কেননা, যমীন চতুর্দিক হতে পানি দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছে। আর আমি ওতে উদাত করেছি নয়ন প্রীতিকর সর্বপ্রকার উদ্ভিদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক জিনিসকে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছি যাতে তোমরা উপদেশ লাভ কর।” (৫১:৪৯)। অতঃপর মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আসমান, যমীন এবং এ ছাড়াও আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার আরো বহু নিদর্শন রয়েছে, এগুলো আল্লাহর অনুরাগী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে জ্ঞান ও উপদেশ স্বরূপ।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আকাশ হতে কল্যাণকর বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তদ্দ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান ও পরিপক্ক শস্যরাজি এবং সমুন্নত খর্জুর বৃক্ষ যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর। এগুলো আমার বান্দাদের জীবিকা স্বরূপ। বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত ও শুষ্ক ভূমিকে সঞ্জীবিত করে থাকি। ভূমি তখন সবুজ-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত হতে থাকে। এভাবেই মৃতকে পুনর্জীবিত করা হবে এবং পুনরুত্থান এভাবেই ঘটবে। মানুষ তো এসব নিদর্শন দৈনন্দিন দেখছে। এরপরেও কি তাদের জ্ঞানচক্ষু ফিরবে না? তারা কি এখনো বিশ্বাস করবে না যে, আল্লাহ তাআলা মৃতকে পুনর্জীবন দান করতে পূর্ণরূপে ক্ষমতাবান? যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি মানব সৃষ্টি অপেক্ষা খুব বড় (ভারী বা কঠিন)।” (৪০:৫৭) আর একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি অনুধাবন করে না যে, আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী। সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবনদান করতেও সক্ষম? বস্তুতঃ তিনি সর্বশক্তিমান।” (৪৬:৩৩) মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “এবং তার একটি নিদর্শন এই যে, তুমি ভূমিকে দেখতে পাও শুষ্ক, উর্বর, অতঃপর আমি ওতে বারি বর্ষণ করলে ওটা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়; যিনি ভূমিকে জীবিত করেন তিনিই মৃতের জীবন দানকারী। তিনি তো সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (৪১:৩৯)।

ক্বাফ 50:10

৬-১১ নং আয়াতের তাফসীর: এ লোকগুলো যেটাকে অসম্ভব মনে করছে, বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ ওর চেয়েও নিজের বড় শক্তির নমুনা তাদের সামনে পেশ করে বলছেনঃ তোমরা আকাশের দিকে চেয়ে দেখো, ওর নির্মাণ কৌশলের কথা একটু চিন্তা কর, ওর উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজির প্রতি দৃষ্টিপাত কর এবং লক্ষ্য কর যে, ওর কোন জায়গায় কোন ছিদ্র বা ফাটল নেই। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “যিনি সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে সপ্তাকাশ। দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোন খুঁত দেখতে পাবে না। আবার তাকিয়ে দেখো, কোন ত্রুটি দেখতে পাও কি?” অতঃপর তুমি বারবার দৃষ্টি ফিরাও, সেই দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে। (৬৭:৩-৪)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা যাতে যমীন হেলা-দোলা না করে। কেননা, যমীন চতুর্দিক হতে পানি দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছে। আর আমি ওতে উদাত করেছি নয়ন প্রীতিকর সর্বপ্রকার উদ্ভিদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক জিনিসকে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছি যাতে তোমরা উপদেশ লাভ কর।” (৫১:৪৯)। অতঃপর মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আসমান, যমীন এবং এ ছাড়াও আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার আরো বহু নিদর্শন রয়েছে, এগুলো আল্লাহর অনুরাগী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে জ্ঞান ও উপদেশ স্বরূপ।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আকাশ হতে কল্যাণকর বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তদ্দ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান ও পরিপক্ক শস্যরাজি এবং সমুন্নত খর্জুর বৃক্ষ যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর। এগুলো আমার বান্দাদের জীবিকা স্বরূপ। বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত ও শুষ্ক ভূমিকে সঞ্জীবিত করে থাকি। ভূমি তখন সবুজ-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত হতে থাকে। এভাবেই মৃতকে পুনর্জীবিত করা হবে এবং পুনরুত্থান এভাবেই ঘটবে। মানুষ তো এসব নিদর্শন দৈনন্দিন দেখছে। এরপরেও কি তাদের জ্ঞানচক্ষু ফিরবে না? তারা কি এখনো বিশ্বাস করবে না যে, আল্লাহ তাআলা মৃতকে পুনর্জীবন দান করতে পূর্ণরূপে ক্ষমতাবান? যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি মানব সৃষ্টি অপেক্ষা খুব বড় (ভারী বা কঠিন)।” (৪০:৫৭) আর একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি অনুধাবন করে না যে, আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী। সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবনদান করতেও সক্ষম? বস্তুতঃ তিনি সর্বশক্তিমান।” (৪৬:৩৩) মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “এবং তার একটি নিদর্শন এই যে, তুমি ভূমিকে দেখতে পাও শুষ্ক, উর্বর, অতঃপর আমি ওতে বারি বর্ষণ করলে ওটা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়; যিনি ভূমিকে জীবিত করেন তিনিই মৃতের জীবন দানকারী। তিনি তো সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (৪১:৩৯)।

ক্বাফ 50:11

৬-১১ নং আয়াতের তাফসীর: এ লোকগুলো যেটাকে অসম্ভব মনে করছে, বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ ওর চেয়েও নিজের বড় শক্তির নমুনা তাদের সামনে পেশ করে বলছেনঃ তোমরা আকাশের দিকে চেয়ে দেখো, ওর নির্মাণ কৌশলের কথা একটু চিন্তা কর, ওর উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজির প্রতি দৃষ্টিপাত কর এবং লক্ষ্য কর যে, ওর কোন জায়গায় কোন ছিদ্র বা ফাটল নেই। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ(আরবী) অর্থাৎ “যিনি সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে সপ্তাকাশ। দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোন খুঁত দেখতে পাবে না। আবার তাকিয়ে দেখো, কোন ত্রুটি দেখতে পাও কি?” অতঃপর তুমি বারবার দৃষ্টি ফিরাও, সেই দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে। (৬৭:৩-৪)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা যাতে যমীন হেলা-দোলা না করে। কেননা, যমীন চতুর্দিক হতে পানি দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছে। আর আমি ওতে উদাত করেছি নয়ন প্রীতিকর সর্বপ্রকার উদ্ভিদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক জিনিসকে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছি যাতে তোমরা উপদেশ লাভ কর।” (৫১:৪৯)। অতঃপর মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আসমান, যমীন এবং এ ছাড়াও আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার আরো বহু নিদর্শন রয়েছে, এগুলো আল্লাহর অনুরাগী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে জ্ঞান ও উপদেশ স্বরূপ।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আকাশ হতে কল্যাণকর বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তদ্দ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান ও পরিপক্ক শস্যরাজি এবং সমুন্নত খর্জুর বৃক্ষ যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর। এগুলো আমার বান্দাদের জীবিকা স্বরূপ। বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত ও শুষ্ক ভূমিকে সঞ্জীবিত করে থাকি। ভূমি তখন সবুজ-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত হতে থাকে। এভাবেই মৃতকে পুনর্জীবিত করা হবে এবং পুনরুত্থান এভাবেই ঘটবে। মানুষ তো এসব নিদর্শন দৈনন্দিন দেখছে। এরপরেও কি তাদের জ্ঞানচক্ষু ফিরবে না? তারা কি এখনো বিশ্বাস করবে না যে, আল্লাহ তাআলা মৃতকে পুনর্জীবন দান করতে পূর্ণরূপে ক্ষমতাবান? যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি মানব সৃষ্টি অপেক্ষা খুব বড় (ভারী বা কঠিন)।” (৪০:৫৭) আর একটি আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি অনুধাবন করে না যে, আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী। সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবনদান করতেও সক্ষম? বস্তুতঃ তিনি সর্বশক্তিমান।” (৪৬:৩৩) মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “এবং তার একটি নিদর্শন এই যে, তুমি ভূমিকে দেখতে পাও শুষ্ক, উর্বর, অতঃপর আমি ওতে বারি বর্ষণ করলে ওটা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়; যিনি ভূমিকে জীবিত করেন তিনিই মৃতের জীবন দানকারী। তিনি তো সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (৪১:৩৯)।

ক্বাফ 50:12

১২-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মক্কাবাসীকে ঐ শাস্তি হতে সতর্ক করছেন যা তাদের পূর্বে তাদের মত মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের উপর আপতিত হয়েছিল। যেমন হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন এবং আসহাবুর রাস্স, যাদের পূর্ণ ঘটনা সূরায়ে ফুরকানের তাফসীরে গত হয়েছে। আর সামূদ, আ’দ, ফিরাউন এবং হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়, যাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছে এবং ঐ যমীনকে আল্লাহ সড়া-পচা পাঁকে পরিণত করেছেন। এসব ছিল তাদের কুফরী, ঔদ্ধত্য এবং সত্যের বিরুদ্ধাচরণেরই ফল। আসহাবে আয়কাত দ্বারা হযরত শু’আয়েব (আঃ)-এর কওমকে এবং কাওমু তুব্বা দ্বারা ইয়ামনীদেরকে বুঝানো হয়েছে। সূরায়ে দুখানে তাদের ঘটনাও গত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীর করা হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। অতএব সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলারই প্রাপ্য। এসব উম্মত তাদের রাসূলদেরকে (আঃ) অবিশ্বাস করেছিল। তাই তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, একজন রাসূলকে (আঃ) অস্বীকারকারী যেন সমস্ত রাসূলকেই অস্বীকারকারী। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম রাসূলদেরকে অস্বীকার করে ।” (২৬:১০৫)অথচ তাদের নিকট তো শুধু হযরত নূহই (আঃ) আগমন করেছিলেন। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তারা এমনই ছিল যে, যদি তাদের নিকট সমস্ত রাসূলও আসতেন তবুও তারা সকলকেই অবিশ্বাস করতো, একজনকেও বিশ্বাস করতো না। তাদের কৃতকর্মের ফল হিসেবে তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার শাস্তির ওয়াদা পূর্ণ হয়েছে। অতএব মক্কাবাসী এবং অন্যান্য সম্বোধনকৃত লোকদেরও এই বদভ্যাস পরিত্যাগ করা উচিত। নচেৎ হয়তো ঐরূপ শাস্তি তাদের উপরও আপতিত হবে।এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি কি প্রথমবার সৃষ্টি করেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি যে, পুনঃসৃষ্টি বিষয়ে তারা সন্দেহ পোষণ করবে? প্রথমবার সৃষ্টি করা হতে তো দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা খুব সহজই হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রথমবার তিনিই সৃষ্টি করেছেন এবং পুনর্বার সৃষ্টিও তিনিই করবেন এবং এটা তার কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) মহামহিমানিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়; বলে- অস্তিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে যখন ওটা পচে গলে যাবে? বলঃ ওর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই যিনি এটা প্রথমবার সৃষ্টি করছেন। এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।” (৩৬:৭৮-৭৯) সহীহ হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আদম-সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়। সে বলে- আল্লাহ আমাকে পুনর্বার কখনই সৃষ্টি করতে পারবেন না। অথচ প্রথমবারের সৃষ্টি দ্বিতীয়বারের সৃষ্টি হতে আমার কাছে মোটেই সহজ নয়।

ক্বাফ 50:13

১২-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মক্কাবাসীকে ঐ শাস্তি হতে সতর্ক করছেন যা তাদের পূর্বে তাদের মত মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের উপর আপতিত হয়েছিল। যেমন হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন এবং আসহাবুর রাস্স, যাদের পূর্ণ ঘটনা সূরায়ে ফুরকানের তাফসীরে গত হয়েছে। আর সামূদ, আ’দ, ফিরাউন এবং হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়, যাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছে এবং ঐ যমীনকে আল্লাহ সড়া-পচা পাঁকে পরিণত করেছেন। এসব ছিল তাদের কুফরী, ঔদ্ধত্য এবং সত্যের বিরুদ্ধাচরণেরই ফল। আসহাবে আয়কাত দ্বারা হযরত শু’আয়েব (আঃ)-এর কওমকে এবং কাওমু তুব্বা দ্বারা ইয়ামনীদেরকে বুঝানো হয়েছে। সূরায়ে দুখানে তাদের ঘটনাও গত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীর করা হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। অতএব সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলারই প্রাপ্য। এসব উম্মত তাদের রাসূলদেরকে (আঃ) অবিশ্বাস করেছিল। তাই তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, একজন রাসূলকে (আঃ) অস্বীকারকারী যেন সমস্ত রাসূলকেই অস্বীকারকারী। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম রাসূলদেরকে অস্বীকার করে ।” (২৬:১০৫)অথচ তাদের নিকট তো শুধু হযরত নূহই (আঃ) আগমন করেছিলেন। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তারা এমনই ছিল যে, যদি তাদের নিকট সমস্ত রাসূলও আসতেন তবুও তারা সকলকেই অবিশ্বাস করতো, একজনকেও বিশ্বাস করতো না। তাদের কৃতকর্মের ফল হিসেবে তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার শাস্তির ওয়াদা পূর্ণ হয়েছে। অতএব মক্কাবাসী এবং অন্যান্য সম্বোধনকৃত লোকদেরও এই বদভ্যাস পরিত্যাগ করা উচিত। নচেৎ হয়তো ঐরূপ শাস্তি তাদের উপরও আপতিত হবে।এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি কি প্রথমবার সৃষ্টি করেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি যে, পুনঃসৃষ্টি বিষয়ে তারা সন্দেহ পোষণ করবে? প্রথমবার সৃষ্টি করা হতে তো দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা খুব সহজই হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রথমবার তিনিই সৃষ্টি করেছেন এবং পুনর্বার সৃষ্টিও তিনিই করবেন এবং এটা তার কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) মহামহিমানিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়; বলে- অস্তিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে যখন ওটা পচে গলে যাবে? বলঃ ওর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই যিনি এটা প্রথমবার সৃষ্টি করছেন। এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।” (৩৬:৭৮-৭৯) সহীহ হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আদম-সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়। সে বলে- আল্লাহ আমাকে পুনর্বার কখনই সৃষ্টি করতে পারবেন না। অথচ প্রথমবারের সৃষ্টি দ্বিতীয়বারের সৃষ্টি হতে আমার কাছে মোটেই সহজ নয়।

ক্বাফ 50:14

১২-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মক্কাবাসীকে ঐ শাস্তি হতে সতর্ক করছেন যা তাদের পূর্বে তাদের মত মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের উপর আপতিত হয়েছিল। যেমন হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন এবং আসহাবুর রাস্স, যাদের পূর্ণ ঘটনা সূরায়ে ফুরকানের তাফসীরে গত হয়েছে। আর সামূদ, আ’দ, ফিরাউন এবং হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়, যাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছে এবং ঐ যমীনকে আল্লাহ সড়া-পচা পাঁকে পরিণত করেছেন। এসব ছিল তাদের কুফরী, ঔদ্ধত্য এবং সত্যের বিরুদ্ধাচরণেরই ফল। আসহাবে আয়কাত দ্বারা হযরত শু’আয়েব (আঃ)-এর কওমকে এবং কাওমু তুব্বা দ্বারা ইয়ামনীদেরকে বুঝানো হয়েছে। সূরায়ে দুখানে তাদের ঘটনাও গত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীর করা হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। অতএব সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলারই প্রাপ্য। এসব উম্মত তাদের রাসূলদেরকে (আঃ) অবিশ্বাস করেছিল। তাই তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, একজন রাসূলকে (আঃ) অস্বীকারকারী যেন সমস্ত রাসূলকেই অস্বীকারকারী। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম রাসূলদেরকে অস্বীকার করে ।” (২৬:১০৫)অথচ তাদের নিকট তো শুধু হযরত নূহই (আঃ) আগমন করেছিলেন। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তারা এমনই ছিল যে, যদি তাদের নিকট সমস্ত রাসূলও আসতেন তবুও তারা সকলকেই অবিশ্বাস করতো, একজনকেও বিশ্বাস করতো না। তাদের কৃতকর্মের ফল হিসেবে তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার শাস্তির ওয়াদা পূর্ণ হয়েছে। অতএব মক্কাবাসী এবং অন্যান্য সম্বোধনকৃত লোকদেরও এই বদভ্যাস পরিত্যাগ করা উচিত। নচেৎ হয়তো ঐরূপ শাস্তি তাদের উপরও আপতিত হবে।এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি কি প্রথমবার সৃষ্টি করেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি যে, পুনঃসৃষ্টি বিষয়ে তারা সন্দেহ পোষণ করবে? প্রথমবার সৃষ্টি করা হতে তো দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা খুব সহজই হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রথমবার তিনিই সৃষ্টি করেছেন এবং পুনর্বার সৃষ্টিও তিনিই করবেন এবং এটা তার কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) মহামহিমানিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়; বলে- অস্তিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে যখন ওটা পচে গলে যাবে? বলঃ ওর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই যিনি এটা প্রথমবার সৃষ্টি করছেন। এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।” (৩৬:৭৮-৭৯) সহীহ হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আদম-সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়। সে বলে- আল্লাহ আমাকে পুনর্বার কখনই সৃষ্টি করতে পারবেন না। অথচ প্রথমবারের সৃষ্টি দ্বিতীয়বারের সৃষ্টি হতে আমার কাছে মোটেই সহজ নয়।

ক্বাফ 50:15

১২-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা মক্কাবাসীকে ঐ শাস্তি হতে সতর্ক করছেন যা তাদের পূর্বে তাদের মত মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের উপর আপতিত হয়েছিল। যেমন হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন এবং আসহাবুর রাস্স, যাদের পূর্ণ ঘটনা সূরায়ে ফুরকানের তাফসীরে গত হয়েছে। আর সামূদ, আ’দ, ফিরাউন এবং হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়, যাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছে এবং ঐ যমীনকে আল্লাহ সড়া-পচা পাঁকে পরিণত করেছেন। এসব ছিল তাদের কুফরী, ঔদ্ধত্য এবং সত্যের বিরুদ্ধাচরণেরই ফল। আসহাবে আয়কাত দ্বারা হযরত শু’আয়েব (আঃ)-এর কওমকে এবং কাওমু তুব্বা দ্বারা ইয়ামনীদেরকে বুঝানো হয়েছে। সূরায়ে দুখানে তাদের ঘটনাও গত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীর করা হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন প্রয়োজন নেই। অতএব সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলারই প্রাপ্য। এসব উম্মত তাদের রাসূলদেরকে (আঃ) অবিশ্বাস করেছিল। তাই তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, একজন রাসূলকে (আঃ) অস্বীকারকারী যেন সমস্ত রাসূলকেই অস্বীকারকারী। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম রাসূলদেরকে অস্বীকার করে ।” (২৬:১০৫)অথচ তাদের নিকট তো শুধু হযরত নূহই (আঃ) আগমন করেছিলেন। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে তারা এমনই ছিল যে, যদি তাদের নিকট সমস্ত রাসূলও আসতেন তবুও তারা সকলকেই অবিশ্বাস করতো, একজনকেও বিশ্বাস করতো না। তাদের কৃতকর্মের ফল হিসেবে তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার শাস্তির ওয়াদা পূর্ণ হয়েছে। অতএব মক্কাবাসী এবং অন্যান্য সম্বোধনকৃত লোকদেরও এই বদভ্যাস পরিত্যাগ করা উচিত। নচেৎ হয়তো ঐরূপ শাস্তি তাদের উপরও আপতিত হবে।এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি কি প্রথমবার সৃষ্টি করেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি যে, পুনঃসৃষ্টি বিষয়ে তারা সন্দেহ পোষণ করবে? প্রথমবার সৃষ্টি করা হতে তো দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা খুব সহজই হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রথমবার তিনিই সৃষ্টি করেছেন এবং পুনর্বার সৃষ্টিও তিনিই করবেন এবং এটা তার কাছে খুবই সহজ।” (৩০:২৭) মহামহিমানিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়; বলে- অস্তিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে যখন ওটা পচে গলে যাবে? বলঃ ওর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই যিনি এটা প্রথমবার সৃষ্টি করছেন। এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।” (৩৬:৭৮-৭৯) সহীহ হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আদম-সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়। সে বলে- আল্লাহ আমাকে পুনর্বার কখনই সৃষ্টি করতে পারবেন না। অথচ প্রথমবারের সৃষ্টি দ্বিতীয়বারের সৃষ্টি হতে আমার কাছে মোটেই সহজ নয়।

ক্বাফ 50:16

১৬-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, তিনিই মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর জ্ঞান সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে, এমনকি মানুষের মনে যে ভাল-মন্দ ধারণার উদ্রেক হয় সেটাও তিনি জানেন। সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের অন্তরে যে ধারণা আসে আল্লাহ তা'আলা তা ক্ষমা করে দিয়েছেন যে পর্যন্ত না তা তাদের মুখ দিয়ে বের হয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর।' অর্থাৎ তাঁর ফেরেশতাগণ। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহর ইলম বা অবগতিকে বুঝানো হয়েছে। তাঁদের উদ্দেশ্য এই যে, যাতে মিলন ও একত্রিত হওন অবশ্যম্ভাবী হয়ে না পড়ে যা হতে তাঁর পবিত্র সত্তা বহু দূরে রয়েছে এবং তিনি এটা হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। কিন্তু শব্দের চহিদা এটা নয়। কেননা, এখানে (আরবী) একথা বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে (আরবী) -এই কথা। যেমন মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফটকারীর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।” (৫৬:৮৫) এর দ্বারাও ফেরেশতাদের তার এরূপ নিকটবর্তী হওয়া বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যিকর (অর্থাৎ কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী ।” (১৫:৯) ফেরেশতারাই কুরআন কারীমকে নিয়ে অবতীর্ণ হতেন এবং এখানেও ফেরেশতাদের এরূপ নৈকট্য বুঝানো হয়েছে। এর উপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁদেরকে ক্ষমতা প্রদান করেছেন। সুতরাং মানুষের উপর ফেরেশতাদেরও প্রভাব থাকে এবং শয়তানেরও প্রভাব থাকে। শয়তান মানুষের দেহের মধ্যে রক্তের মত চলাফেরা করে। যেমন আল্লাহর চরম সত্যবাদী নবী (সঃ) বলেছেন। এজন্যেই এর পরেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ দু’জন ফেরেশতা মানুষের ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “অবশ্যই আছে তোমাদের জন্যে তত্ত্বাবধায়কগণ; সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ; তারা জানে তোমরা যা কর।” (৮২:১০-১২)হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতারা মানুষের ভাল ও মন্দ সমস্ত আমল লিপিবদ্ধ করে থাকেন। এ ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ)-এর দু’টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তিতো এটাই এবং অপর উক্তিটি এই যে, যে আমলের উপর পুরস্কার ও শাস্তি আছে শুধু ঐ আমলগুলোই লিখেন। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। কেননা, প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা হচ্ছেঃ মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।হযরত বিলাল ইবনে হারিস মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে যেটাকে সে বড় সওয়াবের কথা মনে করে না, কিন্তু আল্লাহ ওরই কারণে কিয়ামত পর্যন্ত স্বীয় সন্তুষ্টি তার জন্যে লিখে দেন। পক্ষান্তরে, সে কোন সময় আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে ফেলে যেটাকে সে তেমন কোন বড় গুনাহর কথা মনে করে না, কিন্তু ওরই কারণে আল্লাহ স্বীয় সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত তার জন্যে তার অসন্তুষ্টি লিখে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন) হযরত আলকামা (রঃ) বলেনঃ “এ হাদীসটি আমাকে বহু কথা হতে বাঁচিয়ে নিয়েছে।” আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) বলেন যে, ডান দিকের ফেরেশতা পুণ্য লিখেন এবং তিনি বাম দিকের ফেরেশতার উপর আমানতদার। বান্দা যখন কোন পাপকার্য করে তখন তিনি বাম দিকের ফেরেশতাকে বলেনঃ “থামো।" যদি সে তাড়াতাড়ি বা সাথে সাথে তাওবা করে নেয় তবে তিনি তাকে পাপ লিখতে দেন। কিন্তু তাওবা না করলে বাম দিকের ফেরেশতা ওটা লিখে নেন। (ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান বসরী (রঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করার পর বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তোমার জন্যে সহীফা খুলে দেয়া হয়েছে। দু’জন সম্মানিত ফেরেশতাকে তোমার উপর নিযুক্ত করা হয়েছে। একজন আছেন তোমার ডান দিকে এবং একজন আছেন বাম দিকে। ডানের জন তোমার পুণ্যগুলো লিপিবদ্ধ করছেন এবং বামের জন লিপিবদ্ধ করছেন তোমার পাপগুলো। এখন তুমি যা ইচ্ছা আমল কর, বেশী কর অথবা কম কর। যখন তুমি মৃত্যুবরণ করবে তখন এই দফতর জড়িয়ে নেয়া হবে এবং তোমার কবরে রেখে দেয়া হবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন যখন তুমি কবর হতে উঠবে তখন এটা তোমার সামনে পেশ করা হবে। একথাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক মানুষের কর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্যে বের করবে এক কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। (তাকে বলা হবে) তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৩-১৪) তারপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! তিনি বড়ই ন্যায় বিচার করেছেন যিনি তোমাকেই তোমার নিজের হিসাব রক্ষক করে দিয়েছেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাল-মন্দ যা কিছু কথা মুখ হতে বের হয় তার সবই লিখা হয়। এমন কি মানুষ যে বলেঃ আমি খেয়েছি’, ‘আমি পান করেছি’, ‘আমি গিয়েছি’, ‘আমি এসেছি ইত্যাদি সব কিছুই লিখিত হয়। তারপর বৃহস্পতিবারে তার কথা ও কাজগুলো পেশ করা হয়। অতঃপর ভাল ও মন্দ রেখে দেয়া হয় এবং বাকী সব কিছুই সরিয়ে ফেলা হয়। আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির অর্থ এটাইঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যা চান মিটিয়ে দেন এবং যা চান ঠিক রাখেন এবং তাঁর নিকট উম্মুল কিতাব রয়েছে।” (১৩:৩৯)হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। তখন তিনি জানতে পারলেন যে, হযরত তাউস (রঃ)-এর মতে ফেরেশতারা এটাও লিখে থাকেন। তখন তিনি কাতরানোও বন্ধ করে দেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন যে, তিনি মৃত্যুর সময় উহ পর্যন্ত করেননি।এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে মানুষ! মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যিই আসবে। ঐ সময় ঐ সন্দেহ দূর হয়ে যাবে যাতে তুমি এখন জড়িয়ে পড়েছে। ঐ সময় তোমাকে বলা হবেঃ এটা ওটাই যা হতে তুমি অব্যাহতি চেয়ে এসেছে। এখন ওটা এসে গেছে। তুমি ওটা হতে কোনক্রমেই পরিত্রাণ পেতে পার না। না তুমি এটাকে রোধ করতে পার, না পার এর সাথে মুকাবিলা করতে, না তোমার ব্যপারে কারো কোন সাহায্য ও সুপারিশ কোন কাজে আসবে। সঠিক কথা এটাই যে, এখানে সম্বোধন সাধারণভাবে মানুষকে করা হয়েছে, যদিও কেউ কেউ বলেন যে, এ সম্বোধন কাফিরদের প্রতি এবং অন্য কেউ অন্য কিছু বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি আমার পিতা (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় তাঁর শিয়রে বসেছিলাম। তিনি মূৰ্ছিত হয়ে পড়েছিলেন। তখন আমি নিম্নের ছন্দটি পাঠ করলামঃ (আরবী) অর্থাৎ “যার অশ্রু থেমে আছে, ওটাও একবার টপ টপ করে পড়বে।” তখন তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, হে আমার প্রিয় কন্যা! তুমি যা বললে তা নয়, বরং আল্লাহ যা বলেছেন এটা তা-ই। তা হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যই আসবে; এটা হতেই তোমরা অব্যাহতি চেয়ে আসছে।” এই আসারের আরো বহু ধারা আমি সীরাতে সিদ্দীক (রাঃ)-এর মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মৃত্যুর বর্ণনায় আনয়ন করেছি।সহীহ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় মূৰ্ছিত হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয় তখন তিনি চেহারা মুবারক হতে ঘাম মুছতে মুছতে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! মৃত্যুর বড়ই যন্ত্রণা!”(আরবী) এর কয়েক প্রকার অর্থ করা হয়েছে। প্রথম এই যে, (আরবী) এখানে (আরবী) হয়েছে, অর্থাৎ এটা ওটাই যেটাকে বহু দূরের মনে করতে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে বা নেতিবাচক। তখন অর্থ হবেঃ “এটা ওটাই, যা হতে পরিত্রাণ পাওয়ার এবং যাকে সরিয়ে ফেলার তুমি ক্ষমতা রাখো না।হযরত সুমরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (রঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি মৃত্যু হতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত ঐ খেকশিয়ালের মত যার কাছে যমীন তার ঋণ চাইলো, তখন সে পালাতে শুরু করলো। পালাতে পালাতে যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়লো তখন নিজের গর্তে প্রবেশ করলো। যেহেতু যমীন সেখানেও ছিল সেহেতু ঐ যমীন তাকে বললোঃ “ওরে খেঁকশিয়াল! তুই আমার ঋণ পরিশোধ কর।” তখন সে সেখান হতে আবার পালাতে শুরু করলো। অবশেষে সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারালো। মোটকথা, ঐ খেঁকশিয়াল যেমন যমীন হতে পালাবার রাস্তা পায়নি, অনুরূপভাবে মানুষেরও মৃত্য হতে পালাবার রাস্তা বন্ধ। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) স্বীয় মু'জামুল কাবীর’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এরপর শিংগায় ফুঙ্কার দেয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা স্বলিত হাদীস গত হয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘কিরূপে আমি শান্তি ও আরাম পেতে পারি, অথচ শিংগায় ফুঙ্কার দানকারী ফেরেশতা শিংগা মুখে নিয়ে রয়েছেন এবং গ্রীবা ঝুঁকিয়ে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন তিনি নির্দেশ দিবেন, আর ঐ নির্দেশ অনুযায়ী তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন!” সাহাবীগণ (রাঃ) আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি বলবে?” উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা বলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মবিধায়ক।” মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি উপস্থিত হবে, তার সঙ্গে থাকবে চালক ও তার কর্মের সাক্ষী।' একজন তাকে আল্লাহ তা'আলার দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং অপরজন তার কর্মের সক্ষ্য দিবেন। প্রকাশ্য আয়াত তো এটাই এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) মিম্বরের উপর এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “একজন চালক তাকে হাশরের ময়দানের দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং সাক্ষী হবেন যিনি তার কর্মের সাক্ষ্য দান করবেন।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ফেরেশতাকে এবং (আরবী) দ্বারা আমলকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) ফেরেশতাদের মধ্য হতে হবেন এবং (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্বয়ং মানুষ, যে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে।মহান আল্লাহর “তুমি এই দিবস সম্বন্ধে উদাসীন ছিলে, এখন তোমার সম্মুখ হতে পর্দা উন্মোচন করেছি। অদ্য তোমার দৃষ্টি প্রখর।” এই উক্তিতে সম্বোধনকৃত কে? এ সম্পর্কে তিনটি উক্তি রয়েছে। (এক) এই সম্বোধন কাফিরকে করা হবে। (দুই) এই সম্বোধন সাধারণ মানুষকে করা হয়েছে, ভাল ও মন্দ সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। (তিন) এর দ্বারা স্বয়ং নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। দ্বিতীয় উক্তির তাৎপর্য হচ্ছেঃ ‘আখিরাত ও দুনিয়ার মধ্যে ঐ সম্পর্ক রয়েছে যে সম্পর্ক বুয়েছে জাগ্রত ও স্বপ্নের অবস্থার মধ্যে। আর তৃতীয় উক্তির তাৎপর্য হলোঃ “হে বী (সঃ)! এই কুরআনের অহীর পূর্বে তুমি উদাসীন ছিলে! আমি তোমার উপর কুরআন অবতীর্ণ করে তোমার চোখের উপর হতে পর্দা সরিয়ে দিয়েছি। সুতরাং এখন তোমার দৃষ্টি প্রখর হয়ে গেছে। কিন্তু কুরআন কারীমের শব্দ দ্বারা তো এটাই প্রকাশমান যে, এটা সাধারণ সম্বোধন। অর্থাৎ প্রত্যেককে বলা হবেঃ তুমি এই দিন হতে উদাসীন ছিলে। কেননা, কিয়ামতের দিন প্রত্যেকের চক্ষু পূর্ণভাবে খুলে যাবে। এমনকি কাফিরও সেদিন সোজা হয়ে যাবে। কিন্তু তার সেদিন সোজা হওয়া তার কোন উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন তারা আমার নিকট আসবে সেদিন তারা খুব বেশী শ্রবণকারী ও দর্শনকারী হয়ে যাবে।” (১৯:৩৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সামনে অধোবদন হয়ে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম; এখন আপনি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করুন; আমরা সৎ কর্ম করবে, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।” (৩২:১২)

ক্বাফ 50:17

১৬-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, তিনিই মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর জ্ঞান সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে, এমনকি মানুষের মনে যে ভাল-মন্দ ধারণার উদ্রেক হয় সেটাও তিনি জানেন। সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের অন্তরে যে ধারণা আসে আল্লাহ তা'আলা তা ক্ষমা করে দিয়েছেন যে পর্যন্ত না তা তাদের মুখ দিয়ে বের হয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর।' অর্থাৎ তাঁর ফেরেশতাগণ। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহর ইলম বা অবগতিকে বুঝানো হয়েছে। তাঁদের উদ্দেশ্য এই যে, যাতে মিলন ও একত্রিত হওন অবশ্যম্ভাবী হয়ে না পড়ে যা হতে তাঁর পবিত্র সত্তা বহু দূরে রয়েছে এবং তিনি এটা হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। কিন্তু শব্দের চহিদা এটা নয়। কেননা, এখানে (আরবী) একথা বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে (আরবী) -এই কথা। যেমন মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফটকারীর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।” (৫৬:৮৫) এর দ্বারাও ফেরেশতাদের তার এরূপ নিকটবর্তী হওয়া বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যিকর (অর্থাৎ কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী ।” (১৫:৯) ফেরেশতারাই কুরআন কারীমকে নিয়ে অবতীর্ণ হতেন এবং এখানেও ফেরেশতাদের এরূপ নৈকট্য বুঝানো হয়েছে। এর উপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁদেরকে ক্ষমতা প্রদান করেছেন। সুতরাং মানুষের উপর ফেরেশতাদেরও প্রভাব থাকে এবং শয়তানেরও প্রভাব থাকে। শয়তান মানুষের দেহের মধ্যে রক্তের মত চলাফেরা করে। যেমন আল্লাহর চরম সত্যবাদী নবী (সঃ) বলেছেন। এজন্যেই এর পরেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ দু’জন ফেরেশতা মানুষের ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “অবশ্যই আছে তোমাদের জন্যে তত্ত্বাবধায়কগণ; সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ; তারা জানে তোমরা যা কর।” (৮২:১০-১২)হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতারা মানুষের ভাল ও মন্দ সমস্ত আমল লিপিবদ্ধ করে থাকেন। এ ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ)-এর দু’টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তিতো এটাই এবং অপর উক্তিটি এই যে, যে আমলের উপর পুরস্কার ও শাস্তি আছে শুধু ঐ আমলগুলোই লিখেন। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। কেননা, প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা হচ্ছেঃ মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।হযরত বিলাল ইবনে হারিস মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে যেটাকে সে বড় সওয়াবের কথা মনে করে না, কিন্তু আল্লাহ ওরই কারণে কিয়ামত পর্যন্ত স্বীয় সন্তুষ্টি তার জন্যে লিখে দেন। পক্ষান্তরে, সে কোন সময় আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে ফেলে যেটাকে সে তেমন কোন বড় গুনাহর কথা মনে করে না, কিন্তু ওরই কারণে আল্লাহ স্বীয় সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত তার জন্যে তার অসন্তুষ্টি লিখে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন) হযরত আলকামা (রঃ) বলেনঃ “এ হাদীসটি আমাকে বহু কথা হতে বাঁচিয়ে নিয়েছে।” আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) বলেন যে, ডান দিকের ফেরেশতা পুণ্য লিখেন এবং তিনি বাম দিকের ফেরেশতার উপর আমানতদার। বান্দা যখন কোন পাপকার্য করে তখন তিনি বাম দিকের ফেরেশতাকে বলেনঃ “থামো।" যদি সে তাড়াতাড়ি বা সাথে সাথে তাওবা করে নেয় তবে তিনি তাকে পাপ লিখতে দেন। কিন্তু তাওবা না করলে বাম দিকের ফেরেশতা ওটা লিখে নেন। (ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান বসরী (রঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করার পর বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তোমার জন্যে সহীফা খুলে দেয়া হয়েছে। দু’জন সম্মানিত ফেরেশতাকে তোমার উপর নিযুক্ত করা হয়েছে। একজন আছেন তোমার ডান দিকে এবং একজন আছেন বাম দিকে। ডানের জন তোমার পুণ্যগুলো লিপিবদ্ধ করছেন এবং বামের জন লিপিবদ্ধ করছেন তোমার পাপগুলো। এখন তুমি যা ইচ্ছা আমল কর, বেশী কর অথবা কম কর। যখন তুমি মৃত্যুবরণ করবে তখন এই দফতর জড়িয়ে নেয়া হবে এবং তোমার কবরে রেখে দেয়া হবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন যখন তুমি কবর হতে উঠবে তখন এটা তোমার সামনে পেশ করা হবে। একথাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক মানুষের কর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্যে বের করবে এক কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। (তাকে বলা হবে) তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৩-১৪) তারপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! তিনি বড়ই ন্যায় বিচার করেছেন যিনি তোমাকেই তোমার নিজের হিসাব রক্ষক করে দিয়েছেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাল-মন্দ যা কিছু কথা মুখ হতে বের হয় তার সবই লিখা হয়। এমন কি মানুষ যে বলেঃ আমি খেয়েছি’, ‘আমি পান করেছি’, ‘আমি গিয়েছি’, ‘আমি এসেছি ইত্যাদি সব কিছুই লিখিত হয়। তারপর বৃহস্পতিবারে তার কথা ও কাজগুলো পেশ করা হয়। অতঃপর ভাল ও মন্দ রেখে দেয়া হয় এবং বাকী সব কিছুই সরিয়ে ফেলা হয়। আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির অর্থ এটাইঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যা চান মিটিয়ে দেন এবং যা চান ঠিক রাখেন এবং তাঁর নিকট উম্মুল কিতাব রয়েছে।” (১৩:৩৯)হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। তখন তিনি জানতে পারলেন যে, হযরত তাউস (রঃ)-এর মতে ফেরেশতারা এটাও লিখে থাকেন। তখন তিনি কাতরানোও বন্ধ করে দেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন যে, তিনি মৃত্যুর সময় উহ পর্যন্ত করেননি।এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে মানুষ! মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যিই আসবে। ঐ সময় ঐ সন্দেহ দূর হয়ে যাবে যাতে তুমি এখন জড়িয়ে পড়েছে। ঐ সময় তোমাকে বলা হবেঃ এটা ওটাই যা হতে তুমি অব্যাহতি চেয়ে এসেছে। এখন ওটা এসে গেছে। তুমি ওটা হতে কোনক্রমেই পরিত্রাণ পেতে পার না। না তুমি এটাকে রোধ করতে পার, না পার এর সাথে মুকাবিলা করতে, না তোমার ব্যপারে কারো কোন সাহায্য ও সুপারিশ কোন কাজে আসবে। সঠিক কথা এটাই যে, এখানে সম্বোধন সাধারণভাবে মানুষকে করা হয়েছে, যদিও কেউ কেউ বলেন যে, এ সম্বোধন কাফিরদের প্রতি এবং অন্য কেউ অন্য কিছু বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি আমার পিতা (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় তাঁর শিয়রে বসেছিলাম। তিনি মূৰ্ছিত হয়ে পড়েছিলেন। তখন আমি নিম্নের ছন্দটি পাঠ করলামঃ (আরবী) অর্থাৎ “যার অশ্রু থেমে আছে, ওটাও একবার টপ টপ করে পড়বে।” তখন তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, হে আমার প্রিয় কন্যা! তুমি যা বললে তা নয়, বরং আল্লাহ যা বলেছেন এটা তা-ই। তা হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যই আসবে; এটা হতেই তোমরা অব্যাহতি চেয়ে আসছে।” এই আসারের আরো বহু ধারা আমি সীরাতে সিদ্দীক (রাঃ)-এর মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মৃত্যুর বর্ণনায় আনয়ন করেছি।সহীহ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় মূৰ্ছিত হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয় তখন তিনি চেহারা মুবারক হতে ঘাম মুছতে মুছতে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! মৃত্যুর বড়ই যন্ত্রণা!”(আরবী) এর কয়েক প্রকার অর্থ করা হয়েছে। প্রথম এই যে, (আরবী) এখানে (আরবী) হয়েছে, অর্থাৎ এটা ওটাই যেটাকে বহু দূরের মনে করতে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে বা নেতিবাচক। তখন অর্থ হবেঃ “এটা ওটাই, যা হতে পরিত্রাণ পাওয়ার এবং যাকে সরিয়ে ফেলার তুমি ক্ষমতা রাখো না।হযরত সুমরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (রঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি মৃত্যু হতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত ঐ খেকশিয়ালের মত যার কাছে যমীন তার ঋণ চাইলো, তখন সে পালাতে শুরু করলো। পালাতে পালাতে যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়লো তখন নিজের গর্তে প্রবেশ করলো। যেহেতু যমীন সেখানেও ছিল সেহেতু ঐ যমীন তাকে বললোঃ “ওরে খেঁকশিয়াল! তুই আমার ঋণ পরিশোধ কর।” তখন সে সেখান হতে আবার পালাতে শুরু করলো। অবশেষে সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারালো। মোটকথা, ঐ খেঁকশিয়াল যেমন যমীন হতে পালাবার রাস্তা পায়নি, অনুরূপভাবে মানুষেরও মৃত্য হতে পালাবার রাস্তা বন্ধ। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) স্বীয় মু'জামুল কাবীর’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এরপর শিংগায় ফুঙ্কার দেয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা স্বলিত হাদীস গত হয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘কিরূপে আমি শান্তি ও আরাম পেতে পারি, অথচ শিংগায় ফুঙ্কার দানকারী ফেরেশতা শিংগা মুখে নিয়ে রয়েছেন এবং গ্রীবা ঝুঁকিয়ে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন তিনি নির্দেশ দিবেন, আর ঐ নির্দেশ অনুযায়ী তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন!” সাহাবীগণ (রাঃ) আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি বলবে?” উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা বলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মবিধায়ক।” মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি উপস্থিত হবে, তার সঙ্গে থাকবে চালক ও তার কর্মের সাক্ষী।' একজন তাকে আল্লাহ তা'আলার দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং অপরজন তার কর্মের সক্ষ্য দিবেন। প্রকাশ্য আয়াত তো এটাই এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) মিম্বরের উপর এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “একজন চালক তাকে হাশরের ময়দানের দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং সাক্ষী হবেন যিনি তার কর্মের সাক্ষ্য দান করবেন।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ফেরেশতাকে এবং (আরবী) দ্বারা আমলকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) ফেরেশতাদের মধ্য হতে হবেন এবং (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্বয়ং মানুষ, যে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে।মহান আল্লাহর “তুমি এই দিবস সম্বন্ধে উদাসীন ছিলে, এখন তোমার সম্মুখ হতে পর্দা উন্মোচন করেছি। অদ্য তোমার দৃষ্টি প্রখর।” এই উক্তিতে সম্বোধনকৃত কে? এ সম্পর্কে তিনটি উক্তি রয়েছে। (এক) এই সম্বোধন কাফিরকে করা হবে। (দুই) এই সম্বোধন সাধারণ মানুষকে করা হয়েছে, ভাল ও মন্দ সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। (তিন) এর দ্বারা স্বয়ং নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। দ্বিতীয় উক্তির তাৎপর্য হচ্ছেঃ ‘আখিরাত ও দুনিয়ার মধ্যে ঐ সম্পর্ক রয়েছে যে সম্পর্ক বুয়েছে জাগ্রত ও স্বপ্নের অবস্থার মধ্যে। আর তৃতীয় উক্তির তাৎপর্য হলোঃ “হে বী (সঃ)! এই কুরআনের অহীর পূর্বে তুমি উদাসীন ছিলে! আমি তোমার উপর কুরআন অবতীর্ণ করে তোমার চোখের উপর হতে পর্দা সরিয়ে দিয়েছি। সুতরাং এখন তোমার দৃষ্টি প্রখর হয়ে গেছে। কিন্তু কুরআন কারীমের শব্দ দ্বারা তো এটাই প্রকাশমান যে, এটা সাধারণ সম্বোধন। অর্থাৎ প্রত্যেককে বলা হবেঃ তুমি এই দিন হতে উদাসীন ছিলে। কেননা, কিয়ামতের দিন প্রত্যেকের চক্ষু পূর্ণভাবে খুলে যাবে। এমনকি কাফিরও সেদিন সোজা হয়ে যাবে। কিন্তু তার সেদিন সোজা হওয়া তার কোন উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন তারা আমার নিকট আসবে সেদিন তারা খুব বেশী শ্রবণকারী ও দর্শনকারী হয়ে যাবে।” (১৯:৩৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সামনে অধোবদন হয়ে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম; এখন আপনি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করুন; আমরা সৎ কর্ম করবে, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।” (৩২:১২)

ক্বাফ 50:18

১৬-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, তিনিই মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর জ্ঞান সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে, এমনকি মানুষের মনে যে ভাল-মন্দ ধারণার উদ্রেক হয় সেটাও তিনি জানেন। সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের অন্তরে যে ধারণা আসে আল্লাহ তা'আলা তা ক্ষমা করে দিয়েছেন যে পর্যন্ত না তা তাদের মুখ দিয়ে বের হয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর।' অর্থাৎ তাঁর ফেরেশতাগণ। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহর ইলম বা অবগতিকে বুঝানো হয়েছে। তাঁদের উদ্দেশ্য এই যে, যাতে মিলন ও একত্রিত হওন অবশ্যম্ভাবী হয়ে না পড়ে যা হতে তাঁর পবিত্র সত্তা বহু দূরে রয়েছে এবং তিনি এটা হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। কিন্তু শব্দের চহিদা এটা নয়। কেননা, এখানে (আরবী) একথা বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে (আরবী) -এই কথা। যেমন মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফটকারীর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।” (৫৬:৮৫) এর দ্বারাও ফেরেশতাদের তার এরূপ নিকটবর্তী হওয়া বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যিকর (অর্থাৎ কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী ।” (১৫:৯) ফেরেশতারাই কুরআন কারীমকে নিয়ে অবতীর্ণ হতেন এবং এখানেও ফেরেশতাদের এরূপ নৈকট্য বুঝানো হয়েছে। এর উপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁদেরকে ক্ষমতা প্রদান করেছেন। সুতরাং মানুষের উপর ফেরেশতাদেরও প্রভাব থাকে এবং শয়তানেরও প্রভাব থাকে। শয়তান মানুষের দেহের মধ্যে রক্তের মত চলাফেরা করে। যেমন আল্লাহর চরম সত্যবাদী নবী (সঃ) বলেছেন। এজন্যেই এর পরেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ দু’জন ফেরেশতা মানুষের ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “অবশ্যই আছে তোমাদের জন্যে তত্ত্বাবধায়কগণ; সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ; তারা জানে তোমরা যা কর।” (৮২:১০-১২)হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতারা মানুষের ভাল ও মন্দ সমস্ত আমল লিপিবদ্ধ করে থাকেন। এ ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ)-এর দু’টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তিতো এটাই এবং অপর উক্তিটি এই যে, যে আমলের উপর পুরস্কার ও শাস্তি আছে শুধু ঐ আমলগুলোই লিখেন। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। কেননা, প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা হচ্ছেঃ মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।হযরত বিলাল ইবনে হারিস মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে যেটাকে সে বড় সওয়াবের কথা মনে করে না, কিন্তু আল্লাহ ওরই কারণে কিয়ামত পর্যন্ত স্বীয় সন্তুষ্টি তার জন্যে লিখে দেন। পক্ষান্তরে, সে কোন সময় আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে ফেলে যেটাকে সে তেমন কোন বড় গুনাহর কথা মনে করে না, কিন্তু ওরই কারণে আল্লাহ স্বীয় সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত তার জন্যে তার অসন্তুষ্টি লিখে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন) হযরত আলকামা (রঃ) বলেনঃ “এ হাদীসটি আমাকে বহু কথা হতে বাঁচিয়ে নিয়েছে।” আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) বলেন যে, ডান দিকের ফেরেশতা পুণ্য লিখেন এবং তিনি বাম দিকের ফেরেশতার উপর আমানতদার। বান্দা যখন কোন পাপকার্য করে তখন তিনি বাম দিকের ফেরেশতাকে বলেনঃ “থামো।" যদি সে তাড়াতাড়ি বা সাথে সাথে তাওবা করে নেয় তবে তিনি তাকে পাপ লিখতে দেন। কিন্তু তাওবা না করলে বাম দিকের ফেরেশতা ওটা লিখে নেন। (ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান বসরী (রঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করার পর বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তোমার জন্যে সহীফা খুলে দেয়া হয়েছে। দু’জন সম্মানিত ফেরেশতাকে তোমার উপর নিযুক্ত করা হয়েছে। একজন আছেন তোমার ডান দিকে এবং একজন আছেন বাম দিকে। ডানের জন তোমার পুণ্যগুলো লিপিবদ্ধ করছেন এবং বামের জন লিপিবদ্ধ করছেন তোমার পাপগুলো। এখন তুমি যা ইচ্ছা আমল কর, বেশী কর অথবা কম কর। যখন তুমি মৃত্যুবরণ করবে তখন এই দফতর জড়িয়ে নেয়া হবে এবং তোমার কবরে রেখে দেয়া হবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন যখন তুমি কবর হতে উঠবে তখন এটা তোমার সামনে পেশ করা হবে। একথাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক মানুষের কর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্যে বের করবে এক কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। (তাকে বলা হবে) তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৩-১৪) তারপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! তিনি বড়ই ন্যায় বিচার করেছেন যিনি তোমাকেই তোমার নিজের হিসাব রক্ষক করে দিয়েছেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাল-মন্দ যা কিছু কথা মুখ হতে বের হয় তার সবই লিখা হয়। এমন কি মানুষ যে বলেঃ আমি খেয়েছি’, ‘আমি পান করেছি’, ‘আমি গিয়েছি’, ‘আমি এসেছি ইত্যাদি সব কিছুই লিখিত হয়। তারপর বৃহস্পতিবারে তার কথা ও কাজগুলো পেশ করা হয়। অতঃপর ভাল ও মন্দ রেখে দেয়া হয় এবং বাকী সব কিছুই সরিয়ে ফেলা হয়। আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির অর্থ এটাইঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যা চান মিটিয়ে দেন এবং যা চান ঠিক রাখেন এবং তাঁর নিকট উম্মুল কিতাব রয়েছে।” (১৩:৩৯)হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। তখন তিনি জানতে পারলেন যে, হযরত তাউস (রঃ)-এর মতে ফেরেশতারা এটাও লিখে থাকেন। তখন তিনি কাতরানোও বন্ধ করে দেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন যে, তিনি মৃত্যুর সময় উহ পর্যন্ত করেননি।এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে মানুষ! মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যিই আসবে। ঐ সময় ঐ সন্দেহ দূর হয়ে যাবে যাতে তুমি এখন জড়িয়ে পড়েছে। ঐ সময় তোমাকে বলা হবেঃ এটা ওটাই যা হতে তুমি অব্যাহতি চেয়ে এসেছে। এখন ওটা এসে গেছে। তুমি ওটা হতে কোনক্রমেই পরিত্রাণ পেতে পার না। না তুমি এটাকে রোধ করতে পার, না পার এর সাথে মুকাবিলা করতে, না তোমার ব্যপারে কারো কোন সাহায্য ও সুপারিশ কোন কাজে আসবে। সঠিক কথা এটাই যে, এখানে সম্বোধন সাধারণভাবে মানুষকে করা হয়েছে, যদিও কেউ কেউ বলেন যে, এ সম্বোধন কাফিরদের প্রতি এবং অন্য কেউ অন্য কিছু বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি আমার পিতা (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় তাঁর শিয়রে বসেছিলাম। তিনি মূৰ্ছিত হয়ে পড়েছিলেন। তখন আমি নিম্নের ছন্দটি পাঠ করলামঃ (আরবী) অর্থাৎ “যার অশ্রু থেমে আছে, ওটাও একবার টপ টপ করে পড়বে।” তখন তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, হে আমার প্রিয় কন্যা! তুমি যা বললে তা নয়, বরং আল্লাহ যা বলেছেন এটা তা-ই। তা হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যই আসবে; এটা হতেই তোমরা অব্যাহতি চেয়ে আসছে।” এই আসারের আরো বহু ধারা আমি সীরাতে সিদ্দীক (রাঃ)-এর মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মৃত্যুর বর্ণনায় আনয়ন করেছি।সহীহ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় মূৰ্ছিত হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয় তখন তিনি চেহারা মুবারক হতে ঘাম মুছতে মুছতে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! মৃত্যুর বড়ই যন্ত্রণা!”(আরবী) এর কয়েক প্রকার অর্থ করা হয়েছে। প্রথম এই যে, (আরবী) এখানে (আরবী) হয়েছে, অর্থাৎ এটা ওটাই যেটাকে বহু দূরের মনে করতে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে বা নেতিবাচক। তখন অর্থ হবেঃ “এটা ওটাই, যা হতে পরিত্রাণ পাওয়ার এবং যাকে সরিয়ে ফেলার তুমি ক্ষমতা রাখো না।হযরত সুমরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (রঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি মৃত্যু হতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত ঐ খেকশিয়ালের মত যার কাছে যমীন তার ঋণ চাইলো, তখন সে পালাতে শুরু করলো। পালাতে পালাতে যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়লো তখন নিজের গর্তে প্রবেশ করলো। যেহেতু যমীন সেখানেও ছিল সেহেতু ঐ যমীন তাকে বললোঃ “ওরে খেঁকশিয়াল! তুই আমার ঋণ পরিশোধ কর।” তখন সে সেখান হতে আবার পালাতে শুরু করলো। অবশেষে সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারালো। মোটকথা, ঐ খেঁকশিয়াল যেমন যমীন হতে পালাবার রাস্তা পায়নি, অনুরূপভাবে মানুষেরও মৃত্য হতে পালাবার রাস্তা বন্ধ। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) স্বীয় মু'জামুল কাবীর’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এরপর শিংগায় ফুঙ্কার দেয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা স্বলিত হাদীস গত হয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘কিরূপে আমি শান্তি ও আরাম পেতে পারি, অথচ শিংগায় ফুঙ্কার দানকারী ফেরেশতা শিংগা মুখে নিয়ে রয়েছেন এবং গ্রীবা ঝুঁকিয়ে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন তিনি নির্দেশ দিবেন, আর ঐ নির্দেশ অনুযায়ী তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন!” সাহাবীগণ (রাঃ) আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি বলবে?” উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা বলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মবিধায়ক।” মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি উপস্থিত হবে, তার সঙ্গে থাকবে চালক ও তার কর্মের সাক্ষী।' একজন তাকে আল্লাহ তা'আলার দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং অপরজন তার কর্মের সক্ষ্য দিবেন। প্রকাশ্য আয়াত তো এটাই এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) মিম্বরের উপর এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “একজন চালক তাকে হাশরের ময়দানের দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং সাক্ষী হবেন যিনি তার কর্মের সাক্ষ্য দান করবেন।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ফেরেশতাকে এবং (আরবী) দ্বারা আমলকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) ফেরেশতাদের মধ্য হতে হবেন এবং (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্বয়ং মানুষ, যে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে।মহান আল্লাহর “তুমি এই দিবস সম্বন্ধে উদাসীন ছিলে, এখন তোমার সম্মুখ হতে পর্দা উন্মোচন করেছি। অদ্য তোমার দৃষ্টি প্রখর।” এই উক্তিতে সম্বোধনকৃত কে? এ সম্পর্কে তিনটি উক্তি রয়েছে। (এক) এই সম্বোধন কাফিরকে করা হবে। (দুই) এই সম্বোধন সাধারণ মানুষকে করা হয়েছে, ভাল ও মন্দ সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। (তিন) এর দ্বারা স্বয়ং নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। দ্বিতীয় উক্তির তাৎপর্য হচ্ছেঃ ‘আখিরাত ও দুনিয়ার মধ্যে ঐ সম্পর্ক রয়েছে যে সম্পর্ক বুয়েছে জাগ্রত ও স্বপ্নের অবস্থার মধ্যে। আর তৃতীয় উক্তির তাৎপর্য হলোঃ “হে বী (সঃ)! এই কুরআনের অহীর পূর্বে তুমি উদাসীন ছিলে! আমি তোমার উপর কুরআন অবতীর্ণ করে তোমার চোখের উপর হতে পর্দা সরিয়ে দিয়েছি। সুতরাং এখন তোমার দৃষ্টি প্রখর হয়ে গেছে। কিন্তু কুরআন কারীমের শব্দ দ্বারা তো এটাই প্রকাশমান যে, এটা সাধারণ সম্বোধন। অর্থাৎ প্রত্যেককে বলা হবেঃ তুমি এই দিন হতে উদাসীন ছিলে। কেননা, কিয়ামতের দিন প্রত্যেকের চক্ষু পূর্ণভাবে খুলে যাবে। এমনকি কাফিরও সেদিন সোজা হয়ে যাবে। কিন্তু তার সেদিন সোজা হওয়া তার কোন উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন তারা আমার নিকট আসবে সেদিন তারা খুব বেশী শ্রবণকারী ও দর্শনকারী হয়ে যাবে।” (১৯:৩৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সামনে অধোবদন হয়ে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম; এখন আপনি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করুন; আমরা সৎ কর্ম করবে, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।” (৩২:১২)

ক্বাফ 50:19

১৬-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, তিনিই মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর জ্ঞান সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে, এমনকি মানুষের মনে যে ভাল-মন্দ ধারণার উদ্রেক হয় সেটাও তিনি জানেন। সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের অন্তরে যে ধারণা আসে আল্লাহ তা'আলা তা ক্ষমা করে দিয়েছেন যে পর্যন্ত না তা তাদের মুখ দিয়ে বের হয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর।' অর্থাৎ তাঁর ফেরেশতাগণ। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহর ইলম বা অবগতিকে বুঝানো হয়েছে। তাঁদের উদ্দেশ্য এই যে, যাতে মিলন ও একত্রিত হওন অবশ্যম্ভাবী হয়ে না পড়ে যা হতে তাঁর পবিত্র সত্তা বহু দূরে রয়েছে এবং তিনি এটা হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। কিন্তু শব্দের চহিদা এটা নয়। কেননা, এখানে (আরবী) একথা বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে (আরবী) -এই কথা। যেমন মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফটকারীর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।” (৫৬:৮৫) এর দ্বারাও ফেরেশতাদের তার এরূপ নিকটবর্তী হওয়া বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যিকর (অর্থাৎ কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী ।” (১৫:৯) ফেরেশতারাই কুরআন কারীমকে নিয়ে অবতীর্ণ হতেন এবং এখানেও ফেরেশতাদের এরূপ নৈকট্য বুঝানো হয়েছে। এর উপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁদেরকে ক্ষমতা প্রদান করেছেন। সুতরাং মানুষের উপর ফেরেশতাদেরও প্রভাব থাকে এবং শয়তানেরও প্রভাব থাকে। শয়তান মানুষের দেহের মধ্যে রক্তের মত চলাফেরা করে। যেমন আল্লাহর চরম সত্যবাদী নবী (সঃ) বলেছেন। এজন্যেই এর পরেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ দু’জন ফেরেশতা মানুষের ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “অবশ্যই আছে তোমাদের জন্যে তত্ত্বাবধায়কগণ; সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ; তারা জানে তোমরা যা কর।” (৮২:১০-১২)হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতারা মানুষের ভাল ও মন্দ সমস্ত আমল লিপিবদ্ধ করে থাকেন। এ ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ)-এর দু’টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তিতো এটাই এবং অপর উক্তিটি এই যে, যে আমলের উপর পুরস্কার ও শাস্তি আছে শুধু ঐ আমলগুলোই লিখেন। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। কেননা, প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা হচ্ছেঃ মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।হযরত বিলাল ইবনে হারিস মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে যেটাকে সে বড় সওয়াবের কথা মনে করে না, কিন্তু আল্লাহ ওরই কারণে কিয়ামত পর্যন্ত স্বীয় সন্তুষ্টি তার জন্যে লিখে দেন। পক্ষান্তরে, সে কোন সময় আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে ফেলে যেটাকে সে তেমন কোন বড় গুনাহর কথা মনে করে না, কিন্তু ওরই কারণে আল্লাহ স্বীয় সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত তার জন্যে তার অসন্তুষ্টি লিখে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন) হযরত আলকামা (রঃ) বলেনঃ “এ হাদীসটি আমাকে বহু কথা হতে বাঁচিয়ে নিয়েছে।” আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) বলেন যে, ডান দিকের ফেরেশতা পুণ্য লিখেন এবং তিনি বাম দিকের ফেরেশতার উপর আমানতদার। বান্দা যখন কোন পাপকার্য করে তখন তিনি বাম দিকের ফেরেশতাকে বলেনঃ “থামো।" যদি সে তাড়াতাড়ি বা সাথে সাথে তাওবা করে নেয় তবে তিনি তাকে পাপ লিখতে দেন। কিন্তু তাওবা না করলে বাম দিকের ফেরেশতা ওটা লিখে নেন। (ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান বসরী (রঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করার পর বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তোমার জন্যে সহীফা খুলে দেয়া হয়েছে। দু’জন সম্মানিত ফেরেশতাকে তোমার উপর নিযুক্ত করা হয়েছে। একজন আছেন তোমার ডান দিকে এবং একজন আছেন বাম দিকে। ডানের জন তোমার পুণ্যগুলো লিপিবদ্ধ করছেন এবং বামের জন লিপিবদ্ধ করছেন তোমার পাপগুলো। এখন তুমি যা ইচ্ছা আমল কর, বেশী কর অথবা কম কর। যখন তুমি মৃত্যুবরণ করবে তখন এই দফতর জড়িয়ে নেয়া হবে এবং তোমার কবরে রেখে দেয়া হবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন যখন তুমি কবর হতে উঠবে তখন এটা তোমার সামনে পেশ করা হবে। একথাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক মানুষের কর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্যে বের করবে এক কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। (তাকে বলা হবে) তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৩-১৪) তারপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! তিনি বড়ই ন্যায় বিচার করেছেন যিনি তোমাকেই তোমার নিজের হিসাব রক্ষক করে দিয়েছেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাল-মন্দ যা কিছু কথা মুখ হতে বের হয় তার সবই লিখা হয়। এমন কি মানুষ যে বলেঃ আমি খেয়েছি’, ‘আমি পান করেছি’, ‘আমি গিয়েছি’, ‘আমি এসেছি ইত্যাদি সব কিছুই লিখিত হয়। তারপর বৃহস্পতিবারে তার কথা ও কাজগুলো পেশ করা হয়। অতঃপর ভাল ও মন্দ রেখে দেয়া হয় এবং বাকী সব কিছুই সরিয়ে ফেলা হয়। আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির অর্থ এটাইঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যা চান মিটিয়ে দেন এবং যা চান ঠিক রাখেন এবং তাঁর নিকট উম্মুল কিতাব রয়েছে।” (১৩:৩৯)হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। তখন তিনি জানতে পারলেন যে, হযরত তাউস (রঃ)-এর মতে ফেরেশতারা এটাও লিখে থাকেন। তখন তিনি কাতরানোও বন্ধ করে দেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন যে, তিনি মৃত্যুর সময় উহ পর্যন্ত করেননি।এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে মানুষ! মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যিই আসবে। ঐ সময় ঐ সন্দেহ দূর হয়ে যাবে যাতে তুমি এখন জড়িয়ে পড়েছে। ঐ সময় তোমাকে বলা হবেঃ এটা ওটাই যা হতে তুমি অব্যাহতি চেয়ে এসেছে। এখন ওটা এসে গেছে। তুমি ওটা হতে কোনক্রমেই পরিত্রাণ পেতে পার না। না তুমি এটাকে রোধ করতে পার, না পার এর সাথে মুকাবিলা করতে, না তোমার ব্যপারে কারো কোন সাহায্য ও সুপারিশ কোন কাজে আসবে। সঠিক কথা এটাই যে, এখানে সম্বোধন সাধারণভাবে মানুষকে করা হয়েছে, যদিও কেউ কেউ বলেন যে, এ সম্বোধন কাফিরদের প্রতি এবং অন্য কেউ অন্য কিছু বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি আমার পিতা (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় তাঁর শিয়রে বসেছিলাম। তিনি মূৰ্ছিত হয়ে পড়েছিলেন। তখন আমি নিম্নের ছন্দটি পাঠ করলামঃ (আরবী) অর্থাৎ “যার অশ্রু থেমে আছে, ওটাও একবার টপ টপ করে পড়বে।” তখন তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, হে আমার প্রিয় কন্যা! তুমি যা বললে তা নয়, বরং আল্লাহ যা বলেছেন এটা তা-ই। তা হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যই আসবে; এটা হতেই তোমরা অব্যাহতি চেয়ে আসছে।” এই আসারের আরো বহু ধারা আমি সীরাতে সিদ্দীক (রাঃ)-এর মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মৃত্যুর বর্ণনায় আনয়ন করেছি।সহীহ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় মূৰ্ছিত হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয় তখন তিনি চেহারা মুবারক হতে ঘাম মুছতে মুছতে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! মৃত্যুর বড়ই যন্ত্রণা!”(আরবী) এর কয়েক প্রকার অর্থ করা হয়েছে। প্রথম এই যে, (আরবী) এখানে (আরবী) হয়েছে, অর্থাৎ এটা ওটাই যেটাকে বহু দূরের মনে করতে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে বা নেতিবাচক। তখন অর্থ হবেঃ “এটা ওটাই, যা হতে পরিত্রাণ পাওয়ার এবং যাকে সরিয়ে ফেলার তুমি ক্ষমতা রাখো না।হযরত সুমরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (রঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি মৃত্যু হতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত ঐ খেকশিয়ালের মত যার কাছে যমীন তার ঋণ চাইলো, তখন সে পালাতে শুরু করলো। পালাতে পালাতে যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়লো তখন নিজের গর্তে প্রবেশ করলো। যেহেতু যমীন সেখানেও ছিল সেহেতু ঐ যমীন তাকে বললোঃ “ওরে খেঁকশিয়াল! তুই আমার ঋণ পরিশোধ কর।” তখন সে সেখান হতে আবার পালাতে শুরু করলো। অবশেষে সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারালো। মোটকথা, ঐ খেঁকশিয়াল যেমন যমীন হতে পালাবার রাস্তা পায়নি, অনুরূপভাবে মানুষেরও মৃত্য হতে পালাবার রাস্তা বন্ধ। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) স্বীয় মু'জামুল কাবীর’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এরপর শিংগায় ফুঙ্কার দেয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা স্বলিত হাদীস গত হয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘কিরূপে আমি শান্তি ও আরাম পেতে পারি, অথচ শিংগায় ফুঙ্কার দানকারী ফেরেশতা শিংগা মুখে নিয়ে রয়েছেন এবং গ্রীবা ঝুঁকিয়ে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন তিনি নির্দেশ দিবেন, আর ঐ নির্দেশ অনুযায়ী তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন!” সাহাবীগণ (রাঃ) আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি বলবে?” উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা বলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মবিধায়ক।” মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি উপস্থিত হবে, তার সঙ্গে থাকবে চালক ও তার কর্মের সাক্ষী।' একজন তাকে আল্লাহ তা'আলার দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং অপরজন তার কর্মের সক্ষ্য দিবেন। প্রকাশ্য আয়াত তো এটাই এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) মিম্বরের উপর এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “একজন চালক তাকে হাশরের ময়দানের দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং সাক্ষী হবেন যিনি তার কর্মের সাক্ষ্য দান করবেন।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ফেরেশতাকে এবং (আরবী) দ্বারা আমলকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) ফেরেশতাদের মধ্য হতে হবেন এবং (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্বয়ং মানুষ, যে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে।মহান আল্লাহর “তুমি এই দিবস সম্বন্ধে উদাসীন ছিলে, এখন তোমার সম্মুখ হতে পর্দা উন্মোচন করেছি। অদ্য তোমার দৃষ্টি প্রখর।” এই উক্তিতে সম্বোধনকৃত কে? এ সম্পর্কে তিনটি উক্তি রয়েছে। (এক) এই সম্বোধন কাফিরকে করা হবে। (দুই) এই সম্বোধন সাধারণ মানুষকে করা হয়েছে, ভাল ও মন্দ সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। (তিন) এর দ্বারা স্বয়ং নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। দ্বিতীয় উক্তির তাৎপর্য হচ্ছেঃ ‘আখিরাত ও দুনিয়ার মধ্যে ঐ সম্পর্ক রয়েছে যে সম্পর্ক বুয়েছে জাগ্রত ও স্বপ্নের অবস্থার মধ্যে। আর তৃতীয় উক্তির তাৎপর্য হলোঃ “হে বী (সঃ)! এই কুরআনের অহীর পূর্বে তুমি উদাসীন ছিলে! আমি তোমার উপর কুরআন অবতীর্ণ করে তোমার চোখের উপর হতে পর্দা সরিয়ে দিয়েছি। সুতরাং এখন তোমার দৃষ্টি প্রখর হয়ে গেছে। কিন্তু কুরআন কারীমের শব্দ দ্বারা তো এটাই প্রকাশমান যে, এটা সাধারণ সম্বোধন। অর্থাৎ প্রত্যেককে বলা হবেঃ তুমি এই দিন হতে উদাসীন ছিলে। কেননা, কিয়ামতের দিন প্রত্যেকের চক্ষু পূর্ণভাবে খুলে যাবে। এমনকি কাফিরও সেদিন সোজা হয়ে যাবে। কিন্তু তার সেদিন সোজা হওয়া তার কোন উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন তারা আমার নিকট আসবে সেদিন তারা খুব বেশী শ্রবণকারী ও দর্শনকারী হয়ে যাবে।” (১৯:৩৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সামনে অধোবদন হয়ে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম; এখন আপনি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করুন; আমরা সৎ কর্ম করবে, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।” (৩২:১২)

ক্বাফ 50:20

১৬-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, তিনিই মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর জ্ঞান সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে, এমনকি মানুষের মনে যে ভাল-মন্দ ধারণার উদ্রেক হয় সেটাও তিনি জানেন। সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের অন্তরে যে ধারণা আসে আল্লাহ তা'আলা তা ক্ষমা করে দিয়েছেন যে পর্যন্ত না তা তাদের মুখ দিয়ে বের হয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর।' অর্থাৎ তাঁর ফেরেশতাগণ। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহর ইলম বা অবগতিকে বুঝানো হয়েছে। তাঁদের উদ্দেশ্য এই যে, যাতে মিলন ও একত্রিত হওন অবশ্যম্ভাবী হয়ে না পড়ে যা হতে তাঁর পবিত্র সত্তা বহু দূরে রয়েছে এবং তিনি এটা হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। কিন্তু শব্দের চহিদা এটা নয়। কেননা, এখানে (আরবী) একথা বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে (আরবী) -এই কথা। যেমন মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফটকারীর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।” (৫৬:৮৫) এর দ্বারাও ফেরেশতাদের তার এরূপ নিকটবর্তী হওয়া বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যিকর (অর্থাৎ কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী ।” (১৫:৯) ফেরেশতারাই কুরআন কারীমকে নিয়ে অবতীর্ণ হতেন এবং এখানেও ফেরেশতাদের এরূপ নৈকট্য বুঝানো হয়েছে। এর উপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁদেরকে ক্ষমতা প্রদান করেছেন। সুতরাং মানুষের উপর ফেরেশতাদেরও প্রভাব থাকে এবং শয়তানেরও প্রভাব থাকে। শয়তান মানুষের দেহের মধ্যে রক্তের মত চলাফেরা করে। যেমন আল্লাহর চরম সত্যবাদী নবী (সঃ) বলেছেন। এজন্যেই এর পরেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ দু’জন ফেরেশতা মানুষের ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “অবশ্যই আছে তোমাদের জন্যে তত্ত্বাবধায়কগণ; সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ; তারা জানে তোমরা যা কর।” (৮২:১০-১২)হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতারা মানুষের ভাল ও মন্দ সমস্ত আমল লিপিবদ্ধ করে থাকেন। এ ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ)-এর দু’টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তিতো এটাই এবং অপর উক্তিটি এই যে, যে আমলের উপর পুরস্কার ও শাস্তি আছে শুধু ঐ আমলগুলোই লিখেন। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। কেননা, প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা হচ্ছেঃ মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।হযরত বিলাল ইবনে হারিস মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে যেটাকে সে বড় সওয়াবের কথা মনে করে না, কিন্তু আল্লাহ ওরই কারণে কিয়ামত পর্যন্ত স্বীয় সন্তুষ্টি তার জন্যে লিখে দেন। পক্ষান্তরে, সে কোন সময় আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে ফেলে যেটাকে সে তেমন কোন বড় গুনাহর কথা মনে করে না, কিন্তু ওরই কারণে আল্লাহ স্বীয় সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত তার জন্যে তার অসন্তুষ্টি লিখে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন) হযরত আলকামা (রঃ) বলেনঃ “এ হাদীসটি আমাকে বহু কথা হতে বাঁচিয়ে নিয়েছে।” আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) বলেন যে, ডান দিকের ফেরেশতা পুণ্য লিখেন এবং তিনি বাম দিকের ফেরেশতার উপর আমানতদার। বান্দা যখন কোন পাপকার্য করে তখন তিনি বাম দিকের ফেরেশতাকে বলেনঃ “থামো।" যদি সে তাড়াতাড়ি বা সাথে সাথে তাওবা করে নেয় তবে তিনি তাকে পাপ লিখতে দেন। কিন্তু তাওবা না করলে বাম দিকের ফেরেশতা ওটা লিখে নেন। (ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান বসরী (রঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করার পর বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তোমার জন্যে সহীফা খুলে দেয়া হয়েছে। দু’জন সম্মানিত ফেরেশতাকে তোমার উপর নিযুক্ত করা হয়েছে। একজন আছেন তোমার ডান দিকে এবং একজন আছেন বাম দিকে। ডানের জন তোমার পুণ্যগুলো লিপিবদ্ধ করছেন এবং বামের জন লিপিবদ্ধ করছেন তোমার পাপগুলো। এখন তুমি যা ইচ্ছা আমল কর, বেশী কর অথবা কম কর। যখন তুমি মৃত্যুবরণ করবে তখন এই দফতর জড়িয়ে নেয়া হবে এবং তোমার কবরে রেখে দেয়া হবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন যখন তুমি কবর হতে উঠবে তখন এটা তোমার সামনে পেশ করা হবে। একথাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক মানুষের কর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্যে বের করবে এক কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। (তাকে বলা হবে) তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৩-১৪) তারপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! তিনি বড়ই ন্যায় বিচার করেছেন যিনি তোমাকেই তোমার নিজের হিসাব রক্ষক করে দিয়েছেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাল-মন্দ যা কিছু কথা মুখ হতে বের হয় তার সবই লিখা হয়। এমন কি মানুষ যে বলেঃ আমি খেয়েছি’, ‘আমি পান করেছি’, ‘আমি গিয়েছি’, ‘আমি এসেছি ইত্যাদি সব কিছুই লিখিত হয়। তারপর বৃহস্পতিবারে তার কথা ও কাজগুলো পেশ করা হয়। অতঃপর ভাল ও মন্দ রেখে দেয়া হয় এবং বাকী সব কিছুই সরিয়ে ফেলা হয়। আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির অর্থ এটাইঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যা চান মিটিয়ে দেন এবং যা চান ঠিক রাখেন এবং তাঁর নিকট উম্মুল কিতাব রয়েছে।” (১৩:৩৯)হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। তখন তিনি জানতে পারলেন যে, হযরত তাউস (রঃ)-এর মতে ফেরেশতারা এটাও লিখে থাকেন। তখন তিনি কাতরানোও বন্ধ করে দেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন যে, তিনি মৃত্যুর সময় উহ পর্যন্ত করেননি।এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে মানুষ! মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যিই আসবে। ঐ সময় ঐ সন্দেহ দূর হয়ে যাবে যাতে তুমি এখন জড়িয়ে পড়েছে। ঐ সময় তোমাকে বলা হবেঃ এটা ওটাই যা হতে তুমি অব্যাহতি চেয়ে এসেছে। এখন ওটা এসে গেছে। তুমি ওটা হতে কোনক্রমেই পরিত্রাণ পেতে পার না। না তুমি এটাকে রোধ করতে পার, না পার এর সাথে মুকাবিলা করতে, না তোমার ব্যপারে কারো কোন সাহায্য ও সুপারিশ কোন কাজে আসবে। সঠিক কথা এটাই যে, এখানে সম্বোধন সাধারণভাবে মানুষকে করা হয়েছে, যদিও কেউ কেউ বলেন যে, এ সম্বোধন কাফিরদের প্রতি এবং অন্য কেউ অন্য কিছু বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি আমার পিতা (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় তাঁর শিয়রে বসেছিলাম। তিনি মূৰ্ছিত হয়ে পড়েছিলেন। তখন আমি নিম্নের ছন্দটি পাঠ করলামঃ (আরবী) অর্থাৎ “যার অশ্রু থেমে আছে, ওটাও একবার টপ টপ করে পড়বে।” তখন তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, হে আমার প্রিয় কন্যা! তুমি যা বললে তা নয়, বরং আল্লাহ যা বলেছেন এটা তা-ই। তা হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যই আসবে; এটা হতেই তোমরা অব্যাহতি চেয়ে আসছে।” এই আসারের আরো বহু ধারা আমি সীরাতে সিদ্দীক (রাঃ)-এর মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মৃত্যুর বর্ণনায় আনয়ন করেছি।সহীহ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় মূৰ্ছিত হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয় তখন তিনি চেহারা মুবারক হতে ঘাম মুছতে মুছতে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! মৃত্যুর বড়ই যন্ত্রণা!”(আরবী) এর কয়েক প্রকার অর্থ করা হয়েছে। প্রথম এই যে, (আরবী) এখানে (আরবী) হয়েছে, অর্থাৎ এটা ওটাই যেটাকে বহু দূরের মনে করতে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে বা নেতিবাচক। তখন অর্থ হবেঃ “এটা ওটাই, যা হতে পরিত্রাণ পাওয়ার এবং যাকে সরিয়ে ফেলার তুমি ক্ষমতা রাখো না।হযরত সুমরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (রঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি মৃত্যু হতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত ঐ খেকশিয়ালের মত যার কাছে যমীন তার ঋণ চাইলো, তখন সে পালাতে শুরু করলো। পালাতে পালাতে যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়লো তখন নিজের গর্তে প্রবেশ করলো। যেহেতু যমীন সেখানেও ছিল সেহেতু ঐ যমীন তাকে বললোঃ “ওরে খেঁকশিয়াল! তুই আমার ঋণ পরিশোধ কর।” তখন সে সেখান হতে আবার পালাতে শুরু করলো। অবশেষে সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারালো। মোটকথা, ঐ খেঁকশিয়াল যেমন যমীন হতে পালাবার রাস্তা পায়নি, অনুরূপভাবে মানুষেরও মৃত্য হতে পালাবার রাস্তা বন্ধ। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) স্বীয় মু'জামুল কাবীর’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এরপর শিংগায় ফুঙ্কার দেয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা স্বলিত হাদীস গত হয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘কিরূপে আমি শান্তি ও আরাম পেতে পারি, অথচ শিংগায় ফুঙ্কার দানকারী ফেরেশতা শিংগা মুখে নিয়ে রয়েছেন এবং গ্রীবা ঝুঁকিয়ে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন তিনি নির্দেশ দিবেন, আর ঐ নির্দেশ অনুযায়ী তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন!” সাহাবীগণ (রাঃ) আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি বলবে?” উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা বলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মবিধায়ক।” মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি উপস্থিত হবে, তার সঙ্গে থাকবে চালক ও তার কর্মের সাক্ষী।' একজন তাকে আল্লাহ তা'আলার দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং অপরজন তার কর্মের সক্ষ্য দিবেন। প্রকাশ্য আয়াত তো এটাই এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) মিম্বরের উপর এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “একজন চালক তাকে হাশরের ময়দানের দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং সাক্ষী হবেন যিনি তার কর্মের সাক্ষ্য দান করবেন।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ফেরেশতাকে এবং (আরবী) দ্বারা আমলকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) ফেরেশতাদের মধ্য হতে হবেন এবং (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্বয়ং মানুষ, যে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে।মহান আল্লাহর “তুমি এই দিবস সম্বন্ধে উদাসীন ছিলে, এখন তোমার সম্মুখ হতে পর্দা উন্মোচন করেছি। অদ্য তোমার দৃষ্টি প্রখর।” এই উক্তিতে সম্বোধনকৃত কে? এ সম্পর্কে তিনটি উক্তি রয়েছে। (এক) এই সম্বোধন কাফিরকে করা হবে। (দুই) এই সম্বোধন সাধারণ মানুষকে করা হয়েছে, ভাল ও মন্দ সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। (তিন) এর দ্বারা স্বয়ং নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। দ্বিতীয় উক্তির তাৎপর্য হচ্ছেঃ ‘আখিরাত ও দুনিয়ার মধ্যে ঐ সম্পর্ক রয়েছে যে সম্পর্ক বুয়েছে জাগ্রত ও স্বপ্নের অবস্থার মধ্যে। আর তৃতীয় উক্তির তাৎপর্য হলোঃ “হে বী (সঃ)! এই কুরআনের অহীর পূর্বে তুমি উদাসীন ছিলে! আমি তোমার উপর কুরআন অবতীর্ণ করে তোমার চোখের উপর হতে পর্দা সরিয়ে দিয়েছি। সুতরাং এখন তোমার দৃষ্টি প্রখর হয়ে গেছে। কিন্তু কুরআন কারীমের শব্দ দ্বারা তো এটাই প্রকাশমান যে, এটা সাধারণ সম্বোধন। অর্থাৎ প্রত্যেককে বলা হবেঃ তুমি এই দিন হতে উদাসীন ছিলে। কেননা, কিয়ামতের দিন প্রত্যেকের চক্ষু পূর্ণভাবে খুলে যাবে। এমনকি কাফিরও সেদিন সোজা হয়ে যাবে। কিন্তু তার সেদিন সোজা হওয়া তার কোন উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন তারা আমার নিকট আসবে সেদিন তারা খুব বেশী শ্রবণকারী ও দর্শনকারী হয়ে যাবে।” (১৯:৩৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সামনে অধোবদন হয়ে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম; এখন আপনি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করুন; আমরা সৎ কর্ম করবে, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।” (৩২:১২)

ক্বাফ 50:21

১৬-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, তিনিই মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর জ্ঞান সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে, এমনকি মানুষের মনে যে ভাল-মন্দ ধারণার উদ্রেক হয় সেটাও তিনি জানেন। সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের অন্তরে যে ধারণা আসে আল্লাহ তা'আলা তা ক্ষমা করে দিয়েছেন যে পর্যন্ত না তা তাদের মুখ দিয়ে বের হয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর।' অর্থাৎ তাঁর ফেরেশতাগণ। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহর ইলম বা অবগতিকে বুঝানো হয়েছে। তাঁদের উদ্দেশ্য এই যে, যাতে মিলন ও একত্রিত হওন অবশ্যম্ভাবী হয়ে না পড়ে যা হতে তাঁর পবিত্র সত্তা বহু দূরে রয়েছে এবং তিনি এটা হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। কিন্তু শব্দের চহিদা এটা নয়। কেননা, এখানে (আরবী) একথা বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে (আরবী) -এই কথা। যেমন মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফটকারীর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।” (৫৬:৮৫) এর দ্বারাও ফেরেশতাদের তার এরূপ নিকটবর্তী হওয়া বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যিকর (অর্থাৎ কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী ।” (১৫:৯) ফেরেশতারাই কুরআন কারীমকে নিয়ে অবতীর্ণ হতেন এবং এখানেও ফেরেশতাদের এরূপ নৈকট্য বুঝানো হয়েছে। এর উপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁদেরকে ক্ষমতা প্রদান করেছেন। সুতরাং মানুষের উপর ফেরেশতাদেরও প্রভাব থাকে এবং শয়তানেরও প্রভাব থাকে। শয়তান মানুষের দেহের মধ্যে রক্তের মত চলাফেরা করে। যেমন আল্লাহর চরম সত্যবাদী নবী (সঃ) বলেছেন। এজন্যেই এর পরেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ দু’জন ফেরেশতা মানুষের ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “অবশ্যই আছে তোমাদের জন্যে তত্ত্বাবধায়কগণ; সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ; তারা জানে তোমরা যা কর।” (৮২:১০-১২)হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতারা মানুষের ভাল ও মন্দ সমস্ত আমল লিপিবদ্ধ করে থাকেন। এ ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ)-এর দু’টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তিতো এটাই এবং অপর উক্তিটি এই যে, যে আমলের উপর পুরস্কার ও শাস্তি আছে শুধু ঐ আমলগুলোই লিখেন। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। কেননা, প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা হচ্ছেঃ মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।হযরত বিলাল ইবনে হারিস মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে যেটাকে সে বড় সওয়াবের কথা মনে করে না, কিন্তু আল্লাহ ওরই কারণে কিয়ামত পর্যন্ত স্বীয় সন্তুষ্টি তার জন্যে লিখে দেন। পক্ষান্তরে, সে কোন সময় আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে ফেলে যেটাকে সে তেমন কোন বড় গুনাহর কথা মনে করে না, কিন্তু ওরই কারণে আল্লাহ স্বীয় সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত তার জন্যে তার অসন্তুষ্টি লিখে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন) হযরত আলকামা (রঃ) বলেনঃ “এ হাদীসটি আমাকে বহু কথা হতে বাঁচিয়ে নিয়েছে।” আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) বলেন যে, ডান দিকের ফেরেশতা পুণ্য লিখেন এবং তিনি বাম দিকের ফেরেশতার উপর আমানতদার। বান্দা যখন কোন পাপকার্য করে তখন তিনি বাম দিকের ফেরেশতাকে বলেনঃ “থামো।" যদি সে তাড়াতাড়ি বা সাথে সাথে তাওবা করে নেয় তবে তিনি তাকে পাপ লিখতে দেন। কিন্তু তাওবা না করলে বাম দিকের ফেরেশতা ওটা লিখে নেন। (ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান বসরী (রঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করার পর বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তোমার জন্যে সহীফা খুলে দেয়া হয়েছে। দু’জন সম্মানিত ফেরেশতাকে তোমার উপর নিযুক্ত করা হয়েছে। একজন আছেন তোমার ডান দিকে এবং একজন আছেন বাম দিকে। ডানের জন তোমার পুণ্যগুলো লিপিবদ্ধ করছেন এবং বামের জন লিপিবদ্ধ করছেন তোমার পাপগুলো। এখন তুমি যা ইচ্ছা আমল কর, বেশী কর অথবা কম কর। যখন তুমি মৃত্যুবরণ করবে তখন এই দফতর জড়িয়ে নেয়া হবে এবং তোমার কবরে রেখে দেয়া হবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন যখন তুমি কবর হতে উঠবে তখন এটা তোমার সামনে পেশ করা হবে। একথাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক মানুষের কর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্যে বের করবে এক কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। (তাকে বলা হবে) তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৩-১৪) তারপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! তিনি বড়ই ন্যায় বিচার করেছেন যিনি তোমাকেই তোমার নিজের হিসাব রক্ষক করে দিয়েছেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাল-মন্দ যা কিছু কথা মুখ হতে বের হয় তার সবই লিখা হয়। এমন কি মানুষ যে বলেঃ আমি খেয়েছি’, ‘আমি পান করেছি’, ‘আমি গিয়েছি’, ‘আমি এসেছি ইত্যাদি সব কিছুই লিখিত হয়। তারপর বৃহস্পতিবারে তার কথা ও কাজগুলো পেশ করা হয়। অতঃপর ভাল ও মন্দ রেখে দেয়া হয় এবং বাকী সব কিছুই সরিয়ে ফেলা হয়। আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির অর্থ এটাইঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যা চান মিটিয়ে দেন এবং যা চান ঠিক রাখেন এবং তাঁর নিকট উম্মুল কিতাব রয়েছে।” (১৩:৩৯)হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। তখন তিনি জানতে পারলেন যে, হযরত তাউস (রঃ)-এর মতে ফেরেশতারা এটাও লিখে থাকেন। তখন তিনি কাতরানোও বন্ধ করে দেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন যে, তিনি মৃত্যুর সময় উহ পর্যন্ত করেননি।এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে মানুষ! মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যিই আসবে। ঐ সময় ঐ সন্দেহ দূর হয়ে যাবে যাতে তুমি এখন জড়িয়ে পড়েছে। ঐ সময় তোমাকে বলা হবেঃ এটা ওটাই যা হতে তুমি অব্যাহতি চেয়ে এসেছে। এখন ওটা এসে গেছে। তুমি ওটা হতে কোনক্রমেই পরিত্রাণ পেতে পার না। না তুমি এটাকে রোধ করতে পার, না পার এর সাথে মুকাবিলা করতে, না তোমার ব্যপারে কারো কোন সাহায্য ও সুপারিশ কোন কাজে আসবে। সঠিক কথা এটাই যে, এখানে সম্বোধন সাধারণভাবে মানুষকে করা হয়েছে, যদিও কেউ কেউ বলেন যে, এ সম্বোধন কাফিরদের প্রতি এবং অন্য কেউ অন্য কিছু বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি আমার পিতা (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় তাঁর শিয়রে বসেছিলাম। তিনি মূৰ্ছিত হয়ে পড়েছিলেন। তখন আমি নিম্নের ছন্দটি পাঠ করলামঃ (আরবী) অর্থাৎ “যার অশ্রু থেমে আছে, ওটাও একবার টপ টপ করে পড়বে।” তখন তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, হে আমার প্রিয় কন্যা! তুমি যা বললে তা নয়, বরং আল্লাহ যা বলেছেন এটা তা-ই। তা হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যই আসবে; এটা হতেই তোমরা অব্যাহতি চেয়ে আসছে।” এই আসারের আরো বহু ধারা আমি সীরাতে সিদ্দীক (রাঃ)-এর মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মৃত্যুর বর্ণনায় আনয়ন করেছি।সহীহ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় মূৰ্ছিত হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয় তখন তিনি চেহারা মুবারক হতে ঘাম মুছতে মুছতে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! মৃত্যুর বড়ই যন্ত্রণা!”(আরবী) এর কয়েক প্রকার অর্থ করা হয়েছে। প্রথম এই যে, (আরবী) এখানে (আরবী) হয়েছে, অর্থাৎ এটা ওটাই যেটাকে বহু দূরের মনে করতে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে বা নেতিবাচক। তখন অর্থ হবেঃ “এটা ওটাই, যা হতে পরিত্রাণ পাওয়ার এবং যাকে সরিয়ে ফেলার তুমি ক্ষমতা রাখো না।হযরত সুমরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (রঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি মৃত্যু হতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত ঐ খেকশিয়ালের মত যার কাছে যমীন তার ঋণ চাইলো, তখন সে পালাতে শুরু করলো। পালাতে পালাতে যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়লো তখন নিজের গর্তে প্রবেশ করলো। যেহেতু যমীন সেখানেও ছিল সেহেতু ঐ যমীন তাকে বললোঃ “ওরে খেঁকশিয়াল! তুই আমার ঋণ পরিশোধ কর।” তখন সে সেখান হতে আবার পালাতে শুরু করলো। অবশেষে সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারালো। মোটকথা, ঐ খেঁকশিয়াল যেমন যমীন হতে পালাবার রাস্তা পায়নি, অনুরূপভাবে মানুষেরও মৃত্য হতে পালাবার রাস্তা বন্ধ। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) স্বীয় মু'জামুল কাবীর’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এরপর শিংগায় ফুঙ্কার দেয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা স্বলিত হাদীস গত হয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘কিরূপে আমি শান্তি ও আরাম পেতে পারি, অথচ শিংগায় ফুঙ্কার দানকারী ফেরেশতা শিংগা মুখে নিয়ে রয়েছেন এবং গ্রীবা ঝুঁকিয়ে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন তিনি নির্দেশ দিবেন, আর ঐ নির্দেশ অনুযায়ী তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন!” সাহাবীগণ (রাঃ) আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি বলবে?” উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা বলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মবিধায়ক।” মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি উপস্থিত হবে, তার সঙ্গে থাকবে চালক ও তার কর্মের সাক্ষী।' একজন তাকে আল্লাহ তা'আলার দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং অপরজন তার কর্মের সক্ষ্য দিবেন। প্রকাশ্য আয়াত তো এটাই এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) মিম্বরের উপর এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “একজন চালক তাকে হাশরের ময়দানের দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং সাক্ষী হবেন যিনি তার কর্মের সাক্ষ্য দান করবেন।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ফেরেশতাকে এবং (আরবী) দ্বারা আমলকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) ফেরেশতাদের মধ্য হতে হবেন এবং (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্বয়ং মানুষ, যে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে।মহান আল্লাহর “তুমি এই দিবস সম্বন্ধে উদাসীন ছিলে, এখন তোমার সম্মুখ হতে পর্দা উন্মোচন করেছি। অদ্য তোমার দৃষ্টি প্রখর।” এই উক্তিতে সম্বোধনকৃত কে? এ সম্পর্কে তিনটি উক্তি রয়েছে। (এক) এই সম্বোধন কাফিরকে করা হবে। (দুই) এই সম্বোধন সাধারণ মানুষকে করা হয়েছে, ভাল ও মন্দ সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। (তিন) এর দ্বারা স্বয়ং নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। দ্বিতীয় উক্তির তাৎপর্য হচ্ছেঃ ‘আখিরাত ও দুনিয়ার মধ্যে ঐ সম্পর্ক রয়েছে যে সম্পর্ক বুয়েছে জাগ্রত ও স্বপ্নের অবস্থার মধ্যে। আর তৃতীয় উক্তির তাৎপর্য হলোঃ “হে বী (সঃ)! এই কুরআনের অহীর পূর্বে তুমি উদাসীন ছিলে! আমি তোমার উপর কুরআন অবতীর্ণ করে তোমার চোখের উপর হতে পর্দা সরিয়ে দিয়েছি। সুতরাং এখন তোমার দৃষ্টি প্রখর হয়ে গেছে। কিন্তু কুরআন কারীমের শব্দ দ্বারা তো এটাই প্রকাশমান যে, এটা সাধারণ সম্বোধন। অর্থাৎ প্রত্যেককে বলা হবেঃ তুমি এই দিন হতে উদাসীন ছিলে। কেননা, কিয়ামতের দিন প্রত্যেকের চক্ষু পূর্ণভাবে খুলে যাবে। এমনকি কাফিরও সেদিন সোজা হয়ে যাবে। কিন্তু তার সেদিন সোজা হওয়া তার কোন উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন তারা আমার নিকট আসবে সেদিন তারা খুব বেশী শ্রবণকারী ও দর্শনকারী হয়ে যাবে।” (১৯:৩৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সামনে অধোবদন হয়ে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম; এখন আপনি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করুন; আমরা সৎ কর্ম করবে, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।” (৩২:১২)

ক্বাফ 50:22

১৬-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, তিনিই মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর জ্ঞান সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে, এমনকি মানুষের মনে যে ভাল-মন্দ ধারণার উদ্রেক হয় সেটাও তিনি জানেন। সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের অন্তরে যে ধারণা আসে আল্লাহ তা'আলা তা ক্ষমা করে দিয়েছেন যে পর্যন্ত না তা তাদের মুখ দিয়ে বের হয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর।' অর্থাৎ তাঁর ফেরেশতাগণ। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা আল্লাহর ইলম বা অবগতিকে বুঝানো হয়েছে। তাঁদের উদ্দেশ্য এই যে, যাতে মিলন ও একত্রিত হওন অবশ্যম্ভাবী হয়ে না পড়ে যা হতে তাঁর পবিত্র সত্তা বহু দূরে রয়েছে এবং তিনি এটা হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। কিন্তু শব্দের চহিদা এটা নয়। কেননা, এখানে (আরবী) একথা বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে (আরবী) -এই কথা। যেমন মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফটকারীর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাদের অপেক্ষা তার নিকটতর, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।” (৫৬:৮৫) এর দ্বারাও ফেরেশতাদের তার এরূপ নিকটবর্তী হওয়া বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি যিকর (অর্থাৎ কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী ।” (১৫:৯) ফেরেশতারাই কুরআন কারীমকে নিয়ে অবতীর্ণ হতেন এবং এখানেও ফেরেশতাদের এরূপ নৈকট্য বুঝানো হয়েছে। এর উপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁদেরকে ক্ষমতা প্রদান করেছেন। সুতরাং মানুষের উপর ফেরেশতাদেরও প্রভাব থাকে এবং শয়তানেরও প্রভাব থাকে। শয়তান মানুষের দেহের মধ্যে রক্তের মত চলাফেরা করে। যেমন আল্লাহর চরম সত্যবাদী নবী (সঃ) বলেছেন। এজন্যেই এর পরেই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ দু’জন ফেরেশতা মানুষের ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “অবশ্যই আছে তোমাদের জন্যে তত্ত্বাবধায়কগণ; সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ; তারা জানে তোমরা যা কর।” (৮২:১০-১২)হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতারা মানুষের ভাল ও মন্দ সমস্ত আমল লিপিবদ্ধ করে থাকেন। এ ব্যাপারে হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ)-এর দু’টি উক্তি রয়েছে। একটি উক্তিতো এটাই এবং অপর উক্তিটি এই যে, যে আমলের উপর পুরস্কার ও শাস্তি আছে শুধু ঐ আমলগুলোই লিখেন। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। কেননা, প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা হচ্ছেঃ মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।হযরত বিলাল ইবনে হারিস মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে যেটাকে সে বড় সওয়াবের কথা মনে করে না, কিন্তু আল্লাহ ওরই কারণে কিয়ামত পর্যন্ত স্বীয় সন্তুষ্টি তার জন্যে লিখে দেন। পক্ষান্তরে, সে কোন সময় আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কোন কথা উচ্চারণ করে ফেলে যেটাকে সে তেমন কোন বড় গুনাহর কথা মনে করে না, কিন্তু ওরই কারণে আল্লাহ স্বীয় সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত তার জন্যে তার অসন্তুষ্টি লিখে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন) হযরত আলকামা (রঃ) বলেনঃ “এ হাদীসটি আমাকে বহু কথা হতে বাঁচিয়ে নিয়েছে।” আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) বলেন যে, ডান দিকের ফেরেশতা পুণ্য লিখেন এবং তিনি বাম দিকের ফেরেশতার উপর আমানতদার। বান্দা যখন কোন পাপকার্য করে তখন তিনি বাম দিকের ফেরেশতাকে বলেনঃ “থামো।" যদি সে তাড়াতাড়ি বা সাথে সাথে তাওবা করে নেয় তবে তিনি তাকে পাপ লিখতে দেন। কিন্তু তাওবা না করলে বাম দিকের ফেরেশতা ওটা লিখে নেন। (ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান বসরী (রঃ) (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করার পর বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তোমার জন্যে সহীফা খুলে দেয়া হয়েছে। দু’জন সম্মানিত ফেরেশতাকে তোমার উপর নিযুক্ত করা হয়েছে। একজন আছেন তোমার ডান দিকে এবং একজন আছেন বাম দিকে। ডানের জন তোমার পুণ্যগুলো লিপিবদ্ধ করছেন এবং বামের জন লিপিবদ্ধ করছেন তোমার পাপগুলো। এখন তুমি যা ইচ্ছা আমল কর, বেশী কর অথবা কম কর। যখন তুমি মৃত্যুবরণ করবে তখন এই দফতর জড়িয়ে নেয়া হবে এবং তোমার কবরে রেখে দেয়া হবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন যখন তুমি কবর হতে উঠবে তখন এটা তোমার সামনে পেশ করা হবে। একথাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক মানুষের কর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্যে বের করবে এক কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। (তাকে বলা হবে) তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্যে যথেষ্ট।” (১৭:১৩-১৪) তারপর তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! তিনি বড়ই ন্যায় বিচার করেছেন যিনি তোমাকেই তোমার নিজের হিসাব রক্ষক করে দিয়েছেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাল-মন্দ যা কিছু কথা মুখ হতে বের হয় তার সবই লিখা হয়। এমন কি মানুষ যে বলেঃ আমি খেয়েছি’, ‘আমি পান করেছি’, ‘আমি গিয়েছি’, ‘আমি এসেছি ইত্যাদি সব কিছুই লিখিত হয়। তারপর বৃহস্পতিবারে তার কথা ও কাজগুলো পেশ করা হয়। অতঃপর ভাল ও মন্দ রেখে দেয়া হয় এবং বাকী সব কিছুই সরিয়ে ফেলা হয়। আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তির অর্থ এটাইঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ যা চান মিটিয়ে দেন এবং যা চান ঠিক রাখেন এবং তাঁর নিকট উম্মুল কিতাব রয়েছে।” (১৩:৩৯)হযরত ইমাম আহমাদ (রঃ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। তখন তিনি জানতে পারলেন যে, হযরত তাউস (রঃ)-এর মতে ফেরেশতারা এটাও লিখে থাকেন। তখন তিনি কাতরানোও বন্ধ করে দেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন যে, তিনি মৃত্যুর সময় উহ পর্যন্ত করেননি।এরপর প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে মানুষ! মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যিই আসবে। ঐ সময় ঐ সন্দেহ দূর হয়ে যাবে যাতে তুমি এখন জড়িয়ে পড়েছে। ঐ সময় তোমাকে বলা হবেঃ এটা ওটাই যা হতে তুমি অব্যাহতি চেয়ে এসেছে। এখন ওটা এসে গেছে। তুমি ওটা হতে কোনক্রমেই পরিত্রাণ পেতে পার না। না তুমি এটাকে রোধ করতে পার, না পার এর সাথে মুকাবিলা করতে, না তোমার ব্যপারে কারো কোন সাহায্য ও সুপারিশ কোন কাজে আসবে। সঠিক কথা এটাই যে, এখানে সম্বোধন সাধারণভাবে মানুষকে করা হয়েছে, যদিও কেউ কেউ বলেন যে, এ সম্বোধন কাফিরদের প্রতি এবং অন্য কেউ অন্য কিছু বলেছেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি আমার পিতা (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় তাঁর শিয়রে বসেছিলাম। তিনি মূৰ্ছিত হয়ে পড়েছিলেন। তখন আমি নিম্নের ছন্দটি পাঠ করলামঃ (আরবী) অর্থাৎ “যার অশ্রু থেমে আছে, ওটাও একবার টপ টপ করে পড়বে।” তখন তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, হে আমার প্রিয় কন্যা! তুমি যা বললে তা নয়, বরং আল্লাহ যা বলেছেন এটা তা-ই। তা হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যই আসবে; এটা হতেই তোমরা অব্যাহতি চেয়ে আসছে।” এই আসারের আরো বহু ধারা আমি সীরাতে সিদ্দীক (রাঃ)-এর মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মৃত্যুর বর্ণনায় আনয়ন করেছি।সহীহ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় মূৰ্ছিত হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয় তখন তিনি চেহারা মুবারক হতে ঘাম মুছতে মুছতে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! মৃত্যুর বড়ই যন্ত্রণা!”(আরবী) এর কয়েক প্রকার অর্থ করা হয়েছে। প্রথম এই যে, (আরবী) এখানে (আরবী) হয়েছে, অর্থাৎ এটা ওটাই যেটাকে বহু দূরের মনে করতে। দ্বিতীয় এই যে, এখানে বা নেতিবাচক। তখন অর্থ হবেঃ “এটা ওটাই, যা হতে পরিত্রাণ পাওয়ার এবং যাকে সরিয়ে ফেলার তুমি ক্ষমতা রাখো না।হযরত সুমরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (রঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি মৃত্যু হতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত ঐ খেকশিয়ালের মত যার কাছে যমীন তার ঋণ চাইলো, তখন সে পালাতে শুরু করলো। পালাতে পালাতে যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়লো তখন নিজের গর্তে প্রবেশ করলো। যেহেতু যমীন সেখানেও ছিল সেহেতু ঐ যমীন তাকে বললোঃ “ওরে খেঁকশিয়াল! তুই আমার ঋণ পরিশোধ কর।” তখন সে সেখান হতে আবার পালাতে শুরু করলো। অবশেষে সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারালো। মোটকথা, ঐ খেঁকশিয়াল যেমন যমীন হতে পালাবার রাস্তা পায়নি, অনুরূপভাবে মানুষেরও মৃত্য হতে পালাবার রাস্তা বন্ধ। (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) স্বীয় মু'জামুল কাবীর’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এরপর শিংগায় ফুঙ্কার দেয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা স্বলিত হাদীস গত হয়েছে। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘কিরূপে আমি শান্তি ও আরাম পেতে পারি, অথচ শিংগায় ফুঙ্কার দানকারী ফেরেশতা শিংগা মুখে নিয়ে রয়েছেন এবং গ্রীবা ঝুঁকিয়ে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছেন যে, কখন তিনি নির্দেশ দিবেন, আর ঐ নির্দেশ অনুযায়ী তিনি শিংগায় ফুৎকার দিবেন!” সাহাবীগণ (রাঃ) আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা কি বলবে?” উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা বলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মবিধায়ক।” মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি উপস্থিত হবে, তার সঙ্গে থাকবে চালক ও তার কর্মের সাক্ষী।' একজন তাকে আল্লাহ তা'আলার দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং অপরজন তার কর্মের সক্ষ্য দিবেন। প্রকাশ্য আয়াত তো এটাই এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) মিম্বরের উপর এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন এবং বলেনঃ “একজন চালক তাকে হাশরের ময়দানের দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং সাক্ষী হবেন যিনি তার কর্মের সাক্ষ্য দান করবেন।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ফেরেশতাকে এবং (আরবী) দ্বারা আমলকে বুঝানো হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) ফেরেশতাদের মধ্য হতে হবেন এবং (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্বয়ং মানুষ, যে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে।মহান আল্লাহর “তুমি এই দিবস সম্বন্ধে উদাসীন ছিলে, এখন তোমার সম্মুখ হতে পর্দা উন্মোচন করেছি। অদ্য তোমার দৃষ্টি প্রখর।” এই উক্তিতে সম্বোধনকৃত কে? এ সম্পর্কে তিনটি উক্তি রয়েছে। (এক) এই সম্বোধন কাফিরকে করা হবে। (দুই) এই সম্বোধন সাধারণ মানুষকে করা হয়েছে, ভাল ও মন্দ সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। (তিন) এর দ্বারা স্বয়ং নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। দ্বিতীয় উক্তির তাৎপর্য হচ্ছেঃ ‘আখিরাত ও দুনিয়ার মধ্যে ঐ সম্পর্ক রয়েছে যে সম্পর্ক বুয়েছে জাগ্রত ও স্বপ্নের অবস্থার মধ্যে। আর তৃতীয় উক্তির তাৎপর্য হলোঃ “হে বী (সঃ)! এই কুরআনের অহীর পূর্বে তুমি উদাসীন ছিলে! আমি তোমার উপর কুরআন অবতীর্ণ করে তোমার চোখের উপর হতে পর্দা সরিয়ে দিয়েছি। সুতরাং এখন তোমার দৃষ্টি প্রখর হয়ে গেছে। কিন্তু কুরআন কারীমের শব্দ দ্বারা তো এটাই প্রকাশমান যে, এটা সাধারণ সম্বোধন। অর্থাৎ প্রত্যেককে বলা হবেঃ তুমি এই দিন হতে উদাসীন ছিলে। কেননা, কিয়ামতের দিন প্রত্যেকের চক্ষু পূর্ণভাবে খুলে যাবে। এমনকি কাফিরও সেদিন সোজা হয়ে যাবে। কিন্তু তার সেদিন সোজা হওয়া তার কোন উপকারে আসবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন তারা আমার নিকট আসবে সেদিন তারা খুব বেশী শ্রবণকারী ও দর্শনকারী হয়ে যাবে।” (১৯:৩৮) মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হায়, তুমি যদি দেখতে! যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সামনে অধোবদন হয়ে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম; এখন আপনি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করুন; আমরা সৎ কর্ম করবে, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।” (৩২:১২)

ক্বাফ 50:23

২৩-২৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যে ফেরেশতা আদম সন্তানের আমলের উপর নিযুক্ত রয়েছে সে কিয়ামতের দিন তার আমলের সাক্ষ্যদান করবে। সে বলবেঃ এই তো আমার নিকট আমলনামা প্রস্তুত। এতে একটুও কম-বেশী করা হয়নি।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা ঐ ফেরেশতার কথা হবে যাকে (আরবী) বলা হয়েছে, যিনি তাকে হাশরের ময়দানের দিকে নিয়ে যাবেন। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেনঃ “আমার নিকট পছন্দনীয় উক্তি এটাই যে, এটা অন্তর্ভুক্ত করে এই ফেরেশতাকেও এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতাকেও। আল্লাহ তা'আলা আদল ও ইনসাফের সাথে মাখলুকের মধ্যে ফায়সালা করবেন।(আরবী) শব্দটি দ্বিবচনের রূপ। কোন কোন নাহভী বলেন যে, কোন কোন আরব একবচনকে দ্বিবচন করে থাকে। যেমন হাজ্জাজের উক্তি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। তিনি তাঁর জল্লাদকে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু'জন তার গর্দান মেরে দাও।” অথচ জল্লাদ তো একজনই ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, প্রকৃতপক্ষে এটা নূনে তাকীদ, যার তাসহীল আলিফের দিকে করা হয়েছে। কিন্তু এটা খুব দূরের কথা। কেননা, এরূপ তো ওয়াকফ-এর অবস্থায় হয়ে থাকে। বাহ্যতঃ এটাও জানা যাচ্ছে যে, এই সম্বোধন উপরোক্তে দু’জন ফেরেশতার প্রতি হবে। হাঁকিয়ে আনয়নকারী ফেরেশতা তাকে হিসাবের জন্যে পেশ করবেন এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতা সাক্ষ্য দিয়ে দিবেন। তখন আল্লাহ তাআলা দু’জনকেই নির্দেশ দিবেনঃ “তোমরা দু'জন তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ কর।” যা অত্যন্ত জঘন্য স্থান। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে রক্ষা করুন!আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেনঃ কল্যাণকর কাজে প্রবল বাধাদানকারী, সীমালংঘনকারী, সন্দেহ পোষণকারী এবং আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারী লোককে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।হাদীস গত হয়েছে যে, এই লোকদেরকে লক্ষ্য করে কিয়ামতের দিন জাহান্নাম স্বীয় গর্দান উঁচু করে হাশরের ময়দানের সমস্ত লোককে শুনিয়ে বলবেঃ “আমি তিন প্রকারের লোকের জন্যে নিযুক্ত হয়েছি। (এক) উদ্ধত ও সত্যের বিরুদ্ধাচরণকারীর জন্যে, (দুই) আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারীর জন্যে এবং (তিন) ছবি তৈরীকারীর জন্যে।” অতঃপর জাহান্নাম এসব লোককে জড়িয়ে ধরবে। মুসনাদে আহমাদের হাদীসে তৃতীয় প্রকারের লোক ওদেরকে বলা হয়েছে যারা অন্যায়ভাবে হত্যাকারী।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তার সহচর অর্থাৎ শয়তান বলবে- হে আল্লাহ! আমি তাকে পথভ্রষ্ট করিনি, বরং সে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েছিল। বাতিলকে সে স্বয়ং গ্রহণ করে নিয়েছিল। সে নিজেই সত্যের বিরোধী ছিল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন সব কিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে তখন শয়তান বলবেঃ আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সত্য প্রতিশ্রুতি, আমিও তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিনি। আমার তো তোমাদের উপর কোন আধিপত্য ছিল না, আমি শুধু তোমাদেরকে আহ্বান করেছিলাম এবং তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে। সুতরাং তোমরা আমার প্রতি দোষারোপ করো না, তোমরা নিজেদেরই প্রতি দোষারোপ কর। আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নই এবং তোমরাও আমার উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নও। তোমরা যে পূর্বে আমাকে আল্লাহর শরীক করেছিলে তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। যালিমদের জন্যে তো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আছেই।” (১৪:২২)।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন যে, তিনি মানুষ ও তার সঙ্গী শয়তানকে বলবেনঃ তোমরা আমার সামনে বাক-বিতণ্ডা করো না, কেননা আমি তো তোমাদেরকে পূর্বেই সতর্ক করেছি। অর্থাৎ আমি রাসূলদের মাধ্যমে তোমাদেরকে সতর্ক করেছিলাম এবং কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছিলাম। আর তোমাদের উপর দলীল-প্রমাণাদি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অতএব, জেনে রেখো যে, আমার কথার রদবদল হয় না এবং আমি আমার বান্দাদের প্রতি কোন অবিচার করি না যে, একজনের পাপের কারণে অন্যজনকে পাকড়াও করবে। প্রত্যেকের উপর হুজ্জত পুরো হয়ে গেছে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ পাপের যিম্মাদার।

ক্বাফ 50:24

২৩-২৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যে ফেরেশতা আদম সন্তানের আমলের উপর নিযুক্ত রয়েছে সে কিয়ামতের দিন তার আমলের সাক্ষ্যদান করবে। সে বলবেঃ এই তো আমার নিকট আমলনামা প্রস্তুত। এতে একটুও কম-বেশী করা হয়নি।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা ঐ ফেরেশতার কথা হবে যাকে (আরবী) বলা হয়েছে, যিনি তাকে হাশরের ময়দানের দিকে নিয়ে যাবেন। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেনঃ “আমার নিকট পছন্দনীয় উক্তি এটাই যে, এটা অন্তর্ভুক্ত করে এই ফেরেশতাকেও এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতাকেও। আল্লাহ তা'আলা আদল ও ইনসাফের সাথে মাখলুকের মধ্যে ফায়সালা করবেন।(আরবী) শব্দটি দ্বিবচনের রূপ। কোন কোন নাহভী বলেন যে, কোন কোন আরব একবচনকে দ্বিবচন করে থাকে। যেমন হাজ্জাজের উক্তি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। তিনি তাঁর জল্লাদকে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু'জন তার গর্দান মেরে দাও।” অথচ জল্লাদ তো একজনই ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, প্রকৃতপক্ষে এটা নূনে তাকীদ, যার তাসহীল আলিফের দিকে করা হয়েছে। কিন্তু এটা খুব দূরের কথা। কেননা, এরূপ তো ওয়াকফ-এর অবস্থায় হয়ে থাকে। বাহ্যতঃ এটাও জানা যাচ্ছে যে, এই সম্বোধন উপরোক্তে দু’জন ফেরেশতার প্রতি হবে। হাঁকিয়ে আনয়নকারী ফেরেশতা তাকে হিসাবের জন্যে পেশ করবেন এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতা সাক্ষ্য দিয়ে দিবেন। তখন আল্লাহ তাআলা দু’জনকেই নির্দেশ দিবেনঃ “তোমরা দু'জন তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ কর।” যা অত্যন্ত জঘন্য স্থান। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে রক্ষা করুন!আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেনঃ কল্যাণকর কাজে প্রবল বাধাদানকারী, সীমালংঘনকারী, সন্দেহ পোষণকারী এবং আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারী লোককে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।হাদীস গত হয়েছে যে, এই লোকদেরকে লক্ষ্য করে কিয়ামতের দিন জাহান্নাম স্বীয় গর্দান উঁচু করে হাশরের ময়দানের সমস্ত লোককে শুনিয়ে বলবেঃ “আমি তিন প্রকারের লোকের জন্যে নিযুক্ত হয়েছি। (এক) উদ্ধত ও সত্যের বিরুদ্ধাচরণকারীর জন্যে, (দুই) আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারীর জন্যে এবং (তিন) ছবি তৈরীকারীর জন্যে।” অতঃপর জাহান্নাম এসব লোককে জড়িয়ে ধরবে। মুসনাদে আহমাদের হাদীসে তৃতীয় প্রকারের লোক ওদেরকে বলা হয়েছে যারা অন্যায়ভাবে হত্যাকারী।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তার সহচর অর্থাৎ শয়তান বলবে- হে আল্লাহ! আমি তাকে পথভ্রষ্ট করিনি, বরং সে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েছিল। বাতিলকে সে স্বয়ং গ্রহণ করে নিয়েছিল। সে নিজেই সত্যের বিরোধী ছিল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন সব কিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে তখন শয়তান বলবেঃ আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সত্য প্রতিশ্রুতি, আমিও তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিনি। আমার তো তোমাদের উপর কোন আধিপত্য ছিল না, আমি শুধু তোমাদেরকে আহ্বান করেছিলাম এবং তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে। সুতরাং তোমরা আমার প্রতি দোষারোপ করো না, তোমরা নিজেদেরই প্রতি দোষারোপ কর। আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নই এবং তোমরাও আমার উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নও। তোমরা যে পূর্বে আমাকে আল্লাহর শরীক করেছিলে তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। যালিমদের জন্যে তো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আছেই।” (১৪:২২)।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন যে, তিনি মানুষ ও তার সঙ্গী শয়তানকে বলবেনঃ তোমরা আমার সামনে বাক-বিতণ্ডা করো না, কেননা আমি তো তোমাদেরকে পূর্বেই সতর্ক করেছি। অর্থাৎ আমি রাসূলদের মাধ্যমে তোমাদেরকে সতর্ক করেছিলাম এবং কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছিলাম। আর তোমাদের উপর দলীল-প্রমাণাদি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অতএব, জেনে রেখো যে, আমার কথার রদবদল হয় না এবং আমি আমার বান্দাদের প্রতি কোন অবিচার করি না যে, একজনের পাপের কারণে অন্যজনকে পাকড়াও করবে। প্রত্যেকের উপর হুজ্জত পুরো হয়ে গেছে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ পাপের যিম্মাদার।

ক্বাফ 50:25

২৩-২৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যে ফেরেশতা আদম সন্তানের আমলের উপর নিযুক্ত রয়েছে সে কিয়ামতের দিন তার আমলের সাক্ষ্যদান করবে। সে বলবেঃ এই তো আমার নিকট আমলনামা প্রস্তুত। এতে একটুও কম-বেশী করা হয়নি।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা ঐ ফেরেশতার কথা হবে যাকে (আরবী) বলা হয়েছে, যিনি তাকে হাশরের ময়দানের দিকে নিয়ে যাবেন। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেনঃ “আমার নিকট পছন্দনীয় উক্তি এটাই যে, এটা অন্তর্ভুক্ত করে এই ফেরেশতাকেও এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতাকেও। আল্লাহ তা'আলা আদল ও ইনসাফের সাথে মাখলুকের মধ্যে ফায়সালা করবেন।(আরবী) শব্দটি দ্বিবচনের রূপ। কোন কোন নাহভী বলেন যে, কোন কোন আরব একবচনকে দ্বিবচন করে থাকে। যেমন হাজ্জাজের উক্তি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। তিনি তাঁর জল্লাদকে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু'জন তার গর্দান মেরে দাও।” অথচ জল্লাদ তো একজনই ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, প্রকৃতপক্ষে এটা নূনে তাকীদ, যার তাসহীল আলিফের দিকে করা হয়েছে। কিন্তু এটা খুব দূরের কথা। কেননা, এরূপ তো ওয়াকফ-এর অবস্থায় হয়ে থাকে। বাহ্যতঃ এটাও জানা যাচ্ছে যে, এই সম্বোধন উপরোক্তে দু’জন ফেরেশতার প্রতি হবে। হাঁকিয়ে আনয়নকারী ফেরেশতা তাকে হিসাবের জন্যে পেশ করবেন এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতা সাক্ষ্য দিয়ে দিবেন। তখন আল্লাহ তাআলা দু’জনকেই নির্দেশ দিবেনঃ “তোমরা দু'জন তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ কর।” যা অত্যন্ত জঘন্য স্থান। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে রক্ষা করুন!আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেনঃ কল্যাণকর কাজে প্রবল বাধাদানকারী, সীমালংঘনকারী, সন্দেহ পোষণকারী এবং আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারী লোককে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।হাদীস গত হয়েছে যে, এই লোকদেরকে লক্ষ্য করে কিয়ামতের দিন জাহান্নাম স্বীয় গর্দান উঁচু করে হাশরের ময়দানের সমস্ত লোককে শুনিয়ে বলবেঃ “আমি তিন প্রকারের লোকের জন্যে নিযুক্ত হয়েছি। (এক) উদ্ধত ও সত্যের বিরুদ্ধাচরণকারীর জন্যে, (দুই) আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারীর জন্যে এবং (তিন) ছবি তৈরীকারীর জন্যে।” অতঃপর জাহান্নাম এসব লোককে জড়িয়ে ধরবে। মুসনাদে আহমাদের হাদীসে তৃতীয় প্রকারের লোক ওদেরকে বলা হয়েছে যারা অন্যায়ভাবে হত্যাকারী।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তার সহচর অর্থাৎ শয়তান বলবে- হে আল্লাহ! আমি তাকে পথভ্রষ্ট করিনি, বরং সে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েছিল। বাতিলকে সে স্বয়ং গ্রহণ করে নিয়েছিল। সে নিজেই সত্যের বিরোধী ছিল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন সব কিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে তখন শয়তান বলবেঃ আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সত্য প্রতিশ্রুতি, আমিও তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিনি। আমার তো তোমাদের উপর কোন আধিপত্য ছিল না, আমি শুধু তোমাদেরকে আহ্বান করেছিলাম এবং তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে। সুতরাং তোমরা আমার প্রতি দোষারোপ করো না, তোমরা নিজেদেরই প্রতি দোষারোপ কর। আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নই এবং তোমরাও আমার উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নও। তোমরা যে পূর্বে আমাকে আল্লাহর শরীক করেছিলে তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। যালিমদের জন্যে তো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আছেই।” (১৪:২২)।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন যে, তিনি মানুষ ও তার সঙ্গী শয়তানকে বলবেনঃ তোমরা আমার সামনে বাক-বিতণ্ডা করো না, কেননা আমি তো তোমাদেরকে পূর্বেই সতর্ক করেছি। অর্থাৎ আমি রাসূলদের মাধ্যমে তোমাদেরকে সতর্ক করেছিলাম এবং কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছিলাম। আর তোমাদের উপর দলীল-প্রমাণাদি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অতএব, জেনে রেখো যে, আমার কথার রদবদল হয় না এবং আমি আমার বান্দাদের প্রতি কোন অবিচার করি না যে, একজনের পাপের কারণে অন্যজনকে পাকড়াও করবে। প্রত্যেকের উপর হুজ্জত পুরো হয়ে গেছে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ পাপের যিম্মাদার।

ক্বাফ 50:26

২৩-২৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যে ফেরেশতা আদম সন্তানের আমলের উপর নিযুক্ত রয়েছে সে কিয়ামতের দিন তার আমলের সাক্ষ্যদান করবে। সে বলবেঃ এই তো আমার নিকট আমলনামা প্রস্তুত। এতে একটুও কম-বেশী করা হয়নি।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা ঐ ফেরেশতার কথা হবে যাকে (আরবী) বলা হয়েছে, যিনি তাকে হাশরের ময়দানের দিকে নিয়ে যাবেন। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেনঃ “আমার নিকট পছন্দনীয় উক্তি এটাই যে, এটা অন্তর্ভুক্ত করে এই ফেরেশতাকেও এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতাকেও। আল্লাহ তা'আলা আদল ও ইনসাফের সাথে মাখলুকের মধ্যে ফায়সালা করবেন।(আরবী) শব্দটি দ্বিবচনের রূপ। কোন কোন নাহভী বলেন যে, কোন কোন আরব একবচনকে দ্বিবচন করে থাকে। যেমন হাজ্জাজের উক্তি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। তিনি তাঁর জল্লাদকে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু'জন তার গর্দান মেরে দাও।” অথচ জল্লাদ তো একজনই ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, প্রকৃতপক্ষে এটা নূনে তাকীদ, যার তাসহীল আলিফের দিকে করা হয়েছে। কিন্তু এটা খুব দূরের কথা। কেননা, এরূপ তো ওয়াকফ-এর অবস্থায় হয়ে থাকে। বাহ্যতঃ এটাও জানা যাচ্ছে যে, এই সম্বোধন উপরোক্তে দু’জন ফেরেশতার প্রতি হবে। হাঁকিয়ে আনয়নকারী ফেরেশতা তাকে হিসাবের জন্যে পেশ করবেন এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতা সাক্ষ্য দিয়ে দিবেন। তখন আল্লাহ তাআলা দু’জনকেই নির্দেশ দিবেনঃ “তোমরা দু'জন তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ কর।” যা অত্যন্ত জঘন্য স্থান। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে রক্ষা করুন!আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেনঃ কল্যাণকর কাজে প্রবল বাধাদানকারী, সীমালংঘনকারী, সন্দেহ পোষণকারী এবং আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারী লোককে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।হাদীস গত হয়েছে যে, এই লোকদেরকে লক্ষ্য করে কিয়ামতের দিন জাহান্নাম স্বীয় গর্দান উঁচু করে হাশরের ময়দানের সমস্ত লোককে শুনিয়ে বলবেঃ “আমি তিন প্রকারের লোকের জন্যে নিযুক্ত হয়েছি। (এক) উদ্ধত ও সত্যের বিরুদ্ধাচরণকারীর জন্যে, (দুই) আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারীর জন্যে এবং (তিন) ছবি তৈরীকারীর জন্যে।” অতঃপর জাহান্নাম এসব লোককে জড়িয়ে ধরবে। মুসনাদে আহমাদের হাদীসে তৃতীয় প্রকারের লোক ওদেরকে বলা হয়েছে যারা অন্যায়ভাবে হত্যাকারী।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তার সহচর অর্থাৎ শয়তান বলবে- হে আল্লাহ! আমি তাকে পথভ্রষ্ট করিনি, বরং সে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েছিল। বাতিলকে সে স্বয়ং গ্রহণ করে নিয়েছিল। সে নিজেই সত্যের বিরোধী ছিল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন সব কিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে তখন শয়তান বলবেঃ আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সত্য প্রতিশ্রুতি, আমিও তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিনি। আমার তো তোমাদের উপর কোন আধিপত্য ছিল না, আমি শুধু তোমাদেরকে আহ্বান করেছিলাম এবং তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে। সুতরাং তোমরা আমার প্রতি দোষারোপ করো না, তোমরা নিজেদেরই প্রতি দোষারোপ কর। আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নই এবং তোমরাও আমার উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নও। তোমরা যে পূর্বে আমাকে আল্লাহর শরীক করেছিলে তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। যালিমদের জন্যে তো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আছেই।” (১৪:২২)।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন যে, তিনি মানুষ ও তার সঙ্গী শয়তানকে বলবেনঃ তোমরা আমার সামনে বাক-বিতণ্ডা করো না, কেননা আমি তো তোমাদেরকে পূর্বেই সতর্ক করেছি। অর্থাৎ আমি রাসূলদের মাধ্যমে তোমাদেরকে সতর্ক করেছিলাম এবং কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছিলাম। আর তোমাদের উপর দলীল-প্রমাণাদি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অতএব, জেনে রেখো যে, আমার কথার রদবদল হয় না এবং আমি আমার বান্দাদের প্রতি কোন অবিচার করি না যে, একজনের পাপের কারণে অন্যজনকে পাকড়াও করবে। প্রত্যেকের উপর হুজ্জত পুরো হয়ে গেছে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ পাপের যিম্মাদার।

ক্বাফ 50:27

২৩-২৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যে ফেরেশতা আদম সন্তানের আমলের উপর নিযুক্ত রয়েছে সে কিয়ামতের দিন তার আমলের সাক্ষ্যদান করবে। সে বলবেঃ এই তো আমার নিকট আমলনামা প্রস্তুত। এতে একটুও কম-বেশী করা হয়নি।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা ঐ ফেরেশতার কথা হবে যাকে (আরবী) বলা হয়েছে, যিনি তাকে হাশরের ময়দানের দিকে নিয়ে যাবেন। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেনঃ “আমার নিকট পছন্দনীয় উক্তি এটাই যে, এটা অন্তর্ভুক্ত করে এই ফেরেশতাকেও এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতাকেও। আল্লাহ তা'আলা আদল ও ইনসাফের সাথে মাখলুকের মধ্যে ফায়সালা করবেন।(আরবী) শব্দটি দ্বিবচনের রূপ। কোন কোন নাহভী বলেন যে, কোন কোন আরব একবচনকে দ্বিবচন করে থাকে। যেমন হাজ্জাজের উক্তি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। তিনি তাঁর জল্লাদকে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু'জন তার গর্দান মেরে দাও।” অথচ জল্লাদ তো একজনই ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, প্রকৃতপক্ষে এটা নূনে তাকীদ, যার তাসহীল আলিফের দিকে করা হয়েছে। কিন্তু এটা খুব দূরের কথা। কেননা, এরূপ তো ওয়াকফ-এর অবস্থায় হয়ে থাকে। বাহ্যতঃ এটাও জানা যাচ্ছে যে, এই সম্বোধন উপরোক্তে দু’জন ফেরেশতার প্রতি হবে। হাঁকিয়ে আনয়নকারী ফেরেশতা তাকে হিসাবের জন্যে পেশ করবেন এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতা সাক্ষ্য দিয়ে দিবেন। তখন আল্লাহ তাআলা দু’জনকেই নির্দেশ দিবেনঃ “তোমরা দু'জন তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ কর।” যা অত্যন্ত জঘন্য স্থান। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে রক্ষা করুন!আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেনঃ কল্যাণকর কাজে প্রবল বাধাদানকারী, সীমালংঘনকারী, সন্দেহ পোষণকারী এবং আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারী লোককে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।হাদীস গত হয়েছে যে, এই লোকদেরকে লক্ষ্য করে কিয়ামতের দিন জাহান্নাম স্বীয় গর্দান উঁচু করে হাশরের ময়দানের সমস্ত লোককে শুনিয়ে বলবেঃ “আমি তিন প্রকারের লোকের জন্যে নিযুক্ত হয়েছি। (এক) উদ্ধত ও সত্যের বিরুদ্ধাচরণকারীর জন্যে, (দুই) আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারীর জন্যে এবং (তিন) ছবি তৈরীকারীর জন্যে।” অতঃপর জাহান্নাম এসব লোককে জড়িয়ে ধরবে। মুসনাদে আহমাদের হাদীসে তৃতীয় প্রকারের লোক ওদেরকে বলা হয়েছে যারা অন্যায়ভাবে হত্যাকারী।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তার সহচর অর্থাৎ শয়তান বলবে- হে আল্লাহ! আমি তাকে পথভ্রষ্ট করিনি, বরং সে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েছিল। বাতিলকে সে স্বয়ং গ্রহণ করে নিয়েছিল। সে নিজেই সত্যের বিরোধী ছিল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন সব কিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে তখন শয়তান বলবেঃ আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সত্য প্রতিশ্রুতি, আমিও তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিনি। আমার তো তোমাদের উপর কোন আধিপত্য ছিল না, আমি শুধু তোমাদেরকে আহ্বান করেছিলাম এবং তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে। সুতরাং তোমরা আমার প্রতি দোষারোপ করো না, তোমরা নিজেদেরই প্রতি দোষারোপ কর। আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নই এবং তোমরাও আমার উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নও। তোমরা যে পূর্বে আমাকে আল্লাহর শরীক করেছিলে তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। যালিমদের জন্যে তো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আছেই।” (১৪:২২)।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন যে, তিনি মানুষ ও তার সঙ্গী শয়তানকে বলবেনঃ তোমরা আমার সামনে বাক-বিতণ্ডা করো না, কেননা আমি তো তোমাদেরকে পূর্বেই সতর্ক করেছি। অর্থাৎ আমি রাসূলদের মাধ্যমে তোমাদেরকে সতর্ক করেছিলাম এবং কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছিলাম। আর তোমাদের উপর দলীল-প্রমাণাদি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অতএব, জেনে রেখো যে, আমার কথার রদবদল হয় না এবং আমি আমার বান্দাদের প্রতি কোন অবিচার করি না যে, একজনের পাপের কারণে অন্যজনকে পাকড়াও করবে। প্রত্যেকের উপর হুজ্জত পুরো হয়ে গেছে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ পাপের যিম্মাদার।