Tafseer ibn Kathir — ক্বাফ 50:28 – আয-যারিয়াত 51:26
Contents
- ক্বাফ 50:28
- ক্বাফ 50:29
- ক্বাফ 50:30
- ক্বাফ 50:31
- ক্বাফ 50:32
- ক্বাফ 50:33
- ক্বাফ 50:34
- ক্বাফ 50:35
- ক্বাফ 50:36
- ক্বাফ 50:37
- ক্বাফ 50:38
- ক্বাফ 50:39
- ক্বাফ 50:40
- ক্বাফ 50:41
- ক্বাফ 50:42
- ক্বাফ 50:43
- ক্বাফ 50:44
- ক্বাফ 50:45
- আয-যারিয়াত 51:1
- আয-যারিয়াত 51:2
- আয-যারিয়াত 51:3
- আয-যারিয়াত 51:4
- আয-যারিয়াত 51:5
- আয-যারিয়াত 51:6
- আয-যারিয়াত 51:7
- আয-যারিয়াত 51:8
- আয-যারিয়াত 51:9
- আয-যারিয়াত 51:10
- আয-যারিয়াত 51:11
- আয-যারিয়াত 51:12
- আয-যারিয়াত 51:13
- আয-যারিয়াত 51:14
- আয-যারিয়াত 51:15
- আয-যারিয়াত 51:16
- আয-যারিয়াত 51:17
- আয-যারিয়াত 51:18
- আয-যারিয়াত 51:19
- আয-যারিয়াত 51:20
- আয-যারিয়াত 51:21
- আয-যারিয়াত 51:22
- আয-যারিয়াত 51:23
- আয-যারিয়াত 51:24
- আয-যারিয়াত 51:25
- আয-যারিয়াত 51:26
ক্বাফ 50:28
২৩-২৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যে ফেরেশতা আদম সন্তানের আমলের উপর নিযুক্ত রয়েছে সে কিয়ামতের দিন তার আমলের সাক্ষ্যদান করবে। সে বলবেঃ এই তো আমার নিকট আমলনামা প্রস্তুত। এতে একটুও কম-বেশী করা হয়নি।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা ঐ ফেরেশতার কথা হবে যাকে (আরবী) বলা হয়েছে, যিনি তাকে হাশরের ময়দানের দিকে নিয়ে যাবেন। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেনঃ “আমার নিকট পছন্দনীয় উক্তি এটাই যে, এটা অন্তর্ভুক্ত করে এই ফেরেশতাকেও এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতাকেও। আল্লাহ তা'আলা আদল ও ইনসাফের সাথে মাখলুকের মধ্যে ফায়সালা করবেন।(আরবী) শব্দটি দ্বিবচনের রূপ। কোন কোন নাহভী বলেন যে, কোন কোন আরব একবচনকে দ্বিবচন করে থাকে। যেমন হাজ্জাজের উক্তি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। তিনি তাঁর জল্লাদকে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু'জন তার গর্দান মেরে দাও।” অথচ জল্লাদ তো একজনই ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, প্রকৃতপক্ষে এটা নূনে তাকীদ, যার তাসহীল আলিফের দিকে করা হয়েছে। কিন্তু এটা খুব দূরের কথা। কেননা, এরূপ তো ওয়াকফ-এর অবস্থায় হয়ে থাকে। বাহ্যতঃ এটাও জানা যাচ্ছে যে, এই সম্বোধন উপরোক্তে দু’জন ফেরেশতার প্রতি হবে। হাঁকিয়ে আনয়নকারী ফেরেশতা তাকে হিসাবের জন্যে পেশ করবেন এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতা সাক্ষ্য দিয়ে দিবেন। তখন আল্লাহ তাআলা দু’জনকেই নির্দেশ দিবেনঃ “তোমরা দু'জন তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ কর।” যা অত্যন্ত জঘন্য স্থান। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে রক্ষা করুন!আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেনঃ কল্যাণকর কাজে প্রবল বাধাদানকারী, সীমালংঘনকারী, সন্দেহ পোষণকারী এবং আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারী লোককে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।হাদীস গত হয়েছে যে, এই লোকদেরকে লক্ষ্য করে কিয়ামতের দিন জাহান্নাম স্বীয় গর্দান উঁচু করে হাশরের ময়দানের সমস্ত লোককে শুনিয়ে বলবেঃ “আমি তিন প্রকারের লোকের জন্যে নিযুক্ত হয়েছি। (এক) উদ্ধত ও সত্যের বিরুদ্ধাচরণকারীর জন্যে, (দুই) আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারীর জন্যে এবং (তিন) ছবি তৈরীকারীর জন্যে।” অতঃপর জাহান্নাম এসব লোককে জড়িয়ে ধরবে। মুসনাদে আহমাদের হাদীসে তৃতীয় প্রকারের লোক ওদেরকে বলা হয়েছে যারা অন্যায়ভাবে হত্যাকারী।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তার সহচর অর্থাৎ শয়তান বলবে- হে আল্লাহ! আমি তাকে পথভ্রষ্ট করিনি, বরং সে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েছিল। বাতিলকে সে স্বয়ং গ্রহণ করে নিয়েছিল। সে নিজেই সত্যের বিরোধী ছিল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন সব কিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে তখন শয়তান বলবেঃ আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সত্য প্রতিশ্রুতি, আমিও তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিনি। আমার তো তোমাদের উপর কোন আধিপত্য ছিল না, আমি শুধু তোমাদেরকে আহ্বান করেছিলাম এবং তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে। সুতরাং তোমরা আমার প্রতি দোষারোপ করো না, তোমরা নিজেদেরই প্রতি দোষারোপ কর। আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নই এবং তোমরাও আমার উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নও। তোমরা যে পূর্বে আমাকে আল্লাহর শরীক করেছিলে তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। যালিমদের জন্যে তো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আছেই।” (১৪:২২)।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন যে, তিনি মানুষ ও তার সঙ্গী শয়তানকে বলবেনঃ তোমরা আমার সামনে বাক-বিতণ্ডা করো না, কেননা আমি তো তোমাদেরকে পূর্বেই সতর্ক করেছি। অর্থাৎ আমি রাসূলদের মাধ্যমে তোমাদেরকে সতর্ক করেছিলাম এবং কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছিলাম। আর তোমাদের উপর দলীল-প্রমাণাদি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অতএব, জেনে রেখো যে, আমার কথার রদবদল হয় না এবং আমি আমার বান্দাদের প্রতি কোন অবিচার করি না যে, একজনের পাপের কারণে অন্যজনকে পাকড়াও করবে। প্রত্যেকের উপর হুজ্জত পুরো হয়ে গেছে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ পাপের যিম্মাদার।
ক্বাফ 50:29
২৩-২৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যে ফেরেশতা আদম সন্তানের আমলের উপর নিযুক্ত রয়েছে সে কিয়ামতের দিন তার আমলের সাক্ষ্যদান করবে। সে বলবেঃ এই তো আমার নিকট আমলনামা প্রস্তুত। এতে একটুও কম-বেশী করা হয়নি।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এটা ঐ ফেরেশতার কথা হবে যাকে (আরবী) বলা হয়েছে, যিনি তাকে হাশরের ময়দানের দিকে নিয়ে যাবেন। ইমাম ইবনে জারীর (রাঃ) বলেনঃ “আমার নিকট পছন্দনীয় উক্তি এটাই যে, এটা অন্তর্ভুক্ত করে এই ফেরেশতাকেও এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতাকেও। আল্লাহ তা'আলা আদল ও ইনসাফের সাথে মাখলুকের মধ্যে ফায়সালা করবেন।(আরবী) শব্দটি দ্বিবচনের রূপ। কোন কোন নাহভী বলেন যে, কোন কোন আরব একবচনকে দ্বিবচন করে থাকে। যেমন হাজ্জাজের উক্তি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। তিনি তাঁর জল্লাদকে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দু'জন তার গর্দান মেরে দাও।” অথচ জল্লাদ তো একজনই ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, প্রকৃতপক্ষে এটা নূনে তাকীদ, যার তাসহীল আলিফের দিকে করা হয়েছে। কিন্তু এটা খুব দূরের কথা। কেননা, এরূপ তো ওয়াকফ-এর অবস্থায় হয়ে থাকে। বাহ্যতঃ এটাও জানা যাচ্ছে যে, এই সম্বোধন উপরোক্তে দু’জন ফেরেশতার প্রতি হবে। হাঁকিয়ে আনয়নকারী ফেরেশতা তাকে হিসাবের জন্যে পেশ করবেন এবং সাক্ষ্যদানকারী ফেরেশতা সাক্ষ্য দিয়ে দিবেন। তখন আল্লাহ তাআলা দু’জনকেই নির্দেশ দিবেনঃ “তোমরা দু'জন তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ কর।” যা অত্যন্ত জঘন্য স্থান। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে রক্ষা করুন!আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেনঃ কল্যাণকর কাজে প্রবল বাধাদানকারী, সীমালংঘনকারী, সন্দেহ পোষণকারী এবং আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারী লোককে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।হাদীস গত হয়েছে যে, এই লোকদেরকে লক্ষ্য করে কিয়ামতের দিন জাহান্নাম স্বীয় গর্দান উঁচু করে হাশরের ময়দানের সমস্ত লোককে শুনিয়ে বলবেঃ “আমি তিন প্রকারের লোকের জন্যে নিযুক্ত হয়েছি। (এক) উদ্ধত ও সত্যের বিরুদ্ধাচরণকারীর জন্যে, (দুই) আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপনকারীর জন্যে এবং (তিন) ছবি তৈরীকারীর জন্যে।” অতঃপর জাহান্নাম এসব লোককে জড়িয়ে ধরবে। মুসনাদে আহমাদের হাদীসে তৃতীয় প্রকারের লোক ওদেরকে বলা হয়েছে যারা অন্যায়ভাবে হত্যাকারী।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ তার সহচর অর্থাৎ শয়তান বলবে- হে আল্লাহ! আমি তাকে পথভ্রষ্ট করিনি, বরং সে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েছিল। বাতিলকে সে স্বয়ং গ্রহণ করে নিয়েছিল। সে নিজেই সত্যের বিরোধী ছিল। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন সব কিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে তখন শয়তান বলবেঃ আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সত্য প্রতিশ্রুতি, আমিও তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিনি। আমার তো তোমাদের উপর কোন আধিপত্য ছিল না, আমি শুধু তোমাদেরকে আহ্বান করেছিলাম এবং তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে। সুতরাং তোমরা আমার প্রতি দোষারোপ করো না, তোমরা নিজেদেরই প্রতি দোষারোপ কর। আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নই এবং তোমরাও আমার উদ্ধারে সাহায্য করতে সক্ষম নও। তোমরা যে পূর্বে আমাকে আল্লাহর শরীক করেছিলে তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। যালিমদের জন্যে তো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আছেই।” (১৪:২২)।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন যে, তিনি মানুষ ও তার সঙ্গী শয়তানকে বলবেনঃ তোমরা আমার সামনে বাক-বিতণ্ডা করো না, কেননা আমি তো তোমাদেরকে পূর্বেই সতর্ক করেছি। অর্থাৎ আমি রাসূলদের মাধ্যমে তোমাদেরকে সতর্ক করেছিলাম এবং কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছিলাম। আর তোমাদের উপর দলীল-প্রমাণাদি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অতএব, জেনে রেখো যে, আমার কথার রদবদল হয় না এবং আমি আমার বান্দাদের প্রতি কোন অবিচার করি না যে, একজনের পাপের কারণে অন্যজনকে পাকড়াও করবে। প্রত্যেকের উপর হুজ্জত পুরো হয়ে গেছে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ পাপের যিম্মাদার।
ক্বাফ 50:30
৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: যেহেতু আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি ওকে পূর্ণ করবেন, সেহেতু কিয়ামতের দিন যেসব দানব ও মানব ওর যোগ্য হবে তাদেরকে ওর মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে এবং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তুমি পূর্ণ হয়েছে কি?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “যদি আরো কিছু পাপী বাকী থাকে তবে তাদেরকেও আমার মধ্যে নিক্ষেপ করুন!” সহীহ বুখারী শরীফে এই আয়াতের তাফসীরে এই হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পাপীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং সে আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পা তাতে রাখবেন, তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” মুসনাদে আহমাদে এটাও রয়েছে যে, ঐ সময় জাহান্নাম সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ আপনার ইযযতের কসম! এখন যথেষ্ট হয়েছে।” আর জান্নাতে জায়গা ফাঁকা থেকে যাবে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা একটা নতুন মাখলুক সৃষ্টি করে ঐ জায়গা আবাদ করবেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একবার জানাত ও জাহানামের মধ্যে কথোপকথন হয়। জাহান্নাম বলেঃ “আমাকে প্রত্যেক অহংকারী ও উদ্ধত ব্যক্তির জন্যে তৈরী করা হয়েছে।” আর জান্নাত বলেঃ “আমার অবস্থা এই যে, যারা দুর্বল লোক, যাদেরকে দুনিয়ায় সম্মানিত মনে করা হতো না তারাই আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে বলেনঃ “তুমি আমার রহমত। আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এই রহমত দান করবে।” আর জাহান্নামকে তিনি বলবেনঃ “তুমি আমার শাস্তি। তোমার মাধ্যমে আমি যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করবে। যা, তোমরা উভয়েই পূর্ণ হয়ে যাবে।” তখন জাহান্নাম তো পূর্ণ হবে না, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পদ ওতে রাখবেন। তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” ঐ সময় ওটা ভরে যাবে এবং ওর সমস্ত জোড় পর পর সংকুচিত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুকের কারো প্রতি কোন যুলুম করবেন না। জান্নাতে যে জায়গা বেঁচে যাবে ওটা পূর্ণ করার জন্যে মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য মাখলুক সৃষ্টি করবেন। মুসনাদে আহমাদে জাহান্নামের উক্তি নিম্নরূপ রয়েছেঃ “ঔদ্ধত্য প্রকাশকারী ও অহংকারী বাদশাহ ও শরীফ লোকেরা আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” মুসনাদে আবূ ইয়ালায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁর সত্তার পরিচিতি প্রদান করবেন। আমি তখন সিজদায় পড়ে যাবো। আল্লাহ তা'আলা তাতে খুবই সন্তুষ্ট হবেন। তারপর আমি তার এমন প্রশংসা করবে যে, তিনি অত্যন্ত খুশী হবেন। এরপর আমাকে শাফাআত করার অনুমতি দেয়া হবে। অতঃপর আমার উম্মত জাহান্নামের উপরের পুল অতিক্রম করতে শুরু করবে। কেউ কেউ তো চোখের পলকে পার হয়ে যাবে। কেউ কেউ তা অতিক্রম করবে দ্রুতগামী ঘোড়ার চেয়েও দ্রুত গতিতে। এমন কি এক ব্যক্তি হাঁটুর ভরে চলতে চলতে তা অতিক্রম করবে এবং এটা হবে আমল অনুযায়ী। আর জাহান্নাম আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তাল্লাহ তা'আলা তাতে তার পা রেখে দিবেন। তখন সে সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। আমি হাউযের উপর থাকবো।” সহাবীগণ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাউয কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! ওর পানি দুধের চেয়েও সাদা, মধুর চেয়েও মিষ্ট, বৰফের চেয়েও ঠাণ্ডা এবং মৃগনাভী অপেক্ষাও সুগন্ধময়। তথায় বরতন থাকবে ত"কাশের তারকার চেয়েও বেশী। যে ব্যক্তি ওর পানি পেয়ে যাবে সে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। আর যে ব্যক্তি ওর থেকে বঞ্চিত থাকবে সে কোন জায়গাতেই পান পাবে যদদ্বারা সে পরিতৃপ্ত হতে পারে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে কোন জায়গা আছে কি যে, আমার মধ্যে আরো বেশী (সংখ্যক দানব ও মানবের অবস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে?” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে একজনেরও আসার জায়গা আছে কি? আমি তো পরিপূর্ণ হয়ে গেছি।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওর মধ্যে জাহান্নামীদেরকে নিক্ষেপ করা হবে, শেষ পর্যন্ত সে বলবেঃ “আমি পূর্ণ হয়ে গেছি।” সে আরো বলবে? “আমার মধ্যে বেশীর জায়গা আছে কি?” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রথম উক্তিটিকেই গ্রহণ করেছেন। এই দ্বিতীয় উক্তিটির ভাবার্থ এই যে, যেন ঐ গুরুজনদের মতে এই প্রশ্ন এর পরে হবে যে, আল্লহ তা'আলা স্বীয় পদ ওর মধ্যে রেখে দিবেন। এরপর যখন তাকে প্রশ্ন করা হবে, “তুমি কি পরিপূর্ণ হয়েছে?” সে তখন জবাব দিবেঃ “আমার মধ্যে এমন কোন জায়গা বাকী আছে কি যে, কেউ সেখানে আসতে পারে?” অর্থাৎ একটুও জায়গা ফাকা নেই।হযরত আউফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ এটা ঐ সময় হবে যখন তাতে একটা সুচ পরিমাণ জায়গাও ফাকা থাকবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ জান্নাতকে নিকটস্থ করা হবে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন যা দূরে নয়। কেননা, যার আগমন নিশ্চিত সেটাকে দূরে মনে করা হয় না।(আরবী)-এর অর্থ হলোঃ প্রত্যাবর্তনকারী, তাওবাকারী ও গুনাহর কাজ হতে দূরে অবস্থানকারী। হলো ঐ ব্যক্তি যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং তা ভঙ্গ করে। হযরত উসায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)হলো ঐ ব্যক্তি যে কোন মজলিস হতে উঠে না যে পর্যন্ত না ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং যে পরম করুণাময় আল্লাহকে না দেখেই ভয় করে অর্থাৎ নির্জনেও আল্লাহর ভয় অন্তরে রাখে। হাদীসে আছে যে, ঐ ব্যক্তিও কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবে যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার চক্ষু হতে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে এবং বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয় তাদেরকে বলা হবেঃ শান্তির সাথে তোমরা ওতে অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশ কর। আল্লাহর সমস্ত শাস্তি হতে তোমরা নিরাপত্তা লাভ করলে। আর ভাবার্থ এও হবে যে, ফেরেশতারা তাদেরকে সালাম করবেন।এটা অনন্ত জীবনের দিন অর্থাৎ তোমরা জান্নাতে যাচ্ছ চিরস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে, যেখানে কখনো মৃত্যু হবে না, যেখান হতে কখনো বের করে দেয়ার কোন আশংকা থাকবে না এবং স্থানান্তরও করা হবে না। মহান আল্লাহ বলেনঃ সেথায় তারা যা কামনা করবে তাই পাবে এবং আমার নিকট রয়েছে তারো অধিক।হযরত কাসীর ইবনে মুররাহ (রঃ) বলেনঃ -এর মধ্যে এও রয়েছে যে, জান্নাতবাসীর পার্শ্বদিয়ে একখণ্ড মেঘ চলবে যার মধ্য থেকে শব্দ আসবেঃ ‘তোমরা কি চাও? তোমরা যা চাইবে তাই বর্ষিয়ে দিবো।' সুতরাং তারা যা কামনা করবে তাই বর্ষিত হবে। হযরত কাসীর (রঃ) বলেনঃ যদি আল্লাহ তা'আলা আমার নিকট ঐ মেঘ হাযির করে এবং আমি কি চাই তা জিজ্ঞেস করা হয় তবে আমি অবশ্যই বলবেঃ সুন্দর পোশাক পরিহিতা সুন্দরী কুমারী যুবতী মহিলা বর্ষণ করা হোক।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের যে পাখীরই গোশত খাওয়ার ইচ্ছা হবে, তৎক্ষণাৎ ওটা ভাজা অবস্থায় তোমাদের সামনে হাযির হয়ে যাবে।”মুসনাদে আহমাদের মারফু হাদীসে রয়েছেঃ “জান্নাতবাসী যদি সন্তান চায় তবে একই সময়ে গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব ও সন্তানের যৌবনাবস্থা হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন) জামে তিরমিযীতে রয়েছেঃ “সে যেভাবে চাইবে সেভাবেই হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমার নিকট রয়েছে আরো অধিক। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ভাল কাজ করেছে তাদের জন্যে উত্তম পুরস্কার রয়েছে এবং আরো অধিক রয়েছে।” (১০:২৬)সুহায়েব ইবনে সিনান রূমী (রঃ) বলেন যে, এই আধিক্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার দর্শন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতবাসীরা প্রত্যেক শুক্রবারে আল্লাহর দর্শন লাভ করবে। (আরবী)-এর অর্থ এটাই। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট একটি সাদা দর্পণ নিয়ে আগমন করেন যার মধ্যস্থলে একটি বিন্দু ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি?' উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “এটা জুমআর দিন, যা খাস করে আপনাকে ও আপনার উম্মতকে দান করা হয়েছে, যাতে সবাই আপনাদের পিছনে রয়েছে, ইয়াহূদীরাও এবং খৃষ্টানরাও। এতে বহু কিছু কল্যাণ ও বরকত রয়েছে। এতে এমন এক সময় রয়েছে যে, ঐ সময় আল্লাহর নিকট যা চাওয়া হয় তা পাওয়া যায়। আমাদের ওখানে এর নাম হলো , (আরবী) বা আধিক্যের দিন।” নবী (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! (আরবী)কি?” জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “আপনার প্রতিপালক জান্নাতুল ফিরদাউসে একটি প্রশস্ত ময়দান বানিয়েছেন যাতে মৃগনাভির টিলা রয়েছে। জুমআর দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী ফেরেশতাদেরকে অবতীর্ণ করেন। ওর চতুর্দিকে আলোর মিম্বরসমূহ থাকে যেগুলোতে নবীগণ (আঃ) উপবেশন করেন। শহীদ ও সিদ্দীকগণ তাঁদের পিছনে ঐ মৃগনাভীর টিলাগুলোর উপর থাকবেন। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমি তোমাদের সাথে কৃত ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছি। এখন তোমরা আমার নিকট যা ইচ্ছা চাও, পাবে।” তাঁরা সবাই বলবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার সন্তুষ্টি চাই।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমি তো তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েই গেছি। এ ছাড়াও তোমরা চাও, পাবে। আমার নিকট আরো অধিক রয়েছে। তারা তখন জুমআর দিনকে পছন্দ করবেন। কেননা, ঐ দিনেই তারা বহু কিছু নিয়ামত লাভ করেন। এটা ঐ দিন যেই দিন আপনার প্রতিপালক আরশের উপর সমাসীন হবেন। ঐ দিনেই হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়। ঐ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইমাম শাফেয়ীতে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) তাঁর কিতাবুল উম্মের কিতাবুল জুমআর মধ্যেও এ হাদীসটি আনয়ন করেছেন)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে একটি খুব বড় ‘আসার’ আনয়ন করেছেন যাতে বহু কথাই গারীব বা দুর্বল। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যে সত্তর বছর পর্যন্ত এক দিকেই মুখ করে বসে থাকবে। অতঃপর একজন হুর আসবে যে তার স্কন্ধে হাত রেখে তার দৃষ্টি নিজের দিকে ফিরিয়ে দিবে। সে এমন সুন্দরী হবে যে, সে তার গণ্ডদেশে তার চেহারা এমনভাবে দেখতে পাবে যেমনভাবে আয়নায় দেখা যায়। সে যেসব অলংকার পরে থাকবে ওগুলোর এক একটি ক্ষুদ্র মুক্তা এমন হবে যে, ওর কিরণে সারা দুনিয়া উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সে সালাম দিবে, তখন ঐ জান্নাতী উত্তর দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ “তুমি কে?” সে উত্তরে বলবেঃ “আমি হলাম সে-ই যাকে কুরআনে বলা হয়েছে। তার গায়ে সত্তরটি হুল্লা (পোশাক বিশেষ) থাকবে, এতদসত্ত্বেও তার সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্যের কারণে বাহির হতেই তার পদনালীর মজ্জা দৃষ্টিগোচর হবে। তার মাথায় মণি-মুক্তা বসানো মুকুট থাকবে যার সমান্যতম মুক্তা পূর্ব ও পশ্চিমকে আলোকিত করার পক্ষে যথেষ্ট হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন)
ক্বাফ 50:31
৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: যেহেতু আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি ওকে পূর্ণ করবেন, সেহেতু কিয়ামতের দিন যেসব দানব ও মানব ওর যোগ্য হবে তাদেরকে ওর মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে এবং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তুমি পূর্ণ হয়েছে কি?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “যদি আরো কিছু পাপী বাকী থাকে তবে তাদেরকেও আমার মধ্যে নিক্ষেপ করুন!” সহীহ বুখারী শরীফে এই আয়াতের তাফসীরে এই হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পাপীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং সে আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পা তাতে রাখবেন, তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” মুসনাদে আহমাদে এটাও রয়েছে যে, ঐ সময় জাহান্নাম সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ আপনার ইযযতের কসম! এখন যথেষ্ট হয়েছে।” আর জান্নাতে জায়গা ফাঁকা থেকে যাবে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা একটা নতুন মাখলুক সৃষ্টি করে ঐ জায়গা আবাদ করবেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একবার জানাত ও জাহানামের মধ্যে কথোপকথন হয়। জাহান্নাম বলেঃ “আমাকে প্রত্যেক অহংকারী ও উদ্ধত ব্যক্তির জন্যে তৈরী করা হয়েছে।” আর জান্নাত বলেঃ “আমার অবস্থা এই যে, যারা দুর্বল লোক, যাদেরকে দুনিয়ায় সম্মানিত মনে করা হতো না তারাই আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে বলেনঃ “তুমি আমার রহমত। আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এই রহমত দান করবে।” আর জাহান্নামকে তিনি বলবেনঃ “তুমি আমার শাস্তি। তোমার মাধ্যমে আমি যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করবে। যা, তোমরা উভয়েই পূর্ণ হয়ে যাবে।” তখন জাহান্নাম তো পূর্ণ হবে না, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পদ ওতে রাখবেন। তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” ঐ সময় ওটা ভরে যাবে এবং ওর সমস্ত জোড় পর পর সংকুচিত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুকের কারো প্রতি কোন যুলুম করবেন না। জান্নাতে যে জায়গা বেঁচে যাবে ওটা পূর্ণ করার জন্যে মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য মাখলুক সৃষ্টি করবেন। মুসনাদে আহমাদে জাহান্নামের উক্তি নিম্নরূপ রয়েছেঃ “ঔদ্ধত্য প্রকাশকারী ও অহংকারী বাদশাহ ও শরীফ লোকেরা আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” মুসনাদে আবূ ইয়ালায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁর সত্তার পরিচিতি প্রদান করবেন। আমি তখন সিজদায় পড়ে যাবো। আল্লাহ তা'আলা তাতে খুবই সন্তুষ্ট হবেন। তারপর আমি তার এমন প্রশংসা করবে যে, তিনি অত্যন্ত খুশী হবেন। এরপর আমাকে শাফাআত করার অনুমতি দেয়া হবে। অতঃপর আমার উম্মত জাহান্নামের উপরের পুল অতিক্রম করতে শুরু করবে। কেউ কেউ তো চোখের পলকে পার হয়ে যাবে। কেউ কেউ তা অতিক্রম করবে দ্রুতগামী ঘোড়ার চেয়েও দ্রুত গতিতে। এমন কি এক ব্যক্তি হাঁটুর ভরে চলতে চলতে তা অতিক্রম করবে এবং এটা হবে আমল অনুযায়ী। আর জাহান্নাম আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তাল্লাহ তা'আলা তাতে তার পা রেখে দিবেন। তখন সে সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। আমি হাউযের উপর থাকবো।” সহাবীগণ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাউয কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! ওর পানি দুধের চেয়েও সাদা, মধুর চেয়েও মিষ্ট, বৰফের চেয়েও ঠাণ্ডা এবং মৃগনাভী অপেক্ষাও সুগন্ধময়। তথায় বরতন থাকবে ত"কাশের তারকার চেয়েও বেশী। যে ব্যক্তি ওর পানি পেয়ে যাবে সে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। আর যে ব্যক্তি ওর থেকে বঞ্চিত থাকবে সে কোন জায়গাতেই পান পাবে যদদ্বারা সে পরিতৃপ্ত হতে পারে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে কোন জায়গা আছে কি যে, আমার মধ্যে আরো বেশী (সংখ্যক দানব ও মানবের অবস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে?” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে একজনেরও আসার জায়গা আছে কি? আমি তো পরিপূর্ণ হয়ে গেছি।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওর মধ্যে জাহান্নামীদেরকে নিক্ষেপ করা হবে, শেষ পর্যন্ত সে বলবেঃ “আমি পূর্ণ হয়ে গেছি।” সে আরো বলবে? “আমার মধ্যে বেশীর জায়গা আছে কি?” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রথম উক্তিটিকেই গ্রহণ করেছেন। এই দ্বিতীয় উক্তিটির ভাবার্থ এই যে, যেন ঐ গুরুজনদের মতে এই প্রশ্ন এর পরে হবে যে, আল্লহ তা'আলা স্বীয় পদ ওর মধ্যে রেখে দিবেন। এরপর যখন তাকে প্রশ্ন করা হবে, “তুমি কি পরিপূর্ণ হয়েছে?” সে তখন জবাব দিবেঃ “আমার মধ্যে এমন কোন জায়গা বাকী আছে কি যে, কেউ সেখানে আসতে পারে?” অর্থাৎ একটুও জায়গা ফাকা নেই।হযরত আউফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ এটা ঐ সময় হবে যখন তাতে একটা সুচ পরিমাণ জায়গাও ফাকা থাকবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ জান্নাতকে নিকটস্থ করা হবে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন যা দূরে নয়। কেননা, যার আগমন নিশ্চিত সেটাকে দূরে মনে করা হয় না।(আরবী)-এর অর্থ হলোঃ প্রত্যাবর্তনকারী, তাওবাকারী ও গুনাহর কাজ হতে দূরে অবস্থানকারী। হলো ঐ ব্যক্তি যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং তা ভঙ্গ করে। হযরত উসায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)হলো ঐ ব্যক্তি যে কোন মজলিস হতে উঠে না যে পর্যন্ত না ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং যে পরম করুণাময় আল্লাহকে না দেখেই ভয় করে অর্থাৎ নির্জনেও আল্লাহর ভয় অন্তরে রাখে। হাদীসে আছে যে, ঐ ব্যক্তিও কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবে যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার চক্ষু হতে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে এবং বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয় তাদেরকে বলা হবেঃ শান্তির সাথে তোমরা ওতে অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশ কর। আল্লাহর সমস্ত শাস্তি হতে তোমরা নিরাপত্তা লাভ করলে। আর ভাবার্থ এও হবে যে, ফেরেশতারা তাদেরকে সালাম করবেন।এটা অনন্ত জীবনের দিন অর্থাৎ তোমরা জান্নাতে যাচ্ছ চিরস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে, যেখানে কখনো মৃত্যু হবে না, যেখান হতে কখনো বের করে দেয়ার কোন আশংকা থাকবে না এবং স্থানান্তরও করা হবে না। মহান আল্লাহ বলেনঃ সেথায় তারা যা কামনা করবে তাই পাবে এবং আমার নিকট রয়েছে তারো অধিক।হযরত কাসীর ইবনে মুররাহ (রঃ) বলেনঃ -এর মধ্যে এও রয়েছে যে, জান্নাতবাসীর পার্শ্বদিয়ে একখণ্ড মেঘ চলবে যার মধ্য থেকে শব্দ আসবেঃ ‘তোমরা কি চাও? তোমরা যা চাইবে তাই বর্ষিয়ে দিবো।' সুতরাং তারা যা কামনা করবে তাই বর্ষিত হবে। হযরত কাসীর (রঃ) বলেনঃ যদি আল্লাহ তা'আলা আমার নিকট ঐ মেঘ হাযির করে এবং আমি কি চাই তা জিজ্ঞেস করা হয় তবে আমি অবশ্যই বলবেঃ সুন্দর পোশাক পরিহিতা সুন্দরী কুমারী যুবতী মহিলা বর্ষণ করা হোক।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের যে পাখীরই গোশত খাওয়ার ইচ্ছা হবে, তৎক্ষণাৎ ওটা ভাজা অবস্থায় তোমাদের সামনে হাযির হয়ে যাবে।”মুসনাদে আহমাদের মারফু হাদীসে রয়েছেঃ “জান্নাতবাসী যদি সন্তান চায় তবে একই সময়ে গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব ও সন্তানের যৌবনাবস্থা হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন) জামে তিরমিযীতে রয়েছেঃ “সে যেভাবে চাইবে সেভাবেই হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমার নিকট রয়েছে আরো অধিক। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ভাল কাজ করেছে তাদের জন্যে উত্তম পুরস্কার রয়েছে এবং আরো অধিক রয়েছে।” (১০:২৬)সুহায়েব ইবনে সিনান রূমী (রঃ) বলেন যে, এই আধিক্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার দর্শন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতবাসীরা প্রত্যেক শুক্রবারে আল্লাহর দর্শন লাভ করবে। (আরবী)-এর অর্থ এটাই। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট একটি সাদা দর্পণ নিয়ে আগমন করেন যার মধ্যস্থলে একটি বিন্দু ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি?' উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “এটা জুমআর দিন, যা খাস করে আপনাকে ও আপনার উম্মতকে দান করা হয়েছে, যাতে সবাই আপনাদের পিছনে রয়েছে, ইয়াহূদীরাও এবং খৃষ্টানরাও। এতে বহু কিছু কল্যাণ ও বরকত রয়েছে। এতে এমন এক সময় রয়েছে যে, ঐ সময় আল্লাহর নিকট যা চাওয়া হয় তা পাওয়া যায়। আমাদের ওখানে এর নাম হলো , (আরবী) বা আধিক্যের দিন।” নবী (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! (আরবী)কি?” জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “আপনার প্রতিপালক জান্নাতুল ফিরদাউসে একটি প্রশস্ত ময়দান বানিয়েছেন যাতে মৃগনাভির টিলা রয়েছে। জুমআর দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী ফেরেশতাদেরকে অবতীর্ণ করেন। ওর চতুর্দিকে আলোর মিম্বরসমূহ থাকে যেগুলোতে নবীগণ (আঃ) উপবেশন করেন। শহীদ ও সিদ্দীকগণ তাঁদের পিছনে ঐ মৃগনাভীর টিলাগুলোর উপর থাকবেন। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমি তোমাদের সাথে কৃত ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছি। এখন তোমরা আমার নিকট যা ইচ্ছা চাও, পাবে।” তাঁরা সবাই বলবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার সন্তুষ্টি চাই।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমি তো তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েই গেছি। এ ছাড়াও তোমরা চাও, পাবে। আমার নিকট আরো অধিক রয়েছে। তারা তখন জুমআর দিনকে পছন্দ করবেন। কেননা, ঐ দিনেই তারা বহু কিছু নিয়ামত লাভ করেন। এটা ঐ দিন যেই দিন আপনার প্রতিপালক আরশের উপর সমাসীন হবেন। ঐ দিনেই হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়। ঐ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইমাম শাফেয়ীতে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) তাঁর কিতাবুল উম্মের কিতাবুল জুমআর মধ্যেও এ হাদীসটি আনয়ন করেছেন)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে একটি খুব বড় ‘আসার’ আনয়ন করেছেন যাতে বহু কথাই গারীব বা দুর্বল। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যে সত্তর বছর পর্যন্ত এক দিকেই মুখ করে বসে থাকবে। অতঃপর একজন হুর আসবে যে তার স্কন্ধে হাত রেখে তার দৃষ্টি নিজের দিকে ফিরিয়ে দিবে। সে এমন সুন্দরী হবে যে, সে তার গণ্ডদেশে তার চেহারা এমনভাবে দেখতে পাবে যেমনভাবে আয়নায় দেখা যায়। সে যেসব অলংকার পরে থাকবে ওগুলোর এক একটি ক্ষুদ্র মুক্তা এমন হবে যে, ওর কিরণে সারা দুনিয়া উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সে সালাম দিবে, তখন ঐ জান্নাতী উত্তর দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ “তুমি কে?” সে উত্তরে বলবেঃ “আমি হলাম সে-ই যাকে কুরআনে বলা হয়েছে। তার গায়ে সত্তরটি হুল্লা (পোশাক বিশেষ) থাকবে, এতদসত্ত্বেও তার সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্যের কারণে বাহির হতেই তার পদনালীর মজ্জা দৃষ্টিগোচর হবে। তার মাথায় মণি-মুক্তা বসানো মুকুট থাকবে যার সমান্যতম মুক্তা পূর্ব ও পশ্চিমকে আলোকিত করার পক্ষে যথেষ্ট হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন)
ক্বাফ 50:32
৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: যেহেতু আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি ওকে পূর্ণ করবেন, সেহেতু কিয়ামতের দিন যেসব দানব ও মানব ওর যোগ্য হবে তাদেরকে ওর মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে এবং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তুমি পূর্ণ হয়েছে কি?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “যদি আরো কিছু পাপী বাকী থাকে তবে তাদেরকেও আমার মধ্যে নিক্ষেপ করুন!” সহীহ বুখারী শরীফে এই আয়াতের তাফসীরে এই হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পাপীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং সে আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পা তাতে রাখবেন, তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” মুসনাদে আহমাদে এটাও রয়েছে যে, ঐ সময় জাহান্নাম সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ আপনার ইযযতের কসম! এখন যথেষ্ট হয়েছে।” আর জান্নাতে জায়গা ফাঁকা থেকে যাবে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা একটা নতুন মাখলুক সৃষ্টি করে ঐ জায়গা আবাদ করবেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একবার জানাত ও জাহানামের মধ্যে কথোপকথন হয়। জাহান্নাম বলেঃ “আমাকে প্রত্যেক অহংকারী ও উদ্ধত ব্যক্তির জন্যে তৈরী করা হয়েছে।” আর জান্নাত বলেঃ “আমার অবস্থা এই যে, যারা দুর্বল লোক, যাদেরকে দুনিয়ায় সম্মানিত মনে করা হতো না তারাই আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে বলেনঃ “তুমি আমার রহমত। আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এই রহমত দান করবে।” আর জাহান্নামকে তিনি বলবেনঃ “তুমি আমার শাস্তি। তোমার মাধ্যমে আমি যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করবে। যা, তোমরা উভয়েই পূর্ণ হয়ে যাবে।” তখন জাহান্নাম তো পূর্ণ হবে না, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পদ ওতে রাখবেন। তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” ঐ সময় ওটা ভরে যাবে এবং ওর সমস্ত জোড় পর পর সংকুচিত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুকের কারো প্রতি কোন যুলুম করবেন না। জান্নাতে যে জায়গা বেঁচে যাবে ওটা পূর্ণ করার জন্যে মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য মাখলুক সৃষ্টি করবেন। মুসনাদে আহমাদে জাহান্নামের উক্তি নিম্নরূপ রয়েছেঃ “ঔদ্ধত্য প্রকাশকারী ও অহংকারী বাদশাহ ও শরীফ লোকেরা আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” মুসনাদে আবূ ইয়ালায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁর সত্তার পরিচিতি প্রদান করবেন। আমি তখন সিজদায় পড়ে যাবো। আল্লাহ তা'আলা তাতে খুবই সন্তুষ্ট হবেন। তারপর আমি তার এমন প্রশংসা করবে যে, তিনি অত্যন্ত খুশী হবেন। এরপর আমাকে শাফাআত করার অনুমতি দেয়া হবে। অতঃপর আমার উম্মত জাহান্নামের উপরের পুল অতিক্রম করতে শুরু করবে। কেউ কেউ তো চোখের পলকে পার হয়ে যাবে। কেউ কেউ তা অতিক্রম করবে দ্রুতগামী ঘোড়ার চেয়েও দ্রুত গতিতে। এমন কি এক ব্যক্তি হাঁটুর ভরে চলতে চলতে তা অতিক্রম করবে এবং এটা হবে আমল অনুযায়ী। আর জাহান্নাম আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তাল্লাহ তা'আলা তাতে তার পা রেখে দিবেন। তখন সে সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। আমি হাউযের উপর থাকবো।” সহাবীগণ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাউয কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! ওর পানি দুধের চেয়েও সাদা, মধুর চেয়েও মিষ্ট, বৰফের চেয়েও ঠাণ্ডা এবং মৃগনাভী অপেক্ষাও সুগন্ধময়। তথায় বরতন থাকবে ত"কাশের তারকার চেয়েও বেশী। যে ব্যক্তি ওর পানি পেয়ে যাবে সে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। আর যে ব্যক্তি ওর থেকে বঞ্চিত থাকবে সে কোন জায়গাতেই পান পাবে যদদ্বারা সে পরিতৃপ্ত হতে পারে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে কোন জায়গা আছে কি যে, আমার মধ্যে আরো বেশী (সংখ্যক দানব ও মানবের অবস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে?” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে একজনেরও আসার জায়গা আছে কি? আমি তো পরিপূর্ণ হয়ে গেছি।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওর মধ্যে জাহান্নামীদেরকে নিক্ষেপ করা হবে, শেষ পর্যন্ত সে বলবেঃ “আমি পূর্ণ হয়ে গেছি।” সে আরো বলবে? “আমার মধ্যে বেশীর জায়গা আছে কি?” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রথম উক্তিটিকেই গ্রহণ করেছেন। এই দ্বিতীয় উক্তিটির ভাবার্থ এই যে, যেন ঐ গুরুজনদের মতে এই প্রশ্ন এর পরে হবে যে, আল্লহ তা'আলা স্বীয় পদ ওর মধ্যে রেখে দিবেন। এরপর যখন তাকে প্রশ্ন করা হবে, “তুমি কি পরিপূর্ণ হয়েছে?” সে তখন জবাব দিবেঃ “আমার মধ্যে এমন কোন জায়গা বাকী আছে কি যে, কেউ সেখানে আসতে পারে?” অর্থাৎ একটুও জায়গা ফাকা নেই।হযরত আউফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ এটা ঐ সময় হবে যখন তাতে একটা সুচ পরিমাণ জায়গাও ফাকা থাকবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ জান্নাতকে নিকটস্থ করা হবে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন যা দূরে নয়। কেননা, যার আগমন নিশ্চিত সেটাকে দূরে মনে করা হয় না।(আরবী)-এর অর্থ হলোঃ প্রত্যাবর্তনকারী, তাওবাকারী ও গুনাহর কাজ হতে দূরে অবস্থানকারী। হলো ঐ ব্যক্তি যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং তা ভঙ্গ করে। হযরত উসায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)হলো ঐ ব্যক্তি যে কোন মজলিস হতে উঠে না যে পর্যন্ত না ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং যে পরম করুণাময় আল্লাহকে না দেখেই ভয় করে অর্থাৎ নির্জনেও আল্লাহর ভয় অন্তরে রাখে। হাদীসে আছে যে, ঐ ব্যক্তিও কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবে যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার চক্ষু হতে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে এবং বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয় তাদেরকে বলা হবেঃ শান্তির সাথে তোমরা ওতে অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশ কর। আল্লাহর সমস্ত শাস্তি হতে তোমরা নিরাপত্তা লাভ করলে। আর ভাবার্থ এও হবে যে, ফেরেশতারা তাদেরকে সালাম করবেন।এটা অনন্ত জীবনের দিন অর্থাৎ তোমরা জান্নাতে যাচ্ছ চিরস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে, যেখানে কখনো মৃত্যু হবে না, যেখান হতে কখনো বের করে দেয়ার কোন আশংকা থাকবে না এবং স্থানান্তরও করা হবে না। মহান আল্লাহ বলেনঃ সেথায় তারা যা কামনা করবে তাই পাবে এবং আমার নিকট রয়েছে তারো অধিক।হযরত কাসীর ইবনে মুররাহ (রঃ) বলেনঃ -এর মধ্যে এও রয়েছে যে, জান্নাতবাসীর পার্শ্বদিয়ে একখণ্ড মেঘ চলবে যার মধ্য থেকে শব্দ আসবেঃ ‘তোমরা কি চাও? তোমরা যা চাইবে তাই বর্ষিয়ে দিবো।' সুতরাং তারা যা কামনা করবে তাই বর্ষিত হবে। হযরত কাসীর (রঃ) বলেনঃ যদি আল্লাহ তা'আলা আমার নিকট ঐ মেঘ হাযির করে এবং আমি কি চাই তা জিজ্ঞেস করা হয় তবে আমি অবশ্যই বলবেঃ সুন্দর পোশাক পরিহিতা সুন্দরী কুমারী যুবতী মহিলা বর্ষণ করা হোক।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের যে পাখীরই গোশত খাওয়ার ইচ্ছা হবে, তৎক্ষণাৎ ওটা ভাজা অবস্থায় তোমাদের সামনে হাযির হয়ে যাবে।”মুসনাদে আহমাদের মারফু হাদীসে রয়েছেঃ “জান্নাতবাসী যদি সন্তান চায় তবে একই সময়ে গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব ও সন্তানের যৌবনাবস্থা হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন) জামে তিরমিযীতে রয়েছেঃ “সে যেভাবে চাইবে সেভাবেই হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমার নিকট রয়েছে আরো অধিক। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ভাল কাজ করেছে তাদের জন্যে উত্তম পুরস্কার রয়েছে এবং আরো অধিক রয়েছে।” (১০:২৬)সুহায়েব ইবনে সিনান রূমী (রঃ) বলেন যে, এই আধিক্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার দর্শন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতবাসীরা প্রত্যেক শুক্রবারে আল্লাহর দর্শন লাভ করবে। (আরবী)-এর অর্থ এটাই। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট একটি সাদা দর্পণ নিয়ে আগমন করেন যার মধ্যস্থলে একটি বিন্দু ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি?' উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “এটা জুমআর দিন, যা খাস করে আপনাকে ও আপনার উম্মতকে দান করা হয়েছে, যাতে সবাই আপনাদের পিছনে রয়েছে, ইয়াহূদীরাও এবং খৃষ্টানরাও। এতে বহু কিছু কল্যাণ ও বরকত রয়েছে। এতে এমন এক সময় রয়েছে যে, ঐ সময় আল্লাহর নিকট যা চাওয়া হয় তা পাওয়া যায়। আমাদের ওখানে এর নাম হলো , (আরবী) বা আধিক্যের দিন।” নবী (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! (আরবী)কি?” জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “আপনার প্রতিপালক জান্নাতুল ফিরদাউসে একটি প্রশস্ত ময়দান বানিয়েছেন যাতে মৃগনাভির টিলা রয়েছে। জুমআর দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী ফেরেশতাদেরকে অবতীর্ণ করেন। ওর চতুর্দিকে আলোর মিম্বরসমূহ থাকে যেগুলোতে নবীগণ (আঃ) উপবেশন করেন। শহীদ ও সিদ্দীকগণ তাঁদের পিছনে ঐ মৃগনাভীর টিলাগুলোর উপর থাকবেন। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমি তোমাদের সাথে কৃত ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছি। এখন তোমরা আমার নিকট যা ইচ্ছা চাও, পাবে।” তাঁরা সবাই বলবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার সন্তুষ্টি চাই।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমি তো তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েই গেছি। এ ছাড়াও তোমরা চাও, পাবে। আমার নিকট আরো অধিক রয়েছে। তারা তখন জুমআর দিনকে পছন্দ করবেন। কেননা, ঐ দিনেই তারা বহু কিছু নিয়ামত লাভ করেন। এটা ঐ দিন যেই দিন আপনার প্রতিপালক আরশের উপর সমাসীন হবেন। ঐ দিনেই হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়। ঐ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইমাম শাফেয়ীতে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) তাঁর কিতাবুল উম্মের কিতাবুল জুমআর মধ্যেও এ হাদীসটি আনয়ন করেছেন)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে একটি খুব বড় ‘আসার’ আনয়ন করেছেন যাতে বহু কথাই গারীব বা দুর্বল। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যে সত্তর বছর পর্যন্ত এক দিকেই মুখ করে বসে থাকবে। অতঃপর একজন হুর আসবে যে তার স্কন্ধে হাত রেখে তার দৃষ্টি নিজের দিকে ফিরিয়ে দিবে। সে এমন সুন্দরী হবে যে, সে তার গণ্ডদেশে তার চেহারা এমনভাবে দেখতে পাবে যেমনভাবে আয়নায় দেখা যায়। সে যেসব অলংকার পরে থাকবে ওগুলোর এক একটি ক্ষুদ্র মুক্তা এমন হবে যে, ওর কিরণে সারা দুনিয়া উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সে সালাম দিবে, তখন ঐ জান্নাতী উত্তর দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ “তুমি কে?” সে উত্তরে বলবেঃ “আমি হলাম সে-ই যাকে কুরআনে বলা হয়েছে। তার গায়ে সত্তরটি হুল্লা (পোশাক বিশেষ) থাকবে, এতদসত্ত্বেও তার সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্যের কারণে বাহির হতেই তার পদনালীর মজ্জা দৃষ্টিগোচর হবে। তার মাথায় মণি-মুক্তা বসানো মুকুট থাকবে যার সমান্যতম মুক্তা পূর্ব ও পশ্চিমকে আলোকিত করার পক্ষে যথেষ্ট হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন)
ক্বাফ 50:33
৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: যেহেতু আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি ওকে পূর্ণ করবেন, সেহেতু কিয়ামতের দিন যেসব দানব ও মানব ওর যোগ্য হবে তাদেরকে ওর মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে এবং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তুমি পূর্ণ হয়েছে কি?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “যদি আরো কিছু পাপী বাকী থাকে তবে তাদেরকেও আমার মধ্যে নিক্ষেপ করুন!” সহীহ বুখারী শরীফে এই আয়াতের তাফসীরে এই হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পাপীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং সে আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পা তাতে রাখবেন, তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” মুসনাদে আহমাদে এটাও রয়েছে যে, ঐ সময় জাহান্নাম সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ আপনার ইযযতের কসম! এখন যথেষ্ট হয়েছে।” আর জান্নাতে জায়গা ফাঁকা থেকে যাবে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা একটা নতুন মাখলুক সৃষ্টি করে ঐ জায়গা আবাদ করবেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একবার জানাত ও জাহানামের মধ্যে কথোপকথন হয়। জাহান্নাম বলেঃ “আমাকে প্রত্যেক অহংকারী ও উদ্ধত ব্যক্তির জন্যে তৈরী করা হয়েছে।” আর জান্নাত বলেঃ “আমার অবস্থা এই যে, যারা দুর্বল লোক, যাদেরকে দুনিয়ায় সম্মানিত মনে করা হতো না তারাই আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে বলেনঃ “তুমি আমার রহমত। আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এই রহমত দান করবে।” আর জাহান্নামকে তিনি বলবেনঃ “তুমি আমার শাস্তি। তোমার মাধ্যমে আমি যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করবে। যা, তোমরা উভয়েই পূর্ণ হয়ে যাবে।” তখন জাহান্নাম তো পূর্ণ হবে না, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পদ ওতে রাখবেন। তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” ঐ সময় ওটা ভরে যাবে এবং ওর সমস্ত জোড় পর পর সংকুচিত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুকের কারো প্রতি কোন যুলুম করবেন না। জান্নাতে যে জায়গা বেঁচে যাবে ওটা পূর্ণ করার জন্যে মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য মাখলুক সৃষ্টি করবেন। মুসনাদে আহমাদে জাহান্নামের উক্তি নিম্নরূপ রয়েছেঃ “ঔদ্ধত্য প্রকাশকারী ও অহংকারী বাদশাহ ও শরীফ লোকেরা আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” মুসনাদে আবূ ইয়ালায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁর সত্তার পরিচিতি প্রদান করবেন। আমি তখন সিজদায় পড়ে যাবো। আল্লাহ তা'আলা তাতে খুবই সন্তুষ্ট হবেন। তারপর আমি তার এমন প্রশংসা করবে যে, তিনি অত্যন্ত খুশী হবেন। এরপর আমাকে শাফাআত করার অনুমতি দেয়া হবে। অতঃপর আমার উম্মত জাহান্নামের উপরের পুল অতিক্রম করতে শুরু করবে। কেউ কেউ তো চোখের পলকে পার হয়ে যাবে। কেউ কেউ তা অতিক্রম করবে দ্রুতগামী ঘোড়ার চেয়েও দ্রুত গতিতে। এমন কি এক ব্যক্তি হাঁটুর ভরে চলতে চলতে তা অতিক্রম করবে এবং এটা হবে আমল অনুযায়ী। আর জাহান্নাম আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তাল্লাহ তা'আলা তাতে তার পা রেখে দিবেন। তখন সে সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। আমি হাউযের উপর থাকবো।” সহাবীগণ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাউয কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! ওর পানি দুধের চেয়েও সাদা, মধুর চেয়েও মিষ্ট, বৰফের চেয়েও ঠাণ্ডা এবং মৃগনাভী অপেক্ষাও সুগন্ধময়। তথায় বরতন থাকবে ত"কাশের তারকার চেয়েও বেশী। যে ব্যক্তি ওর পানি পেয়ে যাবে সে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। আর যে ব্যক্তি ওর থেকে বঞ্চিত থাকবে সে কোন জায়গাতেই পান পাবে যদদ্বারা সে পরিতৃপ্ত হতে পারে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে কোন জায়গা আছে কি যে, আমার মধ্যে আরো বেশী (সংখ্যক দানব ও মানবের অবস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে?” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে একজনেরও আসার জায়গা আছে কি? আমি তো পরিপূর্ণ হয়ে গেছি।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওর মধ্যে জাহান্নামীদেরকে নিক্ষেপ করা হবে, শেষ পর্যন্ত সে বলবেঃ “আমি পূর্ণ হয়ে গেছি।” সে আরো বলবে? “আমার মধ্যে বেশীর জায়গা আছে কি?” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রথম উক্তিটিকেই গ্রহণ করেছেন। এই দ্বিতীয় উক্তিটির ভাবার্থ এই যে, যেন ঐ গুরুজনদের মতে এই প্রশ্ন এর পরে হবে যে, আল্লহ তা'আলা স্বীয় পদ ওর মধ্যে রেখে দিবেন। এরপর যখন তাকে প্রশ্ন করা হবে, “তুমি কি পরিপূর্ণ হয়েছে?” সে তখন জবাব দিবেঃ “আমার মধ্যে এমন কোন জায়গা বাকী আছে কি যে, কেউ সেখানে আসতে পারে?” অর্থাৎ একটুও জায়গা ফাকা নেই।হযরত আউফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ এটা ঐ সময় হবে যখন তাতে একটা সুচ পরিমাণ জায়গাও ফাকা থাকবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ জান্নাতকে নিকটস্থ করা হবে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন যা দূরে নয়। কেননা, যার আগমন নিশ্চিত সেটাকে দূরে মনে করা হয় না।(আরবী)-এর অর্থ হলোঃ প্রত্যাবর্তনকারী, তাওবাকারী ও গুনাহর কাজ হতে দূরে অবস্থানকারী। হলো ঐ ব্যক্তি যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং তা ভঙ্গ করে। হযরত উসায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)হলো ঐ ব্যক্তি যে কোন মজলিস হতে উঠে না যে পর্যন্ত না ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং যে পরম করুণাময় আল্লাহকে না দেখেই ভয় করে অর্থাৎ নির্জনেও আল্লাহর ভয় অন্তরে রাখে। হাদীসে আছে যে, ঐ ব্যক্তিও কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবে যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার চক্ষু হতে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে এবং বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয় তাদেরকে বলা হবেঃ শান্তির সাথে তোমরা ওতে অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশ কর। আল্লাহর সমস্ত শাস্তি হতে তোমরা নিরাপত্তা লাভ করলে। আর ভাবার্থ এও হবে যে, ফেরেশতারা তাদেরকে সালাম করবেন।এটা অনন্ত জীবনের দিন অর্থাৎ তোমরা জান্নাতে যাচ্ছ চিরস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে, যেখানে কখনো মৃত্যু হবে না, যেখান হতে কখনো বের করে দেয়ার কোন আশংকা থাকবে না এবং স্থানান্তরও করা হবে না। মহান আল্লাহ বলেনঃ সেথায় তারা যা কামনা করবে তাই পাবে এবং আমার নিকট রয়েছে তারো অধিক।হযরত কাসীর ইবনে মুররাহ (রঃ) বলেনঃ -এর মধ্যে এও রয়েছে যে, জান্নাতবাসীর পার্শ্বদিয়ে একখণ্ড মেঘ চলবে যার মধ্য থেকে শব্দ আসবেঃ ‘তোমরা কি চাও? তোমরা যা চাইবে তাই বর্ষিয়ে দিবো।' সুতরাং তারা যা কামনা করবে তাই বর্ষিত হবে। হযরত কাসীর (রঃ) বলেনঃ যদি আল্লাহ তা'আলা আমার নিকট ঐ মেঘ হাযির করে এবং আমি কি চাই তা জিজ্ঞেস করা হয় তবে আমি অবশ্যই বলবেঃ সুন্দর পোশাক পরিহিতা সুন্দরী কুমারী যুবতী মহিলা বর্ষণ করা হোক।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের যে পাখীরই গোশত খাওয়ার ইচ্ছা হবে, তৎক্ষণাৎ ওটা ভাজা অবস্থায় তোমাদের সামনে হাযির হয়ে যাবে।”মুসনাদে আহমাদের মারফু হাদীসে রয়েছেঃ “জান্নাতবাসী যদি সন্তান চায় তবে একই সময়ে গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব ও সন্তানের যৌবনাবস্থা হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন) জামে তিরমিযীতে রয়েছেঃ “সে যেভাবে চাইবে সেভাবেই হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমার নিকট রয়েছে আরো অধিক। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ভাল কাজ করেছে তাদের জন্যে উত্তম পুরস্কার রয়েছে এবং আরো অধিক রয়েছে।” (১০:২৬)সুহায়েব ইবনে সিনান রূমী (রঃ) বলেন যে, এই আধিক্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার দর্শন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতবাসীরা প্রত্যেক শুক্রবারে আল্লাহর দর্শন লাভ করবে। (আরবী)-এর অর্থ এটাই। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট একটি সাদা দর্পণ নিয়ে আগমন করেন যার মধ্যস্থলে একটি বিন্দু ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি?' উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “এটা জুমআর দিন, যা খাস করে আপনাকে ও আপনার উম্মতকে দান করা হয়েছে, যাতে সবাই আপনাদের পিছনে রয়েছে, ইয়াহূদীরাও এবং খৃষ্টানরাও। এতে বহু কিছু কল্যাণ ও বরকত রয়েছে। এতে এমন এক সময় রয়েছে যে, ঐ সময় আল্লাহর নিকট যা চাওয়া হয় তা পাওয়া যায়। আমাদের ওখানে এর নাম হলো , (আরবী) বা আধিক্যের দিন।” নবী (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! (আরবী)কি?” জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “আপনার প্রতিপালক জান্নাতুল ফিরদাউসে একটি প্রশস্ত ময়দান বানিয়েছেন যাতে মৃগনাভির টিলা রয়েছে। জুমআর দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী ফেরেশতাদেরকে অবতীর্ণ করেন। ওর চতুর্দিকে আলোর মিম্বরসমূহ থাকে যেগুলোতে নবীগণ (আঃ) উপবেশন করেন। শহীদ ও সিদ্দীকগণ তাঁদের পিছনে ঐ মৃগনাভীর টিলাগুলোর উপর থাকবেন। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমি তোমাদের সাথে কৃত ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছি। এখন তোমরা আমার নিকট যা ইচ্ছা চাও, পাবে।” তাঁরা সবাই বলবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার সন্তুষ্টি চাই।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমি তো তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েই গেছি। এ ছাড়াও তোমরা চাও, পাবে। আমার নিকট আরো অধিক রয়েছে। তারা তখন জুমআর দিনকে পছন্দ করবেন। কেননা, ঐ দিনেই তারা বহু কিছু নিয়ামত লাভ করেন। এটা ঐ দিন যেই দিন আপনার প্রতিপালক আরশের উপর সমাসীন হবেন। ঐ দিনেই হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়। ঐ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইমাম শাফেয়ীতে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) তাঁর কিতাবুল উম্মের কিতাবুল জুমআর মধ্যেও এ হাদীসটি আনয়ন করেছেন)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে একটি খুব বড় ‘আসার’ আনয়ন করেছেন যাতে বহু কথাই গারীব বা দুর্বল। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যে সত্তর বছর পর্যন্ত এক দিকেই মুখ করে বসে থাকবে। অতঃপর একজন হুর আসবে যে তার স্কন্ধে হাত রেখে তার দৃষ্টি নিজের দিকে ফিরিয়ে দিবে। সে এমন সুন্দরী হবে যে, সে তার গণ্ডদেশে তার চেহারা এমনভাবে দেখতে পাবে যেমনভাবে আয়নায় দেখা যায়। সে যেসব অলংকার পরে থাকবে ওগুলোর এক একটি ক্ষুদ্র মুক্তা এমন হবে যে, ওর কিরণে সারা দুনিয়া উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সে সালাম দিবে, তখন ঐ জান্নাতী উত্তর দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ “তুমি কে?” সে উত্তরে বলবেঃ “আমি হলাম সে-ই যাকে কুরআনে বলা হয়েছে। তার গায়ে সত্তরটি হুল্লা (পোশাক বিশেষ) থাকবে, এতদসত্ত্বেও তার সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্যের কারণে বাহির হতেই তার পদনালীর মজ্জা দৃষ্টিগোচর হবে। তার মাথায় মণি-মুক্তা বসানো মুকুট থাকবে যার সমান্যতম মুক্তা পূর্ব ও পশ্চিমকে আলোকিত করার পক্ষে যথেষ্ট হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন)
ক্বাফ 50:34
৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: যেহেতু আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি ওকে পূর্ণ করবেন, সেহেতু কিয়ামতের দিন যেসব দানব ও মানব ওর যোগ্য হবে তাদেরকে ওর মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে এবং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তুমি পূর্ণ হয়েছে কি?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “যদি আরো কিছু পাপী বাকী থাকে তবে তাদেরকেও আমার মধ্যে নিক্ষেপ করুন!” সহীহ বুখারী শরীফে এই আয়াতের তাফসীরে এই হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পাপীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং সে আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পা তাতে রাখবেন, তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” মুসনাদে আহমাদে এটাও রয়েছে যে, ঐ সময় জাহান্নাম সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ আপনার ইযযতের কসম! এখন যথেষ্ট হয়েছে।” আর জান্নাতে জায়গা ফাঁকা থেকে যাবে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা একটা নতুন মাখলুক সৃষ্টি করে ঐ জায়গা আবাদ করবেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একবার জানাত ও জাহানামের মধ্যে কথোপকথন হয়। জাহান্নাম বলেঃ “আমাকে প্রত্যেক অহংকারী ও উদ্ধত ব্যক্তির জন্যে তৈরী করা হয়েছে।” আর জান্নাত বলেঃ “আমার অবস্থা এই যে, যারা দুর্বল লোক, যাদেরকে দুনিয়ায় সম্মানিত মনে করা হতো না তারাই আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে বলেনঃ “তুমি আমার রহমত। আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এই রহমত দান করবে।” আর জাহান্নামকে তিনি বলবেনঃ “তুমি আমার শাস্তি। তোমার মাধ্যমে আমি যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করবে। যা, তোমরা উভয়েই পূর্ণ হয়ে যাবে।” তখন জাহান্নাম তো পূর্ণ হবে না, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পদ ওতে রাখবেন। তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” ঐ সময় ওটা ভরে যাবে এবং ওর সমস্ত জোড় পর পর সংকুচিত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুকের কারো প্রতি কোন যুলুম করবেন না। জান্নাতে যে জায়গা বেঁচে যাবে ওটা পূর্ণ করার জন্যে মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য মাখলুক সৃষ্টি করবেন। মুসনাদে আহমাদে জাহান্নামের উক্তি নিম্নরূপ রয়েছেঃ “ঔদ্ধত্য প্রকাশকারী ও অহংকারী বাদশাহ ও শরীফ লোকেরা আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” মুসনাদে আবূ ইয়ালায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁর সত্তার পরিচিতি প্রদান করবেন। আমি তখন সিজদায় পড়ে যাবো। আল্লাহ তা'আলা তাতে খুবই সন্তুষ্ট হবেন। তারপর আমি তার এমন প্রশংসা করবে যে, তিনি অত্যন্ত খুশী হবেন। এরপর আমাকে শাফাআত করার অনুমতি দেয়া হবে। অতঃপর আমার উম্মত জাহান্নামের উপরের পুল অতিক্রম করতে শুরু করবে। কেউ কেউ তো চোখের পলকে পার হয়ে যাবে। কেউ কেউ তা অতিক্রম করবে দ্রুতগামী ঘোড়ার চেয়েও দ্রুত গতিতে। এমন কি এক ব্যক্তি হাঁটুর ভরে চলতে চলতে তা অতিক্রম করবে এবং এটা হবে আমল অনুযায়ী। আর জাহান্নাম আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তাল্লাহ তা'আলা তাতে তার পা রেখে দিবেন। তখন সে সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। আমি হাউযের উপর থাকবো।” সহাবীগণ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাউয কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! ওর পানি দুধের চেয়েও সাদা, মধুর চেয়েও মিষ্ট, বৰফের চেয়েও ঠাণ্ডা এবং মৃগনাভী অপেক্ষাও সুগন্ধময়। তথায় বরতন থাকবে ত"কাশের তারকার চেয়েও বেশী। যে ব্যক্তি ওর পানি পেয়ে যাবে সে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। আর যে ব্যক্তি ওর থেকে বঞ্চিত থাকবে সে কোন জায়গাতেই পান পাবে যদদ্বারা সে পরিতৃপ্ত হতে পারে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে কোন জায়গা আছে কি যে, আমার মধ্যে আরো বেশী (সংখ্যক দানব ও মানবের অবস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে?” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে একজনেরও আসার জায়গা আছে কি? আমি তো পরিপূর্ণ হয়ে গেছি।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওর মধ্যে জাহান্নামীদেরকে নিক্ষেপ করা হবে, শেষ পর্যন্ত সে বলবেঃ “আমি পূর্ণ হয়ে গেছি।” সে আরো বলবে? “আমার মধ্যে বেশীর জায়গা আছে কি?” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রথম উক্তিটিকেই গ্রহণ করেছেন। এই দ্বিতীয় উক্তিটির ভাবার্থ এই যে, যেন ঐ গুরুজনদের মতে এই প্রশ্ন এর পরে হবে যে, আল্লহ তা'আলা স্বীয় পদ ওর মধ্যে রেখে দিবেন। এরপর যখন তাকে প্রশ্ন করা হবে, “তুমি কি পরিপূর্ণ হয়েছে?” সে তখন জবাব দিবেঃ “আমার মধ্যে এমন কোন জায়গা বাকী আছে কি যে, কেউ সেখানে আসতে পারে?” অর্থাৎ একটুও জায়গা ফাকা নেই।হযরত আউফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ এটা ঐ সময় হবে যখন তাতে একটা সুচ পরিমাণ জায়গাও ফাকা থাকবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ জান্নাতকে নিকটস্থ করা হবে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন যা দূরে নয়। কেননা, যার আগমন নিশ্চিত সেটাকে দূরে মনে করা হয় না।(আরবী)-এর অর্থ হলোঃ প্রত্যাবর্তনকারী, তাওবাকারী ও গুনাহর কাজ হতে দূরে অবস্থানকারী। হলো ঐ ব্যক্তি যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং তা ভঙ্গ করে। হযরত উসায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)হলো ঐ ব্যক্তি যে কোন মজলিস হতে উঠে না যে পর্যন্ত না ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং যে পরম করুণাময় আল্লাহকে না দেখেই ভয় করে অর্থাৎ নির্জনেও আল্লাহর ভয় অন্তরে রাখে। হাদীসে আছে যে, ঐ ব্যক্তিও কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবে যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার চক্ষু হতে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে এবং বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয় তাদেরকে বলা হবেঃ শান্তির সাথে তোমরা ওতে অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশ কর। আল্লাহর সমস্ত শাস্তি হতে তোমরা নিরাপত্তা লাভ করলে। আর ভাবার্থ এও হবে যে, ফেরেশতারা তাদেরকে সালাম করবেন।এটা অনন্ত জীবনের দিন অর্থাৎ তোমরা জান্নাতে যাচ্ছ চিরস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে, যেখানে কখনো মৃত্যু হবে না, যেখান হতে কখনো বের করে দেয়ার কোন আশংকা থাকবে না এবং স্থানান্তরও করা হবে না। মহান আল্লাহ বলেনঃ সেথায় তারা যা কামনা করবে তাই পাবে এবং আমার নিকট রয়েছে তারো অধিক।হযরত কাসীর ইবনে মুররাহ (রঃ) বলেনঃ -এর মধ্যে এও রয়েছে যে, জান্নাতবাসীর পার্শ্বদিয়ে একখণ্ড মেঘ চলবে যার মধ্য থেকে শব্দ আসবেঃ ‘তোমরা কি চাও? তোমরা যা চাইবে তাই বর্ষিয়ে দিবো।' সুতরাং তারা যা কামনা করবে তাই বর্ষিত হবে। হযরত কাসীর (রঃ) বলেনঃ যদি আল্লাহ তা'আলা আমার নিকট ঐ মেঘ হাযির করে এবং আমি কি চাই তা জিজ্ঞেস করা হয় তবে আমি অবশ্যই বলবেঃ সুন্দর পোশাক পরিহিতা সুন্দরী কুমারী যুবতী মহিলা বর্ষণ করা হোক।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের যে পাখীরই গোশত খাওয়ার ইচ্ছা হবে, তৎক্ষণাৎ ওটা ভাজা অবস্থায় তোমাদের সামনে হাযির হয়ে যাবে।”মুসনাদে আহমাদের মারফু হাদীসে রয়েছেঃ “জান্নাতবাসী যদি সন্তান চায় তবে একই সময়ে গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব ও সন্তানের যৌবনাবস্থা হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন) জামে তিরমিযীতে রয়েছেঃ “সে যেভাবে চাইবে সেভাবেই হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমার নিকট রয়েছে আরো অধিক। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ভাল কাজ করেছে তাদের জন্যে উত্তম পুরস্কার রয়েছে এবং আরো অধিক রয়েছে।” (১০:২৬)সুহায়েব ইবনে সিনান রূমী (রঃ) বলেন যে, এই আধিক্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার দর্শন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতবাসীরা প্রত্যেক শুক্রবারে আল্লাহর দর্শন লাভ করবে। (আরবী)-এর অর্থ এটাই। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট একটি সাদা দর্পণ নিয়ে আগমন করেন যার মধ্যস্থলে একটি বিন্দু ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি?' উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “এটা জুমআর দিন, যা খাস করে আপনাকে ও আপনার উম্মতকে দান করা হয়েছে, যাতে সবাই আপনাদের পিছনে রয়েছে, ইয়াহূদীরাও এবং খৃষ্টানরাও। এতে বহু কিছু কল্যাণ ও বরকত রয়েছে। এতে এমন এক সময় রয়েছে যে, ঐ সময় আল্লাহর নিকট যা চাওয়া হয় তা পাওয়া যায়। আমাদের ওখানে এর নাম হলো , (আরবী) বা আধিক্যের দিন।” নবী (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! (আরবী)কি?” জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “আপনার প্রতিপালক জান্নাতুল ফিরদাউসে একটি প্রশস্ত ময়দান বানিয়েছেন যাতে মৃগনাভির টিলা রয়েছে। জুমআর দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী ফেরেশতাদেরকে অবতীর্ণ করেন। ওর চতুর্দিকে আলোর মিম্বরসমূহ থাকে যেগুলোতে নবীগণ (আঃ) উপবেশন করেন। শহীদ ও সিদ্দীকগণ তাঁদের পিছনে ঐ মৃগনাভীর টিলাগুলোর উপর থাকবেন। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমি তোমাদের সাথে কৃত ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছি। এখন তোমরা আমার নিকট যা ইচ্ছা চাও, পাবে।” তাঁরা সবাই বলবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার সন্তুষ্টি চাই।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমি তো তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েই গেছি। এ ছাড়াও তোমরা চাও, পাবে। আমার নিকট আরো অধিক রয়েছে। তারা তখন জুমআর দিনকে পছন্দ করবেন। কেননা, ঐ দিনেই তারা বহু কিছু নিয়ামত লাভ করেন। এটা ঐ দিন যেই দিন আপনার প্রতিপালক আরশের উপর সমাসীন হবেন। ঐ দিনেই হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়। ঐ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইমাম শাফেয়ীতে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) তাঁর কিতাবুল উম্মের কিতাবুল জুমআর মধ্যেও এ হাদীসটি আনয়ন করেছেন)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে একটি খুব বড় ‘আসার’ আনয়ন করেছেন যাতে বহু কথাই গারীব বা দুর্বল। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যে সত্তর বছর পর্যন্ত এক দিকেই মুখ করে বসে থাকবে। অতঃপর একজন হুর আসবে যে তার স্কন্ধে হাত রেখে তার দৃষ্টি নিজের দিকে ফিরিয়ে দিবে। সে এমন সুন্দরী হবে যে, সে তার গণ্ডদেশে তার চেহারা এমনভাবে দেখতে পাবে যেমনভাবে আয়নায় দেখা যায়। সে যেসব অলংকার পরে থাকবে ওগুলোর এক একটি ক্ষুদ্র মুক্তা এমন হবে যে, ওর কিরণে সারা দুনিয়া উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সে সালাম দিবে, তখন ঐ জান্নাতী উত্তর দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ “তুমি কে?” সে উত্তরে বলবেঃ “আমি হলাম সে-ই যাকে কুরআনে বলা হয়েছে। তার গায়ে সত্তরটি হুল্লা (পোশাক বিশেষ) থাকবে, এতদসত্ত্বেও তার সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্যের কারণে বাহির হতেই তার পদনালীর মজ্জা দৃষ্টিগোচর হবে। তার মাথায় মণি-মুক্তা বসানো মুকুট থাকবে যার সমান্যতম মুক্তা পূর্ব ও পশ্চিমকে আলোকিত করার পক্ষে যথেষ্ট হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন)
ক্বাফ 50:35
৩০-৩৫ নং আয়াতের তাফসীর: যেহেতু আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি ওকে পূর্ণ করবেন, সেহেতু কিয়ামতের দিন যেসব দানব ও মানব ওর যোগ্য হবে তাদেরকে ওর মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে এবং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ওকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “তুমি পূর্ণ হয়েছে কি?” উত্তরে জাহান্নাম বলবেঃ “যদি আরো কিছু পাপী বাকী থাকে তবে তাদেরকেও আমার মধ্যে নিক্ষেপ করুন!” সহীহ বুখারী শরীফে এই আয়াতের তাফসীরে এই হাদীস রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পাপীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং সে আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পা তাতে রাখবেন, তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” মুসনাদে আহমাদে এটাও রয়েছে যে, ঐ সময় জাহান্নাম সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ আপনার ইযযতের কসম! এখন যথেষ্ট হয়েছে।” আর জান্নাতে জায়গা ফাঁকা থেকে যাবে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা একটা নতুন মাখলুক সৃষ্টি করে ঐ জায়গা আবাদ করবেন। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, একবার জানাত ও জাহানামের মধ্যে কথোপকথন হয়। জাহান্নাম বলেঃ “আমাকে প্রত্যেক অহংকারী ও উদ্ধত ব্যক্তির জন্যে তৈরী করা হয়েছে।” আর জান্নাত বলেঃ “আমার অবস্থা এই যে, যারা দুর্বল লোক, যাদেরকে দুনিয়ায় সম্মানিত মনে করা হতো না তারাই আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে বলেনঃ “তুমি আমার রহমত। আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এই রহমত দান করবে।” আর জাহান্নামকে তিনি বলবেনঃ “তুমি আমার শাস্তি। তোমার মাধ্যমে আমি যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করবে। যা, তোমরা উভয়েই পূর্ণ হয়ে যাবে।” তখন জাহান্নাম তো পূর্ণ হবে না, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পদ ওতে রাখবেন। তখন সে বলবেঃ “যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।” ঐ সময় ওটা ভরে যাবে এবং ওর সমস্ত জোড় পর পর সংকুচিত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুকের কারো প্রতি কোন যুলুম করবেন না। জান্নাতে যে জায়গা বেঁচে যাবে ওটা পূর্ণ করার জন্যে মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য মাখলুক সৃষ্টি করবেন। মুসনাদে আহমাদে জাহান্নামের উক্তি নিম্নরূপ রয়েছেঃ “ঔদ্ধত্য প্রকাশকারী ও অহংকারী বাদশাহ ও শরীফ লোকেরা আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।” মুসনাদে আবূ ইয়ালায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁর সত্তার পরিচিতি প্রদান করবেন। আমি তখন সিজদায় পড়ে যাবো। আল্লাহ তা'আলা তাতে খুবই সন্তুষ্ট হবেন। তারপর আমি তার এমন প্রশংসা করবে যে, তিনি অত্যন্ত খুশী হবেন। এরপর আমাকে শাফাআত করার অনুমতি দেয়া হবে। অতঃপর আমার উম্মত জাহান্নামের উপরের পুল অতিক্রম করতে শুরু করবে। কেউ কেউ তো চোখের পলকে পার হয়ে যাবে। কেউ কেউ তা অতিক্রম করবে দ্রুতগামী ঘোড়ার চেয়েও দ্রুত গতিতে। এমন কি এক ব্যক্তি হাঁটুর ভরে চলতে চলতে তা অতিক্রম করবে এবং এটা হবে আমল অনুযায়ী। আর জাহান্নাম আরো বেশী চাইতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তাল্লাহ তা'আলা তাতে তার পা রেখে দিবেন। তখন সে সংকুচিত হয়ে যাবে এবং বলবেঃ যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। আমি হাউযের উপর থাকবো।” সহাবীগণ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাউয কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! ওর পানি দুধের চেয়েও সাদা, মধুর চেয়েও মিষ্ট, বৰফের চেয়েও ঠাণ্ডা এবং মৃগনাভী অপেক্ষাও সুগন্ধময়। তথায় বরতন থাকবে ত"কাশের তারকার চেয়েও বেশী। যে ব্যক্তি ওর পানি পেয়ে যাবে সে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। আর যে ব্যক্তি ওর থেকে বঞ্চিত থাকবে সে কোন জায়গাতেই পান পাবে যদদ্বারা সে পরিতৃপ্ত হতে পারে।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে কোন জায়গা আছে কি যে, আমার মধ্যে আরো বেশী (সংখ্যক দানব ও মানবের অবস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে?” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, জাহান্নাম বলবেঃ “আমার মধ্যে একজনেরও আসার জায়গা আছে কি? আমি তো পরিপূর্ণ হয়ে গেছি।” হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওর মধ্যে জাহান্নামীদেরকে নিক্ষেপ করা হবে, শেষ পর্যন্ত সে বলবেঃ “আমি পূর্ণ হয়ে গেছি।” সে আরো বলবে? “আমার মধ্যে বেশীর জায়গা আছে কি?” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) প্রথম উক্তিটিকেই গ্রহণ করেছেন। এই দ্বিতীয় উক্তিটির ভাবার্থ এই যে, যেন ঐ গুরুজনদের মতে এই প্রশ্ন এর পরে হবে যে, আল্লহ তা'আলা স্বীয় পদ ওর মধ্যে রেখে দিবেন। এরপর যখন তাকে প্রশ্ন করা হবে, “তুমি কি পরিপূর্ণ হয়েছে?” সে তখন জবাব দিবেঃ “আমার মধ্যে এমন কোন জায়গা বাকী আছে কি যে, কেউ সেখানে আসতে পারে?” অর্থাৎ একটুও জায়গা ফাকা নেই।হযরত আউফী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ এটা ঐ সময় হবে যখন তাতে একটা সুচ পরিমাণ জায়গাও ফাকা থাকবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ জান্নাতকে নিকটস্থ করা হবে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন যা দূরে নয়। কেননা, যার আগমন নিশ্চিত সেটাকে দূরে মনে করা হয় না।(আরবী)-এর অর্থ হলোঃ প্রত্যাবর্তনকারী, তাওবাকারী ও গুনাহর কাজ হতে দূরে অবস্থানকারী। হলো ঐ ব্যক্তি যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং তা ভঙ্গ করে। হযরত উসায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)হলো ঐ ব্যক্তি যে কোন মজলিস হতে উঠে না যে পর্যন্ত না ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং যে পরম করুণাময় আল্লাহকে না দেখেই ভয় করে অর্থাৎ নির্জনেও আল্লাহর ভয় অন্তরে রাখে। হাদীসে আছে যে, ঐ ব্যক্তিও কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবে যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার চক্ষু হতে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে এবং বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয় তাদেরকে বলা হবেঃ শান্তির সাথে তোমরা ওতে অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশ কর। আল্লাহর সমস্ত শাস্তি হতে তোমরা নিরাপত্তা লাভ করলে। আর ভাবার্থ এও হবে যে, ফেরেশতারা তাদেরকে সালাম করবেন।এটা অনন্ত জীবনের দিন অর্থাৎ তোমরা জান্নাতে যাচ্ছ চিরস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে, যেখানে কখনো মৃত্যু হবে না, যেখান হতে কখনো বের করে দেয়ার কোন আশংকা থাকবে না এবং স্থানান্তরও করা হবে না। মহান আল্লাহ বলেনঃ সেথায় তারা যা কামনা করবে তাই পাবে এবং আমার নিকট রয়েছে তারো অধিক।হযরত কাসীর ইবনে মুররাহ (রঃ) বলেনঃ -এর মধ্যে এও রয়েছে যে, জান্নাতবাসীর পার্শ্বদিয়ে একখণ্ড মেঘ চলবে যার মধ্য থেকে শব্দ আসবেঃ ‘তোমরা কি চাও? তোমরা যা চাইবে তাই বর্ষিয়ে দিবো।' সুতরাং তারা যা কামনা করবে তাই বর্ষিত হবে। হযরত কাসীর (রঃ) বলেনঃ যদি আল্লাহ তা'আলা আমার নিকট ঐ মেঘ হাযির করে এবং আমি কি চাই তা জিজ্ঞেস করা হয় তবে আমি অবশ্যই বলবেঃ সুন্দর পোশাক পরিহিতা সুন্দরী কুমারী যুবতী মহিলা বর্ষণ করা হোক।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের যে পাখীরই গোশত খাওয়ার ইচ্ছা হবে, তৎক্ষণাৎ ওটা ভাজা অবস্থায় তোমাদের সামনে হাযির হয়ে যাবে।”মুসনাদে আহমাদের মারফু হাদীসে রয়েছেঃ “জান্নাতবাসী যদি সন্তান চায় তবে একই সময়ে গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব ও সন্তানের যৌবনাবস্থা হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন) জামে তিরমিযীতে রয়েছেঃ “সে যেভাবে চাইবে সেভাবেই হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমার নিকট রয়েছে আরো অধিক। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ভাল কাজ করেছে তাদের জন্যে উত্তম পুরস্কার রয়েছে এবং আরো অধিক রয়েছে।” (১০:২৬)সুহায়েব ইবনে সিনান রূমী (রঃ) বলেন যে, এই আধিক্য হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার দর্শন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন যে, জান্নাতবাসীরা প্রত্যেক শুক্রবারে আল্লাহর দর্শন লাভ করবে। (আরবী)-এর অর্থ এটাই। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট একটি সাদা দর্পণ নিয়ে আগমন করেন যার মধ্যস্থলে একটি বিন্দু ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি?' উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “এটা জুমআর দিন, যা খাস করে আপনাকে ও আপনার উম্মতকে দান করা হয়েছে, যাতে সবাই আপনাদের পিছনে রয়েছে, ইয়াহূদীরাও এবং খৃষ্টানরাও। এতে বহু কিছু কল্যাণ ও বরকত রয়েছে। এতে এমন এক সময় রয়েছে যে, ঐ সময় আল্লাহর নিকট যা চাওয়া হয় তা পাওয়া যায়। আমাদের ওখানে এর নাম হলো , (আরবী) বা আধিক্যের দিন।” নবী (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! (আরবী)কি?” জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ “আপনার প্রতিপালক জান্নাতুল ফিরদাউসে একটি প্রশস্ত ময়দান বানিয়েছেন যাতে মৃগনাভির টিলা রয়েছে। জুমআর দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী ফেরেশতাদেরকে অবতীর্ণ করেন। ওর চতুর্দিকে আলোর মিম্বরসমূহ থাকে যেগুলোতে নবীগণ (আঃ) উপবেশন করেন। শহীদ ও সিদ্দীকগণ তাঁদের পিছনে ঐ মৃগনাভীর টিলাগুলোর উপর থাকবেন। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমি তোমাদের সাথে কৃত ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছি। এখন তোমরা আমার নিকট যা ইচ্ছা চাও, পাবে।” তাঁরা সবাই বলবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার সন্তুষ্টি চাই।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আমি তো তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েই গেছি। এ ছাড়াও তোমরা চাও, পাবে। আমার নিকট আরো অধিক রয়েছে। তারা তখন জুমআর দিনকে পছন্দ করবেন। কেননা, ঐ দিনেই তারা বহু কিছু নিয়ামত লাভ করেন। এটা ঐ দিন যেই দিন আপনার প্রতিপালক আরশের উপর সমাসীন হবেন। ঐ দিনেই হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়। ঐ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে ইমাম শাফেয়ীতে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (রঃ) তাঁর কিতাবুল উম্মের কিতাবুল জুমআর মধ্যেও এ হাদীসটি আনয়ন করেছেন)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে একটি খুব বড় ‘আসার’ আনয়ন করেছেন যাতে বহু কথাই গারীব বা দুর্বল। হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যে সত্তর বছর পর্যন্ত এক দিকেই মুখ করে বসে থাকবে। অতঃপর একজন হুর আসবে যে তার স্কন্ধে হাত রেখে তার দৃষ্টি নিজের দিকে ফিরিয়ে দিবে। সে এমন সুন্দরী হবে যে, সে তার গণ্ডদেশে তার চেহারা এমনভাবে দেখতে পাবে যেমনভাবে আয়নায় দেখা যায়। সে যেসব অলংকার পরে থাকবে ওগুলোর এক একটি ক্ষুদ্র মুক্তা এমন হবে যে, ওর কিরণে সারা দুনিয়া উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সে সালাম দিবে, তখন ঐ জান্নাতী উত্তর দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ “তুমি কে?” সে উত্তরে বলবেঃ “আমি হলাম সে-ই যাকে কুরআনে বলা হয়েছে। তার গায়ে সত্তরটি হুল্লা (পোশাক বিশেষ) থাকবে, এতদসত্ত্বেও তার সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্যের কারণে বাহির হতেই তার পদনালীর মজ্জা দৃষ্টিগোচর হবে। তার মাথায় মণি-মুক্তা বসানো মুকুট থাকবে যার সমান্যতম মুক্তা পূর্ব ও পশ্চিমকে আলোকিত করার পক্ষে যথেষ্ট হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন)
ক্বাফ 50:36
৩৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছেঃ এই কাফিররা কতটুকু ক্ষমতা রাখে? এদের পূর্বে এদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী এবং সংখ্যায় অধিক লোকদের এই অপরাধের কারণেই আল্লাহ তা'আলা ধ্বংস করে দিয়েছেন, যারা শহরে বহু কিছু স্মৃতিসৌধ ছেড়ে গেছে। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। তারা দীর্ঘ সফর করতো। আল্লাহর শাস্তি দেখে তা হতে বাঁচার পথ তারা অনুসন্ধান করতে থাকে। কিন্তু তাদের ঐ চেষ্টা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। আল্লাহর পাকড়াও হতে কে বাঁচতে পারে? প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ তোমরা মনে রেখো যে, যখন আমার শাস্তি এসে যাবে তখন ভূষির মত উড়ে যাবে। প্রত্যেক জ্ঞানী ও বিবেকবান ব্যক্তির জন্যে এতে যথেষ্ট উপদেশ ও শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। যে নিবিষ্ট চিত্তে এটা শ্রবণ করে তার জন্যেও এতে শিক্ষা ও উপদেশ আছে।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর অন্তর্বর্তী সব কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে এবং এতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়িনি। এতেও এটা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুর পর পুনর্জীবন দান করতে পূর্ণরূপে ক্ষমতাবান। কেননা, এতো বড় মাখলুককে যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন তাঁর পক্ষে মৃতকে পুনর্জীবিত করা মোটেই কঠিন নয়।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ অভিশপ্ত ইয়াহূদীরা বলতো যে, আল্লাহ তা'আলা ছয় দিনে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেন এবং সপ্তম দিনে বিশ্রাম গ্রহণ করেন। আর ঐ দিনটি ছিল শনিবার। ঐ দিনের নামটিই তারা। রেখে তবে ছেড়েছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের এই বাজে ধারণাটি খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন যে, তিনি ক্লান্তই হননি, কাজেই বিশ্রাম কিসের? যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তারা কি অনুধাবন করে না যে, আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবনদান করতেও সক্ষম? বস্তুতঃ তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (৪৬:৩৩) আর যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করা মানব সৃষ্টি করা অপেক্ষা বহুগুণে বড় (কঠিন)।” (৪০:৫৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদেরকেই কি সৃষ্টি করা কঠিন, না আকাশ, যা তিনি বানিয়েছেন?” (৭৯:২৭)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! অতএব তারা তোমাকে যা বলে তাতে তুমি মনঃক্ষুন্ন হয়ো না বরং ধৈর্যধারণ কর, তাদেরকে অবকাশ দাও, তাদেরকে ছেড়ে দাও এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে এবং রাত্রে তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।মিরাজের পূর্বে ফজরের ও আসরের নামায ফরয ছিল এবং রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এবং তার উম্মতের উপর এক বছর পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামায ওয়াজিব থাকে। তারপর তাঁর উম্মতের উপর হতে এর বাধ্যবাধকতা রহিত হয়ে যায়। অতঃপর মিরাজের রাত্রে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়, যেগুলোর মধ্যে। ফজর ও আসরের নাম যেমন ছিল তেমনই থাকে। সুতরাং সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে এ কথার দ্বারা ফজর ও আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। হযরত জারীর ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা (একদা) নবী (সঃ)-এর নিকট বসেছিলাম। তিনি চৌদ্দ তারিখের চাঁদের দিকে দৃষ্টিপাত করেন এবং বলেনঃ “তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের সামনে হাযির করা হবে এবং তাকে তোমরা এমনিভাবে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চাঁদকে দেখছো। সুতরাং তোমরা পারলে অবশ্যই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বের নামাযকে কখনো ছাড়বে না।” অতঃপর তিনি .. (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে আরো বলেনঃ ‘রাত্রেও তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।' যেমন অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে, এটা তোমার এক অতিরিক্ত বর্তব্য। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯)(আরবী) দ্বারা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে নামাযের পরে তাসবীহ পাঠকে বুঝানো হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দরিদ্র মুহাজিরগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ধনী লোকেরা তো উচ্চ মর্যাদা ও চিরস্থায়ী নিয়ামত লাভ করে ফেলেছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিরূপে?” তারা জবাবে বললেনঃ আমাদের মত তারাও নামায পড়েন ও রোযা রাখেন। কিন্তু তারা দান-খয়রাত করেন যা আমরা করতে পারি না এবং তাঁরা গোলাম আযাদ করেন, আমরা তা করতে সমর্থ হই না।” তিনি তখন তাদেরকে বললেনঃ “এসো, আমি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলে দিই যা তোমরা করলে তোমরাই সর্বাপেক্ষা অগ্রগামী হয়ে যাবে, তোমাদের উপর কেউই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারবে না। কিন্তু তারাই পারবে যারা তোমাদের মত আমল করবে। তোমরা প্রত্যেক নামাযের পরে সুবহানাল্লাহ', 'আলহামদুলিল্লাহ’ এবং আল্লাহু আকবার' তেত্রিশবার করে পাঠ করবে।” (কিছু দিন পর) তারা আবার আসলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের ধনী ভ্রাতাগণও আমাদের এ আমলের মত আমল করতে শুরু করেছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করে থাকেন।”দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এর দ্বারা মাগরিবের পরে দুই রাকআত নামাযকে বুঝানো হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত আবু উমামাও (রাঃ) এ কথাই বলেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত শা’বী (রঃ), হযরত নাখঈ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ)-এরও এটাই উক্তি।হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে দুই রাকআত নামায পড়তেন, শুধু ফজর ও আসরের পরে পড়তেন না । (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আব্দুর রহমান (রঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে’ একথা বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একটি রাত্রি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অতিবাহিত করি। তিনি ফজরের ফরয নামাযের পূর্বে দুই রাকআত নামায হালকাভাবে আদায় করেন। তারপর তিনি (ফরয) নামাযের জন্যে বাড়ী হতে বের হন এবং আমাকে বলেনঃ “হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! ফজরের পূর্বে দুই রাকআত নামায হলো (আরবী)এবং মাগরিবের পরে দুই রাকআত নামায হলো (আরবী)।” এটা ঐ রাত্রির ঘটনা, যে রাত্রিতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তাহাজ্জুদের তেরো রাকআত নামায রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আদায় করেছিলেন এবং ঐটি ছিল তার খালা হযরত মায়মূনা (রাঃ)-এর পালার রাত্রি। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন। হ্যাঁ, তবে তাহাজ্জুদের মূল হাদীস তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। সম্ভবতঃ পরবতী কথাটি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিজের কথাই হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
ক্বাফ 50:37
৩৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছেঃ এই কাফিররা কতটুকু ক্ষমতা রাখে? এদের পূর্বে এদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী এবং সংখ্যায় অধিক লোকদের এই অপরাধের কারণেই আল্লাহ তা'আলা ধ্বংস করে দিয়েছেন, যারা শহরে বহু কিছু স্মৃতিসৌধ ছেড়ে গেছে। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। তারা দীর্ঘ সফর করতো। আল্লাহর শাস্তি দেখে তা হতে বাঁচার পথ তারা অনুসন্ধান করতে থাকে। কিন্তু তাদের ঐ চেষ্টা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। আল্লাহর পাকড়াও হতে কে বাঁচতে পারে? প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ তোমরা মনে রেখো যে, যখন আমার শাস্তি এসে যাবে তখন ভূষির মত উড়ে যাবে। প্রত্যেক জ্ঞানী ও বিবেকবান ব্যক্তির জন্যে এতে যথেষ্ট উপদেশ ও শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। যে নিবিষ্ট চিত্তে এটা শ্রবণ করে তার জন্যেও এতে শিক্ষা ও উপদেশ আছে।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর অন্তর্বর্তী সব কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে এবং এতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়িনি। এতেও এটা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুর পর পুনর্জীবন দান করতে পূর্ণরূপে ক্ষমতাবান। কেননা, এতো বড় মাখলুককে যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন তাঁর পক্ষে মৃতকে পুনর্জীবিত করা মোটেই কঠিন নয়।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ অভিশপ্ত ইয়াহূদীরা বলতো যে, আল্লাহ তা'আলা ছয় দিনে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেন এবং সপ্তম দিনে বিশ্রাম গ্রহণ করেন। আর ঐ দিনটি ছিল শনিবার। ঐ দিনের নামটিই তারা। রেখে তবে ছেড়েছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের এই বাজে ধারণাটি খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন যে, তিনি ক্লান্তই হননি, কাজেই বিশ্রাম কিসের? যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তারা কি অনুধাবন করে না যে, আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবনদান করতেও সক্ষম? বস্তুতঃ তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (৪৬:৩৩) আর যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করা মানব সৃষ্টি করা অপেক্ষা বহুগুণে বড় (কঠিন)।” (৪০:৫৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদেরকেই কি সৃষ্টি করা কঠিন, না আকাশ, যা তিনি বানিয়েছেন?” (৭৯:২৭)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! অতএব তারা তোমাকে যা বলে তাতে তুমি মনঃক্ষুন্ন হয়ো না বরং ধৈর্যধারণ কর, তাদেরকে অবকাশ দাও, তাদেরকে ছেড়ে দাও এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে এবং রাত্রে তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।মিরাজের পূর্বে ফজরের ও আসরের নামায ফরয ছিল এবং রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এবং তার উম্মতের উপর এক বছর পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামায ওয়াজিব থাকে। তারপর তাঁর উম্মতের উপর হতে এর বাধ্যবাধকতা রহিত হয়ে যায়। অতঃপর মিরাজের রাত্রে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়, যেগুলোর মধ্যে। ফজর ও আসরের নাম যেমন ছিল তেমনই থাকে। সুতরাং সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে এ কথার দ্বারা ফজর ও আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। হযরত জারীর ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা (একদা) নবী (সঃ)-এর নিকট বসেছিলাম। তিনি চৌদ্দ তারিখের চাঁদের দিকে দৃষ্টিপাত করেন এবং বলেনঃ “তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের সামনে হাযির করা হবে এবং তাকে তোমরা এমনিভাবে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চাঁদকে দেখছো। সুতরাং তোমরা পারলে অবশ্যই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বের নামাযকে কখনো ছাড়বে না।” অতঃপর তিনি .. (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে আরো বলেনঃ ‘রাত্রেও তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।' যেমন অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে, এটা তোমার এক অতিরিক্ত বর্তব্য। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯)(আরবী) দ্বারা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে নামাযের পরে তাসবীহ পাঠকে বুঝানো হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দরিদ্র মুহাজিরগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ধনী লোকেরা তো উচ্চ মর্যাদা ও চিরস্থায়ী নিয়ামত লাভ করে ফেলেছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিরূপে?” তারা জবাবে বললেনঃ আমাদের মত তারাও নামায পড়েন ও রোযা রাখেন। কিন্তু তারা দান-খয়রাত করেন যা আমরা করতে পারি না এবং তাঁরা গোলাম আযাদ করেন, আমরা তা করতে সমর্থ হই না।” তিনি তখন তাদেরকে বললেনঃ “এসো, আমি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলে দিই যা তোমরা করলে তোমরাই সর্বাপেক্ষা অগ্রগামী হয়ে যাবে, তোমাদের উপর কেউই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারবে না। কিন্তু তারাই পারবে যারা তোমাদের মত আমল করবে। তোমরা প্রত্যেক নামাযের পরে সুবহানাল্লাহ', 'আলহামদুলিল্লাহ’ এবং আল্লাহু আকবার' তেত্রিশবার করে পাঠ করবে।” (কিছু দিন পর) তারা আবার আসলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের ধনী ভ্রাতাগণও আমাদের এ আমলের মত আমল করতে শুরু করেছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করে থাকেন।”দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এর দ্বারা মাগরিবের পরে দুই রাকআত নামাযকে বুঝানো হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত আবু উমামাও (রাঃ) এ কথাই বলেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত শা’বী (রঃ), হযরত নাখঈ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ)-এরও এটাই উক্তি।হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে দুই রাকআত নামায পড়তেন, শুধু ফজর ও আসরের পরে পড়তেন না । (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আব্দুর রহমান (রঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে’ একথা বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একটি রাত্রি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অতিবাহিত করি। তিনি ফজরের ফরয নামাযের পূর্বে দুই রাকআত নামায হালকাভাবে আদায় করেন। তারপর তিনি (ফরয) নামাযের জন্যে বাড়ী হতে বের হন এবং আমাকে বলেনঃ “হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! ফজরের পূর্বে দুই রাকআত নামায হলো (আরবী)এবং মাগরিবের পরে দুই রাকআত নামায হলো (আরবী)।” এটা ঐ রাত্রির ঘটনা, যে রাত্রিতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তাহাজ্জুদের তেরো রাকআত নামায রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আদায় করেছিলেন এবং ঐটি ছিল তার খালা হযরত মায়মূনা (রাঃ)-এর পালার রাত্রি। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন। হ্যাঁ, তবে তাহাজ্জুদের মূল হাদীস তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। সম্ভবতঃ পরবতী কথাটি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিজের কথাই হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
ক্বাফ 50:38
৩৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছেঃ এই কাফিররা কতটুকু ক্ষমতা রাখে? এদের পূর্বে এদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী এবং সংখ্যায় অধিক লোকদের এই অপরাধের কারণেই আল্লাহ তা'আলা ধ্বংস করে দিয়েছেন, যারা শহরে বহু কিছু স্মৃতিসৌধ ছেড়ে গেছে। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। তারা দীর্ঘ সফর করতো। আল্লাহর শাস্তি দেখে তা হতে বাঁচার পথ তারা অনুসন্ধান করতে থাকে। কিন্তু তাদের ঐ চেষ্টা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। আল্লাহর পাকড়াও হতে কে বাঁচতে পারে? প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ তোমরা মনে রেখো যে, যখন আমার শাস্তি এসে যাবে তখন ভূষির মত উড়ে যাবে। প্রত্যেক জ্ঞানী ও বিবেকবান ব্যক্তির জন্যে এতে যথেষ্ট উপদেশ ও শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। যে নিবিষ্ট চিত্তে এটা শ্রবণ করে তার জন্যেও এতে শিক্ষা ও উপদেশ আছে।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর অন্তর্বর্তী সব কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে এবং এতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়িনি। এতেও এটা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুর পর পুনর্জীবন দান করতে পূর্ণরূপে ক্ষমতাবান। কেননা, এতো বড় মাখলুককে যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন তাঁর পক্ষে মৃতকে পুনর্জীবিত করা মোটেই কঠিন নয়।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ অভিশপ্ত ইয়াহূদীরা বলতো যে, আল্লাহ তা'আলা ছয় দিনে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেন এবং সপ্তম দিনে বিশ্রাম গ্রহণ করেন। আর ঐ দিনটি ছিল শনিবার। ঐ দিনের নামটিই তারা। রেখে তবে ছেড়েছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের এই বাজে ধারণাটি খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন যে, তিনি ক্লান্তই হননি, কাজেই বিশ্রাম কিসের? যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তারা কি অনুধাবন করে না যে, আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবনদান করতেও সক্ষম? বস্তুতঃ তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (৪৬:৩৩) আর যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করা মানব সৃষ্টি করা অপেক্ষা বহুগুণে বড় (কঠিন)।” (৪০:৫৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদেরকেই কি সৃষ্টি করা কঠিন, না আকাশ, যা তিনি বানিয়েছেন?” (৭৯:২৭)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! অতএব তারা তোমাকে যা বলে তাতে তুমি মনঃক্ষুন্ন হয়ো না বরং ধৈর্যধারণ কর, তাদেরকে অবকাশ দাও, তাদেরকে ছেড়ে দাও এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে এবং রাত্রে তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।মিরাজের পূর্বে ফজরের ও আসরের নামায ফরয ছিল এবং রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এবং তার উম্মতের উপর এক বছর পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামায ওয়াজিব থাকে। তারপর তাঁর উম্মতের উপর হতে এর বাধ্যবাধকতা রহিত হয়ে যায়। অতঃপর মিরাজের রাত্রে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়, যেগুলোর মধ্যে। ফজর ও আসরের নাম যেমন ছিল তেমনই থাকে। সুতরাং সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে এ কথার দ্বারা ফজর ও আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। হযরত জারীর ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা (একদা) নবী (সঃ)-এর নিকট বসেছিলাম। তিনি চৌদ্দ তারিখের চাঁদের দিকে দৃষ্টিপাত করেন এবং বলেনঃ “তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের সামনে হাযির করা হবে এবং তাকে তোমরা এমনিভাবে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চাঁদকে দেখছো। সুতরাং তোমরা পারলে অবশ্যই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বের নামাযকে কখনো ছাড়বে না।” অতঃপর তিনি .. (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে আরো বলেনঃ ‘রাত্রেও তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।' যেমন অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে, এটা তোমার এক অতিরিক্ত বর্তব্য। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯)(আরবী) দ্বারা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে নামাযের পরে তাসবীহ পাঠকে বুঝানো হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দরিদ্র মুহাজিরগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ধনী লোকেরা তো উচ্চ মর্যাদা ও চিরস্থায়ী নিয়ামত লাভ করে ফেলেছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিরূপে?” তারা জবাবে বললেনঃ আমাদের মত তারাও নামায পড়েন ও রোযা রাখেন। কিন্তু তারা দান-খয়রাত করেন যা আমরা করতে পারি না এবং তাঁরা গোলাম আযাদ করেন, আমরা তা করতে সমর্থ হই না।” তিনি তখন তাদেরকে বললেনঃ “এসো, আমি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলে দিই যা তোমরা করলে তোমরাই সর্বাপেক্ষা অগ্রগামী হয়ে যাবে, তোমাদের উপর কেউই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারবে না। কিন্তু তারাই পারবে যারা তোমাদের মত আমল করবে। তোমরা প্রত্যেক নামাযের পরে সুবহানাল্লাহ', 'আলহামদুলিল্লাহ’ এবং আল্লাহু আকবার' তেত্রিশবার করে পাঠ করবে।” (কিছু দিন পর) তারা আবার আসলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের ধনী ভ্রাতাগণও আমাদের এ আমলের মত আমল করতে শুরু করেছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করে থাকেন।”দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এর দ্বারা মাগরিবের পরে দুই রাকআত নামাযকে বুঝানো হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত আবু উমামাও (রাঃ) এ কথাই বলেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত শা’বী (রঃ), হযরত নাখঈ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ)-এরও এটাই উক্তি।হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে দুই রাকআত নামায পড়তেন, শুধু ফজর ও আসরের পরে পড়তেন না । (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আব্দুর রহমান (রঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে’ একথা বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একটি রাত্রি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অতিবাহিত করি। তিনি ফজরের ফরয নামাযের পূর্বে দুই রাকআত নামায হালকাভাবে আদায় করেন। তারপর তিনি (ফরয) নামাযের জন্যে বাড়ী হতে বের হন এবং আমাকে বলেনঃ “হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! ফজরের পূর্বে দুই রাকআত নামায হলো (আরবী)এবং মাগরিবের পরে দুই রাকআত নামায হলো (আরবী)।” এটা ঐ রাত্রির ঘটনা, যে রাত্রিতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তাহাজ্জুদের তেরো রাকআত নামায রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আদায় করেছিলেন এবং ঐটি ছিল তার খালা হযরত মায়মূনা (রাঃ)-এর পালার রাত্রি। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন। হ্যাঁ, তবে তাহাজ্জুদের মূল হাদীস তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। সম্ভবতঃ পরবতী কথাটি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিজের কথাই হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
ক্বাফ 50:39
৩৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছেঃ এই কাফিররা কতটুকু ক্ষমতা রাখে? এদের পূর্বে এদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী এবং সংখ্যায় অধিক লোকদের এই অপরাধের কারণেই আল্লাহ তা'আলা ধ্বংস করে দিয়েছেন, যারা শহরে বহু কিছু স্মৃতিসৌধ ছেড়ে গেছে। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। তারা দীর্ঘ সফর করতো। আল্লাহর শাস্তি দেখে তা হতে বাঁচার পথ তারা অনুসন্ধান করতে থাকে। কিন্তু তাদের ঐ চেষ্টা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। আল্লাহর পাকড়াও হতে কে বাঁচতে পারে? প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ তোমরা মনে রেখো যে, যখন আমার শাস্তি এসে যাবে তখন ভূষির মত উড়ে যাবে। প্রত্যেক জ্ঞানী ও বিবেকবান ব্যক্তির জন্যে এতে যথেষ্ট উপদেশ ও শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। যে নিবিষ্ট চিত্তে এটা শ্রবণ করে তার জন্যেও এতে শিক্ষা ও উপদেশ আছে।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর অন্তর্বর্তী সব কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে এবং এতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়িনি। এতেও এটা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুর পর পুনর্জীবন দান করতে পূর্ণরূপে ক্ষমতাবান। কেননা, এতো বড় মাখলুককে যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন তাঁর পক্ষে মৃতকে পুনর্জীবিত করা মোটেই কঠিন নয়।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ অভিশপ্ত ইয়াহূদীরা বলতো যে, আল্লাহ তা'আলা ছয় দিনে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেন এবং সপ্তম দিনে বিশ্রাম গ্রহণ করেন। আর ঐ দিনটি ছিল শনিবার। ঐ দিনের নামটিই তারা। রেখে তবে ছেড়েছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের এই বাজে ধারণাটি খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন যে, তিনি ক্লান্তই হননি, কাজেই বিশ্রাম কিসের? যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তারা কি অনুধাবন করে না যে, আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবনদান করতেও সক্ষম? বস্তুতঃ তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (৪৬:৩৩) আর যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করা মানব সৃষ্টি করা অপেক্ষা বহুগুণে বড় (কঠিন)।” (৪০:৫৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদেরকেই কি সৃষ্টি করা কঠিন, না আকাশ, যা তিনি বানিয়েছেন?” (৭৯:২৭)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! অতএব তারা তোমাকে যা বলে তাতে তুমি মনঃক্ষুন্ন হয়ো না বরং ধৈর্যধারণ কর, তাদেরকে অবকাশ দাও, তাদেরকে ছেড়ে দাও এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে এবং রাত্রে তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।মিরাজের পূর্বে ফজরের ও আসরের নামায ফরয ছিল এবং রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এবং তার উম্মতের উপর এক বছর পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামায ওয়াজিব থাকে। তারপর তাঁর উম্মতের উপর হতে এর বাধ্যবাধকতা রহিত হয়ে যায়। অতঃপর মিরাজের রাত্রে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়, যেগুলোর মধ্যে। ফজর ও আসরের নাম যেমন ছিল তেমনই থাকে। সুতরাং সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে এ কথার দ্বারা ফজর ও আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। হযরত জারীর ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা (একদা) নবী (সঃ)-এর নিকট বসেছিলাম। তিনি চৌদ্দ তারিখের চাঁদের দিকে দৃষ্টিপাত করেন এবং বলেনঃ “তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের সামনে হাযির করা হবে এবং তাকে তোমরা এমনিভাবে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চাঁদকে দেখছো। সুতরাং তোমরা পারলে অবশ্যই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বের নামাযকে কখনো ছাড়বে না।” অতঃপর তিনি .. (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে আরো বলেনঃ ‘রাত্রেও তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।' যেমন অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে, এটা তোমার এক অতিরিক্ত বর্তব্য। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯)(আরবী) দ্বারা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে নামাযের পরে তাসবীহ পাঠকে বুঝানো হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দরিদ্র মুহাজিরগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ধনী লোকেরা তো উচ্চ মর্যাদা ও চিরস্থায়ী নিয়ামত লাভ করে ফেলেছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিরূপে?” তারা জবাবে বললেনঃ আমাদের মত তারাও নামায পড়েন ও রোযা রাখেন। কিন্তু তারা দান-খয়রাত করেন যা আমরা করতে পারি না এবং তাঁরা গোলাম আযাদ করেন, আমরা তা করতে সমর্থ হই না।” তিনি তখন তাদেরকে বললেনঃ “এসো, আমি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলে দিই যা তোমরা করলে তোমরাই সর্বাপেক্ষা অগ্রগামী হয়ে যাবে, তোমাদের উপর কেউই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারবে না। কিন্তু তারাই পারবে যারা তোমাদের মত আমল করবে। তোমরা প্রত্যেক নামাযের পরে সুবহানাল্লাহ', 'আলহামদুলিল্লাহ’ এবং আল্লাহু আকবার' তেত্রিশবার করে পাঠ করবে।” (কিছু দিন পর) তারা আবার আসলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের ধনী ভ্রাতাগণও আমাদের এ আমলের মত আমল করতে শুরু করেছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করে থাকেন।”দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এর দ্বারা মাগরিবের পরে দুই রাকআত নামাযকে বুঝানো হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত আবু উমামাও (রাঃ) এ কথাই বলেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত শা’বী (রঃ), হযরত নাখঈ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ)-এরও এটাই উক্তি।হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে দুই রাকআত নামায পড়তেন, শুধু ফজর ও আসরের পরে পড়তেন না । (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আব্দুর রহমান (রঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে’ একথা বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একটি রাত্রি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অতিবাহিত করি। তিনি ফজরের ফরয নামাযের পূর্বে দুই রাকআত নামায হালকাভাবে আদায় করেন। তারপর তিনি (ফরয) নামাযের জন্যে বাড়ী হতে বের হন এবং আমাকে বলেনঃ “হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! ফজরের পূর্বে দুই রাকআত নামায হলো (আরবী)এবং মাগরিবের পরে দুই রাকআত নামায হলো (আরবী)।” এটা ঐ রাত্রির ঘটনা, যে রাত্রিতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তাহাজ্জুদের তেরো রাকআত নামায রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আদায় করেছিলেন এবং ঐটি ছিল তার খালা হযরত মায়মূনা (রাঃ)-এর পালার রাত্রি। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন। হ্যাঁ, তবে তাহাজ্জুদের মূল হাদীস তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। সম্ভবতঃ পরবতী কথাটি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিজের কথাই হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
ক্বাফ 50:40
৩৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছেঃ এই কাফিররা কতটুকু ক্ষমতা রাখে? এদের পূর্বে এদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী এবং সংখ্যায় অধিক লোকদের এই অপরাধের কারণেই আল্লাহ তা'আলা ধ্বংস করে দিয়েছেন, যারা শহরে বহু কিছু স্মৃতিসৌধ ছেড়ে গেছে। ভূ-পৃষ্ঠে তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। তারা দীর্ঘ সফর করতো। আল্লাহর শাস্তি দেখে তা হতে বাঁচার পথ তারা অনুসন্ধান করতে থাকে। কিন্তু তাদের ঐ চেষ্টা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। আল্লাহর পাকড়াও হতে কে বাঁচতে পারে? প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ তোমরা মনে রেখো যে, যখন আমার শাস্তি এসে যাবে তখন ভূষির মত উড়ে যাবে। প্রত্যেক জ্ঞানী ও বিবেকবান ব্যক্তির জন্যে এতে যথেষ্ট উপদেশ ও শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। যে নিবিষ্ট চিত্তে এটা শ্রবণ করে তার জন্যেও এতে শিক্ষা ও উপদেশ আছে।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এগুলোর অন্তর্বর্তী সব কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে এবং এতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়িনি। এতেও এটা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুর পর পুনর্জীবন দান করতে পূর্ণরূপে ক্ষমতাবান। কেননা, এতো বড় মাখলুককে যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন তাঁর পক্ষে মৃতকে পুনর্জীবিত করা মোটেই কঠিন নয়।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ অভিশপ্ত ইয়াহূদীরা বলতো যে, আল্লাহ তা'আলা ছয় দিনে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেন এবং সপ্তম দিনে বিশ্রাম গ্রহণ করেন। আর ঐ দিনটি ছিল শনিবার। ঐ দিনের নামটিই তারা। রেখে তবে ছেড়েছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের এই বাজে ধারণাটি খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন যে, তিনি ক্লান্তই হননি, কাজেই বিশ্রাম কিসের? যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “তারা কি অনুধাবন করে না যে, আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবনদান করতেও সক্ষম? বস্তুতঃ তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (৪৬:৩৩) আর যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করা মানব সৃষ্টি করা অপেক্ষা বহুগুণে বড় (কঠিন)।” (৪০:৫৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদেরকেই কি সৃষ্টি করা কঠিন, না আকাশ, যা তিনি বানিয়েছেন?” (৭৯:২৭)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! অতএব তারা তোমাকে যা বলে তাতে তুমি মনঃক্ষুন্ন হয়ো না বরং ধৈর্যধারণ কর, তাদেরকে অবকাশ দাও, তাদেরকে ছেড়ে দাও এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে এবং রাত্রে তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।মিরাজের পূর্বে ফজরের ও আসরের নামায ফরয ছিল এবং রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এবং তার উম্মতের উপর এক বছর পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামায ওয়াজিব থাকে। তারপর তাঁর উম্মতের উপর হতে এর বাধ্যবাধকতা রহিত হয়ে যায়। অতঃপর মিরাজের রাত্রে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়, যেগুলোর মধ্যে। ফজর ও আসরের নাম যেমন ছিল তেমনই থাকে। সুতরাং সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে এ কথার দ্বারা ফজর ও আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। হযরত জারীর ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা (একদা) নবী (সঃ)-এর নিকট বসেছিলাম। তিনি চৌদ্দ তারিখের চাঁদের দিকে দৃষ্টিপাত করেন এবং বলেনঃ “তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের সামনে হাযির করা হবে এবং তাকে তোমরা এমনিভাবে দেখতে পাবে যেমনভাবে এই চাঁদকে দেখছো। সুতরাং তোমরা পারলে অবশ্যই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বের নামাযকে কখনো ছাড়বে না।” অতঃপর তিনি .. (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে আরো বলেনঃ ‘রাত্রেও তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।' যেমন অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে, এটা তোমার এক অতিরিক্ত বর্তব্য। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯)(আরবী) দ্বারা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতে নামাযের পরে তাসবীহ পাঠকে বুঝানো হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দরিদ্র মুহাজিরগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ধনী লোকেরা তো উচ্চ মর্যাদা ও চিরস্থায়ী নিয়ামত লাভ করে ফেলেছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিরূপে?” তারা জবাবে বললেনঃ আমাদের মত তারাও নামায পড়েন ও রোযা রাখেন। কিন্তু তারা দান-খয়রাত করেন যা আমরা করতে পারি না এবং তাঁরা গোলাম আযাদ করেন, আমরা তা করতে সমর্থ হই না।” তিনি তখন তাদেরকে বললেনঃ “এসো, আমি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলে দিই যা তোমরা করলে তোমরাই সর্বাপেক্ষা অগ্রগামী হয়ে যাবে, তোমাদের উপর কেউই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারবে না। কিন্তু তারাই পারবে যারা তোমাদের মত আমল করবে। তোমরা প্রত্যেক নামাযের পরে সুবহানাল্লাহ', 'আলহামদুলিল্লাহ’ এবং আল্লাহু আকবার' তেত্রিশবার করে পাঠ করবে।” (কিছু দিন পর) তারা আবার আসলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের ধনী ভ্রাতাগণও আমাদের এ আমলের মত আমল করতে শুরু করেছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করে থাকেন।”দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এর দ্বারা মাগরিবের পরে দুই রাকআত নামাযকে বুঝানো হয়েছে। হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত আবু উমামাও (রাঃ) এ কথাই বলেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত শা’বী (রঃ), হযরত নাখঈ (রঃ) এবং হযরত কাতাদা (রঃ)-এরও এটাই উক্তি।হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে দুই রাকআত নামায পড়তেন, শুধু ফজর ও আসরের পরে পড়তেন না । (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আব্দুর রহমান (রঃ) প্রত্যেক নামাযের পরে’ একথা বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একটি রাত্রি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অতিবাহিত করি। তিনি ফজরের ফরয নামাযের পূর্বে দুই রাকআত নামায হালকাভাবে আদায় করেন। তারপর তিনি (ফরয) নামাযের জন্যে বাড়ী হতে বের হন এবং আমাকে বলেনঃ “হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! ফজরের পূর্বে দুই রাকআত নামায হলো (আরবী)এবং মাগরিবের পরে দুই রাকআত নামায হলো (আরবী)।” এটা ঐ রাত্রির ঘটনা, যে রাত্রিতে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তাহাজ্জুদের তেরো রাকআত নামায রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আদায় করেছিলেন এবং ঐটি ছিল তার খালা হযরত মায়মূনা (রাঃ)-এর পালার রাত্রি। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে গারীব বলেছেন। হ্যাঁ, তবে তাহাজ্জুদের মূল হাদীস তো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। সম্ভবতঃ পরবতী কথাটি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিজের কথাই হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
ক্বাফ 50:41
৪১-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা একজন ফেরেশতাকে বায়তুল মুকাদ্দাসে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে একথা বলার নির্দেশ দিবেনঃ “সড়া-গলা অস্থিসমূহ এবং হে দেহের বিচ্ছিন্ন অংশসমূহ! আল্লাহ তোমাদেরকে একত্রিত হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। তোমাদের মধ্যে তিনি ফায়সালা করবেন।” সুতরাং এর দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। এই সত্য ঐ সন্দেহ ও মতভেদকে দূর করে দিবে যা ইতিপূর্বে ছিল। এটা হবে কবর হতে বের হয়ে যাওয়ার দিন।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রথমে সৃষ্টি করা, তারপর ফিরিয়ে আনা এবং সমস্ত মাখলুককে এক জায়গায় একত্রিত করার ক্ষমতা আমার রয়েছে। ঐ সময় প্রত্যেককে আমি তার আমলের প্রতিদান প্রদান করবে। প্রত্যেকে তার ভাল-মন্দের প্রতিফল পেয়ে যাবে। যমীন ফেটে যাবে। সবাই তাড়াতাড়ি উঠে দাড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যার ফলে মাখলুকের দেহ অংকুরিত হতে শুরু করবে, যেমন কাদায় পড়ে থাকা শস্য বৃষ্টি বর্ষণের ফলে অংকুরিত হয়। যখন দেহ পূর্ণরূপে গঠিত হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হুকুম করবেন। সমস্ত রূহ শিংগার ছিদ্রে থাকবে। হযরত ইসরাফীল (আঃ)-এর শিংগায় ফুৎকার দেয়ার সাথে সাথে রূহগুলো আসমান ও যমীনের মাঝে ফিরতে শুরু করবে। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমার ইযযত ও মর্যাদার কসম! অবশ্যই প্রত্যেক রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে চলে যাবে। যাকে সে দুনিয়ায় আবাদ করে রেখেছিল।” তখন প্রত্যেক রূহ নিজ নিজ দেহে চলে যাবে এবং যেভাবে বিষাক্ত জন্তুর বিষক্রিয়া চতুষ্পদ জন্তুর শিরায় শিরায় অতি তাড়াতাড়ি পৌঁছে যায় সেই ভাবে ঐ দেহের শিরা উপশিরায় অতিসত্বর রূহ চলে যাবে। আর সমস্ত মাখলুক আল্লাহর ফরমান অনুযায়ী দৌড়তে দৌড়তে অতি তাড়াতাড়ি হাশরের মাঠে হাযির হয়ে যাবে। এই সময়টি হবে কাফিরদের উপর অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন তিনি তোমাদেরকে ডাক দিবেন তখন তোমরা তাঁর প্রশংসাসহ তার আহ্বানে সাড়া দিবে এবং তোমরা ধারণা করবে যে, তোমরা খুব অল্পই বসবাস করেছো।” (১৭:৫২)।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম আমার কবরের যমীন ফেটে যাবে।”আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এই সমবেত সমাবেশকরণ আমার জন্যে সহজ। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার হুকুম একবার ছাড়া নয়, চক্ষু অবনত হওয়ার মত।” (৫৪:৫০) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের সকলকে সৃষ্টি করা এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা একটি প্রাণকে মেরে পুনর্জীবিত করার মতই (অতি সহজ), নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।” (৩১:২৮)।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ‘তারা যা বলে তা আমি জানি (এতে তুমি মন খারাপ করো না)। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ)! অবশ্যই আমি জানি যে, তারা যা বলছে এতে তোমার মন সংকীর্ণ হচ্ছে। (কিন্তু তুমি সংকীর্ণমনা হয়ে না বা মন খারাপ করো না, বরং) তুমি তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং সিজদাকারীদের অর্থাৎ নামাযীদের অন্তর্ভুক্ত হও। আর তোমার পতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো যে পর্যন্ত না তোমার মৃত্যু হয়। (১৫:৯৭-৯৯)এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তুমি তাদের উপর জবরদস্তিকারী নও’ অর্থাৎ তুমি তাদেরকে জোরপূর্বক হিদায়াতের উপর আনতে পার না এবং এরূপ করতে আদিষ্টও নও। এও অর্থ হয়ঃ তুমি তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করো না। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই উত্তম। কেননা, শব্দে ‘তুমি তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করো না এরূপ নেই। বরং আছে- তুমি তাদের উপর জাব্বার নও। অর্থাৎ “হে নবী! তুমি শুধু তাবলীগ করেই তোমার কর্তব্য সমাপ্ত কর। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের অর্থেও এসে থাকে। মহান আল্লাহ বলেনঃ “যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে তুমি উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে। অর্থাৎ যার অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে, তার শাস্তিকে যে ভয় করে এবং তাঁর রহমতের আশা করে, তাকে তুমি কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দাও। এতে সে অবশ্যই উপকৃত হবে এবং সঠিক পথে চলে আসবে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার দয়িত্ব শুধু পৌছিয়ে দেয়া এবং হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।” (১৩:৪০) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব তুমি উপদেশ দাও, তুমি তো একজন উপদেশদাতা। তুমি তাদের কর্মনিয়ন্ত্রক নও।” (৮৮:২১-২২)।অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদেরকে হিদায়াত করা তোমার দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহ যাকে চান হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২:২৭২) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত দান করতে পার না, বরং আল্লাহ যাকে চান হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২৮:৫৬) এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ “তুমি তাদের উপর জবরদস্তিকারী নও, সুতরাং যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে তুমি উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে।হযরত কাতাদা (রঃ) দু'আ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! যারা আপনার শাস্তিকে ভয় করে এবং আপনার নিয়ামতের আশা রাখে, আমাদেরকে আপনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করুন! হে অনুগ্রহশীল, হে করুণাময়!”
ক্বাফ 50:42
৪১-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা একজন ফেরেশতাকে বায়তুল মুকাদ্দাসে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে একথা বলার নির্দেশ দিবেনঃ “সড়া-গলা অস্থিসমূহ এবং হে দেহের বিচ্ছিন্ন অংশসমূহ! আল্লাহ তোমাদেরকে একত্রিত হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। তোমাদের মধ্যে তিনি ফায়সালা করবেন।” সুতরাং এর দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। এই সত্য ঐ সন্দেহ ও মতভেদকে দূর করে দিবে যা ইতিপূর্বে ছিল। এটা হবে কবর হতে বের হয়ে যাওয়ার দিন।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রথমে সৃষ্টি করা, তারপর ফিরিয়ে আনা এবং সমস্ত মাখলুককে এক জায়গায় একত্রিত করার ক্ষমতা আমার রয়েছে। ঐ সময় প্রত্যেককে আমি তার আমলের প্রতিদান প্রদান করবে। প্রত্যেকে তার ভাল-মন্দের প্রতিফল পেয়ে যাবে। যমীন ফেটে যাবে। সবাই তাড়াতাড়ি উঠে দাড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যার ফলে মাখলুকের দেহ অংকুরিত হতে শুরু করবে, যেমন কাদায় পড়ে থাকা শস্য বৃষ্টি বর্ষণের ফলে অংকুরিত হয়। যখন দেহ পূর্ণরূপে গঠিত হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হুকুম করবেন। সমস্ত রূহ শিংগার ছিদ্রে থাকবে। হযরত ইসরাফীল (আঃ)-এর শিংগায় ফুৎকার দেয়ার সাথে সাথে রূহগুলো আসমান ও যমীনের মাঝে ফিরতে শুরু করবে। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমার ইযযত ও মর্যাদার কসম! অবশ্যই প্রত্যেক রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে চলে যাবে। যাকে সে দুনিয়ায় আবাদ করে রেখেছিল।” তখন প্রত্যেক রূহ নিজ নিজ দেহে চলে যাবে এবং যেভাবে বিষাক্ত জন্তুর বিষক্রিয়া চতুষ্পদ জন্তুর শিরায় শিরায় অতি তাড়াতাড়ি পৌঁছে যায় সেই ভাবে ঐ দেহের শিরা উপশিরায় অতিসত্বর রূহ চলে যাবে। আর সমস্ত মাখলুক আল্লাহর ফরমান অনুযায়ী দৌড়তে দৌড়তে অতি তাড়াতাড়ি হাশরের মাঠে হাযির হয়ে যাবে। এই সময়টি হবে কাফিরদের উপর অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন তিনি তোমাদেরকে ডাক দিবেন তখন তোমরা তাঁর প্রশংসাসহ তার আহ্বানে সাড়া দিবে এবং তোমরা ধারণা করবে যে, তোমরা খুব অল্পই বসবাস করেছো।” (১৭:৫২)।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম আমার কবরের যমীন ফেটে যাবে।”আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এই সমবেত সমাবেশকরণ আমার জন্যে সহজ। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার হুকুম একবার ছাড়া নয়, চক্ষু অবনত হওয়ার মত।” (৫৪:৫০) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের সকলকে সৃষ্টি করা এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা একটি প্রাণকে মেরে পুনর্জীবিত করার মতই (অতি সহজ), নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।” (৩১:২৮)।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ‘তারা যা বলে তা আমি জানি (এতে তুমি মন খারাপ করো না)। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ)! অবশ্যই আমি জানি যে, তারা যা বলছে এতে তোমার মন সংকীর্ণ হচ্ছে। (কিন্তু তুমি সংকীর্ণমনা হয়ে না বা মন খারাপ করো না, বরং) তুমি তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং সিজদাকারীদের অর্থাৎ নামাযীদের অন্তর্ভুক্ত হও। আর তোমার পতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো যে পর্যন্ত না তোমার মৃত্যু হয়। (১৫:৯৭-৯৯)এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তুমি তাদের উপর জবরদস্তিকারী নও’ অর্থাৎ তুমি তাদেরকে জোরপূর্বক হিদায়াতের উপর আনতে পার না এবং এরূপ করতে আদিষ্টও নও। এও অর্থ হয়ঃ তুমি তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করো না। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই উত্তম। কেননা, শব্দে ‘তুমি তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করো না এরূপ নেই। বরং আছে- তুমি তাদের উপর জাব্বার নও। অর্থাৎ “হে নবী! তুমি শুধু তাবলীগ করেই তোমার কর্তব্য সমাপ্ত কর। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের অর্থেও এসে থাকে। মহান আল্লাহ বলেনঃ “যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে তুমি উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে। অর্থাৎ যার অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে, তার শাস্তিকে যে ভয় করে এবং তাঁর রহমতের আশা করে, তাকে তুমি কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দাও। এতে সে অবশ্যই উপকৃত হবে এবং সঠিক পথে চলে আসবে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার দয়িত্ব শুধু পৌছিয়ে দেয়া এবং হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।” (১৩:৪০) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব তুমি উপদেশ দাও, তুমি তো একজন উপদেশদাতা। তুমি তাদের কর্মনিয়ন্ত্রক নও।” (৮৮:২১-২২)।অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদেরকে হিদায়াত করা তোমার দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহ যাকে চান হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২:২৭২) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত দান করতে পার না, বরং আল্লাহ যাকে চান হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২৮:৫৬) এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ “তুমি তাদের উপর জবরদস্তিকারী নও, সুতরাং যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে তুমি উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে।হযরত কাতাদা (রঃ) দু'আ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! যারা আপনার শাস্তিকে ভয় করে এবং আপনার নিয়ামতের আশা রাখে, আমাদেরকে আপনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করুন! হে অনুগ্রহশীল, হে করুণাময়!”
ক্বাফ 50:43
৪১-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা একজন ফেরেশতাকে বায়তুল মুকাদ্দাসে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে একথা বলার নির্দেশ দিবেনঃ “সড়া-গলা অস্থিসমূহ এবং হে দেহের বিচ্ছিন্ন অংশসমূহ! আল্লাহ তোমাদেরকে একত্রিত হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। তোমাদের মধ্যে তিনি ফায়সালা করবেন।” সুতরাং এর দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। এই সত্য ঐ সন্দেহ ও মতভেদকে দূর করে দিবে যা ইতিপূর্বে ছিল। এটা হবে কবর হতে বের হয়ে যাওয়ার দিন।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রথমে সৃষ্টি করা, তারপর ফিরিয়ে আনা এবং সমস্ত মাখলুককে এক জায়গায় একত্রিত করার ক্ষমতা আমার রয়েছে। ঐ সময় প্রত্যেককে আমি তার আমলের প্রতিদান প্রদান করবে। প্রত্যেকে তার ভাল-মন্দের প্রতিফল পেয়ে যাবে। যমীন ফেটে যাবে। সবাই তাড়াতাড়ি উঠে দাড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যার ফলে মাখলুকের দেহ অংকুরিত হতে শুরু করবে, যেমন কাদায় পড়ে থাকা শস্য বৃষ্টি বর্ষণের ফলে অংকুরিত হয়। যখন দেহ পূর্ণরূপে গঠিত হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হুকুম করবেন। সমস্ত রূহ শিংগার ছিদ্রে থাকবে। হযরত ইসরাফীল (আঃ)-এর শিংগায় ফুৎকার দেয়ার সাথে সাথে রূহগুলো আসমান ও যমীনের মাঝে ফিরতে শুরু করবে। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমার ইযযত ও মর্যাদার কসম! অবশ্যই প্রত্যেক রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে চলে যাবে। যাকে সে দুনিয়ায় আবাদ করে রেখেছিল।” তখন প্রত্যেক রূহ নিজ নিজ দেহে চলে যাবে এবং যেভাবে বিষাক্ত জন্তুর বিষক্রিয়া চতুষ্পদ জন্তুর শিরায় শিরায় অতি তাড়াতাড়ি পৌঁছে যায় সেই ভাবে ঐ দেহের শিরা উপশিরায় অতিসত্বর রূহ চলে যাবে। আর সমস্ত মাখলুক আল্লাহর ফরমান অনুযায়ী দৌড়তে দৌড়তে অতি তাড়াতাড়ি হাশরের মাঠে হাযির হয়ে যাবে। এই সময়টি হবে কাফিরদের উপর অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন তিনি তোমাদেরকে ডাক দিবেন তখন তোমরা তাঁর প্রশংসাসহ তার আহ্বানে সাড়া দিবে এবং তোমরা ধারণা করবে যে, তোমরা খুব অল্পই বসবাস করেছো।” (১৭:৫২)।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম আমার কবরের যমীন ফেটে যাবে।”আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এই সমবেত সমাবেশকরণ আমার জন্যে সহজ। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার হুকুম একবার ছাড়া নয়, চক্ষু অবনত হওয়ার মত।” (৫৪:৫০) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের সকলকে সৃষ্টি করা এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা একটি প্রাণকে মেরে পুনর্জীবিত করার মতই (অতি সহজ), নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।” (৩১:২৮)।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ‘তারা যা বলে তা আমি জানি (এতে তুমি মন খারাপ করো না)। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ)! অবশ্যই আমি জানি যে, তারা যা বলছে এতে তোমার মন সংকীর্ণ হচ্ছে। (কিন্তু তুমি সংকীর্ণমনা হয়ে না বা মন খারাপ করো না, বরং) তুমি তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং সিজদাকারীদের অর্থাৎ নামাযীদের অন্তর্ভুক্ত হও। আর তোমার পতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো যে পর্যন্ত না তোমার মৃত্যু হয়। (১৫:৯৭-৯৯)এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তুমি তাদের উপর জবরদস্তিকারী নও’ অর্থাৎ তুমি তাদেরকে জোরপূর্বক হিদায়াতের উপর আনতে পার না এবং এরূপ করতে আদিষ্টও নও। এও অর্থ হয়ঃ তুমি তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করো না। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই উত্তম। কেননা, শব্দে ‘তুমি তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করো না এরূপ নেই। বরং আছে- তুমি তাদের উপর জাব্বার নও। অর্থাৎ “হে নবী! তুমি শুধু তাবলীগ করেই তোমার কর্তব্য সমাপ্ত কর। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের অর্থেও এসে থাকে। মহান আল্লাহ বলেনঃ “যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে তুমি উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে। অর্থাৎ যার অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে, তার শাস্তিকে যে ভয় করে এবং তাঁর রহমতের আশা করে, তাকে তুমি কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দাও। এতে সে অবশ্যই উপকৃত হবে এবং সঠিক পথে চলে আসবে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার দয়িত্ব শুধু পৌছিয়ে দেয়া এবং হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।” (১৩:৪০) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব তুমি উপদেশ দাও, তুমি তো একজন উপদেশদাতা। তুমি তাদের কর্মনিয়ন্ত্রক নও।” (৮৮:২১-২২)।অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদেরকে হিদায়াত করা তোমার দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহ যাকে চান হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২:২৭২) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত দান করতে পার না, বরং আল্লাহ যাকে চান হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২৮:৫৬) এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ “তুমি তাদের উপর জবরদস্তিকারী নও, সুতরাং যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে তুমি উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে।হযরত কাতাদা (রঃ) দু'আ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! যারা আপনার শাস্তিকে ভয় করে এবং আপনার নিয়ামতের আশা রাখে, আমাদেরকে আপনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করুন! হে অনুগ্রহশীল, হে করুণাময়!”
ক্বাফ 50:44
৪১-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা একজন ফেরেশতাকে বায়তুল মুকাদ্দাসে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে একথা বলার নির্দেশ দিবেনঃ “সড়া-গলা অস্থিসমূহ এবং হে দেহের বিচ্ছিন্ন অংশসমূহ! আল্লাহ তোমাদেরকে একত্রিত হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। তোমাদের মধ্যে তিনি ফায়সালা করবেন।” সুতরাং এর দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। এই সত্য ঐ সন্দেহ ও মতভেদকে দূর করে দিবে যা ইতিপূর্বে ছিল। এটা হবে কবর হতে বের হয়ে যাওয়ার দিন।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রথমে সৃষ্টি করা, তারপর ফিরিয়ে আনা এবং সমস্ত মাখলুককে এক জায়গায় একত্রিত করার ক্ষমতা আমার রয়েছে। ঐ সময় প্রত্যেককে আমি তার আমলের প্রতিদান প্রদান করবে। প্রত্যেকে তার ভাল-মন্দের প্রতিফল পেয়ে যাবে। যমীন ফেটে যাবে। সবাই তাড়াতাড়ি উঠে দাড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যার ফলে মাখলুকের দেহ অংকুরিত হতে শুরু করবে, যেমন কাদায় পড়ে থাকা শস্য বৃষ্টি বর্ষণের ফলে অংকুরিত হয়। যখন দেহ পূর্ণরূপে গঠিত হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হুকুম করবেন। সমস্ত রূহ শিংগার ছিদ্রে থাকবে। হযরত ইসরাফীল (আঃ)-এর শিংগায় ফুৎকার দেয়ার সাথে সাথে রূহগুলো আসমান ও যমীনের মাঝে ফিরতে শুরু করবে। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমার ইযযত ও মর্যাদার কসম! অবশ্যই প্রত্যেক রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে চলে যাবে। যাকে সে দুনিয়ায় আবাদ করে রেখেছিল।” তখন প্রত্যেক রূহ নিজ নিজ দেহে চলে যাবে এবং যেভাবে বিষাক্ত জন্তুর বিষক্রিয়া চতুষ্পদ জন্তুর শিরায় শিরায় অতি তাড়াতাড়ি পৌঁছে যায় সেই ভাবে ঐ দেহের শিরা উপশিরায় অতিসত্বর রূহ চলে যাবে। আর সমস্ত মাখলুক আল্লাহর ফরমান অনুযায়ী দৌড়তে দৌড়তে অতি তাড়াতাড়ি হাশরের মাঠে হাযির হয়ে যাবে। এই সময়টি হবে কাফিরদের উপর অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন তিনি তোমাদেরকে ডাক দিবেন তখন তোমরা তাঁর প্রশংসাসহ তার আহ্বানে সাড়া দিবে এবং তোমরা ধারণা করবে যে, তোমরা খুব অল্পই বসবাস করেছো।” (১৭:৫২)।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম আমার কবরের যমীন ফেটে যাবে।”আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এই সমবেত সমাবেশকরণ আমার জন্যে সহজ। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার হুকুম একবার ছাড়া নয়, চক্ষু অবনত হওয়ার মত।” (৫৪:৫০) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের সকলকে সৃষ্টি করা এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা একটি প্রাণকে মেরে পুনর্জীবিত করার মতই (অতি সহজ), নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।” (৩১:২৮)।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ‘তারা যা বলে তা আমি জানি (এতে তুমি মন খারাপ করো না)। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ)! অবশ্যই আমি জানি যে, তারা যা বলছে এতে তোমার মন সংকীর্ণ হচ্ছে। (কিন্তু তুমি সংকীর্ণমনা হয়ে না বা মন খারাপ করো না, বরং) তুমি তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং সিজদাকারীদের অর্থাৎ নামাযীদের অন্তর্ভুক্ত হও। আর তোমার পতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো যে পর্যন্ত না তোমার মৃত্যু হয়। (১৫:৯৭-৯৯)এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তুমি তাদের উপর জবরদস্তিকারী নও’ অর্থাৎ তুমি তাদেরকে জোরপূর্বক হিদায়াতের উপর আনতে পার না এবং এরূপ করতে আদিষ্টও নও। এও অর্থ হয়ঃ তুমি তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করো না। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই উত্তম। কেননা, শব্দে ‘তুমি তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করো না এরূপ নেই। বরং আছে- তুমি তাদের উপর জাব্বার নও। অর্থাৎ “হে নবী! তুমি শুধু তাবলীগ করেই তোমার কর্তব্য সমাপ্ত কর। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের অর্থেও এসে থাকে। মহান আল্লাহ বলেনঃ “যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে তুমি উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে। অর্থাৎ যার অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে, তার শাস্তিকে যে ভয় করে এবং তাঁর রহমতের আশা করে, তাকে তুমি কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দাও। এতে সে অবশ্যই উপকৃত হবে এবং সঠিক পথে চলে আসবে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার দয়িত্ব শুধু পৌছিয়ে দেয়া এবং হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।” (১৩:৪০) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব তুমি উপদেশ দাও, তুমি তো একজন উপদেশদাতা। তুমি তাদের কর্মনিয়ন্ত্রক নও।” (৮৮:২১-২২)।অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদেরকে হিদায়াত করা তোমার দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহ যাকে চান হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২:২৭২) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত দান করতে পার না, বরং আল্লাহ যাকে চান হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২৮:৫৬) এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ “তুমি তাদের উপর জবরদস্তিকারী নও, সুতরাং যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে তুমি উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে।হযরত কাতাদা (রঃ) দু'আ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! যারা আপনার শাস্তিকে ভয় করে এবং আপনার নিয়ামতের আশা রাখে, আমাদেরকে আপনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করুন! হে অনুগ্রহশীল, হে করুণাময়!”
ক্বাফ 50:45
৪১-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা একজন ফেরেশতাকে বায়তুল মুকাদ্দাসে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে একথা বলার নির্দেশ দিবেনঃ “সড়া-গলা অস্থিসমূহ এবং হে দেহের বিচ্ছিন্ন অংশসমূহ! আল্লাহ তোমাদেরকে একত্রিত হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। তোমাদের মধ্যে তিনি ফায়সালা করবেন।” সুতরাং এর দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। এই সত্য ঐ সন্দেহ ও মতভেদকে দূর করে দিবে যা ইতিপূর্বে ছিল। এটা হবে কবর হতে বের হয়ে যাওয়ার দিন।মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রথমে সৃষ্টি করা, তারপর ফিরিয়ে আনা এবং সমস্ত মাখলুককে এক জায়গায় একত্রিত করার ক্ষমতা আমার রয়েছে। ঐ সময় প্রত্যেককে আমি তার আমলের প্রতিদান প্রদান করবে। প্রত্যেকে তার ভাল-মন্দের প্রতিফল পেয়ে যাবে। যমীন ফেটে যাবে। সবাই তাড়াতাড়ি উঠে দাড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যার ফলে মাখলুকের দেহ অংকুরিত হতে শুরু করবে, যেমন কাদায় পড়ে থাকা শস্য বৃষ্টি বর্ষণের ফলে অংকুরিত হয়। যখন দেহ পূর্ণরূপে গঠিত হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হুকুম করবেন। সমস্ত রূহ শিংগার ছিদ্রে থাকবে। হযরত ইসরাফীল (আঃ)-এর শিংগায় ফুৎকার দেয়ার সাথে সাথে রূহগুলো আসমান ও যমীনের মাঝে ফিরতে শুরু করবে। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমার ইযযত ও মর্যাদার কসম! অবশ্যই প্রত্যেক রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে চলে যাবে। যাকে সে দুনিয়ায় আবাদ করে রেখেছিল।” তখন প্রত্যেক রূহ নিজ নিজ দেহে চলে যাবে এবং যেভাবে বিষাক্ত জন্তুর বিষক্রিয়া চতুষ্পদ জন্তুর শিরায় শিরায় অতি তাড়াতাড়ি পৌঁছে যায় সেই ভাবে ঐ দেহের শিরা উপশিরায় অতিসত্বর রূহ চলে যাবে। আর সমস্ত মাখলুক আল্লাহর ফরমান অনুযায়ী দৌড়তে দৌড়তে অতি তাড়াতাড়ি হাশরের মাঠে হাযির হয়ে যাবে। এই সময়টি হবে কাফিরদের উপর অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন তিনি তোমাদেরকে ডাক দিবেন তখন তোমরা তাঁর প্রশংসাসহ তার আহ্বানে সাড়া দিবে এবং তোমরা ধারণা করবে যে, তোমরা খুব অল্পই বসবাস করেছো।” (১৭:৫২)।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম আমার কবরের যমীন ফেটে যাবে।”আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এই সমবেত সমাবেশকরণ আমার জন্যে সহজ। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার হুকুম একবার ছাড়া নয়, চক্ষু অবনত হওয়ার মত।” (৫৪:৫০) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের সকলকে সৃষ্টি করা এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা একটি প্রাণকে মেরে পুনর্জীবিত করার মতই (অতি সহজ), নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।” (৩১:২৮)।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ‘তারা যা বলে তা আমি জানি (এতে তুমি মন খারাপ করো না)। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ)! অবশ্যই আমি জানি যে, তারা যা বলছে এতে তোমার মন সংকীর্ণ হচ্ছে। (কিন্তু তুমি সংকীর্ণমনা হয়ে না বা মন খারাপ করো না, বরং) তুমি তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং সিজদাকারীদের অর্থাৎ নামাযীদের অন্তর্ভুক্ত হও। আর তোমার পতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো যে পর্যন্ত না তোমার মৃত্যু হয়। (১৫:৯৭-৯৯)এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তুমি তাদের উপর জবরদস্তিকারী নও’ অর্থাৎ তুমি তাদেরকে জোরপূর্বক হিদায়াতের উপর আনতে পার না এবং এরূপ করতে আদিষ্টও নও। এও অর্থ হয়ঃ তুমি তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করো না। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই উত্তম। কেননা, শব্দে ‘তুমি তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করো না এরূপ নেই। বরং আছে- তুমি তাদের উপর জাব্বার নও। অর্থাৎ “হে নবী! তুমি শুধু তাবলীগ করেই তোমার কর্তব্য সমাপ্ত কর। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের অর্থেও এসে থাকে। মহান আল্লাহ বলেনঃ “যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে তুমি উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে। অর্থাৎ যার অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে, তার শাস্তিকে যে ভয় করে এবং তাঁর রহমতের আশা করে, তাকে তুমি কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দাও। এতে সে অবশ্যই উপকৃত হবে এবং সঠিক পথে চলে আসবে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার দয়িত্ব শুধু পৌছিয়ে দেয়া এবং হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।” (১৩:৪০) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব তুমি উপদেশ দাও, তুমি তো একজন উপদেশদাতা। তুমি তাদের কর্মনিয়ন্ত্রক নও।” (৮৮:২১-২২)।অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদেরকে হিদায়াত করা তোমার দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহ যাকে চান হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২:২৭২) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত দান করতে পার না, বরং আল্লাহ যাকে চান হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২৮:৫৬) এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ “তুমি তাদের উপর জবরদস্তিকারী নও, সুতরাং যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে তুমি উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে।হযরত কাতাদা (রঃ) দু'আ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! যারা আপনার শাস্তিকে ভয় করে এবং আপনার নিয়ামতের আশা রাখে, আমাদেরকে আপনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করুন! হে অনুগ্রহশীল, হে করুণাময়!”
আয-যারিয়াত 51:1
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:2
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:3
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:4
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:5
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:6
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:7
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:8
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:9
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:10
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:11
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:12
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:13
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:14
১-১৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে জনগণকে বলেনঃ “তোমরা আমাকে যে কোন আয়াত বা যে কোন হাদীস সম্বন্ধে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।” তখন ইবনুস সাকওয়া দাঁড়িয়ে বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা'আলার (আরবী) -এই উক্তির অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “বাতাস।” “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” সে জিজ্ঞেস করলো। “এর অর্থ মেঘ।” উত্তর দিলেন তিনি। “ (আরবী)-এর ভাবার্থ কি?” প্রশ্ন করলো সে। তিনি জবাবে বললেনঃ “এর ভাবার্থ হলো নৌযানসমূহ।” সে জিজ্ঞেস করলোঃ “ (আরবী)-এর অর্থ কি?” “এর অর্থ হলো ফেরেশতামণ্ডলী।” উত্তর দিলেন তিনি। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়া (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সাবীগ তামীমী হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! (আরবী) সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন!" উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হলো বাতাস। আমি যা বললাম তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমি বলতে না। শুনতাম তবে তোমাকে এটা বলতাম না।” সে প্রশ্ন করলোঃ (আরবী)-এর অর্থ কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “ (আরবী) হলেন ফেরেশতামণ্ডলী। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই অর্থ বলতে না শুনলে আমি তোমার কাছে এ অর্থ বলতাম না।” সে আবার প্রশ্ন করলোঃ “ (আরবী) কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “ (আরবী) হলো নৌযানসমূহ। এ অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে আমি না শুনতাম তবে তোমার কাছে আমি এ অর্থ বলতাম না।” অতঃপর তিনি তাকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে একশ’ চাবুক মারা হলো এবং একটি ঘরে রাখা হলো। যখন তার দেহের ক্ষত ভাল হয়ে গেল তখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে পুনরায় একশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং তাকে সওয়ার করিয়ে দিয়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট হযরত উমার (রাঃ) পত্র লিখলেনঃ “এ ব্যক্তি যেন কোন মজলিসে না বসে।" কিছুদিন পর সে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-এর নিকট এসে কঠিনভাবে শপথ করে বললোঃ “এখন আমার মনের কু-ধারণা দূর হয়ে গেছে। আমার অন্তরে বদ-আকীদা আর নেই যা পূর্বে ছিল।” তখন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে এ খবর অবহিত করলেন এবং সাথে সাথে একথাও লিখলেনঃ “আমারও ধারণা যে, সে এখন বাস্তবিকই সংশোধিত হয়ে গেছে।” উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-কে লিখেনঃ “তাকে এখন মজলিসে বসার অনুমতি দেয়া হোক ।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি দুর্বল। সঠিক কথা এটাই জানা যাচ্ছে যে, হাদীসটি মাওকুফ অর্থাৎ হযরত উমর (রাঃ)-এর নিজের ফরমান। এটা মারফু হাদীস নয়)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রাঃ) সাবীগ তামীমীকে যে বেত্রাঘাত করিয়েছিলেন তার কারণ এই যে, তার বদ-আকীদা তার কাছে প্রকাশ পেয়েছিল এবং তার প্রশ্ন ছিল প্রত্যাখ্যান ও বিরুদ্ধাচরণ মূলক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যা হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) পুরোপুরিভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত হাসান (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন হতে এই তাফসীরই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এবং ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো এ আয়াতগুলোর তাফসীরে অন্য কোন উক্তি আনয়নই করেননি।(আরবী) -এর ভাবার্থ যে মেঘ তা নিম্নের কবিতাংশের পরিভাষাতেও রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিজেকে তাঁরই বশীভূত করছি যার বশীভূত হয়েছে ঐ মেঘ যা পরিষ্কার সুমিষ্ট পানি উঠিয়ে নিয়ে থাকে।”(আরবী) -এর অর্থ কেউ কেউ ঐ নক্ষত্ররাজি নিয়েছেন যেগুলো আকাশে চলাফেরা করে। এই অর্থ নিলে নীচ হতে উপরের দিকে উঠে যাওয়া হবে। প্রথমে বাতাস, তারপর মেঘ, তারপর নক্ষত্ররাজি এবং এরপর ফেরেশতামণ্ডলী, যারা কখনো কখনো আল্লাহ তা'আলার হুকুম নিয়ে অবতরণ করেন এবং কখনো পাহারার কাজ করার জন্যে তাশরীফ আনয়ন করেন। যেহেতু এসব কসম এই ব্যাপারে যে, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে এবং লোকদেরকে পুনর্জীবিত করা হবে সেই হেতু এগুলোর পরেই বলেনঃ “তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য এবং কর্মফল দিবস অবশ্যম্ভাবী।' অতঃপর মহান আল্লাহ আকাশের কসম খেয়েছেন যা সুন্দর, উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অনেকেই (আরবী) শব্দের এ অর্থই করেছেন। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, পানির তরঙ্গ, বালুকার কণা, ক্ষেতের ফসলের পাতা জোরে প্রবাহিত বাতাসে যখন আন্দোলিত হয় তখন এগুলোতে যেন রাস্তা হয়ে যায়। ওটাকেই (আরবী) বলা হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) এক ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের পিছনে মিথ্যাবাদী বিভ্রান্তকারী। তার মাথার চুল পিছনের দিকে ‘হুবুক’ ‘হুবুক’ অর্থাৎ কুঞ্চিত। আবূ সালেহ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা কাঠিন্য বুঝানো হয়েছে। খাসীফ (রঃ) বলেন। (আরবী) -এর অর্থ হলো সুদৃশ্য। হাসান ইবনে হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আকাশের সৌন্দর্য হলো নক্ষত্ররাজি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) দ্বারা সপ্তম আকাশকে বুঝানো হয়েছে। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য এই যে, প্রতিষ্ঠিত থাকে এমন তারকারাজি আকাশে রয়েছে। অধিকাংশ জ্যোতির্বিদের বর্ণনা এই যে, এটা অষ্টম আকাশে রয়েছে, যা সপ্তম আকাশের উপরে রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এই সমুদয় উক্তির সারাংশ একই অর্থাৎ এর দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত আকাশকে বুঝানো হয়েছে। আরো বুঝানো হয়েছে আকাশের উচ্চতা, ওর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ওর পবিত্রতা, ওর নির্মাণ চাতুর্য, ওর দৃঢ়তা, ওর প্রশস্ততা, তারকারাজি দ্বারা ওর জাক-জমকপূর্ণ হওয়া, যেগুলোর মধ্যে কতকগুলো চলতে ফিরতে থাকে এবং কতকগুলো স্থির থাকে, ওর সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় নক্ষত্ররাজি দ্বারা সুষমামণ্ডিত হওয়া। এসব হচ্ছে আকাশের সৌন্দর্যের উপকরণ।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত রয়েছে। কোন কিছুর উপর তোমরা একমত হতে পারনি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাদের কেউ কেউ তো সত্য বলে বিশ্বাস করতো এবং কেউ কেউ মিথ্যা মনে করতো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই ওটা পরিত্যাগ করে।' অর্থাৎ এই অবস্থা ওদেরই হয় যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের বাতিল, মিথ্যা ও বাজে উক্তির কারণে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। সঠিক বোধ ও সত্য জ্ঞান তাদের মধ্য হতে লোপ পেয়ে যায়। যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা ও তোমাদের বাতিল মা'বৃদরা জাহান্নামী লোকদেরকে ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।” (৩৭:১৬১-১৬৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা পথভ্রষ্ট শুধু সেই হয় যে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর থেকে ঐ ব্যক্তিই দূর হয় যাকে সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম হতে ঐ ব্যক্তিই সরে পড়ে যে ব্যক্তি পূর্ব হতেই এটাকে অবিশ্বাস করার উপর উঠে পড়ে লেগেছিল।এরপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ ‘বাজে ও অযৌক্তিক উক্তিকারীরা ধ্বংস হোক।' অর্থাৎ তারাই ধ্বংস হোক যারা বাজে ও মিথ্যা উক্তি করতো, যাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, যারা বলতোঃ আমাদের পুনরুত্থান ঘটবে না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সন্দেহ পোষণকারীরা অভিশপ্ত। হযরত মুআয (রাঃ) স্বীয় ভাষণে এ কথাই বলতেন। এরা প্রতারক ও সন্দিহান।এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ধ্বংস হোক তারা যারা অজ্ঞ ও উদাসীন। যারা বেপরোয়াভাবে কুফরী করতে রয়েছে। তারা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিবস কবে হবে? আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেনঃ এটা হবে সেই দিন, যেই দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে অগ্নিতে। যেমনভাবে সোনাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তেমনিভাবে তারা আগুনে জ্বলতে থাকবে। তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা তোমাদের শাস্তি আস্বাদন কর, তোমরা এই শাস্তিই ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। একথা তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হবে।
আয-যারিয়াত 51:15
১৫-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা আল্লাহভীরু লোকদের পরিণামের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন তারা প্রস্রবণ বিশিষ্ট জান্নাতে অবস্থান করবে। তাদের অবস্থা হবে ঐ অসৎ লোকেদের অবস্থার বিপরীত যারা শাস্তি-সাজার মধ্যে, শংখল-জিঞ্জীরের মধ্যে এবং কঠিন মারপিটের মধ্যে থাকবে। এই মুমিনদের নিকট আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে যে দায়িত্ব ও কর্তব্য এসেছিল তা তারা যথাযথভাবে পালন করতো। আর এর পূর্বেও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতো। কিন্তু দুই কারণে এই তাফসীরের ব্যাপারে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। প্রথম কারণ এই যে, এ তাফসীর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) করেছেন এ কথা বলা হয়। কিন্তু সহীহ সনদে এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত পৌঁছে না। ওর এ সনদটি সম্পূর্ণরূপে দুর্বল। দ্বিতীয় কারণ এই যে, (আরবী) পূর্বের বাক্য হতে (আরবী) হয়েছে। সুতরাং ভাবার্থ হবেঃ আল্লাহভীরু লোকেরা জান্নাতে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতরাশি লাভ করবে। ইতিপূর্বে অর্থাৎ দুনিয়ায় তারা ভাল কাজ করতো। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (তাদেরকে বলা হবেঃ) তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪)।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের আন্তরিকতাপূর্ণ কাজের বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছেন যে, তারা রাত্রির সামান্য অংশই অতিবাহিত করতে নিদ্রায়। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এখানে শব্দটি বা নেতিবাচক। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি হিসেবে অর্থ হবেঃ তাদের উপর এমন কোন রাত্রি অতিবাহিত হতো না যার কিছু অংশ তারা আল্লাহর স্মরণে না কাটাতেন। হয় রাত্রির প্রথমাংশে কিছু নফল পড়তেন, না হয় রাত্রির মধ্যভাগে পড়তেন। অর্থাৎ প্রত্যেক রাত্রের কোন না কোন সময় কিছু না কিছু নামায অবশ্যই পড়তেন। সারা রাত তারা শুয়ে কাটিয়ে দিতেন না।হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এ লোকগুলো মাগরিব ও ইশার নামাযের মাঝে কিছু নফল নামায পড়তেন। হযরত ইমাম আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তারা ইশার নামাযের পূর্বে ঘুমাতেন না।কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের দ্রিা রাত্রে খুব কম হতো। কিছু সময় ঘুমাতেন এবং কিছু সময় জেগে থাকতেন। আর যখন ইবাদতে মনোযোগ দিতেন তখন সকাল হয়ে যেতো।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো। হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) এই আয়াতের এই ভাবার্থ বর্ণনা করার পর বলতেনঃ “বড়ই দুঃখজনক ব্যাপার যে, আমার মধ্যে এটা নেই।” তার ছাত্র খাজা হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, তিনি প্রায়ই বলতেনঃ “আমি যখন আমার আমল জান্নাতীদের আমলের সামনে রাখি তখন আমার আমলকে তাদের আমলের তুলনায় অতি নগণ্য দেখি। পক্ষান্তরে, যখন আমি আমার আমল জাহান্নামীদের আমলের সামনে রাখি তখন দেখি যে, তারা তো কল্যাণ হতে সম্পূর্ণরূপে দূরে ছিল। তারা ছিল আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকারকারী এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবনকে অবিশ্বাসকারী। সুতরাং আমার অবস্থা ঐ লোকেদের মত যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা ভাল ও মন্দ আমল মিশ্রিত করেছে।” (৯:১০২)বানু তামীম গোত্রের একটি লোক হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-কে বললোঃ “হে আবু সালমা (রঃ)! এই গুণ তো আমাদের মধ্যে নেই যে, আমরা রাত্রে খুব কম ঘুমাই? আমরা তো খুব কম সময় আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে থাকি।” তখন তিনি বললেনঃ “ঐ ব্যক্তিও বড় ভাগ্যবান যে ঘুম আসলে শুয়ে পড়ে এবং যখন জেগে ওঠে তখন আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেন, প্রথম যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন তখন জনগণ তাঁকে দেখার জন্যে ভীড় জমায়। তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আল্লাহর কসম। তার চেহারা মুবারকে আমার দৃষ্টি পড়া মাত্রই আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, এই জ্যোতির্ময় চেহারা কোন মিথ্যাবাদী লোকের হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সর্বপ্রথম যে কথা আমার কানে পৌঁছেছিল তা ছিলঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা (দরিদ্রদেরকে) খাদ্য খাওয়াতে থাকো, আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখো, (মানুষকে) সালাম দিতে থাকো এবং রাত্রে নামায আদায় করো যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে এমন কক্ষ রয়েছে যার ভিতরের অংশ বাহির হতে এবং বাহিরের অংশ ভিতর হতে দেখা যায়।” একথা শুনে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কাদের জন্যে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদের জন্যে, যারা নরম কথা বলে, (দরিদ্রদেরকে) খানা খেতে দেয় এবং রাত্রে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন তারা আল্লাহর ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যুহরী (রঃ) এবং হাসান (রঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের ভাবার্থ এই যে, তারা রাত্রির অধিকাংশ তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দেয়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করে।” হযরত যহহাক (রঃ) (আরবী) কে এর পূর্ববর্তী বাক্যের সাথে মিলিয়ে দেন এবং (আরবী) হতে শুরু বলে থাকেন। কিন্তু এই উক্তিতে বড় কৃত্রিমতা রয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো।' মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ ‘তারা নামায পড়ে। অন্যান্য তাফসীরকারগণ বলেন, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘তারা রাত্রে (ইবাদতে) দাঁড়িয়ে থাকে এবং সকাল হলে তারা নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সকালে তারা ক্ষমা প্রার্থনাকারী।” (৩:১৭) এই ক্ষমা প্রার্থনা যদি নামাযেই হয় তবে তো খুবই ভাল। সহীহ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবীদের একটি জামাআতের কয়েকটি রিওয়াইয়াত দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন শেষ তৃতীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকে তখন প্রতি রাত্রে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেনঃ “কোন তাওবাকারী আছে কি? আমি তার তাওবা কবুল করবে। কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে। ক্ষমা করে দিবো। কোন যাজ্ঞাকারী আছে কি? আমি তাকে প্রদান করবে।” ফজর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা এরূপই বলতে থাকেন।”আল্লাহ তাআলা যে হযরত ইয়াকূব (আঃ) সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি তাঁর পুত্রদেরকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।” এ ব্যাপারে অধিকাংশ তাফসীরকার বলেন যে, তাঁর এই ক্ষমা প্রার্থনা রাত্রির শেষ প্রহরেই ছিল।এরপর আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের আর একটি গুণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেমন নামায পড়ে আল্লাহর হক আদায় করেন, অনুরূপভাবে মানুষের হকের কথাও তারা ভুলে যান না। তাঁরা যাকাত আদায় করে থাকেন। তারা জনগণের সঙ্গে সদাচরণ করেন, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন। তাদের ধন-সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে। যেমন হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ভিক্ষুকের হক রয়েছে যদিও সে ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করতে আসে। (এ হাদীস ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর মতে মাহরূম বা বঞ্চিত হলো ঐ ব্যক্তি যার ইসলামে কোন অংশ নেই অর্থাৎ বায়তুল মালে কোন অংশ নেই, কোন কাজ-কামও হাতে নেই এবং কোন শিল্প ও কলা-কৌশলও তার জানা নেই যার দ্বারা সে জীবিকা উপার্জন করতে পারে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন যে, মাহরাম দ্বারা ঐ লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা কাজ-কাম কিছু জানে বটে, কিন্তু তা দ্বারা যা সে উপার্জন করে তা তাদের জীবন ধারণের জন্যে যথেষ্ট হয় না। যহহাক (রঃ) বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে পূর্বে ধনী ছিল; কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার মাল-ধন ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন ইয়ামামায় যখন জলোচ্ছাস হলো এবং এক ব্যক্তির সমস্ত মাল-ধন ও আসবাব পত্র পানিতে ভেসে গেল তখন একজন সাহাবী (রাঃ) বললেনঃ “এ লোকটি মাহরূম বা বঞ্চিত। অন্যান্য বুযুর্গ মুফাসসিরগণ বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে না। একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয় যে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং যাকে তুমি দু' এক গ্রাস খাবার বা দু' একটি খেজুর প্রদান করে থাকো, বরং মিসকীন ঐ ব্যক্তি যে এই পরিমাণ উপার্জন করে যা তার জন্যে যথেষ্ট নয় বা যা তার প্রয়োজন মিটায় না এবং তার এমন অবস্থা প্রকাশ পায় না যে, মানুষ তার অভাবের কথা জানতে পেরে তাকে কিছু দান করে।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) মক্কা যাচ্ছিলেন। পথে একটি কুকুর এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি যবেহকৃত একটি বকরীর কাঁধ কেটে কুকুরটির সামনে নিক্ষেপ করেন এবং বলেনঃ “লোকেরা বলে যে, এটাও মাহরূম বা বঞ্চিত।” হযরত শাবী (রঃ) বলেনঃ “আমি ‘মাহরূম এর অর্থ জানতে অপারগ হয়ে গেছি।”ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যার মাল নেই, তা যে কারণেই হোক না কেন। অর্থাৎ সে হয়তো মাল উপার্জন করতেই সক্ষম নয়, কিংবা হয়তো তার মাল ধ্বংস হয়ে গেছে কোন দুর্যোগের কারণে।”হযরত হাসান ইবনে মুহাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাফিরদেরকে দমন করার উদ্দেশ্যে একটি ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করেন এবং তাঁরা গানীমাতও লাভ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এমন কতগুলো লোক আগমন করে যারা গানীমতের মাল বন্টনের সময় উপস্থিত ছিল না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। এই ঘটনা দ্বারা তো বুঝা যায় যে, এই আয়াতটি মাদানী। কিন্তু আসলে তা নয়, বরং এটি মক্কী আয়াত। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্যে ধরিত্রীতে নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার বহু নিদর্শন রয়েছে। এগুলো মহান সৃষ্টিকর্তার মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব ও বিরাটত্ব প্রমাণ করে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, কিভাবে তিনি দুনিয়ায় জীব-জন্তু ও গাছ-পালা ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিভাবে তিনি পর্বতরাজিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, মাঠ-ময়দানকে করেছেন বিস্তৃত এবং সমুদ্র ও নদ-নদীকে করে রেখেছেন প্রবাহিত। মানুষের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তিনি তাদের বর্ণ, আকৃতি, ভাষা, কামনা-বাসনা, বিবেক-বুদ্ধি, শক্তি-সামর্থ্য বিভিন্ন প্রকারের করেছেন। তাদের অঙ্গ-ভঙ্গী তাদের পাপ পুণ্য এবং দৈহিক গঠনের কথা চিন্তা করলেও বিস্মিত হতে হয়। প্রত্যেক অঙ্গ কেমন উপযুক্ত জায়গায় রয়েছে। এ জন্যেই এরপরেই বলেছেনঃ “তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে)। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না? হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি নিজের সৃষ্টির কথা চিন্তা করবে, নিজের গ্রন্থীগুলোর বিন্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে সে অবশ্যই বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে যে, তাকে আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্যেই ।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবিকার উৎস অর্থাৎ বৃষ্টি এবং প্রতিশ্রুত সবকিছু অর্থাৎ জান্নাত।' হযরত ওয়াসিল আহদাব (রঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমার রিযক তো রয়েছে আসমানে, অথচ আমি তা অনুসন্ধান করছি যমীনে, এটা বড়ই দুঃখজনক ব্যাপারই বটে।” একথা বলে তিনি লোকালয় ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলে চলে যান। তিনি তিন দিন পর্যন্ত তো কিছুই পেলেন না। কিন্তু তৃতীয় দিনে দেখেন যে, টাটকা খেজুরের একটি গুচ্ছ তার পার্শ্বে আছে। তাঁর ভাই, যিনি তাঁর চেয়েও বেশী বিশুদ্ধ ও খাটি অন্তকরণ বিশিষ্ট লোক ছিলেন, তার সাথেই বেরিয়ে এসেছিলেন এবং তারা দুই ভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত জঙ্গলেই জীবন কাটিয়ে দেন। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বয়ং নিজেরই শপথ করে বলেনঃ আমি তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছি অর্থাৎ কিয়ামত, পুনরুত্থান, শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাদি সবই সত্য। যেমন তোমাদের মুখ হতে বের হওয়া কথায় তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে না, অনুরূপভাবে এসব বিষয়েও তোমাদের সন্দেহ করা মোটেই উচিত নয়। হযরত মুআয (রাঃ) যখন কোন কথা বলতেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে বলতেনঃ “নিশ্চয়ই এটা সত্য যেমন তুমি এখানে রয়েছে।”হযরত হাসান বসরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ কওমগুলোকে ধ্বংস করুন যাদের জন্যে তাদের প্রতিপালক (আল্লাহ) শপথ করেছেন, অতঃপর তারা তা বিশ্বাস করেনি।” (এ হাদীসটি মুরসাল। কেননা, হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন তাবেয়ী। তিনি কোন সাহাবীর (রাঃ) নাম না নিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)
আয-যারিয়াত 51:16
১৫-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা আল্লাহভীরু লোকদের পরিণামের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন তারা প্রস্রবণ বিশিষ্ট জান্নাতে অবস্থান করবে। তাদের অবস্থা হবে ঐ অসৎ লোকেদের অবস্থার বিপরীত যারা শাস্তি-সাজার মধ্যে, শংখল-জিঞ্জীরের মধ্যে এবং কঠিন মারপিটের মধ্যে থাকবে। এই মুমিনদের নিকট আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে যে দায়িত্ব ও কর্তব্য এসেছিল তা তারা যথাযথভাবে পালন করতো। আর এর পূর্বেও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতো। কিন্তু দুই কারণে এই তাফসীরের ব্যাপারে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। প্রথম কারণ এই যে, এ তাফসীর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) করেছেন এ কথা বলা হয়। কিন্তু সহীহ সনদে এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত পৌঁছে না। ওর এ সনদটি সম্পূর্ণরূপে দুর্বল। দ্বিতীয় কারণ এই যে, (আরবী) পূর্বের বাক্য হতে (আরবী) হয়েছে। সুতরাং ভাবার্থ হবেঃ আল্লাহভীরু লোকেরা জান্নাতে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতরাশি লাভ করবে। ইতিপূর্বে অর্থাৎ দুনিয়ায় তারা ভাল কাজ করতো। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (তাদেরকে বলা হবেঃ) তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪)।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের আন্তরিকতাপূর্ণ কাজের বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছেন যে, তারা রাত্রির সামান্য অংশই অতিবাহিত করতে নিদ্রায়। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এখানে শব্দটি বা নেতিবাচক। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি হিসেবে অর্থ হবেঃ তাদের উপর এমন কোন রাত্রি অতিবাহিত হতো না যার কিছু অংশ তারা আল্লাহর স্মরণে না কাটাতেন। হয় রাত্রির প্রথমাংশে কিছু নফল পড়তেন, না হয় রাত্রির মধ্যভাগে পড়তেন। অর্থাৎ প্রত্যেক রাত্রের কোন না কোন সময় কিছু না কিছু নামায অবশ্যই পড়তেন। সারা রাত তারা শুয়ে কাটিয়ে দিতেন না।হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এ লোকগুলো মাগরিব ও ইশার নামাযের মাঝে কিছু নফল নামায পড়তেন। হযরত ইমাম আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তারা ইশার নামাযের পূর্বে ঘুমাতেন না।কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের দ্রিা রাত্রে খুব কম হতো। কিছু সময় ঘুমাতেন এবং কিছু সময় জেগে থাকতেন। আর যখন ইবাদতে মনোযোগ দিতেন তখন সকাল হয়ে যেতো।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো। হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) এই আয়াতের এই ভাবার্থ বর্ণনা করার পর বলতেনঃ “বড়ই দুঃখজনক ব্যাপার যে, আমার মধ্যে এটা নেই।” তার ছাত্র খাজা হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, তিনি প্রায়ই বলতেনঃ “আমি যখন আমার আমল জান্নাতীদের আমলের সামনে রাখি তখন আমার আমলকে তাদের আমলের তুলনায় অতি নগণ্য দেখি। পক্ষান্তরে, যখন আমি আমার আমল জাহান্নামীদের আমলের সামনে রাখি তখন দেখি যে, তারা তো কল্যাণ হতে সম্পূর্ণরূপে দূরে ছিল। তারা ছিল আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকারকারী এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবনকে অবিশ্বাসকারী। সুতরাং আমার অবস্থা ঐ লোকেদের মত যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা ভাল ও মন্দ আমল মিশ্রিত করেছে।” (৯:১০২)বানু তামীম গোত্রের একটি লোক হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-কে বললোঃ “হে আবু সালমা (রঃ)! এই গুণ তো আমাদের মধ্যে নেই যে, আমরা রাত্রে খুব কম ঘুমাই? আমরা তো খুব কম সময় আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে থাকি।” তখন তিনি বললেনঃ “ঐ ব্যক্তিও বড় ভাগ্যবান যে ঘুম আসলে শুয়ে পড়ে এবং যখন জেগে ওঠে তখন আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেন, প্রথম যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন তখন জনগণ তাঁকে দেখার জন্যে ভীড় জমায়। তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আল্লাহর কসম। তার চেহারা মুবারকে আমার দৃষ্টি পড়া মাত্রই আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, এই জ্যোতির্ময় চেহারা কোন মিথ্যাবাদী লোকের হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সর্বপ্রথম যে কথা আমার কানে পৌঁছেছিল তা ছিলঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা (দরিদ্রদেরকে) খাদ্য খাওয়াতে থাকো, আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখো, (মানুষকে) সালাম দিতে থাকো এবং রাত্রে নামায আদায় করো যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে এমন কক্ষ রয়েছে যার ভিতরের অংশ বাহির হতে এবং বাহিরের অংশ ভিতর হতে দেখা যায়।” একথা শুনে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কাদের জন্যে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদের জন্যে, যারা নরম কথা বলে, (দরিদ্রদেরকে) খানা খেতে দেয় এবং রাত্রে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন তারা আল্লাহর ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যুহরী (রঃ) এবং হাসান (রঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের ভাবার্থ এই যে, তারা রাত্রির অধিকাংশ তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দেয়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করে।” হযরত যহহাক (রঃ) (আরবী) কে এর পূর্ববর্তী বাক্যের সাথে মিলিয়ে দেন এবং (আরবী) হতে শুরু বলে থাকেন। কিন্তু এই উক্তিতে বড় কৃত্রিমতা রয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো।' মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ ‘তারা নামায পড়ে। অন্যান্য তাফসীরকারগণ বলেন, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘তারা রাত্রে (ইবাদতে) দাঁড়িয়ে থাকে এবং সকাল হলে তারা নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সকালে তারা ক্ষমা প্রার্থনাকারী।” (৩:১৭) এই ক্ষমা প্রার্থনা যদি নামাযেই হয় তবে তো খুবই ভাল। সহীহ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবীদের একটি জামাআতের কয়েকটি রিওয়াইয়াত দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন শেষ তৃতীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকে তখন প্রতি রাত্রে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেনঃ “কোন তাওবাকারী আছে কি? আমি তার তাওবা কবুল করবে। কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে। ক্ষমা করে দিবো। কোন যাজ্ঞাকারী আছে কি? আমি তাকে প্রদান করবে।” ফজর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা এরূপই বলতে থাকেন।”আল্লাহ তাআলা যে হযরত ইয়াকূব (আঃ) সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি তাঁর পুত্রদেরকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।” এ ব্যাপারে অধিকাংশ তাফসীরকার বলেন যে, তাঁর এই ক্ষমা প্রার্থনা রাত্রির শেষ প্রহরেই ছিল।এরপর আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের আর একটি গুণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেমন নামায পড়ে আল্লাহর হক আদায় করেন, অনুরূপভাবে মানুষের হকের কথাও তারা ভুলে যান না। তাঁরা যাকাত আদায় করে থাকেন। তারা জনগণের সঙ্গে সদাচরণ করেন, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন। তাদের ধন-সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে। যেমন হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ভিক্ষুকের হক রয়েছে যদিও সে ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করতে আসে। (এ হাদীস ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর মতে মাহরূম বা বঞ্চিত হলো ঐ ব্যক্তি যার ইসলামে কোন অংশ নেই অর্থাৎ বায়তুল মালে কোন অংশ নেই, কোন কাজ-কামও হাতে নেই এবং কোন শিল্প ও কলা-কৌশলও তার জানা নেই যার দ্বারা সে জীবিকা উপার্জন করতে পারে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন যে, মাহরাম দ্বারা ঐ লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা কাজ-কাম কিছু জানে বটে, কিন্তু তা দ্বারা যা সে উপার্জন করে তা তাদের জীবন ধারণের জন্যে যথেষ্ট হয় না। যহহাক (রঃ) বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে পূর্বে ধনী ছিল; কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার মাল-ধন ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন ইয়ামামায় যখন জলোচ্ছাস হলো এবং এক ব্যক্তির সমস্ত মাল-ধন ও আসবাব পত্র পানিতে ভেসে গেল তখন একজন সাহাবী (রাঃ) বললেনঃ “এ লোকটি মাহরূম বা বঞ্চিত। অন্যান্য বুযুর্গ মুফাসসিরগণ বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে না। একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয় যে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং যাকে তুমি দু' এক গ্রাস খাবার বা দু' একটি খেজুর প্রদান করে থাকো, বরং মিসকীন ঐ ব্যক্তি যে এই পরিমাণ উপার্জন করে যা তার জন্যে যথেষ্ট নয় বা যা তার প্রয়োজন মিটায় না এবং তার এমন অবস্থা প্রকাশ পায় না যে, মানুষ তার অভাবের কথা জানতে পেরে তাকে কিছু দান করে।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) মক্কা যাচ্ছিলেন। পথে একটি কুকুর এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি যবেহকৃত একটি বকরীর কাঁধ কেটে কুকুরটির সামনে নিক্ষেপ করেন এবং বলেনঃ “লোকেরা বলে যে, এটাও মাহরূম বা বঞ্চিত।” হযরত শাবী (রঃ) বলেনঃ “আমি ‘মাহরূম এর অর্থ জানতে অপারগ হয়ে গেছি।”ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যার মাল নেই, তা যে কারণেই হোক না কেন। অর্থাৎ সে হয়তো মাল উপার্জন করতেই সক্ষম নয়, কিংবা হয়তো তার মাল ধ্বংস হয়ে গেছে কোন দুর্যোগের কারণে।”হযরত হাসান ইবনে মুহাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাফিরদেরকে দমন করার উদ্দেশ্যে একটি ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করেন এবং তাঁরা গানীমাতও লাভ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এমন কতগুলো লোক আগমন করে যারা গানীমতের মাল বন্টনের সময় উপস্থিত ছিল না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। এই ঘটনা দ্বারা তো বুঝা যায় যে, এই আয়াতটি মাদানী। কিন্তু আসলে তা নয়, বরং এটি মক্কী আয়াত। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্যে ধরিত্রীতে নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার বহু নিদর্শন রয়েছে। এগুলো মহান সৃষ্টিকর্তার মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব ও বিরাটত্ব প্রমাণ করে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, কিভাবে তিনি দুনিয়ায় জীব-জন্তু ও গাছ-পালা ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিভাবে তিনি পর্বতরাজিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, মাঠ-ময়দানকে করেছেন বিস্তৃত এবং সমুদ্র ও নদ-নদীকে করে রেখেছেন প্রবাহিত। মানুষের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তিনি তাদের বর্ণ, আকৃতি, ভাষা, কামনা-বাসনা, বিবেক-বুদ্ধি, শক্তি-সামর্থ্য বিভিন্ন প্রকারের করেছেন। তাদের অঙ্গ-ভঙ্গী তাদের পাপ পুণ্য এবং দৈহিক গঠনের কথা চিন্তা করলেও বিস্মিত হতে হয়। প্রত্যেক অঙ্গ কেমন উপযুক্ত জায়গায় রয়েছে। এ জন্যেই এরপরেই বলেছেনঃ “তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে)। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না? হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি নিজের সৃষ্টির কথা চিন্তা করবে, নিজের গ্রন্থীগুলোর বিন্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে সে অবশ্যই বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে যে, তাকে আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্যেই ।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবিকার উৎস অর্থাৎ বৃষ্টি এবং প্রতিশ্রুত সবকিছু অর্থাৎ জান্নাত।' হযরত ওয়াসিল আহদাব (রঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমার রিযক তো রয়েছে আসমানে, অথচ আমি তা অনুসন্ধান করছি যমীনে, এটা বড়ই দুঃখজনক ব্যাপারই বটে।” একথা বলে তিনি লোকালয় ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলে চলে যান। তিনি তিন দিন পর্যন্ত তো কিছুই পেলেন না। কিন্তু তৃতীয় দিনে দেখেন যে, টাটকা খেজুরের একটি গুচ্ছ তার পার্শ্বে আছে। তাঁর ভাই, যিনি তাঁর চেয়েও বেশী বিশুদ্ধ ও খাটি অন্তকরণ বিশিষ্ট লোক ছিলেন, তার সাথেই বেরিয়ে এসেছিলেন এবং তারা দুই ভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত জঙ্গলেই জীবন কাটিয়ে দেন। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বয়ং নিজেরই শপথ করে বলেনঃ আমি তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছি অর্থাৎ কিয়ামত, পুনরুত্থান, শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাদি সবই সত্য। যেমন তোমাদের মুখ হতে বের হওয়া কথায় তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে না, অনুরূপভাবে এসব বিষয়েও তোমাদের সন্দেহ করা মোটেই উচিত নয়। হযরত মুআয (রাঃ) যখন কোন কথা বলতেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে বলতেনঃ “নিশ্চয়ই এটা সত্য যেমন তুমি এখানে রয়েছে।”হযরত হাসান বসরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ কওমগুলোকে ধ্বংস করুন যাদের জন্যে তাদের প্রতিপালক (আল্লাহ) শপথ করেছেন, অতঃপর তারা তা বিশ্বাস করেনি।” (এ হাদীসটি মুরসাল। কেননা, হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন তাবেয়ী। তিনি কোন সাহাবীর (রাঃ) নাম না নিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)
আয-যারিয়াত 51:17
১৫-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা আল্লাহভীরু লোকদের পরিণামের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন তারা প্রস্রবণ বিশিষ্ট জান্নাতে অবস্থান করবে। তাদের অবস্থা হবে ঐ অসৎ লোকেদের অবস্থার বিপরীত যারা শাস্তি-সাজার মধ্যে, শংখল-জিঞ্জীরের মধ্যে এবং কঠিন মারপিটের মধ্যে থাকবে। এই মুমিনদের নিকট আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে যে দায়িত্ব ও কর্তব্য এসেছিল তা তারা যথাযথভাবে পালন করতো। আর এর পূর্বেও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতো। কিন্তু দুই কারণে এই তাফসীরের ব্যাপারে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। প্রথম কারণ এই যে, এ তাফসীর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) করেছেন এ কথা বলা হয়। কিন্তু সহীহ সনদে এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত পৌঁছে না। ওর এ সনদটি সম্পূর্ণরূপে দুর্বল। দ্বিতীয় কারণ এই যে, (আরবী) পূর্বের বাক্য হতে (আরবী) হয়েছে। সুতরাং ভাবার্থ হবেঃ আল্লাহভীরু লোকেরা জান্নাতে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতরাশি লাভ করবে। ইতিপূর্বে অর্থাৎ দুনিয়ায় তারা ভাল কাজ করতো। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (তাদেরকে বলা হবেঃ) তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪)।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের আন্তরিকতাপূর্ণ কাজের বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছেন যে, তারা রাত্রির সামান্য অংশই অতিবাহিত করতে নিদ্রায়। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এখানে শব্দটি বা নেতিবাচক। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি হিসেবে অর্থ হবেঃ তাদের উপর এমন কোন রাত্রি অতিবাহিত হতো না যার কিছু অংশ তারা আল্লাহর স্মরণে না কাটাতেন। হয় রাত্রির প্রথমাংশে কিছু নফল পড়তেন, না হয় রাত্রির মধ্যভাগে পড়তেন। অর্থাৎ প্রত্যেক রাত্রের কোন না কোন সময় কিছু না কিছু নামায অবশ্যই পড়তেন। সারা রাত তারা শুয়ে কাটিয়ে দিতেন না।হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এ লোকগুলো মাগরিব ও ইশার নামাযের মাঝে কিছু নফল নামায পড়তেন। হযরত ইমাম আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তারা ইশার নামাযের পূর্বে ঘুমাতেন না।কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের দ্রিা রাত্রে খুব কম হতো। কিছু সময় ঘুমাতেন এবং কিছু সময় জেগে থাকতেন। আর যখন ইবাদতে মনোযোগ দিতেন তখন সকাল হয়ে যেতো।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো। হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) এই আয়াতের এই ভাবার্থ বর্ণনা করার পর বলতেনঃ “বড়ই দুঃখজনক ব্যাপার যে, আমার মধ্যে এটা নেই।” তার ছাত্র খাজা হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, তিনি প্রায়ই বলতেনঃ “আমি যখন আমার আমল জান্নাতীদের আমলের সামনে রাখি তখন আমার আমলকে তাদের আমলের তুলনায় অতি নগণ্য দেখি। পক্ষান্তরে, যখন আমি আমার আমল জাহান্নামীদের আমলের সামনে রাখি তখন দেখি যে, তারা তো কল্যাণ হতে সম্পূর্ণরূপে দূরে ছিল। তারা ছিল আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকারকারী এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবনকে অবিশ্বাসকারী। সুতরাং আমার অবস্থা ঐ লোকেদের মত যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা ভাল ও মন্দ আমল মিশ্রিত করেছে।” (৯:১০২)বানু তামীম গোত্রের একটি লোক হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-কে বললোঃ “হে আবু সালমা (রঃ)! এই গুণ তো আমাদের মধ্যে নেই যে, আমরা রাত্রে খুব কম ঘুমাই? আমরা তো খুব কম সময় আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে থাকি।” তখন তিনি বললেনঃ “ঐ ব্যক্তিও বড় ভাগ্যবান যে ঘুম আসলে শুয়ে পড়ে এবং যখন জেগে ওঠে তখন আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেন, প্রথম যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন তখন জনগণ তাঁকে দেখার জন্যে ভীড় জমায়। তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আল্লাহর কসম। তার চেহারা মুবারকে আমার দৃষ্টি পড়া মাত্রই আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, এই জ্যোতির্ময় চেহারা কোন মিথ্যাবাদী লোকের হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সর্বপ্রথম যে কথা আমার কানে পৌঁছেছিল তা ছিলঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা (দরিদ্রদেরকে) খাদ্য খাওয়াতে থাকো, আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখো, (মানুষকে) সালাম দিতে থাকো এবং রাত্রে নামায আদায় করো যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে এমন কক্ষ রয়েছে যার ভিতরের অংশ বাহির হতে এবং বাহিরের অংশ ভিতর হতে দেখা যায়।” একথা শুনে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কাদের জন্যে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদের জন্যে, যারা নরম কথা বলে, (দরিদ্রদেরকে) খানা খেতে দেয় এবং রাত্রে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন তারা আল্লাহর ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যুহরী (রঃ) এবং হাসান (রঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের ভাবার্থ এই যে, তারা রাত্রির অধিকাংশ তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দেয়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করে।” হযরত যহহাক (রঃ) (আরবী) কে এর পূর্ববর্তী বাক্যের সাথে মিলিয়ে দেন এবং (আরবী) হতে শুরু বলে থাকেন। কিন্তু এই উক্তিতে বড় কৃত্রিমতা রয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো।' মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ ‘তারা নামায পড়ে। অন্যান্য তাফসীরকারগণ বলেন, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘তারা রাত্রে (ইবাদতে) দাঁড়িয়ে থাকে এবং সকাল হলে তারা নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সকালে তারা ক্ষমা প্রার্থনাকারী।” (৩:১৭) এই ক্ষমা প্রার্থনা যদি নামাযেই হয় তবে তো খুবই ভাল। সহীহ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবীদের একটি জামাআতের কয়েকটি রিওয়াইয়াত দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন শেষ তৃতীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকে তখন প্রতি রাত্রে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেনঃ “কোন তাওবাকারী আছে কি? আমি তার তাওবা কবুল করবে। কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে। ক্ষমা করে দিবো। কোন যাজ্ঞাকারী আছে কি? আমি তাকে প্রদান করবে।” ফজর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা এরূপই বলতে থাকেন।”আল্লাহ তাআলা যে হযরত ইয়াকূব (আঃ) সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি তাঁর পুত্রদেরকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।” এ ব্যাপারে অধিকাংশ তাফসীরকার বলেন যে, তাঁর এই ক্ষমা প্রার্থনা রাত্রির শেষ প্রহরেই ছিল।এরপর আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের আর একটি গুণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেমন নামায পড়ে আল্লাহর হক আদায় করেন, অনুরূপভাবে মানুষের হকের কথাও তারা ভুলে যান না। তাঁরা যাকাত আদায় করে থাকেন। তারা জনগণের সঙ্গে সদাচরণ করেন, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন। তাদের ধন-সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে। যেমন হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ভিক্ষুকের হক রয়েছে যদিও সে ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করতে আসে। (এ হাদীস ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর মতে মাহরূম বা বঞ্চিত হলো ঐ ব্যক্তি যার ইসলামে কোন অংশ নেই অর্থাৎ বায়তুল মালে কোন অংশ নেই, কোন কাজ-কামও হাতে নেই এবং কোন শিল্প ও কলা-কৌশলও তার জানা নেই যার দ্বারা সে জীবিকা উপার্জন করতে পারে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন যে, মাহরাম দ্বারা ঐ লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা কাজ-কাম কিছু জানে বটে, কিন্তু তা দ্বারা যা সে উপার্জন করে তা তাদের জীবন ধারণের জন্যে যথেষ্ট হয় না। যহহাক (রঃ) বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে পূর্বে ধনী ছিল; কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার মাল-ধন ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন ইয়ামামায় যখন জলোচ্ছাস হলো এবং এক ব্যক্তির সমস্ত মাল-ধন ও আসবাব পত্র পানিতে ভেসে গেল তখন একজন সাহাবী (রাঃ) বললেনঃ “এ লোকটি মাহরূম বা বঞ্চিত। অন্যান্য বুযুর্গ মুফাসসিরগণ বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে না। একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয় যে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং যাকে তুমি দু' এক গ্রাস খাবার বা দু' একটি খেজুর প্রদান করে থাকো, বরং মিসকীন ঐ ব্যক্তি যে এই পরিমাণ উপার্জন করে যা তার জন্যে যথেষ্ট নয় বা যা তার প্রয়োজন মিটায় না এবং তার এমন অবস্থা প্রকাশ পায় না যে, মানুষ তার অভাবের কথা জানতে পেরে তাকে কিছু দান করে।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) মক্কা যাচ্ছিলেন। পথে একটি কুকুর এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি যবেহকৃত একটি বকরীর কাঁধ কেটে কুকুরটির সামনে নিক্ষেপ করেন এবং বলেনঃ “লোকেরা বলে যে, এটাও মাহরূম বা বঞ্চিত।” হযরত শাবী (রঃ) বলেনঃ “আমি ‘মাহরূম এর অর্থ জানতে অপারগ হয়ে গেছি।”ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যার মাল নেই, তা যে কারণেই হোক না কেন। অর্থাৎ সে হয়তো মাল উপার্জন করতেই সক্ষম নয়, কিংবা হয়তো তার মাল ধ্বংস হয়ে গেছে কোন দুর্যোগের কারণে।”হযরত হাসান ইবনে মুহাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাফিরদেরকে দমন করার উদ্দেশ্যে একটি ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করেন এবং তাঁরা গানীমাতও লাভ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এমন কতগুলো লোক আগমন করে যারা গানীমতের মাল বন্টনের সময় উপস্থিত ছিল না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। এই ঘটনা দ্বারা তো বুঝা যায় যে, এই আয়াতটি মাদানী। কিন্তু আসলে তা নয়, বরং এটি মক্কী আয়াত। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্যে ধরিত্রীতে নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার বহু নিদর্শন রয়েছে। এগুলো মহান সৃষ্টিকর্তার মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব ও বিরাটত্ব প্রমাণ করে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, কিভাবে তিনি দুনিয়ায় জীব-জন্তু ও গাছ-পালা ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিভাবে তিনি পর্বতরাজিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, মাঠ-ময়দানকে করেছেন বিস্তৃত এবং সমুদ্র ও নদ-নদীকে করে রেখেছেন প্রবাহিত। মানুষের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তিনি তাদের বর্ণ, আকৃতি, ভাষা, কামনা-বাসনা, বিবেক-বুদ্ধি, শক্তি-সামর্থ্য বিভিন্ন প্রকারের করেছেন। তাদের অঙ্গ-ভঙ্গী তাদের পাপ পুণ্য এবং দৈহিক গঠনের কথা চিন্তা করলেও বিস্মিত হতে হয়। প্রত্যেক অঙ্গ কেমন উপযুক্ত জায়গায় রয়েছে। এ জন্যেই এরপরেই বলেছেনঃ “তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে)। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না? হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি নিজের সৃষ্টির কথা চিন্তা করবে, নিজের গ্রন্থীগুলোর বিন্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে সে অবশ্যই বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে যে, তাকে আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্যেই ।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবিকার উৎস অর্থাৎ বৃষ্টি এবং প্রতিশ্রুত সবকিছু অর্থাৎ জান্নাত।' হযরত ওয়াসিল আহদাব (রঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমার রিযক তো রয়েছে আসমানে, অথচ আমি তা অনুসন্ধান করছি যমীনে, এটা বড়ই দুঃখজনক ব্যাপারই বটে।” একথা বলে তিনি লোকালয় ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলে চলে যান। তিনি তিন দিন পর্যন্ত তো কিছুই পেলেন না। কিন্তু তৃতীয় দিনে দেখেন যে, টাটকা খেজুরের একটি গুচ্ছ তার পার্শ্বে আছে। তাঁর ভাই, যিনি তাঁর চেয়েও বেশী বিশুদ্ধ ও খাটি অন্তকরণ বিশিষ্ট লোক ছিলেন, তার সাথেই বেরিয়ে এসেছিলেন এবং তারা দুই ভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত জঙ্গলেই জীবন কাটিয়ে দেন। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বয়ং নিজেরই শপথ করে বলেনঃ আমি তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছি অর্থাৎ কিয়ামত, পুনরুত্থান, শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাদি সবই সত্য। যেমন তোমাদের মুখ হতে বের হওয়া কথায় তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে না, অনুরূপভাবে এসব বিষয়েও তোমাদের সন্দেহ করা মোটেই উচিত নয়। হযরত মুআয (রাঃ) যখন কোন কথা বলতেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে বলতেনঃ “নিশ্চয়ই এটা সত্য যেমন তুমি এখানে রয়েছে।”হযরত হাসান বসরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ কওমগুলোকে ধ্বংস করুন যাদের জন্যে তাদের প্রতিপালক (আল্লাহ) শপথ করেছেন, অতঃপর তারা তা বিশ্বাস করেনি।” (এ হাদীসটি মুরসাল। কেননা, হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন তাবেয়ী। তিনি কোন সাহাবীর (রাঃ) নাম না নিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)
আয-যারিয়াত 51:18
১৫-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা আল্লাহভীরু লোকদের পরিণামের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন তারা প্রস্রবণ বিশিষ্ট জান্নাতে অবস্থান করবে। তাদের অবস্থা হবে ঐ অসৎ লোকেদের অবস্থার বিপরীত যারা শাস্তি-সাজার মধ্যে, শংখল-জিঞ্জীরের মধ্যে এবং কঠিন মারপিটের মধ্যে থাকবে। এই মুমিনদের নিকট আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে যে দায়িত্ব ও কর্তব্য এসেছিল তা তারা যথাযথভাবে পালন করতো। আর এর পূর্বেও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতো। কিন্তু দুই কারণে এই তাফসীরের ব্যাপারে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। প্রথম কারণ এই যে, এ তাফসীর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) করেছেন এ কথা বলা হয়। কিন্তু সহীহ সনদে এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত পৌঁছে না। ওর এ সনদটি সম্পূর্ণরূপে দুর্বল। দ্বিতীয় কারণ এই যে, (আরবী) পূর্বের বাক্য হতে (আরবী) হয়েছে। সুতরাং ভাবার্থ হবেঃ আল্লাহভীরু লোকেরা জান্নাতে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতরাশি লাভ করবে। ইতিপূর্বে অর্থাৎ দুনিয়ায় তারা ভাল কাজ করতো। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (তাদেরকে বলা হবেঃ) তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪)।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের আন্তরিকতাপূর্ণ কাজের বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছেন যে, তারা রাত্রির সামান্য অংশই অতিবাহিত করতে নিদ্রায়। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এখানে শব্দটি বা নেতিবাচক। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি হিসেবে অর্থ হবেঃ তাদের উপর এমন কোন রাত্রি অতিবাহিত হতো না যার কিছু অংশ তারা আল্লাহর স্মরণে না কাটাতেন। হয় রাত্রির প্রথমাংশে কিছু নফল পড়তেন, না হয় রাত্রির মধ্যভাগে পড়তেন। অর্থাৎ প্রত্যেক রাত্রের কোন না কোন সময় কিছু না কিছু নামায অবশ্যই পড়তেন। সারা রাত তারা শুয়ে কাটিয়ে দিতেন না।হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এ লোকগুলো মাগরিব ও ইশার নামাযের মাঝে কিছু নফল নামায পড়তেন। হযরত ইমাম আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তারা ইশার নামাযের পূর্বে ঘুমাতেন না।কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের দ্রিা রাত্রে খুব কম হতো। কিছু সময় ঘুমাতেন এবং কিছু সময় জেগে থাকতেন। আর যখন ইবাদতে মনোযোগ দিতেন তখন সকাল হয়ে যেতো।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো। হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) এই আয়াতের এই ভাবার্থ বর্ণনা করার পর বলতেনঃ “বড়ই দুঃখজনক ব্যাপার যে, আমার মধ্যে এটা নেই।” তার ছাত্র খাজা হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, তিনি প্রায়ই বলতেনঃ “আমি যখন আমার আমল জান্নাতীদের আমলের সামনে রাখি তখন আমার আমলকে তাদের আমলের তুলনায় অতি নগণ্য দেখি। পক্ষান্তরে, যখন আমি আমার আমল জাহান্নামীদের আমলের সামনে রাখি তখন দেখি যে, তারা তো কল্যাণ হতে সম্পূর্ণরূপে দূরে ছিল। তারা ছিল আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকারকারী এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবনকে অবিশ্বাসকারী। সুতরাং আমার অবস্থা ঐ লোকেদের মত যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা ভাল ও মন্দ আমল মিশ্রিত করেছে।” (৯:১০২)বানু তামীম গোত্রের একটি লোক হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-কে বললোঃ “হে আবু সালমা (রঃ)! এই গুণ তো আমাদের মধ্যে নেই যে, আমরা রাত্রে খুব কম ঘুমাই? আমরা তো খুব কম সময় আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে থাকি।” তখন তিনি বললেনঃ “ঐ ব্যক্তিও বড় ভাগ্যবান যে ঘুম আসলে শুয়ে পড়ে এবং যখন জেগে ওঠে তখন আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেন, প্রথম যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন তখন জনগণ তাঁকে দেখার জন্যে ভীড় জমায়। তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আল্লাহর কসম। তার চেহারা মুবারকে আমার দৃষ্টি পড়া মাত্রই আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, এই জ্যোতির্ময় চেহারা কোন মিথ্যাবাদী লোকের হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সর্বপ্রথম যে কথা আমার কানে পৌঁছেছিল তা ছিলঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা (দরিদ্রদেরকে) খাদ্য খাওয়াতে থাকো, আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখো, (মানুষকে) সালাম দিতে থাকো এবং রাত্রে নামায আদায় করো যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে এমন কক্ষ রয়েছে যার ভিতরের অংশ বাহির হতে এবং বাহিরের অংশ ভিতর হতে দেখা যায়।” একথা শুনে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কাদের জন্যে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদের জন্যে, যারা নরম কথা বলে, (দরিদ্রদেরকে) খানা খেতে দেয় এবং রাত্রে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন তারা আল্লাহর ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যুহরী (রঃ) এবং হাসান (রঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের ভাবার্থ এই যে, তারা রাত্রির অধিকাংশ তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দেয়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করে।” হযরত যহহাক (রঃ) (আরবী) কে এর পূর্ববর্তী বাক্যের সাথে মিলিয়ে দেন এবং (আরবী) হতে শুরু বলে থাকেন। কিন্তু এই উক্তিতে বড় কৃত্রিমতা রয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো।' মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ ‘তারা নামায পড়ে। অন্যান্য তাফসীরকারগণ বলেন, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘তারা রাত্রে (ইবাদতে) দাঁড়িয়ে থাকে এবং সকাল হলে তারা নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সকালে তারা ক্ষমা প্রার্থনাকারী।” (৩:১৭) এই ক্ষমা প্রার্থনা যদি নামাযেই হয় তবে তো খুবই ভাল। সহীহ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবীদের একটি জামাআতের কয়েকটি রিওয়াইয়াত দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন শেষ তৃতীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকে তখন প্রতি রাত্রে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেনঃ “কোন তাওবাকারী আছে কি? আমি তার তাওবা কবুল করবে। কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে। ক্ষমা করে দিবো। কোন যাজ্ঞাকারী আছে কি? আমি তাকে প্রদান করবে।” ফজর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা এরূপই বলতে থাকেন।”আল্লাহ তাআলা যে হযরত ইয়াকূব (আঃ) সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি তাঁর পুত্রদেরকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।” এ ব্যাপারে অধিকাংশ তাফসীরকার বলেন যে, তাঁর এই ক্ষমা প্রার্থনা রাত্রির শেষ প্রহরেই ছিল।এরপর আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের আর একটি গুণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেমন নামায পড়ে আল্লাহর হক আদায় করেন, অনুরূপভাবে মানুষের হকের কথাও তারা ভুলে যান না। তাঁরা যাকাত আদায় করে থাকেন। তারা জনগণের সঙ্গে সদাচরণ করেন, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন। তাদের ধন-সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে। যেমন হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ভিক্ষুকের হক রয়েছে যদিও সে ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করতে আসে। (এ হাদীস ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর মতে মাহরূম বা বঞ্চিত হলো ঐ ব্যক্তি যার ইসলামে কোন অংশ নেই অর্থাৎ বায়তুল মালে কোন অংশ নেই, কোন কাজ-কামও হাতে নেই এবং কোন শিল্প ও কলা-কৌশলও তার জানা নেই যার দ্বারা সে জীবিকা উপার্জন করতে পারে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন যে, মাহরাম দ্বারা ঐ লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা কাজ-কাম কিছু জানে বটে, কিন্তু তা দ্বারা যা সে উপার্জন করে তা তাদের জীবন ধারণের জন্যে যথেষ্ট হয় না। যহহাক (রঃ) বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে পূর্বে ধনী ছিল; কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার মাল-ধন ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন ইয়ামামায় যখন জলোচ্ছাস হলো এবং এক ব্যক্তির সমস্ত মাল-ধন ও আসবাব পত্র পানিতে ভেসে গেল তখন একজন সাহাবী (রাঃ) বললেনঃ “এ লোকটি মাহরূম বা বঞ্চিত। অন্যান্য বুযুর্গ মুফাসসিরগণ বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে না। একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয় যে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং যাকে তুমি দু' এক গ্রাস খাবার বা দু' একটি খেজুর প্রদান করে থাকো, বরং মিসকীন ঐ ব্যক্তি যে এই পরিমাণ উপার্জন করে যা তার জন্যে যথেষ্ট নয় বা যা তার প্রয়োজন মিটায় না এবং তার এমন অবস্থা প্রকাশ পায় না যে, মানুষ তার অভাবের কথা জানতে পেরে তাকে কিছু দান করে।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) মক্কা যাচ্ছিলেন। পথে একটি কুকুর এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি যবেহকৃত একটি বকরীর কাঁধ কেটে কুকুরটির সামনে নিক্ষেপ করেন এবং বলেনঃ “লোকেরা বলে যে, এটাও মাহরূম বা বঞ্চিত।” হযরত শাবী (রঃ) বলেনঃ “আমি ‘মাহরূম এর অর্থ জানতে অপারগ হয়ে গেছি।”ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যার মাল নেই, তা যে কারণেই হোক না কেন। অর্থাৎ সে হয়তো মাল উপার্জন করতেই সক্ষম নয়, কিংবা হয়তো তার মাল ধ্বংস হয়ে গেছে কোন দুর্যোগের কারণে।”হযরত হাসান ইবনে মুহাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাফিরদেরকে দমন করার উদ্দেশ্যে একটি ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করেন এবং তাঁরা গানীমাতও লাভ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এমন কতগুলো লোক আগমন করে যারা গানীমতের মাল বন্টনের সময় উপস্থিত ছিল না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। এই ঘটনা দ্বারা তো বুঝা যায় যে, এই আয়াতটি মাদানী। কিন্তু আসলে তা নয়, বরং এটি মক্কী আয়াত। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্যে ধরিত্রীতে নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার বহু নিদর্শন রয়েছে। এগুলো মহান সৃষ্টিকর্তার মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব ও বিরাটত্ব প্রমাণ করে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, কিভাবে তিনি দুনিয়ায় জীব-জন্তু ও গাছ-পালা ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিভাবে তিনি পর্বতরাজিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, মাঠ-ময়দানকে করেছেন বিস্তৃত এবং সমুদ্র ও নদ-নদীকে করে রেখেছেন প্রবাহিত। মানুষের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তিনি তাদের বর্ণ, আকৃতি, ভাষা, কামনা-বাসনা, বিবেক-বুদ্ধি, শক্তি-সামর্থ্য বিভিন্ন প্রকারের করেছেন। তাদের অঙ্গ-ভঙ্গী তাদের পাপ পুণ্য এবং দৈহিক গঠনের কথা চিন্তা করলেও বিস্মিত হতে হয়। প্রত্যেক অঙ্গ কেমন উপযুক্ত জায়গায় রয়েছে। এ জন্যেই এরপরেই বলেছেনঃ “তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে)। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না? হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি নিজের সৃষ্টির কথা চিন্তা করবে, নিজের গ্রন্থীগুলোর বিন্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে সে অবশ্যই বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে যে, তাকে আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্যেই ।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবিকার উৎস অর্থাৎ বৃষ্টি এবং প্রতিশ্রুত সবকিছু অর্থাৎ জান্নাত।' হযরত ওয়াসিল আহদাব (রঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমার রিযক তো রয়েছে আসমানে, অথচ আমি তা অনুসন্ধান করছি যমীনে, এটা বড়ই দুঃখজনক ব্যাপারই বটে।” একথা বলে তিনি লোকালয় ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলে চলে যান। তিনি তিন দিন পর্যন্ত তো কিছুই পেলেন না। কিন্তু তৃতীয় দিনে দেখেন যে, টাটকা খেজুরের একটি গুচ্ছ তার পার্শ্বে আছে। তাঁর ভাই, যিনি তাঁর চেয়েও বেশী বিশুদ্ধ ও খাটি অন্তকরণ বিশিষ্ট লোক ছিলেন, তার সাথেই বেরিয়ে এসেছিলেন এবং তারা দুই ভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত জঙ্গলেই জীবন কাটিয়ে দেন। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বয়ং নিজেরই শপথ করে বলেনঃ আমি তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছি অর্থাৎ কিয়ামত, পুনরুত্থান, শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাদি সবই সত্য। যেমন তোমাদের মুখ হতে বের হওয়া কথায় তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে না, অনুরূপভাবে এসব বিষয়েও তোমাদের সন্দেহ করা মোটেই উচিত নয়। হযরত মুআয (রাঃ) যখন কোন কথা বলতেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে বলতেনঃ “নিশ্চয়ই এটা সত্য যেমন তুমি এখানে রয়েছে।”হযরত হাসান বসরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ কওমগুলোকে ধ্বংস করুন যাদের জন্যে তাদের প্রতিপালক (আল্লাহ) শপথ করেছেন, অতঃপর তারা তা বিশ্বাস করেনি।” (এ হাদীসটি মুরসাল। কেননা, হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন তাবেয়ী। তিনি কোন সাহাবীর (রাঃ) নাম না নিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)
আয-যারিয়াত 51:19
১৫-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা আল্লাহভীরু লোকদের পরিণামের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন তারা প্রস্রবণ বিশিষ্ট জান্নাতে অবস্থান করবে। তাদের অবস্থা হবে ঐ অসৎ লোকেদের অবস্থার বিপরীত যারা শাস্তি-সাজার মধ্যে, শংখল-জিঞ্জীরের মধ্যে এবং কঠিন মারপিটের মধ্যে থাকবে। এই মুমিনদের নিকট আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে যে দায়িত্ব ও কর্তব্য এসেছিল তা তারা যথাযথভাবে পালন করতো। আর এর পূর্বেও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতো। কিন্তু দুই কারণে এই তাফসীরের ব্যাপারে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। প্রথম কারণ এই যে, এ তাফসীর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) করেছেন এ কথা বলা হয়। কিন্তু সহীহ সনদে এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত পৌঁছে না। ওর এ সনদটি সম্পূর্ণরূপে দুর্বল। দ্বিতীয় কারণ এই যে, (আরবী) পূর্বের বাক্য হতে (আরবী) হয়েছে। সুতরাং ভাবার্থ হবেঃ আল্লাহভীরু লোকেরা জান্নাতে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতরাশি লাভ করবে। ইতিপূর্বে অর্থাৎ দুনিয়ায় তারা ভাল কাজ করতো। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (তাদেরকে বলা হবেঃ) তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪)।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের আন্তরিকতাপূর্ণ কাজের বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছেন যে, তারা রাত্রির সামান্য অংশই অতিবাহিত করতে নিদ্রায়। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এখানে শব্দটি বা নেতিবাচক। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি হিসেবে অর্থ হবেঃ তাদের উপর এমন কোন রাত্রি অতিবাহিত হতো না যার কিছু অংশ তারা আল্লাহর স্মরণে না কাটাতেন। হয় রাত্রির প্রথমাংশে কিছু নফল পড়তেন, না হয় রাত্রির মধ্যভাগে পড়তেন। অর্থাৎ প্রত্যেক রাত্রের কোন না কোন সময় কিছু না কিছু নামায অবশ্যই পড়তেন। সারা রাত তারা শুয়ে কাটিয়ে দিতেন না।হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এ লোকগুলো মাগরিব ও ইশার নামাযের মাঝে কিছু নফল নামায পড়তেন। হযরত ইমাম আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তারা ইশার নামাযের পূর্বে ঘুমাতেন না।কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের দ্রিা রাত্রে খুব কম হতো। কিছু সময় ঘুমাতেন এবং কিছু সময় জেগে থাকতেন। আর যখন ইবাদতে মনোযোগ দিতেন তখন সকাল হয়ে যেতো।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো। হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) এই আয়াতের এই ভাবার্থ বর্ণনা করার পর বলতেনঃ “বড়ই দুঃখজনক ব্যাপার যে, আমার মধ্যে এটা নেই।” তার ছাত্র খাজা হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, তিনি প্রায়ই বলতেনঃ “আমি যখন আমার আমল জান্নাতীদের আমলের সামনে রাখি তখন আমার আমলকে তাদের আমলের তুলনায় অতি নগণ্য দেখি। পক্ষান্তরে, যখন আমি আমার আমল জাহান্নামীদের আমলের সামনে রাখি তখন দেখি যে, তারা তো কল্যাণ হতে সম্পূর্ণরূপে দূরে ছিল। তারা ছিল আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকারকারী এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবনকে অবিশ্বাসকারী। সুতরাং আমার অবস্থা ঐ লোকেদের মত যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা ভাল ও মন্দ আমল মিশ্রিত করেছে।” (৯:১০২)বানু তামীম গোত্রের একটি লোক হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-কে বললোঃ “হে আবু সালমা (রঃ)! এই গুণ তো আমাদের মধ্যে নেই যে, আমরা রাত্রে খুব কম ঘুমাই? আমরা তো খুব কম সময় আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে থাকি।” তখন তিনি বললেনঃ “ঐ ব্যক্তিও বড় ভাগ্যবান যে ঘুম আসলে শুয়ে পড়ে এবং যখন জেগে ওঠে তখন আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেন, প্রথম যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন তখন জনগণ তাঁকে দেখার জন্যে ভীড় জমায়। তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আল্লাহর কসম। তার চেহারা মুবারকে আমার দৃষ্টি পড়া মাত্রই আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, এই জ্যোতির্ময় চেহারা কোন মিথ্যাবাদী লোকের হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সর্বপ্রথম যে কথা আমার কানে পৌঁছেছিল তা ছিলঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা (দরিদ্রদেরকে) খাদ্য খাওয়াতে থাকো, আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখো, (মানুষকে) সালাম দিতে থাকো এবং রাত্রে নামায আদায় করো যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে এমন কক্ষ রয়েছে যার ভিতরের অংশ বাহির হতে এবং বাহিরের অংশ ভিতর হতে দেখা যায়।” একথা শুনে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কাদের জন্যে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদের জন্যে, যারা নরম কথা বলে, (দরিদ্রদেরকে) খানা খেতে দেয় এবং রাত্রে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন তারা আল্লাহর ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যুহরী (রঃ) এবং হাসান (রঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের ভাবার্থ এই যে, তারা রাত্রির অধিকাংশ তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দেয়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করে।” হযরত যহহাক (রঃ) (আরবী) কে এর পূর্ববর্তী বাক্যের সাথে মিলিয়ে দেন এবং (আরবী) হতে শুরু বলে থাকেন। কিন্তু এই উক্তিতে বড় কৃত্রিমতা রয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো।' মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ ‘তারা নামায পড়ে। অন্যান্য তাফসীরকারগণ বলেন, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘তারা রাত্রে (ইবাদতে) দাঁড়িয়ে থাকে এবং সকাল হলে তারা নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সকালে তারা ক্ষমা প্রার্থনাকারী।” (৩:১৭) এই ক্ষমা প্রার্থনা যদি নামাযেই হয় তবে তো খুবই ভাল। সহীহ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবীদের একটি জামাআতের কয়েকটি রিওয়াইয়াত দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন শেষ তৃতীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকে তখন প্রতি রাত্রে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেনঃ “কোন তাওবাকারী আছে কি? আমি তার তাওবা কবুল করবে। কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে। ক্ষমা করে দিবো। কোন যাজ্ঞাকারী আছে কি? আমি তাকে প্রদান করবে।” ফজর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা এরূপই বলতে থাকেন।”আল্লাহ তাআলা যে হযরত ইয়াকূব (আঃ) সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি তাঁর পুত্রদেরকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।” এ ব্যাপারে অধিকাংশ তাফসীরকার বলেন যে, তাঁর এই ক্ষমা প্রার্থনা রাত্রির শেষ প্রহরেই ছিল।এরপর আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের আর একটি গুণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেমন নামায পড়ে আল্লাহর হক আদায় করেন, অনুরূপভাবে মানুষের হকের কথাও তারা ভুলে যান না। তাঁরা যাকাত আদায় করে থাকেন। তারা জনগণের সঙ্গে সদাচরণ করেন, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন। তাদের ধন-সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে। যেমন হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ভিক্ষুকের হক রয়েছে যদিও সে ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করতে আসে। (এ হাদীস ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর মতে মাহরূম বা বঞ্চিত হলো ঐ ব্যক্তি যার ইসলামে কোন অংশ নেই অর্থাৎ বায়তুল মালে কোন অংশ নেই, কোন কাজ-কামও হাতে নেই এবং কোন শিল্প ও কলা-কৌশলও তার জানা নেই যার দ্বারা সে জীবিকা উপার্জন করতে পারে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন যে, মাহরাম দ্বারা ঐ লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা কাজ-কাম কিছু জানে বটে, কিন্তু তা দ্বারা যা সে উপার্জন করে তা তাদের জীবন ধারণের জন্যে যথেষ্ট হয় না। যহহাক (রঃ) বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে পূর্বে ধনী ছিল; কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার মাল-ধন ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন ইয়ামামায় যখন জলোচ্ছাস হলো এবং এক ব্যক্তির সমস্ত মাল-ধন ও আসবাব পত্র পানিতে ভেসে গেল তখন একজন সাহাবী (রাঃ) বললেনঃ “এ লোকটি মাহরূম বা বঞ্চিত। অন্যান্য বুযুর্গ মুফাসসিরগণ বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে না। একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয় যে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং যাকে তুমি দু' এক গ্রাস খাবার বা দু' একটি খেজুর প্রদান করে থাকো, বরং মিসকীন ঐ ব্যক্তি যে এই পরিমাণ উপার্জন করে যা তার জন্যে যথেষ্ট নয় বা যা তার প্রয়োজন মিটায় না এবং তার এমন অবস্থা প্রকাশ পায় না যে, মানুষ তার অভাবের কথা জানতে পেরে তাকে কিছু দান করে।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) মক্কা যাচ্ছিলেন। পথে একটি কুকুর এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি যবেহকৃত একটি বকরীর কাঁধ কেটে কুকুরটির সামনে নিক্ষেপ করেন এবং বলেনঃ “লোকেরা বলে যে, এটাও মাহরূম বা বঞ্চিত।” হযরত শাবী (রঃ) বলেনঃ “আমি ‘মাহরূম এর অর্থ জানতে অপারগ হয়ে গেছি।”ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যার মাল নেই, তা যে কারণেই হোক না কেন। অর্থাৎ সে হয়তো মাল উপার্জন করতেই সক্ষম নয়, কিংবা হয়তো তার মাল ধ্বংস হয়ে গেছে কোন দুর্যোগের কারণে।”হযরত হাসান ইবনে মুহাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাফিরদেরকে দমন করার উদ্দেশ্যে একটি ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করেন এবং তাঁরা গানীমাতও লাভ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এমন কতগুলো লোক আগমন করে যারা গানীমতের মাল বন্টনের সময় উপস্থিত ছিল না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। এই ঘটনা দ্বারা তো বুঝা যায় যে, এই আয়াতটি মাদানী। কিন্তু আসলে তা নয়, বরং এটি মক্কী আয়াত। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্যে ধরিত্রীতে নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার বহু নিদর্শন রয়েছে। এগুলো মহান সৃষ্টিকর্তার মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব ও বিরাটত্ব প্রমাণ করে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, কিভাবে তিনি দুনিয়ায় জীব-জন্তু ও গাছ-পালা ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিভাবে তিনি পর্বতরাজিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, মাঠ-ময়দানকে করেছেন বিস্তৃত এবং সমুদ্র ও নদ-নদীকে করে রেখেছেন প্রবাহিত। মানুষের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তিনি তাদের বর্ণ, আকৃতি, ভাষা, কামনা-বাসনা, বিবেক-বুদ্ধি, শক্তি-সামর্থ্য বিভিন্ন প্রকারের করেছেন। তাদের অঙ্গ-ভঙ্গী তাদের পাপ পুণ্য এবং দৈহিক গঠনের কথা চিন্তা করলেও বিস্মিত হতে হয়। প্রত্যেক অঙ্গ কেমন উপযুক্ত জায়গায় রয়েছে। এ জন্যেই এরপরেই বলেছেনঃ “তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে)। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না? হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি নিজের সৃষ্টির কথা চিন্তা করবে, নিজের গ্রন্থীগুলোর বিন্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে সে অবশ্যই বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে যে, তাকে আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্যেই ।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবিকার উৎস অর্থাৎ বৃষ্টি এবং প্রতিশ্রুত সবকিছু অর্থাৎ জান্নাত।' হযরত ওয়াসিল আহদাব (রঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমার রিযক তো রয়েছে আসমানে, অথচ আমি তা অনুসন্ধান করছি যমীনে, এটা বড়ই দুঃখজনক ব্যাপারই বটে।” একথা বলে তিনি লোকালয় ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলে চলে যান। তিনি তিন দিন পর্যন্ত তো কিছুই পেলেন না। কিন্তু তৃতীয় দিনে দেখেন যে, টাটকা খেজুরের একটি গুচ্ছ তার পার্শ্বে আছে। তাঁর ভাই, যিনি তাঁর চেয়েও বেশী বিশুদ্ধ ও খাটি অন্তকরণ বিশিষ্ট লোক ছিলেন, তার সাথেই বেরিয়ে এসেছিলেন এবং তারা দুই ভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত জঙ্গলেই জীবন কাটিয়ে দেন। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বয়ং নিজেরই শপথ করে বলেনঃ আমি তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছি অর্থাৎ কিয়ামত, পুনরুত্থান, শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাদি সবই সত্য। যেমন তোমাদের মুখ হতে বের হওয়া কথায় তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে না, অনুরূপভাবে এসব বিষয়েও তোমাদের সন্দেহ করা মোটেই উচিত নয়। হযরত মুআয (রাঃ) যখন কোন কথা বলতেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে বলতেনঃ “নিশ্চয়ই এটা সত্য যেমন তুমি এখানে রয়েছে।”হযরত হাসান বসরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ কওমগুলোকে ধ্বংস করুন যাদের জন্যে তাদের প্রতিপালক (আল্লাহ) শপথ করেছেন, অতঃপর তারা তা বিশ্বাস করেনি।” (এ হাদীসটি মুরসাল। কেননা, হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন তাবেয়ী। তিনি কোন সাহাবীর (রাঃ) নাম না নিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)
আয-যারিয়াত 51:20
১৫-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা আল্লাহভীরু লোকদের পরিণামের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন তারা প্রস্রবণ বিশিষ্ট জান্নাতে অবস্থান করবে। তাদের অবস্থা হবে ঐ অসৎ লোকেদের অবস্থার বিপরীত যারা শাস্তি-সাজার মধ্যে, শংখল-জিঞ্জীরের মধ্যে এবং কঠিন মারপিটের মধ্যে থাকবে। এই মুমিনদের নিকট আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে যে দায়িত্ব ও কর্তব্য এসেছিল তা তারা যথাযথভাবে পালন করতো। আর এর পূর্বেও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতো। কিন্তু দুই কারণে এই তাফসীরের ব্যাপারে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। প্রথম কারণ এই যে, এ তাফসীর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) করেছেন এ কথা বলা হয়। কিন্তু সহীহ সনদে এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত পৌঁছে না। ওর এ সনদটি সম্পূর্ণরূপে দুর্বল। দ্বিতীয় কারণ এই যে, (আরবী) পূর্বের বাক্য হতে (আরবী) হয়েছে। সুতরাং ভাবার্থ হবেঃ আল্লাহভীরু লোকেরা জান্নাতে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতরাশি লাভ করবে। ইতিপূর্বে অর্থাৎ দুনিয়ায় তারা ভাল কাজ করতো। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (তাদেরকে বলা হবেঃ) তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪)।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের আন্তরিকতাপূর্ণ কাজের বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছেন যে, তারা রাত্রির সামান্য অংশই অতিবাহিত করতে নিদ্রায়। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এখানে শব্দটি বা নেতিবাচক। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি হিসেবে অর্থ হবেঃ তাদের উপর এমন কোন রাত্রি অতিবাহিত হতো না যার কিছু অংশ তারা আল্লাহর স্মরণে না কাটাতেন। হয় রাত্রির প্রথমাংশে কিছু নফল পড়তেন, না হয় রাত্রির মধ্যভাগে পড়তেন। অর্থাৎ প্রত্যেক রাত্রের কোন না কোন সময় কিছু না কিছু নামায অবশ্যই পড়তেন। সারা রাত তারা শুয়ে কাটিয়ে দিতেন না।হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এ লোকগুলো মাগরিব ও ইশার নামাযের মাঝে কিছু নফল নামায পড়তেন। হযরত ইমাম আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তারা ইশার নামাযের পূর্বে ঘুমাতেন না।কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের দ্রিা রাত্রে খুব কম হতো। কিছু সময় ঘুমাতেন এবং কিছু সময় জেগে থাকতেন। আর যখন ইবাদতে মনোযোগ দিতেন তখন সকাল হয়ে যেতো।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো। হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) এই আয়াতের এই ভাবার্থ বর্ণনা করার পর বলতেনঃ “বড়ই দুঃখজনক ব্যাপার যে, আমার মধ্যে এটা নেই।” তার ছাত্র খাজা হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, তিনি প্রায়ই বলতেনঃ “আমি যখন আমার আমল জান্নাতীদের আমলের সামনে রাখি তখন আমার আমলকে তাদের আমলের তুলনায় অতি নগণ্য দেখি। পক্ষান্তরে, যখন আমি আমার আমল জাহান্নামীদের আমলের সামনে রাখি তখন দেখি যে, তারা তো কল্যাণ হতে সম্পূর্ণরূপে দূরে ছিল। তারা ছিল আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকারকারী এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবনকে অবিশ্বাসকারী। সুতরাং আমার অবস্থা ঐ লোকেদের মত যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা ভাল ও মন্দ আমল মিশ্রিত করেছে।” (৯:১০২)বানু তামীম গোত্রের একটি লোক হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-কে বললোঃ “হে আবু সালমা (রঃ)! এই গুণ তো আমাদের মধ্যে নেই যে, আমরা রাত্রে খুব কম ঘুমাই? আমরা তো খুব কম সময় আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে থাকি।” তখন তিনি বললেনঃ “ঐ ব্যক্তিও বড় ভাগ্যবান যে ঘুম আসলে শুয়ে পড়ে এবং যখন জেগে ওঠে তখন আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেন, প্রথম যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন তখন জনগণ তাঁকে দেখার জন্যে ভীড় জমায়। তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আল্লাহর কসম। তার চেহারা মুবারকে আমার দৃষ্টি পড়া মাত্রই আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, এই জ্যোতির্ময় চেহারা কোন মিথ্যাবাদী লোকের হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সর্বপ্রথম যে কথা আমার কানে পৌঁছেছিল তা ছিলঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা (দরিদ্রদেরকে) খাদ্য খাওয়াতে থাকো, আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখো, (মানুষকে) সালাম দিতে থাকো এবং রাত্রে নামায আদায় করো যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে এমন কক্ষ রয়েছে যার ভিতরের অংশ বাহির হতে এবং বাহিরের অংশ ভিতর হতে দেখা যায়।” একথা শুনে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কাদের জন্যে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদের জন্যে, যারা নরম কথা বলে, (দরিদ্রদেরকে) খানা খেতে দেয় এবং রাত্রে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন তারা আল্লাহর ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যুহরী (রঃ) এবং হাসান (রঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের ভাবার্থ এই যে, তারা রাত্রির অধিকাংশ তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দেয়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করে।” হযরত যহহাক (রঃ) (আরবী) কে এর পূর্ববর্তী বাক্যের সাথে মিলিয়ে দেন এবং (আরবী) হতে শুরু বলে থাকেন। কিন্তু এই উক্তিতে বড় কৃত্রিমতা রয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো।' মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ ‘তারা নামায পড়ে। অন্যান্য তাফসীরকারগণ বলেন, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘তারা রাত্রে (ইবাদতে) দাঁড়িয়ে থাকে এবং সকাল হলে তারা নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সকালে তারা ক্ষমা প্রার্থনাকারী।” (৩:১৭) এই ক্ষমা প্রার্থনা যদি নামাযেই হয় তবে তো খুবই ভাল। সহীহ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবীদের একটি জামাআতের কয়েকটি রিওয়াইয়াত দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন শেষ তৃতীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকে তখন প্রতি রাত্রে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেনঃ “কোন তাওবাকারী আছে কি? আমি তার তাওবা কবুল করবে। কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে। ক্ষমা করে দিবো। কোন যাজ্ঞাকারী আছে কি? আমি তাকে প্রদান করবে।” ফজর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা এরূপই বলতে থাকেন।”আল্লাহ তাআলা যে হযরত ইয়াকূব (আঃ) সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি তাঁর পুত্রদেরকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।” এ ব্যাপারে অধিকাংশ তাফসীরকার বলেন যে, তাঁর এই ক্ষমা প্রার্থনা রাত্রির শেষ প্রহরেই ছিল।এরপর আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের আর একটি গুণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেমন নামায পড়ে আল্লাহর হক আদায় করেন, অনুরূপভাবে মানুষের হকের কথাও তারা ভুলে যান না। তাঁরা যাকাত আদায় করে থাকেন। তারা জনগণের সঙ্গে সদাচরণ করেন, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন। তাদের ধন-সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে। যেমন হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ভিক্ষুকের হক রয়েছে যদিও সে ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করতে আসে। (এ হাদীস ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর মতে মাহরূম বা বঞ্চিত হলো ঐ ব্যক্তি যার ইসলামে কোন অংশ নেই অর্থাৎ বায়তুল মালে কোন অংশ নেই, কোন কাজ-কামও হাতে নেই এবং কোন শিল্প ও কলা-কৌশলও তার জানা নেই যার দ্বারা সে জীবিকা উপার্জন করতে পারে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন যে, মাহরাম দ্বারা ঐ লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা কাজ-কাম কিছু জানে বটে, কিন্তু তা দ্বারা যা সে উপার্জন করে তা তাদের জীবন ধারণের জন্যে যথেষ্ট হয় না। যহহাক (রঃ) বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে পূর্বে ধনী ছিল; কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার মাল-ধন ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন ইয়ামামায় যখন জলোচ্ছাস হলো এবং এক ব্যক্তির সমস্ত মাল-ধন ও আসবাব পত্র পানিতে ভেসে গেল তখন একজন সাহাবী (রাঃ) বললেনঃ “এ লোকটি মাহরূম বা বঞ্চিত। অন্যান্য বুযুর্গ মুফাসসিরগণ বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে না। একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয় যে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং যাকে তুমি দু' এক গ্রাস খাবার বা দু' একটি খেজুর প্রদান করে থাকো, বরং মিসকীন ঐ ব্যক্তি যে এই পরিমাণ উপার্জন করে যা তার জন্যে যথেষ্ট নয় বা যা তার প্রয়োজন মিটায় না এবং তার এমন অবস্থা প্রকাশ পায় না যে, মানুষ তার অভাবের কথা জানতে পেরে তাকে কিছু দান করে।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) মক্কা যাচ্ছিলেন। পথে একটি কুকুর এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি যবেহকৃত একটি বকরীর কাঁধ কেটে কুকুরটির সামনে নিক্ষেপ করেন এবং বলেনঃ “লোকেরা বলে যে, এটাও মাহরূম বা বঞ্চিত।” হযরত শাবী (রঃ) বলেনঃ “আমি ‘মাহরূম এর অর্থ জানতে অপারগ হয়ে গেছি।”ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যার মাল নেই, তা যে কারণেই হোক না কেন। অর্থাৎ সে হয়তো মাল উপার্জন করতেই সক্ষম নয়, কিংবা হয়তো তার মাল ধ্বংস হয়ে গেছে কোন দুর্যোগের কারণে।”হযরত হাসান ইবনে মুহাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাফিরদেরকে দমন করার উদ্দেশ্যে একটি ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করেন এবং তাঁরা গানীমাতও লাভ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এমন কতগুলো লোক আগমন করে যারা গানীমতের মাল বন্টনের সময় উপস্থিত ছিল না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। এই ঘটনা দ্বারা তো বুঝা যায় যে, এই আয়াতটি মাদানী। কিন্তু আসলে তা নয়, বরং এটি মক্কী আয়াত। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্যে ধরিত্রীতে নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার বহু নিদর্শন রয়েছে। এগুলো মহান সৃষ্টিকর্তার মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব ও বিরাটত্ব প্রমাণ করে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, কিভাবে তিনি দুনিয়ায় জীব-জন্তু ও গাছ-পালা ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিভাবে তিনি পর্বতরাজিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, মাঠ-ময়দানকে করেছেন বিস্তৃত এবং সমুদ্র ও নদ-নদীকে করে রেখেছেন প্রবাহিত। মানুষের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তিনি তাদের বর্ণ, আকৃতি, ভাষা, কামনা-বাসনা, বিবেক-বুদ্ধি, শক্তি-সামর্থ্য বিভিন্ন প্রকারের করেছেন। তাদের অঙ্গ-ভঙ্গী তাদের পাপ পুণ্য এবং দৈহিক গঠনের কথা চিন্তা করলেও বিস্মিত হতে হয়। প্রত্যেক অঙ্গ কেমন উপযুক্ত জায়গায় রয়েছে। এ জন্যেই এরপরেই বলেছেনঃ “তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে)। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না? হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি নিজের সৃষ্টির কথা চিন্তা করবে, নিজের গ্রন্থীগুলোর বিন্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে সে অবশ্যই বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে যে, তাকে আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্যেই ।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবিকার উৎস অর্থাৎ বৃষ্টি এবং প্রতিশ্রুত সবকিছু অর্থাৎ জান্নাত।' হযরত ওয়াসিল আহদাব (রঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমার রিযক তো রয়েছে আসমানে, অথচ আমি তা অনুসন্ধান করছি যমীনে, এটা বড়ই দুঃখজনক ব্যাপারই বটে।” একথা বলে তিনি লোকালয় ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলে চলে যান। তিনি তিন দিন পর্যন্ত তো কিছুই পেলেন না। কিন্তু তৃতীয় দিনে দেখেন যে, টাটকা খেজুরের একটি গুচ্ছ তার পার্শ্বে আছে। তাঁর ভাই, যিনি তাঁর চেয়েও বেশী বিশুদ্ধ ও খাটি অন্তকরণ বিশিষ্ট লোক ছিলেন, তার সাথেই বেরিয়ে এসেছিলেন এবং তারা দুই ভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত জঙ্গলেই জীবন কাটিয়ে দেন। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বয়ং নিজেরই শপথ করে বলেনঃ আমি তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছি অর্থাৎ কিয়ামত, পুনরুত্থান, শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাদি সবই সত্য। যেমন তোমাদের মুখ হতে বের হওয়া কথায় তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে না, অনুরূপভাবে এসব বিষয়েও তোমাদের সন্দেহ করা মোটেই উচিত নয়। হযরত মুআয (রাঃ) যখন কোন কথা বলতেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে বলতেনঃ “নিশ্চয়ই এটা সত্য যেমন তুমি এখানে রয়েছে।”হযরত হাসান বসরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ কওমগুলোকে ধ্বংস করুন যাদের জন্যে তাদের প্রতিপালক (আল্লাহ) শপথ করেছেন, অতঃপর তারা তা বিশ্বাস করেনি।” (এ হাদীসটি মুরসাল। কেননা, হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন তাবেয়ী। তিনি কোন সাহাবীর (রাঃ) নাম না নিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)
আয-যারিয়াত 51:21
১৫-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা আল্লাহভীরু লোকদের পরিণামের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন তারা প্রস্রবণ বিশিষ্ট জান্নাতে অবস্থান করবে। তাদের অবস্থা হবে ঐ অসৎ লোকেদের অবস্থার বিপরীত যারা শাস্তি-সাজার মধ্যে, শংখল-জিঞ্জীরের মধ্যে এবং কঠিন মারপিটের মধ্যে থাকবে। এই মুমিনদের নিকট আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে যে দায়িত্ব ও কর্তব্য এসেছিল তা তারা যথাযথভাবে পালন করতো। আর এর পূর্বেও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতো। কিন্তু দুই কারণে এই তাফসীরের ব্যাপারে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। প্রথম কারণ এই যে, এ তাফসীর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) করেছেন এ কথা বলা হয়। কিন্তু সহীহ সনদে এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত পৌঁছে না। ওর এ সনদটি সম্পূর্ণরূপে দুর্বল। দ্বিতীয় কারণ এই যে, (আরবী) পূর্বের বাক্য হতে (আরবী) হয়েছে। সুতরাং ভাবার্থ হবেঃ আল্লাহভীরু লোকেরা জান্নাতে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতরাশি লাভ করবে। ইতিপূর্বে অর্থাৎ দুনিয়ায় তারা ভাল কাজ করতো। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (তাদেরকে বলা হবেঃ) তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪)।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের আন্তরিকতাপূর্ণ কাজের বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছেন যে, তারা রাত্রির সামান্য অংশই অতিবাহিত করতে নিদ্রায়। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এখানে শব্দটি বা নেতিবাচক। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি হিসেবে অর্থ হবেঃ তাদের উপর এমন কোন রাত্রি অতিবাহিত হতো না যার কিছু অংশ তারা আল্লাহর স্মরণে না কাটাতেন। হয় রাত্রির প্রথমাংশে কিছু নফল পড়তেন, না হয় রাত্রির মধ্যভাগে পড়তেন। অর্থাৎ প্রত্যেক রাত্রের কোন না কোন সময় কিছু না কিছু নামায অবশ্যই পড়তেন। সারা রাত তারা শুয়ে কাটিয়ে দিতেন না।হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এ লোকগুলো মাগরিব ও ইশার নামাযের মাঝে কিছু নফল নামায পড়তেন। হযরত ইমাম আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তারা ইশার নামাযের পূর্বে ঘুমাতেন না।কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের দ্রিা রাত্রে খুব কম হতো। কিছু সময় ঘুমাতেন এবং কিছু সময় জেগে থাকতেন। আর যখন ইবাদতে মনোযোগ দিতেন তখন সকাল হয়ে যেতো।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো। হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) এই আয়াতের এই ভাবার্থ বর্ণনা করার পর বলতেনঃ “বড়ই দুঃখজনক ব্যাপার যে, আমার মধ্যে এটা নেই।” তার ছাত্র খাজা হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, তিনি প্রায়ই বলতেনঃ “আমি যখন আমার আমল জান্নাতীদের আমলের সামনে রাখি তখন আমার আমলকে তাদের আমলের তুলনায় অতি নগণ্য দেখি। পক্ষান্তরে, যখন আমি আমার আমল জাহান্নামীদের আমলের সামনে রাখি তখন দেখি যে, তারা তো কল্যাণ হতে সম্পূর্ণরূপে দূরে ছিল। তারা ছিল আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকারকারী এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবনকে অবিশ্বাসকারী। সুতরাং আমার অবস্থা ঐ লোকেদের মত যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা ভাল ও মন্দ আমল মিশ্রিত করেছে।” (৯:১০২)বানু তামীম গোত্রের একটি লোক হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-কে বললোঃ “হে আবু সালমা (রঃ)! এই গুণ তো আমাদের মধ্যে নেই যে, আমরা রাত্রে খুব কম ঘুমাই? আমরা তো খুব কম সময় আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে থাকি।” তখন তিনি বললেনঃ “ঐ ব্যক্তিও বড় ভাগ্যবান যে ঘুম আসলে শুয়ে পড়ে এবং যখন জেগে ওঠে তখন আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেন, প্রথম যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন তখন জনগণ তাঁকে দেখার জন্যে ভীড় জমায়। তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আল্লাহর কসম। তার চেহারা মুবারকে আমার দৃষ্টি পড়া মাত্রই আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, এই জ্যোতির্ময় চেহারা কোন মিথ্যাবাদী লোকের হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সর্বপ্রথম যে কথা আমার কানে পৌঁছেছিল তা ছিলঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা (দরিদ্রদেরকে) খাদ্য খাওয়াতে থাকো, আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখো, (মানুষকে) সালাম দিতে থাকো এবং রাত্রে নামায আদায় করো যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে এমন কক্ষ রয়েছে যার ভিতরের অংশ বাহির হতে এবং বাহিরের অংশ ভিতর হতে দেখা যায়।” একথা শুনে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কাদের জন্যে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদের জন্যে, যারা নরম কথা বলে, (দরিদ্রদেরকে) খানা খেতে দেয় এবং রাত্রে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন তারা আল্লাহর ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যুহরী (রঃ) এবং হাসান (রঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের ভাবার্থ এই যে, তারা রাত্রির অধিকাংশ তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দেয়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করে।” হযরত যহহাক (রঃ) (আরবী) কে এর পূর্ববর্তী বাক্যের সাথে মিলিয়ে দেন এবং (আরবী) হতে শুরু বলে থাকেন। কিন্তু এই উক্তিতে বড় কৃত্রিমতা রয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো।' মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ ‘তারা নামায পড়ে। অন্যান্য তাফসীরকারগণ বলেন, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘তারা রাত্রে (ইবাদতে) দাঁড়িয়ে থাকে এবং সকাল হলে তারা নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সকালে তারা ক্ষমা প্রার্থনাকারী।” (৩:১৭) এই ক্ষমা প্রার্থনা যদি নামাযেই হয় তবে তো খুবই ভাল। সহীহ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবীদের একটি জামাআতের কয়েকটি রিওয়াইয়াত দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন শেষ তৃতীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকে তখন প্রতি রাত্রে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেনঃ “কোন তাওবাকারী আছে কি? আমি তার তাওবা কবুল করবে। কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে। ক্ষমা করে দিবো। কোন যাজ্ঞাকারী আছে কি? আমি তাকে প্রদান করবে।” ফজর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা এরূপই বলতে থাকেন।”আল্লাহ তাআলা যে হযরত ইয়াকূব (আঃ) সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি তাঁর পুত্রদেরকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।” এ ব্যাপারে অধিকাংশ তাফসীরকার বলেন যে, তাঁর এই ক্ষমা প্রার্থনা রাত্রির শেষ প্রহরেই ছিল।এরপর আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের আর একটি গুণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেমন নামায পড়ে আল্লাহর হক আদায় করেন, অনুরূপভাবে মানুষের হকের কথাও তারা ভুলে যান না। তাঁরা যাকাত আদায় করে থাকেন। তারা জনগণের সঙ্গে সদাচরণ করেন, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন। তাদের ধন-সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে। যেমন হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ভিক্ষুকের হক রয়েছে যদিও সে ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করতে আসে। (এ হাদীস ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর মতে মাহরূম বা বঞ্চিত হলো ঐ ব্যক্তি যার ইসলামে কোন অংশ নেই অর্থাৎ বায়তুল মালে কোন অংশ নেই, কোন কাজ-কামও হাতে নেই এবং কোন শিল্প ও কলা-কৌশলও তার জানা নেই যার দ্বারা সে জীবিকা উপার্জন করতে পারে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন যে, মাহরাম দ্বারা ঐ লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা কাজ-কাম কিছু জানে বটে, কিন্তু তা দ্বারা যা সে উপার্জন করে তা তাদের জীবন ধারণের জন্যে যথেষ্ট হয় না। যহহাক (রঃ) বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে পূর্বে ধনী ছিল; কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার মাল-ধন ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন ইয়ামামায় যখন জলোচ্ছাস হলো এবং এক ব্যক্তির সমস্ত মাল-ধন ও আসবাব পত্র পানিতে ভেসে গেল তখন একজন সাহাবী (রাঃ) বললেনঃ “এ লোকটি মাহরূম বা বঞ্চিত। অন্যান্য বুযুর্গ মুফাসসিরগণ বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে না। একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয় যে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং যাকে তুমি দু' এক গ্রাস খাবার বা দু' একটি খেজুর প্রদান করে থাকো, বরং মিসকীন ঐ ব্যক্তি যে এই পরিমাণ উপার্জন করে যা তার জন্যে যথেষ্ট নয় বা যা তার প্রয়োজন মিটায় না এবং তার এমন অবস্থা প্রকাশ পায় না যে, মানুষ তার অভাবের কথা জানতে পেরে তাকে কিছু দান করে।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) মক্কা যাচ্ছিলেন। পথে একটি কুকুর এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি যবেহকৃত একটি বকরীর কাঁধ কেটে কুকুরটির সামনে নিক্ষেপ করেন এবং বলেনঃ “লোকেরা বলে যে, এটাও মাহরূম বা বঞ্চিত।” হযরত শাবী (রঃ) বলেনঃ “আমি ‘মাহরূম এর অর্থ জানতে অপারগ হয়ে গেছি।”ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যার মাল নেই, তা যে কারণেই হোক না কেন। অর্থাৎ সে হয়তো মাল উপার্জন করতেই সক্ষম নয়, কিংবা হয়তো তার মাল ধ্বংস হয়ে গেছে কোন দুর্যোগের কারণে।”হযরত হাসান ইবনে মুহাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাফিরদেরকে দমন করার উদ্দেশ্যে একটি ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করেন এবং তাঁরা গানীমাতও লাভ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এমন কতগুলো লোক আগমন করে যারা গানীমতের মাল বন্টনের সময় উপস্থিত ছিল না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। এই ঘটনা দ্বারা তো বুঝা যায় যে, এই আয়াতটি মাদানী। কিন্তু আসলে তা নয়, বরং এটি মক্কী আয়াত। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্যে ধরিত্রীতে নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার বহু নিদর্শন রয়েছে। এগুলো মহান সৃষ্টিকর্তার মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব ও বিরাটত্ব প্রমাণ করে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, কিভাবে তিনি দুনিয়ায় জীব-জন্তু ও গাছ-পালা ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিভাবে তিনি পর্বতরাজিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, মাঠ-ময়দানকে করেছেন বিস্তৃত এবং সমুদ্র ও নদ-নদীকে করে রেখেছেন প্রবাহিত। মানুষের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তিনি তাদের বর্ণ, আকৃতি, ভাষা, কামনা-বাসনা, বিবেক-বুদ্ধি, শক্তি-সামর্থ্য বিভিন্ন প্রকারের করেছেন। তাদের অঙ্গ-ভঙ্গী তাদের পাপ পুণ্য এবং দৈহিক গঠনের কথা চিন্তা করলেও বিস্মিত হতে হয়। প্রত্যেক অঙ্গ কেমন উপযুক্ত জায়গায় রয়েছে। এ জন্যেই এরপরেই বলেছেনঃ “তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে)। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না? হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি নিজের সৃষ্টির কথা চিন্তা করবে, নিজের গ্রন্থীগুলোর বিন্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে সে অবশ্যই বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে যে, তাকে আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্যেই ।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবিকার উৎস অর্থাৎ বৃষ্টি এবং প্রতিশ্রুত সবকিছু অর্থাৎ জান্নাত।' হযরত ওয়াসিল আহদাব (রঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমার রিযক তো রয়েছে আসমানে, অথচ আমি তা অনুসন্ধান করছি যমীনে, এটা বড়ই দুঃখজনক ব্যাপারই বটে।” একথা বলে তিনি লোকালয় ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলে চলে যান। তিনি তিন দিন পর্যন্ত তো কিছুই পেলেন না। কিন্তু তৃতীয় দিনে দেখেন যে, টাটকা খেজুরের একটি গুচ্ছ তার পার্শ্বে আছে। তাঁর ভাই, যিনি তাঁর চেয়েও বেশী বিশুদ্ধ ও খাটি অন্তকরণ বিশিষ্ট লোক ছিলেন, তার সাথেই বেরিয়ে এসেছিলেন এবং তারা দুই ভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত জঙ্গলেই জীবন কাটিয়ে দেন। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বয়ং নিজেরই শপথ করে বলেনঃ আমি তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছি অর্থাৎ কিয়ামত, পুনরুত্থান, শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাদি সবই সত্য। যেমন তোমাদের মুখ হতে বের হওয়া কথায় তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে না, অনুরূপভাবে এসব বিষয়েও তোমাদের সন্দেহ করা মোটেই উচিত নয়। হযরত মুআয (রাঃ) যখন কোন কথা বলতেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে বলতেনঃ “নিশ্চয়ই এটা সত্য যেমন তুমি এখানে রয়েছে।”হযরত হাসান বসরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ কওমগুলোকে ধ্বংস করুন যাদের জন্যে তাদের প্রতিপালক (আল্লাহ) শপথ করেছেন, অতঃপর তারা তা বিশ্বাস করেনি।” (এ হাদীসটি মুরসাল। কেননা, হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন তাবেয়ী। তিনি কোন সাহাবীর (রাঃ) নাম না নিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)
আয-যারিয়াত 51:22
১৫-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা আল্লাহভীরু লোকদের পরিণামের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন তারা প্রস্রবণ বিশিষ্ট জান্নাতে অবস্থান করবে। তাদের অবস্থা হবে ঐ অসৎ লোকেদের অবস্থার বিপরীত যারা শাস্তি-সাজার মধ্যে, শংখল-জিঞ্জীরের মধ্যে এবং কঠিন মারপিটের মধ্যে থাকবে। এই মুমিনদের নিকট আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে যে দায়িত্ব ও কর্তব্য এসেছিল তা তারা যথাযথভাবে পালন করতো। আর এর পূর্বেও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতো। কিন্তু দুই কারণে এই তাফসীরের ব্যাপারে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। প্রথম কারণ এই যে, এ তাফসীর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) করেছেন এ কথা বলা হয়। কিন্তু সহীহ সনদে এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত পৌঁছে না। ওর এ সনদটি সম্পূর্ণরূপে দুর্বল। দ্বিতীয় কারণ এই যে, (আরবী) পূর্বের বাক্য হতে (আরবী) হয়েছে। সুতরাং ভাবার্থ হবেঃ আল্লাহভীরু লোকেরা জান্নাতে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতরাশি লাভ করবে। ইতিপূর্বে অর্থাৎ দুনিয়ায় তারা ভাল কাজ করতো। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (তাদেরকে বলা হবেঃ) তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪)।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের আন্তরিকতাপূর্ণ কাজের বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছেন যে, তারা রাত্রির সামান্য অংশই অতিবাহিত করতে নিদ্রায়। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এখানে শব্দটি বা নেতিবাচক। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি হিসেবে অর্থ হবেঃ তাদের উপর এমন কোন রাত্রি অতিবাহিত হতো না যার কিছু অংশ তারা আল্লাহর স্মরণে না কাটাতেন। হয় রাত্রির প্রথমাংশে কিছু নফল পড়তেন, না হয় রাত্রির মধ্যভাগে পড়তেন। অর্থাৎ প্রত্যেক রাত্রের কোন না কোন সময় কিছু না কিছু নামায অবশ্যই পড়তেন। সারা রাত তারা শুয়ে কাটিয়ে দিতেন না।হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এ লোকগুলো মাগরিব ও ইশার নামাযের মাঝে কিছু নফল নামায পড়তেন। হযরত ইমাম আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তারা ইশার নামাযের পূর্বে ঘুমাতেন না।কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের দ্রিা রাত্রে খুব কম হতো। কিছু সময় ঘুমাতেন এবং কিছু সময় জেগে থাকতেন। আর যখন ইবাদতে মনোযোগ দিতেন তখন সকাল হয়ে যেতো।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো। হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) এই আয়াতের এই ভাবার্থ বর্ণনা করার পর বলতেনঃ “বড়ই দুঃখজনক ব্যাপার যে, আমার মধ্যে এটা নেই।” তার ছাত্র খাজা হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, তিনি প্রায়ই বলতেনঃ “আমি যখন আমার আমল জান্নাতীদের আমলের সামনে রাখি তখন আমার আমলকে তাদের আমলের তুলনায় অতি নগণ্য দেখি। পক্ষান্তরে, যখন আমি আমার আমল জাহান্নামীদের আমলের সামনে রাখি তখন দেখি যে, তারা তো কল্যাণ হতে সম্পূর্ণরূপে দূরে ছিল। তারা ছিল আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকারকারী এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবনকে অবিশ্বাসকারী। সুতরাং আমার অবস্থা ঐ লোকেদের মত যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা ভাল ও মন্দ আমল মিশ্রিত করেছে।” (৯:১০২)বানু তামীম গোত্রের একটি লোক হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-কে বললোঃ “হে আবু সালমা (রঃ)! এই গুণ তো আমাদের মধ্যে নেই যে, আমরা রাত্রে খুব কম ঘুমাই? আমরা তো খুব কম সময় আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে থাকি।” তখন তিনি বললেনঃ “ঐ ব্যক্তিও বড় ভাগ্যবান যে ঘুম আসলে শুয়ে পড়ে এবং যখন জেগে ওঠে তখন আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেন, প্রথম যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন তখন জনগণ তাঁকে দেখার জন্যে ভীড় জমায়। তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আল্লাহর কসম। তার চেহারা মুবারকে আমার দৃষ্টি পড়া মাত্রই আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, এই জ্যোতির্ময় চেহারা কোন মিথ্যাবাদী লোকের হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সর্বপ্রথম যে কথা আমার কানে পৌঁছেছিল তা ছিলঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা (দরিদ্রদেরকে) খাদ্য খাওয়াতে থাকো, আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখো, (মানুষকে) সালাম দিতে থাকো এবং রাত্রে নামায আদায় করো যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে এমন কক্ষ রয়েছে যার ভিতরের অংশ বাহির হতে এবং বাহিরের অংশ ভিতর হতে দেখা যায়।” একথা শুনে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কাদের জন্যে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদের জন্যে, যারা নরম কথা বলে, (দরিদ্রদেরকে) খানা খেতে দেয় এবং রাত্রে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন তারা আল্লাহর ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যুহরী (রঃ) এবং হাসান (রঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের ভাবার্থ এই যে, তারা রাত্রির অধিকাংশ তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দেয়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করে।” হযরত যহহাক (রঃ) (আরবী) কে এর পূর্ববর্তী বাক্যের সাথে মিলিয়ে দেন এবং (আরবী) হতে শুরু বলে থাকেন। কিন্তু এই উক্তিতে বড় কৃত্রিমতা রয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো।' মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ ‘তারা নামায পড়ে। অন্যান্য তাফসীরকারগণ বলেন, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘তারা রাত্রে (ইবাদতে) দাঁড়িয়ে থাকে এবং সকাল হলে তারা নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সকালে তারা ক্ষমা প্রার্থনাকারী।” (৩:১৭) এই ক্ষমা প্রার্থনা যদি নামাযেই হয় তবে তো খুবই ভাল। সহীহ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবীদের একটি জামাআতের কয়েকটি রিওয়াইয়াত দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন শেষ তৃতীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকে তখন প্রতি রাত্রে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেনঃ “কোন তাওবাকারী আছে কি? আমি তার তাওবা কবুল করবে। কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে। ক্ষমা করে দিবো। কোন যাজ্ঞাকারী আছে কি? আমি তাকে প্রদান করবে।” ফজর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা এরূপই বলতে থাকেন।”আল্লাহ তাআলা যে হযরত ইয়াকূব (আঃ) সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি তাঁর পুত্রদেরকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।” এ ব্যাপারে অধিকাংশ তাফসীরকার বলেন যে, তাঁর এই ক্ষমা প্রার্থনা রাত্রির শেষ প্রহরেই ছিল।এরপর আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের আর একটি গুণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেমন নামায পড়ে আল্লাহর হক আদায় করেন, অনুরূপভাবে মানুষের হকের কথাও তারা ভুলে যান না। তাঁরা যাকাত আদায় করে থাকেন। তারা জনগণের সঙ্গে সদাচরণ করেন, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন। তাদের ধন-সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে। যেমন হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ভিক্ষুকের হক রয়েছে যদিও সে ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করতে আসে। (এ হাদীস ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর মতে মাহরূম বা বঞ্চিত হলো ঐ ব্যক্তি যার ইসলামে কোন অংশ নেই অর্থাৎ বায়তুল মালে কোন অংশ নেই, কোন কাজ-কামও হাতে নেই এবং কোন শিল্প ও কলা-কৌশলও তার জানা নেই যার দ্বারা সে জীবিকা উপার্জন করতে পারে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন যে, মাহরাম দ্বারা ঐ লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা কাজ-কাম কিছু জানে বটে, কিন্তু তা দ্বারা যা সে উপার্জন করে তা তাদের জীবন ধারণের জন্যে যথেষ্ট হয় না। যহহাক (রঃ) বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে পূর্বে ধনী ছিল; কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার মাল-ধন ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন ইয়ামামায় যখন জলোচ্ছাস হলো এবং এক ব্যক্তির সমস্ত মাল-ধন ও আসবাব পত্র পানিতে ভেসে গেল তখন একজন সাহাবী (রাঃ) বললেনঃ “এ লোকটি মাহরূম বা বঞ্চিত। অন্যান্য বুযুর্গ মুফাসসিরগণ বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে না। একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয় যে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং যাকে তুমি দু' এক গ্রাস খাবার বা দু' একটি খেজুর প্রদান করে থাকো, বরং মিসকীন ঐ ব্যক্তি যে এই পরিমাণ উপার্জন করে যা তার জন্যে যথেষ্ট নয় বা যা তার প্রয়োজন মিটায় না এবং তার এমন অবস্থা প্রকাশ পায় না যে, মানুষ তার অভাবের কথা জানতে পেরে তাকে কিছু দান করে।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) মক্কা যাচ্ছিলেন। পথে একটি কুকুর এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি যবেহকৃত একটি বকরীর কাঁধ কেটে কুকুরটির সামনে নিক্ষেপ করেন এবং বলেনঃ “লোকেরা বলে যে, এটাও মাহরূম বা বঞ্চিত।” হযরত শাবী (রঃ) বলেনঃ “আমি ‘মাহরূম এর অর্থ জানতে অপারগ হয়ে গেছি।”ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যার মাল নেই, তা যে কারণেই হোক না কেন। অর্থাৎ সে হয়তো মাল উপার্জন করতেই সক্ষম নয়, কিংবা হয়তো তার মাল ধ্বংস হয়ে গেছে কোন দুর্যোগের কারণে।”হযরত হাসান ইবনে মুহাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাফিরদেরকে দমন করার উদ্দেশ্যে একটি ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করেন এবং তাঁরা গানীমাতও লাভ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এমন কতগুলো লোক আগমন করে যারা গানীমতের মাল বন্টনের সময় উপস্থিত ছিল না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। এই ঘটনা দ্বারা তো বুঝা যায় যে, এই আয়াতটি মাদানী। কিন্তু আসলে তা নয়, বরং এটি মক্কী আয়াত। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্যে ধরিত্রীতে নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার বহু নিদর্শন রয়েছে। এগুলো মহান সৃষ্টিকর্তার মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব ও বিরাটত্ব প্রমাণ করে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, কিভাবে তিনি দুনিয়ায় জীব-জন্তু ও গাছ-পালা ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিভাবে তিনি পর্বতরাজিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, মাঠ-ময়দানকে করেছেন বিস্তৃত এবং সমুদ্র ও নদ-নদীকে করে রেখেছেন প্রবাহিত। মানুষের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তিনি তাদের বর্ণ, আকৃতি, ভাষা, কামনা-বাসনা, বিবেক-বুদ্ধি, শক্তি-সামর্থ্য বিভিন্ন প্রকারের করেছেন। তাদের অঙ্গ-ভঙ্গী তাদের পাপ পুণ্য এবং দৈহিক গঠনের কথা চিন্তা করলেও বিস্মিত হতে হয়। প্রত্যেক অঙ্গ কেমন উপযুক্ত জায়গায় রয়েছে। এ জন্যেই এরপরেই বলেছেনঃ “তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে)। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না? হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি নিজের সৃষ্টির কথা চিন্তা করবে, নিজের গ্রন্থীগুলোর বিন্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে সে অবশ্যই বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে যে, তাকে আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্যেই ।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবিকার উৎস অর্থাৎ বৃষ্টি এবং প্রতিশ্রুত সবকিছু অর্থাৎ জান্নাত।' হযরত ওয়াসিল আহদাব (রঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমার রিযক তো রয়েছে আসমানে, অথচ আমি তা অনুসন্ধান করছি যমীনে, এটা বড়ই দুঃখজনক ব্যাপারই বটে।” একথা বলে তিনি লোকালয় ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলে চলে যান। তিনি তিন দিন পর্যন্ত তো কিছুই পেলেন না। কিন্তু তৃতীয় দিনে দেখেন যে, টাটকা খেজুরের একটি গুচ্ছ তার পার্শ্বে আছে। তাঁর ভাই, যিনি তাঁর চেয়েও বেশী বিশুদ্ধ ও খাটি অন্তকরণ বিশিষ্ট লোক ছিলেন, তার সাথেই বেরিয়ে এসেছিলেন এবং তারা দুই ভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত জঙ্গলেই জীবন কাটিয়ে দেন। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বয়ং নিজেরই শপথ করে বলেনঃ আমি তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছি অর্থাৎ কিয়ামত, পুনরুত্থান, শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাদি সবই সত্য। যেমন তোমাদের মুখ হতে বের হওয়া কথায় তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে না, অনুরূপভাবে এসব বিষয়েও তোমাদের সন্দেহ করা মোটেই উচিত নয়। হযরত মুআয (রাঃ) যখন কোন কথা বলতেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে বলতেনঃ “নিশ্চয়ই এটা সত্য যেমন তুমি এখানে রয়েছে।”হযরত হাসান বসরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ কওমগুলোকে ধ্বংস করুন যাদের জন্যে তাদের প্রতিপালক (আল্লাহ) শপথ করেছেন, অতঃপর তারা তা বিশ্বাস করেনি।” (এ হাদীসটি মুরসাল। কেননা, হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন তাবেয়ী। তিনি কোন সাহাবীর (রাঃ) নাম না নিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)
আয-যারিয়াত 51:23
১৫-২৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা আল্লাহভীরু লোকদের পরিণামের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন তারা প্রস্রবণ বিশিষ্ট জান্নাতে অবস্থান করবে। তাদের অবস্থা হবে ঐ অসৎ লোকেদের অবস্থার বিপরীত যারা শাস্তি-সাজার মধ্যে, শংখল-জিঞ্জীরের মধ্যে এবং কঠিন মারপিটের মধ্যে থাকবে। এই মুমিনদের নিকট আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে যে দায়িত্ব ও কর্তব্য এসেছিল তা তারা যথাযথভাবে পালন করতো। আর এর পূর্বেও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতো। কিন্তু দুই কারণে এই তাফসীরের ব্যাপারে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। প্রথম কারণ এই যে, এ তাফসীর হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) করেছেন এ কথা বলা হয়। কিন্তু সহীহ সনদে এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত পৌঁছে না। ওর এ সনদটি সম্পূর্ণরূপে দুর্বল। দ্বিতীয় কারণ এই যে, (আরবী) পূর্বের বাক্য হতে (আরবী) হয়েছে। সুতরাং ভাবার্থ হবেঃ আল্লাহভীরু লোকেরা জান্নাতে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতরাশি লাভ করবে। ইতিপূর্বে অর্থাৎ দুনিয়ায় তারা ভাল কাজ করতো। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (তাদেরকে বলা হবেঃ) তোমরা পানাহার কর তৃপ্তির সাথে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।” (৬৯:২৪)।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের আন্তরিকতাপূর্ণ কাজের বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছেন যে, তারা রাত্রির সামান্য অংশই অতিবাহিত করতে নিদ্রায়। কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এখানে শব্দটি বা নেতিবাচক। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তি হিসেবে অর্থ হবেঃ তাদের উপর এমন কোন রাত্রি অতিবাহিত হতো না যার কিছু অংশ তারা আল্লাহর স্মরণে না কাটাতেন। হয় রাত্রির প্রথমাংশে কিছু নফল পড়তেন, না হয় রাত্রির মধ্যভাগে পড়তেন। অর্থাৎ প্রত্যেক রাত্রের কোন না কোন সময় কিছু না কিছু নামায অবশ্যই পড়তেন। সারা রাত তারা শুয়ে কাটিয়ে দিতেন না।হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) প্রমুখ মনীষী বলেন যে, এ লোকগুলো মাগরিব ও ইশার নামাযের মাঝে কিছু নফল নামায পড়তেন। হযরত ইমাম আবু জাফর বাকির (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তারা ইশার নামাযের পূর্বে ঘুমাতেন না।কোন কোন তাফসীরকার বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী) হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের দ্রিা রাত্রে খুব কম হতো। কিছু সময় ঘুমাতেন এবং কিছু সময় জেগে থাকতেন। আর যখন ইবাদতে মনোযোগ দিতেন তখন সকাল হয়ে যেতো।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো। হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস (রঃ) এই আয়াতের এই ভাবার্থ বর্ণনা করার পর বলতেনঃ “বড়ই দুঃখজনক ব্যাপার যে, আমার মধ্যে এটা নেই।” তার ছাত্র খাজা হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি রয়েছে যে, তিনি প্রায়ই বলতেনঃ “আমি যখন আমার আমল জান্নাতীদের আমলের সামনে রাখি তখন আমার আমলকে তাদের আমলের তুলনায় অতি নগণ্য দেখি। পক্ষান্তরে, যখন আমি আমার আমল জাহান্নামীদের আমলের সামনে রাখি তখন দেখি যে, তারা তো কল্যাণ হতে সম্পূর্ণরূপে দূরে ছিল। তারা ছিল আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকারকারী এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবনকে অবিশ্বাসকারী। সুতরাং আমার অবস্থা ঐ লোকেদের মত যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা ভাল ও মন্দ আমল মিশ্রিত করেছে।” (৯:১০২)বানু তামীম গোত্রের একটি লোক হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-কে বললোঃ “হে আবু সালমা (রঃ)! এই গুণ তো আমাদের মধ্যে নেই যে, আমরা রাত্রে খুব কম ঘুমাই? আমরা তো খুব কম সময় আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে থাকি।” তখন তিনি বললেনঃ “ঐ ব্যক্তিও বড় ভাগ্যবান যে ঘুম আসলে শুয়ে পড়ে এবং যখন জেগে ওঠে তখন আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেন, প্রথম যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন তখন জনগণ তাঁকে দেখার জন্যে ভীড় জমায়। তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আল্লাহর কসম। তার চেহারা মুবারকে আমার দৃষ্টি পড়া মাত্রই আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, এই জ্যোতির্ময় চেহারা কোন মিথ্যাবাদী লোকের হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সর্বপ্রথম যে কথা আমার কানে পৌঁছেছিল তা ছিলঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা (দরিদ্রদেরকে) খাদ্য খাওয়াতে থাকো, আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখো, (মানুষকে) সালাম দিতে থাকো এবং রাত্রে নামায আদায় করো যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে এমন কক্ষ রয়েছে যার ভিতরের অংশ বাহির হতে এবং বাহিরের অংশ ভিতর হতে দেখা যায়।” একথা শুনে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা কাদের জন্যে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তাদের জন্যে, যারা নরম কথা বলে, (দরিদ্রদেরকে) খানা খেতে দেয় এবং রাত্রে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন তারা আল্লাহর ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যুহরী (রঃ) এবং হাসান (রঃ) বলেনঃ “এই আয়াতের ভাবার্থ এই যে, তারা রাত্রির অধিকাংশ তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দেয়।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করে।” হযরত যহহাক (রঃ) (আরবী) কে এর পূর্ববর্তী বাক্যের সাথে মিলিয়ে দেন এবং (আরবী) হতে শুরু বলে থাকেন। কিন্তু এই উক্তিতে বড় কৃত্রিমতা রয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো।' মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ ‘তারা নামায পড়ে। অন্যান্য তাফসীরকারগণ বলেন, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘তারা রাত্রে (ইবাদতে) দাঁড়িয়ে থাকে এবং সকাল হলে তারা নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সকালে তারা ক্ষমা প্রার্থনাকারী।” (৩:১৭) এই ক্ষমা প্রার্থনা যদি নামাযেই হয় তবে তো খুবই ভাল। সহীহ হাদীস গ্রন্থসমূহে সাহাবীদের একটি জামাআতের কয়েকটি রিওয়াইয়াত দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন শেষ তৃতীয়াংশ রাত্রি অবশিষ্ট থাকে তখন প্রতি রাত্রে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেনঃ “কোন তাওবাকারী আছে কি? আমি তার তাওবা কবুল করবে। কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে। ক্ষমা করে দিবো। কোন যাজ্ঞাকারী আছে কি? আমি তাকে প্রদান করবে।” ফজর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা এরূপই বলতে থাকেন।”আল্লাহ তাআলা যে হযরত ইয়াকূব (আঃ) সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি তাঁর পুত্রদেরকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।” এ ব্যাপারে অধিকাংশ তাফসীরকার বলেন যে, তাঁর এই ক্ষমা প্রার্থনা রাত্রির শেষ প্রহরেই ছিল।এরপর আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের আর একটি গুণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেমন নামায পড়ে আল্লাহর হক আদায় করেন, অনুরূপভাবে মানুষের হকের কথাও তারা ভুলে যান না। তাঁরা যাকাত আদায় করে থাকেন। তারা জনগণের সঙ্গে সদাচরণ করেন, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন। তাদের ধন-সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে। যেমন হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ভিক্ষুকের হক রয়েছে যদিও সে ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করতে আসে। (এ হাদীস ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর মতে মাহরূম বা বঞ্চিত হলো ঐ ব্যক্তি যার ইসলামে কোন অংশ নেই অর্থাৎ বায়তুল মালে কোন অংশ নেই, কোন কাজ-কামও হাতে নেই এবং কোন শিল্প ও কলা-কৌশলও তার জানা নেই যার দ্বারা সে জীবিকা উপার্জন করতে পারে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন যে, মাহরাম দ্বারা ঐ লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা কাজ-কাম কিছু জানে বটে, কিন্তু তা দ্বারা যা সে উপার্জন করে তা তাদের জীবন ধারণের জন্যে যথেষ্ট হয় না। যহহাক (রঃ) বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে পূর্বে ধনী ছিল; কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার মাল-ধন ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন ইয়ামামায় যখন জলোচ্ছাস হলো এবং এক ব্যক্তির সমস্ত মাল-ধন ও আসবাব পত্র পানিতে ভেসে গেল তখন একজন সাহাবী (রাঃ) বললেনঃ “এ লোকটি মাহরূম বা বঞ্চিত। অন্যান্য বুযুর্গ মুফাসসিরগণ বলেন যে, মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যে অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে না। একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি মিসকীন নয় যে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং যাকে তুমি দু' এক গ্রাস খাবার বা দু' একটি খেজুর প্রদান করে থাকো, বরং মিসকীন ঐ ব্যক্তি যে এই পরিমাণ উপার্জন করে যা তার জন্যে যথেষ্ট নয় বা যা তার প্রয়োজন মিটায় না এবং তার এমন অবস্থা প্রকাশ পায় না যে, মানুষ তার অভাবের কথা জানতে পেরে তাকে কিছু দান করে।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) মক্কা যাচ্ছিলেন। পথে একটি কুকুর এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি যবেহকৃত একটি বকরীর কাঁধ কেটে কুকুরটির সামনে নিক্ষেপ করেন এবং বলেনঃ “লোকেরা বলে যে, এটাও মাহরূম বা বঞ্চিত।” হযরত শাবী (রঃ) বলেনঃ “আমি ‘মাহরূম এর অর্থ জানতে অপারগ হয়ে গেছি।”ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “মাহরূম হলো ঐ ব্যক্তি যার মাল নেই, তা যে কারণেই হোক না কেন। অর্থাৎ সে হয়তো মাল উপার্জন করতেই সক্ষম নয়, কিংবা হয়তো তার মাল ধ্বংস হয়ে গেছে কোন দুর্যোগের কারণে।”হযরত হাসান ইবনে মুহাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাফিরদেরকে দমন করার উদ্দেশ্যে একটি ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করেন এবং তাঁরা গানীমাতও লাভ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এমন কতগুলো লোক আগমন করে যারা গানীমতের মাল বন্টনের সময় উপস্থিত ছিল না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। এই ঘটনা দ্বারা তো বুঝা যায় যে, এই আয়াতটি মাদানী। কিন্তু আসলে তা নয়, বরং এটি মক্কী আয়াত। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্যে ধরিত্রীতে নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ক্ষমতার বহু নিদর্শন রয়েছে। এগুলো মহান সৃষ্টিকর্তার মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব ও বিরাটত্ব প্রমাণ করে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যাবে যে, কিভাবে তিনি দুনিয়ায় জীব-জন্তু ও গাছ-পালা ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিভাবে তিনি পর্বতরাজিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, মাঠ-ময়দানকে করেছেন বিস্তৃত এবং সমুদ্র ও নদ-নদীকে করে রেখেছেন প্রবাহিত। মানুষের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তিনি তাদের বর্ণ, আকৃতি, ভাষা, কামনা-বাসনা, বিবেক-বুদ্ধি, শক্তি-সামর্থ্য বিভিন্ন প্রকারের করেছেন। তাদের অঙ্গ-ভঙ্গী তাদের পাপ পুণ্য এবং দৈহিক গঠনের কথা চিন্তা করলেও বিস্মিত হতে হয়। প্রত্যেক অঙ্গ কেমন উপযুক্ত জায়গায় রয়েছে। এ জন্যেই এরপরেই বলেছেনঃ “তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে)। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না? হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তি নিজের সৃষ্টির কথা চিন্তা করবে, নিজের গ্রন্থীগুলোর বিন্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে সে অবশ্যই বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে যে, তাকে আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্যেই ।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ “আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবিকার উৎস অর্থাৎ বৃষ্টি এবং প্রতিশ্রুত সবকিছু অর্থাৎ জান্নাত।' হযরত ওয়াসিল আহদাব (রঃ) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেনঃ “আমার রিযক তো রয়েছে আসমানে, অথচ আমি তা অনুসন্ধান করছি যমীনে, এটা বড়ই দুঃখজনক ব্যাপারই বটে।” একথা বলে তিনি লোকালয় ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলে চলে যান। তিনি তিন দিন পর্যন্ত তো কিছুই পেলেন না। কিন্তু তৃতীয় দিনে দেখেন যে, টাটকা খেজুরের একটি গুচ্ছ তার পার্শ্বে আছে। তাঁর ভাই, যিনি তাঁর চেয়েও বেশী বিশুদ্ধ ও খাটি অন্তকরণ বিশিষ্ট লোক ছিলেন, তার সাথেই বেরিয়ে এসেছিলেন এবং তারা দুই ভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত জঙ্গলেই জীবন কাটিয়ে দেন। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বয়ং নিজেরই শপথ করে বলেনঃ আমি তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছি অর্থাৎ কিয়ামত, পুনরুত্থান, শাস্তি ও পুরস্কার ইত্যাদি সবই সত্য। যেমন তোমাদের মুখ হতে বের হওয়া কথায় তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে না, অনুরূপভাবে এসব বিষয়েও তোমাদের সন্দেহ করা মোটেই উচিত নয়। হযরত মুআয (রাঃ) যখন কোন কথা বলতেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে বলতেনঃ “নিশ্চয়ই এটা সত্য যেমন তুমি এখানে রয়েছে।”হযরত হাসান বসরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ কওমগুলোকে ধ্বংস করুন যাদের জন্যে তাদের প্রতিপালক (আল্লাহ) শপথ করেছেন, অতঃপর তারা তা বিশ্বাস করেনি।” (এ হাদীসটি মুরসাল। কেননা, হযরত হাসান বসরী (রঃ) একজন তাবেয়ী। তিনি কোন সাহাবীর (রাঃ) নাম না নিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন)
আয-যারিয়াত 51:24
২৪-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: এ ঘটনাটি সূরায়ে হূদ ও সূরায়ে হিজরে গত হয়েছে। মেহমান বা অতিথিরা ফেরেশতা ছিলেন, যারা মানুষের আকারে আগমন করেছিলেন। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা সম্মান দান করেছিলেন। হযরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং অন্যান্য আলেমদের একটি জামা'আত বলেন যে, অতিথিদেরকে আতিথ্য দান করা ওয়াজিব। হাদীসেও এটা এসেছে এবং কুরআন কারীমের বাহ্যিক শব্দও এটাই।মানবরূপী ফেরেশতাগণ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে সালাম করেন এবং তিনি সালামের জবাব দেন। দ্বিতীয় (আরবী) শব্দের উপর দুই পেশ হওয়াটাই এর প্রমাণ। আল্লাহ তা'আলা এজন্যেই বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তোমাদেরকে সালাম দেয়া হবে তখন তোমরা ওর চেয়ে উত্তম (শব্দ) দ্বারা জবাব দিবে অথবা ওটাই ফিরিয়ে দিবে।" (৪:৮৬)হযরত খলীল (আঃ) উত্তম পন্থাটিই গ্রহণ করেন। তারা যে আসলে ফেরেশতা ছিলেন তা হযরত ইবরাহীম (আঃ) জানতেন না বলে তিনি বলেনঃ “এরা তো অপরিচিত লোক।” ফেরেশতারা ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ), হযরত মীকাঈল (আঃ) এবং হযরত ইসরাফীল (আঃ)। তাঁরা সুশ্রী যুবকের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন। তাদের চেহারায় মর্যাদা ও ভীতির লক্ষণ প্রকাশমান ছিল। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের খাদ্য তৈরীর কাজে মগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি নিঃশব্দে অতি তাড়াতাড়ি স্বীয় স্ত্রীর নিকট গমন করেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই গো-বৎসের ভাজা গোশত নিয়ে তাদের সামনে হাযির হয়ে যান। তিনি ঐ গোশত তাঁদের নিকটে রেখে দেন এবং বলেনঃ “আপনারা খাচ্ছেন না কেন?” এর দ্বারা জিয়াফতের আদব জানা যাচ্ছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) মেহমানকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই এবং তাদের জন্যে তিনি যে খাবার আনছেন এ অনুগ্রহের কথা তাদেরকে বলেই নিঃশব্দে তাঁদের নিকট হতে চলে গেলেন এবং তাড়াতাড়ি উৎকৃষ্ট হতে উৎকৃষ্টতম যে জিনিস তিনি পেলেন তা প্রস্তুত করে নিয়ে আসলেন। তা ছিল অল্প বয়স্ক একটি তাজা গো-বৎসের ভাজা গোশত। এ খাদ্য তাদের সামনে রেখে দিয়ে তিনি তাদেরকে খেয়ে নেন' একথা বললেন না। কেননা, এতে এক ধরনের হুকুম পাওয়া যাচ্ছে। বরং তিনি তার সম্মানিত মেহমানদেরকে অত্যন্ত বিনয় ও ভালবাসার সুরে বলেনঃ “আপনারা খেতে শুরু করছেন না কেন?” যেমন কোন ব্যক্তি কাউকেও বলে থাকেঃ “যদি আপনি দয়া, অনুগ্রহ ও সদাচরণ করতে চান তবে করতে পারেন।"এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “এতে তাদের সম্পর্কে তার মনে ভীতির সঞ্চার হলো।' যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থৎ “সে যখন দেখলো যে, তাদের হস্তগুলো ওর দিকে প্রসারিত হচ্ছে না, তখন সে তাদেরকে অবাঞ্ছিত মনে করলো এবং তাদের সম্বন্ধে তার মনে ভীতির সঞ্চার হলো। তারা বললোঃ ভয় করো না, আমরা লুত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। তখন তার স্ত্রী দাঁড়িয়েছিল এবং সে হাসলো।" (১১:৭০-৭১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ “অতঃপর আমি তাকে ইসহাক (আঃ)-এর ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়াকূব (আঃ)-এর সুসংবাদ দিলাম। সে বললোঃ কি আশ্চর্য! সন্তানের জননী হবো আমি যখন আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! এটা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার। তারা বললোঃ আল্লাহর কাজে তুমি বিস্ময়বোধ করছো? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি প্রশংসার্হ ও সম্মানার্হ।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ “তারা তাকে এক জ্ঞানী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলো। এ আয়াতে আছে যে, ফেরেশতারা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, আর পূর্ববর্তী আয়াতে রয়েছে, এ সংবাদ তাঁরা তার স্ত্রীকে দিয়েছিলেন। সুতরাং ভাবার্থ এই যে, স্বামী-স্ত্রী দু'জনকেই এ সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল। কেননা, সন্তানের জন্মগ্রহণ উভয়ের জন্যেই খুশীর বিষয়।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ সুসংবাদ শুনে হযরত ইবরাহীম। (আঃ)-এর স্ত্রীর মুখ দিয়ে জোর শব্দ বেরিয়ে আসলো এবং কপালে হাত মেরে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বললেনঃ “যৌবনে আমি বন্ধ্যা ছিলাম। এখন আমিও বৃদ্ধা এবং আমার স্বামীও বৃদ্ধ, এমতাবস্থায় আমি গর্ভবতী হববা?” তার এই কথা শুনে ফেরেশতারা বললেনঃ “এই সুসংবাদ আমরা আমাদের নিজেদের পক্ষ হতে দিচ্ছি না। বরং মহামহিমান্বিত আল্লাহই আমাদেরকে এ সুসংবাদ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তো প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। আপনারা যে মহা সম্মান পাওয়ার যোগ্য এটা তিনি ভালরূপেই জানেন। তাঁর ঘোষণা এই যে, এ বৃদ্ধ বয়সেই তিনি আপনাদেরকে সন্তান দান করবেন। তাঁর কোন কাজই প্রজ্ঞাশূন্য নয় এবং তার কোন হুকুমও হিকমত শূন্য হতে পারে না।”
আয-যারিয়াত 51:25
২৪-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: এ ঘটনাটি সূরায়ে হূদ ও সূরায়ে হিজরে গত হয়েছে। মেহমান বা অতিথিরা ফেরেশতা ছিলেন, যারা মানুষের আকারে আগমন করেছিলেন। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা সম্মান দান করেছিলেন। হযরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং অন্যান্য আলেমদের একটি জামা'আত বলেন যে, অতিথিদেরকে আতিথ্য দান করা ওয়াজিব। হাদীসেও এটা এসেছে এবং কুরআন কারীমের বাহ্যিক শব্দও এটাই।মানবরূপী ফেরেশতাগণ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে সালাম করেন এবং তিনি সালামের জবাব দেন। দ্বিতীয় (আরবী) শব্দের উপর দুই পেশ হওয়াটাই এর প্রমাণ। আল্লাহ তা'আলা এজন্যেই বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তোমাদেরকে সালাম দেয়া হবে তখন তোমরা ওর চেয়ে উত্তম (শব্দ) দ্বারা জবাব দিবে অথবা ওটাই ফিরিয়ে দিবে।" (৪:৮৬)হযরত খলীল (আঃ) উত্তম পন্থাটিই গ্রহণ করেন। তারা যে আসলে ফেরেশতা ছিলেন তা হযরত ইবরাহীম (আঃ) জানতেন না বলে তিনি বলেনঃ “এরা তো অপরিচিত লোক।” ফেরেশতারা ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ), হযরত মীকাঈল (আঃ) এবং হযরত ইসরাফীল (আঃ)। তাঁরা সুশ্রী যুবকের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন। তাদের চেহারায় মর্যাদা ও ভীতির লক্ষণ প্রকাশমান ছিল। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের খাদ্য তৈরীর কাজে মগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি নিঃশব্দে অতি তাড়াতাড়ি স্বীয় স্ত্রীর নিকট গমন করেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই গো-বৎসের ভাজা গোশত নিয়ে তাদের সামনে হাযির হয়ে যান। তিনি ঐ গোশত তাঁদের নিকটে রেখে দেন এবং বলেনঃ “আপনারা খাচ্ছেন না কেন?” এর দ্বারা জিয়াফতের আদব জানা যাচ্ছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) মেহমানকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই এবং তাদের জন্যে তিনি যে খাবার আনছেন এ অনুগ্রহের কথা তাদেরকে বলেই নিঃশব্দে তাঁদের নিকট হতে চলে গেলেন এবং তাড়াতাড়ি উৎকৃষ্ট হতে উৎকৃষ্টতম যে জিনিস তিনি পেলেন তা প্রস্তুত করে নিয়ে আসলেন। তা ছিল অল্প বয়স্ক একটি তাজা গো-বৎসের ভাজা গোশত। এ খাদ্য তাদের সামনে রেখে দিয়ে তিনি তাদেরকে খেয়ে নেন' একথা বললেন না। কেননা, এতে এক ধরনের হুকুম পাওয়া যাচ্ছে। বরং তিনি তার সম্মানিত মেহমানদেরকে অত্যন্ত বিনয় ও ভালবাসার সুরে বলেনঃ “আপনারা খেতে শুরু করছেন না কেন?” যেমন কোন ব্যক্তি কাউকেও বলে থাকেঃ “যদি আপনি দয়া, অনুগ্রহ ও সদাচরণ করতে চান তবে করতে পারেন।"এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “এতে তাদের সম্পর্কে তার মনে ভীতির সঞ্চার হলো।' যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থৎ “সে যখন দেখলো যে, তাদের হস্তগুলো ওর দিকে প্রসারিত হচ্ছে না, তখন সে তাদেরকে অবাঞ্ছিত মনে করলো এবং তাদের সম্বন্ধে তার মনে ভীতির সঞ্চার হলো। তারা বললোঃ ভয় করো না, আমরা লুত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। তখন তার স্ত্রী দাঁড়িয়েছিল এবং সে হাসলো।" (১১:৭০-৭১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ “অতঃপর আমি তাকে ইসহাক (আঃ)-এর ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়াকূব (আঃ)-এর সুসংবাদ দিলাম। সে বললোঃ কি আশ্চর্য! সন্তানের জননী হবো আমি যখন আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! এটা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার। তারা বললোঃ আল্লাহর কাজে তুমি বিস্ময়বোধ করছো? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি প্রশংসার্হ ও সম্মানার্হ।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ “তারা তাকে এক জ্ঞানী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলো। এ আয়াতে আছে যে, ফেরেশতারা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, আর পূর্ববর্তী আয়াতে রয়েছে, এ সংবাদ তাঁরা তার স্ত্রীকে দিয়েছিলেন। সুতরাং ভাবার্থ এই যে, স্বামী-স্ত্রী দু'জনকেই এ সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল। কেননা, সন্তানের জন্মগ্রহণ উভয়ের জন্যেই খুশীর বিষয়।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ সুসংবাদ শুনে হযরত ইবরাহীম। (আঃ)-এর স্ত্রীর মুখ দিয়ে জোর শব্দ বেরিয়ে আসলো এবং কপালে হাত মেরে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বললেনঃ “যৌবনে আমি বন্ধ্যা ছিলাম। এখন আমিও বৃদ্ধা এবং আমার স্বামীও বৃদ্ধ, এমতাবস্থায় আমি গর্ভবতী হববা?” তার এই কথা শুনে ফেরেশতারা বললেনঃ “এই সুসংবাদ আমরা আমাদের নিজেদের পক্ষ হতে দিচ্ছি না। বরং মহামহিমান্বিত আল্লাহই আমাদেরকে এ সুসংবাদ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তো প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। আপনারা যে মহা সম্মান পাওয়ার যোগ্য এটা তিনি ভালরূপেই জানেন। তাঁর ঘোষণা এই যে, এ বৃদ্ধ বয়সেই তিনি আপনাদেরকে সন্তান দান করবেন। তাঁর কোন কাজই প্রজ্ঞাশূন্য নয় এবং তার কোন হুকুমও হিকমত শূন্য হতে পারে না।”
আয-যারিয়াত 51:26
২৪-৩০ নং আয়াতের তাফসীর: এ ঘটনাটি সূরায়ে হূদ ও সূরায়ে হিজরে গত হয়েছে। মেহমান বা অতিথিরা ফেরেশতা ছিলেন, যারা মানুষের আকারে আগমন করেছিলেন। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা সম্মান দান করেছিলেন। হযরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং অন্যান্য আলেমদের একটি জামা'আত বলেন যে, অতিথিদেরকে আতিথ্য দান করা ওয়াজিব। হাদীসেও এটা এসেছে এবং কুরআন কারীমের বাহ্যিক শব্দও এটাই।মানবরূপী ফেরেশতাগণ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে সালাম করেন এবং তিনি সালামের জবাব দেন। দ্বিতীয় (আরবী) শব্দের উপর দুই পেশ হওয়াটাই এর প্রমাণ। আল্লাহ তা'আলা এজন্যেই বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তোমাদেরকে সালাম দেয়া হবে তখন তোমরা ওর চেয়ে উত্তম (শব্দ) দ্বারা জবাব দিবে অথবা ওটাই ফিরিয়ে দিবে।" (৪:৮৬)হযরত খলীল (আঃ) উত্তম পন্থাটিই গ্রহণ করেন। তারা যে আসলে ফেরেশতা ছিলেন তা হযরত ইবরাহীম (আঃ) জানতেন না বলে তিনি বলেনঃ “এরা তো অপরিচিত লোক।” ফেরেশতারা ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ), হযরত মীকাঈল (আঃ) এবং হযরত ইসরাফীল (আঃ)। তাঁরা সুশ্রী যুবকের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন। তাদের চেহারায় মর্যাদা ও ভীতির লক্ষণ প্রকাশমান ছিল। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের খাদ্য তৈরীর কাজে মগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি নিঃশব্দে অতি তাড়াতাড়ি স্বীয় স্ত্রীর নিকট গমন করেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই গো-বৎসের ভাজা গোশত নিয়ে তাদের সামনে হাযির হয়ে যান। তিনি ঐ গোশত তাঁদের নিকটে রেখে দেন এবং বলেনঃ “আপনারা খাচ্ছেন না কেন?” এর দ্বারা জিয়াফতের আদব জানা যাচ্ছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) মেহমানকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই এবং তাদের জন্যে তিনি যে খাবার আনছেন এ অনুগ্রহের কথা তাদেরকে বলেই নিঃশব্দে তাঁদের নিকট হতে চলে গেলেন এবং তাড়াতাড়ি উৎকৃষ্ট হতে উৎকৃষ্টতম যে জিনিস তিনি পেলেন তা প্রস্তুত করে নিয়ে আসলেন। তা ছিল অল্প বয়স্ক একটি তাজা গো-বৎসের ভাজা গোশত। এ খাদ্য তাদের সামনে রেখে দিয়ে তিনি তাদেরকে খেয়ে নেন' একথা বললেন না। কেননা, এতে এক ধরনের হুকুম পাওয়া যাচ্ছে। বরং তিনি তার সম্মানিত মেহমানদেরকে অত্যন্ত বিনয় ও ভালবাসার সুরে বলেনঃ “আপনারা খেতে শুরু করছেন না কেন?” যেমন কোন ব্যক্তি কাউকেও বলে থাকেঃ “যদি আপনি দয়া, অনুগ্রহ ও সদাচরণ করতে চান তবে করতে পারেন।"এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “এতে তাদের সম্পর্কে তার মনে ভীতির সঞ্চার হলো।' যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থৎ “সে যখন দেখলো যে, তাদের হস্তগুলো ওর দিকে প্রসারিত হচ্ছে না, তখন সে তাদেরকে অবাঞ্ছিত মনে করলো এবং তাদের সম্বন্ধে তার মনে ভীতির সঞ্চার হলো। তারা বললোঃ ভয় করো না, আমরা লুত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। তখন তার স্ত্রী দাঁড়িয়েছিল এবং সে হাসলো।" (১১:৭০-৭১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ “অতঃপর আমি তাকে ইসহাক (আঃ)-এর ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়াকূব (আঃ)-এর সুসংবাদ দিলাম। সে বললোঃ কি আশ্চর্য! সন্তানের জননী হবো আমি যখন আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! এটা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার। তারা বললোঃ আল্লাহর কাজে তুমি বিস্ময়বোধ করছো? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি প্রশংসার্হ ও সম্মানার্হ।”মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ “তারা তাকে এক জ্ঞানী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলো। এ আয়াতে আছে যে, ফেরেশতারা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, আর পূর্ববর্তী আয়াতে রয়েছে, এ সংবাদ তাঁরা তার স্ত্রীকে দিয়েছিলেন। সুতরাং ভাবার্থ এই যে, স্বামী-স্ত্রী দু'জনকেই এ সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল। কেননা, সন্তানের জন্মগ্রহণ উভয়ের জন্যেই খুশীর বিষয়।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ সুসংবাদ শুনে হযরত ইবরাহীম। (আঃ)-এর স্ত্রীর মুখ দিয়ে জোর শব্দ বেরিয়ে আসলো এবং কপালে হাত মেরে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বললেনঃ “যৌবনে আমি বন্ধ্যা ছিলাম। এখন আমিও বৃদ্ধা এবং আমার স্বামীও বৃদ্ধ, এমতাবস্থায় আমি গর্ভবতী হববা?” তার এই কথা শুনে ফেরেশতারা বললেনঃ “এই সুসংবাদ আমরা আমাদের নিজেদের পক্ষ হতে দিচ্ছি না। বরং মহামহিমান্বিত আল্লাহই আমাদেরকে এ সুসংবাদ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তো প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। আপনারা যে মহা সম্মান পাওয়ার যোগ্য এটা তিনি ভালরূপেই জানেন। তাঁর ঘোষণা এই যে, এ বৃদ্ধ বয়সেই তিনি আপনাদেরকে সন্তান দান করবেন। তাঁর কোন কাজই প্রজ্ঞাশূন্য নয় এবং তার কোন হুকুমও হিকমত শূন্য হতে পারে না।”