Tafseer ibn Kathir — আল-ওয়াকিয়া 56:79 – আল-হাদীদ 57:26
Contents
- আল-ওয়াকিয়া 56:79
- আল-ওয়াকিয়া 56:80
- আল-ওয়াকিয়া 56:81
- আল-ওয়াকিয়া 56:82
- আল-ওয়াকিয়া 56:83
- আল-ওয়াকিয়া 56:84
- আল-ওয়াকিয়া 56:85
- আল-ওয়াকিয়া 56:86
- আল-ওয়াকিয়া 56:87
- আল-ওয়াকিয়া 56:88
- আল-ওয়াকিয়া 56:89
- আল-ওয়াকিয়া 56:90
- আল-ওয়াকিয়া 56:91
- আল-ওয়াকিয়া 56:92
- আল-ওয়াকিয়া 56:93
- আল-ওয়াকিয়া 56:94
- আল-ওয়াকিয়া 56:95
- আল-ওয়াকিয়া 56:96
- আল-হাদীদ 57:1
- আল-হাদীদ 57:2
- আল-হাদীদ 57:3
- আল-হাদীদ 57:4
- আল-হাদীদ 57:5
- আল-হাদীদ 57:6
- আল-হাদীদ 57:7
- আল-হাদীদ 57:8
- আল-হাদীদ 57:9
- আল-হাদীদ 57:10
- আল-হাদীদ 57:11
- আল-হাদীদ 57:12
- আল-হাদীদ 57:13
- আল-হাদীদ 57:14
- আল-হাদীদ 57:15
- আল-হাদীদ 57:16
- আল-হাদীদ 57:17
- আল-হাদীদ 57:18
- আল-হাদীদ 57:19
- আল-হাদীদ 57:20
- আল-হাদীদ 57:21
- আল-হাদীদ 57:22
- আল-হাদীদ 57:23
- আল-হাদীদ 57:24
- আল-হাদীদ 57:25
- আল-হাদীদ 57:26
আল-ওয়াকিয়া 56:79
৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার এই কসমগুলো কালাম শুরু করার জন্যে হয়ে থাকে। কিন্তু এই উক্তিটি দুর্বল। জমহুর বলেন যে, এটা আল্লাহ তা'আলার কসম, তিনি তার মাখলুকের মধ্যে যার ইচ্ছা কসম খেতে পারেন এবং এর দ্বারা ঐ জিনিসের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। কোন কোন মুফাসসিরের উক্তি এই যে, এখানে (আরবী) অতিরিক্ত এবং.... (আরবী) হলো কসমের জবাব। এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। অন্যেরা বলেন যে, এখানে (আরবী)-কে অতিরিক্ত বলার কোন প্রয়োজনই নেই। কালামে আরবের প্রথা হিসেবে এটা কসমের শুরুতে এসে থাকে। যখন কোন জিনিসের উপর কসম খাওয়া হয় এবং ওটাকে অস্বীকার করা উদ্দেশ্য হয় তখন কসমের শুরুতে এই এসে থাকে। যেমন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিম্নের উক্তিতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাত কখনো কোন স্ত্রীলোকের হাতকে স্পর্শ করেনি।” অর্থাৎ বায়আত গ্রহণের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কখনো কোন নিঃসম্পর্ক স্ত্রীলোকের সাথে মুসাফাহা বা করমর্দন করেননি। অনুরূপভাবে এখানেও। কসমের শুরুতে নিয়ম অনুযায়ী এসেছে, অতিরিক্ত হিসেবে নয়। তাহলে কালামের ভাবার্থ হবেঃ কুরআন কারীম সম্পর্কে তোমাদের যে ধারণা আছে যে, এটা যাদু, এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বরং এ পবিত্র কিতাবটি আল্লাহর কালাম। কোন কোন আরব বলেন যে, (আরবী) দ্বারা তাদের কালামকে অস্বীকার করা হয়েছে। অতঃপর আসল বিষয়ের স্বীকৃতি শব্দে রয়েছে।(আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন কারীম ক্রমান্বয়ে অবতীর্ণ হওয়া। লাওহে মাহফুয হতে তো কদরের রাত্রিতে কুরআন কারীম একই সাথে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়। তারপর প্রয়োজন মত অল্প অল্প করে সময়ে সময়ে অবতীর্ণ হতে থাকে। এই ভাবে কয়েক বছরে পূর্ণ কুরআন অবতীর্ণ হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আসমানের সূর্যোদয়ের জায়গাকে বুঝানো হয়েছে। (আরবী) দ্বারা (আরবী) উদ্দেশ্য। হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন ঐগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। যহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ তারকাগুলোকে বুঝানো হয়েছে যেগুলো সম্পর্কে মুশরিকদের আকীদা বা বিশ্বাস ছিল যে, অমুক অমুক তারকার কারণে তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে।এরপর ঘোষিত হচ্ছেঃ অবশ্যই এটা এক মহাশপথ! কেননা, যে বিষয়ের উপর শপথ করা হচ্ছে তা খুবই বড় বিষয়। অর্থাৎ এই কুরআন বড়ই সম্মানিত কিতাব। এটা বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন, সুরক্ষিত ও সুদৃঢ় কিতাবে রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা পূতঃপবিত্র তারা ব্যতীত অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না। অর্থাৎ শুধু ফেরেশতারাই এটা স্পর্শ করে থাকেন। হ্যাঁ, তবে দুনিয়ায় এটাকে সবাই স্পর্শ করে সেটা অন্য কথা। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এখানে পবিত্র দ্বারা উদ্দেশ্য মানুষ নয়, মানুষ তো পাপী। এটা কাফিরদের জবাবে বলা হয়েছে। তারা বলতো যে, এই কুরআন নিয়ে শয়তান অবতীর্ণ হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় পরিষ্কারভাবে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা নিয়ে শয়তানরা অবতীর্ণ হয় না, না তাদের এই যোগ্যতা বা শক্তি আছে, এমনকি তাদেরকে তো এটা শ্রবণ হতেও দূর করে দেয়া হয়।” (২৬:২১০-২১২) এ আয়াতের তাফসীরে এ উক্তিটিই মনে বেশী ধরছে। তবে অন্যান্য উক্তিগুলোও এর অনুরূপ হতে পারে। ফারা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, এর স্বাদ ও মজা শুধুমাত্র ঈমানদার লোকেরাই পেতে পারে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো অপবিত্রতা হতে পবিত্র হওয়া। যদিও এটা খবর, কিন্তু উদ্দেশ্য হলো ইনশা। কুরআন দ্বারা এখানে মাসহাফ উদ্দেশ্য। ভাবার্থ হলো এই যে, মুসলমান অপবিত্র অবস্থায় কুরআন কারীমে হাত লাগাবে না। একটি হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমকে সাথে নিয়ে হারবী কাফিরদের দেশে যেতে নিষেধ করেছেন। কেননা, হতে পারে যে, শত্রুরা এর কোন ক্ষতি সাধন করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে হাযাম (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে পত্রটি লিখে দিয়েছিলেন তাতে এও ছিলঃ “পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া যেন কেউ কুরআন স্পর্শ না করে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) স্বীয় মুআত্তা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)মারাসীলে আবি দাউদে রয়েছে যে, যুহরী (রঃ) বলেনঃ “আমি স্বয়ং পত্রটি দেখেছি এবং তাতে এই বাক্যটি পাঠ করেছি।” যদিও এ রিওয়াইয়াতটির বহু সনদ রয়েছে কিন্তু প্রত্যেকটির বিষয়েই চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ এই কুরআন কবিতা, যাদু অথবা অন্য কোন বিষয়ের গ্রন্থ নয়, বরং এটা সরাসরি সত্য। কারণ এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। এটাই সঠিক ও সত্য কিতাব। এটা ছাড়া এর বিরোধী সবই মিথ্যা এবং সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যাত। তবুও কি তোমরা এই বাণীকে তুচ্ছ গণ্য করবে? এর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কি এটাই হবে যে, তোমরা একে অবিশ্বাস করবে? ইযদ গোত্রের ভাষায় (আরবী)-এর অর্থ (আরবী) বা কৃতজ্ঞতা এসে থাকে। মুসনাদের একটি হাদীসেও (আরবী) -এর অর্থ (আরবী) করা হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা বলে থাকো যে, অমুক তারকার কারণে তোমরা পানি পেয়েছো বা অমুক তারকার কারণে অমুক জিনিস পেয়েছো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বৃষ্টির সময় কোন কোন লোক কুফরী কালেমা বলে ফেলে। তারা বলে থাকে যে, বৃষ্টির কারণ হলো অমুক তারকা।হযরত যায়েদ ইবনে খালিদ জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা হুদায়বিয়ায় অবস্থান করছিলাম, রাত্রে খুব বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিল। ফজরের নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের দিকে মুখ করে বলেনঃ “আজ রাত্রে তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন তা তোমরা জান কি?” জনগণ বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আজ আমার বান্দাদের মধ্যে অনেকে কাফির হয়েছে এবং অনেকে মুমিন হয়েছে। যে বলেছে যে, আল্লাহর ফযল ও করমে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে, সে আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং তারকাকে অস্বীকারকারী। আর যে বলেছে যে, অমুক অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে, সে আমার সাথে কুফরী করেছে এবং তারকার উপর ঈমান এনেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) স্বীয় মুআত্তা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিমও (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আকাশ হতে যে বরকত নাযিল হয় তা কারো ঈমানের এবং কারো কুফরীর কারণ হয়ে থাকে (শেষ পর্যন্ত)।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন) হ্যাঁ, তবে এটা লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, একবার হযরত উমার (রাঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “সুরাইয়া তারকা উদিত হতে কত দিন বাকী আছে?” তারপর তিনি বলেনঃ “জ্যোতির্বিদদের ধারণা এই যে, এই তারকা লুপ্ত হয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর আবার দিগন্তে প্রকাশিত হয়ে থাকে। বাস্তবে এটাই হয় যে, এই প্রশ্নোত্তর ও ইসতিসকার (পানির জন্যে প্রার্থনার) সাত দিন অতিক্রান্ত হতেই বৃষ্টি বর্ষিত হয়। তবে এ ঘটনাটি স্বভাব এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এটা নয় যে, ঐ তারকাকেই তিনি বৃষ্টি বর্ষণের কারণ মনে করতেন। কেননা, এ ধরনের আকীদা তো কুফরী! হ্যাঁ, তবে অভিজ্ঞতাবলে কোন কিছু জেনে নেয়া বা কোন কথা বলে দেয়া অন্য জিনিস। এই ব্যাপারে বহু হাদীস (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ মানুষের জন্যে যে রহমত খুলে দেন তা কেউ বন্ধ রাখতে পারে না। (৩৫:২) এই আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে বলতে শুনেনঃ ‘অমুক তারকার প্রভাবে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। তখন তিনি বলেনঃ “তুমি মিথ্যা কথা বলেছে। এ বৃষ্টি তো আল্লাহ তাআলাই বর্ষণ করেছেন! এটা আল্লাহর রিযক।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখনই রাত্রে কোন কওমের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে তখনই সকালে ঐ কওম ওর সাথে কুফরীকারী হয়েছে।” তারপর আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তিটি তিনি উদ্ধৃত করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের উপজীব্য করে নিয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, তাদের মধ্যে কোন উক্তিকারী উক্তি করেঃ “অমুক অমুক তারকার প্রভাবে আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। (এ হাদীসটিও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে মারফু' রূপে বর্ণিত আছেঃ “সাত বছর পর্যন্ত যদি মানুষ দুর্ভিক্ষের মধ্যে পতিত থাকে, তারপর যদি তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়, তবে তখনো তারা বলে বসবে যে, অমুক তারকা বৃষ্টি বর্ষণ করেছে।”‘তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের উপজীব্য করে নিয়েছে। আল্লাহ পাকের এ উক্তি সম্পর্কে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমরা এ কথা বলো না যে, অমুক প্রাচুর্যের কারণ হলো অমুক জিনিস, বরং বললঃ সব কিছুই আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এসে থাকে। সুতরাং ভাবার্থ এটাও। আবার ভাবার্থ এও হতে পারে যে, কুরআনে তাদের কোনই অংশ নেই, বরং তাদের অংশ এটাই যে, তারা এই কুরআনের উপর মিথ্যারোপ করে থাকে। এই ভাবার্থের পৃষ্ঠপোষকতা করে নিম্নের আয়াতদ্বয়ঃ (আরবী)
আল-ওয়াকিয়া 56:80
৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার এই কসমগুলো কালাম শুরু করার জন্যে হয়ে থাকে। কিন্তু এই উক্তিটি দুর্বল। জমহুর বলেন যে, এটা আল্লাহ তা'আলার কসম, তিনি তার মাখলুকের মধ্যে যার ইচ্ছা কসম খেতে পারেন এবং এর দ্বারা ঐ জিনিসের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। কোন কোন মুফাসসিরের উক্তি এই যে, এখানে (আরবী) অতিরিক্ত এবং.... (আরবী) হলো কসমের জবাব। এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। অন্যেরা বলেন যে, এখানে (আরবী)-কে অতিরিক্ত বলার কোন প্রয়োজনই নেই। কালামে আরবের প্রথা হিসেবে এটা কসমের শুরুতে এসে থাকে। যখন কোন জিনিসের উপর কসম খাওয়া হয় এবং ওটাকে অস্বীকার করা উদ্দেশ্য হয় তখন কসমের শুরুতে এই এসে থাকে। যেমন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিম্নের উক্তিতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাত কখনো কোন স্ত্রীলোকের হাতকে স্পর্শ করেনি।” অর্থাৎ বায়আত গ্রহণের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কখনো কোন নিঃসম্পর্ক স্ত্রীলোকের সাথে মুসাফাহা বা করমর্দন করেননি। অনুরূপভাবে এখানেও। কসমের শুরুতে নিয়ম অনুযায়ী এসেছে, অতিরিক্ত হিসেবে নয়। তাহলে কালামের ভাবার্থ হবেঃ কুরআন কারীম সম্পর্কে তোমাদের যে ধারণা আছে যে, এটা যাদু, এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বরং এ পবিত্র কিতাবটি আল্লাহর কালাম। কোন কোন আরব বলেন যে, (আরবী) দ্বারা তাদের কালামকে অস্বীকার করা হয়েছে। অতঃপর আসল বিষয়ের স্বীকৃতি শব্দে রয়েছে।(আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন কারীম ক্রমান্বয়ে অবতীর্ণ হওয়া। লাওহে মাহফুয হতে তো কদরের রাত্রিতে কুরআন কারীম একই সাথে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়। তারপর প্রয়োজন মত অল্প অল্প করে সময়ে সময়ে অবতীর্ণ হতে থাকে। এই ভাবে কয়েক বছরে পূর্ণ কুরআন অবতীর্ণ হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আসমানের সূর্যোদয়ের জায়গাকে বুঝানো হয়েছে। (আরবী) দ্বারা (আরবী) উদ্দেশ্য। হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন ঐগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। যহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ তারকাগুলোকে বুঝানো হয়েছে যেগুলো সম্পর্কে মুশরিকদের আকীদা বা বিশ্বাস ছিল যে, অমুক অমুক তারকার কারণে তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে।এরপর ঘোষিত হচ্ছেঃ অবশ্যই এটা এক মহাশপথ! কেননা, যে বিষয়ের উপর শপথ করা হচ্ছে তা খুবই বড় বিষয়। অর্থাৎ এই কুরআন বড়ই সম্মানিত কিতাব। এটা বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন, সুরক্ষিত ও সুদৃঢ় কিতাবে রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা পূতঃপবিত্র তারা ব্যতীত অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না। অর্থাৎ শুধু ফেরেশতারাই এটা স্পর্শ করে থাকেন। হ্যাঁ, তবে দুনিয়ায় এটাকে সবাই স্পর্শ করে সেটা অন্য কথা। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এখানে পবিত্র দ্বারা উদ্দেশ্য মানুষ নয়, মানুষ তো পাপী। এটা কাফিরদের জবাবে বলা হয়েছে। তারা বলতো যে, এই কুরআন নিয়ে শয়তান অবতীর্ণ হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় পরিষ্কারভাবে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা নিয়ে শয়তানরা অবতীর্ণ হয় না, না তাদের এই যোগ্যতা বা শক্তি আছে, এমনকি তাদেরকে তো এটা শ্রবণ হতেও দূর করে দেয়া হয়।” (২৬:২১০-২১২) এ আয়াতের তাফসীরে এ উক্তিটিই মনে বেশী ধরছে। তবে অন্যান্য উক্তিগুলোও এর অনুরূপ হতে পারে। ফারা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, এর স্বাদ ও মজা শুধুমাত্র ঈমানদার লোকেরাই পেতে পারে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো অপবিত্রতা হতে পবিত্র হওয়া। যদিও এটা খবর, কিন্তু উদ্দেশ্য হলো ইনশা। কুরআন দ্বারা এখানে মাসহাফ উদ্দেশ্য। ভাবার্থ হলো এই যে, মুসলমান অপবিত্র অবস্থায় কুরআন কারীমে হাত লাগাবে না। একটি হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমকে সাথে নিয়ে হারবী কাফিরদের দেশে যেতে নিষেধ করেছেন। কেননা, হতে পারে যে, শত্রুরা এর কোন ক্ষতি সাধন করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে হাযাম (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে পত্রটি লিখে দিয়েছিলেন তাতে এও ছিলঃ “পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া যেন কেউ কুরআন স্পর্শ না করে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) স্বীয় মুআত্তা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)মারাসীলে আবি দাউদে রয়েছে যে, যুহরী (রঃ) বলেনঃ “আমি স্বয়ং পত্রটি দেখেছি এবং তাতে এই বাক্যটি পাঠ করেছি।” যদিও এ রিওয়াইয়াতটির বহু সনদ রয়েছে কিন্তু প্রত্যেকটির বিষয়েই চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ এই কুরআন কবিতা, যাদু অথবা অন্য কোন বিষয়ের গ্রন্থ নয়, বরং এটা সরাসরি সত্য। কারণ এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। এটাই সঠিক ও সত্য কিতাব। এটা ছাড়া এর বিরোধী সবই মিথ্যা এবং সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যাত। তবুও কি তোমরা এই বাণীকে তুচ্ছ গণ্য করবে? এর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কি এটাই হবে যে, তোমরা একে অবিশ্বাস করবে? ইযদ গোত্রের ভাষায় (আরবী)-এর অর্থ (আরবী) বা কৃতজ্ঞতা এসে থাকে। মুসনাদের একটি হাদীসেও (আরবী) -এর অর্থ (আরবী) করা হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা বলে থাকো যে, অমুক তারকার কারণে তোমরা পানি পেয়েছো বা অমুক তারকার কারণে অমুক জিনিস পেয়েছো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বৃষ্টির সময় কোন কোন লোক কুফরী কালেমা বলে ফেলে। তারা বলে থাকে যে, বৃষ্টির কারণ হলো অমুক তারকা।হযরত যায়েদ ইবনে খালিদ জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা হুদায়বিয়ায় অবস্থান করছিলাম, রাত্রে খুব বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিল। ফজরের নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের দিকে মুখ করে বলেনঃ “আজ রাত্রে তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন তা তোমরা জান কি?” জনগণ বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আজ আমার বান্দাদের মধ্যে অনেকে কাফির হয়েছে এবং অনেকে মুমিন হয়েছে। যে বলেছে যে, আল্লাহর ফযল ও করমে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে, সে আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং তারকাকে অস্বীকারকারী। আর যে বলেছে যে, অমুক অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে, সে আমার সাথে কুফরী করেছে এবং তারকার উপর ঈমান এনেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) স্বীয় মুআত্তা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিমও (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আকাশ হতে যে বরকত নাযিল হয় তা কারো ঈমানের এবং কারো কুফরীর কারণ হয়ে থাকে (শেষ পর্যন্ত)।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন) হ্যাঁ, তবে এটা লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, একবার হযরত উমার (রাঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “সুরাইয়া তারকা উদিত হতে কত দিন বাকী আছে?” তারপর তিনি বলেনঃ “জ্যোতির্বিদদের ধারণা এই যে, এই তারকা লুপ্ত হয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর আবার দিগন্তে প্রকাশিত হয়ে থাকে। বাস্তবে এটাই হয় যে, এই প্রশ্নোত্তর ও ইসতিসকার (পানির জন্যে প্রার্থনার) সাত দিন অতিক্রান্ত হতেই বৃষ্টি বর্ষিত হয়। তবে এ ঘটনাটি স্বভাব এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এটা নয় যে, ঐ তারকাকেই তিনি বৃষ্টি বর্ষণের কারণ মনে করতেন। কেননা, এ ধরনের আকীদা তো কুফরী! হ্যাঁ, তবে অভিজ্ঞতাবলে কোন কিছু জেনে নেয়া বা কোন কথা বলে দেয়া অন্য জিনিস। এই ব্যাপারে বহু হাদীস (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ মানুষের জন্যে যে রহমত খুলে দেন তা কেউ বন্ধ রাখতে পারে না। (৩৫:২) এই আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে বলতে শুনেনঃ ‘অমুক তারকার প্রভাবে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। তখন তিনি বলেনঃ “তুমি মিথ্যা কথা বলেছে। এ বৃষ্টি তো আল্লাহ তাআলাই বর্ষণ করেছেন! এটা আল্লাহর রিযক।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখনই রাত্রে কোন কওমের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে তখনই সকালে ঐ কওম ওর সাথে কুফরীকারী হয়েছে।” তারপর আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তিটি তিনি উদ্ধৃত করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের উপজীব্য করে নিয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, তাদের মধ্যে কোন উক্তিকারী উক্তি করেঃ “অমুক অমুক তারকার প্রভাবে আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। (এ হাদীসটিও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে মারফু' রূপে বর্ণিত আছেঃ “সাত বছর পর্যন্ত যদি মানুষ দুর্ভিক্ষের মধ্যে পতিত থাকে, তারপর যদি তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়, তবে তখনো তারা বলে বসবে যে, অমুক তারকা বৃষ্টি বর্ষণ করেছে।”‘তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের উপজীব্য করে নিয়েছে। আল্লাহ পাকের এ উক্তি সম্পর্কে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমরা এ কথা বলো না যে, অমুক প্রাচুর্যের কারণ হলো অমুক জিনিস, বরং বললঃ সব কিছুই আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এসে থাকে। সুতরাং ভাবার্থ এটাও। আবার ভাবার্থ এও হতে পারে যে, কুরআনে তাদের কোনই অংশ নেই, বরং তাদের অংশ এটাই যে, তারা এই কুরআনের উপর মিথ্যারোপ করে থাকে। এই ভাবার্থের পৃষ্ঠপোষকতা করে নিম্নের আয়াতদ্বয়ঃ (আরবী)
আল-ওয়াকিয়া 56:81
৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার এই কসমগুলো কালাম শুরু করার জন্যে হয়ে থাকে। কিন্তু এই উক্তিটি দুর্বল। জমহুর বলেন যে, এটা আল্লাহ তা'আলার কসম, তিনি তার মাখলুকের মধ্যে যার ইচ্ছা কসম খেতে পারেন এবং এর দ্বারা ঐ জিনিসের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। কোন কোন মুফাসসিরের উক্তি এই যে, এখানে (আরবী) অতিরিক্ত এবং.... (আরবী) হলো কসমের জবাব। এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। অন্যেরা বলেন যে, এখানে (আরবী)-কে অতিরিক্ত বলার কোন প্রয়োজনই নেই। কালামে আরবের প্রথা হিসেবে এটা কসমের শুরুতে এসে থাকে। যখন কোন জিনিসের উপর কসম খাওয়া হয় এবং ওটাকে অস্বীকার করা উদ্দেশ্য হয় তখন কসমের শুরুতে এই এসে থাকে। যেমন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিম্নের উক্তিতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাত কখনো কোন স্ত্রীলোকের হাতকে স্পর্শ করেনি।” অর্থাৎ বায়আত গ্রহণের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কখনো কোন নিঃসম্পর্ক স্ত্রীলোকের সাথে মুসাফাহা বা করমর্দন করেননি। অনুরূপভাবে এখানেও। কসমের শুরুতে নিয়ম অনুযায়ী এসেছে, অতিরিক্ত হিসেবে নয়। তাহলে কালামের ভাবার্থ হবেঃ কুরআন কারীম সম্পর্কে তোমাদের যে ধারণা আছে যে, এটা যাদু, এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বরং এ পবিত্র কিতাবটি আল্লাহর কালাম। কোন কোন আরব বলেন যে, (আরবী) দ্বারা তাদের কালামকে অস্বীকার করা হয়েছে। অতঃপর আসল বিষয়ের স্বীকৃতি শব্দে রয়েছে।(আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন কারীম ক্রমান্বয়ে অবতীর্ণ হওয়া। লাওহে মাহফুয হতে তো কদরের রাত্রিতে কুরআন কারীম একই সাথে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়। তারপর প্রয়োজন মত অল্প অল্প করে সময়ে সময়ে অবতীর্ণ হতে থাকে। এই ভাবে কয়েক বছরে পূর্ণ কুরআন অবতীর্ণ হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আসমানের সূর্যোদয়ের জায়গাকে বুঝানো হয়েছে। (আরবী) দ্বারা (আরবী) উদ্দেশ্য। হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন ঐগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। যহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ তারকাগুলোকে বুঝানো হয়েছে যেগুলো সম্পর্কে মুশরিকদের আকীদা বা বিশ্বাস ছিল যে, অমুক অমুক তারকার কারণে তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে।এরপর ঘোষিত হচ্ছেঃ অবশ্যই এটা এক মহাশপথ! কেননা, যে বিষয়ের উপর শপথ করা হচ্ছে তা খুবই বড় বিষয়। অর্থাৎ এই কুরআন বড়ই সম্মানিত কিতাব। এটা বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন, সুরক্ষিত ও সুদৃঢ় কিতাবে রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা পূতঃপবিত্র তারা ব্যতীত অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না। অর্থাৎ শুধু ফেরেশতারাই এটা স্পর্শ করে থাকেন। হ্যাঁ, তবে দুনিয়ায় এটাকে সবাই স্পর্শ করে সেটা অন্য কথা। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এখানে পবিত্র দ্বারা উদ্দেশ্য মানুষ নয়, মানুষ তো পাপী। এটা কাফিরদের জবাবে বলা হয়েছে। তারা বলতো যে, এই কুরআন নিয়ে শয়তান অবতীর্ণ হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় পরিষ্কারভাবে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা নিয়ে শয়তানরা অবতীর্ণ হয় না, না তাদের এই যোগ্যতা বা শক্তি আছে, এমনকি তাদেরকে তো এটা শ্রবণ হতেও দূর করে দেয়া হয়।” (২৬:২১০-২১২) এ আয়াতের তাফসীরে এ উক্তিটিই মনে বেশী ধরছে। তবে অন্যান্য উক্তিগুলোও এর অনুরূপ হতে পারে। ফারা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, এর স্বাদ ও মজা শুধুমাত্র ঈমানদার লোকেরাই পেতে পারে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো অপবিত্রতা হতে পবিত্র হওয়া। যদিও এটা খবর, কিন্তু উদ্দেশ্য হলো ইনশা। কুরআন দ্বারা এখানে মাসহাফ উদ্দেশ্য। ভাবার্থ হলো এই যে, মুসলমান অপবিত্র অবস্থায় কুরআন কারীমে হাত লাগাবে না। একটি হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমকে সাথে নিয়ে হারবী কাফিরদের দেশে যেতে নিষেধ করেছেন। কেননা, হতে পারে যে, শত্রুরা এর কোন ক্ষতি সাধন করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে হাযাম (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে পত্রটি লিখে দিয়েছিলেন তাতে এও ছিলঃ “পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া যেন কেউ কুরআন স্পর্শ না করে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) স্বীয় মুআত্তা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)মারাসীলে আবি দাউদে রয়েছে যে, যুহরী (রঃ) বলেনঃ “আমি স্বয়ং পত্রটি দেখেছি এবং তাতে এই বাক্যটি পাঠ করেছি।” যদিও এ রিওয়াইয়াতটির বহু সনদ রয়েছে কিন্তু প্রত্যেকটির বিষয়েই চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ এই কুরআন কবিতা, যাদু অথবা অন্য কোন বিষয়ের গ্রন্থ নয়, বরং এটা সরাসরি সত্য। কারণ এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। এটাই সঠিক ও সত্য কিতাব। এটা ছাড়া এর বিরোধী সবই মিথ্যা এবং সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যাত। তবুও কি তোমরা এই বাণীকে তুচ্ছ গণ্য করবে? এর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কি এটাই হবে যে, তোমরা একে অবিশ্বাস করবে? ইযদ গোত্রের ভাষায় (আরবী)-এর অর্থ (আরবী) বা কৃতজ্ঞতা এসে থাকে। মুসনাদের একটি হাদীসেও (আরবী) -এর অর্থ (আরবী) করা হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা বলে থাকো যে, অমুক তারকার কারণে তোমরা পানি পেয়েছো বা অমুক তারকার কারণে অমুক জিনিস পেয়েছো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বৃষ্টির সময় কোন কোন লোক কুফরী কালেমা বলে ফেলে। তারা বলে থাকে যে, বৃষ্টির কারণ হলো অমুক তারকা।হযরত যায়েদ ইবনে খালিদ জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা হুদায়বিয়ায় অবস্থান করছিলাম, রাত্রে খুব বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিল। ফজরের নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের দিকে মুখ করে বলেনঃ “আজ রাত্রে তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন তা তোমরা জান কি?” জনগণ বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আজ আমার বান্দাদের মধ্যে অনেকে কাফির হয়েছে এবং অনেকে মুমিন হয়েছে। যে বলেছে যে, আল্লাহর ফযল ও করমে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে, সে আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং তারকাকে অস্বীকারকারী। আর যে বলেছে যে, অমুক অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে, সে আমার সাথে কুফরী করেছে এবং তারকার উপর ঈমান এনেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) স্বীয় মুআত্তা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিমও (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আকাশ হতে যে বরকত নাযিল হয় তা কারো ঈমানের এবং কারো কুফরীর কারণ হয়ে থাকে (শেষ পর্যন্ত)।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন) হ্যাঁ, তবে এটা লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, একবার হযরত উমার (রাঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “সুরাইয়া তারকা উদিত হতে কত দিন বাকী আছে?” তারপর তিনি বলেনঃ “জ্যোতির্বিদদের ধারণা এই যে, এই তারকা লুপ্ত হয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর আবার দিগন্তে প্রকাশিত হয়ে থাকে। বাস্তবে এটাই হয় যে, এই প্রশ্নোত্তর ও ইসতিসকার (পানির জন্যে প্রার্থনার) সাত দিন অতিক্রান্ত হতেই বৃষ্টি বর্ষিত হয়। তবে এ ঘটনাটি স্বভাব এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এটা নয় যে, ঐ তারকাকেই তিনি বৃষ্টি বর্ষণের কারণ মনে করতেন। কেননা, এ ধরনের আকীদা তো কুফরী! হ্যাঁ, তবে অভিজ্ঞতাবলে কোন কিছু জেনে নেয়া বা কোন কথা বলে দেয়া অন্য জিনিস। এই ব্যাপারে বহু হাদীস (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ মানুষের জন্যে যে রহমত খুলে দেন তা কেউ বন্ধ রাখতে পারে না। (৩৫:২) এই আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে বলতে শুনেনঃ ‘অমুক তারকার প্রভাবে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। তখন তিনি বলেনঃ “তুমি মিথ্যা কথা বলেছে। এ বৃষ্টি তো আল্লাহ তাআলাই বর্ষণ করেছেন! এটা আল্লাহর রিযক।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখনই রাত্রে কোন কওমের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে তখনই সকালে ঐ কওম ওর সাথে কুফরীকারী হয়েছে।” তারপর আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তিটি তিনি উদ্ধৃত করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের উপজীব্য করে নিয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, তাদের মধ্যে কোন উক্তিকারী উক্তি করেঃ “অমুক অমুক তারকার প্রভাবে আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। (এ হাদীসটিও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে মারফু' রূপে বর্ণিত আছেঃ “সাত বছর পর্যন্ত যদি মানুষ দুর্ভিক্ষের মধ্যে পতিত থাকে, তারপর যদি তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়, তবে তখনো তারা বলে বসবে যে, অমুক তারকা বৃষ্টি বর্ষণ করেছে।”‘তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের উপজীব্য করে নিয়েছে। আল্লাহ পাকের এ উক্তি সম্পর্কে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমরা এ কথা বলো না যে, অমুক প্রাচুর্যের কারণ হলো অমুক জিনিস, বরং বললঃ সব কিছুই আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এসে থাকে। সুতরাং ভাবার্থ এটাও। আবার ভাবার্থ এও হতে পারে যে, কুরআনে তাদের কোনই অংশ নেই, বরং তাদের অংশ এটাই যে, তারা এই কুরআনের উপর মিথ্যারোপ করে থাকে। এই ভাবার্থের পৃষ্ঠপোষকতা করে নিম্নের আয়াতদ্বয়ঃ (আরবী)
আল-ওয়াকিয়া 56:82
৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার এই কসমগুলো কালাম শুরু করার জন্যে হয়ে থাকে। কিন্তু এই উক্তিটি দুর্বল। জমহুর বলেন যে, এটা আল্লাহ তা'আলার কসম, তিনি তার মাখলুকের মধ্যে যার ইচ্ছা কসম খেতে পারেন এবং এর দ্বারা ঐ জিনিসের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। কোন কোন মুফাসসিরের উক্তি এই যে, এখানে (আরবী) অতিরিক্ত এবং.... (আরবী) হলো কসমের জবাব। এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। অন্যেরা বলেন যে, এখানে (আরবী)-কে অতিরিক্ত বলার কোন প্রয়োজনই নেই। কালামে আরবের প্রথা হিসেবে এটা কসমের শুরুতে এসে থাকে। যখন কোন জিনিসের উপর কসম খাওয়া হয় এবং ওটাকে অস্বীকার করা উদ্দেশ্য হয় তখন কসমের শুরুতে এই এসে থাকে। যেমন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিম্নের উক্তিতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাত কখনো কোন স্ত্রীলোকের হাতকে স্পর্শ করেনি।” অর্থাৎ বায়আত গ্রহণের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কখনো কোন নিঃসম্পর্ক স্ত্রীলোকের সাথে মুসাফাহা বা করমর্দন করেননি। অনুরূপভাবে এখানেও। কসমের শুরুতে নিয়ম অনুযায়ী এসেছে, অতিরিক্ত হিসেবে নয়। তাহলে কালামের ভাবার্থ হবেঃ কুরআন কারীম সম্পর্কে তোমাদের যে ধারণা আছে যে, এটা যাদু, এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বরং এ পবিত্র কিতাবটি আল্লাহর কালাম। কোন কোন আরব বলেন যে, (আরবী) দ্বারা তাদের কালামকে অস্বীকার করা হয়েছে। অতঃপর আসল বিষয়ের স্বীকৃতি শব্দে রয়েছে।(আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন কারীম ক্রমান্বয়ে অবতীর্ণ হওয়া। লাওহে মাহফুয হতে তো কদরের রাত্রিতে কুরআন কারীম একই সাথে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়। তারপর প্রয়োজন মত অল্প অল্প করে সময়ে সময়ে অবতীর্ণ হতে থাকে। এই ভাবে কয়েক বছরে পূর্ণ কুরআন অবতীর্ণ হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আসমানের সূর্যোদয়ের জায়গাকে বুঝানো হয়েছে। (আরবী) দ্বারা (আরবী) উদ্দেশ্য। হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন ঐগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। যহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ তারকাগুলোকে বুঝানো হয়েছে যেগুলো সম্পর্কে মুশরিকদের আকীদা বা বিশ্বাস ছিল যে, অমুক অমুক তারকার কারণে তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে।এরপর ঘোষিত হচ্ছেঃ অবশ্যই এটা এক মহাশপথ! কেননা, যে বিষয়ের উপর শপথ করা হচ্ছে তা খুবই বড় বিষয়। অর্থাৎ এই কুরআন বড়ই সম্মানিত কিতাব। এটা বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন, সুরক্ষিত ও সুদৃঢ় কিতাবে রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা পূতঃপবিত্র তারা ব্যতীত অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না। অর্থাৎ শুধু ফেরেশতারাই এটা স্পর্শ করে থাকেন। হ্যাঁ, তবে দুনিয়ায় এটাকে সবাই স্পর্শ করে সেটা অন্য কথা। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এখানে পবিত্র দ্বারা উদ্দেশ্য মানুষ নয়, মানুষ তো পাপী। এটা কাফিরদের জবাবে বলা হয়েছে। তারা বলতো যে, এই কুরআন নিয়ে শয়তান অবতীর্ণ হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় পরিষ্কারভাবে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা নিয়ে শয়তানরা অবতীর্ণ হয় না, না তাদের এই যোগ্যতা বা শক্তি আছে, এমনকি তাদেরকে তো এটা শ্রবণ হতেও দূর করে দেয়া হয়।” (২৬:২১০-২১২) এ আয়াতের তাফসীরে এ উক্তিটিই মনে বেশী ধরছে। তবে অন্যান্য উক্তিগুলোও এর অনুরূপ হতে পারে। ফারা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, এর স্বাদ ও মজা শুধুমাত্র ঈমানদার লোকেরাই পেতে পারে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো অপবিত্রতা হতে পবিত্র হওয়া। যদিও এটা খবর, কিন্তু উদ্দেশ্য হলো ইনশা। কুরআন দ্বারা এখানে মাসহাফ উদ্দেশ্য। ভাবার্থ হলো এই যে, মুসলমান অপবিত্র অবস্থায় কুরআন কারীমে হাত লাগাবে না। একটি হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমকে সাথে নিয়ে হারবী কাফিরদের দেশে যেতে নিষেধ করেছেন। কেননা, হতে পারে যে, শত্রুরা এর কোন ক্ষতি সাধন করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে হাযাম (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে পত্রটি লিখে দিয়েছিলেন তাতে এও ছিলঃ “পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া যেন কেউ কুরআন স্পর্শ না করে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) স্বীয় মুআত্তা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)মারাসীলে আবি দাউদে রয়েছে যে, যুহরী (রঃ) বলেনঃ “আমি স্বয়ং পত্রটি দেখেছি এবং তাতে এই বাক্যটি পাঠ করেছি।” যদিও এ রিওয়াইয়াতটির বহু সনদ রয়েছে কিন্তু প্রত্যেকটির বিষয়েই চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ এই কুরআন কবিতা, যাদু অথবা অন্য কোন বিষয়ের গ্রন্থ নয়, বরং এটা সরাসরি সত্য। কারণ এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। এটাই সঠিক ও সত্য কিতাব। এটা ছাড়া এর বিরোধী সবই মিথ্যা এবং সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যাত। তবুও কি তোমরা এই বাণীকে তুচ্ছ গণ্য করবে? এর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কি এটাই হবে যে, তোমরা একে অবিশ্বাস করবে? ইযদ গোত্রের ভাষায় (আরবী)-এর অর্থ (আরবী) বা কৃতজ্ঞতা এসে থাকে। মুসনাদের একটি হাদীসেও (আরবী) -এর অর্থ (আরবী) করা হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা বলে থাকো যে, অমুক তারকার কারণে তোমরা পানি পেয়েছো বা অমুক তারকার কারণে অমুক জিনিস পেয়েছো।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বৃষ্টির সময় কোন কোন লোক কুফরী কালেমা বলে ফেলে। তারা বলে থাকে যে, বৃষ্টির কারণ হলো অমুক তারকা।হযরত যায়েদ ইবনে খালিদ জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা হুদায়বিয়ায় অবস্থান করছিলাম, রাত্রে খুব বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিল। ফজরের নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের দিকে মুখ করে বলেনঃ “আজ রাত্রে তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন তা তোমরা জান কি?” জনগণ বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আজ আমার বান্দাদের মধ্যে অনেকে কাফির হয়েছে এবং অনেকে মুমিন হয়েছে। যে বলেছে যে, আল্লাহর ফযল ও করমে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে, সে আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং তারকাকে অস্বীকারকারী। আর যে বলেছে যে, অমুক অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে, সে আমার সাথে কুফরী করেছে এবং তারকার উপর ঈমান এনেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) স্বীয় মুআত্তা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিমও (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আকাশ হতে যে বরকত নাযিল হয় তা কারো ঈমানের এবং কারো কুফরীর কারণ হয়ে থাকে (শেষ পর্যন্ত)।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন) হ্যাঁ, তবে এটা লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, একবার হযরত উমার (রাঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “সুরাইয়া তারকা উদিত হতে কত দিন বাকী আছে?” তারপর তিনি বলেনঃ “জ্যোতির্বিদদের ধারণা এই যে, এই তারকা লুপ্ত হয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর আবার দিগন্তে প্রকাশিত হয়ে থাকে। বাস্তবে এটাই হয় যে, এই প্রশ্নোত্তর ও ইসতিসকার (পানির জন্যে প্রার্থনার) সাত দিন অতিক্রান্ত হতেই বৃষ্টি বর্ষিত হয়। তবে এ ঘটনাটি স্বভাব এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এটা নয় যে, ঐ তারকাকেই তিনি বৃষ্টি বর্ষণের কারণ মনে করতেন। কেননা, এ ধরনের আকীদা তো কুফরী! হ্যাঁ, তবে অভিজ্ঞতাবলে কোন কিছু জেনে নেয়া বা কোন কথা বলে দেয়া অন্য জিনিস। এই ব্যাপারে বহু হাদীস (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ মানুষের জন্যে যে রহমত খুলে দেন তা কেউ বন্ধ রাখতে পারে না। (৩৫:২) এই আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে বলতে শুনেনঃ ‘অমুক তারকার প্রভাবে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। তখন তিনি বলেনঃ “তুমি মিথ্যা কথা বলেছে। এ বৃষ্টি তো আল্লাহ তাআলাই বর্ষণ করেছেন! এটা আল্লাহর রিযক।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখনই রাত্রে কোন কওমের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে তখনই সকালে ঐ কওম ওর সাথে কুফরীকারী হয়েছে।” তারপর আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তিটি তিনি উদ্ধৃত করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের উপজীব্য করে নিয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, তাদের মধ্যে কোন উক্তিকারী উক্তি করেঃ “অমুক অমুক তারকার প্রভাবে আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। (এ হাদীসটিও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে মারফু' রূপে বর্ণিত আছেঃ “সাত বছর পর্যন্ত যদি মানুষ দুর্ভিক্ষের মধ্যে পতিত থাকে, তারপর যদি তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়, তবে তখনো তারা বলে বসবে যে, অমুক তারকা বৃষ্টি বর্ষণ করেছে।”‘তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের উপজীব্য করে নিয়েছে। আল্লাহ পাকের এ উক্তি সম্পর্কে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমরা এ কথা বলো না যে, অমুক প্রাচুর্যের কারণ হলো অমুক জিনিস, বরং বললঃ সব কিছুই আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এসে থাকে। সুতরাং ভাবার্থ এটাও। আবার ভাবার্থ এও হতে পারে যে, কুরআনে তাদের কোনই অংশ নেই, বরং তাদের অংশ এটাই যে, তারা এই কুরআনের উপর মিথ্যারোপ করে থাকে। এই ভাবার্থের পৃষ্ঠপোষকতা করে নিম্নের আয়াতদ্বয়ঃ (আরবী)
আল-ওয়াকিয়া 56:83
৮৩-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যখন রূহ কণ্ঠাগত হয় অর্থাৎ যখন মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হয়, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে এবং বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? তখন তার প্রত্যয় হবে যে, এটা বিদায়ক্ষণ। আর পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাবে।সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে।” (৭৫:২৬-৩০) এ জন্যেই এখানে বলেনঃ তখন তোমরা তাকিয়ে থাকো। অর্থাৎ একটি লোক বিদায়ক্ষণে উপস্থিত। সে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করছে, রূহ বিদায় হতে চলেছে। তোমরা সবাই তার পার্শ্বে বসে তার দিকে তাকাতে থাকো। কিন্তু তোমাদের কেউ কিছু করতে পারে কি? না, কেউই কিছু করতে সক্ষম নয়। আমার ফেরেশতারা ঐ মৃত্যুমুখী ব্যক্তির তোমাদের চেয়েও বেশী নিকটে রয়েছে যাদেরকে তোমরা দেখতে পাও। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “এবং তিনি তাঁর বান্দাদের উপর জয়যুক্ত, তিনি তোমাদের উপর রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রেরণ করেন। যখন তোমাদের মধ্যে কারো মৃত্যুর সময় এসে পড়ে তখন আমার প্রেরিতরা সঠিকভাবে তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে। তারপর তারা সবাই তাদের সত্য মাওলার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে যিনি ন্যায় বিচারক এবং সত্ত্বর হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২)আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও তবে তোমরা ওটা অর্থাৎ প্রাণ ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও। অর্থাৎ যদি এটা সত্য হয় যে, তোমরা পুনরুজ্জীবিত হবে না এবং তোমাদেরকে হাশরের ময়দানে হাযির করা হবে না, যদি তোমরা হাশর-নশরে বিশ্বাসী না হও এবং তোমাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে না ইত্যাদি, তবে আমি বলি যে, তোমরা তাহলে ঐ রূহকে যেতে দিচ্ছ কেন? আটকিয়ে রাখো! যদি রূহ তোমাদের আয়ত্তাধীন হয়ে থাকে তবে কণ্ঠাগত প্রাণ বা রূহকে ওর আসল জায়গায় পৌঁছিয়ে দাও না? কিন্তু তোমরা তা কখনো পারবে না। সুতরাং জেনে রেখো যে, যেমন এই রূহকে আমি দেহে নিক্ষেপ করতে সক্ষম ছিলাম এবং তা তোমরা স্বচক্ষে দেখেছো, তেমনই বিশ্বাস রেখো যে, দ্বিতীয়বার ঐ রূহকে দেহে নিক্ষেপ করে নতুনভাবে জীবন দানেও আমি সক্ষম হবো। না তোমাদের নিজেদের জীবন সৃষ্টিতে কোন দখল আছে, না মৃত্যুতে কোন কর্তৃত্ব আছে, তাহলে পুনরুত্থানে তোমাদের দখল কোথা হতে আসলো? যেমন তোমরা বলছো যে, তোমরা মৃত্যুর পরে পুনরুজ্জীবিত হবে না? তোমাদের ধারণা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ অমূলক।
আল-ওয়াকিয়া 56:84
৮৩-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যখন রূহ কণ্ঠাগত হয় অর্থাৎ যখন মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হয়, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে এবং বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? তখন তার প্রত্যয় হবে যে, এটা বিদায়ক্ষণ। আর পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাবে।সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে।” (৭৫:২৬-৩০) এ জন্যেই এখানে বলেনঃ তখন তোমরা তাকিয়ে থাকো। অর্থাৎ একটি লোক বিদায়ক্ষণে উপস্থিত। সে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করছে, রূহ বিদায় হতে চলেছে। তোমরা সবাই তার পার্শ্বে বসে তার দিকে তাকাতে থাকো। কিন্তু তোমাদের কেউ কিছু করতে পারে কি? না, কেউই কিছু করতে সক্ষম নয়। আমার ফেরেশতারা ঐ মৃত্যুমুখী ব্যক্তির তোমাদের চেয়েও বেশী নিকটে রয়েছে যাদেরকে তোমরা দেখতে পাও। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “এবং তিনি তাঁর বান্দাদের উপর জয়যুক্ত, তিনি তোমাদের উপর রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রেরণ করেন। যখন তোমাদের মধ্যে কারো মৃত্যুর সময় এসে পড়ে তখন আমার প্রেরিতরা সঠিকভাবে তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে। তারপর তারা সবাই তাদের সত্য মাওলার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে যিনি ন্যায় বিচারক এবং সত্ত্বর হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২)আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও তবে তোমরা ওটা অর্থাৎ প্রাণ ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও। অর্থাৎ যদি এটা সত্য হয় যে, তোমরা পুনরুজ্জীবিত হবে না এবং তোমাদেরকে হাশরের ময়দানে হাযির করা হবে না, যদি তোমরা হাশর-নশরে বিশ্বাসী না হও এবং তোমাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে না ইত্যাদি, তবে আমি বলি যে, তোমরা তাহলে ঐ রূহকে যেতে দিচ্ছ কেন? আটকিয়ে রাখো! যদি রূহ তোমাদের আয়ত্তাধীন হয়ে থাকে তবে কণ্ঠাগত প্রাণ বা রূহকে ওর আসল জায়গায় পৌঁছিয়ে দাও না? কিন্তু তোমরা তা কখনো পারবে না। সুতরাং জেনে রেখো যে, যেমন এই রূহকে আমি দেহে নিক্ষেপ করতে সক্ষম ছিলাম এবং তা তোমরা স্বচক্ষে দেখেছো, তেমনই বিশ্বাস রেখো যে, দ্বিতীয়বার ঐ রূহকে দেহে নিক্ষেপ করে নতুনভাবে জীবন দানেও আমি সক্ষম হবো। না তোমাদের নিজেদের জীবন সৃষ্টিতে কোন দখল আছে, না মৃত্যুতে কোন কর্তৃত্ব আছে, তাহলে পুনরুত্থানে তোমাদের দখল কোথা হতে আসলো? যেমন তোমরা বলছো যে, তোমরা মৃত্যুর পরে পুনরুজ্জীবিত হবে না? তোমাদের ধারণা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ অমূলক।
আল-ওয়াকিয়া 56:85
৮৩-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যখন রূহ কণ্ঠাগত হয় অর্থাৎ যখন মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হয়, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে এবং বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? তখন তার প্রত্যয় হবে যে, এটা বিদায়ক্ষণ। আর পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাবে।সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে।” (৭৫:২৬-৩০) এ জন্যেই এখানে বলেনঃ তখন তোমরা তাকিয়ে থাকো। অর্থাৎ একটি লোক বিদায়ক্ষণে উপস্থিত। সে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করছে, রূহ বিদায় হতে চলেছে। তোমরা সবাই তার পার্শ্বে বসে তার দিকে তাকাতে থাকো। কিন্তু তোমাদের কেউ কিছু করতে পারে কি? না, কেউই কিছু করতে সক্ষম নয়। আমার ফেরেশতারা ঐ মৃত্যুমুখী ব্যক্তির তোমাদের চেয়েও বেশী নিকটে রয়েছে যাদেরকে তোমরা দেখতে পাও। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “এবং তিনি তাঁর বান্দাদের উপর জয়যুক্ত, তিনি তোমাদের উপর রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রেরণ করেন। যখন তোমাদের মধ্যে কারো মৃত্যুর সময় এসে পড়ে তখন আমার প্রেরিতরা সঠিকভাবে তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে। তারপর তারা সবাই তাদের সত্য মাওলার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে যিনি ন্যায় বিচারক এবং সত্ত্বর হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২)আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও তবে তোমরা ওটা অর্থাৎ প্রাণ ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও। অর্থাৎ যদি এটা সত্য হয় যে, তোমরা পুনরুজ্জীবিত হবে না এবং তোমাদেরকে হাশরের ময়দানে হাযির করা হবে না, যদি তোমরা হাশর-নশরে বিশ্বাসী না হও এবং তোমাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে না ইত্যাদি, তবে আমি বলি যে, তোমরা তাহলে ঐ রূহকে যেতে দিচ্ছ কেন? আটকিয়ে রাখো! যদি রূহ তোমাদের আয়ত্তাধীন হয়ে থাকে তবে কণ্ঠাগত প্রাণ বা রূহকে ওর আসল জায়গায় পৌঁছিয়ে দাও না? কিন্তু তোমরা তা কখনো পারবে না। সুতরাং জেনে রেখো যে, যেমন এই রূহকে আমি দেহে নিক্ষেপ করতে সক্ষম ছিলাম এবং তা তোমরা স্বচক্ষে দেখেছো, তেমনই বিশ্বাস রেখো যে, দ্বিতীয়বার ঐ রূহকে দেহে নিক্ষেপ করে নতুনভাবে জীবন দানেও আমি সক্ষম হবো। না তোমাদের নিজেদের জীবন সৃষ্টিতে কোন দখল আছে, না মৃত্যুতে কোন কর্তৃত্ব আছে, তাহলে পুনরুত্থানে তোমাদের দখল কোথা হতে আসলো? যেমন তোমরা বলছো যে, তোমরা মৃত্যুর পরে পুনরুজ্জীবিত হবে না? তোমাদের ধারণা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ অমূলক।
আল-ওয়াকিয়া 56:86
৮৩-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যখন রূহ কণ্ঠাগত হয় অর্থাৎ যখন মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হয়, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে এবং বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? তখন তার প্রত্যয় হবে যে, এটা বিদায়ক্ষণ। আর পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাবে।সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে।” (৭৫:২৬-৩০) এ জন্যেই এখানে বলেনঃ তখন তোমরা তাকিয়ে থাকো। অর্থাৎ একটি লোক বিদায়ক্ষণে উপস্থিত। সে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করছে, রূহ বিদায় হতে চলেছে। তোমরা সবাই তার পার্শ্বে বসে তার দিকে তাকাতে থাকো। কিন্তু তোমাদের কেউ কিছু করতে পারে কি? না, কেউই কিছু করতে সক্ষম নয়। আমার ফেরেশতারা ঐ মৃত্যুমুখী ব্যক্তির তোমাদের চেয়েও বেশী নিকটে রয়েছে যাদেরকে তোমরা দেখতে পাও। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “এবং তিনি তাঁর বান্দাদের উপর জয়যুক্ত, তিনি তোমাদের উপর রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রেরণ করেন। যখন তোমাদের মধ্যে কারো মৃত্যুর সময় এসে পড়ে তখন আমার প্রেরিতরা সঠিকভাবে তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে। তারপর তারা সবাই তাদের সত্য মাওলার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে যিনি ন্যায় বিচারক এবং সত্ত্বর হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২)আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও তবে তোমরা ওটা অর্থাৎ প্রাণ ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও। অর্থাৎ যদি এটা সত্য হয় যে, তোমরা পুনরুজ্জীবিত হবে না এবং তোমাদেরকে হাশরের ময়দানে হাযির করা হবে না, যদি তোমরা হাশর-নশরে বিশ্বাসী না হও এবং তোমাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে না ইত্যাদি, তবে আমি বলি যে, তোমরা তাহলে ঐ রূহকে যেতে দিচ্ছ কেন? আটকিয়ে রাখো! যদি রূহ তোমাদের আয়ত্তাধীন হয়ে থাকে তবে কণ্ঠাগত প্রাণ বা রূহকে ওর আসল জায়গায় পৌঁছিয়ে দাও না? কিন্তু তোমরা তা কখনো পারবে না। সুতরাং জেনে রেখো যে, যেমন এই রূহকে আমি দেহে নিক্ষেপ করতে সক্ষম ছিলাম এবং তা তোমরা স্বচক্ষে দেখেছো, তেমনই বিশ্বাস রেখো যে, দ্বিতীয়বার ঐ রূহকে দেহে নিক্ষেপ করে নতুনভাবে জীবন দানেও আমি সক্ষম হবো। না তোমাদের নিজেদের জীবন সৃষ্টিতে কোন দখল আছে, না মৃত্যুতে কোন কর্তৃত্ব আছে, তাহলে পুনরুত্থানে তোমাদের দখল কোথা হতে আসলো? যেমন তোমরা বলছো যে, তোমরা মৃত্যুর পরে পুনরুজ্জীবিত হবে না? তোমাদের ধারণা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ অমূলক।
আল-ওয়াকিয়া 56:87
৮৩-৮৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যখন রূহ কণ্ঠাগত হয় অর্থাৎ যখন মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হয়, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে এবং বলা হবেঃ কে তাকে রক্ষা করবে? তখন তার প্রত্যয় হবে যে, এটা বিদায়ক্ষণ। আর পায়ের সাথে পা জড়িয়ে যাবে।সেই দিন আল্লাহর নিকট সব কিছু প্রত্যানীত হবে।” (৭৫:২৬-৩০) এ জন্যেই এখানে বলেনঃ তখন তোমরা তাকিয়ে থাকো। অর্থাৎ একটি লোক বিদায়ক্ষণে উপস্থিত। সে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করছে, রূহ বিদায় হতে চলেছে। তোমরা সবাই তার পার্শ্বে বসে তার দিকে তাকাতে থাকো। কিন্তু তোমাদের কেউ কিছু করতে পারে কি? না, কেউই কিছু করতে সক্ষম নয়। আমার ফেরেশতারা ঐ মৃত্যুমুখী ব্যক্তির তোমাদের চেয়েও বেশী নিকটে রয়েছে যাদেরকে তোমরা দেখতে পাও। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “এবং তিনি তাঁর বান্দাদের উপর জয়যুক্ত, তিনি তোমাদের উপর রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রেরণ করেন। যখন তোমাদের মধ্যে কারো মৃত্যুর সময় এসে পড়ে তখন আমার প্রেরিতরা সঠিকভাবে তার মৃত্যু ঘটিয়ে থাকে। তারপর তারা সবাই তাদের সত্য মাওলার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে যিনি ন্যায় বিচারক এবং সত্ত্বর হিসাব গ্রহণকারী।” (৬:৬১-৬২)আর এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা যদি কর্তৃত্বাধীন না হও তবে তোমরা ওটা অর্থাৎ প্রাণ ফিরাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও। অর্থাৎ যদি এটা সত্য হয় যে, তোমরা পুনরুজ্জীবিত হবে না এবং তোমাদেরকে হাশরের ময়দানে হাযির করা হবে না, যদি তোমরা হাশর-নশরে বিশ্বাসী না হও এবং তোমাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে না ইত্যাদি, তবে আমি বলি যে, তোমরা তাহলে ঐ রূহকে যেতে দিচ্ছ কেন? আটকিয়ে রাখো! যদি রূহ তোমাদের আয়ত্তাধীন হয়ে থাকে তবে কণ্ঠাগত প্রাণ বা রূহকে ওর আসল জায়গায় পৌঁছিয়ে দাও না? কিন্তু তোমরা তা কখনো পারবে না। সুতরাং জেনে রেখো যে, যেমন এই রূহকে আমি দেহে নিক্ষেপ করতে সক্ষম ছিলাম এবং তা তোমরা স্বচক্ষে দেখেছো, তেমনই বিশ্বাস রেখো যে, দ্বিতীয়বার ঐ রূহকে দেহে নিক্ষেপ করে নতুনভাবে জীবন দানেও আমি সক্ষম হবো। না তোমাদের নিজেদের জীবন সৃষ্টিতে কোন দখল আছে, না মৃত্যুতে কোন কর্তৃত্ব আছে, তাহলে পুনরুত্থানে তোমাদের দখল কোথা হতে আসলো? যেমন তোমরা বলছো যে, তোমরা মৃত্যুর পরে পুনরুজ্জীবিত হবে না? তোমাদের ধারণা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ অমূলক।
আল-ওয়াকিয়া 56:88
৮৮-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ঐ অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা মৃত্যুর সময়, মৃত্যু যন্ত্রণার সময় এবং দুনিয়ার শেষ মুহূর্তে মানুষের হয়ে থাকে। হয়তো সে উচ্চ পর্যায়ের আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত হবে বা তার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হবে, যার ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে, কিংবা হয়তো সে হতভাগ্য হবে, যে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে অজ্ঞ থেকেছে এবং সত্য পথ হতে গাফেল থেকেছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দা, যারা তাঁর আহকামের উপর আমলকারী ছিল এবং অবাধ্যাচরণের কাজ পরিত্যাগকারী ছিল তাদেরকে তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা নানা প্রকারের সুসংবাদ শুনিয়ে থাকেন। যেমন ইতিপূর্বে হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস গত হয়েছে যে, রহমতের ফেরেশতারা তাদেরকে বলেনঃ “হে পবিত্র রূহ এবং হে পবিত্র দেহধারী রূহ! বিশ্রাম ও আরামের দিকে চল, পরম করুণাময় আল্লাহর দিকে চল যিনি কখনো অসন্তুষ্ট হবেন না।(আরবী)-এর অর্থ হলো বিশ্রাম এবং (আরবী)-এর অর্থ হলো আরাম। মোটকথা, তারা দুনিয়ার বিপদাপদ হতে বিশ্রাম ও শান্তি লাভ করে থাকে। চিরস্থায়ী শান্তি ও প্রকৃত আনন্দ আল্লাহর গোলাম তখনই লাভ করে থাকে। তারা একটা প্রশস্ততা দেখতে পায়। তাদের সামনে রিযক ও রহমত থাকে। তারা জান্নাতে আদনের দিকে ধাবিত হয়। জান্নাতের একটি সবুজ সজীব শাখা প্রকাশিত হয় এবং তখনই আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দার রূহ কবয করা হয়। এটা হযরত আবুল আলিয়া (রঃ)-এর উক্তি। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, মৃত্যুর পূর্বেই মরণমুখী প্রত্যেক ব্যক্তিই সে জান্নাতী কি জাহান্নামী তা জানতে পারে। মৃত্যু-যন্ত্রণার সময়ের হাদীসগুলো যদিও আমরা সূরায়ে ইবরাহীমের (আরবী) এ আয়াতের তাফসীরে আনয়ন করেছি, কিন্তু এটা এর সর্বোত্তম স্থান বলে এখানেও একটা অংশ বর্ণনা করছি। হযরত তামীমুদ্দারী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মালাকুল মাউত (আঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আমার অমুক বান্দার নিকট যাও এবং তাকে আমার দরবারে নিয়ে এসো। আমি তাকে দুঃখ-সুখ, কষ্ট-আরাম, আনন্দ-নিরানন্দ ইত্যাদি সব কিছুরই মাধ্যমে পরীক্ষা করেছি এবং তাকে আমার চাহিদা মোতাবিক পেয়েছি। এখন আমি তাকে চিরস্থায়ী সুখ প্রদান করতে চাই। তাকে আমার খাস দরবারে পেশ কর।” মালাকুল মাউত পাঁচশ জন রহমতের ফেরেশতা এবং জান্নাতের কাফন ও জান্নাতী খোশবু সাথে নিয়ে তার নিকট আগমন করেন। যদিও রাইহান (খোশবু) একই হয়, কিন্তু এর মাথায় বিশ প্রকারের রঙ থাকে। প্রত্যেকটিরই পৃথক পৃথক সুগন্ধি রয়েছে। আর তাদের সাথে থাকে সাদা রেশম এবং তাতে থাকে মেশক বা মৃগনাভী (শেষ পর্যন্ত)।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-এর (আরবী) অক্ষরকে পেশ দিয়ে পড়তে শুনেছেন। কিন্তু সমস্ত কারী (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) কে যবর দিয়ে পড়েছেন।হযরত উম্মে হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “মৃত্যুর পর কি আমরা পরস্পর মিলিত হবো এবং আমাদের একে অপরকে দেখবে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “রূহ পাখী হয়ে যাবে যা গাছের ফল খাবে, শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে। ঐ সময় রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদেই এ হাদীসের সহায়ক। রূপে আর একটি হাদীস রয়েছে, যার ইসনাদ খুবই উত্তম এবং মতনও খুব সবল) এ হাদীসে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে বড়ই সুসংবাদ রয়েছে। অন্য এক সহীহ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, শহীদদের রূহগুলো সবুজ রঙ এর পাখীর অন্তরে অবস্থান করে, যে পাখী জান্নাতের সব জায়গায় ইচ্ছামত বিচরণ করে ও পানাহার করে এবং আরশের নীচে লটকানো লণ্ঠনে আশ্রয় নেয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা (রঃ) গাধায় সওয়ার হয়ে একটি জানাযার পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন। ঐ সময় তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন এবং তাঁর চুল দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি বলেন যে, অমুকের পুত্র অমুক তাঁর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহ তাআলাও তার সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করে, তিনি তার সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন।” একথা শুনে সাহাবীগণ (রাঃ) মাথা ঝুকিয়ে দিয়ে কাঁদতে শুরু করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কাঁদছো কেন?” উত্তরে তারা বলেনঃ “আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি (তাহলে তো আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকে আমাদের পছন্দ করা হলো না)?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আরে, তা নয়, তা নয়। বরং এটা হলো মৃত্যুকালীন অবস্থার কথা। ঐ সময় আল্লাহর নৈক্য প্রাপ্ত বান্দাদেরকে সুখ-শান্তিময় ও আরামদায়ক জান্নাতের সুংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা লাফিয়ে উঠে এবং চায় যে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, যাতে তারা ঐ সব নিয়ামত লাভ করতে পারে। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলাও তাদের সাক্ষাৎ কামনা করেন। আর যদি সে সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্যতম হয় তবে তাদেরকে অত্যুষ্ণ পানির আপ্যায়ন ও জাহান্নামের দহনের সুসংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা মৃত্যুকে অপছন্দ করে এবং রূহ লুকাতে থাকে এবং তাদের মন চায় যে, কোনক্রমেই তারা আল্লাহ তাআলার নিকট হাযির হবে না। সুতরাং আল্লাহ তাআলাও তাদের সাক্ষাৎকে অপছন্দ করেন।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি সে ডান দিকের লোকদের একজন হয় তবে মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে সালাম দেয় এবং বলেঃ তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। তুমি আল্লাহর আযাব হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। তাকে বলা হবেঃ হে দক্ষিণ পার্শ্ববর্তী! তোমার প্রতি সালাম বা শান্তি। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা বলেঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলেঃ তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং যা তোমরা ফরমায়েশ কর। এটা হলো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (৪১:৩০-৩২) ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমার জন্যে স্বীকৃত যে, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। এটাও হতে পারে যে, সালাম এখানে দু'আর অর্থে এসেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কিন্তু সে যদি সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তার জন্যে আপ্যায়ন রয়েছে অত্যুষ্ণ পানির দ্বারা এবং জাহান্নামের দহন রয়েছে যা নাড়ী-ভূড়ি ঝলসিয়ে দিবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এটা তো ধ্রুব সত্য। অতএব, তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।হযরত উকবা ইবনে আমির জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বলেনঃ “এটা তোমরা তোমাদের রুকূতে রাখো।” আর যখন (আরবী) (৮৭:১) অবতীর্ণ হয় তখন বলেনঃ “এটাকে তোমরা তোমাদের সিজদায় রাখো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) বলে তার জন্যে জান্নাতে একটি গাছ রোপণ করা হয়।” ((এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুটি বাক্য আছে যা উচ্চারণ করতে খুবই সহজ, ওযন দণ্ডের পরিমাণে খুবই ভারী এবং করুণাময় আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়, বাক্য দুটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মহা পবিত্র আল্লাহ, তার জন্যে সমস্ত প্রশংসা। মহাপবিত্র আল্লাহ, তিনি মহামহিম।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর কিতাবের শেষে আনয়ন করেছেন)
আল-ওয়াকিয়া 56:89
৮৮-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ঐ অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা মৃত্যুর সময়, মৃত্যু যন্ত্রণার সময় এবং দুনিয়ার শেষ মুহূর্তে মানুষের হয়ে থাকে। হয়তো সে উচ্চ পর্যায়ের আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত হবে বা তার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হবে, যার ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে, কিংবা হয়তো সে হতভাগ্য হবে, যে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে অজ্ঞ থেকেছে এবং সত্য পথ হতে গাফেল থেকেছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দা, যারা তাঁর আহকামের উপর আমলকারী ছিল এবং অবাধ্যাচরণের কাজ পরিত্যাগকারী ছিল তাদেরকে তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা নানা প্রকারের সুসংবাদ শুনিয়ে থাকেন। যেমন ইতিপূর্বে হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস গত হয়েছে যে, রহমতের ফেরেশতারা তাদেরকে বলেনঃ “হে পবিত্র রূহ এবং হে পবিত্র দেহধারী রূহ! বিশ্রাম ও আরামের দিকে চল, পরম করুণাময় আল্লাহর দিকে চল যিনি কখনো অসন্তুষ্ট হবেন না।(আরবী)-এর অর্থ হলো বিশ্রাম এবং (আরবী)-এর অর্থ হলো আরাম। মোটকথা, তারা দুনিয়ার বিপদাপদ হতে বিশ্রাম ও শান্তি লাভ করে থাকে। চিরস্থায়ী শান্তি ও প্রকৃত আনন্দ আল্লাহর গোলাম তখনই লাভ করে থাকে। তারা একটা প্রশস্ততা দেখতে পায়। তাদের সামনে রিযক ও রহমত থাকে। তারা জান্নাতে আদনের দিকে ধাবিত হয়। জান্নাতের একটি সবুজ সজীব শাখা প্রকাশিত হয় এবং তখনই আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দার রূহ কবয করা হয়। এটা হযরত আবুল আলিয়া (রঃ)-এর উক্তি। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, মৃত্যুর পূর্বেই মরণমুখী প্রত্যেক ব্যক্তিই সে জান্নাতী কি জাহান্নামী তা জানতে পারে। মৃত্যু-যন্ত্রণার সময়ের হাদীসগুলো যদিও আমরা সূরায়ে ইবরাহীমের (আরবী) এ আয়াতের তাফসীরে আনয়ন করেছি, কিন্তু এটা এর সর্বোত্তম স্থান বলে এখানেও একটা অংশ বর্ণনা করছি। হযরত তামীমুদ্দারী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মালাকুল মাউত (আঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আমার অমুক বান্দার নিকট যাও এবং তাকে আমার দরবারে নিয়ে এসো। আমি তাকে দুঃখ-সুখ, কষ্ট-আরাম, আনন্দ-নিরানন্দ ইত্যাদি সব কিছুরই মাধ্যমে পরীক্ষা করেছি এবং তাকে আমার চাহিদা মোতাবিক পেয়েছি। এখন আমি তাকে চিরস্থায়ী সুখ প্রদান করতে চাই। তাকে আমার খাস দরবারে পেশ কর।” মালাকুল মাউত পাঁচশ জন রহমতের ফেরেশতা এবং জান্নাতের কাফন ও জান্নাতী খোশবু সাথে নিয়ে তার নিকট আগমন করেন। যদিও রাইহান (খোশবু) একই হয়, কিন্তু এর মাথায় বিশ প্রকারের রঙ থাকে। প্রত্যেকটিরই পৃথক পৃথক সুগন্ধি রয়েছে। আর তাদের সাথে থাকে সাদা রেশম এবং তাতে থাকে মেশক বা মৃগনাভী (শেষ পর্যন্ত)।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-এর (আরবী) অক্ষরকে পেশ দিয়ে পড়তে শুনেছেন। কিন্তু সমস্ত কারী (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) কে যবর দিয়ে পড়েছেন।হযরত উম্মে হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “মৃত্যুর পর কি আমরা পরস্পর মিলিত হবো এবং আমাদের একে অপরকে দেখবে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “রূহ পাখী হয়ে যাবে যা গাছের ফল খাবে, শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে। ঐ সময় রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদেই এ হাদীসের সহায়ক। রূপে আর একটি হাদীস রয়েছে, যার ইসনাদ খুবই উত্তম এবং মতনও খুব সবল) এ হাদীসে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে বড়ই সুসংবাদ রয়েছে। অন্য এক সহীহ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, শহীদদের রূহগুলো সবুজ রঙ এর পাখীর অন্তরে অবস্থান করে, যে পাখী জান্নাতের সব জায়গায় ইচ্ছামত বিচরণ করে ও পানাহার করে এবং আরশের নীচে লটকানো লণ্ঠনে আশ্রয় নেয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা (রঃ) গাধায় সওয়ার হয়ে একটি জানাযার পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন। ঐ সময় তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন এবং তাঁর চুল দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি বলেন যে, অমুকের পুত্র অমুক তাঁর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহ তাআলাও তার সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করে, তিনি তার সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন।” একথা শুনে সাহাবীগণ (রাঃ) মাথা ঝুকিয়ে দিয়ে কাঁদতে শুরু করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কাঁদছো কেন?” উত্তরে তারা বলেনঃ “আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি (তাহলে তো আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকে আমাদের পছন্দ করা হলো না)?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আরে, তা নয়, তা নয়। বরং এটা হলো মৃত্যুকালীন অবস্থার কথা। ঐ সময় আল্লাহর নৈক্য প্রাপ্ত বান্দাদেরকে সুখ-শান্তিময় ও আরামদায়ক জান্নাতের সুংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা লাফিয়ে উঠে এবং চায় যে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, যাতে তারা ঐ সব নিয়ামত লাভ করতে পারে। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলাও তাদের সাক্ষাৎ কামনা করেন। আর যদি সে সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্যতম হয় তবে তাদেরকে অত্যুষ্ণ পানির আপ্যায়ন ও জাহান্নামের দহনের সুসংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা মৃত্যুকে অপছন্দ করে এবং রূহ লুকাতে থাকে এবং তাদের মন চায় যে, কোনক্রমেই তারা আল্লাহ তাআলার নিকট হাযির হবে না। সুতরাং আল্লাহ তাআলাও তাদের সাক্ষাৎকে অপছন্দ করেন।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি সে ডান দিকের লোকদের একজন হয় তবে মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে সালাম দেয় এবং বলেঃ তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। তুমি আল্লাহর আযাব হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। তাকে বলা হবেঃ হে দক্ষিণ পার্শ্ববর্তী! তোমার প্রতি সালাম বা শান্তি। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা বলেঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলেঃ তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং যা তোমরা ফরমায়েশ কর। এটা হলো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (৪১:৩০-৩২) ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমার জন্যে স্বীকৃত যে, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। এটাও হতে পারে যে, সালাম এখানে দু'আর অর্থে এসেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কিন্তু সে যদি সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তার জন্যে আপ্যায়ন রয়েছে অত্যুষ্ণ পানির দ্বারা এবং জাহান্নামের দহন রয়েছে যা নাড়ী-ভূড়ি ঝলসিয়ে দিবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এটা তো ধ্রুব সত্য। অতএব, তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।হযরত উকবা ইবনে আমির জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বলেনঃ “এটা তোমরা তোমাদের রুকূতে রাখো।” আর যখন (আরবী) (৮৭:১) অবতীর্ণ হয় তখন বলেনঃ “এটাকে তোমরা তোমাদের সিজদায় রাখো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) বলে তার জন্যে জান্নাতে একটি গাছ রোপণ করা হয়।” ((এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুটি বাক্য আছে যা উচ্চারণ করতে খুবই সহজ, ওযন দণ্ডের পরিমাণে খুবই ভারী এবং করুণাময় আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়, বাক্য দুটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মহা পবিত্র আল্লাহ, তার জন্যে সমস্ত প্রশংসা। মহাপবিত্র আল্লাহ, তিনি মহামহিম।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর কিতাবের শেষে আনয়ন করেছেন)
আল-ওয়াকিয়া 56:90
৮৮-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ঐ অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা মৃত্যুর সময়, মৃত্যু যন্ত্রণার সময় এবং দুনিয়ার শেষ মুহূর্তে মানুষের হয়ে থাকে। হয়তো সে উচ্চ পর্যায়ের আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত হবে বা তার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হবে, যার ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে, কিংবা হয়তো সে হতভাগ্য হবে, যে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে অজ্ঞ থেকেছে এবং সত্য পথ হতে গাফেল থেকেছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দা, যারা তাঁর আহকামের উপর আমলকারী ছিল এবং অবাধ্যাচরণের কাজ পরিত্যাগকারী ছিল তাদেরকে তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা নানা প্রকারের সুসংবাদ শুনিয়ে থাকেন। যেমন ইতিপূর্বে হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস গত হয়েছে যে, রহমতের ফেরেশতারা তাদেরকে বলেনঃ “হে পবিত্র রূহ এবং হে পবিত্র দেহধারী রূহ! বিশ্রাম ও আরামের দিকে চল, পরম করুণাময় আল্লাহর দিকে চল যিনি কখনো অসন্তুষ্ট হবেন না।(আরবী)-এর অর্থ হলো বিশ্রাম এবং (আরবী)-এর অর্থ হলো আরাম। মোটকথা, তারা দুনিয়ার বিপদাপদ হতে বিশ্রাম ও শান্তি লাভ করে থাকে। চিরস্থায়ী শান্তি ও প্রকৃত আনন্দ আল্লাহর গোলাম তখনই লাভ করে থাকে। তারা একটা প্রশস্ততা দেখতে পায়। তাদের সামনে রিযক ও রহমত থাকে। তারা জান্নাতে আদনের দিকে ধাবিত হয়। জান্নাতের একটি সবুজ সজীব শাখা প্রকাশিত হয় এবং তখনই আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দার রূহ কবয করা হয়। এটা হযরত আবুল আলিয়া (রঃ)-এর উক্তি। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, মৃত্যুর পূর্বেই মরণমুখী প্রত্যেক ব্যক্তিই সে জান্নাতী কি জাহান্নামী তা জানতে পারে। মৃত্যু-যন্ত্রণার সময়ের হাদীসগুলো যদিও আমরা সূরায়ে ইবরাহীমের (আরবী) এ আয়াতের তাফসীরে আনয়ন করেছি, কিন্তু এটা এর সর্বোত্তম স্থান বলে এখানেও একটা অংশ বর্ণনা করছি। হযরত তামীমুদ্দারী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মালাকুল মাউত (আঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আমার অমুক বান্দার নিকট যাও এবং তাকে আমার দরবারে নিয়ে এসো। আমি তাকে দুঃখ-সুখ, কষ্ট-আরাম, আনন্দ-নিরানন্দ ইত্যাদি সব কিছুরই মাধ্যমে পরীক্ষা করেছি এবং তাকে আমার চাহিদা মোতাবিক পেয়েছি। এখন আমি তাকে চিরস্থায়ী সুখ প্রদান করতে চাই। তাকে আমার খাস দরবারে পেশ কর।” মালাকুল মাউত পাঁচশ জন রহমতের ফেরেশতা এবং জান্নাতের কাফন ও জান্নাতী খোশবু সাথে নিয়ে তার নিকট আগমন করেন। যদিও রাইহান (খোশবু) একই হয়, কিন্তু এর মাথায় বিশ প্রকারের রঙ থাকে। প্রত্যেকটিরই পৃথক পৃথক সুগন্ধি রয়েছে। আর তাদের সাথে থাকে সাদা রেশম এবং তাতে থাকে মেশক বা মৃগনাভী (শেষ পর্যন্ত)।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-এর (আরবী) অক্ষরকে পেশ দিয়ে পড়তে শুনেছেন। কিন্তু সমস্ত কারী (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) কে যবর দিয়ে পড়েছেন।হযরত উম্মে হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “মৃত্যুর পর কি আমরা পরস্পর মিলিত হবো এবং আমাদের একে অপরকে দেখবে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “রূহ পাখী হয়ে যাবে যা গাছের ফল খাবে, শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে। ঐ সময় রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদেই এ হাদীসের সহায়ক। রূপে আর একটি হাদীস রয়েছে, যার ইসনাদ খুবই উত্তম এবং মতনও খুব সবল) এ হাদীসে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে বড়ই সুসংবাদ রয়েছে। অন্য এক সহীহ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, শহীদদের রূহগুলো সবুজ রঙ এর পাখীর অন্তরে অবস্থান করে, যে পাখী জান্নাতের সব জায়গায় ইচ্ছামত বিচরণ করে ও পানাহার করে এবং আরশের নীচে লটকানো লণ্ঠনে আশ্রয় নেয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা (রঃ) গাধায় সওয়ার হয়ে একটি জানাযার পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন। ঐ সময় তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন এবং তাঁর চুল দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি বলেন যে, অমুকের পুত্র অমুক তাঁর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহ তাআলাও তার সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করে, তিনি তার সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন।” একথা শুনে সাহাবীগণ (রাঃ) মাথা ঝুকিয়ে দিয়ে কাঁদতে শুরু করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কাঁদছো কেন?” উত্তরে তারা বলেনঃ “আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি (তাহলে তো আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকে আমাদের পছন্দ করা হলো না)?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আরে, তা নয়, তা নয়। বরং এটা হলো মৃত্যুকালীন অবস্থার কথা। ঐ সময় আল্লাহর নৈক্য প্রাপ্ত বান্দাদেরকে সুখ-শান্তিময় ও আরামদায়ক জান্নাতের সুংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা লাফিয়ে উঠে এবং চায় যে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, যাতে তারা ঐ সব নিয়ামত লাভ করতে পারে। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলাও তাদের সাক্ষাৎ কামনা করেন। আর যদি সে সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্যতম হয় তবে তাদেরকে অত্যুষ্ণ পানির আপ্যায়ন ও জাহান্নামের দহনের সুসংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা মৃত্যুকে অপছন্দ করে এবং রূহ লুকাতে থাকে এবং তাদের মন চায় যে, কোনক্রমেই তারা আল্লাহ তাআলার নিকট হাযির হবে না। সুতরাং আল্লাহ তাআলাও তাদের সাক্ষাৎকে অপছন্দ করেন।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি সে ডান দিকের লোকদের একজন হয় তবে মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে সালাম দেয় এবং বলেঃ তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। তুমি আল্লাহর আযাব হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। তাকে বলা হবেঃ হে দক্ষিণ পার্শ্ববর্তী! তোমার প্রতি সালাম বা শান্তি। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা বলেঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলেঃ তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং যা তোমরা ফরমায়েশ কর। এটা হলো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (৪১:৩০-৩২) ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমার জন্যে স্বীকৃত যে, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। এটাও হতে পারে যে, সালাম এখানে দু'আর অর্থে এসেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কিন্তু সে যদি সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তার জন্যে আপ্যায়ন রয়েছে অত্যুষ্ণ পানির দ্বারা এবং জাহান্নামের দহন রয়েছে যা নাড়ী-ভূড়ি ঝলসিয়ে দিবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এটা তো ধ্রুব সত্য। অতএব, তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।হযরত উকবা ইবনে আমির জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বলেনঃ “এটা তোমরা তোমাদের রুকূতে রাখো।” আর যখন (আরবী) (৮৭:১) অবতীর্ণ হয় তখন বলেনঃ “এটাকে তোমরা তোমাদের সিজদায় রাখো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) বলে তার জন্যে জান্নাতে একটি গাছ রোপণ করা হয়।” ((এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুটি বাক্য আছে যা উচ্চারণ করতে খুবই সহজ, ওযন দণ্ডের পরিমাণে খুবই ভারী এবং করুণাময় আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়, বাক্য দুটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মহা পবিত্র আল্লাহ, তার জন্যে সমস্ত প্রশংসা। মহাপবিত্র আল্লাহ, তিনি মহামহিম।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর কিতাবের শেষে আনয়ন করেছেন)
আল-ওয়াকিয়া 56:91
৮৮-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ঐ অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা মৃত্যুর সময়, মৃত্যু যন্ত্রণার সময় এবং দুনিয়ার শেষ মুহূর্তে মানুষের হয়ে থাকে। হয়তো সে উচ্চ পর্যায়ের আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত হবে বা তার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হবে, যার ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে, কিংবা হয়তো সে হতভাগ্য হবে, যে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে অজ্ঞ থেকেছে এবং সত্য পথ হতে গাফেল থেকেছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দা, যারা তাঁর আহকামের উপর আমলকারী ছিল এবং অবাধ্যাচরণের কাজ পরিত্যাগকারী ছিল তাদেরকে তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা নানা প্রকারের সুসংবাদ শুনিয়ে থাকেন। যেমন ইতিপূর্বে হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস গত হয়েছে যে, রহমতের ফেরেশতারা তাদেরকে বলেনঃ “হে পবিত্র রূহ এবং হে পবিত্র দেহধারী রূহ! বিশ্রাম ও আরামের দিকে চল, পরম করুণাময় আল্লাহর দিকে চল যিনি কখনো অসন্তুষ্ট হবেন না।(আরবী)-এর অর্থ হলো বিশ্রাম এবং (আরবী)-এর অর্থ হলো আরাম। মোটকথা, তারা দুনিয়ার বিপদাপদ হতে বিশ্রাম ও শান্তি লাভ করে থাকে। চিরস্থায়ী শান্তি ও প্রকৃত আনন্দ আল্লাহর গোলাম তখনই লাভ করে থাকে। তারা একটা প্রশস্ততা দেখতে পায়। তাদের সামনে রিযক ও রহমত থাকে। তারা জান্নাতে আদনের দিকে ধাবিত হয়। জান্নাতের একটি সবুজ সজীব শাখা প্রকাশিত হয় এবং তখনই আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দার রূহ কবয করা হয়। এটা হযরত আবুল আলিয়া (রঃ)-এর উক্তি। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, মৃত্যুর পূর্বেই মরণমুখী প্রত্যেক ব্যক্তিই সে জান্নাতী কি জাহান্নামী তা জানতে পারে। মৃত্যু-যন্ত্রণার সময়ের হাদীসগুলো যদিও আমরা সূরায়ে ইবরাহীমের (আরবী) এ আয়াতের তাফসীরে আনয়ন করেছি, কিন্তু এটা এর সর্বোত্তম স্থান বলে এখানেও একটা অংশ বর্ণনা করছি। হযরত তামীমুদ্দারী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মালাকুল মাউত (আঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আমার অমুক বান্দার নিকট যাও এবং তাকে আমার দরবারে নিয়ে এসো। আমি তাকে দুঃখ-সুখ, কষ্ট-আরাম, আনন্দ-নিরানন্দ ইত্যাদি সব কিছুরই মাধ্যমে পরীক্ষা করেছি এবং তাকে আমার চাহিদা মোতাবিক পেয়েছি। এখন আমি তাকে চিরস্থায়ী সুখ প্রদান করতে চাই। তাকে আমার খাস দরবারে পেশ কর।” মালাকুল মাউত পাঁচশ জন রহমতের ফেরেশতা এবং জান্নাতের কাফন ও জান্নাতী খোশবু সাথে নিয়ে তার নিকট আগমন করেন। যদিও রাইহান (খোশবু) একই হয়, কিন্তু এর মাথায় বিশ প্রকারের রঙ থাকে। প্রত্যেকটিরই পৃথক পৃথক সুগন্ধি রয়েছে। আর তাদের সাথে থাকে সাদা রেশম এবং তাতে থাকে মেশক বা মৃগনাভী (শেষ পর্যন্ত)।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-এর (আরবী) অক্ষরকে পেশ দিয়ে পড়তে শুনেছেন। কিন্তু সমস্ত কারী (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) কে যবর দিয়ে পড়েছেন।হযরত উম্মে হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “মৃত্যুর পর কি আমরা পরস্পর মিলিত হবো এবং আমাদের একে অপরকে দেখবে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “রূহ পাখী হয়ে যাবে যা গাছের ফল খাবে, শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে। ঐ সময় রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদেই এ হাদীসের সহায়ক। রূপে আর একটি হাদীস রয়েছে, যার ইসনাদ খুবই উত্তম এবং মতনও খুব সবল) এ হাদীসে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে বড়ই সুসংবাদ রয়েছে। অন্য এক সহীহ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, শহীদদের রূহগুলো সবুজ রঙ এর পাখীর অন্তরে অবস্থান করে, যে পাখী জান্নাতের সব জায়গায় ইচ্ছামত বিচরণ করে ও পানাহার করে এবং আরশের নীচে লটকানো লণ্ঠনে আশ্রয় নেয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা (রঃ) গাধায় সওয়ার হয়ে একটি জানাযার পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন। ঐ সময় তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন এবং তাঁর চুল দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি বলেন যে, অমুকের পুত্র অমুক তাঁর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহ তাআলাও তার সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করে, তিনি তার সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন।” একথা শুনে সাহাবীগণ (রাঃ) মাথা ঝুকিয়ে দিয়ে কাঁদতে শুরু করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কাঁদছো কেন?” উত্তরে তারা বলেনঃ “আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি (তাহলে তো আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকে আমাদের পছন্দ করা হলো না)?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আরে, তা নয়, তা নয়। বরং এটা হলো মৃত্যুকালীন অবস্থার কথা। ঐ সময় আল্লাহর নৈক্য প্রাপ্ত বান্দাদেরকে সুখ-শান্তিময় ও আরামদায়ক জান্নাতের সুংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা লাফিয়ে উঠে এবং চায় যে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, যাতে তারা ঐ সব নিয়ামত লাভ করতে পারে। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলাও তাদের সাক্ষাৎ কামনা করেন। আর যদি সে সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্যতম হয় তবে তাদেরকে অত্যুষ্ণ পানির আপ্যায়ন ও জাহান্নামের দহনের সুসংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা মৃত্যুকে অপছন্দ করে এবং রূহ লুকাতে থাকে এবং তাদের মন চায় যে, কোনক্রমেই তারা আল্লাহ তাআলার নিকট হাযির হবে না। সুতরাং আল্লাহ তাআলাও তাদের সাক্ষাৎকে অপছন্দ করেন।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি সে ডান দিকের লোকদের একজন হয় তবে মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে সালাম দেয় এবং বলেঃ তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। তুমি আল্লাহর আযাব হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। তাকে বলা হবেঃ হে দক্ষিণ পার্শ্ববর্তী! তোমার প্রতি সালাম বা শান্তি। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা বলেঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলেঃ তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং যা তোমরা ফরমায়েশ কর। এটা হলো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (৪১:৩০-৩২) ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমার জন্যে স্বীকৃত যে, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। এটাও হতে পারে যে, সালাম এখানে দু'আর অর্থে এসেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কিন্তু সে যদি সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তার জন্যে আপ্যায়ন রয়েছে অত্যুষ্ণ পানির দ্বারা এবং জাহান্নামের দহন রয়েছে যা নাড়ী-ভূড়ি ঝলসিয়ে দিবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এটা তো ধ্রুব সত্য। অতএব, তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।হযরত উকবা ইবনে আমির জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বলেনঃ “এটা তোমরা তোমাদের রুকূতে রাখো।” আর যখন (আরবী) (৮৭:১) অবতীর্ণ হয় তখন বলেনঃ “এটাকে তোমরা তোমাদের সিজদায় রাখো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) বলে তার জন্যে জান্নাতে একটি গাছ রোপণ করা হয়।” ((এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুটি বাক্য আছে যা উচ্চারণ করতে খুবই সহজ, ওযন দণ্ডের পরিমাণে খুবই ভারী এবং করুণাময় আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়, বাক্য দুটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মহা পবিত্র আল্লাহ, তার জন্যে সমস্ত প্রশংসা। মহাপবিত্র আল্লাহ, তিনি মহামহিম।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর কিতাবের শেষে আনয়ন করেছেন)
আল-ওয়াকিয়া 56:92
৮৮-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ঐ অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা মৃত্যুর সময়, মৃত্যু যন্ত্রণার সময় এবং দুনিয়ার শেষ মুহূর্তে মানুষের হয়ে থাকে। হয়তো সে উচ্চ পর্যায়ের আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত হবে বা তার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হবে, যার ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে, কিংবা হয়তো সে হতভাগ্য হবে, যে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে অজ্ঞ থেকেছে এবং সত্য পথ হতে গাফেল থেকেছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দা, যারা তাঁর আহকামের উপর আমলকারী ছিল এবং অবাধ্যাচরণের কাজ পরিত্যাগকারী ছিল তাদেরকে তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা নানা প্রকারের সুসংবাদ শুনিয়ে থাকেন। যেমন ইতিপূর্বে হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস গত হয়েছে যে, রহমতের ফেরেশতারা তাদেরকে বলেনঃ “হে পবিত্র রূহ এবং হে পবিত্র দেহধারী রূহ! বিশ্রাম ও আরামের দিকে চল, পরম করুণাময় আল্লাহর দিকে চল যিনি কখনো অসন্তুষ্ট হবেন না।(আরবী)-এর অর্থ হলো বিশ্রাম এবং (আরবী)-এর অর্থ হলো আরাম। মোটকথা, তারা দুনিয়ার বিপদাপদ হতে বিশ্রাম ও শান্তি লাভ করে থাকে। চিরস্থায়ী শান্তি ও প্রকৃত আনন্দ আল্লাহর গোলাম তখনই লাভ করে থাকে। তারা একটা প্রশস্ততা দেখতে পায়। তাদের সামনে রিযক ও রহমত থাকে। তারা জান্নাতে আদনের দিকে ধাবিত হয়। জান্নাতের একটি সবুজ সজীব শাখা প্রকাশিত হয় এবং তখনই আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দার রূহ কবয করা হয়। এটা হযরত আবুল আলিয়া (রঃ)-এর উক্তি। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, মৃত্যুর পূর্বেই মরণমুখী প্রত্যেক ব্যক্তিই সে জান্নাতী কি জাহান্নামী তা জানতে পারে। মৃত্যু-যন্ত্রণার সময়ের হাদীসগুলো যদিও আমরা সূরায়ে ইবরাহীমের (আরবী) এ আয়াতের তাফসীরে আনয়ন করেছি, কিন্তু এটা এর সর্বোত্তম স্থান বলে এখানেও একটা অংশ বর্ণনা করছি। হযরত তামীমুদ্দারী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মালাকুল মাউত (আঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আমার অমুক বান্দার নিকট যাও এবং তাকে আমার দরবারে নিয়ে এসো। আমি তাকে দুঃখ-সুখ, কষ্ট-আরাম, আনন্দ-নিরানন্দ ইত্যাদি সব কিছুরই মাধ্যমে পরীক্ষা করেছি এবং তাকে আমার চাহিদা মোতাবিক পেয়েছি। এখন আমি তাকে চিরস্থায়ী সুখ প্রদান করতে চাই। তাকে আমার খাস দরবারে পেশ কর।” মালাকুল মাউত পাঁচশ জন রহমতের ফেরেশতা এবং জান্নাতের কাফন ও জান্নাতী খোশবু সাথে নিয়ে তার নিকট আগমন করেন। যদিও রাইহান (খোশবু) একই হয়, কিন্তু এর মাথায় বিশ প্রকারের রঙ থাকে। প্রত্যেকটিরই পৃথক পৃথক সুগন্ধি রয়েছে। আর তাদের সাথে থাকে সাদা রেশম এবং তাতে থাকে মেশক বা মৃগনাভী (শেষ পর্যন্ত)।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-এর (আরবী) অক্ষরকে পেশ দিয়ে পড়তে শুনেছেন। কিন্তু সমস্ত কারী (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) কে যবর দিয়ে পড়েছেন।হযরত উম্মে হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “মৃত্যুর পর কি আমরা পরস্পর মিলিত হবো এবং আমাদের একে অপরকে দেখবে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “রূহ পাখী হয়ে যাবে যা গাছের ফল খাবে, শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে। ঐ সময় রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদেই এ হাদীসের সহায়ক। রূপে আর একটি হাদীস রয়েছে, যার ইসনাদ খুবই উত্তম এবং মতনও খুব সবল) এ হাদীসে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে বড়ই সুসংবাদ রয়েছে। অন্য এক সহীহ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, শহীদদের রূহগুলো সবুজ রঙ এর পাখীর অন্তরে অবস্থান করে, যে পাখী জান্নাতের সব জায়গায় ইচ্ছামত বিচরণ করে ও পানাহার করে এবং আরশের নীচে লটকানো লণ্ঠনে আশ্রয় নেয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা (রঃ) গাধায় সওয়ার হয়ে একটি জানাযার পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন। ঐ সময় তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন এবং তাঁর চুল দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি বলেন যে, অমুকের পুত্র অমুক তাঁর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহ তাআলাও তার সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করে, তিনি তার সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন।” একথা শুনে সাহাবীগণ (রাঃ) মাথা ঝুকিয়ে দিয়ে কাঁদতে শুরু করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কাঁদছো কেন?” উত্তরে তারা বলেনঃ “আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি (তাহলে তো আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকে আমাদের পছন্দ করা হলো না)?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আরে, তা নয়, তা নয়। বরং এটা হলো মৃত্যুকালীন অবস্থার কথা। ঐ সময় আল্লাহর নৈক্য প্রাপ্ত বান্দাদেরকে সুখ-শান্তিময় ও আরামদায়ক জান্নাতের সুংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা লাফিয়ে উঠে এবং চায় যে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, যাতে তারা ঐ সব নিয়ামত লাভ করতে পারে। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলাও তাদের সাক্ষাৎ কামনা করেন। আর যদি সে সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্যতম হয় তবে তাদেরকে অত্যুষ্ণ পানির আপ্যায়ন ও জাহান্নামের দহনের সুসংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা মৃত্যুকে অপছন্দ করে এবং রূহ লুকাতে থাকে এবং তাদের মন চায় যে, কোনক্রমেই তারা আল্লাহ তাআলার নিকট হাযির হবে না। সুতরাং আল্লাহ তাআলাও তাদের সাক্ষাৎকে অপছন্দ করেন।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি সে ডান দিকের লোকদের একজন হয় তবে মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে সালাম দেয় এবং বলেঃ তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। তুমি আল্লাহর আযাব হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। তাকে বলা হবেঃ হে দক্ষিণ পার্শ্ববর্তী! তোমার প্রতি সালাম বা শান্তি। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা বলেঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলেঃ তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং যা তোমরা ফরমায়েশ কর। এটা হলো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (৪১:৩০-৩২) ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমার জন্যে স্বীকৃত যে, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। এটাও হতে পারে যে, সালাম এখানে দু'আর অর্থে এসেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কিন্তু সে যদি সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তার জন্যে আপ্যায়ন রয়েছে অত্যুষ্ণ পানির দ্বারা এবং জাহান্নামের দহন রয়েছে যা নাড়ী-ভূড়ি ঝলসিয়ে দিবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এটা তো ধ্রুব সত্য। অতএব, তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।হযরত উকবা ইবনে আমির জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বলেনঃ “এটা তোমরা তোমাদের রুকূতে রাখো।” আর যখন (আরবী) (৮৭:১) অবতীর্ণ হয় তখন বলেনঃ “এটাকে তোমরা তোমাদের সিজদায় রাখো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) বলে তার জন্যে জান্নাতে একটি গাছ রোপণ করা হয়।” ((এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুটি বাক্য আছে যা উচ্চারণ করতে খুবই সহজ, ওযন দণ্ডের পরিমাণে খুবই ভারী এবং করুণাময় আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়, বাক্য দুটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মহা পবিত্র আল্লাহ, তার জন্যে সমস্ত প্রশংসা। মহাপবিত্র আল্লাহ, তিনি মহামহিম।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর কিতাবের শেষে আনয়ন করেছেন)
আল-ওয়াকিয়া 56:93
৮৮-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ঐ অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা মৃত্যুর সময়, মৃত্যু যন্ত্রণার সময় এবং দুনিয়ার শেষ মুহূর্তে মানুষের হয়ে থাকে। হয়তো সে উচ্চ পর্যায়ের আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত হবে বা তার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হবে, যার ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে, কিংবা হয়তো সে হতভাগ্য হবে, যে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে অজ্ঞ থেকেছে এবং সত্য পথ হতে গাফেল থেকেছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দা, যারা তাঁর আহকামের উপর আমলকারী ছিল এবং অবাধ্যাচরণের কাজ পরিত্যাগকারী ছিল তাদেরকে তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা নানা প্রকারের সুসংবাদ শুনিয়ে থাকেন। যেমন ইতিপূর্বে হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস গত হয়েছে যে, রহমতের ফেরেশতারা তাদেরকে বলেনঃ “হে পবিত্র রূহ এবং হে পবিত্র দেহধারী রূহ! বিশ্রাম ও আরামের দিকে চল, পরম করুণাময় আল্লাহর দিকে চল যিনি কখনো অসন্তুষ্ট হবেন না।(আরবী)-এর অর্থ হলো বিশ্রাম এবং (আরবী)-এর অর্থ হলো আরাম। মোটকথা, তারা দুনিয়ার বিপদাপদ হতে বিশ্রাম ও শান্তি লাভ করে থাকে। চিরস্থায়ী শান্তি ও প্রকৃত আনন্দ আল্লাহর গোলাম তখনই লাভ করে থাকে। তারা একটা প্রশস্ততা দেখতে পায়। তাদের সামনে রিযক ও রহমত থাকে। তারা জান্নাতে আদনের দিকে ধাবিত হয়। জান্নাতের একটি সবুজ সজীব শাখা প্রকাশিত হয় এবং তখনই আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দার রূহ কবয করা হয়। এটা হযরত আবুল আলিয়া (রঃ)-এর উক্তি। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, মৃত্যুর পূর্বেই মরণমুখী প্রত্যেক ব্যক্তিই সে জান্নাতী কি জাহান্নামী তা জানতে পারে। মৃত্যু-যন্ত্রণার সময়ের হাদীসগুলো যদিও আমরা সূরায়ে ইবরাহীমের (আরবী) এ আয়াতের তাফসীরে আনয়ন করেছি, কিন্তু এটা এর সর্বোত্তম স্থান বলে এখানেও একটা অংশ বর্ণনা করছি। হযরত তামীমুদ্দারী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মালাকুল মাউত (আঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আমার অমুক বান্দার নিকট যাও এবং তাকে আমার দরবারে নিয়ে এসো। আমি তাকে দুঃখ-সুখ, কষ্ট-আরাম, আনন্দ-নিরানন্দ ইত্যাদি সব কিছুরই মাধ্যমে পরীক্ষা করেছি এবং তাকে আমার চাহিদা মোতাবিক পেয়েছি। এখন আমি তাকে চিরস্থায়ী সুখ প্রদান করতে চাই। তাকে আমার খাস দরবারে পেশ কর।” মালাকুল মাউত পাঁচশ জন রহমতের ফেরেশতা এবং জান্নাতের কাফন ও জান্নাতী খোশবু সাথে নিয়ে তার নিকট আগমন করেন। যদিও রাইহান (খোশবু) একই হয়, কিন্তু এর মাথায় বিশ প্রকারের রঙ থাকে। প্রত্যেকটিরই পৃথক পৃথক সুগন্ধি রয়েছে। আর তাদের সাথে থাকে সাদা রেশম এবং তাতে থাকে মেশক বা মৃগনাভী (শেষ পর্যন্ত)।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-এর (আরবী) অক্ষরকে পেশ দিয়ে পড়তে শুনেছেন। কিন্তু সমস্ত কারী (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) কে যবর দিয়ে পড়েছেন।হযরত উম্মে হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “মৃত্যুর পর কি আমরা পরস্পর মিলিত হবো এবং আমাদের একে অপরকে দেখবে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “রূহ পাখী হয়ে যাবে যা গাছের ফল খাবে, শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে। ঐ সময় রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদেই এ হাদীসের সহায়ক। রূপে আর একটি হাদীস রয়েছে, যার ইসনাদ খুবই উত্তম এবং মতনও খুব সবল) এ হাদীসে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে বড়ই সুসংবাদ রয়েছে। অন্য এক সহীহ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, শহীদদের রূহগুলো সবুজ রঙ এর পাখীর অন্তরে অবস্থান করে, যে পাখী জান্নাতের সব জায়গায় ইচ্ছামত বিচরণ করে ও পানাহার করে এবং আরশের নীচে লটকানো লণ্ঠনে আশ্রয় নেয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা (রঃ) গাধায় সওয়ার হয়ে একটি জানাযার পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন। ঐ সময় তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন এবং তাঁর চুল দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি বলেন যে, অমুকের পুত্র অমুক তাঁর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহ তাআলাও তার সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করে, তিনি তার সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন।” একথা শুনে সাহাবীগণ (রাঃ) মাথা ঝুকিয়ে দিয়ে কাঁদতে শুরু করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কাঁদছো কেন?” উত্তরে তারা বলেনঃ “আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি (তাহলে তো আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকে আমাদের পছন্দ করা হলো না)?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আরে, তা নয়, তা নয়। বরং এটা হলো মৃত্যুকালীন অবস্থার কথা। ঐ সময় আল্লাহর নৈক্য প্রাপ্ত বান্দাদেরকে সুখ-শান্তিময় ও আরামদায়ক জান্নাতের সুংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা লাফিয়ে উঠে এবং চায় যে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, যাতে তারা ঐ সব নিয়ামত লাভ করতে পারে। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলাও তাদের সাক্ষাৎ কামনা করেন। আর যদি সে সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্যতম হয় তবে তাদেরকে অত্যুষ্ণ পানির আপ্যায়ন ও জাহান্নামের দহনের সুসংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা মৃত্যুকে অপছন্দ করে এবং রূহ লুকাতে থাকে এবং তাদের মন চায় যে, কোনক্রমেই তারা আল্লাহ তাআলার নিকট হাযির হবে না। সুতরাং আল্লাহ তাআলাও তাদের সাক্ষাৎকে অপছন্দ করেন।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি সে ডান দিকের লোকদের একজন হয় তবে মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে সালাম দেয় এবং বলেঃ তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। তুমি আল্লাহর আযাব হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। তাকে বলা হবেঃ হে দক্ষিণ পার্শ্ববর্তী! তোমার প্রতি সালাম বা শান্তি। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা বলেঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলেঃ তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং যা তোমরা ফরমায়েশ কর। এটা হলো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (৪১:৩০-৩২) ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমার জন্যে স্বীকৃত যে, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। এটাও হতে পারে যে, সালাম এখানে দু'আর অর্থে এসেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কিন্তু সে যদি সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তার জন্যে আপ্যায়ন রয়েছে অত্যুষ্ণ পানির দ্বারা এবং জাহান্নামের দহন রয়েছে যা নাড়ী-ভূড়ি ঝলসিয়ে দিবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এটা তো ধ্রুব সত্য। অতএব, তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।হযরত উকবা ইবনে আমির জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বলেনঃ “এটা তোমরা তোমাদের রুকূতে রাখো।” আর যখন (আরবী) (৮৭:১) অবতীর্ণ হয় তখন বলেনঃ “এটাকে তোমরা তোমাদের সিজদায় রাখো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) বলে তার জন্যে জান্নাতে একটি গাছ রোপণ করা হয়।” ((এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুটি বাক্য আছে যা উচ্চারণ করতে খুবই সহজ, ওযন দণ্ডের পরিমাণে খুবই ভারী এবং করুণাময় আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়, বাক্য দুটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মহা পবিত্র আল্লাহ, তার জন্যে সমস্ত প্রশংসা। মহাপবিত্র আল্লাহ, তিনি মহামহিম।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর কিতাবের শেষে আনয়ন করেছেন)
আল-ওয়াকিয়া 56:94
৮৮-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ঐ অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা মৃত্যুর সময়, মৃত্যু যন্ত্রণার সময় এবং দুনিয়ার শেষ মুহূর্তে মানুষের হয়ে থাকে। হয়তো সে উচ্চ পর্যায়ের আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত হবে বা তার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হবে, যার ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে, কিংবা হয়তো সে হতভাগ্য হবে, যে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে অজ্ঞ থেকেছে এবং সত্য পথ হতে গাফেল থেকেছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দা, যারা তাঁর আহকামের উপর আমলকারী ছিল এবং অবাধ্যাচরণের কাজ পরিত্যাগকারী ছিল তাদেরকে তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা নানা প্রকারের সুসংবাদ শুনিয়ে থাকেন। যেমন ইতিপূর্বে হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস গত হয়েছে যে, রহমতের ফেরেশতারা তাদেরকে বলেনঃ “হে পবিত্র রূহ এবং হে পবিত্র দেহধারী রূহ! বিশ্রাম ও আরামের দিকে চল, পরম করুণাময় আল্লাহর দিকে চল যিনি কখনো অসন্তুষ্ট হবেন না।(আরবী)-এর অর্থ হলো বিশ্রাম এবং (আরবী)-এর অর্থ হলো আরাম। মোটকথা, তারা দুনিয়ার বিপদাপদ হতে বিশ্রাম ও শান্তি লাভ করে থাকে। চিরস্থায়ী শান্তি ও প্রকৃত আনন্দ আল্লাহর গোলাম তখনই লাভ করে থাকে। তারা একটা প্রশস্ততা দেখতে পায়। তাদের সামনে রিযক ও রহমত থাকে। তারা জান্নাতে আদনের দিকে ধাবিত হয়। জান্নাতের একটি সবুজ সজীব শাখা প্রকাশিত হয় এবং তখনই আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দার রূহ কবয করা হয়। এটা হযরত আবুল আলিয়া (রঃ)-এর উক্তি। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, মৃত্যুর পূর্বেই মরণমুখী প্রত্যেক ব্যক্তিই সে জান্নাতী কি জাহান্নামী তা জানতে পারে। মৃত্যু-যন্ত্রণার সময়ের হাদীসগুলো যদিও আমরা সূরায়ে ইবরাহীমের (আরবী) এ আয়াতের তাফসীরে আনয়ন করেছি, কিন্তু এটা এর সর্বোত্তম স্থান বলে এখানেও একটা অংশ বর্ণনা করছি। হযরত তামীমুদ্দারী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মালাকুল মাউত (আঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আমার অমুক বান্দার নিকট যাও এবং তাকে আমার দরবারে নিয়ে এসো। আমি তাকে দুঃখ-সুখ, কষ্ট-আরাম, আনন্দ-নিরানন্দ ইত্যাদি সব কিছুরই মাধ্যমে পরীক্ষা করেছি এবং তাকে আমার চাহিদা মোতাবিক পেয়েছি। এখন আমি তাকে চিরস্থায়ী সুখ প্রদান করতে চাই। তাকে আমার খাস দরবারে পেশ কর।” মালাকুল মাউত পাঁচশ জন রহমতের ফেরেশতা এবং জান্নাতের কাফন ও জান্নাতী খোশবু সাথে নিয়ে তার নিকট আগমন করেন। যদিও রাইহান (খোশবু) একই হয়, কিন্তু এর মাথায় বিশ প্রকারের রঙ থাকে। প্রত্যেকটিরই পৃথক পৃথক সুগন্ধি রয়েছে। আর তাদের সাথে থাকে সাদা রেশম এবং তাতে থাকে মেশক বা মৃগনাভী (শেষ পর্যন্ত)।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-এর (আরবী) অক্ষরকে পেশ দিয়ে পড়তে শুনেছেন। কিন্তু সমস্ত কারী (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) কে যবর দিয়ে পড়েছেন।হযরত উম্মে হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “মৃত্যুর পর কি আমরা পরস্পর মিলিত হবো এবং আমাদের একে অপরকে দেখবে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “রূহ পাখী হয়ে যাবে যা গাছের ফল খাবে, শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে। ঐ সময় রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদেই এ হাদীসের সহায়ক। রূপে আর একটি হাদীস রয়েছে, যার ইসনাদ খুবই উত্তম এবং মতনও খুব সবল) এ হাদীসে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে বড়ই সুসংবাদ রয়েছে। অন্য এক সহীহ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, শহীদদের রূহগুলো সবুজ রঙ এর পাখীর অন্তরে অবস্থান করে, যে পাখী জান্নাতের সব জায়গায় ইচ্ছামত বিচরণ করে ও পানাহার করে এবং আরশের নীচে লটকানো লণ্ঠনে আশ্রয় নেয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা (রঃ) গাধায় সওয়ার হয়ে একটি জানাযার পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন। ঐ সময় তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন এবং তাঁর চুল দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি বলেন যে, অমুকের পুত্র অমুক তাঁর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহ তাআলাও তার সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করে, তিনি তার সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন।” একথা শুনে সাহাবীগণ (রাঃ) মাথা ঝুকিয়ে দিয়ে কাঁদতে শুরু করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কাঁদছো কেন?” উত্তরে তারা বলেনঃ “আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি (তাহলে তো আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকে আমাদের পছন্দ করা হলো না)?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আরে, তা নয়, তা নয়। বরং এটা হলো মৃত্যুকালীন অবস্থার কথা। ঐ সময় আল্লাহর নৈক্য প্রাপ্ত বান্দাদেরকে সুখ-শান্তিময় ও আরামদায়ক জান্নাতের সুংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা লাফিয়ে উঠে এবং চায় যে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, যাতে তারা ঐ সব নিয়ামত লাভ করতে পারে। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলাও তাদের সাক্ষাৎ কামনা করেন। আর যদি সে সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্যতম হয় তবে তাদেরকে অত্যুষ্ণ পানির আপ্যায়ন ও জাহান্নামের দহনের সুসংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা মৃত্যুকে অপছন্দ করে এবং রূহ লুকাতে থাকে এবং তাদের মন চায় যে, কোনক্রমেই তারা আল্লাহ তাআলার নিকট হাযির হবে না। সুতরাং আল্লাহ তাআলাও তাদের সাক্ষাৎকে অপছন্দ করেন।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি সে ডান দিকের লোকদের একজন হয় তবে মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে সালাম দেয় এবং বলেঃ তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। তুমি আল্লাহর আযাব হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। তাকে বলা হবেঃ হে দক্ষিণ পার্শ্ববর্তী! তোমার প্রতি সালাম বা শান্তি। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা বলেঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলেঃ তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং যা তোমরা ফরমায়েশ কর। এটা হলো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (৪১:৩০-৩২) ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমার জন্যে স্বীকৃত যে, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। এটাও হতে পারে যে, সালাম এখানে দু'আর অর্থে এসেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কিন্তু সে যদি সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তার জন্যে আপ্যায়ন রয়েছে অত্যুষ্ণ পানির দ্বারা এবং জাহান্নামের দহন রয়েছে যা নাড়ী-ভূড়ি ঝলসিয়ে দিবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এটা তো ধ্রুব সত্য। অতএব, তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।হযরত উকবা ইবনে আমির জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বলেনঃ “এটা তোমরা তোমাদের রুকূতে রাখো।” আর যখন (আরবী) (৮৭:১) অবতীর্ণ হয় তখন বলেনঃ “এটাকে তোমরা তোমাদের সিজদায় রাখো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) বলে তার জন্যে জান্নাতে একটি গাছ রোপণ করা হয়।” ((এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুটি বাক্য আছে যা উচ্চারণ করতে খুবই সহজ, ওযন দণ্ডের পরিমাণে খুবই ভারী এবং করুণাময় আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়, বাক্য দুটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মহা পবিত্র আল্লাহ, তার জন্যে সমস্ত প্রশংসা। মহাপবিত্র আল্লাহ, তিনি মহামহিম।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর কিতাবের শেষে আনয়ন করেছেন)
আল-ওয়াকিয়া 56:95
৮৮-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ঐ অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা মৃত্যুর সময়, মৃত্যু যন্ত্রণার সময় এবং দুনিয়ার শেষ মুহূর্তে মানুষের হয়ে থাকে। হয়তো সে উচ্চ পর্যায়ের আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত হবে বা তার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হবে, যার ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে, কিংবা হয়তো সে হতভাগ্য হবে, যে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে অজ্ঞ থেকেছে এবং সত্য পথ হতে গাফেল থেকেছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দা, যারা তাঁর আহকামের উপর আমলকারী ছিল এবং অবাধ্যাচরণের কাজ পরিত্যাগকারী ছিল তাদেরকে তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা নানা প্রকারের সুসংবাদ শুনিয়ে থাকেন। যেমন ইতিপূর্বে হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস গত হয়েছে যে, রহমতের ফেরেশতারা তাদেরকে বলেনঃ “হে পবিত্র রূহ এবং হে পবিত্র দেহধারী রূহ! বিশ্রাম ও আরামের দিকে চল, পরম করুণাময় আল্লাহর দিকে চল যিনি কখনো অসন্তুষ্ট হবেন না।(আরবী)-এর অর্থ হলো বিশ্রাম এবং (আরবী)-এর অর্থ হলো আরাম। মোটকথা, তারা দুনিয়ার বিপদাপদ হতে বিশ্রাম ও শান্তি লাভ করে থাকে। চিরস্থায়ী শান্তি ও প্রকৃত আনন্দ আল্লাহর গোলাম তখনই লাভ করে থাকে। তারা একটা প্রশস্ততা দেখতে পায়। তাদের সামনে রিযক ও রহমত থাকে। তারা জান্নাতে আদনের দিকে ধাবিত হয়। জান্নাতের একটি সবুজ সজীব শাখা প্রকাশিত হয় এবং তখনই আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দার রূহ কবয করা হয়। এটা হযরত আবুল আলিয়া (রঃ)-এর উক্তি। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, মৃত্যুর পূর্বেই মরণমুখী প্রত্যেক ব্যক্তিই সে জান্নাতী কি জাহান্নামী তা জানতে পারে। মৃত্যু-যন্ত্রণার সময়ের হাদীসগুলো যদিও আমরা সূরায়ে ইবরাহীমের (আরবী) এ আয়াতের তাফসীরে আনয়ন করেছি, কিন্তু এটা এর সর্বোত্তম স্থান বলে এখানেও একটা অংশ বর্ণনা করছি। হযরত তামীমুদ্দারী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মালাকুল মাউত (আঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আমার অমুক বান্দার নিকট যাও এবং তাকে আমার দরবারে নিয়ে এসো। আমি তাকে দুঃখ-সুখ, কষ্ট-আরাম, আনন্দ-নিরানন্দ ইত্যাদি সব কিছুরই মাধ্যমে পরীক্ষা করেছি এবং তাকে আমার চাহিদা মোতাবিক পেয়েছি। এখন আমি তাকে চিরস্থায়ী সুখ প্রদান করতে চাই। তাকে আমার খাস দরবারে পেশ কর।” মালাকুল মাউত পাঁচশ জন রহমতের ফেরেশতা এবং জান্নাতের কাফন ও জান্নাতী খোশবু সাথে নিয়ে তার নিকট আগমন করেন। যদিও রাইহান (খোশবু) একই হয়, কিন্তু এর মাথায় বিশ প্রকারের রঙ থাকে। প্রত্যেকটিরই পৃথক পৃথক সুগন্ধি রয়েছে। আর তাদের সাথে থাকে সাদা রেশম এবং তাতে থাকে মেশক বা মৃগনাভী (শেষ পর্যন্ত)।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-এর (আরবী) অক্ষরকে পেশ দিয়ে পড়তে শুনেছেন। কিন্তু সমস্ত কারী (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) কে যবর দিয়ে পড়েছেন।হযরত উম্মে হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “মৃত্যুর পর কি আমরা পরস্পর মিলিত হবো এবং আমাদের একে অপরকে দেখবে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “রূহ পাখী হয়ে যাবে যা গাছের ফল খাবে, শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে। ঐ সময় রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদেই এ হাদীসের সহায়ক। রূপে আর একটি হাদীস রয়েছে, যার ইসনাদ খুবই উত্তম এবং মতনও খুব সবল) এ হাদীসে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে বড়ই সুসংবাদ রয়েছে। অন্য এক সহীহ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, শহীদদের রূহগুলো সবুজ রঙ এর পাখীর অন্তরে অবস্থান করে, যে পাখী জান্নাতের সব জায়গায় ইচ্ছামত বিচরণ করে ও পানাহার করে এবং আরশের নীচে লটকানো লণ্ঠনে আশ্রয় নেয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা (রঃ) গাধায় সওয়ার হয়ে একটি জানাযার পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন। ঐ সময় তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন এবং তাঁর চুল দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি বলেন যে, অমুকের পুত্র অমুক তাঁর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহ তাআলাও তার সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করে, তিনি তার সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন।” একথা শুনে সাহাবীগণ (রাঃ) মাথা ঝুকিয়ে দিয়ে কাঁদতে শুরু করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কাঁদছো কেন?” উত্তরে তারা বলেনঃ “আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি (তাহলে তো আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকে আমাদের পছন্দ করা হলো না)?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আরে, তা নয়, তা নয়। বরং এটা হলো মৃত্যুকালীন অবস্থার কথা। ঐ সময় আল্লাহর নৈক্য প্রাপ্ত বান্দাদেরকে সুখ-শান্তিময় ও আরামদায়ক জান্নাতের সুংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা লাফিয়ে উঠে এবং চায় যে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, যাতে তারা ঐ সব নিয়ামত লাভ করতে পারে। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলাও তাদের সাক্ষাৎ কামনা করেন। আর যদি সে সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্যতম হয় তবে তাদেরকে অত্যুষ্ণ পানির আপ্যায়ন ও জাহান্নামের দহনের সুসংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা মৃত্যুকে অপছন্দ করে এবং রূহ লুকাতে থাকে এবং তাদের মন চায় যে, কোনক্রমেই তারা আল্লাহ তাআলার নিকট হাযির হবে না। সুতরাং আল্লাহ তাআলাও তাদের সাক্ষাৎকে অপছন্দ করেন।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি সে ডান দিকের লোকদের একজন হয় তবে মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে সালাম দেয় এবং বলেঃ তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। তুমি আল্লাহর আযাব হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। তাকে বলা হবেঃ হে দক্ষিণ পার্শ্ববর্তী! তোমার প্রতি সালাম বা শান্তি। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা বলেঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলেঃ তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং যা তোমরা ফরমায়েশ কর। এটা হলো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (৪১:৩০-৩২) ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমার জন্যে স্বীকৃত যে, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। এটাও হতে পারে যে, সালাম এখানে দু'আর অর্থে এসেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কিন্তু সে যদি সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তার জন্যে আপ্যায়ন রয়েছে অত্যুষ্ণ পানির দ্বারা এবং জাহান্নামের দহন রয়েছে যা নাড়ী-ভূড়ি ঝলসিয়ে দিবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এটা তো ধ্রুব সত্য। অতএব, তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।হযরত উকবা ইবনে আমির জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বলেনঃ “এটা তোমরা তোমাদের রুকূতে রাখো।” আর যখন (আরবী) (৮৭:১) অবতীর্ণ হয় তখন বলেনঃ “এটাকে তোমরা তোমাদের সিজদায় রাখো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) বলে তার জন্যে জান্নাতে একটি গাছ রোপণ করা হয়।” ((এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুটি বাক্য আছে যা উচ্চারণ করতে খুবই সহজ, ওযন দণ্ডের পরিমাণে খুবই ভারী এবং করুণাময় আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়, বাক্য দুটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মহা পবিত্র আল্লাহ, তার জন্যে সমস্ত প্রশংসা। মহাপবিত্র আল্লাহ, তিনি মহামহিম।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর কিতাবের শেষে আনয়ন করেছেন)
আল-ওয়াকিয়া 56:96
৮৮-৯৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে ঐ অবস্থার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা মৃত্যুর সময়, মৃত্যু যন্ত্রণার সময় এবং দুনিয়ার শেষ মুহূর্তে মানুষের হয়ে থাকে। হয়তো সে উচ্চ পর্যায়ের আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত হবে বা তার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হবে, যার ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে, কিংবা হয়তো সে হতভাগ্য হবে, যে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে অজ্ঞ থেকেছে এবং সত্য পথ হতে গাফেল থেকেছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দা, যারা তাঁর আহকামের উপর আমলকারী ছিল এবং অবাধ্যাচরণের কাজ পরিত্যাগকারী ছিল তাদেরকে তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা নানা প্রকারের সুসংবাদ শুনিয়ে থাকেন। যেমন ইতিপূর্বে হযরত বারা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস গত হয়েছে যে, রহমতের ফেরেশতারা তাদেরকে বলেনঃ “হে পবিত্র রূহ এবং হে পবিত্র দেহধারী রূহ! বিশ্রাম ও আরামের দিকে চল, পরম করুণাময় আল্লাহর দিকে চল যিনি কখনো অসন্তুষ্ট হবেন না।(আরবী)-এর অর্থ হলো বিশ্রাম এবং (আরবী)-এর অর্থ হলো আরাম। মোটকথা, তারা দুনিয়ার বিপদাপদ হতে বিশ্রাম ও শান্তি লাভ করে থাকে। চিরস্থায়ী শান্তি ও প্রকৃত আনন্দ আল্লাহর গোলাম তখনই লাভ করে থাকে। তারা একটা প্রশস্ততা দেখতে পায়। তাদের সামনে রিযক ও রহমত থাকে। তারা জান্নাতে আদনের দিকে ধাবিত হয়। জান্নাতের একটি সবুজ সজীব শাখা প্রকাশিত হয় এবং তখনই আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত বান্দার রূহ কবয করা হয়। এটা হযরত আবুল আলিয়া (রঃ)-এর উক্তি। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, মৃত্যুর পূর্বেই মরণমুখী প্রত্যেক ব্যক্তিই সে জান্নাতী কি জাহান্নামী তা জানতে পারে। মৃত্যু-যন্ত্রণার সময়ের হাদীসগুলো যদিও আমরা সূরায়ে ইবরাহীমের (আরবী) এ আয়াতের তাফসীরে আনয়ন করেছি, কিন্তু এটা এর সর্বোত্তম স্থান বলে এখানেও একটা অংশ বর্ণনা করছি। হযরত তামীমুদ্দারী (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মালাকুল মাউত (আঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আমার অমুক বান্দার নিকট যাও এবং তাকে আমার দরবারে নিয়ে এসো। আমি তাকে দুঃখ-সুখ, কষ্ট-আরাম, আনন্দ-নিরানন্দ ইত্যাদি সব কিছুরই মাধ্যমে পরীক্ষা করেছি এবং তাকে আমার চাহিদা মোতাবিক পেয়েছি। এখন আমি তাকে চিরস্থায়ী সুখ প্রদান করতে চাই। তাকে আমার খাস দরবারে পেশ কর।” মালাকুল মাউত পাঁচশ জন রহমতের ফেরেশতা এবং জান্নাতের কাফন ও জান্নাতী খোশবু সাথে নিয়ে তার নিকট আগমন করেন। যদিও রাইহান (খোশবু) একই হয়, কিন্তু এর মাথায় বিশ প্রকারের রঙ থাকে। প্রত্যেকটিরই পৃথক পৃথক সুগন্ধি রয়েছে। আর তাদের সাথে থাকে সাদা রেশম এবং তাতে থাকে মেশক বা মৃগনাভী (শেষ পর্যন্ত)।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবী) অর্থাৎ (আরবী)-এর (আরবী) অক্ষরকে পেশ দিয়ে পড়তে শুনেছেন। কিন্তু সমস্ত কারী (আরবী) অর্থাৎ (আরবী) কে যবর দিয়ে পড়েছেন।হযরত উম্মে হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “মৃত্যুর পর কি আমরা পরস্পর মিলিত হবো এবং আমাদের একে অপরকে দেখবে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “রূহ পাখী হয়ে যাবে যা গাছের ফল খাবে, শেষ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে। ঐ সময় রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদেই এ হাদীসের সহায়ক। রূপে আর একটি হাদীস রয়েছে, যার ইসনাদ খুবই উত্তম এবং মতনও খুব সবল) এ হাদীসে প্রত্যেক মুমিনের জন্যে বড়ই সুসংবাদ রয়েছে। অন্য এক সহীহ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, শহীদদের রূহগুলো সবুজ রঙ এর পাখীর অন্তরে অবস্থান করে, যে পাখী জান্নাতের সব জায়গায় ইচ্ছামত বিচরণ করে ও পানাহার করে এবং আরশের নীচে লটকানো লণ্ঠনে আশ্রয় নেয়। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা (রঃ) গাধায় সওয়ার হয়ে একটি জানাযার পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন। ঐ সময় তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন এবং তাঁর চুল দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি বলেন যে, অমুকের পুত্র অমুক তাঁর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহ তাআলাও তার সাথে সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করে, তিনি তার সাথে সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন।” একথা শুনে সাহাবীগণ (রাঃ) মাথা ঝুকিয়ে দিয়ে কাঁদতে শুরু করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা কাঁদছো কেন?” উত্তরে তারা বলেনঃ “আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি (তাহলে তো আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎকে আমাদের পছন্দ করা হলো না)?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “আরে, তা নয়, তা নয়। বরং এটা হলো মৃত্যুকালীন অবস্থার কথা। ঐ সময় আল্লাহর নৈক্য প্রাপ্ত বান্দাদেরকে সুখ-শান্তিময় ও আরামদায়ক জান্নাতের সুংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা লাফিয়ে উঠে এবং চায় যে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, যাতে তারা ঐ সব নিয়ামত লাভ করতে পারে। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলাও তাদের সাক্ষাৎ কামনা করেন। আর যদি সে সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্যতম হয় তবে তাদেরকে অত্যুষ্ণ পানির আপ্যায়ন ও জাহান্নামের দহনের সুসংবাদ দেয়া হয়, যার কারণে তারা মৃত্যুকে অপছন্দ করে এবং রূহ লুকাতে থাকে এবং তাদের মন চায় যে, কোনক্রমেই তারা আল্লাহ তাআলার নিকট হাযির হবে না। সুতরাং আল্লাহ তাআলাও তাদের সাক্ষাৎকে অপছন্দ করেন।”এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি সে ডান দিকের লোকদের একজন হয় তবে মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে সালাম দেয় এবং বলেঃ তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। তুমি আল্লাহর আযাব হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। তাকে বলা হবেঃ হে দক্ষিণ পার্শ্ববর্তী! তোমার প্রতি সালাম বা শান্তি। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “যারা বলেঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলেঃ তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্যে আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্যে রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং যা তোমরা ফরমায়েশ কর। এটা হলো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (৪১:৩০-৩২) ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমার জন্যে স্বীকৃত যে, তুমি আসহাবুল ইয়ামীনের অন্তর্ভুক্ত। এটাও হতে পারে যে, সালাম এখানে দু'আর অর্থে এসেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ কিন্তু সে যদি সত্য অস্বীকারকারী ও বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তার জন্যে আপ্যায়ন রয়েছে অত্যুষ্ণ পানির দ্বারা এবং জাহান্নামের দহন রয়েছে যা নাড়ী-ভূড়ি ঝলসিয়ে দিবে।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এটা তো ধ্রুব সত্য। অতএব, তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।হযরত উকবা ইবনে আমির জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর (আরবী) অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বলেনঃ “এটা তোমরা তোমাদের রুকূতে রাখো।” আর যখন (আরবী) (৮৭:১) অবতীর্ণ হয় তখন বলেনঃ “এটাকে তোমরা তোমাদের সিজদায় রাখো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি (আরবী) বলে তার জন্যে জান্নাতে একটি গাছ রোপণ করা হয়।” ((এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুটি বাক্য আছে যা উচ্চারণ করতে খুবই সহজ, ওযন দণ্ডের পরিমাণে খুবই ভারী এবং করুণাময় আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়, বাক্য দুটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “মহা পবিত্র আল্লাহ, তার জন্যে সমস্ত প্রশংসা। মহাপবিত্র আল্লাহ, তিনি মহামহিম।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর কিতাবের শেষে আনয়ন করেছেন)
আল-হাদীদ 57:1
হযরত ইরবায ইবনে সারিয়াহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শয়নের পূর্বে ঐ সূরাগুলো পাঠ করতেন যেগুলোর শুরুতে বা রয়েছে। এবং বলতেনঃ “এগুলোর মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে যা হাজার আয়াত হতেও উত্তম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ হাদীসে যে আয়াতটির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলাই খুব ভাল জানেন, আয়াতটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আদি, তিনিই অন্ত, তিনিই ব্যক্ত, তিনিই গুপ্ত এবং তিনি সর্ব বিষয়ে সম্যক অবহিত।” এর বিস্তারিত বর্ণনা সত্বরই আসছে ইনশা-আল্লাহ। ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর: সমস্ত প্রাণী ও উদ্ভিদ আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা বর্ণনা করে থাকে। সপ্ত আসমান ও যমীন এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সমস্ত মাখলূক ও প্রত্যেক জিনিস তাঁর প্রশংসা ও গুণকীর্তনে মগ্ন রয়েছে। কিন্তু মানুষ এদের তাসবীহ পাঠ বুঝতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সপ্ত আকাশ ও যমীন এবং এগুলোর মধ্যে যারা রয়েছে, সবাই তাঁর (আল্লাহর) পবিত্রতা ঘোষণা করে থাকে। আর যত কিছু রয়েছে সবই তাঁর সপ্রশংস মহিমা ঘোষণা করে থাকে, কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ বুঝতে পার না, নিশ্চয়ই তিনি সহনশীল, ক্ষমাকারী।” (১৭:৪৪) সবাই তার সামনে নীচু, অক্ষম এবং শক্তিহীন। তাঁর নির্ধারিত শরীয়ত এবং তাঁর আহকাম হিকমতে পরিপূর্ণ। প্রকৃত বাদশাহ তিনিই যার কর্তৃত্বাধীনে আসমান ও যমীন রয়েছে। সৃষ্টজীবের ব্যবস্থাপক তিনিই। জীবন ও মৃত্যু তাঁরই অধিকারভুক্ত। তিনিই ধ্বংস করেন এবং তিনিই সৃষ্টি করেন। যাকে তিনি যা কিছু দেয়ার ইচ্ছা করেন, দিয়ে থাকেন। তিনি সব কিছুর উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হতে পারে না।এরপরে ... (আরবী)-এ আয়াতটি রয়েছে যার ব্যাপারে উল্লিখিত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এটা এক হাজার আয়াত হতেও উত্তম।হযরত আবু যামীল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমার মনে এক সন্দেহ বা খা আছে, কিন্তু মুখে তা আনতে ইচ্ছা হচ্ছে না। তাঁর একথা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) মুচকি হেসে বললেন, সম্ভবতঃ এটা এমন সন্দেহ হবে যা থেকে কেউই বাঁচতে পারেনি। এমন কি কুরআন কারীমেও রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে যদি তোমার সন্দেহ হয়, তাহলে তোমার পূর্বে যারা কুরআন পড়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর। অবশ্যই তোমার কাছে তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে সত্য এসেছে।” (১০:৯৪) তারপর তিনি বলেনঃ “যখন তোমার মনে কোন সন্দেহ আসবে তখন (আরবী)-এ আয়াতটি পড়ে নিয়ো।” (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ আয়াতের তাফসীরে দশেরও অধিক উক্তি রয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, ইয়াহইয়া বলেনঃ (আরবী) ও (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইলমের দিক দিয়ে ব্যক্ত ও গুপ্ত হওয়া। এই ইয়াহ্ইয়া হলেন যিয়াদ ফারার পুত্র। তাঁর রচিত একটি পুস্তক রয়েছে যার নাম মাআনিল কুরআন।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শয়নের সময় নিম্নলিখিত দু'আটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ, হে সপ্ত আকাশ এবং বড় আরশের রব! হে আমাদের এবং সমস্ত জিনিসের প্রতিপালক! হে তাওরাত ও ইনজীল অবতীর্ণকারী! হে দানা ও বিচি উদগীরণকারী! আপনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই। এমন প্রত্যেক জিনিসের অনিষ্ঠ হতে আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি যার ঝুঁটি আপনার হাতে রয়েছে। আপনিই প্রথম এবং আপনার পূর্বে কিছুই ছিল না, আপনিই শেষ এবং আপনার পরে কিছুই থাকবে না। আপনি ব্যক্ত বা প্রকাশ্য এবং আপনার উপর কোন কিছুই নেই, আপনি গুপ্ত এবং কোন কিছুই আপনার কাছে গুপ্ত নয়, আমাদের ঋণ আপনি আদায় করে দিন এবং আমাদেরকে দারিদ্রমুক্ত করে দিন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুহায়েল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু সালেহ (রঃ) স্বীয় পরিবারের লোককে এই দু'আ শিক্ষা দিতেন এবং বলতেন যে, যখন তারা শয়ন করবে তখন যেন ডান পাশে শুয়ে এ দু'আটি পড়ে নেয়।" (এটা ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে তার জন্যে কিবলামুখী করে বিছানা বিছিয়ে দেয়া হতো। তিনি তাঁর ডান হস্ত-তালুর উপর মাথা রেখে আরাম করতেন। তারপর আস্তে আস্তে কিছু পাঠ করতেন। কিন্তু শেষ রাত্রে উপরোক্তে দু'আটি উচ্চস্বরে পড়তেন। তবে শব্দগুলোতে কিছু হেরফের রয়েছে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ আয়াতের তাফসীরে জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা স্বীয় সাহাবীবর্গসহ বসেছিলেন এমতাবস্থায় তাঁদের উপর এক খণ্ড মেঘ দেখা দেয়। তিনি সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি তা তোমরা জান কি?” তাঁরা জবাবে বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তিনি তখন বললেনঃ “এটাকে ‘ইনাল; বলা হয়। এটা যমীনকে সায়রাব বা পানিসিক্ত করে থাকে। জনগণের উপর এটা বর্ষিত হয় যারা না আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, না তাকে ডাকে। আবার তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের উপর এটা কি তা জান কি?” তারা উত্তর দিলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ই বেশী অবহিত।” “এটা হলো উঁচু সুরক্ষিত ছাদ ও জড়িয়ে ধরা তরঙ্গ।” বললেন তিনি। এরপর তিনি বললেনঃ “তোমাদের এবং এর মধ্যে কতটা ব্যবধান আছে তা কি তোমরা জান?” তারা উত্তরে বললেনঃ “এ সম্পর্কে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী।” তিনি বললেনঃ “তোমাদের ও এর মধ্যে পাঁচশ’ বছরের পথের ব্যবধান।” তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “এর উপরে কি আছে তা কি তোমরা জান?” তারা উত্তর দিলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) বেশী খবর রাখেন।” তিনি বললেনঃ “এর উপরে দ্বিতীয় আকাশ রয়েছে। আর এই দুই আকাশের মধ্যবর্তী ব্যবধান হলো পাঁচশ' বছরের পথ। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাতটি আকাশের কথা বললেন এবং প্রত্যেকটির মাঝে এই পরিমাণ দূরত্বেরই বর্ণনা দিলেন। এরপর তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “সপ্তম আকাশের উপর কি আছে তা কি তোমাদের জানা আছে?” সাহাবীগণ (রাঃ) জবাব দিলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ই বেশী অবগত।” তিনি বললেনঃ “সপ্তম আকাশের উপর এই পরিমাণ দূরত্বে আরশ রয়েছে অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের নীচে কি আছে তা কি তোমরা জান?” তাঁরা জবাব দিলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ই সবচেয়ে ভাল জানেন।” তিনি বললেনঃ “তাহলো যমীন।” তারপর বললেনঃ “এর নীচে কি আছে তা কি জান?” তারা উত্তর দিলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী।” তিনি বললেনঃ “এর নীচে আর একটি যমীন আছে। এই দুই যমীনের মধ্যেও পাঁচশ' বছরের পথের ব্যবধান।” এই ভাবে তিনি সাতটি যমীনের কথা সমপরিমাণ দূরত্ব সহ বর্ণনা করলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “যাঁর হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা যদি সর্বাপেক্ষা নিম্নতম যমীনে একটি রশি লটকিয়ে দাও তবে ওটাও আল্লাহ তাআলারই নিকট পৌঁছবে।” অতঃপর তিনি (আরবী) আয়াতটি পাঠ করেন।” (ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেন যে, এটা গারীব, কেননা এর বর্ণনাকারী হাসানের তার উস্তাদ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে শোন প্রমাণিত নয়। যেমন এটা আইয়ুব (রঃ), ইউনুস (রঃ), আলী ইবনে যায়েদ (রঃ) প্রমুখ মুহাদ্দিসের উক্তি)কোন কোন আহলুল ইলম এই হাদীসের শরাহতে বলেছেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রশির আল্লাহ তা'আলারই ইলমে কুদরত পর্যন্ত পৌঁছা, তার সত্তা পর্যন্ত পৌঁছা উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহ তাআলার ইলম ও তার প্রভাব এবং তার রাজত্ব নিঃসন্দেহে সব জায়গাতেই রয়েছে, কিন্তু তিনি তাঁর জাত বা সত্তারূপে আরশের উপর রয়েছেন। যেমন তিনি তার এই বিশেষণ স্বীয় কিতাবের মধ্যে স্বয়ং বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদেও এ হাদীসটি রয়েছে এবং তাতে দুই যমীনের মাঝে দূরত্ব সাত শ' বছরের পথ বলে বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিম এবং মুসনাদে বাযযারেও এ হাদীসটি আছে, কিন্তু মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে রশি লটকিয়ে দেয়ার বাক্যটি নেই এবং প্রত্যেক দুই যমীনের মাঝের দূরত্ব তাতেও পাঁচশ বছরের পথের কথা রয়েছে। ইমাম বাযযার (রঃ) বলেন যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ছাড়া আর কেউই এটা নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেননি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-ও এ হাদীসটি মরসালরূপে বর্ণনা করেছেন অর্থাৎ হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ “আমাদের নিকট এটা বর্ণনা করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি হাদীস বর্ণনা করেন এবং সাহাবীর নাম উল্লেখ করেননি। সম্ভবতঃ এটাই সঠিক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদে বাযযার কিতাবুল আসমা এবং ওয়াস সিফাতুল বায়হাকীতে এ হাদীসটি হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। কিন্তু এর ইসনাদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আছে এবং মতনে গারাবাত ও নাকারাত রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী) (৬৫:১২)-এর তাফসীরে। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তি আনয়ন করেছেন যে, আসমান ও যমীনের মাঝে চারজন ফেরেশতার সাক্ষাৎ হয়। তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কোথা হতে আসলে?” তখন একজন উত্তর দেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে সপ্তম আকাশ হতে প্রেরণ করেছেন এবং আমি সেখানে আল্লাহ তা'আলাকে ছেড়ে এলাম।” দ্বিতীয়জন বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে সপ্তম যমীন হতে প্রেরণ করেছিলেন এবং তিনি সেখানে ছিলেন। তৃতীয়জন বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে মাশারিক (পূর্ব দিক) হতে প্রেরণ করেছেন এবং সেখানে আল্লাহ তা'আলা ছিলেন। চতুর্থ জন বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে মাগরিব (পশ্চিম দিক) হতে পাঠিয়েছেন এবং তথায় আমি তাঁকে ছেড়ে আসলাম।” (এ হাদীসটিও গারীব, বরং মনে হচ্ছে যে, হযরত কাতাদা (রঃ) বর্ণিত হাদীসটি যা উপরে মুরসালরূপে উল্লিখিত হলো, সম্ভবতঃ ওটাও হযরত কাতাদারই (রঃ) নিজের উক্তি হবে, যেমন এটা স্বয়ং তাঁরই উক্তি। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
আল-হাদীদ 57:2
হযরত ইরবায ইবনে সারিয়াহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শয়নের পূর্বে ঐ সূরাগুলো পাঠ করতেন যেগুলোর শুরুতে বা রয়েছে। এবং বলতেনঃ “এগুলোর মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে যা হাজার আয়াত হতেও উত্তম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ হাদীসে যে আয়াতটির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলাই খুব ভাল জানেন, আয়াতটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আদি, তিনিই অন্ত, তিনিই ব্যক্ত, তিনিই গুপ্ত এবং তিনি সর্ব বিষয়ে সম্যক অবহিত।” এর বিস্তারিত বর্ণনা সত্বরই আসছে ইনশা-আল্লাহ। ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর: সমস্ত প্রাণী ও উদ্ভিদ আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা বর্ণনা করে থাকে। সপ্ত আসমান ও যমীন এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সমস্ত মাখলূক ও প্রত্যেক জিনিস তাঁর প্রশংসা ও গুণকীর্তনে মগ্ন রয়েছে। কিন্তু মানুষ এদের তাসবীহ পাঠ বুঝতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সপ্ত আকাশ ও যমীন এবং এগুলোর মধ্যে যারা রয়েছে, সবাই তাঁর (আল্লাহর) পবিত্রতা ঘোষণা করে থাকে। আর যত কিছু রয়েছে সবই তাঁর সপ্রশংস মহিমা ঘোষণা করে থাকে, কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ বুঝতে পার না, নিশ্চয়ই তিনি সহনশীল, ক্ষমাকারী।” (১৭:৪৪) সবাই তার সামনে নীচু, অক্ষম এবং শক্তিহীন। তাঁর নির্ধারিত শরীয়ত এবং তাঁর আহকাম হিকমতে পরিপূর্ণ। প্রকৃত বাদশাহ তিনিই যার কর্তৃত্বাধীনে আসমান ও যমীন রয়েছে। সৃষ্টজীবের ব্যবস্থাপক তিনিই। জীবন ও মৃত্যু তাঁরই অধিকারভুক্ত। তিনিই ধ্বংস করেন এবং তিনিই সৃষ্টি করেন। যাকে তিনি যা কিছু দেয়ার ইচ্ছা করেন, দিয়ে থাকেন। তিনি সব কিছুর উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হতে পারে না।এরপরে ... (আরবী)-এ আয়াতটি রয়েছে যার ব্যাপারে উল্লিখিত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এটা এক হাজার আয়াত হতেও উত্তম।হযরত আবু যামীল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমার মনে এক সন্দেহ বা খা আছে, কিন্তু মুখে তা আনতে ইচ্ছা হচ্ছে না। তাঁর একথা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) মুচকি হেসে বললেন, সম্ভবতঃ এটা এমন সন্দেহ হবে যা থেকে কেউই বাঁচতে পারেনি। এমন কি কুরআন কারীমেও রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে যদি তোমার সন্দেহ হয়, তাহলে তোমার পূর্বে যারা কুরআন পড়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর। অবশ্যই তোমার কাছে তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে সত্য এসেছে।” (১০:৯৪) তারপর তিনি বলেনঃ “যখন তোমার মনে কোন সন্দেহ আসবে তখন (আরবী)-এ আয়াতটি পড়ে নিয়ো।” (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ আয়াতের তাফসীরে দশেরও অধিক উক্তি রয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, ইয়াহইয়া বলেনঃ (আরবী) ও (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইলমের দিক দিয়ে ব্যক্ত ও গুপ্ত হওয়া। এই ইয়াহ্ইয়া হলেন যিয়াদ ফারার পুত্র। তাঁর রচিত একটি পুস্তক রয়েছে যার নাম মাআনিল কুরআন।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শয়নের সময় নিম্নলিখিত দু'আটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ, হে সপ্ত আকাশ এবং বড় আরশের রব! হে আমাদের এবং সমস্ত জিনিসের প্রতিপালক! হে তাওরাত ও ইনজীল অবতীর্ণকারী! হে দানা ও বিচি উদগীরণকারী! আপনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই। এমন প্রত্যেক জিনিসের অনিষ্ঠ হতে আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি যার ঝুঁটি আপনার হাতে রয়েছে। আপনিই প্রথম এবং আপনার পূর্বে কিছুই ছিল না, আপনিই শেষ এবং আপনার পরে কিছুই থাকবে না। আপনি ব্যক্ত বা প্রকাশ্য এবং আপনার উপর কোন কিছুই নেই, আপনি গুপ্ত এবং কোন কিছুই আপনার কাছে গুপ্ত নয়, আমাদের ঋণ আপনি আদায় করে দিন এবং আমাদেরকে দারিদ্রমুক্ত করে দিন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুহায়েল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু সালেহ (রঃ) স্বীয় পরিবারের লোককে এই দু'আ শিক্ষা দিতেন এবং বলতেন যে, যখন তারা শয়ন করবে তখন যেন ডান পাশে শুয়ে এ দু'আটি পড়ে নেয়।" (এটা ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে তার জন্যে কিবলামুখী করে বিছানা বিছিয়ে দেয়া হতো। তিনি তাঁর ডান হস্ত-তালুর উপর মাথা রেখে আরাম করতেন। তারপর আস্তে আস্তে কিছু পাঠ করতেন। কিন্তু শেষ রাত্রে উপরোক্তে দু'আটি উচ্চস্বরে পড়তেন। তবে শব্দগুলোতে কিছু হেরফের রয়েছে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ আয়াতের তাফসীরে জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা স্বীয় সাহাবীবর্গসহ বসেছিলেন এমতাবস্থায় তাঁদের উপর এক খণ্ড মেঘ দেখা দেয়। তিনি সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি তা তোমরা জান কি?” তাঁরা জবাবে বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তিনি তখন বললেনঃ “এটাকে ‘ইনাল; বলা হয়। এটা যমীনকে সায়রাব বা পানিসিক্ত করে থাকে। জনগণের উপর এটা বর্ষিত হয় যারা না আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, না তাকে ডাকে। আবার তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের উপর এটা কি তা জান কি?” তারা উত্তর দিলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ই বেশী অবহিত।” “এটা হলো উঁচু সুরক্ষিত ছাদ ও জড়িয়ে ধরা তরঙ্গ।” বললেন তিনি। এরপর তিনি বললেনঃ “তোমাদের এবং এর মধ্যে কতটা ব্যবধান আছে তা কি তোমরা জান?” তারা উত্তরে বললেনঃ “এ সম্পর্কে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী।” তিনি বললেনঃ “তোমাদের ও এর মধ্যে পাঁচশ’ বছরের পথের ব্যবধান।” তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “এর উপরে কি আছে তা কি তোমরা জান?” তারা উত্তর দিলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) বেশী খবর রাখেন।” তিনি বললেনঃ “এর উপরে দ্বিতীয় আকাশ রয়েছে। আর এই দুই আকাশের মধ্যবর্তী ব্যবধান হলো পাঁচশ' বছরের পথ। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাতটি আকাশের কথা বললেন এবং প্রত্যেকটির মাঝে এই পরিমাণ দূরত্বেরই বর্ণনা দিলেন। এরপর তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “সপ্তম আকাশের উপর কি আছে তা কি তোমাদের জানা আছে?” সাহাবীগণ (রাঃ) জবাব দিলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ই বেশী অবগত।” তিনি বললেনঃ “সপ্তম আকাশের উপর এই পরিমাণ দূরত্বে আরশ রয়েছে অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের নীচে কি আছে তা কি তোমরা জান?” তাঁরা জবাব দিলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ই সবচেয়ে ভাল জানেন।” তিনি বললেনঃ “তাহলো যমীন।” তারপর বললেনঃ “এর নীচে কি আছে তা কি জান?” তারা উত্তর দিলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী।” তিনি বললেনঃ “এর নীচে আর একটি যমীন আছে। এই দুই যমীনের মধ্যেও পাঁচশ' বছরের পথের ব্যবধান।” এই ভাবে তিনি সাতটি যমীনের কথা সমপরিমাণ দূরত্ব সহ বর্ণনা করলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “যাঁর হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা যদি সর্বাপেক্ষা নিম্নতম যমীনে একটি রশি লটকিয়ে দাও তবে ওটাও আল্লাহ তাআলারই নিকট পৌঁছবে।” অতঃপর তিনি (আরবী) আয়াতটি পাঠ করেন।” (ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেন যে, এটা গারীব, কেননা এর বর্ণনাকারী হাসানের তার উস্তাদ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে শোন প্রমাণিত নয়। যেমন এটা আইয়ুব (রঃ), ইউনুস (রঃ), আলী ইবনে যায়েদ (রঃ) প্রমুখ মুহাদ্দিসের উক্তি)কোন কোন আহলুল ইলম এই হাদীসের শরাহতে বলেছেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রশির আল্লাহ তা'আলারই ইলমে কুদরত পর্যন্ত পৌঁছা, তার সত্তা পর্যন্ত পৌঁছা উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহ তাআলার ইলম ও তার প্রভাব এবং তার রাজত্ব নিঃসন্দেহে সব জায়গাতেই রয়েছে, কিন্তু তিনি তাঁর জাত বা সত্তারূপে আরশের উপর রয়েছেন। যেমন তিনি তার এই বিশেষণ স্বীয় কিতাবের মধ্যে স্বয়ং বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদেও এ হাদীসটি রয়েছে এবং তাতে দুই যমীনের মাঝে দূরত্ব সাত শ' বছরের পথ বলে বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিম এবং মুসনাদে বাযযারেও এ হাদীসটি আছে, কিন্তু মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে রশি লটকিয়ে দেয়ার বাক্যটি নেই এবং প্রত্যেক দুই যমীনের মাঝের দূরত্ব তাতেও পাঁচশ বছরের পথের কথা রয়েছে। ইমাম বাযযার (রঃ) বলেন যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ছাড়া আর কেউই এটা নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেননি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-ও এ হাদীসটি মরসালরূপে বর্ণনা করেছেন অর্থাৎ হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ “আমাদের নিকট এটা বর্ণনা করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি হাদীস বর্ণনা করেন এবং সাহাবীর নাম উল্লেখ করেননি। সম্ভবতঃ এটাই সঠিক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদে বাযযার কিতাবুল আসমা এবং ওয়াস সিফাতুল বায়হাকীতে এ হাদীসটি হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। কিন্তু এর ইসনাদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আছে এবং মতনে গারাবাত ও নাকারাত রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী) (৬৫:১২)-এর তাফসীরে। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তি আনয়ন করেছেন যে, আসমান ও যমীনের মাঝে চারজন ফেরেশতার সাক্ষাৎ হয়। তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কোথা হতে আসলে?” তখন একজন উত্তর দেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে সপ্তম আকাশ হতে প্রেরণ করেছেন এবং আমি সেখানে আল্লাহ তা'আলাকে ছেড়ে এলাম।” দ্বিতীয়জন বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে সপ্তম যমীন হতে প্রেরণ করেছিলেন এবং তিনি সেখানে ছিলেন। তৃতীয়জন বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে মাশারিক (পূর্ব দিক) হতে প্রেরণ করেছেন এবং সেখানে আল্লাহ তা'আলা ছিলেন। চতুর্থ জন বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে মাগরিব (পশ্চিম দিক) হতে পাঠিয়েছেন এবং তথায় আমি তাঁকে ছেড়ে আসলাম।” (এ হাদীসটিও গারীব, বরং মনে হচ্ছে যে, হযরত কাতাদা (রঃ) বর্ণিত হাদীসটি যা উপরে মুরসালরূপে উল্লিখিত হলো, সম্ভবতঃ ওটাও হযরত কাতাদারই (রঃ) নিজের উক্তি হবে, যেমন এটা স্বয়ং তাঁরই উক্তি। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
আল-হাদীদ 57:3
হযরত ইরবায ইবনে সারিয়াহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শয়নের পূর্বে ঐ সূরাগুলো পাঠ করতেন যেগুলোর শুরুতে বা রয়েছে। এবং বলতেনঃ “এগুলোর মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে যা হাজার আয়াত হতেও উত্তম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ হাদীসে যে আয়াতটির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলাই খুব ভাল জানেন, আয়াতটি হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আদি, তিনিই অন্ত, তিনিই ব্যক্ত, তিনিই গুপ্ত এবং তিনি সর্ব বিষয়ে সম্যক অবহিত।” এর বিস্তারিত বর্ণনা সত্বরই আসছে ইনশা-আল্লাহ। ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর: সমস্ত প্রাণী ও উদ্ভিদ আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা বর্ণনা করে থাকে। সপ্ত আসমান ও যমীন এবং এগুলোর মধ্যস্থিত সমস্ত মাখলূক ও প্রত্যেক জিনিস তাঁর প্রশংসা ও গুণকীর্তনে মগ্ন রয়েছে। কিন্তু মানুষ এদের তাসবীহ পাঠ বুঝতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সপ্ত আকাশ ও যমীন এবং এগুলোর মধ্যে যারা রয়েছে, সবাই তাঁর (আল্লাহর) পবিত্রতা ঘোষণা করে থাকে। আর যত কিছু রয়েছে সবই তাঁর সপ্রশংস মহিমা ঘোষণা করে থাকে, কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ বুঝতে পার না, নিশ্চয়ই তিনি সহনশীল, ক্ষমাকারী।” (১৭:৪৪) সবাই তার সামনে নীচু, অক্ষম এবং শক্তিহীন। তাঁর নির্ধারিত শরীয়ত এবং তাঁর আহকাম হিকমতে পরিপূর্ণ। প্রকৃত বাদশাহ তিনিই যার কর্তৃত্বাধীনে আসমান ও যমীন রয়েছে। সৃষ্টজীবের ব্যবস্থাপক তিনিই। জীবন ও মৃত্যু তাঁরই অধিকারভুক্ত। তিনিই ধ্বংস করেন এবং তিনিই সৃষ্টি করেন। যাকে তিনি যা কিছু দেয়ার ইচ্ছা করেন, দিয়ে থাকেন। তিনি সব কিছুর উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হতে পারে না।এরপরে ... (আরবী)-এ আয়াতটি রয়েছে যার ব্যাপারে উল্লিখিত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এটা এক হাজার আয়াত হতেও উত্তম।হযরত আবু যামীল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমার মনে এক সন্দেহ বা খা আছে, কিন্তু মুখে তা আনতে ইচ্ছা হচ্ছে না। তাঁর একথা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) মুচকি হেসে বললেন, সম্ভবতঃ এটা এমন সন্দেহ হবে যা থেকে কেউই বাঁচতে পারেনি। এমন কি কুরআন কারীমেও রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে যদি তোমার সন্দেহ হয়, তাহলে তোমার পূর্বে যারা কুরআন পড়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর। অবশ্যই তোমার কাছে তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে সত্য এসেছে।” (১০:৯৪) তারপর তিনি বলেনঃ “যখন তোমার মনে কোন সন্দেহ আসবে তখন (আরবী)-এ আয়াতটি পড়ে নিয়ো।” (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ আয়াতের তাফসীরে দশেরও অধিক উক্তি রয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, ইয়াহইয়া বলেনঃ (আরবী) ও (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইলমের দিক দিয়ে ব্যক্ত ও গুপ্ত হওয়া। এই ইয়াহ্ইয়া হলেন যিয়াদ ফারার পুত্র। তাঁর রচিত একটি পুস্তক রয়েছে যার নাম মাআনিল কুরআন।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শয়নের সময় নিম্নলিখিত দু'আটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ, হে সপ্ত আকাশ এবং বড় আরশের রব! হে আমাদের এবং সমস্ত জিনিসের প্রতিপালক! হে তাওরাত ও ইনজীল অবতীর্ণকারী! হে দানা ও বিচি উদগীরণকারী! আপনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই। এমন প্রত্যেক জিনিসের অনিষ্ঠ হতে আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি যার ঝুঁটি আপনার হাতে রয়েছে। আপনিই প্রথম এবং আপনার পূর্বে কিছুই ছিল না, আপনিই শেষ এবং আপনার পরে কিছুই থাকবে না। আপনি ব্যক্ত বা প্রকাশ্য এবং আপনার উপর কোন কিছুই নেই, আপনি গুপ্ত এবং কোন কিছুই আপনার কাছে গুপ্ত নয়, আমাদের ঋণ আপনি আদায় করে দিন এবং আমাদেরকে দারিদ্রমুক্ত করে দিন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুহায়েল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু সালেহ (রঃ) স্বীয় পরিবারের লোককে এই দু'আ শিক্ষা দিতেন এবং বলতেন যে, যখন তারা শয়ন করবে তখন যেন ডান পাশে শুয়ে এ দু'আটি পড়ে নেয়।" (এটা ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে তার জন্যে কিবলামুখী করে বিছানা বিছিয়ে দেয়া হতো। তিনি তাঁর ডান হস্ত-তালুর উপর মাথা রেখে আরাম করতেন। তারপর আস্তে আস্তে কিছু পাঠ করতেন। কিন্তু শেষ রাত্রে উপরোক্তে দু'আটি উচ্চস্বরে পড়তেন। তবে শব্দগুলোতে কিছু হেরফের রয়েছে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ আয়াতের তাফসীরে জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা স্বীয় সাহাবীবর্গসহ বসেছিলেন এমতাবস্থায় তাঁদের উপর এক খণ্ড মেঘ দেখা দেয়। তিনি সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি তা তোমরা জান কি?” তাঁরা জবাবে বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তিনি তখন বললেনঃ “এটাকে ‘ইনাল; বলা হয়। এটা যমীনকে সায়রাব বা পানিসিক্ত করে থাকে। জনগণের উপর এটা বর্ষিত হয় যারা না আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, না তাকে ডাকে। আবার তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের উপর এটা কি তা জান কি?” তারা উত্তর দিলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ই বেশী অবহিত।” “এটা হলো উঁচু সুরক্ষিত ছাদ ও জড়িয়ে ধরা তরঙ্গ।” বললেন তিনি। এরপর তিনি বললেনঃ “তোমাদের এবং এর মধ্যে কতটা ব্যবধান আছে তা কি তোমরা জান?” তারা উত্তরে বললেনঃ “এ সম্পর্কে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী।” তিনি বললেনঃ “তোমাদের ও এর মধ্যে পাঁচশ’ বছরের পথের ব্যবধান।” তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “এর উপরে কি আছে তা কি তোমরা জান?” তারা উত্তর দিলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) বেশী খবর রাখেন।” তিনি বললেনঃ “এর উপরে দ্বিতীয় আকাশ রয়েছে। আর এই দুই আকাশের মধ্যবর্তী ব্যবধান হলো পাঁচশ' বছরের পথ। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাতটি আকাশের কথা বললেন এবং প্রত্যেকটির মাঝে এই পরিমাণ দূরত্বেরই বর্ণনা দিলেন। এরপর তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “সপ্তম আকাশের উপর কি আছে তা কি তোমাদের জানা আছে?” সাহাবীগণ (রাঃ) জবাব দিলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ই বেশী অবগত।” তিনি বললেনঃ “সপ্তম আকাশের উপর এই পরিমাণ দূরত্বে আরশ রয়েছে অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের নীচে কি আছে তা কি তোমরা জান?” তাঁরা জবাব দিলেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ই সবচেয়ে ভাল জানেন।” তিনি বললেনঃ “তাহলো যমীন।” তারপর বললেনঃ “এর নীচে কি আছে তা কি জান?” তারা উত্তর দিলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী।” তিনি বললেনঃ “এর নীচে আর একটি যমীন আছে। এই দুই যমীনের মধ্যেও পাঁচশ' বছরের পথের ব্যবধান।” এই ভাবে তিনি সাতটি যমীনের কথা সমপরিমাণ দূরত্ব সহ বর্ণনা করলেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “যাঁর হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা যদি সর্বাপেক্ষা নিম্নতম যমীনে একটি রশি লটকিয়ে দাও তবে ওটাও আল্লাহ তাআলারই নিকট পৌঁছবে।” অতঃপর তিনি (আরবী) আয়াতটি পাঠ করেন।” (ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেন যে, এটা গারীব, কেননা এর বর্ণনাকারী হাসানের তার উস্তাদ হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে শোন প্রমাণিত নয়। যেমন এটা আইয়ুব (রঃ), ইউনুস (রঃ), আলী ইবনে যায়েদ (রঃ) প্রমুখ মুহাদ্দিসের উক্তি)কোন কোন আহলুল ইলম এই হাদীসের শরাহতে বলেছেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রশির আল্লাহ তা'আলারই ইলমে কুদরত পর্যন্ত পৌঁছা, তার সত্তা পর্যন্ত পৌঁছা উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহ তাআলার ইলম ও তার প্রভাব এবং তার রাজত্ব নিঃসন্দেহে সব জায়গাতেই রয়েছে, কিন্তু তিনি তাঁর জাত বা সত্তারূপে আরশের উপর রয়েছেন। যেমন তিনি তার এই বিশেষণ স্বীয় কিতাবের মধ্যে স্বয়ং বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদেও এ হাদীসটি রয়েছে এবং তাতে দুই যমীনের মাঝে দূরত্ব সাত শ' বছরের পথ বলে বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিম এবং মুসনাদে বাযযারেও এ হাদীসটি আছে, কিন্তু মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে রশি লটকিয়ে দেয়ার বাক্যটি নেই এবং প্রত্যেক দুই যমীনের মাঝের দূরত্ব তাতেও পাঁচশ বছরের পথের কথা রয়েছে। ইমাম বাযযার (রঃ) বলেন যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ছাড়া আর কেউই এটা নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেননি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-ও এ হাদীসটি মরসালরূপে বর্ণনা করেছেন অর্থাৎ হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ “আমাদের নিকট এটা বর্ণনা করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি হাদীস বর্ণনা করেন এবং সাহাবীর নাম উল্লেখ করেননি। সম্ভবতঃ এটাই সঠিক। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদে বাযযার কিতাবুল আসমা এবং ওয়াস সিফাতুল বায়হাকীতে এ হাদীসটি হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। কিন্তু এর ইসনাদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আছে এবং মতনে গারাবাত ও নাকারাত রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) (আরবী) (৬৫:১২)-এর তাফসীরে। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তি আনয়ন করেছেন যে, আসমান ও যমীনের মাঝে চারজন ফেরেশতার সাক্ষাৎ হয়। তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কোথা হতে আসলে?” তখন একজন উত্তর দেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে সপ্তম আকাশ হতে প্রেরণ করেছেন এবং আমি সেখানে আল্লাহ তা'আলাকে ছেড়ে এলাম।” দ্বিতীয়জন বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে সপ্তম যমীন হতে প্রেরণ করেছিলেন এবং তিনি সেখানে ছিলেন। তৃতীয়জন বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে মাশারিক (পূর্ব দিক) হতে প্রেরণ করেছেন এবং সেখানে আল্লাহ তা'আলা ছিলেন। চতুর্থ জন বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাকে মাগরিব (পশ্চিম দিক) হতে পাঠিয়েছেন এবং তথায় আমি তাঁকে ছেড়ে আসলাম।” (এ হাদীসটিও গারীব, বরং মনে হচ্ছে যে, হযরত কাতাদা (রঃ) বর্ণিত হাদীসটি যা উপরে মুরসালরূপে উল্লিখিত হলো, সম্ভবতঃ ওটাও হযরত কাতাদারই (রঃ) নিজের উক্তি হবে, যেমন এটা স্বয়ং তাঁরই উক্তি। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
আল-হাদীদ 57:4
৪-৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলার যমীন ও আসমানকে ছয় দিনে সৃষ্টি করা এবং তাঁর আরশে সমাসীন হওয়ার কথা সূরায়ে আ'রাফের তাফসীরে পূর্ণভাবে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে এর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।কি পরিমাণ বৃষ্টিবিন্দু আকাশ হতে যমীনে পড়ে, কতটি শস্যবীজ মাটিতে পতিত হয়, কতটি চারা জন্মে, কি পরিমাণ শস্য ও ফল উৎপন্ন হয় এসব খবর আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই রাখেন। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অদশ্যের চাবিকাঠি তারই হাতে রয়েছে যা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না, স্থলে ও সমুদ্রে যা কিছু আছে তা একমাত্র তিনিই জানেন, কোন পাতার পতিত হওয়ার খবরও তার অজানা নয়, যমীনের অন্ধকারের গুপ্ত শস্যবীজ এবং কোন সিক্ত ও শুষ্ক জিনিস এমন নেই যা প্রকাশ্য কিতাবে বিদ্যমান নেই।” (৬:৫৯) সূরায়ে বাকারার তাফসীরে এটা গত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত ফেরেশতা বৃষ্টির এক একটি বিন্দু তাঁর নির্দেশিত জায়গায় পৌঁছিয়ে দেন। আকাশে যা কিছু উত্থিত হয় অর্থাৎ ফেরেশতা এবং আমলসমূহ, এ সব কিছুই তিনি জানেন। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছেঃ “রাত্রির আমল দিবসের পূর্বে এবং দিবসের আমল রাত্রির পূর্বে তাঁর নিকট উঠিয়ে দেয়া হয়।” মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেন তা যেমনই হোক যা-ই হোক। আর তোমরাও স্থলে থাকো বা পানিতে থাকো, রাত্রি যোক বা দিন হোক, তোমরা বাড়ীতে থাকো বা জঙ্গলে থাকো, সবই তাঁর অবগতির পক্ষে সমান। সদা-সর্বদা তাঁর দর্শন ও তাঁর শ্রবণ তোমাদের সাথে রয়েছে। তোমাদের সমস্ত কথা তিনি শুনছেন এবং তোমাদের অবস্থা তিনি দেখছেন। তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব খবর তিনি রাখেন। যেমন ঘোষণা করা হয়েছেঃ “তার থেকে যে কিছু গোপন করতে চায় তার এ চেষ্টা বৃথা, যিনি প্রকাশ্য এবং গোপনীয়, এমন কি অন্তরের খবরও জানেন। তার থেকে কোন কিছু কি করে গোপন করা যেতে পারে?” অন্য আয়াতে আছেঃ “গোপনীয় কথা এবং প্রকাশ্য কথা, রাত্রে হোক বা দিনে হোক, সবই তাঁর কাছে উজ্জ্বল ও প্রকাশমান।” সত্যকথা এটাই যে, তিনিই প্রতিপালক এবং প্রকৃত ও সত্য মা’বূদ তিনিই।সহীহ হাদীসে এসেছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ইহসানের অর্থ হলোঃ তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যে, তুমি যেন আল্লাহকে দেখছো আর তুমি যদি তাকে না দেখো তবে এ বিশ্বাস রাখবে যে, তিনি তোমাকে দেখছেন।” একটি লোকে এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন হিকমতের খোরাক দান করুন যাতে আমার জীবন উজ্জ্বলময় হয়।” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তুমি আল্লাহ হতে এমনই লজ্জা করবে যেমন লজ্জা কর তোমার নিকটতম সৎ আত্মীয় হতে যে তোমার নিকট হতে কখনো পৃথক হয় না।” (এ হাদীসটি আবু বকর ইসমাঈলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তিনটি কাজ করলো সে ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করলো। (এক) এক আল্লাহর ইবাদত করলো, (দুই) সন্তুষ্ট চিত্তে নিজের মালের যাকাত আদায় করলো। যাকাতে পশু দিলে বৃদ্ধ, অক্ষম, পাতলা, দুর্বল এবং রোগা পশু দেয় না এবং (তিন) নিজের নফসকে পবিত্র করলো।” তখন একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নফসকে পবিত্র করার অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “এ কথাকে অন্তরের সাথে বিশ্বাস করা যে, সর্ব জায়গাতেই আল্লাহ তা'আলা তোমার সাথে রয়েছেন।” (এ হাদীসটি আবু নাঈম ইবনে হাম্মাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) প্রায়ই নিম্নের ছন্দটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তুমি সম্পূর্ণরূপে একাকী ও নির্জনে থাকবে তখনো তুমি বলো না যে, তুমি একাকী রয়েছে। বরং বল যে, তোমার উপর একজন রক্ষক রয়েছেন। কোন সময়েই তুমি আল্লাহকে উদাসীন মনে করো না এবং জেনে রেখো যে, গোপন হতে গোপনতম কাজও তাঁর কাছে গোপন নয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই এবং আল্লাহরই দিকে সমস্ত বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে। অর্থাৎ তিনিই দুনিয়া ও আখিরাতের মালিক। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তো মালিক পরলোকের ও ইহলোকের।” (৯২:১৩) তার এই মালিকানার উপর আমাদের তার প্রশংসা করা একান্ত কর্তব্য। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, দুনিয়া ও আখিরাতে প্রশংসা তারই।” (২৮:৭০) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে যার মালিকানাধীন আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই এবং আখিরাতেও প্রশংসা তারই। তিনি বিজ্ঞানময় ও (সব কিছু) সম্যক অবগত।” (৩৪:১) সুতরাং আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিসের উপর মালিকানা রয়েছে একমাত্র তাঁরই। সারা আসমান ও যমীনের সৃষ্টজীব তাঁরই দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ, তাঁরই খাদেম এবং তাঁর সামনে অবনত। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকট উপস্থিত হবে না বান্দারূপে। তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে গণনা করেছেন, আর কিয়ামত দিবসে তাদের সকলেই তাঁর নিকট আসবে একাকী অবস্থায়।" (১৯:৯৩-৯৫)মহান আল্লাহর উক্তিঃ “আল্লাহরই দিকে সমস্ত বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে।' তিনি তাঁর মাখলুকের মধ্যে যা চান হুকুম দিয়ে থাকেন। তিনি ন্যায় বিচারক, তিনি অবিচার ও যুলুম করেন না। বরং এক একটি পুণ্যকে তিনি দশগুণ করে বাড়িয়ে দেন এবং নিজের পক্ষ হতে বড় প্রতিদান প্রদান করে থাকেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন আমি ন্যায়ের মানমণ্ড স্থাপন করবে, তখন কোন নফসের প্রতি বিন্দুমাত্র যুলুম করা হবে না, কোন কিছু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় তবুও তা আমি হাযির করবে এবং হিসাব গ্রহণের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট।" (২১:৪৭)।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তিনিই রাত্রিকে প্রবেশ করান দিবসে এবং দিবসকে প্রবেশ করান রাত্রিতে, আর তিনি অন্তর্যামী।” অর্থাৎ মাখলুকের মধ্যে সবকিছুর ব্যবস্থাপনা তিনিই করেন। দিবস ও রজনীর পরিবর্তন ঘটানো তাঁরই কাজ। স্বীয় হিকমতের মাধ্যমে তিনি এ দু’টির হ্রাস-বৃদ্ধি করে থাকেন। কখনো দিন বড় করেন ও রাত্রি ছোট করেন এবং কখনো রাত্রি বড় করেন ও দিন ছোট করেন। আবার কখনো দুটোকেই সমান করে দেন। কখনো করেন শীতকাল, কখনো করেন গ্রীষ্মকাল এবং কখনো করেন বর্ষাকাল, কখনো বসন্তকাল, আর কখনো। শরকাল। এ সব কিছুই বান্দাদের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্যেই করে থাকেন। তিনি অন্তর্যামী। তিনি অন্তরের ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম বিষয়েরও খবর রাখেন। কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন থাকে না।
আল-হাদীদ 57:5
৪-৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলার যমীন ও আসমানকে ছয় দিনে সৃষ্টি করা এবং তাঁর আরশে সমাসীন হওয়ার কথা সূরায়ে আ'রাফের তাফসীরে পূর্ণভাবে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে এর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।কি পরিমাণ বৃষ্টিবিন্দু আকাশ হতে যমীনে পড়ে, কতটি শস্যবীজ মাটিতে পতিত হয়, কতটি চারা জন্মে, কি পরিমাণ শস্য ও ফল উৎপন্ন হয় এসব খবর আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই রাখেন। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অদশ্যের চাবিকাঠি তারই হাতে রয়েছে যা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না, স্থলে ও সমুদ্রে যা কিছু আছে তা একমাত্র তিনিই জানেন, কোন পাতার পতিত হওয়ার খবরও তার অজানা নয়, যমীনের অন্ধকারের গুপ্ত শস্যবীজ এবং কোন সিক্ত ও শুষ্ক জিনিস এমন নেই যা প্রকাশ্য কিতাবে বিদ্যমান নেই।” (৬:৫৯) সূরায়ে বাকারার তাফসীরে এটা গত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত ফেরেশতা বৃষ্টির এক একটি বিন্দু তাঁর নির্দেশিত জায়গায় পৌঁছিয়ে দেন। আকাশে যা কিছু উত্থিত হয় অর্থাৎ ফেরেশতা এবং আমলসমূহ, এ সব কিছুই তিনি জানেন। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছেঃ “রাত্রির আমল দিবসের পূর্বে এবং দিবসের আমল রাত্রির পূর্বে তাঁর নিকট উঠিয়ে দেয়া হয়।” মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেন তা যেমনই হোক যা-ই হোক। আর তোমরাও স্থলে থাকো বা পানিতে থাকো, রাত্রি যোক বা দিন হোক, তোমরা বাড়ীতে থাকো বা জঙ্গলে থাকো, সবই তাঁর অবগতির পক্ষে সমান। সদা-সর্বদা তাঁর দর্শন ও তাঁর শ্রবণ তোমাদের সাথে রয়েছে। তোমাদের সমস্ত কথা তিনি শুনছেন এবং তোমাদের অবস্থা তিনি দেখছেন। তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব খবর তিনি রাখেন। যেমন ঘোষণা করা হয়েছেঃ “তার থেকে যে কিছু গোপন করতে চায় তার এ চেষ্টা বৃথা, যিনি প্রকাশ্য এবং গোপনীয়, এমন কি অন্তরের খবরও জানেন। তার থেকে কোন কিছু কি করে গোপন করা যেতে পারে?” অন্য আয়াতে আছেঃ “গোপনীয় কথা এবং প্রকাশ্য কথা, রাত্রে হোক বা দিনে হোক, সবই তাঁর কাছে উজ্জ্বল ও প্রকাশমান।” সত্যকথা এটাই যে, তিনিই প্রতিপালক এবং প্রকৃত ও সত্য মা’বূদ তিনিই।সহীহ হাদীসে এসেছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ইহসানের অর্থ হলোঃ তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যে, তুমি যেন আল্লাহকে দেখছো আর তুমি যদি তাকে না দেখো তবে এ বিশ্বাস রাখবে যে, তিনি তোমাকে দেখছেন।” একটি লোকে এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন হিকমতের খোরাক দান করুন যাতে আমার জীবন উজ্জ্বলময় হয়।” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তুমি আল্লাহ হতে এমনই লজ্জা করবে যেমন লজ্জা কর তোমার নিকটতম সৎ আত্মীয় হতে যে তোমার নিকট হতে কখনো পৃথক হয় না।” (এ হাদীসটি আবু বকর ইসমাঈলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তিনটি কাজ করলো সে ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করলো। (এক) এক আল্লাহর ইবাদত করলো, (দুই) সন্তুষ্ট চিত্তে নিজের মালের যাকাত আদায় করলো। যাকাতে পশু দিলে বৃদ্ধ, অক্ষম, পাতলা, দুর্বল এবং রোগা পশু দেয় না এবং (তিন) নিজের নফসকে পবিত্র করলো।” তখন একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নফসকে পবিত্র করার অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “এ কথাকে অন্তরের সাথে বিশ্বাস করা যে, সর্ব জায়গাতেই আল্লাহ তা'আলা তোমার সাথে রয়েছেন।” (এ হাদীসটি আবু নাঈম ইবনে হাম্মাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) প্রায়ই নিম্নের ছন্দটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তুমি সম্পূর্ণরূপে একাকী ও নির্জনে থাকবে তখনো তুমি বলো না যে, তুমি একাকী রয়েছে। বরং বল যে, তোমার উপর একজন রক্ষক রয়েছেন। কোন সময়েই তুমি আল্লাহকে উদাসীন মনে করো না এবং জেনে রেখো যে, গোপন হতে গোপনতম কাজও তাঁর কাছে গোপন নয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই এবং আল্লাহরই দিকে সমস্ত বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে। অর্থাৎ তিনিই দুনিয়া ও আখিরাতের মালিক। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তো মালিক পরলোকের ও ইহলোকের।” (৯২:১৩) তার এই মালিকানার উপর আমাদের তার প্রশংসা করা একান্ত কর্তব্য। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, দুনিয়া ও আখিরাতে প্রশংসা তারই।” (২৮:৭০) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে যার মালিকানাধীন আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই এবং আখিরাতেও প্রশংসা তারই। তিনি বিজ্ঞানময় ও (সব কিছু) সম্যক অবগত।” (৩৪:১) সুতরাং আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিসের উপর মালিকানা রয়েছে একমাত্র তাঁরই। সারা আসমান ও যমীনের সৃষ্টজীব তাঁরই দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ, তাঁরই খাদেম এবং তাঁর সামনে অবনত। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকট উপস্থিত হবে না বান্দারূপে। তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে গণনা করেছেন, আর কিয়ামত দিবসে তাদের সকলেই তাঁর নিকট আসবে একাকী অবস্থায়।" (১৯:৯৩-৯৫)মহান আল্লাহর উক্তিঃ “আল্লাহরই দিকে সমস্ত বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে।' তিনি তাঁর মাখলুকের মধ্যে যা চান হুকুম দিয়ে থাকেন। তিনি ন্যায় বিচারক, তিনি অবিচার ও যুলুম করেন না। বরং এক একটি পুণ্যকে তিনি দশগুণ করে বাড়িয়ে দেন এবং নিজের পক্ষ হতে বড় প্রতিদান প্রদান করে থাকেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন আমি ন্যায়ের মানমণ্ড স্থাপন করবে, তখন কোন নফসের প্রতি বিন্দুমাত্র যুলুম করা হবে না, কোন কিছু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় তবুও তা আমি হাযির করবে এবং হিসাব গ্রহণের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট।" (২১:৪৭)।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তিনিই রাত্রিকে প্রবেশ করান দিবসে এবং দিবসকে প্রবেশ করান রাত্রিতে, আর তিনি অন্তর্যামী।” অর্থাৎ মাখলুকের মধ্যে সবকিছুর ব্যবস্থাপনা তিনিই করেন। দিবস ও রজনীর পরিবর্তন ঘটানো তাঁরই কাজ। স্বীয় হিকমতের মাধ্যমে তিনি এ দু’টির হ্রাস-বৃদ্ধি করে থাকেন। কখনো দিন বড় করেন ও রাত্রি ছোট করেন এবং কখনো রাত্রি বড় করেন ও দিন ছোট করেন। আবার কখনো দুটোকেই সমান করে দেন। কখনো করেন শীতকাল, কখনো করেন গ্রীষ্মকাল এবং কখনো করেন বর্ষাকাল, কখনো বসন্তকাল, আর কখনো। শরকাল। এ সব কিছুই বান্দাদের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্যেই করে থাকেন। তিনি অন্তর্যামী। তিনি অন্তরের ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম বিষয়েরও খবর রাখেন। কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন থাকে না।
আল-হাদীদ 57:6
৪-৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলার যমীন ও আসমানকে ছয় দিনে সৃষ্টি করা এবং তাঁর আরশে সমাসীন হওয়ার কথা সূরায়ে আ'রাফের তাফসীরে পূর্ণভাবে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এখানে এর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।কি পরিমাণ বৃষ্টিবিন্দু আকাশ হতে যমীনে পড়ে, কতটি শস্যবীজ মাটিতে পতিত হয়, কতটি চারা জন্মে, কি পরিমাণ শস্য ও ফল উৎপন্ন হয় এসব খবর আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই রাখেন। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অদশ্যের চাবিকাঠি তারই হাতে রয়েছে যা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না, স্থলে ও সমুদ্রে যা কিছু আছে তা একমাত্র তিনিই জানেন, কোন পাতার পতিত হওয়ার খবরও তার অজানা নয়, যমীনের অন্ধকারের গুপ্ত শস্যবীজ এবং কোন সিক্ত ও শুষ্ক জিনিস এমন নেই যা প্রকাশ্য কিতাবে বিদ্যমান নেই।” (৬:৫৯) সূরায়ে বাকারার তাফসীরে এটা গত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত ফেরেশতা বৃষ্টির এক একটি বিন্দু তাঁর নির্দেশিত জায়গায় পৌঁছিয়ে দেন। আকাশে যা কিছু উত্থিত হয় অর্থাৎ ফেরেশতা এবং আমলসমূহ, এ সব কিছুই তিনি জানেন। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছেঃ “রাত্রির আমল দিবসের পূর্বে এবং দিবসের আমল রাত্রির পূর্বে তাঁর নিকট উঠিয়ে দেয়া হয়।” মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেন তা যেমনই হোক যা-ই হোক। আর তোমরাও স্থলে থাকো বা পানিতে থাকো, রাত্রি যোক বা দিন হোক, তোমরা বাড়ীতে থাকো বা জঙ্গলে থাকো, সবই তাঁর অবগতির পক্ষে সমান। সদা-সর্বদা তাঁর দর্শন ও তাঁর শ্রবণ তোমাদের সাথে রয়েছে। তোমাদের সমস্ত কথা তিনি শুনছেন এবং তোমাদের অবস্থা তিনি দেখছেন। তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব খবর তিনি রাখেন। যেমন ঘোষণা করা হয়েছেঃ “তার থেকে যে কিছু গোপন করতে চায় তার এ চেষ্টা বৃথা, যিনি প্রকাশ্য এবং গোপনীয়, এমন কি অন্তরের খবরও জানেন। তার থেকে কোন কিছু কি করে গোপন করা যেতে পারে?” অন্য আয়াতে আছেঃ “গোপনীয় কথা এবং প্রকাশ্য কথা, রাত্রে হোক বা দিনে হোক, সবই তাঁর কাছে উজ্জ্বল ও প্রকাশমান।” সত্যকথা এটাই যে, তিনিই প্রতিপালক এবং প্রকৃত ও সত্য মা’বূদ তিনিই।সহীহ হাদীসে এসেছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ইহসানের অর্থ হলোঃ তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যে, তুমি যেন আল্লাহকে দেখছো আর তুমি যদি তাকে না দেখো তবে এ বিশ্বাস রাখবে যে, তিনি তোমাকে দেখছেন।” একটি লোকে এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে এমন হিকমতের খোরাক দান করুন যাতে আমার জীবন উজ্জ্বলময় হয়।” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তুমি আল্লাহ হতে এমনই লজ্জা করবে যেমন লজ্জা কর তোমার নিকটতম সৎ আত্মীয় হতে যে তোমার নিকট হতে কখনো পৃথক হয় না।” (এ হাদীসটি আবু বকর ইসমাঈলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গারীব বা দুর্বল)রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তিনটি কাজ করলো সে ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করলো। (এক) এক আল্লাহর ইবাদত করলো, (দুই) সন্তুষ্ট চিত্তে নিজের মালের যাকাত আদায় করলো। যাকাতে পশু দিলে বৃদ্ধ, অক্ষম, পাতলা, দুর্বল এবং রোগা পশু দেয় না এবং (তিন) নিজের নফসকে পবিত্র করলো।” তখন একটি লোক জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নফসকে পবিত্র করার অর্থ কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “এ কথাকে অন্তরের সাথে বিশ্বাস করা যে, সর্ব জায়গাতেই আল্লাহ তা'আলা তোমার সাথে রয়েছেন।” (এ হাদীসটি আবু নাঈম ইবনে হাম্মাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) প্রায়ই নিম্নের ছন্দটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তুমি সম্পূর্ণরূপে একাকী ও নির্জনে থাকবে তখনো তুমি বলো না যে, তুমি একাকী রয়েছে। বরং বল যে, তোমার উপর একজন রক্ষক রয়েছেন। কোন সময়েই তুমি আল্লাহকে উদাসীন মনে করো না এবং জেনে রেখো যে, গোপন হতে গোপনতম কাজও তাঁর কাছে গোপন নয়।”মহান আল্লাহ বলেনঃ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই এবং আল্লাহরই দিকে সমস্ত বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে। অর্থাৎ তিনিই দুনিয়া ও আখিরাতের মালিক। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তো মালিক পরলোকের ও ইহলোকের।” (৯২:১৩) তার এই মালিকানার উপর আমাদের তার প্রশংসা করা একান্ত কর্তব্য। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, দুনিয়া ও আখিরাতে প্রশংসা তারই।” (২৮:৭০) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে যার মালিকানাধীন আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই এবং আখিরাতেও প্রশংসা তারই। তিনি বিজ্ঞানময় ও (সব কিছু) সম্যক অবগত।” (৩৪:১) সুতরাং আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিসের উপর মালিকানা রয়েছে একমাত্র তাঁরই। সারা আসমান ও যমীনের সৃষ্টজীব তাঁরই দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ, তাঁরই খাদেম এবং তাঁর সামনে অবনত। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকট উপস্থিত হবে না বান্দারূপে। তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে গণনা করেছেন, আর কিয়ামত দিবসে তাদের সকলেই তাঁর নিকট আসবে একাকী অবস্থায়।" (১৯:৯৩-৯৫)মহান আল্লাহর উক্তিঃ “আল্লাহরই দিকে সমস্ত বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে।' তিনি তাঁর মাখলুকের মধ্যে যা চান হুকুম দিয়ে থাকেন। তিনি ন্যায় বিচারক, তিনি অবিচার ও যুলুম করেন না। বরং এক একটি পুণ্যকে তিনি দশগুণ করে বাড়িয়ে দেন এবং নিজের পক্ষ হতে বড় প্রতিদান প্রদান করে থাকেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন আমি ন্যায়ের মানমণ্ড স্থাপন করবে, তখন কোন নফসের প্রতি বিন্দুমাত্র যুলুম করা হবে না, কোন কিছু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় তবুও তা আমি হাযির করবে এবং হিসাব গ্রহণের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট।" (২১:৪৭)।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তিনিই রাত্রিকে প্রবেশ করান দিবসে এবং দিবসকে প্রবেশ করান রাত্রিতে, আর তিনি অন্তর্যামী।” অর্থাৎ মাখলুকের মধ্যে সবকিছুর ব্যবস্থাপনা তিনিই করেন। দিবস ও রজনীর পরিবর্তন ঘটানো তাঁরই কাজ। স্বীয় হিকমতের মাধ্যমে তিনি এ দু’টির হ্রাস-বৃদ্ধি করে থাকেন। কখনো দিন বড় করেন ও রাত্রি ছোট করেন এবং কখনো রাত্রি বড় করেন ও দিন ছোট করেন। আবার কখনো দুটোকেই সমান করে দেন। কখনো করেন শীতকাল, কখনো করেন গ্রীষ্মকাল এবং কখনো করেন বর্ষাকাল, কখনো বসন্তকাল, আর কখনো। শরকাল। এ সব কিছুই বান্দাদের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্যেই করে থাকেন। তিনি অন্তর্যামী। তিনি অন্তরের ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম বিষয়েরও খবর রাখেন। কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন থাকে না।
আল-হাদীদ 57:7
৭-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা নিজের উপর এবং নিজের রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন ও ওর উপর দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের সাথে প্রতিষ্ঠিত থাকার হিদায়াত করছেন এবং তাঁর পথে খরচ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন। তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যে মাল হস্তান্তর রূপে দিয়েছেন, তোমরা তার আনুগত্য হিসেবে তা ব্যয় কর এবং বুঝে নাও যে, এই মাল যেমন অন্যের হাত হতে তোমার হাতে এসেছে, তেমনিভাবে তোমার হাত হতে সত্বরই এটা অন্যের হাতে চলে যাবে। আর তোমার জন্যে রয়ে যাবে হিসাব ও শাস্তি। এতে এ ইঙ্গিতও রয়েছে যে, হয়তো তোমার উত্তরাধিকারী সৎ হবে এবং তোমার সম্পদকে আমার পথে খরচ করে আমার নৈকট্য লাভ করবে, আবার এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে, সে অসৎ হবে এবং মন্দ কাজে ও অন্যায় পথে তোমার সম্পদ উড়িয়ে দিবে এবং এই অন্যায় কাজের উৎস তুমিই হবে। কারণ তুমি যদি এ সম্পদ ছেড়ে না যেতে তবে তোমার ওয়ারিস এটা অন্যায় কাজে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগে পেতো না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শাখীর (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তাআলার উক্তির উদ্ধৃতি দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।” (১০২:১) অতঃপর তিনি বলেনঃ “ইবনে আদম বলেঃ আমার মাল, আমার মাল। অথচ তার মাল তো ওটাই যা সে খেয়েছে, পরেছে এবং দান খায়রাত করেছে। যা সে খেয়েছে তা নিঃশেষ হয়েছে, যা সে পরিধান করেছে তা পুরনো হয়ে গেছে, আর যা সে আল্লাহর পথে দান করেছে তা তার কাছে সঞ্চিত রয়েছে। আর যা সে ছেড়ে গেল তা অন্যদের মাল। সে তা লোকদের জন্যে ছেড়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে এবং এতে শেষের অংশটুকু অতিরিক্ত রয়েছে)এ দু’টি কাজের প্রতি আল্লাহ তা'আলা উৎসাহ প্রদান করছেন এবং খুব বড় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের কি হলো যে, তোমরা আল্লাহতে ঈমান আন না? অথচ রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনতে আহ্বান করছে। তিনি মানুষের নিকট দলীল-প্রমাণাদি উপস্থাপন করেছেন এবং তাদেরকে মু'জিযা প্রদর্শন করছেন। সহীহ বুখারীর শরাহর প্রাথমিক অংশ কিতাবুল ঈমানে আমরা এ হাদীসটি বর্ণনা করে এসেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের নিকট উত্তম ঈমানদার ব্যক্তি কে?” উত্তরে তাঁরা বলেনঃ “ফেরেশতাগণ ।” তিনি বলেনঃ “তারা তো আল্লাহ তা'আলার নিকট রয়েছে, সুতরাং তারা ঈমানদার হয়েছে এতে বিস্ময়ের কি আছে?” তখন তারা বললেনঃ “তাহলে নবীগণ।” তিনি বলেনঃ “তাঁদের উপর তো অহী ও আল্লাহর কালাম অবতীর্ণ হয়, সুতরাং তারা তো ঈমান আনবেনই।” তারা তখন বলেনঃ “তাহলে আমরা।” তিনি বলেনঃ “কেন তোমরা ঈমানদার হবে না? আমি তো তোমাদের মধ্যে জীবিত অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছি। জেনে রেখো যে, উত্তম বিস্ময়পূর্ণ ঈমানদার হলো ঐ লোকেরা যারা তোমাদের পরে আসবে। তারা সহীফা ও গ্রন্থসমূহে সবকিছুই লিপিবদ্ধ দেখে ঈমান আনয়ন করবে।” সূরায়ে বাকারার শুরুতে (আরবী) (২:৩) এর তাফসীরেও আমরা এরূপ হাদীসগুলো লিপিবদ্ধ করেছি।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা মানুষকে তাদের কৃত অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ আল্লাহ তোমাদের নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের কথা স্মরণ কর যা তোমাদের উপর রয়েছে এবং স্মরণ কর তার সাথে কৃত ঐ অঙ্গীকারকে যা তিনি তোমাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছেন, যখন তোমরা বলেছিলেঃ আমরা শুনলাম ও মানলাম।” (৫:৭)এর দ্বারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করা বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এই মীসাক’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ মীসাক বা অঙ্গীকার যা হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠে তাদের নিকট হতে গ্রহণ করা হয়েছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এরও এটাই মাযহাব। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই তাঁর বান্দার প্রতি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ-এর প্রতি) সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে যুলুম, অবিচার ও অন্যায়ের অন্ধকার হতে বের করে সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল হিদায়াত ও সত্যের পথে আনয়ন করতে পারেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণাময়, পরম দয়ালু। এটা আল্লাহ তা'আলার বড় মেহেরবানী যে, তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের জন্যে কিতাব ও রাসূল পাঠিয়েছেন, সংশয়-সন্দেহ দূর করেছেন এবং হিদায়াত সুস্পষ্ট করেছেন।আল্লাহ পাক ঈমান আনয়ন ও দান-খয়রাতের হুকুম করে, তারপর ঈমানের প্রতি উৎসাহিত করে এবং এটা বর্ণনা দিয়ে যে, ঈমান না আনার এখন কোন ওরের সুযোগে নেই, দান-খয়রাতের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেন এবং বলেনঃ আমার পথে খরচ করতে থাকো এবং দারিদ্রকে ভয় করো না। কারণ যার পথে তোমরা খরচ করছো তিনি যমীন ও আসমানের ধন-ভাণ্ডারের একাই মালিক। আরশ ও কুরসী তাঁরই এবং তিনি তোমাদের কাছে তোমাদের এ দান-খয়রাতের প্রতিদান দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা (আল্লাহর পথে) যা কিছু খরচ করেছে, তিনি তোমাদেরকে ওর উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন এবং তিনি উত্তম রিযকদাতা।” (৩৪:৩৯) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের কাছে যা রয়েছে তা শেষ হয়ে যাবে এবং আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা চিরস্থায়ী (তা কখনো শেষ হবার নয়)।” (১৬:৯৬) যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে খরচ করতে থাকে এবং আরশের মালিক হতে কমে যাওয়ার ভয় করে না, সত্বরই তিনি তাকে উত্তম বিনিময় প্রদান করবেন। তারা নির্ভরশীল যে, আল্লাহর পথে যা খরচ করছে তার প্রতিদান তারা ইহকালে ও পরকালে অবশ্যই পাবে।এরপর মহান আল্লাহ বলছেন যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বে যারা ধন-সম্পদ খরচ করেছে এবং যারা তা করেনি, তারা কখনো সমান নয়, যদিও তারা মক্কা বিজয়ের পর খরচ করে থাকে। কারণ মক্কা বিজয়ের পূর্বে মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয় এবং শক্তি ছিল খুবই কম। আর এজন্যেও যে, ঐ সময় ঈমান শুধু ঐ লোকেরাই কবুল করতো যাদের অন্তর সম্পূর্ণরূপে কালিমামুক্ত ছিল। মক্কা বিজয়ের পর মুসলমানদের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, সংখ্যাও বেড়ে যায় এবং বহু অঞ্চল বিজিত হয়। এর সাথে সাথে মুসলমানদের আর্থিক অবস্থাও ভাল হয়। সুতরাং ঐ সময় ও এই সময়ের মধ্যে যেই পার্থক্য, ঐ সময়ের মুসলমান ও এই সময়ের মুসলমানদের মধ্যেও সেই পার্থক্য। ঐ সময়ের মুসলমানরা বড় রকমের প্রতিদান প্রাপ্ত হবে, যদিও উভয় যুগের মুসলমানরাই প্রকৃত কল্যাণ লাভে অংশীদার।কেউ কেউ বলেন যে, এখানে বিজয় দ্বারা হুদায়বিয়ার সন্ধিকে বুঝানো হয়েছে। মুসনাদে আহমাদের নিম্নের রিওয়াইয়াতটি এর পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-এর মধ্যে কিছু মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। হযরত খালিদ (রাঃ) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি আমার কিছু দিন পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলেই আমার উপর গর্ব প্রকাশ করছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানে এ খবর পৌঁছলে তিনি বলেনঃ “আমার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আমার জন্যে ছেড়ে দাও। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তোমরা উহুদ বা অন্য কোন পাহাড়ের সমান সোনা খরচ কর তবুও তাদের আমলের সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন।)প্রকাশ থাকে যে, এটা হযরত খালিদ (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের পরের ঘটনা এবং তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধির পরে এবং মক্কা বিজয়ের পূর্বে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। আর যে মতানৈক্যের বর্ণনা এই হাদীসে রয়েছে তা বানু জুযাইমা গোত্রের ব্যাপারে ঘটেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের পর হযরত খালিদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একদল সৈন্য এই গোত্রের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যখন তারা সেখানে পৌঁছেন তখন ঐ লোকগুলো বলতে শুরু করেঃ “আমরা মুসলমান হয়েছি। কিন্তু অজানার কারণে আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি’ একথা না বলে ‘আমরা সা’বী বা বেদ্বীন হয়েছি' একথা বলেন। কেননা, কাফিররা মুসলমানদেরকে একথাই বলতো। হযরত খালিদ (রাঃ) এই কালিমার ভাবার্থ - বুঝতে না পেরে তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। এমন কি তাদের যারা বন্দী হয় তাদেরকেও হত্যা করার আদেশ করেন। এই ঘটনায় হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হযরত খালিদ (রাঃ)-এর বিরধিতা করেন। এই ঘটনাটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উপরে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সাহাবীদেরকে (রাঃ) মন্দ বলো না। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড়ের সমানও সোনা (আল্লাহর পথে) খরচ করে তবুও তাদের তিন পাই শস্যের পুণ্যেও পৌঁছতে পারবে না। এমন কি দেড় পাই পুণ্যেও পৌছতে সক্ষম হবে না।”হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধির বছর যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গাসফান নামক স্থানে পৌঁছি তখন তিনি বলেনঃ “এমন লোকও আসবে যাদের আমলের তুলনায় তোমরা তোমাদের আমলকে নগণ্য মনে করবে।” সাহাবীগণ প্রশ্ন করেনঃ “তারা কি কুরায়েশ হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না, বরং ইয়ামনী। তাদের অন্তর হবে কোমল এবং চরিত্র হবে অত্যন্ত মধুর।” আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কি আমাদের চেয়ে উত্তম হবে? উত্তর দিলেন তিনিঃ “তাদের কারো কাছে যদি উহুদ পাহাড়ের সমানও সোনা থাকে এবং সে তা আল্লাহর পথে খরচও করে ফেলে তবুও তোমাদের কারো তিন পাই, এমনকি দেড় পাই শস্য দান করার পুণ্যও সে লাভ করতে পারবে না। জেনে রেখো যে, আমাদের মধ্যে এবং সারা দুনিয়ার লোকদের মধ্যে এটাই পার্থক্য।” অতঃপর তিনি .. (আরবী) আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে খারেজীদের সম্পর্কে রয়েছেঃ “তোমরা তাদের নামায ও রোযার তুলনায় তোমাদের নামায ও রোযাকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে। তারা দুনিয়া হতে এমনিভাবে বের হয়ে যাবে যেমনিভাবে তীর কামান হতে বের হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ রিওয়াইয়াতটি গারীব বা দুর্বল)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ “সত্বরই এমন এক কওমের আবির্ভাব হবে যে, যখন তোমরা তাদের আমলের সঙ্গে তোমাদের আমলের তুলনা করবে তখন তোমাদেরকে খুবই কম মনে করবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কি কুরায়েশ হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “না, তারা হবে সরল চিত্ত ও কোমল হৃদয়ের লোক এবং ওখানকার অধিবাসী।” অতঃপর তিনি ইয়ামনের দিকে স্বীয় হস্ত মুবারক দ্বারা ইশারা করেন। তারপর বলেনঃ “তারা হবে ইয়ামনী লোক। ইয়ামনবাসীদের ঈমানই তো প্রকৃত ঈমান এবং ইয়ামনবাসীদের হিকমতই তো প্রকৃত হিকমত।” সাহাবীগণ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “তারা কি আমাদের চেয়েও উত্তম হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যার হাতে আমার জীবন রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তাদের মধ্যে কারো নিকট সোনার পাহাড়ও থাকে এবং ওটাকে সে আল্লাহর পথে দানও করে ফেলে তবুও সে তোমাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ এরও পর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না।” অতঃপর তিনি তার অঙ্গুলিগুলো বন্ধ করেন এবং কনিষ্ঠাঙ্গুলি বাড়িয়ে দিয়ে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, এটাই পার্থক্য হলো আমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে।” অতঃপর তিনি .. (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। এ হাদীসে হুদায়বিয়ার উল্লেখ নেই। সুতরাং এও হতে পারে যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে ওটা বিজয়ের পরবর্তী খবর দিয়েছিলেন। যেমন মক্কা শরীফে অবতীর্ণ প্রাথমিক সূরাগুলোর অন্যতম সূরা, সূরায়ে মুযযামমিলে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “কেউ কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে লিপ্ত হবে।” (৭৩:২০) সুতরাং যেমন এই আয়াতে আগামীতে সংঘটিতব্য একটি ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, তেমনই এই আয়াত এবং হাদীসকেও বুঝে নিতে হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তবে আল্লাহ উভয়ের কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের পূর্বে এবং পরেও যে কেউ যা কিছু আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করেছে তার প্রতিদান তিনি তাকে অবশ্যই প্রদান করবেন। কাউকেও বেশী দেয়া হবে এবং কাউকেও কম দেয়া হবে। সেটা স্বতন্ত্র কথা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “মুমিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে ও যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ সবকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা ঘরে বসে। থাকে তাদের উপর যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ মহা পুরস্কারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।” (৪:৯৫) অনুরূপভাবে সহীহ হাদীসেও রয়েছেঃ “সবল মুমিন ভাল ও আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় দুর্বল মুমিন হতে, তবে কল্যাণ উভয়ের মধ্যে রয়েছে।”যদি এই আয়াতের এই বাক্যটি না থাকতো তবে সম্ভবতঃ মানুষ এই পরবর্তীদেরকে তুচ্ছ মনে করতো। এ জন্যেই পূর্ববর্তীদের ফযীলত বর্ণনা করার পর সংযোগ স্থাপন করে মূল প্রতিদানে উভয়কে শরীক করা হয়েছে। মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমরা যা কর আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত। তিনি মর্যাদায় যে পার্থক্য রেখেছেন তা অনুমানে নয়, বরং সঠিক জ্ঞান দ্বারা। হাদীসে এসেছেঃ “এক দিরহাম এক লক্ষ দিরহাম হতে বেড়ে যায়। এটাও স্মরণ রাখার বিষয় যে, এই আয়াতের বড় অংশের অংশীদার হলেন হযরত আবু বকর (রাঃ)। কেননা, এর উপর আমলকারী সমস্ত নবীর উম্মতবর্গের ইনি নেতা। তিনি প্রাথমিক সংকীর্ণতার সময় নিজের সমুদয় মাল আল্লাহর পথে দান করে দিয়েছিলেন। এর প্রতিদান তিনি আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে চাননি। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা দরবারে নববীতে (সঃ) বসেছিলাম। হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন। তাঁর গায়ে একটি মাত্র পোশাক ছিল যার খোলা অংশ তিনি কাঁটা দ্বারা আটকিয়ে রেখেছিলেন। এমন সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়েন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি? হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর গায়ে একটি মাত্র পোশাক, তাও আবার কাঁটা দিয়ে আটকানো রয়েছে, কারণ কি?" উত্তরে নবী (সঃ) বললেনঃ “সে তার সমুদয় সম্পদ আমার কাজে মক্কা বিজয়ের পূর্বেই আল্লাহর পথে খরচ করে ফেলেছে। এখন তার কাছে আর কিছুই নেই। একথা শুনে হযরত জিবরাঈল (আঃ) নবী (সঃ)-কে বললেনঃ “তাকে বলুন যে, আল্লাহ তাআলা তাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, তিনি তাঁর দারিদ্র অবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করেন এবং তাঁর কাছে জবাব চান। তিনি তখন আরয করেনঃ “আমি আমার মহামহিমান্বিত প্রতিপালকের উপর কি করে অসন্তুষ্ট হতে পারি? আমি আমার প্রতিপালকের উপর সন্তুষ্ট।” (এ হাদীসটি আবু মুহাম্মাদ হুসাইন ইবনে মাসউদ বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সনদের দিক দিয়ে এ হাদসটি দুর্বল। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন)অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “কে আছে যে আল্লাহকে দিবে উত্তম ঋণ?' এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্যে খরচ করা। কেউ কেউ বলেন যে, উদ্দেশ্য হলো ছেলে-মেয়েদেরকে খাওয়ানো, পরানো ইত্যাদিতে খরচ। হতে পারে যে, এ আয়াতটি উমূম বা সাধারণত্বের দিক দিয়ে দুটো উদ্দেশ্যকেই অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর আল্লাহ পাক বলেন যে, (যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করবে) তার জন্যে তিনি ওটাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটাকে তিনি বহুগুণে বদ্ধি করবেন এবং তার জন্যে রয়েছে মহা পুরস্কার। অর্থাৎ উত্তম পুরস্কার ও পবিত্র রিযক এবং ওটা হলো কিয়ামতের দিনে জান্নাত।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন আবুদ দাহদাহ আনসারী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের কাছে ঋণ চাচ্ছেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ বলেনঃ “হ্যাঁ, হে আবু দাহদাহ!" তখন হযরত আবুদ দাহদাহ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার হাতটি আমাকে দেখান (আপনার হাতটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিন)।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার হস্ত মুবারক বাড়িয়ে দিলেন। হযরত আবু দাহদাহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতটি নিজের মধ্যে নিয়ে বললেনঃ “আমি আমার ঐ বাগানটি আল্লাহ তা'আলাকে ঋণ স্বরূপ দিলাম যাতে ছয়শটি খেজুরের গাছ রয়েছে। তার স্ত্রী এবং ছেলে-মেয়েও ঐ বাগানে ছিলেন। তিনি আসলেন এবং বাগানের দরবার উপর দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রীকে ডাক দিলেন। স্ত্রী তার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে আসলেন। তখন তিনি স্ত্রীকে বললেন, তুমি (ছেলে-মেয়ে নিয়ে) বেরিয়ে এসো। আমি আমার মহামহিমান্বিত প্রতিপালককে এ বাগানটি ঋণ স্বরূপ দিয়ে দিয়েছি।” স্ত্রী খুশী হয়ে বললেনঃ “আপনি খুবই লাভজনক ব্যবসায় হাত দিয়েছেন।” অতঃপর ছেলে-মেয়ে ও ঘরের আসবাবপত্র নিয়ে বেরিয়ে আসলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “জান্নাতী গাছ ও তথাকার বাগান যা ফলে পরিপূর্ণ এবং যার শাখাগুলো ইয়াকূত ও মণিমুক্তার তা আল্লাহ তা'আলা আবুদ দাহদাহ (রাঃ)-কে দান করলেন।”
আল-হাদীদ 57:8
৭-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা নিজের উপর এবং নিজের রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন ও ওর উপর দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের সাথে প্রতিষ্ঠিত থাকার হিদায়াত করছেন এবং তাঁর পথে খরচ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন। তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যে মাল হস্তান্তর রূপে দিয়েছেন, তোমরা তার আনুগত্য হিসেবে তা ব্যয় কর এবং বুঝে নাও যে, এই মাল যেমন অন্যের হাত হতে তোমার হাতে এসেছে, তেমনিভাবে তোমার হাত হতে সত্বরই এটা অন্যের হাতে চলে যাবে। আর তোমার জন্যে রয়ে যাবে হিসাব ও শাস্তি। এতে এ ইঙ্গিতও রয়েছে যে, হয়তো তোমার উত্তরাধিকারী সৎ হবে এবং তোমার সম্পদকে আমার পথে খরচ করে আমার নৈকট্য লাভ করবে, আবার এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে, সে অসৎ হবে এবং মন্দ কাজে ও অন্যায় পথে তোমার সম্পদ উড়িয়ে দিবে এবং এই অন্যায় কাজের উৎস তুমিই হবে। কারণ তুমি যদি এ সম্পদ ছেড়ে না যেতে তবে তোমার ওয়ারিস এটা অন্যায় কাজে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগে পেতো না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শাখীর (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তাআলার উক্তির উদ্ধৃতি দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।” (১০২:১) অতঃপর তিনি বলেনঃ “ইবনে আদম বলেঃ আমার মাল, আমার মাল। অথচ তার মাল তো ওটাই যা সে খেয়েছে, পরেছে এবং দান খায়রাত করেছে। যা সে খেয়েছে তা নিঃশেষ হয়েছে, যা সে পরিধান করেছে তা পুরনো হয়ে গেছে, আর যা সে আল্লাহর পথে দান করেছে তা তার কাছে সঞ্চিত রয়েছে। আর যা সে ছেড়ে গেল তা অন্যদের মাল। সে তা লোকদের জন্যে ছেড়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে এবং এতে শেষের অংশটুকু অতিরিক্ত রয়েছে)এ দু’টি কাজের প্রতি আল্লাহ তা'আলা উৎসাহ প্রদান করছেন এবং খুব বড় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের কি হলো যে, তোমরা আল্লাহতে ঈমান আন না? অথচ রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনতে আহ্বান করছে। তিনি মানুষের নিকট দলীল-প্রমাণাদি উপস্থাপন করেছেন এবং তাদেরকে মু'জিযা প্রদর্শন করছেন। সহীহ বুখারীর শরাহর প্রাথমিক অংশ কিতাবুল ঈমানে আমরা এ হাদীসটি বর্ণনা করে এসেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের নিকট উত্তম ঈমানদার ব্যক্তি কে?” উত্তরে তাঁরা বলেনঃ “ফেরেশতাগণ ।” তিনি বলেনঃ “তারা তো আল্লাহ তা'আলার নিকট রয়েছে, সুতরাং তারা ঈমানদার হয়েছে এতে বিস্ময়ের কি আছে?” তখন তারা বললেনঃ “তাহলে নবীগণ।” তিনি বলেনঃ “তাঁদের উপর তো অহী ও আল্লাহর কালাম অবতীর্ণ হয়, সুতরাং তারা তো ঈমান আনবেনই।” তারা তখন বলেনঃ “তাহলে আমরা।” তিনি বলেনঃ “কেন তোমরা ঈমানদার হবে না? আমি তো তোমাদের মধ্যে জীবিত অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছি। জেনে রেখো যে, উত্তম বিস্ময়পূর্ণ ঈমানদার হলো ঐ লোকেরা যারা তোমাদের পরে আসবে। তারা সহীফা ও গ্রন্থসমূহে সবকিছুই লিপিবদ্ধ দেখে ঈমান আনয়ন করবে।” সূরায়ে বাকারার শুরুতে (আরবী) (২:৩) এর তাফসীরেও আমরা এরূপ হাদীসগুলো লিপিবদ্ধ করেছি।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা মানুষকে তাদের কৃত অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ আল্লাহ তোমাদের নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের কথা স্মরণ কর যা তোমাদের উপর রয়েছে এবং স্মরণ কর তার সাথে কৃত ঐ অঙ্গীকারকে যা তিনি তোমাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছেন, যখন তোমরা বলেছিলেঃ আমরা শুনলাম ও মানলাম।” (৫:৭)এর দ্বারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করা বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এই মীসাক’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ মীসাক বা অঙ্গীকার যা হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠে তাদের নিকট হতে গ্রহণ করা হয়েছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এরও এটাই মাযহাব। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই তাঁর বান্দার প্রতি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ-এর প্রতি) সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে যুলুম, অবিচার ও অন্যায়ের অন্ধকার হতে বের করে সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল হিদায়াত ও সত্যের পথে আনয়ন করতে পারেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণাময়, পরম দয়ালু। এটা আল্লাহ তা'আলার বড় মেহেরবানী যে, তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের জন্যে কিতাব ও রাসূল পাঠিয়েছেন, সংশয়-সন্দেহ দূর করেছেন এবং হিদায়াত সুস্পষ্ট করেছেন।আল্লাহ পাক ঈমান আনয়ন ও দান-খয়রাতের হুকুম করে, তারপর ঈমানের প্রতি উৎসাহিত করে এবং এটা বর্ণনা দিয়ে যে, ঈমান না আনার এখন কোন ওরের সুযোগে নেই, দান-খয়রাতের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেন এবং বলেনঃ আমার পথে খরচ করতে থাকো এবং দারিদ্রকে ভয় করো না। কারণ যার পথে তোমরা খরচ করছো তিনি যমীন ও আসমানের ধন-ভাণ্ডারের একাই মালিক। আরশ ও কুরসী তাঁরই এবং তিনি তোমাদের কাছে তোমাদের এ দান-খয়রাতের প্রতিদান দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা (আল্লাহর পথে) যা কিছু খরচ করেছে, তিনি তোমাদেরকে ওর উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন এবং তিনি উত্তম রিযকদাতা।” (৩৪:৩৯) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের কাছে যা রয়েছে তা শেষ হয়ে যাবে এবং আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা চিরস্থায়ী (তা কখনো শেষ হবার নয়)।” (১৬:৯৬) যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে খরচ করতে থাকে এবং আরশের মালিক হতে কমে যাওয়ার ভয় করে না, সত্বরই তিনি তাকে উত্তম বিনিময় প্রদান করবেন। তারা নির্ভরশীল যে, আল্লাহর পথে যা খরচ করছে তার প্রতিদান তারা ইহকালে ও পরকালে অবশ্যই পাবে।এরপর মহান আল্লাহ বলছেন যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বে যারা ধন-সম্পদ খরচ করেছে এবং যারা তা করেনি, তারা কখনো সমান নয়, যদিও তারা মক্কা বিজয়ের পর খরচ করে থাকে। কারণ মক্কা বিজয়ের পূর্বে মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয় এবং শক্তি ছিল খুবই কম। আর এজন্যেও যে, ঐ সময় ঈমান শুধু ঐ লোকেরাই কবুল করতো যাদের অন্তর সম্পূর্ণরূপে কালিমামুক্ত ছিল। মক্কা বিজয়ের পর মুসলমানদের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, সংখ্যাও বেড়ে যায় এবং বহু অঞ্চল বিজিত হয়। এর সাথে সাথে মুসলমানদের আর্থিক অবস্থাও ভাল হয়। সুতরাং ঐ সময় ও এই সময়ের মধ্যে যেই পার্থক্য, ঐ সময়ের মুসলমান ও এই সময়ের মুসলমানদের মধ্যেও সেই পার্থক্য। ঐ সময়ের মুসলমানরা বড় রকমের প্রতিদান প্রাপ্ত হবে, যদিও উভয় যুগের মুসলমানরাই প্রকৃত কল্যাণ লাভে অংশীদার।কেউ কেউ বলেন যে, এখানে বিজয় দ্বারা হুদায়বিয়ার সন্ধিকে বুঝানো হয়েছে। মুসনাদে আহমাদের নিম্নের রিওয়াইয়াতটি এর পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-এর মধ্যে কিছু মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। হযরত খালিদ (রাঃ) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি আমার কিছু দিন পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলেই আমার উপর গর্ব প্রকাশ করছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানে এ খবর পৌঁছলে তিনি বলেনঃ “আমার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আমার জন্যে ছেড়ে দাও। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তোমরা উহুদ বা অন্য কোন পাহাড়ের সমান সোনা খরচ কর তবুও তাদের আমলের সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন।)প্রকাশ থাকে যে, এটা হযরত খালিদ (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের পরের ঘটনা এবং তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধির পরে এবং মক্কা বিজয়ের পূর্বে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। আর যে মতানৈক্যের বর্ণনা এই হাদীসে রয়েছে তা বানু জুযাইমা গোত্রের ব্যাপারে ঘটেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের পর হযরত খালিদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একদল সৈন্য এই গোত্রের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যখন তারা সেখানে পৌঁছেন তখন ঐ লোকগুলো বলতে শুরু করেঃ “আমরা মুসলমান হয়েছি। কিন্তু অজানার কারণে আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি’ একথা না বলে ‘আমরা সা’বী বা বেদ্বীন হয়েছি' একথা বলেন। কেননা, কাফিররা মুসলমানদেরকে একথাই বলতো। হযরত খালিদ (রাঃ) এই কালিমার ভাবার্থ - বুঝতে না পেরে তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। এমন কি তাদের যারা বন্দী হয় তাদেরকেও হত্যা করার আদেশ করেন। এই ঘটনায় হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হযরত খালিদ (রাঃ)-এর বিরধিতা করেন। এই ঘটনাটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উপরে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সাহাবীদেরকে (রাঃ) মন্দ বলো না। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড়ের সমানও সোনা (আল্লাহর পথে) খরচ করে তবুও তাদের তিন পাই শস্যের পুণ্যেও পৌঁছতে পারবে না। এমন কি দেড় পাই পুণ্যেও পৌছতে সক্ষম হবে না।”হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধির বছর যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গাসফান নামক স্থানে পৌঁছি তখন তিনি বলেনঃ “এমন লোকও আসবে যাদের আমলের তুলনায় তোমরা তোমাদের আমলকে নগণ্য মনে করবে।” সাহাবীগণ প্রশ্ন করেনঃ “তারা কি কুরায়েশ হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না, বরং ইয়ামনী। তাদের অন্তর হবে কোমল এবং চরিত্র হবে অত্যন্ত মধুর।” আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কি আমাদের চেয়ে উত্তম হবে? উত্তর দিলেন তিনিঃ “তাদের কারো কাছে যদি উহুদ পাহাড়ের সমানও সোনা থাকে এবং সে তা আল্লাহর পথে খরচও করে ফেলে তবুও তোমাদের কারো তিন পাই, এমনকি দেড় পাই শস্য দান করার পুণ্যও সে লাভ করতে পারবে না। জেনে রেখো যে, আমাদের মধ্যে এবং সারা দুনিয়ার লোকদের মধ্যে এটাই পার্থক্য।” অতঃপর তিনি .. (আরবী) আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে খারেজীদের সম্পর্কে রয়েছেঃ “তোমরা তাদের নামায ও রোযার তুলনায় তোমাদের নামায ও রোযাকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে। তারা দুনিয়া হতে এমনিভাবে বের হয়ে যাবে যেমনিভাবে তীর কামান হতে বের হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ রিওয়াইয়াতটি গারীব বা দুর্বল)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ “সত্বরই এমন এক কওমের আবির্ভাব হবে যে, যখন তোমরা তাদের আমলের সঙ্গে তোমাদের আমলের তুলনা করবে তখন তোমাদেরকে খুবই কম মনে করবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কি কুরায়েশ হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “না, তারা হবে সরল চিত্ত ও কোমল হৃদয়ের লোক এবং ওখানকার অধিবাসী।” অতঃপর তিনি ইয়ামনের দিকে স্বীয় হস্ত মুবারক দ্বারা ইশারা করেন। তারপর বলেনঃ “তারা হবে ইয়ামনী লোক। ইয়ামনবাসীদের ঈমানই তো প্রকৃত ঈমান এবং ইয়ামনবাসীদের হিকমতই তো প্রকৃত হিকমত।” সাহাবীগণ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “তারা কি আমাদের চেয়েও উত্তম হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যার হাতে আমার জীবন রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তাদের মধ্যে কারো নিকট সোনার পাহাড়ও থাকে এবং ওটাকে সে আল্লাহর পথে দানও করে ফেলে তবুও সে তোমাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ এরও পর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না।” অতঃপর তিনি তার অঙ্গুলিগুলো বন্ধ করেন এবং কনিষ্ঠাঙ্গুলি বাড়িয়ে দিয়ে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, এটাই পার্থক্য হলো আমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে।” অতঃপর তিনি .. (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। এ হাদীসে হুদায়বিয়ার উল্লেখ নেই। সুতরাং এও হতে পারে যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে ওটা বিজয়ের পরবর্তী খবর দিয়েছিলেন। যেমন মক্কা শরীফে অবতীর্ণ প্রাথমিক সূরাগুলোর অন্যতম সূরা, সূরায়ে মুযযামমিলে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “কেউ কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে লিপ্ত হবে।” (৭৩:২০) সুতরাং যেমন এই আয়াতে আগামীতে সংঘটিতব্য একটি ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, তেমনই এই আয়াত এবং হাদীসকেও বুঝে নিতে হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তবে আল্লাহ উভয়ের কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের পূর্বে এবং পরেও যে কেউ যা কিছু আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করেছে তার প্রতিদান তিনি তাকে অবশ্যই প্রদান করবেন। কাউকেও বেশী দেয়া হবে এবং কাউকেও কম দেয়া হবে। সেটা স্বতন্ত্র কথা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “মুমিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে ও যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ সবকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা ঘরে বসে। থাকে তাদের উপর যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ মহা পুরস্কারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।” (৪:৯৫) অনুরূপভাবে সহীহ হাদীসেও রয়েছেঃ “সবল মুমিন ভাল ও আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় দুর্বল মুমিন হতে, তবে কল্যাণ উভয়ের মধ্যে রয়েছে।”যদি এই আয়াতের এই বাক্যটি না থাকতো তবে সম্ভবতঃ মানুষ এই পরবর্তীদেরকে তুচ্ছ মনে করতো। এ জন্যেই পূর্ববর্তীদের ফযীলত বর্ণনা করার পর সংযোগ স্থাপন করে মূল প্রতিদানে উভয়কে শরীক করা হয়েছে। মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমরা যা কর আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত। তিনি মর্যাদায় যে পার্থক্য রেখেছেন তা অনুমানে নয়, বরং সঠিক জ্ঞান দ্বারা। হাদীসে এসেছেঃ “এক দিরহাম এক লক্ষ দিরহাম হতে বেড়ে যায়। এটাও স্মরণ রাখার বিষয় যে, এই আয়াতের বড় অংশের অংশীদার হলেন হযরত আবু বকর (রাঃ)। কেননা, এর উপর আমলকারী সমস্ত নবীর উম্মতবর্গের ইনি নেতা। তিনি প্রাথমিক সংকীর্ণতার সময় নিজের সমুদয় মাল আল্লাহর পথে দান করে দিয়েছিলেন। এর প্রতিদান তিনি আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে চাননি। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা দরবারে নববীতে (সঃ) বসেছিলাম। হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন। তাঁর গায়ে একটি মাত্র পোশাক ছিল যার খোলা অংশ তিনি কাঁটা দ্বারা আটকিয়ে রেখেছিলেন। এমন সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়েন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি? হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর গায়ে একটি মাত্র পোশাক, তাও আবার কাঁটা দিয়ে আটকানো রয়েছে, কারণ কি?" উত্তরে নবী (সঃ) বললেনঃ “সে তার সমুদয় সম্পদ আমার কাজে মক্কা বিজয়ের পূর্বেই আল্লাহর পথে খরচ করে ফেলেছে। এখন তার কাছে আর কিছুই নেই। একথা শুনে হযরত জিবরাঈল (আঃ) নবী (সঃ)-কে বললেনঃ “তাকে বলুন যে, আল্লাহ তাআলা তাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, তিনি তাঁর দারিদ্র অবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করেন এবং তাঁর কাছে জবাব চান। তিনি তখন আরয করেনঃ “আমি আমার মহামহিমান্বিত প্রতিপালকের উপর কি করে অসন্তুষ্ট হতে পারি? আমি আমার প্রতিপালকের উপর সন্তুষ্ট।” (এ হাদীসটি আবু মুহাম্মাদ হুসাইন ইবনে মাসউদ বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সনদের দিক দিয়ে এ হাদসটি দুর্বল। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন)অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “কে আছে যে আল্লাহকে দিবে উত্তম ঋণ?' এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্যে খরচ করা। কেউ কেউ বলেন যে, উদ্দেশ্য হলো ছেলে-মেয়েদেরকে খাওয়ানো, পরানো ইত্যাদিতে খরচ। হতে পারে যে, এ আয়াতটি উমূম বা সাধারণত্বের দিক দিয়ে দুটো উদ্দেশ্যকেই অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর আল্লাহ পাক বলেন যে, (যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করবে) তার জন্যে তিনি ওটাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটাকে তিনি বহুগুণে বদ্ধি করবেন এবং তার জন্যে রয়েছে মহা পুরস্কার। অর্থাৎ উত্তম পুরস্কার ও পবিত্র রিযক এবং ওটা হলো কিয়ামতের দিনে জান্নাত।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন আবুদ দাহদাহ আনসারী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের কাছে ঋণ চাচ্ছেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ বলেনঃ “হ্যাঁ, হে আবু দাহদাহ!" তখন হযরত আবুদ দাহদাহ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার হাতটি আমাকে দেখান (আপনার হাতটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিন)।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার হস্ত মুবারক বাড়িয়ে দিলেন। হযরত আবু দাহদাহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতটি নিজের মধ্যে নিয়ে বললেনঃ “আমি আমার ঐ বাগানটি আল্লাহ তা'আলাকে ঋণ স্বরূপ দিলাম যাতে ছয়শটি খেজুরের গাছ রয়েছে। তার স্ত্রী এবং ছেলে-মেয়েও ঐ বাগানে ছিলেন। তিনি আসলেন এবং বাগানের দরবার উপর দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রীকে ডাক দিলেন। স্ত্রী তার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে আসলেন। তখন তিনি স্ত্রীকে বললেন, তুমি (ছেলে-মেয়ে নিয়ে) বেরিয়ে এসো। আমি আমার মহামহিমান্বিত প্রতিপালককে এ বাগানটি ঋণ স্বরূপ দিয়ে দিয়েছি।” স্ত্রী খুশী হয়ে বললেনঃ “আপনি খুবই লাভজনক ব্যবসায় হাত দিয়েছেন।” অতঃপর ছেলে-মেয়ে ও ঘরের আসবাবপত্র নিয়ে বেরিয়ে আসলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “জান্নাতী গাছ ও তথাকার বাগান যা ফলে পরিপূর্ণ এবং যার শাখাগুলো ইয়াকূত ও মণিমুক্তার তা আল্লাহ তা'আলা আবুদ দাহদাহ (রাঃ)-কে দান করলেন।”
আল-হাদীদ 57:9
৭-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা নিজের উপর এবং নিজের রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন ও ওর উপর দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের সাথে প্রতিষ্ঠিত থাকার হিদায়াত করছেন এবং তাঁর পথে খরচ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন। তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যে মাল হস্তান্তর রূপে দিয়েছেন, তোমরা তার আনুগত্য হিসেবে তা ব্যয় কর এবং বুঝে নাও যে, এই মাল যেমন অন্যের হাত হতে তোমার হাতে এসেছে, তেমনিভাবে তোমার হাত হতে সত্বরই এটা অন্যের হাতে চলে যাবে। আর তোমার জন্যে রয়ে যাবে হিসাব ও শাস্তি। এতে এ ইঙ্গিতও রয়েছে যে, হয়তো তোমার উত্তরাধিকারী সৎ হবে এবং তোমার সম্পদকে আমার পথে খরচ করে আমার নৈকট্য লাভ করবে, আবার এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে, সে অসৎ হবে এবং মন্দ কাজে ও অন্যায় পথে তোমার সম্পদ উড়িয়ে দিবে এবং এই অন্যায় কাজের উৎস তুমিই হবে। কারণ তুমি যদি এ সম্পদ ছেড়ে না যেতে তবে তোমার ওয়ারিস এটা অন্যায় কাজে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগে পেতো না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শাখীর (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তাআলার উক্তির উদ্ধৃতি দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।” (১০২:১) অতঃপর তিনি বলেনঃ “ইবনে আদম বলেঃ আমার মাল, আমার মাল। অথচ তার মাল তো ওটাই যা সে খেয়েছে, পরেছে এবং দান খায়রাত করেছে। যা সে খেয়েছে তা নিঃশেষ হয়েছে, যা সে পরিধান করেছে তা পুরনো হয়ে গেছে, আর যা সে আল্লাহর পথে দান করেছে তা তার কাছে সঞ্চিত রয়েছে। আর যা সে ছেড়ে গেল তা অন্যদের মাল। সে তা লোকদের জন্যে ছেড়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে এবং এতে শেষের অংশটুকু অতিরিক্ত রয়েছে)এ দু’টি কাজের প্রতি আল্লাহ তা'আলা উৎসাহ প্রদান করছেন এবং খুব বড় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের কি হলো যে, তোমরা আল্লাহতে ঈমান আন না? অথচ রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনতে আহ্বান করছে। তিনি মানুষের নিকট দলীল-প্রমাণাদি উপস্থাপন করেছেন এবং তাদেরকে মু'জিযা প্রদর্শন করছেন। সহীহ বুখারীর শরাহর প্রাথমিক অংশ কিতাবুল ঈমানে আমরা এ হাদীসটি বর্ণনা করে এসেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের নিকট উত্তম ঈমানদার ব্যক্তি কে?” উত্তরে তাঁরা বলেনঃ “ফেরেশতাগণ ।” তিনি বলেনঃ “তারা তো আল্লাহ তা'আলার নিকট রয়েছে, সুতরাং তারা ঈমানদার হয়েছে এতে বিস্ময়ের কি আছে?” তখন তারা বললেনঃ “তাহলে নবীগণ।” তিনি বলেনঃ “তাঁদের উপর তো অহী ও আল্লাহর কালাম অবতীর্ণ হয়, সুতরাং তারা তো ঈমান আনবেনই।” তারা তখন বলেনঃ “তাহলে আমরা।” তিনি বলেনঃ “কেন তোমরা ঈমানদার হবে না? আমি তো তোমাদের মধ্যে জীবিত অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছি। জেনে রেখো যে, উত্তম বিস্ময়পূর্ণ ঈমানদার হলো ঐ লোকেরা যারা তোমাদের পরে আসবে। তারা সহীফা ও গ্রন্থসমূহে সবকিছুই লিপিবদ্ধ দেখে ঈমান আনয়ন করবে।” সূরায়ে বাকারার শুরুতে (আরবী) (২:৩) এর তাফসীরেও আমরা এরূপ হাদীসগুলো লিপিবদ্ধ করেছি।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা মানুষকে তাদের কৃত অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ আল্লাহ তোমাদের নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের কথা স্মরণ কর যা তোমাদের উপর রয়েছে এবং স্মরণ কর তার সাথে কৃত ঐ অঙ্গীকারকে যা তিনি তোমাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছেন, যখন তোমরা বলেছিলেঃ আমরা শুনলাম ও মানলাম।” (৫:৭)এর দ্বারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করা বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এই মীসাক’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ মীসাক বা অঙ্গীকার যা হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠে তাদের নিকট হতে গ্রহণ করা হয়েছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এরও এটাই মাযহাব। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই তাঁর বান্দার প্রতি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ-এর প্রতি) সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে যুলুম, অবিচার ও অন্যায়ের অন্ধকার হতে বের করে সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল হিদায়াত ও সত্যের পথে আনয়ন করতে পারেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণাময়, পরম দয়ালু। এটা আল্লাহ তা'আলার বড় মেহেরবানী যে, তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের জন্যে কিতাব ও রাসূল পাঠিয়েছেন, সংশয়-সন্দেহ দূর করেছেন এবং হিদায়াত সুস্পষ্ট করেছেন।আল্লাহ পাক ঈমান আনয়ন ও দান-খয়রাতের হুকুম করে, তারপর ঈমানের প্রতি উৎসাহিত করে এবং এটা বর্ণনা দিয়ে যে, ঈমান না আনার এখন কোন ওরের সুযোগে নেই, দান-খয়রাতের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেন এবং বলেনঃ আমার পথে খরচ করতে থাকো এবং দারিদ্রকে ভয় করো না। কারণ যার পথে তোমরা খরচ করছো তিনি যমীন ও আসমানের ধন-ভাণ্ডারের একাই মালিক। আরশ ও কুরসী তাঁরই এবং তিনি তোমাদের কাছে তোমাদের এ দান-খয়রাতের প্রতিদান দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা (আল্লাহর পথে) যা কিছু খরচ করেছে, তিনি তোমাদেরকে ওর উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন এবং তিনি উত্তম রিযকদাতা।” (৩৪:৩৯) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের কাছে যা রয়েছে তা শেষ হয়ে যাবে এবং আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা চিরস্থায়ী (তা কখনো শেষ হবার নয়)।” (১৬:৯৬) যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে খরচ করতে থাকে এবং আরশের মালিক হতে কমে যাওয়ার ভয় করে না, সত্বরই তিনি তাকে উত্তম বিনিময় প্রদান করবেন। তারা নির্ভরশীল যে, আল্লাহর পথে যা খরচ করছে তার প্রতিদান তারা ইহকালে ও পরকালে অবশ্যই পাবে।এরপর মহান আল্লাহ বলছেন যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বে যারা ধন-সম্পদ খরচ করেছে এবং যারা তা করেনি, তারা কখনো সমান নয়, যদিও তারা মক্কা বিজয়ের পর খরচ করে থাকে। কারণ মক্কা বিজয়ের পূর্বে মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয় এবং শক্তি ছিল খুবই কম। আর এজন্যেও যে, ঐ সময় ঈমান শুধু ঐ লোকেরাই কবুল করতো যাদের অন্তর সম্পূর্ণরূপে কালিমামুক্ত ছিল। মক্কা বিজয়ের পর মুসলমানদের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, সংখ্যাও বেড়ে যায় এবং বহু অঞ্চল বিজিত হয়। এর সাথে সাথে মুসলমানদের আর্থিক অবস্থাও ভাল হয়। সুতরাং ঐ সময় ও এই সময়ের মধ্যে যেই পার্থক্য, ঐ সময়ের মুসলমান ও এই সময়ের মুসলমানদের মধ্যেও সেই পার্থক্য। ঐ সময়ের মুসলমানরা বড় রকমের প্রতিদান প্রাপ্ত হবে, যদিও উভয় যুগের মুসলমানরাই প্রকৃত কল্যাণ লাভে অংশীদার।কেউ কেউ বলেন যে, এখানে বিজয় দ্বারা হুদায়বিয়ার সন্ধিকে বুঝানো হয়েছে। মুসনাদে আহমাদের নিম্নের রিওয়াইয়াতটি এর পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-এর মধ্যে কিছু মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। হযরত খালিদ (রাঃ) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি আমার কিছু দিন পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলেই আমার উপর গর্ব প্রকাশ করছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানে এ খবর পৌঁছলে তিনি বলেনঃ “আমার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আমার জন্যে ছেড়ে দাও। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তোমরা উহুদ বা অন্য কোন পাহাড়ের সমান সোনা খরচ কর তবুও তাদের আমলের সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন।)প্রকাশ থাকে যে, এটা হযরত খালিদ (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের পরের ঘটনা এবং তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধির পরে এবং মক্কা বিজয়ের পূর্বে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। আর যে মতানৈক্যের বর্ণনা এই হাদীসে রয়েছে তা বানু জুযাইমা গোত্রের ব্যাপারে ঘটেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের পর হযরত খালিদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একদল সৈন্য এই গোত্রের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যখন তারা সেখানে পৌঁছেন তখন ঐ লোকগুলো বলতে শুরু করেঃ “আমরা মুসলমান হয়েছি। কিন্তু অজানার কারণে আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি’ একথা না বলে ‘আমরা সা’বী বা বেদ্বীন হয়েছি' একথা বলেন। কেননা, কাফিররা মুসলমানদেরকে একথাই বলতো। হযরত খালিদ (রাঃ) এই কালিমার ভাবার্থ - বুঝতে না পেরে তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। এমন কি তাদের যারা বন্দী হয় তাদেরকেও হত্যা করার আদেশ করেন। এই ঘটনায় হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হযরত খালিদ (রাঃ)-এর বিরধিতা করেন। এই ঘটনাটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উপরে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সাহাবীদেরকে (রাঃ) মন্দ বলো না। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড়ের সমানও সোনা (আল্লাহর পথে) খরচ করে তবুও তাদের তিন পাই শস্যের পুণ্যেও পৌঁছতে পারবে না। এমন কি দেড় পাই পুণ্যেও পৌছতে সক্ষম হবে না।”হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধির বছর যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গাসফান নামক স্থানে পৌঁছি তখন তিনি বলেনঃ “এমন লোকও আসবে যাদের আমলের তুলনায় তোমরা তোমাদের আমলকে নগণ্য মনে করবে।” সাহাবীগণ প্রশ্ন করেনঃ “তারা কি কুরায়েশ হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না, বরং ইয়ামনী। তাদের অন্তর হবে কোমল এবং চরিত্র হবে অত্যন্ত মধুর।” আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কি আমাদের চেয়ে উত্তম হবে? উত্তর দিলেন তিনিঃ “তাদের কারো কাছে যদি উহুদ পাহাড়ের সমানও সোনা থাকে এবং সে তা আল্লাহর পথে খরচও করে ফেলে তবুও তোমাদের কারো তিন পাই, এমনকি দেড় পাই শস্য দান করার পুণ্যও সে লাভ করতে পারবে না। জেনে রেখো যে, আমাদের মধ্যে এবং সারা দুনিয়ার লোকদের মধ্যে এটাই পার্থক্য।” অতঃপর তিনি .. (আরবী) আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে খারেজীদের সম্পর্কে রয়েছেঃ “তোমরা তাদের নামায ও রোযার তুলনায় তোমাদের নামায ও রোযাকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে। তারা দুনিয়া হতে এমনিভাবে বের হয়ে যাবে যেমনিভাবে তীর কামান হতে বের হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ রিওয়াইয়াতটি গারীব বা দুর্বল)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ “সত্বরই এমন এক কওমের আবির্ভাব হবে যে, যখন তোমরা তাদের আমলের সঙ্গে তোমাদের আমলের তুলনা করবে তখন তোমাদেরকে খুবই কম মনে করবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কি কুরায়েশ হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “না, তারা হবে সরল চিত্ত ও কোমল হৃদয়ের লোক এবং ওখানকার অধিবাসী।” অতঃপর তিনি ইয়ামনের দিকে স্বীয় হস্ত মুবারক দ্বারা ইশারা করেন। তারপর বলেনঃ “তারা হবে ইয়ামনী লোক। ইয়ামনবাসীদের ঈমানই তো প্রকৃত ঈমান এবং ইয়ামনবাসীদের হিকমতই তো প্রকৃত হিকমত।” সাহাবীগণ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “তারা কি আমাদের চেয়েও উত্তম হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যার হাতে আমার জীবন রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তাদের মধ্যে কারো নিকট সোনার পাহাড়ও থাকে এবং ওটাকে সে আল্লাহর পথে দানও করে ফেলে তবুও সে তোমাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ এরও পর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না।” অতঃপর তিনি তার অঙ্গুলিগুলো বন্ধ করেন এবং কনিষ্ঠাঙ্গুলি বাড়িয়ে দিয়ে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, এটাই পার্থক্য হলো আমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে।” অতঃপর তিনি .. (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। এ হাদীসে হুদায়বিয়ার উল্লেখ নেই। সুতরাং এও হতে পারে যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে ওটা বিজয়ের পরবর্তী খবর দিয়েছিলেন। যেমন মক্কা শরীফে অবতীর্ণ প্রাথমিক সূরাগুলোর অন্যতম সূরা, সূরায়ে মুযযামমিলে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “কেউ কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে লিপ্ত হবে।” (৭৩:২০) সুতরাং যেমন এই আয়াতে আগামীতে সংঘটিতব্য একটি ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, তেমনই এই আয়াত এবং হাদীসকেও বুঝে নিতে হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তবে আল্লাহ উভয়ের কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের পূর্বে এবং পরেও যে কেউ যা কিছু আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করেছে তার প্রতিদান তিনি তাকে অবশ্যই প্রদান করবেন। কাউকেও বেশী দেয়া হবে এবং কাউকেও কম দেয়া হবে। সেটা স্বতন্ত্র কথা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “মুমিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে ও যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ সবকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা ঘরে বসে। থাকে তাদের উপর যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ মহা পুরস্কারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।” (৪:৯৫) অনুরূপভাবে সহীহ হাদীসেও রয়েছেঃ “সবল মুমিন ভাল ও আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় দুর্বল মুমিন হতে, তবে কল্যাণ উভয়ের মধ্যে রয়েছে।”যদি এই আয়াতের এই বাক্যটি না থাকতো তবে সম্ভবতঃ মানুষ এই পরবর্তীদেরকে তুচ্ছ মনে করতো। এ জন্যেই পূর্ববর্তীদের ফযীলত বর্ণনা করার পর সংযোগ স্থাপন করে মূল প্রতিদানে উভয়কে শরীক করা হয়েছে। মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমরা যা কর আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত। তিনি মর্যাদায় যে পার্থক্য রেখেছেন তা অনুমানে নয়, বরং সঠিক জ্ঞান দ্বারা। হাদীসে এসেছেঃ “এক দিরহাম এক লক্ষ দিরহাম হতে বেড়ে যায়। এটাও স্মরণ রাখার বিষয় যে, এই আয়াতের বড় অংশের অংশীদার হলেন হযরত আবু বকর (রাঃ)। কেননা, এর উপর আমলকারী সমস্ত নবীর উম্মতবর্গের ইনি নেতা। তিনি প্রাথমিক সংকীর্ণতার সময় নিজের সমুদয় মাল আল্লাহর পথে দান করে দিয়েছিলেন। এর প্রতিদান তিনি আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে চাননি। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা দরবারে নববীতে (সঃ) বসেছিলাম। হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন। তাঁর গায়ে একটি মাত্র পোশাক ছিল যার খোলা অংশ তিনি কাঁটা দ্বারা আটকিয়ে রেখেছিলেন। এমন সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়েন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি? হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর গায়ে একটি মাত্র পোশাক, তাও আবার কাঁটা দিয়ে আটকানো রয়েছে, কারণ কি?" উত্তরে নবী (সঃ) বললেনঃ “সে তার সমুদয় সম্পদ আমার কাজে মক্কা বিজয়ের পূর্বেই আল্লাহর পথে খরচ করে ফেলেছে। এখন তার কাছে আর কিছুই নেই। একথা শুনে হযরত জিবরাঈল (আঃ) নবী (সঃ)-কে বললেনঃ “তাকে বলুন যে, আল্লাহ তাআলা তাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, তিনি তাঁর দারিদ্র অবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করেন এবং তাঁর কাছে জবাব চান। তিনি তখন আরয করেনঃ “আমি আমার মহামহিমান্বিত প্রতিপালকের উপর কি করে অসন্তুষ্ট হতে পারি? আমি আমার প্রতিপালকের উপর সন্তুষ্ট।” (এ হাদীসটি আবু মুহাম্মাদ হুসাইন ইবনে মাসউদ বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সনদের দিক দিয়ে এ হাদসটি দুর্বল। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন)অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “কে আছে যে আল্লাহকে দিবে উত্তম ঋণ?' এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্যে খরচ করা। কেউ কেউ বলেন যে, উদ্দেশ্য হলো ছেলে-মেয়েদেরকে খাওয়ানো, পরানো ইত্যাদিতে খরচ। হতে পারে যে, এ আয়াতটি উমূম বা সাধারণত্বের দিক দিয়ে দুটো উদ্দেশ্যকেই অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর আল্লাহ পাক বলেন যে, (যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করবে) তার জন্যে তিনি ওটাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটাকে তিনি বহুগুণে বদ্ধি করবেন এবং তার জন্যে রয়েছে মহা পুরস্কার। অর্থাৎ উত্তম পুরস্কার ও পবিত্র রিযক এবং ওটা হলো কিয়ামতের দিনে জান্নাত।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন আবুদ দাহদাহ আনসারী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের কাছে ঋণ চাচ্ছেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ বলেনঃ “হ্যাঁ, হে আবু দাহদাহ!" তখন হযরত আবুদ দাহদাহ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার হাতটি আমাকে দেখান (আপনার হাতটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিন)।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার হস্ত মুবারক বাড়িয়ে দিলেন। হযরত আবু দাহদাহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতটি নিজের মধ্যে নিয়ে বললেনঃ “আমি আমার ঐ বাগানটি আল্লাহ তা'আলাকে ঋণ স্বরূপ দিলাম যাতে ছয়শটি খেজুরের গাছ রয়েছে। তার স্ত্রী এবং ছেলে-মেয়েও ঐ বাগানে ছিলেন। তিনি আসলেন এবং বাগানের দরবার উপর দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রীকে ডাক দিলেন। স্ত্রী তার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে আসলেন। তখন তিনি স্ত্রীকে বললেন, তুমি (ছেলে-মেয়ে নিয়ে) বেরিয়ে এসো। আমি আমার মহামহিমান্বিত প্রতিপালককে এ বাগানটি ঋণ স্বরূপ দিয়ে দিয়েছি।” স্ত্রী খুশী হয়ে বললেনঃ “আপনি খুবই লাভজনক ব্যবসায় হাত দিয়েছেন।” অতঃপর ছেলে-মেয়ে ও ঘরের আসবাবপত্র নিয়ে বেরিয়ে আসলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “জান্নাতী গাছ ও তথাকার বাগান যা ফলে পরিপূর্ণ এবং যার শাখাগুলো ইয়াকূত ও মণিমুক্তার তা আল্লাহ তা'আলা আবুদ দাহদাহ (রাঃ)-কে দান করলেন।”
আল-হাদীদ 57:10
৭-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা নিজের উপর এবং নিজের রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন ও ওর উপর দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের সাথে প্রতিষ্ঠিত থাকার হিদায়াত করছেন এবং তাঁর পথে খরচ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন। তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যে মাল হস্তান্তর রূপে দিয়েছেন, তোমরা তার আনুগত্য হিসেবে তা ব্যয় কর এবং বুঝে নাও যে, এই মাল যেমন অন্যের হাত হতে তোমার হাতে এসেছে, তেমনিভাবে তোমার হাত হতে সত্বরই এটা অন্যের হাতে চলে যাবে। আর তোমার জন্যে রয়ে যাবে হিসাব ও শাস্তি। এতে এ ইঙ্গিতও রয়েছে যে, হয়তো তোমার উত্তরাধিকারী সৎ হবে এবং তোমার সম্পদকে আমার পথে খরচ করে আমার নৈকট্য লাভ করবে, আবার এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে, সে অসৎ হবে এবং মন্দ কাজে ও অন্যায় পথে তোমার সম্পদ উড়িয়ে দিবে এবং এই অন্যায় কাজের উৎস তুমিই হবে। কারণ তুমি যদি এ সম্পদ ছেড়ে না যেতে তবে তোমার ওয়ারিস এটা অন্যায় কাজে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগে পেতো না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শাখীর (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তাআলার উক্তির উদ্ধৃতি দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।” (১০২:১) অতঃপর তিনি বলেনঃ “ইবনে আদম বলেঃ আমার মাল, আমার মাল। অথচ তার মাল তো ওটাই যা সে খেয়েছে, পরেছে এবং দান খায়রাত করেছে। যা সে খেয়েছে তা নিঃশেষ হয়েছে, যা সে পরিধান করেছে তা পুরনো হয়ে গেছে, আর যা সে আল্লাহর পথে দান করেছে তা তার কাছে সঞ্চিত রয়েছে। আর যা সে ছেড়ে গেল তা অন্যদের মাল। সে তা লোকদের জন্যে ছেড়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে এবং এতে শেষের অংশটুকু অতিরিক্ত রয়েছে)এ দু’টি কাজের প্রতি আল্লাহ তা'আলা উৎসাহ প্রদান করছেন এবং খুব বড় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের কি হলো যে, তোমরা আল্লাহতে ঈমান আন না? অথচ রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনতে আহ্বান করছে। তিনি মানুষের নিকট দলীল-প্রমাণাদি উপস্থাপন করেছেন এবং তাদেরকে মু'জিযা প্রদর্শন করছেন। সহীহ বুখারীর শরাহর প্রাথমিক অংশ কিতাবুল ঈমানে আমরা এ হাদীসটি বর্ণনা করে এসেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের নিকট উত্তম ঈমানদার ব্যক্তি কে?” উত্তরে তাঁরা বলেনঃ “ফেরেশতাগণ ।” তিনি বলেনঃ “তারা তো আল্লাহ তা'আলার নিকট রয়েছে, সুতরাং তারা ঈমানদার হয়েছে এতে বিস্ময়ের কি আছে?” তখন তারা বললেনঃ “তাহলে নবীগণ।” তিনি বলেনঃ “তাঁদের উপর তো অহী ও আল্লাহর কালাম অবতীর্ণ হয়, সুতরাং তারা তো ঈমান আনবেনই।” তারা তখন বলেনঃ “তাহলে আমরা।” তিনি বলেনঃ “কেন তোমরা ঈমানদার হবে না? আমি তো তোমাদের মধ্যে জীবিত অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছি। জেনে রেখো যে, উত্তম বিস্ময়পূর্ণ ঈমানদার হলো ঐ লোকেরা যারা তোমাদের পরে আসবে। তারা সহীফা ও গ্রন্থসমূহে সবকিছুই লিপিবদ্ধ দেখে ঈমান আনয়ন করবে।” সূরায়ে বাকারার শুরুতে (আরবী) (২:৩) এর তাফসীরেও আমরা এরূপ হাদীসগুলো লিপিবদ্ধ করেছি।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা মানুষকে তাদের কৃত অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ আল্লাহ তোমাদের নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের কথা স্মরণ কর যা তোমাদের উপর রয়েছে এবং স্মরণ কর তার সাথে কৃত ঐ অঙ্গীকারকে যা তিনি তোমাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছেন, যখন তোমরা বলেছিলেঃ আমরা শুনলাম ও মানলাম।” (৫:৭)এর দ্বারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করা বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এই মীসাক’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ মীসাক বা অঙ্গীকার যা হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠে তাদের নিকট হতে গ্রহণ করা হয়েছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এরও এটাই মাযহাব। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই তাঁর বান্দার প্রতি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ-এর প্রতি) সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে যুলুম, অবিচার ও অন্যায়ের অন্ধকার হতে বের করে সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল হিদায়াত ও সত্যের পথে আনয়ন করতে পারেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণাময়, পরম দয়ালু। এটা আল্লাহ তা'আলার বড় মেহেরবানী যে, তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের জন্যে কিতাব ও রাসূল পাঠিয়েছেন, সংশয়-সন্দেহ দূর করেছেন এবং হিদায়াত সুস্পষ্ট করেছেন।আল্লাহ পাক ঈমান আনয়ন ও দান-খয়রাতের হুকুম করে, তারপর ঈমানের প্রতি উৎসাহিত করে এবং এটা বর্ণনা দিয়ে যে, ঈমান না আনার এখন কোন ওরের সুযোগে নেই, দান-খয়রাতের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেন এবং বলেনঃ আমার পথে খরচ করতে থাকো এবং দারিদ্রকে ভয় করো না। কারণ যার পথে তোমরা খরচ করছো তিনি যমীন ও আসমানের ধন-ভাণ্ডারের একাই মালিক। আরশ ও কুরসী তাঁরই এবং তিনি তোমাদের কাছে তোমাদের এ দান-খয়রাতের প্রতিদান দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা (আল্লাহর পথে) যা কিছু খরচ করেছে, তিনি তোমাদেরকে ওর উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন এবং তিনি উত্তম রিযকদাতা।” (৩৪:৩৯) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের কাছে যা রয়েছে তা শেষ হয়ে যাবে এবং আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা চিরস্থায়ী (তা কখনো শেষ হবার নয়)।” (১৬:৯৬) যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে খরচ করতে থাকে এবং আরশের মালিক হতে কমে যাওয়ার ভয় করে না, সত্বরই তিনি তাকে উত্তম বিনিময় প্রদান করবেন। তারা নির্ভরশীল যে, আল্লাহর পথে যা খরচ করছে তার প্রতিদান তারা ইহকালে ও পরকালে অবশ্যই পাবে।এরপর মহান আল্লাহ বলছেন যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বে যারা ধন-সম্পদ খরচ করেছে এবং যারা তা করেনি, তারা কখনো সমান নয়, যদিও তারা মক্কা বিজয়ের পর খরচ করে থাকে। কারণ মক্কা বিজয়ের পূর্বে মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয় এবং শক্তি ছিল খুবই কম। আর এজন্যেও যে, ঐ সময় ঈমান শুধু ঐ লোকেরাই কবুল করতো যাদের অন্তর সম্পূর্ণরূপে কালিমামুক্ত ছিল। মক্কা বিজয়ের পর মুসলমানদের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, সংখ্যাও বেড়ে যায় এবং বহু অঞ্চল বিজিত হয়। এর সাথে সাথে মুসলমানদের আর্থিক অবস্থাও ভাল হয়। সুতরাং ঐ সময় ও এই সময়ের মধ্যে যেই পার্থক্য, ঐ সময়ের মুসলমান ও এই সময়ের মুসলমানদের মধ্যেও সেই পার্থক্য। ঐ সময়ের মুসলমানরা বড় রকমের প্রতিদান প্রাপ্ত হবে, যদিও উভয় যুগের মুসলমানরাই প্রকৃত কল্যাণ লাভে অংশীদার।কেউ কেউ বলেন যে, এখানে বিজয় দ্বারা হুদায়বিয়ার সন্ধিকে বুঝানো হয়েছে। মুসনাদে আহমাদের নিম্নের রিওয়াইয়াতটি এর পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-এর মধ্যে কিছু মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। হযরত খালিদ (রাঃ) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি আমার কিছু দিন পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলেই আমার উপর গর্ব প্রকাশ করছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানে এ খবর পৌঁছলে তিনি বলেনঃ “আমার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আমার জন্যে ছেড়ে দাও। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তোমরা উহুদ বা অন্য কোন পাহাড়ের সমান সোনা খরচ কর তবুও তাদের আমলের সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন।)প্রকাশ থাকে যে, এটা হযরত খালিদ (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের পরের ঘটনা এবং তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধির পরে এবং মক্কা বিজয়ের পূর্বে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। আর যে মতানৈক্যের বর্ণনা এই হাদীসে রয়েছে তা বানু জুযাইমা গোত্রের ব্যাপারে ঘটেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের পর হযরত খালিদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একদল সৈন্য এই গোত্রের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যখন তারা সেখানে পৌঁছেন তখন ঐ লোকগুলো বলতে শুরু করেঃ “আমরা মুসলমান হয়েছি। কিন্তু অজানার কারণে আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি’ একথা না বলে ‘আমরা সা’বী বা বেদ্বীন হয়েছি' একথা বলেন। কেননা, কাফিররা মুসলমানদেরকে একথাই বলতো। হযরত খালিদ (রাঃ) এই কালিমার ভাবার্থ - বুঝতে না পেরে তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। এমন কি তাদের যারা বন্দী হয় তাদেরকেও হত্যা করার আদেশ করেন। এই ঘটনায় হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হযরত খালিদ (রাঃ)-এর বিরধিতা করেন। এই ঘটনাটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উপরে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সাহাবীদেরকে (রাঃ) মন্দ বলো না। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড়ের সমানও সোনা (আল্লাহর পথে) খরচ করে তবুও তাদের তিন পাই শস্যের পুণ্যেও পৌঁছতে পারবে না। এমন কি দেড় পাই পুণ্যেও পৌছতে সক্ষম হবে না।”হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধির বছর যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গাসফান নামক স্থানে পৌঁছি তখন তিনি বলেনঃ “এমন লোকও আসবে যাদের আমলের তুলনায় তোমরা তোমাদের আমলকে নগণ্য মনে করবে।” সাহাবীগণ প্রশ্ন করেনঃ “তারা কি কুরায়েশ হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না, বরং ইয়ামনী। তাদের অন্তর হবে কোমল এবং চরিত্র হবে অত্যন্ত মধুর।” আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কি আমাদের চেয়ে উত্তম হবে? উত্তর দিলেন তিনিঃ “তাদের কারো কাছে যদি উহুদ পাহাড়ের সমানও সোনা থাকে এবং সে তা আল্লাহর পথে খরচও করে ফেলে তবুও তোমাদের কারো তিন পাই, এমনকি দেড় পাই শস্য দান করার পুণ্যও সে লাভ করতে পারবে না। জেনে রেখো যে, আমাদের মধ্যে এবং সারা দুনিয়ার লোকদের মধ্যে এটাই পার্থক্য।” অতঃপর তিনি .. (আরবী) আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে খারেজীদের সম্পর্কে রয়েছেঃ “তোমরা তাদের নামায ও রোযার তুলনায় তোমাদের নামায ও রোযাকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে। তারা দুনিয়া হতে এমনিভাবে বের হয়ে যাবে যেমনিভাবে তীর কামান হতে বের হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ রিওয়াইয়াতটি গারীব বা দুর্বল)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ “সত্বরই এমন এক কওমের আবির্ভাব হবে যে, যখন তোমরা তাদের আমলের সঙ্গে তোমাদের আমলের তুলনা করবে তখন তোমাদেরকে খুবই কম মনে করবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কি কুরায়েশ হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “না, তারা হবে সরল চিত্ত ও কোমল হৃদয়ের লোক এবং ওখানকার অধিবাসী।” অতঃপর তিনি ইয়ামনের দিকে স্বীয় হস্ত মুবারক দ্বারা ইশারা করেন। তারপর বলেনঃ “তারা হবে ইয়ামনী লোক। ইয়ামনবাসীদের ঈমানই তো প্রকৃত ঈমান এবং ইয়ামনবাসীদের হিকমতই তো প্রকৃত হিকমত।” সাহাবীগণ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “তারা কি আমাদের চেয়েও উত্তম হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যার হাতে আমার জীবন রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তাদের মধ্যে কারো নিকট সোনার পাহাড়ও থাকে এবং ওটাকে সে আল্লাহর পথে দানও করে ফেলে তবুও সে তোমাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ এরও পর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না।” অতঃপর তিনি তার অঙ্গুলিগুলো বন্ধ করেন এবং কনিষ্ঠাঙ্গুলি বাড়িয়ে দিয়ে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, এটাই পার্থক্য হলো আমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে।” অতঃপর তিনি .. (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। এ হাদীসে হুদায়বিয়ার উল্লেখ নেই। সুতরাং এও হতে পারে যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে ওটা বিজয়ের পরবর্তী খবর দিয়েছিলেন। যেমন মক্কা শরীফে অবতীর্ণ প্রাথমিক সূরাগুলোর অন্যতম সূরা, সূরায়ে মুযযামমিলে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “কেউ কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে লিপ্ত হবে।” (৭৩:২০) সুতরাং যেমন এই আয়াতে আগামীতে সংঘটিতব্য একটি ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, তেমনই এই আয়াত এবং হাদীসকেও বুঝে নিতে হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তবে আল্লাহ উভয়ের কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের পূর্বে এবং পরেও যে কেউ যা কিছু আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করেছে তার প্রতিদান তিনি তাকে অবশ্যই প্রদান করবেন। কাউকেও বেশী দেয়া হবে এবং কাউকেও কম দেয়া হবে। সেটা স্বতন্ত্র কথা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “মুমিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে ও যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ সবকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা ঘরে বসে। থাকে তাদের উপর যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ মহা পুরস্কারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।” (৪:৯৫) অনুরূপভাবে সহীহ হাদীসেও রয়েছেঃ “সবল মুমিন ভাল ও আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় দুর্বল মুমিন হতে, তবে কল্যাণ উভয়ের মধ্যে রয়েছে।”যদি এই আয়াতের এই বাক্যটি না থাকতো তবে সম্ভবতঃ মানুষ এই পরবর্তীদেরকে তুচ্ছ মনে করতো। এ জন্যেই পূর্ববর্তীদের ফযীলত বর্ণনা করার পর সংযোগ স্থাপন করে মূল প্রতিদানে উভয়কে শরীক করা হয়েছে। মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমরা যা কর আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত। তিনি মর্যাদায় যে পার্থক্য রেখেছেন তা অনুমানে নয়, বরং সঠিক জ্ঞান দ্বারা। হাদীসে এসেছেঃ “এক দিরহাম এক লক্ষ দিরহাম হতে বেড়ে যায়। এটাও স্মরণ রাখার বিষয় যে, এই আয়াতের বড় অংশের অংশীদার হলেন হযরত আবু বকর (রাঃ)। কেননা, এর উপর আমলকারী সমস্ত নবীর উম্মতবর্গের ইনি নেতা। তিনি প্রাথমিক সংকীর্ণতার সময় নিজের সমুদয় মাল আল্লাহর পথে দান করে দিয়েছিলেন। এর প্রতিদান তিনি আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে চাননি। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা দরবারে নববীতে (সঃ) বসেছিলাম। হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন। তাঁর গায়ে একটি মাত্র পোশাক ছিল যার খোলা অংশ তিনি কাঁটা দ্বারা আটকিয়ে রেখেছিলেন। এমন সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়েন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি? হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর গায়ে একটি মাত্র পোশাক, তাও আবার কাঁটা দিয়ে আটকানো রয়েছে, কারণ কি?" উত্তরে নবী (সঃ) বললেনঃ “সে তার সমুদয় সম্পদ আমার কাজে মক্কা বিজয়ের পূর্বেই আল্লাহর পথে খরচ করে ফেলেছে। এখন তার কাছে আর কিছুই নেই। একথা শুনে হযরত জিবরাঈল (আঃ) নবী (সঃ)-কে বললেনঃ “তাকে বলুন যে, আল্লাহ তাআলা তাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, তিনি তাঁর দারিদ্র অবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করেন এবং তাঁর কাছে জবাব চান। তিনি তখন আরয করেনঃ “আমি আমার মহামহিমান্বিত প্রতিপালকের উপর কি করে অসন্তুষ্ট হতে পারি? আমি আমার প্রতিপালকের উপর সন্তুষ্ট।” (এ হাদীসটি আবু মুহাম্মাদ হুসাইন ইবনে মাসউদ বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সনদের দিক দিয়ে এ হাদসটি দুর্বল। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন)অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “কে আছে যে আল্লাহকে দিবে উত্তম ঋণ?' এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্যে খরচ করা। কেউ কেউ বলেন যে, উদ্দেশ্য হলো ছেলে-মেয়েদেরকে খাওয়ানো, পরানো ইত্যাদিতে খরচ। হতে পারে যে, এ আয়াতটি উমূম বা সাধারণত্বের দিক দিয়ে দুটো উদ্দেশ্যকেই অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর আল্লাহ পাক বলেন যে, (যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করবে) তার জন্যে তিনি ওটাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটাকে তিনি বহুগুণে বদ্ধি করবেন এবং তার জন্যে রয়েছে মহা পুরস্কার। অর্থাৎ উত্তম পুরস্কার ও পবিত্র রিযক এবং ওটা হলো কিয়ামতের দিনে জান্নাত।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন আবুদ দাহদাহ আনসারী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের কাছে ঋণ চাচ্ছেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ বলেনঃ “হ্যাঁ, হে আবু দাহদাহ!" তখন হযরত আবুদ দাহদাহ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার হাতটি আমাকে দেখান (আপনার হাতটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিন)।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার হস্ত মুবারক বাড়িয়ে দিলেন। হযরত আবু দাহদাহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতটি নিজের মধ্যে নিয়ে বললেনঃ “আমি আমার ঐ বাগানটি আল্লাহ তা'আলাকে ঋণ স্বরূপ দিলাম যাতে ছয়শটি খেজুরের গাছ রয়েছে। তার স্ত্রী এবং ছেলে-মেয়েও ঐ বাগানে ছিলেন। তিনি আসলেন এবং বাগানের দরবার উপর দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রীকে ডাক দিলেন। স্ত্রী তার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে আসলেন। তখন তিনি স্ত্রীকে বললেন, তুমি (ছেলে-মেয়ে নিয়ে) বেরিয়ে এসো। আমি আমার মহামহিমান্বিত প্রতিপালককে এ বাগানটি ঋণ স্বরূপ দিয়ে দিয়েছি।” স্ত্রী খুশী হয়ে বললেনঃ “আপনি খুবই লাভজনক ব্যবসায় হাত দিয়েছেন।” অতঃপর ছেলে-মেয়ে ও ঘরের আসবাবপত্র নিয়ে বেরিয়ে আসলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “জান্নাতী গাছ ও তথাকার বাগান যা ফলে পরিপূর্ণ এবং যার শাখাগুলো ইয়াকূত ও মণিমুক্তার তা আল্লাহ তা'আলা আবুদ দাহদাহ (রাঃ)-কে দান করলেন।”
আল-হাদীদ 57:11
৭-১১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা নিজের উপর এবং নিজের রাসূল (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন ও ওর উপর দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের সাথে প্রতিষ্ঠিত থাকার হিদায়াত করছেন এবং তাঁর পথে খরচ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন। তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যে মাল হস্তান্তর রূপে দিয়েছেন, তোমরা তার আনুগত্য হিসেবে তা ব্যয় কর এবং বুঝে নাও যে, এই মাল যেমন অন্যের হাত হতে তোমার হাতে এসেছে, তেমনিভাবে তোমার হাত হতে সত্বরই এটা অন্যের হাতে চলে যাবে। আর তোমার জন্যে রয়ে যাবে হিসাব ও শাস্তি। এতে এ ইঙ্গিতও রয়েছে যে, হয়তো তোমার উত্তরাধিকারী সৎ হবে এবং তোমার সম্পদকে আমার পথে খরচ করে আমার নৈকট্য লাভ করবে, আবার এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে, সে অসৎ হবে এবং মন্দ কাজে ও অন্যায় পথে তোমার সম্পদ উড়িয়ে দিবে এবং এই অন্যায় কাজের উৎস তুমিই হবে। কারণ তুমি যদি এ সম্পদ ছেড়ে না যেতে তবে তোমার ওয়ারিস এটা অন্যায় কাজে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগে পেতো না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শাখীর (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তাআলার উক্তির উদ্ধৃতি দেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।” (১০২:১) অতঃপর তিনি বলেনঃ “ইবনে আদম বলেঃ আমার মাল, আমার মাল। অথচ তার মাল তো ওটাই যা সে খেয়েছে, পরেছে এবং দান খায়রাত করেছে। যা সে খেয়েছে তা নিঃশেষ হয়েছে, যা সে পরিধান করেছে তা পুরনো হয়ে গেছে, আর যা সে আল্লাহর পথে দান করেছে তা তার কাছে সঞ্চিত রয়েছে। আর যা সে ছেড়ে গেল তা অন্যদের মাল। সে তা লোকদের জন্যে ছেড়ে গেল।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে এবং এতে শেষের অংশটুকু অতিরিক্ত রয়েছে)এ দু’টি কাজের প্রতি আল্লাহ তা'আলা উৎসাহ প্রদান করছেন এবং খুব বড় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের কি হলো যে, তোমরা আল্লাহতে ঈমান আন না? অথচ রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনতে আহ্বান করছে। তিনি মানুষের নিকট দলীল-প্রমাণাদি উপস্থাপন করেছেন এবং তাদেরকে মু'জিযা প্রদর্শন করছেন। সহীহ বুখারীর শরাহর প্রাথমিক অংশ কিতাবুল ঈমানে আমরা এ হাদীসটি বর্ণনা করে এসেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের নিকট উত্তম ঈমানদার ব্যক্তি কে?” উত্তরে তাঁরা বলেনঃ “ফেরেশতাগণ ।” তিনি বলেনঃ “তারা তো আল্লাহ তা'আলার নিকট রয়েছে, সুতরাং তারা ঈমানদার হয়েছে এতে বিস্ময়ের কি আছে?” তখন তারা বললেনঃ “তাহলে নবীগণ।” তিনি বলেনঃ “তাঁদের উপর তো অহী ও আল্লাহর কালাম অবতীর্ণ হয়, সুতরাং তারা তো ঈমান আনবেনই।” তারা তখন বলেনঃ “তাহলে আমরা।” তিনি বলেনঃ “কেন তোমরা ঈমানদার হবে না? আমি তো তোমাদের মধ্যে জীবিত অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছি। জেনে রেখো যে, উত্তম বিস্ময়পূর্ণ ঈমানদার হলো ঐ লোকেরা যারা তোমাদের পরে আসবে। তারা সহীফা ও গ্রন্থসমূহে সবকিছুই লিপিবদ্ধ দেখে ঈমান আনয়ন করবে।” সূরায়ে বাকারার শুরুতে (আরবী) (২:৩) এর তাফসীরেও আমরা এরূপ হাদীসগুলো লিপিবদ্ধ করেছি।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা মানুষকে তাদের কৃত অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেনঃ আল্লাহ তোমাদের নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহর ঐ নিয়ামতের কথা স্মরণ কর যা তোমাদের উপর রয়েছে এবং স্মরণ কর তার সাথে কৃত ঐ অঙ্গীকারকে যা তিনি তোমাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছেন, যখন তোমরা বলেছিলেঃ আমরা শুনলাম ও মানলাম।” (৫:৭)এর দ্বারা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করা বুঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এই মীসাক’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ মীসাক বা অঙ্গীকার যা হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠে তাদের নিকট হতে গ্রহণ করা হয়েছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এরও এটাই মাযহাব। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই তাঁর বান্দার প্রতি (হযরত মুহাম্মাদ সঃ-এর প্রতি) সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে যুলুম, অবিচার ও অন্যায়ের অন্ধকার হতে বের করে সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল হিদায়াত ও সত্যের পথে আনয়ন করতে পারেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি করুণাময়, পরম দয়ালু। এটা আল্লাহ তা'আলার বড় মেহেরবানী যে, তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের জন্যে কিতাব ও রাসূল পাঠিয়েছেন, সংশয়-সন্দেহ দূর করেছেন এবং হিদায়াত সুস্পষ্ট করেছেন।আল্লাহ পাক ঈমান আনয়ন ও দান-খয়রাতের হুকুম করে, তারপর ঈমানের প্রতি উৎসাহিত করে এবং এটা বর্ণনা দিয়ে যে, ঈমান না আনার এখন কোন ওরের সুযোগে নেই, দান-খয়রাতের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেন এবং বলেনঃ আমার পথে খরচ করতে থাকো এবং দারিদ্রকে ভয় করো না। কারণ যার পথে তোমরা খরচ করছো তিনি যমীন ও আসমানের ধন-ভাণ্ডারের একাই মালিক। আরশ ও কুরসী তাঁরই এবং তিনি তোমাদের কাছে তোমাদের এ দান-খয়রাতের প্রতিদান দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তোমরা (আল্লাহর পথে) যা কিছু খরচ করেছে, তিনি তোমাদেরকে ওর উত্তম প্রতিদান প্রদান করবেন এবং তিনি উত্তম রিযকদাতা।” (৩৪:৩৯) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের কাছে যা রয়েছে তা শেষ হয়ে যাবে এবং আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা চিরস্থায়ী (তা কখনো শেষ হবার নয়)।” (১৬:৯৬) যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে খরচ করতে থাকে এবং আরশের মালিক হতে কমে যাওয়ার ভয় করে না, সত্বরই তিনি তাকে উত্তম বিনিময় প্রদান করবেন। তারা নির্ভরশীল যে, আল্লাহর পথে যা খরচ করছে তার প্রতিদান তারা ইহকালে ও পরকালে অবশ্যই পাবে।এরপর মহান আল্লাহ বলছেন যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বে যারা ধন-সম্পদ খরচ করেছে এবং যারা তা করেনি, তারা কখনো সমান নয়, যদিও তারা মক্কা বিজয়ের পর খরচ করে থাকে। কারণ মক্কা বিজয়ের পূর্বে মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয় এবং শক্তি ছিল খুবই কম। আর এজন্যেও যে, ঐ সময় ঈমান শুধু ঐ লোকেরাই কবুল করতো যাদের অন্তর সম্পূর্ণরূপে কালিমামুক্ত ছিল। মক্কা বিজয়ের পর মুসলমানদের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, সংখ্যাও বেড়ে যায় এবং বহু অঞ্চল বিজিত হয়। এর সাথে সাথে মুসলমানদের আর্থিক অবস্থাও ভাল হয়। সুতরাং ঐ সময় ও এই সময়ের মধ্যে যেই পার্থক্য, ঐ সময়ের মুসলমান ও এই সময়ের মুসলমানদের মধ্যেও সেই পার্থক্য। ঐ সময়ের মুসলমানরা বড় রকমের প্রতিদান প্রাপ্ত হবে, যদিও উভয় যুগের মুসলমানরাই প্রকৃত কল্যাণ লাভে অংশীদার।কেউ কেউ বলেন যে, এখানে বিজয় দ্বারা হুদায়বিয়ার সন্ধিকে বুঝানো হয়েছে। মুসনাদে আহমাদের নিম্নের রিওয়াইয়াতটি এর পৃষ্ঠপোষকতা করেঃ হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-এর মধ্যে কিছু মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। হযরত খালিদ (রাঃ) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি আমার কিছু দিন পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলেই আমার উপর গর্ব প্রকাশ করছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানে এ খবর পৌঁছলে তিনি বলেনঃ “আমার সাহাবীদেরকে (রাঃ) আমার জন্যে ছেড়ে দাও। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তোমরা উহুদ বা অন্য কোন পাহাড়ের সমান সোনা খরচ কর তবুও তাদের আমলের সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন।)প্রকাশ থাকে যে, এটা হযরত খালিদ (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের পরের ঘটনা এবং তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধির পরে এবং মক্কা বিজয়ের পূর্বে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। আর যে মতানৈক্যের বর্ণনা এই হাদীসে রয়েছে তা বানু জুযাইমা গোত্রের ব্যাপারে ঘটেছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের পর হযরত খালিদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একদল সৈন্য এই গোত্রের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যখন তারা সেখানে পৌঁছেন তখন ঐ লোকগুলো বলতে শুরু করেঃ “আমরা মুসলমান হয়েছি। কিন্তু অজানার কারণে আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি’ একথা না বলে ‘আমরা সা’বী বা বেদ্বীন হয়েছি' একথা বলেন। কেননা, কাফিররা মুসলমানদেরকে একথাই বলতো। হযরত খালিদ (রাঃ) এই কালিমার ভাবার্থ - বুঝতে না পেরে তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। এমন কি তাদের যারা বন্দী হয় তাদেরকেও হত্যা করার আদেশ করেন। এই ঘটনায় হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হযরত খালিদ (রাঃ)-এর বিরধিতা করেন। এই ঘটনাটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উপরে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে।সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার সাহাবীদেরকে (রাঃ) মন্দ বলো না। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড়ের সমানও সোনা (আল্লাহর পথে) খরচ করে তবুও তাদের তিন পাই শস্যের পুণ্যেও পৌঁছতে পারবে না। এমন কি দেড় পাই পুণ্যেও পৌছতে সক্ষম হবে না।”হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধির বছর যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে গাসফান নামক স্থানে পৌঁছি তখন তিনি বলেনঃ “এমন লোকও আসবে যাদের আমলের তুলনায় তোমরা তোমাদের আমলকে নগণ্য মনে করবে।” সাহাবীগণ প্রশ্ন করেনঃ “তারা কি কুরায়েশ হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না, বরং ইয়ামনী। তাদের অন্তর হবে কোমল এবং চরিত্র হবে অত্যন্ত মধুর।” আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কি আমাদের চেয়ে উত্তম হবে? উত্তর দিলেন তিনিঃ “তাদের কারো কাছে যদি উহুদ পাহাড়ের সমানও সোনা থাকে এবং সে তা আল্লাহর পথে খরচও করে ফেলে তবুও তোমাদের কারো তিন পাই, এমনকি দেড় পাই শস্য দান করার পুণ্যও সে লাভ করতে পারবে না। জেনে রেখো যে, আমাদের মধ্যে এবং সারা দুনিয়ার লোকদের মধ্যে এটাই পার্থক্য।” অতঃপর তিনি .. (আরবী) আয়াতটি তিলাওয়াত করেন।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর রিওয়াইয়াতে খারেজীদের সম্পর্কে রয়েছেঃ “তোমরা তাদের নামায ও রোযার তুলনায় তোমাদের নামায ও রোযাকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে। তারা দুনিয়া হতে এমনিভাবে বের হয়ে যাবে যেমনিভাবে তীর কামান হতে বের হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ রিওয়াইয়াতটি গারীব বা দুর্বল)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ “সত্বরই এমন এক কওমের আবির্ভাব হবে যে, যখন তোমরা তাদের আমলের সঙ্গে তোমাদের আমলের তুলনা করবে তখন তোমাদেরকে খুবই কম মনে করবে।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কি কুরায়েশ হবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “না, তারা হবে সরল চিত্ত ও কোমল হৃদয়ের লোক এবং ওখানকার অধিবাসী।” অতঃপর তিনি ইয়ামনের দিকে স্বীয় হস্ত মুবারক দ্বারা ইশারা করেন। তারপর বলেনঃ “তারা হবে ইয়ামনী লোক। ইয়ামনবাসীদের ঈমানই তো প্রকৃত ঈমান এবং ইয়ামনবাসীদের হিকমতই তো প্রকৃত হিকমত।” সাহাবীগণ (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “তারা কি আমাদের চেয়েও উত্তম হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “যার হাতে আমার জীবন রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তাদের মধ্যে কারো নিকট সোনার পাহাড়ও থাকে এবং ওটাকে সে আল্লাহর পথে দানও করে ফেলে তবুও সে তোমাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ এরও পর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না।” অতঃপর তিনি তার অঙ্গুলিগুলো বন্ধ করেন এবং কনিষ্ঠাঙ্গুলি বাড়িয়ে দিয়ে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, এটাই পার্থক্য হলো আমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে।” অতঃপর তিনি .. (আরবী)-এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। এ হাদীসে হুদায়বিয়ার উল্লেখ নেই। সুতরাং এও হতে পারে যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে ওটা বিজয়ের পরবর্তী খবর দিয়েছিলেন। যেমন মক্কা শরীফে অবতীর্ণ প্রাথমিক সূরাগুলোর অন্যতম সূরা, সূরায়ে মুযযামমিলে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “কেউ কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে লিপ্ত হবে।” (৭৩:২০) সুতরাং যেমন এই আয়াতে আগামীতে সংঘটিতব্য একটি ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, তেমনই এই আয়াত এবং হাদীসকেও বুঝে নিতে হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তবে আল্লাহ উভয়ের কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের পূর্বে এবং পরেও যে কেউ যা কিছু আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করেছে তার প্রতিদান তিনি তাকে অবশ্যই প্রদান করবেন। কাউকেও বেশী দেয়া হবে এবং কাউকেও কম দেয়া হবে। সেটা স্বতন্ত্র কথা। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “মুমিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে ও যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ সবকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা ঘরে বসে। থাকে তাদের উপর যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ মহা পুরস্কারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।” (৪:৯৫) অনুরূপভাবে সহীহ হাদীসেও রয়েছেঃ “সবল মুমিন ভাল ও আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় দুর্বল মুমিন হতে, তবে কল্যাণ উভয়ের মধ্যে রয়েছে।”যদি এই আয়াতের এই বাক্যটি না থাকতো তবে সম্ভবতঃ মানুষ এই পরবর্তীদেরকে তুচ্ছ মনে করতো। এ জন্যেই পূর্ববর্তীদের ফযীলত বর্ণনা করার পর সংযোগ স্থাপন করে মূল প্রতিদানে উভয়কে শরীক করা হয়েছে। মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ তোমরা যা কর আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত। তিনি মর্যাদায় যে পার্থক্য রেখেছেন তা অনুমানে নয়, বরং সঠিক জ্ঞান দ্বারা। হাদীসে এসেছেঃ “এক দিরহাম এক লক্ষ দিরহাম হতে বেড়ে যায়। এটাও স্মরণ রাখার বিষয় যে, এই আয়াতের বড় অংশের অংশীদার হলেন হযরত আবু বকর (রাঃ)। কেননা, এর উপর আমলকারী সমস্ত নবীর উম্মতবর্গের ইনি নেতা। তিনি প্রাথমিক সংকীর্ণতার সময় নিজের সমুদয় মাল আল্লাহর পথে দান করে দিয়েছিলেন। এর প্রতিদান তিনি আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে চাননি। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা দরবারে নববীতে (সঃ) বসেছিলাম। হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন। তাঁর গায়ে একটি মাত্র পোশাক ছিল যার খোলা অংশ তিনি কাঁটা দ্বারা আটকিয়ে রেখেছিলেন। এমন সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে পড়েন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি? হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর গায়ে একটি মাত্র পোশাক, তাও আবার কাঁটা দিয়ে আটকানো রয়েছে, কারণ কি?" উত্তরে নবী (সঃ) বললেনঃ “সে তার সমুদয় সম্পদ আমার কাজে মক্কা বিজয়ের পূর্বেই আল্লাহর পথে খরচ করে ফেলেছে। এখন তার কাছে আর কিছুই নেই। একথা শুনে হযরত জিবরাঈল (আঃ) নবী (সঃ)-কে বললেনঃ “তাকে বলুন যে, আল্লাহ তাআলা তাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, তিনি তাঁর দারিদ্র অবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করেন এবং তাঁর কাছে জবাব চান। তিনি তখন আরয করেনঃ “আমি আমার মহামহিমান্বিত প্রতিপালকের উপর কি করে অসন্তুষ্ট হতে পারি? আমি আমার প্রতিপালকের উপর সন্তুষ্ট।” (এ হাদীসটি আবু মুহাম্মাদ হুসাইন ইবনে মাসউদ বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সনদের দিক দিয়ে এ হাদসটি দুর্বল। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন)অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “কে আছে যে আল্লাহকে দিবে উত্তম ঋণ?' এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্যে খরচ করা। কেউ কেউ বলেন যে, উদ্দেশ্য হলো ছেলে-মেয়েদেরকে খাওয়ানো, পরানো ইত্যাদিতে খরচ। হতে পারে যে, এ আয়াতটি উমূম বা সাধারণত্বের দিক দিয়ে দুটো উদ্দেশ্যকেই অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর আল্লাহ পাক বলেন যে, (যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করবে) তার জন্যে তিনি ওটাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওটাকে তিনি বহুগুণে বদ্ধি করবেন এবং তার জন্যে রয়েছে মহা পুরস্কার। অর্থাৎ উত্তম পুরস্কার ও পবিত্র রিযক এবং ওটা হলো কিয়ামতের দিনে জান্নাত।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন আবুদ দাহদাহ আনসারী (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের কাছে ঋণ চাচ্ছেন?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ বলেনঃ “হ্যাঁ, হে আবু দাহদাহ!" তখন হযরত আবুদ দাহদাহ (রাঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার হাতটি আমাকে দেখান (আপনার হাতটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিন)।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার হস্ত মুবারক বাড়িয়ে দিলেন। হযরত আবু দাহদাহ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতটি নিজের মধ্যে নিয়ে বললেনঃ “আমি আমার ঐ বাগানটি আল্লাহ তা'আলাকে ঋণ স্বরূপ দিলাম যাতে ছয়শটি খেজুরের গাছ রয়েছে। তার স্ত্রী এবং ছেলে-মেয়েও ঐ বাগানে ছিলেন। তিনি আসলেন এবং বাগানের দরবার উপর দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রীকে ডাক দিলেন। স্ত্রী তার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে আসলেন। তখন তিনি স্ত্রীকে বললেন, তুমি (ছেলে-মেয়ে নিয়ে) বেরিয়ে এসো। আমি আমার মহামহিমান্বিত প্রতিপালককে এ বাগানটি ঋণ স্বরূপ দিয়ে দিয়েছি।” স্ত্রী খুশী হয়ে বললেনঃ “আপনি খুবই লাভজনক ব্যবসায় হাত দিয়েছেন।” অতঃপর ছেলে-মেয়ে ও ঘরের আসবাবপত্র নিয়ে বেরিয়ে আসলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “জান্নাতী গাছ ও তথাকার বাগান যা ফলে পরিপূর্ণ এবং যার শাখাগুলো ইয়াকূত ও মণিমুক্তার তা আল্লাহ তা'আলা আবুদ দাহদাহ (রাঃ)-কে দান করলেন।”
আল-হাদীদ 57:12
১২-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: দান-খয়রাতকারী মুমিনদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ কিয়ামতের দিন তারা তাদের সৎ আমল অনুযায়ী নূর বা জ্যোতি লাভ করবে। ঐ জ্যোতি তাদের সাথে সাথে থাকবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, তাদের কারো কারো জ্যোতি হবে পাহাড়ের সমান, কারো হবে খেজুরের গাছের সমান এবং কারো হবে দণ্ডায়মান মানুষের দেহের সমান। যে পাপী মুমিনদের জ্যোতি সবচেয়ে কম হবে তার শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলির উপর নূর থাকবে, যা কখনো জ্বলবে এবং কখনো নিভে যাবে। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কোন মুমিন এমন হবে যার নূর এই পরিমাণ হবে যে পরিমাণ দূরত্ব মদীনা ও আদনের মাঝে রয়েছে। কারো এর চেয়ে কম হবে, কারো এর চেয়ে আরো কম হবে। কারো নূর এতো কম হবে যে, তার পদদ্বয়ের পার্শ্বই শুধু আলোকিত হবে।” হযরত হুব্বাদ ইবনে উমাইয়া (রঃ) বলেনঃ হে লোক সকল! তোমাদের নাম পিতাসহ এবং বিশেষ নিদর্শনসহ আল্লাহ তা'আলার নিকট লিখিত রয়েছে। অনুরূপভাবে তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় আমলও লিখিত আছে। কিয়ামতের দিন নাম নিয়ে নিয়ে ডাক দিয়ে বলা হবেঃ হে অমুক! এটা তোমার জ্যোতি। হে অমুক! তোমার কোন নূর আমার কাছে নেই। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন।হযরত যহহাক (রঃ) বলেনঃ প্রথমে তো প্রত্যেক লোককেই নূর দেয়া হবে। কিন্তু যখন পুলসিরাতের উপর যাবে তখন মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে। এ দেখে মুমিনরাও ভীত হয়ে পড়বে যে, না জানি হয়তো তাদেরও জ্যোতি নিভে যাবে। তখন তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে আমাদের নূর পুরো করে দিন!”হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতে বর্ণিত নূর বা জ্যোতি দ্বারা পুলসিরাতের উপর নূর লাভ করাকে বুঝানো হয়েছে। যাতে ঐ অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থান সহজেই অতিক্রম করা যায়। হযরত আবু দারদা (রাঃ) ও হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আমাকেই সিজদার অনুমতি দেয়া হবে এবং অনুরূপভাবে সর্বপ্রথম আমাকেই সিজদা হতে মাথা উঠাবারও হুকুম দেয়া হবে। আমি সামনে, পিছনে, ডানে ও বামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে এবং নিজের উম্মতকে চিনে নিবো।” তখন একজন লোক প্রশ্ন করলেনঃ “হযরত নূহ (আঃ) থেকে নিয়ে আপনি পর্যন্ত সবারই উম্মত হাশরের ময়ানে একত্রিত হবে। সুতরাং এতোগুলো উম্মতের মধ্য হতে আপনার উম্মতকে আপনি কি করে চিনতে পারবেন?” জবাবে তিনি বললেনঃ “আমার উম্মতের অযুর অঙ্গগুলো অযুর কারণে চমকাতে থাকবে, এই বিশেষণ অন্য কোন উম্মতের মধ্যে থাকবে না। আর আমার উম্মতকে ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে এবং তাদের চেহারা হবে উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময়। আর তাদের নূর বা জ্যোতি তাদের অগ্রে অগ্রে চলতে থাকবে এবং তাদের সন্তানরা তাদের সঙ্গে থাকবে।” যহহাক (রঃ) বলেন যে, তাদের আমল নামা তাদের ডান হাতে থাকবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যাকে তার ডান হাতে কিতাব (আমলনামা) দেয়া হবে (শেষ পর্যন্ত)।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেথায় তোমরা স্থায়ী হবে, এটাই মহাসাফল্য। এর পরবর্তী আয়াতে কিয়ামতের মাঠের ভয়াবহ ও কম্পন সৃষ্টিকারী ঘটনার বর্ণনা রয়েছে যে, তথায় খাঁটি ঈমানদার সৎকর্মশীল লোক ছাড়া আর কেউই পরিত্রাণ পাবে না।হযরত সুলায়েম ইবনে আমির (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, বাবে দামেশকে আমরা একটি জানাযায় ছিলাম। যখন জানাযার নামায শেষ হয় এবং মৃতদেহ দাফন করার কাজ শুরু হয় তখন হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা এই দুনিয়ার মনযিলে সকাল-সন্ধ্যা করছে। তোমরা এখানে পুণ্য কার্যও করতে পার এবং পাপ কার্যও করতে পার। এরপরে অন্য মনযিলের দিকে তোমাদেরকে যাত্রা শুরু করতে হবে। এই কবরই হচ্ছে ঐ মনযিল যা নির্জনতা, অন্ধকার, পোকা-মাকড় এবং সংকীর্ণতার ঘর। কিন্তু যাকে আল্লাহ প্রশস্ততা দান করেন সেটা অন্য কথা। এরপর তোমরা কিয়ামত মাঠের বিভিন্ন স্থানে গমন করবে। এক জায়গায় বহু লোকের চেহারা সাদা-উজ্জ্বল হবে এবং বহু লোকের চেহারা হবে কালো কুৎসিত। তারপর এক ময়দানে যাবে যেখানে হবে কঠিন অন্ধকার। সেখানে ঈমানদারদেরকে নূর বা জ্যোতি বন্টন করা হবে। সেখানে কাফির ও মুনাফিকদের জন্যে কোন জ্যোতি থাকবে না। এরই বর্ণনা নিম্নের আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অথবা গভীর সমুদ্র তলের অন্ধকার সদৃশ যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ যার উর্ধে মেঘপুঞ্জ, অন্ধকারপুঞ্জ স্তরের উপর স্তর, এমনকি সে হাত বের করলে তা আদৌ দেখতে পাবে না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দান করেন না তার জন্যে কোন জ্যোতিই নেই।” (২৪:৪০) সুতরাং যেমন চক্ষুষ্মনদের। দৃষ্টিশক্তি দ্বারা অন্ধ ব্যক্তি কোন উপকার লাভ করতে পারে না, তেমনই মুনাফিক ও কাফিররা ঈমানদারদের নূর বা জ্যোতি দ্বারা কোন উপকার লাভ করতে সক্ষম হবে না। মুনাফিক ঈমানদারের কাছে আবেদন জানাবেঃ “তোমরা এতো বেশী সামনের দিকে এগিয়ে যেয়ো না, একটু থামো, যাতে আমরাও তোমাদের জ্যোতিকে আশ্রয় করে চলতে পারি ।” দুনিয়ায় এই মুনাফিকরা যেমন মুসলমানদের সাথে প্রতারণা করতো, তেমনই সেদিন মুসলমানরা মুনাফিকদেরকে বলবেঃ “তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও ও আলোর সন্ধান কর।” এরা তখন ফিরে গিয়ে নূর বন্টনের জায়গায় হাযির হবে। কিন্তু সেখানে কিছুই পাবে না। এটাই আল্লাহ তা'আলার প্রতারণা, যার বর্ণনা নিম্নের আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা আল্লাহকে প্রতারিত করছে এবং আল্লাহও তাদেরকে। প্রতারিতকারী।” (৪:১৪২) অতঃপর তারা যখন সেখানে ফিরে যাবে তখন দেখবে যে, মুমিন ও তাদের মাঝে স্থাপিত হয়েছে একটি প্রাচীর যার একটি দরজা রয়েছে, ওর অভ্যন্তরে আছে রহমত এবং বহির্ভাগে রয়েছে শাস্তি। সুতরাং মুনাফিকরা নূর বন্টন হওয়ার সময় পর্যন্ত প্রতারণার মধ্যেই থাকবে। অতঃপর যখন মুমিনরা নূর পাবে এবং তারা পাবে না তখন রহস্য উঘাটিত হয়ে যাবে এবং তারা আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন অন্ধকার পূর্ণভাবে ছেয়ে যাবে এবং মানুষ তার হাতটিও দেখতে পাবে না তখন আল্লাহ তাআলা একটা নূর প্রকাশ করবেন। মুসলমান ঐ দিকে যাবে, তখন মুনাফিকরাও তাদের পিছনে পিছনে যেতে শুরু করবে। মুমিনরা যখন সামনের দিকে অনেক বেশী এগিয়ে যাবে তখন মুনাফিকরা তাদেরকে ডাক দিয়ে থামতে বলবে এবং তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিবে যে, দুনিয়ায় তারা সবাই তো এক সাথেই ছিল।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন মানুষকে তাদের গোপনীয়তা রক্ষার্থে তাদের নাম ধরে ধরে ডাক দিবেন। মুমিনরাও নূর পাবে এবং মুনফিকরাও পাবে। কিন্তু পুলসিরাতের উপর তাদের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হবে। যখন তারা পুলসিরাতের মাঝপথে পৌঁছবে তখন মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে। তারা তখন সন্ত্রস্ত থাকবে। সবারই অবস্থা অত্যন্ত করুণ হবে। সবাই নিজ নিজ জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। যে প্রাচীরের কথা এখানে বলা হয়েছে তা হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে পার্থক্যসীমা। এরই বর্ণনা (আরবী)-এর মধ্যে রয়েছে। সুতরাং জান্নাতে বিরাজ করবে রহমত ও শান্তি এবং জাহান্নামে থাকবে অশান্তি ও শাস্তি। সঠিক কথা এটাই। কিন্তু কারো কারো উক্তি এই যে, এর দ্বারা বায়তুল মুকাদ্দাসের প্রাচীরকে বুঝানো হয়েছে যা জাহান্নামের উপত্যকার নিকট থাকবে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা হলো বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকস্থ প্রাচীর, যার অভ্যন্তরে রয়েছে মসজিদ ইত্যাদি এবং বহির্ভাগে রয়েছে জাহান্নামের উপত্যকা। আরো কতক লোকেও একথাই বলেছেন। কিন্তু এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, এ আয়াতে নির্দিষ্টভাবে এই প্রাচীরই যে তাঁদের উদ্দেশ্য, তা নয়, বরং কাছাকাছি অর্থ হিসেবে এ আয়াতের তাফসীরে তারা এটা উল্লেখ করেছেন। কেননা, জান্নাত আকাশে সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে এবং জাহান্নাম সর্বনিম্ন স্তরে রয়েছে। হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতে যে দরজার বর্ণনা আছে এর দ্বারা মসজিদের বাবুর রহমত উদ্দেশ্য, এটা বানী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াত, যা আমাদের জন্যে সনদ হতে পারে না। সঠিক তত্ত্ব এই যে, প্রাচীরটি কিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফিরদের মাঝে প্রভেদ সৃষ্টি করার জন্যে দাঁড় করানো হবে। মুমিন তো এর দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তারপর দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। আর মুনাফিকরা হতবুদ্ধি হয়ে অন্ধকার ও শাস্তির মধ্যে থাকবে, যেমন তারা দুনিয়াতে কুফরী, অজ্ঞতা, সন্দেহ ও হতবুদ্ধিতার অন্ধকারে ছিল। এখন এই মুনাফিকরা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেঃ “দেখো, দুনিয়ায় আমরা তোমাদের সঙ্গেই ছিলাম, জুমআর নামায জামাআতের সাথে আদায় করতাম, আরাফাতে ও যুদ্ধের মাঠে এক সাথে থাকতাম এবং এক সাথে অবশ্যপালনীয় কাজগুলো পালন করতাম (সুতরাং আজ আমাদেরকে তোমাদের সাথেই থাকতে দাও, পৃথক করে দিয়ো না)।" তখন মুমিনরা বলবেঃ “দেখো, কথা তোমরা ঠিকই বলছো বটে, কিন্তু নিজেদের কৃতকর্মগুলোর প্রতি একটু লক্ষ্য কর তো! সারা জীবন তোমরা কুপ্রবৃত্তি ও আল্লাহর নাফরমানীর কাজে ডুবে থেকেছো। আজ তাওবা করবে, কাল মন্দ কাজ পরিত্যাগ করবে’ এ করতে করতেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছে এবং মুসলমানদের পরিনাম কি হয় তার দিকেই চেয়ে থেকেছে। কিয়ামত যে সংঘটিত হবেই এ বিশ্বাসও তোমাদের ছিল না, কিংবা তোমরা এই আশা পোষণ করতে যে, যদি কিয়ামত সংঘটিত হয়েও যায় তবে তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর মৃত্যু পর্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আল্লাহ তা'আলার দিকে ঝুঁকে পড়ার তোমরা তাওফীক লাভ করনি এবং আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে প্রতারক শয়তান তোমাদেরকে প্রতারণার মধ্যেই ফেলে রেখেছে। অবশেষে আজ তোমরা জাহান্নামে প্রবেশ করেছো।” ভাবার্থ হলোঃ হে মুনাফিকের দল! দৈহিকরূপে তোমরা আমাদের সাথে ছিলে বটে, কিন্তু অন্তর ও নিয়তের সাথে আমাদের সঙ্গে ছিলে না। বরং সন্দেহ ও রিয়াকারীর মধ্যেই পড়েছিলে এবং মন লাগিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করারও সৌভাগ্য তোমরা লাভ করনি।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই মুনাফিকরা মুমিনদের সাথে বিয়ে-শাদী, মজলিস-সমাবেশ এবং জীবন-মরণ ইত্যাদিতে শরীক থাকতো। কিন্তু কিয়ামতের দিন তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক করে দেয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ। তবে দক্ষিণ পার্শ্বস্থ ব্যক্তিরা নয়। তারা থাকবে উদ্যানে এবং তারা জিজ্ঞাসাবাদ করবেতোমাদেরকে কি সে সাকারে (জাহান্নামে) নিক্ষেপ করেছে? তারা বলবেঃ আমরা মুসল্লীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। আমরা অভাবগ্রস্তদেরকে আহার্য দান করতাম না এবং আমরা আলোচনাকারীদের সাথে আলোচনায় নিমগ্ন থাকতাম। আমরা কর্মফল অস্বীকার করতাম, আমাদের নিকট মৃত্যুর আগমন পর্যন্ত।” (৭৪:৩৮-৪৭) প্রকাশ থাকে যে, এ প্রশ্ন করা হবে শুধু তাদেরকে ধমক, শাসন গর্জন এবং লজ্জিত করার জন্যে। আসলে তো প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে মুসলমানরা পূর্ণমাত্রায় ওয়াকিফহাল থাকবে।অতঃপর ওখানে যেমন বলা হয়েছিল যে, কারো সুপারিশ তাদের কোন • উপকার করবে না, অনুরূপভাবে এখানে বলেনঃ আজ তোমাদের নিকট হতে কোন মুক্তিপণ গ্রহণ করা হবে না এবং যারা কুফরী করেছিল তাদের নিকট হতেও না, যদি তারা যমীন ভর্তি সোনাও প্রদান করে। তাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। এটাই তাদের যোগ্য স্থান, কত নিকৃষ্ট এই পরিণাম।
আল-হাদীদ 57:13
১২-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: দান-খয়রাতকারী মুমিনদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ কিয়ামতের দিন তারা তাদের সৎ আমল অনুযায়ী নূর বা জ্যোতি লাভ করবে। ঐ জ্যোতি তাদের সাথে সাথে থাকবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, তাদের কারো কারো জ্যোতি হবে পাহাড়ের সমান, কারো হবে খেজুরের গাছের সমান এবং কারো হবে দণ্ডায়মান মানুষের দেহের সমান। যে পাপী মুমিনদের জ্যোতি সবচেয়ে কম হবে তার শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলির উপর নূর থাকবে, যা কখনো জ্বলবে এবং কখনো নিভে যাবে। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কোন মুমিন এমন হবে যার নূর এই পরিমাণ হবে যে পরিমাণ দূরত্ব মদীনা ও আদনের মাঝে রয়েছে। কারো এর চেয়ে কম হবে, কারো এর চেয়ে আরো কম হবে। কারো নূর এতো কম হবে যে, তার পদদ্বয়ের পার্শ্বই শুধু আলোকিত হবে।” হযরত হুব্বাদ ইবনে উমাইয়া (রঃ) বলেনঃ হে লোক সকল! তোমাদের নাম পিতাসহ এবং বিশেষ নিদর্শনসহ আল্লাহ তা'আলার নিকট লিখিত রয়েছে। অনুরূপভাবে তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় আমলও লিখিত আছে। কিয়ামতের দিন নাম নিয়ে নিয়ে ডাক দিয়ে বলা হবেঃ হে অমুক! এটা তোমার জ্যোতি। হে অমুক! তোমার কোন নূর আমার কাছে নেই। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন।হযরত যহহাক (রঃ) বলেনঃ প্রথমে তো প্রত্যেক লোককেই নূর দেয়া হবে। কিন্তু যখন পুলসিরাতের উপর যাবে তখন মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে। এ দেখে মুমিনরাও ভীত হয়ে পড়বে যে, না জানি হয়তো তাদেরও জ্যোতি নিভে যাবে। তখন তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে আমাদের নূর পুরো করে দিন!”হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতে বর্ণিত নূর বা জ্যোতি দ্বারা পুলসিরাতের উপর নূর লাভ করাকে বুঝানো হয়েছে। যাতে ঐ অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থান সহজেই অতিক্রম করা যায়। হযরত আবু দারদা (রাঃ) ও হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আমাকেই সিজদার অনুমতি দেয়া হবে এবং অনুরূপভাবে সর্বপ্রথম আমাকেই সিজদা হতে মাথা উঠাবারও হুকুম দেয়া হবে। আমি সামনে, পিছনে, ডানে ও বামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে এবং নিজের উম্মতকে চিনে নিবো।” তখন একজন লোক প্রশ্ন করলেনঃ “হযরত নূহ (আঃ) থেকে নিয়ে আপনি পর্যন্ত সবারই উম্মত হাশরের ময়ানে একত্রিত হবে। সুতরাং এতোগুলো উম্মতের মধ্য হতে আপনার উম্মতকে আপনি কি করে চিনতে পারবেন?” জবাবে তিনি বললেনঃ “আমার উম্মতের অযুর অঙ্গগুলো অযুর কারণে চমকাতে থাকবে, এই বিশেষণ অন্য কোন উম্মতের মধ্যে থাকবে না। আর আমার উম্মতকে ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে এবং তাদের চেহারা হবে উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময়। আর তাদের নূর বা জ্যোতি তাদের অগ্রে অগ্রে চলতে থাকবে এবং তাদের সন্তানরা তাদের সঙ্গে থাকবে।” যহহাক (রঃ) বলেন যে, তাদের আমল নামা তাদের ডান হাতে থাকবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যাকে তার ডান হাতে কিতাব (আমলনামা) দেয়া হবে (শেষ পর্যন্ত)।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেথায় তোমরা স্থায়ী হবে, এটাই মহাসাফল্য। এর পরবর্তী আয়াতে কিয়ামতের মাঠের ভয়াবহ ও কম্পন সৃষ্টিকারী ঘটনার বর্ণনা রয়েছে যে, তথায় খাঁটি ঈমানদার সৎকর্মশীল লোক ছাড়া আর কেউই পরিত্রাণ পাবে না।হযরত সুলায়েম ইবনে আমির (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, বাবে দামেশকে আমরা একটি জানাযায় ছিলাম। যখন জানাযার নামায শেষ হয় এবং মৃতদেহ দাফন করার কাজ শুরু হয় তখন হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা এই দুনিয়ার মনযিলে সকাল-সন্ধ্যা করছে। তোমরা এখানে পুণ্য কার্যও করতে পার এবং পাপ কার্যও করতে পার। এরপরে অন্য মনযিলের দিকে তোমাদেরকে যাত্রা শুরু করতে হবে। এই কবরই হচ্ছে ঐ মনযিল যা নির্জনতা, অন্ধকার, পোকা-মাকড় এবং সংকীর্ণতার ঘর। কিন্তু যাকে আল্লাহ প্রশস্ততা দান করেন সেটা অন্য কথা। এরপর তোমরা কিয়ামত মাঠের বিভিন্ন স্থানে গমন করবে। এক জায়গায় বহু লোকের চেহারা সাদা-উজ্জ্বল হবে এবং বহু লোকের চেহারা হবে কালো কুৎসিত। তারপর এক ময়দানে যাবে যেখানে হবে কঠিন অন্ধকার। সেখানে ঈমানদারদেরকে নূর বা জ্যোতি বন্টন করা হবে। সেখানে কাফির ও মুনাফিকদের জন্যে কোন জ্যোতি থাকবে না। এরই বর্ণনা নিম্নের আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অথবা গভীর সমুদ্র তলের অন্ধকার সদৃশ যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ যার উর্ধে মেঘপুঞ্জ, অন্ধকারপুঞ্জ স্তরের উপর স্তর, এমনকি সে হাত বের করলে তা আদৌ দেখতে পাবে না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দান করেন না তার জন্যে কোন জ্যোতিই নেই।” (২৪:৪০) সুতরাং যেমন চক্ষুষ্মনদের। দৃষ্টিশক্তি দ্বারা অন্ধ ব্যক্তি কোন উপকার লাভ করতে পারে না, তেমনই মুনাফিক ও কাফিররা ঈমানদারদের নূর বা জ্যোতি দ্বারা কোন উপকার লাভ করতে সক্ষম হবে না। মুনাফিক ঈমানদারের কাছে আবেদন জানাবেঃ “তোমরা এতো বেশী সামনের দিকে এগিয়ে যেয়ো না, একটু থামো, যাতে আমরাও তোমাদের জ্যোতিকে আশ্রয় করে চলতে পারি ।” দুনিয়ায় এই মুনাফিকরা যেমন মুসলমানদের সাথে প্রতারণা করতো, তেমনই সেদিন মুসলমানরা মুনাফিকদেরকে বলবেঃ “তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও ও আলোর সন্ধান কর।” এরা তখন ফিরে গিয়ে নূর বন্টনের জায়গায় হাযির হবে। কিন্তু সেখানে কিছুই পাবে না। এটাই আল্লাহ তা'আলার প্রতারণা, যার বর্ণনা নিম্নের আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা আল্লাহকে প্রতারিত করছে এবং আল্লাহও তাদেরকে। প্রতারিতকারী।” (৪:১৪২) অতঃপর তারা যখন সেখানে ফিরে যাবে তখন দেখবে যে, মুমিন ও তাদের মাঝে স্থাপিত হয়েছে একটি প্রাচীর যার একটি দরজা রয়েছে, ওর অভ্যন্তরে আছে রহমত এবং বহির্ভাগে রয়েছে শাস্তি। সুতরাং মুনাফিকরা নূর বন্টন হওয়ার সময় পর্যন্ত প্রতারণার মধ্যেই থাকবে। অতঃপর যখন মুমিনরা নূর পাবে এবং তারা পাবে না তখন রহস্য উঘাটিত হয়ে যাবে এবং তারা আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন অন্ধকার পূর্ণভাবে ছেয়ে যাবে এবং মানুষ তার হাতটিও দেখতে পাবে না তখন আল্লাহ তাআলা একটা নূর প্রকাশ করবেন। মুসলমান ঐ দিকে যাবে, তখন মুনাফিকরাও তাদের পিছনে পিছনে যেতে শুরু করবে। মুমিনরা যখন সামনের দিকে অনেক বেশী এগিয়ে যাবে তখন মুনাফিকরা তাদেরকে ডাক দিয়ে থামতে বলবে এবং তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিবে যে, দুনিয়ায় তারা সবাই তো এক সাথেই ছিল।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন মানুষকে তাদের গোপনীয়তা রক্ষার্থে তাদের নাম ধরে ধরে ডাক দিবেন। মুমিনরাও নূর পাবে এবং মুনফিকরাও পাবে। কিন্তু পুলসিরাতের উপর তাদের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হবে। যখন তারা পুলসিরাতের মাঝপথে পৌঁছবে তখন মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে। তারা তখন সন্ত্রস্ত থাকবে। সবারই অবস্থা অত্যন্ত করুণ হবে। সবাই নিজ নিজ জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। যে প্রাচীরের কথা এখানে বলা হয়েছে তা হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে পার্থক্যসীমা। এরই বর্ণনা (আরবী)-এর মধ্যে রয়েছে। সুতরাং জান্নাতে বিরাজ করবে রহমত ও শান্তি এবং জাহান্নামে থাকবে অশান্তি ও শাস্তি। সঠিক কথা এটাই। কিন্তু কারো কারো উক্তি এই যে, এর দ্বারা বায়তুল মুকাদ্দাসের প্রাচীরকে বুঝানো হয়েছে যা জাহান্নামের উপত্যকার নিকট থাকবে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা হলো বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকস্থ প্রাচীর, যার অভ্যন্তরে রয়েছে মসজিদ ইত্যাদি এবং বহির্ভাগে রয়েছে জাহান্নামের উপত্যকা। আরো কতক লোকেও একথাই বলেছেন। কিন্তু এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, এ আয়াতে নির্দিষ্টভাবে এই প্রাচীরই যে তাঁদের উদ্দেশ্য, তা নয়, বরং কাছাকাছি অর্থ হিসেবে এ আয়াতের তাফসীরে তারা এটা উল্লেখ করেছেন। কেননা, জান্নাত আকাশে সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে এবং জাহান্নাম সর্বনিম্ন স্তরে রয়েছে। হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতে যে দরজার বর্ণনা আছে এর দ্বারা মসজিদের বাবুর রহমত উদ্দেশ্য, এটা বানী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াত, যা আমাদের জন্যে সনদ হতে পারে না। সঠিক তত্ত্ব এই যে, প্রাচীরটি কিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফিরদের মাঝে প্রভেদ সৃষ্টি করার জন্যে দাঁড় করানো হবে। মুমিন তো এর দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তারপর দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। আর মুনাফিকরা হতবুদ্ধি হয়ে অন্ধকার ও শাস্তির মধ্যে থাকবে, যেমন তারা দুনিয়াতে কুফরী, অজ্ঞতা, সন্দেহ ও হতবুদ্ধিতার অন্ধকারে ছিল। এখন এই মুনাফিকরা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেঃ “দেখো, দুনিয়ায় আমরা তোমাদের সঙ্গেই ছিলাম, জুমআর নামায জামাআতের সাথে আদায় করতাম, আরাফাতে ও যুদ্ধের মাঠে এক সাথে থাকতাম এবং এক সাথে অবশ্যপালনীয় কাজগুলো পালন করতাম (সুতরাং আজ আমাদেরকে তোমাদের সাথেই থাকতে দাও, পৃথক করে দিয়ো না)।" তখন মুমিনরা বলবেঃ “দেখো, কথা তোমরা ঠিকই বলছো বটে, কিন্তু নিজেদের কৃতকর্মগুলোর প্রতি একটু লক্ষ্য কর তো! সারা জীবন তোমরা কুপ্রবৃত্তি ও আল্লাহর নাফরমানীর কাজে ডুবে থেকেছো। আজ তাওবা করবে, কাল মন্দ কাজ পরিত্যাগ করবে’ এ করতে করতেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছে এবং মুসলমানদের পরিনাম কি হয় তার দিকেই চেয়ে থেকেছে। কিয়ামত যে সংঘটিত হবেই এ বিশ্বাসও তোমাদের ছিল না, কিংবা তোমরা এই আশা পোষণ করতে যে, যদি কিয়ামত সংঘটিত হয়েও যায় তবে তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর মৃত্যু পর্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আল্লাহ তা'আলার দিকে ঝুঁকে পড়ার তোমরা তাওফীক লাভ করনি এবং আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে প্রতারক শয়তান তোমাদেরকে প্রতারণার মধ্যেই ফেলে রেখেছে। অবশেষে আজ তোমরা জাহান্নামে প্রবেশ করেছো।” ভাবার্থ হলোঃ হে মুনাফিকের দল! দৈহিকরূপে তোমরা আমাদের সাথে ছিলে বটে, কিন্তু অন্তর ও নিয়তের সাথে আমাদের সঙ্গে ছিলে না। বরং সন্দেহ ও রিয়াকারীর মধ্যেই পড়েছিলে এবং মন লাগিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করারও সৌভাগ্য তোমরা লাভ করনি।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই মুনাফিকরা মুমিনদের সাথে বিয়ে-শাদী, মজলিস-সমাবেশ এবং জীবন-মরণ ইত্যাদিতে শরীক থাকতো। কিন্তু কিয়ামতের দিন তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক করে দেয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ। তবে দক্ষিণ পার্শ্বস্থ ব্যক্তিরা নয়। তারা থাকবে উদ্যানে এবং তারা জিজ্ঞাসাবাদ করবেতোমাদেরকে কি সে সাকারে (জাহান্নামে) নিক্ষেপ করেছে? তারা বলবেঃ আমরা মুসল্লীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। আমরা অভাবগ্রস্তদেরকে আহার্য দান করতাম না এবং আমরা আলোচনাকারীদের সাথে আলোচনায় নিমগ্ন থাকতাম। আমরা কর্মফল অস্বীকার করতাম, আমাদের নিকট মৃত্যুর আগমন পর্যন্ত।” (৭৪:৩৮-৪৭) প্রকাশ থাকে যে, এ প্রশ্ন করা হবে শুধু তাদেরকে ধমক, শাসন গর্জন এবং লজ্জিত করার জন্যে। আসলে তো প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে মুসলমানরা পূর্ণমাত্রায় ওয়াকিফহাল থাকবে।অতঃপর ওখানে যেমন বলা হয়েছিল যে, কারো সুপারিশ তাদের কোন • উপকার করবে না, অনুরূপভাবে এখানে বলেনঃ আজ তোমাদের নিকট হতে কোন মুক্তিপণ গ্রহণ করা হবে না এবং যারা কুফরী করেছিল তাদের নিকট হতেও না, যদি তারা যমীন ভর্তি সোনাও প্রদান করে। তাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। এটাই তাদের যোগ্য স্থান, কত নিকৃষ্ট এই পরিণাম।
আল-হাদীদ 57:14
১২-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: দান-খয়রাতকারী মুমিনদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ কিয়ামতের দিন তারা তাদের সৎ আমল অনুযায়ী নূর বা জ্যোতি লাভ করবে। ঐ জ্যোতি তাদের সাথে সাথে থাকবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, তাদের কারো কারো জ্যোতি হবে পাহাড়ের সমান, কারো হবে খেজুরের গাছের সমান এবং কারো হবে দণ্ডায়মান মানুষের দেহের সমান। যে পাপী মুমিনদের জ্যোতি সবচেয়ে কম হবে তার শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলির উপর নূর থাকবে, যা কখনো জ্বলবে এবং কখনো নিভে যাবে। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কোন মুমিন এমন হবে যার নূর এই পরিমাণ হবে যে পরিমাণ দূরত্ব মদীনা ও আদনের মাঝে রয়েছে। কারো এর চেয়ে কম হবে, কারো এর চেয়ে আরো কম হবে। কারো নূর এতো কম হবে যে, তার পদদ্বয়ের পার্শ্বই শুধু আলোকিত হবে।” হযরত হুব্বাদ ইবনে উমাইয়া (রঃ) বলেনঃ হে লোক সকল! তোমাদের নাম পিতাসহ এবং বিশেষ নিদর্শনসহ আল্লাহ তা'আলার নিকট লিখিত রয়েছে। অনুরূপভাবে তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় আমলও লিখিত আছে। কিয়ামতের দিন নাম নিয়ে নিয়ে ডাক দিয়ে বলা হবেঃ হে অমুক! এটা তোমার জ্যোতি। হে অমুক! তোমার কোন নূর আমার কাছে নেই। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন।হযরত যহহাক (রঃ) বলেনঃ প্রথমে তো প্রত্যেক লোককেই নূর দেয়া হবে। কিন্তু যখন পুলসিরাতের উপর যাবে তখন মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে। এ দেখে মুমিনরাও ভীত হয়ে পড়বে যে, না জানি হয়তো তাদেরও জ্যোতি নিভে যাবে। তখন তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে আমাদের নূর পুরো করে দিন!”হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতে বর্ণিত নূর বা জ্যোতি দ্বারা পুলসিরাতের উপর নূর লাভ করাকে বুঝানো হয়েছে। যাতে ঐ অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থান সহজেই অতিক্রম করা যায়। হযরত আবু দারদা (রাঃ) ও হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আমাকেই সিজদার অনুমতি দেয়া হবে এবং অনুরূপভাবে সর্বপ্রথম আমাকেই সিজদা হতে মাথা উঠাবারও হুকুম দেয়া হবে। আমি সামনে, পিছনে, ডানে ও বামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে এবং নিজের উম্মতকে চিনে নিবো।” তখন একজন লোক প্রশ্ন করলেনঃ “হযরত নূহ (আঃ) থেকে নিয়ে আপনি পর্যন্ত সবারই উম্মত হাশরের ময়ানে একত্রিত হবে। সুতরাং এতোগুলো উম্মতের মধ্য হতে আপনার উম্মতকে আপনি কি করে চিনতে পারবেন?” জবাবে তিনি বললেনঃ “আমার উম্মতের অযুর অঙ্গগুলো অযুর কারণে চমকাতে থাকবে, এই বিশেষণ অন্য কোন উম্মতের মধ্যে থাকবে না। আর আমার উম্মতকে ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে এবং তাদের চেহারা হবে উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময়। আর তাদের নূর বা জ্যোতি তাদের অগ্রে অগ্রে চলতে থাকবে এবং তাদের সন্তানরা তাদের সঙ্গে থাকবে।” যহহাক (রঃ) বলেন যে, তাদের আমল নামা তাদের ডান হাতে থাকবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যাকে তার ডান হাতে কিতাব (আমলনামা) দেয়া হবে (শেষ পর্যন্ত)।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেথায় তোমরা স্থায়ী হবে, এটাই মহাসাফল্য। এর পরবর্তী আয়াতে কিয়ামতের মাঠের ভয়াবহ ও কম্পন সৃষ্টিকারী ঘটনার বর্ণনা রয়েছে যে, তথায় খাঁটি ঈমানদার সৎকর্মশীল লোক ছাড়া আর কেউই পরিত্রাণ পাবে না।হযরত সুলায়েম ইবনে আমির (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, বাবে দামেশকে আমরা একটি জানাযায় ছিলাম। যখন জানাযার নামায শেষ হয় এবং মৃতদেহ দাফন করার কাজ শুরু হয় তখন হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা এই দুনিয়ার মনযিলে সকাল-সন্ধ্যা করছে। তোমরা এখানে পুণ্য কার্যও করতে পার এবং পাপ কার্যও করতে পার। এরপরে অন্য মনযিলের দিকে তোমাদেরকে যাত্রা শুরু করতে হবে। এই কবরই হচ্ছে ঐ মনযিল যা নির্জনতা, অন্ধকার, পোকা-মাকড় এবং সংকীর্ণতার ঘর। কিন্তু যাকে আল্লাহ প্রশস্ততা দান করেন সেটা অন্য কথা। এরপর তোমরা কিয়ামত মাঠের বিভিন্ন স্থানে গমন করবে। এক জায়গায় বহু লোকের চেহারা সাদা-উজ্জ্বল হবে এবং বহু লোকের চেহারা হবে কালো কুৎসিত। তারপর এক ময়দানে যাবে যেখানে হবে কঠিন অন্ধকার। সেখানে ঈমানদারদেরকে নূর বা জ্যোতি বন্টন করা হবে। সেখানে কাফির ও মুনাফিকদের জন্যে কোন জ্যোতি থাকবে না। এরই বর্ণনা নিম্নের আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অথবা গভীর সমুদ্র তলের অন্ধকার সদৃশ যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ যার উর্ধে মেঘপুঞ্জ, অন্ধকারপুঞ্জ স্তরের উপর স্তর, এমনকি সে হাত বের করলে তা আদৌ দেখতে পাবে না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দান করেন না তার জন্যে কোন জ্যোতিই নেই।” (২৪:৪০) সুতরাং যেমন চক্ষুষ্মনদের। দৃষ্টিশক্তি দ্বারা অন্ধ ব্যক্তি কোন উপকার লাভ করতে পারে না, তেমনই মুনাফিক ও কাফিররা ঈমানদারদের নূর বা জ্যোতি দ্বারা কোন উপকার লাভ করতে সক্ষম হবে না। মুনাফিক ঈমানদারের কাছে আবেদন জানাবেঃ “তোমরা এতো বেশী সামনের দিকে এগিয়ে যেয়ো না, একটু থামো, যাতে আমরাও তোমাদের জ্যোতিকে আশ্রয় করে চলতে পারি ।” দুনিয়ায় এই মুনাফিকরা যেমন মুসলমানদের সাথে প্রতারণা করতো, তেমনই সেদিন মুসলমানরা মুনাফিকদেরকে বলবেঃ “তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও ও আলোর সন্ধান কর।” এরা তখন ফিরে গিয়ে নূর বন্টনের জায়গায় হাযির হবে। কিন্তু সেখানে কিছুই পাবে না। এটাই আল্লাহ তা'আলার প্রতারণা, যার বর্ণনা নিম্নের আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা আল্লাহকে প্রতারিত করছে এবং আল্লাহও তাদেরকে। প্রতারিতকারী।” (৪:১৪২) অতঃপর তারা যখন সেখানে ফিরে যাবে তখন দেখবে যে, মুমিন ও তাদের মাঝে স্থাপিত হয়েছে একটি প্রাচীর যার একটি দরজা রয়েছে, ওর অভ্যন্তরে আছে রহমত এবং বহির্ভাগে রয়েছে শাস্তি। সুতরাং মুনাফিকরা নূর বন্টন হওয়ার সময় পর্যন্ত প্রতারণার মধ্যেই থাকবে। অতঃপর যখন মুমিনরা নূর পাবে এবং তারা পাবে না তখন রহস্য উঘাটিত হয়ে যাবে এবং তারা আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন অন্ধকার পূর্ণভাবে ছেয়ে যাবে এবং মানুষ তার হাতটিও দেখতে পাবে না তখন আল্লাহ তাআলা একটা নূর প্রকাশ করবেন। মুসলমান ঐ দিকে যাবে, তখন মুনাফিকরাও তাদের পিছনে পিছনে যেতে শুরু করবে। মুমিনরা যখন সামনের দিকে অনেক বেশী এগিয়ে যাবে তখন মুনাফিকরা তাদেরকে ডাক দিয়ে থামতে বলবে এবং তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিবে যে, দুনিয়ায় তারা সবাই তো এক সাথেই ছিল।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন মানুষকে তাদের গোপনীয়তা রক্ষার্থে তাদের নাম ধরে ধরে ডাক দিবেন। মুমিনরাও নূর পাবে এবং মুনফিকরাও পাবে। কিন্তু পুলসিরাতের উপর তাদের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হবে। যখন তারা পুলসিরাতের মাঝপথে পৌঁছবে তখন মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে। তারা তখন সন্ত্রস্ত থাকবে। সবারই অবস্থা অত্যন্ত করুণ হবে। সবাই নিজ নিজ জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। যে প্রাচীরের কথা এখানে বলা হয়েছে তা হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে পার্থক্যসীমা। এরই বর্ণনা (আরবী)-এর মধ্যে রয়েছে। সুতরাং জান্নাতে বিরাজ করবে রহমত ও শান্তি এবং জাহান্নামে থাকবে অশান্তি ও শাস্তি। সঠিক কথা এটাই। কিন্তু কারো কারো উক্তি এই যে, এর দ্বারা বায়তুল মুকাদ্দাসের প্রাচীরকে বুঝানো হয়েছে যা জাহান্নামের উপত্যকার নিকট থাকবে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা হলো বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকস্থ প্রাচীর, যার অভ্যন্তরে রয়েছে মসজিদ ইত্যাদি এবং বহির্ভাগে রয়েছে জাহান্নামের উপত্যকা। আরো কতক লোকেও একথাই বলেছেন। কিন্তু এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, এ আয়াতে নির্দিষ্টভাবে এই প্রাচীরই যে তাঁদের উদ্দেশ্য, তা নয়, বরং কাছাকাছি অর্থ হিসেবে এ আয়াতের তাফসীরে তারা এটা উল্লেখ করেছেন। কেননা, জান্নাত আকাশে সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে এবং জাহান্নাম সর্বনিম্ন স্তরে রয়েছে। হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতে যে দরজার বর্ণনা আছে এর দ্বারা মসজিদের বাবুর রহমত উদ্দেশ্য, এটা বানী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াত, যা আমাদের জন্যে সনদ হতে পারে না। সঠিক তত্ত্ব এই যে, প্রাচীরটি কিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফিরদের মাঝে প্রভেদ সৃষ্টি করার জন্যে দাঁড় করানো হবে। মুমিন তো এর দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তারপর দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। আর মুনাফিকরা হতবুদ্ধি হয়ে অন্ধকার ও শাস্তির মধ্যে থাকবে, যেমন তারা দুনিয়াতে কুফরী, অজ্ঞতা, সন্দেহ ও হতবুদ্ধিতার অন্ধকারে ছিল। এখন এই মুনাফিকরা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেঃ “দেখো, দুনিয়ায় আমরা তোমাদের সঙ্গেই ছিলাম, জুমআর নামায জামাআতের সাথে আদায় করতাম, আরাফাতে ও যুদ্ধের মাঠে এক সাথে থাকতাম এবং এক সাথে অবশ্যপালনীয় কাজগুলো পালন করতাম (সুতরাং আজ আমাদেরকে তোমাদের সাথেই থাকতে দাও, পৃথক করে দিয়ো না)।" তখন মুমিনরা বলবেঃ “দেখো, কথা তোমরা ঠিকই বলছো বটে, কিন্তু নিজেদের কৃতকর্মগুলোর প্রতি একটু লক্ষ্য কর তো! সারা জীবন তোমরা কুপ্রবৃত্তি ও আল্লাহর নাফরমানীর কাজে ডুবে থেকেছো। আজ তাওবা করবে, কাল মন্দ কাজ পরিত্যাগ করবে’ এ করতে করতেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছে এবং মুসলমানদের পরিনাম কি হয় তার দিকেই চেয়ে থেকেছে। কিয়ামত যে সংঘটিত হবেই এ বিশ্বাসও তোমাদের ছিল না, কিংবা তোমরা এই আশা পোষণ করতে যে, যদি কিয়ামত সংঘটিত হয়েও যায় তবে তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর মৃত্যু পর্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আল্লাহ তা'আলার দিকে ঝুঁকে পড়ার তোমরা তাওফীক লাভ করনি এবং আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে প্রতারক শয়তান তোমাদেরকে প্রতারণার মধ্যেই ফেলে রেখেছে। অবশেষে আজ তোমরা জাহান্নামে প্রবেশ করেছো।” ভাবার্থ হলোঃ হে মুনাফিকের দল! দৈহিকরূপে তোমরা আমাদের সাথে ছিলে বটে, কিন্তু অন্তর ও নিয়তের সাথে আমাদের সঙ্গে ছিলে না। বরং সন্দেহ ও রিয়াকারীর মধ্যেই পড়েছিলে এবং মন লাগিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করারও সৌভাগ্য তোমরা লাভ করনি।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই মুনাফিকরা মুমিনদের সাথে বিয়ে-শাদী, মজলিস-সমাবেশ এবং জীবন-মরণ ইত্যাদিতে শরীক থাকতো। কিন্তু কিয়ামতের দিন তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক করে দেয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ। তবে দক্ষিণ পার্শ্বস্থ ব্যক্তিরা নয়। তারা থাকবে উদ্যানে এবং তারা জিজ্ঞাসাবাদ করবেতোমাদেরকে কি সে সাকারে (জাহান্নামে) নিক্ষেপ করেছে? তারা বলবেঃ আমরা মুসল্লীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। আমরা অভাবগ্রস্তদেরকে আহার্য দান করতাম না এবং আমরা আলোচনাকারীদের সাথে আলোচনায় নিমগ্ন থাকতাম। আমরা কর্মফল অস্বীকার করতাম, আমাদের নিকট মৃত্যুর আগমন পর্যন্ত।” (৭৪:৩৮-৪৭) প্রকাশ থাকে যে, এ প্রশ্ন করা হবে শুধু তাদেরকে ধমক, শাসন গর্জন এবং লজ্জিত করার জন্যে। আসলে তো প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে মুসলমানরা পূর্ণমাত্রায় ওয়াকিফহাল থাকবে।অতঃপর ওখানে যেমন বলা হয়েছিল যে, কারো সুপারিশ তাদের কোন • উপকার করবে না, অনুরূপভাবে এখানে বলেনঃ আজ তোমাদের নিকট হতে কোন মুক্তিপণ গ্রহণ করা হবে না এবং যারা কুফরী করেছিল তাদের নিকট হতেও না, যদি তারা যমীন ভর্তি সোনাও প্রদান করে। তাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। এটাই তাদের যোগ্য স্থান, কত নিকৃষ্ট এই পরিণাম।
আল-হাদীদ 57:15
১২-১৫ নং আয়াতের তাফসীর: দান-খয়রাতকারী মুমিনদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ কিয়ামতের দিন তারা তাদের সৎ আমল অনুযায়ী নূর বা জ্যোতি লাভ করবে। ঐ জ্যোতি তাদের সাথে সাথে থাকবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, তাদের কারো কারো জ্যোতি হবে পাহাড়ের সমান, কারো হবে খেজুরের গাছের সমান এবং কারো হবে দণ্ডায়মান মানুষের দেহের সমান। যে পাপী মুমিনদের জ্যোতি সবচেয়ে কম হবে তার শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলির উপর নূর থাকবে, যা কখনো জ্বলবে এবং কখনো নিভে যাবে। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন কোন মুমিন এমন হবে যার নূর এই পরিমাণ হবে যে পরিমাণ দূরত্ব মদীনা ও আদনের মাঝে রয়েছে। কারো এর চেয়ে কম হবে, কারো এর চেয়ে আরো কম হবে। কারো নূর এতো কম হবে যে, তার পদদ্বয়ের পার্শ্বই শুধু আলোকিত হবে।” হযরত হুব্বাদ ইবনে উমাইয়া (রঃ) বলেনঃ হে লোক সকল! তোমাদের নাম পিতাসহ এবং বিশেষ নিদর্শনসহ আল্লাহ তা'আলার নিকট লিখিত রয়েছে। অনুরূপভাবে তোমাদের প্রকাশ্য ও গোপনীয় আমলও লিখিত আছে। কিয়ামতের দিন নাম নিয়ে নিয়ে ডাক দিয়ে বলা হবেঃ হে অমুক! এটা তোমার জ্যোতি। হে অমুক! তোমার কোন নূর আমার কাছে নেই। অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন।হযরত যহহাক (রঃ) বলেনঃ প্রথমে তো প্রত্যেক লোককেই নূর দেয়া হবে। কিন্তু যখন পুলসিরাতের উপর যাবে তখন মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে। এ দেখে মুমিনরাও ভীত হয়ে পড়বে যে, না জানি হয়তো তাদেরও জ্যোতি নিভে যাবে। তখন তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে আমাদের নূর পুরো করে দিন!”হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতে বর্ণিত নূর বা জ্যোতি দ্বারা পুলসিরাতের উপর নূর লাভ করাকে বুঝানো হয়েছে। যাতে ঐ অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থান সহজেই অতিক্রম করা যায়। হযরত আবু দারদা (রাঃ) ও হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আমাকেই সিজদার অনুমতি দেয়া হবে এবং অনুরূপভাবে সর্বপ্রথম আমাকেই সিজদা হতে মাথা উঠাবারও হুকুম দেয়া হবে। আমি সামনে, পিছনে, ডানে ও বামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে এবং নিজের উম্মতকে চিনে নিবো।” তখন একজন লোক প্রশ্ন করলেনঃ “হযরত নূহ (আঃ) থেকে নিয়ে আপনি পর্যন্ত সবারই উম্মত হাশরের ময়ানে একত্রিত হবে। সুতরাং এতোগুলো উম্মতের মধ্য হতে আপনার উম্মতকে আপনি কি করে চিনতে পারবেন?” জবাবে তিনি বললেনঃ “আমার উম্মতের অযুর অঙ্গগুলো অযুর কারণে চমকাতে থাকবে, এই বিশেষণ অন্য কোন উম্মতের মধ্যে থাকবে না। আর আমার উম্মতকে ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে এবং তাদের চেহারা হবে উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময়। আর তাদের নূর বা জ্যোতি তাদের অগ্রে অগ্রে চলতে থাকবে এবং তাদের সন্তানরা তাদের সঙ্গে থাকবে।” যহহাক (রঃ) বলেন যে, তাদের আমল নামা তাদের ডান হাতে থাকবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যাকে তার ডান হাতে কিতাব (আমলনামা) দেয়া হবে (শেষ পর্যন্ত)।”মহান আল্লাহ বলেনঃ “আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেথায় তোমরা স্থায়ী হবে, এটাই মহাসাফল্য। এর পরবর্তী আয়াতে কিয়ামতের মাঠের ভয়াবহ ও কম্পন সৃষ্টিকারী ঘটনার বর্ণনা রয়েছে যে, তথায় খাঁটি ঈমানদার সৎকর্মশীল লোক ছাড়া আর কেউই পরিত্রাণ পাবে না।হযরত সুলায়েম ইবনে আমির (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, বাবে দামেশকে আমরা একটি জানাযায় ছিলাম। যখন জানাযার নামায শেষ হয় এবং মৃতদেহ দাফন করার কাজ শুরু হয় তখন হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা এই দুনিয়ার মনযিলে সকাল-সন্ধ্যা করছে। তোমরা এখানে পুণ্য কার্যও করতে পার এবং পাপ কার্যও করতে পার। এরপরে অন্য মনযিলের দিকে তোমাদেরকে যাত্রা শুরু করতে হবে। এই কবরই হচ্ছে ঐ মনযিল যা নির্জনতা, অন্ধকার, পোকা-মাকড় এবং সংকীর্ণতার ঘর। কিন্তু যাকে আল্লাহ প্রশস্ততা দান করেন সেটা অন্য কথা। এরপর তোমরা কিয়ামত মাঠের বিভিন্ন স্থানে গমন করবে। এক জায়গায় বহু লোকের চেহারা সাদা-উজ্জ্বল হবে এবং বহু লোকের চেহারা হবে কালো কুৎসিত। তারপর এক ময়দানে যাবে যেখানে হবে কঠিন অন্ধকার। সেখানে ঈমানদারদেরকে নূর বা জ্যোতি বন্টন করা হবে। সেখানে কাফির ও মুনাফিকদের জন্যে কোন জ্যোতি থাকবে না। এরই বর্ণনা নিম্নের আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অথবা গভীর সমুদ্র তলের অন্ধকার সদৃশ যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ যার উর্ধে মেঘপুঞ্জ, অন্ধকারপুঞ্জ স্তরের উপর স্তর, এমনকি সে হাত বের করলে তা আদৌ দেখতে পাবে না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দান করেন না তার জন্যে কোন জ্যোতিই নেই।” (২৪:৪০) সুতরাং যেমন চক্ষুষ্মনদের। দৃষ্টিশক্তি দ্বারা অন্ধ ব্যক্তি কোন উপকার লাভ করতে পারে না, তেমনই মুনাফিক ও কাফিররা ঈমানদারদের নূর বা জ্যোতি দ্বারা কোন উপকার লাভ করতে সক্ষম হবে না। মুনাফিক ঈমানদারের কাছে আবেদন জানাবেঃ “তোমরা এতো বেশী সামনের দিকে এগিয়ে যেয়ো না, একটু থামো, যাতে আমরাও তোমাদের জ্যোতিকে আশ্রয় করে চলতে পারি ।” দুনিয়ায় এই মুনাফিকরা যেমন মুসলমানদের সাথে প্রতারণা করতো, তেমনই সেদিন মুসলমানরা মুনাফিকদেরকে বলবেঃ “তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও ও আলোর সন্ধান কর।” এরা তখন ফিরে গিয়ে নূর বন্টনের জায়গায় হাযির হবে। কিন্তু সেখানে কিছুই পাবে না। এটাই আল্লাহ তা'আলার প্রতারণা, যার বর্ণনা নিম্নের আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা আল্লাহকে প্রতারিত করছে এবং আল্লাহও তাদেরকে। প্রতারিতকারী।” (৪:১৪২) অতঃপর তারা যখন সেখানে ফিরে যাবে তখন দেখবে যে, মুমিন ও তাদের মাঝে স্থাপিত হয়েছে একটি প্রাচীর যার একটি দরজা রয়েছে, ওর অভ্যন্তরে আছে রহমত এবং বহির্ভাগে রয়েছে শাস্তি। সুতরাং মুনাফিকরা নূর বন্টন হওয়ার সময় পর্যন্ত প্রতারণার মধ্যেই থাকবে। অতঃপর যখন মুমিনরা নূর পাবে এবং তারা পাবে না তখন রহস্য উঘাটিত হয়ে যাবে এবং তারা আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন অন্ধকার পূর্ণভাবে ছেয়ে যাবে এবং মানুষ তার হাতটিও দেখতে পাবে না তখন আল্লাহ তাআলা একটা নূর প্রকাশ করবেন। মুসলমান ঐ দিকে যাবে, তখন মুনাফিকরাও তাদের পিছনে পিছনে যেতে শুরু করবে। মুমিনরা যখন সামনের দিকে অনেক বেশী এগিয়ে যাবে তখন মুনাফিকরা তাদেরকে ডাক দিয়ে থামতে বলবে এবং তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিবে যে, দুনিয়ায় তারা সবাই তো এক সাথেই ছিল।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন মানুষকে তাদের গোপনীয়তা রক্ষার্থে তাদের নাম ধরে ধরে ডাক দিবেন। মুমিনরাও নূর পাবে এবং মুনফিকরাও পাবে। কিন্তু পুলসিরাতের উপর তাদের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হবে। যখন তারা পুলসিরাতের মাঝপথে পৌঁছবে তখন মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে। তারা তখন সন্ত্রস্ত থাকবে। সবারই অবস্থা অত্যন্ত করুণ হবে। সবাই নিজ নিজ জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। যে প্রাচীরের কথা এখানে বলা হয়েছে তা হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে পার্থক্যসীমা। এরই বর্ণনা (আরবী)-এর মধ্যে রয়েছে। সুতরাং জান্নাতে বিরাজ করবে রহমত ও শান্তি এবং জাহান্নামে থাকবে অশান্তি ও শাস্তি। সঠিক কথা এটাই। কিন্তু কারো কারো উক্তি এই যে, এর দ্বারা বায়তুল মুকাদ্দাসের প্রাচীরকে বুঝানো হয়েছে যা জাহান্নামের উপত্যকার নিকট থাকবে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা হলো বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকস্থ প্রাচীর, যার অভ্যন্তরে রয়েছে মসজিদ ইত্যাদি এবং বহির্ভাগে রয়েছে জাহান্নামের উপত্যকা। আরো কতক লোকেও একথাই বলেছেন। কিন্তু এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, এ আয়াতে নির্দিষ্টভাবে এই প্রাচীরই যে তাঁদের উদ্দেশ্য, তা নয়, বরং কাছাকাছি অর্থ হিসেবে এ আয়াতের তাফসীরে তারা এটা উল্লেখ করেছেন। কেননা, জান্নাত আকাশে সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে এবং জাহান্নাম সর্বনিম্ন স্তরে রয়েছে। হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতে যে দরজার বর্ণনা আছে এর দ্বারা মসজিদের বাবুর রহমত উদ্দেশ্য, এটা বানী ইসরাঈলের রিওয়াইয়াত, যা আমাদের জন্যে সনদ হতে পারে না। সঠিক তত্ত্ব এই যে, প্রাচীরটি কিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফিরদের মাঝে প্রভেদ সৃষ্টি করার জন্যে দাঁড় করানো হবে। মুমিন তো এর দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তারপর দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। আর মুনাফিকরা হতবুদ্ধি হয়ে অন্ধকার ও শাস্তির মধ্যে থাকবে, যেমন তারা দুনিয়াতে কুফরী, অজ্ঞতা, সন্দেহ ও হতবুদ্ধিতার অন্ধকারে ছিল। এখন এই মুনাফিকরা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেঃ “দেখো, দুনিয়ায় আমরা তোমাদের সঙ্গেই ছিলাম, জুমআর নামায জামাআতের সাথে আদায় করতাম, আরাফাতে ও যুদ্ধের মাঠে এক সাথে থাকতাম এবং এক সাথে অবশ্যপালনীয় কাজগুলো পালন করতাম (সুতরাং আজ আমাদেরকে তোমাদের সাথেই থাকতে দাও, পৃথক করে দিয়ো না)।" তখন মুমিনরা বলবেঃ “দেখো, কথা তোমরা ঠিকই বলছো বটে, কিন্তু নিজেদের কৃতকর্মগুলোর প্রতি একটু লক্ষ্য কর তো! সারা জীবন তোমরা কুপ্রবৃত্তি ও আল্লাহর নাফরমানীর কাজে ডুবে থেকেছো। আজ তাওবা করবে, কাল মন্দ কাজ পরিত্যাগ করবে’ এ করতে করতেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছে এবং মুসলমানদের পরিনাম কি হয় তার দিকেই চেয়ে থেকেছে। কিয়ামত যে সংঘটিত হবেই এ বিশ্বাসও তোমাদের ছিল না, কিংবা তোমরা এই আশা পোষণ করতে যে, যদি কিয়ামত সংঘটিত হয়েও যায় তবে তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর মৃত্যু পর্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আল্লাহ তা'আলার দিকে ঝুঁকে পড়ার তোমরা তাওফীক লাভ করনি এবং আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে প্রতারক শয়তান তোমাদেরকে প্রতারণার মধ্যেই ফেলে রেখেছে। অবশেষে আজ তোমরা জাহান্নামে প্রবেশ করেছো।” ভাবার্থ হলোঃ হে মুনাফিকের দল! দৈহিকরূপে তোমরা আমাদের সাথে ছিলে বটে, কিন্তু অন্তর ও নিয়তের সাথে আমাদের সঙ্গে ছিলে না। বরং সন্দেহ ও রিয়াকারীর মধ্যেই পড়েছিলে এবং মন লাগিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করারও সৌভাগ্য তোমরা লাভ করনি।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই মুনাফিকরা মুমিনদের সাথে বিয়ে-শাদী, মজলিস-সমাবেশ এবং জীবন-মরণ ইত্যাদিতে শরীক থাকতো। কিন্তু কিয়ামতের দিন তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক করে দেয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ। তবে দক্ষিণ পার্শ্বস্থ ব্যক্তিরা নয়। তারা থাকবে উদ্যানে এবং তারা জিজ্ঞাসাবাদ করবেতোমাদেরকে কি সে সাকারে (জাহান্নামে) নিক্ষেপ করেছে? তারা বলবেঃ আমরা মুসল্লীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। আমরা অভাবগ্রস্তদেরকে আহার্য দান করতাম না এবং আমরা আলোচনাকারীদের সাথে আলোচনায় নিমগ্ন থাকতাম। আমরা কর্মফল অস্বীকার করতাম, আমাদের নিকট মৃত্যুর আগমন পর্যন্ত।” (৭৪:৩৮-৪৭) প্রকাশ থাকে যে, এ প্রশ্ন করা হবে শুধু তাদেরকে ধমক, শাসন গর্জন এবং লজ্জিত করার জন্যে। আসলে তো প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে মুসলমানরা পূর্ণমাত্রায় ওয়াকিফহাল থাকবে।অতঃপর ওখানে যেমন বলা হয়েছিল যে, কারো সুপারিশ তাদের কোন • উপকার করবে না, অনুরূপভাবে এখানে বলেনঃ আজ তোমাদের নিকট হতে কোন মুক্তিপণ গ্রহণ করা হবে না এবং যারা কুফরী করেছিল তাদের নিকট হতেও না, যদি তারা যমীন ভর্তি সোনাও প্রদান করে। তাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। এটাই তাদের যোগ্য স্থান, কত নিকৃষ্ট এই পরিণাম।
আল-হাদীদ 57:16
১৬-১৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ মুমিনদের জন্যে কি এখন পর্যন্ত ঐ সময় আসেনি যে, তারা আল্লাহর যিকির, নসীহত, কুরআনের আয়াতসমূহ এবং নবী (সঃ)-এর হাদীসসমূহ শুনে তাদের হৃদয় বিগলিত হয়? তারা শুনে ও মানে, আদেশসমূহ পালন করে এবং নিষিদ্ধ জিনিস হতে বিরত থাকে?হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম অবতীর্ণ হতে হতে তেরো বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়, এরপরেও মুসলমানদের অন্তর ইসলামের প্রতি পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়নি, এখানে এরই অভিযোগ করা হয়েছে।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “চার বছর অতিক্রান্ত হতেই আমাদেরকে এ ব্যাপারে নিন্দে করে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।"সাহাবীগণ (রাঃ) দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের নিকট কিছু বর্ণনা করুন।” তখন (আরবী) অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ)! আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি ।" (১২-৩) কিছুদিন পর আবার তারা এই আরজই করলে আল্লাহ তা'আলা (আরবী) অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ “আল্লাহ উত্তম বাণী অবতীর্ণ করেছেন।” (৩৯:২৩) আরো কিছুদিন পর পুনরায় তাঁরা একথাই বললে আল্লাহ তা'আলা ... (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন।হযরত শাদ্দাদ ইবনে আউস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষের মধ্য হতে প্রথম (ভাল বিষয়) যা উঠে যাবে তা হবে এই বিনয়-নম্রতা।” এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদের মত যেন এরা না হয়, বহুকাল অতিক্রান্ত হয়ে গেলে যাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে পড়েছিল। আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে ইয়াহুদী নাসারার মত হতে নিষেধ করছেন। তারা আল্লাহর কিতাবকে পরিবর্তন করে ফেলেছিল। স্বল্প মূল্যের বিনিময়ে ওকে বিক্রি করে দিয়েছিল। কিতাবুল্লাহকে পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে নিজেদের মনগড়া মত ও কিয়াসের পিছনে পড়ে গিয়েছিল। নিজেদের আবিষ্কৃত উক্তিগুলো তারা মানতে থাকে। আল্লাহর দ্বীনে তারা অন্যদের অন্ধ অনুকরণ করতে থাকে। নিজেদের আলেম ও দরবেশদের সনদ বিহীন কথাগুলো তারা দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয়। এই দুস্কার্যের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয় কঠোর করে দেন। আল্লাহ তা'আলার হাজারো কথা শুনালেও তাদের অন্তর নরম হয় না। কোন ওয়াজ নসীহত তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। কোন প্রতিশ্রুতি ও ভীতি প্রদর্শন তাদের অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরাতে সক্ষম হয় না। তাদের অধিকাংশই ফাসেক ও প্রকাশ্য দুষ্কৃতিকারী হয়ে যায়। তাদের অন্তর অপবিত্র এবং আমল অপরিপক্ক হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমি তাদের উপর অভিসম্পাত নাযিল করেছি ও তাদের অন্তর কঠোর করে দিয়েছি, তারা কথাগুলো স্বস্থান হতে ফিরিয়ে দেয় এবং আমার উপদেশাবলী তারা ভুলে যায়।” (৫:১৩) অর্থাৎ তাদের অন্তর নষ্ট হয়ে যায়। তাই তারা আল্লাহর কথাগুলোর পরিবর্তন ঘটায়, সৎকার্যাবলী পরিত্যাগ করে এবং অসৎকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এ জন্যেই রাব্দুল আ’লামীন এই উম্মতকে সতর্ক করছেনঃ সাবধান! তোমরা ইয়াহুদী ও নাসারাদের মত হয়ো না। সর্বদিক দিয়েই তাদের হতে পৃথক থাকো।হযরত রাবী ইবনে আবি উমাইলা (রাঃ) বলেন, কুরআন হাদীসের মিষ্টত্ব তো অনস্বীকার্য বটেই, কিন্তু আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে একটি খুবই প্রিয় ও মধুর কথা শুনেছি যা আমাকে অত্যন্ত মুগ্ধ করেছে। তিনি বলেছেনঃ “যখন বানী ইসরাঈলের আসমানী কিতাবের উপর কয়েক যুগ অতিবাহিত হলো তখন তারা কিছু কিতাব নিজেরাই রচনা করে নিলো এবং তাতে ঐ মাসআলাগুলো লিপিবদ্ধ করলো যেগুলো তাদের নিকট পছন্দনীয় ছিল। ওগুলো ছিল তাদের নিজেদেরই মস্তিষ্ক প্রসূত। এখন তারা সানন্দে জিহ্বা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওগুলো পড়তে লাগলো। ওগুলোর অধিকাংশ মাসআলা আল্লাহর কিতাবের বিপরীত ছিল। যেসব হুকুম মানতে তাদের মন চাইতো না তা তারা পরিবর্তন করে দিতো এবং নিজেদের রচিত কিতাবে নিজেদের চাহিদা মত মাসআলা জমা করে নিতো। ঐগুলোর উপরই তারা আমল করতো। এখন তারা জনগণকেও মানতে উদ্বুদ্ধ করলো। তাদেরকে তারা এরই দাওয়াত দিলো এবং জোরপূর্বক মানাতে শুরু করলো। এমনকি যারা মানতে অস্বীকার করতে তাদেরকে তারা শাস্তি দিতো, কষ্ট দিতো, মারপিঠ করতো এবং হত্যা করে। ফেলতেও কুণ্ঠিত হতো না। তাদের মধ্যে একজন আল্লাহওয়ালা, আলেম ও মুত্তাকী লোক ছিলেন। তিনি তাদের শক্তি ও বাড়াবাড়িতে ভীত হয়ে আল্লাহর। কিতাবকে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম জিনিসে লিখে একটি শিঙ্গায় ভরে দেন এবং ঐ শিঙ্গাটিকে স্বীয় স্কন্ধে লটকিয়ে দেন। তাদের দুষ্কার্য ও হত্যাকাণ্ড দিন দিন বেড়েই চললো। শেষ পর্যন্ত তারা ঐ লোকদেরকে হত্যা করে ফেললো যারা আল্লাহর কিতাবের উপর আমলকারী ছিলেন। অতঃপর তারা পরস্পর পরামর্শ করলোঃ “দেখো, এভাবে এক এক করে কতজনকে আর হত্যা করতে থাকবে? এদের বড় আলেম, আমাদের এই কিতাবকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকারকারী এবং সমস্ত বানী ইসরাঈলের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহর কিতাবের উপর আমলকারী অমুক আলেম রয়েছেন, তাঁকে ধরে নিয়ে এসো এবং তার সামনে তোমাদের এই কিতাব পেশ কর। যদি তিনি মেনে নেন তবে তো আমাদের জন্যে সোনায় সোহাগা হবে। আর যদি না মানেন তবে তাকে হত্যা করে ফেলে। তাহলে তোমাদের এই কিতাবের বিরোধী আর কেউ থাকবে না। আর অন্যেরা সবাই আমাদের এই কিতাবকে কবুল করে নিবে এবং মানতে শুরু করবে। এই পরামর্শ অনুযায়ী ঐ লোকগুলো আল্লাহর কিতাবের আলেম ও আমেল ঐ বুযুর্গ ব্যক্তিকে ধরে আনলো এবং বললোঃ “দেখুন, আমাদের এই কিতাবের সব কিছুই আপনি মানেন তো? না, মানেন না? এর উপর আপনার ঈমান আছে, না নেই?” উত্তরে ঐ আল্লাহওয়ালা আলেম লোকটি বললেনঃ “তোমরা এতে যা লিখেছো তা আমাকে শুনিয়ে দাও।” তারা শুনিয়ে দেয়ার পর বললোঃ “এটা আপনি মানেন তো?” ঐ ব্যক্তির জীবনের ভয় ছিল, এ কারণে সাহসিকতার সাথে মানি না' এ কথা সরাসরি বলতে পারলেন না, বরং তাঁর ঐ শিঙ্গার দিকে ইশারা করে বললেনঃ “আমার এর উপর ঈমান রয়েছে। তারা বুঝলো যে, তার ঈমান তাদের কিতাবের উপরই রয়েছে। তাই তারা তাঁকে কষ্ট দেয়া হতে বিরত থাকলো। তথাপিও তারা তাঁর কাজ কারবার দেখে সন্দেহের মধ্যেই ছিল। শেষ পর্যন্ত যখন তার মৃত্যু হলো তখন তারা তদন্ত শুরু করলো যে, না জানি হয় তো তার কাছে আল্লাহর কিতাবের ও সত্য মাসআলার কোন গ্রন্থ রয়েছে। অবশেষে তারা তার ঐ শিঙ্গাটি উদ্ধার করলো। পড়ে দেখলো যে, ওর মধ্যে আল্লাহর কিতাবের আসল মাসআলাগুলো বিদ্যমান রয়েছে। এখন তারা কথা বানিয়ে নিয়ে বললোঃ “আমরা তো কখনো এই মাসআলাগুলো শুনিনি। এরূপ কথা আমাদের ধর্মে নেই।” ফলে ভীষণ হাঙ্গামার সৃষ্টি হলো। তারা বাহাত্তরটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়লো। এই বাহাত্তরটি দলের মধ্যে যে দলটি সত্যের উপর ছিল সেটা হলো ঐ দল, যারা ঐ শিঙ্গাযুক্ত মাসআলাগুলোর উপর আমলকারী ছিল।” হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এই ঘটনাটি বর্ণনা করার পর বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমাদের মধ্যে যারা বাকী থাকবে তারা অনুরূপ সমস্যারই সম্মুখীন হবে এবং হবে সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন ও নিরুপায়। সুতরাং এই অক্ষমতা, অসহায়তা ও শক্তিহীনতার সময়েও তাদের অবশ্য কর্তব্য হবে আল্লাহর দ্বীনের উপর স্থির ও অটল থাকা এবং আল্লাহদ্রোহীদেরকে ঘৃণার চক্ষে দেখা।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইবরাহীম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইত্রীস ইবনে উরকূব (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আবদুল্লাহ (রাঃ)! যে ব্যক্তি ভাল কাজের আদেশ করে না এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে না সে তো ধ্বংস হয়ে যাবে।” একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “ধ্বংস হবে ঐ ব্যক্তি যে অন্তরে ভালকে ভাল ও মন্দর্কে মন্দ বলে জানে না।” অতঃপর তিনি বানী ইসরাঈলের উপরোক্তে ঘটনাটি বর্ণনা করেন।” (এটা ইমাম আবু জাফর তাবারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ ‘জেনে রেখো যে, আল্লাহই ধরিত্রীকে ওর মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। এতে ইঙ্গিত রয়েছে ঐ বিষয়ের দিকে যে, আল্লাহ তাআলা কঠোর হৃদয়কে কঠোরতার পরেও নরম করে দিতে সক্ষম। পথভ্রষ্টদেরকে তাদের পথভ্রষ্টতার পরেও তিনি সরল সঠিক পথে আনয়নের ক্ষমতা রাখেন। বৃষ্টি যেমন শুষ্ক ভূমিকে সিক্ত করে থাকে, তেমনই আল্লাহ তাআলা মৃত হৃদয়কে জীবিত করতে পারেন। অন্তর যখন গুমরাহীর অন্ধকারে ছেয়ে যায় তখন আল্লাহর কিতাবের আলো আকস্মিকভাবে ঐ অন্তরকে আলোকোজ্জ্বল করে তুলে। আল্লাহর অহী অন্তরের তালা চাবি স্বরূপ। সত্য ও সঠিক হিদায়াতকারী হলেন একমাত্র আল্লাহ। তিনিই পথভ্রষ্টতার পর সরল সঠিক পথে আনয়নকারী। তিনি যা চান তাই করে থাকেন। তিনি বিজ্ঞানময়, সূক্ষদর্শী, সম্যক অবগত এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতার অধিকারী। তিনি মহান, সর্বোচ্চ মর্যাদাবান।
আল-হাদীদ 57:17
১৬-১৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলছেনঃ মুমিনদের জন্যে কি এখন পর্যন্ত ঐ সময় আসেনি যে, তারা আল্লাহর যিকির, নসীহত, কুরআনের আয়াতসমূহ এবং নবী (সঃ)-এর হাদীসসমূহ শুনে তাদের হৃদয় বিগলিত হয়? তারা শুনে ও মানে, আদেশসমূহ পালন করে এবং নিষিদ্ধ জিনিস হতে বিরত থাকে?হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কুরআন কারীম অবতীর্ণ হতে হতে তেরো বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়, এরপরেও মুসলমানদের অন্তর ইসলামের প্রতি পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়নি, এখানে এরই অভিযোগ করা হয়েছে।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “চার বছর অতিক্রান্ত হতেই আমাদেরকে এ ব্যাপারে নিন্দে করে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।"সাহাবীগণ (রাঃ) দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের নিকট কিছু বর্ণনা করুন।” তখন (আরবী) অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ)! আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি ।" (১২-৩) কিছুদিন পর আবার তারা এই আরজই করলে আল্লাহ তা'আলা (আরবী) অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ “আল্লাহ উত্তম বাণী অবতীর্ণ করেছেন।” (৩৯:২৩) আরো কিছুদিন পর পুনরায় তাঁরা একথাই বললে আল্লাহ তা'আলা ... (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ করেন।হযরত শাদ্দাদ ইবনে আউস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মানুষের মধ্য হতে প্রথম (ভাল বিষয়) যা উঠে যাবে তা হবে এই বিনয়-নম্রতা।” এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদের মত যেন এরা না হয়, বহুকাল অতিক্রান্ত হয়ে গেলে যাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে পড়েছিল। আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে ইয়াহুদী নাসারার মত হতে নিষেধ করছেন। তারা আল্লাহর কিতাবকে পরিবর্তন করে ফেলেছিল। স্বল্প মূল্যের বিনিময়ে ওকে বিক্রি করে দিয়েছিল। কিতাবুল্লাহকে পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে নিজেদের মনগড়া মত ও কিয়াসের পিছনে পড়ে গিয়েছিল। নিজেদের আবিষ্কৃত উক্তিগুলো তারা মানতে থাকে। আল্লাহর দ্বীনে তারা অন্যদের অন্ধ অনুকরণ করতে থাকে। নিজেদের আলেম ও দরবেশদের সনদ বিহীন কথাগুলো তারা দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয়। এই দুস্কার্যের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয় কঠোর করে দেন। আল্লাহ তা'আলার হাজারো কথা শুনালেও তাদের অন্তর নরম হয় না। কোন ওয়াজ নসীহত তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। কোন প্রতিশ্রুতি ও ভীতি প্রদর্শন তাদের অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরাতে সক্ষম হয় না। তাদের অধিকাংশই ফাসেক ও প্রকাশ্য দুষ্কৃতিকারী হয়ে যায়। তাদের অন্তর অপবিত্র এবং আমল অপরিপক্ক হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমি তাদের উপর অভিসম্পাত নাযিল করেছি ও তাদের অন্তর কঠোর করে দিয়েছি, তারা কথাগুলো স্বস্থান হতে ফিরিয়ে দেয় এবং আমার উপদেশাবলী তারা ভুলে যায়।” (৫:১৩) অর্থাৎ তাদের অন্তর নষ্ট হয়ে যায়। তাই তারা আল্লাহর কথাগুলোর পরিবর্তন ঘটায়, সৎকার্যাবলী পরিত্যাগ করে এবং অসৎকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এ জন্যেই রাব্দুল আ’লামীন এই উম্মতকে সতর্ক করছেনঃ সাবধান! তোমরা ইয়াহুদী ও নাসারাদের মত হয়ো না। সর্বদিক দিয়েই তাদের হতে পৃথক থাকো।হযরত রাবী ইবনে আবি উমাইলা (রাঃ) বলেন, কুরআন হাদীসের মিষ্টত্ব তো অনস্বীকার্য বটেই, কিন্তু আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে একটি খুবই প্রিয় ও মধুর কথা শুনেছি যা আমাকে অত্যন্ত মুগ্ধ করেছে। তিনি বলেছেনঃ “যখন বানী ইসরাঈলের আসমানী কিতাবের উপর কয়েক যুগ অতিবাহিত হলো তখন তারা কিছু কিতাব নিজেরাই রচনা করে নিলো এবং তাতে ঐ মাসআলাগুলো লিপিবদ্ধ করলো যেগুলো তাদের নিকট পছন্দনীয় ছিল। ওগুলো ছিল তাদের নিজেদেরই মস্তিষ্ক প্রসূত। এখন তারা সানন্দে জিহ্বা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওগুলো পড়তে লাগলো। ওগুলোর অধিকাংশ মাসআলা আল্লাহর কিতাবের বিপরীত ছিল। যেসব হুকুম মানতে তাদের মন চাইতো না তা তারা পরিবর্তন করে দিতো এবং নিজেদের রচিত কিতাবে নিজেদের চাহিদা মত মাসআলা জমা করে নিতো। ঐগুলোর উপরই তারা আমল করতো। এখন তারা জনগণকেও মানতে উদ্বুদ্ধ করলো। তাদেরকে তারা এরই দাওয়াত দিলো এবং জোরপূর্বক মানাতে শুরু করলো। এমনকি যারা মানতে অস্বীকার করতে তাদেরকে তারা শাস্তি দিতো, কষ্ট দিতো, মারপিঠ করতো এবং হত্যা করে। ফেলতেও কুণ্ঠিত হতো না। তাদের মধ্যে একজন আল্লাহওয়ালা, আলেম ও মুত্তাকী লোক ছিলেন। তিনি তাদের শক্তি ও বাড়াবাড়িতে ভীত হয়ে আল্লাহর। কিতাবকে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম জিনিসে লিখে একটি শিঙ্গায় ভরে দেন এবং ঐ শিঙ্গাটিকে স্বীয় স্কন্ধে লটকিয়ে দেন। তাদের দুষ্কার্য ও হত্যাকাণ্ড দিন দিন বেড়েই চললো। শেষ পর্যন্ত তারা ঐ লোকদেরকে হত্যা করে ফেললো যারা আল্লাহর কিতাবের উপর আমলকারী ছিলেন। অতঃপর তারা পরস্পর পরামর্শ করলোঃ “দেখো, এভাবে এক এক করে কতজনকে আর হত্যা করতে থাকবে? এদের বড় আলেম, আমাদের এই কিতাবকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকারকারী এবং সমস্ত বানী ইসরাঈলের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহর কিতাবের উপর আমলকারী অমুক আলেম রয়েছেন, তাঁকে ধরে নিয়ে এসো এবং তার সামনে তোমাদের এই কিতাব পেশ কর। যদি তিনি মেনে নেন তবে তো আমাদের জন্যে সোনায় সোহাগা হবে। আর যদি না মানেন তবে তাকে হত্যা করে ফেলে। তাহলে তোমাদের এই কিতাবের বিরোধী আর কেউ থাকবে না। আর অন্যেরা সবাই আমাদের এই কিতাবকে কবুল করে নিবে এবং মানতে শুরু করবে। এই পরামর্শ অনুযায়ী ঐ লোকগুলো আল্লাহর কিতাবের আলেম ও আমেল ঐ বুযুর্গ ব্যক্তিকে ধরে আনলো এবং বললোঃ “দেখুন, আমাদের এই কিতাবের সব কিছুই আপনি মানেন তো? না, মানেন না? এর উপর আপনার ঈমান আছে, না নেই?” উত্তরে ঐ আল্লাহওয়ালা আলেম লোকটি বললেনঃ “তোমরা এতে যা লিখেছো তা আমাকে শুনিয়ে দাও।” তারা শুনিয়ে দেয়ার পর বললোঃ “এটা আপনি মানেন তো?” ঐ ব্যক্তির জীবনের ভয় ছিল, এ কারণে সাহসিকতার সাথে মানি না' এ কথা সরাসরি বলতে পারলেন না, বরং তাঁর ঐ শিঙ্গার দিকে ইশারা করে বললেনঃ “আমার এর উপর ঈমান রয়েছে। তারা বুঝলো যে, তার ঈমান তাদের কিতাবের উপরই রয়েছে। তাই তারা তাঁকে কষ্ট দেয়া হতে বিরত থাকলো। তথাপিও তারা তাঁর কাজ কারবার দেখে সন্দেহের মধ্যেই ছিল। শেষ পর্যন্ত যখন তার মৃত্যু হলো তখন তারা তদন্ত শুরু করলো যে, না জানি হয় তো তার কাছে আল্লাহর কিতাবের ও সত্য মাসআলার কোন গ্রন্থ রয়েছে। অবশেষে তারা তার ঐ শিঙ্গাটি উদ্ধার করলো। পড়ে দেখলো যে, ওর মধ্যে আল্লাহর কিতাবের আসল মাসআলাগুলো বিদ্যমান রয়েছে। এখন তারা কথা বানিয়ে নিয়ে বললোঃ “আমরা তো কখনো এই মাসআলাগুলো শুনিনি। এরূপ কথা আমাদের ধর্মে নেই।” ফলে ভীষণ হাঙ্গামার সৃষ্টি হলো। তারা বাহাত্তরটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়লো। এই বাহাত্তরটি দলের মধ্যে যে দলটি সত্যের উপর ছিল সেটা হলো ঐ দল, যারা ঐ শিঙ্গাযুক্ত মাসআলাগুলোর উপর আমলকারী ছিল।” হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এই ঘটনাটি বর্ণনা করার পর বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমাদের মধ্যে যারা বাকী থাকবে তারা অনুরূপ সমস্যারই সম্মুখীন হবে এবং হবে সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন ও নিরুপায়। সুতরাং এই অক্ষমতা, অসহায়তা ও শক্তিহীনতার সময়েও তাদের অবশ্য কর্তব্য হবে আল্লাহর দ্বীনের উপর স্থির ও অটল থাকা এবং আল্লাহদ্রোহীদেরকে ঘৃণার চক্ষে দেখা।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ইবরাহীম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইত্রীস ইবনে উরকূব (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আবদুল্লাহ (রাঃ)! যে ব্যক্তি ভাল কাজের আদেশ করে না এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে না সে তো ধ্বংস হয়ে যাবে।” একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “ধ্বংস হবে ঐ ব্যক্তি যে অন্তরে ভালকে ভাল ও মন্দর্কে মন্দ বলে জানে না।” অতঃপর তিনি বানী ইসরাঈলের উপরোক্তে ঘটনাটি বর্ণনা করেন।” (এটা ইমাম আবু জাফর তাবারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ ‘জেনে রেখো যে, আল্লাহই ধরিত্রীকে ওর মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। এতে ইঙ্গিত রয়েছে ঐ বিষয়ের দিকে যে, আল্লাহ তাআলা কঠোর হৃদয়কে কঠোরতার পরেও নরম করে দিতে সক্ষম। পথভ্রষ্টদেরকে তাদের পথভ্রষ্টতার পরেও তিনি সরল সঠিক পথে আনয়নের ক্ষমতা রাখেন। বৃষ্টি যেমন শুষ্ক ভূমিকে সিক্ত করে থাকে, তেমনই আল্লাহ তাআলা মৃত হৃদয়কে জীবিত করতে পারেন। অন্তর যখন গুমরাহীর অন্ধকারে ছেয়ে যায় তখন আল্লাহর কিতাবের আলো আকস্মিকভাবে ঐ অন্তরকে আলোকোজ্জ্বল করে তুলে। আল্লাহর অহী অন্তরের তালা চাবি স্বরূপ। সত্য ও সঠিক হিদায়াতকারী হলেন একমাত্র আল্লাহ। তিনিই পথভ্রষ্টতার পর সরল সঠিক পথে আনয়নকারী। তিনি যা চান তাই করে থাকেন। তিনি বিজ্ঞানময়, সূক্ষদর্শী, সম্যক অবগত এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতার অধিকারী। তিনি মহান, সর্বোচ্চ মর্যাদাবান।
আল-হাদীদ 57:18
১৮-১৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, ফকীর, মিসকীন ইত্যাদি অভাবগ্রস্তদেরকে যারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে স্বীয় হালাল ধন-সম্পদ থেকে সৎ নিয়তে দান করে, আল্লাহ বিনিময় হিসেবে তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে তাদেরকে প্রদান করবেন। তিনি তাদেরকে ঐ দান দশ গুণ হতে সাতশ গুণ পর্যন্ত এবং তারও বেশী বদ্ধি করবেন। তাদের জন্যে রয়েছে বেহিসাব সওয়াব ও মহাপুরস্কার।আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীরাই সিদ্দীক ও শহীদ। এই দুই গুণের অধিকারী শুধুমাত্র এই ঈমানদার ললাকেরাই। কোন কোন গুরুজন কে পৃথক বাক্য বলেছেন। মোটকথা, তিন শ্রেণী হলো। (এক) (আরবী) (দানশীল), (দুই) (আরবী) (সত্যনিষ্ঠ) এবং (তিন) (আরবী)-(শহীদগণ)। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর যে আল্লাহ এবং রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করবে সে নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সঙ্কর্মপরায়ণ যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, তাদের সঙ্গী হবে।” (৪:৬৯) এখানেও সিদ্দীক ও শহীদের মধ্যে পার্থক্য সূচিত করা হয়েছে, যার দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এঁরা দুই শ্রেণীর লোক। সিদ্দীকের মর্যাদা নিঃসন্দেহে শহীদ অপেক্ষা বেশী।হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই জান্নাতবাসীরা তাদের উপরের প্রাসাদের জান্নাতীদেরকে এভাবেই দেখবে, যেমন তোমরা পূর্ব দিকের ও পশ্চিম দিকের উজ্জ্বল নক্ষত্রকে আকাশ প্রান্তে দেখে থাকো।” সাহাবীগণ (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ মর্যাদা তো শুধু নবীদের, তাঁরা ছাড়া তো এ মর্যাদায় অন্য কেউ পৌছতে পারবে না?” জবাবে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! এরা হলো ঐ সব লোক যারা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছে এবং রাসূলদের (আঃ) সত্যতা স্বীকার করেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)একটি গারীব হাদীস দ্বারা এটাও জানা যায় যে, এই আয়াতে শহীদ ও সিদ্দীক এ দুটো এই মুমিনেরই বিশেষণ।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার উম্মতের মুমিন ব্যক্তি শহীদ।” অতঃপর তিনি এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। হযরত আমর ইবনে মায়মূন (রঃ) বলেনঃ “এ দু’জন কিয়ামতের দিন দুটি অঙ্গুলীর মত হয়ে আসবে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, শহীদদের রূহ সবুজ রঙ এর পাখীর দেহের মধ্যে থাকবে। জান্নাতের মধ্যে যথেচ্ছা পানাহার করে ঘুরে বেড়াবে। রাত্রে লণ্ঠনের মধ্যে আশ্রয় নিবে। তাদের প্রতিপালক তাদের উপর প্রকাশিত হয়ে বলবেনঃ “তোমরা কি চাও?” উত্তরে তারা বলবেঃ “আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যাতে আমরা আবার আপনার পথে জিহাদ করে শহীদ হতে পারি।" আল্লাহ তা'আলা জবাব দিবেনঃ “আমি তো এই ফায়সালা করেই দিয়েছি যে, দুনিয়ায় কেউ পুনরায় ফিরে যাবে না।”মহান আল্লাহ বলেনঃ তাদের জন্যে রয়েছে তাদের প্রাপ্য পুরস্কার ও জ্যোতি। ঐ নূর বা জ্যোতি তাদের সামনে থাকবে এবং তা তাদের আমল অনুযায়ী হবে।হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শহীদগণ চার প্রকার। (এক) ঐ পাকা ঈমানদার যে শত্রুর মুখোমুখি হয়েছে এবং প্রাণপণে যুদ্ধ করেছে, অবশেষে শহীদ হয়েছে। সে এমনই ব্যক্তি যে, (তার মর্যাদা দেখে) লোকেরা তার দিকে এই ভাবে তাকাবে।" ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর মস্তক এমনভাবে উঠান যে, তাঁর টুপিটি মাথা হতে নীচে পড়ে যায়। আর এ হাদীসটি বর্ণনা করার সময় হযরত উমার (রাঃ)-এরও মাথার টুপি নীচে পড়ে যায়। (দুই) ঐ ব্যক্তি যে ঈমানদার বটে এবং জিহাদের জন্যে বেরও হয়েছে। কিন্তু অন্তরে সাহস কম আছে। হঠাৎ একটি তীর এসে তার দেহে বিদ্ধ হয় এবং দেহ হতে রূহ বেরিয়ে যায়। এ ব্যক্তি হলো দ্বিতীয় শ্রেণীর শহীদ। (তিন) ঐ ব্যক্তি যার ভাল মন্দ আমল রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাকে পছন্দ করেছেন। সে জিহাদের মাঠে নেমেছে এবং কাফিরদের হাতে নিহত হয়েছে। এ ব্যক্তি তৃতীয় শ্রেণীর শহীদ। (চার) ঐ ব্যক্তি যার গুনাহ খুব বেশী আছে। সে জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছে এবং শক্রর হাতে নিহত হয়েছে। এ হলো চতুর্থ শ্রেণীর শহীদ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)এই সৎ লোকেদের পরিণাম বর্ণনা করার পর আল্লাহ তা'আলা অসৎ লোকদের পরিণাম বর্ণনা করছেন যে, যারা কুফরী করেছে ও আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকার করেছে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী।
আল-হাদীদ 57:19
১৮-১৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, ফকীর, মিসকীন ইত্যাদি অভাবগ্রস্তদেরকে যারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে স্বীয় হালাল ধন-সম্পদ থেকে সৎ নিয়তে দান করে, আল্লাহ বিনিময় হিসেবে তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে তাদেরকে প্রদান করবেন। তিনি তাদেরকে ঐ দান দশ গুণ হতে সাতশ গুণ পর্যন্ত এবং তারও বেশী বদ্ধি করবেন। তাদের জন্যে রয়েছে বেহিসাব সওয়াব ও মহাপুরস্কার।আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীরাই সিদ্দীক ও শহীদ। এই দুই গুণের অধিকারী শুধুমাত্র এই ঈমানদার ললাকেরাই। কোন কোন গুরুজন কে পৃথক বাক্য বলেছেন। মোটকথা, তিন শ্রেণী হলো। (এক) (আরবী) (দানশীল), (দুই) (আরবী) (সত্যনিষ্ঠ) এবং (তিন) (আরবী)-(শহীদগণ)। যেমন আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আর যে আল্লাহ এবং রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করবে সে নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সঙ্কর্মপরায়ণ যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, তাদের সঙ্গী হবে।” (৪:৬৯) এখানেও সিদ্দীক ও শহীদের মধ্যে পার্থক্য সূচিত করা হয়েছে, যার দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এঁরা দুই শ্রেণীর লোক। সিদ্দীকের মর্যাদা নিঃসন্দেহে শহীদ অপেক্ষা বেশী।হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই জান্নাতবাসীরা তাদের উপরের প্রাসাদের জান্নাতীদেরকে এভাবেই দেখবে, যেমন তোমরা পূর্ব দিকের ও পশ্চিম দিকের উজ্জ্বল নক্ষত্রকে আকাশ প্রান্তে দেখে থাকো।” সাহাবীগণ (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ মর্যাদা তো শুধু নবীদের, তাঁরা ছাড়া তো এ মর্যাদায় অন্য কেউ পৌছতে পারবে না?” জবাবে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! এরা হলো ঐ সব লোক যারা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছে এবং রাসূলদের (আঃ) সত্যতা স্বীকার করেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)একটি গারীব হাদীস দ্বারা এটাও জানা যায় যে, এই আয়াতে শহীদ ও সিদ্দীক এ দুটো এই মুমিনেরই বিশেষণ।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার উম্মতের মুমিন ব্যক্তি শহীদ।” অতঃপর তিনি এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। হযরত আমর ইবনে মায়মূন (রঃ) বলেনঃ “এ দু’জন কিয়ামতের দিন দুটি অঙ্গুলীর মত হয়ে আসবে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, শহীদদের রূহ সবুজ রঙ এর পাখীর দেহের মধ্যে থাকবে। জান্নাতের মধ্যে যথেচ্ছা পানাহার করে ঘুরে বেড়াবে। রাত্রে লণ্ঠনের মধ্যে আশ্রয় নিবে। তাদের প্রতিপালক তাদের উপর প্রকাশিত হয়ে বলবেনঃ “তোমরা কি চাও?” উত্তরে তারা বলবেঃ “আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিন, যাতে আমরা আবার আপনার পথে জিহাদ করে শহীদ হতে পারি।" আল্লাহ তা'আলা জবাব দিবেনঃ “আমি তো এই ফায়সালা করেই দিয়েছি যে, দুনিয়ায় কেউ পুনরায় ফিরে যাবে না।”মহান আল্লাহ বলেনঃ তাদের জন্যে রয়েছে তাদের প্রাপ্য পুরস্কার ও জ্যোতি। ঐ নূর বা জ্যোতি তাদের সামনে থাকবে এবং তা তাদের আমল অনুযায়ী হবে।হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শহীদগণ চার প্রকার। (এক) ঐ পাকা ঈমানদার যে শত্রুর মুখোমুখি হয়েছে এবং প্রাণপণে যুদ্ধ করেছে, অবশেষে শহীদ হয়েছে। সে এমনই ব্যক্তি যে, (তার মর্যাদা দেখে) লোকেরা তার দিকে এই ভাবে তাকাবে।" ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর মস্তক এমনভাবে উঠান যে, তাঁর টুপিটি মাথা হতে নীচে পড়ে যায়। আর এ হাদীসটি বর্ণনা করার সময় হযরত উমার (রাঃ)-এরও মাথার টুপি নীচে পড়ে যায়। (দুই) ঐ ব্যক্তি যে ঈমানদার বটে এবং জিহাদের জন্যে বেরও হয়েছে। কিন্তু অন্তরে সাহস কম আছে। হঠাৎ একটি তীর এসে তার দেহে বিদ্ধ হয় এবং দেহ হতে রূহ বেরিয়ে যায়। এ ব্যক্তি হলো দ্বিতীয় শ্রেণীর শহীদ। (তিন) ঐ ব্যক্তি যার ভাল মন্দ আমল রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাকে পছন্দ করেছেন। সে জিহাদের মাঠে নেমেছে এবং কাফিরদের হাতে নিহত হয়েছে। এ ব্যক্তি তৃতীয় শ্রেণীর শহীদ। (চার) ঐ ব্যক্তি যার গুনাহ খুব বেশী আছে। সে জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছে এবং শক্রর হাতে নিহত হয়েছে। এ হলো চতুর্থ শ্রেণীর শহীদ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)এই সৎ লোকেদের পরিণাম বর্ণনা করার পর আল্লাহ তা'আলা অসৎ লোকদের পরিণাম বর্ণনা করছেন যে, যারা কুফরী করেছে ও আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকার করেছে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী।
আল-হাদীদ 57:20
২০-২১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন যে, দুনিয়ার সবকিছুই অতি ঘৃণ্য, তুচ্ছ ও নগণ্য। এখানে দুনিয়াবাসীর জন্যে রয়েছে শুধুমাত্র ক্রীড়া-কৌতুক, শান-শওকত, পারস্পরিক গর্ব ও অহংকার এবং ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণ রৌপ্য আর চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদি পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট মনোরম করা হয়েছে। এই সব ইহজীবনের ভোগ্যবস্তু। আর আল্লাহ, তাঁর নিকট উত্তম আশ্রয়স্থল।” (৩:১৪)এরপর পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এর শ্যামল-সজীবতা ধ্বংসশীল, এখানকার নিয়ামতরাশি নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী। (আরবী) বলা হয় ঐ বৃষ্টিকে যা মানুষের নৈরাশ্যের পর বর্ষিত হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তিনিই আল্লাহ যিনি মানুষের নৈরাশ্যের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন। সুতরাং যেমন বৃষ্টির কারণে যমীনে শস্য উৎপাদিত হয়, ক্ষেতের শস্য আন্দোলিত হতে থাকে এবং কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, অনুরূপভাবে দুনিয়াবাসী দুনিয়ার মাল-ধন, পণ্যদ্রব্য এবং মূল্যবান সামগ্রী লাভ করে অহংকারে ফুলে ওঠে। কিন্তু পরিণাম এই দাঁড়ায় যে, ক্ষেতের ঐ সবুজ-শ্যামল ও নয়ন তৃপ্তিকর শস্য শুকিয়ে যায় এবং শেষে খড় কুটায় পরিণত হয়। ঠিক তদ্রুপ দুনিয়ার সজীবতা ও চাকচিক্য এবং ভোগ্যবস্তু সবই একদিন মাটির সাথে মিশে যাবে। দুনিয়ার জীবনও তাই। প্রথমে আসে যৌবন, এর পরে অর্ধবয়স এবং শেষে বার্ধক্যে উপনীত হয়। স্বয়ং মানুষের অবস্থাও ঠিক অনুরূপ। তার শৈশব, কৈশর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব এবং বার্ধক্য, এসব অবস্থার কথা চিন্তা করলে বিস্মিত হতে হয়! কোথায় সেই যৌবনাবস্থার রক্তের গরম এবং শক্তির দাপট, আর কোথায় বার্ধক্যাবস্থার দুর্বলতা, কোমরের বক্রতা ও অস্থির শক্তিহীনতা! যেমন আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহ তিনিই যিনি তোমাদেরকে দুর্বলতার অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন, তারপর ঐ দুর্বলতার পরে শক্তি দান করেছেন, আবার ঐ শক্তির পর দিয়েছেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য, তিনি যা চান সৃষ্টি করে থাকেন, তিনি সর্বজ্ঞ ও ক্ষমতাবান।” (৩০:৫৪)। এই দৃষ্টান্ত দ্বারা দুনিয়ার অস্থায়ীত্ব ও নশ্বরতার বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আখিরাতের দু’টি দৃশ্য প্রদর্শন করে একটি হতে ভয় দেখাচ্ছেন ও অপরটির প্রতি উৎসাহিত করছেন। তিনি বলেনঃ সত্বরই কিয়ামত সংঘটিত হতে যাচ্ছে এবং ওটা নিজের সাথে নিয়ে আসছে আল্লাহর আযাব ও শাস্তি এবং তার ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। সুতরাং তোমরা এমন কাজ কর যদদ্বারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি হতে বাঁচতে পার এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করতে পার, রক্ষা পেতে পার তার শাস্তি হতে এবং হকদার হতে পার তার ক্ষমার! দুনিয়া তো শুধু প্রতারণার বেড়া। যে এর প্রতি আকৃষ্ট হয় তার অবস্থা এমনই হয় যে, এই দুনিয়া ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি সে খেয়ালই করে না। দিনরাত্রি ওরই চিন্তাতেই। সে ডুবে থাকে। এই নশ্বর ও ধ্বংসশীল জগতকে সে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থাও তার দাঁড়িয়ে যায় যে, সে আখিরাতকে অস্বীকার করে বসে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে একটি চাবুক রাখার জায়গা দুনিয়া ও ওর মধ্যে যা কিছু আছে তার সব থেকে উত্তম। তোমরা পাঠ করঃ (আরবী) অর্থাৎ “পার্থিব জীবন ছলনার ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আয়াতটির উল্লেখ ছাড়া হাদীসটি সহীহ গ্রন্থেও রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের জন্যে জান্নাত জুতার তাসমার (চামড়ার লম্বা অংশের) চেয়েও বেশী নিকটবর্তী, জাহান্নামও অনুরূপ।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম বুখারী (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) সুতরাং জানা যাচ্ছে যে, ভাল ও মন্দ মানুষের খুবই নিকটে রয়েছে। তাই মানুষের উচিত মঙ্গলের দিকে অগ্রণী হওয়া এবং মন্দ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া যাতে পাপ ও অন্যায় মাফ হয়ে যায় এবং পুণ্য ও মর্যাদা উঁচু হয়। এ জন্যেই এর পরপরই আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও সেই জান্নাত লাভের প্রয়াসে যা প্রশস্ততায় আকাশ ও পৃথিবীর মত। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দৌড়িয়ে যাও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রশস্ততা হলো আকাশ ও পৃথিবী (তুল্য) যা তৈরী করা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্যে।” (৩:১৩৩)এ লোকগুলো আল্লাহ তা'আলার এই অনুগ্রহ লাভের যোগ্য ছিল। এ জন্যেই পরম করুণাময় আল্লাহ এদের প্রতি তাঁর পূর্ণ অনুগ্রহ দান করেছেন।পূর্বে একটি বিশুদ্ধ হাদীস গত হয়েছে যে, একবার মুহাজিরদের মধ্য হতে দরিদ্র লোকেরা আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সম্পদশালী লোকেরা তো জান্নাতের উচ্চশ্রেণী ও চিরস্থায়ী নিয়ামত রাশির অধিকারী হয়ে গেলেন! রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “এটা কিরূপে?” উত্তরে তারা বললেনঃ “নামায, রোযা তো তারা ও আমরা সবাই করি। কিন্তু মাল-ধনের কারণে তারা দান খায়রাত ও গোলাম আযাদ করে থাকেন। কিন্তু আমরা দারিদ্রের কারণে এ কাজ করতে পারি না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “এসো, আমি তোমাদেরকে এমন একটি কাজের কথা বলে দিচ্ছি, যদি তোমরা তা কর তবে তোমরা সবারই আগে বেড়ে যাবে। তবে তাদের উপর তোমরা প্রাধান্য লাভ করতে পারবে না যারা নিজেরাও এ কাজ করতে শুরু করে দিবে। তাহলে এই যে, তোমরা প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আল্লাহু আকবার এবং তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করবে।" কিছুদিন পর ঐ মহান ব্যক্তিবর্গ পুনরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের এই অযীফার খবর আমাদের ধনী ভাইয়েরাও পেয়ে গেছেন এবং তাঁরাও এটা পড়তে শুরু করেছেন!" তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি এটা দান করেন।”
আল-হাদীদ 57:21
২০-২১ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন যে, দুনিয়ার সবকিছুই অতি ঘৃণ্য, তুচ্ছ ও নগণ্য। এখানে দুনিয়াবাসীর জন্যে রয়েছে শুধুমাত্র ক্রীড়া-কৌতুক, শান-শওকত, পারস্পরিক গর্ব ও অহংকার এবং ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ(আরবী) অর্থাৎ “নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণ রৌপ্য আর চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদি পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট মনোরম করা হয়েছে। এই সব ইহজীবনের ভোগ্যবস্তু। আর আল্লাহ, তাঁর নিকট উত্তম আশ্রয়স্থল।” (৩:১৪)এরপর পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এর শ্যামল-সজীবতা ধ্বংসশীল, এখানকার নিয়ামতরাশি নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী। (আরবী) বলা হয় ঐ বৃষ্টিকে যা মানুষের নৈরাশ্যের পর বর্ষিত হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তিনিই আল্লাহ যিনি মানুষের নৈরাশ্যের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন। সুতরাং যেমন বৃষ্টির কারণে যমীনে শস্য উৎপাদিত হয়, ক্ষেতের শস্য আন্দোলিত হতে থাকে এবং কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, অনুরূপভাবে দুনিয়াবাসী দুনিয়ার মাল-ধন, পণ্যদ্রব্য এবং মূল্যবান সামগ্রী লাভ করে অহংকারে ফুলে ওঠে। কিন্তু পরিণাম এই দাঁড়ায় যে, ক্ষেতের ঐ সবুজ-শ্যামল ও নয়ন তৃপ্তিকর শস্য শুকিয়ে যায় এবং শেষে খড় কুটায় পরিণত হয়। ঠিক তদ্রুপ দুনিয়ার সজীবতা ও চাকচিক্য এবং ভোগ্যবস্তু সবই একদিন মাটির সাথে মিশে যাবে। দুনিয়ার জীবনও তাই। প্রথমে আসে যৌবন, এর পরে অর্ধবয়স এবং শেষে বার্ধক্যে উপনীত হয়। স্বয়ং মানুষের অবস্থাও ঠিক অনুরূপ। তার শৈশব, কৈশর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব এবং বার্ধক্য, এসব অবস্থার কথা চিন্তা করলে বিস্মিত হতে হয়! কোথায় সেই যৌবনাবস্থার রক্তের গরম এবং শক্তির দাপট, আর কোথায় বার্ধক্যাবস্থার দুর্বলতা, কোমরের বক্রতা ও অস্থির শক্তিহীনতা! যেমন আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহ তিনিই যিনি তোমাদেরকে দুর্বলতার অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন, তারপর ঐ দুর্বলতার পরে শক্তি দান করেছেন, আবার ঐ শক্তির পর দিয়েছেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য, তিনি যা চান সৃষ্টি করে থাকেন, তিনি সর্বজ্ঞ ও ক্ষমতাবান।” (৩০:৫৪)। এই দৃষ্টান্ত দ্বারা দুনিয়ার অস্থায়ীত্ব ও নশ্বরতার বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আখিরাতের দু’টি দৃশ্য প্রদর্শন করে একটি হতে ভয় দেখাচ্ছেন ও অপরটির প্রতি উৎসাহিত করছেন। তিনি বলেনঃ সত্বরই কিয়ামত সংঘটিত হতে যাচ্ছে এবং ওটা নিজের সাথে নিয়ে আসছে আল্লাহর আযাব ও শাস্তি এবং তার ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। সুতরাং তোমরা এমন কাজ কর যদদ্বারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি হতে বাঁচতে পার এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করতে পার, রক্ষা পেতে পার তার শাস্তি হতে এবং হকদার হতে পার তার ক্ষমার! দুনিয়া তো শুধু প্রতারণার বেড়া। যে এর প্রতি আকৃষ্ট হয় তার অবস্থা এমনই হয় যে, এই দুনিয়া ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি সে খেয়ালই করে না। দিনরাত্রি ওরই চিন্তাতেই। সে ডুবে থাকে। এই নশ্বর ও ধ্বংসশীল জগতকে সে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থাও তার দাঁড়িয়ে যায় যে, সে আখিরাতকে অস্বীকার করে বসে।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে একটি চাবুক রাখার জায়গা দুনিয়া ও ওর মধ্যে যা কিছু আছে তার সব থেকে উত্তম। তোমরা পাঠ করঃ (আরবী) অর্থাৎ “পার্থিব জীবন ছলনার ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। আয়াতটির উল্লেখ ছাড়া হাদীসটি সহীহ গ্রন্থেও রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের প্রত্যেকের জন্যে জান্নাত জুতার তাসমার (চামড়ার লম্বা অংশের) চেয়েও বেশী নিকটবর্তী, জাহান্নামও অনুরূপ।” (ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম বুখারী (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) সুতরাং জানা যাচ্ছে যে, ভাল ও মন্দ মানুষের খুবই নিকটে রয়েছে। তাই মানুষের উচিত মঙ্গলের দিকে অগ্রণী হওয়া এবং মন্দ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া যাতে পাপ ও অন্যায় মাফ হয়ে যায় এবং পুণ্য ও মর্যাদা উঁচু হয়। এ জন্যেই এর পরপরই আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা অগ্রণী হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও সেই জান্নাত লাভের প্রয়াসে যা প্রশস্ততায় আকাশ ও পৃথিবীর মত। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা দৌড়িয়ে যাও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং এমন জান্নাতের দিকে যার প্রশস্ততা হলো আকাশ ও পৃথিবী (তুল্য) যা তৈরী করা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্যে।” (৩:১৩৩)এ লোকগুলো আল্লাহ তা'আলার এই অনুগ্রহ লাভের যোগ্য ছিল। এ জন্যেই পরম করুণাময় আল্লাহ এদের প্রতি তাঁর পূর্ণ অনুগ্রহ দান করেছেন।পূর্বে একটি বিশুদ্ধ হাদীস গত হয়েছে যে, একবার মুহাজিরদের মধ্য হতে দরিদ্র লোকেরা আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সম্পদশালী লোকেরা তো জান্নাতের উচ্চশ্রেণী ও চিরস্থায়ী নিয়ামত রাশির অধিকারী হয়ে গেলেন! রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “এটা কিরূপে?” উত্তরে তারা বললেনঃ “নামায, রোযা তো তারা ও আমরা সবাই করি। কিন্তু মাল-ধনের কারণে তারা দান খায়রাত ও গোলাম আযাদ করে থাকেন। কিন্তু আমরা দারিদ্রের কারণে এ কাজ করতে পারি না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বললেনঃ “এসো, আমি তোমাদেরকে এমন একটি কাজের কথা বলে দিচ্ছি, যদি তোমরা তা কর তবে তোমরা সবারই আগে বেড়ে যাবে। তবে তাদের উপর তোমরা প্রাধান্য লাভ করতে পারবে না যারা নিজেরাও এ কাজ করতে শুরু করে দিবে। তাহলে এই যে, তোমরা প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আল্লাহু আকবার এবং তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করবে।" কিছুদিন পর ঐ মহান ব্যক্তিবর্গ পুনরায় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে আরয করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের এই অযীফার খবর আমাদের ধনী ভাইয়েরাও পেয়ে গেছেন এবং তাঁরাও এটা পড়তে শুরু করেছেন!" তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি এটা দান করেন।”
আল-হাদীদ 57:22
২২-২৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার খবর দিচ্ছেন যে, তিনি মাখলুকাতকে সৃষ্টি করার পূর্বেই তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তিনি বলেন যে, ভূ-পৃষ্ঠের যে অংশে কোন বিপর্যয় আসে অথবা ব্যক্তিগতভাবে কারো উপর কোন বিপদ আপতিত হয়, তার এই বিশ্বাস রাখা উচিত যে, ওটার হওয়া নিশ্চিতই ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, প্রাণসমূহ সৃষ্টি করার পূর্বেই ওদের ভাগ্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সঠিকতম কথা এটাই যে, মাখলুককে সৃষ্টি করার পূর্বেই তাদের ভাগ্য নির্ধারিত ছিল।ইমাম হাসান (রাঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! প্রত্যেক বিপদ বিপর্যয় যা আসমান ও যমীনে আপতিত হয় তা প্রাণসমূহের সৃষ্টির পূর্বেই মহান প্রতিপালকের কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং এতে সন্দেহের কি আছে?” যমীনের মসীবত হলো অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিপদ হলো দুঃখ, কষ্ট, রোগ ইত্যাদি। যে কাউকেও কোন আঁচড় লাগে বা পা পিছলিয়ে পড়ে কোন আঘাত লাগে কিংবা কোন কঠিন পরিশ্রমের কারণে ঘর্ম নির্গত হয়, এসবই তার গুনাহর কারণেই হয়ে থাকে। আরো তো বহু গুনাহ রয়েছে যেগুলো গাফুরুর রাহীম আল্লাহ ক্ষমা করেই দেন। কাদরিয়া সম্প্রদায়ের মত খণ্ডনে এই আয়াত একটি বড় দলীল। তাদের ধারণা এই যে, পূর্ব অবগতি কোন জিনিসই নয়। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে লাঞ্ছিত করুন!সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা যমীন ও আসমান সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার পূর্বে তকদীর নির্ধারণ করেন। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাঁর আরশ পানির উপর ছিল। (এটা ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ কার্য অস্তিত্বে আসার পূর্বে ওটা জেনে নেয়া, ওটা হওয়ার জ্ঞান লাভ করা এবং ওটাকে লিপিবদ্ধ করা আল্লাহ তা'আলার নিকট মমাটেই কঠিন নয়। তিনিই তো ওগুলোর সৃষ্টিকর্তা। যা কিছু হয়ে গেছে এবং যা কিছু হবে, তার সীমাহীন জ্ঞান সবই অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তোমাদেরকে এ খবর এজন্যেই দিলাম যে, তোমাদের উপর যে বিপদ আপদ আপতিত হয় তা কখনো টলবার ছিল না এ বিশ্বাস যেন তোমাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হয়ে যায়। সুতরাং বিপদের সময় যেন তোমাদের মধ্যে ধৈর্য, সহনশীলতা, স্থিরতা এবং রূহানী শক্তি বিদ্যমান থাকে। তোমরা যেন হায়, হায়, হা-হুতাশ না কর এবং অধৈর্য না হয়ে পড়। তোমরা যেন নিশ্চিন্ত থাকে যে, এ বিপদ আসারই ছিল। অনুরূপভাবে যদি তোমরা ধন-সম্পদের বিজয় ইত্যাদি অযাচিতভাবে লাভ কর তবে যেন অহংকারে ফেটে না পড়। এমন যেন না হও যে, ধন-মাল পেয়ে আল্লাহকে ভুলে বস। এই সময়েও তোমাদের সামনে আমার শিক্ষা থাকবে যে, তোমাদেরকে ধন-মালের মালিক করে দেয়া আমারই হাতে, এতে তোমাদের কোনই কৃতিত্ব নেই। একটি কিরআতে (আরবী) আছে এবং আর একটি কিরআতে (আরবী) আছে। দুটোই পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত। এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে, যে ব্যক্তি নিজেকে বড় মনে করে এবং অন্যের উপর গর্ব প্রকাশ করে সে আল্লাহর শত্রু। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “অশান্তি ও শান্তি এবং আনন্দ ও নিরানন্দ সব মানুষের উপরই আসে। আনন্দকে কৃতজ্ঞতায় এবং দুঃখকে ধৈর্যধারণে কাটিয়ে দাও।” মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এ লোকগুলো নিজেরাও কৃপণ ও শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে এবং অন্যদেরকেও কার্পণ্য ও শরীয়ত বিরোধী কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে তার কোনই ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। কেননা তিনি সমস্ত মাখলূক হতে অভাবমুক্ত ও বেপরোয়া। তিনি তো প্রশংসাৰ্হ। যেমন হযরত মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “যদি তোমরা কুফরী কর এবং সারা বিশ্বের মানুষও কাফির হয়ে যার (তবুও আল্লাহর কোন ক্ষতি হবে না), সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ তো অভাবমুক্ত ও প্রশংসার্হ।” (১৪:৮)
আল-হাদীদ 57:23
২২-২৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার খবর দিচ্ছেন যে, তিনি মাখলুকাতকে সৃষ্টি করার পূর্বেই তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তিনি বলেন যে, ভূ-পৃষ্ঠের যে অংশে কোন বিপর্যয় আসে অথবা ব্যক্তিগতভাবে কারো উপর কোন বিপদ আপতিত হয়, তার এই বিশ্বাস রাখা উচিত যে, ওটার হওয়া নিশ্চিতই ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, প্রাণসমূহ সৃষ্টি করার পূর্বেই ওদের ভাগ্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সঠিকতম কথা এটাই যে, মাখলুককে সৃষ্টি করার পূর্বেই তাদের ভাগ্য নির্ধারিত ছিল।ইমাম হাসান (রাঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! প্রত্যেক বিপদ বিপর্যয় যা আসমান ও যমীনে আপতিত হয় তা প্রাণসমূহের সৃষ্টির পূর্বেই মহান প্রতিপালকের কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং এতে সন্দেহের কি আছে?” যমীনের মসীবত হলো অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিপদ হলো দুঃখ, কষ্ট, রোগ ইত্যাদি। যে কাউকেও কোন আঁচড় লাগে বা পা পিছলিয়ে পড়ে কোন আঘাত লাগে কিংবা কোন কঠিন পরিশ্রমের কারণে ঘর্ম নির্গত হয়, এসবই তার গুনাহর কারণেই হয়ে থাকে। আরো তো বহু গুনাহ রয়েছে যেগুলো গাফুরুর রাহীম আল্লাহ ক্ষমা করেই দেন। কাদরিয়া সম্প্রদায়ের মত খণ্ডনে এই আয়াত একটি বড় দলীল। তাদের ধারণা এই যে, পূর্ব অবগতি কোন জিনিসই নয়। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে লাঞ্ছিত করুন!সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা যমীন ও আসমান সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার পূর্বে তকদীর নির্ধারণ করেন। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাঁর আরশ পানির উপর ছিল। (এটা ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ কার্য অস্তিত্বে আসার পূর্বে ওটা জেনে নেয়া, ওটা হওয়ার জ্ঞান লাভ করা এবং ওটাকে লিপিবদ্ধ করা আল্লাহ তা'আলার নিকট মমাটেই কঠিন নয়। তিনিই তো ওগুলোর সৃষ্টিকর্তা। যা কিছু হয়ে গেছে এবং যা কিছু হবে, তার সীমাহীন জ্ঞান সবই অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তোমাদেরকে এ খবর এজন্যেই দিলাম যে, তোমাদের উপর যে বিপদ আপদ আপতিত হয় তা কখনো টলবার ছিল না এ বিশ্বাস যেন তোমাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হয়ে যায়। সুতরাং বিপদের সময় যেন তোমাদের মধ্যে ধৈর্য, সহনশীলতা, স্থিরতা এবং রূহানী শক্তি বিদ্যমান থাকে। তোমরা যেন হায়, হায়, হা-হুতাশ না কর এবং অধৈর্য না হয়ে পড়। তোমরা যেন নিশ্চিন্ত থাকে যে, এ বিপদ আসারই ছিল। অনুরূপভাবে যদি তোমরা ধন-সম্পদের বিজয় ইত্যাদি অযাচিতভাবে লাভ কর তবে যেন অহংকারে ফেটে না পড়। এমন যেন না হও যে, ধন-মাল পেয়ে আল্লাহকে ভুলে বস। এই সময়েও তোমাদের সামনে আমার শিক্ষা থাকবে যে, তোমাদেরকে ধন-মালের মালিক করে দেয়া আমারই হাতে, এতে তোমাদের কোনই কৃতিত্ব নেই। একটি কিরআতে (আরবী) আছে এবং আর একটি কিরআতে (আরবী) আছে। দুটোই পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত। এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে, যে ব্যক্তি নিজেকে বড় মনে করে এবং অন্যের উপর গর্ব প্রকাশ করে সে আল্লাহর শত্রু। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “অশান্তি ও শান্তি এবং আনন্দ ও নিরানন্দ সব মানুষের উপরই আসে। আনন্দকে কৃতজ্ঞতায় এবং দুঃখকে ধৈর্যধারণে কাটিয়ে দাও।” মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এ লোকগুলো নিজেরাও কৃপণ ও শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে এবং অন্যদেরকেও কার্পণ্য ও শরীয়ত বিরোধী কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে তার কোনই ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। কেননা তিনি সমস্ত মাখলূক হতে অভাবমুক্ত ও বেপরোয়া। তিনি তো প্রশংসাৰ্হ। যেমন হযরত মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “যদি তোমরা কুফরী কর এবং সারা বিশ্বের মানুষও কাফির হয়ে যার (তবুও আল্লাহর কোন ক্ষতি হবে না), সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ তো অভাবমুক্ত ও প্রশংসার্হ।” (১৪:৮)
আল-হাদীদ 57:24
২২-২৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ব্যাপক ক্ষমতার খবর দিচ্ছেন যে, তিনি মাখলুকাতকে সৃষ্টি করার পূর্বেই তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তিনি বলেন যে, ভূ-পৃষ্ঠের যে অংশে কোন বিপর্যয় আসে অথবা ব্যক্তিগতভাবে কারো উপর কোন বিপদ আপতিত হয়, তার এই বিশ্বাস রাখা উচিত যে, ওটার হওয়া নিশ্চিতই ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, প্রাণসমূহ সৃষ্টি করার পূর্বেই ওদের ভাগ্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সঠিকতম কথা এটাই যে, মাখলুককে সৃষ্টি করার পূর্বেই তাদের ভাগ্য নির্ধারিত ছিল।ইমাম হাসান (রাঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! প্রত্যেক বিপদ বিপর্যয় যা আসমান ও যমীনে আপতিত হয় তা প্রাণসমূহের সৃষ্টির পূর্বেই মহান প্রতিপালকের কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং এতে সন্দেহের কি আছে?” যমীনের মসীবত হলো অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিপদ হলো দুঃখ, কষ্ট, রোগ ইত্যাদি। যে কাউকেও কোন আঁচড় লাগে বা পা পিছলিয়ে পড়ে কোন আঘাত লাগে কিংবা কোন কঠিন পরিশ্রমের কারণে ঘর্ম নির্গত হয়, এসবই তার গুনাহর কারণেই হয়ে থাকে। আরো তো বহু গুনাহ রয়েছে যেগুলো গাফুরুর রাহীম আল্লাহ ক্ষমা করেই দেন। কাদরিয়া সম্প্রদায়ের মত খণ্ডনে এই আয়াত একটি বড় দলীল। তাদের ধারণা এই যে, পূর্ব অবগতি কোন জিনিসই নয়। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে লাঞ্ছিত করুন!সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা যমীন ও আসমান সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার পূর্বে তকদীর নির্ধারণ করেন। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাঁর আরশ পানির উপর ছিল। (এটা ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ কার্য অস্তিত্বে আসার পূর্বে ওটা জেনে নেয়া, ওটা হওয়ার জ্ঞান লাভ করা এবং ওটাকে লিপিবদ্ধ করা আল্লাহ তা'আলার নিকট মমাটেই কঠিন নয়। তিনিই তো ওগুলোর সৃষ্টিকর্তা। যা কিছু হয়ে গেছে এবং যা কিছু হবে, তার সীমাহীন জ্ঞান সবই অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তোমাদেরকে এ খবর এজন্যেই দিলাম যে, তোমাদের উপর যে বিপদ আপদ আপতিত হয় তা কখনো টলবার ছিল না এ বিশ্বাস যেন তোমাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হয়ে যায়। সুতরাং বিপদের সময় যেন তোমাদের মধ্যে ধৈর্য, সহনশীলতা, স্থিরতা এবং রূহানী শক্তি বিদ্যমান থাকে। তোমরা যেন হায়, হায়, হা-হুতাশ না কর এবং অধৈর্য না হয়ে পড়। তোমরা যেন নিশ্চিন্ত থাকে যে, এ বিপদ আসারই ছিল। অনুরূপভাবে যদি তোমরা ধন-সম্পদের বিজয় ইত্যাদি অযাচিতভাবে লাভ কর তবে যেন অহংকারে ফেটে না পড়। এমন যেন না হও যে, ধন-মাল পেয়ে আল্লাহকে ভুলে বস। এই সময়েও তোমাদের সামনে আমার শিক্ষা থাকবে যে, তোমাদেরকে ধন-মালের মালিক করে দেয়া আমারই হাতে, এতে তোমাদের কোনই কৃতিত্ব নেই। একটি কিরআতে (আরবী) আছে এবং আর একটি কিরআতে (আরবী) আছে। দুটোই পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত। এ জন্যেই ইরশাদ হচ্ছে, যে ব্যক্তি নিজেকে বড় মনে করে এবং অন্যের উপর গর্ব প্রকাশ করে সে আল্লাহর শত্রু। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “অশান্তি ও শান্তি এবং আনন্দ ও নিরানন্দ সব মানুষের উপরই আসে। আনন্দকে কৃতজ্ঞতায় এবং দুঃখকে ধৈর্যধারণে কাটিয়ে দাও।” মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এ লোকগুলো নিজেরাও কৃপণ ও শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে এবং অন্যদেরকেও কার্পণ্য ও শরীয়ত বিরোধী কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে তার কোনই ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। কেননা তিনি সমস্ত মাখলূক হতে অভাবমুক্ত ও বেপরোয়া। তিনি তো প্রশংসাৰ্হ। যেমন হযরত মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “যদি তোমরা কুফরী কর এবং সারা বিশ্বের মানুষও কাফির হয়ে যার (তবুও আল্লাহর কোন ক্ষতি হবে না), সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ তো অভাবমুক্ত ও প্রশংসার্হ।” (১৪:৮)
আল-হাদীদ 57:25
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি আমার রাসূলদেরকে (আঃ) মু'জিযা দিয়ে, স্পষ্ট প্রমাণ প্রদান করে এবং পূর্ণ দলীলসমূহ দিয়ে দুনিয়ায় প্রেরণ করেছি। সাথে সাথে তাদেরকে কিতাবও প্রদান করেছি যা খাটি, পরিষ্কার ও সত্য। আর দিয়েছি আদল ও হক, যা দ্বারা প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তি তাদের কথাকে কবুল করে নিতে স্বাভাবিকভাবেই বাধ্য হয়। হ্যাঁ, তবে যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে এবং বুঝেও বুঝতে চায় না তারা এর থেকে বঞ্চিত রয়ে যায়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে আয়াত বা দলীল-প্রমাণের উপর রয়েছে এবং যার অনুসরণ করে তার প্রেরিত সাক্ষী।” (১১:১৭) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।” (৩০:৩০) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড।” (৫৫:৭) সুতরাং এখানে তিনি বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, যেন মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। অর্থাৎ রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করে এবং তার আদেশ পালন করে। তারা যেন রাসূল (সঃ)-এরই সমস্ত কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। কেননা, তার কথার মত অন্য কারো কথা সরাসরি সত্য নয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালকের কথা পূর্ণ হয়েছে যিনি স্বীয় খবর প্রদানে সত্যবাদী এবং স্বীয় আহকামে ন্যায়পরায়ণ।” (৬:১১৫) কারণ এটাই যে, যখন মুমিনরা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং পুরোপুরিভাবে আল্লাহর নিয়ামতের অধিকারী হবে তখন তারা বলবেঃ (আরবী)অর্থাৎ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্যে যিনি আমাদেরকে এর জন্যে পথ প্রদর্শন করেছেন, যদি আল্লাহ আমাদেরকে পথ প্রদর্শন না করতেন তবে আমরা পথ পেতাম না, আমাদের নিকট রাসূলগণ সত্যসহ এসেছিলেন।” (৭:৪৩)। এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আমি সত্য অস্বীকারকারীদেরকে দমন করার লক্ষ্যে লোহা তৈরী করেছি। অর্থাৎ প্রথমে কিতাব, রাসূল এবং হকের মাধ্যমে হুজ্জত কায়েম করেছি। অতঃপর বক্র অন্তর বিশিষ্ট লোকদের বক্রতা দূর করার জন্য আমি লোহা সৃষ্টি করেছি যে, যেন এর দ্বারা অস্ত্র-শস্ত্র তৈরী করা যায় এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ ভক্ত বান্দারা তারা শত্রুদের অন্তরের কাঁটা বের করে আনে। এই নমুনাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশায় সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়। মক্কা শরীফে তিনি সুদীর্ঘ তেরো বছর মুশরিকদেরকে বুঝাতে, তাওহীদ ও সুন্নাতের দাওয়াত প্রদানে এবং তাদের বদ আকীদা সংশোধনকরণে কাটিয়ে দেন। তারা স্বয়ং তাঁর উপর যেসব বিপদ আপদ চাপিয়ে দেয় তা তিনি সহ্য করেন। কিন্তু যখন এই হুজ্জত শেষ হয়ে গেল তখন শরীয়ত মুসলমানদেরকে হিজরত করার অনুমতি দিলো। তারপর আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিলেন যে, এখন ইসলাম প্রচারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করা হোক। তাদের গর্দান উড়িয়ে দিয়ে যমীনকে আল্লাহর অহীর বিরুদ্ধাচরণকারীদের হতে পবিত্র করা হোক। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কিয়ামতের পূর্বেই আমি তরবারীসহ প্রেরিত হয়েছি যে পর্যন্ত না শরীক বিহীন এক আল্লাহরই ইবাদত করা হয়। আর আমার রিক আমার বর্শার ছায়ার নীচে রেখে দেয়া হয়েছে এবং লাঞ্ছনা ও অবমাননা ঐ লোকদের, যারা আমার হুকুমের বিরুদ্ধাচরণ করে। যে ব্যক্তি কোন কওমের সহিত সাদৃশ্য যুক্ত হয় সে তাদেরই একজন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুতরাং লৌহ দ্বারা অস্ত্রশস্ত্র তৈরী করা হয়। যেমন তরবারী, বর্শা, ছুরি, তীর, বর্ম ইত্যাদি। এছাড়া এর দ্বারা জনগণ আরো বহু উপকার লাভ করে থাকে। যেমন এই লৌহ দ্বারা তারা কুড়াল, কোদাল, দা, আরী, চাষের যন্ত্রপাতি, বয়নের যন্ত্রপাতি, রান্নার পাত্র, রুটির তাওয়া ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরী করে থাকে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) তিনটি জিনিসসহ জান্নাত হতে এসেছিলেন। (এক) নেহাই, (দুই) বাঁশী এবং (তিন) হাতুড়ী। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, আল্লাহ প্রকাশ করে দিবেন। কে প্রত্যক্ষ না করেও তাকে ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে সাহায্য করে। অর্থাৎ এই অস্ত্র-শস্ত্রগুলো উঠিয়ে নেক নিয়তে কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে সাহায্য করতে চায় তা আল্লাহ পরীক্ষা করতে চান। আল্লাহ তো শক্তিমান, পরাক্রমশালী। তাঁর দ্বীনের যে সাহায্য করবে সে নিজেরই সাহায্য করবে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলা নিজেই নিজের দ্বীনকে শক্তিশালী করেন। তিনি তো জিহাদের ব্যবস্থা দিয়েছেন বান্দাদেরকে শুধু পরীক্ষা করার জন্যে। বান্দার সাহায্যের তাঁর কোনই প্রয়োজন নেই। বিজয় ও সাহায্য তো তাঁরই পক্ষ থেকে এসে থাকে।
আল-হাদীদ 57:26
২৬-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী ও রাসূল হযরত নূহ (আঃ) এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ) থেকে নিয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) পর্যন্ত যত নবী এসেছেন সবাই হযরত নূহ (আঃ)-এর বংশধর রূপে এসেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেছেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি তার বংশধরের মধ্যেই নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (২৯:২৭) শেষ পর্যন্ত বানী ইসরাঈলের শেষ নবী হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর আগমনের সুসংবাদ শুনিয়ে দেন। সুতরাং হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পরে বরাবরই রাসূলদের ক্রম জারী থেকেছে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত, যাকে ইঞ্জীল প্রদান করা হয় এবং যার অনুসারী উম্মত কোমল হৃদয় ও নরম মিজাষরূপে পরিগণিত হয়েছে। তারা আল্লাহ ভীতি এবং সৃষ্টির প্রতি দয়া, এই পবিত্র গুণে গুণান্বিত ছিলেন।এরপর খৃষ্টানদের একটি বিদআতের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা তাদের শরীয়তে ছিল না, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের পক্ষ থেকে ওটা আবিষ্কার করে নিয়েছিল। ওটা হলো সন্ন্যাসবাদ। এর পরবর্তী বাক্যের দুটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম এই যে, তাদের উদ্দেশ্য ভাল ছিল। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই তারা এটা প্রবর্তন করেছিল। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ) প্রমুখ গুরুজনের এটাই উক্তি। দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ আমি তাদের উপর এটা ওয়াজিব করিনি, বরং আমি তাদের উপর শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ওয়াজিব করেছিলাম।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ এটাও তারা যথাযথভাবে পালন করেনি। যেমনভাবে এর উপর স্থির থাকা তাদের উচিত ছিল তেমনভাবে তারা স্থির থাকেনি। সুতরাং তারা দুটি মন্দ কাজ করলো। (এক) তারা নিজেদের পক্ষ হতে আল্লাহর দ্বীনে নতুন পন্থা আবিষ্কার করলো। (দুই) তারা ওর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকলো না। অর্থাৎ যেটাকে তারা নিজেরাই আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করে নিয়েছিল, শেষে ওর উপরও তারা পুরোপুরিভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকলো না।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে ডাক দেনঃ “হে ইবনে মাসউদ (রাঃ)!” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এই তো আমি হাযির আছি।” তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে, বানী ইসরাঈলের বাহাত্তরটি দল হয়ে গেছে যাদের মধ্যে তিন দল পরিত্রাণ পেয়েছে। প্রথম দলটি বানী ইসরাঈলের পথভ্রষ্টতা দেখে তাদের হিদায়াতের জন্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের বড়দের মধ্যে তাবলীগ শুরু করে দিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐ লোকগুলো এই তাবলীগকারী দলটির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো এবং বাদশাহ ও আমীরগণ যারা এই তাবলীগের কারণে বড়ই হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল, এই তাবলীগী দলটির বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করলো এবং এভাবে তাদেরকে হত্যাও করলো এবং বন্দীও করলো। এই দলটিতে মুক্তি লাভ করলো। তারপর দ্বিতীয় দলটি দাঁড়িয়ে গেল। তাদের সাথে মুকাবিলা করার শক্তি তো এদের ছিল না, তথাপি নিজেদের দ্বীনী শক্তির বলে ঐ উদ্ধত লোকদের দরবারে সত্যের বক্তৃতা শুরু করে দিলো এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর মূল মাযহাবের দিকে তাদেরকে দাওয়াত দিতে লাগলো। ঐ হতভাগ্যের দল এদেরকেও হত্যা করে দিলো, তাদেরকে আরী দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করলো এবং আগুনে জ্বালিয়ে দিলো। এর সবই এই দলটি ধৈর্যের সাথে বরদাশত করলো। এভাবে এ দলটিও নাজাত পেয়ে গেল। এরপর উঠলো তৃতীয় দলটি। এরা এদের পূর্ববর্তী দলটির চেয়েও দুর্বল ছিল। এদের এ শক্তি ছিল না যে, ঐ যালিমদের মধ্যে প্রকৃত দ্বীনের আহকামের তাবলীগ করে। এজন্যে তারা নিজেদের দ্বীনকে রক্ষা করার উপায় এটাই মনে করলো যে, তারা জঙ্গলে চলে যাবে এবং পাহাড়ে পর্বতে আরোহণ করবে ও ইবাদতে মশগুল হয়ে যাবে। আর দুনিয়াকে পরিত্যাগ করবে। তাদেরই বর্ণনা (আরবী)-এই আয়াতে রয়েছে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এই হাদীসটিই অন্য সনদেও বর্ণিত আছে। তাতে তেহাত্তর দলের বর্ণনা রয়েছে। তাতে এও আছেঃ তারাই পুরস্কার লাভ করবে যারা আমার উপর ঈমান আনবে এবং আমার সত্যতা স্বীকার করবে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই যারা ফাসেক তারা হলো ঐ সব লোকে যারা আমাকে অবিশ্বাস করবে এবং আমার বিরোধী হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর পরে বানী ইসরাঈলের বাদশাহরা তাওরাত ও ইঞ্জীলের মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। কিন্তু কতগুলো লোক ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং আসল তাওরাত ও ইঞ্জীল তাদের হাতে থাকে যা তারা তিলাওয়াত করতো। একবার আল্লাহর কিতাবে রদবদলকারী লোকেরা তাদের বাদশাহর কাছে এই খাঁটি মুমিনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেঃ “এই লোকগুলো আল্লাহর কিতাব বলে যে কিতাব পাঠ করে তাতে তো আমাদেরকে গালি দেয়া হয়েছে। তাতে লিখিত আছে যে, যে কেউই আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব অনুযায়ী ফায়সালা করে না তারা কাফির এবং এ ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে। এ লোকগুলো আমাদের কাজের উপর দোষারোপ করে থাকে। সুতরাং আপনি এদেরকে আপনার দরবারে ডাকিয়ে নিন এবং এদেরকে বাধ্য করুন যে, হয় এরা কিতাব এভাবে পাঠ করুক যেভাবে আমরা পাঠ করি এবং ঐরূপই আকীদা ও বিশ্বাস রাখে যেরূপ বিশ্বাস আমরা রাখি, না হয় তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করুন।”তাদের এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই খাঁটি মুমিনদেরকে বাদশাহর দরবারে আহ্বান করা হলো। তাদেরকে বলা হলোঃ “হয় তোমরা আমাদের সংশোধনকৃত কিতাব পাঠ কর এবং তোমাদের হাতে যে আল্লাহ প্রদত্ত কিতাব রয়েছে তা পরিত্যাগ কর, না হয় মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাও এবং বধ্যভূমির দিকে অগ্রসর হও।” তখন ঐ পবিত্র দলগুলোর একটি দল বললোঃ “তোমরা আমাদের জন্যে একটি উঁচু প্রাসাদ তৈরী কর এবং আমাদেরকে সেখানে উঠিয়ে দাও। আমাদের জন্যে দড়ি ও ছড়ির ব্যবস্থা কর। অতঃপর আমাদের খাদ্য ও পানীয় দ্রব্য তাতে রেখে দেবে। আমরা উপর থেকে তা টেনে উঠিয়ে নিবো। আমরা নীচে কখনো নামবো না এবং তোমাদের লোকালয়ে আসবো না। আর একটি দল বললোঃ “আমাদেরকে ছেড়ে দাও। আমরা এখান হতে হিজরত করে চলে যাচ্ছি। আমরা পাহাড়ে জঙ্গলে চলে যাবো। ঝরণা, নদী-নালা এবং পুকুর-পুষ্করিণী হতে আমরা জানোয়ারের মত পানি পান করবে। এরপরে যদি তোমরা আমাদেরকে তোমাদের লোকালয়ে দেখতে পাও তবে নির্ধিদায় আমাদেরকে হত্যা করে ফেলো।” তৃতীয় দলটি বললোঃ “তোমরা আমাদেরকে তোমাদের লোকালয়ের এক প্রান্তে কিছু ভূখণ্ড দিয়ে দাও এবং সেখানে সীমারেখা টেনে দাও। আমরা সেখানেই কূপ খনন করবে এবং চাষাবাদ করবে। তোমাদের লোকালয়ে আমরা কখনো আসবই না।" এই আল্লাহভীরু লোকদের সাথে ঐ লোকগুলোর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল বলে তারা এদের আবেদন মঞ্জুর করলো এবং এ লোকগুলো নিজ নিজ ঠিকানায় চলে গেল। কিন্তু তাদের সাথে এমন কতগুলো লোকও গেল যাদের অন্তরে প্রকৃতপক্ষে ঈমান ছিল না। তারা শুধু অনুকরণ হিসেবে এদের সঙ্গী হয়েছিল। তাদের ব্যাপারেই আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।অতঃপর যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে রাসূলরূপে প্রেরণ করলেন তখন তাদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক লোকই বাকী ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের খবর শোন মাত্রই খানকাহবাসীরা তাদের খানকাহ হতে, জঙ্গলবাসীরা জঙ্গল হতে এবং ঘেরাও আঙ্গিনায় বসবাসকারীরা তাদের ঐ আঙ্গিনা হতে বেরিয়ে আসলো এবং তাঁর খিদমতে হাযির হয়ে তার উপর ঈমান আনয়ন করে এবং তার সত্যতা স্বীকার করে। এরই বর্ণনা নিম্নের আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, তিনি তাঁর অনুগ্রহে তোমাদেরকে দিবেন দ্বিগুণ পুরস্কার এবং তিনি তোমাদেরকে দিবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা চলবে।” (৫৭:২৮) অর্থাৎ তাদের হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন এবং পরে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন, এ কারণেই তাদের জন্যে রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার। আর নূর বা আলো হলো কুরআন ও সুন্নাহ্। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “এটা এই জন্যে যে, কিতাবীগণ যেন জানতে পারে, আল্লাহর সামান্যতম অনুগ্রহের উপরও তাদের কোন অধিকার নেই। অনুগ্রহ আল্লাহরই ইখতিয়ারে, যাকে ইচ্ছা তাকে তিনি তা দান করেন। আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।” পরবর্তী এ দুটি আয়াতের তাফসীর এই আয়াতের পরেই আসছে ইনশাআল্লাহ। হযরত সাহল ইবনে আবি উমামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ)-এর খিলাফতের যুগে তিনি এবং তাঁর পিতা মদীনায় হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন। ঐ সময় তিনি মদীনার শাসনকর্তা ছিলেন। যখন তারা হযরত আনাস (রাঃ)-এর নিকট আসেন তখন তিনি নামায পড়ছিলেন এবং নামায পড়ছিলেন প্রায় মুসাফিরের নামাযের মত হালকাভাবে। তিনি সালাম ফিরালে তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি ফরয নামায পড়লেন, না নফল নামায?" উত্তরে তিনি বললেন, ফরয নামায। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামায এরূপই ছিল। আমি আমার ধারণা ও জানামতে এতে কোন ভুল করিনি। হ্যাঁ, তবে যদি ভুল বশতঃ কিছু হয়ে থাকে তবে আমি তা বলতে পারি না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের জীবনের উপর কঠোরতা অবলম্বন করো না। অন্যথায় তোমাদের উপর কঠোরতা অবলম্বন করা হবে। এক সম্প্রদায় নিজেদের জীবনের উপর কঠোরতা অবলম্বন করেছিল বলে তাদের উপরও কঠোরতা অবলম্বন করা হয়েছিল। তাদের অবশিষ্টাংশ তাদের খানকাতে ও তাদের ঘরসমূহে এখনো বিদ্যমান রয়েছে। এটাই ছিল ঐ কঠোরতা অর্থাৎ দুনিয়া ত্যাগ, যা আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর ওয়াজিব করেননি। দ্বিতীয়বার তারা পিতা-পুত্র হযরত আনাস (রাঃ)-কে বললেনঃ “আসুন, আমরা সওয়ারীর উপর সওয়ার হয়ে চলি এবং দেখি ও শিক্ষা গ্রহণ করি।” হযরত আনাস (রাঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, বেশ!” অতঃপর সবাই সওয়ার হয়ে চললেন। কয়েকটি বস্তী তারা দেখলেন যেগুলো একেবারে শ্মশানে পরিণত হয়েছিল এবং ঘরগুলো উল্টোমুখে পড়েছিল। এ দেখে তারা হযরত আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এ শহরগুলোর অবস্থা কি আপনার জানা আছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, খুব ভাল জানা আছে। এমন কি এগুলোর অধিবাসীদের সম্পর্কেও আমি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তাদেরকে ঔদ্ধত্য ও হিংসা-বিদ্বেষ ধ্বংস করে দিয়েছে। হিংসা পুণ্যের জ্যোতিকে নিভিয়ে দেয়, আর ঔদ্ধত্য বা হঠকারিতা ওটাকে সত্যতায় রূপ দান করে বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। চক্ষুরও যেনা হয়, হাত, পা এবং জিহ্বারও যেনা হয়, আর লজ্জাস্থান ওটাকে বাস্তবে রূপায়িত করে অথবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।” (এটা হাফিয আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আইয়াস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবী (আঃ)-এর জন্যেই সন্ন্যাসবাদ ছিল এবং আমার উম্মতের সন্ন্যাসবাদ হলো মহামহিমান্বিত আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাফিয আবুল ইয়ালাও (রঃ) এটা বর্ণনা। করেছেন, কিন্তু তার বর্ণনায় প্রত্যেক নবীর স্থলে প্রত্যেক উম্মত রয়েছে)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাঁর কাছে একজন লোক এসে বলেঃ “আমাকে কিছু অসিয়ত করুন।” তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি আমার কাছে যে আবেদন করলে এই আবেদনই আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে করেছিলাম। আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার অসিয়ত করছি। এটাই সমস্ত পুণ্য কার্যের মূল। তুমি জিহাদকে নিজের জন্যে অবশ্যকর্তব্য করে নাও। এটাই হলো ইসলামের সন্ন্যাসবাদ। আর আল্লাহর যিক্র এবং কুরআন পাঠকে তুমি নিজের উপর অবশ্যপালনীয় করে ফেলো। এটাই আকাশে তোমার রূহ এবং পৃথিবীতে তোমার যিক্র।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) এককভাবে বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাইসবচেয়ে ভাল জানেন)