Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-হাদীদ 57:27 – আল-হাশর 59:9

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-হাদীদ 57:27
  2. আল-হাদীদ 57:28
  3. আল-হাদীদ 57:29
  4. আল-মুজাদালা 58:1
  5. আল-মুজাদালা 58:2
  6. আল-মুজাদালা 58:3
  7. আল-মুজাদালা 58:4
  8. আল-মুজাদালা 58:5
  9. আল-মুজাদালা 58:6
  10. আল-মুজাদালা 58:7
  11. আল-মুজাদালা 58:8
  12. আল-মুজাদালা 58:9
  13. আল-মুজাদালা 58:10
  14. আল-মুজাদালা 58:11
  15. আল-মুজাদালা 58:12
  16. আল-মুজাদালা 58:13
  17. আল-মুজাদালা 58:14
  18. আল-মুজাদালা 58:15
  19. আল-মুজাদালা 58:16
  20. আল-মুজাদালা 58:17
  21. আল-মুজাদালা 58:18
  22. আল-মুজাদালা 58:19
  23. আল-মুজাদালা 58:20
  24. আল-মুজাদালা 58:21
  25. আল-মুজাদালা 58:22
  26. আল-হাশর 59:1
  27. আল-হাশর 59:2
  28. আল-হাশর 59:3
  29. আল-হাশর 59:4
  30. আল-হাশর 59:5
  31. আল-হাশর 59:6
  32. আল-হাশর 59:7
  33. আল-হাশর 59:8
  34. আল-হাশর 59:9

আল-হাদীদ 57:27

২৬-২৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী ও রাসূল হযরত নূহ (আঃ) এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ) থেকে নিয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) পর্যন্ত যত নবী এসেছেন সবাই হযরত নূহ (আঃ)-এর বংশধর রূপে এসেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেছেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি তার বংশধরের মধ্যেই নবুওয়াত ও কিতাব রেখেছি।” (২৯:২৭) শেষ পর্যন্ত বানী ইসরাঈলের শেষ নবী হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর আগমনের সুসংবাদ শুনিয়ে দেন। সুতরাং হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর পরে বরাবরই রাসূলদের ক্রম জারী থেকেছে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত, যাকে ইঞ্জীল প্রদান করা হয় এবং যার অনুসারী উম্মত কোমল হৃদয় ও নরম মিজাষরূপে পরিগণিত হয়েছে। তারা আল্লাহ ভীতি এবং সৃষ্টির প্রতি দয়া, এই পবিত্র গুণে গুণান্বিত ছিলেন।এরপর খৃষ্টানদের একটি বিদআতের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যা তাদের শরীয়তে ছিল না, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের পক্ষ থেকে ওটা আবিষ্কার করে নিয়েছিল। ওটা হলো সন্ন্যাসবাদ। এর পরবর্তী বাক্যের দুটি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম এই যে, তাদের উদ্দেশ্য ভাল ছিল। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই তারা এটা প্রবর্তন করেছিল। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ) প্রমুখ গুরুজনের এটাই উক্তি। দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ আমি তাদের উপর এটা ওয়াজিব করিনি, বরং আমি তাদের উপর শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ওয়াজিব করেছিলাম।অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ এটাও তারা যথাযথভাবে পালন করেনি। যেমনভাবে এর উপর স্থির থাকা তাদের উচিত ছিল তেমনভাবে তারা স্থির থাকেনি। সুতরাং তারা দুটি মন্দ কাজ করলো। (এক) তারা নিজেদের পক্ষ হতে আল্লাহর দ্বীনে নতুন পন্থা আবিষ্কার করলো। (দুই) তারা ওর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকলো না। অর্থাৎ যেটাকে তারা নিজেরাই আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করে নিয়েছিল, শেষে ওর উপরও তারা পুরোপুরিভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকলো না।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে ডাক দেনঃ “হে ইবনে মাসউদ (রাঃ)!” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এই তো আমি হাযির আছি।” তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে, বানী ইসরাঈলের বাহাত্তরটি দল হয়ে গেছে যাদের মধ্যে তিন দল পরিত্রাণ পেয়েছে। প্রথম দলটি বানী ইসরাঈলের পথভ্রষ্টতা দেখে তাদের হিদায়াতের জন্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের বড়দের মধ্যে তাবলীগ শুরু করে দিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐ লোকগুলো এই তাবলীগকারী দলটির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো এবং বাদশাহ ও আমীরগণ যারা এই তাবলীগের কারণে বড়ই হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল, এই তাবলীগী দলটির বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করলো এবং এভাবে তাদেরকে হত্যাও করলো এবং বন্দীও করলো। এই দলটিতে মুক্তি লাভ করলো। তারপর দ্বিতীয় দলটি দাঁড়িয়ে গেল। তাদের সাথে মুকাবিলা করার শক্তি তো এদের ছিল না, তথাপি নিজেদের দ্বীনী শক্তির বলে ঐ উদ্ধত লোকদের দরবারে সত্যের বক্তৃতা শুরু করে দিলো এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর মূল মাযহাবের দিকে তাদেরকে দাওয়াত দিতে লাগলো। ঐ হতভাগ্যের দল এদেরকেও হত্যা করে দিলো, তাদেরকে আরী দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করলো এবং আগুনে জ্বালিয়ে দিলো। এর সবই এই দলটি ধৈর্যের সাথে বরদাশত করলো। এভাবে এ দলটিও নাজাত পেয়ে গেল। এরপর উঠলো তৃতীয় দলটি। এরা এদের পূর্ববর্তী দলটির চেয়েও দুর্বল ছিল। এদের এ শক্তি ছিল না যে, ঐ যালিমদের মধ্যে প্রকৃত দ্বীনের আহকামের তাবলীগ করে। এজন্যে তারা নিজেদের দ্বীনকে রক্ষা করার উপায় এটাই মনে করলো যে, তারা জঙ্গলে চলে যাবে এবং পাহাড়ে পর্বতে আরোহণ করবে ও ইবাদতে মশগুল হয়ে যাবে। আর দুনিয়াকে পরিত্যাগ করবে। তাদেরই বর্ণনা (আরবী)-এই আয়াতে রয়েছে। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এই হাদীসটিই অন্য সনদেও বর্ণিত আছে। তাতে তেহাত্তর দলের বর্ণনা রয়েছে। তাতে এও আছেঃ তারাই পুরস্কার লাভ করবে যারা আমার উপর ঈমান আনবে এবং আমার সত্যতা স্বীকার করবে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই যারা ফাসেক তারা হলো ঐ সব লোকে যারা আমাকে অবিশ্বাস করবে এবং আমার বিরোধী হবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর পরে বানী ইসরাঈলের বাদশাহরা তাওরাত ও ইঞ্জীলের মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। কিন্তু কতগুলো লোক ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং আসল তাওরাত ও ইঞ্জীল তাদের হাতে থাকে যা তারা তিলাওয়াত করতো। একবার আল্লাহর কিতাবে রদবদলকারী লোকেরা তাদের বাদশাহর কাছে এই খাঁটি মুমিনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেঃ “এই লোকগুলো আল্লাহর কিতাব বলে যে কিতাব পাঠ করে তাতে তো আমাদেরকে গালি দেয়া হয়েছে। তাতে লিখিত আছে যে, যে কেউই আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব অনুযায়ী ফায়সালা করে না তারা কাফির এবং এ ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে। এ লোকগুলো আমাদের কাজের উপর দোষারোপ করে থাকে। সুতরাং আপনি এদেরকে আপনার দরবারে ডাকিয়ে নিন এবং এদেরকে বাধ্য করুন যে, হয় এরা কিতাব এভাবে পাঠ করুক যেভাবে আমরা পাঠ করি এবং ঐরূপই আকীদা ও বিশ্বাস রাখে যেরূপ বিশ্বাস আমরা রাখি, না হয় তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করুন।”তাদের এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই খাঁটি মুমিনদেরকে বাদশাহর দরবারে আহ্বান করা হলো। তাদেরকে বলা হলোঃ “হয় তোমরা আমাদের সংশোধনকৃত কিতাব পাঠ কর এবং তোমাদের হাতে যে আল্লাহ প্রদত্ত কিতাব রয়েছে তা পরিত্যাগ কর, না হয় মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাও এবং বধ্যভূমির দিকে অগ্রসর হও।” তখন ঐ পবিত্র দলগুলোর একটি দল বললোঃ “তোমরা আমাদের জন্যে একটি উঁচু প্রাসাদ তৈরী কর এবং আমাদেরকে সেখানে উঠিয়ে দাও। আমাদের জন্যে দড়ি ও ছড়ির ব্যবস্থা কর। অতঃপর আমাদের খাদ্য ও পানীয় দ্রব্য তাতে রেখে দেবে। আমরা উপর থেকে তা টেনে উঠিয়ে নিবো। আমরা নীচে কখনো নামবো না এবং তোমাদের লোকালয়ে আসবো না। আর একটি দল বললোঃ “আমাদেরকে ছেড়ে দাও। আমরা এখান হতে হিজরত করে চলে যাচ্ছি। আমরা পাহাড়ে জঙ্গলে চলে যাবো। ঝরণা, নদী-নালা এবং পুকুর-পুষ্করিণী হতে আমরা জানোয়ারের মত পানি পান করবে। এরপরে যদি তোমরা আমাদেরকে তোমাদের লোকালয়ে দেখতে পাও তবে নির্ধিদায় আমাদেরকে হত্যা করে ফেলো।” তৃতীয় দলটি বললোঃ “তোমরা আমাদেরকে তোমাদের লোকালয়ের এক প্রান্তে কিছু ভূখণ্ড দিয়ে দাও এবং সেখানে সীমারেখা টেনে দাও। আমরা সেখানেই কূপ খনন করবে এবং চাষাবাদ করবে। তোমাদের লোকালয়ে আমরা কখনো আসবই না।" এই আল্লাহভীরু লোকদের সাথে ঐ লোকগুলোর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল বলে তারা এদের আবেদন মঞ্জুর করলো এবং এ লোকগুলো নিজ নিজ ঠিকানায় চলে গেল। কিন্তু তাদের সাথে এমন কতগুলো লোকও গেল যাদের অন্তরে প্রকৃতপক্ষে ঈমান ছিল না। তারা শুধু অনুকরণ হিসেবে এদের সঙ্গী হয়েছিল। তাদের ব্যাপারেই আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।অতঃপর যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে রাসূলরূপে প্রেরণ করলেন তখন তাদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক লোকই বাকী ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর রিসালাতের খবর শোন মাত্রই খানকাহবাসীরা তাদের খানকাহ হতে, জঙ্গলবাসীরা জঙ্গল হতে এবং ঘেরাও আঙ্গিনায় বসবাসকারীরা তাদের ঐ আঙ্গিনা হতে বেরিয়ে আসলো এবং তাঁর খিদমতে হাযির হয়ে তার উপর ঈমান আনয়ন করে এবং তার সত্যতা স্বীকার করে। এরই বর্ণনা নিম্নের আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, তিনি তাঁর অনুগ্রহে তোমাদেরকে দিবেন দ্বিগুণ পুরস্কার এবং তিনি তোমাদেরকে দিবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা চলবে।” (৫৭:২৮) অর্থাৎ তাদের হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন এবং পরে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন, এ কারণেই তাদের জন্যে রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার। আর নূর বা আলো হলো কুরআন ও সুন্নাহ্। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “এটা এই জন্যে যে, কিতাবীগণ যেন জানতে পারে, আল্লাহর সামান্যতম অনুগ্রহের উপরও তাদের কোন অধিকার নেই। অনুগ্রহ আল্লাহরই ইখতিয়ারে, যাকে ইচ্ছা তাকে তিনি তা দান করেন। আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।” পরবর্তী এ দুটি আয়াতের তাফসীর এই আয়াতের পরেই আসছে ইনশাআল্লাহ। হযরত সাহল ইবনে আবি উমামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ)-এর খিলাফতের যুগে তিনি এবং তাঁর পিতা মদীনায় হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন। ঐ সময় তিনি মদীনার শাসনকর্তা ছিলেন। যখন তারা হযরত আনাস (রাঃ)-এর নিকট আসেন তখন তিনি নামায পড়ছিলেন এবং নামায পড়ছিলেন প্রায় মুসাফিরের নামাযের মত হালকাভাবে। তিনি সালাম ফিরালে তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি ফরয নামায পড়লেন, না নফল নামায?" উত্তরে তিনি বললেন, ফরয নামায। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামায এরূপই ছিল। আমি আমার ধারণা ও জানামতে এতে কোন ভুল করিনি। হ্যাঁ, তবে যদি ভুল বশতঃ কিছু হয়ে থাকে তবে আমি তা বলতে পারি না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের জীবনের উপর কঠোরতা অবলম্বন করো না। অন্যথায় তোমাদের উপর কঠোরতা অবলম্বন করা হবে। এক সম্প্রদায় নিজেদের জীবনের উপর কঠোরতা অবলম্বন করেছিল বলে তাদের উপরও কঠোরতা অবলম্বন করা হয়েছিল। তাদের অবশিষ্টাংশ তাদের খানকাতে ও তাদের ঘরসমূহে এখনো বিদ্যমান রয়েছে। এটাই ছিল ঐ কঠোরতা অর্থাৎ দুনিয়া ত্যাগ, যা আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর ওয়াজিব করেননি। দ্বিতীয়বার তারা পিতা-পুত্র হযরত আনাস (রাঃ)-কে বললেনঃ “আসুন, আমরা সওয়ারীর উপর সওয়ার হয়ে চলি এবং দেখি ও শিক্ষা গ্রহণ করি।” হযরত আনাস (রাঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, বেশ!” অতঃপর সবাই সওয়ার হয়ে চললেন। কয়েকটি বস্তী তারা দেখলেন যেগুলো একেবারে শ্মশানে পরিণত হয়েছিল এবং ঘরগুলো উল্টোমুখে পড়েছিল। এ দেখে তারা হযরত আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এ শহরগুলোর অবস্থা কি আপনার জানা আছে?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, খুব ভাল জানা আছে। এমন কি এগুলোর অধিবাসীদের সম্পর্কেও আমি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তাদেরকে ঔদ্ধত্য ও হিংসা-বিদ্বেষ ধ্বংস করে দিয়েছে। হিংসা পুণ্যের জ্যোতিকে নিভিয়ে দেয়, আর ঔদ্ধত্য বা হঠকারিতা ওটাকে সত্যতায় রূপ দান করে বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। চক্ষুরও যেনা হয়, হাত, পা এবং জিহ্বারও যেনা হয়, আর লজ্জাস্থান ওটাকে বাস্তবে রূপায়িত করে অথবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।” (এটা হাফিয আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আইয়াস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবী (আঃ)-এর জন্যেই সন্ন্যাসবাদ ছিল এবং আমার উম্মতের সন্ন্যাসবাদ হলো মহামহিমান্বিত আল্লাহর পথে জিহাদ করা।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। হাফিয আবুল ইয়ালাও (রঃ) এটা বর্ণনা। করেছেন, কিন্তু তার বর্ণনায় প্রত্যেক নবীর স্থলে প্রত্যেক উম্মত রয়েছে)হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাঁর কাছে একজন লোক এসে বলেঃ “আমাকে কিছু অসিয়ত করুন।” তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি আমার কাছে যে আবেদন করলে এই আবেদনই আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে করেছিলাম। আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার অসিয়ত করছি। এটাই সমস্ত পুণ্য কার্যের মূল। তুমি জিহাদকে নিজের জন্যে অবশ্যকর্তব্য করে নাও। এটাই হলো ইসলামের সন্ন্যাসবাদ। আর আল্লাহর যিক্র এবং কুরআন পাঠকে তুমি নিজের উপর অবশ্যপালনীয় করে ফেলো। এটাই আকাশে তোমার রূহ এবং পৃথিবীতে তোমার যিক্র।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) এককভাবে বর্ণনা করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাইসবচেয়ে ভাল জানেন)

আল-হাদীদ 57:28

২৮-২৯ নং আয়াতের তাফসীর: এর পূর্ববর্তী আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ যে মুমিনদের বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে এর দ্বারা আহলে কিতাবের মুমিনদেরকে বুঝানো হয়েছে এবং তারা দ্বিগুণ পুরস্কার লাভ করবে। যেমন সূরায়ে কাসাসের আয়াতে রয়েছে। আর যেমন একটি হাদীসে হযরত আবু মুসা। আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিন ব্যক্তিকে। আল্লাহ দ্বিগুণ প্রতিদান প্রদান করবেন। (এক) ঐ আহলে কিতাব, যে তার নবী (আঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে, তারপর আমার উপরও ঈমান আনয়ন করেছে। সে দ্বিগুণ বিনিময় লাভ করবে। (দুই) ঐ গোলাম, যে আল্লাহ তা'আলার হক আদায় করে এবং তার মনিবের হক আদায় করে। তার জন্যে রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার। (তিন) ঐ ব্যক্তি, যে তার ক্রীতদাসীকে আদব শিক্ষা দিয়েছে এবং খুব ভাল আদব অর্থাৎ শরয়ী আদব শিখিয়েছে। অতঃপর তাকে আযাদ করে দিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে। তার জন্যেও দ্বিগুণ প্রতিদান রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, আহলে কিতাব যখন দ্বিগুণ প্রতিদান প্রাপ্তির কারণে গর্ব ও ফখর করতে শুরু করে তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। সুতরাং এই উম্মতকে দ্বিগুণ প্রতিদান প্রদানের পর হিদায়াতের নূর দেয়ারও ওয়াদা দেয়া হলো এবং সাথে সাথে ক্ষমা করে দেয়ারও ওয়াদা আল্লাহ। পাক করলেন। সুতরাং এই উম্মতকে নূর ও মাগফিরাত এ দু’টি অতিরিক্ত দেয়া হলো। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ!. যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তবে তিনি তোমাদের জন্যে ফুরকান (হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী) করবেন, তোমাদের অপরাধ মার্জনা করবেন ও তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন এবং আল্লাহ বড় অনুগ্রহশীল।” (৮:২৯)। হযরত সাঈদ ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) বলেন যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) ইয়াহূদীদের একজন বড় আলেমকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদেরকে একটি পুণ্যের বিনিময়ে সর্বাধিক কতগুণ প্রদান করা হয়?" সে উত্তরে বলেনঃ “সাড়ে তিনশগুণ পর্যন্ত।” তখন হযরত উমার (রাঃ) আল্লাহ তা'আলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তোমাদের দ্বিগুণ দিয়েছেন।” হযরত সাঈদ (রঃ) এটা বর্ণনা করার পর মহামহিমান্বিত আল্লাহর(আরবী)-এই উক্তিটিই তিলাওয়াত করেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের এবং ইয়াহূদী ও নাসারাদের দৃষ্টান্ত হলো ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে তার কোন একটি কাজে কতকগুলো মজুর নিয়োগ করার ইচ্ছা করলো। অতঃপর সে ঘোষণা করলোঃ “এমন কেউ আছে কি যে আমার নিকট হতে এক কীরাত (এক আউন্সের চব্বিশ ভাগের এক ভাগ পরিমাণ ওজন) গ্রহণ করবে এবং এর বিনিময়ে ফজরের নামায হতে নিয়ে দুপুর পর্যন্ত আমার কাজ করবে?” তার এ ঘোষণা শুনে ইয়াহূদরা প্রস্তুত হয়ে গেল। সে আবার ঘোষণা করলোঃ “যে যোহর হতে আসর পর্যন্ত কাজ করবে তাকে আমি এক কীরাত প্রদান করবে।” এতে নাসারাগণ প্রস্তুত হলো এবং কাজ করলো (ও মজুরী নিলো)। পুনরায় লোকটি। ঘোষণা করলোঃ “আসর হতে মাগরিব পর্যন্ত যে কাজ করবে তাকে আমি দুই কীরাত প্রদান করবে।” তখন তোমরা (মুসলমানরা) কাজ করলে। এই ইয়াহূদী ও নাসারারা খুবই অসন্তুষ্ট হলো। তারা বলতে লাগলোঃ “আমরা কাজ করলাম বেশী এবং পারিশ্রমিক পেলাম কম, তারা কাজ করলো কম এবং পারিশ্রমিক পেলো বেশী।” তখন তাদেরকে বলা হলো তোমাদের হক কি নষ্ট করা হয়েছে?” তারা উত্তরে বললোঃ “না, আমাদের হক নষ্ট করা হয়নি বটে।” তখন তাদেরকে বলা হলোঃ “তাহলে এটা হলো আমার অনুগ্রহ, আমি যাকে ইচ্ছা এটা প্রদান করে থাকি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, মুসলমান এবং ইয়াহুদী ও নাসারাদের দৃষ্টান্ত হলো ঐ ব্যক্তির মত যে তার কোন কাজে কতকগুলো লোককে নিয়োগ করলো এবং পারিশ্রমিক নির্ধারণ করলো। আর বললোঃ “তোমরা সারা দিন কাজ করবে। তারা কাজে লেগে গেল। কিন্তু অর্ধদিন কাজ করার পর তারা বললোঃ “আমরা আর কাজ করবে না এবং যেটুকু কাজ করেছি পারিশ্রমিকও নিবো না।” লোকটি তাদেরকে বুঝিয়ে বললোঃ “এরূপ করো না, বরং কাজ পূর্ণ কর এবং মজুরীও নিয়ে নাও।” কিন্তু তারা পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করলো এবং আধা কাজ ফেলে দিয়ে মজুরী না নিয়ে চলে গেল। সে তখন অন্য লোকদেরকে কাজে লাগিয়ে দিলো এবং বললোঃ “তোমরা সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করবে এবং পুরো এক দিনেরই মজুরী পাবে।” এ লোকগুলো কাজে লেগে গেল। কিন্তু আসরের সময়েই তারা কাজ ছেড়ে দিয়ে বললোঃ “আমরা আজ কাজ করতে পারবো না এবং মজুরীও নিবো না। লোকটি খুব বুঝালো এবং বললোঃ “দেখো, এখন দিনের তো আর বেশী অংশ বাকী নেই। তোমরা কাজ কর এবং পারিশ্রমিক নিয়ে নাও।” কিন্তু তারা মানলো না এবং মজুরী না নিয়েই চলে গেল। লোকটি আবার অন্যদেরকে কাজে নিয়োগ করলো এবং বললোঃ “তোমরা মাগরিব পর্যন্ত কাজ করবে এবং পুরো দিনের মজুরী পাবে।” অতঃপর তারা মাগরিব পর্যন্ত কাজ করলো এবং পূর্বের দুটি দলের মজুরীও নিয়ে নিলো। সুতরাং এটা হলো তাদের দৃষ্টান্ত এবং ঐ নূরের দৃষ্টান্ত যা তারা কবুল করলো।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা এখানে বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, কিতাবীগণ যেন জানতে পারে, আল্লাহর সামান্যতম অনুগ্রহের উপরেও তাদের কোন অধিকার নেই এবং এটাও যেন তারা জানতে পারে যে, অনুগ্রহ আল্লাহরই ইখতিয়ারে। তাঁর অনুগ্রহের হিসাব কেউই লাগাতে পারে না। তিনি তাঁর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা দান করে থাকেন। আল্লাহ মহাঅনুগ্রহশীল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এখানে (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর (আরবী) কিরআতে রয়েছে। অনুরূপভাবে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) এবং হযরত আতা ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) হতেও এই কিরআতই বর্ণিত আছে। উদ্দেশ্য এটাই যে, আরবের কালামে (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর জন্যে এসে থাকে, যা কালামের শুরুতে ও শেষে আসে এবং তখন অস্বীকৃতি উদ্দেশ্য হয় না। যেমন আল্লাহ পাকের (আরবী) এবং (আরবী) -এই উক্তিগুলোতে রয়েছে।

আল-হাদীদ 57:29

২৮-২৯ নং আয়াতের তাফসীর: এর পূর্ববর্তী আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ যে মুমিনদের বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে এর দ্বারা আহলে কিতাবের মুমিনদেরকে বুঝানো হয়েছে এবং তারা দ্বিগুণ পুরস্কার লাভ করবে। যেমন সূরায়ে কাসাসের আয়াতে রয়েছে। আর যেমন একটি হাদীসে হযরত আবু মুসা। আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিন ব্যক্তিকে। আল্লাহ দ্বিগুণ প্রতিদান প্রদান করবেন। (এক) ঐ আহলে কিতাব, যে তার নবী (আঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে, তারপর আমার উপরও ঈমান আনয়ন করেছে। সে দ্বিগুণ বিনিময় লাভ করবে। (দুই) ঐ গোলাম, যে আল্লাহ তা'আলার হক আদায় করে এবং তার মনিবের হক আদায় করে। তার জন্যে রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার। (তিন) ঐ ব্যক্তি, যে তার ক্রীতদাসীকে আদব শিক্ষা দিয়েছে এবং খুব ভাল আদব অর্থাৎ শরয়ী আদব শিখিয়েছে। অতঃপর তাকে আযাদ করে দিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে। তার জন্যেও দ্বিগুণ প্রতিদান রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, আহলে কিতাব যখন দ্বিগুণ প্রতিদান প্রাপ্তির কারণে গর্ব ও ফখর করতে শুরু করে তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। সুতরাং এই উম্মতকে দ্বিগুণ প্রতিদান প্রদানের পর হিদায়াতের নূর দেয়ারও ওয়াদা দেয়া হলো এবং সাথে সাথে ক্ষমা করে দেয়ারও ওয়াদা আল্লাহ। পাক করলেন। সুতরাং এই উম্মতকে নূর ও মাগফিরাত এ দু’টি অতিরিক্ত দেয়া হলো। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ!. যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তবে তিনি তোমাদের জন্যে ফুরকান (হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী) করবেন, তোমাদের অপরাধ মার্জনা করবেন ও তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন এবং আল্লাহ বড় অনুগ্রহশীল।” (৮:২৯)। হযরত সাঈদ ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) বলেন যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) ইয়াহূদীদের একজন বড় আলেমকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদেরকে একটি পুণ্যের বিনিময়ে সর্বাধিক কতগুণ প্রদান করা হয়?" সে উত্তরে বলেনঃ “সাড়ে তিনশগুণ পর্যন্ত।” তখন হযরত উমার (রাঃ) আল্লাহ তা'আলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তোমাদের দ্বিগুণ দিয়েছেন।” হযরত সাঈদ (রঃ) এটা বর্ণনা করার পর মহামহিমান্বিত আল্লাহর(আরবী)-এই উক্তিটিই তিলাওয়াত করেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের এবং ইয়াহূদী ও নাসারাদের দৃষ্টান্ত হলো ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে তার কোন একটি কাজে কতকগুলো মজুর নিয়োগ করার ইচ্ছা করলো। অতঃপর সে ঘোষণা করলোঃ “এমন কেউ আছে কি যে আমার নিকট হতে এক কীরাত (এক আউন্সের চব্বিশ ভাগের এক ভাগ পরিমাণ ওজন) গ্রহণ করবে এবং এর বিনিময়ে ফজরের নামায হতে নিয়ে দুপুর পর্যন্ত আমার কাজ করবে?” তার এ ঘোষণা শুনে ইয়াহূদরা প্রস্তুত হয়ে গেল। সে আবার ঘোষণা করলোঃ “যে যোহর হতে আসর পর্যন্ত কাজ করবে তাকে আমি এক কীরাত প্রদান করবে।” এতে নাসারাগণ প্রস্তুত হলো এবং কাজ করলো (ও মজুরী নিলো)। পুনরায় লোকটি। ঘোষণা করলোঃ “আসর হতে মাগরিব পর্যন্ত যে কাজ করবে তাকে আমি দুই কীরাত প্রদান করবে।” তখন তোমরা (মুসলমানরা) কাজ করলে। এই ইয়াহূদী ও নাসারারা খুবই অসন্তুষ্ট হলো। তারা বলতে লাগলোঃ “আমরা কাজ করলাম বেশী এবং পারিশ্রমিক পেলাম কম, তারা কাজ করলো কম এবং পারিশ্রমিক পেলো বেশী।” তখন তাদেরকে বলা হলো তোমাদের হক কি নষ্ট করা হয়েছে?” তারা উত্তরে বললোঃ “না, আমাদের হক নষ্ট করা হয়নি বটে।” তখন তাদেরকে বলা হলোঃ “তাহলে এটা হলো আমার অনুগ্রহ, আমি যাকে ইচ্ছা এটা প্রদান করে থাকি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, মুসলমান এবং ইয়াহুদী ও নাসারাদের দৃষ্টান্ত হলো ঐ ব্যক্তির মত যে তার কোন কাজে কতকগুলো লোককে নিয়োগ করলো এবং পারিশ্রমিক নির্ধারণ করলো। আর বললোঃ “তোমরা সারা দিন কাজ করবে। তারা কাজে লেগে গেল। কিন্তু অর্ধদিন কাজ করার পর তারা বললোঃ “আমরা আর কাজ করবে না এবং যেটুকু কাজ করেছি পারিশ্রমিকও নিবো না।” লোকটি তাদেরকে বুঝিয়ে বললোঃ “এরূপ করো না, বরং কাজ পূর্ণ কর এবং মজুরীও নিয়ে নাও।” কিন্তু তারা পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করলো এবং আধা কাজ ফেলে দিয়ে মজুরী না নিয়ে চলে গেল। সে তখন অন্য লোকদেরকে কাজে লাগিয়ে দিলো এবং বললোঃ “তোমরা সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করবে এবং পুরো এক দিনেরই মজুরী পাবে।” এ লোকগুলো কাজে লেগে গেল। কিন্তু আসরের সময়েই তারা কাজ ছেড়ে দিয়ে বললোঃ “আমরা আজ কাজ করতে পারবো না এবং মজুরীও নিবো না। লোকটি খুব বুঝালো এবং বললোঃ “দেখো, এখন দিনের তো আর বেশী অংশ বাকী নেই। তোমরা কাজ কর এবং পারিশ্রমিক নিয়ে নাও।” কিন্তু তারা মানলো না এবং মজুরী না নিয়েই চলে গেল। লোকটি আবার অন্যদেরকে কাজে নিয়োগ করলো এবং বললোঃ “তোমরা মাগরিব পর্যন্ত কাজ করবে এবং পুরো দিনের মজুরী পাবে।” অতঃপর তারা মাগরিব পর্যন্ত কাজ করলো এবং পূর্বের দুটি দলের মজুরীও নিয়ে নিলো। সুতরাং এটা হলো তাদের দৃষ্টান্ত এবং ঐ নূরের দৃষ্টান্ত যা তারা কবুল করলো।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা এখানে বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, কিতাবীগণ যেন জানতে পারে, আল্লাহর সামান্যতম অনুগ্রহের উপরেও তাদের কোন অধিকার নেই এবং এটাও যেন তারা জানতে পারে যে, অনুগ্রহ আল্লাহরই ইখতিয়ারে। তাঁর অনুগ্রহের হিসাব কেউই লাগাতে পারে না। তিনি তাঁর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা দান করে থাকেন। আল্লাহ মহাঅনুগ্রহশীল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, (আরবী) এখানে (আরবী) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর (আরবী) কিরআতে রয়েছে। অনুরূপভাবে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) এবং হযরত আতা ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) হতেও এই কিরআতই বর্ণিত আছে। উদ্দেশ্য এটাই যে, আরবের কালামে (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর জন্যে এসে থাকে, যা কালামের শুরুতে ও শেষে আসে এবং তখন অস্বীকৃতি উদ্দেশ্য হয় না। যেমন আল্লাহ পাকের (আরবী) এবং (আরবী) -এই উক্তিগুলোতে রয়েছে।

আল-মুজাদালা 58:1

হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে যাঁর শ্রবণশক্তি সমস্ত শব্দকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। এই বাদানুবাদকারিণী মহিলাটি এসে নবী (সঃ)-এর সাথে এতো চুপে চুপে কথা বলতে শুরু করে যে, আমি ঐ ঘরেই থাকা সত্ত্বেও মোটেই শুনতে পাইনি যে, সে কি বলছে! কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা ঐ গুপ্ত কথাও শুনে নেন এবং এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম ইবনেমাজাহ (রঃ), ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হাদীসটি নিম্নরূপে বর্ণিত আছেঃহযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ্ কল্যাণময় যিনি উঁচু-নীচু সব শব্দই শুনেন। এই অভিযোগকারিণী মহিলাটি ছিল হযরত খাওলা বিনতে সা’লাবাহ (রাঃ)। যখন সে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয় তখন এতো ফিসফিস করে কথা বলে যে, তার কোন কোন শব্দ আমার কানে আসছিল বটে, কিন্তু অধিকাংশ কথাই আমার কানেও পৌছেনি। অথচ আমি ঐ ঘরেই বিদ্যমান ছিলাম। সে তার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার যৌবন তো তার সাথেই কেটেছে। এখন আমি বুড়ি হয়ে গেছি এবং আমার সন্তান জন্মদানের যোগ্যতা লোপ পেয়েছে, এমতাবস্থায় আমার স্বামী আমার সাথে যিহার [যাহেলী যুগে আরব সমাজে যদি কোন লোক তার স্ত্রীকে (আরবী) (তুমি আমার জন্যে আমার মাতার পৃষ্ঠ সদৃশ) এ কথা বলতো তাহলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়েযেতো। এভাবে বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করাকে যিহার বলে] করেছে। হে আল্লাহ! আমি আপনার সামনে দুঃখের কান্না কাঁদছি।” তখনো মহিলাটি ঘর হতে বের হয়নি ইতিমধ্যেই হযরত জিবরাঈল (আঃ) আয়াত নিয়ে অবতীর্ণ হন। তার স্বামীর নাম ছিল হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)।কখনো কখনো তার মাথা খারাপ হয়ে যেতো, ঐ সময় তিনি তাঁর স্ত্রীর সাথে যিহার করে ফেলতেন। তারপর যখন জ্ঞান ফিরে আসতো তখন এমন হতেন যে, যেন কিছুই হয়নি। তার স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফতওয়া নিতে এবং আল্লাহ্ তা'আলার নিকট আবেদন জানাতে আসলে আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। হযরত যায়েদ (রাঃ) বলেন যে, হযরত উমার (রাঃ) তাঁর খিলাফতের আমলে লোকদের সাথে পথ চলছিলেন, পথে একটি মহিলার সাথে সাক্ষাৎ হয়। মহিলাটি তাকে ডেকে থামতে বলে। হযরত উমার (রাঃ) তৎক্ষণাৎ থেমে যান এবং মহিলাটির কাছে গিয়ে আদব ও মনোযোগের সাথে মাথা ঝুঁকিয়ে দিয়ে তার কথা শুনতে থাকেন। নিজের ফরমায়েশ মুতাবেক কাজ করিয়ে নিয়ে মহিলাটি ফিরে যায় এবং হযরত উমার (রাঃ) তার লোকদের কাছে ফিরে আসেন। তখন একটি লোক বলে ওঠেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! একটি বৃদ্ধা মহিলার কথায় আপনি থেমে গেলেন এবং আপনার কারণে এতোগুলো লোককে এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে হলো।” একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আফসোস! এই মহিলাটি কে তা কি তুমি জান?” উত্তরে লোকটি বলেঃ “জ্বী, না। তখন তিনি বলেনঃ “ইনি ঐ মহিলা যার আবেদন আল্লাহ্ তা'আলা সপ্তম আকাশের উপর হতে শুনেন। ইনি হলেন হযরত খাওলা বিনতে সা'লাবাহ (রাঃ)। যদি তিনি আজ সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত, এমনকি কিছু রাত্রি পর্যন্তও কথা বলতে থাকতেন তবুও আমি তার খিদমত হতে সরতাম না। হ্যাঁ, তবে নামাযের সময় নামায আদায় করতাম এবং তারপর আজ্ঞাবহ রূপে তাঁর খিদমতে হাযির হয়ে যেতাম।” (এ হাদীসটির সনদ ছেদকাটা। তবে অন্য ধারাতেও এটা বর্ণিত আছে)অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, মহিলাটি ছিলেন খাওলা বিনতে সামিত (রাঃ) এবং তাঁর মাতার নাম ছিল মুআযাহ্ (রাঃ), যার ব্যাপারে (আরবী) (২৪:৩৩) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু সঠিক কথা এটাই যে, মহিলাটি ছিলেন আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-এর স্ত্রী খাওলা (রাঃ)।

আল-মুজাদালা 58:2

২-৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত খুওয়াইলাহ্ বিনতে সা'লাবাহ্ (রাঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমার এবং (আমার স্বামী) হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ্ তাআলা সূরায়ে মুজাদালার প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। আমি তার ঘরে ছিলাম। তিনি খুবই বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁর চরিত্রও ভাল ছিল না। একদা তিনি আমার কাছে আসেন, আমি তাকে এমন এক কথা বলে ফেলি যে, তিনি রাগান্বিত হন এবং আমাকে বলে ফেলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি আমার জন্যে আমার মাতার পৃষ্ঠ সদৃশ।” তারপর তিনি ঘর হতে বেরিয়ে যান। এবং কওমী মজলিসে কিছুক্ষণ বসে থাকেন। অতঃপর তিনি বাড়ীতে ফিরে আসেন। এরপর তিনি আমার সাথে কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে চাইলে আমি বলিঃ কখনো না, যার হাতে খুওয়াইলাহর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! আপনার। একথা (যিহারের কথা) বলার পর আপনি আপনার এ মনোবাসনা পূর্ণ করতে পারেন না যে পর্যন্ত না আমাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর ফায়সালা হয়। কিন্তু তিনি মানলেন না, বরং জোর পূর্বক তাঁর কাম বাসনা চরিতার্থ করতে চাইলেন। কিন্তু তিনি দুর্বল ছিলেন বলে আমি তার উপর বিজয় লাভ করলাম এবং তিনি পরাজিত হলেন। আমি আমার প্রতিবেশিনীর বাড়ী গিয়ে একটা কাপড় চেয়ে নিলাম এবং তা গায়ে দিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট গমন করলাম। আমার স্বামীর সাথে আমার যা কিছু ঘটেছিল তা আমি তাঁর সামনে নিঃসংকোচে বর্ণনা করলাম এবং তার দুশ্চরিত্রতার অভিযোগ করলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাকে বলতে থাকলেনঃ “হে খুওয়াইলাহ্ (রঃ)! তোমার স্বামীর ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে ভয় কর, সে তো অতি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছে।” আল্লাহর কসম! আমাদের মধ্যে এসব কথাবার্তা চলতে আছে ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর উপর অহী অবতীর্ণ হতে শুরু হয়। শেষ হলে তিনি বলেনঃ “হে খুওয়াইলাহ (রাঃ)! তোমার ও তোমার স্বামীর ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ করেছেন।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন। তারপর তিনি আমাকে বলেনঃ “তোমার স্বামীকে বলল যে, সে যেন একটি গোলাম আযাদ - করে।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গোলাম আযাদ করার মত সামর্থ্য তার নেই। তিনি বললেনঃ “তাহলে সে যেন একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখে।” আমি বললাম, আল্লাহর কসম! তিনি তো অতি বৃদ্ধ। দুই মাস রোযা রাখার শক্তি তার নেই। তাহলে সে যেন এক অসাক (প্রায় পাকি চার মণ) খেজুর ষাটজন মিসকীনকে খেতে দেয়।” বললেন তিনি। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ পরিমাণ খেজুরও তার কাছে নেই। তিনি বললেনঃ “আচ্ছা, আমি অর্ধ অসাক খেজুর তাকে দিচ্ছি।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঠিক আছে, বাকী অর্ধেক আমি দিচ্ছি। তিনি বললেনঃ “বাঃ, বাঃ! খুবই ভাল কাজ করলে তুমি। যাও, এটা আদায় করছে। আর তোমার স্বামীর সাথে প্রেম-প্রীতি, শুভাকাঙ্ক্ষা ও আনুগত্য সহ জীবন কাটিয়ে দাও।” আমি বললামঃ আমি তাই করবো। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কোন কোন রিওয়াইয়াতে মহিলাটির নাম খুওয়াইলাহ্ এর স্থলে খাওলাহ্ রয়েছে এবং বিনতু সা'লাবাহ্ এর স্থলে বিনতে মালিক ইবনে সা'লাবাহ্ আছে। এসব উক্তিতে এমন কোন মতপার্থক্য নেই যে, একে অপরের বিরোধ হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এই সূরার প্রাথমিক এই আয়াতগুলোর সঠিক শানে নুযূল এটাই। হযরত সালমা ইবনে সাখ আনসারীর (রাঃ) ঘটনাটি যা এখনই আসছে, এ আয়াতগুলোতে আছে, এই হুকুমই সেখানেও দেয়া হয়েছে অর্থাৎ গোলাম আযাদ করা বা দুই মাস একাদিক্রমে রোযা রাখা অথবা ষাটজন মিসকীনকে খাদ্য খেতে দেয়া।ঘটনাটি হযরত সালমা ইবনে সাখর আনসারী (রাঃ) নিজেই নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃ“অন্যদের তুলনায় আমার স্ত্রী-সহবাসের ক্ষমতা অধিক ছিল। রমযান মাসে দিনের বেলায় আমি নিজেকে হয় তত সহবাস হতে বিরত রাখতে পারবো না এই ভয়ে সারা রমযান মাসের জন্যে আমার স্ত্রীর সাথে আমি যিহার করে ফেলি। একদা রাত্রে আমার স্ত্রী আমার সেবায় লিপ্ত ছিল এমতাবস্থায় তার দেহের কোন এক অংশ হতে কাপড় সরে যায়। তখন আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে তার সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়ে পড়ি। সকাল হলে আমি আমার কওমের কাছে ফিরে আমার রাত্রির ঘটনাটি বর্ণনা করি এবং তাদেরকে বলিঃ তোমরা আমাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট চল এবং তাকে আমার ঘটনাটি অবহিত কর।তারা সবাই আমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করলো এবং বললোঃ “আমরা তোমার সাথে যাবো না। হতে পারে যে, এ ব্যাপারে কুরআন কারীমে কোন আয়াত অবতীর্ণ হয়ে যাবে অথবা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন কথা বলে দিবেন যার ফলে আমরা চিরদিনের জন্যে কলংকিত হবো। তুমি নিজেই যাও এবং দেখো, তোমার ব্যাপারে কি ঘটে।” আমি তখন বেরিয়ে পড়লাম এবং নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে গেলাম। অতঃপর তাকে আমি আমার খবর অবহিত করলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি এ কাজ করেছো?” আমি উত্তরে বললামঃ জ্বী, হ্যাঁ, আমি এ কাজ করেছি। পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি এ কাজ করেছো?” আমি জবাব দিলামঃ হ্যাঁ, জনাব! আমার দ্বারা এ কাজ হয়ে গেছে। আবার তিনি বললেনঃ “এ কাজ করেছো তুমি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যাঁ, হুযুর! সত্যিই আমি এ কাজ করে ফেলেছি। সুতরাং আমার উপর আপনি মহামহিমান্বিত আল্লাহর হুকুম জারী করুন! আমি ধৈর্যের সাথে তা সহ্য করবে। তখন তিনি বললেনঃ “তুমি একটি গোলাম আযাদ কর।” আমি তখন আমার গদানে হাত রেখে বললামঃ যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আমি শুধু এরই (অর্থাৎ আমার গদানেরই) মালিক। এ ছাড়া আমি আর কিছুরই মালিক নই (অর্থাৎ আমার গোলাম আযাদ করার ক্ষমতা নেই। তিনি বললেনঃ “তাহলে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখো।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রোযার কারণেই তো আমার দ্বারা এ কাজ হয়ে গেছে (সুতরাং এটাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়)। তিনি বললেনঃ “যাও, তাহলে সাদকা কর।” আমি বললামঃ আপনাকে যিনি সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আমার কাছে সাদকা করার মত কিছুই নেই। এমন কি আজ রাত্রে আমার পরিবারের সবাই ক্ষুধার্ত রয়েছে। তাদের রাত্রির খাবার পর্যন্ত নেই! তিনি তখন আমাকে বললেনঃ “তুমি বানু রুয়েক গোত্রের সাদকার মালিকদের কাছে যাও এবং তাদেরকে বল যে, তারা যেন তাদের সাদকার মাল তোমাকেই দেয়। তুমি ওর মধ্য হতে এক অসাক খেজুর ষাটজন মিসকীনকে প্রদান করবে এবং বাকীগুলো তোমার নিজের ও পরিবারের কাজে ব্যয় করবে।”রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর একথা শুনে আমি খুশী মনে ফিরে আসলাম এবং আমার কওমের কাছে গিয়ে বললামঃ “তোমাদের কাছে আমি পেয়েছিলাম সংকীর্ণতা ও মন্দ অভিমত। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে পেয়েছি আমি প্রশস্ততা ও বরকত। তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা যেন তোমাদের সাদকার মাল আমাকেই প্রদান কর। তারা তখন আমাকে তা দিয়ে দিলো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযীও (রঃ) সংক্ষিপ্তভাবে এটা বর্ণনা করেছেন এবং তিনিএটাকে হাসান বলেছেন)বাহ্যতঃ এটা জানা যাচ্ছে যে, এটা হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ) এবং তার স্ত্রী হযরত খুওয়াইলাহ্ বিনতে সা'লাবাহ্ (রাঃ)-এর ঘটনার পরবর্তী ঘটনা। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যিহারের প্রথম ঘটনা হচ্ছে হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-এর ঘটনাটি, যিনি হযরত উবাদাহ্ ইবনে সামিতের (রাঃ) ভাই ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল খাওলা বিনতে সা'লাবাহ্ ইবনে মালিক। এই ঘটনার পর হযরত খাওলা (রাঃ)-এর এই ভয় ছিল হয়তো তালাক হয়ে গেছে। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে এসে বলেনঃ আমার স্বামী আমার সাথে যিহার করেছে। যদি আমরা পৃথক পৃথক হয়ে যাই তবে আমরা দুজনই ধ্বংস হয়ে যাবো। আর কোন সন্তানের জন্মদান করার মত ক্ষমতা আমার নেই। দীর্ঘদিন ধরে আমি তার সাথে সংসার করে আসছি।” এভাবে তিনি কথা বলছিলেন এবং ক্রন্দন করছিলেন। এ পর্যন্ত ইসলামে যিহারের কোন হুকুম ছিল। ঐ সময় (আরবী) হতে পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “গোলাম আযাদ করার ক্ষমতা তোমার আছে কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর কসম! এ ক্ষমতা আমার নেই।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন তাঁর জন্যে অর্থ সংগ্রহ করেন এবং তা দিয়ে তিনি গোলাম আযাদ করেন। আর এভাবে তিনি তাঁর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ছাড়াও আরো বহু গুরুজনও একথাই বলেছেন যে, এ আয়াতগুলো তাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। এসব ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দ হতে এসেছে। অজ্ঞতার যুগের লোকেরা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করার সময় বলতোঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি আমার জন্যে আমার মাতার পৃষ্ঠ সদৃশ।" শরীয়তের হুকুম এই যে, এরূপভাবে যে কোন অঙ্গের নাম নিবে, তাতে যিহার হয়ে যাবে। জাহেলিয়াতের যুগে যিহারকে তালাক মনে করা হতো। আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতের জন্যে এতে কাফফারা নির্ধারণ করেছেন এবং এটাকে তালাক রূপে গণ্য করেননি, যেমন জাহেলিয়াতের যুগে এই প্রথা ছিল। পূর্বযুগীয় অধিকাংশ গুরুজন একথাই বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) অজ্ঞতার যুগের এই প্রথার উল্লেখ করে বলেনঃ ইসলামে যখন হযরত খুওয়াইলাহ্ সম্পর্কীয় ঘটনাটি সংঘটিত হলো এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়েই দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলো তখন হযরত আউস (রাঃ) তার স্ত্রীকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে প্রেরণ করলেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) চিরুণী করছিলেন। তিনি ঘটনাটি শুনে বললেনঃ “আমাদের কাছে এর কোন নির্দেশ নেই।” ইতিমধ্যে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তিনি হযরত খুওয়াইলাহ (রাঃ)-কে সুসংবাদ প্রদান করেন। যখন গোলাম আযাদ করার কথা উল্লেখ করা হয় তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাদের কাছে কোন গোলাম নেই। আমার স্বামী গোলাম আযাদ করতে সক্ষম নন।” তারপর একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখার নির্দেশ দেয়া হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমার স্বামী যদি দিনে তিনবার করে পানি পান না করেন তবে তাঁর দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যাবে।” এরপর যখন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “এতেও যে অসমর্থ, সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে।' তখন হযরত খুওয়াইলাহ (রাঃ) বলেনঃ “কয়েক গ্রাস খাদ্য খেয়েই তো আমাদেরকে সারা দিন কাটিয়ে দিতে হয়, অন্যদেরকে খাওয়ানো তো বহু দূরের কথা!” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অর্ধ অসাক ত্রিশ সা’ (খাদ্য) আনিয়ে নিয়ে তাঁকে দিলেন এবং তাঁর স্বামীকে নির্দেশ দিলেন যে, তিনি যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ খুবই সবল ও উত্তম। কিন্তু বর্ণনার ধারা গারাবত মুক্ত নয়) আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, খাওলা বিনতে দালীজ (রাঃ) একজন আনসারীর স্ত্রী ছিলেন, যিনি চোখে কম দেখতেন। তিনি ছিলেন খুব দরিদ্র এবং তার চরিত্রও খুব ভাল ছিল না। একদিন কথায় কথায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়ে যায় এবং জাহেলিয়াত যুগের প্রথা ও রীতি অনুযায়ী স্বামী স্ত্রীর সাথে যিহার করে নেন। অজ্ঞতা যুগের এটাই ছিল তালাক। স্ত্রী হযরত খাওলা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হন। ঐ সময় তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরে ছিলেন এবং হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর মস্তক ধৌত করছিলেন। হযরত খাওলা (রাঃ) তাঁর সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। ঘটনাটি শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “এখন আর কি হতে পারে? আমার জানা মতে তুমি তার উপর হারাম হয়ে গেছে। তাঁর একথা শুনে হযরত খাওলা (রাঃ) বললেনঃ “আমি আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করছি।" হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মস্তক মুবারকের এক দিক ধুয়ে দিয়ে ঘুরে অন্য দিকে গেলেন এবং ওদিকের অংশ ধুতে লাগলেন। তখন হযরত খাওলাও (রাঃ) ঘুরে গিয়ে ওদিকে বসে পড়েন এবং স্বীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) পুনরায় ঐ জবাবই দেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) লক্ষ্য করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর চেহারা মুবারকের রঙ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তখন তিনি হযরত খাওলা (রাঃ)-কে বললেনঃ “তুমি একটু সরে বসো।" তিনি সরে গেলেন। ইতিমধ্যে অহী নাযিল হতে শুরু হয়। অহী নাযিল হওয়া শেষ হলে তিনি প্রশ্ন করেনঃ “মহিলাটি কোথায়?” হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁকে ডাকিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন তাঁকে বলেনঃ “যাও, তোমার স্বামীকে ডেকে নিয়ে এসো।” তিনি কাঁদতে কাঁদতে গেলেন এবং স্বামীকে ডেকে নিয়ে এলেন। স্বামী সম্পর্কে যে মন্তব্য তিনি করেছিলেন যে, তিনি কম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন, দরিদ্র এবং দুশ্চরিত্র, নবী (সঃ) তাঁকে সেরূপই পেলেন। তখন তিনি পাঠ করলেনঃ (আরবী)অতঃপর মহিলাটির স্বামীকে বললেনঃ “তুমি স্ত্রীকে স্পর্শ করার পূর্বে গোলাম আযাদ করতে পার কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “না।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “তাহলে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখতে কি তুমি সক্ষম হবে?” জবাবে তিনি বললেনঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! আমি দিনে দুইবার বা তিনবার না খেলে আমার চক্ষু নষ্ট হয়ে যাবার উপক্রম হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াতে পারবে কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “না, তবে যদি আপনি আমাকে সাহায্য করেন তাহলে পারবো)।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁকে সাহায্য করলেন এবং তাঁকে বললেনঃ “ষাটজন মিসকীনকে খানা খাওয়ায়ে দাও।” আল্লাহ্ তা'আলা জাহেলিয়াত যুগের প্রথা, তালাককে উঠিয়ে দিয়ে এটাকে যিহাররূপে নির্ধারণ করলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, “ঈলা ও যিহার জাহেলিয়াতের যুগের তালাক ছিল। আল্লাহ তা'আলা ঈলায় তো চার মাস সময় নির্ধারণ করেন এবং যিহারে নির্ধারণ করেন কাফফারা।হযরত ইমাম মালিক (রঃ) (আরবী) শব্দ দ্বারা দলীল গ্রহণ করে বলেন যে, এখানে মুমিনদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, সুতরাং কাফিররা এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। জমহুরের মাযহাব এর বিপরীত। তাঁরা (আরবী) শব্দের এই জবাব দেন যে, প্রাধান্য হিসাবে এটা বলা হয়েছে। সুতরাং (আরবী) হিসেবে (আরবী) উদ্দেশ্য হতে পারে না। জমহুর (আরবী) দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, দাসীর সাথে যিহার হয় না এবং দাসী এই বা সম্বোধনের মধ্যে দাখিলও নয়।আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ (আরবী) (তাদের পত্নীগণ তাদের মা নয়, যারা তাদেরকে জন্মদান করে শুধু তারাই তাদের মাতা)। অর্থাৎ কোন ব্যক্তির তার স্ত্রীকে (আরবী) বা (আরবী) অথবা (আরবী) কিংবা এগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত কথা বলার দ্বারা স্ত্রী কখনো তার মা হতে পারে না। বরং যারা তাদেরকে জন্মদান করে শুধু তারাই তাদের মাতা। তারা তো অসংগত ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাপ মোচনকারী ও ক্ষমাশীল। তিনি জাহেলিয়াত যুগের এই সংকীর্ণতাকে তোমাদের হতে দূর করে দিয়েছেন। অনুরূপভাবে প্রত্যেক ঐ কথা যা কোন চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই মানুষের মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায় সেটাও তিনি ক্ষমা করে দেন। যেমন সুনানে আবি দাউদে রয়েছেঃ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) শুনতে পান যে, একটি লোক তার স্ত্রীকে বলছেঃ “হে আমার বোন!” তখন তিনি লোকটিকে বলেনঃ “এটা কি তোমার বোন?” অর্থাৎ তার এ উক্তিকে তিনি অপছন্দ করেন এবং তাকে বাধা দেন। কিন্তু ঐ স্ত্রীকে তিনি তার জন্যে হারাম করে দিলেন না। কেননা, প্রকৃতপক্ষে তার এটা উদ্দেশ্য ছিল না, শুধু মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল মাত্র। অন্যথায় অবশ্যই ঐ স্ত্রী তার জন্যে হারাম হয়ে যেতো। কেননা, সঠিক উক্তি এটাই যে, নিজের স্ত্রীকে যে ব্যক্তি তাদের নামে স্মরণ করে যারা চিরস্থায়ীভাবে মুহাররামাত (যাদের সাথে বিবাহ চিরতরে অবৈধ) যেমন ভগ্নী, ফুফু, খালা ইত্যাদি, তবে এরাও মাতার হুকুমের পর্যায়ে পড়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে এবং পরে নিজেদের উক্তি হতে ফিরে আসে।” এর একটি ভাবার্থ এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, যিহার করলো, অতঃপর এই শব্দেরই পুনরাবৃত্তি করলো। কিন্তু এটা ঠিক নয়। ইমাম শাফিয়ী (রঃ)-এর উক্তি মতে এর ভাবার্থ হলোঃ যিহার করলো, তারপর ঐ স্ত্রীকে আটক করে রাখলো। শেষ পর্যন্ত এমন এক যামানা অতিবাহিত হলো যে, ইচ্ছা করলে নিয়মিতভাবে তাকে তালাক দিতে পারতো, কিন্তু তালাক দিলো না।ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ আবার ফিরে আসলো সহবাসের দিকে অথবা সহবাসের ইচ্ছা করলো। এটা বৈধ নয় যে পর্যন্ত না উল্লিখিত কাফফারা আদায় করে।ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সহবাস করার ইচ্ছা করলো বা তার সাথে জীবন যাপন করার দৃঢ় সংকল্প করলো।ইমাম আবু হানীফা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, উদ্দেশ্য হলো যিহারের দিকে ফিরে আসা, এর হুরমত ও জাহেলিয়াত যুগের হুকুম উঠে যাওয়ার পর। সুতরাং এখন যে ব্যক্তি যিহার করবে তার উপর তার স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে যে পর্যন্ত না সে কাফফারা আদায় করে। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ যে বিষয়কে সে নিজের জীবনের উপর হারাম করে নিয়েছিল সেটা আবার সে বৈধ করতে চায় সে যেন কাফফারা আদায় করে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কাফফারা আদায় করার পূর্বে সহবাস করা নিষিদ্ধ, কিন্তু যদি গুপ্তাঙ্গ ছাড়া অন্য কিছু স্পর্শ করে তবে কোন দোষ নেই।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এখানে (আরবী) দ্বারা সহবাস করাকে বুঝানো হয়েছে। যুহরী (রঃ) বলেন যে, কাফফারা আদায়ের পূর্বে হাত লাগানো, ভালবাসা দেখানো ইত্যাদিও জায়েয নয়।আহলুস সুনান হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, একটি লোক বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আমার স্ত্রীর সাথে যিহার করেছি এবং কাফফারা আদায়ের পূর্বে তার সাথে সহবাসও করে ফেলেছি (এখন উপায় কি?)।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহ্ তোমার প্রতি দয়া করুন, তুমি এটা কেন করেছো?” উত্তরে সে বলেঃ “চাঁদনী রাতে তার পাঁয়জোর (পায়ের অলংকার) আমাকে ব্যাকুল করে তুলেছিল।” তার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “এখন হতে আর তার নিকটবর্তী হয়ো না যে পর্যন্ত না আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ অনুযায়ী কাফফারা আদায় কর।” (ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান, গারীব, সহীহ বলেছেন। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটাকে মুরসাল রূপে বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা মুরসাল হওয়াকেই সঠিক বলেছেন)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ যিহারের কাফফারার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, একটি দাস মুক্ত করতে হবে। দাসকে যে মুমিন হতে হবে এ শর্ত এখানে আরোপ করা হয়নি, যেমন হত্যার কাফফারায় দাসের মুমিন হওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে।ইমাম শাফেয়ী (রঃ) তো বলেন যে, এই অনির্দিষ্টকে নির্দিষ্টের উপর স্থাপন করা হবে। অর্থাৎ হত্যার কাফফারার ব্যাপারে যেমন মুমিন গোলাম আযাদ করার হুকুম রয়েছে, তেমনই এই যিহারের কাফফারার ব্যাপারেও ঐ হুকুমই থাকবে। এর দলীল এই হাদীসটিও যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) একটি কালো রঙ এর দাসী সম্পর্কে বলেনঃ “একেই আযাদ বা মুক্ত করে দাও, কেননা, এটা মুমিনা দাসী।”উপরে বর্ণিত ঘটনায় জানা গেছে যে, যিহার করে কাফফারা আদায় করার পূর্বেই স্ত্রীর সাথে সহবাসকারীকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) দ্বিগুণ কাফফারা আদায় করার নির্দেশ দেননি।এরপর মহান আল্লাহ্ বলেনঃ এই নির্দেশ তোমাদেরকে দেয়া হলো, অর্থাৎ তোমাদের ধমকানো হচ্ছে। আল্লাহ্ তোমাদের কার্যের ব্যাপারে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তোমাদের অবস্থা তিনি সম্যক অবগত। তোমরা যা কর আল্লাহ্ তার খবর রাখেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ গোলাম আযাদ করার যার সামর্থ্য থাকবে না, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে তাকে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখতে হবে। যে এতেও অসমর্থ হবে, সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে। পূর্ববর্ণিত হাদীসগুলোর আলোকে জানা যাচ্ছে যে, আদিষ্ট প্রথম সুরতটি (গোলাম আযাদ করা) হলো অগ্রগণ্য, তারপর দ্বিতীয়টি (একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখা) এবং এরপর তৃতীয়টি (ষাটজন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়ানো)। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের এ হাদীসটিতেও রয়েছে যাতে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) রমযান মাসে স্ত্রীর সাথে সহবাসকারী লোকটিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।মহান আল্লাহ বলেন, এই আহকাম আমি এ জন্যেই নির্ধারণ করেছি যে, যেন তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে (সঃ) বিশ্বাস স্থাপন কর। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। সাবধান! তোমরা তার বিধানের উল্টো কাজ করো না, তার নিষিদ্ধ বিষয়ের সীমা ছাড়িয়ে যেয়ো না। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা কাফির হবে অর্থাৎ ঈমান আনয়ন করবে না, আমার আদেশ মান্য করবে না, শরীয়তের আহকামের অমর্যাদা ও অসম্মান করবে এবং ওর প্রতি বেপরোয়া ভাব দেখাবে, তারা আমার শাস্তি হতে বেঁচে যাবে এ ধারণা তোমরা কখনো পোষণ করো না। জেনে রেখো যে, তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

আল-মুজাদালা 58:3

২-৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত খুওয়াইলাহ্ বিনতে সা'লাবাহ্ (রাঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমার এবং (আমার স্বামী) হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ্ তাআলা সূরায়ে মুজাদালার প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। আমি তার ঘরে ছিলাম। তিনি খুবই বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁর চরিত্রও ভাল ছিল না। একদা তিনি আমার কাছে আসেন, আমি তাকে এমন এক কথা বলে ফেলি যে, তিনি রাগান্বিত হন এবং আমাকে বলে ফেলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি আমার জন্যে আমার মাতার পৃষ্ঠ সদৃশ।” তারপর তিনি ঘর হতে বেরিয়ে যান। এবং কওমী মজলিসে কিছুক্ষণ বসে থাকেন। অতঃপর তিনি বাড়ীতে ফিরে আসেন। এরপর তিনি আমার সাথে কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে চাইলে আমি বলিঃ কখনো না, যার হাতে খুওয়াইলাহর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! আপনার। একথা (যিহারের কথা) বলার পর আপনি আপনার এ মনোবাসনা পূর্ণ করতে পারেন না যে পর্যন্ত না আমাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর ফায়সালা হয়। কিন্তু তিনি মানলেন না, বরং জোর পূর্বক তাঁর কাম বাসনা চরিতার্থ করতে চাইলেন। কিন্তু তিনি দুর্বল ছিলেন বলে আমি তার উপর বিজয় লাভ করলাম এবং তিনি পরাজিত হলেন। আমি আমার প্রতিবেশিনীর বাড়ী গিয়ে একটা কাপড় চেয়ে নিলাম এবং তা গায়ে দিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট গমন করলাম। আমার স্বামীর সাথে আমার যা কিছু ঘটেছিল তা আমি তাঁর সামনে নিঃসংকোচে বর্ণনা করলাম এবং তার দুশ্চরিত্রতার অভিযোগ করলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাকে বলতে থাকলেনঃ “হে খুওয়াইলাহ্ (রঃ)! তোমার স্বামীর ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে ভয় কর, সে তো অতি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছে।” আল্লাহর কসম! আমাদের মধ্যে এসব কথাবার্তা চলতে আছে ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর উপর অহী অবতীর্ণ হতে শুরু হয়। শেষ হলে তিনি বলেনঃ “হে খুওয়াইলাহ (রাঃ)! তোমার ও তোমার স্বামীর ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ করেছেন।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন। তারপর তিনি আমাকে বলেনঃ “তোমার স্বামীকে বলল যে, সে যেন একটি গোলাম আযাদ - করে।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গোলাম আযাদ করার মত সামর্থ্য তার নেই। তিনি বললেনঃ “তাহলে সে যেন একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখে।” আমি বললাম, আল্লাহর কসম! তিনি তো অতি বৃদ্ধ। দুই মাস রোযা রাখার শক্তি তার নেই। তাহলে সে যেন এক অসাক (প্রায় পাকি চার মণ) খেজুর ষাটজন মিসকীনকে খেতে দেয়।” বললেন তিনি। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ পরিমাণ খেজুরও তার কাছে নেই। তিনি বললেনঃ “আচ্ছা, আমি অর্ধ অসাক খেজুর তাকে দিচ্ছি।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঠিক আছে, বাকী অর্ধেক আমি দিচ্ছি। তিনি বললেনঃ “বাঃ, বাঃ! খুবই ভাল কাজ করলে তুমি। যাও, এটা আদায় করছে। আর তোমার স্বামীর সাথে প্রেম-প্রীতি, শুভাকাঙ্ক্ষা ও আনুগত্য সহ জীবন কাটিয়ে দাও।” আমি বললামঃ আমি তাই করবো। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কোন কোন রিওয়াইয়াতে মহিলাটির নাম খুওয়াইলাহ্ এর স্থলে খাওলাহ্ রয়েছে এবং বিনতু সা'লাবাহ্ এর স্থলে বিনতে মালিক ইবনে সা'লাবাহ্ আছে। এসব উক্তিতে এমন কোন মতপার্থক্য নেই যে, একে অপরের বিরোধ হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এই সূরার প্রাথমিক এই আয়াতগুলোর সঠিক শানে নুযূল এটাই। হযরত সালমা ইবনে সাখ আনসারীর (রাঃ) ঘটনাটি যা এখনই আসছে, এ আয়াতগুলোতে আছে, এই হুকুমই সেখানেও দেয়া হয়েছে অর্থাৎ গোলাম আযাদ করা বা দুই মাস একাদিক্রমে রোযা রাখা অথবা ষাটজন মিসকীনকে খাদ্য খেতে দেয়া।ঘটনাটি হযরত সালমা ইবনে সাখর আনসারী (রাঃ) নিজেই নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃ“অন্যদের তুলনায় আমার স্ত্রী-সহবাসের ক্ষমতা অধিক ছিল। রমযান মাসে দিনের বেলায় আমি নিজেকে হয় তত সহবাস হতে বিরত রাখতে পারবো না এই ভয়ে সারা রমযান মাসের জন্যে আমার স্ত্রীর সাথে আমি যিহার করে ফেলি। একদা রাত্রে আমার স্ত্রী আমার সেবায় লিপ্ত ছিল এমতাবস্থায় তার দেহের কোন এক অংশ হতে কাপড় সরে যায়। তখন আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে তার সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়ে পড়ি। সকাল হলে আমি আমার কওমের কাছে ফিরে আমার রাত্রির ঘটনাটি বর্ণনা করি এবং তাদেরকে বলিঃ তোমরা আমাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট চল এবং তাকে আমার ঘটনাটি অবহিত কর।তারা সবাই আমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করলো এবং বললোঃ “আমরা তোমার সাথে যাবো না। হতে পারে যে, এ ব্যাপারে কুরআন কারীমে কোন আয়াত অবতীর্ণ হয়ে যাবে অথবা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন কথা বলে দিবেন যার ফলে আমরা চিরদিনের জন্যে কলংকিত হবো। তুমি নিজেই যাও এবং দেখো, তোমার ব্যাপারে কি ঘটে।” আমি তখন বেরিয়ে পড়লাম এবং নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে গেলাম। অতঃপর তাকে আমি আমার খবর অবহিত করলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি এ কাজ করেছো?” আমি উত্তরে বললামঃ জ্বী, হ্যাঁ, আমি এ কাজ করেছি। পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি এ কাজ করেছো?” আমি জবাব দিলামঃ হ্যাঁ, জনাব! আমার দ্বারা এ কাজ হয়ে গেছে। আবার তিনি বললেনঃ “এ কাজ করেছো তুমি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যাঁ, হুযুর! সত্যিই আমি এ কাজ করে ফেলেছি। সুতরাং আমার উপর আপনি মহামহিমান্বিত আল্লাহর হুকুম জারী করুন! আমি ধৈর্যের সাথে তা সহ্য করবে। তখন তিনি বললেনঃ “তুমি একটি গোলাম আযাদ কর।” আমি তখন আমার গদানে হাত রেখে বললামঃ যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আমি শুধু এরই (অর্থাৎ আমার গদানেরই) মালিক। এ ছাড়া আমি আর কিছুরই মালিক নই (অর্থাৎ আমার গোলাম আযাদ করার ক্ষমতা নেই। তিনি বললেনঃ “তাহলে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখো।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রোযার কারণেই তো আমার দ্বারা এ কাজ হয়ে গেছে (সুতরাং এটাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়)। তিনি বললেনঃ “যাও, তাহলে সাদকা কর।” আমি বললামঃ আপনাকে যিনি সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আমার কাছে সাদকা করার মত কিছুই নেই। এমন কি আজ রাত্রে আমার পরিবারের সবাই ক্ষুধার্ত রয়েছে। তাদের রাত্রির খাবার পর্যন্ত নেই! তিনি তখন আমাকে বললেনঃ “তুমি বানু রুয়েক গোত্রের সাদকার মালিকদের কাছে যাও এবং তাদেরকে বল যে, তারা যেন তাদের সাদকার মাল তোমাকেই দেয়। তুমি ওর মধ্য হতে এক অসাক খেজুর ষাটজন মিসকীনকে প্রদান করবে এবং বাকীগুলো তোমার নিজের ও পরিবারের কাজে ব্যয় করবে।”রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর একথা শুনে আমি খুশী মনে ফিরে আসলাম এবং আমার কওমের কাছে গিয়ে বললামঃ “তোমাদের কাছে আমি পেয়েছিলাম সংকীর্ণতা ও মন্দ অভিমত। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে পেয়েছি আমি প্রশস্ততা ও বরকত। তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা যেন তোমাদের সাদকার মাল আমাকেই প্রদান কর। তারা তখন আমাকে তা দিয়ে দিলো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযীও (রঃ) সংক্ষিপ্তভাবে এটা বর্ণনা করেছেন এবং তিনিএটাকে হাসান বলেছেন)বাহ্যতঃ এটা জানা যাচ্ছে যে, এটা হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ) এবং তার স্ত্রী হযরত খুওয়াইলাহ্ বিনতে সা'লাবাহ্ (রাঃ)-এর ঘটনার পরবর্তী ঘটনা। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যিহারের প্রথম ঘটনা হচ্ছে হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-এর ঘটনাটি, যিনি হযরত উবাদাহ্ ইবনে সামিতের (রাঃ) ভাই ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল খাওলা বিনতে সা'লাবাহ্ ইবনে মালিক। এই ঘটনার পর হযরত খাওলা (রাঃ)-এর এই ভয় ছিল হয়তো তালাক হয়ে গেছে। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে এসে বলেনঃ আমার স্বামী আমার সাথে যিহার করেছে। যদি আমরা পৃথক পৃথক হয়ে যাই তবে আমরা দুজনই ধ্বংস হয়ে যাবো। আর কোন সন্তানের জন্মদান করার মত ক্ষমতা আমার নেই। দীর্ঘদিন ধরে আমি তার সাথে সংসার করে আসছি।” এভাবে তিনি কথা বলছিলেন এবং ক্রন্দন করছিলেন। এ পর্যন্ত ইসলামে যিহারের কোন হুকুম ছিল। ঐ সময় (আরবী) হতে পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “গোলাম আযাদ করার ক্ষমতা তোমার আছে কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর কসম! এ ক্ষমতা আমার নেই।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন তাঁর জন্যে অর্থ সংগ্রহ করেন এবং তা দিয়ে তিনি গোলাম আযাদ করেন। আর এভাবে তিনি তাঁর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ছাড়াও আরো বহু গুরুজনও একথাই বলেছেন যে, এ আয়াতগুলো তাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। এসব ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দ হতে এসেছে। অজ্ঞতার যুগের লোকেরা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করার সময় বলতোঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি আমার জন্যে আমার মাতার পৃষ্ঠ সদৃশ।" শরীয়তের হুকুম এই যে, এরূপভাবে যে কোন অঙ্গের নাম নিবে, তাতে যিহার হয়ে যাবে। জাহেলিয়াতের যুগে যিহারকে তালাক মনে করা হতো। আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতের জন্যে এতে কাফফারা নির্ধারণ করেছেন এবং এটাকে তালাক রূপে গণ্য করেননি, যেমন জাহেলিয়াতের যুগে এই প্রথা ছিল। পূর্বযুগীয় অধিকাংশ গুরুজন একথাই বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) অজ্ঞতার যুগের এই প্রথার উল্লেখ করে বলেনঃ ইসলামে যখন হযরত খুওয়াইলাহ্ সম্পর্কীয় ঘটনাটি সংঘটিত হলো এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়েই দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলো তখন হযরত আউস (রাঃ) তার স্ত্রীকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে প্রেরণ করলেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) চিরুণী করছিলেন। তিনি ঘটনাটি শুনে বললেনঃ “আমাদের কাছে এর কোন নির্দেশ নেই।” ইতিমধ্যে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তিনি হযরত খুওয়াইলাহ (রাঃ)-কে সুসংবাদ প্রদান করেন। যখন গোলাম আযাদ করার কথা উল্লেখ করা হয় তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাদের কাছে কোন গোলাম নেই। আমার স্বামী গোলাম আযাদ করতে সক্ষম নন।” তারপর একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখার নির্দেশ দেয়া হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমার স্বামী যদি দিনে তিনবার করে পানি পান না করেন তবে তাঁর দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যাবে।” এরপর যখন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “এতেও যে অসমর্থ, সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে।' তখন হযরত খুওয়াইলাহ (রাঃ) বলেনঃ “কয়েক গ্রাস খাদ্য খেয়েই তো আমাদেরকে সারা দিন কাটিয়ে দিতে হয়, অন্যদেরকে খাওয়ানো তো বহু দূরের কথা!” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অর্ধ অসাক ত্রিশ সা’ (খাদ্য) আনিয়ে নিয়ে তাঁকে দিলেন এবং তাঁর স্বামীকে নির্দেশ দিলেন যে, তিনি যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ খুবই সবল ও উত্তম। কিন্তু বর্ণনার ধারা গারাবত মুক্ত নয়) আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, খাওলা বিনতে দালীজ (রাঃ) একজন আনসারীর স্ত্রী ছিলেন, যিনি চোখে কম দেখতেন। তিনি ছিলেন খুব দরিদ্র এবং তার চরিত্রও খুব ভাল ছিল না। একদিন কথায় কথায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়ে যায় এবং জাহেলিয়াত যুগের প্রথা ও রীতি অনুযায়ী স্বামী স্ত্রীর সাথে যিহার করে নেন। অজ্ঞতা যুগের এটাই ছিল তালাক। স্ত্রী হযরত খাওলা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হন। ঐ সময় তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরে ছিলেন এবং হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর মস্তক ধৌত করছিলেন। হযরত খাওলা (রাঃ) তাঁর সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। ঘটনাটি শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “এখন আর কি হতে পারে? আমার জানা মতে তুমি তার উপর হারাম হয়ে গেছে। তাঁর একথা শুনে হযরত খাওলা (রাঃ) বললেনঃ “আমি আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করছি।" হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মস্তক মুবারকের এক দিক ধুয়ে দিয়ে ঘুরে অন্য দিকে গেলেন এবং ওদিকের অংশ ধুতে লাগলেন। তখন হযরত খাওলাও (রাঃ) ঘুরে গিয়ে ওদিকে বসে পড়েন এবং স্বীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) পুনরায় ঐ জবাবই দেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) লক্ষ্য করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর চেহারা মুবারকের রঙ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তখন তিনি হযরত খাওলা (রাঃ)-কে বললেনঃ “তুমি একটু সরে বসো।" তিনি সরে গেলেন। ইতিমধ্যে অহী নাযিল হতে শুরু হয়। অহী নাযিল হওয়া শেষ হলে তিনি প্রশ্ন করেনঃ “মহিলাটি কোথায়?” হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁকে ডাকিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন তাঁকে বলেনঃ “যাও, তোমার স্বামীকে ডেকে নিয়ে এসো।” তিনি কাঁদতে কাঁদতে গেলেন এবং স্বামীকে ডেকে নিয়ে এলেন। স্বামী সম্পর্কে যে মন্তব্য তিনি করেছিলেন যে, তিনি কম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন, দরিদ্র এবং দুশ্চরিত্র, নবী (সঃ) তাঁকে সেরূপই পেলেন। তখন তিনি পাঠ করলেনঃ (আরবী)অতঃপর মহিলাটির স্বামীকে বললেনঃ “তুমি স্ত্রীকে স্পর্শ করার পূর্বে গোলাম আযাদ করতে পার কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “না।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “তাহলে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখতে কি তুমি সক্ষম হবে?” জবাবে তিনি বললেনঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! আমি দিনে দুইবার বা তিনবার না খেলে আমার চক্ষু নষ্ট হয়ে যাবার উপক্রম হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াতে পারবে কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “না, তবে যদি আপনি আমাকে সাহায্য করেন তাহলে পারবো)।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁকে সাহায্য করলেন এবং তাঁকে বললেনঃ “ষাটজন মিসকীনকে খানা খাওয়ায়ে দাও।” আল্লাহ্ তা'আলা জাহেলিয়াত যুগের প্রথা, তালাককে উঠিয়ে দিয়ে এটাকে যিহাররূপে নির্ধারণ করলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, “ঈলা ও যিহার জাহেলিয়াতের যুগের তালাক ছিল। আল্লাহ তা'আলা ঈলায় তো চার মাস সময় নির্ধারণ করেন এবং যিহারে নির্ধারণ করেন কাফফারা।হযরত ইমাম মালিক (রঃ) (আরবী) শব্দ দ্বারা দলীল গ্রহণ করে বলেন যে, এখানে মুমিনদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, সুতরাং কাফিররা এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। জমহুরের মাযহাব এর বিপরীত। তাঁরা (আরবী) শব্দের এই জবাব দেন যে, প্রাধান্য হিসাবে এটা বলা হয়েছে। সুতরাং (আরবী) হিসেবে (আরবী) উদ্দেশ্য হতে পারে না। জমহুর (আরবী) দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, দাসীর সাথে যিহার হয় না এবং দাসী এই বা সম্বোধনের মধ্যে দাখিলও নয়।আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ (আরবী) (তাদের পত্নীগণ তাদের মা নয়, যারা তাদেরকে জন্মদান করে শুধু তারাই তাদের মাতা)। অর্থাৎ কোন ব্যক্তির তার স্ত্রীকে (আরবী) বা (আরবী) অথবা (আরবী) কিংবা এগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত কথা বলার দ্বারা স্ত্রী কখনো তার মা হতে পারে না। বরং যারা তাদেরকে জন্মদান করে শুধু তারাই তাদের মাতা। তারা তো অসংগত ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাপ মোচনকারী ও ক্ষমাশীল। তিনি জাহেলিয়াত যুগের এই সংকীর্ণতাকে তোমাদের হতে দূর করে দিয়েছেন। অনুরূপভাবে প্রত্যেক ঐ কথা যা কোন চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই মানুষের মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায় সেটাও তিনি ক্ষমা করে দেন। যেমন সুনানে আবি দাউদে রয়েছেঃ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) শুনতে পান যে, একটি লোক তার স্ত্রীকে বলছেঃ “হে আমার বোন!” তখন তিনি লোকটিকে বলেনঃ “এটা কি তোমার বোন?” অর্থাৎ তার এ উক্তিকে তিনি অপছন্দ করেন এবং তাকে বাধা দেন। কিন্তু ঐ স্ত্রীকে তিনি তার জন্যে হারাম করে দিলেন না। কেননা, প্রকৃতপক্ষে তার এটা উদ্দেশ্য ছিল না, শুধু মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল মাত্র। অন্যথায় অবশ্যই ঐ স্ত্রী তার জন্যে হারাম হয়ে যেতো। কেননা, সঠিক উক্তি এটাই যে, নিজের স্ত্রীকে যে ব্যক্তি তাদের নামে স্মরণ করে যারা চিরস্থায়ীভাবে মুহাররামাত (যাদের সাথে বিবাহ চিরতরে অবৈধ) যেমন ভগ্নী, ফুফু, খালা ইত্যাদি, তবে এরাও মাতার হুকুমের পর্যায়ে পড়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে এবং পরে নিজেদের উক্তি হতে ফিরে আসে।” এর একটি ভাবার্থ এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, যিহার করলো, অতঃপর এই শব্দেরই পুনরাবৃত্তি করলো। কিন্তু এটা ঠিক নয়। ইমাম শাফিয়ী (রঃ)-এর উক্তি মতে এর ভাবার্থ হলোঃ যিহার করলো, তারপর ঐ স্ত্রীকে আটক করে রাখলো। শেষ পর্যন্ত এমন এক যামানা অতিবাহিত হলো যে, ইচ্ছা করলে নিয়মিতভাবে তাকে তালাক দিতে পারতো, কিন্তু তালাক দিলো না।ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ আবার ফিরে আসলো সহবাসের দিকে অথবা সহবাসের ইচ্ছা করলো। এটা বৈধ নয় যে পর্যন্ত না উল্লিখিত কাফফারা আদায় করে।ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সহবাস করার ইচ্ছা করলো বা তার সাথে জীবন যাপন করার দৃঢ় সংকল্প করলো।ইমাম আবু হানীফা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, উদ্দেশ্য হলো যিহারের দিকে ফিরে আসা, এর হুরমত ও জাহেলিয়াত যুগের হুকুম উঠে যাওয়ার পর। সুতরাং এখন যে ব্যক্তি যিহার করবে তার উপর তার স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে যে পর্যন্ত না সে কাফফারা আদায় করে। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ যে বিষয়কে সে নিজের জীবনের উপর হারাম করে নিয়েছিল সেটা আবার সে বৈধ করতে চায় সে যেন কাফফারা আদায় করে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কাফফারা আদায় করার পূর্বে সহবাস করা নিষিদ্ধ, কিন্তু যদি গুপ্তাঙ্গ ছাড়া অন্য কিছু স্পর্শ করে তবে কোন দোষ নেই।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এখানে (আরবী) দ্বারা সহবাস করাকে বুঝানো হয়েছে। যুহরী (রঃ) বলেন যে, কাফফারা আদায়ের পূর্বে হাত লাগানো, ভালবাসা দেখানো ইত্যাদিও জায়েয নয়।আহলুস সুনান হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, একটি লোক বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আমার স্ত্রীর সাথে যিহার করেছি এবং কাফফারা আদায়ের পূর্বে তার সাথে সহবাসও করে ফেলেছি (এখন উপায় কি?)।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহ্ তোমার প্রতি দয়া করুন, তুমি এটা কেন করেছো?” উত্তরে সে বলেঃ “চাঁদনী রাতে তার পাঁয়জোর (পায়ের অলংকার) আমাকে ব্যাকুল করে তুলেছিল।” তার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “এখন হতে আর তার নিকটবর্তী হয়ো না যে পর্যন্ত না আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ অনুযায়ী কাফফারা আদায় কর।” (ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান, গারীব, সহীহ বলেছেন। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটাকে মুরসাল রূপে বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা মুরসাল হওয়াকেই সঠিক বলেছেন)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ যিহারের কাফফারার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, একটি দাস মুক্ত করতে হবে। দাসকে যে মুমিন হতে হবে এ শর্ত এখানে আরোপ করা হয়নি, যেমন হত্যার কাফফারায় দাসের মুমিন হওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে।ইমাম শাফেয়ী (রঃ) তো বলেন যে, এই অনির্দিষ্টকে নির্দিষ্টের উপর স্থাপন করা হবে। অর্থাৎ হত্যার কাফফারার ব্যাপারে যেমন মুমিন গোলাম আযাদ করার হুকুম রয়েছে, তেমনই এই যিহারের কাফফারার ব্যাপারেও ঐ হুকুমই থাকবে। এর দলীল এই হাদীসটিও যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) একটি কালো রঙ এর দাসী সম্পর্কে বলেনঃ “একেই আযাদ বা মুক্ত করে দাও, কেননা, এটা মুমিনা দাসী।”উপরে বর্ণিত ঘটনায় জানা গেছে যে, যিহার করে কাফফারা আদায় করার পূর্বেই স্ত্রীর সাথে সহবাসকারীকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) দ্বিগুণ কাফফারা আদায় করার নির্দেশ দেননি।এরপর মহান আল্লাহ্ বলেনঃ এই নির্দেশ তোমাদেরকে দেয়া হলো, অর্থাৎ তোমাদের ধমকানো হচ্ছে। আল্লাহ্ তোমাদের কার্যের ব্যাপারে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তোমাদের অবস্থা তিনি সম্যক অবগত। তোমরা যা কর আল্লাহ্ তার খবর রাখেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ গোলাম আযাদ করার যার সামর্থ্য থাকবে না, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে তাকে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখতে হবে। যে এতেও অসমর্থ হবে, সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে। পূর্ববর্ণিত হাদীসগুলোর আলোকে জানা যাচ্ছে যে, আদিষ্ট প্রথম সুরতটি (গোলাম আযাদ করা) হলো অগ্রগণ্য, তারপর দ্বিতীয়টি (একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখা) এবং এরপর তৃতীয়টি (ষাটজন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়ানো)। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের এ হাদীসটিতেও রয়েছে যাতে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) রমযান মাসে স্ত্রীর সাথে সহবাসকারী লোকটিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।মহান আল্লাহ বলেন, এই আহকাম আমি এ জন্যেই নির্ধারণ করেছি যে, যেন তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে (সঃ) বিশ্বাস স্থাপন কর। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। সাবধান! তোমরা তার বিধানের উল্টো কাজ করো না, তার নিষিদ্ধ বিষয়ের সীমা ছাড়িয়ে যেয়ো না। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা কাফির হবে অর্থাৎ ঈমান আনয়ন করবে না, আমার আদেশ মান্য করবে না, শরীয়তের আহকামের অমর্যাদা ও অসম্মান করবে এবং ওর প্রতি বেপরোয়া ভাব দেখাবে, তারা আমার শাস্তি হতে বেঁচে যাবে এ ধারণা তোমরা কখনো পোষণ করো না। জেনে রেখো যে, তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

আল-মুজাদালা 58:4

২-৪ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত খুওয়াইলাহ্ বিনতে সা'লাবাহ্ (রাঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমার এবং (আমার স্বামী) হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-এর ব্যাপারে আল্লাহ্ তাআলা সূরায়ে মুজাদালার প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। আমি তার ঘরে ছিলাম। তিনি খুবই বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁর চরিত্রও ভাল ছিল না। একদা তিনি আমার কাছে আসেন, আমি তাকে এমন এক কথা বলে ফেলি যে, তিনি রাগান্বিত হন এবং আমাকে বলে ফেলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি আমার জন্যে আমার মাতার পৃষ্ঠ সদৃশ।” তারপর তিনি ঘর হতে বেরিয়ে যান। এবং কওমী মজলিসে কিছুক্ষণ বসে থাকেন। অতঃপর তিনি বাড়ীতে ফিরে আসেন। এরপর তিনি আমার সাথে কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে চাইলে আমি বলিঃ কখনো না, যার হাতে খুওয়াইলাহর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! আপনার। একথা (যিহারের কথা) বলার পর আপনি আপনার এ মনোবাসনা পূর্ণ করতে পারেন না যে পর্যন্ত না আমাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর ফায়সালা হয়। কিন্তু তিনি মানলেন না, বরং জোর পূর্বক তাঁর কাম বাসনা চরিতার্থ করতে চাইলেন। কিন্তু তিনি দুর্বল ছিলেন বলে আমি তার উপর বিজয় লাভ করলাম এবং তিনি পরাজিত হলেন। আমি আমার প্রতিবেশিনীর বাড়ী গিয়ে একটা কাপড় চেয়ে নিলাম এবং তা গায়ে দিয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট গমন করলাম। আমার স্বামীর সাথে আমার যা কিছু ঘটেছিল তা আমি তাঁর সামনে নিঃসংকোচে বর্ণনা করলাম এবং তার দুশ্চরিত্রতার অভিযোগ করলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাকে বলতে থাকলেনঃ “হে খুওয়াইলাহ্ (রঃ)! তোমার স্বামীর ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে ভয় কর, সে তো অতি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছে।” আল্লাহর কসম! আমাদের মধ্যে এসব কথাবার্তা চলতে আছে ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর উপর অহী অবতীর্ণ হতে শুরু হয়। শেষ হলে তিনি বলেনঃ “হে খুওয়াইলাহ (রাঃ)! তোমার ও তোমার স্বামীর ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ করেছেন।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো পাঠ করেন। তারপর তিনি আমাকে বলেনঃ “তোমার স্বামীকে বলল যে, সে যেন একটি গোলাম আযাদ - করে।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গোলাম আযাদ করার মত সামর্থ্য তার নেই। তিনি বললেনঃ “তাহলে সে যেন একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখে।” আমি বললাম, আল্লাহর কসম! তিনি তো অতি বৃদ্ধ। দুই মাস রোযা রাখার শক্তি তার নেই। তাহলে সে যেন এক অসাক (প্রায় পাকি চার মণ) খেজুর ষাটজন মিসকীনকে খেতে দেয়।” বললেন তিনি। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ পরিমাণ খেজুরও তার কাছে নেই। তিনি বললেনঃ “আচ্ছা, আমি অর্ধ অসাক খেজুর তাকে দিচ্ছি।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঠিক আছে, বাকী অর্ধেক আমি দিচ্ছি। তিনি বললেনঃ “বাঃ, বাঃ! খুবই ভাল কাজ করলে তুমি। যাও, এটা আদায় করছে। আর তোমার স্বামীর সাথে প্রেম-প্রীতি, শুভাকাঙ্ক্ষা ও আনুগত্য সহ জীবন কাটিয়ে দাও।” আমি বললামঃ আমি তাই করবো। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কোন কোন রিওয়াইয়াতে মহিলাটির নাম খুওয়াইলাহ্ এর স্থলে খাওলাহ্ রয়েছে এবং বিনতু সা'লাবাহ্ এর স্থলে বিনতে মালিক ইবনে সা'লাবাহ্ আছে। এসব উক্তিতে এমন কোন মতপার্থক্য নেই যে, একে অপরের বিরোধ হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এই সূরার প্রাথমিক এই আয়াতগুলোর সঠিক শানে নুযূল এটাই। হযরত সালমা ইবনে সাখ আনসারীর (রাঃ) ঘটনাটি যা এখনই আসছে, এ আয়াতগুলোতে আছে, এই হুকুমই সেখানেও দেয়া হয়েছে অর্থাৎ গোলাম আযাদ করা বা দুই মাস একাদিক্রমে রোযা রাখা অথবা ষাটজন মিসকীনকে খাদ্য খেতে দেয়া।ঘটনাটি হযরত সালমা ইবনে সাখর আনসারী (রাঃ) নিজেই নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃ“অন্যদের তুলনায় আমার স্ত্রী-সহবাসের ক্ষমতা অধিক ছিল। রমযান মাসে দিনের বেলায় আমি নিজেকে হয় তত সহবাস হতে বিরত রাখতে পারবো না এই ভয়ে সারা রমযান মাসের জন্যে আমার স্ত্রীর সাথে আমি যিহার করে ফেলি। একদা রাত্রে আমার স্ত্রী আমার সেবায় লিপ্ত ছিল এমতাবস্থায় তার দেহের কোন এক অংশ হতে কাপড় সরে যায়। তখন আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে তার সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়ে পড়ি। সকাল হলে আমি আমার কওমের কাছে ফিরে আমার রাত্রির ঘটনাটি বর্ণনা করি এবং তাদেরকে বলিঃ তোমরা আমাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট চল এবং তাকে আমার ঘটনাটি অবহিত কর।তারা সবাই আমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করলো এবং বললোঃ “আমরা তোমার সাথে যাবো না। হতে পারে যে, এ ব্যাপারে কুরআন কারীমে কোন আয়াত অবতীর্ণ হয়ে যাবে অথবা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এমন কথা বলে দিবেন যার ফলে আমরা চিরদিনের জন্যে কলংকিত হবো। তুমি নিজেই যাও এবং দেখো, তোমার ব্যাপারে কি ঘটে।” আমি তখন বেরিয়ে পড়লাম এবং নবী (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে গেলাম। অতঃপর তাকে আমি আমার খবর অবহিত করলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি এ কাজ করেছো?” আমি উত্তরে বললামঃ জ্বী, হ্যাঁ, আমি এ কাজ করেছি। পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তুমি এ কাজ করেছো?” আমি জবাব দিলামঃ হ্যাঁ, জনাব! আমার দ্বারা এ কাজ হয়ে গেছে। আবার তিনি বললেনঃ “এ কাজ করেছো তুমি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যাঁ, হুযুর! সত্যিই আমি এ কাজ করে ফেলেছি। সুতরাং আমার উপর আপনি মহামহিমান্বিত আল্লাহর হুকুম জারী করুন! আমি ধৈর্যের সাথে তা সহ্য করবে। তখন তিনি বললেনঃ “তুমি একটি গোলাম আযাদ কর।” আমি তখন আমার গদানে হাত রেখে বললামঃ যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আমি শুধু এরই (অর্থাৎ আমার গদানেরই) মালিক। এ ছাড়া আমি আর কিছুরই মালিক নই (অর্থাৎ আমার গোলাম আযাদ করার ক্ষমতা নেই। তিনি বললেনঃ “তাহলে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখো।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রোযার কারণেই তো আমার দ্বারা এ কাজ হয়ে গেছে (সুতরাং এটাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়)। তিনি বললেনঃ “যাও, তাহলে সাদকা কর।” আমি বললামঃ আপনাকে যিনি সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আমার কাছে সাদকা করার মত কিছুই নেই। এমন কি আজ রাত্রে আমার পরিবারের সবাই ক্ষুধার্ত রয়েছে। তাদের রাত্রির খাবার পর্যন্ত নেই! তিনি তখন আমাকে বললেনঃ “তুমি বানু রুয়েক গোত্রের সাদকার মালিকদের কাছে যাও এবং তাদেরকে বল যে, তারা যেন তাদের সাদকার মাল তোমাকেই দেয়। তুমি ওর মধ্য হতে এক অসাক খেজুর ষাটজন মিসকীনকে প্রদান করবে এবং বাকীগুলো তোমার নিজের ও পরিবারের কাজে ব্যয় করবে।”রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর একথা শুনে আমি খুশী মনে ফিরে আসলাম এবং আমার কওমের কাছে গিয়ে বললামঃ “তোমাদের কাছে আমি পেয়েছিলাম সংকীর্ণতা ও মন্দ অভিমত। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে পেয়েছি আমি প্রশস্ততা ও বরকত। তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা যেন তোমাদের সাদকার মাল আমাকেই প্রদান কর। তারা তখন আমাকে তা দিয়ে দিলো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযীও (রঃ) সংক্ষিপ্তভাবে এটা বর্ণনা করেছেন এবং তিনিএটাকে হাসান বলেছেন)বাহ্যতঃ এটা জানা যাচ্ছে যে, এটা হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ) এবং তার স্ত্রী হযরত খুওয়াইলাহ্ বিনতে সা'লাবাহ্ (রাঃ)-এর ঘটনার পরবর্তী ঘটনা। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যিহারের প্রথম ঘটনা হচ্ছে হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-এর ঘটনাটি, যিনি হযরত উবাদাহ্ ইবনে সামিতের (রাঃ) ভাই ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল খাওলা বিনতে সা'লাবাহ্ ইবনে মালিক। এই ঘটনার পর হযরত খাওলা (রাঃ)-এর এই ভয় ছিল হয়তো তালাক হয়ে গেছে। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে এসে বলেনঃ আমার স্বামী আমার সাথে যিহার করেছে। যদি আমরা পৃথক পৃথক হয়ে যাই তবে আমরা দুজনই ধ্বংস হয়ে যাবো। আর কোন সন্তানের জন্মদান করার মত ক্ষমতা আমার নেই। দীর্ঘদিন ধরে আমি তার সাথে সংসার করে আসছি।” এভাবে তিনি কথা বলছিলেন এবং ক্রন্দন করছিলেন। এ পর্যন্ত ইসলামে যিহারের কোন হুকুম ছিল। ঐ সময় (আরবী) হতে পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-কে ডেকে বলেনঃ “গোলাম আযাদ করার ক্ষমতা তোমার আছে কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর কসম! এ ক্ষমতা আমার নেই।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন তাঁর জন্যে অর্থ সংগ্রহ করেন এবং তা দিয়ে তিনি গোলাম আযাদ করেন। আর এভাবে তিনি তাঁর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ছাড়াও আরো বহু গুরুজনও একথাই বলেছেন যে, এ আয়াতগুলো তাদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। এসব ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দ হতে এসেছে। অজ্ঞতার যুগের লোকেরা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করার সময় বলতোঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি আমার জন্যে আমার মাতার পৃষ্ঠ সদৃশ।" শরীয়তের হুকুম এই যে, এরূপভাবে যে কোন অঙ্গের নাম নিবে, তাতে যিহার হয়ে যাবে। জাহেলিয়াতের যুগে যিহারকে তালাক মনে করা হতো। আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতের জন্যে এতে কাফফারা নির্ধারণ করেছেন এবং এটাকে তালাক রূপে গণ্য করেননি, যেমন জাহেলিয়াতের যুগে এই প্রথা ছিল। পূর্বযুগীয় অধিকাংশ গুরুজন একথাই বলেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) অজ্ঞতার যুগের এই প্রথার উল্লেখ করে বলেনঃ ইসলামে যখন হযরত খুওয়াইলাহ্ সম্পর্কীয় ঘটনাটি সংঘটিত হলো এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়েই দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলো তখন হযরত আউস (রাঃ) তার স্ত্রীকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে প্রেরণ করলেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) চিরুণী করছিলেন। তিনি ঘটনাটি শুনে বললেনঃ “আমাদের কাছে এর কোন নির্দেশ নেই।” ইতিমধ্যে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তিনি হযরত খুওয়াইলাহ (রাঃ)-কে সুসংবাদ প্রদান করেন। যখন গোলাম আযাদ করার কথা উল্লেখ করা হয় তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমাদের কাছে কোন গোলাম নেই। আমার স্বামী গোলাম আযাদ করতে সক্ষম নন।” তারপর একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখার নির্দেশ দেয়া হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমার স্বামী যদি দিনে তিনবার করে পানি পান না করেন তবে তাঁর দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যাবে।” এরপর যখন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “এতেও যে অসমর্থ, সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে।' তখন হযরত খুওয়াইলাহ (রাঃ) বলেনঃ “কয়েক গ্রাস খাদ্য খেয়েই তো আমাদেরকে সারা দিন কাটিয়ে দিতে হয়, অন্যদেরকে খাওয়ানো তো বহু দূরের কথা!” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অর্ধ অসাক ত্রিশ সা’ (খাদ্য) আনিয়ে নিয়ে তাঁকে দিলেন এবং তাঁর স্বামীকে নির্দেশ দিলেন যে, তিনি যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ খুবই সবল ও উত্তম। কিন্তু বর্ণনার ধারা গারাবত মুক্ত নয়) আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, খাওলা বিনতে দালীজ (রাঃ) একজন আনসারীর স্ত্রী ছিলেন, যিনি চোখে কম দেখতেন। তিনি ছিলেন খুব দরিদ্র এবং তার চরিত্রও খুব ভাল ছিল না। একদিন কথায় কথায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়ে যায় এবং জাহেলিয়াত যুগের প্রথা ও রীতি অনুযায়ী স্বামী স্ত্রীর সাথে যিহার করে নেন। অজ্ঞতা যুগের এটাই ছিল তালাক। স্ত্রী হযরত খাওলা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হন। ঐ সময় তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরে ছিলেন এবং হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর মস্তক ধৌত করছিলেন। হযরত খাওলা (রাঃ) তাঁর সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। ঘটনাটি শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “এখন আর কি হতে পারে? আমার জানা মতে তুমি তার উপর হারাম হয়ে গেছে। তাঁর একথা শুনে হযরত খাওলা (রাঃ) বললেনঃ “আমি আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করছি।" হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মস্তক মুবারকের এক দিক ধুয়ে দিয়ে ঘুরে অন্য দিকে গেলেন এবং ওদিকের অংশ ধুতে লাগলেন। তখন হযরত খাওলাও (রাঃ) ঘুরে গিয়ে ওদিকে বসে পড়েন এবং স্বীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) পুনরায় ঐ জবাবই দেন।হযরত আয়েশা (রাঃ) লক্ষ্য করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর চেহারা মুবারকের রঙ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তখন তিনি হযরত খাওলা (রাঃ)-কে বললেনঃ “তুমি একটু সরে বসো।" তিনি সরে গেলেন। ইতিমধ্যে অহী নাযিল হতে শুরু হয়। অহী নাযিল হওয়া শেষ হলে তিনি প্রশ্ন করেনঃ “মহিলাটি কোথায়?” হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁকে ডাকিয়ে নেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন তাঁকে বলেনঃ “যাও, তোমার স্বামীকে ডেকে নিয়ে এসো।” তিনি কাঁদতে কাঁদতে গেলেন এবং স্বামীকে ডেকে নিয়ে এলেন। স্বামী সম্পর্কে যে মন্তব্য তিনি করেছিলেন যে, তিনি কম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন, দরিদ্র এবং দুশ্চরিত্র, নবী (সঃ) তাঁকে সেরূপই পেলেন। তখন তিনি পাঠ করলেনঃ (আরবী)অতঃপর মহিলাটির স্বামীকে বললেনঃ “তুমি স্ত্রীকে স্পর্শ করার পূর্বে গোলাম আযাদ করতে পার কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “না।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “তাহলে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখতে কি তুমি সক্ষম হবে?” জবাবে তিনি বললেনঃ “যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার শপথ! আমি দিনে দুইবার বা তিনবার না খেলে আমার চক্ষু নষ্ট হয়ে যাবার উপক্রম হবে।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াতে পারবে কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “না, তবে যদি আপনি আমাকে সাহায্য করেন তাহলে পারবো)।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁকে সাহায্য করলেন এবং তাঁকে বললেনঃ “ষাটজন মিসকীনকে খানা খাওয়ায়ে দাও।” আল্লাহ্ তা'আলা জাহেলিয়াত যুগের প্রথা, তালাককে উঠিয়ে দিয়ে এটাকে যিহাররূপে নির্ধারণ করলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, “ঈলা ও যিহার জাহেলিয়াতের যুগের তালাক ছিল। আল্লাহ তা'আলা ঈলায় তো চার মাস সময় নির্ধারণ করেন এবং যিহারে নির্ধারণ করেন কাফফারা।হযরত ইমাম মালিক (রঃ) (আরবী) শব্দ দ্বারা দলীল গ্রহণ করে বলেন যে, এখানে মুমিনদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, সুতরাং কাফিররা এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। জমহুরের মাযহাব এর বিপরীত। তাঁরা (আরবী) শব্দের এই জবাব দেন যে, প্রাধান্য হিসাবে এটা বলা হয়েছে। সুতরাং (আরবী) হিসেবে (আরবী) উদ্দেশ্য হতে পারে না। জমহুর (আরবী) দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, দাসীর সাথে যিহার হয় না এবং দাসী এই বা সম্বোধনের মধ্যে দাখিলও নয়।আল্লাহ তাআলার উক্তিঃ (আরবী) (তাদের পত্নীগণ তাদের মা নয়, যারা তাদেরকে জন্মদান করে শুধু তারাই তাদের মাতা)। অর্থাৎ কোন ব্যক্তির তার স্ত্রীকে (আরবী) বা (আরবী) অথবা (আরবী) কিংবা এগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত কথা বলার দ্বারা স্ত্রী কখনো তার মা হতে পারে না। বরং যারা তাদেরকে জন্মদান করে শুধু তারাই তাদের মাতা। তারা তো অসংগত ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাপ মোচনকারী ও ক্ষমাশীল। তিনি জাহেলিয়াত যুগের এই সংকীর্ণতাকে তোমাদের হতে দূর করে দিয়েছেন। অনুরূপভাবে প্রত্যেক ঐ কথা যা কোন চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই মানুষের মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায় সেটাও তিনি ক্ষমা করে দেন। যেমন সুনানে আবি দাউদে রয়েছেঃ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) শুনতে পান যে, একটি লোক তার স্ত্রীকে বলছেঃ “হে আমার বোন!” তখন তিনি লোকটিকে বলেনঃ “এটা কি তোমার বোন?” অর্থাৎ তার এ উক্তিকে তিনি অপছন্দ করেন এবং তাকে বাধা দেন। কিন্তু ঐ স্ত্রীকে তিনি তার জন্যে হারাম করে দিলেন না। কেননা, প্রকৃতপক্ষে তার এটা উদ্দেশ্য ছিল না, শুধু মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল মাত্র। অন্যথায় অবশ্যই ঐ স্ত্রী তার জন্যে হারাম হয়ে যেতো। কেননা, সঠিক উক্তি এটাই যে, নিজের স্ত্রীকে যে ব্যক্তি তাদের নামে স্মরণ করে যারা চিরস্থায়ীভাবে মুহাররামাত (যাদের সাথে বিবাহ চিরতরে অবৈধ) যেমন ভগ্নী, ফুফু, খালা ইত্যাদি, তবে এরাও মাতার হুকুমের পর্যায়ে পড়ে যাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে এবং পরে নিজেদের উক্তি হতে ফিরে আসে।” এর একটি ভাবার্থ এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, যিহার করলো, অতঃপর এই শব্দেরই পুনরাবৃত্তি করলো। কিন্তু এটা ঠিক নয়। ইমাম শাফিয়ী (রঃ)-এর উক্তি মতে এর ভাবার্থ হলোঃ যিহার করলো, তারপর ঐ স্ত্রীকে আটক করে রাখলো। শেষ পর্যন্ত এমন এক যামানা অতিবাহিত হলো যে, ইচ্ছা করলে নিয়মিতভাবে তাকে তালাক দিতে পারতো, কিন্তু তালাক দিলো না।ইমাম আহমাদ (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হলোঃ আবার ফিরে আসলো সহবাসের দিকে অথবা সহবাসের ইচ্ছা করলো। এটা বৈধ নয় যে পর্যন্ত না উল্লিখিত কাফফারা আদায় করে।ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ সহবাস করার ইচ্ছা করলো বা তার সাথে জীবন যাপন করার দৃঢ় সংকল্প করলো।ইমাম আবু হানীফা (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, উদ্দেশ্য হলো যিহারের দিকে ফিরে আসা, এর হুরমত ও জাহেলিয়াত যুগের হুকুম উঠে যাওয়ার পর। সুতরাং এখন যে ব্যক্তি যিহার করবে তার উপর তার স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে যে পর্যন্ত না সে কাফফারা আদায় করে। হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ যে বিষয়কে সে নিজের জীবনের উপর হারাম করে নিয়েছিল সেটা আবার সে বৈধ করতে চায় সে যেন কাফফারা আদায় করে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, কাফফারা আদায় করার পূর্বে সহবাস করা নিষিদ্ধ, কিন্তু যদি গুপ্তাঙ্গ ছাড়া অন্য কিছু স্পর্শ করে তবে কোন দোষ নেই।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এখানে (আরবী) দ্বারা সহবাস করাকে বুঝানো হয়েছে। যুহরী (রঃ) বলেন যে, কাফফারা আদায়ের পূর্বে হাত লাগানো, ভালবাসা দেখানো ইত্যাদিও জায়েয নয়।আহলুস সুনান হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, একটি লোক বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আমার স্ত্রীর সাথে যিহার করেছি এবং কাফফারা আদায়ের পূর্বে তার সাথে সহবাসও করে ফেলেছি (এখন উপায় কি?)।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “আল্লাহ্ তোমার প্রতি দয়া করুন, তুমি এটা কেন করেছো?” উত্তরে সে বলেঃ “চাঁদনী রাতে তার পাঁয়জোর (পায়ের অলংকার) আমাকে ব্যাকুল করে তুলেছিল।” তার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “এখন হতে আর তার নিকটবর্তী হয়ো না যে পর্যন্ত না আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ অনুযায়ী কাফফারা আদায় কর।” (ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান, গারীব, সহীহ বলেছেন। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) ও ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটাকে মুরসাল রূপে বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) এটা মুরসাল হওয়াকেই সঠিক বলেছেন)এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ যিহারের কাফফারার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, একটি দাস মুক্ত করতে হবে। দাসকে যে মুমিন হতে হবে এ শর্ত এখানে আরোপ করা হয়নি, যেমন হত্যার কাফফারায় দাসের মুমিন হওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে।ইমাম শাফেয়ী (রঃ) তো বলেন যে, এই অনির্দিষ্টকে নির্দিষ্টের উপর স্থাপন করা হবে। অর্থাৎ হত্যার কাফফারার ব্যাপারে যেমন মুমিন গোলাম আযাদ করার হুকুম রয়েছে, তেমনই এই যিহারের কাফফারার ব্যাপারেও ঐ হুকুমই থাকবে। এর দলীল এই হাদীসটিও যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) একটি কালো রঙ এর দাসী সম্পর্কে বলেনঃ “একেই আযাদ বা মুক্ত করে দাও, কেননা, এটা মুমিনা দাসী।”উপরে বর্ণিত ঘটনায় জানা গেছে যে, যিহার করে কাফফারা আদায় করার পূর্বেই স্ত্রীর সাথে সহবাসকারীকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) দ্বিগুণ কাফফারা আদায় করার নির্দেশ দেননি।এরপর মহান আল্লাহ্ বলেনঃ এই নির্দেশ তোমাদেরকে দেয়া হলো, অর্থাৎ তোমাদের ধমকানো হচ্ছে। আল্লাহ্ তোমাদের কার্যের ব্যাপারে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তোমাদের অবস্থা তিনি সম্যক অবগত। তোমরা যা কর আল্লাহ্ তার খবর রাখেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ গোলাম আযাদ করার যার সামর্থ্য থাকবে না, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে তাকে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখতে হবে। যে এতেও অসমর্থ হবে, সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে। পূর্ববর্ণিত হাদীসগুলোর আলোকে জানা যাচ্ছে যে, আদিষ্ট প্রথম সুরতটি (গোলাম আযাদ করা) হলো অগ্রগণ্য, তারপর দ্বিতীয়টি (একাদিক্রমে দুই মাস রোযা রাখা) এবং এরপর তৃতীয়টি (ষাটজন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়ানো)। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের এ হাদীসটিতেও রয়েছে যাতে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) রমযান মাসে স্ত্রীর সাথে সহবাসকারী লোকটিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।মহান আল্লাহ বলেন, এই আহকাম আমি এ জন্যেই নির্ধারণ করেছি যে, যেন তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে (সঃ) বিশ্বাস স্থাপন কর। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। সাবধান! তোমরা তার বিধানের উল্টো কাজ করো না, তার নিষিদ্ধ বিষয়ের সীমা ছাড়িয়ে যেয়ো না। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যারা কাফির হবে অর্থাৎ ঈমান আনয়ন করবে না, আমার আদেশ মান্য করবে না, শরীয়তের আহকামের অমর্যাদা ও অসম্মান করবে এবং ওর প্রতি বেপরোয়া ভাব দেখাবে, তারা আমার শাস্তি হতে বেঁচে যাবে এ ধারণা তোমরা কখনো পোষণ করো না। জেনে রেখো যে, তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

আল-মুজাদালা 58:5

৫-৭ নং আয়াতের তাফসীর: যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করে এবং শরীয়তের আহকাম হতে বিমুখ হয়ে যায় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করা হবে যেমন লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করা হয়েছে তাদের পূর্ববর্তীদেরকে।মহান আল্লাহ বলেনঃ এভাবেই সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেছি এবং নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করে দিয়েছি, যাদের অন্তরে ঔদ্ধত্যপনা রয়েছে তারা ছাড়া কেউই এগুলো অস্বীকার করতে পারে না। আর যারা এগুলো অস্বীকার করে তারা কাফির এবং এসব কাফিরের জন্যে এখানে রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি এবং এরপর পরকালেও তাদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি অপেক্ষা করছে। এখানে তাদেরকে তাদের অহংকার আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়া হতে বিরত রাখছে, এর প্রতিফল হিসেবে তাদেরকে পরকালে সীমাহীনভাবে অপদস্থ করা হবে। যেদিন তারা হবে চরমভাবে পদদলিত। কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত মানুষকে একই ময়দানে একত্রিত করবেন এবং তারা দুনিয়ায় ভালমন্দ যা করতো তা তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে। যদিও তারা বিস্মৃত হয়েছে, কিন্তু আল্লাহ্ ওর হিসাব ৱেখেছেন। তাঁর ফেরেশতামণ্ডলী ওগুলো লিখে রেখেছেন। না আল্লাহ্ হতে কোন কিছু গোপন থাকে এবং না তিনি কোন কিছু ভুলে যান।মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ তোমরা যেখানেই থাকো এবং যে অবস্থাতেই থকো, আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের সব কথাই শুনেন এবং তোমাদের সব অবস্থাই দেখেন। তাঁর নিকট কিছুই গোপন থাকে না। তার জ্ঞান সারা দুনিয়াকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। প্রত্যেক কাল ও স্থানের খবর তার কাছে সব সময়ই রয়েছে। আসমান ও যমীনের সমস্ত সৃষ্টির খবর তিনি রাখেন। তিনজন লোক মিলিত হয়ে পরস্পর অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে পরামর্শ করলেও তিনি চতুর্থজন হিসাবে তা শুনে থাকেন। সুতরাং তাদের এটা মনে করা উচিত নয় যে, তারা তিনজন আছে, বরং আল্লাহ্ তা'আলাকে চতুর্থজন হিসেবে গণ্য করা উচিত। অনুরূপভাবে পাচজন লোক পরস্পর গোপন পরামর্শ করলে ষষ্ঠজন আল্লাহ তাআলা রয়েছেন। তাদের এ ঈমান থাকতে হবে যে, তারা যেখানেই থাকুক না কেন তাদের সাথে আল্লাহ্ রয়েছেন। তিনি তাদের অবস্থা অবগত আছেন এবং তাদের কথা শুনছেন। আবার এর সাথে সাথে তাঁর ফেরেশতামণ্ডলীও লিখতে রয়েছেন যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাআলা তাদের গোপনীয় কথা ও গোপন পরামর্শের খবর অবগত আছেন এবং আল্লাহ্ অদৃশ্যের খবর খুব ভাল জানেন?” (৯:৭৮)আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন কথা ও গোপন পরামর্শ শুনি না? অথচ আমার প্রেরিত (ফেরেশতা) গণ তাদের নিকট লিখতে রয়েছে!” (৪৩:৮০)।অধিকাংশ গুরুজন এর উপর ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, এই আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার সত্তা সব জায়গাতেই বিদ্যমান থাকা নয়, বরং তার ইলম সব জায়গায়ই বিদ্যমান রয়েছে, এটাই উদ্দেশ্য। তিনজনের সমাবেশে চতুর্থটি হবে তাঁর ইলম। নিঃসন্দেহে এ বিষয়ের উপর পূর্ণ ঈমান রাখতে হবে যে, এখানে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সত্তা সঙ্গে থাকা উদ্দেশ্য নয়, বরং তার ইলম সব জায়গায় বিদ্যমান থাকাই উদ্দেশ্য। হ্যাঁ, তবে এটা সুনিশ্চিত যে, তাঁর শোন এবং দেখাও এভাবেই তাঁর ইলমের সাথে রয়েছে। মহান আল্লাহ্ তাঁর সমস্ত মাখলুকের কার্যাবলী সম্যক অবগত। তাদের কোন কাজই তার নিকট গোপনীয় নয়। সুতরাং তারা যা কিছু করছে, তিনি কিয়ামতের দিন তাদেরকে তা জানিয়ে দিবেন। আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে সম্যক অবগত। হযরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতকে ইলম দ্বারাই শুরু করেছেন এবং ইলম দ্বারাই শেষ করেছেন।

আল-মুজাদালা 58:6

৫-৭ নং আয়াতের তাফসীর: যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করে এবং শরীয়তের আহকাম হতে বিমুখ হয়ে যায় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করা হবে যেমন লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করা হয়েছে তাদের পূর্ববর্তীদেরকে।মহান আল্লাহ বলেনঃ এভাবেই সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেছি এবং নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করে দিয়েছি, যাদের অন্তরে ঔদ্ধত্যপনা রয়েছে তারা ছাড়া কেউই এগুলো অস্বীকার করতে পারে না। আর যারা এগুলো অস্বীকার করে তারা কাফির এবং এসব কাফিরের জন্যে এখানে রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি এবং এরপর পরকালেও তাদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি অপেক্ষা করছে। এখানে তাদেরকে তাদের অহংকার আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়া হতে বিরত রাখছে, এর প্রতিফল হিসেবে তাদেরকে পরকালে সীমাহীনভাবে অপদস্থ করা হবে। যেদিন তারা হবে চরমভাবে পদদলিত। কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত মানুষকে একই ময়দানে একত্রিত করবেন এবং তারা দুনিয়ায় ভালমন্দ যা করতো তা তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে। যদিও তারা বিস্মৃত হয়েছে, কিন্তু আল্লাহ্ ওর হিসাব ৱেখেছেন। তাঁর ফেরেশতামণ্ডলী ওগুলো লিখে রেখেছেন। না আল্লাহ্ হতে কোন কিছু গোপন থাকে এবং না তিনি কোন কিছু ভুলে যান।মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ তোমরা যেখানেই থাকো এবং যে অবস্থাতেই থকো, আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের সব কথাই শুনেন এবং তোমাদের সব অবস্থাই দেখেন। তাঁর নিকট কিছুই গোপন থাকে না। তার জ্ঞান সারা দুনিয়াকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। প্রত্যেক কাল ও স্থানের খবর তার কাছে সব সময়ই রয়েছে। আসমান ও যমীনের সমস্ত সৃষ্টির খবর তিনি রাখেন। তিনজন লোক মিলিত হয়ে পরস্পর অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে পরামর্শ করলেও তিনি চতুর্থজন হিসাবে তা শুনে থাকেন। সুতরাং তাদের এটা মনে করা উচিত নয় যে, তারা তিনজন আছে, বরং আল্লাহ্ তা'আলাকে চতুর্থজন হিসেবে গণ্য করা উচিত। অনুরূপভাবে পাচজন লোক পরস্পর গোপন পরামর্শ করলে ষষ্ঠজন আল্লাহ তাআলা রয়েছেন। তাদের এ ঈমান থাকতে হবে যে, তারা যেখানেই থাকুক না কেন তাদের সাথে আল্লাহ্ রয়েছেন। তিনি তাদের অবস্থা অবগত আছেন এবং তাদের কথা শুনছেন। আবার এর সাথে সাথে তাঁর ফেরেশতামণ্ডলীও লিখতে রয়েছেন যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাআলা তাদের গোপনীয় কথা ও গোপন পরামর্শের খবর অবগত আছেন এবং আল্লাহ্ অদৃশ্যের খবর খুব ভাল জানেন?” (৯:৭৮)আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন কথা ও গোপন পরামর্শ শুনি না? অথচ আমার প্রেরিত (ফেরেশতা) গণ তাদের নিকট লিখতে রয়েছে!” (৪৩:৮০)।অধিকাংশ গুরুজন এর উপর ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, এই আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার সত্তা সব জায়গাতেই বিদ্যমান থাকা নয়, বরং তার ইলম সব জায়গায়ই বিদ্যমান রয়েছে, এটাই উদ্দেশ্য। তিনজনের সমাবেশে চতুর্থটি হবে তাঁর ইলম। নিঃসন্দেহে এ বিষয়ের উপর পূর্ণ ঈমান রাখতে হবে যে, এখানে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সত্তা সঙ্গে থাকা উদ্দেশ্য নয়, বরং তার ইলম সব জায়গায় বিদ্যমান থাকাই উদ্দেশ্য। হ্যাঁ, তবে এটা সুনিশ্চিত যে, তাঁর শোন এবং দেখাও এভাবেই তাঁর ইলমের সাথে রয়েছে। মহান আল্লাহ্ তাঁর সমস্ত মাখলুকের কার্যাবলী সম্যক অবগত। তাদের কোন কাজই তার নিকট গোপনীয় নয়। সুতরাং তারা যা কিছু করছে, তিনি কিয়ামতের দিন তাদেরকে তা জানিয়ে দিবেন। আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে সম্যক অবগত। হযরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতকে ইলম দ্বারাই শুরু করেছেন এবং ইলম দ্বারাই শেষ করেছেন।

আল-মুজাদালা 58:7

৫-৭ নং আয়াতের তাফসীর: যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করে এবং শরীয়তের আহকাম হতে বিমুখ হয়ে যায় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করা হবে যেমন লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করা হয়েছে তাদের পূর্ববর্তীদেরকে।মহান আল্লাহ বলেনঃ এভাবেই সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেছি এবং নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করে দিয়েছি, যাদের অন্তরে ঔদ্ধত্যপনা রয়েছে তারা ছাড়া কেউই এগুলো অস্বীকার করতে পারে না। আর যারা এগুলো অস্বীকার করে তারা কাফির এবং এসব কাফিরের জন্যে এখানে রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি এবং এরপর পরকালেও তাদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি অপেক্ষা করছে। এখানে তাদেরকে তাদের অহংকার আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়া হতে বিরত রাখছে, এর প্রতিফল হিসেবে তাদেরকে পরকালে সীমাহীনভাবে অপদস্থ করা হবে। যেদিন তারা হবে চরমভাবে পদদলিত। কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত মানুষকে একই ময়দানে একত্রিত করবেন এবং তারা দুনিয়ায় ভালমন্দ যা করতো তা তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে। যদিও তারা বিস্মৃত হয়েছে, কিন্তু আল্লাহ্ ওর হিসাব ৱেখেছেন। তাঁর ফেরেশতামণ্ডলী ওগুলো লিখে রেখেছেন। না আল্লাহ্ হতে কোন কিছু গোপন থাকে এবং না তিনি কোন কিছু ভুলে যান।মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ তোমরা যেখানেই থাকো এবং যে অবস্থাতেই থকো, আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের সব কথাই শুনেন এবং তোমাদের সব অবস্থাই দেখেন। তাঁর নিকট কিছুই গোপন থাকে না। তার জ্ঞান সারা দুনিয়াকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। প্রত্যেক কাল ও স্থানের খবর তার কাছে সব সময়ই রয়েছে। আসমান ও যমীনের সমস্ত সৃষ্টির খবর তিনি রাখেন। তিনজন লোক মিলিত হয়ে পরস্পর অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে পরামর্শ করলেও তিনি চতুর্থজন হিসাবে তা শুনে থাকেন। সুতরাং তাদের এটা মনে করা উচিত নয় যে, তারা তিনজন আছে, বরং আল্লাহ্ তা'আলাকে চতুর্থজন হিসেবে গণ্য করা উচিত। অনুরূপভাবে পাচজন লোক পরস্পর গোপন পরামর্শ করলে ষষ্ঠজন আল্লাহ তাআলা রয়েছেন। তাদের এ ঈমান থাকতে হবে যে, তারা যেখানেই থাকুক না কেন তাদের সাথে আল্লাহ্ রয়েছেন। তিনি তাদের অবস্থা অবগত আছেন এবং তাদের কথা শুনছেন। আবার এর সাথে সাথে তাঁর ফেরেশতামণ্ডলীও লিখতে রয়েছেন যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাআলা তাদের গোপনীয় কথা ও গোপন পরামর্শের খবর অবগত আছেন এবং আল্লাহ্ অদৃশ্যের খবর খুব ভাল জানেন?” (৯:৭৮)আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন কথা ও গোপন পরামর্শ শুনি না? অথচ আমার প্রেরিত (ফেরেশতা) গণ তাদের নিকট লিখতে রয়েছে!” (৪৩:৮০)।অধিকাংশ গুরুজন এর উপর ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, এই আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার সত্তা সব জায়গাতেই বিদ্যমান থাকা নয়, বরং তার ইলম সব জায়গায়ই বিদ্যমান রয়েছে, এটাই উদ্দেশ্য। তিনজনের সমাবেশে চতুর্থটি হবে তাঁর ইলম। নিঃসন্দেহে এ বিষয়ের উপর পূর্ণ ঈমান রাখতে হবে যে, এখানে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলার সত্তা সঙ্গে থাকা উদ্দেশ্য নয়, বরং তার ইলম সব জায়গায় বিদ্যমান থাকাই উদ্দেশ্য। হ্যাঁ, তবে এটা সুনিশ্চিত যে, তাঁর শোন এবং দেখাও এভাবেই তাঁর ইলমের সাথে রয়েছে। মহান আল্লাহ্ তাঁর সমস্ত মাখলুকের কার্যাবলী সম্যক অবগত। তাদের কোন কাজই তার নিকট গোপনীয় নয়। সুতরাং তারা যা কিছু করছে, তিনি কিয়ামতের দিন তাদেরকে তা জানিয়ে দিবেন। আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে সম্যক অবগত। হযরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতকে ইলম দ্বারাই শুরু করেছেন এবং ইলম দ্বারাই শেষ করেছেন।

আল-মুজাদালা 58:8

৮-১০ নং আয়াতের তাফসীর: মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল তারা ছিল ইয়াহূদী। মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) বলেন যে, নবী (সঃ) ও ইয়াহুদীদের মাঝে যখন চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয় তখন ইয়াহুদীরা এই কাজ করতে শুরু করে যে, যেখানেই তারা কোন মুসলমানকে দেখতে এবং যেখানেই কোন মুসলমান তাদের কাছে যেতো তখন তারা এদিকে-ওদিকে একত্রিত হয়ে চুপে-চুপে এবং ইশারা-ইঙ্গিতে এমনভাবে কানাকানি করতো যে, যে মুসলমান একাকী তাদের কাছে থাকতো সে ধারণা করতো যে, তারা তাকে হত্যা করারই চক্রান্ত করছে। তার আরো ধারণা হতো যে, তারা তার বিরুদ্ধে এবং অন্যান্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে গোপন সড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছে। সুতরাং সে তাদের কাছে যেতেও ভয় কর তো। যখন সাধারণভাবে এসব অভিযোগ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কানে পৌছতে লাগলো তখন তিনি তাদেরকে এই ঘৃণ্য কাজে বাধা দিলেন এবং চরমভাবে নিষেধ করলেন। কিন্তু এর পরেও তারা আবার এ কাজে লেগে পড়লো।হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন, তিনি (তাঁর দাদা) বলেনঃ “আমরা রাত্রে পালাক্রমে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর খিতমতে হাযির হতাম, উদ্দেশ্য এই যে, রাত্রে তাঁর কোন কাজের প্রয়োজন হলে আমরা তা করে দিবো। একদা রাত্রে যাদের পালা ছিল তারা এসে গেল এবং আরো কিছু লোক সওয়াবের নিয়তে এসে পড়লো। লোক খুব বেশী একত্রিত হওয়ার কারণে আমরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে এদিকে-ওদিকে বসে পড়লাম। প্রত্যেক দল নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করতে লাগলো। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এসে পড়লেন। তিনি বললেনঃ “তোমরা কি গোপন পরামর্শ করছো? আমি কি তোমাদেরকে এর থেকে নিষেধ করিনি?” উত্তরে আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আল্লাহর নিকট তাওবা করছি। আমরা মাসীহ দাজ্জালের আলোচনা করছিলাম। কেননা, তার ব্যাপারে আমাদের মনে খটকা লাগছে। তিনি একথা শুনে বললেনঃ “আমি তোমাদের উপর তার চেয়েও যে বিষয়ে বেশী ভয় করি তার খবর কি তোমাদেরকে দিবো না?” আমরা বললামঃ হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদেরকে আপনি ঐ খবর দিন! তিনি বললেনঃ “তা হলো গোপন শিরক। তা এই ভাবে যে, একটি লোকে দাড়িয়ে গেল এবং লোকদেরকে দেখাবার জন্যে কোন (ইবাদতের) কাজ করলো।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ গারীব এবং এতে কোন কোন বর্ণনাকারী দুর্বল রয়েছেন)এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তারা পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণের জন্যে কানাকানি করে। অর্থাৎ তারা হয়তো পাপের কাজের উপর কানাকানি করে যাতে তাদের নিজেদেরই ক্ষতি হয়, কিংবা হয়তো যুলুমের কাজে কানাকানি করে যাতে তারা অন্যদের ক্ষতি সাধনের ষড়যন্ত্র করে, অথবা তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণের উপর কানাকানি করে এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করতে একে অপরকে পাকিয়ে তোলে।আল্লাহ্ তা'আলা ঐ পাপী ও বদ লোকদের আর একটি জঘন্য আচরণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা সালামের শব্দের পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকে। তারা রাসূল (সঃ)-কে এমন কথা দ্বারা অভিবাদন করে যদদ্বারা আল্লাহ্ তাঁকে অভিবাদন করেননি।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা কয়েকজন ইয়াহূদী রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আবুল কাসেম (সঃ)! তোমার মৃত্যু হোক (তাদের উপর আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হোক!)” তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রতি উত্তরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মৃত্যু হোক।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মন্দ বচন ও কঠোর উক্তিকে অপছন্দ করেন। হযরত আয়েশা (রাঃ)! তখন বলেনঃ “আপনি কি শুনেননি যে, তারা আপনাকে (আরবী) বলেছে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তুমি কি শুননি যে, আমি তাদেরকে (আরবী) বলেছি?” তখন আল্লাহ্ তা'আলা ... (আরবী)আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটিও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ্ এর মধ্যে অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী)এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছিলেনঃ “তাদের ব্যাপারে আমাদের দু'আ কবুল হয়েছে এবং আমাদের ব্যাপারে তাদের দু'আ কবূল হয়নি।”হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর সাহাবীবর্গসহ বসেছিলেন এমতাবস্থায় একজন ইয়াহূদী এসে তাদেরকে সালাম করলো। তারা তার সালামের উত্তর দিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সে কি বললো তা কি তোমরা জান?” তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে তো সালাম করলো।” তিনি বললেনঃ “বরং সে (আরবী) বলেছে। অর্থাৎ ‘তোমাদের ধর্ম মিটে যাক’ বা ‘তোমাদের ধর্মের পরাজয় ঘটুক।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “তাকে ডেকে আনেনা।” তখন সহাবীগণ (রাঃ) তাকে ডেকে আনলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তুমি কি বলেছো?” সে উত্তরে বললোঃ “হ্যাঁ।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবাদেরকে বললেনঃ “যদি আলে কিতাবদের কেউ তোমাদেরকে সালাম দেয় তবে তোমরা বলবেঃ অর্থাৎ ‘তোমার উপরও ওটাই যা তুমি বললে'।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ্ গ্রন্থেও এ হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে অনুরূপ বর্ণিত আছে)ঐ লোকগুলো নিজেদের কৃতকর্মের উপর খুশী হয়ে মনে মনে বলতোঃ যদি ইনি সত্যি আল্লাহর নবী হতেন তবে আমাদের এই চক্রান্তের কারণে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই দুনিয়াতেই আমাদেরকে শাস্তি দিতেন। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তো আমাদের ভিতরের অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তাই আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন যে, তাদের জন্যে পরকালের শাস্তিই যথেষ্ট, যেখানে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। কত নিকৃষ্ট সেই আবাস!হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতের শানে নুযূল হলো ইয়াহূদের এই ভাবে সালাম দেয়ার পদ্ধতি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুনাফিকরা এভাবেই সালাম দিতো। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনদেরকে আদব শিক্ষা দিচ্ছেন। বলছেনঃ হে মুমিনগণ! তোমরা এই মুনাফিক ও ইয়াহূদীদের মত কাজ করো না। তোমরা যখন গোপনে পরামর্শ কর তখন সেই পরামর্শ যেন পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ সম্পর্কে না হয়। তোমরা কল্যাণকর কাজ ও তাকওয়া অবলম্বনের পরামর্শ করবে। তোমাদের সদা-সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে চলা উচিত যার কাছে তোমাদের সকলকেই একত্রিত হতে হবে, যিনি ঐ সময় তোমাদেরকে প্রত্যেক পুণ্য ও পাপের পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান করবেন। আর তোমাদের সমস্ত কাজ-কর্ম ও কথাবর্তা সম্পর্কে তোমাদেরকে তিনি অবহিত করবেন। তোমরা যদিও ভুলে গেছো, কিন্তু তাঁর কাছে সবই রক্ষিত ও বিদ্যমান রয়েছে।হযরত সাফওয়ান (রঃ) বলেনঃ “আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর হাত ধারণ করেছিলাম এমন সময় একটি লোক এসে তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “কিয়ামতের দিন যে আল্লাহ্ তা'আলার সাথে মুমিনদের কানাকানি হবে এ সম্পর্কে আপনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হতে কি শুনেছেন?” হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উমার (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তাআলা মুমিনকে নিজের কাছে ডেকে নিবেন এবং তাকে তার এমনই কাছে করবেন যে, স্বীয় হস্ত তার উপর রেখে দিবেন এবং লোকেদের হতে তাকে পর্দা করবেন। অতঃপর তাঁকে গুনাহসমূহ স্বীকার করিয়ে নিবেন। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমার অমুক অমুক পাপ কর্মের কথা মনে আছে কি?” এভাবে তিনি তাকে প্রশ্ন করতে থাকবেন এবং সে স্বীকার করতে থাকবে। আর সে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চিন্তায় ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে মহান আল্লাহ্ তাকে বলবেনঃ “দেখো, দুনিয়ায় আমি তোমার এসব গুনাহ্ ঢেকে রেখেছিলাম এবং আজ আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।” অতঃপর তাকে তার পুণ্যসমূহের আমলনামা প্রদান করা হবে। কিন্তু কাফির ও মুনাফিকদের ব্যাপারে সাক্ষীগণ ঘোষণা করবেঃ “এরা হলো ঐ সব লোক যারা তাদের প্রতিপালকের উপর মিথ্যা আরোপ করতো, জেনে রেখো যে, অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর লা'নত'।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁদের সহীহ্ গ্রন্থে কাতাদাহ (রঃ)-এর হাদীস হতে এটা তাখরীজ করেছেন)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ শয়তানের প্ররোচনায় হয় এই গোপন পরামর্শ, মুমিনদেরকে দুঃখ দেয়ার জন্যে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত শয়তান বা অন্য কেউ তাদের সমান্যতম ক্ষতি সাধনেও সক্ষম নয়। মুমিনরা যদি এরূপ কোন কার্যকলাপের আভাস পায় তবে তারা যেন (আরবী) পাঠ করে ও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং তাঁরই উপর ভরসা করে। এরূপ করলে ইনশাআল্লাহ্ শয়তান তাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। যে কানাকানির কারণে কোন মুসলমানের মনে কষ্ট হয় এবং সে তা অপছন্দ করে এরূপ কানাকানি হতে হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা তিনজন থাকবে তখন যেন দুইজন একজনকে বাদ দিয়ে কানাকানি না করে, কেননা এতে ঐ তৃতীয় ব্যক্তির মনে কষ্ট হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) আমাশ (রঃ)-এর হাদীস হতে এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন তোমরা তিনজন থাকবে তখন যেন দুইজন তৃতীয় জনের অনুমতি ছাড়া তাকে বাদ দিয়ে কানাকানি করে। কেননা, এতে সে মনে দুঃখ ও ব্যথা পায়।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)

আল-মুজাদালা 58:9

৮-১০ নং আয়াতের তাফসীর: মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল তারা ছিল ইয়াহূদী। মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) বলেন যে, নবী (সঃ) ও ইয়াহুদীদের মাঝে যখন চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয় তখন ইয়াহুদীরা এই কাজ করতে শুরু করে যে, যেখানেই তারা কোন মুসলমানকে দেখতে এবং যেখানেই কোন মুসলমান তাদের কাছে যেতো তখন তারা এদিকে-ওদিকে একত্রিত হয়ে চুপে-চুপে এবং ইশারা-ইঙ্গিতে এমনভাবে কানাকানি করতো যে, যে মুসলমান একাকী তাদের কাছে থাকতো সে ধারণা করতো যে, তারা তাকে হত্যা করারই চক্রান্ত করছে। তার আরো ধারণা হতো যে, তারা তার বিরুদ্ধে এবং অন্যান্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে গোপন সড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছে। সুতরাং সে তাদের কাছে যেতেও ভয় কর তো। যখন সাধারণভাবে এসব অভিযোগ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কানে পৌছতে লাগলো তখন তিনি তাদেরকে এই ঘৃণ্য কাজে বাধা দিলেন এবং চরমভাবে নিষেধ করলেন। কিন্তু এর পরেও তারা আবার এ কাজে লেগে পড়লো।হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন, তিনি (তাঁর দাদা) বলেনঃ “আমরা রাত্রে পালাক্রমে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর খিতমতে হাযির হতাম, উদ্দেশ্য এই যে, রাত্রে তাঁর কোন কাজের প্রয়োজন হলে আমরা তা করে দিবো। একদা রাত্রে যাদের পালা ছিল তারা এসে গেল এবং আরো কিছু লোক সওয়াবের নিয়তে এসে পড়লো। লোক খুব বেশী একত্রিত হওয়ার কারণে আমরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে এদিকে-ওদিকে বসে পড়লাম। প্রত্যেক দল নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করতে লাগলো। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এসে পড়লেন। তিনি বললেনঃ “তোমরা কি গোপন পরামর্শ করছো? আমি কি তোমাদেরকে এর থেকে নিষেধ করিনি?” উত্তরে আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আল্লাহর নিকট তাওবা করছি। আমরা মাসীহ দাজ্জালের আলোচনা করছিলাম। কেননা, তার ব্যাপারে আমাদের মনে খটকা লাগছে। তিনি একথা শুনে বললেনঃ “আমি তোমাদের উপর তার চেয়েও যে বিষয়ে বেশী ভয় করি তার খবর কি তোমাদেরকে দিবো না?” আমরা বললামঃ হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদেরকে আপনি ঐ খবর দিন! তিনি বললেনঃ “তা হলো গোপন শিরক। তা এই ভাবে যে, একটি লোকে দাড়িয়ে গেল এবং লোকদেরকে দেখাবার জন্যে কোন (ইবাদতের) কাজ করলো।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ গারীব এবং এতে কোন কোন বর্ণনাকারী দুর্বল রয়েছেন)এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তারা পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণের জন্যে কানাকানি করে। অর্থাৎ তারা হয়তো পাপের কাজের উপর কানাকানি করে যাতে তাদের নিজেদেরই ক্ষতি হয়, কিংবা হয়তো যুলুমের কাজে কানাকানি করে যাতে তারা অন্যদের ক্ষতি সাধনের ষড়যন্ত্র করে, অথবা তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণের উপর কানাকানি করে এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করতে একে অপরকে পাকিয়ে তোলে।আল্লাহ্ তা'আলা ঐ পাপী ও বদ লোকদের আর একটি জঘন্য আচরণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা সালামের শব্দের পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকে। তারা রাসূল (সঃ)-কে এমন কথা দ্বারা অভিবাদন করে যদদ্বারা আল্লাহ্ তাঁকে অভিবাদন করেননি।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা কয়েকজন ইয়াহূদী রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আবুল কাসেম (সঃ)! তোমার মৃত্যু হোক (তাদের উপর আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হোক!)” তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রতি উত্তরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মৃত্যু হোক।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মন্দ বচন ও কঠোর উক্তিকে অপছন্দ করেন। হযরত আয়েশা (রাঃ)! তখন বলেনঃ “আপনি কি শুনেননি যে, তারা আপনাকে (আরবী) বলেছে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তুমি কি শুননি যে, আমি তাদেরকে (আরবী) বলেছি?” তখন আল্লাহ্ তা'আলা ... (আরবী)আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটিও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ্ এর মধ্যে অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী)এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছিলেনঃ “তাদের ব্যাপারে আমাদের দু'আ কবুল হয়েছে এবং আমাদের ব্যাপারে তাদের দু'আ কবূল হয়নি।”হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর সাহাবীবর্গসহ বসেছিলেন এমতাবস্থায় একজন ইয়াহূদী এসে তাদেরকে সালাম করলো। তারা তার সালামের উত্তর দিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সে কি বললো তা কি তোমরা জান?” তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে তো সালাম করলো।” তিনি বললেনঃ “বরং সে (আরবী) বলেছে। অর্থাৎ ‘তোমাদের ধর্ম মিটে যাক’ বা ‘তোমাদের ধর্মের পরাজয় ঘটুক।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “তাকে ডেকে আনেনা।” তখন সহাবীগণ (রাঃ) তাকে ডেকে আনলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তুমি কি বলেছো?” সে উত্তরে বললোঃ “হ্যাঁ।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবাদেরকে বললেনঃ “যদি আলে কিতাবদের কেউ তোমাদেরকে সালাম দেয় তবে তোমরা বলবেঃ অর্থাৎ ‘তোমার উপরও ওটাই যা তুমি বললে'।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ্ গ্রন্থেও এ হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে অনুরূপ বর্ণিত আছে)ঐ লোকগুলো নিজেদের কৃতকর্মের উপর খুশী হয়ে মনে মনে বলতোঃ যদি ইনি সত্যি আল্লাহর নবী হতেন তবে আমাদের এই চক্রান্তের কারণে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই দুনিয়াতেই আমাদেরকে শাস্তি দিতেন। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তো আমাদের ভিতরের অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তাই আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন যে, তাদের জন্যে পরকালের শাস্তিই যথেষ্ট, যেখানে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। কত নিকৃষ্ট সেই আবাস!হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতের শানে নুযূল হলো ইয়াহূদের এই ভাবে সালাম দেয়ার পদ্ধতি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুনাফিকরা এভাবেই সালাম দিতো। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনদেরকে আদব শিক্ষা দিচ্ছেন। বলছেনঃ হে মুমিনগণ! তোমরা এই মুনাফিক ও ইয়াহূদীদের মত কাজ করো না। তোমরা যখন গোপনে পরামর্শ কর তখন সেই পরামর্শ যেন পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ সম্পর্কে না হয়। তোমরা কল্যাণকর কাজ ও তাকওয়া অবলম্বনের পরামর্শ করবে। তোমাদের সদা-সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে চলা উচিত যার কাছে তোমাদের সকলকেই একত্রিত হতে হবে, যিনি ঐ সময় তোমাদেরকে প্রত্যেক পুণ্য ও পাপের পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান করবেন। আর তোমাদের সমস্ত কাজ-কর্ম ও কথাবর্তা সম্পর্কে তোমাদেরকে তিনি অবহিত করবেন। তোমরা যদিও ভুলে গেছো, কিন্তু তাঁর কাছে সবই রক্ষিত ও বিদ্যমান রয়েছে।হযরত সাফওয়ান (রঃ) বলেনঃ “আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর হাত ধারণ করেছিলাম এমন সময় একটি লোক এসে তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “কিয়ামতের দিন যে আল্লাহ্ তা'আলার সাথে মুমিনদের কানাকানি হবে এ সম্পর্কে আপনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হতে কি শুনেছেন?” হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উমার (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তাআলা মুমিনকে নিজের কাছে ডেকে নিবেন এবং তাকে তার এমনই কাছে করবেন যে, স্বীয় হস্ত তার উপর রেখে দিবেন এবং লোকেদের হতে তাকে পর্দা করবেন। অতঃপর তাঁকে গুনাহসমূহ স্বীকার করিয়ে নিবেন। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমার অমুক অমুক পাপ কর্মের কথা মনে আছে কি?” এভাবে তিনি তাকে প্রশ্ন করতে থাকবেন এবং সে স্বীকার করতে থাকবে। আর সে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চিন্তায় ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে মহান আল্লাহ্ তাকে বলবেনঃ “দেখো, দুনিয়ায় আমি তোমার এসব গুনাহ্ ঢেকে রেখেছিলাম এবং আজ আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।” অতঃপর তাকে তার পুণ্যসমূহের আমলনামা প্রদান করা হবে। কিন্তু কাফির ও মুনাফিকদের ব্যাপারে সাক্ষীগণ ঘোষণা করবেঃ “এরা হলো ঐ সব লোক যারা তাদের প্রতিপালকের উপর মিথ্যা আরোপ করতো, জেনে রেখো যে, অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর লা'নত'।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁদের সহীহ্ গ্রন্থে কাতাদাহ (রঃ)-এর হাদীস হতে এটা তাখরীজ করেছেন)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ শয়তানের প্ররোচনায় হয় এই গোপন পরামর্শ, মুমিনদেরকে দুঃখ দেয়ার জন্যে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত শয়তান বা অন্য কেউ তাদের সমান্যতম ক্ষতি সাধনেও সক্ষম নয়। মুমিনরা যদি এরূপ কোন কার্যকলাপের আভাস পায় তবে তারা যেন (আরবী) পাঠ করে ও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং তাঁরই উপর ভরসা করে। এরূপ করলে ইনশাআল্লাহ্ শয়তান তাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। যে কানাকানির কারণে কোন মুসলমানের মনে কষ্ট হয় এবং সে তা অপছন্দ করে এরূপ কানাকানি হতে হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা তিনজন থাকবে তখন যেন দুইজন একজনকে বাদ দিয়ে কানাকানি না করে, কেননা এতে ঐ তৃতীয় ব্যক্তির মনে কষ্ট হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) আমাশ (রঃ)-এর হাদীস হতে এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন তোমরা তিনজন থাকবে তখন যেন দুইজন তৃতীয় জনের অনুমতি ছাড়া তাকে বাদ দিয়ে কানাকানি করে। কেননা, এতে সে মনে দুঃখ ও ব্যথা পায়।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)

আল-মুজাদালা 58:10

৮-১০ নং আয়াতের তাফসীর: মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল তারা ছিল ইয়াহূদী। মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) বলেন যে, নবী (সঃ) ও ইয়াহুদীদের মাঝে যখন চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয় তখন ইয়াহুদীরা এই কাজ করতে শুরু করে যে, যেখানেই তারা কোন মুসলমানকে দেখতে এবং যেখানেই কোন মুসলমান তাদের কাছে যেতো তখন তারা এদিকে-ওদিকে একত্রিত হয়ে চুপে-চুপে এবং ইশারা-ইঙ্গিতে এমনভাবে কানাকানি করতো যে, যে মুসলমান একাকী তাদের কাছে থাকতো সে ধারণা করতো যে, তারা তাকে হত্যা করারই চক্রান্ত করছে। তার আরো ধারণা হতো যে, তারা তার বিরুদ্ধে এবং অন্যান্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে গোপন সড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছে। সুতরাং সে তাদের কাছে যেতেও ভয় কর তো। যখন সাধারণভাবে এসব অভিযোগ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কানে পৌছতে লাগলো তখন তিনি তাদেরকে এই ঘৃণ্য কাজে বাধা দিলেন এবং চরমভাবে নিষেধ করলেন। কিন্তু এর পরেও তারা আবার এ কাজে লেগে পড়লো।হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন, তিনি (তাঁর দাদা) বলেনঃ “আমরা রাত্রে পালাক্রমে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর খিতমতে হাযির হতাম, উদ্দেশ্য এই যে, রাত্রে তাঁর কোন কাজের প্রয়োজন হলে আমরা তা করে দিবো। একদা রাত্রে যাদের পালা ছিল তারা এসে গেল এবং আরো কিছু লোক সওয়াবের নিয়তে এসে পড়লো। লোক খুব বেশী একত্রিত হওয়ার কারণে আমরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে এদিকে-ওদিকে বসে পড়লাম। প্রত্যেক দল নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করতে লাগলো। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এসে পড়লেন। তিনি বললেনঃ “তোমরা কি গোপন পরামর্শ করছো? আমি কি তোমাদেরকে এর থেকে নিষেধ করিনি?” উত্তরে আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আল্লাহর নিকট তাওবা করছি। আমরা মাসীহ দাজ্জালের আলোচনা করছিলাম। কেননা, তার ব্যাপারে আমাদের মনে খটকা লাগছে। তিনি একথা শুনে বললেনঃ “আমি তোমাদের উপর তার চেয়েও যে বিষয়ে বেশী ভয় করি তার খবর কি তোমাদেরকে দিবো না?” আমরা বললামঃ হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদেরকে আপনি ঐ খবর দিন! তিনি বললেনঃ “তা হলো গোপন শিরক। তা এই ভাবে যে, একটি লোকে দাড়িয়ে গেল এবং লোকদেরকে দেখাবার জন্যে কোন (ইবাদতের) কাজ করলো।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ গারীব এবং এতে কোন কোন বর্ণনাকারী দুর্বল রয়েছেন)এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তারা পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণের জন্যে কানাকানি করে। অর্থাৎ তারা হয়তো পাপের কাজের উপর কানাকানি করে যাতে তাদের নিজেদেরই ক্ষতি হয়, কিংবা হয়তো যুলুমের কাজে কানাকানি করে যাতে তারা অন্যদের ক্ষতি সাধনের ষড়যন্ত্র করে, অথবা তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণের উপর কানাকানি করে এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করতে একে অপরকে পাকিয়ে তোলে।আল্লাহ্ তা'আলা ঐ পাপী ও বদ লোকদের আর একটি জঘন্য আচরণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা সালামের শব্দের পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকে। তারা রাসূল (সঃ)-কে এমন কথা দ্বারা অভিবাদন করে যদদ্বারা আল্লাহ্ তাঁকে অভিবাদন করেননি।হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা কয়েকজন ইয়াহূদী রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আবুল কাসেম (সঃ)! তোমার মৃত্যু হোক (তাদের উপর আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হোক!)” তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রতি উত্তরে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মৃত্যু হোক।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “হে আয়েশা (রাঃ)! নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মন্দ বচন ও কঠোর উক্তিকে অপছন্দ করেন। হযরত আয়েশা (রাঃ)! তখন বলেনঃ “আপনি কি শুনেননি যে, তারা আপনাকে (আরবী) বলেছে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তুমি কি শুননি যে, আমি তাদেরকে (আরবী) বলেছি?” তখন আল্লাহ্ তা'আলা ... (আরবী)আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটিও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সহীহ্ এর মধ্যে অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী)এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছিলেনঃ “তাদের ব্যাপারে আমাদের দু'আ কবুল হয়েছে এবং আমাদের ব্যাপারে তাদের দু'আ কবূল হয়নি।”হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর সাহাবীবর্গসহ বসেছিলেন এমতাবস্থায় একজন ইয়াহূদী এসে তাদেরকে সালাম করলো। তারা তার সালামের উত্তর দিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “সে কি বললো তা কি তোমরা জান?” তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সে তো সালাম করলো।” তিনি বললেনঃ “বরং সে (আরবী) বলেছে। অর্থাৎ ‘তোমাদের ধর্ম মিটে যাক’ বা ‘তোমাদের ধর্মের পরাজয় ঘটুক।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “তাকে ডেকে আনেনা।” তখন সহাবীগণ (রাঃ) তাকে ডেকে আনলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তুমি কি বলেছো?” সে উত্তরে বললোঃ “হ্যাঁ।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবাদেরকে বললেনঃ “যদি আলে কিতাবদের কেউ তোমাদেরকে সালাম দেয় তবে তোমরা বলবেঃ অর্থাৎ ‘তোমার উপরও ওটাই যা তুমি বললে'।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ্ গ্রন্থেও এ হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে অনুরূপ বর্ণিত আছে)ঐ লোকগুলো নিজেদের কৃতকর্মের উপর খুশী হয়ে মনে মনে বলতোঃ যদি ইনি সত্যি আল্লাহর নবী হতেন তবে আমাদের এই চক্রান্তের কারণে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই দুনিয়াতেই আমাদেরকে শাস্তি দিতেন। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তো আমাদের ভিতরের অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তাই আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন যে, তাদের জন্যে পরকালের শাস্তিই যথেষ্ট, যেখানে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। কত নিকৃষ্ট সেই আবাস!হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াতের শানে নুযূল হলো ইয়াহূদের এই ভাবে সালাম দেয়ার পদ্ধতি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুনাফিকরা এভাবেই সালাম দিতো। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনদেরকে আদব শিক্ষা দিচ্ছেন। বলছেনঃ হে মুমিনগণ! তোমরা এই মুনাফিক ও ইয়াহূদীদের মত কাজ করো না। তোমরা যখন গোপনে পরামর্শ কর তখন সেই পরামর্শ যেন পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ সম্পর্কে না হয়। তোমরা কল্যাণকর কাজ ও তাকওয়া অবলম্বনের পরামর্শ করবে। তোমাদের সদা-সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে চলা উচিত যার কাছে তোমাদের সকলকেই একত্রিত হতে হবে, যিনি ঐ সময় তোমাদেরকে প্রত্যেক পুণ্য ও পাপের পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান করবেন। আর তোমাদের সমস্ত কাজ-কর্ম ও কথাবর্তা সম্পর্কে তোমাদেরকে তিনি অবহিত করবেন। তোমরা যদিও ভুলে গেছো, কিন্তু তাঁর কাছে সবই রক্ষিত ও বিদ্যমান রয়েছে।হযরত সাফওয়ান (রঃ) বলেনঃ “আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর হাত ধারণ করেছিলাম এমন সময় একটি লোক এসে তাকে জিজ্ঞেস করলোঃ “কিয়ামতের দিন যে আল্লাহ্ তা'আলার সাথে মুমিনদের কানাকানি হবে এ সম্পর্কে আপনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হতে কি শুনেছেন?” হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উমার (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তাআলা মুমিনকে নিজের কাছে ডেকে নিবেন এবং তাকে তার এমনই কাছে করবেন যে, স্বীয় হস্ত তার উপর রেখে দিবেন এবং লোকেদের হতে তাকে পর্দা করবেন। অতঃপর তাঁকে গুনাহসমূহ স্বীকার করিয়ে নিবেন। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করবেনঃ “তোমার অমুক অমুক পাপ কর্মের কথা মনে আছে কি?” এভাবে তিনি তাকে প্রশ্ন করতে থাকবেন এবং সে স্বীকার করতে থাকবে। আর সে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চিন্তায় ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে মহান আল্লাহ্ তাকে বলবেনঃ “দেখো, দুনিয়ায় আমি তোমার এসব গুনাহ্ ঢেকে রেখেছিলাম এবং আজ আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।” অতঃপর তাকে তার পুণ্যসমূহের আমলনামা প্রদান করা হবে। কিন্তু কাফির ও মুনাফিকদের ব্যাপারে সাক্ষীগণ ঘোষণা করবেঃ “এরা হলো ঐ সব লোক যারা তাদের প্রতিপালকের উপর মিথ্যা আরোপ করতো, জেনে রেখো যে, অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর লা'নত'।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাঁদের সহীহ্ গ্রন্থে কাতাদাহ (রঃ)-এর হাদীস হতে এটা তাখরীজ করেছেন)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ শয়তানের প্ররোচনায় হয় এই গোপন পরামর্শ, মুমিনদেরকে দুঃখ দেয়ার জন্যে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত শয়তান বা অন্য কেউ তাদের সমান্যতম ক্ষতি সাধনেও সক্ষম নয়। মুমিনরা যদি এরূপ কোন কার্যকলাপের আভাস পায় তবে তারা যেন (আরবী) পাঠ করে ও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং তাঁরই উপর ভরসা করে। এরূপ করলে ইনশাআল্লাহ্ শয়তান তাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। যে কানাকানির কারণে কোন মুসলমানের মনে কষ্ট হয় এবং সে তা অপছন্দ করে এরূপ কানাকানি হতে হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা তিনজন থাকবে তখন যেন দুইজন একজনকে বাদ দিয়ে কানাকানি না করে, কেননা এতে ঐ তৃতীয় ব্যক্তির মনে কষ্ট হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) আমাশ (রঃ)-এর হাদীস হতে এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন তোমরা তিনজন থাকবে তখন যেন দুইজন তৃতীয় জনের অনুমতি ছাড়া তাকে বাদ দিয়ে কানাকানি করে। কেননা, এতে সে মনে দুঃখ ও ব্যথা পায়।” (এ হাদীসটি আবদুর রাযযাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)

আল-মুজাদালা 58:11

এখানে আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনদেরকে মজলিসে বসার আদব বা ভদ্রতা শিক্ষা দিতে গিয়ে এবং একে অপরের প্রতি অনুগ্রহ করার নির্দেশ দিতে গিয়ে বলেনঃ যখন তোমরা কোন মজলিসে একত্রিত হবে এবং তোমরা বসে যাওয়ার পর কেউ এসে পড়বে তখন তার বসার জায়গা করে দেয়ার উদ্দেশ্যে তোমরা একটু একটু করে সরে সরে বসবে এবং এই ভাবে জায়গা কিছুটা প্রশস্ত করে দিবে। এর বিনিময়ে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের জন্যে স্থান প্রশস্ত করে দিবেন। কেননা প্রত্যেক আমলের বিনিময় ঐরূপই হয়ে থাকে। যেমন সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্যে মসজিদ বানিয়ে দিবে, আল্লাহ্ তাঁর জন্যে জান্নাতে ঘর বানিয়ে দিবেন।” অন্য হাদীসে রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি কোন লোকের কাঠিন্য সহজ করবে, আল্লাহ্ দুনিয়া ও আখিরাতে তার (বিপদ-আপদের) কাঠিন্য সহজ করে দিবেন। আল্লাহ তাঁর বান্দাকে সাহায্য করতে থাকেন যে পর্যন্ত বান্দা তার (মুসলমান) ভাইকে সাহায্য করতে থাকে। এই ধরনের আরো বহু হাদীস রয়েছে।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি যিকরের মজলিসের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। যেমন, ওয়া হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কিছু উপদেশ বাণী প্রদান করছেন এবং জনগণ বসে শুনছেন। এমন সময় কেউ একজন এসে পড়লেন। কিন্তু কেউই নিজ জায়গা হতে একটু সরছেন না যে ঐ লোকটি বসতে পারেন। তখন আল্লাহ্ পাক আয়াত নাযিল করে নির্দেশ দিলেনঃ তোমরা একটু একটু করে সরে গিয়ে স্থান প্রশস্ত করে দাও, যাতে পরে আগমনকারীর বসার জায়গা হয়েযায়।হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, জুমআর দিন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ঐ দিন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) একটি সংকীর্ণ জায়গায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। জায়গা কম ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যেসব মুহাজির ও আনসার বদরের যুদ্ধে তাঁর সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদেরকে তিনি অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখতেন। ঐ দিন ঘটনাক্রমে কয়েকজন বদরী সাহাবী (রাঃ) কিছু বিলম্বে আগমন করেন। তারা এসে নবী (সঃ)-এর নিকট দাঁড়িয়ে যান। তাঁকে তাঁরা সালাম করেন এবং তিনিও উত্তর দেন। মজলিসের লোকদেরকেও তারা সালাম জানান এবং তারাও জবাব দেন। অতঃপর ঐ বদরী সহাবীগণ (রাঃ) এই আশায় দাঁড়িয়ে থাকেন যে, মজলিসে তাদের জন্যে একটু জায়গা করে দিলে তারা বসে পড়বেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের এ অবস্থা লক্ষ্য করে আর থামতে পারলেন না, নাম ধরে ধরে তিনি কতক লোককে দাঁড়াতে বললেন এবং ঐ উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন সহাবীদেরকে ঐ সব জায়গায় বসার নির্দেশ দিলেন। এতে যাদেরকে উঠিয়ে দেয়া হলো তাঁরা মনে কিছু ব্যথা পেলেন এবং তাঁদের কাছে এটা কিছু কঠিন ঠেকলো। মুনাফিকরা এটাকে একটা সুযোগে হিসেবে গ্রহণ করলো। তারা বলতে শুরু করলোঃ “দেখো, তিনি ন্যায় বিচার করার দাবীদার, অথচ যারা তাঁর উপদেশবাণী শুনবার আগ্রহে পূর্বেই এসে তার পার্শ্বে জায়গা নিয়েছিল তাদেরকে তিনি উঠিয়ে দিয়ে তাদের জায়গায় বসিয়ে দিলেন এমন লোকেদেরকে, যারা পরে এসেছে। এর চেয়ে অবিচার মূলক আচরণ আর কি হতে পারে?” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহ্ ঐ ব্যক্তির উপর দয়া করুন যে তাঁর ভাইয়ের জন্যে মজলিসে জায়গা করে দেয়।” তাঁর এ প্রার্থনা শোন মাত্রই সাহাবীগণ তাড়াতাড়ি খুশীমনে নিজ নিজ জায়গা হতে সরতে লাগলেন এবং তাঁদের ভাইয়ের জন্যে জায়গা করে দিলেন। অতঃপর জুমআর দিন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “কোন মানুষ যেন কোন মানুষকে উঠিয়ে দিয়ে তার জায়গার না বসে, বরং তোমরা মজলিসে স্থান প্রশস্ত করে দাও।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) নাফে' (রঃ) হতে এটা সহীহাইনে তাখরীজ করেছেন)হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জুমআর দিন তোমাদের কেউ যেন তার ভাইকে তার জায়গা হতে উঠিয়ে না দেয়, বরং যেন বলে জায়গা করে দাও।” (এ হাদীসটি ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)কোন আগন্তুকের জন্যে দাঁড়ানো জায়েয কি-না এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ এতে অনুমতি দেন না এবং দলীল হিসেবে নিম্নের হাদীসটি পেশ করে থাকেনঃ “যে ব্যক্তি চায় যে, লোকেরা তার সামনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকুক, সে যেন জাহান্নামে তাঁর স্থান বানিয়ে নেয়।”কেউ কেউ আবার এর ব্যাখ্যা করে বলেন যে, কেউ সফর হতে আসলে তার জন্যে এবং কোন হাকিমের জন্যে তাঁর হুকুমতের জায়গায় দাঁড়ানো জায়েয। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সাহাবীদেরকে (রাঃ) বলেছিলেনঃ “তোমরা তোমাদের নেতার জন্যে দাঁড়িয়ে যাও।” এটা তাঁর তা'যীমের জন্যে ছিল না, বরং তার ফায়সালা জারী করিয়ে দেয়াই উদ্দেশ্য ছিল। এসব ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। হ্যাঁ, তবে এটাকে অভ্যাস করে নেয়া যে, মজলিসে যখনই কোন বড়লোকে এবং মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি আসবে তার জন্যেই মানুষ উঠে দাঁড়াবে, এটা আজমীদের রীতি-নীতি। সুনানের হাদীসে রয়েছে যে, সাহাবীদের (রঃ) নিকট আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর চেয়ে অধিক প্রিয় ও সম্মানিত আর কোন লোকই ছিলেন না। তথাপি তাঁকে দেখে তারা দাঁড়াতেন না। কারণ তাঁরা জানতেন যে, তিনি এটা পছন্দ করেন না। সুনানের অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এসেই মজলিসের শেষ প্রান্তে বসে পড়তেন এবং যেখানেই তিনি বসতেন সেটাই হয়ে যেতো সভাপতির স্থান। আর সাহাবীগণ নিজ নিজ মর্যাদা অনুযায়ী বসে যেতেন। প্রায়ই হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর ডান দিকে বসতেন এবং হযরত উমার (রাঃ) বাম দিকে বসতেন। সাধারণতঃ হযরত উসমান (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) তাঁর সামনের দিকে বসতেন। কেননা, তাঁরা দু’জন ছিলেন অহীর লেখক। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে যা বলতেন তাঁরা তা লিখে নিতেন।সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী ও বিবেকবান ব্যক্তি তারা যেন আমার কাছাকাছি বসে। তারপর যেন মর্যাদা অনুযায়ী সবাই ক্রমান্বয়ে বসতে থাকে।” এই ব্যবস্থা রাখার কারণ ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যা কিছু বলেন তা যেন এই জ্ঞানী লোকেরা ভালভাবে শুনেন ও বুঝেন। সুফফা যুক্ত মজলিসের বর্ণনা কিছু পূর্বেই গত হলো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) অন্যান্য লোকদেরকে সরিয়ে দিয়ে তাঁদের স্থানে বদরী সহাবীদেরকে বসিয়ে দেন। যদিও এর সাথে অন্য কারণও ছিল। যেমন ঐ লোকদের নিজেদেরই উচিত ছিল ঐ মর্যাদাবান সহাবীদের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং নিজেরা সরে গিয়ে তাদের জায়গা করে দেয়া। কিন্তু যখন তাঁরা নিজেরা তা করলেন না তখন হুকুমের মাধ্যমে তাদের দ্বারা তা করিয়ে নেয়া হলো। অনুরূপভাবে প্রথমে যারা এসেছিলেন তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বহু কথা ও উপদেশ বাণী শুনেছেন। তারপর এই মর্যাদা সম্পন্ন লোকগণ আসলেন। তখন তিনি চাইলেন যে, তাঁরাও যেন আরামের সাথে বসে গিয়ে তাঁর উপদেশপূর্ণ কথা শোনর সুযোগে গ্রহণ করতে পারেন। এভাবে এই উম্মতকে এই শিক্ষা দেয়াও উদ্দেশ্য ছিল যে, তারা যেন তাদের বড়দেরকে ইমামের পার্শ্বে বসার সুযোগে দেন এবং তাদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দান করেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নামাযের সফ বা সারি ঠিক করার সময় নিজেই আমাদের কাঁধ ধরে ধরে ঠিক করতেন এবং মুখেও বলতেনঃ ‘সোজাভাবে দাঁড়াও, বক্রভাবে দাঁড় হয়ো না। জ্ঞানী ও বিবেকবানরা আমার নিকটবর্তী হয়ে দাঁড়াবে। তারপর মর্যাদা অনুপাতে ক্রমান্বয়ে দাঁড়াবে।” এই হাদীসটি বর্ণনা করার পর হযরত আবু মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “বড়ই দুঃখের বিষয় যে, এই হুকুম সত্ত্বেও তোমরা এখনো লাইন বা সারিকে বক্রই করছো!” (ইমাম আহমাদ (রঃ) এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিম, সুনানে আবি দাউদ, সুনানে নাসাঈ ও সুনানে ইবনে মাজাহুতেও এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে) এটা স্পষ্টভাবে প্রকাশমান যে, নামাযের জন্যে যখন এই হুকুম ছিল তখন নামায ছাড়া অন্য সময়ে তো এই হুকুমের গুরুত্ব আরো বেশী থাকার কথা। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা লাইনগুলো ঠিক রেখো, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রেখো, সারিগুলোর মাঝে জায়গা ফাঁকা রেখো না, লাইনে নিজের (মুসল্লী) ভাইদের কাছে কোমল হয়ে যাও, সারিতে শয়তানের জন্যে ছিদ্র ছেড়ে রেখো না। যে ব্যক্তি লাইন বা সারি মিলিয়ে রাখে তাকে আল্লাহ্ মিলিয়ে রাখেন এবং যে ব্যক্তি লাইন কেটে দেয়, আল্লাহও তাকে কেটে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এজন্যেই সায়্যিদুল কুররা (কারীদের নেতা) হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) যখন নামাযে আসতেন তখন তিনি প্রথম সারিতে বা কাতারে যেতেন এবং সেখান হতে দুর্বল জ্ঞান বিশিষ্ট ব্যক্তিকে পিছনে সরিয়ে দিতেন এবং নিজে তার স্থানে দাঁড়িয়ে যেতেন। আর ঐ হাদীসটিকেই তিনি দলীল হিসেবে গ্রহণ করতেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “জ্ঞানী ও বিবেকবান ব্যক্তি আমার নিকটবর্তী হয়ে দাঁড়াবে এবং তারপর ক্রমান্বয়ে জ্ঞান অনুপাতে দাঁড়াবে।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-কে দেখে কেউ উঠে দাঁড়ালে তিনি তার জায়গায় বসতেন না এবং ঐ হাদীসটি পেশ করতেন যা উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, কেউ যেন কাউকেও উঠিয়ে দিয়ে তার জায়গায় না বসে।এখানে নমুনা হিসেবে আমরা কতকগুলো মাসআলা এবং অল্প সংখ্যক হাদীস লিখে সামনে অগ্রসর হচ্ছি। বিস্তারিত ব্যাখ্যার জায়গা এখানে নেই এবং সেই সুযোগেও নেই।সহীহ্ হাদীসে রয়েছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বসেছিলেন, এমন সময় তিনজন লোক আসলো। একজন তো মজলিসের মাঝে শূন্য জায়গা দেখে সেখানে বসে পড়লো এবং দ্বিতীয়জন মজলিসের শেষ প্রান্তে স্থান নিলো। আর তৃতীয়জন ফিরে চলে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আমি কি তোমাদেরকে তিন ব্যক্তির খবর দিবো না? এক ব্যক্তি তো আল্লাহর দিকে স্থান নিলো এবং আল্লাহ্ তাকে স্থান দিলেন। দ্বিতীয়জন আল্লাহ্ হতে লজ্জা করলো এবং আল্লাহও তার হতে লজ্জা করলেন। আর তৃতীয়জন মুখ ফিরিয়ে নিলো এবং আল্লাহও তার হতে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “কারো জন্যে বৈধ নয় যে, সে দুইজনের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে। হ্যাঁ, তবে যদি তাদের দু'জনের অনুমতিক্রমে হয় তাহলে সেটা স্বতন্ত্র কথা।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবূ দাঊদ (রঃ) এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান বলেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, মজলিসে স্থান প্রশস্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে জিহাদের ব্যাপারে। অনুরূপভাবে উঠে দাঁড়ানোর নির্দেশও জিহাদের ব্যাপারেই দেয়া হয়েছে।হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ যখন তোমাদেরকে কল্যাণ ও ভাল কাজের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তোমরা তৎক্ষণাৎ সাড়া দিয়ে।হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছেঃ যখন তোমাদেরকে নামাযের জন্যে ডাক দেয়া হয় তখন তোমরা উঠে দাঁড়িয়ে যাবে। হযরত আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, সাহাবায়ে কিরাম যখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট আসতেন তখন প্রত্যেকেই চাইতেন যে, তিনিই সব শেষে যাবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কোন প্রয়োজন থাকলে তিনি খুবই অস্বস্তি বোধ করতেন। কিন্তু মানবতার খাতিরে তিনি কিছুই বলতেন না। তখন নির্দেশ দেয়া হয় যে, যখন ফিরে যেতে বলা হয় তখন যেন তারা ফিরে যায়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তোমাদেরকে বলা হয়ঃ তোমরা ফিরে যাও, তবে তোমরা ফিরে যাবে।” (২৪:২৮)এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ যখন তোমাদেরকে মজলিসে জায়গা করে দেয়ার কথা বলা হয় তখন জায়গা দেয়ায় এবং যখন উঠে যাওয়ার কথা বলা হয় তখন উঠে যাওয়ায় তোমরা নিজেদের জন্যে মানহানিকর মনে করো না, বরং এর মাধ্যমে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তোমাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন। তোমাদের এ পুণ্যময় কাজ তিনি বিনষ্ট করবেন না। বরং এর বিনিময়ে তিনি তোমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম পুরস্কার প্রদান করবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর আহকামের উপর বিনয়ের সাথে স্বীয় গর্দান ঝুঁকিয়ে দেয়, তিনি তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। ঈমানদার ও সঠিক জ্ঞানের অধিকারীদের অভ্যাস এটাই যে, তারা আল্লাহর হুকুমের সামনে তাদের গর্দান ঝুঁকিয়ে থাকে এবং এভাবে তারা উচ্চ মর্যাদা লাভের হকদার হয়ে যায়। মর্যাদার হকদার কারা এবং কারা এর হকদার নয় এ সম্পর্কে আল্লাহ্ সবিশেষ অবহিত।হযরত আবূ তুফায়েল আমির ইবনে ওয়ায়েলাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আসফান নামক স্থানে হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর সঙ্গে হযরত নাফে ইবনে হারিস (রাঃ)-এর সাক্ষাৎ হয়। হযরত উমার (রাঃ) তাঁকে মক্কা শরীফের আমেল নিযুক্ত করেছিলেন। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “মক্কায় কাকে তুমি তোমার স্থলাভিষিক্ত করে এসেছো?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ইবনে ইবষী (রাঃ)-কে আমি আমার স্থলাভিষিক্ত করে এসেছি।” তখন হযরত উমার (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “সে তো আমার আযাদকৃত গোলাম! সুতরাং কি করে তাকে মক্কাবাসীর উপর আমীর নিযুক্ত করে আসলে?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! তিনি আল্লাহর কিতাবের পাঠক, ফারায়েযের আলেম এবং একজন ভাল বক্তা।” এ কথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তুমি সত্য বলেছো। নবী (সঃ) বলেছেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ এই কিতাবের কারণে এক কওমকে সম্মানিত ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী করবেন এবং অন্যদেরকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করবেন এবং তাদের মর্যাদা কমিয়ে দিবেন।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আলেমদের যে ফযীলতের কথা এই আয়াতে এবং অন্যান্য আয়াত ও হাদীসসমূহে প্রকাশিত হয়েছে, এ সবগুলো আমি সহীহ্ বুখারীর কিতাবুল ইলমের শারায়ূতে জমা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর এবং তাঁরই নিকট আমি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

আল-মুজাদালা 58:12

১২-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যখন তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে চুপি-চুপি কথা বলতে চাইবে তখন যেন কথা বলার পূর্বে তাঁর পথে সাদকা প্রদান করে, যাতে তাদের অন্তর পবিত্র হয় এবং তোমরা তাঁর নবী (সঃ)-এর সাথে পরামর্শ করার যোগ্য হতে পার। হ্যাঁ, তবে যদি কেউ দরিদ্র হয় তাহলে তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার দয়া ও ক্ষমা রয়েছে। অর্থাৎ তার উপর এ হুকুম প্রযোজ্য নয়। এ হুকুম শুধুমাত্র ধনীদের উপর প্রযোজ্য।এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ তোমরা কি চুপে-চুপে কথা বলার পূর্বে সাদকা প্রদানকে কষ্টকর মনে কর এবং ভয় কর যে, এই নির্দেশ কত দিনের জন্যে রয়েছে? যাক, তোমরা যদি এই সাদকা প্রদানকে কষ্টকর ও অসুবিধাজনক মনে করে থাকো তবে তোমাদেরকে এজন্যে কোন চিন্তা করতে হবে না। আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। এখন আর তোমাদেরকে এ জন্যে সাদকা প্রদান করতে হবে না। এখন তোমরা নামায সুপ্রতিষ্ঠিত কর, যাকাত দিতে থাকো এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য কর। কথিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে গোপন পরামর্শ করার পূর্বে সাদকা প্রদান করার গৌরব শুধুমাত্র হযরত আলী (রাঃ)-ই লাভ করেন। তারপর এ হুকুম উঠে যায়। এক দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) সাদকা করে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে চুপি-চুপি কথা বলেন। তিনি তাঁকে দশটি মাসআলা জিজ্ঞেস করেন। অতঃপর এ হুকুম রহিত হয়ে যায়। হযরত আলী (রাঃ) হতেও এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ “এই আয়াতের উপর না কেউ আমার পূর্বে আমল করেছে না পরে কেউ আমল করতে পেরেছে। আমার কাছে একটি মাত্র দীনার ছিল। আমি ওটাকে ভাঙ্গিয়ে দশ দিরহাম পাই। এ দিরহাম আমি আল্লাহর নামে কোন একজন মিসকীনকে দান করি। তারপর আমি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে তাঁর সাথে চুপে-চুপে কথা বলি। তারপর এ হুকুম উঠে যায়। সুতরাং আমার পূর্বেও কেউ এ আয়াতের উপর আমল করেনি এবং পরেও কেউ আমল করতে পারেনি।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “সাদকার পরিমাণ কি এক দীনার নির্ধারণ করা উচিত?” হযরত আলী (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যাবে।” তিনি বললেনঃ “তাহলে অর্ধ দীনার?” তিনি জবাব দেনঃ “প্রত্যেকের এটাও আদায় করার ক্ষমতা নেই।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, তাহলে কত নির্ধারণ করতে হবে তুমিই বল?” তিনি বললেনঃ “এক যব বরাবর সোনা নির্ধারণ করা হোক।” তার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) খুশী হয়ে বললেনঃ “বাঃ বাঃ! তুমি তো একজন সাধক ব্যক্তি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “সুতরাং আমারই কারণে আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতের উপর (কাজ) সহজ ও হালকা করে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামে তিরমিযীতেও এটা বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মুসলমানরা বরাবরই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে চুপি-চুপি কথা বলার পূর্বে সাদকা করতো। কিন্তু যাকাত ফরয হওয়ার পর এ হুকুম উঠে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে খুব বেশী বেশী প্রশ্ন করতে শুরু করেন, ফলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর উপর তা কঠিন বোধ হয়। তখন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা পুনরায় এ হুকুম জারী করেন। ফলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর উপর হালকা হয়ে যায়। কেননা, এরপর জনগণ প্রশ্ন করা ছেড়ে দেয়। অতঃপর পুনরায় আল্লাহ্ তা'আলা মুসলমানদের উপর প্রশস্ততা আনয়ন করেন এবং এ হুকুম রহিত করে দেন। হযরত ইকরামা (রাঃ) ও হযরত হাসান বসরীরও (রঃ) উক্তি এটাই যে, এ হুকুম রহিত হয়ে যায়। হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) ও হযরত মুকাতিলও (রঃ) এ কথাই বলেন। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, শুধু দিনের কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত এ হুকুম বাকী থাকে। হযরত আলীও (রাঃ) এ কথাই বলেন যে, এই হুকুমের উপর শুধু আমিই আমল করতে সক্ষম হই এবং এ হুকুম নাযিল হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের জন্যেই এটা বাকী থাকে, অতঃপর এটা মানসূখ হয়ে যায়।

আল-মুজাদালা 58:13

১২-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যখন তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে চুপি-চুপি কথা বলতে চাইবে তখন যেন কথা বলার পূর্বে তাঁর পথে সাদকা প্রদান করে, যাতে তাদের অন্তর পবিত্র হয় এবং তোমরা তাঁর নবী (সঃ)-এর সাথে পরামর্শ করার যোগ্য হতে পার। হ্যাঁ, তবে যদি কেউ দরিদ্র হয় তাহলে তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার দয়া ও ক্ষমা রয়েছে। অর্থাৎ তার উপর এ হুকুম প্রযোজ্য নয়। এ হুকুম শুধুমাত্র ধনীদের উপর প্রযোজ্য।এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ তোমরা কি চুপে-চুপে কথা বলার পূর্বে সাদকা প্রদানকে কষ্টকর মনে কর এবং ভয় কর যে, এই নির্দেশ কত দিনের জন্যে রয়েছে? যাক, তোমরা যদি এই সাদকা প্রদানকে কষ্টকর ও অসুবিধাজনক মনে করে থাকো তবে তোমাদেরকে এজন্যে কোন চিন্তা করতে হবে না। আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। এখন আর তোমাদেরকে এ জন্যে সাদকা প্রদান করতে হবে না। এখন তোমরা নামায সুপ্রতিষ্ঠিত কর, যাকাত দিতে থাকো এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য কর। কথিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে গোপন পরামর্শ করার পূর্বে সাদকা প্রদান করার গৌরব শুধুমাত্র হযরত আলী (রাঃ)-ই লাভ করেন। তারপর এ হুকুম উঠে যায়। এক দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) সাদকা করে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে চুপি-চুপি কথা বলেন। তিনি তাঁকে দশটি মাসআলা জিজ্ঞেস করেন। অতঃপর এ হুকুম রহিত হয়ে যায়। হযরত আলী (রাঃ) হতেও এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ “এই আয়াতের উপর না কেউ আমার পূর্বে আমল করেছে না পরে কেউ আমল করতে পেরেছে। আমার কাছে একটি মাত্র দীনার ছিল। আমি ওটাকে ভাঙ্গিয়ে দশ দিরহাম পাই। এ দিরহাম আমি আল্লাহর নামে কোন একজন মিসকীনকে দান করি। তারপর আমি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে তাঁর সাথে চুপে-চুপে কথা বলি। তারপর এ হুকুম উঠে যায়। সুতরাং আমার পূর্বেও কেউ এ আয়াতের উপর আমল করেনি এবং পরেও কেউ আমল করতে পারেনি।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “সাদকার পরিমাণ কি এক দীনার নির্ধারণ করা উচিত?” হযরত আলী (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যাবে।” তিনি বললেনঃ “তাহলে অর্ধ দীনার?” তিনি জবাব দেনঃ “প্রত্যেকের এটাও আদায় করার ক্ষমতা নেই।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, তাহলে কত নির্ধারণ করতে হবে তুমিই বল?” তিনি বললেনঃ “এক যব বরাবর সোনা নির্ধারণ করা হোক।” তার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) খুশী হয়ে বললেনঃ “বাঃ বাঃ! তুমি তো একজন সাধক ব্যক্তি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “সুতরাং আমারই কারণে আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতের উপর (কাজ) সহজ ও হালকা করে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামে তিরমিযীতেও এটা বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মুসলমানরা বরাবরই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে চুপি-চুপি কথা বলার পূর্বে সাদকা করতো। কিন্তু যাকাত ফরয হওয়ার পর এ হুকুম উঠে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে খুব বেশী বেশী প্রশ্ন করতে শুরু করেন, ফলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর উপর তা কঠিন বোধ হয়। তখন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা পুনরায় এ হুকুম জারী করেন। ফলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর উপর হালকা হয়ে যায়। কেননা, এরপর জনগণ প্রশ্ন করা ছেড়ে দেয়। অতঃপর পুনরায় আল্লাহ্ তা'আলা মুসলমানদের উপর প্রশস্ততা আনয়ন করেন এবং এ হুকুম রহিত করে দেন। হযরত ইকরামা (রাঃ) ও হযরত হাসান বসরীরও (রঃ) উক্তি এটাই যে, এ হুকুম রহিত হয়ে যায়। হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) ও হযরত মুকাতিলও (রঃ) এ কথাই বলেন। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, শুধু দিনের কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত এ হুকুম বাকী থাকে। হযরত আলীও (রাঃ) এ কথাই বলেন যে, এই হুকুমের উপর শুধু আমিই আমল করতে সক্ষম হই এবং এ হুকুম নাযিল হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের জন্যেই এটা বাকী থাকে, অতঃপর এটা মানসূখ হয়ে যায়।

আল-মুজাদালা 58:14

১৪-১৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকদের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা অন্তরে ইয়াহুদীদের প্রতি ভালবাসা পোষণ করে, কিন্তু প্রকৃত তারা এ ইয়াহদীদেরও দলভুক্ত নয় এবং মুমিনদেরও দলভুক্ত নয়। তারা এদিকেরও নয়, ওদিকেরও নয়। তারা প্রকাশ্যভাবে মিথ্যা শপথ করে থাকে। মুমিনদের কাছে এসে তারা তাদের পক্ষেই কথা বলে। রাসূল (সঃ)-এর কাছে এসে কসম খেয়ে তারা নিজেদেরকে ঈমানদার হিসেবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে এবং বলে যে, তারা নিশ্চিতরূপে মুসলমান। অথচ অন্তরে তারা সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করে। তারা যে মিথ্যাবাদী এটা জেনে শুনেও মিথ্যা শপথ করতে মোটেই দ্বিধা বোধ করে না। তাদের এই দুস্কার্যের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন কঠিন শাস্তি। এই প্রতারণার জন্যে তাদেরকে মন্দ প্রতিদান দেয়া হবে। তারা তো তাদের শপথগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং মানুষকে তারা আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে। মুখে তারা ঈমান প্রকাশ করে এবং অন্তরে কুফরী গোপন রাখে। কসমের মাধ্যমে তারা নিজেদের ভিতরের দুস্কৃতিকে গোপন করে। অভিজ্ঞ লোকদের উপর তারা কসমের দ্বারা নিজেদেরকে সত্যবাদী রূপে পেশ করে এবং তাদেরকে তাদের প্রশংসাকারী বানিয়ে নেয়। ধীরে ধীরে তারা তাদেরকে নিজেদের রঙে রঞ্জিত করে এবং এই ভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথ হতে ফিরিয়ে রাখে। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেন যে, এই মুনাফিকদের জন্যে রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহর শাস্তির মুকাবিলায় তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদের কোনই কাজে আসবে না, তারা জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, কখনই তাদেরকে সেখান হতে বের করা হবে না। কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তাদের সকলকেই এক ময়দানে একত্রিত করবেন, কাউকেও বাদ রাখবেন না তখন দুনিয়ায় যেমন তাদের অভ্যাস ছিল যে, নিজেদের মিথ্যা কথাকে তারা শপথ করে সত্যরূপে দেখাতো, অনুরূপভাবে ঐ দিনও তারা আল্লাহর সামনে নিজেদের হিদায়াত ও সঠিক পথের অনুসারী হওয়ার উপর বড় বড় কসম খাবে এবং মনে করবে যে, সেখানেও বুঝি তাদের চালাকী ধরা পড়বে না। কিন্তু মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর কাছে কি তাদের এই ফাকিবাজি ধরা না পড়ে থাকতে পারে? তিনি তো তাদের মিথ্যাবাদী হওয়ার কথা এ দুনিয়াতেও মুমিনদের নিকট বর্ণনা করে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ সাবধান! তারাই তো মিথ্যাবাদী।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (একদা) নবী (সঃ) তাঁর কোন এক কক্ষের ছায়ায় বসেছিলেন এবং কিছু সাহাবায়ে কিরামও (রাঃ) তাঁর নিকট ছিলেন। ছায়াযুক্ত স্থান কম ছিল। কষ্ট করে তারা সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখো, এখানে এখনই এমন একজন লোক আসবে যে শয়তানী দৃষ্টিতে তাকাবে। সে আসলে তোমরা কেউই তার সাথে কথা বলবে না।” অল্পক্ষণের মধ্যেই একজন কয়বা চক্ষু বিশিষ্ট লোক আসলো। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেনঃ “তুমি এবং অমুক অমুক লোক আমাকে গালি দাও কেন?” একথা শুনেই লোকটি চলে গেল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যে কয়েকজনের নাম করেছিলেন তাদের সবাইকে সে ডেকে নিয়ে আসলো এবং সবাই শপথ করে করে বললো যে, তাদের কেউই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বেয়াদবী মূলক কথা বলেনি। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা (আল্লাহর নিকট) সেই রূপ শপথ করবে যেই রূপ শপথ তোমাদের নিকট করে এবং তারা মনে করে যে, তাতে তারা উপকৃত হবে। সাবধান! তারাই তো মিথ্যাবাদী।” এই একই অবস্থা, আল্লাহর দরবারে মুশরিকদেরও হবে যে, তারা বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ শয়তান তাদের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করেছে এবং তাদের অন্তরকে নিজের মুষ্টির মধ্যে নিয়ে ফেলেছে, ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে।হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে গ্রামে বা জঙ্গলে তিনজন রয়েছে এবং তাদের মধ্যে নামায প্রতিষ্ঠিত করা হয় না, তাদের উপর শয়তান প্রভুত্ব বিস্তার করে ফেলে। সুতরাং তুমি জামাআতকে অপরিহার্য রূপে ধরে নাও। বাঘ ঐ বকরীকে খেয়ে ফেলে যে দল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সায়েব (রঃ) বলেন যে, এখানে জামাআত দ্বারা নামাযের জামাআতকে বুঝানো হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ “তারা শয়তানেরই দল' অর্থাৎ যাদের উপর শয়তান প্রভুত্ব বিস্তার করেছে এবং এর ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে।এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ 'সাবধান! শয়তানের দল অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত।

আল-মুজাদালা 58:15

১৪-১৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকদের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা অন্তরে ইয়াহুদীদের প্রতি ভালবাসা পোষণ করে, কিন্তু প্রকৃত তারা এ ইয়াহদীদেরও দলভুক্ত নয় এবং মুমিনদেরও দলভুক্ত নয়। তারা এদিকেরও নয়, ওদিকেরও নয়। তারা প্রকাশ্যভাবে মিথ্যা শপথ করে থাকে। মুমিনদের কাছে এসে তারা তাদের পক্ষেই কথা বলে। রাসূল (সঃ)-এর কাছে এসে কসম খেয়ে তারা নিজেদেরকে ঈমানদার হিসেবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে এবং বলে যে, তারা নিশ্চিতরূপে মুসলমান। অথচ অন্তরে তারা সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করে। তারা যে মিথ্যাবাদী এটা জেনে শুনেও মিথ্যা শপথ করতে মোটেই দ্বিধা বোধ করে না। তাদের এই দুস্কার্যের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন কঠিন শাস্তি। এই প্রতারণার জন্যে তাদেরকে মন্দ প্রতিদান দেয়া হবে। তারা তো তাদের শপথগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং মানুষকে তারা আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে। মুখে তারা ঈমান প্রকাশ করে এবং অন্তরে কুফরী গোপন রাখে। কসমের মাধ্যমে তারা নিজেদের ভিতরের দুস্কৃতিকে গোপন করে। অভিজ্ঞ লোকদের উপর তারা কসমের দ্বারা নিজেদেরকে সত্যবাদী রূপে পেশ করে এবং তাদেরকে তাদের প্রশংসাকারী বানিয়ে নেয়। ধীরে ধীরে তারা তাদেরকে নিজেদের রঙে রঞ্জিত করে এবং এই ভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথ হতে ফিরিয়ে রাখে। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেন যে, এই মুনাফিকদের জন্যে রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহর শাস্তির মুকাবিলায় তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদের কোনই কাজে আসবে না, তারা জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, কখনই তাদেরকে সেখান হতে বের করা হবে না। কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তাদের সকলকেই এক ময়দানে একত্রিত করবেন, কাউকেও বাদ রাখবেন না তখন দুনিয়ায় যেমন তাদের অভ্যাস ছিল যে, নিজেদের মিথ্যা কথাকে তারা শপথ করে সত্যরূপে দেখাতো, অনুরূপভাবে ঐ দিনও তারা আল্লাহর সামনে নিজেদের হিদায়াত ও সঠিক পথের অনুসারী হওয়ার উপর বড় বড় কসম খাবে এবং মনে করবে যে, সেখানেও বুঝি তাদের চালাকী ধরা পড়বে না। কিন্তু মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর কাছে কি তাদের এই ফাকিবাজি ধরা না পড়ে থাকতে পারে? তিনি তো তাদের মিথ্যাবাদী হওয়ার কথা এ দুনিয়াতেও মুমিনদের নিকট বর্ণনা করে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ সাবধান! তারাই তো মিথ্যাবাদী।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (একদা) নবী (সঃ) তাঁর কোন এক কক্ষের ছায়ায় বসেছিলেন এবং কিছু সাহাবায়ে কিরামও (রাঃ) তাঁর নিকট ছিলেন। ছায়াযুক্ত স্থান কম ছিল। কষ্ট করে তারা সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখো, এখানে এখনই এমন একজন লোক আসবে যে শয়তানী দৃষ্টিতে তাকাবে। সে আসলে তোমরা কেউই তার সাথে কথা বলবে না।” অল্পক্ষণের মধ্যেই একজন কয়বা চক্ষু বিশিষ্ট লোক আসলো। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেনঃ “তুমি এবং অমুক অমুক লোক আমাকে গালি দাও কেন?” একথা শুনেই লোকটি চলে গেল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যে কয়েকজনের নাম করেছিলেন তাদের সবাইকে সে ডেকে নিয়ে আসলো এবং সবাই শপথ করে করে বললো যে, তাদের কেউই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বেয়াদবী মূলক কথা বলেনি। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা (আল্লাহর নিকট) সেই রূপ শপথ করবে যেই রূপ শপথ তোমাদের নিকট করে এবং তারা মনে করে যে, তাতে তারা উপকৃত হবে। সাবধান! তারাই তো মিথ্যাবাদী।” এই একই অবস্থা, আল্লাহর দরবারে মুশরিকদেরও হবে যে, তারা বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ শয়তান তাদের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করেছে এবং তাদের অন্তরকে নিজের মুষ্টির মধ্যে নিয়ে ফেলেছে, ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে।হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে গ্রামে বা জঙ্গলে তিনজন রয়েছে এবং তাদের মধ্যে নামায প্রতিষ্ঠিত করা হয় না, তাদের উপর শয়তান প্রভুত্ব বিস্তার করে ফেলে। সুতরাং তুমি জামাআতকে অপরিহার্য রূপে ধরে নাও। বাঘ ঐ বকরীকে খেয়ে ফেলে যে দল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সায়েব (রঃ) বলেন যে, এখানে জামাআত দ্বারা নামাযের জামাআতকে বুঝানো হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ “তারা শয়তানেরই দল' অর্থাৎ যাদের উপর শয়তান প্রভুত্ব বিস্তার করেছে এবং এর ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে।এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ 'সাবধান! শয়তানের দল অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত।

আল-মুজাদালা 58:16

১৪-১৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকদের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা অন্তরে ইয়াহুদীদের প্রতি ভালবাসা পোষণ করে, কিন্তু প্রকৃত তারা এ ইয়াহদীদেরও দলভুক্ত নয় এবং মুমিনদেরও দলভুক্ত নয়। তারা এদিকেরও নয়, ওদিকেরও নয়। তারা প্রকাশ্যভাবে মিথ্যা শপথ করে থাকে। মুমিনদের কাছে এসে তারা তাদের পক্ষেই কথা বলে। রাসূল (সঃ)-এর কাছে এসে কসম খেয়ে তারা নিজেদেরকে ঈমানদার হিসেবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে এবং বলে যে, তারা নিশ্চিতরূপে মুসলমান। অথচ অন্তরে তারা সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করে। তারা যে মিথ্যাবাদী এটা জেনে শুনেও মিথ্যা শপথ করতে মোটেই দ্বিধা বোধ করে না। তাদের এই দুস্কার্যের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন কঠিন শাস্তি। এই প্রতারণার জন্যে তাদেরকে মন্দ প্রতিদান দেয়া হবে। তারা তো তাদের শপথগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং মানুষকে তারা আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে। মুখে তারা ঈমান প্রকাশ করে এবং অন্তরে কুফরী গোপন রাখে। কসমের মাধ্যমে তারা নিজেদের ভিতরের দুস্কৃতিকে গোপন করে। অভিজ্ঞ লোকদের উপর তারা কসমের দ্বারা নিজেদেরকে সত্যবাদী রূপে পেশ করে এবং তাদেরকে তাদের প্রশংসাকারী বানিয়ে নেয়। ধীরে ধীরে তারা তাদেরকে নিজেদের রঙে রঞ্জিত করে এবং এই ভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথ হতে ফিরিয়ে রাখে। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেন যে, এই মুনাফিকদের জন্যে রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহর শাস্তির মুকাবিলায় তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদের কোনই কাজে আসবে না, তারা জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, কখনই তাদেরকে সেখান হতে বের করা হবে না। কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তাদের সকলকেই এক ময়দানে একত্রিত করবেন, কাউকেও বাদ রাখবেন না তখন দুনিয়ায় যেমন তাদের অভ্যাস ছিল যে, নিজেদের মিথ্যা কথাকে তারা শপথ করে সত্যরূপে দেখাতো, অনুরূপভাবে ঐ দিনও তারা আল্লাহর সামনে নিজেদের হিদায়াত ও সঠিক পথের অনুসারী হওয়ার উপর বড় বড় কসম খাবে এবং মনে করবে যে, সেখানেও বুঝি তাদের চালাকী ধরা পড়বে না। কিন্তু মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর কাছে কি তাদের এই ফাকিবাজি ধরা না পড়ে থাকতে পারে? তিনি তো তাদের মিথ্যাবাদী হওয়ার কথা এ দুনিয়াতেও মুমিনদের নিকট বর্ণনা করে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ সাবধান! তারাই তো মিথ্যাবাদী।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (একদা) নবী (সঃ) তাঁর কোন এক কক্ষের ছায়ায় বসেছিলেন এবং কিছু সাহাবায়ে কিরামও (রাঃ) তাঁর নিকট ছিলেন। ছায়াযুক্ত স্থান কম ছিল। কষ্ট করে তারা সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখো, এখানে এখনই এমন একজন লোক আসবে যে শয়তানী দৃষ্টিতে তাকাবে। সে আসলে তোমরা কেউই তার সাথে কথা বলবে না।” অল্পক্ষণের মধ্যেই একজন কয়বা চক্ষু বিশিষ্ট লোক আসলো। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেনঃ “তুমি এবং অমুক অমুক লোক আমাকে গালি দাও কেন?” একথা শুনেই লোকটি চলে গেল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যে কয়েকজনের নাম করেছিলেন তাদের সবাইকে সে ডেকে নিয়ে আসলো এবং সবাই শপথ করে করে বললো যে, তাদের কেউই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বেয়াদবী মূলক কথা বলেনি। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা (আল্লাহর নিকট) সেই রূপ শপথ করবে যেই রূপ শপথ তোমাদের নিকট করে এবং তারা মনে করে যে, তাতে তারা উপকৃত হবে। সাবধান! তারাই তো মিথ্যাবাদী।” এই একই অবস্থা, আল্লাহর দরবারে মুশরিকদেরও হবে যে, তারা বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ শয়তান তাদের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করেছে এবং তাদের অন্তরকে নিজের মুষ্টির মধ্যে নিয়ে ফেলেছে, ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে।হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে গ্রামে বা জঙ্গলে তিনজন রয়েছে এবং তাদের মধ্যে নামায প্রতিষ্ঠিত করা হয় না, তাদের উপর শয়তান প্রভুত্ব বিস্তার করে ফেলে। সুতরাং তুমি জামাআতকে অপরিহার্য রূপে ধরে নাও। বাঘ ঐ বকরীকে খেয়ে ফেলে যে দল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সায়েব (রঃ) বলেন যে, এখানে জামাআত দ্বারা নামাযের জামাআতকে বুঝানো হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ “তারা শয়তানেরই দল' অর্থাৎ যাদের উপর শয়তান প্রভুত্ব বিস্তার করেছে এবং এর ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে।এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ 'সাবধান! শয়তানের দল অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত।

আল-মুজাদালা 58:17

১৪-১৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকদের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা অন্তরে ইয়াহুদীদের প্রতি ভালবাসা পোষণ করে, কিন্তু প্রকৃত তারা এ ইয়াহদীদেরও দলভুক্ত নয় এবং মুমিনদেরও দলভুক্ত নয়। তারা এদিকেরও নয়, ওদিকেরও নয়। তারা প্রকাশ্যভাবে মিথ্যা শপথ করে থাকে। মুমিনদের কাছে এসে তারা তাদের পক্ষেই কথা বলে। রাসূল (সঃ)-এর কাছে এসে কসম খেয়ে তারা নিজেদেরকে ঈমানদার হিসেবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে এবং বলে যে, তারা নিশ্চিতরূপে মুসলমান। অথচ অন্তরে তারা সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করে। তারা যে মিথ্যাবাদী এটা জেনে শুনেও মিথ্যা শপথ করতে মোটেই দ্বিধা বোধ করে না। তাদের এই দুস্কার্যের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন কঠিন শাস্তি। এই প্রতারণার জন্যে তাদেরকে মন্দ প্রতিদান দেয়া হবে। তারা তো তাদের শপথগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং মানুষকে তারা আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে। মুখে তারা ঈমান প্রকাশ করে এবং অন্তরে কুফরী গোপন রাখে। কসমের মাধ্যমে তারা নিজেদের ভিতরের দুস্কৃতিকে গোপন করে। অভিজ্ঞ লোকদের উপর তারা কসমের দ্বারা নিজেদেরকে সত্যবাদী রূপে পেশ করে এবং তাদেরকে তাদের প্রশংসাকারী বানিয়ে নেয়। ধীরে ধীরে তারা তাদেরকে নিজেদের রঙে রঞ্জিত করে এবং এই ভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথ হতে ফিরিয়ে রাখে। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেন যে, এই মুনাফিকদের জন্যে রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহর শাস্তির মুকাবিলায় তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদের কোনই কাজে আসবে না, তারা জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, কখনই তাদেরকে সেখান হতে বের করা হবে না। কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তাদের সকলকেই এক ময়দানে একত্রিত করবেন, কাউকেও বাদ রাখবেন না তখন দুনিয়ায় যেমন তাদের অভ্যাস ছিল যে, নিজেদের মিথ্যা কথাকে তারা শপথ করে সত্যরূপে দেখাতো, অনুরূপভাবে ঐ দিনও তারা আল্লাহর সামনে নিজেদের হিদায়াত ও সঠিক পথের অনুসারী হওয়ার উপর বড় বড় কসম খাবে এবং মনে করবে যে, সেখানেও বুঝি তাদের চালাকী ধরা পড়বে না। কিন্তু মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর কাছে কি তাদের এই ফাকিবাজি ধরা না পড়ে থাকতে পারে? তিনি তো তাদের মিথ্যাবাদী হওয়ার কথা এ দুনিয়াতেও মুমিনদের নিকট বর্ণনা করে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ সাবধান! তারাই তো মিথ্যাবাদী।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (একদা) নবী (সঃ) তাঁর কোন এক কক্ষের ছায়ায় বসেছিলেন এবং কিছু সাহাবায়ে কিরামও (রাঃ) তাঁর নিকট ছিলেন। ছায়াযুক্ত স্থান কম ছিল। কষ্ট করে তারা সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখো, এখানে এখনই এমন একজন লোক আসবে যে শয়তানী দৃষ্টিতে তাকাবে। সে আসলে তোমরা কেউই তার সাথে কথা বলবে না।” অল্পক্ষণের মধ্যেই একজন কয়বা চক্ষু বিশিষ্ট লোক আসলো। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেনঃ “তুমি এবং অমুক অমুক লোক আমাকে গালি দাও কেন?” একথা শুনেই লোকটি চলে গেল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যে কয়েকজনের নাম করেছিলেন তাদের সবাইকে সে ডেকে নিয়ে আসলো এবং সবাই শপথ করে করে বললো যে, তাদের কেউই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বেয়াদবী মূলক কথা বলেনি। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা (আল্লাহর নিকট) সেই রূপ শপথ করবে যেই রূপ শপথ তোমাদের নিকট করে এবং তারা মনে করে যে, তাতে তারা উপকৃত হবে। সাবধান! তারাই তো মিথ্যাবাদী।” এই একই অবস্থা, আল্লাহর দরবারে মুশরিকদেরও হবে যে, তারা বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ শয়তান তাদের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করেছে এবং তাদের অন্তরকে নিজের মুষ্টির মধ্যে নিয়ে ফেলেছে, ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে।হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে গ্রামে বা জঙ্গলে তিনজন রয়েছে এবং তাদের মধ্যে নামায প্রতিষ্ঠিত করা হয় না, তাদের উপর শয়তান প্রভুত্ব বিস্তার করে ফেলে। সুতরাং তুমি জামাআতকে অপরিহার্য রূপে ধরে নাও। বাঘ ঐ বকরীকে খেয়ে ফেলে যে দল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সায়েব (রঃ) বলেন যে, এখানে জামাআত দ্বারা নামাযের জামাআতকে বুঝানো হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ “তারা শয়তানেরই দল' অর্থাৎ যাদের উপর শয়তান প্রভুত্ব বিস্তার করেছে এবং এর ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে।এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ 'সাবধান! শয়তানের দল অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত।

আল-মুজাদালা 58:18

১৪-১৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকদের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা অন্তরে ইয়াহুদীদের প্রতি ভালবাসা পোষণ করে, কিন্তু প্রকৃত তারা এ ইয়াহদীদেরও দলভুক্ত নয় এবং মুমিনদেরও দলভুক্ত নয়। তারা এদিকেরও নয়, ওদিকেরও নয়। তারা প্রকাশ্যভাবে মিথ্যা শপথ করে থাকে। মুমিনদের কাছে এসে তারা তাদের পক্ষেই কথা বলে। রাসূল (সঃ)-এর কাছে এসে কসম খেয়ে তারা নিজেদেরকে ঈমানদার হিসেবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে এবং বলে যে, তারা নিশ্চিতরূপে মুসলমান। অথচ অন্তরে তারা সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করে। তারা যে মিথ্যাবাদী এটা জেনে শুনেও মিথ্যা শপথ করতে মোটেই দ্বিধা বোধ করে না। তাদের এই দুস্কার্যের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন কঠিন শাস্তি। এই প্রতারণার জন্যে তাদেরকে মন্দ প্রতিদান দেয়া হবে। তারা তো তাদের শপথগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং মানুষকে তারা আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে। মুখে তারা ঈমান প্রকাশ করে এবং অন্তরে কুফরী গোপন রাখে। কসমের মাধ্যমে তারা নিজেদের ভিতরের দুস্কৃতিকে গোপন করে। অভিজ্ঞ লোকদের উপর তারা কসমের দ্বারা নিজেদেরকে সত্যবাদী রূপে পেশ করে এবং তাদেরকে তাদের প্রশংসাকারী বানিয়ে নেয়। ধীরে ধীরে তারা তাদেরকে নিজেদের রঙে রঞ্জিত করে এবং এই ভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথ হতে ফিরিয়ে রাখে। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেন যে, এই মুনাফিকদের জন্যে রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহর শাস্তির মুকাবিলায় তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদের কোনই কাজে আসবে না, তারা জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, কখনই তাদেরকে সেখান হতে বের করা হবে না। কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তাদের সকলকেই এক ময়দানে একত্রিত করবেন, কাউকেও বাদ রাখবেন না তখন দুনিয়ায় যেমন তাদের অভ্যাস ছিল যে, নিজেদের মিথ্যা কথাকে তারা শপথ করে সত্যরূপে দেখাতো, অনুরূপভাবে ঐ দিনও তারা আল্লাহর সামনে নিজেদের হিদায়াত ও সঠিক পথের অনুসারী হওয়ার উপর বড় বড় কসম খাবে এবং মনে করবে যে, সেখানেও বুঝি তাদের চালাকী ধরা পড়বে না। কিন্তু মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর কাছে কি তাদের এই ফাকিবাজি ধরা না পড়ে থাকতে পারে? তিনি তো তাদের মিথ্যাবাদী হওয়ার কথা এ দুনিয়াতেও মুমিনদের নিকট বর্ণনা করে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ সাবধান! তারাই তো মিথ্যাবাদী।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (একদা) নবী (সঃ) তাঁর কোন এক কক্ষের ছায়ায় বসেছিলেন এবং কিছু সাহাবায়ে কিরামও (রাঃ) তাঁর নিকট ছিলেন। ছায়াযুক্ত স্থান কম ছিল। কষ্ট করে তারা সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখো, এখানে এখনই এমন একজন লোক আসবে যে শয়তানী দৃষ্টিতে তাকাবে। সে আসলে তোমরা কেউই তার সাথে কথা বলবে না।” অল্পক্ষণের মধ্যেই একজন কয়বা চক্ষু বিশিষ্ট লোক আসলো। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেনঃ “তুমি এবং অমুক অমুক লোক আমাকে গালি দাও কেন?” একথা শুনেই লোকটি চলে গেল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যে কয়েকজনের নাম করেছিলেন তাদের সবাইকে সে ডেকে নিয়ে আসলো এবং সবাই শপথ করে করে বললো যে, তাদের কেউই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বেয়াদবী মূলক কথা বলেনি। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা (আল্লাহর নিকট) সেই রূপ শপথ করবে যেই রূপ শপথ তোমাদের নিকট করে এবং তারা মনে করে যে, তাতে তারা উপকৃত হবে। সাবধান! তারাই তো মিথ্যাবাদী।” এই একই অবস্থা, আল্লাহর দরবারে মুশরিকদেরও হবে যে, তারা বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ শয়তান তাদের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করেছে এবং তাদের অন্তরকে নিজের মুষ্টির মধ্যে নিয়ে ফেলেছে, ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে।হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে গ্রামে বা জঙ্গলে তিনজন রয়েছে এবং তাদের মধ্যে নামায প্রতিষ্ঠিত করা হয় না, তাদের উপর শয়তান প্রভুত্ব বিস্তার করে ফেলে। সুতরাং তুমি জামাআতকে অপরিহার্য রূপে ধরে নাও। বাঘ ঐ বকরীকে খেয়ে ফেলে যে দল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সায়েব (রঃ) বলেন যে, এখানে জামাআত দ্বারা নামাযের জামাআতকে বুঝানো হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ “তারা শয়তানেরই দল' অর্থাৎ যাদের উপর শয়তান প্রভুত্ব বিস্তার করেছে এবং এর ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে।এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ 'সাবধান! শয়তানের দল অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত।

আল-মুজাদালা 58:19

১৪-১৯ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকদের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা অন্তরে ইয়াহুদীদের প্রতি ভালবাসা পোষণ করে, কিন্তু প্রকৃত তারা এ ইয়াহদীদেরও দলভুক্ত নয় এবং মুমিনদেরও দলভুক্ত নয়। তারা এদিকেরও নয়, ওদিকেরও নয়। তারা প্রকাশ্যভাবে মিথ্যা শপথ করে থাকে। মুমিনদের কাছে এসে তারা তাদের পক্ষেই কথা বলে। রাসূল (সঃ)-এর কাছে এসে কসম খেয়ে তারা নিজেদেরকে ঈমানদার হিসেবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে এবং বলে যে, তারা নিশ্চিতরূপে মুসলমান। অথচ অন্তরে তারা সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করে। তারা যে মিথ্যাবাদী এটা জেনে শুনেও মিথ্যা শপথ করতে মোটেই দ্বিধা বোধ করে না। তাদের এই দুস্কার্যের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন কঠিন শাস্তি। এই প্রতারণার জন্যে তাদেরকে মন্দ প্রতিদান দেয়া হবে। তারা তো তাদের শপথগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং মানুষকে তারা আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে। মুখে তারা ঈমান প্রকাশ করে এবং অন্তরে কুফরী গোপন রাখে। কসমের মাধ্যমে তারা নিজেদের ভিতরের দুস্কৃতিকে গোপন করে। অভিজ্ঞ লোকদের উপর তারা কসমের দ্বারা নিজেদেরকে সত্যবাদী রূপে পেশ করে এবং তাদেরকে তাদের প্রশংসাকারী বানিয়ে নেয়। ধীরে ধীরে তারা তাদেরকে নিজেদের রঙে রঞ্জিত করে এবং এই ভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথ হতে ফিরিয়ে রাখে। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেন যে, এই মুনাফিকদের জন্যে রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহর শাস্তির মুকাবিলায় তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদের কোনই কাজে আসবে না, তারা জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, কখনই তাদেরকে সেখান হতে বের করা হবে না। কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তাদের সকলকেই এক ময়দানে একত্রিত করবেন, কাউকেও বাদ রাখবেন না তখন দুনিয়ায় যেমন তাদের অভ্যাস ছিল যে, নিজেদের মিথ্যা কথাকে তারা শপথ করে সত্যরূপে দেখাতো, অনুরূপভাবে ঐ দিনও তারা আল্লাহর সামনে নিজেদের হিদায়াত ও সঠিক পথের অনুসারী হওয়ার উপর বড় বড় কসম খাবে এবং মনে করবে যে, সেখানেও বুঝি তাদের চালাকী ধরা পড়বে না। কিন্তু মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর কাছে কি তাদের এই ফাকিবাজি ধরা না পড়ে থাকতে পারে? তিনি তো তাদের মিথ্যাবাদী হওয়ার কথা এ দুনিয়াতেও মুমিনদের নিকট বর্ণনা করে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ সাবধান! তারাই তো মিথ্যাবাদী।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (একদা) নবী (সঃ) তাঁর কোন এক কক্ষের ছায়ায় বসেছিলেন এবং কিছু সাহাবায়ে কিরামও (রাঃ) তাঁর নিকট ছিলেন। ছায়াযুক্ত স্থান কম ছিল। কষ্ট করে তারা সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখো, এখানে এখনই এমন একজন লোক আসবে যে শয়তানী দৃষ্টিতে তাকাবে। সে আসলে তোমরা কেউই তার সাথে কথা বলবে না।” অল্পক্ষণের মধ্যেই একজন কয়বা চক্ষু বিশিষ্ট লোক আসলো। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেনঃ “তুমি এবং অমুক অমুক লোক আমাকে গালি দাও কেন?” একথা শুনেই লোকটি চলে গেল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যে কয়েকজনের নাম করেছিলেন তাদের সবাইকে সে ডেকে নিয়ে আসলো এবং সবাই শপথ করে করে বললো যে, তাদের কেউই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বেয়াদবী মূলক কথা বলেনি। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “তারা (আল্লাহর নিকট) সেই রূপ শপথ করবে যেই রূপ শপথ তোমাদের নিকট করে এবং তারা মনে করে যে, তাতে তারা উপকৃত হবে। সাবধান! তারাই তো মিথ্যাবাদী।” এই একই অবস্থা, আল্লাহর দরবারে মুশরিকদেরও হবে যে, তারা বলবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।” (৬:২৩) এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ শয়তান তাদের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করেছে এবং তাদের অন্তরকে নিজের মুষ্টির মধ্যে নিয়ে ফেলেছে, ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে।হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে গ্রামে বা জঙ্গলে তিনজন রয়েছে এবং তাদের মধ্যে নামায প্রতিষ্ঠিত করা হয় না, তাদের উপর শয়তান প্রভুত্ব বিস্তার করে ফেলে। সুতরাং তুমি জামাআতকে অপরিহার্য রূপে ধরে নাও। বাঘ ঐ বকরীকে খেয়ে ফেলে যে দল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সায়েব (রঃ) বলেন যে, এখানে জামাআত দ্বারা নামাযের জামাআতকে বুঝানো হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ “তারা শয়তানেরই দল' অর্থাৎ যাদের উপর শয়তান প্রভুত্ব বিস্তার করেছে এবং এর ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে।এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ 'সাবধান! শয়তানের দল অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত।

আল-মুজাদালা 58:20

২০-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, যারা সত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, হিদায়াত হতে দূরে সরে পড়েছে, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং শরীয়তের বিধানসমূহের আনুগত্য হতে পৃথক হয়ে গেছে তারা হবে চরম লাঞ্ছিত। তারা আল্লাহ্ তা'আলার রহমত হতে ও তার করুণাপূর্ণ দৃষ্টি হতে হবে বঞ্চিত। তারা দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আল্লাহ্ তা'আলা সিদ্ধান্ত করেছেন যে, তিনি এবং তাঁর রাসূল (সঃ) অবশ্যই বিজয়ী হবেন। নিশ্চয়ই তিনি মহাশক্তিমান ও পরাক্রমশালী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার রাসূলদেরকে ও মুমিনদেরকে সাহায্য করবে পার্থিব জীবনে এবং যেদিন সাক্ষীগণদণ্ডায়মান হবে। যেদিন যালিমদের ওযর-আপত্তি কোন কাজে আসবে না, তাদের জন্যে রয়েছে লা'নত এবং তাদের জন্যে রয়েছে। নিকৃষ্ট আবাস।” (৪০:৫১-৫২) আর এখানে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ্ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন- আমি এবং আমার রাসূল অবশ্যই বিজয়ী হবো। আল্লাহ্ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।” অর্থাৎ ঐ শক্তিমান ও পরাক্রমশালী আল্লাহ এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে, তিনি তাঁর শত্রুদের উপর জয়যুক্ত থাকবেন। তাঁর এ সিদ্ধান্ত অটল যে, ইহজগতে ও পরজগতে পরিণাম হিসেবে বিজয় ও সাহায্যলাভ মুমিনদের অংশ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি পাবে না আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায়কে, যারা ভালবাসে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচারীদেরকে হোক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোত্র। অর্থাৎ তারা কখনো এই বিরুদ্ধাচারীদেরকে ভালবাসবে না। যদিও তারা তাদের নিকটতম আত্মীয় হয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মুমিনরা যেন মুমিনদের ছাড়া কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক থাকবে না; তবে ব্যতিক্রম, যদি তোমরা তাদের নিকট হতে আত্মরক্ষার জন্যে সতর্কতা অবলম্বন কর।” (৩:২৮) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “বল- তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা প্রিয় হয় তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভ্রাতা, তোমাদের পত্নী, তোমাদের স্বগোষ্ঠী, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, যার মন্দা পড়ার তোমরা আশংকা কর এবং তোমাদের বাসস্থান, যা তোমরা ভালবাস, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আল্লাহ্ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।” (৯:২৪) হযরত সাঈদ ইবনে আবদিল আযীম (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, (আরবী) এ আয়াতটি হযরত আবু উবাইদাহ্ আমির ইবনে আবদিল্লাহ্ ইবনুল জাররাহ্ (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন তিনি তাঁর (কাফির) পিতাকে বদরের যুদ্ধে হত্যা করেন। হযরত উমার (রাঃ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পূর্বক্ষণে যখন খিলাফতের জন্যে একটি দলকে নির্ধারণ করেন যে, তাঁরা মিলিতভাবে যাকে ইচ্ছা খলীফা নির্বাচন করবেন, ঐ সময় তিনি হযরত আবু উবাইদাহ্ সম্পর্কে বলেছিলেনঃ “যদি আজ তিনি বেঁচে থাকতেন তবে তাঁকেই আমি খলীফা বানাতাম।” একথাও বলা হয়েছে যে, এক একজনের মধ্যে পৃথক পৃথক গুণ ছিল। যেমন হযরত আবু উবাইদাহ্ (রাঃ) স্বীয় পিতাকে হত্যা করেছিলেন, হযরত আবূ বকর (রাঃ) স্বীয় পুত্র আব্দুর রহমানকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিলেন, হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রাঃ) তাঁর ভ্রাতা উবায়েদ ইবনে উমায়েরকে হত্যা করেছিলেন এবং হযরত উমার (রাঃ), হযরত হামযাহ (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত উবাইদাহ্ ইবনে হারিস (রাঃ) নিজেদের নিকতম আত্মীয় উবাহ্, শায়বাহ্ এবং ওয়ালীদ ইবনে উত্বহূকে হত্যা করেছিলেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এতে এঘটনাটি অন্তর্ভুক্ত যে, যখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বদরী বন্দীদের সম্পর্কে মুসলমানদের সাথে পরামর্শ করেন তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ গ্রহণ করা হোক যাতে মুসলমানদের অর্থিক সংকট দূর হয়ে যায় এবং মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে যুদ্ধাস্ত্রমমূহ সংগৃহীত হতে পারে। আর এর বিনিময়ে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হোক। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হয়তো আল্লাহ্ তা'আলা তাদের অন্তর ইসলামের দিকে ফিরিয়ে দিবেন। তাছাড়া তারা তো আমাদেরই আত্মীয়-স্বজন বটে। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) এর সম্পূর্ণ বিপরীত মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে মুসলমানের যে আত্মীয় মুশরিক তাকে তারই হাতে সমর্পণ করে দিন এবং তাকে নির্দেশ দিন যে, সে যেন তাকে হত্যা করে। আমরা আল্লাহ্ তা'আলাকে দেখাতে চাই যে, আমাদের অন্তরে মুশরিকদের প্রতি কোনই। ভালবাসা নেই। আমার হাতে আমার অমুক আত্মীয়কে সমর্পণ করুন। হযরত আলী (রাঃ)-এর হাতে আকীলকে সঁপে দিন এবং অমুক সাহাবীর হাতে অমুক কাফিরকে সমর্পণ করুন!” এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ যারা নিজেদের অন্তর আল্লাহর শত্রুদের ভালবাসা হতে শূন্য করে এবং নিজেদের মুশরিক আত্মীয়দের প্রতি ভালবাসা পরিত্যাগ করে তারা হলো পূর্ণ ঈমানদার। তাদের অন্তরে ঈমানের মূল গেড়ে বসেছে। তাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা শক্তিশালী করেছেন নিজের পক্ষ হতে রূহ দ্বারা। তাদের দৃষ্টিতে তিনি ঈমানকে সৌন্দর্যময় করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারা আল্লাহর জন্যে তাদের মুশরিক আত্মীয়দের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল বলে এর বিনিময়ে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাদের প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন এবং তাদেরকে এতো বেশী করে দিয়েছেন যে, তারাও তাঁর প্রতি প্রসন্ন হয়েছে। তারাই আল্লাহর দল এবং আল্লাহর দলই হবে সফলকাম। এ দলটি শয়তানী দলটির সম্পূর্ণ বিপরীত।হযরত আবু হাযিম আ’রাজ (রঃ) হযরত যুহরী (রঃ)-এর নিকট লিখেনঃ “জেনে রাখুন যে, মাহাত্ম দুই প্রকার। প্রথম হলো ঐ মাহাত্ম্য যা আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁর ওলীদের হাতে জারী করে থাকেন, যারা সাধারণ লোকদের চোখে লাগেন না এবং যাদের সাধারণ কোন খ্যাতি থাকে না। যাদের বিশেষণ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ) এরূপে প্রকাশ করেছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ভালবাসেন ঐ সব লোককে যারা হয় নামধাম শূন্য, আল্লাহভীরু ও সঙ্কৰ্মশীল। যদি তারা অনুপস্থিত থাকে তবে তাদের সম্পর্কে কোন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় না এবং উপস্থিত থাকলে তাদের কোন মর্যাদা দেয়া হয় না। তাদের অন্তর হলো হিদায়াতের প্রদীপ, যা প্রত্যেক কালো, অন্ধকার ফিত্না হতে বের হয়ে থাকে। এরাই হলো আল্লাহর ঐ আউলিয়া যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ এরাই আল্লাহর দল। জেনে রেখো যে, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হরত হাসান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) দুআ করতেনঃ “হে আল্লাহ! কোন ফাসেক ও ফাজেরের কোন নিয়ামত ও অনুগ্রহ আমার উপর রাখবেন না। কেননা, আমি আমার উপর আপনার নাযিলকৃত অহীতে পাঠ করেছিঃ তুমি পাবে না আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায় যারা ভালবাসে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচারীদেরকে।" (এটা হযরত নাঈম ইবনে হাম্মাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, পূর্বযুগীয় গুরুজনদের মতে এ আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা বাদশাহদের সাথে মেলামেশা করে। (এটা আবু আহমাদ আসকারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-মুজাদালা 58:21

২০-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, যারা সত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, হিদায়াত হতে দূরে সরে পড়েছে, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং শরীয়তের বিধানসমূহের আনুগত্য হতে পৃথক হয়ে গেছে তারা হবে চরম লাঞ্ছিত। তারা আল্লাহ্ তা'আলার রহমত হতে ও তার করুণাপূর্ণ দৃষ্টি হতে হবে বঞ্চিত। তারা দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আল্লাহ্ তা'আলা সিদ্ধান্ত করেছেন যে, তিনি এবং তাঁর রাসূল (সঃ) অবশ্যই বিজয়ী হবেন। নিশ্চয়ই তিনি মহাশক্তিমান ও পরাক্রমশালী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার রাসূলদেরকে ও মুমিনদেরকে সাহায্য করবে পার্থিব জীবনে এবং যেদিন সাক্ষীগণদণ্ডায়মান হবে। যেদিন যালিমদের ওযর-আপত্তি কোন কাজে আসবে না, তাদের জন্যে রয়েছে লা'নত এবং তাদের জন্যে রয়েছে। নিকৃষ্ট আবাস।” (৪০:৫১-৫২) আর এখানে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ্ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন- আমি এবং আমার রাসূল অবশ্যই বিজয়ী হবো। আল্লাহ্ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।” অর্থাৎ ঐ শক্তিমান ও পরাক্রমশালী আল্লাহ এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে, তিনি তাঁর শত্রুদের উপর জয়যুক্ত থাকবেন। তাঁর এ সিদ্ধান্ত অটল যে, ইহজগতে ও পরজগতে পরিণাম হিসেবে বিজয় ও সাহায্যলাভ মুমিনদের অংশ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি পাবে না আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায়কে, যারা ভালবাসে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচারীদেরকে হোক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোত্র। অর্থাৎ তারা কখনো এই বিরুদ্ধাচারীদেরকে ভালবাসবে না। যদিও তারা তাদের নিকটতম আত্মীয় হয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মুমিনরা যেন মুমিনদের ছাড়া কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক থাকবে না; তবে ব্যতিক্রম, যদি তোমরা তাদের নিকট হতে আত্মরক্ষার জন্যে সতর্কতা অবলম্বন কর।” (৩:২৮) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “বল- তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা প্রিয় হয় তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভ্রাতা, তোমাদের পত্নী, তোমাদের স্বগোষ্ঠী, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, যার মন্দা পড়ার তোমরা আশংকা কর এবং তোমাদের বাসস্থান, যা তোমরা ভালবাস, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আল্লাহ্ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।” (৯:২৪) হযরত সাঈদ ইবনে আবদিল আযীম (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, (আরবী) এ আয়াতটি হযরত আবু উবাইদাহ্ আমির ইবনে আবদিল্লাহ্ ইবনুল জাররাহ্ (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন তিনি তাঁর (কাফির) পিতাকে বদরের যুদ্ধে হত্যা করেন। হযরত উমার (রাঃ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পূর্বক্ষণে যখন খিলাফতের জন্যে একটি দলকে নির্ধারণ করেন যে, তাঁরা মিলিতভাবে যাকে ইচ্ছা খলীফা নির্বাচন করবেন, ঐ সময় তিনি হযরত আবু উবাইদাহ্ সম্পর্কে বলেছিলেনঃ “যদি আজ তিনি বেঁচে থাকতেন তবে তাঁকেই আমি খলীফা বানাতাম।” একথাও বলা হয়েছে যে, এক একজনের মধ্যে পৃথক পৃথক গুণ ছিল। যেমন হযরত আবু উবাইদাহ্ (রাঃ) স্বীয় পিতাকে হত্যা করেছিলেন, হযরত আবূ বকর (রাঃ) স্বীয় পুত্র আব্দুর রহমানকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিলেন, হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রাঃ) তাঁর ভ্রাতা উবায়েদ ইবনে উমায়েরকে হত্যা করেছিলেন এবং হযরত উমার (রাঃ), হযরত হামযাহ (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত উবাইদাহ্ ইবনে হারিস (রাঃ) নিজেদের নিকতম আত্মীয় উবাহ্, শায়বাহ্ এবং ওয়ালীদ ইবনে উত্বহূকে হত্যা করেছিলেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এতে এঘটনাটি অন্তর্ভুক্ত যে, যখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বদরী বন্দীদের সম্পর্কে মুসলমানদের সাথে পরামর্শ করেন তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ গ্রহণ করা হোক যাতে মুসলমানদের অর্থিক সংকট দূর হয়ে যায় এবং মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে যুদ্ধাস্ত্রমমূহ সংগৃহীত হতে পারে। আর এর বিনিময়ে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হোক। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হয়তো আল্লাহ্ তা'আলা তাদের অন্তর ইসলামের দিকে ফিরিয়ে দিবেন। তাছাড়া তারা তো আমাদেরই আত্মীয়-স্বজন বটে। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) এর সম্পূর্ণ বিপরীত মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে মুসলমানের যে আত্মীয় মুশরিক তাকে তারই হাতে সমর্পণ করে দিন এবং তাকে নির্দেশ দিন যে, সে যেন তাকে হত্যা করে। আমরা আল্লাহ্ তা'আলাকে দেখাতে চাই যে, আমাদের অন্তরে মুশরিকদের প্রতি কোনই। ভালবাসা নেই। আমার হাতে আমার অমুক আত্মীয়কে সমর্পণ করুন। হযরত আলী (রাঃ)-এর হাতে আকীলকে সঁপে দিন এবং অমুক সাহাবীর হাতে অমুক কাফিরকে সমর্পণ করুন!” এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ যারা নিজেদের অন্তর আল্লাহর শত্রুদের ভালবাসা হতে শূন্য করে এবং নিজেদের মুশরিক আত্মীয়দের প্রতি ভালবাসা পরিত্যাগ করে তারা হলো পূর্ণ ঈমানদার। তাদের অন্তরে ঈমানের মূল গেড়ে বসেছে। তাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা শক্তিশালী করেছেন নিজের পক্ষ হতে রূহ দ্বারা। তাদের দৃষ্টিতে তিনি ঈমানকে সৌন্দর্যময় করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারা আল্লাহর জন্যে তাদের মুশরিক আত্মীয়দের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল বলে এর বিনিময়ে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাদের প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন এবং তাদেরকে এতো বেশী করে দিয়েছেন যে, তারাও তাঁর প্রতি প্রসন্ন হয়েছে। তারাই আল্লাহর দল এবং আল্লাহর দলই হবে সফলকাম। এ দলটি শয়তানী দলটির সম্পূর্ণ বিপরীত।হযরত আবু হাযিম আ’রাজ (রঃ) হযরত যুহরী (রঃ)-এর নিকট লিখেনঃ “জেনে রাখুন যে, মাহাত্ম দুই প্রকার। প্রথম হলো ঐ মাহাত্ম্য যা আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁর ওলীদের হাতে জারী করে থাকেন, যারা সাধারণ লোকদের চোখে লাগেন না এবং যাদের সাধারণ কোন খ্যাতি থাকে না। যাদের বিশেষণ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ) এরূপে প্রকাশ করেছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ভালবাসেন ঐ সব লোককে যারা হয় নামধাম শূন্য, আল্লাহভীরু ও সঙ্কৰ্মশীল। যদি তারা অনুপস্থিত থাকে তবে তাদের সম্পর্কে কোন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় না এবং উপস্থিত থাকলে তাদের কোন মর্যাদা দেয়া হয় না। তাদের অন্তর হলো হিদায়াতের প্রদীপ, যা প্রত্যেক কালো, অন্ধকার ফিত্না হতে বের হয়ে থাকে। এরাই হলো আল্লাহর ঐ আউলিয়া যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ এরাই আল্লাহর দল। জেনে রেখো যে, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হরত হাসান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) দুআ করতেনঃ “হে আল্লাহ! কোন ফাসেক ও ফাজেরের কোন নিয়ামত ও অনুগ্রহ আমার উপর রাখবেন না। কেননা, আমি আমার উপর আপনার নাযিলকৃত অহীতে পাঠ করেছিঃ তুমি পাবে না আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায় যারা ভালবাসে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচারীদেরকে।" (এটা হযরত নাঈম ইবনে হাম্মাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, পূর্বযুগীয় গুরুজনদের মতে এ আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা বাদশাহদের সাথে মেলামেশা করে। (এটা আবু আহমাদ আসকারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-মুজাদালা 58:22

২০-২২ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, যারা সত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, হিদায়াত হতে দূরে সরে পড়েছে, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং শরীয়তের বিধানসমূহের আনুগত্য হতে পৃথক হয়ে গেছে তারা হবে চরম লাঞ্ছিত। তারা আল্লাহ্ তা'আলার রহমত হতে ও তার করুণাপূর্ণ দৃষ্টি হতে হবে বঞ্চিত। তারা দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আল্লাহ্ তা'আলা সিদ্ধান্ত করেছেন যে, তিনি এবং তাঁর রাসূল (সঃ) অবশ্যই বিজয়ী হবেন। নিশ্চয়ই তিনি মহাশক্তিমান ও পরাক্রমশালী। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আমার রাসূলদেরকে ও মুমিনদেরকে সাহায্য করবে পার্থিব জীবনে এবং যেদিন সাক্ষীগণদণ্ডায়মান হবে। যেদিন যালিমদের ওযর-আপত্তি কোন কাজে আসবে না, তাদের জন্যে রয়েছে লা'নত এবং তাদের জন্যে রয়েছে। নিকৃষ্ট আবাস।” (৪০:৫১-৫২) আর এখানে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ্ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন- আমি এবং আমার রাসূল অবশ্যই বিজয়ী হবো। আল্লাহ্ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।” অর্থাৎ ঐ শক্তিমান ও পরাক্রমশালী আল্লাহ এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে, তিনি তাঁর শত্রুদের উপর জয়যুক্ত থাকবেন। তাঁর এ সিদ্ধান্ত অটল যে, ইহজগতে ও পরজগতে পরিণাম হিসেবে বিজয় ও সাহায্যলাভ মুমিনদের অংশ।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি পাবে না আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায়কে, যারা ভালবাসে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচারীদেরকে হোক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোত্র। অর্থাৎ তারা কখনো এই বিরুদ্ধাচারীদেরকে ভালবাসবে না। যদিও তারা তাদের নিকটতম আত্মীয় হয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মুমিনরা যেন মুমিনদের ছাড়া কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক থাকবে না; তবে ব্যতিক্রম, যদি তোমরা তাদের নিকট হতে আত্মরক্ষার জন্যে সতর্কতা অবলম্বন কর।” (৩:২৮) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “বল- তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সঃ) এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা প্রিয় হয় তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভ্রাতা, তোমাদের পত্নী, তোমাদের স্বগোষ্ঠী, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, যার মন্দা পড়ার তোমরা আশংকা কর এবং তোমাদের বাসস্থান, যা তোমরা ভালবাস, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আল্লাহ্ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।” (৯:২৪) হযরত সাঈদ ইবনে আবদিল আযীম (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, (আরবী) এ আয়াতটি হযরত আবু উবাইদাহ্ আমির ইবনে আবদিল্লাহ্ ইবনুল জাররাহ্ (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যখন তিনি তাঁর (কাফির) পিতাকে বদরের যুদ্ধে হত্যা করেন। হযরত উমার (রাঃ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পূর্বক্ষণে যখন খিলাফতের জন্যে একটি দলকে নির্ধারণ করেন যে, তাঁরা মিলিতভাবে যাকে ইচ্ছা খলীফা নির্বাচন করবেন, ঐ সময় তিনি হযরত আবু উবাইদাহ্ সম্পর্কে বলেছিলেনঃ “যদি আজ তিনি বেঁচে থাকতেন তবে তাঁকেই আমি খলীফা বানাতাম।” একথাও বলা হয়েছে যে, এক একজনের মধ্যে পৃথক পৃথক গুণ ছিল। যেমন হযরত আবু উবাইদাহ্ (রাঃ) স্বীয় পিতাকে হত্যা করেছিলেন, হযরত আবূ বকর (রাঃ) স্বীয় পুত্র আব্দুর রহমানকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিলেন, হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রাঃ) তাঁর ভ্রাতা উবায়েদ ইবনে উমায়েরকে হত্যা করেছিলেন এবং হযরত উমার (রাঃ), হযরত হামযাহ (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত উবাইদাহ্ ইবনে হারিস (রাঃ) নিজেদের নিকতম আত্মীয় উবাহ্, শায়বাহ্ এবং ওয়ালীদ ইবনে উত্বহূকে হত্যা করেছিলেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এতে এঘটনাটি অন্তর্ভুক্ত যে, যখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বদরী বন্দীদের সম্পর্কে মুসলমানদের সাথে পরামর্শ করেন তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ গ্রহণ করা হোক যাতে মুসলমানদের অর্থিক সংকট দূর হয়ে যায় এবং মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে যুদ্ধাস্ত্রমমূহ সংগৃহীত হতে পারে। আর এর বিনিময়ে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হোক। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হয়তো আল্লাহ্ তা'আলা তাদের অন্তর ইসলামের দিকে ফিরিয়ে দিবেন। তাছাড়া তারা তো আমাদেরই আত্মীয়-স্বজন বটে। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) এর সম্পূর্ণ বিপরীত মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে মুসলমানের যে আত্মীয় মুশরিক তাকে তারই হাতে সমর্পণ করে দিন এবং তাকে নির্দেশ দিন যে, সে যেন তাকে হত্যা করে। আমরা আল্লাহ্ তা'আলাকে দেখাতে চাই যে, আমাদের অন্তরে মুশরিকদের প্রতি কোনই। ভালবাসা নেই। আমার হাতে আমার অমুক আত্মীয়কে সমর্পণ করুন। হযরত আলী (রাঃ)-এর হাতে আকীলকে সঁপে দিন এবং অমুক সাহাবীর হাতে অমুক কাফিরকে সমর্পণ করুন!” এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ যারা নিজেদের অন্তর আল্লাহর শত্রুদের ভালবাসা হতে শূন্য করে এবং নিজেদের মুশরিক আত্মীয়দের প্রতি ভালবাসা পরিত্যাগ করে তারা হলো পূর্ণ ঈমানদার। তাদের অন্তরে ঈমানের মূল গেড়ে বসেছে। তাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা শক্তিশালী করেছেন নিজের পক্ষ হতে রূহ দ্বারা। তাদের দৃষ্টিতে তিনি ঈমানকে সৌন্দর্যময় করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারা আল্লাহর জন্যে তাদের মুশরিক আত্মীয়দের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল বলে এর বিনিময়ে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাদের প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন এবং তাদেরকে এতো বেশী করে দিয়েছেন যে, তারাও তাঁর প্রতি প্রসন্ন হয়েছে। তারাই আল্লাহর দল এবং আল্লাহর দলই হবে সফলকাম। এ দলটি শয়তানী দলটির সম্পূর্ণ বিপরীত।হযরত আবু হাযিম আ’রাজ (রঃ) হযরত যুহরী (রঃ)-এর নিকট লিখেনঃ “জেনে রাখুন যে, মাহাত্ম দুই প্রকার। প্রথম হলো ঐ মাহাত্ম্য যা আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁর ওলীদের হাতে জারী করে থাকেন, যারা সাধারণ লোকদের চোখে লাগেন না এবং যাদের সাধারণ কোন খ্যাতি থাকে না। যাদের বিশেষণ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ) এরূপে প্রকাশ করেছেনঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ভালবাসেন ঐ সব লোককে যারা হয় নামধাম শূন্য, আল্লাহভীরু ও সঙ্কৰ্মশীল। যদি তারা অনুপস্থিত থাকে তবে তাদের সম্পর্কে কোন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় না এবং উপস্থিত থাকলে তাদের কোন মর্যাদা দেয়া হয় না। তাদের অন্তর হলো হিদায়াতের প্রদীপ, যা প্রত্যেক কালো, অন্ধকার ফিত্না হতে বের হয়ে থাকে। এরাই হলো আল্লাহর ঐ আউলিয়া যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ এরাই আল্লাহর দল। জেনে রেখো যে, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হরত হাসান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) দুআ করতেনঃ “হে আল্লাহ! কোন ফাসেক ও ফাজেরের কোন নিয়ামত ও অনুগ্রহ আমার উপর রাখবেন না। কেননা, আমি আমার উপর আপনার নাযিলকৃত অহীতে পাঠ করেছিঃ তুমি পাবে না আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায় যারা ভালবাসে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচারীদেরকে।" (এটা হযরত নাঈম ইবনে হাম্মাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, পূর্বযুগীয় গুরুজনদের মতে এ আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা বাদশাহদের সাথে মেলামেশা করে। (এটা আবু আহমাদ আসকারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-হাশর 59:1

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতেন যে, এটা হলো সূরায়ে বানিন নাযীর। সহীহ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “এটা হলো সূরায়ে হার।” তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সূরাটি বানু নাযীর সম্প্রদায়ের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। সহীহ্ বুখারীর অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “এটা কি সূরায়ে বানী নাযীর।” ১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তআলা খবর দিচ্ছেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিস আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সপ্তম আকাশ ও পৃথিবী এবং ওগুলোর মধ্যে যত কিছু রয়েছে সবাই তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে থাকে। সব কিছুই তার তাসবীহ্ পাঠ করে কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ্ পাঠ বুঝতে পার না। (১৭:৪৪)তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। তিনি তাঁর সমুদয় হুকুম ও আদেশ দানের ব্যাপারে বিজ্ঞানময়। তিনি আহলে কিতাবের কাফিরদেরকে অর্থাৎ বানু নাযীরকে আবাসস্থল হতে বিতাড়িত করেছিলেন। এর সংক্ষিপ্ত ঘটনা এই যে, মদীনায় হিজরত করার পর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মদীনার এই ইয়াহূদীদের সাথে সন্ধি করে নিয়েছিলেন যে, তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করবেন না এবং তারাও তাঁর সাথে যুদ্ধ করবে না। কিন্তু ঐ লোকগুলো এই চুক্তি ভঙ্গ করে দেয় যার কারণে তাদের। উপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়। আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে তাদের উপর বিজয় দান করেন এবং তিনি তাদেরকে এখান হতে বের করে দেন। তারা। যে এখান হতে (মদীনা হতে) বের হবে এটা মুসলমানরা কল্পনাও করেনি। স্বয়ং ইয়াহূদীরাও ধারণা করেনি যে, তাদের সুদৃঢ় দূর্গ বিদ্যমান থাকা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে। কিন্তু যখন তাদের উপর আল্লাহর মার পড়লো তখন তাদের ঐ মযবূত দূর্গগুলো থেকেই গেল, হঠাৎ তাদের উপর এমনভাবে আল্লাহর শাস্তি এসে পড়লো যে, তারা একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে মদীনা হতে বের করে দিলেন। তাদের কেউ কেউ সিরিয়ার কৃষিভূমির দিকে চলে গেল এবং কেউ কেউ গেল খায়বারের দিকে। তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছিল যে, তারা তাদের ধন-সম্পদ ও আসবাবপত্রের যা কিছু উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব তা নিয়ে যেতে পারে। এ জন্যে তারা তাদের নিজেদের হাতে তাদের ঘরবাড়ী ভেঙ্গে দিলো এবং যত কিছু সঙ্গে নিয়ে যেতে পারলো তা নিয়ে গেল আর যা অবশিষ্ট থাকলে তা মুসলমানদের হাতে আসলো।এই ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচারীদের পরিণামের প্রতি লক্ষ্য কর এবং তা হতে শিক্ষা গ্রহণ কর যে, কিভাবে তাদের উপর অকস্মাৎ আল্লাহর আযাব এসে পড়লো এবং দুনিয়াতেও তারা ধ্বংস হয়ে গেল এবং পরকালেও তাদের জন্যে রয়েছে। জাহান্নামের কঠিন শাস্তি। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণনা করেন যে, কুরায়েশ কাফিররা ইবনে উবাই এবং তার আউস ও খাযরাজ গোত্রীয় মুশরিক সঙ্গীদেরকে পত্র লিখলো। এ পত্রটি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বদর প্রান্তর হতে প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই তাদের হস্তগত হয়। পত্রটির বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপঃ “তোমরা আমাদের সাথীকে (রাসূলুল্লাহকে সঃ) তোমাদের ওখানে স্থান দিয়েছে। এখন তোমরা হয় তার সাথে যুদ্ধ করে তাকে বের করে দাও, না হয় আমরাই তোমাদেরকে বের করে দিবো এবং আমাদের সমস্ত সেনাবাহিনী নিয়ে গিয়ে তোমাদেরকে আক্রমণ করবে। অতঃপর তোমাদের সকল যোদ্ধা ও বীরপুরুষকে হত্যা করে ফেলবো এবং তোমাদের নারী ও কন্যাদেরকে দাসী বানিয়ে নিবো। আল্লাহর শপথ! এ কাজ আমরা অবশ্যই করবে। সুতরাং তোমরা চিন্তা-ভাবনা করে দেখো!”আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই এবং তার মূর্তিপূজক সঙ্গীরা এ পত্র পেয়ে পরস্পর পরামর্শ করলো এবং গোপনীয়ভাবে সর্বসম্মতিক্রমে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে। যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। এ খবর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কর্ণগোচর হলে তিনি স্বয়ং তাদের নিকট গমন করেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “আমি অবগত হয়েছি যে, কুরায়েশদের পত্র তোমাদের হস্তগত হয়েছে এবং পত্রের মর্মানুযায়ী তোমরা তোমাদের মৃত্যুর আসবাব-পত্র নিজেদেরই হাতে তৈরী করতে শুরু করেছো। তোমরা নিজেদের হাতে তোমাদের সন্তানদেরকে ও ভ্রাতাদেরকে হত্যা করার ইচ্ছা করছো। আমি আর একবার তোমাদেরকে সুযোগে দিচ্ছি যে, তোমরা চিন্তা-ভাবনা করে দেখে এই অসৎ সংকল্প হতে বিরত থাকো।”রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ উপদেশ তাদের উপর ক্রিয়াশীল হলো এবং তারা নিজ নিজ জায়গায় চলে গেল। কিন্তু কুরায়েশরা বদরের যুদ্ধ হতে ফারেগ হয়ে আবার পত্র লিখলো এবং পূর্বের মতই হুমকি দিলো ও নিজেদের শক্তি, সংখ্যা ও দুর্ভেদ্য দূর্গের কথা স্মরণ করিয়ে দিলো। এর ফলে মদীনার ঐ লোকগুলো আবার যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করলো। বানু নাযীর গোত্র এখন পরিষ্কারভাবে চুক্তি ভঙ্গের কথা ঘোষণা করলো। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে লোক পাঠিয়ে তাঁকে জানিয়ে দিলো যে, তিনি যেন ত্রিশজন লোকসহ তাদের দিকে অগ্রসর হন এবং তারাও তাদের ত্রিশজন পণ্ডিত লোককে পাঠিয়ে দিচ্ছে। উভয় দল এক জায়গায় মিলিত হয়ে পরস্পর আলাপ-আলোচনা করবে। যদি তাদের এ লোকগুলো তাঁকে সত্যবাদী রূপে মেনে নেয় এবং ঈমান আনয়ন করে তবে তারাও তার সাথে রয়েছে। তাদের এ চুক্তি ভঙ্গের কারণে পর দিন সকালে রসূলুল্লাহ্ (সঃ) স্বীয় সৈন্যবাহিনী নিয়ে গিয়ে তাদেরকে অবরোধ করেন এবং বলেনঃ “তোমরা যদি আবার নতুনভাবে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর কর তবে তো ভাল কথা, অন্যথায় তোমাদের জন্যে কোন নিরাপত্তা নেই।” তারা তাঁর এ প্রস্তাব প্রকাশ্যভাবে প্রত্যাখ্যান করলো এবং যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেল। সুতরাং সারা দিন ধরে যুদ্ধ চললো। পরদিন। প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বানু নাযীরকে উক্ত অবস্থাতেই ছেড়ে দিয়ে বানু কুরাইযার নিকট সেনাবাহিনীসহ গমন করলেন। তাদেরকেও তিনি নতুনভাবে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হবার আহ্বান জানান। তারা তা মেনে নেয় এবং তাদের সাথে সন্ধি হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান হতে ফারেগ হয়ে পুনরায় বানু নাযীরের নিকট গমন করেন। আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অবশেষে তারা পরাজিত হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের মদীনা ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দেন এবং বলেনঃ “তোমরা উট বোঝাই করে যত আসবাব-পত্র নিয়ে যেতে পার নিয়ে যাও।” সুতরাং তারা ঘর-বাড়ীর আসবাব-পত্র এমন কি দরজা ও কাঠগুলোও উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে সেখান হতে বিদায় গ্রহণ করে। তাদের খর্জুর-বৃক্ষগুলো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর জন্যে বিশিষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ্ তা'আলা এগুলো তাকেই দিয়ে দেন। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তাদের (ইয়াহুদীদের) নিকট হতে তাঁর রাসূল (সঃ)-কে যে ফায় দিয়েছেন, তার জন্যে তোমরা অশ্ব কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি।” (৫৯:৬) কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এর অধিকাংশই মুহাজিরদেরকে দিয়ে দেন। আনসারদের মধ্যে শুধু দু’জন অভাবগ্রস্তকে অংশ দেন। এ ছাড়া সবই তিনি মুহাজিরদের মধ্যে বন্টন করেন। যা বাকী থাকে ওটাই ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাদকা যা বানু ফাতেমার হাতে এসেছিল।অবশ্যই আমরা সংক্ষেপে গাওয়ায়ে বানী নাযীরের ঘটনা বর্ণনা করবে এবং এজন্যে আল্লাহরই নিকট আমরা সহায্য প্রার্থনা করছি।আসহাবে মাগাযী ওয়াস সিয়ার এ যুদ্ধের কারণ যা বর্ণনা করেছেন তা এই যে, মুশরিকরা প্রতারণা করে বি’রে মাউনাহ্ নাক স্থানে সাহাবীদেরকে শহীদ করে দেয় যারা সংখ্যায় সত্তরজন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে হযরত আমর ইবনে উমাইয়া যামারী (রাঃ) নামক সাহাবী কোন রকমে রক্ষা পেয়ে পলায়ন করেন এবং মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। পথে সুযোগে পেয়ে তিনি বানু আমির গোত্রের দু’জন লোককে হত্যা করে ফেলেন, অথচ এ গোত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছিলেন। কিন্তু হযরত আমির (রাঃ)-এর এ খবর জানা ছিল না। মদীনায় পৌছে যখন তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সামনে ঘটনাটি বর্ণনা করেন তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি তাদেরকে হত্যা করে ফেলেছো? তাহলে তো এখন তাদের ওয়ারিশদেরকে রক্তপণ প্রদান করা আমার অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।” বানু নাযীর ও বানু আমিরের মধ্যেও পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সন্ধি ছিল। এজন্যেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বানু নাযীরের নিকট গমন করলেন এ উদ্দেশ্যে যে, রক্তপণের তারা কিছু আদায় করবে এবং তিনি কিছু আদায় করবেন আর এভাবে বানু আমীরকে সন্তুষ্ট করবেন। বানু নাযীর গোত্রের বস্তিটি মদীনার পূর্ব দিকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সেখানে পৌঁছলে তারা তাকে বললোঃ “হে আবুল কাসিম (সঃ)! হ্যাঁ, আমরা এ জন্যে প্রস্তুত আছি। এখনই আমরা আমাদের অংশ মুতাবিক সম্পদসহ আপনার খিদমতে হাযির হচ্ছি।” অতঃপর তারা তার নিকট হতে সরে গিয়ে পরস্পর পরামর্শ করলোঃ “এর চেয়ে বড় সুযোগে কি আর পাওয়া যাবে? এখন তিনি আমাদের হাতের মুঠোর মধ্যে রয়েছেন। এসো তাকে আমরা শেষ করে (হত্যা করে) ফেলি।” তারা পরামর্শক্রমে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, যে দেয়াল ঘেঁষে তিনি বসে আছেন ঐ ঘরের উপর কেউ চড়ে যাবে এবং সেখান হতে সে তার উপর একটি বড় পাথর নিক্ষেপ করবে। এতেই তাঁর জীবনলীলা শেষ হয়ে যাবে।আমর ইবনে জাহাশ ইবনে কা'ব এই কাজে নিযুক্ত হলো। অতঃপর কার্য সাধনের উদ্দেশ্যে সে ছাদের উপর আরোহণ করলো। ইতিমধ্যে আল্লাহ তা'আলা হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে স্বীয় নবী (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে নির্দেশ দিলেন। যে, তিনি যেন সেখান হতে চলে যান। সুতরাং তিনি তৎক্ষণাৎ সেখান হতে উঠে চলে গেলেন, ফলে ঐ নরাধম তার উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হলো। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবী ছিলেন। যেমন হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) প্রমুখ। তিনি সেখান হতে সরাসরি মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। আর ওদিকে যেসব সাহাবী তাঁর সাথে ছিলেন না এবং মদীনাতেই তাঁর জন্যে অপেক্ষমান ছিলেন, তাঁরা তাঁর বিলম্ব দেখে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং তার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু একটি লোকের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন যে, তিনি মদীনায় পৌছে গেছেন। সুতরাং তাঁরা ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর বিলম্বের কারণ জিজ্ঞেস করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘটনাটি সবিস্তারে বর্ণনা করেন এবং তাঁদেরকে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন।সহাবীগণ তৎক্ষণাৎ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান এবং আল্লাহর পথে বেরিয়ে পড়েন। ইয়াহূদীরা মুসলিম সেনাবাহিনীকে দেখে তাদের দূর্গের ফটক বন্ধ করে দিয়ে তথায় আশ্রয় গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে অবরোধ করেন এবং তাদের আশে-পাশের খেজুর বৃক্ষগুলো কেটে ফেলার ও জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। তখন ইয়াহুদীরা চীৎকার করে বলতে লাগলো যে, এটা হচ্ছে কি? যিনি অন্যদেরকে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করেন এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে মন্দ বলেন তিনি এটা কি করতে শুরু করলেন? সুতরাং একদিকে তো তাদের এই খেজুর বৃক্ষ কেটে ফেলার দুঃখ এবং অপরদিকে সাহায্য আসার যে কথা ছিল সেদিক হতে নৈরাশ্য, এ দু'টো বিষয় তাদের কোমর একেবারে ভেঙ্গ দিলো। সাহায্যের ঘটনাটি এই যে, বানু আউফ ইবনে খাযরাজের গোত্রটি যার মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালল, ওয়ালীআহ, মালিক ইবনে ককিল, সুওয়ায়েদ, আ'মাস প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ছিল, তারা বানী নাযীর গোত্রকে বলে পাঠিয়েছিলঃ “তোমরা মুকাবিলায় স্থির ও অটল থাকো, দূর্গ মুসলমানদের হাতে ছেড়ে দিয়ো না এবং আত্মসমর্পণ করো না, আমরা তোমাদের সাহায্যার্থে রয়েছি। তোমাদের শত্রু আমাদেরও শক্র। আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। তোমরা যুদ্ধের জন্যে বের হলে আমরাও বের হবো।” কিন্তু তখন পর্যন্ত তাদের ঐ ওয়াদা পূর্ণ হয়নি। তারা ইয়াহুদীদের সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসেনি। এদিকে এই বানী নাযীর গোত্র ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট আবেদন করলো যে, তিনি যেন তাদের প্রাণ রক্ষা করেন। তারা মদীনা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু তারা তাদের ধন-সম্পদ ও আসবাবপত্রের যা কিছু তাদের উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে যেতে পারবে তা যেন তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাদের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং তারা তাদের আবাসভূমি ছেড়ে চলে যায়। যাবার সময় তারা তাদের ঘরের দরজাগুলো পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলে দিয়ে এগুলো সাথে নিয়ে যায় এবং ঘরগুলোও ভেঙ্গে ফেলে। এগুলো নিয়ে গিয়ে তারা সিরিয়া ও খায়বারে বসতি স্থাপন করে। তাদের অবশিষ্ট মালগুলো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর জন্যে খাস হয়ে যায় যে, তিনি ইচ্ছামত ওগুলো খরচ করতে পারেন। ওগুলো তিনি ঐ সব লোকের মধ্যে বন্টন করে দেন যাঁরা প্রথম দিকে হিজরত করেছিলেন। আনসারদের মাত্র দু’জন দরিদ্র লোককে তিনি কিছু অংশ দেন। তাঁরা হলেন হযরত সাহল ইবনে হানীফ (রাঃ) ও হযরত সাম্মাক ইবনে খারশাহ (রাঃ)। বানু নাযীর গোত্রের মাত্র দু’জন লোক মুসলমান হয় যাদের ধন-সম্পদ তাদের কাছেই থেকে যায়। একজন হলো ইয়ামীন ইবনে আমর ইবনে কা'ব (রাঃ), যে আমর ইবনে জাহ্হাশের চাচাতো ভাই ছিল। যে ছিল ঐ আমর যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে পাথর দ্বারা হত্যা করার ঘৃণ্য সংকল্প করেছিল। দ্বিতীয়জন হলো সা’দ ইবনে অহাব (রাঃ)।একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত ইয়ামীন (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে ইয়ামীন (রাঃ)! তোমার ঐ চাচাতো ভাইটিকে দেখো, সে আমার সাথে কি দুর্ব্যবহারই না করেছিল এবং আমার ক্ষতি সাধনের জন্যে কি ঘণ্য ষড়যন্ত্রেই না। লিপ্ত হয়েছিল!” তাঁর একথা শুনে হযরত ইয়ামীন (রাঃ) একটি লোকের মাধ্যমে তাকে হত্যা করেন। সূরায়ে হাশর বানু নাযীরের এই ঘটনা বর্ণনায় অবতীর্ণ হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “হাশরের ভূমি হলো সিরিয়া দেশ। এ ব্যাপারে যদি কারো সন্দেহ থাকে তবে যেন সে (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন ঐ ইয়াহূদীদেরকে বলেনঃ “তোমরা এখান হতে বেরিয়ে যাও।” তখন তারা বলেঃ “আমরা কোথায় যাবো?” উত্তরে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “হাশরের ভূমির দিকে।”হযরত হাসান (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন বানু নাযীরকে নির্বাসন দেন তখন বলেনঃ “এটা হলো প্রথম হার এবং আমি এর পিছনে পিছনে রয়েছি।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বানু নাযীরের ঐ দূর্গগুলোর অবরোধ মাত্র ছয়দিন পর্যন্ত ছিল। দূর্গাগুলোর দৃঢ়তা, ইয়াহূদীদের সংখ্যাধিক্য, মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ও গোপন চক্রান্ত ইত্যাদি দেখে অবরোধকারী মুসলমানদের এটা কল্পনাও ছিল না যে, তারা এতো তাড়াতাড়ি সব ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে। আর ইয়হূদীরাও গর্বিত ছিল যে, তাদের দূর্গগুলো সবদিক দিয়েই সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য। সুতরাং তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে অবশ্যই রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহর শাস্তি এমন এক দিক হতে আসলো যা ছিল তাদের ধারণাতীত। আল্লাহ্ তা'আলার নীতি এটাই যে, চক্রান্তকারীরা তাদের চক্রান্তের মধ্যেই থাকে, এমতাবস্থায় তাদের অজান্তে আকস্মিকভাবে তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। তাদের অন্তরে ত্রাসের সঞ্চার হয়। আর ত্রাসের সঞ্চার হবেই না বা কেন? তাদেরকে অররোধকারী ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে প্রভাব দান করা হয়েছিল। তাঁর নাম শুনে শত্রুদের অন্তর এক মাসের পথের ব্যবধান হতে কেঁপে উঠতো। তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক! ইয়াহূদীরা তাদের নিজেদের হাতে তাদের ঘর-বাড়ীগুলো ধ্বংস করতে শুরু করে। ছাদের কাঠ ও ঘরের দরজাগুলো নিয়ে যাবার জন্যে ভেঙ্গে ফেলতে থাকে। মুমিনদের হাতেও ওগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাই আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ অতএব, হে চক্ষুষ্মন ব্যক্তিরা! তোমরা এটা হতে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ কর।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি ঐ ইয়াহুদীদের ভাগ্যে নির্বাসন লিপিবদ্ধ না থাকতো এবং আল্লাহ তাদের নির্বাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না থাকতেন তবে দুনিয়ায় তিনি তাদেরকে আরো কঠিন শাস্তি দিতেন। তাদেরকে হত্যা করা হতো ও বন্দী করা হতো। অতঃপর তাদের জন্যে পরকালে রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি।বানু নাযীরের এ যুদ্ধ বদর যুদ্ধের ছয় মাস পরে সংঘটিত হয়েছিল। উট বোঝাই করে যত মাল তারা নিয়ে যেতে পারতো তা নিয়ে যাবার অনুমতি তাদেরকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে যাবার অনুমতি তাদেরকে দেয়া হয়নি। তারা ছিল ঐ গোত্রের লোক যাদেরকে ইতিপূর্বে কখনো নির্বাসন দেয়া হয়নি। হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো বানী নাযীরের এই ঘটনা সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়।শব্দের অর্থ ‘হত্যা’ এবং ধ্বংসও করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রতি তিনজনকে একটি করে উট এবং একটি করে মশক দিয়েছিলেন। এই ফায়সালার পরেও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত মাসলামা (রাঃ)-কে তাদের নিকট পাঠিয়ে দেন এবং তাদেরকে অনুমতি প্রদান করেন যে, তারা যেন তিন দিনের মধ্যে নিজেদের আসবাব-পত্র ঠিকঠাক করে নিয়ে সেখান হতে প্রস্থান করে। এই পার্থিব শাস্তির পরেই পারলৌকিক শাস্তিরও বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সেখানেও তাদের জন্যে জাহান্নামের আগুন অবধারিত রয়েছে। তাদের এই দুর্গতির প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং একদিক দিয়ে তারা সমস্ত নবীকেই অস্বীকার ও অবিশ্বাস করেছে। কেননা, প্রত্যেক নবীই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। ঐ লোকগুলো তাকে পুরোপুরিভাবে চিনতো ও জানতো। এমনকি পিতা তার পুত্রকে যেমন চিনে তার চেয়েও অধিক তারা শেষ নবী (সঃ)-কে চিনতো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও শুধু হিংসার কারণেই তাকে তারা মানতো না। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধাচরণে তারা উঠে পড়ে লেগে যায়। আর প্রকাশ্য ব্যাপার এই যে, আল্লাহ্ তা'আলাও স্বীয় বিরুদ্ধাচারীদের উপর কঠিন শাস্তি অবতীর্ণ করে থাকেন।(আরবী) বলা হয় ভাল খেজুরের গাছকে। কারো কারো উক্তি মতে আজওয়াহ্ ও বিরনী এই প্রকার খেজুরগুলো লীনাহ্-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। কেউ কেউ বলেন যে, শুধু আযওয়াহ লীনাহ্-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। আবার কারো কারো মতে সর্বপ্রকারের খেজুরই এর অন্তর্ভুক্ত। বুওয়াইরাহ্ও এর অন্তর্ভুক্ত। ইয়াহূদীরা যে তিরস্কারের ছলে বলেছিল যে, তাদের খেজুরের গাছগুলো কাটিয়ে দিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের উক্তির বিপরীত কাজ করতঃ ভূ-পৃষ্ঠে কেন বিপর্যয় সৃষ্টি করছেন? এটা তাদের ঐ প্রশ্নেরই জবাব যে, যা কিছু হচ্ছে সবই প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে তার শত্রুদেরকে লাঞ্ছিত ও অকৃতকার্য করে দেয়ার লক্ষ্যেই হচ্ছে। যেসব গাছ বাকী রেখে দেয়া হচ্ছে সেটাও তাঁরঅনুমতিক্রমেই হচ্ছে এবং যেগুলো কাটিয়ে ফেলা হচ্ছে সেটাও যৌক্তিকতার সাথেই হচ্ছে।এটাও বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ একে অপরকে ঐ গাছগুলো কেটে ফেলতে নিষেধ করছিলেন এই কারণে যে, শেষে তো ওগুলো গানীমাত হিসেবে মুসলমানরাই লাভ করবেন, সুতরাং ওগুলো কেটে ফেলে লাভ কি? তখন আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন যে, বাধাদানকারীরাও একদিকে সত্যের উপর রয়েছে এবং কর্তনকারীরাও সত্যের উপর রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো মুসলমানদের উপকার সাধন করা এবং তাদের উদ্দেশ্য হলো কাফিরদেরকে রাগান্বিত করে তোলা এবং তাদের দুষ্কার্যের স্বাদ গ্রহণ করানো। এটাও এদের উদ্দেশ্য যে, এর ফলে এই শত্রুরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে এবং এরপর যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে যাবে, তখন তাদের মন্দ কার্যের শাস্তি হিসেবে তাদেরকে তরবারী দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করে দেয়া হবে।সাহাবীগণ এ কাজ তো করলেন বটে, কিন্তু পরক্ষণেই ভয় পেলেন যে, না জানি হয়তো ঐ খর্জুর বৃক্ষগুলো কেটে ফেলা অথবা বাকী রেখে দেয়ার কারণে তাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। তাই তারা এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আল্লাহ্ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ দু'টোতেই প্রতিদান বা সওয়াব রয়েছে, কর্তন করার মধ্যেও এবং বাকী রেখে দেয়ার মধ্যেও। কোন কোন রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, কেটে ফেলা এবং জ্বালিয়ে দেয়া। উভয়েরই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।ঐ সময় বানু কুরাইযা ইয়াহুদীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছিলেন এবং তাদেরকে মদীনাতেই অবস্থানের অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তারাও যখন মুকাবিলায় নেমে পড়ে তখন তাদের মধ্যে যারা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তাদেরকে হত্যা করা হয় এবং তাদের নারীরা, শিশুরা ও তাদের সম্পদগুলো মুসলমানদের মধ্যে বন্টিত হয়। হ্যাঁ, তবে তাদের মধ্যে যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে। হাযির হয়ে ঈমান আনয়ন করে তারা রক্ষা পায়। অতঃপর মদীনা হতে সমস্ত উয়াহূদীকে বের করে দেয়া হয়। বানী কাইনুকাকেও, যাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) ছিলেন এবং বানী হারিসাকেও। সমস্ত ইয়াহদীকে নির্বাসন দেয়া হয়। এই সমুদয় ঘটনা আরব কবিরা তাঁদের কবিতার মধ্যে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন যা সীরাতে ইবনে ইসহাকে বর্ণিত হয়েছে। ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর মতে এটা উহুদ ও বি’রে মাউনার পরবর্তী ঘটনা এবং উরওয়া (রঃ)-এর মতে এ ঘটনাটি বদর যুদ্ধের ছয় মাস পরে সংঘটিত হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-হাশর 59:2

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতেন যে, এটা হলো সূরায়ে বানিন নাযীর। সহীহ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “এটা হলো সূরায়ে হার।” তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সূরাটি বানু নাযীর সম্প্রদায়ের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। সহীহ্ বুখারীর অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “এটা কি সূরায়ে বানী নাযীর।” ১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তআলা খবর দিচ্ছেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিস আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সপ্তম আকাশ ও পৃথিবী এবং ওগুলোর মধ্যে যত কিছু রয়েছে সবাই তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে থাকে। সব কিছুই তার তাসবীহ্ পাঠ করে কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ্ পাঠ বুঝতে পার না। (১৭:৪৪)তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। তিনি তাঁর সমুদয় হুকুম ও আদেশ দানের ব্যাপারে বিজ্ঞানময়। তিনি আহলে কিতাবের কাফিরদেরকে অর্থাৎ বানু নাযীরকে আবাসস্থল হতে বিতাড়িত করেছিলেন। এর সংক্ষিপ্ত ঘটনা এই যে, মদীনায় হিজরত করার পর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মদীনার এই ইয়াহূদীদের সাথে সন্ধি করে নিয়েছিলেন যে, তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করবেন না এবং তারাও তাঁর সাথে যুদ্ধ করবে না। কিন্তু ঐ লোকগুলো এই চুক্তি ভঙ্গ করে দেয় যার কারণে তাদের। উপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়। আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে তাদের উপর বিজয় দান করেন এবং তিনি তাদেরকে এখান হতে বের করে দেন। তারা। যে এখান হতে (মদীনা হতে) বের হবে এটা মুসলমানরা কল্পনাও করেনি। স্বয়ং ইয়াহূদীরাও ধারণা করেনি যে, তাদের সুদৃঢ় দূর্গ বিদ্যমান থাকা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে। কিন্তু যখন তাদের উপর আল্লাহর মার পড়লো তখন তাদের ঐ মযবূত দূর্গগুলো থেকেই গেল, হঠাৎ তাদের উপর এমনভাবে আল্লাহর শাস্তি এসে পড়লো যে, তারা একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে মদীনা হতে বের করে দিলেন। তাদের কেউ কেউ সিরিয়ার কৃষিভূমির দিকে চলে গেল এবং কেউ কেউ গেল খায়বারের দিকে। তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছিল যে, তারা তাদের ধন-সম্পদ ও আসবাবপত্রের যা কিছু উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব তা নিয়ে যেতে পারে। এ জন্যে তারা তাদের নিজেদের হাতে তাদের ঘরবাড়ী ভেঙ্গে দিলো এবং যত কিছু সঙ্গে নিয়ে যেতে পারলো তা নিয়ে গেল আর যা অবশিষ্ট থাকলে তা মুসলমানদের হাতে আসলো।এই ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচারীদের পরিণামের প্রতি লক্ষ্য কর এবং তা হতে শিক্ষা গ্রহণ কর যে, কিভাবে তাদের উপর অকস্মাৎ আল্লাহর আযাব এসে পড়লো এবং দুনিয়াতেও তারা ধ্বংস হয়ে গেল এবং পরকালেও তাদের জন্যে রয়েছে। জাহান্নামের কঠিন শাস্তি। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণনা করেন যে, কুরায়েশ কাফিররা ইবনে উবাই এবং তার আউস ও খাযরাজ গোত্রীয় মুশরিক সঙ্গীদেরকে পত্র লিখলো। এ পত্রটি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বদর প্রান্তর হতে প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই তাদের হস্তগত হয়। পত্রটির বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপঃ “তোমরা আমাদের সাথীকে (রাসূলুল্লাহকে সঃ) তোমাদের ওখানে স্থান দিয়েছে। এখন তোমরা হয় তার সাথে যুদ্ধ করে তাকে বের করে দাও, না হয় আমরাই তোমাদেরকে বের করে দিবো এবং আমাদের সমস্ত সেনাবাহিনী নিয়ে গিয়ে তোমাদেরকে আক্রমণ করবে। অতঃপর তোমাদের সকল যোদ্ধা ও বীরপুরুষকে হত্যা করে ফেলবো এবং তোমাদের নারী ও কন্যাদেরকে দাসী বানিয়ে নিবো। আল্লাহর শপথ! এ কাজ আমরা অবশ্যই করবে। সুতরাং তোমরা চিন্তা-ভাবনা করে দেখো!”আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই এবং তার মূর্তিপূজক সঙ্গীরা এ পত্র পেয়ে পরস্পর পরামর্শ করলো এবং গোপনীয়ভাবে সর্বসম্মতিক্রমে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে। যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। এ খবর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কর্ণগোচর হলে তিনি স্বয়ং তাদের নিকট গমন করেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “আমি অবগত হয়েছি যে, কুরায়েশদের পত্র তোমাদের হস্তগত হয়েছে এবং পত্রের মর্মানুযায়ী তোমরা তোমাদের মৃত্যুর আসবাব-পত্র নিজেদেরই হাতে তৈরী করতে শুরু করেছো। তোমরা নিজেদের হাতে তোমাদের সন্তানদেরকে ও ভ্রাতাদেরকে হত্যা করার ইচ্ছা করছো। আমি আর একবার তোমাদেরকে সুযোগে দিচ্ছি যে, তোমরা চিন্তা-ভাবনা করে দেখে এই অসৎ সংকল্প হতে বিরত থাকো।”রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ উপদেশ তাদের উপর ক্রিয়াশীল হলো এবং তারা নিজ নিজ জায়গায় চলে গেল। কিন্তু কুরায়েশরা বদরের যুদ্ধ হতে ফারেগ হয়ে আবার পত্র লিখলো এবং পূর্বের মতই হুমকি দিলো ও নিজেদের শক্তি, সংখ্যা ও দুর্ভেদ্য দূর্গের কথা স্মরণ করিয়ে দিলো। এর ফলে মদীনার ঐ লোকগুলো আবার যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করলো। বানু নাযীর গোত্র এখন পরিষ্কারভাবে চুক্তি ভঙ্গের কথা ঘোষণা করলো। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে লোক পাঠিয়ে তাঁকে জানিয়ে দিলো যে, তিনি যেন ত্রিশজন লোকসহ তাদের দিকে অগ্রসর হন এবং তারাও তাদের ত্রিশজন পণ্ডিত লোককে পাঠিয়ে দিচ্ছে। উভয় দল এক জায়গায় মিলিত হয়ে পরস্পর আলাপ-আলোচনা করবে। যদি তাদের এ লোকগুলো তাঁকে সত্যবাদী রূপে মেনে নেয় এবং ঈমান আনয়ন করে তবে তারাও তার সাথে রয়েছে। তাদের এ চুক্তি ভঙ্গের কারণে পর দিন সকালে রসূলুল্লাহ্ (সঃ) স্বীয় সৈন্যবাহিনী নিয়ে গিয়ে তাদেরকে অবরোধ করেন এবং বলেনঃ “তোমরা যদি আবার নতুনভাবে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর কর তবে তো ভাল কথা, অন্যথায় তোমাদের জন্যে কোন নিরাপত্তা নেই।” তারা তাঁর এ প্রস্তাব প্রকাশ্যভাবে প্রত্যাখ্যান করলো এবং যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেল। সুতরাং সারা দিন ধরে যুদ্ধ চললো। পরদিন। প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বানু নাযীরকে উক্ত অবস্থাতেই ছেড়ে দিয়ে বানু কুরাইযার নিকট সেনাবাহিনীসহ গমন করলেন। তাদেরকেও তিনি নতুনভাবে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হবার আহ্বান জানান। তারা তা মেনে নেয় এবং তাদের সাথে সন্ধি হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান হতে ফারেগ হয়ে পুনরায় বানু নাযীরের নিকট গমন করেন। আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অবশেষে তারা পরাজিত হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের মদীনা ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দেন এবং বলেনঃ “তোমরা উট বোঝাই করে যত আসবাব-পত্র নিয়ে যেতে পার নিয়ে যাও।” সুতরাং তারা ঘর-বাড়ীর আসবাব-পত্র এমন কি দরজা ও কাঠগুলোও উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে সেখান হতে বিদায় গ্রহণ করে। তাদের খর্জুর-বৃক্ষগুলো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর জন্যে বিশিষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ্ তা'আলা এগুলো তাকেই দিয়ে দেন। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তাদের (ইয়াহুদীদের) নিকট হতে তাঁর রাসূল (সঃ)-কে যে ফায় দিয়েছেন, তার জন্যে তোমরা অশ্ব কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি।” (৫৯:৬) কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এর অধিকাংশই মুহাজিরদেরকে দিয়ে দেন। আনসারদের মধ্যে শুধু দু’জন অভাবগ্রস্তকে অংশ দেন। এ ছাড়া সবই তিনি মুহাজিরদের মধ্যে বন্টন করেন। যা বাকী থাকে ওটাই ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাদকা যা বানু ফাতেমার হাতে এসেছিল।অবশ্যই আমরা সংক্ষেপে গাওয়ায়ে বানী নাযীরের ঘটনা বর্ণনা করবে এবং এজন্যে আল্লাহরই নিকট আমরা সহায্য প্রার্থনা করছি।আসহাবে মাগাযী ওয়াস সিয়ার এ যুদ্ধের কারণ যা বর্ণনা করেছেন তা এই যে, মুশরিকরা প্রতারণা করে বি’রে মাউনাহ্ নাক স্থানে সাহাবীদেরকে শহীদ করে দেয় যারা সংখ্যায় সত্তরজন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে হযরত আমর ইবনে উমাইয়া যামারী (রাঃ) নামক সাহাবী কোন রকমে রক্ষা পেয়ে পলায়ন করেন এবং মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। পথে সুযোগে পেয়ে তিনি বানু আমির গোত্রের দু’জন লোককে হত্যা করে ফেলেন, অথচ এ গোত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছিলেন। কিন্তু হযরত আমির (রাঃ)-এর এ খবর জানা ছিল না। মদীনায় পৌছে যখন তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সামনে ঘটনাটি বর্ণনা করেন তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি তাদেরকে হত্যা করে ফেলেছো? তাহলে তো এখন তাদের ওয়ারিশদেরকে রক্তপণ প্রদান করা আমার অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।” বানু নাযীর ও বানু আমিরের মধ্যেও পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সন্ধি ছিল। এজন্যেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বানু নাযীরের নিকট গমন করলেন এ উদ্দেশ্যে যে, রক্তপণের তারা কিছু আদায় করবে এবং তিনি কিছু আদায় করবেন আর এভাবে বানু আমীরকে সন্তুষ্ট করবেন। বানু নাযীর গোত্রের বস্তিটি মদীনার পূর্ব দিকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সেখানে পৌঁছলে তারা তাকে বললোঃ “হে আবুল কাসিম (সঃ)! হ্যাঁ, আমরা এ জন্যে প্রস্তুত আছি। এখনই আমরা আমাদের অংশ মুতাবিক সম্পদসহ আপনার খিদমতে হাযির হচ্ছি।” অতঃপর তারা তার নিকট হতে সরে গিয়ে পরস্পর পরামর্শ করলোঃ “এর চেয়ে বড় সুযোগে কি আর পাওয়া যাবে? এখন তিনি আমাদের হাতের মুঠোর মধ্যে রয়েছেন। এসো তাকে আমরা শেষ করে (হত্যা করে) ফেলি।” তারা পরামর্শক্রমে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, যে দেয়াল ঘেঁষে তিনি বসে আছেন ঐ ঘরের উপর কেউ চড়ে যাবে এবং সেখান হতে সে তার উপর একটি বড় পাথর নিক্ষেপ করবে। এতেই তাঁর জীবনলীলা শেষ হয়ে যাবে।আমর ইবনে জাহাশ ইবনে কা'ব এই কাজে নিযুক্ত হলো। অতঃপর কার্য সাধনের উদ্দেশ্যে সে ছাদের উপর আরোহণ করলো। ইতিমধ্যে আল্লাহ তা'আলা হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে স্বীয় নবী (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে নির্দেশ দিলেন। যে, তিনি যেন সেখান হতে চলে যান। সুতরাং তিনি তৎক্ষণাৎ সেখান হতে উঠে চলে গেলেন, ফলে ঐ নরাধম তার উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হলো। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবী ছিলেন। যেমন হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) প্রমুখ। তিনি সেখান হতে সরাসরি মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। আর ওদিকে যেসব সাহাবী তাঁর সাথে ছিলেন না এবং মদীনাতেই তাঁর জন্যে অপেক্ষমান ছিলেন, তাঁরা তাঁর বিলম্ব দেখে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং তার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু একটি লোকের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন যে, তিনি মদীনায় পৌছে গেছেন। সুতরাং তাঁরা ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর বিলম্বের কারণ জিজ্ঞেস করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘটনাটি সবিস্তারে বর্ণনা করেন এবং তাঁদেরকে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন।সহাবীগণ তৎক্ষণাৎ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান এবং আল্লাহর পথে বেরিয়ে পড়েন। ইয়াহূদীরা মুসলিম সেনাবাহিনীকে দেখে তাদের দূর্গের ফটক বন্ধ করে দিয়ে তথায় আশ্রয় গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে অবরোধ করেন এবং তাদের আশে-পাশের খেজুর বৃক্ষগুলো কেটে ফেলার ও জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। তখন ইয়াহুদীরা চীৎকার করে বলতে লাগলো যে, এটা হচ্ছে কি? যিনি অন্যদেরকে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করেন এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে মন্দ বলেন তিনি এটা কি করতে শুরু করলেন? সুতরাং একদিকে তো তাদের এই খেজুর বৃক্ষ কেটে ফেলার দুঃখ এবং অপরদিকে সাহায্য আসার যে কথা ছিল সেদিক হতে নৈরাশ্য, এ দু'টো বিষয় তাদের কোমর একেবারে ভেঙ্গ দিলো। সাহায্যের ঘটনাটি এই যে, বানু আউফ ইবনে খাযরাজের গোত্রটি যার মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালল, ওয়ালীআহ, মালিক ইবনে ককিল, সুওয়ায়েদ, আ'মাস প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ছিল, তারা বানী নাযীর গোত্রকে বলে পাঠিয়েছিলঃ “তোমরা মুকাবিলায় স্থির ও অটল থাকো, দূর্গ মুসলমানদের হাতে ছেড়ে দিয়ো না এবং আত্মসমর্পণ করো না, আমরা তোমাদের সাহায্যার্থে রয়েছি। তোমাদের শত্রু আমাদেরও শক্র। আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। তোমরা যুদ্ধের জন্যে বের হলে আমরাও বের হবো।” কিন্তু তখন পর্যন্ত তাদের ঐ ওয়াদা পূর্ণ হয়নি। তারা ইয়াহুদীদের সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসেনি। এদিকে এই বানী নাযীর গোত্র ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট আবেদন করলো যে, তিনি যেন তাদের প্রাণ রক্ষা করেন। তারা মদীনা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু তারা তাদের ধন-সম্পদ ও আসবাবপত্রের যা কিছু তাদের উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে যেতে পারবে তা যেন তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাদের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং তারা তাদের আবাসভূমি ছেড়ে চলে যায়। যাবার সময় তারা তাদের ঘরের দরজাগুলো পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলে দিয়ে এগুলো সাথে নিয়ে যায় এবং ঘরগুলোও ভেঙ্গে ফেলে। এগুলো নিয়ে গিয়ে তারা সিরিয়া ও খায়বারে বসতি স্থাপন করে। তাদের অবশিষ্ট মালগুলো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর জন্যে খাস হয়ে যায় যে, তিনি ইচ্ছামত ওগুলো খরচ করতে পারেন। ওগুলো তিনি ঐ সব লোকের মধ্যে বন্টন করে দেন যাঁরা প্রথম দিকে হিজরত করেছিলেন। আনসারদের মাত্র দু’জন দরিদ্র লোককে তিনি কিছু অংশ দেন। তাঁরা হলেন হযরত সাহল ইবনে হানীফ (রাঃ) ও হযরত সাম্মাক ইবনে খারশাহ (রাঃ)। বানু নাযীর গোত্রের মাত্র দু’জন লোক মুসলমান হয় যাদের ধন-সম্পদ তাদের কাছেই থেকে যায়। একজন হলো ইয়ামীন ইবনে আমর ইবনে কা'ব (রাঃ), যে আমর ইবনে জাহ্হাশের চাচাতো ভাই ছিল। যে ছিল ঐ আমর যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে পাথর দ্বারা হত্যা করার ঘৃণ্য সংকল্প করেছিল। দ্বিতীয়জন হলো সা’দ ইবনে অহাব (রাঃ)।একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত ইয়ামীন (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে ইয়ামীন (রাঃ)! তোমার ঐ চাচাতো ভাইটিকে দেখো, সে আমার সাথে কি দুর্ব্যবহারই না করেছিল এবং আমার ক্ষতি সাধনের জন্যে কি ঘণ্য ষড়যন্ত্রেই না। লিপ্ত হয়েছিল!” তাঁর একথা শুনে হযরত ইয়ামীন (রাঃ) একটি লোকের মাধ্যমে তাকে হত্যা করেন। সূরায়ে হাশর বানু নাযীরের এই ঘটনা বর্ণনায় অবতীর্ণ হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “হাশরের ভূমি হলো সিরিয়া দেশ। এ ব্যাপারে যদি কারো সন্দেহ থাকে তবে যেন সে (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন ঐ ইয়াহূদীদেরকে বলেনঃ “তোমরা এখান হতে বেরিয়ে যাও।” তখন তারা বলেঃ “আমরা কোথায় যাবো?” উত্তরে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “হাশরের ভূমির দিকে।”হযরত হাসান (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন বানু নাযীরকে নির্বাসন দেন তখন বলেনঃ “এটা হলো প্রথম হার এবং আমি এর পিছনে পিছনে রয়েছি।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বানু নাযীরের ঐ দূর্গগুলোর অবরোধ মাত্র ছয়দিন পর্যন্ত ছিল। দূর্গাগুলোর দৃঢ়তা, ইয়াহূদীদের সংখ্যাধিক্য, মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ও গোপন চক্রান্ত ইত্যাদি দেখে অবরোধকারী মুসলমানদের এটা কল্পনাও ছিল না যে, তারা এতো তাড়াতাড়ি সব ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে। আর ইয়হূদীরাও গর্বিত ছিল যে, তাদের দূর্গগুলো সবদিক দিয়েই সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য। সুতরাং তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে অবশ্যই রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহর শাস্তি এমন এক দিক হতে আসলো যা ছিল তাদের ধারণাতীত। আল্লাহ্ তা'আলার নীতি এটাই যে, চক্রান্তকারীরা তাদের চক্রান্তের মধ্যেই থাকে, এমতাবস্থায় তাদের অজান্তে আকস্মিকভাবে তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। তাদের অন্তরে ত্রাসের সঞ্চার হয়। আর ত্রাসের সঞ্চার হবেই না বা কেন? তাদেরকে অররোধকারী ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে প্রভাব দান করা হয়েছিল। তাঁর নাম শুনে শত্রুদের অন্তর এক মাসের পথের ব্যবধান হতে কেঁপে উঠতো। তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক! ইয়াহূদীরা তাদের নিজেদের হাতে তাদের ঘর-বাড়ীগুলো ধ্বংস করতে শুরু করে। ছাদের কাঠ ও ঘরের দরজাগুলো নিয়ে যাবার জন্যে ভেঙ্গে ফেলতে থাকে। মুমিনদের হাতেও ওগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাই আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ অতএব, হে চক্ষুষ্মন ব্যক্তিরা! তোমরা এটা হতে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ কর।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি ঐ ইয়াহুদীদের ভাগ্যে নির্বাসন লিপিবদ্ধ না থাকতো এবং আল্লাহ তাদের নির্বাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না থাকতেন তবে দুনিয়ায় তিনি তাদেরকে আরো কঠিন শাস্তি দিতেন। তাদেরকে হত্যা করা হতো ও বন্দী করা হতো। অতঃপর তাদের জন্যে পরকালে রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি।বানু নাযীরের এ যুদ্ধ বদর যুদ্ধের ছয় মাস পরে সংঘটিত হয়েছিল। উট বোঝাই করে যত মাল তারা নিয়ে যেতে পারতো তা নিয়ে যাবার অনুমতি তাদেরকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে যাবার অনুমতি তাদেরকে দেয়া হয়নি। তারা ছিল ঐ গোত্রের লোক যাদেরকে ইতিপূর্বে কখনো নির্বাসন দেয়া হয়নি। হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো বানী নাযীরের এই ঘটনা সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়।শব্দের অর্থ ‘হত্যা’ এবং ধ্বংসও করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রতি তিনজনকে একটি করে উট এবং একটি করে মশক দিয়েছিলেন। এই ফায়সালার পরেও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত মাসলামা (রাঃ)-কে তাদের নিকট পাঠিয়ে দেন এবং তাদেরকে অনুমতি প্রদান করেন যে, তারা যেন তিন দিনের মধ্যে নিজেদের আসবাব-পত্র ঠিকঠাক করে নিয়ে সেখান হতে প্রস্থান করে। এই পার্থিব শাস্তির পরেই পারলৌকিক শাস্তিরও বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সেখানেও তাদের জন্যে জাহান্নামের আগুন অবধারিত রয়েছে। তাদের এই দুর্গতির প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং একদিক দিয়ে তারা সমস্ত নবীকেই অস্বীকার ও অবিশ্বাস করেছে। কেননা, প্রত্যেক নবীই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। ঐ লোকগুলো তাকে পুরোপুরিভাবে চিনতো ও জানতো। এমনকি পিতা তার পুত্রকে যেমন চিনে তার চেয়েও অধিক তারা শেষ নবী (সঃ)-কে চিনতো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও শুধু হিংসার কারণেই তাকে তারা মানতো না। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধাচরণে তারা উঠে পড়ে লেগে যায়। আর প্রকাশ্য ব্যাপার এই যে, আল্লাহ্ তা'আলাও স্বীয় বিরুদ্ধাচারীদের উপর কঠিন শাস্তি অবতীর্ণ করে থাকেন।(আরবী) বলা হয় ভাল খেজুরের গাছকে। কারো কারো উক্তি মতে আজওয়াহ্ ও বিরনী এই প্রকার খেজুরগুলো লীনাহ্-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। কেউ কেউ বলেন যে, শুধু আযওয়াহ লীনাহ্-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। আবার কারো কারো মতে সর্বপ্রকারের খেজুরই এর অন্তর্ভুক্ত। বুওয়াইরাহ্ও এর অন্তর্ভুক্ত। ইয়াহূদীরা যে তিরস্কারের ছলে বলেছিল যে, তাদের খেজুরের গাছগুলো কাটিয়ে দিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের উক্তির বিপরীত কাজ করতঃ ভূ-পৃষ্ঠে কেন বিপর্যয় সৃষ্টি করছেন? এটা তাদের ঐ প্রশ্নেরই জবাব যে, যা কিছু হচ্ছে সবই প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে তার শত্রুদেরকে লাঞ্ছিত ও অকৃতকার্য করে দেয়ার লক্ষ্যেই হচ্ছে। যেসব গাছ বাকী রেখে দেয়া হচ্ছে সেটাও তাঁরঅনুমতিক্রমেই হচ্ছে এবং যেগুলো কাটিয়ে ফেলা হচ্ছে সেটাও যৌক্তিকতার সাথেই হচ্ছে।এটাও বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ একে অপরকে ঐ গাছগুলো কেটে ফেলতে নিষেধ করছিলেন এই কারণে যে, শেষে তো ওগুলো গানীমাত হিসেবে মুসলমানরাই লাভ করবেন, সুতরাং ওগুলো কেটে ফেলে লাভ কি? তখন আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন যে, বাধাদানকারীরাও একদিকে সত্যের উপর রয়েছে এবং কর্তনকারীরাও সত্যের উপর রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো মুসলমানদের উপকার সাধন করা এবং তাদের উদ্দেশ্য হলো কাফিরদেরকে রাগান্বিত করে তোলা এবং তাদের দুষ্কার্যের স্বাদ গ্রহণ করানো। এটাও এদের উদ্দেশ্য যে, এর ফলে এই শত্রুরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে এবং এরপর যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে যাবে, তখন তাদের মন্দ কার্যের শাস্তি হিসেবে তাদেরকে তরবারী দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করে দেয়া হবে।সাহাবীগণ এ কাজ তো করলেন বটে, কিন্তু পরক্ষণেই ভয় পেলেন যে, না জানি হয়তো ঐ খর্জুর বৃক্ষগুলো কেটে ফেলা অথবা বাকী রেখে দেয়ার কারণে তাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। তাই তারা এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আল্লাহ্ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ দু'টোতেই প্রতিদান বা সওয়াব রয়েছে, কর্তন করার মধ্যেও এবং বাকী রেখে দেয়ার মধ্যেও। কোন কোন রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, কেটে ফেলা এবং জ্বালিয়ে দেয়া। উভয়েরই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।ঐ সময় বানু কুরাইযা ইয়াহুদীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছিলেন এবং তাদেরকে মদীনাতেই অবস্থানের অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তারাও যখন মুকাবিলায় নেমে পড়ে তখন তাদের মধ্যে যারা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তাদেরকে হত্যা করা হয় এবং তাদের নারীরা, শিশুরা ও তাদের সম্পদগুলো মুসলমানদের মধ্যে বন্টিত হয়। হ্যাঁ, তবে তাদের মধ্যে যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে। হাযির হয়ে ঈমান আনয়ন করে তারা রক্ষা পায়। অতঃপর মদীনা হতে সমস্ত উয়াহূদীকে বের করে দেয়া হয়। বানী কাইনুকাকেও, যাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) ছিলেন এবং বানী হারিসাকেও। সমস্ত ইয়াহদীকে নির্বাসন দেয়া হয়। এই সমুদয় ঘটনা আরব কবিরা তাঁদের কবিতার মধ্যে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন যা সীরাতে ইবনে ইসহাকে বর্ণিত হয়েছে। ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর মতে এটা উহুদ ও বি’রে মাউনার পরবর্তী ঘটনা এবং উরওয়া (রঃ)-এর মতে এ ঘটনাটি বদর যুদ্ধের ছয় মাস পরে সংঘটিত হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-হাশর 59:3

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতেন যে, এটা হলো সূরায়ে বানিন নাযীর। সহীহ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “এটা হলো সূরায়ে হার।” তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সূরাটি বানু নাযীর সম্প্রদায়ের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। সহীহ্ বুখারীর অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “এটা কি সূরায়ে বানী নাযীর।” ১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তআলা খবর দিচ্ছেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিস আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সপ্তম আকাশ ও পৃথিবী এবং ওগুলোর মধ্যে যত কিছু রয়েছে সবাই তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে থাকে। সব কিছুই তার তাসবীহ্ পাঠ করে কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ্ পাঠ বুঝতে পার না। (১৭:৪৪)তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। তিনি তাঁর সমুদয় হুকুম ও আদেশ দানের ব্যাপারে বিজ্ঞানময়। তিনি আহলে কিতাবের কাফিরদেরকে অর্থাৎ বানু নাযীরকে আবাসস্থল হতে বিতাড়িত করেছিলেন। এর সংক্ষিপ্ত ঘটনা এই যে, মদীনায় হিজরত করার পর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মদীনার এই ইয়াহূদীদের সাথে সন্ধি করে নিয়েছিলেন যে, তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করবেন না এবং তারাও তাঁর সাথে যুদ্ধ করবে না। কিন্তু ঐ লোকগুলো এই চুক্তি ভঙ্গ করে দেয় যার কারণে তাদের। উপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়। আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে তাদের উপর বিজয় দান করেন এবং তিনি তাদেরকে এখান হতে বের করে দেন। তারা। যে এখান হতে (মদীনা হতে) বের হবে এটা মুসলমানরা কল্পনাও করেনি। স্বয়ং ইয়াহূদীরাও ধারণা করেনি যে, তাদের সুদৃঢ় দূর্গ বিদ্যমান থাকা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে। কিন্তু যখন তাদের উপর আল্লাহর মার পড়লো তখন তাদের ঐ মযবূত দূর্গগুলো থেকেই গেল, হঠাৎ তাদের উপর এমনভাবে আল্লাহর শাস্তি এসে পড়লো যে, তারা একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে মদীনা হতে বের করে দিলেন। তাদের কেউ কেউ সিরিয়ার কৃষিভূমির দিকে চলে গেল এবং কেউ কেউ গেল খায়বারের দিকে। তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছিল যে, তারা তাদের ধন-সম্পদ ও আসবাবপত্রের যা কিছু উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব তা নিয়ে যেতে পারে। এ জন্যে তারা তাদের নিজেদের হাতে তাদের ঘরবাড়ী ভেঙ্গে দিলো এবং যত কিছু সঙ্গে নিয়ে যেতে পারলো তা নিয়ে গেল আর যা অবশিষ্ট থাকলে তা মুসলমানদের হাতে আসলো।এই ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচারীদের পরিণামের প্রতি লক্ষ্য কর এবং তা হতে শিক্ষা গ্রহণ কর যে, কিভাবে তাদের উপর অকস্মাৎ আল্লাহর আযাব এসে পড়লো এবং দুনিয়াতেও তারা ধ্বংস হয়ে গেল এবং পরকালেও তাদের জন্যে রয়েছে। জাহান্নামের কঠিন শাস্তি। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণনা করেন যে, কুরায়েশ কাফিররা ইবনে উবাই এবং তার আউস ও খাযরাজ গোত্রীয় মুশরিক সঙ্গীদেরকে পত্র লিখলো। এ পত্রটি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বদর প্রান্তর হতে প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই তাদের হস্তগত হয়। পত্রটির বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপঃ “তোমরা আমাদের সাথীকে (রাসূলুল্লাহকে সঃ) তোমাদের ওখানে স্থান দিয়েছে। এখন তোমরা হয় তার সাথে যুদ্ধ করে তাকে বের করে দাও, না হয় আমরাই তোমাদেরকে বের করে দিবো এবং আমাদের সমস্ত সেনাবাহিনী নিয়ে গিয়ে তোমাদেরকে আক্রমণ করবে। অতঃপর তোমাদের সকল যোদ্ধা ও বীরপুরুষকে হত্যা করে ফেলবো এবং তোমাদের নারী ও কন্যাদেরকে দাসী বানিয়ে নিবো। আল্লাহর শপথ! এ কাজ আমরা অবশ্যই করবে। সুতরাং তোমরা চিন্তা-ভাবনা করে দেখো!”আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই এবং তার মূর্তিপূজক সঙ্গীরা এ পত্র পেয়ে পরস্পর পরামর্শ করলো এবং গোপনীয়ভাবে সর্বসম্মতিক্রমে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে। যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। এ খবর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কর্ণগোচর হলে তিনি স্বয়ং তাদের নিকট গমন করেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “আমি অবগত হয়েছি যে, কুরায়েশদের পত্র তোমাদের হস্তগত হয়েছে এবং পত্রের মর্মানুযায়ী তোমরা তোমাদের মৃত্যুর আসবাব-পত্র নিজেদেরই হাতে তৈরী করতে শুরু করেছো। তোমরা নিজেদের হাতে তোমাদের সন্তানদেরকে ও ভ্রাতাদেরকে হত্যা করার ইচ্ছা করছো। আমি আর একবার তোমাদেরকে সুযোগে দিচ্ছি যে, তোমরা চিন্তা-ভাবনা করে দেখে এই অসৎ সংকল্প হতে বিরত থাকো।”রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ উপদেশ তাদের উপর ক্রিয়াশীল হলো এবং তারা নিজ নিজ জায়গায় চলে গেল। কিন্তু কুরায়েশরা বদরের যুদ্ধ হতে ফারেগ হয়ে আবার পত্র লিখলো এবং পূর্বের মতই হুমকি দিলো ও নিজেদের শক্তি, সংখ্যা ও দুর্ভেদ্য দূর্গের কথা স্মরণ করিয়ে দিলো। এর ফলে মদীনার ঐ লোকগুলো আবার যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করলো। বানু নাযীর গোত্র এখন পরিষ্কারভাবে চুক্তি ভঙ্গের কথা ঘোষণা করলো। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে লোক পাঠিয়ে তাঁকে জানিয়ে দিলো যে, তিনি যেন ত্রিশজন লোকসহ তাদের দিকে অগ্রসর হন এবং তারাও তাদের ত্রিশজন পণ্ডিত লোককে পাঠিয়ে দিচ্ছে। উভয় দল এক জায়গায় মিলিত হয়ে পরস্পর আলাপ-আলোচনা করবে। যদি তাদের এ লোকগুলো তাঁকে সত্যবাদী রূপে মেনে নেয় এবং ঈমান আনয়ন করে তবে তারাও তার সাথে রয়েছে। তাদের এ চুক্তি ভঙ্গের কারণে পর দিন সকালে রসূলুল্লাহ্ (সঃ) স্বীয় সৈন্যবাহিনী নিয়ে গিয়ে তাদেরকে অবরোধ করেন এবং বলেনঃ “তোমরা যদি আবার নতুনভাবে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর কর তবে তো ভাল কথা, অন্যথায় তোমাদের জন্যে কোন নিরাপত্তা নেই।” তারা তাঁর এ প্রস্তাব প্রকাশ্যভাবে প্রত্যাখ্যান করলো এবং যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেল। সুতরাং সারা দিন ধরে যুদ্ধ চললো। পরদিন। প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বানু নাযীরকে উক্ত অবস্থাতেই ছেড়ে দিয়ে বানু কুরাইযার নিকট সেনাবাহিনীসহ গমন করলেন। তাদেরকেও তিনি নতুনভাবে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হবার আহ্বান জানান। তারা তা মেনে নেয় এবং তাদের সাথে সন্ধি হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান হতে ফারেগ হয়ে পুনরায় বানু নাযীরের নিকট গমন করেন। আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অবশেষে তারা পরাজিত হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের মদীনা ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দেন এবং বলেনঃ “তোমরা উট বোঝাই করে যত আসবাব-পত্র নিয়ে যেতে পার নিয়ে যাও।” সুতরাং তারা ঘর-বাড়ীর আসবাব-পত্র এমন কি দরজা ও কাঠগুলোও উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে সেখান হতে বিদায় গ্রহণ করে। তাদের খর্জুর-বৃক্ষগুলো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর জন্যে বিশিষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ্ তা'আলা এগুলো তাকেই দিয়ে দেন। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তাদের (ইয়াহুদীদের) নিকট হতে তাঁর রাসূল (সঃ)-কে যে ফায় দিয়েছেন, তার জন্যে তোমরা অশ্ব কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি।” (৫৯:৬) কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এর অধিকাংশই মুহাজিরদেরকে দিয়ে দেন। আনসারদের মধ্যে শুধু দু’জন অভাবগ্রস্তকে অংশ দেন। এ ছাড়া সবই তিনি মুহাজিরদের মধ্যে বন্টন করেন। যা বাকী থাকে ওটাই ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাদকা যা বানু ফাতেমার হাতে এসেছিল।অবশ্যই আমরা সংক্ষেপে গাওয়ায়ে বানী নাযীরের ঘটনা বর্ণনা করবে এবং এজন্যে আল্লাহরই নিকট আমরা সহায্য প্রার্থনা করছি।আসহাবে মাগাযী ওয়াস সিয়ার এ যুদ্ধের কারণ যা বর্ণনা করেছেন তা এই যে, মুশরিকরা প্রতারণা করে বি’রে মাউনাহ্ নাক স্থানে সাহাবীদেরকে শহীদ করে দেয় যারা সংখ্যায় সত্তরজন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে হযরত আমর ইবনে উমাইয়া যামারী (রাঃ) নামক সাহাবী কোন রকমে রক্ষা পেয়ে পলায়ন করেন এবং মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। পথে সুযোগে পেয়ে তিনি বানু আমির গোত্রের দু’জন লোককে হত্যা করে ফেলেন, অথচ এ গোত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছিলেন। কিন্তু হযরত আমির (রাঃ)-এর এ খবর জানা ছিল না। মদীনায় পৌছে যখন তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সামনে ঘটনাটি বর্ণনা করেন তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি তাদেরকে হত্যা করে ফেলেছো? তাহলে তো এখন তাদের ওয়ারিশদেরকে রক্তপণ প্রদান করা আমার অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।” বানু নাযীর ও বানু আমিরের মধ্যেও পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সন্ধি ছিল। এজন্যেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বানু নাযীরের নিকট গমন করলেন এ উদ্দেশ্যে যে, রক্তপণের তারা কিছু আদায় করবে এবং তিনি কিছু আদায় করবেন আর এভাবে বানু আমীরকে সন্তুষ্ট করবেন। বানু নাযীর গোত্রের বস্তিটি মদীনার পূর্ব দিকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সেখানে পৌঁছলে তারা তাকে বললোঃ “হে আবুল কাসিম (সঃ)! হ্যাঁ, আমরা এ জন্যে প্রস্তুত আছি। এখনই আমরা আমাদের অংশ মুতাবিক সম্পদসহ আপনার খিদমতে হাযির হচ্ছি।” অতঃপর তারা তার নিকট হতে সরে গিয়ে পরস্পর পরামর্শ করলোঃ “এর চেয়ে বড় সুযোগে কি আর পাওয়া যাবে? এখন তিনি আমাদের হাতের মুঠোর মধ্যে রয়েছেন। এসো তাকে আমরা শেষ করে (হত্যা করে) ফেলি।” তারা পরামর্শক্রমে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, যে দেয়াল ঘেঁষে তিনি বসে আছেন ঐ ঘরের উপর কেউ চড়ে যাবে এবং সেখান হতে সে তার উপর একটি বড় পাথর নিক্ষেপ করবে। এতেই তাঁর জীবনলীলা শেষ হয়ে যাবে।আমর ইবনে জাহাশ ইবনে কা'ব এই কাজে নিযুক্ত হলো। অতঃপর কার্য সাধনের উদ্দেশ্যে সে ছাদের উপর আরোহণ করলো। ইতিমধ্যে আল্লাহ তা'আলা হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে স্বীয় নবী (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে নির্দেশ দিলেন। যে, তিনি যেন সেখান হতে চলে যান। সুতরাং তিনি তৎক্ষণাৎ সেখান হতে উঠে চলে গেলেন, ফলে ঐ নরাধম তার উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হলো। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবী ছিলেন। যেমন হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) প্রমুখ। তিনি সেখান হতে সরাসরি মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। আর ওদিকে যেসব সাহাবী তাঁর সাথে ছিলেন না এবং মদীনাতেই তাঁর জন্যে অপেক্ষমান ছিলেন, তাঁরা তাঁর বিলম্ব দেখে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং তার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু একটি লোকের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন যে, তিনি মদীনায় পৌছে গেছেন। সুতরাং তাঁরা ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর বিলম্বের কারণ জিজ্ঞেস করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘটনাটি সবিস্তারে বর্ণনা করেন এবং তাঁদেরকে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন।সহাবীগণ তৎক্ষণাৎ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান এবং আল্লাহর পথে বেরিয়ে পড়েন। ইয়াহূদীরা মুসলিম সেনাবাহিনীকে দেখে তাদের দূর্গের ফটক বন্ধ করে দিয়ে তথায় আশ্রয় গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে অবরোধ করেন এবং তাদের আশে-পাশের খেজুর বৃক্ষগুলো কেটে ফেলার ও জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। তখন ইয়াহুদীরা চীৎকার করে বলতে লাগলো যে, এটা হচ্ছে কি? যিনি অন্যদেরকে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করেন এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে মন্দ বলেন তিনি এটা কি করতে শুরু করলেন? সুতরাং একদিকে তো তাদের এই খেজুর বৃক্ষ কেটে ফেলার দুঃখ এবং অপরদিকে সাহায্য আসার যে কথা ছিল সেদিক হতে নৈরাশ্য, এ দু'টো বিষয় তাদের কোমর একেবারে ভেঙ্গ দিলো। সাহায্যের ঘটনাটি এই যে, বানু আউফ ইবনে খাযরাজের গোত্রটি যার মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালল, ওয়ালীআহ, মালিক ইবনে ককিল, সুওয়ায়েদ, আ'মাস প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ছিল, তারা বানী নাযীর গোত্রকে বলে পাঠিয়েছিলঃ “তোমরা মুকাবিলায় স্থির ও অটল থাকো, দূর্গ মুসলমানদের হাতে ছেড়ে দিয়ো না এবং আত্মসমর্পণ করো না, আমরা তোমাদের সাহায্যার্থে রয়েছি। তোমাদের শত্রু আমাদেরও শক্র। আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। তোমরা যুদ্ধের জন্যে বের হলে আমরাও বের হবো।” কিন্তু তখন পর্যন্ত তাদের ঐ ওয়াদা পূর্ণ হয়নি। তারা ইয়াহুদীদের সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসেনি। এদিকে এই বানী নাযীর গোত্র ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট আবেদন করলো যে, তিনি যেন তাদের প্রাণ রক্ষা করেন। তারা মদীনা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু তারা তাদের ধন-সম্পদ ও আসবাবপত্রের যা কিছু তাদের উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে যেতে পারবে তা যেন তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাদের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং তারা তাদের আবাসভূমি ছেড়ে চলে যায়। যাবার সময় তারা তাদের ঘরের দরজাগুলো পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলে দিয়ে এগুলো সাথে নিয়ে যায় এবং ঘরগুলোও ভেঙ্গে ফেলে। এগুলো নিয়ে গিয়ে তারা সিরিয়া ও খায়বারে বসতি স্থাপন করে। তাদের অবশিষ্ট মালগুলো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর জন্যে খাস হয়ে যায় যে, তিনি ইচ্ছামত ওগুলো খরচ করতে পারেন। ওগুলো তিনি ঐ সব লোকের মধ্যে বন্টন করে দেন যাঁরা প্রথম দিকে হিজরত করেছিলেন। আনসারদের মাত্র দু’জন দরিদ্র লোককে তিনি কিছু অংশ দেন। তাঁরা হলেন হযরত সাহল ইবনে হানীফ (রাঃ) ও হযরত সাম্মাক ইবনে খারশাহ (রাঃ)। বানু নাযীর গোত্রের মাত্র দু’জন লোক মুসলমান হয় যাদের ধন-সম্পদ তাদের কাছেই থেকে যায়। একজন হলো ইয়ামীন ইবনে আমর ইবনে কা'ব (রাঃ), যে আমর ইবনে জাহ্হাশের চাচাতো ভাই ছিল। যে ছিল ঐ আমর যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে পাথর দ্বারা হত্যা করার ঘৃণ্য সংকল্প করেছিল। দ্বিতীয়জন হলো সা’দ ইবনে অহাব (রাঃ)।একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত ইয়ামীন (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে ইয়ামীন (রাঃ)! তোমার ঐ চাচাতো ভাইটিকে দেখো, সে আমার সাথে কি দুর্ব্যবহারই না করেছিল এবং আমার ক্ষতি সাধনের জন্যে কি ঘণ্য ষড়যন্ত্রেই না। লিপ্ত হয়েছিল!” তাঁর একথা শুনে হযরত ইয়ামীন (রাঃ) একটি লোকের মাধ্যমে তাকে হত্যা করেন। সূরায়ে হাশর বানু নাযীরের এই ঘটনা বর্ণনায় অবতীর্ণ হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “হাশরের ভূমি হলো সিরিয়া দেশ। এ ব্যাপারে যদি কারো সন্দেহ থাকে তবে যেন সে (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন ঐ ইয়াহূদীদেরকে বলেনঃ “তোমরা এখান হতে বেরিয়ে যাও।” তখন তারা বলেঃ “আমরা কোথায় যাবো?” উত্তরে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “হাশরের ভূমির দিকে।”হযরত হাসান (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন বানু নাযীরকে নির্বাসন দেন তখন বলেনঃ “এটা হলো প্রথম হার এবং আমি এর পিছনে পিছনে রয়েছি।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বানু নাযীরের ঐ দূর্গগুলোর অবরোধ মাত্র ছয়দিন পর্যন্ত ছিল। দূর্গাগুলোর দৃঢ়তা, ইয়াহূদীদের সংখ্যাধিক্য, মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ও গোপন চক্রান্ত ইত্যাদি দেখে অবরোধকারী মুসলমানদের এটা কল্পনাও ছিল না যে, তারা এতো তাড়াতাড়ি সব ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে। আর ইয়হূদীরাও গর্বিত ছিল যে, তাদের দূর্গগুলো সবদিক দিয়েই সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য। সুতরাং তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে অবশ্যই রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহর শাস্তি এমন এক দিক হতে আসলো যা ছিল তাদের ধারণাতীত। আল্লাহ্ তা'আলার নীতি এটাই যে, চক্রান্তকারীরা তাদের চক্রান্তের মধ্যেই থাকে, এমতাবস্থায় তাদের অজান্তে আকস্মিকভাবে তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। তাদের অন্তরে ত্রাসের সঞ্চার হয়। আর ত্রাসের সঞ্চার হবেই না বা কেন? তাদেরকে অররোধকারী ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে প্রভাব দান করা হয়েছিল। তাঁর নাম শুনে শত্রুদের অন্তর এক মাসের পথের ব্যবধান হতে কেঁপে উঠতো। তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক! ইয়াহূদীরা তাদের নিজেদের হাতে তাদের ঘর-বাড়ীগুলো ধ্বংস করতে শুরু করে। ছাদের কাঠ ও ঘরের দরজাগুলো নিয়ে যাবার জন্যে ভেঙ্গে ফেলতে থাকে। মুমিনদের হাতেও ওগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাই আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ অতএব, হে চক্ষুষ্মন ব্যক্তিরা! তোমরা এটা হতে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ কর।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি ঐ ইয়াহুদীদের ভাগ্যে নির্বাসন লিপিবদ্ধ না থাকতো এবং আল্লাহ তাদের নির্বাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না থাকতেন তবে দুনিয়ায় তিনি তাদেরকে আরো কঠিন শাস্তি দিতেন। তাদেরকে হত্যা করা হতো ও বন্দী করা হতো। অতঃপর তাদের জন্যে পরকালে রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি।বানু নাযীরের এ যুদ্ধ বদর যুদ্ধের ছয় মাস পরে সংঘটিত হয়েছিল। উট বোঝাই করে যত মাল তারা নিয়ে যেতে পারতো তা নিয়ে যাবার অনুমতি তাদেরকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে যাবার অনুমতি তাদেরকে দেয়া হয়নি। তারা ছিল ঐ গোত্রের লোক যাদেরকে ইতিপূর্বে কখনো নির্বাসন দেয়া হয়নি। হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো বানী নাযীরের এই ঘটনা সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়।শব্দের অর্থ ‘হত্যা’ এবং ধ্বংসও করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রতি তিনজনকে একটি করে উট এবং একটি করে মশক দিয়েছিলেন। এই ফায়সালার পরেও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত মাসলামা (রাঃ)-কে তাদের নিকট পাঠিয়ে দেন এবং তাদেরকে অনুমতি প্রদান করেন যে, তারা যেন তিন দিনের মধ্যে নিজেদের আসবাব-পত্র ঠিকঠাক করে নিয়ে সেখান হতে প্রস্থান করে। এই পার্থিব শাস্তির পরেই পারলৌকিক শাস্তিরও বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সেখানেও তাদের জন্যে জাহান্নামের আগুন অবধারিত রয়েছে। তাদের এই দুর্গতির প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং একদিক দিয়ে তারা সমস্ত নবীকেই অস্বীকার ও অবিশ্বাস করেছে। কেননা, প্রত্যেক নবীই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। ঐ লোকগুলো তাকে পুরোপুরিভাবে চিনতো ও জানতো। এমনকি পিতা তার পুত্রকে যেমন চিনে তার চেয়েও অধিক তারা শেষ নবী (সঃ)-কে চিনতো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও শুধু হিংসার কারণেই তাকে তারা মানতো না। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধাচরণে তারা উঠে পড়ে লেগে যায়। আর প্রকাশ্য ব্যাপার এই যে, আল্লাহ্ তা'আলাও স্বীয় বিরুদ্ধাচারীদের উপর কঠিন শাস্তি অবতীর্ণ করে থাকেন।(আরবী) বলা হয় ভাল খেজুরের গাছকে। কারো কারো উক্তি মতে আজওয়াহ্ ও বিরনী এই প্রকার খেজুরগুলো লীনাহ্-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। কেউ কেউ বলেন যে, শুধু আযওয়াহ লীনাহ্-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। আবার কারো কারো মতে সর্বপ্রকারের খেজুরই এর অন্তর্ভুক্ত। বুওয়াইরাহ্ও এর অন্তর্ভুক্ত। ইয়াহূদীরা যে তিরস্কারের ছলে বলেছিল যে, তাদের খেজুরের গাছগুলো কাটিয়ে দিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের উক্তির বিপরীত কাজ করতঃ ভূ-পৃষ্ঠে কেন বিপর্যয় সৃষ্টি করছেন? এটা তাদের ঐ প্রশ্নেরই জবাব যে, যা কিছু হচ্ছে সবই প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে তার শত্রুদেরকে লাঞ্ছিত ও অকৃতকার্য করে দেয়ার লক্ষ্যেই হচ্ছে। যেসব গাছ বাকী রেখে দেয়া হচ্ছে সেটাও তাঁরঅনুমতিক্রমেই হচ্ছে এবং যেগুলো কাটিয়ে ফেলা হচ্ছে সেটাও যৌক্তিকতার সাথেই হচ্ছে।এটাও বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ একে অপরকে ঐ গাছগুলো কেটে ফেলতে নিষেধ করছিলেন এই কারণে যে, শেষে তো ওগুলো গানীমাত হিসেবে মুসলমানরাই লাভ করবেন, সুতরাং ওগুলো কেটে ফেলে লাভ কি? তখন আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন যে, বাধাদানকারীরাও একদিকে সত্যের উপর রয়েছে এবং কর্তনকারীরাও সত্যের উপর রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো মুসলমানদের উপকার সাধন করা এবং তাদের উদ্দেশ্য হলো কাফিরদেরকে রাগান্বিত করে তোলা এবং তাদের দুষ্কার্যের স্বাদ গ্রহণ করানো। এটাও এদের উদ্দেশ্য যে, এর ফলে এই শত্রুরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে এবং এরপর যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে যাবে, তখন তাদের মন্দ কার্যের শাস্তি হিসেবে তাদেরকে তরবারী দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করে দেয়া হবে।সাহাবীগণ এ কাজ তো করলেন বটে, কিন্তু পরক্ষণেই ভয় পেলেন যে, না জানি হয়তো ঐ খর্জুর বৃক্ষগুলো কেটে ফেলা অথবা বাকী রেখে দেয়ার কারণে তাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। তাই তারা এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আল্লাহ্ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ দু'টোতেই প্রতিদান বা সওয়াব রয়েছে, কর্তন করার মধ্যেও এবং বাকী রেখে দেয়ার মধ্যেও। কোন কোন রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, কেটে ফেলা এবং জ্বালিয়ে দেয়া। উভয়েরই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।ঐ সময় বানু কুরাইযা ইয়াহুদীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছিলেন এবং তাদেরকে মদীনাতেই অবস্থানের অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তারাও যখন মুকাবিলায় নেমে পড়ে তখন তাদের মধ্যে যারা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তাদেরকে হত্যা করা হয় এবং তাদের নারীরা, শিশুরা ও তাদের সম্পদগুলো মুসলমানদের মধ্যে বন্টিত হয়। হ্যাঁ, তবে তাদের মধ্যে যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে। হাযির হয়ে ঈমান আনয়ন করে তারা রক্ষা পায়। অতঃপর মদীনা হতে সমস্ত উয়াহূদীকে বের করে দেয়া হয়। বানী কাইনুকাকেও, যাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) ছিলেন এবং বানী হারিসাকেও। সমস্ত ইয়াহদীকে নির্বাসন দেয়া হয়। এই সমুদয় ঘটনা আরব কবিরা তাঁদের কবিতার মধ্যে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন যা সীরাতে ইবনে ইসহাকে বর্ণিত হয়েছে। ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর মতে এটা উহুদ ও বি’রে মাউনার পরবর্তী ঘটনা এবং উরওয়া (রঃ)-এর মতে এ ঘটনাটি বদর যুদ্ধের ছয় মাস পরে সংঘটিত হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-হাশর 59:4

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতেন যে, এটা হলো সূরায়ে বানিন নাযীর। সহীহ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “এটা হলো সূরায়ে হার।” তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সূরাটি বানু নাযীর সম্প্রদায়ের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। সহীহ্ বুখারীর অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “এটা কি সূরায়ে বানী নাযীর।” ১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তআলা খবর দিচ্ছেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিস আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সপ্তম আকাশ ও পৃথিবী এবং ওগুলোর মধ্যে যত কিছু রয়েছে সবাই তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে থাকে। সব কিছুই তার তাসবীহ্ পাঠ করে কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ্ পাঠ বুঝতে পার না। (১৭:৪৪)তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। তিনি তাঁর সমুদয় হুকুম ও আদেশ দানের ব্যাপারে বিজ্ঞানময়। তিনি আহলে কিতাবের কাফিরদেরকে অর্থাৎ বানু নাযীরকে আবাসস্থল হতে বিতাড়িত করেছিলেন। এর সংক্ষিপ্ত ঘটনা এই যে, মদীনায় হিজরত করার পর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মদীনার এই ইয়াহূদীদের সাথে সন্ধি করে নিয়েছিলেন যে, তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করবেন না এবং তারাও তাঁর সাথে যুদ্ধ করবে না। কিন্তু ঐ লোকগুলো এই চুক্তি ভঙ্গ করে দেয় যার কারণে তাদের। উপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়। আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে তাদের উপর বিজয় দান করেন এবং তিনি তাদেরকে এখান হতে বের করে দেন। তারা। যে এখান হতে (মদীনা হতে) বের হবে এটা মুসলমানরা কল্পনাও করেনি। স্বয়ং ইয়াহূদীরাও ধারণা করেনি যে, তাদের সুদৃঢ় দূর্গ বিদ্যমান থাকা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে। কিন্তু যখন তাদের উপর আল্লাহর মার পড়লো তখন তাদের ঐ মযবূত দূর্গগুলো থেকেই গেল, হঠাৎ তাদের উপর এমনভাবে আল্লাহর শাস্তি এসে পড়লো যে, তারা একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে মদীনা হতে বের করে দিলেন। তাদের কেউ কেউ সিরিয়ার কৃষিভূমির দিকে চলে গেল এবং কেউ কেউ গেল খায়বারের দিকে। তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছিল যে, তারা তাদের ধন-সম্পদ ও আসবাবপত্রের যা কিছু উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব তা নিয়ে যেতে পারে। এ জন্যে তারা তাদের নিজেদের হাতে তাদের ঘরবাড়ী ভেঙ্গে দিলো এবং যত কিছু সঙ্গে নিয়ে যেতে পারলো তা নিয়ে গেল আর যা অবশিষ্ট থাকলে তা মুসলমানদের হাতে আসলো।এই ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচারীদের পরিণামের প্রতি লক্ষ্য কর এবং তা হতে শিক্ষা গ্রহণ কর যে, কিভাবে তাদের উপর অকস্মাৎ আল্লাহর আযাব এসে পড়লো এবং দুনিয়াতেও তারা ধ্বংস হয়ে গেল এবং পরকালেও তাদের জন্যে রয়েছে। জাহান্নামের কঠিন শাস্তি। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণনা করেন যে, কুরায়েশ কাফিররা ইবনে উবাই এবং তার আউস ও খাযরাজ গোত্রীয় মুশরিক সঙ্গীদেরকে পত্র লিখলো। এ পত্রটি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বদর প্রান্তর হতে প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই তাদের হস্তগত হয়। পত্রটির বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপঃ “তোমরা আমাদের সাথীকে (রাসূলুল্লাহকে সঃ) তোমাদের ওখানে স্থান দিয়েছে। এখন তোমরা হয় তার সাথে যুদ্ধ করে তাকে বের করে দাও, না হয় আমরাই তোমাদেরকে বের করে দিবো এবং আমাদের সমস্ত সেনাবাহিনী নিয়ে গিয়ে তোমাদেরকে আক্রমণ করবে। অতঃপর তোমাদের সকল যোদ্ধা ও বীরপুরুষকে হত্যা করে ফেলবো এবং তোমাদের নারী ও কন্যাদেরকে দাসী বানিয়ে নিবো। আল্লাহর শপথ! এ কাজ আমরা অবশ্যই করবে। সুতরাং তোমরা চিন্তা-ভাবনা করে দেখো!”আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই এবং তার মূর্তিপূজক সঙ্গীরা এ পত্র পেয়ে পরস্পর পরামর্শ করলো এবং গোপনীয়ভাবে সর্বসম্মতিক্রমে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে। যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। এ খবর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কর্ণগোচর হলে তিনি স্বয়ং তাদের নিকট গমন করেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “আমি অবগত হয়েছি যে, কুরায়েশদের পত্র তোমাদের হস্তগত হয়েছে এবং পত্রের মর্মানুযায়ী তোমরা তোমাদের মৃত্যুর আসবাব-পত্র নিজেদেরই হাতে তৈরী করতে শুরু করেছো। তোমরা নিজেদের হাতে তোমাদের সন্তানদেরকে ও ভ্রাতাদেরকে হত্যা করার ইচ্ছা করছো। আমি আর একবার তোমাদেরকে সুযোগে দিচ্ছি যে, তোমরা চিন্তা-ভাবনা করে দেখে এই অসৎ সংকল্প হতে বিরত থাকো।”রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ উপদেশ তাদের উপর ক্রিয়াশীল হলো এবং তারা নিজ নিজ জায়গায় চলে গেল। কিন্তু কুরায়েশরা বদরের যুদ্ধ হতে ফারেগ হয়ে আবার পত্র লিখলো এবং পূর্বের মতই হুমকি দিলো ও নিজেদের শক্তি, সংখ্যা ও দুর্ভেদ্য দূর্গের কথা স্মরণ করিয়ে দিলো। এর ফলে মদীনার ঐ লোকগুলো আবার যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করলো। বানু নাযীর গোত্র এখন পরিষ্কারভাবে চুক্তি ভঙ্গের কথা ঘোষণা করলো। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে লোক পাঠিয়ে তাঁকে জানিয়ে দিলো যে, তিনি যেন ত্রিশজন লোকসহ তাদের দিকে অগ্রসর হন এবং তারাও তাদের ত্রিশজন পণ্ডিত লোককে পাঠিয়ে দিচ্ছে। উভয় দল এক জায়গায় মিলিত হয়ে পরস্পর আলাপ-আলোচনা করবে। যদি তাদের এ লোকগুলো তাঁকে সত্যবাদী রূপে মেনে নেয় এবং ঈমান আনয়ন করে তবে তারাও তার সাথে রয়েছে। তাদের এ চুক্তি ভঙ্গের কারণে পর দিন সকালে রসূলুল্লাহ্ (সঃ) স্বীয় সৈন্যবাহিনী নিয়ে গিয়ে তাদেরকে অবরোধ করেন এবং বলেনঃ “তোমরা যদি আবার নতুনভাবে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর কর তবে তো ভাল কথা, অন্যথায় তোমাদের জন্যে কোন নিরাপত্তা নেই।” তারা তাঁর এ প্রস্তাব প্রকাশ্যভাবে প্রত্যাখ্যান করলো এবং যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেল। সুতরাং সারা দিন ধরে যুদ্ধ চললো। পরদিন। প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বানু নাযীরকে উক্ত অবস্থাতেই ছেড়ে দিয়ে বানু কুরাইযার নিকট সেনাবাহিনীসহ গমন করলেন। তাদেরকেও তিনি নতুনভাবে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হবার আহ্বান জানান। তারা তা মেনে নেয় এবং তাদের সাথে সন্ধি হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান হতে ফারেগ হয়ে পুনরায় বানু নাযীরের নিকট গমন করেন। আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অবশেষে তারা পরাজিত হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের মদীনা ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দেন এবং বলেনঃ “তোমরা উট বোঝাই করে যত আসবাব-পত্র নিয়ে যেতে পার নিয়ে যাও।” সুতরাং তারা ঘর-বাড়ীর আসবাব-পত্র এমন কি দরজা ও কাঠগুলোও উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে সেখান হতে বিদায় গ্রহণ করে। তাদের খর্জুর-বৃক্ষগুলো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর জন্যে বিশিষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ্ তা'আলা এগুলো তাকেই দিয়ে দেন। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তাদের (ইয়াহুদীদের) নিকট হতে তাঁর রাসূল (সঃ)-কে যে ফায় দিয়েছেন, তার জন্যে তোমরা অশ্ব কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি।” (৫৯:৬) কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এর অধিকাংশই মুহাজিরদেরকে দিয়ে দেন। আনসারদের মধ্যে শুধু দু’জন অভাবগ্রস্তকে অংশ দেন। এ ছাড়া সবই তিনি মুহাজিরদের মধ্যে বন্টন করেন। যা বাকী থাকে ওটাই ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাদকা যা বানু ফাতেমার হাতে এসেছিল।অবশ্যই আমরা সংক্ষেপে গাওয়ায়ে বানী নাযীরের ঘটনা বর্ণনা করবে এবং এজন্যে আল্লাহরই নিকট আমরা সহায্য প্রার্থনা করছি।আসহাবে মাগাযী ওয়াস সিয়ার এ যুদ্ধের কারণ যা বর্ণনা করেছেন তা এই যে, মুশরিকরা প্রতারণা করে বি’রে মাউনাহ্ নাক স্থানে সাহাবীদেরকে শহীদ করে দেয় যারা সংখ্যায় সত্তরজন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে হযরত আমর ইবনে উমাইয়া যামারী (রাঃ) নামক সাহাবী কোন রকমে রক্ষা পেয়ে পলায়ন করেন এবং মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। পথে সুযোগে পেয়ে তিনি বানু আমির গোত্রের দু’জন লোককে হত্যা করে ফেলেন, অথচ এ গোত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছিলেন। কিন্তু হযরত আমির (রাঃ)-এর এ খবর জানা ছিল না। মদীনায় পৌছে যখন তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সামনে ঘটনাটি বর্ণনা করেন তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি তাদেরকে হত্যা করে ফেলেছো? তাহলে তো এখন তাদের ওয়ারিশদেরকে রক্তপণ প্রদান করা আমার অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।” বানু নাযীর ও বানু আমিরের মধ্যেও পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সন্ধি ছিল। এজন্যেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বানু নাযীরের নিকট গমন করলেন এ উদ্দেশ্যে যে, রক্তপণের তারা কিছু আদায় করবে এবং তিনি কিছু আদায় করবেন আর এভাবে বানু আমীরকে সন্তুষ্ট করবেন। বানু নাযীর গোত্রের বস্তিটি মদীনার পূর্ব দিকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সেখানে পৌঁছলে তারা তাকে বললোঃ “হে আবুল কাসিম (সঃ)! হ্যাঁ, আমরা এ জন্যে প্রস্তুত আছি। এখনই আমরা আমাদের অংশ মুতাবিক সম্পদসহ আপনার খিদমতে হাযির হচ্ছি।” অতঃপর তারা তার নিকট হতে সরে গিয়ে পরস্পর পরামর্শ করলোঃ “এর চেয়ে বড় সুযোগে কি আর পাওয়া যাবে? এখন তিনি আমাদের হাতের মুঠোর মধ্যে রয়েছেন। এসো তাকে আমরা শেষ করে (হত্যা করে) ফেলি।” তারা পরামর্শক্রমে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, যে দেয়াল ঘেঁষে তিনি বসে আছেন ঐ ঘরের উপর কেউ চড়ে যাবে এবং সেখান হতে সে তার উপর একটি বড় পাথর নিক্ষেপ করবে। এতেই তাঁর জীবনলীলা শেষ হয়ে যাবে।আমর ইবনে জাহাশ ইবনে কা'ব এই কাজে নিযুক্ত হলো। অতঃপর কার্য সাধনের উদ্দেশ্যে সে ছাদের উপর আরোহণ করলো। ইতিমধ্যে আল্লাহ তা'আলা হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে স্বীয় নবী (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে নির্দেশ দিলেন। যে, তিনি যেন সেখান হতে চলে যান। সুতরাং তিনি তৎক্ষণাৎ সেখান হতে উঠে চলে গেলেন, ফলে ঐ নরাধম তার উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হলো। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবী ছিলেন। যেমন হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) প্রমুখ। তিনি সেখান হতে সরাসরি মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। আর ওদিকে যেসব সাহাবী তাঁর সাথে ছিলেন না এবং মদীনাতেই তাঁর জন্যে অপেক্ষমান ছিলেন, তাঁরা তাঁর বিলম্ব দেখে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং তার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু একটি লোকের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন যে, তিনি মদীনায় পৌছে গেছেন। সুতরাং তাঁরা ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর বিলম্বের কারণ জিজ্ঞেস করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘটনাটি সবিস্তারে বর্ণনা করেন এবং তাঁদেরকে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন।সহাবীগণ তৎক্ষণাৎ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান এবং আল্লাহর পথে বেরিয়ে পড়েন। ইয়াহূদীরা মুসলিম সেনাবাহিনীকে দেখে তাদের দূর্গের ফটক বন্ধ করে দিয়ে তথায় আশ্রয় গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে অবরোধ করেন এবং তাদের আশে-পাশের খেজুর বৃক্ষগুলো কেটে ফেলার ও জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। তখন ইয়াহুদীরা চীৎকার করে বলতে লাগলো যে, এটা হচ্ছে কি? যিনি অন্যদেরকে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করেন এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে মন্দ বলেন তিনি এটা কি করতে শুরু করলেন? সুতরাং একদিকে তো তাদের এই খেজুর বৃক্ষ কেটে ফেলার দুঃখ এবং অপরদিকে সাহায্য আসার যে কথা ছিল সেদিক হতে নৈরাশ্য, এ দু'টো বিষয় তাদের কোমর একেবারে ভেঙ্গ দিলো। সাহায্যের ঘটনাটি এই যে, বানু আউফ ইবনে খাযরাজের গোত্রটি যার মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালল, ওয়ালীআহ, মালিক ইবনে ককিল, সুওয়ায়েদ, আ'মাস প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ছিল, তারা বানী নাযীর গোত্রকে বলে পাঠিয়েছিলঃ “তোমরা মুকাবিলায় স্থির ও অটল থাকো, দূর্গ মুসলমানদের হাতে ছেড়ে দিয়ো না এবং আত্মসমর্পণ করো না, আমরা তোমাদের সাহায্যার্থে রয়েছি। তোমাদের শত্রু আমাদেরও শক্র। আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। তোমরা যুদ্ধের জন্যে বের হলে আমরাও বের হবো।” কিন্তু তখন পর্যন্ত তাদের ঐ ওয়াদা পূর্ণ হয়নি। তারা ইয়াহুদীদের সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসেনি। এদিকে এই বানী নাযীর গোত্র ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট আবেদন করলো যে, তিনি যেন তাদের প্রাণ রক্ষা করেন। তারা মদীনা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু তারা তাদের ধন-সম্পদ ও আসবাবপত্রের যা কিছু তাদের উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে যেতে পারবে তা যেন তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাদের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং তারা তাদের আবাসভূমি ছেড়ে চলে যায়। যাবার সময় তারা তাদের ঘরের দরজাগুলো পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলে দিয়ে এগুলো সাথে নিয়ে যায় এবং ঘরগুলোও ভেঙ্গে ফেলে। এগুলো নিয়ে গিয়ে তারা সিরিয়া ও খায়বারে বসতি স্থাপন করে। তাদের অবশিষ্ট মালগুলো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর জন্যে খাস হয়ে যায় যে, তিনি ইচ্ছামত ওগুলো খরচ করতে পারেন। ওগুলো তিনি ঐ সব লোকের মধ্যে বন্টন করে দেন যাঁরা প্রথম দিকে হিজরত করেছিলেন। আনসারদের মাত্র দু’জন দরিদ্র লোককে তিনি কিছু অংশ দেন। তাঁরা হলেন হযরত সাহল ইবনে হানীফ (রাঃ) ও হযরত সাম্মাক ইবনে খারশাহ (রাঃ)। বানু নাযীর গোত্রের মাত্র দু’জন লোক মুসলমান হয় যাদের ধন-সম্পদ তাদের কাছেই থেকে যায়। একজন হলো ইয়ামীন ইবনে আমর ইবনে কা'ব (রাঃ), যে আমর ইবনে জাহ্হাশের চাচাতো ভাই ছিল। যে ছিল ঐ আমর যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে পাথর দ্বারা হত্যা করার ঘৃণ্য সংকল্প করেছিল। দ্বিতীয়জন হলো সা’দ ইবনে অহাব (রাঃ)।একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত ইয়ামীন (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে ইয়ামীন (রাঃ)! তোমার ঐ চাচাতো ভাইটিকে দেখো, সে আমার সাথে কি দুর্ব্যবহারই না করেছিল এবং আমার ক্ষতি সাধনের জন্যে কি ঘণ্য ষড়যন্ত্রেই না। লিপ্ত হয়েছিল!” তাঁর একথা শুনে হযরত ইয়ামীন (রাঃ) একটি লোকের মাধ্যমে তাকে হত্যা করেন। সূরায়ে হাশর বানু নাযীরের এই ঘটনা বর্ণনায় অবতীর্ণ হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “হাশরের ভূমি হলো সিরিয়া দেশ। এ ব্যাপারে যদি কারো সন্দেহ থাকে তবে যেন সে (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন ঐ ইয়াহূদীদেরকে বলেনঃ “তোমরা এখান হতে বেরিয়ে যাও।” তখন তারা বলেঃ “আমরা কোথায় যাবো?” উত্তরে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “হাশরের ভূমির দিকে।”হযরত হাসান (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন বানু নাযীরকে নির্বাসন দেন তখন বলেনঃ “এটা হলো প্রথম হার এবং আমি এর পিছনে পিছনে রয়েছি।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বানু নাযীরের ঐ দূর্গগুলোর অবরোধ মাত্র ছয়দিন পর্যন্ত ছিল। দূর্গাগুলোর দৃঢ়তা, ইয়াহূদীদের সংখ্যাধিক্য, মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ও গোপন চক্রান্ত ইত্যাদি দেখে অবরোধকারী মুসলমানদের এটা কল্পনাও ছিল না যে, তারা এতো তাড়াতাড়ি সব ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে। আর ইয়হূদীরাও গর্বিত ছিল যে, তাদের দূর্গগুলো সবদিক দিয়েই সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য। সুতরাং তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে অবশ্যই রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহর শাস্তি এমন এক দিক হতে আসলো যা ছিল তাদের ধারণাতীত। আল্লাহ্ তা'আলার নীতি এটাই যে, চক্রান্তকারীরা তাদের চক্রান্তের মধ্যেই থাকে, এমতাবস্থায় তাদের অজান্তে আকস্মিকভাবে তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। তাদের অন্তরে ত্রাসের সঞ্চার হয়। আর ত্রাসের সঞ্চার হবেই না বা কেন? তাদেরকে অররোধকারী ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে প্রভাব দান করা হয়েছিল। তাঁর নাম শুনে শত্রুদের অন্তর এক মাসের পথের ব্যবধান হতে কেঁপে উঠতো। তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক! ইয়াহূদীরা তাদের নিজেদের হাতে তাদের ঘর-বাড়ীগুলো ধ্বংস করতে শুরু করে। ছাদের কাঠ ও ঘরের দরজাগুলো নিয়ে যাবার জন্যে ভেঙ্গে ফেলতে থাকে। মুমিনদের হাতেও ওগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাই আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ অতএব, হে চক্ষুষ্মন ব্যক্তিরা! তোমরা এটা হতে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ কর।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি ঐ ইয়াহুদীদের ভাগ্যে নির্বাসন লিপিবদ্ধ না থাকতো এবং আল্লাহ তাদের নির্বাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না থাকতেন তবে দুনিয়ায় তিনি তাদেরকে আরো কঠিন শাস্তি দিতেন। তাদেরকে হত্যা করা হতো ও বন্দী করা হতো। অতঃপর তাদের জন্যে পরকালে রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি।বানু নাযীরের এ যুদ্ধ বদর যুদ্ধের ছয় মাস পরে সংঘটিত হয়েছিল। উট বোঝাই করে যত মাল তারা নিয়ে যেতে পারতো তা নিয়ে যাবার অনুমতি তাদেরকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে যাবার অনুমতি তাদেরকে দেয়া হয়নি। তারা ছিল ঐ গোত্রের লোক যাদেরকে ইতিপূর্বে কখনো নির্বাসন দেয়া হয়নি। হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো বানী নাযীরের এই ঘটনা সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়।শব্দের অর্থ ‘হত্যা’ এবং ধ্বংসও করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রতি তিনজনকে একটি করে উট এবং একটি করে মশক দিয়েছিলেন। এই ফায়সালার পরেও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত মাসলামা (রাঃ)-কে তাদের নিকট পাঠিয়ে দেন এবং তাদেরকে অনুমতি প্রদান করেন যে, তারা যেন তিন দিনের মধ্যে নিজেদের আসবাব-পত্র ঠিকঠাক করে নিয়ে সেখান হতে প্রস্থান করে। এই পার্থিব শাস্তির পরেই পারলৌকিক শাস্তিরও বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সেখানেও তাদের জন্যে জাহান্নামের আগুন অবধারিত রয়েছে। তাদের এই দুর্গতির প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং একদিক দিয়ে তারা সমস্ত নবীকেই অস্বীকার ও অবিশ্বাস করেছে। কেননা, প্রত্যেক নবীই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। ঐ লোকগুলো তাকে পুরোপুরিভাবে চিনতো ও জানতো। এমনকি পিতা তার পুত্রকে যেমন চিনে তার চেয়েও অধিক তারা শেষ নবী (সঃ)-কে চিনতো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও শুধু হিংসার কারণেই তাকে তারা মানতো না। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধাচরণে তারা উঠে পড়ে লেগে যায়। আর প্রকাশ্য ব্যাপার এই যে, আল্লাহ্ তা'আলাও স্বীয় বিরুদ্ধাচারীদের উপর কঠিন শাস্তি অবতীর্ণ করে থাকেন।(আরবী) বলা হয় ভাল খেজুরের গাছকে। কারো কারো উক্তি মতে আজওয়াহ্ ও বিরনী এই প্রকার খেজুরগুলো লীনাহ্-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। কেউ কেউ বলেন যে, শুধু আযওয়াহ লীনাহ্-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। আবার কারো কারো মতে সর্বপ্রকারের খেজুরই এর অন্তর্ভুক্ত। বুওয়াইরাহ্ও এর অন্তর্ভুক্ত। ইয়াহূদীরা যে তিরস্কারের ছলে বলেছিল যে, তাদের খেজুরের গাছগুলো কাটিয়ে দিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের উক্তির বিপরীত কাজ করতঃ ভূ-পৃষ্ঠে কেন বিপর্যয় সৃষ্টি করছেন? এটা তাদের ঐ প্রশ্নেরই জবাব যে, যা কিছু হচ্ছে সবই প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে তার শত্রুদেরকে লাঞ্ছিত ও অকৃতকার্য করে দেয়ার লক্ষ্যেই হচ্ছে। যেসব গাছ বাকী রেখে দেয়া হচ্ছে সেটাও তাঁরঅনুমতিক্রমেই হচ্ছে এবং যেগুলো কাটিয়ে ফেলা হচ্ছে সেটাও যৌক্তিকতার সাথেই হচ্ছে।এটাও বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ একে অপরকে ঐ গাছগুলো কেটে ফেলতে নিষেধ করছিলেন এই কারণে যে, শেষে তো ওগুলো গানীমাত হিসেবে মুসলমানরাই লাভ করবেন, সুতরাং ওগুলো কেটে ফেলে লাভ কি? তখন আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন যে, বাধাদানকারীরাও একদিকে সত্যের উপর রয়েছে এবং কর্তনকারীরাও সত্যের উপর রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো মুসলমানদের উপকার সাধন করা এবং তাদের উদ্দেশ্য হলো কাফিরদেরকে রাগান্বিত করে তোলা এবং তাদের দুষ্কার্যের স্বাদ গ্রহণ করানো। এটাও এদের উদ্দেশ্য যে, এর ফলে এই শত্রুরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে এবং এরপর যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে যাবে, তখন তাদের মন্দ কার্যের শাস্তি হিসেবে তাদেরকে তরবারী দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করে দেয়া হবে।সাহাবীগণ এ কাজ তো করলেন বটে, কিন্তু পরক্ষণেই ভয় পেলেন যে, না জানি হয়তো ঐ খর্জুর বৃক্ষগুলো কেটে ফেলা অথবা বাকী রেখে দেয়ার কারণে তাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। তাই তারা এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আল্লাহ্ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ দু'টোতেই প্রতিদান বা সওয়াব রয়েছে, কর্তন করার মধ্যেও এবং বাকী রেখে দেয়ার মধ্যেও। কোন কোন রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, কেটে ফেলা এবং জ্বালিয়ে দেয়া। উভয়েরই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।ঐ সময় বানু কুরাইযা ইয়াহুদীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছিলেন এবং তাদেরকে মদীনাতেই অবস্থানের অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তারাও যখন মুকাবিলায় নেমে পড়ে তখন তাদের মধ্যে যারা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তাদেরকে হত্যা করা হয় এবং তাদের নারীরা, শিশুরা ও তাদের সম্পদগুলো মুসলমানদের মধ্যে বন্টিত হয়। হ্যাঁ, তবে তাদের মধ্যে যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে। হাযির হয়ে ঈমান আনয়ন করে তারা রক্ষা পায়। অতঃপর মদীনা হতে সমস্ত উয়াহূদীকে বের করে দেয়া হয়। বানী কাইনুকাকেও, যাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) ছিলেন এবং বানী হারিসাকেও। সমস্ত ইয়াহদীকে নির্বাসন দেয়া হয়। এই সমুদয় ঘটনা আরব কবিরা তাঁদের কবিতার মধ্যে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন যা সীরাতে ইবনে ইসহাকে বর্ণিত হয়েছে। ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর মতে এটা উহুদ ও বি’রে মাউনার পরবর্তী ঘটনা এবং উরওয়া (রঃ)-এর মতে এ ঘটনাটি বদর যুদ্ধের ছয় মাস পরে সংঘটিত হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-হাশর 59:5

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলতেন যে, এটা হলো সূরায়ে বানিন নাযীর। সহীহ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে রয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “এটা হলো সূরায়ে হার।” তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ সূরাটি বানু নাযীর সম্প্রদায়ের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। সহীহ্ বুখারীর অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বলেনঃ “এটা কি সূরায়ে বানী নাযীর।” ১-৫ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তআলা খবর দিচ্ছেন যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিস আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সপ্তম আকাশ ও পৃথিবী এবং ওগুলোর মধ্যে যত কিছু রয়েছে সবাই তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে থাকে। সব কিছুই তার তাসবীহ্ পাঠ করে কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ্ পাঠ বুঝতে পার না। (১৭:৪৪)তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। তিনি তাঁর সমুদয় হুকুম ও আদেশ দানের ব্যাপারে বিজ্ঞানময়। তিনি আহলে কিতাবের কাফিরদেরকে অর্থাৎ বানু নাযীরকে আবাসস্থল হতে বিতাড়িত করেছিলেন। এর সংক্ষিপ্ত ঘটনা এই যে, মদীনায় হিজরত করার পর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মদীনার এই ইয়াহূদীদের সাথে সন্ধি করে নিয়েছিলেন যে, তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করবেন না এবং তারাও তাঁর সাথে যুদ্ধ করবে না। কিন্তু ঐ লোকগুলো এই চুক্তি ভঙ্গ করে দেয় যার কারণে তাদের। উপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়। আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে তাদের উপর বিজয় দান করেন এবং তিনি তাদেরকে এখান হতে বের করে দেন। তারা। যে এখান হতে (মদীনা হতে) বের হবে এটা মুসলমানরা কল্পনাও করেনি। স্বয়ং ইয়াহূদীরাও ধারণা করেনি যে, তাদের সুদৃঢ় দূর্গ বিদ্যমান থাকা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে। কিন্তু যখন তাদের উপর আল্লাহর মার পড়লো তখন তাদের ঐ মযবূত দূর্গগুলো থেকেই গেল, হঠাৎ তাদের উপর এমনভাবে আল্লাহর শাস্তি এসে পড়লো যে, তারা একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে মদীনা হতে বের করে দিলেন। তাদের কেউ কেউ সিরিয়ার কৃষিভূমির দিকে চলে গেল এবং কেউ কেউ গেল খায়বারের দিকে। তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছিল যে, তারা তাদের ধন-সম্পদ ও আসবাবপত্রের যা কিছু উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব তা নিয়ে যেতে পারে। এ জন্যে তারা তাদের নিজেদের হাতে তাদের ঘরবাড়ী ভেঙ্গে দিলো এবং যত কিছু সঙ্গে নিয়ে যেতে পারলো তা নিয়ে গেল আর যা অবশিষ্ট থাকলে তা মুসলমানদের হাতে আসলো।এই ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচারীদের পরিণামের প্রতি লক্ষ্য কর এবং তা হতে শিক্ষা গ্রহণ কর যে, কিভাবে তাদের উপর অকস্মাৎ আল্লাহর আযাব এসে পড়লো এবং দুনিয়াতেও তারা ধ্বংস হয়ে গেল এবং পরকালেও তাদের জন্যে রয়েছে। জাহান্নামের কঠিন শাস্তি। হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবীদের এক ব্যক্তি হতে বর্ণনা করেন যে, কুরায়েশ কাফিররা ইবনে উবাই এবং তার আউস ও খাযরাজ গোত্রীয় মুশরিক সঙ্গীদেরকে পত্র লিখলো। এ পত্রটি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বদর প্রান্তর হতে প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই তাদের হস্তগত হয়। পত্রটির বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপঃ “তোমরা আমাদের সাথীকে (রাসূলুল্লাহকে সঃ) তোমাদের ওখানে স্থান দিয়েছে। এখন তোমরা হয় তার সাথে যুদ্ধ করে তাকে বের করে দাও, না হয় আমরাই তোমাদেরকে বের করে দিবো এবং আমাদের সমস্ত সেনাবাহিনী নিয়ে গিয়ে তোমাদেরকে আক্রমণ করবে। অতঃপর তোমাদের সকল যোদ্ধা ও বীরপুরুষকে হত্যা করে ফেলবো এবং তোমাদের নারী ও কন্যাদেরকে দাসী বানিয়ে নিবো। আল্লাহর শপথ! এ কাজ আমরা অবশ্যই করবে। সুতরাং তোমরা চিন্তা-ভাবনা করে দেখো!”আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই এবং তার মূর্তিপূজক সঙ্গীরা এ পত্র পেয়ে পরস্পর পরামর্শ করলো এবং গোপনীয়ভাবে সর্বসম্মতিক্রমে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে। যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। এ খবর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কর্ণগোচর হলে তিনি স্বয়ং তাদের নিকট গমন করেন এবং তাদেরকে বলেনঃ “আমি অবগত হয়েছি যে, কুরায়েশদের পত্র তোমাদের হস্তগত হয়েছে এবং পত্রের মর্মানুযায়ী তোমরা তোমাদের মৃত্যুর আসবাব-পত্র নিজেদেরই হাতে তৈরী করতে শুরু করেছো। তোমরা নিজেদের হাতে তোমাদের সন্তানদেরকে ও ভ্রাতাদেরকে হত্যা করার ইচ্ছা করছো। আমি আর একবার তোমাদেরকে সুযোগে দিচ্ছি যে, তোমরা চিন্তা-ভাবনা করে দেখে এই অসৎ সংকল্প হতে বিরত থাকো।”রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ উপদেশ তাদের উপর ক্রিয়াশীল হলো এবং তারা নিজ নিজ জায়গায় চলে গেল। কিন্তু কুরায়েশরা বদরের যুদ্ধ হতে ফারেগ হয়ে আবার পত্র লিখলো এবং পূর্বের মতই হুমকি দিলো ও নিজেদের শক্তি, সংখ্যা ও দুর্ভেদ্য দূর্গের কথা স্মরণ করিয়ে দিলো। এর ফলে মদীনার ঐ লোকগুলো আবার যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করলো। বানু নাযীর গোত্র এখন পরিষ্কারভাবে চুক্তি ভঙ্গের কথা ঘোষণা করলো। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে লোক পাঠিয়ে তাঁকে জানিয়ে দিলো যে, তিনি যেন ত্রিশজন লোকসহ তাদের দিকে অগ্রসর হন এবং তারাও তাদের ত্রিশজন পণ্ডিত লোককে পাঠিয়ে দিচ্ছে। উভয় দল এক জায়গায় মিলিত হয়ে পরস্পর আলাপ-আলোচনা করবে। যদি তাদের এ লোকগুলো তাঁকে সত্যবাদী রূপে মেনে নেয় এবং ঈমান আনয়ন করে তবে তারাও তার সাথে রয়েছে। তাদের এ চুক্তি ভঙ্গের কারণে পর দিন সকালে রসূলুল্লাহ্ (সঃ) স্বীয় সৈন্যবাহিনী নিয়ে গিয়ে তাদেরকে অবরোধ করেন এবং বলেনঃ “তোমরা যদি আবার নতুনভাবে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর কর তবে তো ভাল কথা, অন্যথায় তোমাদের জন্যে কোন নিরাপত্তা নেই।” তারা তাঁর এ প্রস্তাব প্রকাশ্যভাবে প্রত্যাখ্যান করলো এবং যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেল। সুতরাং সারা দিন ধরে যুদ্ধ চললো। পরদিন। প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বানু নাযীরকে উক্ত অবস্থাতেই ছেড়ে দিয়ে বানু কুরাইযার নিকট সেনাবাহিনীসহ গমন করলেন। তাদেরকেও তিনি নতুনভাবে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হবার আহ্বান জানান। তারা তা মেনে নেয় এবং তাদের সাথে সন্ধি হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেখান হতে ফারেগ হয়ে পুনরায় বানু নাযীরের নিকট গমন করেন। আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অবশেষে তারা পরাজিত হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের মদীনা ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দেন এবং বলেনঃ “তোমরা উট বোঝাই করে যত আসবাব-পত্র নিয়ে যেতে পার নিয়ে যাও।” সুতরাং তারা ঘর-বাড়ীর আসবাব-পত্র এমন কি দরজা ও কাঠগুলোও উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে সেখান হতে বিদায় গ্রহণ করে। তাদের খর্জুর-বৃক্ষগুলো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর জন্যে বিশিষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ্ তা'আলা এগুলো তাকেই দিয়ে দেন। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আল্লাহ্ তাদের (ইয়াহুদীদের) নিকট হতে তাঁর রাসূল (সঃ)-কে যে ফায় দিয়েছেন, তার জন্যে তোমরা অশ্ব কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি।” (৫৯:৬) কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এর অধিকাংশই মুহাজিরদেরকে দিয়ে দেন। আনসারদের মধ্যে শুধু দু’জন অভাবগ্রস্তকে অংশ দেন। এ ছাড়া সবই তিনি মুহাজিরদের মধ্যে বন্টন করেন। যা বাকী থাকে ওটাই ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাদকা যা বানু ফাতেমার হাতে এসেছিল।অবশ্যই আমরা সংক্ষেপে গাওয়ায়ে বানী নাযীরের ঘটনা বর্ণনা করবে এবং এজন্যে আল্লাহরই নিকট আমরা সহায্য প্রার্থনা করছি।আসহাবে মাগাযী ওয়াস সিয়ার এ যুদ্ধের কারণ যা বর্ণনা করেছেন তা এই যে, মুশরিকরা প্রতারণা করে বি’রে মাউনাহ্ নাক স্থানে সাহাবীদেরকে শহীদ করে দেয় যারা সংখ্যায় সত্তরজন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে হযরত আমর ইবনে উমাইয়া যামারী (রাঃ) নামক সাহাবী কোন রকমে রক্ষা পেয়ে পলায়ন করেন এবং মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। পথে সুযোগে পেয়ে তিনি বানু আমির গোত্রের দু’জন লোককে হত্যা করে ফেলেন, অথচ এ গোত্রটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছিলেন। কিন্তু হযরত আমির (রাঃ)-এর এ খবর জানা ছিল না। মদীনায় পৌছে যখন তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সামনে ঘটনাটি বর্ণনা করেন তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি তাদেরকে হত্যা করে ফেলেছো? তাহলে তো এখন তাদের ওয়ারিশদেরকে রক্তপণ প্রদান করা আমার অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।” বানু নাযীর ও বানু আমিরের মধ্যেও পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সন্ধি ছিল। এজন্যেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বানু নাযীরের নিকট গমন করলেন এ উদ্দেশ্যে যে, রক্তপণের তারা কিছু আদায় করবে এবং তিনি কিছু আদায় করবেন আর এভাবে বানু আমীরকে সন্তুষ্ট করবেন। বানু নাযীর গোত্রের বস্তিটি মদীনার পূর্ব দিকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সেখানে পৌঁছলে তারা তাকে বললোঃ “হে আবুল কাসিম (সঃ)! হ্যাঁ, আমরা এ জন্যে প্রস্তুত আছি। এখনই আমরা আমাদের অংশ মুতাবিক সম্পদসহ আপনার খিদমতে হাযির হচ্ছি।” অতঃপর তারা তার নিকট হতে সরে গিয়ে পরস্পর পরামর্শ করলোঃ “এর চেয়ে বড় সুযোগে কি আর পাওয়া যাবে? এখন তিনি আমাদের হাতের মুঠোর মধ্যে রয়েছেন। এসো তাকে আমরা শেষ করে (হত্যা করে) ফেলি।” তারা পরামর্শক্রমে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, যে দেয়াল ঘেঁষে তিনি বসে আছেন ঐ ঘরের উপর কেউ চড়ে যাবে এবং সেখান হতে সে তার উপর একটি বড় পাথর নিক্ষেপ করবে। এতেই তাঁর জীবনলীলা শেষ হয়ে যাবে।আমর ইবনে জাহাশ ইবনে কা'ব এই কাজে নিযুক্ত হলো। অতঃপর কার্য সাধনের উদ্দেশ্যে সে ছাদের উপর আরোহণ করলো। ইতিমধ্যে আল্লাহ তা'আলা হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে স্বীয় নবী (সঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে নির্দেশ দিলেন। যে, তিনি যেন সেখান হতে চলে যান। সুতরাং তিনি তৎক্ষণাৎ সেখান হতে উঠে চলে গেলেন, ফলে ঐ নরাধম তার উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হলো। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে তাঁর কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবী ছিলেন। যেমন হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) প্রমুখ। তিনি সেখান হতে সরাসরি মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। আর ওদিকে যেসব সাহাবী তাঁর সাথে ছিলেন না এবং মদীনাতেই তাঁর জন্যে অপেক্ষমান ছিলেন, তাঁরা তাঁর বিলম্ব দেখে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং তার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু একটি লোকের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন যে, তিনি মদীনায় পৌছে গেছেন। সুতরাং তাঁরা ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে তাঁর বিলম্বের কারণ জিজ্ঞেস করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘটনাটি সবিস্তারে বর্ণনা করেন এবং তাঁদেরকে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন।সহাবীগণ তৎক্ষণাৎ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যান এবং আল্লাহর পথে বেরিয়ে পড়েন। ইয়াহূদীরা মুসলিম সেনাবাহিনীকে দেখে তাদের দূর্গের ফটক বন্ধ করে দিয়ে তথায় আশ্রয় গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে অবরোধ করেন এবং তাদের আশে-পাশের খেজুর বৃক্ষগুলো কেটে ফেলার ও জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। তখন ইয়াহুদীরা চীৎকার করে বলতে লাগলো যে, এটা হচ্ছে কি? যিনি অন্যদেরকে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করেন এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে মন্দ বলেন তিনি এটা কি করতে শুরু করলেন? সুতরাং একদিকে তো তাদের এই খেজুর বৃক্ষ কেটে ফেলার দুঃখ এবং অপরদিকে সাহায্য আসার যে কথা ছিল সেদিক হতে নৈরাশ্য, এ দু'টো বিষয় তাদের কোমর একেবারে ভেঙ্গ দিলো। সাহায্যের ঘটনাটি এই যে, বানু আউফ ইবনে খাযরাজের গোত্রটি যার মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালল, ওয়ালীআহ, মালিক ইবনে ককিল, সুওয়ায়েদ, আ'মাস প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ছিল, তারা বানী নাযীর গোত্রকে বলে পাঠিয়েছিলঃ “তোমরা মুকাবিলায় স্থির ও অটল থাকো, দূর্গ মুসলমানদের হাতে ছেড়ে দিয়ো না এবং আত্মসমর্পণ করো না, আমরা তোমাদের সাহায্যার্থে রয়েছি। তোমাদের শত্রু আমাদেরও শক্র। আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। তোমরা যুদ্ধের জন্যে বের হলে আমরাও বের হবো।” কিন্তু তখন পর্যন্ত তাদের ঐ ওয়াদা পূর্ণ হয়নি। তারা ইয়াহুদীদের সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসেনি। এদিকে এই বানী নাযীর গোত্র ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট আবেদন করলো যে, তিনি যেন তাদের প্রাণ রক্ষা করেন। তারা মদীনা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু তারা তাদের ধন-সম্পদ ও আসবাবপত্রের যা কিছু তাদের উটের উপর বোঝাই করে নিয়ে যেতে পারবে তা যেন তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাদের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং তারা তাদের আবাসভূমি ছেড়ে চলে যায়। যাবার সময় তারা তাদের ঘরের দরজাগুলো পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলে দিয়ে এগুলো সাথে নিয়ে যায় এবং ঘরগুলোও ভেঙ্গে ফেলে। এগুলো নিয়ে গিয়ে তারা সিরিয়া ও খায়বারে বসতি স্থাপন করে। তাদের অবশিষ্ট মালগুলো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর জন্যে খাস হয়ে যায় যে, তিনি ইচ্ছামত ওগুলো খরচ করতে পারেন। ওগুলো তিনি ঐ সব লোকের মধ্যে বন্টন করে দেন যাঁরা প্রথম দিকে হিজরত করেছিলেন। আনসারদের মাত্র দু’জন দরিদ্র লোককে তিনি কিছু অংশ দেন। তাঁরা হলেন হযরত সাহল ইবনে হানীফ (রাঃ) ও হযরত সাম্মাক ইবনে খারশাহ (রাঃ)। বানু নাযীর গোত্রের মাত্র দু’জন লোক মুসলমান হয় যাদের ধন-সম্পদ তাদের কাছেই থেকে যায়। একজন হলো ইয়ামীন ইবনে আমর ইবনে কা'ব (রাঃ), যে আমর ইবনে জাহ্হাশের চাচাতো ভাই ছিল। যে ছিল ঐ আমর যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে পাথর দ্বারা হত্যা করার ঘৃণ্য সংকল্প করেছিল। দ্বিতীয়জন হলো সা’দ ইবনে অহাব (রাঃ)।একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত ইয়ামীন (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে ইয়ামীন (রাঃ)! তোমার ঐ চাচাতো ভাইটিকে দেখো, সে আমার সাথে কি দুর্ব্যবহারই না করেছিল এবং আমার ক্ষতি সাধনের জন্যে কি ঘণ্য ষড়যন্ত্রেই না। লিপ্ত হয়েছিল!” তাঁর একথা শুনে হযরত ইয়ামীন (রাঃ) একটি লোকের মাধ্যমে তাকে হত্যা করেন। সূরায়ে হাশর বানু নাযীরের এই ঘটনা বর্ণনায় অবতীর্ণ হয়।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “হাশরের ভূমি হলো সিরিয়া দেশ। এ ব্যাপারে যদি কারো সন্দেহ থাকে তবে যেন সে (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে।” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন ঐ ইয়াহূদীদেরকে বলেনঃ “তোমরা এখান হতে বেরিয়ে যাও।” তখন তারা বলেঃ “আমরা কোথায় যাবো?” উত্তরে তিনি তাদেরকে বলেনঃ “হাশরের ভূমির দিকে।”হযরত হাসান (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন বানু নাযীরকে নির্বাসন দেন তখন বলেনঃ “এটা হলো প্রথম হার এবং আমি এর পিছনে পিছনে রয়েছি।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)বানু নাযীরের ঐ দূর্গগুলোর অবরোধ মাত্র ছয়দিন পর্যন্ত ছিল। দূর্গাগুলোর দৃঢ়তা, ইয়াহূদীদের সংখ্যাধিক্য, মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ও গোপন চক্রান্ত ইত্যাদি দেখে অবরোধকারী মুসলমানদের এটা কল্পনাও ছিল না যে, তারা এতো তাড়াতাড়ি সব ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে। আর ইয়হূদীরাও গর্বিত ছিল যে, তাদের দূর্গগুলো সবদিক দিয়েই সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য। সুতরাং তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে অবশ্যই রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহর শাস্তি এমন এক দিক হতে আসলো যা ছিল তাদের ধারণাতীত। আল্লাহ্ তা'আলার নীতি এটাই যে, চক্রান্তকারীরা তাদের চক্রান্তের মধ্যেই থাকে, এমতাবস্থায় তাদের অজান্তে আকস্মিকভাবে তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে। তাদের অন্তরে ত্রাসের সঞ্চার হয়। আর ত্রাসের সঞ্চার হবেই না বা কেন? তাদেরকে অররোধকারী ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে প্রভাব দান করা হয়েছিল। তাঁর নাম শুনে শত্রুদের অন্তর এক মাসের পথের ব্যবধান হতে কেঁপে উঠতো। তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক! ইয়াহূদীরা তাদের নিজেদের হাতে তাদের ঘর-বাড়ীগুলো ধ্বংস করতে শুরু করে। ছাদের কাঠ ও ঘরের দরজাগুলো নিয়ে যাবার জন্যে ভেঙ্গে ফেলতে থাকে। মুমিনদের হাতেও ওগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাই আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ অতএব, হে চক্ষুষ্মন ব্যক্তিরা! তোমরা এটা হতে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ কর।এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি ঐ ইয়াহুদীদের ভাগ্যে নির্বাসন লিপিবদ্ধ না থাকতো এবং আল্লাহ তাদের নির্বাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না থাকতেন তবে দুনিয়ায় তিনি তাদেরকে আরো কঠিন শাস্তি দিতেন। তাদেরকে হত্যা করা হতো ও বন্দী করা হতো। অতঃপর তাদের জন্যে পরকালে রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি।বানু নাযীরের এ যুদ্ধ বদর যুদ্ধের ছয় মাস পরে সংঘটিত হয়েছিল। উট বোঝাই করে যত মাল তারা নিয়ে যেতে পারতো তা নিয়ে যাবার অনুমতি তাদেরকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে যাবার অনুমতি তাদেরকে দেয়া হয়নি। তারা ছিল ঐ গোত্রের লোক যাদেরকে ইতিপূর্বে কখনো নির্বাসন দেয়া হয়নি। হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো বানী নাযীরের এই ঘটনা সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়।শব্দের অর্থ ‘হত্যা’ এবং ধ্বংসও করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রতি তিনজনকে একটি করে উট এবং একটি করে মশক দিয়েছিলেন। এই ফায়সালার পরেও রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত মাসলামা (রাঃ)-কে তাদের নিকট পাঠিয়ে দেন এবং তাদেরকে অনুমতি প্রদান করেন যে, তারা যেন তিন দিনের মধ্যে নিজেদের আসবাব-পত্র ঠিকঠাক করে নিয়ে সেখান হতে প্রস্থান করে। এই পার্থিব শাস্তির পরেই পারলৌকিক শাস্তিরও বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, সেখানেও তাদের জন্যে জাহান্নামের আগুন অবধারিত রয়েছে। তাদের এই দুর্গতির প্রকৃত কারণ এই যে, তারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং একদিক দিয়ে তারা সমস্ত নবীকেই অস্বীকার ও অবিশ্বাস করেছে। কেননা, প্রত্যেক নবীই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। ঐ লোকগুলো তাকে পুরোপুরিভাবে চিনতো ও জানতো। এমনকি পিতা তার পুত্রকে যেমন চিনে তার চেয়েও অধিক তারা শেষ নবী (সঃ)-কে চিনতো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও শুধু হিংসার কারণেই তাকে তারা মানতো না। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধাচরণে তারা উঠে পড়ে লেগে যায়। আর প্রকাশ্য ব্যাপার এই যে, আল্লাহ্ তা'আলাও স্বীয় বিরুদ্ধাচারীদের উপর কঠিন শাস্তি অবতীর্ণ করে থাকেন।(আরবী) বলা হয় ভাল খেজুরের গাছকে। কারো কারো উক্তি মতে আজওয়াহ্ ও বিরনী এই প্রকার খেজুরগুলো লীনাহ্-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। কেউ কেউ বলেন যে, শুধু আযওয়াহ লীনাহ্-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। আবার কারো কারো মতে সর্বপ্রকারের খেজুরই এর অন্তর্ভুক্ত। বুওয়াইরাহ্ও এর অন্তর্ভুক্ত। ইয়াহূদীরা যে তিরস্কারের ছলে বলেছিল যে, তাদের খেজুরের গাছগুলো কাটিয়ে দিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) নিজের উক্তির বিপরীত কাজ করতঃ ভূ-পৃষ্ঠে কেন বিপর্যয় সৃষ্টি করছেন? এটা তাদের ঐ প্রশ্নেরই জবাব যে, যা কিছু হচ্ছে সবই প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে তার শত্রুদেরকে লাঞ্ছিত ও অকৃতকার্য করে দেয়ার লক্ষ্যেই হচ্ছে। যেসব গাছ বাকী রেখে দেয়া হচ্ছে সেটাও তাঁরঅনুমতিক্রমেই হচ্ছে এবং যেগুলো কাটিয়ে ফেলা হচ্ছে সেটাও যৌক্তিকতার সাথেই হচ্ছে।এটাও বর্ণিত আছে যে, মুহাজিরগণ একে অপরকে ঐ গাছগুলো কেটে ফেলতে নিষেধ করছিলেন এই কারণে যে, শেষে তো ওগুলো গানীমাত হিসেবে মুসলমানরাই লাভ করবেন, সুতরাং ওগুলো কেটে ফেলে লাভ কি? তখন আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন যে, বাধাদানকারীরাও একদিকে সত্যের উপর রয়েছে এবং কর্তনকারীরাও সত্যের উপর রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো মুসলমানদের উপকার সাধন করা এবং তাদের উদ্দেশ্য হলো কাফিরদেরকে রাগান্বিত করে তোলা এবং তাদের দুষ্কার্যের স্বাদ গ্রহণ করানো। এটাও এদের উদ্দেশ্য যে, এর ফলে এই শত্রুরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে এবং এরপর যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে যাবে, তখন তাদের মন্দ কার্যের শাস্তি হিসেবে তাদেরকে তরবারী দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করে দেয়া হবে।সাহাবীগণ এ কাজ তো করলেন বটে, কিন্তু পরক্ষণেই ভয় পেলেন যে, না জানি হয়তো ঐ খর্জুর বৃক্ষগুলো কেটে ফেলা অথবা বাকী রেখে দেয়ার কারণে তাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। তাই তারা এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আল্লাহ্ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ দু'টোতেই প্রতিদান বা সওয়াব রয়েছে, কর্তন করার মধ্যেও এবং বাকী রেখে দেয়ার মধ্যেও। কোন কোন রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, কেটে ফেলা এবং জ্বালিয়ে দেয়া। উভয়েরই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।ঐ সময় বানু কুরাইযা ইয়াহুদীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছিলেন এবং তাদেরকে মদীনাতেই অবস্থানের অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তারাও যখন মুকাবিলায় নেমে পড়ে তখন তাদের মধ্যে যারা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তাদেরকে হত্যা করা হয় এবং তাদের নারীরা, শিশুরা ও তাদের সম্পদগুলো মুসলমানদের মধ্যে বন্টিত হয়। হ্যাঁ, তবে তাদের মধ্যে যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে। হাযির হয়ে ঈমান আনয়ন করে তারা রক্ষা পায়। অতঃপর মদীনা হতে সমস্ত উয়াহূদীকে বের করে দেয়া হয়। বানী কাইনুকাকেও, যাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ) ছিলেন এবং বানী হারিসাকেও। সমস্ত ইয়াহদীকে নির্বাসন দেয়া হয়। এই সমুদয় ঘটনা আরব কবিরা তাঁদের কবিতার মধ্যে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন যা সীরাতে ইবনে ইসহাকে বর্ণিত হয়েছে। ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর মতে এটা উহুদ ও বি’রে মাউনার পরবর্তী ঘটনা এবং উরওয়া (রঃ)-এর মতে এ ঘটনাটি বদর যুদ্ধের ছয় মাস পরে সংঘটিত হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

আল-হাশর 59:6

৬-৭ নং আয়াতের তাফসীর: ফায় কোন মালকে বলে, ওর বিশেষণ কি এবং হুকুম কি এসবের বর্ণনা এখানে দেয়া হচ্ছে। ফায় কাফিরদের ঐ মালকে বলা হয় যা তাদের সাথে যুদ্ধ করা ছাড়াই মুসলমানদের হস্তগত হয়। যেমন বানী নাযীরের ঐ মাল ছিল যার বর্ণনা উপরে গত হলো যে, মুসলমানরা ওর জন্যে তাদের অশ্বে কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করেনি। অর্থাৎ ঐ কাফিরদের সাথে সামনা-সামনি কোন যুদ্ধ হয়নি, বরং আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে ত্রাসের সঞ্চার করে দেন এবং তারা তাদের দূর্গ শূন্য করে দিয়ে মুসলমানদের কর্তৃত্বে চলে আসে। এটাকেই ফায় বলা হয়। তাদের মাল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দখলে এসে যায়। তিনি ইচ্ছামত ওগুলো ব্যয় করেন। সুতরাং তিনি পুণ্য ও ভাল কাজেই ওগুলো খরচ করেন, যার বর্ণনা এর পরবর্তী আয়াত এবং অন্য আয়াতে রয়েছে।তাই এখানে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা বানু নাযীরের নিকট হতে তাঁর রাসূল (সঃ)-কে যে ফায় দিয়েছেন, তার জন্যে তোমরা (মুসলমানরা) অশ্বে কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি। আল্লাহ্ তো যার উপর ইচ্ছা তাঁর রাসূলদেরকে কর্তৃত্ব দান করে থাকেন। আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। তাঁর উপর কারো কোন শক্তি নেই এবং কেউ তার কোন কাজে বাধাদান করারও ক্ষমতা রাখে না। বরং তিনিই সবারই উপর বিজয়ী এবং সবাই তাঁর আদেশ পালনে বাধ্য।এরপর আল্লাহ্ পাক বলেনঃ যে জনপদ এভাবে বিজিত হবে ওর মালের হুকুম এটাই যে, ওটা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিজের দখলে নিয়ে নিবেন যার বর্ণনা এই আয়াতে এবং পরবর্তী আয়াতে রয়েছে। এটাই হলো ফায়-এর মালের খরচের স্থান এবং এর খরচের হুকুম। যেমন হাদীসে এসেছে যে, বানী নাযীরের মাল ফায় হিসেবে খাস করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এরই হয়ে যায়। তা হতে তিনি স্বীয় পরিবারের লোকদেরকে সারা বছরের খরচ দিতেন এবং যা অবশিষ্ট থাকতো তা তিনি যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধের আসবাব-পত্র ক্রয়ের কাজে ব্যয় করতেন। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) ছাড়া সুনানের অন্যান্য লেখকগণ তাদের কিতাবসমূহে এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত মালিক ইবনে আউস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা বেলা কিছুটা উঠে যাওয়ার পর আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তার বাড়ীতে গিয়ে দেখি যে, তিনি একটি চৌকির উপর বসে আছেন যার উপর কাপড়, চাদর ইত্যাদি কিছুই নেই। আমাকে দেখে তিনি বলেনঃ “তোমার কওমের কিছু লোক আমার কাছে এসেছিল। আমি তাদেরকে কিছু দিয়েছি। তুমি তা নিয়ে তাদের মধ্যে বন্টন করে দাও।” আমি বললামঃ জনাব! যদি এ কাজের দায়িত্ব অন্যের উপর অর্পণ করতেন তবে খুবই ভাল হতো। তিনি বললেনঃ “না, তোমাকেই এ দায়িত্ব দেয়া হলো।” আমি বললামঃ ঠিক আছে। ইতিমধ্যে (তার দ্বাররক্ষী) ইয়ারফা (রাঃ) এসে বললেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! হযরত উসমান উবনে আফফান (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ), হযরত যুবায়ের ইবনে আওয়াম (রাঃ) এবং হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) এসেছেন। তাঁদেরকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছেন কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, তাদেরকে আসতে বলো।” তারা। আসলেন। আবার ইয়ারফা (রাঃ) এসে বললেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! হযরত আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাচ্ছেন। হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “তাদেরকেও আসতে বলো।” তাঁরা দু’জনও আসলেন। হযরত আব্বাস (রাঃ) বললেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আমার মধ্যে ও এর (হযরত আলীর রাঃ) মধ্যে মীসাংসা করে দিন।” পূর্বে যে চারজন বুযুর্গ ব্যক্তি এসেছিলেন তাদের মধ্য হতেও কোন একজন বললেনঃ “হ্যাঁ, হে আমীরুল মুমিনীন! এ দুজনের মধ্যে ফায়সালা করে দিন এবং তাদের শান্তি দান করুন।” ঐ সময় আমার ধারণা হলো যে, এই দুই বুযুর্গ ব্যক্তিই ঐ চারজন বুযুর্গ ব্যক্তিকে পূর্বে পাঠিয়েছেন। হযরত উমার (রাঃ) এই দু’জনকে বললেনঃ “আপনারা থামুন।” অতঃপর তিনি ঐ চারজন সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্বোধন করে বলেন, যে আল্লাহর হুকুমে আকাশ ও পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। তাঁর কসম দিয়ে আমি আপনাদেরকে বলছি যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) যে বলেছেনঃ ‘আমরা (নবীরা) কোন ওয়ারিশ রেখে যাই না, আমরা যা কিছু (মাল-ধন) ছেড়ে যাই তা সাদকারূপে গণ্য হয়। এটা কি আপনাদের জানা আছে?” তারা উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ (আমাদের জানা আছে)।” অতঃপর তিনি হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বললেন, যে আল্লাহর হুকুমে আসমান ও যমীন কায়েম রয়েছে তাঁর কসম দিয়ে আমি আপনাদেরকে বলছি যে, “আমরা কোন ওয়ারিশ রেখে যাই না, আমরা যা ছেড়ে যাই তা সাদকারূপে গণ্য হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর এ উক্তিটি আপনাদের জানা আছে কি?” তাঁরা জাবাবে বললেনঃ “হ্যাঁ, আছে।” তখন হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর জন্যে কিছু সম্পদ খাস করেছিলেন যা জনগণের মধ্যে কারো জন্যে খাস করেননি।” অতঃপর তিনি ... (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা বানী নাযীরের মাল স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে ফায় স্বরূপ দিয়েছিলেন। আল্লাহর কসম! না আমি এতে আপনাদের উপর অন্য কাউকেও প্রাধান্য দিয়েছি, না আমি নিজে সবই নিয়ে নিয়েছি। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এটা হতে তাঁর নিজের ও পরিবারবর্গের এক বছরের খরচ গ্রহণ করতেন এবং বাকীটা বায়তুল মালে জমা দিতেন। তারপর তিনি ঐ চারজন মহান ব্যক্তিকে অনুরূপভাবে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি আপনাদের জানা আছে?” তাঁরা ‘হ্যাঁ' বলে উত্তরে দেন। তারপর তিনি ঐ দুই সম্মানিত ব্যক্তিকে ঐ রূপ কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করেন এবং তারাও উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলেন। অতঃপর হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকালের পর হযরত আবু বকর (রাঃ) খলীফা নির্বাচিত হন। তারপর আপনারা দুজন (হযরত আলী রাঃ ও হযরত আব্বাস রাঃ) তাঁর কাছে আসেন। হে আব্বাস (রাঃ)! আপনি আত্মীয়তার দাবী জানিয়ে আপনার ভ্রাতুস্পুত্র (সঃ)-এর মাল হতে আপনার মীরাস যাজ্ঞা করেন। আর ইনি অর্থাৎ হযরত আলী (রাঃ) নিজের প্রাপ্যের দাবী জানিয়ে স্বীয় স্ত্রী অর্থাৎ হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর পক্ষ হতে তাঁর পিতা (সঃ)-এর মালের মীরাস চেয়ে বসেন। জবাবে হযরত আবু বকর (রাঃ) আপনাদের দুজনকে বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা কোন ওয়ারিশ রেখে যাই না। আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই তা সাদকারূপে গণ্য হয়।” আল্লাহ্ তা'আলা খুব ভাল জানেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) নিশ্চিতরূপে একজন সত্যবাদী, পুণ্যবান, হিদায়াতপ্রাপ্ত ও সত্যের অনুসারী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যতদিন খলীফা ছিলেন ততদিন তিনি এ মালের জিম্মাদার ছিলেন। তাঁর ইন্তেকালের পর আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খলীফা নির্বাচিত হয়েছি। তারপর ঐ মাল আমার জিম্মাদারীতে চলে আসে। এরপর এক পর্যায়ে আপনারা দু'জন আমার নিকট আগমন করেন এবং নিজেরা এই মালের জিম্মাদার হওয়ার প্রস্তাব ও দাবী জানান। জবাবে আমি আপনাদেরকে বলি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যেভাবে এ মাল খরচ করতেন আপনারাও ঐ ভাবে খরচ করবেন এই শর্তে যদি আপনারা এই মালের জিম্মাদার হতে চান তবে আমি এটা আপনাদের হাতে সমর্পণ করতে পারি। আপনারা এটা স্বীকার করে নেন এবং আল্লাহ্ তা'আলাকে সাক্ষী রেখে আপনারা এ মালের জিম্মাদারী গ্রহণ করেন। অতঃপর এখন আপনারা আমার কাছে এসেছেন, তবে কি আপনারা এছাড়া অন্য কোন ফায়সালা চান? আল্লাহর কসম! কিয়ামত পর্যন্ত আমি এছাড়া অন্য কোন ফায়সালা করতে পারি না। হ্যাঁ, এটা হতে পারে যে, যদি আপনারা আপনাদের অঙ্গীকার অনুযায়ী এই মালের রক্ষণাবেক্ষণ ও খরচ করতে অপারগ হন তবে এর জিম্মাদারী আমাকে ফিরিয়ে দেন যাতে আমি নিজেই এটাকে ঐ রূপেই খরচ করি যেরূপে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) খরচ করতেন এবং যেভাবে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে খরচ করা হতো এবং আজ পর্যন্ত হচ্ছে।” (ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “জনগণ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে তাদের গাছ ইত্যাদি প্রদান করতো। অবশেষে যখন বানী কুরাইযা ও বানী নাযীরের ধন-সম্পদ তার অধিকারভুক্ত হলো তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁকে প্রদত্ত জনগণের মালগুলো তিনি জনগণকে ফিরিয়ে দিতে শুরু করলেন। তখন আমার পরিবারস্থ লোকগুলো আমাকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট এ কথা বলার জন্যে পাঠালো যে, তিনি যেন আমাদেরকেও আমাদের তাঁকে প্রদত্ত সম্পদগুলো ফিরিয়ে দেন। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একথা বললে তিনি ওগুলো আমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনি ওগুলো তার পক্ষ হতে হযরত উম্মে আইমান (রাঃ)-কে দিয়ে রেখেছিলেন। হযরত উম্মে আইমান (রাঃ) যখন জানতে পারলেন যে, এগুলো তাঁর নিকট হতে নিয়ে নেয়া হবে তখন তিনি আমার ঘাড়ের উপর কাপড় রেখে দিয়ে বললেনঃ “যে আল্লাহ্ ছাড়া কোন মা'বূদ নেই তাঁর কসম! এগুলো আমি আপনাকে কখনই দিবো না। এগুলো তো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাকে দিয়ে রেখেছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাঁকে বললেনঃ “হে উম্মে আইমান (রাঃ)! এর বিনিময়ে আমি তোমাকে এতো এতো প্রদান করবে (সুতরাং তোমার চিন্তার কোন কারণ নেই)।” কিন্তু তিনি মানলেন না, বরং ঐ কথাই বলতে থাকলেন। আবার রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “তোমার জন্যে এতো এতো রয়েছে। এতেও তিনি সন্তুষ্ট হলেন না, বরং একই কথা বলতে থাকলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) পুনরায় বললেনঃ “তোমাকে এই পরিমাণ, এই পরিমাণ দেয়া হবে। আমার ধারণা হয় যে, তিনি শেষ পর্যন্ত বললেনঃ “তোমাকে যা দেয়া হয়েছে তার প্রায় দশগুণ দেয়া হবে, তখন তিনি খুশী হলেন এবং নীরবতা অবলম্বন করলেন। সুতরাং আমাদের মাল আমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হলো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ফায়-এর এই মাল যে পাঁচ জায়গায় খরচ করা হবে, গানীমতের মাল খরচ করার জায়গাও এই পাঁচটি। সূরায়ে আনফালে এর পূর্ণ তাত্রী ও তাওযীহ্ সহ পরিপূর্ণ তাফসীর আল্লাহ্ পাকের ফযল ও করমে গত হয়েছে। এ জন্যে এখানে আমরা আর এর পুনরাবৃত্তি করলাম না।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ ফায়-এর মালের খরচের জায়গাগুলো আমি এজন্যেই স্পষ্টভাবে বর্ণনা করলাম যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান শুধু তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে। শুধু মালদারদের হাতে চলে গেলে তারা তাদের ইচ্ছামত তা খরচ করতো এবং দরিদ্রদের হাতে তা আসতো না।ইরশাদ হচ্ছেঃ আমার রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে যে কাজ করতে বলে তা তোমরা কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাকো। তোমরা এ বিশ্বাস রাখো যে, রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে যে কাজ করার আদেশ করে সেটা ভাল কাজই হয় এবং যে কাজ হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা নিঃসন্দেহে মন্দ কাজ।হযরত মাসরূক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন মহিলা হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “আমার নিকট এ খবর পৌছেছে যে, আপনি নারীদের উল্কি করা হতে ও চুলে চুল মিলিত করা হতে নিষেধ করে থাকেন, আচ্ছা বলুন তো, আপনি এটা আল্লাহর কিতাবে পেয়েছেন, অথবা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হতে শুনেছেন?” উত্তরে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, এটা আমি আল্লাহর কিতাবেও পেয়েছি এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হতেও শুনেছি।” একথা শুনে মহিলাটি বলেঃ “আমি গোটা কুরআন মাজীদ পাঠ করেছি, কিন্তু কোথাও তো এটা পাইনি!” তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “তুমি তাতে (আরবী) (রাসূল সঃ তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাকো) এটা কি পাওনি?” মহিলাটি জবাবে বলেঃ “হ্যাঁ, তাতো পেয়েছি।” তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেনঃ “আমি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উল্কি করা হতে, চুলে চুল মিলানো হতে এবং কপাল ও মুখমণ্ডলের চুল নূচা হতে নিষেধ করেছেন।” মহিলাটি তখন বললোঃ “জনাব! আপনার পরিবারের কোন কোন মহিলাও তো এরূপ করে থাকে?” তিনি তাকে বললেনঃ “তাহলে তুমি আমার বাড়ীর ভিতরে প্রবেশ করে দেখে এসো।” সে। গেল এবং দেখে এসে বললোঃ “জনাব! আমাকে ক্ষমা করুন! আমি ভুল বলেছি। উপরোক্তে কোন দোষ আপনার পরিবারের কোন মহিলার মধ্যে আমি দেখতে পেলাম না।” তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) মহিলাটিকে বললেনঃ “তুমি কি ভুলে গিয়েছে যে, আল্লাহর সৎ বান্দা (হযরত আয়েব আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি এটা চাই না যে, যা হতে আমি তোমাদেরকে বিরত রাখছি আমি নিজে তার বিপরীত করবে।” (১১:৮৮) (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আলকামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা অভিসম্পাত বর্ষণ করেন ঐ নারীদের উপর যারা উল্কি করায় ও যারা উল্কি করে, যারা তাদের কপালের চুল নূচে এবং যারা নিজেদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে তাদের সামনের দাঁতগুলোর প্রশস্ততা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর তৈরীকৃত সৃষ্টির পরিবর্তন ঘটায়।” তার এ কথা শুনে বানী আসাদ গোত্রের উম্মে ইয়াকুব নাম্নী একটি মহিলা তাঁকে জিজ্ঞেস করেঃ “আপনি কি এরূপ কথা বলেছেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ) যার উপর লা'নত করেছেন, আমি কেন তার উপর লা'নত করবে না? আর যা কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে?” মহিলাটি বললোঃ “আমি কুরআন কারীমের প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত সবই পাঠ করেছি, কিন্তু আমি কোথাও তো এ হুকুম পাইনি?” তিনি বললেনঃ “তুমি যদি বুঝে ও চিন্তা করে পাঠ করতে তবে অবশ্যই তা পেতে। আল্লাহ্ তা'আলার উক্তিটি কি তুমি কুরআন কারীমে পাওনি?” সে জবাবে বললোঃ “হ্যাঁ, এটা তো পেয়েছি!” তারপর তিনি তাকে ঐ হাদীসটি শুনিয়ে দেন। তখন সে তাঁকে বললোঃ “আমার ধারণা যে, আপনার পরিবারের লোকও এই রূপ করে থাকে।” তিনি তাকে বললেনঃ “তুমি (আমার বাড়ীতে) যাও এবং দেখে এসো!” সে গেল, কিন্তু সে যা ধারণা করেছিল তার কিছুই দেখলো না। সুতরাং সে ফিরে এসে বললোঃ “আমি কিছুই দেখতে পেলাম না।” তিনি তখন বললেনঃ “যদি আমার গৃহিণী এরূপ করতো তবে অবশ্যই আমি তাকে ছেড়ে দিতাম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম(রঃ) তাঁদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি যখন তোমাদেরকে কোন নির্দেশ দিই তখন তোমরা তোমাদের সাধ্যমত তা পালন করবে এবং যখন তোমাদেরকে কোন কিছু হতে নিষেধ করি তখন তোমরা তা হতে বিরত থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উমার (রাঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কদুর খোলের তৈরী পাত্রে, সবুজ রং এর কলসে, আলকাতরার রঙ এ রঞ্জিত পাত্রে এবং কাঠে খোদাইকৃত পাত্রে নবীয তৈরী করতে অর্থাৎ খেজুর, কিসমিস্ ইত্যাদি ভিজিয়ে রাখতে নিষেধ করেছেন। অতঃর তাঁরা (আরবী) এই আয়াতটিই পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে তোমরা আল্লাহকে ভয় করতঃ তার নির্দেশাবলী মেনে চল এবং তাঁর নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ হতে দূরে থাকো। জেনে রেখো যে, যারা তাঁর নাফরমানী ও বিরুদ্ধাচরণ করে এবং তিনি যা করতে নিষেধ করেছেন তা করে তাদেরকে তিনি কঠোর শাস্তি দেন এবং দুঃখের মার মারেন।

আল-হাশর 59:7

৬-৭ নং আয়াতের তাফসীর: ফায় কোন মালকে বলে, ওর বিশেষণ কি এবং হুকুম কি এসবের বর্ণনা এখানে দেয়া হচ্ছে। ফায় কাফিরদের ঐ মালকে বলা হয় যা তাদের সাথে যুদ্ধ করা ছাড়াই মুসলমানদের হস্তগত হয়। যেমন বানী নাযীরের ঐ মাল ছিল যার বর্ণনা উপরে গত হলো যে, মুসলমানরা ওর জন্যে তাদের অশ্বে কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করেনি। অর্থাৎ ঐ কাফিরদের সাথে সামনা-সামনি কোন যুদ্ধ হয়নি, বরং আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে ত্রাসের সঞ্চার করে দেন এবং তারা তাদের দূর্গ শূন্য করে দিয়ে মুসলমানদের কর্তৃত্বে চলে আসে। এটাকেই ফায় বলা হয়। তাদের মাল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দখলে এসে যায়। তিনি ইচ্ছামত ওগুলো ব্যয় করেন। সুতরাং তিনি পুণ্য ও ভাল কাজেই ওগুলো খরচ করেন, যার বর্ণনা এর পরবর্তী আয়াত এবং অন্য আয়াতে রয়েছে।তাই এখানে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা বানু নাযীরের নিকট হতে তাঁর রাসূল (সঃ)-কে যে ফায় দিয়েছেন, তার জন্যে তোমরা (মুসলমানরা) অশ্বে কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি। আল্লাহ্ তো যার উপর ইচ্ছা তাঁর রাসূলদেরকে কর্তৃত্ব দান করে থাকেন। আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। তাঁর উপর কারো কোন শক্তি নেই এবং কেউ তার কোন কাজে বাধাদান করারও ক্ষমতা রাখে না। বরং তিনিই সবারই উপর বিজয়ী এবং সবাই তাঁর আদেশ পালনে বাধ্য।এরপর আল্লাহ্ পাক বলেনঃ যে জনপদ এভাবে বিজিত হবে ওর মালের হুকুম এটাই যে, ওটা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিজের দখলে নিয়ে নিবেন যার বর্ণনা এই আয়াতে এবং পরবর্তী আয়াতে রয়েছে। এটাই হলো ফায়-এর মালের খরচের স্থান এবং এর খরচের হুকুম। যেমন হাদীসে এসেছে যে, বানী নাযীরের মাল ফায় হিসেবে খাস করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এরই হয়ে যায়। তা হতে তিনি স্বীয় পরিবারের লোকদেরকে সারা বছরের খরচ দিতেন এবং যা অবশিষ্ট থাকতো তা তিনি যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধের আসবাব-পত্র ক্রয়ের কাজে ব্যয় করতেন। (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) ছাড়া সুনানের অন্যান্য লেখকগণ তাদের কিতাবসমূহে এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত মালিক ইবনে আউস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা বেলা কিছুটা উঠে যাওয়ার পর আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তার বাড়ীতে গিয়ে দেখি যে, তিনি একটি চৌকির উপর বসে আছেন যার উপর কাপড়, চাদর ইত্যাদি কিছুই নেই। আমাকে দেখে তিনি বলেনঃ “তোমার কওমের কিছু লোক আমার কাছে এসেছিল। আমি তাদেরকে কিছু দিয়েছি। তুমি তা নিয়ে তাদের মধ্যে বন্টন করে দাও।” আমি বললামঃ জনাব! যদি এ কাজের দায়িত্ব অন্যের উপর অর্পণ করতেন তবে খুবই ভাল হতো। তিনি বললেনঃ “না, তোমাকেই এ দায়িত্ব দেয়া হলো।” আমি বললামঃ ঠিক আছে। ইতিমধ্যে (তার দ্বাররক্ষী) ইয়ারফা (রাঃ) এসে বললেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! হযরত উসমান উবনে আফফান (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ), হযরত যুবায়ের ইবনে আওয়াম (রাঃ) এবং হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) এসেছেন। তাঁদেরকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছেন কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, তাদেরকে আসতে বলো।” তারা। আসলেন। আবার ইয়ারফা (রাঃ) এসে বললেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! হযরত আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাচ্ছেন। হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “তাদেরকেও আসতে বলো।” তাঁরা দু’জনও আসলেন। হযরত আব্বাস (রাঃ) বললেনঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! আমার মধ্যে ও এর (হযরত আলীর রাঃ) মধ্যে মীসাংসা করে দিন।” পূর্বে যে চারজন বুযুর্গ ব্যক্তি এসেছিলেন তাদের মধ্য হতেও কোন একজন বললেনঃ “হ্যাঁ, হে আমীরুল মুমিনীন! এ দুজনের মধ্যে ফায়সালা করে দিন এবং তাদের শান্তি দান করুন।” ঐ সময় আমার ধারণা হলো যে, এই দুই বুযুর্গ ব্যক্তিই ঐ চারজন বুযুর্গ ব্যক্তিকে পূর্বে পাঠিয়েছেন। হযরত উমার (রাঃ) এই দু’জনকে বললেনঃ “আপনারা থামুন।” অতঃপর তিনি ঐ চারজন সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্বোধন করে বলেন, যে আল্লাহর হুকুমে আকাশ ও পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। তাঁর কসম দিয়ে আমি আপনাদেরকে বলছি যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) যে বলেছেনঃ ‘আমরা (নবীরা) কোন ওয়ারিশ রেখে যাই না, আমরা যা কিছু (মাল-ধন) ছেড়ে যাই তা সাদকারূপে গণ্য হয়। এটা কি আপনাদের জানা আছে?” তারা উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ (আমাদের জানা আছে)।” অতঃপর তিনি হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বললেন, যে আল্লাহর হুকুমে আসমান ও যমীন কায়েম রয়েছে তাঁর কসম দিয়ে আমি আপনাদেরকে বলছি যে, “আমরা কোন ওয়ারিশ রেখে যাই না, আমরা যা ছেড়ে যাই তা সাদকারূপে গণ্য হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর এ উক্তিটি আপনাদের জানা আছে কি?” তাঁরা জাবাবে বললেনঃ “হ্যাঁ, আছে।” তখন হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রাসূল (সঃ)-এর জন্যে কিছু সম্পদ খাস করেছিলেন যা জনগণের মধ্যে কারো জন্যে খাস করেননি।” অতঃপর তিনি ... (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা বানী নাযীরের মাল স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে ফায় স্বরূপ দিয়েছিলেন। আল্লাহর কসম! না আমি এতে আপনাদের উপর অন্য কাউকেও প্রাধান্য দিয়েছি, না আমি নিজে সবই নিয়ে নিয়েছি। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) এটা হতে তাঁর নিজের ও পরিবারবর্গের এক বছরের খরচ গ্রহণ করতেন এবং বাকীটা বায়তুল মালে জমা দিতেন। তারপর তিনি ঐ চারজন মহান ব্যক্তিকে অনুরূপভাবে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি আপনাদের জানা আছে?” তাঁরা ‘হ্যাঁ' বলে উত্তরে দেন। তারপর তিনি ঐ দুই সম্মানিত ব্যক্তিকে ঐ রূপ কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করেন এবং তারাও উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলেন। অতঃপর হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকালের পর হযরত আবু বকর (রাঃ) খলীফা নির্বাচিত হন। তারপর আপনারা দুজন (হযরত আলী রাঃ ও হযরত আব্বাস রাঃ) তাঁর কাছে আসেন। হে আব্বাস (রাঃ)! আপনি আত্মীয়তার দাবী জানিয়ে আপনার ভ্রাতুস্পুত্র (সঃ)-এর মাল হতে আপনার মীরাস যাজ্ঞা করেন। আর ইনি অর্থাৎ হযরত আলী (রাঃ) নিজের প্রাপ্যের দাবী জানিয়ে স্বীয় স্ত্রী অর্থাৎ হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর পক্ষ হতে তাঁর পিতা (সঃ)-এর মালের মীরাস চেয়ে বসেন। জবাবে হযরত আবু বকর (রাঃ) আপনাদের দুজনকে বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা কোন ওয়ারিশ রেখে যাই না। আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই তা সাদকারূপে গণ্য হয়।” আল্লাহ্ তা'আলা খুব ভাল জানেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) নিশ্চিতরূপে একজন সত্যবাদী, পুণ্যবান, হিদায়াতপ্রাপ্ত ও সত্যের অনুসারী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যতদিন খলীফা ছিলেন ততদিন তিনি এ মালের জিম্মাদার ছিলেন। তাঁর ইন্তেকালের পর আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খলীফা নির্বাচিত হয়েছি। তারপর ঐ মাল আমার জিম্মাদারীতে চলে আসে। এরপর এক পর্যায়ে আপনারা দু'জন আমার নিকট আগমন করেন এবং নিজেরা এই মালের জিম্মাদার হওয়ার প্রস্তাব ও দাবী জানান। জবাবে আমি আপনাদেরকে বলি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যেভাবে এ মাল খরচ করতেন আপনারাও ঐ ভাবে খরচ করবেন এই শর্তে যদি আপনারা এই মালের জিম্মাদার হতে চান তবে আমি এটা আপনাদের হাতে সমর্পণ করতে পারি। আপনারা এটা স্বীকার করে নেন এবং আল্লাহ্ তা'আলাকে সাক্ষী রেখে আপনারা এ মালের জিম্মাদারী গ্রহণ করেন। অতঃপর এখন আপনারা আমার কাছে এসেছেন, তবে কি আপনারা এছাড়া অন্য কোন ফায়সালা চান? আল্লাহর কসম! কিয়ামত পর্যন্ত আমি এছাড়া অন্য কোন ফায়সালা করতে পারি না। হ্যাঁ, এটা হতে পারে যে, যদি আপনারা আপনাদের অঙ্গীকার অনুযায়ী এই মালের রক্ষণাবেক্ষণ ও খরচ করতে অপারগ হন তবে এর জিম্মাদারী আমাকে ফিরিয়ে দেন যাতে আমি নিজেই এটাকে ঐ রূপেই খরচ করি যেরূপে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) খরচ করতেন এবং যেভাবে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতের যুগে খরচ করা হতো এবং আজ পর্যন্ত হচ্ছে।” (ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “জনগণ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে তাদের গাছ ইত্যাদি প্রদান করতো। অবশেষে যখন বানী কুরাইযা ও বানী নাযীরের ধন-সম্পদ তার অধিকারভুক্ত হলো তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁকে প্রদত্ত জনগণের মালগুলো তিনি জনগণকে ফিরিয়ে দিতে শুরু করলেন। তখন আমার পরিবারস্থ লোকগুলো আমাকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট এ কথা বলার জন্যে পাঠালো যে, তিনি যেন আমাদেরকেও আমাদের তাঁকে প্রদত্ত সম্পদগুলো ফিরিয়ে দেন। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একথা বললে তিনি ওগুলো আমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনি ওগুলো তার পক্ষ হতে হযরত উম্মে আইমান (রাঃ)-কে দিয়ে রেখেছিলেন। হযরত উম্মে আইমান (রাঃ) যখন জানতে পারলেন যে, এগুলো তাঁর নিকট হতে নিয়ে নেয়া হবে তখন তিনি আমার ঘাড়ের উপর কাপড় রেখে দিয়ে বললেনঃ “যে আল্লাহ্ ছাড়া কোন মা'বূদ নেই তাঁর কসম! এগুলো আমি আপনাকে কখনই দিবো না। এগুলো তো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাকে দিয়ে রেখেছেন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাঁকে বললেনঃ “হে উম্মে আইমান (রাঃ)! এর বিনিময়ে আমি তোমাকে এতো এতো প্রদান করবে (সুতরাং তোমার চিন্তার কোন কারণ নেই)।” কিন্তু তিনি মানলেন না, বরং ঐ কথাই বলতে থাকলেন। আবার রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁকে বললেনঃ “তোমার জন্যে এতো এতো রয়েছে। এতেও তিনি সন্তুষ্ট হলেন না, বরং একই কথা বলতে থাকলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) পুনরায় বললেনঃ “তোমাকে এই পরিমাণ, এই পরিমাণ দেয়া হবে। আমার ধারণা হয় যে, তিনি শেষ পর্যন্ত বললেনঃ “তোমাকে যা দেয়া হয়েছে তার প্রায় দশগুণ দেয়া হবে, তখন তিনি খুশী হলেন এবং নীরবতা অবলম্বন করলেন। সুতরাং আমাদের মাল আমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হলো।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ফায়-এর এই মাল যে পাঁচ জায়গায় খরচ করা হবে, গানীমতের মাল খরচ করার জায়গাও এই পাঁচটি। সূরায়ে আনফালে এর পূর্ণ তাত্রী ও তাওযীহ্ সহ পরিপূর্ণ তাফসীর আল্লাহ্ পাকের ফযল ও করমে গত হয়েছে। এ জন্যে এখানে আমরা আর এর পুনরাবৃত্তি করলাম না।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ ফায়-এর মালের খরচের জায়গাগুলো আমি এজন্যেই স্পষ্টভাবে বর্ণনা করলাম যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান শুধু তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে। শুধু মালদারদের হাতে চলে গেলে তারা তাদের ইচ্ছামত তা খরচ করতো এবং দরিদ্রদের হাতে তা আসতো না।ইরশাদ হচ্ছেঃ আমার রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে যে কাজ করতে বলে তা তোমরা কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাকো। তোমরা এ বিশ্বাস রাখো যে, রাসূল (সঃ) তোমাদেরকে যে কাজ করার আদেশ করে সেটা ভাল কাজই হয় এবং যে কাজ হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা নিঃসন্দেহে মন্দ কাজ।হযরত মাসরূক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন মহিলা হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “আমার নিকট এ খবর পৌছেছে যে, আপনি নারীদের উল্কি করা হতে ও চুলে চুল মিলিত করা হতে নিষেধ করে থাকেন, আচ্ছা বলুন তো, আপনি এটা আল্লাহর কিতাবে পেয়েছেন, অথবা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হতে শুনেছেন?” উত্তরে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, এটা আমি আল্লাহর কিতাবেও পেয়েছি এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হতেও শুনেছি।” একথা শুনে মহিলাটি বলেঃ “আমি গোটা কুরআন মাজীদ পাঠ করেছি, কিন্তু কোথাও তো এটা পাইনি!” তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “তুমি তাতে (আরবী) (রাসূল সঃ তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাকো) এটা কি পাওনি?” মহিলাটি জবাবে বলেঃ “হ্যাঁ, তাতো পেয়েছি।” তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেনঃ “আমি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উল্কি করা হতে, চুলে চুল মিলানো হতে এবং কপাল ও মুখমণ্ডলের চুল নূচা হতে নিষেধ করেছেন।” মহিলাটি তখন বললোঃ “জনাব! আপনার পরিবারের কোন কোন মহিলাও তো এরূপ করে থাকে?” তিনি তাকে বললেনঃ “তাহলে তুমি আমার বাড়ীর ভিতরে প্রবেশ করে দেখে এসো।” সে। গেল এবং দেখে এসে বললোঃ “জনাব! আমাকে ক্ষমা করুন! আমি ভুল বলেছি। উপরোক্তে কোন দোষ আপনার পরিবারের কোন মহিলার মধ্যে আমি দেখতে পেলাম না।” তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) মহিলাটিকে বললেনঃ “তুমি কি ভুলে গিয়েছে যে, আল্লাহর সৎ বান্দা (হযরত আয়েব আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি এটা চাই না যে, যা হতে আমি তোমাদেরকে বিরত রাখছি আমি নিজে তার বিপরীত করবে।” (১১:৮৮) (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আলকামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা অভিসম্পাত বর্ষণ করেন ঐ নারীদের উপর যারা উল্কি করায় ও যারা উল্কি করে, যারা তাদের কপালের চুল নূচে এবং যারা নিজেদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে তাদের সামনের দাঁতগুলোর প্রশস্ততা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর তৈরীকৃত সৃষ্টির পরিবর্তন ঘটায়।” তার এ কথা শুনে বানী আসাদ গোত্রের উম্মে ইয়াকুব নাম্নী একটি মহিলা তাঁকে জিজ্ঞেস করেঃ “আপনি কি এরূপ কথা বলেছেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ) যার উপর লা'নত করেছেন, আমি কেন তার উপর লা'নত করবে না? আর যা কুরআন কারীমে বিদ্যমান রয়েছে?” মহিলাটি বললোঃ “আমি কুরআন কারীমের প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত সবই পাঠ করেছি, কিন্তু আমি কোথাও তো এ হুকুম পাইনি?” তিনি বললেনঃ “তুমি যদি বুঝে ও চিন্তা করে পাঠ করতে তবে অবশ্যই তা পেতে। আল্লাহ্ তা'আলার উক্তিটি কি তুমি কুরআন কারীমে পাওনি?” সে জবাবে বললোঃ “হ্যাঁ, এটা তো পেয়েছি!” তারপর তিনি তাকে ঐ হাদীসটি শুনিয়ে দেন। তখন সে তাঁকে বললোঃ “আমার ধারণা যে, আপনার পরিবারের লোকও এই রূপ করে থাকে।” তিনি তাকে বললেনঃ “তুমি (আমার বাড়ীতে) যাও এবং দেখে এসো!” সে গেল, কিন্তু সে যা ধারণা করেছিল তার কিছুই দেখলো না। সুতরাং সে ফিরে এসে বললোঃ “আমি কিছুই দেখতে পেলাম না।” তিনি তখন বললেনঃ “যদি আমার গৃহিণী এরূপ করতো তবে অবশ্যই আমি তাকে ছেড়ে দিতাম।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম(রঃ) তাঁদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে এটা তাখরীজ করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি যখন তোমাদেরকে কোন নির্দেশ দিই তখন তোমরা তোমাদের সাধ্যমত তা পালন করবে এবং যখন তোমাদেরকে কোন কিছু হতে নিষেধ করি তখন তোমরা তা হতে বিরত থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উমার (রাঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কদুর খোলের তৈরী পাত্রে, সবুজ রং এর কলসে, আলকাতরার রঙ এ রঞ্জিত পাত্রে এবং কাঠে খোদাইকৃত পাত্রে নবীয তৈরী করতে অর্থাৎ খেজুর, কিসমিস্ ইত্যাদি ভিজিয়ে রাখতে নিষেধ করেছেন। অতঃর তাঁরা (আরবী) এই আয়াতটিই পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে তোমরা আল্লাহকে ভয় করতঃ তার নির্দেশাবলী মেনে চল এবং তাঁর নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ হতে দূরে থাকো। জেনে রেখো যে, যারা তাঁর নাফরমানী ও বিরুদ্ধাচরণ করে এবং তিনি যা করতে নিষেধ করেছেন তা করে তাদেরকে তিনি কঠোর শাস্তি দেন এবং দুঃখের মার মারেন।

আল-হাশর 59:8

৮-১০ নং আয়াতের তাফসীর: উপরে বর্ণিত হয়েছিল যে, ফায় এর মাল অর্থাৎ কাফিরদের যে মাল যুদ্ধক্ষেত্রে বিনা যুদ্ধেই মুসলমানদের অধিকারে আসে তা বিশিষ্টভাবে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মাল বলে গণ্য হয়। তিনি ঐ মাল কাকে প্রদান করবেন এটাও উপরে বর্ণিত হয়েছে। এখন এই আয়াতগুলোতেও ওরই আরো হকারদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, এই মালের হকদার হলো ঐ দরিদ্র মুহাজিরগণ যারা আল্লাহ্ তা'আলাকে সন্তুষ্ট করার জন্যে নিজেদের সম্প্রদায়কে অসন্তুষ্ট করেছেন। এমনকি তাদেরকে তাদের প্রিয় জন্মভূমি ও নিজেদের হাতে অর্জিত সম্পদ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। তারা আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাহায্যে সদা নিমগ্ন থেকেছেন। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করেছেন। তাঁরাই তো সত্যাশ্রয়ী। তাঁরা তাঁদের কাজকে তাঁদের কথা অনুযায়ী সত্য করে দেখিয়েছেন। এই গুণাবলী মহান মুহাজিরদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। এরপর আনসারদের প্রশংসা করা হচ্ছে। তাদের ফযীলত, শরাফত ও বুযুর্গী প্রকাশ করা হচ্ছে। তাদের অন্তরের প্রশস্ততা, আন্তরিকতা, ঈসার (নিজের প্রয়োজনের চেয়ে অপরের প্রয়োজনকে বেশী প্রাধান্য দেয়া এবং দানশীলতার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাঁরা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে এই নগরীতে (মদীনায়) বসবাস করেছেন ও ঈমান এনেছেন, তাঁরা মুহাজিরদেরকে ভালবাসেন এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্যে তারা অন্তরে আকাক্ষা পোষণ করেন না এবং তারা তাদেরকে (মুহাজিরদেরকে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেন নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও।হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি আমার পরবর্তী খলীফাকে উপদেশ দিচ্ছি প্রথম শ্রেণীর মুহাজিরদের সাথে উত্তম অচরণের, অর্থাৎ তিনি যেন তাঁদের অগ্রাধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখেন। তাঁকে আমি আনসারদের সাথেও উত্তম আচরণের উপদেশ দিচ্ছি। সুতরাং তাদের মধ্যে যারা উত্তম আচরণকারী তাঁদের প্রতি এগিয়ে যাওয়ার এবং তাদের মধ্যে যারা মন্দ আচরণকারী তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়ার উপদেশ দিচ্ছি।” হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা মুহাজিরগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দুনিয়ায় আমরা আনসারদের মত এমন ভাল মানুষ আর দেখিনি। অল্পের মধ্যে অল্প এবং বেশীর মধ্যে বেশী তারা বরাবরই আমাদের উপর খরচ করছেন। বহুদিন যাবত তারা আমাদের সমুদয় বহন করছেন। তাঁরা এসব করছেন অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে ও উৎফুল্লভাবে। কখনো তাদের চেহারায় অসন্তুষ্টির ভাব পরিলক্ষিত হয় না। তারা এমন আন্তরিকতার সাথে আমাদের খিদমত করছেন যে, আমাদের ভয় হচ্ছে না জানি হয়তো তারা আমাদের সমস্ত সৎ আমলের প্রতিদান নিয়ে নিবেন!” তাদের এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “না, না, যে পর্যন্ত তোমরা তাদের প্রশংসা করতে থাকবে এবং তাদের জন্যে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) একদা আনসারদেরকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “আমি বাহরাইল এলাকাটি তোমাদের নামে লিখে দিচ্ছি।” এ কথা শুনে তাঁরা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে পর্যন্ত আপনি আমাদের মুহাজির ভাইদেরকে এই পরিমাণ না দিবেন সেই পর্যন্ত আমরা এটা গ্রহণ করবে না।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “তাহলে আগামীতেও তোমরা সবর করতে থাকবে। আমার পরে এমন এক সময় আসবে যে, অন্যদেরকে দেয়া হবে এবং তোমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আনসারগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের খেজুরের বাগানগুলো আমাদের মধ্যে এবং আমাদের মুহাজির ভাইদের মধ্যে বন্টন করে দিন!” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, বরং বাগানে কাজকর্ম তোমরাই করবে এবং উৎপাদিত ফলে আমাদেরকে শরীক করবে।” আনসারগণ জবাব দিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আনন্দিত চিত্তে এটা মেনে নিলাম।” এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ এই আনসারগণ মুহাজিরদের মান-মর্যাদা ও বুযুর্গী দেখে অন্তরে হিংসা পোষণ করে না। মুহাজিরগণ যা লাভ করে তাতে তারা মোটেই ঈর্ষা করে না। এই অর্থেরই ইঙ্গিত বহন করে নিম্নের হাদীসটিঃহযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে বসেছিলাম এমন সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “দেখো, এখনই একজন জান্নাতী লোক আগমন করবে।” অল্পক্ষণ পরেই একজন আনসারী (রাঃ) বাম হাতে তার জুতা ধারণ করে নতুনভাবে অযু করা অবস্থায় আগমন করলেন। তাঁর দাড়ি হতে টপ-টপ করে পানি পড়ছিল। দ্বিতীয় দিনও আমরা অনুরূপভাবে বসেছিলাম, তখনও তিনি (নবী সঃ) ঐ কথাই বললেন এবং ঐ লোকটিই ঐ ভাবেই আসলেন। তৃতীয় দিনেও ঐ একই ব্যাপার ঘটলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন মজলিস হতে উঠে গেলেন তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) তাঁর (আগন্তুকের) পশ্চাদানুসরণ করলেন। তিনি তাকে বললেনঃ “জনাব! আজ আমার মধ্যে ও আমার পিতার মধ্যে কিছু বচসা হয়েছে। তাই আমি শপথ করে বসেছি যে, তিন দিন পর্যন্ত আমি বাড়ীতে প্রবেশ করবে না। সুতরাং যদি দয়া করে আপনি আমাকে অনুমতি দেন তবে এই দিনগুলো আমি আপনার বাড়ীতে কাটিয়ে দিবো।” তিনি বললেনঃ “বেশ, ঠিক আছে।” অতএব, তিন দিন আমি তার সাথে তার বাড়ীতে অতিবাহিত করলাম। দেখলাম যে, তিনি রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাযও পড়লেন না। শুধু এতোটুকু করলেন যে, জেগে ওঠে বিছানায় শুয়ে শুয়েই আল্লাহর যিক্র ও তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে থাকলেন। হ্যাঁ, তবে এটা অবশ্যই ছিল যে, আমি তার মুখে ভাল কথা ছাড়া আর কিছুই শুনিনি। তিন রাত্রি অতিবাহিত হলে তাঁর আমল আমার কাছে হাল্কা লাগলো। অতঃপর আমি তাকে বললামঃ জনাব! আমার মধ্যে ও আমার পিতার মধ্যে কোন বচসাও হয়নি এবং অসন্তুষ্টির কারণে আমি বাড়িও ছাড়িনি। বরং প্রকৃত ব্যাপার এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপর্যুপরি তিন দিন বলেন যে, এখনই একটি জান্নাতী লোক আসবে। আর তিন দিনই আপনারই আগমন ঘটে। তাই আমি ইচ্ছা করলাম যে, কয়েকদিন আপনার সাহচর্যে আমি কাটিয়ে দিবে। অতঃপর এটা লক্ষ্য করবে যে, আপনি কি এমন আমল করেন যার কারণে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জীবিতাবস্থাতেই আপনার জান্নাতী হওয়ার সুসংবাদ আমাদেরকে প্রদান করলেন! তাই আমি এই কৌশল অবলম্বন করেছিলাম এবং তিন দিন পর্যন্ত আপনার খিদমতে থাকলাম, যেন আপনার আমল দেখে আমিও ঐরূপ আমল করে জান্নাতবাসী হতে পারি। কিন্তু আমি তো আপনাকে কোন নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ আমল করতে দেখলাম না এবং ইবাদতেও তো অন্যদেরকে ছাড়িয়ে যেতে দেখলাম না। এখন আমি আপনার নিকট হতে বিদায় গ্রহণ করছি। কিন্তু বিদায় বেলায় আপনার নিকট আমি জানতে চাই যে, আর কি এমন আমল করেন যার কারণে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আপনার জান্নাতী হওয়ার কথা বললেন? উত্তরে তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি আমাকে যে আমল করতে দেখেছো, এ ছাড়া অন্য কোন বিশেষ ও গোপনীয় আমল আমি করি না।” তাঁর এ জবাব শুনে আমি তাঁর নিকট হতে বিদায় গ্রহণ করে চলতে শুরু করলাম। অল্প দূরে গিয়েছি ইতিমধ্যে তিনি আমাকে ডাক দিয়ে বললেনঃ “আমার আর একটি আমল রয়েছে, তা এই যে, আমি কখনো কোন মুসলমানের প্রতি হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করিনি এবং কখনো কোন মুসলমানের অমঙ্গল কামনা করিনি। আমি তার এ কথা শুনে বললামঃ হ্যাঁ, এবার আমার জানা হয়ে গেছে যে, আপনার এই আমলই আপনাকে এই মর্যাদায় পৌছিয়ে দিয়েছে এবং এটা এমনই এক আমল যে, অনেকেই এটার ক্ষমতা রাখে না।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নাসাঈও (রঃ) তাঁর নামক গ্রন্থে এ হাদীসটি আনয়ন করেছেন)মোটকথা, আনসারদের মধ্যে এই বিশেষণ ছিল যে, মুহাজিরগণ মাল ইত্যাদি লাভ করলে এবং তারা তা না পেলে তাঁরা মনক্ষুন্ন হতেন না। বানী নাযীর গোত্রের মাল মুহাজিরদের মধ্যে বন্টিত হলে কোন একজন আনসারী সমালোচনা করেন। ঐ সময় (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মুহাজির ভাইগণ ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততি ছেড়ে তোমাদের কাছে এসেছে।” তাঁরা তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের মাল-ধন আপনি তাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে বন্টন করে দিন!” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তোমরা কি এর চেয়েও বেশী ত্যাগ স্বীকার করতে পার না?” তারা জবাব দিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বলুন, কি ত্যাগ স্বীকার আমাদেরকে করতে হবে?” তিনি বললেনঃ “মুহাজিরগণ ক্ষেত-খামারের কাজ জানে না। সুতরাং তোমরাই তোমাদের ক্ষেতে ও বাগানে কাজ করবে এবং উৎপাদিত ফল-শস্যাদি হতে তাদেরকে অংশ দিবে।” আনসারগণ সন্তুষ্ট চিত্তে এতে সম্মতি জানালেন। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা (আনসাররা) তাদেরকে (মুহাজিরদেরকে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাগ্রস্ত হলেও।সহীহ্ হাদীসেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “যার কাছে (মালের) স্বল্পতা রয়েছে এবং নিজেরই প্রয়োজন আছে, এতদ্সত্ত্বেও সাদকা করে, তার সাদকা হলো উত্তম সাদকা।” এই মর্যাদা ঐ লোকদের মর্যাদার চেয়েও অগ্রগণ্য যাদের সম্পর্কে অল্লিাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আহার্যের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম এবং বন্দীকে খাদ্য ভক্ষণ করিয়ে থাকে।” (৭৬:৮) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ "মালের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তারা তা দান করে। কিন্তু এই লোকগুলো অর্থাৎ আনসারদের নিজেদের প্রয়োজন ও অভাব থাকা সত্ত্বেও তারা দান করে থাকেন। মালের প্রতি আসক্তি থাকে এবং প্রয়োজন থাকে না ঐ সময়ের দান-খয়রাত ঐ মর্যাদায় পৌছে না যে, প্রয়োজন ও অভাব থাকা সত্ত্বেও দান করা হয়।এই প্রকারের দান ছিল হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর দান। তিনি তার সমস্ত মাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! তোমার পরিবারবর্গের জন্যে কি রেখে এসেছো?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তাদের জন্যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে রেখে এসেছি।” অনুরূপভাবে ঐ ঘটনাটিও এরই অন্তর্ভুক্ত যা ইয়ারমূকের যুদ্ধে হযরত ইকরামা (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদের ব্যাপারে ঘটেছিল। যুদ্ধের ময়দানে মুজাহিদগণ (রাঃ) আহত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। পিপাসায় কাতর হয়ে তাঁরা ছটফট করছেন এবং পানি পানি’ করে চীৎকার করছেন! এমন সময় একজন মুসলমান পানির মশক কাঁধে নিয়ে আসলেন। ঐ পানি তিনি আহত মুজাহিদদের সামনে পেশ করলেন। কিন্তু একজন বললেনঃ ঐ যে, ঐ ব্যক্তিকে দাও। তিনি ঐ দ্বিতীয় মুজাহিদের নিকট গেলেন। তিনি তখন তার পার্শ্ববর্তী আর এক ব্যক্তিকে দেখিয়ে দিলেন। ঐ মুসলমানটি তখন তৃতীয় মুজাহিদের নিকট গিয়ে দেখেন যে, তাঁর প্রাণরায়ু নির্গত হয়ে গেছে! দৌড়িয়ে তিনি দ্বিতীয় মুজাহিদের নিকট ফিরে গিয়ে দেখতে পান যে, তাঁরও প্রাণ পাখী। উড়ে গেছে। তারপর তিনি প্রথম মুজাহিদের নিকট ফিরে গিয়ে দেখেন যে, তিনিও এই নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণ করে মহান আল্লাহর কাছে হাযির হয়ে গেছেন! আল্লাহ্ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন ও তাদেরকে সন্তুষ্ট রাখুন!” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি খুবই অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি। মেহেরবানী করে আমার জন্যে কিছু খাবারের ব্যবস্থা করুন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাঁর স্ত্রীদের বাড়ীতে লোকে পাঠান। কিন্তু তাঁদের কারো বাড়ীতেই কিছুই পাওয়া গেল না। তিনি তখন জনগণকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “রাত্রে আমার এই মেহমানকে নিয়ে যাবে এমন কেউ আছে কি?” একজন আনসারী (রাঃ) দাড়িয়ে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি (আছি)।” অতঃপর তিনি লোকটিকে সাথে নিয়ে বাড়ী চললেন। বাড়ী গিয়ে স্ত্রীকে বললেনঃ “দেখো, ইনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মেহমান! আজ যদি আমরা নিজেরা কিছুই খেতে না পাই তবুও যেন এ মেহমান অনাহারে না থাকে।” এ কথা শুনে তাঁর স্ত্রী বললেনঃ “আল্লাহর কসম! বাড়ীতে আজ শিশুদের খাবার ছাড়া আর কিছুই নেই।” আনসারী তখন তাঁর স্ত্রীকে বললেনঃ “শিশুদের না খাইয়েই শুইয়ে দাও। আর আমরা দু'জন (স্বামী-স্ত্রী) তো পেটে কাপড় বেঁধে অনাহারেই রাত্রি কাটিয়ে দিবো। মেহমানের খাওয়ার সময় তুমি প্রদীপটি নিভিয়ে দিবে। তখন মেহমান। মনে করবে যে, আমরা খেতে আছি।” স্ত্রী তাই করলেন। সকালে লোকটি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হলে তিনি বলেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ এই ব্যক্তির এবং তার স্ত্রীর রাত্রের কাজ দেখে খুশী হয়েছেন এবং হেসেছেন।” ঐ ব্যাপারেই (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমে ঐ আনসারীর নাম দেয়া হয়েছে হযরত আবূ তালহা (রাঃ)। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ যারা কার্পণ্য হতে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে তারাই সফলকাম। হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা যুলুম হতে বেঁচে থাকো। কেননা, এই যুলুম কিয়ামতের দিন যুলমত বা অন্ধকারের কারণ হবে। হে লোক সকল! তোমরা কার্পণ্য ও লোভ-লালসাকে ভয় কর। কেননা, এটা এমন একটা জিনিস যা ততামাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করে ফেলেছে। এরই কারণে তারা পরস্পর খুনাখুনি করেছে এবং হারামকে হালাল করে নিয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যুলম হতে দূরে থাকো। কেননা, যুলম কিয়ামতের দিন অন্ধকার রূপ ধারণ করবে। আর তোমরা কটুবাক্য প্রয়োগ করা হতে বিরত থাকো। জেনে রেখো যে, আল্লাহ্ তা'আলা অশ্লীলভাষীকে ও নির্লজ্জতাপূর্ণ। কাজকে ভালবাসেন না। তোমরা লোভ-লালসা ও কার্পণ্য হতে বিরত থাকো। কেননা, একারণেই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তারা জনগণকে যুলম করার নির্দেশ দিতো তখন তারা যুলম করতো, তারা পাপাচারের হুকুম করতো ফলে তারা পাপাচার করতো এবং তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দিতো, তাই তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতো।” (ইমাম আ’মাশ (রঃ) ও ইমাম শু'বা (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহর পথের ধুলো-বালি এবং জাহান্নামের ধূয়া কোন বান্দার পেটে একত্রিত হতে পারে না (অর্থাৎ আল্লাহর পথের ধুলো যার উপরে পড়েছে সে জাহান্নামের আগুন হতে মুক্ত হয়ে গেছে)।”(ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাঊদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)হযরত আসওয়াদ ইবনে হিলাল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত আবদুল্লাহ্ (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আবু আবদির রহমান (রাঃ)! আমি তো ধ্বংস হয়ে গেছি।” তিনি তার একথা শুনে বলেনঃ “কেন, ব্যাপার কি?” লোকটি উত্তরে বলেঃ “যারা কার্পণ্য হতে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে তারাই সফলকাম। আর আমি তো একজন কৃপণ লোক। আমি তো আমার মালের কিছুই খরচ করতে চাই না!” তখন হযরত আবদুল্লাহ্ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “এখানে কার্পণ্য দ্বারা উদ্দেশ্য এই যে, তুমি তোমার কোন মুসলমান ভাই-এর মাল যুলম করে ভক্ষণ করবে। হ্যাঁ, তবে কার্পণ্যও নিঃসন্দেহে খুবই খারাপ জিনিস।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবুল হাইয়াজ আসাদী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ করা অবস্থায় আমি দেখলাম যে, একটি লোক শুধু -এই দু'আটি পাঠ করছেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আমার জীবনের কার্পণ্য ও লোভ-লালসা হতে রক্ষা করুন!” শেষ পর্যন্ত আমি থাকতে না পেরে তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ জনাব! আপনি শুধু এই প্রার্থনাই কেন করছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যদি এটা হতে রক্ষা পাওয়া যায় তবে ব্যভিচার হবে না, চুরি হবে না এবং অন্য কোন খারাপ কাজও হতে পারে না।” অতঃপর আমি তার দিকে ভাল করে চেয়ে দেখলাম। তখন দেখি যে, তিনি হলেন হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)।” (এটা হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) ও হযরত ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি যাকাত আদায় করলো, মেহমানদারী করলো এবং আল্লাহর পথের জরুরী কাজে (মাল) প্রদান করলো সে তার নফসের কার্পণ্য ও লোভ-লালসা হতে দূর হয়ে গেল।মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা তাদের (মুহাজির ও আনসারদের) পরে এসেছে, তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাগণকে ক্ষমা করুন এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু। (এটাও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এঁরা হলেন ফায়-এর মালের তৃতীয় প্রকার হকদার। মুহাজির ও আনসারদের দরিদ্রদের পরে তাদের অনুসারী হলেন তাদের পরবর্তী লোকেরা। এই লোকদের মিসকীনরাও এই ফায়-এর মালের হকদার। এঁরা আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এঁদের পূর্ববর্তী ঈমানদার লোকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন। যেমন সূরায়ে বারাআতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ্ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট।” (৯:১০০) অর্থাৎ এই পরবর্তী লোকেরা ঐ পূর্ববর্তী লোকদের পদাংক অনুসরণকারী এবং তাদের উত্তম চরিত্রের অনুসারী ও ভাল দু'আর মাধ্যমে তাদেরকে স্মরণকারী। যেন তাদের ভিতর ও বাহির পূর্ববর্তীদের অনুসারী। এজন্যেই আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতে কারীমায় বলেনঃ যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাদেরকে ক্ষমা করুন এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেস রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।এই দু'আ দ্বারা হযরত ইমাম মালিক (রঃ) কতই না পবিত্র দলীল গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন যে, রাফেযী সম্প্রদায়ের কোন লোককে যেন সেই সময়ের নেতা ফায়-এর মাল হতে কিছুই প্রদান না করেন। কেননা, তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবীদের জন্যে দু'আ করার পরিবর্তে তাদেরকে গালি দিয়ে থাকে। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেনঃ “ঐ লোকদের প্রতি তোমরা লক্ষ্য কর যে, কিভাবে তারা কুরআনের বিরুদ্ধাচরণ করছে! কুরআন হুকুম করছে যে, মানুষ যেন মুহাজির ও আনসারদের জন্যে দু'আ করে, অথচ এ লোকগুলো (রাফেযীরা) তাদেরকে গালি দেয়।” অতঃপর তিনি...(আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মাসরূক (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবীদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার তোমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, অথচ তোমরা তাদেরকে গালি দিচ্ছ! আমি তোমাদের নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “এই উম্মত শেষ হবে না যে পর্যন্ত না তাদের পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদেরকে লা'নত করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)-এই আয়াতে যে ফায়-এর মালের বর্ণনা দেয়া হয়েছে ওটা তো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর জন্যে খাস। তারপর পরবর্তী (আরবী)-এই আয়াতে যে মালের কথা বলা হয়েছে তা আম বা সাধারণ করে দেয়া হয়েছে এবং সমস্ত মুসলমান এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এখন একজন মুসলমানও এমন নেই যার এই মালের অধিকার নেই, শুধু গোলামদের ছাড়া। (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ হাদীসের সনদটি ছেদকাটা)হযরত মালিক ইবনে আউস ইবনে হাসান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) (আরবী) (৯:৬০)-এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যাকাতের হকদার তো হলো এই লোকগুলো।” তারপর তিনি (আরবী) (৮:৪১) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “গানীমাতের হকদার তো হলো এই লোকগুলো।” এরপর তিনি (আরবী) এ আয়াতগুলো পাঠ করে বলেনঃ “ফায়-এর মালের হকদারদের বর্ণনা দেয়ার পর এই আয়াত সমস্ত মুসলমানকে এই ফায়-এর মালের হকদার বানিয়ে দিয়েছে। সবাই এই মালের হকদার। যদি আমি জীবিত থাকি তবে তোমরা দেখবে যে, গ্রাম-পল্লীর রাখালদেরকেও আমি এর অংশ প্রদান করবে যাদের কপালে এই মাল লাভ করার জন্যে ঘর্মও দেখা দেয়নি।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল-হাশর 59:9

৮-১০ নং আয়াতের তাফসীর: উপরে বর্ণিত হয়েছিল যে, ফায় এর মাল অর্থাৎ কাফিরদের যে মাল যুদ্ধক্ষেত্রে বিনা যুদ্ধেই মুসলমানদের অধিকারে আসে তা বিশিষ্টভাবে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মাল বলে গণ্য হয়। তিনি ঐ মাল কাকে প্রদান করবেন এটাও উপরে বর্ণিত হয়েছে। এখন এই আয়াতগুলোতেও ওরই আরো হকারদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, এই মালের হকদার হলো ঐ দরিদ্র মুহাজিরগণ যারা আল্লাহ্ তা'আলাকে সন্তুষ্ট করার জন্যে নিজেদের সম্প্রদায়কে অসন্তুষ্ট করেছেন। এমনকি তাদেরকে তাদের প্রিয় জন্মভূমি ও নিজেদের হাতে অর্জিত সম্পদ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। তারা আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাহায্যে সদা নিমগ্ন থেকেছেন। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করেছেন। তাঁরাই তো সত্যাশ্রয়ী। তাঁরা তাঁদের কাজকে তাঁদের কথা অনুযায়ী সত্য করে দেখিয়েছেন। এই গুণাবলী মহান মুহাজিরদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। এরপর আনসারদের প্রশংসা করা হচ্ছে। তাদের ফযীলত, শরাফত ও বুযুর্গী প্রকাশ করা হচ্ছে। তাদের অন্তরের প্রশস্ততা, আন্তরিকতা, ঈসার (নিজের প্রয়োজনের চেয়ে অপরের প্রয়োজনকে বেশী প্রাধান্য দেয়া এবং দানশীলতার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাঁরা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে এই নগরীতে (মদীনায়) বসবাস করেছেন ও ঈমান এনেছেন, তাঁরা মুহাজিরদেরকে ভালবাসেন এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্যে তারা অন্তরে আকাক্ষা পোষণ করেন না এবং তারা তাদেরকে (মুহাজিরদেরকে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেন নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও।হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি আমার পরবর্তী খলীফাকে উপদেশ দিচ্ছি প্রথম শ্রেণীর মুহাজিরদের সাথে উত্তম অচরণের, অর্থাৎ তিনি যেন তাঁদের অগ্রাধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখেন। তাঁকে আমি আনসারদের সাথেও উত্তম আচরণের উপদেশ দিচ্ছি। সুতরাং তাদের মধ্যে যারা উত্তম আচরণকারী তাঁদের প্রতি এগিয়ে যাওয়ার এবং তাদের মধ্যে যারা মন্দ আচরণকারী তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়ার উপদেশ দিচ্ছি।” হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা মুহাজিরগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দুনিয়ায় আমরা আনসারদের মত এমন ভাল মানুষ আর দেখিনি। অল্পের মধ্যে অল্প এবং বেশীর মধ্যে বেশী তারা বরাবরই আমাদের উপর খরচ করছেন। বহুদিন যাবত তারা আমাদের সমুদয় বহন করছেন। তাঁরা এসব করছেন অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে ও উৎফুল্লভাবে। কখনো তাদের চেহারায় অসন্তুষ্টির ভাব পরিলক্ষিত হয় না। তারা এমন আন্তরিকতার সাথে আমাদের খিদমত করছেন যে, আমাদের ভয় হচ্ছে না জানি হয়তো তারা আমাদের সমস্ত সৎ আমলের প্রতিদান নিয়ে নিবেন!” তাদের এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “না, না, যে পর্যন্ত তোমরা তাদের প্রশংসা করতে থাকবে এবং তাদের জন্যে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) একদা আনসারদেরকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “আমি বাহরাইল এলাকাটি তোমাদের নামে লিখে দিচ্ছি।” এ কথা শুনে তাঁরা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে পর্যন্ত আপনি আমাদের মুহাজির ভাইদেরকে এই পরিমাণ না দিবেন সেই পর্যন্ত আমরা এটা গ্রহণ করবে না।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “তাহলে আগামীতেও তোমরা সবর করতে থাকবে। আমার পরে এমন এক সময় আসবে যে, অন্যদেরকে দেয়া হবে এবং তোমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আনসারগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের খেজুরের বাগানগুলো আমাদের মধ্যে এবং আমাদের মুহাজির ভাইদের মধ্যে বন্টন করে দিন!” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, বরং বাগানে কাজকর্ম তোমরাই করবে এবং উৎপাদিত ফলে আমাদেরকে শরীক করবে।” আনসারগণ জবাব দিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আনন্দিত চিত্তে এটা মেনে নিলাম।” এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ এই আনসারগণ মুহাজিরদের মান-মর্যাদা ও বুযুর্গী দেখে অন্তরে হিংসা পোষণ করে না। মুহাজিরগণ যা লাভ করে তাতে তারা মোটেই ঈর্ষা করে না। এই অর্থেরই ইঙ্গিত বহন করে নিম্নের হাদীসটিঃহযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে বসেছিলাম এমন সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “দেখো, এখনই একজন জান্নাতী লোক আগমন করবে।” অল্পক্ষণ পরেই একজন আনসারী (রাঃ) বাম হাতে তার জুতা ধারণ করে নতুনভাবে অযু করা অবস্থায় আগমন করলেন। তাঁর দাড়ি হতে টপ-টপ করে পানি পড়ছিল। দ্বিতীয় দিনও আমরা অনুরূপভাবে বসেছিলাম, তখনও তিনি (নবী সঃ) ঐ কথাই বললেন এবং ঐ লোকটিই ঐ ভাবেই আসলেন। তৃতীয় দিনেও ঐ একই ব্যাপার ঘটলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন মজলিস হতে উঠে গেলেন তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) তাঁর (আগন্তুকের) পশ্চাদানুসরণ করলেন। তিনি তাকে বললেনঃ “জনাব! আজ আমার মধ্যে ও আমার পিতার মধ্যে কিছু বচসা হয়েছে। তাই আমি শপথ করে বসেছি যে, তিন দিন পর্যন্ত আমি বাড়ীতে প্রবেশ করবে না। সুতরাং যদি দয়া করে আপনি আমাকে অনুমতি দেন তবে এই দিনগুলো আমি আপনার বাড়ীতে কাটিয়ে দিবো।” তিনি বললেনঃ “বেশ, ঠিক আছে।” অতএব, তিন দিন আমি তার সাথে তার বাড়ীতে অতিবাহিত করলাম। দেখলাম যে, তিনি রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাযও পড়লেন না। শুধু এতোটুকু করলেন যে, জেগে ওঠে বিছানায় শুয়ে শুয়েই আল্লাহর যিক্র ও তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে থাকলেন। হ্যাঁ, তবে এটা অবশ্যই ছিল যে, আমি তার মুখে ভাল কথা ছাড়া আর কিছুই শুনিনি। তিন রাত্রি অতিবাহিত হলে তাঁর আমল আমার কাছে হাল্কা লাগলো। অতঃপর আমি তাকে বললামঃ জনাব! আমার মধ্যে ও আমার পিতার মধ্যে কোন বচসাও হয়নি এবং অসন্তুষ্টির কারণে আমি বাড়িও ছাড়িনি। বরং প্রকৃত ব্যাপার এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপর্যুপরি তিন দিন বলেন যে, এখনই একটি জান্নাতী লোক আসবে। আর তিন দিনই আপনারই আগমন ঘটে। তাই আমি ইচ্ছা করলাম যে, কয়েকদিন আপনার সাহচর্যে আমি কাটিয়ে দিবে। অতঃপর এটা লক্ষ্য করবে যে, আপনি কি এমন আমল করেন যার কারণে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জীবিতাবস্থাতেই আপনার জান্নাতী হওয়ার সুসংবাদ আমাদেরকে প্রদান করলেন! তাই আমি এই কৌশল অবলম্বন করেছিলাম এবং তিন দিন পর্যন্ত আপনার খিদমতে থাকলাম, যেন আপনার আমল দেখে আমিও ঐরূপ আমল করে জান্নাতবাসী হতে পারি। কিন্তু আমি তো আপনাকে কোন নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ আমল করতে দেখলাম না এবং ইবাদতেও তো অন্যদেরকে ছাড়িয়ে যেতে দেখলাম না। এখন আমি আপনার নিকট হতে বিদায় গ্রহণ করছি। কিন্তু বিদায় বেলায় আপনার নিকট আমি জানতে চাই যে, আর কি এমন আমল করেন যার কারণে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আপনার জান্নাতী হওয়ার কথা বললেন? উত্তরে তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি আমাকে যে আমল করতে দেখেছো, এ ছাড়া অন্য কোন বিশেষ ও গোপনীয় আমল আমি করি না।” তাঁর এ জবাব শুনে আমি তাঁর নিকট হতে বিদায় গ্রহণ করে চলতে শুরু করলাম। অল্প দূরে গিয়েছি ইতিমধ্যে তিনি আমাকে ডাক দিয়ে বললেনঃ “আমার আর একটি আমল রয়েছে, তা এই যে, আমি কখনো কোন মুসলমানের প্রতি হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করিনি এবং কখনো কোন মুসলমানের অমঙ্গল কামনা করিনি। আমি তার এ কথা শুনে বললামঃ হ্যাঁ, এবার আমার জানা হয়ে গেছে যে, আপনার এই আমলই আপনাকে এই মর্যাদায় পৌছিয়ে দিয়েছে এবং এটা এমনই এক আমল যে, অনেকেই এটার ক্ষমতা রাখে না।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নাসাঈও (রঃ) তাঁর নামক গ্রন্থে এ হাদীসটি আনয়ন করেছেন)মোটকথা, আনসারদের মধ্যে এই বিশেষণ ছিল যে, মুহাজিরগণ মাল ইত্যাদি লাভ করলে এবং তারা তা না পেলে তাঁরা মনক্ষুন্ন হতেন না। বানী নাযীর গোত্রের মাল মুহাজিরদের মধ্যে বন্টিত হলে কোন একজন আনসারী সমালোচনা করেন। ঐ সময় (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মুহাজির ভাইগণ ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততি ছেড়ে তোমাদের কাছে এসেছে।” তাঁরা তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের মাল-ধন আপনি তাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে বন্টন করে দিন!” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তোমরা কি এর চেয়েও বেশী ত্যাগ স্বীকার করতে পার না?” তারা জবাব দিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বলুন, কি ত্যাগ স্বীকার আমাদেরকে করতে হবে?” তিনি বললেনঃ “মুহাজিরগণ ক্ষেত-খামারের কাজ জানে না। সুতরাং তোমরাই তোমাদের ক্ষেতে ও বাগানে কাজ করবে এবং উৎপাদিত ফল-শস্যাদি হতে তাদেরকে অংশ দিবে।” আনসারগণ সন্তুষ্ট চিত্তে এতে সম্মতি জানালেন। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা (আনসাররা) তাদেরকে (মুহাজিরদেরকে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাগ্রস্ত হলেও।সহীহ্ হাদীসেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “যার কাছে (মালের) স্বল্পতা রয়েছে এবং নিজেরই প্রয়োজন আছে, এতদ্সত্ত্বেও সাদকা করে, তার সাদকা হলো উত্তম সাদকা।” এই মর্যাদা ঐ লোকদের মর্যাদার চেয়েও অগ্রগণ্য যাদের সম্পর্কে অল্লিাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আহার্যের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম এবং বন্দীকে খাদ্য ভক্ষণ করিয়ে থাকে।” (৭৬:৮) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ "মালের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তারা তা দান করে। কিন্তু এই লোকগুলো অর্থাৎ আনসারদের নিজেদের প্রয়োজন ও অভাব থাকা সত্ত্বেও তারা দান করে থাকেন। মালের প্রতি আসক্তি থাকে এবং প্রয়োজন থাকে না ঐ সময়ের দান-খয়রাত ঐ মর্যাদায় পৌছে না যে, প্রয়োজন ও অভাব থাকা সত্ত্বেও দান করা হয়।এই প্রকারের দান ছিল হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর দান। তিনি তার সমস্ত মাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! তোমার পরিবারবর্গের জন্যে কি রেখে এসেছো?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তাদের জন্যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে রেখে এসেছি।” অনুরূপভাবে ঐ ঘটনাটিও এরই অন্তর্ভুক্ত যা ইয়ারমূকের যুদ্ধে হযরত ইকরামা (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদের ব্যাপারে ঘটেছিল। যুদ্ধের ময়দানে মুজাহিদগণ (রাঃ) আহত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। পিপাসায় কাতর হয়ে তাঁরা ছটফট করছেন এবং পানি পানি’ করে চীৎকার করছেন! এমন সময় একজন মুসলমান পানির মশক কাঁধে নিয়ে আসলেন। ঐ পানি তিনি আহত মুজাহিদদের সামনে পেশ করলেন। কিন্তু একজন বললেনঃ ঐ যে, ঐ ব্যক্তিকে দাও। তিনি ঐ দ্বিতীয় মুজাহিদের নিকট গেলেন। তিনি তখন তার পার্শ্ববর্তী আর এক ব্যক্তিকে দেখিয়ে দিলেন। ঐ মুসলমানটি তখন তৃতীয় মুজাহিদের নিকট গিয়ে দেখেন যে, তাঁর প্রাণরায়ু নির্গত হয়ে গেছে! দৌড়িয়ে তিনি দ্বিতীয় মুজাহিদের নিকট ফিরে গিয়ে দেখতে পান যে, তাঁরও প্রাণ পাখী। উড়ে গেছে। তারপর তিনি প্রথম মুজাহিদের নিকট ফিরে গিয়ে দেখেন যে, তিনিও এই নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণ করে মহান আল্লাহর কাছে হাযির হয়ে গেছেন! আল্লাহ্ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন ও তাদেরকে সন্তুষ্ট রাখুন!” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি খুবই অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি। মেহেরবানী করে আমার জন্যে কিছু খাবারের ব্যবস্থা করুন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাঁর স্ত্রীদের বাড়ীতে লোকে পাঠান। কিন্তু তাঁদের কারো বাড়ীতেই কিছুই পাওয়া গেল না। তিনি তখন জনগণকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “রাত্রে আমার এই মেহমানকে নিয়ে যাবে এমন কেউ আছে কি?” একজন আনসারী (রাঃ) দাড়িয়ে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি (আছি)।” অতঃপর তিনি লোকটিকে সাথে নিয়ে বাড়ী চললেন। বাড়ী গিয়ে স্ত্রীকে বললেনঃ “দেখো, ইনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মেহমান! আজ যদি আমরা নিজেরা কিছুই খেতে না পাই তবুও যেন এ মেহমান অনাহারে না থাকে।” এ কথা শুনে তাঁর স্ত্রী বললেনঃ “আল্লাহর কসম! বাড়ীতে আজ শিশুদের খাবার ছাড়া আর কিছুই নেই।” আনসারী তখন তাঁর স্ত্রীকে বললেনঃ “শিশুদের না খাইয়েই শুইয়ে দাও। আর আমরা দু'জন (স্বামী-স্ত্রী) তো পেটে কাপড় বেঁধে অনাহারেই রাত্রি কাটিয়ে দিবো। মেহমানের খাওয়ার সময় তুমি প্রদীপটি নিভিয়ে দিবে। তখন মেহমান। মনে করবে যে, আমরা খেতে আছি।” স্ত্রী তাই করলেন। সকালে লোকটি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হলে তিনি বলেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ এই ব্যক্তির এবং তার স্ত্রীর রাত্রের কাজ দেখে খুশী হয়েছেন এবং হেসেছেন।” ঐ ব্যাপারেই (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমে ঐ আনসারীর নাম দেয়া হয়েছে হযরত আবূ তালহা (রাঃ)। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ যারা কার্পণ্য হতে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে তারাই সফলকাম। হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা যুলুম হতে বেঁচে থাকো। কেননা, এই যুলুম কিয়ামতের দিন যুলমত বা অন্ধকারের কারণ হবে। হে লোক সকল! তোমরা কার্পণ্য ও লোভ-লালসাকে ভয় কর। কেননা, এটা এমন একটা জিনিস যা ততামাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করে ফেলেছে। এরই কারণে তারা পরস্পর খুনাখুনি করেছে এবং হারামকে হালাল করে নিয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যুলম হতে দূরে থাকো। কেননা, যুলম কিয়ামতের দিন অন্ধকার রূপ ধারণ করবে। আর তোমরা কটুবাক্য প্রয়োগ করা হতে বিরত থাকো। জেনে রেখো যে, আল্লাহ্ তা'আলা অশ্লীলভাষীকে ও নির্লজ্জতাপূর্ণ। কাজকে ভালবাসেন না। তোমরা লোভ-লালসা ও কার্পণ্য হতে বিরত থাকো। কেননা, একারণেই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তারা জনগণকে যুলম করার নির্দেশ দিতো তখন তারা যুলম করতো, তারা পাপাচারের হুকুম করতো ফলে তারা পাপাচার করতো এবং তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দিতো, তাই তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতো।” (ইমাম আ’মাশ (রঃ) ও ইমাম শু'বা (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহর পথের ধুলো-বালি এবং জাহান্নামের ধূয়া কোন বান্দার পেটে একত্রিত হতে পারে না (অর্থাৎ আল্লাহর পথের ধুলো যার উপরে পড়েছে সে জাহান্নামের আগুন হতে মুক্ত হয়ে গেছে)।”(ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাঊদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)হযরত আসওয়াদ ইবনে হিলাল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত আবদুল্লাহ্ (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আবু আবদির রহমান (রাঃ)! আমি তো ধ্বংস হয়ে গেছি।” তিনি তার একথা শুনে বলেনঃ “কেন, ব্যাপার কি?” লোকটি উত্তরে বলেঃ “যারা কার্পণ্য হতে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে তারাই সফলকাম। আর আমি তো একজন কৃপণ লোক। আমি তো আমার মালের কিছুই খরচ করতে চাই না!” তখন হযরত আবদুল্লাহ্ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “এখানে কার্পণ্য দ্বারা উদ্দেশ্য এই যে, তুমি তোমার কোন মুসলমান ভাই-এর মাল যুলম করে ভক্ষণ করবে। হ্যাঁ, তবে কার্পণ্যও নিঃসন্দেহে খুবই খারাপ জিনিস।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবুল হাইয়াজ আসাদী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ করা অবস্থায় আমি দেখলাম যে, একটি লোক শুধু -এই দু'আটি পাঠ করছেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আমার জীবনের কার্পণ্য ও লোভ-লালসা হতে রক্ষা করুন!” শেষ পর্যন্ত আমি থাকতে না পেরে তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ জনাব! আপনি শুধু এই প্রার্থনাই কেন করছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যদি এটা হতে রক্ষা পাওয়া যায় তবে ব্যভিচার হবে না, চুরি হবে না এবং অন্য কোন খারাপ কাজও হতে পারে না।” অতঃপর আমি তার দিকে ভাল করে চেয়ে দেখলাম। তখন দেখি যে, তিনি হলেন হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)।” (এটা হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) ও হযরত ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি যাকাত আদায় করলো, মেহমানদারী করলো এবং আল্লাহর পথের জরুরী কাজে (মাল) প্রদান করলো সে তার নফসের কার্পণ্য ও লোভ-লালসা হতে দূর হয়ে গেল।মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা তাদের (মুহাজির ও আনসারদের) পরে এসেছে, তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাগণকে ক্ষমা করুন এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু। (এটাও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এঁরা হলেন ফায়-এর মালের তৃতীয় প্রকার হকদার। মুহাজির ও আনসারদের দরিদ্রদের পরে তাদের অনুসারী হলেন তাদের পরবর্তী লোকেরা। এই লোকদের মিসকীনরাও এই ফায়-এর মালের হকদার। এঁরা আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এঁদের পূর্ববর্তী ঈমানদার লোকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন। যেমন সূরায়ে বারাআতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ্ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট।” (৯:১০০) অর্থাৎ এই পরবর্তী লোকেরা ঐ পূর্ববর্তী লোকদের পদাংক অনুসরণকারী এবং তাদের উত্তম চরিত্রের অনুসারী ও ভাল দু'আর মাধ্যমে তাদেরকে স্মরণকারী। যেন তাদের ভিতর ও বাহির পূর্ববর্তীদের অনুসারী। এজন্যেই আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতে কারীমায় বলেনঃ যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাদেরকে ক্ষমা করুন এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেস রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।এই দু'আ দ্বারা হযরত ইমাম মালিক (রঃ) কতই না পবিত্র দলীল গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন যে, রাফেযী সম্প্রদায়ের কোন লোককে যেন সেই সময়ের নেতা ফায়-এর মাল হতে কিছুই প্রদান না করেন। কেননা, তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবীদের জন্যে দু'আ করার পরিবর্তে তাদেরকে গালি দিয়ে থাকে। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেনঃ “ঐ লোকদের প্রতি তোমরা লক্ষ্য কর যে, কিভাবে তারা কুরআনের বিরুদ্ধাচরণ করছে! কুরআন হুকুম করছে যে, মানুষ যেন মুহাজির ও আনসারদের জন্যে দু'আ করে, অথচ এ লোকগুলো (রাফেযীরা) তাদেরকে গালি দেয়।” অতঃপর তিনি...(আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত মাসরূক (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবীদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার তোমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, অথচ তোমরা তাদেরকে গালি দিচ্ছ! আমি তোমাদের নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “এই উম্মত শেষ হবে না যে পর্যন্ত না তাদের পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদেরকে লা'নত করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)-এই আয়াতে যে ফায়-এর মালের বর্ণনা দেয়া হয়েছে ওটা তো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর জন্যে খাস। তারপর পরবর্তী (আরবী)-এই আয়াতে যে মালের কথা বলা হয়েছে তা আম বা সাধারণ করে দেয়া হয়েছে এবং সমস্ত মুসলমান এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এখন একজন মুসলমানও এমন নেই যার এই মালের অধিকার নেই, শুধু গোলামদের ছাড়া। (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ হাদীসের সনদটি ছেদকাটা)হযরত মালিক ইবনে আউস ইবনে হাসান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) (আরবী) (৯:৬০)-এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যাকাতের হকদার তো হলো এই লোকগুলো।” তারপর তিনি (আরবী) (৮:৪১) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “গানীমাতের হকদার তো হলো এই লোকগুলো।” এরপর তিনি (আরবী) এ আয়াতগুলো পাঠ করে বলেনঃ “ফায়-এর মালের হকদারদের বর্ণনা দেয়ার পর এই আয়াত সমস্ত মুসলমানকে এই ফায়-এর মালের হকদার বানিয়ে দিয়েছে। সবাই এই মালের হকদার। যদি আমি জীবিত থাকি তবে তোমরা দেখবে যে, গ্রাম-পল্লীর রাখালদেরকেও আমি এর অংশ প্রদান করবে যাদের কপালে এই মাল লাভ করার জন্যে ঘর্মও দেখা দেয়নি।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)