Tafseer ibn Kathir — আস-সফ 61:1 – আল-মুনাফিকুন 63:11
Contents
- আস-সফ 61:1
- আস-সফ 61:2
- আস-সফ 61:3
- আস-সফ 61:4
- আস-সফ 61:5
- আস-সফ 61:6
- আস-সফ 61:7
- আস-সফ 61:8
- আস-সফ 61:9
- আস-সফ 61:10
- আস-সফ 61:11
- আস-সফ 61:12
- আস-সফ 61:13
- আস-সফ 61:14
- আল-জুমুআ 62:1
- আল-জুমুআ 62:2
- আল-জুমুআ 62:3
- আল-জুমুআ 62:4
- আল-জুমুআ 62:5
- আল-জুমুআ 62:6
- আল-জুমুআ 62:7
- আল-জুমুআ 62:8
- আল-জুমুআ 62:9
- আল-জুমুআ 62:10
- আল-জুমুআ 62:11
- আল-মুনাফিকুন 63:1
- আল-মুনাফিকুন 63:2
- আল-মুনাফিকুন 63:3
- আল-মুনাফিকুন 63:4
- আল-মুনাফিকুন 63:5
- আল-মুনাফিকুন 63:6
- আল-মুনাফিকুন 63:7
- আল-মুনাফিকুন 63:8
- আল-মুনাফিকুন 63:9
- আল-মুনাফিকুন 63:10
- আল-মুনাফিকুন 63:11
আস-সফ 61:1
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা একদা পরস্পর আলোচনা করছিলাম যে, আমাদের মধ্যে কেউ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করতো যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন আমল সবচেয়ে প্রিয়? কিন্তু তখনো কেউ দাঁড়ায়নি, ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত আমাদের নিকট আসলেন এবং এক এক করে প্রত্যেককে ডেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট নিয়ে গেলেন। আমরা সবাই একত্রিত হলে তিনি এই পূর্ণ সূরাটি আমাদেরকে পাঠ করে শুনালেন।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত এক হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করতে ভয় পাচ্ছিলাম।” তাতে এও রয়েছে যে, যেমনভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পূর্ণ সূরাটি পাঠ করে শুনিয়েছিলেন তেমনিভাবেই এই হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী তাবেয়ীকে পাঠ করে শুনান, তাবেয়ী তার ছাত্রকে এবং তার ছাত্র তার ছাত্রকে পাঠ করে শুনান। এই ভাবে শেষ পর্যন্ত উস্তাদ তার শাগরিদকে পাঠ করে শুনিয়ে দেন।অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেনঃ “আমরা বলেছিলাম যে, যদি আমরা এরূপ আমলের খবর জানতে পারি তবে অবশ্যই আমরা ওর উপর আমলকারী হয়ে যাবো।”আমাকে আমার উস্তাদ শায়খুল মুসনাদ আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে আবি তালিব হাজ্জারও (রঃ) স্বীয় সনদে এ হাদীসটি বর্ণনা করে শুনিয়েছেন এবং তাতেও ক্রমিকভাবে প্রত্যেক শিক্ষকের তার ছাত্রকে এই সূরাটি পাঠ করে শুনানো বর্ণিত আছে। এমনকি আমার উস্তাদও এটা তার উস্তাদ হতে শুনেছেন। কিন্তু তিনি নিজে নিরক্ষর ছিলেন এবং এটাকে মুখস্থ করার সময় পাননি বলে আমাকে পাঠ করে শুনাননি। কিন্তু সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, আমার অন্য উস্তাদ হাফিয কাবীর আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে উসমান (রঃ) স্বীয় সনদে এ হাদীসটি আমাকে পড়াবার সময় এই সূরাটিও পূর্ণভাবে পাঠ করে শুনিয়েছেন। ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর: প্রথম আয়াতের তাফসীর কয়েকবার গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।এরপর আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করছেন যারা এমন কথা বলে যা নিজেরা করে না এবং ওয়াদা করার পর তা পুরো করে না। পূর্বযুগীয় কোন কোন আলেম এই আয়াতকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে বলেন যে, ওয়াদা পূর্ণ করা সাধারণভাবেই ওয়াজিব। যার সাথে ওয়াদা করে সে তা পূর্ণ করার তাগিদ করুক আর নাই করুক। তারা তাদের দলীল হিসেবে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এ হাদীসটিও পেশ করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুনাফিকের নিদর্শন হলো তিনটি। (এক) ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করবে, (দুই) কথা বললে মিথ্যা বলবে এবং (তিন) তার কাছে আমানত রাখা হলে তা খিয়ানত করবে।” অন্য সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “চারটি অভ্যাস যার মধ্যে আছে সে নির্ভেজাল মুনাফিক। আর যার মধ্যে এগুলোর কোন একটি অভ্যাস রয়েছে তার মধ্যে নিফাক বা কপটতার একটি অভ্যাস রয়েছে যে পর্যন্ত সে তা পরিত্যাগ করে। এগুলোর মধ্যে একটি অভ্যাস হলো ওয়াদা ভঙ্গ করা। শারহে বুখারীর শুরুতে আমরা এই হাদীসগুলো পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেছি। সুতরাং আল্লাহর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা।এ জন্যেই এখানেও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেনঃ তোমরা যা কর না তোমাদের তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক।হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমির ইবনে রাবীআহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করেন, ঐ সময় আমি নাবালক ছিলাম। খেলা করার জন্যে আমি বের হলে আমার মা আমাকে ডাক দিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এসো, তোমাকে কিছু দিচ্ছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার মাতাকে বললেনঃ ‘সত্যি কি তুমি তোমার ছেলেকে কিছু দিতে চাও?' আমার মাতা উত্তরে বললেনঃ “জ্বী হ্যাঁ, খেজুর দিতে চাই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাহলে ভাল, অন্যথায় জেনে রেখো যে, যদি কিছুই না দেয়ার ইচ্ছা করতে তবে মিথ্যা বলার পাপ তোমার উপর লিখা হতো (তোমাকে মিথ্যাবাদিনী হিসেবে গণ্য করা হতো)।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যদি ওয়াদার সাথে ওয়াদাকৃত ব্যক্তির তাগীদের সম্পর্ক থাকে তবে ঐ ওয়াদা পুরো করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। যেমন কেউ যদি কাউকেও বলেঃ “তুমি বিয়ে কর, আমি তোমাকে দৈনিক এতো এতো দিতে থাকবো।” তার কথা মত যদি ঐ লোকটি বিয়ে করে নেয় তবে যতদিন ঐ বিয়ে টিকে থাকবে ততদিন ঐ ব্যক্তির উপর তার ওয়াদা মুতাবিক দিতে থাকা ওয়াজিব হবে। কেননা, তাতে মানুষের এমন হকের সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়ে গেছে যার উপর তাকে কঠিনভাবে জবাবদিহি করতে হবে। জমহুরে মাযহাব এই যে, ওয়াদা পূরণ করা সাধারণভাবে ওয়াজিবই নয়। এই আয়াতের জবাব তাঁরা এই দেন যে, যখন জনগণ তাদের উপর জিহাদ ফরয হওয়া কামনা করলো এবং তা তাদের উপর ফরয হয়ে গেল তখন কতক লোক ভীত ও চিন্তিত হয়ে পড়লো এবং জিহাদ হতে বিমুখ হয়ে গেল। ঐ সময় (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলো। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তুমি কি তাদেরকে দেখোনি যাদেরকে বলা হয়েছিলঃ তোমরা তোমাদের হস্ত সংবরণ কর, নামায কায়েম কর এবং যাকাত দাও? অতঃপর যখন তাদেরকে যুদ্ধের বিধান দেয়া হলো তখন তাদের একদল মানুষকে ভয় করছিল আল্লাহকে ভয় করার মত অথবা তদপেক্ষা অধিক, এবং বলতে লাগলোঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে যুদ্ধের বিধান কেন দিলেন? আমাদেরকে কিছু দিনের অবকাশ দেন না? বলঃ পার্থিব ভোগ সামান্য এবং যে মুত্তাকী তার জন্যে পরকালই উত্তম। তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও যুলুম করা হবে না। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমন কি তোমরা সুউচ্চ সুদৃঢ় দূর্গে অবস্থান করলেও।” (৪:৭৭-৭৮) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “মুমিনরা বলে- কেন তাদের উপর কোন সূৱা অবতীর্ণ হয় না? অতঃপর যখন কোন সুস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যুদ্ধের বর্ণনা দেয়া হয় তখন যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে তাদেরকে তুমি দেখো যে, মৃত্যুর অজ্ঞানতা যাকে পেয়ে বসেছে তার মত তারা তোমার দিকে তাকাতে রয়েছে।” (৪৭:২০) এই আয়াতটিও এই রূপই।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জিহাদ ফরয হওয়ার পূর্বে কতক মুমিন বলেছিলঃ “যদি আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্যে এমন আমল অবশ্যপালনীয় করতেন যা তার নিকট সর্বাপেক্ষা পছন্দনীয় তাহলে কতই না ভাল হতো!' তখন মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে জানিয়ে দিলেনঃ “আমার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় হলো ঈমান, যা সম্পূর্ণরূপে সন্দেহমুক্ত এবং বেঈমানদের সাথে জিহাদ করা।' এটা কতক মুমিনের নিকট খুবই ভারী বোধ হলো। মহামহিমান্বিত আল্লাহ তখন বললেনঃ “তোমরা যা কর না তা কেন বল?” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) বলেন যে, মুমিনরা বলেছিলঃ “কোন্ আমল আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় তা যদি আমরা জানতাম তবে অবশ্যই আমরা ঐ আমল করতাম। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাদেরকে এটা জানাতে গিয়ে বলেনঃ “যারা আল্লাহর পথে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত হয়ে সংগ্রাম করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন।” অতঃপর উহুদের দিন তাদের পরীক্ষা হয়ে যায়। তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়ে যায়। তখন আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা যা কর না তা তোমরা কেন বল?” তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে আমার নিকট ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয় যে আমার পথে যুদ্ধ করেছে।'কোন কোন গুরুজন বলেন যে, এটা ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা বলতোঃ “আমরা যুদ্ধ করেছি', অথচ তারা যুদ্ধ করেনি, বলতোঃ “আমরা আহত হয়েছি', অথচ আহত হয়নি, বলতোঃ “আমরা প্রহৃত হয়েছি’ অথচ প্রহৃত হয়নি, বলতোঃ ‘আমরা ধৈর্য ধারণ করেছি', অথচ ধৈর্যধারণ করেনি, বলতোঃ ‘আমাদেরকে বন্দী করা হয়েছে, অথচ তাদেরকে বন্দী করা হয়নি।ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। তারা মুসলমানদেরকে সাহায্য করার ওয়াদা করতো, কিন্তু প্রয়োজনের সময় সাহায্য করতো না। যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা জিহাদ উদ্দেশ্য।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যারা এসব কথা বলেছিলেন তাঁদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা আনসারী (রাঃ)-ও একজন ছিলেন। যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো এবং জানা গেল যে, জিহাদ হলো সবচেয়ে উত্তম আমল তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন যে, মৃত্যু পর্যন্ত তিনি নিজেকে আল্লাহর পথে ওয়াকফ করে দিলেন। ওরই উপর তিনি কায়েম থাকেন এবং আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যান।হযরত আবুল আসওয়াদ দাইলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু মূসা (রাঃ) একবার বসরার কারীদেরকে ডেকে পাঠান। তখন তিনশজন কারী তাঁর নিকট আগমন করেন যাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন কুরআনের পাঠক। অতঃপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “দেখুন, আপনারা হলেন বসরাবাসীদের কারী এবং তাদের মধ্যে উত্তম লোকে। জেনে রাখুন যে, আমরা একটি সূরা পাঠ করতাম যা (আরবী) সূরাগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত ছিল। অতঃপর তা আমাদেরকে ভুলিয়ে , দেয়া হয়েছে। ওর মধ্য হতে শুধু এটুকু আমার স্মরণ আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! যা তোমরা কর না তা তোমরা কেন বল?” সুতরাং ওটা লিখা হবে এবং সাক্ষী হিসেবে তোমাদের গলদেশে লটকানো হবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন ওটা সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ 'যারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, আল্লাহ্ তাদেরকে ভালবাসেন।' অর্থাৎ এটা হলো আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে সংবাদ যে, তিনি তাঁর ঐ মুমিন বান্দাদেরকে ভালবাসেন যারা শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, যাতে আল্লাহর কালেমা সমুন্নত হয়, ইসলামের হিফাযত হয় এবং তাঁর দ্বীন সমস্ত দ্বীনের উপর জয়যুক্ত হয়। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “তিন প্রকারের লোককে দেখে আল্লাহ্ তা'আলা হেসে থাকেন। (এক) যারা রাত্রে উঠে তাহাজ্জুদের নামায পড়ে, (দুই) নামাযের জন্যে যারা কাতারবন্দী বা সারিবদ্ধ হয় এবং (তিন) যুদ্ধের জন্যে যারা সারিবদ্ধ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন) হযরত মাতরাফ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “হযরত আবু যারের (রাঃ) রিওয়াইয়াতকৃত একটি হাদীস আমার নিকট পৌঁছে। আমার মনে বাসনা জাগলো যে, আমি স্বয়ং তার সাথে সাক্ষাৎ করে তার মুখে হাদীসটি শুনবো। সুতরাং একদা আমি তাঁর সাথে সাক্ষাত করলাম এবং আমার মনের বাসনা তাঁর সামনে প্রকাশ করলাম। তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেনঃ “হাদীসটি কি?” আমি বললামঃ আল্লাহ্ তা'আলা তিন ব্যক্তিকে শত্রু মনে করেন এবং তিন ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব রাখেন। তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, আমি আমার বন্ধু হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উপর কখনো মিথ্যা আরোপ করতে পারি না। সত্যিই তিনি আমাদের নিকট এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আমি তখন জিজ্ঞেস করলামঃ যাদের সাথে আল্লাহ পাক বন্ধুত্ব রাখেন ঐ তিন ব্যক্তি কারা? তিনি জবাবে বললেনঃ “এক তো ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর পথে জিহাদ করে। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে বের হয়ে শত্রুদের সাথে বীরত্ব সহকারে যুদ্ধ করে। তুমি এর সত্যতা আল্লাহর কিতাবেও দেখতে পার।” অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন, তারপর পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমের এ হাদীসটি এভাবে এই শব্দেই এতোটুকুই বর্ণিত হয়েছে। হাঁ, তবে জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতে হাদীসটি পূর্ণভাবে রয়েছে এবং আমরাও এটাকে অন্য জায়গায় পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি। সুতরাং আল্লাহরই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আমার বান্দা, আমার উপর নির্ভরশীল এবং আমার নিকট পছন্দনীয়। তুমি দুশ্চরিত্র ও কর্কশভাষী নও। তুমি বাজারে শোরগোলকারী নও। মন্দের প্রতিশোধ তুমি মন্দ দ্বারা গ্রহণ কর না বরং মার্জনা ও ক্ষমা করে থাকো। তোমার জন্মস্থান মক্কা, হিজরতের স্থান তাবাহ, দেশ সিরিয়া। তোমার উম্মতের সংখ্যা অধিক যারা আল্লাহর প্রশংসাকারী। সর্বাবস্থায় ও সর্বস্থলে তারা সদা আল্লাহর প্রশংসা করে থাকে। সকাল বেলায় নিম্নস্বরে তাদের আল্লাহর যিক্রের শব্দ সর্বদা শোন যায়, যেমন মৌমাছির গুনগুন্ শব্দ। তারা তাদের গোঁফ হেঁটে থাকে ও নখ কেটে থাকে। তারা তাদের পদনালীর অর্ধেক পর্যন্ত তাদের লুঙ্গী লটকিয়ে থাকে। জিহাদের মাঠে তাদের সারি নামাযের সারীর মত।” অতঃপর হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) (আরবী) -এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। তারপর বলেনঃ “তারা সূর্যের প্রতি লক্ষ্য রাখে, যখনই এবং যেখানেই সময় হয় তারা নামায আদায় করে থাকে যদিও সওয়ারীর উপরও অবস্থান করে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সেনাবাহিনীকে সারিবদ্ধ না করা পর্যন্ত শত্রুদের সাথে যুদ্ধ শুরু করতেন না। সুতরাং কাতারবন্দী বা সারিবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছেঃ যুদ্ধে তারা একে অপরের সাথে মিলিত অবস্থায় সারিবদ্ধ হয়। কাতাদা (রঃ) (আরবী)-এর ভাবার্থ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ তুমি কি দেখনি যে, অট্টালিকা নির্মাণকারী তার অট্টালিকার কোন জায়গায় উঁচু নীচু হোক বা আঁকা বাকা হোক এটা সে চায় না। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলাও চান না যে, তাঁর কাজে মতভেদ হোক। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং মুমিনদেরকে তাদের যুদ্ধে এবং তাদের নামাযে কাতারবন্দী করেছেন। সুতরাং মুমিনদের উচিত যে, তারা আল্লাহ তা'আলার হুকুম মেনে চলবে। যারা তাঁর হুকুম মেনে চলবে ওটা হবে তাদের পরিত্রাণের উপায়।”যারা আল্লাহর পথে সগ্রাম করে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন। অতঃপর হযরত আবূ বাহরিয়্যাহ (রঃ) বলেনঃ “যখন আপনারা আমাকে দেখবেন যে, আমি কাতার বা সারির মধ্যে এদিক ওদিক ভ্রুক্ষেপ করছি তখন আপনারা আমাকে ইচ্ছামত ভৎসনা ও গালিগালাজ করতে পারেন।” [এটা বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)]
আস-সফ 61:2
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা একদা পরস্পর আলোচনা করছিলাম যে, আমাদের মধ্যে কেউ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করতো যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন আমল সবচেয়ে প্রিয়? কিন্তু তখনো কেউ দাঁড়ায়নি, ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত আমাদের নিকট আসলেন এবং এক এক করে প্রত্যেককে ডেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট নিয়ে গেলেন। আমরা সবাই একত্রিত হলে তিনি এই পূর্ণ সূরাটি আমাদেরকে পাঠ করে শুনালেন।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত এক হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করতে ভয় পাচ্ছিলাম।” তাতে এও রয়েছে যে, যেমনভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পূর্ণ সূরাটি পাঠ করে শুনিয়েছিলেন তেমনিভাবেই এই হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী তাবেয়ীকে পাঠ করে শুনান, তাবেয়ী তার ছাত্রকে এবং তার ছাত্র তার ছাত্রকে পাঠ করে শুনান। এই ভাবে শেষ পর্যন্ত উস্তাদ তার শাগরিদকে পাঠ করে শুনিয়ে দেন।অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেনঃ “আমরা বলেছিলাম যে, যদি আমরা এরূপ আমলের খবর জানতে পারি তবে অবশ্যই আমরা ওর উপর আমলকারী হয়ে যাবো।”আমাকে আমার উস্তাদ শায়খুল মুসনাদ আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে আবি তালিব হাজ্জারও (রঃ) স্বীয় সনদে এ হাদীসটি বর্ণনা করে শুনিয়েছেন এবং তাতেও ক্রমিকভাবে প্রত্যেক শিক্ষকের তার ছাত্রকে এই সূরাটি পাঠ করে শুনানো বর্ণিত আছে। এমনকি আমার উস্তাদও এটা তার উস্তাদ হতে শুনেছেন। কিন্তু তিনি নিজে নিরক্ষর ছিলেন এবং এটাকে মুখস্থ করার সময় পাননি বলে আমাকে পাঠ করে শুনাননি। কিন্তু সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, আমার অন্য উস্তাদ হাফিয কাবীর আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে উসমান (রঃ) স্বীয় সনদে এ হাদীসটি আমাকে পড়াবার সময় এই সূরাটিও পূর্ণভাবে পাঠ করে শুনিয়েছেন। ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর: প্রথম আয়াতের তাফসীর কয়েকবার গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।এরপর আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করছেন যারা এমন কথা বলে যা নিজেরা করে না এবং ওয়াদা করার পর তা পুরো করে না। পূর্বযুগীয় কোন কোন আলেম এই আয়াতকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে বলেন যে, ওয়াদা পূর্ণ করা সাধারণভাবেই ওয়াজিব। যার সাথে ওয়াদা করে সে তা পূর্ণ করার তাগিদ করুক আর নাই করুক। তারা তাদের দলীল হিসেবে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এ হাদীসটিও পেশ করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুনাফিকের নিদর্শন হলো তিনটি। (এক) ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করবে, (দুই) কথা বললে মিথ্যা বলবে এবং (তিন) তার কাছে আমানত রাখা হলে তা খিয়ানত করবে।” অন্য সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “চারটি অভ্যাস যার মধ্যে আছে সে নির্ভেজাল মুনাফিক। আর যার মধ্যে এগুলোর কোন একটি অভ্যাস রয়েছে তার মধ্যে নিফাক বা কপটতার একটি অভ্যাস রয়েছে যে পর্যন্ত সে তা পরিত্যাগ করে। এগুলোর মধ্যে একটি অভ্যাস হলো ওয়াদা ভঙ্গ করা। শারহে বুখারীর শুরুতে আমরা এই হাদীসগুলো পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেছি। সুতরাং আল্লাহর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা।এ জন্যেই এখানেও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেনঃ তোমরা যা কর না তোমাদের তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক।হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমির ইবনে রাবীআহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করেন, ঐ সময় আমি নাবালক ছিলাম। খেলা করার জন্যে আমি বের হলে আমার মা আমাকে ডাক দিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এসো, তোমাকে কিছু দিচ্ছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার মাতাকে বললেনঃ ‘সত্যি কি তুমি তোমার ছেলেকে কিছু দিতে চাও?' আমার মাতা উত্তরে বললেনঃ “জ্বী হ্যাঁ, খেজুর দিতে চাই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাহলে ভাল, অন্যথায় জেনে রেখো যে, যদি কিছুই না দেয়ার ইচ্ছা করতে তবে মিথ্যা বলার পাপ তোমার উপর লিখা হতো (তোমাকে মিথ্যাবাদিনী হিসেবে গণ্য করা হতো)।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যদি ওয়াদার সাথে ওয়াদাকৃত ব্যক্তির তাগীদের সম্পর্ক থাকে তবে ঐ ওয়াদা পুরো করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। যেমন কেউ যদি কাউকেও বলেঃ “তুমি বিয়ে কর, আমি তোমাকে দৈনিক এতো এতো দিতে থাকবো।” তার কথা মত যদি ঐ লোকটি বিয়ে করে নেয় তবে যতদিন ঐ বিয়ে টিকে থাকবে ততদিন ঐ ব্যক্তির উপর তার ওয়াদা মুতাবিক দিতে থাকা ওয়াজিব হবে। কেননা, তাতে মানুষের এমন হকের সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়ে গেছে যার উপর তাকে কঠিনভাবে জবাবদিহি করতে হবে। জমহুরে মাযহাব এই যে, ওয়াদা পূরণ করা সাধারণভাবে ওয়াজিবই নয়। এই আয়াতের জবাব তাঁরা এই দেন যে, যখন জনগণ তাদের উপর জিহাদ ফরয হওয়া কামনা করলো এবং তা তাদের উপর ফরয হয়ে গেল তখন কতক লোক ভীত ও চিন্তিত হয়ে পড়লো এবং জিহাদ হতে বিমুখ হয়ে গেল। ঐ সময় (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলো। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তুমি কি তাদেরকে দেখোনি যাদেরকে বলা হয়েছিলঃ তোমরা তোমাদের হস্ত সংবরণ কর, নামায কায়েম কর এবং যাকাত দাও? অতঃপর যখন তাদেরকে যুদ্ধের বিধান দেয়া হলো তখন তাদের একদল মানুষকে ভয় করছিল আল্লাহকে ভয় করার মত অথবা তদপেক্ষা অধিক, এবং বলতে লাগলোঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে যুদ্ধের বিধান কেন দিলেন? আমাদেরকে কিছু দিনের অবকাশ দেন না? বলঃ পার্থিব ভোগ সামান্য এবং যে মুত্তাকী তার জন্যে পরকালই উত্তম। তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও যুলুম করা হবে না। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমন কি তোমরা সুউচ্চ সুদৃঢ় দূর্গে অবস্থান করলেও।” (৪:৭৭-৭৮) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “মুমিনরা বলে- কেন তাদের উপর কোন সূৱা অবতীর্ণ হয় না? অতঃপর যখন কোন সুস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যুদ্ধের বর্ণনা দেয়া হয় তখন যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে তাদেরকে তুমি দেখো যে, মৃত্যুর অজ্ঞানতা যাকে পেয়ে বসেছে তার মত তারা তোমার দিকে তাকাতে রয়েছে।” (৪৭:২০) এই আয়াতটিও এই রূপই।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জিহাদ ফরয হওয়ার পূর্বে কতক মুমিন বলেছিলঃ “যদি আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্যে এমন আমল অবশ্যপালনীয় করতেন যা তার নিকট সর্বাপেক্ষা পছন্দনীয় তাহলে কতই না ভাল হতো!' তখন মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে জানিয়ে দিলেনঃ “আমার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় হলো ঈমান, যা সম্পূর্ণরূপে সন্দেহমুক্ত এবং বেঈমানদের সাথে জিহাদ করা।' এটা কতক মুমিনের নিকট খুবই ভারী বোধ হলো। মহামহিমান্বিত আল্লাহ তখন বললেনঃ “তোমরা যা কর না তা কেন বল?” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) বলেন যে, মুমিনরা বলেছিলঃ “কোন্ আমল আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় তা যদি আমরা জানতাম তবে অবশ্যই আমরা ঐ আমল করতাম। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাদেরকে এটা জানাতে গিয়ে বলেনঃ “যারা আল্লাহর পথে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত হয়ে সংগ্রাম করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন।” অতঃপর উহুদের দিন তাদের পরীক্ষা হয়ে যায়। তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়ে যায়। তখন আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা যা কর না তা তোমরা কেন বল?” তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে আমার নিকট ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয় যে আমার পথে যুদ্ধ করেছে।'কোন কোন গুরুজন বলেন যে, এটা ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা বলতোঃ “আমরা যুদ্ধ করেছি', অথচ তারা যুদ্ধ করেনি, বলতোঃ “আমরা আহত হয়েছি', অথচ আহত হয়নি, বলতোঃ “আমরা প্রহৃত হয়েছি’ অথচ প্রহৃত হয়নি, বলতোঃ ‘আমরা ধৈর্য ধারণ করেছি', অথচ ধৈর্যধারণ করেনি, বলতোঃ ‘আমাদেরকে বন্দী করা হয়েছে, অথচ তাদেরকে বন্দী করা হয়নি।ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। তারা মুসলমানদেরকে সাহায্য করার ওয়াদা করতো, কিন্তু প্রয়োজনের সময় সাহায্য করতো না। যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা জিহাদ উদ্দেশ্য।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যারা এসব কথা বলেছিলেন তাঁদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা আনসারী (রাঃ)-ও একজন ছিলেন। যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো এবং জানা গেল যে, জিহাদ হলো সবচেয়ে উত্তম আমল তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন যে, মৃত্যু পর্যন্ত তিনি নিজেকে আল্লাহর পথে ওয়াকফ করে দিলেন। ওরই উপর তিনি কায়েম থাকেন এবং আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যান।হযরত আবুল আসওয়াদ দাইলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু মূসা (রাঃ) একবার বসরার কারীদেরকে ডেকে পাঠান। তখন তিনশজন কারী তাঁর নিকট আগমন করেন যাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন কুরআনের পাঠক। অতঃপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “দেখুন, আপনারা হলেন বসরাবাসীদের কারী এবং তাদের মধ্যে উত্তম লোকে। জেনে রাখুন যে, আমরা একটি সূরা পাঠ করতাম যা (আরবী) সূরাগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত ছিল। অতঃপর তা আমাদেরকে ভুলিয়ে , দেয়া হয়েছে। ওর মধ্য হতে শুধু এটুকু আমার স্মরণ আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! যা তোমরা কর না তা তোমরা কেন বল?” সুতরাং ওটা লিখা হবে এবং সাক্ষী হিসেবে তোমাদের গলদেশে লটকানো হবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন ওটা সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ 'যারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, আল্লাহ্ তাদেরকে ভালবাসেন।' অর্থাৎ এটা হলো আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে সংবাদ যে, তিনি তাঁর ঐ মুমিন বান্দাদেরকে ভালবাসেন যারা শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, যাতে আল্লাহর কালেমা সমুন্নত হয়, ইসলামের হিফাযত হয় এবং তাঁর দ্বীন সমস্ত দ্বীনের উপর জয়যুক্ত হয়। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “তিন প্রকারের লোককে দেখে আল্লাহ্ তা'আলা হেসে থাকেন। (এক) যারা রাত্রে উঠে তাহাজ্জুদের নামায পড়ে, (দুই) নামাযের জন্যে যারা কাতারবন্দী বা সারিবদ্ধ হয় এবং (তিন) যুদ্ধের জন্যে যারা সারিবদ্ধ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন) হযরত মাতরাফ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “হযরত আবু যারের (রাঃ) রিওয়াইয়াতকৃত একটি হাদীস আমার নিকট পৌঁছে। আমার মনে বাসনা জাগলো যে, আমি স্বয়ং তার সাথে সাক্ষাৎ করে তার মুখে হাদীসটি শুনবো। সুতরাং একদা আমি তাঁর সাথে সাক্ষাত করলাম এবং আমার মনের বাসনা তাঁর সামনে প্রকাশ করলাম। তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেনঃ “হাদীসটি কি?” আমি বললামঃ আল্লাহ্ তা'আলা তিন ব্যক্তিকে শত্রু মনে করেন এবং তিন ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব রাখেন। তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, আমি আমার বন্ধু হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উপর কখনো মিথ্যা আরোপ করতে পারি না। সত্যিই তিনি আমাদের নিকট এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আমি তখন জিজ্ঞেস করলামঃ যাদের সাথে আল্লাহ পাক বন্ধুত্ব রাখেন ঐ তিন ব্যক্তি কারা? তিনি জবাবে বললেনঃ “এক তো ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর পথে জিহাদ করে। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে বের হয়ে শত্রুদের সাথে বীরত্ব সহকারে যুদ্ধ করে। তুমি এর সত্যতা আল্লাহর কিতাবেও দেখতে পার।” অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন, তারপর পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমের এ হাদীসটি এভাবে এই শব্দেই এতোটুকুই বর্ণিত হয়েছে। হাঁ, তবে জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতে হাদীসটি পূর্ণভাবে রয়েছে এবং আমরাও এটাকে অন্য জায়গায় পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি। সুতরাং আল্লাহরই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আমার বান্দা, আমার উপর নির্ভরশীল এবং আমার নিকট পছন্দনীয়। তুমি দুশ্চরিত্র ও কর্কশভাষী নও। তুমি বাজারে শোরগোলকারী নও। মন্দের প্রতিশোধ তুমি মন্দ দ্বারা গ্রহণ কর না বরং মার্জনা ও ক্ষমা করে থাকো। তোমার জন্মস্থান মক্কা, হিজরতের স্থান তাবাহ, দেশ সিরিয়া। তোমার উম্মতের সংখ্যা অধিক যারা আল্লাহর প্রশংসাকারী। সর্বাবস্থায় ও সর্বস্থলে তারা সদা আল্লাহর প্রশংসা করে থাকে। সকাল বেলায় নিম্নস্বরে তাদের আল্লাহর যিক্রের শব্দ সর্বদা শোন যায়, যেমন মৌমাছির গুনগুন্ শব্দ। তারা তাদের গোঁফ হেঁটে থাকে ও নখ কেটে থাকে। তারা তাদের পদনালীর অর্ধেক পর্যন্ত তাদের লুঙ্গী লটকিয়ে থাকে। জিহাদের মাঠে তাদের সারি নামাযের সারীর মত।” অতঃপর হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) (আরবী) -এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। তারপর বলেনঃ “তারা সূর্যের প্রতি লক্ষ্য রাখে, যখনই এবং যেখানেই সময় হয় তারা নামায আদায় করে থাকে যদিও সওয়ারীর উপরও অবস্থান করে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সেনাবাহিনীকে সারিবদ্ধ না করা পর্যন্ত শত্রুদের সাথে যুদ্ধ শুরু করতেন না। সুতরাং কাতারবন্দী বা সারিবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছেঃ যুদ্ধে তারা একে অপরের সাথে মিলিত অবস্থায় সারিবদ্ধ হয়। কাতাদা (রঃ) (আরবী)-এর ভাবার্থ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ তুমি কি দেখনি যে, অট্টালিকা নির্মাণকারী তার অট্টালিকার কোন জায়গায় উঁচু নীচু হোক বা আঁকা বাকা হোক এটা সে চায় না। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলাও চান না যে, তাঁর কাজে মতভেদ হোক। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং মুমিনদেরকে তাদের যুদ্ধে এবং তাদের নামাযে কাতারবন্দী করেছেন। সুতরাং মুমিনদের উচিত যে, তারা আল্লাহ তা'আলার হুকুম মেনে চলবে। যারা তাঁর হুকুম মেনে চলবে ওটা হবে তাদের পরিত্রাণের উপায়।”যারা আল্লাহর পথে সগ্রাম করে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন। অতঃপর হযরত আবূ বাহরিয়্যাহ (রঃ) বলেনঃ “যখন আপনারা আমাকে দেখবেন যে, আমি কাতার বা সারির মধ্যে এদিক ওদিক ভ্রুক্ষেপ করছি তখন আপনারা আমাকে ইচ্ছামত ভৎসনা ও গালিগালাজ করতে পারেন।” [এটা বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)]
আস-সফ 61:3
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা একদা পরস্পর আলোচনা করছিলাম যে, আমাদের মধ্যে কেউ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করতো যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন আমল সবচেয়ে প্রিয়? কিন্তু তখনো কেউ দাঁড়ায়নি, ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত আমাদের নিকট আসলেন এবং এক এক করে প্রত্যেককে ডেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট নিয়ে গেলেন। আমরা সবাই একত্রিত হলে তিনি এই পূর্ণ সূরাটি আমাদেরকে পাঠ করে শুনালেন।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত এক হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করতে ভয় পাচ্ছিলাম।” তাতে এও রয়েছে যে, যেমনভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পূর্ণ সূরাটি পাঠ করে শুনিয়েছিলেন তেমনিভাবেই এই হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী তাবেয়ীকে পাঠ করে শুনান, তাবেয়ী তার ছাত্রকে এবং তার ছাত্র তার ছাত্রকে পাঠ করে শুনান। এই ভাবে শেষ পর্যন্ত উস্তাদ তার শাগরিদকে পাঠ করে শুনিয়ে দেন।অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেনঃ “আমরা বলেছিলাম যে, যদি আমরা এরূপ আমলের খবর জানতে পারি তবে অবশ্যই আমরা ওর উপর আমলকারী হয়ে যাবো।”আমাকে আমার উস্তাদ শায়খুল মুসনাদ আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে আবি তালিব হাজ্জারও (রঃ) স্বীয় সনদে এ হাদীসটি বর্ণনা করে শুনিয়েছেন এবং তাতেও ক্রমিকভাবে প্রত্যেক শিক্ষকের তার ছাত্রকে এই সূরাটি পাঠ করে শুনানো বর্ণিত আছে। এমনকি আমার উস্তাদও এটা তার উস্তাদ হতে শুনেছেন। কিন্তু তিনি নিজে নিরক্ষর ছিলেন এবং এটাকে মুখস্থ করার সময় পাননি বলে আমাকে পাঠ করে শুনাননি। কিন্তু সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, আমার অন্য উস্তাদ হাফিয কাবীর আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে উসমান (রঃ) স্বীয় সনদে এ হাদীসটি আমাকে পড়াবার সময় এই সূরাটিও পূর্ণভাবে পাঠ করে শুনিয়েছেন। ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর: প্রথম আয়াতের তাফসীর কয়েকবার গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।এরপর আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করছেন যারা এমন কথা বলে যা নিজেরা করে না এবং ওয়াদা করার পর তা পুরো করে না। পূর্বযুগীয় কোন কোন আলেম এই আয়াতকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে বলেন যে, ওয়াদা পূর্ণ করা সাধারণভাবেই ওয়াজিব। যার সাথে ওয়াদা করে সে তা পূর্ণ করার তাগিদ করুক আর নাই করুক। তারা তাদের দলীল হিসেবে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এ হাদীসটিও পেশ করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুনাফিকের নিদর্শন হলো তিনটি। (এক) ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করবে, (দুই) কথা বললে মিথ্যা বলবে এবং (তিন) তার কাছে আমানত রাখা হলে তা খিয়ানত করবে।” অন্য সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “চারটি অভ্যাস যার মধ্যে আছে সে নির্ভেজাল মুনাফিক। আর যার মধ্যে এগুলোর কোন একটি অভ্যাস রয়েছে তার মধ্যে নিফাক বা কপটতার একটি অভ্যাস রয়েছে যে পর্যন্ত সে তা পরিত্যাগ করে। এগুলোর মধ্যে একটি অভ্যাস হলো ওয়াদা ভঙ্গ করা। শারহে বুখারীর শুরুতে আমরা এই হাদীসগুলো পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেছি। সুতরাং আল্লাহর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা।এ জন্যেই এখানেও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেনঃ তোমরা যা কর না তোমাদের তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক।হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমির ইবনে রাবীআহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করেন, ঐ সময় আমি নাবালক ছিলাম। খেলা করার জন্যে আমি বের হলে আমার মা আমাকে ডাক দিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এসো, তোমাকে কিছু দিচ্ছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার মাতাকে বললেনঃ ‘সত্যি কি তুমি তোমার ছেলেকে কিছু দিতে চাও?' আমার মাতা উত্তরে বললেনঃ “জ্বী হ্যাঁ, খেজুর দিতে চাই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাহলে ভাল, অন্যথায় জেনে রেখো যে, যদি কিছুই না দেয়ার ইচ্ছা করতে তবে মিথ্যা বলার পাপ তোমার উপর লিখা হতো (তোমাকে মিথ্যাবাদিনী হিসেবে গণ্য করা হতো)।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যদি ওয়াদার সাথে ওয়াদাকৃত ব্যক্তির তাগীদের সম্পর্ক থাকে তবে ঐ ওয়াদা পুরো করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। যেমন কেউ যদি কাউকেও বলেঃ “তুমি বিয়ে কর, আমি তোমাকে দৈনিক এতো এতো দিতে থাকবো।” তার কথা মত যদি ঐ লোকটি বিয়ে করে নেয় তবে যতদিন ঐ বিয়ে টিকে থাকবে ততদিন ঐ ব্যক্তির উপর তার ওয়াদা মুতাবিক দিতে থাকা ওয়াজিব হবে। কেননা, তাতে মানুষের এমন হকের সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়ে গেছে যার উপর তাকে কঠিনভাবে জবাবদিহি করতে হবে। জমহুরে মাযহাব এই যে, ওয়াদা পূরণ করা সাধারণভাবে ওয়াজিবই নয়। এই আয়াতের জবাব তাঁরা এই দেন যে, যখন জনগণ তাদের উপর জিহাদ ফরয হওয়া কামনা করলো এবং তা তাদের উপর ফরয হয়ে গেল তখন কতক লোক ভীত ও চিন্তিত হয়ে পড়লো এবং জিহাদ হতে বিমুখ হয়ে গেল। ঐ সময় (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলো। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তুমি কি তাদেরকে দেখোনি যাদেরকে বলা হয়েছিলঃ তোমরা তোমাদের হস্ত সংবরণ কর, নামায কায়েম কর এবং যাকাত দাও? অতঃপর যখন তাদেরকে যুদ্ধের বিধান দেয়া হলো তখন তাদের একদল মানুষকে ভয় করছিল আল্লাহকে ভয় করার মত অথবা তদপেক্ষা অধিক, এবং বলতে লাগলোঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে যুদ্ধের বিধান কেন দিলেন? আমাদেরকে কিছু দিনের অবকাশ দেন না? বলঃ পার্থিব ভোগ সামান্য এবং যে মুত্তাকী তার জন্যে পরকালই উত্তম। তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও যুলুম করা হবে না। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমন কি তোমরা সুউচ্চ সুদৃঢ় দূর্গে অবস্থান করলেও।” (৪:৭৭-৭৮) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “মুমিনরা বলে- কেন তাদের উপর কোন সূৱা অবতীর্ণ হয় না? অতঃপর যখন কোন সুস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যুদ্ধের বর্ণনা দেয়া হয় তখন যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে তাদেরকে তুমি দেখো যে, মৃত্যুর অজ্ঞানতা যাকে পেয়ে বসেছে তার মত তারা তোমার দিকে তাকাতে রয়েছে।” (৪৭:২০) এই আয়াতটিও এই রূপই।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জিহাদ ফরয হওয়ার পূর্বে কতক মুমিন বলেছিলঃ “যদি আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্যে এমন আমল অবশ্যপালনীয় করতেন যা তার নিকট সর্বাপেক্ষা পছন্দনীয় তাহলে কতই না ভাল হতো!' তখন মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে জানিয়ে দিলেনঃ “আমার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় হলো ঈমান, যা সম্পূর্ণরূপে সন্দেহমুক্ত এবং বেঈমানদের সাথে জিহাদ করা।' এটা কতক মুমিনের নিকট খুবই ভারী বোধ হলো। মহামহিমান্বিত আল্লাহ তখন বললেনঃ “তোমরা যা কর না তা কেন বল?” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) বলেন যে, মুমিনরা বলেছিলঃ “কোন্ আমল আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় তা যদি আমরা জানতাম তবে অবশ্যই আমরা ঐ আমল করতাম। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাদেরকে এটা জানাতে গিয়ে বলেনঃ “যারা আল্লাহর পথে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত হয়ে সংগ্রাম করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন।” অতঃপর উহুদের দিন তাদের পরীক্ষা হয়ে যায়। তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়ে যায়। তখন আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা যা কর না তা তোমরা কেন বল?” তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে আমার নিকট ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয় যে আমার পথে যুদ্ধ করেছে।'কোন কোন গুরুজন বলেন যে, এটা ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা বলতোঃ “আমরা যুদ্ধ করেছি', অথচ তারা যুদ্ধ করেনি, বলতোঃ “আমরা আহত হয়েছি', অথচ আহত হয়নি, বলতোঃ “আমরা প্রহৃত হয়েছি’ অথচ প্রহৃত হয়নি, বলতোঃ ‘আমরা ধৈর্য ধারণ করেছি', অথচ ধৈর্যধারণ করেনি, বলতোঃ ‘আমাদেরকে বন্দী করা হয়েছে, অথচ তাদেরকে বন্দী করা হয়নি।ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। তারা মুসলমানদেরকে সাহায্য করার ওয়াদা করতো, কিন্তু প্রয়োজনের সময় সাহায্য করতো না। যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা জিহাদ উদ্দেশ্য।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যারা এসব কথা বলেছিলেন তাঁদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা আনসারী (রাঃ)-ও একজন ছিলেন। যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো এবং জানা গেল যে, জিহাদ হলো সবচেয়ে উত্তম আমল তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন যে, মৃত্যু পর্যন্ত তিনি নিজেকে আল্লাহর পথে ওয়াকফ করে দিলেন। ওরই উপর তিনি কায়েম থাকেন এবং আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যান।হযরত আবুল আসওয়াদ দাইলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু মূসা (রাঃ) একবার বসরার কারীদেরকে ডেকে পাঠান। তখন তিনশজন কারী তাঁর নিকট আগমন করেন যাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন কুরআনের পাঠক। অতঃপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “দেখুন, আপনারা হলেন বসরাবাসীদের কারী এবং তাদের মধ্যে উত্তম লোকে। জেনে রাখুন যে, আমরা একটি সূরা পাঠ করতাম যা (আরবী) সূরাগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত ছিল। অতঃপর তা আমাদেরকে ভুলিয়ে , দেয়া হয়েছে। ওর মধ্য হতে শুধু এটুকু আমার স্মরণ আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! যা তোমরা কর না তা তোমরা কেন বল?” সুতরাং ওটা লিখা হবে এবং সাক্ষী হিসেবে তোমাদের গলদেশে লটকানো হবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন ওটা সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ 'যারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, আল্লাহ্ তাদেরকে ভালবাসেন।' অর্থাৎ এটা হলো আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে সংবাদ যে, তিনি তাঁর ঐ মুমিন বান্দাদেরকে ভালবাসেন যারা শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, যাতে আল্লাহর কালেমা সমুন্নত হয়, ইসলামের হিফাযত হয় এবং তাঁর দ্বীন সমস্ত দ্বীনের উপর জয়যুক্ত হয়। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “তিন প্রকারের লোককে দেখে আল্লাহ্ তা'আলা হেসে থাকেন। (এক) যারা রাত্রে উঠে তাহাজ্জুদের নামায পড়ে, (দুই) নামাযের জন্যে যারা কাতারবন্দী বা সারিবদ্ধ হয় এবং (তিন) যুদ্ধের জন্যে যারা সারিবদ্ধ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন) হযরত মাতরাফ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “হযরত আবু যারের (রাঃ) রিওয়াইয়াতকৃত একটি হাদীস আমার নিকট পৌঁছে। আমার মনে বাসনা জাগলো যে, আমি স্বয়ং তার সাথে সাক্ষাৎ করে তার মুখে হাদীসটি শুনবো। সুতরাং একদা আমি তাঁর সাথে সাক্ষাত করলাম এবং আমার মনের বাসনা তাঁর সামনে প্রকাশ করলাম। তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেনঃ “হাদীসটি কি?” আমি বললামঃ আল্লাহ্ তা'আলা তিন ব্যক্তিকে শত্রু মনে করেন এবং তিন ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব রাখেন। তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, আমি আমার বন্ধু হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উপর কখনো মিথ্যা আরোপ করতে পারি না। সত্যিই তিনি আমাদের নিকট এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আমি তখন জিজ্ঞেস করলামঃ যাদের সাথে আল্লাহ পাক বন্ধুত্ব রাখেন ঐ তিন ব্যক্তি কারা? তিনি জবাবে বললেনঃ “এক তো ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর পথে জিহাদ করে। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে বের হয়ে শত্রুদের সাথে বীরত্ব সহকারে যুদ্ধ করে। তুমি এর সত্যতা আল্লাহর কিতাবেও দেখতে পার।” অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন, তারপর পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমের এ হাদীসটি এভাবে এই শব্দেই এতোটুকুই বর্ণিত হয়েছে। হাঁ, তবে জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতে হাদীসটি পূর্ণভাবে রয়েছে এবং আমরাও এটাকে অন্য জায়গায় পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি। সুতরাং আল্লাহরই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আমার বান্দা, আমার উপর নির্ভরশীল এবং আমার নিকট পছন্দনীয়। তুমি দুশ্চরিত্র ও কর্কশভাষী নও। তুমি বাজারে শোরগোলকারী নও। মন্দের প্রতিশোধ তুমি মন্দ দ্বারা গ্রহণ কর না বরং মার্জনা ও ক্ষমা করে থাকো। তোমার জন্মস্থান মক্কা, হিজরতের স্থান তাবাহ, দেশ সিরিয়া। তোমার উম্মতের সংখ্যা অধিক যারা আল্লাহর প্রশংসাকারী। সর্বাবস্থায় ও সর্বস্থলে তারা সদা আল্লাহর প্রশংসা করে থাকে। সকাল বেলায় নিম্নস্বরে তাদের আল্লাহর যিক্রের শব্দ সর্বদা শোন যায়, যেমন মৌমাছির গুনগুন্ শব্দ। তারা তাদের গোঁফ হেঁটে থাকে ও নখ কেটে থাকে। তারা তাদের পদনালীর অর্ধেক পর্যন্ত তাদের লুঙ্গী লটকিয়ে থাকে। জিহাদের মাঠে তাদের সারি নামাযের সারীর মত।” অতঃপর হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) (আরবী) -এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। তারপর বলেনঃ “তারা সূর্যের প্রতি লক্ষ্য রাখে, যখনই এবং যেখানেই সময় হয় তারা নামায আদায় করে থাকে যদিও সওয়ারীর উপরও অবস্থান করে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সেনাবাহিনীকে সারিবদ্ধ না করা পর্যন্ত শত্রুদের সাথে যুদ্ধ শুরু করতেন না। সুতরাং কাতারবন্দী বা সারিবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছেঃ যুদ্ধে তারা একে অপরের সাথে মিলিত অবস্থায় সারিবদ্ধ হয়। কাতাদা (রঃ) (আরবী)-এর ভাবার্থ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ তুমি কি দেখনি যে, অট্টালিকা নির্মাণকারী তার অট্টালিকার কোন জায়গায় উঁচু নীচু হোক বা আঁকা বাকা হোক এটা সে চায় না। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলাও চান না যে, তাঁর কাজে মতভেদ হোক। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং মুমিনদেরকে তাদের যুদ্ধে এবং তাদের নামাযে কাতারবন্দী করেছেন। সুতরাং মুমিনদের উচিত যে, তারা আল্লাহ তা'আলার হুকুম মেনে চলবে। যারা তাঁর হুকুম মেনে চলবে ওটা হবে তাদের পরিত্রাণের উপায়।”যারা আল্লাহর পথে সগ্রাম করে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন। অতঃপর হযরত আবূ বাহরিয়্যাহ (রঃ) বলেনঃ “যখন আপনারা আমাকে দেখবেন যে, আমি কাতার বা সারির মধ্যে এদিক ওদিক ভ্রুক্ষেপ করছি তখন আপনারা আমাকে ইচ্ছামত ভৎসনা ও গালিগালাজ করতে পারেন।” [এটা বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)]
আস-সফ 61:4
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা একদা পরস্পর আলোচনা করছিলাম যে, আমাদের মধ্যে কেউ যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করতো যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন আমল সবচেয়ে প্রিয়? কিন্তু তখনো কেউ দাঁড়ায়নি, ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দূত আমাদের নিকট আসলেন এবং এক এক করে প্রত্যেককে ডেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট নিয়ে গেলেন। আমরা সবাই একত্রিত হলে তিনি এই পূর্ণ সূরাটি আমাদেরকে পাঠ করে শুনালেন।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত এক হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করতে ভয় পাচ্ছিলাম।” তাতে এও রয়েছে যে, যেমনভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পূর্ণ সূরাটি পাঠ করে শুনিয়েছিলেন তেমনিভাবেই এই হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী তাবেয়ীকে পাঠ করে শুনান, তাবেয়ী তার ছাত্রকে এবং তার ছাত্র তার ছাত্রকে পাঠ করে শুনান। এই ভাবে শেষ পর্যন্ত উস্তাদ তার শাগরিদকে পাঠ করে শুনিয়ে দেন।অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বলেনঃ “আমরা বলেছিলাম যে, যদি আমরা এরূপ আমলের খবর জানতে পারি তবে অবশ্যই আমরা ওর উপর আমলকারী হয়ে যাবো।”আমাকে আমার উস্তাদ শায়খুল মুসনাদ আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে আবি তালিব হাজ্জারও (রঃ) স্বীয় সনদে এ হাদীসটি বর্ণনা করে শুনিয়েছেন এবং তাতেও ক্রমিকভাবে প্রত্যেক শিক্ষকের তার ছাত্রকে এই সূরাটি পাঠ করে শুনানো বর্ণিত আছে। এমনকি আমার উস্তাদও এটা তার উস্তাদ হতে শুনেছেন। কিন্তু তিনি নিজে নিরক্ষর ছিলেন এবং এটাকে মুখস্থ করার সময় পাননি বলে আমাকে পাঠ করে শুনাননি। কিন্তু সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে, আমার অন্য উস্তাদ হাফিয কাবীর আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে উসমান (রঃ) স্বীয় সনদে এ হাদীসটি আমাকে পড়াবার সময় এই সূরাটিও পূর্ণভাবে পাঠ করে শুনিয়েছেন। ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর: প্রথম আয়াতের তাফসীর কয়েকবার গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।এরপর আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করছেন যারা এমন কথা বলে যা নিজেরা করে না এবং ওয়াদা করার পর তা পুরো করে না। পূর্বযুগীয় কোন কোন আলেম এই আয়াতকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে বলেন যে, ওয়াদা পূর্ণ করা সাধারণভাবেই ওয়াজিব। যার সাথে ওয়াদা করে সে তা পূর্ণ করার তাগিদ করুক আর নাই করুক। তারা তাদের দলীল হিসেবে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এ হাদীসটিও পেশ করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুনাফিকের নিদর্শন হলো তিনটি। (এক) ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করবে, (দুই) কথা বললে মিথ্যা বলবে এবং (তিন) তার কাছে আমানত রাখা হলে তা খিয়ানত করবে।” অন্য সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ “চারটি অভ্যাস যার মধ্যে আছে সে নির্ভেজাল মুনাফিক। আর যার মধ্যে এগুলোর কোন একটি অভ্যাস রয়েছে তার মধ্যে নিফাক বা কপটতার একটি অভ্যাস রয়েছে যে পর্যন্ত সে তা পরিত্যাগ করে। এগুলোর মধ্যে একটি অভ্যাস হলো ওয়াদা ভঙ্গ করা। শারহে বুখারীর শুরুতে আমরা এই হাদীসগুলো পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেছি। সুতরাং আল্লাহর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা।এ জন্যেই এখানেও আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেনঃ তোমরা যা কর না তোমাদের তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক।হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমির ইবনে রাবীআহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করেন, ঐ সময় আমি নাবালক ছিলাম। খেলা করার জন্যে আমি বের হলে আমার মা আমাকে ডাক দিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর বান্দা! এসো, তোমাকে কিছু দিচ্ছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার মাতাকে বললেনঃ ‘সত্যি কি তুমি তোমার ছেলেকে কিছু দিতে চাও?' আমার মাতা উত্তরে বললেনঃ “জ্বী হ্যাঁ, খেজুর দিতে চাই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাহলে ভাল, অন্যথায় জেনে রেখো যে, যদি কিছুই না দেয়ার ইচ্ছা করতে তবে মিথ্যা বলার পাপ তোমার উপর লিখা হতো (তোমাকে মিথ্যাবাদিনী হিসেবে গণ্য করা হতো)।" (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যদি ওয়াদার সাথে ওয়াদাকৃত ব্যক্তির তাগীদের সম্পর্ক থাকে তবে ঐ ওয়াদা পুরো করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। যেমন কেউ যদি কাউকেও বলেঃ “তুমি বিয়ে কর, আমি তোমাকে দৈনিক এতো এতো দিতে থাকবো।” তার কথা মত যদি ঐ লোকটি বিয়ে করে নেয় তবে যতদিন ঐ বিয়ে টিকে থাকবে ততদিন ঐ ব্যক্তির উপর তার ওয়াদা মুতাবিক দিতে থাকা ওয়াজিব হবে। কেননা, তাতে মানুষের এমন হকের সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়ে গেছে যার উপর তাকে কঠিনভাবে জবাবদিহি করতে হবে। জমহুরে মাযহাব এই যে, ওয়াদা পূরণ করা সাধারণভাবে ওয়াজিবই নয়। এই আয়াতের জবাব তাঁরা এই দেন যে, যখন জনগণ তাদের উপর জিহাদ ফরয হওয়া কামনা করলো এবং তা তাদের উপর ফরয হয়ে গেল তখন কতক লোক ভীত ও চিন্তিত হয়ে পড়লো এবং জিহাদ হতে বিমুখ হয়ে গেল। ঐ সময় (আরবী)-এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলো। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “তুমি কি তাদেরকে দেখোনি যাদেরকে বলা হয়েছিলঃ তোমরা তোমাদের হস্ত সংবরণ কর, নামায কায়েম কর এবং যাকাত দাও? অতঃপর যখন তাদেরকে যুদ্ধের বিধান দেয়া হলো তখন তাদের একদল মানুষকে ভয় করছিল আল্লাহকে ভয় করার মত অথবা তদপেক্ষা অধিক, এবং বলতে লাগলোঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে যুদ্ধের বিধান কেন দিলেন? আমাদেরকে কিছু দিনের অবকাশ দেন না? বলঃ পার্থিব ভোগ সামান্য এবং যে মুত্তাকী তার জন্যে পরকালই উত্তম। তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও যুলুম করা হবে না। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমন কি তোমরা সুউচ্চ সুদৃঢ় দূর্গে অবস্থান করলেও।” (৪:৭৭-৭৮) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “মুমিনরা বলে- কেন তাদের উপর কোন সূৱা অবতীর্ণ হয় না? অতঃপর যখন কোন সুস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যুদ্ধের বর্ণনা দেয়া হয় তখন যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে তাদেরকে তুমি দেখো যে, মৃত্যুর অজ্ঞানতা যাকে পেয়ে বসেছে তার মত তারা তোমার দিকে তাকাতে রয়েছে।” (৪৭:২০) এই আয়াতটিও এই রূপই।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জিহাদ ফরয হওয়ার পূর্বে কতক মুমিন বলেছিলঃ “যদি আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্যে এমন আমল অবশ্যপালনীয় করতেন যা তার নিকট সর্বাপেক্ষা পছন্দনীয় তাহলে কতই না ভাল হতো!' তখন মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে জানিয়ে দিলেনঃ “আমার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় হলো ঈমান, যা সম্পূর্ণরূপে সন্দেহমুক্ত এবং বেঈমানদের সাথে জিহাদ করা।' এটা কতক মুমিনের নিকট খুবই ভারী বোধ হলো। মহামহিমান্বিত আল্লাহ তখন বললেনঃ “তোমরা যা কর না তা কেন বল?” ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন। মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) বলেন যে, মুমিনরা বলেছিলঃ “কোন্ আমল আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় তা যদি আমরা জানতাম তবে অবশ্যই আমরা ঐ আমল করতাম। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাদেরকে এটা জানাতে গিয়ে বলেনঃ “যারা আল্লাহর পথে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত হয়ে সংগ্রাম করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন।” অতঃপর উহুদের দিন তাদের পরীক্ষা হয়ে যায়। তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়ে যায়। তখন আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা যা কর না তা তোমরা কেন বল?” তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে আমার নিকট ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয় যে আমার পথে যুদ্ধ করেছে।'কোন কোন গুরুজন বলেন যে, এটা ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা বলতোঃ “আমরা যুদ্ধ করেছি', অথচ তারা যুদ্ধ করেনি, বলতোঃ “আমরা আহত হয়েছি', অথচ আহত হয়নি, বলতোঃ “আমরা প্রহৃত হয়েছি’ অথচ প্রহৃত হয়নি, বলতোঃ ‘আমরা ধৈর্য ধারণ করেছি', অথচ ধৈর্যধারণ করেনি, বলতোঃ ‘আমাদেরকে বন্দী করা হয়েছে, অথচ তাদেরকে বন্দী করা হয়নি।ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। তারা মুসলমানদেরকে সাহায্য করার ওয়াদা করতো, কিন্তু প্রয়োজনের সময় সাহায্য করতো না। যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা জিহাদ উদ্দেশ্য।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যারা এসব কথা বলেছিলেন তাঁদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা আনসারী (রাঃ)-ও একজন ছিলেন। যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো এবং জানা গেল যে, জিহাদ হলো সবচেয়ে উত্তম আমল তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন যে, মৃত্যু পর্যন্ত তিনি নিজেকে আল্লাহর পথে ওয়াকফ করে দিলেন। ওরই উপর তিনি কায়েম থাকেন এবং আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যান।হযরত আবুল আসওয়াদ দাইলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু মূসা (রাঃ) একবার বসরার কারীদেরকে ডেকে পাঠান। তখন তিনশজন কারী তাঁর নিকট আগমন করেন যাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন কুরআনের পাঠক। অতঃপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “দেখুন, আপনারা হলেন বসরাবাসীদের কারী এবং তাদের মধ্যে উত্তম লোকে। জেনে রাখুন যে, আমরা একটি সূরা পাঠ করতাম যা (আরবী) সূরাগুলোর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত ছিল। অতঃপর তা আমাদেরকে ভুলিয়ে , দেয়া হয়েছে। ওর মধ্য হতে শুধু এটুকু আমার স্মরণ আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! যা তোমরা কর না তা তোমরা কেন বল?” সুতরাং ওটা লিখা হবে এবং সাক্ষী হিসেবে তোমাদের গলদেশে লটকানো হবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন ওটা সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ 'যারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, আল্লাহ্ তাদেরকে ভালবাসেন।' অর্থাৎ এটা হলো আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে সংবাদ যে, তিনি তাঁর ঐ মুমিন বান্দাদেরকে ভালবাসেন যারা শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, যাতে আল্লাহর কালেমা সমুন্নত হয়, ইসলামের হিফাযত হয় এবং তাঁর দ্বীন সমস্ত দ্বীনের উপর জয়যুক্ত হয়। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “তিন প্রকারের লোককে দেখে আল্লাহ্ তা'আলা হেসে থাকেন। (এক) যারা রাত্রে উঠে তাহাজ্জুদের নামায পড়ে, (দুই) নামাযের জন্যে যারা কাতারবন্দী বা সারিবদ্ধ হয় এবং (তিন) যুদ্ধের জন্যে যারা সারিবদ্ধ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন) হযরত মাতরাফ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “হযরত আবু যারের (রাঃ) রিওয়াইয়াতকৃত একটি হাদীস আমার নিকট পৌঁছে। আমার মনে বাসনা জাগলো যে, আমি স্বয়ং তার সাথে সাক্ষাৎ করে তার মুখে হাদীসটি শুনবো। সুতরাং একদা আমি তাঁর সাথে সাক্ষাত করলাম এবং আমার মনের বাসনা তাঁর সামনে প্রকাশ করলাম। তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেনঃ “হাদীসটি কি?” আমি বললামঃ আল্লাহ্ তা'আলা তিন ব্যক্তিকে শত্রু মনে করেন এবং তিন ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব রাখেন। তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, আমি আমার বন্ধু হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উপর কখনো মিথ্যা আরোপ করতে পারি না। সত্যিই তিনি আমাদের নিকট এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আমি তখন জিজ্ঞেস করলামঃ যাদের সাথে আল্লাহ পাক বন্ধুত্ব রাখেন ঐ তিন ব্যক্তি কারা? তিনি জবাবে বললেনঃ “এক তো ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর পথে জিহাদ করে। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে বের হয়ে শত্রুদের সাথে বীরত্ব সহকারে যুদ্ধ করে। তুমি এর সত্যতা আল্লাহর কিতাবেও দেখতে পার।” অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন, তারপর পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন। মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমের এ হাদীসটি এভাবে এই শব্দেই এতোটুকুই বর্ণিত হয়েছে। হাঁ, তবে জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতে হাদীসটি পূর্ণভাবে রয়েছে এবং আমরাও এটাকে অন্য জায়গায় পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি। সুতরাং আল্লাহরই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আমার বান্দা, আমার উপর নির্ভরশীল এবং আমার নিকট পছন্দনীয়। তুমি দুশ্চরিত্র ও কর্কশভাষী নও। তুমি বাজারে শোরগোলকারী নও। মন্দের প্রতিশোধ তুমি মন্দ দ্বারা গ্রহণ কর না বরং মার্জনা ও ক্ষমা করে থাকো। তোমার জন্মস্থান মক্কা, হিজরতের স্থান তাবাহ, দেশ সিরিয়া। তোমার উম্মতের সংখ্যা অধিক যারা আল্লাহর প্রশংসাকারী। সর্বাবস্থায় ও সর্বস্থলে তারা সদা আল্লাহর প্রশংসা করে থাকে। সকাল বেলায় নিম্নস্বরে তাদের আল্লাহর যিক্রের শব্দ সর্বদা শোন যায়, যেমন মৌমাছির গুনগুন্ শব্দ। তারা তাদের গোঁফ হেঁটে থাকে ও নখ কেটে থাকে। তারা তাদের পদনালীর অর্ধেক পর্যন্ত তাদের লুঙ্গী লটকিয়ে থাকে। জিহাদের মাঠে তাদের সারি নামাযের সারীর মত।” অতঃপর হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) (আরবী) -এ আয়াতটিই তিলাওয়াত করেন। তারপর বলেনঃ “তারা সূর্যের প্রতি লক্ষ্য রাখে, যখনই এবং যেখানেই সময় হয় তারা নামায আদায় করে থাকে যদিও সওয়ারীর উপরও অবস্থান করে।”হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সেনাবাহিনীকে সারিবদ্ধ না করা পর্যন্ত শত্রুদের সাথে যুদ্ধ শুরু করতেন না। সুতরাং কাতারবন্দী বা সারিবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছেঃ যুদ্ধে তারা একে অপরের সাথে মিলিত অবস্থায় সারিবদ্ধ হয়। কাতাদা (রঃ) (আরবী)-এর ভাবার্থ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ তুমি কি দেখনি যে, অট্টালিকা নির্মাণকারী তার অট্টালিকার কোন জায়গায় উঁচু নীচু হোক বা আঁকা বাকা হোক এটা সে চায় না। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলাও চান না যে, তাঁর কাজে মতভেদ হোক। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং মুমিনদেরকে তাদের যুদ্ধে এবং তাদের নামাযে কাতারবন্দী করেছেন। সুতরাং মুমিনদের উচিত যে, তারা আল্লাহ তা'আলার হুকুম মেনে চলবে। যারা তাঁর হুকুম মেনে চলবে ওটা হবে তাদের পরিত্রাণের উপায়।”যারা আল্লাহর পথে সগ্রাম করে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন। অতঃপর হযরত আবূ বাহরিয়্যাহ (রঃ) বলেনঃ “যখন আপনারা আমাকে দেখবেন যে, আমি কাতার বা সারির মধ্যে এদিক ওদিক ভ্রুক্ষেপ করছি তখন আপনারা আমাকে ইচ্ছামত ভৎসনা ও গালিগালাজ করতে পারেন।” [এটা বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)]
আস-সফ 61:5
৫-৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দা ও রাসূল হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ) সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর কওমকে বলেনঃ “হে আমার কওম! তোমরা তো আমার রিসালাতের সত্যতা সম্পর্কে পূর্ণভাবে অবহিত রয়েছে, এতদসত্ত্বেও কেন তোমরা আমার রিসালাতকে অস্বীকার করে আমাকে কষ্ট দিচ্ছ?" এর দ্বারা যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এক দিক দিয়ে সান্ত্বনা দেয়া হচ্ছে। দেখা যায় যে, তাঁকেও যখন মক্কার কাফিররা কষ্ট দেয় তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর রহম করুন, তাকে তো এর চেয়েও বেশী কষ্ট দেয়া হয়েছিল, কিন্তু এর পরেও তিনি ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।” সাথে সাথে মুমিনদেরকে ভদ্রতা শিক্ষা দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন নবী (সঃ)-কে কষ্ট না দেয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! মূসা (আঃ)-কে যারা ক্লেশ দিয়েছে তোমরা তাদের ন্যায় হয়ো না। তারা যা রটনা করেছিল আল্লাহ তা হতে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন এবং আল্লাহর নিকট সে মর্যাদাবান।” (৩৩:৬৯)আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “অতঃপর যখন তারা বক্তৃপথ অবলম্বন করলো তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন। অর্থাৎ যখন তারা জেনে শুনে সত্যের অনুসরণ হতে সরে গিয়ে বক্র পথে চললো তখন আল্লাহ তাআলাও তাদের অন্তরকে হিদায়াত হতে সরিয়ে দিলেন এবং ওকে সন্দেহ ও বিস্ময় দ্বারা পূর্ণ করে দিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি তাদের অন্তর ও চক্ষুগুলো ফিরিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবার এর উপর ঈমান আনেনি এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিবো।” মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “যে ব্যক্তি রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করবে তার কাছে হিদায়াত প্রকাশিত হবার পর এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথের অনুসরণ করবে, আমি তাকে ঐদিকেই ফিরিয়ে দিবো যে দিকে সে ফিরে গেছে এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব, আর ওটা নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থল।” (৪:১১৫)এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে বলেনঃ আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।এরপর হযরত ঈসা (আঃ)-এর ভাষণের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে, যে ভাষণ তিনি বানী ইসরাঈলের সামনে দিয়েছিলেন। ঐ ভাষণে তিনি বলেছিলেনঃ “হে বানী ইসরাঈল! তাওরাতে আমার (আগমনের) শুভসংবাদ হয়েছিল, আর আমি দৃঢ়ভাবে এর সত্যতা অনুমোদনকারী। এখন আমি তোমাদের সামনে একজন রাসূল (সঃ)-এর শুভাগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করছি যিনি হলেন নবী, উম্মী, মক্কী আহমাদে মুজতাবা, মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সঃ)। সুতরাং হযরত ঈসা (আঃ) হলেন বানী ইসরাঈলের শেষ নবী এবং হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) হলেন সমস্ত নবী ও রাসূলের মধ্যে সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তার পরে কোন নবীও আসবেন না এবং কোন রাসূলও আসবেন না। তার পরে সর্বদিক দিয়েই নবুওয়াত ও রিসালাত শেষ হয়ে গেছে। ইমাম বুখারী (রঃ) একটি অতি সুন্দর হাদীস বর্ণনা করেছেন। তা হচ্ছেঃ হযরত জুবায়ের ইবনে মুতঈম (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আমার অনেকগুলো নাম রয়েছে। আমি মুহাম্মাদ (সঃ), আমি আহমাদ (সঃ), আমি মাহী, যার কারণে আল্লাহ কুফরীকে নিশ্চিহ্ন করেছেন, আমি হাশির, আমার পায়ের উপর লোকদের হাশর হবে এবং আমি আকিব।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিমও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের সামনে তাঁর বহু নামের উল্লেখ করেছেন। ওগুলোর মধ্যে আমি কয়েকটি মনে রেখেছি। তিনি বলেছেনঃ “আমি মুহাম্মাদ (সঃ), আমি আহমাদ (সঃ), আমি হা’শির, আমি মুকাফফা, আমি নবীউর রহমত, আমি নবীই উত তাওবাহ এবং আমি নবীইউল মালহামাহ্।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ তায়ালেসী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন)কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ঐ রাসূল নবী উম্মীর অনুসরণ করে যাকে তারা তাদের কাছে। রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিখিত পায়।” (৭:১৫৭) অন্য জায়গায় আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার নিয়েছিলেনঃ তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত যা কিছু দিয়েছি তার শপথ, আর তোমাদের কাছে যা আছে তার সমর্থকরূপে যখন একজন রাসূল আসবে তখন নিশ্চয়ই তোমরা তাকে বিশ্বাস করবে এবং তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেনঃ তোমরা কি স্বীকার করলে? এবং এই ব্যাপারে আমার অঙ্গীকার কি তোমরা গ্রহণ করলে? তারা বললোঃ স্বীকার করলাম। তিনি বললেনঃ তবে তোমরা সাক্ষী থাকো এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী থাকলাম।” (৩:৮১)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা এমন কোন নবী প্রেরণ করেননি যার কাছে এই অঙ্গীকার নেননি যে, যদি তাঁর জীবদ্দশায় হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) প্রেরিত হন তবে তিনি তার অনুসরণ করবেন। বরং প্রত্যেক নবীর (আঃ) নিকট হতেই এই অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে যে, তিনি তাঁর উম্মত হতেও যেন এই অঙ্গীকার গ্রহণ করেন।একদা সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদেরকে আপনার নিজের খবর দিন!” তখন তিনি বলেনঃ “আমি আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আ এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর শুভসংবাদ। আর আমার মাতা যখন আমাকে গর্ভে ধারণ করেন তখন তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, যেন তার মধ্য হতে এমন এক নূর বা জ্যোতি বের হলো যার কারণে সিরিয়ার বসরা শহরের প্রাসাদগুলো আলোকিত হয়ে উঠলো।” (এটা ইবনে ইসহাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ উত্তম। একে মযবূতকারী অন্য সনদওরয়েছে)হযরত ইরবায ইবনে সারিয়াহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট শেষ নবী হিসেবে ছিলাম, অথচ হযরত আদম (আঃ) তখন ঠাসা মাটি রূপে ছিলেন। তোমাদেরকে আমি এর সূচনা শুনাচ্ছি। আমি আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আ, হযরত ঈসা (আঃ)-এর শুভসংবাদ এবং আমার মাতার স্বপ্ন। নবীদের মাতাদেরকে এভাবেই স্বপ্ন দেখানো হয়ে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার কাজের সূচনা কি?" তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আ, হযরত ঈসা (আঃ)-এর শুভসংবাদ এবং আমার মাতা স্বপ্ন দেখেন যে, তার মধ্য হতে এক নূর বের হয় যা সিরিয়ার প্রাসাদগুলোকে আলোকোজ্জ্বল করে তোলে।" (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ বাদশাহ নাজ্জাশীর দেশে প্রেরণ করেন। আমরা প্রায় আশিজন লোক ছিলাম যাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত জাফর (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ), হযরত উসমান ইবনে মাযুউন (রাঃ) এবং হযরত আবু মূসাও (রাঃ) ছিলেন। তারা নাজ্জাশীর নিকট আসেন। আর ওদিকে কুরায়েশরা আমর ইবনুল আস এবং আম্মারাহ ইবনুল ওয়ালীদকে নাজ্জাশীর নিকট উপঢৌকন সহ প্রেরণ করেন। তারা উভয়ে নাজ্জাশীর সামনে হাযির হয়ে তাঁকে সিজদাহ করে। তারপর ডানে বামে ঘুরে বসে পড়ে। এরপর আবেদন করেঃ “আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্য হতে কতক লোক আমাদের দ্বীন পরিত্যাগ করে বিপথগামী হয়েছে এবং আপনার দেশে চলে এসেছে। আমাদের সম্প্রদায় আমাদেরকে আপনার দরবারে এজন্যেই পাঠিয়েছে যে, আপনি তাদেরকে আমাদের সাথে আমাদের দেশে পাঠিয়ে দিবেন।” নাজ্জাশী জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কোথায়?” তারা জবাব দিলোঃ “এখানেই এই শহরেই। তারা রয়েছে। তিনি তখন সাহাবীদেরকে তাঁর সামনে হাযির করার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ অনুযায়ী সাহাবীগণ শাহী দরবারে হাযির হলেন। হযরত জাফর (রাঃ) স্বীয় সঙ্গীদেরকে বললেনঃ “আমি আজ তোমাদের মুখোপাত্র।” তখন সবাই তার অনুসরণ করলেন। অতঃপর তিনি সভাষদবর্গকে সালাম দিলেন, কিন্তু তিনি সিজদাহ করলেন না। সভষদবর্গ তখন বললোঃ “তুমি সিজদাহ করলে না কেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমরা মহিমান্বিত আল্লাহ ছাড়া কাউকেও সিজদাহ করি না। তারা প্রশ্ন করলোঃ “কেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাদের নিকট তাঁর রাসূল (সঃ)-কে প্রেরণ করেছেন, যিনি আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেন নামায পড়ি, যাকাত আদায় করি।” এখন আমর ইবনুল আস (রাঃ) আর কথা না বলে থাকতে পারলেন না, তিনি চিন্তা করলেন যে, এসব কথা হয়তো বাদশাহ ও তাঁর সভাষদবর্গের উপর ক্রিয়াশীল হয়ে যাবে। তাই তিনি বাদশাহকে উত্তেজিত করার উদ্দেশ্যে হযরত জাফর (রাঃ)-এর কথার মাঝে বলে উঠলেনঃ “জনাব! হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) সম্পর্কে এদের আকীদা বা বিশ্বাস আপনাদের আকীদার সম্পূর্ণ বিপরীত।” তখন বাদশাহ হযরত জাফর (রাঃ)-কে প্রশ্ন করলেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ) ও তাঁর মাতা সম্পর্কে তোমাদের আকীদা কি?" হযরত জা'ফর (রাঃ) জবাবে বললেনঃ “এ ব্যাপারে আমাদের আকীদা ওটাই যা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁর পবিত্র কিতাবে আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। তা এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর কালেমা ও তাঁর রূহ, যা তিনি কুমারী ও সতী-সাধ্বী নারী হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন। তাকে কখনো কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি। তাঁর সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার কোন সম্ভাবনাই ছিল না।” বাদশাহ এ ভাষণ শুনে ভূমি হতে একটি কুটা উঠিয়ে নিয়ে বললেনঃ “হে হাবশের অধিবাসী! হে বক্তাগণ! হে বিদ্বানমণ্ডলী! হে দরবেশবৃন্দ! এই ব্যাপারে এই লোকদের (মুসলমানদের) এবং আমাদের আকীদা একই। আল্লাহর কসম! এই ব্যাপারে এদের আকীদা এবং আমাদের আকীদার মধ্যে এই কুটা পরিমাণও পার্থক্য নেই। হে মুহাজিরদের দল! তোমাদের আগমন শুভ হয়েছে এবং ঐ রাসূল (সঃ)-কেও আমি মুবারকবাদ জানাচ্ছি যার নিকট হতে তোমরা এসেছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর রাসূল। তিনিই ঐ রাসূল যার শুভাগমনের ভবিষ্যদ্বাণী আমরা ইঞ্জীলে পড়েছি। ইনিই ঐ নবী যার সুসংবাদ আমাদের নবী হযরত ঈসা (আঃ) প্রদান করেছেন। আমার পক্ষ হতে তোমাদেরকে আমার দেশে তোমাদের ইচ্ছামত যে কোন জায়গায় বসবাস করার সাধারণ অনুমতি দেয়া হলো। আল্লাহর কসম! যদি আমার উপর দেশ পরিচালনার ঝামেলাযুক্ত দায়িত্ব অর্পিত না থাকতো তবে এখনই আমি এই রাসূল (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে তাঁর জুতা বহন করতাম, তার সেবা করতাম এবং তাঁকে অযু করিয়ে দিতাম।” এটুকু বলে তিনি ঐ দুই জন কুরায়েশীকে তাদের উপঢৌকন ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।এই মুহাজিরদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাড়াতাড়ি করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলিত হন এবং তিনি বদরের যুদ্ধেও যযাগদান করেন। তিনি ধারণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট নাজ্জাশী বাদশাহর মত্যর খবর পৌঁছলে তিনি তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এই পর্ণ ঘটনাটি হযরত জাফর (রাঃ) ও হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। আমাদের তাফসীরের বিষয়বস্তই আলাদা। তাই আমরা এ ঘটনাটি এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করলাম। বিস্তারিত আলোচনা সীরাতের কিতাবগুলোতে দ্রষ্টব্য। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) সম্পর্কে পূর্ববর্তী নবীগণ (আঃ) বরাবরই ভবিষ্যদ্বাণী করতে থেকেছেন এবং তারা নিজ নিজ উম্মতকে নিজ নিজ কিতাব হতে তার গুণাবলী শুনিয়েছেন। আর তাদেরকে তাঁর অনুসরণ করার ও তাকে সাহায্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। যা, তবে তাঁর কাজের খ্যাতি জগতবাসীর কাছে ছড়িয়ে পড়েছে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আর পর, যিনি সমস্ত নবীর পিতা ছিলেন। অনুরূপভাবে তার আরো অধিক খ্যাতির কারণ হয় হযরত ঈসা (আঃ)-এর সুসংবাদ। যে হাদীসে রাসূলুল্লাহ প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তরে তাঁর নবুওয়াতের বিষয়টির সম্পর্ক হযরত খালীল (আঃ)-এর দু'আ ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর সুসংবাদের দিকে করেছিলেন। তার দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। এ দুটোর সাথে তাঁর স্বীয় সম্মানিতা মাতার স্বপ্নের উল্লেখ করার কারণ এই ছিল যে, মক্কাবাসীর মধ্যে তার খ্যাতির সূচনার কারণ এই স্বপ্নই ছিল। তার উপর অসংখ্য দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক!মহান আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর যখন সে স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের নিকট আসলো তখন তারা বলতে লাগলোঃ এটা তো এক স্পষ্ট যাদু।' অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এতো খ্যাতি এবং তাঁর সম্পর্কে পূর্ববর্তী নবীদের ক্রমান্বয়ে ভবিষ্যদ্বাণী সত্ত্বেও যখন তিনি উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট দলীল প্রমাণসহ তাদের কাছে আসলেন তখন তারা অর্থাৎ কাফিররা ও বিরোধীরা বলে উঠলোঃ এটা তো স্পষ্ট যাদু ছাড়া কিছুই নয়।
আস-সফ 61:6
৫-৬ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দা ও রাসূল হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ) সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর কওমকে বলেনঃ “হে আমার কওম! তোমরা তো আমার রিসালাতের সত্যতা সম্পর্কে পূর্ণভাবে অবহিত রয়েছে, এতদসত্ত্বেও কেন তোমরা আমার রিসালাতকে অস্বীকার করে আমাকে কষ্ট দিচ্ছ?" এর দ্বারা যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এক দিক দিয়ে সান্ত্বনা দেয়া হচ্ছে। দেখা যায় যে, তাঁকেও যখন মক্কার কাফিররা কষ্ট দেয় তখন তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর রহম করুন, তাকে তো এর চেয়েও বেশী কষ্ট দেয়া হয়েছিল, কিন্তু এর পরেও তিনি ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।” সাথে সাথে মুমিনদেরকে ভদ্রতা শিক্ষা দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন নবী (সঃ)-কে কষ্ট না দেয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! মূসা (আঃ)-কে যারা ক্লেশ দিয়েছে তোমরা তাদের ন্যায় হয়ো না। তারা যা রটনা করেছিল আল্লাহ তা হতে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন এবং আল্লাহর নিকট সে মর্যাদাবান।” (৩৩:৬৯)আল্লাহ তা'আলার উক্তিঃ “অতঃপর যখন তারা বক্তৃপথ অবলম্বন করলো তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন। অর্থাৎ যখন তারা জেনে শুনে সত্যের অনুসরণ হতে সরে গিয়ে বক্র পথে চললো তখন আল্লাহ তাআলাও তাদের অন্তরকে হিদায়াত হতে সরিয়ে দিলেন এবং ওকে সন্দেহ ও বিস্ময় দ্বারা পূর্ণ করে দিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি তাদের অন্তর ও চক্ষুগুলো ফিরিয়ে দিবো, যেমন তারা প্রথমবার এর উপর ঈমান আনেনি এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিবো।” মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “যে ব্যক্তি রাসূল (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করবে তার কাছে হিদায়াত প্রকাশিত হবার পর এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথের অনুসরণ করবে, আমি তাকে ঐদিকেই ফিরিয়ে দিবো যে দিকে সে ফিরে গেছে এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব, আর ওটা নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থল।” (৪:১১৫)এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে বলেনঃ আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।এরপর হযরত ঈসা (আঃ)-এর ভাষণের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে, যে ভাষণ তিনি বানী ইসরাঈলের সামনে দিয়েছিলেন। ঐ ভাষণে তিনি বলেছিলেনঃ “হে বানী ইসরাঈল! তাওরাতে আমার (আগমনের) শুভসংবাদ হয়েছিল, আর আমি দৃঢ়ভাবে এর সত্যতা অনুমোদনকারী। এখন আমি তোমাদের সামনে একজন রাসূল (সঃ)-এর শুভাগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করছি যিনি হলেন নবী, উম্মী, মক্কী আহমাদে মুজতাবা, মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সঃ)। সুতরাং হযরত ঈসা (আঃ) হলেন বানী ইসরাঈলের শেষ নবী এবং হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) হলেন সমস্ত নবী ও রাসূলের মধ্যে সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তার পরে কোন নবীও আসবেন না এবং কোন রাসূলও আসবেন না। তার পরে সর্বদিক দিয়েই নবুওয়াত ও রিসালাত শেষ হয়ে গেছে। ইমাম বুখারী (রঃ) একটি অতি সুন্দর হাদীস বর্ণনা করেছেন। তা হচ্ছেঃ হযরত জুবায়ের ইবনে মুতঈম (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আমার অনেকগুলো নাম রয়েছে। আমি মুহাম্মাদ (সঃ), আমি আহমাদ (সঃ), আমি মাহী, যার কারণে আল্লাহ কুফরীকে নিশ্চিহ্ন করেছেন, আমি হাশির, আমার পায়ের উপর লোকদের হাশর হবে এবং আমি আকিব।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিমও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের সামনে তাঁর বহু নামের উল্লেখ করেছেন। ওগুলোর মধ্যে আমি কয়েকটি মনে রেখেছি। তিনি বলেছেনঃ “আমি মুহাম্মাদ (সঃ), আমি আহমাদ (সঃ), আমি হা’শির, আমি মুকাফফা, আমি নবীউর রহমত, আমি নবীই উত তাওবাহ এবং আমি নবীইউল মালহামাহ্।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ তায়ালেসী (রঃ) এবং ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন)কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ঐ রাসূল নবী উম্মীর অনুসরণ করে যাকে তারা তাদের কাছে। রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিখিত পায়।” (৭:১৫৭) অন্য জায়গায় আছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার নিয়েছিলেনঃ তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত যা কিছু দিয়েছি তার শপথ, আর তোমাদের কাছে যা আছে তার সমর্থকরূপে যখন একজন রাসূল আসবে তখন নিশ্চয়ই তোমরা তাকে বিশ্বাস করবে এবং তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেনঃ তোমরা কি স্বীকার করলে? এবং এই ব্যাপারে আমার অঙ্গীকার কি তোমরা গ্রহণ করলে? তারা বললোঃ স্বীকার করলাম। তিনি বললেনঃ তবে তোমরা সাক্ষী থাকো এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী থাকলাম।” (৩:৮১)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা এমন কোন নবী প্রেরণ করেননি যার কাছে এই অঙ্গীকার নেননি যে, যদি তাঁর জীবদ্দশায় হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) প্রেরিত হন তবে তিনি তার অনুসরণ করবেন। বরং প্রত্যেক নবীর (আঃ) নিকট হতেই এই অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে যে, তিনি তাঁর উম্মত হতেও যেন এই অঙ্গীকার গ্রহণ করেন।একদা সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদেরকে আপনার নিজের খবর দিন!” তখন তিনি বলেনঃ “আমি আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আ এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর শুভসংবাদ। আর আমার মাতা যখন আমাকে গর্ভে ধারণ করেন তখন তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, যেন তার মধ্য হতে এমন এক নূর বা জ্যোতি বের হলো যার কারণে সিরিয়ার বসরা শহরের প্রাসাদগুলো আলোকিত হয়ে উঠলো।” (এটা ইবনে ইসহাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ উত্তম। একে মযবূতকারী অন্য সনদওরয়েছে)হযরত ইরবায ইবনে সারিয়াহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট শেষ নবী হিসেবে ছিলাম, অথচ হযরত আদম (আঃ) তখন ঠাসা মাটি রূপে ছিলেন। তোমাদেরকে আমি এর সূচনা শুনাচ্ছি। আমি আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আ, হযরত ঈসা (আঃ)-এর শুভসংবাদ এবং আমার মাতার স্বপ্ন। নবীদের মাতাদেরকে এভাবেই স্বপ্ন দেখানো হয়ে থাকে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু উমামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার কাজের সূচনা কি?" তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আ, হযরত ঈসা (আঃ)-এর শুভসংবাদ এবং আমার মাতা স্বপ্ন দেখেন যে, তার মধ্য হতে এক নূর বের হয় যা সিরিয়ার প্রাসাদগুলোকে আলোকোজ্জ্বল করে তোলে।" (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ বাদশাহ নাজ্জাশীর দেশে প্রেরণ করেন। আমরা প্রায় আশিজন লোক ছিলাম যাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত জাফর (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ), হযরত উসমান ইবনে মাযুউন (রাঃ) এবং হযরত আবু মূসাও (রাঃ) ছিলেন। তারা নাজ্জাশীর নিকট আসেন। আর ওদিকে কুরায়েশরা আমর ইবনুল আস এবং আম্মারাহ ইবনুল ওয়ালীদকে নাজ্জাশীর নিকট উপঢৌকন সহ প্রেরণ করেন। তারা উভয়ে নাজ্জাশীর সামনে হাযির হয়ে তাঁকে সিজদাহ করে। তারপর ডানে বামে ঘুরে বসে পড়ে। এরপর আবেদন করেঃ “আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্য হতে কতক লোক আমাদের দ্বীন পরিত্যাগ করে বিপথগামী হয়েছে এবং আপনার দেশে চলে এসেছে। আমাদের সম্প্রদায় আমাদেরকে আপনার দরবারে এজন্যেই পাঠিয়েছে যে, আপনি তাদেরকে আমাদের সাথে আমাদের দেশে পাঠিয়ে দিবেন।” নাজ্জাশী জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কোথায়?” তারা জবাব দিলোঃ “এখানেই এই শহরেই। তারা রয়েছে। তিনি তখন সাহাবীদেরকে তাঁর সামনে হাযির করার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ অনুযায়ী সাহাবীগণ শাহী দরবারে হাযির হলেন। হযরত জাফর (রাঃ) স্বীয় সঙ্গীদেরকে বললেনঃ “আমি আজ তোমাদের মুখোপাত্র।” তখন সবাই তার অনুসরণ করলেন। অতঃপর তিনি সভাষদবর্গকে সালাম দিলেন, কিন্তু তিনি সিজদাহ করলেন না। সভষদবর্গ তখন বললোঃ “তুমি সিজদাহ করলে না কেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমরা মহিমান্বিত আল্লাহ ছাড়া কাউকেও সিজদাহ করি না। তারা প্রশ্ন করলোঃ “কেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমাদের নিকট তাঁর রাসূল (সঃ)-কে প্রেরণ করেছেন, যিনি আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেন নামায পড়ি, যাকাত আদায় করি।” এখন আমর ইবনুল আস (রাঃ) আর কথা না বলে থাকতে পারলেন না, তিনি চিন্তা করলেন যে, এসব কথা হয়তো বাদশাহ ও তাঁর সভাষদবর্গের উপর ক্রিয়াশীল হয়ে যাবে। তাই তিনি বাদশাহকে উত্তেজিত করার উদ্দেশ্যে হযরত জাফর (রাঃ)-এর কথার মাঝে বলে উঠলেনঃ “জনাব! হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) সম্পর্কে এদের আকীদা বা বিশ্বাস আপনাদের আকীদার সম্পূর্ণ বিপরীত।” তখন বাদশাহ হযরত জাফর (রাঃ)-কে প্রশ্ন করলেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ) ও তাঁর মাতা সম্পর্কে তোমাদের আকীদা কি?" হযরত জা'ফর (রাঃ) জবাবে বললেনঃ “এ ব্যাপারে আমাদের আকীদা ওটাই যা আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁর পবিত্র কিতাবে আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। তা এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর কালেমা ও তাঁর রূহ, যা তিনি কুমারী ও সতী-সাধ্বী নারী হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন। তাকে কখনো কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি। তাঁর সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার কোন সম্ভাবনাই ছিল না।” বাদশাহ এ ভাষণ শুনে ভূমি হতে একটি কুটা উঠিয়ে নিয়ে বললেনঃ “হে হাবশের অধিবাসী! হে বক্তাগণ! হে বিদ্বানমণ্ডলী! হে দরবেশবৃন্দ! এই ব্যাপারে এই লোকদের (মুসলমানদের) এবং আমাদের আকীদা একই। আল্লাহর কসম! এই ব্যাপারে এদের আকীদা এবং আমাদের আকীদার মধ্যে এই কুটা পরিমাণও পার্থক্য নেই। হে মুহাজিরদের দল! তোমাদের আগমন শুভ হয়েছে এবং ঐ রাসূল (সঃ)-কেও আমি মুবারকবাদ জানাচ্ছি যার নিকট হতে তোমরা এসেছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর রাসূল। তিনিই ঐ রাসূল যার শুভাগমনের ভবিষ্যদ্বাণী আমরা ইঞ্জীলে পড়েছি। ইনিই ঐ নবী যার সুসংবাদ আমাদের নবী হযরত ঈসা (আঃ) প্রদান করেছেন। আমার পক্ষ হতে তোমাদেরকে আমার দেশে তোমাদের ইচ্ছামত যে কোন জায়গায় বসবাস করার সাধারণ অনুমতি দেয়া হলো। আল্লাহর কসম! যদি আমার উপর দেশ পরিচালনার ঝামেলাযুক্ত দায়িত্ব অর্পিত না থাকতো তবে এখনই আমি এই রাসূল (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে তাঁর জুতা বহন করতাম, তার সেবা করতাম এবং তাঁকে অযু করিয়ে দিতাম।” এটুকু বলে তিনি ঐ দুই জন কুরায়েশীকে তাদের উপঢৌকন ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।এই মুহাজিরদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাড়াতাড়ি করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলিত হন এবং তিনি বদরের যুদ্ধেও যযাগদান করেন। তিনি ধারণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট নাজ্জাশী বাদশাহর মত্যর খবর পৌঁছলে তিনি তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এই পর্ণ ঘটনাটি হযরত জাফর (রাঃ) ও হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। আমাদের তাফসীরের বিষয়বস্তই আলাদা। তাই আমরা এ ঘটনাটি এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করলাম। বিস্তারিত আলোচনা সীরাতের কিতাবগুলোতে দ্রষ্টব্য। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) সম্পর্কে পূর্ববর্তী নবীগণ (আঃ) বরাবরই ভবিষ্যদ্বাণী করতে থেকেছেন এবং তারা নিজ নিজ উম্মতকে নিজ নিজ কিতাব হতে তার গুণাবলী শুনিয়েছেন। আর তাদেরকে তাঁর অনুসরণ করার ও তাকে সাহায্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। যা, তবে তাঁর কাজের খ্যাতি জগতবাসীর কাছে ছড়িয়ে পড়েছে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আর পর, যিনি সমস্ত নবীর পিতা ছিলেন। অনুরূপভাবে তার আরো অধিক খ্যাতির কারণ হয় হযরত ঈসা (আঃ)-এর সুসংবাদ। যে হাদীসে রাসূলুল্লাহ প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তরে তাঁর নবুওয়াতের বিষয়টির সম্পর্ক হযরত খালীল (আঃ)-এর দু'আ ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর সুসংবাদের দিকে করেছিলেন। তার দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। এ দুটোর সাথে তাঁর স্বীয় সম্মানিতা মাতার স্বপ্নের উল্লেখ করার কারণ এই ছিল যে, মক্কাবাসীর মধ্যে তার খ্যাতির সূচনার কারণ এই স্বপ্নই ছিল। তার উপর অসংখ্য দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক!মহান আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর যখন সে স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের নিকট আসলো তখন তারা বলতে লাগলোঃ এটা তো এক স্পষ্ট যাদু।' অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এতো খ্যাতি এবং তাঁর সম্পর্কে পূর্ববর্তী নবীদের ক্রমান্বয়ে ভবিষ্যদ্বাণী সত্ত্বেও যখন তিনি উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট দলীল প্রমাণসহ তাদের কাছে আসলেন তখন তারা অর্থাৎ কাফিররা ও বিরোধীরা বলে উঠলোঃ এটা তো স্পষ্ট যাদু ছাড়া কিছুই নয়।
আস-সফ 61:7
৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে এবং তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করে তার চেয়ে অধিক যালিম আর কেউই হতে পারে না। সে যদি বে-খবর হতো তবে তো একটা কথা ছিল, কিন্তু তার তো অবস্থা এই যে, তাকে তাওহীদ ও ইখলাসের দিকে সদা-সর্বদা আহ্বান করা হচ্ছে, সুতরাং যে ব্যক্তি এ ধরনের যালিম তার ভাগ্যে হিদায়াত আসবে কোথা হতে? তাদের চাহিদা এই যে, তারা সত্যকে মিথ্যা দ্বারা হারিয়ে ফেলবে। তাদের দৃষ্টান্ত ঠিক ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্তের মত যে ব্যক্তি সূর্যের রশ্মিকে মুখের ফু দ্বারা নিভিয়ে দিতে চায়। এটা যেমন অসম্ভব যে, তাদের মুখের ফু দ্বারা সূর্যের আলো নিভে যাবে ঠিক তদ্রুপ এটাও অসম্ভব যে, এই কাফিরদের মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীন দুনিয়ার বুক হতে মুছে যাবে। কিন্তু আল্লাহ এই ফায়সালা করেছেন যে, তিনি তাঁর নূরকে উদ্ভাসিত করবেন যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। আর তিনিই তাঁর রাসূল (সঃ)-কে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ সকল দ্বীনের উপর ওকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করার জন্যে, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। এই দুটি আয়াতের পূর্ণ তাফসীর সূরায়ে বারাআতে গত হয়েছে। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে এবং আমরা তাঁর নিকট কৃতজ্ঞ।
আস-সফ 61:8
৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে এবং তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করে তার চেয়ে অধিক যালিম আর কেউই হতে পারে না। সে যদি বে-খবর হতো তবে তো একটা কথা ছিল, কিন্তু তার তো অবস্থা এই যে, তাকে তাওহীদ ও ইখলাসের দিকে সদা-সর্বদা আহ্বান করা হচ্ছে, সুতরাং যে ব্যক্তি এ ধরনের যালিম তার ভাগ্যে হিদায়াত আসবে কোথা হতে? তাদের চাহিদা এই যে, তারা সত্যকে মিথ্যা দ্বারা হারিয়ে ফেলবে। তাদের দৃষ্টান্ত ঠিক ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্তের মত যে ব্যক্তি সূর্যের রশ্মিকে মুখের ফু দ্বারা নিভিয়ে দিতে চায়। এটা যেমন অসম্ভব যে, তাদের মুখের ফু দ্বারা সূর্যের আলো নিভে যাবে ঠিক তদ্রুপ এটাও অসম্ভব যে, এই কাফিরদের মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীন দুনিয়ার বুক হতে মুছে যাবে। কিন্তু আল্লাহ এই ফায়সালা করেছেন যে, তিনি তাঁর নূরকে উদ্ভাসিত করবেন যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। আর তিনিই তাঁর রাসূল (সঃ)-কে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ সকল দ্বীনের উপর ওকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করার জন্যে, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। এই দুটি আয়াতের পূর্ণ তাফসীর সূরায়ে বারাআতে গত হয়েছে। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে এবং আমরা তাঁর নিকট কৃতজ্ঞ।
আস-সফ 61:9
৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর: মহান আল্লাহ বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে এবং তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করে তার চেয়ে অধিক যালিম আর কেউই হতে পারে না। সে যদি বে-খবর হতো তবে তো একটা কথা ছিল, কিন্তু তার তো অবস্থা এই যে, তাকে তাওহীদ ও ইখলাসের দিকে সদা-সর্বদা আহ্বান করা হচ্ছে, সুতরাং যে ব্যক্তি এ ধরনের যালিম তার ভাগ্যে হিদায়াত আসবে কোথা হতে? তাদের চাহিদা এই যে, তারা সত্যকে মিথ্যা দ্বারা হারিয়ে ফেলবে। তাদের দৃষ্টান্ত ঠিক ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্তের মত যে ব্যক্তি সূর্যের রশ্মিকে মুখের ফু দ্বারা নিভিয়ে দিতে চায়। এটা যেমন অসম্ভব যে, তাদের মুখের ফু দ্বারা সূর্যের আলো নিভে যাবে ঠিক তদ্রুপ এটাও অসম্ভব যে, এই কাফিরদের মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীন দুনিয়ার বুক হতে মুছে যাবে। কিন্তু আল্লাহ এই ফায়সালা করেছেন যে, তিনি তাঁর নূরকে উদ্ভাসিত করবেন যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। আর তিনিই তাঁর রাসূল (সঃ)-কে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ সকল দ্বীনের উপর ওকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করার জন্যে, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। এই দুটি আয়াতের পূর্ণ তাফসীর সূরায়ে বারাআতে গত হয়েছে। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে এবং আমরা তাঁর নিকট কৃতজ্ঞ।
আস-সফ 61:10
১০-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বর্ণিত হাদীস পূর্বে গত হয়েছে যে, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন আমল আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয়?” তাঁদের এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তা'আলা এই সূরাটি অবতীর্ণ করেন। এতে তিনি বলেনঃ এসো, আমি তোমাদেরকে এমন এক লাভজনক ব্যবসার কথা বলে দিই যাতে ক্ষতির কোনই সম্ভাবনা নেই। এতে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে এবং ভয়ের কোন কারণ থাকবে না। তা হচ্ছে এই যে, তোমরা আল্লাহর একত্বে ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর রিসালাতে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এই ব্যবসা দুনিয়ার ব্যবসা হতে বহুগুণে উত্তম। যদি তোমরা এই ব্যবসায়ে হাত দাও তবে তোমাদের পদস্খলন ও পাপ-অপরাধ আমি ক্ষমা করে দিবো। আর তোমাদেরকে দাখিল করবে এমন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং তোমাদেরকে প্রবিষ্ট করবে স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। বিশ্বাস রেখো যে, মহাসাফল্য এটাই।আরো জেনে রেখো যে, তোমরা সদা তোমাদের শত্রুদের সাথে মুকাবিলা করে থাকো, এই মুকাবিলার সময় আমি তোমাদেরকে সাহায্য করতে থাকবো এবং তোমাদের ঈপ্সিত বিজয় দান করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তবে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পাগুলো স্থির রাখবেন।” (৪৭:৭) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অবশ্যই আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন যে তাঁকে সাহায্য করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমতাবান, মহাপরাক্রমশালী।” (২২:৪০) দুনিয়ার এই সাহায্য ও বিজয় এবং আখিরাতের ঐ জান্নাত ও নিয়ামত ঐ লোকদের জন্যে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের কাজে সদা লেগে থাকে এবং জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর দ্বীনের খিদমত করে। তাই তো তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি আমার পক্ষ হতে মুমিনদেরকে এর সুসংবদি দাও।
আস-সফ 61:11
১০-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বর্ণিত হাদীস পূর্বে গত হয়েছে যে, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন আমল আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয়?” তাঁদের এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তা'আলা এই সূরাটি অবতীর্ণ করেন। এতে তিনি বলেনঃ এসো, আমি তোমাদেরকে এমন এক লাভজনক ব্যবসার কথা বলে দিই যাতে ক্ষতির কোনই সম্ভাবনা নেই। এতে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে এবং ভয়ের কোন কারণ থাকবে না। তা হচ্ছে এই যে, তোমরা আল্লাহর একত্বে ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর রিসালাতে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এই ব্যবসা দুনিয়ার ব্যবসা হতে বহুগুণে উত্তম। যদি তোমরা এই ব্যবসায়ে হাত দাও তবে তোমাদের পদস্খলন ও পাপ-অপরাধ আমি ক্ষমা করে দিবো। আর তোমাদেরকে দাখিল করবে এমন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং তোমাদেরকে প্রবিষ্ট করবে স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। বিশ্বাস রেখো যে, মহাসাফল্য এটাই।আরো জেনে রেখো যে, তোমরা সদা তোমাদের শত্রুদের সাথে মুকাবিলা করে থাকো, এই মুকাবিলার সময় আমি তোমাদেরকে সাহায্য করতে থাকবো এবং তোমাদের ঈপ্সিত বিজয় দান করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তবে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পাগুলো স্থির রাখবেন।” (৪৭:৭) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অবশ্যই আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন যে তাঁকে সাহায্য করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমতাবান, মহাপরাক্রমশালী।” (২২:৪০) দুনিয়ার এই সাহায্য ও বিজয় এবং আখিরাতের ঐ জান্নাত ও নিয়ামত ঐ লোকদের জন্যে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের কাজে সদা লেগে থাকে এবং জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর দ্বীনের খিদমত করে। তাই তো তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি আমার পক্ষ হতে মুমিনদেরকে এর সুসংবদি দাও।
আস-সফ 61:12
১০-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বর্ণিত হাদীস পূর্বে গত হয়েছে যে, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন আমল আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয়?” তাঁদের এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তা'আলা এই সূরাটি অবতীর্ণ করেন। এতে তিনি বলেনঃ এসো, আমি তোমাদেরকে এমন এক লাভজনক ব্যবসার কথা বলে দিই যাতে ক্ষতির কোনই সম্ভাবনা নেই। এতে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে এবং ভয়ের কোন কারণ থাকবে না। তা হচ্ছে এই যে, তোমরা আল্লাহর একত্বে ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর রিসালাতে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এই ব্যবসা দুনিয়ার ব্যবসা হতে বহুগুণে উত্তম। যদি তোমরা এই ব্যবসায়ে হাত দাও তবে তোমাদের পদস্খলন ও পাপ-অপরাধ আমি ক্ষমা করে দিবো। আর তোমাদেরকে দাখিল করবে এমন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং তোমাদেরকে প্রবিষ্ট করবে স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। বিশ্বাস রেখো যে, মহাসাফল্য এটাই।আরো জেনে রেখো যে, তোমরা সদা তোমাদের শত্রুদের সাথে মুকাবিলা করে থাকো, এই মুকাবিলার সময় আমি তোমাদেরকে সাহায্য করতে থাকবো এবং তোমাদের ঈপ্সিত বিজয় দান করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তবে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পাগুলো স্থির রাখবেন।” (৪৭:৭) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অবশ্যই আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন যে তাঁকে সাহায্য করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমতাবান, মহাপরাক্রমশালী।” (২২:৪০) দুনিয়ার এই সাহায্য ও বিজয় এবং আখিরাতের ঐ জান্নাত ও নিয়ামত ঐ লোকদের জন্যে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের কাজে সদা লেগে থাকে এবং জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর দ্বীনের খিদমত করে। তাই তো তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি আমার পক্ষ হতে মুমিনদেরকে এর সুসংবদি দাও।
আস-সফ 61:13
১০-১৩ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) বর্ণিত হাদীস পূর্বে গত হয়েছে যে, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন আমল আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয়?” তাঁদের এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তা'আলা এই সূরাটি অবতীর্ণ করেন। এতে তিনি বলেনঃ এসো, আমি তোমাদেরকে এমন এক লাভজনক ব্যবসার কথা বলে দিই যাতে ক্ষতির কোনই সম্ভাবনা নেই। এতে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে এবং ভয়ের কোন কারণ থাকবে না। তা হচ্ছে এই যে, তোমরা আল্লাহর একত্বে ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর রিসালাতে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এই ব্যবসা দুনিয়ার ব্যবসা হতে বহুগুণে উত্তম। যদি তোমরা এই ব্যবসায়ে হাত দাও তবে তোমাদের পদস্খলন ও পাপ-অপরাধ আমি ক্ষমা করে দিবো। আর তোমাদেরকে দাখিল করবে এমন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং তোমাদেরকে প্রবিষ্ট করবে স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। বিশ্বাস রেখো যে, মহাসাফল্য এটাই।আরো জেনে রেখো যে, তোমরা সদা তোমাদের শত্রুদের সাথে মুকাবিলা করে থাকো, এই মুকাবিলার সময় আমি তোমাদেরকে সাহায্য করতে থাকবো এবং তোমাদের ঈপ্সিত বিজয় দান করবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তবে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পাগুলো স্থির রাখবেন।” (৪৭:৭) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী)অর্থাৎ “অবশ্যই আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন যে তাঁকে সাহায্য করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমতাবান, মহাপরাক্রমশালী।” (২২:৪০) দুনিয়ার এই সাহায্য ও বিজয় এবং আখিরাতের ঐ জান্নাত ও নিয়ামত ঐ লোকদের জন্যে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের কাজে সদা লেগে থাকে এবং জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর দ্বীনের খিদমত করে। তাই তো তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি আমার পক্ষ হতে মুমিনদেরকে এর সুসংবদি দাও।
আস-সফ 61:14
মহান আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন সদা-সর্বদা জান-মাল, ইজ্জত-আবরূ, কথা এবং কাজ দ্বারা আল্লাহকে সাহায্য করে, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর ডাকে সাড়া দেয়, যেমন হাওয়ারীগণ হযরত ঈসা (আঃ)-এর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন যখন তিনি বলেছিলেনঃ আল্লাহর পথে কে আমাকে সাহায্যকারী হবে? অর্থাৎ আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়ার কাজে কে আমার সাহায্যকারী হবে? তখন হযরত ঈসা (আঃ)-এর অনুসারী হাওয়ারীরা বলেছিলঃ আমরা আল্লাহর সাহায্যকারী। অর্থাৎ আল্লাহর এই দ্বীনের কাজে আমরাই আপনার সঙ্গী হিসেবে কাজ করবে, আপনাকে সাহায্য করবে ও আপনার অনুসারী হিসেবে থাকবো। তখন হযরত ঈসা (আঃ) তাদেরকে প্রচারক হিসেবে সিরিয়ার শহরগুলোতে পাঠিয়ে দেন। হজ্বের মৌসুমে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও বলেছিলেনঃ “এমন কেউ আছে কি যে আমাকে জায়গা দিতে পারে যাতে আমি আল্লাহর রিসালাতকে জনগণের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে পারি? কুরায়েশরা তো আমাকে আমার প্রতিপালকের বাণী মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়ার কাজে বাধা প্রদান করেছে।” তখন মদীনার অধিবাসী আউস ও খাযরাজ গোত্রীয় লোকদেরকে মহান আল্লাহ এই সৌভাগ্যের অধিকারী করেন যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন। তারা তাঁর কথা মেনে চলার অঙ্গীকার করেন। তাঁরা এই প্রতিজ্ঞা করেন যে, যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদের বাসভূমিতে চলে যান তবে কোনক্রমেই তাঁরা তাঁর কোন ক্ষতি সাধন হতে দিবেন না। তারা তার পক্ষ হতে শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন এবং যে কোন ত্যাগের বিনিময়ে তাকে রক্ষা করবেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন তাঁর সঙ্গীগণসহ হিজরত করে তাদের বাসভূমি মদীনা নগরীতে পৌঁছলেন তখন বাস্তবিকই তাঁরা তাঁদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন এবং তাদের কথাকে বাস্তবে রূপদান করলেন। এ কারণেই তারা ‘আনসার এই মহান উপাধিতে ভূষিত হন। আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন এবং তাঁদেরকে সন্তুষ্ট রাখুন। মহান আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর বানী ইসরাঈলের একদল ঈমান আনলো এবং একদল কফরী করলো' অর্থাৎ যখন ঈসা (আঃ) তাঁর অনুসারী হাওয়ারীদেরকে নিয়ে দ্বীনের তাবলীগ করতে শুরু করলেন তখন বানী ইসরাঈলের কিছু লোক সঠিক পথে এসে গেল, আর কিছু লোক এপথে আসলো না। এমনকি তারা। তাকে এবং তাঁর সতী-সাধ্বী মাতার প্রতি জঘন্যতম অপবাদ রচনা করলো। এই ইয়াহুদীদের উপর চিরতরে আল্লাহর গযব পতিত হলো। আবার যারা তাঁকে মেনে নিলো তাদের মধ্যে একটি দল মানার ব্যাপারে সীমালংঘন করলো এবং তাকে তার মর্যাদার চেয়েও বাড়িয়ে দিলো। এদের মধ্যেও আবার কয়েকটি দল হয়ে গেল। একটি দল বলতে লাগলো যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। অন্য একটি দল বললো যে, হযরত ঈসা (আঃ) তিনজনের একজন অর্থাৎ পিতা, পুত্র ও রূহুল কুদস। আর একটি দল তো তাকে আল্লাহ বলেই স্বীকার করে নিলো। এসবের আলোচনা সূরায়ে নিসায় বিস্তারিতভাবে রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ পরে আমি মুমিনদেরকে শক্তিশালী করলাম তাদের শত্রুদের মুকাবিলায়। অর্থাৎ আমি তাদেরকে তাদের শত্রু খৃষ্টানদের উপর বিজয়ী করলাম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ যখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করলেন তখন হযরত ঈসা (আঃ) গোসল করে পাক সাফ হয়ে স্বীয় সহচরদের নিকট আসলেন। ঐ সময় তার মাথা হতে পানির ফোটা ঝরে পড়ছিল। তাঁর সহচরগণ ছিলেন বারোজন। তাঁরা একটি ঘরে অবস্থান করছিলেন। তিনি তাদের মধ্যে এসেই বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যে আমার উপর ঈমান এনেছে বটে কিন্তু পরে কুফরী করবে। একবার নয়, বরং বারো বার।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে এমন আছে যে এই ব্যাপারে প্রস্তুত হতে পারে যে, তাকে আমার চেহারার সাথে সাদৃশ্যযুক্ত করে দেয়া হবে এবং আমার পরিবর্তে তাকে হত্যা করে দেয়া হবে, অতঃপর সে জান্নাতে আমার সাথে আমার মর্যাদায় থাকবে?” তাঁর একথার জবাবে তাঁদের মধ্যে বয়সে যিনি সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন তিনি বললেনঃ “আমি এ জন্যে প্রস্তুত আছি।” হযরত ঈসা (আঃ) তাকে বললেনঃ “তুমি বসে পড়।” অতঃপর পুনরায় তিনি তার কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। এবারও ঐ যুবকটি দাড়িয়ে বললেনঃ “আমিই এজন্যে প্রস্তুত।” হযরত ঈসা (আঃ) এবারও তাঁকে বসে যেতে বললেন। তৃতীয়বার হযরত ঈসা (আঃ) ঐ কথাই বললেন এবং তৃতীয়বারও ঐ যুবকটিই দাঁড়িয়ে সম্মতি জানালেন। এবার তিনি বললেনঃ “আচ্ছা, বেশ!” তৎক্ষণাৎ তার আকৃতি সম্পূর্ণরূপে হযরত ঈসা (আঃ)-এর মত হয়ে গেল এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে ঐ ঘরের একটি ছিদ্র দিয়ে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হলো। হযরত ঈসা (আঃ)-কে অনুসন্ধানকারী ইয়াহূদীরা দৌড়িয়ে আসলো এবং ঐ যুবকটিকে ঈসা (আঃ) মনে করে গ্রেফতার করলো ও হত্যা করে শূলে চড়িয়ে দিলো। হযরত ঈসা (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ঐ অবশিষ্ট এগারোজন লোকের মধ্য হতে কেউ কেউ বারো বার কুফরী করলো, অথচ ইতিপূর্বে তারা ঈমানদার ছিল।অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ)-কে মান্যকারী বানী ইসরাঈলের দলটি তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে গেল। একটি দল বললোঃ “স্বয়ং আল্লাহ হযরত (হযরত ঈসা আঃ-এর আকৃতিতে) যতদিন ইচ্ছা করেছিলেন আমাদের মধ্যে ছিলেন। অতঃপর তিনি আকাশে উঠে গেলেন।" এই দলটিকে ইয়াকুবিয়্যাহ বলা হয়। দ্বিতীয় দলটি বললোঃ “আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী আমাদের মাঝে ছিলেন, অতঃপর তিনি তাকে নিজের কাছে উঠিয়ে নিলেন।” এই দলটিকে বলা হয় নাসতুরিয়্যাহ। তৃতীয় দলটি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। তাদের আকীদাহ বা বিশ্বাস এই যে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তাদের মধ্যে ছিলেন, অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তাঁকে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। এই দলটি হলো মুসলিম দল।অতঃপর ঐ কাফির দল দুটির শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তারা ঐ মুসলিম দলটিকে মেরে পিটে হত্যা ও ধ্বংস করতে শুরু করে। অবশেষে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে প্রেরণ করেন। বানী ইসরাঈলের ঐ মুসলিম দলটি তাঁর উপরও ঈমান আনয়ন করে। সুতরাং এই ঈমানদার দলটিকে আল্লাহ তাআলা সাহায্য করেন এবং তাদেরকে তাদের শত্রুদের উপর জয়যুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিজয়ী হওয়া এবং দ্বীন ইসলামের অন্যান্য দ্বীনগুলোকে পরাজিত করাই হলো তাদের বিজয়ী হওয়া ও তাদের শত্রুদের উপর জয়লাভ করা।" (এটা তাফসীরে ইবনে জারীরে ও সুনানে নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে)সুতরাং এই উম্মত সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে সদাসর্বদা বিজয়ীই থাকবে, শেষ পর্যন্ত কিয়ামত এসে যাবে এবং এই উম্মতের শেষের লোকগুলো হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গী হয়ে মাসীহ দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন, যেমন সহীহ হাদীসে বিদ্যমান রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল-জুমুআ 62:1
সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) জুমআর নামাযে সূরায়ে জুমআহ ও সূরায়ে মুনাফিকূন পাঠ করতেন। ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, সৃষ্ট সব কিছু বাকশক্তি সম্পন্ন হোক বা নির্বাক হোক, সদা-সর্বদা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণায় মগ্ন রয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এমন কোন জিনিস নেই যে তাঁর প্রশংসা কীর্তন করে না।” (১৭:৪৪) সমস্ত মাখলুক, আসমানেরই হোক বা যমীনেরই হোক, তাঁর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনায় মশগুল রয়েছে। তিনি আকাশ ও পৃথিবীর বাদশাহ্ এবং এ দু’টির মধ্যে তিনি পূর্ণভাবে স্বীয় ব্যবস্থাপনা ও হুকুম জারীকারী। তিনি সর্ব প্রকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। তিনি দোষ মুক্ত এবং সমস্ত উত্তম গুণাবলী ও বিশেষণের সাথে বিশেষিত। তিনি মহাপরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়। এর তাফসীর কয়েক জায়গায় গত হয়েছে।উম্মী দ্বারা আরবদেরকে বুঝানো হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে ও নিরক্ষরদেরকে বলঃ তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছো? যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে নিশ্চয়ই তারা পথ পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তোমার কর্তব্য শুধু প্রচার করা। আল্লাহ্ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।” (৩:২০) এখানে আরবের উল্লেখ করার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, অনারব এর অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং কারণ শুধু এটাই যে, তাদের উপর অন্যদের তুলনায় ইহ্সান ও ইকরাম বহুগুণে বেশী রয়েছে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “নিশ্চয়ই এটা তোমার জন্যে ও তোমার সম্প্রদায়ের জন্যে উপদেশ।” (৪৩:৪৪) এখানেও কওমকে খাস করা উদ্দেশ্য নয়। কেননা, কুরআন সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে উপদেশ। অনুরূপভাবে আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার নিকটতম আত্মীয়দেরকে ভীতি প্রদর্শন কর।" (২৬:২১৪) এখানেও উদ্দেশ্য এটা কখনই নয় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর ভীতি প্রদর্শন শুধুমাত্র তাঁর আত্মীয়-স্বজনের জন্যেই খাস, বরং তাঁর সতর্ককরণ তো সাধারণভাবে সবারই জন্যে। মহান আল্লাহ্ ঘোষণা করেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ!) তুমি বলঃ হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদের সবারই নিকট আল্লাহর রাসূল (রূপে এসেছি)।” (৭:১৫৮) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এর মাধ্যমে আমি তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শন করবে এবং তাদেরকেও, যাদের কাছে পৌঁছবে।” (৬:১৯) অনুরূপভাবে কুরআন সম্পর্কে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সমস্ত দলের মধ্যে যে কেউই এটাকে অস্বীকার করবে তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম।” (১১:১৭) এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সারা বিশ্ববাসীর জন্যে রাসূল। সমস্ত মাখলুকের তিনি নবী, তারা লাল হোক না কালোই হোক। সূরায়ে আনআমের তাফসীরে আমরা এটা পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি এবং বহু আয়াত ও হাদীসও আনয়ন করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহরই জন্যে।এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, ঐ নিরক্ষর অর্থাৎ আরবদের মধ্যে তিনি স্বীয় রাসূল (সাঃ)-কে প্রেরণ করেন। এটা এই জন্যে যে, যেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আ কবূল হওয়া জানা যায়। তিনি মক্কাবাসীর জন্যে আল্লাহ্ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেছিলেন যে, তিনি যেন তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল প্রেরণ করেন, যিনি তাদেরকে আল্লাহর আয়াত পাঠ করে শুনাবেন, তাদেরকে পাপ হতে পবিত্র করবেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন। আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এ দু'আ কবূল করেন।ঐ সময় সমস্ত মাখলুকের জন্যে আল্লাহর নবীর কঠিন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। আহলে কিতাবের শুধুমাত্র কতক লোক হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্য দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁরা ইফরাত ও তাফরীত হতে বেঁচে ছিলেন। তাঁরা ছাড়া দুনিয়ার সমস্ত মানুষ সত্য দ্বীনকে ভুলে বসেছিল এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজে জড়িয়ে পড়েছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় রাসূল (সাঃ)-কে প্রেরণ করলেন। তিনি ঐ নিরক্ষরদেরকে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনালেন, তাদেরকে পাপ হতে পবিত্র করলেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিলেন। অথচ ইতিপূর্বে তারা ঘোর বিভ্রান্তিতে ছিল।আরবরা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীনের দাবীদার ছিল বটে, কিন্তু অবস্থা এই ছিল যে, তারা ঐ দ্বীনকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও বদল করে ফেলেছিল। তারা ঐ দ্বীনের মধ্যে এতো বেশী পরিবর্তন আনয়ন করেছিল যে, তাওহীদ শিরকে এবং বিশ্বাস সন্দেহে পরিবর্তিত হয়েছিল। তারা নিজেরাই বহু কিছু বিদআত আবিষ্কার করে নিয়ে আল্লাহর দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছিল। অনুরূপভাবে আহলে কিতাবও তাদের কিতাবগুলো বদলিয়ে দিয়েছিল, সাথে সাথে অর্থেরও পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা হয়রত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে আযীমুশ শান শরীয়ত এবং পরিপূর্ণ দ্বীনসহ দুনিয়াবাসীর নিকট প্রেরণ করেন, যেন তিনি এই গোলযোগ মিটিয়ে দিতে পারেন। যেন তিনি আহলে কিতাবের নিকট মহান আল্লাহর আসল আহকাম পৌঁছিয়ে দেন, তাঁর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির আহকাম জনগণকে জানিয়ে দেন, এমন আমল তাদেরকে বাতলিয়ে দেন যা তাদেরকে জানাতের নিকটবর্তী করবে এবং জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ লাভ করাবে, তিনি সমস্ত মাখলুকের জন্যে পথ প্রদর্শক হন, শরীয়তের মূল ও শাখা সবই শিক্ষা দেন, ছোট বড় কোন কথা ও কাজ না ছাড়েন, সবারই সমস্ত শক-সন্দেহ দূর করে দেন এবং জনগণকে এমন দ্বীনের উপর আনয়ন করেন যার মধ্যে সর্বপ্রকারের মঙ্গল বিদ্যমান রয়েছে। এসব মহান দায়িত্ব পালনের জন্যে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর মধ্যে এমন শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গী একত্রিত করেন যা না তার পূর্বে কারো মধ্যে ছিল এবং না তার পরে কারো মধ্যে থাকতে পারে। মহান আল্লাহ সদা-সর্বদা তার উপর দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করতে থাকুন!(আরবী)-এ আয়াতের তাফসীরে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে বসেছিলাম এমন সময় তার উপর সূরায়ে জুমআহ অবতীর্ণ হয়। জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (আরবী)দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে?” কিন্তু তিনি কোন উত্তর দিলেন না। তিনবার এই প্রশ্ন করা হয়। আমাদের মধ্যে হযরত সালমান ফারসীও (রঃ) ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাতখানা হযরত সালমান ফারসীর (রাঃ) উপর রেখে বললেনঃ “ঈমান যদি সারিয়্যা নক্ষত্রের নিকট হতো তাহলেও এই লোকগুলোর মধ্যে এক বা কয়েক ব্যক্তি এটা পেয়ে যেতো।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু আবদিল্লাহ বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ রিওয়াইয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী সূরা এবং এটাও প্রমাণিত হচ্ছে যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে নবী, শুধু আরববাসীদের জন্যে নয়। কেননা, তিনি এই আয়াতের তাফসীরে পারস্যবাসীদের সম্পর্কে উপরোক্তে মন্তব্য করেন। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) পারস্য ও রোমের সম্রাটদের নিকট ইসলামের দাওয়াতনামা প্রেরণ করেছিলেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজনও বলেন যে, এর দ্বারা অনারবদেরকে বুঝানো হয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে এবং তাঁর অহীর সত্যতা স্বীকার করেছে।হযরত সাহল ইবনে সা'দ সায়েদী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ “এখন হতে নিয়ে বংশানুক্রমে তিন পুরুষ (পিড়ী) পর্যন্ত আগমনকারী আমার উম্মতের নারী ও পুরুষরা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” অতঃপর তিনি ....(আরবী) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)‘তিনি (আল্লাহ) পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' অর্থাৎ তিনি স্বীয় শরীয়ত ও তকদীর নির্ধারণে প্রবল পরাক্রম ও মহাবিজ্ঞানময়।মহান আল্লাহর উক্তিঃ এটা আল্লাহরই অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা এটা তিনি দান করেন। আল্লাহ তো বড় অনুগ্রহশীল।' অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে এরূপ আযীমুশ শান নবুওয়াত দান করা এবং এই মহান অনুগ্রহে অনুগৃহীত করা আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ অনুগ্রহ। তিনি তাঁর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা দান করে থাকেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল।
আল-জুমুআ 62:2
সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) জুমআর নামাযে সূরায়ে জুমআহ ও সূরায়ে মুনাফিকূন পাঠ করতেন। ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, সৃষ্ট সব কিছু বাকশক্তি সম্পন্ন হোক বা নির্বাক হোক, সদা-সর্বদা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণায় মগ্ন রয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এমন কোন জিনিস নেই যে তাঁর প্রশংসা কীর্তন করে না।” (১৭:৪৪) সমস্ত মাখলুক, আসমানেরই হোক বা যমীনেরই হোক, তাঁর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনায় মশগুল রয়েছে। তিনি আকাশ ও পৃথিবীর বাদশাহ্ এবং এ দু’টির মধ্যে তিনি পূর্ণভাবে স্বীয় ব্যবস্থাপনা ও হুকুম জারীকারী। তিনি সর্ব প্রকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। তিনি দোষ মুক্ত এবং সমস্ত উত্তম গুণাবলী ও বিশেষণের সাথে বিশেষিত। তিনি মহাপরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়। এর তাফসীর কয়েক জায়গায় গত হয়েছে।উম্মী দ্বারা আরবদেরকে বুঝানো হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে ও নিরক্ষরদেরকে বলঃ তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছো? যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে নিশ্চয়ই তারা পথ পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তোমার কর্তব্য শুধু প্রচার করা। আল্লাহ্ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।” (৩:২০) এখানে আরবের উল্লেখ করার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, অনারব এর অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং কারণ শুধু এটাই যে, তাদের উপর অন্যদের তুলনায় ইহ্সান ও ইকরাম বহুগুণে বেশী রয়েছে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “নিশ্চয়ই এটা তোমার জন্যে ও তোমার সম্প্রদায়ের জন্যে উপদেশ।” (৪৩:৪৪) এখানেও কওমকে খাস করা উদ্দেশ্য নয়। কেননা, কুরআন সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে উপদেশ। অনুরূপভাবে আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার নিকটতম আত্মীয়দেরকে ভীতি প্রদর্শন কর।" (২৬:২১৪) এখানেও উদ্দেশ্য এটা কখনই নয় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর ভীতি প্রদর্শন শুধুমাত্র তাঁর আত্মীয়-স্বজনের জন্যেই খাস, বরং তাঁর সতর্ককরণ তো সাধারণভাবে সবারই জন্যে। মহান আল্লাহ্ ঘোষণা করেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ!) তুমি বলঃ হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদের সবারই নিকট আল্লাহর রাসূল (রূপে এসেছি)।” (৭:১৫৮) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এর মাধ্যমে আমি তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শন করবে এবং তাদেরকেও, যাদের কাছে পৌঁছবে।” (৬:১৯) অনুরূপভাবে কুরআন সম্পর্কে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সমস্ত দলের মধ্যে যে কেউই এটাকে অস্বীকার করবে তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম।” (১১:১৭) এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সারা বিশ্ববাসীর জন্যে রাসূল। সমস্ত মাখলুকের তিনি নবী, তারা লাল হোক না কালোই হোক। সূরায়ে আনআমের তাফসীরে আমরা এটা পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি এবং বহু আয়াত ও হাদীসও আনয়ন করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহরই জন্যে।এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, ঐ নিরক্ষর অর্থাৎ আরবদের মধ্যে তিনি স্বীয় রাসূল (সাঃ)-কে প্রেরণ করেন। এটা এই জন্যে যে, যেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আ কবূল হওয়া জানা যায়। তিনি মক্কাবাসীর জন্যে আল্লাহ্ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেছিলেন যে, তিনি যেন তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল প্রেরণ করেন, যিনি তাদেরকে আল্লাহর আয়াত পাঠ করে শুনাবেন, তাদেরকে পাপ হতে পবিত্র করবেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন। আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এ দু'আ কবূল করেন।ঐ সময় সমস্ত মাখলুকের জন্যে আল্লাহর নবীর কঠিন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। আহলে কিতাবের শুধুমাত্র কতক লোক হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্য দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁরা ইফরাত ও তাফরীত হতে বেঁচে ছিলেন। তাঁরা ছাড়া দুনিয়ার সমস্ত মানুষ সত্য দ্বীনকে ভুলে বসেছিল এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজে জড়িয়ে পড়েছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় রাসূল (সাঃ)-কে প্রেরণ করলেন। তিনি ঐ নিরক্ষরদেরকে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনালেন, তাদেরকে পাপ হতে পবিত্র করলেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিলেন। অথচ ইতিপূর্বে তারা ঘোর বিভ্রান্তিতে ছিল।আরবরা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীনের দাবীদার ছিল বটে, কিন্তু অবস্থা এই ছিল যে, তারা ঐ দ্বীনকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও বদল করে ফেলেছিল। তারা ঐ দ্বীনের মধ্যে এতো বেশী পরিবর্তন আনয়ন করেছিল যে, তাওহীদ শিরকে এবং বিশ্বাস সন্দেহে পরিবর্তিত হয়েছিল। তারা নিজেরাই বহু কিছু বিদআত আবিষ্কার করে নিয়ে আল্লাহর দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছিল। অনুরূপভাবে আহলে কিতাবও তাদের কিতাবগুলো বদলিয়ে দিয়েছিল, সাথে সাথে অর্থেরও পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা হয়রত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে আযীমুশ শান শরীয়ত এবং পরিপূর্ণ দ্বীনসহ দুনিয়াবাসীর নিকট প্রেরণ করেন, যেন তিনি এই গোলযোগ মিটিয়ে দিতে পারেন। যেন তিনি আহলে কিতাবের নিকট মহান আল্লাহর আসল আহকাম পৌঁছিয়ে দেন, তাঁর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির আহকাম জনগণকে জানিয়ে দেন, এমন আমল তাদেরকে বাতলিয়ে দেন যা তাদেরকে জানাতের নিকটবর্তী করবে এবং জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ লাভ করাবে, তিনি সমস্ত মাখলুকের জন্যে পথ প্রদর্শক হন, শরীয়তের মূল ও শাখা সবই শিক্ষা দেন, ছোট বড় কোন কথা ও কাজ না ছাড়েন, সবারই সমস্ত শক-সন্দেহ দূর করে দেন এবং জনগণকে এমন দ্বীনের উপর আনয়ন করেন যার মধ্যে সর্বপ্রকারের মঙ্গল বিদ্যমান রয়েছে। এসব মহান দায়িত্ব পালনের জন্যে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর মধ্যে এমন শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গী একত্রিত করেন যা না তার পূর্বে কারো মধ্যে ছিল এবং না তার পরে কারো মধ্যে থাকতে পারে। মহান আল্লাহ সদা-সর্বদা তার উপর দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করতে থাকুন!(আরবী)-এ আয়াতের তাফসীরে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে বসেছিলাম এমন সময় তার উপর সূরায়ে জুমআহ অবতীর্ণ হয়। জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (আরবী)দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে?” কিন্তু তিনি কোন উত্তর দিলেন না। তিনবার এই প্রশ্ন করা হয়। আমাদের মধ্যে হযরত সালমান ফারসীও (রঃ) ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাতখানা হযরত সালমান ফারসীর (রাঃ) উপর রেখে বললেনঃ “ঈমান যদি সারিয়্যা নক্ষত্রের নিকট হতো তাহলেও এই লোকগুলোর মধ্যে এক বা কয়েক ব্যক্তি এটা পেয়ে যেতো।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু আবদিল্লাহ বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ রিওয়াইয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী সূরা এবং এটাও প্রমাণিত হচ্ছে যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে নবী, শুধু আরববাসীদের জন্যে নয়। কেননা, তিনি এই আয়াতের তাফসীরে পারস্যবাসীদের সম্পর্কে উপরোক্তে মন্তব্য করেন। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) পারস্য ও রোমের সম্রাটদের নিকট ইসলামের দাওয়াতনামা প্রেরণ করেছিলেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজনও বলেন যে, এর দ্বারা অনারবদেরকে বুঝানো হয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে এবং তাঁর অহীর সত্যতা স্বীকার করেছে।হযরত সাহল ইবনে সা'দ সায়েদী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ “এখন হতে নিয়ে বংশানুক্রমে তিন পুরুষ (পিড়ী) পর্যন্ত আগমনকারী আমার উম্মতের নারী ও পুরুষরা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” অতঃপর তিনি ....(আরবী) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)‘তিনি (আল্লাহ) পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' অর্থাৎ তিনি স্বীয় শরীয়ত ও তকদীর নির্ধারণে প্রবল পরাক্রম ও মহাবিজ্ঞানময়।মহান আল্লাহর উক্তিঃ এটা আল্লাহরই অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা এটা তিনি দান করেন। আল্লাহ তো বড় অনুগ্রহশীল।' অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে এরূপ আযীমুশ শান নবুওয়াত দান করা এবং এই মহান অনুগ্রহে অনুগৃহীত করা আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ অনুগ্রহ। তিনি তাঁর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা দান করে থাকেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল।
আল-জুমুআ 62:3
সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) জুমআর নামাযে সূরায়ে জুমআহ ও সূরায়ে মুনাফিকূন পাঠ করতেন। ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, সৃষ্ট সব কিছু বাকশক্তি সম্পন্ন হোক বা নির্বাক হোক, সদা-সর্বদা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণায় মগ্ন রয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এমন কোন জিনিস নেই যে তাঁর প্রশংসা কীর্তন করে না।” (১৭:৪৪) সমস্ত মাখলুক, আসমানেরই হোক বা যমীনেরই হোক, তাঁর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনায় মশগুল রয়েছে। তিনি আকাশ ও পৃথিবীর বাদশাহ্ এবং এ দু’টির মধ্যে তিনি পূর্ণভাবে স্বীয় ব্যবস্থাপনা ও হুকুম জারীকারী। তিনি সর্ব প্রকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। তিনি দোষ মুক্ত এবং সমস্ত উত্তম গুণাবলী ও বিশেষণের সাথে বিশেষিত। তিনি মহাপরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়। এর তাফসীর কয়েক জায়গায় গত হয়েছে।উম্মী দ্বারা আরবদেরকে বুঝানো হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে ও নিরক্ষরদেরকে বলঃ তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছো? যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে নিশ্চয়ই তারা পথ পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তোমার কর্তব্য শুধু প্রচার করা। আল্লাহ্ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।” (৩:২০) এখানে আরবের উল্লেখ করার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, অনারব এর অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং কারণ শুধু এটাই যে, তাদের উপর অন্যদের তুলনায় ইহ্সান ও ইকরাম বহুগুণে বেশী রয়েছে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “নিশ্চয়ই এটা তোমার জন্যে ও তোমার সম্প্রদায়ের জন্যে উপদেশ।” (৪৩:৪৪) এখানেও কওমকে খাস করা উদ্দেশ্য নয়। কেননা, কুরআন সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে উপদেশ। অনুরূপভাবে আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার নিকটতম আত্মীয়দেরকে ভীতি প্রদর্শন কর।" (২৬:২১৪) এখানেও উদ্দেশ্য এটা কখনই নয় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর ভীতি প্রদর্শন শুধুমাত্র তাঁর আত্মীয়-স্বজনের জন্যেই খাস, বরং তাঁর সতর্ককরণ তো সাধারণভাবে সবারই জন্যে। মহান আল্লাহ্ ঘোষণা করেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ!) তুমি বলঃ হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদের সবারই নিকট আল্লাহর রাসূল (রূপে এসেছি)।” (৭:১৫৮) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এর মাধ্যমে আমি তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শন করবে এবং তাদেরকেও, যাদের কাছে পৌঁছবে।” (৬:১৯) অনুরূপভাবে কুরআন সম্পর্কে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সমস্ত দলের মধ্যে যে কেউই এটাকে অস্বীকার করবে তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম।” (১১:১৭) এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সারা বিশ্ববাসীর জন্যে রাসূল। সমস্ত মাখলুকের তিনি নবী, তারা লাল হোক না কালোই হোক। সূরায়ে আনআমের তাফসীরে আমরা এটা পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি এবং বহু আয়াত ও হাদীসও আনয়ন করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহরই জন্যে।এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, ঐ নিরক্ষর অর্থাৎ আরবদের মধ্যে তিনি স্বীয় রাসূল (সাঃ)-কে প্রেরণ করেন। এটা এই জন্যে যে, যেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আ কবূল হওয়া জানা যায়। তিনি মক্কাবাসীর জন্যে আল্লাহ্ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেছিলেন যে, তিনি যেন তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল প্রেরণ করেন, যিনি তাদেরকে আল্লাহর আয়াত পাঠ করে শুনাবেন, তাদেরকে পাপ হতে পবিত্র করবেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন। আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এ দু'আ কবূল করেন।ঐ সময় সমস্ত মাখলুকের জন্যে আল্লাহর নবীর কঠিন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। আহলে কিতাবের শুধুমাত্র কতক লোক হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্য দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁরা ইফরাত ও তাফরীত হতে বেঁচে ছিলেন। তাঁরা ছাড়া দুনিয়ার সমস্ত মানুষ সত্য দ্বীনকে ভুলে বসেছিল এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজে জড়িয়ে পড়েছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় রাসূল (সাঃ)-কে প্রেরণ করলেন। তিনি ঐ নিরক্ষরদেরকে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনালেন, তাদেরকে পাপ হতে পবিত্র করলেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিলেন। অথচ ইতিপূর্বে তারা ঘোর বিভ্রান্তিতে ছিল।আরবরা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীনের দাবীদার ছিল বটে, কিন্তু অবস্থা এই ছিল যে, তারা ঐ দ্বীনকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও বদল করে ফেলেছিল। তারা ঐ দ্বীনের মধ্যে এতো বেশী পরিবর্তন আনয়ন করেছিল যে, তাওহীদ শিরকে এবং বিশ্বাস সন্দেহে পরিবর্তিত হয়েছিল। তারা নিজেরাই বহু কিছু বিদআত আবিষ্কার করে নিয়ে আল্লাহর দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছিল। অনুরূপভাবে আহলে কিতাবও তাদের কিতাবগুলো বদলিয়ে দিয়েছিল, সাথে সাথে অর্থেরও পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা হয়রত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে আযীমুশ শান শরীয়ত এবং পরিপূর্ণ দ্বীনসহ দুনিয়াবাসীর নিকট প্রেরণ করেন, যেন তিনি এই গোলযোগ মিটিয়ে দিতে পারেন। যেন তিনি আহলে কিতাবের নিকট মহান আল্লাহর আসল আহকাম পৌঁছিয়ে দেন, তাঁর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির আহকাম জনগণকে জানিয়ে দেন, এমন আমল তাদেরকে বাতলিয়ে দেন যা তাদেরকে জানাতের নিকটবর্তী করবে এবং জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ লাভ করাবে, তিনি সমস্ত মাখলুকের জন্যে পথ প্রদর্শক হন, শরীয়তের মূল ও শাখা সবই শিক্ষা দেন, ছোট বড় কোন কথা ও কাজ না ছাড়েন, সবারই সমস্ত শক-সন্দেহ দূর করে দেন এবং জনগণকে এমন দ্বীনের উপর আনয়ন করেন যার মধ্যে সর্বপ্রকারের মঙ্গল বিদ্যমান রয়েছে। এসব মহান দায়িত্ব পালনের জন্যে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর মধ্যে এমন শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গী একত্রিত করেন যা না তার পূর্বে কারো মধ্যে ছিল এবং না তার পরে কারো মধ্যে থাকতে পারে। মহান আল্লাহ সদা-সর্বদা তার উপর দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করতে থাকুন!(আরবী)-এ আয়াতের তাফসীরে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে বসেছিলাম এমন সময় তার উপর সূরায়ে জুমআহ অবতীর্ণ হয়। জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (আরবী)দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে?” কিন্তু তিনি কোন উত্তর দিলেন না। তিনবার এই প্রশ্ন করা হয়। আমাদের মধ্যে হযরত সালমান ফারসীও (রঃ) ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাতখানা হযরত সালমান ফারসীর (রাঃ) উপর রেখে বললেনঃ “ঈমান যদি সারিয়্যা নক্ষত্রের নিকট হতো তাহলেও এই লোকগুলোর মধ্যে এক বা কয়েক ব্যক্তি এটা পেয়ে যেতো।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু আবদিল্লাহ বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ রিওয়াইয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী সূরা এবং এটাও প্রমাণিত হচ্ছে যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে নবী, শুধু আরববাসীদের জন্যে নয়। কেননা, তিনি এই আয়াতের তাফসীরে পারস্যবাসীদের সম্পর্কে উপরোক্তে মন্তব্য করেন। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) পারস্য ও রোমের সম্রাটদের নিকট ইসলামের দাওয়াতনামা প্রেরণ করেছিলেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজনও বলেন যে, এর দ্বারা অনারবদেরকে বুঝানো হয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে এবং তাঁর অহীর সত্যতা স্বীকার করেছে।হযরত সাহল ইবনে সা'দ সায়েদী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ “এখন হতে নিয়ে বংশানুক্রমে তিন পুরুষ (পিড়ী) পর্যন্ত আগমনকারী আমার উম্মতের নারী ও পুরুষরা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” অতঃপর তিনি ....(আরবী) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)‘তিনি (আল্লাহ) পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' অর্থাৎ তিনি স্বীয় শরীয়ত ও তকদীর নির্ধারণে প্রবল পরাক্রম ও মহাবিজ্ঞানময়।মহান আল্লাহর উক্তিঃ এটা আল্লাহরই অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা এটা তিনি দান করেন। আল্লাহ তো বড় অনুগ্রহশীল।' অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে এরূপ আযীমুশ শান নবুওয়াত দান করা এবং এই মহান অনুগ্রহে অনুগৃহীত করা আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ অনুগ্রহ। তিনি তাঁর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা দান করে থাকেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল।
আল-জুমুআ 62:4
সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) জুমআর নামাযে সূরায়ে জুমআহ ও সূরায়ে মুনাফিকূন পাঠ করতেন। ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, সৃষ্ট সব কিছু বাকশক্তি সম্পন্ন হোক বা নির্বাক হোক, সদা-সর্বদা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণায় মগ্ন রয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এমন কোন জিনিস নেই যে তাঁর প্রশংসা কীর্তন করে না।” (১৭:৪৪) সমস্ত মাখলুক, আসমানেরই হোক বা যমীনেরই হোক, তাঁর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনায় মশগুল রয়েছে। তিনি আকাশ ও পৃথিবীর বাদশাহ্ এবং এ দু’টির মধ্যে তিনি পূর্ণভাবে স্বীয় ব্যবস্থাপনা ও হুকুম জারীকারী। তিনি সর্ব প্রকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। তিনি দোষ মুক্ত এবং সমস্ত উত্তম গুণাবলী ও বিশেষণের সাথে বিশেষিত। তিনি মহাপরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়। এর তাফসীর কয়েক জায়গায় গত হয়েছে।উম্মী দ্বারা আরবদেরকে বুঝানো হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে ও নিরক্ষরদেরকে বলঃ তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছো? যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে নিশ্চয়ই তারা পথ পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তোমার কর্তব্য শুধু প্রচার করা। আল্লাহ্ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।” (৩:২০) এখানে আরবের উল্লেখ করার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, অনারব এর অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং কারণ শুধু এটাই যে, তাদের উপর অন্যদের তুলনায় ইহ্সান ও ইকরাম বহুগুণে বেশী রয়েছে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অথাৎ “নিশ্চয়ই এটা তোমার জন্যে ও তোমার সম্প্রদায়ের জন্যে উপদেশ।” (৪৩:৪৪) এখানেও কওমকে খাস করা উদ্দেশ্য নয়। কেননা, কুরআন সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে উপদেশ। অনুরূপভাবে আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি তোমার নিকটতম আত্মীয়দেরকে ভীতি প্রদর্শন কর।" (২৬:২১৪) এখানেও উদ্দেশ্য এটা কখনই নয় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর ভীতি প্রদর্শন শুধুমাত্র তাঁর আত্মীয়-স্বজনের জন্যেই খাস, বরং তাঁর সতর্ককরণ তো সাধারণভাবে সবারই জন্যে। মহান আল্লাহ্ ঘোষণা করেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ!) তুমি বলঃ হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদের সবারই নিকট আল্লাহর রাসূল (রূপে এসেছি)।” (৭:১৫৮) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এর মাধ্যমে আমি তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শন করবে এবং তাদেরকেও, যাদের কাছে পৌঁছবে।” (৬:১৯) অনুরূপভাবে কুরআন সম্পর্কে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “সমস্ত দলের মধ্যে যে কেউই এটাকে অস্বীকার করবে তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম।” (১১:১৭) এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সারা বিশ্ববাসীর জন্যে রাসূল। সমস্ত মাখলুকের তিনি নবী, তারা লাল হোক না কালোই হোক। সূরায়ে আনআমের তাফসীরে আমরা এটা পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি এবং বহু আয়াত ও হাদীসও আনয়ন করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহরই জন্যে।এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, ঐ নিরক্ষর অর্থাৎ আরবদের মধ্যে তিনি স্বীয় রাসূল (সাঃ)-কে প্রেরণ করেন। এটা এই জন্যে যে, যেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আ কবূল হওয়া জানা যায়। তিনি মক্কাবাসীর জন্যে আল্লাহ্ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেছিলেন যে, তিনি যেন তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল প্রেরণ করেন, যিনি তাদেরকে আল্লাহর আয়াত পাঠ করে শুনাবেন, তাদেরকে পাপ হতে পবিত্র করবেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন। আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এ দু'আ কবূল করেন।ঐ সময় সমস্ত মাখলুকের জন্যে আল্লাহর নবীর কঠিন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। আহলে কিতাবের শুধুমাত্র কতক লোক হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্য দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁরা ইফরাত ও তাফরীত হতে বেঁচে ছিলেন। তাঁরা ছাড়া দুনিয়ার সমস্ত মানুষ সত্য দ্বীনকে ভুলে বসেছিল এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজে জড়িয়ে পড়েছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় রাসূল (সাঃ)-কে প্রেরণ করলেন। তিনি ঐ নিরক্ষরদেরকে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনালেন, তাদেরকে পাপ হতে পবিত্র করলেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিলেন। অথচ ইতিপূর্বে তারা ঘোর বিভ্রান্তিতে ছিল।আরবরা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীনের দাবীদার ছিল বটে, কিন্তু অবস্থা এই ছিল যে, তারা ঐ দ্বীনকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও বদল করে ফেলেছিল। তারা ঐ দ্বীনের মধ্যে এতো বেশী পরিবর্তন আনয়ন করেছিল যে, তাওহীদ শিরকে এবং বিশ্বাস সন্দেহে পরিবর্তিত হয়েছিল। তারা নিজেরাই বহু কিছু বিদআত আবিষ্কার করে নিয়ে আল্লাহর দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছিল। অনুরূপভাবে আহলে কিতাবও তাদের কিতাবগুলো বদলিয়ে দিয়েছিল, সাথে সাথে অর্থেরও পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা হয়রত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে আযীমুশ শান শরীয়ত এবং পরিপূর্ণ দ্বীনসহ দুনিয়াবাসীর নিকট প্রেরণ করেন, যেন তিনি এই গোলযোগ মিটিয়ে দিতে পারেন। যেন তিনি আহলে কিতাবের নিকট মহান আল্লাহর আসল আহকাম পৌঁছিয়ে দেন, তাঁর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির আহকাম জনগণকে জানিয়ে দেন, এমন আমল তাদেরকে বাতলিয়ে দেন যা তাদেরকে জানাতের নিকটবর্তী করবে এবং জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ লাভ করাবে, তিনি সমস্ত মাখলুকের জন্যে পথ প্রদর্শক হন, শরীয়তের মূল ও শাখা সবই শিক্ষা দেন, ছোট বড় কোন কথা ও কাজ না ছাড়েন, সবারই সমস্ত শক-সন্দেহ দূর করে দেন এবং জনগণকে এমন দ্বীনের উপর আনয়ন করেন যার মধ্যে সর্বপ্রকারের মঙ্গল বিদ্যমান রয়েছে। এসব মহান দায়িত্ব পালনের জন্যে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর মধ্যে এমন শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গী একত্রিত করেন যা না তার পূর্বে কারো মধ্যে ছিল এবং না তার পরে কারো মধ্যে থাকতে পারে। মহান আল্লাহ সদা-সর্বদা তার উপর দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করতে থাকুন!(আরবী)-এ আয়াতের তাফসীরে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে বসেছিলাম এমন সময় তার উপর সূরায়ে জুমআহ অবতীর্ণ হয়। জনগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! (আরবী)দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে?” কিন্তু তিনি কোন উত্তর দিলেন না। তিনবার এই প্রশ্ন করা হয়। আমাদের মধ্যে হযরত সালমান ফারসীও (রঃ) ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর হাতখানা হযরত সালমান ফারসীর (রাঃ) উপর রেখে বললেনঃ “ঈমান যদি সারিয়্যা নক্ষত্রের নিকট হতো তাহলেও এই লোকগুলোর মধ্যে এক বা কয়েক ব্যক্তি এটা পেয়ে যেতো।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু আবদিল্লাহ বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ রিওয়াইয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী সূরা এবং এটাও প্রমাণিত হচ্ছে যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে নবী, শুধু আরববাসীদের জন্যে নয়। কেননা, তিনি এই আয়াতের তাফসীরে পারস্যবাসীদের সম্পর্কে উপরোক্তে মন্তব্য করেন। এ জন্যেই তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) পারস্য ও রোমের সম্রাটদের নিকট ইসলামের দাওয়াতনামা প্রেরণ করেছিলেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ গুরুজনও বলেন যে, এর দ্বারা অনারবদেরকে বুঝানো হয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে এবং তাঁর অহীর সত্যতা স্বীকার করেছে।হযরত সাহল ইবনে সা'দ সায়েদী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ “এখন হতে নিয়ে বংশানুক্রমে তিন পুরুষ (পিড়ী) পর্যন্ত আগমনকারী আমার উম্মতের নারী ও পুরুষরা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” অতঃপর তিনি ....(আরবী) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)‘তিনি (আল্লাহ) পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' অর্থাৎ তিনি স্বীয় শরীয়ত ও তকদীর নির্ধারণে প্রবল পরাক্রম ও মহাবিজ্ঞানময়।মহান আল্লাহর উক্তিঃ এটা আল্লাহরই অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা এটা তিনি দান করেন। আল্লাহ তো বড় অনুগ্রহশীল।' অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে এরূপ আযীমুশ শান নবুওয়াত দান করা এবং এই মহান অনুগ্রহে অনুগৃহীত করা আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ অনুগ্রহ। তিনি তাঁর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা দান করে থাকেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল।
আল-জুমুআ 62:5
৫-৮ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতগুলোতে ইয়াহূদীদেরকে নিন্দে করা হচ্ছে যে, তাদেরকে তাওরাত। প্রদান করা হয় এবং আমল করার জন্যে তারা তা গ্রহণ করে, কিন্তু আমল করেনি। ঘোষিত হচ্ছে যে, তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে পুস্তক বহনকারী গর্দভ। যদি গর্দভের উপর কিতাবের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয় তবে সে তো এটা বুঝতে পারবে যে, তার উপর বোঝা রয়েছে, কিন্তু কি বোঝা রয়েছে তা সে মোটেই বুঝতে পারবে না। অনুরূপভাবে এই ইয়াহূদীরা বাহ্যিকভাবে তো তাওরাতের শব্দগুলো মুখে উচ্চারণ করছে, কিন্তু মতলব কিছুই বুঝে না। এর উপর তারা আমল তো করেই না, এমন কি একে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে ফেলছে। সুতরাং প্রকতপক্ষে তারা এ নির্বোধ ও অবুঝ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট। কেননা, মহান আল্লাহ এদেরকে বোধশক্তিই দান করেননি। কিন্তু এ লোকগুলোকে তো তিনি বোধশক্তি দিয়েছেন, অথচ তারা তা ব্যবহার করে না ও কাজে লাগায় না। এ জন্যেই অন্য আয়াতে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্ট! তারাই গাফিল।” (৭:১৭৯)এখানে বলা হচ্ছে যে, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করে ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তাদের দৃষ্টান্ত কতই না নিকৃষ্ট। তারা অত্যাচারী এবং আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি জুমআর দিন ইমামের খুৎবাহ দান অবস্থায় কথা বলে সে পুস্তক বহনকারী গর্দভের মত এবং যে ব্যক্তি তাকে বলেঃ চুপ কর তার জুমআ'হ্ হয় না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে ইয়াহুদীগণ! যদি তোমরা মনে কর যে, তোমরাই আল্লাহর বন্ধু, অন্য কোন মানব গোষ্ঠী নয়, তবে তোমরা মৃত্যু কামনা কর যদি তোমরা সত্যবাদী হও।' অর্থাৎ হে ইয়াহূদীদের দল! যদি তোমাদের দাবী এই হয় যে, তোমরা সত্যের উপর রয়েছে আর হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এবং তাঁর সহচরবৃন্দ অসত্যের উপর রয়েছেন তবে তোমর প্রার্থনা করঃ আমাদের দুই দলের মধ্যে যারা অসত্যের উপর রয়েছে তাকে যেন আল্লাহ মৃত্যু দান করেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “কিন্তু তাদের হস্ত যা অগ্রে প্রেরণ করেছে তার কারণে কখনো মত্য কামনা করবে না। অর্থাৎ যারা যে কুফরী, যুলম ও পাপের কাজ করেছে সেই কারণে তারা কখনো মৃত্যু কামনা করবে না।আল্লাহ তা'আলা যালিমদের সম্পর্কে সম্যক অবগত।সূরায়ে বাকারার নিম্নের আয়াতগুলোর তাফসীরে ইয়াহুদীদের সাথে। মুবাহালার পূর্ণ বর্ণনা গত হয়েছেঃ “বলঃ যদি আল্লাহর নিকট পরকালের বাসস্থান অন্য লোকে ব্যতীত বিশেষভাবে শুধু তোমাদের জন্যেই হয় তবে তোমরা মুত্যু কামনা কর- যদি সত্যবাদী হও। কিন্তু তাদের কৃতকর্মের জন্যে তারা কখনো ওটা কামনা করবে না এবং আল্লাহ যালিমদের সম্বন্ধে অবহিত। তুমি অবশ্যই তাদেরকে জীবনের প্রতি সমস্ত মানুষ, এমনকি মুশরিকদের অপেক্ষা অধিক লোভী দেখতে পাবে। তাদের প্রত্যেকে সহস্র বছর বাঁচার আকাঙ্ক্ষা করে। কিন্তু দীর্ঘায়ু তাদেরকে শাস্তি হতে দূরে রাখতে পারবে না। তারা যা করে আল্লাহ ওর দ্রষ্টা।” সূরায়ে আলে ইমরানের নিম্নের আয়াতে খৃষ্টানদের সাথে মুবাহালার বর্ণনা রয়েছেঃ“তোমার নিকট জ্ঞান আসার পর যে কেউ এ বিষয়ে তোমার সাথে তর্ক করে তাকে বলঃ এসো, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রদেরকে ও তোমাদের পুত্রদেরকে, আমাদের নারীদেরকে ও তোমাদের নারীদেরকে, আমাদের নিজেদেরকে ও তোমাদের নিজেদেরকে; অতঃপর আমরা বিনীত আবেদন করি এবং মিথ্যাবাদীদের উপর দিই আল্লাহর লানত।” আর মুশরিকদের সাথে মুবাহালার বর্ণনা রয়েছে সূরায়ে মারইয়ামের নিম্নের আয়াতে “বলঃ যারা বিভ্রান্তিতে রয়েছে, দয়াময় তাদেরকে প্রচুর ঢিল দিবেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আবু জেহেল (আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি লা'নত বর্ষণ করুন!) বলেঃ “আমি যদি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে কা’বার নিকট দেখতে পাই তবে অবশ্যই তার গর্দান পরিমাপ করবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ খবর পৌঁছলে তিনি বলেনঃ “যদি সে এরূপ করতো তবে অবশ্যই ফেরেশতাগণ জনগণের চোখের সামনে তাকে পাকড়াও করতেন। আর যদি ইয়াহূদীরা মৃত্যু কামনা করতো তবে অবশ্যই তারা মরে যেতো এবং জাহান্নামে তাদের জায়গা দেখে নিতো। আর আল্লাহর সাথে যারা মুবাহালা করতে চেয়েছিল তারা যদি মুবাহালার জন্যে বের হতো তবে অবশ্যই তারা এমন অবস্থায় ফিরে আসতো যে, তাদের পরিবারবর্গ এবং মাল-ধন তারা। পেতো না।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার উক্তিঃ বলঃ (হে মুহাম্মাদ সঃ)! তোমরা যে মৃত্যু হতে পলায়ন কর সেই মৃত্যুর সাথে তোমাদের সাক্ষাৎ হবেই। অতঃপর তোমরা প্রত্যানীত হবে অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর নিকট এবং তোমাদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে যা তোমরা করতে। যেমন সূরায়ে নিসার মধ্যে আল্লাহ তা'আলার উক্তি রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যেখানেই থাকো না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, সুউচ্চ ও সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করলেও।”তিবরানী (রঃ)-এর মু’জাম গ্রন্থে হযরত সমরা' (রাঃ) হতে একটি মারফ হাদীস বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি মৃত্যু হতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত হলো ঐ খেকশিয়াল যার কাছে ভূমি তার প্রদত্ত ঋণ চায়। তখন সে দ্রুত বেগে পালাতে শুরু করে। শেষে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তার গর্তে ঢুকে পড়ে। তখন ভূমি তাকে বলেঃ “হে খেকশিয়াল! আমাকে আমার ঋণ দিয়ে দাও।” একথা শুনে সে পুনরায় লেজগুটিয়ে ভীষণ বেগে দৌড়াতে শুরু করে। অবশেষে তার গর্দান ভেঙ্গে যায় এবং সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।”
আল-জুমুআ 62:6
৫-৮ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতগুলোতে ইয়াহূদীদেরকে নিন্দে করা হচ্ছে যে, তাদেরকে তাওরাত। প্রদান করা হয় এবং আমল করার জন্যে তারা তা গ্রহণ করে, কিন্তু আমল করেনি। ঘোষিত হচ্ছে যে, তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে পুস্তক বহনকারী গর্দভ। যদি গর্দভের উপর কিতাবের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয় তবে সে তো এটা বুঝতে পারবে যে, তার উপর বোঝা রয়েছে, কিন্তু কি বোঝা রয়েছে তা সে মোটেই বুঝতে পারবে না। অনুরূপভাবে এই ইয়াহূদীরা বাহ্যিকভাবে তো তাওরাতের শব্দগুলো মুখে উচ্চারণ করছে, কিন্তু মতলব কিছুই বুঝে না। এর উপর তারা আমল তো করেই না, এমন কি একে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে ফেলছে। সুতরাং প্রকতপক্ষে তারা এ নির্বোধ ও অবুঝ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট। কেননা, মহান আল্লাহ এদেরকে বোধশক্তিই দান করেননি। কিন্তু এ লোকগুলোকে তো তিনি বোধশক্তি দিয়েছেন, অথচ তারা তা ব্যবহার করে না ও কাজে লাগায় না। এ জন্যেই অন্য আয়াতে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্ট! তারাই গাফিল।” (৭:১৭৯)এখানে বলা হচ্ছে যে, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করে ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তাদের দৃষ্টান্ত কতই না নিকৃষ্ট। তারা অত্যাচারী এবং আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি জুমআর দিন ইমামের খুৎবাহ দান অবস্থায় কথা বলে সে পুস্তক বহনকারী গর্দভের মত এবং যে ব্যক্তি তাকে বলেঃ চুপ কর তার জুমআ'হ্ হয় না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে ইয়াহুদীগণ! যদি তোমরা মনে কর যে, তোমরাই আল্লাহর বন্ধু, অন্য কোন মানব গোষ্ঠী নয়, তবে তোমরা মৃত্যু কামনা কর যদি তোমরা সত্যবাদী হও।' অর্থাৎ হে ইয়াহূদীদের দল! যদি তোমাদের দাবী এই হয় যে, তোমরা সত্যের উপর রয়েছে আর হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এবং তাঁর সহচরবৃন্দ অসত্যের উপর রয়েছেন তবে তোমর প্রার্থনা করঃ আমাদের দুই দলের মধ্যে যারা অসত্যের উপর রয়েছে তাকে যেন আল্লাহ মৃত্যু দান করেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “কিন্তু তাদের হস্ত যা অগ্রে প্রেরণ করেছে তার কারণে কখনো মত্য কামনা করবে না। অর্থাৎ যারা যে কুফরী, যুলম ও পাপের কাজ করেছে সেই কারণে তারা কখনো মৃত্যু কামনা করবে না।আল্লাহ তা'আলা যালিমদের সম্পর্কে সম্যক অবগত।সূরায়ে বাকারার নিম্নের আয়াতগুলোর তাফসীরে ইয়াহুদীদের সাথে। মুবাহালার পূর্ণ বর্ণনা গত হয়েছেঃ “বলঃ যদি আল্লাহর নিকট পরকালের বাসস্থান অন্য লোকে ব্যতীত বিশেষভাবে শুধু তোমাদের জন্যেই হয় তবে তোমরা মুত্যু কামনা কর- যদি সত্যবাদী হও। কিন্তু তাদের কৃতকর্মের জন্যে তারা কখনো ওটা কামনা করবে না এবং আল্লাহ যালিমদের সম্বন্ধে অবহিত। তুমি অবশ্যই তাদেরকে জীবনের প্রতি সমস্ত মানুষ, এমনকি মুশরিকদের অপেক্ষা অধিক লোভী দেখতে পাবে। তাদের প্রত্যেকে সহস্র বছর বাঁচার আকাঙ্ক্ষা করে। কিন্তু দীর্ঘায়ু তাদেরকে শাস্তি হতে দূরে রাখতে পারবে না। তারা যা করে আল্লাহ ওর দ্রষ্টা।” সূরায়ে আলে ইমরানের নিম্নের আয়াতে খৃষ্টানদের সাথে মুবাহালার বর্ণনা রয়েছেঃ“তোমার নিকট জ্ঞান আসার পর যে কেউ এ বিষয়ে তোমার সাথে তর্ক করে তাকে বলঃ এসো, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রদেরকে ও তোমাদের পুত্রদেরকে, আমাদের নারীদেরকে ও তোমাদের নারীদেরকে, আমাদের নিজেদেরকে ও তোমাদের নিজেদেরকে; অতঃপর আমরা বিনীত আবেদন করি এবং মিথ্যাবাদীদের উপর দিই আল্লাহর লানত।” আর মুশরিকদের সাথে মুবাহালার বর্ণনা রয়েছে সূরায়ে মারইয়ামের নিম্নের আয়াতে “বলঃ যারা বিভ্রান্তিতে রয়েছে, দয়াময় তাদেরকে প্রচুর ঢিল দিবেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আবু জেহেল (আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি লা'নত বর্ষণ করুন!) বলেঃ “আমি যদি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে কা’বার নিকট দেখতে পাই তবে অবশ্যই তার গর্দান পরিমাপ করবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ খবর পৌঁছলে তিনি বলেনঃ “যদি সে এরূপ করতো তবে অবশ্যই ফেরেশতাগণ জনগণের চোখের সামনে তাকে পাকড়াও করতেন। আর যদি ইয়াহূদীরা মৃত্যু কামনা করতো তবে অবশ্যই তারা মরে যেতো এবং জাহান্নামে তাদের জায়গা দেখে নিতো। আর আল্লাহর সাথে যারা মুবাহালা করতে চেয়েছিল তারা যদি মুবাহালার জন্যে বের হতো তবে অবশ্যই তারা এমন অবস্থায় ফিরে আসতো যে, তাদের পরিবারবর্গ এবং মাল-ধন তারা। পেতো না।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার উক্তিঃ বলঃ (হে মুহাম্মাদ সঃ)! তোমরা যে মৃত্যু হতে পলায়ন কর সেই মৃত্যুর সাথে তোমাদের সাক্ষাৎ হবেই। অতঃপর তোমরা প্রত্যানীত হবে অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর নিকট এবং তোমাদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে যা তোমরা করতে। যেমন সূরায়ে নিসার মধ্যে আল্লাহ তা'আলার উক্তি রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যেখানেই থাকো না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, সুউচ্চ ও সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করলেও।”তিবরানী (রঃ)-এর মু’জাম গ্রন্থে হযরত সমরা' (রাঃ) হতে একটি মারফ হাদীস বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি মৃত্যু হতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত হলো ঐ খেকশিয়াল যার কাছে ভূমি তার প্রদত্ত ঋণ চায়। তখন সে দ্রুত বেগে পালাতে শুরু করে। শেষে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তার গর্তে ঢুকে পড়ে। তখন ভূমি তাকে বলেঃ “হে খেকশিয়াল! আমাকে আমার ঋণ দিয়ে দাও।” একথা শুনে সে পুনরায় লেজগুটিয়ে ভীষণ বেগে দৌড়াতে শুরু করে। অবশেষে তার গর্দান ভেঙ্গে যায় এবং সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।”
আল-জুমুআ 62:7
৫-৮ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতগুলোতে ইয়াহূদীদেরকে নিন্দে করা হচ্ছে যে, তাদেরকে তাওরাত। প্রদান করা হয় এবং আমল করার জন্যে তারা তা গ্রহণ করে, কিন্তু আমল করেনি। ঘোষিত হচ্ছে যে, তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে পুস্তক বহনকারী গর্দভ। যদি গর্দভের উপর কিতাবের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয় তবে সে তো এটা বুঝতে পারবে যে, তার উপর বোঝা রয়েছে, কিন্তু কি বোঝা রয়েছে তা সে মোটেই বুঝতে পারবে না। অনুরূপভাবে এই ইয়াহূদীরা বাহ্যিকভাবে তো তাওরাতের শব্দগুলো মুখে উচ্চারণ করছে, কিন্তু মতলব কিছুই বুঝে না। এর উপর তারা আমল তো করেই না, এমন কি একে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে ফেলছে। সুতরাং প্রকতপক্ষে তারা এ নির্বোধ ও অবুঝ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট। কেননা, মহান আল্লাহ এদেরকে বোধশক্তিই দান করেননি। কিন্তু এ লোকগুলোকে তো তিনি বোধশক্তি দিয়েছেন, অথচ তারা তা ব্যবহার করে না ও কাজে লাগায় না। এ জন্যেই অন্য আয়াতে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্ট! তারাই গাফিল।” (৭:১৭৯)এখানে বলা হচ্ছে যে, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করে ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তাদের দৃষ্টান্ত কতই না নিকৃষ্ট। তারা অত্যাচারী এবং আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি জুমআর দিন ইমামের খুৎবাহ দান অবস্থায় কথা বলে সে পুস্তক বহনকারী গর্দভের মত এবং যে ব্যক্তি তাকে বলেঃ চুপ কর তার জুমআ'হ্ হয় না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে ইয়াহুদীগণ! যদি তোমরা মনে কর যে, তোমরাই আল্লাহর বন্ধু, অন্য কোন মানব গোষ্ঠী নয়, তবে তোমরা মৃত্যু কামনা কর যদি তোমরা সত্যবাদী হও।' অর্থাৎ হে ইয়াহূদীদের দল! যদি তোমাদের দাবী এই হয় যে, তোমরা সত্যের উপর রয়েছে আর হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এবং তাঁর সহচরবৃন্দ অসত্যের উপর রয়েছেন তবে তোমর প্রার্থনা করঃ আমাদের দুই দলের মধ্যে যারা অসত্যের উপর রয়েছে তাকে যেন আল্লাহ মৃত্যু দান করেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “কিন্তু তাদের হস্ত যা অগ্রে প্রেরণ করেছে তার কারণে কখনো মত্য কামনা করবে না। অর্থাৎ যারা যে কুফরী, যুলম ও পাপের কাজ করেছে সেই কারণে তারা কখনো মৃত্যু কামনা করবে না।আল্লাহ তা'আলা যালিমদের সম্পর্কে সম্যক অবগত।সূরায়ে বাকারার নিম্নের আয়াতগুলোর তাফসীরে ইয়াহুদীদের সাথে। মুবাহালার পূর্ণ বর্ণনা গত হয়েছেঃ “বলঃ যদি আল্লাহর নিকট পরকালের বাসস্থান অন্য লোকে ব্যতীত বিশেষভাবে শুধু তোমাদের জন্যেই হয় তবে তোমরা মুত্যু কামনা কর- যদি সত্যবাদী হও। কিন্তু তাদের কৃতকর্মের জন্যে তারা কখনো ওটা কামনা করবে না এবং আল্লাহ যালিমদের সম্বন্ধে অবহিত। তুমি অবশ্যই তাদেরকে জীবনের প্রতি সমস্ত মানুষ, এমনকি মুশরিকদের অপেক্ষা অধিক লোভী দেখতে পাবে। তাদের প্রত্যেকে সহস্র বছর বাঁচার আকাঙ্ক্ষা করে। কিন্তু দীর্ঘায়ু তাদেরকে শাস্তি হতে দূরে রাখতে পারবে না। তারা যা করে আল্লাহ ওর দ্রষ্টা।” সূরায়ে আলে ইমরানের নিম্নের আয়াতে খৃষ্টানদের সাথে মুবাহালার বর্ণনা রয়েছেঃ“তোমার নিকট জ্ঞান আসার পর যে কেউ এ বিষয়ে তোমার সাথে তর্ক করে তাকে বলঃ এসো, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রদেরকে ও তোমাদের পুত্রদেরকে, আমাদের নারীদেরকে ও তোমাদের নারীদেরকে, আমাদের নিজেদেরকে ও তোমাদের নিজেদেরকে; অতঃপর আমরা বিনীত আবেদন করি এবং মিথ্যাবাদীদের উপর দিই আল্লাহর লানত।” আর মুশরিকদের সাথে মুবাহালার বর্ণনা রয়েছে সূরায়ে মারইয়ামের নিম্নের আয়াতে “বলঃ যারা বিভ্রান্তিতে রয়েছে, দয়াময় তাদেরকে প্রচুর ঢিল দিবেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আবু জেহেল (আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি লা'নত বর্ষণ করুন!) বলেঃ “আমি যদি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে কা’বার নিকট দেখতে পাই তবে অবশ্যই তার গর্দান পরিমাপ করবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ খবর পৌঁছলে তিনি বলেনঃ “যদি সে এরূপ করতো তবে অবশ্যই ফেরেশতাগণ জনগণের চোখের সামনে তাকে পাকড়াও করতেন। আর যদি ইয়াহূদীরা মৃত্যু কামনা করতো তবে অবশ্যই তারা মরে যেতো এবং জাহান্নামে তাদের জায়গা দেখে নিতো। আর আল্লাহর সাথে যারা মুবাহালা করতে চেয়েছিল তারা যদি মুবাহালার জন্যে বের হতো তবে অবশ্যই তারা এমন অবস্থায় ফিরে আসতো যে, তাদের পরিবারবর্গ এবং মাল-ধন তারা। পেতো না।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার উক্তিঃ বলঃ (হে মুহাম্মাদ সঃ)! তোমরা যে মৃত্যু হতে পলায়ন কর সেই মৃত্যুর সাথে তোমাদের সাক্ষাৎ হবেই। অতঃপর তোমরা প্রত্যানীত হবে অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর নিকট এবং তোমাদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে যা তোমরা করতে। যেমন সূরায়ে নিসার মধ্যে আল্লাহ তা'আলার উক্তি রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যেখানেই থাকো না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, সুউচ্চ ও সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করলেও।”তিবরানী (রঃ)-এর মু’জাম গ্রন্থে হযরত সমরা' (রাঃ) হতে একটি মারফ হাদীস বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি মৃত্যু হতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত হলো ঐ খেকশিয়াল যার কাছে ভূমি তার প্রদত্ত ঋণ চায়। তখন সে দ্রুত বেগে পালাতে শুরু করে। শেষে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তার গর্তে ঢুকে পড়ে। তখন ভূমি তাকে বলেঃ “হে খেকশিয়াল! আমাকে আমার ঋণ দিয়ে দাও।” একথা শুনে সে পুনরায় লেজগুটিয়ে ভীষণ বেগে দৌড়াতে শুরু করে। অবশেষে তার গর্দান ভেঙ্গে যায় এবং সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।”
আল-জুমুআ 62:8
৫-৮ নং আয়াতের তাফসীর: এই আয়াতগুলোতে ইয়াহূদীদেরকে নিন্দে করা হচ্ছে যে, তাদেরকে তাওরাত। প্রদান করা হয় এবং আমল করার জন্যে তারা তা গ্রহণ করে, কিন্তু আমল করেনি। ঘোষিত হচ্ছে যে, তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে পুস্তক বহনকারী গর্দভ। যদি গর্দভের উপর কিতাবের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয় তবে সে তো এটা বুঝতে পারবে যে, তার উপর বোঝা রয়েছে, কিন্তু কি বোঝা রয়েছে তা সে মোটেই বুঝতে পারবে না। অনুরূপভাবে এই ইয়াহূদীরা বাহ্যিকভাবে তো তাওরাতের শব্দগুলো মুখে উচ্চারণ করছে, কিন্তু মতলব কিছুই বুঝে না। এর উপর তারা আমল তো করেই না, এমন কি একে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে ফেলছে। সুতরাং প্রকতপক্ষে তারা এ নির্বোধ ও অবুঝ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট। কেননা, মহান আল্লাহ এদেরকে বোধশক্তিই দান করেননি। কিন্তু এ লোকগুলোকে তো তিনি বোধশক্তি দিয়েছেন, অথচ তারা তা ব্যবহার করে না ও কাজে লাগায় না। এ জন্যেই অন্য আয়াতে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্ট! তারাই গাফিল।” (৭:১৭৯)এখানে বলা হচ্ছে যে, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করে ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তাদের দৃষ্টান্ত কতই না নিকৃষ্ট। তারা অত্যাচারী এবং আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি জুমআর দিন ইমামের খুৎবাহ দান অবস্থায় কথা বলে সে পুস্তক বহনকারী গর্দভের মত এবং যে ব্যক্তি তাকে বলেঃ চুপ কর তার জুমআ'হ্ হয় না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে ইয়াহুদীগণ! যদি তোমরা মনে কর যে, তোমরাই আল্লাহর বন্ধু, অন্য কোন মানব গোষ্ঠী নয়, তবে তোমরা মৃত্যু কামনা কর যদি তোমরা সত্যবাদী হও।' অর্থাৎ হে ইয়াহূদীদের দল! যদি তোমাদের দাবী এই হয় যে, তোমরা সত্যের উপর রয়েছে আর হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এবং তাঁর সহচরবৃন্দ অসত্যের উপর রয়েছেন তবে তোমর প্রার্থনা করঃ আমাদের দুই দলের মধ্যে যারা অসত্যের উপর রয়েছে তাকে যেন আল্লাহ মৃত্যু দান করেন।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “কিন্তু তাদের হস্ত যা অগ্রে প্রেরণ করেছে তার কারণে কখনো মত্য কামনা করবে না। অর্থাৎ যারা যে কুফরী, যুলম ও পাপের কাজ করেছে সেই কারণে তারা কখনো মৃত্যু কামনা করবে না।আল্লাহ তা'আলা যালিমদের সম্পর্কে সম্যক অবগত।সূরায়ে বাকারার নিম্নের আয়াতগুলোর তাফসীরে ইয়াহুদীদের সাথে। মুবাহালার পূর্ণ বর্ণনা গত হয়েছেঃ “বলঃ যদি আল্লাহর নিকট পরকালের বাসস্থান অন্য লোকে ব্যতীত বিশেষভাবে শুধু তোমাদের জন্যেই হয় তবে তোমরা মুত্যু কামনা কর- যদি সত্যবাদী হও। কিন্তু তাদের কৃতকর্মের জন্যে তারা কখনো ওটা কামনা করবে না এবং আল্লাহ যালিমদের সম্বন্ধে অবহিত। তুমি অবশ্যই তাদেরকে জীবনের প্রতি সমস্ত মানুষ, এমনকি মুশরিকদের অপেক্ষা অধিক লোভী দেখতে পাবে। তাদের প্রত্যেকে সহস্র বছর বাঁচার আকাঙ্ক্ষা করে। কিন্তু দীর্ঘায়ু তাদেরকে শাস্তি হতে দূরে রাখতে পারবে না। তারা যা করে আল্লাহ ওর দ্রষ্টা।” সূরায়ে আলে ইমরানের নিম্নের আয়াতে খৃষ্টানদের সাথে মুবাহালার বর্ণনা রয়েছেঃ“তোমার নিকট জ্ঞান আসার পর যে কেউ এ বিষয়ে তোমার সাথে তর্ক করে তাকে বলঃ এসো, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রদেরকে ও তোমাদের পুত্রদেরকে, আমাদের নারীদেরকে ও তোমাদের নারীদেরকে, আমাদের নিজেদেরকে ও তোমাদের নিজেদেরকে; অতঃপর আমরা বিনীত আবেদন করি এবং মিথ্যাবাদীদের উপর দিই আল্লাহর লানত।” আর মুশরিকদের সাথে মুবাহালার বর্ণনা রয়েছে সূরায়ে মারইয়ামের নিম্নের আয়াতে “বলঃ যারা বিভ্রান্তিতে রয়েছে, দয়াময় তাদেরকে প্রচুর ঢিল দিবেন।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আবু জেহেল (আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি লা'নত বর্ষণ করুন!) বলেঃ “আমি যদি মুহাম্মাদ (সঃ)-কে কা’বার নিকট দেখতে পাই তবে অবশ্যই তার গর্দান পরিমাপ করবে।” রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ খবর পৌঁছলে তিনি বলেনঃ “যদি সে এরূপ করতো তবে অবশ্যই ফেরেশতাগণ জনগণের চোখের সামনে তাকে পাকড়াও করতেন। আর যদি ইয়াহূদীরা মৃত্যু কামনা করতো তবে অবশ্যই তারা মরে যেতো এবং জাহান্নামে তাদের জায়গা দেখে নিতো। আর আল্লাহর সাথে যারা মুবাহালা করতে চেয়েছিল তারা যদি মুবাহালার জন্যে বের হতো তবে অবশ্যই তারা এমন অবস্থায় ফিরে আসতো যে, তাদের পরিবারবর্গ এবং মাল-ধন তারা। পেতো না।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার উক্তিঃ বলঃ (হে মুহাম্মাদ সঃ)! তোমরা যে মৃত্যু হতে পলায়ন কর সেই মৃত্যুর সাথে তোমাদের সাক্ষাৎ হবেই। অতঃপর তোমরা প্রত্যানীত হবে অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর নিকট এবং তোমাদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে যা তোমরা করতে। যেমন সূরায়ে নিসার মধ্যে আল্লাহ তা'আলার উক্তি রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা যেখানেই থাকো না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, সুউচ্চ ও সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করলেও।”তিবরানী (রঃ)-এর মু’জাম গ্রন্থে হযরত সমরা' (রাঃ) হতে একটি মারফ হাদীস বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি মৃত্যু হতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত হলো ঐ খেকশিয়াল যার কাছে ভূমি তার প্রদত্ত ঋণ চায়। তখন সে দ্রুত বেগে পালাতে শুরু করে। শেষে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তার গর্তে ঢুকে পড়ে। তখন ভূমি তাকে বলেঃ “হে খেকশিয়াল! আমাকে আমার ঋণ দিয়ে দাও।” একথা শুনে সে পুনরায় লেজগুটিয়ে ভীষণ বেগে দৌড়াতে শুরু করে। অবশেষে তার গর্দান ভেঙ্গে যায় এবং সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।”
আল-জুমুআ 62:9
৯-১০ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দ হতে বের করা হয়েছে, কারণ এই যে, এই দিনে মুসলমানরা বড় বড় মসজিদে ইবাদতের জন্যে জমা বা একত্রিত হয়ে থাকে। আর এটিও একটি কারণ যে, এই দিনে সমস্ত মাখলুকের সৃষ্টি-কার্য পূর্ণ হয়েছিল। ছয় দিনে সারা জগত বানানো হয়। ষষ্ঠ দিন ছিল জুমআর দিন। এই দিনেই হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়। এই দিনেই জান্নাতে তাঁর অবস্থান ঘটে এবং এই দিনেই তাঁকে জান্নাত হতে বের করে দেয়া হয়। এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এই দিনের মধ্যে এমন একটি সময় রয়েছে যে, ঐ সময়ে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট যা যা করা হয় তা-ই তিনি দান করে থাকেন।হযরত সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে সালমান (রাঃ)! জুমআর দিন কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জমুআহর দিন এমন এক দিন যে, এ দিনে তোমাদের পিতা-মাতাকে (হযরত আদম আঃ ও হযরত হাওয়া আঃ কে) আল্লাহ একত্রিত করেন। অথবা বলেনঃ “তোমাদের পিতাকে (হযরত আদমকে আঃ) জমা করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে (মাওকুফরূপেও) অনুরূপ বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রাচীন অভিধানে এটাকে ইয়াওমুল আরূবাহ বলা হতো। পূর্ববর্তী উম্মতদেরকেও প্রতি সাতদিনে একটি দিন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু জুমআর দিনের হিদায়াত তারা লাভ করেনি। ইয়াহূদীরা শনিবারকে পছন্দ করে যেদিন মাখলুকের সৃষ্টি কার্য শুরুই হয়নি। নাসারাগণ রবিবারকে পছন্দ করে যেই দিন মাখলুক সৃষ্টির সূচনা হয়। আর এই উম্মতের জন্যে আল্লাহ তা'আলা জুমআ'হূকে পছন্দ করেছেন যেই দিন তিনি মাখলুকের সৃষ্টিকার্য পরিপূর্ণ করেছেন। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা (দুনিয়ায়) সর্বশেষে আগমনকারী, আর কিয়ামতের দিন আমরা সর্বাগ্রে হবো। যাদেরকে আমাদের পূর্বে (আসমানী) কিতাব দেয়া হয় তারা এ দিনের ব্যাপারে মতভেদ করে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। এ ব্যাপারেও তারা আমাদের পিছনে রয়েছে। ইয়াহূদীরা আগামী কাল এবং খৃষ্টানরা আগামী কালের পরের দিন।” এটা সহীহ বুখারীর শব্দ আর সহীহ মুসলিমের শব্দ হলোঃ আল্লাহ তা'আলা জুমআহ্ হতে ভ্রষ্ট করেছেন আমাদের পূর্ববর্তীদেরকে। ইয়াহুদীদের জন্যে ছিল শনিবার এবং খৃষ্টানদের জন্যে ছিল রবিবার। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাদেরকে আনয়ন করেন এবং জুমআ’হর জন্যে আমাদেরকে হিদায়াত দান করেন। সুতরাং তিনি রেখেছেন শুক্রবার, শনিবার ও রবিবার। এভাবে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা কিয়ামতের দিন আমাদের পিছনে থাকবে। দুনিয়াবাসীর হিসেবে আমরা শেষে রয়েছি। কিন্তু কিয়ামতের দিন সমস্ত মাখলুকের মধ্যে সর্বপ্রথম আমাদের ব্যাপারে ফায়সালা করা হবে।”এখানে আল্লাহ তা'আলা জুমআর দিন স্বীয় মুসলিম বান্দাদেরকে তাঁর ইবাদতের জন্যে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। (আরবী) দ্বারা এখানে দৌড়ানো উদ্দেশ্য নয়, বরং ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমরা আল্লাহর যিকর অর্থাৎ নামাযের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়, কাজ-কর্ম ছেড়ে দিয়ে মসজিদ পানে অগ্রসর হও। যেমন মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মুমিন অবস্থায় যে আখিরাতের কামনা করে এবং ওর জন্যে চেষ্টা সাধনা করে।” (১৭:১৯)হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআত (আরবী) এর স্থলে (আরবী) রয়েছে। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, নামাযের জন্যে দৌড়িয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা ইকামত শুনলে নামাযের জন্যে ধীরে সুস্থে যাবে, দৌড়াবে না। নামাযের যে অংশ (জামাআতের সাথে) পাবে তা পড়ে নিবে এবং যা ছুটে যাবে তা পুরো করবে।” অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে ছিলেন এমতাবস্থায় তিনি দরযার কাছে জনগণের পায়ের জোর শব্দ শুনতে পান। নামায শেষে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি?” সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তাড়াতাড়ি করে নামাযে শরীক হয়েছি।” তখন তিনি বললেনঃ “না, না, এরূপ করো না। ধীরে সুস্থে নামাযে আসবে। যা পাবে পড়বে এবং যা ছুটে যাবে তা পুরো করে নিবে।" হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! এখানে এ হুকুম কখনো নয় যে, মানুষ নামাযের জন্যে দৌড়িয়ে আসবে। এটা তো নিষেধ। বরং এখানে উদ্দেশ্য হলো অত্যন্ত আগ্রহ, মনোযোগ ও বিনয়ের সাথে নামায পড়া। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ স্বীয় মন ও আমল দ্বারা চেষ্টা কর। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তিনি (হযরত ইসমাঈল আঃ) এমন বয়সে পদার্পণ করলেন যে, তাঁর সাথে (হযরত ইবরাহীম আঃ এর সাথে) চলাফেরা করতে সক্ষম হলেন।” (৩৭:১০২) জুমআর নামাযের জন্যে আগমনকারীর জুমআ’হর পূর্বে গোসল করা উচিত। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যখন জুমআ’হর জন্যে আসবে তখন যেন সে গোসল করে নেয়। এ দু' গ্রন্থেই হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জুমআর দিন প্রত্যেক মুসলমানের উপর গোসল ওয়াজিব।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক মুসলমানের উপর আল্লাহর হক এই যে, সে প্রতি সাত দিনে এক দিন গোসল করবে, যাতে সে তার মাথা ও শরীর ধৌত করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক মুসলিমের জন্যে প্রতি সাত দিনে একদিন গোসল রয়েছে এবং তা হলো জুমআর দিন।” (ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম হিব্বান (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)হযরত আউস ইবনে আউস সাকাফী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি জুমআ'র দিন ভালভাবে গোসল করে এবং সকালেই মসজিদ পানে রওয়ানা হয়ে যায়, পায়ে হেঁটে যায়, সওয়ার হয় না, ইমামের নিকটবর্তী হয়ে বসে মনোযোগের সাথে খুৎবাহ শুনে এবং বাজে কথা বলে না, সে প্রতি পদক্ষেপের বিনিময়ে সারা বছরের রোযা ও সারা বছরের কিয়ামের (রাত্রে দাঁড়িয়ে ইবাদত করার) পুণ্য লাভ করে।” (এ হাদীসটি আহলে সুনানে আরবাআহ ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে খুবই উত্তম বলেছেন) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জুমআর দিন যে ব্যক্তি নাপাক অবস্থার গোসলের ন্যায় গোসল করে আওয়াল বা প্রথম সময়ে মসজিদে গেল সে যেন একটা উট কুরবানী করলো, যে দ্বিতীয় সময়ে হাযির হলো সে যেন একটা গরু কুরবানী করলো, যে তৃতীয় সময়ে পৌঁছলো সে একটা মেষ কুরবানী করার সওয়াব পেলো, যে হাযির হলো চতুর্থ ওয়াক্তে সে যেন সাদকাহ করলো একটা মোরগ এবং যে হাযির হলো পঞ্চম ওয়াক্তে, একটা ডিম আল্লাহর পথে সাদকাহ করার মত পুণ্য সে লাভ করলো। অতঃপর যখন ইমাম (খুত্বাহ দেয়ার উদ্দেশ্যে) বের হয় তখন ফেরেশতামণ্ডলী। হাযির হয়ে যিক্র শুনতে থাকেন।" (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) জুমআ'র দিন স্বীয় সাধ্য অনুযায়ী ভাল পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, মিসওয়াক করা এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও পাক-পবিত্র হয়ে জুমআর নামাযের জন্যে আসা উচিত। একটি হাদীসে গোসলের বর্ণনার সাথে সাথেই মিসওয়াক করা ও সুগন্ধি ব্যবহারের বর্ণনাও রয়েছে। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি জুমআর দিন গোসল করে ও স্বীয় পরিবারের লোকদেরকে সুগন্ধি মাখায় যদি থাকে, অতঃপর ভাল কাপড় পরিধান করে মসজিদে আসে ও ইচ্ছা হলে কিছু নফল নামায পড়ে নেয় এবং কাউকেও কষ্ট দেয় না (অর্থাৎ কারো ঘাড়ের উপর দিয়ে যায় না ও কোন উপবিষ্ট লোককে উঠায় না), অতঃপর ইমাম এসে খুৎবাহ শুরু করলে নীরবে তা শুনতে থাকে, তার এই জুমআহ্ হতে পরবর্তী জুমআ’হ্ পর্যন্ত যত পাপ হয় সবই কাফফারা বা মাফ হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুনানে আবু দাউদে ও সুনানে ইবনে মাজা হতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে। সালাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি মিম্বরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি দৈনন্দিনের পরিশ্রমের কাপড় ছাড়া দু'টি কাপড় ক্রয় করে নিয়ে জুমআর নামাযের জন্যে খাস বা নির্দিষ্টি করে রাখে তবে ক্ষতি কি?” একথা তিনি ঐ সময় বলেন যখন দেখেন যে, জনগণ সাধারণ কাপড় পরিধান করে রয়েছে। তাই তিনি বলেন যে, শক্তি থাকলে কেন এরূপ করবে না? এ আয়াতে যে আযানের বর্ণনা রয়েছে ওর দ্বারা ঐ আযান উদ্দেশ্য যা ইমামের মিম্বরের উপর বসার পর দেয়া হয়। নবী (সঃ)-এর যুগে এ আযান ছিল। যখন নবী (সঃ) বাড়ী হতে বেরিয়ে এসে মিম্বরে উপবেশন করতেন তখন তাঁর সামনে এই আযান দেয়া হতো। এর পূর্ববর্তী আযান নবী (সঃ)-এর যুগে ছিল না। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এই আযান চালু করেন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, নবী (সঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-এর যুগে জুমুআহর আযান শুধু ঐ সময় হতো যখন ইমাম খুৎবাহ দেয়ার জন্যে মিম্বরে বসতেন। হযরত উসমান। (রাঃ)-এর যুগে যখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলো তখন তিনি এই দ্বিতীয় আযান একটি পৃথক স্থানের উপর বলিয়ে নেন। ঐ স্থানটির নাম ছিল যাওরা, মসজিদের নিকটবর্তী সর্বাপেক্ষা উঁচু জায়গা এটাই ছিল। হযরত মাকল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন ইমাম জুমআর খুত্বার জন্যে বেরিয়ে আসতেন তখনই শুধু মুআযযিন আযান দিতেন। এর পর শুধু তাকবীর দেয়া হতো এবং মুসল্লীগণ নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। এই সময়েই ক্রয়-বিক্রয় হারাম হয়ে যায়। হযরত উসমান (রাঃ) শুধু লোক জমা করবার জন্যেই প্রথম আযান চালু করেন।জুমআ'হয় হাযির হওয়ার হুকুম শুধু আযাদ-পুরুষদের উপর রয়েছে। নারী, গোলাম ও শিশুদের উপর এ হুকুম নেই। রুগ্ন, মুসাফির এবং অন্যান্য মাযুর ব্যক্তিদের উপরও এ হুকুম প্রযোজ্য নয়। যেমন ফুরূর কিতাব সমূহের মধ্যে এর প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। অর্থাৎ বেচা-কেনা ত্যাগ করে তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও।উলামায়ে কিরাম এই ব্যাপারে একমত যে, জুমআর দিন যখন আযান হয়ে যাবে তখন এর পরে বেচা-কেনা সম্পূর্ণরূপে হারাম হয়ে যাবে। তবে দাতা যখন দিবে তখন সেটাও শুদ্ধ হবে কি-না এই ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। প্রকাশ্য আয়াত দ্বারা তো এটাই বুঝা যাচ্ছে যে, ওটাও শুদ্ধ হবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ বেচা-কেনা ছেড়ে আল্লাহর যিকর ও নামাযের দিকে তোমাদের গমন তোমাদের জন্যে শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি কর। হ্যাঁ, তবে যখন তোমাদের নামায পড়া হয়ে যাবে তখন সেখান হতে চলে যাওয়া এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধানে লেগে পড়া তোমাদের জন্যে বৈধ।আরাক ইবনে মালিক (রাঃ) জুমআর নামায হতে ফারেগ হয়ে মসজিদের দরযার উপর দাঁড়িয়ে যেতেন এবং নিম্নের দু'আটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার আহ্বানে সাড়া দিয়েছি ও আপনার হুকুম অনুযায়ী এই সমাবেশ হতে উঠে এসেছি (ও পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছি), সুতরাং আপনি আমাকে আপনার অনুগ্রহ দান করুন, আপনি তো সর্বোত্তম রিযকদাতা।” (এটা ইমাম ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এই আয়াতকে সামনে রেখে পূর্বযুগীয় কয়েকজন মনীষী বলেছেন যে, যে ব্যক্তি জুমআর দিন নামাযের পরে ক্রয়-বিক্রয় করে আল্লাহ তা'আলা তাকে সত্তর গুণ বেশী বরকত দান করবেন।মহান আল্লাহর উক্তিঃ নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে, আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে। অর্থাৎ ক্রয়-বিক্রয়ের অবস্থাতে আল্লাহকে স্মরণ করবে। দুনিয়ার লাভের মধ্যে এমনভাবে নিমগ্ন হয়ে পড়বে না যে, পরকালের লাভের কথা একেবারে ভুলে যাবে। এজন্যেই হাদীসে এসেছেঃ “যে ব্যক্তি কোন বাজারে গিয়ে পাঠ করেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন অংশীদার নেই, রাজত্ব ও প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান।” আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে এক লক্ষ পুণ্য লিখে নেন এবং এক লক্ষ পাপ ক্ষমা করে থাকেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, বান্দা তখনই আল্লাহর অধিক যিকরকারী হতে পারে যখন সে দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে সর্বাবস্থাতেই আল্লাহর যিকর করে।
আল-জুমুআ 62:10
৯-১০ নং আয়াতের তাফসীর: (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দ হতে বের করা হয়েছে, কারণ এই যে, এই দিনে মুসলমানরা বড় বড় মসজিদে ইবাদতের জন্যে জমা বা একত্রিত হয়ে থাকে। আর এটিও একটি কারণ যে, এই দিনে সমস্ত মাখলুকের সৃষ্টি-কার্য পূর্ণ হয়েছিল। ছয় দিনে সারা জগত বানানো হয়। ষষ্ঠ দিন ছিল জুমআর দিন। এই দিনেই হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়। এই দিনেই জান্নাতে তাঁর অবস্থান ঘটে এবং এই দিনেই তাঁকে জান্নাত হতে বের করে দেয়া হয়। এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এই দিনের মধ্যে এমন একটি সময় রয়েছে যে, ঐ সময়ে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট যা যা করা হয় তা-ই তিনি দান করে থাকেন।হযরত সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে সালমান (রাঃ)! জুমআর দিন কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “জমুআহর দিন এমন এক দিন যে, এ দিনে তোমাদের পিতা-মাতাকে (হযরত আদম আঃ ও হযরত হাওয়া আঃ কে) আল্লাহ একত্রিত করেন। অথবা বলেনঃ “তোমাদের পিতাকে (হযরত আদমকে আঃ) জমা করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে (মাওকুফরূপেও) অনুরূপ বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। প্রাচীন অভিধানে এটাকে ইয়াওমুল আরূবাহ বলা হতো। পূর্ববর্তী উম্মতদেরকেও প্রতি সাতদিনে একটি দিন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু জুমআর দিনের হিদায়াত তারা লাভ করেনি। ইয়াহূদীরা শনিবারকে পছন্দ করে যেদিন মাখলুকের সৃষ্টি কার্য শুরুই হয়নি। নাসারাগণ রবিবারকে পছন্দ করে যেই দিন মাখলুক সৃষ্টির সূচনা হয়। আর এই উম্মতের জন্যে আল্লাহ তা'আলা জুমআ'হূকে পছন্দ করেছেন যেই দিন তিনি মাখলুকের সৃষ্টিকার্য পরিপূর্ণ করেছেন। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমরা (দুনিয়ায়) সর্বশেষে আগমনকারী, আর কিয়ামতের দিন আমরা সর্বাগ্রে হবো। যাদেরকে আমাদের পূর্বে (আসমানী) কিতাব দেয়া হয় তারা এ দিনের ব্যাপারে মতভেদ করে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। এ ব্যাপারেও তারা আমাদের পিছনে রয়েছে। ইয়াহূদীরা আগামী কাল এবং খৃষ্টানরা আগামী কালের পরের দিন।” এটা সহীহ বুখারীর শব্দ আর সহীহ মুসলিমের শব্দ হলোঃ আল্লাহ তা'আলা জুমআহ্ হতে ভ্রষ্ট করেছেন আমাদের পূর্ববর্তীদেরকে। ইয়াহুদীদের জন্যে ছিল শনিবার এবং খৃষ্টানদের জন্যে ছিল রবিবার। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আমাদেরকে আনয়ন করেন এবং জুমআ’হর জন্যে আমাদেরকে হিদায়াত দান করেন। সুতরাং তিনি রেখেছেন শুক্রবার, শনিবার ও রবিবার। এভাবে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা কিয়ামতের দিন আমাদের পিছনে থাকবে। দুনিয়াবাসীর হিসেবে আমরা শেষে রয়েছি। কিন্তু কিয়ামতের দিন সমস্ত মাখলুকের মধ্যে সর্বপ্রথম আমাদের ব্যাপারে ফায়সালা করা হবে।”এখানে আল্লাহ তা'আলা জুমআর দিন স্বীয় মুসলিম বান্দাদেরকে তাঁর ইবাদতের জন্যে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। (আরবী) দ্বারা এখানে দৌড়ানো উদ্দেশ্য নয়, বরং ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমরা আল্লাহর যিকর অর্থাৎ নামাযের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়, কাজ-কর্ম ছেড়ে দিয়ে মসজিদ পানে অগ্রসর হও। যেমন মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মুমিন অবস্থায় যে আখিরাতের কামনা করে এবং ওর জন্যে চেষ্টা সাধনা করে।” (১৭:১৯)হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআত (আরবী) এর স্থলে (আরবী) রয়েছে। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, নামাযের জন্যে দৌড়িয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা ইকামত শুনলে নামাযের জন্যে ধীরে সুস্থে যাবে, দৌড়াবে না। নামাযের যে অংশ (জামাআতের সাথে) পাবে তা পড়ে নিবে এবং যা ছুটে যাবে তা পুরো করবে।” অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে ছিলেন এমতাবস্থায় তিনি দরযার কাছে জনগণের পায়ের জোর শব্দ শুনতে পান। নামায শেষে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি?” সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তাড়াতাড়ি করে নামাযে শরীক হয়েছি।” তখন তিনি বললেনঃ “না, না, এরূপ করো না। ধীরে সুস্থে নামাযে আসবে। যা পাবে পড়বে এবং যা ছুটে যাবে তা পুরো করে নিবে।" হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! এখানে এ হুকুম কখনো নয় যে, মানুষ নামাযের জন্যে দৌড়িয়ে আসবে। এটা তো নিষেধ। বরং এখানে উদ্দেশ্য হলো অত্যন্ত আগ্রহ, মনোযোগ ও বিনয়ের সাথে নামায পড়া। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ স্বীয় মন ও আমল দ্বারা চেষ্টা কর। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তিনি (হযরত ইসমাঈল আঃ) এমন বয়সে পদার্পণ করলেন যে, তাঁর সাথে (হযরত ইবরাহীম আঃ এর সাথে) চলাফেরা করতে সক্ষম হলেন।” (৩৭:১০২) জুমআর নামাযের জন্যে আগমনকারীর জুমআ’হর পূর্বে গোসল করা উচিত। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যখন জুমআ’হর জন্যে আসবে তখন যেন সে গোসল করে নেয়। এ দু' গ্রন্থেই হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জুমআর দিন প্রত্যেক মুসলমানের উপর গোসল ওয়াজিব।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক মুসলমানের উপর আল্লাহর হক এই যে, সে প্রতি সাত দিনে এক দিন গোসল করবে, যাতে সে তার মাথা ও শরীর ধৌত করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক মুসলিমের জন্যে প্রতি সাত দিনে একদিন গোসল রয়েছে এবং তা হলো জুমআর দিন।” (ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম হিব্বান (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)হযরত আউস ইবনে আউস সাকাফী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি জুমআ'র দিন ভালভাবে গোসল করে এবং সকালেই মসজিদ পানে রওয়ানা হয়ে যায়, পায়ে হেঁটে যায়, সওয়ার হয় না, ইমামের নিকটবর্তী হয়ে বসে মনোযোগের সাথে খুৎবাহ শুনে এবং বাজে কথা বলে না, সে প্রতি পদক্ষেপের বিনিময়ে সারা বছরের রোযা ও সারা বছরের কিয়ামের (রাত্রে দাঁড়িয়ে ইবাদত করার) পুণ্য লাভ করে।” (এ হাদীসটি আহলে সুনানে আরবাআহ ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে খুবই উত্তম বলেছেন) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জুমআর দিন যে ব্যক্তি নাপাক অবস্থার গোসলের ন্যায় গোসল করে আওয়াল বা প্রথম সময়ে মসজিদে গেল সে যেন একটা উট কুরবানী করলো, যে দ্বিতীয় সময়ে হাযির হলো সে যেন একটা গরু কুরবানী করলো, যে তৃতীয় সময়ে পৌঁছলো সে একটা মেষ কুরবানী করার সওয়াব পেলো, যে হাযির হলো চতুর্থ ওয়াক্তে সে যেন সাদকাহ করলো একটা মোরগ এবং যে হাযির হলো পঞ্চম ওয়াক্তে, একটা ডিম আল্লাহর পথে সাদকাহ করার মত পুণ্য সে লাভ করলো। অতঃপর যখন ইমাম (খুত্বাহ দেয়ার উদ্দেশ্যে) বের হয় তখন ফেরেশতামণ্ডলী। হাযির হয়ে যিক্র শুনতে থাকেন।" (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) জুমআ'র দিন স্বীয় সাধ্য অনুযায়ী ভাল পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, মিসওয়াক করা এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও পাক-পবিত্র হয়ে জুমআর নামাযের জন্যে আসা উচিত। একটি হাদীসে গোসলের বর্ণনার সাথে সাথেই মিসওয়াক করা ও সুগন্ধি ব্যবহারের বর্ণনাও রয়েছে। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি জুমআর দিন গোসল করে ও স্বীয় পরিবারের লোকদেরকে সুগন্ধি মাখায় যদি থাকে, অতঃপর ভাল কাপড় পরিধান করে মসজিদে আসে ও ইচ্ছা হলে কিছু নফল নামায পড়ে নেয় এবং কাউকেও কষ্ট দেয় না (অর্থাৎ কারো ঘাড়ের উপর দিয়ে যায় না ও কোন উপবিষ্ট লোককে উঠায় না), অতঃপর ইমাম এসে খুৎবাহ শুরু করলে নীরবে তা শুনতে থাকে, তার এই জুমআহ্ হতে পরবর্তী জুমআ’হ্ পর্যন্ত যত পাপ হয় সবই কাফফারা বা মাফ হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)সুনানে আবু দাউদে ও সুনানে ইবনে মাজা হতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে। সালাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি মিম্বরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি দৈনন্দিনের পরিশ্রমের কাপড় ছাড়া দু'টি কাপড় ক্রয় করে নিয়ে জুমআর নামাযের জন্যে খাস বা নির্দিষ্টি করে রাখে তবে ক্ষতি কি?” একথা তিনি ঐ সময় বলেন যখন দেখেন যে, জনগণ সাধারণ কাপড় পরিধান করে রয়েছে। তাই তিনি বলেন যে, শক্তি থাকলে কেন এরূপ করবে না? এ আয়াতে যে আযানের বর্ণনা রয়েছে ওর দ্বারা ঐ আযান উদ্দেশ্য যা ইমামের মিম্বরের উপর বসার পর দেয়া হয়। নবী (সঃ)-এর যুগে এ আযান ছিল। যখন নবী (সঃ) বাড়ী হতে বেরিয়ে এসে মিম্বরে উপবেশন করতেন তখন তাঁর সামনে এই আযান দেয়া হতো। এর পূর্ববর্তী আযান নবী (সঃ)-এর যুগে ছিল না। আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান (রাঃ) শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এই আযান চালু করেন। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, নবী (সঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-এর যুগে জুমুআহর আযান শুধু ঐ সময় হতো যখন ইমাম খুৎবাহ দেয়ার জন্যে মিম্বরে বসতেন। হযরত উসমান। (রাঃ)-এর যুগে যখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলো তখন তিনি এই দ্বিতীয় আযান একটি পৃথক স্থানের উপর বলিয়ে নেন। ঐ স্থানটির নাম ছিল যাওরা, মসজিদের নিকটবর্তী সর্বাপেক্ষা উঁচু জায়গা এটাই ছিল। হযরত মাকল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন ইমাম জুমআর খুত্বার জন্যে বেরিয়ে আসতেন তখনই শুধু মুআযযিন আযান দিতেন। এর পর শুধু তাকবীর দেয়া হতো এবং মুসল্লীগণ নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। এই সময়েই ক্রয়-বিক্রয় হারাম হয়ে যায়। হযরত উসমান (রাঃ) শুধু লোক জমা করবার জন্যেই প্রথম আযান চালু করেন।জুমআ'হয় হাযির হওয়ার হুকুম শুধু আযাদ-পুরুষদের উপর রয়েছে। নারী, গোলাম ও শিশুদের উপর এ হুকুম নেই। রুগ্ন, মুসাফির এবং অন্যান্য মাযুর ব্যক্তিদের উপরও এ হুকুম প্রযোজ্য নয়। যেমন ফুরূর কিতাব সমূহের মধ্যে এর প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। অর্থাৎ বেচা-কেনা ত্যাগ করে তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও।উলামায়ে কিরাম এই ব্যাপারে একমত যে, জুমআর দিন যখন আযান হয়ে যাবে তখন এর পরে বেচা-কেনা সম্পূর্ণরূপে হারাম হয়ে যাবে। তবে দাতা যখন দিবে তখন সেটাও শুদ্ধ হবে কি-না এই ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। প্রকাশ্য আয়াত দ্বারা তো এটাই বুঝা যাচ্ছে যে, ওটাও শুদ্ধ হবে না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ বেচা-কেনা ছেড়ে আল্লাহর যিকর ও নামাযের দিকে তোমাদের গমন তোমাদের জন্যে শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি কর। হ্যাঁ, তবে যখন তোমাদের নামায পড়া হয়ে যাবে তখন সেখান হতে চলে যাওয়া এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধানে লেগে পড়া তোমাদের জন্যে বৈধ।আরাক ইবনে মালিক (রাঃ) জুমআর নামায হতে ফারেগ হয়ে মসজিদের দরযার উপর দাঁড়িয়ে যেতেন এবং নিম্নের দু'আটি পাঠ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার আহ্বানে সাড়া দিয়েছি ও আপনার হুকুম অনুযায়ী এই সমাবেশ হতে উঠে এসেছি (ও পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছি), সুতরাং আপনি আমাকে আপনার অনুগ্রহ দান করুন, আপনি তো সর্বোত্তম রিযকদাতা।” (এটা ইমাম ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এই আয়াতকে সামনে রেখে পূর্বযুগীয় কয়েকজন মনীষী বলেছেন যে, যে ব্যক্তি জুমআর দিন নামাযের পরে ক্রয়-বিক্রয় করে আল্লাহ তা'আলা তাকে সত্তর গুণ বেশী বরকত দান করবেন।মহান আল্লাহর উক্তিঃ নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে, আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে। অর্থাৎ ক্রয়-বিক্রয়ের অবস্থাতে আল্লাহকে স্মরণ করবে। দুনিয়ার লাভের মধ্যে এমনভাবে নিমগ্ন হয়ে পড়বে না যে, পরকালের লাভের কথা একেবারে ভুলে যাবে। এজন্যেই হাদীসে এসেছেঃ “যে ব্যক্তি কোন বাজারে গিয়ে পাঠ করেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন অংশীদার নেই, রাজত্ব ও প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান।” আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে এক লক্ষ পুণ্য লিখে নেন এবং এক লক্ষ পাপ ক্ষমা করে থাকেন। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, বান্দা তখনই আল্লাহর অধিক যিকরকারী হতে পারে যখন সে দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে সর্বাবস্থাতেই আল্লাহর যিকর করে।
আল-জুমুআ 62:11
জুমআ’হ্র দিন মদীনায় ব্যবসার মাল আসার কারণে যেসব সাহাবী খুৎবাহ ছেড়ে দিয়ে উঠে গিয়েছিলেন তাঁদেরকে এখানে আল্লাহ তা'আলা ধমক দিচ্ছেন যে, এই সব লোক যখন কোন ব্যবসা ও খেল-তামাশা দেখে তখন ওদিকে ছুটে যায় এবং নবী (সঃ)-কে দণ্ডায়মান অবস্থায় ছেড়ে দেয়। হযরত মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) বলেন যে, ওটা ছিল দাহইয়া ইবনে খালফিয়্যাহ (রাঃ)-এর ব্যবসার মাল। তিনি জুমআ’রহ দিন ব্যবসার মালসহ মদীনায় আগমন করেন এবং খবর প্রচারের উদ্দেশ্যে ঢোল বাজাতে শুরু করেন। তিনি তখন পর্যন্ত মুসলমান হননি।ঢোলের শব্দ শুনে মাত্র কয়েকজন ছাড়া সবাই মসজিদ হতে বেরিয়ে পড়েন। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, মাত্র বারো জন লোক বসে থাকেন এবং বাকী সবাই ঐ বাণিজ্যিক কাফেলার দিকে ছুটে যান। ঐ সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে আবূ ইয়ালায় হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে যে হাদীসটি বর্ণিত আছে তাতে এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যদি তোমরা সবাই চলে যেতে এবং তোমাদের একজনও বাকী না থাকতো তবে যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এই উপত্যকা আগুন হয়ে তোমাদের উপর পতিত হতো। “যাঁরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট রয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে হযরত আবূ বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-ও ছিলেন। এই আয়াত দ্বারা এটাও জানা গেল যে, জুমআ’র খুৎবা দাঁড়িয়ে পড়তে হবে। সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির ইবনে সামরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) জুমআ’'র দিন দু’টি খুৎবাহ পাঠ করতেন, মাঝে বসতেন, কুরআন কারীম তিলাওয়াত করতেন এবং জনগণকে উপদেশ দিতেন। এখানে একথাটিও স্মরণ রাখার বিষয় যে, কারো কারো মতে এটা হলো ঐ সময়ের ঘটনা যখন নবী (সঃ) জুমআ’হর নামাযের পরে খুৎবাহ পাঠ করতেন। মারাসীলে আবি দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুৎবাহর পূর্বে জুমআ’হর নামায পড়তেন, যেমন ঈদের নামায পড়া হয়। একদা তিনি খুৎবাহ দিচ্ছিলেন। এমন সময় একটি লোক এসে বললোঃ “দাহিয়্যাহ্ খালফিয়্যাহ (রাঃ) ব্যবসার মাল নিয়ে এসেছে।” একথা শোনামাত্রই কয়েকজন ছাড়া সবাই উঠে যান। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি জনগণকে জানিয়ে দাও যে, আখিরাতের সাওয়াব, যা আল্লাহর নিকট রয়েছে তা ক্রয়-বিক্রয় ও খেল-তামাশা হতে বহুগুণে উত্তম। আল্লাহর উপর ভরসা করে অনুমতিযুক্ত সময়ে যে ব্যক্তি রিযক তলব করবে, আল্লাহ তাকে উত্তমরূপে রিযক দান করবেন।
আল-মুনাফিকুন 63:1
১-৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, যখন তারা নবী (সঃ)-এর নিকট আসে তখন শপথ করে করে ইসলাম প্রকাশ করে এবং তাঁর রিসালাত স্বীকার করে। কিন্তু প্রকতপক্ষে তাদের অন্তর ইসলাম হতে বহু দূরে রয়েছে। নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর নবী এবং মুনাফিকদের উক্তিও এটাই। কিন্তু তাদের অন্তরে এর কোন ক্রিয়া নেই। সুতরাং তারা মিথ্যাবাদী।মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ এই মুনাফিকরা তোমার কাছে এসে কসম খেয়ে খেয়ে তোমার রিসালাতের স্বীকারোক্তি করে। কিন্তু তুমি বিশ্বাস রেখো যে, তাদের এই কসমের কোনই মূল্য নেই। এটা তাদের মিথ্যাকে সত্য বানাবার একটা মাধ্যম মাত্র।এর দ্বারা মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য হলো এই যে, মুমিনগণ যেন তাদের হতে সতর্ক থাকে। তারা যেন এই মুনাফিকদেরকে খাঁটি মুমিন মনে করে তাদের কোন কাজে তাদের অনুসরণ না করে। কেননা, তারা ইসলামের নামে কুফরী করিয়ে ফেলবে। তারা আল্লাহর পথ হতে বহু দূরে রয়েছে এবং তাদের আমল অতি জঘন্য।যহহাক (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) অর্থাৎ (আরবি) তে যের দিয়ে রয়েছে। তখন ভাবার্থ হবেঃ তারা তাদের বাহ্যিক স্বীকারোক্তিকে নিজেদের জীবন রক্ষার মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছে যে, তারা হত্যা ও কুফরীর হুকুম হতে দুনিয়ায় বেঁচে যাবে। তাদের অন্তরে নিফাক স্থান করে নিয়েছে। তাই তারা ঈমান হতে ফিরে গিয়ে কুফরীর দিকে এবং হিদায়াত হতে সরে গিয়ে গুমরাহীর দিকে চলে এসেছে। এখন তাদের হৃদয় মোহর করে দেয়া হয়েছে। ফলে তাদের মধ্যে যে বোধশক্তি ছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে। বাহ্যতঃ তো তারা মুখে মিষ্টি কথা বলে এবং তারা বেশ বাকপটু। কিন্তু তাদের অন্তর কালিমাময়।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা যে কোন শোরগোলকে মনে করে তাদেরই বিরুদ্ধে।' অর্থাৎ যখনই কোন ভয়াবহ ঘটনা ঘটে তখন তারা ধারণা করে নেয় যে, তাদের উপর হয়তো তা আপতিত হচ্ছে। তাই তারা মৃত্যুর ভয়ে হা-হুতাশ করে। যেমন আল্লাহ তা’আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাদের ব্যাপারে কৃপণতা বশতঃ (যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে সাহায্য করার ব্যাপারে মুনাফিকরা কৃপণতা প্রকাশ করেছিল), যখন বিপদ আসে তখন তুমি দেখবে, মৃত্যু ভয়ে মূৰ্ছাতুর ব্যক্তির মত চক্ষু উলটিয়ে তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু যখন বিপদ চলে যায় তখন তারা ধনের লালসায় তোমাদেরকে তীক্ষ্ণ ভাষায় বিদ্ধ করে। তারা ঈমান আনেনি, এই জন্যে আল্লাহ তাদের কার্যাবলী নিষ্ফল করেছেন, আর আল্লাহর পক্ষে এটা সহজ।” (৩৩:১৯) এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক হও, আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চলেছে?হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুনাফিকদের বহু নিদর্শন রয়েছে যেগুলো দ্বারা তাদেরকে চেনা যায়। তাদের সালাম হলো লা’নত, তাদের খাদ্য হলো লুঠতরাজ, তাদের গানীমাত হলো হারাম ও খিয়ানত, তারা মসজিদের নিকটবর্তী হওয়াকে অপছন্দ করে, নামাযের জন্যে তারা শেষ সময়ে এসে থাকে, তারা অহংকারী ও আত্মগর্বী হয় এবং তারা নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ হতে বঞ্চিত থাকে। তারা নিজেরাও ভাল কাজ করে না এবং অন্যদেরকেও ভাল কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে না। তারা রাত্রে খড়ি এবং দিনে শোরগোলকারী।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত রয়েছে) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তারা দিনে খুবই পানাহারকারী হয় এবং রাত্রে শুষ্ক কাঠের মত তারা পড়ে থাকে।
আল-মুনাফিকুন 63:2
১-৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, যখন তারা নবী (সঃ)-এর নিকট আসে তখন শপথ করে করে ইসলাম প্রকাশ করে এবং তাঁর রিসালাত স্বীকার করে। কিন্তু প্রকতপক্ষে তাদের অন্তর ইসলাম হতে বহু দূরে রয়েছে। নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর নবী এবং মুনাফিকদের উক্তিও এটাই। কিন্তু তাদের অন্তরে এর কোন ক্রিয়া নেই। সুতরাং তারা মিথ্যাবাদী।মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ এই মুনাফিকরা তোমার কাছে এসে কসম খেয়ে খেয়ে তোমার রিসালাতের স্বীকারোক্তি করে। কিন্তু তুমি বিশ্বাস রেখো যে, তাদের এই কসমের কোনই মূল্য নেই। এটা তাদের মিথ্যাকে সত্য বানাবার একটা মাধ্যম মাত্র।এর দ্বারা মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য হলো এই যে, মুমিনগণ যেন তাদের হতে সতর্ক থাকে। তারা যেন এই মুনাফিকদেরকে খাঁটি মুমিন মনে করে তাদের কোন কাজে তাদের অনুসরণ না করে। কেননা, তারা ইসলামের নামে কুফরী করিয়ে ফেলবে। তারা আল্লাহর পথ হতে বহু দূরে রয়েছে এবং তাদের আমল অতি জঘন্য।যহহাক (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) অর্থাৎ (আরবি) তে যের দিয়ে রয়েছে। তখন ভাবার্থ হবেঃ তারা তাদের বাহ্যিক স্বীকারোক্তিকে নিজেদের জীবন রক্ষার মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছে যে, তারা হত্যা ও কুফরীর হুকুম হতে দুনিয়ায় বেঁচে যাবে। তাদের অন্তরে নিফাক স্থান করে নিয়েছে। তাই তারা ঈমান হতে ফিরে গিয়ে কুফরীর দিকে এবং হিদায়াত হতে সরে গিয়ে গুমরাহীর দিকে চলে এসেছে। এখন তাদের হৃদয় মোহর করে দেয়া হয়েছে। ফলে তাদের মধ্যে যে বোধশক্তি ছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে। বাহ্যতঃ তো তারা মুখে মিষ্টি কথা বলে এবং তারা বেশ বাকপটু। কিন্তু তাদের অন্তর কালিমাময়।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা যে কোন শোরগোলকে মনে করে তাদেরই বিরুদ্ধে।' অর্থাৎ যখনই কোন ভয়াবহ ঘটনা ঘটে তখন তারা ধারণা করে নেয় যে, তাদের উপর হয়তো তা আপতিত হচ্ছে। তাই তারা মৃত্যুর ভয়ে হা-হুতাশ করে। যেমন আল্লাহ তা’আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাদের ব্যাপারে কৃপণতা বশতঃ (যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে সাহায্য করার ব্যাপারে মুনাফিকরা কৃপণতা প্রকাশ করেছিল), যখন বিপদ আসে তখন তুমি দেখবে, মৃত্যু ভয়ে মূৰ্ছাতুর ব্যক্তির মত চক্ষু উলটিয়ে তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু যখন বিপদ চলে যায় তখন তারা ধনের লালসায় তোমাদেরকে তীক্ষ্ণ ভাষায় বিদ্ধ করে। তারা ঈমান আনেনি, এই জন্যে আল্লাহ তাদের কার্যাবলী নিষ্ফল করেছেন, আর আল্লাহর পক্ষে এটা সহজ।” (৩৩:১৯) এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক হও, আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চলেছে?হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুনাফিকদের বহু নিদর্শন রয়েছে যেগুলো দ্বারা তাদেরকে চেনা যায়। তাদের সালাম হলো লা’নত, তাদের খাদ্য হলো লুঠতরাজ, তাদের গানীমাত হলো হারাম ও খিয়ানত, তারা মসজিদের নিকটবর্তী হওয়াকে অপছন্দ করে, নামাযের জন্যে তারা শেষ সময়ে এসে থাকে, তারা অহংকারী ও আত্মগর্বী হয় এবং তারা নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ হতে বঞ্চিত থাকে। তারা নিজেরাও ভাল কাজ করে না এবং অন্যদেরকেও ভাল কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে না। তারা রাত্রে খড়ি এবং দিনে শোরগোলকারী।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত রয়েছে) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তারা দিনে খুবই পানাহারকারী হয় এবং রাত্রে শুষ্ক কাঠের মত তারা পড়ে থাকে।
আল-মুনাফিকুন 63:3
১-৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, যখন তারা নবী (সঃ)-এর নিকট আসে তখন শপথ করে করে ইসলাম প্রকাশ করে এবং তাঁর রিসালাত স্বীকার করে। কিন্তু প্রকতপক্ষে তাদের অন্তর ইসলাম হতে বহু দূরে রয়েছে। নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর নবী এবং মুনাফিকদের উক্তিও এটাই। কিন্তু তাদের অন্তরে এর কোন ক্রিয়া নেই। সুতরাং তারা মিথ্যাবাদী।মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ এই মুনাফিকরা তোমার কাছে এসে কসম খেয়ে খেয়ে তোমার রিসালাতের স্বীকারোক্তি করে। কিন্তু তুমি বিশ্বাস রেখো যে, তাদের এই কসমের কোনই মূল্য নেই। এটা তাদের মিথ্যাকে সত্য বানাবার একটা মাধ্যম মাত্র।এর দ্বারা মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য হলো এই যে, মুমিনগণ যেন তাদের হতে সতর্ক থাকে। তারা যেন এই মুনাফিকদেরকে খাঁটি মুমিন মনে করে তাদের কোন কাজে তাদের অনুসরণ না করে। কেননা, তারা ইসলামের নামে কুফরী করিয়ে ফেলবে। তারা আল্লাহর পথ হতে বহু দূরে রয়েছে এবং তাদের আমল অতি জঘন্য।যহহাক (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) অর্থাৎ (আরবি) তে যের দিয়ে রয়েছে। তখন ভাবার্থ হবেঃ তারা তাদের বাহ্যিক স্বীকারোক্তিকে নিজেদের জীবন রক্ষার মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছে যে, তারা হত্যা ও কুফরীর হুকুম হতে দুনিয়ায় বেঁচে যাবে। তাদের অন্তরে নিফাক স্থান করে নিয়েছে। তাই তারা ঈমান হতে ফিরে গিয়ে কুফরীর দিকে এবং হিদায়াত হতে সরে গিয়ে গুমরাহীর দিকে চলে এসেছে। এখন তাদের হৃদয় মোহর করে দেয়া হয়েছে। ফলে তাদের মধ্যে যে বোধশক্তি ছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে। বাহ্যতঃ তো তারা মুখে মিষ্টি কথা বলে এবং তারা বেশ বাকপটু। কিন্তু তাদের অন্তর কালিমাময়।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা যে কোন শোরগোলকে মনে করে তাদেরই বিরুদ্ধে।' অর্থাৎ যখনই কোন ভয়াবহ ঘটনা ঘটে তখন তারা ধারণা করে নেয় যে, তাদের উপর হয়তো তা আপতিত হচ্ছে। তাই তারা মৃত্যুর ভয়ে হা-হুতাশ করে। যেমন আল্লাহ তা’আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাদের ব্যাপারে কৃপণতা বশতঃ (যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে সাহায্য করার ব্যাপারে মুনাফিকরা কৃপণতা প্রকাশ করেছিল), যখন বিপদ আসে তখন তুমি দেখবে, মৃত্যু ভয়ে মূৰ্ছাতুর ব্যক্তির মত চক্ষু উলটিয়ে তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু যখন বিপদ চলে যায় তখন তারা ধনের লালসায় তোমাদেরকে তীক্ষ্ণ ভাষায় বিদ্ধ করে। তারা ঈমান আনেনি, এই জন্যে আল্লাহ তাদের কার্যাবলী নিষ্ফল করেছেন, আর আল্লাহর পক্ষে এটা সহজ।” (৩৩:১৯) এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক হও, আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চলেছে?হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুনাফিকদের বহু নিদর্শন রয়েছে যেগুলো দ্বারা তাদেরকে চেনা যায়। তাদের সালাম হলো লা’নত, তাদের খাদ্য হলো লুঠতরাজ, তাদের গানীমাত হলো হারাম ও খিয়ানত, তারা মসজিদের নিকটবর্তী হওয়াকে অপছন্দ করে, নামাযের জন্যে তারা শেষ সময়ে এসে থাকে, তারা অহংকারী ও আত্মগর্বী হয় এবং তারা নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ হতে বঞ্চিত থাকে। তারা নিজেরাও ভাল কাজ করে না এবং অন্যদেরকেও ভাল কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে না। তারা রাত্রে খড়ি এবং দিনে শোরগোলকারী।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত রয়েছে) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তারা দিনে খুবই পানাহারকারী হয় এবং রাত্রে শুষ্ক কাঠের মত তারা পড়ে থাকে।
আল-মুনাফিকুন 63:4
১-৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, যখন তারা নবী (সঃ)-এর নিকট আসে তখন শপথ করে করে ইসলাম প্রকাশ করে এবং তাঁর রিসালাত স্বীকার করে। কিন্তু প্রকতপক্ষে তাদের অন্তর ইসলাম হতে বহু দূরে রয়েছে। নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ (সঃ) আল্লাহর নবী এবং মুনাফিকদের উক্তিও এটাই। কিন্তু তাদের অন্তরে এর কোন ক্রিয়া নেই। সুতরাং তারা মিথ্যাবাদী।মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ এই মুনাফিকরা তোমার কাছে এসে কসম খেয়ে খেয়ে তোমার রিসালাতের স্বীকারোক্তি করে। কিন্তু তুমি বিশ্বাস রেখো যে, তাদের এই কসমের কোনই মূল্য নেই। এটা তাদের মিথ্যাকে সত্য বানাবার একটা মাধ্যম মাত্র।এর দ্বারা মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য হলো এই যে, মুমিনগণ যেন তাদের হতে সতর্ক থাকে। তারা যেন এই মুনাফিকদেরকে খাঁটি মুমিন মনে করে তাদের কোন কাজে তাদের অনুসরণ না করে। কেননা, তারা ইসলামের নামে কুফরী করিয়ে ফেলবে। তারা আল্লাহর পথ হতে বহু দূরে রয়েছে এবং তাদের আমল অতি জঘন্য।যহহাক (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবি) অর্থাৎ (আরবি) তে যের দিয়ে রয়েছে। তখন ভাবার্থ হবেঃ তারা তাদের বাহ্যিক স্বীকারোক্তিকে নিজেদের জীবন রক্ষার মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছে যে, তারা হত্যা ও কুফরীর হুকুম হতে দুনিয়ায় বেঁচে যাবে। তাদের অন্তরে নিফাক স্থান করে নিয়েছে। তাই তারা ঈমান হতে ফিরে গিয়ে কুফরীর দিকে এবং হিদায়াত হতে সরে গিয়ে গুমরাহীর দিকে চলে এসেছে। এখন তাদের হৃদয় মোহর করে দেয়া হয়েছে। ফলে তাদের মধ্যে যে বোধশক্তি ছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে। বাহ্যতঃ তো তারা মুখে মিষ্টি কথা বলে এবং তারা বেশ বাকপটু। কিন্তু তাদের অন্তর কালিমাময়।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা যে কোন শোরগোলকে মনে করে তাদেরই বিরুদ্ধে।' অর্থাৎ যখনই কোন ভয়াবহ ঘটনা ঘটে তখন তারা ধারণা করে নেয় যে, তাদের উপর হয়তো তা আপতিত হচ্ছে। তাই তারা মৃত্যুর ভয়ে হা-হুতাশ করে। যেমন আল্লাহ তা’আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাদের ব্যাপারে কৃপণতা বশতঃ (যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে সাহায্য করার ব্যাপারে মুনাফিকরা কৃপণতা প্রকাশ করেছিল), যখন বিপদ আসে তখন তুমি দেখবে, মৃত্যু ভয়ে মূৰ্ছাতুর ব্যক্তির মত চক্ষু উলটিয়ে তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু যখন বিপদ চলে যায় তখন তারা ধনের লালসায় তোমাদেরকে তীক্ষ্ণ ভাষায় বিদ্ধ করে। তারা ঈমান আনেনি, এই জন্যে আল্লাহ তাদের কার্যাবলী নিষ্ফল করেছেন, আর আল্লাহর পক্ষে এটা সহজ।” (৩৩:১৯) এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক হও, আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চলেছে?হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মুনাফিকদের বহু নিদর্শন রয়েছে যেগুলো দ্বারা তাদেরকে চেনা যায়। তাদের সালাম হলো লা’নত, তাদের খাদ্য হলো লুঠতরাজ, তাদের গানীমাত হলো হারাম ও খিয়ানত, তারা মসজিদের নিকটবর্তী হওয়াকে অপছন্দ করে, নামাযের জন্যে তারা শেষ সময়ে এসে থাকে, তারা অহংকারী ও আত্মগর্বী হয় এবং তারা নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ হতে বঞ্চিত থাকে। তারা নিজেরাও ভাল কাজ করে না এবং অন্যদেরকেও ভাল কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে না। তারা রাত্রে খড়ি এবং দিনে শোরগোলকারী।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত রয়েছে) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তারা দিনে খুবই পানাহারকারী হয় এবং রাত্রে শুষ্ক কাঠের মত তারা পড়ে থাকে।
আল-মুনাফিকুন 63:5
৫-৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা অভিশপ্ত মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ তাদের কৃত পাপের ব্যাপারে খাঁটি মুসলমানরা যখন তাদেরকে বলেঃ এসো, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখন তারা গর্বভরে মাথা দুলিয়ে থাকে। এভাবে তারা বিমুখ হয়ে যায়। এর প্রতিফল হলো এই যে, তাদের জন্যে ক্ষমার দর বন্ধ। তাদের জন্যে নবী (সঃ)-এর ক্ষমা প্রার্থনা তাদের কোনই উপকারে আসবে না। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। সূরায়ে বারাআতে এই বিষয়েই আয়াত গত হয়েছে এবং সেখানে এর তাফসীর এবং সাথে সাথে এই সম্পর্কীয় হাদীসসমূহও বর্ণিত হয়েছে।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে যে, মুনাফিক সুফইয়ান তার মুখখানা ডান দিকে ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং ক্রোধ ও গর্বের সাথে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছিল। ওরই বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে। এগুলো সবই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল সম্পর্কে বর্ণনা, এরূপ মন্তব্য করেছেন পূর্বযুগীয় অধিকাংশ গুরুজন। যেমন এটা সত্বরই আসছে ইনশাআল্লাহ।সীরাতে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের মধ্যে রয়েছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল তার কওমের মধ্যে এক বড় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিল। জুমআ’র দিন নবী (সঃ) যখন খুৎবাহ দেয়ার জন্যে দাঁড়াতেন তখন সে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলতোঃ “হে জনমণ্ডলী! ইনি হলেন আল্লাহর রাসূল (সঃ)। ইনি তোমাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছেন। এরই কারণে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে মর্যাদা দান করেছেন। সুতরাং তাঁকে সাহায্য করা এখন তোমাদের অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তোমরা তাঁকে সম্মান করবে ও মর্যাদা দিবে এবং তিনি যা কিছু বলবেন সবই মেনে চলবে।” এ কথা বলে সে বসে পড়তো। উহুদের যুদ্ধে তার কপটতা প্রকাশ পেয়ে যায়। সেখান হতে সে প্রকাশ্যভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণ করে এক তৃতীয়াংশ সৈন্য নিয়ে মদীনায় ফিরে আসে। যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদীনায় ফিরে আসেন এবং জুমআ’র দিনে মিম্বরের উপর উপবিষ্ট হন তখন অভ্যাসমত আবদুল্লাহ ইবনে উবাই সেদিনও দাঁড়িয়ে যায় এবং সে কথা বলতে যাবে এমতাবস্থায় কয়েক জন সাহাবী এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে যান এবং তার কাপড় ধরে নিয়ে বলে ওঠেনঃ “ওরে আল্লাহর দুশমন! তুই বসে যা। এখন তোর কথা বলার মুখ নেই। তুই যা কিছু করেছিস তা আর কারো কাছে গোপন নেই। তোর আর ঐ যোগ্যতা নেই যে, মন যা চাইবে তাই বলবি।” সে তখন অসন্তুষ্ট হয়ে জনগণের ঘাড়ের উপর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। সে বলতে বলতে গেলঃ “আমি কি কোন মন্দ কথা বলার জন্যে দাঁড়িয়েছিলাম? আমি তো তাঁর কাজ মযবুত করার উদ্দেশ্যেই দাঁড়িয়েছিলাম।” মসজিদের দরজার উপর কয়েক জন আনসারীর সাথে তার সাক্ষাৎ হলো। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” উত্তরে সে বললঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাজকে দৃঢ় করার উদ্দেশ্যেই দাঁড়িয়েছিলাম এমন সময় কয়েকজন সাহাবী আমার উপর লাফিয়ে পড়ে আমাকে টানা-হেঁচড়া করতে শুরু করে এবং আমাকে ধমকাতে থাকে। তাদের ধারণায় আমি যেন কোন মন্দ কথা বলার জন্যে দাঁড়িয়েছিলাম। অথচ আমার উদ্দেশ্য শুধু এই ছিল যে, আমি তাঁর কথা ও কাজেরই পৃষ্টপোষকতা করবো।” একথা শুনে ঐ আনসারীগণ বললেনঃ “ভাল কথা, তুমি ফিরে চল। আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর নিকট আবেদন জানাবো যে, তিনি যেন তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সে তখন বললোঃ “আমার এর কোন প্রয়োজন নেই।”হযরত কাতাদাহ (রঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঘটনাটি ছিল এই যে, তারই কওমের একজন যুবক মুসলমান তার এ ধরনের কার্যকলাপের কথা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট পৌঁছিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে ডাকিয়ে নেন। সে সরাসরি অস্বীকার করে। সে মিথ্যা শপথও করে। তখন আনসারীগণ ঐ সাহাবীকে তিরস্কার এবং শাসন-গর্জন করেন ও মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেন। ঐ সময় এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এতে আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকের মিথ্যা শপথের এবং যুবক সাহাবীটির সত্যবাদীতার বর্ণনা দিয়েছেন। অতঃপর ঐ মুনাফিককে বলা হয়ঃ “চলো, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর মাধ্যমে তোমার পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করিয়ে নাও।” তখন সে অস্বীকার করে এবং মাথা ঘুরিয়ে নিয়ে চলে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কোন মনযিলে অবতরণ করলে সেখানে নামায না পড়া পর্যন্ত যাত্রা শুরু করতেন না। তাবূকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) খবর পেলেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই বলছেঃ “আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে তথা হতে প্রবল ও সম্মানীরা দুর্বল ও লাঞ্ছিতদেরকে বহিষ্কার করবেই।” অর্থাৎ আমরা এই দুর্বল ও মর্যাদাহীন মুহাজিরদেরকে আমাদের শহর মদীনা হতে বের করে দিবো। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দিনের শেষ ভাগে অবতরণের পূর্বেই যাত্রা শুরু করে দেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে বলা হয়ঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে তোমার অপরাধের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর।" তখন আল্লাহ্ তা'আলা (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ ইবনে সীরীন পর্যন্ত তো সঠিক বটে, কিন্তু এটা তাবূকের ঘটনা একথা বলার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে, এমনকি এটা সঠিক কথাই নয়। কেননা, তাবূকের যুদ্ধে তো আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই হাযিরই ছিল না, বরং সে তার একটি দল নিয়ে ফিরে গিয়েছিল। কুতুবে। মাগাযী ও সিয়ারের লেখকগণ এ মন্তব্য করেছেন যে, এ মুরীসী যুদ্ধের ঘটনা এবং ???)এই ঘটনায় হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হিব্বান (রঃ), হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আবি বকর (রঃ) এবং হযরত আসিম ইবনে উমার ইবনে কাতাদাহ্ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই যুদ্ধস্থলে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এক জায়গায় অবস্থান করছিলেন। তথায় পানির জায়গার উপর যে জনসমাবেশ ছিল ওর মধ্যে হযরত জাহজাহ ইবনে সাঈদ গিফারী (রঃ) ও হযরত সিনান ইবনে ইয়াযীদ (রাঃ)-এর মাঝে কিছু ঝগড়া হয়ে যায়। হযরত জাহজাহ (রাঃ) হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর একজন কর্মচারী ছিলেন। ঝগড়া চরম আকার ধারণ করে। হযরত সিনান (রাঃ) সাহায্যের জন্যে আনসারদেরকে আহবান করেন এবং হযরত জাহজাহ্ (রাঃ) আহ্বান করেন মুহাজিরদেরকে। ঐ সময় হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) প্রমুখ আনসারদের একটি দল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর পাশে উববিষ্ট ছিলেন। এই ফরিয়াদ শুনে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই বলতে শুরু করেঃ “আমাদের শহরেই এ লোকগুলো আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করে দিলো? আমাদের ও এই কুরায়েশদের দৃষ্টান্ত ওটাই যাকে একজন বলেছে- ‘স্বীয় কুকুরকে তুমি মোটা-তাজা কর যাতে সে তোমাকেই কামড় দেয়। আল্লাহর শপথ! আমরা মদীনায় ফিরে গেলে তথা হতে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কার করবেই।” অতঃপর সে তার পাশে উপবিষ্ট লোকদেরকে সম্বোধন করে বলতে শুরু করলোঃ “সব বিপদ তোমরা নিজেরাই নিজেদের হাতে টেনে এনেছো। তোমরা এই মুহাজিরদেরকে তোমাদের শহরে জায়গা দিয়েছে এবং নিজেদের সম্পদের অর্ধাংশ দান করেছে। এখনো যদি তোমরা তাদেরকে আর্থিক সাহায্য না কর তবে তারা সংকটে পড়ে মদীনা হতে বেরিয়ে যাবে।” হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) এসব কথাই শুনলেন। ঐ সময় তিনি অল্প বয়স্ক ছিলেন। তিনি সরাসরি নবী (সাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন। ঐ সময় তাঁর নিকট হযরত উমার ইবনে খাত্তাবও (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। রাগান্বিত হয়ে তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (রঃ)! আমাকে নির্দেশ দিন, আমি তার গদান উড়িয়ে দিই।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “এ কাজ করলে এটা প্রচারিত হয়ে পড়বে যে, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) নিজের সঙ্গী-সাথীদেরকেও হত্যা করে থাকেন। এটা ঠিক হবে না। যাও, লোকদেরকে যাত্রা শুরু করার হুকুম দিয়ে দাও।” আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই যখন এ খবর পেলো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তার কথা জেনে ফেলেছেন তখন সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো এবং তাঁর দরবারে হাযির হয়ে ওযর-আপত্তি, হীলা-বাহানা করতে লাগলো এবং কথা পাল্টাতে শুরু করলো। আর শপথ করে বলতে লাগলো যে, সে এরূপ কথা কখনো বলেনি। এই লোকটি তার সম্প্রদায়ের মধ্যে খুবই মর্যাদাবান ও প্রভাবশালী ছিল। তাছাড়া লোকেরাও বলতে লাগলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! সম্ভবতঃ এই বালকটিই ভুল বলেছে। সে হয়তো ধারণা করেছে, প্রকৃত ঘটনা হয়তো এটা নয়।” রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) সময়ের পূর্বেই এখান হতে তাড়াতাড়ি যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন। পথে হযরত উসায়েদ ইবনে হুযায়ের (রাঃ) তাঁর সাথে মিলিত হন এবং তাঁর নবুওয়াতের যথাযোগ্য আদবের সাথে তাঁকে সালাম করেন। অতঃপর আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আজ যে সময়ের পূর্বেই যাত্রা শুরু করেছেন, ব্যাপার কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে বলেনঃ “তোমার কি জানা নেই যে, তোমাদের সঙ্গী আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই বলেছেঃ “মদীনায় পৌঁছে আমরা সম্মানিত ব্যক্তিরা লাঞ্ছিত ব্যক্তিদেরকে অর্থাৎ মুহাজিরদেরকে বহিষ্কার করে দিবো?” তখন হযরত উসায়েদ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! সম্মানিত তো আপনিই, আর লাঞ্ছিত হলো তো সেই। আপনি তার কথাকে মোটেই পরোয়া করবেন না। আসলে মদীনায় আপনার আগমনে সে ক্রোধে ও হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছে। মদীনাবাসীরা তাকে নেতা নির্বাচন করার উপর ঐকমত্যে পৌঁছেছিল এবং তার মাথার মুকুটও তৈরী হচ্ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ রাব্বুল আ'লামীন আপনাকে এখানে আনিয়েছেন এবং রাজত্ব তার হাত হতে ছুটে গেছে। কাজেই আপনার উপর সে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছে। হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! চলতে থাকুন।” তাঁরা দুপুরেই যাত্রা শুরু করেছিলেন। সন্ধ্যা হলো, রাত্রি হলো, সকাল হলো, এমনকি রৌদ্রের প্রখরতা এসে গেলে তিনি শিবির স্থাপন করলেন, যাতে জনগণ আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই-এর ঐ কথায় মুষড়ে না পড়ে। জনগণের ক্লান্তি ও রাত্রি জাগরণ ছিল বলে অবতরণ করা মাত্রই সবাই ঘুমিয়ে পড়েন। আর এদিকে এই সূরায়ে মুনাফিকূন অবতীর্ণ হয়ে গেল। (এটা সীরাতে ইসহাক নামক গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। একজন মুহাজির একজন আনসারকে পাথর মেরে দেন। এটাকে কেন্দ্র করে কথা বেড়ে চলে এবং উভয়েই নিজ নিজ দলের নিকট ফরিয়াদ জানান এবং তাঁদেরকে আহ্বান করেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন এবং বলেনঃ “একি অজ্ঞতার যুগের কাজ-কারবার শুরু করলে তোমরা? এই বেদুঈনী অভ্যাস পরিত্যাগ কর।” আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল বলতে লাগলোঃ “এখন মুহাজিরগণ এরূপ করতে শুরু করলো? আল্লাহর কসম! মদীনায় পৌঁছেই আমরা সম্মানীরা এই লাঞ্ছিতদেরকে মদীনা হতে বের করে দিবো।” ঐ সময় মদীনায় আনসারদের সংখ্যা মুহাজিরদের অপেক্ষা বহু গুণে বেশী ছিল। তবে পরবর্তীতে মুহাজিরদের সংখ্যা অনেক হয়ে যায়। হযরত উমার (রাঃ) যখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর এ কথা শুনতে পেলেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এ কাজ হতে বিরত রাখলেন।" (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বলেনঃ “আমি তাবূকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বললোঃ “আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে তথা হতে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কার করবেই।” আমি তার এ কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বর্ণনা করলাম। কিন্তু সে এসে অস্বীকার করে বসলো ও শপথ করলো। ঐ সময় আমার সম্প্রদায় আমাকে বহু কিছু গাল মন্দ দিলো এবং নানা প্রকারে তিরস্কার করলো যে, আমি এরূপ কেন করলাম? আমি দুঃখিত মনে সেখান হতে চলে আসলাম। আমার দুঃখের কোন সীমা থাকলো না। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেনঃ ‘আল্লাহ তা’আলা তোমার ওযর ও সত্যবাদিতা (সম্পৰ্কীয় আয়াত) অবতীর্ণ করেছেন। ঐ সময় ... (আরবি)-এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন) মুসনাদে আহমাদে এটা এভাবেও বর্ণিত আছে যে, হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বলেনঃ “আমি আমার চাচার সাথে এক যুদ্ধে ছিলাম। আমি আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে এ দু’টি কথা বলতে শুনলামঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর সহচরদের জন্যে ব্যয় করো না” এবং “তারা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে তথা হতে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কার করবেই।” আমি এটা আমার চাচার নিকট বর্ণনা করি এবং আমার চাচা তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে ডেকে পাঠালে সে সম্পূর্ণরূপে কথাগুলো অস্বীকার করে এবং শপথও করে নেয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার কথা সত্য ও আমার কথা মিথ্যা বলে মেনে নেন। আমার চাচাও আমাকে বহু তিরস্কার করেন। আমি এতে এতো বেশী দুঃখিত ও লজ্জিত হই যে, বাড়ী হতে বের হওয়া পরিত্যাগ করি। শেষ পর্যন্ত এই সূরাটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার সত্যতা স্বীকার করেন এবং সূরাটি আমাকে পড়ে শুনিয়ে দেন।মুসনাদে আহমাদের অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, এক সফরে সাহাবীগণ সংকটময় অবস্থায় পতিত হলে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই উপরোক্ত কথা দু’টি বলে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডেকে পাঠিয়ে একথা জিজ্ঞেস করলে সে তা অস্বীকার করে এবং শপথ করে বলে যে, সে এরূপ কথা কখনো বলেনি। তখন জনগণ যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ)-কে মিথ্যাবাদী রূপে সাব্যস্ত করেন। এতে হযরত যায়েদ (রাঃ) খুবই দুঃখিত ও লজ্জিত হন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা এ সূরাটি অবতীর্ণ করেন। আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তাদেরকে (মুনাফিকদেরকে) ডাকলে তারা মাথা ফিরিয়ে নেয়।আল্লাহ তা’আলা মুনাফিকদেরকে দেয়ালে ঠেকানো কাঠের স্তম্ভ সদৃশ এই কারণে বলেছেন যে, তারা দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে সুন্দর ছিল। জামে তিরমিযীতে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমরা এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বের হই। কিছু বেদুঈনও আমাদের সাথে ছিল। পানির জায়গায় তারা প্রথমেই পৌঁছতে চাইতো। অনুরূপভাবে আমরাও ঐ চেষ্টাতেই থাকতাম। একদা একজন বেদুঈন গিয়ে পানি দখল করে নেয় এবং হাউয পূর্ণ করে হাউযের চতুর্দিকে সে পাথর রেখে দেয় এবং উপর হতে চামড়া ছড়িয়ে দেয়। একজন আনসারী এসে ঐ হাউযের মধ্য হতে নিজের উটকে পানি পান করাবার ইচ্ছা করে। বেদুঈন তাকে বাধা দেয়। আনসারী জোরপূর্বক পানি পান করাতে গেলে ঐ বেদুঈন লাঠি দ্বারা আনসারীর মাথায় আঘাত করে। ফলে আনসারীর মাথা জখম হয়। আনসারী আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর লোক ছিল বলে সরাসরি তার কাছে চলে যায় এবং ঘটনাটি বর্ণনা করে। এতে সে ভীষণ রাগান্বিত হয় এবং বলেঃ “এই বেদুঈনদেরকে কিছুই দিয়ো না, তাহলে তারা আপনা আপনি ক্ষুধার জ্বালায় পালিয়ে যাবে। এই বেদুঈনরা আহারের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসতো এবং খেয়ে নিতো। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তার সঙ্গীদেরকে বললোঃ “তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খাদ্য নিয়ে এমন সময় যাবে যখন এই বেদুঈনরা থাকবে না। তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে নিয়ে খাদ্য খেয়ে নিবেন এবং এরা খেতে পাবে না। তখন এরা না খেয়ে খেয়ে আপনা আপনি পালিয়ে যাবে। আর আমরা মদীনায় গিয়ে এ হীন ও ছোট লোকদেরকে মদীনা হতে বের করে দিবো।” আমি আমার চাচার পিছনে বসতাম। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই যা কিছু বললো আমি তার সবই শুনলাম এবং আমার চাচার নিকট বর্ণনা করলাম। আমার চাচা তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে ডাকিয়ে নিলেন। সে সবকিছুই অস্বীকার করলো এবং শপথও করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে সত্যবাদী মনে করলেন এবং আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করলেন। আমার চাচা আমার কাছে এসে আমাকে বললেনঃ “তুমি এটা করলে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করেছেন। অন্যান্য মুসলমানরাও তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করেছে।' এ কথা শুনে তো আমার উপর দুঃখের পাহাড় ভেঙ্গে পড়লো। আমি অত্যন্ত দুঃখিত অবস্থায় মাথা নীচু করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। অল্পক্ষণ পরেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আসলেন এবং আমার কান ধরলেন। আমি ফিরে তাকিয়ে দেখি যে, তিনি মুচকি হাসছেন। আল্লাহর শপথ! ঐ সময় আমি এতো বেশী খুশী হয়েছিলাম যে, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। যদি আমি দুনিয়ার চিরস্থায়ী জীবন লাভ করতাম তবুও এতো খুশী হতে পারতাম না। অতঃপর হযরত আবূ বকর (রাঃ) আমার কাছে এসে আমাকে বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাকে কি বললেন?” আমি উত্তরে বললাম, তিনি কিছুই আমাকে বলেনি, শুধু মুচকি হেসে চলে গেলেন। তখন তিনি বললেনঃ “ঠিক আছে, তুমি খুশী হও।” তাঁর চলে যাওয়ার পরেই হযরত উমার (রাঃ) আমার কাছে আসলেন এবং ঐ প্রশ্নই আমাকে করলেন। আমিও ঐ একই জবাব দিলাম। সকালে সূরায়ে মুনাফিকূন অবতীর্ণ হলো।” অন্য রিওয়াইয়াতে সূরাটি (আরবি) পর্যন্ত পড়াও বর্ণিত আছে।আবদুল্লাহ ইবনে লাহীআহ (রঃ) এবং মূসা ইবনে উকবাও (রঃ) এই হাদীসটি মাগাযীর মধ্যে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু এ দু’জনের বর্ণনায় সংবাদদাতার নাম আউস ইবনে আকরাম রয়েছে, যে বানু হারেস ইবনে খাযরাজ গোত্রভুক্ত ছিল। তাহলে সম্ভবতঃ হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) ও খবর পৌঁছিয়েছিলেন এবং হযরত আউসও (রাঃ) পৌঁছিয়েছিলেন। আবার এও হতে পারে যে, বর্ণনাকারী নামে ভুল করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আমর ইবনে সাবিত আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা গাযওয়ায়ে মুরীসীর ঘটনা। এটা ঐ যুদ্ধ যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত খালেদ (রাঃ)-কে প্রেরণ করে ‘মানাত’ প্রতিমাকে ভাঙ্গিয়েছিলেন যা কিফা মুশাললাল ও সমুদ্রের মধ্যস্থলে অবস্থিত ছিল। এই যুদ্ধেই দুই জন লোকের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। একজন ছিলেন মুহাজির এবং অন্যজন ছিলেন বাহায় গোত্রের লোক। বাহায গোত্র আনসারদের মিত্র ছিল। বাহযী আনসারদেরকে এবং মুহাজির মুহাজিরদেরকে আহ্বান করে। উভয়পক্ষের কিছু লোক দাঁড়িয়ে যায় এবং তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। ঝগড়া শেষ হলে মুনাফিক ও রোগা অন্তরের লোকেরা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর নিকট একত্রিত হয় এবং তাকে বলেঃ “আপনার কাছে তো আমরা বহু কিছু আশা করেছিলাম। আমাদের শত্রুদের ব্যাপারে আপনি ছিলেন আমাদের রক্ষক। এখন তো আপনি একেবারে অকেজো ও কর্ম বিমুখ হয়ে পড়েছেন। এখন না আছে আপনার কোন উপকারের চিন্তা, না ক্ষতির চিন্তা। আপনিই তো এই মুহাজিরদেরকে এতোটা উপরে উঠিয়ে দিয়েছেন? কথায় কথায় তারা আমাদের উপর আক্রমণ চালায়। নতুন মুহাজিরদেরকে তারা জালাবীব বলতো। আল্লাহর ঐ শত্রু জবাবে বললোঃ “আল্লাহর কসম! আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে অবশ্যই প্রবলরা দুর্বলদেরকে বহিষ্কার করবে।” মুনাফিক মালিক ইবনে দাখশান বললোঃ “আমি প্রথম থেকেই বলে আসছি যে, এদের সঙ্গে সুসম্পর্ক পরিত্যাগ করা হোক, তাহলে তারা আপনা আপনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে?” হযরত উমার (রাঃ) এসব কথা শুনে নেন। তিনি নবী পাক (সাঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ লোকদের মধ্যে হাঙ্গামার গোড়া পত্তনকারী এই লোকটির ব্যাপারে আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “আমি যদি তোমাকে অনুমতি দিই তবে কি তুমি তাকে হত্যা করে ফেলবে?” জবাবে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আল্লাহর কসম! এখনই আমি তাকে নিজ হাতে হত্যা করে ফেলবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, বসে পড়।” ইতিমধ্যে হযরত উসায়েদ ইবনে হুযায়েরও (রাঃ) ঐ কথা বলতে বলতে আসলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকেও ঐ একই প্রশ্ন করলেন এবং তিনিও ঐ একই উত্তর দিলেন। তাঁকেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বসে যেতে বললেন। এরপর কিছুক্ষণ অতিবাহিত হলে তিনি সকলকে তথা হতে যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন এবং সময়ের পূর্বেই তারা সেখান হতে রওয়ানা হয়ে গেলেন। তারা ঐ দিন-রাত এবং পরবর্তী দিনের সকাল পর্যন্ত বরাবর চলতেই থাকলেন। যখন রৌদ্র প্রখর হয়ে উঠলো তখন অবতরণের হুকুম করলেন। দ্বিপ্রহর ঢলে পড়ার সাথে সাথেই পুনরায় তাড়াতাড়ি যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন। এভাবে চলতে চলতে তৃতীয় দিনের সকাল বেলায় কিফা মুশাললাল হতে মদীনা শরীফে পৌছে গেলেন। হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে হত্যা করার আমি নির্দেশ দিলে সত্যিই কি তুমি তাকে হত্যা করে ফেলতে?” জবাবে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তার মাথা দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতাম।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যদি তুমি সেই দিন তাকে হত্যা করে ফেলতে তবে বহু লোকের নাক ধূলো-মলিন হয়ে যেতো। কেননা, যদি আমি তাদেরকে বলতাম তবে তারাও তাকে হত্যা করতে মোটেই দ্বিধাবোধ করতো না। তখন লোকদের একথা বলার সুযোগ হয়ে যেতো যে, মুহাম্মাদ (সঃ) স্বীয় সহচরদেরকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে থাকেন। এই ঘটনারই বর্ণনা এই আয়াতগুলোতে রয়েছে।” (এ বর্ণনাটি খুবই গরীব। এতে এমন কতকগুলো চমকপ্রদ কথা রয়েছে, যেগুলোর অন্যান্য রিওয়াইয়াতে নেই) সীরাতে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ), যিনি একজন খাঁটি মুসলমান ছিলেন, এই ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি শুনেছি যে, আমার পিতা যে উক্তি করেছে তার প্রতিশোধ হিসেবে আপনি তাকে হত্যা করতে চান। যদি এটা সত্য হয়, তবে তাকে হত্যা করার আদেশ আপনি অন্য কাউকেও দিবেন না। আমিই যাচ্ছি এবং তার কর্তিত মস্তক এনে আপনার পদতলে নিক্ষেপ করছি। আল্লাহর কসম! খাযরাজ গোত্রের প্রত্যেকেই জানে যে, কোন ছেলে তার পিতাকে আমার চেয়ে বেশী শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনকারী নেই। কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে আমার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় পিতাকেও হত্যা করতে প্রস্তুত আছি। যদি আপনি অন্য কাউকেও নির্দেশ দেন এবং সে আমার পিতাকে হত্যা করে তবে আমার ভয় হচ্ছে যে, না জানি হয়তো প্রতিশোধ গ্রহণের নেশায় উন্মত্ত হয়ে তাকে হত্যা করে ফেলবো। আর যদি আমার দ্বারা এ কাজই হয়ে যায় তবে একজন কাফিরের বিনিময়ে একজন মুসলমানকে হত্যা করার অপরাধে আমি জাহান্নামী হয়ে যাবো। সুতরাং এখন আপনি আমার পিতাকে হত্যা করার আদেশ আমাকেই করুন।” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “না, না। আমি তাকে হত্যা করতে চাই না। আমি তো তার সাথে আরো উত্তম ও নম্র ব্যবহার করতে চাই যতক্ষণ সে আমাদের সাথে রয়েছে।” হযরত ইকরামা (রঃ) ও হযরত ইবনে যায়েদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, সেনাবাহিনীসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদীনায় পৌঁছেন তখন ঐ মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) মদীনা শরীফের দরবার উপর দাঁড়িয়ে যান ও তরবারী তুলে ধরেন। জনগণ মদীনায় প্রবেশ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তার পিতা এসে পড়ে। তিনি স্বীয় পিতাকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দাঁড়িয়ে যাও, মদীনায় প্রবেশ করো না।” সে বললোঃ “ব্যাপার কি? আমাকে বাধা দিচ্ছ কেন?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “তুমি মদীনায় প্রবেশ করতে পার না যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (সঃ) অনুমতি দেন। সম্মানিত তিনিই এবং লাঞ্ছিত তুমিই।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসলেনঃ তার অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি সেনাবাহিনীর সর্বশেষ অংশে থাকতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখে ঐ মুনাফিক তাঁর কাছে স্বীয় পুত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার পিতাকে আটক করে রেখেছো কেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আপনি অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত আমার পিতাকে আমি মদীনায় প্রবেশ করতে দিবো না।” অতঃপর নবী (সঃ)-এর অনুমতিক্রমে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তাঁর পিতাকে মদীনায় প্রবেশ করতে দিলেন।মুসনাদে হুমাইদীতে রয়ছে যে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তাঁর পিতাকে বলেনঃ “যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি নিজের মুখে একথা না বলবে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হলেন সম্মানিত এবং তুমি লাঞ্ছিত, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাকে আমি মদীনায় প্রবেশ করতে দিবো না। এর পূর্বে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতার অত্যধিক গাম্ভীর্য ও প্রভাবের কারণে আজ পর্যন্ত আমি তার মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিনি, কিন্তু আপনি যদি তার উপর অসন্তুষ্ট থাকেন তবে আমাকে নির্দেশ দিন, আমি তার মাথা কেটে নিয়ে আপনার নিকট হাযির করছি। অন্য কাউকেও তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিবেন না। এমনও হতে পারে যে, আমার পিতৃহন্তাকে আমি চলাফেরা অবস্থায় দেখতে পারবো না।”
আল-মুনাফিকুন 63:6
৫-৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা অভিশপ্ত মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ তাদের কৃত পাপের ব্যাপারে খাঁটি মুসলমানরা যখন তাদেরকে বলেঃ এসো, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখন তারা গর্বভরে মাথা দুলিয়ে থাকে। এভাবে তারা বিমুখ হয়ে যায়। এর প্রতিফল হলো এই যে, তাদের জন্যে ক্ষমার দর বন্ধ। তাদের জন্যে নবী (সঃ)-এর ক্ষমা প্রার্থনা তাদের কোনই উপকারে আসবে না। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। সূরায়ে বারাআতে এই বিষয়েই আয়াত গত হয়েছে এবং সেখানে এর তাফসীর এবং সাথে সাথে এই সম্পর্কীয় হাদীসসমূহও বর্ণিত হয়েছে।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে যে, মুনাফিক সুফইয়ান তার মুখখানা ডান দিকে ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং ক্রোধ ও গর্বের সাথে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছিল। ওরই বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে। এগুলো সবই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল সম্পর্কে বর্ণনা, এরূপ মন্তব্য করেছেন পূর্বযুগীয় অধিকাংশ গুরুজন। যেমন এটা সত্বরই আসছে ইনশাআল্লাহ।সীরাতে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের মধ্যে রয়েছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল তার কওমের মধ্যে এক বড় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিল। জুমআ’র দিন নবী (সঃ) যখন খুৎবাহ দেয়ার জন্যে দাঁড়াতেন তখন সে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলতোঃ “হে জনমণ্ডলী! ইনি হলেন আল্লাহর রাসূল (সঃ)। ইনি তোমাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছেন। এরই কারণে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে মর্যাদা দান করেছেন। সুতরাং তাঁকে সাহায্য করা এখন তোমাদের অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তোমরা তাঁকে সম্মান করবে ও মর্যাদা দিবে এবং তিনি যা কিছু বলবেন সবই মেনে চলবে।” এ কথা বলে সে বসে পড়তো। উহুদের যুদ্ধে তার কপটতা প্রকাশ পেয়ে যায়। সেখান হতে সে প্রকাশ্যভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণ করে এক তৃতীয়াংশ সৈন্য নিয়ে মদীনায় ফিরে আসে। যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদীনায় ফিরে আসেন এবং জুমআ’র দিনে মিম্বরের উপর উপবিষ্ট হন তখন অভ্যাসমত আবদুল্লাহ ইবনে উবাই সেদিনও দাঁড়িয়ে যায় এবং সে কথা বলতে যাবে এমতাবস্থায় কয়েক জন সাহাবী এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে যান এবং তার কাপড় ধরে নিয়ে বলে ওঠেনঃ “ওরে আল্লাহর দুশমন! তুই বসে যা। এখন তোর কথা বলার মুখ নেই। তুই যা কিছু করেছিস তা আর কারো কাছে গোপন নেই। তোর আর ঐ যোগ্যতা নেই যে, মন যা চাইবে তাই বলবি।” সে তখন অসন্তুষ্ট হয়ে জনগণের ঘাড়ের উপর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। সে বলতে বলতে গেলঃ “আমি কি কোন মন্দ কথা বলার জন্যে দাঁড়িয়েছিলাম? আমি তো তাঁর কাজ মযবুত করার উদ্দেশ্যেই দাঁড়িয়েছিলাম।” মসজিদের দরজার উপর কয়েক জন আনসারীর সাথে তার সাক্ষাৎ হলো। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” উত্তরে সে বললঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাজকে দৃঢ় করার উদ্দেশ্যেই দাঁড়িয়েছিলাম এমন সময় কয়েকজন সাহাবী আমার উপর লাফিয়ে পড়ে আমাকে টানা-হেঁচড়া করতে শুরু করে এবং আমাকে ধমকাতে থাকে। তাদের ধারণায় আমি যেন কোন মন্দ কথা বলার জন্যে দাঁড়িয়েছিলাম। অথচ আমার উদ্দেশ্য শুধু এই ছিল যে, আমি তাঁর কথা ও কাজেরই পৃষ্টপোষকতা করবো।” একথা শুনে ঐ আনসারীগণ বললেনঃ “ভাল কথা, তুমি ফিরে চল। আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর নিকট আবেদন জানাবো যে, তিনি যেন তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সে তখন বললোঃ “আমার এর কোন প্রয়োজন নেই।”হযরত কাতাদাহ (রঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঘটনাটি ছিল এই যে, তারই কওমের একজন যুবক মুসলমান তার এ ধরনের কার্যকলাপের কথা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট পৌঁছিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে ডাকিয়ে নেন। সে সরাসরি অস্বীকার করে। সে মিথ্যা শপথও করে। তখন আনসারীগণ ঐ সাহাবীকে তিরস্কার এবং শাসন-গর্জন করেন ও মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেন। ঐ সময় এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এতে আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকের মিথ্যা শপথের এবং যুবক সাহাবীটির সত্যবাদীতার বর্ণনা দিয়েছেন। অতঃপর ঐ মুনাফিককে বলা হয়ঃ “চলো, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর মাধ্যমে তোমার পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করিয়ে নাও।” তখন সে অস্বীকার করে এবং মাথা ঘুরিয়ে নিয়ে চলে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কোন মনযিলে অবতরণ করলে সেখানে নামায না পড়া পর্যন্ত যাত্রা শুরু করতেন না। তাবূকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) খবর পেলেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই বলছেঃ “আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে তথা হতে প্রবল ও সম্মানীরা দুর্বল ও লাঞ্ছিতদেরকে বহিষ্কার করবেই।” অর্থাৎ আমরা এই দুর্বল ও মর্যাদাহীন মুহাজিরদেরকে আমাদের শহর মদীনা হতে বের করে দিবো। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দিনের শেষ ভাগে অবতরণের পূর্বেই যাত্রা শুরু করে দেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে বলা হয়ঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে তোমার অপরাধের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর।" তখন আল্লাহ্ তা'আলা (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ ইবনে সীরীন পর্যন্ত তো সঠিক বটে, কিন্তু এটা তাবূকের ঘটনা একথা বলার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে, এমনকি এটা সঠিক কথাই নয়। কেননা, তাবূকের যুদ্ধে তো আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই হাযিরই ছিল না, বরং সে তার একটি দল নিয়ে ফিরে গিয়েছিল। কুতুবে। মাগাযী ও সিয়ারের লেখকগণ এ মন্তব্য করেছেন যে, এ মুরীসী যুদ্ধের ঘটনা এবং ???)এই ঘটনায় হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হিব্বান (রঃ), হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আবি বকর (রঃ) এবং হযরত আসিম ইবনে উমার ইবনে কাতাদাহ্ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই যুদ্ধস্থলে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এক জায়গায় অবস্থান করছিলেন। তথায় পানির জায়গার উপর যে জনসমাবেশ ছিল ওর মধ্যে হযরত জাহজাহ ইবনে সাঈদ গিফারী (রঃ) ও হযরত সিনান ইবনে ইয়াযীদ (রাঃ)-এর মাঝে কিছু ঝগড়া হয়ে যায়। হযরত জাহজাহ (রাঃ) হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর একজন কর্মচারী ছিলেন। ঝগড়া চরম আকার ধারণ করে। হযরত সিনান (রাঃ) সাহায্যের জন্যে আনসারদেরকে আহবান করেন এবং হযরত জাহজাহ্ (রাঃ) আহ্বান করেন মুহাজিরদেরকে। ঐ সময় হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) প্রমুখ আনসারদের একটি দল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর পাশে উববিষ্ট ছিলেন। এই ফরিয়াদ শুনে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই বলতে শুরু করেঃ “আমাদের শহরেই এ লোকগুলো আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করে দিলো? আমাদের ও এই কুরায়েশদের দৃষ্টান্ত ওটাই যাকে একজন বলেছে- ‘স্বীয় কুকুরকে তুমি মোটা-তাজা কর যাতে সে তোমাকেই কামড় দেয়। আল্লাহর শপথ! আমরা মদীনায় ফিরে গেলে তথা হতে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কার করবেই।” অতঃপর সে তার পাশে উপবিষ্ট লোকদেরকে সম্বোধন করে বলতে শুরু করলোঃ “সব বিপদ তোমরা নিজেরাই নিজেদের হাতে টেনে এনেছো। তোমরা এই মুহাজিরদেরকে তোমাদের শহরে জায়গা দিয়েছে এবং নিজেদের সম্পদের অর্ধাংশ দান করেছে। এখনো যদি তোমরা তাদেরকে আর্থিক সাহায্য না কর তবে তারা সংকটে পড়ে মদীনা হতে বেরিয়ে যাবে।” হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) এসব কথাই শুনলেন। ঐ সময় তিনি অল্প বয়স্ক ছিলেন। তিনি সরাসরি নবী (সাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন। ঐ সময় তাঁর নিকট হযরত উমার ইবনে খাত্তাবও (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। রাগান্বিত হয়ে তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (রঃ)! আমাকে নির্দেশ দিন, আমি তার গদান উড়িয়ে দিই।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “এ কাজ করলে এটা প্রচারিত হয়ে পড়বে যে, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) নিজের সঙ্গী-সাথীদেরকেও হত্যা করে থাকেন। এটা ঠিক হবে না। যাও, লোকদেরকে যাত্রা শুরু করার হুকুম দিয়ে দাও।” আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই যখন এ খবর পেলো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তার কথা জেনে ফেলেছেন তখন সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো এবং তাঁর দরবারে হাযির হয়ে ওযর-আপত্তি, হীলা-বাহানা করতে লাগলো এবং কথা পাল্টাতে শুরু করলো। আর শপথ করে বলতে লাগলো যে, সে এরূপ কথা কখনো বলেনি। এই লোকটি তার সম্প্রদায়ের মধ্যে খুবই মর্যাদাবান ও প্রভাবশালী ছিল। তাছাড়া লোকেরাও বলতে লাগলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! সম্ভবতঃ এই বালকটিই ভুল বলেছে। সে হয়তো ধারণা করেছে, প্রকৃত ঘটনা হয়তো এটা নয়।” রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) সময়ের পূর্বেই এখান হতে তাড়াতাড়ি যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন। পথে হযরত উসায়েদ ইবনে হুযায়ের (রাঃ) তাঁর সাথে মিলিত হন এবং তাঁর নবুওয়াতের যথাযোগ্য আদবের সাথে তাঁকে সালাম করেন। অতঃপর আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আজ যে সময়ের পূর্বেই যাত্রা শুরু করেছেন, ব্যাপার কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে বলেনঃ “তোমার কি জানা নেই যে, তোমাদের সঙ্গী আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই বলেছেঃ “মদীনায় পৌঁছে আমরা সম্মানিত ব্যক্তিরা লাঞ্ছিত ব্যক্তিদেরকে অর্থাৎ মুহাজিরদেরকে বহিষ্কার করে দিবো?” তখন হযরত উসায়েদ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! সম্মানিত তো আপনিই, আর লাঞ্ছিত হলো তো সেই। আপনি তার কথাকে মোটেই পরোয়া করবেন না। আসলে মদীনায় আপনার আগমনে সে ক্রোধে ও হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছে। মদীনাবাসীরা তাকে নেতা নির্বাচন করার উপর ঐকমত্যে পৌঁছেছিল এবং তার মাথার মুকুটও তৈরী হচ্ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ রাব্বুল আ'লামীন আপনাকে এখানে আনিয়েছেন এবং রাজত্ব তার হাত হতে ছুটে গেছে। কাজেই আপনার উপর সে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছে। হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! চলতে থাকুন।” তাঁরা দুপুরেই যাত্রা শুরু করেছিলেন। সন্ধ্যা হলো, রাত্রি হলো, সকাল হলো, এমনকি রৌদ্রের প্রখরতা এসে গেলে তিনি শিবির স্থাপন করলেন, যাতে জনগণ আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই-এর ঐ কথায় মুষড়ে না পড়ে। জনগণের ক্লান্তি ও রাত্রি জাগরণ ছিল বলে অবতরণ করা মাত্রই সবাই ঘুমিয়ে পড়েন। আর এদিকে এই সূরায়ে মুনাফিকূন অবতীর্ণ হয়ে গেল। (এটা সীরাতে ইসহাক নামক গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। একজন মুহাজির একজন আনসারকে পাথর মেরে দেন। এটাকে কেন্দ্র করে কথা বেড়ে চলে এবং উভয়েই নিজ নিজ দলের নিকট ফরিয়াদ জানান এবং তাঁদেরকে আহ্বান করেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন এবং বলেনঃ “একি অজ্ঞতার যুগের কাজ-কারবার শুরু করলে তোমরা? এই বেদুঈনী অভ্যাস পরিত্যাগ কর।” আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল বলতে লাগলোঃ “এখন মুহাজিরগণ এরূপ করতে শুরু করলো? আল্লাহর কসম! মদীনায় পৌঁছেই আমরা সম্মানীরা এই লাঞ্ছিতদেরকে মদীনা হতে বের করে দিবো।” ঐ সময় মদীনায় আনসারদের সংখ্যা মুহাজিরদের অপেক্ষা বহু গুণে বেশী ছিল। তবে পরবর্তীতে মুহাজিরদের সংখ্যা অনেক হয়ে যায়। হযরত উমার (রাঃ) যখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর এ কথা শুনতে পেলেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এ কাজ হতে বিরত রাখলেন।" (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বলেনঃ “আমি তাবূকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বললোঃ “আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে তথা হতে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কার করবেই।” আমি তার এ কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বর্ণনা করলাম। কিন্তু সে এসে অস্বীকার করে বসলো ও শপথ করলো। ঐ সময় আমার সম্প্রদায় আমাকে বহু কিছু গাল মন্দ দিলো এবং নানা প্রকারে তিরস্কার করলো যে, আমি এরূপ কেন করলাম? আমি দুঃখিত মনে সেখান হতে চলে আসলাম। আমার দুঃখের কোন সীমা থাকলো না। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেনঃ ‘আল্লাহ তা’আলা তোমার ওযর ও সত্যবাদিতা (সম্পৰ্কীয় আয়াত) অবতীর্ণ করেছেন। ঐ সময় ... (আরবি)-এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন) মুসনাদে আহমাদে এটা এভাবেও বর্ণিত আছে যে, হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বলেনঃ “আমি আমার চাচার সাথে এক যুদ্ধে ছিলাম। আমি আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে এ দু’টি কথা বলতে শুনলামঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর সহচরদের জন্যে ব্যয় করো না” এবং “তারা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে তথা হতে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কার করবেই।” আমি এটা আমার চাচার নিকট বর্ণনা করি এবং আমার চাচা তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে ডেকে পাঠালে সে সম্পূর্ণরূপে কথাগুলো অস্বীকার করে এবং শপথও করে নেয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার কথা সত্য ও আমার কথা মিথ্যা বলে মেনে নেন। আমার চাচাও আমাকে বহু তিরস্কার করেন। আমি এতে এতো বেশী দুঃখিত ও লজ্জিত হই যে, বাড়ী হতে বের হওয়া পরিত্যাগ করি। শেষ পর্যন্ত এই সূরাটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার সত্যতা স্বীকার করেন এবং সূরাটি আমাকে পড়ে শুনিয়ে দেন।মুসনাদে আহমাদের অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, এক সফরে সাহাবীগণ সংকটময় অবস্থায় পতিত হলে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই উপরোক্ত কথা দু’টি বলে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডেকে পাঠিয়ে একথা জিজ্ঞেস করলে সে তা অস্বীকার করে এবং শপথ করে বলে যে, সে এরূপ কথা কখনো বলেনি। তখন জনগণ যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ)-কে মিথ্যাবাদী রূপে সাব্যস্ত করেন। এতে হযরত যায়েদ (রাঃ) খুবই দুঃখিত ও লজ্জিত হন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা এ সূরাটি অবতীর্ণ করেন। আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তাদেরকে (মুনাফিকদেরকে) ডাকলে তারা মাথা ফিরিয়ে নেয়।আল্লাহ তা’আলা মুনাফিকদেরকে দেয়ালে ঠেকানো কাঠের স্তম্ভ সদৃশ এই কারণে বলেছেন যে, তারা দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে সুন্দর ছিল। জামে তিরমিযীতে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমরা এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বের হই। কিছু বেদুঈনও আমাদের সাথে ছিল। পানির জায়গায় তারা প্রথমেই পৌঁছতে চাইতো। অনুরূপভাবে আমরাও ঐ চেষ্টাতেই থাকতাম। একদা একজন বেদুঈন গিয়ে পানি দখল করে নেয় এবং হাউয পূর্ণ করে হাউযের চতুর্দিকে সে পাথর রেখে দেয় এবং উপর হতে চামড়া ছড়িয়ে দেয়। একজন আনসারী এসে ঐ হাউযের মধ্য হতে নিজের উটকে পানি পান করাবার ইচ্ছা করে। বেদুঈন তাকে বাধা দেয়। আনসারী জোরপূর্বক পানি পান করাতে গেলে ঐ বেদুঈন লাঠি দ্বারা আনসারীর মাথায় আঘাত করে। ফলে আনসারীর মাথা জখম হয়। আনসারী আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর লোক ছিল বলে সরাসরি তার কাছে চলে যায় এবং ঘটনাটি বর্ণনা করে। এতে সে ভীষণ রাগান্বিত হয় এবং বলেঃ “এই বেদুঈনদেরকে কিছুই দিয়ো না, তাহলে তারা আপনা আপনি ক্ষুধার জ্বালায় পালিয়ে যাবে। এই বেদুঈনরা আহারের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসতো এবং খেয়ে নিতো। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তার সঙ্গীদেরকে বললোঃ “তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খাদ্য নিয়ে এমন সময় যাবে যখন এই বেদুঈনরা থাকবে না। তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে নিয়ে খাদ্য খেয়ে নিবেন এবং এরা খেতে পাবে না। তখন এরা না খেয়ে খেয়ে আপনা আপনি পালিয়ে যাবে। আর আমরা মদীনায় গিয়ে এ হীন ও ছোট লোকদেরকে মদীনা হতে বের করে দিবো।” আমি আমার চাচার পিছনে বসতাম। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই যা কিছু বললো আমি তার সবই শুনলাম এবং আমার চাচার নিকট বর্ণনা করলাম। আমার চাচা তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে ডাকিয়ে নিলেন। সে সবকিছুই অস্বীকার করলো এবং শপথও করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে সত্যবাদী মনে করলেন এবং আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করলেন। আমার চাচা আমার কাছে এসে আমাকে বললেনঃ “তুমি এটা করলে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করেছেন। অন্যান্য মুসলমানরাও তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করেছে।' এ কথা শুনে তো আমার উপর দুঃখের পাহাড় ভেঙ্গে পড়লো। আমি অত্যন্ত দুঃখিত অবস্থায় মাথা নীচু করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। অল্পক্ষণ পরেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আসলেন এবং আমার কান ধরলেন। আমি ফিরে তাকিয়ে দেখি যে, তিনি মুচকি হাসছেন। আল্লাহর শপথ! ঐ সময় আমি এতো বেশী খুশী হয়েছিলাম যে, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। যদি আমি দুনিয়ার চিরস্থায়ী জীবন লাভ করতাম তবুও এতো খুশী হতে পারতাম না। অতঃপর হযরত আবূ বকর (রাঃ) আমার কাছে এসে আমাকে বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাকে কি বললেন?” আমি উত্তরে বললাম, তিনি কিছুই আমাকে বলেনি, শুধু মুচকি হেসে চলে গেলেন। তখন তিনি বললেনঃ “ঠিক আছে, তুমি খুশী হও।” তাঁর চলে যাওয়ার পরেই হযরত উমার (রাঃ) আমার কাছে আসলেন এবং ঐ প্রশ্নই আমাকে করলেন। আমিও ঐ একই জবাব দিলাম। সকালে সূরায়ে মুনাফিকূন অবতীর্ণ হলো।” অন্য রিওয়াইয়াতে সূরাটি (আরবি) পর্যন্ত পড়াও বর্ণিত আছে।আবদুল্লাহ ইবনে লাহীআহ (রঃ) এবং মূসা ইবনে উকবাও (রঃ) এই হাদীসটি মাগাযীর মধ্যে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু এ দু’জনের বর্ণনায় সংবাদদাতার নাম আউস ইবনে আকরাম রয়েছে, যে বানু হারেস ইবনে খাযরাজ গোত্রভুক্ত ছিল। তাহলে সম্ভবতঃ হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) ও খবর পৌঁছিয়েছিলেন এবং হযরত আউসও (রাঃ) পৌঁছিয়েছিলেন। আবার এও হতে পারে যে, বর্ণনাকারী নামে ভুল করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আমর ইবনে সাবিত আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা গাযওয়ায়ে মুরীসীর ঘটনা। এটা ঐ যুদ্ধ যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত খালেদ (রাঃ)-কে প্রেরণ করে ‘মানাত’ প্রতিমাকে ভাঙ্গিয়েছিলেন যা কিফা মুশাললাল ও সমুদ্রের মধ্যস্থলে অবস্থিত ছিল। এই যুদ্ধেই দুই জন লোকের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। একজন ছিলেন মুহাজির এবং অন্যজন ছিলেন বাহায় গোত্রের লোক। বাহায গোত্র আনসারদের মিত্র ছিল। বাহযী আনসারদেরকে এবং মুহাজির মুহাজিরদেরকে আহ্বান করে। উভয়পক্ষের কিছু লোক দাঁড়িয়ে যায় এবং তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। ঝগড়া শেষ হলে মুনাফিক ও রোগা অন্তরের লোকেরা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর নিকট একত্রিত হয় এবং তাকে বলেঃ “আপনার কাছে তো আমরা বহু কিছু আশা করেছিলাম। আমাদের শত্রুদের ব্যাপারে আপনি ছিলেন আমাদের রক্ষক। এখন তো আপনি একেবারে অকেজো ও কর্ম বিমুখ হয়ে পড়েছেন। এখন না আছে আপনার কোন উপকারের চিন্তা, না ক্ষতির চিন্তা। আপনিই তো এই মুহাজিরদেরকে এতোটা উপরে উঠিয়ে দিয়েছেন? কথায় কথায় তারা আমাদের উপর আক্রমণ চালায়। নতুন মুহাজিরদেরকে তারা জালাবীব বলতো। আল্লাহর ঐ শত্রু জবাবে বললোঃ “আল্লাহর কসম! আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে অবশ্যই প্রবলরা দুর্বলদেরকে বহিষ্কার করবে।” মুনাফিক মালিক ইবনে দাখশান বললোঃ “আমি প্রথম থেকেই বলে আসছি যে, এদের সঙ্গে সুসম্পর্ক পরিত্যাগ করা হোক, তাহলে তারা আপনা আপনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে?” হযরত উমার (রাঃ) এসব কথা শুনে নেন। তিনি নবী পাক (সাঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ লোকদের মধ্যে হাঙ্গামার গোড়া পত্তনকারী এই লোকটির ব্যাপারে আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “আমি যদি তোমাকে অনুমতি দিই তবে কি তুমি তাকে হত্যা করে ফেলবে?” জবাবে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আল্লাহর কসম! এখনই আমি তাকে নিজ হাতে হত্যা করে ফেলবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, বসে পড়।” ইতিমধ্যে হযরত উসায়েদ ইবনে হুযায়েরও (রাঃ) ঐ কথা বলতে বলতে আসলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকেও ঐ একই প্রশ্ন করলেন এবং তিনিও ঐ একই উত্তর দিলেন। তাঁকেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বসে যেতে বললেন। এরপর কিছুক্ষণ অতিবাহিত হলে তিনি সকলকে তথা হতে যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন এবং সময়ের পূর্বেই তারা সেখান হতে রওয়ানা হয়ে গেলেন। তারা ঐ দিন-রাত এবং পরবর্তী দিনের সকাল পর্যন্ত বরাবর চলতেই থাকলেন। যখন রৌদ্র প্রখর হয়ে উঠলো তখন অবতরণের হুকুম করলেন। দ্বিপ্রহর ঢলে পড়ার সাথে সাথেই পুনরায় তাড়াতাড়ি যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন। এভাবে চলতে চলতে তৃতীয় দিনের সকাল বেলায় কিফা মুশাললাল হতে মদীনা শরীফে পৌছে গেলেন। হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে হত্যা করার আমি নির্দেশ দিলে সত্যিই কি তুমি তাকে হত্যা করে ফেলতে?” জবাবে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তার মাথা দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতাম।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যদি তুমি সেই দিন তাকে হত্যা করে ফেলতে তবে বহু লোকের নাক ধূলো-মলিন হয়ে যেতো। কেননা, যদি আমি তাদেরকে বলতাম তবে তারাও তাকে হত্যা করতে মোটেই দ্বিধাবোধ করতো না। তখন লোকদের একথা বলার সুযোগ হয়ে যেতো যে, মুহাম্মাদ (সঃ) স্বীয় সহচরদেরকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে থাকেন। এই ঘটনারই বর্ণনা এই আয়াতগুলোতে রয়েছে।” (এ বর্ণনাটি খুবই গরীব। এতে এমন কতকগুলো চমকপ্রদ কথা রয়েছে, যেগুলোর অন্যান্য রিওয়াইয়াতে নেই) সীরাতে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ), যিনি একজন খাঁটি মুসলমান ছিলেন, এই ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি শুনেছি যে, আমার পিতা যে উক্তি করেছে তার প্রতিশোধ হিসেবে আপনি তাকে হত্যা করতে চান। যদি এটা সত্য হয়, তবে তাকে হত্যা করার আদেশ আপনি অন্য কাউকেও দিবেন না। আমিই যাচ্ছি এবং তার কর্তিত মস্তক এনে আপনার পদতলে নিক্ষেপ করছি। আল্লাহর কসম! খাযরাজ গোত্রের প্রত্যেকেই জানে যে, কোন ছেলে তার পিতাকে আমার চেয়ে বেশী শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনকারী নেই। কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে আমার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় পিতাকেও হত্যা করতে প্রস্তুত আছি। যদি আপনি অন্য কাউকেও নির্দেশ দেন এবং সে আমার পিতাকে হত্যা করে তবে আমার ভয় হচ্ছে যে, না জানি হয়তো প্রতিশোধ গ্রহণের নেশায় উন্মত্ত হয়ে তাকে হত্যা করে ফেলবো। আর যদি আমার দ্বারা এ কাজই হয়ে যায় তবে একজন কাফিরের বিনিময়ে একজন মুসলমানকে হত্যা করার অপরাধে আমি জাহান্নামী হয়ে যাবো। সুতরাং এখন আপনি আমার পিতাকে হত্যা করার আদেশ আমাকেই করুন।” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “না, না। আমি তাকে হত্যা করতে চাই না। আমি তো তার সাথে আরো উত্তম ও নম্র ব্যবহার করতে চাই যতক্ষণ সে আমাদের সাথে রয়েছে।” হযরত ইকরামা (রঃ) ও হযরত ইবনে যায়েদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, সেনাবাহিনীসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদীনায় পৌঁছেন তখন ঐ মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) মদীনা শরীফের দরবার উপর দাঁড়িয়ে যান ও তরবারী তুলে ধরেন। জনগণ মদীনায় প্রবেশ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তার পিতা এসে পড়ে। তিনি স্বীয় পিতাকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দাঁড়িয়ে যাও, মদীনায় প্রবেশ করো না।” সে বললোঃ “ব্যাপার কি? আমাকে বাধা দিচ্ছ কেন?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “তুমি মদীনায় প্রবেশ করতে পার না যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (সঃ) অনুমতি দেন। সম্মানিত তিনিই এবং লাঞ্ছিত তুমিই।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসলেনঃ তার অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি সেনাবাহিনীর সর্বশেষ অংশে থাকতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখে ঐ মুনাফিক তাঁর কাছে স্বীয় পুত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার পিতাকে আটক করে রেখেছো কেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আপনি অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত আমার পিতাকে আমি মদীনায় প্রবেশ করতে দিবো না।” অতঃপর নবী (সঃ)-এর অনুমতিক্রমে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তাঁর পিতাকে মদীনায় প্রবেশ করতে দিলেন।মুসনাদে হুমাইদীতে রয়ছে যে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তাঁর পিতাকে বলেনঃ “যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি নিজের মুখে একথা না বলবে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হলেন সম্মানিত এবং তুমি লাঞ্ছিত, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাকে আমি মদীনায় প্রবেশ করতে দিবো না। এর পূর্বে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতার অত্যধিক গাম্ভীর্য ও প্রভাবের কারণে আজ পর্যন্ত আমি তার মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিনি, কিন্তু আপনি যদি তার উপর অসন্তুষ্ট থাকেন তবে আমাকে নির্দেশ দিন, আমি তার মাথা কেটে নিয়ে আপনার নিকট হাযির করছি। অন্য কাউকেও তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিবেন না। এমনও হতে পারে যে, আমার পিতৃহন্তাকে আমি চলাফেরা অবস্থায় দেখতে পারবো না।”
আল-মুনাফিকুন 63:7
৫-৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা অভিশপ্ত মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ তাদের কৃত পাপের ব্যাপারে খাঁটি মুসলমানরা যখন তাদেরকে বলেঃ এসো, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখন তারা গর্বভরে মাথা দুলিয়ে থাকে। এভাবে তারা বিমুখ হয়ে যায়। এর প্রতিফল হলো এই যে, তাদের জন্যে ক্ষমার দর বন্ধ। তাদের জন্যে নবী (সঃ)-এর ক্ষমা প্রার্থনা তাদের কোনই উপকারে আসবে না। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। সূরায়ে বারাআতে এই বিষয়েই আয়াত গত হয়েছে এবং সেখানে এর তাফসীর এবং সাথে সাথে এই সম্পর্কীয় হাদীসসমূহও বর্ণিত হয়েছে।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে যে, মুনাফিক সুফইয়ান তার মুখখানা ডান দিকে ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং ক্রোধ ও গর্বের সাথে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছিল। ওরই বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে। এগুলো সবই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল সম্পর্কে বর্ণনা, এরূপ মন্তব্য করেছেন পূর্বযুগীয় অধিকাংশ গুরুজন। যেমন এটা সত্বরই আসছে ইনশাআল্লাহ।সীরাতে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের মধ্যে রয়েছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল তার কওমের মধ্যে এক বড় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিল। জুমআ’র দিন নবী (সঃ) যখন খুৎবাহ দেয়ার জন্যে দাঁড়াতেন তখন সে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলতোঃ “হে জনমণ্ডলী! ইনি হলেন আল্লাহর রাসূল (সঃ)। ইনি তোমাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছেন। এরই কারণে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে মর্যাদা দান করেছেন। সুতরাং তাঁকে সাহায্য করা এখন তোমাদের অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তোমরা তাঁকে সম্মান করবে ও মর্যাদা দিবে এবং তিনি যা কিছু বলবেন সবই মেনে চলবে।” এ কথা বলে সে বসে পড়তো। উহুদের যুদ্ধে তার কপটতা প্রকাশ পেয়ে যায়। সেখান হতে সে প্রকাশ্যভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণ করে এক তৃতীয়াংশ সৈন্য নিয়ে মদীনায় ফিরে আসে। যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদীনায় ফিরে আসেন এবং জুমআ’র দিনে মিম্বরের উপর উপবিষ্ট হন তখন অভ্যাসমত আবদুল্লাহ ইবনে উবাই সেদিনও দাঁড়িয়ে যায় এবং সে কথা বলতে যাবে এমতাবস্থায় কয়েক জন সাহাবী এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে যান এবং তার কাপড় ধরে নিয়ে বলে ওঠেনঃ “ওরে আল্লাহর দুশমন! তুই বসে যা। এখন তোর কথা বলার মুখ নেই। তুই যা কিছু করেছিস তা আর কারো কাছে গোপন নেই। তোর আর ঐ যোগ্যতা নেই যে, মন যা চাইবে তাই বলবি।” সে তখন অসন্তুষ্ট হয়ে জনগণের ঘাড়ের উপর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। সে বলতে বলতে গেলঃ “আমি কি কোন মন্দ কথা বলার জন্যে দাঁড়িয়েছিলাম? আমি তো তাঁর কাজ মযবুত করার উদ্দেশ্যেই দাঁড়িয়েছিলাম।” মসজিদের দরজার উপর কয়েক জন আনসারীর সাথে তার সাক্ষাৎ হলো। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” উত্তরে সে বললঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাজকে দৃঢ় করার উদ্দেশ্যেই দাঁড়িয়েছিলাম এমন সময় কয়েকজন সাহাবী আমার উপর লাফিয়ে পড়ে আমাকে টানা-হেঁচড়া করতে শুরু করে এবং আমাকে ধমকাতে থাকে। তাদের ধারণায় আমি যেন কোন মন্দ কথা বলার জন্যে দাঁড়িয়েছিলাম। অথচ আমার উদ্দেশ্য শুধু এই ছিল যে, আমি তাঁর কথা ও কাজেরই পৃষ্টপোষকতা করবো।” একথা শুনে ঐ আনসারীগণ বললেনঃ “ভাল কথা, তুমি ফিরে চল। আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর নিকট আবেদন জানাবো যে, তিনি যেন তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সে তখন বললোঃ “আমার এর কোন প্রয়োজন নেই।”হযরত কাতাদাহ (রঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঘটনাটি ছিল এই যে, তারই কওমের একজন যুবক মুসলমান তার এ ধরনের কার্যকলাপের কথা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট পৌঁছিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে ডাকিয়ে নেন। সে সরাসরি অস্বীকার করে। সে মিথ্যা শপথও করে। তখন আনসারীগণ ঐ সাহাবীকে তিরস্কার এবং শাসন-গর্জন করেন ও মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেন। ঐ সময় এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এতে আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকের মিথ্যা শপথের এবং যুবক সাহাবীটির সত্যবাদীতার বর্ণনা দিয়েছেন। অতঃপর ঐ মুনাফিককে বলা হয়ঃ “চলো, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর মাধ্যমে তোমার পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করিয়ে নাও।” তখন সে অস্বীকার করে এবং মাথা ঘুরিয়ে নিয়ে চলে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কোন মনযিলে অবতরণ করলে সেখানে নামায না পড়া পর্যন্ত যাত্রা শুরু করতেন না। তাবূকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) খবর পেলেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই বলছেঃ “আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে তথা হতে প্রবল ও সম্মানীরা দুর্বল ও লাঞ্ছিতদেরকে বহিষ্কার করবেই।” অর্থাৎ আমরা এই দুর্বল ও মর্যাদাহীন মুহাজিরদেরকে আমাদের শহর মদীনা হতে বের করে দিবো। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দিনের শেষ ভাগে অবতরণের পূর্বেই যাত্রা শুরু করে দেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে বলা হয়ঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে তোমার অপরাধের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর।" তখন আল্লাহ্ তা'আলা (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ ইবনে সীরীন পর্যন্ত তো সঠিক বটে, কিন্তু এটা তাবূকের ঘটনা একথা বলার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে, এমনকি এটা সঠিক কথাই নয়। কেননা, তাবূকের যুদ্ধে তো আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই হাযিরই ছিল না, বরং সে তার একটি দল নিয়ে ফিরে গিয়েছিল। কুতুবে। মাগাযী ও সিয়ারের লেখকগণ এ মন্তব্য করেছেন যে, এ মুরীসী যুদ্ধের ঘটনা এবং ???)এই ঘটনায় হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হিব্বান (রঃ), হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আবি বকর (রঃ) এবং হযরত আসিম ইবনে উমার ইবনে কাতাদাহ্ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই যুদ্ধস্থলে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এক জায়গায় অবস্থান করছিলেন। তথায় পানির জায়গার উপর যে জনসমাবেশ ছিল ওর মধ্যে হযরত জাহজাহ ইবনে সাঈদ গিফারী (রঃ) ও হযরত সিনান ইবনে ইয়াযীদ (রাঃ)-এর মাঝে কিছু ঝগড়া হয়ে যায়। হযরত জাহজাহ (রাঃ) হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর একজন কর্মচারী ছিলেন। ঝগড়া চরম আকার ধারণ করে। হযরত সিনান (রাঃ) সাহায্যের জন্যে আনসারদেরকে আহবান করেন এবং হযরত জাহজাহ্ (রাঃ) আহ্বান করেন মুহাজিরদেরকে। ঐ সময় হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) প্রমুখ আনসারদের একটি দল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর পাশে উববিষ্ট ছিলেন। এই ফরিয়াদ শুনে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই বলতে শুরু করেঃ “আমাদের শহরেই এ লোকগুলো আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করে দিলো? আমাদের ও এই কুরায়েশদের দৃষ্টান্ত ওটাই যাকে একজন বলেছে- ‘স্বীয় কুকুরকে তুমি মোটা-তাজা কর যাতে সে তোমাকেই কামড় দেয়। আল্লাহর শপথ! আমরা মদীনায় ফিরে গেলে তথা হতে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কার করবেই।” অতঃপর সে তার পাশে উপবিষ্ট লোকদেরকে সম্বোধন করে বলতে শুরু করলোঃ “সব বিপদ তোমরা নিজেরাই নিজেদের হাতে টেনে এনেছো। তোমরা এই মুহাজিরদেরকে তোমাদের শহরে জায়গা দিয়েছে এবং নিজেদের সম্পদের অর্ধাংশ দান করেছে। এখনো যদি তোমরা তাদেরকে আর্থিক সাহায্য না কর তবে তারা সংকটে পড়ে মদীনা হতে বেরিয়ে যাবে।” হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) এসব কথাই শুনলেন। ঐ সময় তিনি অল্প বয়স্ক ছিলেন। তিনি সরাসরি নবী (সাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন। ঐ সময় তাঁর নিকট হযরত উমার ইবনে খাত্তাবও (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। রাগান্বিত হয়ে তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (রঃ)! আমাকে নির্দেশ দিন, আমি তার গদান উড়িয়ে দিই।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “এ কাজ করলে এটা প্রচারিত হয়ে পড়বে যে, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) নিজের সঙ্গী-সাথীদেরকেও হত্যা করে থাকেন। এটা ঠিক হবে না। যাও, লোকদেরকে যাত্রা শুরু করার হুকুম দিয়ে দাও।” আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই যখন এ খবর পেলো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তার কথা জেনে ফেলেছেন তখন সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো এবং তাঁর দরবারে হাযির হয়ে ওযর-আপত্তি, হীলা-বাহানা করতে লাগলো এবং কথা পাল্টাতে শুরু করলো। আর শপথ করে বলতে লাগলো যে, সে এরূপ কথা কখনো বলেনি। এই লোকটি তার সম্প্রদায়ের মধ্যে খুবই মর্যাদাবান ও প্রভাবশালী ছিল। তাছাড়া লোকেরাও বলতে লাগলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! সম্ভবতঃ এই বালকটিই ভুল বলেছে। সে হয়তো ধারণা করেছে, প্রকৃত ঘটনা হয়তো এটা নয়।” রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) সময়ের পূর্বেই এখান হতে তাড়াতাড়ি যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন। পথে হযরত উসায়েদ ইবনে হুযায়ের (রাঃ) তাঁর সাথে মিলিত হন এবং তাঁর নবুওয়াতের যথাযোগ্য আদবের সাথে তাঁকে সালাম করেন। অতঃপর আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আজ যে সময়ের পূর্বেই যাত্রা শুরু করেছেন, ব্যাপার কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে বলেনঃ “তোমার কি জানা নেই যে, তোমাদের সঙ্গী আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই বলেছেঃ “মদীনায় পৌঁছে আমরা সম্মানিত ব্যক্তিরা লাঞ্ছিত ব্যক্তিদেরকে অর্থাৎ মুহাজিরদেরকে বহিষ্কার করে দিবো?” তখন হযরত উসায়েদ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! সম্মানিত তো আপনিই, আর লাঞ্ছিত হলো তো সেই। আপনি তার কথাকে মোটেই পরোয়া করবেন না। আসলে মদীনায় আপনার আগমনে সে ক্রোধে ও হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছে। মদীনাবাসীরা তাকে নেতা নির্বাচন করার উপর ঐকমত্যে পৌঁছেছিল এবং তার মাথার মুকুটও তৈরী হচ্ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ রাব্বুল আ'লামীন আপনাকে এখানে আনিয়েছেন এবং রাজত্ব তার হাত হতে ছুটে গেছে। কাজেই আপনার উপর সে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছে। হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! চলতে থাকুন।” তাঁরা দুপুরেই যাত্রা শুরু করেছিলেন। সন্ধ্যা হলো, রাত্রি হলো, সকাল হলো, এমনকি রৌদ্রের প্রখরতা এসে গেলে তিনি শিবির স্থাপন করলেন, যাতে জনগণ আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই-এর ঐ কথায় মুষড়ে না পড়ে। জনগণের ক্লান্তি ও রাত্রি জাগরণ ছিল বলে অবতরণ করা মাত্রই সবাই ঘুমিয়ে পড়েন। আর এদিকে এই সূরায়ে মুনাফিকূন অবতীর্ণ হয়ে গেল। (এটা সীরাতে ইসহাক নামক গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। একজন মুহাজির একজন আনসারকে পাথর মেরে দেন। এটাকে কেন্দ্র করে কথা বেড়ে চলে এবং উভয়েই নিজ নিজ দলের নিকট ফরিয়াদ জানান এবং তাঁদেরকে আহ্বান করেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন এবং বলেনঃ “একি অজ্ঞতার যুগের কাজ-কারবার শুরু করলে তোমরা? এই বেদুঈনী অভ্যাস পরিত্যাগ কর।” আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল বলতে লাগলোঃ “এখন মুহাজিরগণ এরূপ করতে শুরু করলো? আল্লাহর কসম! মদীনায় পৌঁছেই আমরা সম্মানীরা এই লাঞ্ছিতদেরকে মদীনা হতে বের করে দিবো।” ঐ সময় মদীনায় আনসারদের সংখ্যা মুহাজিরদের অপেক্ষা বহু গুণে বেশী ছিল। তবে পরবর্তীতে মুহাজিরদের সংখ্যা অনেক হয়ে যায়। হযরত উমার (রাঃ) যখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর এ কথা শুনতে পেলেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এ কাজ হতে বিরত রাখলেন।" (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বলেনঃ “আমি তাবূকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বললোঃ “আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে তথা হতে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কার করবেই।” আমি তার এ কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বর্ণনা করলাম। কিন্তু সে এসে অস্বীকার করে বসলো ও শপথ করলো। ঐ সময় আমার সম্প্রদায় আমাকে বহু কিছু গাল মন্দ দিলো এবং নানা প্রকারে তিরস্কার করলো যে, আমি এরূপ কেন করলাম? আমি দুঃখিত মনে সেখান হতে চলে আসলাম। আমার দুঃখের কোন সীমা থাকলো না। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেনঃ ‘আল্লাহ তা’আলা তোমার ওযর ও সত্যবাদিতা (সম্পৰ্কীয় আয়াত) অবতীর্ণ করেছেন। ঐ সময় ... (আরবি)-এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন) মুসনাদে আহমাদে এটা এভাবেও বর্ণিত আছে যে, হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বলেনঃ “আমি আমার চাচার সাথে এক যুদ্ধে ছিলাম। আমি আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে এ দু’টি কথা বলতে শুনলামঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর সহচরদের জন্যে ব্যয় করো না” এবং “তারা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে তথা হতে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কার করবেই।” আমি এটা আমার চাচার নিকট বর্ণনা করি এবং আমার চাচা তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে ডেকে পাঠালে সে সম্পূর্ণরূপে কথাগুলো অস্বীকার করে এবং শপথও করে নেয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার কথা সত্য ও আমার কথা মিথ্যা বলে মেনে নেন। আমার চাচাও আমাকে বহু তিরস্কার করেন। আমি এতে এতো বেশী দুঃখিত ও লজ্জিত হই যে, বাড়ী হতে বের হওয়া পরিত্যাগ করি। শেষ পর্যন্ত এই সূরাটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার সত্যতা স্বীকার করেন এবং সূরাটি আমাকে পড়ে শুনিয়ে দেন।মুসনাদে আহমাদের অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, এক সফরে সাহাবীগণ সংকটময় অবস্থায় পতিত হলে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই উপরোক্ত কথা দু’টি বলে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডেকে পাঠিয়ে একথা জিজ্ঞেস করলে সে তা অস্বীকার করে এবং শপথ করে বলে যে, সে এরূপ কথা কখনো বলেনি। তখন জনগণ যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ)-কে মিথ্যাবাদী রূপে সাব্যস্ত করেন। এতে হযরত যায়েদ (রাঃ) খুবই দুঃখিত ও লজ্জিত হন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা এ সূরাটি অবতীর্ণ করেন। আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তাদেরকে (মুনাফিকদেরকে) ডাকলে তারা মাথা ফিরিয়ে নেয়।আল্লাহ তা’আলা মুনাফিকদেরকে দেয়ালে ঠেকানো কাঠের স্তম্ভ সদৃশ এই কারণে বলেছেন যে, তারা দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে সুন্দর ছিল। জামে তিরমিযীতে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমরা এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বের হই। কিছু বেদুঈনও আমাদের সাথে ছিল। পানির জায়গায় তারা প্রথমেই পৌঁছতে চাইতো। অনুরূপভাবে আমরাও ঐ চেষ্টাতেই থাকতাম। একদা একজন বেদুঈন গিয়ে পানি দখল করে নেয় এবং হাউয পূর্ণ করে হাউযের চতুর্দিকে সে পাথর রেখে দেয় এবং উপর হতে চামড়া ছড়িয়ে দেয়। একজন আনসারী এসে ঐ হাউযের মধ্য হতে নিজের উটকে পানি পান করাবার ইচ্ছা করে। বেদুঈন তাকে বাধা দেয়। আনসারী জোরপূর্বক পানি পান করাতে গেলে ঐ বেদুঈন লাঠি দ্বারা আনসারীর মাথায় আঘাত করে। ফলে আনসারীর মাথা জখম হয়। আনসারী আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর লোক ছিল বলে সরাসরি তার কাছে চলে যায় এবং ঘটনাটি বর্ণনা করে। এতে সে ভীষণ রাগান্বিত হয় এবং বলেঃ “এই বেদুঈনদেরকে কিছুই দিয়ো না, তাহলে তারা আপনা আপনি ক্ষুধার জ্বালায় পালিয়ে যাবে। এই বেদুঈনরা আহারের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসতো এবং খেয়ে নিতো। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তার সঙ্গীদেরকে বললোঃ “তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খাদ্য নিয়ে এমন সময় যাবে যখন এই বেদুঈনরা থাকবে না। তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে নিয়ে খাদ্য খেয়ে নিবেন এবং এরা খেতে পাবে না। তখন এরা না খেয়ে খেয়ে আপনা আপনি পালিয়ে যাবে। আর আমরা মদীনায় গিয়ে এ হীন ও ছোট লোকদেরকে মদীনা হতে বের করে দিবো।” আমি আমার চাচার পিছনে বসতাম। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই যা কিছু বললো আমি তার সবই শুনলাম এবং আমার চাচার নিকট বর্ণনা করলাম। আমার চাচা তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে ডাকিয়ে নিলেন। সে সবকিছুই অস্বীকার করলো এবং শপথও করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে সত্যবাদী মনে করলেন এবং আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করলেন। আমার চাচা আমার কাছে এসে আমাকে বললেনঃ “তুমি এটা করলে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করেছেন। অন্যান্য মুসলমানরাও তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করেছে।' এ কথা শুনে তো আমার উপর দুঃখের পাহাড় ভেঙ্গে পড়লো। আমি অত্যন্ত দুঃখিত অবস্থায় মাথা নীচু করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। অল্পক্ষণ পরেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আসলেন এবং আমার কান ধরলেন। আমি ফিরে তাকিয়ে দেখি যে, তিনি মুচকি হাসছেন। আল্লাহর শপথ! ঐ সময় আমি এতো বেশী খুশী হয়েছিলাম যে, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। যদি আমি দুনিয়ার চিরস্থায়ী জীবন লাভ করতাম তবুও এতো খুশী হতে পারতাম না। অতঃপর হযরত আবূ বকর (রাঃ) আমার কাছে এসে আমাকে বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাকে কি বললেন?” আমি উত্তরে বললাম, তিনি কিছুই আমাকে বলেনি, শুধু মুচকি হেসে চলে গেলেন। তখন তিনি বললেনঃ “ঠিক আছে, তুমি খুশী হও।” তাঁর চলে যাওয়ার পরেই হযরত উমার (রাঃ) আমার কাছে আসলেন এবং ঐ প্রশ্নই আমাকে করলেন। আমিও ঐ একই জবাব দিলাম। সকালে সূরায়ে মুনাফিকূন অবতীর্ণ হলো।” অন্য রিওয়াইয়াতে সূরাটি (আরবি) পর্যন্ত পড়াও বর্ণিত আছে।আবদুল্লাহ ইবনে লাহীআহ (রঃ) এবং মূসা ইবনে উকবাও (রঃ) এই হাদীসটি মাগাযীর মধ্যে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু এ দু’জনের বর্ণনায় সংবাদদাতার নাম আউস ইবনে আকরাম রয়েছে, যে বানু হারেস ইবনে খাযরাজ গোত্রভুক্ত ছিল। তাহলে সম্ভবতঃ হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) ও খবর পৌঁছিয়েছিলেন এবং হযরত আউসও (রাঃ) পৌঁছিয়েছিলেন। আবার এও হতে পারে যে, বর্ণনাকারী নামে ভুল করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আমর ইবনে সাবিত আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা গাযওয়ায়ে মুরীসীর ঘটনা। এটা ঐ যুদ্ধ যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত খালেদ (রাঃ)-কে প্রেরণ করে ‘মানাত’ প্রতিমাকে ভাঙ্গিয়েছিলেন যা কিফা মুশাললাল ও সমুদ্রের মধ্যস্থলে অবস্থিত ছিল। এই যুদ্ধেই দুই জন লোকের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। একজন ছিলেন মুহাজির এবং অন্যজন ছিলেন বাহায় গোত্রের লোক। বাহায গোত্র আনসারদের মিত্র ছিল। বাহযী আনসারদেরকে এবং মুহাজির মুহাজিরদেরকে আহ্বান করে। উভয়পক্ষের কিছু লোক দাঁড়িয়ে যায় এবং তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। ঝগড়া শেষ হলে মুনাফিক ও রোগা অন্তরের লোকেরা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর নিকট একত্রিত হয় এবং তাকে বলেঃ “আপনার কাছে তো আমরা বহু কিছু আশা করেছিলাম। আমাদের শত্রুদের ব্যাপারে আপনি ছিলেন আমাদের রক্ষক। এখন তো আপনি একেবারে অকেজো ও কর্ম বিমুখ হয়ে পড়েছেন। এখন না আছে আপনার কোন উপকারের চিন্তা, না ক্ষতির চিন্তা। আপনিই তো এই মুহাজিরদেরকে এতোটা উপরে উঠিয়ে দিয়েছেন? কথায় কথায় তারা আমাদের উপর আক্রমণ চালায়। নতুন মুহাজিরদেরকে তারা জালাবীব বলতো। আল্লাহর ঐ শত্রু জবাবে বললোঃ “আল্লাহর কসম! আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে অবশ্যই প্রবলরা দুর্বলদেরকে বহিষ্কার করবে।” মুনাফিক মালিক ইবনে দাখশান বললোঃ “আমি প্রথম থেকেই বলে আসছি যে, এদের সঙ্গে সুসম্পর্ক পরিত্যাগ করা হোক, তাহলে তারা আপনা আপনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে?” হযরত উমার (রাঃ) এসব কথা শুনে নেন। তিনি নবী পাক (সাঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ লোকদের মধ্যে হাঙ্গামার গোড়া পত্তনকারী এই লোকটির ব্যাপারে আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “আমি যদি তোমাকে অনুমতি দিই তবে কি তুমি তাকে হত্যা করে ফেলবে?” জবাবে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আল্লাহর কসম! এখনই আমি তাকে নিজ হাতে হত্যা করে ফেলবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, বসে পড়।” ইতিমধ্যে হযরত উসায়েদ ইবনে হুযায়েরও (রাঃ) ঐ কথা বলতে বলতে আসলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকেও ঐ একই প্রশ্ন করলেন এবং তিনিও ঐ একই উত্তর দিলেন। তাঁকেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বসে যেতে বললেন। এরপর কিছুক্ষণ অতিবাহিত হলে তিনি সকলকে তথা হতে যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন এবং সময়ের পূর্বেই তারা সেখান হতে রওয়ানা হয়ে গেলেন। তারা ঐ দিন-রাত এবং পরবর্তী দিনের সকাল পর্যন্ত বরাবর চলতেই থাকলেন। যখন রৌদ্র প্রখর হয়ে উঠলো তখন অবতরণের হুকুম করলেন। দ্বিপ্রহর ঢলে পড়ার সাথে সাথেই পুনরায় তাড়াতাড়ি যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন। এভাবে চলতে চলতে তৃতীয় দিনের সকাল বেলায় কিফা মুশাললাল হতে মদীনা শরীফে পৌছে গেলেন। হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে হত্যা করার আমি নির্দেশ দিলে সত্যিই কি তুমি তাকে হত্যা করে ফেলতে?” জবাবে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তার মাথা দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতাম।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যদি তুমি সেই দিন তাকে হত্যা করে ফেলতে তবে বহু লোকের নাক ধূলো-মলিন হয়ে যেতো। কেননা, যদি আমি তাদেরকে বলতাম তবে তারাও তাকে হত্যা করতে মোটেই দ্বিধাবোধ করতো না। তখন লোকদের একথা বলার সুযোগ হয়ে যেতো যে, মুহাম্মাদ (সঃ) স্বীয় সহচরদেরকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে থাকেন। এই ঘটনারই বর্ণনা এই আয়াতগুলোতে রয়েছে।” (এ বর্ণনাটি খুবই গরীব। এতে এমন কতকগুলো চমকপ্রদ কথা রয়েছে, যেগুলোর অন্যান্য রিওয়াইয়াতে নেই) সীরাতে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ), যিনি একজন খাঁটি মুসলমান ছিলেন, এই ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি শুনেছি যে, আমার পিতা যে উক্তি করেছে তার প্রতিশোধ হিসেবে আপনি তাকে হত্যা করতে চান। যদি এটা সত্য হয়, তবে তাকে হত্যা করার আদেশ আপনি অন্য কাউকেও দিবেন না। আমিই যাচ্ছি এবং তার কর্তিত মস্তক এনে আপনার পদতলে নিক্ষেপ করছি। আল্লাহর কসম! খাযরাজ গোত্রের প্রত্যেকেই জানে যে, কোন ছেলে তার পিতাকে আমার চেয়ে বেশী শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনকারী নেই। কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে আমার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় পিতাকেও হত্যা করতে প্রস্তুত আছি। যদি আপনি অন্য কাউকেও নির্দেশ দেন এবং সে আমার পিতাকে হত্যা করে তবে আমার ভয় হচ্ছে যে, না জানি হয়তো প্রতিশোধ গ্রহণের নেশায় উন্মত্ত হয়ে তাকে হত্যা করে ফেলবো। আর যদি আমার দ্বারা এ কাজই হয়ে যায় তবে একজন কাফিরের বিনিময়ে একজন মুসলমানকে হত্যা করার অপরাধে আমি জাহান্নামী হয়ে যাবো। সুতরাং এখন আপনি আমার পিতাকে হত্যা করার আদেশ আমাকেই করুন।” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “না, না। আমি তাকে হত্যা করতে চাই না। আমি তো তার সাথে আরো উত্তম ও নম্র ব্যবহার করতে চাই যতক্ষণ সে আমাদের সাথে রয়েছে।” হযরত ইকরামা (রঃ) ও হযরত ইবনে যায়েদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, সেনাবাহিনীসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদীনায় পৌঁছেন তখন ঐ মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) মদীনা শরীফের দরবার উপর দাঁড়িয়ে যান ও তরবারী তুলে ধরেন। জনগণ মদীনায় প্রবেশ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তার পিতা এসে পড়ে। তিনি স্বীয় পিতাকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দাঁড়িয়ে যাও, মদীনায় প্রবেশ করো না।” সে বললোঃ “ব্যাপার কি? আমাকে বাধা দিচ্ছ কেন?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “তুমি মদীনায় প্রবেশ করতে পার না যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (সঃ) অনুমতি দেন। সম্মানিত তিনিই এবং লাঞ্ছিত তুমিই।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসলেনঃ তার অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি সেনাবাহিনীর সর্বশেষ অংশে থাকতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখে ঐ মুনাফিক তাঁর কাছে স্বীয় পুত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার পিতাকে আটক করে রেখেছো কেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আপনি অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত আমার পিতাকে আমি মদীনায় প্রবেশ করতে দিবো না।” অতঃপর নবী (সঃ)-এর অনুমতিক্রমে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তাঁর পিতাকে মদীনায় প্রবেশ করতে দিলেন।মুসনাদে হুমাইদীতে রয়ছে যে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তাঁর পিতাকে বলেনঃ “যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি নিজের মুখে একথা না বলবে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হলেন সম্মানিত এবং তুমি লাঞ্ছিত, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাকে আমি মদীনায় প্রবেশ করতে দিবো না। এর পূর্বে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতার অত্যধিক গাম্ভীর্য ও প্রভাবের কারণে আজ পর্যন্ত আমি তার মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিনি, কিন্তু আপনি যদি তার উপর অসন্তুষ্ট থাকেন তবে আমাকে নির্দেশ দিন, আমি তার মাথা কেটে নিয়ে আপনার নিকট হাযির করছি। অন্য কাউকেও তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিবেন না। এমনও হতে পারে যে, আমার পিতৃহন্তাকে আমি চলাফেরা অবস্থায় দেখতে পারবো না।”
আল-মুনাফিকুন 63:8
৫-৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা অভিশপ্ত মুনাফিকদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ তাদের কৃত পাপের ব্যাপারে খাঁটি মুসলমানরা যখন তাদেরকে বলেঃ এসো, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখন তারা গর্বভরে মাথা দুলিয়ে থাকে। এভাবে তারা বিমুখ হয়ে যায়। এর প্রতিফল হলো এই যে, তাদের জন্যে ক্ষমার দর বন্ধ। তাদের জন্যে নবী (সঃ)-এর ক্ষমা প্রার্থনা তাদের কোনই উপকারে আসবে না। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। সূরায়ে বারাআতে এই বিষয়েই আয়াত গত হয়েছে এবং সেখানে এর তাফসীর এবং সাথে সাথে এই সম্পর্কীয় হাদীসসমূহও বর্ণিত হয়েছে।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে যে, মুনাফিক সুফইয়ান তার মুখখানা ডান দিকে ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং ক্রোধ ও গর্বের সাথে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছিল। ওরই বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে। এগুলো সবই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল সম্পর্কে বর্ণনা, এরূপ মন্তব্য করেছেন পূর্বযুগীয় অধিকাংশ গুরুজন। যেমন এটা সত্বরই আসছে ইনশাআল্লাহ।সীরাতে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের মধ্যে রয়েছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল তার কওমের মধ্যে এক বড় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিল। জুমআ’র দিন নবী (সঃ) যখন খুৎবাহ দেয়ার জন্যে দাঁড়াতেন তখন সে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলতোঃ “হে জনমণ্ডলী! ইনি হলেন আল্লাহর রাসূল (সঃ)। ইনি তোমাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছেন। এরই কারণে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে মর্যাদা দান করেছেন। সুতরাং তাঁকে সাহায্য করা এখন তোমাদের অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তোমরা তাঁকে সম্মান করবে ও মর্যাদা দিবে এবং তিনি যা কিছু বলবেন সবই মেনে চলবে।” এ কথা বলে সে বসে পড়তো। উহুদের যুদ্ধে তার কপটতা প্রকাশ পেয়ে যায়। সেখান হতে সে প্রকাশ্যভাবে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবাধ্যাচরণ করে এক তৃতীয়াংশ সৈন্য নিয়ে মদীনায় ফিরে আসে। যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদীনায় ফিরে আসেন এবং জুমআ’র দিনে মিম্বরের উপর উপবিষ্ট হন তখন অভ্যাসমত আবদুল্লাহ ইবনে উবাই সেদিনও দাঁড়িয়ে যায় এবং সে কথা বলতে যাবে এমতাবস্থায় কয়েক জন সাহাবী এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে যান এবং তার কাপড় ধরে নিয়ে বলে ওঠেনঃ “ওরে আল্লাহর দুশমন! তুই বসে যা। এখন তোর কথা বলার মুখ নেই। তুই যা কিছু করেছিস তা আর কারো কাছে গোপন নেই। তোর আর ঐ যোগ্যতা নেই যে, মন যা চাইবে তাই বলবি।” সে তখন অসন্তুষ্ট হয়ে জনগণের ঘাড়ের উপর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। সে বলতে বলতে গেলঃ “আমি কি কোন মন্দ কথা বলার জন্যে দাঁড়িয়েছিলাম? আমি তো তাঁর কাজ মযবুত করার উদ্দেশ্যেই দাঁড়িয়েছিলাম।” মসজিদের দরজার উপর কয়েক জন আনসারীর সাথে তার সাক্ষাৎ হলো। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ব্যাপার কি?” উত্তরে সে বললঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাজকে দৃঢ় করার উদ্দেশ্যেই দাঁড়িয়েছিলাম এমন সময় কয়েকজন সাহাবী আমার উপর লাফিয়ে পড়ে আমাকে টানা-হেঁচড়া করতে শুরু করে এবং আমাকে ধমকাতে থাকে। তাদের ধারণায় আমি যেন কোন মন্দ কথা বলার জন্যে দাঁড়িয়েছিলাম। অথচ আমার উদ্দেশ্য শুধু এই ছিল যে, আমি তাঁর কথা ও কাজেরই পৃষ্টপোষকতা করবো।” একথা শুনে ঐ আনসারীগণ বললেনঃ “ভাল কথা, তুমি ফিরে চল। আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর নিকট আবেদন জানাবো যে, তিনি যেন তোমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সে তখন বললোঃ “আমার এর কোন প্রয়োজন নেই।”হযরত কাতাদাহ (রঃ) ও হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঘটনাটি ছিল এই যে, তারই কওমের একজন যুবক মুসলমান তার এ ধরনের কার্যকলাপের কথা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট পৌঁছিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে ডাকিয়ে নেন। সে সরাসরি অস্বীকার করে। সে মিথ্যা শপথও করে। তখন আনসারীগণ ঐ সাহাবীকে তিরস্কার এবং শাসন-গর্জন করেন ও মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেন। ঐ সময় এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এতে আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকের মিথ্যা শপথের এবং যুবক সাহাবীটির সত্যবাদীতার বর্ণনা দিয়েছেন। অতঃপর ঐ মুনাফিককে বলা হয়ঃ “চলো, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর মাধ্যমে তোমার পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করিয়ে নাও।” তখন সে অস্বীকার করে এবং মাথা ঘুরিয়ে নিয়ে চলে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কোন মনযিলে অবতরণ করলে সেখানে নামায না পড়া পর্যন্ত যাত্রা শুরু করতেন না। তাবূকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) খবর পেলেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই বলছেঃ “আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে তথা হতে প্রবল ও সম্মানীরা দুর্বল ও লাঞ্ছিতদেরকে বহিষ্কার করবেই।” অর্থাৎ আমরা এই দুর্বল ও মর্যাদাহীন মুহাজিরদেরকে আমাদের শহর মদীনা হতে বের করে দিবো। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দিনের শেষ ভাগে অবতরণের পূর্বেই যাত্রা শুরু করে দেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে বলা হয়ঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট হাযির হয়ে তোমার অপরাধের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর।" তখন আল্লাহ্ তা'আলা (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ ইবনে সীরীন পর্যন্ত তো সঠিক বটে, কিন্তু এটা তাবূকের ঘটনা একথা বলার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে, এমনকি এটা সঠিক কথাই নয়। কেননা, তাবূকের যুদ্ধে তো আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই হাযিরই ছিল না, বরং সে তার একটি দল নিয়ে ফিরে গিয়েছিল। কুতুবে। মাগাযী ও সিয়ারের লেখকগণ এ মন্তব্য করেছেন যে, এ মুরীসী যুদ্ধের ঘটনা এবং ???)এই ঘটনায় হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হিব্বান (রঃ), হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আবি বকর (রঃ) এবং হযরত আসিম ইবনে উমার ইবনে কাতাদাহ্ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই যুদ্ধস্থলে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এক জায়গায় অবস্থান করছিলেন। তথায় পানির জায়গার উপর যে জনসমাবেশ ছিল ওর মধ্যে হযরত জাহজাহ ইবনে সাঈদ গিফারী (রঃ) ও হযরত সিনান ইবনে ইয়াযীদ (রাঃ)-এর মাঝে কিছু ঝগড়া হয়ে যায়। হযরত জাহজাহ (রাঃ) হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ)-এর একজন কর্মচারী ছিলেন। ঝগড়া চরম আকার ধারণ করে। হযরত সিনান (রাঃ) সাহায্যের জন্যে আনসারদেরকে আহবান করেন এবং হযরত জাহজাহ্ (রাঃ) আহ্বান করেন মুহাজিরদেরকে। ঐ সময় হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) প্রমুখ আনসারদের একটি দল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর পাশে উববিষ্ট ছিলেন। এই ফরিয়াদ শুনে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই বলতে শুরু করেঃ “আমাদের শহরেই এ লোকগুলো আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করে দিলো? আমাদের ও এই কুরায়েশদের দৃষ্টান্ত ওটাই যাকে একজন বলেছে- ‘স্বীয় কুকুরকে তুমি মোটা-তাজা কর যাতে সে তোমাকেই কামড় দেয়। আল্লাহর শপথ! আমরা মদীনায় ফিরে গেলে তথা হতে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কার করবেই।” অতঃপর সে তার পাশে উপবিষ্ট লোকদেরকে সম্বোধন করে বলতে শুরু করলোঃ “সব বিপদ তোমরা নিজেরাই নিজেদের হাতে টেনে এনেছো। তোমরা এই মুহাজিরদেরকে তোমাদের শহরে জায়গা দিয়েছে এবং নিজেদের সম্পদের অর্ধাংশ দান করেছে। এখনো যদি তোমরা তাদেরকে আর্থিক সাহায্য না কর তবে তারা সংকটে পড়ে মদীনা হতে বেরিয়ে যাবে।” হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) এসব কথাই শুনলেন। ঐ সময় তিনি অল্প বয়স্ক ছিলেন। তিনি সরাসরি নবী (সাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন। ঐ সময় তাঁর নিকট হযরত উমার ইবনে খাত্তাবও (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। রাগান্বিত হয়ে তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (রঃ)! আমাকে নির্দেশ দিন, আমি তার গদান উড়িয়ে দিই।” তাঁর এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (রাঃ) তাঁকে বললেনঃ “এ কাজ করলে এটা প্রচারিত হয়ে পড়বে যে, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) নিজের সঙ্গী-সাথীদেরকেও হত্যা করে থাকেন। এটা ঠিক হবে না। যাও, লোকদেরকে যাত্রা শুরু করার হুকুম দিয়ে দাও।” আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই যখন এ খবর পেলো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তার কথা জেনে ফেলেছেন তখন সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো এবং তাঁর দরবারে হাযির হয়ে ওযর-আপত্তি, হীলা-বাহানা করতে লাগলো এবং কথা পাল্টাতে শুরু করলো। আর শপথ করে বলতে লাগলো যে, সে এরূপ কথা কখনো বলেনি। এই লোকটি তার সম্প্রদায়ের মধ্যে খুবই মর্যাদাবান ও প্রভাবশালী ছিল। তাছাড়া লোকেরাও বলতে লাগলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! সম্ভবতঃ এই বালকটিই ভুল বলেছে। সে হয়তো ধারণা করেছে, প্রকৃত ঘটনা হয়তো এটা নয়।” রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) সময়ের পূর্বেই এখান হতে তাড়াতাড়ি যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন। পথে হযরত উসায়েদ ইবনে হুযায়ের (রাঃ) তাঁর সাথে মিলিত হন এবং তাঁর নবুওয়াতের যথাযোগ্য আদবের সাথে তাঁকে সালাম করেন। অতঃপর আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আজ যে সময়ের পূর্বেই যাত্রা শুরু করেছেন, ব্যাপার কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে বলেনঃ “তোমার কি জানা নেই যে, তোমাদের সঙ্গী আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই বলেছেঃ “মদীনায় পৌঁছে আমরা সম্মানিত ব্যক্তিরা লাঞ্ছিত ব্যক্তিদেরকে অর্থাৎ মুহাজিরদেরকে বহিষ্কার করে দিবো?” তখন হযরত উসায়েদ (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! সম্মানিত তো আপনিই, আর লাঞ্ছিত হলো তো সেই। আপনি তার কথাকে মোটেই পরোয়া করবেন না। আসলে মদীনায় আপনার আগমনে সে ক্রোধে ও হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছে। মদীনাবাসীরা তাকে নেতা নির্বাচন করার উপর ঐকমত্যে পৌঁছেছিল এবং তার মাথার মুকুটও তৈরী হচ্ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ রাব্বুল আ'লামীন আপনাকে এখানে আনিয়েছেন এবং রাজত্ব তার হাত হতে ছুটে গেছে। কাজেই আপনার উপর সে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছে। হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! চলতে থাকুন।” তাঁরা দুপুরেই যাত্রা শুরু করেছিলেন। সন্ধ্যা হলো, রাত্রি হলো, সকাল হলো, এমনকি রৌদ্রের প্রখরতা এসে গেলে তিনি শিবির স্থাপন করলেন, যাতে জনগণ আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই-এর ঐ কথায় মুষড়ে না পড়ে। জনগণের ক্লান্তি ও রাত্রি জাগরণ ছিল বলে অবতরণ করা মাত্রই সবাই ঘুমিয়ে পড়েন। আর এদিকে এই সূরায়ে মুনাফিকূন অবতীর্ণ হয়ে গেল। (এটা সীরাতে ইসহাক নামক গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে)হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম। একজন মুহাজির একজন আনসারকে পাথর মেরে দেন। এটাকে কেন্দ্র করে কথা বেড়ে চলে এবং উভয়েই নিজ নিজ দলের নিকট ফরিয়াদ জানান এবং তাঁদেরকে আহ্বান করেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন এবং বলেনঃ “একি অজ্ঞতার যুগের কাজ-কারবার শুরু করলে তোমরা? এই বেদুঈনী অভ্যাস পরিত্যাগ কর।” আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল বলতে লাগলোঃ “এখন মুহাজিরগণ এরূপ করতে শুরু করলো? আল্লাহর কসম! মদীনায় পৌঁছেই আমরা সম্মানীরা এই লাঞ্ছিতদেরকে মদীনা হতে বের করে দিবো।” ঐ সময় মদীনায় আনসারদের সংখ্যা মুহাজিরদের অপেক্ষা বহু গুণে বেশী ছিল। তবে পরবর্তীতে মুহাজিরদের সংখ্যা অনেক হয়ে যায়। হযরত উমার (রাঃ) যখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর এ কথা শুনতে পেলেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এ কাজ হতে বিরত রাখলেন।" (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বলেনঃ “আমি তাবূকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বললোঃ “আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে তথা হতে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কার করবেই।” আমি তার এ কথা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বর্ণনা করলাম। কিন্তু সে এসে অস্বীকার করে বসলো ও শপথ করলো। ঐ সময় আমার সম্প্রদায় আমাকে বহু কিছু গাল মন্দ দিলো এবং নানা প্রকারে তিরস্কার করলো যে, আমি এরূপ কেন করলাম? আমি দুঃখিত মনে সেখান হতে চলে আসলাম। আমার দুঃখের কোন সীমা থাকলো না। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেনঃ ‘আল্লাহ তা’আলা তোমার ওযর ও সত্যবাদিতা (সম্পৰ্কীয় আয়াত) অবতীর্ণ করেছেন। ঐ সময় ... (আরবি)-এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন) মুসনাদে আহমাদে এটা এভাবেও বর্ণিত আছে যে, হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বলেনঃ “আমি আমার চাচার সাথে এক যুদ্ধে ছিলাম। আমি আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে এ দু’টি কথা বলতে শুনলামঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর সহচরদের জন্যে ব্যয় করো না” এবং “তারা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে তথা হতে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কার করবেই।” আমি এটা আমার চাচার নিকট বর্ণনা করি এবং আমার চাচা তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে ডেকে পাঠালে সে সম্পূর্ণরূপে কথাগুলো অস্বীকার করে এবং শপথও করে নেয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার কথা সত্য ও আমার কথা মিথ্যা বলে মেনে নেন। আমার চাচাও আমাকে বহু তিরস্কার করেন। আমি এতে এতো বেশী দুঃখিত ও লজ্জিত হই যে, বাড়ী হতে বের হওয়া পরিত্যাগ করি। শেষ পর্যন্ত এই সূরাটি অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার সত্যতা স্বীকার করেন এবং সূরাটি আমাকে পড়ে শুনিয়ে দেন।মুসনাদে আহমাদের অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, এক সফরে সাহাবীগণ সংকটময় অবস্থায় পতিত হলে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই উপরোক্ত কথা দু’টি বলে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ডেকে পাঠিয়ে একথা জিজ্ঞেস করলে সে তা অস্বীকার করে এবং শপথ করে বলে যে, সে এরূপ কথা কখনো বলেনি। তখন জনগণ যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ)-কে মিথ্যাবাদী রূপে সাব্যস্ত করেন। এতে হযরত যায়েদ (রাঃ) খুবই দুঃখিত ও লজ্জিত হন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা এ সূরাটি অবতীর্ণ করেন। আল্লাহর রাসূল (সঃ) তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তাদেরকে (মুনাফিকদেরকে) ডাকলে তারা মাথা ফিরিয়ে নেয়।আল্লাহ তা’আলা মুনাফিকদেরকে দেয়ালে ঠেকানো কাঠের স্তম্ভ সদৃশ এই কারণে বলেছেন যে, তারা দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে সুন্দর ছিল। জামে তিরমিযীতে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমরা এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বের হই। কিছু বেদুঈনও আমাদের সাথে ছিল। পানির জায়গায় তারা প্রথমেই পৌঁছতে চাইতো। অনুরূপভাবে আমরাও ঐ চেষ্টাতেই থাকতাম। একদা একজন বেদুঈন গিয়ে পানি দখল করে নেয় এবং হাউয পূর্ণ করে হাউযের চতুর্দিকে সে পাথর রেখে দেয় এবং উপর হতে চামড়া ছড়িয়ে দেয়। একজন আনসারী এসে ঐ হাউযের মধ্য হতে নিজের উটকে পানি পান করাবার ইচ্ছা করে। বেদুঈন তাকে বাধা দেয়। আনসারী জোরপূর্বক পানি পান করাতে গেলে ঐ বেদুঈন লাঠি দ্বারা আনসারীর মাথায় আঘাত করে। ফলে আনসারীর মাথা জখম হয়। আনসারী আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর লোক ছিল বলে সরাসরি তার কাছে চলে যায় এবং ঘটনাটি বর্ণনা করে। এতে সে ভীষণ রাগান্বিত হয় এবং বলেঃ “এই বেদুঈনদেরকে কিছুই দিয়ো না, তাহলে তারা আপনা আপনি ক্ষুধার জ্বালায় পালিয়ে যাবে। এই বেদুঈনরা আহারের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসতো এবং খেয়ে নিতো। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তার সঙ্গীদেরকে বললোঃ “তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খাদ্য নিয়ে এমন সময় যাবে যখন এই বেদুঈনরা থাকবে না। তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে নিয়ে খাদ্য খেয়ে নিবেন এবং এরা খেতে পাবে না। তখন এরা না খেয়ে খেয়ে আপনা আপনি পালিয়ে যাবে। আর আমরা মদীনায় গিয়ে এ হীন ও ছোট লোকদেরকে মদীনা হতে বের করে দিবো।” আমি আমার চাচার পিছনে বসতাম। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই যা কিছু বললো আমি তার সবই শুনলাম এবং আমার চাচার নিকট বর্ণনা করলাম। আমার চাচা তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে ডাকিয়ে নিলেন। সে সবকিছুই অস্বীকার করলো এবং শপথও করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে সত্যবাদী মনে করলেন এবং আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করলেন। আমার চাচা আমার কাছে এসে আমাকে বললেনঃ “তুমি এটা করলে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করেছেন। অন্যান্য মুসলমানরাও তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করেছে।' এ কথা শুনে তো আমার উপর দুঃখের পাহাড় ভেঙ্গে পড়লো। আমি অত্যন্ত দুঃখিত অবস্থায় মাথা নীচু করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। অল্পক্ষণ পরেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আসলেন এবং আমার কান ধরলেন। আমি ফিরে তাকিয়ে দেখি যে, তিনি মুচকি হাসছেন। আল্লাহর শপথ! ঐ সময় আমি এতো বেশী খুশী হয়েছিলাম যে, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। যদি আমি দুনিয়ার চিরস্থায়ী জীবন লাভ করতাম তবুও এতো খুশী হতে পারতাম না। অতঃপর হযরত আবূ বকর (রাঃ) আমার কাছে এসে আমাকে বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাকে কি বললেন?” আমি উত্তরে বললাম, তিনি কিছুই আমাকে বলেনি, শুধু মুচকি হেসে চলে গেলেন। তখন তিনি বললেনঃ “ঠিক আছে, তুমি খুশী হও।” তাঁর চলে যাওয়ার পরেই হযরত উমার (রাঃ) আমার কাছে আসলেন এবং ঐ প্রশ্নই আমাকে করলেন। আমিও ঐ একই জবাব দিলাম। সকালে সূরায়ে মুনাফিকূন অবতীর্ণ হলো।” অন্য রিওয়াইয়াতে সূরাটি (আরবি) পর্যন্ত পড়াও বর্ণিত আছে।আবদুল্লাহ ইবনে লাহীআহ (রঃ) এবং মূসা ইবনে উকবাও (রঃ) এই হাদীসটি মাগাযীর মধ্যে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু এ দু’জনের বর্ণনায় সংবাদদাতার নাম আউস ইবনে আকরাম রয়েছে, যে বানু হারেস ইবনে খাযরাজ গোত্রভুক্ত ছিল। তাহলে সম্ভবতঃ হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) ও খবর পৌঁছিয়েছিলেন এবং হযরত আউসও (রাঃ) পৌঁছিয়েছিলেন। আবার এও হতে পারে যে, বর্ণনাকারী নামে ভুল করেছেন। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রাঃ) এবং হযরত আমর ইবনে সাবিত আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা গাযওয়ায়ে মুরীসীর ঘটনা। এটা ঐ যুদ্ধ যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত খালেদ (রাঃ)-কে প্রেরণ করে ‘মানাত’ প্রতিমাকে ভাঙ্গিয়েছিলেন যা কিফা মুশাললাল ও সমুদ্রের মধ্যস্থলে অবস্থিত ছিল। এই যুদ্ধেই দুই জন লোকের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। একজন ছিলেন মুহাজির এবং অন্যজন ছিলেন বাহায় গোত্রের লোক। বাহায গোত্র আনসারদের মিত্র ছিল। বাহযী আনসারদেরকে এবং মুহাজির মুহাজিরদেরকে আহ্বান করে। উভয়পক্ষের কিছু লোক দাঁড়িয়ে যায় এবং তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। ঝগড়া শেষ হলে মুনাফিক ও রোগা অন্তরের লোকেরা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর নিকট একত্রিত হয় এবং তাকে বলেঃ “আপনার কাছে তো আমরা বহু কিছু আশা করেছিলাম। আমাদের শত্রুদের ব্যাপারে আপনি ছিলেন আমাদের রক্ষক। এখন তো আপনি একেবারে অকেজো ও কর্ম বিমুখ হয়ে পড়েছেন। এখন না আছে আপনার কোন উপকারের চিন্তা, না ক্ষতির চিন্তা। আপনিই তো এই মুহাজিরদেরকে এতোটা উপরে উঠিয়ে দিয়েছেন? কথায় কথায় তারা আমাদের উপর আক্রমণ চালায়। নতুন মুহাজিরদেরকে তারা জালাবীব বলতো। আল্লাহর ঐ শত্রু জবাবে বললোঃ “আল্লাহর কসম! আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে অবশ্যই প্রবলরা দুর্বলদেরকে বহিষ্কার করবে।” মুনাফিক মালিক ইবনে দাখশান বললোঃ “আমি প্রথম থেকেই বলে আসছি যে, এদের সঙ্গে সুসম্পর্ক পরিত্যাগ করা হোক, তাহলে তারা আপনা আপনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে?” হযরত উমার (রাঃ) এসব কথা শুনে নেন। তিনি নবী পাক (সাঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ লোকদের মধ্যে হাঙ্গামার গোড়া পত্তনকারী এই লোকটির ব্যাপারে আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিই।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “আমি যদি তোমাকে অনুমতি দিই তবে কি তুমি তাকে হত্যা করে ফেলবে?” জবাবে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আল্লাহর কসম! এখনই আমি তাকে নিজ হাতে হত্যা করে ফেলবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, বসে পড়।” ইতিমধ্যে হযরত উসায়েদ ইবনে হুযায়েরও (রাঃ) ঐ কথা বলতে বলতে আসলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকেও ঐ একই প্রশ্ন করলেন এবং তিনিও ঐ একই উত্তর দিলেন। তাঁকেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) বসে যেতে বললেন। এরপর কিছুক্ষণ অতিবাহিত হলে তিনি সকলকে তথা হতে যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন এবং সময়ের পূর্বেই তারা সেখান হতে রওয়ানা হয়ে গেলেন। তারা ঐ দিন-রাত এবং পরবর্তী দিনের সকাল পর্যন্ত বরাবর চলতেই থাকলেন। যখন রৌদ্র প্রখর হয়ে উঠলো তখন অবতরণের হুকুম করলেন। দ্বিপ্রহর ঢলে পড়ার সাথে সাথেই পুনরায় তাড়াতাড়ি যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন। এভাবে চলতে চলতে তৃতীয় দিনের সকাল বেলায় কিফা মুশাললাল হতে মদীনা শরীফে পৌছে গেলেন। হযরত উমার (রাঃ)-কে ডেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে হত্যা করার আমি নির্দেশ দিলে সত্যিই কি তুমি তাকে হত্যা করে ফেলতে?” জবাবে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তার মাথা দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতাম।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যদি তুমি সেই দিন তাকে হত্যা করে ফেলতে তবে বহু লোকের নাক ধূলো-মলিন হয়ে যেতো। কেননা, যদি আমি তাদেরকে বলতাম তবে তারাও তাকে হত্যা করতে মোটেই দ্বিধাবোধ করতো না। তখন লোকদের একথা বলার সুযোগ হয়ে যেতো যে, মুহাম্মাদ (সঃ) স্বীয় সহচরদেরকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে থাকেন। এই ঘটনারই বর্ণনা এই আয়াতগুলোতে রয়েছে।” (এ বর্ণনাটি খুবই গরীব। এতে এমন কতকগুলো চমকপ্রদ কথা রয়েছে, যেগুলোর অন্যান্য রিওয়াইয়াতে নেই) সীরাতে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকে রয়েছে যে, মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ), যিনি একজন খাঁটি মুসলমান ছিলেন, এই ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি শুনেছি যে, আমার পিতা যে উক্তি করেছে তার প্রতিশোধ হিসেবে আপনি তাকে হত্যা করতে চান। যদি এটা সত্য হয়, তবে তাকে হত্যা করার আদেশ আপনি অন্য কাউকেও দিবেন না। আমিই যাচ্ছি এবং তার কর্তিত মস্তক এনে আপনার পদতলে নিক্ষেপ করছি। আল্লাহর কসম! খাযরাজ গোত্রের প্রত্যেকেই জানে যে, কোন ছেলে তার পিতাকে আমার চেয়ে বেশী শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনকারী নেই। কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশক্রমে আমার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় পিতাকেও হত্যা করতে প্রস্তুত আছি। যদি আপনি অন্য কাউকেও নির্দেশ দেন এবং সে আমার পিতাকে হত্যা করে তবে আমার ভয় হচ্ছে যে, না জানি হয়তো প্রতিশোধ গ্রহণের নেশায় উন্মত্ত হয়ে তাকে হত্যা করে ফেলবো। আর যদি আমার দ্বারা এ কাজই হয়ে যায় তবে একজন কাফিরের বিনিময়ে একজন মুসলমানকে হত্যা করার অপরাধে আমি জাহান্নামী হয়ে যাবো। সুতরাং এখন আপনি আমার পিতাকে হত্যা করার আদেশ আমাকেই করুন।” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “না, না। আমি তাকে হত্যা করতে চাই না। আমি তো তার সাথে আরো উত্তম ও নম্র ব্যবহার করতে চাই যতক্ষণ সে আমাদের সাথে রয়েছে।” হযরত ইকরামা (রঃ) ও হযরত ইবনে যায়েদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, সেনাবাহিনীসহ রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদীনায় পৌঁছেন তখন ঐ মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) মদীনা শরীফের দরবার উপর দাঁড়িয়ে যান ও তরবারী তুলে ধরেন। জনগণ মদীনায় প্রবেশ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তার পিতা এসে পড়ে। তিনি স্বীয় পিতাকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দাঁড়িয়ে যাও, মদীনায় প্রবেশ করো না।” সে বললোঃ “ব্যাপার কি? আমাকে বাধা দিচ্ছ কেন?” হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “তুমি মদীনায় প্রবেশ করতে পার না যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (সঃ) অনুমতি দেন। সম্মানিত তিনিই এবং লাঞ্ছিত তুমিই।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসলেনঃ তার অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি সেনাবাহিনীর সর্বশেষ অংশে থাকতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখে ঐ মুনাফিক তাঁর কাছে স্বীয় পুত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার পিতাকে আটক করে রেখেছো কেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহর কসম! আপনি অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত আমার পিতাকে আমি মদীনায় প্রবেশ করতে দিবো না।” অতঃপর নবী (সঃ)-এর অনুমতিক্রমে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তাঁর পিতাকে মদীনায় প্রবেশ করতে দিলেন।মুসনাদে হুমাইদীতে রয়ছে যে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তাঁর পিতাকে বলেনঃ “যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি নিজের মুখে একথা না বলবে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হলেন সম্মানিত এবং তুমি লাঞ্ছিত, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাকে আমি মদীনায় প্রবেশ করতে দিবো না। এর পূর্বে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতার অত্যধিক গাম্ভীর্য ও প্রভাবের কারণে আজ পর্যন্ত আমি তার মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিনি, কিন্তু আপনি যদি তার উপর অসন্তুষ্ট থাকেন তবে আমাকে নির্দেশ দিন, আমি তার মাথা কেটে নিয়ে আপনার নিকট হাযির করছি। অন্য কাউকেও তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিবেন না। এমনও হতে পারে যে, আমার পিতৃহন্তাকে আমি চলাফেরা অবস্থায় দেখতে পারবো না।”
আল-মুনাফিকুন 63:9
৯-১১ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন খুব বেশী বেশী করে আল্লাহর যিক্র করে এবং তাদেরকে সতর্ক করছেন যে, তারা যেন ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততির প্রেমে পড়ে আল্লাহকে ভুলে না যায়। এরপর বলেনঃ যারা আল্লাহর স্মরণে উদাসীন হবে তারা হবে ক্ষতিগ্রস্ত।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁর আনুগত্যের কাজে মাল খরচ করার নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন মৃত্যুর পূর্বেই তাদেরকে প্রদত্ত মাল হতে খরচ করে। মৃত্যুর সময়ের নিরুপায় অবস্থা দেখে মাল খরচ করতঃ শান্তি লাভের আশা করা বৃথা হবে। ঐ সময় তারা চাইবে যে, যদি অল্প সময়ের জন্যেও ছেড়ে দেয়া হতো তবে যা কিছু ভাল কাজ আছে সবই তারা করতো এবং মন খুলে আল্লাহর পথে দান-খয়রাত করতো। কিন্তু তখন সময় কোথায়? যে বিপদ আসার তা এসেই গেছে। এটা কখনো টলবার নয়। বিপদ মাথার উপর এসেই পড়েছে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন তাদের শাস্তি আসবে সেই দিন সম্পর্কে তুমি মানুষকে সতর্ক কর, তখন যালিমরা বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে কিছু কালের জন্যে অবকাশ দিন, আমরা আপনার আহ্বানে সাড়া দিবো এবং রাসূলদেরকে অনুসরণ করবো! তোমরা কি পূর্বে শপথ করে বলতে না যে, তোমাদের পতন নেই?" (১৪:৪৪) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “শেষ পর্যন্ত তাদের কারো যখন মৃত্যু এসে যাবে তখন বলবে- হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যেন আমি ভাল কাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম, কখনো নয়।” (২৩:৯৯-১০০)এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ নির্ধারিত সময়কাল যখন উপস্থিত হয়ে যাবে, আল্লাহ কখনো কাউকেও অবকাশ দিবেন না। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। এ লোকগুলোকে যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তবে এসব কথা তারা ভুলে যাবে এবং পূর্বে যে কাজ করতো পুনরায় ঐ কাজই করতে থাকবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “ঐ মালদার ব্যক্তি যে হজ্ব করেনি ও যাকাত দেয়নি সে মৃত্যুর সময় দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে।" একটি লোক তখন বললোঃ “জনাব! আল্লাহকে ভয় করুন। দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাক্ষা তো করবে কাফির।” তখন তিনি বললেনঃ “তাড়াতাড়ি করছো কেন? আমি তোমাকে কুরআন থেকে এটা পাঠ করে শুনাচ্ছি।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে পূর্ণ রুকূটি পাঠ করে শুনালেন। লোকটি জিজ্ঞেস করলোঃ “কি পরিমাণ সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হয়?” জবাবে তিনি বলেনঃ “দুই শত এবং এর চেয়ে বেশী হলে।” সে প্রশ্ন করলোঃ “হজ্ব কখন ফরয হয়?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “যখন পথ খরচ ও সওয়ারীর শক্তি থাকে। একটি মারফূ’ রিওয়াইয়াতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। কিন্তু এর মাওকুফটাই সঠিকতর। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হযরত যহ্হাক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে ইনকিতা' রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, একদা সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বেশী বয়সের আলোচনা করেন। তখন তিনি বলেনঃ “নির্ধারিত কাল যখন উপস্থিত হবে, আল্লাহ কখনো অবকাশ দিবেন না। বয়সের আধিক্য এই ভাবে হয় যে, আল্লাহ তা’আলা কোন বান্দাকে সুসন্তান দান করেন এবং ঐ সন্তানরা তাদের পিতার মৃত্যুর পর তার জন্যে দু'আ করতে থাকে। ঐ দু'আ তার কবরে পৌঁছে থাকে।”
আল-মুনাফিকুন 63:10
৯-১১ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন খুব বেশী বেশী করে আল্লাহর যিক্র করে এবং তাদেরকে সতর্ক করছেন যে, তারা যেন ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততির প্রেমে পড়ে আল্লাহকে ভুলে না যায়। এরপর বলেনঃ যারা আল্লাহর স্মরণে উদাসীন হবে তারা হবে ক্ষতিগ্রস্ত।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁর আনুগত্যের কাজে মাল খরচ করার নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন মৃত্যুর পূর্বেই তাদেরকে প্রদত্ত মাল হতে খরচ করে। মৃত্যুর সময়ের নিরুপায় অবস্থা দেখে মাল খরচ করতঃ শান্তি লাভের আশা করা বৃথা হবে। ঐ সময় তারা চাইবে যে, যদি অল্প সময়ের জন্যেও ছেড়ে দেয়া হতো তবে যা কিছু ভাল কাজ আছে সবই তারা করতো এবং মন খুলে আল্লাহর পথে দান-খয়রাত করতো। কিন্তু তখন সময় কোথায়? যে বিপদ আসার তা এসেই গেছে। এটা কখনো টলবার নয়। বিপদ মাথার উপর এসেই পড়েছে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন তাদের শাস্তি আসবে সেই দিন সম্পর্কে তুমি মানুষকে সতর্ক কর, তখন যালিমরা বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে কিছু কালের জন্যে অবকাশ দিন, আমরা আপনার আহ্বানে সাড়া দিবো এবং রাসূলদেরকে অনুসরণ করবো! তোমরা কি পূর্বে শপথ করে বলতে না যে, তোমাদের পতন নেই?" (১৪:৪৪) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “শেষ পর্যন্ত তাদের কারো যখন মৃত্যু এসে যাবে তখন বলবে- হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যেন আমি ভাল কাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম, কখনো নয়।” (২৩:৯৯-১০০)এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ নির্ধারিত সময়কাল যখন উপস্থিত হয়ে যাবে, আল্লাহ কখনো কাউকেও অবকাশ দিবেন না। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। এ লোকগুলোকে যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তবে এসব কথা তারা ভুলে যাবে এবং পূর্বে যে কাজ করতো পুনরায় ঐ কাজই করতে থাকবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “ঐ মালদার ব্যক্তি যে হজ্ব করেনি ও যাকাত দেয়নি সে মৃত্যুর সময় দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে।" একটি লোক তখন বললোঃ “জনাব! আল্লাহকে ভয় করুন। দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাক্ষা তো করবে কাফির।” তখন তিনি বললেনঃ “তাড়াতাড়ি করছো কেন? আমি তোমাকে কুরআন থেকে এটা পাঠ করে শুনাচ্ছি।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে পূর্ণ রুকূটি পাঠ করে শুনালেন। লোকটি জিজ্ঞেস করলোঃ “কি পরিমাণ সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হয়?” জবাবে তিনি বলেনঃ “দুই শত এবং এর চেয়ে বেশী হলে।” সে প্রশ্ন করলোঃ “হজ্ব কখন ফরয হয়?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “যখন পথ খরচ ও সওয়ারীর শক্তি থাকে। একটি মারফূ’ রিওয়াইয়াতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। কিন্তু এর মাওকুফটাই সঠিকতর। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হযরত যহ্হাক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে ইনকিতা' রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, একদা সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বেশী বয়সের আলোচনা করেন। তখন তিনি বলেনঃ “নির্ধারিত কাল যখন উপস্থিত হবে, আল্লাহ কখনো অবকাশ দিবেন না। বয়সের আধিক্য এই ভাবে হয় যে, আল্লাহ তা’আলা কোন বান্দাকে সুসন্তান দান করেন এবং ঐ সন্তানরা তাদের পিতার মৃত্যুর পর তার জন্যে দু'আ করতে থাকে। ঐ দু'আ তার কবরে পৌঁছে থাকে।”
আল-মুনাফিকুন 63:11
৯-১১ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন খুব বেশী বেশী করে আল্লাহর যিক্র করে এবং তাদেরকে সতর্ক করছেন যে, তারা যেন ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততির প্রেমে পড়ে আল্লাহকে ভুলে না যায়। এরপর বলেনঃ যারা আল্লাহর স্মরণে উদাসীন হবে তারা হবে ক্ষতিগ্রস্ত।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাঁর আনুগত্যের কাজে মাল খরচ করার নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন মৃত্যুর পূর্বেই তাদেরকে প্রদত্ত মাল হতে খরচ করে। মৃত্যুর সময়ের নিরুপায় অবস্থা দেখে মাল খরচ করতঃ শান্তি লাভের আশা করা বৃথা হবে। ঐ সময় তারা চাইবে যে, যদি অল্প সময়ের জন্যেও ছেড়ে দেয়া হতো তবে যা কিছু ভাল কাজ আছে সবই তারা করতো এবং মন খুলে আল্লাহর পথে দান-খয়রাত করতো। কিন্তু তখন সময় কোথায়? যে বিপদ আসার তা এসেই গেছে। এটা কখনো টলবার নয়। বিপদ মাথার উপর এসেই পড়েছে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “যেদিন তাদের শাস্তি আসবে সেই দিন সম্পর্কে তুমি মানুষকে সতর্ক কর, তখন যালিমরা বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে কিছু কালের জন্যে অবকাশ দিন, আমরা আপনার আহ্বানে সাড়া দিবো এবং রাসূলদেরকে অনুসরণ করবো! তোমরা কি পূর্বে শপথ করে বলতে না যে, তোমাদের পতন নেই?" (১৪:৪৪) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “শেষ পর্যন্ত তাদের কারো যখন মৃত্যু এসে যাবে তখন বলবে- হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যেন আমি ভাল কাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম, কখনো নয়।” (২৩:৯৯-১০০)এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ নির্ধারিত সময়কাল যখন উপস্থিত হয়ে যাবে, আল্লাহ কখনো কাউকেও অবকাশ দিবেন না। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। এ লোকগুলোকে যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তবে এসব কথা তারা ভুলে যাবে এবং পূর্বে যে কাজ করতো পুনরায় ঐ কাজই করতে থাকবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “ঐ মালদার ব্যক্তি যে হজ্ব করেনি ও যাকাত দেয়নি সে মৃত্যুর সময় দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে।" একটি লোক তখন বললোঃ “জনাব! আল্লাহকে ভয় করুন। দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাক্ষা তো করবে কাফির।” তখন তিনি বললেনঃ “তাড়াতাড়ি করছো কেন? আমি তোমাকে কুরআন থেকে এটা পাঠ করে শুনাচ্ছি।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে পূর্ণ রুকূটি পাঠ করে শুনালেন। লোকটি জিজ্ঞেস করলোঃ “কি পরিমাণ সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হয়?” জবাবে তিনি বলেনঃ “দুই শত এবং এর চেয়ে বেশী হলে।” সে প্রশ্ন করলোঃ “হজ্ব কখন ফরয হয়?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “যখন পথ খরচ ও সওয়ারীর শক্তি থাকে। একটি মারফূ’ রিওয়াইয়াতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। কিন্তু এর মাওকুফটাই সঠিকতর। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হযরত যহ্হাক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে ইনকিতা' রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, একদা সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বেশী বয়সের আলোচনা করেন। তখন তিনি বলেনঃ “নির্ধারিত কাল যখন উপস্থিত হবে, আল্লাহ কখনো অবকাশ দিবেন না। বয়সের আধিক্য এই ভাবে হয় যে, আল্লাহ তা’আলা কোন বান্দাকে সুসন্তান দান করেন এবং ঐ সন্তানরা তাদের পিতার মৃত্যুর পর তার জন্যে দু'আ করতে থাকে। ঐ দু'আ তার কবরে পৌঁছে থাকে।”