Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আত-তাগাবুন 64:1 – আত-তাহরীম 66:12

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আত-তাগাবুন 64:1
  2. আত-তাগাবুন 64:2
  3. আত-তাগাবুন 64:3
  4. আত-তাগাবুন 64:4
  5. আত-তাগাবুন 64:5
  6. আত-তাগাবুন 64:6
  7. আত-তাগাবুন 64:7
  8. আত-তাগাবুন 64:8
  9. আত-তাগাবুন 64:9
  10. আত-তাগাবুন 64:10
  11. আত-তাগাবুন 64:11
  12. আত-তাগাবুন 64:12
  13. আত-তাগাবুন 64:13
  14. আত-তাগাবুন 64:14
  15. আত-তাগাবুন 64:15
  16. আত-তাগাবুন 64:16
  17. আত-তাগাবুন 64:17
  18. আত-তাগাবুন 64:18
  19. আত-তালাক 65:1
  20. আত-তালাক 65:2
  21. আত-তালাক 65:3
  22. আত-তালাক 65:4
  23. আত-তালাক 65:5
  24. আত-তালাক 65:6
  25. আত-তালাক 65:7
  26. আত-তালাক 65:8
  27. আত-তালাক 65:9
  28. আত-তালাক 65:10
  29. আত-তালাক 65:11
  30. আত-তালাক 65:12
  31. আত-তাহরীম 66:1
  32. আত-তাহরীম 66:2
  33. আত-তাহরীম 66:3
  34. আত-তাহরীম 66:4
  35. আত-তাহরীম 66:5
  36. আত-তাহরীম 66:6
  37. আত-তাহরীম 66:7
  38. আত-তাহরীম 66:8
  39. আত-তাহরীম 66:9
  40. আত-তাহরীম 66:10
  41. আত-তাহরীম 66:11
  42. আত-তাহরীম 66:12

আত-তাগাবুন 64:1

আবার এটাকে মাক্কী সূরাও বলা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে শিশু জন্মগ্রহণ করে তার মাথার জোড়ে সূরায়ে তাগায়ূনের পাঁচটি আয়াত লিখিত থাকে। (ইমাম তিবরানী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে আসাকির (রঃ) ওয়ালী ইবনে সালেহ এর জীবনীতে আনয়ন করেছেন। কিন্তুটি হাদীসটি গারীব এমনকি মুনকারও বটে) ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর সাব্বাহাতের সূরাগুলোর মধ্যে এটাই সর্বশেষ সূরা। সৃষ্টি কুলের আল্লাহ্ পাকের তাসবীহ্ পাঠের বর্ণনা কয়েকবার দেয়া হয়েছে। রাজত্ব ও প্রশংসার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ্। সব কিছুরই উপর রয়েছে তাঁর কর্তৃত্ব, প্রত্যেক কাজ ও প্রত্যেক জিনিসের পরিমাপ বা মূল্যায়ন নির্ধারণকারী তিনিই। তিনিই প্রশংসারযোগ্য। যে জিনিসের তিনি ইচ্ছা করেন তা তিনি কার্যে পরিণতকারী। কেউই তাঁর কোন কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। তিনি না চাইলে কোন কিছুই হবে না। তিনি সারা মাখলূকের সৃষ্টিকর্তা। তাঁরই ইচ্ছায় মানবমণ্ডলীর কেউ হয়েছে কাফির এবং কেউ হয়েছে মুমিন। কে হিদায়াতের যোগ্য এবং কে গুমরাহীর যোগ্য তা তিনি সম্যক অবগত। তিনি স্বীয় বান্দাদের সমৃদয় কাজকর্ম প্রত্যক্ষকারী। তাদেরকে তিনি তাদের সমুদয় কাজের প্রতিদান প্রদানকারী। তিনি আদল ও হিকমতের সাথে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। তিনিই মানুষকে আকৃতি দান করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মানুষ! কিসে তোমাকে তোমার মহান প্রতিপালক সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করলো? যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুঠাম করেছেন এবং সুসমঞ্জস করেছেন, যেই আকৃতিতে চেয়েছেন, তিনি তোমাকে গঠন করেছেন।” (৮২:৬-৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ তিনিই যিনি তোমাদের জন্যে যমীনকে শান্তির স্থল বানিয়েছেন এবং আসমানকে বানিয়েছেন ছাদ স্বরূপ, আর তোমাদেরকে আকৃতি দান করেছেন- তোমাদের আকৃতি করেছেন সুশোভন এবং তোমাদেরকে উৎকৃষ্ট ও পবিত্র বস্তু হতে রিয্‌ক দান করেছেন।” (৪০:৬৪)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যাবর্তন তো তাঁরই নিকট। আল্লাহ তা'আলা যে আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় বিষয় অবগত আছেন এ সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে তিনি বলেনঃ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তিনি জানেন এবং তিনি জানেন তোমরা যা গোপন কর ও তোমরা যা প্রকাশ কর এবং তিনি অন্তর্যামী।

আত-তাগাবুন 64:2

আবার এটাকে মাক্কী সূরাও বলা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে শিশু জন্মগ্রহণ করে তার মাথার জোড়ে সূরায়ে তাগায়ূনের পাঁচটি আয়াত লিখিত থাকে। (ইমাম তিবরানী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে আসাকির (রঃ) ওয়ালী ইবনে সালেহ এর জীবনীতে আনয়ন করেছেন। কিন্তুটি হাদীসটি গারীব এমনকি মুনকারও বটে) ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর সাব্বাহাতের সূরাগুলোর মধ্যে এটাই সর্বশেষ সূরা। সৃষ্টি কুলের আল্লাহ্ পাকের তাসবীহ্ পাঠের বর্ণনা কয়েকবার দেয়া হয়েছে। রাজত্ব ও প্রশংসার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ্। সব কিছুরই উপর রয়েছে তাঁর কর্তৃত্ব, প্রত্যেক কাজ ও প্রত্যেক জিনিসের পরিমাপ বা মূল্যায়ন নির্ধারণকারী তিনিই। তিনিই প্রশংসারযোগ্য। যে জিনিসের তিনি ইচ্ছা করেন তা তিনি কার্যে পরিণতকারী। কেউই তাঁর কোন কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। তিনি না চাইলে কোন কিছুই হবে না। তিনি সারা মাখলূকের সৃষ্টিকর্তা। তাঁরই ইচ্ছায় মানবমণ্ডলীর কেউ হয়েছে কাফির এবং কেউ হয়েছে মুমিন। কে হিদায়াতের যোগ্য এবং কে গুমরাহীর যোগ্য তা তিনি সম্যক অবগত। তিনি স্বীয় বান্দাদের সমৃদয় কাজকর্ম প্রত্যক্ষকারী। তাদেরকে তিনি তাদের সমুদয় কাজের প্রতিদান প্রদানকারী। তিনি আদল ও হিকমতের সাথে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। তিনিই মানুষকে আকৃতি দান করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মানুষ! কিসে তোমাকে তোমার মহান প্রতিপালক সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করলো? যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুঠাম করেছেন এবং সুসমঞ্জস করেছেন, যেই আকৃতিতে চেয়েছেন, তিনি তোমাকে গঠন করেছেন।” (৮২:৬-৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ তিনিই যিনি তোমাদের জন্যে যমীনকে শান্তির স্থল বানিয়েছেন এবং আসমানকে বানিয়েছেন ছাদ স্বরূপ, আর তোমাদেরকে আকৃতি দান করেছেন- তোমাদের আকৃতি করেছেন সুশোভন এবং তোমাদেরকে উৎকৃষ্ট ও পবিত্র বস্তু হতে রিয্‌ক দান করেছেন।” (৪০:৬৪)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যাবর্তন তো তাঁরই নিকট। আল্লাহ তা'আলা যে আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় বিষয় অবগত আছেন এ সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে তিনি বলেনঃ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তিনি জানেন এবং তিনি জানেন তোমরা যা গোপন কর ও তোমরা যা প্রকাশ কর এবং তিনি অন্তর্যামী।

আত-তাগাবুন 64:3

আবার এটাকে মাক্কী সূরাও বলা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে শিশু জন্মগ্রহণ করে তার মাথার জোড়ে সূরায়ে তাগায়ূনের পাঁচটি আয়াত লিখিত থাকে। (ইমাম তিবরানী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে আসাকির (রঃ) ওয়ালী ইবনে সালেহ এর জীবনীতে আনয়ন করেছেন। কিন্তুটি হাদীসটি গারীব এমনকি মুনকারও বটে) ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর সাব্বাহাতের সূরাগুলোর মধ্যে এটাই সর্বশেষ সূরা। সৃষ্টি কুলের আল্লাহ্ পাকের তাসবীহ্ পাঠের বর্ণনা কয়েকবার দেয়া হয়েছে। রাজত্ব ও প্রশংসার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ্। সব কিছুরই উপর রয়েছে তাঁর কর্তৃত্ব, প্রত্যেক কাজ ও প্রত্যেক জিনিসের পরিমাপ বা মূল্যায়ন নির্ধারণকারী তিনিই। তিনিই প্রশংসারযোগ্য। যে জিনিসের তিনি ইচ্ছা করেন তা তিনি কার্যে পরিণতকারী। কেউই তাঁর কোন কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। তিনি না চাইলে কোন কিছুই হবে না। তিনি সারা মাখলূকের সৃষ্টিকর্তা। তাঁরই ইচ্ছায় মানবমণ্ডলীর কেউ হয়েছে কাফির এবং কেউ হয়েছে মুমিন। কে হিদায়াতের যোগ্য এবং কে গুমরাহীর যোগ্য তা তিনি সম্যক অবগত। তিনি স্বীয় বান্দাদের সমৃদয় কাজকর্ম প্রত্যক্ষকারী। তাদেরকে তিনি তাদের সমুদয় কাজের প্রতিদান প্রদানকারী। তিনি আদল ও হিকমতের সাথে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। তিনিই মানুষকে আকৃতি দান করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মানুষ! কিসে তোমাকে তোমার মহান প্রতিপালক সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করলো? যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুঠাম করেছেন এবং সুসমঞ্জস করেছেন, যেই আকৃতিতে চেয়েছেন, তিনি তোমাকে গঠন করেছেন।” (৮২:৬-৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ তিনিই যিনি তোমাদের জন্যে যমীনকে শান্তির স্থল বানিয়েছেন এবং আসমানকে বানিয়েছেন ছাদ স্বরূপ, আর তোমাদেরকে আকৃতি দান করেছেন- তোমাদের আকৃতি করেছেন সুশোভন এবং তোমাদেরকে উৎকৃষ্ট ও পবিত্র বস্তু হতে রিয্‌ক দান করেছেন।” (৪০:৬৪)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যাবর্তন তো তাঁরই নিকট। আল্লাহ তা'আলা যে আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় বিষয় অবগত আছেন এ সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে তিনি বলেনঃ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তিনি জানেন এবং তিনি জানেন তোমরা যা গোপন কর ও তোমরা যা প্রকাশ কর এবং তিনি অন্তর্যামী।

আত-তাগাবুন 64:4

আবার এটাকে মাক্কী সূরাও বলা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে শিশু জন্মগ্রহণ করে তার মাথার জোড়ে সূরায়ে তাগায়ূনের পাঁচটি আয়াত লিখিত থাকে। (ইমাম তিবরানী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে আসাকির (রঃ) ওয়ালী ইবনে সালেহ এর জীবনীতে আনয়ন করেছেন। কিন্তুটি হাদীসটি গারীব এমনকি মুনকারও বটে) ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর সাব্বাহাতের সূরাগুলোর মধ্যে এটাই সর্বশেষ সূরা। সৃষ্টি কুলের আল্লাহ্ পাকের তাসবীহ্ পাঠের বর্ণনা কয়েকবার দেয়া হয়েছে। রাজত্ব ও প্রশংসার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ্। সব কিছুরই উপর রয়েছে তাঁর কর্তৃত্ব, প্রত্যেক কাজ ও প্রত্যেক জিনিসের পরিমাপ বা মূল্যায়ন নির্ধারণকারী তিনিই। তিনিই প্রশংসারযোগ্য। যে জিনিসের তিনি ইচ্ছা করেন তা তিনি কার্যে পরিণতকারী। কেউই তাঁর কোন কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। তিনি না চাইলে কোন কিছুই হবে না। তিনি সারা মাখলূকের সৃষ্টিকর্তা। তাঁরই ইচ্ছায় মানবমণ্ডলীর কেউ হয়েছে কাফির এবং কেউ হয়েছে মুমিন। কে হিদায়াতের যোগ্য এবং কে গুমরাহীর যোগ্য তা তিনি সম্যক অবগত। তিনি স্বীয় বান্দাদের সমৃদয় কাজকর্ম প্রত্যক্ষকারী। তাদেরকে তিনি তাদের সমুদয় কাজের প্রতিদান প্রদানকারী। তিনি আদল ও হিকমতের সাথে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। তিনিই মানুষকে আকৃতি দান করেছেন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মানুষ! কিসে তোমাকে তোমার মহান প্রতিপালক সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করলো? যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুঠাম করেছেন এবং সুসমঞ্জস করেছেন, যেই আকৃতিতে চেয়েছেন, তিনি তোমাকে গঠন করেছেন।” (৮২:৬-৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ তিনিই যিনি তোমাদের জন্যে যমীনকে শান্তির স্থল বানিয়েছেন এবং আসমানকে বানিয়েছেন ছাদ স্বরূপ, আর তোমাদেরকে আকৃতি দান করেছেন- তোমাদের আকৃতি করেছেন সুশোভন এবং তোমাদেরকে উৎকৃষ্ট ও পবিত্র বস্তু হতে রিয্‌ক দান করেছেন।” (৪০:৬৪)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যাবর্তন তো তাঁরই নিকট। আল্লাহ তা'আলা যে আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় বিষয় অবগত আছেন এ সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে তিনি বলেনঃ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তিনি জানেন এবং তিনি জানেন তোমরা যা গোপন কর ও তোমরা যা প্রকাশ কর এবং তিনি অন্তর্যামী।

আত-তাগাবুন 64:5

৫-৬ নং আয়াতের তাফসীর এখানে পূর্ববর্তী কাফিরদের কুফরী এবং তাদের মন্দ শাস্তি ও নিকৃষ্ট বিনিময়ের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের নিকট কি তোমাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের বৃত্তান্ত নেই? তারা রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল ও সত্যকে অস্বীকার করেছিল। তারা দুনিয়া ও আখিরাতে ধ্বংস হয়ে গেছে। দুনিয়াতেও তারা আল্লাহর কোপানলে পতিত হয়েছে এবং আখিরাতের শাস্তি তাদের জন্যে বাকী রয়েছে। ঐ শাস্তি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। এর একমাত্র কারণ এটাই যে, রাসূলগণ তাদের নিকট আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে স্পষ্ট দলীল ও উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ নিয়ে আগমন করেছিলেন, কিন্তু তারা ওগুলো অবিশ্বাস করেছিল। একজন মানুষ যে নবী হতে পারেন তা তারা অসম্ভব মনে করেছিল। তাই তারা নবীদেরকে স্বীকার করেনি এবং সৎ আমলও পরিত্যাগ করেছিল। তখন আল্লাহ তা’আলাও তাদেরকে পরোয়া করেননি। কারণ তিনি তো সম্পূর্ণরূপে অভাবমুক্ত এবং প্রশংসার্হ।

আত-তাগাবুন 64:6

৫-৬ নং আয়াতের তাফসীর এখানে পূর্ববর্তী কাফিরদের কুফরী এবং তাদের মন্দ শাস্তি ও নিকৃষ্ট বিনিময়ের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের নিকট কি তোমাদের পূর্ববর্তী কাফিরদের বৃত্তান্ত নেই? তারা রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল ও সত্যকে অস্বীকার করেছিল। তারা দুনিয়া ও আখিরাতে ধ্বংস হয়ে গেছে। দুনিয়াতেও তারা আল্লাহর কোপানলে পতিত হয়েছে এবং আখিরাতের শাস্তি তাদের জন্যে বাকী রয়েছে। ঐ শাস্তি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। এর একমাত্র কারণ এটাই যে, রাসূলগণ তাদের নিকট আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে স্পষ্ট দলীল ও উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ নিয়ে আগমন করেছিলেন, কিন্তু তারা ওগুলো অবিশ্বাস করেছিল। একজন মানুষ যে নবী হতে পারেন তা তারা অসম্ভব মনে করেছিল। তাই তারা নবীদেরকে স্বীকার করেনি এবং সৎ আমলও পরিত্যাগ করেছিল। তখন আল্লাহ তা’আলাও তাদেরকে পরোয়া করেননি। কারণ তিনি তো সম্পূর্ণরূপে অভাবমুক্ত এবং প্রশংসার্হ।

আত-তাগাবুন 64:7

৭-১০ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, কাফির, মুশরিক ও মুলহিদরা মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানকে অবিশ্বাস করছে, তাই তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। জেনে রেখো যে, তোমাদেরকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা, তোমাদের বিনিময় প্রদান করা ইত্যাদি কাজ আল্লাহ তা'আলার পক্ষে খুবই সহজ।এটা হচ্ছে তৃতীয় আয়াত যাতে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কসম খেয়ে কিয়ামতের সত্যতা বর্ণনা করতে বলেছেন। প্রথম সূরায়ে ইউনুসে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা তোমার নিকট জানতে চায় যে, এটা কি সত্য? বল- হ্যাঁ, আমার প্রতিপালকের শপথ! এটা অবশ্যই সত্য। আর তোমরা এটা ব্যর্থ করতে পারবে না।” (১০:৫৩) দ্বিতীয় আয়াত সূরায়ে সাবাতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলে- আমাদের কিয়ামত আসবে না। বল- আসবেই, শপথ আমার প্রতিপালকের, নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট ওটা আসবেই।” (৩৪:৩) আর তৃতীয় হলো এই আয়াতটিঃ (আরবি)অর্থাৎ “কাফিররা ধারণা করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বল- নিশ্চয়ই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে।অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ অতএব তোমরা ঈমান আনয়ন কর আল্লাহর উপর, তাঁর রাসূলের উপর এবং যে নূর আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন তার উপর অর্থাৎ কুরআনের উপর। আর তোমাদের কোন গোপন আমলও আল্লাহর নিকট অজানা নয়, বরং তিনি সব কিছুরই খবর রাখেন।মহান আল্লাহর উক্তিঃ সমাবেশের দিন অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তোমাদেরকে সমবেত করবেন। ঐদিন আল্লাহ তা’আলা সকলকে একত্রিত করবেন বলেই ঐ দিনকে অর্থাৎ কিয়ামতের দিনকে (আরবি) বলা হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওটা লোকদেরকে একত্রিত করার ও হাযির করার দিন।” (১১:১০৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “বলঃ নিশ্চয়ই পূর্ববর্তীগণ ও পরবর্তীগণ সকলকে একত্রিত করা হবে এক নির্ধারিত দিনের নির্ধারিত সময়ে।” (৫৬:৪৯-৫০)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো কিয়ামতের একটি নাম। কিয়ামতের এই নামের কারণ এই যে, জান্নাতবাসীরা জাহান্নামবাসীদেরকে ক্ষতির মধ্যে নিক্ষেপ করবে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ এর চেয়ে বড় তাগাবুন যা ক্ষতি কি হতে পারে যে, জান্নাতীদের সামনে তাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে? এর পরবর্তী আয়াতই যেন এর তাফসীর। মহান আল্লাহ বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহে বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে তিনি তার পাপ মোচন করবেন এবং তাকে দাখিল করবেন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তারা হবে চিরস্থায়ী। এটাই মহাসাফল্য। কিন্তু যারা কুফরী করে এবং আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেথায় তারা স্থায়ী হবে। কত মন্দ সে প্রত্যাবর্তন স্থল!

আত-তাগাবুন 64:8

৭-১০ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, কাফির, মুশরিক ও মুলহিদরা মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানকে অবিশ্বাস করছে, তাই তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। জেনে রেখো যে, তোমাদেরকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা, তোমাদের বিনিময় প্রদান করা ইত্যাদি কাজ আল্লাহ তা'আলার পক্ষে খুবই সহজ।এটা হচ্ছে তৃতীয় আয়াত যাতে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কসম খেয়ে কিয়ামতের সত্যতা বর্ণনা করতে বলেছেন। প্রথম সূরায়ে ইউনুসে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা তোমার নিকট জানতে চায় যে, এটা কি সত্য? বল- হ্যাঁ, আমার প্রতিপালকের শপথ! এটা অবশ্যই সত্য। আর তোমরা এটা ব্যর্থ করতে পারবে না।” (১০:৫৩) দ্বিতীয় আয়াত সূরায়ে সাবাতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলে- আমাদের কিয়ামত আসবে না। বল- আসবেই, শপথ আমার প্রতিপালকের, নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট ওটা আসবেই।” (৩৪:৩) আর তৃতীয় হলো এই আয়াতটিঃ (আরবি)অর্থাৎ “কাফিররা ধারণা করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বল- নিশ্চয়ই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে।অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ অতএব তোমরা ঈমান আনয়ন কর আল্লাহর উপর, তাঁর রাসূলের উপর এবং যে নূর আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন তার উপর অর্থাৎ কুরআনের উপর। আর তোমাদের কোন গোপন আমলও আল্লাহর নিকট অজানা নয়, বরং তিনি সব কিছুরই খবর রাখেন।মহান আল্লাহর উক্তিঃ সমাবেশের দিন অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তোমাদেরকে সমবেত করবেন। ঐদিন আল্লাহ তা’আলা সকলকে একত্রিত করবেন বলেই ঐ দিনকে অর্থাৎ কিয়ামতের দিনকে (আরবি) বলা হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওটা লোকদেরকে একত্রিত করার ও হাযির করার দিন।” (১১:১০৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “বলঃ নিশ্চয়ই পূর্ববর্তীগণ ও পরবর্তীগণ সকলকে একত্রিত করা হবে এক নির্ধারিত দিনের নির্ধারিত সময়ে।” (৫৬:৪৯-৫০)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো কিয়ামতের একটি নাম। কিয়ামতের এই নামের কারণ এই যে, জান্নাতবাসীরা জাহান্নামবাসীদেরকে ক্ষতির মধ্যে নিক্ষেপ করবে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ এর চেয়ে বড় তাগাবুন যা ক্ষতি কি হতে পারে যে, জান্নাতীদের সামনে তাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে? এর পরবর্তী আয়াতই যেন এর তাফসীর। মহান আল্লাহ বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহে বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে তিনি তার পাপ মোচন করবেন এবং তাকে দাখিল করবেন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তারা হবে চিরস্থায়ী। এটাই মহাসাফল্য। কিন্তু যারা কুফরী করে এবং আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেথায় তারা স্থায়ী হবে। কত মন্দ সে প্রত্যাবর্তন স্থল!

আত-তাগাবুন 64:9

৭-১০ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, কাফির, মুশরিক ও মুলহিদরা মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানকে অবিশ্বাস করছে, তাই তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। জেনে রেখো যে, তোমাদেরকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা, তোমাদের বিনিময় প্রদান করা ইত্যাদি কাজ আল্লাহ তা'আলার পক্ষে খুবই সহজ।এটা হচ্ছে তৃতীয় আয়াত যাতে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কসম খেয়ে কিয়ামতের সত্যতা বর্ণনা করতে বলেছেন। প্রথম সূরায়ে ইউনুসে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা তোমার নিকট জানতে চায় যে, এটা কি সত্য? বল- হ্যাঁ, আমার প্রতিপালকের শপথ! এটা অবশ্যই সত্য। আর তোমরা এটা ব্যর্থ করতে পারবে না।” (১০:৫৩) দ্বিতীয় আয়াত সূরায়ে সাবাতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলে- আমাদের কিয়ামত আসবে না। বল- আসবেই, শপথ আমার প্রতিপালকের, নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট ওটা আসবেই।” (৩৪:৩) আর তৃতীয় হলো এই আয়াতটিঃ (আরবি)অর্থাৎ “কাফিররা ধারণা করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বল- নিশ্চয়ই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে।অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ অতএব তোমরা ঈমান আনয়ন কর আল্লাহর উপর, তাঁর রাসূলের উপর এবং যে নূর আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন তার উপর অর্থাৎ কুরআনের উপর। আর তোমাদের কোন গোপন আমলও আল্লাহর নিকট অজানা নয়, বরং তিনি সব কিছুরই খবর রাখেন।মহান আল্লাহর উক্তিঃ সমাবেশের দিন অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তোমাদেরকে সমবেত করবেন। ঐদিন আল্লাহ তা’আলা সকলকে একত্রিত করবেন বলেই ঐ দিনকে অর্থাৎ কিয়ামতের দিনকে (আরবি) বলা হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওটা লোকদেরকে একত্রিত করার ও হাযির করার দিন।” (১১:১০৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “বলঃ নিশ্চয়ই পূর্ববর্তীগণ ও পরবর্তীগণ সকলকে একত্রিত করা হবে এক নির্ধারিত দিনের নির্ধারিত সময়ে।” (৫৬:৪৯-৫০)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো কিয়ামতের একটি নাম। কিয়ামতের এই নামের কারণ এই যে, জান্নাতবাসীরা জাহান্নামবাসীদেরকে ক্ষতির মধ্যে নিক্ষেপ করবে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ এর চেয়ে বড় তাগাবুন যা ক্ষতি কি হতে পারে যে, জান্নাতীদের সামনে তাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে? এর পরবর্তী আয়াতই যেন এর তাফসীর। মহান আল্লাহ বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহে বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে তিনি তার পাপ মোচন করবেন এবং তাকে দাখিল করবেন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তারা হবে চিরস্থায়ী। এটাই মহাসাফল্য। কিন্তু যারা কুফরী করে এবং আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেথায় তারা স্থায়ী হবে। কত মন্দ সে প্রত্যাবর্তন স্থল!

আত-তাগাবুন 64:10

৭-১০ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, কাফির, মুশরিক ও মুলহিদরা মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানকে অবিশ্বাস করছে, তাই তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। জেনে রেখো যে, তোমাদেরকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা, তোমাদের বিনিময় প্রদান করা ইত্যাদি কাজ আল্লাহ তা'আলার পক্ষে খুবই সহজ।এটা হচ্ছে তৃতীয় আয়াত যাতে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কসম খেয়ে কিয়ামতের সত্যতা বর্ণনা করতে বলেছেন। প্রথম সূরায়ে ইউনুসে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা তোমার নিকট জানতে চায় যে, এটা কি সত্য? বল- হ্যাঁ, আমার প্রতিপালকের শপথ! এটা অবশ্যই সত্য। আর তোমরা এটা ব্যর্থ করতে পারবে না।” (১০:৫৩) দ্বিতীয় আয়াত সূরায়ে সাবাতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “কাফিররা বলে- আমাদের কিয়ামত আসবে না। বল- আসবেই, শপথ আমার প্রতিপালকের, নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট ওটা আসবেই।” (৩৪:৩) আর তৃতীয় হলো এই আয়াতটিঃ (আরবি)অর্থাৎ “কাফিররা ধারণা করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বল- নিশ্চয়ই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে।অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ অতএব তোমরা ঈমান আনয়ন কর আল্লাহর উপর, তাঁর রাসূলের উপর এবং যে নূর আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন তার উপর অর্থাৎ কুরআনের উপর। আর তোমাদের কোন গোপন আমলও আল্লাহর নিকট অজানা নয়, বরং তিনি সব কিছুরই খবর রাখেন।মহান আল্লাহর উক্তিঃ সমাবেশের দিন অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তোমাদেরকে সমবেত করবেন। ঐদিন আল্লাহ তা’আলা সকলকে একত্রিত করবেন বলেই ঐ দিনকে অর্থাৎ কিয়ামতের দিনকে (আরবি) বলা হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওটা লোকদেরকে একত্রিত করার ও হাযির করার দিন।” (১১:১০৩) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “বলঃ নিশ্চয়ই পূর্ববর্তীগণ ও পরবর্তীগণ সকলকে একত্রিত করা হবে এক নির্ধারিত দিনের নির্ধারিত সময়ে।” (৫৬:৪৯-৫০)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) হলো কিয়ামতের একটি নাম। কিয়ামতের এই নামের কারণ এই যে, জান্নাতবাসীরা জাহান্নামবাসীদেরকে ক্ষতির মধ্যে নিক্ষেপ করবে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ এর চেয়ে বড় তাগাবুন যা ক্ষতি কি হতে পারে যে, জান্নাতীদের সামনে তাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে? এর পরবর্তী আয়াতই যেন এর তাফসীর। মহান আল্লাহ বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহে বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে তিনি তার পাপ মোচন করবেন এবং তাকে দাখিল করবেন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তারা হবে চিরস্থায়ী। এটাই মহাসাফল্য। কিন্তু যারা কুফরী করে এবং আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেথায় তারা স্থায়ী হবে। কত মন্দ সে প্রত্যাবর্তন স্থল!

আত-তাগাবুন 64:11

১১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর সূরায়ে হাদীদেও এ বিষয়টি গত হয়েছে যে, যা কিছু হয় তা আল্লাহর হুকুমেই হয়। তাঁর ইচ্ছা ও নির্ধারণ ছাড়া কিছুই হয় না। এখন কোন লোকের উপর কোন বিপদ আপতিত হলে তার এটা বিশ্বাস করা উচিত যে, এ বিপদ আল্লাহর ফায়সালা ও নির্ধারণক্রমেই আপতিত হয়েছে। সুতরাং তার উচিত ধৈর্যধারণ করা এবং আল্লাহর মর্জির উপর স্থির থাকা। আর সে যেন পুণ্য ও কল্যাণের আশা রাখে। সে যেন আল্লাহর ফায়সালাকে দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেয়। তাহলে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তার অন্তরে হিদায়াত দান করবেন। সে তখন সঠিক বিশ্বাসের ঔজ্জ্বল্য স্বীয় অন্তরে দেখতে পাবে। আবার কোন কোন সময় এমনও হয় যে, ঐ বিপদের বিনিময়ে আল্লাহ তা’আলা দুনিয়াতেই অফুরন্ত কল্যাণ দান করে থাকেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তার ঈমান দৃঢ় হয়ে যায়। সে বিশ্বাস রাখে যে, যে বিপদ তার উপর আপতিত হয়েছে তা আপতিত হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা হওয়ারই ছিল না। হযরত আলকামা (রাঃ)-এর সামনে এ আয়াতটি পাঠ করা হয় এবং তাঁকে এর ভাবার্থ জিজ্ঞেস করা হয়। তখন তিনি বলেনঃ “এর দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে প্রত্যেক বিপদের সময় এই বিশ্বাস রাখে যে, ঐ বিপদ আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে। অতঃপর সন্তুষ্ট চিত্তে সে তা সহ্য করে।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) ও হযরত মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ এই যে, সে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পাঠ করে।‘মুত্তাফাকুন আলাইহি' এর হাদীসে রয়েছেঃ মু'মিনের জন্যে বিস্মিত হতে হয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা তার জন্যে যে ফায়সালাই করেন তা তার জন্যে কল্যাণকরই হয়ে থাকে। তার উপর কোন বিপদ আপতিত হলে সে সবর করে, সুতরাং তা হয় তার জন্যে কল্যাণকর। আবার তার জন্যে আনন্দদায়ক কোন ব্যাপার ঘটলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং সেটাও হয় তার জন্যে কল্যাণকর। এটা মু'মিন ছাড়া আর কারো জন্যে নয়।” হযরত উবাদাহ্ ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ আমল সর্বোত্তম?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহ্ উপর ঈমান আনা, তাঁর সত্যতা বিশ্বাস করা এবং তাঁর পথে জিহাদ করা।” লোকটি বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমি এর চেয়ে কোন সহজ আমল কামনা করছি।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “তোমার ভাগ্যে যে ফায়সালা করে দেয়া হয়েছে ঐ ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে তিরস্কার বা নিন্দে করবে না (বরং তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে)।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য কর। অর্থাৎ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ) যা করার আদেশ করেছেন তা পালন কর এবং যা করতে নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকো। অতঃপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ্ বলেনঃ যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, (তবে জেনে রেখো যে,) আমার রাসূল (সঃ)-এর দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে প্রচার করা। অর্থাৎ যদি তোমরা মান্য না কর তবে তোমাদের আমলের জন্যে আল্লাহর রাসূল (সঃ) মোটেই দায়ী হবেন না। তাঁর দায়িত্ব তো শুধু স্পষ্টভাবে প্রচার করে দেয়া এবং তাঁর এ দায়িত্ব তিনি যথাযথভাবে পালন করেছেন। এখন তোমাদের দুষ্কর্মের শাস্তি তোমাদেরকেই ভোগ করতে হবে।এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং মু'মিনরা যেন আল্লাহর উপরই নির্ভর করে। প্রথম বাক্যে তাওহীদের খবর দেয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো তলব, অর্থাৎ আল্লাহর তাওহীদকে মেনে নাও এবং ইখলাসের সাথে শুধু তাঁরই ইবাদত কর।যেহেতু নির্ভরযোগ্য একমাত্র আল্লাহ্ সেই হেতু মু'মিনদের উচিত একমাত্র তাঁরই উপর নির্ভর করা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের অধিকর্তা, তিনি ব্যতীত কোন মা’বূদ নেই, অতএব তাঁকেই গ্রহণ কর কর্ম বিধায়করূপে।” (৭৩:৯)

আত-তাগাবুন 64:12

১১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর সূরায়ে হাদীদেও এ বিষয়টি গত হয়েছে যে, যা কিছু হয় তা আল্লাহর হুকুমেই হয়। তাঁর ইচ্ছা ও নির্ধারণ ছাড়া কিছুই হয় না। এখন কোন লোকের উপর কোন বিপদ আপতিত হলে তার এটা বিশ্বাস করা উচিত যে, এ বিপদ আল্লাহর ফায়সালা ও নির্ধারণক্রমেই আপতিত হয়েছে। সুতরাং তার উচিত ধৈর্যধারণ করা এবং আল্লাহর মর্জির উপর স্থির থাকা। আর সে যেন পুণ্য ও কল্যাণের আশা রাখে। সে যেন আল্লাহর ফায়সালাকে দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেয়। তাহলে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তার অন্তরে হিদায়াত দান করবেন। সে তখন সঠিক বিশ্বাসের ঔজ্জ্বল্য স্বীয় অন্তরে দেখতে পাবে। আবার কোন কোন সময় এমনও হয় যে, ঐ বিপদের বিনিময়ে আল্লাহ তা’আলা দুনিয়াতেই অফুরন্ত কল্যাণ দান করে থাকেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তার ঈমান দৃঢ় হয়ে যায়। সে বিশ্বাস রাখে যে, যে বিপদ তার উপর আপতিত হয়েছে তা আপতিত হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা হওয়ারই ছিল না। হযরত আলকামা (রাঃ)-এর সামনে এ আয়াতটি পাঠ করা হয় এবং তাঁকে এর ভাবার্থ জিজ্ঞেস করা হয়। তখন তিনি বলেনঃ “এর দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে প্রত্যেক বিপদের সময় এই বিশ্বাস রাখে যে, ঐ বিপদ আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে। অতঃপর সন্তুষ্ট চিত্তে সে তা সহ্য করে।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) ও হযরত মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ এই যে, সে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পাঠ করে।‘মুত্তাফাকুন আলাইহি' এর হাদীসে রয়েছেঃ মু'মিনের জন্যে বিস্মিত হতে হয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা তার জন্যে যে ফায়সালাই করেন তা তার জন্যে কল্যাণকরই হয়ে থাকে। তার উপর কোন বিপদ আপতিত হলে সে সবর করে, সুতরাং তা হয় তার জন্যে কল্যাণকর। আবার তার জন্যে আনন্দদায়ক কোন ব্যাপার ঘটলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং সেটাও হয় তার জন্যে কল্যাণকর। এটা মু'মিন ছাড়া আর কারো জন্যে নয়।” হযরত উবাদাহ্ ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ আমল সর্বোত্তম?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহ্ উপর ঈমান আনা, তাঁর সত্যতা বিশ্বাস করা এবং তাঁর পথে জিহাদ করা।” লোকটি বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমি এর চেয়ে কোন সহজ আমল কামনা করছি।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “তোমার ভাগ্যে যে ফায়সালা করে দেয়া হয়েছে ঐ ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে তিরস্কার বা নিন্দে করবে না (বরং তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে)।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য কর। অর্থাৎ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ) যা করার আদেশ করেছেন তা পালন কর এবং যা করতে নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকো। অতঃপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ্ বলেনঃ যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, (তবে জেনে রেখো যে,) আমার রাসূল (সঃ)-এর দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে প্রচার করা। অর্থাৎ যদি তোমরা মান্য না কর তবে তোমাদের আমলের জন্যে আল্লাহর রাসূল (সঃ) মোটেই দায়ী হবেন না। তাঁর দায়িত্ব তো শুধু স্পষ্টভাবে প্রচার করে দেয়া এবং তাঁর এ দায়িত্ব তিনি যথাযথভাবে পালন করেছেন। এখন তোমাদের দুষ্কর্মের শাস্তি তোমাদেরকেই ভোগ করতে হবে।এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং মু'মিনরা যেন আল্লাহর উপরই নির্ভর করে। প্রথম বাক্যে তাওহীদের খবর দেয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো তলব, অর্থাৎ আল্লাহর তাওহীদকে মেনে নাও এবং ইখলাসের সাথে শুধু তাঁরই ইবাদত কর।যেহেতু নির্ভরযোগ্য একমাত্র আল্লাহ্ সেই হেতু মু'মিনদের উচিত একমাত্র তাঁরই উপর নির্ভর করা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের অধিকর্তা, তিনি ব্যতীত কোন মা’বূদ নেই, অতএব তাঁকেই গ্রহণ কর কর্ম বিধায়করূপে।” (৭৩:৯)

আত-তাগাবুন 64:13

১১-১৩ নং আয়াতের তাফসীর সূরায়ে হাদীদেও এ বিষয়টি গত হয়েছে যে, যা কিছু হয় তা আল্লাহর হুকুমেই হয়। তাঁর ইচ্ছা ও নির্ধারণ ছাড়া কিছুই হয় না। এখন কোন লোকের উপর কোন বিপদ আপতিত হলে তার এটা বিশ্বাস করা উচিত যে, এ বিপদ আল্লাহর ফায়সালা ও নির্ধারণক্রমেই আপতিত হয়েছে। সুতরাং তার উচিত ধৈর্যধারণ করা এবং আল্লাহর মর্জির উপর স্থির থাকা। আর সে যেন পুণ্য ও কল্যাণের আশা রাখে। সে যেন আল্লাহর ফায়সালাকে দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেয়। তাহলে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তার অন্তরে হিদায়াত দান করবেন। সে তখন সঠিক বিশ্বাসের ঔজ্জ্বল্য স্বীয় অন্তরে দেখতে পাবে। আবার কোন কোন সময় এমনও হয় যে, ঐ বিপদের বিনিময়ে আল্লাহ তা’আলা দুনিয়াতেই অফুরন্ত কল্যাণ দান করে থাকেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তার ঈমান দৃঢ় হয়ে যায়। সে বিশ্বাস রাখে যে, যে বিপদ তার উপর আপতিত হয়েছে তা আপতিত হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা হওয়ারই ছিল না। হযরত আলকামা (রাঃ)-এর সামনে এ আয়াতটি পাঠ করা হয় এবং তাঁকে এর ভাবার্থ জিজ্ঞেস করা হয়। তখন তিনি বলেনঃ “এর দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে প্রত্যেক বিপদের সময় এই বিশ্বাস রাখে যে, ঐ বিপদ আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে। অতঃপর সন্তুষ্ট চিত্তে সে তা সহ্য করে।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করেছেন)হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) ও হযরত মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ এই যে, সে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পাঠ করে।‘মুত্তাফাকুন আলাইহি' এর হাদীসে রয়েছেঃ মু'মিনের জন্যে বিস্মিত হতে হয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা তার জন্যে যে ফায়সালাই করেন তা তার জন্যে কল্যাণকরই হয়ে থাকে। তার উপর কোন বিপদ আপতিত হলে সে সবর করে, সুতরাং তা হয় তার জন্যে কল্যাণকর। আবার তার জন্যে আনন্দদায়ক কোন ব্যাপার ঘটলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং সেটাও হয় তার জন্যে কল্যাণকর। এটা মু'মিন ছাড়া আর কারো জন্যে নয়।” হযরত উবাদাহ্ ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন্ আমল সর্বোত্তম?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আল্লাহ্ উপর ঈমান আনা, তাঁর সত্যতা বিশ্বাস করা এবং তাঁর পথে জিহাদ করা।” লোকটি বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমি এর চেয়ে কোন সহজ আমল কামনা করছি।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “তোমার ভাগ্যে যে ফায়সালা করে দেয়া হয়েছে ঐ ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে তিরস্কার বা নিন্দে করবে না (বরং তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে)।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এরপর মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য কর। অর্থাৎ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ) যা করার আদেশ করেছেন তা পালন কর এবং যা করতে নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকো। অতঃপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ্ বলেনঃ যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, (তবে জেনে রেখো যে,) আমার রাসূল (সঃ)-এর দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে প্রচার করা। অর্থাৎ যদি তোমরা মান্য না কর তবে তোমাদের আমলের জন্যে আল্লাহর রাসূল (সঃ) মোটেই দায়ী হবেন না। তাঁর দায়িত্ব তো শুধু স্পষ্টভাবে প্রচার করে দেয়া এবং তাঁর এ দায়িত্ব তিনি যথাযথভাবে পালন করেছেন। এখন তোমাদের দুষ্কর্মের শাস্তি তোমাদেরকেই ভোগ করতে হবে।এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, সুতরাং মু'মিনরা যেন আল্লাহর উপরই নির্ভর করে। প্রথম বাক্যে তাওহীদের খবর দেয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো তলব, অর্থাৎ আল্লাহর তাওহীদকে মেনে নাও এবং ইখলাসের সাথে শুধু তাঁরই ইবাদত কর।যেহেতু নির্ভরযোগ্য একমাত্র আল্লাহ্ সেই হেতু মু'মিনদের উচিত একমাত্র তাঁরই উপর নির্ভর করা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের অধিকর্তা, তিনি ব্যতীত কোন মা’বূদ নেই, অতএব তাঁকেই গ্রহণ কর কর্ম বিধায়করূপে।” (৭৩:৯)

আত-তাগাবুন 64:14

১৪-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ্ তা'আলা স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ কতক স্ত্রী তাদের স্বামীদেরকে এবং কতক সন্তান তাদের পিতা-মাতাদেরকে আল্লাহ্‌ স্মরণ ও নেক আমল হতে দূরে সরিয়ে রাখে যা প্রকৃতপক্ষে শক্রতাই বটে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমাদের ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। যারা উদাসীন হবে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” (৬৩:৯) এখানেও আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তোমরা তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। দ্বীনের রক্ষণাবেক্ষণকে তাদের প্রয়োজন ও ফরমায়েশ পূর্ণ করার উপর প্রাধান্য দিবে। মানুষ স্ত্রী, ছেলে মেয়ে এবং মাল-ধনের খাতিরে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে এবং আল্লাহর নাফরমানী করে বসে। তাদের প্রেমে পড়ে আহকামে ইলাহীকে পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মক্কাবাসী কতক লোক ইসলাম কবূল করে নিয়েছিল, কিন্তু স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের প্রেমে পড়ে হিজরত করেনি। অতঃপর যখন ইসলামের খুব বেশী প্রকাশ ঘটে তখন তারা হিজরত করে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর নিকট চলে যায়। গিয়ে দেখে যে, যাঁরা পূর্বে হিজরত করেছিলেন তাঁরা বহু কিছুর জ্ঞান লাভ করেছেন। তখন এই লোকদের মনে হলো যে, তারা তাদের সন্তান-সন্ততিকে শাস্তি প্রদান করবে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা ঘোষণা করলেনঃ তোমরা যদি তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ-ক্রটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। অর্থাৎ এখন তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদেরকে ক্ষমা করে দাও, ভবিষ্যতের জন্যে সতর্ক থাকবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্যে পরীক্ষা, আল্লাহরই নিকট রয়েছে মহাপুরস্কার।' অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন যে, এগুলো পেয়ে কে নাফরমানীতে জড়িয়ে পড়ছে এবং কে আনুগত্য করছে। আল্লাহ তা'আলার নিকট যে মহাপুরস্কার রয়েছে সেদিকে মানুষের খেয়াল রাখা উচিত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণ রৌপ্য আর চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদি পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি, মানুষের নিকট মনোরম করা হয়েছে। এই সব ইহজীবনের ভোগ্যবস্তু। আর আল্লাহ্, তাঁর নিকট উত্তম আশ্রয়স্থল।” (৩:১৪) আরো, যা এর পরে রয়েছে।হযরত আবূ বুরাইদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুৎবাহ দিচ্ছিলেন এমন সময় হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) লম্বা লম্বা জামা পরিহিত হয়ে এসে পড়লেন। তাঁরা জামার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে বাধা লেগে লেগে পড়ছিলেন ও উঠছিলেন, এই ভাবে আসছিলেন। তাঁরা তো তখন শিশু! জামাগুলো লাল রঙএর ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দৃষ্টি তাঁদের উপর পড়া মাত্রই তিনি মিম্বর হতে নেমে গিয়ে তাদেরকে উঠিয়ে নিয়ে আসলেন এবং নিজের সামনে বসিয়ে নিলেন। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সত্য বলেছেন এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ও সত্য কথা বলেছেন, তা হলোঃ “তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্যে পরীক্ষা।” এই দুই শিশুকে পড়ে উঠে আসতে দেখে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। তাই খুৎবাহ ছেড়ে এদেরকে উঠিয়ে নিয়ে আসতে হলো। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটি হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আশআস ইবনে কায়েস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “কিনদাহ গোত্রের প্রতিনিধি দলের মধ্যে শামিল হয়ে আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সন্তান-সন্ততি আছে কি?” আমি উত্তরে বললামঃ জ্বী হ্যাঁ, আপনার খিদমতে হাযির হওয়ার উদ্দেশ্যে বের হবার সময় আমার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। যদি তার স্থলে একটি বন্য জন্তু হতো তবে ওটাই আমার জন্যে ভাল ছিল। তিনি একথা শুনে বললেনঃ “না, না, এরূপ কথা বলো না। এরাই হলো চক্ষু ঠাণ্ডাকারী এবং এরা মারা গেলেও পুণ্য রয়েছে। তারপর তিনি বললেনঃ “তবে হ্যাঁ, এরা আবার ভীরুতা ও দুঃখেরও কারণ হয়ে থাকে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সন্তান অন্তরের ফল বটে, কিন্তু আবার সন্তানই কাপুরুষতা, কৃপণতা ও দুঃখেরও কারণ হয়।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বায্‌যার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ মালিক আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শুধু ঐ ব্যক্তি তোমার শত্রু নয় যে, (সে কাফির বলে) তুমি (যুদ্ধে) তাকে হত্যা কর তবে ওটা হবে তোমার জন্যে সফলতা, আর যদি তুমি নিহত হও তবে তুমি জান্নাতে প্রবেশ করবে। বরং সম্ভবতঃ তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তোমার সন্তান, যে তোমার পৃষ্ঠ হতে বের হয়েছে। অতঃপর তোমার আর একটি চরম শত্রু হলো তোমার মাল, যার মালিক হয়েছে তোমার দক্ষিণ হস্ত। [এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তিবরানী (রঃ)]এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর।' অর্থাৎ তোমরা তোমাদের শক্তি ও সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় কর। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি যখন তোমাদেরকে কোন আদেশ করবো তখন তোমরা যথাসাধ্য তা পালন করবে এবং যখন নিষেধ করবো (কোন কিছু হতে) তখন তা হতে বিরত থাকবে।”কোন কোন মুফাসসির বলেছেন যে, এই আয়াতটি সূরায়ে আলে ইমরানের নিম্নের আয়াতটিকে রহিতকারীঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর এবং তোমরা আত্মসমর্পণ না করে কোন অবস্থায় মরো না।" (৩:১০২) অর্থাৎ প্রথমে বলেছিলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর। আর পরে বললেনঃ ‘তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেছেন, প্রথম আয়াতটি জনগণের কাছে খুবই কঠিন ঠেকেছিল। তাঁরা নামাযে এতো দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁদের পা ফুলে যেতো। আর তাঁরা সিজদায় এতো দীর্ঘক্ষণ ধরে পড়ে থাকতেন যে, তাঁদের কপালে ক্ষত হয়ে যেতো। তখন আল্লাহ তা'আলা এই দ্বিতীয় আয়াতটি নাযিল করে তাঁদের উপর হালকা করে দিলেন। আরো কিছু মুফাসসিরও একথাই বলেছেন যে, প্রথম আয়াতটি মানসূখ এবং দ্বিতীয় আয়াতটি নাসেখ। অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুগত হয়ে যাও। তাদের আনুগত্য হতে এক ইঞ্চি পরিমাণও এদিক ওদিক হয়ো না। আগেও বেড়ে যেয়ো না এবং পিছনেও সরে এসো না। আর আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে যা দিয়ে রেখেছেন তা হতে তোমাদের আত্মীয়-স্বজনকে ফকীর-মিসকীন ও অভাবগ্রস্তদেরকে দান করতে থাকো। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের প্রতি যে ইহসান করেছেন ঐ ইহসান তোমরা তাঁর সৃষ্টজীবের প্রতি করে যাও। তাহলে এটা হবে তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যদি এটা না কর তবে দুনিয়ার ধ্বংস তোমরা নিজেরাই নিজেদের হাতে টেনে আনবে। (আরবি) এর তাফসীর সূরায়ে হাশরের এই আয়াতে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর তবে তিনি তোমাদের জন্যে ওটা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। অর্থাৎ তোমাদের দরিদ্র ও অভাগ্রস্তদের উপর খরচ করাই হলো আল্লাহ তা'আলাকে উত্তম ঋণ দেয়া। সূরায়ে বাকারাতেও এটা গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। অর্থাৎ তোমাদের অপরাধসমূহ তিনি মার্জনা করবেন। এ জন্যেই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এখানে বলেনঃ আল্লাহ গুণগ্রাহী অর্থাৎ তিনি অল্প সকাজের বেশী পুণ্য দান করেন এবং তিনি সহনশীল অর্থাৎ তিনি পাপ ও অপরাধসমূহ ক্ষমা করে থাকেন এবং স্বীয় বান্দাদের পাপ দেখেও দেখেন না। অর্থাৎ ক্ষমার চক্ষে দেখেন। তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এর তাফসীর ইতিপূর্বে কয়েকবার গত হয়েছে।

আত-তাগাবুন 64:15

১৪-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ্ তা'আলা স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ কতক স্ত্রী তাদের স্বামীদেরকে এবং কতক সন্তান তাদের পিতা-মাতাদেরকে আল্লাহ্‌ স্মরণ ও নেক আমল হতে দূরে সরিয়ে রাখে যা প্রকৃতপক্ষে শক্রতাই বটে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমাদের ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। যারা উদাসীন হবে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” (৬৩:৯) এখানেও আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তোমরা তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। দ্বীনের রক্ষণাবেক্ষণকে তাদের প্রয়োজন ও ফরমায়েশ পূর্ণ করার উপর প্রাধান্য দিবে। মানুষ স্ত্রী, ছেলে মেয়ে এবং মাল-ধনের খাতিরে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে এবং আল্লাহর নাফরমানী করে বসে। তাদের প্রেমে পড়ে আহকামে ইলাহীকে পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মক্কাবাসী কতক লোক ইসলাম কবূল করে নিয়েছিল, কিন্তু স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের প্রেমে পড়ে হিজরত করেনি। অতঃপর যখন ইসলামের খুব বেশী প্রকাশ ঘটে তখন তারা হিজরত করে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর নিকট চলে যায়। গিয়ে দেখে যে, যাঁরা পূর্বে হিজরত করেছিলেন তাঁরা বহু কিছুর জ্ঞান লাভ করেছেন। তখন এই লোকদের মনে হলো যে, তারা তাদের সন্তান-সন্ততিকে শাস্তি প্রদান করবে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা ঘোষণা করলেনঃ তোমরা যদি তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ-ক্রটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। অর্থাৎ এখন তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদেরকে ক্ষমা করে দাও, ভবিষ্যতের জন্যে সতর্ক থাকবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্যে পরীক্ষা, আল্লাহরই নিকট রয়েছে মহাপুরস্কার।' অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন যে, এগুলো পেয়ে কে নাফরমানীতে জড়িয়ে পড়ছে এবং কে আনুগত্য করছে। আল্লাহ তা'আলার নিকট যে মহাপুরস্কার রয়েছে সেদিকে মানুষের খেয়াল রাখা উচিত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণ রৌপ্য আর চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদি পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি, মানুষের নিকট মনোরম করা হয়েছে। এই সব ইহজীবনের ভোগ্যবস্তু। আর আল্লাহ্, তাঁর নিকট উত্তম আশ্রয়স্থল।” (৩:১৪) আরো, যা এর পরে রয়েছে।হযরত আবূ বুরাইদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুৎবাহ দিচ্ছিলেন এমন সময় হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) লম্বা লম্বা জামা পরিহিত হয়ে এসে পড়লেন। তাঁরা জামার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে বাধা লেগে লেগে পড়ছিলেন ও উঠছিলেন, এই ভাবে আসছিলেন। তাঁরা তো তখন শিশু! জামাগুলো লাল রঙএর ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দৃষ্টি তাঁদের উপর পড়া মাত্রই তিনি মিম্বর হতে নেমে গিয়ে তাদেরকে উঠিয়ে নিয়ে আসলেন এবং নিজের সামনে বসিয়ে নিলেন। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সত্য বলেছেন এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ও সত্য কথা বলেছেন, তা হলোঃ “তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্যে পরীক্ষা।” এই দুই শিশুকে পড়ে উঠে আসতে দেখে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। তাই খুৎবাহ ছেড়ে এদেরকে উঠিয়ে নিয়ে আসতে হলো। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটি হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আশআস ইবনে কায়েস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “কিনদাহ গোত্রের প্রতিনিধি দলের মধ্যে শামিল হয়ে আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সন্তান-সন্ততি আছে কি?” আমি উত্তরে বললামঃ জ্বী হ্যাঁ, আপনার খিদমতে হাযির হওয়ার উদ্দেশ্যে বের হবার সময় আমার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। যদি তার স্থলে একটি বন্য জন্তু হতো তবে ওটাই আমার জন্যে ভাল ছিল। তিনি একথা শুনে বললেনঃ “না, না, এরূপ কথা বলো না। এরাই হলো চক্ষু ঠাণ্ডাকারী এবং এরা মারা গেলেও পুণ্য রয়েছে। তারপর তিনি বললেনঃ “তবে হ্যাঁ, এরা আবার ভীরুতা ও দুঃখেরও কারণ হয়ে থাকে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সন্তান অন্তরের ফল বটে, কিন্তু আবার সন্তানই কাপুরুষতা, কৃপণতা ও দুঃখেরও কারণ হয়।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বায্‌যার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ মালিক আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শুধু ঐ ব্যক্তি তোমার শত্রু নয় যে, (সে কাফির বলে) তুমি (যুদ্ধে) তাকে হত্যা কর তবে ওটা হবে তোমার জন্যে সফলতা, আর যদি তুমি নিহত হও তবে তুমি জান্নাতে প্রবেশ করবে। বরং সম্ভবতঃ তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তোমার সন্তান, যে তোমার পৃষ্ঠ হতে বের হয়েছে। অতঃপর তোমার আর একটি চরম শত্রু হলো তোমার মাল, যার মালিক হয়েছে তোমার দক্ষিণ হস্ত। [এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তিবরানী (রঃ)]এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর।' অর্থাৎ তোমরা তোমাদের শক্তি ও সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় কর। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি যখন তোমাদেরকে কোন আদেশ করবো তখন তোমরা যথাসাধ্য তা পালন করবে এবং যখন নিষেধ করবো (কোন কিছু হতে) তখন তা হতে বিরত থাকবে।”কোন কোন মুফাসসির বলেছেন যে, এই আয়াতটি সূরায়ে আলে ইমরানের নিম্নের আয়াতটিকে রহিতকারীঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর এবং তোমরা আত্মসমর্পণ না করে কোন অবস্থায় মরো না।" (৩:১০২) অর্থাৎ প্রথমে বলেছিলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর। আর পরে বললেনঃ ‘তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেছেন, প্রথম আয়াতটি জনগণের কাছে খুবই কঠিন ঠেকেছিল। তাঁরা নামাযে এতো দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁদের পা ফুলে যেতো। আর তাঁরা সিজদায় এতো দীর্ঘক্ষণ ধরে পড়ে থাকতেন যে, তাঁদের কপালে ক্ষত হয়ে যেতো। তখন আল্লাহ তা'আলা এই দ্বিতীয় আয়াতটি নাযিল করে তাঁদের উপর হালকা করে দিলেন। আরো কিছু মুফাসসিরও একথাই বলেছেন যে, প্রথম আয়াতটি মানসূখ এবং দ্বিতীয় আয়াতটি নাসেখ। অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুগত হয়ে যাও। তাদের আনুগত্য হতে এক ইঞ্চি পরিমাণও এদিক ওদিক হয়ো না। আগেও বেড়ে যেয়ো না এবং পিছনেও সরে এসো না। আর আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে যা দিয়ে রেখেছেন তা হতে তোমাদের আত্মীয়-স্বজনকে ফকীর-মিসকীন ও অভাবগ্রস্তদেরকে দান করতে থাকো। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের প্রতি যে ইহসান করেছেন ঐ ইহসান তোমরা তাঁর সৃষ্টজীবের প্রতি করে যাও। তাহলে এটা হবে তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যদি এটা না কর তবে দুনিয়ার ধ্বংস তোমরা নিজেরাই নিজেদের হাতে টেনে আনবে। (আরবি) এর তাফসীর সূরায়ে হাশরের এই আয়াতে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর তবে তিনি তোমাদের জন্যে ওটা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। অর্থাৎ তোমাদের দরিদ্র ও অভাগ্রস্তদের উপর খরচ করাই হলো আল্লাহ তা'আলাকে উত্তম ঋণ দেয়া। সূরায়ে বাকারাতেও এটা গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। অর্থাৎ তোমাদের অপরাধসমূহ তিনি মার্জনা করবেন। এ জন্যেই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এখানে বলেনঃ আল্লাহ গুণগ্রাহী অর্থাৎ তিনি অল্প সকাজের বেশী পুণ্য দান করেন এবং তিনি সহনশীল অর্থাৎ তিনি পাপ ও অপরাধসমূহ ক্ষমা করে থাকেন এবং স্বীয় বান্দাদের পাপ দেখেও দেখেন না। অর্থাৎ ক্ষমার চক্ষে দেখেন। তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এর তাফসীর ইতিপূর্বে কয়েকবার গত হয়েছে।

আত-তাগাবুন 64:16

১৪-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ্ তা'আলা স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ কতক স্ত্রী তাদের স্বামীদেরকে এবং কতক সন্তান তাদের পিতা-মাতাদেরকে আল্লাহ্‌ স্মরণ ও নেক আমল হতে দূরে সরিয়ে রাখে যা প্রকৃতপক্ষে শক্রতাই বটে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমাদের ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। যারা উদাসীন হবে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” (৬৩:৯) এখানেও আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তোমরা তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। দ্বীনের রক্ষণাবেক্ষণকে তাদের প্রয়োজন ও ফরমায়েশ পূর্ণ করার উপর প্রাধান্য দিবে। মানুষ স্ত্রী, ছেলে মেয়ে এবং মাল-ধনের খাতিরে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে এবং আল্লাহর নাফরমানী করে বসে। তাদের প্রেমে পড়ে আহকামে ইলাহীকে পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মক্কাবাসী কতক লোক ইসলাম কবূল করে নিয়েছিল, কিন্তু স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের প্রেমে পড়ে হিজরত করেনি। অতঃপর যখন ইসলামের খুব বেশী প্রকাশ ঘটে তখন তারা হিজরত করে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর নিকট চলে যায়। গিয়ে দেখে যে, যাঁরা পূর্বে হিজরত করেছিলেন তাঁরা বহু কিছুর জ্ঞান লাভ করেছেন। তখন এই লোকদের মনে হলো যে, তারা তাদের সন্তান-সন্ততিকে শাস্তি প্রদান করবে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা ঘোষণা করলেনঃ তোমরা যদি তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ-ক্রটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। অর্থাৎ এখন তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদেরকে ক্ষমা করে দাও, ভবিষ্যতের জন্যে সতর্ক থাকবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্যে পরীক্ষা, আল্লাহরই নিকট রয়েছে মহাপুরস্কার।' অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন যে, এগুলো পেয়ে কে নাফরমানীতে জড়িয়ে পড়ছে এবং কে আনুগত্য করছে। আল্লাহ তা'আলার নিকট যে মহাপুরস্কার রয়েছে সেদিকে মানুষের খেয়াল রাখা উচিত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণ রৌপ্য আর চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদি পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি, মানুষের নিকট মনোরম করা হয়েছে। এই সব ইহজীবনের ভোগ্যবস্তু। আর আল্লাহ্, তাঁর নিকট উত্তম আশ্রয়স্থল।” (৩:১৪) আরো, যা এর পরে রয়েছে।হযরত আবূ বুরাইদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুৎবাহ দিচ্ছিলেন এমন সময় হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) লম্বা লম্বা জামা পরিহিত হয়ে এসে পড়লেন। তাঁরা জামার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে বাধা লেগে লেগে পড়ছিলেন ও উঠছিলেন, এই ভাবে আসছিলেন। তাঁরা তো তখন শিশু! জামাগুলো লাল রঙএর ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দৃষ্টি তাঁদের উপর পড়া মাত্রই তিনি মিম্বর হতে নেমে গিয়ে তাদেরকে উঠিয়ে নিয়ে আসলেন এবং নিজের সামনে বসিয়ে নিলেন। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সত্য বলেছেন এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ও সত্য কথা বলেছেন, তা হলোঃ “তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্যে পরীক্ষা।” এই দুই শিশুকে পড়ে উঠে আসতে দেখে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। তাই খুৎবাহ ছেড়ে এদেরকে উঠিয়ে নিয়ে আসতে হলো। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটি হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আশআস ইবনে কায়েস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “কিনদাহ গোত্রের প্রতিনিধি দলের মধ্যে শামিল হয়ে আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সন্তান-সন্ততি আছে কি?” আমি উত্তরে বললামঃ জ্বী হ্যাঁ, আপনার খিদমতে হাযির হওয়ার উদ্দেশ্যে বের হবার সময় আমার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। যদি তার স্থলে একটি বন্য জন্তু হতো তবে ওটাই আমার জন্যে ভাল ছিল। তিনি একথা শুনে বললেনঃ “না, না, এরূপ কথা বলো না। এরাই হলো চক্ষু ঠাণ্ডাকারী এবং এরা মারা গেলেও পুণ্য রয়েছে। তারপর তিনি বললেনঃ “তবে হ্যাঁ, এরা আবার ভীরুতা ও দুঃখেরও কারণ হয়ে থাকে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সন্তান অন্তরের ফল বটে, কিন্তু আবার সন্তানই কাপুরুষতা, কৃপণতা ও দুঃখেরও কারণ হয়।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বায্‌যার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ মালিক আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শুধু ঐ ব্যক্তি তোমার শত্রু নয় যে, (সে কাফির বলে) তুমি (যুদ্ধে) তাকে হত্যা কর তবে ওটা হবে তোমার জন্যে সফলতা, আর যদি তুমি নিহত হও তবে তুমি জান্নাতে প্রবেশ করবে। বরং সম্ভবতঃ তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তোমার সন্তান, যে তোমার পৃষ্ঠ হতে বের হয়েছে। অতঃপর তোমার আর একটি চরম শত্রু হলো তোমার মাল, যার মালিক হয়েছে তোমার দক্ষিণ হস্ত। [এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তিবরানী (রঃ)]এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর।' অর্থাৎ তোমরা তোমাদের শক্তি ও সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় কর। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি যখন তোমাদেরকে কোন আদেশ করবো তখন তোমরা যথাসাধ্য তা পালন করবে এবং যখন নিষেধ করবো (কোন কিছু হতে) তখন তা হতে বিরত থাকবে।”কোন কোন মুফাসসির বলেছেন যে, এই আয়াতটি সূরায়ে আলে ইমরানের নিম্নের আয়াতটিকে রহিতকারীঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর এবং তোমরা আত্মসমর্পণ না করে কোন অবস্থায় মরো না।" (৩:১০২) অর্থাৎ প্রথমে বলেছিলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর। আর পরে বললেনঃ ‘তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেছেন, প্রথম আয়াতটি জনগণের কাছে খুবই কঠিন ঠেকেছিল। তাঁরা নামাযে এতো দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁদের পা ফুলে যেতো। আর তাঁরা সিজদায় এতো দীর্ঘক্ষণ ধরে পড়ে থাকতেন যে, তাঁদের কপালে ক্ষত হয়ে যেতো। তখন আল্লাহ তা'আলা এই দ্বিতীয় আয়াতটি নাযিল করে তাঁদের উপর হালকা করে দিলেন। আরো কিছু মুফাসসিরও একথাই বলেছেন যে, প্রথম আয়াতটি মানসূখ এবং দ্বিতীয় আয়াতটি নাসেখ। অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুগত হয়ে যাও। তাদের আনুগত্য হতে এক ইঞ্চি পরিমাণও এদিক ওদিক হয়ো না। আগেও বেড়ে যেয়ো না এবং পিছনেও সরে এসো না। আর আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে যা দিয়ে রেখেছেন তা হতে তোমাদের আত্মীয়-স্বজনকে ফকীর-মিসকীন ও অভাবগ্রস্তদেরকে দান করতে থাকো। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের প্রতি যে ইহসান করেছেন ঐ ইহসান তোমরা তাঁর সৃষ্টজীবের প্রতি করে যাও। তাহলে এটা হবে তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যদি এটা না কর তবে দুনিয়ার ধ্বংস তোমরা নিজেরাই নিজেদের হাতে টেনে আনবে। (আরবি) এর তাফসীর সূরায়ে হাশরের এই আয়াতে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর তবে তিনি তোমাদের জন্যে ওটা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। অর্থাৎ তোমাদের দরিদ্র ও অভাগ্রস্তদের উপর খরচ করাই হলো আল্লাহ তা'আলাকে উত্তম ঋণ দেয়া। সূরায়ে বাকারাতেও এটা গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। অর্থাৎ তোমাদের অপরাধসমূহ তিনি মার্জনা করবেন। এ জন্যেই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এখানে বলেনঃ আল্লাহ গুণগ্রাহী অর্থাৎ তিনি অল্প সকাজের বেশী পুণ্য দান করেন এবং তিনি সহনশীল অর্থাৎ তিনি পাপ ও অপরাধসমূহ ক্ষমা করে থাকেন এবং স্বীয় বান্দাদের পাপ দেখেও দেখেন না। অর্থাৎ ক্ষমার চক্ষে দেখেন। তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এর তাফসীর ইতিপূর্বে কয়েকবার গত হয়েছে।

আত-তাগাবুন 64:17

১৪-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ্ তা'আলা স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ কতক স্ত্রী তাদের স্বামীদেরকে এবং কতক সন্তান তাদের পিতা-মাতাদেরকে আল্লাহ্‌ স্মরণ ও নেক আমল হতে দূরে সরিয়ে রাখে যা প্রকৃতপক্ষে শক্রতাই বটে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমাদের ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। যারা উদাসীন হবে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” (৬৩:৯) এখানেও আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তোমরা তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। দ্বীনের রক্ষণাবেক্ষণকে তাদের প্রয়োজন ও ফরমায়েশ পূর্ণ করার উপর প্রাধান্য দিবে। মানুষ স্ত্রী, ছেলে মেয়ে এবং মাল-ধনের খাতিরে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে এবং আল্লাহর নাফরমানী করে বসে। তাদের প্রেমে পড়ে আহকামে ইলাহীকে পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মক্কাবাসী কতক লোক ইসলাম কবূল করে নিয়েছিল, কিন্তু স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের প্রেমে পড়ে হিজরত করেনি। অতঃপর যখন ইসলামের খুব বেশী প্রকাশ ঘটে তখন তারা হিজরত করে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর নিকট চলে যায়। গিয়ে দেখে যে, যাঁরা পূর্বে হিজরত করেছিলেন তাঁরা বহু কিছুর জ্ঞান লাভ করেছেন। তখন এই লোকদের মনে হলো যে, তারা তাদের সন্তান-সন্ততিকে শাস্তি প্রদান করবে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা ঘোষণা করলেনঃ তোমরা যদি তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ-ক্রটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। অর্থাৎ এখন তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদেরকে ক্ষমা করে দাও, ভবিষ্যতের জন্যে সতর্ক থাকবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্যে পরীক্ষা, আল্লাহরই নিকট রয়েছে মহাপুরস্কার।' অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন যে, এগুলো পেয়ে কে নাফরমানীতে জড়িয়ে পড়ছে এবং কে আনুগত্য করছে। আল্লাহ তা'আলার নিকট যে মহাপুরস্কার রয়েছে সেদিকে মানুষের খেয়াল রাখা উচিত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণ রৌপ্য আর চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদি পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি, মানুষের নিকট মনোরম করা হয়েছে। এই সব ইহজীবনের ভোগ্যবস্তু। আর আল্লাহ্, তাঁর নিকট উত্তম আশ্রয়স্থল।” (৩:১৪) আরো, যা এর পরে রয়েছে।হযরত আবূ বুরাইদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুৎবাহ দিচ্ছিলেন এমন সময় হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) লম্বা লম্বা জামা পরিহিত হয়ে এসে পড়লেন। তাঁরা জামার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে বাধা লেগে লেগে পড়ছিলেন ও উঠছিলেন, এই ভাবে আসছিলেন। তাঁরা তো তখন শিশু! জামাগুলো লাল রঙএর ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দৃষ্টি তাঁদের উপর পড়া মাত্রই তিনি মিম্বর হতে নেমে গিয়ে তাদেরকে উঠিয়ে নিয়ে আসলেন এবং নিজের সামনে বসিয়ে নিলেন। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সত্য বলেছেন এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ও সত্য কথা বলেছেন, তা হলোঃ “তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্যে পরীক্ষা।” এই দুই শিশুকে পড়ে উঠে আসতে দেখে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। তাই খুৎবাহ ছেড়ে এদেরকে উঠিয়ে নিয়ে আসতে হলো। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটি হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আশআস ইবনে কায়েস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “কিনদাহ গোত্রের প্রতিনিধি দলের মধ্যে শামিল হয়ে আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সন্তান-সন্ততি আছে কি?” আমি উত্তরে বললামঃ জ্বী হ্যাঁ, আপনার খিদমতে হাযির হওয়ার উদ্দেশ্যে বের হবার সময় আমার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। যদি তার স্থলে একটি বন্য জন্তু হতো তবে ওটাই আমার জন্যে ভাল ছিল। তিনি একথা শুনে বললেনঃ “না, না, এরূপ কথা বলো না। এরাই হলো চক্ষু ঠাণ্ডাকারী এবং এরা মারা গেলেও পুণ্য রয়েছে। তারপর তিনি বললেনঃ “তবে হ্যাঁ, এরা আবার ভীরুতা ও দুঃখেরও কারণ হয়ে থাকে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সন্তান অন্তরের ফল বটে, কিন্তু আবার সন্তানই কাপুরুষতা, কৃপণতা ও দুঃখেরও কারণ হয়।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বায্‌যার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ মালিক আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শুধু ঐ ব্যক্তি তোমার শত্রু নয় যে, (সে কাফির বলে) তুমি (যুদ্ধে) তাকে হত্যা কর তবে ওটা হবে তোমার জন্যে সফলতা, আর যদি তুমি নিহত হও তবে তুমি জান্নাতে প্রবেশ করবে। বরং সম্ভবতঃ তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তোমার সন্তান, যে তোমার পৃষ্ঠ হতে বের হয়েছে। অতঃপর তোমার আর একটি চরম শত্রু হলো তোমার মাল, যার মালিক হয়েছে তোমার দক্ষিণ হস্ত। [এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তিবরানী (রঃ)]এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর।' অর্থাৎ তোমরা তোমাদের শক্তি ও সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় কর। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি যখন তোমাদেরকে কোন আদেশ করবো তখন তোমরা যথাসাধ্য তা পালন করবে এবং যখন নিষেধ করবো (কোন কিছু হতে) তখন তা হতে বিরত থাকবে।”কোন কোন মুফাসসির বলেছেন যে, এই আয়াতটি সূরায়ে আলে ইমরানের নিম্নের আয়াতটিকে রহিতকারীঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর এবং তোমরা আত্মসমর্পণ না করে কোন অবস্থায় মরো না।" (৩:১০২) অর্থাৎ প্রথমে বলেছিলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর। আর পরে বললেনঃ ‘তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেছেন, প্রথম আয়াতটি জনগণের কাছে খুবই কঠিন ঠেকেছিল। তাঁরা নামাযে এতো দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁদের পা ফুলে যেতো। আর তাঁরা সিজদায় এতো দীর্ঘক্ষণ ধরে পড়ে থাকতেন যে, তাঁদের কপালে ক্ষত হয়ে যেতো। তখন আল্লাহ তা'আলা এই দ্বিতীয় আয়াতটি নাযিল করে তাঁদের উপর হালকা করে দিলেন। আরো কিছু মুফাসসিরও একথাই বলেছেন যে, প্রথম আয়াতটি মানসূখ এবং দ্বিতীয় আয়াতটি নাসেখ। অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুগত হয়ে যাও। তাদের আনুগত্য হতে এক ইঞ্চি পরিমাণও এদিক ওদিক হয়ো না। আগেও বেড়ে যেয়ো না এবং পিছনেও সরে এসো না। আর আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে যা দিয়ে রেখেছেন তা হতে তোমাদের আত্মীয়-স্বজনকে ফকীর-মিসকীন ও অভাবগ্রস্তদেরকে দান করতে থাকো। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের প্রতি যে ইহসান করেছেন ঐ ইহসান তোমরা তাঁর সৃষ্টজীবের প্রতি করে যাও। তাহলে এটা হবে তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যদি এটা না কর তবে দুনিয়ার ধ্বংস তোমরা নিজেরাই নিজেদের হাতে টেনে আনবে। (আরবি) এর তাফসীর সূরায়ে হাশরের এই আয়াতে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর তবে তিনি তোমাদের জন্যে ওটা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। অর্থাৎ তোমাদের দরিদ্র ও অভাগ্রস্তদের উপর খরচ করাই হলো আল্লাহ তা'আলাকে উত্তম ঋণ দেয়া। সূরায়ে বাকারাতেও এটা গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। অর্থাৎ তোমাদের অপরাধসমূহ তিনি মার্জনা করবেন। এ জন্যেই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এখানে বলেনঃ আল্লাহ গুণগ্রাহী অর্থাৎ তিনি অল্প সকাজের বেশী পুণ্য দান করেন এবং তিনি সহনশীল অর্থাৎ তিনি পাপ ও অপরাধসমূহ ক্ষমা করে থাকেন এবং স্বীয় বান্দাদের পাপ দেখেও দেখেন না। অর্থাৎ ক্ষমার চক্ষে দেখেন। তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এর তাফসীর ইতিপূর্বে কয়েকবার গত হয়েছে।

আত-তাগাবুন 64:18

১৪-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ্ তা'আলা স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ কতক স্ত্রী তাদের স্বামীদেরকে এবং কতক সন্তান তাদের পিতা-মাতাদেরকে আল্লাহ্‌ স্মরণ ও নেক আমল হতে দূরে সরিয়ে রাখে যা প্রকৃতপক্ষে শক্রতাই বটে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমাদের ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। যারা উদাসীন হবে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” (৬৩:৯) এখানেও আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ তোমরা তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। দ্বীনের রক্ষণাবেক্ষণকে তাদের প্রয়োজন ও ফরমায়েশ পূর্ণ করার উপর প্রাধান্য দিবে। মানুষ স্ত্রী, ছেলে মেয়ে এবং মাল-ধনের খাতিরে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে এবং আল্লাহর নাফরমানী করে বসে। তাদের প্রেমে পড়ে আহকামে ইলাহীকে পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মক্কাবাসী কতক লোক ইসলাম কবূল করে নিয়েছিল, কিন্তু স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের প্রেমে পড়ে হিজরত করেনি। অতঃপর যখন ইসলামের খুব বেশী প্রকাশ ঘটে তখন তারা হিজরত করে আল্লাহর নবী (সঃ)-এর নিকট চলে যায়। গিয়ে দেখে যে, যাঁরা পূর্বে হিজরত করেছিলেন তাঁরা বহু কিছুর জ্ঞান লাভ করেছেন। তখন এই লোকদের মনে হলো যে, তারা তাদের সন্তান-সন্ততিকে শাস্তি প্রদান করবে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা ঘোষণা করলেনঃ তোমরা যদি তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ-ক্রটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। অর্থাৎ এখন তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদেরকে ক্ষমা করে দাও, ভবিষ্যতের জন্যে সতর্ক থাকবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্যে পরীক্ষা, আল্লাহরই নিকট রয়েছে মহাপুরস্কার।' অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন যে, এগুলো পেয়ে কে নাফরমানীতে জড়িয়ে পড়ছে এবং কে আনুগত্য করছে। আল্লাহ তা'আলার নিকট যে মহাপুরস্কার রয়েছে সেদিকে মানুষের খেয়াল রাখা উচিত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণ রৌপ্য আর চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদি পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি, মানুষের নিকট মনোরম করা হয়েছে। এই সব ইহজীবনের ভোগ্যবস্তু। আর আল্লাহ্, তাঁর নিকট উত্তম আশ্রয়স্থল।” (৩:১৪) আরো, যা এর পরে রয়েছে।হযরত আবূ বুরাইদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুৎবাহ দিচ্ছিলেন এমন সময় হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) লম্বা লম্বা জামা পরিহিত হয়ে এসে পড়লেন। তাঁরা জামার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে বাধা লেগে লেগে পড়ছিলেন ও উঠছিলেন, এই ভাবে আসছিলেন। তাঁরা তো তখন শিশু! জামাগুলো লাল রঙএর ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দৃষ্টি তাঁদের উপর পড়া মাত্রই তিনি মিম্বর হতে নেমে গিয়ে তাদেরকে উঠিয়ে নিয়ে আসলেন এবং নিজের সামনে বসিয়ে নিলেন। অতঃপর তিনি বলতে লাগলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সত্য বলেছেন এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ও সত্য কথা বলেছেন, তা হলোঃ “তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্যে পরীক্ষা।” এই দুই শিশুকে পড়ে উঠে আসতে দেখে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। তাই খুৎবাহ ছেড়ে এদেরকে উঠিয়ে নিয়ে আসতে হলো। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটি হাসান গারীব বলেছেন)হযরত আশআস ইবনে কায়েস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “কিনদাহ গোত্রের প্রতিনিধি দলের মধ্যে শামিল হয়ে আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সন্তান-সন্ততি আছে কি?” আমি উত্তরে বললামঃ জ্বী হ্যাঁ, আপনার খিদমতে হাযির হওয়ার উদ্দেশ্যে বের হবার সময় আমার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। যদি তার স্থলে একটি বন্য জন্তু হতো তবে ওটাই আমার জন্যে ভাল ছিল। তিনি একথা শুনে বললেনঃ “না, না, এরূপ কথা বলো না। এরাই হলো চক্ষু ঠাণ্ডাকারী এবং এরা মারা গেলেও পুণ্য রয়েছে। তারপর তিনি বললেনঃ “তবে হ্যাঁ, এরা আবার ভীরুতা ও দুঃখেরও কারণ হয়ে থাকে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সন্তান অন্তরের ফল বটে, কিন্তু আবার সন্তানই কাপুরুষতা, কৃপণতা ও দুঃখেরও কারণ হয়।” (এ হাদীসটি হাফিয আবূ বকর আল বায্‌যার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ মালিক আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শুধু ঐ ব্যক্তি তোমার শত্রু নয় যে, (সে কাফির বলে) তুমি (যুদ্ধে) তাকে হত্যা কর তবে ওটা হবে তোমার জন্যে সফলতা, আর যদি তুমি নিহত হও তবে তুমি জান্নাতে প্রবেশ করবে। বরং সম্ভবতঃ তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তোমার সন্তান, যে তোমার পৃষ্ঠ হতে বের হয়েছে। অতঃপর তোমার আর একটি চরম শত্রু হলো তোমার মাল, যার মালিক হয়েছে তোমার দক্ষিণ হস্ত। [এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তিবরানী (রঃ)]এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর।' অর্থাৎ তোমরা তোমাদের শক্তি ও সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় কর। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি যখন তোমাদেরকে কোন আদেশ করবো তখন তোমরা যথাসাধ্য তা পালন করবে এবং যখন নিষেধ করবো (কোন কিছু হতে) তখন তা হতে বিরত থাকবে।”কোন কোন মুফাসসির বলেছেন যে, এই আয়াতটি সূরায়ে আলে ইমরানের নিম্নের আয়াতটিকে রহিতকারীঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর এবং তোমরা আত্মসমর্পণ না করে কোন অবস্থায় মরো না।" (৩:১০২) অর্থাৎ প্রথমে বলেছিলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর। আর পরে বললেনঃ ‘তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেছেন, প্রথম আয়াতটি জনগণের কাছে খুবই কঠিন ঠেকেছিল। তাঁরা নামাযে এতো দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁদের পা ফুলে যেতো। আর তাঁরা সিজদায় এতো দীর্ঘক্ষণ ধরে পড়ে থাকতেন যে, তাঁদের কপালে ক্ষত হয়ে যেতো। তখন আল্লাহ তা'আলা এই দ্বিতীয় আয়াতটি নাযিল করে তাঁদের উপর হালকা করে দিলেন। আরো কিছু মুফাসসিরও একথাই বলেছেন যে, প্রথম আয়াতটি মানসূখ এবং দ্বিতীয় আয়াতটি নাসেখ। অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অনুগত হয়ে যাও। তাদের আনুগত্য হতে এক ইঞ্চি পরিমাণও এদিক ওদিক হয়ো না। আগেও বেড়ে যেয়ো না এবং পিছনেও সরে এসো না। আর আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে যা দিয়ে রেখেছেন তা হতে তোমাদের আত্মীয়-স্বজনকে ফকীর-মিসকীন ও অভাবগ্রস্তদেরকে দান করতে থাকো। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের প্রতি যে ইহসান করেছেন ঐ ইহসান তোমরা তাঁর সৃষ্টজীবের প্রতি করে যাও। তাহলে এটা হবে তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যদি এটা না কর তবে দুনিয়ার ধ্বংস তোমরা নিজেরাই নিজেদের হাতে টেনে আনবে। (আরবি) এর তাফসীর সূরায়ে হাশরের এই আয়াতে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর তবে তিনি তোমাদের জন্যে ওটা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। অর্থাৎ তোমাদের দরিদ্র ও অভাগ্রস্তদের উপর খরচ করাই হলো আল্লাহ তা'আলাকে উত্তম ঋণ দেয়া। সূরায়ে বাকারাতেও এটা গত হয়েছে।মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। অর্থাৎ তোমাদের অপরাধসমূহ তিনি মার্জনা করবেন। এ জন্যেই আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এখানে বলেনঃ আল্লাহ গুণগ্রাহী অর্থাৎ তিনি অল্প সকাজের বেশী পুণ্য দান করেন এবং তিনি সহনশীল অর্থাৎ তিনি পাপ ও অপরাধসমূহ ক্ষমা করে থাকেন এবং স্বীয় বান্দাদের পাপ দেখেও দেখেন না। অর্থাৎ ক্ষমার চক্ষে দেখেন। তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এর তাফসীর ইতিপূর্বে কয়েকবার গত হয়েছে।

আত-তালাক 65:1

প্রথমতঃ নবী (সঃ)-কে মর্যাদা ও সম্মানের সাথে সম্বোধন করা হয়েছে, অতঃপর এরই অনুসরণে তাঁর উম্মতকে সম্বোধন করা হয়েছে এবং তাদেরকে তালাকের মাসআলা শিক্ষা দেয়া হয়েছে।হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে তালাক দেন। তখন তিনি তাঁর পিতা-মাতার বাড়ীতে চলে যান। ঐ সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলা হয়ঃ “তাকে (হযরত তাফসা রাঃ-কে) ফিরিয়ে নাও। সে খুব বেশী রোযাব্রত পালনকারিণী ও অধিক নামায আদায়কারিণী। সে দুনিয়াতেও তোমার স্ত্রী এবং জান্নাতেও তোমার স্ত্রীদেরই অন্তর্ভুক্ত থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এই রিওয়াইয়াটিই ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন) অন্যান্য সনদেও এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে তালাক দিয়েছিলেন, অতঃপর রুকূ করেছিলেন বা ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর স্ত্রীকে মাসিক ঋতুর অবস্থায় তালাক দেন। হযরত উমার (রাঃ) ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসন্তুষ্ট হন এবং বলেনঃ “সে যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয় এবং ঋতু হতে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীরূপেই রেখে দেয়। অতঃপর পুনরায় ঋতুবতী হওয়ার পর যখন পবিত্র হবে তখন ইচ্ছা হলে এই পবিত্র অবস্থায় সহবাসের পূর্বেই তালাক দিবে। এটাই ঐ ইদ্দত যার হুকুম আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে। এটাও আরো বহু হাদীস গ্রন্থে সনদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত আবূ যুবায়ের (রঃ) ইযযাহর মাওলা হযরত আবদুর রহমান ইবনে আয়মান (রঃ) হতে শুনেছেন যে, তিনি হযরত ইবনে উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে হায়েযের অবস্থায় তালাক দেয় তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তাহলে শুনো! হযরত ইবনে উমার (রাঃ) অর্থাৎ তিনি নিজেই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশায় তাঁর স্ত্রীকে ঋতুর অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন। তখন হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তাকে ফিরিয়ে নেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেন যে, এখন হয় তিনি তাকে তালাক দিবেন, না হয় রেখে দিবেন। অতঃপর নবী (সঃ) (আরবি)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। (সহীহ মুসলিমে এটা বর্ণিত হয়েছে) অন্য রিওয়াইয়াতে (আরবি)-এর ভাবার্থ করা হয়েছেঃ “যে তোহর বা পবিত্রাবস্থায় সহবাস করা হয়নি ঐ তোহরে তালাক দেয়া।' বহু লোকই এটাই বলেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ হায়েযের অবস্থায় তালাক দিয়ো না এবং ঐ তোহরেও তালাক দিয়ো না যাতে স্ত্রী-সহবাস করেছো, বরং ঐ সময় পর্যন্ত ছেড়ে রেখো যে, আবার তার হায়েয হবে এবং ঐ হায়েয হতে আবার পবিত্রতা লাভ করবে। ঐ পবিত্র অবস্থায় একটি তালাক দিয়ে দাও। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, ইদ্দত দ্বারা তোহর উদ্দেশ্য। কুরু দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হায়েয। অথবা হামল বা গর্ভবতী অবস্থায় তালাক দাও, যখন হামল প্রকাশিত হয়ে যাবে। যে তোহরে সহবাস করেছো ঐ তোহরে তালাক দিয়ো না। কেননা, এর দ্বারা স্ত্রীর হামল হলো কি না তা জানা যায় না।এখান হতেই বিজ্ঞ আলেমগণ তালাকের আহকাম গ্রহণ করেছেন এবং তালাকের দুই প্রকার করেছেন। তালাকে সুন্নাত ও তালাকে বিদআত। তালাকে সুন্নাত তো এটাই যে, এমন তোহরে বা পবিত্র অবস্থায় তালাক দিবে যাতে স্ত্রী-সহবাস করেনি অথবা হামলের অবস্থায় তালাক দিবে। আর তালাকে বিদআত এই যে, হায়েযের অবস্থায় তালাক দিবে অথবা এমন তোহরে তালাক দিবে যাতে স্ত্রী-সহবাস করেছে এবং হামল হয়েছে কি-না তা জানা যায়নি। তালাকের তৃতীয় প্রকারও রয়েছে যা তালাকে সুন্নাত নয় এবং তালাকে বিদআতও নয়। ওটা হচ্ছে নাবালেগা বা অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের তালাক এবং ঐ স্ত্রী লোকের তালাক যার হায়েযই হয় না এবং ঐ নারীর তালাক যার সাথে মিলন হয়নি। এসবের আহকাম ও বিস্তারিত আলোচনার জায়গা হচ্ছে ফুরূর কিতাবগুলো, তাফসীর নয়। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে ইদ্দতের হিসাব রাখবে। এমন যেন না হয় যে, ইদ্দতের দীর্ঘতার কারণে স্ত্রীর অন্য স্বামী গ্রহণ করার ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। আর এই ব্যাপারে তোমরা প্রকৃত মাবুদ আল্লাহকে ভয় করবে। ইদ্দতের সময় পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তালাকপ্রাপ্তা নারীর বসবাসের জায়গা দেয়ার দায়িতু স্বামীর উপর ন্যস্ত থাকবে। স্বামী তাকে তার বাড়ী হতে বের করে দিবে না এবং সে নিজেও বের হয়ে যাবে না। কেননা, সে স্বামীর অধিকারে আবদ্ধা রয়েছে।(আরবি) ব্যভিচারকেও অন্তর্ভুক্ত করে এবং এটাও এর মধ্যে শামিল যে, স্ত্রী স্বামীকে বিপদে ফেলবে, তার বিরোধিতা করবে, তাকে কষ্ট দিবে, তার সাথে দুর্ব্যবহার এবং স্বামীর পরিবারের লোকদেরকে কষ্ট দিবে। এরূপ অবস্থায় স্বামীর তার স্ত্রীকে বাড়ী হতে বের করে দেয়া জায়েয।আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ এগুলো আল্লাহর বিধান অর্থাৎ তাঁর শরীয়ত ও সীমারেখা। যে আল্লাহর বিধান লংঘন করে সে নিজেরই উপর অত্যাচার করে। আল্লাহ হয়তো এরপর কোন উপায় করে দিবেন। আল্লাহর ইচ্ছা কেউই জানতে পারে না। ইদ্দতের সময়কাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত নারীর তার স্বামীর বাড়ীতে অবস্থান করা, এটা আল্লাহর হুকম। এর মধ্যে এই যৌক্তিকতা রয়েছে যে, হয়তো এই ইদ্দতের মধ্যে তার স্বামীর মত পরিবর্তন হয়ে যাবে। সে হয়তো তালাক দেয়ার কারণে লজ্জিত হবে। তার অন্তরে হয়তো স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার খেয়াল জেগে উঠবে এবং সে স্ত্রীকে রাজআত করেও নিবে। অতঃপর স্বামী-স্ত্রী সুখে শান্তিতে ঘর-সংসার করতে থাকবে। নতুন কোন উপায় উদ্ভাবন করা দ্বারাও এই রাজআতকেই বুঝানো হয়েছে। এর ভিত্তিতেই কতক পূর্ব যুগীয় গুরুজন এবং তাদের অনুসারীদের যেমন হযরত আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) প্রমুখের মাযহাব এই যে, (আরবি) নারী অর্থাৎ ঐ তালাকপ্রাপ্তা নারী যাকে রাজআত করার অধিকার স্বামীর বাকী নেই, এর ইদ্দত পূর্ণ হবার সময় পর্যন্ত বসবাসের জায়গা দেয়া স্বামীর দায়িত্ব নয়। অনুরূপভাবে যে নারীর স্বামী মারা যাবে তার ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার সময় পর্যন্ত তাকে স্থান দেয়া স্বামীর ওয়ারিশদের উপর ওয়াজিব নয়। তাঁদের দলীল হলো হযরত ফাতিমা বিনতু ফাহরিয়্যাহ (রাঃ) সম্পর্কীয় হাদীসটি। তা এই যে, যখন তার স্বামী হযরত আবূ আমর ইবনে হাফস (রাঃ) তাঁকে তৃতীয় ও সর্বশেষ তালাক দিয়ে দেন তখন তিনি তাঁর স্ত্রীর নিকট বিদ্যমান ছিলেন না। বরং ঐ সময় তিনি ইয়ামনে ছিলেন। সেখান হতেই তিনি স্ত্রীকে তালাক দিয়েছিলেন। তখন তাঁর ওয়াকীল তাঁর স্ত্রীর নিকট সামান্য যব পাঠিয়েছিলেন এই বলে যে, এটা তাঁকে খোরাক হিসেবে দেয়া হলো। এতে ঐ নারী অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন। ওয়াকীল তাকে বললেনঃ “অসন্তুষ্ট হচ্ছ কেন? তোমার খরচ বহন করার দায়িত্ব আমাদের নয়।” মহিলাটি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করে এটা জিজ্ঞেস করেন। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যাঁ, ঠিকই বটে। তোমার খরচ বহন করার দায়িত্ব তোমার এই স্বামীর উপর নয়।" সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, তাঁকে তিনি বলেনঃ “তোমাকে বসবাসের জন্যে ঘর দেয়াও তোমার এ স্বামীর দায়িত্ব নয়। অতঃপর তাকে নির্দেশ দিলেন যে, তিনি যেন উম্মে শুরায়েক (রাঃ)-এর বাড়ীতে তার ইদ্দতের দিনগুলো অতিবাহিত করেন। তারপর বলেনঃ “সেখানে তো আমার অধিকাংশ সাহাবী যাতায়াত করে থাকে। তুমি বরং আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-এর গৃহে ইদ্দত পালন কর। সে অন্ধ মানুষ। তুমি সেখানে তোমার কাপড়ও রেখে দিতে পারবে (শেষ পর্যন্ত)।”মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, ঐ মহিলাটির স্বামীকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন এক যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। তিনি সেখান হতেই তাঁর স্ত্রীকে তালাক পাঠিয়ে দেন।তাঁর স্বামীর ভাই তখন তাঁকে তাঁর স্বামীর বাড়ী হতে চলে যেতে বলেন। মহিলাটি তখন তাঁর স্বামীর ভাইকে বলেনঃ “আমার ইদ্দত পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আমার পানাহার ও বাসস্থানের দায়িত্ব আমার স্বামীর।” তাঁর স্বামীর ভাই এটা অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত এ ঘটনাটির খবর নবী (সঃ)-এর নিকট পৌঁছে যায়। তিনি ফাতিমা নাম্নী ঐ মহিলাটিকে বলেনঃ “তোমার ভরণ-পোষণ ও বাসস্থানের দায়িত্ব তোমার স্বামীর উপর ঐ সময় রয়েছে যখন তোমাকে রাজআত করার অধিকার তার আছে। এটা যখন নেই তখন ওটাও নেই। তুমি এখান হতে চলে যাও এবং অমুক স্ত্রীলোকের বাড়ীতে তোমার ইদ্দত পালন কর।” অতঃপর বললেনঃ “সেখানে তো আমার সাহাবীরা যাতায়াত করে থাকে! তুমি বরং ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-এর বাড়ীতে তোমার ইদ্দতের দিনগুলো অতিবাহিত কর। সে অন্ধ মানুষ। সুতরাং সে তোমাকে দেখতে পাবে না (শেষ পর্যন্ত)।” আবূল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ফাতিমা বিনতু কায়েস (রাঃ) হযরত যহ্‌হাক ইবনে কায়েস কারাশীর (রাঃ) ভগ্নী ছিলেন। তাঁর স্বামী ছিলেন হযরত আবূ আমর ইবনে হাফস ইবনে মুগীরাহ আল মাখযূমী (রাঃ)। হযরত ফাতিমা (রাঃ) বলেনঃ “আমার স্বামী সেনাবাহিনীর সাথে ইয়ামন গিয়েছেন। সেখান হতে তিনি আমাকে তালাক পাঠিয়েছেন। আমি তখন আমার স্বামীর ওলীদের কাছে আমার ভরণ-পোষণ ও বাসস্থান প্রার্থনা করলে তারা বলেনঃ “তোমার স্বামী আমাদের কাছে কিছুই পাঠায়নি এবং আমাদেরকে কোন অসিয়তও করেনি। আমি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তাঁকে বললাম ও আমার স্বামী আমর ইবনে হাফস (রাঃ) আমাকে তালাক পাঠিয়েছেন। আমি তখন তাঁর ওলীদের নিকট আমার বাসস্থান ও খাওয়া খরচ প্রার্থনা করলে তারা বলেন যে, তিনি তাঁদের কাছে কোন কিছু পাঠানওনি এবং তাঁদেরকে কোন অসিয়তও করেননি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এমন স্ত্রীর জন্যে বাসস্থান ও খাওয়া খরচের দায়িত্ব স্বামীর উপর রয়েছে যাকে রাজআত করার অধিকার তার স্বামীর উপর রয়েছে। অতঃপর অন্য স্বামী গ্রহণ না করা পর্যন্ত যে স্ত্রী তার স্বামীর জন্যে হালাল নয় তার খাওয়া-পরা ও বাসস্থানের দায়িত্বও তার স্বামীর নেই।"

আত-তালাক 65:2

২-৩ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ইদ্দত বিশিষ্টা নারীদের ইদ্দতের সময়কাল যখন পূর্ণ হওয়ার নিকটবর্তী হবে তখন তাদের স্বামীদের দুটো পন্থার যে কোন একটি গ্রহণ করা উচিত। হয় তাদেরকে যথাবিধি স্ত্রীরূপেই রেখে দিবে, অর্থাৎ যে তালাক তাদেরকে দিয়েছিল তা হতে রাজআত করে তাদেরকে যথা নিয়মে তাদের বিবাহ বন্ধনে রেখে দিয়ে তাদের সাথে স্ত্রীরূপে বসবাস করবে, না হয় তাদেরকে তালাক দিয়ে দিবে। কিন্তু তাদেরকে গাল মন্দ দিবে না, শাসন গর্জন করবে না, বরং ভালভাবে তাদেরকে পরিত্যাগ করবে।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ যদি তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে রাজআত করে নাও তবে তোমাদের মধ্য হতে অর্থাৎ মুসলমানদের মধ্য হতে দুইজন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখবে। যেমন সুনানে আবি দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “একটি লোক তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে, অতঃপর তার সাথে সহবাস করেছে। অথচ না সে তালাকের উপর সাক্ষী রেখেছে, না রাজআতের উপর সাক্ষী রেখেছে। এর হুকুম কি হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “সে সুন্নাতের বিপরীত তালাক দিয়েছে এবং সুন্নাতের বিপরীত রাজআত করেছে। তার উচিত ছিল তালাকের উপরও সাক্ষী রাখা এবং রাজআতের উপরও সাক্ষী রাখা। সে ভবিষ্যতে আর যেন এর পুনরাবৃত্তি না করে।” হযরত আতা (রঃ) বলেন যে, বিবাহ, তালাক এবং রাজআত দুই জন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া জায়েয নয়। যেমন আল্লাহ পাকের নির্দেশ রয়েছে। তবে নিরুপায়ভাবে হয়ে গেলে সেটা অন্য কথা।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ সাক্ষী নির্ধারণ করার ও সত্য সাক্ষ্য দেয়ার নির্দেশ তাদেরকে দেয়া হচ্ছে যারা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে। যারা শরীয়তের পাবন্দ ও আখিরাতের শাস্তিকে ভয়কারী।ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর একটি উক্তি এই যে, রাজআতের উপর সাক্ষী রাখা ওয়াজিব। অনুরূপভাবে তাঁর মতে বিবাহেও সাক্ষী রাখা ওয়াজিব। অন্য একটি জামাআতেরও এটাই উক্তি। এই মাসআলাকে স্বীকারকারী উলামায়ে কিরামের এ দলটি একথাও বলেন যে, মুখে উচ্চারণ করা ছাড়া রাজআত সাব্যস্ত হয় না। কেননা, সাক্ষী রাখা জরুরী। আর যে পর্যন্ত রাজআতের কথা মুখে উচ্চারণ না করবে সে পর্যন্ত কিভাবে সাক্ষী নির্ধারণ করা যাবে?মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ করে দিবেন। অর্থাৎ যে ব্যক্তি শরীয়তের আহকাম পালন করবে, আল্লাহর হারামকৃত জিনিস হতে দূরে থাকবে, তিনি তার মুক্তির পথ বের করে দিবেন। আর তিনি তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে দান করবেন। হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ………… (আরবি)-এই আয়াত দু’টি পাঠ করতে শুরু করেন। পাঠ শেষে তিনি বলেনঃ “হে আবূ যার (রাঃ)! যদি সমস্ত মানুষ শুধু এটা হতেই গ্রহণ করে তবে তাদের জন্যে যথেষ্ট হয়ে যাবে।” অতঃপর বারবার তিনি এগুলো পড়তে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত আমার তন্দ্রা আসতে লাগলো। তারপর তিনি বললেনঃ “হে আবূ যার (রাঃ)! যখন তোমাকে মদীনা হতে বের করে দেয়া হবে তখন তুমি কি করবে?” আমি জবাবে বললামঃ আমি আরো বেশী প্রশস্ততা ও রহমতের দিকে চলে যাবো। অর্থাৎ মক্কা শরীফে চলে যাবো এবং আমি মক্কার কবুতররূপে থাকবো। তিনি আবার জিজেস করলেনঃ “তোমাকে যখন মক্কা হতেও বের করে দেয়া হবে তখন তুমি কি করবে?” আমি উত্তর দিলামঃ তখন আমি সিরিয়ার পবিত্র ভূমিতে চলে যাবো। তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “তোমাকে যখন সিরিয়া হতেও বের করে দেয়া হবে তখন তুমি কি করবে?” আমি উত্তরে বললামঃ যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আমি তখন আমার তরবারী কাঁধে রেখে মুকাবিলায় নেমে পড়বো। তিনি বললেনঃ “আমি তোমাকে এরচেয়ে উত্তম পন্থা বলে দিবো কি?” আমি বললামঃ অবশ্যই বলে দিন। তিনি বললেনঃ “তুমি শুনবে, মানবে, যদিও হাবশী গোলামও (নেতা) হয়।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক আয়াত হলো (আরবি)- (১৬:৯০)-এই আয়াতটি এবং প্রশস্ততম ওয়াদার আয়াত হলো (আরবি)-এই আয়াতটি। মসনাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি খুব বেশী ইসতিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে তাকে আল্লাহ সর্বপ্রকারের চিন্তা ও দুঃখ হতে মুক্তি দিয়ে থাকেন এবং সর্বপ্রকারের সংকীর্ণতা হতে প্রশস্ততা দান করেন, আর তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রিয্‌ক দান করে থাকেন।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ও চিন্তা হতে মুক্তি দান করবেন। হযরত রাবী (রঃ) বলেন, এর অর্থ হচ্ছেঃ মানুষের উপর যে কাজ কঠিন হয়, আল্লাহ তা সহজ করে দেন। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তার স্ত্রীকে তালাক দিবে, আল্লাহ তাকে মুক্তি দান করবেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেনঃ সে জানে যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে দিবেন এবং ইচ্ছা করলে দিবেন না। আর তিনি এমন জায়গা হতে দিবেন যা সে জানে না। হযরত কাতাদা বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আল্লাহ তাকে সন্দেহযুক্ত বিষয় ও মৃত্যুর সময়ের কষ্ট হতে রক্ষা করবেন। আর তাকে এমন জায়গা হতে রিয্‌ক দান করবেন যা তার কল্পনাতীত।হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এখানে আল্লাহ হতে ভয় করার অর্থ হলো সুন্নাত অনুযায়ী তালাক দেয়া ও সুন্নাত অনুযায়ী রাজআত করা। বর্ণিত আছে যে, হযরত আউফ ইবনে মালিক আশযায়ী (রাঃ) নামক রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর একজন সাহাবীর এক ছেলেকে কাফিররা গ্রেফতার করে নিয়ে যায় এবং জেলখানায় বন্দী করে দেয়। এরপর হযরত আউফ ইবনে মালিক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আসতেন এবং তাঁর পুত্রের অবস্থা, প্রয়োজন এবং বিপদ আপদ ও কষ্টের কথা বর্ণনা করতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ধৈর্যধারণের উপদেশ দিতেন এবং বলতেনঃ “সত্বরই আল্লাহ তা’আলা তার মুক্তির পথ বের করে দিবেন।” অল্পদিন মাত্র অতিবাহিত হয়েছে, ইতিমধ্যে তাঁর পুত্র শক্রদের মধ্য হতে পলায়ন করেন। পথে তিনি শক্রদের ছাগলের পাল পেয়ে যান। ছাগলগুলো তিনি হাঁকিয়ে নিয়ে পিতার নিকট হাযির হন। ঐ সময় (আরবি) –এই আয়াত নাযিল হয়।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই বান্দা গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণে রিয্‌ক হতে বঞ্চিত হয়, দু'আ ছাড়া অন্য কিছু তকদীর ফিরায় না এবং নেক কাজ ও সদ্ব্যবহার ছাড়া অন্য কিছু হায়াত বৃদ্ধি করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মালিক আশায়ীর (রাঃ) পুত্র হযরত আউফ (রাঃ) যখন কাফিরদের হাতে বন্দী ছিলেন তখন তিনি (হযরত মালিক আশযায়ী রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট আসেন (এবং তাঁকে এটা অবহিত করেন)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তুমি তাকে বলে পাঠাও যে সে যেন খুব বেশী বেশী (আরবি) পাঠ করতে থাকে।” কাফিররা হযরত আউফ (রাঃ)-কে বেঁধে রেখেছিল। একদা হঠাৎ করে তার বন্ধন খুলে যায় এবং তিনি সেখান হতে পালাতে শুরু করেন। বাইরে এসে তিনি তাদের একটি উষ্ট্রী দেখতে পান এবং ওর উপর সওয়ার হয়ে বাড়ী অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যান। পথে তিনি কাফিরদের উটের পাল দেখে সবগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে যান। কাফিররা তাঁর পশ্চাদ্বাবন করে। কিন্তু তখন তিনি তাদের নাগালের বাইরে। অবশেষে তিনি তাঁর বাড়ীর দূরযার উপর এসে ডাক দেন। ডাক শুনে তাঁর পিতা বলেনঃ “কা’বার প্রতিপালকের শপথ! এটা তো আউফ (রাঃ)-এর কণ্ঠ।” এ কথা শুনে তাঁর মা বলেনঃ “হায় কপাল! এটা আউফ (রাঃ)-এর কণ্ঠ কি করে হতে পারে? সে তো কাফিরদের হাতে বন্দী! অতঃপর পিতা, মাতা এবং খাদেম বাইরে এসে দেখেন যে, সত্যিই তিনি আউফ (রাঃ)। গোটা প্রাঙ্গন উটে ভর্তি হয়ে যায়। পিতা তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ উটগুলো কেমন?” উত্তরে তিনি ঘটনাটি বর্ণনা করেন। পিতা বলেনঃ “আচ্ছা, থামো। আমি এটা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে আসি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে বললেনঃ “এগুলো সবই তোমার মাল। তোমার মনে যা চায় তাই করতে পার।” ঐ সময় (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সব দিকের সম্পর্ক ছিন্ন করে আল্লাহর হয়ে যায়, আল্লাহ তার সব কাঠিন্যে তার জন্যে যথেষ্ট হয়ে যান এবং তার ধারণাতীত উৎস হতে তাকে রিযিক দান করে থাকেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ হতে সরে গিয়ে দুনিয়ার হয়ে যায়, আল্লাহ তাকে দুনিয়ার হাতেই সঁপে দেন।” (এটাও ইমাম ইবনে আবি হাতিমই (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সওয়ারীতে তার পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে বালক! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি। তুমি আল্লাহকে স্মরণ করবে, তাহলে আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন। তুমি আল্লাহর হুকুমের হিফাযত করবে, তাহলে তুমি আল্লাহকে তোমার পাশে এমনকি তোমার সামনে পাবে। কিছু চাইতে হলে আল্লাহর কাছেই চাবে। সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে তাঁর কাছেই করবে। সমস্ত উম্মত মিলিত হয়ে যদি তোমার উপকার করতে চায় এবং তা যদি আল্লাহ না চান তবে তারা তোমার সামান্যতম উপকারও করতে পারবে না। অনুরূপভাবে সবাই মিলিত হয়ে যদি তোমার ক্ষতি করতে চায় তবে তারা তোমার ক্ষতি করতে পারবে না, তোমার ভাগ্যে আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া। কলম উঠে গেছে এবং কাগজ শুকিয়ে গেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামে তিরমিযীতেও এ হাদীসটি রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন প্রয়োজনে পড়ে এবং সে তা জনগণের সামনে তুলে ধরে, খুব সম্ভব সে কঠিন অবস্থায় পড়ে যাবে, তার কাজ হালকা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার প্রয়োজন আল্লাহর নিকট নিয়ে যায়, আল্লাহ অবশ্য অবশ্যই তার প্রয়োজন পুরো করে থাকেন এবং তার উদ্দেশ্য সফল করেন। হয়তো তাড়াতাড়ি এই দুনিয়াতেই পুরো করেন, না হয় মৃত্যুর পর আখিরাতে পুরো করবেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করবেনই। অর্থাৎ তিনি স্বীয় আহকাম যেমনভাবে চান তাঁর মাখলূকের মধ্যে পুরো করে থাকেন।আল্লাহ সব কিছুর জন্যে স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তাঁর বিধানে প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাণ রয়েছে।”(১৩:৮)

আত-তালাক 65:3

২-৩ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ইদ্দত বিশিষ্টা নারীদের ইদ্দতের সময়কাল যখন পূর্ণ হওয়ার নিকটবর্তী হবে তখন তাদের স্বামীদের দুটো পন্থার যে কোন একটি গ্রহণ করা উচিত। হয় তাদেরকে যথাবিধি স্ত্রীরূপেই রেখে দিবে, অর্থাৎ যে তালাক তাদেরকে দিয়েছিল তা হতে রাজআত করে তাদেরকে যথা নিয়মে তাদের বিবাহ বন্ধনে রেখে দিয়ে তাদের সাথে স্ত্রীরূপে বসবাস করবে, না হয় তাদেরকে তালাক দিয়ে দিবে। কিন্তু তাদেরকে গাল মন্দ দিবে না, শাসন গর্জন করবে না, বরং ভালভাবে তাদেরকে পরিত্যাগ করবে।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ যদি তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে রাজআত করে নাও তবে তোমাদের মধ্য হতে অর্থাৎ মুসলমানদের মধ্য হতে দুইজন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখবে। যেমন সুনানে আবি দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “একটি লোক তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে, অতঃপর তার সাথে সহবাস করেছে। অথচ না সে তালাকের উপর সাক্ষী রেখেছে, না রাজআতের উপর সাক্ষী রেখেছে। এর হুকুম কি হবে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “সে সুন্নাতের বিপরীত তালাক দিয়েছে এবং সুন্নাতের বিপরীত রাজআত করেছে। তার উচিত ছিল তালাকের উপরও সাক্ষী রাখা এবং রাজআতের উপরও সাক্ষী রাখা। সে ভবিষ্যতে আর যেন এর পুনরাবৃত্তি না করে।” হযরত আতা (রঃ) বলেন যে, বিবাহ, তালাক এবং রাজআত দুই জন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া জায়েয নয়। যেমন আল্লাহ পাকের নির্দেশ রয়েছে। তবে নিরুপায়ভাবে হয়ে গেলে সেটা অন্য কথা।মহান আল্লাহ এরপর বলেনঃ সাক্ষী নির্ধারণ করার ও সত্য সাক্ষ্য দেয়ার নির্দেশ তাদেরকে দেয়া হচ্ছে যারা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে। যারা শরীয়তের পাবন্দ ও আখিরাতের শাস্তিকে ভয়কারী।ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর একটি উক্তি এই যে, রাজআতের উপর সাক্ষী রাখা ওয়াজিব। অনুরূপভাবে তাঁর মতে বিবাহেও সাক্ষী রাখা ওয়াজিব। অন্য একটি জামাআতেরও এটাই উক্তি। এই মাসআলাকে স্বীকারকারী উলামায়ে কিরামের এ দলটি একথাও বলেন যে, মুখে উচ্চারণ করা ছাড়া রাজআত সাব্যস্ত হয় না। কেননা, সাক্ষী রাখা জরুরী। আর যে পর্যন্ত রাজআতের কথা মুখে উচ্চারণ না করবে সে পর্যন্ত কিভাবে সাক্ষী নির্ধারণ করা যাবে?মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ করে দিবেন। অর্থাৎ যে ব্যক্তি শরীয়তের আহকাম পালন করবে, আল্লাহর হারামকৃত জিনিস হতে দূরে থাকবে, তিনি তার মুক্তির পথ বের করে দিবেন। আর তিনি তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে দান করবেন। হযরত আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ………… (আরবি)-এই আয়াত দু’টি পাঠ করতে শুরু করেন। পাঠ শেষে তিনি বলেনঃ “হে আবূ যার (রাঃ)! যদি সমস্ত মানুষ শুধু এটা হতেই গ্রহণ করে তবে তাদের জন্যে যথেষ্ট হয়ে যাবে।” অতঃপর বারবার তিনি এগুলো পড়তে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত আমার তন্দ্রা আসতে লাগলো। তারপর তিনি বললেনঃ “হে আবূ যার (রাঃ)! যখন তোমাকে মদীনা হতে বের করে দেয়া হবে তখন তুমি কি করবে?” আমি জবাবে বললামঃ আমি আরো বেশী প্রশস্ততা ও রহমতের দিকে চলে যাবো। অর্থাৎ মক্কা শরীফে চলে যাবো এবং আমি মক্কার কবুতররূপে থাকবো। তিনি আবার জিজেস করলেনঃ “তোমাকে যখন মক্কা হতেও বের করে দেয়া হবে তখন তুমি কি করবে?” আমি উত্তর দিলামঃ তখন আমি সিরিয়ার পবিত্র ভূমিতে চলে যাবো। তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “তোমাকে যখন সিরিয়া হতেও বের করে দেয়া হবে তখন তুমি কি করবে?” আমি উত্তরে বললামঃ যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আমি তখন আমার তরবারী কাঁধে রেখে মুকাবিলায় নেমে পড়বো। তিনি বললেনঃ “আমি তোমাকে এরচেয়ে উত্তম পন্থা বলে দিবো কি?” আমি বললামঃ অবশ্যই বলে দিন। তিনি বললেনঃ “তুমি শুনবে, মানবে, যদিও হাবশী গোলামও (নেতা) হয়।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে)মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “কুরআন কারীমের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক আয়াত হলো (আরবি)- (১৬:৯০)-এই আয়াতটি এবং প্রশস্ততম ওয়াদার আয়াত হলো (আরবি)-এই আয়াতটি। মসনাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি খুব বেশী ইসতিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে তাকে আল্লাহ সর্বপ্রকারের চিন্তা ও দুঃখ হতে মুক্তি দিয়ে থাকেন এবং সর্বপ্রকারের সংকীর্ণতা হতে প্রশস্ততা দান করেন, আর তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রিয্‌ক দান করে থাকেন।”হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ও চিন্তা হতে মুক্তি দান করবেন। হযরত রাবী (রঃ) বলেন, এর অর্থ হচ্ছেঃ মানুষের উপর যে কাজ কঠিন হয়, আল্লাহ তা সহজ করে দেন। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তার স্ত্রীকে তালাক দিবে, আল্লাহ তাকে মুক্তি দান করবেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেনঃ সে জানে যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে দিবেন এবং ইচ্ছা করলে দিবেন না। আর তিনি এমন জায়গা হতে দিবেন যা সে জানে না। হযরত কাতাদা বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ আল্লাহ তাকে সন্দেহযুক্ত বিষয় ও মৃত্যুর সময়ের কষ্ট হতে রক্ষা করবেন। আর তাকে এমন জায়গা হতে রিয্‌ক দান করবেন যা তার কল্পনাতীত।হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এখানে আল্লাহ হতে ভয় করার অর্থ হলো সুন্নাত অনুযায়ী তালাক দেয়া ও সুন্নাত অনুযায়ী রাজআত করা। বর্ণিত আছে যে, হযরত আউফ ইবনে মালিক আশযায়ী (রাঃ) নামক রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর একজন সাহাবীর এক ছেলেকে কাফিররা গ্রেফতার করে নিয়ে যায় এবং জেলখানায় বন্দী করে দেয়। এরপর হযরত আউফ ইবনে মালিক (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আসতেন এবং তাঁর পুত্রের অবস্থা, প্রয়োজন এবং বিপদ আপদ ও কষ্টের কথা বর্ণনা করতেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ধৈর্যধারণের উপদেশ দিতেন এবং বলতেনঃ “সত্বরই আল্লাহ তা’আলা তার মুক্তির পথ বের করে দিবেন।” অল্পদিন মাত্র অতিবাহিত হয়েছে, ইতিমধ্যে তাঁর পুত্র শক্রদের মধ্য হতে পলায়ন করেন। পথে তিনি শক্রদের ছাগলের পাল পেয়ে যান। ছাগলগুলো তিনি হাঁকিয়ে নিয়ে পিতার নিকট হাযির হন। ঐ সময় (আরবি) –এই আয়াত নাযিল হয়।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই বান্দা গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণে রিয্‌ক হতে বঞ্চিত হয়, দু'আ ছাড়া অন্য কিছু তকদীর ফিরায় না এবং নেক কাজ ও সদ্ব্যবহার ছাড়া অন্য কিছু হায়াত বৃদ্ধি করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মালিক আশায়ীর (রাঃ) পুত্র হযরত আউফ (রাঃ) যখন কাফিরদের হাতে বন্দী ছিলেন তখন তিনি (হযরত মালিক আশযায়ী রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট আসেন (এবং তাঁকে এটা অবহিত করেন)। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “তুমি তাকে বলে পাঠাও যে সে যেন খুব বেশী বেশী (আরবি) পাঠ করতে থাকে।” কাফিররা হযরত আউফ (রাঃ)-কে বেঁধে রেখেছিল। একদা হঠাৎ করে তার বন্ধন খুলে যায় এবং তিনি সেখান হতে পালাতে শুরু করেন। বাইরে এসে তিনি তাদের একটি উষ্ট্রী দেখতে পান এবং ওর উপর সওয়ার হয়ে বাড়ী অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যান। পথে তিনি কাফিরদের উটের পাল দেখে সবগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে যান। কাফিররা তাঁর পশ্চাদ্বাবন করে। কিন্তু তখন তিনি তাদের নাগালের বাইরে। অবশেষে তিনি তাঁর বাড়ীর দূরযার উপর এসে ডাক দেন। ডাক শুনে তাঁর পিতা বলেনঃ “কা’বার প্রতিপালকের শপথ! এটা তো আউফ (রাঃ)-এর কণ্ঠ।” এ কথা শুনে তাঁর মা বলেনঃ “হায় কপাল! এটা আউফ (রাঃ)-এর কণ্ঠ কি করে হতে পারে? সে তো কাফিরদের হাতে বন্দী! অতঃপর পিতা, মাতা এবং খাদেম বাইরে এসে দেখেন যে, সত্যিই তিনি আউফ (রাঃ)। গোটা প্রাঙ্গন উটে ভর্তি হয়ে যায়। পিতা তাঁকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ উটগুলো কেমন?” উত্তরে তিনি ঘটনাটি বর্ণনা করেন। পিতা বলেনঃ “আচ্ছা, থামো। আমি এটা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে আসি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথা শুনে বললেনঃ “এগুলো সবই তোমার মাল। তোমার মনে যা চায় তাই করতে পার।” ঐ সময় (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সব দিকের সম্পর্ক ছিন্ন করে আল্লাহর হয়ে যায়, আল্লাহ তার সব কাঠিন্যে তার জন্যে যথেষ্ট হয়ে যান এবং তার ধারণাতীত উৎস হতে তাকে রিযিক দান করে থাকেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ হতে সরে গিয়ে দুনিয়ার হয়ে যায়, আল্লাহ তাকে দুনিয়ার হাতেই সঁপে দেন।” (এটাও ইমাম ইবনে আবি হাতিমই (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সওয়ারীতে তার পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে বালক! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি। তুমি আল্লাহকে স্মরণ করবে, তাহলে আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন। তুমি আল্লাহর হুকুমের হিফাযত করবে, তাহলে তুমি আল্লাহকে তোমার পাশে এমনকি তোমার সামনে পাবে। কিছু চাইতে হলে আল্লাহর কাছেই চাবে। সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে তাঁর কাছেই করবে। সমস্ত উম্মত মিলিত হয়ে যদি তোমার উপকার করতে চায় এবং তা যদি আল্লাহ না চান তবে তারা তোমার সামান্যতম উপকারও করতে পারবে না। অনুরূপভাবে সবাই মিলিত হয়ে যদি তোমার ক্ষতি করতে চায় তবে তারা তোমার ক্ষতি করতে পারবে না, তোমার ভাগ্যে আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া। কলম উঠে গেছে এবং কাগজ শুকিয়ে গেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামে তিরমিযীতেও এ হাদীসটি রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন প্রয়োজনে পড়ে এবং সে তা জনগণের সামনে তুলে ধরে, খুব সম্ভব সে কঠিন অবস্থায় পড়ে যাবে, তার কাজ হালকা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার প্রয়োজন আল্লাহর নিকট নিয়ে যায়, আল্লাহ অবশ্য অবশ্যই তার প্রয়োজন পুরো করে থাকেন এবং তার উদ্দেশ্য সফল করেন। হয়তো তাড়াতাড়ি এই দুনিয়াতেই পুরো করেন, না হয় মৃত্যুর পর আখিরাতে পুরো করবেন।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করবেনই। অর্থাৎ তিনি স্বীয় আহকাম যেমনভাবে চান তাঁর মাখলূকের মধ্যে পুরো করে থাকেন।আল্লাহ সব কিছুর জন্যে স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তাঁর বিধানে প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাণ রয়েছে।”(১৩:৮)

আত-তালাক 65:4

৪-৫ নং আয়াতের তাফসীর যেসব নারীর বয়স বেশী হয়ে যাওয়ার কারণে মাসিক ঋতু বন্ধ হয়ে গেছে এখানে তাদের ইদ্দতের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের ইদ্দত হলো তিন মাস, যেমন ঋতুমতী নারীদের ইদ্দত হলো তিন হায়েয। যেমন সূরায়ে বাকারার আয়াত এটা প্রমাণ করে। অনুরূপভাবে যেসব অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়েদের এখনো রজস্বলা হয়নি তাদেরও ইদ্দত তিন মাস।‘যদি তোমরা সন্দেহ কর’ এর তাফসীরে দু'টি উক্তি রয়েছে। এক তো এই যে, তারা রক্ত দেখলো এবং এতে সন্দেহ থাকলো যে, এটা হায়েযের রক্ত, না ইসহাযা রোগের রক্ত। আর দ্বিতীয় উক্তি এই যে, তাদের ইদ্দতের হুকুমের ব্যাপারে সন্দেহ হয় এবং সেটা জানা যায় না। তাহলে সেটা হবে তিন মাস। এই দ্বিতীয় উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। এই রিওয়াইয়াতটিও এর দলীল যে, হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বহু স্ত্রীলোকের ইদ্দত এখনো বর্ণনা করা হয়নি। যেমন নাবালেগ মেয়ে, বৃদ্ধা এবং গর্ভবতী। স্ত্রীলোকদের (ইদ্দতের বর্ণনা দেয়া হয়নি)।” তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর গর্ভবতীর ইদ্দত বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তার ইদ্দত হলো সন্তান ভূমিষ্ট হওয়া। হয় এটা তালাক, না হয় স্বামীর মৃত্যুর অল্প কিছুকাল পরেই হোক। যেমন এটা কুরআনের এই আয়াত ও হাদীসে নববী (সঃ) দ্বারা প্রমাণিত। আর জমহুর উলামা এবং পূর্বযুগীয় ও পরযুগীয় আলেমদের উক্তি এটাই। তবে হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরায়ে বাকারার আয়াত এবং এই আয়াতটি মিলিত করে তাঁদের ফতওয়া হলোঃ এই দুটোর মধ্যে যেটা বেশী দেরীতে শেষ হবে ঐ ইদ্দতই সে গণনা করবে। অর্থাৎ যদি সন্তান তিন মাসের পূর্বেই ভূমিষ্ট হয়ে যায় তবে তার ইদ্দত হবে তিন মাস। আর যদি তিন মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও সন্তান ভূমিষ্ট না হয় তবে সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময় ইদ্দত রূপে গণ্য হবে।হযরত আবূ সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে। ঐ সময় হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) তাঁর নিকট বিদ্যমান ছিলেন। লোকটি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ “যে মহিলার স্বামীর মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর সন্তান ভূমিষ্ট হয় তার ব্যাপারে আপনার ফতওয়া কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “দুটো ইদ্দতের মধ্যে শেষের ইদ্দতটি সে পালন করবে অর্থাৎ এই অবস্থায় তার ইদ্দত হবে তিন মাস।” হযরত আবূ সালমা (রাঃ) তখন বলেনঃ “কুরআন কারীমে তো রয়েছে যে, গর্ভবতী মহিলার ইদ্দত হলো সন্তান ভূমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত সময়কাল পর্যন্ত?” হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) তখন বলেনঃ “আমিও আমার চাচাতো ভাই হযরত আবূ সালমা (রাঃ)-এর সাথে রয়েছি। অর্থাৎ আমার ফতওয়াও এটাই।" তৎক্ষণাৎ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তার গোলাম কুরাইব (রাঃ)-কে হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর নিকট এই মাসআলা জানার জন্যে প্রেরণ করেন। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেন যে, হযরত সুবাইআহ আসলামিয়্যাহ (রাঃ)-এর স্বামী যখন নিহত হন তখন তিনি গর্ভবতী ছিলেন। চল্লিশ দিন পর তিনি সন্তান প্রসব করেন। তখনই বাগদাতার আগমন ঘটে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বিয়ে পড়িয়ে দেন। বাগদানকারীদের মধ্যে হযরত আবূস সানাবিলও (রাঃ) ছিলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা কিছু দীর্ঘতার সাথে অন্যান্য কিতাবেও বর্ণিত হয়েছ)বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উত্তাহ (রাঃ) হযরত উমার ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে আরকাম যুহরীর (রাঃ) কাছে পত্র লিখেন যে, তিনি যেন সুবাইয়াহ বিনতু হারিস আসলামিয়্যাহ (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে তাঁকে তাঁর ঘটনাটি জিজ্ঞেস করেন এবং তা জেনে নিয়ে তাঁর কাছে পত্র লিখেন। তাঁর কথামত হযরত উমার ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হযরত সুবাইআহ (রাঃ)-এর কাছে গমন করেন এবং তাঁর নিকট হতে তার ঘটনাটি জেনে নিয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উবাহ (রাঃ)-এর কাছে পত্র লিখেন যে, হযরত সুবাইআহ (রাঃ)-এর স্বামী ছিলেন হযরত সা’দ ইবনে খাওলাহ (রাঃ)। তিনি বদরী সাহাবী ছিলেন। বিদায় হজ্বে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। ঐ সময় তাঁর স্ত্রী হযরত সুবাইআহ (রাঃ) গর্ভবতী ছিলেন। অল্পদিন পরেই তাঁর সন্তান ভূমিষ্ট হয়। নিফাস হতে পবিত্র হওয়ার পর তিনি ভাল কাপড় পরিহিতা হয়ে সাজ-সজ্জা করে বসে পড়েন। হযরত আবূস সানাবিল বাকাফ যখন তাঁর নিকট আসেন তখন তাঁকে এ অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি যে এভাবে বসে রয়েছো, তুমি কি বিয়ে করতে চাও? আল্লাহর কসম! চার মাস দশদিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তুমি বিয়ে করতে পার না।” তিনি একথা শুনে চাদর গায়ে দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হন এবং তাকে এ মাসআলা জিজ্ঞেস করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “সন্তান প্রসবের পরেই তোমার ইদ্দত শেষ হয়ে গেছে। সুতরাং এখন তুমি ইচ্ছা করলে বিয়ে করতে পার।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের অধীনে এই হাদীসটি আনয়ন করার পর এও রয়েছে যে, হযরত মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রাঃ) এক মজলিসে ছিলেন। যেখানে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবূ লাইলাও (রাঃ) ছিলেন, যাঁকে তাঁর সঙ্গী সাথীরা খুবই সম্মান প্রদর্শন করতেন। তিনি গর্ভবতী নারীর ইদ্দতের সময়কাল বলতে গিয়ে বলেন যে, ওটা দুই ইদ্দতের মধ্যে শেষটি। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) তখন তাঁকে সুবাইআহ বিনতু হারিস (রাঃ)-এর হাদীসটি শুনিয়ে দেন। তখন তার কোন এক সাথী মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ)-কে কিছু তিরস্কার করেন। ইবনে সীরীন তখন বলেনঃ “তাহলে তো যদি আমি আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর উপর মিথ্যা অপবাদ দিই তবে আমার তার উপর বড়ই বাহাদুরী দেখানো হবে, অথচ তিনি এখনো কুফার এক প্রান্তে জীবিত বিদ্যমান রয়েছেন।” তখন তিনি কিছু লজ্জিত হলেন এবং বললেনঃ “কিন্তু তাঁর চাচা তো একথা বলেন না।” ইবনে সীরীন (রঃ) বলেনঃ “আমি তখন হযরত আবূ আতিয়্যাহ মালিক ইবনে আমির (রঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি আমাকে সুবাইআহ (রাঃ)-এর হাদীসটি পূর্ণভাবে শুনালেন। আমি তাকে বললামঃ এ ব্যাপারে আপনি হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে কিছু শুনেছেন কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ আমরা হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর নিকটে ছিলাম। তিনি বলেনঃ “তোমরা কি তার উপর কঠোরতা অবলম্বন করছে এবং তাকে অবকাশ দিচ্ছ না?" তখন সূরায়ে নিসা অবতীর্ণ হয়। সূরায়ে কাসরা অর্থাৎ সূরায়ে তালাক সূরায়ে নিসা তূলার পরে অবতীর্ণ হয়। আর এতে বলা হয়েছে যে, গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “যে মুলাআনাহ (পরস্পর অভিশাপ) করতে চায়, আমি তার সাথে মুলাআনাহ করতে প্রস্তুত আছি। অর্থাৎ আমার ফতওয়ার বিপরীত যে ফতওয়া দেয় সে যেন আমার সাথে মুকাবিলা করতে আসে এবং মিথ্যাবাদীর উপর আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হওয়ার দুআ করে। আমার ফতওয়া এই যে, গর্ভবতী নারীর ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। প্রথমে হুকুম ছিল এই যে, যেসব নারীর স্বামী মারা যাবে তারা যেন চার মাস দশদিন ইদ্দত পালন করে। তারপর এই আয়াত অবতীর্ণ হয় যে, গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। সুতরাং এই নারীগুলো ঐ নারীগুলো হতে বিশিষ্টা হয়ে গেল। এখন মাসআলা এটাই থাকলো যে, যে নারীর স্বামী মারা যাবে সে গর্ভবতী হলে তার সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পরেই তার ইদ্দতকাল পূর্ণ হয়ে যাবে।”মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) একথা ঐ সময় বলেছিলেন যখন তিনি জানতে পারেন যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর ফতওয়া হলোঃ গর্ভবতী নারীর ইদ্দতকাল দুই ইদ্দতের শেষ ইদ্দত। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল যে সন্তান প্রসব পর্যন্ত, এটা কি তিন তালাক দেয়া হয়েছে এরূপ নারীদের ইদ্দতকাল, না যাদের স্বামী মারা গেছে তাদের ইদ্দতকাল?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “এটা উভয়েরই ইদ্দতকাল।” (এ হাদীসটি খুবই গরীব, এমনকি মুনকারও বটে। কেননা, এর ইসনাদের মধ্যে মুসান্না ইবনে সাবাহ রয়েছে যার হাদীস সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। কিন্তু এর অন্য সনদও রয়েছে) মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহকে যে ভয় করে, আল্লাহ তার সমস্যার সমাধান সহজ করে দেন। যে কোন বিপদ আপদ ও কষ্ট হতে তাকে শান্তি দান করে থাকেন।এটা আল্লাহর বিধান যা তিনি বান্দাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মাধ্যমে অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহকে যে ভয় করে তিনি তার পাপ মোচন করবেন এবং তাকে দান করবেন মহাপুরস্কার।

আত-তালাক 65:5

৪-৫ নং আয়াতের তাফসীর যেসব নারীর বয়স বেশী হয়ে যাওয়ার কারণে মাসিক ঋতু বন্ধ হয়ে গেছে এখানে তাদের ইদ্দতের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাদের ইদ্দত হলো তিন মাস, যেমন ঋতুমতী নারীদের ইদ্দত হলো তিন হায়েয। যেমন সূরায়ে বাকারার আয়াত এটা প্রমাণ করে। অনুরূপভাবে যেসব অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়েদের এখনো রজস্বলা হয়নি তাদেরও ইদ্দত তিন মাস।‘যদি তোমরা সন্দেহ কর’ এর তাফসীরে দু'টি উক্তি রয়েছে। এক তো এই যে, তারা রক্ত দেখলো এবং এতে সন্দেহ থাকলো যে, এটা হায়েযের রক্ত, না ইসহাযা রোগের রক্ত। আর দ্বিতীয় উক্তি এই যে, তাদের ইদ্দতের হুকুমের ব্যাপারে সন্দেহ হয় এবং সেটা জানা যায় না। তাহলে সেটা হবে তিন মাস। এই দ্বিতীয় উক্তিটিই বেশী প্রকাশমান। এই রিওয়াইয়াতটিও এর দলীল যে, হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বহু স্ত্রীলোকের ইদ্দত এখনো বর্ণনা করা হয়নি। যেমন নাবালেগ মেয়ে, বৃদ্ধা এবং গর্ভবতী। স্ত্রীলোকদের (ইদ্দতের বর্ণনা দেয়া হয়নি)।” তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর গর্ভবতীর ইদ্দত বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তার ইদ্দত হলো সন্তান ভূমিষ্ট হওয়া। হয় এটা তালাক, না হয় স্বামীর মৃত্যুর অল্প কিছুকাল পরেই হোক। যেমন এটা কুরআনের এই আয়াত ও হাদীসে নববী (সঃ) দ্বারা প্রমাণিত। আর জমহুর উলামা এবং পূর্বযুগীয় ও পরযুগীয় আলেমদের উক্তি এটাই। তবে হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরায়ে বাকারার আয়াত এবং এই আয়াতটি মিলিত করে তাঁদের ফতওয়া হলোঃ এই দুটোর মধ্যে যেটা বেশী দেরীতে শেষ হবে ঐ ইদ্দতই সে গণনা করবে। অর্থাৎ যদি সন্তান তিন মাসের পূর্বেই ভূমিষ্ট হয়ে যায় তবে তার ইদ্দত হবে তিন মাস। আর যদি তিন মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও সন্তান ভূমিষ্ট না হয় তবে সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময় ইদ্দত রূপে গণ্য হবে।হযরত আবূ সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একজন লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে। ঐ সময় হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) তাঁর নিকট বিদ্যমান ছিলেন। লোকটি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ “যে মহিলার স্বামীর মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর সন্তান ভূমিষ্ট হয় তার ব্যাপারে আপনার ফতওয়া কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “দুটো ইদ্দতের মধ্যে শেষের ইদ্দতটি সে পালন করবে অর্থাৎ এই অবস্থায় তার ইদ্দত হবে তিন মাস।” হযরত আবূ সালমা (রাঃ) তখন বলেনঃ “কুরআন কারীমে তো রয়েছে যে, গর্ভবতী মহিলার ইদ্দত হলো সন্তান ভূমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত সময়কাল পর্যন্ত?” হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) তখন বলেনঃ “আমিও আমার চাচাতো ভাই হযরত আবূ সালমা (রাঃ)-এর সাথে রয়েছি। অর্থাৎ আমার ফতওয়াও এটাই।" তৎক্ষণাৎ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তার গোলাম কুরাইব (রাঃ)-কে হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর নিকট এই মাসআলা জানার জন্যে প্রেরণ করেন। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) বলেন যে, হযরত সুবাইআহ আসলামিয়্যাহ (রাঃ)-এর স্বামী যখন নিহত হন তখন তিনি গর্ভবতী ছিলেন। চল্লিশ দিন পর তিনি সন্তান প্রসব করেন। তখনই বাগদাতার আগমন ঘটে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বিয়ে পড়িয়ে দেন। বাগদানকারীদের মধ্যে হযরত আবূস সানাবিলও (রাঃ) ছিলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা কিছু দীর্ঘতার সাথে অন্যান্য কিতাবেও বর্ণিত হয়েছ)বর্ণিত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উত্তাহ (রাঃ) হযরত উমার ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে আরকাম যুহরীর (রাঃ) কাছে পত্র লিখেন যে, তিনি যেন সুবাইয়াহ বিনতু হারিস আসলামিয়্যাহ (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে তাঁকে তাঁর ঘটনাটি জিজ্ঞেস করেন এবং তা জেনে নিয়ে তাঁর কাছে পত্র লিখেন। তাঁর কথামত হযরত উমার ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হযরত সুবাইআহ (রাঃ)-এর কাছে গমন করেন এবং তাঁর নিকট হতে তার ঘটনাটি জেনে নিয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উবাহ (রাঃ)-এর কাছে পত্র লিখেন যে, হযরত সুবাইআহ (রাঃ)-এর স্বামী ছিলেন হযরত সা’দ ইবনে খাওলাহ (রাঃ)। তিনি বদরী সাহাবী ছিলেন। বিদায় হজ্বে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। ঐ সময় তাঁর স্ত্রী হযরত সুবাইআহ (রাঃ) গর্ভবতী ছিলেন। অল্পদিন পরেই তাঁর সন্তান ভূমিষ্ট হয়। নিফাস হতে পবিত্র হওয়ার পর তিনি ভাল কাপড় পরিহিতা হয়ে সাজ-সজ্জা করে বসে পড়েন। হযরত আবূস সানাবিল বাকাফ যখন তাঁর নিকট আসেন তখন তাঁকে এ অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি যে এভাবে বসে রয়েছো, তুমি কি বিয়ে করতে চাও? আল্লাহর কসম! চার মাস দশদিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তুমি বিয়ে করতে পার না।” তিনি একথা শুনে চাদর গায়ে দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হন এবং তাকে এ মাসআলা জিজ্ঞেস করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “সন্তান প্রসবের পরেই তোমার ইদ্দত শেষ হয়ে গেছে। সুতরাং এখন তুমি ইচ্ছা করলে বিয়ে করতে পার।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের অধীনে এই হাদীসটি আনয়ন করার পর এও রয়েছে যে, হযরত মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রাঃ) এক মজলিসে ছিলেন। যেখানে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবূ লাইলাও (রাঃ) ছিলেন, যাঁকে তাঁর সঙ্গী সাথীরা খুবই সম্মান প্রদর্শন করতেন। তিনি গর্ভবতী নারীর ইদ্দতের সময়কাল বলতে গিয়ে বলেন যে, ওটা দুই ইদ্দতের মধ্যে শেষটি। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ) তখন তাঁকে সুবাইআহ বিনতু হারিস (রাঃ)-এর হাদীসটি শুনিয়ে দেন। তখন তার কোন এক সাথী মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রঃ)-কে কিছু তিরস্কার করেন। ইবনে সীরীন তখন বলেনঃ “তাহলে তো যদি আমি আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর উপর মিথ্যা অপবাদ দিই তবে আমার তার উপর বড়ই বাহাদুরী দেখানো হবে, অথচ তিনি এখনো কুফার এক প্রান্তে জীবিত বিদ্যমান রয়েছেন।” তখন তিনি কিছু লজ্জিত হলেন এবং বললেনঃ “কিন্তু তাঁর চাচা তো একথা বলেন না।” ইবনে সীরীন (রঃ) বলেনঃ “আমি তখন হযরত আবূ আতিয়্যাহ মালিক ইবনে আমির (রঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি আমাকে সুবাইআহ (রাঃ)-এর হাদীসটি পূর্ণভাবে শুনালেন। আমি তাকে বললামঃ এ ব্যাপারে আপনি হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে কিছু শুনেছেন কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ আমরা হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর নিকটে ছিলাম। তিনি বলেনঃ “তোমরা কি তার উপর কঠোরতা অবলম্বন করছে এবং তাকে অবকাশ দিচ্ছ না?" তখন সূরায়ে নিসা অবতীর্ণ হয়। সূরায়ে কাসরা অর্থাৎ সূরায়ে তালাক সূরায়ে নিসা তূলার পরে অবতীর্ণ হয়। আর এতে বলা হয়েছে যে, গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “যে মুলাআনাহ (পরস্পর অভিশাপ) করতে চায়, আমি তার সাথে মুলাআনাহ করতে প্রস্তুত আছি। অর্থাৎ আমার ফতওয়ার বিপরীত যে ফতওয়া দেয় সে যেন আমার সাথে মুকাবিলা করতে আসে এবং মিথ্যাবাদীর উপর আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হওয়ার দুআ করে। আমার ফতওয়া এই যে, গর্ভবতী নারীর ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। প্রথমে হুকুম ছিল এই যে, যেসব নারীর স্বামী মারা যাবে তারা যেন চার মাস দশদিন ইদ্দত পালন করে। তারপর এই আয়াত অবতীর্ণ হয় যে, গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। সুতরাং এই নারীগুলো ঐ নারীগুলো হতে বিশিষ্টা হয়ে গেল। এখন মাসআলা এটাই থাকলো যে, যে নারীর স্বামী মারা যাবে সে গর্ভবতী হলে তার সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পরেই তার ইদ্দতকাল পূর্ণ হয়ে যাবে।”মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) একথা ঐ সময় বলেছিলেন যখন তিনি জানতে পারেন যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর ফতওয়া হলোঃ গর্ভবতী নারীর ইদ্দতকাল দুই ইদ্দতের শেষ ইদ্দত। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল যে সন্তান প্রসব পর্যন্ত, এটা কি তিন তালাক দেয়া হয়েছে এরূপ নারীদের ইদ্দতকাল, না যাদের স্বামী মারা গেছে তাদের ইদ্দতকাল?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “এটা উভয়েরই ইদ্দতকাল।” (এ হাদীসটি খুবই গরীব, এমনকি মুনকারও বটে। কেননা, এর ইসনাদের মধ্যে মুসান্না ইবনে সাবাহ রয়েছে যার হাদীস সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। কিন্তু এর অন্য সনদও রয়েছে) মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহকে যে ভয় করে, আল্লাহ তার সমস্যার সমাধান সহজ করে দেন। যে কোন বিপদ আপদ ও কষ্ট হতে তাকে শান্তি দান করে থাকেন।এটা আল্লাহর বিধান যা তিনি বান্দাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মাধ্যমে অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহকে যে ভয় করে তিনি তার পাপ মোচন করবেন এবং তাকে দান করবেন মহাপুরস্কার।

আত-তালাক 65:6

৬-৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে হুকুম করছেন যে, যখন তাদের মধ্যে কেউ তার স্ত্রীকে তালাক দিবে তখন যেন তার ইদ্দতকাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে তার বসবাসের জায়গা দেয়। এ জায়গা তার শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী হবে। এমনকি হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, যদি সে খুবই সংকীর্ণ অবস্থার লোক হয় তবে যেন তার ঘরের এক কোণাতেই তাকে স্থান দেয়।মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা তাদেরকে সংকটে ফেলার উদ্দেশ্যে উত্যক্ত করো না। তাদেরকে কষ্ট দিয়ে এমন সংকটময় অবস্থায় ফেলে দিয়ো না যে, তারা সহ্য করতে না পেরে বাড়ী ছেড়ে চলে যায়। অথবা তোমাদের হাত হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে তারা তাদের প্রাপ্য মোহর ছেড়ে দেয়। কিংবা তোমরা তাদেরকে এমনভাবে তালাক দিবে না যে, ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার দুই একদিন পূর্বে রাজআত করার ঘোষণা দিবে, এরপর আবার তালাক দিবে এবং ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার নিকটবর্তী সময়ে রাজমাত করে নিবে।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ তালাকপ্রাপ্তা নারী যদি গর্ভবতী হয় তবে তার খাওয়া-খরচের দায়িত্ব তার স্বামীর। অধিকাংশ আলেমের মতে এই হুকুম ঐ মহিলাদের জন্যে খাস করে বর্ণনা করা হচ্ছে যাদেরকে শেষের তালাক দিয়ে দেয়া হয়েছে। যাদেরকে রাজআত করার অধিকার স্বামীর নেই। কেননা, যাকে রাজআত করার অধিকার স্বামীর উপর রয়েছে তার খরচাদি বহন করার দায়িত্ব তো স্বামীর উপর রয়েছেই। সে গর্ভবতী হোক আর না-ই হোক। অন্যান্য আলেমগণ বলেন যে, এটা ঐ নারীদেরও হুকুমের বর্ণনা যাদেরকে রাজআত করার অধিকার স্বামীদের রয়েছে। কেননা, উপরেও এদের বর্ণনা ছিল। এটাকে পৃথকভাবে বর্ণনা করার কারণ এই যে, সাধারণতঃ গর্ভবতীর ইদ্দত কাল দীর্ঘ হয়ে থাকে। সুতরাং কেউ যেন এটা ধারণা না করে যে, ইদ্দতের সময়কাল পর্যন্ত তো তার স্ত্রীর খরচ বহনের দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত, তার পরে নয়। এজন্যেই পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করে দেয়া হয়েছে যে, রাজয়ী তালাক দেয়ার সময় যদি স্ত্রী গর্ভবতী হয় তবে সন্তান ভূমিষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তার খরচ বহনের দায়িত্ব স্বামীর উপর অর্পিত। এ ব্যাপারেও আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে যে, এই খরচ তার জন্যে গর্ভের মাধ্যমে, না গর্ভের জন্যে? ইমাম শাফিয়ী (রঃ) প্রমুখ হতে দু’টি উক্তিই বর্ণিত আছে এবং এর ভিত্তিতে বহু মাসআলাতেও মতানৈক্য প্রকাশ পেয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন এই তালাকপ্রাপ্ত নারীরা গর্ভ হতে ফারেগ হবে তখন যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে দুধ পান করায় তবে তাদেরকে দুধ পান করাতে দিতে হবে। তবে সন্তানদেরকে দুধ পান করানো বা না করানোর এখতেয়ার তাদের রয়েছে। কিন্তু প্রথম বারের দুধ পান অবশ্য তাদেরকে করাতেই হবে। পরে না পান করাতেও পারে। কেননা, শিশুর জীবন সাধারণতঃ এই দুধের সাথেই জড়িত। অতঃপর সে যদি এর পরেও দুধ পান করাতে থাকে তবে পিতা-মাতার মধ্যে যে পারিশ্রমিক দানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে তা অবশ্যই আদায় করতে হবে। তোমরা পরস্পর যে কাজ করে থাকো তা কল্যাণের সাথে ও নিয়ম মাফিক হওয়া উচিত। এটা নয় যে, ক্ষতি করার চেষ্টা করবে এবং তাকে কষ্ট দেয়ার চেষ্টা করবে। যেমন সূরায়ে বাকারায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মাতাকে তার ছেলের ব্যাপারে কষ্ট দেয়া হবে না এবং পিতাকে তার ছেলের ব্যাপারে কষ্ট দেয়া হবে না।” (২:২৩৩)মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি পরস্পরের মধ্যে মতভেদ হয়, যেমন শিশুর পিতা কম দিতে চায় এবং মাতা তা স্বীকার করতে চায় না, অথবা মাতা বেশী দাবী করে এবং পিতার নিকট তা ভারী বোধ হয়, তারা কোনক্রমেই একমত হতে পারে না, তবে স্বামীর অন্য কোন ধাত্রী রাখার এখতেয়ার রয়েছে। হ্যাঁ, তবে ধাত্রীকে যে পারিশ্রমিক দেয়া হবে সেটা নিতেই যদি মা সম্মতি প্রকাশ করে তবে মায়েরই অগ্রাধিকার থাকবে।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ শিশুর পিতা অথবা অভিভাবক যে রয়েছে তার উচিত যে, সে যেন তার সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুর উপর খরচ করে। বিত্তবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত সে আল্লাহ যা দান করেছেন তা হতে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তদপেক্ষা গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না। তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ উবাইদাহ (রাঃ)-এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে, তিনি মোটা কাপড় পরিধান করে থাকেন এবং হালকা খাবার খেয়ে থাকেন। অতঃপর তিনি তাঁর নিকট এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন এবং প্রেরিত লোকটিকে বলে দেন যে, তিনি ঐ এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা পেয়ে কি করেন তা যেন সে দেখে আসে। যখন তিনি এই এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা প্রাপ্ত হন। তখন মিহিন কাপড় পরতে এবং খুব উত্তম খাদ্য খেতে শুরু করেন। প্রেরিত দূত ফিরে এসে হযরত উমার (রাঃ)-এর সামনে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। ঘটনা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ হযরত আবূ উবাইদাহ (রাঃ)-এর উপর দয়া করুন! তিনি …… (আরবি) আয়াতের উপর আমল করেছেন। হাফিয আবূল কাসিম তিবরানী (রঃ) একটি গারীব হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “একটি লোকের নিকট দশটি দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) ছিল। সে তা হতে একটি দীনার আল্লাহর পথে সাদকা করে। দ্বিতীয় এক ব্যক্তির নিকট দশ উকিয়া (এক ঊকিয়ায় চল্লিশ দিরহাম হয়) ছিল। তা হতে সে এক উকিয়া আল্লাহর পথে খরচ করে। তৃতীয় আর এক ব্যক্তির নিকট একশ’ উকিয়া ছিল। তা হতে সে আল্লাহর নামে দশ উকিয়া খরচ করে। এরা তিন জনই প্রতিদান পাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট সমান। কেননা, প্রত্যেকেই তার মালের এক দশমাংশ আল্লাহর পথে খরচ করেছে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ কষ্টের পর দিবেন স্বস্তি। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অবশ্য কষ্টের পরেই স্বস্তি আছে।” (৯৪:৬)মুসনাদে আহমাদের হাদীসটি এখানে উল্লেখযোগ্য। তাতে রয়েছে যে, হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “পূর্ব যুগে এক স্বামী ও এক স্ত্রী বাস করতো। তারা অত্যন্ত দারিদ্রের মধ্যে কালাতিপাত করতো। তাদের কাছে জীবন ধারণের কিছুই ছিল না। একদা স্বামী সফর হতে ফিরে আসে। সে ক্ষুধার জ্বালায় অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়েছিল। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলোঃ “কোন খাবার আছে কি?" স্ত্রী বললেনঃ “আপনি খুশী হন, আল্লাহ প্রদত্ত খাদ্য আমাদের নিকট এসে পৌঁছেছে।” স্বামী বললোঃ “তাহলে নিয়ে এসো। যা আছে তাই এনে দাও। আমি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত।” স্ত্রী বললোঃ “আরো একটু ধৈর্য ধারণ করুন! আমাদের আল্লাহর রহমতের বহু কিছু আশা রয়েছে। যখন আরো কিছু বিলম্ব হয়ে গেল তখন স্বামী আবার বললোঃ “তোমার কাছে যা কিছু আছে তা নিয়ে আস না কেন? আমি যে ক্ষুধার জ্বালায় অত্যন্ত কষ্ট পাচ্ছি। স্ত্রী বললোঃ “এতো তাড়াতাড়ি করছেন কেন? এখনই আমি চুল্লী হতে হাঁড়ি নামিয়ে আনছি।” কিছুক্ষণ পর স্ত্রী যখন দেখলো যে, স্বামী আবার তাগাদা করতে উদ্যত হচ্ছে তখন সে নিজে নিজে বলতে লাগলোঃ “উঠে তন্দুর হতে হাঁড়ি উঠিয়ে দেখি তো!” উঠে দেখে যে, আল্লাহর অসীম কুদরতে তার ভরসার বিনিময়ে হাঁড়ি বকরীর গোশতে পূর্ণ হয়ে আছে। এবং আরো দেখে যে, ঘরের যাঁতা ঘুরতে রয়েছে এবং আটা বের হতে আছে। সে হাঁড়ি হতে সমস্ত গোশত বের করে নিলো এবং যাতা হতে আটা উঠিয়ে নিলো এবং যাতা ঝেড়ে ফেললো। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “যাঁর হাতে আবূল কাসেম (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) বলেছেনঃ যদি সে যাঁতা না ঝাড়তো বরং শুধু আটা নিয়ে নিতো তবে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ যাঁতা ঘুরতে থাকতো।”অন্য একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, একটি লোক বাড়ীতে প্রবেশ করে দেখে যে, ক্ষুধার জ্বালায় পরিবারস্থ লোকদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। এ দেখে সে জঙ্গলের দিকে চলে যায়। তার স্ত্রী যখন দেখলো যে, তার স্বামী অত্যন্ত বিচলিত অবস্থায় রয়েছে এবং তাদের করুণ দৃশ্য দেখতে না পেরে বাড়ী হতে চলে গেছে, তখন সে তার যাতা ঠিকঠাক করলো এবং চুল্লীতে আগুন ধরিয়ে দিলো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি রিয্‌ক দান করুন!” দু'আ শেষে উঠে দেখে যে, হাঁড়ি গোশতে পরিপূর্ণ রয়েছে এবং যাতা ঘুরতে রয়েছে ও আটা বের হতে আছে। ইতিমধ্যে স্বামী বাড়ীতে পৌঁছে গেল এবং স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলোঃ আমি বাড়ী হতে যাওয়ার পর কিছু পেয়েছো কি?” স্ত্রী উত্তরে বললোঃ “হ্যাঁ, মহান আল্লাহ আমাদেরকে বহু কিছু দান করেছেন। সে গিয়ে যাঁতার পাট উঠিয়ে নিলো। নবী (সঃ)-এর সামনে ঘটনাটি বর্ণিত হলে তিনি বলেনঃ “যদি সে যাতার পাট না উঠাতো তবে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ যাতা ঘুরতে থাকতো।”

আত-তালাক 65:7

৬-৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে হুকুম করছেন যে, যখন তাদের মধ্যে কেউ তার স্ত্রীকে তালাক দিবে তখন যেন তার ইদ্দতকাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে তার বসবাসের জায়গা দেয়। এ জায়গা তার শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী হবে। এমনকি হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, যদি সে খুবই সংকীর্ণ অবস্থার লোক হয় তবে যেন তার ঘরের এক কোণাতেই তাকে স্থান দেয়।মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমরা তাদেরকে সংকটে ফেলার উদ্দেশ্যে উত্যক্ত করো না। তাদেরকে কষ্ট দিয়ে এমন সংকটময় অবস্থায় ফেলে দিয়ো না যে, তারা সহ্য করতে না পেরে বাড়ী ছেড়ে চলে যায়। অথবা তোমাদের হাত হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে তারা তাদের প্রাপ্য মোহর ছেড়ে দেয়। কিংবা তোমরা তাদেরকে এমনভাবে তালাক দিবে না যে, ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার দুই একদিন পূর্বে রাজআত করার ঘোষণা দিবে, এরপর আবার তালাক দিবে এবং ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার নিকটবর্তী সময়ে রাজমাত করে নিবে।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ তালাকপ্রাপ্তা নারী যদি গর্ভবতী হয় তবে তার খাওয়া-খরচের দায়িত্ব তার স্বামীর। অধিকাংশ আলেমের মতে এই হুকুম ঐ মহিলাদের জন্যে খাস করে বর্ণনা করা হচ্ছে যাদেরকে শেষের তালাক দিয়ে দেয়া হয়েছে। যাদেরকে রাজআত করার অধিকার স্বামীর নেই। কেননা, যাকে রাজআত করার অধিকার স্বামীর উপর রয়েছে তার খরচাদি বহন করার দায়িত্ব তো স্বামীর উপর রয়েছেই। সে গর্ভবতী হোক আর না-ই হোক। অন্যান্য আলেমগণ বলেন যে, এটা ঐ নারীদেরও হুকুমের বর্ণনা যাদেরকে রাজআত করার অধিকার স্বামীদের রয়েছে। কেননা, উপরেও এদের বর্ণনা ছিল। এটাকে পৃথকভাবে বর্ণনা করার কারণ এই যে, সাধারণতঃ গর্ভবতীর ইদ্দত কাল দীর্ঘ হয়ে থাকে। সুতরাং কেউ যেন এটা ধারণা না করে যে, ইদ্দতের সময়কাল পর্যন্ত তো তার স্ত্রীর খরচ বহনের দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত, তার পরে নয়। এজন্যেই পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করে দেয়া হয়েছে যে, রাজয়ী তালাক দেয়ার সময় যদি স্ত্রী গর্ভবতী হয় তবে সন্তান ভূমিষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তার খরচ বহনের দায়িত্ব স্বামীর উপর অর্পিত। এ ব্যাপারেও আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে যে, এই খরচ তার জন্যে গর্ভের মাধ্যমে, না গর্ভের জন্যে? ইমাম শাফিয়ী (রঃ) প্রমুখ হতে দু’টি উক্তিই বর্ণিত আছে এবং এর ভিত্তিতে বহু মাসআলাতেও মতানৈক্য প্রকাশ পেয়েছে। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যখন এই তালাকপ্রাপ্ত নারীরা গর্ভ হতে ফারেগ হবে তখন যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে দুধ পান করায় তবে তাদেরকে দুধ পান করাতে দিতে হবে। তবে সন্তানদেরকে দুধ পান করানো বা না করানোর এখতেয়ার তাদের রয়েছে। কিন্তু প্রথম বারের দুধ পান অবশ্য তাদেরকে করাতেই হবে। পরে না পান করাতেও পারে। কেননা, শিশুর জীবন সাধারণতঃ এই দুধের সাথেই জড়িত। অতঃপর সে যদি এর পরেও দুধ পান করাতে থাকে তবে পিতা-মাতার মধ্যে যে পারিশ্রমিক দানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে তা অবশ্যই আদায় করতে হবে। তোমরা পরস্পর যে কাজ করে থাকো তা কল্যাণের সাথে ও নিয়ম মাফিক হওয়া উচিত। এটা নয় যে, ক্ষতি করার চেষ্টা করবে এবং তাকে কষ্ট দেয়ার চেষ্টা করবে। যেমন সূরায়ে বাকারায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মাতাকে তার ছেলের ব্যাপারে কষ্ট দেয়া হবে না এবং পিতাকে তার ছেলের ব্যাপারে কষ্ট দেয়া হবে না।” (২:২৩৩)মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি পরস্পরের মধ্যে মতভেদ হয়, যেমন শিশুর পিতা কম দিতে চায় এবং মাতা তা স্বীকার করতে চায় না, অথবা মাতা বেশী দাবী করে এবং পিতার নিকট তা ভারী বোধ হয়, তারা কোনক্রমেই একমত হতে পারে না, তবে স্বামীর অন্য কোন ধাত্রী রাখার এখতেয়ার রয়েছে। হ্যাঁ, তবে ধাত্রীকে যে পারিশ্রমিক দেয়া হবে সেটা নিতেই যদি মা সম্মতি প্রকাশ করে তবে মায়েরই অগ্রাধিকার থাকবে।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ শিশুর পিতা অথবা অভিভাবক যে রয়েছে তার উচিত যে, সে যেন তার সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুর উপর খরচ করে। বিত্তবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত সে আল্লাহ যা দান করেছেন তা হতে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তদপেক্ষা গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না। তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) হযরত আবূ উবাইদাহ (রাঃ)-এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে, তিনি মোটা কাপড় পরিধান করে থাকেন এবং হালকা খাবার খেয়ে থাকেন। অতঃপর তিনি তাঁর নিকট এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন এবং প্রেরিত লোকটিকে বলে দেন যে, তিনি ঐ এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা পেয়ে কি করেন তা যেন সে দেখে আসে। যখন তিনি এই এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা প্রাপ্ত হন। তখন মিহিন কাপড় পরতে এবং খুব উত্তম খাদ্য খেতে শুরু করেন। প্রেরিত দূত ফিরে এসে হযরত উমার (রাঃ)-এর সামনে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। ঘটনা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ হযরত আবূ উবাইদাহ (রাঃ)-এর উপর দয়া করুন! তিনি …… (আরবি) আয়াতের উপর আমল করেছেন। হাফিয আবূল কাসিম তিবরানী (রঃ) একটি গারীব হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “একটি লোকের নিকট দশটি দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) ছিল। সে তা হতে একটি দীনার আল্লাহর পথে সাদকা করে। দ্বিতীয় এক ব্যক্তির নিকট দশ উকিয়া (এক ঊকিয়ায় চল্লিশ দিরহাম হয়) ছিল। তা হতে সে এক উকিয়া আল্লাহর পথে খরচ করে। তৃতীয় আর এক ব্যক্তির নিকট একশ’ উকিয়া ছিল। তা হতে সে আল্লাহর নামে দশ উকিয়া খরচ করে। এরা তিন জনই প্রতিদান পাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট সমান। কেননা, প্রত্যেকেই তার মালের এক দশমাংশ আল্লাহর পথে খরচ করেছে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ কষ্টের পর দিবেন স্বস্তি। যেমন অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অবশ্য কষ্টের পরেই স্বস্তি আছে।” (৯৪:৬)মুসনাদে আহমাদের হাদীসটি এখানে উল্লেখযোগ্য। তাতে রয়েছে যে, হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “পূর্ব যুগে এক স্বামী ও এক স্ত্রী বাস করতো। তারা অত্যন্ত দারিদ্রের মধ্যে কালাতিপাত করতো। তাদের কাছে জীবন ধারণের কিছুই ছিল না। একদা স্বামী সফর হতে ফিরে আসে। সে ক্ষুধার জ্বালায় অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়েছিল। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলোঃ “কোন খাবার আছে কি?" স্ত্রী বললেনঃ “আপনি খুশী হন, আল্লাহ প্রদত্ত খাদ্য আমাদের নিকট এসে পৌঁছেছে।” স্বামী বললোঃ “তাহলে নিয়ে এসো। যা আছে তাই এনে দাও। আমি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত।” স্ত্রী বললোঃ “আরো একটু ধৈর্য ধারণ করুন! আমাদের আল্লাহর রহমতের বহু কিছু আশা রয়েছে। যখন আরো কিছু বিলম্ব হয়ে গেল তখন স্বামী আবার বললোঃ “তোমার কাছে যা কিছু আছে তা নিয়ে আস না কেন? আমি যে ক্ষুধার জ্বালায় অত্যন্ত কষ্ট পাচ্ছি। স্ত্রী বললোঃ “এতো তাড়াতাড়ি করছেন কেন? এখনই আমি চুল্লী হতে হাঁড়ি নামিয়ে আনছি।” কিছুক্ষণ পর স্ত্রী যখন দেখলো যে, স্বামী আবার তাগাদা করতে উদ্যত হচ্ছে তখন সে নিজে নিজে বলতে লাগলোঃ “উঠে তন্দুর হতে হাঁড়ি উঠিয়ে দেখি তো!” উঠে দেখে যে, আল্লাহর অসীম কুদরতে তার ভরসার বিনিময়ে হাঁড়ি বকরীর গোশতে পূর্ণ হয়ে আছে। এবং আরো দেখে যে, ঘরের যাঁতা ঘুরতে রয়েছে এবং আটা বের হতে আছে। সে হাঁড়ি হতে সমস্ত গোশত বের করে নিলো এবং যাতা হতে আটা উঠিয়ে নিলো এবং যাতা ঝেড়ে ফেললো। হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “যাঁর হাতে আবূল কাসেম (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) বলেছেনঃ যদি সে যাঁতা না ঝাড়তো বরং শুধু আটা নিয়ে নিতো তবে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ যাঁতা ঘুরতে থাকতো।”অন্য একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, একটি লোক বাড়ীতে প্রবেশ করে দেখে যে, ক্ষুধার জ্বালায় পরিবারস্থ লোকদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। এ দেখে সে জঙ্গলের দিকে চলে যায়। তার স্ত্রী যখন দেখলো যে, তার স্বামী অত্যন্ত বিচলিত অবস্থায় রয়েছে এবং তাদের করুণ দৃশ্য দেখতে না পেরে বাড়ী হতে চলে গেছে, তখন সে তার যাতা ঠিকঠাক করলো এবং চুল্লীতে আগুন ধরিয়ে দিলো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করলোঃ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি রিয্‌ক দান করুন!” দু'আ শেষে উঠে দেখে যে, হাঁড়ি গোশতে পরিপূর্ণ রয়েছে এবং যাতা ঘুরতে রয়েছে ও আটা বের হতে আছে। ইতিমধ্যে স্বামী বাড়ীতে পৌঁছে গেল এবং স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলোঃ আমি বাড়ী হতে যাওয়ার পর কিছু পেয়েছো কি?” স্ত্রী উত্তরে বললোঃ “হ্যাঁ, মহান আল্লাহ আমাদেরকে বহু কিছু দান করেছেন। সে গিয়ে যাঁতার পাট উঠিয়ে নিলো। নবী (সঃ)-এর সামনে ঘটনাটি বর্ণিত হলে তিনি বলেনঃ “যদি সে যাতার পাট না উঠাতো তবে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ যাতা ঘুরতে থাকতো।”

আত-তালাক 65:8

৮-১১ নং আয়াতের তাফসীর যারা আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করে, তাঁর রাসূল (সাঃ)-কে না মানে এবং তাঁর শরীয়তের উপর না চলে তাদেরকে ধমকের সুরে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ দেখো, পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যেও যারা তোমাদের নীতির উপর চলতো, অহংকার ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতো, আল্লাহর হুকুম ও তাঁর রাসূলদের আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নিতো, তাদেরকে কঠিনভাবে হিসাব দিতে হয়েছিল এবং কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছিল। ক্ষতিই ছিল তাদের কৃতকর্মের পরিণাম। ঐ সময় তারা লজ্জিত হয়েছিল, কিন্তু ঐ সময়ের লজ্জা ও অনুশোচনা তাদের কোন উপকারে আসেনি। দুনিয়ার এই শাস্তিই যদি শেষ শাস্তি হতো তাহলে তো একটা কথা ছিল। কিন্তু না, তা নয়! বরং পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠিন শাস্তি। সুতরাং হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের পরিণাম হতে শিক্ষা গ্রহণ কর। তোমরা তাদের মত হয়ো না।মহান আল্লাহ বলেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন যিকর। এখানে যিক্‌র দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী।” (১৫:৯) কেউ কেউ বলেন যে, এখানে ‘যিক্‌র’ দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) উদ্দেশ্য। যেহেতু সাথে সাথেই বলা হয়েছেঃ (আরবি) তাহলে এটা হবে (আরবি) রাসূলুল্লাহই (সঃ) কুরআনকে জনগণের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, এই সম্পর্কের কারণে তাঁকেই ‘যিক্‌র’ শব্দ দ্বারা স্মরণ করা হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই ভাবার্থকে সঠিক বলেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি মানুষের কাছে আল্লাহর সুস্পষ্ট আয়াত আবৃত্তি করে থাকেন, যারা মুমিন ও সকর্মপরায়ণ তাদেরকে অজ্ঞতার অন্ধকার হতে জ্ঞানের আলোকের দিকে আনার জন্যে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “এই কিতাব আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি, যেন তুমি জনগণকে অন্ধকার হতে আলোকের দিকে নিয়ে আস।” (১৪:১) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোকের দিকে নিয়ে আসেন।” (২৪:২৫৭) অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নাযিলকৃত ওহীকে নূর বা জ্যোতি বলেছেন। কেননা, এর দ্বারা হিদায়াত ও সরল সঠিক পথ লাভ করা যায়। আর মহান আল্লাহ এর নাম রূহও রেখেছেন। কেননা, এর দ্বারা অন্তর জীবন লাভ করে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি তোমার প্রতি আমার হুকুমের রূহের ওহী করেছি, তুমি জানতে না যে, কিতাব কি এবং ঈমান কি? কিন্তু আমি ওটাকে দূর করে দিয়েছি, যার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করে থাকি। নিশ্চয়ই তুমি সরল সঠিক পথের দিশারী।” (৪২:৫২)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যে কেউ আল্লাহে বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে, তিনি তাকে দাখিল করবেন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাকে উত্তম জীবনোপকরণ দিবেন। এর তাফসীর ইতিপূর্বে কয়েকবার করা হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।

আত-তালাক 65:9

৮-১১ নং আয়াতের তাফসীর যারা আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করে, তাঁর রাসূল (সাঃ)-কে না মানে এবং তাঁর শরীয়তের উপর না চলে তাদেরকে ধমকের সুরে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ দেখো, পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যেও যারা তোমাদের নীতির উপর চলতো, অহংকার ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতো, আল্লাহর হুকুম ও তাঁর রাসূলদের আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নিতো, তাদেরকে কঠিনভাবে হিসাব দিতে হয়েছিল এবং কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছিল। ক্ষতিই ছিল তাদের কৃতকর্মের পরিণাম। ঐ সময় তারা লজ্জিত হয়েছিল, কিন্তু ঐ সময়ের লজ্জা ও অনুশোচনা তাদের কোন উপকারে আসেনি। দুনিয়ার এই শাস্তিই যদি শেষ শাস্তি হতো তাহলে তো একটা কথা ছিল। কিন্তু না, তা নয়! বরং পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠিন শাস্তি। সুতরাং হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের পরিণাম হতে শিক্ষা গ্রহণ কর। তোমরা তাদের মত হয়ো না।মহান আল্লাহ বলেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন যিকর। এখানে যিক্‌র দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী।” (১৫:৯) কেউ কেউ বলেন যে, এখানে ‘যিক্‌র’ দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) উদ্দেশ্য। যেহেতু সাথে সাথেই বলা হয়েছেঃ (আরবি) তাহলে এটা হবে (আরবি) রাসূলুল্লাহই (সঃ) কুরআনকে জনগণের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, এই সম্পর্কের কারণে তাঁকেই ‘যিক্‌র’ শব্দ দ্বারা স্মরণ করা হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই ভাবার্থকে সঠিক বলেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি মানুষের কাছে আল্লাহর সুস্পষ্ট আয়াত আবৃত্তি করে থাকেন, যারা মুমিন ও সকর্মপরায়ণ তাদেরকে অজ্ঞতার অন্ধকার হতে জ্ঞানের আলোকের দিকে আনার জন্যে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “এই কিতাব আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি, যেন তুমি জনগণকে অন্ধকার হতে আলোকের দিকে নিয়ে আস।” (১৪:১) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোকের দিকে নিয়ে আসেন।” (২৪:২৫৭) অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নাযিলকৃত ওহীকে নূর বা জ্যোতি বলেছেন। কেননা, এর দ্বারা হিদায়াত ও সরল সঠিক পথ লাভ করা যায়। আর মহান আল্লাহ এর নাম রূহও রেখেছেন। কেননা, এর দ্বারা অন্তর জীবন লাভ করে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি তোমার প্রতি আমার হুকুমের রূহের ওহী করেছি, তুমি জানতে না যে, কিতাব কি এবং ঈমান কি? কিন্তু আমি ওটাকে দূর করে দিয়েছি, যার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করে থাকি। নিশ্চয়ই তুমি সরল সঠিক পথের দিশারী।” (৪২:৫২)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যে কেউ আল্লাহে বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে, তিনি তাকে দাখিল করবেন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাকে উত্তম জীবনোপকরণ দিবেন। এর তাফসীর ইতিপূর্বে কয়েকবার করা হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।

আত-তালাক 65:10

৮-১১ নং আয়াতের তাফসীর যারা আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করে, তাঁর রাসূল (সাঃ)-কে না মানে এবং তাঁর শরীয়তের উপর না চলে তাদেরকে ধমকের সুরে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ দেখো, পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যেও যারা তোমাদের নীতির উপর চলতো, অহংকার ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতো, আল্লাহর হুকুম ও তাঁর রাসূলদের আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নিতো, তাদেরকে কঠিনভাবে হিসাব দিতে হয়েছিল এবং কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছিল। ক্ষতিই ছিল তাদের কৃতকর্মের পরিণাম। ঐ সময় তারা লজ্জিত হয়েছিল, কিন্তু ঐ সময়ের লজ্জা ও অনুশোচনা তাদের কোন উপকারে আসেনি। দুনিয়ার এই শাস্তিই যদি শেষ শাস্তি হতো তাহলে তো একটা কথা ছিল। কিন্তু না, তা নয়! বরং পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠিন শাস্তি। সুতরাং হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের পরিণাম হতে শিক্ষা গ্রহণ কর। তোমরা তাদের মত হয়ো না।মহান আল্লাহ বলেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন যিকর। এখানে যিক্‌র দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী।” (১৫:৯) কেউ কেউ বলেন যে, এখানে ‘যিক্‌র’ দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) উদ্দেশ্য। যেহেতু সাথে সাথেই বলা হয়েছেঃ (আরবি) তাহলে এটা হবে (আরবি) রাসূলুল্লাহই (সঃ) কুরআনকে জনগণের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, এই সম্পর্কের কারণে তাঁকেই ‘যিক্‌র’ শব্দ দ্বারা স্মরণ করা হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই ভাবার্থকে সঠিক বলেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি মানুষের কাছে আল্লাহর সুস্পষ্ট আয়াত আবৃত্তি করে থাকেন, যারা মুমিন ও সকর্মপরায়ণ তাদেরকে অজ্ঞতার অন্ধকার হতে জ্ঞানের আলোকের দিকে আনার জন্যে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “এই কিতাব আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি, যেন তুমি জনগণকে অন্ধকার হতে আলোকের দিকে নিয়ে আস।” (১৪:১) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোকের দিকে নিয়ে আসেন।” (২৪:২৫৭) অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নাযিলকৃত ওহীকে নূর বা জ্যোতি বলেছেন। কেননা, এর দ্বারা হিদায়াত ও সরল সঠিক পথ লাভ করা যায়। আর মহান আল্লাহ এর নাম রূহও রেখেছেন। কেননা, এর দ্বারা অন্তর জীবন লাভ করে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি তোমার প্রতি আমার হুকুমের রূহের ওহী করেছি, তুমি জানতে না যে, কিতাব কি এবং ঈমান কি? কিন্তু আমি ওটাকে দূর করে দিয়েছি, যার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করে থাকি। নিশ্চয়ই তুমি সরল সঠিক পথের দিশারী।” (৪২:৫২)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যে কেউ আল্লাহে বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে, তিনি তাকে দাখিল করবেন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাকে উত্তম জীবনোপকরণ দিবেন। এর তাফসীর ইতিপূর্বে কয়েকবার করা হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।

আত-তালাক 65:11

৮-১১ নং আয়াতের তাফসীর যারা আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করে, তাঁর রাসূল (সাঃ)-কে না মানে এবং তাঁর শরীয়তের উপর না চলে তাদেরকে ধমকের সুরে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ দেখো, পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যেও যারা তোমাদের নীতির উপর চলতো, অহংকার ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতো, আল্লাহর হুকুম ও তাঁর রাসূলদের আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নিতো, তাদেরকে কঠিনভাবে হিসাব দিতে হয়েছিল এবং কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছিল। ক্ষতিই ছিল তাদের কৃতকর্মের পরিণাম। ঐ সময় তারা লজ্জিত হয়েছিল, কিন্তু ঐ সময়ের লজ্জা ও অনুশোচনা তাদের কোন উপকারে আসেনি। দুনিয়ার এই শাস্তিই যদি শেষ শাস্তি হতো তাহলে তো একটা কথা ছিল। কিন্তু না, তা নয়! বরং পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠিন শাস্তি। সুতরাং হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের পরিণাম হতে শিক্ষা গ্রহণ কর। তোমরা তাদের মত হয়ো না।মহান আল্লাহ বলেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন যিকর। এখানে যিক্‌র দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর হিফাযতকারী।” (১৫:৯) কেউ কেউ বলেন যে, এখানে ‘যিক্‌র’ দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) উদ্দেশ্য। যেহেতু সাথে সাথেই বলা হয়েছেঃ (আরবি) তাহলে এটা হবে (আরবি) রাসূলুল্লাহই (সঃ) কুরআনকে জনগণের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, এই সম্পর্কের কারণে তাঁকেই ‘যিক্‌র’ শব্দ দ্বারা স্মরণ করা হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই ভাবার্থকে সঠিক বলেছেন।এরপর আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি মানুষের কাছে আল্লাহর সুস্পষ্ট আয়াত আবৃত্তি করে থাকেন, যারা মুমিন ও সকর্মপরায়ণ তাদেরকে অজ্ঞতার অন্ধকার হতে জ্ঞানের আলোকের দিকে আনার জন্যে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “এই কিতাব আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি, যেন তুমি জনগণকে অন্ধকার হতে আলোকের দিকে নিয়ে আস।” (১৪:১) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোকের দিকে নিয়ে আসেন।” (২৪:২৫৭) অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নাযিলকৃত ওহীকে নূর বা জ্যোতি বলেছেন। কেননা, এর দ্বারা হিদায়াত ও সরল সঠিক পথ লাভ করা যায়। আর মহান আল্লাহ এর নাম রূহও রেখেছেন। কেননা, এর দ্বারা অন্তর জীবন লাভ করে থাকে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি তোমার প্রতি আমার হুকুমের রূহের ওহী করেছি, তুমি জানতে না যে, কিতাব কি এবং ঈমান কি? কিন্তু আমি ওটাকে দূর করে দিয়েছি, যার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করে থাকি। নিশ্চয়ই তুমি সরল সঠিক পথের দিশারী।” (৪২:৫২)এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যে কেউ আল্লাহে বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে, তিনি তাকে দাখিল করবেন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাকে উত্তম জীবনোপকরণ দিবেন। এর তাফসীর ইতিপূর্বে কয়েকবার করা হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।

আত-তালাক 65:12

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতা ও বিরাট সাম্রাজ্যের বর্ণনা দিচ্ছেন, যেন মাখলূক তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখে তাঁর ফরমানকে মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখে এবং তার উপর আমল করতঃ তাঁকে খুশী করে। তাই তিনি বলেনঃ আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সপ্ত আকাশ যেমন হযরত নূহ (আঃ) তার কওমকে বলেছিলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা কি লক্ষ্য করনি? আল্লাহ কিভাবে সৃষ্টি করেছেন সপ্তস্তরে বিন্যস্ত আকাশমণ্ডলী?” (৭১:১৫) মহান আল্লাহ অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “সপ্ত আকাশ ও যমীন এবং এগুলোর যতকিছু রয়েছে সবাই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে।” (১৭:৪৪)মহান আল্লাহর উক্তিঃ ‘ওগুলোরই অনুরূপ যমীনও (অর্থাৎ যমীনও সাতটি)। সহীহ্ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমের সহীহ্ হাদীসে রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি যুলুম করে কারো কনিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত ভূমি দখল করে নিবে, তাকে সপ্ত আকাশের গলাবদ্ধ পরানো হবে।” সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, তাকে সপ্ত যমীন পর্যন্ত ধ্বসিয়ে দেয়া হবে। আমি এর সমস্ত সনদ ও শব্দ বিদায়াহ্ ওয়ান্ নিহায়াহ্ এর শুরুতে যমীন। সৃষ্টির আলোচনায় বর্ণনা করে দিয়েছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে।যেসব লোক বলেছেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সাতটি অঞ্চল বা ভূ-খণ্ড, তাঁরা অযথা এ কথা বলেছেন এবং বিনা দলীলে কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট বিরোধিতা করেছেন। সূরায়ে হাদীদে (আরবি)-এই আয়াতের তাফসীরে সপ্ত আকাশ ও যমীনের এবং ওগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্বের এবং ওগুলোর পুরুত্ব, যা পাঁচশ বছরের পথ, পূর্ণ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনও এ কথাই বলেছেন। অন্য একটি হাদীসেও সপ্ত আকাশ এবং যা কিছু ওগুলোর মধ্যে রয়েছে এবং সপ্ত যমীন ও যা কিছু ওগুলোর মধ্যে রয়েছে, কুরসীর তুলনায় এমনই যেমন কোন এক বিরাট ও প্রশস্ত মাঠে একটি আংটি পড়ে থাকে।তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “যদি আমি এ আয়াতের তাফসীর তোমাদের সামনে বর্ণনা করি তবে তোমরা তা স্বীকার করবে না এবং তোমাদের স্বীকার না করা হবে তোমাদের ওটাকে মিথ্যা মনে করা।” অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, কোন একজন লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এ আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “আমি কিরূপে বিশ্বাস করতে পারি যে, আমি যা কিছু তোমাকে বলবো তা তুমি অস্বীকার করবে না?” আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, প্রত্যেক যমীনে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মত এবং এই যমীনের মাখলূকের মত মাখলূক রয়েছে। হযরত ইবনে মুসান্না (রঃ) বর্ণিত রিওয়াইয়াতে এসেছে যে, প্রত্যেক আসমানে (হযরত ইবরাহীম আঃ -এর মত) হযরত ইবরাহীম (আঃ) রয়েছেন।ইমাম বায়হাকী (রঃ)-এর ‘কিতাবুল আসমা ওয়াসসিফাত' নামক গ্রন্থে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “সপ্ত যমীনের প্রত্যেকটিতে তোমাদের নবীর মত নবী রয়েছেন, আদম (আঃ)-এর মত আদম রয়েছেন, নূহ (আঃ)-এর মত নূহ রয়েছেন, ইবরাহীম (আঃ)-এর মত ইবরাহীম রয়েছেন এবং ঈসা (আঃ)-এর মত ঈসা রয়েছেন।" অতঃপর ইমাম বায়হাকী (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর আর একটি রিওয়াইয়াত আনয়ন করে বলেন যে, এর ইসনাদ বিশুদ্ধ, কিন্তু এটা অতি বিরল। এর একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন আবূয যুহা। ইমাম বায়হাকী (রঃ)-এর জানা মতে ঐ বর্ণনাকারীর অনুসরণ কেউই করেন না। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। একটি মুরসাল এবং অত্যন্ত মুনকার হাদীস ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) বর্ণনা করেছেন। তাতে রয়েছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদের সমাবেশে আগমন করেন। তিনি দেখেন যে, তারা কোন এক বিষয়ের চিন্তায় চুপচাপ বসে রয়েছেন। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “ব্যাপার কি?" উত্তরে তারা বলেনঃ “আমরা আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করছি। তিনি তখন বলেনঃ “বেশ বেশ! খুব ভাল কথা। আল্লাহর মাখলূক সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা করবে। কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে চিন্তা করবে না। জেনে রেখো যে, এই পশ্চিম দিকে একটি সাদা যমীন রয়েছে। ওর শুভ্রতা ওর নূর বা জ্যোতি অথবা বলেনঃ ওর নূর বা জ্যোতি হলো ওর শুভ্রতা। সূর্যের রাস্তা হলো চল্লিশ দিনের। সেখানে আল্লাহর এক মাখলূক রয়েছে যারা চোখের পলক ফেলার সমান সময়টুকুতেও কখনো আল্লাহর নাফরমানী করেনি।” তখন সাহাবীগণ প্রশ্ন করেনঃ “তাহলে শয়তান তাদের হতে কোথায় রয়েছে?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “শয়তানকে যে সৃষ্টি করা হয়েছে কি না এটাও তাদের জানা নেই। তারা আবার জিজ্ঞেস করেনঃ “তারাও কি মানুষ?” জবাবে তিনি বলেনঃ “না। হযরত আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি সম্বন্ধেও তাদের কিছুই জানা নেই।”

আত-তাহরীম 66:1

১-৫ নং আয়াতের তাফসীর এই সূরাটির প্রাথমিক আয়াতগুলোর শানে নুযূলের ব্যাপারে সুফাসসিরদের উক্তি নিম্নরূপঃ কেউ কেউ বলেন যে, এটা হযরত মারিয়াহ্ (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিজের উপর হারাম করে নিয়েছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে এই রিওয়াইয়াতটি বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-এর কথার পরিপ্রেক্ষিতে এটা ঘটেছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এক দাসী সম্পর্কে এ কথা বলেছিলেন। ফলে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর কোন এক স্ত্রীর ঘরে উম্মে ইবরাহীম (রাঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলেছিলেন। তখন তাঁর ঐ স্ত্রী তাঁকে বলেনঃ “তোমার ঘরে ও আমার বিছানায় এ কাজ কারবার?” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাকে আমার উপর হারাম করে নিলাম।” তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হালাল কিভাবে আপনার উপর হারাম হয়ে যাবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “আমি শপথ করছি যে, এখন হতে তার সাথে কোন প্রকারের কথাবার্তা বলবো না।” ঐ সময় এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত যায়েদ (রঃ) বলেনঃ এর দ্বারা জানা গেল যে, তুমি আমার উপর হারাম’ এ কথা কেউ বললে তা বাজে বলে প্রমাণিত হবে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছিলেনঃ “তুমি আমার উপর হারাম। আল্লাহর কসম! আমি তোমার সাহচর্যে থাকবো না।”হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন যে, হারাম করার ব্যাপারে তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা হয় এবং তাঁকে তাঁর কসমের কাফফারা আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়। তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ দু’জন স্ত্রী কে ছিলেন?” উত্তরে হযরত উমার বলেনঃ “তারা হলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। উম্মে ইবরাহীম কিবতিয়্যাহ (রাঃ)-কে কেন্দ্র করেই ঘটনাটির সূত্রপাত হয়। হযরত হাফসা (রাঃ)-এর ঘরে তাঁর পালার দিনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত মারিয়াহ্ কিবতিয়্যাহ্ (রাঃ)-এর সাথে মিলিত হন। এতে হযরত হাফসা (রাঃ) দুঃখিতা হন যে, তাঁর পালার দিনে তাঁরই ঘরে ও তাঁরই বিছানায় তিনি মারিয়াহ্ (রাঃ)-এর সাথে মিলিত হলেন! রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বলে ফেলেনঃ “আমি তাকে আমার উপর হারাম করে নিলাম। তুমি এই ঘটনা কারো কাছে বর্ণনা করো না।” এতদসত্ত্বেও হযরত হাফসা (রাঃ) ঘটনাটি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সামনে প্রকাশ করে দেন। আল্লাহ্ তা'আলা এই খবর স্বীয় নবী (সঃ)-কে জানিয়ে দেন এবং এই আয়াতগুলো নাযিল করেন। নবী (সঃ) কাফফারা আদায় করে স্বীয় কসম ভেঙ্গে দেন এবং ঐ দাসীর সঙ্গে মিলিত হন। এই ঘটনাটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই ফতওয়া দেন যে, কেউ যদি বলেঃ “আমি অমুক জিনিস আমার উপর হারাম করে নিলাম” তবে তার উচিত কসম ভেঙ্গে দিয়ে কাফফারা আদায় করা। একটি লোক তাঁকে এই মাসআলা জিজ্ঞেস করে যে, সে তার স্ত্রীকে নিজের উপর হারাম করে নিয়েছে।তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তোমার স্ত্রী তোমার উপর হারাম নয় (তুমি কাফফারা আদায় করে কসম ভেঙ্গে দাও)।” সবচেয়ে কঠিন কাফফারা তো হলো আল্লাহ্‌ পথে গোলাম আযাদ করা। ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং বহু ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদের ফতওয়া এই যে, যে ব্যক্তি তার স্ত্রী, দাসী অথবা খাওয়া পরার কোন জিনিসকে নিজের উপর হারাম করে নেয়, তার উপর কাফফারা ওয়াজিব হয়ে যায়। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, শুধু স্ত্রী বা দাসীকে নিজের উপর হারাম করে নিলে কাফফারা ওয়াজিব হয়, অন্য কোন জিনিস নিজের উপর হারাম করে নিলে কাফফারা ওয়াজিব হয় না। যদি হারাম করা দ্বারা তালাকের নিয়ত করে তবে অবশ্যই তালাক হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে দাসীকে হারাম করার কথা দ্বারা যদি আযাদ করে দেয়ার নিয়ত করে তবে ঐ দাসী অবশ্যই আযাদ হয়ে যাবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত ঐ নারীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যিনি স্বীয় নফসকে নবী (সঃ)-এর নিকট হিবা বা দান করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এটা গারীব উক্তি। সম্পূর্ণ সঠিক কথা এই যে, এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিজের উপর মধুকে হারাম করে নেয়া।সহীহ্ বুখারীতে এই আয়াতের ক্ষেত্রে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত যায়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ)-এর ঘরে মধু পান করতেন এবং এই কারণে তিনি তার ঘরে কিছুক্ষণ বিলম্ব করতেন। এই জন্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ) পরস্পর পরামর্শ করেন যে, তাঁদের মধ্যে যাঁরই কাছে নবী (সঃ) আসবেন তিনি যেন তাকে বলেনঃ “আপনার মুখ হতে মাগাফীরের (গেঁদ বা আঠা জাতীয় জিনিস যাতে দুর্গন্ধ রয়েছে) গন্ধ আসছে, সম্ভবতঃ আপনি মাগাফীর খেয়েছেন!” সুতরাং তারা এ কথাই বলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আমি যায়নাব (রাঃ)-এর ঘরে মধু পান করেছি। এখন আমি শপথ করছি যে, আর কখনো আমি মধু পান করবো না। সুতরাং তোমরা এ কথা কাউকেও বলবে না।” ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটিকে কিতাবুল ঈমান ওয়ান নুযূর-এর মধ্যেও কিছু বৃদ্ধি সহকারে আনয়ন করেছেন। তাতে রয়েছে যে, এখানে দু'জন স্ত্রী দ্বারা হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। আর চুপে-চুপে কথা বলা দ্বারা বুঝানো হয়েছে ‘আমি মধু পান করেছি' এই উক্তিটি। তিনি কিতাবুত তালাকের মধ্যে এ হাদীসটি আনয়ন করে বলেন যে, মাগাফীর হলো গঁদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত একটি জিনিস যা ঘাসে জন্মে থাকে এবং তাতে কিছুটা মিষ্টতা রয়েছে।কিতাবুত তালাকে এ হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এই শব্দে বা ভাষায় বর্ণিত আছেঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মিষ্টি ও মধু খুব ভালবাসতেন। আসরের নামাযের পর তিনি তাঁর স্ত্রীদের নিকট যেতেন এবং কাউকেও নিকটে করে নিতেন। একদা তিনি হযরত হাফসা (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং অন্যান্য দিন তাঁর কাছে যতক্ষণ অবস্থান করতেন, সেই দিন তদপেক্ষা বেশীক্ষণ অবস্থান করেন। এতে আমার মনে নিজের মর্যাদাবোধ জেগে উঠলো। তত্ত্ব নিয়ে জানলাম যে, তাঁর কওমের একটি স্ত্রীলোক এক মশক মধু তার কাছে উপঢৌকন স্বরূপ পাঠিয়েছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে ঐ মধুর শরবত পান করিয়েছেন। আর এই কারণেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর ঘরে এতোটা বিলম্ব করেছেন। আমি মনে মনে বললাম যে, ঠিক আছে, কৌশল করে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা হতে ফিরিয়ে দিব। সুতরাং আমি হযরত সাওদাহ্ বিনতু যামআহ্ (রাঃ)-কে বললামঃ তোমার ঘরে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসবেন এবং তোমার নিকটবর্তী হবেন তখন তুমি তাকে বলবেঃ “আজ কি আপনি মাগাফীর খেয়েছেন?” তিনি জবাবে বলবেনঃ “না।” তখন তুমি বলবেঃ তাহলে এই গন্ধ কিসের?” তিনি। তখন বলবেনঃ “হাফসা (রাঃ) মধু পান করিয়েছেন।” তুমি তখন বলবেঃ “সম্ভবতঃ মৌমাছি ‘আরফাত’ নামক কণ্ঠকযুক্ত গাছ হতে মধু আহরণ করেছে।” আমার কাছে যখন আসবেন তখন আমিও তাই বলবো। হে সফিয়া (রাঃ)! তোমার কাছে যখন আসবেন তখন তুমিও তাই বলবে।” হযরত সাওদাহ (রাঃ) বলেনঃ “যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার ঘরে আসলেন, তখন তিনি দরজার উপরই ছিলেন, তখন আমি ইচ্ছা করলাম যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) আমাকে যা বলতে বলেছেন তাই বলে দিই, কেননা, আমি তাকে খুবই ভয় করতাম। কিন্তু ঐ সময় আমি নীরব থাকলাম। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার কাছে আসলেন তখন আমি ঐ কথাই বলে দিলাম। তারপর তিনি হযরত সফিয়া (রাঃ)-এর নিকট গেলে তিনিও ঐ কথাই বলেন। এরপর হযরত হাফসা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে মধু পান করাতে চাইলে তিনি বলেনঃ “আমার এর প্রয়োজন নেই।” হযরত সাওদা (রাঃ) তখন বলতে লাগলেনঃ “আফসোস! আমরা এটাকে হারাম করিয়ে দিলাম!” আমি (আয়েশা রাঃ) বললামঃ চুপ থাকো। সহীহ মুসলিমে এটুকু বেশী রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুর্গন্ধকে খুবই ঘৃণা করতেন। এজন্যেই ঐ স্ত্রীগণ বলেছিলেনঃ “আপনি মাগাফীর খেয়েছেন কি?” কেননা, মাগাফীরেও কিছুটা দুর্গন্ধ রয়েছে। যখন তিনি উত্তর দিলেন যে, না, তিনি মাগাফীর খাননি। বরং মধু খেয়েছেন, তখন তাঁরা বললেনঃ “তাহলে মৌমাছি ‘আরফাত' গাছ হতে মধু আহরণ করে থাকবে, যার গাঁদের নাম হলো, মাগাফীর এবং ওরই ক্রিয়ার প্রভাবে এই মধুতে মাগাফীরের গন্ধ রয়েছে। এই রিওয়াইয়াতে (আরবি) শব্দ রয়েছে, জাওহারী (রঃ) যার অর্থ করেছেন (আরবি) অর্থাৎ খেয়েছে। মৌমাছিকেও (আরবি) বলা হয় এবং (আরবি) হালকা শব্দকে বলা হয়। পাখী যখন চঞ্চু দ্বারা কোন খাদ্য খায় তখন তার চঞ্চুর শব্দ শোনা যায়, ঐ সময় আরবরা বলেঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি পাখীর চঞ্চুর শব্দ শুনেছি।” একটি হাদীসে রয়েছেঃ “জান্নাতীরা পাখীর হালকা ও মিষ্টি শব্দ শুনতে পাবে।” এখানেও আরবী (আরবি) শব্দ রয়েছে। আসমাঈ' (রঃ) যিনি হযরত শু'বা (রাঃ) -এর মজলিসে ছিলেন, বলেন যে, হযরত শু’বা (আরবি) শব্দটি (আরবি) অর্থাৎ দ্বারা পড়েন। তখন হযরত আসমাঈ’ (রঃ) বলেন যে, ওটা (আরবি) দ্বারা হবে। তখন হযরত শুবা (রঃ) তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “এ ব্যক্তি এটা আমার চেয়ে বেশী জানেন। এটাই সঠিক হবে। তোমরা এটা সংশোধন করে নাও।” এ ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। মোটকথা, মধু পান করানোর ঘটনায় দু’টি নাম বর্ণিত আছে। একটি হযরত হাফসা (রাঃ)-এর নাম এবং অপরটি হযরত যায়নাব (রাঃ)-এর নাম। এই ব্যাপারে যারা একমত হয়েছিলেন তাঁরা হলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। তাহলে খুব সম্ভব ঘটনা দু'টো হবে। তবে এই দুজনের ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।পরস্পর এই প্রকারের পরামর্শ গ্রহণকারিণী ছিলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। এটা এ হাদীস দ্বারাও জানা যাচ্ছে যা মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি (হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ) বলেনঃ বহু দিন হতে আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, ……(আরবি)–এ আয়াতের মধ্যে যে দু’জন স্ত্রীর বর্ণনা রয়েছে তাঁদের নাম হযরত উমার (রাঃ)-এর কাছে জেনে নিবো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর এই খলীফা যখন হজ্বের সফরে বের হলেন তখন আমিও তার সাথে বের হলাম। পথে এক জায়গায় খলীফা উমার (রাঃ) রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের দিকে চললেন। আমি তখন পানির পাত্র নিয়ে তার পিছনে পিছনে গেলাম। তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূর্ণ করে ফিরে আসলেন। আমি পানি ঢেলে ঢেলে তাঁকে অযু করালাম। সুযোগ পেয়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আমীরুল মু'মিনীন! ……… (আরবি) এই আয়াতে যে দুই জনকে সম্বোধন করা হয়েছে তাঁরা কারা? তিনি জবাবে বললেনঃ “হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! এটা বড়ই আফসোসের বিষয়!” যুহরী (রঃ) বলেন যে, হযরত উমার (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর এ প্রশ্ন করাকে অপছন্দ করলেন। কিন্তু ওটা গোপন করা বৈধ ছিল না বলে তিনি উত্তর দেনঃ “এর দ্বারা হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে।” অতঃপর হযরত উমার (রাঃ) ঘটনাটি বর্ণনা করতে শুরু করেন। তিনি বলেনঃ “আমরা কুরায়েশরা আমাদের নারীদেরকে আমাদের আওতাধীনে রাখতাম। কিন্তু মদীনাবাসীদের উপর তাদের নারীরা আধিপত্য করতো। যখন আমরা হিজরত করে মদীনায় আসলাম তখন আমাদের নারীরাও তাদের দেখাদেখি। আমাদের উপর প্রাধান্য লাভের ইচ্ছা করে। আমি মদীনা শরীফের উপরের অংশে হযরত উমাইয়া ইবনে যায়েদের বাড়ীতে অবস্থান করতাম। একদা আমি আমার স্ত্রীর উপর অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে কিছু বলতে লাগলাম। তখন সে উল্টিয়ে আমাকেও জবাব দিতে শুরু করলো। তার এই আচরণ আমার নিকট খুবই খারাপ বোধ হলো। আমি মনে মনে বললামঃ এই ধরনের নতুন আচরণ কেন? আমাকে বিস্মিত হতে দেখে সে বললোঃ “আপনি কি চিন্তা করছেন? আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরাও তাকে জবাব দিয়ে থাকে। কোন কোন সময় তো তারা সারা দিন ধরে তাঁর সাথে কথাবার্তা বলাও বন্ধ রাখে।” তার এই কথা শুনে আমি অন্য এক সমস্যায় পড়লাম। সরাসরি আমি আমার কন্যা হাফসা (রাঃ)-এর বাড়ীতে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তোমরা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জবাব দিয়ে থাকো এবং মাঝে মাঝে সারা দিন তার সাথে কথাবার্তা বলা বন্ধ রাখো এটা কি সত্য? সে উত্তরে বললোঃ “হ্যাঁ, এটা সত্য বটে।” আমি তখন বললামঃ যারা এরূপ করে তারা ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তোমরা কি ভুলে যাচ্ছ যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর অসন্তুষ্টির কারণে এরূপ নারীর উপর স্বয়ং আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন? সাবধান! আগামীতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জবাব দিবে না এবং তাঁর কাছে কিছুই চাইবে না। কিছু চাইতে হলে আমার কাছেই চাইবে। আয়েশা (রাঃ)-কে দেখে তুমি তার প্রতি লোভ বা হিংসা করবে না। সে তোমার চেয়ে ভাল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট অধিকতর প্রিয়। হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! আমার প্রতিবেশী একজন আনসারী ছিলেন। আমরা উভয়ে পালা ভাগ করে নিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর খিদমতে আমি একদিন হাযির হতাম এবং একদিন তিনি হাযির হতেন। আমি আমার পালার দিনের সমস্ত হাদীস, আয়াত ইত্যাদি শুনে তাঁকে এসে শুনাতাম এবং তিনি তার পালার দিন সবকিছু আমাকে এসে শুনাতেন। আমাদের মধ্যে এ কথাটি ঐ সময় মশহর হয়ে গিয়েছিল যে, গাসসানী বাদশাহ্ আমাদের উপর আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। একদা আমার সঙ্গী তাঁর পালার দিনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে গিয়েছিলেন! ইশার সময় এসে তিনি আমার দরজার উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডাক দিতে লাগলেন। আমি উদ্বেগের সাথে বের হয়ে বললামঃ খবর ভাল তো? তিনি উত্তরে বললেনঃ “আজ তো একটা কঠিন ব্যাপার ঘটে গেছে।” আমি বললামঃ গাস্‌সানী বাদশাহ কি পৌঁছে গেছে? তিনি জবাবে বললেনঃ “এর চেয়েও কঠিন সমস্যা দেখা দিয়েছে।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ কি হয়েছে, বলুন না? তিনি বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়েছেন।” আমি তখন বললামঃ আফসোস! হাফসা (রাঃ) তো ধ্বংস হয়ে গেল! আমি পূর্ব হতেই এটার আশংকা করছিলাম। ফজরের নামায পড়েই কাপড়-চোপড় পরে আমি সরাসরি হাফসা (রাঃ)-এর বাড়ীতে হাযির হলাম। দেখলাম যে, সে কাঁদছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কি তোমাদেরকে তালাক দিয়ে ফেলেছেন? সে জবাব দিলোঃ “এ খবর তো বলতে পারছি না। তবে তিনি আমাদের হতে পৃথক হয়ে নিজের কক্ষে অবস্থান করছেন। আমি সেখানে গেলাম। দেখি যে, একজন হাবশী গোলাম পাহারা দিচ্ছে। আমি তাকে বললামঃ যাও, আমার জন্যে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা কর। সে গেল এবং ফিরে এসে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কোন উত্তর দিলেন না।” আমি তখন সেখান হতে ফিরে এসে মসজিদে গেলাম। দেখলাম যে, মিম্বরের পাশে সাহাবীদের একটি দল বসে রয়েছেন এবং কারো কারো চক্ষু দিয়ে তো অশ্রু ঝরছে! আমি অল্পক্ষণ সেখানে বসে থাকলাম। কিন্তু আমার মনে শান্তি কোথায়? আবার উঠে দাঁড়ালাম এবং ঐ গোলামের কাছে গিয়ে অনুমতি চাইতে বললাম। গোলাম এবারও এসে খবর দিলো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন উত্তর দেননি। আবার আমি মসজিদে চলে গেলাম। সেখান হতে আবার ফিরে আসলাম এবং পুনরায় গোলামকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইতে বললাম। গোলাম আবার গেল এবং ঐ একই জবাব দিলো। আমি ফিরে যাচ্ছিলাম এমন সময় গোলাম আমাকে ডাক দিলো এবং বললোঃ “আপনাকে অনুমতি দেয়া হয়েছে।” আমি প্রবেশ করে দেখলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বস্তার উপর হেলান লাগিয়ে বসে আছেন। যার দাগ তার দেহ মুবারকে পড়ে গেছে। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি আপনার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে ফেলেছেন? তিনি মাথা উঠিয়ে আমার দিকে চেয়ে বললেনঃ “না।” আমি বললামঃ আল্লাহু আকবার! হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কথা এই যে, আমরা কুরায়েশরা আমাদের স্ত্রীদেরকে আমাদের আজ্ঞাধীনে রাখতাম। কিন্তু মদীনাবাসীদের উপর তাদের স্ত্রীরা প্রাধান্য লাভ করে আছে। এখানে এসে আমাদের স্ত্রীরাও তাদের দেখাদেখি তাদেরই আচরণ গ্রহণ করে নিয়েছে। তারপর আমি আমার স্ত্রীর ঘটনাটিও বর্ণনা করলাম এবং তার একথাটিও বর্ণনা করলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরাও এরূপ করে থাকেন। তারপর আমি আমার একথাটিও বর্ণনা করলাম যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর অসন্তুষ্টির কারণে আল্লাহ যে অসন্তুষ্ট হয়ে যাবেন এবং এর ফলে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে এ ভয় কি তাদের নেই? আমার কথা শুনে তিনি মুচকি হাসলেন। তারপর আমি আমার হাফসা (রাঃ)-এর কাছে যাওয়া, তাকে আয়েশা (রাঃ)-এর প্রতি হিংসা পোষণ না করার উপদেশ দেয়ার কথা বর্ণনা করলাম। এবারও তিনি মুচকি হাসলেন। এরপর আমি বললামঃ অনুমতি হলে আরো কিছুক্ষণ আপনার এখানে অবস্থান করতাম। তিনি অনুমতি দিলে আমি বসে পড়লাম। অতঃপর আমি মাথা উঠিয়ে ঘরের চতুর্দিকে লক্ষ্য করে দেখি যে, তিনটি শুষ্ক চামড়া ছাড়া আর কিছুই নেই। তাঁর খাস দরবারের এ অবস্থা দেখে আমার খুবই দুঃখ হলো। আমি আরয করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দু'আ করুন যেন আল্লাহ তা'আলা আপনার উম্মতের উপর প্রশস্ততা দান করেন। দেখুন তো পারসিক ও রোমকরা আল্লাহর ইবাদত করে না, অথচ তারা দুনিয়ার কত বেশী নিয়ামতের মধ্যে ডুবে রয়েছে? আমার একথা শোনা মাত্রই তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং বলতে লাগলেনঃ “হে খাত্তাবের পুত্র! তুমি তো, সন্দেহের মধ্যে এখনো রয়ে গেছে। এই কওমের জন্যে দুনিয়ার এই নিয়ামতরাশি কল্যাণকর নয়। তাদেরকে এগুলো তাড়াতাড়ি করে দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হয়েছে।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন!ব্যাপারটা ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্ত্রীদের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণে শপথ করেছিলেন যে, এক মাসকাল তিনি তাদের সাথে মিলিত হবেন না। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তাম্বীহ করেন।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, জামে তিরমিযী এবং সুনানে নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “বছর ধরে আমি এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম যে, হযরত উমার (রাঃ)-কে এই দুইজন স্ত্রীর নাম জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ)-এর অত্যন্ত প্রভাবের কারণে তাঁকে জিজ্ঞেস করার সাহস হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত হজ্ব পালন করে প্রত্যাবর্তনের পথে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।” তারপর তিনি পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন যা উপরে বর্ণিত হলো।সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, তালাকের প্রসিদ্ধির ঘটনাটি পর্দার আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে ঘটেছিল। তাতে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) যেমন হযরত হাফসা (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে তাকে বুঝিয়ে এসেছিলেন, তেমনিভাবে হযরত আয়েশা (রাঃ)-কেও বুঝিয়েছিলেন। তাতে এও রয়েছে যে, যে গোলামটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে পাহারা দিচ্ছিল তার নাম ছিল আবূ রিবাহ (রাঃ)। তাতে এও আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আপনার স্ত্রীদের ব্যাপারে এতো চিন্তিত হচ্ছেন কেন? যদি আপনি তাদেরকে তালাকও দিয়ে দেন তবে আপনার সাথে রয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতামণ্ডলী, হযরত জিবরাঈল (আঃ), হযরত মীকাঈল (আঃ), আমি, হযরত আবূ বকর (রাঃ) এবং সমস্ত মু'মিন।” হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলারই সমস্ত প্রশংসা, আমি এই প্রকারের কথা যে বলছিলাম, আমি আশা করছিলাম যে, আমার কথার সত্যতায় তিনি আয়াত নাযিল করবেন। হলোও তাই। আল্লাহ তা’আলা (আরবি) এই আয়াত এবং (আরবি) এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। যখন আমি জানতে পারলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর স্ত্রীদেরকে তালাক দেননি তখন আমি মসজিদে গিয়ে দরজার উপর দাঁড়িয়ে উচ্চ শব্দে সকলকে জানিয়ে দিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর পবিত্র স্ত্রীদেরকে তালাক দেননি। এ ব্যাপারেই আল্লাহ তা'আলা ... (আরবি)-এই আয়াতটি নাযিল করেন। অর্থাৎ “যখন তাদের কাছে কোন নিরাপত্তা বা ভয়ের খবর পৌঁছে তখন তারা তা প্রচার করতে শুরু করে দেয়। যদি তারা এই খবর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অথবা জ্ঞানী ও বিদ্বান মুসলমানদের নিকট পৌঁছিয়ে দিতো তবে নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে যারা তাহকীককারী তারা ওটা বুঝতে পারতো।” হযরত উমার (রাঃ) আয়াতটি এই পর্যন্ত পাঠ করে বলেনঃ এই বিষয়ের তাহকীককারীদের মধ্যে আমিও একজন।” আরো বহু বুযুর্গ মুফাসসির হতে বর্ণিত আছে যে, দ্বারা হযরত আবূ বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ হযরত উসমানেরও (রাঃ) নাম উল্লেখ করেছেন এবং কেউ কেউ আবার হযরত আলী (রাঃ)-এর নামও নিয়েছেন। একটি দুর্বল হাদীসে মারফূ’’রূপে শুধু হযরত আলী (রাঃ)-এর নাম রয়েছে। কিন্তু এর সনদ দুর্বল এবং সম্পূর্ণরূপে মুনকার। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে মর্যাদাবোধ জেগে উঠেছিল। আমি তখন তাদেরকে বললামঃ যদি নবী (সঃ) তোমাদেরকে পরিত্যাগ করেন তবে তার প্রতিপালক সম্ভবতঃ তাকে দিবেন তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর স্ত্রী। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং আমার ভাষাতেই আল্লাহ পাক তা নাযিল করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এটা পূর্বেই গত হয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বহু ব্যাপারে কুরআনের আনুকূল্য করেছেন। যেমন পর্দার ব্যাপারে, বদর যুদ্ধের বন্দীদের ব্যাপারে এবং মাকামে ইবরাহীমকে কিবলাহ নির্ধারণ করার ব্যাপারে। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন উম্মাহাতুল মু'মিনীন ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মধ্যে মন কষাকষির খবর পেলাম তখন আমি তাদের কাছে গেলাম এবং তাদেরকে বললামঃ তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আপোষ করে নাও, অন্যথায় তিনি যদি তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন তবে তাঁর প্রতিপালক সম্ভবতঃ তাকে তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর স্ত্রী দান করবেন। অবশেষে আমি উম্মাহাতুল মু'মিনীনের শেষ জনের কাছে গেলাম। তখন সে বললোঃ “হে উমার (রাঃ)! আমাদেরকে উপদেশ দানের জন্যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি যথেষ্ট নন যে, আপনি আমাদেরকে উপদেশ দিতে আসলেন?" আমি তখন নীরব হয়ে গেলাম। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা ...- (আরবি) এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন।” (এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ) সহীহ বুখারীর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যে স্ত্রীটি হযরত উমার (রাঃ)-কে এই উত্তর দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি সম্পর্কে তিনি বলেনঃ “ঘটনা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-এর ঘরে ছিলেন। যখন হাফসা (রাঃ) দেখেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মারিয়াহ (রাঃ)-এর সাথে মশগুল রয়েছেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি এ খবর হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জানাবে না। আমি তোমাকে একটি সুসংবাদ দিচ্ছি। তা এই যে, আমার ইন্তেকালের পর আমার খিলাফত হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর পর তোমার আব্বা লাভ করবেন। কিন্তু হযরত হাফসা (রাঃ) এ খবর হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জানিয়ে দেন। তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ খবর আপনার কাছে কে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমাকে অবহিত করেছেন তিনি যিনি সর্বজ্ঞ, সম্যক অবগত।” হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন বলেনঃ “আমি আপনার দিকে তাকাবো যে পর্যন্ত না আপনি মারিয়াহ (রাঃ)-কে আপনার উপর হারাম করবেন।” তখন তিনি হযরত মারিয়াহ (রাঃ)-কে নিজের উপর হারাম করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা .. (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তিবরানী (রঃ)](আরবি)-এর একটি তাফসীর তো এই যে, তারা হবে রোযা পালনকারিণী। একটি মারফূ’ হাদীসেও এই শব্দের এই তাফসীরই এসেছে যে হাদীসটি সূরায়ে বারাআতের এই শব্দের তাফসীরে গত হয়েছে যে, এই উম্মতের সিয়াহাত হলো রোযা রাখা। দ্বিতীয় তাফসীর এই যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হিজরতকারিণীগণ। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী উত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তাদের মধ্যে কেউ হবে অকুমারী এবং কেউ হবে কুমারী। যাতে মন খুশী থাকে।মু’জামে তিবরানীতে রয়েছে যে, ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতে স্বীয় নবী (সঃ)-কে যে ওয়াদা দিয়েছেন তাতে বেওয়া বা অকুমারী দ্বারা হযরত আসিয়া (রাঃ) কে বুঝানো হয়েছে যিনি ফিরাউনের স্ত্রী ছিলেন এবং কুমারী দ্বারা হযরত মরিয়ম (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে যিনি হযরত ইমরানের কন্যা ছিলেন। হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। ঐ সময় হযরত খাদীজাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসেন। তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত খাদীজাহ (রাঃ)-কে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন, তাঁকে সুসংবাদ দেয়া হচ্ছে জান্নাতের একটি ঘরের, যেখানে না আছে গরম এবং না আছে কোন কষ্ট, আর না আছে কোন শোরগোল। যা ছিদ্রকৃত মুক্তা দ্বারা নির্মিত। যার ডানে-বামে মরিয়ম বিনতু ইমরান (রাঃ) এবং আসিয়া বিনতু মাযাহেম (রাঃ)-এর ঘর রয়েছে। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, হযরত খাদীজাহ (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে খাদীজাহ (রাঃ)! তোমার সতীনদেরকে আমার সালাম জানিয়ে দিবে।” হযরত খাদীজাহ (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পূর্বেও কি আপনি কাউকেও বিয়ে করেছিলেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা মরিয়ম বিনতু ইমরান (রাঃ), ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ) এবং মূসা (আঃ)-এর বোন কুলসুম (রাঃ) এই তিনজনকে আমার নিকাহতে দিয়ে রেখেছেন।” (এ হাদীসটি দুর্বল) হযরত আবূ উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেছেনঃ “তুমি কি জান যে, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আমার বিবাহ ইমরানের কন্যা মরিয়ম (রাঃ), মূসা (আঃ)-এর ভগ্নী কুলসুম (রাঃ), এবং ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়ার (রাঃ) সাথে দিয়ে রেখেছেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে মুবারকবাদ।” (এ হাদীসটি আবূ ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটাও দুর্বল হাদীস এবং সাথে সাথে মুরসালও বটে)

আত-তাহরীম 66:2

১-৫ নং আয়াতের তাফসীর এই সূরাটির প্রাথমিক আয়াতগুলোর শানে নুযূলের ব্যাপারে সুফাসসিরদের উক্তি নিম্নরূপঃ কেউ কেউ বলেন যে, এটা হযরত মারিয়াহ্ (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিজের উপর হারাম করে নিয়েছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে এই রিওয়াইয়াতটি বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-এর কথার পরিপ্রেক্ষিতে এটা ঘটেছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এক দাসী সম্পর্কে এ কথা বলেছিলেন। ফলে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর কোন এক স্ত্রীর ঘরে উম্মে ইবরাহীম (রাঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলেছিলেন। তখন তাঁর ঐ স্ত্রী তাঁকে বলেনঃ “তোমার ঘরে ও আমার বিছানায় এ কাজ কারবার?” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাকে আমার উপর হারাম করে নিলাম।” তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হালাল কিভাবে আপনার উপর হারাম হয়ে যাবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “আমি শপথ করছি যে, এখন হতে তার সাথে কোন প্রকারের কথাবার্তা বলবো না।” ঐ সময় এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত যায়েদ (রঃ) বলেনঃ এর দ্বারা জানা গেল যে, তুমি আমার উপর হারাম’ এ কথা কেউ বললে তা বাজে বলে প্রমাণিত হবে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছিলেনঃ “তুমি আমার উপর হারাম। আল্লাহর কসম! আমি তোমার সাহচর্যে থাকবো না।”হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন যে, হারাম করার ব্যাপারে তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা হয় এবং তাঁকে তাঁর কসমের কাফফারা আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়। তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ দু’জন স্ত্রী কে ছিলেন?” উত্তরে হযরত উমার বলেনঃ “তারা হলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। উম্মে ইবরাহীম কিবতিয়্যাহ (রাঃ)-কে কেন্দ্র করেই ঘটনাটির সূত্রপাত হয়। হযরত হাফসা (রাঃ)-এর ঘরে তাঁর পালার দিনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত মারিয়াহ্ কিবতিয়্যাহ্ (রাঃ)-এর সাথে মিলিত হন। এতে হযরত হাফসা (রাঃ) দুঃখিতা হন যে, তাঁর পালার দিনে তাঁরই ঘরে ও তাঁরই বিছানায় তিনি মারিয়াহ্ (রাঃ)-এর সাথে মিলিত হলেন! রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বলে ফেলেনঃ “আমি তাকে আমার উপর হারাম করে নিলাম। তুমি এই ঘটনা কারো কাছে বর্ণনা করো না।” এতদসত্ত্বেও হযরত হাফসা (রাঃ) ঘটনাটি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সামনে প্রকাশ করে দেন। আল্লাহ্ তা'আলা এই খবর স্বীয় নবী (সঃ)-কে জানিয়ে দেন এবং এই আয়াতগুলো নাযিল করেন। নবী (সঃ) কাফফারা আদায় করে স্বীয় কসম ভেঙ্গে দেন এবং ঐ দাসীর সঙ্গে মিলিত হন। এই ঘটনাটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই ফতওয়া দেন যে, কেউ যদি বলেঃ “আমি অমুক জিনিস আমার উপর হারাম করে নিলাম” তবে তার উচিত কসম ভেঙ্গে দিয়ে কাফফারা আদায় করা। একটি লোক তাঁকে এই মাসআলা জিজ্ঞেস করে যে, সে তার স্ত্রীকে নিজের উপর হারাম করে নিয়েছে।তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তোমার স্ত্রী তোমার উপর হারাম নয় (তুমি কাফফারা আদায় করে কসম ভেঙ্গে দাও)।” সবচেয়ে কঠিন কাফফারা তো হলো আল্লাহ্‌ পথে গোলাম আযাদ করা। ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং বহু ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদের ফতওয়া এই যে, যে ব্যক্তি তার স্ত্রী, দাসী অথবা খাওয়া পরার কোন জিনিসকে নিজের উপর হারাম করে নেয়, তার উপর কাফফারা ওয়াজিব হয়ে যায়। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, শুধু স্ত্রী বা দাসীকে নিজের উপর হারাম করে নিলে কাফফারা ওয়াজিব হয়, অন্য কোন জিনিস নিজের উপর হারাম করে নিলে কাফফারা ওয়াজিব হয় না। যদি হারাম করা দ্বারা তালাকের নিয়ত করে তবে অবশ্যই তালাক হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে দাসীকে হারাম করার কথা দ্বারা যদি আযাদ করে দেয়ার নিয়ত করে তবে ঐ দাসী অবশ্যই আযাদ হয়ে যাবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত ঐ নারীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যিনি স্বীয় নফসকে নবী (সঃ)-এর নিকট হিবা বা দান করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এটা গারীব উক্তি। সম্পূর্ণ সঠিক কথা এই যে, এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিজের উপর মধুকে হারাম করে নেয়া।সহীহ্ বুখারীতে এই আয়াতের ক্ষেত্রে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত যায়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ)-এর ঘরে মধু পান করতেন এবং এই কারণে তিনি তার ঘরে কিছুক্ষণ বিলম্ব করতেন। এই জন্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ) পরস্পর পরামর্শ করেন যে, তাঁদের মধ্যে যাঁরই কাছে নবী (সঃ) আসবেন তিনি যেন তাকে বলেনঃ “আপনার মুখ হতে মাগাফীরের (গেঁদ বা আঠা জাতীয় জিনিস যাতে দুর্গন্ধ রয়েছে) গন্ধ আসছে, সম্ভবতঃ আপনি মাগাফীর খেয়েছেন!” সুতরাং তারা এ কথাই বলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আমি যায়নাব (রাঃ)-এর ঘরে মধু পান করেছি। এখন আমি শপথ করছি যে, আর কখনো আমি মধু পান করবো না। সুতরাং তোমরা এ কথা কাউকেও বলবে না।” ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটিকে কিতাবুল ঈমান ওয়ান নুযূর-এর মধ্যেও কিছু বৃদ্ধি সহকারে আনয়ন করেছেন। তাতে রয়েছে যে, এখানে দু'জন স্ত্রী দ্বারা হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। আর চুপে-চুপে কথা বলা দ্বারা বুঝানো হয়েছে ‘আমি মধু পান করেছি' এই উক্তিটি। তিনি কিতাবুত তালাকের মধ্যে এ হাদীসটি আনয়ন করে বলেন যে, মাগাফীর হলো গঁদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত একটি জিনিস যা ঘাসে জন্মে থাকে এবং তাতে কিছুটা মিষ্টতা রয়েছে।কিতাবুত তালাকে এ হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এই শব্দে বা ভাষায় বর্ণিত আছেঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মিষ্টি ও মধু খুব ভালবাসতেন। আসরের নামাযের পর তিনি তাঁর স্ত্রীদের নিকট যেতেন এবং কাউকেও নিকটে করে নিতেন। একদা তিনি হযরত হাফসা (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং অন্যান্য দিন তাঁর কাছে যতক্ষণ অবস্থান করতেন, সেই দিন তদপেক্ষা বেশীক্ষণ অবস্থান করেন। এতে আমার মনে নিজের মর্যাদাবোধ জেগে উঠলো। তত্ত্ব নিয়ে জানলাম যে, তাঁর কওমের একটি স্ত্রীলোক এক মশক মধু তার কাছে উপঢৌকন স্বরূপ পাঠিয়েছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে ঐ মধুর শরবত পান করিয়েছেন। আর এই কারণেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর ঘরে এতোটা বিলম্ব করেছেন। আমি মনে মনে বললাম যে, ঠিক আছে, কৌশল করে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা হতে ফিরিয়ে দিব। সুতরাং আমি হযরত সাওদাহ্ বিনতু যামআহ্ (রাঃ)-কে বললামঃ তোমার ঘরে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসবেন এবং তোমার নিকটবর্তী হবেন তখন তুমি তাকে বলবেঃ “আজ কি আপনি মাগাফীর খেয়েছেন?” তিনি জবাবে বলবেনঃ “না।” তখন তুমি বলবেঃ তাহলে এই গন্ধ কিসের?” তিনি। তখন বলবেনঃ “হাফসা (রাঃ) মধু পান করিয়েছেন।” তুমি তখন বলবেঃ “সম্ভবতঃ মৌমাছি ‘আরফাত’ নামক কণ্ঠকযুক্ত গাছ হতে মধু আহরণ করেছে।” আমার কাছে যখন আসবেন তখন আমিও তাই বলবো। হে সফিয়া (রাঃ)! তোমার কাছে যখন আসবেন তখন তুমিও তাই বলবে।” হযরত সাওদাহ (রাঃ) বলেনঃ “যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার ঘরে আসলেন, তখন তিনি দরজার উপরই ছিলেন, তখন আমি ইচ্ছা করলাম যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) আমাকে যা বলতে বলেছেন তাই বলে দিই, কেননা, আমি তাকে খুবই ভয় করতাম। কিন্তু ঐ সময় আমি নীরব থাকলাম। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার কাছে আসলেন তখন আমি ঐ কথাই বলে দিলাম। তারপর তিনি হযরত সফিয়া (রাঃ)-এর নিকট গেলে তিনিও ঐ কথাই বলেন। এরপর হযরত হাফসা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে মধু পান করাতে চাইলে তিনি বলেনঃ “আমার এর প্রয়োজন নেই।” হযরত সাওদা (রাঃ) তখন বলতে লাগলেনঃ “আফসোস! আমরা এটাকে হারাম করিয়ে দিলাম!” আমি (আয়েশা রাঃ) বললামঃ চুপ থাকো। সহীহ মুসলিমে এটুকু বেশী রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুর্গন্ধকে খুবই ঘৃণা করতেন। এজন্যেই ঐ স্ত্রীগণ বলেছিলেনঃ “আপনি মাগাফীর খেয়েছেন কি?” কেননা, মাগাফীরেও কিছুটা দুর্গন্ধ রয়েছে। যখন তিনি উত্তর দিলেন যে, না, তিনি মাগাফীর খাননি। বরং মধু খেয়েছেন, তখন তাঁরা বললেনঃ “তাহলে মৌমাছি ‘আরফাত' গাছ হতে মধু আহরণ করে থাকবে, যার গাঁদের নাম হলো, মাগাফীর এবং ওরই ক্রিয়ার প্রভাবে এই মধুতে মাগাফীরের গন্ধ রয়েছে। এই রিওয়াইয়াতে (আরবি) শব্দ রয়েছে, জাওহারী (রঃ) যার অর্থ করেছেন (আরবি) অর্থাৎ খেয়েছে। মৌমাছিকেও (আরবি) বলা হয় এবং (আরবি) হালকা শব্দকে বলা হয়। পাখী যখন চঞ্চু দ্বারা কোন খাদ্য খায় তখন তার চঞ্চুর শব্দ শোনা যায়, ঐ সময় আরবরা বলেঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি পাখীর চঞ্চুর শব্দ শুনেছি।” একটি হাদীসে রয়েছেঃ “জান্নাতীরা পাখীর হালকা ও মিষ্টি শব্দ শুনতে পাবে।” এখানেও আরবী (আরবি) শব্দ রয়েছে। আসমাঈ' (রঃ) যিনি হযরত শু'বা (রাঃ) -এর মজলিসে ছিলেন, বলেন যে, হযরত শু’বা (আরবি) শব্দটি (আরবি) অর্থাৎ দ্বারা পড়েন। তখন হযরত আসমাঈ’ (রঃ) বলেন যে, ওটা (আরবি) দ্বারা হবে। তখন হযরত শুবা (রঃ) তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “এ ব্যক্তি এটা আমার চেয়ে বেশী জানেন। এটাই সঠিক হবে। তোমরা এটা সংশোধন করে নাও।” এ ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। মোটকথা, মধু পান করানোর ঘটনায় দু’টি নাম বর্ণিত আছে। একটি হযরত হাফসা (রাঃ)-এর নাম এবং অপরটি হযরত যায়নাব (রাঃ)-এর নাম। এই ব্যাপারে যারা একমত হয়েছিলেন তাঁরা হলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। তাহলে খুব সম্ভব ঘটনা দু'টো হবে। তবে এই দুজনের ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।পরস্পর এই প্রকারের পরামর্শ গ্রহণকারিণী ছিলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। এটা এ হাদীস দ্বারাও জানা যাচ্ছে যা মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি (হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ) বলেনঃ বহু দিন হতে আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, ……(আরবি)–এ আয়াতের মধ্যে যে দু’জন স্ত্রীর বর্ণনা রয়েছে তাঁদের নাম হযরত উমার (রাঃ)-এর কাছে জেনে নিবো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর এই খলীফা যখন হজ্বের সফরে বের হলেন তখন আমিও তার সাথে বের হলাম। পথে এক জায়গায় খলীফা উমার (রাঃ) রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের দিকে চললেন। আমি তখন পানির পাত্র নিয়ে তার পিছনে পিছনে গেলাম। তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূর্ণ করে ফিরে আসলেন। আমি পানি ঢেলে ঢেলে তাঁকে অযু করালাম। সুযোগ পেয়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আমীরুল মু'মিনীন! ……… (আরবি) এই আয়াতে যে দুই জনকে সম্বোধন করা হয়েছে তাঁরা কারা? তিনি জবাবে বললেনঃ “হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! এটা বড়ই আফসোসের বিষয়!” যুহরী (রঃ) বলেন যে, হযরত উমার (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর এ প্রশ্ন করাকে অপছন্দ করলেন। কিন্তু ওটা গোপন করা বৈধ ছিল না বলে তিনি উত্তর দেনঃ “এর দ্বারা হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে।” অতঃপর হযরত উমার (রাঃ) ঘটনাটি বর্ণনা করতে শুরু করেন। তিনি বলেনঃ “আমরা কুরায়েশরা আমাদের নারীদেরকে আমাদের আওতাধীনে রাখতাম। কিন্তু মদীনাবাসীদের উপর তাদের নারীরা আধিপত্য করতো। যখন আমরা হিজরত করে মদীনায় আসলাম তখন আমাদের নারীরাও তাদের দেখাদেখি। আমাদের উপর প্রাধান্য লাভের ইচ্ছা করে। আমি মদীনা শরীফের উপরের অংশে হযরত উমাইয়া ইবনে যায়েদের বাড়ীতে অবস্থান করতাম। একদা আমি আমার স্ত্রীর উপর অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে কিছু বলতে লাগলাম। তখন সে উল্টিয়ে আমাকেও জবাব দিতে শুরু করলো। তার এই আচরণ আমার নিকট খুবই খারাপ বোধ হলো। আমি মনে মনে বললামঃ এই ধরনের নতুন আচরণ কেন? আমাকে বিস্মিত হতে দেখে সে বললোঃ “আপনি কি চিন্তা করছেন? আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরাও তাকে জবাব দিয়ে থাকে। কোন কোন সময় তো তারা সারা দিন ধরে তাঁর সাথে কথাবার্তা বলাও বন্ধ রাখে।” তার এই কথা শুনে আমি অন্য এক সমস্যায় পড়লাম। সরাসরি আমি আমার কন্যা হাফসা (রাঃ)-এর বাড়ীতে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তোমরা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জবাব দিয়ে থাকো এবং মাঝে মাঝে সারা দিন তার সাথে কথাবার্তা বলা বন্ধ রাখো এটা কি সত্য? সে উত্তরে বললোঃ “হ্যাঁ, এটা সত্য বটে।” আমি তখন বললামঃ যারা এরূপ করে তারা ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তোমরা কি ভুলে যাচ্ছ যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর অসন্তুষ্টির কারণে এরূপ নারীর উপর স্বয়ং আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন? সাবধান! আগামীতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জবাব দিবে না এবং তাঁর কাছে কিছুই চাইবে না। কিছু চাইতে হলে আমার কাছেই চাইবে। আয়েশা (রাঃ)-কে দেখে তুমি তার প্রতি লোভ বা হিংসা করবে না। সে তোমার চেয়ে ভাল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট অধিকতর প্রিয়। হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! আমার প্রতিবেশী একজন আনসারী ছিলেন। আমরা উভয়ে পালা ভাগ করে নিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর খিদমতে আমি একদিন হাযির হতাম এবং একদিন তিনি হাযির হতেন। আমি আমার পালার দিনের সমস্ত হাদীস, আয়াত ইত্যাদি শুনে তাঁকে এসে শুনাতাম এবং তিনি তার পালার দিন সবকিছু আমাকে এসে শুনাতেন। আমাদের মধ্যে এ কথাটি ঐ সময় মশহর হয়ে গিয়েছিল যে, গাসসানী বাদশাহ্ আমাদের উপর আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। একদা আমার সঙ্গী তাঁর পালার দিনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে গিয়েছিলেন! ইশার সময় এসে তিনি আমার দরজার উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডাক দিতে লাগলেন। আমি উদ্বেগের সাথে বের হয়ে বললামঃ খবর ভাল তো? তিনি উত্তরে বললেনঃ “আজ তো একটা কঠিন ব্যাপার ঘটে গেছে।” আমি বললামঃ গাস্‌সানী বাদশাহ কি পৌঁছে গেছে? তিনি জবাবে বললেনঃ “এর চেয়েও কঠিন সমস্যা দেখা দিয়েছে।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ কি হয়েছে, বলুন না? তিনি বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়েছেন।” আমি তখন বললামঃ আফসোস! হাফসা (রাঃ) তো ধ্বংস হয়ে গেল! আমি পূর্ব হতেই এটার আশংকা করছিলাম। ফজরের নামায পড়েই কাপড়-চোপড় পরে আমি সরাসরি হাফসা (রাঃ)-এর বাড়ীতে হাযির হলাম। দেখলাম যে, সে কাঁদছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কি তোমাদেরকে তালাক দিয়ে ফেলেছেন? সে জবাব দিলোঃ “এ খবর তো বলতে পারছি না। তবে তিনি আমাদের হতে পৃথক হয়ে নিজের কক্ষে অবস্থান করছেন। আমি সেখানে গেলাম। দেখি যে, একজন হাবশী গোলাম পাহারা দিচ্ছে। আমি তাকে বললামঃ যাও, আমার জন্যে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা কর। সে গেল এবং ফিরে এসে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কোন উত্তর দিলেন না।” আমি তখন সেখান হতে ফিরে এসে মসজিদে গেলাম। দেখলাম যে, মিম্বরের পাশে সাহাবীদের একটি দল বসে রয়েছেন এবং কারো কারো চক্ষু দিয়ে তো অশ্রু ঝরছে! আমি অল্পক্ষণ সেখানে বসে থাকলাম। কিন্তু আমার মনে শান্তি কোথায়? আবার উঠে দাঁড়ালাম এবং ঐ গোলামের কাছে গিয়ে অনুমতি চাইতে বললাম। গোলাম এবারও এসে খবর দিলো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন উত্তর দেননি। আবার আমি মসজিদে চলে গেলাম। সেখান হতে আবার ফিরে আসলাম এবং পুনরায় গোলামকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইতে বললাম। গোলাম আবার গেল এবং ঐ একই জবাব দিলো। আমি ফিরে যাচ্ছিলাম এমন সময় গোলাম আমাকে ডাক দিলো এবং বললোঃ “আপনাকে অনুমতি দেয়া হয়েছে।” আমি প্রবেশ করে দেখলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বস্তার উপর হেলান লাগিয়ে বসে আছেন। যার দাগ তার দেহ মুবারকে পড়ে গেছে। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি আপনার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে ফেলেছেন? তিনি মাথা উঠিয়ে আমার দিকে চেয়ে বললেনঃ “না।” আমি বললামঃ আল্লাহু আকবার! হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কথা এই যে, আমরা কুরায়েশরা আমাদের স্ত্রীদেরকে আমাদের আজ্ঞাধীনে রাখতাম। কিন্তু মদীনাবাসীদের উপর তাদের স্ত্রীরা প্রাধান্য লাভ করে আছে। এখানে এসে আমাদের স্ত্রীরাও তাদের দেখাদেখি তাদেরই আচরণ গ্রহণ করে নিয়েছে। তারপর আমি আমার স্ত্রীর ঘটনাটিও বর্ণনা করলাম এবং তার একথাটিও বর্ণনা করলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরাও এরূপ করে থাকেন। তারপর আমি আমার একথাটিও বর্ণনা করলাম যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর অসন্তুষ্টির কারণে আল্লাহ যে অসন্তুষ্ট হয়ে যাবেন এবং এর ফলে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে এ ভয় কি তাদের নেই? আমার কথা শুনে তিনি মুচকি হাসলেন। তারপর আমি আমার হাফসা (রাঃ)-এর কাছে যাওয়া, তাকে আয়েশা (রাঃ)-এর প্রতি হিংসা পোষণ না করার উপদেশ দেয়ার কথা বর্ণনা করলাম। এবারও তিনি মুচকি হাসলেন। এরপর আমি বললামঃ অনুমতি হলে আরো কিছুক্ষণ আপনার এখানে অবস্থান করতাম। তিনি অনুমতি দিলে আমি বসে পড়লাম। অতঃপর আমি মাথা উঠিয়ে ঘরের চতুর্দিকে লক্ষ্য করে দেখি যে, তিনটি শুষ্ক চামড়া ছাড়া আর কিছুই নেই। তাঁর খাস দরবারের এ অবস্থা দেখে আমার খুবই দুঃখ হলো। আমি আরয করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দু'আ করুন যেন আল্লাহ তা'আলা আপনার উম্মতের উপর প্রশস্ততা দান করেন। দেখুন তো পারসিক ও রোমকরা আল্লাহর ইবাদত করে না, অথচ তারা দুনিয়ার কত বেশী নিয়ামতের মধ্যে ডুবে রয়েছে? আমার একথা শোনা মাত্রই তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং বলতে লাগলেনঃ “হে খাত্তাবের পুত্র! তুমি তো, সন্দেহের মধ্যে এখনো রয়ে গেছে। এই কওমের জন্যে দুনিয়ার এই নিয়ামতরাশি কল্যাণকর নয়। তাদেরকে এগুলো তাড়াতাড়ি করে দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হয়েছে।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন!ব্যাপারটা ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্ত্রীদের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণে শপথ করেছিলেন যে, এক মাসকাল তিনি তাদের সাথে মিলিত হবেন না। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তাম্বীহ করেন।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, জামে তিরমিযী এবং সুনানে নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “বছর ধরে আমি এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম যে, হযরত উমার (রাঃ)-কে এই দুইজন স্ত্রীর নাম জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ)-এর অত্যন্ত প্রভাবের কারণে তাঁকে জিজ্ঞেস করার সাহস হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত হজ্ব পালন করে প্রত্যাবর্তনের পথে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।” তারপর তিনি পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন যা উপরে বর্ণিত হলো।সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, তালাকের প্রসিদ্ধির ঘটনাটি পর্দার আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে ঘটেছিল। তাতে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) যেমন হযরত হাফসা (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে তাকে বুঝিয়ে এসেছিলেন, তেমনিভাবে হযরত আয়েশা (রাঃ)-কেও বুঝিয়েছিলেন। তাতে এও রয়েছে যে, যে গোলামটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে পাহারা দিচ্ছিল তার নাম ছিল আবূ রিবাহ (রাঃ)। তাতে এও আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আপনার স্ত্রীদের ব্যাপারে এতো চিন্তিত হচ্ছেন কেন? যদি আপনি তাদেরকে তালাকও দিয়ে দেন তবে আপনার সাথে রয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতামণ্ডলী, হযরত জিবরাঈল (আঃ), হযরত মীকাঈল (আঃ), আমি, হযরত আবূ বকর (রাঃ) এবং সমস্ত মু'মিন।” হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলারই সমস্ত প্রশংসা, আমি এই প্রকারের কথা যে বলছিলাম, আমি আশা করছিলাম যে, আমার কথার সত্যতায় তিনি আয়াত নাযিল করবেন। হলোও তাই। আল্লাহ তা’আলা (আরবি) এই আয়াত এবং (আরবি) এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। যখন আমি জানতে পারলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর স্ত্রীদেরকে তালাক দেননি তখন আমি মসজিদে গিয়ে দরজার উপর দাঁড়িয়ে উচ্চ শব্দে সকলকে জানিয়ে দিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর পবিত্র স্ত্রীদেরকে তালাক দেননি। এ ব্যাপারেই আল্লাহ তা'আলা ... (আরবি)-এই আয়াতটি নাযিল করেন। অর্থাৎ “যখন তাদের কাছে কোন নিরাপত্তা বা ভয়ের খবর পৌঁছে তখন তারা তা প্রচার করতে শুরু করে দেয়। যদি তারা এই খবর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অথবা জ্ঞানী ও বিদ্বান মুসলমানদের নিকট পৌঁছিয়ে দিতো তবে নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে যারা তাহকীককারী তারা ওটা বুঝতে পারতো।” হযরত উমার (রাঃ) আয়াতটি এই পর্যন্ত পাঠ করে বলেনঃ এই বিষয়ের তাহকীককারীদের মধ্যে আমিও একজন।” আরো বহু বুযুর্গ মুফাসসির হতে বর্ণিত আছে যে, দ্বারা হযরত আবূ বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ হযরত উসমানেরও (রাঃ) নাম উল্লেখ করেছেন এবং কেউ কেউ আবার হযরত আলী (রাঃ)-এর নামও নিয়েছেন। একটি দুর্বল হাদীসে মারফূ’’রূপে শুধু হযরত আলী (রাঃ)-এর নাম রয়েছে। কিন্তু এর সনদ দুর্বল এবং সম্পূর্ণরূপে মুনকার। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে মর্যাদাবোধ জেগে উঠেছিল। আমি তখন তাদেরকে বললামঃ যদি নবী (সঃ) তোমাদেরকে পরিত্যাগ করেন তবে তার প্রতিপালক সম্ভবতঃ তাকে দিবেন তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর স্ত্রী। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং আমার ভাষাতেই আল্লাহ পাক তা নাযিল করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এটা পূর্বেই গত হয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বহু ব্যাপারে কুরআনের আনুকূল্য করেছেন। যেমন পর্দার ব্যাপারে, বদর যুদ্ধের বন্দীদের ব্যাপারে এবং মাকামে ইবরাহীমকে কিবলাহ নির্ধারণ করার ব্যাপারে। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন উম্মাহাতুল মু'মিনীন ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মধ্যে মন কষাকষির খবর পেলাম তখন আমি তাদের কাছে গেলাম এবং তাদেরকে বললামঃ তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আপোষ করে নাও, অন্যথায় তিনি যদি তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন তবে তাঁর প্রতিপালক সম্ভবতঃ তাকে তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর স্ত্রী দান করবেন। অবশেষে আমি উম্মাহাতুল মু'মিনীনের শেষ জনের কাছে গেলাম। তখন সে বললোঃ “হে উমার (রাঃ)! আমাদেরকে উপদেশ দানের জন্যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি যথেষ্ট নন যে, আপনি আমাদেরকে উপদেশ দিতে আসলেন?" আমি তখন নীরব হয়ে গেলাম। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা ...- (আরবি) এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন।” (এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ) সহীহ বুখারীর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যে স্ত্রীটি হযরত উমার (রাঃ)-কে এই উত্তর দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি সম্পর্কে তিনি বলেনঃ “ঘটনা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-এর ঘরে ছিলেন। যখন হাফসা (রাঃ) দেখেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মারিয়াহ (রাঃ)-এর সাথে মশগুল রয়েছেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি এ খবর হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জানাবে না। আমি তোমাকে একটি সুসংবাদ দিচ্ছি। তা এই যে, আমার ইন্তেকালের পর আমার খিলাফত হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর পর তোমার আব্বা লাভ করবেন। কিন্তু হযরত হাফসা (রাঃ) এ খবর হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জানিয়ে দেন। তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ খবর আপনার কাছে কে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমাকে অবহিত করেছেন তিনি যিনি সর্বজ্ঞ, সম্যক অবগত।” হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন বলেনঃ “আমি আপনার দিকে তাকাবো যে পর্যন্ত না আপনি মারিয়াহ (রাঃ)-কে আপনার উপর হারাম করবেন।” তখন তিনি হযরত মারিয়াহ (রাঃ)-কে নিজের উপর হারাম করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা .. (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তিবরানী (রঃ)](আরবি)-এর একটি তাফসীর তো এই যে, তারা হবে রোযা পালনকারিণী। একটি মারফূ’ হাদীসেও এই শব্দের এই তাফসীরই এসেছে যে হাদীসটি সূরায়ে বারাআতের এই শব্দের তাফসীরে গত হয়েছে যে, এই উম্মতের সিয়াহাত হলো রোযা রাখা। দ্বিতীয় তাফসীর এই যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হিজরতকারিণীগণ। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী উত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তাদের মধ্যে কেউ হবে অকুমারী এবং কেউ হবে কুমারী। যাতে মন খুশী থাকে।মু’জামে তিবরানীতে রয়েছে যে, ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতে স্বীয় নবী (সঃ)-কে যে ওয়াদা দিয়েছেন তাতে বেওয়া বা অকুমারী দ্বারা হযরত আসিয়া (রাঃ) কে বুঝানো হয়েছে যিনি ফিরাউনের স্ত্রী ছিলেন এবং কুমারী দ্বারা হযরত মরিয়ম (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে যিনি হযরত ইমরানের কন্যা ছিলেন। হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। ঐ সময় হযরত খাদীজাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসেন। তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত খাদীজাহ (রাঃ)-কে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন, তাঁকে সুসংবাদ দেয়া হচ্ছে জান্নাতের একটি ঘরের, যেখানে না আছে গরম এবং না আছে কোন কষ্ট, আর না আছে কোন শোরগোল। যা ছিদ্রকৃত মুক্তা দ্বারা নির্মিত। যার ডানে-বামে মরিয়ম বিনতু ইমরান (রাঃ) এবং আসিয়া বিনতু মাযাহেম (রাঃ)-এর ঘর রয়েছে। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, হযরত খাদীজাহ (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে খাদীজাহ (রাঃ)! তোমার সতীনদেরকে আমার সালাম জানিয়ে দিবে।” হযরত খাদীজাহ (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পূর্বেও কি আপনি কাউকেও বিয়ে করেছিলেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা মরিয়ম বিনতু ইমরান (রাঃ), ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ) এবং মূসা (আঃ)-এর বোন কুলসুম (রাঃ) এই তিনজনকে আমার নিকাহতে দিয়ে রেখেছেন।” (এ হাদীসটি দুর্বল) হযরত আবূ উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেছেনঃ “তুমি কি জান যে, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আমার বিবাহ ইমরানের কন্যা মরিয়ম (রাঃ), মূসা (আঃ)-এর ভগ্নী কুলসুম (রাঃ), এবং ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়ার (রাঃ) সাথে দিয়ে রেখেছেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে মুবারকবাদ।” (এ হাদীসটি আবূ ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটাও দুর্বল হাদীস এবং সাথে সাথে মুরসালও বটে)

আত-তাহরীম 66:3

১-৫ নং আয়াতের তাফসীর এই সূরাটির প্রাথমিক আয়াতগুলোর শানে নুযূলের ব্যাপারে সুফাসসিরদের উক্তি নিম্নরূপঃ কেউ কেউ বলেন যে, এটা হযরত মারিয়াহ্ (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিজের উপর হারাম করে নিয়েছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে এই রিওয়াইয়াতটি বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-এর কথার পরিপ্রেক্ষিতে এটা ঘটেছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এক দাসী সম্পর্কে এ কথা বলেছিলেন। ফলে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর কোন এক স্ত্রীর ঘরে উম্মে ইবরাহীম (রাঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলেছিলেন। তখন তাঁর ঐ স্ত্রী তাঁকে বলেনঃ “তোমার ঘরে ও আমার বিছানায় এ কাজ কারবার?” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাকে আমার উপর হারাম করে নিলাম।” তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হালাল কিভাবে আপনার উপর হারাম হয়ে যাবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “আমি শপথ করছি যে, এখন হতে তার সাথে কোন প্রকারের কথাবার্তা বলবো না।” ঐ সময় এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত যায়েদ (রঃ) বলেনঃ এর দ্বারা জানা গেল যে, তুমি আমার উপর হারাম’ এ কথা কেউ বললে তা বাজে বলে প্রমাণিত হবে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছিলেনঃ “তুমি আমার উপর হারাম। আল্লাহর কসম! আমি তোমার সাহচর্যে থাকবো না।”হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন যে, হারাম করার ব্যাপারে তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা হয় এবং তাঁকে তাঁর কসমের কাফফারা আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়। তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ দু’জন স্ত্রী কে ছিলেন?” উত্তরে হযরত উমার বলেনঃ “তারা হলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। উম্মে ইবরাহীম কিবতিয়্যাহ (রাঃ)-কে কেন্দ্র করেই ঘটনাটির সূত্রপাত হয়। হযরত হাফসা (রাঃ)-এর ঘরে তাঁর পালার দিনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত মারিয়াহ্ কিবতিয়্যাহ্ (রাঃ)-এর সাথে মিলিত হন। এতে হযরত হাফসা (রাঃ) দুঃখিতা হন যে, তাঁর পালার দিনে তাঁরই ঘরে ও তাঁরই বিছানায় তিনি মারিয়াহ্ (রাঃ)-এর সাথে মিলিত হলেন! রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বলে ফেলেনঃ “আমি তাকে আমার উপর হারাম করে নিলাম। তুমি এই ঘটনা কারো কাছে বর্ণনা করো না।” এতদসত্ত্বেও হযরত হাফসা (রাঃ) ঘটনাটি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সামনে প্রকাশ করে দেন। আল্লাহ্ তা'আলা এই খবর স্বীয় নবী (সঃ)-কে জানিয়ে দেন এবং এই আয়াতগুলো নাযিল করেন। নবী (সঃ) কাফফারা আদায় করে স্বীয় কসম ভেঙ্গে দেন এবং ঐ দাসীর সঙ্গে মিলিত হন। এই ঘটনাটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই ফতওয়া দেন যে, কেউ যদি বলেঃ “আমি অমুক জিনিস আমার উপর হারাম করে নিলাম” তবে তার উচিত কসম ভেঙ্গে দিয়ে কাফফারা আদায় করা। একটি লোক তাঁকে এই মাসআলা জিজ্ঞেস করে যে, সে তার স্ত্রীকে নিজের উপর হারাম করে নিয়েছে।তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তোমার স্ত্রী তোমার উপর হারাম নয় (তুমি কাফফারা আদায় করে কসম ভেঙ্গে দাও)।” সবচেয়ে কঠিন কাফফারা তো হলো আল্লাহ্‌ পথে গোলাম আযাদ করা। ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং বহু ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদের ফতওয়া এই যে, যে ব্যক্তি তার স্ত্রী, দাসী অথবা খাওয়া পরার কোন জিনিসকে নিজের উপর হারাম করে নেয়, তার উপর কাফফারা ওয়াজিব হয়ে যায়। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, শুধু স্ত্রী বা দাসীকে নিজের উপর হারাম করে নিলে কাফফারা ওয়াজিব হয়, অন্য কোন জিনিস নিজের উপর হারাম করে নিলে কাফফারা ওয়াজিব হয় না। যদি হারাম করা দ্বারা তালাকের নিয়ত করে তবে অবশ্যই তালাক হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে দাসীকে হারাম করার কথা দ্বারা যদি আযাদ করে দেয়ার নিয়ত করে তবে ঐ দাসী অবশ্যই আযাদ হয়ে যাবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত ঐ নারীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যিনি স্বীয় নফসকে নবী (সঃ)-এর নিকট হিবা বা দান করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এটা গারীব উক্তি। সম্পূর্ণ সঠিক কথা এই যে, এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিজের উপর মধুকে হারাম করে নেয়া।সহীহ্ বুখারীতে এই আয়াতের ক্ষেত্রে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত যায়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ)-এর ঘরে মধু পান করতেন এবং এই কারণে তিনি তার ঘরে কিছুক্ষণ বিলম্ব করতেন। এই জন্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ) পরস্পর পরামর্শ করেন যে, তাঁদের মধ্যে যাঁরই কাছে নবী (সঃ) আসবেন তিনি যেন তাকে বলেনঃ “আপনার মুখ হতে মাগাফীরের (গেঁদ বা আঠা জাতীয় জিনিস যাতে দুর্গন্ধ রয়েছে) গন্ধ আসছে, সম্ভবতঃ আপনি মাগাফীর খেয়েছেন!” সুতরাং তারা এ কথাই বলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আমি যায়নাব (রাঃ)-এর ঘরে মধু পান করেছি। এখন আমি শপথ করছি যে, আর কখনো আমি মধু পান করবো না। সুতরাং তোমরা এ কথা কাউকেও বলবে না।” ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটিকে কিতাবুল ঈমান ওয়ান নুযূর-এর মধ্যেও কিছু বৃদ্ধি সহকারে আনয়ন করেছেন। তাতে রয়েছে যে, এখানে দু'জন স্ত্রী দ্বারা হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। আর চুপে-চুপে কথা বলা দ্বারা বুঝানো হয়েছে ‘আমি মধু পান করেছি' এই উক্তিটি। তিনি কিতাবুত তালাকের মধ্যে এ হাদীসটি আনয়ন করে বলেন যে, মাগাফীর হলো গঁদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত একটি জিনিস যা ঘাসে জন্মে থাকে এবং তাতে কিছুটা মিষ্টতা রয়েছে।কিতাবুত তালাকে এ হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এই শব্দে বা ভাষায় বর্ণিত আছেঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মিষ্টি ও মধু খুব ভালবাসতেন। আসরের নামাযের পর তিনি তাঁর স্ত্রীদের নিকট যেতেন এবং কাউকেও নিকটে করে নিতেন। একদা তিনি হযরত হাফসা (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং অন্যান্য দিন তাঁর কাছে যতক্ষণ অবস্থান করতেন, সেই দিন তদপেক্ষা বেশীক্ষণ অবস্থান করেন। এতে আমার মনে নিজের মর্যাদাবোধ জেগে উঠলো। তত্ত্ব নিয়ে জানলাম যে, তাঁর কওমের একটি স্ত্রীলোক এক মশক মধু তার কাছে উপঢৌকন স্বরূপ পাঠিয়েছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে ঐ মধুর শরবত পান করিয়েছেন। আর এই কারণেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর ঘরে এতোটা বিলম্ব করেছেন। আমি মনে মনে বললাম যে, ঠিক আছে, কৌশল করে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা হতে ফিরিয়ে দিব। সুতরাং আমি হযরত সাওদাহ্ বিনতু যামআহ্ (রাঃ)-কে বললামঃ তোমার ঘরে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসবেন এবং তোমার নিকটবর্তী হবেন তখন তুমি তাকে বলবেঃ “আজ কি আপনি মাগাফীর খেয়েছেন?” তিনি জবাবে বলবেনঃ “না।” তখন তুমি বলবেঃ তাহলে এই গন্ধ কিসের?” তিনি। তখন বলবেনঃ “হাফসা (রাঃ) মধু পান করিয়েছেন।” তুমি তখন বলবেঃ “সম্ভবতঃ মৌমাছি ‘আরফাত’ নামক কণ্ঠকযুক্ত গাছ হতে মধু আহরণ করেছে।” আমার কাছে যখন আসবেন তখন আমিও তাই বলবো। হে সফিয়া (রাঃ)! তোমার কাছে যখন আসবেন তখন তুমিও তাই বলবে।” হযরত সাওদাহ (রাঃ) বলেনঃ “যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার ঘরে আসলেন, তখন তিনি দরজার উপরই ছিলেন, তখন আমি ইচ্ছা করলাম যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) আমাকে যা বলতে বলেছেন তাই বলে দিই, কেননা, আমি তাকে খুবই ভয় করতাম। কিন্তু ঐ সময় আমি নীরব থাকলাম। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার কাছে আসলেন তখন আমি ঐ কথাই বলে দিলাম। তারপর তিনি হযরত সফিয়া (রাঃ)-এর নিকট গেলে তিনিও ঐ কথাই বলেন। এরপর হযরত হাফসা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে মধু পান করাতে চাইলে তিনি বলেনঃ “আমার এর প্রয়োজন নেই।” হযরত সাওদা (রাঃ) তখন বলতে লাগলেনঃ “আফসোস! আমরা এটাকে হারাম করিয়ে দিলাম!” আমি (আয়েশা রাঃ) বললামঃ চুপ থাকো। সহীহ মুসলিমে এটুকু বেশী রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুর্গন্ধকে খুবই ঘৃণা করতেন। এজন্যেই ঐ স্ত্রীগণ বলেছিলেনঃ “আপনি মাগাফীর খেয়েছেন কি?” কেননা, মাগাফীরেও কিছুটা দুর্গন্ধ রয়েছে। যখন তিনি উত্তর দিলেন যে, না, তিনি মাগাফীর খাননি। বরং মধু খেয়েছেন, তখন তাঁরা বললেনঃ “তাহলে মৌমাছি ‘আরফাত' গাছ হতে মধু আহরণ করে থাকবে, যার গাঁদের নাম হলো, মাগাফীর এবং ওরই ক্রিয়ার প্রভাবে এই মধুতে মাগাফীরের গন্ধ রয়েছে। এই রিওয়াইয়াতে (আরবি) শব্দ রয়েছে, জাওহারী (রঃ) যার অর্থ করেছেন (আরবি) অর্থাৎ খেয়েছে। মৌমাছিকেও (আরবি) বলা হয় এবং (আরবি) হালকা শব্দকে বলা হয়। পাখী যখন চঞ্চু দ্বারা কোন খাদ্য খায় তখন তার চঞ্চুর শব্দ শোনা যায়, ঐ সময় আরবরা বলেঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি পাখীর চঞ্চুর শব্দ শুনেছি।” একটি হাদীসে রয়েছেঃ “জান্নাতীরা পাখীর হালকা ও মিষ্টি শব্দ শুনতে পাবে।” এখানেও আরবী (আরবি) শব্দ রয়েছে। আসমাঈ' (রঃ) যিনি হযরত শু'বা (রাঃ) -এর মজলিসে ছিলেন, বলেন যে, হযরত শু’বা (আরবি) শব্দটি (আরবি) অর্থাৎ দ্বারা পড়েন। তখন হযরত আসমাঈ’ (রঃ) বলেন যে, ওটা (আরবি) দ্বারা হবে। তখন হযরত শুবা (রঃ) তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “এ ব্যক্তি এটা আমার চেয়ে বেশী জানেন। এটাই সঠিক হবে। তোমরা এটা সংশোধন করে নাও।” এ ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। মোটকথা, মধু পান করানোর ঘটনায় দু’টি নাম বর্ণিত আছে। একটি হযরত হাফসা (রাঃ)-এর নাম এবং অপরটি হযরত যায়নাব (রাঃ)-এর নাম। এই ব্যাপারে যারা একমত হয়েছিলেন তাঁরা হলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। তাহলে খুব সম্ভব ঘটনা দু'টো হবে। তবে এই দুজনের ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।পরস্পর এই প্রকারের পরামর্শ গ্রহণকারিণী ছিলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। এটা এ হাদীস দ্বারাও জানা যাচ্ছে যা মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি (হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ) বলেনঃ বহু দিন হতে আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, ……(আরবি)–এ আয়াতের মধ্যে যে দু’জন স্ত্রীর বর্ণনা রয়েছে তাঁদের নাম হযরত উমার (রাঃ)-এর কাছে জেনে নিবো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর এই খলীফা যখন হজ্বের সফরে বের হলেন তখন আমিও তার সাথে বের হলাম। পথে এক জায়গায় খলীফা উমার (রাঃ) রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের দিকে চললেন। আমি তখন পানির পাত্র নিয়ে তার পিছনে পিছনে গেলাম। তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূর্ণ করে ফিরে আসলেন। আমি পানি ঢেলে ঢেলে তাঁকে অযু করালাম। সুযোগ পেয়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আমীরুল মু'মিনীন! ……… (আরবি) এই আয়াতে যে দুই জনকে সম্বোধন করা হয়েছে তাঁরা কারা? তিনি জবাবে বললেনঃ “হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! এটা বড়ই আফসোসের বিষয়!” যুহরী (রঃ) বলেন যে, হযরত উমার (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর এ প্রশ্ন করাকে অপছন্দ করলেন। কিন্তু ওটা গোপন করা বৈধ ছিল না বলে তিনি উত্তর দেনঃ “এর দ্বারা হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে।” অতঃপর হযরত উমার (রাঃ) ঘটনাটি বর্ণনা করতে শুরু করেন। তিনি বলেনঃ “আমরা কুরায়েশরা আমাদের নারীদেরকে আমাদের আওতাধীনে রাখতাম। কিন্তু মদীনাবাসীদের উপর তাদের নারীরা আধিপত্য করতো। যখন আমরা হিজরত করে মদীনায় আসলাম তখন আমাদের নারীরাও তাদের দেখাদেখি। আমাদের উপর প্রাধান্য লাভের ইচ্ছা করে। আমি মদীনা শরীফের উপরের অংশে হযরত উমাইয়া ইবনে যায়েদের বাড়ীতে অবস্থান করতাম। একদা আমি আমার স্ত্রীর উপর অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে কিছু বলতে লাগলাম। তখন সে উল্টিয়ে আমাকেও জবাব দিতে শুরু করলো। তার এই আচরণ আমার নিকট খুবই খারাপ বোধ হলো। আমি মনে মনে বললামঃ এই ধরনের নতুন আচরণ কেন? আমাকে বিস্মিত হতে দেখে সে বললোঃ “আপনি কি চিন্তা করছেন? আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরাও তাকে জবাব দিয়ে থাকে। কোন কোন সময় তো তারা সারা দিন ধরে তাঁর সাথে কথাবার্তা বলাও বন্ধ রাখে।” তার এই কথা শুনে আমি অন্য এক সমস্যায় পড়লাম। সরাসরি আমি আমার কন্যা হাফসা (রাঃ)-এর বাড়ীতে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তোমরা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জবাব দিয়ে থাকো এবং মাঝে মাঝে সারা দিন তার সাথে কথাবার্তা বলা বন্ধ রাখো এটা কি সত্য? সে উত্তরে বললোঃ “হ্যাঁ, এটা সত্য বটে।” আমি তখন বললামঃ যারা এরূপ করে তারা ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তোমরা কি ভুলে যাচ্ছ যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর অসন্তুষ্টির কারণে এরূপ নারীর উপর স্বয়ং আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন? সাবধান! আগামীতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জবাব দিবে না এবং তাঁর কাছে কিছুই চাইবে না। কিছু চাইতে হলে আমার কাছেই চাইবে। আয়েশা (রাঃ)-কে দেখে তুমি তার প্রতি লোভ বা হিংসা করবে না। সে তোমার চেয়ে ভাল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট অধিকতর প্রিয়। হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! আমার প্রতিবেশী একজন আনসারী ছিলেন। আমরা উভয়ে পালা ভাগ করে নিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর খিদমতে আমি একদিন হাযির হতাম এবং একদিন তিনি হাযির হতেন। আমি আমার পালার দিনের সমস্ত হাদীস, আয়াত ইত্যাদি শুনে তাঁকে এসে শুনাতাম এবং তিনি তার পালার দিন সবকিছু আমাকে এসে শুনাতেন। আমাদের মধ্যে এ কথাটি ঐ সময় মশহর হয়ে গিয়েছিল যে, গাসসানী বাদশাহ্ আমাদের উপর আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। একদা আমার সঙ্গী তাঁর পালার দিনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে গিয়েছিলেন! ইশার সময় এসে তিনি আমার দরজার উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডাক দিতে লাগলেন। আমি উদ্বেগের সাথে বের হয়ে বললামঃ খবর ভাল তো? তিনি উত্তরে বললেনঃ “আজ তো একটা কঠিন ব্যাপার ঘটে গেছে।” আমি বললামঃ গাস্‌সানী বাদশাহ কি পৌঁছে গেছে? তিনি জবাবে বললেনঃ “এর চেয়েও কঠিন সমস্যা দেখা দিয়েছে।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ কি হয়েছে, বলুন না? তিনি বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়েছেন।” আমি তখন বললামঃ আফসোস! হাফসা (রাঃ) তো ধ্বংস হয়ে গেল! আমি পূর্ব হতেই এটার আশংকা করছিলাম। ফজরের নামায পড়েই কাপড়-চোপড় পরে আমি সরাসরি হাফসা (রাঃ)-এর বাড়ীতে হাযির হলাম। দেখলাম যে, সে কাঁদছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কি তোমাদেরকে তালাক দিয়ে ফেলেছেন? সে জবাব দিলোঃ “এ খবর তো বলতে পারছি না। তবে তিনি আমাদের হতে পৃথক হয়ে নিজের কক্ষে অবস্থান করছেন। আমি সেখানে গেলাম। দেখি যে, একজন হাবশী গোলাম পাহারা দিচ্ছে। আমি তাকে বললামঃ যাও, আমার জন্যে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা কর। সে গেল এবং ফিরে এসে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কোন উত্তর দিলেন না।” আমি তখন সেখান হতে ফিরে এসে মসজিদে গেলাম। দেখলাম যে, মিম্বরের পাশে সাহাবীদের একটি দল বসে রয়েছেন এবং কারো কারো চক্ষু দিয়ে তো অশ্রু ঝরছে! আমি অল্পক্ষণ সেখানে বসে থাকলাম। কিন্তু আমার মনে শান্তি কোথায়? আবার উঠে দাঁড়ালাম এবং ঐ গোলামের কাছে গিয়ে অনুমতি চাইতে বললাম। গোলাম এবারও এসে খবর দিলো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন উত্তর দেননি। আবার আমি মসজিদে চলে গেলাম। সেখান হতে আবার ফিরে আসলাম এবং পুনরায় গোলামকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইতে বললাম। গোলাম আবার গেল এবং ঐ একই জবাব দিলো। আমি ফিরে যাচ্ছিলাম এমন সময় গোলাম আমাকে ডাক দিলো এবং বললোঃ “আপনাকে অনুমতি দেয়া হয়েছে।” আমি প্রবেশ করে দেখলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বস্তার উপর হেলান লাগিয়ে বসে আছেন। যার দাগ তার দেহ মুবারকে পড়ে গেছে। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি আপনার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে ফেলেছেন? তিনি মাথা উঠিয়ে আমার দিকে চেয়ে বললেনঃ “না।” আমি বললামঃ আল্লাহু আকবার! হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কথা এই যে, আমরা কুরায়েশরা আমাদের স্ত্রীদেরকে আমাদের আজ্ঞাধীনে রাখতাম। কিন্তু মদীনাবাসীদের উপর তাদের স্ত্রীরা প্রাধান্য লাভ করে আছে। এখানে এসে আমাদের স্ত্রীরাও তাদের দেখাদেখি তাদেরই আচরণ গ্রহণ করে নিয়েছে। তারপর আমি আমার স্ত্রীর ঘটনাটিও বর্ণনা করলাম এবং তার একথাটিও বর্ণনা করলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরাও এরূপ করে থাকেন। তারপর আমি আমার একথাটিও বর্ণনা করলাম যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর অসন্তুষ্টির কারণে আল্লাহ যে অসন্তুষ্ট হয়ে যাবেন এবং এর ফলে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে এ ভয় কি তাদের নেই? আমার কথা শুনে তিনি মুচকি হাসলেন। তারপর আমি আমার হাফসা (রাঃ)-এর কাছে যাওয়া, তাকে আয়েশা (রাঃ)-এর প্রতি হিংসা পোষণ না করার উপদেশ দেয়ার কথা বর্ণনা করলাম। এবারও তিনি মুচকি হাসলেন। এরপর আমি বললামঃ অনুমতি হলে আরো কিছুক্ষণ আপনার এখানে অবস্থান করতাম। তিনি অনুমতি দিলে আমি বসে পড়লাম। অতঃপর আমি মাথা উঠিয়ে ঘরের চতুর্দিকে লক্ষ্য করে দেখি যে, তিনটি শুষ্ক চামড়া ছাড়া আর কিছুই নেই। তাঁর খাস দরবারের এ অবস্থা দেখে আমার খুবই দুঃখ হলো। আমি আরয করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দু'আ করুন যেন আল্লাহ তা'আলা আপনার উম্মতের উপর প্রশস্ততা দান করেন। দেখুন তো পারসিক ও রোমকরা আল্লাহর ইবাদত করে না, অথচ তারা দুনিয়ার কত বেশী নিয়ামতের মধ্যে ডুবে রয়েছে? আমার একথা শোনা মাত্রই তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং বলতে লাগলেনঃ “হে খাত্তাবের পুত্র! তুমি তো, সন্দেহের মধ্যে এখনো রয়ে গেছে। এই কওমের জন্যে দুনিয়ার এই নিয়ামতরাশি কল্যাণকর নয়। তাদেরকে এগুলো তাড়াতাড়ি করে দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হয়েছে।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন!ব্যাপারটা ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্ত্রীদের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণে শপথ করেছিলেন যে, এক মাসকাল তিনি তাদের সাথে মিলিত হবেন না। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তাম্বীহ করেন।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, জামে তিরমিযী এবং সুনানে নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “বছর ধরে আমি এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম যে, হযরত উমার (রাঃ)-কে এই দুইজন স্ত্রীর নাম জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ)-এর অত্যন্ত প্রভাবের কারণে তাঁকে জিজ্ঞেস করার সাহস হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত হজ্ব পালন করে প্রত্যাবর্তনের পথে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।” তারপর তিনি পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন যা উপরে বর্ণিত হলো।সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, তালাকের প্রসিদ্ধির ঘটনাটি পর্দার আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে ঘটেছিল। তাতে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) যেমন হযরত হাফসা (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে তাকে বুঝিয়ে এসেছিলেন, তেমনিভাবে হযরত আয়েশা (রাঃ)-কেও বুঝিয়েছিলেন। তাতে এও রয়েছে যে, যে গোলামটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে পাহারা দিচ্ছিল তার নাম ছিল আবূ রিবাহ (রাঃ)। তাতে এও আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আপনার স্ত্রীদের ব্যাপারে এতো চিন্তিত হচ্ছেন কেন? যদি আপনি তাদেরকে তালাকও দিয়ে দেন তবে আপনার সাথে রয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতামণ্ডলী, হযরত জিবরাঈল (আঃ), হযরত মীকাঈল (আঃ), আমি, হযরত আবূ বকর (রাঃ) এবং সমস্ত মু'মিন।” হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলারই সমস্ত প্রশংসা, আমি এই প্রকারের কথা যে বলছিলাম, আমি আশা করছিলাম যে, আমার কথার সত্যতায় তিনি আয়াত নাযিল করবেন। হলোও তাই। আল্লাহ তা’আলা (আরবি) এই আয়াত এবং (আরবি) এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। যখন আমি জানতে পারলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর স্ত্রীদেরকে তালাক দেননি তখন আমি মসজিদে গিয়ে দরজার উপর দাঁড়িয়ে উচ্চ শব্দে সকলকে জানিয়ে দিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর পবিত্র স্ত্রীদেরকে তালাক দেননি। এ ব্যাপারেই আল্লাহ তা'আলা ... (আরবি)-এই আয়াতটি নাযিল করেন। অর্থাৎ “যখন তাদের কাছে কোন নিরাপত্তা বা ভয়ের খবর পৌঁছে তখন তারা তা প্রচার করতে শুরু করে দেয়। যদি তারা এই খবর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অথবা জ্ঞানী ও বিদ্বান মুসলমানদের নিকট পৌঁছিয়ে দিতো তবে নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে যারা তাহকীককারী তারা ওটা বুঝতে পারতো।” হযরত উমার (রাঃ) আয়াতটি এই পর্যন্ত পাঠ করে বলেনঃ এই বিষয়ের তাহকীককারীদের মধ্যে আমিও একজন।” আরো বহু বুযুর্গ মুফাসসির হতে বর্ণিত আছে যে, দ্বারা হযরত আবূ বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ হযরত উসমানেরও (রাঃ) নাম উল্লেখ করেছেন এবং কেউ কেউ আবার হযরত আলী (রাঃ)-এর নামও নিয়েছেন। একটি দুর্বল হাদীসে মারফূ’’রূপে শুধু হযরত আলী (রাঃ)-এর নাম রয়েছে। কিন্তু এর সনদ দুর্বল এবং সম্পূর্ণরূপে মুনকার। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে মর্যাদাবোধ জেগে উঠেছিল। আমি তখন তাদেরকে বললামঃ যদি নবী (সঃ) তোমাদেরকে পরিত্যাগ করেন তবে তার প্রতিপালক সম্ভবতঃ তাকে দিবেন তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর স্ত্রী। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং আমার ভাষাতেই আল্লাহ পাক তা নাযিল করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এটা পূর্বেই গত হয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বহু ব্যাপারে কুরআনের আনুকূল্য করেছেন। যেমন পর্দার ব্যাপারে, বদর যুদ্ধের বন্দীদের ব্যাপারে এবং মাকামে ইবরাহীমকে কিবলাহ নির্ধারণ করার ব্যাপারে। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন উম্মাহাতুল মু'মিনীন ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মধ্যে মন কষাকষির খবর পেলাম তখন আমি তাদের কাছে গেলাম এবং তাদেরকে বললামঃ তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আপোষ করে নাও, অন্যথায় তিনি যদি তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন তবে তাঁর প্রতিপালক সম্ভবতঃ তাকে তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর স্ত্রী দান করবেন। অবশেষে আমি উম্মাহাতুল মু'মিনীনের শেষ জনের কাছে গেলাম। তখন সে বললোঃ “হে উমার (রাঃ)! আমাদেরকে উপদেশ দানের জন্যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি যথেষ্ট নন যে, আপনি আমাদেরকে উপদেশ দিতে আসলেন?" আমি তখন নীরব হয়ে গেলাম। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা ...- (আরবি) এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন।” (এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ) সহীহ বুখারীর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যে স্ত্রীটি হযরত উমার (রাঃ)-কে এই উত্তর দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি সম্পর্কে তিনি বলেনঃ “ঘটনা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-এর ঘরে ছিলেন। যখন হাফসা (রাঃ) দেখেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মারিয়াহ (রাঃ)-এর সাথে মশগুল রয়েছেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি এ খবর হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জানাবে না। আমি তোমাকে একটি সুসংবাদ দিচ্ছি। তা এই যে, আমার ইন্তেকালের পর আমার খিলাফত হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর পর তোমার আব্বা লাভ করবেন। কিন্তু হযরত হাফসা (রাঃ) এ খবর হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জানিয়ে দেন। তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ খবর আপনার কাছে কে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমাকে অবহিত করেছেন তিনি যিনি সর্বজ্ঞ, সম্যক অবগত।” হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন বলেনঃ “আমি আপনার দিকে তাকাবো যে পর্যন্ত না আপনি মারিয়াহ (রাঃ)-কে আপনার উপর হারাম করবেন।” তখন তিনি হযরত মারিয়াহ (রাঃ)-কে নিজের উপর হারাম করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা .. (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তিবরানী (রঃ)](আরবি)-এর একটি তাফসীর তো এই যে, তারা হবে রোযা পালনকারিণী। একটি মারফূ’ হাদীসেও এই শব্দের এই তাফসীরই এসেছে যে হাদীসটি সূরায়ে বারাআতের এই শব্দের তাফসীরে গত হয়েছে যে, এই উম্মতের সিয়াহাত হলো রোযা রাখা। দ্বিতীয় তাফসীর এই যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হিজরতকারিণীগণ। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী উত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তাদের মধ্যে কেউ হবে অকুমারী এবং কেউ হবে কুমারী। যাতে মন খুশী থাকে।মু’জামে তিবরানীতে রয়েছে যে, ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতে স্বীয় নবী (সঃ)-কে যে ওয়াদা দিয়েছেন তাতে বেওয়া বা অকুমারী দ্বারা হযরত আসিয়া (রাঃ) কে বুঝানো হয়েছে যিনি ফিরাউনের স্ত্রী ছিলেন এবং কুমারী দ্বারা হযরত মরিয়ম (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে যিনি হযরত ইমরানের কন্যা ছিলেন। হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। ঐ সময় হযরত খাদীজাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসেন। তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত খাদীজাহ (রাঃ)-কে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন, তাঁকে সুসংবাদ দেয়া হচ্ছে জান্নাতের একটি ঘরের, যেখানে না আছে গরম এবং না আছে কোন কষ্ট, আর না আছে কোন শোরগোল। যা ছিদ্রকৃত মুক্তা দ্বারা নির্মিত। যার ডানে-বামে মরিয়ম বিনতু ইমরান (রাঃ) এবং আসিয়া বিনতু মাযাহেম (রাঃ)-এর ঘর রয়েছে। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, হযরত খাদীজাহ (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে খাদীজাহ (রাঃ)! তোমার সতীনদেরকে আমার সালাম জানিয়ে দিবে।” হযরত খাদীজাহ (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পূর্বেও কি আপনি কাউকেও বিয়ে করেছিলেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা মরিয়ম বিনতু ইমরান (রাঃ), ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ) এবং মূসা (আঃ)-এর বোন কুলসুম (রাঃ) এই তিনজনকে আমার নিকাহতে দিয়ে রেখেছেন।” (এ হাদীসটি দুর্বল) হযরত আবূ উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেছেনঃ “তুমি কি জান যে, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আমার বিবাহ ইমরানের কন্যা মরিয়ম (রাঃ), মূসা (আঃ)-এর ভগ্নী কুলসুম (রাঃ), এবং ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়ার (রাঃ) সাথে দিয়ে রেখেছেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে মুবারকবাদ।” (এ হাদীসটি আবূ ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটাও দুর্বল হাদীস এবং সাথে সাথে মুরসালও বটে)

আত-তাহরীম 66:4

১-৫ নং আয়াতের তাফসীর এই সূরাটির প্রাথমিক আয়াতগুলোর শানে নুযূলের ব্যাপারে সুফাসসিরদের উক্তি নিম্নরূপঃ কেউ কেউ বলেন যে, এটা হযরত মারিয়াহ্ (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিজের উপর হারাম করে নিয়েছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে এই রিওয়াইয়াতটি বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-এর কথার পরিপ্রেক্ষিতে এটা ঘটেছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এক দাসী সম্পর্কে এ কথা বলেছিলেন। ফলে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর কোন এক স্ত্রীর ঘরে উম্মে ইবরাহীম (রাঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলেছিলেন। তখন তাঁর ঐ স্ত্রী তাঁকে বলেনঃ “তোমার ঘরে ও আমার বিছানায় এ কাজ কারবার?” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাকে আমার উপর হারাম করে নিলাম।” তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হালাল কিভাবে আপনার উপর হারাম হয়ে যাবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “আমি শপথ করছি যে, এখন হতে তার সাথে কোন প্রকারের কথাবার্তা বলবো না।” ঐ সময় এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত যায়েদ (রঃ) বলেনঃ এর দ্বারা জানা গেল যে, তুমি আমার উপর হারাম’ এ কথা কেউ বললে তা বাজে বলে প্রমাণিত হবে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছিলেনঃ “তুমি আমার উপর হারাম। আল্লাহর কসম! আমি তোমার সাহচর্যে থাকবো না।”হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন যে, হারাম করার ব্যাপারে তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা হয় এবং তাঁকে তাঁর কসমের কাফফারা আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়। তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ দু’জন স্ত্রী কে ছিলেন?” উত্তরে হযরত উমার বলেনঃ “তারা হলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। উম্মে ইবরাহীম কিবতিয়্যাহ (রাঃ)-কে কেন্দ্র করেই ঘটনাটির সূত্রপাত হয়। হযরত হাফসা (রাঃ)-এর ঘরে তাঁর পালার দিনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত মারিয়াহ্ কিবতিয়্যাহ্ (রাঃ)-এর সাথে মিলিত হন। এতে হযরত হাফসা (রাঃ) দুঃখিতা হন যে, তাঁর পালার দিনে তাঁরই ঘরে ও তাঁরই বিছানায় তিনি মারিয়াহ্ (রাঃ)-এর সাথে মিলিত হলেন! রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বলে ফেলেনঃ “আমি তাকে আমার উপর হারাম করে নিলাম। তুমি এই ঘটনা কারো কাছে বর্ণনা করো না।” এতদসত্ত্বেও হযরত হাফসা (রাঃ) ঘটনাটি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সামনে প্রকাশ করে দেন। আল্লাহ্ তা'আলা এই খবর স্বীয় নবী (সঃ)-কে জানিয়ে দেন এবং এই আয়াতগুলো নাযিল করেন। নবী (সঃ) কাফফারা আদায় করে স্বীয় কসম ভেঙ্গে দেন এবং ঐ দাসীর সঙ্গে মিলিত হন। এই ঘটনাটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই ফতওয়া দেন যে, কেউ যদি বলেঃ “আমি অমুক জিনিস আমার উপর হারাম করে নিলাম” তবে তার উচিত কসম ভেঙ্গে দিয়ে কাফফারা আদায় করা। একটি লোক তাঁকে এই মাসআলা জিজ্ঞেস করে যে, সে তার স্ত্রীকে নিজের উপর হারাম করে নিয়েছে।তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তোমার স্ত্রী তোমার উপর হারাম নয় (তুমি কাফফারা আদায় করে কসম ভেঙ্গে দাও)।” সবচেয়ে কঠিন কাফফারা তো হলো আল্লাহ্‌ পথে গোলাম আযাদ করা। ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং বহু ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদের ফতওয়া এই যে, যে ব্যক্তি তার স্ত্রী, দাসী অথবা খাওয়া পরার কোন জিনিসকে নিজের উপর হারাম করে নেয়, তার উপর কাফফারা ওয়াজিব হয়ে যায়। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, শুধু স্ত্রী বা দাসীকে নিজের উপর হারাম করে নিলে কাফফারা ওয়াজিব হয়, অন্য কোন জিনিস নিজের উপর হারাম করে নিলে কাফফারা ওয়াজিব হয় না। যদি হারাম করা দ্বারা তালাকের নিয়ত করে তবে অবশ্যই তালাক হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে দাসীকে হারাম করার কথা দ্বারা যদি আযাদ করে দেয়ার নিয়ত করে তবে ঐ দাসী অবশ্যই আযাদ হয়ে যাবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত ঐ নারীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যিনি স্বীয় নফসকে নবী (সঃ)-এর নিকট হিবা বা দান করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এটা গারীব উক্তি। সম্পূর্ণ সঠিক কথা এই যে, এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিজের উপর মধুকে হারাম করে নেয়া।সহীহ্ বুখারীতে এই আয়াতের ক্ষেত্রে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত যায়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ)-এর ঘরে মধু পান করতেন এবং এই কারণে তিনি তার ঘরে কিছুক্ষণ বিলম্ব করতেন। এই জন্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ) পরস্পর পরামর্শ করেন যে, তাঁদের মধ্যে যাঁরই কাছে নবী (সঃ) আসবেন তিনি যেন তাকে বলেনঃ “আপনার মুখ হতে মাগাফীরের (গেঁদ বা আঠা জাতীয় জিনিস যাতে দুর্গন্ধ রয়েছে) গন্ধ আসছে, সম্ভবতঃ আপনি মাগাফীর খেয়েছেন!” সুতরাং তারা এ কথাই বলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আমি যায়নাব (রাঃ)-এর ঘরে মধু পান করেছি। এখন আমি শপথ করছি যে, আর কখনো আমি মধু পান করবো না। সুতরাং তোমরা এ কথা কাউকেও বলবে না।” ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটিকে কিতাবুল ঈমান ওয়ান নুযূর-এর মধ্যেও কিছু বৃদ্ধি সহকারে আনয়ন করেছেন। তাতে রয়েছে যে, এখানে দু'জন স্ত্রী দ্বারা হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। আর চুপে-চুপে কথা বলা দ্বারা বুঝানো হয়েছে ‘আমি মধু পান করেছি' এই উক্তিটি। তিনি কিতাবুত তালাকের মধ্যে এ হাদীসটি আনয়ন করে বলেন যে, মাগাফীর হলো গঁদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত একটি জিনিস যা ঘাসে জন্মে থাকে এবং তাতে কিছুটা মিষ্টতা রয়েছে।কিতাবুত তালাকে এ হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এই শব্দে বা ভাষায় বর্ণিত আছেঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মিষ্টি ও মধু খুব ভালবাসতেন। আসরের নামাযের পর তিনি তাঁর স্ত্রীদের নিকট যেতেন এবং কাউকেও নিকটে করে নিতেন। একদা তিনি হযরত হাফসা (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং অন্যান্য দিন তাঁর কাছে যতক্ষণ অবস্থান করতেন, সেই দিন তদপেক্ষা বেশীক্ষণ অবস্থান করেন। এতে আমার মনে নিজের মর্যাদাবোধ জেগে উঠলো। তত্ত্ব নিয়ে জানলাম যে, তাঁর কওমের একটি স্ত্রীলোক এক মশক মধু তার কাছে উপঢৌকন স্বরূপ পাঠিয়েছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে ঐ মধুর শরবত পান করিয়েছেন। আর এই কারণেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর ঘরে এতোটা বিলম্ব করেছেন। আমি মনে মনে বললাম যে, ঠিক আছে, কৌশল করে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা হতে ফিরিয়ে দিব। সুতরাং আমি হযরত সাওদাহ্ বিনতু যামআহ্ (রাঃ)-কে বললামঃ তোমার ঘরে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসবেন এবং তোমার নিকটবর্তী হবেন তখন তুমি তাকে বলবেঃ “আজ কি আপনি মাগাফীর খেয়েছেন?” তিনি জবাবে বলবেনঃ “না।” তখন তুমি বলবেঃ তাহলে এই গন্ধ কিসের?” তিনি। তখন বলবেনঃ “হাফসা (রাঃ) মধু পান করিয়েছেন।” তুমি তখন বলবেঃ “সম্ভবতঃ মৌমাছি ‘আরফাত’ নামক কণ্ঠকযুক্ত গাছ হতে মধু আহরণ করেছে।” আমার কাছে যখন আসবেন তখন আমিও তাই বলবো। হে সফিয়া (রাঃ)! তোমার কাছে যখন আসবেন তখন তুমিও তাই বলবে।” হযরত সাওদাহ (রাঃ) বলেনঃ “যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার ঘরে আসলেন, তখন তিনি দরজার উপরই ছিলেন, তখন আমি ইচ্ছা করলাম যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) আমাকে যা বলতে বলেছেন তাই বলে দিই, কেননা, আমি তাকে খুবই ভয় করতাম। কিন্তু ঐ সময় আমি নীরব থাকলাম। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার কাছে আসলেন তখন আমি ঐ কথাই বলে দিলাম। তারপর তিনি হযরত সফিয়া (রাঃ)-এর নিকট গেলে তিনিও ঐ কথাই বলেন। এরপর হযরত হাফসা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে মধু পান করাতে চাইলে তিনি বলেনঃ “আমার এর প্রয়োজন নেই।” হযরত সাওদা (রাঃ) তখন বলতে লাগলেনঃ “আফসোস! আমরা এটাকে হারাম করিয়ে দিলাম!” আমি (আয়েশা রাঃ) বললামঃ চুপ থাকো। সহীহ মুসলিমে এটুকু বেশী রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুর্গন্ধকে খুবই ঘৃণা করতেন। এজন্যেই ঐ স্ত্রীগণ বলেছিলেনঃ “আপনি মাগাফীর খেয়েছেন কি?” কেননা, মাগাফীরেও কিছুটা দুর্গন্ধ রয়েছে। যখন তিনি উত্তর দিলেন যে, না, তিনি মাগাফীর খাননি। বরং মধু খেয়েছেন, তখন তাঁরা বললেনঃ “তাহলে মৌমাছি ‘আরফাত' গাছ হতে মধু আহরণ করে থাকবে, যার গাঁদের নাম হলো, মাগাফীর এবং ওরই ক্রিয়ার প্রভাবে এই মধুতে মাগাফীরের গন্ধ রয়েছে। এই রিওয়াইয়াতে (আরবি) শব্দ রয়েছে, জাওহারী (রঃ) যার অর্থ করেছেন (আরবি) অর্থাৎ খেয়েছে। মৌমাছিকেও (আরবি) বলা হয় এবং (আরবি) হালকা শব্দকে বলা হয়। পাখী যখন চঞ্চু দ্বারা কোন খাদ্য খায় তখন তার চঞ্চুর শব্দ শোনা যায়, ঐ সময় আরবরা বলেঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি পাখীর চঞ্চুর শব্দ শুনেছি।” একটি হাদীসে রয়েছেঃ “জান্নাতীরা পাখীর হালকা ও মিষ্টি শব্দ শুনতে পাবে।” এখানেও আরবী (আরবি) শব্দ রয়েছে। আসমাঈ' (রঃ) যিনি হযরত শু'বা (রাঃ) -এর মজলিসে ছিলেন, বলেন যে, হযরত শু’বা (আরবি) শব্দটি (আরবি) অর্থাৎ দ্বারা পড়েন। তখন হযরত আসমাঈ’ (রঃ) বলেন যে, ওটা (আরবি) দ্বারা হবে। তখন হযরত শুবা (রঃ) তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “এ ব্যক্তি এটা আমার চেয়ে বেশী জানেন। এটাই সঠিক হবে। তোমরা এটা সংশোধন করে নাও।” এ ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। মোটকথা, মধু পান করানোর ঘটনায় দু’টি নাম বর্ণিত আছে। একটি হযরত হাফসা (রাঃ)-এর নাম এবং অপরটি হযরত যায়নাব (রাঃ)-এর নাম। এই ব্যাপারে যারা একমত হয়েছিলেন তাঁরা হলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। তাহলে খুব সম্ভব ঘটনা দু'টো হবে। তবে এই দুজনের ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।পরস্পর এই প্রকারের পরামর্শ গ্রহণকারিণী ছিলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। এটা এ হাদীস দ্বারাও জানা যাচ্ছে যা মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি (হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ) বলেনঃ বহু দিন হতে আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, ……(আরবি)–এ আয়াতের মধ্যে যে দু’জন স্ত্রীর বর্ণনা রয়েছে তাঁদের নাম হযরত উমার (রাঃ)-এর কাছে জেনে নিবো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর এই খলীফা যখন হজ্বের সফরে বের হলেন তখন আমিও তার সাথে বের হলাম। পথে এক জায়গায় খলীফা উমার (রাঃ) রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের দিকে চললেন। আমি তখন পানির পাত্র নিয়ে তার পিছনে পিছনে গেলাম। তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূর্ণ করে ফিরে আসলেন। আমি পানি ঢেলে ঢেলে তাঁকে অযু করালাম। সুযোগ পেয়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আমীরুল মু'মিনীন! ……… (আরবি) এই আয়াতে যে দুই জনকে সম্বোধন করা হয়েছে তাঁরা কারা? তিনি জবাবে বললেনঃ “হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! এটা বড়ই আফসোসের বিষয়!” যুহরী (রঃ) বলেন যে, হযরত উমার (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর এ প্রশ্ন করাকে অপছন্দ করলেন। কিন্তু ওটা গোপন করা বৈধ ছিল না বলে তিনি উত্তর দেনঃ “এর দ্বারা হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে।” অতঃপর হযরত উমার (রাঃ) ঘটনাটি বর্ণনা করতে শুরু করেন। তিনি বলেনঃ “আমরা কুরায়েশরা আমাদের নারীদেরকে আমাদের আওতাধীনে রাখতাম। কিন্তু মদীনাবাসীদের উপর তাদের নারীরা আধিপত্য করতো। যখন আমরা হিজরত করে মদীনায় আসলাম তখন আমাদের নারীরাও তাদের দেখাদেখি। আমাদের উপর প্রাধান্য লাভের ইচ্ছা করে। আমি মদীনা শরীফের উপরের অংশে হযরত উমাইয়া ইবনে যায়েদের বাড়ীতে অবস্থান করতাম। একদা আমি আমার স্ত্রীর উপর অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে কিছু বলতে লাগলাম। তখন সে উল্টিয়ে আমাকেও জবাব দিতে শুরু করলো। তার এই আচরণ আমার নিকট খুবই খারাপ বোধ হলো। আমি মনে মনে বললামঃ এই ধরনের নতুন আচরণ কেন? আমাকে বিস্মিত হতে দেখে সে বললোঃ “আপনি কি চিন্তা করছেন? আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরাও তাকে জবাব দিয়ে থাকে। কোন কোন সময় তো তারা সারা দিন ধরে তাঁর সাথে কথাবার্তা বলাও বন্ধ রাখে।” তার এই কথা শুনে আমি অন্য এক সমস্যায় পড়লাম। সরাসরি আমি আমার কন্যা হাফসা (রাঃ)-এর বাড়ীতে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তোমরা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জবাব দিয়ে থাকো এবং মাঝে মাঝে সারা দিন তার সাথে কথাবার্তা বলা বন্ধ রাখো এটা কি সত্য? সে উত্তরে বললোঃ “হ্যাঁ, এটা সত্য বটে।” আমি তখন বললামঃ যারা এরূপ করে তারা ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তোমরা কি ভুলে যাচ্ছ যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর অসন্তুষ্টির কারণে এরূপ নারীর উপর স্বয়ং আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন? সাবধান! আগামীতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জবাব দিবে না এবং তাঁর কাছে কিছুই চাইবে না। কিছু চাইতে হলে আমার কাছেই চাইবে। আয়েশা (রাঃ)-কে দেখে তুমি তার প্রতি লোভ বা হিংসা করবে না। সে তোমার চেয়ে ভাল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট অধিকতর প্রিয়। হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! আমার প্রতিবেশী একজন আনসারী ছিলেন। আমরা উভয়ে পালা ভাগ করে নিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর খিদমতে আমি একদিন হাযির হতাম এবং একদিন তিনি হাযির হতেন। আমি আমার পালার দিনের সমস্ত হাদীস, আয়াত ইত্যাদি শুনে তাঁকে এসে শুনাতাম এবং তিনি তার পালার দিন সবকিছু আমাকে এসে শুনাতেন। আমাদের মধ্যে এ কথাটি ঐ সময় মশহর হয়ে গিয়েছিল যে, গাসসানী বাদশাহ্ আমাদের উপর আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। একদা আমার সঙ্গী তাঁর পালার দিনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে গিয়েছিলেন! ইশার সময় এসে তিনি আমার দরজার উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডাক দিতে লাগলেন। আমি উদ্বেগের সাথে বের হয়ে বললামঃ খবর ভাল তো? তিনি উত্তরে বললেনঃ “আজ তো একটা কঠিন ব্যাপার ঘটে গেছে।” আমি বললামঃ গাস্‌সানী বাদশাহ কি পৌঁছে গেছে? তিনি জবাবে বললেনঃ “এর চেয়েও কঠিন সমস্যা দেখা দিয়েছে।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ কি হয়েছে, বলুন না? তিনি বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়েছেন।” আমি তখন বললামঃ আফসোস! হাফসা (রাঃ) তো ধ্বংস হয়ে গেল! আমি পূর্ব হতেই এটার আশংকা করছিলাম। ফজরের নামায পড়েই কাপড়-চোপড় পরে আমি সরাসরি হাফসা (রাঃ)-এর বাড়ীতে হাযির হলাম। দেখলাম যে, সে কাঁদছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কি তোমাদেরকে তালাক দিয়ে ফেলেছেন? সে জবাব দিলোঃ “এ খবর তো বলতে পারছি না। তবে তিনি আমাদের হতে পৃথক হয়ে নিজের কক্ষে অবস্থান করছেন। আমি সেখানে গেলাম। দেখি যে, একজন হাবশী গোলাম পাহারা দিচ্ছে। আমি তাকে বললামঃ যাও, আমার জন্যে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা কর। সে গেল এবং ফিরে এসে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কোন উত্তর দিলেন না।” আমি তখন সেখান হতে ফিরে এসে মসজিদে গেলাম। দেখলাম যে, মিম্বরের পাশে সাহাবীদের একটি দল বসে রয়েছেন এবং কারো কারো চক্ষু দিয়ে তো অশ্রু ঝরছে! আমি অল্পক্ষণ সেখানে বসে থাকলাম। কিন্তু আমার মনে শান্তি কোথায়? আবার উঠে দাঁড়ালাম এবং ঐ গোলামের কাছে গিয়ে অনুমতি চাইতে বললাম। গোলাম এবারও এসে খবর দিলো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন উত্তর দেননি। আবার আমি মসজিদে চলে গেলাম। সেখান হতে আবার ফিরে আসলাম এবং পুনরায় গোলামকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইতে বললাম। গোলাম আবার গেল এবং ঐ একই জবাব দিলো। আমি ফিরে যাচ্ছিলাম এমন সময় গোলাম আমাকে ডাক দিলো এবং বললোঃ “আপনাকে অনুমতি দেয়া হয়েছে।” আমি প্রবেশ করে দেখলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বস্তার উপর হেলান লাগিয়ে বসে আছেন। যার দাগ তার দেহ মুবারকে পড়ে গেছে। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি আপনার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে ফেলেছেন? তিনি মাথা উঠিয়ে আমার দিকে চেয়ে বললেনঃ “না।” আমি বললামঃ আল্লাহু আকবার! হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কথা এই যে, আমরা কুরায়েশরা আমাদের স্ত্রীদেরকে আমাদের আজ্ঞাধীনে রাখতাম। কিন্তু মদীনাবাসীদের উপর তাদের স্ত্রীরা প্রাধান্য লাভ করে আছে। এখানে এসে আমাদের স্ত্রীরাও তাদের দেখাদেখি তাদেরই আচরণ গ্রহণ করে নিয়েছে। তারপর আমি আমার স্ত্রীর ঘটনাটিও বর্ণনা করলাম এবং তার একথাটিও বর্ণনা করলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরাও এরূপ করে থাকেন। তারপর আমি আমার একথাটিও বর্ণনা করলাম যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর অসন্তুষ্টির কারণে আল্লাহ যে অসন্তুষ্ট হয়ে যাবেন এবং এর ফলে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে এ ভয় কি তাদের নেই? আমার কথা শুনে তিনি মুচকি হাসলেন। তারপর আমি আমার হাফসা (রাঃ)-এর কাছে যাওয়া, তাকে আয়েশা (রাঃ)-এর প্রতি হিংসা পোষণ না করার উপদেশ দেয়ার কথা বর্ণনা করলাম। এবারও তিনি মুচকি হাসলেন। এরপর আমি বললামঃ অনুমতি হলে আরো কিছুক্ষণ আপনার এখানে অবস্থান করতাম। তিনি অনুমতি দিলে আমি বসে পড়লাম। অতঃপর আমি মাথা উঠিয়ে ঘরের চতুর্দিকে লক্ষ্য করে দেখি যে, তিনটি শুষ্ক চামড়া ছাড়া আর কিছুই নেই। তাঁর খাস দরবারের এ অবস্থা দেখে আমার খুবই দুঃখ হলো। আমি আরয করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দু'আ করুন যেন আল্লাহ তা'আলা আপনার উম্মতের উপর প্রশস্ততা দান করেন। দেখুন তো পারসিক ও রোমকরা আল্লাহর ইবাদত করে না, অথচ তারা দুনিয়ার কত বেশী নিয়ামতের মধ্যে ডুবে রয়েছে? আমার একথা শোনা মাত্রই তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং বলতে লাগলেনঃ “হে খাত্তাবের পুত্র! তুমি তো, সন্দেহের মধ্যে এখনো রয়ে গেছে। এই কওমের জন্যে দুনিয়ার এই নিয়ামতরাশি কল্যাণকর নয়। তাদেরকে এগুলো তাড়াতাড়ি করে দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হয়েছে।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন!ব্যাপারটা ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্ত্রীদের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণে শপথ করেছিলেন যে, এক মাসকাল তিনি তাদের সাথে মিলিত হবেন না। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তাম্বীহ করেন।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, জামে তিরমিযী এবং সুনানে নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “বছর ধরে আমি এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম যে, হযরত উমার (রাঃ)-কে এই দুইজন স্ত্রীর নাম জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ)-এর অত্যন্ত প্রভাবের কারণে তাঁকে জিজ্ঞেস করার সাহস হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত হজ্ব পালন করে প্রত্যাবর্তনের পথে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।” তারপর তিনি পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন যা উপরে বর্ণিত হলো।সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, তালাকের প্রসিদ্ধির ঘটনাটি পর্দার আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে ঘটেছিল। তাতে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) যেমন হযরত হাফসা (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে তাকে বুঝিয়ে এসেছিলেন, তেমনিভাবে হযরত আয়েশা (রাঃ)-কেও বুঝিয়েছিলেন। তাতে এও রয়েছে যে, যে গোলামটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে পাহারা দিচ্ছিল তার নাম ছিল আবূ রিবাহ (রাঃ)। তাতে এও আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আপনার স্ত্রীদের ব্যাপারে এতো চিন্তিত হচ্ছেন কেন? যদি আপনি তাদেরকে তালাকও দিয়ে দেন তবে আপনার সাথে রয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতামণ্ডলী, হযরত জিবরাঈল (আঃ), হযরত মীকাঈল (আঃ), আমি, হযরত আবূ বকর (রাঃ) এবং সমস্ত মু'মিন।” হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলারই সমস্ত প্রশংসা, আমি এই প্রকারের কথা যে বলছিলাম, আমি আশা করছিলাম যে, আমার কথার সত্যতায় তিনি আয়াত নাযিল করবেন। হলোও তাই। আল্লাহ তা’আলা (আরবি) এই আয়াত এবং (আরবি) এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। যখন আমি জানতে পারলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর স্ত্রীদেরকে তালাক দেননি তখন আমি মসজিদে গিয়ে দরজার উপর দাঁড়িয়ে উচ্চ শব্দে সকলকে জানিয়ে দিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর পবিত্র স্ত্রীদেরকে তালাক দেননি। এ ব্যাপারেই আল্লাহ তা'আলা ... (আরবি)-এই আয়াতটি নাযিল করেন। অর্থাৎ “যখন তাদের কাছে কোন নিরাপত্তা বা ভয়ের খবর পৌঁছে তখন তারা তা প্রচার করতে শুরু করে দেয়। যদি তারা এই খবর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অথবা জ্ঞানী ও বিদ্বান মুসলমানদের নিকট পৌঁছিয়ে দিতো তবে নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে যারা তাহকীককারী তারা ওটা বুঝতে পারতো।” হযরত উমার (রাঃ) আয়াতটি এই পর্যন্ত পাঠ করে বলেনঃ এই বিষয়ের তাহকীককারীদের মধ্যে আমিও একজন।” আরো বহু বুযুর্গ মুফাসসির হতে বর্ণিত আছে যে, দ্বারা হযরত আবূ বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ হযরত উসমানেরও (রাঃ) নাম উল্লেখ করেছেন এবং কেউ কেউ আবার হযরত আলী (রাঃ)-এর নামও নিয়েছেন। একটি দুর্বল হাদীসে মারফূ’’রূপে শুধু হযরত আলী (রাঃ)-এর নাম রয়েছে। কিন্তু এর সনদ দুর্বল এবং সম্পূর্ণরূপে মুনকার। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে মর্যাদাবোধ জেগে উঠেছিল। আমি তখন তাদেরকে বললামঃ যদি নবী (সঃ) তোমাদেরকে পরিত্যাগ করেন তবে তার প্রতিপালক সম্ভবতঃ তাকে দিবেন তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর স্ত্রী। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং আমার ভাষাতেই আল্লাহ পাক তা নাযিল করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এটা পূর্বেই গত হয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বহু ব্যাপারে কুরআনের আনুকূল্য করেছেন। যেমন পর্দার ব্যাপারে, বদর যুদ্ধের বন্দীদের ব্যাপারে এবং মাকামে ইবরাহীমকে কিবলাহ নির্ধারণ করার ব্যাপারে। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন উম্মাহাতুল মু'মিনীন ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মধ্যে মন কষাকষির খবর পেলাম তখন আমি তাদের কাছে গেলাম এবং তাদেরকে বললামঃ তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আপোষ করে নাও, অন্যথায় তিনি যদি তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন তবে তাঁর প্রতিপালক সম্ভবতঃ তাকে তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর স্ত্রী দান করবেন। অবশেষে আমি উম্মাহাতুল মু'মিনীনের শেষ জনের কাছে গেলাম। তখন সে বললোঃ “হে উমার (রাঃ)! আমাদেরকে উপদেশ দানের জন্যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি যথেষ্ট নন যে, আপনি আমাদেরকে উপদেশ দিতে আসলেন?" আমি তখন নীরব হয়ে গেলাম। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা ...- (আরবি) এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন।” (এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ) সহীহ বুখারীর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যে স্ত্রীটি হযরত উমার (রাঃ)-কে এই উত্তর দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি সম্পর্কে তিনি বলেনঃ “ঘটনা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-এর ঘরে ছিলেন। যখন হাফসা (রাঃ) দেখেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মারিয়াহ (রাঃ)-এর সাথে মশগুল রয়েছেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি এ খবর হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জানাবে না। আমি তোমাকে একটি সুসংবাদ দিচ্ছি। তা এই যে, আমার ইন্তেকালের পর আমার খিলাফত হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর পর তোমার আব্বা লাভ করবেন। কিন্তু হযরত হাফসা (রাঃ) এ খবর হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জানিয়ে দেন। তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ খবর আপনার কাছে কে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমাকে অবহিত করেছেন তিনি যিনি সর্বজ্ঞ, সম্যক অবগত।” হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন বলেনঃ “আমি আপনার দিকে তাকাবো যে পর্যন্ত না আপনি মারিয়াহ (রাঃ)-কে আপনার উপর হারাম করবেন।” তখন তিনি হযরত মারিয়াহ (রাঃ)-কে নিজের উপর হারাম করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা .. (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তিবরানী (রঃ)](আরবি)-এর একটি তাফসীর তো এই যে, তারা হবে রোযা পালনকারিণী। একটি মারফূ’ হাদীসেও এই শব্দের এই তাফসীরই এসেছে যে হাদীসটি সূরায়ে বারাআতের এই শব্দের তাফসীরে গত হয়েছে যে, এই উম্মতের সিয়াহাত হলো রোযা রাখা। দ্বিতীয় তাফসীর এই যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হিজরতকারিণীগণ। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী উত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তাদের মধ্যে কেউ হবে অকুমারী এবং কেউ হবে কুমারী। যাতে মন খুশী থাকে।মু’জামে তিবরানীতে রয়েছে যে, ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতে স্বীয় নবী (সঃ)-কে যে ওয়াদা দিয়েছেন তাতে বেওয়া বা অকুমারী দ্বারা হযরত আসিয়া (রাঃ) কে বুঝানো হয়েছে যিনি ফিরাউনের স্ত্রী ছিলেন এবং কুমারী দ্বারা হযরত মরিয়ম (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে যিনি হযরত ইমরানের কন্যা ছিলেন। হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। ঐ সময় হযরত খাদীজাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসেন। তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত খাদীজাহ (রাঃ)-কে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন, তাঁকে সুসংবাদ দেয়া হচ্ছে জান্নাতের একটি ঘরের, যেখানে না আছে গরম এবং না আছে কোন কষ্ট, আর না আছে কোন শোরগোল। যা ছিদ্রকৃত মুক্তা দ্বারা নির্মিত। যার ডানে-বামে মরিয়ম বিনতু ইমরান (রাঃ) এবং আসিয়া বিনতু মাযাহেম (রাঃ)-এর ঘর রয়েছে। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, হযরত খাদীজাহ (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে খাদীজাহ (রাঃ)! তোমার সতীনদেরকে আমার সালাম জানিয়ে দিবে।” হযরত খাদীজাহ (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পূর্বেও কি আপনি কাউকেও বিয়ে করেছিলেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা মরিয়ম বিনতু ইমরান (রাঃ), ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ) এবং মূসা (আঃ)-এর বোন কুলসুম (রাঃ) এই তিনজনকে আমার নিকাহতে দিয়ে রেখেছেন।” (এ হাদীসটি দুর্বল) হযরত আবূ উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেছেনঃ “তুমি কি জান যে, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আমার বিবাহ ইমরানের কন্যা মরিয়ম (রাঃ), মূসা (আঃ)-এর ভগ্নী কুলসুম (রাঃ), এবং ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়ার (রাঃ) সাথে দিয়ে রেখেছেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে মুবারকবাদ।” (এ হাদীসটি আবূ ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটাও দুর্বল হাদীস এবং সাথে সাথে মুরসালও বটে)

আত-তাহরীম 66:5

১-৫ নং আয়াতের তাফসীর এই সূরাটির প্রাথমিক আয়াতগুলোর শানে নুযূলের ব্যাপারে সুফাসসিরদের উক্তি নিম্নরূপঃ কেউ কেউ বলেন যে, এটা হযরত মারিয়াহ্ (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নিজের উপর হারাম করে নিয়েছিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। সুনানে নাসাঈতে এই রিওয়াইয়াতটি বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-এর কথার পরিপ্রেক্ষিতে এটা ঘটেছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এক দাসী সম্পর্কে এ কথা বলেছিলেন। ফলে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর কোন এক স্ত্রীর ঘরে উম্মে ইবরাহীম (রাঃ)-এর সাথে কথাবার্তা বলেছিলেন। তখন তাঁর ঐ স্ত্রী তাঁকে বলেনঃ “তোমার ঘরে ও আমার বিছানায় এ কাজ কারবার?” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আমি তাকে আমার উপর হারাম করে নিলাম।” তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হালাল কিভাবে আপনার উপর হারাম হয়ে যাবে?” জবাবে তিনি বলেনঃ “আমি শপথ করছি যে, এখন হতে তার সাথে কোন প্রকারের কথাবার্তা বলবো না।” ঐ সময় এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। হযরত যায়েদ (রঃ) বলেনঃ এর দ্বারা জানা গেল যে, তুমি আমার উপর হারাম’ এ কথা কেউ বললে তা বাজে বলে প্রমাণিত হবে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছিলেনঃ “তুমি আমার উপর হারাম। আল্লাহর কসম! আমি তোমার সাহচর্যে থাকবো না।”হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন যে, হারাম করার ব্যাপারে তো রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা হয় এবং তাঁকে তাঁর কসমের কাফফারা আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়। তাফসীরে ইবনে জারীরে রয়েছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ দু’জন স্ত্রী কে ছিলেন?” উত্তরে হযরত উমার বলেনঃ “তারা হলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। উম্মে ইবরাহীম কিবতিয়্যাহ (রাঃ)-কে কেন্দ্র করেই ঘটনাটির সূত্রপাত হয়। হযরত হাফসা (রাঃ)-এর ঘরে তাঁর পালার দিনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত মারিয়াহ্ কিবতিয়্যাহ্ (রাঃ)-এর সাথে মিলিত হন। এতে হযরত হাফসা (রাঃ) দুঃখিতা হন যে, তাঁর পালার দিনে তাঁরই ঘরে ও তাঁরই বিছানায় তিনি মারিয়াহ্ (রাঃ)-এর সাথে মিলিত হলেন! রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বলে ফেলেনঃ “আমি তাকে আমার উপর হারাম করে নিলাম। তুমি এই ঘটনা কারো কাছে বর্ণনা করো না।” এতদসত্ত্বেও হযরত হাফসা (রাঃ) ঘটনাটি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সামনে প্রকাশ করে দেন। আল্লাহ্ তা'আলা এই খবর স্বীয় নবী (সঃ)-কে জানিয়ে দেন এবং এই আয়াতগুলো নাযিল করেন। নবী (সঃ) কাফফারা আদায় করে স্বীয় কসম ভেঙ্গে দেন এবং ঐ দাসীর সঙ্গে মিলিত হন। এই ঘটনাটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই ফতওয়া দেন যে, কেউ যদি বলেঃ “আমি অমুক জিনিস আমার উপর হারাম করে নিলাম” তবে তার উচিত কসম ভেঙ্গে দিয়ে কাফফারা আদায় করা। একটি লোক তাঁকে এই মাসআলা জিজ্ঞেস করে যে, সে তার স্ত্রীকে নিজের উপর হারাম করে নিয়েছে।তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তোমার স্ত্রী তোমার উপর হারাম নয় (তুমি কাফফারা আদায় করে কসম ভেঙ্গে দাও)।” সবচেয়ে কঠিন কাফফারা তো হলো আল্লাহ্‌ পথে গোলাম আযাদ করা। ইমাম আহমাদ (রঃ) এবং বহু ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদের ফতওয়া এই যে, যে ব্যক্তি তার স্ত্রী, দাসী অথবা খাওয়া পরার কোন জিনিসকে নিজের উপর হারাম করে নেয়, তার উপর কাফফারা ওয়াজিব হয়ে যায়। ইমাম শাফিয়ী (রঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, শুধু স্ত্রী বা দাসীকে নিজের উপর হারাম করে নিলে কাফফারা ওয়াজিব হয়, অন্য কোন জিনিস নিজের উপর হারাম করে নিলে কাফফারা ওয়াজিব হয় না। যদি হারাম করা দ্বারা তালাকের নিয়ত করে তবে অবশ্যই তালাক হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে দাসীকে হারাম করার কথা দ্বারা যদি আযাদ করে দেয়ার নিয়ত করে তবে ঐ দাসী অবশ্যই আযাদ হয়ে যাবে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত ঐ নারীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যিনি স্বীয় নফসকে নবী (সঃ)-এর নিকট হিবা বা দান করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এটা গারীব উক্তি। সম্পূর্ণ সঠিক কথা এই যে, এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিজের উপর মধুকে হারাম করে নেয়া।সহীহ্ বুখারীতে এই আয়াতের ক্ষেত্রে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত যায়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ)-এর ঘরে মধু পান করতেন এবং এই কারণে তিনি তার ঘরে কিছুক্ষণ বিলম্ব করতেন। এই জন্যে হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ) পরস্পর পরামর্শ করেন যে, তাঁদের মধ্যে যাঁরই কাছে নবী (সঃ) আসবেন তিনি যেন তাকে বলেনঃ “আপনার মুখ হতে মাগাফীরের (গেঁদ বা আঠা জাতীয় জিনিস যাতে দুর্গন্ধ রয়েছে) গন্ধ আসছে, সম্ভবতঃ আপনি মাগাফীর খেয়েছেন!” সুতরাং তারা এ কথাই বলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “আমি যায়নাব (রাঃ)-এর ঘরে মধু পান করেছি। এখন আমি শপথ করছি যে, আর কখনো আমি মধু পান করবো না। সুতরাং তোমরা এ কথা কাউকেও বলবে না।” ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটিকে কিতাবুল ঈমান ওয়ান নুযূর-এর মধ্যেও কিছু বৃদ্ধি সহকারে আনয়ন করেছেন। তাতে রয়েছে যে, এখানে দু'জন স্ত্রী দ্বারা হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। আর চুপে-চুপে কথা বলা দ্বারা বুঝানো হয়েছে ‘আমি মধু পান করেছি' এই উক্তিটি। তিনি কিতাবুত তালাকের মধ্যে এ হাদীসটি আনয়ন করে বলেন যে, মাগাফীর হলো গঁদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত একটি জিনিস যা ঘাসে জন্মে থাকে এবং তাতে কিছুটা মিষ্টতা রয়েছে।কিতাবুত তালাকে এ হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এই শব্দে বা ভাষায় বর্ণিত আছেঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মিষ্টি ও মধু খুব ভালবাসতেন। আসরের নামাযের পর তিনি তাঁর স্ত্রীদের নিকট যেতেন এবং কাউকেও নিকটে করে নিতেন। একদা তিনি হযরত হাফসা (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং অন্যান্য দিন তাঁর কাছে যতক্ষণ অবস্থান করতেন, সেই দিন তদপেক্ষা বেশীক্ষণ অবস্থান করেন। এতে আমার মনে নিজের মর্যাদাবোধ জেগে উঠলো। তত্ত্ব নিয়ে জানলাম যে, তাঁর কওমের একটি স্ত্রীলোক এক মশক মধু তার কাছে উপঢৌকন স্বরূপ পাঠিয়েছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে ঐ মধুর শরবত পান করিয়েছেন। আর এই কারণেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর ঘরে এতোটা বিলম্ব করেছেন। আমি মনে মনে বললাম যে, ঠিক আছে, কৌশল করে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা হতে ফিরিয়ে দিব। সুতরাং আমি হযরত সাওদাহ্ বিনতু যামআহ্ (রাঃ)-কে বললামঃ তোমার ঘরে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসবেন এবং তোমার নিকটবর্তী হবেন তখন তুমি তাকে বলবেঃ “আজ কি আপনি মাগাফীর খেয়েছেন?” তিনি জবাবে বলবেনঃ “না।” তখন তুমি বলবেঃ তাহলে এই গন্ধ কিসের?” তিনি। তখন বলবেনঃ “হাফসা (রাঃ) মধু পান করিয়েছেন।” তুমি তখন বলবেঃ “সম্ভবতঃ মৌমাছি ‘আরফাত’ নামক কণ্ঠকযুক্ত গাছ হতে মধু আহরণ করেছে।” আমার কাছে যখন আসবেন তখন আমিও তাই বলবো। হে সফিয়া (রাঃ)! তোমার কাছে যখন আসবেন তখন তুমিও তাই বলবে।” হযরত সাওদাহ (রাঃ) বলেনঃ “যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার ঘরে আসলেন, তখন তিনি দরজার উপরই ছিলেন, তখন আমি ইচ্ছা করলাম যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) আমাকে যা বলতে বলেছেন তাই বলে দিই, কেননা, আমি তাকে খুবই ভয় করতাম। কিন্তু ঐ সময় আমি নীরব থাকলাম। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার কাছে আসলেন তখন আমি ঐ কথাই বলে দিলাম। তারপর তিনি হযরত সফিয়া (রাঃ)-এর নিকট গেলে তিনিও ঐ কথাই বলেন। এরপর হযরত হাফসা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে মধু পান করাতে চাইলে তিনি বলেনঃ “আমার এর প্রয়োজন নেই।” হযরত সাওদা (রাঃ) তখন বলতে লাগলেনঃ “আফসোস! আমরা এটাকে হারাম করিয়ে দিলাম!” আমি (আয়েশা রাঃ) বললামঃ চুপ থাকো। সহীহ মুসলিমে এটুকু বেশী রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুর্গন্ধকে খুবই ঘৃণা করতেন। এজন্যেই ঐ স্ত্রীগণ বলেছিলেনঃ “আপনি মাগাফীর খেয়েছেন কি?” কেননা, মাগাফীরেও কিছুটা দুর্গন্ধ রয়েছে। যখন তিনি উত্তর দিলেন যে, না, তিনি মাগাফীর খাননি। বরং মধু খেয়েছেন, তখন তাঁরা বললেনঃ “তাহলে মৌমাছি ‘আরফাত' গাছ হতে মধু আহরণ করে থাকবে, যার গাঁদের নাম হলো, মাগাফীর এবং ওরই ক্রিয়ার প্রভাবে এই মধুতে মাগাফীরের গন্ধ রয়েছে। এই রিওয়াইয়াতে (আরবি) শব্দ রয়েছে, জাওহারী (রঃ) যার অর্থ করেছেন (আরবি) অর্থাৎ খেয়েছে। মৌমাছিকেও (আরবি) বলা হয় এবং (আরবি) হালকা শব্দকে বলা হয়। পাখী যখন চঞ্চু দ্বারা কোন খাদ্য খায় তখন তার চঞ্চুর শব্দ শোনা যায়, ঐ সময় আরবরা বলেঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি পাখীর চঞ্চুর শব্দ শুনেছি।” একটি হাদীসে রয়েছেঃ “জান্নাতীরা পাখীর হালকা ও মিষ্টি শব্দ শুনতে পাবে।” এখানেও আরবী (আরবি) শব্দ রয়েছে। আসমাঈ' (রঃ) যিনি হযরত শু'বা (রাঃ) -এর মজলিসে ছিলেন, বলেন যে, হযরত শু’বা (আরবি) শব্দটি (আরবি) অর্থাৎ দ্বারা পড়েন। তখন হযরত আসমাঈ’ (রঃ) বলেন যে, ওটা (আরবি) দ্বারা হবে। তখন হযরত শুবা (রঃ) তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেনঃ “এ ব্যক্তি এটা আমার চেয়ে বেশী জানেন। এটাই সঠিক হবে। তোমরা এটা সংশোধন করে নাও।” এ ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। মোটকথা, মধু পান করানোর ঘটনায় দু’টি নাম বর্ণিত আছে। একটি হযরত হাফসা (রাঃ)-এর নাম এবং অপরটি হযরত যায়নাব (রাঃ)-এর নাম। এই ব্যাপারে যারা একমত হয়েছিলেন তাঁরা হলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। তাহলে খুব সম্ভব ঘটনা দু'টো হবে। তবে এই দুজনের ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।পরস্পর এই প্রকারের পরামর্শ গ্রহণকারিণী ছিলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)। এটা এ হাদীস দ্বারাও জানা যাচ্ছে যা মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি (হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ) বলেনঃ বহু দিন হতে আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, ……(আরবি)–এ আয়াতের মধ্যে যে দু’জন স্ত্রীর বর্ণনা রয়েছে তাঁদের নাম হযরত উমার (রাঃ)-এর কাছে জেনে নিবো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর এই খলীফা যখন হজ্বের সফরে বের হলেন তখন আমিও তার সাথে বের হলাম। পথে এক জায়গায় খলীফা উমার (রাঃ) রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের দিকে চললেন। আমি তখন পানির পাত্র নিয়ে তার পিছনে পিছনে গেলাম। তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূর্ণ করে ফিরে আসলেন। আমি পানি ঢেলে ঢেলে তাঁকে অযু করালাম। সুযোগ পেয়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আমীরুল মু'মিনীন! ……… (আরবি) এই আয়াতে যে দুই জনকে সম্বোধন করা হয়েছে তাঁরা কারা? তিনি জবাবে বললেনঃ “হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! এটা বড়ই আফসোসের বিষয়!” যুহরী (রঃ) বলেন যে, হযরত উমার (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর এ প্রশ্ন করাকে অপছন্দ করলেন। কিন্তু ওটা গোপন করা বৈধ ছিল না বলে তিনি উত্তর দেনঃ “এর দ্বারা হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে।” অতঃপর হযরত উমার (রাঃ) ঘটনাটি বর্ণনা করতে শুরু করেন। তিনি বলেনঃ “আমরা কুরায়েশরা আমাদের নারীদেরকে আমাদের আওতাধীনে রাখতাম। কিন্তু মদীনাবাসীদের উপর তাদের নারীরা আধিপত্য করতো। যখন আমরা হিজরত করে মদীনায় আসলাম তখন আমাদের নারীরাও তাদের দেখাদেখি। আমাদের উপর প্রাধান্য লাভের ইচ্ছা করে। আমি মদীনা শরীফের উপরের অংশে হযরত উমাইয়া ইবনে যায়েদের বাড়ীতে অবস্থান করতাম। একদা আমি আমার স্ত্রীর উপর অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে কিছু বলতে লাগলাম। তখন সে উল্টিয়ে আমাকেও জবাব দিতে শুরু করলো। তার এই আচরণ আমার নিকট খুবই খারাপ বোধ হলো। আমি মনে মনে বললামঃ এই ধরনের নতুন আচরণ কেন? আমাকে বিস্মিত হতে দেখে সে বললোঃ “আপনি কি চিন্তা করছেন? আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরাও তাকে জবাব দিয়ে থাকে। কোন কোন সময় তো তারা সারা দিন ধরে তাঁর সাথে কথাবার্তা বলাও বন্ধ রাখে।” তার এই কথা শুনে আমি অন্য এক সমস্যায় পড়লাম। সরাসরি আমি আমার কন্যা হাফসা (রাঃ)-এর বাড়ীতে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তোমরা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে জবাব দিয়ে থাকো এবং মাঝে মাঝে সারা দিন তার সাথে কথাবার্তা বলা বন্ধ রাখো এটা কি সত্য? সে উত্তরে বললোঃ “হ্যাঁ, এটা সত্য বটে।” আমি তখন বললামঃ যারা এরূপ করে তারা ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তোমরা কি ভুলে যাচ্ছ যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর অসন্তুষ্টির কারণে এরূপ নারীর উপর স্বয়ং আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন? সাবধান! আগামীতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কোন জবাব দিবে না এবং তাঁর কাছে কিছুই চাইবে না। কিছু চাইতে হলে আমার কাছেই চাইবে। আয়েশা (রাঃ)-কে দেখে তুমি তার প্রতি লোভ বা হিংসা করবে না। সে তোমার চেয়ে ভাল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট অধিকতর প্রিয়। হে ইবনে আব্বাস (রাঃ)! আমার প্রতিবেশী একজন আনসারী ছিলেন। আমরা উভয়ে পালা ভাগ করে নিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর খিদমতে আমি একদিন হাযির হতাম এবং একদিন তিনি হাযির হতেন। আমি আমার পালার দিনের সমস্ত হাদীস, আয়াত ইত্যাদি শুনে তাঁকে এসে শুনাতাম এবং তিনি তার পালার দিন সবকিছু আমাকে এসে শুনাতেন। আমাদের মধ্যে এ কথাটি ঐ সময় মশহর হয়ে গিয়েছিল যে, গাসসানী বাদশাহ্ আমাদের উপর আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। একদা আমার সঙ্গী তাঁর পালার দিনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে গিয়েছিলেন! ইশার সময় এসে তিনি আমার দরজার উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডাক দিতে লাগলেন। আমি উদ্বেগের সাথে বের হয়ে বললামঃ খবর ভাল তো? তিনি উত্তরে বললেনঃ “আজ তো একটা কঠিন ব্যাপার ঘটে গেছে।” আমি বললামঃ গাস্‌সানী বাদশাহ কি পৌঁছে গেছে? তিনি জবাবে বললেনঃ “এর চেয়েও কঠিন সমস্যা দেখা দিয়েছে।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ কি হয়েছে, বলুন না? তিনি বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়েছেন।” আমি তখন বললামঃ আফসোস! হাফসা (রাঃ) তো ধ্বংস হয়ে গেল! আমি পূর্ব হতেই এটার আশংকা করছিলাম। ফজরের নামায পড়েই কাপড়-চোপড় পরে আমি সরাসরি হাফসা (রাঃ)-এর বাড়ীতে হাযির হলাম। দেখলাম যে, সে কাঁদছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কি তোমাদেরকে তালাক দিয়ে ফেলেছেন? সে জবাব দিলোঃ “এ খবর তো বলতে পারছি না। তবে তিনি আমাদের হতে পৃথক হয়ে নিজের কক্ষে অবস্থান করছেন। আমি সেখানে গেলাম। দেখি যে, একজন হাবশী গোলাম পাহারা দিচ্ছে। আমি তাকে বললামঃ যাও, আমার জন্যে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা কর। সে গেল এবং ফিরে এসে বললোঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কোন উত্তর দিলেন না।” আমি তখন সেখান হতে ফিরে এসে মসজিদে গেলাম। দেখলাম যে, মিম্বরের পাশে সাহাবীদের একটি দল বসে রয়েছেন এবং কারো কারো চক্ষু দিয়ে তো অশ্রু ঝরছে! আমি অল্পক্ষণ সেখানে বসে থাকলাম। কিন্তু আমার মনে শান্তি কোথায়? আবার উঠে দাঁড়ালাম এবং ঐ গোলামের কাছে গিয়ে অনুমতি চাইতে বললাম। গোলাম এবারও এসে খবর দিলো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন উত্তর দেননি। আবার আমি মসজিদে চলে গেলাম। সেখান হতে আবার ফিরে আসলাম এবং পুনরায় গোলামকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইতে বললাম। গোলাম আবার গেল এবং ঐ একই জবাব দিলো। আমি ফিরে যাচ্ছিলাম এমন সময় গোলাম আমাকে ডাক দিলো এবং বললোঃ “আপনাকে অনুমতি দেয়া হয়েছে।” আমি প্রবেশ করে দেখলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি বস্তার উপর হেলান লাগিয়ে বসে আছেন। যার দাগ তার দেহ মুবারকে পড়ে গেছে। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি আপনার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে ফেলেছেন? তিনি মাথা উঠিয়ে আমার দিকে চেয়ে বললেনঃ “না।” আমি বললামঃ আল্লাহু আকবার! হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কথা এই যে, আমরা কুরায়েশরা আমাদের স্ত্রীদেরকে আমাদের আজ্ঞাধীনে রাখতাম। কিন্তু মদীনাবাসীদের উপর তাদের স্ত্রীরা প্রাধান্য লাভ করে আছে। এখানে এসে আমাদের স্ত্রীরাও তাদের দেখাদেখি তাদেরই আচরণ গ্রহণ করে নিয়েছে। তারপর আমি আমার স্ত্রীর ঘটনাটিও বর্ণনা করলাম এবং তার একথাটিও বর্ণনা করলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীরাও এরূপ করে থাকেন। তারপর আমি আমার একথাটিও বর্ণনা করলাম যে, আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর অসন্তুষ্টির কারণে আল্লাহ যে অসন্তুষ্ট হয়ে যাবেন এবং এর ফলে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে এ ভয় কি তাদের নেই? আমার কথা শুনে তিনি মুচকি হাসলেন। তারপর আমি আমার হাফসা (রাঃ)-এর কাছে যাওয়া, তাকে আয়েশা (রাঃ)-এর প্রতি হিংসা পোষণ না করার উপদেশ দেয়ার কথা বর্ণনা করলাম। এবারও তিনি মুচকি হাসলেন। এরপর আমি বললামঃ অনুমতি হলে আরো কিছুক্ষণ আপনার এখানে অবস্থান করতাম। তিনি অনুমতি দিলে আমি বসে পড়লাম। অতঃপর আমি মাথা উঠিয়ে ঘরের চতুর্দিকে লক্ষ্য করে দেখি যে, তিনটি শুষ্ক চামড়া ছাড়া আর কিছুই নেই। তাঁর খাস দরবারের এ অবস্থা দেখে আমার খুবই দুঃখ হলো। আমি আরয করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দু'আ করুন যেন আল্লাহ তা'আলা আপনার উম্মতের উপর প্রশস্ততা দান করেন। দেখুন তো পারসিক ও রোমকরা আল্লাহর ইবাদত করে না, অথচ তারা দুনিয়ার কত বেশী নিয়ামতের মধ্যে ডুবে রয়েছে? আমার একথা শোনা মাত্রই তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং বলতে লাগলেনঃ “হে খাত্তাবের পুত্র! তুমি তো, সন্দেহের মধ্যে এখনো রয়ে গেছে। এই কওমের জন্যে দুনিয়ার এই নিয়ামতরাশি কল্যাণকর নয়। তাদেরকে এগুলো তাড়াতাড়ি করে দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হয়েছে।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন!ব্যাপারটা ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্ত্রীদের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণে শপথ করেছিলেন যে, এক মাসকাল তিনি তাদের সাথে মিলিত হবেন না। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তাম্বীহ করেন।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, জামে তিরমিযী এবং সুনানে নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “বছর ধরে আমি এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম যে, হযরত উমার (রাঃ)-কে এই দুইজন স্ত্রীর নাম জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ)-এর অত্যন্ত প্রভাবের কারণে তাঁকে জিজ্ঞেস করার সাহস হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত হজ্ব পালন করে প্রত্যাবর্তনের পথে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।” তারপর তিনি পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন যা উপরে বর্ণিত হলো।সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, তালাকের প্রসিদ্ধির ঘটনাটি পর্দার আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে ঘটেছিল। তাতে রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) যেমন হযরত হাফসা (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে তাকে বুঝিয়ে এসেছিলেন, তেমনিভাবে হযরত আয়েশা (রাঃ)-কেও বুঝিয়েছিলেন। তাতে এও রয়েছে যে, যে গোলামটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে পাহারা দিচ্ছিল তার নাম ছিল আবূ রিবাহ (রাঃ)। তাতে এও আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আপনার স্ত্রীদের ব্যাপারে এতো চিন্তিত হচ্ছেন কেন? যদি আপনি তাদেরকে তালাকও দিয়ে দেন তবে আপনার সাথে রয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতামণ্ডলী, হযরত জিবরাঈল (আঃ), হযরত মীকাঈল (আঃ), আমি, হযরত আবূ বকর (রাঃ) এবং সমস্ত মু'মিন।” হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলারই সমস্ত প্রশংসা, আমি এই প্রকারের কথা যে বলছিলাম, আমি আশা করছিলাম যে, আমার কথার সত্যতায় তিনি আয়াত নাযিল করবেন। হলোও তাই। আল্লাহ তা’আলা (আরবি) এই আয়াত এবং (আরবি) এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। যখন আমি জানতে পারলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর স্ত্রীদেরকে তালাক দেননি তখন আমি মসজিদে গিয়ে দরজার উপর দাঁড়িয়ে উচ্চ শব্দে সকলকে জানিয়ে দিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর পবিত্র স্ত্রীদেরকে তালাক দেননি। এ ব্যাপারেই আল্লাহ তা'আলা ... (আরবি)-এই আয়াতটি নাযিল করেন। অর্থাৎ “যখন তাদের কাছে কোন নিরাপত্তা বা ভয়ের খবর পৌঁছে তখন তারা তা প্রচার করতে শুরু করে দেয়। যদি তারা এই খবর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অথবা জ্ঞানী ও বিদ্বান মুসলমানদের নিকট পৌঁছিয়ে দিতো তবে নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে যারা তাহকীককারী তারা ওটা বুঝতে পারতো।” হযরত উমার (রাঃ) আয়াতটি এই পর্যন্ত পাঠ করে বলেনঃ এই বিষয়ের তাহকীককারীদের মধ্যে আমিও একজন।” আরো বহু বুযুর্গ মুফাসসির হতে বর্ণিত আছে যে, দ্বারা হযরত আবূ বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ হযরত উসমানেরও (রাঃ) নাম উল্লেখ করেছেন এবং কেউ কেউ আবার হযরত আলী (রাঃ)-এর নামও নিয়েছেন। একটি দুর্বল হাদীসে মারফূ’’রূপে শুধু হযরত আলী (রাঃ)-এর নাম রয়েছে। কিন্তু এর সনদ দুর্বল এবং সম্পূর্ণরূপে মুনকার। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে মর্যাদাবোধ জেগে উঠেছিল। আমি তখন তাদেরকে বললামঃ যদি নবী (সঃ) তোমাদেরকে পরিত্যাগ করেন তবে তার প্রতিপালক সম্ভবতঃ তাকে দিবেন তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর স্ত্রী। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং আমার ভাষাতেই আল্লাহ পাক তা নাযিল করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এটা পূর্বেই গত হয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বহু ব্যাপারে কুরআনের আনুকূল্য করেছেন। যেমন পর্দার ব্যাপারে, বদর যুদ্ধের বন্দীদের ব্যাপারে এবং মাকামে ইবরাহীমকে কিবলাহ নির্ধারণ করার ব্যাপারে। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি যখন উম্মাহাতুল মু'মিনীন ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মধ্যে মন কষাকষির খবর পেলাম তখন আমি তাদের কাছে গেলাম এবং তাদেরকে বললামঃ তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আপোষ করে নাও, অন্যথায় তিনি যদি তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন তবে তাঁর প্রতিপালক সম্ভবতঃ তাকে তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর স্ত্রী দান করবেন। অবশেষে আমি উম্মাহাতুল মু'মিনীনের শেষ জনের কাছে গেলাম। তখন সে বললোঃ “হে উমার (রাঃ)! আমাদেরকে উপদেশ দানের জন্যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি যথেষ্ট নন যে, আপনি আমাদেরকে উপদেশ দিতে আসলেন?" আমি তখন নীরব হয়ে গেলাম। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা ...- (আরবি) এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন।” (এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) ) সহীহ বুখারীর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যে স্ত্রীটি হযরত উমার (রাঃ)-কে এই উত্তর দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি সম্পর্কে তিনি বলেনঃ “ঘটনা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-এর ঘরে ছিলেন। যখন হাফসা (রাঃ) দেখেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মারিয়াহ (রাঃ)-এর সাথে মশগুল রয়েছেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বলেনঃ “তুমি এ খবর হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জানাবে না। আমি তোমাকে একটি সুসংবাদ দিচ্ছি। তা এই যে, আমার ইন্তেকালের পর আমার খিলাফত হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর পর তোমার আব্বা লাভ করবেন। কিন্তু হযরত হাফসা (রাঃ) এ খবর হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জানিয়ে দেন। তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ খবর আপনার কাছে কে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমাকে অবহিত করেছেন তিনি যিনি সর্বজ্ঞ, সম্যক অবগত।” হযরত আয়েশা (রাঃ) তখন বলেনঃ “আমি আপনার দিকে তাকাবো যে পর্যন্ত না আপনি মারিয়াহ (রাঃ)-কে আপনার উপর হারাম করবেন।” তখন তিনি হযরত মারিয়াহ (রাঃ)-কে নিজের উপর হারাম করেন। ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা .. (আরবি)-এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।” [এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তিবরানী (রঃ)](আরবি)-এর একটি তাফসীর তো এই যে, তারা হবে রোযা পালনকারিণী। একটি মারফূ’ হাদীসেও এই শব্দের এই তাফসীরই এসেছে যে হাদীসটি সূরায়ে বারাআতের এই শব্দের তাফসীরে গত হয়েছে যে, এই উম্মতের সিয়াহাত হলো রোযা রাখা। দ্বিতীয় তাফসীর এই যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হিজরতকারিণীগণ। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী উত্তম। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তাদের মধ্যে কেউ হবে অকুমারী এবং কেউ হবে কুমারী। যাতে মন খুশী থাকে।মু’জামে তিবরানীতে রয়েছে যে, ইবনে ইয়াযীদ (রঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতে স্বীয় নবী (সঃ)-কে যে ওয়াদা দিয়েছেন তাতে বেওয়া বা অকুমারী দ্বারা হযরত আসিয়া (রাঃ) কে বুঝানো হয়েছে যিনি ফিরাউনের স্ত্রী ছিলেন এবং কুমারী দ্বারা হযরত মরিয়ম (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে যিনি হযরত ইমরানের কন্যা ছিলেন। হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন। ঐ সময় হযরত খাদীজাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসেন। তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত খাদীজাহ (রাঃ)-কে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন, তাঁকে সুসংবাদ দেয়া হচ্ছে জান্নাতের একটি ঘরের, যেখানে না আছে গরম এবং না আছে কোন কষ্ট, আর না আছে কোন শোরগোল। যা ছিদ্রকৃত মুক্তা দ্বারা নির্মিত। যার ডানে-বামে মরিয়ম বিনতু ইমরান (রাঃ) এবং আসিয়া বিনতু মাযাহেম (রাঃ)-এর ঘর রয়েছে। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, হযরত খাদীজাহ (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে খাদীজাহ (রাঃ)! তোমার সতীনদেরকে আমার সালাম জানিয়ে দিবে।” হযরত খাদীজাহ (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পূর্বেও কি আপনি কাউকেও বিয়ে করেছিলেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা মরিয়ম বিনতু ইমরান (রাঃ), ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ) এবং মূসা (আঃ)-এর বোন কুলসুম (রাঃ) এই তিনজনকে আমার নিকাহতে দিয়ে রেখেছেন।” (এ হাদীসটি দুর্বল) হযরত আবূ উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেছেনঃ “তুমি কি জান যে, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আমার বিবাহ ইমরানের কন্যা মরিয়ম (রাঃ), মূসা (আঃ)-এর ভগ্নী কুলসুম (রাঃ), এবং ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়ার (রাঃ) সাথে দিয়ে রেখেছেন? তিনি উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে মুবারকবাদ।” (এ হাদীসটি আবূ ইয়ালা (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটাও দুর্বল হাদীস এবং সাথে সাথে মুরসালও বটে)

আত-তাহরীম 66:6

৬-৮ নং আয়াতের তাফসীর হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমরা তোমাদের পরিবারের লোকদেরকে ইলম ও আদব শিক্ষা দাও। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তোমরা আল্লাহর আদেশ মেনে চল এবং অবাধ্যাচরণ করো না। পরিবারের লোকদেরকে আল্লাহর যিকরের তাগীদ কর, যাতে আল্লাহ তোমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেন।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং পরিবারের লোকদেরকেও ভয় করতে বল। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্যের হুকুম কর এবং অবাধ্যাচরণ হতে নিষেধ কর। তাদের উপর আল্লাহর হুকুম কায়েম রাখো এবং তাদেরকে আল্লাহর আহকাম পালন করার তাগীদ করতে থাকো। সৎ কাজে তাদেরকে সাহায্য কর এবং অসৎ কাজে তাদেরকে শাসন-গর্জন কর।মুকাতিল (রঃ) বলেনঃ প্রত্যেক মুসলমানের উপর নিজের পরিবারভুক্ত লোকদেরকে এবং দাস-দাসীদেরকে আল্লাহর হুকুম পালন করার ও তাঁর নাফরমানী হতে বিরত থাকার শিক্ষা ও উপদেশ দান করতে থাকা ফরয।আবদুল মালিক ইবনে রাবী' ইবনে সিববাহ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের শিশুদেরকে নামাযের হুকুম কর যখন তাদের বয়স সাত বছর হয়। আর যখন তারা দশ বছর বয়সে পদার্পণ করে তখন তাদেরকে নামাযে অবহেলার কারণে প্রহার কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবূ দাউদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ফকীহদের ফরমান এই যে, অনুরূপভাবে শিশুদেরকে এই বয়স হতেই রোযার জন্যেও তাগীদ করা উচিত। যাতে প্রাপ্ত বয়সে পৌঁছা পর্যন্ত তারা নামায রোযায় পূর্ণমাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। যাতে তাদের মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করার এবং তাঁদের নাফরমানী হতে বিরত থাকার অভ্যাস পয়দা হয়। মুমিনরা এ কাজ করলে তারাও তাদের পরিবার পরিজন জাহান্নামের অগ্নি হতে রক্ষা পাবে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর। এদের দ্বারা অগ্নি প্রজ্বলিত করা হবে। তাহলে আগুন কত কঠিন তেজ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।প্রস্তর দ্বারা হয়তো ঐ প্রস্তর উদ্দেশ্য হতে পারে দুনিয়ায় যেগুলোর পূজা করা হয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা এবং তোমাদের মা'বূদরা জাহান্নামের ইন্ধন হবে।”(২১:৯৮) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), আবূ জা’ফর আল বাকির (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ওটা হবে গন্ধকের পাথর যা হবে অত্যন্ত দুর্গন্ধময়। একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। ঐ সময় তাঁর খিদমতে কয়েকজন সাহাবী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বৃদ্ধ লোক জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জাহান্নামের পাথরটি দুনিয়ার পাথরের মত?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যাঁর অধিকারে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! জাহান্নামের একটি পাথর দুনিয়ার সমস্ত পাথর হতে বড়।” একথা শুনে বৃদ্ধ লোকটি অচৈতন্য হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বক্ষে হাত রেখে বুঝতে পারলেন যে, তিনি জীবিত আছেন। সুতরাং তিনি তাঁকে ডাক দিয়ে বললেনঃ “হে বৃদ্ধ! বলঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্।” বৃদ্ধ তা পাঠ করলেন। তারপর তিনি ঐ বৃদ্ধ লোকটিকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন। সাহাবীগণ তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের মধ্য হতে শুধু তাঁকেই এ সুসংবাদ দান করলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওটা ঐ ব্যক্তির জন্যে, যে আমার সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং ভয় করে আমার শাস্তিকে।” (১৪:১৪)।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ এতে (এই শাস্তি দেয়ার কাজে) নিয়োজিত রয়েছে নির্মম হৃদয়, কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ। অর্থাৎ তাদের স্বভাব বা প্রকৃতি কঠোর। কাফেরদের জন্যে তাদের অন্তরে কোন করুণা রাখা হয়নি। তারা নিকৃষ্ট পন্থায় কঠিন শাস্তি দিয়ে থাকে। তাদেরকে দেখা মাত্রই অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামীদের প্রথম দলটি যখন জাহান্নামের দিকে এগিয়ে চলবে তখন দেখবে যে, দরজার উপর চার লক্ষ ফেরেশতা শাস্তি দেয়ার জন্যে প্রস্তুত রয়েছেন, যাঁদের চেহারা অত্যন্ত ভয়াবহ, রঙ অত্যন্ত কালে। দাঁতগুলো বাইরের দিকে বেরিয়ে আছে। তাঁরা অত্যন্ত নির্দয় ও কঠোর হৃদয়। তাঁদের অন্তরে অণুপরিমাণও দয়া রাখা হয়নি। তাঁরা এতো মোটা ও চওড়া যে, যদি পাখী তাদের এক স্কন্ধ হতে উড়তে শুরু করে তবে অন্য স্কন্ধে পৌঁছতে তার দুই মাস সময় লাগবে। তারপর তারা (জাহান্নামীরা) দ্বিতীয় দরজার উপর ঊনিশ জন ফেরেশতা দেখতে পাবে, যাদের বক্ষ এতো প্রশস্ত যে, তা সত্তর বছরের পথ। অতঃপর তাদেরকে এক দরজা হতে অন্য দরজার দিকে ধাক্কা দেয়া হবে। পাঁচ শত বছর পড়তে থাকার পর অন্য দরজার কাছে তারা তা দেখতে পাবে। এই ভাবে প্রতিটি দরজার উপর এই ফেরেশতামণ্ডলী আল্লাহ তা'আলার আজ্ঞাধীন রয়েছেন। একদিকে আদেশ এবং অন্যদিকে তা প্রতিপালন। তাঁদেরকে যাবানিয়্যাহ বলা হয়। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাঁদের হাত হতে মুক্তি দান করুন! এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে কাফিরগণ! আজ তোমরা দোষ স্খালনের চেষ্টা করো না। তোমরা যা করতে তোমাদেরকে তারই প্রতিফল দেয়া হবে। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন কাফিরদেরকে বলা হবেঃ আজকে তোমরা কোন ওযর পেশ করো না, কারণ আজ তোমাদের কোন ওযর কবূল করা হবে না। তোমাদেরকে আজকে তোমাদের কৃতকর্মেরই শুধু প্রতিফল দেয়া হবে।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা কর, বিশুদ্ধ তাওবা। অর্থাৎ সত্য ও খাঁটি তাওবা কর যার ফলে তোমাদের পূর্ববর্তী পাপরাশি মার্জনা করা হবে। আর তোমাদের মন্দ স্বভাব দূর হয়ে যাবে। হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে খুৎবায় বলতে শুনেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট এমন বিশুদ্ধ তাওবা কর যে, তোমার দ্বারা ঐ পাপকার্যের আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।” (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ “অতঃপর ঐ পাপকার্য করার ইচ্ছাও করবে না।" হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে। একটি মারফূ’ হাদীসে এরূপই এসেছে যা দুর্বল এবং সঠিক কথা এটাই যে, এ হাদীসটিও মাওকুফ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।পূর্বযুগীয় আলেমগণ বলেনঃ খাঁটি ও বিশুদ্ধ তাওবা এই যে, গুনাহ হয়ে যাওয়ার পরই তাওবা করবে ও লজ্জিত হবে এবং আগামীতে ঐ পাপকার্য আর না করার দৃঢ় সংকল্প করবে। আর যদি গুনাহতে কারো হক থাকে তবে চতুর্থ শর্ত এই যে, ঐ হক নিয়মিতভাবে আদায় করবে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “লজ্জিত হওয়াও হলো তাওবা করা।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেনঃ “কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সময় এই উম্মতের শেষের লোকেরা কি কাজ করবে তা আমাদেরকে বলে দেয়া হয়েছে। একটি এই যে, মানুষ তার স্ত্রী বা দাসীর গৃহ্যদ্বারে সঙ্গম করবে। অথচ এটা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল হারাম করেছেন। আর এ কাজে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) অসন্তুষ্ট হন। অনুরূপভাবে পুরুষের সাথে পুরুষ কুকাজে লিপ্ত হবে। যা হারাম এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অসন্তুষ্টির কারণ। এ লোকদের নামাযও আল্লাহর নিকট কবূল হয় না। যে পর্যন্ত না তারা তাওবা করে বিশুদ্ধ তাওবা।" তখন হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “বিশুদ্ধ তাওবা কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই প্রশ্নই করেছিলাম। তিনি জবাবে বলেছিলেনঃ “ভুলক্রমে গুনাহ হয়ে গেছে, অতঃপর ওর উপর লজ্জিত হওয়া, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা, তারপর ঐ গুনাহর দিকে আর ঝুঁকে না পড়া।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান (রঃ) বলেনঃ বিশুদ্ধ তাওবা হলো এই যে, যেমন গুনাহর প্রতি ভালবাসা ও আকর্ষণ ছিল ঐ রকমই ওর প্রতি অন্তরে ঘৃণা জন্মে যাওয়া। যখন ঐ গুনাহর কথা স্মরণ হয় তখন ক্ষমা প্রার্থনা করা। যখন কোন বান্দা তাওবা করার জন্যে দঢ় সংকল্প করে নেয় এবং তাওবার উপর অটল থাকে তখন আল্লাহ তা'আলা তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন।সহীহ্ হাদীসে এসেছে যে, ইসলাম গ্রহণের পর ইসলাম-পূর্ব যুগের সমস্ত গুনাহ্ ইসলাম মিটিয়ে দেয়। এখন থাকলো এই কথা যে, বিশুদ্ধ তাওবায় শর্ত হলো, তাওবাকারী মৃত্যু পর্যন্ত আর ঐ গুনাহর কাজ কখনো করবে না। যেমন হাদীস ও আসার এখনই বর্ণিত হলো যে, আর কখনো ঐ পাপের কাজে হাত দিবে না। অথবা শুধু এই দৃঢ় সংকল্প যথেষ্ট হবে যে, ঐ পাপকার্য আর কখনো করবে না, তারপর হয় তো মানবিক চাহিদা হিসেবে আবার পদস্খলন ঘটে যাবে। যেমন এখনই হাদীস গত হলো যে, তাওবা পূর্বের সমস্ত গুনাহকে মিটিয়ে দেয়। তাহলে শুধু কি তাওবার দ্বারাই গুনাহ্ মাফ হয়ে যাবে, না মৃত্যু পর্যন্ত ঐ গুনাহর কাজ আর না করা শর্ত? প্রথমটির দলীল তো এই সহীহ্ হাদীসটি যে, যে ব্যক্তি ইসলামে সৎ কাজ করবে, সে তার অজ্ঞতার যুগের অসৎ কাজের কারণে গ্রেফতার হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণের পরেও অসৎ কাজে জড়িয়ে পড়বে তাকে তার ইসলাম ও জাহেলিয়াত উভয় যুগের অসৎ কাজের জন্যে পাকড়াও করা হবে। সুতরাং ইসলাম, যা পাপরাশিকে দূর করে দেয়ার ব্যাপারে তাওবার অপেক্ষাও অগ্রগণ্য, এর পরেও যখন তার অসত্ত্বার্যের কারণে পাকড়াও করা হচ্ছে, তখন তাওবার পরেও অসৎ কাজ পুনরায় করলে তো আরো বেশী তাকে পাকড়াও করা উচিত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আল্লাহ নবী (সঃ) ও তার মুমিন সঙ্গীদেরকে অপদস্থ করবেন না। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে যে জ্যোতি দান করা হবে তা তাদের সামনে ও দক্ষিণ পার্শ্বে ধাবিত হবে। আর অন্যেরা সবাই অন্ধকারের মধ্যে থাকবে। যেমন ইতিপূর্বে এটা সূরায়ে হাদীদের তাফসীরে গত হয়েছে। যখন মুমিনগণ দেখবে যে, মুনাফিকরা যে জ্যোতি লাভ করেছিল, ঠিক প্রয়োজনের সময় তা তাদের হতে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এবং তারা অন্ধকারের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন তারা (মুমিনরা) দুআ করবেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে জ্যোতিতে আপনি পূর্ণতা দান করুন এবং আমাদেরকে রক্ষা করুন! আপনি তো সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।বানু কিনানাহ্ গোত্রের একজন লোক বলেনঃ “মক্কা বিজয়ের দিন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে নামায পড়েছিলাম। আমি তাঁকে দু’আয় বলতে শুনেছিলামঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! কিয়ামতের দিন আপনি আমাকে অপদস্ত করবেন না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ যার (রাঃ) ও হযরত আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আমাকে সিজদার অনুমতি দেয়া হবে। অনুরূপভাবে সর্বপ্রথম আমাকেই সিজদা হতে মস্তক উত্তোলনেরও অনুমতি দেয়া হবে। আমি আমার সামনে এবং ডানে ও বামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমার উম্মতকে চিনে নিবো।” একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদেরকে আপনি কি করে চিনতে পারবেন? বহু উম্মত তো মিশ্রিতভাবে থাকবে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার উম্মতের লোকদের একটি চিহ্ন তো এই যে, তাদের অযুর অঙ্গগুলো উজ্জ্বল হবে ও চমকিতে থাকবে। অন্য কোন উম্মতের লোকদের এরূপ হবে না। দ্বিতীয় পরিচয় এই যে, তাদের আমলনামা তাদের ডান হাতে থাকবে। তৃতীয় নিদর্শন এই যে, তাদের ললাটে সিজদার চিহ্ন থাকবে। চতুর্থ চিহ্ন এই যে, তাদের জ্যোতি তাদের আগে আগে থাকবে।” (এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনে নাসরুল মুরূযী (রঃ) বর্ণনা করেছন)

আত-তাহরীম 66:7

৬-৮ নং আয়াতের তাফসীর হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমরা তোমাদের পরিবারের লোকদেরকে ইলম ও আদব শিক্ষা দাও। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তোমরা আল্লাহর আদেশ মেনে চল এবং অবাধ্যাচরণ করো না। পরিবারের লোকদেরকে আল্লাহর যিকরের তাগীদ কর, যাতে আল্লাহ তোমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেন।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং পরিবারের লোকদেরকেও ভয় করতে বল। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্যের হুকুম কর এবং অবাধ্যাচরণ হতে নিষেধ কর। তাদের উপর আল্লাহর হুকুম কায়েম রাখো এবং তাদেরকে আল্লাহর আহকাম পালন করার তাগীদ করতে থাকো। সৎ কাজে তাদেরকে সাহায্য কর এবং অসৎ কাজে তাদেরকে শাসন-গর্জন কর।মুকাতিল (রঃ) বলেনঃ প্রত্যেক মুসলমানের উপর নিজের পরিবারভুক্ত লোকদেরকে এবং দাস-দাসীদেরকে আল্লাহর হুকুম পালন করার ও তাঁর নাফরমানী হতে বিরত থাকার শিক্ষা ও উপদেশ দান করতে থাকা ফরয।আবদুল মালিক ইবনে রাবী' ইবনে সিববাহ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের শিশুদেরকে নামাযের হুকুম কর যখন তাদের বয়স সাত বছর হয়। আর যখন তারা দশ বছর বয়সে পদার্পণ করে তখন তাদেরকে নামাযে অবহেলার কারণে প্রহার কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবূ দাউদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ফকীহদের ফরমান এই যে, অনুরূপভাবে শিশুদেরকে এই বয়স হতেই রোযার জন্যেও তাগীদ করা উচিত। যাতে প্রাপ্ত বয়সে পৌঁছা পর্যন্ত তারা নামায রোযায় পূর্ণমাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। যাতে তাদের মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করার এবং তাঁদের নাফরমানী হতে বিরত থাকার অভ্যাস পয়দা হয়। মুমিনরা এ কাজ করলে তারাও তাদের পরিবার পরিজন জাহান্নামের অগ্নি হতে রক্ষা পাবে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর। এদের দ্বারা অগ্নি প্রজ্বলিত করা হবে। তাহলে আগুন কত কঠিন তেজ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।প্রস্তর দ্বারা হয়তো ঐ প্রস্তর উদ্দেশ্য হতে পারে দুনিয়ায় যেগুলোর পূজা করা হয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা এবং তোমাদের মা'বূদরা জাহান্নামের ইন্ধন হবে।”(২১:৯৮) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), আবূ জা’ফর আল বাকির (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ওটা হবে গন্ধকের পাথর যা হবে অত্যন্ত দুর্গন্ধময়। একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। ঐ সময় তাঁর খিদমতে কয়েকজন সাহাবী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বৃদ্ধ লোক জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জাহান্নামের পাথরটি দুনিয়ার পাথরের মত?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যাঁর অধিকারে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! জাহান্নামের একটি পাথর দুনিয়ার সমস্ত পাথর হতে বড়।” একথা শুনে বৃদ্ধ লোকটি অচৈতন্য হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বক্ষে হাত রেখে বুঝতে পারলেন যে, তিনি জীবিত আছেন। সুতরাং তিনি তাঁকে ডাক দিয়ে বললেনঃ “হে বৃদ্ধ! বলঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্।” বৃদ্ধ তা পাঠ করলেন। তারপর তিনি ঐ বৃদ্ধ লোকটিকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন। সাহাবীগণ তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের মধ্য হতে শুধু তাঁকেই এ সুসংবাদ দান করলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওটা ঐ ব্যক্তির জন্যে, যে আমার সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং ভয় করে আমার শাস্তিকে।” (১৪:১৪)।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ এতে (এই শাস্তি দেয়ার কাজে) নিয়োজিত রয়েছে নির্মম হৃদয়, কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ। অর্থাৎ তাদের স্বভাব বা প্রকৃতি কঠোর। কাফেরদের জন্যে তাদের অন্তরে কোন করুণা রাখা হয়নি। তারা নিকৃষ্ট পন্থায় কঠিন শাস্তি দিয়ে থাকে। তাদেরকে দেখা মাত্রই অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামীদের প্রথম দলটি যখন জাহান্নামের দিকে এগিয়ে চলবে তখন দেখবে যে, দরজার উপর চার লক্ষ ফেরেশতা শাস্তি দেয়ার জন্যে প্রস্তুত রয়েছেন, যাঁদের চেহারা অত্যন্ত ভয়াবহ, রঙ অত্যন্ত কালে। দাঁতগুলো বাইরের দিকে বেরিয়ে আছে। তাঁরা অত্যন্ত নির্দয় ও কঠোর হৃদয়। তাঁদের অন্তরে অণুপরিমাণও দয়া রাখা হয়নি। তাঁরা এতো মোটা ও চওড়া যে, যদি পাখী তাদের এক স্কন্ধ হতে উড়তে শুরু করে তবে অন্য স্কন্ধে পৌঁছতে তার দুই মাস সময় লাগবে। তারপর তারা (জাহান্নামীরা) দ্বিতীয় দরজার উপর ঊনিশ জন ফেরেশতা দেখতে পাবে, যাদের বক্ষ এতো প্রশস্ত যে, তা সত্তর বছরের পথ। অতঃপর তাদেরকে এক দরজা হতে অন্য দরজার দিকে ধাক্কা দেয়া হবে। পাঁচ শত বছর পড়তে থাকার পর অন্য দরজার কাছে তারা তা দেখতে পাবে। এই ভাবে প্রতিটি দরজার উপর এই ফেরেশতামণ্ডলী আল্লাহ তা'আলার আজ্ঞাধীন রয়েছেন। একদিকে আদেশ এবং অন্যদিকে তা প্রতিপালন। তাঁদেরকে যাবানিয়্যাহ বলা হয়। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাঁদের হাত হতে মুক্তি দান করুন! এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে কাফিরগণ! আজ তোমরা দোষ স্খালনের চেষ্টা করো না। তোমরা যা করতে তোমাদেরকে তারই প্রতিফল দেয়া হবে। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন কাফিরদেরকে বলা হবেঃ আজকে তোমরা কোন ওযর পেশ করো না, কারণ আজ তোমাদের কোন ওযর কবূল করা হবে না। তোমাদেরকে আজকে তোমাদের কৃতকর্মেরই শুধু প্রতিফল দেয়া হবে।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা কর, বিশুদ্ধ তাওবা। অর্থাৎ সত্য ও খাঁটি তাওবা কর যার ফলে তোমাদের পূর্ববর্তী পাপরাশি মার্জনা করা হবে। আর তোমাদের মন্দ স্বভাব দূর হয়ে যাবে। হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে খুৎবায় বলতে শুনেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট এমন বিশুদ্ধ তাওবা কর যে, তোমার দ্বারা ঐ পাপকার্যের আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।” (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ “অতঃপর ঐ পাপকার্য করার ইচ্ছাও করবে না।" হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে। একটি মারফূ’ হাদীসে এরূপই এসেছে যা দুর্বল এবং সঠিক কথা এটাই যে, এ হাদীসটিও মাওকুফ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।পূর্বযুগীয় আলেমগণ বলেনঃ খাঁটি ও বিশুদ্ধ তাওবা এই যে, গুনাহ হয়ে যাওয়ার পরই তাওবা করবে ও লজ্জিত হবে এবং আগামীতে ঐ পাপকার্য আর না করার দৃঢ় সংকল্প করবে। আর যদি গুনাহতে কারো হক থাকে তবে চতুর্থ শর্ত এই যে, ঐ হক নিয়মিতভাবে আদায় করবে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “লজ্জিত হওয়াও হলো তাওবা করা।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেনঃ “কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সময় এই উম্মতের শেষের লোকেরা কি কাজ করবে তা আমাদেরকে বলে দেয়া হয়েছে। একটি এই যে, মানুষ তার স্ত্রী বা দাসীর গৃহ্যদ্বারে সঙ্গম করবে। অথচ এটা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল হারাম করেছেন। আর এ কাজে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) অসন্তুষ্ট হন। অনুরূপভাবে পুরুষের সাথে পুরুষ কুকাজে লিপ্ত হবে। যা হারাম এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অসন্তুষ্টির কারণ। এ লোকদের নামাযও আল্লাহর নিকট কবূল হয় না। যে পর্যন্ত না তারা তাওবা করে বিশুদ্ধ তাওবা।" তখন হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “বিশুদ্ধ তাওবা কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই প্রশ্নই করেছিলাম। তিনি জবাবে বলেছিলেনঃ “ভুলক্রমে গুনাহ হয়ে গেছে, অতঃপর ওর উপর লজ্জিত হওয়া, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা, তারপর ঐ গুনাহর দিকে আর ঝুঁকে না পড়া।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান (রঃ) বলেনঃ বিশুদ্ধ তাওবা হলো এই যে, যেমন গুনাহর প্রতি ভালবাসা ও আকর্ষণ ছিল ঐ রকমই ওর প্রতি অন্তরে ঘৃণা জন্মে যাওয়া। যখন ঐ গুনাহর কথা স্মরণ হয় তখন ক্ষমা প্রার্থনা করা। যখন কোন বান্দা তাওবা করার জন্যে দঢ় সংকল্প করে নেয় এবং তাওবার উপর অটল থাকে তখন আল্লাহ তা'আলা তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন।সহীহ্ হাদীসে এসেছে যে, ইসলাম গ্রহণের পর ইসলাম-পূর্ব যুগের সমস্ত গুনাহ্ ইসলাম মিটিয়ে দেয়। এখন থাকলো এই কথা যে, বিশুদ্ধ তাওবায় শর্ত হলো, তাওবাকারী মৃত্যু পর্যন্ত আর ঐ গুনাহর কাজ কখনো করবে না। যেমন হাদীস ও আসার এখনই বর্ণিত হলো যে, আর কখনো ঐ পাপের কাজে হাত দিবে না। অথবা শুধু এই দৃঢ় সংকল্প যথেষ্ট হবে যে, ঐ পাপকার্য আর কখনো করবে না, তারপর হয় তো মানবিক চাহিদা হিসেবে আবার পদস্খলন ঘটে যাবে। যেমন এখনই হাদীস গত হলো যে, তাওবা পূর্বের সমস্ত গুনাহকে মিটিয়ে দেয়। তাহলে শুধু কি তাওবার দ্বারাই গুনাহ্ মাফ হয়ে যাবে, না মৃত্যু পর্যন্ত ঐ গুনাহর কাজ আর না করা শর্ত? প্রথমটির দলীল তো এই সহীহ্ হাদীসটি যে, যে ব্যক্তি ইসলামে সৎ কাজ করবে, সে তার অজ্ঞতার যুগের অসৎ কাজের কারণে গ্রেফতার হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণের পরেও অসৎ কাজে জড়িয়ে পড়বে তাকে তার ইসলাম ও জাহেলিয়াত উভয় যুগের অসৎ কাজের জন্যে পাকড়াও করা হবে। সুতরাং ইসলাম, যা পাপরাশিকে দূর করে দেয়ার ব্যাপারে তাওবার অপেক্ষাও অগ্রগণ্য, এর পরেও যখন তার অসত্ত্বার্যের কারণে পাকড়াও করা হচ্ছে, তখন তাওবার পরেও অসৎ কাজ পুনরায় করলে তো আরো বেশী তাকে পাকড়াও করা উচিত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আল্লাহ নবী (সঃ) ও তার মুমিন সঙ্গীদেরকে অপদস্থ করবেন না। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে যে জ্যোতি দান করা হবে তা তাদের সামনে ও দক্ষিণ পার্শ্বে ধাবিত হবে। আর অন্যেরা সবাই অন্ধকারের মধ্যে থাকবে। যেমন ইতিপূর্বে এটা সূরায়ে হাদীদের তাফসীরে গত হয়েছে। যখন মুমিনগণ দেখবে যে, মুনাফিকরা যে জ্যোতি লাভ করেছিল, ঠিক প্রয়োজনের সময় তা তাদের হতে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এবং তারা অন্ধকারের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন তারা (মুমিনরা) দুআ করবেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে জ্যোতিতে আপনি পূর্ণতা দান করুন এবং আমাদেরকে রক্ষা করুন! আপনি তো সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।বানু কিনানাহ্ গোত্রের একজন লোক বলেনঃ “মক্কা বিজয়ের দিন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে নামায পড়েছিলাম। আমি তাঁকে দু’আয় বলতে শুনেছিলামঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! কিয়ামতের দিন আপনি আমাকে অপদস্ত করবেন না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ যার (রাঃ) ও হযরত আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আমাকে সিজদার অনুমতি দেয়া হবে। অনুরূপভাবে সর্বপ্রথম আমাকেই সিজদা হতে মস্তক উত্তোলনেরও অনুমতি দেয়া হবে। আমি আমার সামনে এবং ডানে ও বামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমার উম্মতকে চিনে নিবো।” একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদেরকে আপনি কি করে চিনতে পারবেন? বহু উম্মত তো মিশ্রিতভাবে থাকবে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার উম্মতের লোকদের একটি চিহ্ন তো এই যে, তাদের অযুর অঙ্গগুলো উজ্জ্বল হবে ও চমকিতে থাকবে। অন্য কোন উম্মতের লোকদের এরূপ হবে না। দ্বিতীয় পরিচয় এই যে, তাদের আমলনামা তাদের ডান হাতে থাকবে। তৃতীয় নিদর্শন এই যে, তাদের ললাটে সিজদার চিহ্ন থাকবে। চতুর্থ চিহ্ন এই যে, তাদের জ্যোতি তাদের আগে আগে থাকবে।” (এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনে নাসরুল মুরূযী (রঃ) বর্ণনা করেছন)

আত-তাহরীম 66:8

৬-৮ নং আয়াতের তাফসীর হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমরা তোমাদের পরিবারের লোকদেরকে ইলম ও আদব শিক্ষা দাও। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তোমরা আল্লাহর আদেশ মেনে চল এবং অবাধ্যাচরণ করো না। পরিবারের লোকদেরকে আল্লাহর যিকরের তাগীদ কর, যাতে আল্লাহ তোমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করেন।মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং পরিবারের লোকদেরকেও ভয় করতে বল। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, অর্থ হলোঃ তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্যের হুকুম কর এবং অবাধ্যাচরণ হতে নিষেধ কর। তাদের উপর আল্লাহর হুকুম কায়েম রাখো এবং তাদেরকে আল্লাহর আহকাম পালন করার তাগীদ করতে থাকো। সৎ কাজে তাদেরকে সাহায্য কর এবং অসৎ কাজে তাদেরকে শাসন-গর্জন কর।মুকাতিল (রঃ) বলেনঃ প্রত্যেক মুসলমানের উপর নিজের পরিবারভুক্ত লোকদেরকে এবং দাস-দাসীদেরকে আল্লাহর হুকুম পালন করার ও তাঁর নাফরমানী হতে বিরত থাকার শিক্ষা ও উপদেশ দান করতে থাকা ফরয।আবদুল মালিক ইবনে রাবী' ইবনে সিববাহ (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের শিশুদেরকে নামাযের হুকুম কর যখন তাদের বয়স সাত বছর হয়। আর যখন তারা দশ বছর বয়সে পদার্পণ করে তখন তাদেরকে নামাযে অবহেলার কারণে প্রহার কর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবূ দাউদ (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)ফকীহদের ফরমান এই যে, অনুরূপভাবে শিশুদেরকে এই বয়স হতেই রোযার জন্যেও তাগীদ করা উচিত। যাতে প্রাপ্ত বয়সে পৌঁছা পর্যন্ত তারা নামায রোযায় পূর্ণমাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। যাতে তাদের মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করার এবং তাঁদের নাফরমানী হতে বিরত থাকার অভ্যাস পয়দা হয়। মুমিনরা এ কাজ করলে তারাও তাদের পরিবার পরিজন জাহান্নামের অগ্নি হতে রক্ষা পাবে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর। এদের দ্বারা অগ্নি প্রজ্বলিত করা হবে। তাহলে আগুন কত কঠিন তেজ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।প্রস্তর দ্বারা হয়তো ঐ প্রস্তর উদ্দেশ্য হতে পারে দুনিয়ায় যেগুলোর পূজা করা হয়। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা এবং তোমাদের মা'বূদরা জাহান্নামের ইন্ধন হবে।”(২১:৯৮) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), আবূ জা’ফর আল বাকির (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, ওটা হবে গন্ধকের পাথর যা হবে অত্যন্ত দুর্গন্ধময়। একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। ঐ সময় তাঁর খিদমতে কয়েকজন সাহাবী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বৃদ্ধ লোক জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! জাহান্নামের পাথরটি দুনিয়ার পাথরের মত?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যাঁর অধিকারে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! জাহান্নামের একটি পাথর দুনিয়ার সমস্ত পাথর হতে বড়।” একথা শুনে বৃদ্ধ লোকটি অচৈতন্য হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বক্ষে হাত রেখে বুঝতে পারলেন যে, তিনি জীবিত আছেন। সুতরাং তিনি তাঁকে ডাক দিয়ে বললেনঃ “হে বৃদ্ধ! বলঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্।” বৃদ্ধ তা পাঠ করলেন। তারপর তিনি ঐ বৃদ্ধ লোকটিকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন। সাহাবীগণ তখন বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের মধ্য হতে শুধু তাঁকেই এ সুসংবাদ দান করলেন?” তিনি উত্তরে বললেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ওটা ঐ ব্যক্তির জন্যে, যে আমার সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং ভয় করে আমার শাস্তিকে।” (১৪:১৪)।এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ এতে (এই শাস্তি দেয়ার কাজে) নিয়োজিত রয়েছে নির্মম হৃদয়, কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ। অর্থাৎ তাদের স্বভাব বা প্রকৃতি কঠোর। কাফেরদের জন্যে তাদের অন্তরে কোন করুণা রাখা হয়নি। তারা নিকৃষ্ট পন্থায় কঠিন শাস্তি দিয়ে থাকে। তাদেরকে দেখা মাত্রই অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামীদের প্রথম দলটি যখন জাহান্নামের দিকে এগিয়ে চলবে তখন দেখবে যে, দরজার উপর চার লক্ষ ফেরেশতা শাস্তি দেয়ার জন্যে প্রস্তুত রয়েছেন, যাঁদের চেহারা অত্যন্ত ভয়াবহ, রঙ অত্যন্ত কালে। দাঁতগুলো বাইরের দিকে বেরিয়ে আছে। তাঁরা অত্যন্ত নির্দয় ও কঠোর হৃদয়। তাঁদের অন্তরে অণুপরিমাণও দয়া রাখা হয়নি। তাঁরা এতো মোটা ও চওড়া যে, যদি পাখী তাদের এক স্কন্ধ হতে উড়তে শুরু করে তবে অন্য স্কন্ধে পৌঁছতে তার দুই মাস সময় লাগবে। তারপর তারা (জাহান্নামীরা) দ্বিতীয় দরজার উপর ঊনিশ জন ফেরেশতা দেখতে পাবে, যাদের বক্ষ এতো প্রশস্ত যে, তা সত্তর বছরের পথ। অতঃপর তাদেরকে এক দরজা হতে অন্য দরজার দিকে ধাক্কা দেয়া হবে। পাঁচ শত বছর পড়তে থাকার পর অন্য দরজার কাছে তারা তা দেখতে পাবে। এই ভাবে প্রতিটি দরজার উপর এই ফেরেশতামণ্ডলী আল্লাহ তা'আলার আজ্ঞাধীন রয়েছেন। একদিকে আদেশ এবং অন্যদিকে তা প্রতিপালন। তাঁদেরকে যাবানিয়্যাহ বলা হয়। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাঁদের হাত হতে মুক্তি দান করুন! এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে কাফিরগণ! আজ তোমরা দোষ স্খালনের চেষ্টা করো না। তোমরা যা করতে তোমাদেরকে তারই প্রতিফল দেয়া হবে। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন কাফিরদেরকে বলা হবেঃ আজকে তোমরা কোন ওযর পেশ করো না, কারণ আজ তোমাদের কোন ওযর কবূল করা হবে না। তোমাদেরকে আজকে তোমাদের কৃতকর্মেরই শুধু প্রতিফল দেয়া হবে।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা কর, বিশুদ্ধ তাওবা। অর্থাৎ সত্য ও খাঁটি তাওবা কর যার ফলে তোমাদের পূর্ববর্তী পাপরাশি মার্জনা করা হবে। আর তোমাদের মন্দ স্বভাব দূর হয়ে যাবে। হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে খুৎবায় বলতে শুনেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট এমন বিশুদ্ধ তাওবা কর যে, তোমার দ্বারা ঐ পাপকার্যের আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।” (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) অন্য রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ “অতঃপর ঐ পাপকার্য করার ইচ্ছাও করবে না।" হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতেও প্রায় এরূপই বর্ণিত আছে। একটি মারফূ’ হাদীসে এরূপই এসেছে যা দুর্বল এবং সঠিক কথা এটাই যে, এ হাদীসটিও মাওকুফ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।পূর্বযুগীয় আলেমগণ বলেনঃ খাঁটি ও বিশুদ্ধ তাওবা এই যে, গুনাহ হয়ে যাওয়ার পরই তাওবা করবে ও লজ্জিত হবে এবং আগামীতে ঐ পাপকার্য আর না করার দৃঢ় সংকল্প করবে। আর যদি গুনাহতে কারো হক থাকে তবে চতুর্থ শর্ত এই যে, ঐ হক নিয়মিতভাবে আদায় করবে।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “লজ্জিত হওয়াও হলো তাওবা করা।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেনঃ “কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সময় এই উম্মতের শেষের লোকেরা কি কাজ করবে তা আমাদেরকে বলে দেয়া হয়েছে। একটি এই যে, মানুষ তার স্ত্রী বা দাসীর গৃহ্যদ্বারে সঙ্গম করবে। অথচ এটা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল হারাম করেছেন। আর এ কাজে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) অসন্তুষ্ট হন। অনুরূপভাবে পুরুষের সাথে পুরুষ কুকাজে লিপ্ত হবে। যা হারাম এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর অসন্তুষ্টির কারণ। এ লোকদের নামাযও আল্লাহর নিকট কবূল হয় না। যে পর্যন্ত না তারা তাওবা করে বিশুদ্ধ তাওবা।" তখন হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “বিশুদ্ধ তাওবা কি?" উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই প্রশ্নই করেছিলাম। তিনি জবাবে বলেছিলেনঃ “ভুলক্রমে গুনাহ হয়ে গেছে, অতঃপর ওর উপর লজ্জিত হওয়া, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা, তারপর ঐ গুনাহর দিকে আর ঝুঁকে না পড়া।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত হাসান (রঃ) বলেনঃ বিশুদ্ধ তাওবা হলো এই যে, যেমন গুনাহর প্রতি ভালবাসা ও আকর্ষণ ছিল ঐ রকমই ওর প্রতি অন্তরে ঘৃণা জন্মে যাওয়া। যখন ঐ গুনাহর কথা স্মরণ হয় তখন ক্ষমা প্রার্থনা করা। যখন কোন বান্দা তাওবা করার জন্যে দঢ় সংকল্প করে নেয় এবং তাওবার উপর অটল থাকে তখন আল্লাহ তা'আলা তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন।সহীহ্ হাদীসে এসেছে যে, ইসলাম গ্রহণের পর ইসলাম-পূর্ব যুগের সমস্ত গুনাহ্ ইসলাম মিটিয়ে দেয়। এখন থাকলো এই কথা যে, বিশুদ্ধ তাওবায় শর্ত হলো, তাওবাকারী মৃত্যু পর্যন্ত আর ঐ গুনাহর কাজ কখনো করবে না। যেমন হাদীস ও আসার এখনই বর্ণিত হলো যে, আর কখনো ঐ পাপের কাজে হাত দিবে না। অথবা শুধু এই দৃঢ় সংকল্প যথেষ্ট হবে যে, ঐ পাপকার্য আর কখনো করবে না, তারপর হয় তো মানবিক চাহিদা হিসেবে আবার পদস্খলন ঘটে যাবে। যেমন এখনই হাদীস গত হলো যে, তাওবা পূর্বের সমস্ত গুনাহকে মিটিয়ে দেয়। তাহলে শুধু কি তাওবার দ্বারাই গুনাহ্ মাফ হয়ে যাবে, না মৃত্যু পর্যন্ত ঐ গুনাহর কাজ আর না করা শর্ত? প্রথমটির দলীল তো এই সহীহ্ হাদীসটি যে, যে ব্যক্তি ইসলামে সৎ কাজ করবে, সে তার অজ্ঞতার যুগের অসৎ কাজের কারণে গ্রেফতার হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণের পরেও অসৎ কাজে জড়িয়ে পড়বে তাকে তার ইসলাম ও জাহেলিয়াত উভয় যুগের অসৎ কাজের জন্যে পাকড়াও করা হবে। সুতরাং ইসলাম, যা পাপরাশিকে দূর করে দেয়ার ব্যাপারে তাওবার অপেক্ষাও অগ্রগণ্য, এর পরেও যখন তার অসত্ত্বার্যের কারণে পাকড়াও করা হচ্ছে, তখন তাওবার পরেও অসৎ কাজ পুনরায় করলে তো আরো বেশী তাকে পাকড়াও করা উচিত। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ আল্লাহ নবী (সঃ) ও তার মুমিন সঙ্গীদেরকে অপদস্থ করবেন না। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে যে জ্যোতি দান করা হবে তা তাদের সামনে ও দক্ষিণ পার্শ্বে ধাবিত হবে। আর অন্যেরা সবাই অন্ধকারের মধ্যে থাকবে। যেমন ইতিপূর্বে এটা সূরায়ে হাদীদের তাফসীরে গত হয়েছে। যখন মুমিনগণ দেখবে যে, মুনাফিকরা যে জ্যোতি লাভ করেছিল, ঠিক প্রয়োজনের সময় তা তাদের হতে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এবং তারা অন্ধকারের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন তারা (মুমিনরা) দুআ করবেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে জ্যোতিতে আপনি পূর্ণতা দান করুন এবং আমাদেরকে রক্ষা করুন! আপনি তো সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।বানু কিনানাহ্ গোত্রের একজন লোক বলেনঃ “মক্কা বিজয়ের দিন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে নামায পড়েছিলাম। আমি তাঁকে দু’আয় বলতে শুনেছিলামঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! কিয়ামতের দিন আপনি আমাকে অপদস্ত করবেন না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ যার (রাঃ) ও হযরত আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আমাকে সিজদার অনুমতি দেয়া হবে। অনুরূপভাবে সর্বপ্রথম আমাকেই সিজদা হতে মস্তক উত্তোলনেরও অনুমতি দেয়া হবে। আমি আমার সামনে এবং ডানে ও বামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমার উম্মতকে চিনে নিবো।” একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাদেরকে আপনি কি করে চিনতে পারবেন? বহু উম্মত তো মিশ্রিতভাবে থাকবে?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমার উম্মতের লোকদের একটি চিহ্ন তো এই যে, তাদের অযুর অঙ্গগুলো উজ্জ্বল হবে ও চমকিতে থাকবে। অন্য কোন উম্মতের লোকদের এরূপ হবে না। দ্বিতীয় পরিচয় এই যে, তাদের আমলনামা তাদের ডান হাতে থাকবে। তৃতীয় নিদর্শন এই যে, তাদের ললাটে সিজদার চিহ্ন থাকবে। চতুর্থ চিহ্ন এই যে, তাদের জ্যোতি তাদের আগে আগে থাকবে।” (এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনে নাসরুল মুরূযী (রঃ) বর্ণনা করেছন)

আত-তাহরীম 66:9

৯-১০ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র-শস্ত্রসহ জিহাদ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। আরো নির্দেশ দিচ্ছেন দুনিয়ায় তাদের প্রতি কঠোর হতে। আর পরকালেও তাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম এবং ওটা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থল।এরপর আল্লাহ দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝাচ্ছেন যে, কাফিরদের তাদের কুফরী সত্ত্বেও মুসলমানদের সাথে দুনিয়ায় মিলে মিশে থাকা কিয়ামতের দিন কোনই উপকারে আসবে না। যেমন দুই জন নবী, হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত লূত (আঃ)-এর স্ত্রীদ্বয়, যারা সদা-সর্বদা এই নবীদের সাহচর্যে থাকতো, তাঁদের সাথে সব সময় উঠা বসা করতো, এক সাথে পানাহার করতো এবং এক সাথে রাত্রি যাপনও করতো, কিন্তু যেহেতু তাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, বরং তারা কুফরীর উপর কায়েম ছিল, সেই হেতু নবীদের অষ্ট প্রহরের সাহচর্য তাদের কোন কাজে আসলো না। নবীগণ তাদের পারলৌকিক কোন উপকার করতে পারলেন না এবং তাদেরকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করতে সক্ষম হলেন না। বরং তাদেরকেও জাহান্নামীদের সাথে জাহান্নামে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, এখানে খিয়ানত দ্বারা ব্যভিচার উদ্দেশ্য নয়। নবীদের (আঃ) পবিত্রতা ও সততা এতো ঊর্ধ্বে যে, তাদের স্ত্রীদের মধ্যে ব্যভিচাররূপ জঘন্য পাপকার্য প্রকাশ পাওয়া সম্ভব হতে পারে না। আমরা সূরায়ে নূরের তাফসীরে এর পূর্ণ বর্ণনা দিয়েছি। বরং এখানেও উদ্দেশ্য দ্বীনের ব্যাপারে খিয়ানত করা। অর্থাৎ তারা দ্বীনের ব্যাপারে তাদের স্বামীদের খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। দ্বীনের কাজে তাদের সঙ্গিনী হয়নি।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তাদের বিশ্বাসঘাতকতা ব্যভিচার ছিল না। বরং এই ছিল যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর স্ত্রী বলতো যে, এই লোকটি অর্থাৎ হযরত নূহ (আঃ) একজন পাগল। আর হযরত লূত (আঃ)-এর স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতা এই ছিল যে, তাঁর বাড়ীতে কোন মেহমান আসলে সে কাফিরদেরকে খবর দিয়ে দিতো। হযরত নূহ (আঃ)-এর স্ত্রী তাঁর গোপন তথ্য এবং গোপনে ঈমান আনয়নকারীদের নাম কাফিরদের কাছে প্রকাশ করে দিতো। অনুরূপভাবে হযরত লূত (আঃ)-এর স্ত্রীও তার স্বামী হযরত লূত (আঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করতো এবং যাঁরা মেহমানরূপে তাঁর বাড়ীতে আসতেন তাঁদের খবর তার কওমকে দিয়ে দিতো, যাদের কু-কাজের অভ্যাস ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে একথাও বর্ণিত আছে যে, কোন নবীরই স্ত্রী কখনো ব্যভিচার করেনি। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজনও একথাই বলেন। এটাকে দলীলরূপে গ্রহণ করে কোন কোন আলেম বলেছেনঃ সাধারণ লোকদের মধ্যে একথা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, হাদীসে আছেঃ যে ব্যক্তি এমন লোকের সাথে পানাহার করে যাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে, ঐ লোকটিকেও ক্ষমা করে দেয়া হয়, এটা খুবই দুর্বল হাদীস। আর প্রকৃত ব্যাপারও এটাই যে, এ হাদীসটি একেবারে ভিত্তিহীন। তবে হ্যাঁ, একজন বুযুর্গ ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যাকে ক্ষমা করা হয়েছে তার সাথে যে থাকবে তাকেও ক্ষমা করে দেয়া হবে' একথা কি আপনি বলেছেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না, কিন্তু এখন আমি একথা বলছি।"

আত-তাহরীম 66:10

৯-১০ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র-শস্ত্রসহ জিহাদ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। আরো নির্দেশ দিচ্ছেন দুনিয়ায় তাদের প্রতি কঠোর হতে। আর পরকালেও তাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম এবং ওটা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থল।এরপর আল্লাহ দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝাচ্ছেন যে, কাফিরদের তাদের কুফরী সত্ত্বেও মুসলমানদের সাথে দুনিয়ায় মিলে মিশে থাকা কিয়ামতের দিন কোনই উপকারে আসবে না। যেমন দুই জন নবী, হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত লূত (আঃ)-এর স্ত্রীদ্বয়, যারা সদা-সর্বদা এই নবীদের সাহচর্যে থাকতো, তাঁদের সাথে সব সময় উঠা বসা করতো, এক সাথে পানাহার করতো এবং এক সাথে রাত্রি যাপনও করতো, কিন্তু যেহেতু তাদের মধ্যে ঈমান ছিল না, বরং তারা কুফরীর উপর কায়েম ছিল, সেই হেতু নবীদের অষ্ট প্রহরের সাহচর্য তাদের কোন কাজে আসলো না। নবীগণ তাদের পারলৌকিক কোন উপকার করতে পারলেন না এবং তাদেরকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করতে সক্ষম হলেন না। বরং তাদেরকেও জাহান্নামীদের সাথে জাহান্নামে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, এখানে খিয়ানত দ্বারা ব্যভিচার উদ্দেশ্য নয়। নবীদের (আঃ) পবিত্রতা ও সততা এতো ঊর্ধ্বে যে, তাদের স্ত্রীদের মধ্যে ব্যভিচাররূপ জঘন্য পাপকার্য প্রকাশ পাওয়া সম্ভব হতে পারে না। আমরা সূরায়ে নূরের তাফসীরে এর পূর্ণ বর্ণনা দিয়েছি। বরং এখানেও উদ্দেশ্য দ্বীনের ব্যাপারে খিয়ানত করা। অর্থাৎ তারা দ্বীনের ব্যাপারে তাদের স্বামীদের খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। দ্বীনের কাজে তাদের সঙ্গিনী হয়নি।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তাদের বিশ্বাসঘাতকতা ব্যভিচার ছিল না। বরং এই ছিল যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর স্ত্রী বলতো যে, এই লোকটি অর্থাৎ হযরত নূহ (আঃ) একজন পাগল। আর হযরত লূত (আঃ)-এর স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতা এই ছিল যে, তাঁর বাড়ীতে কোন মেহমান আসলে সে কাফিরদেরকে খবর দিয়ে দিতো। হযরত নূহ (আঃ)-এর স্ত্রী তাঁর গোপন তথ্য এবং গোপনে ঈমান আনয়নকারীদের নাম কাফিরদের কাছে প্রকাশ করে দিতো। অনুরূপভাবে হযরত লূত (আঃ)-এর স্ত্রীও তার স্বামী হযরত লূত (আঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করতো এবং যাঁরা মেহমানরূপে তাঁর বাড়ীতে আসতেন তাঁদের খবর তার কওমকে দিয়ে দিতো, যাদের কু-কাজের অভ্যাস ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে একথাও বর্ণিত আছে যে, কোন নবীরই স্ত্রী কখনো ব্যভিচার করেনি। হযরত যহহাক (রঃ) প্রমুখ গুরুজনও একথাই বলেন। এটাকে দলীলরূপে গ্রহণ করে কোন কোন আলেম বলেছেনঃ সাধারণ লোকদের মধ্যে একথা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, হাদীসে আছেঃ যে ব্যক্তি এমন লোকের সাথে পানাহার করে যাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে, ঐ লোকটিকেও ক্ষমা করে দেয়া হয়, এটা খুবই দুর্বল হাদীস। আর প্রকৃত ব্যাপারও এটাই যে, এ হাদীসটি একেবারে ভিত্তিহীন। তবে হ্যাঁ, একজন বুযুর্গ ব্যক্তি হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যাকে ক্ষমা করা হয়েছে তার সাথে যে থাকবে তাকেও ক্ষমা করে দেয়া হবে' একথা কি আপনি বলেছেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “না, কিন্তু এখন আমি একথা বলছি।"

আত-তাহরীম 66:11

১১-১২ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তা’আলা মুসলমানদের জন্যে দৃষ্টান্ত পেশ করে বলেনঃ যদি মুসলমানরা প্রয়োজনবোধে কাফিরদের সাথে মিলে মিশে থাকে তবে তাদের কোন অপরাধ হবে না। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মুমিনগণ যেন মুমিনগণ ব্যতীত কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক থাকবে না; তবে ব্যতিক্রম যদি তোমরা তাদের নিকট হতে আত্মরক্ষার জন্যে সতর্কতা অবলম্বন কর।” (৩:২৮) হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, সারা জগতের লোকের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উদ্ধত লোক ছিল ফিরাউন। কিন্তু তার কুফরীও তার স্ত্রীর কোন ক্ষতি করতে পারেনি। কেননা, তার স্ত্রী তাঁর যবরদস্ত ঈমানের উপর পূর্ণমাত্রায় কায়েম ছিলেন। আল্লাহ তা'আলা ন্যায় বিচারক ও হাকিম। তিনি একজনের পাপের কারণে অন্যজনকে পাকড়াও করেন না। হযরত সালমান (রঃ) বলেন যে, ফিরাউন ঐ সতী-সাধ্বী নারীর উপর সর্বপ্রকারের নির্যাতন করতো। কঠিন গরমের সময় তাকে রৌদ্রে দাঁড় করিয়ে দিতো। কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ ফেরেশতাদের পরের দ্বারা তাঁকে ছায়া করতেন এবং তাঁকে গরমের কষ্ট হতে রক্ষা করতেন। এমন কি তিনি তাকে তার জান্নাতী ঘর দেখিয়ে দিতেন। ফলে তাঁর রূহ তাযা হয়ে উঠতে এবং ঈমান বৃদ্ধি পেতো। তিনি ফিরাউন ও হযরত মূসা (আঃ)-এর ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকতেন যে, জয়লাভ কে করলো? সব সময় তিনি শুনতে পেতেন যে, হযরত মূসাই (আঃ) জয়লাভ করেছেন। তখন ওটাই তাঁর ঈমান আনয়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তিনি ঘোষণা করেনঃ ‘আমি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ)-এর প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনলাম।” ফিরাউন এ খবর জানতে পেরে তার লোকজনকে বললোঃ সবচেয়ে বড় পাথর তোমরা খোঁজ করে নিয়ে এসো। অতঃপর তাকে চিত করে শুইয়ে দাও এবং তাকে বললোঃ “তুমি তোমার এই আকীদা হতে বিরত থাকো। যদি বিরত থাকে তবে ভাল কথা, সে আমার স্ত্রী। তাকে মর্যাদা সহকারে আমার কাছে ফিরিয়ে আনবে। আর যদি না মানে তবে ঐ পাথর তার উপর নিক্ষেপ করবে এবং তার মাংস টুকরো টুকরো করে ফেলবে। অতঃপর তার লোকেরা পাথর নিয়ে আসলো এবং তাঁকে নিয়ে গেল ও চিত করে শুইয়ে দিলো এবং তাঁর উপর ঐ পাথর নিক্ষেপ করার জন্যে উঠালো। ঐ সময় তিনি আকাশের দিকে তার চক্ষু উঠালেন। মহান আল্লাহ পর্দা সরিয়ে দিলেন এবং তিনি জান্নাত এবং সেখানে তাঁর জন্যে যে ঘর তৈরী করা হয়েছে তা স্বচক্ষে দেখে নিলেন। ওতেই তাঁর রূহ বেরিয়ে পড়লো। যখন পাথর তার উপর নিক্ষেপ করা হয় তখন তার মধ্যে রূহ ছিলই না। তিনি শাহাদাতের সময় দু'আ করেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক। 'আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন। তাঁর দু'আর সূক্ষ্মতার প্রতি লক্ষ্য করা যাক, প্রথমে তিনি আল্লাহর সন্নিধান কামনা করছেন, তারপর ঘরের প্রার্থনা করছেন। এই ঘটনার বর্ণনায় মারফূ’ হাদীসও এসেছে। তারপর তিনি দুআ করছেনঃ “আমাকে উদ্ধার করুন ফিরাউন ও তার দুষ্কৃতি হতে এবং আমাকে উদ্ধার করুন যালিম সম্প্রদায় হতে।”ঐ পুণ্যবতী মহিলার নাম ছিল, আসিয়া বিনতু মাযাহিম (রাঃ)। তার ঈমান আনয়নের ঘটনাটি হযরত আবূল আলিয়া নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃ ফিরাউনের দারোগার স্ত্রীর ঈমান ছিল হযরত আসিয়ার (রাঃ) ঈমান আনয়নের কারণ। দারোগার স্ত্রী একদা ফিরাউনের কন্যার মাথার চুলে চিরুণী করে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ করে চিরুণী তার হাত হতে পড়ে যায়। তখন তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়ঃ “কাফিররা ধ্বংস হোক।” ফিরাউনের কন্যা তার মুখে একথা শুনে বললোঃ “তুমি কি আমার পিতা ছাড়া অন্য কাউকে প্রতিপালক বলে স্বীকার কর?" মহিলাটি উত্তরে বলল “আমার, তোমার পিতার এবং অন্যান্য সবারই প্রতিপালক হলেন আল্লাহ।" সে তখন ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে মহিলাটিকে খুবই মারপিট করলো। অতঃপর তার পিতাকে এ খবর দিয়ে দিলো। ফিরাউন মহিলাটিকে ডেকে নিয়ে নিজেই জিজ্ঞেস করলোঃ “তুমি কি আমার ছাড়া আর কারো ইবাদত কর?” মহিলাটি জবাবে বললেনঃ “হ্যাঁ, আমার, তোমার এবং সমস্ত সৃষ্টজীবের প্রতিপালক হলেন, আল্লাহ। আমি তাঁরই ইবাদত করি।” একথা শুনে ফিরাউন তার লোকদেরকে হুকুম করলোঃ “মহিলাটিকে চিৎ করে শুইয়ে দাও। তার হাতে পায়ে পেরেক মেরে দাও আর সাপ ছেড়ে দাও যে তাকে কামড়াতে থাকবে।” মহিলাটি এই অবস্থাতেই থাকেন। আবার একদিন ফিরাউন তার কাছে এসে বললোঃ “এখনো কি তোমার চিন্তার পরিবর্তন হয়নি। পুনরায় তিনি জবাব দিলেনঃ “তোমার আমার এবং সব জিনিসের প্রতিপালক হলেন একমাত্র আল্লাহ।” ফিরাউন বললোঃ “আচ্ছা, এখন আমি তোমার চোখের সামনে তোমার ছেলেকে টুকরো টুকরো করে ফেলছি। সুতরাং এখনো তোমাকে বলছিঃ আমার কথা মেনে নাও এবং তোমার এই দ্বীন হতে ফিরে এসো।” মহিলাটি উত্তর দিলেনঃ “তোমার যা ইচ্ছা হয় তাই কর।” ঐ অত্যাচারী তখন তাঁর পুত্রকে ধরে আনতে বললো এবং তার সামনে মেরে ফেললো। ছেলেটির রূহ যখন বের হয় তখন সে বললোঃ “মা! তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাও। আল্লাহ তোমার জন্যে বড় বড় পুণ্য রেখেছেন এবং তুমি অমুক অমুক নিয়ামত লাভ করবে।” মহিলাটি তাঁর ছেলের রূহ এভাবে বের হতে স্বচক্ষে দেখলেন। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করলেন এবং আল্লাহ পাকের ফায়সালাকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিলেন। ফিরাউন আবার তাঁকে বেধে ফেলে রাখলো এবং সাপ ছেড়ে দিলো। পুনরায় একদিন এসে নিজের কথার পুনরাবৃত্তি করলো। মহিলাটি এবারও অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে একই জবাব দিলেন। ফিরাউন তাকে আবার ঐ হুমুকই দিলো এবং তাঁর আরেকটি ছেলে ধরে এনে তার চোখের সামনে মেরে ফেললো। ছেলেটির রূহ অনুরূপভাবেই তার মাতাকে সুসংবাদ দিলো এবং তাকে ধৈর্যধারণে উৎসাহিত করলো।ফিরাউনের স্ত্রী এই মহিলাটির বড় ছেলের রূহের সুসংবাদ শুনেছিলেন। এই ছোট ছেলেটিরও সুসংবাদ শুনলেন। সুতরাং তিনিও ঈমান আনয়ন করলেন। ওদিকে ঐ মহিলাটির রূহ আল্লাহ তা'আলা কবয করে নিলেন এবং তাঁর মনযিল ও মরতবা যা আল্লাহ তা’আলার নিকট ছিল তা পর্দা সরিয়ে ফিরাউনের স্ত্রীকে দেখিয়ে দেয়া হলো। সুতরাং তার ঈমান বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ফিরাউনের কানেও তাঁর ঈমানের কথা পৌঁছে গেল। সে একদা তার সভাষদবর্গকে বললোঃ “তোমরা আমার স্ত্রীর কোন খবর রাখো কি? তোমরা তাকে কিরূপ মনে কর?” তার এই প্রশ্নের উত্তরে সবাই তাঁর খুব প্রশংসা করলো এবং তার গুণাবলীর বর্ণনা দিলো। ফিরাউন তখন তাদেরকে বললোঃ “না, না, তোমরা তার খবর রাখে না। সে আমি ছাড়া অন্যকে উপাস্যরূপে মেনে থাকে।” তারপর তাদের মধ্যে পরামর্শ হলো যে, তাঁকে হত্যা করে ফেলা হবে। অতঃপর তাঁর হাতে পায়ে পেরেক মেরে শুইয়ে দেয়া হলো। ঐ সময় তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর দুআ কবুল করেন এবং পর্দা সরিয়ে দিয়ে তাকে তার জান্নাতী ঘর দেখিয়ে দেন। তা দেখে তিনি হেসে ওঠেন। ঠিক ঐ সময়েই তাঁর কাছে ফিরাউন এসে পড়ে এবং তাঁকে হাসির অবস্থায় দেখতে পায়। তখন সে তার লোকজনকে বলেঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা কি বিস্ময়বোধ করছে না যে, এরূপ কঠিন শাস্তির অবস্থাতেও এ মহিলা হাসতে রয়েছে? নিশ্চয়ই এর মাথা খারাপ হয়েছে।” মোটকথা ঐ শাস্তিতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছেন। তা হলো হযরত মরিয়ম বিনতে ইমরানের (আঃ) দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতী-সাধ্বী রমণী। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আমার ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম।আল্লাহ তা'আলা হযরত জিবরাঈলকে মানুষের রূপ দিয়ে হযরত মরিয়ম (আঃ)-এর নিকট প্রেরণ করেন এবং তাঁকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন তার মুখ দিয়ে মরিয়ম (আঃ)-এর জামার ফাঁকে ফুঁকে দেন। তাতেই তিনি গর্ভবতী হয়ে যান এবং হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি তাঁর মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম। এরপর মহান আল্লাহ হযরত মরিয়ম (আঃ)-এর আরো প্রশংসা করে বলেনঃ সে তাঁর প্রতিপালকের বাণী ও তাঁর কিতাব সত্যি বলে গ্রহণ করেছিল, সে ছিল অনুগতদের একজন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাটিতে চারটি রেখা টানেন এবং সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এগুলো কি তা তোমরা জান কি?” তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ই ভাল জানেন।” তিনি তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, জান্নাতী রমণীদের মধ্যে চারজন হলো সর্বোত্তম। তাঁরা হলো খাদীজা বিনতু খুওয়াইলিদ (রাঃ), ফাতেমা বিনতু মুহাম্মাদ (সঃ) (রাঃ), মরিয়ম বিনতু ইমরান (আঃ) এবং ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতু মাযাহিম (রাঃ)।” (এ হাদসীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “পুরুষ লোকদের মধ্যে তো পূর্ণতাপ্রাপ্ত লোক বহু রয়েছে। কিন্তু রমণীদের মধ্যে পূর্ণতাপ্রাপ্তা রমণী রয়েছে শুধুমাত্র ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ), মরিয়ম বিন্তু ইমরান (আঃ) ও খাদীজা বিন্তু খুওয়াইলিদ (রাঃ)। আর সমস্ত রমণীর মতো আয়েশা (রাঃ)-এর ফযীলত এমনই যেমন সমস্ত খাদ্যের মধ্যে সারীদ মাদক খাদ্যের ফযীলত।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)আমরা আমাদের কিতাব আল বিদাইয়াহ্ ওয়ান নিহাইয়াহ এর মধ্যে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনায় এই হাদীসের সনদ ও শব্দসমূহ বর্ণনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আর আল্লাহ তা'আলার ফযল ও করমে এই সূরারই আয়াতের শব্দ (আরবি)-এর তাফসীরের মধ্যে ঐ হাদীসটির বর্ণনা করে দিয়েছি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে হযরত আসিয়া বিন্তু মাযাহিম (রাঃ)-ও একজন।

আত-তাহরীম 66:12

১১-১২ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তা’আলা মুসলমানদের জন্যে দৃষ্টান্ত পেশ করে বলেনঃ যদি মুসলমানরা প্রয়োজনবোধে কাফিরদের সাথে মিলে মিশে থাকে তবে তাদের কোন অপরাধ হবে না। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মুমিনগণ যেন মুমিনগণ ব্যতীত কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক থাকবে না; তবে ব্যতিক্রম যদি তোমরা তাদের নিকট হতে আত্মরক্ষার জন্যে সতর্কতা অবলম্বন কর।” (৩:২৮) হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, সারা জগতের লোকের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উদ্ধত লোক ছিল ফিরাউন। কিন্তু তার কুফরীও তার স্ত্রীর কোন ক্ষতি করতে পারেনি। কেননা, তার স্ত্রী তাঁর যবরদস্ত ঈমানের উপর পূর্ণমাত্রায় কায়েম ছিলেন। আল্লাহ তা'আলা ন্যায় বিচারক ও হাকিম। তিনি একজনের পাপের কারণে অন্যজনকে পাকড়াও করেন না। হযরত সালমান (রঃ) বলেন যে, ফিরাউন ঐ সতী-সাধ্বী নারীর উপর সর্বপ্রকারের নির্যাতন করতো। কঠিন গরমের সময় তাকে রৌদ্রে দাঁড় করিয়ে দিতো। কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ ফেরেশতাদের পরের দ্বারা তাঁকে ছায়া করতেন এবং তাঁকে গরমের কষ্ট হতে রক্ষা করতেন। এমন কি তিনি তাকে তার জান্নাতী ঘর দেখিয়ে দিতেন। ফলে তাঁর রূহ তাযা হয়ে উঠতে এবং ঈমান বৃদ্ধি পেতো। তিনি ফিরাউন ও হযরত মূসা (আঃ)-এর ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকতেন যে, জয়লাভ কে করলো? সব সময় তিনি শুনতে পেতেন যে, হযরত মূসাই (আঃ) জয়লাভ করেছেন। তখন ওটাই তাঁর ঈমান আনয়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তিনি ঘোষণা করেনঃ ‘আমি হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ)-এর প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনলাম।” ফিরাউন এ খবর জানতে পেরে তার লোকজনকে বললোঃ সবচেয়ে বড় পাথর তোমরা খোঁজ করে নিয়ে এসো। অতঃপর তাকে চিত করে শুইয়ে দাও এবং তাকে বললোঃ “তুমি তোমার এই আকীদা হতে বিরত থাকো। যদি বিরত থাকে তবে ভাল কথা, সে আমার স্ত্রী। তাকে মর্যাদা সহকারে আমার কাছে ফিরিয়ে আনবে। আর যদি না মানে তবে ঐ পাথর তার উপর নিক্ষেপ করবে এবং তার মাংস টুকরো টুকরো করে ফেলবে। অতঃপর তার লোকেরা পাথর নিয়ে আসলো এবং তাঁকে নিয়ে গেল ও চিত করে শুইয়ে দিলো এবং তাঁর উপর ঐ পাথর নিক্ষেপ করার জন্যে উঠালো। ঐ সময় তিনি আকাশের দিকে তার চক্ষু উঠালেন। মহান আল্লাহ পর্দা সরিয়ে দিলেন এবং তিনি জান্নাত এবং সেখানে তাঁর জন্যে যে ঘর তৈরী করা হয়েছে তা স্বচক্ষে দেখে নিলেন। ওতেই তাঁর রূহ বেরিয়ে পড়লো। যখন পাথর তার উপর নিক্ষেপ করা হয় তখন তার মধ্যে রূহ ছিলই না। তিনি শাহাদাতের সময় দু'আ করেছিলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক। 'আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন। তাঁর দু'আর সূক্ষ্মতার প্রতি লক্ষ্য করা যাক, প্রথমে তিনি আল্লাহর সন্নিধান কামনা করছেন, তারপর ঘরের প্রার্থনা করছেন। এই ঘটনার বর্ণনায় মারফূ’ হাদীসও এসেছে। তারপর তিনি দুআ করছেনঃ “আমাকে উদ্ধার করুন ফিরাউন ও তার দুষ্কৃতি হতে এবং আমাকে উদ্ধার করুন যালিম সম্প্রদায় হতে।”ঐ পুণ্যবতী মহিলার নাম ছিল, আসিয়া বিনতু মাযাহিম (রাঃ)। তার ঈমান আনয়নের ঘটনাটি হযরত আবূল আলিয়া নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেনঃ ফিরাউনের দারোগার স্ত্রীর ঈমান ছিল হযরত আসিয়ার (রাঃ) ঈমান আনয়নের কারণ। দারোগার স্ত্রী একদা ফিরাউনের কন্যার মাথার চুলে চিরুণী করে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ করে চিরুণী তার হাত হতে পড়ে যায়। তখন তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়ঃ “কাফিররা ধ্বংস হোক।” ফিরাউনের কন্যা তার মুখে একথা শুনে বললোঃ “তুমি কি আমার পিতা ছাড়া অন্য কাউকে প্রতিপালক বলে স্বীকার কর?" মহিলাটি উত্তরে বলল “আমার, তোমার পিতার এবং অন্যান্য সবারই প্রতিপালক হলেন আল্লাহ।" সে তখন ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে মহিলাটিকে খুবই মারপিট করলো। অতঃপর তার পিতাকে এ খবর দিয়ে দিলো। ফিরাউন মহিলাটিকে ডেকে নিয়ে নিজেই জিজ্ঞেস করলোঃ “তুমি কি আমার ছাড়া আর কারো ইবাদত কর?” মহিলাটি জবাবে বললেনঃ “হ্যাঁ, আমার, তোমার এবং সমস্ত সৃষ্টজীবের প্রতিপালক হলেন, আল্লাহ। আমি তাঁরই ইবাদত করি।” একথা শুনে ফিরাউন তার লোকদেরকে হুকুম করলোঃ “মহিলাটিকে চিৎ করে শুইয়ে দাও। তার হাতে পায়ে পেরেক মেরে দাও আর সাপ ছেড়ে দাও যে তাকে কামড়াতে থাকবে।” মহিলাটি এই অবস্থাতেই থাকেন। আবার একদিন ফিরাউন তার কাছে এসে বললোঃ “এখনো কি তোমার চিন্তার পরিবর্তন হয়নি। পুনরায় তিনি জবাব দিলেনঃ “তোমার আমার এবং সব জিনিসের প্রতিপালক হলেন একমাত্র আল্লাহ।” ফিরাউন বললোঃ “আচ্ছা, এখন আমি তোমার চোখের সামনে তোমার ছেলেকে টুকরো টুকরো করে ফেলছি। সুতরাং এখনো তোমাকে বলছিঃ আমার কথা মেনে নাও এবং তোমার এই দ্বীন হতে ফিরে এসো।” মহিলাটি উত্তর দিলেনঃ “তোমার যা ইচ্ছা হয় তাই কর।” ঐ অত্যাচারী তখন তাঁর পুত্রকে ধরে আনতে বললো এবং তার সামনে মেরে ফেললো। ছেলেটির রূহ যখন বের হয় তখন সে বললোঃ “মা! তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাও। আল্লাহ তোমার জন্যে বড় বড় পুণ্য রেখেছেন এবং তুমি অমুক অমুক নিয়ামত লাভ করবে।” মহিলাটি তাঁর ছেলের রূহ এভাবে বের হতে স্বচক্ষে দেখলেন। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করলেন এবং আল্লাহ পাকের ফায়সালাকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিলেন। ফিরাউন আবার তাঁকে বেধে ফেলে রাখলো এবং সাপ ছেড়ে দিলো। পুনরায় একদিন এসে নিজের কথার পুনরাবৃত্তি করলো। মহিলাটি এবারও অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে একই জবাব দিলেন। ফিরাউন তাকে আবার ঐ হুমুকই দিলো এবং তাঁর আরেকটি ছেলে ধরে এনে তার চোখের সামনে মেরে ফেললো। ছেলেটির রূহ অনুরূপভাবেই তার মাতাকে সুসংবাদ দিলো এবং তাকে ধৈর্যধারণে উৎসাহিত করলো।ফিরাউনের স্ত্রী এই মহিলাটির বড় ছেলের রূহের সুসংবাদ শুনেছিলেন। এই ছোট ছেলেটিরও সুসংবাদ শুনলেন। সুতরাং তিনিও ঈমান আনয়ন করলেন। ওদিকে ঐ মহিলাটির রূহ আল্লাহ তা'আলা কবয করে নিলেন এবং তাঁর মনযিল ও মরতবা যা আল্লাহ তা’আলার নিকট ছিল তা পর্দা সরিয়ে ফিরাউনের স্ত্রীকে দেখিয়ে দেয়া হলো। সুতরাং তার ঈমান বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ফিরাউনের কানেও তাঁর ঈমানের কথা পৌঁছে গেল। সে একদা তার সভাষদবর্গকে বললোঃ “তোমরা আমার স্ত্রীর কোন খবর রাখো কি? তোমরা তাকে কিরূপ মনে কর?” তার এই প্রশ্নের উত্তরে সবাই তাঁর খুব প্রশংসা করলো এবং তার গুণাবলীর বর্ণনা দিলো। ফিরাউন তখন তাদেরকে বললোঃ “না, না, তোমরা তার খবর রাখে না। সে আমি ছাড়া অন্যকে উপাস্যরূপে মেনে থাকে।” তারপর তাদের মধ্যে পরামর্শ হলো যে, তাঁকে হত্যা করে ফেলা হবে। অতঃপর তাঁর হাতে পায়ে পেরেক মেরে শুইয়ে দেয়া হলো। ঐ সময় তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর দুআ কবুল করেন এবং পর্দা সরিয়ে দিয়ে তাকে তার জান্নাতী ঘর দেখিয়ে দেন। তা দেখে তিনি হেসে ওঠেন। ঠিক ঐ সময়েই তাঁর কাছে ফিরাউন এসে পড়ে এবং তাঁকে হাসির অবস্থায় দেখতে পায়। তখন সে তার লোকজনকে বলেঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা কি বিস্ময়বোধ করছে না যে, এরূপ কঠিন শাস্তির অবস্থাতেও এ মহিলা হাসতে রয়েছে? নিশ্চয়ই এর মাথা খারাপ হয়েছে।” মোটকথা ঐ শাস্তিতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছেন। তা হলো হযরত মরিয়ম বিনতে ইমরানের (আঃ) দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতী-সাধ্বী রমণী। মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আমার ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম।আল্লাহ তা'আলা হযরত জিবরাঈলকে মানুষের রূপ দিয়ে হযরত মরিয়ম (আঃ)-এর নিকট প্রেরণ করেন এবং তাঁকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন তার মুখ দিয়ে মরিয়ম (আঃ)-এর জামার ফাঁকে ফুঁকে দেন। তাতেই তিনি গর্ভবতী হয়ে যান এবং হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি তাঁর মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম। এরপর মহান আল্লাহ হযরত মরিয়ম (আঃ)-এর আরো প্রশংসা করে বলেনঃ সে তাঁর প্রতিপালকের বাণী ও তাঁর কিতাব সত্যি বলে গ্রহণ করেছিল, সে ছিল অনুগতদের একজন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাটিতে চারটি রেখা টানেন এবং সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এগুলো কি তা তোমরা জান কি?” তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-ই ভাল জানেন।” তিনি তখন বললেনঃ “জেনে রেখো যে, জান্নাতী রমণীদের মধ্যে চারজন হলো সর্বোত্তম। তাঁরা হলো খাদীজা বিনতু খুওয়াইলিদ (রাঃ), ফাতেমা বিনতু মুহাম্মাদ (সঃ) (রাঃ), মরিয়ম বিনতু ইমরান (আঃ) এবং ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতু মাযাহিম (রাঃ)।” (এ হাদসীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “পুরুষ লোকদের মধ্যে তো পূর্ণতাপ্রাপ্ত লোক বহু রয়েছে। কিন্তু রমণীদের মধ্যে পূর্ণতাপ্রাপ্তা রমণী রয়েছে শুধুমাত্র ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ), মরিয়ম বিন্তু ইমরান (আঃ) ও খাদীজা বিন্তু খুওয়াইলিদ (রাঃ)। আর সমস্ত রমণীর মতো আয়েশা (রাঃ)-এর ফযীলত এমনই যেমন সমস্ত খাদ্যের মধ্যে সারীদ মাদক খাদ্যের ফযীলত।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)আমরা আমাদের কিতাব আল বিদাইয়াহ্ ওয়ান নিহাইয়াহ এর মধ্যে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনায় এই হাদীসের সনদ ও শব্দসমূহ বর্ণনা করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আর আল্লাহ তা'আলার ফযল ও করমে এই সূরারই আয়াতের শব্দ (আরবি)-এর তাফসীরের মধ্যে ঐ হাদীসটির বর্ণনা করে দিয়েছি যাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে হযরত আসিয়া বিন্তু মাযাহিম (রাঃ)-ও একজন।