Lafzullah

Tafseer ibn Kathir — আল-জিন 72:1 – আল-মুযযাম্মিল 73:18

Author / source: Tawheed Publication

Contents
  1. আল-জিন 72:1
  2. আল-জিন 72:2
  3. আল-জিন 72:3
  4. আল-জিন 72:4
  5. আল-জিন 72:5
  6. আল-জিন 72:6
  7. আল-জিন 72:7
  8. আল-জিন 72:8
  9. আল-জিন 72:9
  10. আল-জিন 72:10
  11. আল-জিন 72:11
  12. আল-জিন 72:12
  13. আল-জিন 72:13
  14. আল-জিন 72:14
  15. আল-জিন 72:15
  16. আল-জিন 72:16
  17. আল-জিন 72:17
  18. আল-জিন 72:18
  19. আল-জিন 72:19
  20. আল-জিন 72:20
  21. আল-জিন 72:21
  22. আল-জিন 72:22
  23. আল-জিন 72:23
  24. আল-জিন 72:24
  25. আল-জিন 72:25
  26. আল-জিন 72:26
  27. আল-জিন 72:27
  28. আল-জিন 72:28
  29. আল-মুযযাম্মিল 73:1
  30. আল-মুযযাম্মিল 73:2
  31. আল-মুযযাম্মিল 73:3
  32. আল-মুযযাম্মিল 73:4
  33. আল-মুযযাম্মিল 73:5
  34. আল-মুযযাম্মিল 73:6
  35. আল-মুযযাম্মিল 73:7
  36. আল-মুযযাম্মিল 73:8
  37. আল-মুযযাম্মিল 73:9
  38. আল-মুযযাম্মিল 73:10
  39. আল-মুযযাম্মিল 73:11
  40. আল-মুযযাম্মিল 73:12
  41. আল-মুযযাম্মিল 73:13
  42. আল-মুযযাম্মিল 73:14
  43. আল-মুযযাম্মিল 73:15
  44. আল-মুযযাম্মিল 73:16
  45. আল-মুযযাম্মিল 73:17
  46. আল-মুযযাম্মিল 73:18

আল-জিন 72:1

১-৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার কওমকে ঐ ঘটনাটি অবহিত কর যে, জ্বিনেরা কুরআন কারীম শুনেছে, সত্য জেনেছে, ওর উপর ঈমান এনেছে এবং ওর অনুগত হয়েছে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলঃ আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, জ্বিনদের একটি দল কুরআন কারীম শুনে নিজেদের কওমের মধ্যে গিয়ে বলেঃ আজ আমরা এক অতি চমৎকার ও বিস্ময়কর কিতাবের বাণী শুনেছি যা সত্য ও মুক্তির পথ প্রদর্শন করে। আমরা তা মেনে নিয়েছি। এখন এটা অসম্ভব যে, আমরা আল্লাহর সাথে অন্য কারো ইবাদত করবো। এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতের মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন আমি জ্বিনদের একটি দলকে তোমার নিকট প্রেরণ করেছিলাম, যেন তারা কুরআন শ্রবণ করে।” (৪৬:২৯) এর তাফসীর হাদীস সমূহের মাধ্যমে আমরা সেখানে বর্ণনা করেছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের কার্য, ক্ষমতা ও নির্দেশ উচ্চ মানের ও বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর নিয়ামতরাজি, শক্তি এবং সৃষ্টজীবের প্রতি করুণা অপরিসীম। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা উচ্চাঙ্গের। তাঁর মহত্ত্ব ও সম্মান অতি উন্নত। তাঁর যিকর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর মাহাত্ম্য খুবই উন্নত মানের।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ (আরবি) বলা হয় পিতাকেও। যদি জ্বিনেরা জানতো যে, মানুষের মধ্যেও (আরবি) রয়েছে তবে তারা আল্লাহর সম্পর্কে এই শব্দ ব্যবহার করতো না। (এ উক্তিটি সনদের দিক দিয়ে সবল হলেও এর অর্থ বোধগম্য হচ্ছে না। সম্ভবতঃ এতে কোন একটা কিছু ছুটে গেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ঐ জ্বিনেরা তাদের কওমকে আরো বলেঃ আল্লাহ গ্রহণ করেননি কোন পত্নী এবং না কোন সন্তান। এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তারা আরো বলেঃ আমাদের নির্বোধরা অর্থাৎ শয়তানরা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে ও অপবাদ দেয়। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য সাধারণও হতে পারে। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিই যে আল্লাহর জন্যে স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করে সে নির্বোধ এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে বাতিল আকীদা রাখে এবং অন্যায় ও অবিচারমূলক কথা মুখ থেকে বের করে।ঐ জ্বিনেরা আরো বলতে থাকে আমাদের ধারণা ছিল যে, দানব ও মানব কখনো আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করতে পারে না। কিন্তু কুরআন পাঠ করে আমরা জানতে পারলাম যে, এ দু'টি জাতি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্‌ সত্তা এসব থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। এরপর বলা হচ্ছেঃ জ্বিনদের খুব বেশী বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ এই যে, তারা দেখতো যে, যখনই মানুষ কোন জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে যেতো তখনই সে বলতোঃ আমি এই জঙ্গলের সবচেয়ে বড় জ্বিনের আশ্রয় গ্রহণ করছি। এ কথা বলার পর সে মনে করতো যে, সে সমস্ত জ্বিনের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। যেমন তারা যখন কোন শহরে যেতো তখন ঐ শহরের বড় নেতার শরণাপন্ন হতো। ফলে ঐ শহরের অন্যান্য লোকও তাদেরকে কোন কষ্ট দিতো না, যদিও তারা তার শত্রু হতো। যখন জ্বিনেরা দেখলো যে, মানুষও তাদের আশ্রয়ে এসে থাকে তখন তাদের ঔদ্ধত্য ও আত্মম্ভরিতা আরো বৃদ্ধি পেলো এবং তারা আরো বেশী বেশী মানুষের ক্ষতি সাধনে তৎপর হয়ে উঠলো। আর ভাবার্থ এও হতে পারে যে, জ্বিনেরা মানুষের এ অবস্থা দেখে তাদেরকে আরো ভয় দেখাতে শুরু করলো ও তাদেরকে নানাভাবে কষ্ট দিতে লাগলো। প্রকৃতপক্ষে দানবরা মানবদেরকে ভয় করতো, যেমন মানব দানবদেরকে ভয় করতো এবং তার চেয়েও বেশী। এমনকি যে জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে মানব যেতো সেখান থেকে দানবরা পালিয়ে যেতো। কিন্তু যখন থেকে মুশরিকরা দানবদের শরণাপন্ন হতে শুরু করলো এবং বলতে লাগলোঃ “এই উপত্যকার জ্বিন-সরদারের আমরা শরণাপন্ন হলাম এই স্বার্থে যে, সে আমাদের, আমাদের সন্তানদের এবং আমাদের ধন-মালের কোন ক্ষতি সাধন করবে না তখন থেকে জ্বিনদের সাহস বেড়ে গেল। কারণ তারা মনে করলো যে, মানুষই তো তাদেরকে ভয় করে। সুতরাং তারা নানা প্রকারে মানুষকে ভয় দেখাতে, কষ্ট দিতে ও উৎপীড়ন করতে লাগলো।কারদাম ইবনে আবী সায়েব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আমার পিতার সাথে কোন কার্য উপলক্ষে মদীনা হতে বাইরের দিকে যাত্রা শুরু করি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মক্কায় রাসূলরূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন। রাত্রিকালে আমরা জঙ্গলে এক রাখালের নিকট অবস্থান করি। অর্ধ রাত্রে একটি নেকড়ে বাঘ এসে ঐ রাখালের একটি বকরী ধরে নিয়ে যায়। রাখালটি বাঘটির পিছনে দৌড় দেয় এবং চীৎকার করে বলতে লাগেঃ “হে এই উপত্যকার আবাদকারী! আমি তোমার আশ্রয়ে এসেছি।” সাথে সাথে একটি শব্দ শোনা গেল, অথচ আমরা কোন লোককে দেখতে পেলাম না। শব্দটি হলোঃ “হে নেকড়ে বাঘ! এ বকরীকে ছেড়ে দাও।” অল্পক্ষণ পরেই আমরা দেখলাম যে, ঐ বকরীটিই পালিয়ে আসলো এবং যুথে এসে মিলিত হয়ে গেল। সে একটু যখমও হয়নি। এটার পরিপেক্ষিতেই আল্লাহ্ তা'আলা মক্কায় স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেনঃ কতিপয় মানুষ কতক জিনের আশ্রয় গ্রহণ করতো, ফলে তারা জ্বিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিতো। (এটা ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হতে পারে যে, নেকড়ে বাঘের রূপ ধরে জ্বিনই এসেছিল, যে বকরীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং এদিকে ঐ রাখালটির দোহাইতে ছেড়ে দিয়েছিল, যাতে রাখালের এবং তার মুখে শুনে অন্যান্য লোকদেরও এ বিশ্বাস জন্মে যে, জ্বিনদের আশ্রয়ে আসলে বিপদ-আপদ হতে নিরাপত্তা লাভ করা যায়। এভাবে জ্বিন মানুষকে পথভ্রষ্ট করে দ্বীন হতে সরিয়ে দিতে পারে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। মুসলমান জ্বিনগুলো তাদের কওমকে আরো বললোঃ হে জ্বিনদের দল! তোমাদের মত মানুষও মনে করে যে, মৃত্যুর পর আল্লাহ্ কাউকেও পুনরুত্থিত করবেন না। অথবা এই অর্থ হবেঃ তোমাদের মত মানুষও মনে করতো যে, আল্লাহ্ কাউকেও রাসূলরূপে প্রেরণ করবেন না।

আল-জিন 72:2

১-৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার কওমকে ঐ ঘটনাটি অবহিত কর যে, জ্বিনেরা কুরআন কারীম শুনেছে, সত্য জেনেছে, ওর উপর ঈমান এনেছে এবং ওর অনুগত হয়েছে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলঃ আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, জ্বিনদের একটি দল কুরআন কারীম শুনে নিজেদের কওমের মধ্যে গিয়ে বলেঃ আজ আমরা এক অতি চমৎকার ও বিস্ময়কর কিতাবের বাণী শুনেছি যা সত্য ও মুক্তির পথ প্রদর্শন করে। আমরা তা মেনে নিয়েছি। এখন এটা অসম্ভব যে, আমরা আল্লাহর সাথে অন্য কারো ইবাদত করবো। এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতের মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন আমি জ্বিনদের একটি দলকে তোমার নিকট প্রেরণ করেছিলাম, যেন তারা কুরআন শ্রবণ করে।” (৪৬:২৯) এর তাফসীর হাদীস সমূহের মাধ্যমে আমরা সেখানে বর্ণনা করেছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের কার্য, ক্ষমতা ও নির্দেশ উচ্চ মানের ও বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর নিয়ামতরাজি, শক্তি এবং সৃষ্টজীবের প্রতি করুণা অপরিসীম। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা উচ্চাঙ্গের। তাঁর মহত্ত্ব ও সম্মান অতি উন্নত। তাঁর যিকর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর মাহাত্ম্য খুবই উন্নত মানের।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ (আরবি) বলা হয় পিতাকেও। যদি জ্বিনেরা জানতো যে, মানুষের মধ্যেও (আরবি) রয়েছে তবে তারা আল্লাহর সম্পর্কে এই শব্দ ব্যবহার করতো না। (এ উক্তিটি সনদের দিক দিয়ে সবল হলেও এর অর্থ বোধগম্য হচ্ছে না। সম্ভবতঃ এতে কোন একটা কিছু ছুটে গেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ঐ জ্বিনেরা তাদের কওমকে আরো বলেঃ আল্লাহ গ্রহণ করেননি কোন পত্নী এবং না কোন সন্তান। এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তারা আরো বলেঃ আমাদের নির্বোধরা অর্থাৎ শয়তানরা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে ও অপবাদ দেয়। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য সাধারণও হতে পারে। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিই যে আল্লাহর জন্যে স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করে সে নির্বোধ এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে বাতিল আকীদা রাখে এবং অন্যায় ও অবিচারমূলক কথা মুখ থেকে বের করে।ঐ জ্বিনেরা আরো বলতে থাকে আমাদের ধারণা ছিল যে, দানব ও মানব কখনো আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করতে পারে না। কিন্তু কুরআন পাঠ করে আমরা জানতে পারলাম যে, এ দু'টি জাতি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্‌ সত্তা এসব থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। এরপর বলা হচ্ছেঃ জ্বিনদের খুব বেশী বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ এই যে, তারা দেখতো যে, যখনই মানুষ কোন জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে যেতো তখনই সে বলতোঃ আমি এই জঙ্গলের সবচেয়ে বড় জ্বিনের আশ্রয় গ্রহণ করছি। এ কথা বলার পর সে মনে করতো যে, সে সমস্ত জ্বিনের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। যেমন তারা যখন কোন শহরে যেতো তখন ঐ শহরের বড় নেতার শরণাপন্ন হতো। ফলে ঐ শহরের অন্যান্য লোকও তাদেরকে কোন কষ্ট দিতো না, যদিও তারা তার শত্রু হতো। যখন জ্বিনেরা দেখলো যে, মানুষও তাদের আশ্রয়ে এসে থাকে তখন তাদের ঔদ্ধত্য ও আত্মম্ভরিতা আরো বৃদ্ধি পেলো এবং তারা আরো বেশী বেশী মানুষের ক্ষতি সাধনে তৎপর হয়ে উঠলো। আর ভাবার্থ এও হতে পারে যে, জ্বিনেরা মানুষের এ অবস্থা দেখে তাদেরকে আরো ভয় দেখাতে শুরু করলো ও তাদেরকে নানাভাবে কষ্ট দিতে লাগলো। প্রকৃতপক্ষে দানবরা মানবদেরকে ভয় করতো, যেমন মানব দানবদেরকে ভয় করতো এবং তার চেয়েও বেশী। এমনকি যে জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে মানব যেতো সেখান থেকে দানবরা পালিয়ে যেতো। কিন্তু যখন থেকে মুশরিকরা দানবদের শরণাপন্ন হতে শুরু করলো এবং বলতে লাগলোঃ “এই উপত্যকার জ্বিন-সরদারের আমরা শরণাপন্ন হলাম এই স্বার্থে যে, সে আমাদের, আমাদের সন্তানদের এবং আমাদের ধন-মালের কোন ক্ষতি সাধন করবে না তখন থেকে জ্বিনদের সাহস বেড়ে গেল। কারণ তারা মনে করলো যে, মানুষই তো তাদেরকে ভয় করে। সুতরাং তারা নানা প্রকারে মানুষকে ভয় দেখাতে, কষ্ট দিতে ও উৎপীড়ন করতে লাগলো।কারদাম ইবনে আবী সায়েব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আমার পিতার সাথে কোন কার্য উপলক্ষে মদীনা হতে বাইরের দিকে যাত্রা শুরু করি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মক্কায় রাসূলরূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন। রাত্রিকালে আমরা জঙ্গলে এক রাখালের নিকট অবস্থান করি। অর্ধ রাত্রে একটি নেকড়ে বাঘ এসে ঐ রাখালের একটি বকরী ধরে নিয়ে যায়। রাখালটি বাঘটির পিছনে দৌড় দেয় এবং চীৎকার করে বলতে লাগেঃ “হে এই উপত্যকার আবাদকারী! আমি তোমার আশ্রয়ে এসেছি।” সাথে সাথে একটি শব্দ শোনা গেল, অথচ আমরা কোন লোককে দেখতে পেলাম না। শব্দটি হলোঃ “হে নেকড়ে বাঘ! এ বকরীকে ছেড়ে দাও।” অল্পক্ষণ পরেই আমরা দেখলাম যে, ঐ বকরীটিই পালিয়ে আসলো এবং যুথে এসে মিলিত হয়ে গেল। সে একটু যখমও হয়নি। এটার পরিপেক্ষিতেই আল্লাহ্ তা'আলা মক্কায় স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেনঃ কতিপয় মানুষ কতক জিনের আশ্রয় গ্রহণ করতো, ফলে তারা জ্বিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিতো। (এটা ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হতে পারে যে, নেকড়ে বাঘের রূপ ধরে জ্বিনই এসেছিল, যে বকরীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং এদিকে ঐ রাখালটির দোহাইতে ছেড়ে দিয়েছিল, যাতে রাখালের এবং তার মুখে শুনে অন্যান্য লোকদেরও এ বিশ্বাস জন্মে যে, জ্বিনদের আশ্রয়ে আসলে বিপদ-আপদ হতে নিরাপত্তা লাভ করা যায়। এভাবে জ্বিন মানুষকে পথভ্রষ্ট করে দ্বীন হতে সরিয়ে দিতে পারে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। মুসলমান জ্বিনগুলো তাদের কওমকে আরো বললোঃ হে জ্বিনদের দল! তোমাদের মত মানুষও মনে করে যে, মৃত্যুর পর আল্লাহ্ কাউকেও পুনরুত্থিত করবেন না। অথবা এই অর্থ হবেঃ তোমাদের মত মানুষও মনে করতো যে, আল্লাহ্ কাউকেও রাসূলরূপে প্রেরণ করবেন না।

আল-জিন 72:3

১-৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার কওমকে ঐ ঘটনাটি অবহিত কর যে, জ্বিনেরা কুরআন কারীম শুনেছে, সত্য জেনেছে, ওর উপর ঈমান এনেছে এবং ওর অনুগত হয়েছে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলঃ আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, জ্বিনদের একটি দল কুরআন কারীম শুনে নিজেদের কওমের মধ্যে গিয়ে বলেঃ আজ আমরা এক অতি চমৎকার ও বিস্ময়কর কিতাবের বাণী শুনেছি যা সত্য ও মুক্তির পথ প্রদর্শন করে। আমরা তা মেনে নিয়েছি। এখন এটা অসম্ভব যে, আমরা আল্লাহর সাথে অন্য কারো ইবাদত করবো। এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতের মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন আমি জ্বিনদের একটি দলকে তোমার নিকট প্রেরণ করেছিলাম, যেন তারা কুরআন শ্রবণ করে।” (৪৬:২৯) এর তাফসীর হাদীস সমূহের মাধ্যমে আমরা সেখানে বর্ণনা করেছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের কার্য, ক্ষমতা ও নির্দেশ উচ্চ মানের ও বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর নিয়ামতরাজি, শক্তি এবং সৃষ্টজীবের প্রতি করুণা অপরিসীম। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা উচ্চাঙ্গের। তাঁর মহত্ত্ব ও সম্মান অতি উন্নত। তাঁর যিকর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর মাহাত্ম্য খুবই উন্নত মানের।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ (আরবি) বলা হয় পিতাকেও। যদি জ্বিনেরা জানতো যে, মানুষের মধ্যেও (আরবি) রয়েছে তবে তারা আল্লাহর সম্পর্কে এই শব্দ ব্যবহার করতো না। (এ উক্তিটি সনদের দিক দিয়ে সবল হলেও এর অর্থ বোধগম্য হচ্ছে না। সম্ভবতঃ এতে কোন একটা কিছু ছুটে গেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ঐ জ্বিনেরা তাদের কওমকে আরো বলেঃ আল্লাহ গ্রহণ করেননি কোন পত্নী এবং না কোন সন্তান। এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তারা আরো বলেঃ আমাদের নির্বোধরা অর্থাৎ শয়তানরা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে ও অপবাদ দেয়। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য সাধারণও হতে পারে। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিই যে আল্লাহর জন্যে স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করে সে নির্বোধ এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে বাতিল আকীদা রাখে এবং অন্যায় ও অবিচারমূলক কথা মুখ থেকে বের করে।ঐ জ্বিনেরা আরো বলতে থাকে আমাদের ধারণা ছিল যে, দানব ও মানব কখনো আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করতে পারে না। কিন্তু কুরআন পাঠ করে আমরা জানতে পারলাম যে, এ দু'টি জাতি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্‌ সত্তা এসব থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। এরপর বলা হচ্ছেঃ জ্বিনদের খুব বেশী বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ এই যে, তারা দেখতো যে, যখনই মানুষ কোন জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে যেতো তখনই সে বলতোঃ আমি এই জঙ্গলের সবচেয়ে বড় জ্বিনের আশ্রয় গ্রহণ করছি। এ কথা বলার পর সে মনে করতো যে, সে সমস্ত জ্বিনের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। যেমন তারা যখন কোন শহরে যেতো তখন ঐ শহরের বড় নেতার শরণাপন্ন হতো। ফলে ঐ শহরের অন্যান্য লোকও তাদেরকে কোন কষ্ট দিতো না, যদিও তারা তার শত্রু হতো। যখন জ্বিনেরা দেখলো যে, মানুষও তাদের আশ্রয়ে এসে থাকে তখন তাদের ঔদ্ধত্য ও আত্মম্ভরিতা আরো বৃদ্ধি পেলো এবং তারা আরো বেশী বেশী মানুষের ক্ষতি সাধনে তৎপর হয়ে উঠলো। আর ভাবার্থ এও হতে পারে যে, জ্বিনেরা মানুষের এ অবস্থা দেখে তাদেরকে আরো ভয় দেখাতে শুরু করলো ও তাদেরকে নানাভাবে কষ্ট দিতে লাগলো। প্রকৃতপক্ষে দানবরা মানবদেরকে ভয় করতো, যেমন মানব দানবদেরকে ভয় করতো এবং তার চেয়েও বেশী। এমনকি যে জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে মানব যেতো সেখান থেকে দানবরা পালিয়ে যেতো। কিন্তু যখন থেকে মুশরিকরা দানবদের শরণাপন্ন হতে শুরু করলো এবং বলতে লাগলোঃ “এই উপত্যকার জ্বিন-সরদারের আমরা শরণাপন্ন হলাম এই স্বার্থে যে, সে আমাদের, আমাদের সন্তানদের এবং আমাদের ধন-মালের কোন ক্ষতি সাধন করবে না তখন থেকে জ্বিনদের সাহস বেড়ে গেল। কারণ তারা মনে করলো যে, মানুষই তো তাদেরকে ভয় করে। সুতরাং তারা নানা প্রকারে মানুষকে ভয় দেখাতে, কষ্ট দিতে ও উৎপীড়ন করতে লাগলো।কারদাম ইবনে আবী সায়েব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আমার পিতার সাথে কোন কার্য উপলক্ষে মদীনা হতে বাইরের দিকে যাত্রা শুরু করি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মক্কায় রাসূলরূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন। রাত্রিকালে আমরা জঙ্গলে এক রাখালের নিকট অবস্থান করি। অর্ধ রাত্রে একটি নেকড়ে বাঘ এসে ঐ রাখালের একটি বকরী ধরে নিয়ে যায়। রাখালটি বাঘটির পিছনে দৌড় দেয় এবং চীৎকার করে বলতে লাগেঃ “হে এই উপত্যকার আবাদকারী! আমি তোমার আশ্রয়ে এসেছি।” সাথে সাথে একটি শব্দ শোনা গেল, অথচ আমরা কোন লোককে দেখতে পেলাম না। শব্দটি হলোঃ “হে নেকড়ে বাঘ! এ বকরীকে ছেড়ে দাও।” অল্পক্ষণ পরেই আমরা দেখলাম যে, ঐ বকরীটিই পালিয়ে আসলো এবং যুথে এসে মিলিত হয়ে গেল। সে একটু যখমও হয়নি। এটার পরিপেক্ষিতেই আল্লাহ্ তা'আলা মক্কায় স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেনঃ কতিপয় মানুষ কতক জিনের আশ্রয় গ্রহণ করতো, ফলে তারা জ্বিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিতো। (এটা ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হতে পারে যে, নেকড়ে বাঘের রূপ ধরে জ্বিনই এসেছিল, যে বকরীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং এদিকে ঐ রাখালটির দোহাইতে ছেড়ে দিয়েছিল, যাতে রাখালের এবং তার মুখে শুনে অন্যান্য লোকদেরও এ বিশ্বাস জন্মে যে, জ্বিনদের আশ্রয়ে আসলে বিপদ-আপদ হতে নিরাপত্তা লাভ করা যায়। এভাবে জ্বিন মানুষকে পথভ্রষ্ট করে দ্বীন হতে সরিয়ে দিতে পারে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। মুসলমান জ্বিনগুলো তাদের কওমকে আরো বললোঃ হে জ্বিনদের দল! তোমাদের মত মানুষও মনে করে যে, মৃত্যুর পর আল্লাহ্ কাউকেও পুনরুত্থিত করবেন না। অথবা এই অর্থ হবেঃ তোমাদের মত মানুষও মনে করতো যে, আল্লাহ্ কাউকেও রাসূলরূপে প্রেরণ করবেন না।

আল-জিন 72:4

১-৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার কওমকে ঐ ঘটনাটি অবহিত কর যে, জ্বিনেরা কুরআন কারীম শুনেছে, সত্য জেনেছে, ওর উপর ঈমান এনেছে এবং ওর অনুগত হয়েছে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলঃ আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, জ্বিনদের একটি দল কুরআন কারীম শুনে নিজেদের কওমের মধ্যে গিয়ে বলেঃ আজ আমরা এক অতি চমৎকার ও বিস্ময়কর কিতাবের বাণী শুনেছি যা সত্য ও মুক্তির পথ প্রদর্শন করে। আমরা তা মেনে নিয়েছি। এখন এটা অসম্ভব যে, আমরা আল্লাহর সাথে অন্য কারো ইবাদত করবো। এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতের মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন আমি জ্বিনদের একটি দলকে তোমার নিকট প্রেরণ করেছিলাম, যেন তারা কুরআন শ্রবণ করে।” (৪৬:২৯) এর তাফসীর হাদীস সমূহের মাধ্যমে আমরা সেখানে বর্ণনা করেছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের কার্য, ক্ষমতা ও নির্দেশ উচ্চ মানের ও বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর নিয়ামতরাজি, শক্তি এবং সৃষ্টজীবের প্রতি করুণা অপরিসীম। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা উচ্চাঙ্গের। তাঁর মহত্ত্ব ও সম্মান অতি উন্নত। তাঁর যিকর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর মাহাত্ম্য খুবই উন্নত মানের।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ (আরবি) বলা হয় পিতাকেও। যদি জ্বিনেরা জানতো যে, মানুষের মধ্যেও (আরবি) রয়েছে তবে তারা আল্লাহর সম্পর্কে এই শব্দ ব্যবহার করতো না। (এ উক্তিটি সনদের দিক দিয়ে সবল হলেও এর অর্থ বোধগম্য হচ্ছে না। সম্ভবতঃ এতে কোন একটা কিছু ছুটে গেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ঐ জ্বিনেরা তাদের কওমকে আরো বলেঃ আল্লাহ গ্রহণ করেননি কোন পত্নী এবং না কোন সন্তান। এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তারা আরো বলেঃ আমাদের নির্বোধরা অর্থাৎ শয়তানরা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে ও অপবাদ দেয়। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য সাধারণও হতে পারে। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিই যে আল্লাহর জন্যে স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করে সে নির্বোধ এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে বাতিল আকীদা রাখে এবং অন্যায় ও অবিচারমূলক কথা মুখ থেকে বের করে।ঐ জ্বিনেরা আরো বলতে থাকে আমাদের ধারণা ছিল যে, দানব ও মানব কখনো আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করতে পারে না। কিন্তু কুরআন পাঠ করে আমরা জানতে পারলাম যে, এ দু'টি জাতি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্‌ সত্তা এসব থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। এরপর বলা হচ্ছেঃ জ্বিনদের খুব বেশী বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ এই যে, তারা দেখতো যে, যখনই মানুষ কোন জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে যেতো তখনই সে বলতোঃ আমি এই জঙ্গলের সবচেয়ে বড় জ্বিনের আশ্রয় গ্রহণ করছি। এ কথা বলার পর সে মনে করতো যে, সে সমস্ত জ্বিনের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। যেমন তারা যখন কোন শহরে যেতো তখন ঐ শহরের বড় নেতার শরণাপন্ন হতো। ফলে ঐ শহরের অন্যান্য লোকও তাদেরকে কোন কষ্ট দিতো না, যদিও তারা তার শত্রু হতো। যখন জ্বিনেরা দেখলো যে, মানুষও তাদের আশ্রয়ে এসে থাকে তখন তাদের ঔদ্ধত্য ও আত্মম্ভরিতা আরো বৃদ্ধি পেলো এবং তারা আরো বেশী বেশী মানুষের ক্ষতি সাধনে তৎপর হয়ে উঠলো। আর ভাবার্থ এও হতে পারে যে, জ্বিনেরা মানুষের এ অবস্থা দেখে তাদেরকে আরো ভয় দেখাতে শুরু করলো ও তাদেরকে নানাভাবে কষ্ট দিতে লাগলো। প্রকৃতপক্ষে দানবরা মানবদেরকে ভয় করতো, যেমন মানব দানবদেরকে ভয় করতো এবং তার চেয়েও বেশী। এমনকি যে জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে মানব যেতো সেখান থেকে দানবরা পালিয়ে যেতো। কিন্তু যখন থেকে মুশরিকরা দানবদের শরণাপন্ন হতে শুরু করলো এবং বলতে লাগলোঃ “এই উপত্যকার জ্বিন-সরদারের আমরা শরণাপন্ন হলাম এই স্বার্থে যে, সে আমাদের, আমাদের সন্তানদের এবং আমাদের ধন-মালের কোন ক্ষতি সাধন করবে না তখন থেকে জ্বিনদের সাহস বেড়ে গেল। কারণ তারা মনে করলো যে, মানুষই তো তাদেরকে ভয় করে। সুতরাং তারা নানা প্রকারে মানুষকে ভয় দেখাতে, কষ্ট দিতে ও উৎপীড়ন করতে লাগলো।কারদাম ইবনে আবী সায়েব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আমার পিতার সাথে কোন কার্য উপলক্ষে মদীনা হতে বাইরের দিকে যাত্রা শুরু করি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মক্কায় রাসূলরূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন। রাত্রিকালে আমরা জঙ্গলে এক রাখালের নিকট অবস্থান করি। অর্ধ রাত্রে একটি নেকড়ে বাঘ এসে ঐ রাখালের একটি বকরী ধরে নিয়ে যায়। রাখালটি বাঘটির পিছনে দৌড় দেয় এবং চীৎকার করে বলতে লাগেঃ “হে এই উপত্যকার আবাদকারী! আমি তোমার আশ্রয়ে এসেছি।” সাথে সাথে একটি শব্দ শোনা গেল, অথচ আমরা কোন লোককে দেখতে পেলাম না। শব্দটি হলোঃ “হে নেকড়ে বাঘ! এ বকরীকে ছেড়ে দাও।” অল্পক্ষণ পরেই আমরা দেখলাম যে, ঐ বকরীটিই পালিয়ে আসলো এবং যুথে এসে মিলিত হয়ে গেল। সে একটু যখমও হয়নি। এটার পরিপেক্ষিতেই আল্লাহ্ তা'আলা মক্কায় স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেনঃ কতিপয় মানুষ কতক জিনের আশ্রয় গ্রহণ করতো, ফলে তারা জ্বিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিতো। (এটা ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হতে পারে যে, নেকড়ে বাঘের রূপ ধরে জ্বিনই এসেছিল, যে বকরীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং এদিকে ঐ রাখালটির দোহাইতে ছেড়ে দিয়েছিল, যাতে রাখালের এবং তার মুখে শুনে অন্যান্য লোকদেরও এ বিশ্বাস জন্মে যে, জ্বিনদের আশ্রয়ে আসলে বিপদ-আপদ হতে নিরাপত্তা লাভ করা যায়। এভাবে জ্বিন মানুষকে পথভ্রষ্ট করে দ্বীন হতে সরিয়ে দিতে পারে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। মুসলমান জ্বিনগুলো তাদের কওমকে আরো বললোঃ হে জ্বিনদের দল! তোমাদের মত মানুষও মনে করে যে, মৃত্যুর পর আল্লাহ্ কাউকেও পুনরুত্থিত করবেন না। অথবা এই অর্থ হবেঃ তোমাদের মত মানুষও মনে করতো যে, আল্লাহ্ কাউকেও রাসূলরূপে প্রেরণ করবেন না।

আল-জিন 72:5

১-৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার কওমকে ঐ ঘটনাটি অবহিত কর যে, জ্বিনেরা কুরআন কারীম শুনেছে, সত্য জেনেছে, ওর উপর ঈমান এনেছে এবং ওর অনুগত হয়েছে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলঃ আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, জ্বিনদের একটি দল কুরআন কারীম শুনে নিজেদের কওমের মধ্যে গিয়ে বলেঃ আজ আমরা এক অতি চমৎকার ও বিস্ময়কর কিতাবের বাণী শুনেছি যা সত্য ও মুক্তির পথ প্রদর্শন করে। আমরা তা মেনে নিয়েছি। এখন এটা অসম্ভব যে, আমরা আল্লাহর সাথে অন্য কারো ইবাদত করবো। এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতের মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন আমি জ্বিনদের একটি দলকে তোমার নিকট প্রেরণ করেছিলাম, যেন তারা কুরআন শ্রবণ করে।” (৪৬:২৯) এর তাফসীর হাদীস সমূহের মাধ্যমে আমরা সেখানে বর্ণনা করেছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের কার্য, ক্ষমতা ও নির্দেশ উচ্চ মানের ও বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর নিয়ামতরাজি, শক্তি এবং সৃষ্টজীবের প্রতি করুণা অপরিসীম। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা উচ্চাঙ্গের। তাঁর মহত্ত্ব ও সম্মান অতি উন্নত। তাঁর যিকর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর মাহাত্ম্য খুবই উন্নত মানের।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ (আরবি) বলা হয় পিতাকেও। যদি জ্বিনেরা জানতো যে, মানুষের মধ্যেও (আরবি) রয়েছে তবে তারা আল্লাহর সম্পর্কে এই শব্দ ব্যবহার করতো না। (এ উক্তিটি সনদের দিক দিয়ে সবল হলেও এর অর্থ বোধগম্য হচ্ছে না। সম্ভবতঃ এতে কোন একটা কিছু ছুটে গেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ঐ জ্বিনেরা তাদের কওমকে আরো বলেঃ আল্লাহ গ্রহণ করেননি কোন পত্নী এবং না কোন সন্তান। এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তারা আরো বলেঃ আমাদের নির্বোধরা অর্থাৎ শয়তানরা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে ও অপবাদ দেয়। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য সাধারণও হতে পারে। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিই যে আল্লাহর জন্যে স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করে সে নির্বোধ এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে বাতিল আকীদা রাখে এবং অন্যায় ও অবিচারমূলক কথা মুখ থেকে বের করে।ঐ জ্বিনেরা আরো বলতে থাকে আমাদের ধারণা ছিল যে, দানব ও মানব কখনো আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করতে পারে না। কিন্তু কুরআন পাঠ করে আমরা জানতে পারলাম যে, এ দু'টি জাতি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্‌ সত্তা এসব থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। এরপর বলা হচ্ছেঃ জ্বিনদের খুব বেশী বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ এই যে, তারা দেখতো যে, যখনই মানুষ কোন জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে যেতো তখনই সে বলতোঃ আমি এই জঙ্গলের সবচেয়ে বড় জ্বিনের আশ্রয় গ্রহণ করছি। এ কথা বলার পর সে মনে করতো যে, সে সমস্ত জ্বিনের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। যেমন তারা যখন কোন শহরে যেতো তখন ঐ শহরের বড় নেতার শরণাপন্ন হতো। ফলে ঐ শহরের অন্যান্য লোকও তাদেরকে কোন কষ্ট দিতো না, যদিও তারা তার শত্রু হতো। যখন জ্বিনেরা দেখলো যে, মানুষও তাদের আশ্রয়ে এসে থাকে তখন তাদের ঔদ্ধত্য ও আত্মম্ভরিতা আরো বৃদ্ধি পেলো এবং তারা আরো বেশী বেশী মানুষের ক্ষতি সাধনে তৎপর হয়ে উঠলো। আর ভাবার্থ এও হতে পারে যে, জ্বিনেরা মানুষের এ অবস্থা দেখে তাদেরকে আরো ভয় দেখাতে শুরু করলো ও তাদেরকে নানাভাবে কষ্ট দিতে লাগলো। প্রকৃতপক্ষে দানবরা মানবদেরকে ভয় করতো, যেমন মানব দানবদেরকে ভয় করতো এবং তার চেয়েও বেশী। এমনকি যে জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে মানব যেতো সেখান থেকে দানবরা পালিয়ে যেতো। কিন্তু যখন থেকে মুশরিকরা দানবদের শরণাপন্ন হতে শুরু করলো এবং বলতে লাগলোঃ “এই উপত্যকার জ্বিন-সরদারের আমরা শরণাপন্ন হলাম এই স্বার্থে যে, সে আমাদের, আমাদের সন্তানদের এবং আমাদের ধন-মালের কোন ক্ষতি সাধন করবে না তখন থেকে জ্বিনদের সাহস বেড়ে গেল। কারণ তারা মনে করলো যে, মানুষই তো তাদেরকে ভয় করে। সুতরাং তারা নানা প্রকারে মানুষকে ভয় দেখাতে, কষ্ট দিতে ও উৎপীড়ন করতে লাগলো।কারদাম ইবনে আবী সায়েব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আমার পিতার সাথে কোন কার্য উপলক্ষে মদীনা হতে বাইরের দিকে যাত্রা শুরু করি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মক্কায় রাসূলরূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন। রাত্রিকালে আমরা জঙ্গলে এক রাখালের নিকট অবস্থান করি। অর্ধ রাত্রে একটি নেকড়ে বাঘ এসে ঐ রাখালের একটি বকরী ধরে নিয়ে যায়। রাখালটি বাঘটির পিছনে দৌড় দেয় এবং চীৎকার করে বলতে লাগেঃ “হে এই উপত্যকার আবাদকারী! আমি তোমার আশ্রয়ে এসেছি।” সাথে সাথে একটি শব্দ শোনা গেল, অথচ আমরা কোন লোককে দেখতে পেলাম না। শব্দটি হলোঃ “হে নেকড়ে বাঘ! এ বকরীকে ছেড়ে দাও।” অল্পক্ষণ পরেই আমরা দেখলাম যে, ঐ বকরীটিই পালিয়ে আসলো এবং যুথে এসে মিলিত হয়ে গেল। সে একটু যখমও হয়নি। এটার পরিপেক্ষিতেই আল্লাহ্ তা'আলা মক্কায় স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেনঃ কতিপয় মানুষ কতক জিনের আশ্রয় গ্রহণ করতো, ফলে তারা জ্বিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিতো। (এটা ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হতে পারে যে, নেকড়ে বাঘের রূপ ধরে জ্বিনই এসেছিল, যে বকরীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং এদিকে ঐ রাখালটির দোহাইতে ছেড়ে দিয়েছিল, যাতে রাখালের এবং তার মুখে শুনে অন্যান্য লোকদেরও এ বিশ্বাস জন্মে যে, জ্বিনদের আশ্রয়ে আসলে বিপদ-আপদ হতে নিরাপত্তা লাভ করা যায়। এভাবে জ্বিন মানুষকে পথভ্রষ্ট করে দ্বীন হতে সরিয়ে দিতে পারে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। মুসলমান জ্বিনগুলো তাদের কওমকে আরো বললোঃ হে জ্বিনদের দল! তোমাদের মত মানুষও মনে করে যে, মৃত্যুর পর আল্লাহ্ কাউকেও পুনরুত্থিত করবেন না। অথবা এই অর্থ হবেঃ তোমাদের মত মানুষও মনে করতো যে, আল্লাহ্ কাউকেও রাসূলরূপে প্রেরণ করবেন না।

আল-জিন 72:6

১-৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার কওমকে ঐ ঘটনাটি অবহিত কর যে, জ্বিনেরা কুরআন কারীম শুনেছে, সত্য জেনেছে, ওর উপর ঈমান এনেছে এবং ওর অনুগত হয়েছে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলঃ আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, জ্বিনদের একটি দল কুরআন কারীম শুনে নিজেদের কওমের মধ্যে গিয়ে বলেঃ আজ আমরা এক অতি চমৎকার ও বিস্ময়কর কিতাবের বাণী শুনেছি যা সত্য ও মুক্তির পথ প্রদর্শন করে। আমরা তা মেনে নিয়েছি। এখন এটা অসম্ভব যে, আমরা আল্লাহর সাথে অন্য কারো ইবাদত করবো। এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতের মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন আমি জ্বিনদের একটি দলকে তোমার নিকট প্রেরণ করেছিলাম, যেন তারা কুরআন শ্রবণ করে।” (৪৬:২৯) এর তাফসীর হাদীস সমূহের মাধ্যমে আমরা সেখানে বর্ণনা করেছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের কার্য, ক্ষমতা ও নির্দেশ উচ্চ মানের ও বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর নিয়ামতরাজি, শক্তি এবং সৃষ্টজীবের প্রতি করুণা অপরিসীম। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা উচ্চাঙ্গের। তাঁর মহত্ত্ব ও সম্মান অতি উন্নত। তাঁর যিকর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর মাহাত্ম্য খুবই উন্নত মানের।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ (আরবি) বলা হয় পিতাকেও। যদি জ্বিনেরা জানতো যে, মানুষের মধ্যেও (আরবি) রয়েছে তবে তারা আল্লাহর সম্পর্কে এই শব্দ ব্যবহার করতো না। (এ উক্তিটি সনদের দিক দিয়ে সবল হলেও এর অর্থ বোধগম্য হচ্ছে না। সম্ভবতঃ এতে কোন একটা কিছু ছুটে গেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ঐ জ্বিনেরা তাদের কওমকে আরো বলেঃ আল্লাহ গ্রহণ করেননি কোন পত্নী এবং না কোন সন্তান। এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তারা আরো বলেঃ আমাদের নির্বোধরা অর্থাৎ শয়তানরা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে ও অপবাদ দেয়। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য সাধারণও হতে পারে। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিই যে আল্লাহর জন্যে স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করে সে নির্বোধ এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে বাতিল আকীদা রাখে এবং অন্যায় ও অবিচারমূলক কথা মুখ থেকে বের করে।ঐ জ্বিনেরা আরো বলতে থাকে আমাদের ধারণা ছিল যে, দানব ও মানব কখনো আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করতে পারে না। কিন্তু কুরআন পাঠ করে আমরা জানতে পারলাম যে, এ দু'টি জাতি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্‌ সত্তা এসব থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। এরপর বলা হচ্ছেঃ জ্বিনদের খুব বেশী বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ এই যে, তারা দেখতো যে, যখনই মানুষ কোন জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে যেতো তখনই সে বলতোঃ আমি এই জঙ্গলের সবচেয়ে বড় জ্বিনের আশ্রয় গ্রহণ করছি। এ কথা বলার পর সে মনে করতো যে, সে সমস্ত জ্বিনের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। যেমন তারা যখন কোন শহরে যেতো তখন ঐ শহরের বড় নেতার শরণাপন্ন হতো। ফলে ঐ শহরের অন্যান্য লোকও তাদেরকে কোন কষ্ট দিতো না, যদিও তারা তার শত্রু হতো। যখন জ্বিনেরা দেখলো যে, মানুষও তাদের আশ্রয়ে এসে থাকে তখন তাদের ঔদ্ধত্য ও আত্মম্ভরিতা আরো বৃদ্ধি পেলো এবং তারা আরো বেশী বেশী মানুষের ক্ষতি সাধনে তৎপর হয়ে উঠলো। আর ভাবার্থ এও হতে পারে যে, জ্বিনেরা মানুষের এ অবস্থা দেখে তাদেরকে আরো ভয় দেখাতে শুরু করলো ও তাদেরকে নানাভাবে কষ্ট দিতে লাগলো। প্রকৃতপক্ষে দানবরা মানবদেরকে ভয় করতো, যেমন মানব দানবদেরকে ভয় করতো এবং তার চেয়েও বেশী। এমনকি যে জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে মানব যেতো সেখান থেকে দানবরা পালিয়ে যেতো। কিন্তু যখন থেকে মুশরিকরা দানবদের শরণাপন্ন হতে শুরু করলো এবং বলতে লাগলোঃ “এই উপত্যকার জ্বিন-সরদারের আমরা শরণাপন্ন হলাম এই স্বার্থে যে, সে আমাদের, আমাদের সন্তানদের এবং আমাদের ধন-মালের কোন ক্ষতি সাধন করবে না তখন থেকে জ্বিনদের সাহস বেড়ে গেল। কারণ তারা মনে করলো যে, মানুষই তো তাদেরকে ভয় করে। সুতরাং তারা নানা প্রকারে মানুষকে ভয় দেখাতে, কষ্ট দিতে ও উৎপীড়ন করতে লাগলো।কারদাম ইবনে আবী সায়েব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আমার পিতার সাথে কোন কার্য উপলক্ষে মদীনা হতে বাইরের দিকে যাত্রা শুরু করি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মক্কায় রাসূলরূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন। রাত্রিকালে আমরা জঙ্গলে এক রাখালের নিকট অবস্থান করি। অর্ধ রাত্রে একটি নেকড়ে বাঘ এসে ঐ রাখালের একটি বকরী ধরে নিয়ে যায়। রাখালটি বাঘটির পিছনে দৌড় দেয় এবং চীৎকার করে বলতে লাগেঃ “হে এই উপত্যকার আবাদকারী! আমি তোমার আশ্রয়ে এসেছি।” সাথে সাথে একটি শব্দ শোনা গেল, অথচ আমরা কোন লোককে দেখতে পেলাম না। শব্দটি হলোঃ “হে নেকড়ে বাঘ! এ বকরীকে ছেড়ে দাও।” অল্পক্ষণ পরেই আমরা দেখলাম যে, ঐ বকরীটিই পালিয়ে আসলো এবং যুথে এসে মিলিত হয়ে গেল। সে একটু যখমও হয়নি। এটার পরিপেক্ষিতেই আল্লাহ্ তা'আলা মক্কায় স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেনঃ কতিপয় মানুষ কতক জিনের আশ্রয় গ্রহণ করতো, ফলে তারা জ্বিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিতো। (এটা ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হতে পারে যে, নেকড়ে বাঘের রূপ ধরে জ্বিনই এসেছিল, যে বকরীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং এদিকে ঐ রাখালটির দোহাইতে ছেড়ে দিয়েছিল, যাতে রাখালের এবং তার মুখে শুনে অন্যান্য লোকদেরও এ বিশ্বাস জন্মে যে, জ্বিনদের আশ্রয়ে আসলে বিপদ-আপদ হতে নিরাপত্তা লাভ করা যায়। এভাবে জ্বিন মানুষকে পথভ্রষ্ট করে দ্বীন হতে সরিয়ে দিতে পারে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। মুসলমান জ্বিনগুলো তাদের কওমকে আরো বললোঃ হে জ্বিনদের দল! তোমাদের মত মানুষও মনে করে যে, মৃত্যুর পর আল্লাহ্ কাউকেও পুনরুত্থিত করবেন না। অথবা এই অর্থ হবেঃ তোমাদের মত মানুষও মনে করতো যে, আল্লাহ্ কাউকেও রাসূলরূপে প্রেরণ করবেন না।

আল-জিন 72:7

১-৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার কওমকে ঐ ঘটনাটি অবহিত কর যে, জ্বিনেরা কুরআন কারীম শুনেছে, সত্য জেনেছে, ওর উপর ঈমান এনেছে এবং ওর অনুগত হয়েছে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলঃ আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, জ্বিনদের একটি দল কুরআন কারীম শুনে নিজেদের কওমের মধ্যে গিয়ে বলেঃ আজ আমরা এক অতি চমৎকার ও বিস্ময়কর কিতাবের বাণী শুনেছি যা সত্য ও মুক্তির পথ প্রদর্শন করে। আমরা তা মেনে নিয়েছি। এখন এটা অসম্ভব যে, আমরা আল্লাহর সাথে অন্য কারো ইবাদত করবো। এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতের মতঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন আমি জ্বিনদের একটি দলকে তোমার নিকট প্রেরণ করেছিলাম, যেন তারা কুরআন শ্রবণ করে।” (৪৬:২৯) এর তাফসীর হাদীস সমূহের মাধ্যমে আমরা সেখানে বর্ণনা করেছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বলেঃ আমাদের প্রতিপালকের কার্য, ক্ষমতা ও নির্দেশ উচ্চ মানের ও বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর নিয়ামতরাজি, শক্তি এবং সৃষ্টজীবের প্রতি করুণা অপরিসীম। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা উচ্চাঙ্গের। তাঁর মহত্ত্ব ও সম্মান অতি উন্নত। তাঁর যিকর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর মাহাত্ম্য খুবই উন্নত মানের।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ (আরবি) বলা হয় পিতাকেও। যদি জ্বিনেরা জানতো যে, মানুষের মধ্যেও (আরবি) রয়েছে তবে তারা আল্লাহর সম্পর্কে এই শব্দ ব্যবহার করতো না। (এ উক্তিটি সনদের দিক দিয়ে সবল হলেও এর অর্থ বোধগম্য হচ্ছে না। সম্ভবতঃ এতে কোন একটা কিছু ছুটে গেছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)ঐ জ্বিনেরা তাদের কওমকে আরো বলেঃ আল্লাহ গ্রহণ করেননি কোন পত্নী এবং না কোন সন্তান। এর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। তারা আরো বলেঃ আমাদের নির্বোধরা অর্থাৎ শয়তানরা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে ও অপবাদ দেয়। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য সাধারণও হতে পারে। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিই যে আল্লাহর জন্যে স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করে সে নির্বোধ এবং চরম মিথ্যাবাদী। সে বাতিল আকীদা রাখে এবং অন্যায় ও অবিচারমূলক কথা মুখ থেকে বের করে।ঐ জ্বিনেরা আরো বলতে থাকে আমাদের ধারণা ছিল যে, দানব ও মানব কখনো আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করতে পারে না। কিন্তু কুরআন পাঠ করে আমরা জানতে পারলাম যে, এ দু'টি জাতি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্‌ সত্তা এসব থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। এরপর বলা হচ্ছেঃ জ্বিনদের খুব বেশী বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ এই যে, তারা দেখতো যে, যখনই মানুষ কোন জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে যেতো তখনই সে বলতোঃ আমি এই জঙ্গলের সবচেয়ে বড় জ্বিনের আশ্রয় গ্রহণ করছি। এ কথা বলার পর সে মনে করতো যে, সে সমস্ত জ্বিনের অনিষ্ট হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। যেমন তারা যখন কোন শহরে যেতো তখন ঐ শহরের বড় নেতার শরণাপন্ন হতো। ফলে ঐ শহরের অন্যান্য লোকও তাদেরকে কোন কষ্ট দিতো না, যদিও তারা তার শত্রু হতো। যখন জ্বিনেরা দেখলো যে, মানুষও তাদের আশ্রয়ে এসে থাকে তখন তাদের ঔদ্ধত্য ও আত্মম্ভরিতা আরো বৃদ্ধি পেলো এবং তারা আরো বেশী বেশী মানুষের ক্ষতি সাধনে তৎপর হয়ে উঠলো। আর ভাবার্থ এও হতে পারে যে, জ্বিনেরা মানুষের এ অবস্থা দেখে তাদেরকে আরো ভয় দেখাতে শুরু করলো ও তাদেরকে নানাভাবে কষ্ট দিতে লাগলো। প্রকৃতপক্ষে দানবরা মানবদেরকে ভয় করতো, যেমন মানব দানবদেরকে ভয় করতো এবং তার চেয়েও বেশী। এমনকি যে জঙ্গলে বা মরু প্রান্তরে মানব যেতো সেখান থেকে দানবরা পালিয়ে যেতো। কিন্তু যখন থেকে মুশরিকরা দানবদের শরণাপন্ন হতে শুরু করলো এবং বলতে লাগলোঃ “এই উপত্যকার জ্বিন-সরদারের আমরা শরণাপন্ন হলাম এই স্বার্থে যে, সে আমাদের, আমাদের সন্তানদের এবং আমাদের ধন-মালের কোন ক্ষতি সাধন করবে না তখন থেকে জ্বিনদের সাহস বেড়ে গেল। কারণ তারা মনে করলো যে, মানুষই তো তাদেরকে ভয় করে। সুতরাং তারা নানা প্রকারে মানুষকে ভয় দেখাতে, কষ্ট দিতে ও উৎপীড়ন করতে লাগলো।কারদাম ইবনে আবী সায়েব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আমার পিতার সাথে কোন কার্য উপলক্ষে মদীনা হতে বাইরের দিকে যাত্রা শুরু করি। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মক্কায় রাসূলরূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন। রাত্রিকালে আমরা জঙ্গলে এক রাখালের নিকট অবস্থান করি। অর্ধ রাত্রে একটি নেকড়ে বাঘ এসে ঐ রাখালের একটি বকরী ধরে নিয়ে যায়। রাখালটি বাঘটির পিছনে দৌড় দেয় এবং চীৎকার করে বলতে লাগেঃ “হে এই উপত্যকার আবাদকারী! আমি তোমার আশ্রয়ে এসেছি।” সাথে সাথে একটি শব্দ শোনা গেল, অথচ আমরা কোন লোককে দেখতে পেলাম না। শব্দটি হলোঃ “হে নেকড়ে বাঘ! এ বকরীকে ছেড়ে দাও।” অল্পক্ষণ পরেই আমরা দেখলাম যে, ঐ বকরীটিই পালিয়ে আসলো এবং যুথে এসে মিলিত হয়ে গেল। সে একটু যখমও হয়নি। এটার পরিপেক্ষিতেই আল্লাহ্ তা'আলা মক্কায় স্বীয় রাসূল (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেনঃ কতিপয় মানুষ কতক জিনের আশ্রয় গ্রহণ করতো, ফলে তারা জ্বিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিতো। (এটা ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হতে পারে যে, নেকড়ে বাঘের রূপ ধরে জ্বিনই এসেছিল, যে বকরীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং এদিকে ঐ রাখালটির দোহাইতে ছেড়ে দিয়েছিল, যাতে রাখালের এবং তার মুখে শুনে অন্যান্য লোকদেরও এ বিশ্বাস জন্মে যে, জ্বিনদের আশ্রয়ে আসলে বিপদ-আপদ হতে নিরাপত্তা লাভ করা যায়। এভাবে জ্বিন মানুষকে পথভ্রষ্ট করে দ্বীন হতে সরিয়ে দিতে পারে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। মুসলমান জ্বিনগুলো তাদের কওমকে আরো বললোঃ হে জ্বিনদের দল! তোমাদের মত মানুষও মনে করে যে, মৃত্যুর পর আল্লাহ্ কাউকেও পুনরুত্থিত করবেন না। অথবা এই অর্থ হবেঃ তোমাদের মত মানুষও মনে করতো যে, আল্লাহ্ কাউকেও রাসূলরূপে প্রেরণ করবেন না।

আল-জিন 72:8

৮-১০ নং আয়াতের তাফসীর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বি’সাতের পূর্বে জ্বিনেরা আকাশের উপর গিয়ে কোন জায়গায় বসে পড়তো এবং কান লাগিয়ে এবং একটার সঙ্গে শতটা মিথ্যা মিলিয়ে দিয়ে নিজেদের লোকদেরকে বলতো। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে পয়গম্বর রূপে পাঠানো হলো এবং তার উপর কুরআন কারীম নাযিল হতে শুরু হলো তখন আকাশের উপর কঠোর প্রহরী বসিয়ে দেয়া হলো ঐ শয়তানদের পূর্বের মত সেখানে বসে পড়ার আর সুযোগ রইলো না। যাতে কুরআন কারীম ও গণকদের কথার মধ্যে মিশ্রণ না ঘটে যায় এবং সত্যের সন্ধানীদের কোন অসুবিধা না হয়।ঐ মুসলমান জ্বিনগুলো তাদের সম্প্রদায়কে বলেঃ পূর্বে তো আমরা আকাশের উপর বসে পড়তাম। কিন্তু এখন তো দেখা যায় যে, তথায় কঠোর প্রহরী বসে রয়েছে। তারা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে! এর প্রকৃত রহস্য যে কি তা আমাদের জানা নেই। মহামহিমান্বিত আল্লাহ জগদ্বাসীর মঙ্গলই চান, না তাদের অমঙ্গলই অভিপ্রেত তা আমরা বলতে পারি না।ঐ মুসলমান জ্বিনদের আদব-কায়দা লক্ষ্যণীয় যে, তারা অমঙ্গলের সম্বন্ধের জন্যে কোন কর্তা উল্লেখ করেনি, কিন্তু মঙ্গলের সম্বন্ধ আল্লাহ তা'আলার সাথে লাগিয়েছে এবং বলেছেঃ এই প্রহরী নিযুক্তিকরণের উদ্দেশ্য যে কি তা আমরা জানি না। অনুরূপভাবে সহীহ হাদীসেও এসেছেঃ “অমঙ্গল ও অকল্যাণ আপনার পক্ষ থেকে নয়।” ইতিপূর্বেও মাঝে মাঝে তারকা নিক্ষিপ্ত হতো, কিন্তু এতো অধিকভাবে নয়। যেমন হাদীসে হযরত আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বসেছিলাম, হঠাৎ আকাশে একটি তারা নিক্ষিপ্ত হলো এবং আলো বিচ্ছুরিত হলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরা এটা সম্পর্কে কি বলতে?” আমরা উত্তরে বললামঃ আমরা বলতাম যে, কোন মহান ব্যক্তির জন্মের কারণে বা কোন বুযুর্গ ব্যক্তির মৃত্যুর কারণে এরূপ হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “না, তা নয়। বরং যখন আল্লাহ আকাশে কোন কাজের ফায়সালা করেন (তখন এরূপ হয়ে থাকে)।” সূরা সাবার তাফসীরে এ হাদীসটি পূর্ণভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তারকা খুববেশী নিক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ হলো ওগুলো দ্বারা শয়তানদেরকে ধ্বংস করা ও আকাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যেন তারা আকাশের খবর নেয়া হতে বঞ্চিত হয়। এ ব্যবস্থা গ্রহণের পর জ্বিনেরা চতুর্দিকে অনুসন্ধান চালাতে শুরু করলো যে, তাদের আকাশে যাওয়া বন্ধ হওয়ার কারণ কি? সুতরাং তাদের একটি দল আরবে আসলো এবং সেখানে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ফজরের নামাযে কুরআন কারীম পাঠরত অবস্থায় পেলো। তারা তখন বুঝতে পারলো যে, এই নবী (সঃ)-এর বি’সাত এবং এই কালামের অবতরণই তাদের আকাশে যাওয়ার পথ বন্ধ হওয়ার একমাত্র কারণ। অতঃপর ভাগ্যবান ও বুদ্ধিমান জ্বিনগুলো তো মুসলমান হয়ে গেল। আর অবশিষ্ট জ্বিনদের ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য লাভ হলো না। সূরা আহকাফের (আরবি) (৪৬:২৯) এই আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ বর্ণনা গত হয়েছে। নক্ষত্ররাজির ঝরে পড়া এবং আকাশ সুরক্ষিত হওয়া শুধুমাত্র জ্বিনদের জন্যেই নয়, বরং মানুষের জন্যেও এক ভীতিপ্রদ নিদর্শন ছিল। তারা ভয় পাচ্ছিল এবং অপেক্ষমান ছিল যে, দেখা যাক কি ফল হয়। আর সাধারণতঃ নবীদের (আঃ) আগমন এবং আল্লাহর দ্বীন জয়যুক্ত হওয়ার সময় এরূপ হয়েও থাকতো।হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, শয়তানরা ইতিপূর্বে আসমানী বৈঠকে বসে ফেরেশতাদের পারস্পরিক আলোচনা শুনতো। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাসূলরূপে প্রেরিত হলেন তখন এক রাত্রে শয়তানদের প্রতি এক বড় অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হলো, যা দেখে তায়েফবাসীরা বিচলিত হয়ে পড়লো যে, সম্ভবতঃ আকাশবাসীদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হলো। তারা লক্ষ্য করলো যে, ক্রমান্বয়ে তারকাগুলো ভেঙ্গে পড়ছে এবং অগ্নিশিখা উঠতে রয়েছে। আর দূর দূরান্ত পর্যন্ত তীক্ষ্ণতার সাথে চলতে রয়েছে। এ দেখে তায়েফবাসী তাদের গোলামগুলো আযাদ করতে এবং পশু আল্লাহর পথে চেড়ে দিতে শুরু করলো। পরিশেষে আবদে ইয়ালীল ইনে আমর ইবনে উমায়ের তাদেরকে বললোঃ “হে তায়েফবাসী! তোমাদের মালগুলো তোমরা ধ্বংস করছো কেন? তোমরা নক্ষত্রগুলোকে গণে পড়ে দেখো। যদি তারকাগুলোকে নিজ নিজ জায়গায় পেয়ে যাও তবে জানবে যে, আকাশবাসীরা ধ্বংস হয়নি। বরং এসব ব্যবস্থাপনা শুধু ইবনে আবী কাবশা অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর জন্যেই হচ্ছে। আর যদি তোমরা দেখতে পাও যে, সত্যি সত্যিই তারকাগুলো নিজ নিজ নির্ধারিত স্থানে নেই তবে নিশ্চিতরূপে জানবে যে, আকাশবাসীরা ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা তখন নক্ষত্রগুলো গণে পড়ে দেখলো এবং দেখতে পেলোলা যে, তারকাগুলো নিজ নিজ নির্ধারিত স্থানেই রয়েছে। এ দেখে তায়েফবাসীরাও আশ্বস্ত হলো এবং শয়তানরাও পালিয়ে গেল। তারা ইবলীসের কাছে গিয়ে তাকে ঘটনাটি শুনালো। ইবলীস তখন তাদেরকে বললোঃ তোমরা প্রত্যেক এলাকা হতে আমার নিকট মাটি নিয়ে এসো।" তারা তার নিকট মাটি নিয়ে আসলো। সে মাটি শুকলো এবং বললোঃ “এর হেতু মক্কায় রয়েছে।” নাসীবাইনের সাতজন জ্বিন মক্কায় পৌঁছলো। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে হারামে নামায পড়াচ্ছিলেন এবং কুরআন কারীম পাঠ করছিলেন। কুরআন শুনে ঐ জ্বিনদের অন্তর কোমল হয়ে যায়। আরো নিকটে গিয়ে তারা শুনতে থাকে এবং এতে মুগ্ধ হয়ে তারা মুসলমান হয়ে যায় এবং নিজেদের কওমকেও ইসলামের দাওয়াত দেয়।আমরা এই পূর্ণ ঘটনাটি পুরোপুরিভাবে ‘কিতাবুসসীরাত'-এর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সূচনার বর্ণনায় লিখে দিয়েছি। সুতরাং আল্লাহরই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।

আল-জিন 72:9

৮-১০ নং আয়াতের তাফসীর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বি’সাতের পূর্বে জ্বিনেরা আকাশের উপর গিয়ে কোন জায়গায় বসে পড়তো এবং কান লাগিয়ে এবং একটার সঙ্গে শতটা মিথ্যা মিলিয়ে দিয়ে নিজেদের লোকদেরকে বলতো। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে পয়গম্বর রূপে পাঠানো হলো এবং তার উপর কুরআন কারীম নাযিল হতে শুরু হলো তখন আকাশের উপর কঠোর প্রহরী বসিয়ে দেয়া হলো ঐ শয়তানদের পূর্বের মত সেখানে বসে পড়ার আর সুযোগ রইলো না। যাতে কুরআন কারীম ও গণকদের কথার মধ্যে মিশ্রণ না ঘটে যায় এবং সত্যের সন্ধানীদের কোন অসুবিধা না হয়।ঐ মুসলমান জ্বিনগুলো তাদের সম্প্রদায়কে বলেঃ পূর্বে তো আমরা আকাশের উপর বসে পড়তাম। কিন্তু এখন তো দেখা যায় যে, তথায় কঠোর প্রহরী বসে রয়েছে। তারা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে! এর প্রকৃত রহস্য যে কি তা আমাদের জানা নেই। মহামহিমান্বিত আল্লাহ জগদ্বাসীর মঙ্গলই চান, না তাদের অমঙ্গলই অভিপ্রেত তা আমরা বলতে পারি না।ঐ মুসলমান জ্বিনদের আদব-কায়দা লক্ষ্যণীয় যে, তারা অমঙ্গলের সম্বন্ধের জন্যে কোন কর্তা উল্লেখ করেনি, কিন্তু মঙ্গলের সম্বন্ধ আল্লাহ তা'আলার সাথে লাগিয়েছে এবং বলেছেঃ এই প্রহরী নিযুক্তিকরণের উদ্দেশ্য যে কি তা আমরা জানি না। অনুরূপভাবে সহীহ হাদীসেও এসেছেঃ “অমঙ্গল ও অকল্যাণ আপনার পক্ষ থেকে নয়।” ইতিপূর্বেও মাঝে মাঝে তারকা নিক্ষিপ্ত হতো, কিন্তু এতো অধিকভাবে নয়। যেমন হাদীসে হযরত আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বসেছিলাম, হঠাৎ আকাশে একটি তারা নিক্ষিপ্ত হলো এবং আলো বিচ্ছুরিত হলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরা এটা সম্পর্কে কি বলতে?” আমরা উত্তরে বললামঃ আমরা বলতাম যে, কোন মহান ব্যক্তির জন্মের কারণে বা কোন বুযুর্গ ব্যক্তির মৃত্যুর কারণে এরূপ হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “না, তা নয়। বরং যখন আল্লাহ আকাশে কোন কাজের ফায়সালা করেন (তখন এরূপ হয়ে থাকে)।” সূরা সাবার তাফসীরে এ হাদীসটি পূর্ণভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তারকা খুববেশী নিক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ হলো ওগুলো দ্বারা শয়তানদেরকে ধ্বংস করা ও আকাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যেন তারা আকাশের খবর নেয়া হতে বঞ্চিত হয়। এ ব্যবস্থা গ্রহণের পর জ্বিনেরা চতুর্দিকে অনুসন্ধান চালাতে শুরু করলো যে, তাদের আকাশে যাওয়া বন্ধ হওয়ার কারণ কি? সুতরাং তাদের একটি দল আরবে আসলো এবং সেখানে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ফজরের নামাযে কুরআন কারীম পাঠরত অবস্থায় পেলো। তারা তখন বুঝতে পারলো যে, এই নবী (সঃ)-এর বি’সাত এবং এই কালামের অবতরণই তাদের আকাশে যাওয়ার পথ বন্ধ হওয়ার একমাত্র কারণ। অতঃপর ভাগ্যবান ও বুদ্ধিমান জ্বিনগুলো তো মুসলমান হয়ে গেল। আর অবশিষ্ট জ্বিনদের ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য লাভ হলো না। সূরা আহকাফের (আরবি) (৪৬:২৯) এই আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ বর্ণনা গত হয়েছে। নক্ষত্ররাজির ঝরে পড়া এবং আকাশ সুরক্ষিত হওয়া শুধুমাত্র জ্বিনদের জন্যেই নয়, বরং মানুষের জন্যেও এক ভীতিপ্রদ নিদর্শন ছিল। তারা ভয় পাচ্ছিল এবং অপেক্ষমান ছিল যে, দেখা যাক কি ফল হয়। আর সাধারণতঃ নবীদের (আঃ) আগমন এবং আল্লাহর দ্বীন জয়যুক্ত হওয়ার সময় এরূপ হয়েও থাকতো।হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, শয়তানরা ইতিপূর্বে আসমানী বৈঠকে বসে ফেরেশতাদের পারস্পরিক আলোচনা শুনতো। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাসূলরূপে প্রেরিত হলেন তখন এক রাত্রে শয়তানদের প্রতি এক বড় অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হলো, যা দেখে তায়েফবাসীরা বিচলিত হয়ে পড়লো যে, সম্ভবতঃ আকাশবাসীদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হলো। তারা লক্ষ্য করলো যে, ক্রমান্বয়ে তারকাগুলো ভেঙ্গে পড়ছে এবং অগ্নিশিখা উঠতে রয়েছে। আর দূর দূরান্ত পর্যন্ত তীক্ষ্ণতার সাথে চলতে রয়েছে। এ দেখে তায়েফবাসী তাদের গোলামগুলো আযাদ করতে এবং পশু আল্লাহর পথে চেড়ে দিতে শুরু করলো। পরিশেষে আবদে ইয়ালীল ইনে আমর ইবনে উমায়ের তাদেরকে বললোঃ “হে তায়েফবাসী! তোমাদের মালগুলো তোমরা ধ্বংস করছো কেন? তোমরা নক্ষত্রগুলোকে গণে পড়ে দেখো। যদি তারকাগুলোকে নিজ নিজ জায়গায় পেয়ে যাও তবে জানবে যে, আকাশবাসীরা ধ্বংস হয়নি। বরং এসব ব্যবস্থাপনা শুধু ইবনে আবী কাবশা অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর জন্যেই হচ্ছে। আর যদি তোমরা দেখতে পাও যে, সত্যি সত্যিই তারকাগুলো নিজ নিজ নির্ধারিত স্থানে নেই তবে নিশ্চিতরূপে জানবে যে, আকাশবাসীরা ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা তখন নক্ষত্রগুলো গণে পড়ে দেখলো এবং দেখতে পেলোলা যে, তারকাগুলো নিজ নিজ নির্ধারিত স্থানেই রয়েছে। এ দেখে তায়েফবাসীরাও আশ্বস্ত হলো এবং শয়তানরাও পালিয়ে গেল। তারা ইবলীসের কাছে গিয়ে তাকে ঘটনাটি শুনালো। ইবলীস তখন তাদেরকে বললোঃ তোমরা প্রত্যেক এলাকা হতে আমার নিকট মাটি নিয়ে এসো।" তারা তার নিকট মাটি নিয়ে আসলো। সে মাটি শুকলো এবং বললোঃ “এর হেতু মক্কায় রয়েছে।” নাসীবাইনের সাতজন জ্বিন মক্কায় পৌঁছলো। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে হারামে নামায পড়াচ্ছিলেন এবং কুরআন কারীম পাঠ করছিলেন। কুরআন শুনে ঐ জ্বিনদের অন্তর কোমল হয়ে যায়। আরো নিকটে গিয়ে তারা শুনতে থাকে এবং এতে মুগ্ধ হয়ে তারা মুসলমান হয়ে যায় এবং নিজেদের কওমকেও ইসলামের দাওয়াত দেয়।আমরা এই পূর্ণ ঘটনাটি পুরোপুরিভাবে ‘কিতাবুসসীরাত'-এর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সূচনার বর্ণনায় লিখে দিয়েছি। সুতরাং আল্লাহরই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।

আল-জিন 72:10

৮-১০ নং আয়াতের তাফসীর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বি’সাতের পূর্বে জ্বিনেরা আকাশের উপর গিয়ে কোন জায়গায় বসে পড়তো এবং কান লাগিয়ে এবং একটার সঙ্গে শতটা মিথ্যা মিলিয়ে দিয়ে নিজেদের লোকদেরকে বলতো। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে পয়গম্বর রূপে পাঠানো হলো এবং তার উপর কুরআন কারীম নাযিল হতে শুরু হলো তখন আকাশের উপর কঠোর প্রহরী বসিয়ে দেয়া হলো ঐ শয়তানদের পূর্বের মত সেখানে বসে পড়ার আর সুযোগ রইলো না। যাতে কুরআন কারীম ও গণকদের কথার মধ্যে মিশ্রণ না ঘটে যায় এবং সত্যের সন্ধানীদের কোন অসুবিধা না হয়।ঐ মুসলমান জ্বিনগুলো তাদের সম্প্রদায়কে বলেঃ পূর্বে তো আমরা আকাশের উপর বসে পড়তাম। কিন্তু এখন তো দেখা যায় যে, তথায় কঠোর প্রহরী বসে রয়েছে। তারা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে! এর প্রকৃত রহস্য যে কি তা আমাদের জানা নেই। মহামহিমান্বিত আল্লাহ জগদ্বাসীর মঙ্গলই চান, না তাদের অমঙ্গলই অভিপ্রেত তা আমরা বলতে পারি না।ঐ মুসলমান জ্বিনদের আদব-কায়দা লক্ষ্যণীয় যে, তারা অমঙ্গলের সম্বন্ধের জন্যে কোন কর্তা উল্লেখ করেনি, কিন্তু মঙ্গলের সম্বন্ধ আল্লাহ তা'আলার সাথে লাগিয়েছে এবং বলেছেঃ এই প্রহরী নিযুক্তিকরণের উদ্দেশ্য যে কি তা আমরা জানি না। অনুরূপভাবে সহীহ হাদীসেও এসেছেঃ “অমঙ্গল ও অকল্যাণ আপনার পক্ষ থেকে নয়।” ইতিপূর্বেও মাঝে মাঝে তারকা নিক্ষিপ্ত হতো, কিন্তু এতো অধিকভাবে নয়। যেমন হাদীসে হযরত আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে বসেছিলাম, হঠাৎ আকাশে একটি তারা নিক্ষিপ্ত হলো এবং আলো বিচ্ছুরিত হলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরা এটা সম্পর্কে কি বলতে?” আমরা উত্তরে বললামঃ আমরা বলতাম যে, কোন মহান ব্যক্তির জন্মের কারণে বা কোন বুযুর্গ ব্যক্তির মৃত্যুর কারণে এরূপ হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “না, তা নয়। বরং যখন আল্লাহ আকাশে কোন কাজের ফায়সালা করেন (তখন এরূপ হয়ে থাকে)।” সূরা সাবার তাফসীরে এ হাদীসটি পূর্ণভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তারকা খুববেশী নিক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ হলো ওগুলো দ্বারা শয়তানদেরকে ধ্বংস করা ও আকাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যেন তারা আকাশের খবর নেয়া হতে বঞ্চিত হয়। এ ব্যবস্থা গ্রহণের পর জ্বিনেরা চতুর্দিকে অনুসন্ধান চালাতে শুরু করলো যে, তাদের আকাশে যাওয়া বন্ধ হওয়ার কারণ কি? সুতরাং তাদের একটি দল আরবে আসলো এবং সেখানে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে ফজরের নামাযে কুরআন কারীম পাঠরত অবস্থায় পেলো। তারা তখন বুঝতে পারলো যে, এই নবী (সঃ)-এর বি’সাত এবং এই কালামের অবতরণই তাদের আকাশে যাওয়ার পথ বন্ধ হওয়ার একমাত্র কারণ। অতঃপর ভাগ্যবান ও বুদ্ধিমান জ্বিনগুলো তো মুসলমান হয়ে গেল। আর অবশিষ্ট জ্বিনদের ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য লাভ হলো না। সূরা আহকাফের (আরবি) (৪৬:২৯) এই আয়াতের তাফসীরে এর পূর্ণ বর্ণনা গত হয়েছে। নক্ষত্ররাজির ঝরে পড়া এবং আকাশ সুরক্ষিত হওয়া শুধুমাত্র জ্বিনদের জন্যেই নয়, বরং মানুষের জন্যেও এক ভীতিপ্রদ নিদর্শন ছিল। তারা ভয় পাচ্ছিল এবং অপেক্ষমান ছিল যে, দেখা যাক কি ফল হয়। আর সাধারণতঃ নবীদের (আঃ) আগমন এবং আল্লাহর দ্বীন জয়যুক্ত হওয়ার সময় এরূপ হয়েও থাকতো।হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, শয়তানরা ইতিপূর্বে আসমানী বৈঠকে বসে ফেরেশতাদের পারস্পরিক আলোচনা শুনতো। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাসূলরূপে প্রেরিত হলেন তখন এক রাত্রে শয়তানদের প্রতি এক বড় অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হলো, যা দেখে তায়েফবাসীরা বিচলিত হয়ে পড়লো যে, সম্ভবতঃ আকাশবাসীদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হলো। তারা লক্ষ্য করলো যে, ক্রমান্বয়ে তারকাগুলো ভেঙ্গে পড়ছে এবং অগ্নিশিখা উঠতে রয়েছে। আর দূর দূরান্ত পর্যন্ত তীক্ষ্ণতার সাথে চলতে রয়েছে। এ দেখে তায়েফবাসী তাদের গোলামগুলো আযাদ করতে এবং পশু আল্লাহর পথে চেড়ে দিতে শুরু করলো। পরিশেষে আবদে ইয়ালীল ইনে আমর ইবনে উমায়ের তাদেরকে বললোঃ “হে তায়েফবাসী! তোমাদের মালগুলো তোমরা ধ্বংস করছো কেন? তোমরা নক্ষত্রগুলোকে গণে পড়ে দেখো। যদি তারকাগুলোকে নিজ নিজ জায়গায় পেয়ে যাও তবে জানবে যে, আকাশবাসীরা ধ্বংস হয়নি। বরং এসব ব্যবস্থাপনা শুধু ইবনে আবী কাবশা অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর জন্যেই হচ্ছে। আর যদি তোমরা দেখতে পাও যে, সত্যি সত্যিই তারকাগুলো নিজ নিজ নির্ধারিত স্থানে নেই তবে নিশ্চিতরূপে জানবে যে, আকাশবাসীরা ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা তখন নক্ষত্রগুলো গণে পড়ে দেখলো এবং দেখতে পেলোলা যে, তারকাগুলো নিজ নিজ নির্ধারিত স্থানেই রয়েছে। এ দেখে তায়েফবাসীরাও আশ্বস্ত হলো এবং শয়তানরাও পালিয়ে গেল। তারা ইবলীসের কাছে গিয়ে তাকে ঘটনাটি শুনালো। ইবলীস তখন তাদেরকে বললোঃ তোমরা প্রত্যেক এলাকা হতে আমার নিকট মাটি নিয়ে এসো।" তারা তার নিকট মাটি নিয়ে আসলো। সে মাটি শুকলো এবং বললোঃ “এর হেতু মক্কায় রয়েছে।” নাসীবাইনের সাতজন জ্বিন মক্কায় পৌঁছলো। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে হারামে নামায পড়াচ্ছিলেন এবং কুরআন কারীম পাঠ করছিলেন। কুরআন শুনে ঐ জ্বিনদের অন্তর কোমল হয়ে যায়। আরো নিকটে গিয়ে তারা শুনতে থাকে এবং এতে মুগ্ধ হয়ে তারা মুসলমান হয়ে যায় এবং নিজেদের কওমকেও ইসলামের দাওয়াত দেয়।আমরা এই পূর্ণ ঘটনাটি পুরোপুরিভাবে ‘কিতাবুসসীরাত'-এর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সূচনার বর্ণনায় লিখে দিয়েছি। সুতরাং আল্লাহরই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।

আল-জিন 72:11

১১-১৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, জ্বিনেরা নিজেদের সম্পর্কে সংবাদ দিতে গিয়ে বলেঃ আমাদের মধ্যে কতক রয়েছে সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক রয়েছে দুষ্কৃতিকারী। আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী। হযরত আ’মাশ (রঃ) বলেনঃ “একটি জ্বিন আমাদের কাছে আসতো। আমি একদা তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তোমাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য কি? সে উত্তরে বললোঃ “চাউল।” আমি তাকে চাউল এনে দিলাম। তখন দেখলাম যে, খাদ্যগ্ৰাস ক্রমাগত উঠতে রয়েছে বটে, কিন্তু খাদ্য ভক্ষণকারী কাউকেও দেখা যাচ্ছে না। আমি তাকে প্রশ্ন করলামঃ আমাদের মত তোমাদেরও কি কামনা বাসনা রয়েছে? সে জবাব দিলোঃ “হ্যাঁ, রয়েছে। আমি তাকে আবার প্রশ্ন করলামঃ রাফেযী সম্প্রদায়কে তোমাদের মধ্যে কিরূপ গণ্য করা হয়? উত্তরে সে বললোঃ “তাদেরকে অতি নিকৃষ্ট সম্প্রদায় রূপে গণ্য করা হয়।” (হাফিজ আবুল মুযানী (রঃ) বলেন যে, এর সনদ বিশুদ্ধ)হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আব্বাস ইবনে আহমাদ দামেশকী (রঃ) বলেনঃ আমি রাত্রিকালে একটি জ্বিনকে নিম্নলিখত শ্লোকগুলো পড়তে শুনেছিঃ (আরবি)অর্থাৎ “অন্তর আল্লাহর মহব্বতে পূর্ণ হয়ে গেছে, এমনকি পূর্বে ও পশ্চিমে ওর মূল বা ঝড় গেড়ে বসেছে। সে উদ্বিগ্ন ও হতবুদ্ধি হয়ে আল্লাহর প্রেমে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে, যে আল্লাহ তার প্রতিপালক। সে সৃষ্টজীব হতে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।"এরপর জ্বিনদের আরো উক্তি উদ্ধৃত করা হচ্ছেঃ এখন আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে পরাভূত করতে পারবো না এবং পলায়ন করেও তাকে ব্যর্থ করতে পারবো না। কোনক্রমেই তাঁকে অপারগ করা সম্ভব নয়। অতঃপর গৌরব প্রকাশ করে জ্বিনগুলো বলেঃ আমরা যখন পথ-নির্দেশক বাণী শুনলাম তখন তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম। আর এটা গৌরব প্রকাশেরই স্থান বটে। এর চেয়ে বড় ফযীলত ও মর্যাদা আর কি হতে পারে যে, আল্লাহর কালাম শোনা মাত্রই তা তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করলো এবং সাথে সাথেই তারা ঈমান আনলো?এরপর তারা বলেঃ যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তার কোন ক্ষতি ও কোন অন্যায়ের আশংকা থাকবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “সৎকর্মপরায়ণ ও মুমিন ব্যক্তির কোন যুলুম ও ক্ষতির আশংকা থাকবে না।"(২০:১১২) তারপর ঐ জ্বিনেরা আরো বলেঃ আমাদের কতক আত্মসমর্পণকারী এবং কতক সীমালংঘনকারী, যারা আত্মসমর্পণ করে তারা সুচিন্তিতভাবে সত্যপথ বেছে নেয়। পক্ষান্তরে যারা সীমালংঘনকারী তারা তো হবে জাহান্নামেরই ইন্ধন।(আরবি) এর দু’টি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। একটি হলোঃ যদি সমস্ত মানুষ ইসলামের উপর, সোজা-সঠিক পথের উপর এবং আল্লাহর আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর প্রচুর বারি বর্ষণ করতাম এবং তাদের জীবিকায় প্রশস্ততা ও স্বচ্ছলতা দান করতাম। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জীল ও তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, সঠিকভাবে কায়েম করতো এবং ভালভাবে মেনে চলতো তবে তারা তাদের উপর হতে ও নীচ হতে অর্থাৎ আসমান হতে ও যমীন হতে জীবিকা লাভ করতো।”(৫:৬৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি গ্রামবাসী ঈমান আনতো ও ভয় করতো তবে আমি তাদের উপর আসমান ও যমীনের বরকত খুলে দিতাম।”(৭:৯৬)মহান আল্লাহর উক্তিঃ যদদ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করতাম যে, কে হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং কে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত মক্কার কুরায়েশ কাফিরদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, তখন তারা দীর্ঘ সাত বছরের দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়।দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ যদি তারা সবাই পথভ্রষ্ট হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর জীবিকার দরজা খুলে দিতাম, যাতে তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে এবং আল্লাহকে ভুলে গিয়ে নিকৃষ্টতম শাস্তির যোগ্য হয়ে পড়ে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ভুলে বসলো, যে নসীহত তাদেরকে করা হয়েছিল, তখন আমি তাদের উপর সবকিছুরই দরজা খুলে দিলাত, শেষ পর্যন্ত যখন তারা আনন্দে বিভোর হয়ে পড়লো তাদেরকে দেয়া সুখ সামগ্রীর কারণে তখন আকস্মিকভাবে আমি তাদের পাকড়াও করলাম, ফলে তারা সম্পূর্ণরূপে হতাশ হয়ে পড়লো।”(৬:৪৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা কি ধারণা করে যে, আমি যে তাদের মাল ও সন্তান সন্ততি বৃদ্ধি করছি, এটা তাদের কল্যাণ সাধন করছি? (না, তা কখনো নয়) বরং তারা বুঝে না।” (২৩:৫৫-৫৬)এরপর বলা হচ্ছেঃ যে কেউ তার প্রতিপালকের যিকির হতে বিমুখ হয়, তার প্রতিপালক তাকে দুঃসহ শাস্তিতে প্রবেশ করাবেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি পাহাড়ের নাম। আর হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, ওটা জাহান্নামের একটি কূপের নাম।

আল-জিন 72:12

১১-১৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, জ্বিনেরা নিজেদের সম্পর্কে সংবাদ দিতে গিয়ে বলেঃ আমাদের মধ্যে কতক রয়েছে সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক রয়েছে দুষ্কৃতিকারী। আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী। হযরত আ’মাশ (রঃ) বলেনঃ “একটি জ্বিন আমাদের কাছে আসতো। আমি একদা তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তোমাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য কি? সে উত্তরে বললোঃ “চাউল।” আমি তাকে চাউল এনে দিলাম। তখন দেখলাম যে, খাদ্যগ্ৰাস ক্রমাগত উঠতে রয়েছে বটে, কিন্তু খাদ্য ভক্ষণকারী কাউকেও দেখা যাচ্ছে না। আমি তাকে প্রশ্ন করলামঃ আমাদের মত তোমাদেরও কি কামনা বাসনা রয়েছে? সে জবাব দিলোঃ “হ্যাঁ, রয়েছে। আমি তাকে আবার প্রশ্ন করলামঃ রাফেযী সম্প্রদায়কে তোমাদের মধ্যে কিরূপ গণ্য করা হয়? উত্তরে সে বললোঃ “তাদেরকে অতি নিকৃষ্ট সম্প্রদায় রূপে গণ্য করা হয়।” (হাফিজ আবুল মুযানী (রঃ) বলেন যে, এর সনদ বিশুদ্ধ)হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আব্বাস ইবনে আহমাদ দামেশকী (রঃ) বলেনঃ আমি রাত্রিকালে একটি জ্বিনকে নিম্নলিখত শ্লোকগুলো পড়তে শুনেছিঃ (আরবি)অর্থাৎ “অন্তর আল্লাহর মহব্বতে পূর্ণ হয়ে গেছে, এমনকি পূর্বে ও পশ্চিমে ওর মূল বা ঝড় গেড়ে বসেছে। সে উদ্বিগ্ন ও হতবুদ্ধি হয়ে আল্লাহর প্রেমে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে, যে আল্লাহ তার প্রতিপালক। সে সৃষ্টজীব হতে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।"এরপর জ্বিনদের আরো উক্তি উদ্ধৃত করা হচ্ছেঃ এখন আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে পরাভূত করতে পারবো না এবং পলায়ন করেও তাকে ব্যর্থ করতে পারবো না। কোনক্রমেই তাঁকে অপারগ করা সম্ভব নয়। অতঃপর গৌরব প্রকাশ করে জ্বিনগুলো বলেঃ আমরা যখন পথ-নির্দেশক বাণী শুনলাম তখন তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম। আর এটা গৌরব প্রকাশেরই স্থান বটে। এর চেয়ে বড় ফযীলত ও মর্যাদা আর কি হতে পারে যে, আল্লাহর কালাম শোনা মাত্রই তা তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করলো এবং সাথে সাথেই তারা ঈমান আনলো?এরপর তারা বলেঃ যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তার কোন ক্ষতি ও কোন অন্যায়ের আশংকা থাকবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “সৎকর্মপরায়ণ ও মুমিন ব্যক্তির কোন যুলুম ও ক্ষতির আশংকা থাকবে না।"(২০:১১২) তারপর ঐ জ্বিনেরা আরো বলেঃ আমাদের কতক আত্মসমর্পণকারী এবং কতক সীমালংঘনকারী, যারা আত্মসমর্পণ করে তারা সুচিন্তিতভাবে সত্যপথ বেছে নেয়। পক্ষান্তরে যারা সীমালংঘনকারী তারা তো হবে জাহান্নামেরই ইন্ধন।(আরবি) এর দু’টি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। একটি হলোঃ যদি সমস্ত মানুষ ইসলামের উপর, সোজা-সঠিক পথের উপর এবং আল্লাহর আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর প্রচুর বারি বর্ষণ করতাম এবং তাদের জীবিকায় প্রশস্ততা ও স্বচ্ছলতা দান করতাম। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জীল ও তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, সঠিকভাবে কায়েম করতো এবং ভালভাবে মেনে চলতো তবে তারা তাদের উপর হতে ও নীচ হতে অর্থাৎ আসমান হতে ও যমীন হতে জীবিকা লাভ করতো।”(৫:৬৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি গ্রামবাসী ঈমান আনতো ও ভয় করতো তবে আমি তাদের উপর আসমান ও যমীনের বরকত খুলে দিতাম।”(৭:৯৬)মহান আল্লাহর উক্তিঃ যদদ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করতাম যে, কে হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং কে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত মক্কার কুরায়েশ কাফিরদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, তখন তারা দীর্ঘ সাত বছরের দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়।দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ যদি তারা সবাই পথভ্রষ্ট হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর জীবিকার দরজা খুলে দিতাম, যাতে তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে এবং আল্লাহকে ভুলে গিয়ে নিকৃষ্টতম শাস্তির যোগ্য হয়ে পড়ে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ভুলে বসলো, যে নসীহত তাদেরকে করা হয়েছিল, তখন আমি তাদের উপর সবকিছুরই দরজা খুলে দিলাত, শেষ পর্যন্ত যখন তারা আনন্দে বিভোর হয়ে পড়লো তাদেরকে দেয়া সুখ সামগ্রীর কারণে তখন আকস্মিকভাবে আমি তাদের পাকড়াও করলাম, ফলে তারা সম্পূর্ণরূপে হতাশ হয়ে পড়লো।”(৬:৪৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা কি ধারণা করে যে, আমি যে তাদের মাল ও সন্তান সন্ততি বৃদ্ধি করছি, এটা তাদের কল্যাণ সাধন করছি? (না, তা কখনো নয়) বরং তারা বুঝে না।” (২৩:৫৫-৫৬)এরপর বলা হচ্ছেঃ যে কেউ তার প্রতিপালকের যিকির হতে বিমুখ হয়, তার প্রতিপালক তাকে দুঃসহ শাস্তিতে প্রবেশ করাবেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি পাহাড়ের নাম। আর হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, ওটা জাহান্নামের একটি কূপের নাম।

আল-জিন 72:13

১১-১৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, জ্বিনেরা নিজেদের সম্পর্কে সংবাদ দিতে গিয়ে বলেঃ আমাদের মধ্যে কতক রয়েছে সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক রয়েছে দুষ্কৃতিকারী। আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী। হযরত আ’মাশ (রঃ) বলেনঃ “একটি জ্বিন আমাদের কাছে আসতো। আমি একদা তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তোমাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য কি? সে উত্তরে বললোঃ “চাউল।” আমি তাকে চাউল এনে দিলাম। তখন দেখলাম যে, খাদ্যগ্ৰাস ক্রমাগত উঠতে রয়েছে বটে, কিন্তু খাদ্য ভক্ষণকারী কাউকেও দেখা যাচ্ছে না। আমি তাকে প্রশ্ন করলামঃ আমাদের মত তোমাদেরও কি কামনা বাসনা রয়েছে? সে জবাব দিলোঃ “হ্যাঁ, রয়েছে। আমি তাকে আবার প্রশ্ন করলামঃ রাফেযী সম্প্রদায়কে তোমাদের মধ্যে কিরূপ গণ্য করা হয়? উত্তরে সে বললোঃ “তাদেরকে অতি নিকৃষ্ট সম্প্রদায় রূপে গণ্য করা হয়।” (হাফিজ আবুল মুযানী (রঃ) বলেন যে, এর সনদ বিশুদ্ধ)হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আব্বাস ইবনে আহমাদ দামেশকী (রঃ) বলেনঃ আমি রাত্রিকালে একটি জ্বিনকে নিম্নলিখত শ্লোকগুলো পড়তে শুনেছিঃ (আরবি)অর্থাৎ “অন্তর আল্লাহর মহব্বতে পূর্ণ হয়ে গেছে, এমনকি পূর্বে ও পশ্চিমে ওর মূল বা ঝড় গেড়ে বসেছে। সে উদ্বিগ্ন ও হতবুদ্ধি হয়ে আল্লাহর প্রেমে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে, যে আল্লাহ তার প্রতিপালক। সে সৃষ্টজীব হতে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।"এরপর জ্বিনদের আরো উক্তি উদ্ধৃত করা হচ্ছেঃ এখন আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে পরাভূত করতে পারবো না এবং পলায়ন করেও তাকে ব্যর্থ করতে পারবো না। কোনক্রমেই তাঁকে অপারগ করা সম্ভব নয়। অতঃপর গৌরব প্রকাশ করে জ্বিনগুলো বলেঃ আমরা যখন পথ-নির্দেশক বাণী শুনলাম তখন তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম। আর এটা গৌরব প্রকাশেরই স্থান বটে। এর চেয়ে বড় ফযীলত ও মর্যাদা আর কি হতে পারে যে, আল্লাহর কালাম শোনা মাত্রই তা তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করলো এবং সাথে সাথেই তারা ঈমান আনলো?এরপর তারা বলেঃ যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তার কোন ক্ষতি ও কোন অন্যায়ের আশংকা থাকবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “সৎকর্মপরায়ণ ও মুমিন ব্যক্তির কোন যুলুম ও ক্ষতির আশংকা থাকবে না।"(২০:১১২) তারপর ঐ জ্বিনেরা আরো বলেঃ আমাদের কতক আত্মসমর্পণকারী এবং কতক সীমালংঘনকারী, যারা আত্মসমর্পণ করে তারা সুচিন্তিতভাবে সত্যপথ বেছে নেয়। পক্ষান্তরে যারা সীমালংঘনকারী তারা তো হবে জাহান্নামেরই ইন্ধন।(আরবি) এর দু’টি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। একটি হলোঃ যদি সমস্ত মানুষ ইসলামের উপর, সোজা-সঠিক পথের উপর এবং আল্লাহর আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর প্রচুর বারি বর্ষণ করতাম এবং তাদের জীবিকায় প্রশস্ততা ও স্বচ্ছলতা দান করতাম। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জীল ও তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, সঠিকভাবে কায়েম করতো এবং ভালভাবে মেনে চলতো তবে তারা তাদের উপর হতে ও নীচ হতে অর্থাৎ আসমান হতে ও যমীন হতে জীবিকা লাভ করতো।”(৫:৬৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি গ্রামবাসী ঈমান আনতো ও ভয় করতো তবে আমি তাদের উপর আসমান ও যমীনের বরকত খুলে দিতাম।”(৭:৯৬)মহান আল্লাহর উক্তিঃ যদদ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করতাম যে, কে হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং কে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত মক্কার কুরায়েশ কাফিরদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, তখন তারা দীর্ঘ সাত বছরের দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়।দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ যদি তারা সবাই পথভ্রষ্ট হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর জীবিকার দরজা খুলে দিতাম, যাতে তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে এবং আল্লাহকে ভুলে গিয়ে নিকৃষ্টতম শাস্তির যোগ্য হয়ে পড়ে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ভুলে বসলো, যে নসীহত তাদেরকে করা হয়েছিল, তখন আমি তাদের উপর সবকিছুরই দরজা খুলে দিলাত, শেষ পর্যন্ত যখন তারা আনন্দে বিভোর হয়ে পড়লো তাদেরকে দেয়া সুখ সামগ্রীর কারণে তখন আকস্মিকভাবে আমি তাদের পাকড়াও করলাম, ফলে তারা সম্পূর্ণরূপে হতাশ হয়ে পড়লো।”(৬:৪৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা কি ধারণা করে যে, আমি যে তাদের মাল ও সন্তান সন্ততি বৃদ্ধি করছি, এটা তাদের কল্যাণ সাধন করছি? (না, তা কখনো নয়) বরং তারা বুঝে না।” (২৩:৫৫-৫৬)এরপর বলা হচ্ছেঃ যে কেউ তার প্রতিপালকের যিকির হতে বিমুখ হয়, তার প্রতিপালক তাকে দুঃসহ শাস্তিতে প্রবেশ করাবেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি পাহাড়ের নাম। আর হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, ওটা জাহান্নামের একটি কূপের নাম।

আল-জিন 72:14

১১-১৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, জ্বিনেরা নিজেদের সম্পর্কে সংবাদ দিতে গিয়ে বলেঃ আমাদের মধ্যে কতক রয়েছে সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক রয়েছে দুষ্কৃতিকারী। আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী। হযরত আ’মাশ (রঃ) বলেনঃ “একটি জ্বিন আমাদের কাছে আসতো। আমি একদা তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তোমাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য কি? সে উত্তরে বললোঃ “চাউল।” আমি তাকে চাউল এনে দিলাম। তখন দেখলাম যে, খাদ্যগ্ৰাস ক্রমাগত উঠতে রয়েছে বটে, কিন্তু খাদ্য ভক্ষণকারী কাউকেও দেখা যাচ্ছে না। আমি তাকে প্রশ্ন করলামঃ আমাদের মত তোমাদেরও কি কামনা বাসনা রয়েছে? সে জবাব দিলোঃ “হ্যাঁ, রয়েছে। আমি তাকে আবার প্রশ্ন করলামঃ রাফেযী সম্প্রদায়কে তোমাদের মধ্যে কিরূপ গণ্য করা হয়? উত্তরে সে বললোঃ “তাদেরকে অতি নিকৃষ্ট সম্প্রদায় রূপে গণ্য করা হয়।” (হাফিজ আবুল মুযানী (রঃ) বলেন যে, এর সনদ বিশুদ্ধ)হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আব্বাস ইবনে আহমাদ দামেশকী (রঃ) বলেনঃ আমি রাত্রিকালে একটি জ্বিনকে নিম্নলিখত শ্লোকগুলো পড়তে শুনেছিঃ (আরবি)অর্থাৎ “অন্তর আল্লাহর মহব্বতে পূর্ণ হয়ে গেছে, এমনকি পূর্বে ও পশ্চিমে ওর মূল বা ঝড় গেড়ে বসেছে। সে উদ্বিগ্ন ও হতবুদ্ধি হয়ে আল্লাহর প্রেমে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে, যে আল্লাহ তার প্রতিপালক। সে সৃষ্টজীব হতে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।"এরপর জ্বিনদের আরো উক্তি উদ্ধৃত করা হচ্ছেঃ এখন আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে পরাভূত করতে পারবো না এবং পলায়ন করেও তাকে ব্যর্থ করতে পারবো না। কোনক্রমেই তাঁকে অপারগ করা সম্ভব নয়। অতঃপর গৌরব প্রকাশ করে জ্বিনগুলো বলেঃ আমরা যখন পথ-নির্দেশক বাণী শুনলাম তখন তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম। আর এটা গৌরব প্রকাশেরই স্থান বটে। এর চেয়ে বড় ফযীলত ও মর্যাদা আর কি হতে পারে যে, আল্লাহর কালাম শোনা মাত্রই তা তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করলো এবং সাথে সাথেই তারা ঈমান আনলো?এরপর তারা বলেঃ যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তার কোন ক্ষতি ও কোন অন্যায়ের আশংকা থাকবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “সৎকর্মপরায়ণ ও মুমিন ব্যক্তির কোন যুলুম ও ক্ষতির আশংকা থাকবে না।"(২০:১১২) তারপর ঐ জ্বিনেরা আরো বলেঃ আমাদের কতক আত্মসমর্পণকারী এবং কতক সীমালংঘনকারী, যারা আত্মসমর্পণ করে তারা সুচিন্তিতভাবে সত্যপথ বেছে নেয়। পক্ষান্তরে যারা সীমালংঘনকারী তারা তো হবে জাহান্নামেরই ইন্ধন।(আরবি) এর দু’টি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। একটি হলোঃ যদি সমস্ত মানুষ ইসলামের উপর, সোজা-সঠিক পথের উপর এবং আল্লাহর আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর প্রচুর বারি বর্ষণ করতাম এবং তাদের জীবিকায় প্রশস্ততা ও স্বচ্ছলতা দান করতাম। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জীল ও তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, সঠিকভাবে কায়েম করতো এবং ভালভাবে মেনে চলতো তবে তারা তাদের উপর হতে ও নীচ হতে অর্থাৎ আসমান হতে ও যমীন হতে জীবিকা লাভ করতো।”(৫:৬৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি গ্রামবাসী ঈমান আনতো ও ভয় করতো তবে আমি তাদের উপর আসমান ও যমীনের বরকত খুলে দিতাম।”(৭:৯৬)মহান আল্লাহর উক্তিঃ যদদ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করতাম যে, কে হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং কে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত মক্কার কুরায়েশ কাফিরদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, তখন তারা দীর্ঘ সাত বছরের দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়।দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ যদি তারা সবাই পথভ্রষ্ট হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর জীবিকার দরজা খুলে দিতাম, যাতে তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে এবং আল্লাহকে ভুলে গিয়ে নিকৃষ্টতম শাস্তির যোগ্য হয়ে পড়ে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ভুলে বসলো, যে নসীহত তাদেরকে করা হয়েছিল, তখন আমি তাদের উপর সবকিছুরই দরজা খুলে দিলাত, শেষ পর্যন্ত যখন তারা আনন্দে বিভোর হয়ে পড়লো তাদেরকে দেয়া সুখ সামগ্রীর কারণে তখন আকস্মিকভাবে আমি তাদের পাকড়াও করলাম, ফলে তারা সম্পূর্ণরূপে হতাশ হয়ে পড়লো।”(৬:৪৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা কি ধারণা করে যে, আমি যে তাদের মাল ও সন্তান সন্ততি বৃদ্ধি করছি, এটা তাদের কল্যাণ সাধন করছি? (না, তা কখনো নয়) বরং তারা বুঝে না।” (২৩:৫৫-৫৬)এরপর বলা হচ্ছেঃ যে কেউ তার প্রতিপালকের যিকির হতে বিমুখ হয়, তার প্রতিপালক তাকে দুঃসহ শাস্তিতে প্রবেশ করাবেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি পাহাড়ের নাম। আর হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, ওটা জাহান্নামের একটি কূপের নাম।

আল-জিন 72:15

১১-১৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, জ্বিনেরা নিজেদের সম্পর্কে সংবাদ দিতে গিয়ে বলেঃ আমাদের মধ্যে কতক রয়েছে সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক রয়েছে দুষ্কৃতিকারী। আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী। হযরত আ’মাশ (রঃ) বলেনঃ “একটি জ্বিন আমাদের কাছে আসতো। আমি একদা তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তোমাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য কি? সে উত্তরে বললোঃ “চাউল।” আমি তাকে চাউল এনে দিলাম। তখন দেখলাম যে, খাদ্যগ্ৰাস ক্রমাগত উঠতে রয়েছে বটে, কিন্তু খাদ্য ভক্ষণকারী কাউকেও দেখা যাচ্ছে না। আমি তাকে প্রশ্ন করলামঃ আমাদের মত তোমাদেরও কি কামনা বাসনা রয়েছে? সে জবাব দিলোঃ “হ্যাঁ, রয়েছে। আমি তাকে আবার প্রশ্ন করলামঃ রাফেযী সম্প্রদায়কে তোমাদের মধ্যে কিরূপ গণ্য করা হয়? উত্তরে সে বললোঃ “তাদেরকে অতি নিকৃষ্ট সম্প্রদায় রূপে গণ্য করা হয়।” (হাফিজ আবুল মুযানী (রঃ) বলেন যে, এর সনদ বিশুদ্ধ)হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আব্বাস ইবনে আহমাদ দামেশকী (রঃ) বলেনঃ আমি রাত্রিকালে একটি জ্বিনকে নিম্নলিখত শ্লোকগুলো পড়তে শুনেছিঃ (আরবি)অর্থাৎ “অন্তর আল্লাহর মহব্বতে পূর্ণ হয়ে গেছে, এমনকি পূর্বে ও পশ্চিমে ওর মূল বা ঝড় গেড়ে বসেছে। সে উদ্বিগ্ন ও হতবুদ্ধি হয়ে আল্লাহর প্রেমে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে, যে আল্লাহ তার প্রতিপালক। সে সৃষ্টজীব হতে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।"এরপর জ্বিনদের আরো উক্তি উদ্ধৃত করা হচ্ছেঃ এখন আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে পরাভূত করতে পারবো না এবং পলায়ন করেও তাকে ব্যর্থ করতে পারবো না। কোনক্রমেই তাঁকে অপারগ করা সম্ভব নয়। অতঃপর গৌরব প্রকাশ করে জ্বিনগুলো বলেঃ আমরা যখন পথ-নির্দেশক বাণী শুনলাম তখন তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম। আর এটা গৌরব প্রকাশেরই স্থান বটে। এর চেয়ে বড় ফযীলত ও মর্যাদা আর কি হতে পারে যে, আল্লাহর কালাম শোনা মাত্রই তা তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করলো এবং সাথে সাথেই তারা ঈমান আনলো?এরপর তারা বলেঃ যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তার কোন ক্ষতি ও কোন অন্যায়ের আশংকা থাকবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “সৎকর্মপরায়ণ ও মুমিন ব্যক্তির কোন যুলুম ও ক্ষতির আশংকা থাকবে না।"(২০:১১২) তারপর ঐ জ্বিনেরা আরো বলেঃ আমাদের কতক আত্মসমর্পণকারী এবং কতক সীমালংঘনকারী, যারা আত্মসমর্পণ করে তারা সুচিন্তিতভাবে সত্যপথ বেছে নেয়। পক্ষান্তরে যারা সীমালংঘনকারী তারা তো হবে জাহান্নামেরই ইন্ধন।(আরবি) এর দু’টি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। একটি হলোঃ যদি সমস্ত মানুষ ইসলামের উপর, সোজা-সঠিক পথের উপর এবং আল্লাহর আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর প্রচুর বারি বর্ষণ করতাম এবং তাদের জীবিকায় প্রশস্ততা ও স্বচ্ছলতা দান করতাম। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জীল ও তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, সঠিকভাবে কায়েম করতো এবং ভালভাবে মেনে চলতো তবে তারা তাদের উপর হতে ও নীচ হতে অর্থাৎ আসমান হতে ও যমীন হতে জীবিকা লাভ করতো।”(৫:৬৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি গ্রামবাসী ঈমান আনতো ও ভয় করতো তবে আমি তাদের উপর আসমান ও যমীনের বরকত খুলে দিতাম।”(৭:৯৬)মহান আল্লাহর উক্তিঃ যদদ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করতাম যে, কে হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং কে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত মক্কার কুরায়েশ কাফিরদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, তখন তারা দীর্ঘ সাত বছরের দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়।দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ যদি তারা সবাই পথভ্রষ্ট হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর জীবিকার দরজা খুলে দিতাম, যাতে তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে এবং আল্লাহকে ভুলে গিয়ে নিকৃষ্টতম শাস্তির যোগ্য হয়ে পড়ে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ভুলে বসলো, যে নসীহত তাদেরকে করা হয়েছিল, তখন আমি তাদের উপর সবকিছুরই দরজা খুলে দিলাত, শেষ পর্যন্ত যখন তারা আনন্দে বিভোর হয়ে পড়লো তাদেরকে দেয়া সুখ সামগ্রীর কারণে তখন আকস্মিকভাবে আমি তাদের পাকড়াও করলাম, ফলে তারা সম্পূর্ণরূপে হতাশ হয়ে পড়লো।”(৬:৪৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা কি ধারণা করে যে, আমি যে তাদের মাল ও সন্তান সন্ততি বৃদ্ধি করছি, এটা তাদের কল্যাণ সাধন করছি? (না, তা কখনো নয়) বরং তারা বুঝে না।” (২৩:৫৫-৫৬)এরপর বলা হচ্ছেঃ যে কেউ তার প্রতিপালকের যিকির হতে বিমুখ হয়, তার প্রতিপালক তাকে দুঃসহ শাস্তিতে প্রবেশ করাবেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি পাহাড়ের নাম। আর হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, ওটা জাহান্নামের একটি কূপের নাম।

আল-জিন 72:16

১১-১৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, জ্বিনেরা নিজেদের সম্পর্কে সংবাদ দিতে গিয়ে বলেঃ আমাদের মধ্যে কতক রয়েছে সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক রয়েছে দুষ্কৃতিকারী। আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী। হযরত আ’মাশ (রঃ) বলেনঃ “একটি জ্বিন আমাদের কাছে আসতো। আমি একদা তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তোমাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য কি? সে উত্তরে বললোঃ “চাউল।” আমি তাকে চাউল এনে দিলাম। তখন দেখলাম যে, খাদ্যগ্ৰাস ক্রমাগত উঠতে রয়েছে বটে, কিন্তু খাদ্য ভক্ষণকারী কাউকেও দেখা যাচ্ছে না। আমি তাকে প্রশ্ন করলামঃ আমাদের মত তোমাদেরও কি কামনা বাসনা রয়েছে? সে জবাব দিলোঃ “হ্যাঁ, রয়েছে। আমি তাকে আবার প্রশ্ন করলামঃ রাফেযী সম্প্রদায়কে তোমাদের মধ্যে কিরূপ গণ্য করা হয়? উত্তরে সে বললোঃ “তাদেরকে অতি নিকৃষ্ট সম্প্রদায় রূপে গণ্য করা হয়।” (হাফিজ আবুল মুযানী (রঃ) বলেন যে, এর সনদ বিশুদ্ধ)হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আব্বাস ইবনে আহমাদ দামেশকী (রঃ) বলেনঃ আমি রাত্রিকালে একটি জ্বিনকে নিম্নলিখত শ্লোকগুলো পড়তে শুনেছিঃ (আরবি)অর্থাৎ “অন্তর আল্লাহর মহব্বতে পূর্ণ হয়ে গেছে, এমনকি পূর্বে ও পশ্চিমে ওর মূল বা ঝড় গেড়ে বসেছে। সে উদ্বিগ্ন ও হতবুদ্ধি হয়ে আল্লাহর প্রেমে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে, যে আল্লাহ তার প্রতিপালক। সে সৃষ্টজীব হতে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।"এরপর জ্বিনদের আরো উক্তি উদ্ধৃত করা হচ্ছেঃ এখন আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে পরাভূত করতে পারবো না এবং পলায়ন করেও তাকে ব্যর্থ করতে পারবো না। কোনক্রমেই তাঁকে অপারগ করা সম্ভব নয়। অতঃপর গৌরব প্রকাশ করে জ্বিনগুলো বলেঃ আমরা যখন পথ-নির্দেশক বাণী শুনলাম তখন তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম। আর এটা গৌরব প্রকাশেরই স্থান বটে। এর চেয়ে বড় ফযীলত ও মর্যাদা আর কি হতে পারে যে, আল্লাহর কালাম শোনা মাত্রই তা তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করলো এবং সাথে সাথেই তারা ঈমান আনলো?এরপর তারা বলেঃ যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তার কোন ক্ষতি ও কোন অন্যায়ের আশংকা থাকবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “সৎকর্মপরায়ণ ও মুমিন ব্যক্তির কোন যুলুম ও ক্ষতির আশংকা থাকবে না।"(২০:১১২) তারপর ঐ জ্বিনেরা আরো বলেঃ আমাদের কতক আত্মসমর্পণকারী এবং কতক সীমালংঘনকারী, যারা আত্মসমর্পণ করে তারা সুচিন্তিতভাবে সত্যপথ বেছে নেয়। পক্ষান্তরে যারা সীমালংঘনকারী তারা তো হবে জাহান্নামেরই ইন্ধন।(আরবি) এর দু’টি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। একটি হলোঃ যদি সমস্ত মানুষ ইসলামের উপর, সোজা-সঠিক পথের উপর এবং আল্লাহর আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর প্রচুর বারি বর্ষণ করতাম এবং তাদের জীবিকায় প্রশস্ততা ও স্বচ্ছলতা দান করতাম। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জীল ও তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, সঠিকভাবে কায়েম করতো এবং ভালভাবে মেনে চলতো তবে তারা তাদের উপর হতে ও নীচ হতে অর্থাৎ আসমান হতে ও যমীন হতে জীবিকা লাভ করতো।”(৫:৬৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি গ্রামবাসী ঈমান আনতো ও ভয় করতো তবে আমি তাদের উপর আসমান ও যমীনের বরকত খুলে দিতাম।”(৭:৯৬)মহান আল্লাহর উক্তিঃ যদদ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করতাম যে, কে হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং কে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত মক্কার কুরায়েশ কাফিরদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, তখন তারা দীর্ঘ সাত বছরের দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়।দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ যদি তারা সবাই পথভ্রষ্ট হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর জীবিকার দরজা খুলে দিতাম, যাতে তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে এবং আল্লাহকে ভুলে গিয়ে নিকৃষ্টতম শাস্তির যোগ্য হয়ে পড়ে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ভুলে বসলো, যে নসীহত তাদেরকে করা হয়েছিল, তখন আমি তাদের উপর সবকিছুরই দরজা খুলে দিলাত, শেষ পর্যন্ত যখন তারা আনন্দে বিভোর হয়ে পড়লো তাদেরকে দেয়া সুখ সামগ্রীর কারণে তখন আকস্মিকভাবে আমি তাদের পাকড়াও করলাম, ফলে তারা সম্পূর্ণরূপে হতাশ হয়ে পড়লো।”(৬:৪৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা কি ধারণা করে যে, আমি যে তাদের মাল ও সন্তান সন্ততি বৃদ্ধি করছি, এটা তাদের কল্যাণ সাধন করছি? (না, তা কখনো নয়) বরং তারা বুঝে না।” (২৩:৫৫-৫৬)এরপর বলা হচ্ছেঃ যে কেউ তার প্রতিপালকের যিকির হতে বিমুখ হয়, তার প্রতিপালক তাকে দুঃসহ শাস্তিতে প্রবেশ করাবেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি পাহাড়ের নাম। আর হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, ওটা জাহান্নামের একটি কূপের নাম।

আল-জিন 72:17

১১-১৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, জ্বিনেরা নিজেদের সম্পর্কে সংবাদ দিতে গিয়ে বলেঃ আমাদের মধ্যে কতক রয়েছে সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক রয়েছে দুষ্কৃতিকারী। আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী। হযরত আ’মাশ (রঃ) বলেনঃ “একটি জ্বিন আমাদের কাছে আসতো। আমি একদা তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তোমাদের নিকট সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য কি? সে উত্তরে বললোঃ “চাউল।” আমি তাকে চাউল এনে দিলাম। তখন দেখলাম যে, খাদ্যগ্ৰাস ক্রমাগত উঠতে রয়েছে বটে, কিন্তু খাদ্য ভক্ষণকারী কাউকেও দেখা যাচ্ছে না। আমি তাকে প্রশ্ন করলামঃ আমাদের মত তোমাদেরও কি কামনা বাসনা রয়েছে? সে জবাব দিলোঃ “হ্যাঁ, রয়েছে। আমি তাকে আবার প্রশ্ন করলামঃ রাফেযী সম্প্রদায়কে তোমাদের মধ্যে কিরূপ গণ্য করা হয়? উত্তরে সে বললোঃ “তাদেরকে অতি নিকৃষ্ট সম্প্রদায় রূপে গণ্য করা হয়।” (হাফিজ আবুল মুযানী (রঃ) বলেন যে, এর সনদ বিশুদ্ধ)হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আব্বাস ইবনে আহমাদ দামেশকী (রঃ) বলেনঃ আমি রাত্রিকালে একটি জ্বিনকে নিম্নলিখত শ্লোকগুলো পড়তে শুনেছিঃ (আরবি)অর্থাৎ “অন্তর আল্লাহর মহব্বতে পূর্ণ হয়ে গেছে, এমনকি পূর্বে ও পশ্চিমে ওর মূল বা ঝড় গেড়ে বসেছে। সে উদ্বিগ্ন ও হতবুদ্ধি হয়ে আল্লাহর প্রেমে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে, যে আল্লাহ তার প্রতিপালক। সে সৃষ্টজীব হতে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।"এরপর জ্বিনদের আরো উক্তি উদ্ধৃত করা হচ্ছেঃ এখন আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে পরাভূত করতে পারবো না এবং পলায়ন করেও তাকে ব্যর্থ করতে পারবো না। কোনক্রমেই তাঁকে অপারগ করা সম্ভব নয়। অতঃপর গৌরব প্রকাশ করে জ্বিনগুলো বলেঃ আমরা যখন পথ-নির্দেশক বাণী শুনলাম তখন তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম। আর এটা গৌরব প্রকাশেরই স্থান বটে। এর চেয়ে বড় ফযীলত ও মর্যাদা আর কি হতে পারে যে, আল্লাহর কালাম শোনা মাত্রই তা তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করলো এবং সাথে সাথেই তারা ঈমান আনলো?এরপর তারা বলেঃ যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তার কোন ক্ষতি ও কোন অন্যায়ের আশংকা থাকবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “সৎকর্মপরায়ণ ও মুমিন ব্যক্তির কোন যুলুম ও ক্ষতির আশংকা থাকবে না।"(২০:১১২) তারপর ঐ জ্বিনেরা আরো বলেঃ আমাদের কতক আত্মসমর্পণকারী এবং কতক সীমালংঘনকারী, যারা আত্মসমর্পণ করে তারা সুচিন্তিতভাবে সত্যপথ বেছে নেয়। পক্ষান্তরে যারা সীমালংঘনকারী তারা তো হবে জাহান্নামেরই ইন্ধন।(আরবি) এর দু’টি ভাবার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। একটি হলোঃ যদি সমস্ত মানুষ ইসলামের উপর, সোজা-সঠিক পথের উপর এবং আল্লাহর আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর প্রচুর বারি বর্ষণ করতাম এবং তাদের জীবিকায় প্রশস্ততা ও স্বচ্ছলতা দান করতাম। যেমন মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জীল ও তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, সঠিকভাবে কায়েম করতো এবং ভালভাবে মেনে চলতো তবে তারা তাদের উপর হতে ও নীচ হতে অর্থাৎ আসমান হতে ও যমীন হতে জীবিকা লাভ করতো।”(৫:৬৬) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি গ্রামবাসী ঈমান আনতো ও ভয় করতো তবে আমি তাদের উপর আসমান ও যমীনের বরকত খুলে দিতাম।”(৭:৯৬)মহান আল্লাহর উক্তিঃ যদদ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করতাম যে, কে হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং কে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।হযরত মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত মক্কার কুরায়েশ কাফিরদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, তখন তারা দীর্ঘ সাত বছরের দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়।দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ যদি তারা সবাই পথভ্রষ্ট হয়ে যেতো তবে আমি তাদের উপর জীবিকার দরজা খুলে দিতাম, যাতে তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে এবং আল্লাহকে ভুলে গিয়ে নিকৃষ্টতম শাস্তির যোগ্য হয়ে পড়ে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন তারা ভুলে বসলো, যে নসীহত তাদেরকে করা হয়েছিল, তখন আমি তাদের উপর সবকিছুরই দরজা খুলে দিলাত, শেষ পর্যন্ত যখন তারা আনন্দে বিভোর হয়ে পড়লো তাদেরকে দেয়া সুখ সামগ্রীর কারণে তখন আকস্মিকভাবে আমি তাদের পাকড়াও করলাম, ফলে তারা সম্পূর্ণরূপে হতাশ হয়ে পড়লো।”(৬:৪৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা কি ধারণা করে যে, আমি যে তাদের মাল ও সন্তান সন্ততি বৃদ্ধি করছি, এটা তাদের কল্যাণ সাধন করছি? (না, তা কখনো নয়) বরং তারা বুঝে না।” (২৩:৫৫-৫৬)এরপর বলা হচ্ছেঃ যে কেউ তার প্রতিপালকের যিকির হতে বিমুখ হয়, তার প্রতিপালক তাকে দুঃসহ শাস্তিতে প্রবেশ করাবেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) হলো জাহান্নামের একটি পাহাড়ের নাম। আর হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) বলেন যে, ওটা জাহান্নামের একটি কূপের নাম।

আল-জিন 72:18

১৮-২৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁর ইবাদতের জায়গাকে শিরক হতে পবিত্র রাখে, সেখানে যেন অন্য কাউকেও না ডাকে। কাউকেও যেন আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে শরীক না করে। ইয়াহূদ ও খৃষ্টানরা তাদের গীর্জা ও মন্দিরে গিয়ে আল্লাহর সাথে অন্যদেরকে শরীক করতো। তাই এই উম্মতকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন এরূপ না করে, বরং নবী (সঃ) এবং উম্মত সবাই যেন একত্ববাদী হয়ে থাকে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময় শুধু মসজিদে আকসা ও মসজিদে হারামই বিদ্যমান ছিল। হযরত আ’মাশ (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁর মসজিদে মানবের সাথে নামায পড়ার অনুমতি প্রার্থনা করে। সুতরাং তাদেরকে যেন বলা হচ্ছেঃ তোমরা নামায পড়তে পার, কিন্তু তাদের সাথে মিশ্রিত হয়ে যেয়ো না।হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জ্বিনের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো দূর দূরান্তে থাকি, সুতরাং আপনার মসজিদে নামায পড়তে আসতে পারি কি করে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “উদ্দেশ্য হলো নামায আদায় করা এবং আল্লাহর ইবাদতে লেগে থাকা, তা যেখানেই হোক না কেন।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সাধারণ এটা সমস্ত মসজিদকেই অন্তর্ভুক্ত করে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সিজদার অঙ্গগুলোর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। ভাবার্থ হলোঃ যে অঙ্গগুলোর উপর তোমরা সিজদা কর ওগুলো সবই আল্লাহর। সুতরাং তোমাদের এই অঙ্গগুলোর দ্বারা অন্যদেরকে সিজদা করা হারাম। সহীহ হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাতটি হাড়ের উপর সিজদা করতে আমি আদিষ্ট হয়েছি। ওগুলো হলোঃ কপাল, (হাত দ্বারা ইশারা করে তিনি নাককেও কপালের অন্তর্ভুক্ত করেন), দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের পাতা।”(আরবি)-এ আয়াতের একটি ভাবার্থ হলো এই যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে যখন কুরআন পাঠ শুনলো তখন তারা এমনাবে আগে আগে বেড়ে চললো যে, যেন একে অপরের মাথার উপর দিয়ে চলে যাবে। দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বললোঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) তার প্রতি আনুগত্যের অবস্থা এই যে, যখন তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যান এবং সাহাবীগণ তাঁর পিছনে থাকেন তখন প্রথম হতে শেষ পৃর্যন্ত আনুগত্য ও অনুকরণে এমনভাবে লেগে থাকেন যে, যেন একটা বৃত্ত। তৃতীয় উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন জনগণের মধ্যে একত্ববাদ ঘোষণা করেন তখন কাফিররা দাঁত কটমট হয়ে এই দ্বীন ইসলামকে মিটিয়ে দিতে এবং এর আলোকে নির্বাপিত করে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ পাকের ইচ্ছা এর বিপরীত, তিনি এই দ্বীনকে সমুন্নত করতে চান ? এই তৃতীয় উক্তিটিই বেশী একাশমান। কেননা এর পরেই রয়েছেঃ তুমি বল আমি আমার প্রতিপালককেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক করি না।।অর্থাৎ সত্যের আহ্বান ও একত্ববাদের শব্দ যখন কাফিরদের কানে পৌঁছে যার প্রতি তারা বহুদিন হতেই মনঃক্ষুন্ন ছিল তখন তারা কষ্ট প্রদানে, বিরুদ্ধাচরণে এবং অবিশ্বাসকরণে উঠে পড়ে লেগে যায়। আর সত্যকে মিটিয়ে দিতে চায় ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শত্রুতার উপর একতাবদ্ধ হয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ আমি আমার এক শরীকবিহীন প্রতিপালকের ইবাদতে মগ্ন রয়েছি। আমি তাঁরই আশ্রয়ে আছি। তাঁরই উপর আমি ভরসা করি। তিনিই আমার আশ্রয়দানস্থল। তোমরা কখনো আমার নিকট হতে এ আশা করো না যে, আমি অন্য কারো সামনে মাথা নত করবো এবং তার ইবাদত করবো। আমি তোমাদের মতই মানুষ। তোমাদের লাভ-ক্ষতির আমি মালিক নই। আমি তো আল্লাহর এক দাস মাত্র। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আমিও এক বান্দা। তোমাদেরকে হিদায়াত করা বা পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা আমি রাখি না। সবকিছুই আল্লাহর অধিকারভুক্ত। আমি তো শুধু একজন প্রচারক। আমি নিজেই যদি আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করি তবে অবশ্যই তিনি আমাকে শাস্তি দিবেন এবং আমাকে বাঁচাবার কারো ক্ষমতা হবে না। আল্লাহ ছাড়া আমি কোন আশ্রয় স্থল দেখি না। আমার পদমর্যাদা শুধু প্রচারক ও রাসূল হিসেবেই রয়েছে।কারো কারো মতে (আরবি) শব্দের ইসতিসনা বা স্বাতন্ত্র (আরবি)-এর সাথে রয়েছে। অর্থাৎ আমি লাভ ক্ষতি এবং হিদায়াত ও যালালাতের মালিক নই। আমি তো শুধু তাবলীগ করি ও আল্লাহর বাণী মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে থাকি। আবার এই ইসতিসনা (আরবি)-এর সাথেও হতে পারে। অর্থাৎ আমাকে শুধু আমার রিসালাতের পালনই আল্লাহর আযাব হতে বাঁচাতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে রাসূল (সঃ)! তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তুমি (জনগণের কাছে) পৌঁছিয়ে দাও, আর যদি তুমি তা না কর তাহলে তুমি তার রিসালাত পৌঁছিয়ে দিলে না, আর আল্লাহ তোমাকে লোকদের (অনিষ্ট) হতে রক্ষা করবেন।”(৫:৬৭)ইরশাদ হচ্ছেঃ যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অমান্য করে তাদের জন্যে রয়েছে জাহান্নামের অগ্নি, সেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে। যখন এই মুশরিক দানব ও মানবরা কিয়ামতের দিন ভয়াবহ আযাব দেখতে পাবে তখন তারা বুঝতে পারবে কে সাহায্যকারীর দিক দিয়ে দুর্বল এবং কে সংখ্যায় স্বল্প। অর্থাৎ একত্ববাদে বিশ্বাসী মুমিন না তাতে অবিশ্বাসী মুশরিক। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ঐদিন মুশরিকদের শুধু নাম হিসেবেও কোন সাহায্যকারী থাকবে না এবং মহামহিমান্বিত আল্লাহর সেনাবাহিনীর তুলনায় তাদের সংখ্যা হবে অতি নগণ্য।

আল-জিন 72:19

১৮-২৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁর ইবাদতের জায়গাকে শিরক হতে পবিত্র রাখে, সেখানে যেন অন্য কাউকেও না ডাকে। কাউকেও যেন আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে শরীক না করে। ইয়াহূদ ও খৃষ্টানরা তাদের গীর্জা ও মন্দিরে গিয়ে আল্লাহর সাথে অন্যদেরকে শরীক করতো। তাই এই উম্মতকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন এরূপ না করে, বরং নবী (সঃ) এবং উম্মত সবাই যেন একত্ববাদী হয়ে থাকে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময় শুধু মসজিদে আকসা ও মসজিদে হারামই বিদ্যমান ছিল। হযরত আ’মাশ (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁর মসজিদে মানবের সাথে নামায পড়ার অনুমতি প্রার্থনা করে। সুতরাং তাদেরকে যেন বলা হচ্ছেঃ তোমরা নামায পড়তে পার, কিন্তু তাদের সাথে মিশ্রিত হয়ে যেয়ো না।হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জ্বিনের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো দূর দূরান্তে থাকি, সুতরাং আপনার মসজিদে নামায পড়তে আসতে পারি কি করে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “উদ্দেশ্য হলো নামায আদায় করা এবং আল্লাহর ইবাদতে লেগে থাকা, তা যেখানেই হোক না কেন।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সাধারণ এটা সমস্ত মসজিদকেই অন্তর্ভুক্ত করে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সিজদার অঙ্গগুলোর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। ভাবার্থ হলোঃ যে অঙ্গগুলোর উপর তোমরা সিজদা কর ওগুলো সবই আল্লাহর। সুতরাং তোমাদের এই অঙ্গগুলোর দ্বারা অন্যদেরকে সিজদা করা হারাম। সহীহ হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাতটি হাড়ের উপর সিজদা করতে আমি আদিষ্ট হয়েছি। ওগুলো হলোঃ কপাল, (হাত দ্বারা ইশারা করে তিনি নাককেও কপালের অন্তর্ভুক্ত করেন), দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের পাতা।”(আরবি)-এ আয়াতের একটি ভাবার্থ হলো এই যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে যখন কুরআন পাঠ শুনলো তখন তারা এমনাবে আগে আগে বেড়ে চললো যে, যেন একে অপরের মাথার উপর দিয়ে চলে যাবে। দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বললোঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) তার প্রতি আনুগত্যের অবস্থা এই যে, যখন তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যান এবং সাহাবীগণ তাঁর পিছনে থাকেন তখন প্রথম হতে শেষ পৃর্যন্ত আনুগত্য ও অনুকরণে এমনভাবে লেগে থাকেন যে, যেন একটা বৃত্ত। তৃতীয় উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন জনগণের মধ্যে একত্ববাদ ঘোষণা করেন তখন কাফিররা দাঁত কটমট হয়ে এই দ্বীন ইসলামকে মিটিয়ে দিতে এবং এর আলোকে নির্বাপিত করে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ পাকের ইচ্ছা এর বিপরীত, তিনি এই দ্বীনকে সমুন্নত করতে চান ? এই তৃতীয় উক্তিটিই বেশী একাশমান। কেননা এর পরেই রয়েছেঃ তুমি বল আমি আমার প্রতিপালককেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক করি না।।অর্থাৎ সত্যের আহ্বান ও একত্ববাদের শব্দ যখন কাফিরদের কানে পৌঁছে যার প্রতি তারা বহুদিন হতেই মনঃক্ষুন্ন ছিল তখন তারা কষ্ট প্রদানে, বিরুদ্ধাচরণে এবং অবিশ্বাসকরণে উঠে পড়ে লেগে যায়। আর সত্যকে মিটিয়ে দিতে চায় ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শত্রুতার উপর একতাবদ্ধ হয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ আমি আমার এক শরীকবিহীন প্রতিপালকের ইবাদতে মগ্ন রয়েছি। আমি তাঁরই আশ্রয়ে আছি। তাঁরই উপর আমি ভরসা করি। তিনিই আমার আশ্রয়দানস্থল। তোমরা কখনো আমার নিকট হতে এ আশা করো না যে, আমি অন্য কারো সামনে মাথা নত করবো এবং তার ইবাদত করবো। আমি তোমাদের মতই মানুষ। তোমাদের লাভ-ক্ষতির আমি মালিক নই। আমি তো আল্লাহর এক দাস মাত্র। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আমিও এক বান্দা। তোমাদেরকে হিদায়াত করা বা পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা আমি রাখি না। সবকিছুই আল্লাহর অধিকারভুক্ত। আমি তো শুধু একজন প্রচারক। আমি নিজেই যদি আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করি তবে অবশ্যই তিনি আমাকে শাস্তি দিবেন এবং আমাকে বাঁচাবার কারো ক্ষমতা হবে না। আল্লাহ ছাড়া আমি কোন আশ্রয় স্থল দেখি না। আমার পদমর্যাদা শুধু প্রচারক ও রাসূল হিসেবেই রয়েছে।কারো কারো মতে (আরবি) শব্দের ইসতিসনা বা স্বাতন্ত্র (আরবি)-এর সাথে রয়েছে। অর্থাৎ আমি লাভ ক্ষতি এবং হিদায়াত ও যালালাতের মালিক নই। আমি তো শুধু তাবলীগ করি ও আল্লাহর বাণী মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে থাকি। আবার এই ইসতিসনা (আরবি)-এর সাথেও হতে পারে। অর্থাৎ আমাকে শুধু আমার রিসালাতের পালনই আল্লাহর আযাব হতে বাঁচাতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে রাসূল (সঃ)! তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তুমি (জনগণের কাছে) পৌঁছিয়ে দাও, আর যদি তুমি তা না কর তাহলে তুমি তার রিসালাত পৌঁছিয়ে দিলে না, আর আল্লাহ তোমাকে লোকদের (অনিষ্ট) হতে রক্ষা করবেন।”(৫:৬৭)ইরশাদ হচ্ছেঃ যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অমান্য করে তাদের জন্যে রয়েছে জাহান্নামের অগ্নি, সেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে। যখন এই মুশরিক দানব ও মানবরা কিয়ামতের দিন ভয়াবহ আযাব দেখতে পাবে তখন তারা বুঝতে পারবে কে সাহায্যকারীর দিক দিয়ে দুর্বল এবং কে সংখ্যায় স্বল্প। অর্থাৎ একত্ববাদে বিশ্বাসী মুমিন না তাতে অবিশ্বাসী মুশরিক। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ঐদিন মুশরিকদের শুধু নাম হিসেবেও কোন সাহায্যকারী থাকবে না এবং মহামহিমান্বিত আল্লাহর সেনাবাহিনীর তুলনায় তাদের সংখ্যা হবে অতি নগণ্য।

আল-জিন 72:20

১৮-২৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁর ইবাদতের জায়গাকে শিরক হতে পবিত্র রাখে, সেখানে যেন অন্য কাউকেও না ডাকে। কাউকেও যেন আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে শরীক না করে। ইয়াহূদ ও খৃষ্টানরা তাদের গীর্জা ও মন্দিরে গিয়ে আল্লাহর সাথে অন্যদেরকে শরীক করতো। তাই এই উম্মতকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন এরূপ না করে, বরং নবী (সঃ) এবং উম্মত সবাই যেন একত্ববাদী হয়ে থাকে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময় শুধু মসজিদে আকসা ও মসজিদে হারামই বিদ্যমান ছিল। হযরত আ’মাশ (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁর মসজিদে মানবের সাথে নামায পড়ার অনুমতি প্রার্থনা করে। সুতরাং তাদেরকে যেন বলা হচ্ছেঃ তোমরা নামায পড়তে পার, কিন্তু তাদের সাথে মিশ্রিত হয়ে যেয়ো না।হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জ্বিনের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো দূর দূরান্তে থাকি, সুতরাং আপনার মসজিদে নামায পড়তে আসতে পারি কি করে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “উদ্দেশ্য হলো নামায আদায় করা এবং আল্লাহর ইবাদতে লেগে থাকা, তা যেখানেই হোক না কেন।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সাধারণ এটা সমস্ত মসজিদকেই অন্তর্ভুক্ত করে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সিজদার অঙ্গগুলোর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। ভাবার্থ হলোঃ যে অঙ্গগুলোর উপর তোমরা সিজদা কর ওগুলো সবই আল্লাহর। সুতরাং তোমাদের এই অঙ্গগুলোর দ্বারা অন্যদেরকে সিজদা করা হারাম। সহীহ হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাতটি হাড়ের উপর সিজদা করতে আমি আদিষ্ট হয়েছি। ওগুলো হলোঃ কপাল, (হাত দ্বারা ইশারা করে তিনি নাককেও কপালের অন্তর্ভুক্ত করেন), দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের পাতা।”(আরবি)-এ আয়াতের একটি ভাবার্থ হলো এই যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে যখন কুরআন পাঠ শুনলো তখন তারা এমনাবে আগে আগে বেড়ে চললো যে, যেন একে অপরের মাথার উপর দিয়ে চলে যাবে। দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বললোঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) তার প্রতি আনুগত্যের অবস্থা এই যে, যখন তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যান এবং সাহাবীগণ তাঁর পিছনে থাকেন তখন প্রথম হতে শেষ পৃর্যন্ত আনুগত্য ও অনুকরণে এমনভাবে লেগে থাকেন যে, যেন একটা বৃত্ত। তৃতীয় উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন জনগণের মধ্যে একত্ববাদ ঘোষণা করেন তখন কাফিররা দাঁত কটমট হয়ে এই দ্বীন ইসলামকে মিটিয়ে দিতে এবং এর আলোকে নির্বাপিত করে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ পাকের ইচ্ছা এর বিপরীত, তিনি এই দ্বীনকে সমুন্নত করতে চান ? এই তৃতীয় উক্তিটিই বেশী একাশমান। কেননা এর পরেই রয়েছেঃ তুমি বল আমি আমার প্রতিপালককেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক করি না।।অর্থাৎ সত্যের আহ্বান ও একত্ববাদের শব্দ যখন কাফিরদের কানে পৌঁছে যার প্রতি তারা বহুদিন হতেই মনঃক্ষুন্ন ছিল তখন তারা কষ্ট প্রদানে, বিরুদ্ধাচরণে এবং অবিশ্বাসকরণে উঠে পড়ে লেগে যায়। আর সত্যকে মিটিয়ে দিতে চায় ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শত্রুতার উপর একতাবদ্ধ হয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ আমি আমার এক শরীকবিহীন প্রতিপালকের ইবাদতে মগ্ন রয়েছি। আমি তাঁরই আশ্রয়ে আছি। তাঁরই উপর আমি ভরসা করি। তিনিই আমার আশ্রয়দানস্থল। তোমরা কখনো আমার নিকট হতে এ আশা করো না যে, আমি অন্য কারো সামনে মাথা নত করবো এবং তার ইবাদত করবো। আমি তোমাদের মতই মানুষ। তোমাদের লাভ-ক্ষতির আমি মালিক নই। আমি তো আল্লাহর এক দাস মাত্র। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আমিও এক বান্দা। তোমাদেরকে হিদায়াত করা বা পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা আমি রাখি না। সবকিছুই আল্লাহর অধিকারভুক্ত। আমি তো শুধু একজন প্রচারক। আমি নিজেই যদি আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করি তবে অবশ্যই তিনি আমাকে শাস্তি দিবেন এবং আমাকে বাঁচাবার কারো ক্ষমতা হবে না। আল্লাহ ছাড়া আমি কোন আশ্রয় স্থল দেখি না। আমার পদমর্যাদা শুধু প্রচারক ও রাসূল হিসেবেই রয়েছে।কারো কারো মতে (আরবি) শব্দের ইসতিসনা বা স্বাতন্ত্র (আরবি)-এর সাথে রয়েছে। অর্থাৎ আমি লাভ ক্ষতি এবং হিদায়াত ও যালালাতের মালিক নই। আমি তো শুধু তাবলীগ করি ও আল্লাহর বাণী মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে থাকি। আবার এই ইসতিসনা (আরবি)-এর সাথেও হতে পারে। অর্থাৎ আমাকে শুধু আমার রিসালাতের পালনই আল্লাহর আযাব হতে বাঁচাতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে রাসূল (সঃ)! তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তুমি (জনগণের কাছে) পৌঁছিয়ে দাও, আর যদি তুমি তা না কর তাহলে তুমি তার রিসালাত পৌঁছিয়ে দিলে না, আর আল্লাহ তোমাকে লোকদের (অনিষ্ট) হতে রক্ষা করবেন।”(৫:৬৭)ইরশাদ হচ্ছেঃ যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অমান্য করে তাদের জন্যে রয়েছে জাহান্নামের অগ্নি, সেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে। যখন এই মুশরিক দানব ও মানবরা কিয়ামতের দিন ভয়াবহ আযাব দেখতে পাবে তখন তারা বুঝতে পারবে কে সাহায্যকারীর দিক দিয়ে দুর্বল এবং কে সংখ্যায় স্বল্প। অর্থাৎ একত্ববাদে বিশ্বাসী মুমিন না তাতে অবিশ্বাসী মুশরিক। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ঐদিন মুশরিকদের শুধু নাম হিসেবেও কোন সাহায্যকারী থাকবে না এবং মহামহিমান্বিত আল্লাহর সেনাবাহিনীর তুলনায় তাদের সংখ্যা হবে অতি নগণ্য।

আল-জিন 72:21

১৮-২৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁর ইবাদতের জায়গাকে শিরক হতে পবিত্র রাখে, সেখানে যেন অন্য কাউকেও না ডাকে। কাউকেও যেন আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে শরীক না করে। ইয়াহূদ ও খৃষ্টানরা তাদের গীর্জা ও মন্দিরে গিয়ে আল্লাহর সাথে অন্যদেরকে শরীক করতো। তাই এই উম্মতকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন এরূপ না করে, বরং নবী (সঃ) এবং উম্মত সবাই যেন একত্ববাদী হয়ে থাকে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময় শুধু মসজিদে আকসা ও মসজিদে হারামই বিদ্যমান ছিল। হযরত আ’মাশ (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁর মসজিদে মানবের সাথে নামায পড়ার অনুমতি প্রার্থনা করে। সুতরাং তাদেরকে যেন বলা হচ্ছেঃ তোমরা নামায পড়তে পার, কিন্তু তাদের সাথে মিশ্রিত হয়ে যেয়ো না।হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জ্বিনের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো দূর দূরান্তে থাকি, সুতরাং আপনার মসজিদে নামায পড়তে আসতে পারি কি করে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “উদ্দেশ্য হলো নামায আদায় করা এবং আল্লাহর ইবাদতে লেগে থাকা, তা যেখানেই হোক না কেন।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সাধারণ এটা সমস্ত মসজিদকেই অন্তর্ভুক্ত করে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সিজদার অঙ্গগুলোর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। ভাবার্থ হলোঃ যে অঙ্গগুলোর উপর তোমরা সিজদা কর ওগুলো সবই আল্লাহর। সুতরাং তোমাদের এই অঙ্গগুলোর দ্বারা অন্যদেরকে সিজদা করা হারাম। সহীহ হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাতটি হাড়ের উপর সিজদা করতে আমি আদিষ্ট হয়েছি। ওগুলো হলোঃ কপাল, (হাত দ্বারা ইশারা করে তিনি নাককেও কপালের অন্তর্ভুক্ত করেন), দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের পাতা।”(আরবি)-এ আয়াতের একটি ভাবার্থ হলো এই যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে যখন কুরআন পাঠ শুনলো তখন তারা এমনাবে আগে আগে বেড়ে চললো যে, যেন একে অপরের মাথার উপর দিয়ে চলে যাবে। দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বললোঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) তার প্রতি আনুগত্যের অবস্থা এই যে, যখন তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যান এবং সাহাবীগণ তাঁর পিছনে থাকেন তখন প্রথম হতে শেষ পৃর্যন্ত আনুগত্য ও অনুকরণে এমনভাবে লেগে থাকেন যে, যেন একটা বৃত্ত। তৃতীয় উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন জনগণের মধ্যে একত্ববাদ ঘোষণা করেন তখন কাফিররা দাঁত কটমট হয়ে এই দ্বীন ইসলামকে মিটিয়ে দিতে এবং এর আলোকে নির্বাপিত করে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ পাকের ইচ্ছা এর বিপরীত, তিনি এই দ্বীনকে সমুন্নত করতে চান ? এই তৃতীয় উক্তিটিই বেশী একাশমান। কেননা এর পরেই রয়েছেঃ তুমি বল আমি আমার প্রতিপালককেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক করি না।।অর্থাৎ সত্যের আহ্বান ও একত্ববাদের শব্দ যখন কাফিরদের কানে পৌঁছে যার প্রতি তারা বহুদিন হতেই মনঃক্ষুন্ন ছিল তখন তারা কষ্ট প্রদানে, বিরুদ্ধাচরণে এবং অবিশ্বাসকরণে উঠে পড়ে লেগে যায়। আর সত্যকে মিটিয়ে দিতে চায় ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শত্রুতার উপর একতাবদ্ধ হয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ আমি আমার এক শরীকবিহীন প্রতিপালকের ইবাদতে মগ্ন রয়েছি। আমি তাঁরই আশ্রয়ে আছি। তাঁরই উপর আমি ভরসা করি। তিনিই আমার আশ্রয়দানস্থল। তোমরা কখনো আমার নিকট হতে এ আশা করো না যে, আমি অন্য কারো সামনে মাথা নত করবো এবং তার ইবাদত করবো। আমি তোমাদের মতই মানুষ। তোমাদের লাভ-ক্ষতির আমি মালিক নই। আমি তো আল্লাহর এক দাস মাত্র। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আমিও এক বান্দা। তোমাদেরকে হিদায়াত করা বা পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা আমি রাখি না। সবকিছুই আল্লাহর অধিকারভুক্ত। আমি তো শুধু একজন প্রচারক। আমি নিজেই যদি আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করি তবে অবশ্যই তিনি আমাকে শাস্তি দিবেন এবং আমাকে বাঁচাবার কারো ক্ষমতা হবে না। আল্লাহ ছাড়া আমি কোন আশ্রয় স্থল দেখি না। আমার পদমর্যাদা শুধু প্রচারক ও রাসূল হিসেবেই রয়েছে।কারো কারো মতে (আরবি) শব্দের ইসতিসনা বা স্বাতন্ত্র (আরবি)-এর সাথে রয়েছে। অর্থাৎ আমি লাভ ক্ষতি এবং হিদায়াত ও যালালাতের মালিক নই। আমি তো শুধু তাবলীগ করি ও আল্লাহর বাণী মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে থাকি। আবার এই ইসতিসনা (আরবি)-এর সাথেও হতে পারে। অর্থাৎ আমাকে শুধু আমার রিসালাতের পালনই আল্লাহর আযাব হতে বাঁচাতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে রাসূল (সঃ)! তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তুমি (জনগণের কাছে) পৌঁছিয়ে দাও, আর যদি তুমি তা না কর তাহলে তুমি তার রিসালাত পৌঁছিয়ে দিলে না, আর আল্লাহ তোমাকে লোকদের (অনিষ্ট) হতে রক্ষা করবেন।”(৫:৬৭)ইরশাদ হচ্ছেঃ যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অমান্য করে তাদের জন্যে রয়েছে জাহান্নামের অগ্নি, সেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে। যখন এই মুশরিক দানব ও মানবরা কিয়ামতের দিন ভয়াবহ আযাব দেখতে পাবে তখন তারা বুঝতে পারবে কে সাহায্যকারীর দিক দিয়ে দুর্বল এবং কে সংখ্যায় স্বল্প। অর্থাৎ একত্ববাদে বিশ্বাসী মুমিন না তাতে অবিশ্বাসী মুশরিক। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ঐদিন মুশরিকদের শুধু নাম হিসেবেও কোন সাহায্যকারী থাকবে না এবং মহামহিমান্বিত আল্লাহর সেনাবাহিনীর তুলনায় তাদের সংখ্যা হবে অতি নগণ্য।

আল-জিন 72:22

১৮-২৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁর ইবাদতের জায়গাকে শিরক হতে পবিত্র রাখে, সেখানে যেন অন্য কাউকেও না ডাকে। কাউকেও যেন আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে শরীক না করে। ইয়াহূদ ও খৃষ্টানরা তাদের গীর্জা ও মন্দিরে গিয়ে আল্লাহর সাথে অন্যদেরকে শরীক করতো। তাই এই উম্মতকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন এরূপ না করে, বরং নবী (সঃ) এবং উম্মত সবাই যেন একত্ববাদী হয়ে থাকে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময় শুধু মসজিদে আকসা ও মসজিদে হারামই বিদ্যমান ছিল। হযরত আ’মাশ (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁর মসজিদে মানবের সাথে নামায পড়ার অনুমতি প্রার্থনা করে। সুতরাং তাদেরকে যেন বলা হচ্ছেঃ তোমরা নামায পড়তে পার, কিন্তু তাদের সাথে মিশ্রিত হয়ে যেয়ো না।হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জ্বিনের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো দূর দূরান্তে থাকি, সুতরাং আপনার মসজিদে নামায পড়তে আসতে পারি কি করে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “উদ্দেশ্য হলো নামায আদায় করা এবং আল্লাহর ইবাদতে লেগে থাকা, তা যেখানেই হোক না কেন।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সাধারণ এটা সমস্ত মসজিদকেই অন্তর্ভুক্ত করে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সিজদার অঙ্গগুলোর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। ভাবার্থ হলোঃ যে অঙ্গগুলোর উপর তোমরা সিজদা কর ওগুলো সবই আল্লাহর। সুতরাং তোমাদের এই অঙ্গগুলোর দ্বারা অন্যদেরকে সিজদা করা হারাম। সহীহ হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাতটি হাড়ের উপর সিজদা করতে আমি আদিষ্ট হয়েছি। ওগুলো হলোঃ কপাল, (হাত দ্বারা ইশারা করে তিনি নাককেও কপালের অন্তর্ভুক্ত করেন), দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের পাতা।”(আরবি)-এ আয়াতের একটি ভাবার্থ হলো এই যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে যখন কুরআন পাঠ শুনলো তখন তারা এমনাবে আগে আগে বেড়ে চললো যে, যেন একে অপরের মাথার উপর দিয়ে চলে যাবে। দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বললোঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) তার প্রতি আনুগত্যের অবস্থা এই যে, যখন তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যান এবং সাহাবীগণ তাঁর পিছনে থাকেন তখন প্রথম হতে শেষ পৃর্যন্ত আনুগত্য ও অনুকরণে এমনভাবে লেগে থাকেন যে, যেন একটা বৃত্ত। তৃতীয় উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন জনগণের মধ্যে একত্ববাদ ঘোষণা করেন তখন কাফিররা দাঁত কটমট হয়ে এই দ্বীন ইসলামকে মিটিয়ে দিতে এবং এর আলোকে নির্বাপিত করে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ পাকের ইচ্ছা এর বিপরীত, তিনি এই দ্বীনকে সমুন্নত করতে চান ? এই তৃতীয় উক্তিটিই বেশী একাশমান। কেননা এর পরেই রয়েছেঃ তুমি বল আমি আমার প্রতিপালককেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক করি না।।অর্থাৎ সত্যের আহ্বান ও একত্ববাদের শব্দ যখন কাফিরদের কানে পৌঁছে যার প্রতি তারা বহুদিন হতেই মনঃক্ষুন্ন ছিল তখন তারা কষ্ট প্রদানে, বিরুদ্ধাচরণে এবং অবিশ্বাসকরণে উঠে পড়ে লেগে যায়। আর সত্যকে মিটিয়ে দিতে চায় ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শত্রুতার উপর একতাবদ্ধ হয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ আমি আমার এক শরীকবিহীন প্রতিপালকের ইবাদতে মগ্ন রয়েছি। আমি তাঁরই আশ্রয়ে আছি। তাঁরই উপর আমি ভরসা করি। তিনিই আমার আশ্রয়দানস্থল। তোমরা কখনো আমার নিকট হতে এ আশা করো না যে, আমি অন্য কারো সামনে মাথা নত করবো এবং তার ইবাদত করবো। আমি তোমাদের মতই মানুষ। তোমাদের লাভ-ক্ষতির আমি মালিক নই। আমি তো আল্লাহর এক দাস মাত্র। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আমিও এক বান্দা। তোমাদেরকে হিদায়াত করা বা পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা আমি রাখি না। সবকিছুই আল্লাহর অধিকারভুক্ত। আমি তো শুধু একজন প্রচারক। আমি নিজেই যদি আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করি তবে অবশ্যই তিনি আমাকে শাস্তি দিবেন এবং আমাকে বাঁচাবার কারো ক্ষমতা হবে না। আল্লাহ ছাড়া আমি কোন আশ্রয় স্থল দেখি না। আমার পদমর্যাদা শুধু প্রচারক ও রাসূল হিসেবেই রয়েছে।কারো কারো মতে (আরবি) শব্দের ইসতিসনা বা স্বাতন্ত্র (আরবি)-এর সাথে রয়েছে। অর্থাৎ আমি লাভ ক্ষতি এবং হিদায়াত ও যালালাতের মালিক নই। আমি তো শুধু তাবলীগ করি ও আল্লাহর বাণী মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে থাকি। আবার এই ইসতিসনা (আরবি)-এর সাথেও হতে পারে। অর্থাৎ আমাকে শুধু আমার রিসালাতের পালনই আল্লাহর আযাব হতে বাঁচাতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে রাসূল (সঃ)! তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তুমি (জনগণের কাছে) পৌঁছিয়ে দাও, আর যদি তুমি তা না কর তাহলে তুমি তার রিসালাত পৌঁছিয়ে দিলে না, আর আল্লাহ তোমাকে লোকদের (অনিষ্ট) হতে রক্ষা করবেন।”(৫:৬৭)ইরশাদ হচ্ছেঃ যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অমান্য করে তাদের জন্যে রয়েছে জাহান্নামের অগ্নি, সেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে। যখন এই মুশরিক দানব ও মানবরা কিয়ামতের দিন ভয়াবহ আযাব দেখতে পাবে তখন তারা বুঝতে পারবে কে সাহায্যকারীর দিক দিয়ে দুর্বল এবং কে সংখ্যায় স্বল্প। অর্থাৎ একত্ববাদে বিশ্বাসী মুমিন না তাতে অবিশ্বাসী মুশরিক। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ঐদিন মুশরিকদের শুধু নাম হিসেবেও কোন সাহায্যকারী থাকবে না এবং মহামহিমান্বিত আল্লাহর সেনাবাহিনীর তুলনায় তাদের সংখ্যা হবে অতি নগণ্য।

আল-জিন 72:23

১৮-২৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁর ইবাদতের জায়গাকে শিরক হতে পবিত্র রাখে, সেখানে যেন অন্য কাউকেও না ডাকে। কাউকেও যেন আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে শরীক না করে। ইয়াহূদ ও খৃষ্টানরা তাদের গীর্জা ও মন্দিরে গিয়ে আল্লাহর সাথে অন্যদেরকে শরীক করতো। তাই এই উম্মতকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন এরূপ না করে, বরং নবী (সঃ) এবং উম্মত সবাই যেন একত্ববাদী হয়ে থাকে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময় শুধু মসজিদে আকসা ও মসজিদে হারামই বিদ্যমান ছিল। হযরত আ’মাশ (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁর মসজিদে মানবের সাথে নামায পড়ার অনুমতি প্রার্থনা করে। সুতরাং তাদেরকে যেন বলা হচ্ছেঃ তোমরা নামায পড়তে পার, কিন্তু তাদের সাথে মিশ্রিত হয়ে যেয়ো না।হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জ্বিনের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো দূর দূরান্তে থাকি, সুতরাং আপনার মসজিদে নামায পড়তে আসতে পারি কি করে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “উদ্দেশ্য হলো নামায আদায় করা এবং আল্লাহর ইবাদতে লেগে থাকা, তা যেখানেই হোক না কেন।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সাধারণ এটা সমস্ত মসজিদকেই অন্তর্ভুক্ত করে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সিজদার অঙ্গগুলোর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। ভাবার্থ হলোঃ যে অঙ্গগুলোর উপর তোমরা সিজদা কর ওগুলো সবই আল্লাহর। সুতরাং তোমাদের এই অঙ্গগুলোর দ্বারা অন্যদেরকে সিজদা করা হারাম। সহীহ হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাতটি হাড়ের উপর সিজদা করতে আমি আদিষ্ট হয়েছি। ওগুলো হলোঃ কপাল, (হাত দ্বারা ইশারা করে তিনি নাককেও কপালের অন্তর্ভুক্ত করেন), দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের পাতা।”(আরবি)-এ আয়াতের একটি ভাবার্থ হলো এই যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে যখন কুরআন পাঠ শুনলো তখন তারা এমনাবে আগে আগে বেড়ে চললো যে, যেন একে অপরের মাথার উপর দিয়ে চলে যাবে। দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বললোঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) তার প্রতি আনুগত্যের অবস্থা এই যে, যখন তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যান এবং সাহাবীগণ তাঁর পিছনে থাকেন তখন প্রথম হতে শেষ পৃর্যন্ত আনুগত্য ও অনুকরণে এমনভাবে লেগে থাকেন যে, যেন একটা বৃত্ত। তৃতীয় উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন জনগণের মধ্যে একত্ববাদ ঘোষণা করেন তখন কাফিররা দাঁত কটমট হয়ে এই দ্বীন ইসলামকে মিটিয়ে দিতে এবং এর আলোকে নির্বাপিত করে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ পাকের ইচ্ছা এর বিপরীত, তিনি এই দ্বীনকে সমুন্নত করতে চান ? এই তৃতীয় উক্তিটিই বেশী একাশমান। কেননা এর পরেই রয়েছেঃ তুমি বল আমি আমার প্রতিপালককেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক করি না।।অর্থাৎ সত্যের আহ্বান ও একত্ববাদের শব্দ যখন কাফিরদের কানে পৌঁছে যার প্রতি তারা বহুদিন হতেই মনঃক্ষুন্ন ছিল তখন তারা কষ্ট প্রদানে, বিরুদ্ধাচরণে এবং অবিশ্বাসকরণে উঠে পড়ে লেগে যায়। আর সত্যকে মিটিয়ে দিতে চায় ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শত্রুতার উপর একতাবদ্ধ হয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ আমি আমার এক শরীকবিহীন প্রতিপালকের ইবাদতে মগ্ন রয়েছি। আমি তাঁরই আশ্রয়ে আছি। তাঁরই উপর আমি ভরসা করি। তিনিই আমার আশ্রয়দানস্থল। তোমরা কখনো আমার নিকট হতে এ আশা করো না যে, আমি অন্য কারো সামনে মাথা নত করবো এবং তার ইবাদত করবো। আমি তোমাদের মতই মানুষ। তোমাদের লাভ-ক্ষতির আমি মালিক নই। আমি তো আল্লাহর এক দাস মাত্র। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আমিও এক বান্দা। তোমাদেরকে হিদায়াত করা বা পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা আমি রাখি না। সবকিছুই আল্লাহর অধিকারভুক্ত। আমি তো শুধু একজন প্রচারক। আমি নিজেই যদি আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করি তবে অবশ্যই তিনি আমাকে শাস্তি দিবেন এবং আমাকে বাঁচাবার কারো ক্ষমতা হবে না। আল্লাহ ছাড়া আমি কোন আশ্রয় স্থল দেখি না। আমার পদমর্যাদা শুধু প্রচারক ও রাসূল হিসেবেই রয়েছে।কারো কারো মতে (আরবি) শব্দের ইসতিসনা বা স্বাতন্ত্র (আরবি)-এর সাথে রয়েছে। অর্থাৎ আমি লাভ ক্ষতি এবং হিদায়াত ও যালালাতের মালিক নই। আমি তো শুধু তাবলীগ করি ও আল্লাহর বাণী মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে থাকি। আবার এই ইসতিসনা (আরবি)-এর সাথেও হতে পারে। অর্থাৎ আমাকে শুধু আমার রিসালাতের পালনই আল্লাহর আযাব হতে বাঁচাতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে রাসূল (সঃ)! তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তুমি (জনগণের কাছে) পৌঁছিয়ে দাও, আর যদি তুমি তা না কর তাহলে তুমি তার রিসালাত পৌঁছিয়ে দিলে না, আর আল্লাহ তোমাকে লোকদের (অনিষ্ট) হতে রক্ষা করবেন।”(৫:৬৭)ইরশাদ হচ্ছেঃ যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অমান্য করে তাদের জন্যে রয়েছে জাহান্নামের অগ্নি, সেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে। যখন এই মুশরিক দানব ও মানবরা কিয়ামতের দিন ভয়াবহ আযাব দেখতে পাবে তখন তারা বুঝতে পারবে কে সাহায্যকারীর দিক দিয়ে দুর্বল এবং কে সংখ্যায় স্বল্প। অর্থাৎ একত্ববাদে বিশ্বাসী মুমিন না তাতে অবিশ্বাসী মুশরিক। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ঐদিন মুশরিকদের শুধু নাম হিসেবেও কোন সাহায্যকারী থাকবে না এবং মহামহিমান্বিত আল্লাহর সেনাবাহিনীর তুলনায় তাদের সংখ্যা হবে অতি নগণ্য।

আল-জিন 72:24

১৮-২৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাঁর ইবাদতের জায়গাকে শিরক হতে পবিত্র রাখে, সেখানে যেন অন্য কাউকেও না ডাকে। কাউকেও যেন আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে শরীক না করে। ইয়াহূদ ও খৃষ্টানরা তাদের গীর্জা ও মন্দিরে গিয়ে আল্লাহর সাথে অন্যদেরকে শরীক করতো। তাই এই উম্মতকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন এরূপ না করে, বরং নবী (সঃ) এবং উম্মত সবাই যেন একত্ববাদী হয়ে থাকে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময় শুধু মসজিদে আকসা ও মসজিদে হারামই বিদ্যমান ছিল। হযরত আ’মাশ (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে এটাও বর্ণনা করেছেন যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তাঁর মসজিদে মানবের সাথে নামায পড়ার অনুমতি প্রার্থনা করে। সুতরাং তাদেরকে যেন বলা হচ্ছেঃ তোমরা নামায পড়তে পার, কিন্তু তাদের সাথে মিশ্রিত হয়ে যেয়ো না।হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, জ্বিনের রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আরয করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা তো দূর দূরান্তে থাকি, সুতরাং আপনার মসজিদে নামায পড়তে আসতে পারি কি করে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “উদ্দেশ্য হলো নামায আদায় করা এবং আল্লাহর ইবাদতে লেগে থাকা, তা যেখানেই হোক না কেন।” হযরত ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সাধারণ এটা সমস্ত মসজিদকেই অন্তর্ভুক্ত করে। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি সিজদার অঙ্গগুলোর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। ভাবার্থ হলোঃ যে অঙ্গগুলোর উপর তোমরা সিজদা কর ওগুলো সবই আল্লাহর। সুতরাং তোমাদের এই অঙ্গগুলোর দ্বারা অন্যদেরকে সিজদা করা হারাম। সহীহ হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাতটি হাড়ের উপর সিজদা করতে আমি আদিষ্ট হয়েছি। ওগুলো হলোঃ কপাল, (হাত দ্বারা ইশারা করে তিনি নাককেও কপালের অন্তর্ভুক্ত করেন), দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের পাতা।”(আরবি)-এ আয়াতের একটি ভাবার্থ হলো এই যে, জ্বিনেরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে যখন কুরআন পাঠ শুনলো তখন তারা এমনাবে আগে আগে বেড়ে চললো যে, যেন একে অপরের মাথার উপর দিয়ে চলে যাবে। দ্বিতীয় ভাবার্থ হলোঃ জ্বিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়কে বললোঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীদের (রাঃ) তার প্রতি আনুগত্যের অবস্থা এই যে, যখন তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যান এবং সাহাবীগণ তাঁর পিছনে থাকেন তখন প্রথম হতে শেষ পৃর্যন্ত আনুগত্য ও অনুকরণে এমনভাবে লেগে থাকেন যে, যেন একটা বৃত্ত। তৃতীয় উক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন জনগণের মধ্যে একত্ববাদ ঘোষণা করেন তখন কাফিররা দাঁত কটমট হয়ে এই দ্বীন ইসলামকে মিটিয়ে দিতে এবং এর আলোকে নির্বাপিত করে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ পাকের ইচ্ছা এর বিপরীত, তিনি এই দ্বীনকে সমুন্নত করতে চান ? এই তৃতীয় উক্তিটিই বেশী একাশমান। কেননা এর পরেই রয়েছেঃ তুমি বল আমি আমার প্রতিপালককেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক করি না।।অর্থাৎ সত্যের আহ্বান ও একত্ববাদের শব্দ যখন কাফিরদের কানে পৌঁছে যার প্রতি তারা বহুদিন হতেই মনঃক্ষুন্ন ছিল তখন তারা কষ্ট প্রদানে, বিরুদ্ধাচরণে এবং অবিশ্বাসকরণে উঠে পড়ে লেগে যায়। আর সত্যকে মিটিয়ে দিতে চায় ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শত্রুতার উপর একতাবদ্ধ হয়। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ কাফিরদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ আমি আমার এক শরীকবিহীন প্রতিপালকের ইবাদতে মগ্ন রয়েছি। আমি তাঁরই আশ্রয়ে আছি। তাঁরই উপর আমি ভরসা করি। তিনিই আমার আশ্রয়দানস্থল। তোমরা কখনো আমার নিকট হতে এ আশা করো না যে, আমি অন্য কারো সামনে মাথা নত করবো এবং তার ইবাদত করবো। আমি তোমাদের মতই মানুষ। তোমাদের লাভ-ক্ষতির আমি মালিক নই। আমি তো আল্লাহর এক দাস মাত্র। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আমিও এক বান্দা। তোমাদেরকে হিদায়াত করা বা পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা আমি রাখি না। সবকিছুই আল্লাহর অধিকারভুক্ত। আমি তো শুধু একজন প্রচারক। আমি নিজেই যদি আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করি তবে অবশ্যই তিনি আমাকে শাস্তি দিবেন এবং আমাকে বাঁচাবার কারো ক্ষমতা হবে না। আল্লাহ ছাড়া আমি কোন আশ্রয় স্থল দেখি না। আমার পদমর্যাদা শুধু প্রচারক ও রাসূল হিসেবেই রয়েছে।কারো কারো মতে (আরবি) শব্দের ইসতিসনা বা স্বাতন্ত্র (আরবি)-এর সাথে রয়েছে। অর্থাৎ আমি লাভ ক্ষতি এবং হিদায়াত ও যালালাতের মালিক নই। আমি তো শুধু তাবলীগ করি ও আল্লাহর বাণী মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে থাকি। আবার এই ইসতিসনা (আরবি)-এর সাথেও হতে পারে। অর্থাৎ আমাকে শুধু আমার রিসালাতের পালনই আল্লাহর আযাব হতে বাঁচাতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে রাসূল (সঃ)! তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তুমি (জনগণের কাছে) পৌঁছিয়ে দাও, আর যদি তুমি তা না কর তাহলে তুমি তার রিসালাত পৌঁছিয়ে দিলে না, আর আল্লাহ তোমাকে লোকদের (অনিষ্ট) হতে রক্ষা করবেন।”(৫:৬৭)ইরশাদ হচ্ছেঃ যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অমান্য করে তাদের জন্যে রয়েছে জাহান্নামের অগ্নি, সেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে। যখন এই মুশরিক দানব ও মানবরা কিয়ামতের দিন ভয়াবহ আযাব দেখতে পাবে তখন তারা বুঝতে পারবে কে সাহায্যকারীর দিক দিয়ে দুর্বল এবং কে সংখ্যায় স্বল্প। অর্থাৎ একত্ববাদে বিশ্বাসী মুমিন না তাতে অবিশ্বাসী মুশরিক। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ঐদিন মুশরিকদের শুধু নাম হিসেবেও কোন সাহায্যকারী থাকবে না এবং মহামহিমান্বিত আল্লাহর সেনাবাহিনীর তুলনায় তাদের সংখ্যা হবে অতি নগণ্য।

আল-জিন 72:25

২৫-২৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি জনগণকে বলে দাওঃ কিয়ামত কখন হবে এ জ্ঞান আমার নেই। এমন কি ওর সময় নিকটবর্তী কি দূরবর্তী এটাও আমার জানা নেই। অধিকাংশ মূখ ও অজ্ঞ লোকের মধ্যে যে এটা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যমীনের ভিতরের জিনিসেরও খবর রাখেন, এটা যে সম্পূর্ণ ভুল কথা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ হলো এই আয়াতে কারীমাটি। এই রিওয়াইয়াতের কোন মূল ভিত্তিই নেই। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথা। আমরা এটা কোন কিতাবে পাইনি। হ্যাঁ, এর বিপরীতটা পরিষ্কারভাবে সাব্যস্ত আছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে যখন জিজ্ঞেস করা হতো তখন তিনি তার না জানার কথা প্রকাশ করতেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) গ্রাম্য লোকের রূপ ধরে তার নিকট এসে তাঁকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি তাঁকে পরিষ্কারভাবে উত্তর দিয়েছিলেন যে, এর জ্ঞান যেমন জিজ্ঞেসকারীর নেই তেমনই জিজ্ঞাসিত ব্যক্তিরও নেই।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, একজন গ্রাম্য লোক উচ্চস্বরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামত কখন হবে?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “কিয়ামত তো অবশ্যই হবে, এখন তুমি এর জন্যে কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তা বল দেখি?” লোকটি বললোঃ “আমার কাছে রোযা নামাযের আধিক্য নেই, তবে এটা সত্য যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে ভালবাসী।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তুমি যাকে ভালবাস তার সাথেই তুমি থাকবে।" হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, মুসলমানরা এ হাদীস শুনে যতো বেশী খুশী হয়েছিল অন্য হাদীস শুনে ততো বেশী খুশী হয়নি। এ হাদীস দ্বারাও জানা গেল যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জানা ছিল না।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, এই উম্মতকে আল্লাহ অর্ধদিন পর্যন্ত অবকাশ দিবেন।" অন্য একটি রিওয়াইয়াতে এটুকু বেশী রয়েছে যে, হযরত সা'দ (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়ঃ “অর্ধদিন দ্বারা উদ্দেশ্য কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পাঁচশ বছর।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহ অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না, তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত। যেমন আল্লাহ তা’আলার উক্তিঃ (আরবি)অর্থাৎ “যা তিনি ইচ্ছা করেন তদ্ব্যতীত তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত্ব করতে পারে না।”(২:২৫৫) মানুষের মধ্য থেকেই হোক বা দানবের মধ্য থেকেই হোক, যাকে আল্লাহ যেটুকু চান অবহিত করে থাকেন। আবার এর আরো বিশেষত্ব এই যে, তার হিফাজত এবং সাথে সাথে এই ইলমের প্রসারের জন্যে যা আল্লাহ তাকে দিয়েছেন, তার আশেপাশে সদা রক্ষক ফেরেশতা নিয়োজিত থাকেন।(আরবি) বা (আরবি) সর্বনামটি কারো কারো মতে নবী (সঃ)-এর দিকে ফিরেছে। অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর সামনে ও পিছনে চারজন ফেরেশতা থাকতেন, যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, তারা তাদের প্রতিপালকের পয়গাম সঠিকভাবে তার নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। আবার কারো কারো মতে, এর (আরবি) টি আহলে শিরকের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ পালাক্রমে আগমনকারী ফেরেশতারা আল্লাহর নবী (সঃ)-কে শয়তান হতে ও তাঁর অনিষ্ঠ হতে রক্ষা করেন, যাতে আহলে শিরক জানতে পারে যে, রাসূলগণ আল্লাহর রিসালাত আদায় করেছেন। অর্থাৎ রাসূলদেরকে অবিশ্বাসকারীরাও যেন তাদের রিসালাতকে জেনে নেয়। কিন্তু এতে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। ইয়াকূব (রঃ)-এর কিরআত পেশের সাথে রয়েছে। অর্থাৎ জনগণ যেন জেনে নেয় যে, রাসূলগণ তাবলীগ করেছেন। আর সম্ভবতঃ ভাবার্থ এও হবে যে, যেন আল্লাহ জেনে নেন। অর্থাৎ তিনি তাঁর ফেরেশতাদেরকে পাঠিয়ে তাঁর রাসূলদের হিফাযত করে থাকেন, যেন তারা রিসালাত আদায় করতে পারেন ও ওহীর হিফাজত করতে পারেন। আর যেন আল্লাহ তা'আলা জেনে নেন যে, তাঁরা রিসালাত আদায় করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি এ যাবৎ যে কিবলা অনুসরণ করছিলে ওকে আমি এই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যাতে জানতে পারি কে রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণ করে এবং কে ফিরে যায়?" (২:১৪৩) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন ঈমানদারদেরকে এবং মুনাফিকদেরকে।”(২৯:১১) এই ধরনের আরো আয়াতসমূহ রয়েছে। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তো প্রথম হতেই জানেন, কিন্তু তা তিনি প্রকাশ করেও জেনে নেন। এই জন্যেই এখানে এর পরেই বলেন যে, তিনি সবকিছুরই বিস্তারিত হিসাব রাখেন।

আল-জিন 72:26

২৫-২৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি জনগণকে বলে দাওঃ কিয়ামত কখন হবে এ জ্ঞান আমার নেই। এমন কি ওর সময় নিকটবর্তী কি দূরবর্তী এটাও আমার জানা নেই। অধিকাংশ মূখ ও অজ্ঞ লোকের মধ্যে যে এটা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যমীনের ভিতরের জিনিসেরও খবর রাখেন, এটা যে সম্পূর্ণ ভুল কথা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ হলো এই আয়াতে কারীমাটি। এই রিওয়াইয়াতের কোন মূল ভিত্তিই নেই। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথা। আমরা এটা কোন কিতাবে পাইনি। হ্যাঁ, এর বিপরীতটা পরিষ্কারভাবে সাব্যস্ত আছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে যখন জিজ্ঞেস করা হতো তখন তিনি তার না জানার কথা প্রকাশ করতেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) গ্রাম্য লোকের রূপ ধরে তার নিকট এসে তাঁকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি তাঁকে পরিষ্কারভাবে উত্তর দিয়েছিলেন যে, এর জ্ঞান যেমন জিজ্ঞেসকারীর নেই তেমনই জিজ্ঞাসিত ব্যক্তিরও নেই।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, একজন গ্রাম্য লোক উচ্চস্বরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামত কখন হবে?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “কিয়ামত তো অবশ্যই হবে, এখন তুমি এর জন্যে কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তা বল দেখি?” লোকটি বললোঃ “আমার কাছে রোযা নামাযের আধিক্য নেই, তবে এটা সত্য যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে ভালবাসী।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তুমি যাকে ভালবাস তার সাথেই তুমি থাকবে।" হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, মুসলমানরা এ হাদীস শুনে যতো বেশী খুশী হয়েছিল অন্য হাদীস শুনে ততো বেশী খুশী হয়নি। এ হাদীস দ্বারাও জানা গেল যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জানা ছিল না।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, এই উম্মতকে আল্লাহ অর্ধদিন পর্যন্ত অবকাশ দিবেন।" অন্য একটি রিওয়াইয়াতে এটুকু বেশী রয়েছে যে, হযরত সা'দ (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়ঃ “অর্ধদিন দ্বারা উদ্দেশ্য কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পাঁচশ বছর।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহ অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না, তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত। যেমন আল্লাহ তা’আলার উক্তিঃ (আরবি)অর্থাৎ “যা তিনি ইচ্ছা করেন তদ্ব্যতীত তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত্ব করতে পারে না।”(২:২৫৫) মানুষের মধ্য থেকেই হোক বা দানবের মধ্য থেকেই হোক, যাকে আল্লাহ যেটুকু চান অবহিত করে থাকেন। আবার এর আরো বিশেষত্ব এই যে, তার হিফাজত এবং সাথে সাথে এই ইলমের প্রসারের জন্যে যা আল্লাহ তাকে দিয়েছেন, তার আশেপাশে সদা রক্ষক ফেরেশতা নিয়োজিত থাকেন।(আরবি) বা (আরবি) সর্বনামটি কারো কারো মতে নবী (সঃ)-এর দিকে ফিরেছে। অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর সামনে ও পিছনে চারজন ফেরেশতা থাকতেন, যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, তারা তাদের প্রতিপালকের পয়গাম সঠিকভাবে তার নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। আবার কারো কারো মতে, এর (আরবি) টি আহলে শিরকের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ পালাক্রমে আগমনকারী ফেরেশতারা আল্লাহর নবী (সঃ)-কে শয়তান হতে ও তাঁর অনিষ্ঠ হতে রক্ষা করেন, যাতে আহলে শিরক জানতে পারে যে, রাসূলগণ আল্লাহর রিসালাত আদায় করেছেন। অর্থাৎ রাসূলদেরকে অবিশ্বাসকারীরাও যেন তাদের রিসালাতকে জেনে নেয়। কিন্তু এতে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। ইয়াকূব (রঃ)-এর কিরআত পেশের সাথে রয়েছে। অর্থাৎ জনগণ যেন জেনে নেয় যে, রাসূলগণ তাবলীগ করেছেন। আর সম্ভবতঃ ভাবার্থ এও হবে যে, যেন আল্লাহ জেনে নেন। অর্থাৎ তিনি তাঁর ফেরেশতাদেরকে পাঠিয়ে তাঁর রাসূলদের হিফাযত করে থাকেন, যেন তারা রিসালাত আদায় করতে পারেন ও ওহীর হিফাজত করতে পারেন। আর যেন আল্লাহ তা'আলা জেনে নেন যে, তাঁরা রিসালাত আদায় করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি এ যাবৎ যে কিবলা অনুসরণ করছিলে ওকে আমি এই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যাতে জানতে পারি কে রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণ করে এবং কে ফিরে যায়?" (২:১৪৩) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন ঈমানদারদেরকে এবং মুনাফিকদেরকে।”(২৯:১১) এই ধরনের আরো আয়াতসমূহ রয়েছে। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তো প্রথম হতেই জানেন, কিন্তু তা তিনি প্রকাশ করেও জেনে নেন। এই জন্যেই এখানে এর পরেই বলেন যে, তিনি সবকিছুরই বিস্তারিত হিসাব রাখেন।

আল-জিন 72:27

২৫-২৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি জনগণকে বলে দাওঃ কিয়ামত কখন হবে এ জ্ঞান আমার নেই। এমন কি ওর সময় নিকটবর্তী কি দূরবর্তী এটাও আমার জানা নেই। অধিকাংশ মূখ ও অজ্ঞ লোকের মধ্যে যে এটা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যমীনের ভিতরের জিনিসেরও খবর রাখেন, এটা যে সম্পূর্ণ ভুল কথা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ হলো এই আয়াতে কারীমাটি। এই রিওয়াইয়াতের কোন মূল ভিত্তিই নেই। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথা। আমরা এটা কোন কিতাবে পাইনি। হ্যাঁ, এর বিপরীতটা পরিষ্কারভাবে সাব্যস্ত আছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে যখন জিজ্ঞেস করা হতো তখন তিনি তার না জানার কথা প্রকাশ করতেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) গ্রাম্য লোকের রূপ ধরে তার নিকট এসে তাঁকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি তাঁকে পরিষ্কারভাবে উত্তর দিয়েছিলেন যে, এর জ্ঞান যেমন জিজ্ঞেসকারীর নেই তেমনই জিজ্ঞাসিত ব্যক্তিরও নেই।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, একজন গ্রাম্য লোক উচ্চস্বরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামত কখন হবে?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “কিয়ামত তো অবশ্যই হবে, এখন তুমি এর জন্যে কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তা বল দেখি?” লোকটি বললোঃ “আমার কাছে রোযা নামাযের আধিক্য নেই, তবে এটা সত্য যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে ভালবাসী।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তুমি যাকে ভালবাস তার সাথেই তুমি থাকবে।" হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, মুসলমানরা এ হাদীস শুনে যতো বেশী খুশী হয়েছিল অন্য হাদীস শুনে ততো বেশী খুশী হয়নি। এ হাদীস দ্বারাও জানা গেল যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জানা ছিল না।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, এই উম্মতকে আল্লাহ অর্ধদিন পর্যন্ত অবকাশ দিবেন।" অন্য একটি রিওয়াইয়াতে এটুকু বেশী রয়েছে যে, হযরত সা'দ (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়ঃ “অর্ধদিন দ্বারা উদ্দেশ্য কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পাঁচশ বছর।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহ অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না, তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত। যেমন আল্লাহ তা’আলার উক্তিঃ (আরবি)অর্থাৎ “যা তিনি ইচ্ছা করেন তদ্ব্যতীত তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত্ব করতে পারে না।”(২:২৫৫) মানুষের মধ্য থেকেই হোক বা দানবের মধ্য থেকেই হোক, যাকে আল্লাহ যেটুকু চান অবহিত করে থাকেন। আবার এর আরো বিশেষত্ব এই যে, তার হিফাজত এবং সাথে সাথে এই ইলমের প্রসারের জন্যে যা আল্লাহ তাকে দিয়েছেন, তার আশেপাশে সদা রক্ষক ফেরেশতা নিয়োজিত থাকেন।(আরবি) বা (আরবি) সর্বনামটি কারো কারো মতে নবী (সঃ)-এর দিকে ফিরেছে। অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর সামনে ও পিছনে চারজন ফেরেশতা থাকতেন, যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, তারা তাদের প্রতিপালকের পয়গাম সঠিকভাবে তার নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। আবার কারো কারো মতে, এর (আরবি) টি আহলে শিরকের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ পালাক্রমে আগমনকারী ফেরেশতারা আল্লাহর নবী (সঃ)-কে শয়তান হতে ও তাঁর অনিষ্ঠ হতে রক্ষা করেন, যাতে আহলে শিরক জানতে পারে যে, রাসূলগণ আল্লাহর রিসালাত আদায় করেছেন। অর্থাৎ রাসূলদেরকে অবিশ্বাসকারীরাও যেন তাদের রিসালাতকে জেনে নেয়। কিন্তু এতে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। ইয়াকূব (রঃ)-এর কিরআত পেশের সাথে রয়েছে। অর্থাৎ জনগণ যেন জেনে নেয় যে, রাসূলগণ তাবলীগ করেছেন। আর সম্ভবতঃ ভাবার্থ এও হবে যে, যেন আল্লাহ জেনে নেন। অর্থাৎ তিনি তাঁর ফেরেশতাদেরকে পাঠিয়ে তাঁর রাসূলদের হিফাযত করে থাকেন, যেন তারা রিসালাত আদায় করতে পারেন ও ওহীর হিফাজত করতে পারেন। আর যেন আল্লাহ তা'আলা জেনে নেন যে, তাঁরা রিসালাত আদায় করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি এ যাবৎ যে কিবলা অনুসরণ করছিলে ওকে আমি এই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যাতে জানতে পারি কে রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণ করে এবং কে ফিরে যায়?" (২:১৪৩) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন ঈমানদারদেরকে এবং মুনাফিকদেরকে।”(২৯:১১) এই ধরনের আরো আয়াতসমূহ রয়েছে। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তো প্রথম হতেই জানেন, কিন্তু তা তিনি প্রকাশ করেও জেনে নেন। এই জন্যেই এখানে এর পরেই বলেন যে, তিনি সবকিছুরই বিস্তারিত হিসাব রাখেন।

আল-জিন 72:28

২৫-২৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি জনগণকে বলে দাওঃ কিয়ামত কখন হবে এ জ্ঞান আমার নেই। এমন কি ওর সময় নিকটবর্তী কি দূরবর্তী এটাও আমার জানা নেই। অধিকাংশ মূখ ও অজ্ঞ লোকের মধ্যে যে এটা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যমীনের ভিতরের জিনিসেরও খবর রাখেন, এটা যে সম্পূর্ণ ভুল কথা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ হলো এই আয়াতে কারীমাটি। এই রিওয়াইয়াতের কোন মূল ভিত্তিই নেই। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথা। আমরা এটা কোন কিতাবে পাইনি। হ্যাঁ, এর বিপরীতটা পরিষ্কারভাবে সাব্যস্ত আছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে যখন জিজ্ঞেস করা হতো তখন তিনি তার না জানার কথা প্রকাশ করতেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) গ্রাম্য লোকের রূপ ধরে তার নিকট এসে তাঁকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি তাঁকে পরিষ্কারভাবে উত্তর দিয়েছিলেন যে, এর জ্ঞান যেমন জিজ্ঞেসকারীর নেই তেমনই জিজ্ঞাসিত ব্যক্তিরও নেই।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, একজন গ্রাম্য লোক উচ্চস্বরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিয়ামত কখন হবে?" উত্তরে তিনি বলেনঃ “কিয়ামত তো অবশ্যই হবে, এখন তুমি এর জন্যে কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তা বল দেখি?” লোকটি বললোঃ “আমার কাছে রোযা নামাযের আধিক্য নেই, তবে এটা সত্য যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে ভালবাসী।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তুমি যাকে ভালবাস তার সাথেই তুমি থাকবে।" হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, মুসলমানরা এ হাদীস শুনে যতো বেশী খুশী হয়েছিল অন্য হাদীস শুনে ততো বেশী খুশী হয়নি। এ হাদীস দ্বারাও জানা গেল যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জানা ছিল না।মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, এই উম্মতকে আল্লাহ অর্ধদিন পর্যন্ত অবকাশ দিবেন।" অন্য একটি রিওয়াইয়াতে এটুকু বেশী রয়েছে যে, হযরত সা'দ (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হয়ঃ “অর্ধদিন দ্বারা উদ্দেশ্য কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পাঁচশ বছর।এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহ অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না, তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত। যেমন আল্লাহ তা’আলার উক্তিঃ (আরবি)অর্থাৎ “যা তিনি ইচ্ছা করেন তদ্ব্যতীত তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত্ব করতে পারে না।”(২:২৫৫) মানুষের মধ্য থেকেই হোক বা দানবের মধ্য থেকেই হোক, যাকে আল্লাহ যেটুকু চান অবহিত করে থাকেন। আবার এর আরো বিশেষত্ব এই যে, তার হিফাজত এবং সাথে সাথে এই ইলমের প্রসারের জন্যে যা আল্লাহ তাকে দিয়েছেন, তার আশেপাশে সদা রক্ষক ফেরেশতা নিয়োজিত থাকেন।(আরবি) বা (আরবি) সর্বনামটি কারো কারো মতে নবী (সঃ)-এর দিকে ফিরেছে। অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর সামনে ও পিছনে চারজন ফেরেশতা থাকতেন, যাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, তারা তাদের প্রতিপালকের পয়গাম সঠিকভাবে তার নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। আবার কারো কারো মতে, এর (আরবি) টি আহলে শিরকের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ পালাক্রমে আগমনকারী ফেরেশতারা আল্লাহর নবী (সঃ)-কে শয়তান হতে ও তাঁর অনিষ্ঠ হতে রক্ষা করেন, যাতে আহলে শিরক জানতে পারে যে, রাসূলগণ আল্লাহর রিসালাত আদায় করেছেন। অর্থাৎ রাসূলদেরকে অবিশ্বাসকারীরাও যেন তাদের রিসালাতকে জেনে নেয়। কিন্তু এতে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। ইয়াকূব (রঃ)-এর কিরআত পেশের সাথে রয়েছে। অর্থাৎ জনগণ যেন জেনে নেয় যে, রাসূলগণ তাবলীগ করেছেন। আর সম্ভবতঃ ভাবার্থ এও হবে যে, যেন আল্লাহ জেনে নেন। অর্থাৎ তিনি তাঁর ফেরেশতাদেরকে পাঠিয়ে তাঁর রাসূলদের হিফাযত করে থাকেন, যেন তারা রিসালাত আদায় করতে পারেন ও ওহীর হিফাজত করতে পারেন। আর যেন আল্লাহ তা'আলা জেনে নেন যে, তাঁরা রিসালাত আদায় করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তুমি এ যাবৎ যে কিবলা অনুসরণ করছিলে ওকে আমি এই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যাতে জানতে পারি কে রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণ করে এবং কে ফিরে যায়?" (২:১৪৩) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন ঈমানদারদেরকে এবং মুনাফিকদেরকে।”(২৯:১১) এই ধরনের আরো আয়াতসমূহ রয়েছে। ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তো প্রথম হতেই জানেন, কিন্তু তা তিনি প্রকাশ করেও জেনে নেন। এই জন্যেই এখানে এর পরেই বলেন যে, তিনি সবকিছুরই বিস্তারিত হিসাব রাখেন।

আল-মুযযাম্মিল 73:1

মুসনাদে বাযযারে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরায়েশরা দারুণ নদুওয়াতে একত্রিত হয়ে পরস্পর বলাবলি করলোঃ এসো, আমরা এই ব্যক্তির (হযরত মুহাম্মাদ সঃ)-এর এমন এক নাম স্থির করি যে, সবারই মুখ দিয়ে এই নামই বের হবে, যাতে বাইরের লোকেরা একই আওয়ায শুনে যায়। তখন কেউ কেউ বললো যে, তার নাম ‘কাহিন' বা গণক রাখা হোক। একথা শুনে অন্যেরা বললো যে, প্রকৃতপক্ষে সে তো ‘কাহিন’ বা গণক নয়। আর একটি প্রস্তাব উঠলো যে, তাহলে এর নাম ‘মাজনুন' বা পাগল রাখা হোক। এর উপরও অন্যেরা আপত্তি উঠালো যে, সে পাগলও নয়। এরপর প্রস্তাব রাখা হলো যে, এর নাম ‘সাহির’ বা যাদুকর রাখা হোক। কিন্তু এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যাত হলো। কারণ বলা হলো যে, সে ‘সাহির’ বা যাদুকরও নয়। মোটকথা তারা তাঁর এমন কোন খারাপ নাম স্থির করতে পারলো না যাতে সবাই একমত হতে পারে। এভাবেই ঐ মজলিস ভেঙ্গে গেল। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আসলেন এবং “হে বস্ত্রাবৃত' বলে তাঁকে সম্বোধন করলেন। (এই বর্ণনার একজন বর্ণনাকারী মুআল্লা ইবনে আবদির রহমানের নিকট হতে যদিও আহলে ইলমের একটি দল রিওয়াইয়াত নিয়ে থাকেন এবং তার থেকে হাদীস বর্ণনা করে থাকেন, কিন্তু তাঁর রিওয়াইয়াত সমূহের মধ্যে এমন বহু হাদীস রয়েছে যেগুলোর উপর তাঁর অনুসরণ করা যায় না) ১-৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন রাত্রিকালে কাপড় জড়িয়ে শয়ন করা পরিত্যাগ করেন এবং তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়িয়ে থাকার কাজ অবলম্বন করেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায়, আর আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে।” (৩২:১৬) রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা জীবন এ হুকুম পালন করে গেছেন। তাহাজ্জুদের নামায শুধু তাঁর উপর ফরয ছিল। অর্থাৎ এ নামায তাঁর উম্মতের উপর ওয়াজিব নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং তুমি রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে; এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় যে, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯) এই হুকুমের সাথে সাথে পরিমাণও বর্ণনা করে দিলেন যে, অর্ধেক রাত্রি বা কিছু কম-বেশী।(আরবি) বলা হয় শয়নকারী ও বস্ত্রাবৃত ব্যক্তিকে। আবার এ অর্থও করা হয়েছেঃ হে কুরআনকে উত্তম রূপে গ্রহণকারী! তুমি অর্ধরাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামাযে মগ্ন থাকো। অথবা কিছু কম বেশী করো। আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে, যাতে ভালভাবে বুঝতে পারা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হুকুম ও বরাবর পালন করে এসেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীম খুবই ধীরে ধীরে ও থেমে থেমে পাঠ করতেন। ফলে খুব দেরীতে সূরা শেষ হতো। ছোট সূরাও যেন বড় হয়ে যেতো। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুব টেনে টেনে পাঠ করতেন।” তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করে শুনিয়ে দেন, যাতে তিনি (আরবি) এবং (আরবি) শব্দের উপর মদ করেন অর্থাৎ ওগুলো দীর্ঘ করে পড়েন।ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেকটি আয়াতের উপর পূর্ণ ওয়াকফ করতেন বা থামতেন। যেমন (আরবি)পড়ে থামতেন, (আরবি) পড়ে থামতেন (আরবি) এর উপর ওয়াফ করতেন এবং (আরবি) পড়ে থামতেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবী দাউদ এবং ‘জামে’ তিরমিযীতেও রয়েছে)মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআনের পাঠককে কিয়ামতের দিন বলা হবেঃ ‘পড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে ও স্পষ্টভাবে পড়তে থাকো যেমন দুনিয়ায় পড়তে। তোমার মনযিল ও মরতবা হলো ওটা যেখানে তোমার আখিরী আয়াত শেষ হয়। (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদ, জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন) আমরা এই তাফসীরের শুরুতে ঐ সব হাদীস আনয়ন করেছি যেগুলো ধীরে ধীরে পাঠ মুস্তাহাব হওয়া এবং ভাল ও মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করার কথা বলে দেয়। যেমন এ হাদীসটি, যাতে রয়েছেঃ কুরআনকে স্বীয় সুর দ্বারা সৌন্দৰ্য্য মণ্ডিত কর এবং ঐ ব্যক্তি আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করে না। আর হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথা বলাঃ “তাকে হযরত দাউদ (আঃ)-এর বংশধর এর মধুর সুর দান করা হয়েছে এবং হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-এর একথা বলাঃ “আমি যদি জানতাম যে, আপনি আমার কুরআন পাঠ শুনছেন তবে আমি আরো উত্তম ও মধুর সুরে পড়তাম।" আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর এ কথা বলাঃ “বালুকার মত কুরআনকে ছড়িয়ে দিয়ো না এবং কবিতার মত কুরআনকে অভদ্রতার সাথে। পড়ো না, ওর চমৎকারিত্বের প্রতি খেয়াল রেখো এবং অন্তরে তা ক্রিয়াশীল করো। আর সূরা তাড়াতাড়ি শেষ করার পিছনে লেগে পড়ো না।” (এটা ইমাম বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) একটি লোক এসে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বললোঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা আজ রাত্রে একই রাকআতে পাঠ করে ফেলেছি।" তার একথা শুনে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “তা হলে সম্ভবতঃ তুমি কবিতার মত তাড়াতাড়ি করে পাঠ করে থাকবে। ঐ সূরাগুলো আমার বেশ মুখস্থ আছে যেগুলি রাসুলুল্লাহ (সঃ) মিলিয়ে পড়তেন। তারপর তিনি মুফাসসাল সূরাগুলোর মধ্যে বিশিষ্ট সূরার নাম লিখেন যেগুলোর দু’টি করে সূরা মিলিত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক এক রাকআতে পাঠ করতেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করছি গুরুভার বাণী। অর্থাৎ তা আমল করতেও ভারী হবে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও বৃহত্তের কারণে অবতীর্ণ হওয়ার সময়েও খুবই কষ্টদায়ক হবে। যেমন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় তার উরু আমার উরুর উপর ছিল। তখন ওহীর বোঝা আমার উপর এমন ভারীবোধ হলো যে, আমার ভয় হলো না জানি হয়তো আমার উরু ভেঙ্গেই যাবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় আপনি কিছু অনুভব করেন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমি এমন শব্দ শুনতে পাই যেমন কোন জিঞ্জীরের শব্দ হয়। আমি নিঃশব্দ হয়ে পড়ি। যখনই ওহী অবতীর্ণ হয় তখন তা আমার উপর এমন বোঝা স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায় যে, আমার মনে হয় যেন আমার প্রাণই বেরিয়ে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হারিস ইবনে হিশাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার কাছে ওহী কিভাবে আসে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “কখনো কখনো খুবই কষ্ট হয়। কিন্তু এ সত্ত্বেও ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায় শেষ হওয়ার সাথে সাথে ওহী আমার মুখস্থ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে আগমন করে ও ওহী অবতীর্ণ করেন। তিনি কথা বলতে থাকেন এবং আমি তা মুখস্থ করতে থাকি।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি একবার নবী (সঃ)-কে এমন অবস্থায় দেখেছি যে, তার উপর ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। তখন শীতকাল ছিল। এতদসত্ত্বেও তাঁর ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং ঘর্ম টপ টপ করে পড়ছিল।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন কোন সময় উষ্ট্রীর উপর সওয়ার থাকতেন এবং ঐ অবস্থাতেই তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হতো। তখন উন্ত্রী ওহীর ভারে ঝুঁকে পড়তো। তাফসীরে ইবনে জারীরে এও রয়েছে যে, অতঃপর যে পর্যন্ত ওহী বন্ধ না হতো উষ্ট্ৰী নড়তে পারতো না এবং তার গর্দান উঁচু হতো না। ভাবার্থ এই যে, স্বয়ং ওহীর ভার বহন করা কঠিন ছিল। এবং আহকাম পালন করাও ছিল অনুরূপ কঠিন। হযরত ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি এটাই। হযরত আবদুর রহমান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দুনিয়াতে যেমন এটা ভারী কাজ, তেমনই আখিরাতেও এর প্রতিদান ও পুরস্কার ভারী হবে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অবশ্য রাত্রিকালের উত্থান দলনে প্রবলতর এবং বাক্য স্ফুরণে সঠিক। আবিসিনীয় ভাষায় (আরবি) শব্দের অর্থ হলো দাঁড়িয়ে থাকা। সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকলে (আরবি) বলা হয়। তাহাজ্জুদের নামাযের উৎকৃষ্টতা এই যে, এর ফলে অন্তর ও রসনা এক হয়ে যায়। তিলাওয়াতের যে শব্দগুলো মুখ দিয়ে বের হয় তা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। দিনের তুলনায় রাত্রির নির্জনতায় অর্থ ও ভাব অন্তরে ভালভাবে গেঁথে যায়। কেননা দিবস হলো কোলাহল ও অর্থোপার্জনের সময়।হযরত আনাস (রাঃ) (আরবি) কে (আরবি) পড়লে জনগণ বলে ওঠেঃ আমরাতো (আরবি) পড়ে (আরবি) থাকি? উত্তরে তিনি বলেনঃ (আরবি) এবং একই অর্থবোধক শব্দ।ইরশাদ হচ্ছেঃ (হে নবী সঃ)! দিবাভাগে তোমার জন্যে রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। তুমি শুয়ে-বসে থাকতে পার, বিশ্রাম করতে পার, বেশী বেশী নফল আদায় করতে পার এবং তোমার পার্থিব কাজ-কাম সম্পন্ন করতে পার। অতএব রাত্রিকে তুমি তোমার আখিরাতের কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে নাও। এ হুকুম ঐ সময় ছিল যখন রাত্রির নামায ফরয ছিল। তারপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় বান্দাদের উপর অনুগ্রহ করেন এবং হালকাকরণের জন্যে রাত্রির কিয়ামের সময় হ্রাস করে দেন এবং বলেনঃ তোমরা রাত্রির অল্প সময় কিয়াম কর। এই ফরমানের পর হযরত আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত পাঠ করলেন। তাঁর এ উক্তিটি সঠিকও বটে। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে হিশাম (রঃ) তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন এবং মদীনার পথে যাত্রা শুরু করেন। উদ্দেশ্য এই যে, তিনি তাঁর সেখানকার ঘরবাড়ী বিক্রি করে ফেলবেন এবং ওর মূল্য দিয়ে অস্ত্র-শস্ত্র ইত্যাদি ক্রয় করে জিহাদে অংশগ্রহণ করবেন। তিনি রোমকদের সাথে লড়াই করতে থাকবেন। অতঃপর হয় রোম বিজিত হবে, না হয় তিনি শাহাদাত বরণ করবেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি তাঁর কওমের লোকদের সাথে মিলিত হন। এবং তাঁদের কাছে স্বীয় উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন। তাঁর এই সংকল্পের কথা শুনে তাঁরা বললেনঃ তাহলে শুনুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশায় আপনারই কওমের ছয়জন লোক এটাই সংকল্প করেছিল যে, তারা নিজেদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দিবে এবং ঘরবাড়ী ইত্যাদি বেচে দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে দাঁড়িয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে তাদেরকে ডেকে বললেনঃ “আমি কি তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ নই? খবরদার! এ কাজ করো না।” এভাবে তিনি তাদেরকে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে নিষেধ করেন। এ হাদীস শুনে হযরত সাঈদ (রাঃ) তাঁর ঐ সংকল্প ত্যাগ করেন এবং সেখানেই তাঁর কওমের লোকদেরকে বললেনঃ “তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলাম। তারপর তিনি সেখান হতে বিদায় নিয়ে স্বস্থানে চলে আসলেন। স্বীয় জামাআতের সাথে মিলিত হয়ে তিনি তাদেরকে বললেনঃ আমি এখান থেকে যাওয়ার পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামায পড়ার পদ্ধতি জিজ্ঞেস করি। তিনি উত্তরে বলেনঃ এ মাসআলাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) সবচেয়ে ভাল বলতে পারবেন। সুতরাং তুমি সেখানে গিয়ে তাঁকেই জিজ্ঞেস করো। তুমি তাঁর কাছে যা শুনবে তা আমাকেও বলে যেয়ো। আমি তখন হযরত হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং তাকে বললাম আমাকে একটু হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে নিয়ে চলুন। তিনি প্রথমে যেতে অস্বীকার করলেও আমার পীড়াপীড়িতে শেষে যেতে সম্মত হলেন। সুতরাং আমরা উভয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে গেলাম। হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত হাকীম (রাঃ)-এর গলার স্বর শুনেই তাঁকে চিনতে পারলেন এবং বললেন “কে, হাকীম?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমি হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সাথে ওটা কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এটা সাঈদ ইবনে হিশাম (রাঃ)।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোন হিশাম? আমিরের ছেলে হিশাম কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমিরের ছেলে হিশামই বটে।” এ কথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হযরত আমির (রাঃ)-এর জন্যে রহমতের দু’আ করলেন এবং বললেনঃ “আমির (রাঃ) খুব ভাল মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।” আমি তখন আরয করলামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল তা আমাকে অবহিত করুন। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি কি কুরআন পড়নি?” আমি উত্তর দিলাম ও হ্যাঁ, পড়েছি বটে। তিনি তখন বললেনঃ “কুরআনই তার চরিত্র।” আমি তখন তাঁর নিকট হতে বিদায় গ্রহণের অনুমতি চাওয়ার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু হঠাৎ আমার মনে পড়লো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) রাত্রির নামায সম্পর্কে প্রশ্ন করা দরকার। আমার এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি কি সূরা মুযযাম্মিল পড়নি?” আমি জবাব দিলামঃ হ্যাঁ, অবশ্যই পড়েছি। তিনি বললেনঃ “তাহলে শুনো। সূরার এই প্রথম ভাগে রাত্রির কিয়াম (দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদের নামায পড়া) ফরয করা হয় এবং এক বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ তাহাজ্জুদের নামায ফরয হিসেবে আদায় করতেন। এমন কি তাঁদের পা ফুলে যেতো। বারো মাস পরে এই সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং মহান আল্লাহ ভার লাঘব করে দেন। তাহাজ্জুদের নামাযকে তিনি ফরয হিসেবে না রেখে নফল হিসেবে রেখে দেন।” এবার আমি বিদায় গ্রহণের ইচ্ছা করলাম। কিন্তু বিতর নামাযের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করার কথা মনে পড়ে গেল। তাই আমি বললামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামাযের পদ্ধতিও আমাকে জানিয়ে দিন। তিনি তখন বললেনঃ শুননা, (রাত্রে) আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মিসওয়াক, অযুর পানি ইত্যাদি ঠিক করে একদিকে রেখে দিতাম। যখনই আল্লাহর ইচ্ছা হতো তিনি চক্ষু খুলতেন। তিনি উঠে মিসওয়াক করতেন ও অযু করতেন এবং আট রাকআত নামায পড়তেন। মধ্যে তাশাহহুদে মোটেই বসতেন না। আট রাকআত পূর্ণ করার পর তিনি আত্তাহিয়্যাতুতে বসতেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলার যিকির করতেন, দু'আ করতেন এবং সালাম না ফিরিয়েই উঠে পড়তেন। আর নবম রাকআত পড়ে যিকির ও দুআ করতেন এবং উচ্চ শব্দে সালাম ফিরাতেন। এ শব্দ আমরাও শুনতে পেতাম। তারপর বসে বসেই দুই রাকআত নামায পড়তেন। হে আমার প্রিয় পুত্র! সব মিলিয়ে মোট এগারো রাকআত হলো। অতঃপর যখন তাঁর বয়স বেশী হয় এবং দেহ ভারী হয়ে যায় তখন থেকে তিনি সাত রাকআত বিতর পড়ে সালাম ফিরাতেন এবং পরে বসে বসে দুই রাকআত নামায পড়তেন। সুতরাং হে প্রিয় বৎস! এটা নয় রাকআত হলো। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তিনি কোন নামায পড়তে শুরু করতেন তখন তা চিরস্থায়ীভাবে পড়তে থাকতেন। তবে হ্যাঁ, কোন ব্যবস্থা বা ঘুম অথবা দুঃখ কষ্টের কারণে কিংবা রোগের কারণে রাত্রে ঐ নামায পড়তে না পারলে দিনের বেলায় বারো রাকআত পড়ে নিতেন। আমার জানা নেই যে, তিনি গোটা কুরআন রাত থেকে নিয়ে সকাল পর্যন্ত পড়ে শেষ করেছেন এবং রমযান ছাড়া অন্য কোন পুরো মাসই রোযা রেখেছেন।” অতঃপর আমি উম্মুল মু'মিনিন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট হতে বিদায় নিয়ে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁর সামনে সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তরের পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি সবটারই সত্যতা স্বীকার করলেন এবং বললেনঃ “আমিও যদি তাঁর কাছে যাতায়াত করতে পারতাম তবে আমি নিজের কানে শুনে আসতাম।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মাদুর বিছিয়ে রাখতাম যার উপর তিনি তাহাজ্জুদের নামায আদায় করতেন। লোকেরা এ খবর জানতে পেরে রাত্রির নামাযেও তাঁর ইকতিদা করার জন্যে এসে পড়ে। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাগান্বিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। উম্মতের প্রতি তিনি বড়ই মেহেরবান ছিলেন এবং সাথে সাথে এ ভয়ও করতেন যে, হয়তো এ নামায ফরয হয়ে যাবে, তাই তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে লোক সকল! ঐ সব আমলের উপরই কষ্ট স্বীকার কর যেগুলো পালনের তোমাদের শক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পুণ্যদানে অপারগ হবেন না। বরং তোমরাই আমলে অপারগ হয়ে যাবে। ঐ আমলই সর্বাপেক্ষা উত্তম যার উপর চিরস্থায়ীভাবে থাকা হয়। এদিকে কুরআন কারীমে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং সাহাবীগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করে দেন এবং ঘুম যেন না আসে এ জন্যে তারা রশি বেঁধে লটকিতে লাগলেন। আট মাস এই ভাবেই কেটে গেল। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাঁদের এ চেষ্টা দেখে আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করলেন এবং রাত্রির কিয়ামকে এশার ফরয নামাযের দিকে ফিরিয়ে দিলেন। আর রাত্রির কিয়াম ছেড়ে দিলেন। (এ রিওয়াইয়াতটি মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও রয়েছে। কিন্তু এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ যুবাইদী দুর্বল। আসল হাদীস সূরা মুয্যাম্মিলের নাযিল হওয়ার উল্লেখ ছাড়া সহীহ গ্রন্থেও রয়েছে) এই হাদীসের শব্দাবলীর ভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী সূরা, অথচ প্রকৃতপক্ষে এ সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। অনুরূপভাবে এ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, আর্ট মাস পরে এর শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এই উক্তিটিও দুর্বল। সহীহ ওটাই যা মুসনাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বছর পরে শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা মুযযাম্মিলের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) রমযান শরীফের রাত্রির কিয়ামের মতই কিয়াম করতে শুরু করেন। আর এ সূরার প্রাথমিক ও শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার মাঝে প্রায় এক বছরের ব্যবধান ছিল। তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত আবূ উমামাহ (রাঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। হযরত আবূ আবদির রহমান (রঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর পর্যন্ত কিয়াম করেন, এমন কি তাদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। অতঃপর (আরবি) অবতীর্ণ হয় এবং তাঁরা শান্তি পান। হযরত হাসান বসরী (রঃ) হযরত সুদ্দীরও (রঃ) উক্তি এটাই। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ রিওয়াইয়াতটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে ষোল মাসের সময়কালের সাথে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর বা দু’বছর পর্যন্ত কিয়াম করতে থাকেন। তাঁদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। তারপর সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তাঁদের ভার লাঘব হয়ে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) দশ বছরের মেয়াদের কথা বলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলোর হুকুম অনুযায়ী মুমিনগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করেন, কিন্তু তাঁদের খুবই কষ্ট হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি দয়া করেন এবং (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন এভাবে তাঁদের প্রতি প্রশস্ততা আনয়ন করেন এবং সংকীর্ণতা দূরীভূত করেন। সুতরাং আল্লাহ তা’আলারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁতে মগ্ন হও। অর্থাৎ দুনিয়ার কাজ-কারবার হতে অবসর লাভ করে প্রশান্তির সাথে খুব বেশী বেশী তার যিকির করতে থাকো, তার দিকে ঝুঁকে পড়ে তাঁর প্রতি মনোনিবেশ কর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতএব যখনই অবসর পাও সাবধান করো।” একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) অর্থাৎ স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং দুনিয়া ছেড়ে দিতে নিষেধ করেছেন। এখানে ভাবার্থ হচ্ছেঃ হে নবী (সঃ)! পার্থিব সৃষ্টিকূল হতে সম্পর্ক চ্ছিন্ন করে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করার একটা সময় অবশ্যই নির্দিষ্ট করে নাও। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই হলেন মালিক ও ব্যবস্থাপক। পূর্ব ও পশ্চিম সবই তাঁর অধিকারভুক্ত। তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউ নেই। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি যেমন এই আল্লাহরই ইবাদত করছো, তেমনই একমাত্র তার উপরই নির্ভরশীল হয়ে যাও। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারই ইবাদত কর এবং তার উপর ভরসা কর।” এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ “আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।” এই অর্থের আরো বহু আয়াত রয়েছে যে, ইবাদত, আনুগত্য এবং ভরসা করার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ।

আল-মুযযাম্মিল 73:2

মুসনাদে বাযযারে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরায়েশরা দারুণ নদুওয়াতে একত্রিত হয়ে পরস্পর বলাবলি করলোঃ এসো, আমরা এই ব্যক্তির (হযরত মুহাম্মাদ সঃ)-এর এমন এক নাম স্থির করি যে, সবারই মুখ দিয়ে এই নামই বের হবে, যাতে বাইরের লোকেরা একই আওয়ায শুনে যায়। তখন কেউ কেউ বললো যে, তার নাম ‘কাহিন' বা গণক রাখা হোক। একথা শুনে অন্যেরা বললো যে, প্রকৃতপক্ষে সে তো ‘কাহিন’ বা গণক নয়। আর একটি প্রস্তাব উঠলো যে, তাহলে এর নাম ‘মাজনুন' বা পাগল রাখা হোক। এর উপরও অন্যেরা আপত্তি উঠালো যে, সে পাগলও নয়। এরপর প্রস্তাব রাখা হলো যে, এর নাম ‘সাহির’ বা যাদুকর রাখা হোক। কিন্তু এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যাত হলো। কারণ বলা হলো যে, সে ‘সাহির’ বা যাদুকরও নয়। মোটকথা তারা তাঁর এমন কোন খারাপ নাম স্থির করতে পারলো না যাতে সবাই একমত হতে পারে। এভাবেই ঐ মজলিস ভেঙ্গে গেল। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আসলেন এবং “হে বস্ত্রাবৃত' বলে তাঁকে সম্বোধন করলেন। (এই বর্ণনার একজন বর্ণনাকারী মুআল্লা ইবনে আবদির রহমানের নিকট হতে যদিও আহলে ইলমের একটি দল রিওয়াইয়াত নিয়ে থাকেন এবং তার থেকে হাদীস বর্ণনা করে থাকেন, কিন্তু তাঁর রিওয়াইয়াত সমূহের মধ্যে এমন বহু হাদীস রয়েছে যেগুলোর উপর তাঁর অনুসরণ করা যায় না) ১-৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন রাত্রিকালে কাপড় জড়িয়ে শয়ন করা পরিত্যাগ করেন এবং তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়িয়ে থাকার কাজ অবলম্বন করেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায়, আর আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে।” (৩২:১৬) রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা জীবন এ হুকুম পালন করে গেছেন। তাহাজ্জুদের নামায শুধু তাঁর উপর ফরয ছিল। অর্থাৎ এ নামায তাঁর উম্মতের উপর ওয়াজিব নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং তুমি রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে; এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় যে, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯) এই হুকুমের সাথে সাথে পরিমাণও বর্ণনা করে দিলেন যে, অর্ধেক রাত্রি বা কিছু কম-বেশী।(আরবি) বলা হয় শয়নকারী ও বস্ত্রাবৃত ব্যক্তিকে। আবার এ অর্থও করা হয়েছেঃ হে কুরআনকে উত্তম রূপে গ্রহণকারী! তুমি অর্ধরাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামাযে মগ্ন থাকো। অথবা কিছু কম বেশী করো। আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে, যাতে ভালভাবে বুঝতে পারা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হুকুম ও বরাবর পালন করে এসেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীম খুবই ধীরে ধীরে ও থেমে থেমে পাঠ করতেন। ফলে খুব দেরীতে সূরা শেষ হতো। ছোট সূরাও যেন বড় হয়ে যেতো। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুব টেনে টেনে পাঠ করতেন।” তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করে শুনিয়ে দেন, যাতে তিনি (আরবি) এবং (আরবি) শব্দের উপর মদ করেন অর্থাৎ ওগুলো দীর্ঘ করে পড়েন।ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেকটি আয়াতের উপর পূর্ণ ওয়াকফ করতেন বা থামতেন। যেমন (আরবি)পড়ে থামতেন, (আরবি) পড়ে থামতেন (আরবি) এর উপর ওয়াফ করতেন এবং (আরবি) পড়ে থামতেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবী দাউদ এবং ‘জামে’ তিরমিযীতেও রয়েছে)মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআনের পাঠককে কিয়ামতের দিন বলা হবেঃ ‘পড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে ও স্পষ্টভাবে পড়তে থাকো যেমন দুনিয়ায় পড়তে। তোমার মনযিল ও মরতবা হলো ওটা যেখানে তোমার আখিরী আয়াত শেষ হয়। (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদ, জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন) আমরা এই তাফসীরের শুরুতে ঐ সব হাদীস আনয়ন করেছি যেগুলো ধীরে ধীরে পাঠ মুস্তাহাব হওয়া এবং ভাল ও মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করার কথা বলে দেয়। যেমন এ হাদীসটি, যাতে রয়েছেঃ কুরআনকে স্বীয় সুর দ্বারা সৌন্দৰ্য্য মণ্ডিত কর এবং ঐ ব্যক্তি আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করে না। আর হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথা বলাঃ “তাকে হযরত দাউদ (আঃ)-এর বংশধর এর মধুর সুর দান করা হয়েছে এবং হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-এর একথা বলাঃ “আমি যদি জানতাম যে, আপনি আমার কুরআন পাঠ শুনছেন তবে আমি আরো উত্তম ও মধুর সুরে পড়তাম।" আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর এ কথা বলাঃ “বালুকার মত কুরআনকে ছড়িয়ে দিয়ো না এবং কবিতার মত কুরআনকে অভদ্রতার সাথে। পড়ো না, ওর চমৎকারিত্বের প্রতি খেয়াল রেখো এবং অন্তরে তা ক্রিয়াশীল করো। আর সূরা তাড়াতাড়ি শেষ করার পিছনে লেগে পড়ো না।” (এটা ইমাম বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) একটি লোক এসে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বললোঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা আজ রাত্রে একই রাকআতে পাঠ করে ফেলেছি।" তার একথা শুনে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “তা হলে সম্ভবতঃ তুমি কবিতার মত তাড়াতাড়ি করে পাঠ করে থাকবে। ঐ সূরাগুলো আমার বেশ মুখস্থ আছে যেগুলি রাসুলুল্লাহ (সঃ) মিলিয়ে পড়তেন। তারপর তিনি মুফাসসাল সূরাগুলোর মধ্যে বিশিষ্ট সূরার নাম লিখেন যেগুলোর দু’টি করে সূরা মিলিত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক এক রাকআতে পাঠ করতেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করছি গুরুভার বাণী। অর্থাৎ তা আমল করতেও ভারী হবে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও বৃহত্তের কারণে অবতীর্ণ হওয়ার সময়েও খুবই কষ্টদায়ক হবে। যেমন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় তার উরু আমার উরুর উপর ছিল। তখন ওহীর বোঝা আমার উপর এমন ভারীবোধ হলো যে, আমার ভয় হলো না জানি হয়তো আমার উরু ভেঙ্গেই যাবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় আপনি কিছু অনুভব করেন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমি এমন শব্দ শুনতে পাই যেমন কোন জিঞ্জীরের শব্দ হয়। আমি নিঃশব্দ হয়ে পড়ি। যখনই ওহী অবতীর্ণ হয় তখন তা আমার উপর এমন বোঝা স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায় যে, আমার মনে হয় যেন আমার প্রাণই বেরিয়ে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হারিস ইবনে হিশাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার কাছে ওহী কিভাবে আসে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “কখনো কখনো খুবই কষ্ট হয়। কিন্তু এ সত্ত্বেও ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায় শেষ হওয়ার সাথে সাথে ওহী আমার মুখস্থ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে আগমন করে ও ওহী অবতীর্ণ করেন। তিনি কথা বলতে থাকেন এবং আমি তা মুখস্থ করতে থাকি।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি একবার নবী (সঃ)-কে এমন অবস্থায় দেখেছি যে, তার উপর ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। তখন শীতকাল ছিল। এতদসত্ত্বেও তাঁর ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং ঘর্ম টপ টপ করে পড়ছিল।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন কোন সময় উষ্ট্রীর উপর সওয়ার থাকতেন এবং ঐ অবস্থাতেই তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হতো। তখন উন্ত্রী ওহীর ভারে ঝুঁকে পড়তো। তাফসীরে ইবনে জারীরে এও রয়েছে যে, অতঃপর যে পর্যন্ত ওহী বন্ধ না হতো উষ্ট্ৰী নড়তে পারতো না এবং তার গর্দান উঁচু হতো না। ভাবার্থ এই যে, স্বয়ং ওহীর ভার বহন করা কঠিন ছিল। এবং আহকাম পালন করাও ছিল অনুরূপ কঠিন। হযরত ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি এটাই। হযরত আবদুর রহমান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দুনিয়াতে যেমন এটা ভারী কাজ, তেমনই আখিরাতেও এর প্রতিদান ও পুরস্কার ভারী হবে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অবশ্য রাত্রিকালের উত্থান দলনে প্রবলতর এবং বাক্য স্ফুরণে সঠিক। আবিসিনীয় ভাষায় (আরবি) শব্দের অর্থ হলো দাঁড়িয়ে থাকা। সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকলে (আরবি) বলা হয়। তাহাজ্জুদের নামাযের উৎকৃষ্টতা এই যে, এর ফলে অন্তর ও রসনা এক হয়ে যায়। তিলাওয়াতের যে শব্দগুলো মুখ দিয়ে বের হয় তা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। দিনের তুলনায় রাত্রির নির্জনতায় অর্থ ও ভাব অন্তরে ভালভাবে গেঁথে যায়। কেননা দিবস হলো কোলাহল ও অর্থোপার্জনের সময়।হযরত আনাস (রাঃ) (আরবি) কে (আরবি) পড়লে জনগণ বলে ওঠেঃ আমরাতো (আরবি) পড়ে (আরবি) থাকি? উত্তরে তিনি বলেনঃ (আরবি) এবং একই অর্থবোধক শব্দ।ইরশাদ হচ্ছেঃ (হে নবী সঃ)! দিবাভাগে তোমার জন্যে রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। তুমি শুয়ে-বসে থাকতে পার, বিশ্রাম করতে পার, বেশী বেশী নফল আদায় করতে পার এবং তোমার পার্থিব কাজ-কাম সম্পন্ন করতে পার। অতএব রাত্রিকে তুমি তোমার আখিরাতের কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে নাও। এ হুকুম ঐ সময় ছিল যখন রাত্রির নামায ফরয ছিল। তারপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় বান্দাদের উপর অনুগ্রহ করেন এবং হালকাকরণের জন্যে রাত্রির কিয়ামের সময় হ্রাস করে দেন এবং বলেনঃ তোমরা রাত্রির অল্প সময় কিয়াম কর। এই ফরমানের পর হযরত আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত পাঠ করলেন। তাঁর এ উক্তিটি সঠিকও বটে। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে হিশাম (রঃ) তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন এবং মদীনার পথে যাত্রা শুরু করেন। উদ্দেশ্য এই যে, তিনি তাঁর সেখানকার ঘরবাড়ী বিক্রি করে ফেলবেন এবং ওর মূল্য দিয়ে অস্ত্র-শস্ত্র ইত্যাদি ক্রয় করে জিহাদে অংশগ্রহণ করবেন। তিনি রোমকদের সাথে লড়াই করতে থাকবেন। অতঃপর হয় রোম বিজিত হবে, না হয় তিনি শাহাদাত বরণ করবেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি তাঁর কওমের লোকদের সাথে মিলিত হন। এবং তাঁদের কাছে স্বীয় উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন। তাঁর এই সংকল্পের কথা শুনে তাঁরা বললেনঃ তাহলে শুনুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশায় আপনারই কওমের ছয়জন লোক এটাই সংকল্প করেছিল যে, তারা নিজেদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দিবে এবং ঘরবাড়ী ইত্যাদি বেচে দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে দাঁড়িয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে তাদেরকে ডেকে বললেনঃ “আমি কি তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ নই? খবরদার! এ কাজ করো না।” এভাবে তিনি তাদেরকে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে নিষেধ করেন। এ হাদীস শুনে হযরত সাঈদ (রাঃ) তাঁর ঐ সংকল্প ত্যাগ করেন এবং সেখানেই তাঁর কওমের লোকদেরকে বললেনঃ “তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলাম। তারপর তিনি সেখান হতে বিদায় নিয়ে স্বস্থানে চলে আসলেন। স্বীয় জামাআতের সাথে মিলিত হয়ে তিনি তাদেরকে বললেনঃ আমি এখান থেকে যাওয়ার পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামায পড়ার পদ্ধতি জিজ্ঞেস করি। তিনি উত্তরে বলেনঃ এ মাসআলাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) সবচেয়ে ভাল বলতে পারবেন। সুতরাং তুমি সেখানে গিয়ে তাঁকেই জিজ্ঞেস করো। তুমি তাঁর কাছে যা শুনবে তা আমাকেও বলে যেয়ো। আমি তখন হযরত হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং তাকে বললাম আমাকে একটু হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে নিয়ে চলুন। তিনি প্রথমে যেতে অস্বীকার করলেও আমার পীড়াপীড়িতে শেষে যেতে সম্মত হলেন। সুতরাং আমরা উভয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে গেলাম। হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত হাকীম (রাঃ)-এর গলার স্বর শুনেই তাঁকে চিনতে পারলেন এবং বললেন “কে, হাকীম?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমি হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সাথে ওটা কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এটা সাঈদ ইবনে হিশাম (রাঃ)।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোন হিশাম? আমিরের ছেলে হিশাম কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমিরের ছেলে হিশামই বটে।” এ কথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হযরত আমির (রাঃ)-এর জন্যে রহমতের দু’আ করলেন এবং বললেনঃ “আমির (রাঃ) খুব ভাল মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।” আমি তখন আরয করলামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল তা আমাকে অবহিত করুন। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি কি কুরআন পড়নি?” আমি উত্তর দিলাম ও হ্যাঁ, পড়েছি বটে। তিনি তখন বললেনঃ “কুরআনই তার চরিত্র।” আমি তখন তাঁর নিকট হতে বিদায় গ্রহণের অনুমতি চাওয়ার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু হঠাৎ আমার মনে পড়লো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) রাত্রির নামায সম্পর্কে প্রশ্ন করা দরকার। আমার এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি কি সূরা মুযযাম্মিল পড়নি?” আমি জবাব দিলামঃ হ্যাঁ, অবশ্যই পড়েছি। তিনি বললেনঃ “তাহলে শুনো। সূরার এই প্রথম ভাগে রাত্রির কিয়াম (দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদের নামায পড়া) ফরয করা হয় এবং এক বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ তাহাজ্জুদের নামায ফরয হিসেবে আদায় করতেন। এমন কি তাঁদের পা ফুলে যেতো। বারো মাস পরে এই সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং মহান আল্লাহ ভার লাঘব করে দেন। তাহাজ্জুদের নামাযকে তিনি ফরয হিসেবে না রেখে নফল হিসেবে রেখে দেন।” এবার আমি বিদায় গ্রহণের ইচ্ছা করলাম। কিন্তু বিতর নামাযের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করার কথা মনে পড়ে গেল। তাই আমি বললামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামাযের পদ্ধতিও আমাকে জানিয়ে দিন। তিনি তখন বললেনঃ শুননা, (রাত্রে) আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মিসওয়াক, অযুর পানি ইত্যাদি ঠিক করে একদিকে রেখে দিতাম। যখনই আল্লাহর ইচ্ছা হতো তিনি চক্ষু খুলতেন। তিনি উঠে মিসওয়াক করতেন ও অযু করতেন এবং আট রাকআত নামায পড়তেন। মধ্যে তাশাহহুদে মোটেই বসতেন না। আট রাকআত পূর্ণ করার পর তিনি আত্তাহিয়্যাতুতে বসতেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলার যিকির করতেন, দু'আ করতেন এবং সালাম না ফিরিয়েই উঠে পড়তেন। আর নবম রাকআত পড়ে যিকির ও দুআ করতেন এবং উচ্চ শব্দে সালাম ফিরাতেন। এ শব্দ আমরাও শুনতে পেতাম। তারপর বসে বসেই দুই রাকআত নামায পড়তেন। হে আমার প্রিয় পুত্র! সব মিলিয়ে মোট এগারো রাকআত হলো। অতঃপর যখন তাঁর বয়স বেশী হয় এবং দেহ ভারী হয়ে যায় তখন থেকে তিনি সাত রাকআত বিতর পড়ে সালাম ফিরাতেন এবং পরে বসে বসে দুই রাকআত নামায পড়তেন। সুতরাং হে প্রিয় বৎস! এটা নয় রাকআত হলো। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তিনি কোন নামায পড়তে শুরু করতেন তখন তা চিরস্থায়ীভাবে পড়তে থাকতেন। তবে হ্যাঁ, কোন ব্যবস্থা বা ঘুম অথবা দুঃখ কষ্টের কারণে কিংবা রোগের কারণে রাত্রে ঐ নামায পড়তে না পারলে দিনের বেলায় বারো রাকআত পড়ে নিতেন। আমার জানা নেই যে, তিনি গোটা কুরআন রাত থেকে নিয়ে সকাল পর্যন্ত পড়ে শেষ করেছেন এবং রমযান ছাড়া অন্য কোন পুরো মাসই রোযা রেখেছেন।” অতঃপর আমি উম্মুল মু'মিনিন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট হতে বিদায় নিয়ে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁর সামনে সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তরের পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি সবটারই সত্যতা স্বীকার করলেন এবং বললেনঃ “আমিও যদি তাঁর কাছে যাতায়াত করতে পারতাম তবে আমি নিজের কানে শুনে আসতাম।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মাদুর বিছিয়ে রাখতাম যার উপর তিনি তাহাজ্জুদের নামায আদায় করতেন। লোকেরা এ খবর জানতে পেরে রাত্রির নামাযেও তাঁর ইকতিদা করার জন্যে এসে পড়ে। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাগান্বিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। উম্মতের প্রতি তিনি বড়ই মেহেরবান ছিলেন এবং সাথে সাথে এ ভয়ও করতেন যে, হয়তো এ নামায ফরয হয়ে যাবে, তাই তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে লোক সকল! ঐ সব আমলের উপরই কষ্ট স্বীকার কর যেগুলো পালনের তোমাদের শক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পুণ্যদানে অপারগ হবেন না। বরং তোমরাই আমলে অপারগ হয়ে যাবে। ঐ আমলই সর্বাপেক্ষা উত্তম যার উপর চিরস্থায়ীভাবে থাকা হয়। এদিকে কুরআন কারীমে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং সাহাবীগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করে দেন এবং ঘুম যেন না আসে এ জন্যে তারা রশি বেঁধে লটকিতে লাগলেন। আট মাস এই ভাবেই কেটে গেল। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাঁদের এ চেষ্টা দেখে আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করলেন এবং রাত্রির কিয়ামকে এশার ফরয নামাযের দিকে ফিরিয়ে দিলেন। আর রাত্রির কিয়াম ছেড়ে দিলেন। (এ রিওয়াইয়াতটি মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও রয়েছে। কিন্তু এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ যুবাইদী দুর্বল। আসল হাদীস সূরা মুয্যাম্মিলের নাযিল হওয়ার উল্লেখ ছাড়া সহীহ গ্রন্থেও রয়েছে) এই হাদীসের শব্দাবলীর ভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী সূরা, অথচ প্রকৃতপক্ষে এ সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। অনুরূপভাবে এ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, আর্ট মাস পরে এর শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এই উক্তিটিও দুর্বল। সহীহ ওটাই যা মুসনাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বছর পরে শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা মুযযাম্মিলের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) রমযান শরীফের রাত্রির কিয়ামের মতই কিয়াম করতে শুরু করেন। আর এ সূরার প্রাথমিক ও শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার মাঝে প্রায় এক বছরের ব্যবধান ছিল। তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত আবূ উমামাহ (রাঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। হযরত আবূ আবদির রহমান (রঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর পর্যন্ত কিয়াম করেন, এমন কি তাদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। অতঃপর (আরবি) অবতীর্ণ হয় এবং তাঁরা শান্তি পান। হযরত হাসান বসরী (রঃ) হযরত সুদ্দীরও (রঃ) উক্তি এটাই। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ রিওয়াইয়াতটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে ষোল মাসের সময়কালের সাথে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর বা দু’বছর পর্যন্ত কিয়াম করতে থাকেন। তাঁদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। তারপর সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তাঁদের ভার লাঘব হয়ে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) দশ বছরের মেয়াদের কথা বলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলোর হুকুম অনুযায়ী মুমিনগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করেন, কিন্তু তাঁদের খুবই কষ্ট হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি দয়া করেন এবং (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন এভাবে তাঁদের প্রতি প্রশস্ততা আনয়ন করেন এবং সংকীর্ণতা দূরীভূত করেন। সুতরাং আল্লাহ তা’আলারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁতে মগ্ন হও। অর্থাৎ দুনিয়ার কাজ-কারবার হতে অবসর লাভ করে প্রশান্তির সাথে খুব বেশী বেশী তার যিকির করতে থাকো, তার দিকে ঝুঁকে পড়ে তাঁর প্রতি মনোনিবেশ কর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতএব যখনই অবসর পাও সাবধান করো।” একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) অর্থাৎ স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং দুনিয়া ছেড়ে দিতে নিষেধ করেছেন। এখানে ভাবার্থ হচ্ছেঃ হে নবী (সঃ)! পার্থিব সৃষ্টিকূল হতে সম্পর্ক চ্ছিন্ন করে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করার একটা সময় অবশ্যই নির্দিষ্ট করে নাও। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই হলেন মালিক ও ব্যবস্থাপক। পূর্ব ও পশ্চিম সবই তাঁর অধিকারভুক্ত। তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউ নেই। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি যেমন এই আল্লাহরই ইবাদত করছো, তেমনই একমাত্র তার উপরই নির্ভরশীল হয়ে যাও। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারই ইবাদত কর এবং তার উপর ভরসা কর।” এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ “আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।” এই অর্থের আরো বহু আয়াত রয়েছে যে, ইবাদত, আনুগত্য এবং ভরসা করার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ।

আল-মুযযাম্মিল 73:3

মুসনাদে বাযযারে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরায়েশরা দারুণ নদুওয়াতে একত্রিত হয়ে পরস্পর বলাবলি করলোঃ এসো, আমরা এই ব্যক্তির (হযরত মুহাম্মাদ সঃ)-এর এমন এক নাম স্থির করি যে, সবারই মুখ দিয়ে এই নামই বের হবে, যাতে বাইরের লোকেরা একই আওয়ায শুনে যায়। তখন কেউ কেউ বললো যে, তার নাম ‘কাহিন' বা গণক রাখা হোক। একথা শুনে অন্যেরা বললো যে, প্রকৃতপক্ষে সে তো ‘কাহিন’ বা গণক নয়। আর একটি প্রস্তাব উঠলো যে, তাহলে এর নাম ‘মাজনুন' বা পাগল রাখা হোক। এর উপরও অন্যেরা আপত্তি উঠালো যে, সে পাগলও নয়। এরপর প্রস্তাব রাখা হলো যে, এর নাম ‘সাহির’ বা যাদুকর রাখা হোক। কিন্তু এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যাত হলো। কারণ বলা হলো যে, সে ‘সাহির’ বা যাদুকরও নয়। মোটকথা তারা তাঁর এমন কোন খারাপ নাম স্থির করতে পারলো না যাতে সবাই একমত হতে পারে। এভাবেই ঐ মজলিস ভেঙ্গে গেল। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আসলেন এবং “হে বস্ত্রাবৃত' বলে তাঁকে সম্বোধন করলেন। (এই বর্ণনার একজন বর্ণনাকারী মুআল্লা ইবনে আবদির রহমানের নিকট হতে যদিও আহলে ইলমের একটি দল রিওয়াইয়াত নিয়ে থাকেন এবং তার থেকে হাদীস বর্ণনা করে থাকেন, কিন্তু তাঁর রিওয়াইয়াত সমূহের মধ্যে এমন বহু হাদীস রয়েছে যেগুলোর উপর তাঁর অনুসরণ করা যায় না) ১-৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন রাত্রিকালে কাপড় জড়িয়ে শয়ন করা পরিত্যাগ করেন এবং তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়িয়ে থাকার কাজ অবলম্বন করেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায়, আর আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে।” (৩২:১৬) রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা জীবন এ হুকুম পালন করে গেছেন। তাহাজ্জুদের নামায শুধু তাঁর উপর ফরয ছিল। অর্থাৎ এ নামায তাঁর উম্মতের উপর ওয়াজিব নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং তুমি রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে; এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় যে, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯) এই হুকুমের সাথে সাথে পরিমাণও বর্ণনা করে দিলেন যে, অর্ধেক রাত্রি বা কিছু কম-বেশী।(আরবি) বলা হয় শয়নকারী ও বস্ত্রাবৃত ব্যক্তিকে। আবার এ অর্থও করা হয়েছেঃ হে কুরআনকে উত্তম রূপে গ্রহণকারী! তুমি অর্ধরাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামাযে মগ্ন থাকো। অথবা কিছু কম বেশী করো। আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে, যাতে ভালভাবে বুঝতে পারা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হুকুম ও বরাবর পালন করে এসেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীম খুবই ধীরে ধীরে ও থেমে থেমে পাঠ করতেন। ফলে খুব দেরীতে সূরা শেষ হতো। ছোট সূরাও যেন বড় হয়ে যেতো। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুব টেনে টেনে পাঠ করতেন।” তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করে শুনিয়ে দেন, যাতে তিনি (আরবি) এবং (আরবি) শব্দের উপর মদ করেন অর্থাৎ ওগুলো দীর্ঘ করে পড়েন।ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেকটি আয়াতের উপর পূর্ণ ওয়াকফ করতেন বা থামতেন। যেমন (আরবি)পড়ে থামতেন, (আরবি) পড়ে থামতেন (আরবি) এর উপর ওয়াফ করতেন এবং (আরবি) পড়ে থামতেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবী দাউদ এবং ‘জামে’ তিরমিযীতেও রয়েছে)মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআনের পাঠককে কিয়ামতের দিন বলা হবেঃ ‘পড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে ও স্পষ্টভাবে পড়তে থাকো যেমন দুনিয়ায় পড়তে। তোমার মনযিল ও মরতবা হলো ওটা যেখানে তোমার আখিরী আয়াত শেষ হয়। (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদ, জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন) আমরা এই তাফসীরের শুরুতে ঐ সব হাদীস আনয়ন করেছি যেগুলো ধীরে ধীরে পাঠ মুস্তাহাব হওয়া এবং ভাল ও মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করার কথা বলে দেয়। যেমন এ হাদীসটি, যাতে রয়েছেঃ কুরআনকে স্বীয় সুর দ্বারা সৌন্দৰ্য্য মণ্ডিত কর এবং ঐ ব্যক্তি আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করে না। আর হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথা বলাঃ “তাকে হযরত দাউদ (আঃ)-এর বংশধর এর মধুর সুর দান করা হয়েছে এবং হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-এর একথা বলাঃ “আমি যদি জানতাম যে, আপনি আমার কুরআন পাঠ শুনছেন তবে আমি আরো উত্তম ও মধুর সুরে পড়তাম।" আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর এ কথা বলাঃ “বালুকার মত কুরআনকে ছড়িয়ে দিয়ো না এবং কবিতার মত কুরআনকে অভদ্রতার সাথে। পড়ো না, ওর চমৎকারিত্বের প্রতি খেয়াল রেখো এবং অন্তরে তা ক্রিয়াশীল করো। আর সূরা তাড়াতাড়ি শেষ করার পিছনে লেগে পড়ো না।” (এটা ইমাম বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) একটি লোক এসে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বললোঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা আজ রাত্রে একই রাকআতে পাঠ করে ফেলেছি।" তার একথা শুনে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “তা হলে সম্ভবতঃ তুমি কবিতার মত তাড়াতাড়ি করে পাঠ করে থাকবে। ঐ সূরাগুলো আমার বেশ মুখস্থ আছে যেগুলি রাসুলুল্লাহ (সঃ) মিলিয়ে পড়তেন। তারপর তিনি মুফাসসাল সূরাগুলোর মধ্যে বিশিষ্ট সূরার নাম লিখেন যেগুলোর দু’টি করে সূরা মিলিত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক এক রাকআতে পাঠ করতেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করছি গুরুভার বাণী। অর্থাৎ তা আমল করতেও ভারী হবে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও বৃহত্তের কারণে অবতীর্ণ হওয়ার সময়েও খুবই কষ্টদায়ক হবে। যেমন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় তার উরু আমার উরুর উপর ছিল। তখন ওহীর বোঝা আমার উপর এমন ভারীবোধ হলো যে, আমার ভয় হলো না জানি হয়তো আমার উরু ভেঙ্গেই যাবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় আপনি কিছু অনুভব করেন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমি এমন শব্দ শুনতে পাই যেমন কোন জিঞ্জীরের শব্দ হয়। আমি নিঃশব্দ হয়ে পড়ি। যখনই ওহী অবতীর্ণ হয় তখন তা আমার উপর এমন বোঝা স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায় যে, আমার মনে হয় যেন আমার প্রাণই বেরিয়ে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হারিস ইবনে হিশাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার কাছে ওহী কিভাবে আসে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “কখনো কখনো খুবই কষ্ট হয়। কিন্তু এ সত্ত্বেও ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায় শেষ হওয়ার সাথে সাথে ওহী আমার মুখস্থ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে আগমন করে ও ওহী অবতীর্ণ করেন। তিনি কথা বলতে থাকেন এবং আমি তা মুখস্থ করতে থাকি।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি একবার নবী (সঃ)-কে এমন অবস্থায় দেখেছি যে, তার উপর ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। তখন শীতকাল ছিল। এতদসত্ত্বেও তাঁর ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং ঘর্ম টপ টপ করে পড়ছিল।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন কোন সময় উষ্ট্রীর উপর সওয়ার থাকতেন এবং ঐ অবস্থাতেই তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হতো। তখন উন্ত্রী ওহীর ভারে ঝুঁকে পড়তো। তাফসীরে ইবনে জারীরে এও রয়েছে যে, অতঃপর যে পর্যন্ত ওহী বন্ধ না হতো উষ্ট্ৰী নড়তে পারতো না এবং তার গর্দান উঁচু হতো না। ভাবার্থ এই যে, স্বয়ং ওহীর ভার বহন করা কঠিন ছিল। এবং আহকাম পালন করাও ছিল অনুরূপ কঠিন। হযরত ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি এটাই। হযরত আবদুর রহমান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দুনিয়াতে যেমন এটা ভারী কাজ, তেমনই আখিরাতেও এর প্রতিদান ও পুরস্কার ভারী হবে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অবশ্য রাত্রিকালের উত্থান দলনে প্রবলতর এবং বাক্য স্ফুরণে সঠিক। আবিসিনীয় ভাষায় (আরবি) শব্দের অর্থ হলো দাঁড়িয়ে থাকা। সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকলে (আরবি) বলা হয়। তাহাজ্জুদের নামাযের উৎকৃষ্টতা এই যে, এর ফলে অন্তর ও রসনা এক হয়ে যায়। তিলাওয়াতের যে শব্দগুলো মুখ দিয়ে বের হয় তা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। দিনের তুলনায় রাত্রির নির্জনতায় অর্থ ও ভাব অন্তরে ভালভাবে গেঁথে যায়। কেননা দিবস হলো কোলাহল ও অর্থোপার্জনের সময়।হযরত আনাস (রাঃ) (আরবি) কে (আরবি) পড়লে জনগণ বলে ওঠেঃ আমরাতো (আরবি) পড়ে (আরবি) থাকি? উত্তরে তিনি বলেনঃ (আরবি) এবং একই অর্থবোধক শব্দ।ইরশাদ হচ্ছেঃ (হে নবী সঃ)! দিবাভাগে তোমার জন্যে রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। তুমি শুয়ে-বসে থাকতে পার, বিশ্রাম করতে পার, বেশী বেশী নফল আদায় করতে পার এবং তোমার পার্থিব কাজ-কাম সম্পন্ন করতে পার। অতএব রাত্রিকে তুমি তোমার আখিরাতের কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে নাও। এ হুকুম ঐ সময় ছিল যখন রাত্রির নামায ফরয ছিল। তারপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় বান্দাদের উপর অনুগ্রহ করেন এবং হালকাকরণের জন্যে রাত্রির কিয়ামের সময় হ্রাস করে দেন এবং বলেনঃ তোমরা রাত্রির অল্প সময় কিয়াম কর। এই ফরমানের পর হযরত আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত পাঠ করলেন। তাঁর এ উক্তিটি সঠিকও বটে। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে হিশাম (রঃ) তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন এবং মদীনার পথে যাত্রা শুরু করেন। উদ্দেশ্য এই যে, তিনি তাঁর সেখানকার ঘরবাড়ী বিক্রি করে ফেলবেন এবং ওর মূল্য দিয়ে অস্ত্র-শস্ত্র ইত্যাদি ক্রয় করে জিহাদে অংশগ্রহণ করবেন। তিনি রোমকদের সাথে লড়াই করতে থাকবেন। অতঃপর হয় রোম বিজিত হবে, না হয় তিনি শাহাদাত বরণ করবেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি তাঁর কওমের লোকদের সাথে মিলিত হন। এবং তাঁদের কাছে স্বীয় উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন। তাঁর এই সংকল্পের কথা শুনে তাঁরা বললেনঃ তাহলে শুনুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশায় আপনারই কওমের ছয়জন লোক এটাই সংকল্প করেছিল যে, তারা নিজেদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দিবে এবং ঘরবাড়ী ইত্যাদি বেচে দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে দাঁড়িয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে তাদেরকে ডেকে বললেনঃ “আমি কি তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ নই? খবরদার! এ কাজ করো না।” এভাবে তিনি তাদেরকে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে নিষেধ করেন। এ হাদীস শুনে হযরত সাঈদ (রাঃ) তাঁর ঐ সংকল্প ত্যাগ করেন এবং সেখানেই তাঁর কওমের লোকদেরকে বললেনঃ “তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলাম। তারপর তিনি সেখান হতে বিদায় নিয়ে স্বস্থানে চলে আসলেন। স্বীয় জামাআতের সাথে মিলিত হয়ে তিনি তাদেরকে বললেনঃ আমি এখান থেকে যাওয়ার পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামায পড়ার পদ্ধতি জিজ্ঞেস করি। তিনি উত্তরে বলেনঃ এ মাসআলাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) সবচেয়ে ভাল বলতে পারবেন। সুতরাং তুমি সেখানে গিয়ে তাঁকেই জিজ্ঞেস করো। তুমি তাঁর কাছে যা শুনবে তা আমাকেও বলে যেয়ো। আমি তখন হযরত হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং তাকে বললাম আমাকে একটু হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে নিয়ে চলুন। তিনি প্রথমে যেতে অস্বীকার করলেও আমার পীড়াপীড়িতে শেষে যেতে সম্মত হলেন। সুতরাং আমরা উভয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে গেলাম। হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত হাকীম (রাঃ)-এর গলার স্বর শুনেই তাঁকে চিনতে পারলেন এবং বললেন “কে, হাকীম?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমি হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সাথে ওটা কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এটা সাঈদ ইবনে হিশাম (রাঃ)।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোন হিশাম? আমিরের ছেলে হিশাম কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমিরের ছেলে হিশামই বটে।” এ কথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হযরত আমির (রাঃ)-এর জন্যে রহমতের দু’আ করলেন এবং বললেনঃ “আমির (রাঃ) খুব ভাল মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।” আমি তখন আরয করলামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল তা আমাকে অবহিত করুন। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি কি কুরআন পড়নি?” আমি উত্তর দিলাম ও হ্যাঁ, পড়েছি বটে। তিনি তখন বললেনঃ “কুরআনই তার চরিত্র।” আমি তখন তাঁর নিকট হতে বিদায় গ্রহণের অনুমতি চাওয়ার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু হঠাৎ আমার মনে পড়লো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) রাত্রির নামায সম্পর্কে প্রশ্ন করা দরকার। আমার এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি কি সূরা মুযযাম্মিল পড়নি?” আমি জবাব দিলামঃ হ্যাঁ, অবশ্যই পড়েছি। তিনি বললেনঃ “তাহলে শুনো। সূরার এই প্রথম ভাগে রাত্রির কিয়াম (দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদের নামায পড়া) ফরয করা হয় এবং এক বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ তাহাজ্জুদের নামায ফরয হিসেবে আদায় করতেন। এমন কি তাঁদের পা ফুলে যেতো। বারো মাস পরে এই সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং মহান আল্লাহ ভার লাঘব করে দেন। তাহাজ্জুদের নামাযকে তিনি ফরয হিসেবে না রেখে নফল হিসেবে রেখে দেন।” এবার আমি বিদায় গ্রহণের ইচ্ছা করলাম। কিন্তু বিতর নামাযের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করার কথা মনে পড়ে গেল। তাই আমি বললামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামাযের পদ্ধতিও আমাকে জানিয়ে দিন। তিনি তখন বললেনঃ শুননা, (রাত্রে) আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মিসওয়াক, অযুর পানি ইত্যাদি ঠিক করে একদিকে রেখে দিতাম। যখনই আল্লাহর ইচ্ছা হতো তিনি চক্ষু খুলতেন। তিনি উঠে মিসওয়াক করতেন ও অযু করতেন এবং আট রাকআত নামায পড়তেন। মধ্যে তাশাহহুদে মোটেই বসতেন না। আট রাকআত পূর্ণ করার পর তিনি আত্তাহিয়্যাতুতে বসতেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলার যিকির করতেন, দু'আ করতেন এবং সালাম না ফিরিয়েই উঠে পড়তেন। আর নবম রাকআত পড়ে যিকির ও দুআ করতেন এবং উচ্চ শব্দে সালাম ফিরাতেন। এ শব্দ আমরাও শুনতে পেতাম। তারপর বসে বসেই দুই রাকআত নামায পড়তেন। হে আমার প্রিয় পুত্র! সব মিলিয়ে মোট এগারো রাকআত হলো। অতঃপর যখন তাঁর বয়স বেশী হয় এবং দেহ ভারী হয়ে যায় তখন থেকে তিনি সাত রাকআত বিতর পড়ে সালাম ফিরাতেন এবং পরে বসে বসে দুই রাকআত নামায পড়তেন। সুতরাং হে প্রিয় বৎস! এটা নয় রাকআত হলো। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তিনি কোন নামায পড়তে শুরু করতেন তখন তা চিরস্থায়ীভাবে পড়তে থাকতেন। তবে হ্যাঁ, কোন ব্যবস্থা বা ঘুম অথবা দুঃখ কষ্টের কারণে কিংবা রোগের কারণে রাত্রে ঐ নামায পড়তে না পারলে দিনের বেলায় বারো রাকআত পড়ে নিতেন। আমার জানা নেই যে, তিনি গোটা কুরআন রাত থেকে নিয়ে সকাল পর্যন্ত পড়ে শেষ করেছেন এবং রমযান ছাড়া অন্য কোন পুরো মাসই রোযা রেখেছেন।” অতঃপর আমি উম্মুল মু'মিনিন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট হতে বিদায় নিয়ে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁর সামনে সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তরের পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি সবটারই সত্যতা স্বীকার করলেন এবং বললেনঃ “আমিও যদি তাঁর কাছে যাতায়াত করতে পারতাম তবে আমি নিজের কানে শুনে আসতাম।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মাদুর বিছিয়ে রাখতাম যার উপর তিনি তাহাজ্জুদের নামায আদায় করতেন। লোকেরা এ খবর জানতে পেরে রাত্রির নামাযেও তাঁর ইকতিদা করার জন্যে এসে পড়ে। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাগান্বিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। উম্মতের প্রতি তিনি বড়ই মেহেরবান ছিলেন এবং সাথে সাথে এ ভয়ও করতেন যে, হয়তো এ নামায ফরয হয়ে যাবে, তাই তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে লোক সকল! ঐ সব আমলের উপরই কষ্ট স্বীকার কর যেগুলো পালনের তোমাদের শক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পুণ্যদানে অপারগ হবেন না। বরং তোমরাই আমলে অপারগ হয়ে যাবে। ঐ আমলই সর্বাপেক্ষা উত্তম যার উপর চিরস্থায়ীভাবে থাকা হয়। এদিকে কুরআন কারীমে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং সাহাবীগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করে দেন এবং ঘুম যেন না আসে এ জন্যে তারা রশি বেঁধে লটকিতে লাগলেন। আট মাস এই ভাবেই কেটে গেল। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাঁদের এ চেষ্টা দেখে আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করলেন এবং রাত্রির কিয়ামকে এশার ফরয নামাযের দিকে ফিরিয়ে দিলেন। আর রাত্রির কিয়াম ছেড়ে দিলেন। (এ রিওয়াইয়াতটি মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও রয়েছে। কিন্তু এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ যুবাইদী দুর্বল। আসল হাদীস সূরা মুয্যাম্মিলের নাযিল হওয়ার উল্লেখ ছাড়া সহীহ গ্রন্থেও রয়েছে) এই হাদীসের শব্দাবলীর ভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী সূরা, অথচ প্রকৃতপক্ষে এ সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। অনুরূপভাবে এ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, আর্ট মাস পরে এর শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এই উক্তিটিও দুর্বল। সহীহ ওটাই যা মুসনাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বছর পরে শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা মুযযাম্মিলের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) রমযান শরীফের রাত্রির কিয়ামের মতই কিয়াম করতে শুরু করেন। আর এ সূরার প্রাথমিক ও শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার মাঝে প্রায় এক বছরের ব্যবধান ছিল। তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত আবূ উমামাহ (রাঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। হযরত আবূ আবদির রহমান (রঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর পর্যন্ত কিয়াম করেন, এমন কি তাদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। অতঃপর (আরবি) অবতীর্ণ হয় এবং তাঁরা শান্তি পান। হযরত হাসান বসরী (রঃ) হযরত সুদ্দীরও (রঃ) উক্তি এটাই। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ রিওয়াইয়াতটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে ষোল মাসের সময়কালের সাথে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর বা দু’বছর পর্যন্ত কিয়াম করতে থাকেন। তাঁদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। তারপর সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তাঁদের ভার লাঘব হয়ে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) দশ বছরের মেয়াদের কথা বলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলোর হুকুম অনুযায়ী মুমিনগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করেন, কিন্তু তাঁদের খুবই কষ্ট হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি দয়া করেন এবং (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন এভাবে তাঁদের প্রতি প্রশস্ততা আনয়ন করেন এবং সংকীর্ণতা দূরীভূত করেন। সুতরাং আল্লাহ তা’আলারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁতে মগ্ন হও। অর্থাৎ দুনিয়ার কাজ-কারবার হতে অবসর লাভ করে প্রশান্তির সাথে খুব বেশী বেশী তার যিকির করতে থাকো, তার দিকে ঝুঁকে পড়ে তাঁর প্রতি মনোনিবেশ কর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতএব যখনই অবসর পাও সাবধান করো।” একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) অর্থাৎ স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং দুনিয়া ছেড়ে দিতে নিষেধ করেছেন। এখানে ভাবার্থ হচ্ছেঃ হে নবী (সঃ)! পার্থিব সৃষ্টিকূল হতে সম্পর্ক চ্ছিন্ন করে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করার একটা সময় অবশ্যই নির্দিষ্ট করে নাও। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই হলেন মালিক ও ব্যবস্থাপক। পূর্ব ও পশ্চিম সবই তাঁর অধিকারভুক্ত। তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউ নেই। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি যেমন এই আল্লাহরই ইবাদত করছো, তেমনই একমাত্র তার উপরই নির্ভরশীল হয়ে যাও। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারই ইবাদত কর এবং তার উপর ভরসা কর।” এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ “আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।” এই অর্থের আরো বহু আয়াত রয়েছে যে, ইবাদত, আনুগত্য এবং ভরসা করার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ।

আল-মুযযাম্মিল 73:4

মুসনাদে বাযযারে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরায়েশরা দারুণ নদুওয়াতে একত্রিত হয়ে পরস্পর বলাবলি করলোঃ এসো, আমরা এই ব্যক্তির (হযরত মুহাম্মাদ সঃ)-এর এমন এক নাম স্থির করি যে, সবারই মুখ দিয়ে এই নামই বের হবে, যাতে বাইরের লোকেরা একই আওয়ায শুনে যায়। তখন কেউ কেউ বললো যে, তার নাম ‘কাহিন' বা গণক রাখা হোক। একথা শুনে অন্যেরা বললো যে, প্রকৃতপক্ষে সে তো ‘কাহিন’ বা গণক নয়। আর একটি প্রস্তাব উঠলো যে, তাহলে এর নাম ‘মাজনুন' বা পাগল রাখা হোক। এর উপরও অন্যেরা আপত্তি উঠালো যে, সে পাগলও নয়। এরপর প্রস্তাব রাখা হলো যে, এর নাম ‘সাহির’ বা যাদুকর রাখা হোক। কিন্তু এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যাত হলো। কারণ বলা হলো যে, সে ‘সাহির’ বা যাদুকরও নয়। মোটকথা তারা তাঁর এমন কোন খারাপ নাম স্থির করতে পারলো না যাতে সবাই একমত হতে পারে। এভাবেই ঐ মজলিস ভেঙ্গে গেল। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আসলেন এবং “হে বস্ত্রাবৃত' বলে তাঁকে সম্বোধন করলেন। (এই বর্ণনার একজন বর্ণনাকারী মুআল্লা ইবনে আবদির রহমানের নিকট হতে যদিও আহলে ইলমের একটি দল রিওয়াইয়াত নিয়ে থাকেন এবং তার থেকে হাদীস বর্ণনা করে থাকেন, কিন্তু তাঁর রিওয়াইয়াত সমূহের মধ্যে এমন বহু হাদীস রয়েছে যেগুলোর উপর তাঁর অনুসরণ করা যায় না) ১-৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন রাত্রিকালে কাপড় জড়িয়ে শয়ন করা পরিত্যাগ করেন এবং তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়িয়ে থাকার কাজ অবলম্বন করেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায়, আর আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে।” (৩২:১৬) রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা জীবন এ হুকুম পালন করে গেছেন। তাহাজ্জুদের নামায শুধু তাঁর উপর ফরয ছিল। অর্থাৎ এ নামায তাঁর উম্মতের উপর ওয়াজিব নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং তুমি রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে; এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় যে, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯) এই হুকুমের সাথে সাথে পরিমাণও বর্ণনা করে দিলেন যে, অর্ধেক রাত্রি বা কিছু কম-বেশী।(আরবি) বলা হয় শয়নকারী ও বস্ত্রাবৃত ব্যক্তিকে। আবার এ অর্থও করা হয়েছেঃ হে কুরআনকে উত্তম রূপে গ্রহণকারী! তুমি অর্ধরাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামাযে মগ্ন থাকো। অথবা কিছু কম বেশী করো। আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে, যাতে ভালভাবে বুঝতে পারা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হুকুম ও বরাবর পালন করে এসেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীম খুবই ধীরে ধীরে ও থেমে থেমে পাঠ করতেন। ফলে খুব দেরীতে সূরা শেষ হতো। ছোট সূরাও যেন বড় হয়ে যেতো। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুব টেনে টেনে পাঠ করতেন।” তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করে শুনিয়ে দেন, যাতে তিনি (আরবি) এবং (আরবি) শব্দের উপর মদ করেন অর্থাৎ ওগুলো দীর্ঘ করে পড়েন।ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেকটি আয়াতের উপর পূর্ণ ওয়াকফ করতেন বা থামতেন। যেমন (আরবি)পড়ে থামতেন, (আরবি) পড়ে থামতেন (আরবি) এর উপর ওয়াফ করতেন এবং (আরবি) পড়ে থামতেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবী দাউদ এবং ‘জামে’ তিরমিযীতেও রয়েছে)মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআনের পাঠককে কিয়ামতের দিন বলা হবেঃ ‘পড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে ও স্পষ্টভাবে পড়তে থাকো যেমন দুনিয়ায় পড়তে। তোমার মনযিল ও মরতবা হলো ওটা যেখানে তোমার আখিরী আয়াত শেষ হয়। (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদ, জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন) আমরা এই তাফসীরের শুরুতে ঐ সব হাদীস আনয়ন করেছি যেগুলো ধীরে ধীরে পাঠ মুস্তাহাব হওয়া এবং ভাল ও মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করার কথা বলে দেয়। যেমন এ হাদীসটি, যাতে রয়েছেঃ কুরআনকে স্বীয় সুর দ্বারা সৌন্দৰ্য্য মণ্ডিত কর এবং ঐ ব্যক্তি আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করে না। আর হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথা বলাঃ “তাকে হযরত দাউদ (আঃ)-এর বংশধর এর মধুর সুর দান করা হয়েছে এবং হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-এর একথা বলাঃ “আমি যদি জানতাম যে, আপনি আমার কুরআন পাঠ শুনছেন তবে আমি আরো উত্তম ও মধুর সুরে পড়তাম।" আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর এ কথা বলাঃ “বালুকার মত কুরআনকে ছড়িয়ে দিয়ো না এবং কবিতার মত কুরআনকে অভদ্রতার সাথে। পড়ো না, ওর চমৎকারিত্বের প্রতি খেয়াল রেখো এবং অন্তরে তা ক্রিয়াশীল করো। আর সূরা তাড়াতাড়ি শেষ করার পিছনে লেগে পড়ো না।” (এটা ইমাম বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) একটি লোক এসে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বললোঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা আজ রাত্রে একই রাকআতে পাঠ করে ফেলেছি।" তার একথা শুনে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “তা হলে সম্ভবতঃ তুমি কবিতার মত তাড়াতাড়ি করে পাঠ করে থাকবে। ঐ সূরাগুলো আমার বেশ মুখস্থ আছে যেগুলি রাসুলুল্লাহ (সঃ) মিলিয়ে পড়তেন। তারপর তিনি মুফাসসাল সূরাগুলোর মধ্যে বিশিষ্ট সূরার নাম লিখেন যেগুলোর দু’টি করে সূরা মিলিত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক এক রাকআতে পাঠ করতেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করছি গুরুভার বাণী। অর্থাৎ তা আমল করতেও ভারী হবে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও বৃহত্তের কারণে অবতীর্ণ হওয়ার সময়েও খুবই কষ্টদায়ক হবে। যেমন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় তার উরু আমার উরুর উপর ছিল। তখন ওহীর বোঝা আমার উপর এমন ভারীবোধ হলো যে, আমার ভয় হলো না জানি হয়তো আমার উরু ভেঙ্গেই যাবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় আপনি কিছু অনুভব করেন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমি এমন শব্দ শুনতে পাই যেমন কোন জিঞ্জীরের শব্দ হয়। আমি নিঃশব্দ হয়ে পড়ি। যখনই ওহী অবতীর্ণ হয় তখন তা আমার উপর এমন বোঝা স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায় যে, আমার মনে হয় যেন আমার প্রাণই বেরিয়ে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হারিস ইবনে হিশাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার কাছে ওহী কিভাবে আসে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “কখনো কখনো খুবই কষ্ট হয়। কিন্তু এ সত্ত্বেও ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায় শেষ হওয়ার সাথে সাথে ওহী আমার মুখস্থ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে আগমন করে ও ওহী অবতীর্ণ করেন। তিনি কথা বলতে থাকেন এবং আমি তা মুখস্থ করতে থাকি।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি একবার নবী (সঃ)-কে এমন অবস্থায় দেখেছি যে, তার উপর ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। তখন শীতকাল ছিল। এতদসত্ত্বেও তাঁর ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং ঘর্ম টপ টপ করে পড়ছিল।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন কোন সময় উষ্ট্রীর উপর সওয়ার থাকতেন এবং ঐ অবস্থাতেই তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হতো। তখন উন্ত্রী ওহীর ভারে ঝুঁকে পড়তো। তাফসীরে ইবনে জারীরে এও রয়েছে যে, অতঃপর যে পর্যন্ত ওহী বন্ধ না হতো উষ্ট্ৰী নড়তে পারতো না এবং তার গর্দান উঁচু হতো না। ভাবার্থ এই যে, স্বয়ং ওহীর ভার বহন করা কঠিন ছিল। এবং আহকাম পালন করাও ছিল অনুরূপ কঠিন। হযরত ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি এটাই। হযরত আবদুর রহমান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দুনিয়াতে যেমন এটা ভারী কাজ, তেমনই আখিরাতেও এর প্রতিদান ও পুরস্কার ভারী হবে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অবশ্য রাত্রিকালের উত্থান দলনে প্রবলতর এবং বাক্য স্ফুরণে সঠিক। আবিসিনীয় ভাষায় (আরবি) শব্দের অর্থ হলো দাঁড়িয়ে থাকা। সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকলে (আরবি) বলা হয়। তাহাজ্জুদের নামাযের উৎকৃষ্টতা এই যে, এর ফলে অন্তর ও রসনা এক হয়ে যায়। তিলাওয়াতের যে শব্দগুলো মুখ দিয়ে বের হয় তা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। দিনের তুলনায় রাত্রির নির্জনতায় অর্থ ও ভাব অন্তরে ভালভাবে গেঁথে যায়। কেননা দিবস হলো কোলাহল ও অর্থোপার্জনের সময়।হযরত আনাস (রাঃ) (আরবি) কে (আরবি) পড়লে জনগণ বলে ওঠেঃ আমরাতো (আরবি) পড়ে (আরবি) থাকি? উত্তরে তিনি বলেনঃ (আরবি) এবং একই অর্থবোধক শব্দ।ইরশাদ হচ্ছেঃ (হে নবী সঃ)! দিবাভাগে তোমার জন্যে রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। তুমি শুয়ে-বসে থাকতে পার, বিশ্রাম করতে পার, বেশী বেশী নফল আদায় করতে পার এবং তোমার পার্থিব কাজ-কাম সম্পন্ন করতে পার। অতএব রাত্রিকে তুমি তোমার আখিরাতের কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে নাও। এ হুকুম ঐ সময় ছিল যখন রাত্রির নামায ফরয ছিল। তারপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় বান্দাদের উপর অনুগ্রহ করেন এবং হালকাকরণের জন্যে রাত্রির কিয়ামের সময় হ্রাস করে দেন এবং বলেনঃ তোমরা রাত্রির অল্প সময় কিয়াম কর। এই ফরমানের পর হযরত আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত পাঠ করলেন। তাঁর এ উক্তিটি সঠিকও বটে। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে হিশাম (রঃ) তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন এবং মদীনার পথে যাত্রা শুরু করেন। উদ্দেশ্য এই যে, তিনি তাঁর সেখানকার ঘরবাড়ী বিক্রি করে ফেলবেন এবং ওর মূল্য দিয়ে অস্ত্র-শস্ত্র ইত্যাদি ক্রয় করে জিহাদে অংশগ্রহণ করবেন। তিনি রোমকদের সাথে লড়াই করতে থাকবেন। অতঃপর হয় রোম বিজিত হবে, না হয় তিনি শাহাদাত বরণ করবেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি তাঁর কওমের লোকদের সাথে মিলিত হন। এবং তাঁদের কাছে স্বীয় উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন। তাঁর এই সংকল্পের কথা শুনে তাঁরা বললেনঃ তাহলে শুনুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশায় আপনারই কওমের ছয়জন লোক এটাই সংকল্প করেছিল যে, তারা নিজেদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দিবে এবং ঘরবাড়ী ইত্যাদি বেচে দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে দাঁড়িয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে তাদেরকে ডেকে বললেনঃ “আমি কি তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ নই? খবরদার! এ কাজ করো না।” এভাবে তিনি তাদেরকে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে নিষেধ করেন। এ হাদীস শুনে হযরত সাঈদ (রাঃ) তাঁর ঐ সংকল্প ত্যাগ করেন এবং সেখানেই তাঁর কওমের লোকদেরকে বললেনঃ “তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলাম। তারপর তিনি সেখান হতে বিদায় নিয়ে স্বস্থানে চলে আসলেন। স্বীয় জামাআতের সাথে মিলিত হয়ে তিনি তাদেরকে বললেনঃ আমি এখান থেকে যাওয়ার পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামায পড়ার পদ্ধতি জিজ্ঞেস করি। তিনি উত্তরে বলেনঃ এ মাসআলাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) সবচেয়ে ভাল বলতে পারবেন। সুতরাং তুমি সেখানে গিয়ে তাঁকেই জিজ্ঞেস করো। তুমি তাঁর কাছে যা শুনবে তা আমাকেও বলে যেয়ো। আমি তখন হযরত হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং তাকে বললাম আমাকে একটু হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে নিয়ে চলুন। তিনি প্রথমে যেতে অস্বীকার করলেও আমার পীড়াপীড়িতে শেষে যেতে সম্মত হলেন। সুতরাং আমরা উভয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে গেলাম। হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত হাকীম (রাঃ)-এর গলার স্বর শুনেই তাঁকে চিনতে পারলেন এবং বললেন “কে, হাকীম?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমি হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সাথে ওটা কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এটা সাঈদ ইবনে হিশাম (রাঃ)।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোন হিশাম? আমিরের ছেলে হিশাম কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমিরের ছেলে হিশামই বটে।” এ কথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হযরত আমির (রাঃ)-এর জন্যে রহমতের দু’আ করলেন এবং বললেনঃ “আমির (রাঃ) খুব ভাল মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।” আমি তখন আরয করলামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল তা আমাকে অবহিত করুন। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি কি কুরআন পড়নি?” আমি উত্তর দিলাম ও হ্যাঁ, পড়েছি বটে। তিনি তখন বললেনঃ “কুরআনই তার চরিত্র।” আমি তখন তাঁর নিকট হতে বিদায় গ্রহণের অনুমতি চাওয়ার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু হঠাৎ আমার মনে পড়লো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) রাত্রির নামায সম্পর্কে প্রশ্ন করা দরকার। আমার এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি কি সূরা মুযযাম্মিল পড়নি?” আমি জবাব দিলামঃ হ্যাঁ, অবশ্যই পড়েছি। তিনি বললেনঃ “তাহলে শুনো। সূরার এই প্রথম ভাগে রাত্রির কিয়াম (দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদের নামায পড়া) ফরয করা হয় এবং এক বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ তাহাজ্জুদের নামায ফরয হিসেবে আদায় করতেন। এমন কি তাঁদের পা ফুলে যেতো। বারো মাস পরে এই সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং মহান আল্লাহ ভার লাঘব করে দেন। তাহাজ্জুদের নামাযকে তিনি ফরয হিসেবে না রেখে নফল হিসেবে রেখে দেন।” এবার আমি বিদায় গ্রহণের ইচ্ছা করলাম। কিন্তু বিতর নামাযের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করার কথা মনে পড়ে গেল। তাই আমি বললামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামাযের পদ্ধতিও আমাকে জানিয়ে দিন। তিনি তখন বললেনঃ শুননা, (রাত্রে) আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মিসওয়াক, অযুর পানি ইত্যাদি ঠিক করে একদিকে রেখে দিতাম। যখনই আল্লাহর ইচ্ছা হতো তিনি চক্ষু খুলতেন। তিনি উঠে মিসওয়াক করতেন ও অযু করতেন এবং আট রাকআত নামায পড়তেন। মধ্যে তাশাহহুদে মোটেই বসতেন না। আট রাকআত পূর্ণ করার পর তিনি আত্তাহিয়্যাতুতে বসতেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলার যিকির করতেন, দু'আ করতেন এবং সালাম না ফিরিয়েই উঠে পড়তেন। আর নবম রাকআত পড়ে যিকির ও দুআ করতেন এবং উচ্চ শব্দে সালাম ফিরাতেন। এ শব্দ আমরাও শুনতে পেতাম। তারপর বসে বসেই দুই রাকআত নামায পড়তেন। হে আমার প্রিয় পুত্র! সব মিলিয়ে মোট এগারো রাকআত হলো। অতঃপর যখন তাঁর বয়স বেশী হয় এবং দেহ ভারী হয়ে যায় তখন থেকে তিনি সাত রাকআত বিতর পড়ে সালাম ফিরাতেন এবং পরে বসে বসে দুই রাকআত নামায পড়তেন। সুতরাং হে প্রিয় বৎস! এটা নয় রাকআত হলো। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তিনি কোন নামায পড়তে শুরু করতেন তখন তা চিরস্থায়ীভাবে পড়তে থাকতেন। তবে হ্যাঁ, কোন ব্যবস্থা বা ঘুম অথবা দুঃখ কষ্টের কারণে কিংবা রোগের কারণে রাত্রে ঐ নামায পড়তে না পারলে দিনের বেলায় বারো রাকআত পড়ে নিতেন। আমার জানা নেই যে, তিনি গোটা কুরআন রাত থেকে নিয়ে সকাল পর্যন্ত পড়ে শেষ করেছেন এবং রমযান ছাড়া অন্য কোন পুরো মাসই রোযা রেখেছেন।” অতঃপর আমি উম্মুল মু'মিনিন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট হতে বিদায় নিয়ে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁর সামনে সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তরের পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি সবটারই সত্যতা স্বীকার করলেন এবং বললেনঃ “আমিও যদি তাঁর কাছে যাতায়াত করতে পারতাম তবে আমি নিজের কানে শুনে আসতাম।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মাদুর বিছিয়ে রাখতাম যার উপর তিনি তাহাজ্জুদের নামায আদায় করতেন। লোকেরা এ খবর জানতে পেরে রাত্রির নামাযেও তাঁর ইকতিদা করার জন্যে এসে পড়ে। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাগান্বিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। উম্মতের প্রতি তিনি বড়ই মেহেরবান ছিলেন এবং সাথে সাথে এ ভয়ও করতেন যে, হয়তো এ নামায ফরয হয়ে যাবে, তাই তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে লোক সকল! ঐ সব আমলের উপরই কষ্ট স্বীকার কর যেগুলো পালনের তোমাদের শক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পুণ্যদানে অপারগ হবেন না। বরং তোমরাই আমলে অপারগ হয়ে যাবে। ঐ আমলই সর্বাপেক্ষা উত্তম যার উপর চিরস্থায়ীভাবে থাকা হয়। এদিকে কুরআন কারীমে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং সাহাবীগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করে দেন এবং ঘুম যেন না আসে এ জন্যে তারা রশি বেঁধে লটকিতে লাগলেন। আট মাস এই ভাবেই কেটে গেল। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাঁদের এ চেষ্টা দেখে আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করলেন এবং রাত্রির কিয়ামকে এশার ফরয নামাযের দিকে ফিরিয়ে দিলেন। আর রাত্রির কিয়াম ছেড়ে দিলেন। (এ রিওয়াইয়াতটি মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও রয়েছে। কিন্তু এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ যুবাইদী দুর্বল। আসল হাদীস সূরা মুয্যাম্মিলের নাযিল হওয়ার উল্লেখ ছাড়া সহীহ গ্রন্থেও রয়েছে) এই হাদীসের শব্দাবলীর ভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী সূরা, অথচ প্রকৃতপক্ষে এ সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। অনুরূপভাবে এ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, আর্ট মাস পরে এর শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এই উক্তিটিও দুর্বল। সহীহ ওটাই যা মুসনাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বছর পরে শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা মুযযাম্মিলের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) রমযান শরীফের রাত্রির কিয়ামের মতই কিয়াম করতে শুরু করেন। আর এ সূরার প্রাথমিক ও শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার মাঝে প্রায় এক বছরের ব্যবধান ছিল। তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত আবূ উমামাহ (রাঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। হযরত আবূ আবদির রহমান (রঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর পর্যন্ত কিয়াম করেন, এমন কি তাদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। অতঃপর (আরবি) অবতীর্ণ হয় এবং তাঁরা শান্তি পান। হযরত হাসান বসরী (রঃ) হযরত সুদ্দীরও (রঃ) উক্তি এটাই। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ রিওয়াইয়াতটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে ষোল মাসের সময়কালের সাথে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর বা দু’বছর পর্যন্ত কিয়াম করতে থাকেন। তাঁদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। তারপর সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তাঁদের ভার লাঘব হয়ে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) দশ বছরের মেয়াদের কথা বলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলোর হুকুম অনুযায়ী মুমিনগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করেন, কিন্তু তাঁদের খুবই কষ্ট হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি দয়া করেন এবং (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন এভাবে তাঁদের প্রতি প্রশস্ততা আনয়ন করেন এবং সংকীর্ণতা দূরীভূত করেন। সুতরাং আল্লাহ তা’আলারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁতে মগ্ন হও। অর্থাৎ দুনিয়ার কাজ-কারবার হতে অবসর লাভ করে প্রশান্তির সাথে খুব বেশী বেশী তার যিকির করতে থাকো, তার দিকে ঝুঁকে পড়ে তাঁর প্রতি মনোনিবেশ কর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতএব যখনই অবসর পাও সাবধান করো।” একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) অর্থাৎ স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং দুনিয়া ছেড়ে দিতে নিষেধ করেছেন। এখানে ভাবার্থ হচ্ছেঃ হে নবী (সঃ)! পার্থিব সৃষ্টিকূল হতে সম্পর্ক চ্ছিন্ন করে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করার একটা সময় অবশ্যই নির্দিষ্ট করে নাও। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই হলেন মালিক ও ব্যবস্থাপক। পূর্ব ও পশ্চিম সবই তাঁর অধিকারভুক্ত। তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউ নেই। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি যেমন এই আল্লাহরই ইবাদত করছো, তেমনই একমাত্র তার উপরই নির্ভরশীল হয়ে যাও। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারই ইবাদত কর এবং তার উপর ভরসা কর।” এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ “আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।” এই অর্থের আরো বহু আয়াত রয়েছে যে, ইবাদত, আনুগত্য এবং ভরসা করার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ।

আল-মুযযাম্মিল 73:5

মুসনাদে বাযযারে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরায়েশরা দারুণ নদুওয়াতে একত্রিত হয়ে পরস্পর বলাবলি করলোঃ এসো, আমরা এই ব্যক্তির (হযরত মুহাম্মাদ সঃ)-এর এমন এক নাম স্থির করি যে, সবারই মুখ দিয়ে এই নামই বের হবে, যাতে বাইরের লোকেরা একই আওয়ায শুনে যায়। তখন কেউ কেউ বললো যে, তার নাম ‘কাহিন' বা গণক রাখা হোক। একথা শুনে অন্যেরা বললো যে, প্রকৃতপক্ষে সে তো ‘কাহিন’ বা গণক নয়। আর একটি প্রস্তাব উঠলো যে, তাহলে এর নাম ‘মাজনুন' বা পাগল রাখা হোক। এর উপরও অন্যেরা আপত্তি উঠালো যে, সে পাগলও নয়। এরপর প্রস্তাব রাখা হলো যে, এর নাম ‘সাহির’ বা যাদুকর রাখা হোক। কিন্তু এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যাত হলো। কারণ বলা হলো যে, সে ‘সাহির’ বা যাদুকরও নয়। মোটকথা তারা তাঁর এমন কোন খারাপ নাম স্থির করতে পারলো না যাতে সবাই একমত হতে পারে। এভাবেই ঐ মজলিস ভেঙ্গে গেল। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আসলেন এবং “হে বস্ত্রাবৃত' বলে তাঁকে সম্বোধন করলেন। (এই বর্ণনার একজন বর্ণনাকারী মুআল্লা ইবনে আবদির রহমানের নিকট হতে যদিও আহলে ইলমের একটি দল রিওয়াইয়াত নিয়ে থাকেন এবং তার থেকে হাদীস বর্ণনা করে থাকেন, কিন্তু তাঁর রিওয়াইয়াত সমূহের মধ্যে এমন বহু হাদীস রয়েছে যেগুলোর উপর তাঁর অনুসরণ করা যায় না) ১-৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন রাত্রিকালে কাপড় জড়িয়ে শয়ন করা পরিত্যাগ করেন এবং তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়িয়ে থাকার কাজ অবলম্বন করেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায়, আর আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে।” (৩২:১৬) রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা জীবন এ হুকুম পালন করে গেছেন। তাহাজ্জুদের নামায শুধু তাঁর উপর ফরয ছিল। অর্থাৎ এ নামায তাঁর উম্মতের উপর ওয়াজিব নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং তুমি রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে; এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় যে, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯) এই হুকুমের সাথে সাথে পরিমাণও বর্ণনা করে দিলেন যে, অর্ধেক রাত্রি বা কিছু কম-বেশী।(আরবি) বলা হয় শয়নকারী ও বস্ত্রাবৃত ব্যক্তিকে। আবার এ অর্থও করা হয়েছেঃ হে কুরআনকে উত্তম রূপে গ্রহণকারী! তুমি অর্ধরাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামাযে মগ্ন থাকো। অথবা কিছু কম বেশী করো। আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে, যাতে ভালভাবে বুঝতে পারা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হুকুম ও বরাবর পালন করে এসেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীম খুবই ধীরে ধীরে ও থেমে থেমে পাঠ করতেন। ফলে খুব দেরীতে সূরা শেষ হতো। ছোট সূরাও যেন বড় হয়ে যেতো। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুব টেনে টেনে পাঠ করতেন।” তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করে শুনিয়ে দেন, যাতে তিনি (আরবি) এবং (আরবি) শব্দের উপর মদ করেন অর্থাৎ ওগুলো দীর্ঘ করে পড়েন।ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেকটি আয়াতের উপর পূর্ণ ওয়াকফ করতেন বা থামতেন। যেমন (আরবি)পড়ে থামতেন, (আরবি) পড়ে থামতেন (আরবি) এর উপর ওয়াফ করতেন এবং (আরবি) পড়ে থামতেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবী দাউদ এবং ‘জামে’ তিরমিযীতেও রয়েছে)মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআনের পাঠককে কিয়ামতের দিন বলা হবেঃ ‘পড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে ও স্পষ্টভাবে পড়তে থাকো যেমন দুনিয়ায় পড়তে। তোমার মনযিল ও মরতবা হলো ওটা যেখানে তোমার আখিরী আয়াত শেষ হয়। (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদ, জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন) আমরা এই তাফসীরের শুরুতে ঐ সব হাদীস আনয়ন করেছি যেগুলো ধীরে ধীরে পাঠ মুস্তাহাব হওয়া এবং ভাল ও মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করার কথা বলে দেয়। যেমন এ হাদীসটি, যাতে রয়েছেঃ কুরআনকে স্বীয় সুর দ্বারা সৌন্দৰ্য্য মণ্ডিত কর এবং ঐ ব্যক্তি আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করে না। আর হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথা বলাঃ “তাকে হযরত দাউদ (আঃ)-এর বংশধর এর মধুর সুর দান করা হয়েছে এবং হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-এর একথা বলাঃ “আমি যদি জানতাম যে, আপনি আমার কুরআন পাঠ শুনছেন তবে আমি আরো উত্তম ও মধুর সুরে পড়তাম।" আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর এ কথা বলাঃ “বালুকার মত কুরআনকে ছড়িয়ে দিয়ো না এবং কবিতার মত কুরআনকে অভদ্রতার সাথে। পড়ো না, ওর চমৎকারিত্বের প্রতি খেয়াল রেখো এবং অন্তরে তা ক্রিয়াশীল করো। আর সূরা তাড়াতাড়ি শেষ করার পিছনে লেগে পড়ো না।” (এটা ইমাম বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) একটি লোক এসে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বললোঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা আজ রাত্রে একই রাকআতে পাঠ করে ফেলেছি।" তার একথা শুনে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “তা হলে সম্ভবতঃ তুমি কবিতার মত তাড়াতাড়ি করে পাঠ করে থাকবে। ঐ সূরাগুলো আমার বেশ মুখস্থ আছে যেগুলি রাসুলুল্লাহ (সঃ) মিলিয়ে পড়তেন। তারপর তিনি মুফাসসাল সূরাগুলোর মধ্যে বিশিষ্ট সূরার নাম লিখেন যেগুলোর দু’টি করে সূরা মিলিত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক এক রাকআতে পাঠ করতেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করছি গুরুভার বাণী। অর্থাৎ তা আমল করতেও ভারী হবে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও বৃহত্তের কারণে অবতীর্ণ হওয়ার সময়েও খুবই কষ্টদায়ক হবে। যেমন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় তার উরু আমার উরুর উপর ছিল। তখন ওহীর বোঝা আমার উপর এমন ভারীবোধ হলো যে, আমার ভয় হলো না জানি হয়তো আমার উরু ভেঙ্গেই যাবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় আপনি কিছু অনুভব করেন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমি এমন শব্দ শুনতে পাই যেমন কোন জিঞ্জীরের শব্দ হয়। আমি নিঃশব্দ হয়ে পড়ি। যখনই ওহী অবতীর্ণ হয় তখন তা আমার উপর এমন বোঝা স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায় যে, আমার মনে হয় যেন আমার প্রাণই বেরিয়ে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হারিস ইবনে হিশাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার কাছে ওহী কিভাবে আসে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “কখনো কখনো খুবই কষ্ট হয়। কিন্তু এ সত্ত্বেও ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায় শেষ হওয়ার সাথে সাথে ওহী আমার মুখস্থ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে আগমন করে ও ওহী অবতীর্ণ করেন। তিনি কথা বলতে থাকেন এবং আমি তা মুখস্থ করতে থাকি।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি একবার নবী (সঃ)-কে এমন অবস্থায় দেখেছি যে, তার উপর ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। তখন শীতকাল ছিল। এতদসত্ত্বেও তাঁর ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং ঘর্ম টপ টপ করে পড়ছিল।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন কোন সময় উষ্ট্রীর উপর সওয়ার থাকতেন এবং ঐ অবস্থাতেই তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হতো। তখন উন্ত্রী ওহীর ভারে ঝুঁকে পড়তো। তাফসীরে ইবনে জারীরে এও রয়েছে যে, অতঃপর যে পর্যন্ত ওহী বন্ধ না হতো উষ্ট্ৰী নড়তে পারতো না এবং তার গর্দান উঁচু হতো না। ভাবার্থ এই যে, স্বয়ং ওহীর ভার বহন করা কঠিন ছিল। এবং আহকাম পালন করাও ছিল অনুরূপ কঠিন। হযরত ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি এটাই। হযরত আবদুর রহমান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দুনিয়াতে যেমন এটা ভারী কাজ, তেমনই আখিরাতেও এর প্রতিদান ও পুরস্কার ভারী হবে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অবশ্য রাত্রিকালের উত্থান দলনে প্রবলতর এবং বাক্য স্ফুরণে সঠিক। আবিসিনীয় ভাষায় (আরবি) শব্দের অর্থ হলো দাঁড়িয়ে থাকা। সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকলে (আরবি) বলা হয়। তাহাজ্জুদের নামাযের উৎকৃষ্টতা এই যে, এর ফলে অন্তর ও রসনা এক হয়ে যায়। তিলাওয়াতের যে শব্দগুলো মুখ দিয়ে বের হয় তা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। দিনের তুলনায় রাত্রির নির্জনতায় অর্থ ও ভাব অন্তরে ভালভাবে গেঁথে যায়। কেননা দিবস হলো কোলাহল ও অর্থোপার্জনের সময়।হযরত আনাস (রাঃ) (আরবি) কে (আরবি) পড়লে জনগণ বলে ওঠেঃ আমরাতো (আরবি) পড়ে (আরবি) থাকি? উত্তরে তিনি বলেনঃ (আরবি) এবং একই অর্থবোধক শব্দ।ইরশাদ হচ্ছেঃ (হে নবী সঃ)! দিবাভাগে তোমার জন্যে রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। তুমি শুয়ে-বসে থাকতে পার, বিশ্রাম করতে পার, বেশী বেশী নফল আদায় করতে পার এবং তোমার পার্থিব কাজ-কাম সম্পন্ন করতে পার। অতএব রাত্রিকে তুমি তোমার আখিরাতের কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে নাও। এ হুকুম ঐ সময় ছিল যখন রাত্রির নামায ফরয ছিল। তারপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় বান্দাদের উপর অনুগ্রহ করেন এবং হালকাকরণের জন্যে রাত্রির কিয়ামের সময় হ্রাস করে দেন এবং বলেনঃ তোমরা রাত্রির অল্প সময় কিয়াম কর। এই ফরমানের পর হযরত আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত পাঠ করলেন। তাঁর এ উক্তিটি সঠিকও বটে। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে হিশাম (রঃ) তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন এবং মদীনার পথে যাত্রা শুরু করেন। উদ্দেশ্য এই যে, তিনি তাঁর সেখানকার ঘরবাড়ী বিক্রি করে ফেলবেন এবং ওর মূল্য দিয়ে অস্ত্র-শস্ত্র ইত্যাদি ক্রয় করে জিহাদে অংশগ্রহণ করবেন। তিনি রোমকদের সাথে লড়াই করতে থাকবেন। অতঃপর হয় রোম বিজিত হবে, না হয় তিনি শাহাদাত বরণ করবেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি তাঁর কওমের লোকদের সাথে মিলিত হন। এবং তাঁদের কাছে স্বীয় উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন। তাঁর এই সংকল্পের কথা শুনে তাঁরা বললেনঃ তাহলে শুনুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশায় আপনারই কওমের ছয়জন লোক এটাই সংকল্প করেছিল যে, তারা নিজেদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দিবে এবং ঘরবাড়ী ইত্যাদি বেচে দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে দাঁড়িয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে তাদেরকে ডেকে বললেনঃ “আমি কি তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ নই? খবরদার! এ কাজ করো না।” এভাবে তিনি তাদেরকে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে নিষেধ করেন। এ হাদীস শুনে হযরত সাঈদ (রাঃ) তাঁর ঐ সংকল্প ত্যাগ করেন এবং সেখানেই তাঁর কওমের লোকদেরকে বললেনঃ “তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলাম। তারপর তিনি সেখান হতে বিদায় নিয়ে স্বস্থানে চলে আসলেন। স্বীয় জামাআতের সাথে মিলিত হয়ে তিনি তাদেরকে বললেনঃ আমি এখান থেকে যাওয়ার পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামায পড়ার পদ্ধতি জিজ্ঞেস করি। তিনি উত্তরে বলেনঃ এ মাসআলাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) সবচেয়ে ভাল বলতে পারবেন। সুতরাং তুমি সেখানে গিয়ে তাঁকেই জিজ্ঞেস করো। তুমি তাঁর কাছে যা শুনবে তা আমাকেও বলে যেয়ো। আমি তখন হযরত হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং তাকে বললাম আমাকে একটু হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে নিয়ে চলুন। তিনি প্রথমে যেতে অস্বীকার করলেও আমার পীড়াপীড়িতে শেষে যেতে সম্মত হলেন। সুতরাং আমরা উভয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে গেলাম। হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত হাকীম (রাঃ)-এর গলার স্বর শুনেই তাঁকে চিনতে পারলেন এবং বললেন “কে, হাকীম?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমি হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সাথে ওটা কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এটা সাঈদ ইবনে হিশাম (রাঃ)।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোন হিশাম? আমিরের ছেলে হিশাম কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমিরের ছেলে হিশামই বটে।” এ কথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হযরত আমির (রাঃ)-এর জন্যে রহমতের দু’আ করলেন এবং বললেনঃ “আমির (রাঃ) খুব ভাল মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।” আমি তখন আরয করলামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল তা আমাকে অবহিত করুন। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি কি কুরআন পড়নি?” আমি উত্তর দিলাম ও হ্যাঁ, পড়েছি বটে। তিনি তখন বললেনঃ “কুরআনই তার চরিত্র।” আমি তখন তাঁর নিকট হতে বিদায় গ্রহণের অনুমতি চাওয়ার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু হঠাৎ আমার মনে পড়লো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) রাত্রির নামায সম্পর্কে প্রশ্ন করা দরকার। আমার এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি কি সূরা মুযযাম্মিল পড়নি?” আমি জবাব দিলামঃ হ্যাঁ, অবশ্যই পড়েছি। তিনি বললেনঃ “তাহলে শুনো। সূরার এই প্রথম ভাগে রাত্রির কিয়াম (দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদের নামায পড়া) ফরয করা হয় এবং এক বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ তাহাজ্জুদের নামায ফরয হিসেবে আদায় করতেন। এমন কি তাঁদের পা ফুলে যেতো। বারো মাস পরে এই সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং মহান আল্লাহ ভার লাঘব করে দেন। তাহাজ্জুদের নামাযকে তিনি ফরয হিসেবে না রেখে নফল হিসেবে রেখে দেন।” এবার আমি বিদায় গ্রহণের ইচ্ছা করলাম। কিন্তু বিতর নামাযের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করার কথা মনে পড়ে গেল। তাই আমি বললামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামাযের পদ্ধতিও আমাকে জানিয়ে দিন। তিনি তখন বললেনঃ শুননা, (রাত্রে) আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মিসওয়াক, অযুর পানি ইত্যাদি ঠিক করে একদিকে রেখে দিতাম। যখনই আল্লাহর ইচ্ছা হতো তিনি চক্ষু খুলতেন। তিনি উঠে মিসওয়াক করতেন ও অযু করতেন এবং আট রাকআত নামায পড়তেন। মধ্যে তাশাহহুদে মোটেই বসতেন না। আট রাকআত পূর্ণ করার পর তিনি আত্তাহিয়্যাতুতে বসতেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলার যিকির করতেন, দু'আ করতেন এবং সালাম না ফিরিয়েই উঠে পড়তেন। আর নবম রাকআত পড়ে যিকির ও দুআ করতেন এবং উচ্চ শব্দে সালাম ফিরাতেন। এ শব্দ আমরাও শুনতে পেতাম। তারপর বসে বসেই দুই রাকআত নামায পড়তেন। হে আমার প্রিয় পুত্র! সব মিলিয়ে মোট এগারো রাকআত হলো। অতঃপর যখন তাঁর বয়স বেশী হয় এবং দেহ ভারী হয়ে যায় তখন থেকে তিনি সাত রাকআত বিতর পড়ে সালাম ফিরাতেন এবং পরে বসে বসে দুই রাকআত নামায পড়তেন। সুতরাং হে প্রিয় বৎস! এটা নয় রাকআত হলো। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তিনি কোন নামায পড়তে শুরু করতেন তখন তা চিরস্থায়ীভাবে পড়তে থাকতেন। তবে হ্যাঁ, কোন ব্যবস্থা বা ঘুম অথবা দুঃখ কষ্টের কারণে কিংবা রোগের কারণে রাত্রে ঐ নামায পড়তে না পারলে দিনের বেলায় বারো রাকআত পড়ে নিতেন। আমার জানা নেই যে, তিনি গোটা কুরআন রাত থেকে নিয়ে সকাল পর্যন্ত পড়ে শেষ করেছেন এবং রমযান ছাড়া অন্য কোন পুরো মাসই রোযা রেখেছেন।” অতঃপর আমি উম্মুল মু'মিনিন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট হতে বিদায় নিয়ে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁর সামনে সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তরের পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি সবটারই সত্যতা স্বীকার করলেন এবং বললেনঃ “আমিও যদি তাঁর কাছে যাতায়াত করতে পারতাম তবে আমি নিজের কানে শুনে আসতাম।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মাদুর বিছিয়ে রাখতাম যার উপর তিনি তাহাজ্জুদের নামায আদায় করতেন। লোকেরা এ খবর জানতে পেরে রাত্রির নামাযেও তাঁর ইকতিদা করার জন্যে এসে পড়ে। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাগান্বিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। উম্মতের প্রতি তিনি বড়ই মেহেরবান ছিলেন এবং সাথে সাথে এ ভয়ও করতেন যে, হয়তো এ নামায ফরয হয়ে যাবে, তাই তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে লোক সকল! ঐ সব আমলের উপরই কষ্ট স্বীকার কর যেগুলো পালনের তোমাদের শক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পুণ্যদানে অপারগ হবেন না। বরং তোমরাই আমলে অপারগ হয়ে যাবে। ঐ আমলই সর্বাপেক্ষা উত্তম যার উপর চিরস্থায়ীভাবে থাকা হয়। এদিকে কুরআন কারীমে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং সাহাবীগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করে দেন এবং ঘুম যেন না আসে এ জন্যে তারা রশি বেঁধে লটকিতে লাগলেন। আট মাস এই ভাবেই কেটে গেল। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাঁদের এ চেষ্টা দেখে আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করলেন এবং রাত্রির কিয়ামকে এশার ফরয নামাযের দিকে ফিরিয়ে দিলেন। আর রাত্রির কিয়াম ছেড়ে দিলেন। (এ রিওয়াইয়াতটি মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও রয়েছে। কিন্তু এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ যুবাইদী দুর্বল। আসল হাদীস সূরা মুয্যাম্মিলের নাযিল হওয়ার উল্লেখ ছাড়া সহীহ গ্রন্থেও রয়েছে) এই হাদীসের শব্দাবলীর ভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী সূরা, অথচ প্রকৃতপক্ষে এ সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। অনুরূপভাবে এ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, আর্ট মাস পরে এর শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এই উক্তিটিও দুর্বল। সহীহ ওটাই যা মুসনাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বছর পরে শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা মুযযাম্মিলের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) রমযান শরীফের রাত্রির কিয়ামের মতই কিয়াম করতে শুরু করেন। আর এ সূরার প্রাথমিক ও শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার মাঝে প্রায় এক বছরের ব্যবধান ছিল। তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত আবূ উমামাহ (রাঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। হযরত আবূ আবদির রহমান (রঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর পর্যন্ত কিয়াম করেন, এমন কি তাদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। অতঃপর (আরবি) অবতীর্ণ হয় এবং তাঁরা শান্তি পান। হযরত হাসান বসরী (রঃ) হযরত সুদ্দীরও (রঃ) উক্তি এটাই। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ রিওয়াইয়াতটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে ষোল মাসের সময়কালের সাথে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর বা দু’বছর পর্যন্ত কিয়াম করতে থাকেন। তাঁদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। তারপর সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তাঁদের ভার লাঘব হয়ে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) দশ বছরের মেয়াদের কথা বলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলোর হুকুম অনুযায়ী মুমিনগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করেন, কিন্তু তাঁদের খুবই কষ্ট হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি দয়া করেন এবং (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন এভাবে তাঁদের প্রতি প্রশস্ততা আনয়ন করেন এবং সংকীর্ণতা দূরীভূত করেন। সুতরাং আল্লাহ তা’আলারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁতে মগ্ন হও। অর্থাৎ দুনিয়ার কাজ-কারবার হতে অবসর লাভ করে প্রশান্তির সাথে খুব বেশী বেশী তার যিকির করতে থাকো, তার দিকে ঝুঁকে পড়ে তাঁর প্রতি মনোনিবেশ কর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতএব যখনই অবসর পাও সাবধান করো।” একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) অর্থাৎ স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং দুনিয়া ছেড়ে দিতে নিষেধ করেছেন। এখানে ভাবার্থ হচ্ছেঃ হে নবী (সঃ)! পার্থিব সৃষ্টিকূল হতে সম্পর্ক চ্ছিন্ন করে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করার একটা সময় অবশ্যই নির্দিষ্ট করে নাও। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই হলেন মালিক ও ব্যবস্থাপক। পূর্ব ও পশ্চিম সবই তাঁর অধিকারভুক্ত। তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউ নেই। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি যেমন এই আল্লাহরই ইবাদত করছো, তেমনই একমাত্র তার উপরই নির্ভরশীল হয়ে যাও। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারই ইবাদত কর এবং তার উপর ভরসা কর।” এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ “আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।” এই অর্থের আরো বহু আয়াত রয়েছে যে, ইবাদত, আনুগত্য এবং ভরসা করার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ।

আল-মুযযাম্মিল 73:6

মুসনাদে বাযযারে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরায়েশরা দারুণ নদুওয়াতে একত্রিত হয়ে পরস্পর বলাবলি করলোঃ এসো, আমরা এই ব্যক্তির (হযরত মুহাম্মাদ সঃ)-এর এমন এক নাম স্থির করি যে, সবারই মুখ দিয়ে এই নামই বের হবে, যাতে বাইরের লোকেরা একই আওয়ায শুনে যায়। তখন কেউ কেউ বললো যে, তার নাম ‘কাহিন' বা গণক রাখা হোক। একথা শুনে অন্যেরা বললো যে, প্রকৃতপক্ষে সে তো ‘কাহিন’ বা গণক নয়। আর একটি প্রস্তাব উঠলো যে, তাহলে এর নাম ‘মাজনুন' বা পাগল রাখা হোক। এর উপরও অন্যেরা আপত্তি উঠালো যে, সে পাগলও নয়। এরপর প্রস্তাব রাখা হলো যে, এর নাম ‘সাহির’ বা যাদুকর রাখা হোক। কিন্তু এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যাত হলো। কারণ বলা হলো যে, সে ‘সাহির’ বা যাদুকরও নয়। মোটকথা তারা তাঁর এমন কোন খারাপ নাম স্থির করতে পারলো না যাতে সবাই একমত হতে পারে। এভাবেই ঐ মজলিস ভেঙ্গে গেল। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আসলেন এবং “হে বস্ত্রাবৃত' বলে তাঁকে সম্বোধন করলেন। (এই বর্ণনার একজন বর্ণনাকারী মুআল্লা ইবনে আবদির রহমানের নিকট হতে যদিও আহলে ইলমের একটি দল রিওয়াইয়াত নিয়ে থাকেন এবং তার থেকে হাদীস বর্ণনা করে থাকেন, কিন্তু তাঁর রিওয়াইয়াত সমূহের মধ্যে এমন বহু হাদীস রয়েছে যেগুলোর উপর তাঁর অনুসরণ করা যায় না) ১-৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন রাত্রিকালে কাপড় জড়িয়ে শয়ন করা পরিত্যাগ করেন এবং তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়িয়ে থাকার কাজ অবলম্বন করেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায়, আর আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে।” (৩২:১৬) রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা জীবন এ হুকুম পালন করে গেছেন। তাহাজ্জুদের নামায শুধু তাঁর উপর ফরয ছিল। অর্থাৎ এ নামায তাঁর উম্মতের উপর ওয়াজিব নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং তুমি রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে; এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় যে, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯) এই হুকুমের সাথে সাথে পরিমাণও বর্ণনা করে দিলেন যে, অর্ধেক রাত্রি বা কিছু কম-বেশী।(আরবি) বলা হয় শয়নকারী ও বস্ত্রাবৃত ব্যক্তিকে। আবার এ অর্থও করা হয়েছেঃ হে কুরআনকে উত্তম রূপে গ্রহণকারী! তুমি অর্ধরাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামাযে মগ্ন থাকো। অথবা কিছু কম বেশী করো। আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে, যাতে ভালভাবে বুঝতে পারা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হুকুম ও বরাবর পালন করে এসেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীম খুবই ধীরে ধীরে ও থেমে থেমে পাঠ করতেন। ফলে খুব দেরীতে সূরা শেষ হতো। ছোট সূরাও যেন বড় হয়ে যেতো। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুব টেনে টেনে পাঠ করতেন।” তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করে শুনিয়ে দেন, যাতে তিনি (আরবি) এবং (আরবি) শব্দের উপর মদ করেন অর্থাৎ ওগুলো দীর্ঘ করে পড়েন।ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেকটি আয়াতের উপর পূর্ণ ওয়াকফ করতেন বা থামতেন। যেমন (আরবি)পড়ে থামতেন, (আরবি) পড়ে থামতেন (আরবি) এর উপর ওয়াফ করতেন এবং (আরবি) পড়ে থামতেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবী দাউদ এবং ‘জামে’ তিরমিযীতেও রয়েছে)মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআনের পাঠককে কিয়ামতের দিন বলা হবেঃ ‘পড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে ও স্পষ্টভাবে পড়তে থাকো যেমন দুনিয়ায় পড়তে। তোমার মনযিল ও মরতবা হলো ওটা যেখানে তোমার আখিরী আয়াত শেষ হয়। (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদ, জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন) আমরা এই তাফসীরের শুরুতে ঐ সব হাদীস আনয়ন করেছি যেগুলো ধীরে ধীরে পাঠ মুস্তাহাব হওয়া এবং ভাল ও মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করার কথা বলে দেয়। যেমন এ হাদীসটি, যাতে রয়েছেঃ কুরআনকে স্বীয় সুর দ্বারা সৌন্দৰ্য্য মণ্ডিত কর এবং ঐ ব্যক্তি আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করে না। আর হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথা বলাঃ “তাকে হযরত দাউদ (আঃ)-এর বংশধর এর মধুর সুর দান করা হয়েছে এবং হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-এর একথা বলাঃ “আমি যদি জানতাম যে, আপনি আমার কুরআন পাঠ শুনছেন তবে আমি আরো উত্তম ও মধুর সুরে পড়তাম।" আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর এ কথা বলাঃ “বালুকার মত কুরআনকে ছড়িয়ে দিয়ো না এবং কবিতার মত কুরআনকে অভদ্রতার সাথে। পড়ো না, ওর চমৎকারিত্বের প্রতি খেয়াল রেখো এবং অন্তরে তা ক্রিয়াশীল করো। আর সূরা তাড়াতাড়ি শেষ করার পিছনে লেগে পড়ো না।” (এটা ইমাম বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) একটি লোক এসে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বললোঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা আজ রাত্রে একই রাকআতে পাঠ করে ফেলেছি।" তার একথা শুনে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “তা হলে সম্ভবতঃ তুমি কবিতার মত তাড়াতাড়ি করে পাঠ করে থাকবে। ঐ সূরাগুলো আমার বেশ মুখস্থ আছে যেগুলি রাসুলুল্লাহ (সঃ) মিলিয়ে পড়তেন। তারপর তিনি মুফাসসাল সূরাগুলোর মধ্যে বিশিষ্ট সূরার নাম লিখেন যেগুলোর দু’টি করে সূরা মিলিত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক এক রাকআতে পাঠ করতেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করছি গুরুভার বাণী। অর্থাৎ তা আমল করতেও ভারী হবে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও বৃহত্তের কারণে অবতীর্ণ হওয়ার সময়েও খুবই কষ্টদায়ক হবে। যেমন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় তার উরু আমার উরুর উপর ছিল। তখন ওহীর বোঝা আমার উপর এমন ভারীবোধ হলো যে, আমার ভয় হলো না জানি হয়তো আমার উরু ভেঙ্গেই যাবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় আপনি কিছু অনুভব করেন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমি এমন শব্দ শুনতে পাই যেমন কোন জিঞ্জীরের শব্দ হয়। আমি নিঃশব্দ হয়ে পড়ি। যখনই ওহী অবতীর্ণ হয় তখন তা আমার উপর এমন বোঝা স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায় যে, আমার মনে হয় যেন আমার প্রাণই বেরিয়ে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হারিস ইবনে হিশাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার কাছে ওহী কিভাবে আসে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “কখনো কখনো খুবই কষ্ট হয়। কিন্তু এ সত্ত্বেও ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায় শেষ হওয়ার সাথে সাথে ওহী আমার মুখস্থ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে আগমন করে ও ওহী অবতীর্ণ করেন। তিনি কথা বলতে থাকেন এবং আমি তা মুখস্থ করতে থাকি।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি একবার নবী (সঃ)-কে এমন অবস্থায় দেখেছি যে, তার উপর ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। তখন শীতকাল ছিল। এতদসত্ত্বেও তাঁর ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং ঘর্ম টপ টপ করে পড়ছিল।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন কোন সময় উষ্ট্রীর উপর সওয়ার থাকতেন এবং ঐ অবস্থাতেই তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হতো। তখন উন্ত্রী ওহীর ভারে ঝুঁকে পড়তো। তাফসীরে ইবনে জারীরে এও রয়েছে যে, অতঃপর যে পর্যন্ত ওহী বন্ধ না হতো উষ্ট্ৰী নড়তে পারতো না এবং তার গর্দান উঁচু হতো না। ভাবার্থ এই যে, স্বয়ং ওহীর ভার বহন করা কঠিন ছিল। এবং আহকাম পালন করাও ছিল অনুরূপ কঠিন। হযরত ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি এটাই। হযরত আবদুর রহমান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দুনিয়াতে যেমন এটা ভারী কাজ, তেমনই আখিরাতেও এর প্রতিদান ও পুরস্কার ভারী হবে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অবশ্য রাত্রিকালের উত্থান দলনে প্রবলতর এবং বাক্য স্ফুরণে সঠিক। আবিসিনীয় ভাষায় (আরবি) শব্দের অর্থ হলো দাঁড়িয়ে থাকা। সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকলে (আরবি) বলা হয়। তাহাজ্জুদের নামাযের উৎকৃষ্টতা এই যে, এর ফলে অন্তর ও রসনা এক হয়ে যায়। তিলাওয়াতের যে শব্দগুলো মুখ দিয়ে বের হয় তা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। দিনের তুলনায় রাত্রির নির্জনতায় অর্থ ও ভাব অন্তরে ভালভাবে গেঁথে যায়। কেননা দিবস হলো কোলাহল ও অর্থোপার্জনের সময়।হযরত আনাস (রাঃ) (আরবি) কে (আরবি) পড়লে জনগণ বলে ওঠেঃ আমরাতো (আরবি) পড়ে (আরবি) থাকি? উত্তরে তিনি বলেনঃ (আরবি) এবং একই অর্থবোধক শব্দ।ইরশাদ হচ্ছেঃ (হে নবী সঃ)! দিবাভাগে তোমার জন্যে রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। তুমি শুয়ে-বসে থাকতে পার, বিশ্রাম করতে পার, বেশী বেশী নফল আদায় করতে পার এবং তোমার পার্থিব কাজ-কাম সম্পন্ন করতে পার। অতএব রাত্রিকে তুমি তোমার আখিরাতের কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে নাও। এ হুকুম ঐ সময় ছিল যখন রাত্রির নামায ফরয ছিল। তারপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় বান্দাদের উপর অনুগ্রহ করেন এবং হালকাকরণের জন্যে রাত্রির কিয়ামের সময় হ্রাস করে দেন এবং বলেনঃ তোমরা রাত্রির অল্প সময় কিয়াম কর। এই ফরমানের পর হযরত আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত পাঠ করলেন। তাঁর এ উক্তিটি সঠিকও বটে। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে হিশাম (রঃ) তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন এবং মদীনার পথে যাত্রা শুরু করেন। উদ্দেশ্য এই যে, তিনি তাঁর সেখানকার ঘরবাড়ী বিক্রি করে ফেলবেন এবং ওর মূল্য দিয়ে অস্ত্র-শস্ত্র ইত্যাদি ক্রয় করে জিহাদে অংশগ্রহণ করবেন। তিনি রোমকদের সাথে লড়াই করতে থাকবেন। অতঃপর হয় রোম বিজিত হবে, না হয় তিনি শাহাদাত বরণ করবেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি তাঁর কওমের লোকদের সাথে মিলিত হন। এবং তাঁদের কাছে স্বীয় উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন। তাঁর এই সংকল্পের কথা শুনে তাঁরা বললেনঃ তাহলে শুনুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশায় আপনারই কওমের ছয়জন লোক এটাই সংকল্প করেছিল যে, তারা নিজেদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দিবে এবং ঘরবাড়ী ইত্যাদি বেচে দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে দাঁড়িয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে তাদেরকে ডেকে বললেনঃ “আমি কি তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ নই? খবরদার! এ কাজ করো না।” এভাবে তিনি তাদেরকে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে নিষেধ করেন। এ হাদীস শুনে হযরত সাঈদ (রাঃ) তাঁর ঐ সংকল্প ত্যাগ করেন এবং সেখানেই তাঁর কওমের লোকদেরকে বললেনঃ “তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলাম। তারপর তিনি সেখান হতে বিদায় নিয়ে স্বস্থানে চলে আসলেন। স্বীয় জামাআতের সাথে মিলিত হয়ে তিনি তাদেরকে বললেনঃ আমি এখান থেকে যাওয়ার পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামায পড়ার পদ্ধতি জিজ্ঞেস করি। তিনি উত্তরে বলেনঃ এ মাসআলাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) সবচেয়ে ভাল বলতে পারবেন। সুতরাং তুমি সেখানে গিয়ে তাঁকেই জিজ্ঞেস করো। তুমি তাঁর কাছে যা শুনবে তা আমাকেও বলে যেয়ো। আমি তখন হযরত হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং তাকে বললাম আমাকে একটু হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে নিয়ে চলুন। তিনি প্রথমে যেতে অস্বীকার করলেও আমার পীড়াপীড়িতে শেষে যেতে সম্মত হলেন। সুতরাং আমরা উভয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে গেলাম। হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত হাকীম (রাঃ)-এর গলার স্বর শুনেই তাঁকে চিনতে পারলেন এবং বললেন “কে, হাকীম?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমি হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সাথে ওটা কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এটা সাঈদ ইবনে হিশাম (রাঃ)।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোন হিশাম? আমিরের ছেলে হিশাম কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমিরের ছেলে হিশামই বটে।” এ কথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হযরত আমির (রাঃ)-এর জন্যে রহমতের দু’আ করলেন এবং বললেনঃ “আমির (রাঃ) খুব ভাল মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।” আমি তখন আরয করলামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল তা আমাকে অবহিত করুন। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি কি কুরআন পড়নি?” আমি উত্তর দিলাম ও হ্যাঁ, পড়েছি বটে। তিনি তখন বললেনঃ “কুরআনই তার চরিত্র।” আমি তখন তাঁর নিকট হতে বিদায় গ্রহণের অনুমতি চাওয়ার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু হঠাৎ আমার মনে পড়লো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) রাত্রির নামায সম্পর্কে প্রশ্ন করা দরকার। আমার এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি কি সূরা মুযযাম্মিল পড়নি?” আমি জবাব দিলামঃ হ্যাঁ, অবশ্যই পড়েছি। তিনি বললেনঃ “তাহলে শুনো। সূরার এই প্রথম ভাগে রাত্রির কিয়াম (দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদের নামায পড়া) ফরয করা হয় এবং এক বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ তাহাজ্জুদের নামায ফরয হিসেবে আদায় করতেন। এমন কি তাঁদের পা ফুলে যেতো। বারো মাস পরে এই সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং মহান আল্লাহ ভার লাঘব করে দেন। তাহাজ্জুদের নামাযকে তিনি ফরয হিসেবে না রেখে নফল হিসেবে রেখে দেন।” এবার আমি বিদায় গ্রহণের ইচ্ছা করলাম। কিন্তু বিতর নামাযের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করার কথা মনে পড়ে গেল। তাই আমি বললামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামাযের পদ্ধতিও আমাকে জানিয়ে দিন। তিনি তখন বললেনঃ শুননা, (রাত্রে) আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মিসওয়াক, অযুর পানি ইত্যাদি ঠিক করে একদিকে রেখে দিতাম। যখনই আল্লাহর ইচ্ছা হতো তিনি চক্ষু খুলতেন। তিনি উঠে মিসওয়াক করতেন ও অযু করতেন এবং আট রাকআত নামায পড়তেন। মধ্যে তাশাহহুদে মোটেই বসতেন না। আট রাকআত পূর্ণ করার পর তিনি আত্তাহিয়্যাতুতে বসতেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলার যিকির করতেন, দু'আ করতেন এবং সালাম না ফিরিয়েই উঠে পড়তেন। আর নবম রাকআত পড়ে যিকির ও দুআ করতেন এবং উচ্চ শব্দে সালাম ফিরাতেন। এ শব্দ আমরাও শুনতে পেতাম। তারপর বসে বসেই দুই রাকআত নামায পড়তেন। হে আমার প্রিয় পুত্র! সব মিলিয়ে মোট এগারো রাকআত হলো। অতঃপর যখন তাঁর বয়স বেশী হয় এবং দেহ ভারী হয়ে যায় তখন থেকে তিনি সাত রাকআত বিতর পড়ে সালাম ফিরাতেন এবং পরে বসে বসে দুই রাকআত নামায পড়তেন। সুতরাং হে প্রিয় বৎস! এটা নয় রাকআত হলো। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তিনি কোন নামায পড়তে শুরু করতেন তখন তা চিরস্থায়ীভাবে পড়তে থাকতেন। তবে হ্যাঁ, কোন ব্যবস্থা বা ঘুম অথবা দুঃখ কষ্টের কারণে কিংবা রোগের কারণে রাত্রে ঐ নামায পড়তে না পারলে দিনের বেলায় বারো রাকআত পড়ে নিতেন। আমার জানা নেই যে, তিনি গোটা কুরআন রাত থেকে নিয়ে সকাল পর্যন্ত পড়ে শেষ করেছেন এবং রমযান ছাড়া অন্য কোন পুরো মাসই রোযা রেখেছেন।” অতঃপর আমি উম্মুল মু'মিনিন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট হতে বিদায় নিয়ে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁর সামনে সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তরের পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি সবটারই সত্যতা স্বীকার করলেন এবং বললেনঃ “আমিও যদি তাঁর কাছে যাতায়াত করতে পারতাম তবে আমি নিজের কানে শুনে আসতাম।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মাদুর বিছিয়ে রাখতাম যার উপর তিনি তাহাজ্জুদের নামায আদায় করতেন। লোকেরা এ খবর জানতে পেরে রাত্রির নামাযেও তাঁর ইকতিদা করার জন্যে এসে পড়ে। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাগান্বিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। উম্মতের প্রতি তিনি বড়ই মেহেরবান ছিলেন এবং সাথে সাথে এ ভয়ও করতেন যে, হয়তো এ নামায ফরয হয়ে যাবে, তাই তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে লোক সকল! ঐ সব আমলের উপরই কষ্ট স্বীকার কর যেগুলো পালনের তোমাদের শক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পুণ্যদানে অপারগ হবেন না। বরং তোমরাই আমলে অপারগ হয়ে যাবে। ঐ আমলই সর্বাপেক্ষা উত্তম যার উপর চিরস্থায়ীভাবে থাকা হয়। এদিকে কুরআন কারীমে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং সাহাবীগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করে দেন এবং ঘুম যেন না আসে এ জন্যে তারা রশি বেঁধে লটকিতে লাগলেন। আট মাস এই ভাবেই কেটে গেল। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাঁদের এ চেষ্টা দেখে আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করলেন এবং রাত্রির কিয়ামকে এশার ফরয নামাযের দিকে ফিরিয়ে দিলেন। আর রাত্রির কিয়াম ছেড়ে দিলেন। (এ রিওয়াইয়াতটি মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও রয়েছে। কিন্তু এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ যুবাইদী দুর্বল। আসল হাদীস সূরা মুয্যাম্মিলের নাযিল হওয়ার উল্লেখ ছাড়া সহীহ গ্রন্থেও রয়েছে) এই হাদীসের শব্দাবলীর ভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী সূরা, অথচ প্রকৃতপক্ষে এ সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। অনুরূপভাবে এ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, আর্ট মাস পরে এর শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এই উক্তিটিও দুর্বল। সহীহ ওটাই যা মুসনাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বছর পরে শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা মুযযাম্মিলের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) রমযান শরীফের রাত্রির কিয়ামের মতই কিয়াম করতে শুরু করেন। আর এ সূরার প্রাথমিক ও শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার মাঝে প্রায় এক বছরের ব্যবধান ছিল। তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত আবূ উমামাহ (রাঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। হযরত আবূ আবদির রহমান (রঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর পর্যন্ত কিয়াম করেন, এমন কি তাদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। অতঃপর (আরবি) অবতীর্ণ হয় এবং তাঁরা শান্তি পান। হযরত হাসান বসরী (রঃ) হযরত সুদ্দীরও (রঃ) উক্তি এটাই। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ রিওয়াইয়াতটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে ষোল মাসের সময়কালের সাথে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর বা দু’বছর পর্যন্ত কিয়াম করতে থাকেন। তাঁদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। তারপর সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তাঁদের ভার লাঘব হয়ে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) দশ বছরের মেয়াদের কথা বলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলোর হুকুম অনুযায়ী মুমিনগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করেন, কিন্তু তাঁদের খুবই কষ্ট হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি দয়া করেন এবং (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন এভাবে তাঁদের প্রতি প্রশস্ততা আনয়ন করেন এবং সংকীর্ণতা দূরীভূত করেন। সুতরাং আল্লাহ তা’আলারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁতে মগ্ন হও। অর্থাৎ দুনিয়ার কাজ-কারবার হতে অবসর লাভ করে প্রশান্তির সাথে খুব বেশী বেশী তার যিকির করতে থাকো, তার দিকে ঝুঁকে পড়ে তাঁর প্রতি মনোনিবেশ কর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতএব যখনই অবসর পাও সাবধান করো।” একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) অর্থাৎ স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং দুনিয়া ছেড়ে দিতে নিষেধ করেছেন। এখানে ভাবার্থ হচ্ছেঃ হে নবী (সঃ)! পার্থিব সৃষ্টিকূল হতে সম্পর্ক চ্ছিন্ন করে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করার একটা সময় অবশ্যই নির্দিষ্ট করে নাও। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই হলেন মালিক ও ব্যবস্থাপক। পূর্ব ও পশ্চিম সবই তাঁর অধিকারভুক্ত। তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউ নেই। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি যেমন এই আল্লাহরই ইবাদত করছো, তেমনই একমাত্র তার উপরই নির্ভরশীল হয়ে যাও। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারই ইবাদত কর এবং তার উপর ভরসা কর।” এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ “আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।” এই অর্থের আরো বহু আয়াত রয়েছে যে, ইবাদত, আনুগত্য এবং ভরসা করার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ।

আল-মুযযাম্মিল 73:7

মুসনাদে বাযযারে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরায়েশরা দারুণ নদুওয়াতে একত্রিত হয়ে পরস্পর বলাবলি করলোঃ এসো, আমরা এই ব্যক্তির (হযরত মুহাম্মাদ সঃ)-এর এমন এক নাম স্থির করি যে, সবারই মুখ দিয়ে এই নামই বের হবে, যাতে বাইরের লোকেরা একই আওয়ায শুনে যায়। তখন কেউ কেউ বললো যে, তার নাম ‘কাহিন' বা গণক রাখা হোক। একথা শুনে অন্যেরা বললো যে, প্রকৃতপক্ষে সে তো ‘কাহিন’ বা গণক নয়। আর একটি প্রস্তাব উঠলো যে, তাহলে এর নাম ‘মাজনুন' বা পাগল রাখা হোক। এর উপরও অন্যেরা আপত্তি উঠালো যে, সে পাগলও নয়। এরপর প্রস্তাব রাখা হলো যে, এর নাম ‘সাহির’ বা যাদুকর রাখা হোক। কিন্তু এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যাত হলো। কারণ বলা হলো যে, সে ‘সাহির’ বা যাদুকরও নয়। মোটকথা তারা তাঁর এমন কোন খারাপ নাম স্থির করতে পারলো না যাতে সবাই একমত হতে পারে। এভাবেই ঐ মজলিস ভেঙ্গে গেল। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আসলেন এবং “হে বস্ত্রাবৃত' বলে তাঁকে সম্বোধন করলেন। (এই বর্ণনার একজন বর্ণনাকারী মুআল্লা ইবনে আবদির রহমানের নিকট হতে যদিও আহলে ইলমের একটি দল রিওয়াইয়াত নিয়ে থাকেন এবং তার থেকে হাদীস বর্ণনা করে থাকেন, কিন্তু তাঁর রিওয়াইয়াত সমূহের মধ্যে এমন বহু হাদীস রয়েছে যেগুলোর উপর তাঁর অনুসরণ করা যায় না) ১-৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন রাত্রিকালে কাপড় জড়িয়ে শয়ন করা পরিত্যাগ করেন এবং তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়িয়ে থাকার কাজ অবলম্বন করেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায়, আর আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে।” (৩২:১৬) রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা জীবন এ হুকুম পালন করে গেছেন। তাহাজ্জুদের নামায শুধু তাঁর উপর ফরয ছিল। অর্থাৎ এ নামায তাঁর উম্মতের উপর ওয়াজিব নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং তুমি রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে; এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় যে, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯) এই হুকুমের সাথে সাথে পরিমাণও বর্ণনা করে দিলেন যে, অর্ধেক রাত্রি বা কিছু কম-বেশী।(আরবি) বলা হয় শয়নকারী ও বস্ত্রাবৃত ব্যক্তিকে। আবার এ অর্থও করা হয়েছেঃ হে কুরআনকে উত্তম রূপে গ্রহণকারী! তুমি অর্ধরাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামাযে মগ্ন থাকো। অথবা কিছু কম বেশী করো। আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে, যাতে ভালভাবে বুঝতে পারা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হুকুম ও বরাবর পালন করে এসেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীম খুবই ধীরে ধীরে ও থেমে থেমে পাঠ করতেন। ফলে খুব দেরীতে সূরা শেষ হতো। ছোট সূরাও যেন বড় হয়ে যেতো। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুব টেনে টেনে পাঠ করতেন।” তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করে শুনিয়ে দেন, যাতে তিনি (আরবি) এবং (আরবি) শব্দের উপর মদ করেন অর্থাৎ ওগুলো দীর্ঘ করে পড়েন।ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেকটি আয়াতের উপর পূর্ণ ওয়াকফ করতেন বা থামতেন। যেমন (আরবি)পড়ে থামতেন, (আরবি) পড়ে থামতেন (আরবি) এর উপর ওয়াফ করতেন এবং (আরবি) পড়ে থামতেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবী দাউদ এবং ‘জামে’ তিরমিযীতেও রয়েছে)মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআনের পাঠককে কিয়ামতের দিন বলা হবেঃ ‘পড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে ও স্পষ্টভাবে পড়তে থাকো যেমন দুনিয়ায় পড়তে। তোমার মনযিল ও মরতবা হলো ওটা যেখানে তোমার আখিরী আয়াত শেষ হয়। (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদ, জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন) আমরা এই তাফসীরের শুরুতে ঐ সব হাদীস আনয়ন করেছি যেগুলো ধীরে ধীরে পাঠ মুস্তাহাব হওয়া এবং ভাল ও মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করার কথা বলে দেয়। যেমন এ হাদীসটি, যাতে রয়েছেঃ কুরআনকে স্বীয় সুর দ্বারা সৌন্দৰ্য্য মণ্ডিত কর এবং ঐ ব্যক্তি আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করে না। আর হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথা বলাঃ “তাকে হযরত দাউদ (আঃ)-এর বংশধর এর মধুর সুর দান করা হয়েছে এবং হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-এর একথা বলাঃ “আমি যদি জানতাম যে, আপনি আমার কুরআন পাঠ শুনছেন তবে আমি আরো উত্তম ও মধুর সুরে পড়তাম।" আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর এ কথা বলাঃ “বালুকার মত কুরআনকে ছড়িয়ে দিয়ো না এবং কবিতার মত কুরআনকে অভদ্রতার সাথে। পড়ো না, ওর চমৎকারিত্বের প্রতি খেয়াল রেখো এবং অন্তরে তা ক্রিয়াশীল করো। আর সূরা তাড়াতাড়ি শেষ করার পিছনে লেগে পড়ো না।” (এটা ইমাম বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) একটি লোক এসে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বললোঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা আজ রাত্রে একই রাকআতে পাঠ করে ফেলেছি।" তার একথা শুনে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “তা হলে সম্ভবতঃ তুমি কবিতার মত তাড়াতাড়ি করে পাঠ করে থাকবে। ঐ সূরাগুলো আমার বেশ মুখস্থ আছে যেগুলি রাসুলুল্লাহ (সঃ) মিলিয়ে পড়তেন। তারপর তিনি মুফাসসাল সূরাগুলোর মধ্যে বিশিষ্ট সূরার নাম লিখেন যেগুলোর দু’টি করে সূরা মিলিত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক এক রাকআতে পাঠ করতেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করছি গুরুভার বাণী। অর্থাৎ তা আমল করতেও ভারী হবে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও বৃহত্তের কারণে অবতীর্ণ হওয়ার সময়েও খুবই কষ্টদায়ক হবে। যেমন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় তার উরু আমার উরুর উপর ছিল। তখন ওহীর বোঝা আমার উপর এমন ভারীবোধ হলো যে, আমার ভয় হলো না জানি হয়তো আমার উরু ভেঙ্গেই যাবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় আপনি কিছু অনুভব করেন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমি এমন শব্দ শুনতে পাই যেমন কোন জিঞ্জীরের শব্দ হয়। আমি নিঃশব্দ হয়ে পড়ি। যখনই ওহী অবতীর্ণ হয় তখন তা আমার উপর এমন বোঝা স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায় যে, আমার মনে হয় যেন আমার প্রাণই বেরিয়ে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হারিস ইবনে হিশাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার কাছে ওহী কিভাবে আসে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “কখনো কখনো খুবই কষ্ট হয়। কিন্তু এ সত্ত্বেও ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায় শেষ হওয়ার সাথে সাথে ওহী আমার মুখস্থ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে আগমন করে ও ওহী অবতীর্ণ করেন। তিনি কথা বলতে থাকেন এবং আমি তা মুখস্থ করতে থাকি।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি একবার নবী (সঃ)-কে এমন অবস্থায় দেখেছি যে, তার উপর ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। তখন শীতকাল ছিল। এতদসত্ত্বেও তাঁর ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং ঘর্ম টপ টপ করে পড়ছিল।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন কোন সময় উষ্ট্রীর উপর সওয়ার থাকতেন এবং ঐ অবস্থাতেই তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হতো। তখন উন্ত্রী ওহীর ভারে ঝুঁকে পড়তো। তাফসীরে ইবনে জারীরে এও রয়েছে যে, অতঃপর যে পর্যন্ত ওহী বন্ধ না হতো উষ্ট্ৰী নড়তে পারতো না এবং তার গর্দান উঁচু হতো না। ভাবার্থ এই যে, স্বয়ং ওহীর ভার বহন করা কঠিন ছিল। এবং আহকাম পালন করাও ছিল অনুরূপ কঠিন। হযরত ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি এটাই। হযরত আবদুর রহমান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দুনিয়াতে যেমন এটা ভারী কাজ, তেমনই আখিরাতেও এর প্রতিদান ও পুরস্কার ভারী হবে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অবশ্য রাত্রিকালের উত্থান দলনে প্রবলতর এবং বাক্য স্ফুরণে সঠিক। আবিসিনীয় ভাষায় (আরবি) শব্দের অর্থ হলো দাঁড়িয়ে থাকা। সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকলে (আরবি) বলা হয়। তাহাজ্জুদের নামাযের উৎকৃষ্টতা এই যে, এর ফলে অন্তর ও রসনা এক হয়ে যায়। তিলাওয়াতের যে শব্দগুলো মুখ দিয়ে বের হয় তা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। দিনের তুলনায় রাত্রির নির্জনতায় অর্থ ও ভাব অন্তরে ভালভাবে গেঁথে যায়। কেননা দিবস হলো কোলাহল ও অর্থোপার্জনের সময়।হযরত আনাস (রাঃ) (আরবি) কে (আরবি) পড়লে জনগণ বলে ওঠেঃ আমরাতো (আরবি) পড়ে (আরবি) থাকি? উত্তরে তিনি বলেনঃ (আরবি) এবং একই অর্থবোধক শব্দ।ইরশাদ হচ্ছেঃ (হে নবী সঃ)! দিবাভাগে তোমার জন্যে রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। তুমি শুয়ে-বসে থাকতে পার, বিশ্রাম করতে পার, বেশী বেশী নফল আদায় করতে পার এবং তোমার পার্থিব কাজ-কাম সম্পন্ন করতে পার। অতএব রাত্রিকে তুমি তোমার আখিরাতের কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে নাও। এ হুকুম ঐ সময় ছিল যখন রাত্রির নামায ফরয ছিল। তারপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় বান্দাদের উপর অনুগ্রহ করেন এবং হালকাকরণের জন্যে রাত্রির কিয়ামের সময় হ্রাস করে দেন এবং বলেনঃ তোমরা রাত্রির অল্প সময় কিয়াম কর। এই ফরমানের পর হযরত আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত পাঠ করলেন। তাঁর এ উক্তিটি সঠিকও বটে। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে হিশাম (রঃ) তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন এবং মদীনার পথে যাত্রা শুরু করেন। উদ্দেশ্য এই যে, তিনি তাঁর সেখানকার ঘরবাড়ী বিক্রি করে ফেলবেন এবং ওর মূল্য দিয়ে অস্ত্র-শস্ত্র ইত্যাদি ক্রয় করে জিহাদে অংশগ্রহণ করবেন। তিনি রোমকদের সাথে লড়াই করতে থাকবেন। অতঃপর হয় রোম বিজিত হবে, না হয় তিনি শাহাদাত বরণ করবেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি তাঁর কওমের লোকদের সাথে মিলিত হন। এবং তাঁদের কাছে স্বীয় উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন। তাঁর এই সংকল্পের কথা শুনে তাঁরা বললেনঃ তাহলে শুনুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশায় আপনারই কওমের ছয়জন লোক এটাই সংকল্প করেছিল যে, তারা নিজেদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দিবে এবং ঘরবাড়ী ইত্যাদি বেচে দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে দাঁড়িয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে তাদেরকে ডেকে বললেনঃ “আমি কি তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ নই? খবরদার! এ কাজ করো না।” এভাবে তিনি তাদেরকে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে নিষেধ করেন। এ হাদীস শুনে হযরত সাঈদ (রাঃ) তাঁর ঐ সংকল্প ত্যাগ করেন এবং সেখানেই তাঁর কওমের লোকদেরকে বললেনঃ “তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলাম। তারপর তিনি সেখান হতে বিদায় নিয়ে স্বস্থানে চলে আসলেন। স্বীয় জামাআতের সাথে মিলিত হয়ে তিনি তাদেরকে বললেনঃ আমি এখান থেকে যাওয়ার পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামায পড়ার পদ্ধতি জিজ্ঞেস করি। তিনি উত্তরে বলেনঃ এ মাসআলাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) সবচেয়ে ভাল বলতে পারবেন। সুতরাং তুমি সেখানে গিয়ে তাঁকেই জিজ্ঞেস করো। তুমি তাঁর কাছে যা শুনবে তা আমাকেও বলে যেয়ো। আমি তখন হযরত হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং তাকে বললাম আমাকে একটু হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে নিয়ে চলুন। তিনি প্রথমে যেতে অস্বীকার করলেও আমার পীড়াপীড়িতে শেষে যেতে সম্মত হলেন। সুতরাং আমরা উভয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে গেলাম। হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত হাকীম (রাঃ)-এর গলার স্বর শুনেই তাঁকে চিনতে পারলেন এবং বললেন “কে, হাকীম?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমি হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সাথে ওটা কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এটা সাঈদ ইবনে হিশাম (রাঃ)।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোন হিশাম? আমিরের ছেলে হিশাম কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমিরের ছেলে হিশামই বটে।” এ কথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হযরত আমির (রাঃ)-এর জন্যে রহমতের দু’আ করলেন এবং বললেনঃ “আমির (রাঃ) খুব ভাল মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।” আমি তখন আরয করলামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল তা আমাকে অবহিত করুন। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি কি কুরআন পড়নি?” আমি উত্তর দিলাম ও হ্যাঁ, পড়েছি বটে। তিনি তখন বললেনঃ “কুরআনই তার চরিত্র।” আমি তখন তাঁর নিকট হতে বিদায় গ্রহণের অনুমতি চাওয়ার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু হঠাৎ আমার মনে পড়লো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) রাত্রির নামায সম্পর্কে প্রশ্ন করা দরকার। আমার এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি কি সূরা মুযযাম্মিল পড়নি?” আমি জবাব দিলামঃ হ্যাঁ, অবশ্যই পড়েছি। তিনি বললেনঃ “তাহলে শুনো। সূরার এই প্রথম ভাগে রাত্রির কিয়াম (দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদের নামায পড়া) ফরয করা হয় এবং এক বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ তাহাজ্জুদের নামায ফরয হিসেবে আদায় করতেন। এমন কি তাঁদের পা ফুলে যেতো। বারো মাস পরে এই সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং মহান আল্লাহ ভার লাঘব করে দেন। তাহাজ্জুদের নামাযকে তিনি ফরয হিসেবে না রেখে নফল হিসেবে রেখে দেন।” এবার আমি বিদায় গ্রহণের ইচ্ছা করলাম। কিন্তু বিতর নামাযের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করার কথা মনে পড়ে গেল। তাই আমি বললামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামাযের পদ্ধতিও আমাকে জানিয়ে দিন। তিনি তখন বললেনঃ শুননা, (রাত্রে) আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মিসওয়াক, অযুর পানি ইত্যাদি ঠিক করে একদিকে রেখে দিতাম। যখনই আল্লাহর ইচ্ছা হতো তিনি চক্ষু খুলতেন। তিনি উঠে মিসওয়াক করতেন ও অযু করতেন এবং আট রাকআত নামায পড়তেন। মধ্যে তাশাহহুদে মোটেই বসতেন না। আট রাকআত পূর্ণ করার পর তিনি আত্তাহিয়্যাতুতে বসতেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলার যিকির করতেন, দু'আ করতেন এবং সালাম না ফিরিয়েই উঠে পড়তেন। আর নবম রাকআত পড়ে যিকির ও দুআ করতেন এবং উচ্চ শব্দে সালাম ফিরাতেন। এ শব্দ আমরাও শুনতে পেতাম। তারপর বসে বসেই দুই রাকআত নামায পড়তেন। হে আমার প্রিয় পুত্র! সব মিলিয়ে মোট এগারো রাকআত হলো। অতঃপর যখন তাঁর বয়স বেশী হয় এবং দেহ ভারী হয়ে যায় তখন থেকে তিনি সাত রাকআত বিতর পড়ে সালাম ফিরাতেন এবং পরে বসে বসে দুই রাকআত নামায পড়তেন। সুতরাং হে প্রিয় বৎস! এটা নয় রাকআত হলো। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তিনি কোন নামায পড়তে শুরু করতেন তখন তা চিরস্থায়ীভাবে পড়তে থাকতেন। তবে হ্যাঁ, কোন ব্যবস্থা বা ঘুম অথবা দুঃখ কষ্টের কারণে কিংবা রোগের কারণে রাত্রে ঐ নামায পড়তে না পারলে দিনের বেলায় বারো রাকআত পড়ে নিতেন। আমার জানা নেই যে, তিনি গোটা কুরআন রাত থেকে নিয়ে সকাল পর্যন্ত পড়ে শেষ করেছেন এবং রমযান ছাড়া অন্য কোন পুরো মাসই রোযা রেখেছেন।” অতঃপর আমি উম্মুল মু'মিনিন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট হতে বিদায় নিয়ে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁর সামনে সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তরের পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি সবটারই সত্যতা স্বীকার করলেন এবং বললেনঃ “আমিও যদি তাঁর কাছে যাতায়াত করতে পারতাম তবে আমি নিজের কানে শুনে আসতাম।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মাদুর বিছিয়ে রাখতাম যার উপর তিনি তাহাজ্জুদের নামায আদায় করতেন। লোকেরা এ খবর জানতে পেরে রাত্রির নামাযেও তাঁর ইকতিদা করার জন্যে এসে পড়ে। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাগান্বিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। উম্মতের প্রতি তিনি বড়ই মেহেরবান ছিলেন এবং সাথে সাথে এ ভয়ও করতেন যে, হয়তো এ নামায ফরয হয়ে যাবে, তাই তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে লোক সকল! ঐ সব আমলের উপরই কষ্ট স্বীকার কর যেগুলো পালনের তোমাদের শক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পুণ্যদানে অপারগ হবেন না। বরং তোমরাই আমলে অপারগ হয়ে যাবে। ঐ আমলই সর্বাপেক্ষা উত্তম যার উপর চিরস্থায়ীভাবে থাকা হয়। এদিকে কুরআন কারীমে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং সাহাবীগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করে দেন এবং ঘুম যেন না আসে এ জন্যে তারা রশি বেঁধে লটকিতে লাগলেন। আট মাস এই ভাবেই কেটে গেল। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাঁদের এ চেষ্টা দেখে আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করলেন এবং রাত্রির কিয়ামকে এশার ফরয নামাযের দিকে ফিরিয়ে দিলেন। আর রাত্রির কিয়াম ছেড়ে দিলেন। (এ রিওয়াইয়াতটি মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও রয়েছে। কিন্তু এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ যুবাইদী দুর্বল। আসল হাদীস সূরা মুয্যাম্মিলের নাযিল হওয়ার উল্লেখ ছাড়া সহীহ গ্রন্থেও রয়েছে) এই হাদীসের শব্দাবলীর ভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী সূরা, অথচ প্রকৃতপক্ষে এ সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। অনুরূপভাবে এ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, আর্ট মাস পরে এর শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এই উক্তিটিও দুর্বল। সহীহ ওটাই যা মুসনাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বছর পরে শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা মুযযাম্মিলের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) রমযান শরীফের রাত্রির কিয়ামের মতই কিয়াম করতে শুরু করেন। আর এ সূরার প্রাথমিক ও শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার মাঝে প্রায় এক বছরের ব্যবধান ছিল। তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত আবূ উমামাহ (রাঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। হযরত আবূ আবদির রহমান (রঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর পর্যন্ত কিয়াম করেন, এমন কি তাদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। অতঃপর (আরবি) অবতীর্ণ হয় এবং তাঁরা শান্তি পান। হযরত হাসান বসরী (রঃ) হযরত সুদ্দীরও (রঃ) উক্তি এটাই। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ রিওয়াইয়াতটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে ষোল মাসের সময়কালের সাথে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর বা দু’বছর পর্যন্ত কিয়াম করতে থাকেন। তাঁদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। তারপর সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তাঁদের ভার লাঘব হয়ে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) দশ বছরের মেয়াদের কথা বলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলোর হুকুম অনুযায়ী মুমিনগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করেন, কিন্তু তাঁদের খুবই কষ্ট হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি দয়া করেন এবং (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন এভাবে তাঁদের প্রতি প্রশস্ততা আনয়ন করেন এবং সংকীর্ণতা দূরীভূত করেন। সুতরাং আল্লাহ তা’আলারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁতে মগ্ন হও। অর্থাৎ দুনিয়ার কাজ-কারবার হতে অবসর লাভ করে প্রশান্তির সাথে খুব বেশী বেশী তার যিকির করতে থাকো, তার দিকে ঝুঁকে পড়ে তাঁর প্রতি মনোনিবেশ কর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতএব যখনই অবসর পাও সাবধান করো।” একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) অর্থাৎ স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং দুনিয়া ছেড়ে দিতে নিষেধ করেছেন। এখানে ভাবার্থ হচ্ছেঃ হে নবী (সঃ)! পার্থিব সৃষ্টিকূল হতে সম্পর্ক চ্ছিন্ন করে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করার একটা সময় অবশ্যই নির্দিষ্ট করে নাও। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই হলেন মালিক ও ব্যবস্থাপক। পূর্ব ও পশ্চিম সবই তাঁর অধিকারভুক্ত। তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউ নেই। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি যেমন এই আল্লাহরই ইবাদত করছো, তেমনই একমাত্র তার উপরই নির্ভরশীল হয়ে যাও। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারই ইবাদত কর এবং তার উপর ভরসা কর।” এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ “আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।” এই অর্থের আরো বহু আয়াত রয়েছে যে, ইবাদত, আনুগত্য এবং ভরসা করার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ।

আল-মুযযাম্মিল 73:8

মুসনাদে বাযযারে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরায়েশরা দারুণ নদুওয়াতে একত্রিত হয়ে পরস্পর বলাবলি করলোঃ এসো, আমরা এই ব্যক্তির (হযরত মুহাম্মাদ সঃ)-এর এমন এক নাম স্থির করি যে, সবারই মুখ দিয়ে এই নামই বের হবে, যাতে বাইরের লোকেরা একই আওয়ায শুনে যায়। তখন কেউ কেউ বললো যে, তার নাম ‘কাহিন' বা গণক রাখা হোক। একথা শুনে অন্যেরা বললো যে, প্রকৃতপক্ষে সে তো ‘কাহিন’ বা গণক নয়। আর একটি প্রস্তাব উঠলো যে, তাহলে এর নাম ‘মাজনুন' বা পাগল রাখা হোক। এর উপরও অন্যেরা আপত্তি উঠালো যে, সে পাগলও নয়। এরপর প্রস্তাব রাখা হলো যে, এর নাম ‘সাহির’ বা যাদুকর রাখা হোক। কিন্তু এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যাত হলো। কারণ বলা হলো যে, সে ‘সাহির’ বা যাদুকরও নয়। মোটকথা তারা তাঁর এমন কোন খারাপ নাম স্থির করতে পারলো না যাতে সবাই একমত হতে পারে। এভাবেই ঐ মজলিস ভেঙ্গে গেল। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আসলেন এবং “হে বস্ত্রাবৃত' বলে তাঁকে সম্বোধন করলেন। (এই বর্ণনার একজন বর্ণনাকারী মুআল্লা ইবনে আবদির রহমানের নিকট হতে যদিও আহলে ইলমের একটি দল রিওয়াইয়াত নিয়ে থাকেন এবং তার থেকে হাদীস বর্ণনা করে থাকেন, কিন্তু তাঁর রিওয়াইয়াত সমূহের মধ্যে এমন বহু হাদীস রয়েছে যেগুলোর উপর তাঁর অনুসরণ করা যায় না) ১-৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন রাত্রিকালে কাপড় জড়িয়ে শয়ন করা পরিত্যাগ করেন এবং তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়িয়ে থাকার কাজ অবলম্বন করেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায়, আর আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে।” (৩২:১৬) রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা জীবন এ হুকুম পালন করে গেছেন। তাহাজ্জুদের নামায শুধু তাঁর উপর ফরয ছিল। অর্থাৎ এ নামায তাঁর উম্মতের উপর ওয়াজিব নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং তুমি রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে; এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় যে, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯) এই হুকুমের সাথে সাথে পরিমাণও বর্ণনা করে দিলেন যে, অর্ধেক রাত্রি বা কিছু কম-বেশী।(আরবি) বলা হয় শয়নকারী ও বস্ত্রাবৃত ব্যক্তিকে। আবার এ অর্থও করা হয়েছেঃ হে কুরআনকে উত্তম রূপে গ্রহণকারী! তুমি অর্ধরাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামাযে মগ্ন থাকো। অথবা কিছু কম বেশী করো। আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে, যাতে ভালভাবে বুঝতে পারা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হুকুম ও বরাবর পালন করে এসেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীম খুবই ধীরে ধীরে ও থেমে থেমে পাঠ করতেন। ফলে খুব দেরীতে সূরা শেষ হতো। ছোট সূরাও যেন বড় হয়ে যেতো। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুব টেনে টেনে পাঠ করতেন।” তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করে শুনিয়ে দেন, যাতে তিনি (আরবি) এবং (আরবি) শব্দের উপর মদ করেন অর্থাৎ ওগুলো দীর্ঘ করে পড়েন।ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেকটি আয়াতের উপর পূর্ণ ওয়াকফ করতেন বা থামতেন। যেমন (আরবি)পড়ে থামতেন, (আরবি) পড়ে থামতেন (আরবি) এর উপর ওয়াফ করতেন এবং (আরবি) পড়ে থামতেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবী দাউদ এবং ‘জামে’ তিরমিযীতেও রয়েছে)মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআনের পাঠককে কিয়ামতের দিন বলা হবেঃ ‘পড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে ও স্পষ্টভাবে পড়তে থাকো যেমন দুনিয়ায় পড়তে। তোমার মনযিল ও মরতবা হলো ওটা যেখানে তোমার আখিরী আয়াত শেষ হয়। (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদ, জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন) আমরা এই তাফসীরের শুরুতে ঐ সব হাদীস আনয়ন করেছি যেগুলো ধীরে ধীরে পাঠ মুস্তাহাব হওয়া এবং ভাল ও মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করার কথা বলে দেয়। যেমন এ হাদীসটি, যাতে রয়েছেঃ কুরআনকে স্বীয় সুর দ্বারা সৌন্দৰ্য্য মণ্ডিত কর এবং ঐ ব্যক্তি আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করে না। আর হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথা বলাঃ “তাকে হযরত দাউদ (আঃ)-এর বংশধর এর মধুর সুর দান করা হয়েছে এবং হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-এর একথা বলাঃ “আমি যদি জানতাম যে, আপনি আমার কুরআন পাঠ শুনছেন তবে আমি আরো উত্তম ও মধুর সুরে পড়তাম।" আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর এ কথা বলাঃ “বালুকার মত কুরআনকে ছড়িয়ে দিয়ো না এবং কবিতার মত কুরআনকে অভদ্রতার সাথে। পড়ো না, ওর চমৎকারিত্বের প্রতি খেয়াল রেখো এবং অন্তরে তা ক্রিয়াশীল করো। আর সূরা তাড়াতাড়ি শেষ করার পিছনে লেগে পড়ো না।” (এটা ইমাম বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) একটি লোক এসে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বললোঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা আজ রাত্রে একই রাকআতে পাঠ করে ফেলেছি।" তার একথা শুনে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “তা হলে সম্ভবতঃ তুমি কবিতার মত তাড়াতাড়ি করে পাঠ করে থাকবে। ঐ সূরাগুলো আমার বেশ মুখস্থ আছে যেগুলি রাসুলুল্লাহ (সঃ) মিলিয়ে পড়তেন। তারপর তিনি মুফাসসাল সূরাগুলোর মধ্যে বিশিষ্ট সূরার নাম লিখেন যেগুলোর দু’টি করে সূরা মিলিত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক এক রাকআতে পাঠ করতেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করছি গুরুভার বাণী। অর্থাৎ তা আমল করতেও ভারী হবে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও বৃহত্তের কারণে অবতীর্ণ হওয়ার সময়েও খুবই কষ্টদায়ক হবে। যেমন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় তার উরু আমার উরুর উপর ছিল। তখন ওহীর বোঝা আমার উপর এমন ভারীবোধ হলো যে, আমার ভয় হলো না জানি হয়তো আমার উরু ভেঙ্গেই যাবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় আপনি কিছু অনুভব করেন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমি এমন শব্দ শুনতে পাই যেমন কোন জিঞ্জীরের শব্দ হয়। আমি নিঃশব্দ হয়ে পড়ি। যখনই ওহী অবতীর্ণ হয় তখন তা আমার উপর এমন বোঝা স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায় যে, আমার মনে হয় যেন আমার প্রাণই বেরিয়ে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হারিস ইবনে হিশাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার কাছে ওহী কিভাবে আসে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “কখনো কখনো খুবই কষ্ট হয়। কিন্তু এ সত্ত্বেও ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায় শেষ হওয়ার সাথে সাথে ওহী আমার মুখস্থ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে আগমন করে ও ওহী অবতীর্ণ করেন। তিনি কথা বলতে থাকেন এবং আমি তা মুখস্থ করতে থাকি।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি একবার নবী (সঃ)-কে এমন অবস্থায় দেখেছি যে, তার উপর ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। তখন শীতকাল ছিল। এতদসত্ত্বেও তাঁর ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং ঘর্ম টপ টপ করে পড়ছিল।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন কোন সময় উষ্ট্রীর উপর সওয়ার থাকতেন এবং ঐ অবস্থাতেই তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হতো। তখন উন্ত্রী ওহীর ভারে ঝুঁকে পড়তো। তাফসীরে ইবনে জারীরে এও রয়েছে যে, অতঃপর যে পর্যন্ত ওহী বন্ধ না হতো উষ্ট্ৰী নড়তে পারতো না এবং তার গর্দান উঁচু হতো না। ভাবার্থ এই যে, স্বয়ং ওহীর ভার বহন করা কঠিন ছিল। এবং আহকাম পালন করাও ছিল অনুরূপ কঠিন। হযরত ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি এটাই। হযরত আবদুর রহমান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দুনিয়াতে যেমন এটা ভারী কাজ, তেমনই আখিরাতেও এর প্রতিদান ও পুরস্কার ভারী হবে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অবশ্য রাত্রিকালের উত্থান দলনে প্রবলতর এবং বাক্য স্ফুরণে সঠিক। আবিসিনীয় ভাষায় (আরবি) শব্দের অর্থ হলো দাঁড়িয়ে থাকা। সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকলে (আরবি) বলা হয়। তাহাজ্জুদের নামাযের উৎকৃষ্টতা এই যে, এর ফলে অন্তর ও রসনা এক হয়ে যায়। তিলাওয়াতের যে শব্দগুলো মুখ দিয়ে বের হয় তা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। দিনের তুলনায় রাত্রির নির্জনতায় অর্থ ও ভাব অন্তরে ভালভাবে গেঁথে যায়। কেননা দিবস হলো কোলাহল ও অর্থোপার্জনের সময়।হযরত আনাস (রাঃ) (আরবি) কে (আরবি) পড়লে জনগণ বলে ওঠেঃ আমরাতো (আরবি) পড়ে (আরবি) থাকি? উত্তরে তিনি বলেনঃ (আরবি) এবং একই অর্থবোধক শব্দ।ইরশাদ হচ্ছেঃ (হে নবী সঃ)! দিবাভাগে তোমার জন্যে রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। তুমি শুয়ে-বসে থাকতে পার, বিশ্রাম করতে পার, বেশী বেশী নফল আদায় করতে পার এবং তোমার পার্থিব কাজ-কাম সম্পন্ন করতে পার। অতএব রাত্রিকে তুমি তোমার আখিরাতের কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে নাও। এ হুকুম ঐ সময় ছিল যখন রাত্রির নামায ফরয ছিল। তারপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় বান্দাদের উপর অনুগ্রহ করেন এবং হালকাকরণের জন্যে রাত্রির কিয়ামের সময় হ্রাস করে দেন এবং বলেনঃ তোমরা রাত্রির অল্প সময় কিয়াম কর। এই ফরমানের পর হযরত আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত পাঠ করলেন। তাঁর এ উক্তিটি সঠিকও বটে। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে হিশাম (রঃ) তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন এবং মদীনার পথে যাত্রা শুরু করেন। উদ্দেশ্য এই যে, তিনি তাঁর সেখানকার ঘরবাড়ী বিক্রি করে ফেলবেন এবং ওর মূল্য দিয়ে অস্ত্র-শস্ত্র ইত্যাদি ক্রয় করে জিহাদে অংশগ্রহণ করবেন। তিনি রোমকদের সাথে লড়াই করতে থাকবেন। অতঃপর হয় রোম বিজিত হবে, না হয় তিনি শাহাদাত বরণ করবেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি তাঁর কওমের লোকদের সাথে মিলিত হন। এবং তাঁদের কাছে স্বীয় উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন। তাঁর এই সংকল্পের কথা শুনে তাঁরা বললেনঃ তাহলে শুনুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশায় আপনারই কওমের ছয়জন লোক এটাই সংকল্প করেছিল যে, তারা নিজেদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দিবে এবং ঘরবাড়ী ইত্যাদি বেচে দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে দাঁড়িয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে তাদেরকে ডেকে বললেনঃ “আমি কি তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ নই? খবরদার! এ কাজ করো না।” এভাবে তিনি তাদেরকে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে নিষেধ করেন। এ হাদীস শুনে হযরত সাঈদ (রাঃ) তাঁর ঐ সংকল্প ত্যাগ করেন এবং সেখানেই তাঁর কওমের লোকদেরকে বললেনঃ “তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলাম। তারপর তিনি সেখান হতে বিদায় নিয়ে স্বস্থানে চলে আসলেন। স্বীয় জামাআতের সাথে মিলিত হয়ে তিনি তাদেরকে বললেনঃ আমি এখান থেকে যাওয়ার পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামায পড়ার পদ্ধতি জিজ্ঞেস করি। তিনি উত্তরে বলেনঃ এ মাসআলাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) সবচেয়ে ভাল বলতে পারবেন। সুতরাং তুমি সেখানে গিয়ে তাঁকেই জিজ্ঞেস করো। তুমি তাঁর কাছে যা শুনবে তা আমাকেও বলে যেয়ো। আমি তখন হযরত হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং তাকে বললাম আমাকে একটু হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে নিয়ে চলুন। তিনি প্রথমে যেতে অস্বীকার করলেও আমার পীড়াপীড়িতে শেষে যেতে সম্মত হলেন। সুতরাং আমরা উভয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে গেলাম। হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত হাকীম (রাঃ)-এর গলার স্বর শুনেই তাঁকে চিনতে পারলেন এবং বললেন “কে, হাকীম?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমি হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সাথে ওটা কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এটা সাঈদ ইবনে হিশাম (রাঃ)।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোন হিশাম? আমিরের ছেলে হিশাম কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমিরের ছেলে হিশামই বটে।” এ কথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হযরত আমির (রাঃ)-এর জন্যে রহমতের দু’আ করলেন এবং বললেনঃ “আমির (রাঃ) খুব ভাল মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।” আমি তখন আরয করলামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল তা আমাকে অবহিত করুন। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি কি কুরআন পড়নি?” আমি উত্তর দিলাম ও হ্যাঁ, পড়েছি বটে। তিনি তখন বললেনঃ “কুরআনই তার চরিত্র।” আমি তখন তাঁর নিকট হতে বিদায় গ্রহণের অনুমতি চাওয়ার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু হঠাৎ আমার মনে পড়লো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) রাত্রির নামায সম্পর্কে প্রশ্ন করা দরকার। আমার এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি কি সূরা মুযযাম্মিল পড়নি?” আমি জবাব দিলামঃ হ্যাঁ, অবশ্যই পড়েছি। তিনি বললেনঃ “তাহলে শুনো। সূরার এই প্রথম ভাগে রাত্রির কিয়াম (দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদের নামায পড়া) ফরয করা হয় এবং এক বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ তাহাজ্জুদের নামায ফরয হিসেবে আদায় করতেন। এমন কি তাঁদের পা ফুলে যেতো। বারো মাস পরে এই সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং মহান আল্লাহ ভার লাঘব করে দেন। তাহাজ্জুদের নামাযকে তিনি ফরয হিসেবে না রেখে নফল হিসেবে রেখে দেন।” এবার আমি বিদায় গ্রহণের ইচ্ছা করলাম। কিন্তু বিতর নামাযের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করার কথা মনে পড়ে গেল। তাই আমি বললামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামাযের পদ্ধতিও আমাকে জানিয়ে দিন। তিনি তখন বললেনঃ শুননা, (রাত্রে) আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মিসওয়াক, অযুর পানি ইত্যাদি ঠিক করে একদিকে রেখে দিতাম। যখনই আল্লাহর ইচ্ছা হতো তিনি চক্ষু খুলতেন। তিনি উঠে মিসওয়াক করতেন ও অযু করতেন এবং আট রাকআত নামায পড়তেন। মধ্যে তাশাহহুদে মোটেই বসতেন না। আট রাকআত পূর্ণ করার পর তিনি আত্তাহিয়্যাতুতে বসতেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলার যিকির করতেন, দু'আ করতেন এবং সালাম না ফিরিয়েই উঠে পড়তেন। আর নবম রাকআত পড়ে যিকির ও দুআ করতেন এবং উচ্চ শব্দে সালাম ফিরাতেন। এ শব্দ আমরাও শুনতে পেতাম। তারপর বসে বসেই দুই রাকআত নামায পড়তেন। হে আমার প্রিয় পুত্র! সব মিলিয়ে মোট এগারো রাকআত হলো। অতঃপর যখন তাঁর বয়স বেশী হয় এবং দেহ ভারী হয়ে যায় তখন থেকে তিনি সাত রাকআত বিতর পড়ে সালাম ফিরাতেন এবং পরে বসে বসে দুই রাকআত নামায পড়তেন। সুতরাং হে প্রিয় বৎস! এটা নয় রাকআত হলো। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তিনি কোন নামায পড়তে শুরু করতেন তখন তা চিরস্থায়ীভাবে পড়তে থাকতেন। তবে হ্যাঁ, কোন ব্যবস্থা বা ঘুম অথবা দুঃখ কষ্টের কারণে কিংবা রোগের কারণে রাত্রে ঐ নামায পড়তে না পারলে দিনের বেলায় বারো রাকআত পড়ে নিতেন। আমার জানা নেই যে, তিনি গোটা কুরআন রাত থেকে নিয়ে সকাল পর্যন্ত পড়ে শেষ করেছেন এবং রমযান ছাড়া অন্য কোন পুরো মাসই রোযা রেখেছেন।” অতঃপর আমি উম্মুল মু'মিনিন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট হতে বিদায় নিয়ে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁর সামনে সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তরের পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি সবটারই সত্যতা স্বীকার করলেন এবং বললেনঃ “আমিও যদি তাঁর কাছে যাতায়াত করতে পারতাম তবে আমি নিজের কানে শুনে আসতাম।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মাদুর বিছিয়ে রাখতাম যার উপর তিনি তাহাজ্জুদের নামায আদায় করতেন। লোকেরা এ খবর জানতে পেরে রাত্রির নামাযেও তাঁর ইকতিদা করার জন্যে এসে পড়ে। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাগান্বিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। উম্মতের প্রতি তিনি বড়ই মেহেরবান ছিলেন এবং সাথে সাথে এ ভয়ও করতেন যে, হয়তো এ নামায ফরয হয়ে যাবে, তাই তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে লোক সকল! ঐ সব আমলের উপরই কষ্ট স্বীকার কর যেগুলো পালনের তোমাদের শক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পুণ্যদানে অপারগ হবেন না। বরং তোমরাই আমলে অপারগ হয়ে যাবে। ঐ আমলই সর্বাপেক্ষা উত্তম যার উপর চিরস্থায়ীভাবে থাকা হয়। এদিকে কুরআন কারীমে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং সাহাবীগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করে দেন এবং ঘুম যেন না আসে এ জন্যে তারা রশি বেঁধে লটকিতে লাগলেন। আট মাস এই ভাবেই কেটে গেল। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাঁদের এ চেষ্টা দেখে আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করলেন এবং রাত্রির কিয়ামকে এশার ফরয নামাযের দিকে ফিরিয়ে দিলেন। আর রাত্রির কিয়াম ছেড়ে দিলেন। (এ রিওয়াইয়াতটি মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও রয়েছে। কিন্তু এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ যুবাইদী দুর্বল। আসল হাদীস সূরা মুয্যাম্মিলের নাযিল হওয়ার উল্লেখ ছাড়া সহীহ গ্রন্থেও রয়েছে) এই হাদীসের শব্দাবলীর ভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী সূরা, অথচ প্রকৃতপক্ষে এ সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। অনুরূপভাবে এ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, আর্ট মাস পরে এর শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এই উক্তিটিও দুর্বল। সহীহ ওটাই যা মুসনাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বছর পরে শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা মুযযাম্মিলের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) রমযান শরীফের রাত্রির কিয়ামের মতই কিয়াম করতে শুরু করেন। আর এ সূরার প্রাথমিক ও শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার মাঝে প্রায় এক বছরের ব্যবধান ছিল। তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত আবূ উমামাহ (রাঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। হযরত আবূ আবদির রহমান (রঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর পর্যন্ত কিয়াম করেন, এমন কি তাদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। অতঃপর (আরবি) অবতীর্ণ হয় এবং তাঁরা শান্তি পান। হযরত হাসান বসরী (রঃ) হযরত সুদ্দীরও (রঃ) উক্তি এটাই। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ রিওয়াইয়াতটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে ষোল মাসের সময়কালের সাথে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর বা দু’বছর পর্যন্ত কিয়াম করতে থাকেন। তাঁদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। তারপর সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তাঁদের ভার লাঘব হয়ে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) দশ বছরের মেয়াদের কথা বলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলোর হুকুম অনুযায়ী মুমিনগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করেন, কিন্তু তাঁদের খুবই কষ্ট হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি দয়া করেন এবং (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন এভাবে তাঁদের প্রতি প্রশস্ততা আনয়ন করেন এবং সংকীর্ণতা দূরীভূত করেন। সুতরাং আল্লাহ তা’আলারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁতে মগ্ন হও। অর্থাৎ দুনিয়ার কাজ-কারবার হতে অবসর লাভ করে প্রশান্তির সাথে খুব বেশী বেশী তার যিকির করতে থাকো, তার দিকে ঝুঁকে পড়ে তাঁর প্রতি মনোনিবেশ কর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতএব যখনই অবসর পাও সাবধান করো।” একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) অর্থাৎ স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং দুনিয়া ছেড়ে দিতে নিষেধ করেছেন। এখানে ভাবার্থ হচ্ছেঃ হে নবী (সঃ)! পার্থিব সৃষ্টিকূল হতে সম্পর্ক চ্ছিন্ন করে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করার একটা সময় অবশ্যই নির্দিষ্ট করে নাও। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই হলেন মালিক ও ব্যবস্থাপক। পূর্ব ও পশ্চিম সবই তাঁর অধিকারভুক্ত। তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউ নেই। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি যেমন এই আল্লাহরই ইবাদত করছো, তেমনই একমাত্র তার উপরই নির্ভরশীল হয়ে যাও। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারই ইবাদত কর এবং তার উপর ভরসা কর।” এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ “আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।” এই অর্থের আরো বহু আয়াত রয়েছে যে, ইবাদত, আনুগত্য এবং ভরসা করার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ।

আল-মুযযাম্মিল 73:9

মুসনাদে বাযযারে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরায়েশরা দারুণ নদুওয়াতে একত্রিত হয়ে পরস্পর বলাবলি করলোঃ এসো, আমরা এই ব্যক্তির (হযরত মুহাম্মাদ সঃ)-এর এমন এক নাম স্থির করি যে, সবারই মুখ দিয়ে এই নামই বের হবে, যাতে বাইরের লোকেরা একই আওয়ায শুনে যায়। তখন কেউ কেউ বললো যে, তার নাম ‘কাহিন' বা গণক রাখা হোক। একথা শুনে অন্যেরা বললো যে, প্রকৃতপক্ষে সে তো ‘কাহিন’ বা গণক নয়। আর একটি প্রস্তাব উঠলো যে, তাহলে এর নাম ‘মাজনুন' বা পাগল রাখা হোক। এর উপরও অন্যেরা আপত্তি উঠালো যে, সে পাগলও নয়। এরপর প্রস্তাব রাখা হলো যে, এর নাম ‘সাহির’ বা যাদুকর রাখা হোক। কিন্তু এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যাত হলো। কারণ বলা হলো যে, সে ‘সাহির’ বা যাদুকরও নয়। মোটকথা তারা তাঁর এমন কোন খারাপ নাম স্থির করতে পারলো না যাতে সবাই একমত হতে পারে। এভাবেই ঐ মজলিস ভেঙ্গে গেল। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর নিকট আসলেন এবং “হে বস্ত্রাবৃত' বলে তাঁকে সম্বোধন করলেন। (এই বর্ণনার একজন বর্ণনাকারী মুআল্লা ইবনে আবদির রহমানের নিকট হতে যদিও আহলে ইলমের একটি দল রিওয়াইয়াত নিয়ে থাকেন এবং তার থেকে হাদীস বর্ণনা করে থাকেন, কিন্তু তাঁর রিওয়াইয়াত সমূহের মধ্যে এমন বহু হাদীস রয়েছে যেগুলোর উপর তাঁর অনুসরণ করা যায় না) ১-৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন রাত্রিকালে কাপড় জড়িয়ে শয়ন করা পরিত্যাগ করেন এবং তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়িয়ে থাকার কাজ অবলম্বন করেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায়, আর আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা হতে তারা ব্যয় করে।” (৩২:১৬) রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা জীবন এ হুকুম পালন করে গেছেন। তাহাজ্জুদের নামায শুধু তাঁর উপর ফরয ছিল। অর্থাৎ এ নামায তাঁর উম্মতের উপর ওয়াজিব নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এবং তুমি রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে; এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় যে, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” (১৭:৭৯) এই হুকুমের সাথে সাথে পরিমাণও বর্ণনা করে দিলেন যে, অর্ধেক রাত্রি বা কিছু কম-বেশী।(আরবি) বলা হয় শয়নকারী ও বস্ত্রাবৃত ব্যক্তিকে। আবার এ অর্থও করা হয়েছেঃ হে কুরআনকে উত্তম রূপে গ্রহণকারী! তুমি অর্ধরাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামাযে মগ্ন থাকো। অথবা কিছু কম বেশী করো। আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে, যাতে ভালভাবে বুঝতে পারা যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ হুকুম ও বরাবর পালন করে এসেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীম খুবই ধীরে ধীরে ও থেমে থেমে পাঠ করতেন। ফলে খুব দেরীতে সূরা শেষ হতো। ছোট সূরাও যেন বড় হয়ে যেতো। সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, হযরত আনাস (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুব টেনে টেনে পাঠ করতেন।” তারপর তিনি (আরবি) পাঠ করে শুনিয়ে দেন, যাতে তিনি (আরবি) এবং (আরবি) শব্দের উপর মদ করেন অর্থাৎ ওগুলো দীর্ঘ করে পড়েন।ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেকটি আয়াতের উপর পূর্ণ ওয়াকফ করতেন বা থামতেন। যেমন (আরবি)পড়ে থামতেন, (আরবি) পড়ে থামতেন (আরবি) এর উপর ওয়াফ করতেন এবং (আরবি) পড়ে থামতেন। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবী দাউদ এবং ‘জামে’ তিরমিযীতেও রয়েছে)মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কুরআনের পাঠককে কিয়ামতের দিন বলা হবেঃ ‘পড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে ও স্পষ্টভাবে পড়তে থাকো যেমন দুনিয়ায় পড়তে। তোমার মনযিল ও মরতবা হলো ওটা যেখানে তোমার আখিরী আয়াত শেষ হয়। (এ হাদীসটি সুনানে আবী দাউদ, জামে তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন) আমরা এই তাফসীরের শুরুতে ঐ সব হাদীস আনয়ন করেছি যেগুলো ধীরে ধীরে পাঠ মুস্তাহাব হওয়া এবং ভাল ও মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করার কথা বলে দেয়। যেমন এ হাদীসটি, যাতে রয়েছেঃ কুরআনকে স্বীয় সুর দ্বারা সৌন্দৰ্য্য মণ্ডিত কর এবং ঐ ব্যক্তি আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করে না। আর হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ কথা বলাঃ “তাকে হযরত দাউদ (আঃ)-এর বংশধর এর মধুর সুর দান করা হয়েছে এবং হযরত আবূ মূসা (রাঃ)-এর একথা বলাঃ “আমি যদি জানতাম যে, আপনি আমার কুরআন পাঠ শুনছেন তবে আমি আরো উত্তম ও মধুর সুরে পড়তাম।" আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর এ কথা বলাঃ “বালুকার মত কুরআনকে ছড়িয়ে দিয়ো না এবং কবিতার মত কুরআনকে অভদ্রতার সাথে। পড়ো না, ওর চমৎকারিত্বের প্রতি খেয়াল রেখো এবং অন্তরে তা ক্রিয়াশীল করো। আর সূরা তাড়াতাড়ি শেষ করার পিছনে লেগে পড়ো না।” (এটা ইমাম বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) একটি লোক এসে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে বললোঃ “আমি মুফাসসালের সমস্ত সূরা আজ রাত্রে একই রাকআতে পাঠ করে ফেলেছি।" তার একথা শুনে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “তা হলে সম্ভবতঃ তুমি কবিতার মত তাড়াতাড়ি করে পাঠ করে থাকবে। ঐ সূরাগুলো আমার বেশ মুখস্থ আছে যেগুলি রাসুলুল্লাহ (সঃ) মিলিয়ে পড়তেন। তারপর তিনি মুফাসসাল সূরাগুলোর মধ্যে বিশিষ্ট সূরার নাম লিখেন যেগুলোর দু’টি করে সূরা মিলিত করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক এক রাকআতে পাঠ করতেন।এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করছি গুরুভার বাণী। অর্থাৎ তা আমল করতেও ভারী হবে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও বৃহত্তের কারণে অবতীর্ণ হওয়ার সময়েও খুবই কষ্টদায়ক হবে। যেমন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় তার উরু আমার উরুর উপর ছিল। তখন ওহীর বোঝা আমার উপর এমন ভারীবোধ হলো যে, আমার ভয় হলো না জানি হয়তো আমার উরু ভেঙ্গেই যাবে।মুসনাদে আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় আপনি কিছু অনুভব করেন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমি এমন শব্দ শুনতে পাই যেমন কোন জিঞ্জীরের শব্দ হয়। আমি নিঃশব্দ হয়ে পড়ি। যখনই ওহী অবতীর্ণ হয় তখন তা আমার উপর এমন বোঝা স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায় যে, আমার মনে হয় যেন আমার প্রাণই বেরিয়ে পড়বে।” হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হারিস ইবনে হিশাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার কাছে ওহী কিভাবে আসে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “কখনো কখনো খুবই কষ্ট হয়। কিন্তু এ সত্ত্বেও ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায় শেষ হওয়ার সাথে সাথে ওহী আমার মুখস্থ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে আগমন করে ও ওহী অবতীর্ণ করেন। তিনি কথা বলতে থাকেন এবং আমি তা মুখস্থ করতে থাকি।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি একবার নবী (সঃ)-কে এমন অবস্থায় দেখেছি যে, তার উপর ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। তখন শীতকাল ছিল। এতদসত্ত্বেও তাঁর ললাট ঘর্মাক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং ঘর্ম টপ টপ করে পড়ছিল।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন কোন সময় উষ্ট্রীর উপর সওয়ার থাকতেন এবং ঐ অবস্থাতেই তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হতো। তখন উন্ত্রী ওহীর ভারে ঝুঁকে পড়তো। তাফসীরে ইবনে জারীরে এও রয়েছে যে, অতঃপর যে পর্যন্ত ওহী বন্ধ না হতো উষ্ট্ৰী নড়তে পারতো না এবং তার গর্দান উঁচু হতো না। ভাবার্থ এই যে, স্বয়ং ওহীর ভার বহন করা কঠিন ছিল। এবং আহকাম পালন করাও ছিল অনুরূপ কঠিন। হযরত ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি এটাই। হযরত আবদুর রহমান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, দুনিয়াতে যেমন এটা ভারী কাজ, তেমনই আখিরাতেও এর প্রতিদান ও পুরস্কার ভারী হবে। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অবশ্য রাত্রিকালের উত্থান দলনে প্রবলতর এবং বাক্য স্ফুরণে সঠিক। আবিসিনীয় ভাষায় (আরবি) শব্দের অর্থ হলো দাঁড়িয়ে থাকা। সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকলে (আরবি) বলা হয়। তাহাজ্জুদের নামাযের উৎকৃষ্টতা এই যে, এর ফলে অন্তর ও রসনা এক হয়ে যায়। তিলাওয়াতের যে শব্দগুলো মুখ দিয়ে বের হয় তা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। দিনের তুলনায় রাত্রির নির্জনতায় অর্থ ও ভাব অন্তরে ভালভাবে গেঁথে যায়। কেননা দিবস হলো কোলাহল ও অর্থোপার্জনের সময়।হযরত আনাস (রাঃ) (আরবি) কে (আরবি) পড়লে জনগণ বলে ওঠেঃ আমরাতো (আরবি) পড়ে (আরবি) থাকি? উত্তরে তিনি বলেনঃ (আরবি) এবং একই অর্থবোধক শব্দ।ইরশাদ হচ্ছেঃ (হে নবী সঃ)! দিবাভাগে তোমার জন্যে রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। তুমি শুয়ে-বসে থাকতে পার, বিশ্রাম করতে পার, বেশী বেশী নফল আদায় করতে পার এবং তোমার পার্থিব কাজ-কাম সম্পন্ন করতে পার। অতএব রাত্রিকে তুমি তোমার আখিরাতের কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে নাও। এ হুকুম ঐ সময় ছিল যখন রাত্রির নামায ফরয ছিল। তারপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় বান্দাদের উপর অনুগ্রহ করেন এবং হালকাকরণের জন্যে রাত্রির কিয়ামের সময় হ্রাস করে দেন এবং বলেনঃ তোমরা রাত্রির অল্প সময় কিয়াম কর। এই ফরমানের পর হযরত আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) (আরবি) হতে (আরবি) পর্যন্ত পাঠ করলেন। তাঁর এ উক্তিটি সঠিকও বটে। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত সাঈদ ইবনে হিশাম (রঃ) তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন এবং মদীনার পথে যাত্রা শুরু করেন। উদ্দেশ্য এই যে, তিনি তাঁর সেখানকার ঘরবাড়ী বিক্রি করে ফেলবেন এবং ওর মূল্য দিয়ে অস্ত্র-শস্ত্র ইত্যাদি ক্রয় করে জিহাদে অংশগ্রহণ করবেন। তিনি রোমকদের সাথে লড়াই করতে থাকবেন। অতঃপর হয় রোম বিজিত হবে, না হয় তিনি শাহাদাত বরণ করবেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি তাঁর কওমের লোকদের সাথে মিলিত হন। এবং তাঁদের কাছে স্বীয় উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন। তাঁর এই সংকল্পের কথা শুনে তাঁরা বললেনঃ তাহলে শুনুন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশায় আপনারই কওমের ছয়জন লোক এটাই সংকল্প করেছিল যে, তারা নিজেদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দিবে এবং ঘরবাড়ী ইত্যাদি বেচে দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে দাঁড়িয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ খবর পেয়ে তাদেরকে ডেকে বললেনঃ “আমি কি তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ নই? খবরদার! এ কাজ করো না।” এভাবে তিনি তাদেরকে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে নিষেধ করেন। এ হাদীস শুনে হযরত সাঈদ (রাঃ) তাঁর ঐ সংকল্প ত্যাগ করেন এবং সেখানেই তাঁর কওমের লোকদেরকে বললেনঃ “তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলাম। তারপর তিনি সেখান হতে বিদায় নিয়ে স্বস্থানে চলে আসলেন। স্বীয় জামাআতের সাথে মিলিত হয়ে তিনি তাদেরকে বললেনঃ আমি এখান থেকে যাওয়ার পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট গমন করি এবং তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামায পড়ার পদ্ধতি জিজ্ঞেস করি। তিনি উত্তরে বলেনঃ এ মাসআলাটি হযরত আয়েশা (রাঃ) সবচেয়ে ভাল বলতে পারবেন। সুতরাং তুমি সেখানে গিয়ে তাঁকেই জিজ্ঞেস করো। তুমি তাঁর কাছে যা শুনবে তা আমাকেও বলে যেয়ো। আমি তখন হযরত হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং তাকে বললাম আমাকে একটু হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে নিয়ে চলুন। তিনি প্রথমে যেতে অস্বীকার করলেও আমার পীড়াপীড়িতে শেষে যেতে সম্মত হলেন। সুতরাং আমরা উভয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে গেলাম। হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত হাকীম (রাঃ)-এর গলার স্বর শুনেই তাঁকে চিনতে পারলেন এবং বললেন “কে, হাকীম?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমি হাকীম ইবনে আফলাহ (রাঃ)। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সাথে ওটা কে?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “এটা সাঈদ ইবনে হিশাম (রাঃ)।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “কোন হিশাম? আমিরের ছেলে হিশাম কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যাঁ, আমিরের ছেলে হিশামই বটে।” এ কথা শুনে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হযরত আমির (রাঃ)-এর জন্যে রহমতের দু’আ করলেন এবং বললেনঃ “আমির (রাঃ) খুব ভাল মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।” আমি তখন আরয করলামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র কেমন ছিল তা আমাকে অবহিত করুন। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি কি কুরআন পড়নি?” আমি উত্তর দিলাম ও হ্যাঁ, পড়েছি বটে। তিনি তখন বললেনঃ “কুরআনই তার চরিত্র।” আমি তখন তাঁর নিকট হতে বিদায় গ্রহণের অনুমতি চাওয়ার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু হঠাৎ আমার মনে পড়লো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) রাত্রির নামায সম্পর্কে প্রশ্ন করা দরকার। আমার এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেনঃ “তুমি কি সূরা মুযযাম্মিল পড়নি?” আমি জবাব দিলামঃ হ্যাঁ, অবশ্যই পড়েছি। তিনি বললেনঃ “তাহলে শুনো। সূরার এই প্রথম ভাগে রাত্রির কিয়াম (দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদের নামায পড়া) ফরয করা হয় এবং এক বছর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ তাহাজ্জুদের নামায ফরয হিসেবে আদায় করতেন। এমন কি তাঁদের পা ফুলে যেতো। বারো মাস পরে এই সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং মহান আল্লাহ ভার লাঘব করে দেন। তাহাজ্জুদের নামাযকে তিনি ফরয হিসেবে না রেখে নফল হিসেবে রেখে দেন।” এবার আমি বিদায় গ্রহণের ইচ্ছা করলাম। কিন্তু বিতর নামাযের মাসআলাটি জিজ্ঞেস করার কথা মনে পড়ে গেল। তাই আমি বললামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিতর নামাযের পদ্ধতিও আমাকে জানিয়ে দিন। তিনি তখন বললেনঃ শুননা, (রাত্রে) আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মিসওয়াক, অযুর পানি ইত্যাদি ঠিক করে একদিকে রেখে দিতাম। যখনই আল্লাহর ইচ্ছা হতো তিনি চক্ষু খুলতেন। তিনি উঠে মিসওয়াক করতেন ও অযু করতেন এবং আট রাকআত নামায পড়তেন। মধ্যে তাশাহহুদে মোটেই বসতেন না। আট রাকআত পূর্ণ করার পর তিনি আত্তাহিয়্যাতুতে বসতেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলার যিকির করতেন, দু'আ করতেন এবং সালাম না ফিরিয়েই উঠে পড়তেন। আর নবম রাকআত পড়ে যিকির ও দুআ করতেন এবং উচ্চ শব্দে সালাম ফিরাতেন। এ শব্দ আমরাও শুনতে পেতাম। তারপর বসে বসেই দুই রাকআত নামায পড়তেন। হে আমার প্রিয় পুত্র! সব মিলিয়ে মোট এগারো রাকআত হলো। অতঃপর যখন তাঁর বয়স বেশী হয় এবং দেহ ভারী হয়ে যায় তখন থেকে তিনি সাত রাকআত বিতর পড়ে সালাম ফিরাতেন এবং পরে বসে বসে দুই রাকআত নামায পড়তেন। সুতরাং হে প্রিয় বৎস! এটা নয় রাকআত হলো। আর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন তিনি কোন নামায পড়তে শুরু করতেন তখন তা চিরস্থায়ীভাবে পড়তে থাকতেন। তবে হ্যাঁ, কোন ব্যবস্থা বা ঘুম অথবা দুঃখ কষ্টের কারণে কিংবা রোগের কারণে রাত্রে ঐ নামায পড়তে না পারলে দিনের বেলায় বারো রাকআত পড়ে নিতেন। আমার জানা নেই যে, তিনি গোটা কুরআন রাত থেকে নিয়ে সকাল পর্যন্ত পড়ে শেষ করেছেন এবং রমযান ছাড়া অন্য কোন পুরো মাসই রোযা রেখেছেন।” অতঃপর আমি উম্মুল মু'মিনিন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট হতে বিদায় নিয়ে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁর সামনে সমস্ত প্রশ্ন ও উত্তরের পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি সবটারই সত্যতা স্বীকার করলেন এবং বললেনঃ “আমিও যদি তাঁর কাছে যাতায়াত করতে পারতাম তবে আমি নিজের কানে শুনে আসতাম।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্যে মাদুর বিছিয়ে রাখতাম যার উপর তিনি তাহাজ্জুদের নামায আদায় করতেন। লোকেরা এ খবর জানতে পেরে রাত্রির নামাযেও তাঁর ইকতিদা করার জন্যে এসে পড়ে। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) রাগান্বিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। উম্মতের প্রতি তিনি বড়ই মেহেরবান ছিলেন এবং সাথে সাথে এ ভয়ও করতেন যে, হয়তো এ নামায ফরয হয়ে যাবে, তাই তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ “হে লোক সকল! ঐ সব আমলের উপরই কষ্ট স্বীকার কর যেগুলো পালনের তোমাদের শক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পুণ্যদানে অপারগ হবেন না। বরং তোমরাই আমলে অপারগ হয়ে যাবে। ঐ আমলই সর্বাপেক্ষা উত্তম যার উপর চিরস্থায়ীভাবে থাকা হয়। এদিকে কুরআন কারীমে এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং সাহাবীগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করে দেন এবং ঘুম যেন না আসে এ জন্যে তারা রশি বেঁধে লটকিতে লাগলেন। আট মাস এই ভাবেই কেটে গেল। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাঁদের এ চেষ্টা দেখে আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করলেন এবং রাত্রির কিয়ামকে এশার ফরয নামাযের দিকে ফিরিয়ে দিলেন। আর রাত্রির কিয়াম ছেড়ে দিলেন। (এ রিওয়াইয়াতটি মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমেও রয়েছে। কিন্তু এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ যুবাইদী দুর্বল। আসল হাদীস সূরা মুয্যাম্মিলের নাযিল হওয়ার উল্লেখ ছাড়া সহীহ গ্রন্থেও রয়েছে) এই হাদীসের শব্দাবলীর ভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, এটা মাদানী সূরা, অথচ প্রকৃতপক্ষে এ সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। অনুরূপভাবে এ রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, আর্ট মাস পরে এর শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এই উক্তিটিও দুর্বল। সহীহ ওটাই যা মুসনাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক বছর পরে শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা মুযযাম্মিলের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) রমযান শরীফের রাত্রির কিয়ামের মতই কিয়াম করতে শুরু করেন। আর এ সূরার প্রাথমিক ও শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার মাঝে প্রায় এক বছরের ব্যবধান ছিল। তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত আবূ উমামাহ (রাঃ) হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। হযরত আবূ আবদির রহমান (রঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর পর্যন্ত কিয়াম করেন, এমন কি তাদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। অতঃপর (আরবি) অবতীর্ণ হয় এবং তাঁরা শান্তি পান। হযরত হাসান বসরী (রঃ) হযরত সুদ্দীরও (রঃ) উক্তি এটাই। মুসনাদে ইবনে আবী হাতিমে এ রিওয়াইয়াতটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে ষোল মাসের সময়কালের সাথে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ (রাঃ) এক বছর বা দু’বছর পর্যন্ত কিয়াম করতে থাকেন। তাঁদের পা ও পদনালী ফুলে যায়। তারপর সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং তাঁদের ভার লাঘব হয়ে যায়। হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) দশ বছরের মেয়াদের কথা বলেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রাথমিক আয়াতগুলোর হুকুম অনুযায়ী মুমিনগণ রাত্রির কিয়াম শুরু করেন, কিন্তু তাঁদের খুবই কষ্ট হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি দয়া করেন এবং (আরবি) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন এভাবে তাঁদের প্রতি প্রশস্ততা আনয়ন করেন এবং সংকীর্ণতা দূরীভূত করেন। সুতরাং আল্লাহ তা’আলারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁতে মগ্ন হও। অর্থাৎ দুনিয়ার কাজ-কারবার হতে অবসর লাভ করে প্রশান্তির সাথে খুব বেশী বেশী তার যিকির করতে থাকো, তার দিকে ঝুঁকে পড়ে তাঁর প্রতি মনোনিবেশ কর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতএব যখনই অবসর পাও সাবধান করো।” একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) অর্থাৎ স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং দুনিয়া ছেড়ে দিতে নিষেধ করেছেন। এখানে ভাবার্থ হচ্ছেঃ হে নবী (সঃ)! পার্থিব সৃষ্টিকূল হতে সম্পর্ক চ্ছিন্ন করে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করার একটা সময় অবশ্যই নির্দিষ্ট করে নাও। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহই হলেন মালিক ও ব্যবস্থাপক। পূর্ব ও পশ্চিম সবই তাঁর অধিকারভুক্ত। তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউ নেই। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তুমি যেমন এই আল্লাহরই ইবাদত করছো, তেমনই একমাত্র তার উপরই নির্ভরশীল হয়ে যাও। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারই ইবাদত কর এবং তার উপর ভরসা কর।” এই বিষয়টিই নিম্নের আয়াতেও রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ “আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।” এই অর্থের আরো বহু আয়াত রয়েছে যে, ইবাদত, আনুগত্য এবং ভরসা করার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ।

আল-মুযযাম্মিল 73:10

১০-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কাফিরদের বিদ্রুপাত্মক কথার উপর ধৈর্য ধারণের হিদায়াত করছেন এবং বলছেনঃ তাদেরকে কোন তিরস্কার ধমক ছাড়াই তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। আমি স্বয়ং তাদেরকে দেখে নিবো। আমার গজব ও ক্রোধের সময় দেখবো কি করে তারা মুক্তি পেতে পারে। তাদের মধ্যে যারা সম্পদশালী ও স্বচ্ছল লোক, যারা তোমাকে নানা প্রকারে কষ্ট দিচ্ছে, যাদের উপর দ্বিগুণ প্রাপ্য রয়েছে, এক জানের আর এক মালের, আর তারা কোনটাই আদায় করছে না, তাদের সাথে তুমি সম্পর্ক ছিন্ন করে দাও, তারপর দেখে নিয়ো, আমি তাদের সাথে কি ব্যবহার করি। অল্প দিন তারা দুনিয়ায় ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকুক, পরিণামে তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে পতিত হবে। কেমন আযাব? এমন কঠিন আযাব যে, তাদেরকে শৃংখল পরিয়ে জাহান্নামের প্রজ্বলিত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে। আর তাদেরকে এমন খাদ্য খেতে দেয়া হবে যা কণ্ঠ নালীতে আটকে যাবে। নীচেও নামবে না এবং উপরেও উঠবে না। আরো নানা প্রকারের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে দেয়া হবে। এমন এক সময়ও হবে যখন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে। পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হয়ে যাবে। যে বালুকারাশিকে বাতাস এদিক-ওদিক উড়িয়ে নিয়ে যাবে। কারো কোন নাম-নিশানাও বাকী থাকবে না। যমীন এক সমতল ভূমিতে পরিণত হবে, যেখানে কোন উঁচু-নীচু পরিলক্ষিত হবে না। এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ হে লোক সকল এবং বিশেষ করে হে কাফিরদের দল! আমি তোমাদের নিকট তোমাদের জন্যে সাক্ষী স্বরূপ এক রাসূল (সঃ) পাঠিয়েছি, যে রাসূল সত্যবাদী ও সত্যায়িত, যেমন আমি ফিরাউনের নিকট আমার আহকাম পৌঁছাবার জন্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরাউন যখন তাকে অমান্য করলো তখন আমি তাকে কিরূপ কঠিন শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম তা তো তোমাদের জানা আছে। সুতরাং আমার এই নবী (সঃ)-কে যদি তোমরা অমান্য কর তবে তোমাদেরও পরিণাম ভাল হবে না। তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং তোমাদেরকে তচনচ করে দেয়া হবে। কেন না এই রাসূল (সঃ) সমস্ত রাসূলের নেতা। সুতরাং তাকে অমান্য করার শাস্তিও হবে অন্যান্য শাস্তি অপেক্ষা বড়। এর পরবর্তী আয়াতের দু’টি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হলোঃ যদি তোমরা কুফরী কর তবে বল তো ঐ দিনের শাস্তি হতে তোমরা কিরূপে মুক্তি পেতে পার যে দিনের ভয়াবহতা কিশোরকে বৃদ্ধে পরিণত করবে? দ্বিতীয় অর্থ হলোঃ তোমরা যদি এতো বড় ভয়াবহ দিনকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস কর তবে তোমরা, তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় কিরূপে লাভ করতে পার? এই উভয় অর্থই উত্তম হলেও প্রথম অর্থটিই বেশী উত্তম! এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এটা হলো কিয়ামতের দিন যেই দিন আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বলবেনঃ ‘উঠো এবং তোমার সন্তানদের মধ্য হতে জাহান্নামীদেরকে পৃথক কর।' তখন হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কতজনের মধ্য হতে কতজন? আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ প্রতি হাজারের মধ্য হতে নয়শ নিরানব্বই জনকে।' এ কথা শুনে মুসলমানদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও তাদের চেহারা দেখে তা বুঝে নিলেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে সান্ত্বনার সুরে বললেনঃ জেনে রেখো যে, হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান অনেক। ইয়াজুজ ও মাজুজও হযরত আদম (আঃ)-এরই সন্তান। তারা এক একজন নিজের পিছনে এক হাজার করে সন্তান ছেড়ে যায়। সুতরাং তারা এবং তাদের মত লোক মিলে এই সংখ্যা দাঁড়াবে। সুতরাং ঘাবড়াবার কিছুই নেই। জান্নাত তোমাদের জন্যে এবং তোমরা জান্নাতের জন্যে।” (ইমাম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এটা গারীব হাদীস) সূরা হজ্বের শুরুতে এরকম হাদীস সমূহের বর্ণনা গত হয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ দিনের ভয়াবহতার কারণে আকাশও বিদীর্ণ হয়ে যাবে। কেউ কেউ (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি আল্লাহর দিকে ফিরিয়েছেন। কিন্তু এটা সবল নয়। কেননা এখানে তাঁর যিকিরই নেই।মহান আল্লাহ বলেনঃ ঐদিনের ওয়াদা নিশ্চিতরূপে সত্য। ওটা সংঘটিত হবেই। ঐ দিনের আগমনে কোন সন্দেহই নেই।

আল-মুযযাম্মিল 73:11

১০-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কাফিরদের বিদ্রুপাত্মক কথার উপর ধৈর্য ধারণের হিদায়াত করছেন এবং বলছেনঃ তাদেরকে কোন তিরস্কার ধমক ছাড়াই তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। আমি স্বয়ং তাদেরকে দেখে নিবো। আমার গজব ও ক্রোধের সময় দেখবো কি করে তারা মুক্তি পেতে পারে। তাদের মধ্যে যারা সম্পদশালী ও স্বচ্ছল লোক, যারা তোমাকে নানা প্রকারে কষ্ট দিচ্ছে, যাদের উপর দ্বিগুণ প্রাপ্য রয়েছে, এক জানের আর এক মালের, আর তারা কোনটাই আদায় করছে না, তাদের সাথে তুমি সম্পর্ক ছিন্ন করে দাও, তারপর দেখে নিয়ো, আমি তাদের সাথে কি ব্যবহার করি। অল্প দিন তারা দুনিয়ায় ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকুক, পরিণামে তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে পতিত হবে। কেমন আযাব? এমন কঠিন আযাব যে, তাদেরকে শৃংখল পরিয়ে জাহান্নামের প্রজ্বলিত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে। আর তাদেরকে এমন খাদ্য খেতে দেয়া হবে যা কণ্ঠ নালীতে আটকে যাবে। নীচেও নামবে না এবং উপরেও উঠবে না। আরো নানা প্রকারের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে দেয়া হবে। এমন এক সময়ও হবে যখন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে। পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হয়ে যাবে। যে বালুকারাশিকে বাতাস এদিক-ওদিক উড়িয়ে নিয়ে যাবে। কারো কোন নাম-নিশানাও বাকী থাকবে না। যমীন এক সমতল ভূমিতে পরিণত হবে, যেখানে কোন উঁচু-নীচু পরিলক্ষিত হবে না। এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ হে লোক সকল এবং বিশেষ করে হে কাফিরদের দল! আমি তোমাদের নিকট তোমাদের জন্যে সাক্ষী স্বরূপ এক রাসূল (সঃ) পাঠিয়েছি, যে রাসূল সত্যবাদী ও সত্যায়িত, যেমন আমি ফিরাউনের নিকট আমার আহকাম পৌঁছাবার জন্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরাউন যখন তাকে অমান্য করলো তখন আমি তাকে কিরূপ কঠিন শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম তা তো তোমাদের জানা আছে। সুতরাং আমার এই নবী (সঃ)-কে যদি তোমরা অমান্য কর তবে তোমাদেরও পরিণাম ভাল হবে না। তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং তোমাদেরকে তচনচ করে দেয়া হবে। কেন না এই রাসূল (সঃ) সমস্ত রাসূলের নেতা। সুতরাং তাকে অমান্য করার শাস্তিও হবে অন্যান্য শাস্তি অপেক্ষা বড়। এর পরবর্তী আয়াতের দু’টি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হলোঃ যদি তোমরা কুফরী কর তবে বল তো ঐ দিনের শাস্তি হতে তোমরা কিরূপে মুক্তি পেতে পার যে দিনের ভয়াবহতা কিশোরকে বৃদ্ধে পরিণত করবে? দ্বিতীয় অর্থ হলোঃ তোমরা যদি এতো বড় ভয়াবহ দিনকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস কর তবে তোমরা, তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় কিরূপে লাভ করতে পার? এই উভয় অর্থই উত্তম হলেও প্রথম অর্থটিই বেশী উত্তম! এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এটা হলো কিয়ামতের দিন যেই দিন আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বলবেনঃ ‘উঠো এবং তোমার সন্তানদের মধ্য হতে জাহান্নামীদেরকে পৃথক কর।' তখন হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কতজনের মধ্য হতে কতজন? আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ প্রতি হাজারের মধ্য হতে নয়শ নিরানব্বই জনকে।' এ কথা শুনে মুসলমানদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও তাদের চেহারা দেখে তা বুঝে নিলেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে সান্ত্বনার সুরে বললেনঃ জেনে রেখো যে, হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান অনেক। ইয়াজুজ ও মাজুজও হযরত আদম (আঃ)-এরই সন্তান। তারা এক একজন নিজের পিছনে এক হাজার করে সন্তান ছেড়ে যায়। সুতরাং তারা এবং তাদের মত লোক মিলে এই সংখ্যা দাঁড়াবে। সুতরাং ঘাবড়াবার কিছুই নেই। জান্নাত তোমাদের জন্যে এবং তোমরা জান্নাতের জন্যে।” (ইমাম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এটা গারীব হাদীস) সূরা হজ্বের শুরুতে এরকম হাদীস সমূহের বর্ণনা গত হয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ দিনের ভয়াবহতার কারণে আকাশও বিদীর্ণ হয়ে যাবে। কেউ কেউ (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি আল্লাহর দিকে ফিরিয়েছেন। কিন্তু এটা সবল নয়। কেননা এখানে তাঁর যিকিরই নেই।মহান আল্লাহ বলেনঃ ঐদিনের ওয়াদা নিশ্চিতরূপে সত্য। ওটা সংঘটিত হবেই। ঐ দিনের আগমনে কোন সন্দেহই নেই।

আল-মুযযাম্মিল 73:12

১০-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কাফিরদের বিদ্রুপাত্মক কথার উপর ধৈর্য ধারণের হিদায়াত করছেন এবং বলছেনঃ তাদেরকে কোন তিরস্কার ধমক ছাড়াই তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। আমি স্বয়ং তাদেরকে দেখে নিবো। আমার গজব ও ক্রোধের সময় দেখবো কি করে তারা মুক্তি পেতে পারে। তাদের মধ্যে যারা সম্পদশালী ও স্বচ্ছল লোক, যারা তোমাকে নানা প্রকারে কষ্ট দিচ্ছে, যাদের উপর দ্বিগুণ প্রাপ্য রয়েছে, এক জানের আর এক মালের, আর তারা কোনটাই আদায় করছে না, তাদের সাথে তুমি সম্পর্ক ছিন্ন করে দাও, তারপর দেখে নিয়ো, আমি তাদের সাথে কি ব্যবহার করি। অল্প দিন তারা দুনিয়ায় ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকুক, পরিণামে তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে পতিত হবে। কেমন আযাব? এমন কঠিন আযাব যে, তাদেরকে শৃংখল পরিয়ে জাহান্নামের প্রজ্বলিত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে। আর তাদেরকে এমন খাদ্য খেতে দেয়া হবে যা কণ্ঠ নালীতে আটকে যাবে। নীচেও নামবে না এবং উপরেও উঠবে না। আরো নানা প্রকারের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে দেয়া হবে। এমন এক সময়ও হবে যখন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে। পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হয়ে যাবে। যে বালুকারাশিকে বাতাস এদিক-ওদিক উড়িয়ে নিয়ে যাবে। কারো কোন নাম-নিশানাও বাকী থাকবে না। যমীন এক সমতল ভূমিতে পরিণত হবে, যেখানে কোন উঁচু-নীচু পরিলক্ষিত হবে না। এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ হে লোক সকল এবং বিশেষ করে হে কাফিরদের দল! আমি তোমাদের নিকট তোমাদের জন্যে সাক্ষী স্বরূপ এক রাসূল (সঃ) পাঠিয়েছি, যে রাসূল সত্যবাদী ও সত্যায়িত, যেমন আমি ফিরাউনের নিকট আমার আহকাম পৌঁছাবার জন্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরাউন যখন তাকে অমান্য করলো তখন আমি তাকে কিরূপ কঠিন শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম তা তো তোমাদের জানা আছে। সুতরাং আমার এই নবী (সঃ)-কে যদি তোমরা অমান্য কর তবে তোমাদেরও পরিণাম ভাল হবে না। তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং তোমাদেরকে তচনচ করে দেয়া হবে। কেন না এই রাসূল (সঃ) সমস্ত রাসূলের নেতা। সুতরাং তাকে অমান্য করার শাস্তিও হবে অন্যান্য শাস্তি অপেক্ষা বড়। এর পরবর্তী আয়াতের দু’টি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হলোঃ যদি তোমরা কুফরী কর তবে বল তো ঐ দিনের শাস্তি হতে তোমরা কিরূপে মুক্তি পেতে পার যে দিনের ভয়াবহতা কিশোরকে বৃদ্ধে পরিণত করবে? দ্বিতীয় অর্থ হলোঃ তোমরা যদি এতো বড় ভয়াবহ দিনকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস কর তবে তোমরা, তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় কিরূপে লাভ করতে পার? এই উভয় অর্থই উত্তম হলেও প্রথম অর্থটিই বেশী উত্তম! এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এটা হলো কিয়ামতের দিন যেই দিন আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বলবেনঃ ‘উঠো এবং তোমার সন্তানদের মধ্য হতে জাহান্নামীদেরকে পৃথক কর।' তখন হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কতজনের মধ্য হতে কতজন? আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ প্রতি হাজারের মধ্য হতে নয়শ নিরানব্বই জনকে।' এ কথা শুনে মুসলমানদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও তাদের চেহারা দেখে তা বুঝে নিলেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে সান্ত্বনার সুরে বললেনঃ জেনে রেখো যে, হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান অনেক। ইয়াজুজ ও মাজুজও হযরত আদম (আঃ)-এরই সন্তান। তারা এক একজন নিজের পিছনে এক হাজার করে সন্তান ছেড়ে যায়। সুতরাং তারা এবং তাদের মত লোক মিলে এই সংখ্যা দাঁড়াবে। সুতরাং ঘাবড়াবার কিছুই নেই। জান্নাত তোমাদের জন্যে এবং তোমরা জান্নাতের জন্যে।” (ইমাম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এটা গারীব হাদীস) সূরা হজ্বের শুরুতে এরকম হাদীস সমূহের বর্ণনা গত হয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ দিনের ভয়াবহতার কারণে আকাশও বিদীর্ণ হয়ে যাবে। কেউ কেউ (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি আল্লাহর দিকে ফিরিয়েছেন। কিন্তু এটা সবল নয়। কেননা এখানে তাঁর যিকিরই নেই।মহান আল্লাহ বলেনঃ ঐদিনের ওয়াদা নিশ্চিতরূপে সত্য। ওটা সংঘটিত হবেই। ঐ দিনের আগমনে কোন সন্দেহই নেই।

আল-মুযযাম্মিল 73:13

১০-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কাফিরদের বিদ্রুপাত্মক কথার উপর ধৈর্য ধারণের হিদায়াত করছেন এবং বলছেনঃ তাদেরকে কোন তিরস্কার ধমক ছাড়াই তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। আমি স্বয়ং তাদেরকে দেখে নিবো। আমার গজব ও ক্রোধের সময় দেখবো কি করে তারা মুক্তি পেতে পারে। তাদের মধ্যে যারা সম্পদশালী ও স্বচ্ছল লোক, যারা তোমাকে নানা প্রকারে কষ্ট দিচ্ছে, যাদের উপর দ্বিগুণ প্রাপ্য রয়েছে, এক জানের আর এক মালের, আর তারা কোনটাই আদায় করছে না, তাদের সাথে তুমি সম্পর্ক ছিন্ন করে দাও, তারপর দেখে নিয়ো, আমি তাদের সাথে কি ব্যবহার করি। অল্প দিন তারা দুনিয়ায় ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকুক, পরিণামে তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে পতিত হবে। কেমন আযাব? এমন কঠিন আযাব যে, তাদেরকে শৃংখল পরিয়ে জাহান্নামের প্রজ্বলিত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে। আর তাদেরকে এমন খাদ্য খেতে দেয়া হবে যা কণ্ঠ নালীতে আটকে যাবে। নীচেও নামবে না এবং উপরেও উঠবে না। আরো নানা প্রকারের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে দেয়া হবে। এমন এক সময়ও হবে যখন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে। পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হয়ে যাবে। যে বালুকারাশিকে বাতাস এদিক-ওদিক উড়িয়ে নিয়ে যাবে। কারো কোন নাম-নিশানাও বাকী থাকবে না। যমীন এক সমতল ভূমিতে পরিণত হবে, যেখানে কোন উঁচু-নীচু পরিলক্ষিত হবে না। এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ হে লোক সকল এবং বিশেষ করে হে কাফিরদের দল! আমি তোমাদের নিকট তোমাদের জন্যে সাক্ষী স্বরূপ এক রাসূল (সঃ) পাঠিয়েছি, যে রাসূল সত্যবাদী ও সত্যায়িত, যেমন আমি ফিরাউনের নিকট আমার আহকাম পৌঁছাবার জন্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরাউন যখন তাকে অমান্য করলো তখন আমি তাকে কিরূপ কঠিন শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম তা তো তোমাদের জানা আছে। সুতরাং আমার এই নবী (সঃ)-কে যদি তোমরা অমান্য কর তবে তোমাদেরও পরিণাম ভাল হবে না। তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং তোমাদেরকে তচনচ করে দেয়া হবে। কেন না এই রাসূল (সঃ) সমস্ত রাসূলের নেতা। সুতরাং তাকে অমান্য করার শাস্তিও হবে অন্যান্য শাস্তি অপেক্ষা বড়। এর পরবর্তী আয়াতের দু’টি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হলোঃ যদি তোমরা কুফরী কর তবে বল তো ঐ দিনের শাস্তি হতে তোমরা কিরূপে মুক্তি পেতে পার যে দিনের ভয়াবহতা কিশোরকে বৃদ্ধে পরিণত করবে? দ্বিতীয় অর্থ হলোঃ তোমরা যদি এতো বড় ভয়াবহ দিনকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস কর তবে তোমরা, তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় কিরূপে লাভ করতে পার? এই উভয় অর্থই উত্তম হলেও প্রথম অর্থটিই বেশী উত্তম! এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এটা হলো কিয়ামতের দিন যেই দিন আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বলবেনঃ ‘উঠো এবং তোমার সন্তানদের মধ্য হতে জাহান্নামীদেরকে পৃথক কর।' তখন হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কতজনের মধ্য হতে কতজন? আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ প্রতি হাজারের মধ্য হতে নয়শ নিরানব্বই জনকে।' এ কথা শুনে মুসলমানদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও তাদের চেহারা দেখে তা বুঝে নিলেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে সান্ত্বনার সুরে বললেনঃ জেনে রেখো যে, হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান অনেক। ইয়াজুজ ও মাজুজও হযরত আদম (আঃ)-এরই সন্তান। তারা এক একজন নিজের পিছনে এক হাজার করে সন্তান ছেড়ে যায়। সুতরাং তারা এবং তাদের মত লোক মিলে এই সংখ্যা দাঁড়াবে। সুতরাং ঘাবড়াবার কিছুই নেই। জান্নাত তোমাদের জন্যে এবং তোমরা জান্নাতের জন্যে।” (ইমাম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এটা গারীব হাদীস) সূরা হজ্বের শুরুতে এরকম হাদীস সমূহের বর্ণনা গত হয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ দিনের ভয়াবহতার কারণে আকাশও বিদীর্ণ হয়ে যাবে। কেউ কেউ (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি আল্লাহর দিকে ফিরিয়েছেন। কিন্তু এটা সবল নয়। কেননা এখানে তাঁর যিকিরই নেই।মহান আল্লাহ বলেনঃ ঐদিনের ওয়াদা নিশ্চিতরূপে সত্য। ওটা সংঘটিত হবেই। ঐ দিনের আগমনে কোন সন্দেহই নেই।

আল-মুযযাম্মিল 73:14

১০-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কাফিরদের বিদ্রুপাত্মক কথার উপর ধৈর্য ধারণের হিদায়াত করছেন এবং বলছেনঃ তাদেরকে কোন তিরস্কার ধমক ছাড়াই তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। আমি স্বয়ং তাদেরকে দেখে নিবো। আমার গজব ও ক্রোধের সময় দেখবো কি করে তারা মুক্তি পেতে পারে। তাদের মধ্যে যারা সম্পদশালী ও স্বচ্ছল লোক, যারা তোমাকে নানা প্রকারে কষ্ট দিচ্ছে, যাদের উপর দ্বিগুণ প্রাপ্য রয়েছে, এক জানের আর এক মালের, আর তারা কোনটাই আদায় করছে না, তাদের সাথে তুমি সম্পর্ক ছিন্ন করে দাও, তারপর দেখে নিয়ো, আমি তাদের সাথে কি ব্যবহার করি। অল্প দিন তারা দুনিয়ায় ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকুক, পরিণামে তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে পতিত হবে। কেমন আযাব? এমন কঠিন আযাব যে, তাদেরকে শৃংখল পরিয়ে জাহান্নামের প্রজ্বলিত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে। আর তাদেরকে এমন খাদ্য খেতে দেয়া হবে যা কণ্ঠ নালীতে আটকে যাবে। নীচেও নামবে না এবং উপরেও উঠবে না। আরো নানা প্রকারের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে দেয়া হবে। এমন এক সময়ও হবে যখন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে। পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হয়ে যাবে। যে বালুকারাশিকে বাতাস এদিক-ওদিক উড়িয়ে নিয়ে যাবে। কারো কোন নাম-নিশানাও বাকী থাকবে না। যমীন এক সমতল ভূমিতে পরিণত হবে, যেখানে কোন উঁচু-নীচু পরিলক্ষিত হবে না। এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ হে লোক সকল এবং বিশেষ করে হে কাফিরদের দল! আমি তোমাদের নিকট তোমাদের জন্যে সাক্ষী স্বরূপ এক রাসূল (সঃ) পাঠিয়েছি, যে রাসূল সত্যবাদী ও সত্যায়িত, যেমন আমি ফিরাউনের নিকট আমার আহকাম পৌঁছাবার জন্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরাউন যখন তাকে অমান্য করলো তখন আমি তাকে কিরূপ কঠিন শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম তা তো তোমাদের জানা আছে। সুতরাং আমার এই নবী (সঃ)-কে যদি তোমরা অমান্য কর তবে তোমাদেরও পরিণাম ভাল হবে না। তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং তোমাদেরকে তচনচ করে দেয়া হবে। কেন না এই রাসূল (সঃ) সমস্ত রাসূলের নেতা। সুতরাং তাকে অমান্য করার শাস্তিও হবে অন্যান্য শাস্তি অপেক্ষা বড়। এর পরবর্তী আয়াতের দু’টি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হলোঃ যদি তোমরা কুফরী কর তবে বল তো ঐ দিনের শাস্তি হতে তোমরা কিরূপে মুক্তি পেতে পার যে দিনের ভয়াবহতা কিশোরকে বৃদ্ধে পরিণত করবে? দ্বিতীয় অর্থ হলোঃ তোমরা যদি এতো বড় ভয়াবহ দিনকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস কর তবে তোমরা, তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় কিরূপে লাভ করতে পার? এই উভয় অর্থই উত্তম হলেও প্রথম অর্থটিই বেশী উত্তম! এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এটা হলো কিয়ামতের দিন যেই দিন আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বলবেনঃ ‘উঠো এবং তোমার সন্তানদের মধ্য হতে জাহান্নামীদেরকে পৃথক কর।' তখন হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কতজনের মধ্য হতে কতজন? আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ প্রতি হাজারের মধ্য হতে নয়শ নিরানব্বই জনকে।' এ কথা শুনে মুসলমানদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও তাদের চেহারা দেখে তা বুঝে নিলেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে সান্ত্বনার সুরে বললেনঃ জেনে রেখো যে, হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান অনেক। ইয়াজুজ ও মাজুজও হযরত আদম (আঃ)-এরই সন্তান। তারা এক একজন নিজের পিছনে এক হাজার করে সন্তান ছেড়ে যায়। সুতরাং তারা এবং তাদের মত লোক মিলে এই সংখ্যা দাঁড়াবে। সুতরাং ঘাবড়াবার কিছুই নেই। জান্নাত তোমাদের জন্যে এবং তোমরা জান্নাতের জন্যে।” (ইমাম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এটা গারীব হাদীস) সূরা হজ্বের শুরুতে এরকম হাদীস সমূহের বর্ণনা গত হয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ দিনের ভয়াবহতার কারণে আকাশও বিদীর্ণ হয়ে যাবে। কেউ কেউ (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি আল্লাহর দিকে ফিরিয়েছেন। কিন্তু এটা সবল নয়। কেননা এখানে তাঁর যিকিরই নেই।মহান আল্লাহ বলেনঃ ঐদিনের ওয়াদা নিশ্চিতরূপে সত্য। ওটা সংঘটিত হবেই। ঐ দিনের আগমনে কোন সন্দেহই নেই।

আল-মুযযাম্মিল 73:15

১০-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কাফিরদের বিদ্রুপাত্মক কথার উপর ধৈর্য ধারণের হিদায়াত করছেন এবং বলছেনঃ তাদেরকে কোন তিরস্কার ধমক ছাড়াই তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। আমি স্বয়ং তাদেরকে দেখে নিবো। আমার গজব ও ক্রোধের সময় দেখবো কি করে তারা মুক্তি পেতে পারে। তাদের মধ্যে যারা সম্পদশালী ও স্বচ্ছল লোক, যারা তোমাকে নানা প্রকারে কষ্ট দিচ্ছে, যাদের উপর দ্বিগুণ প্রাপ্য রয়েছে, এক জানের আর এক মালের, আর তারা কোনটাই আদায় করছে না, তাদের সাথে তুমি সম্পর্ক ছিন্ন করে দাও, তারপর দেখে নিয়ো, আমি তাদের সাথে কি ব্যবহার করি। অল্প দিন তারা দুনিয়ায় ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকুক, পরিণামে তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে পতিত হবে। কেমন আযাব? এমন কঠিন আযাব যে, তাদেরকে শৃংখল পরিয়ে জাহান্নামের প্রজ্বলিত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে। আর তাদেরকে এমন খাদ্য খেতে দেয়া হবে যা কণ্ঠ নালীতে আটকে যাবে। নীচেও নামবে না এবং উপরেও উঠবে না। আরো নানা প্রকারের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে দেয়া হবে। এমন এক সময়ও হবে যখন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে। পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হয়ে যাবে। যে বালুকারাশিকে বাতাস এদিক-ওদিক উড়িয়ে নিয়ে যাবে। কারো কোন নাম-নিশানাও বাকী থাকবে না। যমীন এক সমতল ভূমিতে পরিণত হবে, যেখানে কোন উঁচু-নীচু পরিলক্ষিত হবে না। এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ হে লোক সকল এবং বিশেষ করে হে কাফিরদের দল! আমি তোমাদের নিকট তোমাদের জন্যে সাক্ষী স্বরূপ এক রাসূল (সঃ) পাঠিয়েছি, যে রাসূল সত্যবাদী ও সত্যায়িত, যেমন আমি ফিরাউনের নিকট আমার আহকাম পৌঁছাবার জন্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরাউন যখন তাকে অমান্য করলো তখন আমি তাকে কিরূপ কঠিন শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম তা তো তোমাদের জানা আছে। সুতরাং আমার এই নবী (সঃ)-কে যদি তোমরা অমান্য কর তবে তোমাদেরও পরিণাম ভাল হবে না। তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং তোমাদেরকে তচনচ করে দেয়া হবে। কেন না এই রাসূল (সঃ) সমস্ত রাসূলের নেতা। সুতরাং তাকে অমান্য করার শাস্তিও হবে অন্যান্য শাস্তি অপেক্ষা বড়। এর পরবর্তী আয়াতের দু’টি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হলোঃ যদি তোমরা কুফরী কর তবে বল তো ঐ দিনের শাস্তি হতে তোমরা কিরূপে মুক্তি পেতে পার যে দিনের ভয়াবহতা কিশোরকে বৃদ্ধে পরিণত করবে? দ্বিতীয় অর্থ হলোঃ তোমরা যদি এতো বড় ভয়াবহ দিনকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস কর তবে তোমরা, তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় কিরূপে লাভ করতে পার? এই উভয় অর্থই উত্তম হলেও প্রথম অর্থটিই বেশী উত্তম! এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এটা হলো কিয়ামতের দিন যেই দিন আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বলবেনঃ ‘উঠো এবং তোমার সন্তানদের মধ্য হতে জাহান্নামীদেরকে পৃথক কর।' তখন হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কতজনের মধ্য হতে কতজন? আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ প্রতি হাজারের মধ্য হতে নয়শ নিরানব্বই জনকে।' এ কথা শুনে মুসলমানদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও তাদের চেহারা দেখে তা বুঝে নিলেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে সান্ত্বনার সুরে বললেনঃ জেনে রেখো যে, হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান অনেক। ইয়াজুজ ও মাজুজও হযরত আদম (আঃ)-এরই সন্তান। তারা এক একজন নিজের পিছনে এক হাজার করে সন্তান ছেড়ে যায়। সুতরাং তারা এবং তাদের মত লোক মিলে এই সংখ্যা দাঁড়াবে। সুতরাং ঘাবড়াবার কিছুই নেই। জান্নাত তোমাদের জন্যে এবং তোমরা জান্নাতের জন্যে।” (ইমাম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এটা গারীব হাদীস) সূরা হজ্বের শুরুতে এরকম হাদীস সমূহের বর্ণনা গত হয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ দিনের ভয়াবহতার কারণে আকাশও বিদীর্ণ হয়ে যাবে। কেউ কেউ (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি আল্লাহর দিকে ফিরিয়েছেন। কিন্তু এটা সবল নয়। কেননা এখানে তাঁর যিকিরই নেই।মহান আল্লাহ বলেনঃ ঐদিনের ওয়াদা নিশ্চিতরূপে সত্য। ওটা সংঘটিত হবেই। ঐ দিনের আগমনে কোন সন্দেহই নেই।

আল-মুযযাম্মিল 73:16

১০-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কাফিরদের বিদ্রুপাত্মক কথার উপর ধৈর্য ধারণের হিদায়াত করছেন এবং বলছেনঃ তাদেরকে কোন তিরস্কার ধমক ছাড়াই তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। আমি স্বয়ং তাদেরকে দেখে নিবো। আমার গজব ও ক্রোধের সময় দেখবো কি করে তারা মুক্তি পেতে পারে। তাদের মধ্যে যারা সম্পদশালী ও স্বচ্ছল লোক, যারা তোমাকে নানা প্রকারে কষ্ট দিচ্ছে, যাদের উপর দ্বিগুণ প্রাপ্য রয়েছে, এক জানের আর এক মালের, আর তারা কোনটাই আদায় করছে না, তাদের সাথে তুমি সম্পর্ক ছিন্ন করে দাও, তারপর দেখে নিয়ো, আমি তাদের সাথে কি ব্যবহার করি। অল্প দিন তারা দুনিয়ায় ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকুক, পরিণামে তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে পতিত হবে। কেমন আযাব? এমন কঠিন আযাব যে, তাদেরকে শৃংখল পরিয়ে জাহান্নামের প্রজ্বলিত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে। আর তাদেরকে এমন খাদ্য খেতে দেয়া হবে যা কণ্ঠ নালীতে আটকে যাবে। নীচেও নামবে না এবং উপরেও উঠবে না। আরো নানা প্রকারের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে দেয়া হবে। এমন এক সময়ও হবে যখন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে। পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হয়ে যাবে। যে বালুকারাশিকে বাতাস এদিক-ওদিক উড়িয়ে নিয়ে যাবে। কারো কোন নাম-নিশানাও বাকী থাকবে না। যমীন এক সমতল ভূমিতে পরিণত হবে, যেখানে কোন উঁচু-নীচু পরিলক্ষিত হবে না। এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ হে লোক সকল এবং বিশেষ করে হে কাফিরদের দল! আমি তোমাদের নিকট তোমাদের জন্যে সাক্ষী স্বরূপ এক রাসূল (সঃ) পাঠিয়েছি, যে রাসূল সত্যবাদী ও সত্যায়িত, যেমন আমি ফিরাউনের নিকট আমার আহকাম পৌঁছাবার জন্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরাউন যখন তাকে অমান্য করলো তখন আমি তাকে কিরূপ কঠিন শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম তা তো তোমাদের জানা আছে। সুতরাং আমার এই নবী (সঃ)-কে যদি তোমরা অমান্য কর তবে তোমাদেরও পরিণাম ভাল হবে না। তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং তোমাদেরকে তচনচ করে দেয়া হবে। কেন না এই রাসূল (সঃ) সমস্ত রাসূলের নেতা। সুতরাং তাকে অমান্য করার শাস্তিও হবে অন্যান্য শাস্তি অপেক্ষা বড়। এর পরবর্তী আয়াতের দু’টি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হলোঃ যদি তোমরা কুফরী কর তবে বল তো ঐ দিনের শাস্তি হতে তোমরা কিরূপে মুক্তি পেতে পার যে দিনের ভয়াবহতা কিশোরকে বৃদ্ধে পরিণত করবে? দ্বিতীয় অর্থ হলোঃ তোমরা যদি এতো বড় ভয়াবহ দিনকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস কর তবে তোমরা, তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় কিরূপে লাভ করতে পার? এই উভয় অর্থই উত্তম হলেও প্রথম অর্থটিই বেশী উত্তম! এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এটা হলো কিয়ামতের দিন যেই দিন আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বলবেনঃ ‘উঠো এবং তোমার সন্তানদের মধ্য হতে জাহান্নামীদেরকে পৃথক কর।' তখন হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কতজনের মধ্য হতে কতজন? আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ প্রতি হাজারের মধ্য হতে নয়শ নিরানব্বই জনকে।' এ কথা শুনে মুসলমানদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও তাদের চেহারা দেখে তা বুঝে নিলেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে সান্ত্বনার সুরে বললেনঃ জেনে রেখো যে, হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান অনেক। ইয়াজুজ ও মাজুজও হযরত আদম (আঃ)-এরই সন্তান। তারা এক একজন নিজের পিছনে এক হাজার করে সন্তান ছেড়ে যায়। সুতরাং তারা এবং তাদের মত লোক মিলে এই সংখ্যা দাঁড়াবে। সুতরাং ঘাবড়াবার কিছুই নেই। জান্নাত তোমাদের জন্যে এবং তোমরা জান্নাতের জন্যে।” (ইমাম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এটা গারীব হাদীস) সূরা হজ্বের শুরুতে এরকম হাদীস সমূহের বর্ণনা গত হয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ দিনের ভয়াবহতার কারণে আকাশও বিদীর্ণ হয়ে যাবে। কেউ কেউ (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি আল্লাহর দিকে ফিরিয়েছেন। কিন্তু এটা সবল নয়। কেননা এখানে তাঁর যিকিরই নেই।মহান আল্লাহ বলেনঃ ঐদিনের ওয়াদা নিশ্চিতরূপে সত্য। ওটা সংঘটিত হবেই। ঐ দিনের আগমনে কোন সন্দেহই নেই।

আল-মুযযাম্মিল 73:17

১০-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কাফিরদের বিদ্রুপাত্মক কথার উপর ধৈর্য ধারণের হিদায়াত করছেন এবং বলছেনঃ তাদেরকে কোন তিরস্কার ধমক ছাড়াই তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। আমি স্বয়ং তাদেরকে দেখে নিবো। আমার গজব ও ক্রোধের সময় দেখবো কি করে তারা মুক্তি পেতে পারে। তাদের মধ্যে যারা সম্পদশালী ও স্বচ্ছল লোক, যারা তোমাকে নানা প্রকারে কষ্ট দিচ্ছে, যাদের উপর দ্বিগুণ প্রাপ্য রয়েছে, এক জানের আর এক মালের, আর তারা কোনটাই আদায় করছে না, তাদের সাথে তুমি সম্পর্ক ছিন্ন করে দাও, তারপর দেখে নিয়ো, আমি তাদের সাথে কি ব্যবহার করি। অল্প দিন তারা দুনিয়ায় ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকুক, পরিণামে তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে পতিত হবে। কেমন আযাব? এমন কঠিন আযাব যে, তাদেরকে শৃংখল পরিয়ে জাহান্নামের প্রজ্বলিত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে। আর তাদেরকে এমন খাদ্য খেতে দেয়া হবে যা কণ্ঠ নালীতে আটকে যাবে। নীচেও নামবে না এবং উপরেও উঠবে না। আরো নানা প্রকারের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে দেয়া হবে। এমন এক সময়ও হবে যখন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে। পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হয়ে যাবে। যে বালুকারাশিকে বাতাস এদিক-ওদিক উড়িয়ে নিয়ে যাবে। কারো কোন নাম-নিশানাও বাকী থাকবে না। যমীন এক সমতল ভূমিতে পরিণত হবে, যেখানে কোন উঁচু-নীচু পরিলক্ষিত হবে না। এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ হে লোক সকল এবং বিশেষ করে হে কাফিরদের দল! আমি তোমাদের নিকট তোমাদের জন্যে সাক্ষী স্বরূপ এক রাসূল (সঃ) পাঠিয়েছি, যে রাসূল সত্যবাদী ও সত্যায়িত, যেমন আমি ফিরাউনের নিকট আমার আহকাম পৌঁছাবার জন্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরাউন যখন তাকে অমান্য করলো তখন আমি তাকে কিরূপ কঠিন শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম তা তো তোমাদের জানা আছে। সুতরাং আমার এই নবী (সঃ)-কে যদি তোমরা অমান্য কর তবে তোমাদেরও পরিণাম ভাল হবে না। তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং তোমাদেরকে তচনচ করে দেয়া হবে। কেন না এই রাসূল (সঃ) সমস্ত রাসূলের নেতা। সুতরাং তাকে অমান্য করার শাস্তিও হবে অন্যান্য শাস্তি অপেক্ষা বড়। এর পরবর্তী আয়াতের দু’টি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হলোঃ যদি তোমরা কুফরী কর তবে বল তো ঐ দিনের শাস্তি হতে তোমরা কিরূপে মুক্তি পেতে পার যে দিনের ভয়াবহতা কিশোরকে বৃদ্ধে পরিণত করবে? দ্বিতীয় অর্থ হলোঃ তোমরা যদি এতো বড় ভয়াবহ দিনকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস কর তবে তোমরা, তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় কিরূপে লাভ করতে পার? এই উভয় অর্থই উত্তম হলেও প্রথম অর্থটিই বেশী উত্তম! এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এটা হলো কিয়ামতের দিন যেই দিন আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বলবেনঃ ‘উঠো এবং তোমার সন্তানদের মধ্য হতে জাহান্নামীদেরকে পৃথক কর।' তখন হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কতজনের মধ্য হতে কতজন? আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ প্রতি হাজারের মধ্য হতে নয়শ নিরানব্বই জনকে।' এ কথা শুনে মুসলমানদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও তাদের চেহারা দেখে তা বুঝে নিলেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে সান্ত্বনার সুরে বললেনঃ জেনে রেখো যে, হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান অনেক। ইয়াজুজ ও মাজুজও হযরত আদম (আঃ)-এরই সন্তান। তারা এক একজন নিজের পিছনে এক হাজার করে সন্তান ছেড়ে যায়। সুতরাং তারা এবং তাদের মত লোক মিলে এই সংখ্যা দাঁড়াবে। সুতরাং ঘাবড়াবার কিছুই নেই। জান্নাত তোমাদের জন্যে এবং তোমরা জান্নাতের জন্যে।” (ইমাম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এটা গারীব হাদীস) সূরা হজ্বের শুরুতে এরকম হাদীস সমূহের বর্ণনা গত হয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ দিনের ভয়াবহতার কারণে আকাশও বিদীর্ণ হয়ে যাবে। কেউ কেউ (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি আল্লাহর দিকে ফিরিয়েছেন। কিন্তু এটা সবল নয়। কেননা এখানে তাঁর যিকিরই নেই।মহান আল্লাহ বলেনঃ ঐদিনের ওয়াদা নিশ্চিতরূপে সত্য। ওটা সংঘটিত হবেই। ঐ দিনের আগমনে কোন সন্দেহই নেই।

আল-মুযযাম্মিল 73:18

১০-১৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে কাফিরদের বিদ্রুপাত্মক কথার উপর ধৈর্য ধারণের হিদায়াত করছেন এবং বলছেনঃ তাদেরকে কোন তিরস্কার ধমক ছাড়াই তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। আমি স্বয়ং তাদেরকে দেখে নিবো। আমার গজব ও ক্রোধের সময় দেখবো কি করে তারা মুক্তি পেতে পারে। তাদের মধ্যে যারা সম্পদশালী ও স্বচ্ছল লোক, যারা তোমাকে নানা প্রকারে কষ্ট দিচ্ছে, যাদের উপর দ্বিগুণ প্রাপ্য রয়েছে, এক জানের আর এক মালের, আর তারা কোনটাই আদায় করছে না, তাদের সাথে তুমি সম্পর্ক ছিন্ন করে দাও, তারপর দেখে নিয়ো, আমি তাদের সাথে কি ব্যবহার করি। অল্প দিন তারা দুনিয়ায় ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকুক, পরিণামে তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে পতিত হবে। কেমন আযাব? এমন কঠিন আযাব যে, তাদেরকে শৃংখল পরিয়ে জাহান্নামের প্রজ্বলিত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে। আর তাদেরকে এমন খাদ্য খেতে দেয়া হবে যা কণ্ঠ নালীতে আটকে যাবে। নীচেও নামবে না এবং উপরেও উঠবে না। আরো নানা প্রকারের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে দেয়া হবে। এমন এক সময়ও হবে যখন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে। পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হয়ে যাবে। যে বালুকারাশিকে বাতাস এদিক-ওদিক উড়িয়ে নিয়ে যাবে। কারো কোন নাম-নিশানাও বাকী থাকবে না। যমীন এক সমতল ভূমিতে পরিণত হবে, যেখানে কোন উঁচু-নীচু পরিলক্ষিত হবে না। এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ বলেনঃ হে লোক সকল এবং বিশেষ করে হে কাফিরদের দল! আমি তোমাদের নিকট তোমাদের জন্যে সাক্ষী স্বরূপ এক রাসূল (সঃ) পাঠিয়েছি, যে রাসূল সত্যবাদী ও সত্যায়িত, যেমন আমি ফিরাউনের নিকট আমার আহকাম পৌঁছাবার জন্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরাউন যখন তাকে অমান্য করলো তখন আমি তাকে কিরূপ কঠিন শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম তা তো তোমাদের জানা আছে। সুতরাং আমার এই নবী (সঃ)-কে যদি তোমরা অমান্য কর তবে তোমাদেরও পরিণাম ভাল হবে না। তোমাদের উপরও আল্লাহর আযাব এসে পড়বে এবং তোমাদেরকে তচনচ করে দেয়া হবে। কেন না এই রাসূল (সঃ) সমস্ত রাসূলের নেতা। সুতরাং তাকে অমান্য করার শাস্তিও হবে অন্যান্য শাস্তি অপেক্ষা বড়। এর পরবর্তী আয়াতের দু’টি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হলোঃ যদি তোমরা কুফরী কর তবে বল তো ঐ দিনের শাস্তি হতে তোমরা কিরূপে মুক্তি পেতে পার যে দিনের ভয়াবহতা কিশোরকে বৃদ্ধে পরিণত করবে? দ্বিতীয় অর্থ হলোঃ তোমরা যদি এতো বড় ভয়াবহ দিনকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস কর তবে তোমরা, তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় কিরূপে লাভ করতে পার? এই উভয় অর্থই উত্তম হলেও প্রথম অর্থটিই বেশী উত্তম! এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এটা হলো কিয়ামতের দিন যেই দিন আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম (আঃ)-কে বলবেনঃ ‘উঠো এবং তোমার সন্তানদের মধ্য হতে জাহান্নামীদেরকে পৃথক কর।' তখন হযরত আদম (আঃ) বলবেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! কতজনের মধ্য হতে কতজন? আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ প্রতি হাজারের মধ্য হতে নয়শ নিরানব্বই জনকে।' এ কথা শুনে মুসলমানদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল এবং তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও তাদের চেহারা দেখে তা বুঝে নিলেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে সান্ত্বনার সুরে বললেনঃ জেনে রেখো যে, হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান অনেক। ইয়াজুজ ও মাজুজও হযরত আদম (আঃ)-এরই সন্তান। তারা এক একজন নিজের পিছনে এক হাজার করে সন্তান ছেড়ে যায়। সুতরাং তারা এবং তাদের মত লোক মিলে এই সংখ্যা দাঁড়াবে। সুতরাং ঘাবড়াবার কিছুই নেই। জান্নাত তোমাদের জন্যে এবং তোমরা জান্নাতের জন্যে।” (ইমাম তিবরানী (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এটা গারীব হাদীস) সূরা হজ্বের শুরুতে এরকম হাদীস সমূহের বর্ণনা গত হয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ঐ দিনের ভয়াবহতার কারণে আকাশও বিদীর্ণ হয়ে যাবে। কেউ কেউ (আরবি)-এর (আরবি) সর্বনামটি আল্লাহর দিকে ফিরিয়েছেন। কিন্তু এটা সবল নয়। কেননা এখানে তাঁর যিকিরই নেই।মহান আল্লাহ বলেনঃ ঐদিনের ওয়াদা নিশ্চিতরূপে সত্য। ওটা সংঘটিত হবেই। ঐ দিনের আগমনে কোন সন্দেহই নেই।